বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ও ভোটডাকাতদের নাশকতা

দ্বি-মুখি হামলার মুখে জনগণ

ভয়ানক দ্বি-মুখি হামলার শিকার এখন বাংলাদেশের জনগণ। এক দিকে প্রাণনাশী করোনা ভাইরাসের মহামারি। অপরদিক ঘাড়ের উপর খাড়িয়ে ভোট-ডাকাতদের বিশাল ঘাতকদল। লাশ পড়ছে যেমন করোনা ভাইরাসে, তেমনি শত শত লাশ পড়ছে সরকারি দলের গুন্ডা, পুলিশ ও RAB এর খুনিদের হাতে। ফলে ভয়াবহ বিপদের মুখে এখন বাংলাদেশের জনগণ। এরূপ মহামারির মোকাবেলার সামর্থ্য আম জনগণের থাকে না। এটি এক বিশাল যুদ্ধ। এ যুদ্ধ এতই ভয়ংকর যে শিরকমুক্ত হয়ে নিহত হলে ইসলামে রয়েছে শহীদের মর্যাদা।এ যুদ্ধের মোকাবেলায় মার্কিন যুক্তরা্ষ্ট্রের ন্যায় বিশ্বশক্তিও হিমশিম খাচ্ছে। হিমশিম খাচ্ছে গ্রেট ব্রিটেন, ফান্স, রাশিয়া, ইটালী, স্পেন। প্রশ্ন হলো, এ মুহুর্তে বাংলাদেশ কি করবে? বাংলাদেশীদের জন্য মহাবিপদ এজন্য যে, দেশে দায়িত্বশীল কোন সরকার্ নেই। আছে এক ভোটডাকাত সরকার। ডাকাতদের কাজ তো ডাকাতি করা, তাদের কাছ থেকে কি জনকল্যাণ আশা করা যায়? 

সভ্য ও বিবেকবান মানুষের প্রধান গুণটি হলো, কিসে মানুষের কল্যাণ তা নিয়েই গভীর চিন্তা-ভাবনা করা এবং সে ভাবনা নিয়ে ত্বরিৎ ময়দানে নেমে পড়া। দেশ সভ্যতর ও সমৃদ্ধ হয় এমন বিবেকবান মানুষের কারণেই। কিন্তু চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাতদের ন্যায় অপরাধীদের থেকে কি সেরূপ কিছু আশা করা যায়? যে অপরাধীদের কাজ চুরি-ডাকাতি, ভোটডাকাতি ও গুম-খুনের রাজনীতি, তাদের মানসিক বিকলাঙ্গতাটি বিশাল। তাদের থাকে না জনগণের কল্যাণ নিয়ে কিছু ভাবা ও কিছু করার সামর্থ্য। ক্যান্সারে পেট আক্রান্ত  হলে খাদ্যে রুচি থাকে না। তেমনি নীতি-নৈতিকতা মারা পড়লে, রুচি থাকে না সভ্য কাজে। ফলে জনগণের স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষাখাত বা অন্য কোন জনকল্যাণ নিয়ে ভাবার রুচি চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাতদের থাকে না। সভ্য কর্ম বাদ দিয়ে তারা বরং আবিস্কার করে দুর্বৃত্তির নতুন কৌশল। ২০১৮ সালে তেমনই এক অসভ্য আবিস্কার হলো নির্বাচন-পূর্ব রাতে ভোটডাকাতির কৌশল। ইতিহাসের বুকে বাংলাদেশ কোন সভ্য আবিস্কারে স্থান না পেলেও অবশ্যই বেঁচে থাকবে ভোটডাকাতির এ অসভ্য আবিস্কার নিয়ে। বিপদের আরো কারণ, বাংলাদেশ সে অসভ্যদের হাতেই আজ অধিকৃত। তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য, যে কোন মূল্যে নিজেদের বাঁচানো, জনগণকে বাঁচানো নয়। সেটি বুঝা যায় তাদের রাজনীতির লক্ষ্য ও বিনিয়োগ দেখে।  

বাংলাদেশের ভোটডাকাতগণ কথা বলে ফেরেশতার ন্যায়। অথচ তাদের আসল চরিত্র কখনোই গোপন থাকার নয়। সেটি জানা যায়, কীভাবে তারা ক্ষমতায় এলো তা থেকে। জানা যায়, বাজেটের বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দের দিকে নজর দিলে। রাজস্বের অর্থ জনগণের। ফলে জনগণের কল্যাণ নিয়ে যারা ভাবে, রাজস্বের অর্থ তারা ব্যয় করে জনগণের কল্যাণে। কোন নেতা বা নেত্রীর মৃত পিতা বা মাতার স্মৃতিকে বড় করতে নয়। জন-কল্যাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতটি হলো স্বাস্থ্য খাত। ফলে যারা জনগণের কল্যাণ নিয়ে ভাবে তারা জাতীয় বাজেটে সবচেয়ে বেশী বরাদ্দ রাখে স্বাস্থ্য খাতে। কারণ, এ খাতটি হলো জনগণকে মৃত্যু থেকে বাঁচানোর খাত। ফলে অন্য কোন খাত এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। অধিকাংশ মানুষই নানা পেশায় নেমে নিজ পরিবারের ভরন-পোষনের দায়ভার নিজে পারে। কিন্তু নানা রোগ-ভোগে চিকিৎসায় খরচ বহনের সামর্থ্য সবার থাকে না। থাকে না প্রয়োজনীয় অর্থ। এ কাজটি তাই সরকারের। সরকার সে দায়ভার না নিলে গরীবদের বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে হয়। তাই দেশের সরকার কতটা সভ্য, বিবেকমান ও দায়ত্বশীল  সেটি জানতে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না, বুঝা যায় জাতীয় বাজেটের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেখে।

 

অবহেলিত স্বাস্থ্যখাত

বাংলাদেশের বাজেটের জনকল্যাণমুখি চরিত্র কতটুকু সেটির বিচার করা যাক। গ্রেট ব্রিটেনের জনসংখ্যা ৬ কোটি ৭০ লাখ। এ দেশটির বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হলো ১৪০.৪ বিলিয়ন পাউন্ড। অপরদিকে বাংলাদেশের জনসংখ্য ১৭ কোটি যা গ্রেট ব্রিটেনের জনসংখ্যার আড়াই গুণ। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের পরিমাণ ২৯,৪৬৪ কোটি টাকা অর্থাৎ ২৯৪ বিলিয়ন টাকা। বর্তমানে পাউন্ডের মূল্য ১০০ টাকারও কিছু বেশী। অতএব স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দকৃত ২৯৪ বিলিয়ন টাকার পরিমাণটি ৩ বিলিয়ন পাউন্ডেরও কিছু কম। ৬ কোটি ৭০ লাখ জনগণের জন্য ১৪০.৪ বিলিয়ন পাউন্ড এবং ১৭ কোটি মানুষের জন্য ৩ বিলিয়নেরও কম। বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য বাজেট মাত্র ১৭ পাউন্ডেরও কাছাকাছি। অথচ বিলেতে সেটি ২ হাজার ৯৫ পাউন্ড।

বিষয়টি অন্যভাবে দেখা যাক। বাংলাদেশে অর্থভান্ডার গ্রেট ব্রিটেনের সাথে তূলনীয় নয়। কিন্তু তূলনা করা যেতে দেশ দুটির স্বাস্থ্য খাতের প্রায়োরিটির। সেটি বুঝা যায়, জিডিপি (Gross Domestic Product) ও  সর্বমোট বাজেটের কতটা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয় -তা থেকে। বাজেট অর্থ বরাদ্দের পরিমান কম হতে পারে, কিন্তু তূলনামূলক বিচারে স্বাস্থ্য খাতের প্রায়োরিটি কখনোই কম পারে না। দেখা যাক,  জিডিপি’র কতটা ব্যয় হয় স্বাস্থ্য খাতে? গ্রেট ব্রিটেন তার জিডিপি’র ৭% খরচ করে স্বাস্থ্য খাতে।  বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিয়েছে জিডিপি’র মাত্র ১.০২%।  ব্যয়ের এ অনুপাতটি প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল ও পাকিস্তান থেকেও কম। ভারত ব্যয় করে জিডিপি’র ১.১৬% ৴এবং শ্রীলংকা ব্যয় করে ১.৫০%। তবে দক্ষিণ এশিয়ার বুকে সবচেয়ে বেশী বরাদ্দ নেপালের এবং দ্বিতীয় স্থানে পাকিস্তান । ২০১৬ সালে স্বাস্থ্য খাতে নেপাল ব্যয় করেছিল জিডিপি’র ৬.৩% এবং পাকিস্তান ব্যয় করেছিল তার জিডিপি’র ২.৭৫%। বাংলাদেশ ও ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের জিডিপি ব্যয় ছিল দ্বিগুণ। নেপালের ছিল ৫ গুণ।  

তুলনা করা যাক, প্রতিবেশী দেশগুলোর মাঝে সমুদয় বাজেটের কে কতটা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে -সেটি? বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের পরিমাণ সমুদয় বাৎসরিক বাজেটের মাত্র ৫.৬৩%। এ বরাদ্দটি প্রতিবেশী পাকিস্তানের তুলনায় অত্যন্ত কম। পাকিস্তানের সরকার  ২০১৯ সালের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিয়েছে মোট বাজেটের ১৭.৭% ভাগ। অথচ দেশের ভোটডাকাত সরকারের দাবী, বাংলাদেশের অবস্থা পাকিস্তানের চেয়ে অনেক ভাল। এদের অনেকে পাকিস্তানকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে। অপর দিকে সরকারের মন্ত্রীগণ বড়াই করে, বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর হতে যাচ্ছে। অপরদিকে গ্রেট ব্রিটেন স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয় মোট বাজেটের ২৪%। এমন বিশাল বরাদ্দের কারণেই ব্রিটিশ সরকার তার নাগরিকদের জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে হার্ট অপারেশন, ট্রান্সপ্লান্ট অপরাশেন,ডায়ালাইসিসের ন্যায় সকল প্রকার চিকিৎসাই বিনা মূল্যে দেয়। অথচ বাংলাদেশে রোগীদেরও প্রাণ বাঁচানোর ঔষধ সরকার থেকে দেয়া হয় না। ডায়ালাইসিসের সামর্থ্য না থাকায় অধিকাংশ রোগীই বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে বাংলাদেশে। ফলে বুঝতে কি বাঁকি থাকে, বাংলাদেশে জনগণের প্রাণ বাঁচানোর খাতটি কতটা অবহেলিত। তাতে ধরা পড়ে সরকারের দায়িত্বহীনতা। অথচ শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয় মৃত মুজিবের নামে। শত কোটি টাকা ব্যয় করে মুর্তি গড়া হয়। হাজার হাজার কোটি টাকার চুরিডাকাতি হয়ে যাচ্ছে সরকারি তহবিল থেকে -যা দিয়ে শত শত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা দেয়া যেত, কেনা যেত বহু হাজার ভেন্টিলেটর এবং দেয়া যেত কিডনি ডায়ালাইসাইসিস। বহু লক্ষ মানুষকে তখন বিনা মূল্যে প্রাণ বাঁচানোর চিকিৎসা দেয়া যেত।

বাংলাদেশে অভাব অর্থের নয়, বরং সেটি বিবেকের। ভোটডাকাতদের সেটি থাকারও কথা নয়। তাদের এজেন্ডা মানুষকে বাঁচানো নয়, বরং গুমখুন,ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা ক্রসফায়ারে দিয়ে মানুষ মারার। এ দুর্বৃত্তগণ বাজেটের বেশীর ভাগ অর্থ খরচ করে নিজেদের গদি বাঁচাতে। নিজের পকেট ভরতে এরা সরকারি প্রজেক্টের অর্থের করে চুরি-ডাকাতি। তাদের চুরি-ডাকাতির ফলে প্রতি মাইল রাস্তা বানাতে বাংলাদেশে খরচ হয় বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় বেশী। জনগণের দেয়া রাজস্বের অর্থ ব্যয় হচ্ছে পুলিশ বাহিনী, প্রশাসন, বিচারক, RAB ও সেনাবাহিনীর ন্যায় যারা ভোটডাকাত সরকারের গদির পাহারাদার ও ভোটডাকাতির ডাকাত তাদের জৌলুস বৃদ্ধিতে। অপরদিকে বিনা চিকিৎসায় লাখ লাখ মানুষ মারা গেলেও তা নিয়ে সরকারেরর মাথা ব্যথা নেই। বরং প্রচার দেয়া হয়, সরকার প্রচুর সেবা দিচ্ছে। যত দোষ রোগ-জীবানু ও জনগণের। 

 

যে আযাব অনিবার্য দুর্বৃত্ত শাসনে

যে কোন যুদ্ধ যোদ্ধা লাগে। এবং লাগে যুদ্ধাস্ত্র এবং যোগ্য জেনারেল বা নেতৃত্ব। খালি হাতে কোন সৈনিককে রণাঙ্গণে পাঠানোটি গুরুতর অপরাধ। এতে স্রেফ প্রাণক্ষয় হয়। তেমনি এক গুরুতর অপরাধ হচ্ছে বাংলাদেশের ডাক্তার ও নার্সদের সাথে। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ডাক্তার ও নার্সদের যুদ্ধটি করতে হচ্ছে অনেকটা খালি হাতে। শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বেসরকারি ডাক্তার ও নার্সদের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, পারসোনাল প্রটেকটিক ইকুইপমেন্ট তথা মাস্ক, গ্লাভস, এ্যাপ্রোন, চোখের কভার নিজ খরচে কিনতে। যেন যুদ্ধে যেতে হবে নিজে অস্ত্র কিনে! 

যে কোন যুদ্ধে সৈনিকদের স্বীকৃতি ও তাদের প্রতি সৌজন্যবোধ  যে কোন সভ্য সমাজেই কাম্য। নইলে যুদ্ধে সৈনিক জোটে না। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি মহলে সেটি নেই। পাকিস্তানে ডাক্তার-নার্সদের হাসপাতালের সামনে গার্ড অব অনার দেয়া হচ্ছে। সে চিত্র টিভিতেও বার বার দেখানো হচ্ছে। বিলেতে ডাক্তার-নার্সদের শুধু সরকার নয়, জনগণও দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সমস্বরে সাবাশ দিচ্ছে। সে চিত্রও টিভিতে বার বার দেখানো হচ্ছে। হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সদের সাবাশ দিতে তাদের কাছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উপঢৌকন নিয়ে হাজির হচ্ছে্। অথচ বাংলাদেশে তাদেরকে তিরস্কার করা হচ্ছে। জরুরী সামগ্রী না জুগিয়ে হাসিনা হুমকি দিচ্ছে, সে নাকি বিদেশ থেকে ডাক্তার আনবে।  

বাংলাদেশের হাসপাতালগুলির অবস্থাও বেহাল। নাই জরুরী সামগ্রী। নাই কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য পৃথক পৃথক কামরা। অধিকাংশ হাসপাতালে নাই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট। এ মুহুর্তে অতি জরুরী হলো ভেন্টিলেটর যা কৃত্রিম ভাবে অতি অসুস্থ্য রোগীকে অক্সিজেন জোগায়। তাতে রোগী পায় রোগের সাথে লড়াইয়ের সামর্থ্য এবং পায় কিছু বাড়তি সময়। অনেক রোগী তাতে বেঁচে যায়। ভেন্টিলেটর না লাগালে রোগের সাথে লড়াইয়ের সামর্থ্য দ্রুত লোপ পায় এবং রোগী মারা যায়। ভেন্টিলেটর সংগ্রহে সরকারের উদ্যোগ কই? হাসপাতালে নাই পর্যাপ্ত সংখ্যক মাস্ক। নাই রোগীদের ভাইরাস সনাক্ত করার টেস্ট সামগ্রী। দেশ জুড়ে পুরা এক বেহাল অবস্থা।

অপরদিকে মন্ত্রীদের দাবী, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকতে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আসা অসম্ভব। এভাবে এক ভোটডাকাত দুর্বৃত্তকে তারা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারি দরবেশ বানিয়ে ফেলেছে। যেন বাংলাদেশে আসতে হলে ভাইরাসকে শেখ হাসিনার অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। সুস্পষ্ট শিরক আর কাকে বলে? ভাবটা এমন, যে দেশে সাপ-শকুন, গরু-ছাগলকে ভগবান বলা হয়, সে দেশে হাসিনা কম কিসে? অথচ ভাইরাস শুধু আসে নাই, বহু লোক তাতে ইতিমধ্যে মারা গেছে। বাংলাদেশে যে কীরূপ বিবেকশূণ্য আহম্মকদের শাসন চলছে -সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে?     

দুর্বৃত্তদের ক্ষমতায় রাখার এটি হলো এক ভয়ংকর আযাব। আযাব তখন নানা বেশে মানুষকে ঘিরে ধরে। আযাবেরই এক রূপ, দেশ ছেয়ে যায় ভয়ানক দুর্বৃত্তদের দ্বারা।  মানব ইতিহাসের নৃশংস বর্বরতাগুলো কখন বাঘ-ভালুকের ন্যায় হিংস্র জানোয়ার হাতে হয়নি। বরং হয়েছে মানবরূপী এরূপ হিংস্র জন্তুদের হাতে। পবিত্র কোর’অআনে এদের শুধু পশু বলা হয়নি, তার চেয়েও নিকৃষ্ট জন্তু বলা হয়েছে। পবিত্র কোর’আনের ভাষায় সে বর্ণনাটি হলো, “উলা’য়িকা কা আল আন’য়াম, বালহুম আদাল” অর্থঃ এরাই হলো গবাদি পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট।”

তাই ইসলামে সবচেয়ে বড় মাপের ইবাদতটি জঙ্গলের বাঘ-ভালুক নির্মূল নয়। ড্রেনের মশামারি নির্মূলও নয়। বরং সেটি হলো রাষ্ট্র থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদ। যারা প্রকৃত  মুসলিম তাদের মাঝে দুর্বৃত্ত নির্মূলের এ পবিত্র জিহাদটি নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় অতিশয় মজ্জাগত বলেই সুরা আল-ইমরানে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের সমগ্র মানব জাতির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে কোথায় সে মুসলিম? কোথা সে ইসলাম? এবং  কোথায় সে জিহাদ? ১৬/০৪/২০২০




বিবিধ প্রসঙ্গ ১২

 ১. নেতার আসনে দুর্বৃত্তকে বসানোর আযাব

গাড়ি গর্তে পড়ে এবং বহু নিরীহ মানুষের মৃত্যু ঘটে অযোগ্য চালকের কারণে। ফলে প্রতিটি দায়িত্বশীল সরকারের গুরু দায়িত্বটি হয় যাতে অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স না যায় -সেটির ব্যবস্থা নেয়া। বিষয়টি অবিকল জাতির বেলায়ও। চাষাবাদ, শিল্প, পশুপালন, গৃহনির্মাণ বা ব্যবসাবাণিজ্যে ব্যর্থতার কারণে কোন জাতিই ধ্বংস হয় না। সে ব্যর্থ্যতায় দারিদ্র্য আসলেও ভয়াবহ আযাব আসে না। জাতির জীবনে আযাব আসে এবং ধ্বংস হয়, নেতার আসনে আল্লাহতায়ালার অবাধ্য কোন দুর্বৃত্তকে বসালে। ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তকে যারা খোদা বানিয়েছিল এবং তার পক্ষে অস্ত্র ধরেছিল তারা মিশরবাসীকে কোন কল্যাণ দেয়নি। ফিরাউনের অপরাধের সাথে মিশরবাসীদের অপরাধ তখন একাকার হয়ে গিয়েছিল। তাদের সে অপরাধ মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ভয়াবহ আযাবকে সেদিন অনিবার্য করে তুলেছিল।

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় জনগণের দায়ভারটি বিশাল। জনগণের ঈমান, যোগ্যতা ও বিবেকের পরীক্ষাটি হয় নেতা নির্বাচনের সামর্থ্যের মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্র দেয় সুযোগ্য নেতা নির্বাচিত করে কল্যাণের পথে চলার সুযোগ। সে সাথে সুযোগ করে দেয় দুর্বৃত্ত নেতা নির্বাচন করে ভয়ানক আযাব ডেকে আনারও। ফলে গণতান্ত্রিক দেশে আযাবের সাথে শুধু দুর্বৃত্ত সরকারই দায়ী হয়না, দায়ী তারাও যারা সে দুর্বৃত্তদের নির্বাচিত করে। একটি জাতির জনগণ কতটা অযোগ্য ও বেঈমান সেটি যাচাইয়ের জন্য জরিপের প্রয়োজন পড়ে না, সেটি নির্ভূল ভাবে বুঝা যায় সেদেশের দুর্বৃত্ত শাসককে দেখে। প্রকৃত ঈমানদারদের স্বভাব হলো, দুর্বৃত্ত শাসককে তারা কখনোই মেনে নেয় না। গ্রামে বাঘ ঢুললে গ্রামবাসী যেমন একতাবদ্ধ হয়ে বাঘ হত্যা করে তেমন তারা কোন জালেম শাসক তাড়ায়। সে রকম লড়াই না থাকলে হলে বুঝতে হবে জনগণের মাঝে বিবেকবোধ, বিচারবোধ ও ঈমানের প্রচণ্ড ঘাটতি রয়ে গেছে। গরু-ছাগল বাঘ তাড়ায় না, বরং বাঘের হাতে নিহত হওয়াই তাদের রীতি। তেমনি একটি পশু সুলভ স্বভাব তাদের মাঝেও যাদের মাঝ বিবেকবোধ, বিচারবোধ ও ঈমান বলে কিছু নাই।

নির্বাচনের মাধ্যমে যাচায় হয় জনগণের বিবেকবোধ, বিচারবোধ ও ঈমানের। এখানে ভূল হলে জনগণের উপর আযাব অনিবার্য হয়। তখন লক্ষ লক্ষ মানুষকে সে আযাবে প্রাণ দিয়ে ভূলের দায় পরিশোধ করতে হয়। সে পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ ও প্রাণনাশী হতে পারে তারই দুটি উজ্বল দৃষ্টান্ত হলো হিটলারের আমলের জার্মানী এবং মুজিব-হাসিনা আমলের বাংলাদেশ। হিটলারের ন্যায় এক ফ্যাসিস্ট দুর্বৃত্তকে নির্বাচিত করে জার্মান জাতি তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপদটি ডেকে এনেছিল। তাতে জার্মান জনগণকে ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধের আযাবে পড়তে হয়েছে এবং তাতে মৃত্যু ঘটেছে বহু লক্ষ জার্মানীর। ধ্বংস হয়েছে বহু লক্ষ ঘরবাড়ী। তেমনি বাংলাদেশীগণ ভূগেছে ১৯৭০ সালে শেখ মুজিবের মত একজন ফ্যাসিস্ট দুর্বৃত্তকে নির্বাচিত করে। ফলে দেশবাসীর জীবনে এসেছে ভয়াবহ যুদ্ধ। এসেছে হাজার হাজার মানুষের জীবনে মৃত্যু। এসেছে আগ্রাসী হিন্দু ভারতের গোলামী। এসেছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। এসেছে বহু লক্ষ মানুষের জীবনে অনাহারের দুর্বিসহ যাতনা এবং মৃত্যু। গণতন্ত্রের কথা বলে মুজিব প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল ফেরাউনী মডেলের এক দল-এক নেতার বাকশালী স্বৈরাচার। গণতন্ত্রকে পাঠিয়েছিল কবরস্থানে। কেড়ে নিয়েছিল কথা বলার স্বাধীনতা। বিদ্রোহী জনগণকে নিয়ন্ত্রনে আনতে দেশব্যাপী দাবড়িয়ে দিয়েছিল নৃশংস রক্ষিবাহিনী। তাতে নিহত হয়েছিল তিরিশ হাজারের বেশী মানুষ।

বাংলাদেশের মানুষ একই ভূল করেছে ২০০৮ সালে হাসিনার ন্যায় ভোট-ডাকাত স্বৈরাচারিকে নির্বাচিত করে। সে ভূলের কারণে জনগণ হারিয়েছে ভোটের অধিকার। গণতন্ত্র গেছে নির্বাসনে। এবং পেয়েছে চুরিডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন-ধর্ষণ এবং ফাঁসির রাজনীতি। জনগণের রাজস্বের অর্থ এবং প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় হচ্ছে শেখ হাসিনার বিশাল ডাকাত দলের প্রতিপালনে।  

 

২. কে নেতা হওয়ার যোগ্য?

বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এমন একটি দেশে কে নেতা হওয়ার জন্য যোগ্য বা অযোগ্য –সে বিষয়ে বিচারের মানদন্ডটি যে কোন অমুসলিম দেশ থেকে ভিন্নতর। কারণ, মুসলিম দেশ এবং অমুসলিম দেশের আদর্শিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক চরিত্র এবং লক্ষ্য যেমন এক নয়, তেমনি এক নয় উভয় দেশের নেতার উপর অর্পিত দায়ভারও। এমন একটি ভিন্নতার কারণেই ১৯৪৭ সালে বাঙালী মুসলিমগণ গান্ধি বা নেহেরুর ন্যায় হিন্দুকে নেতা রূপে গ্রহণ করেনি। তারা মুহম্মদ আলী জিন্নাহকে নেতা রূপে বরণ করেছিল এবং পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিল। সে বাঙালী মুসলিমের সে আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা আজও বিলুপ্ত হয়নি। এবং ভবিষ্যতেও সেটি বিলুপ্ত হওয়ার নয়। এমন একটি মুসলিম দেশের নেতাকে শুধু বাঙালী হলে চলে না, তাকে তার রাজনীতিতে দেশটির মুসলিম জনগণের বিশ্বাস ও আশা-আকাঙ্খারও প্রতিফলন ঘটাতে হয়। সে প্রতিফলনটি ঘটানোর কারণে মহম্মদ আলী জিন্নাহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের কাছে কায়েদে আজম হতে পেরেছিলেন।

এখানেই মুজিব-হাসিনার বাকশালী রাজনীতির বিশাল ব্যর্থতা। তাদের রাজনীতিতে যে বিষয়টি প্রতিফলিত হচ্ছে সেটি হলো চরম ক্ষমতালিপ্সা ও ভারতসেবী বাঁদী চরিত্র। কবরে পাঠানো হয়েছে বাঙালী মুসলিমের আশা-আকাঙ্খার কথা। জনগণের কাছে তারা এতটাই ঘৃণার পাত্র যে, ক্ষমতায় থাকতে মুজিবকে বিরোধীদলের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করতে হয়েছে। এবং চালু করতে হয়েছে একদলীয় বাকশালী প্রথা। সে সাথে নিষিদ্ধ করতে হয়েছে সকল বিরোধী দলীয় পত্র-পত্রিকা এবং রাজপথের মিটিং-মিছিল। হাসিনাকেও একই পথ ধরতে হয়েছে। তাকে বিরোধী দলীয় নেতাদের গুম, খুন ও ফাঁসিতে ঝুলাতে হয়েছে। এবং ভোটের বাক্সে ডাকাতি করতে হয়েছে।এমন দুর্বৃত্ত ডাকাতগণ কি কোন মুসলিম দেশের নেতা হতে পারে? সেটি ডাকাত সর্দারকে মসজিদের ইমাম বানানোর মত।

 

৩. আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়া ও পাপ থেকে বাঁচার তাড়না

মুসলিমকে শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, তাসবিহ-তাহলিল নিয়ে বাঁচলে চলে না, তাকে বাঁচতে হয়ে বিশেষ একটি রাজনৈতিক লক্ষ্যকে হৃদয়ে নিয়ে। একজন কাফের যেমন হৃদয়ে জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, সমাজবাদ বা সেক্যুলারিজম নিয়ে বাঁচে, মুসলিম সেটি পারে না। তাঁকে শুধু নিজ-জীবনে মহান আল্লাহর দ্বীন তথা শরিয়তকে প্রতিষ্ঠা দিলে চলে না, সেটির প্রতিষ্ঠা দিতে হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে। এটিই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত।  হৃদয়ে সে তীব্র বাসনাটি থাকার জন্য সে একজন কাফের থেকে ভিন্নতর। নবীজী (সাঃ)র প্রতিটি সাহাবা বেঁচেছেন সে রাজনৈতীক লক্ষ্যের বাস্তবায়নে। অধিকাংশ সাহাবী সে লক্ষ্য শহীদ হয়ে গেছেন। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় হওয়ার এটিই তো একমাত্র পথ। ফলে যারাই মহান নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাদের অনুসারি তাদের হৃদয়ে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় হওয়ার প্রচণ্ড তাড়না। সে তাড়নার  কারণেই আল্লাহর রাজ্যে তাঁরই দ্বীন তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় মুসলিম জনগণ নিজেদের সর্ব-সামর্থ্যের বিনিয়োগ ঘটায়।

অথচ হাসিনার ন্যায় বাকশালীদের কাছে বিষয়টি ভিন্ন। তাদের কাছে সে বিশুদ্ধ ইসলামী চেতনা নিয়ে বাঁচাটি  চিত্রিত হয় সন্ত্রাস রূপে। এবং তারা নিজেরা বাঁচে হৃদয়ে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রবর্তিত কুফরি আইনের প্রতি আত্মসমর্পণ নিয়ে। বাঁচে ভারতের গো-পূজারীদের পদসেবা দিয়ে। মুজিব-হাসিনা তাই মুসলিমদের নেতা-নেত্রী হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয় কি করে? শরিয়তের বিলুপ্তি, ইসলামপন্থিদের হত্যা ও ফাঁসিতে ঝুলানোর মত যেসব অপরাধ ইসলামের শত্রুগণ যুগ যুগ ধরে করেছে, হাসিনা তো তাই করছে। মুজিবও সেটি করেছে। অথচ পাপ শুধু মুর্তিপূজা নয়, বরং ইসলামের শত্রুকে নেতা রূপে বরণ করাও। এ পাপে আযাব যে অনিবার্য -সে হুশ বা ক’জন বাংলাদেশীর?

 

৪. ইসলাম থেকে দূরে সরার পরিণাম

মুসলিমদের কাজ হয়েছে স্রোতে ভাসা। স্রোতের টানে তারা দূরে সরেছে  ইসলাম থেকে।তারা ভেসেছে সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ ও সমাজবাদের স্রোতে। বাংলাদেশের মানুষ এখন আটকা পড়েছে ইতিহাসের বর্বরতম ফ্যাসিবাদের চরে। আজ থেকে শত বছর আগেও মুসলিমগণ ইসলাম থেকে এতটা দূরে ছিল না। তখন মুসলিম জাহানের বুকে ৫৭টি দেশের নামে দেয়াল ছিল না। ভাষা, বর্ণ, এলাকার নামে খুনোখুনি ছিল না। অবস্থা এখন এতটাই খারাপ হয়েছে যে, নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা এলাকার মানুষ কিভাবে একত্রে থাকতে হয় -সে দিক দিয়ে ভারতীয় কাফেরগণও মুসলিমদের থেকে শ্রেষ্ঠ গণ্য হচ্ছে।

অথচ সে স্রোতে ভাসা থেকে বাঁচতেই মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশঃ “ওয়া তাছিমু বি হাবলিল্লাহি জামিয়াঁও ওয়া লা তাফাররাকু” অর্থঃ এবং তোমরা সবাই শক্ত ভাবে ধরো আল্লাহর রশিকে এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না। আল্লাহতায়ালার সে পবিত্র রশিটি হলো পবিত্র কোর’আন –যা বান্দার সংযোগ গড়ে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে। একমাত্র এ কোর’আনই মুসলিমদের বাঁচাতে পারে বিচ্ছিন্নতা থেকে বাঁচাতে।  অথচ সে কোর’আন না ধরে মুসলিমগণ ধরেছে জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, সমাজবাদ, রাজতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের রশি। ফলে সরেছে কোর’আন থেকে এবং পরস্পরে বিভক্তও হয়েছে। এবং বিভক্তি শত্রুর হাতে পরাজয়, হত্যা, ধর্ষষ ও ধ্বংস আনবে সেটিই তো স্বাভাবিক। এ হলো আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার পরিণাম।   

৫. গণমুখিতা নয়, চাই আল্লাহমুখিতা

কে কতটা জনগণের কাছে প্রিয় হলো তার ভিত্তিতে জান্নাত জুটবে না। বহু নবীও জনগণের কাছে প্রিয় হতে পারেননি। বরং অনেক নবী ও তাঁদের অনুসারিদের জনগণ নির্মম ভাবে হত্যা করেছে। প্রাণ বাঁচাতে তাদের অনেককে দেশ ছাড়তে হয়েছে। আখেরাতে কল্যাণ তো মহান আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়াতে। আর আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় হওয়ার পথ তার প্রতিটি হুকুমের প্রতি সদা আনুগত্য।

কিন্তু মুসলিম জীবনে সে আনুগত্য কোথায়? আনুগত্যের প্রকাশটি ঘটে শুধু নামায-রোযায় নয়, বরং মহান আল্লাহতায়ালার আইন তথা শরিয়ত পালনের মধ্য দিয়ে। প্রশ্ন হলো, দেশের আদালতে শরিয়তের বদল ইংরেজ কাফেরদের রচিত আইনের কাছে আত্মসমর্পণ নিয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় হওয়া যায়?  প্রিয় হওয়া যায় কি তাদেরকে সমর্থণ দিলে যারা ইসলামের আত্মস্বীকৃত বিপক্ষ শক্তি এবং কোয়ালিশন গড়ে নরেন্দ্র মোদির ন্যায় কাফেরের সাথে?
 

৬. হীনতা ও কদর্যতা বাড়ে দুর্বৃত্তকে সন্মান দেয়ায়

গরু-ছাগল,সাপ-শকুনের পূজা দিলে সে ইতর জীবগুলি মর্যাদা বাড়ে না। সেগুলি গরু-ছাগল, সাপ-শকুনই থাকে যায। বরং মর্যাদা হারায় তারা যারা সে ইতর জীবকে পূজা দেয়। তেমনি মর্যাদা থাকেনা শেখ মুজিবের ন্যায় ভারতের সেবাদাস এক গণতন্ত্র হত্যাকারী বাকশালী স্বৈরাচারিকে মর্যাদা দিলে। ফিরাউনের ন্যায় এক দুর্বৃত্তকে সন্মান দেয়াতে মিশরবাসী শুধু তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোর’আনে নয়, সমগ্র মানব ইতিহাসে কুলাঙ্গর রূপে চিত্রিত হয়ে আছে। বড় বড় পিরামিড গড়ে সে দুর্বৃত্তিকে ঢাকা যায়নি। মাথায় দুর্গন্ধময় মল-মুত্র নিয়ে হাঁটায় কারো মর্যাদা বাড়ে না। মল-মুত্রের স্থান তো আবর্জনার স্তুপে, মাথার উপরে নয়। তেমনি দেশে সর্বোচ্চ আসনে ভোটডাকাত এক দুর্বৃত্তকে বসিয়ে তাকে মাননীয় বলাতেও বিশ্বের দরবারে দেশবাসীর মর্যাদা বাড়ে না। ভোটডাকাত দুর্বৃত্তদের স্থান তো জেলে হওয়া উচিত, শাসকের আসনে নয়।

৭. নরেন্দ্র মোদির বন্ধু শেখ হাসিনা

প্রতিবেশীর ঘরে যখন খুন-ধর্ষণ হয় –সেটি তখন সে ঘরের আভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। অন্যরাও তখন সে অসভ্য বর্বরতা রুখতে ছুটে আসে। সে অসভ্যতার প্রতিরোধে উদ্যোগী  না হওয়াটি আরেক অসভ্যতা। কিন্তু সে সনাতন সভ্য নীতি  শেখ হাসিনার উপর কাজ করে না। হাসিনার কথা, ভারত আমাদের বন্ধু প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর ঘরে যা কিছু হোক সেটি তার অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। অতএব কিছু বলা যাবে না।  তার অনুগত   RAB প্রধান বলেছে, ভারতে যা কিছু হচ্ছে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলে তা কঠোর হাতে দমন করা হবে। যে বাংলাদেশে ভারতের রাজ্য, কেন্দ্রীয় সরকারেরর বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না।

ভারতে মুসলিমদের উপর চলছে খুন, ধর্ষণ ও নির্যাতনের চরম বিভীষিকা। বিশ্ববাসী তা নিয়ে সরব। কিন্তু সে নির্মম অসভ্যতার বিরুদ্ধে হাসিনা মুখ খুলছে না। বরং হাসিনা সমর্থণ করছে অসভ্যতার নায়ক নরেন্দ্র মোদিকে। এক ডাকাত আরেক ডাকাতের নৃশংস দুর্বৃত্তিকে নিন্দা করেনা। এখানে সে নীতিই কাজ করছে। তাই বাংলাদেশ ভোট-ডাকাতি হলে বা শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যা হলে মোদির মুখে যেমন হাসিনার নিন্দা নেই, তেমনি মোদি সরকারের উদ্যোগে ভারত ও কাশ্মিরে গণহ্ত্যা হলে বা গরুর গোশতো খাওয়ার কারণে রাস্তায় পিটিয়ে মুসলিমকে হত্যা করলেও হাসিনার মুখে কোন প্রতিবাদ নাই। দুর্বৃত্ত মনিব ঘরের মধ্যে কাউকে ধর্ষণ করলে বা হত্যা করলে ঘরের চাকর প্রতিবাদ করে না। বরং সাহায্য করে না। ভারতের প্রতি সেরূপ বাঁদী চরিত্র হলো হলো শেখ হাসিনার। 

 

৮.অসভ্য শাসন এবং বিচারে বৈষম্য

ভারতে মাত্র এক হিন্দু নারীর ধর্ষণে ৪ জনের ফাঁসি হলো। কিন্তু গুজরাতে ২০০২সালে যারা শত শত মুসলিম নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল এবং হত্যা করা হয়েছিল তিন হাজারেরও বেশী মুসলিমকে। গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল বাবরী মসজিদ। সে অপরাধে কারো কি ফাঁসী হয়েছিল? মোদি সরকারের কাছে সেগুলি কোন অপরাধই নয়। এবং মোদি নিজেও সে অপরাধের সাথে জড়িত। ভারতের আদালতে মুসলিমগণ ন্যায় বিচার থেকে যে কতটা বঞ্চিত এ হলো তার নজির। এমন করোনা ভাইরাসের রোগীদের সাহায্যের যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে তা থেকেও মুসলিমদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। একটি দেশ অসভ্যদের শাসনে গেলে অবিচার কতটা প্রবল হয় –এ হলো তার নজির।

৯. ঈমানদার ও বেঈমানী: কীরূপে দেখা যায়?

ঈমানদারী ও বেঈমানী অদৃশ্য নয়। দুটি’ই খালি চোখে অতি সুস্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। ঈমানদারী দেখা যায় অন্যায়কে ঘৃণা ও ন্যায়কে ভালবাসার সামর্থ্যে। দেখা যায় ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের জিহাদে। দেখা যায় আল্লাহর নির্দেশ পালনে একাগ্রতার মাঝে। অপরদিকে বেঈমানী দৃশ্যমান হয় চুরি-ডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম-খুন, মিথ্যাচার ও স্বৈরাচারি নৃশংসতার মাঝে। দেখা যায় দেশী-বিদেশী কাফের শক্তির সাথে বন্ধুত্বের মাঝে। সে বেঈমানীটা আরো প্রবল ভাবে দেখা যায়, স্বৈরাচারি ভোটডাকাত শাসককে দেশের পিতা, দেশের বন্ধু, দেশের নেতা ও মাননীয় বলার মঝে।

কোর’আনের ইসলাম ও নবীজী (সা:)র আদর্শকে একমাত্র তাঁরাই ভালবাসে যাদের মধ্যে রয়েছে দুর্বৃত্তির নির্মূলে প্রবল আগ্রহ। আলো ও আঁধার একত্রে থাকে না; আলোর আগমনে আঁধার চলে যেতে বাধ্য। তেমনি কোন ব্যক্তির মাঝে নবীজী (সাঃ)র আদর্শ ও দুর্বৃত্তের আদর্শ একত্রে থাকে না। চরিত্রে দুর্বৃত্তি দেখে নিশ্চিত বলা যায় তার মধ্যে ইসলাম বলে কিছু নাই, নবীজী (সাঃ)র আদর্শেরও কিছু নাই। এমন ব্যক্তির নামায-রোযা, হজ্ব-উমরাহ, হাতে তাসবিহ, মাথায় টুপি বা হিজাব স্রেফ নিজের বেঈমানীটি লুকানোর স্বার্থে। যারা জালেম হওয়ার পথ বেছে ন্যায় তাদের জন্য অসম্ভব হয় ঈমানদার হওয়া। মহান আল্লাহতায়াল পবিত্র কোর’আনে বার বার বলেছেন, তিনি জালেমদের হিদায়েত দেন না। তাই ঈমানদার হতে হলে প্রথমে জুলুমের পথ ছাড়তে হয়। জালেম হওয়াটা কাফেরদের কাজ। তাই পবিত্র কোর’আনের ঘোষণাঃ “ওয়াল কাফিরুনা হুমুজ জালিমুন” অর্থঃ “এবং যারা কাফির তারাই জালিম” –(সুরা বাকারা, আয়াত ২৫৪) । ১৫/০৪/২০২০




বিবিধ প্রসঙ্গ ১০

১. মহাবিপদ শিরক নিয়ে মৃত্যুর

মৃত্যুর ন্যায় একটি গুরুতর বিষয দূরে থাক, আল্লাহতায়ালার অনুমতি ছাডা গাছের একটি মরা পাতাও পড়ে না। পবিত্র কোর’আনে বার বার এ কথাও বলা হয়েছে, আল্লাহতায়ালার অনুমতি  ছাড়া কোন বিপদ কাউকেই স্পর্শ করতে না। যেমন বলা হয়েছে সুরা তাগাবুনের ১১ নম্বর আয়াতে এবং সুরা হাদীদের ২২ নম্বর আয়াতে। মহান আল্লাহতায়ালার এ ঘোষণার উপর বিশ্বাস করার মধ্যেই ঈমানদারী। সামান্য অবিশ্বাস কাফেরে পরিণত করে। তবে মহামারি, ভূমিকম্প, সুনামী, টর্নেডোর ন্যায় নানা রূপ বিপদ কাফের জনপদে আসে তাদের শাস্তি দিতে –যেমন এসেছে আদ ও সামুদ জাতি, ফেরাউনের অনুসারি, মাদায়েনের অধিবাসী ও লুত (আঃ)’য়ের কওমের উপর। নূহ (আঃ)’য়ের সময় আযাব এসেছে এক মহাপ্লাবন রূপে।

তবে ঈমানদারেরর ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। বিপদ-আপদ, রোগ-ভোগ, এবং জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি তাদের জীবনের আসে। এরূপ বিপদে ফেলে ঈমানের পরীক্ষা নেয়াটাই মহান আল্লাহতায়ালার রীতি। সে বর্ণনাটি এসেছে সুরা বাকারার ২১৪ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, “তোমরা কি মনে করে নিয়েছো, পূর্ববর্তীদের উপর যেরূপ পরীক্ষা এসেছে সেরূপ কোন পরীক্ষা ছাড়াই তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তাদের উপর এসেছে এমন দুঃখ-কষ্ট ও ক্ষয়ক্ষতি যে তারা ভয়ে প্রকম্পিত হয়েছে। এমন কি রাসূল এবং তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারাও বলে উঠেছে, “আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই নিকটে।” প্রমোশন আসে পরীক্ষায় পাশের পর। এরূপ পরীক্ষায় পাশ করে যারা নিহত হয় মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরেক শাহাদতের মর্যাদা দেন এবং পুরস্কৃত করেন জান্নাত দিয়ে। এবং যারা সে পরীক্ষায় ফেল করে তারা পায় জাহান্নাম।

করোনা ভাইরাস দেখিয়ে দিল মানুষ কত অসহায় মহান আল্লাহতায়ালার অতিক্ষুদ্র এক সৃষ্টির কাছে -যা খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু তবুও অহংকারী মানুষ ভাইরাসের স্রষ্টা সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহকে ভয় করতে রাজী নয়। তারা ভাইরাসের ভয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে গৃহবন্দী হতে রাজী, কিন্তু রাজী নয় আল্লাহকে ভয় করতে এবং তাঁর উপর ঈমান আনতে। এবং এরূপ ভীতুরাই চন্দ্র-সূর্য, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, গরুবাছুড়, সাপ এবং মুর্তিকে ভগবানের আসন বসিয়েছে। ভেবেছে এগুলির পুজার মধ্যেই মুক্তি। কোটি কোটি মানুষ এভাবে মুশরিকে পরিণত হয়েছে।  করোনার কারণে তেমনি বহু কোটি মানুষ মুশরিকে পরিণত হবে আল্লাহর বদলে ভাইরাসের ভয়ে। তাই এরূপ মহামারীতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণনাশই শুধু হয়না, বরং ভয়ংকর মহামারীটি হয় ঈমান নাশের অঙ্গণে –যা অনন্ত অসীম কালের জন্য জাহান্নামে টানে।

 

২. লক্ষ হোক মানুষ রূপে বেড়ে উঠা

চোর-ডাকাতদের কাজ থানার পুলিশ ও আদালতের বিচারকদের হাতে রাখা। তখন থানার সামনে চুরি-ডাকাতি বা খুন-খারাবি হলেও পুলিশ বলে, তারা কিছুই দেখিনি বা শুনেনি। ডাকাতদের বিরুদ্ধে কেস কোর্টে উঠলেও তারা বেকসুর খালাস পায়। তবে কোন দেশেই চোর-ডাকাতদের শক্তি এতটা প্রবল নয় যে, তারা দেশের সমগ্র পুলিশ, প্রশাসন ও আদালতকে নিয়ন্ত্রণে নিবে। তবে বাংলাদেশে ভোটডাকাতদের অর্জনটি বিশাল। তারা পুরাপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে দেশের পুলিশ, আদালত ও মিডিয়াকে। শুধু তাই নয়, ভোটডাকাতদের সবচেয়ে বড় অর্জনটি হলো, সাধারণ চোর-ডাকাতদের ন্যায় তাদেরকে ভোটডাকাতির কাজটি নিজ হাতে করতে হয় না। সেটি করে দেয় দেশের পুলিশ, প্রশাসন এবং দেশের নির্বাচনী কমিশন। বাংলাদেশে তেমনটিই হয়েছে গত নির্বাচনে।  ফলে সে নির্বচনে হাজার হাজার ভোটকেন্দ্রে ভোটডাকাতি হলেও সে অপরাধে কাউকে গ্রেফতার হতে হয়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি।

এক্ষেত্রে জনগণের আচরণটি আরো বিস্ময়কর ও বিবেকহীন। সুবোধ ভদ্র লোক যতই দুর্বল, নিরক্ষর বা অর্থহীনই হোক না কেন – কোন চোর বা ডাকাতকে তারা কখনোই সম্মন করে না। মাননীয় বলে সম্বোধনও করেনা। বিশ্বের কোন দেশেই সেটি হয়না। আদিকাল থেকে প্রতিটি ভদ্রলোকের সেটিই রীতি। কিন্তু চুরি-ডাকাতিকে ঘৃণা করার সে নীতি মারা পড়েছে শুধু বাংলাদেশের পুলিশ বিভাগ, আদালত, প্রশাসন, মিডয়া জগত এবং রাজনীতির  অঙ্গণে নয়, জনগণের মাঝেও। মারা পড়েছে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী মহলেও। ফলে ডাকাত সর্দারনীকে ঘৃনা না করে তাকে মাননীয় বলাও সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সমগ্র বিশ্বমাঝে বাঙালীদের এ এক নয়া রেকর্ড। বিশ্ববাসী ভাবছে এমন কাজ একমাত্র বাংলাদেশীদের পক্ষে্‌ই সম্ভব। কারণ, এ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বের তাবত রাষ্ট্রকে পিছনে ফেলে পর পর ৫ বার দুর্বৃত্তিতে প্রথম হয়ে তারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।

তবে ভোটডাকাতিতে প্রথম হওয়ার বিষয়টি দুর্বৃত্তিতে ৫ বার প্রথম হয়ে চেয়েও জঘন্য। কারণ ভোটডাকাতিটি কোন সাধারণ দুর্বৃত্ত নয়। কিছু ঘুষখোর অফিসার বা চোরডাকাত থাকলে সেটি করা যায় না। বরং সেজন্য চাই দেশের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবাহিনী, সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী, প্রশাসন, আদালত এবং মিডিয়ার সংঘবদ্ধ রাষ্ট্রীয় দুর্বৃত্তি। কোন গ্রামের সবাই চোর-ডাকাত হয় না। তেমনি বিশ্বের কোন দেশের সবগুলো প্রতিষ্ঠানই ডাকাতির সাথে জড়িত হয়না। এ ইতিহাস একমাত্র বাংলাদেশের। মানুষ রূপে বেড়ে উঠায় বাঙালীর ব্যর্থতা যে কতটা বিশাল -এ হলো তার নজির।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালীর মানুষ রূপে বেড়ে উঠার ব্যর্থতাটি হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলেন। তাই বলেছিলেন, “হে বিধাতা! ৭ কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে মানুষ করোনি।” তবে রবীন্দ্রনাথের ভ্রান্তি হলো, এ ব্যর্থতার জন্য তিনি বিধাতাকে দায়ী করেছেন। বাঙালীকে দায়ী করেননি। এখানেই রবীন্দ্রনাথের বিচারে ব্যর্থতা। ভাল মানুষ হওয়া বা দুর্বৃত্ত হওয়াটি আল্লাহতায়ালা মানুষকে তার নিজের এখতিয়ারে দিয়েছেন। নইলে রোজ হাশরের বিচার দিনে বিচার করবেন কি করে? বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জনগণের সমস্যাটি রাস্তাঘাট, পশুপালন, মৎসপালন বা শিল্প নিয়ে নয়। বরং তাদের নিজেদের বেড়ে উঠা নিয়ে। তাই তাদের মনযোগী হ্ওয়া উচিত মানুষ রূপে বেড়ে উঠায়। কারণ  মহান আল্লাহতায়ালার কাছে রাস্তাঘাট, পশুপালন, মৎসপালন বা শিল্পে কতটা উন্নতি হলো সে হিসাব দিতে  হবে না। বরং হিসাব দিতে হবে মানুষ রূপে বেড়ে কাজটি কতটা হয়েছিল সেটির।

 

৩. জরুরী রাষ্ট্রের সংশোধন

 
চালক ভাল হলে বাসের সকল যাত্রী মাতাল হলেও গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছে। সেটি সত্য রাষ্ট্র্রের ক্ষেত্রেও। রাষ্ট্রের চালক চোর-ডাকাত বা ভোটডাকাত হলে দেশের সকল মসজিদগুলি নামাযী দিয়ে ভরে উঠলেও তাতে দেশে শান্তি আসে না। বরং দেশ তখন দুর্বৃত্তিতে ভরে উঠে।এজন্যই নবীজী (সাঃ) খোদ রাষ্ট্রনায়কের আসনে বসেছিলেন। এবং তাঁর ইন্তেকালের পর শ্রেষ্ঠ সাহাবীগণ বসেছেন। কিন্তু নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাদের সে সূন্নত বাংলাদেশে বেঁচে নেই। বরং যে চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাতদের স্থান হওয়া উচিত কারাগারে তারা দখলে নিয়েছে দেশের প্রশাসন, রাজনীতি, আদালত, পুলিশ ও প্রশাসনকে।  জনগণের অপরাধ হলো, তারা রাষ্ট্রের চালকের আসন থেকে দুর্বৃত্তদের  না হটিয়ে স্রেফ মসজিদ মাদ্রাসা গড়ায় মনযোগ দিয়েছে।

 

৪.কামেল ইনসানের ভ্রান্ত ধারণা

মহান আল্লাহতায়ালা চান মানুষ তার যোগ্যতা ও সামর্থ্যে পূর্ণতা পাক। ইসলামে এরূপ পূর্ণ মানুষকে বলা হয় কামেল ইনসান। কিন্তু তা নিয়ে ভ্রান্তিও কম নয়। কামেল তাকে বলা হয় যার মনযোগটি স্রেফ নামায়,রোজা,হজ,যাকাত ও তাসবিহ পাঠে। যে স্রেফ ঘর থেকে মসজিদে যায় এবং মসজিদ থেকে ঘরে আসে। রাজনীতি, সমাজকর্ম এবং দেশ ও বিশ্ব নিয়ে চিন্তা-ভাবনাকে দুনিয়াবী বিষয় মনে করা হয়। অথচ এমনটি নবীজী (সাঃ)’র সূন্নতের বিরোধী। মানব মাত্রই এ পৃথিবী পৃষ্টে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা। তাই তাকে ভাবতে  হয় শুধু নিজেকে নিয়ে নয়, বরং মহান আল্লাহর অন্য সৃষ্টিকে নিয়েও। স্রেফ নিজেকে নিয়ে ভাবাটি পরম স্বার্থপরতা ও ধর্মহীনতাও। তাকে ভাবতে হয় নিজের প্রতিবেশী, পরিবেশ, সমাজ ও নিজ দেশবাসীর পাশাপাশী বিশ্ববাসীকে নিয়েও। ভাবনার পাশাপাশী তাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে লড়ায়েও নামতে হয়। প্রয়োজনে জান ও মালের কোরবানীও পেশ করতে হয়। তারই নমুনা যেমন মহান নবীজী (সাঃ), তেমনি তাঁর সাহাবাগণ।

৫.বেঈমানীর রূপ

শান্তি ও কল্যানের লক্ষ্যে মহান আল্লাহতায়ালা দিয়েছেন পরিপূর্ণ ইসলামী বিধান -যাতে রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র,শরিয়ত, হুদুদ এবং অন্যায় নির্মূলের জিহাদ। তাই বেঈমানী হলো, এ বিধান ছাড়াই শান্তি ও কল্যানের কথা ভাবা। তাই যারা শরিয়তি বিধান ছাড়াই শান্তি ও কল্যাণের কথা ভাবেন -তারা সে ভাবনার মধ্য দিয়ে অনাস্থার প্রকাশ ঘটায় মহান আল্লাহর বিধানের প্রতি। এটি হলো সুস্পষ্ট বেঈমানী।বাংলাদেশে এমন বেঈমানদের সংখ্যাটি বিশাল। এরা নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন করে বটে, তবে রাষ্ট্রের আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার ঘোরতর বিরোধী। তারা শরিয়তকে প্রয়োজনীয় মনে করে না।    

অথচ মহান আল্লাহতায়ালা চান ঈমানদারগণ তাঁর দেয়া ইসলামী বিধানের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা দিক এবং দূরে থাকুক কাফেরদের বিধান, রীতিনীতি ও সংস্কৃতি থেকে। প্রশ্ন হলো, মুসলিমগণ মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে কি নিয়ে মুখ দেখাবে? কাফেরদের থেকে তাদের ভিন্নতাই বা কতটুকু? কাফেরদের ন্যায় তারাও কি আল্লাহতায়ালার শরিয়তি আইনের বদলে কুফরি আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়নি? অন্যায় নির্মূলের জিহাদ বাদ দিয়ে তারাই কি অন্যায়কে প্রতিষ্ঠা দেয়নি? আল্লাহর কাছে হিসাব দেয়ার আগে এ হিসাব কী তারা নিবে না?

 

৬. চোরডাকাত ও ভোটডাকাতদের কালো হাত ইতিহাসের উপর

ভোট-ডাকাতদের কালো হাত শুধু জনগণের ব্যালটের উপরই পড়েনি। হাত পড়েছে ইতিহাসের উপরও। এজেন্ডা এখানে সুস্পষ্ট। তাদের লক্ষ্য, চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত, স্বৈরাচারি রূপে তাদের যে বিশাল কুখ্যাতি – ইতিহাসের পাতা থেকে সেটিকে বিলুপ্ত করা। লক্ষ এখানে যারা জ্ঞানী-গুনি ও দেশপ্রেমিক তাদের হটিয়ে চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত ও স্বৈরাচারিদের জন্য ইতিহাসের পাতায় শূণ্য স্থান সৃষ্টি করা। মুজিব বর্ষের নামে হচ্ছে শত শত কোটির বিনিয়োগ। লক্ষ্য কী? মুজিবের মূল পরিচয়টি কি জনগণ জানে না? মুজিব ভোট-ডাকাত হাসিনা পিতা। পিতা বাকশালী স্বৈরাচারেরও। সে পিতা ভারতসেবী বাঁদী রাজনীতিরও। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম গণতন্ত্র হত্যা হয় তারই হাতে। রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামের পক্ষ নেয়াকে মুজিবই সর্বপ্রথম নিষিদ্ধ করে। তাছাড়া বাংলাদেশের বুকে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পিতাও মুজিব।

হাসিনা চায় তার পিতার এসব কু-কর্মগুলিকে ঢাকতে। এজন্যই তার এ বিশাল বিনিয়োগ। এবং সেটি জনগণের রাজস্বের অর্থে। কোন সভ্যদেশেই মৃত মানুষের জন্য এতটাকা খরচ হয় না যা হচছে বাংলাদেশে মুজিবের নামে।অথচ দেশে করোনা ভাইরাস টেস্টের ব্যবস্থা নাই।অসভ্য ভোটডাকাতদের হাতে দেশ হাইজ্যাক হওয়ার এটাই বিপদ। হাজার হাজার টাকা খরচ করেও জনগণের স্মৃতি থেকে মুজিবের এ পরিচয় কি বিলুপ্ত করা যাবে? ১২/০৪/২০২০

 




বিবিধ প্রসঙ্গ -১১

১. শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও হুজুরদের নিরবতা

বাংলাদেশে হুজুরগণ ঘন্টার পর ঘন্টা ওয়াজ করতে রাজী, কিন্তু শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে মুহুর্তের জন্যও রাস্তায় নামতে রাজী নন। কারণ, ওয়াজে অর্থ মেলে, খ্যাতিও বাড়ে। অপর দিকে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কাজে নামাতে রয়েছে জেল-জুলুমের ভয়। এতে দ্বন্দ সৃষ্টি হয় সরকারের সাথে। অথচ শরিয়ত নিয়ে বাঁচাটি প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ। শরিয়তের পালন না হলে পূর্ণ ইসলাম পালনই হয় না। তাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে রাস্তায় নামাটি জিহাদ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, হুজুরগণ তাদের ওয়াজে নানা বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করলেও দেশের আদালতে ব্রিটিশ কাফেরদের রচিত আইন মানা যে হারাম এবং শরিয়ত অনুযায়ী বিচার করা যে ফরজ সে বিষয়টিও তারা ওয়াজে তুলে ধরেন না।

কওমী মাদ্রাসার হুজুরদের কাছে নিজেদের স্বার্থ হাছিলের বিষয়টি যে কতটা  গুরুত্বপূর্ণ তা দেখা গেছে শেখ হাসিনার কাছ থেকে একখানি সার্টিফিকেট পাওয়ার পর। শেখ হাসিনা ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতা এসেছে তা বাংলাদেশের শিশুরাও বুঝে। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে দেশ জুড়ে গুম, খুন, সন্ত্রাস, ব্যাংক লুট্ ও ফাঁসির রাজনীতি। মুর্তিতে মুর্তিতে বাংলাদেশকে বিন্দাবন বানানো হয়েছে। অথচ তা নিয়ে কওমী মাদ্রাসার হুজুরগণ নিরব। বরং এ ভোটডাকাতকে কওমী জননী খেতাবে ভূষিত করেছে। প্রশ্ন হলো, কোর’আন হাদিস থেকে কি তারা এটিই শিখেছেন?

পবিত্র কোর’আনে আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের শ্রেষ্ঠ জাতি বলেছেন। সেটির কারণ এ নয় যে, তারা বেশী বেশী নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন করে। নামায-রোযা, হজ্ব-উমরাহ বহু ধোকাবাজ, ঘুষখোর, সূদখোর, ব্যাভিচারিকে পালন করতে দেখা যায়। বরং আল্লাহতায়ালার নিজের বর্ণনায় মুসলিমদের শ্রষ্ঠত্বের মূল কারণটি হলো, তারা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা দেয় এবং অন্যায়ের নির্মূল করে। যেমনটি বলা হয়েছে সুরা আল ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে। অথচ বাংলাদেশের কওমী হুজুরগণ অন্যায়কারীদের নির্মূলে না নেমে ভোটডাকাতের ন্যায় এক অন্যায়ের জননীকে ‘কওমী জননী’ খেতাব দিয়েছে! প্রশ্ন হলো এরূপ বিচার জ্ঞান নিয়ে তারা কোর’আন হাদীসের ব্যাখ্যা দেন কি করে? ইমামতিই বা করেন কি করে?


সুরা নাছে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর নিজের পরিচয়টি দিয়েছেন “মালিকিন নাছ” তথা মানব জাতির রাজা রূপে। রাজার রাজত্ব চলে আইনের উপর। তাই প্রশ্ন হলো, আইনের প্রয়োগ ছাড়া রাজত্ব চলে কি করে? মহান আল্লাহতায়ালার সে আইন হলো শরিয়ত। অথচ ৫৭টি মুসলিম দেশের কোথাও শরিয়ত মানা হয় না। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার এ শরিয়তি আইন নাযিল হয়েছে কি স্রেফ কোর’আনে লিপিবদ্ধ থাকার জন্য? নবীজী (সাঃ) ও তাঁর মহান সাহাবাগণ শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়ে গেছেন শরিয়তের প্রতিষ্ঠা কত জরুরী। নবীজীর (সাঃ)র জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত যার কারণে মুসলিমগণ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল। হুজুরগণ বহু সূন্নতের ওয়াজ করেন। অথচ নবীজী (সাঃ)র এ অতি গুরুত্বপূর্ণ সূন্নতটি নিয়ে তাদের মুখে কোন কথা নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের নামেও অনেক দল। যারা নিজেদের সেসব ধর্মীয় দলের নেতাকর্মী রূপে জাহির করেন, তাদের মুখেও এ নিয়ে কোন কথা নেই।আইন অমান্য করাটি প্রতি রাজ্যেই কঠোর শাস্তি যোগ্য অপরাধ। প্রশ্ন হলো, শরিয়ত অমান্যের বিশ্বজুড়ে যে তান্ডব, তাতে কি আযাবই অনিবার্য করে না? আযাব যেমন ভূমিকম্প, সুনামী, ঘুর্ণিঝড় রূপে আসতে পারে, তেমনি আসতে পারে মহামারি রূপেও। প্রশ্ন হলো, আজকের করোনা ভাইরাসের মহামারী কি আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে রহমত বলা যাবে?


২. জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব

কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল ওলামা” অর্থঃ ‘সৃষ্টিকূলের মাঝে শুধু জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।’ এখানে জ্ঞান বলতে যা বুঝানো হয়েছে তা হলো কোর’আনের জ্ঞান। এর অর্থ দাঁড়ায়, যার মধ্যে কোর’আনের জ্ঞান নাই, তার মধ্যে আল্লাহর ভয়ও নাই। আল্লাহর ভ্য়ই ইবাদতের মাঝে প্রাণ সৃষ্টি করে। অপরদিকে জ্ঞানের অভাবে নামায়-রোযার ন্যায় ইবাদতও প্রাণহীন ও ভয়শূণ্য হয়। জ্ঞানী হওয়ার কাজটি তাই সবার উপর ফরজ। এটিই মুসলিম হওয়ার পথ। তাই নামায়-রোযা ফরজ করার বহু বছর আগে জ্ঞানার্জন ফরজ করা হয়েছে।

 ৩. নেতার যোগ্যতার বিষয় ও জনগণের দায়ভার

ইমামের কাজ সুষ্ঠ ভাবে নামায পড়ানো। তেমনি মুসলিম দেশে নেতার কাজ হলো, দেশকে ইসলামের নির্দেশিত পথে পরিচালনা করা। দায়িত্ব এখানে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা। এটি এক গুরু দায়িত্ব। সে দায়িত্বের খেয়ানত হয় যদি রাষ্ট্বের ড্রাইভিং সিটে বসে দেশকে সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ বা অন্য কোন মতবাদের পথে চালানো করা হয়। প্রশ্ন হলো, যে নামাযই ঠিক মত পড়ে না তাকে কি কখনো ইমাম বানানো যায়? তেমনি যে ব্যক্তির রাজনীতিতে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় কোন অঙ্গীকার ও কোরবানী নাই -তাকে কি মুসলিম দেশের নেতা বানানো যায়? নেতা নির্বাচনে দেখতে হয় ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও মুসলিমের বিজয় বাড়াতে তার অবদান কতটুকু। সে কাজে তাঁর যোগ্যতাই বা কতটুকু? যে ব্যক্তি কোনদিন ইসলামের পক্ষে রাস্তায় নামলো না এবং একটি কথাও বললো না -সে ব্যক্তি মুসলিমের নেতা হয় কি করে? জনগণের কাজ স্রেফ রাজস্ব দেয়া নয়। সে রাজস্বের মাধ্যমে কাকে প্রতিপালন করা হচ্ছে -সেদিকেও কড়া দৃষ্টি দেয়া। নইলে নিজেদের রাজস্বের অর্থে নিজেদেরই বিপদ ডেকে আনা হয়। বাংলাদেশে কি তাই হচ্ছে না?

ইমামতির চেয়েও বহুগুণ গুরুত্বপূর্ণ পদটি হলো মুসলিম দেশের প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টের। ইমামের ভূলে রাষ্ট্র ধ্বংস হয় না, দেশবাসীও বিপদে পড়ে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থ্যের প্রতি অঙ্গীকারহীন হলে নাশকতা বাড়ে ইসলামের বিরুদ্ধে। তখন মহা সংকটে পড়ে দেশবাসী। এবং বিজয় ও উৎসব বাড়ে ইসলামের শত্রুশক্তির। বাংলাদেশের অঙ্গণে সেটিই ঘটেছে। হাসিনার ভারতসেবী রাজনীতিতে বিপদ বেড়েছে ইসলামের পক্ষের শক্তির এবং উৎসব বেড়েছে ভারতের।

 ৪. আগ্রাসন হিন্দু সংস্কৃতির


মুর্তি, মিনার বা ছবিকে ফুল দিয়ে সন্মান দেখানো নিরেট হিন্দু সংস্কৃতি। এটি মুর্তি পূজা। বাঙালী মুসলিম জীবনে এরূপ পৌত্তলিকতা পূর্বে কখনো ছিল না। সাহাবাগণ এমন কি নবীজী (সাঃ)র কবরে ফুলের মালা নিয়ে হাজির হননি। মুসলিম বাঙালীর জীবনে এ পৌত্তলিক আচারটি ঢুকিয়েছে সেক্যুলারিস্টগণ। এবং তারা একা নয়। রাজনৈতীক অঙ্গণে এরূপ পৌত্তলিকতায় উৎসাহ দিচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও বামপন্থিগণ। লক্ষ্য, মুসলিম বাংলার বুকে কালাচারাল জেনোসাইড। ভারত ভূক্তির জন্য এভাবেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। বাংলাদেশ পৃথক মানচিত্র পেয়েছে তার জলবায়ু্ ও আলোবাতাসের জন্য নয়। বরং বাঙালী মুসলিমের ইসলামী বিশ্বাস ও মুসলিম সংস্কৃতির কারণে। বাঙালী মুসলিমের সে বিশেষ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ঠটি তারা ধ্বংস করতে চায়। এ পৌত্তলিক প্রকল্পের শুরুটি ভাষা আন্দোলনের নামে। শুরু হয় ২১শে ফেব্রেয়ারিতে স্তম্ভের পদতলে ফুলের মালা দেয়া। এখন সে পৌত্তলিকতা শুধু ২১ শে ফেব্রেয়ারিতে সীমিত নয়। সীমিত নয় স্তম্ভের পদতলেও। এখন হচ্ছে প্রতি দিন। এবং ঘরে বাইরে সর্বত্র।

প্রশ্ন হলো, মুসলিম ইতিহাসে বিখ্যাত ব্যক্তির সংখ্যা কি কম? কিন্তু কাউকে কি এভাবে সন্মান দেখানো হয়? লক্ষ্য এখানে মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো। লক্ষণীয় হলো, হুজুরগণ হিন্দু সংস্কৃতির এ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ। তারা ব্যস্ত নিজ নিজ ফেরকা ও দলের নামে নিজেদের ব্যবসা বাঁচা্নো নিয়ে। কারণ তারা জানে, এ পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে কিছু বললে সেক্যুলার মহলে তাদের ব্যবসায়ে ক্ষতি হবে। নিশ্চুপ সেসব তথাকথিত ইসলামী দলের নেতাকর্মীগণও যারা নিজেদের ইসলামের রক্ষক রূপে দাবী করে।

৫. ধর্মব্যবসায়ীদের থাবা


ধর্মব্যবসায়ীদের ৫টি প্রধান লক্ষণ: ১). এরা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কথা মুখে আনে না। প্রতিবাদ নাই, প্রচলিত কুফরি আইনের বিরুদ্ধেও। ২). ধর্মীয় ফিরকা, মাযহাব, ভাষা ও এলাকার নামে গড়ে উঠা বিভেদের দেয়াল ভাঙ্গার কথাও তারা বলে না। তাদের হৃদয়ে দুঃখ জাগে না মুসলিম উম্মাহর বিভক্তিতে। বরং বিরোধীদের বিরুদ্ধে গালীগালাজ করে বিভক্তিকে তারা আরো গভীরতর করে ৩). মুসলিম দেশগুলি শত্রুর হাতে অধিকৃত হলেও জিহাদের পক্ষে ওয়াজ করে না। ৪). দেশ স্বৈরাচারি জালেম শাসকদের হাতে অধিকৃত হলেও তাদের বিরুদ্ধে এরা নিশ্চুপ। ৫). কোর’আন বুঝাার পক্ষেও তারা বলে না। বরং জোর দেয় স্রেফ তেলাওয়াত করা এবং হিফজ করায়।

৬. ঈমানদারের যুদ্ধ

ঈমানদারকে শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের হুকুম মানলে চলে না। মানতে হয় যুদ্ধের হুকুমও। তাই সাহাবাদের জীবনে শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ছিল না, যুদ্ধও ছিল। পবিত্র তেমন একটি হুকুম হলো: “কি হলো তোমাদের যে যুদ্ধ করছো না আল্লাহর রাস্তায় এবং সে সব দুর্বল লোকদের মুক্ত করতে যাদের মধ্যে রয়েছে পুরুষ, মহিলা ও শিশু -যারা বলছে হে আমাদের রব, মুক্ত করুন জালেম অধিকৃত এ জনপদ থেকে; এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য প্রেরণ করুন একজন অভিভাবক এবং আপনার পক্ষ থেকে পাঠান সাহায্যকারী।” -(সুরা নিসা, আয়াত ৭৫)। মজলুম মুসলিমদের পক্ষ থেকে এমন ফরিয়াদ বিশ্বের নানা জালেম অধিকৃত দেশ থেকেই আসছে। কিন্তু মুসলিমদের মাঝে তা নিয়ে আলোড়ন কই?

৭. সবচেয়ে বড় জনসেবা

মানব সেবার সবচেয়ে বড় খাতটি স্কুল-কলেজ ও মসজিদ-মাদ্রাসা গড়া নয় এবং মিসকিন খাওয়ানোও নয়। এ ধরণের কাজগুলি মুনাফিকও করতে পারে। বরং সেবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতটি হলো দেশকে দুর্বৃত্তদের দখল থেকে মুক্ত করা। তখন জনসেবার সে প্রয়োজনীয় কাজগুলি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি করে।

৮.আগ্রাসী ভারত ও বিপন্ন স্বাধীনতা

দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমগণ স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচুক সেটি ভারতীয় হিন্দুগণ কোন কালেই চায়নি। তারা চায় অখন্ড ভারত। সে বিষয়টি কোন গোপন বিষয়ও নয়। নাগপুরে বিজিপির আদি সংগঠন আর.এস.এস’য়ের কেন্দ্রীয় অফিসে দক্ষিণ এশিয়ার যে মানচিত্রটি ঝুলানো রয়েছে সেখানে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নামে কোন দেশই নাই। (সূত্র: আল জাজিরা ইংলিশ)। তাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হোক সেটি যেমন চায়নি, দেশটি বেঁচে থাকুক সেটিও চায়নি। কাশ্মিরী মুসলিমদের স্বাধীনতা হরণের সে লক্ষ্য নিয়েই ৭ লাখ ভারতীয় সৈন্য যুদ্ধ করছে কাশ্মিরে। এটি শুধু বিজিপি’র লক্ষ্য নয়, কংগ্রেসসহ সকল ভারতীয় সংগঠনেরই।

১৯৭১’য়ে ভারতীয়দের যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল,সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভাঙ্গা ও পূর্ব পাকিস্তান দখলে নিয়ে এক বাঁদি রাষ্ট্র জন্ম দেয়া। তাই একাত্তরের যুদ্ধে মুজিবকে রণাঙ্গণে থাকতে হয়নি। তাকে স্বাধীনতার ঘোষণাও দিতে হয়নি। মুক্তি বাহিনীকে কষ্ট করে একটি জেলা বা মহকুমাও স্বাধীন করতে হয়নি। তারা ছিল সাইড শো রূপে। বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতা নিয়ে বেঁচে থাকুক সেটি ভারত যেমন একাত্তরে চায়নি, আজও চায় না। তারা চায় বাংলাদেশে একটি নতজানু সরকার। এমন একটি সরকার ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় আসলেও ভারত তাতে খুশি।

৯. প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা

জীবনটি ঘন অন্ধকারে এমন এক ব্রিজ পাড়ি দেয়ার ন্যায় যাতে রয়েছে অসংখ্য বড় বড় ছিদ্র। কার পা কখোন কোন ছিদ্রে পড়বে তা কেউ জানে না। যার পা পড়বে সে আর ফিরে আসবে না, সরাসরি মৃত্যুর কোলে গিয়ে পড়বে। দেরিতে হলেও কারোই এ ছিদ্রে পড়া থেকে রক্ষা নাই। সে ছিদ্রগুলো যেমন করোনা ভাইরাসের হতে পারে, তেমনি হতে পারে হার্ট স্ট্রোক, ব্রেন স্ট্রোক, নেউমোনিয়া, ক্যান্সারের ন্যায় মারাত্মক ব্যাধির। হতে পারে ভূমিকম্প, সুনামী, টর্নেডোর। প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা তো এটাই, সব সময় সে ছিদ্রে পড়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেয়া। ভয়টি এখানে মৃত্যুর নয়, বরং সেটি হতে হবে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদেহীতার। মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে যথাযথ দায়িত্ব পালনই সেদিনের সে মহা বিপদ থেকে রক্ষা দিতে পারে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেয়ার আগেই তাই নিজের হিসাব নিজেই নেয়া উচিত।

১০.শ্রেষ্ঠ নেক কর্ম

জ্ঞানদান, অর্থদান, সেবাদান ও চিকিৎসাদান –এসবই উত্তম নেক আমল। এরূপ নেক আমলগুলির সামর্থ্য অর্জনও নেক আমল। তবে সবচেয়ে সেরা নেক আমলটি হলো ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। তখন রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও প্রতিটি কর্মী পরিনত হয় নেক আমলের হাতিয়ারে। তখন প্রতিষ্ঠা পায় শরিয়ত। এতে রাষ্ট্র পরিণত হয় একটি কল্যাণধর্মী রাষ্ট্র। নবীজী (সাঃ) মদিনায় হিজরতর পর এমন একটি রাষ্ট্রেরই প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো এমন একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায়  জান, মাল ও বুদ্ধিবৃত্তির বিনিয়োগ। নইলে রাষ্ট্র অধিকৃত হয় শয়তানী শক্তির হাতে। যেমনটি হয়েছে বাংলাদেশ। তখন গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

১১.ভারতের বলদ বিজ্ঞানী
মুসলিমগণ আর কতকাল শত্রুর দলে যোগ দিয়ে মুসলিম মারতে থাকবে? এটি যে হারাম সে বোধই বা ক’জনের? যোগ্যতা থাকলে সেটি ব্যয় হওয়া উচিত ইসলাম ও মুসলিমের বিজয় বাড়াতে, শত্রুর শক্তি বাড়াতে নয়। তেমনি এক বলদ বিজ্ঞানীর নাম আবদুল কালাম। সে ভারতকে দিয়েছে মিজাইল প্রযুক্তি যার টারগেট হলো পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। এটি কোন ফিলিস্তিনীর পক্ষ থেকে ইসরাইলী সেনাবাহিনীর জন্য মিজাইল তৈরী করে দেয়ার মত।

অথচ মুসলিমদের বিরুদ্ধে  ভারতীয় হিন্দুদের ঘৃনা এতটাই তীব্র যে, খবর বেড়িয়েছে ঘরে পানির কল বিকল হলে হিন্দু মিস্ত্রি সেটি সেরে দিতে রাজী হচ্ছে না। মুসলিম হওয়ার কারণে হাসপাতাল ভর্তি করছে না প্রসূতি মা’কে। সম্প্রতি তেমন একটি ঘটনা ঘটেছে রাজস্থানে। ভর্তি না করায় নবজাতক শিশুর জন্ম ও মৃত্যু হয়েছে এ্যামবুলেন্সের মাঝে। খবরটি ছেপেছে গত ৫ই এপ্রিল কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা। সম্প্রতি দিল্লিতে শত শত মুসলিমকে হত্যা করা হলো এবং তাদের ঘর-বাড়ী পুড়িয়ে দেয়া হলো পুলিশের চোখের সামনে। অপর দিকে বিজিপি সরকার প্রকল্প নিয়েছে ভারতের নাগরিক তালিকা থেকে পরিকল্পিত ভাবে মুসলিমদের বাদ দেয়ার। ৮/৪.২০২০




আমার সাম্প্রতিক ফেসবুক এবং টুইটার পোস্ট-১

১.

চোর-ডাকাতেরা কথা বলে ফেরেশতাদের মত, সেটি বুঝা যায় শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে ও শেখ হাসিনার ব্ক্তৃতা শুনলে। অথচ এরাই দেশে চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম,খুন, সন্ত্রাস ও ফাঁসির রাজনীতির জনক। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে এরাই গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়েছে। এবং সত্য কথা বলাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করেছে।

২.
A newly born baby had to die in an ambulance in the Indian state of Rajasthan for his parent’s Muslim identity. The pregnant mother was taken to a government hospital but was denied admission as she is Muslim. The baby was born inside the ambulance and later on, died. –(Source: Daily Anandabazar, 5.4.2020).

3.
ঈমানদারের লক্ষণ: তারা জান-মাল দিয়ে জিহাদ করে ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দেয়।

ধর্ম ব্যবসায়ীদের লক্ষণ: এরা অর্থ দেয় না বরং অর্থ নেয়।এদের জীবনে শরিয়তের লক্ষে জিহাদ থাকে না, থাকে নিজ মত ও দলকে বড় করার লড়াই।

৪.
মুসলিমদের সংখ্যা ১৬০ কোটি। ১৬০কোটি গরু দুধ দিলে সাগর হয়ে যায়। ১৬০ কোটি গাছ ফল দিলে পাহাড় হয়ে যায়। অথচ ১৬০ কোটি মুসলিম কি দিচ্ছে? অথচ মুসলিমদের সংখ্যা যখন ১ কোটিও ছিল না তখন তারা বিশ্ববাসীকে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ও শিক্ষা দিয়েছ।

৫.
বুদ্ধিবৃত্তির লড়াই’য়ে জরুরী হলো কোনটি সত্য এবং কোনটি মিথ্যা সেটিকে জনগণের সামনে সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা। সে সাথে জনগণের চেতনায় বাড়াতে হয় মিথ্যার মাঝে সত্যকে চেনার ক্ষমতা। এবং জনগণকে অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুজাহিদ রূপে খাড়া করা। পবিত্র কোর’আন এবং নবীজী (সা:)র সূন্নত তো সেটিই শেখায়।
৬.
জিহাদে শুধু অস্ত্রই জরুরী নয়, অতি জরুরী হলো বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। নইলে রণাঙ্গণে বিজয় জুটেনা। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মূল লক্ষ্যটি হলো জনগণকে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতিয়ার হওয়া থেকে বাঁচানো।

৭.
কোর’আনের আরেক নাম নূর তথা আলো। তাই যে কোর’আন বুঝলো তার জীবনে কখনোই অন্ধকার থাকে না। ফলে সে ব্যক্তি ধর্ম-ব্যবসায়ী ও ক্ষমতালোভী দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদদের ধোকায় পড়ে না। মনের অন্ধকার নিয়ে সঠিক পথ চেনা অসম্ভব। তাই কোর’আন চায় মনের অন্ধকার দূর করতে।

৮.
কোর’আনের আরেক নাম হিকমাহ। তাই দেয় গভীর প্রজ্ঞা। ফলে যে কোর’আন বুঝলো সে কখনোই বেওকুপের ন্যায় আচরন করে না। এবং রাজনীতির ময়দানে কোর’আনের জ্ঞানশূণ্য বেওকুপদের অনুসারীও হয় না।

৯.
কোর’আনের অন্য নাম হুদা -যা নানা ভ্রান্তপথের মাঝে সঠিক পথটি দেখায়। তাই যে কোর’আন বুঝে না -সে ব্যর্থ হয় জীবনের চলার পথে সঠিক পথটি খুঁজে পেতে।এরূপ পথহারাদের সারা জীবনের পথচলাটি  হয় জাহাননামের পথে। এরূপ পথভ্রষ্টরাই সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, রেসিস্ট, স্বৈরাচারি রাজনীতির নেতাকর্মী হয়।

১০.
কোর’আনের আরেক নাম আয-যিকরা তথা স্মরণ। কোর’আনের পাঠ তাই স্মরণে আনে আল্লাহর মহিমা, করুণা ও তাঁর প্রতিটি মানবের দায়বদ্ধতার কথা। স্মরণে আনে রোজ-হাশরের বিচার দিন, জান্নাত ও জাহান্নামের কথা। তাই শ্রেষ্ঠ যিকর হলো অর্থ বুঝে কোর’আন তেলাওয়াত।

১১.
কোর’আনের আরেক নাম ফুরকান -যা সামর্থ্য দেয় কোনটি সত্য এবং কোনটি মিথ্যা এবং কোনটি ন্যায় এবং কোনটি অন্যায় সেটি বুঝার। তাই যে কোর’আন বুঝে না সে ব্যর্থ হয় সে সামর্থ্য অর্জনে। এরাই রাজনীতিতে দুর্বৃত্তদের পক্ষ নেয়।
১২.
কবিরা গুনাহ তথা সবচেয়ে বড় পাপ শুধু মানব হত্যা ও নারী ধর্ষণ নয়, বরং সত্য হত্যা ও মিথ্যার প্রচারও। এবং ভয়ানক পাপ হলো এ জীবনের বাঁচার এজেন্ডা থেকে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের ন্যায় জিহাদের ন্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে দূরে রাখা। এতে সমাজ নানা রূপ অসভ্যতা ও দুর্বৃত্তিতে ভরে যায়।

১৩.
Like killing a man, killing truth & telling a lie are also great crimes. It is also the worst crime to keep the most important issue in lifelike eliminating the wrong & enacting the right out of the focus. Most people will enter the hellfire for these crimes, not for killing people.

১৪.
ভোট-ডাকাতদের কথা অন্যরা দূরে থাক খোদ শয়তানও বিশ্বাস করে না। কারণ শয়তান জানে তার অনুসারিরা কতটা মিথ্যাবাদী। তাই বিপদ হলো বাংলাদেশে কতজন করোনায় মারা যাবে সেটি আদৌ জানার উপায় নাই।

১৫.
চাকুরি নিয়ে কাজ না করলে কি চাকুরি থাকে? তেমনি ঈমানী দায়ভার পালন না করলে কেউ কি মুসলিম থাকে? সে দায়ভার কি শুধু নামায়-রোযা পালন? সেটি তো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং
অন্যায় নির্মূলের জিহাদ।

১৬.
In the name of re-education, the Chinese government is committing a terrible crime of forced de-Islamisation & cultural conversion of the Uighur Muslims. How such criminals get welcomed in any of the Muslim countries? How the friends of such criminals dare rule in any of the Muslim countries?

১৭.
মুসলিমগণ একে অপরের ভাই। এ ঘোষণাটি মহান আল্লাহর। তাই যার মধ্যে সে চেতনাটি নাই, বুঝতে হবে তার মধ্যে ঈমানও নাই।  নিজের ভাই বা বোনকে যদি হত্যা করা হয় বা জেলে রাখা হয় তবে প্রতিক্রিয়া কি হয়? চীন, ভারত, কাশ্মির, ফিলিস্তিন, মায়ানমারে মুসলিমদের সাথে কীরূপ বর্বরতা হচ্ছে সেটি তো গোপন বিষয় নয়। ভাই কোন মুসলিম কি নীরব বা নিষ্ক্রীয় থাকতে পারে? সেটি কি ঈমানের লক্ষণ?

১৮.
মরার ভয়ে বহু মানুষ বিবেকহীন পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট জীবে পরিণত হয়। বাংলাদেশে এমন পশুদের সংখ্যাটি যে বিশাল সেটিই প্রকাশ পাচ্ছে। পশুরা কা্‌উকে দাফনে বাধা দেয় না। বাধা দেয় না হাসপাতাল নির্মাণেও। অথচ পত্রিকায় প্রকাশ, বহু মানবরূপী পশুরা দল বেঁধে রাস্তায় নেমেছে। তারা করোনার রোগীকে গোরস্তানে দাফন করতে দিচ্ছে। করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য নিজ এলাকায় হাসপাতালও নির্মাণ করতে দিচ্ছে না।

১৯.
শয়তানের জিদ, আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি মানুষকে সে জাহান্নামে নিবেই। সে লক্ষ্যে দেশে দেশে কাজ করছে শয়তানের এজেন্টাগণ। শয়তানের এজেন্ডদের চেনার আলামত হলো: তারা বাঁধা দেয় জান্নাতের পথে চলায় তথা কোর’আন বুঝায় ও শরিয়ত পালনে। বাংলাদেশে তাই কোর’আনের তাফসির, ওয়াজ মহফিল ও জুম্মার খোতবার উপর নিয়ন্ত্রন বসিয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ইসলামী টিভি চ্যানেল। এবং শাস্তি যোগ্য অপরাধ হলো শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জিহাদ। অপর দিকে অবাধ লাইসেন্স দেয়া হয়েছে শয়তানের এজেন্টদের। তাই ব্যাপক ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে গুম, খুন, সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি, ভোটডাকাতি ও ফাঁসির রাজনীতি।  

 

২০.
মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর আয়োজনটি বিশাল।এজন্য রয়েছে বহু হাজার হাসপাতাল। এটি ভাল দিক। কিন্তু অনন্ত কালের জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচানোর আয়োজনটি কই?এটি কি ভয়ানক বেওকুপি নয়?

২১.
অসভ্য সরকার জনগণকেও অসভ্য করে। ভারতে এতদিন মুসলিমদের হত্যা করে আসছে। এখন হামলা হচ্ছে ডাক্তার ও নার্সদের উপর। বাড়ীর মালিকেরা তাদেরকে বাড়ী ছাড়তে বাধ্য করছে। অথচ ইংল্যান্ডের জনগণ জানালায় দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে ডাক্তারদের সাবাশ দিচ্ছে।

২২.
“অতএব আমাকে স্মরণ করো,আমিও তোমাদের স্মরণ করবো।এবং আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং কাফের হয়ে যেয়ো না”-(সুরা বাকারা)। তাই আল্লাহর স্মরণে থাকা বা তাঁর আরজি পেশের জন্য কি কোন পীর বা মাওলানার দরকার আছে?




যে বিপদ শত্রুশাসন ও ভ্রষ্ট ঈমানদারীর

ইতিহাস ভ্রষ্টতার

নবীজী (সাঃ)র যুগে প্রচন্ড অভাব ছিল মুসলিম জনশক্তির। বহু বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে মক্কার কাফেরদের মধ্য থেকে একজন একজন করে তাঁকে মুসলিম করতে হয়েছে। নবুয়তপ্রাপ্তির ১৫ বছর পর বদরের যুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবী নিয়ে হাজির হতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের একটি থানায় যত মুসলিমের বাস মহান নবীজী (সাঃ) ততজন মুসলিমও জীবনের শেষ দিনগুলিতেও দেখে যেতে পারেননি। অথচ আজ প্রায় ১৬০ কোটি মুসলিম তাঁর উম্মত রূপে সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কিন্তু  এ বিপুল সংখ্যক মুসলিমের অর্জন কতটুকু? মূল সমস্যাটি হলো, মুসলিমদের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়লেও অভাব বেড়ছে ঈমানদারীর। প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের পথটি ছিল পবিত্র কোর’আনে বর্ণিত সিরাতুল মুস্তাকীম -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত, একতা, শুরা ভিত্তিক শাসন ও জিহাদ। কিন্তু সে পথ থেকে তাদের ভ্রষ্টতাটি বিশাল। তাদের ইতিহাসটি ছিল স‌রর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি ও বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠার। কিন্তু  আজকের মুসলিমদের ইতিহাসটি বড়ই অগৌরবের। সেটি শুধু শত্রুর হাতে পরাজয়, অপমান, নিহত বা ধর্ষিতা হওয়ার নয়, বরং অশিক্ষিত, অসভ্য ও দুর্বৃত্ত রূপে বেড়ে উঠারও। এর চেয়ে বড় অপমানের আর কি হতে পারে যে, দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের প্রথম দশটির দেশের বেশীর ভাগই হবে মুসলিম অধ্যুষিত। প্রায় শতকার ৯০ ভাগ মুসলিম নিয়ে বাংলাদেশ এ শতাব্দীর শুরুতে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে পর পর ৫ বার প্রথম হয়েছে।

এতবড় চারিত্রিক ও ঈমানী বিপর্যয়ের পরও এ নিয়ে ভাবনা ক’জনের? কী করে এ পতন থেকে মুক্তি -তা নিয়েই বা ক’জন ভাবে? নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করলেও তারা বাঁচে নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলাম ছাড়াই। অধিকাংশ মুসলিম দেশই অধিকৃত বর্বর স্বৈরাচারিদের হাতে অধিকৃত; গণতন্ত্র বলে কিছু নাই। বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশেই জনগণকে বাঁচতে হয় ন্যূনতম মৌলিক মানবিক অধিকার ছাড়াই। ফলে অসম্ভব হয়েছে সভ্য ভাবে বাঁচা। রাষ্ট্র বা সমাজ কতটা সভ্য বা অসভ্য -সে বিষয়টি ধরা পড়ে সে দেশে আইনের মান, বিচারের মান এবং আইন প্রয়োগে সরকার ও দেশবাসীর আগ্রহ ও সামর্থ্য থেকে। জঙ্গলে সভ্য জীবন অসম্ভব, কারণ সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কেউ থাকে না। খুন, ধর্ষণ বা ডাকাতি হলেও সেখানে পুলিশ যায় না, আদালতও  বসে না। জঙ্গল তাই জঙ্গলই। সভ্যতর সমাজ নির্মাণে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো যেমন রাষ্ট্রের নির্মাণ, তেমনি সে রাষ্ট্রে আইনের শাসন। সভ্য দেশের আলামত তো এই, সেখানে কারো সম্পদ, ইজ্জত বা শরীরের উপর হামালা হলে বা কোন আইন অমান্য করলে জেল-জরিমানা হয়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে ফাঁসি হয়। অথচ অসভ্য দেশে এসবের বালাই থাকে না, সেখানে আইন ও আদালত চলে অসভ্য স্বৈর-শাসকের খেয়াল খুশি অনুযায়ী। এমন রাষ্ট্রের কোষাগার, ব্যাংক, শেয়ার মার্কেট থেকে কোটি কোটি টাকা চুরি হলে বা জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি হলেও কোন বিচার হয় না। তখন সমাজে নেমে আসে বন-জঙ্গলের অসভ্যতা। জোর যার রাজত্ব তার –এমন এক বন্য অসভ্যতাই তখন রীতি হয়ে দাঁড়ায়।

সভ্য ভাবে বাঁচার খরচটি তাই বিশাল। শুধু পুলিশ পাললে বা আদালতের প্রতিষ্ঠা দিলে চলে না, জনগণকেও  তখন নিজ অধিকারের অতন্দ্র পাহারাদারে পরিণত হতে হয়। নইলে পুলিশ এবং আদালতের বিচারকগণও ডাকাতদের দলে শরীক হয়ে লুটেপুটে খায়। সে জন্যই ইসলামে জিহাদ প্রতিটি ঈমানদারের উপর নামায-রোযার ন্যায় ফরজ। জিহাদ হলো দুর্বৃত্তদের অসভ্যতা থেকে বাঁচার আমৃত্যু লড়া্ই। বনের হিংস্র পশু তাড়ানোর ন্যায় এটি হলো সমাজের  পশু তাড়ানোর লড়াই। নামায-রোযায় ক্বাজা আছে, কিন্তু এ জিহাদে ক্বাজা নেই। তাই যে সমাজে জিহাদ নাই সে সমাজ মসজিদ-মাদ্রাসায় ভরে উঠলেও সভ্য সমাজ সেখানে নির্মিত হয় না। জঙ্গলে এক পশু আরেক পশুকে ভ্ক্ষণ করলেও যেমন বিচার বসে না, তেমনি অসভ্যতা নেমে আসে তখন রাষ্ট্রে। গুম, খুন, ফাঁসি, চুরি ডাকাতি, ভোট ডাকাতি তখন দেশের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

মহান আল্লাহতায়ালা এ বিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা। তিনিই একমাত্র রাজা। সে সত্যটি পবিত্র কোর’আনে একবার নয়, বহুবার বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, “হুয়াল্লাযী খালাকাস সামাওয়াতি ওয়াল আল আরদ”। অর্থঃ তিনিই সেই মহান সত্ত্বা যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিন। বলা হয়েছে, “লাহু মুলকুস সামাওয়াতে ওয়াল আরদ”। অর্থঃ “আসমান জমিনের রাজত্ব একমাত্র তাঁর অর্থাৎ আল্লাহর”। আল্লাহতায়ালার চান তাঁর নিজের এ রাজ্য পরিপূর্ণ শান্তি ও শৃঙ্খলা। সে শান্তি ও শৃঙ্খলাকে সুনিশ্চিত করতেই তিনি চান আইনের শাসন। এবং সে আইনী বিধানকেই বলা হয় শরিয়ত। বস্তুতঃ শরিয়ত হলো সমাজ থেকে সর্বপ্রকার দুর্বৃত্তির নির্মূলে মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া মূল হাতিয়ার। দুর্বৃত্তির নির্মূলের সে কাজটি নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত করতে পারে না। তাই যে রাষ্ট্রে নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত আছে অথচ শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নাই –সে সমাজে দুর্বৃত্তি ও অসভ্যতা বাড়বে সেটিই স্বাভাবিক। কারণ শরিয়তের বিকল্প শরিয়তই। শরিয়তের আরেকটি অভিধানিক অর্থ হলো “পথ”। এ পথটি মূলতঃ মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের আনুগত্যের মধ্য দিয়ে জান্নাতে পৌঁছার। এবং এ পথটিই হলো পবিত্র কোর’আনের পরিভাষায় সিরাতুল মুস্তাকীম। শরিয়তের সে আইনগুলি অতি সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণিত হয়েছে পবিত্র কোর’আনে। মুসলিমদের কাজ শুধু সে আইনের পাঠ বা মুখস্থ্য করা নয়, বরং প্রতিষ্ঠা। তাই স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে ঈমানদারের দায়ভারটি আদৌ শেষ হয় না। বরং মূল দায়িত্বটি হলো তাঁর দেয়া শরিয়তের পূর্ণ প্রয়োগ। এ কাজের জন্যই সে এ পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা তথা প্রতিনিধি। বস্তুতঃ শরিয়ত পালন ও প্রতিষ্ঠার  সামর্থ্যের মধ্যেই প্রকাশ পায় ব্যক্তির ঈমানী সামর্থ্য। ঈমানদার ব্যক্তি তখন বেড়ে উঠে মহান আল্লাহতায়ালার  সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি (আশরাফুল মখলুকাত) রূপে। মুসলিমদের আজকের ব্যর্থতার কারণ, তাদের মাঝে নামাযী, রোযাদার ও হাজীদের সংখ্যাটি বিশাল। কিন্তু কোথাও নাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। এ বিশাল ব্যর্থতা কি নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত দিয়ে দূর করা যায়?

 

অপরিহার্য কেন ইসলামী রাষ্ট্র?

কোন মতাদর্শই হাওয়ায় প্রতিষ্ঠা পায় না। চায় রাষ্ট্র। সেক্যুলারিস্টগণ তাই চায় সেক্যুলার রাষ্ট্র। কম্যুনিস্টগণ চায় কম্যুনিষ্ট রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। তেমনি শরিয়ত পালনের জন্য অপরিহার্য হলো ইসলামী রাষ্ট্র। চাই, সে রাষ্ট্র জুড়ে পর্যাপ্ত প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় অবকাঠামো। তাই নবীজী (সাঃ)র জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের প্রতিষ্ঠা নয়, সেটি ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। তেমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না পেলে ইসলামের প্রসার যেমন অসম্ভব হতো, তেমনি অসম্ভব হতো মুসলিমদের পক্ষে বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠা। সাহাবায়ে কেরামদের জান ও মালের সবচেয়ে বড় খরচটি হয়েছে এ খাতে। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে মদিনায় হিজরতের প্রথম দিনেই নবীজী (সাঃ)কে তাই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিতে হয়েছে এবং নিজেকে রাষ্ট্রনায়কের  আসনে বসতে হয়েছে। নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবা কেরাম যে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা সৃষ্টি করেছিলেন তার মূল ভিত্তিটি ছিল শরিয়তী আইনের পূর্ণ প্রয়োগ। সে আইনের বলেই সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়েছিল সকল প্রকার দুর্বৃত্তি। এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল হক ও ইনসাফ। বস্তুতঃ এ পৃথিবী পৃষ্টে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ দ্বিতীয়টি নাই্। দেশ স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসায় ভরে ফেললেও এরূপ সমাজ বিপ্লবের কাজটি হয় না। লক্ষ লক্ষ মোহাদ্দেস বা হাফিজ বানিয়েও হয় না। হয় না ঘরে ঘরে নামাযী-রোযাদের সংখ্যা বাড়িয়েও। এবং সেটি সম্ভব হলে মহাজ্ঞানী মহান রাব্বুল আলামীন শরিয়তের বিধান না দিয়ে স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, তাসবিহ-তাহলিলের বিধান দিতেন এবং নবীজীও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিহাদে নামতেন না।

শরিয়তের বিধানই নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার যে দ্বীন তারই নাম ইসলাম। সুরা ইউসুফের ৭৬ নম্বর আয়াতে রাব্বুল আলামীন দ্বীন বলতে আইনকে বুঝিয়েছেন। তাই শরিয়তকে বাদ দিয়ে ইসলাম হয় না। এবং শরিয়ত পালন ছাড়া ইসলাম পালন হয় না। অথচ সে শরিয়ত পালিত হচ্ছে না কোন মুসলিম দেশেই। কারণ, মুসলিম বিশ্বে কোন ইসলামী রাষ্ট্র নাই। নামায ঘরে বা মসজিদে পড়া যায়, কিন্তু শরিয়ত পালন করতে হলে চাই রাষ্ট্র। সে ফরজ পালনের লক্ষ্যেই নবীজী (সাঃ)কে  ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে হয়েছে। অথচ আজকের মুসলিমগণ ইসলামী রাষ্ট্র গড়া বাদ দিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ায় মনযোগ দিয়েছে। ফলে নামাযী, হাফিজ, ক্বারী, মৌলভী, মোহাদ্দেসের সংখ্যা বাড়লেও কোন দেশেই শরিয়ত পালন হচ্ছে না। এটি মূলতঃ বিপদগামী ও অভিশপ্ত ইহুদী ও খৃষ্টানদের পথ। এটি আযাবের পথ। মসজিদ-মাদ্রাসা গড়তে যুদ্ধ লাগে না, কিন্তু  রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ লাগে। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর মহান সাহাবাগণ সে জিহাদের পথ বেছে নিয়েছিলেন বলেই তারা খেলাফায়ে রাশেদা ও বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠার নিয়ামত পেয়েছিলেন। অথচ সে জিহাদের সে পথে বনি ইসরাইল নেয়নি। হে ভীরু কাপুরুষরা হযরত মূসা (আঃ)কে বলেছিল, “হে মূসা (আঃ) তুমি এবং তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা অপেক্ষায় রইলো। ফলে তারা ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, খোলাফায়ে রাশেদা ও বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠার ফজিলত থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। ইসলামী রাষ্ট্র ও শরিয়ত পালনের জিহাদ থেকে পিছু হটার জন্য তাদের উপর এসেছিল শাস্তি; ৪০ বছর যাবত তাদেরকে ঘুরতে হয়েছে সিনা উপত্যাকার মরুভূমিতে। আজকের মুসলিমগণ বেছে নিয়েছে বনি ইসরাইলের পথ। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও শরিয়ত পালন ছাড়াই তারা ইসলাম পালনের বাহানা ধরেছে। ফলে শাস্তি আসছে তাদের ঘাড়েও। কোন মেশিন তখনই সুষ্ঠ ভাবে কাজ করে যখন সেটি চালানো হয় যিনি তৈরী করেছেন তার দেয়া নির্দেশাবলী মেনে। নইলে সে মেশিন বিকল হতে বাধ্য। শরিয়ত হলো ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে আল্লাহর দেয়া বিধান। সে বিধান না মানায় আযাব ঘিরো ধরেছে সমগ্র মানব জাতিকে। ফলে পৃথিবী পূর্ণ হচ্ছে মহামারী, যুদ্ধ, হত্যা, ধর্ষণ, গুম ও সন্ত্রাসে ।

 

ভ্রষ্টতা ঈমানদারীতে                 

মানব জাতির পাপের তালিকাটি বিশাল। তবে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহটি হচ্ছে শরিয়ত অমান্য’র মধ্য দিয়ে। বিদ্রোহীদের পুরস্কৃত করা কখনোই মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত নয়। বরং দেন ভয়াবহ আযাব। সে আযাব আসে মহামারী, ভূমিকম্প, ঘুর্ণিঝড় ও  সুনামীর বেশে। এবং পরকালে শাস্তি দেন জাহান্নামে নিয়ে। কিন্তু সে হুঁশ ক’জনের? অথচ সে আযাব ও শাস্তির হুশিয়ারিটি পবিত্র কোর’আনে একবার নয় বহুবার শোনানো হয়েছে। কিন্তু সে আয়াতগুলি নিয়েই বা ভাবনা ক’জনের? যারা নিজেদের আলেম, পীর, মোহাদ্দেস ও মুসলিম রূপে পরিচয় দিয়ে থাকেন তাদের মাঝে সে ভাবনাটি থাকলে তো মুসলিম দেশগুলিতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিরামহীন জিহাদ শুরু হয়ে যেতো। নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন ছাড়া মুসলিম থাকা যায় না –এ কথা সবারই জানা। কিন্তু শরিয়তি পালন ছাড়া যে মুসলিম থাকা যায় না –সে হুশ ক’জনের? অথচ এ নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে হুশিয়ারি এসেছে সুরা মায়েদার তিনটি আয়াতে। সুরাটির ৪৪, ৪৫ এবং ৪৭ নম্বর আয়াত বলা হয়েছে, “যারাই আমার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করেনা তারাই কাফের। —তারাই জালেম। —তারাই ফাসিক।

অতীতের মুসলিমগণ বেঁচেছে সুরা মায়েদার উপরুক্ত আয়াতগুলি হৃদয়ে ধারণ করে। তারা শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত নিয়ে বাঁচেননি।  শরিয়ত পালন ছাড়া নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাদের জীবনের একটি দিনও অতিবাহিত হয়নি। অতিবাহিত হয়নি পরবর্তী কালের মুসলিমদের জীবনও। তাই ইউরোপীয় কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার পূর্ব-পর্যন্ত প্রতিটি মুসলিম দেশের আদালতে তারা প্রতিষ্ঠা রেখেছে শরিয়তী আইনকে। মুসলিম ভূমির কোথাও কাফেরদের আইন অনুযায়ীই বিচার-আচারে এক দিনের জন্য হয়নি। সেটি যেমন সিরাজদ্দৌলার বাংলাতে হয়নি, তেমন হয়নি মোগলদের শাসনাধীন ভারতেও। কিন্তু ইউরোপীয় কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার পর বিলুপ্ত হয় শরিয়ত পালনের স্বাধীনতা। কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। তখন অসম্ভব হয় ইসলাম পালন। তাই সবচেয়ে সেরা সওয়াবের কাজটি হলো কাফেরদের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জিহাদ। এ জিহাদে নিহত হলে পুরস্কার মেল সরাসরি জান্নাতে যাওয়ার।  

বিদেশী কাফেরদের শাসন বহু আগেই শেষ হয়েছে। কিন্তু শরিয়তী আইনের শাসন এখনো শুরু হয়নি। মুসলিম দেশগুলি অধিকৃত হয়ে আছে ইসলামের দেশী শত্রুদের হাতে। এরা ঔপনিবেশিক কাফেরদের শিক্ষায় বেড়ে উঠা তাদেরই অনুগত খলিফা। ফলে আদলতে এখনো চালু রয়েছে কাফেরদের প্রবর্তিত আইন। প্রশ্ন হলে মসজিদে মুর্তি বসানো হলে কি সে মজসিদে নামায হয়? তেমনি রাষ্ট্রের আদালতে শরিয়তের বদলে কাফেরদের আইন চালু থাকলে কি সে আদালতে কি কোন মুসলিম বিচার চাইতে যেতে পারে? তাতে কি ঈমান থাকে? মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ও তাঁর বিধানকে হৃদয়ে নিয়ে বাঁচা এবং সে গুলির বাস্তবায়নে জিহাদে নামার মধ্যেই তো ঈমানদারী। কিন্তু মুসলিম মাঝে সে ঈমানদারী কই? ঈমানের প্রকাশ তো আমলে। প্রশ্ন হলো, কুফরি আইনের কাছে যেরূপ আত্মসমর্পণ -তাতে কি ঈমানের সে ভ্রষ্টতা কখনো গোপন থাকে? ২/৪/২০২০

 

 

 

 




বিবিধ প্রসঙ্গ-৯

১. যে অপরাধ ভারতকে বিজয়ী করায়

সমগ্র বিশ্বমাঝে মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে বিপদজনক দেশ হলো ভারত। দেশটির সরকারের সামান্যতম আগ্রহ নাই মুসলিমদের জানমাল ও ইজ্জতের সুরক্ষায়। মুসলিমদের উপর কোথাও হামলা শুরু হলে পুলিশ বাহিনী সে হামলা না থামিয়ে নিজেরাই হিন্দু গুন্ডাদের পক্ষ নেয়। সে প্রামাণ্য চিত্রটি এবার দিল্লিতে দেখা গেল। সেখানে পুলিশ যেমন  নিজেরা পিটিয়েছে ও গুলি চালিয়েছে তেমন গুন্ডাদের হাতে ইটের টুকরো তুলে দিয়েছে। ১৯৪৭ সালের ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকে্ই মুসলিমগণ সেখানে বার বার গণহত্যার শিকার হচ্ছে। মুসলিম রমনীগণ হচ্ছে গণধর্ষণের শিকার। জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। সমগ্র কাশ্মিরই এখন একটি জেল; প্রতিটি নাগরিক সেখানে গৃহবন্দী। বিপদের আরো কারণ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই একজন ভয়ংকর অপরাধী। ১৯৯২ সালে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় অযোধ্যার বাবরী মসজিদ। সে কাজে গুন্ডা সংগ্রহের কাজ করেছিল মোদি। তার সে কাজে মোহিত হয়ে ২০০২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী তাকে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী রূপে নিয়োগ দেয়। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ভয়াবহ দাঙ্গার আয়োজন করে গুজরাতে এবং সে দাঙ্গায় ২ হাজারের বেশী মুসলিম হত্যা করা হয় এবং পুড়িয়ে দেয়া হয় বহু হাজার  মুসলিমের ঘরবাড়ী। সেখানে গণহারে ধর্ষিতা হয়েছে মুসলিম নারীরা। এরূপ গণহত্যা ও গণধর্ষণ আয়োজন করাতে বিজিপি-আর, এস. এস মহলে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা তু্ঙ্গে উঠে। ফলে ২০১৪ সালে তাকে দেয়া হওয়া হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদ। উগ্র হিন্দুদের মাঝে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে নরেন্দ্র মোদি গত ফেব্রেয়ারিতে গুজরাতের মডেলের দাঙ্গা শুরু করে দিল্লিতে। হত্যা ও মুসলিমদের গৃহে ও দোকানে আগুণ দেএয়ার পাশাপাশি আগুণ দেয়া হয় দিল্লির ৯টি মসজিদে।

ভারতের মুসলিম বিরোধী চরিত্রটি তাই গোপন কিছু নয়। প্রশ্ন হলো, এরূপ মুসলিম গণহত্যাকারী ভারতের ঘরে যারা বিজয় তুলে দেয় এবং নিজ দেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় পণ্যের জন্য বাজার খুলে দেয় –তারা কি ঈমানদার? ঈমানদার হতে হলে তো মুসলিমের শত্রুদের ঘৃণার সামর্থ্য লাগে। লাগে মুসলিম স্বার্থের সুরক্ষা দেয়ার গভীর ইচ্ছা। অথচ সে সামর্থ্য ও ইচ্ছা একাত্তরে মুজিবের ন্যায় বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মাঝে দেখা যায়নি। মুসলিম বিরোধী এরূপ একটি দেশের সাথে যারা বন্ধুত্ব গড়ে তারা কি কখনো মুসলিম দেশের শাসক হওয়ার যোগ্যতা রাখে? হতে পারে কি মুসলিমের বন্ধু? অথচ ভারত বন্ধু গণ্য হচ্ছে মুজিবের ন্যায় হাসিনার কাছেও। এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা দিচ্ছে ভারতকে। সেদেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যত হত্যা, যত ধর্ষণ এবং যত নির্যাতনই হোক না –শেখ হাসিনা তা নিয়ে মুখ খুলতে রাজী নয়। অথচ ভারত সরকারের নিন্দা করছে বহু ভারতীয় নেতাও। মুসলিম জীবনের অন্যতম মিশন হলো অন্যায় ও জুলুমের নির্মূল। তাই রাজা দাহিরের নির্যাতন থেকে সিন্ধুর হিন্দুদের বাঁচাতে মুসলিম বাহিনী জিহাদে নেমেছিল।      

প্রতিবেশী দেশ রূপে বাংলাদেশীদের দায়িত্বটি বিশাল। বিপন্ন মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশের প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ। কিন্তু সে দায়িত্বটি পালিত হচ্ছে না। কারণ, ক্ষমতায় রয়েছে ভারতসেবী ইসলামের শত্রুগণ। হাসিনা ক্ষমতায় এসেছে ভোট ডাকাতি করে। ভারত এ নিয়ে নিশ্চু্প। বরং হাসিনার এরূপ ভোট ডাকাতির বিজয়ে প্রচণ্ড খুশি ভারত। কারণ ভারত চায়, দেশটিতে তার সেবাদাস ও সেবাদাসীগণ যে কোন রূপে ক্ষমতায় থাক এবং অব্যাহত থাকুক ভারতের প্রতি দাসত্বের রাজনীতি। তাছাড়া ভারত জানে, সুষ্ঠ নির্বাচন হলে শোচনীয় পরাজয় ঘটবে তার সেবাদাসদের।

 

২. প্রসঙ্গ বাঙালীর বিবেকবোধ, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব

মানুষের বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটে শত্রুকে শত্রু এবং বন্ধুকে বন্ধু রূপে বরণ করার মাঝে। তাই সুবুদ্ধির কোন মানুষই কোন নেকড়কে গলা জড়িয়ে চুমু খায় না। এবং নিজ ঘরে তুলে আদর করে চোর-ডাকাতকে। বরং হাতের  কাছে যা পায় তা দিয়ে তাড়া করে। হিংস্র পশু ও চোর-ডাকাতদের প্রতি এটিই হলো সভ্য মানুষের সনাতন নীতি। তেমনি কোন বিবেকবান মানুষই স্বৈরাচারি শাসকের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে না। তাকে নেতার আসনেও বসায় না। কিন্তু বাংলাদেশে  সে সভ্য বিচারটি হয়নি। ফলে শেখ হাসিনার ন্যায় ভোট-ডাকাতও দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়্যারে বসার সুযোগ পেয়েছে। এবং মুজিবের ন্যায় এক খুনি এবং স্বৈরাচারিও দেশের নেতা,পিতা ও বঙ্গবন্ধুর খেতাব পেয়েছে। কোন সভ্য দেশে কি এমনটি ভাবা যায়?

একদলীয় বাকশাল সরকার প্রতিষ্ঠা দিয়ে শেখ মুজিব কেড়ে নিয়েছিল দেশবাসীর স্বাধীনতা। এবং রাজনৈতিক দল গড়ার অধীকার কেড়ে নিয়েছিল ইসলামপন্থিদের। ইসলামপন্থিদের সাথে এরূপ অসভ্য ও অমানবিক আচরণ ঔপনিবেশিক কাফের শাসনামলেও হয়নি। মুজিবের শাসনামলে স্বাধীনতা পেয়েছিল কেবল মুজিবের অনুগত দুর্বৃত্ত দলীয় বাহিনী এবং তার প্রভুরাষ্ট্র ভারত। এবং যারাই মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আ্‌ওয়াজ তুলেছে্ তারা্ই গ্রেফতারি, হত্যা ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। রক্ষিবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে তিরিশ হাজারেরও বেশী রাজনৈতিক নেতাকর্মী। মুজিবের রাজনীতির মূল কথা ছিল ভারতের প্রতি নিঃশর্ত গোলামী। মুজিব ভারতকে দিয়েছিল ফারাক্কার মুখে পদ্মার বুক থেকে পানি তুলে নেয়ার অধিকার। দিয়েছিল বাংলাদেশের ভূমি বেরুবাড়ী। দেশের সীমান্ত বিলুপ্ত করে ভারতকে দিয়েছিল লুন্ঠনের অবাধ স্বাধীনতা। সে ভারতীয় লুটপাটের ফলেই নেমে আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ -যাতে মৃত্য হয় বহু লক্ষ বাংলাদেশীর। মুজিবের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু প্রবল ভাবে বেঁচে আছে মুজিবের ভারতসেবী রাজনীতি। এবং সেটি বাঁচিয়ে রেখেছে মুজিব কণ্যা হাসিনা।   

এখানেই প্রশ্ন উঠে। শেখ মুজিবের ন্যায় একজন স্বৈরাচারি খুনি ভোট-ডাকাত হাসিনার পিতা হতে পারে। বন্ধু হতে পারে আগ্রাসী ভারতেরও। কিন্ত বন্ধু বা পিতা হতে পারে কি কোন বিবেকমান বাংলাদেশীর? এ প্রশ্নটি উঠা উচিত তাদের পক্ষ থেকে যাদের মধ্যে বিবেক ও সাহস বলে এখনো কিছু বেঁচে আছে এবং যারা পরওয়া করে না ভোট-ডাকাত দুর্বৃত্তদের গালিগালাজের। চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও ফ্যাসিস্টদের নেতা, নেত্রী, পিতা বা বন্ধু বলায় তাদের চারিত্রিক কালীমা কমে না, কিন্তু এরূপ চাটুকারিতায় মারা পড়ে স্তাবকের বিবেক, ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ। তাই দেশে যখন কোন চোর, ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও ফ্যাসিস্টগণ নেতা, পিতা, বন্ধু বা প্রধানমন্ত্রী রূপে প্রতিষ্ঠা পায় -তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে বিপুল সংখ্যক দেশবাসীর মাঝে বিবেক, ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ কতটা মৃত?  

 

৩.স্বাধীনতা স্রেফ গোলামীর

স্বৈরাচারি শাসকদের স্বাধীনতা প্রতি যুগেই ছিল। কিন্তু  তাদের শাসনে স্বাধীনতা ছিল না জনগণের। জনগণকে সে স্বাধীনতা দিয়েছিল গণতন্ত্র। সেটি যেমন ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসনোর স্বাধীনতা, তেমনি নামানোর। ভোটডাকাত শেখ হাসিনা সে স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। এর আগে শেখ মুজিবও সে স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসনের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার লক্ষ্যে মুজিব নিষিদ্ধ করেছিল সকল বিরোধী দলীয় পত্রিকা। কেড়ে নিয়েছিল মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে এ ছিল মুজিবের অতি  নৃশংস ও ঘৃণ্য অপরাধ। এরূপ অসভ্য ও অপরাধী শাসককে সভ্য নাগরিকগণ ঘৃণা করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু  বাংলাদেশে সেটি হয়নি। কারণটি বোধগম্য। ডাকাতদের কাছে নৃশংস ডাকাত সর্দারও যেমন হিরো রূপে গৃহীত হয়, তেমনি স্বৈরাচারি মুজিবও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে গণ্য হচ্ছে ভোট-ডাকাত বাকশালীদের কাছে।   

শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার কাছে স্বাধীনতার অর্থ হলো ভারতের প্রতি আত্মসমর্পণের স্বাধীনতা। সে আত্মসমর্পণ জাহির করতে পত্রিকায় লেখালেখিতে যেমন বাধা নাই, তেমনি বাধা নেই টেলিভিশনের পর্দায় কথা বলায় বা রাজপথের মিছিলে। কিন্তু ভয়ানক অপরাধ গণ্য হয়, সে আরোপিত গোলামীর বিরুদ্ধে কথা বলা। যারাই ভারতের বিরুদ্ধে মুখ খুলছে তাদের পিটাতে পুলিশ এবং শেখ হাসিনার দলীয় গুন্ডাগণ একত্রে ময়দানে নামছে। অপর দিকে আদালতের গোলাম বিচারকদের কাজ হয়েছে আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা নয়; বরং সরকার দলীয় গুন্ডা ও খুনিদেরকে আইনের হাত থেকে বাঁচানো। এরূপ গোলামদের হাতেই বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবারার ফাহাদকে শহীদ হতে হলো। গোলামগণ প্রতি যুগে এমনটিই করে তাদের বিদেশী প্রভুদের খুশি করতে।

 

৪. ঈমানদারের ইসলাম ও মুনাফিকের ইসলাম

বেঈমানের জীবনে মূল লড়াইটি হলো নিজ দল, নিজ নেতা ও নিজ দলীয় আদর্শকে বিজয়ী করায়। অপর দিকে ঈমানদারের লড়াইটি আল্লাহর দ্বীন তথা শরিয়তকে বিজয়ী করায়। যে দেশে ঈমানদার ও বেঈমানদের বসবাস সে দেশে এ দু’টি বিপরীত এজেন্ডা নিয়ে রাজনীতির অঙ্গণে সৃষ্টি হয় প্রচন্ড মেরুকরণ। এমন মেরুকরণের রাজনীতিতে থাকে মাত্র দু’টি পক্ষ। একটি আল্লাহর পক্ষ, অপরটি শয়তানের পক্ষ। মহান আল্লাহর নিজের ভাষায় হিযবুল্লাহ (আল্লাহর দল) ও হিযবুশশায়তান (শায়তানের দল)। নিরপেক্ষ বলে কেউ থাকে না। বাংলাদেশে শয়তানের পক্ষটি বিজয়ী। তাদের বিজয়ের ফলেই মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি আইন আজ পরাজিত। এবং আদালতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কাফেরদের রচিত  আইন। আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা পাক -এ শয়তানী পক্ষটি তা কখনোই চায় না।

বাংলাদেশে নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করে এমন মানুষের সংখ্যা ১৬ কোটি। কিন্তু মুসলিম হওয়ার অর্থ্ কি -তা নিয়েই তাদের অজ্ঞতাটি গভীর। তারা ভাবে, মুখে কালেম ও তাসবিহ পাঠ এবং নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালনের মধ্যেই পরিপূর্ণ ইসলাম। এবং মনে করে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহের অঙ্গণে অন্য কিছু না করলেও চলে। অথচ মুসলিম হওয়ার অর্থ বিশাল। সেটি মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে আমৃত্যু হৃদয়ে নিয়ে জীবনের প্রতি অঙ্গণে বাঁচা। সে এজেন্ডার বিজয়ে থাকতে  হয় নিজের জান, মাল ও সর্বপ্রকার সামর্থ্যের বিনিয়োগ। সে এজেন্ডার অপরিহার্য বিষয় হলো ৫টি। ১).এমন এক পরিপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যেখানে থাকবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব এবং সে রাষ্ট্রে  বিলুপ্ত হবে জনগণ, পার্লামেন্ট, স্বৈরাচারি শাসক বা রাজার সার্বভৌমত্ব। ২). রাষ্ট্র চলবে শুরা বা পরামর্শের ভিত্তিতে; রাষ্ট্রীয় প্রধান সার্বভৌম হবে না, বরং হবে নবীজী (সাঃ)র খলিফা বা প্রতিনিধি। প্রায়োরিটি পাবে নবীজী (সাঃ)র আদর্শের প্রতিষ্ঠা ৩). প্রতিষ্ঠা পাবে শরিয়ত ও হুদুদের আইন, ৪). নানা ভাষা, নানা গোত্র ও নানা ভৌগলিক পরিচয়ের নামে গড়ে উঠা বিভক্তির দেয়ালের বিলুপ্তি এবং সচেষ্ট হবে একতার প্রতিষ্ঠায়, ৫), থাকবে অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার লাগাতর জিহাদ। নবীজী (সাঃ) এবং তার খলিফাদের জীবনে ইসলাম বলতে বুঝাতো এ এজেন্ডাগুলি নিয়ে বাঁচা। কিন্তু মুনাফিকের জীবনে ইসলামের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের জীবনে এর কোনটিই থাকে না। কেবল থাকে “আমিও মুসলিম” এ কপট দাবী। এবং ময়দানে থাকে ইসলামকে পরাজিত রাখার লড়াইয়ে তাদের জান, মাল ও মেধার বিনিয়োগ।

 

৫.জান্নাতের পথ ও জাহান্নামের পথ

মুসলিম হওয়ার অর্থটি বিশাল ও বিপ্লবাত্মক। সেটি আমৃত্যু এক পরম দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচা। সে দায়বদ্ধতাটি প্রতি পদে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এবং অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। দোযগের আগুণ থেকে বাঁচতে হলে এ ছাড়া ভিন্ন পথ নাই। নইলে মরতে হয় শয়তানের অনুসারি এক বেঈমান রূপে। ঈমানের চুড়ান্ত পরীক্ষাটি কখনোই নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতে হয় না। সেটি হয় কে কোন পক্ষ দাঁড়ালো ও প্রাণ দিল তা থেকে। নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, দান-খয়রাত মুনাফিকদের জীবনেও থাকে। ফলে কাফেরদের গড়া স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালের সংখ্যা কি কম? কিন্তু তাদের মধ্যে যে গুণটি থাকে না তা হলো, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে এবং অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সামর্থ্য। বাংলাদেশে যারা নিজেদেরকে মুসলিম রূপে দাবী করে তাদের মধ্যে এরূপ সামর্থ্যের অভাবটি বিকট। সে সামর্থ্য না থাকার কারণেই তথাকথিত ১৬ কোটি মুসলিমের দেশে ইসলাম আজ পরাজিত। এবং দেশ অধিকৃত ভোটডাকাতদের হাতে।

অথচ ঈমানদারগণ বাঁচে ভিন্নতর পরিচয় নিয়ে। তাদের অন্তরে থাকে নবী-রাসূল ও নেক বান্দাদের প্রতি যেমন গভীর ভালবাসা তেমনি থাকে চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও গুম-খুনের রাজনীতির দুর্বৃত্তদের প্রতি প্রবল ঘৃণা। জান্নাতের পথে চলতে হলে ছাড়তে হয় দুর্বৃত্তদের পথ। আলো ও আঁধার কখনোই একত্রে চলে না। তেমনি একত্রে চলে না নবীপ্রেম ও দুর্বৃত্তপ্রেম। দুর্বৃত্তপ্রেম প্রবল হওয়ার কারণেই মুজিবের ন্যায় একজন গণতন্ত্র হত্যাকারি ও ভারতসেবী ফ্যাসিষ্টও জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধুর খেতাব পায়। অথচ দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ঘৃনার সামর্থ্য না থাকলে ঈমানদার হওয়াই অসম্ভব। অসম্ভব হয় মানব হওয়াও। পবিত্র কোর’আনে এরূপ বেঈমানদের গবাদীপশুরও চেয়েও অধম বলা হয়েছে। কারণ, গবাদী পশু ঘাস খায় এবং জবাই হয় বটে, তবে দুর্বৃত্তদের পক্ষে ভোট দেয় না, মিছিল করে না ও তাদের পক্ষে লাঠিও ধরে না। ২৭/০৩/২০২০

 

 




করোনা ভাইরাসের বিপদ বনাম সেক্যুলারিজমের বিপদ

বিপদ ঈমান বিলুপ্তির

জাতির ভয়ানক ক্ষতিটি শুধু করোনা ভাইরাস করছে না। করছে সেক্যুলারিস্টগণও। সে সাথে করছে ধর্মব্যবসায়ীগণ। করোনা ভাইরাস মৃত্যু দেয় বটে, কিন্তু কাউকে জাহান্নামে টানে না। বরং ঈমান ও এক্বীন থাকলে, করোনা ভাইরাসের মহামারি শহীদের মর্যাদা দেয়। করোনা ভাইরাস ভারতীয় হিন্দু ধর্মব্যবসায়ীদের বাজারে রমরমা এনেছে। করোনার প্রতিরোধের নামে তারা গো-মুত্র পান করাচ্ছে। এমনকি ভাইরাসের মুর্তি গড়ে সে মুর্তিতে পূজা দেয়াও শুরু করেছে। বিষয়টি হিন্দু ধর্মের সাপের মুর্তিতে পূজা দিয়ে বিষধর সাপকে বসে আনার ন্যায়। করোনাও এখন ভগবানের আসনে বসেছে। সে চিত্রটিও ভারত থেকে ছড়ানো সোসাল মিডিয়াতে  দেখা গেল। বিপদ-আপদ দেখে মানুষের বিবেককে যেমন জাগ্রত হয়, তেমনি বিপদগামীও হয়। এ হলো তার নজির। 

করোনার পাশাপাশি সেক্যুলারিস্টদের সৃষ্ট বিপদও কি কম ভয়ানক? তারা ভাইরাসের বিপদটি তুলে ধরছে  বটে; কিন্তু ভাইরাসও মহা­ন আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি এবং এ মহামারীর পিছনে রয়েছে যে তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনা–সে সত্যটিকে তারা আড়াল করছে। সেক্যুলারিস্টগণ বিপদকে মানতে রাজী, কিন্তু যে কারণে বিপদের আগমন তা নিয়ে ভাবতে  রাজী নয়। যার পক্ষ থেকে এ মহাবিপদের আগমন তাঁকে মানতে রাজী নয়। সেক্যুলারিস্টদের মাঝে ভাইরাস নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে, কিন্তু ঘটনার গভীরে যাওয়ার আগ্রহ নাই। ভাইরাসের যিনি স্রষ্টা তিনি তাদের আলোচনায় নাই। অথচ ঘটনা যত তুচ্ছ, ক্ষুদ্র বা বিশাল হোক, তা এমনিতেই হয় না। সে ঘটনার পিছনে কাজ করে মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা। তাই করোনা ভাইরাসের যে মহামারি শুরু হয়েছে সেটিও মহান আল্লাহতায়ালার সৃষ্ট বিশ্বজগতের বাইরের কোন ঘটনা নয়, ফলে তার ইচ্ছার বাইরের বিষয়ও নয়। তাই এ করোনার মহামারিকে দেখতে হবে মহান আল্লাহতায়ালার উপর গভীর বিশ্বাসকে চেতনায় রেখে। বিপদের এ মুহুর্তে মহান আল্লাহর স্মরণ থেকে বিস্মৃত হওয়ার অর্থ  মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ও পরিকল্পনাকে অস্বীকার করা। সেটি কুফুরি। এ কাজ কাফেরদের যা জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছায়।   

ঈমানদারগণ সকল ঘটনার মধ্যেই মহান আল্লাহতায়লার ইচ্ছার প্রকাশ দেখতে পায়। এরূপ দেখার মধ্যেই ঈমানদারি। মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ছাড়া মানুষের মৃত্যুর ন্যায় গুরুতর ঘটনা দূরে থাক, গাছের একটি পাতাও পড়ে না। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া মানুষ যেমন বেঁচে থাকতে পারে না, তেমনি মরতেও পারে না। জন্মের ন্যায় মৃত্যুও মহান আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি। সে ঘোষণাটি এসেছে সুরা মুলকের ২ নম্বর আয়াতে। এ পৃথিবী একমাত্র তাই ঘটে যা তিনি ঘটাতে চান। পবিত্র কোরআনে তাই বলা হয়েছেঃ “তোমরা যা চাও সেটি হয় না, আল্লাহ যা চান সেটিই হয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু জানেন এবং প্রজ্ঞাময়।” –সুরা ইনসান (দাহর), আয়াত  ৩০। হায়াত-মউত তথা মানব জীবনের প্রতিটি ঘটনার মাঝে ঘটে মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছার প্রকাশ -সেটি বিশ্বাস করার মাঝেই প্রকৃত ঈমান। আল্লাহতায়ালা নয়, বরং মৃত্যু ঘটায় ভাইরাস -এরূপ বিশ্বাস হলো শিরক। এরূপ বিশ্বাস নিয়ে কেউ কি মুসলিম থাকে? নবীজী (সাঃ)র গুরুত্বপূর্ণ হাদীস হলো, সব গুনাহরই মাফ হতে পারে, কিন্তু মাফ নেই শিরকের গুনাহর। এমন বিশ্বাসধারীর কাফের হওয়ার জন্য কি মুর্তিপূজার প্রয়োজন পড়ে? মহামারি তাই শুধু মৃত্যু নিয়ে হাজির হয় না, হাজির হয় শিরক থেকে কে বাঁচার সামর্থ্য রাখে -সে পরীক্ষা নিয়েও।

চেতনার অঙ্গণে আল্লাহর স্মরণ থেকে এরূপ বিস্মৃতি তথা তাঁর উপর বিশ্বাসশূণ্যতার প্রবেশ ঘটায় সেক্যুলারিজম। ঘটনাকে তারা মহান আল্লাহর কুদরতের স্মরণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। বিপদ এখানে করোনা ভাইরাসের মহামারির চেয়েও ভয়াবহ। করোনা ভাইরাস দেয় দেহের মৃত্যু, সেক্যুলারিস্টগণ দেয় ঈমানের মৃত্যু। ঈমানের সে মৃত্যু নিয়ে বেঈমান ব্যক্তিটি তখন জাহান্নামের অন্তহীন আযাবে গিয়ে হাজির হয়। সেক্যুলারিজমের মূল বিপদ এখানেই। সেক্যুলারিস্টগণ শুধু রাজনীতিকেই ইসলামশূণ্য করছে না, মুসলিমদের চেতনা থেকে বিলুপ্ত করছে মহান আল্লাহতায়ালার ভয় ও তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতার ভাবনা। শুধু রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গণে নয়, এমন কি চিকিৎসা বিজ্ঞানের অঙ্গণেও এরা ইসলামী চেতনার প্রবেশকে নিষিদ্ধ করেছে।  এটিই হলো চেতনা বা ধ্যান-ধারণার সেক্যুলারাইজেশন। এভাবেই তারা বিপুল সংখ্যক মুসলিমদের কাফেরে পরিণত করছে। এভাবেই তারা বিপুল ভাবে বাড়িয়ে চলছে জাহান্নামমুখি পথচারিদের সংখ্যা। নবীজী (সাঃ)র যুগে মুর্তিপূজারী কাফেরগণ যা করতো তা করছে আধুনিক যুগের সেক্যুলারিস্টগণ।  

 

সেক্যুলারিজম এক আদিম অজ্ঞতা

সেক্যুলারিজম কোন আধুনিক মতবাদ নয়, বরং এটি এক আদিম অজ্ঞতা। বহু হাজার পূর্বে এমন এক অভিন্ন ধারণা দেখা গেছে হযরত নূহ (আঃ)র পুত্রের মধ্যেও। নবীর পুত্র হয়েও ঘটনার মাঝে আল্লাহর কুদরতকে দেখার সামর্থ্য তার ছিল না। বৃষ্টির পানিতে মাঠ-ঘাট যখন তলিয়ে যাচ্ছে তখনও সে ভেবেছে উঁচু পাহাড় তাকে বাঁচাবে। প্লাবন যে মহান আল্লাহতায়ালা পক্ষ থেকে কাফেরদের ডুবিয়ে মারার আযাব -সেটি সে দেখতে পারিনি। ফলে সে তার পিতার নৌকা নির্মাণকে অহেতুক ও হাস্যকর মনে করেছে। সেক্যুলারিস্টদের সমস্যা, বিপদ-আপদগুলিকে তারা স্রেফ বিপদ-আপদ রূপেই দেখে; তাদের কাছে সুনামী, ভূমিকম্প ও করনোর মহামারী কেবল দুর্যোগই। এখানে অন্ধত্বটি  মনের। মনের এরূপ অন্ধত্বের কারণে তারা দেখতে পায় না বিপদগুলির মহান স্রষ্টাকে। এবং তা নিয়ে তারা ভাবতেও চায়না। এখানেই তাদের বোধশূণ্যতা। আর এরূপ বোধশূণ্যতার আযাব হলো, তারা বঞ্চিত হয় ঈমানদার হতে এবং ধাবিত হয় জাহান্নামের দিকে।

মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাঃ “নিশ্চয়ই জমিন ও আসমানের সৃষ্টি সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের পালাবদলের মাঝে রয়েছে বোধসম্পন্ন মানুষের জন্য আল্লাহর নিদর্শন।” –(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৯০)। আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি শুধু জমিন এবং আসমানই নয়, বরং প্রতিটি সৃষ্টি এবং প্রতি ধ্বংস কান্ডও। তাই তাঁর সুস্পষ্ট নিদর্শন শুধু তাঁর সৃষ্টির মাঝে নয়, আযাবের মাঝেও। তাই আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস করলে বিশ্বাস করতে হয় তাঁর আযাবকেও। তবে আযাব আসে মানুষের নিজ হাতের কামাইয়ের শাস্তি রূপে। সেটি শুধু অপরাধীদের উপরই আসে না, যারা অপরাধীদের নির্মূল না করে তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তাদের উপরও। তাই আযাব শুধু ফিরাউনের উপর আসেনি, এসেছিল সাধারণ মিশরবাসীর উপরও। তাদের অপরাধ ছিল, ফিরাউনের ন্যায় এক দুর্বৃত্ত বিদ্রোহীকে রাজস্ব দিয়ে প্রতিপালন করতো। অথচ সে ভয়ানক পাপের কাজটি অধিকাংশ মুসলিম দেশগুলিতে আজও অতি ব্যাপক ভাবে হচ্ছে। ইসলামের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারি জালেম শক্তিবর্গের আজ যে রম রমা বিজয় তা তো জনগণের সহযোগিতা বা নিরবতার কারণেই। ফলে যে আযাব অতীতের জালেম শক্তি ও তাদের সহযোগিদের ঘিরে ধরেছিল তা আজ আসবে না সেটিই বা কীরূপে ভাবা যায়?     

 

আযাব যে কারণে অনিবার্য হয়

বান্দার নেক আমলকে পুরস্কৃত  করা এবং জুলুমের জন্য শাস্তি দেয়া মহান আল্লাহতায়ালার চিরাচরিত সূন্নত। তাই জুলুম হলো অথচ শাস্তি হলো না সেটি ঘটে না। পবিত্র কোর’আনে ফিরাউন ও মিশরবাসীর উপর আযাবের বর্ণনা এসেছে সুরা আল-আরাফে। মহান আল্লাহতায়ালার নিজের দেয়া সে বর্ণনাটি হলোঃ “অবশেষ আমি তাদের উপর প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, রক্তধারার শাস্তি পাঠিয়ে কষ্ট দেই; এগুলো ছিল আমার সুস্পষ্ট নিদর্শন। কিন্তু তারা শেষ অবধি দাম্ভিকতায় মেতে রইলো। তারা ছিল একটি অপরাধী জাতি।” –সুরা আল আ’রাফ, ১৩৩। মহান আল্লাহতায়ালা এখানে স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন, তাদের উপর আযাবের কারণ হলো, তারা ছিল অবাধ্য ও অপরাধী জাতি। হযরত মূসা (আঃ) যে দ্বীন নিয়ে এসেছিলেন তারা সেটি মানেনি। বরং ইতিহাস গড়েছিল বনি ইসরাইলীদের উপর বর্বর অত্যাচারে। তারা তাদের মেয়ে সন্তানদের জীবিত রাখতো দাসী রূপে ব্যবহারের জন্য এবং পুত্র সন্তানদের হত্যা করতো। এরূপ নৃশংস অপরাধই তাদের উপর আযাব নামিয়ে এনেছিল।

মহান আল্লাহতায়ালার তাঁর সূন্নতের প্রয়োগের প্রেক্ষাপটই এখানে সুস্পষ্ট। শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো, যেখানেই মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সেখানেই হাজির হয় তাঁর আযাব। ঈমানদারগণ প্রতিটি আযাবকে দেখে সে সূন্নতকে সামনে রেখে।  লক্ষ্যণীয় হলো, যে দাম্ভিকতা এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে যেরূপ বিদ্রোহ নিয়ে মেতেছিল ফিরাউন ও তার অনুসারীগণ, সে একই রূপ দাম্ভিকতা এবং বিদ্রোহে ডুবে আছে সমগ্র বিশ্ব। লক্ষাধিক নবী-রাসূল মারফত যে শিক্ষা ও বিধান মহান আল্লাহতায়ালা মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন -তা কোথাও আজ বেঁচে নাই। বনি ইসরাইলীদের মধ্যে যেমন হযরত মূসা (আঃ)য়ের উপর নাযিলকৃত শরিয়ত বেঁচে নাই, তেমনি বেঁচে নাই খৃষ্টানদের মাঝেও। তারা বাঁচছে মহান আল্লাহতায়ালার বিধানকে বাদ দিয়েই। তেমনি মুসলিমদের মাঝেও বেঁচে নাই মহান নবীজী (সাঃ)র প্রতিষ্ঠিত ইসলাম -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত, জিহাদ এবং প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব। দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসক চক্রের হাতে  অধিকৃত হয়েছে ইসলামের জন্মভূমি জাজিরাতুল আরবও। নবীজী (সাঃ)র এ পবিত্র ভূমির নামই শুধু তারা পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিচ্ছে তার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আইন-কানুন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুকরণে সেখানেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ক্লাব, নাইট ক্লাব ও সিনেমা হল। 

 

শয়তানী শক্তির যুদ্ধ ও আল্লাহর সৈন্য

সামরিক শক্তি ও সম্পদ  মানুষকে শয়তানের ন্যায় অহংকারি করে। তখন মন থেকে বিলুপ্ত হয় আল্লাহর ভয়। তাই প্রচণ্ড অহংকার চেপে বসেছে শক্তিশালী দেশগুলির শাসকদের মনে। তাদের অপরাধ কি ফিরাউনের চেয়ে কম? ফিরাউনের গণহত্যার শিকার হয়েছিল বনি ইসরাইলীগণ। তবে ফিরাউনের বাহিনীর হাতে যত মানুষ নিহত হয়েছিল তার চেয়ে শতগুণ বেশী মানুষ নিহত হয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদি শক্তি ও তাদের দোসরদের হাতে। তাদের  নৃশংস তান্ডবের কারণেই আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ার শত শত নগর আজ ধ্বংসপুরি। সেখানে নিহত হয়েছ ২০ লাখেরও বেশী মানুষ। নিজেদের ঘর-বাড়ী ছেড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ দেশে দেশে উদ্বাস্তুর বেশে ঘুরছে। অপরাধ এখানে সমগ্র বিশ্ববাসীর। কারো অপরাধ ঘটেছে সক্রিয় অংশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে, কারো ঘটেছে অপরাধ দেখেও নিরব ও নিষ্ক্রীয় থাকার মধ্য দিয়ে। এমন অপরাধ কি কখনো পুরস্কৃত হয়? বরং তা যে শাস্তি ডেকে আনবে –সেটি কি স্বাভাবিক নয়? ফলে শাস্তির যে এজেন্ডা নিয়ে অপরাধী মিশর বাসীর উপর প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, রক্তধারা নেমে এসেছিল তেমন এজেন্ডা নিয়ে ভাইরাস বা অন্যকিছু আজও আবির্ভুত হতে পারে -তাতেই বা অবিশ্বাসে কি আছে?

যে অহংকার নিয়ে ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহার তার বিশাল হাতি-বাহিনী নিয়ে ক্বাবার উপর হামলার উদ্দেশ্য বেরিয়েছিল সে অহংকার আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা, কোথাও তারা ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হতে দিবে না। তার ও তার কোয়ালিশন পার্টনারদের আক্রোশটি নবীজী (সাঃ)র আমলের প্রতিষ্ঠিত ইসলামের মৌলিক বিধানগুলির বিরুদ্ধে। কোথাও সে বিধানগুলির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হলে তার বিমান বাহিনী সে দেশকে গুড়িয়ে দিবে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ মূলতঃ মহান আল্লাহতায়ালার কোর’আনী ঘোষিত এজেন্ডার বিরুদ্ধে। এক কালে তারা কম্যুনিজমকে প্রতিদ্বন্দী জীবনাদর্শ মনে করতো। এখন মনে করে ইসলামকে। তাদের প্রকল্প একমাত্র পাশ্চাত্যের  জীবনধারা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে বিশ্বময় প্রতিষ্ঠা দেয়া। সেখানে ইসলামের কোন স্থান নাই। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধটিও তাই বিশ্বময়। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সে প্রজেক্টের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে বহু মুসলিম রাষ্ট্রও। 

আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে চলমান এ যুদ্ধে তিনি তাঁর সৈন্যদের নামাবেন সেটিই স্বাভাবিক। আবরাহার বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র পাথর টুকরো মিজাইলে পরিণত হয়েছিল। তেমনটি আজও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড অহংকার অস্ত্রের বিশাল ভান্ডার ও সম্পদ  নিয়ে। অতিশয় গর্বিত বহু মুসলিম দেশ দখল ও দখলকৃত সে দেশগুলির অসংখ্য শহর ধ্বংস করায়। কিন্তু তা আজ ব্যর্থ হচ্ছে ক্ষুদ্র ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। এ যুদ্ধে দেশটির এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কারখানাগুলি বন্ধ, বন্ধ করা হয়েছে অফিস-আদালত,  বিমান যোগাযোগ স্থগিত এবং জনগণ গৃহবন্দী। দ্রুত নীচে নামছে অর্থনীতি। একই অবস্থা ইতালী, জার্মাানী, ফ্রান্স, স্পেন ও ইংল্যান্ডের। কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধেই টালমাটাল অবস্থা। এ যুদ্ধ কয়েক মাস বা কয়েক বছর চললে অবস্থা কীরূপ হবে? আবরাহার  বিশাল হাতির বাহিনীকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে কোন ট্যাংক বাহিনী বা বিমান বাহিনীর প্রয়োজন পড়েনি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আবাবিল পাখি ও ছোট ছোট পাথর  টুকরোই যথেষ্ট  ছিল। বৃহৎ শক্তিবর্গের দর্প চুর্ন করায় তেমনি কাজ দিচ্ছে অতি ক্ষুদ্র করোনা ভাইরাস। আল্লাহ যে সর্বশক্তিমান এবং তাঁর পরিকল্পনাকে প্রতিহত  করা যে মানুষের অসাধ্য -ক্ষুদ্র করোনা ভাইরাস সে সত্যটিকেই প্রবল ভাবে প্রমাণ করছে। ২৪/০৩/২০২০  




বিবিধ প্রসঙ্গ-৮

এক. যে অপচয়ে এ জীবনে বাঁচাটাই ব্যর্থ হয়

একজন নারী বা পুরুষ তার সমগ্র জীবনে যা কিছু খরচ করে তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হলো তার সময়। ব্যক্তির জিম্মায় মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত অতি মহামূল্য আমানত হলো এটি। সময় শেষ হয়ে গেলে সকল সামর্থ্যই শেষ হয়ে যায়। কোটি কোটি টাকার সম্পদও তখন কাজে লাগে না; সে সম্পদের মালিক তখন অন্য কেউ হয়। কাজ লাগে না মেধা, ডিগ্রি বা দৈহিক বল। তাই ব্যক্তির জীবনে অতি গুরুতর খেয়ানত বা পাপ হলো মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া এ শ্রেষ্ঠ আমানতের খেয়ানত। সে মহামূল্য আমানতটি কীরূপে ব্যবহৃত হলো তার ভিত্তিতেই জুটবে জান্নাত বা জাহান্নাম পাবে। কাজে না লাগালে বহু কোটি টাকার সম্পদও কোন কাজ দেয় না। সূর্য্যের তাপে বরফের টুকরো যেমন হাওয়া হয়ে যায়, তেমন জীবনের গতিতে হারিয়ে যায় সময়ও। তাই ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তার পরিচয়টি মেলে সময়ের সুষ্ঠ ব্যবহারে। সবচেয়ে বড় কথা, জীবনের সকল সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ভর করে সময়ের বিনিয়োগটি কীরূপে হলো তার উপর। এবং সবচেয়ে বুদ্ধিমান তো তারাই যারা সময়কে হারিয়ে যেতে দেয় না, বরং ধরে রাখে জীবনের শ্রেষ্ঠ কর্মের মাঝে এবং পাঠিয়ে দেয় পরকালের ট্রেজারে। মানব জীবনের এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দ্বিতীয়টি নেই। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটি বুঝাতেই মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে একটি সুরা নাযিল করেছেন এবং সেটি হলো সুরা আছর।

‘আছর’ শব্দের অর্থ হলো সময়। সুরা আছরে মহান আল্লাহতায়ালা সময়ের কসম খেয়ে যে মহা সত্যটি তুলে ধরেছেন তা হলোঃ “নিশ্চয়ই বিলুপ্ত হয় সময় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিটি মানুষ। কিন্তু সে ক্ষতি থেকে বাঁচে একমাত্র তারাই যারা ঈমান আনে আল্লাহ ও তাঁর বিধানের উপর, নেক কর্মে বিনিয়োগ করে নিজের সময় ও সামর্থ্য এবং একে অপরকে উদ্বুদ্ধ করে হকের প্রতিষ্ঠায় ও ধৈর্য ধারণে।” তবে বিনিয়োগকৃত সময় মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে কতটা প্রতিদান দিবে -সেটি নির্ভর করবে ব্যক্তি তার সময়ের মূল্য কতটা বাড়ালো তার উপর। সবার যোগ্যতা বা সামর্থ্য যেমন এক নয়, তেমনি এক নয় সবার সময়ের মূল্যও। সময়ের উপর ভ্যালুএ্যাডিং তথা মূল্যসংযোজনটি হয় ব্যক্তির যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সৎ কাজে নিজের সামর্থ্য থেকে। সামর্থ্য বৃদ্ধির কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারটি হলো জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। যে জানে এবং যে জানে না –উভয়ে যে এক নয়, সে সত্যটি পবিত্র কোর’আনে বার বার বলা হয়েছে। জ্ঞানহীন, অভিজ্ঞতাহীন ও কর্মহীন ব্যক্তির সময়ের মূল্য তাই জ্ঞানবান অভিজ্ঞ ব্যক্তির সমান হয় না। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বলে যে তাঁর নিজের যোগ্যতা বাড়ালো সেই বহুগুণ বৃদ্ধি করলো তার সময়ের মূল্য। বস্তুতঃ মানব জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সে কাজটি ত্বরান্বিত করতেই মহান আল্লাহতায়ালা জ্ঞানার্জনকে নামায-রোযার আগে ফরজ করেছেন। নামাজের ওয়াক্ত দিনে ৫ বার, কিন্তু জ্ঞানার্জনের ওয়াক্তটি দিন-রাতের প্রতি মুহুর্ত এবং তা আমৃত্যু। এবং এ ফরজ ছুটে গেলে ক্বাজা আদায়ের সুযোগ নেই, বরং ভয়ানক কুফলটি ভুগতে হয় ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে। সেটি যেমন এ দুনিয়ায়, তেমনি আখেরাতে। সে ব্যর্থতা আখেরাতে জাহান্নামে হাজির করে।

আলো-বাতাস ও পানাহারের ন্যায় সময়ের খরচ সবার জীবনেই থাকে। কারো জীবনে সেটি হয় কল্যাণের পথে, কারো জীবনে অকল্যাণের পথে। বিশাল ভিন্নতা থাকে গুণগত সামর্থ্যের অঙ্গণেও। সৎকর্মশীল জ্ঞানীর বিনিয়োগে সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে বাড়ে নেক আমলের ফসল। জাহেলের বিনিয়োগে বাড়ে দুর্বৃত্তি; এবং তা টানে জাহান্নামে। প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বরাদ্দকৃত সময়টি সীমিত। একটি মুহুর্তও বাড়ানো যায় না বহুকোটি অর্থ ব্যয়ে –এ হুশিয়ারিটি এসেছে সুরা মুনাফিকুনে। অপর দিকে সুরা মুলক’য়ে এ দুনিযার জীবন চিত্রিত হয়েছে পরীক্ষাপর্ব রূপে। ব্যক্তির ঈমান ও আমলের বিচারটি হয় পার্থিব জীবনের এ পরীক্ষা অঙ্গণে। তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিচা্র হয় কীরূপে সে মহা মূল্যবান সময়কে খরচ করলো -তা থেকে। সীমিত সময়ের শেষ ঘন্টাটি বেজে উঠলে পরীক্ষার খাতা কেড়ে নেয়া হয়। তাই যার সুস্থ্য বিবেক-বুদ্ধি আছে সে কখনো্ই পরীক্ষার হলে বসে নাচ-গানে মন দেয় না। এবং বাজে কথা ও কাজে সময় নষ্ট করে না। ইসলামে সময়ের এরূপ অপচয় তাই অতি গর্হিত কর্ম। এর পরিনাম নিয়ে ভবিষ্যতের চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছে সুরা মুদাচ্ছেরে। বলা হয়েছে, জাহান্নামবাসীদের যখন জিজ্ঞেস করা হবে তোমরা কী করে জাহান্নামে পৌছলে, তখন যে কারণগুলি তারা তুলে ধরবে তার মধ্যে অন্যতম কারণটি হবে, তারা সময় কাটিয়েছিল বাজে আ্ড্ডায় অর্থহীন আলোচনায়।

শুধু সময় নয়, ব্যক্তির প্রতিটি দৈহিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, আর্থিক সামর্থ্যই হলো মহান আল্লাহতায়ালার দান তথা আমানত। ব্যক্তির ঈমানী দায়বদ্ধতা হলো, এ আমানতকে সে ব্যবহার করবে মহান আল্লাহতায়ালার জমিনে তাঁরই প্রদর্শিত দ্বীন তথা ইসলামের প্রতিষ্ঠায়। এবং প্রতিষ্ঠা দিবে তাঁরই দেয়া কোর’আনী আইন তথা শরিয়ত। একমাত্র এভাবেই পালিত হতে পারে আল্লাহর খলিফা রূপে একজন মুসলিমের আমৃত্যু দায়বদ্ধতা। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় অপরাধ আর কি হতে পারে যে, সে সামর্থ্য ব্যয় হবে জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজমের ন্যায় কুফরি মতবাদের প্রতিষ্ঠায় এবং বাধা দিবে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায়? অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে সে হারাম কাজটিই হচ্ছে।

 

দুই. জাহেল হওয়ার শাস্তি ও অসভ্যতা

মানুষ যখন জাহেল হয়, তখন তার জন্য অসম্ভব হয় ঈমানদার হওয়া। সে সাথে অসম্ভব হয় সভ্য ও বিবেকমান মানুষ রূপে বেড়ে উঠা। জাহেল বা অজ্ঞ হওয়ার এটিই হলো বড় শাস্তি। জাহেলিয়াত হলো মনের ভূবনে গভীর অন্ধকার। ঈমানদার যাওয়ার জন্য যা জরুরী -তা হলো জাহিলিয়াতের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা। গভীর রাতের অন্ধকারে পথ চেনা যায় না। তেমনি মনের অন্ধকারে দেখা যায় না সিরাতুল মুস্তাকীম। সেজন্য চাই কোর’আনের জ্ঞান। চাই সে জ্ঞানে আলোকিত মন। কোর’আনের জ্ঞান দেয় হালাম-হারাম, ন্যায়-অন্যায় চেনার সামর্থ্য। দেয় অতি মানবিক মূল্যবোধ। পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানার্জন এজন্যই ফরয। ইসলামের শুরুটি এজন্যই নামায-রোযা দিয়ে হয়নি, হয়েছে আল্লাহর উপর ঈমানের সাথে “ইকরা” দিয়ে। অর্থাৎ “কোর’আন পড়” তথা কোর’আন থেকে জ্ঞানার্জন করো –এ দিয়ে। কোর’আনের জ্ঞানার্জন তাই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। 

দিনের আলোর ন্যায় রাতের অন্ধকার চেনাটিও সহজ। তেমনি অতি সহজ হলো সমাজের বুকে চলাফেরা কোর’আনের জ্ঞানশূণ্য বেঈমানদের চেনা। কারণ অঙ্গারের উত্তাপের ন্যায় তাদের বেঈমানীর উত্তপাটিও নিজেদের মধ্যে সীমিত থাকে না। বরং তা প্রচার ও প্রতিষ্ঠা পায় রাষ্ট্র জুড়ে। এরা ক্ষমতায় গেলে খুলে দেয় পাপের সকল রাস্তা। দেশে তখন দুর্বৃত্তির প্লাবন আসে। রাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি জুড়ে তখন শুরু হয় সীমাহীন পাপাচার ও জুলুম। সংস্কৃতি নামে পাপাচারকে প্রতিষ্ঠা দেয়াই তখন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। কাফেরদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, যারাই কাফের তারাই জালেম। তাই কাফের হলো অথচ জালেম হলো না -সেটি তাই ভাবা যায় না। তবে তাদের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় জুলুমটি হয় মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে। আল্লাহতায়ালার দেয়া খাদ্য-পানীয়’তে পুষ্ট হয়ে তারা বিদ্রোহ করে তাঁর সার্বভৌমত্ব ও বিধানের বিরুদ্ধে। ইসলামের বদলে তারা বিজয়ী করে জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, সেক্যুলারিজমের ন্যায় নানারূপ  কুফরি মতবাদকে। তাদের কাছে এমন কি সাপ-শকুন,গরু-ছাগল ও মুর্তিও পূজনীয় গণ্য হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও রাজনীতির নামে তারা শুরু করে ইসলামের বিজয় প্রতিরোধের রক্তাত্ব সন্ত্রাস। প্রতিষ্ঠা পায় গুম, খুন ও বিচারেরর নামে হত্যার রাজনীতি। সবচেয়ে বড় ভোট-ডাকাতও তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী রূপে গৃহীত হয়। গণতন্ত্র হত্যাকারি এবং বাকস্বাধীনিতা হরণকারীও তখন দেশবাসীর পিতা ও বন্ধু রূপে গণ্য হয়।

 

তিন. আল্লাহপ্রদত্ত উপাধিটি ভাই’য়েরঃ কিন্তু কতটুকু বেঁচে আছে সে চেতনা?

“একমাত্র মুমিনগণই পরস্পরের ভাই। অত:পর পরিশুদ্ধি আনো ভাইদের মাঝে এবং ভয় করো আল্লাহকে যাতে পেতে পার রহমত।” -সুরা হুজরাত,আয়াত ১০। এক মুসলিম আরেক মুসলিমের ভাই সেটি মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া পদবী। মু’মিনের ঈমাদারী শুধু মহান আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাস নয়, বরং তাঁর দেয়া সে বিশেষ পদবীকেও সন্মান দেয়া। নইলে প্রচণ্ড বেঈমানী হয়। এবং পরস্পরের মাঝে ভাতৃসুলভ সম্পর্কের সে পরিচয়টি মেলে এক ভাই অপর ভাইয়ের সুখ-দুঃখ কতটুকু অনুভুত করে -তা থেকে। নিজের ভাই বহু হাজার মাইল দূরে অবস্থান করলেও তার পা হারানোর ব্যাথাটি হৃদয়ে অনুভুত হয়। তার ব্যাথা লাঘবে অন্য ভাইয়ের অন্তর ছটফট করে। তার বোন ধর্ষিতা বা নিহত হলে সে তখন প্রতিশোধে নামে। দেহে প্রাণ না থাকলে হাত-পা কেটে ফেললেও মৃত ব্যক্তি ব্যাথা পায় না। তেমনি হৃদয়ে ঈমান না থাকলে দুর্বৃত্তদের হা্তে দেশে বা বিদেশে হাজার হাজার মুসলিম ভাই ও বোন নিহত বা ধর্ষিত হলেও তাতে বেদনা জাগে না। বরং দুর্বৃত্ত বেঈমান ব্যক্তিটি নিজ স্বার্থে খুনি ও ধর্ষকের পক্ষ নেয়। বাংলাদেশের ভোট-ডাকাত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আচরণ তো অবিকল তেমনই। ভেতরের বেঈমানী তো এভাবেই বেড়িয়ে আসে। কে বলে মানুষের ঈমান বা বেঈমানী দেখা যায় না? অন্য মুসলিমের বিপদে আচরণ কীরূপ হয় -সেটি দেখে ব্যক্তির ঈমাদারী ও বেঈমানী নীল আকাশের সূর্য্যের ন্যায় খালি চোখেও দেখা যায়। দেখা না গেলে বেঈমানদের বিরুদ্ধে যে ফরজ জিহাদ -সেটিই বা হবে কী করে? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চরিত্র বিশ্ববাসী জানে। সে যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিল তখন তিন হা্জারের বেশী মুসলিমকে গুজরাতের রাজধানী আহমেদাবাদে হত্যা করা হয়। গণধর্ষণের শিকার হয় বহুশত মুসলিম রমনীক। আগুণ দিয়ে ছাই করা হয় মুসলিমদের শত শত ঘরবাড়ী ও দোকানপাট। এ জঘন্য অপরাধের নায়ক যে নরেন্দ্র মোদি তা নিয়ে বিশ্ববাসীর কোন সন্দেহ ছিল না বলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মোদির ভিসাদানে নিষেধাজ্ঞা লাগিয়েছিল। অথচ সে মোদিকে হাসিনা দাওয়াত দিয়েছিল হাসিনা।

নিজ গৃহে অন্য ভাইয়ের আগমনে কেউ কি নিষেধাজ্ঞা লাগায়? বরং দরজায় দাঁড়িয়ে তাকে আলিঙ্গণ করে। তাই একশত বছর আগেও মুসলিম উম্মাহর বুকে ভৌগলিক বিভক্তির দেয়াল গড়া হয়নি। তখন মক্কা, মদিনা, ইস্তাম্বুল, লাহোর, করাচী বা অন্য কোন মুসলিম দেশে ঘর বাঁধতে বা দোকান দিতে কোন বাঙালী মুসলিমের ভিসা লাগেনি। তেমনি অন্য দেশ ও অন্য ভাষার মুসলিমেরও ভিসা লাগেনি বাংলায় এসে ঘর বাঁধতে।  দেয়াল গড়ার এ জাহিলিয়াত এসেছে ইসলাম ছেড়ে জাতীয়তাবাদের ন্যায় কুফরি মতবাদে দীক্ষা নেয়ার পর। তখন তারা উৎসবভরে ভায়ের গলায় ছুরি চালিয়েছে। তাই একাত্তরে বহু হাজার অবাঙালী মুসলিম নিহত হয়েছে বাঙালী মুসলিমের হাতে। এবং তাদের ঘরবাড়ী, দোকানপাট ছিনিয়ে নিয়ে বস্তিতে তোলা হয়েছে। বাংলার সমগ্র ইতিহাসে এরূপ মানবতা বিরোধী বর্বর অপরাধ কোন কালেই ঘটেনি। অথচ সে অপরাধের জন্য কা্উকে কোন শাস্তিও দেয়া হয়নি। বরং পুরস্কৃত করা হয়েছে ছিনিয়ে নেয়া ঘরবাড়ী ও দোকানপাট দিয়ে। আজ যেসব বাঙালী বুদ্ধিজীবী বড় বড় নীতি বাক্য আওড়ায় তারাও বাঙালীর সে ঘৃণ্য অপরাধ নিয়ে কথা বলে না। যেন বিজয়ী হলে সকল অপরাধই জায়েজ হয়ে যায়। অথচ জয় বা পরাজয়ে –সর্বাস্থায় ন্যায়ের পথে থাকাতেই ঈমানদারী। বেঈমানীর লাইসেন্স নাই কোন অবস্থাতেই।

অতিশয় বেঈমানী হলো মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া ভাইয়ের পরিচয়টি ভূলে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তির দেয়াল গড়া ও খুনোখুনি করা। মুসলিম বিশ্বজুড়ে সে বেঈমানীটি ব্যাপক ভাবে হচ্ছে ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতার নামে। এবং সে বেঈমানীর উপর ভিত্তি করেই মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতীক অঙ্গণে গড়ে উঠেছে ৫৭টি রাষ্ট্রের বিভক্তির দেয়াল। আরব, ইরানী, তুর্কী, কুর্দী, মুর তথা নানা ভাষার মুসলিমগণ ইসলামের গৌরব কালে এক অখন্ড মানচিত্রে বসবাসের মধ্য দিয়ে যে ঈমাদারীর প্রমাণ দিল সে ঈমানদারীটি আজ মুসলিম জীবনে কই? তাদের সে সূন্নত কি এতই তুচ্ছ? বরং তাদের শক্তি ও ইজ্জতের মূল উৎস ছিল সে একতা। সে একতার মধ্যেই প্রকাশ পেয়েছিল মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি আনুগত্য। এবং এরূপ আনুগত্য গায়েবী সাহায্য আনবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। অপর দিকে বিভক্তি গড়ার প্রতিটি প্রচেষ্টাই মূলতঃ বেঈমানী। অথচ এ বেঈমানী নিয়ে দেশের আলেম নামধারীরা যেমন নিষ্চুপ, তেমনি নিষ্চুপ তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা। প্রশ্ন হলো, এমন বিদ্রোহ কি কখনো রহমত আনে? বরং যা আনে তা তো প্রতিশ্রুত আযাব। তাছাড়া বিভক্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে যে চরম অবাধ্যতার কবিরা গুনাহ, তা কি স্রেফ নামায-রোযায় দূর হয়? নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত তো মুনাফিকের জীবনেও থাকে। নবীজী (সাঃ)র যুগের মুনাফিকেরা তো মসজিদে নববীতে নবীজী (সাঃ)র পিছনে প্রথম সারিতে নামায পড়েছে্। কিন্তু তাতে তাদের মুনাফিকী দূর হয়নি। এ মহাপাপের শাস্তি থেকে তো তখনই মুক্তি জুটবে যখন বিদ্রোহের বদলে আসবে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। বিভক্তির বদলে সৃষ্টি হবে একতা। এবং দেয়াল গড়া বা পাহারা দেয়ার বদলে শুরু হবে দেয়াল ভাঙ্গার জিহাদ।

ঈমানদার কোন জিহাদ বা যুদ্ধে বিজয়ের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে পুরস্কার পায় না। কারণ, বিজয় তো মহান আল্লাহরতায়ালার দান। সে পুরস্কার পায়, নিজের বলিষ্ঠ ঈমানদারী, নিয়েত ও নিজ সামর্থ্যের বিনিয়োগের বিনময়ে। নিজের সামর্থ্যের সে বিনিয়োগ থাকলে পরাজিত হলেও সে বিজয়ী। তাই প্রকৃত ঈমানদার বিজয় নিয়ে ভাবে না, ভাবে নিজের ঈমানী দায়ভার কতটা পালিত হলো তা নিয়ে। মুসলিমদের পরাজিত এবং জান্নাতের পথ থেকে তাদেরকে দূরে রাখার শয়তানী শক্তিবর্গের প্রকল্প অনেক। মুসলিম বিশ্বের বিভক্ত এ মানচিত্রটি  হলো মুসলিম উম্মাহকে পরাজিত, শক্তিহীন ও ইজ্জতহীন রাখার শয়তানী প্রকল্প। তাই এ বিভক্তি মানচিত্র মেনে নিয়ে বসবাসে কোন পুরস্কার নাই। কোন ইজ্জত বা শান্তিও নাই। বরং যা আছে তা হলো শাস্তি। এবং সে শাস্তি শয়তানী প্রকল্পের কাছে আত্মসমর্পণ ও শয়তানী শক্তিবর্গকে বিজয়ী রাখার শাস্তি। আজ সে শাস্তিই মুসলিম উম্মাহকে ঘিরে ধরেছে। তাই দেশে দেশে মুসলিমগণ নিহত, ধর্ষিতা ও উদ্বাস্তু হচ্ছে। সে সাথে তাদের দেশগুলি অধিকৃত হচ্ছে এবং শহরগুলি শত্রুর বোমা ও মিজাইলের আঘাতে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। অথচ গোলামীর এ অবকাঠামো বিলুপ্তির জিহাদ শুরু হলে সত্ত্বর বিজয় না জুটলোও পরকালে নিশ্চিত জান্নাত জুটতো। মুসলিম দেশগুলিতে নামাযী ও রোযাদারের সংখ্যাটি কোটি কোটি, কিন্তু ইসলামের সে ন্যূনতম ধারণাটি ক’জনের? ২১/০৩/২০২০          




বিবিধ প্রসঙ্গ-৭

১. ভারতে হিন্দুত্ব শাসনঃ এ কোন অসভ্যতা!

কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ১২ই মার্চ এমন এক বিষয়ে সম্পাদকীয় ছেপেছে যা পত্রিকায় না পড়লে বিশ্বাস করাই কঠিন হতো। বিষয়টি বেছে বেছে মুসলিমদের শাস্তি দেয়ার আইন। আধুনিক যুগে এমন আইন কোন দেশে থাকতে পারে -সেটি কল্পনা্ করাই কঠিন। ভারতের বুকে কীরূপ অসভ্য ও নৃশংস শাসন চেপে বসেছে -এ হলো তারই এক করুণ চিত্র। ভয়ানক দুশ্চিন্তার কারণ হলো, ভারতের ২০ কোটি অসহায় মুসলিম এ অসভ্য ও নৃশংস শাসক ও তাদের দলীয় গুন্ডাদের হাতে জিম্মি। তারা  যে কোন সভ্য দেশে সরকারের কাজ হয়, অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ভারতে হচ্ছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। অসভ্যতার অতি নৃশংস চিত্রটি ২০০২ সালে দেখা গিয়েছিল গুজরাতে। তখন গুজরাত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রি ছিল আজকের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নরেন্দ্র মোদি মুসলিম গণহত্যার সে গুজরাতি মডেলকেই সম্প্রতি প্রতিষ্ঠা দিল রাজধানী দিল্লিতে।

দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা বিজিপি সরকারের সে অসভ্য চিত্রটি তুলে ধরেছে “বিষম ব্যবস্থা” শিরোনামায়। সেটি সরকারের একটি আইন নিয়ে। সে আইনী বিধানটি হলো, যদি কোন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, ও শিখ ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে বেড়াতে এসে ভিসায় প্রদত্ত মেয়াদের চেয়ে অধীক কাল অপেক্ষা করে তবে তাকে ১০০ রুপি জরিয়ানা দিতে হবে। কিন্তু সেটি যদি কোন মুসলিমের পক্ষ থেকে হয় তবে তাকে ২১ হাজার রুপি জরিয়ানা দিতে হবে। অর্থাৎ মুসলিম ব্যক্তির জরিমানাটি হবে ২০০ গুণ। ধর্মের নামে এ এক বিস্ময়কর বৈষম্য!   

এটি কি কোন সভ্য দেশের আচরণ? পাকিস্তান ভারতের ন্যায় নিজেকে ধর্ম নিরেপক্ষ রাষ্ট্র বলে দাবী করে না। শাসতান্ত্রিক ভাবে দেশটি শুরু থেকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র। সেখানেও নানা দেশের নানা ধর্মের মানুষ বেড়াতে আসে। ভিসায় প্রদত্ত মেয়াদের চেয়ে বেশী কাল অপেক্ষা করে –এমন ঘটনা সেখানেও বিরল নয়। কিন্তু দেশটি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধর্মের ভিত্তিতে ভেদাভেদ করে –এমন অভিযোগ এমন কি দেশটির শত্রুগণও এ অবধি অভিযোগ  তোলেনি। আইন ভঙ্গ হলে সে দেশে সবাইকে একই জরিমানা দিতে হয়। অপর দিকে ভারতীয়রা গর্ব করে ধর্মনিরেপেক্ষতার দাবী নিয়ে। প্রশ্ন হলো, আইন প্রয়োগে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এরূপ পক্ষপাত-দুষ্টতা কি ধর্মনিরেপেক্ষতা? ধর্মনিরেপেক্ষতার নামে ভারতে কীরূপ অসভ্য জালিয়াতি চলছে –আনন্দবাজারের সম্পাদকীয় হলো তারই নজির।

যারা আইন প্রণয়ন করে তারা গাঁজাসেবী বা মাতাল নয়। তারা উচ্চ শিক্ষিত। তাদের মনে মুসলিমদের বিরুদ্ধে পর্বত-সমান ঘৃণা না থাকলে কি এমন আইন তৈরী করতে পারে? সে ঘৃণাটি যেমন দাঙ্গার নামে গণহত্যাতে প্রকাশ পায়, তেমনি প্রকাশ পায় আইনের প্রয়োগে। ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এমন ঘৃণা যে শুধু সে দেশের আইন-প্রণেতা বিজিপি সাংসদদের মাঝেই বিরাজ করছে -তা নয়। সে বিষাক্ত ঘৃণাটি দেখা যায় ভারতীয় পুলিশ ও ভারতের উচ্চ আদালতের বিচারকদের মাঝেও। দেখা যায় হিন্দু মিডিয়া কর্মীদের মাঝেও। তাই কোথাও মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, গণধর্ষণ ও লুটপাট শুরু হলে পুলিশকে সে অপরাধ দমনে দ্রুত ময়দানে নামতে দেখা যায় না। ময়দানে নামলেও তারা অপরাধ থামায় না। বরং দেখা যায় হিন্দু গুণ্ডাদের সাথে মুসলিমদের বিরুদ্ধে পাথর ছুড়তে বা লাঠি দিয়ে পিঠাতে। সেটি প্রামাণ্য চিত্র দেখা গেছে সোসাল মিডিয়াতে ছড়িয়া পড়া ভিডিওগুলোতে। এমন গভীর ঘৃণা নিয়েই দিল্লির পুলিশগণ মুসলিম গণহত্যা এবং মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে জ্বালাও-পোড়াওয়ের পর্বটি তিন দিন ধরে চলতে  দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা গেছে পুলিশ কিছু সংখ্যক মুসলিম যুবককে রাস্তায় ফেলে পিটাচ্ছে এবং তাদেরকে বলছে জয় শ্রীরাম বলতে। এদের মধ্যে একজনের মৃত্যু ঘটেছে। এমন পুলিশকেই বাহবা দিয়েছে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। উল্লেখ্য হলো এই অমিত শাহের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ উঠেছিল ২০০২ সালে গুজরাতে মুসলিম বিরোধী গণহত্যায় জড়িত থাকা নেয়। দিল্লির পুলিশ যেহেতু অমিত শাহের অধীন, মুসলিম গণহত্যার সে গুজরাতী মডেলেরই প্রয়োগ হলো এবাব দিল্লিতে। সেটিই লিখেছে কলকাতার “দি টেলিগ্রাফ” পত্রিকাটি।

পুলিশ ও বিজিপির গুন্ডাদের ন্যায় ভারতের উচ্চ-আদালতের বিচারকদের মুসলিম বিদ্বেষ কি কম? হিন্দু গুণ্ডাগণ কোন মসজিদ ভাঙ্গলে ভারতের উচ্চ-আদালতের বিচারকদের কাছে সেটি কোন অপরাধ গণ্য হয় না। সে গুন্ডামীর জন্য কারো কোন শাস্তি হয় না। বরং আদালতের কাজ হয়, ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের জমিতে মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দেয়া। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এমন রায়ই দিয়েছে্ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘৃণ্য অপরাধকে জায়েজ করতে। বিজিপি’র নেতাগণ যখন প্রকাশ্যে মুসলিমদের উদ্দেশ্যে “গোলি মারো শালেকো” বলে গুন্ডাদের উস্কানী দেয় -সেটিও বিচারকদের কাছে অপরাধ রূপে গণ্য হয় না। দিল্লিত ৯ মসজিদের উপর হামলা হয়েছে, মসিজদের মিনারে হনুমান অংকিত গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে অপবিত্র করা হয়েছে -কিন্তু সে অপরাধে পুলিশ কাউকে ধরেনি। বরং নিরব দাঁড়িয়ে দেখেছে। তাই আদালত  থেকে কারো কোন শাস্তিও হয়নি। আইনের প্রয়োগ ও জানমালের নিরপত্তা দিতে ভারত যে কতটা ব্যর্থ রাষ্ট্র -এ হলো তারই প্রমাণ।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা যে কতটা সঠিক ছিল এবং ৪০ কোটি মুসলিমের জীবনে দেশটি যে কীরূপ বিশাল কল্যাণ দিয়েছে -সেটি বুঝার জন্য ভারতীয় হিন্দুদের এরূপ অসভ্য শাসনই যথেষ্ট। একমাত্র ভারতের সেবাদাসগণই পাকিস্তান সৃষ্টির অপরিসীম কল্যাণকে অস্বীকার করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশী জনগণের বিপদ হলো, হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টদের প্রতি নতজানু দাসত্ব নিয়ে বাঁচতে চায় এমন অসভ্য মুসলিম বিদ্বেষীদের সংখ্যাটি ভারতের ন্যায় বাংলাদেশেও বিশাল। বরং সত্য তো এটাই, বাংলাদেশে শাসন চলছে এরূপ নৃশংস ফ্যাসিস্টদেরই। এবং সে শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং বেঁচে আছে ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের সাহায্য নিয়েই। চাকর-বাকর ও দাসী-বাঁদীর মাঝে দুর্বৃত্ত মনিবের খুন-খারবাী ও ধর্ষণের ন্যায় অপরাধের নিন্দার সাহস থাকে না। তারা বরং সে অপরাধে জোগালের কাজ করে। সে ভূমিকাটিই পালন করছে ভারতপালিত শেখ হাসিনা। তাই ভারতে মুসলিম হত্যার নিন্দা না করে শেখ হাসিনা সে দেশের অসভ্য ও দুর্বৃত্ত নরেন্দ্র মোদির প্রতি বন্ধুত্বের হাত প্রসার করেছে।

 

 

২. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি সবচেয়ে অবহেলিত

মানব জীবনে যে কাজটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি অর্থ-সম্পদের বৃদ্ধি নয়। নাম-যশ বা প্রভাব-প্রতিপত্তির বৃদ্ধিও নয়। সেটি হলো ঈমান-বৃদ্ধি। একমাত্র ঈমান বাড়লেই মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাটি সম্ভব হয়। একমাত্র তখনই শান্তি আসে যেমন এ দুনিয়ায়, তেমনি সম্ভব হয় জান্নাত লাভ। এমন মানুষের সংখ্যা বাড়লে শান্তি ও কল্যাণ কর্মের জোয়ার সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রীয় জীবনে। তখন পরস্পরে কলহ-বিবাদ ও হানাহানিতে লিপ্ত না হয়ে মুসলিমগণ ভাতৃ-সুলভ সীসাঢালা দেয়ালের জন্ম দেয়। তখন বাড়ে অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে জিহাদে জান-মালের বিনিয়োগ। তখন নির্মিত হয় শক্তিশালী সভ্য রাষ্ট্র, আসে উপর্যোপরি বিজয়। তবে ঈমানের বৃদ্ধি ভাত-মাছ বা অর্থসম্পদে বাড়ে না। সে জন্য অপরিহার্য হলো কোর’আনের জ্ঞান। খাদ্য-পানীয় ছাড়া যেমন দেহ পুষ্টি পায় না, তেমনি কোর’আনের জ্ঞান ছাড়া পুষ্টি পায় না ঈমান। নবীজী (সাঃ) কোর’আনী জ্ঞানের মহাজোয়ার আনতে পেরেছিলেন বলেই সে সময় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ঈমানদার গড়তে পেরেছিলেন। মহা আল্লাহতায়ালা তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের মাঝেও গর্ব করতেন। অথচ আজ সে কোর’আনী জ্ঞান তলানীতে ঠেকেছে। ফলে হাজার হাজর স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পরও মুসলিমদের মাঝে ঈমাদারি বাড়ছে না। বরং দ্রুত বাড়ছে বেঈমানী।  

মুসলিম উম্মাহর মাঝে দুর্বৃত্তি, বিভক্তি ও পরাজয় দেখে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, ঈমান বৃদ্ধির কাজটি হয়নি। এর অর্থ, যথার্থ ভাবে হয়নি কোর’আনী জ্ঞানার্জনের কাজ। অভাব এখানে লোকবল, অর্থবল বা অস্ত্রবলের নয়, বরং প্রকৃত ঈমানদারের। সভ্য রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজ নির্মিত হয় সভ্য মানব নির্মাণের মধ্য দিয়ে। উন্নত রাস্তাঘাট বা কলকারখানার কারণে নয়। তাই রাষ্ট্রের বুকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগটি রাস্তাঘাট বা কলকারখানার নির্মাণ নয়, বরং কোর’আনী জ্ঞানের বিতরণ। একমাত্র তখনই সম্ভব হয় সভ্য ও ঈমানদাররূপে বেড়ে উঠার কাজটি। মানব ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটির জন্যই মহান আল্লাহতায়ালা নবী পাঠিয়েছেন এবং পবিত্র কোর’আন নাযিল করেছেন। মানব তার নিজ জ্ঞানে রাস্তাঘাট, কলকারখানা ও মারণাস্ত্রও নির্মাণ পারে। কিন্তু নিজে গড়ে উঠতে পারে না সভ্য মানব ও ঈমানদার রূপে। সে অসম্ভব কাজটি সমাধা করতেই ফেরেশতা মারফত পবিত্র কোর’আনের আগমন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়ে উঠেছে সে জ্ঞানের বলেই। তাই পবিত্র কোর’আন থেকে জ্ঞনার্জনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ ভূবনে দ্বিতীয়টি নাই। অথচ সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটিই গুরুত্ব হারিয়েছে মুসলিম দেশগুলোতে। ফলে ঘিরে ধরেছে বহুমুখি ব্যর্থতা, পরাজয় ও অপমান। এবং এরচেয়েও ভয়ানক অপমান ও আযাব অপেক্ষা করছে আখেরাতে –যার প্রতিশ্রুতি বার বার শোনানো হয়েছে পবিত্র কোর’আনে।

 

৩. সমস্যাটি বাঁচার নিয়তে  

লক্ষ্য যদি হয় আল্লাহকে খুশি করা ও আখেরাত জান্নাত পাওয়া -তবে আল্লাহর যে কোন হুকুম-পালনই অতি সহজ হয়ে যায়। এমন কি আল্লাহর রাস্তায় বিপুল অর্থদান ও প্রাণদানও। তখন ব্যক্তির জীবন সৃষ্টি হয় মহা বিপ্লব। তখন সহজ হয়, কোর’আনী জ্ঞানার্জনের কাজে অর্থব্যয় ও সময়ব্যয়। মুসলিমদের জীবনে মূল সমস্যাটি এখানেই। অধিকাংশ মানুষ বাঁচে নিজেকে, নিজের পরিবার, দল বা নেতাকে খুশি করতে। ভ্রান্তিটি এখানে বাঁচার নিয়তে। অথচ নামায-রোযার ন্যায় নিয়েত থাকতে হয় ব্যক্তির বাঁচায়। নিয়েত থাকতে হয় প্রতিটি কর্মে। সে নিয়েতের মধ্যেই ধরা পড়ে ব্যক্তির ঈমান এবং নির্ধারিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তার মর্যাদা।

মুমিন কি জন্য বাঁচবে সে গুরুত্বপূর্ণ নিয়েতটি শিখিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। এবং সেটি পবিত্র কোর’আনে এসেছে এভাবে, “ক্বুল, ইন্নাস সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়া’ইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। -(সুরা আনয়াম, আয়াত ১৬২)” অর্থঃ “বল (হে মুহম্মদ), নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কোর’বানী, আমার বেঁচে থাকা ও আমার মৃত্যু –এসব কিছুই আল্লাহ রাব্বিল আলামীনের জন্য অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছা পূরণে।” ঈমানদারের প্রতি মুহুর্তের বাঁচাটি মূলতঃ এ পবিত্র নিয়েত পূরণে। জায়নামাযে দাঁড়িয়ে অন্য কাজ করা যায় না, নামাযের পুরা সময়টি দিতে হয় আল্লাহর উদ্দেশ্যে। তেমনি যে নিয়েতটি নিয়ে ঈমানদারের বাঁচা, সেখানেও কাফের, জালেম, ফাসেক তথা ইসলামের শত্রুপক্ষের কোন অংশদারিত্ব নাই, কোনরূপ দখলদারিও না্ই। তাই ঈমানদার ব্যক্তি সেক্যুলার রাজনীতির সৈনিক হয় না। গোত্র, দল বা নেতার নামে যুদ্ধও করে না। বরং তাঁর সমগ্র সামর্থ্য ব্যয় হয় মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাপূরণে। এরূপ নিয়েত নিয়ে বাঁচাতে ব্যক্তির সমগ্র বাঁচাটিই ইবাদতে পরিণত হয়। এমন বাঁচার মাঝে গুরুত্ব পায় না মুসলিমের ঐক্য, শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের বিজয়ের বিষয়টি। ব্যক্তির এভাবে বাঁচা্টি মর্যাদা বাড়ায় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে। এবং পরকালে জান্নাতে নিয়ে পৌঁছায়।   

মুসলিমদের মূল সমস্যাটি এই নিয়তেই। ক’জন বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত নিয়েতটি নিয়ে? বরং অধীকাংশের বাঁচাটি হয় নিজের ইচ্ছা পূরণে; অথবা নিজ দেশ, নিজ ভাষা, নিজ গোত্র ও নিজ দলের স্বার্থ পূরণে। সেটি যেমন রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে, তেমনি যুদ্ধবিগ্রহে। আল্লাহর উদ্দেশ্যে বাঁচা-মরা ও যুদ্ধবিগ্রহটি গণ্য হয় সাম্প্রদায়িকতা বা মৌলবাদী চরমপন্থা রূপে। দেশ, ভাষা, গোত্র ও দলের স্বার্থ পূরণে এরা জোট বাঁধে ইসলামের দুষমন কাফেরদের সাথে। এভাবেই নিজের সকল সামর্থ্য দিয়ে জাহান্নামের পথে দৌড়ানোটিকে তারা অতি সহজ করে নেয়।

 

৪. উৎসব বিভক্তি নিয়ে

নামায়-রোযা যেমন ফরজ প্রতিটি ব্যক্তির উপর, তেমনি ফরজ হলো মুসলিম উম্মাহর মাঝে একতা গড়ার কাজটি। নামায়-রোযায় ক্বাজা আছে, কিন্তু ক্বাজা নেই এ ফরজ পালনে। কে কোন দলের বা ভাষার –রোজ হাশরের বিচার দিনে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। বরং হিসাব দিতে হবে বিভক্ত মুসলিম উম্মাহকে একতাবদ্ধ করার কাজে আদৌ কোন ভূমিকা ছিল কিনা -সেটি। এবং কি ভূমিকা ছিল আল্লাহর আইন তথা শরিয়তকে আল্লাহর ভূমিতে বিজয়ী করায়? মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানী ও পরাজয়ের মূল কারণটি লোকবল বা অর্থবলের কমতি নয়। বরং সেটি হলো ৫৭টি দেশ ও শত শত দলের নামে মুসলিম বিভক্তি। এ ভয়ানক পাপের কাজটি শুধু হালাল কর্ম নয়, উৎসবের কারণে পরিণত হয়েছে। কথা হলো, মুসলিম মানচিত্রের বিভক্তির দিনগুলিকে বিজয় দিবস রূপে উৎসব করা কি কোন ঈমানদারের কাজ হতে পারে? তা নিয়ে তো উৎসব হবে কাফেরদের রাজধানীতে –যেমন একাত্তরের বিজয় নিয়ে উৎসব হয় দিল্লিতে। এরূপ বিভক্তি নিয়ে তো বরং মাতম হওয়া উচিত।

মহান আল্লাহতায়ালা তো চান মুসলিম উম্মাহর মাঝে সীসাঢালা প্রাচীরসম একতা। তাই যারা মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে চান তারা কি খুশি হতে পারে মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি নিয়ে? নামাযের কাতারে নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা অঞ্চলের মানুষ যেমন একত্রে দাঁড়ায় তেমনি তাদের একত্রে বসবাস করতে হয় অভিন্ন মুসলিম ভূমির মানচিত্রের মাঝে। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাদের আমলে তো সেটিই হয়েছে। নামাযের কাতার ভাঙ্গা যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো মুসলিম রাষ্ট্রের মানচিত্র ভাঙ্গা। একাজে একজন কাফের খুশি হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত ঈমানদার নয়। বেঈমানী শুধু মিথ্যাচর্চা, চুরি-ডাকাতি ও নানারূপ দুর্বৃত্তির মাঝেই ধরা পড়ে না, ধরা পড়ে ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে বিভক্ত মানচিত্র গড়ার মাঝে। সারা জীবন নামায-রোযা ও বার বার হজ্ব-উমরাহ করে কি সে বেঈমানী ঢাকা যায়? মুসলিমদের আজকের দুরাবস্থার কারণ তো এই ভয়াবহ বেঈমানি। এ বেঈমানি আজ জাতির অহংকারে পরিণত হয়েছে।    

একতা মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রচুর রহমত বয়ে আনে। এবং বিভক্তি আনে প্রতিশ্রুত আযাব। তাই মানচিত্র ভেঙ্গে মুসলিম দেশগুলি যতই ছোট হয়েছে, ততই বেড়েছে আযাব। ভূগোল ছোট করলে শক্তি বাড়েনা, বরং তা ভয়ানক ভাবে কমে যায়। মুসলিমগণ শক্তিতে তখনই অপ্রতিরোধ্য ছিল এবং সে সাথে ইজ্জতের অধিকারী ছিল যখন তাদের একটি মাত্র রাষ্ট্র ছিল এবং ছিল না ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে কোন দলাদলি। দেশ ও দলের সংখ্যা যখন থেকে বাড়তে শুরু করেছে তখন থেকেই দ্রুত কমতে শুরু করেছে তাদের শক্তি। এবং দ্রুত কমতে শুরু করেছে ইজ্জত ও নিরাপত্তা। কথা হলো, এ মৌলিক বিষয়গুলি বোঝার জন্য কি স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার প্রয়োজন পড়ে? ইসলামের গৌরব যুগে ভেড়ার রাখালগণও সেটি বুঝতো। তার কারণ, তাদের ছিল কোর’আনের জ্ঞান। সে জ্ঞানের বলে তারা বুঝতেো, মুসলিম জীবনে অতি পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো মুসলিম উম্মাহকে বিভক্তি থেকে বাঁচানো। এবং তেমন এক চেতনার কারণেই তাদের কাছে পবিত্র জিহাদ গণ্য হতো গোত্র, ভাষা, অঞ্চল ও বর্ণের নামে গড়ে উঠা বিভক্তি ও বিভেদের দেয়ালগুলি ভাঙ্গা।  ১৪.০৩.২০২০