মেঠো আদালত যখন উচ্চ-আদালতে

আওয়ামী নৃশংসতা ও অধিকৃত আদালত  

দেশে সরকারি আদালত থাকতে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী  সংগঠনগুলো আদালত বসিয়েছিল উম্মুক্ত ময়দানে। বিচারক রূপে হাজির করেছিল তাদের দলীয় নেতা-কর্মী ও তাদের রাজনীতির হাজার হাজার সমর্থকদের। লক্ষ্য ছিল, একাত্তরে যেসব আলেম-উলামা ও ইসলামপন্থি নেতাকর্মী পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তাদেরকে ফাঁসিতে চড়িয়ে হত্যা করা। তাদেরকে বিরুদ্ধে হ্ত্যা বা খুনের নেশাটি আওয়ামী বাকশালী চক্রের বহুদিনের। একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর বহুহাজার আলেম ও ইসলামী আন্দোলনের বহুহাজার নেতাকর্মীকে তারা খুন করিছিল কোররূপ বিচার না করেই। তখন নিরস্ত্র রাজাকারদের বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করাটি ছিল আওয়ামী ক্যাডারদের রীতি। ১৮ই ডিসেম্বর ঢাকা স্টেডিয়ামে হাত-পা বাঁধা কয়েকজন রাজাকারকে কাদের সিদ্দিকী যেভাবে বেয়োনেট দিয়ে হত্যা করে সে বীভৎস চিত্রটি বহুদেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল। সে খুনের চিত্রটি দেখে প্রখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানী ফালাচী লিখেছিলেন,“মুক্তিবাহিনী বেয়োনেট দিয়ে যেরূপ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা প্রত্যক্ষ করার পর এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলাম,এই ঘৃন্য নগরীতে আমি আর পা রাখবো না।” আওয়ামী বাকশালীরা নৃশংস ভাবে হত্যা করেছিল ভারতীয় হিন্দুদের আক্রমণ থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা বহুহাজার অবাঙালীকেও।অবাঙালীদের ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত করে তাদেরকে রাস্তায় নামানো হয়।

একাত্তরে শাপলা চত্বর পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশের প্রতিটি নগরবন্দর। বহু স্থানে আলেমদের ছিন্ন মাথা নিয়ে আওয়ামী লীগের ক্যাডার ও তাদের সেক্যুলার মিত্রগণ ফুটবলও খেলেছে।বাংলার মাটিতে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধ তো ছিল সে হত্যাকান্ডগুলো। কিন্তু সে অপরাধের বিচার আজও হয়নি।শাপলা চত্বরে গণহত্যার পর শেখ হাসিনা বলেছে সেখানে কোন মানুষ খুন হয়নি।লাশগোপন ও রাজপথে রক্ত ধোয়ার পর এখন গোপন করা হচ্ছে তাদের বর্বর কর্মগুলো। সুকৌশলে গোপন করেছে তাদের একাত্তরের বর্বরতাগুলো।বরং নিজেদের ভয়ংকর অপরাধগুলো ঢাকতে তারা রটিয়েছে তিরিশ লাখ বাঙালী হত্যার কিচ্ছা। তারপরও মহান আল্লাহর মেহেরবানিতে বহুআলেম ও ইসলামি দলের বহু নেতাকর্মী সে যাত্রায় বেঁচে যায়।কিন্তু তাদের সেই বেঁচে যাওয়াটি ভারতপন্থি আওয়ামী বাকশালি চক্র ও তাদের সেক্যুলারিস্ট ও সোসালিস্ট মিত্রদের কাছে অসহ্য।তাই বেঁচে যাওয়াদের নির্মূলে বহু বছর আগে থেকেই তারা নির্মূল কমিটি বানিয়েছে। নির্মূলের তেমন একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখেই নব্বইয়ের দশকে ঢাকার সহরোওয়ার্দি উদ্দানে তারা মেঠো আদালতও বসিয়েছে। সে আদালতে বহু ইসলামপন্থি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায়ও দিয়েছে।কিন্তু সে রায় বাস্তবায়নের ক্ষমতা সে মেঠো আদালতের ছিল না। ফলে সে বাসনা-পূরণও হয়নি। সে রায় বাস্তবায়নে জন্য জরুরী ছিল বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা। সে দখলদারিটি প্রতিষ্ঠা পায় ২০০৮ সালে নির্বাচনে, এবং সেটি  আওয়ামী বাকশালিদের বিজয়ের পর। আজ বাংলাদেশের উচ্চ আদালত মুলত তাদের হাতেই অধিকৃত।ফলে যে রায় সহরোয়ার্দি উদ্দানের মেঠো আদালতে ঘোষিত হয়েছিল বা ঘোষিত হয়েছে শাহবাগের মঞ্চ থেকেই তাই এখন ঘোষিত হচ্ছে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের পক্ষ থেকে। পার্থক্য হলো, বিচারের নামে সরকারি খরচে একটি প্রহসন ঘটানো হচ্ছে।  

কোন মুসলিম দেশে শুধু মসজিদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করলে ইসলাম বাঁচে না। ইসলাম বাঁচাতে হলে দেশের শাসন ক্ষমতা ও আদালতের উপর ইসলামের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করতে হয়। প্রতিষ্ঠা করতে হয় আইনে শাসন এবং প্রণয়োন করতে হয় কোরআনে বর্নিত মহান আল্লাহর শরিয়তি আইন। নবীজী (সাঃ) সেটি নিজে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। সাহাবায়ে কেরাম নবীজী (সাঃ)র সে প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিকে জীবিত রেখেছেন। প্রতি যুগের ও প্রতিস্থানের মুসলমানদের উপর সেটি বাধ্যতামূলক। নইলে তার মুসলমান থাকাটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।নেমে আসে আযাব। মহান আল্লাহ অনন্ত অসীম কালেও পুরোন বা সেকেলে হন না,তেমনি পুরনো বা সেকেলে হয় না তাঁর দেয়া পবিত্র আইন।। বহু লক্ষ বা বহু কোটি বছরও সেটি থাকবে শাশ্বত ও সতেজ। তাই মুসলমান হওয়ার অর্থ পবিত্র কোরআনে ঘোষিত সে আইনের নিছক তেলাওয়াত নয়,বরং সে আইনের পূর্ণপ্রয়োগ।সে আইনর অনুসরণ তাই পশ্চাদপদতা নয়।বরং সেটি হলো শ্বাশত আধুনিকতা। জান্নাতের পথে সেটিই হলো প্রকৃত পথপরিক্রমা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে “আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচার-আচার করে না তারা কাফের, …তারা জালেম, … তারা ফাসেক। -(সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪-৪৭)। কিন্তু বাংলাদেশের যে আইন অনুসারে বিচার হয় সেটি আল্লাহর নাযিলকৃত শরিয়তী আইন নয়,বরং ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত কফুরি আইন।। এ আইনে জ্বিনাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। অপরাধ নয় মদ্যপান, সূদ খাওয়া বা মিথ্যা বলার ন্যায় বহু জঘন্য অপরাধ। বাংলাদেশের মুসলমানদের এখানেই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।খাদ্য,শিল্প বা বিজ্ঞানে ব্যর্থতা নিয়ে আল্লাহর দরবারে প্রশ্ন উঠবে না,কিন্তু প্রশ্ন হবে শরিয়তে প্রয়োগে এ ব্যর্থতা জন্য।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর ঔপনিবেশিক ইংরেজদের হাতে শুধু বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার ন্যায় বিশাল মুসলিম শাসিত ভূমিই অধিকৃত হয়নি,বরং অধিকৃত হয়েছিল দেশের শরিয়তভিত্তিক আদালতও। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের সে সামরিক অধিকৃতি থেকে রাষ্ট্র মূক্তি পেলেও মুক্তি পায়নি দেশের আদালত। দেশের আদালত এখনো পুরাপুরি অধিকৃত ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থা ও তাদের মানসিক গোলামদের হাতে।আদালতে বিচারও হয় ব্রিটিশের আইন অনুসারে।আল্লাহর আইন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশে আস্তাকুরে গিয়ে পড়েছে।আদালতের পাশাপাশি দেশের রাজনীতি,প্রশাসন,সামরিক ছাউনিগুলিও এখন অধিকৃত ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে।আ।ল্লাহর শরিয়তি আইনকে পরাজিত রাখার মধ্যেই তাদের আনন্দ।সেটিই তাদের রাজনীতি। বরং তাদের প্রচন্ড উৎসব ইসলামপন্থিদের ফাঁসি দেয়ার মধ্যে।

ইসলামের বিপক্ষ শক্তির শত্রুতাটি যে শুধু জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে –তা নয়। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে যে শত শত মানুষকে নিহত ও আহত করা হলো তার কি জামায়াত-শিবির কর্মী? ইসলামের বিপক্ষ শক্তির কাছে হত্যাযোগ্য হওয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামের নেতা বা কর্মী হওয়াটি জরুরী নয়। গায়ে ইসলামি লেবাস এবং ইসলামের প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকার থাকাটিই তাদের কাছে হত্যাযোগ্য হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ।বাংলাদেশের ইসলামের বিপক্ষ শক্তির কাছে এটি অজানা নয় যে,একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টি ছিল একমাত্র সেক্যুলারিস্ট, সোসালিস্ট ও ন্যাশনালিস্টদের প্রকল্প। তার সাথে দেশের ইসলামপন্থি কোন দল সংশ্লিষ্ট ছিল না। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বহু ইসলামি দল ছিল,বহুহাজার আলেমও ছিল। কিন্তু চোখে পড়ার মত বিষয়টি হলো,কোন ইসলামি দল ও কোন আলেমই পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টিকে সমর্থন করেনি। কোন মুসলিম দেশও তাদের সেক্যুলারিস্টদের সে দেশভাঙ্গার কাঝে সমর্থন করেনি।আরো লক্ষণীয় হলো,স্বাধীন দেশ রূপে সে সময় কোন মুসলিম দেশই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি।স্বীকৃতি দিয়েছে ভারত,রাশিয়া ও ভূটানের ন্যায় কিছু অমুসলিম দেশ। আলেমগণ তখন দলমত নির্বিশেষে ফতোয়া দিয়েছেন,মুসলিম দেশ ভাঙ্গা কবিরা গুনাহ। ফলে সে কবিরা গুনাহর ন্যায় হারাম কাজে অংশ নেয়া তাদের কাছে অচিন্তনীয় হয়ে পড়ে।তাদের কেউ তাই একাত্তরে ভারতে যাই নাই,ভারতের অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নামেনি। এসবই একাত্তরে ইতিহাস।

বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্ট, সোসালিস্ট ও ন্যাশনালিস্টদের স্মৃতিতে ইসলামপন্থিদের সে ভূমিকার কথাটি এখনো বেঁচে আছে। ফলে তাদের দৃষ্টিতে ইসলামপন্থি হওয়ার অর্থই হলো পাকিস্তানপন্থি রাজাকার হওয়া। সে ধারণা নিয়েই জামায়াতের ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এরূপ বহু হাজার আলেমকে একাত্তরে দেশের ভারতপন্থি সেক্যুলারিস্ট,সোসালিস্ট ও ন্যাশনালিস্টগণ হত্যা করে। এবং সেরূপ হত্যাকান্ড আজও  যেরূপ ঘটাতে চায়, তেমনি ভবিষ্যতেও ঘটাতে চায়।ইসলামের বিরুদ্ধে এমন একটি লাগাতর যুদ্ধাবস্থাকে তারা বলে একাত্তরের চেতনা।তেমন একটি চেতনা বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের মাঝে বেঁচে থাকার কারণে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে কে জামায়াত বা শিবির কর্মী,আর কে হেফাজতে ইসলামের কর্মী -তা নিয়ে তারা কোনরূপ বাছবিচার করে না।

খেলোয়াড় সবাই অভিন্ন টিমের

আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসীর রায় ঘোষনা করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি মুজাম্মিল হোসেন। সাথে আরো যে চারজন বিচারপতি ছিলেন তারা হলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা,এমএ ওহাব মিয়া,সাইয়েদ মাহমুদ হোসেন এবং সামসুদ্দিন চৌধুরি মানিক। এদের মধ্যে একজন বিচারক ফাঁসির রায়ের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। প্রশ্ন হলো, যারা ফাঁসির রায় দিল তাদের পরিচয়টি বিচারক রূপে হলেও ইসলামপন্থিদের যারা রাজপথে পিটিয়ে বা গুলি করে হত্যা করে তাদের বিচারবোধ থেকে কি আদৌ ভিন্নতর? এটি আর কোন গোপন বিষয় নয় যে, আওয়ামী লীগ প্রশাসন,বিচার বিভাগ,সেনাবাহিনী,পুলিশ বাহিনী ও র‌্যাবসহ সরকারের প্রতিটি বিভাগই নিজেদের দলীয় লোক দ্বারা ঢেলে সাজিয়েছে।ফলে যে যেখানে আছে সবাই আওয়ামী লীগের পক্ষে খেলছে। প্রতিটি স্বৈরাচারি সরকারের এটিই রীতি। তাই সেটি যেমন হিটলার করেছিল,তেমনি নমরুদ ফিরাউন,হালাকু-চেঙ্গিজও করেছিল।ফলে তাদের হাতে সে সময় যে লক্ষ লক্ষ মানুষ খুন হতো তার একজনকেও বর্বর শাসকদের নিজ হাতে খুন করতে হয়নি। তাদের অনুগত পুলিশ বাহিনী,সেনাবাহিনী ও আদালতের বিচারকগণই সে কাজটি অতি সুচারু ভাবে সমাধা করতো। বাংলাদেশেও তো সেটিই হচ্ছে। তাই বাংলাদেশে ইসলামপন্থিগণ খুন হচ্ছে শুধু আওয়ামী লীগ,ছাত্র লীগ ও যুবলীগের গুন্ডাদের হাতে নয়,খুন হচ্ছে সেনাবাহিনী,বিজিবী,র‌্যাব ও পুলিশের হাতেও। এমন এক পরিস্থিতে ইসলামপন্থিগণ খুন হবে বিচারপতিদের রায়ে -তাতেই বা বিস্ময়ের কি আছে? শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের হাজার হাজার কর্মীকে হতাহত করার কাজে তাই আওয়ামী লীগ,ছাত্র লীগ ও যুবলীগের গুন্ডাদের বন্দুক হাতে মাঠে নামতে হয়নি। সেখানে কোন বন্যপশুর হামলাও হয়নি। বরং গণহত্যার সে কাজটি অতি দক্ষতার সাথে সুচারু ভাবে সম্পাদন করেছে সেনাবাহিনী,বিজিবী,র‌্যাব ও পুলিশের লোকেরা।এখন এটি প্রমাণিত যে,পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবীর ন্যায় আদালতের বিচারকগণও সে অভিন্ন টিমেরই খেলোয়াড়। এবং সে টিমটি খোদ আওয়ামী লীগের। ছাত্রলীগের ক্যাডারগণ বিশ্বজিতের খুনে যেরূপ নৃশংস ছিল,পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবী সদস্যগণ কি শাপলা চত্বরের গণহত্যায় কম নৃশংস ছিল?

ফিরাউনের দরবারে তিনজন যাদুকর এসেছিল হযরত মুসা (সাঃ)র সাথে প্রতিযোগিতা দিতে। কিন্তু তারা প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে বুঝতে পারে হযরত মুসা (সাঃ) আল্লাহর সত্যিকার নবী। তারা তিনজনই সাথে সাথে ঈমান আনে ও মুসলমান হয়ে যায়। আর সেটিই ছিল ফিরাউনের কাছে মৃত্যুদন্ড পাওয়ার মত অপরাধ। সে অপরাধে তিন নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফিরাউন নৃশংস ভাবে হত্যা করে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে গ্যাস চেম্বারে ডুকিয়ে হত্যা করে হিটলার। তাদেরও কোন অপরাধ করার প্রয়োজন পরেনি। তাদের গ্যাসচেম্বারে পাঠানোর জন্য তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতীক বিশ্বাসই হিটলারের কাছে যথেষ্ট ছিল। হিটলারকে তাদের কাউকে নিজ হাতে খুন করতে হয়নি।বরং সে কাজের জন্য হাজার হাজার খুনি তার সেনাবাহিনী,পুলিশ বাহিনী,বিচারকবাহিনী,দলীয় কর্মীবাহিনীতে সবসময় প্রস্তুত ছিল। ফুটবলের টিমের সব খেলোয়াড়ই একই লক্ষে খেলে। সেটিকে বলা হয় টিমস্পিরিট। সেরূপ টিমস্পিরিট নিয়ে কাজ করে স্বৈরাচারি শাসকদলের কর্মীরা। তেমনি শেখ হাসিনাও তার দলের কর্মীদের শুধু রাজপথে লগি বৈঠা ও অস্ত্র হাতে মোতায়েন করেনি।প্রশাসন,বিচারব্যবস্থা,পুলিশ,সেনাবাহিনীসহ সরকারের নানা স্তরে ও নানা বিভাগে বসিয়েছে।তারা একই লক্ষ নিয়ে কাজও করছে।তাই যারা হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হাজার হাজার মানুষের রক্তে শাপলা চত্বরকে লালে লাল করলো তাদের একজনকে আওয়ামী লীগ,ছাত্রলীগ বা যুব লীগ থেকে আসতে হয়নি।এসেছিল আর্মি, পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবী থেকে। সে রিপোর্ট এসেছে দৈনিক যুগান্তরে। ১২ই মে তারিখে দৈনিক যুগান্তর রিপোর্ট করে,পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবীর ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন এ হামলায় অংশ নিয়েছিল। হামলাকারিদের মধ্যে ১৩০০ জন এসেছিল র‌্যাব থেকে। ৫,৭১২ জন এসেছিল পুলিশ বাহিনী থেকে এবং ৫৭৬ জন এসেছিল বিজিবী থেকে।

ন্যায় বিচারে সামর্থ্য কতটুকু?

আওয়ামী টিমের সদস্যদের মুখের ভাষা ও সুর সর্বত্র একই। তাই যে মিথ্যাচারটি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ দলীয় অফিসে বসে বা জনসভায় উচ্চারন করে, সেটি তাদের দলীয় ক্যাডারগণ আদালতের বিচারক রূপেও করে। যেমন মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে রায়ে বিচারকগণ তাদের ১১২ পৃষ্ঠার রায়ের তৃতীয় পৃষ্ঠায় লিখেছেন একাত্তরে তিরিশ লাখ মানুষ হত্যা ও চার লাখ নারী ধর্ষিতা হওয়ার কথা। তাদের বিচারবোধ ও মিথ্যাচার যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের বস্তির গুন্ডা বা খুনিদের থেকে আদৌও ভিন্নতর নয় -এ হলো তার নমুনা। অথচ তিরিশ লাখ নিহত ও ৪ লাখ নারীর ধর্ষণের মিথ্যাটি যে ভয়ানক মিথ্যা সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন? তিরিশ লাখের অর্থ তিন মিলিয়ন। একাত্তরে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। যে কোন স্কুল ছাত্রও হিসাব করে বের করতে পারে,সাড়ে ৭ কোটির (৭৫ মিলিয়ন)মাঝে তিরিশ লাখ (তিন মিলিয়ন) মানুষের মৃত্যু হলে প্রতি ২৫ জনের মাঝে একজনকে মারা যেতে হয়। যে গ্রামে ১ হাজার মানুষের বাস সে গ্রামে মারা যেতে হয় ৪০ জনকে। ঘটনাক্রমে সে গ্রামে সেনাবাহিনীর প্রবেশ না ঘটলে এবং তাদের হাতে কেউ মারা না গেলে পরবর্তী গ্রামটি যদি হয় ১ হাজার মানুষের তবে সেখান থেকে মারা যেতে হবে কমপক্ষে ৮০ জনকে। যে থানায় ১ লাখ মানুষের বাস সেখানে মারা যেতে হবে ৪ হাজার মানুষকে। প্রতি থানায় ও প্রতি গ্রামে মৃত্যুর সংখ্যা এ হারে না হলে ৩০ লাখের সংখ্যা পূরণ হবে না। তাছাড়া ৯ মাসে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করতে হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রতিদিন গড়ে ১১,১১১ জনকে হত্যা করতে হয়। সে সংখ্যাটি কোন একটি দিন পূরণ করতে ব্যর্থ হলে পরের দিন বেশী করে হত্যা করে তা পূরণ করতে হতো। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাক-বাহিনীর প্রকৃত সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৫  হাজার। -(সূত্রঃ জেনারেল নিয়াজী রচিত বিট্রায়াল অব ইস্ট পাকিস্তান নামক বই,২০০১)।যুদ্ধবন্ধী রূপে যেসব পাকিস্তানীদের ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের মধ্যে অনেকে ছিল বেসামরিক অবাঙালী ও তাদের পরিবারের সদস্য। প্রশ্ন হলো,৪৫ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যের পক্ষে কি সম্ভব ছিল বিল-হাওর,নদী-নালা,দ্বীপ ও চরাভূমিতে পরিপূর্ণ একটি দেশের প্রায় ৭০ হাজার গ্রামে পৌছানো? প্রায় ৭০ হাজার গ্রামের মাঝে ১০ হাজার গ্রামেও কি সেনা বাহিনী পৌঁছতে পেরেছে? প্রতিটি গ্রাম দূরে থাক প্রতিটি ইউনিয়নেও কি তারা যেতে পেরেছিল? অধিকাংশ গ্রামে তখন গাড়ী চলার মত রাস্তা ছিল না।অধিকাংশ গ্রামের অবস্থান নদীর পাড়েও নয় যে তারা লঞ্চ বা নৌকা যোগে সেখানে পৌঁছতে পারতো। ফলে তিরিশ লাখ নিহতের হিসাব মিটাতে হলে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা পড়তে হয় জেলা ও উপজেলা শহরে। কিন্তু কোন জেলা বা উপজেলা শহরে ১০ হাজার বাঙালী কি মারা গেছে? তাই মুজিবের তিরিশ লাখ যে গাঁজাখোরী মিথ্যা সেটি প্রমান করা কি এতই কঠিন?

প্রশ্ন বিচারকদের রায়ে ৪ লাখ ধর্ষণের সংখ্যা নিয়েও। তাদের দেয়া এ তথ্যটিও যে কতটা মিথ্যাপূর্ণ সেটি কি প্রমাণ করা এতই কঠিন? একাত্তরে বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে গড় সদ্স্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪জন। ফলে সাড়ে সাত কোটি মানুষের দেশে প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার পরিবার ছিল।এদের মাঝে ৪ লাখ ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে গড়ে প্রতি ৪৭টি পরিবারের মাঝে অন্তত একটি পরিবারে ধর্ষিতা মহিলা থাকার কথা।যে গ্রামে ২০০টি পরিবারে বাস সে গ্রামে কমপক্ষে ৪টি পরিবারে ধর্ষিতা নারী থাকতে হবে। সে গ্রামে আর্মির প্রবেশ না ঘটলে পাশের গ্রাম থেকে কমপক্ষে ৮ টি পরিবারে ধর্ষিতা নারী থাকতে হবে, নইলে ৪ লাখ ধর্ষিতার সংখ্যা পুরণ হবে না। একাত্তরে বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই গ্রামে বাস করতো। আর সেনা বাহিনীর পক্ষে প্রায় ৭০ হাজার গ্রামের মাঝে ১০ হাজার গ্রামেও কি পৌছা সম্ভব হয়েছে? ফলে সহজেই ধারণা করা যায়, দেশের শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ পরিবারের জীবনের পাক বাহিনীর সাক্ষাৎ মেলেনি। তাই ৪ লাখ ধর্ষণের ঘটনা ঘটতে হলে সেগুলো বেশী বেশী হতে হবে জেলা ও উপজেলা শহরে বা সীমান্তবর্তি গ্রামগুলোতে –যেখানে সেনাবাহিনীর লোকদের অবস্থান ছিল বেশী।ফলে ধর্ষিতা পরিবারের সংখ্যা সেখানে প্রতি ৪৭য়ে একজন নয়, বরং অনেক বেশী হারে হওয়ার কথা।  প্রতি ১০ বা ২০টি পরিবারে কমপক্ষে একজন ধর্ষিতা নারী থাকার কথা। কিন্তু সেটি কি বিশ্বাসযোগ্য?

সুবিচার না করাই যাদের নীতি

ডাকাতপাড়ায় কোন ডাকাতের খুন বা ধর্ষণ নিয়ে বিচার হয় না। তাদের কাজ তো নিরপরাধ মানুষ হত্যা,তাদের সর্বস্ব লুট করা, বিচার করা নয়। ন্যায় বিচার তাদের দর্শনে নাই। তাই শাপলা চত্বরে যে এত নিরীহ মানুষ খুন হলো সে খুনের অপরাধে কি একজনকেও হাসিনার পুলিশ বাহিনী গ্রেফতার করেছে? কোনদিনও কি আদালতে এ গণহত্যার বিচার বসবে? মুজিব আমলে ৩০-৪০ হাজার মানুষ খুন হয়েছিল। কিন্তু শেখ মুজিব কি সে খুনের অপরাধিদের কাউকে কি আদালতে খাড়া করেছে? করিনি। নিজে বরং সিরাজ শিকদারের খুন নিয়ে পার্লামেন্টে কোথায় আজ  সিরাজ শিকদার বলে উল্লাস করেছে। হাসিনার সরকারেরও মূল কাজ হয়েছে তার দলের খুনিদের পরিচর্যা ও প্রতিরক্ষা দেয়া। তাই আওয়ামী লীগ,ছাত্রলীগ ও যুব লীগের কেউ খুন করলে বা ডাকাতি করলে তার বিচার হয় না। বিচারে যদি কারো শাস্তি হয়ে যায় তবে সরকারর মূল কাজ হয় তাদের মাফ করে দেয়া।এরূপ বহু খুনিকে দেশের আওয়ামী প্রেসিডেন্ট মাফ করে দিয়েছেন। কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে টেন্ডার নিয়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মাঝে বন্দুক যুদ্ধ হয় ও ২ জন খুনও হয়।খুনে আসামী ছিল সাইফুল আলম ওরফে মিলন নামের ছাত্রলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা। সরকারে তাকে জামিনে খালাস দিয়েছে। কদিন আগে যাত্রাবাড়িতে ৭-৮ জন খুনি এক গৃহে ঢুকে পিতামাতার সামনে তাদের একমাত্র পুত্রকে হত্যা করে। কিন্তু সে খুনের আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশের কোন তৎরতা নাই,কোন সফলতাও নাই। অথচ রাজপথে পুলিশের বিশাল ঢল নামে জামায়াত-শিবির বা বিএনপির মিছিল বের হলে। তাই পুলিশের কাজ হয়েছে স্রেফ হাসিনার সরকারকে প্রটেকশন দেয়া। খুনিদের ধরা নয়।

মুজিবের প্রধান অপরাধ

মানব চরিত্রের সবচেয়ে বড় বদগুণটি হলো তার মিথ্যাচারিতা।মিথ্যাচারিতা থেকেই জন্ম নেয় সকল প্রকার পাপ। নবীজী (সাঃ) তাই মিথাচারিতাকে সকল পাপের মা বলেছেন। মিথ্যাচারি মানুষকে মহান আল্লাহতায়ালা কখনো হেদায়েত দেননা। মহান আল্লাহর সে সর্বশ্রেষ্ঠ রহমতটুকু পেতে হলে মানুষকে তাই মিথ্যাবাদিতা ছাড়তে হয়। অপর দিকে সত্যবাদীতা থেকেই জন্ম নেয় সকল নেক কর্ম। মুসলমান হওয়ার জন্য তাই প্রাথমিক শর্তটি হলো সত্যবাদী হওয়া। শরিয়তের বিধান হলো কোন মিথ্যাবাদীকে আদালতের বিচারক দূরে থাক সাক্ষিও করা যাবে না। কারণ তাতে অসম্ভব হয় ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা। অপরদিকে শয়তান বেছে বেছে সমাজের মিথ্যাবাদীদের ঘাড়ে সওয়ার হয়। মিথ্যাচারিদেরকেই সে নিজের সৈনিক রূপে গড়ে তোলে। মানুষ জাতির সমগ্র ইতিহাসটি মূলত সত্য ও মিথ্যার লাগাতর দ্বন্দ। তাই কোন দেশে শয়তানের পক্ষের শক্তি যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পায় তখন তারা দেশবাসীকে মিথ্যাচারি করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। কারণ তাতে বিপন্ন হয় তাদের ঈমান রূপে বেড়ে উঠার সামর্থ।মিথ্যাচারি বৃদ্ধির সাথে বাড়ে শয়তানী শক্তির লোকবল।

মুজিবের বড় অপরাধ তাই এ নয় যে,সে ৩০-৪০ হাজার মানুষ খুন করেছিল বা দেশে গণতন্ত্র হত্যা করে বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করেছিল বা ভারতের গোলামী বা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ উপহার দিয়েছিল। বরং তার সবচেয়ে বড় অপরাধ সে দেশের মানুষকে মিথ্যাচারি বানানোর সর্বাত্মক ব্যবস্থা করেছিল। কারণ সে নিজে ছিল বাঙালীর সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মিথ্যাচারি। একাত্তরের তিরিশ লাখ নিহত এবং তিন লাখ বা চার লাখ নারী ধর্ষিতার মিথ্যাচারটি তারই রটানো। আর তার অনুসারীদের কাজ হয়েছে সে মিথ্যাচারকে সমগ্র দেশবাসীর মাঝে প্রতিষ্ঠা দেয়া। মুজিব আমল থেকেই দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও  সকল সরকারি মিডিয়া পরিণত হয়েছে মিথ্যুক তৈরী ও মিথ্যাছড়ানোর ইন্ডাস্ট্রিতে। মুজিব যে তিরিশ লাখের মিথ্যা উচ্চারন করেছিল এগুলির কাজ হয়েছে সে মিথ্যাকে বলবান করা। দেশ আজ  এমন বিবেকহীন মিথ্যুকদের হাতেই অধিকৃত। শুধু সাক্ষি রূপে নয়,বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক পদেও তারা আজ  অধিষ্ঠিত।

মুজিব মিথ্যা বলাকে অপরাধ বা দোষের ভাবতো না।বরং সেটি ছিল তার রাজনীতির শিল্পকলা। মিথ্যাকে দোষের ভাবে না তার অনুসারিগণও। তাই আদালতে দাঁড়িয়ে তার অনুসারিরা মিথ্যা সাক্ষি দিতে দুপায়ে খাড়া। যে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ বা যুবলীগ কর্মীরা রাজপথে চাপাতি বা লগিবৈঠা নিয়ে নিরপরাধ মানুষ খুন করতে পারে এবং খুনের পর উৎসব করতে পারে তারা আদালতে দাঁড়িয়ে রাজনৈতীক বিরোধীদের বিরুদ্ধে স্বচোখে খুন করতে দেখেছি বা র্ষণ করতে দেখেছি -এরূপ মিথ্যা শিক্ষা দিবে তাতে কি আশ্চার্যের কিছু আছে? বিচারকদেরও কি সে সামর্থটুকু আছে যে তারা সে মিথ্যাসাক্ষিকে মিথ্যুক বলে সনাক্ত করবে এবং বিচারের নথি থেকে বিদায় দিবে? বরং তারা নিজেরাও তো সাক্ষিদের চেয়েও বহুগুণ বেশী মিথ্যা বক্তব্য দিয়েছে তাদের রায়ে। নইলে একাত্তরে তিরিশ লাখ খুন ও চার লাখ ধর্ষণের এত বড় বিশাল মিথ্যাটি বিচারের রায়ে লেখেন কি করে?

আদালতের নাম নিয়েও কি কম মিথ্যাচার? এটি কোন বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল? আর্ন্তজাতিক হতে হলে তাতে অন্য জাতির লোকদের উপস্থিতি থাকাটি জরুরী। তার একটি আন্তর্জাতিক মানও লাগে। বিচারক ও আইনজীবীদের কেউ কি বিদেশী। আইনও কি আন্তর্জাতিক? ধোকাবাজি আর কাকে বলে? বিদেশী ব্যারিস্টারগণ এ আদালতে আইনজীবী রূপে যোগ দিতে চেয়েছিল কিন্তু তাদের আসতে দেয়া হয়নি। আদালতের বিচারকগণদের উপর অর্পিত মূল দায়িত্বটি ছিল জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় শোনানো যা জনৈক বিচারক স্কাইপী সংলাপে তার বন্ধুর কাছে উল্লেখও করেছেন। এখন তো সে রায়ই শোনানো হচ্ছে। তাই বিচার যে নিরেট প্রহসন মুলক তা নিয়ে কি আদৌ কোন সন্দেহ আছে?

 

মেঠো আদালত বসছে কোর্ট ভবনে

আদালতের বিচারকগণ কোন অপরাধই নিজ চোখে দেখে না। বিচারে রায় প্রদানে সেটি শর্তও নয়। সাক্ষীর প্রদত্ত সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তারা যে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধেই রায় দিতে পারে।তাই কোন আসামীকে ফাঁসীতে ঝুলানোর জন্য খুনের ঘটনা না ঘটলেও চলে। বরং সে জন্য যা জরুরী তা হলো,এমন কয়েকজন মিথ্যুক সাক্ষী যারা আদালতে বলবে যে আমরা আসামীকে খুন করতে দেখেছি। বিচারের নামে ভয়ানক অবিচার তো এভাবেই হয়। বিচারে তো বেশী কিছু লাগে না।লাগে,অপরাধ কর্মটি যে আসামীর হাতে ঘটেছে তা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। সাক্ষী পেলে আসামীকে সহজেই ফাঁসিতে লটকানো যায়। বাংলাদেশে তো বহু মিথ্যা সাক্ষী ভাড়াতে পাওয়া যায়। অর্থ দিলে তারা আদালতে দাঁড়িযে শেখানো মিথ্যা বুলি তোতা পাখির ন্যায় অনর্গল বলবে দেশে কি তেমন মানুষ কম? অপর দিকে সরকার তো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে সাক্ষীদের মিথ্যা সাক্ষদানের সামর্থ বাড়ানোর কাজে।এক্ষেত্রে বিচারকদের জন্য যে যোগ্যতাটি অতি অপরিহার্য তা হলো প্রদত্ত মিথ্যা সাক্ষ্য থেকে সত্যকে সনাক্ত করার সামর্থ। কিন্তু সে যোগ্যতা কি বাংলাদেশের আদালতের বিচারকদের আছে? তারা তো তিরিশ লাখ নিহত আর চার লাখ ধর্ষনের ন্যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিথ্যাকেও মিথ্যা রূপে সনাক্ত করতে ব্যর্থ। ফলে আদালতে প্রদত্ত সুক্ষ মিথ্যাকে তারা সনাক্ত করবে কীরূপে? সে সামর্থ থাকলে কি তারা একাত্তরে তিরিশ লাখ নিহত ৪ লাখ ধর্ষিতার মিথ্যাটি তারা বিচারের রায়ে লিখতে পারতেন? আওয়ামী লীগের পক্ষে লাঠি ধরার সামর্থ তাদের যে বিস্তর সেটি তারা দেখিয়ে দিয়েছে।

জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে রায় তো দেয়া হচ্ছে রাজপথ থেকে। জনাব আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল যাবতজীবন কারাদন্ডের রায় শুনিয়েছিল। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ,ছাত্রলীগ ও তাদের মিত্রদের সে রায় পছন্দ হয়নি। তাই শাহবাগে লাগাতর মিটিং শুরু হলো এ দাবী নিয়ে যে তাকে অবশ্যই ফাঁসি দিতে হবে।সংসদ তো শাহবাগীদের দাবির সাথে সংহতি প্রকাশ করে আইন পাল্টালো। মামলাকে সরকার সুপ্রিম কোর্টে নিল। সুপ্রিম কোর্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারকদের রায়কে ভূল সাব্যস্ত করে সে রায়টিই দিল যে রায়ের দাবিটি শাহবাগের মঞ্চ থেকে তোলা হয়েছিল এবং ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে একই রূপ রায় ঘোষিত হয়েছিল সহরোয়ার্দি উদ্যানের মেঠো আদালত থেকে। দেশের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ মেটো আদালতের কাছে যে কতটা আত্মসমর্পিত এ হলো তার নজির।

আজ  যারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সাথে জড়িত তারাই নব্বইয়ের দশকে সহরোয়ার্দি উদ্দানে গণ-আদালতের নামে মেঠো আদালত বসিয়েছিল। তাদের কারণেই সহরোয়ার্দি উদ্দানের সে মেঠো আদালতটি এখন আর মাঠে নাই,সেটি এখন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ভবনে এসে বসেছে। ফলে শুধু আব্দুল কাদের মোল্লাকে নয়,আরো বহু নিরপরাধ মানুষকেই যে ফাঁসিতে লটকানোর ব্যবস্থা করা হবে তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? তখন রাজপথে দলীয় গুন্ডাদের দ্বারা মানুষ হত্যার প্রয়োজনটি কমবে। সে কাজটি বিচারকগণই করেবে। আওয়ামী বাকশালীরা তো সেটিই চায়। প্রশ্ন হলো,দেশের প্রশাসন ও আদালত ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হলে কি সুবিচার আশা করা যায়? আশা করা যায় না বলেই তো মহান আল্লাহতায়ালা আদালতের অঙ্গনে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের বিপক্ষ শক্তির নির্মূলকে অপরিহার্য করেছেন।নইলে মুসলমানের রাষ্ট্র ইসলামি রাষ্ট্র হয় না। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটি শুধু কিতাবেই থেকে যায়। দেশ তখন অবিচারপূর্ণ হয়ে উঠে। বাংলাদেশ তো তেমনই এক দেশ। ২০/০৯/২০১৩

 

 




এক বাকশালী বুদ্ধিজীবীর অসভ্য মানস ও রণহুংকার প্রসঙ্গ

এটি কি বুদ্ধিজীবী বা শিক্ষকের ভাষা?

হযরত আলী (রাঃ)র মহামূল্যবান বহু উক্তির মাঝে আরেকটি অতি মূল্যবান উক্তি হলোঃ “মানুষের ব্যক্তিত্ব তার জিহবাতে”। অর্থাৎ যখন সে জিহ্বা নড়ায় তখন প্রকাশ পায় তার ব্যক্তিত্ব । তাই  সভ্য বা অসভ্য মানুষের পরিচয়টি দেহের অবয়বে ও পোষাকপরিচ্ছদে ধরা পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিতেও নয়। ধরা পড়ে মুখের কথা ও লেখনিতে। লেখনির মধ্য দিয়েই কথা বলে ব্যক্তির চেতনা ও ঈমান। মানব ইতিহাসে ভয়ানক অপরাধগুলি শুধু মারণাস্ত্র দিয়ে হয়নি, হয়েছে মুখের ভাষা ও লেখনি দিয়ে। অপরদিকে কথা ও লেখনি দিয়েই সংঘটিত হয়েছে সত্যপ্রচার, সত্য-প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যার প্রতিরোধের ন্যায় বড় বড় মহান কাজ। জান্নাত লাভের মূল কাজটির শুরুও তো হয় মুখের কথা দিয়েই। সেটি মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূল ও তাঁর কিতাবের প্রতি বিশ্বাসভরা কালেমা পাঠ করে। তেমনি জাহান্নামে পৌঁছার জন্য জিহ্বার পাপই যথেষ্ট। দেহের এই ক্ষুদ্র অঙ্গ দিয়েই জঘন্য পাপীরা মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দেয়। আল্লাহতায়ালা, তাঁর রাসূল ও তাঁর দ্বীনকে অস্বীকার করা, অপমান করা বা গালী দেয়ার ন্যায় অপরাধে কি কোন মারাণাস্ত্র লাগে? মুখের কথা ও লেখনি তো সেজন্য যথেষ্ট। তাই রোজ হাশরের বিচার দিনে পাল্লায় তোলা হবে ব্যক্তির কথা ও লেখনিকেও। এমন কি সভ্যদেশের আদালতেও শুধু অস্ত্র ও অর্থের ব্যবহারটাই বিচারে আনা হয় না, বিচারে আনা হয় মুখের ভাষা ও লেখনির প্রয়োগকেও।

মিথ্যাচার ও অশ্রাব্য গালিগালাজ কখনোই চরিত্রের অলংকার নয়। সেটি বরং নিখুঁত পরিমাপ দেয় সে কতটা অসভ্য, ইতর ও অপরাধী। সকল অপরাধের শুরু হয় মিথ্যাচার ও গালিগালাজ দিয়ে। মানব ইতিহাসের বড় বড় বিপর্যয়ের কারণগুলি নিছক যুদ্ধবিগ্রহ, হত্যা, চুরি-ডাকাতি ও ব্যাভিচার নয়। বরং বহু বিপর্যেয়ের কারণ মিথ্যাচার। এবং সত্য-পরায়ন মানুষদের চরিত্র হনন। সত্যকে বেড়ে উঠা ও তার প্রতিষ্ঠাকে তো এভাবেই রুখা হয়। মহান নবীজী (সাঃ)র বিরুদ্ধে মক্কার কাফেরগণ তো সে দুষ্কর্মটিই বেশী বেশী করেছে। মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ এ মানুষটিকে তারা পাগল, যাদুকর, মিথ্যাচারি, সমাজের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারি বলে গালিগালাজ করেছে। আজকের কাফের ফাসেক ও মুনাফিকদেরও তো সেটাই রীতি। এরূপ মিথ্যাচারিদের কারণেই সামাজিক শান্তি লংঘিত হয় এবং সাধারণ মানুষও সত্যের সৈনিকদের বিরুদ্ধে সংহিস হয়ে উঠে। নবী-রাসূলের বিরুদ্ধে তো সেটিই ঘটেছে। নবীজী (সাঃ) এজন্যই মিথ্যাচারকে সকল পাপের মা বলেছেন। অস্ত্রে দেহ খুন হয়, আর মিথ্যাচারে খুন হয় চরিত্র। সেটি হয় কথা ও লেখনীর মধ্য দিয়ে। তাই রাষ্ট্রে শুধু চুরি-ডাকাতি, হত্যা ও ধর্ষণ রোধে আইন থাকলে চলে না, কঠোর আইন থাকতে হয় মিথ্যাচারির শাস্তি বিধানেও। মহান আল্লাহতায়ালার বিধানে এটি ভয়ানক অপরাধ। এজন্যই হত্যা, চুরি-ডাকাতি বা ব্যভিচারীর শাস্তির পাশাপাশি পবিত্র কোরআনে চরিত্র হননকারি মিথ্যাচারীর বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তি ঘোষিত হয়েছে।

 

মুন্তাসির মামুনের অপরাধ

সম্প্রতি এক গুরুতর অপরাধ করেছেন আওয়ামী ঘরানার প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী মুন্তাসির মামুন। তার একটি প্রবন্ধ গত ৩১ অক্টোবর তারিখে দৈনিক জনকন্ঠে ছাপা হয়েছে। মানসিক ভাবে তিনি যে কতটা অসুস্থ্য ও অপরাধী -সেটিই প্রকাশ পেয়েছে তার সে প্রবন্ধে। উক্ত নিবন্ধে বেরিয়ে এসেছে তার অপরাধী মনের বিষাক্ত আবর্জনা। গোখরা সাপের ন্যায় তার অসুস্থ্য মনটি কানায় কানায় বিষপূর্ণ। তবে সে বিষ শুধু ইসলাম ও বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে নয়, বিএনপিসহ সকল বিরোধী দলের বিরুদ্ধেও। উক্ত প্রবন্ধে তিনি জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের “পাকি জারজ” বলেছেন। এটি কি কোন সভ্য মানুষের ভাষা? কোন শিক্ষিত মানুষ কি এরূপ ভাষায় কথা বলে? এতো অতি অসভ্য ও ইতর মানুষের ভাষা। প্রশ্ন হলো এরূপ ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হয় কি করে?

অথচ এ সত্য কি অস্বীকারের উপায় আছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে পথঘাটে মানুষের লাশ তখনই বেশী বেশী পড়ে যখন দেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের হাতে যায়। সেটি যেমন মুজিবামলে দেখা গেছে, তেমনি হাসিনার আমলেও। মুজিবের রক্ষিবাহিনীর হাতে মারা গেছে ৩০—৪০ হাজারের বেশী নিরীহ মানুষ। শাপলা চত্বরের সমাবেশে হাসিনা সরকারের হাতে হতাহত হয়েছে বহুহাজার। র‌্যাব, পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হাতে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। বহুনেতা ইতিমধ্যে খুন হয়েছেন, গুম হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন। কিন্তু কোন হত্যার কি বিচার হয়েছে? হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধেও মুন্তাসির মামূনের দারুন ক্ষোভ। ক্ষোভের কারণ, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কথিত  অত্যাচারের  নাকি বিচার হয়নি। আরো অভিযোগ, শেখ হাসিনা কেন সরকার বিরোধীদের এখনো কেন নির্মূল করেনি। তার অভিযোগ, নির্মূলের সুযোগ ছিল, কিন্তু হাসিনা তা থেকে ফায়দা উঠায়নি। নিবদ্ধটিতে লিখেছেন,“দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা, শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড ছুড়ে হত্যার প্রচেষ্টা, রমনা পার্কে বোমা মেরে হত্যা কোনটার বিচারই আওয়ামী লীগ সম্পন্ন করতে পারেনি নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও অদক্ষতার জন্য।” জামায়াত ও বিএনপি নির্মূলে শেখ হাসিনার সরকারের সে ব্যর্থতার ক্ষোভ তাকে এতটা পাগল করে ফেলেছে যে ন্যূনতম ভদ্রতার ভাষাও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। তাদেরকে তিনি এতকাল রাজাকার বলতেন। এবার “পাকি জারজ” বলেছেন। বিরোধী দল নাকি রাজনীতি করছে শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতার কারণেই। তিনি লিখেছেন,“বেগম খালেদা জিয়া বাঙালীদের ওপর যে অত্যাচার চালিয়েছিলেন, যে যন্ত্রণা দিয়েছিলেন তার কোন সুরাহা আওয়ামী লীগ করেনি। করলে আজ জামায়াত-বিএনপি গণতন্ত্রবিরোধী “পাকি জারজ”দের রাজনীতি করতে পারত না।” এই হলো মুন্তাসির মামূনের ভাষা!

শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ব্যাভিচারের শাস্তি হলো পাথর মেরে হত্যা -যদি সে ব্যাভিচারি ব্যক্তিটি বিবাহিত হয়। অবিবাহিত হলে সে শাস্তিটি প্রকাশ্য জনসমাবেশে পিঠের উপর ১০০টি চাবুক। জ্বিনার শাস্তির ন্যায় কাউকে ব্যাভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তিও কঠোর। তাকেও জনতার সমাবেশে পিঠে ৮০টি চাবুক মারা হয়।এটিই মহান আল্লাহতায়ালার বিধান যা পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে। ইসলামি পরিভাষায় এটিই হলো হদুদ। এরূপ কঠোর শাস্তির কারণে রক্ষা পায় নিরাপরাধ মানুষের চরিত্র। মহা-অকল্যাণ এ বিধানের অবাধ্যতায়। সমাজে তখন আযাব নেমে আসে। আল্লাহর নাযিলকৃত এ বিধানকে যারা অনুসরণ করে না পবিত্র কোরআনে তাদেরকে কাফির, ফাসিক ও যালিম বলা হয়েছে। ঘোষিত হয়েছে “আল্লাহ যে বিধান দিয়েছেন তা দিয়ে যারা (বিচারের) হুকুম দেয় না তারাই কাফের।… তারাই যালিম। …তারাই ফাসিক বা দুর্বৃত্ত।–(সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪, ৪৫ ও ৪৭)। কোন প্রকৃত ঈমানদার কি মহান আল্লাহর এ সুস্পষ্ট কোরআনী হুকুমের অবাধ্য হতে পারে? হতে পারে কি তার শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠায় অমনযোগী?

মুন্তাসির মামূনের অপরাধ, বিএনপি ও জামায়াতের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীকে তিনি “পাকি জারজ” বলে তাদের পিতামাতার বিরুদ্ধে ব্যভিচারের গুরুতর মিথ্যা আরোপ করেছেন। উক্ত নিবন্ধে এ গালিটি একবার নয় কয়েকবার দিয়েছেন। জারজেরা তো ব্যভিচারের ফসল। মুন্তাসির মামূনের একার পক্ষে বিএনপি ও জামায়াতের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর জন্ম-ইতিহাস জানা সম্ভব নয়। ফলে না জেনে তিনি নিরেট মিথ্যাচার করেছেন। একজনের বিরুদ্ধে জ্বিনা বা ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ তুললে তাকে ৮০টি চাবুক খেতে হয়।এক্ষেত্রে মুন্তাসির মামূনের পাওনা তো বহুলক্ষ চাবুকের আঘাত। কারণ তিনি মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন বহুলক্ষ নিরাপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে। এরূপ ভয়ানক মিথ্যাচারির শাস্তি শুধু শরিয়তের বিধানই দেয় না, শাস্তি রয়েছে যে কোন সভ্য দেশের আইনেও। প্রশ্ন হলো এতবড় অপরাধী শাস্তি না পেলে বাংলাদেশের আদালতের আর কোন অপরাধীর শাস্তি দেয়ার অধিকার থাকে কি?

 

অপরিহার্য হলো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা

সভ্য মানুষ যেখানে যায় সেখানে গায়ের বস্ত্রটি পরিধান করে যায়। নইলে তাকে বিবস্ত্র বা নগ্ন বলা হয়। তেমনি ধর্মপরায়ন মানুষও সর্বত্র ধর্ম নিয়েই চলাফেরা করে। নইলে তাকে অধার্মিক বা পাপাচারি বলা হয়। মুসলমানের ধর্ম শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাত পালন নয়, শরিয়তের বিধান পালনও। তাই ইখতিয়ার বিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি যথন বাংলা বিজয় করেন তখন তিনি শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বিধানই আনেননি,এনেছিলেন শরিয়তের বিধানও।বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রথম দিন থেকেই আদালতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সে কোরআনি আইন। নবাব সিরাজুদ্দৌলার শাসন অবধি সে আইন বলবত ছিল। শরিয়তের বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য কোন দেশেই শতকরা শতভাগ মানুষের মুসলমান হওয়ার প্রয়োজন নেই। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে খোদ আরবেও মুসলমানদের সংখ্যা সে অবস্থায় পৌঁছেনি। সেরূপ অবস্থা উমাইয়া বা আব্বাসীয় আমলেও ছিল না। মুসলমানদের মাঝে বহু অমুসলমানও ছিল। তাই বলে কি শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বন্ধ ছিল? বাংলাদেশে অমুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ১০ জনের চেয়ে কম। অথচ মিশর, ইরাক, সিরিয়ার বহু মুসলিম দেশে অমুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ১০ জনের অধিক। লেবাননে এক-তৃতীয়াংশ। হাজার বছর আগে সে সংখ্যা আরো বেশী ছিল। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা কি তাতে বন্ধ থেকেছে? মুসলমানেরা যে দেশই জয় করেছে প্রথম দিন থেকেই সেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করেছে। নামায-রোযা পালনের ন্যায় প্রতিটি মুসলমানের ঘাড়ে এটিও এক অলঙ্ঘনীয় দায়বদ্ধতা।

মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের অপরাধটি শুধু এ নয় যে তারা এদেশের বুক থেকে মুসলিম শাসনকে অপসারিত করেছে। বরং মুসলিম বিরোধী ভয়ানক অপরাধটি হলো, এদেশের আদালতে থেকে শরিয়তি শাসনকেও বিলুপ্ত করেছে। সে স্থলে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের কুফরি আইন। আর বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের অপরাধটি হলো, ব্রিটিশের সে কুফরি আইনকেই আজ অবধি বলবৎ রেখেছে। শরিয়ত আইনী প্রতিষ্ঠা না করে ইসলামের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের কৃত অপরাধকেই তারা শাসতান্ত্রিক বৈধতা দিয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় গাদ্দারি আর কি হতে পারে? আর জনগণের অপরাধ হলো, শরিয়তের প্রতিষ্ঠাবিরোধী রাজনৈতীক দল ও ব্যক্তিদেরকেই তারা বার বার নির্বাচিত করছে। ফলে বাংলাদেশের ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে আল্লাহর দ্বীনের পরাজয়ের জন্য সরকার ও জনগণ উভয়ই দায়ী। এ অপরাধের দায়ভার নিয়ে কি আল্লাহর সামনে তাদের দাঁড়াতে হবে না? সে ভাবনাই বা ক’জনের? শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না থাকায় বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে শাস্তি যোগ্য অপরাধের সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে। পাল্টে গেছে আদালতের সংস্কৃতিও। ফলে মিথ্যাচার ও জ্বিনা-ব্যাভিচারের ন্যায় ভয়ানক অপরাধগুলোও বাংলাদেশের আদালতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। এতে দ্রুত বেড়ে চলেছে অপরাধীদের সংখ্যা। আর এ অপরাধীদের হাতেই অধিকৃত আজ বাংলাদেশের সরকার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ও আদালতসহ দেশের সকল প্রতিষ্ঠান। মুন্তাসির মামূন তো তাদেরই একজন। এতবড় ভয়ানক অপরাধীরা শাস্তি না পেলে খুনি, চোর-ডাকাত ও অন্যান্য অপরাধীদের শাস্তি হবে কীরূপে?

মুন্তাসির মামূনদের ন্যায় ব্যক্তিগণ যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সে দেশটি দুর্বৃত্তে বার বার বিশ্বরেকর্ড গড়বে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? কারণ এরূপ শিক্ষক থেকে ছাত্র ভাল কিছু শিখবে কি? এমন দেশের পথেঘাটে লগিবৈঠা, পিস্তল ও বোমাধারিদের সংখ্যা বাড়বে এবং তাদের হাতে মানুষ খুন হবে, গুম হবে ও নারীরা ধর্ষিতা হবে সেটিই তো স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগ ও তাদের মিত্র সংগঠনে তো এমন সহিংস জীবের সংখ্যা অসংখ্য। হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসায় জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন এক দুর্বৃত্ত ধর্ষনে সেঞ্চুরির উৎসব করেছিল। সে উৎসবের খবর বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছিল। হাসিনা সে দুর্বৃত্তের কোন বিচার করেনি। পুলিশ তার খোঁজে কোখাও তদন্তের প্রয়োজন বোধ করেনি। অথচ পুলিশের ব্যস্ততার অন্ত নেই ইসলামপন্থিদের গ্রেফতার ও ইসলামবিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করায়। এ কারণেই আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় যায় তখনই পথে ঘাটে লাশ পড়া শুরু হয়। লাগাতর গুম হওয়া শুরু হয় বিরোধী দলীয় শিবিরে। লুন্ঠিত হয় ব্যাংক ও শেয়ার বাজার। সেটি যেমন মুজিব আমলে হয়েছে তেমনি হাসিনার আমলেও হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে বিপদের বড় কারণ, অপরাধপ্রবন হিংস্রতা শুধু আওয়ামী লীগের মাঠকর্মীদের মাঝেই প্রকট নয়। হিংস্রতায় আক্তান্ত শুধু মুন্তাসির মামূনের ন্যায় আওয়ামী শিবিরে দুয়েকজন গুরুই নয়।এমন ইতর ও অসভ্য মুন্তাসির মামূনদের সংখ্যা আওয়ামী লীগ শিবিরে হাজার হাজার। এদের সংখ্যা তাদের মাঝে যে কত বেশী সেটি বুঝা যায় ইন্টারনেটে গিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই। নানা ওয়েবসাইট ও ব্লগে এরা দেশের বিবেকমান ও রুচিশীল লেখকদের এমন অশালীন ভাষায় গালীগালাজ করে যা কোন সভ্য মানুষ ভাবতেও পারে না। তখন বুঝা যায় জামায়াত-শিবির-বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে জারজ বলাটিও শুধু মুন্তাসির মামূনের একার অসভ্যতা নয়। বাংলাদেশে স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পথে এরাই বড় বাধা। আবর্জনার স্তুপে যেমন আশেপাশের সকল মশামাছি জমা হয়, আওয়ামী লীগেও তেমনি জমা হয়েছে দেশের বেশীর ভাগ অসভ্য ও ইতর মানুষ।

 

যে অসভ্যতা আওয়ামী লীগের নিজস্ব

উপমহাদেশের রাজনীতিতে সংঘাত এই প্রথম নয়। প্রথম নয় মুসলিম ইতিহাসেও। নবীজী (সাঃ)র আমলে যে রক্তাত্ব লড়াইয়ে শুরু তখনও কোন সাহাবীকে কেউ জারজ বলে গালী দেয়নি। রক্তাক্ষয়ী সংঘাত হয়েছে ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান করতে গিয়েও। সে সংঘাতে বহু লক্ষ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। হিন্দু ও মুসলিম উভয় পক্ষের লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিজেদের ভিটামাটি ত্যাগ করে সীমান্ত অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু সে সময় কি কেউ কাউকে জারজ বলে গালি দিয়েছে? কংগ্রেসের কোন হিন্দু নেতাও কি কোন মুসলিম লীগের নেতাকর্মীকে সে অসভ্য ভাষায় গালি দিয়েছে? পাকিস্তানের বিরোধী হলেও সে কাফের নেতারা মুন্তাসির মামূনের ন্যায় এতটা ইতর ও অসভ্য ছিল না। সভ্য মানুষেরা সভ্য ভাষায় মননশীল যু্ক্তি দিয়ে লড়াই করে। অশ্রাভ্য ভাষায় গালিগালাজ দিয়ে নয়। পাকিস্তান নিয়ে হিন্দুদের বিরোধ থাকলেও মুসলিম লীগের নেতাকর্মীদের জন্মের বৈধতা নিয়ে কোনকালেই তারা কোন প্রশ্ন তোলেনি। সেটি রাজনীতির বিষয়ও নয়। কিন্তু মশামাছি তো আবর্জনা খোঁজে। ফলে যে ইতর ও অসভ্য মানস নিয়ে মুন্তাসির মামূন ও তার আওয়ামী বন্ধুরা গালিগালাজ করে সেটি একান্তই তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি।তারা সেটি পেয়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় সংস্কৃতি থেকে। ১৪ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে এত ইতর স্বভাবের মানুষেরা মুসলিম দেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষাকতায় নামেনি। ফলে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হওয়ার যে রেকর্ডটি বাংলাদেশ গড়লো সেটিও সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ১৪ শত বছরের ইতিহাসে এই প্রথম।

ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে হিংস্র ও ভয়ানক শত্রু হলো মুনাফিকরা। তারা নিজেদের মুসলমান বলে জাহির করে শুধু নিজেদের আসল চেহারা গোপন রাখার লক্ষ্যে। ইসলামের ক্ষতি সাধনই তাদের মূল উদ্দেশ্য। এরাই ঘরের শত্রু। এরা নামাযে হাজির হয়, হজ করে, মাথায় টুপি পড়ে বা কালো পট্টি বাঁধে শুধু জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্য। আজ দেশে দেশে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলো হচ্ছে এরূপ মুনাফিকদের হাতে। কোন মুসলিম দেশে আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার সাহস কি কোন হিন্দুর আছে? অথচ সে কাজ অনায়াসে করছে মুনাফিকরা। আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠাকামীদের বিরুদ্ধে তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান। কোন মুসলিম ভূমি কাফেরদের হাতে অধিকৃত বা খন্ডিত হলে আনন্দে তারা ডুগডুগি বাজায়। আরাকানের মজলুম মুসলমানদের জন্য তাদের মনে যেমন কোন স্থান নেই তেমনি সামান্যতম দরদ নাই ভারত বা কাশ্মিরের অসহায় মুসলমানদের জন্যও। আজ এরাই বাংলাদেশের মাটিতে একাত্তরের ন্যায় ভারতের আরেকটি আগ্রাসন মনেপ্রাণে চায়।এবং সেটি তাদের মনের গোপন বিষয়ও নয়। ইসলামপন্থিদের দ্রুত বেড়ে উঠাতে তারা ভীতু। তারা জানে, নিজ শক্তিতে ইসলামপন্থিদের পরাজয় করার সামর্থ তাদের নেই। ফলে তারা আতংকিত। সেজন্যই প্রতিবেশী কাফের দেশে তারা মিত্র খুঁজছে, যেমনটি একাত্তরে করেছিল।

 

মুন্তাসির মামূন নিজেই একটি রোগ

মুন্তাসির মামূন নিজেই একটি রোগ। এ রোগ ভয়ানক সংক্রামকও। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, বাংলাদেশের পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির ও সেনাবাহিনীর বহু সদস্য এ রোগে আক্রান্ত। আক্রান্ত মুন্তাসির মামূন, শাহরিয়ার কবিরের ন্যায় অসংখ্য আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া কর্মী। এক কালে কলেরায় বাংলাদেশের গ্রামগুলি মানব শুণ্য হতো। আর এ রোগে দেশ মানবশূণ্য না হলেও মানবতা শূণ্য হচ্ছে। লাশ পড়ছে শাপলা চত্বরে। এ রোগের আক্রমণে শুধু জামায়াত শিবির, হেফাজত বা বিএনপির নেতাকর্মীরাই লাশ হয় না। লাশ হয় বিশ্বজিতেরাও। বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে, যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ দেয়া হয়, লগিবৈঠা দিয়ে  মানুষ খুনের উৎসব হয়, হরতালের দিনে পথচারিকে উলঙ্গ করা হয় এবং ধর্ষণে সেঞ্চুরি হয় তো এ রোগের প্রকোপেই। এ রোগের এরূপ প্রাদুর্ভাব নিয়ে কোন সভ্য নাগরিক কি নীরব থাকতে পারে? এ রোগের একমাত্র ঔষধ শরিয়তি আইন। এটিই মহান রাব্বুল আলামীনের দেয়া চিকিৎসা। শরিয়তের আইনই মক্কার কাফেরদের পূর্ণ আরোগ্য দিয়েছিল। বাংলাদেশের রোগাগ্রস্তদের জন্যও ভিন্ন চিকিৎসা নেই।

মুন্তাসির মামূনের প্রচন্ড আক্রোশ ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি তো তার রোগ নিয়েই বাঁচতে চান। তাই শরিয়তের আইনের বিরুদ্ধে তার প্রচন্ড আক্রমণ। মুন্তাসির মামুনের অভিযোগ বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধেও। তার অভিযোগ,“এ দেশের মানুষ তো আবার কথায় কথায় ইসলামের কথা তোলে। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- ক্ষমতার জন্য রসুল (দ) ওফাতের পর থেকে তার প্রাণের আত্মীয়-স্বজন একে অপরের বিরুদ্ধে লড়েছে, বাবা ছেলেকে ছেলে বাবাকে হত্যা করেছে।” কতবড় মিথ্যাচারি এই মুন্তাসির মামূন! তার মিথ্যাচার এখানে নবীজী (সাঃ)র আত্মীয় স্বজনদের বিরুদ্ধেও। প্রশ্ন, নবীজী (সাঃ)র কোন আত্মীয়টি তাঁর পিতাকে স্রেফ ক্ষমতার জন্য হত্যা করেছে? রণাঙ্গনে কোন পিতা, পুত্র বা ভাই ইসলামের বিজয় রুখতে অস্ত্র ধরলে তাকে নিস্তার দেয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। সেটিই তো ঈমানদারি। বাংলাদেশের বহু মুসলিম পরিবারে যেমন অসংখ্য ইসলাম-দুষমণ ঘৃণ্য জীব জন্ম নিয়েছে তেমনি আরব, ইরান, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের প্রতিদেশেই অসংখ্য মুনাফিক ও খুনি জন্ম নিয়েছে। অতীতে পয়গম্বরদের পরিবারেও সেটি হয়েছে। সে জন্য কি ইসলামকে দায়ী করা যায়? তাছাড়া ঘন ঘন ইসলামের নাম নেয়া, আল্লাহকে স্মরণ করা তো মু’মিনের যিকর। সে যিকরের হুকুম তো এসেছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। মুন্তাসির মামুনদের রাজনীতিতে যেমন কথায় কথায় একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, মুজিব,আওয়ামী লীগ, ভারত, গান্ধি, রবীন্দ্রনাথ, সেক্যুলারিজম ও জাতিয়তাবাদের যিকর তেমনি মুসলমানের রাজনীতিতে বেশী বেশী আল্লাহ ও তাঁর শরিয়ত প্রতিষ্ঠার যিকর। এর মধ্যেই তো মু’মিনের ঈমানদারি।

ভয় অস্তিত্ব বিলুপ্তির

মুন্তাসির মামূনের মনে প্রচন্ড ভয়। সে ভয়টি নিজের ও তার সমমনাদের নির্মূলের। সে ভয়টি অমূলকও নয়। কারণ ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ আজ যতটা মারমুখী তা পূর্বে আর কোন সময়ই এতটা তীব্র ছিল না। সে ভয় নিয়েই তিনি লিখেছেন,“আওয়ামী লীগ যদি হারে তা’হলে আওয়ামী লীগ, সমর্থক, হিন্দু এবং যুদ্ধাপরাধী নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের সবাইকে নিকেশ করে দেয়া হবে।” সে ভয়টি কতটা বাস্তব সেটি প্রমাণ করতে গিয়ে লিখেছেন, “এই লেখা যখন লিখছি তখন খবর পেলাম শাহরিয়ার কবিরের, সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিকের বাসায় বোমা রেখে যাওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতেই এই অবস্থা। না থাকলে কি হতো তা অনুমেয়।” এ ভয় শুধু মুন্তাসির মামূনের একার নয়, সমগ্র আওয়ামী শিবির জুড়ে। তাদের ভয়, ১৯৭৫য়ে ১৫ই আগষ্টের ঝড়ে শুধু মুজিব পরিবার বিধস্ত হয়েছিল। এবার শিকড় উপড়ে যাবে সমগ্র আওয়ামী লীগ ও তার নেতাকর্মীদের। অপরাধীদের অপরাধ অন্যরা না পুরাপুরি না জানলেও তারা নিজেরা জানে। ফলে তাদের নিজের মনে থাকে সে অপরাধ থেকে বাঁচার ভয়। চোরডাকাতের মনে এজন্য থাকে সবসময় ধরা পড়ার ভয়। খুনিরা তো সে ভয় নিয়ে আত্মগোপন থাকে এবং রাস্তায় নামে না। ইসলাম, মুসলমান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ভয়ংকর অপরাধগুলি অন্যরা যতটা জানে তার চেয়ে বেশী জানে তারা নিজেরা। তাই আওয়ামী লীগের কাছে মূল ইস্যুটি এখন আর তত্ত্বাবধায় সরকারের বিষয় নয় বরং নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচানোর। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মগজে এ ভয়টি এতই তীব্র যে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের দাবী মেনে নেয়াটি গণ্য হচ্ছে নিজেদের মৃত্যু ডেকে আনা। তাই জীবন বাঁচানোর স্বার্থে তারা চায় যে কোন মূল্যে ও যে কোন ভাবে আওয়ামী লীগের বিজয়। চায় দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রন। এ বিষয়ে কোন ছাড় দিতে তারা রাজি নয়।

হুংকার চুড়ান্ত যুদ্ধের

মুন্তাসির মামূন কোন আপোষ চান না। কারণটিও অনুমেয়। বিরোধী দলের সাথে আপোষ যে হাসিনার পরাজয়কেই ত্বরান্বিত করবে সেটি তিনি বুঝেন। তিনি জানেন, নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় অসম্ভব। ফলে মতলবটি হলো, সহিংস পথে ক্ষমতায় টিকে থাকা। সেটি যুদ্ধের পথে হলেও। তার হিসাব-নিকাশে আওয়ামী লীগারদের সামনে প্রাণ বাঁচানোর এটিই একমাত্র পথ। তাই লিখেছেন, “আমরা বলব, সংবিধান অনুযায়ী যদি তারা নির্বাচন ইচ্ছুক হয় ভাল কথা না হলে সেই আলোচনায় সময় নষ্ট না করাই উচিত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেরও রাস্তাঘাটে প্রতিরোধে প্রস্তুত থাকা বাঞ্ছনীয়। সুশীলদের অনেকে বলেন, সমঝোতা না হলে গৃহযুদ্ধ হবে। …যদি দাঙ্গা হাঙ্গামা হয়, হবে। তাতে আমাদের অনেকেই মারা যাব, তাতে কি আছে? … মৃত্যু তো নির্দিষ্ট এবং একমাত্র সত্য। কিন্তু এক বারের মতো ফয়সালা হয়ে যাক।“

মুন্তাসির মামূন চান আরেকটি যুদ্ধ সত্বর শুরু হোক। এটিকে বলছেন একাত্তরের অসমাপ্ত যুদ্ধ। লক্ষ্য, একাত্তরে যাদের হত্যার সুযোগ হয়নি তাদেরকে হত্যা করা। আরো লক্ষ্য হলো, সে হত্যাকান্ডে ভারতের সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা। ইতিমধ্যে মুন্তাসির মামূনেরই সতীর্থ কলামিস্ট সুদিব ভৌমিক ভারতের “টাইমস অব ইন্ডিয়া”য় ১/১১/১৩ তারিখে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভারতের প্রতি সম্ভাব্য সকল উপায়ে হস্তক্ষেপের আহবান জানিয়েছেন। নইলে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ বিপদে পড়বে সে কথাটিও সে নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন। ভারতের স্বার্থের মাঝেই আওয়ামী ঘরানার এসব বুদ্ধিজীবীরা যে নিজেদের স্বার্থ দেখে সে বিষয়টিও সে নিবন্ধে গোপন থাকেনি।

জমিতে চাষ না দিলে আগাছা জন্মে। কৃষকের লাঙ্গল তাই আগাছা নির্মূলের হাতিয়ার। একই ভাবে আল্লাহর শরিয়তি বিধানটি আগাছা নির্মূল করে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে। তাই আল্লাহর শরিয়তি আইন স্রেফ কিতাবে লিপিবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। সেটির প্রয়োগ শুধু জরুরীই নয়, অপরিহার্য। আজ বাংলাদেশে ইসলামের দুষমন ভয়ানক অপরাধিরা বেড়ে উঠেছে তো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না থাকাতেই। নবীজী ও খোলাফায়ে রাশেদার সময় মুনাফিরা যে ষড়যন্ত্রটি লুকিয়ে লুকিয়ে করতো এখন তারা সেটি করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বসে। এবং প্রকাশ্যে ও বীরদর্পে। গর্তের বিষাক্ত শাপগুলো আজ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সংবিধান থেকে আল্লাহর নাম সরানোর সাহস কি কোন হিন্দুর আছে? আছে কি কোরআনের তাফসির মাহফিল বন্ধ করার সাহস? কিন্তু সে সাহস আছে বাংলাদেশের মুনাফিকদের। কারণ তাদের হাতে রয়েছে নিজেদের মুসলিম পরিচয়ের ঢাল। আছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা।

মুনাফিকদের মুনাফিক বলাই মহান আল্লাহর সূন্নত, মুসলমান বলা নয়। মুসলমান পরিচয় পেতে হলে রাসূলের সাহাবীদের ন্যায় ইসলামের ঝান্ডা নিজ কাঁধে তুলে নিতে হয়। আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় ও ইসলামের বিজয়ে নির্ভয়ে কথা বলতে হয়। অর্থ,শ্রম ও মেধার বিপুল বিণিয়োগও করতে হয়। প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে হাজির হতে হয়। এসবই নবীজীর সূন্নত। সাহাবাগণ তো সে পথেই ইসলামের বিজয় এনেছেন। যারা সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বানি সরায় এবং আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে তাদেরকে মুসলমান বলা কি আল্লাহর সূন্নত? ইসলামের চিহ্নিত এসব শত্রুদেরকে মুসলমান বললে যারা ইসলামের বিজয় আনতে লড়াই করে ও শহীদ হয় তাদেরকে কি বলা যাবে? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা কত সুন্দর করেই না মুনাফিকদের চিত্রটা তুলে ধরেছেন। বলেছেন,“তারা নিজেদের (আল্লাহ ও রাসূলের উপর বিশ্বাসী হওয়ার) শপথকে ঢাল রূপে ব্যবহার করে, অতঃপর মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামি করে। তারা যা করে তা কতই না নিকৃষ্ট!” –(সুরা সুরা মুনাফিকুন, আয়াত ২)। মুন্তাসির মামূনেরা তো সেটিই করছেন। তারা নিজেদের মুসলমান বলে জাহির করে, কিন্তু সেটি ইসলামের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য নয়। ইসলামের গৌরববৃদ্ধি বা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্যও নয়। বরং ইসলামের পথ থেকে মুসলমানদের দূরে সরানোর লক্ষ্যে। কোরআনের তাফসির মহফিলের উপর নিষেধাজ্ঞা, ইসলামি টিভি চ্যানেল বন্ধ, আলেমদের লাঠিপেটা, গ্রেফতারি ও হত্যা, মসজিদ-মাদ্রাসার উপর হামলা, ইসলামি বই বাজেয়াপ্ত –এসব কি কোন কাফিরের হাতে হয়েছে?

ইস্যু স্রেফ নির্দলীয় সরকার নয়

বাংলাদেশে সংকটের মূল কারণটি এ নয় যে, দেশটি আজ স্বৈরাচার কবলিত। বরং সেটি হলো, দেশের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনসহ সকল প্রতিষ্ঠান আজ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত। ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখাই তাদের মূল কাজ। তাই ঈমানদারদের সামনে মূল ইস্যূটি স্রেফ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়। এরূপ নির্বাচন পূর্বেও একাধিকবার হয়েছে। কিন্তু তাতে কি দেশ আবর্জনা মুক্ত হয়েছে? মূল ইস্যুটি দেশের উপর থেকে ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলদারি নির্মূল। এটি এক দীর্ঘকালীন লড়াই। এ লড়াইযে জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হবে। কারণ ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানোর লক্ষ্যে শত্রুপক্ষের প্রস্তুতিও বিশাল। তাছাড়া বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় রুখতে বিদেশী শত্রুরাও নিজেদের বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, যেমনটি আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে করছে। ভারত তো ইতিমধ্যেই হাজার কোটি টাকা বাজেট ঘোষণা করেছে।

তবে মু’মিনের পক্ষে মহান আল্লাহতায়ালা। তাঁর অপার শক্তির সামনে সেসব শক্তি কোন শক্তিই নয়। ফিরাউনের বিশাল বাহিনী যখন বনি ইসরাইলের নিরস্ত্র মানুষদের ধাওয়া করেছিল তখন সামনে ছিল সমূদ্র আর পিছনে ছিল বিশাল সেনাদল। অনেকেই ভেবেছিল, এবার নিস্তার নেই। কিন্তু হযরত মূসা (আঃ)বলেছিলেন, ভয় নেই, আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন। সেদিন ফিরাউনের বিশাল বাহিনী বনি ইসরাইলের কাউকেই কোন ক্ষতি করতে পারিনি। সে বিশাল শত্রুবাহিনীর কাউকেই মহান আল্লাহতায়ালা জীবন্ত ঘরে ফেরার সুযোগ দেননি। সবাইকে সমূদ্রে ডুবিয়ে হত্যা করেছিলেন। একই ভাবে নমরুদের খপ্পর থেকে তিনি হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে রক্ষা করেছিলেন। তেমনি খন্দকের যুদ্ধে আরবের সকল গোত্রের সম্মিলিত হামলার মুখে রক্ষা করেছিলেন মদিনার ক্ষুদ্র মুসলিম বসতিকে। মহান আল্লাহতায়ালা নিরস্ত্র ও দুর্বল ঈমানদারকে তো এভাবেই বিজয়ী করেন। কিন্তু এরূপ সাহায্য কি স্রেফ নির্দলীয় সরকার বা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জোটে?সে জন্য লড়াইকে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের পথে এগিয়ে নিতে হয়।লড়াই তো তখনই খালেছ জিহাদে পরিণত হয়। মুসলমানের কাজ তো খালেছ নিয়তে মহান আল্লাহতায়ালার পরিপূর্ণ গোলামে পরিণত হওয়া। এবং তাঁর দ্বীনের বিজয়ে আত্মনিয়োগ করা। তখন বাকি জিম্মাদারিটা খোদ মহান আল্লাহতায়ালা নিজ হাতে নিয়ে নেন।

হাসিনা ফিরাউনের চেয়ে বেশী শক্তিশালী নয়। বাংলাদেশের মুসলিমও বনি ইসরাইলের চেয়েও দুর্বল নয়। এ মুহুর্তে মূল দায়িত্বটি হলো, এ লড়াইকে স্রেফ আল্লাহর রাস্তায় বিশুদ্ধ জিহাদে পরিনত করা। মু’মিনের জীবনে জিহাদ ছাড়া কোন লড়াই নাই, জিহাদ ছাড়া কোন রাজনীতিও নাই। নিয়তের এ ক্ষেত্রটুকুতে ভেজাল থাকলে পরকালে কোন ফসল তোলা যাবে না। তেমনি একালেও আল্লাহর সাহায্য জুটবে না। সেক্যুলার চেতনায় এমনি একটি বিশুদ্ধ জিহাদ কি সম্ভব? সেক্যুলারিজম তো পরকালের ভাবনাকেই ভূলিয়ে দেয়। সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ তো ইহজাগতিকতা। পরকালের ভাবনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক।  সে জন্য তো চাই রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিপূর্ণ ইসলামিকরণ। একমাত্র বিশুদ্ধ জিহাদেই প্রতি মুহুর্তের শ্রম, প্রতিটি কথা, প্রতিটি লেখনি, প্রতিবিন্দু রক্ত ও প্রতিটি অর্থদান পরকালে বিশাল পুরস্কার দেয়। তথন আন্দোলন ব্যর্থ হলেও কোরবানী ব্যর্থ হয় না। জানমালের সে কোরবানিই অনিবার্য করবে জান্নাতপ্রাপ্তি। নইলে হাজির হতে হবে জাহান্নামে। এ নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তো সে হুশিয়ারিই বার বার শুনিয়েছেন। ০৩/১১/২০১৩

 




বাংলাদেশে মুরতাদদের এজেন্ডা ও  মুরতাদ-তোষণের রাজনীতি

মুরতাদদের মনকষ্ট

প্রতিটি দেশে যেমন ঈমানদার থাকে, তেমনি কাফের, মুনাফিক ও মুরতাদও থাকে। তাদের যেমন বিভিন্ন বিশ্বাস থাকে, তেমনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডাও থাকে। বাংলাদেশও তা থেকে ভিন্নতর নয়। দেশের রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ও সমাজ কোনদিকে এগুবে বা পিছিয়ে যাবে -সেটি নির্ভর করে কাদের হাতে ন্যস্ত রাষ্ট্রের রাজনীতি ও প্রশাসন এবং কি তাদের নীতি। তাই যারা দেশ নিয়ে ভাবে তাদের শুধু দেশের আলো-বাতাস, জলবায়ু, গাছপালা বা পশুপাখি নিয়ে ভাবলে চলে না, ভাবতে হয় বিভিন্ন বিশ্বাস ও এজেন্ডার মানুষদের নিয়েও। এ প্রসঙ্গে মুরতাদগণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ।  তাদের রয়েছে সুস্পষ্ট চিন্তাভাবনা ও রাজনৈতিক এজেন্ডা।তাদের সংখ্যাটিও কম নয়। কি তাদের চিন্তাভাবনা ও এজেন্ডা -সেটি তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে শোনা যাক তাদের নিজেদের প্রথমসারির একজনের জবানবন্দি।  দৈনিক জনকন্ঠের ১৭ই মার্চ,২০১৩ সংখ্যায় আওয়ামী ঘরানার অন্যতম বুদ্ধিজীবী মুনতাসির মামুন মনের প্রচন্ড ক্ষেদ নিয়ে লিখেছিলেন, তাকে কেন নাস্তিক ও মুরতাদ বলা হয়।তার অভিযোগ,“এ নিয়ে আমাকে কয়েকবার মুরতাদ ঘোষণা করা হলো।..গত দুই দশকে এই ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠান আমাদের মুরতাদ ঘোষণা করেছে, জামায়াতীরা বলছে আমরা নাস্তিক।” আল্লামা শফির হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে তার অভিযোগ, হেফাজতে ইসলামও তাকে জামায়াতের মত মুরতাদ ও নাস্তিক বলছে। তার কথা,“তা হলে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে জামায়াতের পার্থক্য কী রইল?” তিনি মুরতাদের একটি অর্থ খাড়া করেছেন। বলেছেন, “মুরতাদ মানে কী? ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে ফিরে যাওয়া।” মুরতাদ প্রসঙ্গে উলামাদের মতের ব্যাখা দিতে গিয়ে বলেছেন,“ইসলাম কেউ ত্যাগ করেছে তাকে মুরতাদ বলা ও তার ওপর হামলা করা – এইটি উলেমাদের মত। কোরান বা রাসূলের (স) নয়।” এখানে তিনি আলেমদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে তার অভিযোগ আলেমগণ এমন কিছু বলছেন যা পবিত্র কোরআন-হাদীসে নাই। অর্থাৎ তার ভাষায় আলেমগণ মিথ্যাবাদী। এবং অভিযোগোর সুরে বলেছেন, ‘উলেমাদে’র কাছে আমরা তো দেশ আর ধর্ম ইজারা দিইনি।”

যে কোন আওয়ামী বাকশালীর ন্যায় মুনতাসির মামুনও নিজেকে সেক্যুলার মনে করেন। সেক্যুলারদের প্রতিটি কর্মের মধ্যে থাকে সুস্পষ্ট চেতনা ও এজেন্ডা কাজ করে -সেটি ইহলৌকিক স্বার্থ পূরণ। সে চেতনায় পারলৌকিক স্বার্থপূরণের ইসলাম-সম্মত কোন ভাবনা কাজ করে না। তেমন একটি ভাবনা থাকলে তো তার রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ইসলামের বিজয় ও এজেন্ডা পূরণে সে সচেষ্ট হতে বাধ্য। তখন সে লক্ষ্যে সে নিজের জানমালের কোরবানীও দেয়। সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ হলো ইহলৌকিকতা। সে ইহলৌকিক ভাবনা নিয়েই তাদের রাজনীতি, এবং তা নিয়েই তাদের সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তি। প্রতিটি কর্মের মধ্যে সেক্যুলারিস্টগণ এভাবেই নিজেদের দুনিয়াবী স্বার্থসিদ্ধি ও অর্থনৈতীক প্রাপ্তির বিষয়টি দেখেন। আসে তাতে বিনিয়োগ ও মুনাফা তোলার ভাবনা। আসে এ পার্থিব ভূবনে একচ্ছত্র ইজারাদারির ভাবনা। আসে স্বৈরাচারি ও স্বেচ্ছাচারিরূপে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের ভাবনা। স্বার্থলাভ ও অর্থনৈতীক প্রাপ্তি ছাড়া কেউ কোন কাজ কেউ করতে পারে –সেটি তারা ভাবতেও পারে না। শেখ মুজিব নিজেকে সেক্যুলারিস্ট রূপে দাবী করতেন। ফলে রাজনীতিতে তিনি ব্যবাহার করেছেন নিজের সেক্যুলার তথা পার্থিব স্বার্থপূরণের  হাতিয়ার রূপে। সে লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশকে তার ইজারাভূক্ত দেশ মনে করতেন। নিজের শাসনামলে সে ইজাদারি তিনি এতটাই প্রবল করতে চেয়েছিলেন যে কাউকে তিনি মাথা তোলার সুযোগ দেননি। ৫ বছরের জন্য সাংসদ নির্বাচিত হয়ে তিনি আজীবনের জন্য প্রেসিডেন্ট থাকার বন্দোবস্ত করেছিলেন। তার অভিলাষ পূরণে সংবিধান পাল্টাতে হয়েছিল, কিন্তু নিজের খায়েশ পাল্টাননি। এক মুহুর্তের জন্যও তিনি গদী ছাড়তে চাননি। আজীবন গদীতে থাকার স্বার্থে অন্য কাউকে তিনি রাজনীতি, লেখালেখি ও মতপ্রকাশের সুযোগ দিতে তিনি রাজী হননি। সকল বিরোধী দলের রাজনীতিকে তিনি নিষিদ্ধ করেন। নিষিদ্ধ করেন তাদের অফিস, পত্র-পত্রিকা ও বই-পুস্তক। বিরোধী দলীয় নেতাদেরও তিনি কারারুদ্ধ করেন। একই রূপ স্বৈরাচারি চেতনা বাসা বেঁধেছে হাসীনার মাথায়। বাসা বেঁধেছে হাসীনার বুদ্ধিবৃত্তিক ফুট-সোলজার মুনতাসির মামুনের মাথায়। তার আফসোস বাংলাদেশে আমার দেশ, সংগ্রাম ও নয়াদিগন্তের মত পত্রিকাগুলা আজও্র কি করে থাকে? এ পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর কাছে তিনি দাবীও রেখেছিলেন। কিন্তু সেটি যে সম্ভব নয় সেটি হাসানুল হক ইনু জানিয়ে দেয়ায় তিনি প্রচন্ড মনকষ্ট পেয়েছেন -সেটিও ফুটে উঠেছে তার নিবন্ধে। তিনি ভূলে যান, এটি শেখ মুজিবের বাকশালী আমল নয়। সে আমলে তারা রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচার ব্যাবস্থার পাশাপাশি যেভাবে মিডিয়াকে নিজেদের অধিকৃত ভারত-ভূমিতে পরিণত করেছিলেন সেটি এখন আর সম্ভব নয়। তাকে বাঁকি জীবনটি বাঁচতে হবে এ মনকষ্ট নিয়েই।

ইজারাদারি নয়, ফরজ দায়িত্বপালন

জনকন্ঠে প্রকাশিত প্রবন্ধে তার প্রবল অভিযোগ, দেশ ও ধর্ম নিয়ে ভাবার অধিকার আলেমদের কে দিল? তার বিস্ময়পূর্ণ প্রশ্ন, আমরা তো তাদের হাতে দেশ ও ধর্মকে ইজারা দেইনি! মুনতাসির মামুনের কান্ডজ্ঞান নিয়ে এখানেই বিস্ময়। নিজেকে তিনি ইতিহাসের গবেষক মনে করেন। অথচ তার কথায় ফুটে উঠেছে, ইসলামের ইতিহাসে তিনি কতটা অজ্ঞ। মনে হচ্ছে, ইসলামের ইতিহাস থেকে তিনি কোন পাঠই নেননি। হয়তো নিলেও সেটি জোর করে ভূলে থাকতে চেয়েছেন। তারা জানা উচিত, দেশ ও ধর্মের পক্ষে কথা বলার জন্য মুসলমান কারো কাছ থেকে অনুমতি নেয় না। এটা তার ঈমানী দায়বদ্ধতা। সেটিই তার প্রকৃত ধর্ম। সে দায়বদ্ধতা থেকেই শুরু হয় জালেম শাসকের বিরুদ্ধে ঈমানদারের জিহাদ। সে মু’মিনের জীবনে জিহাদ নেই, তার অন্তরে কোন ঈমানও নেই। এজন্যই প্রাথমিক কালের মুসলমানদের প্রত্যেকেই ছিলেন মোজাহিদ। শহীদ পয়দা হয়েছে প্রায় প্রতি ঘর থেকে। মু’মিনের দায়বদ্ধতা শুধু  ইসলামের পক্ষে কথা বলা নয়, বরং জালেমের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি ও জানমালের বিনিয়োগ। এবং তাতে সামান্যতম কার্পণ্য হলে সে ব্যক্তি আর মুসলমান হাকে না। প্রকৃত মুসলামান তাই শুধু নামায-রোযা বা হজ-যাকাত পালন করে না। বরং ইসলামের বিপক্ষ শক্তির পূর্ণ পরাজয় ও ইসলামের শরিয়তি হুকুমের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার কাজে জানামালেরও পূর্ণ বিনিয়োগ করা। সে বিনিয়োগে আপোষহীন হওয়ার মধ্যেই তাঁর ঈমানদারি।

মুনতাসির মামুন তার প্রবন্ধে বেছে বেছে কিছু কোরআনের আয়াত পেশ করেছেন। দেখাতে চেয়েছেন, ইসলামে কোন যুদ্ধবিগ্রহ নাই। রক্তক্ষয় ও হানাহানি নাই, এক অনাবিল শান্তির ধর্ম। তাঁর কাছে আল্লাহর পথে জিহাদ হলো মহা অশান্তি। ফলে তার ধারণা, ইসলাম অতীতে প্রধান বিশ্বশক্তি রূপে আবির্ভূত হয়েছিল যুদ্ধবিগ্রহ না করেই। অবশ্যই ইসলাম এ পৃথিবীতে একমাত্র শান্তির ধর্ম। তবে সে শান্তির অর্থ, দুর্বৃ্ত্ত শয়তানি শক্তির মুখে চুমু খাওয়া নয়, তাদের কাছে পোষমানা জীবনও নয়। মুসলমান শান্তি আনে দুর্বৃত্তদের অধিকার থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি, সং,স্কৃতি ও আইন-আদালত মূক্ত করার মধ্য দিয়ে। এ কাজ বিশাল কাজ। একাজ মু’মিনের অর্থ, শ্রম ও রক্ত চায়। নবীজীর সাহাবীদের শতকরা ৭০ ভাগের বেশী তো শহীদ হয়ে গেছেন একাজে। এবং সে কোরবানী পেশের জন্যই মু’মিন ব্যক্তি মাত্রই আল্লাহর কাছে চুক্তিবদ্ধ। সে চুক্তির কথাটি পবিত্র কোরআনে এসেছে এভাবেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ ঈমানদারদের থেকে তাদের জানমাল জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে, অতঃপর সে লড়াইয়ে তারা শত্রুদের যেমন হত্যা করে তেমনি নিজেরাও নিহত হয়।”–(সুরা তাওবা, আয়াত ১১১)।পরবর্তী আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সাথে এমন বিক্রয়চুক্তির সমাধার জন্য ঈমানদারকে খুশি করতে বলেছেন। কারণ এর যে উত্তম চুক্তি কোন ব্যক্তির জীবনে হতে পারে না। মুসলমানের জীবনে মূল মিশনটি এভাবেই আল্লাহতায়ালা নিজে নির্ধারিত করে দিয়েছেন। এক সময় সমগ্র আরবভূমির উপর কাফের শক্তির দখলদারি ছিল। সে দখলদারির অবসান ঘটানো ছাড়া ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা বাড়ানো কি সম্ভব ছিল? ফলে তখন জিহাদ অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল প্রতিটি মুসলমানের উপর। তখন লড়াইটি ছিল শয়তানি শক্তির সে দখলদারি থেকে আরবভূমিকে মূক্ত করার। আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে সে কোরবানির বরকতেই তো তাঁরা সমগ্র মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। আল্লাহতায়ালা তাদের ফেরেশতাকূলে গর্ব করেন। আজও সে পথ ধরেই মুসলমানগণ পুণরায় গৌরব অর্জন করতে পারে। গৌরবের সে পথটি যেমন বেশী বেশী মানব-রপ্তানী বা গার্মেন্টস-উৎপাদন নয়, তেমনি বেশী ধান-মাছ, গরু-ছাগল বা চা-পাট উৎপাদনও নয়। প্রশ্ন হলো, সে জিহাদে নিজেদের অর্থদান, শ্রমদান ও প্রাণদানে মুসলমানগণ আরবের কাফেরদের থেকে কি এজাজত নিয়েছিলেন?

অধিকৃত দেশঃ প্রতিরক্ষা পাচ্ছে পাপীরা

বাংলাদেশ আজ ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে অধিকৃত। ইসলামের এ শত্রুদের এ দখলদারির কারণেই আল্লাহর ভূমিতে আল্লাহর শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। বরং প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রণীত আইন। এ আইনে সূদদান ও সূদগ্রহণ  যেমন আইনসিদ্ধ, তেমনি আইনসিদ্ধ হলো ব্যাভিচার। তাই জনগণের অর্থে প্রতিপালীত বাংলাদেশের পুলিশ ও প্রশাসনের কাজ যেমন সূদী ব্যাংকগুলোকে প্রহরা দেয়া, তেমনি দায়িত্ব হলো পতিতাপল্লির ব্যাভিচারকে পাহারা দেয়া। ফলে জনগণের অর্থে পরিচর্যা ও প্রতিরক্ষা পাচ্ছে জঘন্যতম পাপ। এটি কি কোন মুসলমান ক্ষণিকের জন্যও মেনে নিতে পারে? দেশের সংবিধানে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার দূরে থাক তার প্রতি আস্থার ঘোষনাটিও বিলুপ্ত হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের এমন দখলদারি কি কোন মুসলিম মেনে নিতে পারে? ইসলামপন্থিদের নির্মূলে আল্লাহর শত্রুগণ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, পুলিশ ও বিচারকদের ব্যবহার করছে। এরা পরিণত হয়েছে সরকারে বিশ্বস্থ লাঠিয়ালে। ফলে বাংলাদেশের মুসলমানদের আজকের লড়াই যেমন ঈমান বাঁচানোর লড়াই, তেমনি ইসলাম বাঁচানোর লড়াই। এ লড়াই ইসলামের বিপক্ষ শক্তির দখলদারি বিনাশের লড়াই। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সাথে এ লড়াইয়ে কোন  ঈমানদার ব্যক্তি কি নীরব  ও নিষ্ক্রীয় থাকতে পারে? এবং এ লড়াইয়ে নামার জন্য মুনতাসির মামুনদের মত ব্যক্তিদের থেকে অনুমতি নিতে হবে কেন?  দেশকি তাদের ইজারায়? এমন লড়াইয়ের হুকুম তো দিয়েছেন মহান আল্লাহ, যা বর্নিত হয়েছে পবিত্র কোরআনের ছত্রে ছত্রে। নবীজী(সাঃ)র মহান সাহাবাগণ যেভাবে বার বার জিহাদ করেছেন এবং জানমালের বিপুল কোরবানী দিয়েছেন সেটি কি শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালনের জন্য? লক্ষ্য ছিল কি শুধু মসজিদের প্রতিষ্ঠা?

ইসলামের পূর্বে আরবে কাফেরদের একচ্ছত্র ইজারাদারি ছিল। ইসলামের শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠা প্রতিষ্ঠা দুরে থাক, প্রকাশ্যে নামায আদায় করাও তখন কঠিন ছিল। নবীজী (সাঃ) তাদের সে আধিপত্যের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, ফলে তাদের কাছে তিনি চিহ্নিত হন বিদ্রোহী রূপে। কাফেরদের দরবারে এটাই ছিল নবীজী(সাঃ)র বড় অপরাধ। মক্কার কাফেরদের অত্যাচারে নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাদের মক্কা ছেড়ে মদিনায় আশ্রয় নেন। অবশেষে সে মদিনাতেও তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেয়া হয়নি। খন্দকের যুদ্ধে তো আরবের সকল কাফের গোত্র মহাজোট বেধে মদিনার উপর হামলা করেছিল। অবশেষে ইসলামই বিজয়ী হয়েছে। একই রূপ ঘটনা ঘটেছে হযরত ইব্রাহীম(আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)র সাথে। ফিরাউনের দরবারে হযরত মূসা (আঃ) যখন দ্বীনের দাওয়াত পেশ করেন তখন সে দাওয়াত ফিরাউনের ভাল লাগেনি। হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারিদের হত্যায় ফিরাউন সমুদ্র পর্যন্ত ধাওয়া করেছিল। আল্লাহতায়ালা বাঁচিয়ে দেন হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারিদের এবং ডুবিয়ে হত্যা করেন ফিরাউন ও তার বাহিনীকে। আজও বাংলাদেশের সেই একই সনতন দ্বন্দ। দ্বন্দ এখানে ইসলামের অনুসারিদের সাথে ইসলামের বিপক্ষশক্তির। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইসলামের সে বিপক্ষশক্তি শুধু অমুসলিম ভারতীয় কাফেরশক্তি নয়, তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে মুনতাসির মামুন, শাহরিয়ার কবির, জাফর ইকবাল, আনোয়ার হোসেন, আনিসুজ্জামানের ন্যায় বহু মুসলমান নামধারি বুদ্ধিজীবীরা। যোগ দিয়েছে সকল ভারতপন্থি রাজনীতিবিদেরা। একাত্তরের প্রজন্মের নামে সম্প্রতি শাহবাগে যে নাটক অনুষ্ঠিত হলো তা কি তাদের সে ইসলামবিরোধী চরিত্রটি প্রকাশ করে দেয়নি? নমরুদ, ফিরাউন ও মক্কার কাফেরদের ন্যায়ও তারা তো ইসলামপন্থিদের রাজনীতি ও ক্ষমতা নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়েছিল। এ জীবগুলো তো ঘোষণা দিয়েছিল ইসলামপন্থি রাজাকারদের রক্তমাংস দিয়ে তারা সকাল বিকাল নাশতা করবে। তবে তাদের আক্রোশ শুধু দেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে ছিল না, মূল আক্রোশ তো ছিল মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর মহান রাসূলের বিরুদ্ধে। অতি অশ্লিল ও অশ্রাব্য ভাষায় তারা মহানকরুণাময় আল্লাহর বিরুদ্ধে যাচ্ছে লিখেছে। লিখেছে নবীজী (সাঃ)র স্ত্রীদের বিরুদ্ধেও। সুবোধ সন্তান কি তার পিতার বিরুদ্ধে গালিগালাজ সহ্য করতে পারে? সে কি গালিদাতার বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়বে না? নইলে সে যে পিতার সুযোগ্য সন্তান তার প্রমাণ হয় কীরূপে? আর এখানে গালি দেয়া হয়েছে মহান রাব্বুল আ’লামীন ও তাঁর মহান রাসূলের বিরুদ্ধে। ব্লগারদের এমন অপকর্মের কথা শোনার পরও যদি কোন ঈমানদার রাস্তায় প্রতিবাদে না নামে তবে তাঁর মধ্যে যে ঈমান আছে সেটি কীরূপে বোঝা যাবে? অথচ এ নিকৃষ্ট কুৎসিত জীবগুলোকেই মাথায় তুলেছেন শেখ হাসিনা ও তার তল্পিবাহক এক পাল বুদ্ধিজীবী। শেখ হাসিনা তো নিহত ব্লগার রাজীবকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের শহীদ রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের দূষমনি এরপরও কি গোপন থাকে? হাজার বার হজ বা তাবলিগ জাময়াতের দোয়ার মজলিসে ধর্না দিয়েও কি শেখ হাসিনা ও তার সরকার আল্লাহর বিরুদ্ধে দুষমনি গোপন রাখতে পারে? মুনতাসির মামুনের অভিযোগ, কেন ব্লগারদের মুরতাদ বলা হয়? প্রশ্ন হলো,তবে কি এমন দুর্বৃত্ত জীবগুলোকে ঈমানদার বলা হবে?

মুনতাসির মামুনের হজ ও লাব্বায়েক

জনকন্ঠে প্রকাশিত প্রবন্ধে মুনতাসির মামূন নিজের হজ করার কাহিনী তুলে ধরেছেন। কিন্তু এটি কি কোন ব্যাপার হলো? হজ তো বহু জালেম, বহু ফাসেক, বহু সূদখোর-মদখোর, বহু স্বৈরাচারি এবং ব্যাভিচারিও বার বার করে। কত ঘুষখোর, মদখোর ব্যাভিচারিও তো মাথায় টুপি লাগায়। দাড়িও রাখে। তাতে কি তার আল্লাহভীতি বা ধর্মপরায়নতা বাড়ে? ঈমানের প্রকৃত যাচাই হয় ব্যক্তির রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে। ঈমান যাচাই হয়, লড়াইয়ের ময়দানে ব্যক্তিটি কোন পক্ষে লাঠি ধরলো তা থেকে। কতো দাড়ি টুপিধারি ব্যক্তিই তো আজ ইসলামের শত্রুদের সাথে মিশে ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কত মুসলিম নামধারি ব্যক্তিই তো অতীতে ব্রিটিশ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের বাহিনীতে যোগ দিয়ে মুসলিম ভূমিতে মুসলিম হত্যা করছে।  প্রশ্ন হলো, মুনতাসির মামুন হজ করে আসার খবর বয়ান করলেও বাংলাদেশে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির দখলদারি বিলোপের যে চলমান লড়াই, সে লড়াইয়ে তিনি কি একটি দিনও ইসলামের পক্ষে একটি কথা লিখেছেন বা ময়দানে নেমে একটি বারও আওয়াজ তুলেছেন? হজ তো হযরত ইব্রাহীম (আঃ)র সূন্নত। তাঁর সে মহান সূন্নতটি আল্লাহর প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক তথা আমি হাজির বলা। যখন তার একমাত্র শিশু পুত্র ইব্রাহীমকে কোরবানী করার নির্দেশ এলো তখনও তিনি লাব্বায়েক বলেছেন। আজ বাংলাদেশের মাটিতে যারা ইসলামের পক্ষে লড়াই করছেন তারা তো সে লড়াই করছেন আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আনার লক্ষ্যে। অথচ মুনতাসির মামুন তো লাব্বায়েক বলছেন ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখার অঙ্গিকার নিয়ে। আনুগত্য এখানে শয়তানের। ফলে একবার নয়, হাজার বার হজ করলেও সে হজের কি সামান্যতম মূল্য থাকে? এমন হজ তো সূদখোর, ঘুষখোর ও ব্যাভিচারির নামায-রোযার ন্যায়। নবীজী (সাঃ) পিছনে কত মুনাফিক বছরের পর বছর নামায পড়েছে। কিন্তু তাতে কি তাদের আদৌ কোন কল্যাণ হয়েছে। কল্যাণ তো তারাই পেয়েছে যারা আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে রণাঙ্গণে নেমেছে এবং কোরবানি পেশ করেছে। পবিত্র কোরআনে তো সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও” –(সুরা সাফ আয়াত ১৪)। লক্ষ্য এখানে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়। বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদের এমন এক ব্যবসার কথা বলে দিব যা তোমাদেরকে বেদনাদায়ক আযাব থেকে বাঁচাবে। সেটি হলো তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনো এবং আল্লাহর রাস্তায় জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করো, সেটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা বুঝতে পারতে।”-(সুরা সাফ আয়াত ১০-১১)। অথচ মুনতাসির মামুন আনসার রূপে কাজ করছেন ইসলামের শত্রু পক্ষের এবং লড়ছেন ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে।

কারা মুরতাদ?

মুনতাসির মামুন আরেক মিথ্যা বলেছেন মুরতাদ শব্দের ব্যবহার নিয়ে। জনকন্ঠের নিবন্ধে তিনি লিখেছেন,“আমি বিচারপতি হাবিবুর রহমানের ‘কোরানসূত্র’ ঘেঁটে দেখেছি,সেখানে ‘মুরতাদ’ বলে কোন শব্দ নেই।” তিনি লিখেছেন,“পাকিস্তানে (১৯৭১ সালের আগে) জামায়াত নেতা মওদুদী প্রথম মুরতাদ শব্দটি ব্যবহার শুরু করেন। তার প্রতিষ্ঠার জন্য বিরুদ্ধবাদীদের দমনের ক্ষেত্রে মুরতাদ ঘোষণা করা ছিল এক ধরনের হাতিয়ার। মওদুদী ‘মুরতাদ কী সাজা’ নামে একটি বইও লিখে ফেলেন। এবং সেখানে নানাভাবে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।” মুনতাসির মামুন যে কতটা মিথ্যাচারি ও ইসলামে মৌলিক বিষয়ে তিনি যে কতটা অজ্ঞ -সেটি প্রমাণিত হয় তার এ লেখনিতে। তিনি বিশ্ববিদ্যাদয়ের একজন শিক্ষক, অথচ মুরতাদ শব্দটি তাকে খুঁজতে হয়েছে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের বইতে। অথচ শব্দটির সাথে বাংলাদেশের বহু স্কুলছাত্র ও মাদ্রাসা ছাত্রও পরিচিত। বিশেষ করে সালমান রুশদি ও তসলিমা নাসরীনের কুফরি আচরণের পর। প্রশ্ন হলো, এরূপ বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকতা করেন কীরূপে? তিনি বলতে চেয়েছেন,পাকিস্তানে মুরতাদ শব্দের প্রথম প্রচলন করেছেন মাওলানা মওদুদী। অথচ প্রকৃত সত্য হলো, ইসলামের নামায-রোযা হজ-যাকাত ও জিহাদের ন্যায় মুরতাদ শব্দটিরও প্রচলন ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই। নবীজীর জীবদ্দশাতে কেউ কেউ ইসলাম কবুলের পর ইসলাম ত্যাগ করে কাফেরদের দলে শামিল হয়েছে। নবীজীর পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডও ঘোষিত হয়েছে। এ শব্দের আবিস্কারক তাই মাওলানা মওদুদী নন।

দেহ জীবিত থাকলে তা থেকে দৈহীক শক্তির ন্যায় বর্জও উংপাদিত হয়। দেহের স্বাস্থ্য বাঁচাতে হলে সে বর্জকে নিয়মিত বর্জন করতে হয়। মলমুত্র বন্ধ হয়ে গেলে কি দেহ বাঁচে। মুরতাদগণ হলো উম্মাহর দেহের বর্জ। যে সমাজ মোজাহিদ তৈরী হয় সে সমাজে মুরতাদও তৈরী হয়। মুরতাদ তারাই যারা মুসলমান সমাজের মাঝে প্রকাশ্যে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং শত্রুদের দলে গিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কোন দেশেই জেলে, তাঁতি,কৃষক বা রাখালকে ধরে সামরিক বাহিনী কোর্ট মার্শাল করে না।দেশের বিরুদ্ধে গাদ্দারির অভিযোগে তাদের প্রাণদন্ড দেয়া হয় না।কোর্টমার্শাল তো ঘটে সেনাবাহিনীর সদস্যদের বেলায়। সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার ব্যাপারে অধিকাংশ দেশেই বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু সেনাবাহিনীতে একবার যোগ দিলে যেমন উচ্চ মান-মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা আছে তেমনি অলংঘ্যনীয় দায়বদ্ধতাও আছে। সে দায়বদ্ধতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কঠোর শাস্তিও আছে। তেমনি ইসলাম কাউকে মুসলিম হতে বাধ্য করে না। ধর্মে জোর-জবরদস্তি নেই – তার ব্যাখা তো এটাই। কিন্তু মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো আল্লাহর সৈনিক রূপে নিজেকে শামিল করা এবং শয়তানি শক্তির পক্ষ থেকে যেখানেই হামলা সেখানে গিয়ে হাজির হওয়া। মুরতাদ হলো তারাই যারা আল্লাহর ও মুসলিম উম্মাহর নিরাপত্তার সাথে গাদ্দারি করে। এবং সে গাদ্দারির শাস্তি মৃত্যদন্ড। নানা ফেরকা ও নানা মাজহাবের উলামাদের মাঝে নানা বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু ইসলামের মৌল বিষয়ের ন্যায় মুরতাদের সংজ্ঞা ও শাস্তি নিয়ে কোন মতভেদ নাই।

মুরতাদের শাস্তিঃ ইসলাম ও অন্যধর্মে 

ইংরেজী ভাষায় ব্লাসফেমি একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। এর আভিধানিক অর্থঃ খৃষ্টান ধর্মের উপাস্য ইশ্বরের বিরুদ্ধে অমর্যাদাকর, অবজ্ঞামূলক, আক্রমণাত্মক বা শিষ্ঠাচারবহির্ভূত কিছু বলা বা করা। খৃষ্টান এবং ইহুদী – এ উভয় ধর্মেই এমন অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। সে শাস্তির কথা এসেছে ওল্ড টেস্টামেন্টে। বলা হয়েছেঃ “এবং যে ব্যক্তি প্রভুর নামের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি তথা অপমানকর, অমর্যাদাকর বা শিষ্ঠাচার বহির্ভূত কোন কথা বলবে বা কিছু করবে তবে তার নিশ্চিত শাস্তি হলো তাকে হত্যা করা। জমায়েতের সকলে তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করবে।” –(বুক অব লেভিটিকাস ২৪:১৬)। অপর দিকে হিন্দুধর্মে ব্লাসফেমি শুধু ইশ্বরের বিরুদ্ধে কিছু বলাই নয় বরং কোন ধর্মগুরু বা পুরোহিতের বিরুদ্ধে বলাও। হিন্দুধর্মের আইন বিষয়ক গ্রন্থ মনুষস্মতিতে বলা হয়েছে, “যদি নিম্মজাতের কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ভাবে কোন পুরোহিতকে অবমাননা করে বা তার সাথে খারাপ আচরণ করে তবে রাজার দায়িত্ব হবে দৈহীক শাস্তি বা প্রাণদন্ড দেয়া যাতে সে প্রকম্পিত হয়। -(মনুষস্মতি ২৪:১৬)।

মুনতাসির মামুন কোরআনে বিভিন্ন আয়াতের উদ্ধৃতি তুলে প্রশ্ন তুলেছেন, কোরআনে কোথায় লেখা আছে মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড? বুঝা যায়, মুনতাসির মামুন এখানে ব্যর্থ হয়েছেন কোরআন ও ইসলামের ইতিহাস বুঝতে। ইসলামে মৃত্যুদন্ড রয়েছে খুনীদের জন্য। মৃত্যদন্ড রয়েছে বিবাহিত ব্যভিচারিদের জন্য। কিন্তু এসব অপরাধীদের চেয়েও বড় অপরাধটি সংঘটিত হয় তাদের দ্বারা যারা নিজেদের গলা থেকে আল্লাহর আনুগত্যের রশি দূরে ফেলে দিয়ে বিদ্রোহের পতাকা হাতে তুলে নেয়।  এবং লিপ্ত হয় মুসলিম উম্মাহর নিরাপত্তার বিরুদ্ধে। এরাই কাফেরদের সাথে মিলে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। বাংলাদেশে তো তারা তেমন একটি যুদ্ধই শুরু করেছে। সে যুদ্ধকে তারা বলছে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। সে যুদ্ধে তারা ভারতের সর্ববিধ সহযোগিতাও পাচ্ছে। কোন মুসলিম এমন যুদ্ধাবস্থায় ঘুমাতে পারে? তাছাড়া মুসলিম উম্মাহ কিছুসংখ্যক খুনি বা ব্যাভিচারের পাপে বিপন্ন হয় না। বিপন্ন হয় যখন মুরতাদদের বিদ্রোহ দেখা দেয়। কোন রাজা কি তার রাজ্যে বিদ্রোহীদের ক্ষমা করেন? সেটি হলে কি তার রাজ্য বাঁচে? তাই আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ও সাহাবাগণ এসব বিদ্রোহীদের নির্মূল করেছেন মৃত্যুদন্ড দিয়ে। নবীজীর প্রসিদ্ধ হাদীস, “মান বাদ্দালা দ্বীনাহু, ফাকতুলুহ’। অর্থঃ যে ব্যক্তি তার দ্বীনকে পাল্টিয়ে নিল, তাকে হত্যা কর”। ফলে পাকিস্তানে মাওলানা মওদূদী মুরতাদ ও মুরতাদের শাস্তির ধারণাটি প্রথমে পেশ করেন –মুনতাসির মামুনের এমন মতের কি কোন ভিত্তি থাকে? পাকিস্তানে আজ যে ব্লাসফেমি আইন সেটির প্রবর্তক কি মাওলানা মওদূদী? সালমান রুশদির বিরুদ্ধে হত্যার ফতওয়া দিয়েছিলেন ইমাম খোমিনী। তিনি কি জামায়াতে ইসলামীর সদস্য ছিলেন? মুরতাদের শাস্তি যে মৃত্যুদন্ড তা নিয়ে হানাফি, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী ফেকাহর মধ্যে যেমন দ্বিমত নেই, তেমনি দ্বিমত নেই শিয়াদের মাঝেও। বাংলাদেশেও তা নিয়ে কোন নানাদল, নানা ফেরকা ও নানা মাদ্রাসার আলেম উলামাদের মাঝে তিলমাত্র বিভেদ নাই। নানা মুনতাসির মামুন সেটি না জানলে সেটি তার অজ্ঞতার দোষ, এজন্য কোরআন-হাদীসকে দায়ী করা যায় না।

যে কঠোরতা শত্রুর বিরুদ্ধে

ইসলাম শুধু দয়া, ক্ষমাশীলতা ও দানশীলতার কথাই শেখায় না। অন্যায় ও দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে কঠোর হতেও শেখায়। মুসলমান তাই ইসলামের শত্রুদের সাথে আপোষ করতে জানে না। পবিত্র কোরআনে মুসলমানদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এভাবে, “তাঁরা যেমন পরস্পরে রহমশীল, তেমনি অতি কঠোর কাফেরদের বিরুদ্ধে”। -(সুরা ফাতির)। আর আল্লাহ ও তার দ্বীনের সবচেয়ে বড় শত্রু তো ঘরের শত্রু মুরতাদগণ। হযরত আবু বকরের সময় একদল মানুষ খলিফার ভান্ডারে যাকাত দিতে অস্বীকার করে। হযরত আবু বকর তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করেন। ইসলামের এ বিদ্রোহীদের শাস্তি ছিল মৃত্যুদন্ড। তিনি ঘোষণা দেন, “নবীজীর আমলে মানুষ শুধু যাকাতের উঠই দিত না, উঠের সাথে রশিটাও দিন। কেউ যদি কেউ সে রশি দিতে অস্বীকার করে তবে তাকেও রেহাই দেয়া হবে না।”

মহান আল্লাহতায়ালা চান, তাঁর অবাধ্যরা যেন মুসলিম উম্মাহর ভিতরে ভন্ড মুসলিমের বেশ ধরে ঘর না বাঁধে। ভিতরের কীটরূপী শত্রুদের বাড়তে দিলে কোন সমাজই সামনে এগুতে পারে না। তাই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা,“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দেশে ফ্যাসাদ সৃষ্টিতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হলো এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে, অথবা তাদের হস্তপদসমুহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিস্কার করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।”- (সুরা মায়েদা আয়াত ৩৩)। পবিত্র কোরআনে আরো বলা হয়েছে,“অবশ্য তারা যদি তওবা করে, নামায কায়েম করে আর যাকাত আদায় করে তবে তোমাদের দ্বীনী ভাই (অর্থাৎ মুসলমান)। আর আমি বিধানসমুহ জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য সবিস্তারে বর্ণনা করে থাকি। আর যদি তারা তাদের শপথ প্রতিশ্রুতির পর (অর্থাৎ ইসলাম গ্রহনের পর)ভঙ্গ করে এবং বিদ্রুপ করে তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে, তবে (এসব) কুফর প্রধানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর। কারণ এদের কোন শপথ নেই যাতে তারা ফিরে আসে।” -(সুরা তাওবাহ, আয়াত ১১-১২)।

 

শ্রেষ্ঠজাতি যে কারণে

মুনতাসির মামুন লিখেছেন, “আল্লাহ যেখানে তাঁর প্রিয় বান্দা আমাদের প্রিয় রাসূল (স) সম্পর্কে বলছেন,‘ধর্মের ব্যাপারে তাঁকে দারোগা করা হয়নি সেখানে ‘ইসলামপন্থি’ বলে ব্যক্তিরা কীভাবে ধর্মের দারোগা সাজেন?”  ইসলামের বিরুদ্ধে মুনতাসির মামুনের এটি ভয়ানক বিষোদগার। এমন মিথ্যা কথা বলার মধ্যে তার রাজনৈতীক মতলব আছে। তবে এক্ষেত্রে তিনি একা নন। তার সাথে রয়েছে আওয়ামী ঘরানার সকল বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতীক নেতাকর্মী। তারা চান, মুসলিম ভূমিতে ইসলামি চেতনা নির্মূলে ও পাপাচারের বিস্তারে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, রাজনৈতীক সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, মিডিয়া ও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাসহ সব কিছুকে তারা ইচ্ছামত ব্যবহার করবেন। ইসলামপন্থিদের রক্তমাংস দিয়ে সকাল বিকাল নাশতা করবেন –সেটিও তো তাদের স্বাধীনতা। সে বাসনার কথা তো শাহবাগের সমাবেশে মহাধুমধামে ঘোষণাও করেছেন। তাদের আব্দার, তাদের সে স্বাধীনতায় বাধা দিতে অন্যরা কেন দারোগার ভূমিকায় নামবে? অথচ তিনি জানেন না যে পাপাচারের নির্মূলে মুসলমান তো আল্লাহর সার্বক্ষণিক পুলিশ। আল্লাহর এ পুলিশগণ কোন বেতনের প্রত্যাশায় কাজ করে না। বরং আল্লাহর দ্বীনের পাহারাদারিতে তারা নিজের জানমাল নিয়ে হাজির হয়। একাজে তারা মহান আল্লাহর কাছে নিজেদের জানমাল অনেকে আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। এমন মোজাহিদদের নিয়েই পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরাই হলে দুনিয়ার সেই শ্রেষ্ঠ উম্মত যাদেরকে গড়ে তোলা হয়েছে সমগ্র মানুষ জাতির হেদায়াত ও সংশোধনের জন্য। তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দিবে এবং অন্যায় থেকে মানুষকে রুখবে। এবং ঈমান রাখো আল্লাহর উপর। -(সুরা আল ইমরান আয়াত ১১০)।কোন মুসলিম দেশে আল্লাহর দ্বীনের এমন অতন্দ্র প্রহরী থাকতে কি কোন বেতন ভোগী দারোগা-পুলিশের প্রয়োজন আছে?

 

আক্রোশ ঈমানদারের রাজনীতির বিরুদ্ধে

মুনতাসির মামুনরা ইসলামপন্থিদের বিভক্তি দেখে পুলক পান। আনন্দে ডুগডুগি বাজান। কিন্তু আজ উনাদের প্রচন্ড গোস্সা ইসলামপন্থিদের একতা দেখে। ফলে আদাপানি খেয়ে লেগেছেন, কি করে আবার বিভক্তি গড়া যায়। মুসলমানদের বিভক্ত করো এবং শাসন করো –এটাই তো প্রতি মুসলিম দেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের সনাতন কৌশল। একাজে সরকার কিছু ভাড়াটে মৌলানাকে লাগিয়েছে সরকার বিরোধী আলেমদের কাফের ঘোষণায়। মুনতাসির মামুন প্রচন্ড দুঃখ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, মসজিদগুলো কেন ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনীতির কাজে? লিখেছেন,“মসজিদে রাজনীতি কখনও চলতে পারে না। প্রতি শুক্রবার ইমামদের যুক্তিবাদীদের বিরুদ্ধে বয়ানের রাজনীতি বৈধ নয়। কোরান বা হাদিসের কোথায় সিয়াসতের স্থান আছে?” প্রশ্ন হলো, ইসলামের উপর যার সামান্য জ্ঞান আছে এমন ব্যক্তি কি এরূপ কথা বলতে পারে? অথচ এরাই আবার নিজেদেরকে জ্ঞানী ও যুক্তিবাদী বলেন। তবে কি তাদের জ্ঞান ও যুক্তির দৌড় কি এটুকু? প্রশ্ন তুলেছেন, কোরআন হাদীসের কোথায় সিয়াসত? ইমামদের রাজনৈতীক বৈয়ানেও তার আপত্তি। তাদের দাবী, দেশের ঘুষখোর, মদখোর, সূদখোর, ব্যাভিচারি ও বিদেশের দালাল –এরা সবাই রাজনীতি করতে পারবে। কিন্তু মসজিদের ইমামের রাজনীতিতে কোন অধিকার থাকে পারে না। দেশে সেটি হচ্ছে না বলেই তাদের আপত্তি।

অথচ ইসলামের মহান নবী শুধু নামায-কালাম, হজ-যাকাত শিখিয়ে যাননি, তিনি রাজনীতি, প্রশাসন, সমাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইনন-আদালত, ব্যবসা-বানিজ্য ও যুদ্ধবিগ্রহও শিখিয়ে গেছেন। তিনি মানবজাতির জন্য সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ –কোরআনে ভাষায় উসওয়াতুন হাসানা। তিনি মহান আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুকরণীয় আদর্শ রেখে কর্মজীবনের প্রতি অঙ্গণে। সেটি না হলে তাঁর নবুয়তই অপূর্ণাঙ্গ থেকে যেত। তাছাড়া জীবনের প্রতিক্ষেত্রে তিনি যদি কোন আদর্শই রেখে না যান তবে তিনি কি উসওয়াতুন হাসানা তথা সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হওয়ার মর্যাদা রাখেন? মু’মিনের দায়িত্ব হলো তাঁর জীবনের পথচলার প্রতি কর্মে নবীজী (সাঃ)র আদর্শ খোঁজা এবং তা অনুসরণ করা। মদীনার ১০ বছরের জীনের তিনি ছিলেন পুরাপুরি একজন রাষ্ট্রনায়ক। ছিলন প্রশাসক ও জেনারেল। ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি। বহুমুখি সে কাজের জন্য কি তাঁর কোন সেনানীবাস, সেক্রেটারিয়েট, থানা-পুলিশ বা কোর্ট বিল্ডিং ছিল? সবকিছুর কেন্দ্র ছিল মসজিদ। অথচ মুনতাসির মামুনের অভিযোগ, “কওমি, নন-কওমি,আহলে হাদিস,সাধারণ জঙ্গী,মধ্যপন্থী সব ‘ইসলামী’ আজ মসজিদকে বেছে নিয়েছে রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে। শুধু তাই নয়,জামায়াতীরা মসজিদ থেকে যুক্তিবাদীদের ওপর শুধু ঢিল পাটকেল নয় গুলিও চালায়; হত্যা করে,ভাংচুর করে এবং জায়নামাজ পোড়ায়।” তিনি জানেন না, মসজিদই হলো মোজাহিদদের দুর্গ। সে দুর্গের উপর যখন শত্রুপক্ষের বন্দুক ও ক্যাঁদানে গ্যাসের হামলা হয় তখন সে দুর্গে আশ্রয় নেয়া মোজাহিদগণ যদি মসজিদের কার্পেটের কিছু অংশ পুড়িয়ে ক্যাঁদানে গ্যাসের প্রকোপ প্রশমনের চেষ্টা করে তবে তাতে দোষের কি? মু’মিনের জানের চেয়ে কার্পেট কি বেশী গুরুত্বপূর্ণ? এ অবধি কোন সুবোধ আলেম কি তা নিয়ে কোন আপত্তি তুলেছেন? আপত্তি তো তুলেছে মুনতাসির মামুনের ন্যায় ইসলামে অঙ্গিকারহীন ভারতীয় কাফেরপন্থিদের পক্ষ থেকে। ইসলামের বিজয় নিয়ে যাদের ভাবনা নেই তাদের আবার মসজিদের কার্পেটের প্রতি এত দরদ কেন? তাছাড়া ইসলামের দুর্গ মসজিদ থেকে কাফের-মুরতাদদের বিরুদ্ধে শুধু ওয়াজ নয়, হামলাও হবে তাতেই বা বিস্ময়ের কি আছে?

 

চাই শক্ত ধাক্কা

মুনতাসির মামুন আরো লিখেছেন,“আমাদের এসব বীর ‘মৌলানাদের’ গিয়ে বলব মক্কায় বা মদীনায় গিয়ে রাজনীতির কথা বলতে।” প্রশ্ন হলো তিনি আলেমদের নসিহত করার কে? কোথায় গিয়ে রাজনীতি বা জিহাদ করতে হবে সে ফরমায়েশ দেয়ারই বা কে? তার উচিত তার নিজের চরকায় তেল দেয়া। তিনি কি জানেন না,মুসলিমদের প্রথম কাজ তার নিজ ঘরকে প্রথমে ঠিক করা? তাছাড়া কে কোথায় জন্ম নিবে সেটি তার নিজের আয়ত্ত্বাধীন বিষয় নয়; সে ফয়সালাটি মহান আল্লাহতায়ালার। বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নেয়া প্রতিটি ঈমানদার ব্যাক্তি হলো এ দেশটির বুকে মহান আল্লাহর খলিফা। খলিফা রূপে বাংলাদেশের বুকে তার এ এপোয়েন্টমেন্টটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। সেটি জন্মসূত্রে। এখান থেকে অন্যদেশে যাওয়ার অর্থ হলো আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নির্ধারিত কর্মস্থল থেকে পলায়ন করা। তাই সে কেন সৌদি আরবে যাবে? অন্য কোন দেশেই বা যাবে কেন? নবীজী (সাঃ) ও তার সাহাবাগণ প্রথমে আরবভূমিকে কাফেরদের অধিকৃতি থেকে মুক্ত করেছিলেন। তারপর ছুটেছেন অন্যদেশে। একই সূন্নত পালন করতে হবে বাংলাদেশের মুসলমানদেরও। তাছাড়া বাংলাদেশ আজ হিন্দুস্থানের এজেন্টদের হাতে অধিকৃত। ১৯৭২ সালে ভারত সামরিক বাহিনী তুলে নিলেও তাদের এজেন্টদের তুলে নেয়নি। বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের দায়িত্ব তাই সৌদিআরবে যাওয়া নয়। সেখানে বিপ্লব আনাও নয়। বরং প্রথমে বাংলাদেশকে শত্রুমূক্ত করে পরিপূর্ণ ইসলামি করা। বাংলাদেশের ঈমানদার মুসলমানগণ তো সে কাজই শুরু করেছে। আর এতেই গা-জ্বালা শুরু হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের। ইমামদের মসজিদ কেন্দ্রীক রাজনীতি নিয়ে এজন্যই মুনতাসির মামুনের এত আপত্তি। কিন্তু মুসলিমের তো এ লড়াই থেকে পিছু হটার উপায় নেই। সেটি হলে তা হবে আল্লাহ ও ইসলামের সাথে প্রচন্ড গাদ্দারি। সে গাদ্দারির জন্য তাকে পরকালে জবাব দিতে হতে হবে। যখন ইসলামি জনতা জেগে উঠে, একমাত্র তখনই জালেম শাসকের কুরসী হেলে পড়ে। ঈমানদারদের কাজ হলো, হেলে পড়া কুরসীতে সবাই মিলে শক্ত ধাক্কা দেয়া। একমাত্র তখনই গুড়িয়ে যাবে মুরতাদ-তোষণকারি ও ভারতীয় রাজনীতির সেবাদাসীর মসনদ। একমাত্র তখনই ভেসে যাবে বহুদিনের জমা শিকড়শূণ্য সকল আবর্জনা। ২৩/০৩/১৩; নতুন সংস্করণ ৭/৭/২০১৯

 




কোর’আন বুঝায় ব্যর্থতা ও তার পরিণাম

ডাক্তারী বই বুঝতে অতি অপরিহার্য হলো, বইয়ের ভাষা, জীববিদ্যা, মানব শরীরের এ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রিসহ বহু বিষয়ের জ্ঞান। তেমনি কোর’আন বুঝার জন্য শুধু আরবী ভাষা জানলেই চলে না। কোর’আন বুঝার সামর্থ্য বাড়াতে অতি জরুরী হলো, ইতিহাস, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, এবং কোর’আন নাযিল কালে আরবদের মাঝে প্রচলিত রীতি-নীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতিসহ বহু বিষয়ের জ্ঞান। অথচ বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানদানের ক্ষেত্রটি অতি সীমিত। গুরত্ব পায়নি ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানের ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর শিক্ষাদান। ফলে লক্ষ লক্ষ ছাত্র সেখান থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে বের হলেও কোর’আনের উপর উন্নত মানের তাফসির-কারক সৃষ্টি হচ্ছে না। বাংলা ভাষায় যেসব তাফসির গ্রন্থ্ বাজারে পাওয়া যায় –সেগুলির অধিকাংশই উর্দু বা আরবি ভাষা থেকে অনুদিত। বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার এ এক বিশাল ব্যর্থতা।

অথচ পবিত্র কোর’আন বুঝার সামর্থ্য না থাকলে “আব্‌দ”, “ইবাদত”, “আব্দুল্লাহ’ “ইবাদুর রাহমান”য়ের ন্যায় পবিত্র কোর’আনে ব্যবহৃত অতি গুরুত্বপূর্ণ বহু পরিভাষাই বুঝতে দারুন ভূল হয়। এতে অজ্ঞতা থেকে যায় প্রকৃত ইসলাম নিয়ে। তখন অসম্ভব হয় প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। “আব্‌দ”য়ের অর্থ গোলাম এবং “ইবাদত”য়ের অর্থ গোলামী। মুসলিম হওয়ার দায়বদ্ধতা হলো তাকে বাঁচতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার একনিষ্ঠ “গোলাম”য়ের পরিচিতি এবং ইবাদত তথা গোলামীর দায়ভার নিয়ে। কিন্তু কীরূপ হবে গোলামের সে পরিচিতিটি এবং কীরূপ হবে সে গোলামী? কোথা থেকে জানবে সে প্রকৃত গোলাম ও গোলামীর পরিচিতি? শুধু কোর’আনের হাফিজ বা ক্বারী হলে সে পরিচিতি বুঝা বা চেনা যায় না। এবং সে পরিচিতি নিয়ে বেড়েও উঠাও যায় না। অথচ বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে এখানে ভূল হলে ভূল হবে মুসলিম রূপে বাঁচায়। ফলে ব্যর্থতা জুটবে পরকালে। আবদ (গোলাম) ও ইবাদত (গোলামী)’র সঠিক অর্থ বুঝতে হলে নবীজী (সাঃ)র সমকালীন সময় থেকে এর অর্থ  বুঝতে হবে। এ শব্দ দু’টির অর্থ বাংলাদেশের বা আধুনিক আরব দেশগুলির প্রেক্ষাপটে বুঝলে তার প্রকৃত অর্থ জানায় যেমন ভূল হবে, তেমনি মুসলিম রূপে বাঁচাতেই প্রচণ্ড বিচ্যুতি আসবে।

 

নবীজীর যুগে আরবের বহু ঘরে গোলাম ছিল এবং তাদের সর্বজন স্বীকৃত একটি পরিচিতিও ছিল। গোলামকে বাঁচতে হতো তার মনিবের প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ-আনুগত্য নিয়ে। মনিবের এজেন্ডা পূরণে শুধু ঘরসংসার ও ক্ষেতখামারে কাজ করাই যথেষ্ট ছিল না, মনিবের নির্দেশে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে সর্বসামর্থ্য দিয়ে যুদ্ধেও নামতে হতো। সে যুদ্ধে প্রয়োজনে প্রাণও দিতে হতো। মনিবের কোন হুকুমের অবাধ্যতার শাস্তি স্বরূপ তাকে যদি মনিব আগুণের অঙ্গারের উপর শুইয়ে রাখতো, হত্যা করতো বা জীবিত কবর দিত -তবুও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কোনরূপ অধীকার গোলামের ছিল না। সমাজে তা নিয়ে প্রতিবাদও উঠতো না। কারণ সেটিই ছিল তৎকালীন সমাজের রীতি। তাই হয়রত সুমাইয়া ও তাঁর স্বামী হযরত ইয়াছিরকে যখন তাঁদের কাফের মনিব ইসলাম কবুলের শাস্তি স্বরূপ নির্মম ভাবে হত্যা করে তখন সমাজে কোন প্রতিবাদ উঠেনি। হযরত খাব্বাবকে যখন তাঁর মালিক মক্কার লোকালয়ে আগুণের অঙ্গারের উপর শুইয়ে রেখেছিল তখনও কোন প্রতিবাদ উঠেনি। অথচ গোলাম নয় এমন কোন মানুষকে হত্যা করলে সে আরবের বুকেই তৎকালে যুদ্ধ শুরু হতো। তখন গোলামদের হাটেবাজারে কেনাবেচা হতো এবং তাদের উচ্চ মূল্যও ছিল। মনিবের কাছে বিক্রয় হওয়ার কারণেই তাদের বাঁচতে হতো মালিকের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে। কিন্তু আধুনিক যুগে গোলামের সে পরিচয়টি বেঁচে নাই। গোলাম এখন আল ক্রীতদাস নয়, ফলে মনিবের হুকুম না মানলে বড় জোর চাকুরি যায়, কিন্তু নিহত হতে হয় না। ফলে আজকের যুগের বিরাজমান এ ধারণা নিয়ে কোরআন “আবদ” ও “ইবাদত”য়ের  যে ধারণা পেশ করেছে সেটি বুঝা অসম্ভব।

 

নবীজী (সাঃ)র যুগে ক্রীতদাস বা গোলামের জীবনে গোলামীর যে সার্বক্ষণিক এক দায়বদ্ধতা ছিল তেমন এক দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার বান্দাহ বা গোলামকে। প্রকৃত অর্থে কেউ ঈমান আনলে মহান আল্লাহতায়ালা সে ব্যক্তির সাথে তাঁর জানমাল কিনে নেয়ার একটি পবিত্র চুক্তি সমাধা করেন। বিক্রয়কৃত গোলাম রূপে তাঁকে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া কিছু কাজও করতে হয়। সেটিই অতি সুস্পষ্ট ভাবে বর্নীত হয়েছে সুরা তাওবার ১১১ নং আয়াতে। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের থেকে ক্রয় করে নিয়েছেন তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। (আর ক্রয়কৃত গোলাম রূপে) তাঁরা যুদ্ধ করে আল্লাহতায়ালার রাস্তায়; অতঃপর তাঁরা হত্যা করে (ইসলামের শত্রুদের) এবং নিজেরা্ও (শত্রুদের হাতে) নিহত হয়। আল্লাহর সে প্রতিশ্রুত ওয়াদাটির সত্যতা বর্ণীত হয়েছে তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোর’আনে। আর প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আল্লাহর চেয়ে কে শ্রেষ্ঠতর? অতএব তোমরা উৎফুল্ল হও মহান আল্লাহতায়ালার সাথে কৃত এ ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিতে। আর এটিই তো হলো সর্বশ্রেষ্ঠ সাফল্য।”

মহান আল্লাহতায়ালার ক্রয়কৃত গোলাম রূপে ঈমানদারের দায়িত্ব তাই শুধু নামায-রোযা আদায় নয়,বরং সে দায়ভারটি আরো বিশাল। সেটি হলো মহান প্রভুর প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য। অবাধ্যতা হলে সে কাফেরে পরিণত হয়। তাই ঈমানদার কখনোই নিজে সার্বভৌম শাসক হতে পারে না। বরং তাঁর দায়িত্ব হয়, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তক প্রতিষ্ঠা দেয়া। সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট ও স্বৈরাচারি শাসকদের ক্ষমতায় বসিয়ে সে কাজ সম্ভব নয় বলেই অনিবার্য হয়ে উঠে যুদ্ধ। মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে নিশ্চিত করতে মহান নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণও তাই যুদ্ধ এড়াতে পারেননি। বরং তিনি নিজে যেমন গুরুতর আহত হয়েছেন, তেমনি তাঁর সাহাবাদের শতকরা ৭০ ভাগের  বেশী শহীদ হয়েছেন। শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, মুসলিমগণ বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছে এবং দেশে দেশে ইসলামের বিজয় ছড়িয়ে পড়েছে তো তাদের সে কোরবানীর ফলেই।

 

কিন্তু এক্ষেত্রে আজকের মুসলিমদের ব্যর্থতাটি বিশাল। তারা ব্যর্থ হয়েছে “আবদ” ও “ইবাদত”র অর্থ বুঝতে। তাদের ইবাদত সীমিত হয়ে আছে নামায-রোযা, হজ-যাকাতের ন্যায় কিছু আনুষ্ঠিকতার মাঝে। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, যুদ্ধবিগ্রহ, আইন প্রণয়ন ও বিচার-আচারের অঙ্গণে সে যেন স্বাধীন ও সার্বভৌম।   অথচ এরূপ স্বাধীন ও সার্বভৌম হওয়াটাই কুফরি। মুসলিমের দায়িত্ব এখানে খেলাফতের তথা গোলামসুলভ প্রতিনিধিত্বের। কোর’আন বুঝায় ব্যর্থতার কারণেই হাফিজ, ক্বারী, মাদ্রাসার শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম হওয়া সহজ হয়েছে; কিন্তু অতি কঠিন হয়েছে আল্লাহতায়ালার কাছে বিক্রয়কৃত গোলাম হওয়াটি।  ফলে মুসলিম দেশগুলিতে শরিয়তের বিলুপ্তি এবং ইসলামের আত্মস্বীকৃত শত্রুদের বিজয় যেমন আজ এক নিরেট বাস্তবতা, তেমনি আরেক বাস্তবতা হলো আল্লাহর কাছে বিক্রয়কৃত গোলাম রূপে বেড়ে উঠতে মুসলিমদের ব্যর্থতা। বরং তারা নিজেদের শ্রম, মেধা ও জানমাল বিক্রয় করছে ইসলামের শত্রুদের বিজয়কে বাঁচিয়ে রাখতে। এদের কারণেই মুসলিম দেশগুলিতে প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, মিডিয়া এবং রাজনৈতীক দল চালাতে ইসলামের ঘোরতর শত্রুদেরও লোকবলের অভাব হয় না। বিপুল লোকবল পাচ্ছে চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত এবং গুম-খুনের রাজনীতির অপরাধী নেতা-নেত্রীগণও। ঔপনিবেশিক শাসন আমলে এমনকি ইউরোপীয় কাফেরদের কাছেও তারা নিজেদের বিক্রয় করেছে অতি সস্তা মূল্যে। পরিতাপের বিষয় হলো, কোর’আন বুঝায় গভীর ব্যর্থতার কারণে এরাও মুসলিম সমাজে মুসলিম রূপে পরিচিতি পায়।  মুসলিমদের সবচেয়ে ব্যর্থতা তাই কৃষি, অর্থনীতি, বা ব্যবসা-বাণিজ্যে নয়, বরং সেটি হলো কোর’আন বুঝায়। মহান আল্লাহতায়ালা তার নবীকে দিকে যেখান থেকে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি শুরু করেছিলেন সেটিই আজ গুরুত্ব হারিয়েছে মুসলিম দেশগুলিতে। ফলে ব্যর্থতা শুধু দুনিয়াতেই বাড়ছে না, ভয়াবহ ব্যর্থতা অপেক্ষা করছে আখেরাতেও। এবং সেটি অনন্ত-অসীম কালের জন্য। ০২/০৭/২০‌৯  

 




শেখ মুজিবের লিগ্যাসী ও মহাসংকটে বাংলাদেশ

আওয়ামী রাজনীতির নাশকতা

প্রত্যেক নেতাই তার অনুসারিদের জন্য লিগ্যাসী তথা অনুকরণীয় শিক্ষা রেখে যায়। সে লিগ্যাসী বেঁচে থাকে অনুসারিদের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও আচার-আচরণে। তেমন এক লিগ্যাসী শেখ মুজিবও রেখে গেছেন। বাংলাদেশে আজ  যে আওয়ামী-বাকশালীদের দুঃশাসন চলছে তার শুরু শেখ হাসিনা থেকে নয়, আজকের আওয়ামী লীগও নয়; বরং এর শুরু শেখ মুজিরেব হাতে। আজও  তা চলছে মুজিবের ঐতিহ্য ধরে। আওয়ামী লীগের সর্বসময়ের ভাবনা সে মুজিবী ঐতিহ্য আঁকড়ে থাকায়। গাছ যেমন শিকড় থেকে শক্তি সঞ্চয় করে আজকের আওয়ামী লীগও তেমনি বল পাচ্ছে সে মুজিবী ঐতিহ্য থেকে। রোগব্যাধী ও ক্যান্সার সব সময়ই একই রূপ সিম্পটম নিয়ে হাজির হয়। যক্ষা আজ থেকে দশ বছর আগে যেরূপ উপসর্গ নিয়ে হাজির হতো আজও সেরূপই আসে। আগামীতেও একই ভাবে আসবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ এক ভয়ানক রোগ। ফলে দলটি যখনই ক্ষমতায় আসে তখন একাকী আসে না,সাথে আনে তার স্বভাবজাত সিম্পটমও। আনে ভয়ানক আযাব। সে আযাবের কারণে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫’য়ে যেরূপ ভয়ানক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল,দেশটির সমগ্র ইতিহাসে আর কোন কালেই তেমনটি ঘটেনি। তাতে যে শুধু গণতন্ত্র, সুশাসন, মৌলিক মানবিক অধিকার মারা গিয়েছিল তা নয়, বরং ভয়ানক দুর্ভিক্ষ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে মারা পড়েছিল লক্ষাধিক মানুষ। দলটির ২০০৮-য়ের বিজয় এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোট-ডাকাতির নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি, বরং নামিয়ে এনেছে হত্যা-গুম-ধর্ষণ-সন্ত্রাস ও জেল-জুলুমের এক ভয়ানক দুঃশাসন।

যক্ষা-কলেরার ন্যায় কোন সংক্রামক রোগ-ব্যাধীকে বুঝতে হলে প্রথমে তার জীবাণুকে সনাক্ত করতে হয়। তেমনি আওয়ামী লীগের দুঃশাসন বুঝতে হলে বুঝতে হয় তার মূল জীবাণুকে। আর সে ঘাতক জীবাণুটি হলো শেখ মুজিব নিজে। এবং সেটি আজও  বেঁচে আছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মাঝে। প্রতিটি বিধ্বংসী জীবাণুরই নাশকতা থাকে,মুজিবের ক্ষেত্রে সে নাশকতাটি হলো তাঁর বিনাশী রাজনৈতিক চেতনা। সে চেতনা শুধু চরিত্রেরই বিনাশ ঘটায় না,দেশ ও দেশের সংস্কৃতিরও বিনাশ ঘটায়। সে মুজিবী চেতনায় আনন্দ ও উৎসব দেশ ভাঙ্গাতে,গড়াতে নয়। সর্ববৃহৎ মুসালিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভাঙ্গাতে তারা যেমন বিপুল আনন্দ পেয়েছে,এখন আনন্দ পাছে বাংলাদেশের বিনাশে। সে মুজিবী নাশকতার বাংলাদেশে প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল তাঁর বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের দুঃশাসনে। কোন দেশপ্রেমিক নেতাই দেশের এক ইঞ্চি ভূমি শত্রুর হাতে তুলে দেয়ে না। অথচ মুজিব আনন্দ চিত্তে বাংলাদেশের ভূমি বেরুবাড়ি ইউনিয়ন ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল। মুজিবের মৃত্যু ঘটেছে, কিন্তু তাঁর সে ঘাতক রাজনীতি মারা পড়েনি। বরং আজও  সে রাজনীতি অবিকল বেঁচে আছে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির মাঝে।

১৯৭৫য়ে মুজিবের মৃত্যু এবং ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬-অবধি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে তাঁর দলের দূরে থাকার ফলে মুজিবের স্বপ্নের সে রাজনীতি ও তাঁর কুকীর্তিগূলো আত্মভোলা বাঙালীদের অনেকেই ভূলে গিয়েছিল। ইতিমধ্যে অনেকেই ভূলে গিয়েছিল তাঁর একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার,দলীয় ক্যাডারদের সন্ত্রাস,রক্ষিবাহিনীর অত্যাচার,ইসলামি শিক্ষা ও রাজনীতি-বিরোধী নীতি,সীমাহীন ভারতীয় লুণ্ঠন,১৯৭৪য়ের ভয়ানক দুর্ভিক্ষ,সে দুর্ভিক্ষে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু এবং অসংখ্য জালপড়া বাসন্তির কথা। সে স্মৃতি প্রবীনদের মাঝে কিছুটা বেঁচে থাকলেও নতুন প্রজন্মের তা জানার সুযোগ জুটেনি। এতে প্রচণ্ড লাভ হয়েছিল শেখ মুজিবের। তিনি অনেকের মনে বেঁচে ছিলেন নিজে যা নন তার চেয়েও এক বিশাল পরিচয় নিয়ে। কিন্তু আজ আবার সে মুজিবী শাসনের সে স্মৃতি বাংলাদেশে নেমে এসেছে ভয়ানক তাণ্ডব নিয়ে। ফলে সুযোগ মিলেছে আওয়ামী-বাকশালীদের চরিত্রকে পুনরায় দেখার।

 

মুজিবের অপরাধ

মুজিবের অপরাধের তালিকাটি বিশাল। তাঁর বিশ্বাসঘাতকতা শুধু গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে নয়।সেটি বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব ও ইজ্জতের বিরুদ্ধেও। তিনি বিশ্বমাঝে বাংলাদেশের অপমান বাড়িয়েছেন নানা ভাবে। শায়েস্তাখানের সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে তিনি বিশ্বের দরবারে ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি রূপে পরিচিত করেছেন। তিনিই সর্বপ্রথম কেড়ে নিয়েছিলেন বাকস্বাধীনতা এবং বন্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী পত্রিকা। গণতন্ত্রকে তিনি কবরস্থানে পাঠিয়েছিলেন এবং উপহার দিয়েছিলেন প্রকাণ্ড দুর্ভিক্ষের। দেশের ভূমি বেরুবাড়ি তুলে দেয়ার পাশাপাশি ভারতকে দিয়েছিলেন পদ্মার উপর ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পানি তুলে নেয়ার অধিকার। দেশকে তিনি পরিণত করেছিলেন ২৫ সালা দাসচুক্তিতে আবদ্ধ ভারতের আজ্ঞাবহ এক করদ রাজ্যে। আওয়ামী ‍‌‌‌লীগের দুঃশাসন নিয়ে ‌‍‍‍‌‌‌‍‌‌‌‌‌‍‍‍‍‍‌‌‌‌‌‌জনাব বদরুদ্দিন উমর লিখেছেন,“একাত্তরের ‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍যুদ্ধকালীন ৯ মাস ছাড়া পাকিস্তান আমলের কোন কালেই অবস্থা এতটা খারাপ ছিল না যা আওয়ামী শাসনামলে হয়েছে।”

শেখ মুজিব ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে ভোট নিয়েছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে,কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে তিনি কবরস্থানে পাঠিয়েছিলেন। গণতন্ত্রের সাথে এতবড় গাদ্দারি ও দুষমনি পাকিস্তানী আমলে যেমন হয়নি,ঔপনিবেশিক শাসনামলেও হয়নি। পাকিস্তানী আমলে যেমন আওয়ামী লীগ ছিল, তেমনি মুজিবের রাজনীতিও ছিল। ছিল আওয়ামী লীগের দলীয় পত্রিকা ইত্তেফাক। সে সময় ভারতের সাথে আগরতলা ষড়যন্ত্র করেও তিনি পাড় পেয়ে গিয়েছিলেন। ব্রিটিশ আমলেও মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের ব্রিটিশ-বিরোধী রাজনীতি ছিল। কিন্তু মুজিবের শাসনামলে সেসব ছিল না; বিরোধী দলের জন্য কোনরূপ স্থান ছেড়ে দিতে রাজী ছিলেন না। গণতন্ত্র বলতে তিনি বুঝতেন তাঁর নিজদলের স্বৈরশাসন। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের জন্য জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে বেঁচে থাকাই তিনি কঠিন করেছিলেন। তাদের সায়েস্তা করতে তিনি পুলিশ ও তাঁর দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর বা্ইরেও সেনা বাহিনীর ন্যায় বিশাল এক রক্ষিবাহিনী গড়েছিলেন। তাদের দিয়ে তিনি প্রায় তিরিশ হাজার রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যার ব্যবস্থা করেছিলেন।

 

বিশ্বাসঘাতকতা ইসলামের বিরুদ্ধে

মুজিবের বিশ্বাসঘাতকতা ইসলামের সাথেও কম ছিল না। ১৯৭০য়ের নির্বাচনে তিনি ভোট নিয়েছিলেন এ ওয়াদা দিয়ে যে,তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে ইসলাম বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন করবে না।-(সূত্রঃ আওয়ামী লীগের ১৯৭০’য়ের নির্বাচনি মেনিফেস্টো)। অথচ ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই তিনি প্রকাণ্ড হারাম কাজ করলেন একটি মুসলিম দেশে ভেঙ্গে। আর ক্ষমতায় গিয়েই নিষিদ্ধ করলেন ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে সংগঠিত হওয়াকে। ইসলামী চেতনার  বিরুদ্ধে এর চেযে বড় গাদ্দারি ও বিশ্বাসঘাতকতা আর কি হতে পারে? মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো ইসলামের প্রতিষ্ঠায় সর্বতোভাবে সচেষ্ট হওয়া এবং মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধিতে আত্মনিয়োগ করা। শক্তিবৃদ্ধির কাজে মুসলিমগণ যে সে শুধু সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিই বাড়াবে তা নয়, তারা দেশের ভূগোলও বাড়াবে। সে কাজে অর্থ দিবে, শ্রম দিবে এবং মেধা দিবে। প্রয়োজনে রক্ত তথা প্রাণও দিবে। স্বয়ং নবীজী (সাঃ)এবং তারা সাহাবীগণ তো সেটাই করেছিলেন। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা সে মিশন নিয়ে শহীদ হয়েছেন। ইসলামের প্রসার এবং মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোল ও শক্তিবৃদ্ধির সে তাগিদ নিয়েই তুর্কি যুবক ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলার বুকে এসেছিলেন বহু হাজার মাইল দূর থেকে। অথচ মুজিব চলেছেন উল্টোপথে। মুসলিমদের রাষ্ট্রকে ক্ষুদ্রতর করা, মুসলিম রাষ্ট্রের অর্থনীতি ধ্বংস করা এবং সে রাষ্ট্রে ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করার মিশন নিয়ে রাজনীতিতে নেমেছিলেন শেখ মুজিব। অথচ এরূপ কাজ কোন মুসলিমের হতে  পারে না, দেশে দেশে এরূপ কাজ করে ইবলিস শয়তান ও তার এজেন্টগণ। এতে অপরাধ আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও যুদ্ধ ঘোষণার। কারণ মুসলিম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহর; শাসকগণ প্রতিনিধি মাত্র। “লা তাফারাক্কু” অর্থ পরস্পরে বিভক্ত হয়োনা –এটি মহান আল্লাহর হুকুম। তাই কোন মুসলিম রাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিক দেশভাঙ্গায় যুদ্ধে নামবে সেটি ভাবা যায় না। তাই একাত্তরে কোন আলেম বা ইসলামী দলের কোন কর্মী পাকিস্তান ভাঙ্গায় অংশ নেয়নি। কোন মুসলিম রাষ্ট্রও একাজে সহায়তা দেয়নি। সেটি ছিল নিতান্তুই ইসলামি চেতনাশূণ্য সোসালিস্ট, ন্যাশলিস্ট, ‌সেক্যুলারিস্ট ও হিন্দুদের প্রজেক্ট। প্রকৃত ঈমানদারগণ এটিকে সেদিন কবিরা গুনাহ ভেবেছে। বরং এ দেশ বাঁচানোকে তারা জিহাদ ভেবেছে। অথচ াবাভাআলসে বিদ্রোহ ও  যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বয়ং মুজিব। এভাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন শয়তানের এজেন্ট রূপে। ইসলাম-দুষমণ ভারতীয় সরকার এজন্যই এতটা প্রাণখুলে মুজিবকে সহায়তা দিয়েছিল।

ক্ষমতালাভের পর মুজিব কম্যুনিষ্টদেরও রাজনৈতীক অধিকার দিয়েছিলেন। দলগড়া এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার দিয়েছিলেন ক্যাপিটালিস্ট,ন্যাশনালিস্ট,সেক্যুলারিস্ট এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টানদেরও। কিন্তু সে অধিকার তিনি দেশের ইসলামপন্থিদের দেননি। ইসলামপন্থিদের উপর এমন কঠোর নিয়ন্ত্রণ এমনকি ব্রিটিশ শাসনামলেও ছিল না। তিনি কোরআনের আয়াত সরিয়েছেন রেডিও-টিভি ও বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাবোরর্ডের মনোগ্রাম থেকে। যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলাম ও মুসলিম শব্দ দেখেছেন তিনি সে দু’টি শব্দও সরিয়ে দিয়েছেন। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে “ইকরা বিসমে রাব্বিকা” শব্দটিও সরিয়ে দিয়েছেন। আজ একই পলিসি নিয়ে রাজনীতিতে নেমেছেন তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা সংবিধান থেকে “আল্লাহর উপর আস্থা”র প্রকাশটি বিলুপ্ত করেছেন। অথচ প্রতি কর্মে ও প্রতি পদে আল্লাহর উপর আস্থাটি ঈমানের স্বতঃস্ফুর্ত প্রকাশ।আগুণ যেমন উত্তাপ দিবেই, মু’মিনের ঈমান তেমনি মহান আল্লাহর উপর আস্থার প্রকাশ ঘটাবেই। মু’মিন ব্যক্তি তাই কথায় কথায় ইনশাল্লাহ বলে। মুসলমানদের সংবিধানে তাই “আল্লাহর উপর আস্থা”র কথাটিও থাকে। কিন্তু আওয়ামী-বাকশালীদের সেটি সহ্য হয়নি।

 

ব্যর্থতা শত্রু-মিত্র চেনায়

ধর্ম নিয়ে বাঁচতে হলে জরুরী হয় অধর্মকে জানা। নইলে ধর্ম বাঁচে না। হালালের সাথে হারামের বিধান জানা এজন্যই ইসলামে ফরজ। সমাজে চোর-ডাকাত-ঘুষখোর-ব্যাভিচারিদের চেনা ও তাদের শাস্তিদানের কাজটি যথার্থ না হলে সে সমাজে বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাজনীতিতেও তেমনি ফরজ হলো ইসলাম,দেশ ও গণতন্ত্রের শত্রুদেরও জানা এবং জনগণের সামনে তাদেরকে পরিচিত করে দেয়া। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি না নিয়েও প্রাণে বাঁচা যায়, কিন্তু কে শত্রু আার কে মিত্র -এ জ্ঞানটুকু না থাকলে দেশ তখন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হয়। জনগণকে তাই শুধু নামায-রোযার মাসলা-মাসায়েল,অক্ষর জ্ঞান বা পাটিগণিতের হিসাব-নিকাশ শেখালে চলে না। রাজনৈতিক জ্ঞানদানও জরুরী। সমাজের আবু লাহাব,আবু জেহলদের ন্যায় দুর্বৃত্তদেরও চিনতে হয়। অথচ বাংলাদেশে সে জ্ঞানলাভ ও জ্ঞানদানের কাজটিই হয়নি। এ দায়িত্বটি ছিল দেশের লেখক, বুদ্ধিজীবী, আলেম সমাজ ও রাজনীতিবিদদের। কিন্তু তারা সে দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হয়েছেন। দেশ ও জনগণের শত্রুমিত্র চেনায় প্রচণ্ড ফাঁকি রয়ে গেছে। ফলে দেশ,গণতন্ত্র ও ইসলামের চরম শত্রুগণ ঢুকে পড়েছে দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে। বাংলাদেশ আজ  বিষাক্ত শাপদের হাতে তাই কুক্ষিগত।দেশ ও দেশের জনগণ এখন এদের হাতে আষ্টেপৌড়ে আবদ্ধ। এদের বিষাক্ত ছোবলে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে সমগ্র প্রশাসন।

 

শত্রুপক্ষের বিনিয়োগ ও বিজয়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামে শত্রুপক্ষ বহুদূর এগিয়ে গেছে। দেশের রাজনীতিতে তারাই বিজয়ী পক্ষ। মুজিব তার শাসনামলে এতটা প্রতিষ্ঠা পাননি, যতটা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন আজ । হাজার হাজার মন্দিরের পুরাহিতগণ দিবারাত্র খাটলে শাপ-শকুন ও গরু-বাছুড়ের ন্যায় জানোয়ারকেও ভগবান রূপে প্রতিষ্টা দেয়া য়ায়। পুরুষের লিঙ্গকেও পুজনীয় করা যায়। এভাবে পরাজিত করা যায় মহান আল্লাহর দ্বীনকে।শয়তানের বিপুল সংখ্যক এজেন্ট তো দিবারাত্র একাজটিই করে। হিটলার, মুসোলিনি,বুশ, ব্লেয়ারের ন্যায় নিষ্ঠুরগণও তো এভাবে নেতারূপে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশে তো সেটিই ঘটেছে। ফলে দেশে ১৫ কোটি মুসলমান থাকতে মহান আল্লাহর শরিয়তী বিধান আস্তাকুঁড়ে গিয়ে পড়েছে। আর আদালতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কাফেরদের রচিত আইন। -যে আইনে সূদ নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ নয় পতিতাবৃত্তি। বরং এ আইন মোতাবেক রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রহরা দেয়া হয় সূদী ব্যংক ও পতিতাপল্লিকে। শেখ মুজিবের ন্যায় ইসলামবিরোধী, মানবতাবিরোধী ও গণতন্ত্রহত্যাকারি নিষ্ঠুর স্বৈরাচারি ব্যক্তি তো প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সে পথেই। এবং আজ  তাঁর প্রতিষ্ঠা বাড়াতে আদালতের বিচারকদেরও লাঠিয়াল রূপে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষক ও জাতির পিতা বলতে হবে –এরূপ হুকুম জারি করা হচ্ছে এখন আদালতের কক্ষ থেকে। অথচ বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের শাসনামলে এমনটি ছিল না। তখন কেউ তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলেনি। তাঁর প্রতি সম্মান দেখানোর হুকুম দিয়ে আদালত থেকেও সেদিন ফরমান জারি হয়নি।

 

বিজয়ী শয়তানের এজেন্ডা

মানুষ মাত্রই স্বপ্ন দেখে। প্রতেক্যের জীবনে নিজেকে নিয়ে এবং দেশকে নিয়ে কিছু ভাবনাও থাকে। জীবন ও জগত নিয়ে কাফের যেমন স্বপ্ন দেখে, তেমনি ঈমানদারও স্বপ্ন দেখে। তবে ঈমানদার ও বেঈমানের স্বপ্ন কখনো এক নয়। স্বপ্ন বা ভাবনার মধ্যেই ব্যক্তির আসল পরিচয়। এখানে পরিচয় মেলে যেমন ঈমানদারির, তেমনি বেঈমানীরও। স্বপ্ন ও ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় রাজনীতির। তাই স্বপ্ন ও ভাবনা না থাকলে ব্যক্তির রাজনীতি থাকে না। পশুর সেটি থাকে না বলে পশুর পরিচয় নিছক পশু রূপে। পশুর আস্তাবলে তাই রাজনীতির জন্ম হয়না। বস্তুতঃ রাজনীতি হলো মানুষের স্বপ্ন পূরণের হাতিয়ার। সে স্বপ্ন পূরণে ব্যক্তি যেমন কর্মে নামে,তেমনি রাজনীতিতেও আত্মনিয়োগ করে। সময়,শ্রম,অর্থ,মেধার পাশাপাশি এমনকি নিজের জীবনও বিণিয়োগ করে। মুসলমান তো সে স্বপ্ন পূরণে শহীদও হয়। শহীদের রক্ত এখানে শক্তিশালী অস্ত্র হিসাবে কাজ করে। মহান আল্লাহর কাছে ব্যক্তির শহীদ হওয়াটাই তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। কারণ ব্যক্তি এখানে প্রাণ দেয় ব্যবসা বা সম্পত্তি বাড়াতে নয়,বরং আল্লাহর দ্বীনের বিজয় বাড়াতে। ফলে মহান আল্লাহর কাছে এর চেয়ে বড় নেককর্ম নেই। এমন নেককর্মের বিনিময়ে মু’মিন ব্যক্তিটি রেহাই পাবে আখেরাতে বিচারের কাঠগড়ায় জবাবদেহী থেকে। অথচ সে বিচার থেকে অন্যকারো এত সহজে রেহাই নেই।

মু’মিনের জীবনে এখানে যে স্বপ্ন বা ভাবনাটি কাজ করে সেটি আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের ভাবনা। এখানে আল্লাহর এজেণ্ডার সাথে মু’মিন তাঁর নিজের বাঁচার এজেণ্ডাকে এক করে ফেলে। সে তখন পরিণত হয় হিজবুল্লাহ বা আল্লাহর বাহিনীর মুজাহিদ। তার জীবনে শুরু করে জিহাদ। মহান আল্লাহর সে সর্বকালীন এজেণ্ডাটি ঘোষিত হয়েছে এভাবেঃ “তিনিই সেই মহান আল্লাহ যিনি সঠিক পথ ও সত্যদ্বীনসহ রাসূলকে প্রেরণ করেছেন এ জন্য যে তাঁর দ্বীন যেন সকল ধর্ম ও মতের উপর বিজয়ী হয়।” সুরা সাফ আয়াত ৯, সুরা তাওবাহ আয়াত ৩৩, সুরা ফাতহ আয়াত ২৮)। তাই আল্লাহর দ্বীনকে ন্যাশনালিজম, ক্যাপিটালিজম, সোসালিজম,সেক্যুলারিজম,হিন্দুধর্ম, খৃষ্টানধর্ম ও অন্য কোন ধর্মের উপর বিজয়ী করার জিহাদটি কোন মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের বা কোন মৌলানা-মৌলভীর এজেণ্ডা নয়। বরং সেটি খোদ মহান আল্লাহর। ঈমানদার হওয়ার শর্ত্বই হলো মহান আল্লাহর সে এজেণ্ডার সাথে পুরাপুারি একাত্ব হয়ে যাওয়া। সে এজেণ্ডার যে কোন বিরোধীতাই কুফরি বা বেঈমানী। এমন বিরোধীতা মূলত শয়তানের কাজ। অথচ তেমন বিরোধীতায় নেমেছিলেন শেখ মুজিব। শেখ হাসিনা ও তার বাহিনীর হাতে আজও সেটাই হলো মুজিবের লিগ্যাসী।

 

দখলদারি শয়তানের

শয়তান মানুষকে শুধু নামায-রোযা থেকে বিচ্যুত করে না,বরং তার মূল টার্গেটটি রাজনৈতীক অঙ্গনের উপর দখলদারি। কারণ যে কোন জনগণ বা উম্মাহ শক্তি পায় তার রাজনীতি থেকে। শয়তানী শক্তির হাতে রাজনীতির ময়দানটি অধিকৃত হলে ধর্মপালন ও মসজিদ-মাদ্রাসার উপরও তার দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন মুসলিম দেশকে খণ্ডিত করা বা মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোকে আস্তাবল বানানো বা সেগুলোকে জিহাদ-শূণ্য করার কাজ সহজতর হয়ে যায়। তখন অতি সহজ হয় ইসলামকে পরাজিত করা এবং মুসলমানদের শক্তিহীন করার কাজ। তাই পুঁজিবাদী,জাতীয়তাবাদী,সমাজবাদী ও ঔপনিবেশিক শয়তানী শক্তি যখনই সুযোগ পেয়েছে তখন মসজিদ-মাদ্রাসা ভাঙ্গায় মনযোগী না হয়ে প্রথমে সেদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতে নিয়েছে,এরপর হাত দিয়েছে ধর্মপালনে। তাই শয়তানের অনুচরদের দখলদারিতে মুসলমানদের রাজনৈতিক মানচিত্রে যেমন ধ্বসে গেছে,তেমনি বিনষ্ট হয়ে গেছে ধর্মীয় বিশ্বাস তথা চেতনার মানচিত্রও। বিনষ্ট হয়েছে ইসলামের সর্বোচ্চ ইবাদত জিহাদ। মুসলিম ভূমিতে তারা নিজেরা আবির্ভূত হয়েছে সাক্ষাৎ শয়তান রূপে। এরূপ ছদ্দবেশী শয়তানদের কারণে ভারত ও ইসরাইলের রাজনৈতিক ভূগোল দিন দিন বাড়তে থাকলেও অখণ্ড আরবভূমি ভেঙ্গে ২২টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। এদের হাতে পাকিস্তান ভেঙ্গে গেছে, সূদানও ভেঙ্গে গেছে। ইরাক ও আফগানিস্তানও ভাঙ্গার পথে। অবশিষ্ঠ পাকিস্তানের উপরও লাগাতর হামলা হচ্ছে। এভাবে দিন দিন আনন্দ বাড়ছে এবং সে সাথে শক্তি বাড়ছে শয়তানী শক্তির। আর শয়তানের শক্তিবৃদ্ধির সে উৎসবকে মুসলিম নামধারি শয়তানের এজেন্টগণও নিজেদের উৎসবে পরিণত করেছে।শয়তানের এজেণ্ডাকে নিজদের এজেণ্ডা রূপে গ্রহণ করে বাংলাদেশে তাদের পক্ষে লড়াইটি লড়ছে সেক্যুলার রাজনৈতিক দলের কর্মিবাহিনী ও বুদ্ধিজীবীরা। দেশের মসজিদ-মাদ্রাসা ভাঙ্গা নিয়ে তারা এতটা উৎসাহী নয়,বরং মূল উৎসাহটি ছলচাতুরিতে রাজনৈতীক অঙ্গন দখলে নেয়ায়। লক্ষ্য,মহান আল্লাহর এজেণ্ডাকে ব্যর্থ করে দেয়া।

ঈমানদারের তাকওয়া হলো,শয়তানের সে এজেণ্ডা থেকে সতর্কতার সাথে সর্ব-অবস্থায় দূরে থাকা। সেটি যেমন ধর্ম,অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে,তেমনি রাজনীতিতেও।শয়তানের মূল শয়তানিটি ধরা পড়ে তার রাজনীতিতে,তেমনি রাজনীতিতে ধরা পড়ে ঈমানদারের প্রকৃত ঈমানদারি। নামায-রোযা,হজ-যাকাতে মুনাফেকিটা তেমন ধরা পড়ে না,কারণ শয়তান তার ঝান্ডা বা এজেণ্ডা নিয়ে নামাযের কাতারে বা রোযায় হাজির হয় না। কিন্তু হাজির হয় রাজনীতিতে। ফলে রাজনীতিতে শুরু হয় প্রচণ্ড মুনাফেকি ও বিদ্রোহ। শুরু হয় ঈমানদার সাজার ছদ্দবেশ। ফলে নির্বাচন কালে রাজনীতিতে বাড়ে টুপি,তসবিহ ও মাথায় কালো পট্টি বা রুমাল বাধার কদর।বাড়ে পীরের ওরস,তাবলিগী এজতেমায় ও দরবেশের দরগায় হাজিরা দেয়ার আগ্রহ। ইসলামের স্বঘোষিত শত্রুরাও তখন ধার্মিক সাজে।

 

বন্ধু গণ্য হচ্ছে আল্লাহর শত্রু

ব্যক্তির চেতনা, চরিত্র, রুচিবোধ ও জীবনবোধের সঠিক পরিচয় মেলে তার বন্ধুদের দেখে। সমাজে বা রাজনীতিতে সে ব্যক্তিটি নানা রূপে সাজলেও বন্ধুটিকে বেছে নেয় একান্ত নিজের মত করে। নইলেন্ধুত্ব জমে না। তেল ও পানি যেমন মিশে না,দুই ভিন্ন চরিত্রের মানুষের মাঝেও তেমনি বন্ধুত্ব জমে না। দুর্বৃত্তরা এজন্যই কোন চরিত্রবান ভালো মানুষকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করে না। মদ্যপায়ীরা মদ্যপায়ীদের, ব্যাভিচারিরা ব্যাভিচারীদের এবং ইসলামের শত্রুরা ইসলামের শত্রুদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করে তো একারণেই। তাই কে কাকে বন্ধু বা শত্রু রূপে গ্রহণ করলো সেটি সামান্য বিষয় নয়,বরং মানব জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্য দিয়ে দিয়ে ধরা পড়ে ব্যক্তির প্রকৃত ঈমানদারি ও কুফরি। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে পবিত্র কোরআন হালাল-হারামের পাশাপাশি কাকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়েও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। বলা হয়েছে,“মু’মিনগণ যেন ঈমানদারদের বাদ দিয়ে কাফেরদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না।” -(সুরা আল ইমরান,আয়াত ২৮)।মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এটি এক মহা হুশিয়ারি। আল্লাহর সাথে বান্দাহর সম্পর্ক থাকবে কি থাকবে না তা নির্ধারিত হবে বন্ধু রূপে সে কাদেরকে গ্রহণ করলো তার উপর। তাই ঈমানদার ব্যক্তি অতি সতর্ক হয়ে যায় বন্ধুরূপে কাউকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে। তাই মুজিবকে চেনার মোক্ষম উপায় তার মাঠের বক্তৃতা নয়। বড় বড় বুলিও নয়। বরং সে জন্য নজর দিতে হবে তাঁর বন্ধুদের প্রতি।

আল্লাহর হুশিয়ারি মুজিবের কাছে গুরুত্ব পায়নি, গুরুত্ব পেয়েছে যে কোন ভাবে ক্ষমতায় যাওয়া। তাতে দেশ ও দেশবাসীর জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হোক তা নিয়ে কোন ভাবনা ছিল না। ক্ষমতালাভের সে লক্ষ্য নিয়েই তিনি ভারতের ন্যায় শত্রু দেশের সাথে শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্র করেছেন। তিনি অতি ঘনিষ্ট বন্ধু রূপে বেছে নিয়েছেন মনিসিং,ফনিভূষন মজুমদার ,চিত্তরঞ্জন সুতোর,কালিপদ বৈদ্য, মনরঞ্জন ধর,ইন্দিরা গান্ধির মত ব্যক্তিদের। তাদের সাথে যেমন রাজনীতি করেছেন,তেমনি তাদের পরামর্শ মত দেশও চালিয়েছেন। বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের কাছে মুজিবের এ গোপন ষড়যন্ত্র গোপন থাকেনি। তাই দেশের  হাজার হাজার আলেমের মধ্য থেকে কোন প্রসিদ্ধ আলেমই তার কাছে ভিড়েনি। মুজিব নিজেও কোন আলেমকে কাছে ডাকেননি। কাউকে কোন গুরুত্বপূর্ণ পদও দেননি। বিশ্বে ৫০ টির বেশী মুসলিম রাষ্ট্র,কিন্তু কারো সাথেই মুজিবের বন্ধুত্ব জমেনি। অথচ বন্ধুত্ব জমেছে ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার ন্যায় মুসলিম-দুষমন দেশের সাথে। এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে তিনি কোন পক্ষের লোক? গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে মুজিব শুরুতেই আস্তুাকুঁরে ফেলে ছিলেন। স্বাধীনতার বদলে এনেছেন পরাধীনতা। স্বাধীনতা দিয়েছেন নিজ পরিবার, নিজ দল ও নিজপ্রভু ভারতকে।  সন্ত্রাস ও লুন্ঠনে তাদেরকে দেয়া স্বাধীনতাটি ছিল সীমাহীন। মুজিব শাসনামলে সে স্বাধীনতার প্রয়োগ এতটাই হয়েছে যে তাতে ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে। এবং সে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমের লক্ষাধিক মানুষের জীবনে মৃত্যু ডেকে আনার ব্যবস্থা করেছেন। কুকুর শৃগালের মত মানুষ মরেছে তখন পথে ঘাটে। ৩০ হাজারের বেশী মানুষকে হত্যা করেছেন রক্ষিবাহিনী দিয়ে। একাত্তরের যুদ্ধেও এত মানুষের মৃত্যু ঘটেনি।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে “ইন্নাদিনা ইন্দাল্লাহেল ইসলাম”।  অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একমাত্র গৃহীত ধর্ম হলো ইসলাম। এর অর্থ দাঁড়ায় ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মকে ধর্ম বলাই মহাপাপ। এ পাপ ব্যক্তিকে কাফেরে পরিনত করে। অথচ বিশ্বজুড়ে ধর্মের নামে এ ধর্মই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তেমনি ধোকাবাজি হয়েছে গণতন্ত্রের সাথে। মুর্তিপুঁজা, শাপপুঁজা, গরুপুঁজা ও লিঙ্গপুঁজার ন্যায় চরম অধর্ম  যেমন ভারতে ধর্মরূপে  স্বীকৃত, তেমনি বাংলাদেশে পরাধীনতাকে প্রচার পেয়েছে স্বাধীনতা বলে। স্বাধীনতার নামে পাকিস্তান আমলে এতবড় ধাপ্পাবাজি হয়নি। পাকিস্তান আমলের সে স্বাধীনতা যেমন মুসলিম লীগ নেতাকর্মীদের জন্য ছিল তেমনি আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের জন্যও ছিল। তাই মুজিবকে সেদিন গুম করা হয়নি, রিমান্ডে নিয়ে পুলিশী নির্যাতন করা হয়নি, এবং তাকে ডান্ডাবেরিও পড়ানো হয়নি। বরং জেলে তাকে প্রথম শ্রেণী দেয়া হয়েছে। অথচ আজকের পরাধীন বাংলাদেশে সেটি বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য ভাবাও যায় না।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“আল্লাহতায়ালা ঈমানদারের বন্ধু,এবং তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যান। আর যারা কাফের তাদের বন্ধু হলো শয়তান। শয়তান তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়।” –(সুরা বাকারা আয়াত ২৫৭)।ঈমানদার হওয়ার পুরস্কার ও মর্যদা তাই বিশাল। সে মহা পুরস্কার ও মর্যাদাটি হলো মহান আল্লাহর বন্ধু হয়ে যাওয়ার। আল্লাহর বন্ধু হওয়ার বরকতেই মু’মিনের জীবনে আসে আলোময় সত্যপথ। সে আলোময় পথ বেয়ে মু’মিনের জীবনে জুটে জান্নাত। অপর দিকে বেঈমান তথা ইসলামের বিপক্ষ শক্তি হওয়ার শাস্তি ও অমর্যাদাটিও বিশাল। সেটি শয়তানের বন্ধু হওয়ার। তখন তার জীবন জুড়ে আসে গভীর অন্ধকার। অন্ধকারের পথ বেয়ে সে জুটে জাহান্নামে।

তবে মুজিব নিজেই শুধু শয়তানের পথে যাননি,টেনেছেন সমগ্র বাংলাদেশকেও।সেটি বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠা রুখে। একাজে তিনি ভারতের কাফের সরকারকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল ইসলামি দলকে,এবং সীমিত করেছিলেন ইসলামচর্চাকে। “ইসলাম” ও “মুসলিম” এ দু’টি শব্দকে তিনি সরিয়েছিলেন বাংলাদেশের নানা প্রতিষ্ঠান থেকে। তাই প্রশ্ন হলো,ইসলামের এরূপ বিরুদ্ধাচারনের পরও কি কোন ব্যক্তি আল্লাহর বন্ধু হতে পারে? এরূপ কাজ তো শয়তানের ও তার বন্ধুর। প্রশ্ন হলো,শয়তানের এরূপ একনিষ্ট বন্ধুকে কোন ঈমানদার কি নিজের বন্ধু রূপে গ্রহণ পারে? সে ব্যক্তিটি কি হতে পারে ১৫ কোটি মুসলিম অধ্যুষিত বাংলার বন্ধূ তথা বঙ্গবন্ধু? সেটি বললে বা মেনে নিলে কি ঈমান থাকে? সমাজের আবু লাহাবেদের ন্যায় ইসলামের প্রতিষ্ঠা-বিরোধীদের “বন্ধু” বা “জাতির পিতা” বলা ইসলামের শিক্ষা নয়,নবীজী (সাঃ)র সূন্নতও নয়। বরং তার বিরুদ্ধে “ধ্বংস হোক” বলাই তো মহান আল্লাহর সূন্নত। “সুরা লাহাব”য়ে আবু লাহাবের বিরুদ্ধে সে স্লোগানটি শুনিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। ঈমানদারের দায়িত্ব তাই মহান আল্লাহর সে সূন্নতকে নিষ্ঠার সাথে পালন করা। তাছাড়া মুজিব ও তাঁর দলের অপরাধ কি আবু লাহাবের চেয়ে কম? আবু লাহাব মক্কার ন্যায় এক ক্ষুদ্র জনপদে ইসলামের প্রসার ও প্রতিষ্ঠা রুখতে চেষ্টা করেছিল। আর মুজিব আল্লাহর শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীর বেশে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশের ন্যায় এক বিশাল জনগোষ্ঠির দেশে।

হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তিটি মাটির পুতুল,শাপ-শকুন ও গরু-বাছুড়কে ভগবান বলবে এবং সেগুলোকে ভক্তি ভরে পুজা দিবে সেটিই স্বাভাবিক। কারণ সেটাই তার ধর্ম। তেমনি আল্লাহর শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে শত্রুতা যে আওয়ামী-বাকশালীদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য,তারা শেখ মুজিবকে “জাতির পিতা” বা “বঙ্গবন্ধু” বলবে সেটিও স্বাভাবিক। কারণ শেখ মুজিব ও তাঁর অনুসারিগণ ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার নিয়ে তারা রাজনীতি করে না এবং সে দাবীও তারা করে না। বরং ইসলামের প্রতিপক্ষ হ্ওয়াটাই তাদের মিশন। ফলে ইসলাম-বিনাশী সে রাজনীতির সে নেতাটিকে তারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলবে তাতে আর বিস্ময় কিসের? গরু-বাছুড়,শাপ-শকুন ও মুর্তি যদি নোবেলপ্রাইজ বিজয়ী কোন হিন্দু থেকে পুঁজা পায় তাতে কি অবাক হওয়ার কিছু থাকে? তেমনি আওয়ামী বাকশালীদের কাছে শেখ মুজিবও যদি শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীর খেতাব পায় তাতেই বা বিস্ময়ের কি? কিন্তু যাদের মনে সামান্যতম ঈমান আছে,এবং সে ঈমানের বরকতে নামায-কালাম পড়ে এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় সামান্য অঙ্গিকারও রাখে তারাও যদি এমন ব্যক্তিকে বঙ্গবন্ধু বা জাতির পিতা বলে তবে তার চেয়ে বিস্মযের আর কি থাকতে পারে? ইসলামের শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠা রুখা তো শয়তানের এজেণ্ডা। অথচ সে এজেণ্ডা নিয়ে রাজনীতি করেছেন শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ। ফলে তাকে বন্ধু বা নেতা বললে কি ঈমান থাকে?

 

শয়তানকে খুশি করার রাজনীতি

পাপ শুধু পুতুল পুজা,শর্পপুজা বা গরুপুজা নয়,বরং মহাপাপ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো যারা ইসলামের শরিয়ত প্রতিষ্ঠার রাজনীতির যারা বিরোধী তাদের সম্মান দেখানো,তাদের ভোট দেয়া বা তাদের পক্ষ নেয়া। এ অপরাধ তো খোদ আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনার। কোরআনের ভাষায় এরা হলো “মুফছেদ ফিল আরদ”  তথা জমিনের উপর ফ্যাসাদসৃষ্টি। মহান আল্লাহতায়ালা এমন ফ্যাসাদকে মানবহত্যার চেয়েও জঘন্য ক্ষতিকর বলেছেন। খলিফায়ে রাশেদার যুগে এ অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো। অথচ বিস্ময়ের বিষয় বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে সে পাপ এবং সে অপরাধটি হচ্ছে অহরহ। আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও বিদ্রোহ হচ্ছে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সর্বত্র জুড়ে। দেশটিতে পতিতাবৃত্তির ন্যায় প্রকাশ্য ব্যভিচারকেই শুধু আইনগত বৈধতাই দেয়া হয়নি,বৈধতা ও প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে সূদী ব্যাংক ও মদের ব্যবসাকে। প্রবল ভাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে শরিয়ত-বিরোধী সেক্যুলার রাজনীতিকে। অপরদিকে অসম্ভব করা হয়েছে ইসলামপন্থিদের রাজনীতিকে। কোন ঈমানদার-অধ্যুষিত দেশে কি এটা ভাবা যায়? অথচ একটি মুসলিম দেশে হওয়া উচিত ছিল এর উল্টোটি। ইসলাম বিরোধী এমন রাজনীতিতে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় দেশ এবং শয়তানই খুশি হতে পারে। আর আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো শয়তানকে খুশি করার রাজনীতি। সেটি শুধু আজ নয়, বাংলাদেশের জন্মের পূর্ব থেকেই।

 

অসহ্য দেশের মানচিত্র

তবে ভারতের করদ রাজ্য বা “ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি”তে পরিণত করাই আওয়ামী-বাকশালীদের একমাত্র এজেন্ডা নয়। কারণ ভারতের এটাই একমাত্র লক্ষ্য নয়। ভারত চায় আরো বড় কাজ। সেটি বাংলাদেশের মাটি থেকে ইসলামে সরানোর। ভারতের পেটের মধ্যে ১৬ কোটি মানুষের মৌলবাদী বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকী। এতে পেটের মধ্যে টাইম বোমা নিয়ে ঘুমানোর বিপদ। বাংলাদেশে ইসলামি চেতনা বেড়ে উঠলে যখন তখন এ বোমা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। ফলে ভারত চায় এ বোমাকে বারুদমূক্ত করতে। আর সে বারুদ হলো মৌল ইসলাম। ফলে ভারত চায় ডি-ইসলামাইজেশন। অর্থাৎ চায় ইসলাম থেকে দূরে সরাতে। এবং সেটি কালচারাল কনভার্শনের মাধ্যমে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ বাংলার মাঠ-ঘাট ও গ্রাম-গঞ্জ দিয়ে এঁকেবেঁকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের যে মানচিত্রটি এঁকেছিল তার মধ্যে যেটি ফুটে উঠেছিল সেটি বাংলা ভাষা, অখন্ড বাংলা বা ভাষাভিত্তিক বাঙালী জাতির চিত্র নয়,বরং সে চিত্রটি দুই বাংলার দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক বিভাজনের। তাই বাংলাদেশের দেহে আজ ও ১৯৪৭য়ের পাকিস্তানের ছাপ,সে ছাপটি সাংস্কৃতিক ভিন্নতার। এবং সে ভিন্নতার মূলে ইসলাম। সাতচল্লিশে পাকিস্তান গড়ে উঠেছিল শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজনে নয়,বরং উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রচণ্ডতর এক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে। মুজিব সে পাকিস্তানী প্রজেক্টকে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বপাকিস্তানী নাগরিকদের জন্য অসম্ভব করে দিয়েছেন। একাত্তরের পর সে প্রয়োজন মেটানো এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ভারতের মুসলমানদের ন্যায় আজ একই বিপর্যয়ে পড়েছে বাংলাদেশের মুসলমান। মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়ীক ভারতীয় হিন্দুদের কাছে মুজিব এজন্যই এতটা প্রিয়।

ভারতের কাছে আজও  অতি অসহ্য হলো বাংলাদেশের ১৯৪৭-য়ের এ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মানচিত্র। ভারত একাত্তরে এদেশের ভূগোলের উপর সামরিক দখলদারি পেলেও সে সাংস্কৃতিক মানচিত্র বিলোপ করতে পারিনি। স্বাধীন দেশ রূপে বাংলাদেশের বেঁচে থাকার শক্তির মূল উৎস্যটি পশ্চিম বাংলা বা ভারত থেকে ভিন্নতর এ সাংস্কৃতিক এ মানচিত্র। তাই শত্রুর নজর পড়েছে বাংলাদেশের এই সাংস্কৃতিক মানচিত্রের দিকে। শত্রুপক্ষ সেটির বিলোপ চায়,এবং সেটি বাংলাদেশের মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর মাধ্যমে। এজন্যই ভারতের বিনিয়োগ প্রচণ্ড ভাবে বেড়েছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ময়দানে।

 

সবচেয়ে বড় বিপদ

শেখ মুজিব ভারতের হাতে দেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র তুলে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা তুলে দিচ্ছে দেশবাসীর চেতনার মানচিত্র। ফলে শয়তানী শক্তির হাতে দ্রুত অধিকৃত হচ্ছে দেশের ধর্ম ও শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গন। বাংলার সুলতানি যুগে ইসলামের দ্রুত প্রসার রোধে চৈতন্যদেবের উদ্ভব ঘটিয়েছিল। তার ভক্তি-মূলক গান মানুষকে ইসলাম থেকে দ্রুত আড়াল করেছিল। একই লক্ষ্যে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে। চৈতন্যদেবের ন্যায় তাকেও এক মহাদেব রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া হচ্ছে। এটি এখন আওয়ামী লীগ ও ভারতের যৌথ প্রজেক্ট। একাজে ভারত থেকে শত শত কোটি টাকার অর্থই শুধু আসছে না,হাজার হাজার সাংস্কৃতিক সৈন্যও আসছে। ফলে বাড়ছে ভারতের সাংস্কৃতিক দখলদারি। ১৫ কোটি মুসলমানদের রাজস্বের অর্থে কোরআন-হাদীস ও নবীচরিত ছাপার ব্যবস্থা না হলে কি হবে,প্রতিবছর শত শত বই ছাপা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের উপর। বাড়ছে রবীন্দ্রসঙ্গিতের বছর-ব্যাপী আয়োজন। এতে ভ্রষ্টতা বাড়ছে দেশের নতুন প্রজন্মের মাঝে। ধর্মান্তর না হলেও এতে বিপুল ভাবে ঘটছে কালচারাল কনভার্শন। ফলে আজ  থেকে ৫০ বছরদেশবাসীর জন্য মুসলমান থাকাটি যতটা সহজ ছিল আজ  ততটাই কঠিন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের জন্য এটিই আজ  সবচেয়ে বড় বিপদ। ০৭/০৫/১২, নতুন সংস্করণ ৩০.০৬.১৯

 




যে কারণে হত্যা করা হলো প্রেসিডেন্ট মুহম্মদ মুরসীকে

মিশরে এবার ফিরাউনের দিন

অতীতের ফিরাউন যদি মিশরের শাসন ক্ষমতায় আবার ফিরে আসতো তবে ইসলামের বিজয় নিয়ে যারা স্বপ্ন দেখে তাদের উপর অনিবার্য হতো এক অসহনীয় দুর্দিন। যে ভয়াবহ বিপদ নেমে এসেছিল হযরত মূসা (সাঃ) ও তার ক্‌ওম বনি ইসরাইলের উপর –সেরূপ বিপদের মুখে পড়তে হতো তাদেরও। নির্মম ভাবে তাদের নির্মূল করা হতো এবং বাঁচিয়ে রাখা হতো কেবল নির্যাতনে নির্যাতনে তাদের বাঁকি জীবনকে অতিষ্ট করার লক্ষ্যে। তবে ফিরাউন যেটি করতো সেটি নিখুঁত ভাবে করছে মিশরের স্বৈরাচারি শাসক জেনারেল আব্দুল ফাতাহ আল-সিসি। বরং সে আদিম বর্বরতায় যোগ হয়েছে আধুনিক নৃশংসতা। তার সরকারের হাতেই জেল খানায় নিহত হলো মিশরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্বাচিত সিভিলিয়ান প্রেসিডেন্ট ডক্টর মুহম্মদ মুরসী। উল্লেখ্য হলো, সরকারের পক্ষ থেকে সাঁজানো একটি মামলায় বহু আগেই প্রেসিডেন্ট মুরসীকে প্রাণদন্ড দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে প্রাণদন্ড কার্যকর করতে জেনারেল সিসির সরকার ভয় পাচ্ছিল। ভয় ছিল, প্রাণদন্ড পরিকল্পিত হত্যাকান্ড রূপে চিত্রিত হওয়ার। অবশেষে তাঁকে অন্যপথে বিদায় দেয়া হলো। সেটি হার্ট এ্যাটাকের লেবেল এঁটে দিয়ে।

স্বৈরাচারি শাসকদের হাতে এমন পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বিরল নয়, বরং অতি স্বাভাবিক। শুধু মিশরে নয়, মুসলিম বিশ্বের যেসব দেশ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে অধিকৃত হয়েছিল তাব সবগুলিতে একই রূপ বীভৎসতা। এ দেশগুলিতে ইসলামে সবচেয়ে নৃশংস দুষমনেরা কোন পতিতা পল্লিতে জন্ম নেয়নি, বরং তারা বেড়ে উঠেছে সামরিক বাহিনীর ছাউনীতে বা সেক্যুলারিস্টদের ঘরে। ইসলামের বিজয় বা গৌরববৃদ্ধি তাদের ধাতে সয় না। এসব দেশের সামরিক বাহিনীর যারা রোল মডেল বা তারকা-চরিত্র তাদের সামরিক জীবন শুরু হয়েছিল দেশের স্বাধীনতার সুরক্ষায় নয়, বরং সেটি ছিল কাফেরদের শাসনকে মুসলিম দেশে বলবান ও দীর্ঘায়ীত করার লক্ষ্যে। যেমন পাকিস্তানের জেনারেল আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খান, নিয়াজীর ন্যায় ব্যক্তিগণ। একই উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর সেক্যুলারিস্টদের সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো অবিভক্ত ভারতের নানাভাষী মুসলিমদের প্যান-ইসলামিক পাকিস্তান প্রজেক্টকে ব্যর্থ করে দেয়ায়। এমন কি তারা বার বার বাধাগ্রস্ত করেছে পাকিস্তানে এবং পরবর্তী কালে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারার শাসন প্রক্রিয়া।

নৃশংস নাশকতাটি সেক্যুলারিস্টদের

মুসলিম দেশে সামরিক বাহিনীর ক্যান্টনমেন্টগুলো হলো ইউরোপীয় কাফের সংস্কৃতির অতি সুরক্ষিত দ্বীপ। নিজদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ইসলামী সংস্কৃতির সেখানে প্রবেশাধীকার নাই – বিশেষ করে সেদেশগুলিতে যেগুলি ইউরোপীয় কাফেরদের কলোনী ছিল। এ সেক্যুলার শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে গড়ে উঠা অফিসারগণ ইসলাম থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন যে মসজিদ-মাদ্রাসার উপর বোমা ফেলতেও এরা ইতস্ততঃ করে না -যেমনটি হয়েছে ইসলামাবাদের লাল মসজিদ ও হাফসা মাদ্রাসার উপর। এদের প্রাণ কাঁপে না নৃশংস গণহত্যাতেও। সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ ইহজাগতিকতা। অতি ইহজাগতিকতার কারণেই সেক্যুলারিস্টদের মাঝে বিলুপ্ত হয় আখেরাতের ভয়। দেশের প্রতিরক্ষা কি দিবে, তারা বরং ইহজাগতিক সম্ভোগ বাড়াতে দখলে নেয় নিজ দেশের অতি মূল্যবান আবাসিক এলাকাগুলি। একই রোগ পাকিস্তান আর্মির ভগ্নাংশ ও সে অভিন্ন সেক্যুলার সংস্কৃতির ধারক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীরও।

যে কোন মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গাই কবিরা গুনাহ তথা হারাম। তাতে কুফরি তথা অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহতায়ালার সে অলংঘনীয় কোরাআনী নির্দেশের যাতে বলা হয়েছে তোমরা বিভক্ত হয়ো না। বাংলাদেশের ইতিহাস একাত্তরে শেষ হয়নি। বহুশত পরও মুসলিম দেশ ভাঙ্গার ন্যায় হারাম কাজের বিচার ইসলামপ্রেমী মহলে বার বার বসবে। তখন সে বিচার রুখতে সেক্যুলারিস্ট সন্ত্রাসীরা থাকবে না। তবে সবচেয়ে চুড়ান্ত ও ভয়ানক বিচারটি হবে আখেরাতে। মুসলিম দেশের প্রতিইঞ্চি ভূগোল বাড়াতে অতীতে বহুরক্ত ব্যয় হয়েছে। এবং সে মুসলিম ভূগোলকে খন্ডিত করার কাজটি নিজ খরচে করে দিতে রাজী কাফেরগণ। ভারত তাই পাকিস্তান ভেঙ্গে দিতে ১৯৪৭ থেকেই দু’পায়ে খাড়া ছিল। তারা শুধু কলাবোরেটরদের অপেক্ষায় ছিল। সেটি জোটে ১৯৭১’য়ে। সে কাজে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে সামরিক ও অসামরিক অঙ্গণের বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ। তাই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে, ভারতের ন্যায় কাফের দেশের কোলে গিয়ে উঠতে এবং কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ নিয়ে যুদ্ধ করতে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মাঝে কোন ইতস্ততা দেখা যায়নি। ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলার সেনাসদস্যগণই ২০১৩ সালের ৬ই মে শাপলা চত্ত্বরে বীরদর্পে হিফাজতে ইসলামের শত শত মুসল্লিদের নিষ্ঠুর ভাবে হ্ত্যা করেছে এবং জানাজা ছাড়াই তাদের লাশ ময়লা ফেলার গাড়িতে তুলে গায়েব করে দিয়েছে।  অতীতে এ সেক্যুলার সেনাবাহিনী যেমন অতি  বর্বর স্বৈরাশাসকদের জন্ম দিয়েছে, তেমনি বর্তমানে কাজ করছে ভোট-ডাকাত স্বৈরশাসকের বিশ্বস্ত পাহারাদার রূপে।

মুসলিম বিশ্বে সামরিক সরকারগুলির  ইসলাম বিরোধী নির্মম নিষ্ঠুরতাগুলি বুঝতে হলে সামরিক বাহিনীর অতি রেডিক্যাল সেক্যুলার আদর্শিক প্রেক্ষাপটকে অবশ্যই সামনে রাখতে হবে। ম্যালেরিয়া সবদেশে একই রূপ সিম্পটম নিয়ে হাজির হয়। তেমনি অবস্থা চেতনার রোগেরও। ফলে ইসলামী চেতনা শূণ্য সেক্যুলারিস্টদের চরিত্র সবদেশে একই রূপ নৃশংস হয়। সে গভীর রোগই আজ প্রকট ভাবে পাচ্ছে মিশরে। মিশরের ইতিহাসে অতি কট্টোর ইসলাম বিরোধী সামরিক ব্যক্তিত্ব ছিল কর্নেল জামাল আব্দুন নাসের। ইনিও বন্দুকের জোরে সিসির ন্যায় মিশরের প্রেসিডেন্ট হন। আর সব সেক্যুলারিস্টদেরই মূল দুষমনিটি ইসলামের বিরুদ্ধে। ইবলিস কোথাও ক্ষমতা হাতে পেলে যা করে -এরাও অবিকল তাই করে। ইসলামের বিরুদ্ধে জামাল আব্দুন নাসেরের দুষমনি এতটাই প্রকট ছিল যে, সাইয়েদ কুতুবের ন্যায় বিশ্ববিখ্যাত মোফাচ্ছের এবং “ফি জালালিল কোর’আন’এর ন্যায় প্রসিদ্ধ তাফসিরের রচিয়েতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল। হত্যা করেছে আব্দুল কাদের আওদাসহ আরো অনেক বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদকে। আব্দুন নাসেরের পথ ধরেছে মিশরের বর্তমান স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট আবুল ফাতাহ আল-সিসি। আব্দুন নাসেরের পাশে দাঁড়িয়েছিল সোভিয়েত রাশিয়া। স্বৈরাচারি সিসিকে সমর্থন দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় শাসকগণ ও ইসরা্‌ইল।

মিশরের সামরিক বাহিনীর অফিসারগণ এতটাই কট্টোর ইসলামবিরোধী যে ইসলাপন্থিদের সরকারে স্থান দেয়া দূরে থাক, তাদেরকে কোনরূপ মানবিক অধীকার দিতেও রাজী নয়। সেটিই প্রকট ভাবে প্রকাশ পেল ডক্টর মুরসীর হত্যার মধ্য দিয়ে। তাদের কাছে অসহ্য ছিল ডক্টর মুহম্মদ মুরসীর ন্যায় অতি ইসলামী ব্যক্তির নির্বাচনী বিজয়কে মেনে নেয়া। ফলে তাঁর নির্বচনি বিজয়ের পরই  ষড়যন্ত্র শুরু হয় অপসারণের। ক্ষেত্র তৈরী করে থাকে রাজপথে এবং রাজপথের বাইরে। অর্থ বিতরণ হয় রাজপথের বিক্ষোভে লোক বাড়াতে। বিজিনেস সিন্ডকেটকে উসকানো হয় দ্রব্যমূল্য বাড়াতে। তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা হয় মিশরের সেক্যুলার মিডিয়াকে। সে কাজে বিপুল অর্থ নিয়ে এগিয়ে আসে মধ্যপ্রাচ্যের গণতন্ত্রের ঘোরতর শত্রু সৌদি আরব ও আরব আমিরাত। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলির সরকারগুলিকে প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে সক্রিয় হয় ইসরাইল। কারণ, মুরসী একাত্মতা ঘোষণা করেন গাজার অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনীদের সাথে। ইসরাইলের কাছে সেটি ছিল অসহ্য।

 

নিরস্ত্র প্রতিবাদ এবং পবিত্র জিহাদ যেখানে সন্ত্রাস  

ইসলামের শত্রুপক্ষ সন্ত্রাসের  সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তাদের মিত্র পক্ষ সন্ত্রাসের যে সংজ্ঞা দিয়েছে সেটিই গ্রহণ করেছে মুসলিম দেশগুলির সেক্যুলারিস্টগণ। সে সংজ্ঞা মতে ইসলামের বিজয় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার লক্ষে খাড়া হওয়াটিই সন্ত্রাস। সন্ত্রাস রূপে চিত্রিত হয় মার্কিনী বা ইসরাইলী অধিকৃতির বিরুদ্ধে কথা বলা। এমন কি সন্ত্রাস হলো মিশরের সিসি, বাংলাদেশের হাসিনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজাদের ফ্যাসিবাদী অধিকৃতির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র মানুষের কথা বলাও। সে বিকৃত সংজ্ঞার প্রয়োগ হয়েছে প্রেসিডেন্ট মুরসী এবং তার দল ইখওয়ানুল মুসলিমের বিরুদ্ধে।

গাজা বা অধিকৃত ফিলিস্তিনের যে কোন অংশকে উম্মুক্ত জেলখানার চেয়ে অধীক মর্যাদা দিতে ইসরাইল ও তার মনিব মার্কিন যুক্তরাষ্ট কখনোই রাজী নয়। সে অবস্থা পরিবর্তনের যে কোন উদ্যোগই চিহ্নিত হয় সন্ত্রাস রূপে। প্রেসিডেন্ট মুরসীর আগে গাজাকে উম্মুক্ত জেল খানায় পরিণত করার কাজে ইসরাইলকে পূর্ণ সহায়তা দিয়েছে মিশরের হোসনী মোবারকের স্বৈরাচারি সরকার। ইসরাইলের এজেন্ডা পূরণে গাজার দক্ষিণ সীমান্ত পাহারা দিত মিশরের সেনাবাহিনী। ইসরাইলের পক্ষ থেকে আরোপিত বিধানটি ছিল, মরতে হলে জেলখানার মধ্যেই মরতে হবে; পালানোর রাস্তা দেয়া যাবে না। তেমনি এক করুণ অবস্থা ছিল গাজাবাসীর। তাই গাজার উপর অতীতে যখন অবিরাম বোমা বর্ষণ হয়েছে তখন আহত গাজাবাসীদেরও মিশরীয় সেনাবাহিনী মিশরে ঢুকতে দেয়নি। এরূপ কঠোর পাহারাদারি কাজে হোসনী মোবারকের সরকার অর্থ পেত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

কিন্তু মুহম্মদ মুরসীর প্রেসিডেন্ট হওয়াতে চিত্রই পাল্টে যায়। তিনি খুলে দেন মিশরের সাথে গাজার সীমান্ত।  মিশরের এমন স্বাধীন নীতি ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছিল অতি অসহ্য। ইসরাইল এটিকে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি মনে করে। ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়াটিই বড় কথা নয়, নির্বাচিত হলেও সন্ত্রাসী রূপে গণ্য হতে হয় যদি অবস্থান তাদের স্বার্থের পক্ষে না হয়। তাদের বিচারে সন্ত্রাসী হওয়ার জন্য অস্ত্র হাতে নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না, ইসলাম ও ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলাই যথেষ্ট। ইখওয়ানুল মুসলিমুন এজন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সন্ত্রাসী সংগঠন রূপে গণ্য হয়। সন্ত্রাসী গণ্য হয়েছে খোদ প্রেসিডেন্ট মুরসী। ফলে জেনারেল সিসি যখন মিশরের ইতিহাসের একমাত্র নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসীকে সামরিক শক্তির জোরে সরিয়ে দেয় তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রগণ সেটিকে সমর্থণ করে। এবং তাতে উল্লাস জাহির করে ইসরাইল।

সিসির সে অবৈধ ও অন্যায় সামরিক ক্যু’র বিরুদ্ধে রাজপথে অবস্থান নিয়েছিল মিশরের লক্ষ লক্ষ মানুষ। কিন্তু সামরিক সরকারের কাছে নিরস্ত্র মানুষের শান্তিপূর্ণ সে বিক্ষোভও সহ্য হয়নি –যেমন হাসিনার কাছে সহ্য হয়নি শাপলা চত্ত্বরে মুসল্লীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান। বিক্ষোভ থামাতে সামরিক বাহিনী রক্তাত্ব করেছিল মিশরের রাজপথ। ২০১৩ সালে ১৪ই আগষ্ট কায়রোর রাবা আল আদাবিয়া স্কোয়ারে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার নিরস্ত্র নারীপুরুষকে কয়েক মিনিটের মধ্যে মেশিন গান ও কামান দেগে হত্যা করেছিল জেনারেল আবুল ফাতাহ সিসির সামরিক সরকার। এতবড় গণহত্যায় সাথে জড়িতদের কারোই কোন বিচার হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের মহলেও সে নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিন্দিত হয়নি। যেন ইসলামপন্থি হলে তাদেরকে হত্যা করা কোন অপরাধই নয়। ফলে যে নৃশংস দমন প্রক্রিয়া ও হত্যাকান্ড চলছে সৌদি আরব, সিরিয়া ও আরব আমিরাতে, অবিকল সেটিই চলছে মিশরে। 

ইসলামপন্থিদের বেঁচে থাকাটিও অসহনীয়

কারারুদ্ধ প্রেসিডেন্ট মুরসিকে হত্যা করায় শুধু মিশরের ইসলাম বিরোধী সেক্যুলার স্বৈরাচারি চক্রই খুশি হয়নি, খুশি হয়েছে সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং ইসরাইলের শাসক মহলও। খুশি হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের ন্যায় পাশ্চত্য দেশগুলোর সরকারগুলিও। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে এ কথা ভেবে, শত্রু বিদায় হলো। প্রেসিডেন্ট মুরসী ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী জাগরণের আদি সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমের নেতা। যুদ্ধাংদেহী কাফের দেশগুলির কোনটিই চায়না কোন দেশে কোন ইসলামী সংগঠন ক্ষমতায় বসুক –তা যত সংখ্যাগরিষ্ট ভোটেই হোক। এমন কি জেলের মধ্যে তাদের বেঁচে থাকাটিও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। জেনারেল আবুল ফাতাহ আল সিসি, শেখ হাসিনা, কিং সালমানের ন্যায় প্রচণ্ড স্বৈরাচারি ফ্যাসিষ্টদের শাসনকে তারা সমর্থন দিতে রাজী, কিন্তু কোন ইসলামী দলের গণতান্ত্রিক বিজয়কে নয়। তাই নব্বইয়ের দশকে আলজিরিয়ায় ইসলামপন্থিদের বিজয় রুখতে তারা সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাদখলকে সমর্থন দিয়েছে। এবং তারা মেনে নেয়নি ফিলিস্তিনের নির্বাচনে হামাসের বিশাল নির্বাচনি বিজয়কে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ইসলামপন্থিদের বিজয় দূরে থাক করারুদ্ধ অবস্থায় তাদের বেঁচে থাকাও যে তারা মেনে নিতে রাজী নয় –প্রেসিডেন্ট মুরসীর অপসারন এবং বন্দী অবস্থায় তার হত্যা সেটিই নতুন করে প্রমাণ করলো।    

আরব বিশ্বে স্বৈরাচারি জালেম শাসকদের মূল সাহায্যদাতা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংলান্ড, জার্মান মত পাশ্চত্য দেশগুলি। এরাই মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের মূল শত্রু। তারা জানে স্বৈরাচারি শাসন বিলুপ্ত হলে রাজৈনতিক ক্ষমতা যাবে ইসলামপন্থিদের হাতে। তাতে বিশ্বব্যাপী উত্থান হবে ইসলামের। পাশ্চাত্য সেটি হতে দিতে রাজী নয়। আরব বিশ্বকে ২০ টুকরোর অধীক খণ্ডে বিভক্ত করেছে সে উত্থানকে রুখতে। ইসলামের উত্থান রুখার লক্ষ্যে পাশ্চাত্যের কাফের শক্তিবর্গের নির্ভরযোগ্য সাহায্যকারি হলো এসব স্বৈরাচারি শাসকগণ। তাদের প্রতিশ্রুতি পেয়েই স্বৈরাচারি শাসকগণ অতি নৃশংস হত্যাকান্ড করতেও পিছপা হয়না। এদের হাতেই নিহত হতে হলো সৌদি আরবের প্রখ্যাত লেখক ও কলামিস্ট জামাল খাসোগীকে। তাঁর দেহকে ইলেকট্রিক করাত দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে অ্যাসিডে গুলিয়ে ড্রেনে মধ্যে গায়েব করা হয়েছিল। তাঁর অপরাধ, তিনি ছিলেন সৌদি সরকারের সমলোচক। তাঁর সে হত্যাকান্ড মার্কিনী যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে অপরাধ গণ্য হয়নি। বরং ইসলামের উত্থান রুখতে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ডে দক্ষতা ও নৃশংসতা দেখাতে পারলে ইসলামের এ আন্তর্জাতিক শত্রুপক্ষ প্রয়োজনীয় অস্ত্র এবং অর্থ দিতেও রাজী। তারই নমুনা, ইয়েমেনে সেরূপ এক নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়ে যেতে বিপুল অস্ত্র পাচ্ছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক মহলে সে নৃশংসতার বিরুদ্ধে নিন্দা জানানোরও উপায় নেই। তাদের অধিকৃতি সেসব মহলেও। মিশর থেকে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে জেনারেল আল-সিসির সরকার যেরূপ লাগামহীন যুদ্ধে নেমেছে তাতেও তারা সর্বপ্রকার সাহায্য দিচ্ছে। এখন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গলা টিপে হত্যায় হাত বাড়িয়েছে লিবিয়া এবং সুদানে। সে কাজে তাকে সহায়তা দিচ্ছে সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ গণতন্ত্রবিরোধী আন্তর্জাতিক চক্র। বস্তুতঃ প্রেসিডেন্ট মুরসী হত্যাকান্ডটি স্রেফ কোন ব্যক্তি বিশেষের হত্যা নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র হত্যার একটি সুদূরপ্রসারি ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্য মুসলিম বিশ্বে ইসলামের বিজয়কে প্রতিহত করা। তাই এর সাথে শুধু জেনারেল সিসির সরকার জড়িত  নয়, জড়িত তার আন্তর্জাতিক মিত্রগণও। ১৯/৬/২০১৯  




মানসিক রোগীর হাতে দেশ হাইজ্যাকের বিপদ এবং বিপন্ন বাংলাদেশ

মানসিক রোগীর নৃশংসতা

মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যে কীরূপ ভয়াবহ বিপদ ঘটাতে পারে তারই প্রমাণ হলো, ২০১৫ সালে জার্মান উইঙ্গস বিমান কোম্পানীর ১৪৯ যাত্রীর করুণ মৃত্যু। এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। ঘটনাটি বিশ্বময় প্রচার পায়। জার্মান চিকিৎস্যকের কাছ থেকে প্রমাণ মেলে, বিমানের কো-পাইলট এ্যাড্রিয়াস লুবিটজ ছিল মানসিক রোগী। সে রীতিমত মানসিক রোগের চিকিৎস্যা নিত। তার রোগটি ছিল ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশনের কারন,যে মেয়ে বান্ধবীকে সে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখেছিল সে তার সঙ্গ ত্যাগ করে। সঙ্গি হারানোর বেদনায় লুবিটজ এতটাই বিমর্ষ হয়ে পড়ে যে তার মগজে আত্মহত্যার চিন্তাও বার বার হানা দিতে শুরু করে।অবশেষে সে আত্মহত্যার পথই বেছে নেয়। তবে সাথে ১৪৯ বিমান যাত্রীকে সাথে নিয়ে -যার মধ্যে ছিল বেশ কিছু স্কুল ছাত্র যারা জার্মানী থেকে স্পেনে শিক্ষা সফরে গিয়েছিল। যার নিজের জীবন বাঁচানোর ভাবনা নেই,তার কাছে কি অন্যদের জীবন বাঁচানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়? কো-পাইলট এ্যাড্রিয়াস লুবিটজ’য়ের কাছে তাই কে শিশু,কে বালক,কে নারী বা কে নিরীহ যাত্রী -সে ভাবনা গুরুত্ব পায়নি।তার লক্ষ্যটি ছিল নিজের মৃত্যুর সাথে অন্যদের মৃত্যু ও দুঃখকেও বাড়িয়ে দেয়া।

দৈহীক বিকলাঙ্গতায় রোগীর ভাল কাজের সামর্থ্য যেমন লোপ পায়,তেমনি লোপ পায় ক্ষতির সামর্থ্যও। কিন্তু মানসিক বিকলাঙ্গতায় অন্যকে ক্ষতি করা -এমনকি হত্যা করার শারিরীক সামর্থ্যটি পুরাপুরি থেকে যায়। ফলে তারা সমাজে চলাফেরা করে ভয়ানক হিংস্র জীব রূপে। তাদের হিংস্রতা অনেক সময় হিংস্র পশুকেও হার মানায়। এককালে এমন মানসিক রোগীদেরকে তাই মানসিক হাসপাতালে বন্দী রাখা হতো।চিকিৎস্যা শাস্ত্রের উন্নতির কারণে এখন তাদেরকে নিজ ঘরে চিকিৎস্যা দেয়া হয়। ফলে তারা সমাজে স্বাধীন ভাবে বসবাসের সাথে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে চাকুরি-বাকুরিও করে। কিন্ত্র সমস্যা সৃষ্টি হয় নিয়মিত চিকিৎসা নেয়া নিয়ে। কলেরা, ম্যালেরিয়া বা নিউমোনিয়ার রোগী চিকিৎসা নিলে যেরুপ পুরাপুরি সুস্থ্য হয়ে উঠে মানসিক রোগীদের ক্ষেত্রে সেটি ঘটে না। এরূপ মানসিক রোগভোগ তো আজীবনের। চিকিৎসাও তাই নিতে হয় আজীবন। কিন্তু সমস্যা হলে মানসিক রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা নেয়ার আগ্রহ থাকে না। চিকিৎসার গুরুত্ব বোঝার সামর্থও তাদের লোপ পায়। ফলে তারা সমাজে বাস করে ভয়ানক রোগ নিয়েই। এমনি এক রোগ হলো ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশনের রোগীদের জীবন বড়ই নিরানন্দ। জীবনে আনন্দ বা সুখবোধ তাদের থাকে না। বাইরের রূপটি যতই চাকচিক্যের হোক,তাদের মনের গভীরে সব সময়ই বিষন্নতার ভাব। আর অন্যদের জন্য এখানেই বিপদ। যারা জীবনে সুখ পায় না তারা বরং অপরের সুখে আরো বিমর্ষ ও ইর্ষাকাতর হয়।অন্যদের আনন্দঘন জীবন দেখে তাদের দুঃখের মাত্রাটি আরো বেড়ে যায়। এমন মুহুর্তে অন্যকে দুঃখ দেয়া বা আঘাত দেয়ার মধ্যে তারা তৃপ্তি খুঁজে পায়। চিকিৎস্যা শাস্ত্রের ভাষায় এটিই হলো স্যাডিজম। সমাজে এরূপ মানসিক রোগীরাই চোর-ডাকাত ও সন্ত্রাসী হয়,এবং নানারূপ অপরাধ জগতে ঢুকে। এবং রাজনীতির অঙ্গণে তারা প্রচন্ড স্বৈরাচারি, অত্যাচারি ও গণহত্যার নায়ক হয়।জার্মান উইঙ্গস কোম্পানীর যে বিমানটি ডিপ্রেশের রোগী এ্যাড্রিয়াস লুবিটজ চালনা করছিল সে বিমানের ১৪৯ জন যাত্রীদের অনেকেই ছিল টুরিস্ট -যারা স্পেনে গিয়েছিল তাদের আপনজনকে নিয়ে প্রমোদ ভ্রমনে। তাদের মাঝেও প্রচুর আনন্দ ছিল। বিমানে ছিল জার্মান স্কুলের কিছু আনন্দমুখর তরুন ছাত্র। বিমানের মধ্যে তাদের আনন্দধ্বনি নিশ্চয়ই লুবিটজের বিমর্ষ মনকে আরো বিষিয়ে তোলে।ফলে শুধু নিজের আত্মহননের নেশাই বাড়েনি,বেড়েছে অন্যদের জীবননাশের নেশাও। সে নৃশংস ঘটনাটিই সে ঘটালো বিমান বিধ্বস্ত করে। আরো বিপদ হলো,দৈহীক পঙ্গুত্ব যেরূপ সচরাচর চোখে ধরা পড়ে,মানসিক পঙ্গুত্বটি সে রূপ ধরা পড়ে না। মনের গভীরে রোগটি লুকিয়ে রাখা যায়। হিংস্র বাঘ-ভালুক থেকে মানুষ তাই সাবধান হতে পারলেও পাশের অসুস্থ্য ও হিংস্র মানুষ থেকে সাবধান থাকার সুযোগ থাকে না। কো-পাইলট এ্যাড্রিয়াস লুবিটজের রোগটি তাই জার্মান উইঙ্গস বিমান কোম্পানির কর্তৃপক্ষ টের পায়নি। টের পায়নি তার সহকর্মী পাইলটও। তাই অবাধ সুযোগ পায় শুধু নিজের আত্মহত্যার নয়,বরং যাত্রীভর্তি বিমান নিয়ে ফান্সের আল্পস পর্বতমালায় গিয়ে আঘাত হানার।ফলে জার্মানীর বনের সকল হিংস্র পশুগুলি বিগত শত বছরে যত মানুষ হত্যা করতে পারিনি, লুবিটজ একাই তা করে দেখালো।

মানসিক রোগীর রাজনৈতিক নৃশংসতা

মানসিক রোগীরা যে শুধু বিমানের পাইলট হওয়ার সুযোগ পায় তা নয়,সুযোগ পায় এমনকি দেশের রাজা,প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হওয়ারও। তাদের পাইলট হওয়াতে বড় জোর কয়েক শত যাত্রীর জীবননাশ হয়,কিন্তু দেশের শাসক হওয়াতে প্রাননাশ হয় লক্ষ লক্ষ মানুষের। তারা আবির্ভুত হয় নৃশংস স্বৈরাচারি শাসক রূপে। তখন দেশে যুদ্ধ বা গৃহযুদ্ধ শুরু করে। আত্মঘাতি সে শাসকের হাতে তখন রাষ্ট্রের পুরা সেনাবাহিনী,পুলিশ,আদালত,প্রশাসন ও রাজনৈতিক ক্যাডার বাহিনী আত্মহননের নৃশংস হাতিয়ারে পরিণত হয়। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ায় অবিকল সেটিই ঘটেছে। তাছাড়া শেখ হাসিনার মানসিক রোগটি তো প্রকট। যে বেদনার কারণে জার্মান কো-পাইলট লুবিটজ ডিপ্রিশনের রোগী সেটি শধু তার প্রেমিকা হারানোর। কিন্তু হাসিনা গভীর বেদনাটি হলো তারা পিতা,মাতা,ভাইসহ পুরা পরিবার হারানোর। তার অফিস,তার গৃহ,তার জীবনযাপনের প্রতিটি অঙ্গণ প্রাণহারানো সে আপন জনদের ছবিতে পরিপূর্ণ। ফলে নিদারুন দুঃখ নিয়েই তার বসবাস। প্রতিমুহুর্তে তার মগজে যা হানা দেয় তা হলো তার মৃত আপনজনদের স্মৃতি। এমন স্মৃতি যদি শেখ হাসিনার মনে ভয়ানক মানসিক রোগের জন্ম না দেয় তবে বুঝতে হবে সে হয় উদ্ভিদ বা গরুছাগল,স্বাভাবিক মানুষ নয়।উদ্ভিদ বা গরু-ছাগলের পাশে আপন কেউ জবাই হলেও প্রতিক্রিয়া হয় না। গরু তখনও অবিরাম ঘাষ খায়,উদ্ভিদ তখনও শান্ত থাকে। কিন্তু মানুষ তো প্রতিশোধ পরায়ন হয়। এমন প্রতিশোধ পরায়ন মানুষের সুস্থ বিচারবোধ থাকে না। আপনজন হারানো এমন বিপর্যস্ত মানুষটি দেশের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে জনস্বার্থে যে কোন সভ্যদেশে তাকে তৎক্ষনাৎ কাজ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দেয়া হয়,এমন মানষিক রোগবিশেষজ্ঞের দায়িত্বে রাখা হয়।

বাংলাদেশের মানুষের সামনে ভয়ানক বিপদের কারণ,দেশটির পাইলটের সিটে এখন শেখ হাসিনার ন্যায় প্রতিশোধকামী এক ভয়ানক মানসিক রোগী।তাছাড়া শেখ হাসিনার মানসিক রোগটি কি এখনও কোন গোপন বিষয়? প্রতিটি রোগেরই সিম্পটম আছে,এবং সে সিম্পটম থেকেই সনাক্ত হয় তার রোগ। নিউমোনিয়া বা ম্যালেরিয়া হলে শরীরে তাপ উঠবেই। তেমনি মানসিক ভাবে কেউ অসুস্থ্য হলে তার আচরণও লক্ষণীয় রূপে পাল্টে যাবেই। সে তখন স্বাভাবিক ও সুস্থ্য আচরনের সামর্থ হারায়। হারায় বিচারবোধও। পাগলের রোগ নির্ণয়ে তাই ল্যাবরেটরিতে পাঠানো লাগে না। স্কুলের শিশুরাও সেটি বুঝে। ঢাকার শাপলা চত্বরে হিফাজতে ইসলামের নিরস্ত্র জমায়েত রুখতে যে নেত্রী হাজার হাজার সৈনিক,ট্যাংক,গোলাবারুদ ও মেশিন গান পাঠাতে পারে ও হাজার হাজার মানুষকে হতাহত করতে পারে সে কি মানসিক ভাবে আদৌ সুস্থ্য? মানব ইতিহাসের কোন কালেই কি কোন সুস্থ্য নেতার পক্ষ থেকে এমন ঘটনা ঘটেছে? নয় মাসের যুদ্ধ ছাড়া পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরের রাজনীতিতে যত লাশ পড়েছে তার চেয়ে বেশী লাশ পড়েছে শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালে ৫ই মে’র ভয়াল রাতে। সেটি এই অসুস্থ্যতার কারণে। দলীয় কর্মীদের লগি-বৈঠা নিয়ে কর্মীদের রাস্তায় নামতে বলা এবং এক লাশের বদলে দশ লাশ ফেলতে বলা কি মানসিক সুস্থ্যতার লক্ষণ? যে ব্যক্তি দেশের বিরোধী দলগুলোর অফিসে তালা ঝুলাতে পারে এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীর গৃহের সামনে বালুভর্তি ট্রাক পাঠাতে পারে তার মানসিক অসুস্থ্যতা নিয়ে কি সন্দেহ জাগে? যে নির্বাচনে শতকরা ৫ ভাগ মানুষও অংশ নিল না সেটিকে যে ব্যক্তি সুষ্ঠ নির্বাচন বা গণতন্ত্র বলে -তার বিচার ক্ষমতা যে পূর্ণভাবে লোপ পেয়েছে তা নিয়েও কি সন্দেহ জাগে? মানসিক রোগের এরূপ অসংখ্য লক্ষণ নিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে দিনের পর অঘটন ঘটিয়ে চলেছে। যে ব্যক্তির বসবাস হওয়া উচিত ছিল কোন মানসিক হাসপাতালে,সে এখন বাংলাদেশ সরকারের ড্রাইভিং সিটে। পুরাদেশ তাই হাইজ্যাক হয়ে গেছে তার মত ক্রদ্ধ পাগলীর হাতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমান বিপর্যয় ও হানাহানি মূল কারণ,শেখ হাসিনার এ ভয়ানক মানসিক অসুস্থ্যতা। এমন মানসিক অসুস্থ্যতা নিয়ে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা নবীজী (সাঃ)র চাচা এবং ওহুদ যুদ্ধের সেনাপতি হযরত হামযা (রাঃ)র কলিজা চিবিয়েছিল।হিন্দার মানসিক অসুস্থ্যতার কারণ,হাসিনার মত সেও সে তার পিতা ও ভাইকে হারিয়েছিল। এবং সেটি এক বছর আগে সংঘটিত বদরের যুদ্ধে। তার পিতার মৃত্যু ঘটেছিল হযরত হামযা (রাঃ)র হাতে।

মটিভ ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হিন্দার বেশে আবির্ভূত হয়েছে শেখ হাসিনা।তার রাজনীতির মূল অভিপ্রায় দেশের ইসলামপন্থি নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানো। কারণ,প্রধান ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামিই অতীতে তাকে প্রধানমন্ত্রী হতে বাধা দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তার রাজনীতির মূল বাধা হয়ে থাকবে। তাই ইসলামি নেতাদেরকে লাশে পরিণত করা তার রাজনৈতিক লক্ষ্য। স্বৈর শাসনের আমলে শুধু যে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে তা নয়,কবরে যায় ন্যায়বিচারও। শেখ হাসিনার আক্রোশ শুধু ১৯৭৫য়ের বিপ্লবের নায়কদের বিরুদ্ধে নয়,সেটি বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধেও। আক্রোশ এমনকি তার নিজ দলের নেতাদের বিরুদ্ধেও।জনগণের বিরুদ্ধে হাসিনার আক্রোশের কারণ,তার পিতার মৃত্যুর দিনটিতে তারা রাস্তায় শোক মিছিল করেনি। জানাযা বা গাযেবানা জানাজাও পড়েনি। বরং রাস্তায় নেমে প্রচন্ড আনন্দ করেছে,মিষ্টি বিতরনও করেছে। আর দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আক্রোশের কারণ,তারা তার পিতার লাশকে সিঁড়িতে ফেলে খোন্দকার মোশতাকের মন্ত্রীসভার মন্ত্রী হতে ভিড় করেছে।আরো ক্ষোভ,শেখ মুজিবের মৃত্যুতে যে আব্দুল মালিক উকিল বলেছিলেন “ফিরাউনের মৃত্যু হয়েছে” তাকে তারা দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি বানিয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার গভীর ষড়যন্ত্র খোদ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও। যারা সাডিস্ট তারা ব্যক্তি জীবনে বড্ড দুঃখী। তারা কারোই সুখ সহ্য করতে পারে না। তারা চায় অন্যরাও তাদের ন্যায় গভীর দুঃখে হাবুডুবু খাক। সে রোগটাই হাসিনার মুল রোগ। আর সেটিই ভয়াবহ অকল্যাণ এনেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। ডিপ্রেশন রোগী সর্বদাই আত্মমুখি হয়। তার ভাবনা শুধু তার নিজের সুখ বিবর্জিত জীবন নিয়ে। সমাজ ও দেশের কল্যাণের ভাবনা তার থাকে না। তাই শেখ হাসিনাও তাই আত্মমুখি,তার রাজনীতির মূল অঙ্গিকার একমাত্র তার নিজের ও নিজ পরিবারের প্রতি। স্বৈরাচারিদের সেটিই চিরাচরিত রীতি। শেখ হাসিনা তাই পরিকল্পিত ভাবেই বাংলাদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীদের ভবিষ্যতে শান্তিতে বেঁচে থাকায় অসম্ভব করছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব মারা গেলেও তার দল বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে অপসারিত হলে এবার মারা পড়বে খোদ আওয়ামী লীগ ও তার বহু নেতাকর্মী। পুলিশী প্রটেকশন না পেলে তার কোন মন্ত্রী কি রাস্তায় একাকী চলাচল করতে পারে? শেখ হাসিনারও কি সে সাহস আছে? হিটলারের মৃত্যুর পর তার দল বাঁচেনি,তার দলের নেতৃবৃন্দও বাঁচেনি। অনুরূপ পরিণতি যে আওয়ামী বাকশালীদের জন্যও অপেক্ষা করছে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? স্বৈরাচারি শাসকদের সাথে তো সেটিই ঘটে।

আওয়ামী বাকশালীদের জন্য এখন বসন্ত কাল। কিন্তু এরূপ বসন্তকাল কি চিরকাল থাকে? আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা না বুঝলেও সেটি তাদের অভিভাবক ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা ও দিল্লির শাসক চক্র বুঝে। তাই নির্বাচনে যে কোন মূলে তারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে চায়।তাই তাদের লক্ষ্য,বাকশালীদের এ বসন্তকালকে বাঁচিয়ে রাখা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও যে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের শত্রু আছে -সেটি ভারতের অজানা নয়। ভারতের লক্ষ্য,হাসিনাকে দিয়ে ভারতীয় আধিপত্যাবদের যারা বিরোধী তাদের দ্রুত নির্মূল। এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ-বিরোধী রাজনীতিকে দ্রুত নেতাশূণ্য করা –বিশেষ করে দেশের ইসলামপন্থি শিবিরে। সে সাথে দেশকে দ্রুত ডি-ইসলামাইজড করা। তাই নির্বাচনে কেউ ভোট দিক বা না দিক -সেটি ভারতীয়দের কাছে আদৌ কোন প্রশ্ন নয়।তারা নির্বাচনের তোয়াক্কা করে না। তারা চায়, বাংলাদেশের সরকারে যে ব্যক্তিটি ক্ষমতায় থাকবে সে ব্যক্তিকে অবশ্যই ভারতের অনুগত দাস হতে হবে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর হাসিনাকে সে উদ্দেশ্যেই দিল্লিতে রেখে নিজ দায়িত্বে প্রতিপালন করেছে এবং গভীর ভাবে পোষ মানিয়েছে। এখন ভারত তাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে চায় নিছক নিজ স্বার্থে। লক্ষ্য,হাসিনাকে দিয়ে ভারত-বিরোধীদের নির্মূলে সমগ্র রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ব্যবহার। বাংলাদেশ দুর্বল হলেই তো তাদের লাভ। এবং শক্তি বাড়লেই তাদের ক্ষতি। বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের দেশ। ১৪শত বছর পূর্বের মদীনার ন্যায় এটি সামান্য গ্রাম নয়,বরং বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। মদীনা থেকে যদি বিশ্বের প্রধান বিশ্বশক্তির উদ্ভব ঘটতে পারে, আড়াই কোটি মানুষের দেশ আফগানিস্তানও যদি সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে পারে তবে বাংলাদেশই বা দুর্বল কিসে? ভারতের এখানেই ভয়। তাই শুধু পাকিস্তানের নয়,বাংলাদেশের কোমর ভাঙ্গাও ভারতের মূল নীতি। সেটির প্রমাণ মেলে একাত্তরেই। বাংলাদেশকে দুর্বল করতেই ১৯৭১য়ে তারা বাংলাদেশ লুন্ঠনে নামে।সে সময় ঢাকা, চট্রগ্রাম,কুমিল্লা,যশোর,বগুড়া ও সৈয়দপুরের ক্যান্টনমেন্টে তীরধনুক ছিল না,ছিল হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র যা মাত্র ১৭ দিনের যুদ্ধে প্রায় পুরাটাই অব্যবহৃত রয়ে গিয়েছিল। সে অস্ত্র কেনায় বেশীর ভাগ অর্থ জুগিয়েছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক বাঙালী মুসলমানগণ। অথচ ভারতীয় সেনাবাহিনী সে অস্ত্র বাংলাদেশে রেখে যায়নি। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর বাংলাদেশ ভারতের কাছে স্বাধীন দেশ রূপেও গণ্য হয়নি -এ হলো তারই প্রমাণ। বরং গণ্য হয়েছে অধিকৃত দেশ রূপে,আর পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধাস্ত্র গণ্য হয়েছে গণিমতের মাল রূপে। ভারতীয়গণ তাই সমুদয় অস্ত্রই নিজ দেশে নিয়ে যায়। অথচ সে অস্ত্র লুন্ঠন নিয়ে হাসিনা কোন অভিযোগ তোলে না। শেখ মুজিবও তা নিয়ে কোন কালে অভিযোগ তোলেনি। মেজর আব্দুল জলিল তা নিয়ে প্রতিবাদ করায় সেনাবাহিনীর চাকুরি হারিয়েছিলেন। ভারতের রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাথে হাসিনা ও তার পিতার রাজনৈতিক লক্ষ্যটিও যে এক ও অভিন্ন –এ হলো তার প্রমাণ।

পরিকল্পনা দেশধ্বংসের

আত্মহননেও পরিকল্পনা লাগে। তেমনি দেশধ্বংসেও পরিকল্পনা লাগে। সেরূপ পরিকল্পনা শেখ হাসিনার বহু। সে পরিকল্পনার অংশ রূপেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প পদ্মা সেতুর নির্মানকে বহু বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়। অথচ বিশ্বব্যাংক থেকে পদ্মাসেতুর জন্য বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল আজ থেকে ২০১০ সালে । এতদিনে সে সেতুর উপর দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়ে যেত। দেশে অশান্তি ও গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিও সৃষ্টি করা হচ্ছে অতি পরিকল্পিত ভাবে। শেখ মুজিবও পরিকল্পিত ভাবে দেশকে তলাহীন ঝুড়ি বানিয়েছিল। সে পরিকল্পনার অংশ রূপে দেশের সীমানা ও দেশী বাজার ভারতের জন্য খুলে দেয়। শুরু হয় অর্থপাচার,পণ্যপাচার ও পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানার যন্ত্রপাচার। এমনকি পাচার হয়ে যায় বিদেশীদের দেয়া রিলিফের সামগ্রীও। একাত্তরের আগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিকারক দেশে ছিল পাকিস্তান। সে পাট উৎপাদিত হতো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। ভারতকে হারিয়ে বিশ্ববাজারে সে অবস্থায় পৌছতে পাকিস্তান সরকারকে বহু বছর লেগেছিল। কিন্তু সে অবস্থান থেকে দ্রুত নীচে নামাতে মুজিব ও তার মোড়ল ভারতেরও বিশাল পরিকল্পনা ছিল। সেটি ছিল আদমজীর ন্যায় বিশাল বিশাল জুটমিলগুলোতে তালা ঝুলানো ও পাটের গুদামগুলিতে আগুন দেয়া। এতে ফল দাঁড়ালো,বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাট রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হলো ভারত। এমন ষড়যন্ত্র লাগাতর চললে কি দেশের অর্থনীতি বাঁচে? জনগণের জীবনও কি বাঁচে? মুজিব আমলে তাই বাংলাদেশের অর্থনীতি বাঁচেনি। বরং সৃষ্টি হয়েছে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। একাত্তরের যুদ্ধেও এতো মানুষের মৃত্যু হয়নি যা হয়েছে মুজিবের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে। নারীরা সে সময লজ্জা নিবারণে মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল। অথচ সেরূপ অবস্থা পাকিস্তান আমলে যুদ্ধকালীন ৯ মাসেও সৃষ্টি হয়নি। অথচ সেটিই ছিল শেখ মুজিবের গড়া স্বপ্নের সোনার বাংলা! মুজিবের গড়া সে বাংলা নিয়ে শেখ হাসিনার আজও কত গর্ব! মুজিবের দুঃশাসন ১৯৭৫য়ে শেষ হয়ছে। কিন্তু আজও  শেষ হয়নি তার অসমাপ্ত মিশন। এবং শেষ হয়নি ভারতীয়দের বাংলাদেশ বিধ্বংসী ষড়যন্ত্রও। সে ষড়যন্ত্রকে পূর্ণতা দেয়া নিয়েই তো ভারতের সাথে শেখ হাসিনার কোয়ালিশন।

চালকের রুমে তালা

শেখ হাসিনার যেমন তার সফল ভোট ডাকাতি নিয়ে গভীর ভাবে তৃপ্ত,তেমনি তৃপ্ত তার অভিভাবক দেশ ভারতও। ডাকাতিলব্ধ দেশের পাইলটের সিটটি এখন হাসিনা ছাড়তে নারাজ। জার্মান বিমান চালক এ্যাড্রিয়াস লুবিটজ ভিতর থেকে চালকের রুমে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। মূল পাইলট বহু চেষ্টা করেও সে রুমে ঢুকতে পারিনি। যাত্রীভর্তি বিমান নিয়ে তাই সে সুযোগ পেয়েছে আল্পস পর্বতে আঘাত হানার। হাসিনাও তেমনি দেশের রাজনীতির কন্ট্রোল রুমে তালা লাগিয়ে দিয়েছে।যাকে ইচ্ছা তাকে ফাঁসি দিচ্ছে,যাকে ইচ্ছা তাকে ঘর থেকে উঠিয়ে নিয়ে গুম করে দিচ্ছে বা ক্রসফায়ারে দিয়ে হত্যা করছে। রাজনীতির ময়দানে বিরোধী দলগুলোর জন্য সামান্যতম স্থান ছাড়তেও রাজী নয়। স্বাধীন মিডিয়াকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল,আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা,এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল,আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ন্যায় বহু প্রতিষ্ঠানের কেউই তার পাইলটের সিটে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না। আত্মঘাতি পাইলটের ন্যায় সে দেশবাসীর প্রাণহননে নেমেছে। জার্মান কো-পাইলট লুবিটজ শুধু একটি বিমানকে প্রাণহননের হাতিয়ার বানিয়েছিল,আর শেখ হাসিনা দেশের পুলিশ,র‌্যাব,বিজিবি,আইন-আদালত ও পুরা প্রশাসনকে প্রাণহনের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার এটিই হলো নৃশংস স্বৈরাচারিতদের চিরাচরিত কৌশল। স্বজন হারানোর এমন প্রেক্ষাপটেই অতীতে নৃশংস চেঙ্গিজ খান ও হালাকু খানের জন্ম হয়েছে,এবং তাতে ভয়ানক গণহত্যা নেমে এসেছে পৃথিবীর বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে।তখন ধ্বংসপুরিতে পরিণত হয়েছে বাগদাদ,নিশাপুর, সমরকন্দ,বোখারার ন্যায় বহু সমৃদ্ধ নগরী।

 

জনগণের কি করণীয়?

জনগণের দায়ভারটি শুধু মানসিক রোগীদের হাত থেকে বিমানকে বা ট্রেনকে বাঁচানো নয়,দেশকে বাঁচানোও। এজন্য তাদেরকে শুধু হিংস্র বাঘ-ভালুককে চিনলে চলে না। চিনতে হয় হিংস্র মানসিক রোগীগুলোকেও। নইলে স্রেফ ক্ষমতায় যাওয়ার স্বার্থে তারা দেশে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু করতে পারে। দেশও পরাধীন ও খন্ডিত হতে পারে। ১৯৭১য়ে তো সেটিই হয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষের বড় ব্যর্থতাটি মূলতঃ হিংস্র মানুষ চেনার ক্ষেত্রে।সে ব্যর্থতা যেমন ১৯৭০ নির্বাচনে হয়েছে,তেমনি ২০০৮ সালের নির্বাচনেও হয়েছে। যে মুজিব সিরাজ শিকদারকে হত্যার পর সংসদে দাড়িয়ে উল্লাস ভরে বলতে পারে,“কোথায় আজ সিরাজ শিকদার” বা কয়েক মিনিটে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতে পারে তার মানসিক অসুস্থ্যতা কি কম?  স্বৈরাচারি মুজিবের হাতে দেশ তো পুরাপুরি হাইজ্যাক হয়ে গিয়েছিল ১৯৭০য়ে নির্বাচনি বিজয়ের সাথে সাথেই। অবশেষে দেশ রক্ষা পায় ১৯৭৫ সালে এবং ফিরে আসে আবার মানবাধিকার। কিন্তু দেশ পুণরায় হাইজ্যাক হয়েছে আরেক হিংস্র মানসিক রোগীর হাতে। সেটি তারই কন্যার হাতে। প্রশ্ন,এখন করণীয় কী? করণীয় সেটাই যা জার্মান উইঙ্গসের হাইজ্যাককৃত বিমানের মূল পাইলট করেছিল। ব্লাক বকসের তথ্য থেকে জানা যায়,সে কুড়াল দিয়ে ককপিটের দরজা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকতে চেয়েছিল। চেয়েছিল বিমান চালানোর ড্রাইভিং সিট থেকে লুবিটজকে সরাতে এবং বিমান চালানোর দায়ভার নিজে নিতে। কিন্তু ইতিমধ্যে বড্ড দেরী হয়ে গিয়েছিল। বিপদের এরূপ মুহুর্তে সামান্য দেরী হলে এভাবেই ভয়ানক মৃত্যু নেমে আসে। ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশও আজ  হাইজ্যাকের শিকার। ফলে ভয়ানক বিপদগ্রস্ত হলো ১৬ কোটি মানুষ। এ জিম্মিদশা থেকে মুক্তি দিতে হলে জনগণের দায়িত্ব হলো,যত শীঘ্র সম্ভব শেখ হাসিনাকে ক্ষমতার আসন থেকে সরানো। বিলম্ব হলে ভয়াবহ বিপদ নেমে আসবে সমগ্র বাংলাদেশীদের জীবনে। ইসলামে জিহাদের গুরুত্ব তো এজন্যই সর্বাধীক।কারণ,এরূপ বিপদ থেকে একমাত্র মু’মিনের জিহাদই রক্ষা করতে পারে।

নামায-রোযা,হজ-যাকাত মানব মনে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণকে জাগরিত রাখার অতি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু হাইজ্যাককারিদের হাত থেকে নামায-রোযা,হজ-যাকাত বা দোয়া-দরুদ যেমন প্রাণ বাঁচায় না,তেমনি দেশও বাঁচায় না। বাঁচায় না দেশের স্বাধীনতাও। এবং প্রতিষ্ঠা আনে না মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের। বাংলাদেশের কোটি মানুষের নামায-রোযা এবং তাবলিগী ইস্তেমার লক্ষ লক্ষ মানুষের দোয়াতে তাই স্বৈরাচারি জালেম শাসকের মসনদ একটুও হেলেনি। এরূপ পথ তাই ইসলামের নয়, নবীজী (সাঃ)র সূন্নতও নয়। জালেম শাসকের নির্মূলে মহান আল্লাহতায়ালার প্রেসক্রিপশন হলো জিহাদ। খোদ নবীজী (সাঃ)কেই তাই জায়নামায ছেড়ে জিহাদের ময়দানে নামতে হযেছে। নামায-রোযা,হজ-যাকাতে জানের কোরবানি নেই।অথচ জানের সে বিশাল কোরবানি আছে জিহাদে। আর ইবাদতের কদর তো বাড়ে কোরবানির বিশালতায়। জিহাদ এজন্যই ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। একমাত্র এ ইবাদতটি পালনে প্রাণ গেলে বিনা হিসাবে তৎক্ষনাৎ জান্নাতপ্রাপ্তির গ্যারান্টি মেলে। তখন কবরের আযাব,রোজহাশরের ভয়,পুলসিরাতের বিপদ –এর কোনটাই থাকে না। থাকে না আলমে বারযাখে হাজার হাজার বছর অপেক্ষায় থাকায় পালা। মৃত্যুর পরপরই মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর এ মহান সৈনিককে জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করেন। দেন অতুলনীয় খাদ্যসম্ভার। জিহাদ এবং জিহাদের ময়দানে শাহাদত তাই মু’মিনের জীবনে সবচেয়ে বেশী কাঙ্খিত। মহান সাহাবায়ে কেরামদের কাছে সবচেয়ে পছন্দের পথ ছিল তাই জিহাদ ও জিহাদের ময়দানে শাহাদত লাভ। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা তাই আল্লাহর পথে জিহাদে শহীদ হয়েছেন। মুসলিম দেশগুলিতে ইসলাম আজ  যেরূপ পরাজিত তার কারণ মসজিদ-মাদ্রাসার কমতি নয়, বরং জিহাদের অনুপস্থিতি। যারা সরাসরি জান্নাতে পৌঁছার পথ খোঁজে,তারা সবাই প্রতিনিয়ত জিহাদের ময়দান খোঁজে।তাই বিশ্বের চলমান বিশুদ্ধ জিহাদের ময়দানগুলিতে নানা দেশ ও নানা ভাষার মানুষের এত ভিড়। বাংলাদেশে আজ যে শয়তানী শক্তির অধিকৃতি তা থেকে মুক্তির এটিই একমাত্র পথ। বিগত ১৪শত বছরের ইতিহাসে জালেম শাসকের নির্মূলে কোনকালেই এ ছাড়া ভিন্ন পথ ছিল না।গতানুগতিক রাজনীতির পথে যে মুক্তি নাই -সেটি ইতিমধ্যে প্রমানিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে এ যাবত বহু আন্দোলন হয়েছে। তাতে কেবল জান ও মালের খরচ বেড়েছে। এবং বহু সরকারের পতনও হয়েছে। কিন্তু তাতে কি ইসলামের প্রতিষ্ঠা এক শতাংশও বেড়েছে? জুটেছে কি স্বাধীনতা। বেড়েছে কি শান্তি? বরং এসব আন্দোলনে শক্তিশালী হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষ। একাত্তরে বিরাট যুদ্ধ হলো,অথচ দেশ অধিকৃত হলো কাফের শত্রু শক্তির হাতে। এবং ক্ষমতায় বসলো গণতন্ত্রের ভয়ানক শত্রু।এতে কবরে গেল মত প্রকাশ ও দল গঠনের স্বাধীনতা।সে সাথে কবরে গেল দলীয় রক্ষিবাহিনীর হাতে ৩০ হাজারের বেশী মানুষ।

তাছাড়া স্রেফ নির্বাচন,ভোটদান,জনসভা,মিছিল,হরতাল বা অবরোধ পালনের মধ্য দিয়ে কি জিহাদ পালিত হয়? পালিত হয় কি পরিপূর্ণ ইসলাম। তাতে থাকে কি মহান আল্লাহতায়ালার রাস্তায় জান কোরবানির প্রেরণা? এগুলি কি নবীজী (সাঃ)র দেখানো পথ? জিহাদ হবে স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার রাস্তায়। জিহাদের লক্ষ্য স্রেফ কোন ইসলামি দলকে নির্বাচনে বিজয়ী করা নয়। সংসদে কিছু দলীয় ব্যক্তির সদস্য পদ পাওয়াও নয়। নিছক কোন ইসলামপন্থি ব্যক্তির মুক্তি নিয়ে আন্দোলনও নয়। লক্ষ্য এখানে বিশাল। সেটি হলো সকল প্রকার দুর্বৃত্ত ও ইসলামের শত্রুপক্ষের নির্মূল এবং সে সাথে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তি বিধানের পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠা। মু’মিনের অর্থদান,শ্রমদান ও আত্মদান এ জিহাদে অপরিহার্য। এছাড়া অন্য কোন কর্মসূচি কি কোন কালে মুসলিমের জীবনে অধিক গুরুত্ব পেতে পারে? ১২/০৪/২০১৫

 

 




ভারতীয় নির্বাচনঃ বিশাল বিজয় অপরাধীদের

অপরাধীদের নিরংকুশ বিজয়

২০১৯ সালের ভারতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয় জুটলো ভয়ানক অপরাধীদের। তাদের বিজয়ে ভারতের ২০ কোটি মুসলিম এবং বহু কোটি খৃষ্টান ও তথাকথিত দলিত বা অচ্ছুৎদের জীবনে যে দ্রুত দুর্গতি নেমে আসবে -তা নিয়ে সন্দেহ অতি সামান্যই। জোরদার হবে আসাম থেকে ৪০ লাখ মানুষের গায়ে বাংলাদেশীর লেবেল লাগিয়ে যে দেশত্যাগে বাধ্য করার ন্যায় বহুবিধ মুসলিম বিরোধী উদ্যোগ। সে নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়বে পশ্চিম বাংলাতেও। কিন্তু তাতে পরিনামে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যে খোদ ভারত -তা নিয়েও কি কোন সন্দেহ আছে? অপরাধীদের বিজয়ে কোন দেশই লাভবান হয়না। বরং বাড়ে অপরাধ কর্ম ও অশান্তি। তাছাড়া বিজয়ী অপরাধীগণ যে ভয়ানক অপরাধী -সে বিষয়টি কোন গোপনীয় বিষয় নয়। নরেন্দ্র মোদী ও তার সেনাপতি অমিত শাহের হাতই শুধু গুজরাতের মুসলিম রক্তে রঞ্জিত নয়, রক্তের গন্ধ আসে আরো অনেক বিজয়ী এমপি ও মন্ত্রীদের গা থেকেও। নিছক অহিন্দু হওয়ার অজুহাতে যে দেশের ২০ কোটি মানুষকে –যা জার্মান, ইংল্যান্ড বা ফান্সের জনসংখার তিনগুণের অধীক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গণ থেকে পরিকল্পিত ভাবে দূরে রাখা হয়, সে দেশে কল্যাণকর কিছু কি আশা করা যায়? কল্যাণমুখি সরকারের কাজ তো ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও জাত-পাতের উর্দ্ধে উঠে দেশের বেকার নাগরিকদের কাজ দেয়া, কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে রাখা নয়। অথচ ভারতে ২০ কোটি মুসলিমদের অবহেলিত রাখাই হলো সরকারি নীতি।

ভারতীয়গণ অতীতের ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি। প্রায় দেড় শত বছর আগে বাংলার হিন্দুদের জীবনেও রেনাসাঁ এসেছিল। কিন্তু পরিণামে সে রেনাসাঁ বাঙালী হিন্দুদের তেমন কোন কল্যাণ দেয়নি। কারণ, হিন্দুরা নিজেদের কল্যাণ চেয়েছিল প্রতিবেশী মুসলিমদের অকল্যাণ ঘটিয়ে। তারা এগিয়ে যেত চেয়েছিল শিক্ষা-দীক্ষা, চাকুরি-বাকুরি ও অর্থনীতিতে , মুসলিমদের বাদ দিয়েই। তাদের সে অপরাধের কারণেই ১৯৪৭’য়ে বাংলা বিভক্ত হয়েছে। এবং বাঙালী হিন্দুরা শুধু ভারতীয় রাজনীতিতেই প্রভাব হারায়নি, প্রভাব হারিয়েছে নিজ প্রদেশ পশ্চিম বাংলাতেও। এবারের নির্বাচনের পর পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতার বানার্জির আশংকা, গুজরাতের উগ্রবাদী হিন্দুদের খুনোখুনি ও মুসলিম নিপীড়নের রাজনীতি শুরু হতে যাচ্ছে খোদ পশ্চিম বাংলায়।

মমতার বানার্জির আশংকাটি আদৌ ভিত্তিহীন নয়। এবারের সংসদ নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপি)’র সবচেয়ে বড় বিজয়টি এসেছে পশ্চিম বাংলায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজপি পেয়েছিল রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের মাঝে মাত্র ২টি; এবার পেয়েছে ১৮টি। এ বিশাল বিজয়ে বলীয়ান হয়ে বিজিপি ইতিমধ্যেই কলকাতাসহ পশ্চিম বাংলার নানা শহরে রাজনৈতিক পরিবেশ লাগাতর অশান্ত ও উত্তপ্ত করে চলেছে। অরাজকতার দোহাই দিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে মমতা বানার্জীর সরকারকে হটিয়ে কেন্দ্রীয় শাসন বলবৎ করার। তাছাড়া বিজিপি কোন রাজ্যে শক্তিশালী হলে সে রাজ্যে যা দ্রুত বিনষ্ট হয় তা হলো সাম্প্রদায়িক সম্পৃতি ও শান্তির পরিবেশ। ছিটানো হয় ঘৃনার পে্ট্রোল। সৃষ্টি হয় যে কোন মুহুর্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন জ্বলে উঠার উপযোগী পরিবেশ। মোদীর শাসনামলে এমনটিই হয়েছে গুজরাতে, এবং আজ তা হতে যাচ্ছে উত্তর প্রদেশে। উত্তর প্রদেশে ঘরে গরুর গোশতো রাখার সন্দেহে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। হত্যা করা হচ্ছে গরু-ব্যবসায়ীদের। ভারতীয় মুসলিমদের প্রাণের মূল্য গরুর চেয়েও নীচে নেমেছে। সরকারের প্রায়োরিটি যতটা গরুর নিরাপত্তা দিতে, সেটি নেই মুসলিমের জান-মাল ও ইজ্জত বাঁচাতে। অবস্থা এতটাই নাজুক যে, মুসলিম মায়েরা টুপি মাথায় দিয়ে সন্তানদের মসজিদে পাঠাতে ভয় পায়। আশংকা এখানে বজরং দল বা আরএসএস গুন্ডাদের হাতে পথে নিহত হওয়ার। তেমন একটি মুসলিম বিরোধী সন্ত্রাসের হাওয়াই বেগবান হচ্ছে পশ্চিম বাংলায়। তবে পশ্চিম বাংলায় খুনোখুনি শুরু হলে সেটি যে শুধু যে পশ্চিম বাংলা সীমিত থাকবে না -তা বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে সমগ্র পূর্ব-ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে। ভারতে ২০ কোটি মুসলিমের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বটি মূলতঃ ভারত সরকারের। কিন্তু ভারত তাতে ব্যর্থ হলে ২০ কোটি মুসলিম কি তবে বিলীন হয়ে যাবে? প্রতিবেশী রূপে সুস্থ্য আচরণে হিন্দুগণ ব্যর্থ হলে তাদের জন্য পৃথক ভূমির দাবী তখন অনিবার্য হয়ে উঠবে। এ ২০ কোটি মুসলিম বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে গিয়ে সেখানে ঘর বাঁধেনি। আসমান থেকেও তারা নাযিল হয়। জন্মসূত্রে তারা ভারতীয়; ফলে ভারত ভূমিতেই নিরাপদ বাসস্থান পাওয়াটি যে তাদের বৈধ মানবিক অধিকার -সেটি কি অস্বীকারের উপায় আছে?        

 

মৃত গণতন্ত্র এবং বিজয় ফ্যাসিবাদের

শিক্ষা, সংস্কৃতি, দর্শন, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধে জনগণের স্তরে বিপ্লব না এলে নির্বাচনে বিপুল ভাবে বিজয়ী হয় চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীর ন্যায় ভয়ানক অপরাধীরা। তখন স্বৈরাচারি খুনিরা শুধু এমপি বা মন্ত্রী হয় না, বরং দেশের নেতা, পিতা, বন্ধু রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। এর উদাহরণ শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং সবচেয়ে বড় উদাহরণটি হলো ভারত। গণতন্ত্রের নামে সেখানে শুরু হয়েছে হিন্দু মেজরটির বর্বর স্বৈর শাসন। ডাকাত আরেক ডাকাতকে কখনোই নিন্দা করে না। ফলে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ভোটচুরি, ভোটডাকাতি এবং গুম-খুন ও সন্ত্রাসের যে রাজনীতি প্রতিষ্ঠা দিয়েছে তা বিপুল প্রশংসিত হচ্ছে ভারতীয় শাসক মহলে। মোদীর শাসনামলে ভারতের অর্থনীতিতে কোন উন্নয়ন ঘটেনি, বরং বেড়েছে বেকারত্ব এবং এসেছে অর্থনৈতিক মন্দা। ঋণের দায়ভারে আত্মহত্যা করছে হাজার গরীব কৃষক। অথচ এরপরও এবারের নির্বাচনে বিজেপি’র বিজয়টি ২০১৪ সালের বিজয়ের চেয়েও বিশাল। এর কারণ, মোদী অর্থনীতিতে উন্নতি আনতে না পারলেও এনেছে উগ্র হিন্দুত্বের জোয়ার। ভারতের ন্যায় দেশগুলোতে অর্থনীতির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধর্ম –সেটি হিন্দু ধর্ম। এরই ফল হলো, ৫৪৩ সিটের পার্লামেন্টে ২০১৪ সালে বিজিপি পেয়েছিল ২৮২ সিট এবং এবার পেয়েছে ৩০৩ সিট। ২০১৪ সালে পেয়েছিল ৩১.৩% ভোট এবং এবার পেয়েছে ৩৭.৪%।

গণতন্ত্রকে যদি বলা হয় জনগণের ভোটে যোগ্যবানদের নির্বাচনের প্রক্রিয়া -তবে এ নির্বাচনে গণতন্ত্র শুধু পরাজিতই হয়নি, তার মৃত্যু হয়েছে। বিজয়ী হয়েছে নিরেট ফ্যাসিবাদ। ভারতের রাজনীতি অধিকৃত হয়েছে ভয়ানক খুনি ও অপরাধীদের হাতে। এরই প্রমাণ, নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভায় এবার যারা স্থান পেল তাদের মাঝে বিভিন্ন ধরনের ফৌজদারি অপরাধে বিচারাধীন আসামি হলো ৩৯ শতাংশ। গতবারে তাদের সংখ্যা ছিল ৩১ শতাংশ। বিজয়ীদের মধ্যে ২০১ এমপি এমন যারা নানারূপ অপরাধের আসামি। ভারতীয় গবেষণা সংস্থা এডিআর’য়ের মতে মন্ত্রিসভার ৫৭ সদস্যের মাঝে ২২ জনের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি মামলা আছে। বিষয়টি কোন গোপন বিষয়ও নয়। অপরাধ জগত থেকে আসা এসব মন্ত্রীরা নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামাতে তারা নিজেরাই উল্লেখ করেছিল যে, ফৌজদারি মামলায় তারা আসামী। কিন্তু তাতে তাদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়াতে কোন বাধা পড়েনি। তাদের মধ্যে ১৬ জন হলো এমন অপরাধী যারা খুন ও ধর্ষণের ন্যায় গুরুতর অপরাধের আসামী। আদালতে সাতটি মামলা আছে এমন ব্যক্তিও মন্ত্রী হয়েছেন। নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিরুদ্ধে রয়েছে চারটি মামলা।

এবারের নির্বাচনী যুদ্ধে নরেন্দ্র মোদীর মূল সেনাপতি ছিল অপরাধ জগতের অমিত শাহ। মোদীর ন্যায় অমিত শাহের বাড়ীও  গুজরাতে। তাদের উভয়ের হাতই শিক্ত হয়েছে ২০০২ সালে গণহত্যার শিকার মজলুম মুসলিমদের রক্তে। মুখ খুললে এখনো রক্তের গন্ধ বেরুয় তাদের মুখ থেকে। দুর্বৃত্তি বিপুল সমৃদ্ধি দিয়েছে তাদের সম্পদে। ২০১২ সালে নির্বাচনী হলফনামায় অমিত শাহ তার পরিবারের  সম্পদ দেখিয়েছিল ১২ কোটি ভারতীয় রুপি। ২০১৯ সালে দেখিয়েছে ৩৯ কোটি। ৭ বছের তার সম্পদে বেড়েছে ২৭ কোটি রুপি। এত বিপুল অর্থ আকাশ থেকে পড়েনি, বরং তা হলো অপরাধের কামাই। ভারতে অতি দ্রুত ধনি হওয়ার সহজ ব্যবসাটি হলো সরকারি দলে যোগ দেয়া। এ ব্যবসায় কোন পুঁজি লাগে না, লাগে স্রেফ সন্ত্রাসের সামর্থ্য। সে সামর্থ্য থাকলে  রাজনৈতিক পদ এবং ক্ষমতা -উভয়ই জুটে।

ডাকাত দলে সবচেয়ে নৃশংস ডাকাতকে সর্দার করা হয়, তেমনি সন্ত্রাসের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসীকে। সন্ত্রাসের সে সামর্থ্য না থাকলে স্থান জুটে ভোটারের কাতারে, মন্ত্রী বা এমপি রূপে না। এক কালের “টি বয়” নরেন্দ্র মোদীর কপাল খুলে তখন যখন বিজেপি নেতা লাল কৃষ্ণ আদভানীর নেতৃত্বে হিন্দুত্বের জোয়ার শুরু হয়। মোদি আদবানীর দৃষ্টি কেড়েছিল ১৯৯২ সালে। সেটি গুজরাত থেকে হাজার হাজার উগ্র হিন্দুদের অযোধ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ গুড়িয়ে দেয়ার কাজে নিয়ে। বাবরী মসজিদ ধ্বংসে মোদী ছিল আদভানীর অন্যতম সেনাপতি। বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পুরস্কার স্বরূপ বিজিপির পক্ষ থেকে মোদিকে দেয়া হয় গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীর পদটি। গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পরই তার নেতৃত্বে শুরু হয় আরেক নৃশংস পর্ব। সেটি গুজরাতের মুসলিমদের উপর হত্যা, ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ী ও দোকানে আগুণ দেয়ার প্রক্রিয়া। ২০০২ সালে শুরু হয় মুসলিম নির্মূলের গণহত্যা। মুখ্যমন্ত্রী রূপে সে সময় মোদীর উপর মূল দায়িত্বটি ছিল পুলিশকে নিষ্ক্রীয় রেখে হত্যা, ধর্ষণ এবং ব্যবসায় আগুণ দেয়ার কাজে হিন্দু গুন্ডাদের পর্যাপ্ত সময় দেয়া। সে নিধনযজ্ঞে মৃত্যু ঘটে ২ হাজারের বেশী নরনারী ও শিশুর। পুড়িয়ে ছাই করা হয় বহু হাজার মুসলিমের গৃহ ও দোকানপাট। যে সব আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে গৃহহীন অসহায় মুসলিমগণ স্থান নিয়েছিল মোদী সেগুলিও বন্ধ করে দেয়। সেগুলি চিহ্নিত হয়েছিল শিশু উৎপাদনের কারখানা রূপে।

 

খুন-ধর্ষণের বিচারে অনুমতি নিতে হবে অপরাধী থেকে!    

অপরাধীদের বিপুল বিজয়ে পরিস্থিতি এতটাই পাল্টে গেছে যে, কোন খুনি বা ধর্ষকের বিচারের আগে সে অপরাধী থেকে প্রথমে অনুমতি নিতে হবে। কারণ তারাই মন্ত্রী ও এমপি। গুজরাতে মুসলিম দলন প্রক্রিয়া এবং ২০০২ সালে মুসলিম গণহত্যার কাজে নরেন্দ্র মোদীকে যে অমিত শাহ সর্বপ্রকার সহায়তা দিয়েছিল সেই এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে থাকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব। গুজরাতে যখন মুসলিমদের হত্যা ও তাদের ঘরাড়ী পোড়ানোর কাজ মহা ধুমধামে চলছিল তখন সে হত্যাযজ্ঞ থামাতে পুলিশ বাহিনী কোন দায়িত্ব পালন করেনি। বরং যেসব পুলিশ অফিসারগণ নিজ উদ্যোগে দাঙ্গা থামাতে তৎপর হয়েছিল তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল অন্যত্র বদলী করে। যাদের নেতৃত্বে সেদিন গুজরাতে গণহত্যা পরিচালিত হয়েছিল তাদের হাতেই এখন ভারতের শাসন ভার। ফলে গুজরাত হয় এখন সমগ্র ভারত। আসাম থেকে তাই ৪০ লাখ মুসলিমের বিতাড়নের ষড়যন্ত্র। স্মরণীয় হলো, কলকাতায় মুসলিম এলাকার মধ্য দিয়ে এবার এক নির্বাচনি মিছিল নেতৃত্ব দিয়েছিল অমিত শাহ। সে মিছিল থেকে অকথ্য ভাষায় দু’পাশের মুসলিমদের উদ্দ্যশ্য করে গালি গালাজ করা হয়। অসহায় মুসলিমেরা সেদিন সে অকথ্য গালিগালাজ মুখ বুজে সহ্য  করেছে। প্রতিক্রিয়া দেখালে সেদিনই শুরু হতো মুসলিম নিধনমুখি দাঙ্গা।

নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ৯ দিন পর নরেন্দ্র মোদি শ্রীলঙ্কায় যান। লক্ষ্য ছিল, চার্চের উপর সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত খ্রিষ্টানদের প্রতি সহানুভূতি জানানো। এটি ছিল নির্লজ্জ ভন্ডামী। মোদি কি ভূলে গেছে ভারতীয় খৃষ্টানদের উপর তার নিজ দলের নেতাকর্মীদের নৃশংস হত্যাকান্ডের কথা? মোদির মন্ত্রীসভায় স্থান পেয়েছে উড়িষ্যার হি্ন্দু চরমপন্থিদের নেতা প্রতাপ চন্দ্র সারাঙ্গী। প্রতাপ সারাঙ্গী সাতটি ফৌজদারি মামলার আসামি। সে হলো আরএসএস-বিজেপি রাজনৈতিক গোষ্ঠির সবচেয়ে আক্রমণাত্মক সংগঠন বজরং দল উড়িষ্যার রাজ্যের সভাপতি। এই দলের কর্মীরাই ১৯৯৯ সালে উড়িষ্যায় অস্ট্রেলিয়ান খ্রিষ্টান যাজক গ্রাহাম স্টেইনকে দুই ছেলেসহ ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করে।এরূপ এক বীভৎস খুনের সাথে জড়িত হওয়া সত্ত্বেও প্রতাপের রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠায় কোন ছেদ পড়েনি।  ২০০২ সালে ‘বজরং দল’, ‘দুর্গাবাহিনী’ এবং ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ মিলে উড়িষ্যার বিধানসভা ভবনের যে হামলা করে, তাতেও নেতৃত্বে ছিল প্রতাপ সারাঙ্গীর। সে সময় তাকে আটকও করা হয়েছিল। অথচ এ খুনি প্রতাপকে একটি নয় দুটি দপ্তরের মন্ত্রী করা হয়েছে। বিজেপির কর্মীদের কাছে সে হলো ‘উড়িষ্যার মোদি। সন্ত্রাস ও খুনের সামর্থ্য থাকলে বিজিপিতে যে কীরূপ মূল্য মেল -প্রতাপ হলো তারই প্রমাণ।

তবে নৃশংস অপরাধের সাথে জড়িত হওয়ার কাহিনী কারো কারো জীবনে অমিত শাহ ও প্রতাপ চন্দ্রের চেয়েও অধীকতর বর্বর ও নৃশংস। তাদেরই একজন হলো ভূপালের প্রাগ্য ঠাকুর। এখনো তাকে মন্ত্রী করা হয়নি। তবে প্রতাপ চন্দ্রের মন্ত্রিত্ব পাওয়াতে রাস্তা খুলে গেল প্রাগ্য ঠাকুরের পথ। ২০০৮-এর সেপ্টেম্বরে ভারতজুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে স্থানে স্থানে যে লাগাতর বোমা হামলা চালানো হয় তার মূল আয়োজক ছিল প্রাগ্য ঠাকুর। কোথাও কোথাও আবার মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় হিন্দুদের উসকে দিতে হিন্দু স্থাপনার উপরও সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থলে পাওয়া গেছে হামলার কাজে ব্যবহৃত প্রাগ্যের মোটরসাইকেলও। পুলিশী তদন্তে প্রাগ্যের সংশ্লিষ্টতা ধরা পড়ে ‘রাষ্ট্রীয় জাগরণ মঞ্চ’, ‘অভিনব ভারত’ ইত্যাদি নামে বহু গোপন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সাথে। বহুহত্যার সাথে জড়িত এ সন্ত্রাসীকে বিজিপি ভূপাল আসনে প্রার্থী রূপে খাড়া করে। মধ্যপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দ্বিগবিজয় সিংকে প্রায় চার লাখ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ী হয় প্রাগ্য ঠাকুর।

ভোটের মধ্য দিয়ে ভোটারের মন কথা বলে। প্রাগ্য ঠাকুর, অমিত শাহ প্রতাপ সারাঙ্গীর মত অপরাধীদের বিপুল ভোটে বিজয়ে প্রমাণ মেলে ভারতীয় ভোটারদের অন্তরে মুসলিম বিদ্বেষী রূপটি কতটা প্রকট। এমন বিষাক্ত মনের ভোটারদের মাঝে কি গণতন্ত্র বাঁচে? বাঁচে কি মানবিক সভ্যতা? এরূপ দেশে সহজেই সন্ত্রাসী দল গড়া যায়, কিন্তু সভ্য গণতান্ত্রিক সরকারও কি গড়া যায়?  নির্বাচনী প্রচারকালে গান্ধীর হত্যাকারীকে নাথুরাম গড়সে’কে প্রাগ্য ঠাকুর প্রকাশ্যেই দেশপ্রেমিক রূপে অভিহিত করেছে। কিন্তু তার সে উক্তি বিজিপি’র কাছে আপত্তিকর মনে হয়নি। ফলে দলীয় প্রার্থী পদ থেকে তাকে প্রত্যাহারও করেনি। আর সন্ত্রাসে তার জড়িত থাকার বিষয়? প্রাগ্যের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগকে মিথ্যা বলছে বিজিপি প্রধান অমিত শাহ। আরো বিস্ময়ের বিষয় হলো, প্রাগ্য ঠাকুরের বিরুদ্ধে প্রধান তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা হেমন্ত কারকারে’কে রহস্যমূলক ভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে। প্রাগ্যের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তদন্তে নামায় তাকেও প্রাণ হারাতে হয় সন্ত্রাসী হামলায়।

ভারতীয় গবেষণা সংস্থা এডিআর’য়ের রিপোর্ট মতে লোকসভায় নির্বাচিত এমপি’দের মাঝে ২৩৩ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের মামলা রয়েছে। গত সংসদের চেয়ে এ সংখ্যাটি ১৪ শতাংশ বেশি। এখন বিষয়টি সুনিশ্চিত যে, আগামী দিনে ভারতের নীতি নির্ধারণ করবে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, প্রতাপ চন্দ্র, প্রাগ্য ঠাকুরের মত ভয়ানক অপরাধীরা। প্রশ্ন হলো, উগ্রবাদিদের হাতে অধিকৃত ভারতের ভবিষ্যৎ চেহারাটি যে কতটা হিংসাত্মক হবে -তা নিয়ে অনুমান করাটি কি আদৌ কঠিন? ভারতীয় জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ মুসলিম। সরকারি চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও নয়। উত্তর প্রদেশে প্রায় ৫ কোটি মুসলিমের বাস। কিন্তু বিগত পার্লামেন্টে তাদের মধ্য দিকে একজনও এমপি হতে পারেনি। এবার ২০ কোটি মুসলিমের মধ্য থেকে এমপি’র সংখ্যা মাত্র ২৫ জন। ঢাকা, করাচী বা লাহোরের মত একটি শহরে যত জন মুসলিম ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, উকিল, সরকারি অফিসার, পুলিশ অফিসারের বাস ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের মাঝে তার সিকি ভাগও নেই। এরূপ অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বললে বলা হয় মুসলিমের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব। বলা হয় মুসলিম তোষণ। সেটিকে চিত্রিত করা হচ্ছে অপরাধ রূপে। মানবতা তো পশুত্ব নিয়ে বাঁচে না, সেজন্য মানবিক পরিচয়টি তো অপরিহার্য। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে সে মানবিক রূপটি এখন মৃত। আর মানবতার মৃত্য হলে নরহত্যা, নারী-ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও যে উৎসবে পরিণত হবে সেটিই তো স্বাভাবিক। উৎসবের সে প্রচণ্ড রূপটি দেখা যায় মুসলিম গণহত্যামুখি দাঙ্গাগুলিতে।

 

শুরুটি বহু আগে থেকেই                    

তবে ভারত জুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেরূপ হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও পথেঘাটে দাড়ি টেনে অপমান করার যে অভিযান চলছে -সেটি হঠাৎ করে শুরু হয়নি। শুরুটি শত বছর আগে থেকে। ভারত আজকের এ অবস্থায় পৌঁছেছে সংঘবদ্ধ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ফলে। এরূপ একটি অবস্থা সৃষ্টিতে লাগাতর কাজ করেছে বহু হিন্দু বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, ধর্মগুরু ও মিডিয়া কর্মী। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী জাগরণ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বাণী নিয়ে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তিটি রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণ উত্তপ্ত করেন তিনি হলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকার। তার চিন্তাধারায় পুষ্ট হয়ে ভারত জুড়ে প্রতিষ্ঠা পায় আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ এবং আজকের বিজিপি। নরেন্দ্র মোদীর রাজনীতির শুরু হয় আরএসএস থেকে। সাভারকারই জোরে জোরে বলা শুরু করেন, “হিন্দুদের মূল শত্রু হলো মুসলিম, ইংরেজগণ নয়। -(সূত্রঃ (Jaffrelot (2009). Hindu Nationalism: A Reader. Princeton University Press. pp. 14–15, 86–93. ISBN 1-4008-2803-1) প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি হিন্দুদেরকে ইংরেজদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিতেও উৎসাহ দেন। এবং অধিকৃত আরব ভূমিতে ইংরেজদের হাতে ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হলে সেটিকেও তিনি সমর্থণ দেন। কংগ্রেসের ব্রিটিশ বিরোধী “ভারত ছাড়” আন্দোলনেরও তিনি বিরোধীতা করেন। তিনিই বলেন, “যেসব মুসলিম ভারতের পুলিশ ও সেনাবাহিনী রয়েছে তারা হলো ” traitors” তথা  গাদ্দার। ভারত সরকারকে তিনি পরামর্শ দেন সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সরকারি প্রশাসনে মুসলিমদের সংখ্যা কমাতে। নিষিদ্ধ করতে বলেন মুসলিমদের অস্ত্র কারখানার মালিক বা শ্রমিক হওয়া থেকে। -(সূত্রঃ McKean, Lise (1996), Divine Enterprise: Gurus and the Hindu Nationalist Movement, University of Chicago Press, ISBN 97-0-226-56009-0)

সাভারকারের পর হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার আরেক তারকা হলো মাধব সদাশিব গোয়ালকার। সাভারকারের ন্যায় গোয়ালকারও ছিল মারাঠী। ১৯৩৮ সালে হিন্দুভারতের যে রূপরেখাটি তিনি পেশ করেন তা হলো নিম্নরূপ: “The non-Hindu people of Hindustan must either adopt Hindu culture and language, must learn and respect and hold in reverence the Hindu religion, must entertain no idea but of those of glorification of the Hindu race and culture…..In a word, they must cease to be foreigners, or may stay in the country wholly subordinated to the Hindu nation, claiming nothing, deserving no privileges, far less any preferential treatment—not even citizens’ rights.” (“Pakistan and a World in Disorder—A Grand Strategy for the Twenty-First Century”, p.78)।

 

গোয়ালকারের কথা, “হিন্দুস্থানের অহিন্দুদের অবশ্যই হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দু ভাষাকে গ্রহন করতে হবে। তাদেরকে অবশ্যই শিখতে হবে এবং ভক্তি করতে হবে হিন্দু ধর্মকে। হিন্দু বর্ণ ও হিন্দু সংস্কৃতির জয়কীর্তন ছাড়া অন্য কোন চেতনাকে তারা প্রশ্রয় দিতে পারবে না। তারা কিছু দাবীও করতেও পারবে না –এমনি মৌলিক নাগরিক অধিকারও নয়।” হিন্দু ভারত নিয়ে সাভারকার ও গোয়ালকারের এটিই হলো সেই রূপরেখা যা আজ কোন কিতাবে বন্দি নয়; বরং সেটির বাস্তবায়নে নেমেছে বিজিপি, আরএসএস, বজরং দল, শিব সেনা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ন্যায় অসংখ্য সংগঠন। তাদের ভারতে  মুসলিমদের কোন স্থান নেই। হিটলারের ন্যায় তারাও রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে গণতন্ত্র ও নির্বাচনকে ব্যবহার করছে স্রেফ মই রূপে। কিন্তু তাদের আসল পথটি হলো ফ্যাসিবাদের। তাদের কাছে তাই অনুকরণীয় বীর পুরুষ হলো জার্মানীর হিটলার ও ইতালীর মুসোলিনী–যা সুস্পষ্ট সাভারকারের লেখাতে। জার্মান ইহুদীদের যে স্থানে বসিয়ে হিটলার তাদের নির্মূলে নেমেছিল, ভারতীয় মুসলিমদের জন্য বরাদ্দকৃত স্থানটিও হলো সেটি। তবে হিটলারে নৃশংস নীতি থেকে শিক্ষা নিলেও তারা শিক্ষা নেয়নি তার ভয়াবহ পরিণতি থেকে। সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে হিটলারের জার্মানী ছিল বিশ্বশক্তি। তা সত্ত্বেও হিটলারের ফ্যাসিবাদ জার্মানীকে যা দিয়েছে তা হলো নিদারুন পরাজয়, নৃশংস বর্বরতা ও বীভৎস ধ্বংসযজ্ঞ। প্রশ্ন হলো, বিজিপির ফ্যাসিবাদ ভারতকেও কি ভিন্ন কিছু দিবে? ১৪/০৬/২০১৯




মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর ও ভারতীয় স্ট্রাটেজী

মনমোহন সিংয়ের সফর ও আতংক বাংলাদেশে

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আগামী ৬-৭ সেপ্টম্বর -এ দুই দিনের জন্য বাংলাদেশ সফরে আসছেন। আশা করা হচ্ছে তাঁর এ সফর কালে ট্রানজিট, পানিবন্টন, সমূদ্রসীমা, মাইগ্রেশন, ছিটমহল ইত্যাদী বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে এবং চুক্তিও সাক্ষরিত হবে। মনমোহনের এ আগমন নিয়ে আনন্দ বইছে বাংলাদেশের ভারতপন্থি রাজনৈতিক শিবিরে। অপর দিকে আতংক বাড়ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশীর মাঝে। তাদের ভয়, তাঁর এ সফরে হয়তো বাংলাদেশের আরো কিছু ভূমি, আরো কিছু সম্পদ এবং আরো কিছু স্বার্থ আবারো লুন্ঠিত হবে! পাকানো হবে হয়তো নতুন ষড়যন্ত্র। হয়তো বাংলাদেশীদের গলায় পরানো হবে আরো কিছু নতুন শিকল। তবে এমন ভয় অমূলকও নয়। কারণ, ভারতের সাথে তাদের পূর্বের অভিজ্ঞতাগুলো আদৌ সুখের নয়। এ অবধি দেশটির সাথে বাংলাদেশের যত চুক্তিই হয়েছে তার সবগুলিতেই বাংলাদেশের লোকসান ছাড়া কোন লাভ হয়নি।

শেখ হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসাতে ১৯৯৬ সালে চুক্তি হয়েছিল গঙ্গার পানিবন্টন নিয়ে। তাতে পদ্মায় পানি বাড়িনি। সে চুক্তি যে কতটা ব্যর্থ এবং বাংলাদেশের জন্য যে কতটা ক্ষতিকর সেটি বোঝার জন্য গভীর গবেষণার প্রয়োজন নেই, কলকাতায় ভাগিরথির তীরে একবার দাঁড়ালেই টের পাওয়া যায়। আমি সেটি নিজে চোখে দেখিছি। ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে পানি তুলে নিয়ে বৈশাখ-জৈষ্ঠের খড়া মৌসুমেও ভাগিরথিতে আনা হয়েছে কূল উপচানো থৈ থৈ পানির জোয়ার। সে পানিতে কলকাতা বন্দরে সমূদ্রগ্রামী জাহাজও চলে। আর পদ্মার বুকে তখন ধুধু করা ধুসর বালি। জাহাজ দূরে থাক, নৌকা চালানোও কঠিন। এ বাঁধের ফলে দ্রুত মরুভূমি হতে চলেছে সমগ্র উত্তর বঙ্গ। বাংলাদেশের জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির উপর ফারাক্কার বাঁধ যে মরণছোবল হানছে সে তথ্য বেরিয়ে আসে এমনকি বিশ্বব্যাংকসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা রিপোর্টে। কিন্তু হাসিনা সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীদের তা নিয়ে দূশ্চিন্তা নেই। তারা বরং গর্ব ভরে উৎসব করে সে পানিচুক্তির সফলতা নিয়ে।

ভারত বাঁধ দিতে শুরু করেছে ব্রহ্মপুত্র নদীর উজানে টিপাইমুখে। এটি আন্তর্জাতিক নদী আইনের পরিপন্থি। ভাটির দেশ বাংলাদেশ, ফলে বাংলাদেশের অনুমতি না নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক নদীর উপর উজানে ভারতের বাঁধ নির্মানের অধিকার নেই। অথচ ভারত বাঁধ নির্মান শুরু করেছে অনুমতি না নিয়েই। কিন্তু তা নিয়ে হাসিনা সরকারের মুখে কোন প্রতিবাদ নেই। অতীতে তাঁর পিতার পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ উঠেনি ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে। অথচ বাংলাদেশের দেশপ্রেমিকদের চোখে এনিয়ে ঘুম নেই। গর্দানে রক্তনালী চেপে ধরলে তাতে ত্বরিৎ প্রাণনাশ ঘটে। কারণ এতে বাধাপ্রাপ্ত হয় মগজের রক্ত প্রবাহ। তেমনি নদীর পানি প্রবাহ বন্ধ হলে মারা পড়ে সে দেশের ভূ-প্রকৃতি। এবং পাল্টে যায় জলবায়ু। দেশ তখন মরুভূমি হয়। সীমান্ত রক্ষার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ তাই দেশের নদীগুলির পানির প্রবাহ রক্ষা করা। তাই কোন দেশের দেশপ্রেমিক সরকার শুধু দেশের মানুষ বা সীমান্ত বাঁচাতে যুদ্ধ করে না, যুদ্ধ করে নদী বাঁচাতেও। অথচ তা নিয়ে কোন ভাবনা নেই বর্তমান সরকারের। বরং শেখ হাসীনাসহ দেশের তাবত ভারত-ভক্ত রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ ভারতের সাথে বন্ধুত্বকে বিশাল অর্জন বলে অভিহিত করছেন। বছর দুয়েক আগে তাদেরই কয়েকজন টিপাইমুখ দেখতে ভারতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে বলেছিলেন, টিপাইমুখ বাঁধের ফলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। তাতে নাকি সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনায় পানি থৈ থৈ করবে। শেখ মুজিবও এমন এক অন্ধ ভারত-ভক্তি নিয়ে ভেবেছিলেন, ফারাক্কার ফলে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে না। একই রূপ ধারণা নিয়ে তিনি ভারতের সাথে সীমান্ত-বানিজ্য চুক্তি করেছিলেন। বলেছিলেন, এতে ভারত ও বাংলাদেশ –উভয় দেশের বাণিজ্য বাড়বে। এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি আসবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি হয়নি। ভারতের বাণিজ্য বিপুল ভাবে বাড়লেও দ্রুত সম্পদ পাচার হয়েছে বাংলাদেশের। ফলে এসেছিল ভয়াবহ দুভিক্ষ। তাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ না খেয়ে মারা গিয়েছিল। মহিলারা কাপড়ের অভাবে ঝাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল।

হাসিনা সরকারের কাজ হয়েছে তাঁর পিতার স্মৃতিকে শুধু জ্যান্ত করা নয়, বরং ব্যর্থ রূপে প্রমাণিত তাঁর নীতিগুলোকেও পুনরায় চালু করা। মুর্তিপুঁজা, গরুপুঁজা, লিঙ্গপুঁজা, স্বর্পপুঁজার ন্যায় নানা রূপ আদিম অজ্ঞতা ধর্মের নামে বেঁচে আছে বাপদাদার অজ্ঞতার প্রতি এমন অতিভক্তির কারণেই। তাই বাংলাদেশের সংবিধানে আবর্জনার স্তুপ থেকে ফিরে এসেছে সমাজতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম। আবার শুরু করা হয়েছে ভারতের সাথে আত্মঘাতী সীমান্ত বাণিজ্য। তবে এবার সেটি শুধু সীমান্ত বানিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সমগ্র দেশই এখন ভারতীয় বাজার।

ক্ষুদ্র মনের মানুষের বিশাল দেশ

বাংলাদেশীদের দুর্ভাগ্য, প্রতিবেশী রূপে তারা বৃহৎ দেশ পেয়েছে বটে কিন্তু বড় মনের প্রতিবেশী পাইনি। বনের বাঘ-ভালুক যেমন আশেপাশের জীবগুলোকে নিজের খাদ্য মনে করে এবং যখন তখন সেগুলো আহার করাকে নিজের অধিকার ভাবে, তেমনি অবস্থা ভারতের। পাড়ায় বাঘের আগমন তাই কোন সুখবর আনে না। দিল্লির সাথে তাজউদ্দিনের ৭ দফা চুক্তি এবং শেখ মুজিবের ২৫ দফা চুক্তি, সীমান্ত বাণিজ্যচুক্তি ও ১৯৭৪ সালের সীমান্ত চুক্তিসহ অন্যান্য বহু বিষয়ে ভারতের সে আগ্রাসী চরিত্রকেই অতি নগ্ন ভাবে প্রকাশ করেছে। ভারতের স্বার্থপর ছোট মনের প্রথম প্রকাশ ঘটে যখন একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের বিজযের পর পাকিস্তান আর্মির অব্যবহৃত হাজার কোটি টাকার অস্ত্র নিজ দেশে যায়। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিল পূর্ব পাকিস্তানী। ফলে সে অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের জনগণের রাজস্বের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছিল। ভারতের এ কাণ্ডটি ছিল নিতান্তই রুচিহীন এবং অবাক করার মত বিষয়।

শেখ মুজিব ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা গান্ধির সাথে সীমান্ত চুক্তি করে বাংলাদেশের নিজস্ব ভূমি দক্ষিণ বেরুবাড়ী এবং সে ভূমি-সংলগ্ন ছিট মহল ভারতকে দিয়ে দেন। প্রতিদানে আঙ্গরপোতা ও দহগ্রাম -এ দুটি ছিটমহলকে বাংলাদেশের সাথে সংযোগ করতে বাংলাদেশ পাবে ভারত থেকে তিন বিঘা আয়তনের একটি প্লট। চুক্তির পর পরই ভারত বেরুবাড়ীকে নিজ দেশের সীমানাভূক্ত করে নেয়। পরিবর্তন আনে নিজ দেশের মানচিত্রে। এবং সংশোধন আনে সংবিধানে। কিন্তু বাংলাদেশকে ভারত তার প্রাপ্য তিন বিঘা জমি আজও দেয়নি। ভারতের সমস্যা, দেশটির সংবিধানে অন্যের ভূমি গ্রাস করার বিধান আছে, সে লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করার অনুমতিও আছে, কিন্তু নিজ দেশের এক ইঞ্চি ভূমিকেও বিচ্ছিন্ন করার অনুমতি নাই। তাই কাশ্মির, নিজামের হায়দারাবাদ, মানভাদর এবং সিকিমকে ভারতভূক্ত করতে ভারতীয়দের কোন অসুবিধা হয়নি। অসাংবিধানিকও মনে হয়নি। কিন্তু প্রচণ্ড সাংবিধানিক বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, বাংলাদেশকে মাত্র তিন বিঘা জমি দিতে। অথচ বাংলাদেশের জন্য এ প্লটটি হল অতি গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রয়োজন মানবিক প্রয়োজনে। অঙ্গরপোতা ও দহগ্রাম -এ দুটি ছিটমহলের ২০ হাজার মানুষের বসবাস ভারতের অভ্যন্তরে, বাংলাদেশের মূল ভূ-খণ্ডের সাথে যোগাযোগের এ তিন বিঘা জমিটিই হল একমাত্র সংযোগ লাইন। ভারতীয়দের কথা, তাদের সংবিধানে তিন বিঘা দূরে থাক এক ইঞ্চি জমি দেয়ারও বিধান নেই। ভাবটা এমন, তারা দিতে চাইলেও সংবিধান দিতে দিচেছ না। প্রশ্ন হল, এই যদি সাংবিধানিক আইন হয়, তবে কেন চুক্তি করা হল? তাছাড়া ভারতীয় সংবিধান যে সংশোধিত হয়নি তা তো নয়, এ অবধি বহু কারণে বহু বার সেটি সংশোধিতও হয়েছে। কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে তিন বিঘা জমির ক্ষেত্রে!

 

ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয়

ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয় -এমন বহু ব্যক্তির বসবাস বাংলাদেশে। বিশেষ করে রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে। এমন কি দেশের শীর্ষ পর্যায়ে। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে ভারতীয় স্বার্থের সেবাটাই তাদের কাছে বড়। সম্প্রতি তেমন এক উদাহরন পেশ করলেন শেখ হাসিনা। ভারত মাত্র তিন বিঘা জমি বাংলাদেশকে দিতে রাজী হয়নি। অথচ শেখ হাসিনা সিলেট-মেঘালয় সীমান্তের তামাবিল এলাকার ২৬১ একর বাংলাদেশী ভূমি ভারতকে দিয়ে দিয়েছেন। এতবড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সংসদে কোন বিতর্ক হয়নি। বিরোধী দল বা অন্য কারো সাথে তা নিয়ে পরামর্শও করা হয়নি। নিজের জমি বা পৈতীক সম্পত্তি দিতে কারো অনুমতি লাগে না, পরামর্শও লাগে না। যাকে ইচ্ছা তাকে দেয়া যায়। বাংলাদেশের ২৬১ একর ভূমিকে শেখ হাসিনা যেন সেটাই ভেবেছেন। অথচ এ জমির মালিক শেখ হাসিনা নন, বরং দেশ। সরকার নির্বাচিত হয় দেশের ভূ-খণ্ড হেফাজতের জন্য, বিলিয়ে দেয়ার জন্য নয়।

তাছাড়া তামাবিলের এ ভূমি নিয়ে কোন কালেই কোন বিতর্ক ছিল না। ১৯৫৮ সালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূনের মাঝে দুই দেশের সীমান্ত ও ছিটমহল নিয়ে আলোচনা হয় এবং আলোচনা শেষে সীমান্ত চুক্তিও হয়। সে সময়ও সিলেটের তামাবিল সীমান্ত নিয়ে কোন কথা উঠেনি। অথচ সেটি বিতর্কিত করা হয় আওয়ামী লীগ আমলে। বিতর্ক পাকিয়ে সে ভূমি অবশেষে ছিনিয়েও নেয়া হল। গর্তের কীটও জানে কখন বাইরে বেরুতে হয় এবং কখন খাবার খুঁজতে হয়। তেমনি ভারতও জানে, স্বার্থ উদ্ধারের মোক্ষম সময় কোনটি। তাই যে দাবী পাকিস্তান আমলে উঠলো না, এমন কি যে দাবী বাংলাদেশের অন্য কোন সরকারের আমলেও উঠলো না, সে দাবী উঠলো আওয়ামী লীগ শাসনামলে। এবং সেটি পুরণও হয়ে গেল। অথচ তামাবিল এলাকা দখলের জন্য ২০০১ সালের ১৫-১৬ এপ্রিল তারিখে এক ব্যাটেলিয়ন বিএসএফ সৈন্য নিয়ে ভারত হামলা করে। বাংলাদেশের বিডিআর জোয়ানেরা সে হামলা প্রতিহত করে নিজেদের রক্ত দিয়ে। তারা ২১ জন বিএসএফ সৈন্যকে হত্যা করে এবং নিজেরা হারায় দুইজন সাথীকে। কিন্তু ২০১১ সালে এসে ভারতকে সে ভূমি পেতে কোনরূপ যুদ্ধ করতে হল না। ভারতের হাতে সেটি তুলে দিয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রশ্ন হল, বিডিআর জোয়ানরা যে দেশপ্রেম দেখাতে পেরেছে সে দেশপ্রেম তাঁর মধ্যে কৈ?

স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতি ও বিবেকহীনতা

১৯৭৪ চুক্তি স্বাক্ষরের ১৮ বছর পর ১৯৯২ সালে এসে তিন বিঘা করিডোরটি ভারত খুলতে রাজি হয়। সেটিও দিনে মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য, এবং সেটি লিজের ভিত্তিতে। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত ৪,০৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। এ সীমান্তের নানা স্থান দিয়ে চোরা পথে দিবারাত্র মানুষ পারাপার হয়। সেটি রুখবার সামর্থ ভারতের কোন কালেই ছিল না। আজও নেই। কিন্তু তিন বিঘার করিডোরটি নিয়ন্ত্রন করেছে অতি কঠোর ভাবে। নির্ধারিত সময় বাদে পারাপারের কোন উপায় নেই। অথচ অঙ্গরপোতা ও দহগ্রামের ২০ হাজার বাংলাদেশীর ট্রানজিটের প্রয়োজনটি কয়েক ঘন্টার নয়। সেখানে কোন হাসপাতাল নেই, থানা এবং কোট-কাছারিও নেই। এসবের জন্য দিবারাত্র যে কোন সময় জরুরী প্রয়োজন দেখা দেয়। সে প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশের মূলভূমিতে আসতে হয়। কিন্তু তাদের জন্য ভারত সে সুযোগ দিতে রাজি নয়। নেহাযেত এক অমানবিক অবস্থা। অবরুদ্ধ এলাকার ছেলেমেয়েদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই। অথচ ভারতীয়দের বিবেক তাতে গলেনি। বিএসএফ সেখানে দিবারাত্র পাহারা দেয়। করিডোরটি যেন তাদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি!

অথচ বাংলাদেশের উপর তাদের দাবীটি বিশাল। তিনবিঘার করিডোরটি দিবারাত্র খোলা রাখাকে ভারতীয়রা নিজ নিরাপত্তার প্রতি হুমকি ভাবে। অথচ তারাই বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্ত থেকে পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত শত শত মাইলের ট্রানজিট চায়। ট্রানজিট চায় চট্রগ্রাম ও চালনা বন্দরে যানবাহন নিয়ে পৌঁছার জন্যও। এবং সেটি বছরের প্রতি দিন, প্রতি রাত ও প্রতি মুহুর্তের জন্য। একটি নয়, কয়েকটি রুট দিয়ে। শুধু স্থলে পথে নয়, নৌ-পথেও। এই হল ভারতীয়দের বিবেক ও চেতনার মান! এমন বিবেকহীন স্বার্থপর প্রতিবেশীর সাথে ইচ্ছা করলেই কি বন্ধুত্ব গড়া যায়? পাকিস্তান পারেনি। শ্রীলংকা পারেনি। নেপাল এবং ভূটানও পারছে না। ভারত বন্ধুত্ব চায় না, চায় প্রতিবেশীর আত্মবিসর্জন বা আত্মসমর্পণ। আত্মবিসর্জনের পথ ধরে সিকিম ভারতের বুকে গুম হয়ে গেছে। আর মুজিব ধরেছিল আত্মসমর্পনের পথ। হাসিনার কাছে আজও সেটিই অনুকরণীয় মডেল। ফলে ভারত যা চায় তা পেতে তাদের মুজিব আমলেও যেমন অসুবিধা হয়নি। হাসিনার আমলেও হচ্ছে না। তাই মুজিব দিয়েছিল দক্ষিণ বেরুবাড়ী ইউনিয়ন, আর হাসিনা দিল তামাবিলের ২৬১ একর ভূমি। মুজিব দিয়েছিল ফারাক্কার অনুমোদন, আর হাসিনা দিচ্ছে টিপাইমুখের বাঁধের অনুমোদন। তবে এমন আত্মসমর্পণ ছাড়া তাদের সামনে ভিন্নতর পথও খোলা নেই। এমন আত্মসমর্পণে তারা প্রচণ্ডভাবে দায়বদ্ধও। ভারত সে আত্মসমর্পণটি ক্রয় করেছে বিপুল বিণিয়োগের মাধ্যমে। সেটি শুধু একাত্তরের যুদ্ধে নয়, তার পূর্বে এবং পরেও। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের সৃষ্টি যে ভারতের বিশাল বিনিয়োগের ফল –তা নিয়ে ভারতপন্থি বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের মনে সন্দেহ নাই। তারা জানে, শেখ মুজিবের বক্তৃতায় বাংলাদেশে স্বাধীন হয়নি। মুক্তিবাহিনীর দ্বারা কিছু ব্রিজ ভাঙ্গা বা কিছু পাকসেনা ও রাজাকার নিধনের ফলেও হয়নি। এমন বহু বক্তৃতা ও বহু ভারতীয় সৈন্য হত্যা বিগত ৬০ বছর ধরে উলফার বিদ্রোহী ও কাশ্মীরের মোজাহিদদের দ্বারা হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি তাদের স্বাধীনতা এসেছে? বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হাজার হাজার ভারতী সৈন্যের যুদ্ধ ও তাদের প্রাণদানের বিনিময়ে -সেটি শুধু ভারতের দাবী নয়, ভারতপন্থি বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের দাবীও। সে কথাটি তারা মাঝে মধ্যে স্মরণও করিয়ে দেয়। ভারত-বিরোধীতাকে তারা ভারতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা বা নিমক-হারামী বলে তো সে যুক্তিতেই। তাই বাংলাদেশের ভূমি বিলিয়ে দিয়ে শেখ মুজিব বা শেখ হাসীনা যেটি করছেন সেটি শুধু তাদের আত্মসমর্পিত নীতি নয়, বরং নিমক হালালীও। অন্যের নিমক খেয়ে রাজনীতি করলে এ ছাড়া ভিন্ন পথ আছে কি?

লক্ষ্য রাজনৈতিক ও সামরিক

মনমোহন সিংয়ের সফরে কতগুলি চুক্তি সাক্ষরিত হবে সেটি বড় বিষয় নয়। সেসব চুক্তি শেখ হাসিনার কিছুদিন আগের দিল্লি সফর কালেও সাক্ষরিত হতে পারতো। এ সফরের আসল লক্ষ্য রাজনৈতিক ও সামরিক। পাড়ার বড় সন্ত্রাসীটি নিজ দলীয় ছোট সন্ত্রাসীর গৃহে সময় সময় দিনে-দুপুরে পদধুলি দেয়। লক্ষ্য খোশআলাপ বা পানাহার নয়, বরং তার কাছে সে যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে খবর জানিয়ে দেয়া। এবং সে হুশিয়ারিও দেয়া, তার বিরুদ্ধে কিছু হলে নিস্তার নেই। মনমোহন সিং তাই নিছক পাড়া বেড়াতে বা পানাহারে আসছেন না। স্রেফ খোশআলাপ বা চুক্তি সই করতেও নয়। দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ট্রানজিট, সীমান্ত চুক্তি ইত্যাদির নামে এ সফর অনুষ্ঠিত হলেও আসল লক্ষ্য, হাসীনা বিরোধীদের হুশিয়ার করে দেয়া। আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা কি করে আরো বেশী বাড়ানো যায় তা নিয়ে নতুন রাস্তা বের করা। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত পুতুল সরকার ও সৈন্যদের মনবল বাড়াতে ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীরাও বার বার সফর করেন। মনমোহন সিং আসছেন শেখ হাসিনা মনবল বাড়াতে, সে সাথে বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিতে যে, শেখ হাসিনার সরকার একা নন। বস্তুত ভারত তাঁকে যে কতটা ভালবাসে এবং তাঁর পিছনে যে কতটা শক্ত ভাবে অবস্থান নিয়েছে সেটি জানিয়ে দেয়াই এ সফরের মূল উদ্দেশ্য। এমন একটি হুশিয়ারি কিছু দিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিও শুনিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কিছু হলে ভারত এবার বসে থাকবে না।

শেখ হাসিনা ভালই জানেন, তাঁর ক্ষমতার উৎস জনগণ নয়। দেশের আর্মি, পুলিশ বা র‌্যাবও নয়। বরং ভারত। তাছাড়া বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকার জন্য জনসমর্থন কোন ফ্যাক্টরও নয়। জনগণের সমর্থন না নিয়েও যে এক যুগ ক্ষমতায় থাকা যায় সেটি দেখিয়ে গেছেন সাজাপ্রাপ্ত দুর্বৃত্ত এরশাদ। আর ব্রিটেশেরা থেকে গেছে ১৯০ বছর।

 হাসিনার ক্ষমতালিপ্সা ও আশাহত বিদেশী বন্ধুরা

সম্প্রতি লন্ডনের প্রখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা ইকোনমিষ্ট কিছু সত্য কথা প্রকাশ করেছে। সেটি হল, বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয় ভারতের বিপুল অর্থ ও সমর্থনের বলে। এ হল ঢাকাস্থ কূটনৈতীক মহলের ভিতরের কথা। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি আদৌ কোন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল না, নিরপেক্ষ তো নয়ই। বরং ছিল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিদেশীদের চাপিয়ে দেয়া একটি পক্ষপাতদুষ্ট সরকার। এসেছিল একটি ষড়যন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা দিতে। সে কথা এখন আর কোন গোপন বিষয় নয়। সে ষড়যন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল ব্রিটিশ সরকারও। ফলে বিলেতের রক্ষণশীল পত্রিকা “ইকোনমিষ্ট”এর সে খবর অজানা থাকার কথা নয়। সে ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিল মার্কিন সরকারও। এসব বিদেশী সরকারগুলো সম্প্রতি মুখ খুলেছে এ জন্য নয় যে তারা বিরোধী দলগুলির পক্ষে। মূল কারণটি, শেখ হাসিনাকে যে কারণে তারা ক্ষমতায় এনেছিল এবং তাকে রাজনীতির যে রোড ম্যাপ দেয়া হয়েছিল তা থেকে তিনি বার বার বিচ্যুত হচ্ছেন। এতেই তাদের গোস্বা।

পাশ্চাত্যের নির্দেশিত রোডে ম্যাপে বাংলাদেশে ইসলামের জাগরণ ও প্রতিষ্ঠা রুখতে যা কিছু করনীয় সে সবের পূর্ণ অনুমতি থাকলেও তাদের নিজস্ব লোকদের গায়ে হাত পড়ুক সেটি তারা কখনই চাইনি। ফলে শেখ হাসীনার সরকার যখন ইসলামপান্থিদের রাজপথে পিটাচ্ছিল বা গ্রেফতার করে নির্যাতন করছিল তখন তারা মুখ খুলেনি। কিন্তু এখন খুলছে। তাদের কথা, শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের লোকরাই তাদের একমাত্র লোক নন। বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির মাঠে তাদের আরো বহু টিম রয়েছে। সে সব টিমে বহু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ও আছে। বহু অর্থ ও বহু যত্নে গৃহপালিত এনজিও কর্তাব্যক্তিগণ হলেন সেসব খেলোয়াড়দেরই অন্যতম। পাশ্চাত্যের কথা, শেখ হাসিনার সরকারকে চলতে হবে তাদেরকেও সাথে নিয়ে।

কিন্তু সমস্যা হল, শেখ মুজিবের যেমন ব্যক্তিগত এজেণ্ডা ছিল, তেমন এজেণ্ডা রয়েছে শেখ হাসিনারও। শেখ মুজিবের বাকশালী হওয়ার পিছনে কাজ করেছিল তাঁর প্রচণ্ড ক্ষমতালিপ্সা। সে লিপ্সা পূরণে অন্যরা এগিয়ে না আসলেও ভারত এগিয়ে এসেছিল। ফলে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতের কোলে। এর ফলে তাঁর এক কালের বহু ভক্তরাই দূরে সরিয়েছিল। এমনকি তাদের হাতে তাঁকে নিহতও হতে হয়েছিল। রক্তের একই জিন প্রভাব ফেলছে শেখ হাসিনার উপরও। ক্ষমতার অতি অদম্য লিপ্সা শেখ হাসিনারও। সে লিপ্সা পূরণে ব্রিটিশ ও মার্কিনীরা গত নির্বাচনে সাহায্য দিলেও ভারত ছাড়া এখন আর কেউ সাহায্য দিচ্ছে না। ফলে তাঁকেও উঠতে হচ্ছে একমাত্র ভারতের কোলে। তাছাড়া তার কিছু অদ্ভুদ বিশ্বাসও আছে। সে বিশ্বাস অনুযায়ী বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে শেখ মুজিবের চেয় শ্রেষ্ঠতর কেউ যেমন নেই, তেমনি আজকের বাংলাদেশেও শেখ হাসিানার শ্রেষ্ঠতর কেউ নেই। অনুরূপ বিশ্বাস তাঁর দলের ক্যাডারদেরও। তাই বাংলাদেশে কাউকে যদি নবেল প্রাইজ দিতে হয় তবে সেটি তাকেই দিতে হবে। তার দলীয় ক্যাডার বাংলাদেশের এ্যাটর্নি জেনারেল তো সেটি প্রকাশ্যে বলেছেন।

শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী ক্যাডারদের কাছে ডক্টর ইউনুসের বড় অপরাধ, তাঁর নবেল প্রাইজ প্রাপ্তি। এজন্যই তিনি শেখ হাসিনা ও তাঁর ভক্তদের কাছে ঘৃনার পাত্র। ডক্টর ইউনূসকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীন ব্যাংক থেকে হঠিয়ে অপদস্থ করা হল, তেমনি এক ঘৃনার কারণেই। মার্কিন প্রশাসন এ নিয়ে খুশি নয়। খুশি নয় ব্রিটিশসহ ইউরোপীয় সরকারগুলিও। কারণ, ডক্টর ইউনুস তাদের অতি ঘনিষ্ট লোক। তাঁর সাথে তাদের সহযোগিতার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। তাদের প্রত্যাশা ছিল এবং সে সাথে অনুমতিও ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার শুধু ইসলাম পন্থিদেরও নির্মূল করবে। কিন্তু সে সীমানা অতিক্রম করে হাত তুলেছে ডক্টর ইউনূসের উপরও। হিলারি ক্লিন্টন তাই বাধ্য হয়ে শেখ হাসিনাকে জানিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন, কীভাবে তাঁকে ক্ষমতায় আনা হয়েছে। ব্রিটিশের একই রূপ ক্ষোভ। ডক্টর ইউনূসের সম্প্রতি বিলেতে আগমন এবং ‘গার্ডিয়ান’সহ লন্ডনের নামকরা পত্রিকায় গুলোতে যে ভাবে তাঁর বক্তব্যকে তুলে ধরা হয়েছে তাতেই প্রমাণ মেলে ব্রিটিশ সরকার হাসিনা সরকারের উপর কীরূপ বিক্ষুব্ধ। এতটাই বিক্ষুব্ধ যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ বহুমন্ত্রী লন্ডনে এসেছিলেন তারেক জিয়াসহ আরো কিছু ব্যক্তিকে বাংলাদেশে নিয়ে বিচার করতে, কিন্তু তারা কোন পাত্তাই পাননি। হাসিনা সরকার তাই আন্তর্জাতিক ভাবে অতি বিচ্ছিন্ন সরকার, যেমনটি ছিল শেখ মুজিবের সরকার। মুজিবের সে নিঃসঙ্গতার কারণে বাংলাদেশে যখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে আসে তখন কোন বিদেশী সরকার এগিয়ে আসেনি। বর্তমান সরকারের এরূপ নিঃসঙ্গ অবস্থায় মনমোহনের বাংলাদেশ সফর তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ। নিঃসঙ্গ শেখ হাসিনার পাশে ভারত যে প্রবল ভাবে আছে সেটি জানিয়ে দেয়ার এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রয়োজনীয় সময়ও। নিঃসঙ্গ মুজিবকে সাহস জোগাতে এক সময় ইন্দিরা গান্ধিও ঢাকায় ছুটে এসেছিলেন।

ভারতীয় বিনিয়োগ ও স্বার্থসিদ্ধি

হাসিনাকে নিয়ে পাশ্চাত্য সরকার সমূহের যে মূল্যায়ন তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মুল্যায়ন ভারতের। ভারত চায় শেখ মুজিব ও তার পরিবারের ইমেজকে প্রবলতর করতে। বিদেশীদের কাছে মুজিব পরিচিত ছিলেন একজন ব্যর্থ রাষ্ট্রনায়ক রূপে। তার আমলের বাংলাদেশকে তারা বলেছেন “ভিক্ষার ঝুলি”। অথচ ভারতের কাছে সে আমলটিই ছিল সবচেয়ে স্বর্ণযুগ। সে বিশ্বাস আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও। এত বড় মতের মিল অন্য কোন দেশের নেতাদের সাথে নেই। ভারতের এমন বিশ্বস্থ বন্ধু অন্য কোন দেশে নাই। এবং সেটির পিছনে মুজিব পরিবার। ভারতের কাছে মুজিব পরিবার তাই মূল্যবান এ্যাসেট। এজন্যই মুজিব পরিবার ও ভারতের শাসক ইন্দিরা গান্ধী পরিবারের যোগসূত্র মজবুত করা তাদের অন্যতম লক্ষ্য। সে লক্ষ্য পূরণেই সম্প্রতি বাংলাদেশে সফর করতে এসেছিলেন সোনিয়া গান্ধী। তারা জানে, ভারতীয় স্বার্থের এতবড় সেবক ভারত আর কোন কালেই পায়নি। ভারতের স্বার্থে যে কোন ভারতীয়র চেয়েও মুজিবের অবদানটি ছিল অনেক বড়। ১৯৪৭-এর পূর্বে ভারতীয় হিন্দুরা চায়নি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পাক। ১৯৪৭-এর পর চায়নি দেশটি বেঁচে থাক। পাকিস্তান ভাঙ্গতে তাদের লাগাতর ষড়যন্ত্র চলে ১৯৪৭ সাল থেকেই। ১৯৬৫ সালে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যুদ্ধ লড়েও সে চেষ্টা সফল হয়নি। সেটি সফল হয় ১৯৭১ সালে। এবং সেটি মুজিবের কারণে। ফলে খণ্ডিত হয় তাদের প্রধানতম শত্রু পাকিস্তান। এতবড় কৃতজ্ঞতার কথা ভারত ভূলে কিভাবে?

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে লক্ষ লক্ষ সৈন্য রাখতে ভারতের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হত। এখন সে ব্যায়ভার নেই। তবে সে অর্থ বাঁচিয়ে ভারত যে শুধু তার অর্থনীতি মজবুত করছে তা নয়। বরং বিপুল ভাবে বিনিয়োগ করছে প্রতিবেশগুলোর দেশের রাজনীতিতেও। সে বিনিয়োগের অংশ রূপেই গত নির্বাচনের শেখ হাসিনার বিপুল অর্থপ্রাপ্তি ঘটেছিল। বস্তুত বাংলাদেশে ভারতের মূল বিনিয়োগটি কখনই দেশের কৃষি বা শিল্পের ন্যায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ছিল না। আজ যেমন নয়, তেমনি অতীতেও নয়। বরং ১৯৪৭ সাল থেকেই সেটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিপুল হারে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃক্তিক তাঁবেদার পালনে। এরাই আজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় স্বার্থের বড় পাহারাদার। এরাই গঙ্গার পানি-বন্টন চুক্তিকে সফল চুক্তি বলে উৎসব করে। এবং টিপাইমুখ বাঁধের ফলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনায় পানি থৈ থৈ করবে সে কিসসাও শোনায়। এরাই ভারতীয় সাংস্কৃতিক শিল্পি ও বুদ্ধিজীবীদের সাথে গলা জড়িয়ে বন্ধুত্ব ও সম্পৃতির ঐক্যতান ধরে।

ভারত সরকার কোন খয়রাতি প্রতিষ্ঠান নয়। প্রতিটি বিনিয়োগ থেকে মুনাফা তোলাই সেদেশের সরকার সমুহের সরকারি দায়িত্ব। তেমনি মুনাফা তুলছে বাংলাদেশের গত নির্বাচনে তাদের কৃত বিশাল বিনিয়োগ থেকেও। সে বিনিয়োগেরও ফল রূপে শেখ হাসিনা থেকে বিনা যুদ্ধে ভারত বাংলাদেশের ২৬১ একর জমি ছিনেয়ে নিল। এখন নিচ্ছে ট্রানজিট। নিচ্ছে সীমান্ত বাণিজ্যের সুযোগ। ভারত তার একাত্তরের বিনিয়োগ থেকেও একই ভাবে বিপুল মুনাফা তুলেছে। সূদে-আসলে তাদের মুনাফা তোলার সুযোগ দিতে গিয়ে বাংলাদেশের মানুষ সেদিন লাখে লাখে না খেয়ে মরেছে।

ভারতীয়দের ইসলামভীতি

ভারতীয়দের মনে ধরেছে প্রচণ্ড ইসলামভীতি। তারা দেখছে, মুসলিম বিশ্ব জুড়ে ইসলামের পক্ষে দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে জোয়ার। মানুষ ফিরছে ইসলামের দিকে। তাদের ভয়, ইসলামের প্রতি এরূপ প্রবল আগ্রহই বাংলাদেশীদেরকে ভারত বিরোধী করবে। এতকাল একাত্তরের ঘটনা নিয়ে বিচার বসেছে সেক্যুলার চিন্তার মডেল নিয়ে। এতে অপরাধী গণ্য হচ্ছে ইসলামপন্থিরা আর মহত্তর রূপে চিত্রিত হচ্ছে ভারত ও ভারতপন্থিদের ভূমিকা। সেক্যুলার মডেলে ব্যাভিচারও প্রেম মনে হয়। একাত্তরের মূল্যায়নে ইসলামী মডেল গুরুত্ব পেলে ভারত ও ভারতপন্থিরা গণ্য হবে ঘৃণ্য শত্রু রূপে। ভারত ও ভারতপন্থিরা তাই ইসলামকে ভয় পায়।  তাদের ভয়, দেশটি তখন ইসলামের বিপ্লবের দেশে পরিনত হবে। সে ভয়ের কথা ১৯৭২-য়েই প্রকাশ করেছিলেন ভারতের বিজেপী নেতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। সে ভয়ের কথা সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তাঁর কথায় বাংলাদেশের ২৫% জনগণ ইসলামী মৌলবাদী সংগঠনের সমর্থক। তাঁর কাছে এ চিত্রটি অতি ভয়ংকর। এমন জনসমর্থন তো পাকিস্তানের মৌলবাদী সংগঠনগুলোরও নাই। ফলে বাংলাদেশের যে চিত্রটি মনমোহন সিংয়ের চিত্তকে সর্বদা আচ্ছন্ন করেছে তা দেশের চলমান স্বৈরাচারি শাসন নয়। ভেঙ্গে পড়া আইনশৃঙ্খলা বা সন্ত্রাসও নয়। সীমান্তের চোরাচালান বা ভারতের সাথে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্যিক ঘাটতিও নয়।ারতেভাভভভারততত বরং মৌলবাদী সংগঠনের প্রতি ২৫% ভাগ জনসমর্থনের এ চিত্র। পাকিস্তানের আনবিক বোমার চেয়েও ভারতের জন্য এটি বিপদজনক। ভারত জানে, বিশ্বশক্তির মঞ্চ থেকে সোভিয়েত রাশিয়াকে যে শক্তি বিদায় দিল সেটি ন্যাটোর সামরিক জোট নয়। মার্কিনীদের  পারমানকি অস্ত্রও নয়। বরং আফগানিস্তানের মৌলবাদী দরিদ্র মুসলমানেরা। ইসলাম তাদেরকে অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছে। ভারতের ভয়, বাংলাদেশের মানুষও আজ সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। ইসলামের এ জাগরণকে কি ভাবে কীভাবে রুখা যায় সেটিই যে এ সফরে অত্যাধিক গুরুত্ব পাবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

রাজনীতিতে সংঘাত ও ভারতীয় ইন্ধন

বাংলাদেশে ভারতের প্রধান আগ্রহটি ব্যবসা বানিজ্য নয়, পানিবন্টন বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রনও নয়। বরং সেটি বাংলাদেশের রাজনীতি। ভারতীয়দের কাছে তাদের নিজ দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির চেয়ে এটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতি তাদের এত আগ্রহের কারণ, দেশটির ভৌগলিক অবস্থান এবং ১৬ কোটি জনগণ। বাংলাদেশের এ বিশাল জনগণ ভারতের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হলে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে ভারতের প্রতিরক্ষা। বিপর্যস্ত হবে ভারতের উত্তরপূর্ব সীমান্তের ৭ টি প্রদেশে ভারতীয় শাসন। সেখানে এখন রীতিমত যুদ্ধ চলছে, মোতায়েন রয়েছে তিন লাখের বেশী ভারতীয় সৈন্য। অবরুদ্ধ গাজার ১৫ লাখ ফিলিস্তিনী দুশ্চিন্তায় ফেলেছে মধ্যপ্রাচ্যর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ ইসরাইলকে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৫ লাখ নয়, ১৬ কোটি|

ভারত চায় বাংলাদেশকে যে কোন ভাবে নিজ প্রভাব বলয়ের মধ্যে ধরে রাখতে। বাংলাদেশকে ভারত নিজ ভূগোলের বহির্ভূত কোন বিদেশী স্বাধীন ভূমি ভাবে না। ভাবে, নিজ প্রতিরক্ষা সীমানার অন্তর্ভূক্ত একটি এলাকা রূপে। ভারতীয়দের কাছে অজানা নয়, ভারত বিরোধী ক্ষোভ শুধু উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশে সীমিত নয়, সেটি প্রবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও। ভারতের ভয়, এ ক্ষোভ দ্রুত দমিত না হলে বাংলাদেশীরা মিত্র হতে পারে ওপারের বিদ্রোহীদের। তখন ভারত বিরোধী অভিন্ন রণাঙ্গনের অংশে পরিনত হবে বাংলাদেশও। তাই ভারতের স্ট্রাটেজী, উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশে যুদ্ধ জিততে হলে সে যুদ্ধ জিততে হবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও। আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সে যুদ্ধের দায়ভার দিতে চায় শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে। তাই হাসিনার জন্য ভারত সরকারের সাহায্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ হল ভারতের কাছে হাসিনার গুরুত্ব। এ জন্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাড়ছে সংঘাত ও উত্তাপ। যেন একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। তাই এ উত্তাপপূর্ণ রাজনীতির জন্য দায়ী শুধু শেখ হাসীনা ও তাঁর দলীয় সরকার নয়, বরং বেশী দায়ী ভারত। কারণ, ভারতের চানক্য নীতির মূল কথা, প্রতিবেশী দেশে বিভেদ ও সংঘাত সৃষ্টি করে তাকে দুর্বল কর, অবশেষে দখল কর। ভারতীয় মদদে সেটি যেমন ১৯৭৪ সালে সিকিমে হয়েছিল, তেমনি ১৯৭১-এ পাকিস্তানেও হয়েছিল। দীর্ঘকাল ধরে শ্রীলংকা ও নেপালেও হয়েছে। আর আজ সেটিই হচ্ছে বাংলাদেশে।

ভারতীয় ড্রোন

ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশের যুদ্ধ চলছে বিগত প্রায় ৫০ বছরেরও বেশী কাল ধরে। থামার কোন নামই নিচ্ছে না। বরং দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে চীনও জড়িয়ে পড়েছে। ফলে আফগানিস্তানের যেমন মার্কিনীদের পরাজয় অত্যাসন্ন, তেমনি উত্তরপূর্ব সীমান্তের রাজ্যগুলিতে পরাজয় ঘনিয়ে আসছে ভারতীয়দেরও। কোন যুদ্ধই কোন দেশের পক্ষে এখন আর একাকী লড়া সম্ভব নয়। পারছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। তারা ৪০টির বেশী দেশকে এনেছে আফগানিস্তানে। এরপরও হিমসিম খাচ্ছে। ভারতও তার যুদ্ধে পার্টনার চায়। বাংলাদেশকে টানছে একারণেই। ভারত চায়, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে নিরাপদ ট্রানজিট যা উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৭টি প্রদেশে সৈন্য ও রশদ পৌঁছতে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এভাবে ভারতের স্ট্রাটেজী হল, চলমান যুদ্ধের সাথে বাংলাদেশকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। আফগানিস্তানের যু্দ্ধে একই ভাবে পাকিস্তানকে টেনেছে মার্কিনীরা। এবং সেটি শুরু হয়েছিল জেনারেল পারভেজ মোশাররফের আমলে। তবে মার্কিনীদের সাথে জেনারেল মোশাররফ যতটা জড়িয়েছিল, বর্তমান জারদারী সরকার জড়িয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশী। মোশাররফকে সরিয়ে বেনজির ভূট্টোর পিপল’স পার্টি ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়েছিল মার্কিনীদের সাথে তালবান বিরোধী যুদ্ধে আরো নিবীড় পার্টনার হওয়ার শর্তে। তেমন পার্টনারশিপে বেনজির ভূট্ট্রো রাজী হওয়াতেই জেনারেল মোশাররফকে সরতে হয়েছে। মোশাররফ ড্রোন হামলার সুযোগ দেয়নি, অথচ সে সুযোগ লাগাতর দিচ্ছে জারদারী সরকার। সোয়াতে বা ওয়াজিরস্থানে পাক বাহিনীর হামলা শুরুতে হয়নি, কিন্তু জারদারীর আমলে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। মার্কিনী প্ররোচনায় পাকিস্তান এখন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে নিজ দেশের তালেবানদের বিরুদ্ধেও। ফলে সমগ্র পাকিস্তান পরিনত হয়েছে রণাঙ্গণে।

 

ইসলামের জাগরণ রুখতে মার্কিনীরা যা কিছু আফগানিস্তানে করছে বাংলাদেশে সেটিই করতে চায় ভারত। এক্ষেত্রে ভারত সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্টনার। মোলবাদী নির্মূলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে চলছে মার্কিনীদের ড্রোন হামলা। অপর দিকে ভারতও বসে নাই। হাসিনা সরকার নিজেই পরিনত হয়েছে ভারতীয় ড্রোনে। ভারত এ জোট সরকারকে ক্ষমতায় আনায় সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছে এরূপ একটি লক্ষ্যেকে সামনে রেখেই। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উলফা নেতাদের উপর আঘাত হানতে ভারতকে মার্কিনীদের মত ড্রোন হামলা করতে হচ্ছে না। ইসলামপন্থিদের ধরতেও তাদের ময়দানে নামতে হচ্ছে না। সে কাজ শেখ হাসিনা নিজেই করছেন। পূর্ব রনাঙ্গণের বহু বিদ্রোহী এবং বহু ইসলামপন্থি এখন বাংলাদেশের জেলে। বাংলাদেশ এভাবে জড়িত হয়ে পড়ছে এক অঘোষিত যুদ্ধে। আর এমন যুদ্ধ শুরু হলে কি সহজে থামে? মার্কিনীরা শত চেষ্টা করেও গত ১০ বছরে আফগানিস্তানে থামাতে পারছে না। এরপর যখন ট্রানজিট দিয়ে ভারতীয় রশদ ও সৈন্য পারাপার শুরু হবে তখন তার উপর বিদ্রোহীদের যে হামলা হবে সে কথা কে হলফ করে বলতে পারে? সেরূপ হামলা শুরু হলে হামলাকারিদের উপর ভারতীয় ড্রোনের হামলাও যে শুরু হবে তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে? আজ বিএসএফের গুলিতে সীমান্তে বাংলাদেশী লাশ হচ্ছে। তখন নিরপরাধ মানুষ বিপুল সংখ্যায় লাশ হবে দেশের অভ্যন্তরে, যেমনটি হচ্ছে পাকিস্তানে। তখন ভারত বিরোধীতা বিস্ফোরণে পরিণত হবে, এবং সেটি সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে।

অকার্যকর হচ্ছে নির্বাচন

এ যুদ্ধে শেখ হাসিনা ও তাঁর দলকে অবিরাম সংশ্লিষ্ট রাখার স্বার্থেই ভারত অন্য কোন দলীয় বা সামরিক সরকারকে বাংলাদেশে দেখতে রাজী নয়। তাই ভারতের মূল স্ট্রাটেজী, শেখ হাসিনাকে যে করেই হোক দীর্ঘকাল ক্ষমতায় রাখা। এজন্য পরিকল্পিত ভাবে অকার্যকর করা হচ্ছে গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে। কাশ্মিরে জনসমর্থনহীন গোলাম মুহাম্মদ বখশী সরকারকে ১১ বছর ক্ষমতায় রেখে নেহেরু সরকার যেমন কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করেছিল তেমন নীতি এখান বাংলাদেশকে ঘিরেও। অথচ নির্বাচনের নামে কাশ্মিরেও বার বার নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন হয়েছে জনপ্রিয় কাশ্মিরী নেতাকর্মীদের বছরের পর বছর কারারুদ্ধ করে। ফলে পুতুল বখশি সরকারকে কেউই হারাতে পারিনি। যেমন আফগানিস্তানের কারজাইকেও কেউ নির্বাচনে হারাতে পারছে না। অধিকৃত দেশে এমন সাঁজানো নির্বাচন ঘটানোয় ভারতের অভিজ্ঞতা তাই বিশাল। শেখ হাসিনা ভারতের সে অভিজ্ঞতাকে যে কাজে লাগাবে তা নিয়েও কি কোন সন্দেহ আছে? বরং ভারতীয় অভিজ্ঞতার প্রয়োগ জোরেশোরে শুরুও হয়ে গেছে। ফলে অসম্ভব হয়ে উঠছে অভঅঅসম্ভব নিদদিনির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হটানো। যেমন অসম্ভব করা হয়েছিল শেখ মুজিবের ক্ষেত্রে। বিরোধী দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে পুলিশি হামলা, মামলা ও কারারুদ্ধ করার যে ব্যাপক তৎপরতা – সেটি তো সে লক্ষ্যেই।

মনমোহন সিংয়ের এ সফরে অনেক কিছুরই আয়োজন হবে। অনেক বড় বড় কথা হবে, অনেক চুক্তিও হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অলিখিত চুক্তিটি হবে শেখ হাসিনাকে কি করে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় রাখা যায় তা নিয়ে। তেমনি একটি পরিকল্পনা শেখ মুজিবকে নিয়েও হয়েছিল। কিন্তু সেটি পণ্ড হয়ে যায়। মুজিবকে বাঁচানোর সে ব্যর্থতা নিয়ে ভারতীয় র’ এবং দিল্লির শাসক মহলে আজও মাতম হয়। এবার তারা চায়, আরো হুশিয়ার হয়ে এবং আরো সুক্ষ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্তি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে ইসলামপন্থিদের গ্রেফতার ও তাদের উপর নির্যাতন, সংবিধানের ১৫ম সংশোধন –এসব মূলত সে ভারতীয় প্রজেক্টেরই অংশ বিশেষ। তাই সন্দেহ নেই, মনমোহন সিংয়ের এ সফর শেখ হাসিনা ও তার সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতি গুরুত্বপূর্ণ ভারতের জন্যও। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য এ সফরে যে কোন কল্যাণই নেই, বরং সম্ভাবনা বাড়বে দেশের রাজনীতি আরো সংঘাতপূর্ণ ও রক্তাত্ব হওয়ার -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? ১৬/০৮/১১

 




মজলুম রোহিঙ্গা মুসলিম এবং শেখ হাসিনার অমনুষ্যনীতি

শেখ হাসিনার অমনুষ্যনীতি

শেখ হাসিনার রাজনীতি, বিদেশনীতি ও শাসননীতি যে কতটা বিবেকবর্জিত ও অমানবিক সেটি কি কোন গোপন বিষয়? বহুবার বহু বীভৎস্যতা নিয়ে সেটি ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। একটি লাশের বদলে দশটি লাশ ফেলার রাজনীতি,লগি-বৈঠা নিয়ে বিরোধী দলীয় কর্মীদের হত্যা,যাত্রী ভর্তি বাসে আগুণ,লেখক-সাংবাদিক-আলেম ও বিরোধী দলীয় নেতাদের গুম-খুণ ও গ্রেফতারি –এমন কার্যকলাপকে কি সুস্থ্য ও বিবেকমান মানুষের রাজনীতি বলা যায়? অথচ এরূপ অমনুষ্যনীতিই হলো শেখ হাসিনার রাজনীতি। সে নীতিরই পুনঃরায় প্রকাশ ঘটলো মজলুল রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যে। গতকাল ২৭/০৭/১২ তারিখে আল -জাজিরা ইংরেজী টিভি চ্যানেলের সাথে সাক্ষাতকারে তিনি যা বলেছেন সেটি যেমন হৃদয়শূণ্য তেমনি মানবতাশূন্য। তিনি বলেছেন,রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশে কোন স্থান নাই।যুক্তি দেখিয়েছেন,বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ,অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। তিনি বলেছেন,“সমস্যাটি মায়ানমারের।অতএব বিদেশীদের উচিত,এ নিয়ে বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি না করে মায়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করা।”

আল -জাজিরার সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল,“হত্যা ও নির্যাতন থেকে প্রাণের ভয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চেষ্টা করছিল তখন বাংলাদেশের কোষ্টাল গার্ডগণ তাদের ঢুকতে দেয়নি,এবং বলপূর্ব্বক তাদেরকে মায়ানমারে প্রবেশে বাধ্য করেছিল। এটি কি অমানবিক নয়?” জবাবে হাসিনা বলেন,“না,এটি সঠিক নয়। বাংলাদেশের কোষ্টাল গার্ডগণ রোহিঙ্গাদের সাথে কোনরূপ অমানবিক আচরণ করেনি,তাদেরকে বরং খাদ্য, পানীয় ও ঔষধ দিয়েছে এবং মায়ানবারে ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে রাজী করেছে।” উক্ত সাংবাদিক প্রশ্ন করেন,“আপনার সরকার কি মায়ানমারে সরকারের সাথে রোহিঙ্গাদের এ সংকট নিয়ে কোন রূপ যোগাযোগ করেছে? জবাবে বলেন,“হাঁ আমরা যোগযোগ করেছি”। সে যোগাযোগে মায়ানমার সরকারের কাছে তাঁর সরকারের কি দাবী ছিল সেটি না বলে শেখ হাসিনা কার্যতঃ মায়ানমার সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হন এবং বলেন, “মায়ানমার সরকার সমস্যার সমাধারে চেষ্টা করছে। অবস্থার উন্নতি ঘটেছে এবং উদ্বাস্তু আসাও বন্ধ হয়েছে।” আল জাজিরার সাংবাদিক তার এ জবাবে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন,“প্রধানমন্ত্রি আপনি এসব বিশ্বাস করেন?” শেখ হাসিনার মুখে এ প্রশ্নের কোন জবাব ছিল না। তিনি বরং বিব্রত হন এবং নীরব হয়ে যান। মায়ানমার সরকারের নীতি যে পরিবর্তন হয়েছে তার প্রমাণ কোথায়? ক’দিন আগেই সেদেশের প্রেসিডেন্ট সকল রোহিঙ্গাদের তার দেশে থেকে অপসারণের দাবী করেছেন।

আল জাজিরার সাথে সাক্ষাতকারে শেখ হাসিনার মূল যুক্তিটি ছিল,বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য দেশটিতে জায়গা কোথায়? কিন্তু সমস্যা কি জনবহুল হওয়া নিয়ে? সমস্যা তো হৃদয়হীনতায়। কাউকে বিপদে জায়গা দেয়ার জন্য ঘরের জায়গাটির চেয়ে বড় প্রয়োজন হলো মনের জায়গার। মনে জায়গা না থাকলে দেশ বিশাল হলেও তখন বিপদগ্রস্তের জন্য কোন জায়গা থাকে না। আজ থেকে ৫০ বছর আগে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজকের তুলনায় অর্ধেকও ছিল না। কিন্তু তখনও দেশে অভাব ছিল। প্রচণ্ডতা দারিদ্রতা ছিল। সর্বক্ষেত্রে নানারূপ পশ্চাদপদতা ছিলও। দেশে তখনও দুর্ভিক্ষ আসতো। কিন্তু সে অভাবের দিনেও বাংলার মানুষ ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা লক্ষ লক্ষ মুসলমানদের জন্য জায়গা করে দিয়েছে। কারণ তখন জনগণ ও সরকারের মনে তাদের জন্য বিশাল জায়গা ছিল। অথচ শেখ মুজিব ও তার দলের কারণে বাংলাদেশ শুধু ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি রূপেই বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়নি, রাজনীতিতেও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে প্রকট ভিক্ষুক-সংস্কৃতি। ফলে বাংলাদেশের আওয়ামী সরকার শুধু হাত পেতে নিতেই জানে, দিতে নয়। রোহিঙ্গাদের প্রবেশের বিরুদ্ধে এজন্যই তারা সীমান্তে কোষ্টাল গার্ড বসেয়েছে।

বাস্তবতা হলো,মানুষ শুধু পেট নিয়ে আসে না,বরং বিস্ময়কর মেধা এবং কর্মক্ষম হাত-পা নিয়েও আসে।মেধার কারণে বিশ্বের জনসংখ্যা বিগত শত বছরে বহুগুণ বাড়লেও তার চেয়েও বেশী বেড়েছে সম্পদ। ফলে আজ থেকে হাজার বছর আগে বিশ্বের স্বল্পসংখ্যক মানুষ যে রূপ বাস করতো সে তুলনায় বহুগুণ বেশী প্রাচুয্য নিয়ে বাস করে আজকের মানুষ। তাছাড়া মানুষের পানাহারের দায়িত্ব তো মহান আল্লাহর। কোন ব্যক্তিই তার রেযেক ছাড়া জন্ম নেয় না। ঈমানদারের তো এটিই বিশ্বাস। সে বিশ্বাস না থাকলে তাকে কি মুসলমান বলা যায়? কিন্তু শেখ হাসিনা যে চেতনা নিয়ে কথা বলেছেন সেখানে সে ঈমান কোথায়? বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু লক্ষ লোক জন্মসূত্রে যোগ দিচ্ছে। আজ থেকে ৩০ বছর পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজকের তুলনায় দ্বিগুণ হবে। ৬০ বছর পর হয়তো ৪ গুণ হবে। জনসংখ্যা তো এভাবেই বাড়ে। তখন কি বাংলাদেশের মানুষ খাদ্যাভাবে ও স্থানাভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে? দ্বিগুণ বা চারগুণ জনসংখ্যার দায়ভার তো বাংলাদেশকেই সেদিন বইতে হবে। ইনশাল্লাহ তারা শুধু বেঁচেই থাঁকবে না উন্নতিও করবে। বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ পাট নয়,চা বা চিংড়ি মাছ নয়। গার্মেন্টস বা পশুচর্মও নয়। বরং সেটি দেশের জনগণ। আল্লাহর এ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে আপদ বা বোঝা বললে শুধু সে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিরই  অপমান হয় না,বরং চরম অবমাননা হয় মহান স্রষ্টা মহান আল্লাহর। শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার আল্লাহর বিরুদ্ধে সে অবমাননার রাজনীতিই করে চলেছে। তাছাড়া প্রাণ বাঁচাতে আসা কোন মানুষই প্রতিবেশীর ঘরে আজীবন বসবাসের জন্য আসে না। আশ্রয় চায় সীমিত সময়ের জন্য। বিপদ কেটে গেলে তারা দ্রুত নিজ ঘরে ফিরে যায়। কারণ প্রতিবেশীর ঘর তা যত ভালই হোক, কখনোই নিজ ঘরের মত হয় না। তারা তো চায় তা তাদের নিজ ঘরটি দ্রুত আবার বাসের যোগ্য হোক। তাই আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী দেশগুলির লক্ষ্য হয়,উদ্বাস্তুদের নিজ ঘরে ফিরে যাওয়ার মত একটি পরিস্থিতি দ্রুত সৃষ্টি করা। রাজনীতি তো এভাবেই মানবিক পরিচয় পায়।

হাতছাড়া হলো মহাসুযোগ

বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা ইতিমধ্যেই তলায় ঠেকেছে। শেখ হাসিনার পিতার আমলে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি রূপে। আওয়ামী লীগ তখন ইতিহাস গড়েছিল ব্যাপক দূর্নীতি এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিতে। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ আবার মুজিব আমলের সে পুরোন পরিচিতি ফিরে পেয়েছে। দেশটি এখন আবার বিশ্বের অতি দূর্নীতিগ্রস্ত দেশ। সম্প্রতি সরকারি দলের ভয়ানক দূর্নীতির কারণে পদ্মা সেতু নির্মাণে বরাদ্দকৃত ঋণও বাতিল করে দিল বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য সাহায্যদানকারি সংস্থা। ঠিক এ মূহুর্তে রোহিঙ্গা বিষয়ে মানবতা ও মানবিক অধিকারের পক্ষ নিয়ে মাথা উঁচু করে বিশ্ব মাঝে দাঁড়ানোর সুযোগ এসেছিল বাংলাদেশের। যে গৃহে ১০ জন মানুষের ভাত পাক হয় সে গৃহে ২ জন মেহমান খাওয়াতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যে বাংলাদেশের জনগণ ১৬ কোটি মানুষের আহার জোগাতে পারে তারা কি মায়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা এক বা দুই লাখ মানুষকে কয়েকটি মাস বা বছর খাওয়াতে পারতো না? ইমেজ সৃষ্টির এমন সুযোগ ফি বছর আসে না। আসে মাঝে মধ্যে। কিন্তু জাতির নীতি-নৈতিকতা ও মান-মর্যাদার পরীক্ষা এর মধ্য দিয়েই হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশ সে পরীক্ষায় দারুণ ভাবে ফেল করেছে। তাছাড়া রোহিঙ্গা সংকট যেহেতু একটি আন্তর্জাতিক বিষয়, তাদের বসবাস ও পানাহারের খরচ জোগাতে জাতিসংঘ এবং অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এগিয়ে আসতো। পাকিস্তানে ৩০ লাখ আফগান যখন আশ্রয় নিয়েছে তখন তাদের সাহায্যে দেশটিতে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক সাহায্যও এসেছে। বিদেশীরা তো আর বিপর্যস্ত মানুষকে সমুদ্রে বা আকাশে ভাসমান রেখে খাওয়াতে পারে না? এমন দুর্যোগ মুহুর্তে প্রতিবেশী দেশকে উদ্বাস্তুদের জন্য শুধু মাথাগোঁজার জায়গা দিতে হয়,বাঁকি দায়ভার অন্যরা নিয়ে নেয়। সে সুযোগটুকুই বাংলাদেশ সরকার দেয়নি। বাংলাদেশ নিয়ে এজন্যই আন্তর্জাতিক মহলের প্রচণ্ড হতাশা।

হাসিনা সরকারের বড় অপরাধ, মজলুমের পক্ষ নেয়ার জন্য যে নৈতীক বল দরকার সেটি এ সরকার দেখাতে পারেননি। নৈতীক বল তো আসে সুনীতি থেকে। যাদের বিশ্বজুড়া পরিচিতি দুর্নীতিবাজ রূপে,সেরূপ একটি সরকারের পক্ষে সেটি থাকার কথাও নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নীতি হওয়া উচিত ছিল, প্রাণে বাঁচতে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মায়ানমার সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা। একাজে বাংলাদেশে সরকার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সমর্থণ পেত। সমর্থণ পেত প্রায় ৬০টি মুসলিম দেশের। তখন ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশ একটি শান্তিকামী ও মানবতাবাদী দেশ রূপে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেত। কিন্তু শেখ হাসীনার সরকার সে পথে এগুয়নি। বরং বেছে নিয়েছে অমানবিক বিবেকশূণ্যতার পথ। বাংলাদেশ যে স্রেফ জনসংখ্যাতেই বেড়েছে,মানবতায় নয় -সেটিই শেখ হাসিনার সরকার বিশ্ববাসীর সামনে পুণঃরায় প্রকাশ করে দিল।

তবে শেখ হাসিনার সরকার শুধু যে অমানবিক তাই নয়, প্রচণ্ড আহাম্মকও। সেটি প্রকাশ করে দিল সরকারের মন্ত্রীরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপুমনি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ রোহিঙ্গাদের নির্মূল প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশের জামায়াত-শিবিরের কাণ্ড বলে চিত্রিত করেছে। শুধু মানবিক গুণ নয়, ইতিহাস-জ্ঞানও যে নেহায়েত কম সেটিও কি এর পর বুঝতে বাঁকী থাকে? রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল প্রক্রিয়ার যখন শুরু,তখন বাংলাদেশে জামায়াত বা শিবির বলে কিছু ছিল না। বার্মিজ জাতিয়তাবাদীদের হাতে রোহিঙ্গাদের নির্মূল প্রক্রিয়া শুরু হয় শতাধিক বছর আগে। থেমে থেমে লাগাতর চলছে সে নিধন প্রক্রিয়া। ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি ঘটে ১৯৪২ সালে। তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মায়ানমারের ব্রিটিশ শাসকগণ তখন জাপানীদের হাতে মার খাচ্ছিল। সে অরাজক পরিস্থিতিতে বার্মিজগণ তখন নির্মূলকর্মে নামে। ১৯৪২ সালের ২৮শে মার্চ তারিখে ৫,০০০ রোহিঙ্গা মুসলমানকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। এর পর চলতে থাকে থেমে থেমে মুসলিম নিধন। এরূপ নির্মূল প্রক্রিয়ার ফলে মায়ানামারে বৌদ্ধ জনসংখ্যা বাড়লেও এ এলাকায় মুসলিম রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়েনি। বরং সেখানে বৃদ্ধি পেয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের মারমুখো বৌদ্ধদের সংখ্যা। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ,রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংখ্যা বহু বছর আগে প্রায় দশ লাখ ছিল। কিন্তু সে সংখ্যা এখন ৮ লাখের বেশী নয়। লাগাতর এ নির্যাতন থেকে বাঁচতে প্রায় তিনি লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। প্রায় ২৪ হাজার আশ্রয় নিয়েছে মালয়েশিয়ায়।বহু রোহিঙ্গা মুসলমান বহু কষ্টে দূরবর্তী থাইল্যান্ড,ভারত,ব্রুনাই,সৌদি আরব এবং পাকিস্তানেও আশ্রয় নিয়েছে। শেখ হাসিনা বা দিপুমনি কি এরপরও বলবেন,রোহিঙ্গা নির্মূলের এ দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি জামায়াত-শিবিরের কাণ্ড?

আলোড়িত বিশ্ব এবং অনড় হাসিনা

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ নির্মূল প্রক্রিয়া শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী মহলে কোন বিবেকবোধ জাগ্রত না করলে কি হবে,বিশ্বের বহুদেশে তা ইতিমধ্যেই যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এমনকি ভারতের মত একটি অমুসলিম দেশে বহু গুরুত্বপূর্ণ অমুসলিম রাজনৈতিক নেতারা রাজধানী দিল্লির রাজপথে নেমে এসেছেন। পত্রিকায় প্রকাশ,দিল্লিস্থ্ মায়ানমারের দূতাবাসের সামনে ভারতের সমাজবাদী দল,ইউনাইটেড জনতা দল, সিপিআই, ইন্ডিয়ান ন্যাশন্যাশ লীগের নেতারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবীতে ধর্না দিয়েছেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উপর চাপ দিচ্ছেন,এ গণহত্যা দমনে তার সরকার যেন উদ্যোগ নেয়। গত ২৭/০৭/১২ তারিখে জুম্মার নামায শেষে হাজার হাজার মানুষের বিশাল মিছিল হয়েছে মায়ানমার থেকে বহু দূরে তেহরানের রাজপথে। অথচ ঢাকায় তার অর্ধেক মানুষের মিছিলও এ অবধি হয়নি। হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল করাচীর রাজপথে। মিছিল হয়েছে পাকিস্তানের অন্যান্য শহরে। এ গণহত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তুমুল লেখালেখি হয়েছে নবজাগরিত মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সকল দেশের পত্র-পত্রিকায়। সুস্থ্য দেহে ক্ষুদ্র মাছি বসলেও সবল হাতখানি তেড়ে আসে। কিন্তু অসাড় দেহে জোরে ধাক্কা লাগালেও তা খাড়া হয় না। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সরকারের নীরবতাই প্রমাণ করে বিবেকে কতটা অসুস্থ্য এ সরকারের কর্তব্যক্তিরা।

মায়ানামার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়। রাশিয়া বা চীনও নয়। দীর্ঘকাল সামরিক স্বৈরাচার কবলিত একটি অনুন্নত দেশ। গণতন্ত্র,ব্যক্তি-স্বাধিনতা ও দেশের সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মায়ানমার সরকারের পরিচালিত যুদ্ধটি নতুন কিছু নয়। এ নিয়ে মায়ানমারের সরকার ইতিমধ্যেই পৃথিবী জুড়ে বহু বদনাম কুড়িয়েছে। কারেন বিদ্রোহসহ বহু বিদ্রোহ বহু যুগ ধরে চলছে মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে। এমন একটি বহুল পরিচিত অমানবিক সরকারের বিরুদ্ধে অতি সহজেই বাংলাদেশে সরকার একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে পারতো। বিশ্বপরিস্থিতি ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। মজলুম রোহিঙ্গাদের পক্ষে দাঁড়ালে বিশ্বের বহুদেশ ও বহুসংস্থা বাংলাদেশকে বাহবা দিত। বাংলাদেশে যে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা এতকাল বসবাস করছে তাদেরও ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ সৃষ্টির জন্য এটি ছিল মোক্ষম সময়। কিন্তু হাসিনা সরকার সে পথে এগুয়নি। বরং ধরেছে ভিন্ন পথ। সেটি মানবতা-বিরোধী পথ। ফল দাড়িয়েছে, শেখ হাসিনার মগজের সুস্থ্যতাই নিয়ে বিদেশী সাংবাদিকের সন্দেহ জেগেছে। আল-জাজিরার সাংবাদিকের প্রশ্নে তো সে সংশয়ই ফুটে উঠেছে।

 

রাজনীতি যেখানে ছাগলনীতি

গরু-ছাগলের একটি নীতি আছে।সেটি স্রেফ জৈবীক ভাবে বাঁচা। এমন বাঁচার মধ্যে পাশের প্রতিবেশীর প্রতি কোন কল্যাণ-চিন্তা থাকেনা। কোন নীতিবোধ বা দাযিত্বশীলতাও থাকে না। পশু তো এজন্যই পশু। এজন্যই পশু থেকে কোনরূপ মানবিক আচরণ আশা করা যায় না। গরু-ছাগলের বিশাল পাল থেকে একটিকে ধরে নিয়ে চোখের সামনে গলায় ছুড়ি চালালেও তাতে গরু-ছাগলের ঘাস-পাতা খাওয়ায় ছেদ পড়ে না। পবিত্র কোরআনে ঈমানহীন মানুষকে শুধু পশু নয়,পশুর চেয়েও অধম বলা হয়েছে। প্রতিবেশীর বেদনায় বহু মানুষও যে পশুর মতই বেদনাহীন হয় সে প্রমাণ কি কম? শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের সেটিই হলো নীতি। তাই রোহিঙ্গা মুসলমানদের যতই জবাই করা হোক বা তাদের নারীদের যতই ধর্ষণ করা হোক ও তাদের ঘরবাড়ীতে যতই আগুণ দেয়া হোক, তাতে শেখ হাসিনা ও তার অনুসারিদের মনে সামান্যতম দংশনও হয় না। গুজরাতে যখন তিন হাজারের বেশী মুসলিম নারী-শিশু-বৃদ্ধকে হত্যা করা হলো,এবং মুসলিম বস্তিতে আগুণ দেয়া হলো,তখনও আওয়ামী শিবিরে তাই কোন প্রতিবাদ উঠেনি। প্রতিবাদ তখনও উঠেনি যখন উগ্র হিন্দুরা অযোধ্যায় বাবরী মসজিদকে উৎসবভরে ধ্বংস করে। তখনও আওয়ামী তখনও নিন্দায় রাস্তায় নামেনি যখন ১৯৮৩ সালে আসামের নেলীতে ৫০০০ মুসলমানদের একদিনে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। অথচ তা নিয়ে সেদিন সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আলোড়ন উঠেছিল। এই তো ক’দিন আগে আসামের কোকরাজরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হলো। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও কি আওয়ামী লীগ নেতাদের পক্ষ থেকে কোন কিছু বলা হয়েছে? কাশ্মীরের মুসলমান দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে হত্যা,ধর্ষণ ও জেলজুলুমের মধ্যে আছে কিন্তু তা নিয়ে কি আওয়ামী লীগ কোন দিনও কি কোন প্রতিবাদ করেছে? অথচ বাংলাদেশে কোন হিন্দু বা বৌদ্ধদের গায়ে আঁচড় লাগলে তা নিয়ে ফিল্ম বানিয়ে শাহরিয়ার কবিরের ন্যায় আওয়ামী ঘরানার ক্যাডারগণ তা বিশ্বময় প্রচার করে।তাদের দায়বদ্ধতা যে কোথায় এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে?

 

মায়ানমার সরকারের ফ্যাসীবাদী স্ট্রাটেজী

জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী সাম্প্রতিক হামলাতে ৫০ থেকে ৯০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান নিজেদের ঘরবাড়ী থেকে স্থানচ্যুত হয়েছে। তবে ঘরবাড়ি থেকে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করাটাই মায়ানমার সরকারের একমাত্র অপরাধ নয়। হিউমান রাইট্স ওয়াচের মতে তাদেরকে দাস-শ্রমিক রূপে কাজ করতেও বাধ্য করা হচ্ছে। বিয়েশাদী করতে তাদেরকে সরকার থেকে অনুমতি নিতে হয়।পত্রিকায় প্রকাশ,সন্তানের সংখ্যা অনুর্দ্ধ দুই জন রাখতেও তাদের উপর চাপ দেয়া হয়। দেশের এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যেতেও তাদেরকে সরকার থেকে অনুমতি নিতে হয়। আরো গুরুতর বিষয় হলো,রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংস পলিসির নেতৃত্ব দিচ্ছে বৌদ্ধ পুরোহিতগণ। তারা রোহিঙ্গাদের কালা ও বর্বর রূপে আরোহিত করছে। অথচ তারা ভূলে গেছে বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠিতা বিহারের গৌতম বুদ্ধও শ্বেতাঙ্গ বা গৌর বর্ণের ছিলেন না। বিভিন্ন এনজিও সূত্রে প্রকাশ,রোহিঙ্গাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছতেও এ বৌদ্ধ পুরোহিতগণ বাধা দিচ্ছে। রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় ও স্থাপনায় তারা পোষ্টার এঁটে দিয়েছে এ হুশিয়ারি জানিয়ে যে,রোহিঙ্গাদের সাথে যেন কোনরূপ সংশ্রব না রাখা হয় এবং তাদের কোনরূপ সাহায্য করা না হয়।

তবে রোহিঙ্গা নিমূল প্রক্রিয়ায় শীর্ষে রয়েছে সেদেশের সরকার। গত ১৯/৭/১২ মায়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেন সেইন বলেছেন,“রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের একমাত্র পথ হলো তাদেরকে সকলকে মায়ানমার থেকে সরিয়ে নিয়ে কোন তৃতীয় দেশে বা জাতিসংঘের তত্বাবধানে কোন ত্রান শিবিরে রাখা।” অতি সহজ সমাধান! তিনি যে কতটা অসুস্থ্য চেতনার জীব,তা কি এর পরও বুঝতে বাঁকি থাকে? যারা কট্টোর বর্ণবাদী বা জাতিয়তাবাদী তারা এরূপ নির্মূল প্রক্রিয়ার বাইরে কোন কিছু যেন ভাবতেই পারে না। এমন এক চেতনা নিয়েই হিটলার জার্মানীতে বসবাসরত ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে তাদের নির্মূলের পরিকল্পনা নিয়েছিল। আর বাঙালী জাতিয়তাবাদীরা একাত্তরে বিহারী সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল তাদেরকে হত্যা করে বা তাদেরকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়ে। হাজার হাজার বিহারীকে তখন উৎসবভরে হত্যাও করা হয়েছিল এবং উৎখাত করা হয়েছিল তাদের ঘরবাড়ী ও ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে। ঘরবাড়ী হারানো সে হাজার হাজার বিহারীরা বিগত ৬০ বছরের বেশী কাল ধরে বস্তিতে বসবাস করে সে বর্ণবাদী বাঙালীদের অমনুষ্যনীতিরই সাক্ষর বহন করছে। আর আজ সে অভিন্ন অমুনষ্যনীতির শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা।এখানেও কারণ অভিন্ন। সেটি ভাষা ও বর্ণভিত্তিক কট্টোর জাতিয়তাবাদী ফ্যাসিবাদ। মায়ানমারে সেটি বার্মিজ জাতিয়তাবাদ। তাদের কথা,মায়ানমার শুধু বার্মিজদের জন্য,এখানে অবার্মিজ রোহিঙ্গাদের কোন স্থান নেই। কিন্তু কথা হলো, যে মায়ানমারে শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা বসবাস করলো তারা যদি সে মায়ানমারে স্থান না পায় তবে অন্যরা কেন তাদেরকে স্থান দিবে? তারা দেখে না যে পাশ্ববর্তী মালয়েশিয়ার জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ হলো তারা যারা সে দেশে গিয়েছিল চীন ও দক্ষিণ ভারত থেকে। তাদেরকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। মালয়েশিয়া থেকে ব্রিটিশ শাসকেরা চলে গেছে, কিন্তু চাইনিজ এবং ভারতীয় তামিলদের কি সেদেশ থেকে নির্মূল করা হয়েছে? বহু লক্ষ ভারতীয় ও চাইনিজ ছড়িয়ে আছে আফ্রিকা, ইউরোপ এবং আমেরিকার বহুদেশে। নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা ধর্মের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপস্থিতি বিশ্বের প্রতিদেশে। তারা সেসব দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করছে। এটিই যে কোন সুস্থ্য সমাজের নীতি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সে অধিকার দিতে রাজী নয় মায়ানমার সরকার। অথচ মিয়ানমারের মুসলমানদের বসবাস শত শত বছর পূর্ব থেকে। আরাকানে এক সময় সুলতানি শাসনও ছিল। দীর্ঘকাল ধরে বাংলা ভাষা চর্চা পেয়েছে আরাকান রাজ্যসভায়। কবি আলাওল ছিলেন আরাকান রাজ্যসভার সভাকবি। মায়ানমারে মুসলমানদের এ দীর্ঘ উপস্থিতি ও ঐত্হ্যকে মায়ানমারে বর্ণবাদীরা নির্মূল করতে চায়। কথা হলো এতবড় ভয়ানক অপরাধের বিরুদ্ধে নিন্দা করতে কি বিশাল মানবতা লাগে?

শেখ হাসিনার আদর্শিক আত্মীয়

কোন দেশের জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টদের নিন্দা করার মত নৈতীক বল অপরদেশের ফ্যাসিষ্টদের থাকে না। তাদের মধ্যেও একটি আদর্শিক বন্ধন থাকে। তাই জার্মানীতে যখন ইহুদীদেরকে হাজারে হাজার গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হচ্ছিল সে নৃশংসতার নিন্দা বিশ্বের কোন জাতিয়তাবাদী বা বর্ণবাদীরা করেনি। বরং বহু ভারতীয় ও বাঙালী জাতিয়তাবাদীরা তো হিটলারের ন্যায় সে বর্বর ব্যক্তিটির সাথে বন্ধুত্বও গড়েছে। লক্ষণীয় হলো, মায়ানমারের বর্ণবাদী প্রেসিডেন্ট থেন সেইন ও তার সহিংস অনুসারিদের সাথে শেখ হাসিনা ও তাঁর রাজনৈতিক ক্যাডারদের ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও আদর্শিক পার্থক্য নাই। বরং আদর্শিক দিক দিয়ে তারা বরং পরস্পরের ঘনিষ্ট আত্মীয়। যে অপরাধটি শেখ মুজিবের ফ্যাসীবাদী ক্যাডারগণ অতীতে বিহারীদের সাথে করেছে এবং আজ করছে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, সেটিই তো বার্মিজ ফ্যাসিষ্টগণ করছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাথে। ফলে কোন নৈতীক বল নিয়ে শেখ হাসিনা বার্মিজ নৃশংসতার নিন্দা করবে? বরং শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রীরা পরিণত হয়েছে মায়ানমার সরকারের নির্লজ্জ স্তাবকে। তারা মায়ানমার সরকারকে দায়ী না করে বরং দায়ী করেছেন বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের। মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য অবস্থার উন্নতি হয়েছে সে সার্টিফিকেটও দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আল জাজিরা টিভির সাথে সাক্ষাতকারে তো শেখ হাসিনা সেটিই বলেছেন। কথা হলো,মায়ানমারে যদি অবস্থার উন্নতি হয়েই থাকে তবে কেন বাংলাদেশে তিন লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানের অবস্থান? তাদেরকে কেন সেখান থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না?  ৩০/০৭/১২

শেখ হাসিনার অমনুষ্যনীতি

শেখ হাসিনার রাজনীতি, বিদেশনীতি ও শাসননীতি যে কতটা বিবেকবর্জিত ও অমানবিক সেটি কি কোন গোপন বিষয়? বহুবার বহু বীভৎস্যতা নিয়ে সেটি ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। একটি লাশের বদলে দশটি লাশ ফেলার রাজনীতি,লগি-বৈঠা নিয়ে বিরোধী দলীয় কর্মীদের হত্যা,যাত্রী ভর্তি বাসে আগুণ,লেখক-সাংবাদিক-আলেম ও বিরোধী দলীয় নেতাদের গুম-খুণ ও গ্রেফতারি –এমন কার্যকলাপকে কি সুস্থ্য ও বিবেকমান মানুষের রাজনীতি বলা যায়? অথচ এরূপ অমনুষ্যনীতিই হলো শেখ হাসিনার রাজনীতি। সে নীতিরই পুনঃরায় প্রকাশ ঘটলো মজলুল রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্যে। গতকাল ২৭/০৭/১২ তারিখে আল -জাজিরা ইংরেজী টিভি চ্যানেলের সাথে সাক্ষাতকারে তিনি যা বলেছেন সেটি যেমন হৃদয়শূণ্য তেমনি মানবতাশূন্য। তিনি বলেছেন,রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশে কোন স্থান নাই।যুক্তি দেখিয়েছেন,বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ,অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। তিনি বলেছেন,“সমস্যাটি মায়ানমারের।অতএব বিদেশীদের উচিত,এ নিয়ে বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি না করে মায়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করা।”

 

আল -জাজিরার সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল,“হত্যা ও নির্যাতন থেকে প্রাণের ভয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চেষ্টা করছিল তখন বাংলাদেশের কোষ্টাল গার্ডগণ তাদের ঢুকতে দেয়নি,এবং বলপূর্ব্বক তাদেরকে মায়ানমারে প্রবেশে বাধ্য করেছিল। এটি কি অমানবিক নয়?” জবাবে হাসিনা বলেন,“না,এটি সঠিক নয়। বাংলাদেশের কোষ্টাল গার্ডগণ রোহিঙ্গাদের সাথে কোনরূপ অমানবিক আচরণ করেনি,তাদেরকে বরং খাদ্য, পানীয় ও ঔষধ দিয়েছে এবং মায়ানবারে ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে রাজী করেছে।” উক্ত সাংবাদিক প্রশ্ন করেন,“আপনার সরকার কি মায়ানমারে সরকারের সাথে রোহিঙ্গাদের এ সংকট নিয়ে কোন রূপ যোগাযোগ করেছে? জবাবে বলেন,“হাঁ আমরা যোগযোগ করেছি”। সে যোগাযোগে মায়ানমার সরকারের কাছে তাঁর সরকারের কি দাবী ছিল সেটি না বলে শেখ হাসিনা কার্যতঃ মায়ানমার সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হন এবং বলেন, “মায়ানমার সরকার সমস্যার সমাধারে চেষ্টা করছে। অবস্থার উন্নতি ঘটেছে এবং উদ্বাস্তু আসাও বন্ধ হয়েছে।” আল জাজিরার সাংবাদিক তার এ জবাবে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন,“প্রধানমন্ত্রি আপনি এসব বিশ্বাস করেন?” শেখ হাসিনার মুখে এ প্রশ্নের কোন জবাব ছিল না। তিনি বরং বিব্রত হন এবং নীরব হয়ে যান। মায়ানমার সরকারের নীতি যে পরিবর্তন হয়েছে তার প্রমাণ কোথায়? ক’দিন আগেই সেদেশের প্রেসিডেন্ট সকল রোহিঙ্গাদের তার দেশে থেকে অপসারণের দাবী করেছেন।

 

আল জাজিরার সাথে সাক্ষাতকারে শেখ হাসিনার মূল যুক্তিটি ছিল,বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য দেশটিতে জায়গা কোথায়? কিন্তু সমস্যা কি জনবহুল হওয়া নিয়ে? সমস্যা তো হৃদয়হীনতায়। কাউকে বিপদে জায়গা দেয়ার জন্য ঘরের জায়গাটির চেয়ে বড় প্রয়োজন হলো মনের জায়গার। মনে জায়গা না থাকলে দেশ বিশাল হলেও তখন বিপদগ্রস্তের জন্য কোন জায়গা থাকে না। আজ থেকে ৫০ বছর আগে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজকের তুলনায় অর্ধেকও ছিল না। কিন্তু তখনও দেশে অভাব ছিল। প্রচণ্ডতা দারিদ্রতা ছিল। সর্বক্ষেত্রে নানারূপ পশ্চাদপদতা ছিলও। দেশে তখনও দুর্ভিক্ষ আসতো। কিন্তু সে অভাবের দিনেও বাংলার মানুষ ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা লক্ষ লক্ষ মুসলমানদের জন্য জায়গা করে দিয়েছে। কারণ তখন জনগণ ও সরকারের মনে তাদের জন্য বিশাল জায়গা ছিল। অথচ শেখ মুজিব ও তার দলের কারণে বাংলাদেশ শুধু ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি রূপেই বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়নি, রাজনীতিতেও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে প্রকট ভিক্ষুক-সংস্কৃতি। ফলে বাংলাদেশের আওয়ামী সরকার শুধু হাত পেতে নিতেই জানে, দিতে নয়। রোহিঙ্গাদের প্রবেশের বিরুদ্ধে এজন্যই তারা সীমান্তে কোষ্টাল গার্ড বসেয়েছে।

 

বাস্তবতা হলো,মানুষ শুধু পেট নিয়ে আসে না,বরং বিস্ময়কর মেধা এবং কর্মক্ষম হাত-পা নিয়েও আসে।মেধার কারণে বিশ্বের জনসংখ্যা বিগত শত বছরে বহুগুণ বাড়লেও তার চেয়েও বেশী বেড়েছে সম্পদ। ফলে আজ থেকে হাজার বছর আগে বিশ্বের স্বল্পসংখ্যক মানুষ যে রূপ বাস করতো সে তুলনায় বহুগুণ বেশী প্রাচুয্য নিয়ে বাস করে আজকের মানুষ। তাছাড়া মানুষের পানাহারের দায়িত্ব তো মহান আল্লাহর। কোন ব্যক্তিই তার রেযেক ছাড়া জন্ম নেয় না। ঈমানদারের তো এটিই বিশ্বাস। সে বিশ্বাস না থাকলে তাকে কি মুসলমান বলা যায়? কিন্তু শেখ হাসিনা যে চেতনা নিয়ে কথা বলেছেন সেখানে সে ঈমান কোথায়? বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু লক্ষ লোক জন্মসূত্রে যোগ দিচ্ছে। আজ থেকে ৩০ বছর পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা আজকের তুলনায় দ্বিগুণ হবে। ৬০ বছর পর হয়তো ৪ গুণ হবে। জনসংখ্যা তো এভাবেই বাড়ে। তখন কি বাংলাদেশের মানুষ খাদ্যাভাবে ও স্থানাভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে? দ্বিগুণ বা চারগুণ জনসংখ্যার দায়ভার তো বাংলাদেশকেই সেদিন বইতে হবে। ইনশাল্লাহ তারা শুধু বেঁচেই থাঁকবে না উন্নতিও করবে। বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ পাট নয়,চা বা চিংড়ি মাছ নয়। গার্মেন্টস বা পশুচর্মও নয়। বরং সেটি দেশের জনগণ। আল্লাহর এ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে আপদ বা বোঝা বললে শুধু সে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিরই  অপমান হয় না,বরং চরম অবমাননা হয় মহান স্রষ্টা মহান আল্লাহর। শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার আল্লাহর বিরুদ্ধে সে অবমাননার রাজনীতিই করে চলেছে। তাছাড়া প্রাণ বাঁচাতে আসা কোন মানুষই প্রতিবেশীর ঘরে আজীবন বসবাসের জন্য আসে না। আশ্রয় চায় সীমিত সময়ের জন্য। বিপদ কেটে গেলে তারা দ্রুত নিজ ঘরে ফিরে যায়। কারণ প্রতিবেশীর ঘর তা যত ভালই হোক, কখনোই নিজ ঘরের মত হয় না। তারা তো চায় তা তাদের নিজ ঘরটি দ্রুত আবার বাসের যোগ্য হোক। তাই আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী দেশগুলির লক্ষ্য হয়,উদ্বাস্তুদের নিজ ঘরে ফিরে যাওয়ার মত একটি পরিস্থিতি দ্রুত সৃষ্টি করা। রাজনীতি তো এভাবেই মানবিক পরিচয় পায়।

 

হাতছাড়া হলো মহাসুযোগ

বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা ইতিমধ্যেই তলায় ঠেকেছে। শেখ হাসিনার পিতার আমলে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি রূপে। আওয়ামী লীগ তখন ইতিহাস গড়েছিল ব্যাপক দূর্নীতি এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিতে। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ আবার মুজিব আমলের সে পুরোন পরিচিতি ফিরে পেয়েছে। দেশটি এখন আবার বিশ্বের অতি দূর্নীতিগ্রস্ত দেশ। সম্প্রতি সরকারি দলের ভয়ানক দূর্নীতির কারণে পদ্মা সেতু নির্মাণে বরাদ্দকৃত ঋণও বাতিল করে দিল বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য সাহায্যদানকারি সংস্থা। ঠিক এ মূহুর্তে রোহিঙ্গা বিষয়ে মানবতা ও মানবিক অধিকারের পক্ষ নিয়ে মাথা উঁচু করে বিশ্ব মাঝে দাঁড়ানোর সুযোগ এসেছিল বাংলাদেশের। যে গৃহে ১০ জন মানুষের ভাত পাক হয় সে গৃহে ২ জন মেহমান খাওয়াতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যে বাংলাদেশের জনগণ ১৬ কোটি মানুষের আহার জোগাতে পারে তারা কি মায়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা এক বা দুই লাখ মানুষকে কয়েকটি মাস বা বছর খাওয়াতে পারতো না? ইমেজ সৃষ্টির এমন সুযোগ ফি বছর আসে না। আসে মাঝে মধ্যে। কিন্তু জাতির নীতি-নৈতিকতা ও মান-মর্যাদার পরীক্ষা এর মধ্য দিয়েই হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশ সে পরীক্ষায় দারুণ ভাবে ফেল করেছে। তাছাড়া রোহিঙ্গা সংকট যেহেতু একটি আন্তর্জাতিক বিষয়, তাদের বসবাস ও পানাহারের খরচ জোগাতে জাতিসংঘ এবং অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এগিয়ে আসতো। পাকিস্তানে ৩০ লাখ আফগান যখন আশ্রয় নিয়েছে তখন তাদের সাহায্যে দেশটিতে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক সাহায্যও এসেছে। বিদেশীরা তো আর বিপর্যস্ত মানুষকে সমুদ্রে বা আকাশে ভাসমান রেখে খাওয়াতে পারে না? এমন দুর্যোগ মুহুর্তে প্রতিবেশী দেশকে উদ্বাস্তুদের জন্য শুধু মাথাগোঁজার জায়গা দিতে হয়,বাঁকি দায়ভার অন্যরা নিয়ে নেয়। সে সুযোগটুকুই বাংলাদেশ সরকার দেয়নি। বাংলাদেশ নিয়ে এজন্যই আন্তর্জাতিক মহলের প্রচণ্ড হতাশা।

 

হাসিনা সরকারের বড় অপরাধ, মজলুমের পক্ষ নেয়ার জন্য যে নৈতীক বল দরকার সেটি এ সরকার দেখাতে পারেননি। নৈতীক বল তো আসে সুনীতি থেকে। যাদের বিশ্বজুড়া পরিচিতি দুর্নীতিবাজ রূপে,সেরূপ একটি সরকারের পক্ষে সেটি থাকার কথাও নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নীতি হওয়া উচিত ছিল, প্রাণে বাঁচতে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মায়ানমার সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা। একাজে বাংলাদেশে সরকার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সমর্থণ পেত। সমর্থণ পেত প্রায় ৬০টি মুসলিম দেশের। তখন ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশ একটি শান্তিকামী ও মানবতাবাদী দেশ রূপে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেত। কিন্তু শেখ হাসীনার সরকার সে পথে এগুয়নি। বরং বেছে নিয়েছে অমানবিক বিবেকশূণ্যতার পথ। বাংলাদেশ যে স্রেফ জনসংখ্যাতেই বেড়েছে,মানবতায় নয় -সেটিই শেখ হাসিনার সরকার বিশ্ববাসীর সামনে পুণঃরায় প্রকাশ করে দিল।

 

তবে শেখ হাসিনার সরকার শুধু যে অমানবিক তাই নয়, প্রচণ্ড আহাম্মকও। সেটি প্রকাশ করে দিল সরকারের মন্ত্রীরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপুমনি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ রোহিঙ্গাদের নির্মূল প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশের জামায়াত-শিবিরের কাণ্ড বলে চিত্রিত করেছে। শুধু মানবিক গুণ নয়, ইতিহাস-জ্ঞানও যে নেহায়েত কম সেটিও কি এর পর বুঝতে বাঁকী থাকে? রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল প্রক্রিয়ার যখন শুরু,তখন বাংলাদেশে জামায়াত বা শিবির বলে কিছু ছিল না। বার্মিজ জাতিয়তাবাদীদের হাতে রোহিঙ্গাদের নির্মূল প্রক্রিয়া শুরু হয় শতাধিক বছর আগে। থেমে থেমে লাগাতর চলছে সে নিধন প্রক্রিয়া। ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি ঘটে ১৯৪২ সালে। তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মায়ানমারের ব্রিটিশ শাসকগণ তখন জাপানীদের হাতে মার খাচ্ছিল। সে অরাজক পরিস্থিতিতে বার্মিজগণ তখন নির্মূলকর্মে নামে। ১৯৪২ সালের ২৮শে মার্চ তারিখে ৫,০০০ রোহিঙ্গা মুসলমানকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। এর পর চলতে থাকে থেমে থেমে মুসলিম নিধন। এরূপ নির্মূল প্রক্রিয়ার ফলে মায়ানামারে বৌদ্ধ জনসংখ্যা বাড়লেও এ এলাকায় মুসলিম রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়েনি। বরং সেখানে বৃদ্ধি পেয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের মারমুখো বৌদ্ধদের সংখ্যা। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ,রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংখ্যা বহু বছর আগে প্রায় দশ লাখ ছিল। কিন্তু সে সংখ্যা এখন ৮ লাখের বেশী নয়। লাগাতর এ নির্যাতন থেকে বাঁচতে প্রায় তিনি লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। প্রায় ২৪ হাজার আশ্রয় নিয়েছে মালয়েশিয়ায়।বহু রোহিঙ্গা মুসলমান বহু কষ্টে দূরবর্তী থাইল্যান্ড,ভারত,ব্রুনাই,সৌদি আরব এবং পাকিস্তানেও আশ্রয় নিয়েছে। শেখ হাসিনা বা দিপুমনি কি এরপরও বলবেন,রোহিঙ্গা নির্মূলের এ দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি জামায়াত-শিবিরের কাণ্ড?

 

আলোড়িত বিশ্ব এবং অনড় হাসিনা

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ নির্মূল প্রক্রিয়া শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী মহলে কোন বিবেকবোধ জাগ্রত না করলে কি হবে,বিশ্বের বহুদেশে তা ইতিমধ্যেই যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এমনকি ভারতের মত একটি অমুসলিম দেশে বহু গুরুত্বপূর্ণ অমুসলিম রাজনৈতিক নেতারা রাজধানী দিল্লির রাজপথে নেমে এসেছেন। পত্রিকায় প্রকাশ,দিল্লিস্থ্ মায়ানমারের দূতাবাসের সামনে ভারতের সমাজবাদী দল,ইউনাইটেড জনতা দল, সিপিআই, ইন্ডিয়ান ন্যাশন্যাশ লীগের নেতারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবীতে ধর্না দিয়েছেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উপর চাপ দিচ্ছেন,এ গণহত্যা দমনে তার সরকার যেন উদ্যোগ নেয়। গত ২৭/০৭/১২ তারিখে জুম্মার নামায শেষে হাজার হাজার মানুষের বিশাল মিছিল হয়েছে মায়ানমার থেকে বহু দূরে তেহরানের রাজপথে। অথচ ঢাকায় তার অর্ধেক মানুষের মিছিলও এ অবধি হয়নি। হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল করাচীর রাজপথে। মিছিল হয়েছে পাকিস্তানের অন্যান্য শহরে। এ গণহত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তুমুল লেখালেখি হয়েছে নবজাগরিত মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সকল দেশের পত্র-পত্রিকায়। সুস্থ্য দেহে ক্ষুদ্র মাছি বসলেও সবল হাতখানি তেড়ে আসে। কিন্তু অসাড় দেহে জোরে ধাক্কা লাগালেও তা খাড়া হয় না। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সরকারের নীরবতাই প্রমাণ করে বিবেকে কতটা অসুস্থ্য এ সরকারের কর্তব্যক্তিরা।

 

মায়ানামার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়। রাশিয়া বা চীনও নয়। দীর্ঘকাল সামরিক স্বৈরাচার কবলিত একটি অনুন্নত দেশ। গণতন্ত্র,ব্যক্তি-স্বাধিনতা ও দেশের সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মায়ানমার সরকারের পরিচালিত যুদ্ধটি নতুন কিছু নয়। এ নিয়ে মায়ানমারের সরকার ইতিমধ্যেই পৃথিবী জুড়ে বহু বদনাম কুড়িয়েছে। কারেন বিদ্রোহসহ বহু বিদ্রোহ বহু যুগ ধরে চলছে মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে। এমন একটি বহুল পরিচিত অমানবিক সরকারের বিরুদ্ধে অতি সহজেই বাংলাদেশে সরকার একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে পারতো। বিশ্বপরিস্থিতি ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। মজলুম রোহিঙ্গাদের পক্ষে দাঁড়ালে বিশ্বের বহুদেশ ও বহুসংস্থা বাংলাদেশকে বাহবা দিত। বাংলাদেশে যে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা এতকাল বসবাস করছে তাদেরও ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ সৃষ্টির জন্য এটি ছিল মোক্ষম সময়। কিন্তু হাসিনা সরকার সে পথে এগুয়নি। বরং ধরেছে ভিন্ন পথ। সেটি মানবতা-বিরোধী পথ। ফল দাড়িয়েছে, শেখ হাসিনার মগজের সুস্থ্যতাই নিয়ে বিদেশী সাংবাদিকের সন্দেহ জেগেছে। আল-জাজিরার সাংবাদিকের প্রশ্নে তো সে সংশয়ই ফুটে উঠেছে।

 

রাজনীতি যেখানে ছাগলনীতি

গরু-ছাগলের একটি নীতি আছে।সেটি স্রেফ জৈবীক ভাবে বাঁচা। এমন বাঁচার মধ্যে পাশের প্রতিবেশীর প্রতি কোন কল্যাণ-চিন্তা থাকেনা। কোন নীতিবোধ বা দাযিত্বশীলতাও থাকে না। পশু তো এজন্যই পশু। এজন্যই পশু থেকে কোনরূপ মানবিক আচরণ আশা করা যায় না। গরু-ছাগলের বিশাল পাল থেকে একটিকে ধরে নিয়ে চোখের সামনে গলায় ছুড়ি চালালেও তাতে গরু-ছাগলের ঘাস-পাতা খাওয়ায় ছেদ পড়ে না। পবিত্র কোরআনে ঈমানহীন মানুষকে শুধু পশু নয়,পশুর চেয়েও অধম বলা হয়েছে। প্রতিবেশীর বেদনায় বহু মানুষও যে পশুর মতই বেদনাহীন হয় সে প্রমাণ কি কম? শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের সেটিই হলো নীতি। তাই রোহিঙ্গা মুসলমানদের যতই জবাই করা হোক বা তাদের নারীদের যতই ধর্ষণ করা হোক ও তাদের ঘরবাড়ীতে যতই আগুণ দেয়া হোক, তাতে শেখ হাসিনা ও তার অনুসারিদের মনে সামান্যতম দংশনও হয় না। গুজরাতে যখন তিন হাজারের বেশী মুসলিম নারী-শিশু-বৃদ্ধকে হত্যা করা হলো,এবং মুসলিম বস্তিতে আগুণ দেয়া হলো,তখনও আওয়ামী শিবিরে তাই কোন প্রতিবাদ উঠেনি। প্রতিবাদ তখনও উঠেনি যখন উগ্র হিন্দুরা অযোধ্যায় বাবরী মসজিদকে উৎসবভরে ধ্বংস করে। তখনও আওয়ামী তখনও নিন্দায় রাস্তায় নামেনি যখন ১৯৮৩ সালে আসামের নেলীতে ৫০০০ মুসলমানদের একদিনে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। অথচ তা নিয়ে সেদিন সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আলোড়ন উঠেছিল। এই তো ক’দিন আগে আসামের কোকরাজরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হলো। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও কি আওয়ামী লীগ নেতাদের পক্ষ থেকে কোন কিছু বলা হয়েছে? কাশ্মীরের মুসলমান দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে হত্যা,ধর্ষণ ও জেলজুলুমের মধ্যে আছে কিন্তু তা নিয়ে কি আওয়ামী লীগ কোন দিনও কি কোন প্রতিবাদ করেছে? অথচ বাংলাদেশে কোন হিন্দু বা বৌদ্ধদের গায়ে আঁচড় লাগলে তা নিয়ে ফিল্ম বানিয়ে শাহরিয়ার কবিরের ন্যায় আওয়ামী ঘরানার ক্যাডারগণ তা বিশ্বময় প্রচার করে।তাদের দায়বদ্ধতা যে কোথায় এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে?

 

মায়ানমার সরকারের ফ্যাসীবাদী স্ট্রাটেজী

জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী সাম্প্রতিক হামলাতে ৫০ থেকে ৯০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান নিজেদের ঘরবাড়ী থেকে স্থানচ্যুত হয়েছে। তবে ঘরবাড়ি থেকে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করাটাই মায়ানমার সরকারের একমাত্র অপরাধ নয়। হিউমান রাইট্স ওয়াচের মতে তাদেরকে দাস-শ্রমিক রূপে কাজ করতেও বাধ্য করা হচ্ছে। বিয়েশাদী করতে তাদেরকে সরকার থেকে অনুমতি নিতে হয়।পত্রিকায় প্রকাশ,সন্তানের সংখ্যা অনুর্দ্ধ দুই জন রাখতেও তাদের উপর চাপ দেয়া হয়। দেশের এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যেতেও তাদেরকে সরকার থেকে অনুমতি নিতে হয়। আরো গুরুতর বিষয় হলো,রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংস পলিসির নেতৃত্ব দিচ্ছে বৌদ্ধ পুরোহিতগণ। তারা রোহিঙ্গাদের কালা ও বর্বর রূপে আরোহিত করছে। অথচ তারা ভূলে গেছে বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠিতা বিহারের গৌতম বুদ্ধও শ্বেতাঙ্গ বা গৌর বর্ণের ছিলেন না। বিভিন্ন এনজিও সূত্রে প্রকাশ,রোহিঙ্গাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছতেও এ বৌদ্ধ পুরোহিতগণ বাধা দিচ্ছে। রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত এলাকার বিভিন্ন রাস্তায় ও স্থাপনায় তারা পোষ্টার এঁটে দিয়েছে এ হুশিয়ারি জানিয়ে যে,রোহিঙ্গাদের সাথে যেন কোনরূপ সংশ্রব না রাখা হয় এবং তাদের কোনরূপ সাহায্য করা না হয়।

 

তবে রোহিঙ্গা নিমূল প্রক্রিয়ায় শীর্ষে রয়েছে সেদেশের সরকার। গত ১৯/৭/১২ মায়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেন সেইন বলেছেন,“রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের একমাত্র পথ হলো তাদেরকে সকলকে মায়ানমার থেকে সরিয়ে নিয়ে কোন তৃতীয় দেশে বা জাতিসংঘের তত্বাবধানে কোন ত্রান শিবিরে রাখা।” অতি সহজ সমাধান! তিনি যে কতটা অসুস্থ্য চেতনার জীব,তা কি এর পরও বুঝতে বাঁকি থাকে? যারা কট্টোর বর্ণবাদী বা জাতিয়তাবাদী তারা এরূপ নির্মূল প্রক্রিয়ার বাইরে কোন কিছু যেন ভাবতেই পারে না। এমন এক চেতনা নিয়েই হিটলার জার্মানীতে বসবাসরত ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে তাদের নির্মূলের পরিকল্পনা নিয়েছিল। আর বাঙালী জাতিয়তাবাদীরা একাত্তরে বিহারী সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল তাদেরকে হত্যা করে বা তাদেরকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়ে। হাজার হাজার বিহারীকে তখন উৎসবভরে হত্যাও করা হয়েছিল এবং উৎখাত করা হয়েছিল তাদের ঘরবাড়ী ও ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে। ঘরবাড়ী হারানো সে হাজার হাজার বিহারীরা বিগত ৬০ বছরের বেশী কাল ধরে বস্তিতে বসবাস করে সে বর্ণবাদী বাঙালীদের অমনুষ্যনীতিরই সাক্ষর বহন করছে। আর আজ সে অভিন্ন অমুনষ্যনীতির শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা।এখানেও কারণ অভিন্ন। সেটি ভাষা ও বর্ণভিত্তিক কট্টোর জাতিয়তাবাদী ফ্যাসিবাদ। মায়ানমারে সেটি বার্মিজ জাতিয়তাবাদ। তাদের কথা,মায়ানমার শুধু বার্মিজদের জন্য,এখানে অবার্মিজ রোহিঙ্গাদের কোন স্থান নেই। কিন্তু কথা হলো, যে মায়ানমারে শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা বসবাস করলো তারা যদি সে মায়ানমারে স্থান না পায় তবে অন্যরা কেন তাদেরকে স্থান দিবে? তারা দেখে না যে পাশ্ববর্তী মালয়েশিয়ার জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ হলো তারা যারা সে দেশে গিয়েছিল চীন ও দক্ষিণ ভারত থেকে। তাদেরকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। মালয়েশিয়া থেকে ব্রিটিশ শাসকেরা চলে গেছে, কিন্তু চাইনিজ এবং ভারতীয় তামিলদের কি সেদেশ থেকে নির্মূল করা হয়েছে? বহু লক্ষ ভারতীয় ও চাইনিজ ছড়িয়ে আছে আফ্রিকা, ইউরোপ এবং আমেরিকার বহুদেশে। নানা ভাষা, নানা বর্ণ ও নানা ধর্মের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপস্থিতি বিশ্বের প্রতিদেশে। তারা সেসব দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করছে। এটিই যে কোন সুস্থ্য সমাজের নীতি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সে অধিকার দিতে রাজী নয় মায়ানমার সরকার। অথচ মিয়ানমারের মুসলমানদের বসবাস শত শত বছর পূর্ব থেকে। আরাকানে এক সময় সুলতানি শাসনও ছিল। দীর্ঘকাল ধরে বাংলা ভাষা চর্চা পেয়েছে আরাকান রাজ্যসভায়। কবি আলাওল ছিলেন আরাকান রাজ্যসভার সভাকবি। মায়ানমারে মুসলমানদের এ দীর্ঘ উপস্থিতি ও ঐত্হ্যকে মায়ানমারে বর্ণবাদীরা নির্মূল করতে চায়। কথা হলো এতবড় ভয়ানক অপরাধের বিরুদ্ধে নিন্দা করতে কি বিশাল মানবতা লাগে?

 

শেখ হাসিনার আদর্শিক আত্মীয়

কোন দেশের জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টদের নিন্দা করার মত নৈতীক বল অপরদেশের ফ্যাসিষ্টদের থাকে না। তাদের মধ্যেও একটি আদর্শিক বন্ধন থাকে। তাই জার্মানীতে যখন ইহুদীদেরকে হাজারে হাজার গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হচ্ছিল সে নৃশংসতার নিন্দা বিশ্বের কোন জাতিয়তাবাদী বা বর্ণবাদীরা করেনি। বরং বহু ভারতীয় ও বাঙালী জাতিয়তাবাদীরা তো হিটলারের ন্যায় সে বর্বর ব্যক্তিটির সাথে বন্ধুত্বও গড়েছে। লক্ষণীয় হলো, মায়ানমারের বর্ণবাদী প্রেসিডেন্ট থেন সেইন ও তার সহিংস অনুসারিদের সাথে শেখ হাসিনা ও তাঁর রাজনৈতিক ক্যাডারদের ভাষাগত পার্থক্য থাকলেও আদর্শিক পার্থক্য নাই। বরং আদর্শিক দিক দিয়ে তারা বরং পরস্পরের ঘনিষ্ট আত্মীয়। যে অপরাধটি শেখ মুজিবের ফ্যাসীবাদী ক্যাডারগণ অতীতে বিহারীদের সাথে করেছে এবং আজ করছে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, সেটিই তো বার্মিজ ফ্যাসিষ্টগণ করছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাথে। ফলে কোন নৈতীক বল নিয়ে শেখ হাসিনা বার্মিজ নৃশংসতার নিন্দা করবে? বরং শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রীরা পরিণত হয়েছে মায়ানমার সরকারের নির্লজ্জ স্তাবকে। তারা মায়ানমার সরকারকে দায়ী না করে বরং দায়ী করেছেন বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের। মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য অবস্থার উন্নতি হয়েছে সে সার্টিফিকেটও দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আল জাজিরা টিভির সাথে সাক্ষাতকারে তো শেখ হাসিনা সেটিই বলেছেন। কথা হলো,মায়ানমারে যদি অবস্থার উন্নতি হয়েই থাকে তবে কেন বাংলাদেশে তিন লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানের অবস্থান? তাদেরকে কেন সেখান থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না?  ৩০/০৭/১২