সাংস্কৃতিক যুদ্ধের গ্রাসে বাংলাদেশ

ফিরোজ মাহবুব কামাল 

লক্ষ্যঃ ইসলাম থেকে দূরে সরানো 

ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধটি নিছক সামরিক বা রাজনৈতিক নয়। অস্ত্রের লড়াই এক সময় শেষ হয়, কিন্তু সহজে শেষ হয় না সাংস্কৃতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আঘাত হানা হয় ব্যক্তির ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার সামর্থ্যে। তাই ঈমানদারকে শুধু সীমান্তে যুদ্ধ লড়ার সামর্থ্য থাকলে চলে না, সে সামর্থ্য থাকতে হয় সাংস্কৃতিক অঙ্গণেও। সাংস্কৃতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে লড়াইয়ের মূল হাতিয়ার হলো কোর’আনের জ্ঞান। “জাহিদু বিল কোর’আন” অর্থঃ “কোর’আন দিয়ে জিহাদ করো” বলে কোর’আনের জ্ঞানের অপরিসীম গুরুত্বটি বোঝানো হয়েছে। এখন সে যুদ্ধটি প্রবল ভাবে হচ্ছে প্রতিটি মুসলিম দেশের সাংস্কৃতিক ময়দানে। এখানে কাজ করে শিক্ষা, সাহিত্য, মিডিয়া, সঙ্গিত এবং নানারূপ সামাজিক উৎসব ও অনুষ্ঠান। শত্রুর সামরিক অধিকৃতি এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধকে আরো তীব্রতর করে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে সবচেয়ে বড়  কুফলটি হয়েছে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। মুসলিম দেশগুলিতে শত্রুর সামরিক অধিকৃতি শেষ হয়েছে, কিন্তু শেষ হয়নি সাংস্কৃতিক অধিকৃতি ও যুদ্ধ। এমন একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধের ক্ষেত্র হচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের রণাঙ্গনে ইসলামের শত্রু পক্ষটি অতি-উৎসাহী সহযোদ্ধা পেয়েছে দেশটির বিপুল সংখ্যক সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক ক্যাডার, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী, লেখক-সাংবাদিক, আইনজীবী, বিচারপতিসহ বহু সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের শিবির থেকে।

ঈমানদারের কাছ অতি কাম্য এবং সেসাথে দায়বদ্ধতা হলো আগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই ও শাহাদত। এমন চেতনা এবং এমন জিহাদী সংস্কৃতির বলেই এক কালের মুসলমানেরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছিল। এ যুগেও আফগানিস্তানে তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ও বিশ্বশক্তি  রাশিয়াকে পরাজিত করেছে। এবং এখন গলা চেপে ধরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। আফগান মোজাহিদদের জিহাদ পাল্টে দিচ্ছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ। কামান, বোমা ও যুদ্ধবিমানের বলে গণহত্যা চালানো যায়। নগর-বন্দরও ধ্বংস করা যায়। কিন্তু সে কামানে বা গোলায় কি দর্শন ও সংস্কৃতির বিনাশও সম্ভব? বরং তাদের আগ্রাসন ও গণহত্যায় প্রতিরোধের সে দর্শন ও সংস্কৃতিই দিন দিন আরো বলবান হচ্ছে। কোন মার্কিনী সৈন্যকে রণাঙ্গণে রাখতে মাথাপিছু খরচ হয় প্রায় ১০ লাখ ডলার। অথচ মুসলমানরা হাজির হচ্ছে নিজ খরচে। তারা শুধু স্বেচ্ছাই অর্থই দিচ্ছে না, প্রাণও দিচ্ছে।

 অবস্থা বেগতিক দেখে পাশ্চাত্য এখন ভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়েছে। সেটি শুধু গণহত্যা নয়। নিছক নগর-বন্দর, ঘরবাড়ী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনাশও  নয়। বরং সেটি ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি ধ্বংসের। তাই শুরু করেছে প্রকান্ড আকারের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। নতুন এ স্ট্রাটেজীর আলোকে মানব হত্যার পাশাপাশি ঈমান হত্যাতে তৎপর হয়েছে। এবং সেটি শুধু অধিকৃত দেশগুলিতে সীমিত নয়। বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশ এখন একই রূপ সাংস্কৃতিক যুদ্ধের শিকার। তবে বাংলাদেশ তাদের অন্যতম টার্গেট হওয়ার কারণ, দেশটিতে ১৬ কোটি মুসলিমের বসবাস। তেল, গ্যাস বা অন্য কোন খনিজ সম্পদের চেয়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার বিষয়টিই তাদের কাছে অধীক গুরুত্বপূর্ণ। তেল, গ্যাস লড়াকু সৈনিক বা বোমায় পরিণত হয়না, কিন্তু মানুষ হয়। তাই বাংলাদেশীরা না চাইলেও তাদের এ আগ্রাসনের টার্গেট হওযা থেকে বাঁচার উপার নাই। শত্রুর লক্ষ্য এখন মুসলমানদের ঈমানকে হত্যা করা। তাদের সে আক্রমণের ফলে সংকটে পড়েছে শুধু পার্থিব জীবনই নয়, আখেরাতের জীবনও। কারণ এ যুদ্ধে পরাজিত হলে বাংলাদেশীগণ দেহ নিয়ে বাঁচলেও তাদের পক্ষে অসম্ভব হবে ঈমান নিয়ে বাঁচবে।

 

 লক্ষ্যঃ জিহাদের বিলুপ্তি

কোন দেশকে সামরিক ভাবে অধিকৃত রাখার খরচটি বিশাল। হাজার হাজার বিলিয়ন ডলার খরচ করেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকে সফলতা পায়নি। য তার মিত্রদের স্ট্রাটেজী তাই  মুসলমিনদের জীবন থেকে জিহাদের সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা। এবং ভূলিয়ে দেয়া ইসলামি মৌল শিক্ষাকে। তেমন এক স্ট্রাটেজী নিয়ে ব্রিটিশগণ দীর্ঘকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত ভারতের মাদ্রাসাগুলি বিলুপ্ত করেছিল এবং প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল নিজেদের পছন্দের সিলেবাস নিয়ে আলিয়া মাদ্রাসা। ধর্ম-শিক্ষার ছ্দ্দবেশে এভাবে মুসলিমদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করেছিল জিহাদের ন্যায় ইসলামের মূল বিধানকে। ফলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তাদের ১৯০ বছরের শাসন। ইসলামে বিরুদ্ধে সে অভিন্ন স্ট্রাটেজী কার্যকর রয়েছে বাংলাদেশেও। এখন সে কাজে বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে জনগণের নিজ অর্থে প্রতিষ্ঠিত হাজার হাজার স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়। অধিকৃত দেশের মিডিয়াও। শুরু হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক মিথ্যা-প্রপাগান্ডা। তাদের কথা, ইসলাম এ যুগে অচল। যেন পবিত্র কোর’আন নাযিল হয়েছিল শুধু নবীজী (সাঃ)র জামানার লোকদের জন্য। এরাই শরিয়তী আইনকে মানবতা বিরোধী বলছে। তারা প্রবল প্রতিপক্ষ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও। ইসলাম বিরোধী সে প্রপাগান্ডাকে ব্যাপকতর করতে বহু টিভি চ্যানেল, অসংখ্য পত্র-পত্রিকার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছে হাজার হাজার এনজিও। এদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা হলো, নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলামকে জনগণের মন থেকে ভূলিয়ে দেওয়া। অথচ ইসলাম থেকে নামায-রোযাকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি আলাদা করা যায় না ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদকেও। পবিত্র কোরআনে জিহাদে অংশ নেওয়ার নির্দেশ এসেছে বার বার। সে সব জিহাদে অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। নবীজী (সাঃ) নিজে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ লড়েছেন বহুবার। ইসলামের বহু শত্রুকে হত্যা এবং বনু কুরাইজা ও বনু নাযির ন্যায় ইহুদী বস্তিকে নির্মূল করা হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। অথচ নবীজী (সাঃ)র সে আপোষহীন নীতি ও ইসলামের সে সংগ্রামী ইতিহাসকে তারা সুপরিকল্পিত ভাবে আড়াল করতে চায়। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বাইরেও শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও আইন-আদলতের সংস্কারে ঈমানদারের যে গুরুতর দায়ভার রয়েছে সেটিকেও ভূলিয়ে দিতে চায়।

শত্রুপক্ষের মূল লক্ষ্য, মহান আল্লাহর কোর’আনী নির্দেশের বিরুদ্ধে মুসলিমদেরকে বিদ্রোহী করা। বাংলাদেশী মুসলিমদের জন্য বিপদের বড় কারণ, শত্রু শক্তির এরূপ হামলার মুখে দেশটির ভৌগলিক সীমান্তের ন্যায় সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্ত আজ অরক্ষিত। অথচ মুসলমানদের দায়িত্ব শুধু দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়। বরং অতিগুরুত্বপূর্ণ হলো, চেতনার রাজ্য পাহারা দেওয়া। এবং সেটি সুস্থ্য ঈমান-আক্বিদা ও ইসলামি সংস্কৃতি গড়ে তোলার স্বার্থে। সীমান্ত পাহারায় অবহেলা হলে অনিবার্য হয় পরাজয় ও গোলামী। তখন বিপন্ন হয় জনগণের জানমাল ও ইজ্জত-আবরু। যেমনটি ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে হয়েছিল। সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয় একাকী আসে না। আসে অর্থনৈতিক দুর্গতি,আসে দুর্ভিক্ষ। ইংরেজদের হাতে পরাজয়ের ফলেই মুসলমানদের জীবনে নেমে এসেছিল ছিয়াত্তরের মনত্ত্বর। সে দুর্ভিক্ষে বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা গিয়েছিল, যার অধিকাংশই ছিল মুসলিম। ১৯৭১’য়ে ভারতীয়দের হাতে অধিকৃত হওয়ায় নেমে এসেছিল ১৯৭৪’য়ের দুর্ভিক্ষ। এর চেয়েও ভয়াবহ পরিণতি অনিবার্য হয়ে উঠে সাংস্কৃতিক যুদ্ধে পরাজিত হলে। তখন অসম্ভব হয় সুস্থ্য ঈমান-আক্বিদা নিয়ে বাঁচা। ঈমান-আক্বিদা নিয়ে বাঁচা অসম্ভব হলে পণ্ড হয় সমগ্র জীবনের বাঁচাটাই। সেরূপ বাঁচাতে যা অনিবার্য হয় তা হলো জাহান্নামের আযাব। তাই শুধু ভৌগলিক সীমান্তকে সুরক্ষা দিলে চলে না। সুরক্ষিত করতে হয় ঈমান-আক্বিদার সীমান্তকেও।

 

সবচেয়ে বিনাশী হামলাটি চেতনার ভূমিতে

শয়তানী শক্তির সবচেয়ে বিনাশী হামলাটি হয় চেতনার ভূমিতে। এটি অধিকৃত হলে দেশ দখল অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। প্রতিটি ঈমানদারকে তাই সে হামলার বিরুদ্ধে লাগাতর জিহাদ করতে হয়। সশস্ত্র যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে অন্ধ-বধির বা পঙ্গু ব্যক্তির নিষ্কৃতি আছে। কিন্তু চেতনার মানচিত্র বাঁচাতে শয়তানী শক্তির আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক হামলার বিরুদ্ধে যে লাগাতর জিহাদ -তা থেকে সামান্য ক্ষণের নিষ্কৃতি নেই। চেতনার ভূমিতে যে জিহাদ নবীজী (সাঃ) সেটিকে ‌জিহাদে আকবর বা শ্রেষ্ঠ জিহাদ বলা হয়েছে। রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষেত্রে জিহাদ আসে তার পরে। বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের আগে তেরটি বছর ধরে এ জিহাদ লাগাতর চলেছে মক্কায়। তবে মুসলমানের চেতনা-রাজ্যের ময়দানকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থে অপরিহার্য হলো মুসলিম ভূমির ভৌগলিক মানিচিত্রকে সুরক্ষিত করা।

 শুধু ঘরবাঁধা, চাষাবাদ করা, কলকারখানা গড়া বা নগর-বন্দর নির্মাণই একটি জনগোষ্টির বেঁচে থাকার জন্য সবকিছু নয়। পনাহারে জীবন বাঁচে বটে, তাতে ঈমান বাঁচে না। এরূপ বাঁচায় সিরাতুল মোস্তাকিমও জোটে না। তখন যা জুটে তা হলো পথভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতায় বিপদাপন্ন হয় আখেরাতের জীবন। ইহকাল ও পরকাল বাঁচাতে এজন্যই একজন চিন্তাশীল মানুষকে বেড়ে উঠতে হয় জীবন-বিধান, মূল্যবোধ, জীবন ও জগত নিয়ে একটি সঠিক ধারণা নিয়ে। মুসলমানের কাছে সে জীবন-বিধান হলো ইসলাম। আর নিত্য দিনের বাঁচবার সে প্রক্রিয়া হলো ইসলামী সংস্কৃতি।

নামায-রোযা, হজ-যাকাত এবং জিহাদ হলো একজন ঈমানদারের ইবাদতের প্রক্রিয়া। আর সংস্কৃতি হলো এ জগতে বাঁচবার বা জীবনধারনের প্রক্রিয়া। ইসলামি পরিভাষায় এ প্রক্রিয়া হলো তাহজিব। আরবী ভাষায় তাহজিবের অর্থ হলো,ব্যক্তির কর্ম,রুচী, আচার-আচারণ, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সার্বিক জীবন যাপনের প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধি করণের প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ রিফাইনড হয় তথা সুন্দরতম হয়। দিন দিন সুন্দরতম হয় তার রুচীবোধ, আচার-আচরণ, কাজকর্ম ও চরিত্র। তাই মুসলমানের ইবাদত ও সংস্কৃতি -এ দুটোকে পৃথক করা যায় না। উভয়ের মধ্যেই প্রকাশ পায় আল্লাহতায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া গভীর প্রেরণা ও প্রচেষ্টা। পাখি যেমন তার দুটো ডানার একটিকে হারালে উড়তে পারে না, ঈমানদারও তেমনি আল্লাহর ইবাদত ও ইসলামী সংস্কৃতিও একটি হারালে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠতে পারে না। তাই মুসলিমগণ যেখানে রাষ্ট্র গড়েছে সেখানে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসাই গড়েনি, ইসলামি সংস্কৃতিও গড়েছে। একটির পরিশুদ্ধি ও শক্তি আসে অপরটি থেকে। মোমেনের মূল্যবোধ, রুচীবোধ, পানাহার, পোষাকপরিচ্ছদ, অপরের প্রতি ভালবাসার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তার আল্লাহভীরুতা। ঈমানদার ব্যক্তি অন্যের কল্যাণে সচেষ্ট হয় স্বার্থ চেতনায় নয়, বরং আল্লাহর কাছে প্রিয়তর হওয়ার চেতনায়। এ হলো তার সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতি থেকে সে পায় ইবাদতের স্পিরিট। ঈমানদারে চিন্তুা ও কর্মে এভাবেই আসে পবিত্রতা -যা একজন কাফের বা মোনাফিকের জীবনে কল্পনাও করা যায় না। মুসলিম সমাজে এভাবেই আসে শান্তি, শৃঙ্খলা ও শ্লিলতা। অথচ সেক্যুলার সমাজে সেটি আসে না। সেক্যুলার সমাজে যেটি প্রবলতর হয় সেটি পার্থিব স্বার্থ হাসিলের প্রেরণা। জীবনের উপভোগের তাড়নায় মানুষ এখানে স্বেচ্ছাচারি হয়। সে স্বেচ্ছাচারকে তারা ব্যক্তি-স্বাধীনতার লেবাস পড়িয়ে জায়েজ করে নিতে চায়। সেক্যুলার সমাজে পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, সমকামিতা, অশ্লিলতা, মদ্যপাণের ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বৈধ্যতা পায় তো জীবন উপভোগের এমন স্বেচ্ছাচারি প্রেরণা থেকেই। ফলে সেক্যুলারিজম যেখানে প্রবলতর হয় সেখানে পাপাচারেও প্লাবন আসে।

 

প্রেরণা সংস্কৃতি থেকে

ঈমানদার মাত্রই ইবাদতে প্রেরণা পায় তার সংস্কৃতি থেকে। ফলে স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসায় না গিয়েও মুসলিম সমাজে বসবাসকারি যুবক তাই মসজিদে যায়,নামায পড়ে,রোযা রাখে এবং মানুষের কল্যাণ সাধ্যমত চেষ্টাও করে। সীমান্তের প্রতিরক্ষায় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ময়দানেও হাজির হয়। একাজে শুধু শ্রম-সময়-মেধা নয়, জানমালের কোরবানীও দেয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসার ডিগ্রিধারি না হয়েও নিজেকে বাঁচায় বেপর্দা, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা,চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস-কর্ম ও নানা বিধ পাপাচার থেকে। প্রাথমিক কালের মুসলমানগণ যে মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন সেটি এজন্য নয় যে সেদিন বড় বড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসা ছিল। বরং তখন প্রতিটি ঘর পরিণত হয়েছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান। সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে গড়ে উঠেছিল ইসলামী সংস্কৃতির বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেদিনের মুসলমানেরা উন্নত মানব রূপে বেড়ে উঠতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের আজকের বড় সমস্যা এ নয় যে, দেশগুলি সামরিক ভাবে অধিকৃত। বরং সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং সে সাথে ভয়ানক বিপদের কারণ হলো,দেশগুলির সাংস্কৃতিক সীমান্ত বিলুপ্ত হয়েছে এবং তা অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা। ফলে এদেশগুলিতেও তাই হচ্ছে যা কাফের কবলিত একটি দেশে হয়ে থাকে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিও পরিনত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য রূপে গড়া তোলার ইন্সটিটিউশনে। এর ফলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম সন্তান মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ন্যায় মঙ্গলপ্রদীপ হাতে নিয়ে শোভাযাত্রা করছে। কপালে তীলক পড়ছে, থার্টি ফাষ্ট নাইটে অশ্লিল নাচগানও করছে। এরাই শয়তানের পক্ষে লড়াকু সৈনিক, তাদের  যুদ্ধাংদেহী রূপ শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে।

 ব্যক্তির জীবনে প্রতিটি পাপ, প্রতিটি দুর্বৃত্তি, আল্লাহর হুকুমের প্রতিটি অবাধ্যতাই হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা প্রকাশ পায় বেপর্দা, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা, নাচগান, মদ্যপান, মাদকাশক্তি,সন্ত্রাস, দূর্নীতি ইত্যাদীর ব্যাপক বৃদ্ধিতে। জাতীয় জীবনে সেটি প্রকাশ পায় দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, সূদমূক্ত ব্যাংক ও অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশ আল্লাহর বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহে সমগ্র বিশ্বমাঝে একবার নয়, ৫ বার শিরোপে পেয়েছে। তাদের সে মহাবিদ্রোহটি ঘটেছে আল্লাহর নির্দেশিত সুনীতি প্রতিষ্ঠার হুকুমের অবাধ্যতা এবং সর্বস্তরে দূর্নীতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এরূপ শিরোপা কি বলে না দেশটির মানুষের জীবনযাত্রার প্রক্রিয়া তথা সংস্কৃতি কতটা অসুস্থ্য ও বিদ্রোহাত্মক? এবং সাংস্কৃতিক যুদ্ধে ইসলামের পক্ষের শক্তি কতটা পরাজিত?

 

সংস্কৃতি দর্শন থেকে

ব্যক্তির সংস্কৃতির পরিচয় মেলে পোষাক-পরিচ্ছদ বা পানাহার থেকে নয়। বরং কীরূপ দর্শন বা চেতনা নিয়ে সে বাঁচলো তা থেকে। সংস্কৃতির মূল উপাদান হলো এই দর্শন। বস্তুত দর্শনই মানুষকে পশু থেকে পৃথক করে। নাচগান তো পশুপাখিও করে। কিন্তু তাতে কোন দর্শন থাকে না। তাই পশুপাখির নাচে-গানে কোন সমাজই সভ্যতর হয় না,সেখানে সভ্যতাও নির্মিত হয় না। তাই যে সমাজের সংস্কৃতি যতটা দর্শন-শূন্য, সমাজ ততটাই মানবতা বর্জিত। সে সমাজ তখন ধাবিত হয় পশুত্বের দিকে। দর্শনই নির্ধারণ করে দেয় কে কীভাবে বাঁচবে, কীভাবে পানাহার করবে, কীভাবে জীবন যাপন করবে বা উৎসব করবে সেটি। চেতনার এ ভিন্নতার কারণেই একজন পতিতা, ঘুষখোর, সন্ত্রাসী এবং দুর্বৃত্তের বাঁচার ধরণ,পোষাক-পরিচ্ছদ, পানাহার ও উৎসবের ধরণ ঈমানদারের মত হয় না। মুসলমানের সংস্কৃতি এজন্যই অবিশ্বাসী বা কাফেরের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি বিশেষ বিশ্বাস বা দর্শন জন্ম দেয় একটি বিশেষ রুচী ও সে রুচীভিত্তিক অভ্যাস। সে অভ্যাসের কারণেই ব্যক্তি বেড়ে উঠে সে সংস্কৃতির মানুষ রূপে। সংস্কৃতি এভাবেই সমাজে নীরবে কাজ করে। মুসলিম সমাজ থেকে সৎ নামাযী ও রোযাদারের পাশাপাশী আপোষহীন মোজাহিদ বের হয়ে আসে তা তো সংস্কৃতির সে ইন্সটিটিউশন সক্রিয় থাকার কারণেই। যেখানে সেটি নেই, বুঝতে হবে সেখানে সে পূণ্যময় সংস্কৃতিও নাই।

মুসলমানদের শক্তির মূল উৎস তেল-গ্যাস নয়, জনশক্তিও নয়। সে শক্তি হলো কোরআন ভিত্তিক দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতি। এজন্যই শত্রুপক্ষের আগ্রাসনের শিকার শুধু মুসলিম দেশের ভূগোল নয়, বরং মূল টার্গেট হলো ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি। তাই পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ বাংলাদেশের মত দেশে বোমা বা যুদ্ধ বিমান নিয়ে হাজির হয়নি। হাজির হয়েছে সাংস্কৃতিক প্রকল্প নিয়ে। বাংলাদেশের হাজার হাজার এনজিওর উপর দায়িত্ব পড়েছে সে প্রকল্পকে কার্যকর করা। দেশের সংস্কৃতিকে তারা এভাবে ইসলামের শিক্ষা ও দর্শন থেকে মূ্ক্ত করতে চায়। রাস্তায় মাটি কাটা ও তূত গাছ পাহাড়া দেওয়াকে মহিলার ক্ষমতায়ন বলে এসব এনজিওগুলো তাদেরকে বেপর্দা হতে বাধ্য করছে। অপর দিকে মাইক্রোক্রেডিটের নামে সাধারণ মানুষকে সূদ দিতে ও সূদ খেতেও অভ্যস্থ করছে। অথচ সূদ খাওয়া বা সূদ দেওয়া –উভয়ই হলো আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। ডক্টর ইউনুসকে পাশ্চাত্য মহল নোবেল প্রাইজ দিয়েছে। সেটি এজন্য নয় যে, বাংলাদেশ থেকে তিনি দারিদ্র্য নির্মূল করেছেন। বরং দেশে যতই বাড়ছে গ্রামীন ব্যাংক, ব্রাক বা সূদ ভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট এনজিওর শাখা, ততই বাড়ছে দারিদ্র্য। ডক্টর ইউনুস নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন এজন্য যে, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে বিদ্রোহ করতে তিনি অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছেন। এত বড় সাফল্য ইংরেজগণ তাদের ১৯০ বছরের শাসনেও অর্জন করতে পারিনি। ফলে শুধু নোবেল পুরস্কার নয়, এর চেয়ে কোন বড় পুরস্কার থাকলেও তারা তাকে দিত।

ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের মূল এজেন্ডাটি কি সেটি বুঝা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আফগানিস্তান দখল ও সেখানে চলমান কার্যক্রম থেকে। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সেখানে মুসলিম সংস্কৃতির বিনাশে হাত দিয়েছে। আফগানিস্তানের অপরাধ, অতীতে দেশটির জনগণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছে। এবং সেটি কোন জনশক্তি, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক শক্তির বলে নয়, বরং ইসলামি দর্শন ও সে দর্শন-নির্ভর আপোষহীন জিহাদী সংস্কৃতির কারণে। সে অভিন্ন দর্শন ও দর্শনভিত্তিক সংস্কৃতির বলেই তারা আজ  মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্রদের পরাজিত করতে চলেছে। ফলে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সে দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতির নির্মূলে করতে চায়। এবং সে বিনাশী কর্মের পাশাপাশি বিপুল বিনিয়োগ করছে সেদেশে সেক্যুলার দর্শন ও সেক্যুলার সংস্কৃতির নির্মানে। এটিকে তারা বলছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামোর নির্মান। পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তুলছে অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আফগানিস্তানের শিশুরা এখনও নানা রোগভোগে লাখে লাখে মারা যাচ্ছে। কিন্তু তা থেকে বাঁচানোয় আগ্রহ তাদের নেই, অথচ শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ করছে তাদের নাচগান শেখাতে।

 বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশরের মত দেশে অতীতে একই রূপ স্ট্রাটেজী নিয়ে কাজ করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। এদেশগুলির উপর তাদের দীর্ঘ শাসনমামলে তেমন কোন শিল্প কলকারখানা বা প্রযুক্তি গড়ে না উঠলেও তারা সে সব দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেক্যুলার করেছিল। ফলে এনেছে সাংস্কৃতিক জীবনে প্রচন্ড বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি।

 

ভাবনা নেই আখেরাতের

সেক্যুলারিজমের অভিধানিক অর্থ হলো ইহজাগতিকতা। এখানে ভাবনা নেই আখেরাতের। সেক্যুলারিজমের অর্থ, ব্যক্তি তার কাজ-কর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রেরণা পাবে ইহজাগতিক আনন্দ-উপভোগের তাগিদ থেকে, ধর্ম থেকে নয়। এ উপভোগ বাড়াতেই সে নাচবে, গাইবে, বেপর্দা হবে, অশ্লিল নাটক ও ছায়াছবি দেখবে। মদ্যপান করবে এবং ব্যাভিচারিতেও লিপ্ত হবে। উপার্জন বাড়াতে সে সূদ খাবে এবং ঘুষও খাবে। এগুলো ছাড়া তাদের এ পার্থিব জীবন আনন্দময় হয় কি করে? তাই সেক্যুলারিজম বাড়লে এগুলো বাড়বে অনিবার্য কারণেই। অপর দিকে ধর্মপালনকে বলেছে মৌলবাদী পশ্চাদ-পদতা ও গোঁড়ামী।  

মুসলিম দেশে এমন চেতনা ও এমন সংস্কৃতির বৃদ্ধি পেলে জনগণের মন থেকে আল্লাহতায়ালার ভয়ই বিলুপ্ত হয়। মুসলমানগণ তখন ভূলে যায় নিজেদের ঈমানী দায়বদ্ধতা। বরং বাড়ে মহান আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রবনতা। ফলে বাংলাদেশ, মিশর, পাকিস্তান বা তুরস্কের মত দেশে আল্লাহর আইন তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন কাফেরকে অস্ত্র ধরতে হয়নি। সেকাজের জন্য বরং মুসলিম নামধারি সেক্যুলারগণই যথেষ্ঠ করিৎকর্মা প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামের জাগরণ ও মুসলিম শক্তির উত্থান রুখার লক্ষ্যে আজও দেশে দেশে পাশ্চত্যের অনুগত দাস গড়ে তোলার এটিই সফল মডেল। মার্কিন দখলদার বাহিনী সেটিরই বাস্তবায়ন করছে আফগানিস্তানে। এ স্ট্রাটেজীক কৌশলটির পারঙ্গমতা নিয়ে ব্রিটিশ শাসকচক্রের মনে কোন রূপ সন্দেহ ছিল না। যেখানে অধিকার জমিয়েছে সেখানেই এরূপ সেক্যুলারদেরকেই সযত্নে গড়ে তুলেছে। তাদের সংখ্যা পর্যাপ্ত সংখ্যায় বাড়াতে যেখানে দেরী হয়েছে সেদেশের স্বাধীনতা দিতেও তারা বিলম্ব করেছে। সে ব্রিটিশ পলিসির পরিচয়টি মেলে মিশরে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিনিধি লর্ড ক্রোমারের লেখা থেকে। তিনি লিথেছেন, “কোন ব্রিটিশ উপনিবেশকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা যতক্ষণ না সে দেশে এমন এক সেক্যুলার শ্রেণী গড়ে না উঠে যারা চিন্তা-চেতনায় হবে ব্রিটিশের অনুরূপ।”

ইসলাম থেকে দূরে সরাতে ব্রিটিশ পলিসি যে কতটা ফলপ্রসু হয়েছে তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের মত সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর প্রশাসন, রাজনীতি, সেনাবাহিনী ও বিচার ব্যবস্থায় সেক্যুলার ব্যক্তিদের প্রবল আধিপত্য দেখে। আজও আইন-আদালতে বহাল তবিয়তে রয়েছে ব্রিটেশের প্রবর্তিত পেনাল কোড। বাংলাদেশের সেক্যুলার সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ মুসলিম দেশের জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত হলে কি হবে, দেশে যারা শরিয়ত বা আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা চায় তাদেরকে তারা শত্রু মনে করে। অপরদিকে বিশ্বস্থ্য আপনজন মনে করে ভিন্ দেশী কাফেরদের। এদের কারণেই মুসলিম দেশে হামিদ কারজাইয়ের মত দাস পেতে ইসলারেম শত্রুপক্ষের কোন বেগ পেতে হয় না।

 ইসলামি দর্শন থেকে দূরে সরানো এবং মগজে সেক্যুলার চেতনার পরিচর্যাকে তীব্রতর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের মত দেশে সেক্যুলার দিন-ক্ষণ গুলিকে ইতিহাস থেকে খুঁজে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিচ্ছে। এরই উদাহরণ, বাংলাদেশের মত দেশে বসন্তবরণ বা নববর্ষের দিন উদযাপন। নবীজীর হাদীস, মুসলমানের জীবনে বছরে মাত্র দুটি উৎসব। একটি ঈদুল ফিতর, এবং অপরটি ঈদুল আদহা বা কোরবানীর ঈদ। বাংলার মুসলমানগণ এ দুটো দিনই এতদিন ধুমধামে উদযাপন করে আসছে। বাংলার মুসলমানদের জীবনে নববর্ষের উৎসব কোন কালেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

 

জীবন নিয়ে একজন মুসলমানের মূল্যায়ন আসে মহান আল্লাহর মূল্যায়ন থেকে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহর নিজস্ব ঘোষণাটি হলো, “তিনিই (মহান আল্লাহতায়ালা) জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন যেন পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।” –(সুরা মুলুক.আয়াত ২)। অর্থাৎ মানুষের জন্য এ পার্থিব জীবন পরীক্ষা-কেন্দ্র মাত্র। পরীক্ষা দিতে বসে কেউ কি নাচগান করে? খেলাধুলা বা উৎসবে যোগ দেয়? নাচগান বা উৎসবের আয়োজন তো পরীক্ষায় মনযোগী হওয়াই অসম্ভব করে তোলে। নবীজীর হাদীস, “পানি যেমন শস্য উৎপাদন করে, গান-বাজনাও তেমনি মুনাফেকি উৎপন্ন করে।” মুনাফেকী তো ইসলামে অঙ্গিকার শূন্যতা, ঈমানের সাথে তার আমলের গড়মিল। তাই প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের হাতে মুসলিমদের শক্তি ও মর্যাদা বেড়েছে, কিন্তু নাচগান বাড়েনি। সংস্কৃতির নামে এগুলো শুরু হলে যেটি বাড়ে তা হলো পথভ্রষ্টতা। তখন সিরাতুল মোস্তাকিমে পথচলাই অসম্ভব হয়ে উঠে। তাই এগুলো শয়তানের স্ট্রাটেজী হতে পারে, কোন মুসলমানের নয়।

 নতুন বছর, নতুন মাস, নতুন দিন নবীজী(সাঃ)’র আমলেও ছিল। কিন্তু তা নিয়ে তিনি নিজে যেমন কোনদিন উৎসব করেননি, সাহাবাগণও করেননি। অথচ তারাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়তে পেরেছিলেন। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাগান এ ব্যাপারে অতিশয় মনযোগী ছিলেন যেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সমাজ বা রাষ্ট্রে এমন কিছুর চর্চা না হয় যাতে সিরাতুল মোস্তাকিমে চলাই অসম্ভব হয়। এবং মনযোগে ছেদ পড়ে ধর্মের পথে পথচলায়। ড্রাইভিং সিটে বসে নাচগানে মত্ত হলে সঠিক ভাবে গাড়ী চালানো যায়? এতে বিচ্যুতি ও বিপদ তো অনিবার্য। অবিকল সেটি ঘটে জীবন চালোনার ক্ষেত্রেও।

 

অপসংস্কৃতির আযাব

নবীজী(সাঃ)’র আমলে সংস্কৃতির নামে আনন্দ উপভোগের প্রতি এত আকর্ষণ ছিল না বলেই সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা তাদের জন্য সহজতর হয়েছিল। বরং তারা জন্ম দিয়েছিলেন মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতির। সে সংস্কৃতির প্রভাবে একজন ভৃত্যও খলিফার সাথে পালাক্রমে উঠের পিঠে চড়েছেন। এবং খলিফা ভৃত্যকে উঠের পিঠে বসিয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এর তুলনা  নেই। অথচ বাংলাদেশকে ঘিরে ধরেছে অপসংস্কৃতির আযাব। সংস্কৃতির নামে বাংলাদেশে আজ কি হচ্ছে? যেমন বাড়ছে গুম-খুনের রাজনীতি, তেমনি বাড়ছে ধর্ষণ। ধর্ষিত হচ্ছে মায়ের সামনে কণ্যা, স্বামীর সামনে স্ত্রী, ভাইয়ের সামনে বোন এবং সন্তানের সামনে মা। ধর্ষণ বাড়ছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ২০১০ সালে এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা নববর্ষের কনসার্টে কি ঘটেছিল? যৌন ক্ষুধায় উদভ্রান্ত হায়েনাগণ কি সেদিন নারীদের উপর ঝাপিয়ে পড়িনি? অসংখ্য নারী কি সেদিন লাঞ্ছিত হয়নি? কিছু কাল আগে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ব্যান্ড সঙ্গীতের আসরে কী ঘটলো? সেদিন ধর্ষিতা হয়েছিল শত শত নারী। এটিই কি বাঙালী সংস্কৃতি? দেশের সেক্যুলার পক্ষ এমন সংস্কৃতির উৎকর্ষতা চায়? এরূপ বর্বরতার বিরুদ্ধে গণবিপ্লব কই?

 

নববর্ষ উদযাপনের নামে নারী-পুরুষদের মুখে উলকি কেটে বা নানান সাজে রাস্তায় নামানোর রীতি কোন মুসলিম সংস্কৃতি নয়। বাঙালীর সংস্কৃতিও নয়। এমনকি বাঙালী হিন্দুদেরও নয়। এতদিন নববর্ষের নামে বাংলায় দোকানে দোকানে বড়জোর কিছু হালখাতার অনুষ্ঠান হতো। কিন্তু কোন কালেই এদিনে কনসার্ট গানের আয়োজন বসেনি। জন্তু-জানোয়ারের প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিলও হয়নি। পাশ্চাত্যেও নববর্ষের দিনে এমন উৎসব দিনভর হয় না। বাংলাদেশে এগুলির এত আগমন ঘটেছে নিছক রাজনৈতিক প্রয়োজনে। যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যে অনেক সময় নতুন প্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্র সৈনিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অনেক সময় তাতে বিজয়ও আসে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে সংস্কৃতির নামে এসব অভিনব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ত্বড়িৎ বিজয়ের লক্ষ্যে। লক্ষ্য, নাচ-গান, কনসার্টের নামে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। পাশ্চাত্যের যুবক-যুবতীদের ধর্ম থেকে দূরে টানার প্রয়োজন নেই। তারা জন্ম থেকেই ধর্ম থেকে দূরে। নাচগান, মদ, অশ্লিলতা, উলঙ্গতা ও ব্যভিচারের মধ্য দিয়েই তাদের বেড়ে উঠা। তাই নববর্ষের নামে তাদের মাঝে এ সবে অভ্যস্থ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেটির প্রয়োজন রয়েছে বাংলাদেশে। সেটি ধর্ম থেকে ও নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরানোর লক্ষ্যে। এসবের চর্চা বাড়াতে কাজ করছে প্রচুর দেশী-বিদেশী এনজিও। এমন অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয়ও হচ্ছে। এবং সে অর্থ আসছে বিদেশীদের ভান্ডার থেকে। নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার পাশপাশি অশ্লিলতারও সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এবং এভাবে বিলুপ্ত করা হচেছ ব্যভিচার ও অশ্লিলতাকে ঘৃণা করার অভ্যাস, -যা পাশ্চাত্যে বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে।

 

 

লক্ষ্যঃ পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সর্বগ্রাসী প্লাবন

শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য মুসলিম দেশেও এরূপ নববর্ষ পালনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ পাশ্চাত্য দেশ বিপুল অংকের অর্থ সাহায্য দিচ্ছে। ইরানী, আফগানী, কিরগিজী ও কুর্দীদের নওরোজ উৎসবের দিনে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা বিশেষ বানীও দিয়েছেন। তবে নববর্ষের নামে বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিনিয়োগের মাত্রাটি আরো বিচিত্র ও ব্যাপক। এখানে বানী নয়, আসছে বিপুল আর্থিক বিনিয়োগ। কারণ, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। আফগানিস্তানের চেয়ে প্রায় ৬ গুণ। জনসংখ্যার ৯০% ভাগ মুসলমান, যাদের আপনজনেররা ছড়িয়ে আছে ব্শ্বিজুড়ে। প্রবাসীদের  সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। ফলে বাংলাদেশে ইসলামের জোয়ার এলে তা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। এ বিশাল জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে সেক্যুলার সংস্কৃতিতে বশ করানো তাদের কাছে তাই অতিগুরুত্বপূর্ণ। তারা চায়, এ পৃথিবীটা একটি মেল্টিং পটে পরিণত হোক। আলু-পটল, পেঁয়াজ-মরিচ যেমন চুলার তাপে কড়াইয়ে একাকার হয়ে যায়, তেমনি বিশ্বের সব সংস্কৃতির মানুষ একক সংস্কৃতির মানুষের পরিণত হোক। এভাবে নির্মিত হোক গ্লোবাল ভিলেজ। আর সে গ্লোবাল ভিলেজের সংস্কৃতি হবে পাশ্চাত্যের সেক্যুলার সংস্কৃতি। এজন্যই বাংলাদেশে নারী-পুরুষকে ভ্যালেন্টাইন ডে, বর্ষপালন, মদ্যপান, অশ্লিল নাচ, পাশ্চাত্য ধাঁচের কনসার্টে অভ্যস্থ করায় এসব এনজিওদের এত আগ্রহ। তারা চায় তাদের সাংস্কৃতিক সীমানা বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের প্রতি বসতঘরের মধ্যেও বিস্তৃত হোক। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সীমানা তাই বিলুপ্তির পথে।

 কিন্তু বিপদের আরো কারণ, এতবড় গুরুতর বিষয় নিয়ে ক’জনের দুশ্চিন্তা? কোন পরিবারে কেউ মৃত্যুশর্যায় পড়লে সে পরিবারে দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। আর এখন শয্যাশায়ী সমগ্র বাংলাদেশ ও তার সংস্কৃতি। অথচ ক’জন আলেম, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও লেখক এ বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। ক’জন মুখ খুলেছেন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন? ১৭৫৭ সাল থেকে বাংলার মুসলমান কি সামান্যতমও সামনে এগিয়েছে? তখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্রিটিশের দখলদারি। অস্তমিত হয়েছিল বাংলার মুসলিমদের স্বাধীনতা। কিন্তু সে পরাধীনতা বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা বিদ্রোহের ধ্বনি ছিল অতি দুর্বল। বরং যে যার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। অথচ শত্রুর হামলার মুখে প্রতিরোধের এ দায়ভার প্রতিটি মুসলমানের। এ কাজ শুধু বেতনভোগী সৈনিকের নয়। বরং সে দায়ভার প্রতিটি নাগরিকের। ইসলামে এটি জিহাদ। মুসলমানদের গৌরব কালে এজন্য কোন সেনানীবাস ছিল না। প্রতিটি গৃহই ছিল সেনানীবাস। প্রতিটি যুদ্ধে মানুষ স্বেচ্ছায় সেখান থেকে নিজ খরচে যুদ্ধে গিয়ে হাজির হয়েছে। এবং সেখানে অর্থ, শ্রম ও রক্ত পেশ করেছে। আজ সেনানীবাসের সংখ্যা বেড়েছে, অথচ শত্রুর হামলার মুখে কোন প্রতিরোধ নেই। ফলে দেশের পর দেশ তাই অধিকৃত। এবং অধিকৃত মুসলিম দেশের সাংস্কৃতিও।

 

সাংস্কৃতিক সীমানা রক্ষার লড়ায়ে পরাজিত হলে পরাজয় অনিবার্য হয় ঈমান-আক্বীদা রক্ষার লড়ায়েও। কারণ, মুসলমানে ঈমান-আক্বীদা কখন অনৈসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠে না। মাছের জন্য যেমন পানি চাই, ঈমান নিয়ে বাঁচার জন্যও তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি সংস্কৃতি চাই। মুসলিমগণ অতীতে তাই শুধু কোরআন পাঠ ও নামায-রোযা আদায় করেনি, ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়ত ও ইসলামি সংস্কৃতিরও প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলিমদের অর্থ, রক্ত, সময় ও সামর্থ্যের সবচেয়ে বেশী ভাগ ব্যয় হয়েছে তো ইসলামি রাষ্ট্র ও শিক্ষা-সংস্কৃতির নির্মানে। নামায-রোযা পালন তো কাফের দেশেও সম্ভব। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যা তথা ইসলামী বিধানের পূর্ণ পালন কি অমুসলিম দেশে সম্ভব? অতীতের ন্যায় আজকের মুসলমানদের উপরও একই দায়ভার। সে দায়ভার শুধু কলম-সৈনিকের নয়, প্রতিটি আলেম, প্রতিটি শিক্ষক, প্রতিটি ছাত্র ও প্রতিটি নাগরিকের উপরও। এ লড়ায়ে তাদেরকেও ময়দানে নেমে আসতে হবে। এ লড়াই হতে হবে কোরআনী জ্ঞানের তরবারী দ্বারা। নবীজী (সাঃ)’র যুগে সেটিই হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমও সেটিই। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামায-রোযার আগে ফরয করা হয়েছে। কিন্তু সে ফরয পালনের আয়োজনই বা কোথায়? অনেকেই জ্ঞানার্জন করছেন নিছক রুটিরুজির তালাশে। ফরয আদায়ের লক্ষে নয়। প্রচন্ড শূণ্যতা ও বিচ্যুতি রয়েছে জ্ঞানার্জনের নিয়তেই। ফলে সে জ্ঞানচর্চায় তাদের রুটি-রুজী জুটছে ঠিকই, কিন্তু সে জ্ঞানার্জনে ফরয আদায় হচ্ছে না। এবং জিহাদের ময়দানে বাড়ছে না লোকবল। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য এটি এক বিপদজনক দিক। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে অরক্ষিত শুধু দেশটির রাজনৈতিক সীমান্তুই নয়, বরং প্রচন্ড ভাবে অরক্ষিত দেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও। দেশ তাই দ্রুত ধেয়ে চলেছে সর্বমুখি পরাজয় ও প্রচন্ড বিপর্যের দিকে। ২২/১০/২০২০

 

 




সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 সভ্যতার সংঘাত ও সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং

ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি এতকাল ব্যবহৃত হয়েছে প্রকৌশল-বিজ্ঞান বুঝাতে। গৃহউন্নয়ন,কলকারখানা¸ রাস্তাঘাট, ব্রিজ, অস্ত্র, যন্ত্র, যানবাহন, কম্পিউটার, স্পেসসায়েন্স ইত্যাদীর উন্নয়নের ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার অবদান অপরিসীম। যান্ত্রিক সভ্যতার বিস্ময়কর উন্নয়নের মূলে বস্তুতঃ এই ইঞ্জিনিয়ারিং। এক্ষেত্রে অগ্রগতির ফলে বিগত একশত বছরে বিজ্ঞান যতটা সামনে এগিয়েছে তা মানব ইতিহাসের বিগত বহু হাজার বছরেও এগুয়নি। সবচেয়ে দ্রুত এগিয়েছে বিগত ৫০ বছরে। বলা যায়, পৃথিবীতে যত বিজ্ঞানী আজ  জীবিত আছে, ইতিহাসের সমগ্র বাঁকি সময়ে হয়তো তার সিকি ভাগও জন্ম নেয়নি। তবে যান্ত্রিক উন্নয়ন বিস্ময়কর গতিতে ঘটলেও চেতনা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও বাঁচবার রুচিবোধে মানুষ সামান্যই সামনে এগিয়েছে। অর্থাৎ মানবিক ও সামাজিক উন্নয়ন সে হারে হয়নি। বরং শঠতা, শোষণ, উলঙ্গতা, অশ্লিলতা, সন্ত্রাস, আগ্রাসন, জাতিভেদ ও বর্ণভেদের ন্যায় বহু অসভ্যতা বেঁচে আছে তার আদিম কদর্যতা নিয়ে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের সীমা-সরহাদ নেই। আলোবাতাসের ন্যায় জ্ঞান-বিজ্ঞানও উদার। ফলে যে দেশে ও যে নগরে বিজ্ঞানের আগমন ঘটে সেখানে একই রূপ সুফল বয়ে আনে। পৃথিবী জুড়ে যান্ত্রিক উন্নয়নে এভাবেই মিল সৃষ্টি হয়। ফলে সব দেশের মটরগাড়ি, রেলগাড়ি, উড়ো জাহাজ ও ডুবো জাহাজ একই ভাবে নির্মিত হয় এবং চিকিৎসা পদ্ধতি, গৃহনির্মান ও সড়ক নির্মাণ পদ্ধতিও একই ধারায় চলে। কিন্তু সে মিলটি মানুষের ধর্ম, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হয়নি। বরং চিন্তা-চেতনা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানচিত্রটি নানা জনে ও নানা জনপদে ভিন্ন ভিন্ন। পাশ্চাত্যের একজন বিজ্ঞানী যেরূপ মদ্যশালায় গিয়ে মদ পান করে বা হিন্দু বিজ্ঞানী যেরূপ শাপশকুন ও মুর্তিকে পুজা দেয়, কোন মুসলিম বিজ্ঞানী সেটি করেনা। ধর্ম, রুচিবোধ ও সংস্কৃতি নিয়ে তাদের ধারণাগুলিও ভিন্ন। আর সে ভিন্নতা থেকেই জন্ম নেয় পরস্পরে ঘৃনা এবং ঘৃনা থেকে শুরু হয় সংঘাত। সে ঘৃনা থেকেই মসজিদ, মসজিদের আযান বা মুসলিম রমনীর হিজাবের ন্যায় মুসলিম সংস্কৃতির বহু কিছুই পাশ্চাত্যের বহু দেশে অসহনীয় হয়ে পড়েছে। সে অসহনীয় চেতনার কারণেই পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে মসজিদের আযান মসজিদের বাইরে আসতে দেয়া হয়না এবং দণ্ডনীয় অপরাধ রূপে ঘোষিত হয় মুসলিম মহিলার হিজাব। ফ্রান্সের ন্যায় পাশ্চাত্য সভ্যতার কেন্দ্রভূমিতে তো সেটিই হয়েছে।

একটি দেশের জনগণ কি ধরণের আইন-আদালতকে গ্রহন করবে -সেটি তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তখন প্রকাশ পায় দেশটির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। নামায-রোযা,হজ-যাকাতের ন্যায় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রতিটি মুসলিম দায়বদ্ধ মহান আল্লাহর কাছে। এখানে কোন বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা চলে না। অথচ সে অধিকার মুসলিম নাগরিকদের দেয়া হচ্ছে না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে আফগানিস্তানের ন্যায় মুসলিম দেশ অধিকৃত হয়েছে, মুসলিম ভূমিতে লাগাতর ড্রোন হামলাও হচ্ছে। এরূপ হামলা কোন একটি বিশেষ দেশে সীমিত নয়, বরং হামলা হচ্ছে বহু মুসলিম দেশের বহু জনপদে। বলা যায়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে নতুন কৌশল নিয়ে। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ৫ বছরের বেশী স্থায়ী হয়নি। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধটির বয়স বিশ বছরের বেশী হলেও শেষ হওয়ার নাম নিচ্ছে না। মার্কিন প্রফেসর হান্টিংটন এটিকে বলেছেন “ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন” তথা সভ্যতার লড়াই। এ সংঘাতে প্রফেসর হান্টিংটন দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দি পক্ষকে সনাক্ত করেছেন,একটি পাশ্চাত্য সভ্যতা এবং অপরটি ইসলামের পক্ষের শক্তি। সভ্যতার সে লড়াইটি শুধু যে সামরিক তা নয়, বরং লাগাতর লড়াইটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক ময়দানেও। মুসলিম উম্মাহর ঈমান ও কোমর ভাঙ্গার এ কাজটি চলছে কোনরূপ গোলাবারুদ ছাড়াই। এ যুদ্ধে মূল হাতিয়ার হলো সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। এবং লক্ষ্য হলো কালচারাল কনভার্শন।

প্রত্যেকেই কোন না কোন ভাবে বেঁচে থাকে ও জীবন কাটায়; বেঁচে থাকার সে প্রক্রিয়াটি হলো তার সংস্কৃতি। সবাই একই ভাবে বাঁচে না, জীবনও কাটায় না। ফলে সবার সংস্কৃতিও এক নয়। সমাজ পাল্টাতে হলে সে সংস্কৃতিও পাল্টাতে হয়। এখানে পরিবর্তনটি শুরু হয় চেতনা থেকে।  ধর্ম,দর্শন ও নীতিবাক্য এখানে ইঞ্জিনের কাজ করে। সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে দর্শন ও ধর্মের ভূমিকা তাই চুড়ান্ত। প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষ যেরূপ জীবজন্তুর সাথে উলঙ্গ ভাবে বনে বাসে করে তার কারণ, সেখানে কোন ধর্ম বা দর্শন কাজ করেনি। তাই ধর্ম ও দর্শন বই-পুস্তক,মসজিদ-মাদ্রাসা ও ক্লাসরুমে সীমিত থাকলে উচ্চতর সমাজ বা সভ্যতা নির্মিত হয় না। সেগুলির প্রকাশ ঘটাতে হয় মানুষের চেতনা-চরিত্র, মূল্যবোধ, পোষাক-পরিচ্ছদ, সামাজিকতা, রুচি, আচরণ ও কর্মের মধ্যে। তখন ঘটে সাংস্কৃতিক কনভার্শন এবং সেটিকে বেগমান করতেই প্রয়োজন পড়ে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তথা প্রকৌশলি পরিকল্পনার।

 

ইসলামি সভ্যতার নির্মান ও গুরুত্ব সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের

ইসলাম মানবিক উন্নয়ন চায়, সে উন্নয়নের মধ্য দিয়ে বিশ্বজনীন সভ্যতার নির্মান চায়। চায়, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর ইসলামী বিধানের পূর্ণ বিজয়। এটিই ইসলামের ভিশন; সে সাথে মুসলিমের। ফলে নামায-রোযা,হজ-যাকাতের বাইরেও ইসলাম নিজ সংস্কৃতির প্রসার ও প্রতিষ্ঠা চায়। সংস্কৃতির দুটি ধারা,একটি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের, অপরটি বিদ্রোহের। সন্ত্রাসী, মদ্যপায়ী, ব্যাভিচারি ও পতিতার সংস্কৃতিতে যেটি প্রকাশ পায় সেটি আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেতনা। অথচ মুসলিম সংস্কৃতির মূলে কাজ করে ইবাদতের স্পিরিট। ইবাদতের বিধানটি কাজ করে আল্লাহর অনুগত সুশৃঙ্খল মানুষ গড়ার হাতিয়ার রূপে। ফলে এ সংস্কৃতিতে আসে পবিত্রতা। ইসলামের লক্ষ্য তাই শুধু ধর্মান্তর নয়, সাংস্কৃতিক কনভার্শনও। যে কোন সভ্যতার নির্মানে অপরিহার্য হলো এই সাংস্কৃতিক কনভার্শন। সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়টি তাই শুধু পাশ্চাত্যে বিষয় নয়, ইসলামেরও। বরং পরিকল্পিত সমাজ বিপ্লবের লক্ষ্যে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সবচেয়ে বেশী প্রস্তুতি,ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো হলো ইসলামের। ইসলামের ইবাদত তাই শুধু ব্যক্তি-জীবনে সীমিত নয়, বরং ইবাদতকে সর্বব্যাপী করার লক্ষ্যে অপরিহার্য গণ্য হয় সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অবকাঠামো। আল্লাহর খলিফা রূপে প্রতিটি মুসলমানের নিয়োগপ্রাপ্তি, মহল্লায় মহল্লায় মসজিদ নির্মান, ইসলামি রাষ্ট্র-নির্মান ও হজ-ওমরাহর বিধান তো সে বিশাল অবকাঠামো। ব্রিজ, রাস্তাঘাট ও সামরিক স্থাপনার ন্যায় মুসলিম রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক অবকাঠামোও প্রতিরক্ষা চায়, সে সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই জিহাদ হলো আল্লাহর নির্দেশিত পবিত্র ইন্সটিউশন। তাই যে সমাজে জিহাদ নেই সে সমাজে ইসলামি শরিয়ত যেমন বাঁচে না,তেমনি বাঁচে না ইসলামি সংস্কৃতিও।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাজে নেতৃত্বের দায়িত্ব যেমন আল্লাহর পবিত্র ঘর মসজিদের, তেমনি গুরু দায়িত্ব হলো ইসলামি রাষ্ট্রের। তাই নামায সংঘটিত করাই মসজিদের মূল কাজ নয়, লক্ষ্য এখানে নামাযীদের সাস্কৃতিক কনভার্শনও। তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলের কাজও শুধু রাস্তাঘাট গড়া বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়। বরং সেটি হলো পরিপূর্ণ ইসলামি সভ্যতার নির্মান। আল্লাহর ভিশন এখানে সরকারের ভিশন হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত সে ভিশনটি হলো  “লি ইউযহিরাহু আলা দ্বীনে কুল্লিহি” অর্থাৎ পৃথিবীর সকল ধর্ম ও মতাদর্শের উপর ইসলামের বিজয়ের। ইসলামে এজন্যই সার্বভৌম শাসকের কোন ধারণা নেই, বরং যে ধারণাটি আছে সেটি হলো খেলাফতের তথা মহান আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের। ব্যক্তি, মসজিদ ও রাষ্ট্র সবই এখানে মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র ভিশন নিয়ে একাকার হয়ে কাজ করে। গ্রামের দরিদ্র ঈমানদার ব্যক্তিটির ভিশন আর রাষ্ট্রের শক্তিধর শাসকের ভিশনে কোন পার্থক্য নাই। সবাই এখানে একই রণাঙ্গনে এক ও অভিন্ন ভিশন নিয়ে জিহাদ লড়ে।

 

মুসলিম রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি

মুসলিম হওয়ার অর্থটি বিশাল। এটি শুধু কালেমা পাঠ, নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন নয়। এতে ব্যক্তির বাঁচা-মরা ও জীবনযাত্রার লক্ষ্যই পাল্টে যায়। তাকে বাঁচতে হয় সভ্যতা নির্মাণের দায়ভার কাঁধে নিয়ে। সে পবিত্র মিশনে আমৃত্যু জড়িত থাকাটিই মু’মিনের সংস্কৃতি। মুসলিম সমাজে তাই নীরব বা নিষ্ক্রীয় ব্যক্তির কোন স্থান নেই। সবাইকে এখানে অবিরাম সক্রিয় হতে হয়। এমন এক সর্বাত্মক অংশগ্রহণের কারণেই উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণে সমগ্র মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী সফলতা দেখিয়েছে ইসলাম। মানবতার কথা, নারীপুরুষের সমতার কথা, শোষনমুক্ত সমাজ নির্মাণের কথা, ইনসাফের কথা, দাসমূক্তির কথা এবং ধনীদরিদ্রের পার্থক্য দূরীকরণের কথা –এ সব বড় বড় কথা অতীতে বহু ব্যক্তি, বহু ধর্ম ও বহু মতবাদ নানা ভাবে বলেছে। কিন্তু একমাত্র ইসলামই সেগুলি বাস্তবে পরিণত করেছে। ইসলাম দাসমূক্তিকে শ্রেষ্ঠ ধর্মকর্মে পরিণত হয়েছে। সমতার বিধান? রাষ্ট্রের খলিফা আটার বস্তা নিজের কাঁধে তুলে অন্নহীনের ঘরে পৌছে দিয়েছেন এবং চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে উঠের রশি ধরে টেনেছেন। ইসলামের এ বিস্ময়কর সফলতার কারণ, ইসলাম শুধু ধর্মে পরিবর্তন আনে না, সাংস্কৃতিক কনভার্শনও আনে। আমূল বিপ্লব আনে বাঁচার সংস্কৃতিতে। ইসলামি রাষ্ট্র ও সভ্যতার মূল শক্তি তো এখানেই। কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় যেসব দেশে ইসলামি রাষ্ট্র ও সভ্যতা নির্মিত হয়নি সেখানে দোষটি ইসলামের নয়। বরং এখানে প্রচণ্ড অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে সাংস্কৃতিক কনভার্শনে। এসব দেশের মানুষ নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বিধানকে কবুল করলেও তারা ইসলামের সংস্কৃতিকে কবুল করেনি। বরং মানুষ বেড়ে উঠেছে জাহেলী যুগের দুর্বৃত্তি, সন্ত্রাস, ব্যভিচার ও মিথ্যাচার নিয়ে। ইসলামী সংস্কৃতি নিয়ে বেড়ে উঠার ব্যর্থতার কারণেই বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের দুই শতটির বেশী রাষ্ট্রকে ৫ বার হারিয়েও দিয়েছে। এটি কি কম বীভৎসতা! জাহিলী যুগের আরবগণ কি এর চেয়েও নীচে ছিল? এ বীভৎস ব্যর্থতা থেকে আজ হাজারো ব্যর্থতা গজিয়েছে। এরূপ ব্যর্থতার আযাব ভয়ানক। তখন সভ্যতর সমাজ গড়ে উঠার বদলে দীর্ঘায়ু পায় ফ্যাসিবাদী দুর্বৃত্ত দুঃশাসন।

ইসলাম-কবুলের অর্থ ব্যক্তির অন্তরে কোরআনী জ্ঞানের বীজ-রোপন। আর সংস্কৃতি হলো, সে বীজ থেকে পত্র-পল্লব, ফুল ও ফলে সুশোভিত বিশাল এক বৃক্ষ। বিশাল বৃক্ষের বেড়ে উঠাকে নিশ্চিত করতে যেমন লাগাতর পরিচর্যা চাই, তেমনি সাংস্কৃতিক কনভার্শনের জন্যও চাই লাগাতর সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। মুসলিম রাষ্ট্র ও মসজিদ-মাদ্রাসার বড় দায়িত্ব হলো সে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংকে নিশ্চিত করা। কোন মুসলিম দেশে মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়লো অথচ জনগণের বাঁচার প্রক্রিয়ায় কোন ইসলামী বিপ্লব এলো না -তখন বুঝতে হবে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানগুলি বিকল।

প্রতিটি পাশ্চাত্য দেশের নাগরিকই একটি সুনির্দিষ্ট মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি নিয়ে বাঁচে। সে মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি যত অকল্যানকর বা অশ্লিলই হোক -তা বাঁচিয়ে রাখতে বহু লক্ষ মদ্যশালা, নৃত্যশালা, ক্লাব,ক্যাসিনো, পতিতাপল্লি সেখানে কাজ করছে। সেগুলির পাশে কাজ হাজার হাজার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, অসংখ্য পত্র-পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল। সে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকেই তারা বিশ্বময় করতে  চায়। কারণ তাদের বাঁচাটি এখন আর শুধু নিজ দেশে সীমিত নয়। তাদের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমরনীতির কোন সীমান-সরহাদ নাই। সেটি বিশ্বব্যাপী। সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে অন্যদেশে তাদের বছরের পর বছর কাটাতে হয়। আফগানিস্তান ও ইরাকে লক্ষাধিক মার্কিনী ও ইউরোপীয়রা অবস্থান নিয়ে আছে দশ বছরেরও বেশী কাল ধরে। মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না, মানুষ তো তেমন নিজ সংস্কৃতি ছাড়া বাঁচে না। তারা যেখানে যায় সেখানে শুধু পানাহার চায় না, মদ, জুয়া, ব্যাভিচার, সমকামিতার ন্যায় আরো বহু কিছু চায়। তাই মুসলিম দেশে তাদের বাঁচাটি দুরুহ ও অসহনীয় হয়ে পড়েছে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিকে তাদের  নিজেদের জন্য সহনীয় করতে তার মুসলিম দেশগুলিত নিজ সংস্কৃতির প্রসারে তারা সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং নেমেছে। মুসলমানদের ধর্মান্তর না ঘটাতে পারলেও তারা চায় তাদের কালচারাল কনভার্শন। সে কাজে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করছে জাতিসংঘকে। জাতিসংঘ ব্যক্তি-স্বাধীনতা, নারী-স্বাধীনতা, পেশার স্বাধীনতার নামে একটি বিধিমালা তৈরী করেছে। সে বিধামালায় সমকামিতার ন্যায় ভয়ানক পাপকর্ম যেমন অন্যায় ও অবৈধ নয়, তেমনি অবৈধ নয় ব্যভিচারও। পতিতাদেরকে বলছে সেক্স ওয়ার্কার। মদ্যপান, জুয়াও তাদের কাছে কোন অপরাধ-কর্ম নয়। মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির এই যে পাশ্চাত্যের সংজ্ঞা, সেটিকে তারা অন্যদেশের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। না মানলে সে অবাধ্য রাষ্ট্রটিকে মৌলবাদী রূপে চিত্রিত করছে। সে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে  অবরোধ আরোপ করছে। কোথাও কোথাও ড্রোন হামলাও হচ্ছে। সে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অংশ রূপে বাংলাদেশের মহিলাদের যেমন রাস্তায় মাটি কাটা বা গাছ পাহারায় নিয়োজিত করছে,তেমনি আফগানিস্তানের পর্দানশিন মহিলাদের বেপর্দা করে তাদের নাচ-গান শেখাচ্ছে ও হাতে হারমনিয়াম তুলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে ইসলামের অগ্রগতি শুধু ধর্মান্তরে সীমিত রয়ে গেছে। সাংস্কৃতিক কনভার্শনের কাজ সফল ভাবে হয়নি। ফলে ইসলামের সভ্যতার নির্মানে অংশ নেয়াটি জনগণের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়নি। বরং অপরিচিত রয়ে গেছে নবীজী(সাঃ)র ইসলাম। নবীজী (সাঃ)র ইসলাম –যাতে রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মান, শরিয়তের প্রতিষ্টা ও জিহাদ, তাদের অনেকের কাছেই সেটি জঙ্গি ইসলাম মনে হয়। ফলে আরব, ইরান, তুরস্ক ও আফগানিস্তানের জনগণের ইসলাম কবুলের সাথে সাথে সেসব দেশে ইসলাম যেভাবে বিশ্বশক্তি ও সভ্যতা রূপে আবির্ভুত হয়েছিল সেটি বাংলাদেশে হয়নি। এদেশে অমুসলিমদের মাঝে ইসলামের প্রসার যেমন থেমে গেছে, তেমনি থেমে গেছে ইসলামের সাংস্কৃতিক কনভার্শনও। বরং স্রোত উল্টো দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। হিন্দু বা খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত না হলেও বাঙালী মুসলিমগণ দীক্ষা নিচ্ছে অনৈসলামিক ধ্যান-ধারণা ও সংস্কৃতিতে। সোসাল ইঞ্জিনীয়ারীংয়ের নানাবিধ প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হচ্ছে ইসলাম থেকে মুসলিমদের দূরে সরানোর কাজে। দূরে সরানোর কাজটি যে কতটা সফলতা পাচ্ছে তার  প্রমাণ, মঙ্গলপ্রদীপ ও জীবযন্তুর মুর্তি নিয়ে মিছিল হচ্ছে, মুসলিম মহিলারা সিঁধুর লাগাচ্ছে এবং প্রবলতর হচ্ছে অশ্লিলতা। বাড়ছে ব্যভিচার ও ধর্ষণ। হিন্দু সংস্কৃতি থেকে মুসলমানদের যে ভিন্নতা ছিল সেটি দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে।

 

শত্রুপক্ষের নতুন স্ট্রাটেজী

মুসলমানদের খৃষ্টান,ইহুদী বা হিন্দু বানানো এখন আর শত্রু পক্ষের মূল এজেন্ডা নয়, এজেন্ডা হলো সাংস্কৃতিক কনভার্শন। স্ট্রাটেজী নিয়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরাতে। মুসলিম দেশগুলিতে আজকের প্রচারকগণ গীর্জার পাদ্রী নন,সবাই খৃষ্টানও নন। এসব প্রচারকদের অনেকে যেমন স্বদেশী,তেমনি মুসলমান-নামধারীও। ধর্মের প্রচারকও না হলেও তারা একটি মতের প্রচারক। সে মতবাদটি সেক্যুলারিজম। তারা আল্লাহ-রাসূল বা মুসলমানের ধর্মীয় বিশ্বাসে সরাসরি হামলা করে না। তাদের লড়াইটি সংস্কৃতির ময়দানে। সংস্কৃতি শুধু গান-বাজনা,পোষাক-পরিচ্ছদ বা সাহিত্য নয়, বরং মানুষ যে ভাবে বাঁচে এবং যে রুচি ও মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠে সেটি। জীবন-ধারণের সে প্রক্রিয়ায় তথা সংস্কৃতিতে এতকাল যা প্রভাব রেখেছে তা হলো ধর্ম। তাই ধর্ম পাল্টে গেলে সংস্কৃতিও পাল্টে যায়। আরবের মানুষ যখন ইসলাম কবুল করে তখন তাদের গায়ের রং, দেহের গড়ন বা ভাষা পাল্টে যায়নি। পাল্টে যায় তাদের সংস্কৃতি। ইসলামের পূর্বে মদ্যপান, উলঙ্গ নাচগান ও ব্যাভিচার না হলে তাদের উৎসব হতো না। সে সংস্কৃতিতে পথিককে লুন্ঠন করা,কণ্যা সন্তানকে দাফন করা,মানুষকে ক্রীতদাস বানানো এবং পশুর ন্যায় মানুষকে হাটে তোলা গর্হিত কর্ম গণ্য হত না। বরং এসব ছিল আবহমান আরব সংস্কৃতি।

ঈমান ব্যক্তির অন্তরের বিষয়; সেটি চোখে দেখা যায় না। তবে ঈমান ধরা পড়ে তার বাইরের রূপে। ধরা পড়ে তার কর্ম ও সংস্কৃতিতে। জ্ঞানবান হওয়ার মধ্য দিয়ে যেমন সেটির শুরু, তেমনি লাগাতর ইবাদতের মধ্য দিয়ে সে সংস্কৃতির পরিশুদ্ধি। তাই যার জীবনে ঈমান ও ইবাদত নাই, তার জীবনে উচ্চতর সংস্কৃতিও নাই্। সমাজ ও সংস্কৃতিতে এভাবেই ইসলাম আনে পরিশুদ্ধি। এটাই হলো ইসলামের সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। পরিকল্পিত ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া কোন সুন্দর গৃহ বা শহর গড়ে উঠে না। আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বদৌলতেই দুর্গন্ধময় বস্তি থেকে সুশ্রী নগর নির্মিত হয়। তেমনি সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া সুন্দর ও সভ্যতর সমাজ গড়ে উঠে না। ইসলামে কালচারাল কনভার্শন এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ধর্মান্তরের মধ্যে ইসলামের প্রচার সীমিত থাকলে তাতে ইসলামী সমাজ,রাষ্ট্র ও সভ্যতার নির্মাণ ঘটে না। ইসলামের প্রচার বহুদেশে হয়েছে, কোটি কোটি মানুষ ইসলাম কবুলও করেছে। কিন্তু সবদেশে সবার সাংস্কৃতিক কনভার্শনটি ঠিক মত হয়নি। ইসলাম কবুলের পরও যদি বেপর্দা ভাবে চলে, ইবাদতে আগ্রহী নয় বা ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য ব্যক্তিকে ভোট দেয় -তখন বুঝতে হবে ইসলাম কবুল করলেও তার সাংস্কৃতিক কনভার্শনটি হয়নি। সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে সে ব্যক্তি হিন্দু বা অমুসলিমই রয়ে গেছে। বাংলাদেশসহ বহু মুসলিম দেশে সে সমস্যাটি প্রকট। বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার হয়েছে প্রধানতঃ সুফিদের দ্বারা। নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম যে ইসলাম পেশ করেছিলেন এসব সুফিগণ সে ইসলাম দেখেননি। সে ইসলামের জ্ঞানলাভ যেমন ঘটেনি, তেমনি সে ইসলামের পূর্ণ প্রকাশও তাদের জীবন ঘটেনি। তারা বেড়ে উঠেছেন পীরের খানকায়, কোন ইসলামি রাষ্ট্রে নয়। ফলে অপূর্ণাঙ্গতা রয়ে গেছে তাদের বেড়ে উঠায়। তাদের জীবনে ইসলামের জিহাদ এবং রাজনীতি যেমন ছিল না, তেমনি ইসলামের সংস্কৃতিও পুরাপুরি ছিল না। সুফি, তরিকত, সিলসিলা, ওরশ, খানকাহ ইত্যাদি নানা শব্দ তারা আবিস্কার করেছেন যার উল্লেখ পবিত্র কোর’আনে নাই। ফলে তাদের হাতে যেসব হিন্দু বা অমুসলিম ইসলাম কবুল করে তারা ইসলামের সংস্কৃতির পূর্ণ পরিচয় পায়নি। অথচ ইসলাম কবুলের অর্থ পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ। কোরআনে নির্দেশ এসেছে,“উদখুলু ফি সিলমে কা’ফ্ফা” অর্থঃ “তোমরা ইসলামে পুরিপুরি প্রবেশ করো”।অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগী, অর্থনীতি, সংস্কৃতি বা রাজনীতির কোন অংশকেই ইসলামের বাইরে রাখা যাবে না।

 

জোয়ার সেক্যুলার সংস্কৃতির

পাশ্চাত্য সভ্যতায় সংস্কৃতির যে জোয়ার সেটি মূলতঃ সেক্যুলার সংস্কৃতির। খৃষ্টান ধর্ম বা অন্য কোন ধর্ম নিয়ে তারা বেঁচে নাই, বেঁচে আছে এ সেক্যুলার সংস্কৃতি নিয়ে। পাশ্চাত্যে খৃষ্টান ধর্ম প্রভাব হারিয়েছে অনেক আগেই। এখানে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে নানা উপাদান নিয়ে। তাতে যেমন প্রাগ-খৃষ্টান যুগের ইউরোপীয় প্যাগানিজম আছে, তেমনি আছে গ্রীক ও রোমান সভ্যতার সংস্কৃতি, তেমনি খৃষ্টানধর্মের কিছু প্রভাবও আছে। তবে এখানে মূল সুরটি সেক্যুলারিজমের তথা ইহজাগতিক সুখসম্ভোগের। ইংরাজীতে যাকে বলা হয় হেডোনিজম। সে সুখ সম্ভোগের তাগিদে পাশ্চাত্য শুধু মদ্যপান,অশ্লিলতা ও উলঙ্গতাকে হালাল করে নেয়নি, জায়েজ করে নিয়েছে সমকামিতার ন্যায় আদিম অসভ্যতাকেও। হিন্দু ধর্মের কোন শরিয়ত বা আইনী বিধান নেয়, ফলে এ ধর্মটিও বেঁচে আছে আবহমান এক সনাতন সংস্কৃতি নিয়ে। সাংস্কৃতিক সে আচার এবং ধর্মীয় আচার এখানে একাকার হয়ে গেছে, উভয়ে মিলে হিন্দু সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। তেমনি খৃষ্টান ধর্মেও হালাল-হারামের কোন বিধান নেই। এটিও বেঁচে আছে এক সাংস্কৃতিক আচার রূপে। পাশ্চাত্য চায় সে সংস্কৃতির পৃথিবীব্যাপী প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে তারা দেশে দেশে সাংস্কৃতিক কনভার্শনে মনযোগ দিয়েছে। এবং চালাচ্ছে সোসাল ইঞ্জিনীয়ারীং। মুসলিম দেশগুলিতে পাশ্চাত্যের অর্থে প্রতিপালীত হাজার হাজার এনজিও কাজ করছে বস্তুত সে লক্ষ্যে।

শুরুতে মুসলিম দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক খৃষ্টানদের লক্ষ্য শুধু লুণ্ঠন ছিল না। রাজনৈতিক প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার সাথে খৃষ্টান ধর্মের প্রচারও ছিল। তখন হাজার হাজার খৃষ্টান-পাদ্রী ধর্মের প্রচার নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরেছে। তাদের সে প্রচেষ্ঠা ফিলিপাইন,পাপুয়া নিউগিনি,ফিজি,পূর্ব-তিমুর,নাগাল্যান্ড,মিজোরামের অমুসলিমদের মাঝে সফলতা মিললেও বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে ১৯০ বছরের শাসনেও সে সফলতা মিলেনি। ইসলাম থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ধর্মচ্যুৎ করতে পারেনি। তাদের হাতে বহু মুসলিম দেশ অধিকৃত হয়েছে। তাদের ঔপনিবেশিক শাসনে মুসলিমদের মাঝে অজ্ঞতা ও অশিক্ষাও বেড়েছে। কিন্তু তাদের অবস্থা কখনোই এতটা পচেনি যে খৃষ্টান ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের ন্যায় অন্য কোন ধর্ম তারা কবুল করবে। কয়লা থেকে স্বর্ণ, মল থেকে মধুকে পৃথক ভাবে করতে বিদ্যাবুদ্ধি লাগে না। অজ্ঞতা, ভ্রষ্টতা ও মিথ্যাচারপূর্ণ ধর্মগুলি থেকে ইসলামের শ্রেষ্ঠতা বুঝতেও বেশী বুদ্ধি লাগেনি। গ্রামের মুর্খ মুসলমানেরাও সেটি বুঝে। ফলে হিন্দু ধর্মের গরু-ছাগল,শাপ-শকুন,পাহাড়-পর্বত ও পুলিঙ্গ পুজনীয় হওয়ার ন্যায় প্রকাণ্ড মিথ্যাটি যেমন তাদের কাছে মিথ্যা রূপে ধরা পড়েছে তেমনি ধরা পড়েছে খৃষ্টান ধর্মের হযরত ঈসার মায়ের পেটে ঢুকা, ঈশ্বর হওয়া এবং সে ঈশ্বরের শুলে চড়ে মারা যাওয়ার প্রকাণ্ড মিথ্যাটিও। ধর্মের নামে এরূপ মিথ্যাচার তাই তারা মেনে নেয়নি।

 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংকট

বাংলাদেশের মূল সমস্যাটি নিছক অর্থনৈতিক নয়, বরং সেটি সাংস্কৃতিক। সে সাংস্কৃতিক সমস্যার কারণেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে সুস্থ্য ও সভ্যমানুষ রূপে বেড়ে উঠায়। সে অসুস্থতা ধরা পড়ছে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক দূর্নীতিতে। ধরা পড়ছে দ্রুত বর্ধিষ্ণু অশ্লিতা, ব্যভিচার, ধর্ষণ ও নানারূপ পাপাচারে। ইসলাম শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস বাড়ায়না। মানুষকে শুধু মসজিদমুখিই করেনা। বরং মানবতা, শ্লিলতা, পবিত্রতা যোগ করে তাদের বাঁচাতে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি। এখানেই বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা।

সংস্কৃতির নির্মানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হলো জ্ঞান। এ কারণেই মুর্খ বাউল, শ্মশানবাসী কাপালিক, জটাধর সাধু এবং জ্ঞানবান ঈমানদারের সংস্কৃতি কখনোই এক হয় না। ইসলামে জ্ঞানার্জন এজন্যই ফরয। এবং অজ্ঞ থাকাই সবচেয়ে বড় পাপ। জ্ঞানার্জন ছাড়া ব্যক্তির জীবনে সত্যপথ প্রাপ্তি যেমন অসম্ভব,তেমনি সংস্কৃতির নির্মানও অসম্ভব। তবে সে জ্ঞানার্জনে বিশ্ববিদ্যালয় সহায়ক হলেও,ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ যখন তৈরী হয়েছেন সে সময়ে যখন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল না। অপরদিকে বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতিহাস গড়েছে বিভ্রান্ত,পথভ্রষ্ট ও দুর্বৃত্তদের সৃষ্টিতে। বাংলাদেশকে যারা ৫ বার পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে পরিণত করলো তারা কেউ গ্রামের মূর্খ রাখাল বা ক্ষেতমজুর ছিল না,বরং ছিল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রিধারি। এ ডিগ্রিধারী দুর্বৃত্তরা বরং দেশের কদর্যতা বাড়িয়েছে বিপুল সংখ্যক মানুষকে পথভ্রষ্ট করে।

একমাত্র কোরআনী জ্ঞান থেকেই ব্যক্তি পায় পায় ন্যায় ও অন্যায়, শ্লিল ও অশ্লিল, পবিত্র ও অপবিত্র চেনার সামর্থ্য। পায় প্রজ্ঞা। সন্ধান পায় সিরাতুল মোস্তাকীমের। অন্যথায় জীবন মিথ্যাচারে পূর্ণ হয়ে উঠে। কোরআনকে এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালা হুদা বা ফোরকান রূপে চিত্রিত করেছেন। হুদা’র অর্থ পথ প্রদর্শক আর ফোরকান হলো সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সৃষ্টিকারি। মুসলমানের সংস্কৃতি এজন্যই খৃষ্টান, হিন্দু, শিখ বা প্রকৃতি পুজারির সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন। কতটা ভিন্ন তার উদাহরণ দেয়া যাক। ইসলামে পবিত্র-অপবিত্রতার যে সুস্পষ্ট বিধান তাতে মলমূত্রের ন্যায় গরুর গোবরও অপবিত্র। তাই কাপড়ে গোবর লাগলে তার পবিত্রতা থাকে না। কিন্তু হিন্দুধর্মে সেটি ভিন্ন। গোবর লাগানোটাই এ ধর্মে পবিত্রতা। অপবিত্র আসে বরং হিন্দুর ঘরে মুসলমান আসন নিলে। গোবর দিয়ে লেপে তখন তাতে পবিত্রতা আনা হয়। গান-বাজনা ও নৃত্য ছাড়া হিন্দুদের পুজা হয় না। অথচ ইসলামে সেটিও ভ্রষ্টতা। সিরাতুল মোস্তাকিমে চলায় গান-বাজনা ও নৃত্য যেমন অমনোযোগী করে, তেমনি ভ্রষ্টতাও বাড়ায়।

 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অধিকৃতি

বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের আজকের বড় সমস্যা এ নয় যে, দেশগুলি শত্রুর হাতে সামরিক ভাবে অধিকৃত। বরং সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং সে সাথে ভয়ানক বিপদের কারণ, দেশগুলির সাংস্কৃতিক সীমান্ত বিলুপ্ত হয়েছে এবং তা অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা। দেশের রাজনৈতিক সীমান্ত বিলুপ্ত না হলেও মুসলিম দেশগুলির সংস্কৃতির মানচিত্র শত্রুপক্ষের দখলে গেছে। ফলে এদেশগুলিতেও সেগুলিই অহরহ হচ্ছে যা কাফের কবলিত একটি দেশে হয়ে থাকে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিও পরিনত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য রূপে গড়া তোলার ইন্সটিটিউশনে। পতিতাপল্লি, নাচের আসর, সিনেমা হল,মদ্যশালাই তাদের একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়,বরং গড়া হচ্ছে এবং নতুন ভাবে আবিস্কার করা হচ্ছে আরো বহু সাংস্কৃতিক আচারকে। মুর্তিপুজার ন্যায় আদিম অজ্ঞতাকে বাঁচিয়ে রাখতে যেমন হাজারো মন্দির গড়া হয়, তেমনি নানারূপ পাচাচার ও ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বাঁচিয়ে রাখতেও গড়া হয়েছে নানা আচার। এসব হলো শয়তানের সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। লক্ষ্য, কালচারাল কনভার্শন। এলক্ষ্যেই পহেলা বৈশাখ, বসন্তবরণ, ভালবাসা দিবস, থার্টি ফাষ্ট নাইট ইত্যাদি নানা দিবসকে বাঙালী মুসলিমের জীবনে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম সন্তান মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ন্যায় গেরুয়া পোষাক পড়ছে। মঙ্গলপ্রদীপ হাতে নিয়ে শোভাযাত্রা করছে। কপালে তীলক পড়ছে, অশ্লিল নাচগানও করছে। এসব হলো মানুষকে পথভ্রষ্ট ও পাপাচারি বানানোর শয়তানী কৌশল। এরাই বাংলাদেশের ন্যায় প্রতি দেশে গড়ে উঠছে শয়তানের পক্ষে লড়াকু সৈনিক রূপে এবং তাদের যুদ্ধাংদেহী অবস্থানটি শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে।

অনৈসলামিক দেশে বসবাসের বড় বিপদটি খাদ্যাভাব নয়। রোগভোগ বা স্বাস্থ্যহানীও নয়। বরং সেটি হলো সিরাতুল মোস্তাকিম সহজে খুঁজে না পাওয়ার। কারণ অমুসলিম রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার জুড়ে তখন যা প্রবলতর হয় তা হলো সত্যচ্যুতির তথা পথভ্রষ্টতার। ইসলামী রাষ্ট্রের মূল দায়িত্বটি তাই আল্লাহর রাস্তায় চলার সিরাতুল মোস্তাকীমটি জনসম্মুখে তুলে ধরা। কাফের রাষ্টনায়কগণ করে তার উল্টোটি। জনগণের দৃষ্টি থেকে তারা সমাজে সিরাতুল মুস্তাকীমকে লুকায়। কুফর শব্দের আভিধানিক অর্থও লুকানো। কুফরি তখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে  পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন তখন পথভ্রষ্টতার পথ গড়ে, এবং সে পথগুলি জাহান্নামের দিকে টানে। বিভ্রান্তির সে বিশাল ভিড়ে তখন হারিয়ে যায় সিরাতুল মোস্তাকীম। সে সমাজে দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্ম, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নামে জাহান্নামের ব্যবসায়ীগণ তখণ মোড়ে মোড়ে দোকান সাজিয়ে বসেএবং অন্যদেরও সে পথে ডাকে। বাংলাদেশে শত শত পতিতাপল্লি, শত শত সূদিব্যাংক, হাজার হাজার এনজিও, বহু হাজার সাংস্কৃতিক সংস্থা, হাজার হাজার সিনেমা হল, পত্র-পত্রিকা ও মদের দোকান তো সে কাজটাই করছে। এমন একটি সমাজে প্রতি পদে পা ফেলতে হয় অতি সতর্কতার সাথে। নইলে পা জাহান্নামের গর্তে গিয়ে পড়ে।

মদ-জুয়া,নাচের আসর,পতিতাপল্লি,সূদীব্যাংক,সেক্যুলার শিক্ষা ও রাষ্ট্র ছাড়া যেমন প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতি বাঁচে না, তেমনি কোর’আন-হাদীসের উপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, সমাজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও আইন-আদালত কাজ না করলে ইসলামি সংস্কৃতিও বাঁচেনা। অথচ বাংলাদেশে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলি অধিকৃত হয়েছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে। যারা এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তারা নামে মুসলমান হলেও ইসলামের বিজয় নিয়ে তাদের কোন অঙ্গিকার নাই। লেশমাত্র ভাবনাও নাই। বরং ইসলামের বিজয়ে তেমন একটি আগ্রহ থাকাটাই তাদের কাছে গণ্য হয় ফৌজদারি অপরাধ। আগ্রহী ব্যক্তিদেরকে চিহ্নিত হয় মৌলবাদী সন্ত্রাসী রূপে। তাদের নির্মূলে তারা বরং কাফেরদের সাথে কোয়ালিশন গড়ে।

 

সাংস্কৃতিক কনভার্শনের বিপদ ও ঈমানী দায়ভার

ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় নেয়ামতটি হলো, সেখানে স্পষ্টতর হয় সিরাতুল মোস্তাকীম। এবং বন্ধ করা হয় জাহান্নামের পথ। এমন রাষ্ট্রের বরকতে কোটি কোটি মানুষ বাঁচে জাহান্নামের আগুণ থেকে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মান এজন্যই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নেককর্ম। একাজে সামান্য সময় ব্যয়ও সারারাত তাহাজ্জুদ নামায পড়ার চেয়েও শ্রেষ্ঠ। -(হাদীস)। মহান আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা “আনসারুল্লাহ”র তথা আল্লাহর সাহায্যকারির। একাজে তার শত্রুর হাতে তার মৃত্যু হলে সে পাবে শহীদের মর্যাদা। পাবে বিনা বিচারে জান্নাত। মু’মিনের এ মেহনত ও কোরবানীর বরকতেই বিজয়ী হয় আল্লাহর দ্বীন এবং গড়ে উঠে শ্রেষ্ঠতর সভ্যতা। একারণেই শয়তানী শক্তির সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট হলো রাষ্ট্রের বুকে ইসলামের বিজয়কে অসম্ভব করা। সে শয়তানী প্রজেক্ট নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমেছে বহু রাজনৈতিক দল, এবং বিদেশীদের অর্থে কাজ করছে বহু হাজার এনজিও। দেশটির জন্মকালে ইসলামের প্রতিষ্ঠা যেমন লক্ষ্য ছিল না। তেমনি আজও  নয়। ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারকে রাষ্ট্রীয় ভাবে নিন্দিত হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা রূপে। সাংস্কৃতিক কনভার্শনের কাজে বিনিয়োগ হয়েছে ভারতসহ বহু কাফের দেশের শত শত কোটি টাকা। সে বিনিয়োগ ফলও দিয়েছে। সে বিনিয়োগের কারণে,পাকিস্তানের ২৩ বছরে যত দুর্বৃত্ত এবং ইসলামের যত শত্রু তৈরী হয়েছিল বাংলাদেশে গত ৪০ বছরে হয়েছে তৈরী হয়েছে তার চেয়ে শতগুণ বেশী। ফলে কঠিন হয়ে পড়েছে আল্লাহর শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া। দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে পর পর ৫বার প্রথম হওয়ার মূল কারণ তো শয়তানী শক্তির এ বিশাল বিনিয়োগ। শয়তানী শক্তির সে বিনিয়োগ আজ যে শুধু অব্যাহত রয়েছে তা নয়, বরং বহুগুণ বৃদ্ধিও পেয়েছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের ভয়ানক বিপদ বস্তুত এখানেই।

ইসলামি চরিত্রের নির্মান যেমন জঙ্গলে সম্ভব নয়, তেমনি পীরের খানকায়, মসজিদে বা নিজগৃহে নিছক কোরআন-হাদীস পাঠের মধ্য দিয়েও সম্ভব নয়। মুসলমানের ঈমান-আক্বীদা কখনই অনৈসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠে না। সে জন্য ইসলামি রাষ্ট্র ও জিহাদী সংস্কৃতি চাই। সাহাবায়ে কেরাম,তাবে ও তাবে-তাবেয়ীগণ মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষ রূপে গড়ে উঠেছিলেন তো ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে জিহাদী সংস্কৃতির কারণেই। মুসলমানদের অর্থ, রক্ত, সময় ও সামর্থ্যের সবচেয়ে বেশী ভাগ ব্যয় হয়েছে তো ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির নির্মানে। নামায রোযার পালন তো কাফের দেশেও সম্ভব। কিন্তু সম্ভব কি ইসলামী শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যা? সম্ভব নয় বলেই মুসলমানদের জীবনে হিযরত আসে। সে সাথে জিহাদও আসে। অতীতের ন্যায় আজকের মুসলমানদের উপরও একই দায়ভার। মহান আল্লাহর খলিফা রূপে এটাই একজন ঈমানদারের উপর সবচেয়ে বড় দায়ভার। এ লড়ায়ে সবাইকে ময়দানে নেমে আসতে হয়। এবং লড়াইয়ের শুরুটি তরবারী দিয়ে হয় না; বরং হয় কোরআনী জ্ঞানের । জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামায-রোযার আগে ফরয করা হয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে সে ফরয পালনের আয়োজন কোথায়? অনেকেই জ্ঞানার্জন করছে নিছক রুটিরুজির তালাশে, ফরয আদায় এখানে লক্ষ্য নয়। প্রচন্ড বিচ্যুতি এখানে জ্ঞানার্জনের নিয়তে। ফলে লোভি, শঠ, ধুর্ত ও মিথ্যাচারি ব্যক্তি এ শিক্ষার বদলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘুষখোর, ডাকাত বা সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে। এমন জ্ঞানচর্চায় রুটি-রুজী জুটছে ঠিকই, কিন্তু জ্ঞানার্জনের ফরয আদায় হচ্ছে না। ফলে দেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বাড়লেও জিহাদের ময়দানে লোকবল বাড়ছে না। ফলে বিপ্লব আসছে না সমাজ ও রাষ্ট্রে। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য এটি এক বিপদজনক দিক। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে অরক্ষিত শুধু দেশটির রাজনৈতিক সীমান্তুই নয়, বরং প্রচন্ড ভাবে অরক্ষিত দেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও। ফলে ইসলামের মুল শিক্ষা ও সংস্কৃতিই দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে অপরিচিত থেকে যাচ্ছে। অজ্ঞতার বসে শত্রুর সংস্কৃতিকেই শুধু আপন করে নিচ্ছে না,আপন করে নিচ্ছে তাদের ইসলামবিনাশী রাজনৈতিক এজেন্ডাও।এবং মুসলিম হত্যায় হাতে তুলে নিচ্ছে শত্রুর হাতিয়ার। দেশ তাই দ্রুত অধিকৃত হচ্ছে শত্রুদের হাতে। সেটি যেমন সামরিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে, তেমনি সাংস্কৃতিক ভাবেও। শত্রুর সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন এভাবেই বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে তাদের বিজয়কে সহজসাধ্য ও কম ব্যয়বহুল করে তুলেছে। সে সাথে ভয়ানক ভাবে বাড়িয়ে তুলেছে দেশবাসীর আখেরাতের বিপদও। তাই আজকের লড়াইটি নিছক রাজনৈতিক নয়। স্রেফ অর্থনৈতিকও নয়। সেটি যেমন শত্রুর হাত থেকে দখলদারি মুক্তির, তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি নির্মানের। ১ম সংস্করণ ২৮/০৪/১২; ২য় সংস্করণ ২২/১০/২০২০

 

 




স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ ও ভারতীয় স্ট্রাটেজী

ফিরোজ মাহবুব কামাল

দেহে প্রাণ থাকলে যেমন রোগভোগের সম্ভাবনা থাকে, তেমনি কোন দেশের স্বাধীন মানচিত্র থাকলে শত্রুপক্ষও থাকে। তাই তেমন শত্রুপক্ষ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশেরও আছে। তবে কারা সে শত্রুপক্ষ সেটি বুঝতে হলে বাংলাদেশের ভৌগলিক প্রেক্ষাপট এবং সে সাথে ভারতের স্ট্রাটেজী বা রাজনীতিকে বুঝতে হবে। বাংলাদেশের ভৌগলিক প্রেক্ষাপট অন্যান্য মুসলিম দেশগুলি থেকে ভিন্ন। মায়ানমারের সাথে সামান্য কয়েক মাইলের সীমান্ত ছাড়া তিন দিকেই ভারত। পার্শ্বে বা নিকটে কোন মুসলিম দেশ নেই। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনভিজ্ঞ কোন অমুসলিমের কাছে দেশটির ভূগোল নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব এদের অনেকের কাছেই বোধগম্য নয়। বিষয়টিকে ইচ্ছা করেই আরো বিভ্রান্তিকর করা হচ্ছে ভারতে। ভারতের বিশাল ভূগোলের মাঝে ক্ষুদ্র বাংলাদেশের অবস্থান সেদেশের স্কুল-ছাত্রদের কাছে উপস্থাপিত হয় এক বিরক্তিকর ও প্রশ্নবহ বিষয় রূপে। তাদের প্রশ্ন, কেমন করে তাদের বিশাল দেশের অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র বাংলাদেশ অস্তিত্ব পেল? এটি কি তাদের নিজেদের দূর্বলতা? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে ভারতীয় নাগরিক ও নতুন প্রজন্মদের জানানো হচ্ছে সম্পূর্ন ভিন্ন ও বিকৃত এক ইতিহাস, যার সাথে সত্যের কোন সংশ্রবই নেই।

বাংলাদেশ পাকিস্তানেরই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল ভারতের মুসলমানরা আজ যেভাবে হত্যা, নির্যাতন,বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তা থেকে বাঁচবার তাগিদে। দেশটিতে মুসলমানেরা শতকরা ১৬ ভাগ হলেও সরকারি চাকুরিতে শতকরা ২ ভাগও নেই। উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান হলো এক কল্যানকর সৃষ্টি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির ফলেই বাংলাদেশের ১৭ কোটি মুসলমান যে সংখ্যায় ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সামরিক ও বেসামরিক অফিসার সৃষ্টি করেছে ভারতের ২০ কোটি মুসলমান তার সিকিভাগও সৃষ্টি করতে পারেনি। ২২ কোটি মুসলমানের দেশ পাকিস্তানে করাচী ও লাহোরের ন্যায় মাত্র দু’টি শহরে যে পরিমাণ সম্পদ ও গাড়ি-বাড়ি দেখা যায় তার অর্ধেকও কি ভারতীয় মুসলমানের আছে? অথচ সে পাকিস্তানের জন্মকে চিত্রিত করা হচ্ছে সাম্প্রদায়ীক মুসলিম ও বৃটিশ ষড়যন্ত্রের ফসলরূপে। স্কুলের পাঠ্যবই, সিনেমা, পত্র-পত্রিকা, টিভি-সিরিয়াল, উপন্যাস ইত্যাদির মাধ্যমে এ বিকৃত ভাষ্যকে ইতিহাস বলে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে। ফলে শুধু পাকিস্তানেরই নয়, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকেও নতুন প্রজন্মের কাছে প্রশ্নবহ ও অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। এভাবে ভারতের সাধারণ নাগরিকদের কাছে অবৈধ ও ষড়যন্ত্র-মূলক এক অনাসৃষ্টি রূপে চিত্রিত হচ্ছে শুধু পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশও। সমাজের অবৈধদের প্রতি সচারচরই যেমন ঘৃণাবোধ থাকে, তেমনি এক তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও। এবং সেটি বুঝা যায় বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় নীতি বিশ্লেষণ করলে। পারস্পরিক সমতা, সম্পৃতি, শ্রদ্ধাবোধ ও ভালবাসা প্রাধান্য পেলে বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় রাজনীতি, বাণিজ্যনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি কখনই এতটা বৈরী ও প্রতারণামূলক হত না। ভারতীয়দের বাংলাদেশ-বৈরী এমন আচরণ বুঝবার জন্য বেশী গবেষণার প্রয়োজন নেই, কয়েকটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। 

এক) একাত্তরের যুদ্ধের পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত বহু হাজার কোটি টাকার সামরিক যানবাহন, অস্ত্র, গোলাবারুদ ও নৌযান ভারত কর্তৃক পুরাপুরি লুন্ঠিত হয় এবং তারা কিছুই রেখে যায়নি বাংলাদেশের জন্য। অথচ এ অস্ত্র শুধু পশ্চিম-পাকিস্তানীদের ছিল না। এ অস্ত্র কেনায় ব্যয় হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণেরও রাজস্বের অর্থ। তারাই ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক। ফলে এ অস্ত্রের উপর নায্য অধিকার ছিল বাংলাদেশীদের, ভারতীয়দের নয়। কিন্তু ভারত বাংলাদেশীদের সে বৈধ অধিকার মেনে নেয়নি। বরং দস্যূ বাহিনীর ন্যায় ভারতীয় বাহিনী পরিকল্পিত ভাবে লুন্ঠন করেছে বাংলাদেশের এ সম্পদ। লক্ষ্য ছিল, সে অস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশ নিজের প্রতিরক্ষা যেন মজবুত করতে না পারে। 
দুই) দ্বিপাক্ষিক চুক্তি মোতাবেক মুজিব সরকার ১৯৭৪এ বেরুবাড়ী ভারতকে দিয়ে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের পাওনা তিনবিঘা ভারত বাংলাদেশকে সাথে সাথে দেয়নি। 
তিন) মুজিব আমলে ভারত বাংলাদেশের কারেন্সি নোট ছাপানোর দায়িত্ব নেয়। যে পরিমাণ নোট ছাপতে দেয়া হয়েছিল তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশী নোট ছেপে কালো বাজারে ছেড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহু বছরের জন্য সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেয়। এবং আগমন ঘটায় এক ভয়ানক দুর্ভিক্ষের। 
চার) ১৯৭৫য়ে মাত্র ৪১ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধে গঙ্গা থেকে সর্বোচ্চ ১৬,০০০ কিউসেক পানি উত্তোলনের চুক্তি হয়। দীর্ঘকাল চুক্তি নবায়ন না করে ভারত অবিরাম অধিক পরিমাণে পানি সরিয়ে নেয়। ফলে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে বহু হাজার কোটি টাকা। 
পাঁচ) পদ্মার পানি অবিরাম লুন্ঠন করার স্বার্থে ভারত পানির দাবী করেছে তিন রকমের। ১৯৭৫য়ে ১৬,০০০, ১৯৭৭য়ে ৩০,০০০ এবং ১৯৯৬য়ে ৪৪,০০০ কিউসেক। এরূপ দাবীর মধ্যে ভারত এভাবে প্রকাশ ঘটিয়েছে তার এক স্বেচ্ছাচারি ও আধিপত্যবাদী মানসিকতার। 
ছয়) কিছু বছর আগেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহীদের ভারত শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, তাদেরকে অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণও দিয়েছে। এভাবে ভারতের হাতে পরিকল্পিত ভাবে বিপন্ন হচ্ছে বাংলাদেশের ভৌগলিক সংহতি ও সার্বভৌমত্ব।

ভারতীয় বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঠ্যবই এবং মিডিয়ার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশটিতে গড়ে উঠেছে এমন এক পাকিস্তান-বৈরী এবং সে সাথে বাংলাদেশ-বৈরী মানসিকতা -যার ফলশ্রুতিতে প্রায় প্রতিটি শিক্ষিত ভারতীয়ই উনিশ শ’ সাতচল্লিশের পাক-ভারত বিভক্তিকে নিজেদের জন্য অভিশাপ এবং সে সাথে অগ্রহনযোগ্য মনে করে। তারা কাশ্মিরে ভারতীয় জবর দখল, দলন নীতি ও যুদ্ধের নামে ব্যাপক গনহত্যার যৌক্তিক ভিত্তি পেয়েছে এমনই এক বৈরী চেতনা থেকেই। ভারতীয় মানচিত্রের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থানের কারণে কাশ্মিরকে ভারতীয়রা নিজ দেশের মুকুট মনে করে। কাশ্মির ছাড়া ভারতের মানচিত্র পূর্ণাঙ্গ নয় এমনি এক ভাবনা দেয়া হয় এমনকি স্কুল ছাত্রদের। কাশ্মিরে নিহত হয়েছে লক্ষাধিক নারী-শিশু ও নিরীহ মানুষ। পঙ্গু হয়েছে অগণিত, ধর্ষিতা হয়েছে বহু হাজার এবং জ্বলছে হাজারো ঘরবাড়ী। কিন্তু এনিয়ে একটা “কুছ পরওয়া নেহী” ভাব ভারতের রাজনীতিতে। দেশটিতে মুসলমানদের রক্ত ও ইজ্জত যে কত তুচ্ছ ভাবা হয় তার নজির শুধু দাঙ্গার নামে বার বার মুসলিম গণহত্যাই নয়, কাশ্মিরের এ অবিরাম গণহত্যা, ধর্ষণ এবং জবরদখলও। একটি দেশে বার নির্বাচন হলেই যে সেদেশে মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায় নীতি প্রতিষ্ঠা পাবে সে ধারণা যে কতটা মিথ্যা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ তাই শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্সই নয়, আজকের গণতান্ত্রিক ভারতও।  

সম্প্রসারণবাদী ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও সমরবিদরা বাংলাদেশকে ভাবে নিজ-দেশের পেটের মধ্যে বিষফোঁড়া। পূর্বাংশের ৭টি রাজ্যের সাথে সংযোগ স্থাপনে বাংলাদেশই সে পথে সবচেয়ে বড় বাধা। বড় বাধা পূর্ব এশিয়ায় পথে পা বাড়ানোতেও। এ বাঁধাটি তাদের কাছে প্রকট ভাবে ধরা পড়ে ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের সময়। তখন ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের উপর শুরু হয় চীনের প্রচন্ড হামলা। বাংলাদেশ ও ভূটানের মাঝে সরু ভারতীয় করিডোর দিয়ে তখন ভারতীয় সৈন্য ও রশদ সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ে। তখন পাকিস্তানের কাছে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে করিডোর চায়। পাকিস্তান তা দিতে অস্বীকার করে। ভারতকে সে সুযোগ দিতে চাপ দেয় চীনের প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সে চাপের সামনে নতি স্বীকার করেনি পাকিস্তান। তখন থেকেই ভারতের টার্গেট, যেভাবেই হোক ট্রানজিটের সে সুযোগ হাসিল করতেই হবে। পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে ভারতের বিপুল পুঁজি বিণিয়োগ ও একাত্তরের যুদ্ধের অন্যতম কারণ এখানেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক মেরুদন্ড শক্ত করার বিষয়টি ভারতের বিবেচনায় সামান্যতম গুরুত্বও পায়নি|। সেটি যেমন একাত্তরে নয়, তেমনি এখনও নয়। এখনও তারা ট্রানজিটের দাবী নিয়ে অনড় সে অভিন্ন কারণেই।। তবে এখন সুবিধা হল, তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রচন্ড ভারতপন্থিদের ক্ষমতাসীন হিসাবে পেয়েছে।

ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিবর্তনীয় নীতি হল প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরে লেন্দুপ দর্জিদের মত ভারতপন্থিদের বিপুল সংখ্যায় প্রতিপালন। সিকিমের লেন্দুপ দর্জিরা নির্বাচিত হযেছিল নিজ দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বের নামে। কিন্তু বিজয়ের পর পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে প্রথম দিনেই তারা ভারতভূক্তির ঘোষণা দেয়। আধিপত্য বিস্তারে একটি ব্যয়বহুল ও রক্তাত্ব যুদ্ধের চেয়ে এটিই অতি সহজ ও সস্তা পথ। প্রতিবেশী দেশগুলির বিরুদ্ধে ভারতের এ স্ট্রাটেজী বিপুল সফলতা দিয়েছে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয় হাসিলে ব্যর্থ হয়ে ভারত এ পথই বেছে নেয়। একটি যুদ্ধবিমানের খরচে ভারত বহু হাজার লেন্দুপ দর্জি পালছে প্রতিটি প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরে। এদের সংখ্যা বাংলাদেশে অসংখ্য। এরাই ফারাক্কা বাঁধের মধ্যে বাংলাদেশের কল্যাণ দেখতে পায়। বরাক নদীর উপর টিপাইমুখ বাঁধ দিলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনায় পানি থৈ থৈ করবে, সে খবরও শোনায়। এরাই কোরাস ধরেছিল, ভারতকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জোয়ার বইবে। এরাই একাত্তরের পর সীমান্ত বাণিজ্যের নামে বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেয়। এরূপ মীর জাফরদের কারণেই বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা দখলে পলাশির আম্রকাণনে ব্রিটিশ বাহিনীকে একটি গুলিও ছুঁড়তে হয়নি। এদের কারণেই ভারতকে একটি তীরও ছুঁড়তে হয়নি স্বাধীন দেশ সিকিম দখলে। এবং একটি ঢিলও ছুঁড়তে হয়নি বাংলাদেশের বেরুবাড়ী দখলে। 

প্রতিটি দেশের কাছেই তার স্বাধীন অস্তিত্বের প্রশ্ন অতি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আপোষ চলে না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কি? স্বাধীনতার শত্রুমিত্র কারা? দেশটি কি আদৌ টিকবে? স্বাধীনতার গ্যারান্টি বা রক্ষা-কবচই বা কি? এ সব প্রশ্ন আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে টিকে থাকবে কি থাকবে না -তা নির্ভর করবে এসব প্রশ্নের উত্তর কিভাবে খোঁজা হয় এবং তা থেকে কি ভাবে শিক্ষা নেওয়া হয় তার উপর। কালের বিবর্তনে জনগণের ভাষা, বর্ণ বা ধর্মে পরিবর্তন আসে সামান্যই। অথচ রাজনৈতিক ও ভৌগলিক পরিবর্তন ঘটে সচারচরই। বিগত হাজার বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ে পরিবর্তন এসেছে মাত্র একবার। এবং সেটি ইসলামের আগমনে। কিন্তু এর ভূগোল পাল্টে গেছে বার বার। বিগত পঞ্চাশ বছরেই অন্তত দুইবার। ভূগোলের স্থায়ীত্ব নিয়ে তাই বড়াই চলে না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এর নেতারা বলতো, পাকিস্তান এসেছে টিকে থাকবার জন্য। কিন্তু এতে যতটা জজবা ছিল ততটা বাস্তবতার সম্যক উপলদ্ধি ছিল না। তেমনি বাংলাদেশ আবহমান কাল টিকে থাকবে, এটুকু বললেই এর আয়ু দীর্ঘায়ীত হবে না। শুধু আবেগ দিয়ে দেশের স্থায়ীত্ব বাড়ে না। নদী যেমন চলার গতিপথে বার বার বাঁক নেয়, তেমনি একটি দেশ এবং জাতিও। নদীর বাঁক নির্ধারিত হয় পাহাড়-পর্বত, বৃষ্টি-বাদল, মৃত্তিকার গঠন ও অন্যান্য ভূপ্রকৃতিগত কারণে। কিন্তু স্বাধীনতার নিয়ন্ত্রণ প্রকৃতির হাতে নয়। নিয়ন্ত্রিত হয় জনগণের চিন্তা-চেতনা, ত্যাগের প্রেরণা, রাজনীতির তাগিদ ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে। এগুলোর তারতম্যে পরিবর্তিত হয় দেশের ভৌগলিক মানচিত্রও। শুধু ভাষা বা ভূগোলই একটি দেশের স্বাধীনতার একমাত্র উপাদান নয়। তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের কোন যৌক্তিক ভিত্তিই থাকে না। যুক্তি থাকে না এদেশটির সৃষ্টিরও। পশ্চিম বঙ্গের সাথে মিলে এক অখন্ড ভারতে লীন হওয়ার বিপক্ষেও তখন বলার মত কোন যুক্তি থাকে না।

রাজনীতি হল, দেশবাসীর চিন্তা-চেতনা, আশা-আকাঙ্খা ও বিশ্বাসেরই বিমূর্ত প্রতীক। আস্তিক ও নাস্তিক – উভয়েরই ধর্ম নিয়ে যা ধারণা সেটিরই প্রতিফলন ঘটে রাজনীতিতে। রাজনীতি গণতান্ত্রিক হলে তাতে জনগণের বিচিত্র বিশ্বাসেরই সম্মিলিত প্রতিফলন হয়। বিভিন্ন জাতির চিন্তা-চেতনা, আশা-আকাঙ্খা যেমন এক ও অভিন্ন নয়, তেমনি অভিন্ন নয় সেসব দেশের রাজনীতিও। এক ও অভিন্ন নয় তাই ভারত ও বাংলাদেশের রাজনীতি। প্রতি ফুলের যেমন নিজস্ব রঙ ও গন্ধ আছে, তেমনি প্রতি জনগোষ্ঠির নিজস্ব কিছু বৈশিষ্টও আছে। এ বৈশিষ্ট গুলোকে আরো বিশিষ্টময় করার জন্যই প্রয়োজন পড়ে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের। নইলে ভারতের বুকে মাত্র একটি রাষ্ট্র হত। এবং বিশ্বেও এক রাষ্ট্র হত। এদেশের মানুষ এককালে পাকিস্তান গড়েছিল একারণেই। আজকের বাংলাদেশ তারই ধারাবাহিকতা, ফলে জন্ম সূত্রেই এটি বিশিষ্টময়। ফলে স্বাধীনতার চেতনা খুঁজতে হলে একাত্তর নয় বরং আরো অতীতে যেতে হবে। বাংলাদেশের নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান, এবং অধিকাংশই ধর্মপ্রাণ। ফলে এদেশের রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব থাকবে -সেটাই স্বাভাবিক। যারা ধর্মপ্রাণ তারা ধর্ম নিয়ে শুধু মসজিদেই যায় না, বরং যেখানে যায় সেখানেই সে ধর্মীয় চেতনাকে সঙ্গে নিয়ে যায়। ধর্ম লেবাস নয় যে ক্ষণে ক্ষণে সেটি কেউ খুলবে এবং প্রয়োজনে আবার পরিধান করবে। এটি ব্যক্তির অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যেমন ফুল থেকে তার রং, রূপ ও গন্ধকে পৃথক করা যায় না, তেমনি পৃথক করা যায় না ব্যক্তি থেকে তার ধর্মকে। কি রাজনীতি, কি ব্যবসা-বাণিজ্য, কি শিল্প, কি সাহিত্য -যেখানেই তার বিচরণ সেখানেই সে ঈমানের প্রতিফলন ঘটায়। তাছাড়া রাজনীতি ইসলামের অতি মুখ্য বিষয়। ঈমানের গভীরতার অনুপাতে এর বিস্তার ঘটে মুসলমানের সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে। ইসলামে এটি উচ্চতর ইবাদত। ফলে প্রকৃত মুসলমানের কাছে নামাজ-রোজা, হজ্ব-যাকাতই শুধু গুরুত্বের নয়, গুরুত্বপুর্ণ হলো রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণও। ইসলামের নবী রাজনীতির ময়দানে যতটা সময় ব্যয় করেছেন অন্য কাজে ততটা করেননি। মানুষের মঙ্গলে অথবা অমঙ্গলে রাষ্ট্রের সামর্থ তুলনাহীন। রাষ্ট্রকে বলা হয় সামর্থ্যদাতা, মুক্তিদাতা এবং রক্ষাকর্তা। রাষ্ট্র জাহান্নাম ও জান্নাত – দুইটি দিকেই মানুষকে সমানে টানতে পারে। রাষ্ট্রের এ সামর্থ্যকে আস্তিক-নাস্তিক, মার্কসবাদী-পূঁজিবাদী, জাতিয়তাবাদী-আধিপত্যবাদী, ইসলামী-অনৈসলামি সবাই কাজে লাগাতে চায়। মানব জাতির ইতিহাসে এ নিয়েই যত যুদ্ধ। অনেকে আইন করে বিপক্ষীয় শক্তিকে প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রাখতে চায়। যেমনটি হয়েছে মিশর, তুরস্ক ও আলজেরিয়ায় ইসলামী বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে। মুজিবও বাংলাদেশে সেটিই করেছিল। ইসলামের বিপক্ষ শক্তি আজও বাংলাদেশে সেটিই চায়। এ নিয়েই ভারতের আধিপত্যবাদী শক্তির সাথে বাংলাদেশের ইসলামের বিপক্ষ শক্তির মূল কোয়ালিশন। এ কোয়ালিশনের পক্ষ থেকে হামলা শুরু হয়েছে শুধু বাংলাদেশের ভূমি, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের বিরুদ্ধেই শুধু নয়, লাগাতর হামলা হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধেও। 

শুধু দান খয়রাত আর তাবলিগের উপর নির্ভর করে আর যাই হোক সমাজের ইসলামীকরণ সম্ভব নয়। মুসলমানের ঈমান বাঁচানোও সম্ভব নয়। সেটি সম্ভব হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের কাজে নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ যুদ্ধ করতেন না। এটুকু এতই মোদ্দা কথা যে সেটি বুঝবার জন্য আলেম বা ইসলামে পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রের সংস্কারে অমনোযোগী হলে ইসলামের সত্যিকার অনুসরণ হয় না। বসত-ঘরের পূর্ণ ফায়দা পেতে হলে তাকে জঞ্জালমূক্ত রাখতে হয়। তেমনি রাষ্ট্রের বেলায়ও। ইসলামে জঞ্জাল সরানোর কাজটাই হল জিহাদ। মুসলমানের নামাজে কাজা আছে, কিন্তূ এ কাজে কাজা নেই। প্রায় সত্তর ভাগ সাহাবা একাজে শুধু অর্থ, সময় ও মেধাই দেননি, জীবনও দিয়েছেন। তাদের রক্তের বরকতেই আমদের মত গাফেলরাও আজ জন্মসুত্রে মুসলমান।

স্বাধীন বাংলাদেশে এক অপূর্ব সুযোগ মিলেছে মুসলিমদের। এ সুযোগ ভারতের বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীরও নেই। আর সেটা হল ইসলামের আঙ্গিকে রাষ্ট্রের সংস্কার। যারা সংখ্যালঘু রূপে অমুসলিম দেশে বাস করে তাদের দ্বারা একাজ হয় না। কারণ সে সামর্থ সংখ্যালঘু হওয়ার কারনে তাদের থাকে না। মানুষ যেখানে ঘর বাঁধে তার প্রতি কিছু দায়িত্ববোধও থাকে। ইসলামী পরিভাষায় এটিই হল খেলাফত বা আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ববোধ। জন্মসূত্রে সব মানুষ তার জন্মভূমির প্রতি দায়িত্ববান। এ দায়িত্বপালনে অবহেলায় ভূগতে হয় তাকে এবং তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। শুধু ট্যাক্স দিলে এ দায়িত্ব পালিত হয় না। মেধা, শ্রম, অর্থ ও রক্ত বিনিয়োগেও তাকে সচেষ্ট হতে হয়। ইসলামে এরূপ দায়িত্বপালনের নামই ইবাদত। ইবাদতের এ প্রেরণায় মুসলমানেরা এমনই এক রাষ্ট্র স্থাপনে সচেষ্ট হয়। এমন রাষ্ট্রে পাপের প্রকাশ্য পথগুলো রাষ্ট্রীয় তদারকিতে রুদ্ধ হয়ে যায় এবং প্রশস্ততর হয় পূণ্যের পথ। তখন রাষ্ট্রে শুধু বৈষয়ীক সমৃদ্ধিই আসেনা, বৃদ্ধি পায় মনের পূর্ণময় প্রশান্তিও। এ সুযোগের সন্ধানে অতীতে বহু অর্থ আর রক্ত ব্যায় হয়েছে মুসলিমদের এবং এখনও হচ্ছে। মুসলিমগণ যেখানে ঘর বাঁধে সেখানে স্বাধীন রাষ্ট্রও গড়ে। ইসলামের বিজয়ে নিজ দায়িত্বপালনে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ হলো প্রথম ধাপ।আল্লামা মহম্মদ ইকবাল এ লক্ষেই এ উপমহাদেশে একটি মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। অথচ যারা সেকুলার রাজনীতিতে বিশ্বাসী তাদের কাছে এমন রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি কখনোই গুরুত্ব পায়না। গ্রহণযোগ্যও হয়নি। এমনকি এ বিষয়টি সে সব আলেমও বুঝেনি যারা মসজিদের চার দেয়ালের মাঝে ইসলামকে বন্দি রাখতে চায়। 

ঘর বাঁধলে যেমন তার দেওয়ালটাও জরুরী, তেমন জাতির জন্য জরুরি নিরাপদ সীমান্ত রেখা। প্রয়োজন হলো সুরক্ষিত স্বাধীন রাষ্ট্রের। বাংলাদেশের মুসলিমগণ ভারতের ন্যায় এক প্রবল প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরেও এক নিরাপদ বাসস্থান দিয়েছে বাংলাদেশের ন্যায় একটি পৃথক রাষ্ট্রে বসবাস করার কারণেই। হিন্দু্স্থানি মুসলমানদের তুলনায় বাংলাদেশের মুসলমান এ কারণেই নিরাপদ। ফলে বাংলাদেশের ১৭ কোটি মুসলিম যত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশার প্রশিক্ষিত মানুষ সৃষ্টি করেছে, ভারতের বিশ কোটি মুসলমান তার সমানতো দূরে থাক সিকি ভাগও পারেনি। সে সাথে দিয়েছে আপন বিশ্বাসের বাস্তবায়নের সুযোগ। এমন এক সুযোগের খোঁজেই কাশ্মিরী মুসলমানেরা রক্ত ঢালছে বিগত ৭০ বছর ধরে।

মুসলমানের শক্তিবৃদ্ধিকে যারা নিজেদের বিপদ মনে করে তাদের কাছে বাংলাদেশের এরূপ স্বাধীনতা অসহ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রুমিত্র নির্ণয়ে এ সত্যকে অবশ্যই ধর্তব্যের মধ্যে আনতে হবে। ইসলামে যারা আত্মনিষ্ঠ ও বুঝে স্বাধীনতার কদর,  বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তাদের নিষ্ঠা প্রশ্মাতীত। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তারা নেয়ামত ভাবে। স্বাধীনতার বিপরীতে যা ঘটতে পারে তা হল পরাধীনতা তথা ভারতভুক্তি। পরাধীনতার অর্থই অন্যের অধীনতা, এখানে অন্য বলতে ভারত ভিন্ন আর কে হতে পারে? ভারতভূক্তিতে বাংলাদেশের ধর্মহীন বা ধর্মে অঙ্গিকারহীন সেকুলারদের হারানোর কিছু নেই। বরং অখন্ড ভারতে ইসলামে আপোষহীনদের নিধনে তারা সাম্প্রদায়িক হিন্দুদেরও সর্বাত্মক সহযোগিতা পাবে। বাংলাদেশে এদের একার পক্ষে এ কাজটা দুরূহ। কিন্তু দেশটির ভারত-ভূক্তিতে তারা পাবে দীর্ঘকালীন বিজয়ের স্বাদ। ইসলামের জোয়ার যেভাবে দেশে দেশে বেগবান হচ্ছে তাতে তারা বুঝতে পেরেছে, তাদের নিজেদের রাজনৈতিক আয়ু সংকটের মুখে। ফলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তারা বিদেশী শত্রুকেও আহবান করবে সেটিই স্বাভাবিক। এজন্যই ভারতের সাথে এ পক্ষটির কোয়ালিশন দিন দিন জোরদার হচ্ছে। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় প্রকৃত বিশ্বাসী তাদেরকে এ বিষয়টিকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে। একাত্তরের চেতনা ও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিরূপে যাদের অহংকারপূর্ণ গলাবাজী, ধর্মের প্রতি অঙ্গিকারহীন হওয়াতে ইসলামের বিপক্ষে যাওয়াই তাদের জন্য স্বাভাবিক। তাদের গলাবাজীর লক্ষ্য, নিজেদের আসল মতলবকে গোপন করা। এরূপ লক্ষে মুজিবও এককালে অসংখ্যবার পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়েছে। ফলে আজও যারা জয়বাংলার জয়োধ্বণি তুলছে তারাই যে দেশের মানচিত্র খাবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে? স্বাধীনতার শত্রু-মিত্র নির্ণয়ে তাই সমগ্র বিষয়টাকে দেখতে হবে এমন এক বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে। শুধু একাত্তরের ভূমিকাকে ধর্তব্যে আনলে চিত্তরঞ্জন সুতারের ন্যায় বেতনভোগী ভারতীয় এজেন্টগণকেও মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার মিত্র মনে হবে। এমন এক সংকীর্ণ মূল্যায়নে স্বাধীনতা নয়, পরাধীনতার পথই উন্মূক্ত হবে। এতে ত্বরিৎ বিজয় আসবে শত্রুপক্ষের। ভারতীয় স্ট্রাটেজীর মূল লক্ষ্য তো তেমন একটি বিজয়কে দ্রুত সমাধা করা। ২১/১০/২০২০

 




বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও অর্জিত পরাধীনতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

অর্জিত পরাধীনতা

একাত্তরের পর বাংলাদেশের ভূমি, সম্পদ ও জনগণ যে কতটা অরক্ষিত সেটি বুঝতে কি প্রমানের প্রয়োজন পড়ে? ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে যে দাবীগুলো ভারতীয় নেতাগণ মুখে আনতে সাহস পায়নি সেগুলি এখন মুজিবামলে আদায় করে ছেড়েছ। পাকিস্তান আমলে তারা বেরুবাড়ির দাবী করেনি, কিন্তু একাত্তরে শুধু দাবিই করেনি, ছিনিয়েও নিয়েছে। এবং সেটি মুজিবের হাত দিয়ে। প্রতিদানে কথা ছিল তিন বিঘা করিডোর বাংলাদেশকে দিবে। কিন্তু সেটি দিতে ৪০ বছরের বেশীকাল যাবত টালবাহানা করেছে। টালবাহানা করেছে আঙরপোতা, দহগ্রামের ন্যায় বহু বাংলাদেশী ছিটমহল দিতে। ভারত সেগুলিতে যাওয়ার করিডোর দিতে গড়িমসি করলে কি হবে, এখন বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর আদায় করে নিল। সেটি নিল প্রতিবেশীর প্রতি পারস্পরিক সহযোগিতার দোহাই দিয়ে। অথচ এমন সহযোগিতা কোন কালেই ভারত প্রতিবেশীকে দেয়নি।

ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার তার পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগের স্বার্থে করিডোর চেয়েছিল। সেটিকে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওয়ারলাল নেহেরু একটি অদ্ভুদ দেশের অদ্ভুত আব্দার বলে মস্করা করেছিলেন। বলেছিলেন, ভারতের নিরাপত্তার প্রতি এমন ট্রানজিট হবে মারাত্মক হুমকি। শুধু তাই নয়, একাত্তরে ভারতীয় ভূমির উপর দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের পিআইয়ের বেসামরিক বাণিজ্য বিমান উড়তে দেয়নি। এমন কি শ্রীলংকার উপর চাপ দিয়েছিল যাতে পাকিস্তানী বেসামরিক বিমানকে কোন জ্বালানী তেল না দেয়।

বাংলাদেশের সাথেই কি আচরন ভিন্নতর? একাত্তরের যুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরে কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়। ফলে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটছিল বন্দরে মালামাল বোঝাই ও উত্তোলনের কাজে। এতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। দেশে তখন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। ছিল নিতান্তই দুঃসময়। বাংলাদেশের জন্য চট্রগ্রাম বন্দরটিই ছিল মূল বন্দর। এমন দুঃসময়ে অন্য কেউ নয়, ভারতের অতি বন্ধুভাজন শেখ মুজিব অনুমতি চেয়েছিলেন অন্ততঃ ৬ মাসের জন্য কোলকাতার বন্দর ব্যবহারের। তখন ভারত সরকার জবাবে বলেছিল ৬ মাস কেন ৬ ঘন্টার জন্যও বাংলাদেশকে এ সুবিধা দেয়া যাবে না। এটিকেও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করেছিল। প্রতিবেশী সুলভ সহযোগিতার বুলি তখন নর্দমায় স্থান পেয়েছিল। এমনকি শেখ মুজিবকেও ভারত আজ্ঞাবহ এক সেবাদাস ভৃত্যের চেয়ে বেশী কিছু ভাবেনি। ভৃত্যকে দিয়ে ইচ্ছামত কাজ করিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু তার আব্দারও কি মেনে নেওয়া যায়? এসবই হলো একাত্তরের অর্জন। এভাবে বেড়েছে পরাধীনতা, স্বাধীনতা নয়।

প্রতিবেশীর প্রতি ভারতের এরূপ বৈরী আচরন নিত্যদিনের। প্রতিবেশী নেপাল ও ভূটানের সাথে বাণিজ্য চলাচল সহজতর করার জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট চেয়েছিল বাংলাদেশ। নেপাল চেয়েছিল মংলা বন্দর ব্যবহারের লক্ষ্যে ভারতের উপর দিয়ে মালবাহি ট্রাক চলাচলের ট্রানজিট। ভারত সে দাবি মানেনি। অথচ সে ভারতই নিল বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রায় ছয় শত মাইলের করিডোর। ফলে বুঝতে কি বাঁকি থাকে, পারস্পারিক সহযোগিতা বলতে ভারত যেটি বুঝে সেটি হলো যে কোন প্রকারে নিজের সুবিধা আদায়। প্রতিবেশীর সুবিধাদান নয়। কথা হলো, বাংলাদেশের জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট যদি ভারতের জন্য নিরাপত্তা-সংকট সৃষ্টি করে তবে সে যুক্তি তো বাংলাদেশের জন্যও খাটে। তাছাড়া বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ভারতের সৃষ্ট ষড়যন্ত্র নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে মুজিব নিহত হওয়ার পর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্ব কিছু আওয়ামী লীগ ক্যাডার ভারতে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের সীমান্তে তারা সন্ত্রাসী হামলাও শুরু করে। তাদের হামলায় বহু বাংলাদেশী নিরীহ নাগরিক নিহতও হয়। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থাগুলি তাদেরকে যে শুধু অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে তাই নয়, নিজ ভূমিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারেরও পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগের টিকেট পিরোজপুর থেকে দুই-দুইবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতার ভারতে গিয়ে স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন গড়ে তুলেছে সত্তরের দশক থেকেই। ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত এসব সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া দূরে থাক তাদেরকে নিজভূমি ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। এসব কি প্রতিবেশী-সুলভ আচরণ? অথচ সে ভারতই দাবি তুলেছে আসামের উলফা নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার। হাসিনা সরকার তাদেরকে ভারতের হাতে তুলেও দিচ্ছে। অথচ কাদের সিদ্দিকী ও চিত্তরঞ্জন সুতারের ন্যায় উলফা নেতাদের ভাগ্যে বাংলাদেশের মাটিতে জামাই আদর জুটেনি। ঘাঁটি নির্মান, সামরিক প্রশিক্ষণ ও বাংলাদেশের ভূমি থেকে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনার সুযোগও জুটেনি। বরং জুটেছে জেল।

 

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ভারতীয় ষড়যন্ত্র

বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের করিডোর যে কতটা আত্মঘাতি এবং কিভাবে সেটি বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত করবে -সে বিষয়টিও ভাববার বিষয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত জুড়ে মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম -ভারতের এ সাতটি প্রদেশ। এ রাজ্যগুলির জন্য এমন কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট রয়েছে যা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক). সমগ্র এলাকার আয়তন বাংলাদেশের চেয়েও বৃহৎ অথচ অতি জনবিরল। দুই) সমগ্র এলাকাটিতে হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ট। ফলে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ নিয়ে সমগ্র উপমহদেশে যে রাজনৈতিক সংঘাত ও উত্তাপ -এ এলাকায় সেটি নেই। ফলে এখানে বাংলাদেশ পেতে পারে বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী যা তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্ঠিত বাংলাদেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব -এ দুই দিকের সীমান্ত অতি সহজেই নিরাপত্তা পেতে পারে এ এলাকায় বন্ধু সুলভ কোন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে। অপরদিকে নিরাপত্তা চরম ভাবে বিঘ্নিত হতে পারে যদি কোন কারণে তাদের সাথে বৈরীতা সৃষ্টি হয়। তাই এ এলাকার রাজনীতির গতিপ্রকৃতির সাথে সম্পর্ক রাখাটি বাংলাদেশের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান যেমন আফগানিস্তানের রাজনীতি  থেকে হাত গুটাতে পারে না, তেমনি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয় এ বিশাল এলাকার রাজনীতি থেকে দূরে থাকা। যেহেতু এ এলাকায় চলছে প্রকাণ্ড এক জনযুদ্ধ তাই তাদের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি করা হবে আত্মঘাতি।  অথচ ভারত চায়, বাংলাদেশকে তাদের বিরুদ্ধে খাড়া করতে। তিন). একমাত্র ব্রিটিশ আমল ছাড়া এলাকাটি কখনই ভারতের অন্তর্ভূক্ত ছিল না, এমনকি প্রতাপশালী মুঘল আমলেও নয়। হিন্দু আমলে তো নয়ই। মুর্শিদ কুলি খাঁ যখন বাংলার সুবেদার তথা গভর্নর, তখন তিনি একবার আসাম দখলের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সে দখলদারি বেশী দিন টিকিনি। আসামসহ ৭টি প্রদেশের ভূমি ভারতভূক্ত হয় ব্রিটিশ আমলের একেবারে শেষ দিকে। ভারতীয়করণ প্রক্রিয়া সেজন্যই এখানে ততটা সফলতা পায়নি। এবং গণভিত্তি পায়নি ভারতপন্থি রাজনৈতিক দলগুলি। চার). সমগ্র এলাকাটি শিল্পে অনুন্নত এবং নানাবিধ বৈষম্যের শিকার। অথচ এলাকাটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। ভারতের সিংহভাগ তেল, চা, টিম্বার এ এলাকাতে উৎপন্ন হয়। অথচ চা ও তেল কোম্মানীগুলোর হেড-অফিসগুলো কোলকাতায়। কাঁচামালের রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানগুলিও এলাকার বাইরের। ফলে রাজস্ব আয় থেকে এ এলাকার রাজ্যগুলি বঞ্চিত হচ্ছে শুরু থেকেই। শিল্পোন্নত রাজ্য ও শহরগুলো অনেক দূরে হওয়ায় পণ্যপরিহন ব্যয়ও অধিক। ফলে সহজে ও সস্তায় পণ্য পেতে পারে একমাত্র উৎস বাংলাদেশ থেকেই। ভারতকে করিডোর দিলে সে বাণিজ্যিক সুযোগ হাতছাড়া হতে বাধ্য। পাঁচ) যুদ্ধাবস্থায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হল নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্ত এ এলাকায় সে সুযোগ ভারতের নেই। ভারতের সাথে এ এলাকার সংযোগের একমাত্র পথ হল পার্বত্যভূমি ও বৈরী জনবসতি অধ্যুষিত এলাকার মধ্য অবস্থিত ১৭ কিলোমিটার চওড়া করিডোর। এ করিডোরে স্থাপিত রেল ও সড়ক পথের কোনটাই নিরাপদ নয়। ইতিমধ্যে গেরিলা হামলায় শত শত সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির সেখানে প্রাণনাশ হয়েছে। ছয়). নৃতাত্বিক দিক দিকে এ এলাকার মানুষ মাঙ্গোলিয়। ফলে মূল ভারতের অন্য যে কোন শহরে বা প্রদেশে পা রাখলেই একজন নাগা, মিজো বা মনিপুরি চিহ্নিত হয় বিদেশী রূপে। তারা যে ভারতী নয় সেটি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য এ ভিন্নতাই যথেষ্ট। এ ভিন্নতার জন্যই সেখানে স্বাধীন হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ চলছে বিগত প্রায় ৭০ বছর ধরে। ভারতীয় বাহিনীর অবিরাম রক্ত ঝরছে এলাকায়। বহু চুক্তি, বহু সমঝোতা, বহু নির্বাচন হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতার সে যুদ্ধ থামেনি। ফলে বাড়ছে ভারতের অর্থনীতির উপর চাপ। সমগ্র এলাকা হয়ে পড়েছে ভারতের জন্য ভিয়েতনাম। যে কোন সময় অবস্থা আরো গুরতর রূপ নিতে পারে। আফগানিস্থানে একই রূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল রাশিয়ার জন্য। সে অর্থনৈতিক রক্তশূণ্যতার কারনে বিশাল দেহী রাশিয়ার মানচিত্র ভেঙ্গে বহু রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। ভারত রাশিয়ার চেয়ে শক্তিশালী নয়। তেমনি স্বাধীনতার লক্ষ্যে এ এলাকার মানুষের অঙ্গিকার, আত্মত্যাগ এবং ক্ষমতাও নগণ্য নয়। ফলে এ সংঘাত থামার নয়। ভারত চায় এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু ভারতের কাছে সংকট মুক্তির সে রাস্তা খুব একটা খোলা নাই।

ভারত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর নিয়েছে পণ্য-পরিবহন ও আভ্যন্তরীণ যোগাযোগের দোহাই দিয়ে। বিষয়টি কি আসলেই তাই? মেঘালয়, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের সমুদয় জনসংখ্যা ঢাকা জেলার জনসংখ্যার চেয়েও কম। এমন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির জন্য পণ্যসরবরাহ বা লোক-চলাচলের জন্য এত কি প্রয়োজন পড়লো যে তার জন্য অন্য একটি প্রতিবেশী দেশের মধ্য দিয়ে করিডোর চাইতে হবে? সেখানে এক বিলিয়ন ডলার বিণিয়োগ করতে হবে? যখন তাদের নিজের দেশের মধ্য দিয়েই ১৭ কিলোমিটারের প্রশস্ত করিডোর রয়েছে। বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলো দেশের আভ্যন্তরীণ সড়কের দুরবস্থার কথা জানিয়ে এতকাল পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছে। এবার ভারত বলছে তারা সড়কের উন্নয়নে বাংলাদেশকে দুই বিলিয়ন ডলার লোন দিতে রাজী। এবার বাংলাদেশ যাবে কোথায়? অথচ এই এক বিলিয়ন ডলার দিয়ে ভারত তার ১৭ মাইল প্রশস্ত করিডোর দিয়ে একটি নয়, ডজনের বেশী রেল ও সড়ক পথ নির্মাণ করতে পারতো। এলাকায় নির্মিত হতে পারতো বহু বিমান বন্দর। ভারতের সে দিকে খেয়াল নাই, দাবী তুলেছে বাংলাদেশের মাঝ খান দিয়ে যাওয়ার পথ চাই-ই। যেন কর্তার তোগলোকি আব্দার। গ্রামের রাস্তা ঘুরে যাওয়ায় রুচি নেই, অন্যের শোবার ঘরের ভিতর দিয়ে যেতেই হবে। গ্রামের ঝোপঝাড়ের পাশ দিয়ে রাস্তায় পথ চলতে অত্যাচারি কর্তার ভয় হয়। কারণ তার কুর্মের কারণে শত্রুদের সংখ্যাটি বিশাল। না জানি কখন কে হামলা করে বসে। একই ভয় চেপে বসেছে ভারতীয়দের মাথায়। সমগ্র উত্তরপূর্ব ভারতের স্বাধীনতাকামী জনগণের কাছে তারা চিহ্নিত হয়েছে উপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী রূপে। তারা চায় ভারতীয় শাসন থেকে আশু মুক্তি। এ লক্ষে জানবাজি রেখে তারা যুদ্ধে নেমেছে। ফলে ভারতের জন্য অবস্থা অতি বেগতিক হয়ে পড়েছে। একদিকে কাশ্মীরের মুক্তিযুদ্ধ দমনে যেমন ছয় লাখেরও বেশী ভারতীয় সৈন্য অন্তহীন এক যুদ্ধে আটকা পড়েছে, তেমনি তিন লাখের বেশী সৈন্য যুদ্ধে লিপ্ত উত্তর-পূর্ব এ ভারতে। যুদ্ধাবস্থায় অতিগুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে যতই এ যুদ্ধ তীব্রতর হচ্ছে ততই প্রয়োজন বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোরের। তাই করিডোর নেয়া হলো যে নিতান্তই সামরিক প্রয়োজনে -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? আর বাংলাদেশের জন্য শংকার কারণ মূলতঃ এখানেই। ভারত তার চলমান রক্তাত্ব যুদ্ধে বাংলাদেশকেও জড়াতে চায়। এবং সে সাথে কিছু গুরুতর দায়িত্বও চাপাতে চায়। কারো ঘরের মধ্য দিয়ে পথ চললে সে পথে কিছু ঘটলো সহজেই সেটির দায়-দায়িত্ব ঘরের মালিকের ঘাড়ে চাপানো যায়। তার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলাও দায়ের করা যায়। কিন্তু বিজন মাঠ বা ঝোপঝাড়ের পাশে সেটি ঘটলে আসামী খুঁজে পাওয়া দায়। ভারত এজন্যই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ৫ শত মাইলের করিডোর এবং সে করিডোরের নিরাপত্তার দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশের কাঁধে চাপাতে চায়। এ পথে ভারতীয়দের উপর হামলা হলে বাংলাদেশকে সহজেই একটি ব্যর্থ দেশ এবং সে সাথে সন্ত্রাসী দেশ রূপে আখ্যায়ীত করে আন্তর্জাতিক মহলে নাস্তানাবুদ করা যাবে। সে সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপকে ন্যায়সঙ্গত বলার বাহানাও পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের জন্য এখানেই বিপদ।

 

যে হামলা অনিবার্য

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে ভারতীয় যানবাহন চলা শুরু হলে সেগুলির উপর হামলার সম্ভাবনা কি কম? ভারতীয় বাহিনী কাশ্মীরের মুসলমানদের উপর নিষ্ঠুর বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ ৭০ বছর যাবত। এক লাখের বেশী কাশ্মীরীকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে, বহু হাজার মুসলিম নারী হয়েছে ধর্ষিতা। এখনও সে হত্যাকান্ড ও ধর্ষণ চলছে অবিরাম ভাবে। জাতিসংঘের কাছে ভারত সরকার ১৯৪৮ সালে ওয়াদা করেছিল কাশ্মীরীদের ভাগ্য নির্ধারণে সেখানে গণভোট অনুষ্ঠিত করার অনুমতি দিবে। জাতিসংঘের নিরাপত্ত পরিষদ এ্যাডমিরাল নিমিটস্ এর উপর দায়িত্ব দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল। কিন্তু ভারত সে প্রতিশ্রুতি রাখেনি। এবং সেটি নিছক গায়ের জোরে। এভাবে কাশ্মীরীদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধের পথে। অপর দিকে ভারত জুড়ে মুসলিমদের হত্যা, মুসলিম নারীদের ধর্ষণ, তাদের ঘরবাড়ীতে আগুণ, এমনকি মসজিদ ভাঙ্গার কাজ হয় অতি ধুমধামে ও উৎসবভরে। অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার কাজ হয়েছে হাজার পুলিশের সামনে দিন-দুপুরে। হাজার হাজার সন্ত্রাসী হিন্দুদের দ্বারা ঐতিহাসিক এ মসজিদটি যখন নিশ্চিহ্ন হচ্ছিল তখন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও, বিরোধী দলীয় নেতা বাজপেয়ী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ সম্ভবতঃ আনন্দভরে ডুগডুগি বাজাচ্ছিলেন। এটি ছিল বড় মাপের একটি ঐতিহাসিক অপরাধ। অথচ এ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ভারত সরকারের কোন পুলিশ কোন অপরাধীকেই গ্রেফতার করেনি। আদালতে কারো কোন জেল-জরিমানাও হয়নি। ভাবটা যেন, সেদেশে কোন অপরাধই ঘটেনি। মসজিদটি যেন নিজে নিজেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভারতীয়দের মানবতাবোধ ও মূল্যবোধের এটিই প্রকৃত অবস্থা। এমন একটি দেশ থেকে কি সুস্থ্য পররাষ্টনীতি আশা করা যায়? দেশটিতে দাঙ্গার নামে হাজার হাজার মুসলমানকে জ্বালিয়ে মারার উৎসব হয় বার বার। সাম্প্রতিক কালে আহমেদাবাদে যে মুসলিম গণহত্যা হল সংখ্যালঘূদের বিরুদ্ধে তেমন কান্ড পাকিস্তানের ৭০ বছরের জীবনে একবারও হয়নি। বাংলাদেশের ৫০ বছরের জীবনেও হয়নি।

কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আযাদ লিখেছিলেন, ‘‘আফ্রিকার কোন জঙ্গলে কোন মুসলমান সৈনিকের পায়ে যদি কাঁটাবিদ্ধ হয় এবং সে কাঁটার ব্যাথা যদি তুমি হৃদয়ে অনুভব না কর -তবে খোদার কসম তুমি মুসলমান নও।” –(সুত্রঃ মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রচনাবলী, প্রকাশক: ইসলামী ফাউন্ডেশন, ঢাকা)। এমন চেতনা মাওলানা আবুল কালাম আযাদের একার নয়, এটিই ইসলামের বিশ্ব-ভাতৃত্বের মৌলিক কথা। যার মধ্যে এ চেতনা নাই তার মধ্যে ঈমানও নাই। বাস্তবতা হল, বাংলাদেশে যেমন সেক্যুলারিজমের জোয়ারে ভাসা ভারতপন্থি বহু ক্যাডার আছে, তেমনি প্যান-ইসলামের চেতনায় উজ্জিবীতত বহু লক্ষ মুসলমানও আছে। করিডোরের পথে চোখের সামনে মুসলিম হত্যাকারি ও মসজিদ ধ্বংসকারি ভারতীয়দের কাছে পেয়ে এদের কেউ কেউ যে তাদের উপর বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়বে না -সে গ্যারান্টি কে দেবে? তাছাড়া ১৯৪৭ সালে বাংলার মুসলমানগণ যে স্বাধীন পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তা নিজ বাংলার বাঙালী হিন্দুদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নয়, বরং অবাঙালী মুসলমানদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে। সে চেতনা ছিল প্যান-ইসলামের। সেটি কি এতটাই ঠুনকো যে আওয়ামী বাকশালীদের ভারতমুখি মিথ্যা প্রচারনায় এত সহজে মারা মরবে? চেতনাকে শক্তির জোরে দাবিয়ে রাখা যায়, হত্যা করা যায় না। আর ইসলামি চেতনাকে তো নয়ই। ভারত সেটি জানে, তাই বাংলাদেশ নিয়ে তাদের প্রচণ্ড ভয়।

তাছাড়া বাংলাদেশীদের প্রতি ভারতীয় সৈনিকদের আচরণটাই কি কম উস্কানিমূলক? প্রতি বছর বহু শত বাংলাদেশী নাগরিককে ভারতীয় বর্ডার সিকুরিটি ফোর্স তথা বিএসএফ হত্যা করে। তারকাটার বেড়ায় ঝুলে থাকে তাদের লাশ। এর কোন প্রতিকার বাংলাদেশীরা পায়নি। নিরীহ মানুষের এমন হত্যাকান্ড বিএসএফ পাকিস্তান সীমান্তে বিগত ৬০ বছরেও ঘটাতে পারিনি। এমনকি সেটি নেপাল, ভূটান বা বিশ্বের আর কোন দেশের  সীমান্তেও ঘটে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভারত সরকারের কাছে যে কতটা মূল্যহীন ও তুচ্ছ এবং দেশের জনগণ যে কতটা অরক্ষিত -সেটি বোঝানোর জন্য এ তথ্যটিই কি যথেষ্ট নয়? বহুবার তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়েক কিলোমিটার ঢুকে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। ইচ্ছামত ধরে নিয়ে যায় গরুবাছুড়। বাঁধ দিয়ে সীমান্তের ৫৪টি যৌথ নদীর পানি তুলে নিয়েছে বাংলাদেশের মতামতের তোয়াক্কা না করেই। ফারাক্কা বাঁধ নির্মান করে এক তরফা ভাবেই তুলে নিয়েছে পদ্মার পানি। ষড়যন্ত্র চলছে টিপাইমুখ বাধ দিয়ে সুরমা ও কুশিয়ারার পানি তুলে নেয়ার। বাঁধ দিয়ে পানিশূণ্য করা হচ্ছে তিস্তা। এদের মুখে আবার প্রতিবেশী মূলক সহযোগিতার ভাষা?

 

অধিকৃত বাংলাদেশ

ভারতের আগ্রাসী ভূমিকার কারণ ভারতবিরোধী চেতনা এখন বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। বেতনভোগী কয়েক হাজার র’এর এজেন্ট দিয়ে এমন চেতনাধারিদের দমন অসম্ভব। সেটি ভারতও বুঝে। তাই চায়, বাংলাদেশ সরকার ভারত বিরোধীদের শায়েস্তা করতে বিশ্বস্ত ও অনুগত ঠ্যাঙ্গারের ভূমিকা নিক। শেখ হাসিনার সরকার সে ভূমিকাই বিশ্বস্ততার সাথে পালন করছে দেশের শত শত ইসলামপন্থি নেতা কর্মীদের গ্রেফতার ও নির্যাতন এবং ইসলামী বইপুস্তক বাজয়াপ্ত করার মধ্য দিয়ে। অথচ এটি কি কখনো কোন মুসলমানের এজেণ্ডা হতে পারে? শেখ হাসিনার সরকার রীতিমত যুদ্ধ শুরু করেছে দেশের ইসলামপন্থিদের নির্মূলে। সেটি শুধু জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নয়, সকল ইসলামী দলের বিরুদ্ধেই। কে বা কোন দল একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল সেটি তাদের কাছে বড় কথা নয়, বরং কারা এখন ইসলামের পক্ষ নিচ্ছে সেটিই তাদের বিবেচনায় মূল। এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নামছে। আওয়ামী বাকশালী পক্ষটি এমন একটি যুদ্ধের হুংকার বহু দিন থেকে দিয়ে আসছিল এবং এখন সেটি শুরুও হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ঘাড়ে এভাবেই চাপানো হয়েছে একটি অঘোষিত ভারতীয় যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ব্যয়ভার যেমন ভারতীয়রা বহন করছে, তেমনি কমাণ্ডও তাদের হাতে। বাংলাদেশ বস্তুত এ পক্ষটির হাতেই আজ  অধিকৃত।

হাসিনা জনগণের সমর্থণ নিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। জনপ্রিয়তা হারানো নিয়েও তার কোন দুর্ভাবনা নেই। সে দুর্ভাবনা ও দায়ভারটি বরং ভারতীয়দের। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত। তখন বিপদে পড়বে ভারতের প্রায় বহু বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজার। বিপদে পড়বে উত্তর-পূর্ব ভারতে তাদের যুদ্ধ।  চট্টগ্রাম বন্দরে আটককৃত ১০ ট্রাক অস্ত্র নিয়ে হাসিনা সরকার প্রমাণ করে ছেড়েছে তাঁর সরকার ভারতীয়দের স্বার্থের কতটা সহায়ক। বলা হয়, ১০ ট্রাক চীনা অস্ত্র আনা হয়েছিল উলফা বিদ্রোহীদের হাতে পৌঁছানোর জন্য। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুৎ হলে ভবিষ্যতে ১০ ট্রাক নয় আরো বেশী অস্ত্র যে বিদ্রোহীদের হাতে পৌঁছতে পারে –সে ভয়ে দিল্লির শাসকচক্র অস্থির। ভারতীয় নেতারা শিশু নয় যে তারা সেটি বুঝে না। সে জন্যই ভারত চায়, শেখ হাসিনার সরকার শুধু ক্ষমতায় থাকুক তাই নয়, বরং ভারতের সাথে উলফা বিরোধী যুদ্ধে পুরাপুরি সংশ্লিষ্ট হোক। এ যুদ্ধে যোগ দিক সক্রিয় পার্টনার রূপে, যেমনটি দিয়েছিল একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে।

 

লড়াই দেশ ও ঈমান বাঁচানোর

একাত্তরে যুদ্ধ ৯ মাসে শেষ হলেও এবারে সেটি হচ্ছে না। বরং বাংলাদেশীদের কাঁধে চাপানো হচ্ছে এমন এক লাগাতর যুদ্ধ যা সহজে শেষ হবার নয়। তাছাড়া এ যুদ্ধটি আদৌ বাংলাদেশীদের নিজেদের যুদ্ধ নয়। বরং সর্ব অর্থেই ভারতীয় এবং সেটি ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণের।একাত্তরের যুদ্ধে ভারতের যে উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়, ভারত এবার কোমর বেঁধেছে সেটিই পুরণ করতে। তাই ভারতের লক্ষ্য শুধু করিডোর লাভ নয়। সীমান্ত চুক্তি, সীমান্ত বাণিজ্য বা রাস্তাঘাট নির্মানে কিছু বিনিয়োগও নয়ও। বরং তার চেয়ে ব্যাপক ও সূদুর প্রসারী। সেটি যেমন দেশের ইসলামি চেতনার নির্মূল ও ইসলামপন্থি দেশপ্রেমিকদের কোমর ভাঙ্গার,তেমনি দেশটির উপর পরিপূর্ণ অধিকৃতি জমানোর। মি. ভার্মার ন্যায় ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা সে অভিলাষের কথা গোপন রাখেনি, তেমনি গোপন রাখছেন না বহু ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাও। বিজেপির এক কেন্দ্রীয় নেতা তো সিলেট থেকে খুলনা বরাবর বাংলাদেশের অর্ধেক দখল করে নেয়ার দাবীও তুলেছেন। মুজিবের ন্যায় হাসিনাও চায় ভারতের ইচ্ছা পূরণ। কারণ, ক্ষমতায় থাকার জন্য সেটি গুরুত্বপর্ণ। তাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌল শিক্ষার প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইসলামী সংগঠনগুলির নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতন দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। বস্তুতঃ এসব করা হচ্ছে বাংলাদেশকে ভারতীয় মানচিত্রে বিলীন করার লক্ষ্যে। রাজনৈতিক মানচিত্র বিলুপ্ত না করলেও ইতিমধ্যই বিলুপ্ত করতে পেরেছ সাংস্কৃতিক মানচিত্র। বাংলাদেশীদের সামনে লড়াই এখন তাই শুধু গণতন্ত্র উদ্ধারের নয়। বরং তার চেয়েও গুরুতর। সেটি দেশ বাঁচানোর। এবং সে সাথে ঈমান ও ইসলাম বাঁচানোর। ১১/০৬/২০১৫; নতুন সংস্করণ ২৬/০৩/২০১৯

 

 




হাসিনা সরকারের অপরাধনামা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বিদ্রোহ আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে

শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী সরকারের মুল অপরাধটি স্রেফ জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং খোদ মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর কোরআনী আহকামের বিরুদ্ধে। এ গুরুতর অপরাধটি বিদ্রোহের। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা শুধু সিরাতুল মোস্তাকীমই বাতলিয়ে দেননি, বরং সে সিরাতুল মোস্তাকীমে চলার পথে মু’মিনের জীবনে কীরূপ কর্মকান্ড বা মিশন হবে সেটিও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। মিশন তো তাই যা মিশনারি ব্যক্তিটি প্রতিদিন করে, এবং যা নিয়ে তার লাগাতর ভাবনা ও ত্যাগ-সাধনা। সে পথ বেয়েই সে তার স্বপ্নের ভূবনে পৌঁছে। আর সে স্বপ্ন বা ভিশনটি হলো,আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়। সে লক্ষ্যে আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত মিশনটি হলো “আ’মিরু বিল মারুফ ওয়া নেহি আনিল মুনকার”, অর্থাৎ “ন্যায়ের নির্দেশ দান ও অপরাধীদের নির্মূল”। তবে সে বিজয় জায়নামাযে আসে না। মসজিদ-মাদ্রাসায় বা সুফীর আখড়াতেও আসে না। সে মিশন নিয়ে বাঁচায় অনিবার্য হয়ে উঠে আল্লাহবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লাগাতর জিহাদ। রাষ্ট্র থেকে নমরুদ-ফিরাউনের ন্যায় অপরাধীদের নির্মূল করাই যে মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত সেটি তিনি নিজে তাদের নির্মূল করে দেখিয়েছেন। তিনি চান, মানুষ একাজে তার আনসার বা সহকারি হোক। ঈমান নিয়ে বাঁচার এ এক গভীর দায়বদ্ধতা। দায়বদ্ধতাই তাকে বেঈমানদের থেকে পৃথক করে ফেলে।

পবিত্র কোরআনে বার বার বলা হয়েছে, ঈমানদারগণ জিহাদ করে ও জানমালের কোরবানী পেশ করে “ফি সাবিলিল্লাহ” তথা আল্লাহতায়ালার পথে। আর বেঈমানেরা লড়াই করে “ফি সাবিলিত তাগুত” তথা তাগুত বা শয়তানের পথে। বাংলাদেশে এ দুটি পক্ষের যুদ্ধই দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। বার বার ওমরা করলে কি হবে, হাসিনা সরকারের লড়াই যে আল্লাহর পথে নয় তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? কারণ সেটি হলে সে লড়াইয়ে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা আসে। সে লড়াইয়ে দেশী ও ভিন দেশী কাফের শক্তির বিরুদ্ধে অঙ্গিকারও তখন তীব্রতর হয়। “ফি সাবিলিল্লাহ”র পথে বাঁচার অর্থ স্রেফ নামায-রোযা নিয়ে বাঁচা নয়, বরং “ন্যায়ের নির্দেশ দান ও অপরাধীদের নির্মূল”এর মিশন নিয়ে বাঁচা।পবিত্র কোরআনে সে তাগিদ বার বার এসেছে এবং সেটিরই বাস্তব প্রয়োগ করে গেছেন সাহাবায়ে কেরাম। প্রতি যুগে বান্দাহর দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহর সে সূন্নতকেই অনুসরণ করা। মু’মিনের জীবনে এরূপ বাঁচার মধ্যেই তার রাজনীতি ও জিহাদ। মহান আল্লাহতায়ালার সে সূন্নতের পথ বেয়েই  নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ রাষ্ট্রের বুক থেকে আবুলাহাব, আবুজেহেল ও তার অনুসারিদের নির্মূল করেছিলেন। তাদের নির্মূলের পর দুর্বৃত্ত শাসনের নির্মূলে নেমেছিলেন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যভূক্ত বিশাল ভূ-ভাগেও। শয়তানি শক্তির নির্মূলের সে ধারা অব্যাহত রাখতেই একদল মুসলমান ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে ত্রয়দশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাংলাদেশে পৌঁছেছিলেন। আর মুসলিম বাহিনীর বিজয়ই তো বিজিত দেশের নাগরিকদের জীবনে বিশাল নেয়ামত বয়ে আনে। ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির সে বিজয়ের বরকতেই বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ আজ মুসলমান। নইলে তাদের আজ মুর্তি পুঁজা, শাপশকুন ও গরুছাগলকে পুঁজা করতে হতো। আল্লাহর শত্রু নির্মূলে ঈমানদারগণ ময়দানে নামলে তাদের মদদে মহান আল্লাহতায়ালা ফিরাশতা নামিয়ে দেন।সেটিও মহান আল্লাহর সূন্নত।

ন্যায়ের হুকুম ও অপরাধীদের নির্মূলের কঠিন কাজটি জায়নামাজ থেকে অসম্ভব। সে কাজে শক্তি চাই। সে জন্য তো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে নেয়াটি জরুরী। তাই নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবীগণ নামায-রোযা, হজযাকাত পালনের মধ্যে তাদের ইবাদতকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শত্রুশক্তিকে পরাজিত করে সে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ তারা নিজ হাতে নিয়েছেন এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়ে জায়নামাজে ধর্মকর্ম সীমিত রাখাটি ইসলাম নয়। নবীজী (সাঃ)র সূন্নতও নয়। সেটি হলে অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহর নির্দেশের। সে অবাধ্যতায় খুশি হয় শয়তান ও তার অনুসারিগণ। তারা চায়, মুসলমানগণ রাজপথ শূণ্য করে মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নিক। আর রাষ্ট্রের উপর পুরা দখলদারিটা তাদের হাতে চলে আসুক। বাংলাদেশের আওয়ামী সেক্যুলার পক্ষটির খায়েশ কি তা থেকে আদৌ ভিন্নতর? দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাউকে রাজপথে নামতে দিতে তারা রাজী নয়।কারণ, তাতে তাদের নিজেদের রাজনীতি বিপদে পড়ে। তাদের জিহাদশূণ্য ইসলামে সেটির স্থান নাই। নিজেদের সে বিকৃত ইসলামের দোহাই দিয়েই তারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকামীদের রাজনীতিকে বলছে সন্ত্রাস। প্রশ্ন হলো, মক্কার কাফেরগণ ইসলামের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছিল তাদের এ অবস্থান কি তা থেকে ভিন্নতর?

বাংলাদেশে সেক্যুলারিস্টদের কাজ হয়েছে, রাষ্ট্রের চিহ্নিত অপরাধীদের পরিচর্যা দেয়া। সে সাথে পুরস্কৃত করাও। অপরাধ নির্মূল করতে তো অপরাধকে অপরাধ রূপে গণ্য করার মত মানসিকতা থাকতে হয়। শাস্তি দেয়ার জন্য উপযোগী আইনও থাকতে হয়। ইসলামের সে আইন হলো শরিয়ত। কিন্তু বাংলাদেশের সেক্যুলার দলগুলির অপরাধ, তারা অপরাধের সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছে। দেশটির কুফরি আইনে ব্যাভিচার,জ্বেনা বা পতিতাবৃত্তি কোন অপরাধ নয়। অপরাধ নয় সূদ ও ঘুষ খাওয়া।অপরাধ নয় মিথ্যা কথা বলা বা মিথ্যা বলে কাউকে প্রতারিত করা। বরং সে প্রতারণার কাজটি সবচেয়ে বেশী করে রাজনৈতিক নেতাগণ। নির্বাচন কালে প্রতারণা করাটি একটি শিল্পে পরিণত হয়। আট আনা সের চাউল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুজিব তাই দুর্ভিক্ষ উপহার দিয়েছিলেন। সে ব্যর্থতার জন্য মুজিবের বিবেকে কোন দংশন হয়নি, কোনরূপ শরমও হয়নি। আওয়ামী লীগের আজকের নেতারাও মুজিবের সে সীমাহীন ব্যর্থতা নিয়ে লজ্জিত নয়। বরং মুজিবের এরূপ ধোকাবাজি তাদের কাছে গণ্য হয় সেক্যুলার রাজনীতির অনিবার্য কালচার রূপে। একই অবস্থা মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার। ২০০৮ সালে ভোট নিয়েছেন ঘরে ঘরে চাকুরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি পূরণ নিয়ে কোন ভাবনার লেশ মাত্রও কি তো মধ্যে দেখা গেছে। হাসিনার কাছে অপরাধ নয় নিরপরাধ মানুষকে নির্যাতন করা এবং তাদের খুন করা। বরং এরূপ নৃশংস বর্বরতাগুলো তার কাছে গণ্য হয়েছে রাজনীতির কালচার রূপে। তাই শাপলা চত্বরে শত শত মানুষকে খুন, গুম ও আহত করা হলেও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরি করার উৎসব হলেও সে ঘৃণ্য অপরাধীকে হাসিনা গ্রেফতার করেনি। অপরাধীগণ নিজ দলের হলে তাদের শাস্তি দেয়া দূরে থাক পরিচর্যা দেয়াই হয় তখন সরকারের নীতি। সে নীতির প্রয়োগ করতে গিয়ে হাসিনার সরকার তার দলীয় দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে আনীত হাজার হাজার ফৌজদারি মামলা তুলে নিয়েছেন। দলীয় প্রেসিডেন্টকে দিয়ে শাস্তি মাফ করে দিয়েছেন আদালতে শাস্তিপ্রাপ্ত  বহু খুনিকে। “আ’মিরু বিল মা’রুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার’ অর্থাৎ “ন্যায়ের নির্দেশ দান এবং অপরাধীর নির্মূল” এ কোরআনী নির্দেশের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় অবাধ্যতা আর কি হতে পারে?

 

অপরিহার্য হলো অপরাধীদের নির্মূল

কোন দেশের স্বাধীনতা ও সভ্যতার মূল শত্রু সে দেশের চোর-ডাকাত নয়। চোর-ডাকাতদের লোভটি মানুষের অর্থের দিকে, দেশের স্বাধীনতা ও সংহতির বিরুদ্ধে নয়। ফলে তাদের কারণে কোন দেশ পরাধীন হয় না। খন্ডিতও হয় না। ১৭৫৭ সালে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের হাতে যখন বাংলা অধিকৃত হয় সেটি চোরডাকাদতের কারণে হয়নি, হয়েছে মীর জাফরদের ন্যায় অপরাধী রাজনীতিবিদদের কারণে। রাজনৈতিক অপরাধীগণই সুযোগ পেলে দেশের মানচিত্রে ও স্বাধীনতায় হাত দেয়। অথচ আজ এরূপ ভয়ংকর অপরাধীদের হাতেই বাংলাদেশ অধিকৃত। আর দেশ অপরাধীদের হাতে অধিকৃত হলে তখন নৃশংস হামলা শুধু জনগণের জানমালের উপরই হয় না। তখন বিপন্ন হয় দেশের স্বাধীনতা, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতিও। রাষ্ট্রীয় কোষাগার, ব্যাংক, শেয়ার মার্কেট ও রাষ্ট্রমালিকানাধীন কলকারখানা লুন্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি তখন জনগণও পথে ঘাটে লাশ হতে ও গুম হতে শুরু করে। পুলিশ, আর্মি, আাদালত ও প্রশাসনের কর্মচারিগণ তখন অত্যাচারের হাতিয়ারে পরিণত হয়। বাংলাদেশে তো আজ সেটাই সর্বস্তরে হচ্ছে। তাই ঢাকার শাপলা চত্বরে শত শত মানুষ যাদের হাতে লাশ হলো ও আহত হলো তারা আন্ডার ওয়ার্ল্ডের খুনি নয়। তারা জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্য। এবং তারাই নিরীহ জনগণের উপর গুলি চালানোর কাজে সরকারের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত।যখন সে দায়িত্বটি নৃশংস ভাবে পালিত হয়, তখন শাসকশ্রেণী প্রচন্ড খুশি হয় এদের উপর এবং ভাবনা শুরু হয় কিভাবে তাদেরকে পুরস্কৃত করা যায় -তা নিয়ে।

নিজ দলের ডাকাতদের হাতে মানুষ খুন হলে ডাকাত সর্দার তার বিচার করে না। কারণ সে কাজের জন্যই সর্দারের পক্ষ থেকে সে নির্দেশপ্রাপ্ত। একই নীতি হয়েছে হাসিনা সরকারের। ফলে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে হাজার হাজার মানুষ লাশ হলেও সরকার সে হ্ত্যাকান্ডের অভিযোগে কোন অপরাধী খুনিকে হাজতে তোলেনি। আদালতে তুলে তাদের বিচারও করেনি। পুলিশের হাতে যখন দুয়েকজন মানুষ খুন হয় তখন সে খুনে সরকারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ থাকে। সেটি পুলিশের বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু তাদের হাতে যখন শত শত মানুষ খুন ও ঘুম হয় এবং সে খুন ও গুম নিয়ে যখন বিচার বসে না, তখন তাতে সরকারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? বাংলাদেশে এরূপ সরকারি খুনিরা শত শত বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে। কিন্তু সে অপরাধে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। বরং সরকারের কাজ হয়েছে, সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকারিকে ও নির্যাতনকারিদের বেছে বেছে প্রমোশন দেয়া। মুজিব আমলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু সে অপরাধে কাউকে শাস্তি দেয়া দূরে থাক, ডেকে জিজ্ঞেসও করা হয়নি কেন নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করলো?

স্বৈরাচারি সরকারের এজেন্ডা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া নয়, বরং সেটি নিজের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা। সেটি করতে গিয়ে নিজের নিরপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীকে হত্যা ও নির্যাতনের লাইসেন্স দেয়। দুর্বৃত্ত সরকার বেঁচে থাকে সেরূপ হত্যা ও নির্যাতনের উপর ভর করেই। কোন সভ্যদেশ এমন অপরাধী চক্র দ্বারা অধিকৃত হলে সে দেশের নাগরিকগণ মুক্তির লক্ষ্যে লড়াই করে। ইসলামে সে লড়াইটি নিছক রাজনীতি নয়, সেটি জিহাদ। ধর্মীয় ভাবে সেটি ফরজ। দেশের মানুষ কতটা সভ্য, কতটা আত্মসম্মানী ও কতটা ঈমানদার -সে বিচারটি হয় সে অপরাধী শাসকচক্রের বিরুদ্ধে নির্মূলের আয়োজন দেখে। অথচ সে ভাবনা গরুছাগলের থাকে না। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাদের মাঝে প্রতিবাদও উঠে না। গরুছাগলের এজেন্ডাটি তো ঘাসপাতা খেয়ে বাঁচা। কিন্তু সভ্য মানুষ শুধু পানাহার, ঘর-সংসার নিয়ে বাঁচে না। তারা দেশকে সভ্যতরও করতে চায়। আর ফেরাউন-নমরুদ, আবু লাহাব-আবু জেহেলদের মত দুর্বৃত্তদের শাসনক্ষমতায় বসিয়ে কি দেশকে সভ্য করা সম্ভব? দেশ তখন দূর্নীতি, অসভ্যতা ও ভিক্ষাবৃত্তিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে। যেমনটি মুজিব আমলে ও হাসিনার আমলে বাংলাদেশের ললাটে জুটেছে। তাই এমন দুর্বৃত্ত শাসকদের থেকে মুক্তিলাভ সমাজের সভ্য মানুষদের এক বড় দায়বদ্ধতা। স্রেফ নামাজ-কালাম ও হজ-যাকাত পালনে সে সভ্যতা নির্মিত হয় না বলেই আল্লাহতায়ালা জিহাদকেও ফরজ করেছেন।

স্বৈরাচারি শাসকদের নির্মুলকর্মটি তাই নিছক মানবাধিকার নয়। স্রেফ রাজনৈতিক ইস্যুও নয়। বরং প্রতিটি সভ্য নাগরিকের এক গভীর দায়বদ্ধতা। এমন একটি অধিকারের প্রতিধ্বনি করে বলিষ্ঠ বক্তব্য রেখেছেন ফ্রান্সের প্রখ্যাত লেখক Guy de Maupassant। মোপাসাঁ লিখেছেন, “Since governments take the right of death over their people, it is not astonishing if the people should sometimes take the right of death over governments.”। অর্থঃ “সরকার যখন তার নিজদেশের নাগরিকদের হত্যা করার অধিকারকে নিজ হাতে নেয়, তখন এটিও অবাক হওয়ার বিষয় নয় যে, জনগণেরও উচিত সে সরকারের হত্যার অধিকারটিও নিজ হাতে তুলে নেয়া”।১৭৮৯ সালে বিখ্যাত ফরাসী বিপ্লব ঘটেছিল তো তেমন এক দায়বদ্ধতা থেকেই। সে দায়বদ্ধতা থেকে বিপ্লব এসেছে ইরানেও। একের পর এক বিপ্লব আসছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে। ইংরেজরাও সে চেতনা নিয়ে তাদের রাজা চার্লসের গর্দান কর্তন করেছিল।

 

অপরিহার্য হলো মুরতাদের শাস্তি

প্রশ্ন হলো, আবু জেহেল ও আবু লাহাবদের বাস কি বাংলাদেশে কম? দেশটিতে যারা আল্লাহর শরিয়তি নিজামের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে রেখেছে তারা কি কম নৃশংস? এ রাষ্ট্রীয় অপরাধীদের হাতে যে শুধু আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হচ্ছে তা নয়, তাদের হাতে লাশ হচ্ছে ইসলামের পক্ষের শক্তির নেতাকর্মীরাও। লাশ হচ্ছে রাজপথে ধর্না দেয়া নিরস্ত্র মুসল্লিরা। তাদের লাশগুলোকে ময়লার গাড়িতে ফেলা হচ্ছে ও সে সাথে বহু লাশকে গায়েবও করা হয়েছে। যেমনটি গত ৬ই মে ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হলো। প্রশ্ন হলো, নবীজীর আমলে আল্লাহর শরিয়তী আইনের বিরুদ্ধে কেউ বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার আওয়াজ তুললে তার মাথাটিকে কি দেহের উপর থাকতে দেয়া হতো? অথচ দেশের আওয়ামী সেক্যুলারিস্টদের রাজনীতির ভিত্তি হলো শরিয়তের বিরোধীতা করা। প্রশ্ন হলো, শরিয়তের এমন বিরোধীরা হাজার বার হজ-ওমরাহ করলে বা সারা জীবন নামাজ পড়লেও কি মুসলমান থাকে? মুরতাদ হওয়ার জন্য আল্লাহর শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়াই কি যথেষ্ট নয়? হযরত আবু বকরের সময় কিছু লোকেরা রাষ্ট্রীয় ভান্ডারে যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল। সে অপরাধের কারণে তারা মুরতাদ রূপে ঘোষিত হয়েছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে হযরত আবু বকর (রাঃ) যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। আর যুদ্ধ তো শত্রুর কপালে চুমু দেয়ার জন্য হয় না। আবর্জনাকে ক্ষণিকের জন্যও ঘরে স্থান দেয়া ভদ্রতা নয়, স্বাস্থের জন্য সহায়কও নয়। তেমনি ভদ্রতা নয় আল্লাহর অবাধ্য অপরাধীদের রাষ্ট্রে স্থান দেয়া। কারণ তাতে রাষ্ট্রে পচন ধরে। অথচ বাংলাদেশ আজ এ অপরাধীদের রমরমা ভাব, রাষ্ট্র বরং তাদের হাতেই অধিকৃত।

সভ্যতার পরিমাপে নবী(সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের যুগই হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ। তাদের সে শ্রেষ্ঠতার কারণ এ নয় যে, সে আমলে পিরামিড, তাজমহল বা চীনের প্রাচীর নির্মিত হয়েছিল। বা বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিস্কার ঘটেছিল। বরং সে শ্রেষ্ঠত্ব বিপুল সংখ্যক মানুষের অতি উচ্চতর মানবিক পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠায়। পিরামিড বা তাজমহল নির্মিত না হলেও সে সময় অতি উচ্চমানের অসংখ্য মানুষ নির্মিত হয়েছিল। মানব জাতি আর কখনোই এতবড় সভ্যতার জন্ম দিতে পারিনি। বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৫০ গুণ বৃহৎ রাষ্ট্রের খলিফা তখন ভৃত্যকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। মানুষে মানুষে সমতা ও মানবাধিকারের নীতিকথা নিয়ে বড় বড় বই লেখা হয়েছে। কিন্তু মানব ইতিহাসের কোন কালে একটি মুহুর্তের জন্যও কি এরূপ ঘটনা ঘটেছে? এ বিপ্লব একমাত্র ইসলামের। তখন প্রতি জনপদে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল “আ’মিরু বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার” এর কোরআনী নির্দেশ। তখন মানুষ পেয়েছিল সিরাতুল মোস্তাকীমের সন্ধান এবং নিয়োজিত হয়েছিল সে পথ বেয়ে জান্নাতের পথে বিরামহীন পথচলায়। জান্নাতের পবিত্র মানুষদের তখন দেখা যেত শুধু মসজিদ মাদ্রাসায় নয়, বরং পথেঘাটে, লোকালয়ে, হাটে-বাজারে, প্রশাসনে, রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহে। পাপাচারিদের দ্বারা দেশ অধিকৃত হলে কি সেটি আশা করা যায়? তখন শুধু পথঘাট নয়, রাষ্ট্রের প্রশাসন, আদালত, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও রাজনীতির প্রতিটি অঙ্গণ ভরে উঠে আল্লাহর অবাধ্য জাহান্নামীদের দিয়ে। এরূপ আল্লাহদ্রোহী জাহান্নামীদের বৈশিষ্ঠ হলো, তারা সামর্থ হারায় সৎকর্মের। এবং সামর্থ পায় বীভৎস কুকর্মের। বাংলাদেশ তো তাদের কুকর্মের কারণেই দুই শতাধিক রাষ্টকে হারিয়ে ৫বার দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছে।

 

অপরাধ মানব-উন্নয়নকে অসম্ভব করার

সভ্যতার গুণাগুণ বিচারে মূল বিচার্য বিষয়টি হলো, মানবিকতায় মানুষ কতটা এগুলো সেটি। যান্ত্রিক বা কারিগরি উন্নয়ন নয়। কৃষি বা স্থাপত্যে উন্নয়নও নয়। অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র বা সমাজ অধিকৃত হলে সে মানব-উন্নয়নের কাজটি পুরাপুরি অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেটি যেমন ফিরাউন-নমরুদ ও আবু-জেহেল-আবু-লাহাবদেরর আমলে অসম্ভব হয়েছিল, তেমনি আজ অসম্ভব হয়ে পড়েছে বাংলাদেশে। সংক্রামক রোগের ন্যায় পাপকর্মও ছোঁয়াচে। পাপীরা ক্ষমতায় গেলে সে রোগ তখন বেশী বেশী ছড়ায়। দুর্বৃত্তিতে দেশটির বিশ্বরেকর্ড গড়ার কারণ এ নয় যে, দেশটির গ্রামগঞ্জ ও বস্তিগুলি চোর-ডাকাতের দখলে গেছে। বরং এজন্য যে, ভয়ানক অপরাধীদের দখলে গেছে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষাসংস্কৃতি, পুলিশ ও আদালত। মুসলমানদের আজকের অধঃপতনের কারণ, মুসলিম সমাজ থেকে ক্ষতিকর আবর্জনা সরানোর কাজটি বন্ধ হয়ে গেছে। বরং বেড়েছে তাদের প্রতিপালনের কাজ। এবং সেটি রাজস্বের অর্থে।

মুর্তিপুজারিদের ধর্ম হলো মন্দিরের সবচেয়ে বড় মুর্তিটাকে বেশী বেশী পুজা দেয়া। বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের রাজনীতির মূল নীতিটি হলো দেশের অপরাধমূলক রাজনীতির সবচেয়ে বড় নায়ককে জাতির পিতার আসনে বসানো।প্রশ্ন হলো, সেক্যুলারিস্ট পুজারীগণ সেটি মেনে নিতে পারলেও কোন ঈমানদার কি এমন ব্যক্তিকে সামান্য ক্ষণের জন্যও সন্মান দেখায়? আর তাতে কি তার ঈমান বাঁচে? পথভ্রষ্ট বেঈমান ব্যক্তিগণ যে শুধু সিরাতুল মুস্তাকীম চিনতে ব্যর্থ হয় তা নয়। তারা ব্যর্থ হয় সৎ নেতা চিনতেও। তাদের পথভ্রষ্টতা পদে পদে। বাংলাদেশের মানুষের সে ব্যর্থতাটা ধরা পড়ে শুধু শরিয়তের অনুসরণে নয়, যোগ্য নেতা চেনার ক্ষেত্রেও। নইলে মুজিবের নয় গণতন্ত্র-দুষমন ও বিদেশের সেবাদাস ব্যক্তিটি এত জনপ্রিয়তা পায় কি করে? হাসিনা ও তার দুর্বৃত্ত দোসরগণই বা নির্বাচনে ভোট পায় কি করে? আর সে ভ্রষ্টতাটি এসেছে কোরআনী জ্ঞানের অজ্ঞতা থেকে। চোরডাকাতের দিনের আলোর ভয় পায়। ইসলামের শত্রুপক্ষ তেমনি ভয় পায় কোরআনী জ্ঞানের। ইসলামের শত্রুপক্ষ রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে অজ্ঞতাকেই টিকিয়ে রাখতে চায়। এজন্যই গ্রামগঞ্জে পুলিশ, র‌্যাব ও দলীয় ক্যাডারদের নামানো হয়েছে ইসলামি পুস্তক বাজেয়াপ্ত করার কাজে। ইসলামের বিরুদ্ধে আওয়ামী সরকারেরও এটিও কি কম শাস্তিযোগ্য অপরাধ?    

যে অপরাধ মিথ্যাচারে

ইসলামে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ শুধু খুন-ব্যাভিচার ও চুরিডাকাতি নয়। শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো মিথ্যাচার। জাহান্নামে পৌছার জন্য মানুষ খুন বা ব্যাভিচার জরুরী নয়। মিথ্যাচারই সে জন্য যথেষ্ঠ।মিথ্যা কথা বলাকে নবীজী (সাঃ)সকল পাপের মা বলেছেন। তাই মিথ্যাচারিকে শাস্তি না দিলে রাষ্ট্র বা সমাজ থেকে পাপাচার বন্ধ হয় না। বাংলাদেশের মাটিতে বহু অপরাধির জন্ম। এদের কেউ খুনি, কেউ ব্যাভিচারি, কেউ মদ্যপায়ী, কেউ বা সন্ত্রাসী। কিন্তু মিথ্যাচারে তাদের কেউ কি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী নেতা-কর্মীদের হারিয়ে দেয়ার সামর্থ রাখে? হাসিনার মিথ্যাচারের কিছু নমুনা দেয়া যায়। শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের বহু শত মানুষের নিহত, আহত ও গুম হওয়ার খবর বহু সাংবাদিক লিখেছেন। সরকারি মুখপাত্রগণও নিহত হবার খবর দিয়েছেন। কিন্তু হাসিনার বলেছেন “সেই (৫ মে) দিন কোনো গোলাগুলি বা সেরকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তারা সেখানে গায়ে লাল রঙ মেখে পড়ে ছিল। পরে পুলিশ যখন তাদের ধরে টান দেয়,দেখা গেল উঠে দৌড়াচ্ছে।দেখা গেল লাশ দৌড় মারল।” হাসিনার এ বক্তব্যটি বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো পত্রিকাতেই প্রকাশ পেয়েছে।  এ বক্তব্যটি তার মিথ্যাচারের দলীল। যে কোন সভ্য দেশের আইনে এরূপ মিথ্যা সাক্ষি দেয়া ফৌজদারি অপরাধ। সে রাতের প্রকৃত সত্যটি হলো, সেদিন প্রচন্ড গোলাগোলি হয়েছিল। গোলাগোলিতে বহু শত মানুষ হতাহত হয়েছে। শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের লাশগুলো সেদিন হাসিনার কথা মত দৌড় মারেনি, বরং সেখানেই রক্তাত্ব নিথর দেহ নিয়ে পড়ে ছিল। সরকারি প্রেসনোট দাতারাও সে লাশগুলো দেখেছে। অনেক দেখেছে সে লাশগুলোকে ময়লার গাড়িতে তুলতে। অতএব এরূপ উদ্ভট মিথ্যা তথ্য দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির আইনে বিচার ও সে বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। ১২ই মে তারিখে দৈনিক যুগান্তর রিপোর্ট করে, “পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবীর ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন এ হামলায় অংশ নিয়েছিল। হামলাকারিদের মধ্যে ১৩০০ জন এসেছিল র‌্যাব থেকে। ৫,৭১২ জন এসেছিল পুলিশ বাহিনী থেকে এবং ৫৭৬ জন এসেছিল বিজিবী থেকে। হামলা শুরু হয় রাত আড়াইটার সময় এবং তিন দিক দিয়ে। দৈনিক যুগান্তর লিখেছে, সমগ্র এলাকাটি সে সময় বন্দুকের গুলি, টিয়ারগ্যাসের শেল ও ধোয়াতে পূর্ণ হয়ে যায়। পত্রিকাটি বিবরণ দিয়েছে, সেপাইদের পাশে হামলাতে অংশ নেয় ৫ জন কমান্ডো অফিসার।

হাসিনার দাবী, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে তার শাসনামলটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ। এ কথা বলে তিনি ভুলিয়ে দিতে চান যে, তার আমলে দূর্নীতি বাংলাদেশের প্রথম হওয়ার অপমান। হাসিনার কাছে বাংলাদেশের সেরা শাসক হলেন তার পিতা। অথচ তার বাকিশালী পিতার শাসনামলে কবরস্থ হয়েছিল গণতন্ত্র। নেমে এসেছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ যাতে নিহত হয়েছিল বহু লক্ষ মানুষ। বন্ধ হয়ে যায় শত শত কলকারখানা।তার পিতাকে তিনি বলেন স্বাধীনতার জনক। এটিও কি কম মিথ্যাচার? তবে কি ১৯৪৭ সালে ১৯৭১ সাল অবধি কি বাংলাদেশ কি তবে পরাধীন গোলাম দেশ ছিল? আর গোলাম দেশে হলে কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর ঢাকার খাজা নাজিমুদ্দীন রাষ্ট্রপ্রধান হন কি করে? বগুড়ার মুহম্মদ আলী ও আওয়ামী লীগ নেতা সহরোয়ার্দী সে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন কি করে? ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে যেসব হাজার হাজার বাঙালী সৈন্য ভারতের বিরুদ্ধে লড়লো এবং অনেকে প্রাণও দিল -সেটি কি পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসনকে প্রতিরক্ষা দিতে?

হাসিনা নসিহত করে হরতালের বিরুদ্ধে । হরতাল যে দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর সে উপদেশও দেয়। এটিও কি কম ভন্ডামী? অথচ তিনিই বিএনপি আমলে ১৭৩দিনের হরতাল করেছেন। একটানা ৯৬ ঘন্টার হরতাল করেছেন। তার দলীয় কর্মীরা হরতাল চলাকালে গানপাউডার দিয়ে ১১ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল। প্রচন্ড ভন্ডামি হয়েছে সর্বদলীয় সরকারের নামে। সর্বদলীয় সরকারের নামে সরকার গঠিত হয়েছে মাত্র ৪টি দল থেকে। অথচ বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বহু। কিন্তু হাসিনার সর্বদলের সংজ্ঞায় পড়ে মাত্র আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাসদ ও ওয়াকার্স পার্টি -এ চারটি দল। গণতন্ত্রের নামে তেমনি একটি মশকরা করেছিল হাসিনার পিতা শেখ মুজিবও। মুজিবের কাছে একদলীয় বাকশাল ছিল গণতন্ত্র। আর সকল বিরোধী দলীয় পত্রিকাকে বদ্ধ করাটি ছিল বাকস্বাধীনতা। বাংলাদেশের বুক দিয়ে ব্রিটিশ যুগ গেছে। পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরও গেছে। কিন্তু গণতন্ত্রের নামে এতবড় ধাপ্পাবাজী কি কোনকালেও হয়েছে?

 

অপরাধ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে

যুদ্ধ প্রতিদেশেই রক্তপাত ডেকে আনে। একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানী ও ভারতীয় বাহিনীর রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বাংলাদেশ। সে যুদ্ধে বহু বাঙালী যেমন প্রাণ হারিয়েছে, তেমনি প্রাণ হারিয়েছে বহু অবাঙালীও। সেটি যেমন পাকিস্তানী বাহিনী ও সহযোদ্ধাদের হাতে তেমনি ভারত ও তার সহযোদ্ধা মুক্তিবাহিনীর হাতে। যে কোন যুদ্ধে মূল যুদ্ধটি করে সেনাবাহিনীর লোকেরা। কারণ তাদের হাতেই থাকে সর্বাধিক মারণাস্ত্র। তাই যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে হলে প্রথম ধরতে হয় তার জেনারেলদের। তাই নুরেমবার্গে অনুষ্ঠিত বিচারে যাদের শাস্তি দেয়া হয়েছিল তারা কেউ হিটলারের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছিল না। তারা ছিল সামরিক বাহিনীর অফিসার। কিন্তু হাসিনার সরকার পাকিস্তান ও ভারতীয় বাহিনীর অফিসারদের বিচারে তুলেননি। তার পিতা শেখ মুজিবও তোলেননি।  তাদের কাউকে ডেকে নিয়ে কোন প্রশ্ন পর্যন্ত করেননি। অথচ পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর হাতে বহু নিরাপরাধ মানুষ মারা গেছে। তেমনে ভারতীয় বাহিনীর হাতে্ মারা গেছে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর বোমা বর্ষণে ঢাকার একটি ইয়াতিম খানার শতাধিক আবাসিক ছাত্র নিহত হয়েছিল। সে খবর বিদেশী পত্রপত্রিকায় ছাপা হলেও আওয়ামী ঘরানার পত্রিকাগুলো তা কোনদিন ছাপেনি। অথচ সেটি ছিল ভয়ানক যুদ্ধাপরাধ। নিরস্ত্র রাজাকারদের ঢাকা স্টেডিয়ামে বেয়োনেট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সে চিত্র বিদেশী পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। বাংলাদেশের আনাচে কাঁনাচে এভাবে হত্যা করা হয় বহু হাজার নিরস্ত্র রাজাকারকে। কয়েক লাখ অবাঙালীকে তাদের নিজ ঘরবাড়ী থেকে নামিয়ে পথে বসানো হয়। সেগুলি কি কম যুদ্ধাপরাধ? আজ একই ভাবে পথে ঘাটে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে জামায়াত, শিবির ও বিএনপির নেতাকর্মীদের। এগুলিও কি কম অপরাধ? মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের শাস্তি দেয়ায় সরকারের সামান্যতম আগ্রহ থাকলে এ খুনিদের কেন বিচার হচ্ছে না? এসব আওয়ামী খুনিদের বিচার যে শেখ হাসিনার হাতে কোনকালেও হবে না তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে?

বিচারে সুবিচার করতে হলে তাকে নিরপেক্ষ হতে হয়। কিন্তু যখন বেছে বেছে রাজনৈতিক শত্রুদের হাজতে তোলা হয় এবং তাদেরকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন ও বিচার করা শুরু হয় -তখন সেটিকে কি আর বিচার বলা যায়? সেটি তো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। সরকারের পক্ষ থেকে সে প্রতিহিংসার ঘটনা হলে সেটি ভয়ানক অপরাধ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তখন বিপন্ন হয়। সরকার এভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবী ও আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মীবাহিনী রাজপথে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হত্যা করছে আর সরকার সেটি করছে আদালতের বিচারকদের দিয়ে। পার্থক্যটি কোথায়? পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অফিসারগণ এখন আর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শত্রু নয়। ফলে তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক লক্ষ্যও নয়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামি এবং বিএনপির নেতা-কর্মীগণ তাদের রাজনৈতিক শত্রু। তাই তাদের নির্মূলটি আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের রাজনৈতিক লক্ষ্য। আর সে লক্ষ্য পূরণেই গঠিত হয় আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কি মনে করে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিচারের নামে এরূপ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয়টি বোঝে না? শিশুরাও সেটি বুঝে। ফলে জামায়াতের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বাড়ছে। সেটি বুঝা যায় তাদের মিছিল গুলোতে প্রচুর লোক সমাগম দেখে। সেটি বুঝেই তারা সুষ্ঠ নির্বাচনের বদলে ভোট ডাকাতিতে নামে।

গণতন্ত্রের পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখন হাসিনা সরকার। সকল অপরাধী শক্তি এখন তার পক্ষ নিয়েছে। শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, হাসিনা সরকারের ছলচাতুরি বিশ্ববাসীও বুঝে ফেলেছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন কোন থেকে এ বিচারের বিরুদ্ধে ধিক্কার শুরু হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগ শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয় বিদেশেও বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। ডুবু ডুবু হাসিনার একমাত্র রক্ষক এখন ভারত। প্রশ্ন হলো, ভারত একা কি শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের তলা ধ্বসে যাওয়া নৌকাকে আবার ভাসাতে পারবে? প্রচন্ড জন-উত্তালের মাঝে আওয়ামী লীগের ডুবন্ত নৌকা ভাসাতে আসলে তারা নিজেরাও যে ডুববে তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে? এতে প্রচন্ড তীব্রতা পাবে বরং ভারতবিরোধীতা। তাতে প্রচন্ড লাভবান হবে বাংলাদেশের ইসলামের পক্ষের শক্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত। ভারতের প্রখ্যাত ইংরেজী দৈনিকী “দি হিন্দু” ভারত সরকারকে তো সে হুশিয়ারিটিই শুনিয়েছে। ২৮/১১/১৩

 




বিবিধ ভাবনা-৫

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১.

মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বর শাসন হলো ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার। ফ্যাসিবাদ হলো অতি দুর্বৃত্তদের স্বৈরাচার। তখন দেশের পুলিশ, প্রশাসনের কর্মচারি, আদালতের বিচারক এবং সমগ্র রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো দুর্বৃত্তদের চাকর-বাকরে পরিণত হয়। তখন অসম্ভব হয় আইনের শাসন। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তখন হত্যাযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হয়। যাদেরকেই সরকার নিজেদের শত্রু মনে করে তাদেরকেই নির্মূল করে। তখন সরকার বেছে নেয় গুম-খুনের পথ। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তখন হত্যাযোগ্য অপরাধে পরিণত হয়। এরই উদাহরণ হলো আজকের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এরূপ দুঃশাসন আর কোন কালেই চেপে বসেনি। এ হলো শেখ হাসিনা ও তার পিতা শেখ মুজিবের দান।

ফ্যাসিবাদীরা হলো মানবরূপী অতি হিংস্র জীব। এরা বাঘ-ভালুকের চেয়েও হিংস্রতর। প্রশ্ন হলো, শান্তিপূর্ণ আন্দলোনের মাধ্যমে্ কি এরূপ হিংস্রদের হটানো যায়? নেকড়ের ন্যায় হিংস্র পশু মারতে তো অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নামতে হয়। অথচ বাংলাদেশ দখলে নিয়েছে মানবরূপী এরূপ নেকড়দের এক বিশাল দল। ইউরোপে এরূপ এক অসভ্য শাসন চেপে বসেছিল জার্মানীর হিটলার এবং ইটালির মুসোলিনির হাতে। তাদের হটাতে ইউরোপীয়দের প্রকান্ড একটি বিশ্বযুদ্ধ করতে হয়েছে।

সভ্য ভাবে বাঁচার খরচটি তো বিশাল। সে খরচ পোষাতে অর্থ ও প্রাণের কোরবানী দিতে হয়। ইসলামে সে পবিত্র কাজটিই হলো জিহাদ। কে কতটা সভ্য ভাবে বাঁচবে সেটির হিসাব হয় সে কোরবানীর উপর। যাদের সে সামর্থ্য নাই তারা যেমন দুর্বৃত্ত শাসকদের রাজস্বদাতায় পরিণত হয়, তেমনি তাদের সৈনিকেও পরিণত হয়। এরাই পরকালে পূর্ণ করবে জাহান্নাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সভ্য ভাবে বাঁচার সে আগ্রহ বা সামর্থ্যটি বাংলাদেশীদের মাঝে কতটুকু? সে আগ্রহ ও সামর্থ্য যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীদের মধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে সেটি সুস্পষ্ট ধরা পড়ে দেশের নতজানু মিডিয়াকর্মী, বুদ্ধিজীবী, আদালতের বিচারক, প্রশাসকের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দিকে তাকালে।   

২.

আল্লাহর প্রতি ভালবাসা যতই তীব্রতর হয় ততই তীব্রতর হয় আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও শত্রুতা। নইলে ঘটে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বেঈমানী। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার ঈমানদার বান্দার সে মহৎ গুণটির ঘোষণা এসেছে এভাবে “আশাদ্দু আলাল কুফ্ফার ওয়া রুহামাও বায়নাহুম।” অর্থঃ কাফেরদের বিরুদ্ধে তারা কঠোর, ঈমানদারদের প্রতি করুণাপূর্ণ। তাই মুসলিমকে শুধু হিংস্র পশুদের চিনলে হয় না। চিনতে হয় মানবরূপী হিংস্র জানোয়ারদেরও। সে জানোয়ার তো তারাই যারা মহান আল্লাহতায়ালার জমিনে তার শরিয়তী আইন প্রতিষ্ঠার বিরোধী। মুসলিমকে তাই শুধু পানাহারে বাঁচে না, বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার শত্রুদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও তাদের নির্মূলের স্পৃহা নিয়ে।

৩.

বাংলাদেশে জাতীয় পতাকা আছে। আছে জাতীয় সঙ্গিত, জাতীয় কবি, জাতীয় ফুল ও জাতীয় ফল। দেশের মাঝে যা কিছু অতি বিশাল বা তুলনাহীন তাকেই জাতীয় বলার প্রবনতাটি বাঙালীর মজ্জাগত। তাই প্রশ্ন এসে যায়, বাংলাদেশে জাতীয় চোর কে? মাত্র কিছু লোকের ঘরে যারা সিঁদ কাটে বা পকেটে হাত দেয় -তাকে কি জাতীয় চোর বলা যায়? বাংলাদেশে এমন চোরের সংখ্যা তো বহু লক্ষ। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সামর্থ্যটি তূলনাহীন। সে হানা দিয়েছে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের পকেটে। সে চুরি করেছে কোটি কোটি মানুষের ভোট। একাজটি পূর্বে কেউ করেনি। ফলে জাতীয় চোরের খেতাবটি অন্য কারো প্রাপ্য নয়, সেটি প্রাপ্য একমাত্র হাসিনার। তাই কোন সভ্য ও বিবেকবান মানুষে কি কখনো এরূপ জাতীয় চোরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলতে পারে?

৪.

চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস, ধর্ষণ -এসবই গুরুতর অপরাধ। তবে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হলো দেশবাসীর ভোটের উপর ডাকাতি করা। সে ডাকাতির ফলে সমগ্র দেশ দখলে যায় ভয়ানক অপরাধীদের হাতে। সমগ্র দেশ জুড়ে তখন ডাকাতি হয়ে যায়। ডাকাতদের শাসনে অসম্ভব হয় অন্যান্য অপরাধীদের নির্মূল করা। তখন প্লাবন আসে অপরাধ কর্মে। কারণ, অপরাধীদের সরকার অপরাধীদের নির্মূলে নয় বরং তাদের প্রতিপালনে কাজ করে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলয়ে তাদের বরং অংশীদারিত্ব দেয়া হয়।

তাই চোর-ডাকাত ও খুনিদের ন্যায় অপরাধীদের ক্ষমতায় বসিয়ে আর যাই হোক, চুরি-ডাকাতি, গুম-খুন ও ধর্ষণ বন্ধ করা যায় না। হাসিনার আমলে বাংলাদেশে পুলিশের সংখ্যা বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে।কিন্তু তাতে চুরি-ডাকাতি, গুম-খুন ও ধর্ষণ কমেনি। বরং তা বহুগুণ বেড়েছে। কারণ, ডাকাতদের শাসনে পুলিশের প্রায়োরিটি কখনোই চুরি-ডাকাতি, গুম-খুন ও ধর্ষণ নির্মূল নয়, বরং মূল কাজ হয় সরকারকে পাহারা দেয়া। তখন পুলিশ নিজেও নামে দুর্বৃত্তিতে। তাই সভ্য ভাবে ও শান্তিতে বাঁচতে হলে শুধু ঘর বাঁধলে চলে না। পানাহার জোগাড় করলে চলে না, বরং নির্মূল করতে হয় দুর্বৃত্তদের। সভ্য ভাবে বাঁচার এছাড়া বিকল্প পথ নাই। কিন্তু সে কাজটি বাংলাদেশে হয়নি।   

৫.

ঈমানদারের জীবনে ঈমানের প্রকাশ ঘটে তার প্রতিটি কর্মে ও আচরণে। আগুনে উত্তাপের ন্যায় ঈমানের এরূপ প্রকাশ অনিবার্য। রাজনীতিতে নিরপেক্ষ থাকাটাই তাই ঈমানদারের পক্ষে অসম্ভব। তাকে প্রতি পদে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ নিতে হয়। এটি ঈমানের দায়বদ্ধতা। ফলে ঈমানদার যেমন লড়াই করে ইসলামের পক্ষে, তেমনি বিদ্রোহ করে ভোটডাকাত শাসকের বিরুদ্ধে। সে লড়াইটি না থাকাই বেঈমানী।

 

 

৬.

চোর-ডাকাতদেরও লজ্জা থাকে। তাই তারা রাতের আঁধারে চুরি-ডাকাতিতে নামে। ধরা পড়লে তারা গ্রাম ছাড়ে এবং পরিচিত লোকদের সামনে আসতে লজ্জা পায়। কিন্তু শেখ হাসিনার সে লজ্জা-শরম নাই। অথচ লজ্জা হলো ঈমানের অর্ধেক। বেশরম হওয়াটি তাই বেঈমানী। প্রশ্ন হলো, বেঈমানের শাসন কি কোন সভ্য মানুষ মেনে নেয়? সেটি করলে তো অসভ্যতার বিজয় হয়। বাংলাদেশে কি সেটিই হয়নি?

 

৭.

ঈমানদার হওয়ার অর্থই আল্লাহর সৈনিক হওয়া। মানব জাতি বিভক্ত আল্লাহর সৈনিক ও শয়তানের সৈনিক -এই দুই দলে। ঈমানদারের জীবনে যুদ্ধ তাই অনিবার্য। সুরা নিসা’র৭৬ আয়াতে তাই বলা হয়েছে, “যারা ঈমানদার তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায় এবং যারা কাফের তারা যুদ্ধ করে শয়তানের রাস্তায়। এবং যুদ্ধ করো শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে। নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল অতি দুর্বল।” মহান আল্লাহতায়ালার পথে সে যুদ্ধ না থাকাটি তাই বেঈমানী। নামায-রোযায় সে বেঈমানী ঢাকা যায় না। অপর দিকে কাফেরদের যুদ্ধগুলি হয় ভাষা, বর্ণ, দল, গোত্র ও নানারূপ মতবাদের নামে। বাংলাদেশে তেমন একটি যুদ্ধ তারা যেমন একাত্তরে করেছে, তেমনি এখনো লাগাতর করছে। সেটি যেমন নিজেদের ক্ষমতায় রাখতে, তেমনি ইসলামের বিজয় রুখতে।

 

৮.

জনগণের প্রতি যাদের সামান্যতম দরদ আছে তারা কখনোই তাদের ভোটের উপর ডাকাতি করে না। তাদের কথা বলা ও সভা-সমিতির স্বাধীনতাও কেড়ে নেয় না। এরূপ বর্বর নৃশংসতা তো তাদের যারা জনগণের শত্রু। অথচ বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে তো আজ সেটিই হচ্ছে্। কোন সভ্য দেশের জনগণই এরূপ অসভ্য ও অপরাধী সরকারকে মেনে নেয় না। কারণ মেনে নেয়াটি আরেক অসভ্যতা। তাই সভ্য মানুষ মাত্রই যেমন তার আঙিনা থেকে মশামাছি ও হিংস্র পশু তাড়ায় তেমনি তাড়ায় শাসকের কুরসি থেকে অসভ্য ও দুর্বৃত্তদেরও। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হচ্ছে না। ফলে বিশ্বের দরবারে ধরা পড়ছে বাংলাদেশীদের নিদারুন অক্ষমতা। সে সাথে অসভ্যতাও। ১৯/১০/২০

 

 




কেন এতো ধর্ষণ বাংলাদেশে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

জ্বর কখনোই কোন সুস্থ্য দেহে আসে না। শরীরের উচ্চ তাপমাত্রাই বলে দেয় দেহে ম্যালেরিয়া, নিউমনিয়া, টাইফয়েড, কভিড বা অন্য কোন মারাত্মক ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। জ্বর নিজেই কোন রোগ নয়, রোগের লক্ষণ মাত্র। তেমনি চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় অপরাধগুলোও কোন চরিত্রবান মানুষের জীবনে দেখা যায় না। এগুলো দেখা দিলে  বুঝা যায়, আক্রান্ত ব্যক্তির নৈতিক ব্যাধিটি কতটা তীব্র।সে তীব্র নৈতিক ব্যাধি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার কারণেই বাংলাদেশ এ শতাব্দীর শুরুতে পর পর ৫ বার দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছিল। এখন ইতিহাস গড়ছে চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় মারাত্মক অপরাধে। দেশেটির এ গভীর দুর্দশা যে কোন বিবেকমান ব্যক্তিকেই ভাবিয়ে তুলতে বাধ্য।

প্যারাসিটামল খাওয়ালে জ্বর কমে যায়, কিন্তু তাতে রোগ সারে না। রোগ সারাতে হলে সঠিক রোগনির্ণয় জরুরী এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা জরুরী। তাই দেশে ধর্ষণের ন্যায় অপরাধ দমাতে হলে প্রথম জানতে হয় ধর্ষণ কেন হয় এবং সে কারণগুলি জানার পর সেগুলির মূলোৎপাটন করতে হয়। ধর্ষণ একটি ভয়ানক নৈতিক ব্যাধি। দৈহিক ও নৈতিক সত্ত্বার যোগফলেই মানুষ। খাদ্য-পানীয়তে দেহ বল পায় বটে, কিন্তু নৈতিক বল বাড়াতে হলে চাই জ্ঞান। চাই পরকালের ভয়। সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে যখন চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় অপরাধে প্লাবন আসে তখন বুঝা যায় সে সমাজে জ্ঞানদানের কাজটি যথাযত হয়নি। পরকালের ভয়ও তেমন স্থান পায়নি। শুধু স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়লেই জ্ঞানদান হয় না এবং চরিত্রও গড়ে উঠে না। ডিগ্রিদান ও জ্ঞানদান এক কথা নয়। বরং দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কতজন অসভ্য মানুষকে সভ্য করলো, কতজনের চরিত্রে নৈতিক বল যোগ করলো এবং কতজনকে পাপাচার থেকে ফিরালো -তা দিয়েই বিচার হয় শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য। এক্ষেত্র বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ব্যর্থতা বিশাল। অতিশয় পরিতাপের বিষয় হলো, অসভ্য মানুষকে সভ্য করা, চরিত্রে নৈতিক বল জোগানো, ও পাপাচার থেকে ফিরানো বাংলাদেশের শিক্ষানীতির আদৌও কোন লক্ষ্য নয়।

শিক্ষকগণ মনে করেন, প্রাথমিক স্তরে লিখতে, পড়তে ও হিসাব  কষতে শেখানোই তাদের মূল দায়িত্ব।কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ে দেয়া হয়, কারিগরি, চিকিৎসা, কৃষি, আইন শাস্ত্র ও ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের ন্যায় নানা বিষয়ে জ্ঞান। কিন্তু কোথাও চরিত্রে নৈতিক বল জোগানো, ও পাপাচার থেকে ফিরানোর কোন আয়োজন নাই। ফলে ব্যর্থতাগুলিও বিশাল। দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের ন্যায় অপরাধের সাথে যারা জড়িত  তাদের কেউই মুর্খ বা নিরক্ষর নয়। তারা বনজঙ্গল বা ক্ষেত-খামার থেকেও উঠে আসেনি। তাদের সবাই স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তারা সার্টিফিকেট পেলেও বেড়ে উঠেছে মারাত্মক নৈতিক অপুষ্টি নিয়ে। তাদের মাঝে সৃষ্টি হয়নি পরকালের ভয়।

দৈহিক ভাবে বাঁচার জন্য নিয়মিত খাদ্য চাই। তেমনি খাদ্য চাই নৈতিক পুষ্টির জন্যও। নৈতিক পুষ্টির সে সেরা খাদ্যটি হলো ওহীর জ্ঞান তথা পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান। তাই মানবকে মানব রূপে বেড়ে উঠার জন্য  মহান আল্লাহতায়ালা স্রেফ নানারূপ খাদ্যই দেননি, দিয়েছেন লক্ষাধিক নবী-রাসূলের মাধ্যমে ওহীর জ্ঞান। কোর’আন হলো ওহীর জ্ঞানের সর্বশেষ গ্রন্থ। এ জ্ঞান যেমন জান্নাতের পথ দেখায়, তেমনি বাঁচায় জাহান্নামের আগুন থেকেও। সৃষ্টি করে পরকালে জবাবদিহিতার ভয়। এবং সামর্থ্য জোগায় মানবিক গুণে বেড়ে উঠাতেও। প্রতিটি নরনারীর উপর ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার বা বিজ্ঞানী হওয়া ফরজ নয়। ফরজ নয় এসব বিষয়ে জ্ঞান হাসিলও। কিন্তু প্রত্যেকের উপর নামায-রোযার ন্যায় যা ফরজ তা হলো পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানার্জন। অক্সিজেন ছাড়া যেমন দেহ বাঁচে না, তেমনি কোর’আনের জ্ঞান ছাড়া ঈমানও বাঁচে না। তখন অসম্ভব হয় যেমন মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা, এবং অসম্ভব হয় পাপাচার থেকে বাঁচা। সমাজ তখন পাপাচারি দুর্বৃত্তদের দিয়ে ভরে উঠে। বাংলাদেশে  তো সেটিই হয়েছে। পুলিশ দিয়ে বা  কিছু লোককে ফাঁসি দিয়ে এ নৈতিক ব্যাধি থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। এ রোগের চিকিৎসায় আরো গভীরে যেতে হয়। বাঁচাতে হয় ব্যক্তির বিবেককে।

বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি কাজ করছে বহু হাজার মাদ্রাসা। সেগুলিতে  ছাত্রদের  সংখ্যাও বহু লক্ষ। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, ধর্ষণের অঙ্গণে মাদ্রাসার ছাত্রদের উপস্থিতটি বিরল। হেতু কি? কারণ, মাদ্রাসার ছাত্রদের রয়েছে কোর’আনের সাথে সংশ্রব। এ হলো কোর’আনী জ্ঞানের বিশাল সুফল। কোর’আনী জ্ঞান ব্যক্তির মনে ভ্যাকসিনের কাজ করে। দেয় পাপাচারের বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিরোধের ক্ষমতা। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ঘটছে উল্টোটি। স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষানীতিতে কোর’আনী জ্ঞানচর্চার কোন ব্যবস্থা নাই, বরং রয়েছে কোর’আন থেকে দূরে সরানোর আয়োজন। রয়েছে সেক্যুলারিজমের প্রবল আধিপত্য। ফলে এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীগণ ছাত্রজীবন শেষ করছে পবিত্র কোর’আনের একটি আয়াত না বুঝেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি পরিণত হয়েছে শয়তানের হাতিয়ারে। এখানে ভ্যাকসিন দেয়া হয় ছাত্রছাত্রীদের মনে ইসলামের প্রবেশ ঠেকাতে। এর ফলে এসব ছাত্র-ছাত্রীরা বিপুল সংখ্যায় বেড়ে  উঠছে শয়তানের এজেন্টরূপে। এরাই ১৯৭১’য়ে ভারতে কোলে গিয়ে উঠেছিল এবং ভারতের অস্ত্র নিয়ে মুসলিম বিরোধী ভারতীয় এজেন্ডা পূরণে যুদ্ধে নেমেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামের পক্ষে কথা বললে এসব এজেন্টদের হাতে তাই খুন হতে হয়। ইসলামপ্রম, দেশপ্রেম ও সত্য কথা বলার সাহস থাকাটিও তাদের  কাছে হত্যাযোগ্য অপরাধ। নির্মম অত্যাচারে আবরার ফাহাদ লাশ হয়েছে তো এদের হাতেই। এরাই দেশে চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণে বিপুল বিক্রম দেখাচ্ছে। তাই ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসব এশিয়া ও আফ্রিকার কোন নিভৃত জঙ্গলে না হলেও সেটি হয় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে।যেমনটি শেখ হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসাতে হয়েছিল জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নব্বইয়ের দশকে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, ক্যাম্পাসে ঘোষণা দিয়ে সে বর্বর কান্ডটি ঘটালেও সরকারের পক্ষ থেকে সে ধর্ষককে কোন রূপ শাস্তি দেয়া দেয়া হয়নি।

মানব শিশুকে মানব রূপে বেড়ে উঠতে হলে সব সময় বাঁচতে হয় এক পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এ পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব বুঝাতে মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আশ শামসে ৭ বার কসম খেয়েছেন। পবিত্র কোর’আনের আর কোথাও মহান আল্লাহতায়ালা এভাবে একের  পর এক সাতবার কসম খাননি। কসম শেষে ঘোষণা দিয়েছেন, “ক্বাদ আফলাহা মান যাক্কাহা।” অর্থঃ সে ব্যক্তিই নিশ্চিত কল্যাণ পেল যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করলো। এ পরিশুদ্ধিটি বস্তুতঃ ব্যক্তির আত্মিক, নৈতিক, চারিত্রিক ও কর্মের পরিশুদ্ধি। এ পরিশুদ্ধি করণ প্রক্রিয়াকে আরবীতে বলা হয় তাহজিব। তাহজিবকে সংস্কৃতি বললে তার পূর্ণ অর্থ প্রকাশ পায় না।তাহজিব শব্দটির উৎপত্তি হাজ্জাবা ক্রিয়াপদ থেকে। হাজ্জাবা শব্দের অর্থ হলো পরিশুদ্ধ করা। ব্যক্তির জীবনে এ পরিশুদ্ধি খাদ্য,পানীয় বা সম্পদে আসে না, আসে কোর’আনী জ্ঞানে। যান্ত্রিক পরিশুদ্ধির মাধ্যমে ক্ষেতের আঁখ চিনিতে পরিণত হয়; তেমন কোর’আনী জ্ঞানের মধ্য দিয়ে যে পরিশুদ্ধি আসে তাতে একজন জাহেল ব্যক্তিও ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারে। এরই উদাহরণ হলো, হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ)। তিনি নবীজী (সাঃ)কে খুন করার জন্য তরবারি নিয়ে বের হয়েছিলেন। কিন্তু সদ্য মুসলিম হওয়া নিজ বোনের গৃহের দরজায় দাঁড়িয়ে পবিত্র কোর’আনের কয়েকটি আয়াতের তেলাওয়াত শুনে মুসলিম হয়ে গিয়েছিলেন। তার জীবনে সে বিপ্লবটি এতোই গভীর ছিল যে, তিনি যখন খলিফা হন তখন চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। প্রজারা খাদ্যের অভাবে আছে জানলে নিজেও পেট ভরে আহার করতেন না। মাঝ রাতে না ঘুমিয়ে খাদ্যের বস্তা নিজ কাঁধে চাপিয়ে গরীবের ঘরে পৌছিয়ে দিয়েছেন। এরূপ বিপ্লব এসেছে বহু হাজার সাহাবীর জীবনে। এবং সেটি আত্মীক পরিশুদ্ধির ফলে। ফলে জন্ম নিয়েছে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।  নবীজী (সাঃ)র আগমনে আরবের আলোবাতাস বা খাদ্য-পানীয়ে কোন পরিবর্তন আসেনি। বরং মহাপ্লাবন এসেছিল কোর’আনী জ্ঞানে। এবং তাতে বিলুপ্ত হয়েছিল জাহেলিয়াতের অন্ধকার। সভ্য সমাজের নির্মাণে এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথ।  

কিন্তু বাংলাদেশে সে তাহজিব বা বিশুদ্ধকরণ প্রক্তিয়াটি বিকল। বরং শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে আয়োজন বেড়েছে ভয়ানক  ভাবে চেতনা ও চরিত্রের দূষিতকরণের। শিক্ষাঙ্গণে যেমন নাই কোর’আনী জ্ঞানের অনুশীলন, তেমনি সাহিত্যের অঙ্গণে  নাই কোর’আনী জ্ঞান-সমৃদ্ধ বই-পুস্তক। বরং বাংলা সাহিত্যের ময়দানটি দখলে গেছে পৌত্তলিক কাফের ও সেক্যুলারিস্টদের হাতে। ফলে এ সাহিত্যে রয়েছে বিনোদনের সামগ্রী। রয়েছে যৌনতায়  উস্কানী দেয়ার  সামগ্রীও। কিন্তু  নাই চেতনায় পুষ্টি বা পরিশুদ্ধি  জোগানোর সামগ্রী। ফলে বাঙালীর জীবনে মানব রূপে বেড়ে উঠায় রয়ে গেছে বিশাল ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতা নিয়ে রবিন্দ্রনাথের বেদনাও ছিল গভীর। তাই লিখেছেন, “হে বিধাতা, ৭ কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি।” তবে রবিন্দ্রনাথও সাহিত্যের খাতিরে সাহিত্য রচনা করেছেন। ফলে তার সাহিত্যেও পরিশুদ্ধি তথা মানব রূপে বেড়ে উঠতে পুষ্টি জোগানোর উপকরণ সামান্যই। রবিন্দ্র সাহিত্যের প্রসার বাড়িয়েও কাজের কাজ তেমন হয়নি। মানব রূপে বেড়ে উঠার এ ব্যর্থতার কারণে এ শতাব্দীর শুরুতে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হওয়া বাংলাদেশের  জন্য এতটা সহজ হয়েছে। এবং এখন সম্ভব হচ্ছে চুরি-ডাকাতি, ভোটডাকাতি, খুন-গুম ও ধর্ষণে রেকর্ড গড়াও।

সর্বপ্রকার অপরাধ রোধ ও গণজীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্বটি সরকারের। সশস্ত্র ডাকাত, খুনি বা ধর্ষক দলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামর্থ্য কোন ব্যক্তিরই থাকে না। এ কাজটি বিশাল। এরূপ অপরাধীদের দমনে প্রতিটি সভ্য দেশেই বিশাল পুলিশ বাহিনী থাকে। থাকে প্রশাসন। থাকে আদালত। অথচ বাংলাদেশে সঠিক ভাবে কাজ করছে না এর কোনটিই। অথচ তাদের পালতে বিপুল অর্থের রাজস্ব দেয় জনগণ। বাস্তবতা হলো, কোন সভ্য দেশও অপরাধ মুক্ত নয়। এমন কি নবীজী (সাঃ)র আমলে অপরাধ হয়েছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, প্রতিটি সভ্য দেশে সে অপরাধের শাস্তিও হয়েছে। কিন্তু অসভ্য দেশে সেটি ঘটে না। এজন্যই পবিত্র কোর’আন শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের বিধানই দেয় না, দেয় চোরদের হাত  কাটা এবং খুনি ও ধর্ষকদের হত্যারও নির্দেশও।

অপরাধীরা কখনোই নীতি কথায় বিশ্বাস করে না। পরকালের ভয়ও তাদের মাঝে কাজ করেন। তারা ভয় পায় একমাত্র পুলিশ ও আদালতকে। সে ভয়ই তাদের অপরাধ থেকে দূরে রাখে। তাই পুলিশ ও আদালত বিকল হলে তাদের ভয় করার কিছুই থাকে না। তখন সৃষ্টি হয় অপরাধ কর্মের জোয়ার। ফলে কোন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যখন অপরাধী চক্রের হাতে অধিকৃত হয় তখন সে দেশে অনিবার্য হয়ে উঠে অপরাধ কর্মের একটি ভয়ানক জোয়ার। কারণ অপরাধীদের দমন ও শাস্তিদান তখন সরকারের প্রায়োরিটিতে স্থান পায় না। বরং অপরাধীগণ স্থান পায় সরকারের শরিকদার রূপে। কারণ, এরাই তো সরকারের নিকটতম আদর্শিক আত্মীয়। বাংলাদেশে তো সেটিই ঘটেছে। দেশটিতে জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত হচ্ছে একটি ভোটডাকাত সরকার। এ সরকারের মূল কাজ হলো, নিজের গদির নিরাপত্তা দেয়া। এবং লেশমাত্র ভাবনা নাই জনগণের জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা নিয়ে। প্রশাসন দখল করতে তারা পুলিশকে লাগাচ্ছে ভোটডাকাতিতে। এবং বিরোধীদের গুম ও খুন করতে ময়দানে নামিয়েছে দলীয় চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত, খুন-গুমের সিদ্ধ নায়কদের। অথচ ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পেলে ভোটডাকাতির অভিযোগে হাতকাটা বা প্রাণদন্ড হতো শেখ হাসিনা ও তার সাথীদের। ফলে এমন অপরাধী হাসিনা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ও দুর্বৃত্ত দমনে সচেষ্ট হবে সেটি ভাবা যায়? ফলে হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে যারা গুম, খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে তাদেরকে বেওকুফ বল্লেও কম বলা হয়। ১৪/১০/২০২০   

 




বিবিধ ভাবনা-৪

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১.

ইবনে খলদুনকে বলা হয় সমাজ বিজ্ঞানের পিতা। মানব সভ্যতার উত্থান ও পতন নিয়ে তাঁর লেখনি অত্যন্ত ধারালো। তাঁর অভিমত হলো,শক্তিহীনতা সভ্যতার  ধ্বংস ডেকে আনে। নিজ সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিয়ে স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকতে হলে শুধু সংখ্যায় ও সম্পদে নয় অস্ত্রেও শক্তশালী হতে হয়। প্রতিবেশীর করুণার উপর কখনোই স্বাধীনতা বাঁচে না। জানমাল, ইজ্জত-আবরুও বাঁচে না। থাকতে হয় শত্রুর হামলার মুখে প্রতিরক্ষার পর্যাপ্ত সামর্থ্য। নইলে শত্রুর গোলাম হতে হয়। তখন বাঁচতে হয় অপমান ও গ্লানি নিয়ে। এরই উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। ভারত অবাধে ডাকাতি করছে পদ্মা, তিস্তার পানির উপর। বাস্তবতা হলো, শুধু দুয়েকটি নদী নয়, বাংলাদেশর সবগুলি নদীর পানি তুলে নিলেও বাংলাদেশের সামর্থ্য নাই ভারতের সে অপরাধের বিরুদ্ধ প্রতিবাদ করার। এমন কি সাহস নাই ভারতের এ অপরাধ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে ধর্ণা দেয়ার।  গোলাম তার প্রতিবেশী মনিবের বিরুদ্ধে মামলা করবে -সেটি কি ভাবা যায়?

দেশের সীমান্তে প্রতি বছর বহু বাংলাদেশী নাগরিক ভারতীয় সেনাদের হাতে প্রাণ হারায়।বিশ্বের আর কোন দেশের সীমান্তে এরূপ হত্যাকান্ড  ঘটে না। কিন্তু এরূপ নৃশংস হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধ প্রতিবাদ করবে -সে সাহসও বাংলাদেশের নাই। বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে ট্রানজিট চাইলে ভারতকে সেটিও দিতে হয়েছে। অথচ ভারত রাজি নয় নেপাল ভূটানে যেতে বাংলাদেশকে ট্রানজিট দিতে। ভারতকে দিতে হয়েছে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দরে তাদের মাল উঠানামার সুযোগ। পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে ভারত সে সুযোগ পায়নি। গোলামী এমন অপমানজনক অবস্থায় পৌঁছেছে যে বাংলাদেশে কে শাসক হবে সেটিও নির্ধারণ করে দিচ্ছে ভার।বাংলাদেশের বুকে আজ যে ভোটডাকাত শেখ হাসিনার দুর্বিসহ শাসন -তা তো  বেঁচে আছে ভারতের সাহায্য নিয়েই। একই ভাবে বাংলাদেশের উপর চেপে  বসেছিল শেখ মুজিবের ফ্যাসিবাদী বাকশালী শাসন। এসবই হলো একাত্তরের অর্জন যা ভারতসেবী বাঙালীদের ভাষায় স্বাধীনতা।      

২.

ইতিহাসের অতি সহজ সরল পাঠটি হলো, ইজ্জত ও শক্তি নিয়ে বাঁচতে হলে দেশের ভূগোল বাড়াতে হয়। রাশিয়ার অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে দুর্বল। কিন্তু রাশিয়া বাঁচে বিশ্বশক্তির সন্মান নিয়ে। কারণ রাশিয়ার রয়েছে বিশাল ভূগোল। বিশ্বজনীন সভ্যতার নির্মাণে বৃহৎ ভূগোলের গুরুত্ব মহান নবীজী (সাঃ) বুঝতেন। তিনি জানতেন মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্ত আরব ভূমিতে সীমিত থাকলে বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থান অসম্ভব হবে। অসম্ভব হবে দ্বীনের দ্রুত প্রসার। তাই তিনি সাহবীদেরকে তৎকালীন বিশ্বশক্তি রোমান সাম্রাজ্য ও তার রাজধানি কন্সটান্টিনোপল দখলের নসিহত করে যান। নবীজী (সাঃ)’র সে স্বপ্ন পূরণ করেন উসমানিয়া খলিফা সুলতান মুহম্মদ ফাতেহ ১৪৫৩ সালে। পুরনো সে কন্সটান্টিনোপল হলো তুরস্কের ইস্তাম্বুল।

ক্ষুদ্র বাংলা মানেই ভারতের অধিনস্থ এক গোলাম বাংলা –সেটি খাজা নাযিমুদ্দিন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ারর্দি, শেরে বাংলা ফজলুল হকের ন্যায় মুসলিম নেতারা বুঝতেন। তাই তারা ১৯৪৭’য়ে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করেছিলেন। এবং সেটি এজন্য সম্ভব হয়েছিল যে, তাদের কেউই শেখ মুজিবের ন্যায় ভারতের এজেন্ট ছিলেন না। কান্ডজ্ঞানহীনও ছিলেন না। বরং তাদের মাঝে ছিল প্রজ্ঞা ও বাঙালী মুসলিমদের কল্যাণ চিন্তা। কিন্তু ১৯৭১’য়ে যারা ভারতের কোলে যে সব ইসলামচ্যুৎ কাপালিকগণ আশ্রয় নিয়েছিল তাদের মাঝে সে হুশ ছিল না। তাই তারা ভারতকে বন্ধু মনে করে এবং ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ডেকে আনে। এভাবে ভারতীয় সেনাদের জন্য সুযোগ করে দেয় ব্যাপক লুটতরাজের। পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠি রূপে স্বাধীন থাকাটি তাদের কাছে ভাল লাগেনি। ভাল লাগেনি অখন্ড পাকিস্তানের শরীক রূপে বিশ্বরাজনীতিতে ভূমিকা রাখার কাজটিও। বরং ভাল লেগেছে ভারতের গোলামী। বাংলাদেশের বুকে আজ যেরূপ গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদের তান্ডব তা তো এসব ভারতসেবী কাপালিকদেরই সৃষ্টি।

৩.

৫৭টি মুসলিম দেশের প্রতিটি ঘর যদি প্রাসাদ হয়, মাথাপিছু আয় যদি  ১০ বৃদ্ধিও পায় এবং  নির্মিত হয় হাজার হাজার রাস্তাঘাট ও ব্রিজ -তবুও মুসলিমগণ যে ভারতীয় হিন্দুদের থেকে দুর্বলই থাকবে তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? কারণ হিন্দুগণ ৫৭ টুকরায় বিভক্ত নয়। বিভক্তির কারণে যেরূপ শক্তিহানী ও ইজ্জতহানী হয় -তা সম্পদ, রাস্তাঘাট বা কলকারখানা গড়ে পূরণ করা যায় না।বাংলাদেশের ন্যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম দেশগুলির মূল দুর্বলতা তাই ভূগোলে।

৪.

ঈমানদারের কাছে গুরুত্ব পায় সত্যিকার মুসলিম পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠা। মুসলিম জীবনে এটিই মূল এজেন্ডা। এ এজেন্ডা পূরণে ব্যক্তির অর্জন কতটুকু মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সেটিরই হিসাব দিতে হবে। ভাষা, ভৌগলিক ও গোত্রীয় পরিচয় সেদিন মূল্যহীন হবে। অথচ আজ মুসলিমদের সম্পদ, মেধা ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে নিজেদের ভাষা, ভূগোল ও গোত্র ভিত্তিক পরিচয় বাড়াতে। এ লক্ষে তারা যুদ্ধ করছে এবং প্রাণও দিচ্ছে। একাত্তরে বাঙালী মুসলিমগণ ভাষাভিত্তিক সে পরিচয় বাড়াতে ভারতীয় কাফেরদের সাথে নিয়ে প্রকান্ড রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ লড়েছে। এটি ছিল মহান আল্লাহর দেয়া জানমালের এক খেয়ানত। এমন খেয়ানতে কি মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হতে পারেন? একাজে  খুশি হয় তো শয়তান ও তার কাফের অনুসারিরা।

৫.

জিহাদ হলো সমাজকে পাপ মুক্ত ও দুর্বৃত্ত মুক্ত করার পবিত্র লড়াই। উচ্চতর ও সভ্যতর সমাজ নির্মাণের এছাড়া বিকল্প পথ নাই। কোটি কোটি মানুষের নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে সমাজ পাপমুক্ত হয়না। মসজিদ-মাদ্রাসায় দেশ ভরে ফেললেও সেটি হয় না। সে লক্ষ্যে জিহাদ চাই। তাই যে সমাজে জিহাদ নাই সে সমাজে প্রতিষ্ঠা পায় গুম,খুন,ধর্ষণ, স্বৈরাচার ও বিচারহীন হত্যার শাসন। বাংলাদেশ তারই উদাহরণ। এজন্যই জিহাদ হলো সেরা ইবাদত। এ ইবাদত প্রাণ গেলে বিনা হিসাবে জুটে জান্নাত।

৬.

যারা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরোধী এবং নিষিদ্ধ করে শরিয়তের দাবী নিয়ে আন্দোলনে নামা -তাদেরকে মুসলিম বা ঈমানদার বললে অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহর হুকুমের। তাদেরকে  সম্মান দেখানো ও তাদেরকে শাসক রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজটি বেঈমানের। শরিয়তের বিরুদ্ধে যাদের অবস্থান মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে পবিত্র কোর’আনের সুরা মায়েদায়  কাফের, জালেম ও ফাসেক বলেছেন। আর মহান আল্লাহতায়ালা যাদেরকে কাফের, জালেম ও ফাসেক বলেন তাদেরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, নেতা, জাতির পিতা বা বঙ্গবন্ধু বললে কি ঈমান থাকে? এটি তো বেঈমানদের পথ। মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে বা নামায-রোযা করে কি সে বিশাল বেঈমানী ঢাকা যায়? অথচ বাঙালী মুসলিমদের দ্বারা সে বেঈমানীর কাজটিই অতি ব্যপক ভাবে হচ্ছে।

 

৭.

বাংলাদেশের জনগণের  মূল দুশমন হলো দেশটির দুর্বৃত্ত শাসক চক্র। এরা শয়তানের এজেন্ট। এদের কাজ গুম, খুন, স্বৈরাচার ও ধর্ষণের রাজত্ব কায়েম করা। এবং জনগণকে শয়তানের নির্দেশিত পথে তথা জাহান্নামের পথে নেয়া। তাই এমন একটি দেশে সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি হিংস্র পশু তাড়ানো বা পোকা-মাকড় মারা নয়, বরং এ দুর্বৃত্ত শাসকদের তাড়ানো। হিংস্র পশু বা পোকা-মাকড় কোন ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুনে নেয় না, কিন্তু এ দুর্বৃত্ত শাসকেরা নেয়। তারা কঠিন করে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা।

 

৮.

বাংলাদেশের অবস্থা আজ এতটাই খারাপ যে, চোর, ডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও নৃশংস স্বৈরাচারিদের কাছে বিচার ভিক্ষা করতে হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, সভ্য সমাজে যেসব অপরাধীদের স্থান হওয়া উচিত ছিল কারাগারে বা প্রাপ্য ছিল প্রাণদন্ড -তাদের থেকে কি  বিচার আশা করা যায়? চোর, ডাকাত, খুনি ও স্বৈরাচারিদেপর কাজ তো দুর্বৃত্তদের আদালতের শাস্তি থেকে বাঁচানো। এবং ফাঁসিতে ঝুলায় তাদের যারা তাদের বিরুদ্ধে খাড়া হয়। একারণেই বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ভয়ানক অপরাধীদের অভয় অরণ্যে।

৯.

সভ্য মানুষদের ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল ভিন্ন হলেও তারা একত্রে শান্তিতে বসবাস করে। এটি মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণ।ঈমানদারকে তাই শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতে সিদ্ধ হলে চলে না, তাকে অন্যদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের গুণটিও অর্জন করতে হয়। এরূপ ভাতৃসুলভ গুণ অর্জন করাটি ইসলামে  ফরজ। নইলে সমাজ অশান্ত ও সংঘাতময় হয়। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সেটি অপছন্দের। তাই ঈমানদার মাত্রই কসমোপলিটান এবং একে অপরের ভাই।

মানুষের মাঝে নানা ভাষা ও বর্ণের যে  পরিচয় সেটি বিভক্তি গড়ার জন্য নয়। তেমন একটি কসমোপলিটান ভাতৃত্ব ও সহ-অবস্থান দেখা গেছে মুসলিমদের গৌরব কালে। তাই তুর্কি, কুর্দি, আরব, মুর, ইরানীদের মাঝে নিজ নিজ ভাষার পরিচয়ে পৃথক পৃথক রাষ্ট্র গড়ার প্রয়োজন পড়েনি। তারা একত্রে শান্তিতে অবস্থান করেছে। এবং এক বিশ্বশক্তির জন্ম দিয়েছে। তাতে নিরাপত্তা পেয়েছে মুসলিমদের জানমাল। ১৯৪৭-পূর্ব ভারতে তেমন একটি প্যান-ইসলামিক চেতনা প্রবল কাজ করেছিল মুসলিমদের মাঝে। ফলে ইংরেজ ও হিন্দুদের বাধা সত্ত্বেও তারা প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের। কিন্তু শয়তানী কাফের শক্তির সেটি ভাল লাগেনি। ফলে তাদের হাতে ১৯৪৭ থেকেই শুরু হয় পাকিস্তান বিনাশের কাজ।  ১৯৭১’য়ে সে শয়তানি প্রকল্পে যোগ দেয় শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালী কাপালিকগণও। বাংলাদেশের বুকে আজ যে দুর্বৃত্ত শাসন ও ভারতের প্রতি গোলামী তা তো তাদের কারণেই। ১২/১০/২০২০ 




বিবিধ ভাবনা-৩

                                       ফিরোজ মাহবুব কামাল                      

১.

ঈমানদার হ্‌ওয়ার পুরস্কার যেমন বিশাল, তেমনি বিশাল হলো দায়বদ্ধতাটিও।  তাকে বাঁচতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পবিত্র মিশন নিয়ে। সে মিশনের মূল কথাঃ প্রতিটি মানুষ আমৃত্যু সচেষ্ট হবে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং সকল প্রকার অন্যায়ের নির্মূলে। এভাবেই বিজয় আসে ইসলামের এবং নির্মিত হয় সভ্যতর ব্যক্তি,সমাজ ও রাষ্ট্র। ঈমানদার ব্যক্তি তখন বেড়ে উঠে জান্নাতের যোগ্য রূপে। মুসলিম রাষ্ট্রে  তখন প্রতিষ্ঠা পায় অনাবিল শান্তি, শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম একমাত্র তখনই সেটি ধরা পড়ে। তখন মুসলিম জনপদে সৃষ্টি হয় জান্নাতের পথ চেনা এবং সে পথে চলার সামর্থ্য। মানব জীবনে এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ মিশন। নামায-রোযা বস্তুতঃ সে পবিত্র মিশনের জন্যই ব্যক্তিকে প্রস্তুত করে। যেমন পবিত্র কোর’আনে ঘোষিত হয়েছে, “ইন্নাস সালাতা তানহা আনিল ফাহশা ওয়াল মুনকার।” অর্থঃ নামায অশ্লিলতা ও অন্যায় কাজ থেকে দূরে রাখে।কিন্তু যে দেশে লক্ষ লক্ষ মসজিদ এবং কোটি কোটি নামাযী সে দেশ যদি গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও স্বৈরাচারের প্লাবন সৃষ্টি করে সে দেশবাসীর নামায কতটুকু সত্যিকারের নামায?    

মহান আল্লাহতায়ালা স্রেফ নামায-রোযার সংখ্যা দেখেন না, বরং দেখেন সে নামায-রোযা ব্যক্তির জীবনে কতটা সৎ কর্মের জোয়ার আনলো সেটি। দুর্বৃত্তদের নির্মূলে এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় কে কতটা জান, মাল, শ্রম ও মেধার বিনিয়োগ করলো রোজ হাশরের বিচার দিনে সেটিই সবচেয়ে অধীক গুরুত্ব পাবে। এভাবে বাঁচাতে ব্যক্তির মাঝে তখন গড়ে উঠে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মাগফিরাত লাভ ও জান্নাতের জন্য যোগ্য রূপে গড়ে উঠার সামর্থ্য। মুসলিমগণ যেহেতু এমন একটি মিশন নিয়ে বাঁচে -তাই মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে তাদেরকে সর্বশ্রষ্ঠ উম্মত বা জনগোষ্ঠি রূপে আখ্যায়ীত করেছেন। এ পবিত্র মিশন নিয়ে বাঁচার ফজিলত যে কতটা বিশাল সেটি প্রমাণ করেছেন নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণ। তাদের হাতে গড়ে  উঠেছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। এভাবে পরবর্তীদের জন্য পথ দেখিয়েছেন কীরূপে সে মিশন নিয়ে বাঁচতে হয়। তবে এ পবিত্র মিশন নিয়ে বাঁচার সবচেয়ে বড় নিয়ামতটি হলো, তখন ব্যক্তির মাঝে গড়ে উঠে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মাগফিরাত লাভ ও জান্নাত লাভের যোগ্যতা  নিয়ে বেড়ে উঠার সামর্থ্য। এবং সামর্থ্যটুকুই হলো মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে সামর্থ্য অর্জিত না হলে যা অনিবার্য হয় তা হলো জাহান্নামের আগুন।

২.

আজকের মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে সীমাহীন ব্যর্থতা ও কদর্যতায়। এর কারণ, যে ইসলাম নিয়ে তারা বাঁচছে সেটি আদৌ নবীজী (সাঃ)র ইসলাম নয়। মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথ ছেড়ে  তারা বাঁচছে শয়তানের এজেন্ডা নিয়ে। শয়তানের এজেন্ডা হলো ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকাতার নামে মুসলিমদের বিভক্ত করা ও সে বিভক্তি নিয়ে কলহে লিপ্ত রাখা। মুসলিমদের  দুর্বল রাখার এ হলো শয়তানী কৌশল। মুসলিমগণ শয়তানের সে কৌশলকেই নিজেদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি বানিয়ে নিয়েছে। মুসলিমদের  উদ্দেশ্যে শয়তানের পাঠটি হলো, অখন্ড মুসলিম ভূমিতে ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের ভিন্নতা থাকলে সে ভিন্নতার পরিচয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রও হতে হবে। শয়তান গুরুত্ব দেয় ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের পরিচয়ে ভৌগলিক বিভক্তিকে। তাই ১৯৭১’য়ে বাঙালী মুসলিমদের কাছে গুরুত্ব পায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙ্গে ক্ষুদ্রতর বাংলাদেশ নির্মাণ। শয়তানের এরূপ প্ররোচনায় তারা কাফেরদের থেকেও নিচে নেমেছে। মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি চাইলেও শয়তান চায় তার নিজ দলীয় কাফেরদের মাঝে দৃড় একতা। তাই অখন্ড এক ভারতীয় ভূখন্ডে একত্রে বসবাস করছে বাঙালী, বিহারী, পাঞ্জাবী, গুজরাতী,মারাঠি, তামিল এরূপ নানা ভাষা ও নানা বর্ণের কাফেরগণ। এবং এভাবে জন্ম দিয়েছে শক্তিশালী এক হিন্দু রাষ্ট্রের। অথচ এরূপ একতাবদ্ধ হওয়াটি হিন্দু ধর্মের বিধান নয়। অপর দিকে মুসলিমগণ আজ ৫৭টি রাষ্ট্রে বিভক্ত। অথচ মুসলিমদের উপর একতাবদ্ধ হওয়াটি ফরজ। এবং বিভক্ত হওয়া হারাম। মহান আল্লাহতায়ালা বিভক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে তীব্র হুশিয়ারিটি জানিয়েছেন সুরা আল-ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে। বলেছেন, “তোমরা  আল্লাহর রশি তথা কোর’আনকে আঁকড়ে ধরো এবং  পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” মুসলিমদের মাঝে বিবাদ থাকতেই পারে, কিন্তু ভৌগলিক বিভক্তি তার সমাধান নয়। বরং এরূপ বিভক্তি যে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ভয়ানক আযাব ডেকে আনবে সে হুশিয়ারিটি শোনানো হয়েছে সুরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। ক্ষুদ্রতা শুধু পরাজয় ও গোলামীই বাড়াতে পারে। বিজয় ও গৌরব নয়। তাই একাত্তরে যে ভারতের গোলামী বাঙালী মুসলিমদের উপর চেপে বসেছে তা থেকে কি বেরুনোর উপায়। মুসলিমগণ অতীতে তখনই বিজয় ও গৌরব পেয়েছে যখন তারা আরব, তুর্কী, কুর্দি, ইরানী, মুর এসব ভিন্নতা ভূলে এক উম্মতে ওয়াহেদা সৃষ্টি করেছে। তখন এসেছ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যও।

৩.

শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে কাফেরদের জীবন থেকেও। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফেরগণ কীরূপ একতাবদ্ধ সে দিকে নজর দিতে এবং তা থেকে ছবক নিতে বলা হয়েছে সুরা আনফালের ৭৩ নম্বর আয়াতে।আরবের কাফেরগণ নানা বিবাদ নিয়ে বছরের পর যুদ্ধ করতো। কিন্তু ইসলাম ও মুসলিমদের নির্মূলে তারা ছিল একতাবদ্ধ। খন্দকের যুদ্ধে ১০ হাজার সৈন্যের এক সংঘবদ্ধ বাহিনী নিয়ে তারা মদিনার উপর হামলা করেছিল। সে চিত্রটি আজও অভিন্ন। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ৪০টি কাফের দেশের সেনাবাহিনীকে দেখা গেছে আফগানিস্তান এবং ইরাকের উপর দখলদারি জমাতে। তাই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গতে ভারত একা ছিল না, পাশে ছিল রাশিয়াসহ আরো বহু কাফের দেশ।

ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের নামে যে ব্যক্তি মুসলিম দেশের মানচিত্র খন্ডিত করে সে ব্যক্তি নামাযী বা রোযাদার হতে পারে, সে যে  প্রকৃত ঈমানদার নয় তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ থাকে? বরং ঈমানদার তো তারাই যারা নিজেদের মাঝের ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিক ভিন্নতা ভূলে সীসা ঢালা দেয়ালের ন্যায় একতার দুর্ভেদ্য দেয়ালের ন্যায় দাঁড়িয়ে জিহাদ করে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তারাই যে সর্বাধিক প্রিয় -সে ঘোষণাটি এসেছে সুরা সাফ’য়ের ৪ নম্বর আয়াতে। অপর দিকে বিভক্তি যে মহান অআল্লাহর পক্ষ থেকে অভিসম্পাত ও ভয়ানক আযাব ডেকে আনে -সে ঘোষণাটি এসেছে সুরা আল-ইমরানের ১০৫নম্বর আয়াতে। তাই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে কোন ইসলামী দল, কোন পীর-মাশায়েখ, মাদ্রাসার কোন ছাত্র-শিক্ষক বা মসজিদের কোন ইমাম-মোয়াজ্জিন জড়িত ছিল না। এটি ছিল ইসলামচ্যুৎ সেক্যুলারিষ্টদের কাজ। ইসলামচ্যুৎ এ ইতর ব্যক্তিদের কুকর্ম যেমন একাত্তরে দেখা গেছে তেমনি দেখা যাচ্ছে আজও। শুধু অবাঙালী হওয়ার কারণেই এরা হাজার বিহারীকে হত্যা করেছ এবং তাদের মহিলাদের উপর ধর্ষণ চালিয়েছে। এরাই আজ বাংলাদেশে গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। 

৪.

বাংলাদেশের বুকে শয়তানের বিজয়টি বিশাল। কারণ, এ মুসলিম ভূমিতে শয়তানের অনুসারিদের সংখ্যাটি বিশাল। শয়তানের এজেন্ডা হলো, জনগণকে জান্নাতের পথ থেকে দূরে রাখা চলা। সে লক্ষ্য অর্জনে শয়তানের কৌশলটি হলো, ইসলামের কোর’আনি বিধানকে রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গণে পরাজিত রাাখা। এবং আদালতে শরিয়তের আইনকে স্থান না দেয়া। এভাবে বিপুল সাফল্য পেয়েছে মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার শয়তানী প্রকল্প। বাংলাদেশে আজ যেরূপ গুম,  খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও সীমাহীন স্বৈরাচারের বিজয় তা তো এ শয়তানী প্রকল্প বিজয়ী হওয়ার কারণেই।

অপরদিকে বাংলাদেশে যারা নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয় তাদের ব্যর্থতাটি বিশাল। বিপুল সংখ্যক মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়লেও তারা চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছে সভ্যতর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণে। তারা ইতিহাস গড়েছে গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, স্বৈরাচার, সন্ত্রাসের ন্যায় নানারূপ দুর্বৃত্তিতে। যে পবিত্র মিশন নিয়ে মুসলিমদের বাঁচতে হয় সে মিশন থেকে তারা বহু দূরে সরেছে। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলকে প্রতিহত করার কাজে সবচেয়ে জঘন্য কাজটি করছে দেশের প্রশাসনিক রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো। এটি পরিণত হয়েছে শয়তানের হাতিয়ারে এবং অসম্ভব করে রেখেছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে।   

৫.

কে কি বললো বা লিখলো তা প্রতিটি ব্যক্তির জীবনেই অতি গুরুত্বপূর্ণ। কে কতটা ঈমানদার বা বেঈমান -তা ধরে পড়ে তার কথা,কর্ম ও লেখনীতে। বস্তুতঃ কথা, কর্ম ও লেখনীর মাধ্যমেই প্রকাশ পায় ব্যক্তির ঈমান। এবং তখন ধরা পড়ে কে সত্যের পক্ষে বা বিপক্ষে। অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামের আগুনে পড়বে খুন, ব্যাভিচার বা চুরি-ডাকাতির কারণে নয়, বরং নমরুদ, ফিরাউনের ন্যায় মিথ্যাচারীর­ পক্ষ নেয়াতে। ইতিহাসের নমরুদ ও ফিরাউন মারা গেলেও প্রতি সমাজে অসংখ্য নমরুদ-ফিরাউন আজ বেঁচে আছে তাদের আদর্শ ও মিথ্যাচার নিয়ে। প্রতি সমাজে এরাই হলো ইসলামের প্রতিপক্ষ।এদের ষড়যন্ত্রের কারণেই দেশে দেশে ইসলামের পক্ষের শক্তি আজ পরাজিত। এবং আদালত থেকে বিলুপ্ত হয়েছে শরিয়তি বিধান। দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে তাদের  সৃষ্ট মিথ্যাচারের প্রবল জোয়ারের কারণে অতিশয় কঠিন হয়েছে সিরাতুল মোস্তাকীমের পথে চলা।তাই জাহান্নামে আগুন থেকে বাঁচার জন্য শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতই যথেষ্ট নয়, বরং অতিশয় জরুরী হলো ইসলামের শত্রুপক্ষকে চেনা এবং তাদের মিথ্যাচার থেকে নিজেকে দূরে রাখা। এবং আরো জরুরী হলো, তাদের নির্মূলে নিজের জান-মাল ও প্রতিভার বিনিয়োগ করা।

৬.

প্রশ্ন হলো, ইসলামের শত্রুপক্ষকে চেনা এবং তাদের মিথ্যাচার থেকে নিজেকে দূরে থাকার ক্ষেত্রে বাঙালী মুসলিমদের সাফল্য কতটুকু? বাংলাদেশে যারা ইসলামের শত্রুপক্ষ তাদের কথা ও কাজকর্ম গোপন কিছু নয়। তারা ঘোষনা দিয়েই ইসলামের বিরোধীতা করে। ইসলামপন্থিদের উপর অত্যাচার করে এবং তাদেরকে  হত্যাও করে। নবীজী (সাঃ)’র যে ইসলামে জিহাদ ছিল, ইসলামী রাষ্ট্র ছিল, শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ছিল এবং মুসলিম উম্মাহর মাঝে রাষ্ট্রীয় সীমারেখাহীন ঐক্য ছিল -সে ইসলামে ফিরে যাওয়াকে তারা মৌলবাদী সন্ত্রাস বলে। তাদের নির্মূলে তারা কাফেরদের সাথে কোয়ালিশনও গড়ে।

বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র তীব্রতর হয় শেখ মুজিবের হাতে। ভারতীয় কাফের শাসকচক্রের অতি বিশ্বাসভাজন লোক ছিল মুজিব।  ক্ষমতায় এসেই সে নিষিদ্ধ করে সকল ইসলামী দলকে। নাস্তিক কম্যুনিষ্টদের রাজনৈতিক অধিকার দিলেও সে অধিকার দেয়নি দেশের ইসলামপন্থিদের। ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল মুজিবের কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই তার আমলে ইসলামী ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মীদের স্থান হয় কারাগারে।মুজিব ছিল ভারতের কাফের শক্তির একনিষ্ঠ দালাল, ভারতের সাথে স্বাক্ষর করে ২৫ সালা দাসচুক্তি। ভারতীয়দেরকে খুশি করতে দেন পদ্মার পানি তুলে নেয়ার অবাধ অধিকার। গণতন্ত্র হত্যা করে চালু করে একদলীয় বাকশালী শাসন।চালু করে বিচার বহির্ভূত হত্যা যাতে প্রাণ নাশ করা হয় প্রায় ৩০ হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীর। কথা হলো, এমন একজন অপরাধী ব্যক্তিকে কি দেশের নেতা, বন্ধু বা জাতির পিতা বলা যায়? একজন ডাকাত তার ডাকাত দলের সর্দারকে নেতা, পিতা বা বন্ধু বলতে পারে, কারণ এটি তার দলীয় শৃঙ্খলার বিষয়। কিন্তু  একজন ভদ্রলোক কেন অপরাধীকে নেতা, পিতা বা বন্ধু বলবে? একাজ তো মুজিবভক্ত দুর্বৃত্তদের। অন্যায় করাটাই শুধু নয়, গুরুতর অপরাধ হলো একজন প্রমাণিত অপরাধীকে সম্মান দেখানো। একই রূপ আচরণ হচ্ছে মুজিব কন্যা শেখ হাসিনার সাথে। হাসিনা যে ভোট চোর ও খুনি -সেটি তো বহুবার প্রমানিত হয়েছে। চোরকে চোর এবং খুনিকে খুনি বলার মধ্যেই তো সততা। তাকে পিতা, বন্ধু, নেতা বা প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসালে কি গুণী ও সভ্য মানুষের সন্মান থাকে? এ কাজ তো দুর্বৃত্তদের। তাতে মৃত্যু ঘটে বিবেকের। তাতে বিলুপ্ত হয় ঈমান। বাংলাদেশীদের জন্য ভয়ানক বিপদের কারণ হলো, বাংলাদেশের রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসন, আইন-আদালত পরিণত  হয়েছে বিবেক হত্যার জঘন্য হাতিয়ারে। ফলে মুজিব ও হাসিনার ন্যায় দুর্বৃত্তগণও জনগণের মাথায় উঠতে পেরেছে। ১০/১০/২০২০     




বিবিধ ভাবনা-২

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১.

ঈমানদারের প্রতিটি যুদ্ধই জিহাদ। জিহাদ ভিন্ন অন্য কোন যুদ্ধে ঈমানদার তার জানমালের বিনিয়োগের কথা ভাবতেই পারে না। এ জন্য প্রতিটি ঈমানদারই হলো শতভাগ জিহাদী। অপর দিকে ধর্মহীন সেক্যুলারদের জীবনে জিহাদ বলে কিছু নাই; শাহাদত বলেও কিছু নাই। ইসলামী চেতনা নিয়ে বাঁচা বা মরাকে তারা সাম্প্রদায়িকতা মনে। ফলে কোন যুদ্ধে তারা মরলে নিশ্চিত জাহাননামে যায়।

গরু-ছাগলও মানব কল্যাণে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দেয়। কিন্তু বেঈমানেরা তাদের জানমালের বিনয়োগ করে শয়তানের এজেন্ডা পূরণে তথা মানবের অকল্যাণে। বাংলাদেশের বুকে আজ যেরূপ চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত এবং খুনি ধর্ষকদের শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা তো তাদের কারণেই। তাই র্পবিত্র কোরআনে মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা বেঈমানদেরকে গবাদী পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। মহান আল্লাহতায়ালার সে ঘোষণাটি যে কতটা সত্য তা বাংলাদেশের মানুষ আজ স্বচোখে দেখছে। গবাদী পশু কখনোই ধর্ষণ, গুম-খুন, চুরি-ডাকাতি ও গণহত্যয় নামে না, কিন্তু মানবরূপী এ বেঈমানেরা নামে। বাঘ-ভালুকের ন্যায় হিংস্র পশুদের গরু-ছাগলও চিনে, ফলে তাদের থেকে দূরে থাকে। কিন্তু মানবরূপী এ পশুদের সে সামর্থ্য নাই। বাংলাদেশে এরাই ভারতের ন্যায় মৃসলিম হত্যাকারি দেশকে  শুধু একাত্তরে নয়, আজও বন্ধু গণ্য করে। যে ভারত নিজ দেশে মুসলিমদের নিরাপত্তা দিতে পারে না তারা বাংলাদেশের মুসলিমদের কল্যান করবে সেটি একমাত্র বেওকুপেরা্ই ভাবতে পারে।

 

ব্যক্তির জান, মাল ও মেধা এসবই হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত। সে আমানতের ব্যবহারে ব্যক্তি কখনোই সার্বভৌম বা স্বেচ্ছাচারি হতে পারে না। তাকে সে আমানতের প্রয়োগ করতে হয় খেলাফতের দায়িত্ব পালনে। সে কাজে তাকে মেনে চলতে হয় মহান আল্লাহর দেয়া নির্দেশাবলি। এ হলো ঈমানদার হওয়ার মৌলিক দায়বদ্ধতা। এখানে অবাধ্যতা বা খেয়ানত হলে সে ব্যক্তি কাফেরে পরিণত হয়।

২.

ঈমানদার হওয়ার অর্থই হলো প্রতি কাজে ও জীবনের প্রতি পদে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে দায়বদ্ধ হওয়া। তাই কোন ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনের বিজয় ও মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ছাড়া অন্য কোন এজেন্ডা পূরণে জান ও মালের বিনিয়োগ করবে বা প্রাণ দিবে -তা ভাবাই যায় না। একারণেই কোন ঈমানদার জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী বা স্বৈরাচারি হতে পারে না। এজন্যই একাত্তরে কোন ঈমানদার ব্যক্তি ভারতীয় কাফেরদের কোলে আশ্রয় নেয়নি। এবং তাদের অর্থ ও অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধেও নামেনি। অথচ সে সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে বহু ইসলামী দল ছিল, এবং তাদের লক্ষ লক্ষ কর্মী ও সমর্থকও ছিল। কিন্তু তাদের কেউ ভারতের কাফের অধ্যুষিত দেশে যায়নি। তাদের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধও করেনি। এজন্যই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় কোন আলেম নাই, কোন পীর-মাশায়েখ নাই,মাদ্রাসার কোন ছাত্র নাই, মসজিদের কোন ইমাম বা মোয়াজ্জিন নাই। একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গার এমন কাজকে তারা শতভাগ হারাম গণ্য করেছে। বাংলাদেশের  ইতিহাসে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

একট মুসলিম দেশ ভাঙ্গার এরূপ শতভাগ হারাম কাজে জান,মাল ও মেধার বিনিয়োগ করেছে আওয়ামী লীগ, চীনপন্থি ও রুশপন্থি ন্যাপ ও  কম্যুনিষ্ট পার্টির  নেতাকর্মীগণ। একাজ ছিল নিতান্তই ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলারদের কাজ। বাংলার মাটিতে বেশ্যাবৃত্তি, সুদ-ঘুষ, গুম-খুনের রাজনীতিকে তারা যেমন জায়েজ করে নিয়েছে, তেমনি জায়েজ করে নিয়েছে ইসলামের বিজয়রোধ  ও ভারতীয় পদসেবার রাজনীতিকেও। এরূপ ইসলামী চেতনাশূণ্যতা ও ভারতের প্রতি দায়বদ্ধতাকে ইসলামের বিপক্ষীয় শক্তি একাত্তরের চেতনা বলে প্রতিষ্ঠ দিয়েছে। একাত্তরে এ চেতনার মূল লক্ষ্য ছিল, বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে  ভাঙ্গা এবং পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠি রূপে বিশ্ব রাজনীতিতে বাঙালী মুসলিমদের ভূমিকাকে বিলুপ্ত করা। এবং একাত্তরে ভারতীয় বাহিনীর বিজয়ের পর লক্ষটি হলো, বাংলাদেশকে ভারতের গোলাম রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া এবং বাংলার  মুসলিম ভূমিতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করা। শুধু ভারত নয়, এ বাঙালী সেক্যুলার দুর্বৃত্তদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের তাবত কাফের শক্তি। তাই ভোট চুরি হলে বা ইসলামপন্থিদের হত্যাকরা হলে এ শত্রু শক্তি সেটিকে নিন্দা না করে বরং উল্লাস করে।

৩.

ঈমানের প্রকাশ ঘটে জিহাদের মধ্যে। নামায়-রোযা মুনাফিকেরও থাকতে পারে। জিহাদের ময়দানে তারা নাই। সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারেরর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আয়াতটিতে শুধু আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের ঈমানকেই অপরিহার্য করেননি, অপরিহার্য করেছেন নিজের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহতায়ালার পথে জিহাদ। জিহাদ যেমন অস্ত্র দ্বারা হয়, তেমনি হয় কথা ও লেখনির দ্বারা। বহু মানুষ শহীদ হয় সত্য কথা বলা বা লেখার কারণে। তাই ইসলামের শত্রু প্ক্ষের হাতে শহীদ হওযার জন্য বহু মোজাহিদকে রণাঙ্গনে যেতে হয়নি। যেমন মিশরের ইখওয়ান নেতা হাসানুল বান্না, কোর’আনের বিখ্যাত মোফাচ্ছের শহীদ কুতুব ও ইরানী বুদ্ধিজীবী আলী শরিয়তি শহীদ হয়েছেন স্রেফ সত্য কথা বলা ও লেখার জন্য।

৪.

যারা ইসলামের বিজয় চায় না, বিরোধী শরিয়ত প্রতিষ্ঠার এবং গোলামী করে ভারতের ন্যায় কাফের শক্তির -তারা প্রকৃত বেঈমান। তারাই ইসলামের শত্রু। বড়ই বিস্ময়ের বিষয় হলো, এ নিদারুন সত্য কথাটি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পায়নি। একটি দেশের জন্য গ্লানিকর বিষয়টি ঘুর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা মহামারিতে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণ নাশ নয়, বরং কোন দুর্বৃত্ত বেঈমানকে শাসক রূপে মেনে নেয়া। কোন ঈমানদার ব্যক্তিই এমন দুর্বৃত্তদের জাতির নেতা,পিতা বা বন্ধু বলতে পারেনা। যারা মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের বন্ধু নয় তারা মুসলিমদের বন্ধু হয় কি করে? অথচ বাংলাদেশের ন্য়ায় একটি মুসলিম দেশে সেটিই হচ্ছে। বড়ই আফসোসের বিষয় হলো, এ নিয়ে এমনকি আলেমদের মাঝেও কোন ক্ষোভ নাই।

৫.

কাফের শত্রুকে বন্ধু রূপে গ্রহন করাটি কবিরা গুনাহ। বাঙালীগণ  ১৯৭১য়ে সে গুনাহ করেছে ভারতকে বন্ধু রূপে গ্রহন করে। এমন জঘন্য পাপ তো আযাব ডেকে আনে। বাংলাদেশীদের উপর সে আযাব হলো চোর-ডাকাত ও ধর্ষকদের শাসন।

৬.

সম্প্রতি ভারতের অতি পরিচিত এজেন্ট শাহরিয়ার কবির বলেছে, ভারতের ঋণ কোনদিন শোধ করা যাবে  না। অথচ প্রকৃত সত্য হলো ভূলবার নয় বাংলাদেশীদের  বিরুদ্ধে  ভারতের নৃশংস অপরাধগুলো। এবং এখনো লাগাতর চলছে সে অপরাধের ধারা। মনিব যদি নিজ ঘরে গুম, খুন, চুরি-ডাকাতি এবং ধর্ষণের রাজত্ব কায়েম করে, তার পোষা ভৃত্যটি তা স্বচোখে দেখেও নিন্দা করে না, বরং নিজের দাসত্ব বাঁচাতে মনিবের প্রশংসায় গদগদ হয়। তেমনি অবস্থা শাহরিয়ার কবিরের ন্যায় ভারতীয় দাসদের।

 

ভারতীয়দের  অপরাধের তালিকাটি বিশাল। ১৯৭১’য়ে ভারতের সেনাবাহিনীর হাতে অধিকৃত হওয়ার পর শুরু হয় নৃশংস লুটতরাজ। তখন সীমান্ত বিলুপ্ত করে দেয় বাংলাদেশের খাদ্য ভারতে নিতে। তাতে নেমে আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। মৃত্য হয় লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশী মানুষের। ভারত কেড়ে নিচ্ছে পদ্মা, তিস্তাসহ বহু  নদ-নদীর পানি। একাত্তরের যুদ্ধ শেষে ডাকাতি করে নিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর  হাজার হাজার টাকার অস্ত্র। শাহরিয়ার কবিরের ন্যায় দাসেরা তা নিয়ে তার মনিব দেশ ভারতকে  নিন্দা করতে রাজী নয়।  বরং বাংলাদেশীদের  নসিহত দেয় ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ ও নতজানু হতে।

৭.

চুরি-ডাকাতি, গুম-খুন ও স্বৈরাচার অতি গুরুতর অপরাধ। তবে আরো গুরুতর অপরাধ হলো এসব দুর্বৃত্তদের শাস্তি না দিয়ে নেতা, দেশের শাসক বা জাতির পিতার আসনে বসানো। এ অসভ্য কাজ কোন সভ্য জনগণের হতে পারে না। এটি নিরেট বিবেকহীনতা। মানব অসভ্য হয় অর্থের অভাবে নয়, বরং এরূপ বিবেকহীনতার কারণে। অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামের আগুণে নিক্ষিপ্ত হবে চুরি-ডাকাতি, মানুষ খুন বা ধর্ষণের কারণে নয়, বরং বিবেকহীন বিশ্বাস ও আচরনের কারণে। বিবেকহীনতার কারণেই মানুষ মুর্তি, শাপ-শকুন ও দেব-দেবীকে যেমন পুজা করে তেমনি দুর্বৃত্ত জালেমদের দলের নেতা,জাতির পিতা ও দেশের শাসকের আসনে বসায়।   এবং সে বিবেকহীনতাই বাংলাদেশীদের মাঝে বেশী বেশী হচ্ছে। ফলে দেশটি ইতিহাস গড়ছে গুম, হত্যা, ধর্ষণ ও স্বৈরাচারের ন্যায় নানা রূপ অপরাধে।

অথচ আল্লাহর খলিফা রূপে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের উপর দায়িত্ব ছিল সকল প্রকার অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। দেশবাসী যে এক্ষেত্রে কতটা ব্য়র্থ -তা কি প্রমাণের অপেক্ষা রাখে? এ বিশাল ব্যর্থতা নিয়ে পরকালে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কি কোন পুরস্কার মিলবে? দেশে কতগুলি প্রাসাদ, ব্রিজ বা রাস্তা নির্মিত হলো, মাথাপিছু আয় বা বিদেশে রফতানি কতটা বৃদ্ধি পেল -মহান আল্লাহতায়ালা সে হিসাব চাইবেন না। বরং হিসাব চাওয়া হবে, কত জন অসভ্য মানুষ সভ্য হলো, কত জন বেঈমান ঈমানদার হলো এবং দেশের আদালতে শরিয়ত কতটা প্রতিষ্ঠা পেল -সেগুলি। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেয়ার আগে বাংলাদেশের মানুষ কতটা নিচ্ছে সে ব্যর্থতার হিসাব? এ ব্যর্থতা যে তাদের জাহান্নামে নিবে -সে হুশই বা ক’জনের? ৮/১০/২০২০