রাজনীতি যখন অপরাধের হাতিয়ার

একাকার অপরাধজগত ও রাজনীতি

ব্যক্তির ঈমান, বিবেক বা চেতনা দেখা যায় না। কিন্তু দেখা না গেলেও অজানা থাকে না। দেহের ত্রুটিকে পোষাকে ঢেকে রাখা গেলেও মনের রোগ লুকানো যায় না। সেটি দ্রুত প্রকাশ পায় ব্যক্তির কথা, কর্ম ও আচরনে। ধরা পড়ে ন্যায়কে ভালবাসা এবং অন্যায়কে ঘৃনা করার সামর্থের মধ্য দিয়ে। আল্লাহর আইনে মানুষ গুরুতর অপরাধি হয় ও জাহান্নামের যোগ্য হয় -শুধু মুর্তি পুজার কারণে নয়। আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের এটাই একমাত্র গুরুতর অপরাধ নয়। বরং সবচেয় বড় অপরাধটি ঘটে আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা অবাধ্যতার মধ্য দিয়ে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে কাফের,জালেম ও ফাসেক বলে অভিহিত করে। সে অবাধ্যতার ঘটতে পারে “আমিরু বিল মারুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার” অর্থ “ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করো এবং অন্যায়কে প্রতিহত করো” এ কোরআনী হুকুমের অমান্য করার মধ্য দিয়েও। মু’মিন শাসক তাই ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধে আপোষহীন হয়। ন্যায়-অন্যায়ের সে সংজ্ঞাটি আসে শরিয়ত থেকে। জনগণ ও সরকারের ঈমানদারি হলো সে শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠায়। একাজে নিষ্ঠা না থাকলে বুঝতে হবে,ভয়ানক রোগ আছে ঈমানদারিতে। বার বার হজ-ওমরাহ বা নামায-রোযার মধ্য দিয়ে মুসলিম সাজা যায়, কিন্তু প্রকৃত মুসলিম হওয়া যায় না। মুসলিম হওয়ার অর্থ তো, সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের অনুগত হওয়া। এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠাবান হওয়া। সে দায়ভার যেমন জনগণের, তেমনি সরকারের। বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে ভয়ানক বিদ্রোহ  ও গুরুতর অপরাধটি ঘটছে মূলতঃ এক্ষেত্রটিতে।

জঘন্য খুনি বা অপরাধী হওয়ার জন্য জরুরী নয় যে তাকে নিজ হাতে কাউকে খুন করতে হবে বা কোন অপরাধে জড়িত হতে হবে। স্বৈরাচারি ফিরাউন, হিটলার, শেখ মুজিব বা শেখ হাসিনা কাউকে নিজ হাতে কাউকে খুন করেছেন -সে প্রমাণ নেই। কিন্তু হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে তাদের শাসন আমলে। এরূপ শাসকগণের চরিত্র হলো, তারা শুধু শিরক, ব্যাভিচার, সূদ-ঘুষ ও নাস্তিকতাতেই বৃদ্ধি আনে না, দ্রুত প্রতিষ্ঠা বাড়ায় ভয়ানক অন্যায়েরও। তারা অসম্ভব করেন ন্যায় বিচারকে। বাংলাদেশে অহরহ সেটিই ঘটছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কোন খুনের মামলা দ্রুত করার জন্য হুকুম দিয়েছেন সে প্রমান নেই, কিন্তু নাটোরের চাঞ্চল্যকর গামা হত্যা মামলায় ২০ ফাঁসির আসামিকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। ক্ষমা করে দিয়েছেন লক্ষ্মীপুরের অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি বিপ্লবকে। ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আহসান হাবীব ওরফে টিটুকেও। 

অপরাধ বিচাররোধের

ডাকাত পাড়ায় কখনোই ডাকাতের বিচার বসে না। বরং ডাকাতির নৃশংসতা ডাকাতদের মাঝে প্রশংসিত হয়। সেখানে বরং নিরীহ মানুষের পকেটে হাত দেয়া হয়। তেমনি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সদস্যদের অপরাধ –তা যত ভয়ানকই হোক, তার নিয়ে বিচার বসেনা। অপরদিকে হাজার হাজার মামলা রুজু করে জেলে পাঠানো হয় হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার মামলা করেছিল। সেগুলোও আদালতের মুখ দেখেনি, বরং ঢালাও ভাবে সেগুলো তুলে নেয়া হয়েছে। পুলিশ ও আদালত নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করলে নিজদলীয় অপরাধীদের বিপদ। তাই অপরাধীদের দলীয় শাসন মজবুত করতে হলে অপরিহার্য হয় পুলিশ প্রশাসন  ও আদালতের গলায় রশি পড়ানো। এভাবে রুখতে হয় ন্যায়বিচারের। শেখ হাসীনা সেটি করেছেন তার পিতার দেখানো পথ ধরে। তিনি দেশের ৬৪টি জেলায় নিজ দলের প্রশাসক বসিয়েছেন যাতে তার দলের লোকেরা নিরাপত্তা পায়। তাই দেশে হাজার হাজার মানুষ খুণ হলে কিভাবে তাতে আওয়ামী লীগের কোন নেতার শাস্তি হয়নি। মুজিব আমলেও হয়নি। অথচ বহু স্থানে আাওয়ামী লীগ কর্মীরা বিরোধী দলীয় কর্মি ও নেতার খুণ ও গুম করার  সাথে জড়িত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ কর্মীরা দিনের বেলায় অস্ত্র হাতে বিরোধীদের ধাওয়া করেছে। বহু ক্ষেত্রে হামলাকারিদের ছবিও পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ।অথচ তাদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশ তাদের পাড়ায় বা গৃহে একবারও তদন্তে যায়নি।

শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতার বাইরে ছিলেন তখনও ন্যায় বিচারকে প্রতিহত করেছেন নানা ভাবে । আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন ছাত্রকে ছাত্রলীগ কর্মীরা নির্মম ভাবে হত্যা করেছিল। আদালতে তাদের বিচার হয়েছিল এবং শাস্তিও হয়েছিল। কিন্তু সে খুনের বিচার এবং খুনিদের সে শাস্তি তাঁর ভাল লাগেনি। এরশাদের সাথে যখন তাঁর প্রথম বৈঠক বসে তখন জিদ ধরেন, আলোচনার আগে শাস্তিপ্রাপ্তি খুনের আসামীদের মুক্তি দিতে হবে,নইলে কোন বৈঠক হবে না। তিনি যে ন্যায় বিচারের কতটা বিরোধী এবং খুনিদের মুক্ত করতে কতটা বদ্ধপরিকর -এ হলো তার নমুনা। দুর্বৃত্ত এরশাদেরও ন্যায়নীতি ও ন্যায়বিচারের প্রতি আগ্রহ ছিল না। তাঁর আগ্রহ ছিল শুধু নিজের গদীর দীর্ঘায়ু। তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন গণতন্ত্র হত্যার ন্যায় জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করে। এমন অপরাধি কি খুনীর শাস্তিতে আপোষহীন হতে পারে? ফলে স্বৈরাচারি এরশাদ সেদিন শেখ হাসিনার দাবী মেনে নিয়ে খুনিদের মুক্তি দিয়েছিল। সে বিবরণ লিখেছেন সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর  রহমান খান তাঁর স্মৃতিচারণ বইয়ে।

অপরাধীগণ শুধু ডাকাত পাড়ায় সীমাবদ্ধ থাকলে সমগ্র দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়না। কিন্তু তা দেশময় ছড়িয়ে পড়লে বিপন্ন হয় শান্তি-শৃঙ্খলা। আর সেটি ঘটে অপরাধীরা ক্ষমতায় গেলে। তখন দারোয়ান থেকে কর্তাব্যক্তি পর্যন্ত সমগ্র প্রশাসনই অপরাধী হয়ে উঠে। বাংলাদেশে সেটিই ঘটেছে। ফলে ডাকাতদের এখন আর দল গড়ে রাতের আঁধারে হাওর-বাওর, গ্রাম-গঞ্জ ঘুরে ডাকাতি করার ঝুকি নিতে হয় না। বরং তাতে থাকে গ্রামবাসীর প্রতিরোধে প্রাণনাশের সম্ভাবনা। তারা এখন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের সদস্য হয়ে দিন দুপুরে টেণ্ডার দখল করতে পারে। বনদখল, সরকারি জমি দখল, নদীদখল এবং চাঁদাবাজি করেও বিপুল অর্থ করতে পারে। এমন ডাকাতিতে যেমন অর্থলাভ প্রচুর, তেমনি সম্ভাবনা নেই প্রতিপক্ষের সামান্যতম প্রতিরোধের। বরং জুটে পুলিশ, র‌্যাব, সরকারি প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের সার্বিক সমর্থন। সে সাথে বাড়ে রাজনৈতিক নেতা হওয়ার গৌরব। ফলে অপরাধী কাছে প্রবল আকর্ষন বাড়ছে এমন রাজনৈতিক পেশার। একারণেই পেশাদার অরাজনৈতিক ডাকাতদের সংখ্যা যেমন দিন দিন কমছে, তেমনি দ্রুত বেড়ে চলেছে রাজনৈতিক ডাকাতদের সংখ্যা। আর এভাবেই বাড়ছে দেশজুড়ে অপরাধীদের দখলদারি। অপরাধ জগৎ আর রাজনীতির জগৎ যেন একাকার হয়ে গেছে। ফলে সরকারি দলের কর্মীরা কোনরূপ ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকুরি না করেই বাড়ি-গাড়ি ও বিপুল অর্থের মালিক হচ্ছে।

 

লক্ষ্য পিতার রেকর্ড ভাঙ্গা

দৈনিক “আমার দেশ” য়ের পরিসংখ্যানঃ ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর তিন বছরে দেশে ১২ হাজারেরও বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সে অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ১১ জন করে খুন হয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৫৯২ জন এবং আহত হয়েছেন ৪০ হাজার ১৯০ জন। চলতি বছর ইউপি নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৮৩ জন। তবে পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ১০ হাজার ৬শ’ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৪২১৯ জন ও ২০১০ সালে ৪৩১৫ জন। খুনসহ ডাকাতি, দুর্ধর্ষ চুরি, অপহরণ, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, মাদক কেনাবেচাসহ ৫ লাখেরও বেশি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ১ লাখ ৫৭ হাজার ১০৮টি, ২০১০ সালে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩৪টি ও চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ১ লাখ ৩৭ হাজার অপরাধের ঘটনা ঘটে। গত তিন বছরে শুধু রাজধানী ঢাকায় ৫ হাজার ৫৭৬টি বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকারের ২ বছর ১১ মাসে ৪ সাংবাদিক নিহত, ২৮০ সাংবাদিক আহত, ৮৮ জন লাঞ্ছিত ও ৯৫ জন হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। পেশা গত দায়িত্ব পালনকালে ৪০ সাংবাদিকের ওপর হামলা, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানসহ ৩ জনকে গ্রেফতার, ১ জন অপহৃত ও ২৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। 

দেশে যেভাবে হত্যা-গুম-সন্ত্রাস ও দূর্নীতি বাড়ছে তাতে মনে হয় শেখ হাসিনা গোঁ ধরেছেন তিনি তাঁর পিতার রেকর্ড ভাঙ্গবেনই। বাংলাদেশের অতীতের অন্যদলীয় যে কোন সরকার এ প্রতিযোগিতায় তার ধারে কাছেও আসতে পারবে না। তাঁর পিতার আমলে তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজারের মত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। গ্রেফতার হয়েছিল লক্ষাধিক মানুষ। হাজার হাজার মানুষকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। তবে যে হারে অপরাধ কাণ্ড চলছে তাতে শেখ হাসিনা আর দুই বছর ক্ষমতায় থাকলে নিজ পিতাকে অতিক্রম করে অপরাধ কর্মে রেকর্ড অতিক্রম করতে পারবেন। তবে অপরাধ জগতের একটি ক্ষেত্রে তিনি তাঁর পিতার রেকর্ডকে ইতিমধ্যে অতিক্রম করেছেন। সেটি শেয়ার বাজারের বিনাশ। তার পিতা শিয়ার বাজার বলতে কিছু গড়ে উঠতে দেননি। আর তিনি তার শাসনামলে দুইবার মড়ক লাগিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে যখন প্রথম বার ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখনও শেয়ার বাজারকে রশাতলে নিয়েছিলেন।

আদর্শঃ মুজিবের অপরাধের রাজনীতি                                                  
গণতান্ত্রিক শাসকের মূল কথা, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে সংসদ। সে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ সরকার গঠন করবে। কিন্তু দেশের প্রশাসন ও আদালত কাজ করবে নিরপেক্ষ ভাবে। স্বৈরাচার থেকে গণতন্ত্রের এখানেই পার্থক্য। প্রশাসন ও আদালত -এ দুটি প্রতিষ্ঠানে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে মৃত্যু ঘটে গণতন্ত্রের।  তখন প্রতিষ্ঠিত হয় দলীয় স্বৈরাচার। নির্বাচন তখন অর্থহীন হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের অপরাধ শুধু এ নয় যে, দলটির শাসনামলে দেশে হত্যা, গুম, সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছিল। বরং গুরুতর অপরাধটি ঘটেছে গণতন্ত্র হত্যার মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্র হত্যায় প্রতিপক্ষের নির্মূল সহজতর হয়। সহজতর হয় মানুষ হত্যা। স্বৈরাচারী শাসন অপরাধকর্মে যতটা আজাদী দেয়, গণতন্ত্র তা দেয় না। গণতন্ত্রে সরকারের দায়বদ্ধতা বাড়ে জনগণের কাছে। এমন ধরণের দায়বদ্ধতা নিয়ে শেখ মুজিবের কোন কালেই কোন আগ্রহ ছিল না। বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিব ও তার দলের অপরাধ বহু, তবে গুরুতর অপরাধ এই গণতন্ত্র হত্যা। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে যা ঘটেনি, পাকিস্তান আমলে যা ভাবা যায়নি, সেটিই ঘটেছে মুজিবামলে। পাকিস্তান আমলে মুজিব বহুবার জেলে গেছেন, কিন্তু কোনবারই তাঁকে ডাণ্ডাবেড়ি পড়ানো হয়নি। পুলিশী রিমাণ্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়নি। কোন বারই তাকে লাশ হয়ে ফিরতে হয়নি। অথচ তাঁর উপর আগরতলা ষড়যন্ত্রের ন্যায় গুরুতর অভিযোগ ছিল। কিন্তু তার আমলে লাশ হয়ে ফিরেছেন শুধু মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরি ও বামপন্থি সিরাজ শিকদারই নয়, বহু বহু হাজার রাজনৈতিক কর্মি।

ফ্যাসীবাদকে বুঝতে হলে বুঝতে হয় হিটলারকে। তেমনি আওয়ামী লীগের আজকের রাজনীতি বুঝতে হলে বুঝতে হবে শেখ মুজিবকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ যা হচ্ছে তা মূলত মুজিবী আদর্শেরই বাস্তবায়ন। শেখ মুজিব নিজেকে গনতন্ত্রি বলে দাবী করতেন। কিন্তু সে গণতন্ত্রে অন্যদের প্রচার, দলগঠন ও  সভাসমিতি করার অধিকার ছিল না। তাদের উপর তিনি যে শুধু সরকারি পুলিশ বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছেন তা নয়, সরকারি বাহিনীর সাথে একযোগে কাজ করে দলীয় গুণ্ডা বাহিনীও। পুলিশের সাথে তারাও অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে রাজপথে নেমেছে। জনগণের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন একদলীয় বাকশালী সরকার গঠনের মাধ্যমে। তাঁর গণতন্ত্রে অন্যদের স্বাধীন ভাবে কথা বলা, লেখালেখি করা বা পত্রিকা বের করার অনুমতিও ছিল না। বন্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী মতের পত্রিকা। সে গণতন্ত্রে  স্বাধীন আদালত ও প্রশাসন বলে কিছু ছিল না। প্রশাসন দখল করতে তিনি প্রতি জেলায় নিজ-দলীয় ব্যক্তিদের গভর্নর রূপে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আদালত ও প্রশাসনকে ব্যবহার করেছেন দলীয় এজেণ্ডা বাস্তবায়নে। আদালত থেকে বিরোধী দলীয় নেতাদের জামিন পাওয়ার পথ বন্ধ করেছিলেন। তাঁর আমলে হাজার হাজার মানুষ বিনা বিচারে বছরের পর জেলে থেকেছেন, এবং আদালত অনেককে নিছক পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষ নেয়ায় দীর্ঘ কারাবাসের শাস্তি শুনিয়েছে। ইসলামের পক্ষ নেয়াও অপরাধ গণ্য হয়েছে।আর প্রকাশ্য রাজপথে ঘুরেছে আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের চিহ্নিত খুনিরা। আজও  আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আদর্শ ও গর্ব শেখ মুজিবের সে বাকশালী স্বৈরাচার নিয়েই। হিটলারের প্রতি শ্রদ্ধার অর্থ তার ফ্যাসীবাদের প্রতি শ্রদ্ধা, তখন হিটলারের ভক্তদের রাজনীতি পরিনত হয় অন্যদের উপর নির্যাতন ও নির্মূলের হাতিয়ার রূপে। নিষ্ঠুর অপরাধীদের হাতে তখন অধিকৃত হয় পুলিশ, প্রশাসন,আদালত ও মিডিয়া। তখন লক্ষ লক্ষ্ ইহুদীর নির্মূল এবং বিরোধী রাজনীতি নিষিদ্ধকরণও তখন উৎসবযোগ্য গণ্য হয়। ফলে শেখ মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধার সাথে বাকশালী স্বৈরাচার,অপরাধীদের শাসন ও বিরোধী কর্মীদের উপর নির্যাতন ও হত্যা নেমে না আসলে সেটি মুজিবী আদর্শ হয় কি করে? মুজিবের ভক্ত হওয়ার জন্য মুজিবের ন্যায় শুধু পোষাক পড়ল চলে না, বিরোধীদের নির্মূলে ও তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে তার ন্যায় অপরাধীও হতে হয়। বাংলাদেশে আজ যে মুজিবী আদর্শের অনুসারিদের শাসন -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে?

মুজিবী আদর্শের অনুসরণ বাড়বে অথচ অপরাধ বাড়বে না তা কি হয়?  সুন্দর মোড়কে মেকী জিনিষও মানুষের কাছে সহজে গছানো যায়। মুজিবের ন্যায় একজন অপরাধীর গায়ে “জাতির পিতা” ও “বঙ্গবন্ধু”র মোড়ক লাগানো হয়েছে সে একই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে। এটে আওয়ামী লীগের দলীয় স্ট্রাটেজী যা তারা বাংলাদেশের মানুষের ঘাড়ে চাপাতে সমর্থ হয়েছে। শেখ মুজিবকে “জাতির পিতা” ও “বঙ্গবন্ধু” করে তারা মুজিবের স্বৈরাচারি আদর্শকেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে সমর্থ হয়েছে। হিটলারকে নেতা রূপে কবুল করার কারণে তার নিষ্ঠুরতাও তাই কোটি কোটি জার্মানীর সমর্থণ পেয়েছিল। একই কারণে মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার যত অমানবিকই হোক বাংলাদেশে সেটিও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ফলে নির্বাচনে তাদের বিপুল বিজয়ও ঘটে। এবং সেটি তাঁকে “জাতির পিতা” ও “বঙ্গবন্ধু”র খেতাব দিয়ে জনগণের সামনে পেশ করার কারণে।

 

মূল লড়াইটি চেতনার মানচিত্রে

বাংলাদেশের বিপদ শুধু অপরাধীদের শাসন নয়, বরং বড় বিপদটি হলো বিপুল সংখ্যক মানুষের চেতনায় সে অপরাধীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। চেতনার এ এক ভয়ানক অসুস্থতা। এমন অসুস্থ্যতার কারণেই একজন মানুষ মানবতার ভয়ানক শত্রু ও প্রতিষ্ঠিত অপরাধীকেও “বন্ধু” বলতে পারে,এবং পুত্র না হয়েও তাকে “পিতা” বলে ভক্তি দেখাতে পারে। মুর্তিপুজা, লিঙ্গপুজা, গরুপুজা ও স্বর্পপুজা যত সনাতন অজ্ঞতা বা পাপাচারই হোক, দক্ষিণ এশিয়ার বুকে সে অজ্ঞতা বা পাপাচার নিয়ে কোটি কোটি মানুষ বেঁচে আছে –তা তো সে কারণেই। কোন ব্যক্তি যখন গরু,স্বর্প, মুর্তি ও লিঙ্গকে পুজা করে -তখন কি বুঝতে বাঁকি সে মানুষটির বিবেক বা চেতনা কতটা অসুস্থ্য? এমন গুরুতর অসুস্থ্যতা নিয়ে কি সে মানুষটি মহান আল্লাহতায়ার অস্তিত্বে বিশ্বাসী হতে পারে? সে কি ন্যায় ও সত্যের পক্ষ নিতে পারে? ইসলাম যত শ্রেষ্ঠই হোক তা কি এমন বিবেকশূণ্যদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়? পবিত্র কোরআনে এমন অসুস্থ্য বিবেকের মানুষদের মহান আল্লাহতায়ালা গবাদী পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। গরুও আরেক গরুকে এবং স্বর্প আরেক  স্বর্পকে বা মুর্তিকে পুঁজা করে না। মানুষের বিবেক ও চেতনার মান পশু থেকেও যে কতটা নীচে নামতে পারে এ হলো তার নমুনা। হিটলারের মত অপরাধীরো ভোট পায় এবং ফিরাউনেরা ভগবান রূপে গণ্য হয়তো সে অসুস্থ্যতার কারণেই। মুজিবের ন্যায় স্বৈরাচারি অপরাধীকে যে মানুষটি “বন্ধু” ও “পিতা” বলে সম্মান দেখায়,এবং তাঁর আদর্শের প্রতিষ্ঠায় রাজনীতিতে নামে,তখন কি বুঝতে থাকে তার বিবেকের অসুস্থ্যতা কত প্রকট? এমন মানুষ যাত্রী ভর্তি বাসে আগুণ দিবে বা লগি বৈঠা নিয়ে রাজপথে মুসল্লিদের হত্যায় নামবে তাতে আর আশ্চর্যের কি আছে?

হিটলারের মৃত্যু হয়েছে,সে সাথে ফ্যাসবাদও জার্মানীতে কবরস্থ হয়েছে। হিটলারের ন্যায় অপরাধী সে দেশে আর সম্মান পায় না, বরং ঘরে ঘরে ধিকৃত হয়। এর ফলে বিদায় নিয়েছে তার অনুসারিদের শাসনও। কিন্তু বাংলাদেশে তেমনটি ঘটেনি। শেখ মুজিব বিদায় নিলেও তার স্বৈরাচারি দর্শন ও রাজনীতি আজও  বেঁচে আছে। বরং তাঁর অনুসারিদের হাতেই দেশ আজ  অধিকৃত। এর ফলে বেঁচে আছে আওয়ামী অপরাধীদের শাসনও। দেশের মূল পরাধীনতা তো এখানেই। ফলে দেশকে যারা অপরাধমূক্ত এবং সে সাথে পরাধীনতামূক্ত দেখতে চায় তাদের সামনে লড়াই শুধু রাজনৈতীক নয়, বরং মূল লড়াইটি আদর্শিক। লড়াইটি হতে হবে চেতনার মানচিত্রে। জনগণের মগজে বাড়াতে হবে মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচারকে ঘৃনা করার সামর্থ্য। তখন আওয়ামী অপরাধীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জনগণ পাবে ইম্যুউনিটি বা প্রতিরোধের ক্ষমতা। “বঙ্গবন্ধু” বা “জাতির পিতা” বলে গণতন্ত্রের দুষমনকে সম্মান দেখালে চেতনায় সে মূক্তি ঘটে না, বরং ভয়ানক ভাবে বাড়ে অপরাধীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও অধীনতা।মানুষের কথার মধ্য দিয়ে তার ঈমান কথা বলে। আল্লাহর উপর ঈমান এ অনুমতি দেয় না, যে ব্যক্তি ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখতে সকল ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করলো,কোরআনের শিক্ষাকে সংকুচিত করলো এবং মানবিক অধিকারকে সংকুচিত করলো তাকে সে “দেশের বন্ধু” বা “জাতির পিতা” রূপে মেনে নিবে।  সে তো বরং এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়াইকে জিহাদ রূপে গণ্য করবে। ইসলামের জিহাদ শুধু কাফেরদের বিরুদ্ধে নয়, বরং সর্বপ্রকার অপরাধীদের বিরুদ্ধেও। কোরআনে বর্নিত “ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের উৎখ্যাত” হলো সে জিহাদের মূল কথা। মুসলমান হওয়ার এ এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা। ১৬ কোটি মুসলমানের দেশে সে জিহাদ যে হয়নি তার প্রমাণ হলো অপরাধীদের এ শাসন। তাই এ ব্যর্থতা নিছক কোন ব্যক্তি বা দলের নয়, সেটি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলমানের।  ০৬/০১/২০১২

 

 

 




কোরবানীর চামড়া নিয়ে ষড়যন্ত্র

জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠা সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং প্রকল্পগুলি বহুমুখী। এ প্রকল্পগুলির মূল ভূমি হলো দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি। এবং এ ষড়যন্ত্রের কর্মকৌশলও সুদূর প্রসারি। তারা জানে, পবিত্র কোর’আন থেকে দূরে রাখা সম্ভব হলে সম্ভব হয় মুসলিম সন্তানদের ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠাকে অসম্ভব করা। ইসলামের শত্রুপক্ষ কখনোই চায় না, জনগণ এবং তাদের সন্তানেরা ইসলামী জ্ঞানসমৃদ্ধ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠুক। বরং চায়, তারা ইসলামে অজ্ঞ এবং অঙ্গিকারশূণ্য হোক। তাদের কাছে সে অঙ্গিকারশূণ্যতাই হলো সেক্যুলারিজম। সেজন্যই তাদের টার্গেট, যেসব প্রতিষ্ঠান জনগণের মাঝে ইসলাম বাঁচিয়ে রাখায় লিপ্ত –সেগুলির নির্মূল। এজন্য তাদের নজরে পড়েছে দেশের মাদ্রাসা ও ইয়াতিম খানাগুলি। এগুলিকে তারা বলে তাদের শত্রু তথা জঙ্গি উৎপাদনের কারখানা। দেশে বহুলক্ষ সেক্যুলার স্কুল-কলেজ চলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের রাজস্বের অর্থে। কিন্তু সে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে প্রতিবছর বহু লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী বেরিয়ে আসছে পবিত্র কোর’আন পাঠের সামর্থ্য অর্জন না করেই। কোর’আনের একটি আয়াতের অর্থও তাদের শেখানো হয়না। অথচ ইসলামে শিক্ষার নামে যা প্রতিটি নর-নারীর উপর ফরজ -তা হলো পবিত্র কোর’আন থেকে শিক্ষালাভ। বাংলাদেশের স্কুল কলেজে সেটি না হওয়ায় শিক্ষালাভের নামে যা হচ্ছে তা হলো গণহারে হচ্ছে বিবেক হত্যা এবং ঈমান হত্যা। সে ঈমান হত্যা বাড়াতে এখন স্কুলের ছাত্রীদের হাফপ্যান্ট পড়িয়ে ফুট বল খেলায় নামানো হচ্ছে। এবং মাদ্রাসাগুতো পৌত্তলিক রবিন্দ্রনাথের শিরকপূর্ণ গান গাইতে বাধ্য করা হচ্ছে।

পৌত্তলিকতা বাঁচাতে যেমন লক্ষ লক্ষ মন্দির চাই, তেমনি ইসলাম বিনাশী সেক্যুলারিজম বাঁচাতে চাই ইসলাম-মূক্ত লক্ষ লক্ষ সেক্যুলার স্কুল-কলেজ। বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষ তাই স্কুল-কলেজের সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রচন্ড খুশি। কারণ, তাতে সরকারের প্রশাসনিক ও সেনা বাহিনীতে জুটছে বিপুল সংখ্যায় চোর-ডাকাত, খুনি এবং অতি অপরাধপ্রবন চাকর-বাকর। এর ফলে সহজ হয় যেমন ভোট ডাকাতির নির্বাচন, তেমনি সহজ হয় শাপলা চত্ত্বরের ন্যায় গণহত্যা। এবং তাতে আদালত পাচ্ছে রাজনৈতিক বিরোধীদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করার জন্য বিশাল বিচারক বাহিনী। বাংলাদেশে অতীতে ৫ বার দুর্নীতি বিশ্বে প্রথম হয়েছে এবং ২০১৮ সালে ভোটশূণ্য নির্বাচন হয়েছে তো দেশের রাজনীতি, বিচার-ব্যবস্থা, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে এরূপ বিপুল সংখ্যক দুর্বৃত্ত থাকার কারণেই।    

এবতেদায়ী মাদ্রাসার ছাত্র কমাতে সেক্যুলারিষ্টদের এতদিনের স্ট্রাটেজী ছিল মাদ্রাসার পাশে ব্রাক স্কুলের ন্যায় ফ্রি সেক্যুলার স্কুলের প্রতিষ্ঠা দেয়া। লক্ষ্য ছিল, শিক্ষার নাম ভাঙ্গিয়ে গরীব ঘরের কোমলমতি ছাত্রদের নাচগান শিখিয়ে ইসলাম এবং জীবনের মূল মিশন থেকে দূরে রাখা। কিন্তু তাতে মকতব-মাদ্রাসাগুলির ছাত্র বিপুল সংখ্যায় কমলেও সেগুলি নির্মূল হয়নি। সে ফলাফলকে সামনে রেখে এখন তাদের স্ট্রাটেজিটি হলো আরো আত্মঘাতি ও ষড়যন্ত্রমূলক। তার হাত দিয়েছে এগুলির অর্থনীতিতে।

কোন প্রতিষ্ঠানই নিজস্ব উপার্জন বা অর্থনীতি ছাড়া বাঁচে না। এতিমখানা ও মাদ্রাসার ন্যায় প্রতিষ্ঠানগুলি বাঁচানোর জন্য রয়েছে মহান আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রকল্প। চরম ইসলামবিরোধী ও ভারতসেবী বুদ্ধিজীবী ড. আবুল বারাকাতের মতে সে অর্থনীতিটি বিশাল এবং সেটি বহু হাজার কোটি টাকার। সে অর্থনীতির মূল উৎসটি হলো যাকাত-ফিতরা, সাদাকা এবং কোরবানীর পশুর চামড়া বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ। ইসলামের শত্রু পক্ষ ইসলামকে জীবিত রাখার সে অর্থনীতিতে হাত দিতে চায়। সে অর্থনীতিকে বিনাশ করতেই শেখ হাসিনার সরকার ইসলামী ব্যাংককে নিজ হাতে নিয়েছে। ইসলামী ব্যাংক ছিল দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক; এবং অর্থায়ন করতো বহু সেবামূলক ইসলামী প্রকল্পকে। এখন নিয়ন্ত্রনে নিতে চায়, কোরবানীর পশুর হাট, পশু জবাইয়ের ভুমি এবং চামড়ার বেচা-বিক্রির ব্যবস্থাপণা। এভাবে বন্ধ করতে চায় স্বাচ্ছন্দে কোরবানীর কাজকে। সরকারের সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ময়দানে নেমেছে সরকারপুষ্ট, নীতিশূণ্য ও অর্থলোভী সিন্ডিকেট মাফিয়াদের মাধ্যমে। এমন কি ব্যাংকগুলোও এবারে বাজারে অর্থ ছাড়েনি যাতে আড়তের ক্রেতাগণ ন্যায্য মূল্যে কোরবানীর চামড়া কিনতে পারে।       

বিভিন্ন এনজিও এতকাল প্রচার চালিয়েছে পশু কোরবানীতে বিশাল সংখ্যায় পশু নিধন হয়। কোন কোন হিন্দু সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবী উঠেছে, ভারতের ন্যায় বাংলাদেশেও গরু কোরবানী নিষিদ্ধ হোক। লক্ষণীয় হলো, প্রতিদিন ১০ লাখ পশু হত্যা হয় ম্যাকডোনাল্ড, কেএফসি, বার্গার কিং’য়ের ন্যায় ফাস্টফুডের দোকানগুলির ধনি ও সচ্ছল ক্রেতাদের পেট পুরতে। (সূত্রঃ বিল গেটসের সাম্প্রতিক বক্তব্য)। কিন্তু সে পশু হত্যার বিরুদ্ধে এসব এনজিও এবং হিন্দু সংগঠনগুলি কথা বলে না। অথচ তারা সোচ্চার পশু কোরবানীর বিরুদ্ধে। অথচ এটি মহান আল্লাহতায়ালার বিধান। কোন মানুষ বা সরকারের ক্ষমতা নেই এ বিধান উল্টানোর। তাছাড়া কোরবানীর গোশতের বেশীর ভাগ বিতরণ করা হয় গরীবদের মাঝে। এবং চামড়াগুলি যায় এতিম খানা এবং মাদ্রাসাগুলি বাঁচিয়ে রাখতে। ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র বস্তুতঃ এ কারণেই। তাদের উদ্দেশ্য পশু বাঁচানো নয়; বরং দেশের বহু লক্ষ ইসলামী প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি। সে লক্ষ্যেই তারা বিনাশ করতে চায়, যাকাত-ফিতরা, সাদাকা এবং পশুকোরবানী ভিত্তিক ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের অর্থনীতিকে।       

ইসলামের শত্রুদের কথায় বাংলাদেশের মানুষ কোরবানী বন্ধ করেনি। তবে তাদের পশু কোরবানী বন্ধ করার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলেও এবার তারা সফল হয়েছে অন্য ভাবে। তারা বিপুল ভাবে কমাতে পেরেছে, এতিম খানা ও মাদ্রাসার জন্য প্রাপ্য কোরবানীর চামড়ার অর্থ। পত্রিকায় প্রকাশ, ২০১৯ সালের ঈদুল আযহাতে বাংলাদেশে ৮০ লাখ থেকে প্রায় এক কোটি পশু কোরবানী হওয়ার কথা। (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ৫.৮.২০১৯)। কোরবানীর পশুর মধ্যে থাকে ছাগল, ভেড়া ও গরু। তবে কতগুলি গরু এবং কতগুলি ছাগল বা ভেড়া কোরবানী হয় -সে বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন। ছাগল ও ভেড়ার চামড়া প্রতিটি গড়ে ৩০০টি এবং গরুর চামড়া গড়ে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। গড়ে ৫০০ টাকা করে বিক্রি হলে এক কোটি পশু কোরবানীতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা অর্জিত হওয়ার কথা। এ অর্থের বেশীর ভাগ যায় দেশের এতিমখানা এবং সেগুলি সংলগ্ন মাদ্রাসাগুলোতে। কিন্তু এবার সে পরিমাণ অর্থ অর্জিত হয়নি। অন্য বছর যে চামড়া৩০০ বা ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, দেশের বহুস্থানে সে চামড়াটি ৫০ টাকাও পায়নি। খরিদদারের অভাবে মনের দুঃখে মানুষ পশুর চামড়া নালায় বা নদীতে ফেলেছ বা মাটিতে পুঁতেছে। দেশের সরকারি মহল এতবড় নাশকতা নিয়ে কোন উচ্চ বাচ্য নেই। নীরব দেশের সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী মহল ও মিডিয়াও। সম্ভবতঃ তারা মনে মনে প্রচন্ড খুশি একারণে যে, শত শত কোটি টাকার চামড়া পচলেও সেগুলি তাদের কথিত জঙ্গি তৈরীর কারখানা এতিম খানা ও মাদ্রাসায় যায়নি।

ঈদুল আযহার মওসুমে চামড়া যাতে সংরক্ষিত না করা যায় সে ষড়যন্ত্রে নেমেছে দেশের লবন উৎপাদনকারিগণ। তাদের সিন্ডিকেট লবনের দাম দ্বিগুণেরও বেশী হারে বাড়ায়। ঈদের পূর্বে ৭৪ কেজির এক বস্তা লবন বিক্রি হতো ৬০০ টাকায়, সেটির মূল্য  হয় ১,৩০০ থেকে ১,৪০০ টাকা। (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ৫.৮.২০১৯)। এরূপ বহুমুখী ষড়যন্ত্রে শুধু এতিম খানাগুলিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের চামড়া শিল্প এবং দেশের অর্থনীতি। যে পরিমান চামড়া মাটিতে পুঁতা হয়েছে -তা থেকে উপার্জিত হতে পারতো বিশাল অংকের বিদেশী মূদ্রা। দেশবিরোধী এবং ধর্মবিরোধী নাশকতায় দেশের ইসলাম বিরোধী দুর্বৃত্তগণ যে কতটা আত্মঘাতি হতে পারে -এ হলো তারই নমুনা। ২৬.০৮.২০১৯  




বাংলাদেশের পরাধীনতা

কাকে স্বাধীনতা বলে এবং কাকে পরাধীনতা বলে -কোন কালেই সেটি কোন জটিল বিষয় ছিল না। আজও নয়। আলো ও আঁধারকে চিনতে বেশী বিদ্যাবুদ্ধি লাগে না; এমনকি নিরক্ষরও সেটি বুঝে। বিষয়টি তেমনি সহজ স্বাধীনতা ও পরাধীনতা চেনা নিয়েও। উভয়েরই সুনির্দিষ্ট এবং সর্বজন স্বীকৃত সংজ্ঞা বা আলামত আছে। স্বাধীনতার অর্থ মূলতঃ জনগণের স্বাধীনতা; সেটি যেমন সরকার নির্বাচনের স্বাধীনতা, তেমনি সরকার পরিচালনা এবং সরকারের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা। এখানে সরকার বাচে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে। স্বাধীনতার অর্থ কখনোই সরকারের স্বাধীনতা নয়। এমন স্বাধীনতা এক কালে অধিকৃত দেশের জনগণের উপর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী শক্তির ছিল। তাই বাস্তবতা হলো, সরকার স্বাধীনতা পেলে বিলুপ্তি ঘটে জনগণের স্বাধীনতার। বস্তুতঃ স্বাধীন দেশের পরিচয়টি হলো, সেখানে সরকার কাজ করে জনগণের প্রতিনিধি রূপে; স্বেচ্ছাচারি প্রভু রূপে নয়।

জনগণের স্বাধীনতার অর্থঃ নিজের ভাগ্য, নিজের পেশা, নিজের ধর্মপালন, নিজের রাজনীতি এবং নিজের শিক্ষা-সংস্কৃতি নিজে নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা। সে স্বাধীনতা কখনোই কোন পরাধীন দেশের নাগরিকদের থাকে না। সেখান স্বাধীনতা থাকে একমাত্র শাসকদের। তারা যেমন যাকে ইচ্ছা তাকে ফাঁসিতে ঝুলাতে পারে, তেমনি জেলেও তুলতে পারে। গুমও করে দিতে পারে। এরা স্রেফ জাতির নেতা বা পিতা রূপে নয়, ভগবান রূপেও হাজির হতে পারে –যেমনটি হয়েছিল ফিরাউন। তারা সীমিত করতে পারে ধর্মপালন এবং নিষিদ্ধ করে দিতে পারে কোর’আনের তাফসির, ওয়াজ মাহফিল এবং জিহাদ বিষয়ক বই পাঠের ন্যায় বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমন পরাধীনতার কারণেই মুসলিম দেশে সম্ভব হচ্ছে না শরিয়ত পালনের ন্যায় অতি ফরজ বিষয়।

পরাধীন দেশগুলির বড় আলামত হলো, সেখানে সরকার গঠনে জনগণের ভোটের দরকার হয় না। নির্বাচিত না হ্‌ওয়ায় জনগণের প্রতি সরকারের কোনরূপ দায়বদ্ধতাও থাকে না। তখন দেশ পরিণত হয় শাসকের নিজের মালিকাধীন বংশীয় তালুকে। নিজে মারা গেলে উত্তরাধীকার সূত্রে দেশের মালিক হয় তার সন্তানেরা। সে সূত্র ধরেই শেখ হাসিনার সন্তানেরা তাই এখন থেকেই দেশের শাসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এমন দেশে জনগণের পরাধীনতা বাঁচাতে প্রয়োজন পড়ে কেবল অস্ত্রের এবং সে সাথে অস্ত্রধারি অনুগত পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর। প্রয়োজন পড়ে অনুগত বিচারক বাহিনীর। বস্তুতঃ এরূপ পরাধীন দেশগুলিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী, প্রশাসন, মিডিয়া এবং আদালতের বিচারকগণ পরিণত হয় সরকারের অনুগত চাকর-বাকরে। এবং জনগণ পরিণত হয় নিরেট জিম্মিতে। তখন দেশ পরিণত হয় এক বিশাল জেলখানায়। এবং প্রশাসনের কর্মচারিগণ পরিণত হয় সে জেলখানার পাহারাদারে।

অথচ যে কোন স্বাধীন দেশের পরিচয় হলো, সরকার সেখানে সর্বদা দায়বদ্ধ থাকে জনগণের অভিমত মেনে চলায়। জনগণ তাদের মতামত ব্যক্ত করে যেমন ভোটের মাধ্যমে, তেমনি কথা, লেখনি এবং রাজপথে মিটিং-মিছিলের মাধ্যমে। কিন্তু পরাধীন দেশে মত প্রকাশের সে স্বাধীনতা জনগণের থাকে না। এবং সে স্বাধীনতা না থাকাটাই পরাধীনতা। এমন পরাধীনতা সচারচর ঘটে বিদেশী শত্রুর হাতে দেশ অধিকৃত হলে –যেমনটি হয়েছিল ঔপনিবেশিক ইংরেজদের হাতে অধিকৃত হওয়াতে। তবে তেমন পরাধীনতা ভয়ংকর ভাবে নেমে আসতে পারে দেশী শত্রুদের হাতে দেশ অধিকৃত হলে। সেটি হয়, কোন স্বৈরাচারি ফ্যাসিস্ট শক্তি ক্ষমতায় গেলে। নিরেট বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে তেমনি এক পরাধীন দেশে। দেশের সংবিধান স্বাধীনতার কথা বলে। কিন্তু সেটি কেবল কাগজে-কলমে; বাস্তবে তার কোন আলামত নাই। দেশটিতে স্বাধীনতা আছে কেবল ক্ষমতাসীন সরকারের। এবং তাদের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করতে বিলুপ্তি ঘটেছে জনগণের স্বাধীনতার। স্বাধীন ভাবে বাঁচতে চাওয়াটি এদেশে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাতে বরং গুলির খাদ্য হতে হয়। এবং সেটি দেখা গেছে ২০১৩ সালে ৫ই মে’র রাতে শাপলা চত্ত্বরে। সে রাতে হিফাজতের ইসলামের কর্মীগণ সশস্ত্র বাহিনীর সেপাহীদের হাতে বিশাল সংখ্যায় লাশ হয়েছেন। এবং তাদের লাশ ময়লার গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে গায়েব করা হয়েছে। স্বাধীনতা না থাকায় দেশের স্কুল ছাত্র-ছাত্রীগণও শারিরীক নির্যাতনের মুখে পড়েছে নিরাপদ সড়কের দাবীতে রাস্তায় নেমে।           

একটি দেশের স্বাধীনতা ধরা পড়ে শুধু দেশটির স্বদেশ নীতিতে নয়, বিদেশ নীতিতেও। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরাধীনতাটি চোখে পড়ার মত। ভারতের প্রতি ১০০% নতজানু অধীনতা ধরা পড়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে। ভারতকে ১০০% হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর পরিকল্পনা নিয়ে নির্বাচন জিতেছে নরেন্দ্র মোদী এবং তার দল বিজেপী। সে দেশে কেড়ে নেয়া হচ্ছে ২০ কোটি মুসলিমের জানমাল ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচার  স্বাধীনতা। নরেন্দ্র মোদী ও তার দলের নেতাকর্মীদের এরূপ উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের হাসিনা সরকার কোন কথা বলেনা। কথা বলে না, যখন সে দেশের মুসলিমদের গরুর গোশতো খাওয়ার অভিযোগ এনে রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। প্রতিবাদ করেনা, যখন মাথা থেকে টুপি কেড়ে নিয়ে “জয় শ্রীরাম” বলতে বাধ্য করতে পিটানো হয়। বাংলাদেশ সরকার তখনও প্রতিবাদ করে না, যখন সে দেশে মসজিদ গুড়িয়ে দেয়া হয়। কাশ্মীরে চলছে লাগাতর গণহত্যা, ধর্ষিতা হচ্ছে মুসলিম নারী। কিন্তু হাসিনা সরকার এ জুলুমের বিরুদ্ধেও নিশ্চুপ। এটি কি কোন স্বাধীন সরকারে নীতি হতে পারে? তাতে কি প্রতিফলন ঘটে বাংলাদেশের জনগণের অভিমত? কথা হলো, ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এরূপ হত্যা, ধর্ষণ ও জুলুম দেখেও যে প্রধানমন্ত্রী নীরব থাকে -তাকে কি আদৌ মুসলিম বলা যায়? ভারতের প্রতি নতজানু রাজনীতির এর চেয়ে নগ্নচরিত্র আর কি হতে পারে? কথা হলো, সামান্যতম ঈমান ও আত্মসম্মান আছে -এমন জনগণ কি কখনো বিদেশী শক্তির প্রতি নতজানু এরূপ গোলামদের শাসক রূপে মেনে নেয়?

সরকারের স্বাধীনতা দিয়ে যে দেশ ও দেশবাসীর স্বাধীনতা নির্ণীত হয় না –বাংলাদেশ হলো তারই উদাহরণ। বাংলাদেশে আ্‌ওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। এ দলের নেতাকর্মীদের স্বাধীনতাটিও বিশাল। সে স্বাধীনতার প্রয়োগে তারা প্রচণ্ড স্বৈরাচারিও। যাকে ইচ্ছা তাকে যেমন তারা গ্রেফতার করে; তেমনি গুম, হত্যা এবং নির্যাতনও করে। তারা দেশের অর্থভাণ্ডার, ব্যাংক-বীমা, সরকারি জমি, বনসম্পদ এবং বিদেশ থেকে প্রাপ্ত লোনের অর্থের উপর প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের নিরংকুশ দখলদারি। তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং জনগণের স্বাধীনতা ছিনতাই করছে জনগণের ভোট ছিনতাই করে। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত না হওয়ায় জনগণের প্রতি তাদের কোন দায়বদ্ধতাও নাই্। বরং তাদের দায়বদ্ধতা ভারতের ন্যায় প্রভু-শক্তির প্রতি। কারণ, ভারতই তাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ভারতের নেতৃবর্গ যেমন ভোট-ডাকাতিকে সমর্থণ দিয়েছে, তেমনি লাগাতর সমর্থণ দিচ্ছে স্বৈরাচারি এ ফ্যাসিষ্ট সরকারের আয়ু বাড়াতে। জনগণ যাতে তাদের অবৈধ ও ফ্যাসিবাদি শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নামতে না পারে -সে জন্যই ছিনিয়ে নিয়েছে মত-প্রকাশ এবং মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা। এরূপ পরাধীনতা নিয়ে বাঁচাকে কোন সভ্য মানুষ কি কখনো স্বাধীনতা বলতে পারে?

পরাধীনতার এরূপ নিরেট অসভ্যতা থেকে মুক্তি পেয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশ। মুক্তি পেয়েছে প্রতিবেশী নেপাল, শ্রীলংকা এবং পাকিস্তান। কিন্তু মুক্তি পায়নি বাংলাদেশ। বাংলাদেশীদের জন্য এর চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে? এ অপমান কি দুবৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার শিরোপা পাওয়া বা আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ভিক্ষার ঝুলি হওয়ার চেয়ে কম? শুধু আজ নয়, আজ থেকে বহু শত বছর পরও এ ভূখণ্ডের নতুন প্রজন্ম প্রশ্ন তুলবে এবং সে সাথে অপমান বোধ করবে আজকের বাঙালীদেশীদের সভ্য ও স্বাধীন রূপে বেড়ে উঠার এ নিদারুন ব্যর্থতা দেখে। ২৬.০৮.২০১৯




ভারতে অসভ্য শাসন এবং বিপন্ন মুসলিম

অসভ্যতায় নতুন মাত্রা 

ভারতে শাপ পূজা,গরু পূজা, লিঙ্গ পুজার ন্যায় বহু অসভ্যতা বেঁচে আছে বহু হাজার যাবত। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর সে অসভ্যতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাতে যোগ হয়েছে চরম নৃশংস। অসভ্যতার এরূপ তান্ডব এমন কি হিংস্র পশুদের জগতেও দেখা যায় না। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা এক শ্রেণীর কাফেরদের গবাদী পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট্ বলেছেন। সেটিরই প্রমাণ মিলছে ভারতে মানবরূপী সে নৃশংস অসভ্যদের শাসনে। বনজঙ্গলে গণহত্যা ও গণধর্ষণ যেমন হয়না, তেমনি তা নিয়ে উৎসবও হয় না। কাউকে আগুণে ফেলে হত্যার ন্যায় বীভৎসতাও হয় না। কিন্তু ভারতে এরূপ সবকিছুই হচ্ছে।

দেশটি রক্তাত্ব যুদ্ধ চলছে মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে। চলমান এ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার দল বিজেপি। সাথে রয়েছে বিজেপির জন্মদাতা সংগঠন আর এস এস, এবং সে সাথে বজরং দল, বিশ্বহিন্দু পরিষদ ও শিবসেনাসহ অসংখ্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। রণমুর্তি ধারণ করেছে এমন কি সাধুসন্যাসীগণও। চলমান এ যুদ্ধের মূল অস্ত্রটি হলো মুসলিম বিরোধী তীব্র ঘৃণা। ঘৃণার বিষ মৃত্যু, ধর্ষণ ও নির্যাতন ডেকে আনে হাজার হাজার মুসলিমের জীবনে। সেটি যেমন বার বার দেখা গেছে গুজরাত, মুম্বাই, আসাম, মুজাফনগর, আগ্রা, মুরাদাবাদের ন্যায় নানা স্থানে, তেমনি তার প্রকট রূপটি দেখা যাচ্ছে কাশ্মীরে।

নরেন্দ্র মোদি এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীগণ যে হিন্দু ভারত নির্মাণ করতে চায় সেখানে মুসলিমদের জন্য কোন স্থান নেই। মুসলিমগণও স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচবে, শিক্ষা-দীক্ষা ও চাকুরি-বাকুরিতে অংশ নিবে বা চাষাবাদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য করবে -সেটি তাদের কাছে অসহ্য। নিরেট ফ্যাসিবাদের এর চেয়ে নিখুঁত টেক্সটবুক উদাহরণ আর কি হতে পারে? মুসলিমদের জন্য ভয়ানক বিপদের কারণ হলো এ ফ্যাসিস্টদের হাতেই অধিকৃত হয়েছে  আধুনিক ভারতের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, পুলিশ বিভাগ, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ও মিডিয়া। এদের দাপটে এমন কি হিন্দু মানাবাধিকার কর্মীগণও মুখ খুলতে পারছে না। ফলে মুসলিম বিরোধী বিষাক্ত ঘৃণার লাগামহীন প্রকাশ ঘটছে লাগাতর মুসলিম গণনিধন, নারীধর্ষণ এবং মুসলিমদের ঘরবাড়ী ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে।

তবে বিপদ যে শুধু ভারতীয় মুসলিমদের –তা নয়। ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়া-বাহী মশা সীমান্ত মানে না। তেমনি সীমান্ত মানে না ফ্যাসিবাদী চেতনাও। হিটলারের আমলে মানবতাবিধ্বংসী এ হিংস্র মতবাদটি তাই শুধু জার্মানী ও ইতালীতে সীমিত থাকেনি, প্রায় সমগ্র ইউরোপকে গ্রাস করেছিল। একই অবস্থা হতে যাচ্ছে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতেও। ফলে ফ্যাসিবাদের নৃশংসতা শুধু গুজরাতে সীমিত নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র ভারতে। ছড়িয়ে পড়েছে এমন কি পাশ্ববর্তী শ্রীলংকা এবং মায়ানমারে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, গণধর্ষণ এবং ঘরবাড়ী জ্বালানোর তান্ডব শুরু হয়েছে এ দু’টি বৌদ্ধ-অধ্যুষিত দেশেও। নির্ভেজাল ফ্যাসিবাদ বলতে যা বুঝায় -তা ইতিমধ্যেই চেপে বসেছে বাংলাদেশেও। ফলে দেশটিতে চালু হয়েছে গুম, খুন ও বিচার বহির্ভুত হত্যার সরকারি রাজনীতি। লাঠিয়াল রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশের পুলিশ, সেনাবাহিনী, RAB, আত্মসমর্পিত আদালত এবং শাসক দলের দলীয় গুন্ডা বাহিনী। বিলুপ্ত করা হয়েছে মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা ও  নিরপেক্ষ নির্বাচন।  

 

অসভ্যতা যেখানে রাজনীতির হাতিয়ার

কাশ্মীরে ইতিমধ্যেই এক লাখের অধিক মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষিতা হয়েছে হাজার হাজার নারী। বহু হাজার বৃদ্ধ, যুবক, মহিলা ও শিশু হয়েছে আহত, অন্ধ ও পঙ্গু। মুসলিম হত্যা ও নারী ধর্ষণের অভয় অরণ্য হলো এখন কাশ্মীর। সেখানে কোন অপরাধই –তা যত নৃশংসই হোক তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। নরেন্দ্র মোদি এখন কাশ্মীরীদের শায়েস্তা করতে সৈনিকের লেবাস পড়িয়ে হাজার হাজার বিজিপী ও আর এস এস গুন্ডাদের সেখানে পাঠাচ্ছে। লক্ষ্য, এ নৃশংস অসভ্যদের দিয়ে নিরস্ত্র কাশ্মীরীদের ঘরে ঘরে ঢুকে পিটানো এবং নারীধর্ষণের অসভ্যতাকে ব্যাপকতর করা। এভাবে সে বাস্তবায়ীত হচ্ছে মোদির আবিস্কৃত মুসলিম গণহত্যা ও গণধর্ষণের গুজরাতি মডেল। ফ্যাসিবাদী নেতাগণ দলীয় গুন্ডাদের জন্য এভাবেই খুলে দেয় অপরাধের ফ্লাড গেট। একই কারণে বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে এবং শেখ হাসিনার অনুসারি ছাত্রলীগের কর্মীর দ্বারা জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসব হয়েছে। 

লক্ষণীয় হলো, কাশ্মীরে বা ভারতে মুসলিম-নির্মূল ও ধর্ষণের অসভ্যতা যতই নৃশংসতর হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা ততই তুঙ্গে উঠছে। হিন্দুরা পূজণীয় চরিত্র খোঁজে বিষাক্ত স্বর্প ও শিবের রণমুর্তির মাঝে। চেতনায় বিষপূর্ণ ফ্যাসিবাদি মোদী এজন্যই তাদের কাছে এতো প্রিয়। ২০০২ সালে গুজরাতে তার নেতৃত্বে যে গণহত্যা হয়েছিল তাতে বিশ্বব্যাপী মোদির বিরুদ্ধে ধিক্কার উঠেছিল। এমন কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারও সেদেশে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু তাতে মোদি থামেনি। কারণ, তার জানা ছিল হিন্দু ভোটারের চেতনায় অসভ্যতার মান। সে জানতো নির্বাচনে ভোট বাড়াতে হলে চাই মুসলিম নির্মূলের নৃশংসতা। চাই বিপুল সংখ্যায় মুসলিম নারী ধর্ষণ। তাই গুজরাতে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসার সাথে সাথে তীব্রতর করে মুসলিম নিধন ও মুসলিম নারীধর্ষণের বীভৎসতা। সে নৃশংস অসভ্যতার স্মৃতি তাজা থাকতেই দেয় গুজরাতে নির্বাচন। ফলে যা তার প্রত্যাশা ছিল সেটিই হয়েছে। নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয় মোদি। এবং তার জনপ্রিয়তা শুধু গুজরাতে সীমিত থাকেনি; ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ভারতে। মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছে সে নৃশংস অসভ্যতার সিঁড়ি বয়েই। এ হলো তথাকথিত গণতান্ত্রিক ভারতের চিত্র।  

 

নরেন্দ্র মোদির সফল স্ট্রাটেজী

গুজরাতের পূর্ববর্তী মুখ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে নরেন্দ্র মোদীর মুখ্য মন্ত্রী হওয়ার পিছনে মূল কারণটি ছিল তার দানবীয়্ চরিত্র। ১৯৯২ সালে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার কাজে গুন্ডা সংগ্রহে তার ভূমিকাটি ছিল বিশাল। তার সে ভূমিকাই তাকে শুধু গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী করেনি, ভারতের প্রধানমন্ত্রীও করেছে। ২০১৪ সালের তূলনায় ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজিপির বিজয়টি ছিল আরো অবাক করার মত। ২০১৯ সালের বিজয়ের পিছনেও কাজ করেছে ৫ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে তার সরকারের মুসলিম বিরোধী নৃশংসতর নীতি। গরু রক্ষার নামে হিন্দু গুন্ডাদের ক্ষমতা দেয়া হয় পথে ঘাটে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যার। ফলে সে বর্বরতা রোধে মোদীর সরকার বোধগম্য কারণেই কোন উদ্যোগ নেয়নি।

নরেন্দর মোদী সরকার ও তার গুন্ডাদের নৃশংস বর্বরতার এক হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত হলো ২০১৭ সালের পহেলা এপ্রিল পেহলু খান হত্যাকান্ড। রাজস্থানের পেহলু খান ও তার দুই ছেলে হরিয়ানার গরুর হাট থেকে গরু কেনে ঘরে ফিরছিল। পথে উগ্রহিন্দুদের বাহিনী তাদের উপর হামলা করে। তারা যে হাট থেকে গরু কিনেছে তার বৈধ কাগজ দেখিয়েও নিষ্কৃতি মেলেনি। গুরুতর আহত পেহেলু খান হাসপাতালে মারা যান। কিন্তু খুনের বিচারে খুনিদের শাস্তি মেলেনি। ২০১৯ সালের ১৫ই আগস্ট ইন্ডিয়ার এক্সপ্রেস খবর ছাপে ৭ জন আসামীকেই আদালত মুক্তি দিয়েছে। যদিও পেহেলু খানের উকিল খুনের সাথে আসামীদের জড়িত থাকার প্রমাণ স্বরূপ ভিডিও চিত্র আদালতে পেশ করেছিল। গরুপূজারীদের হাতে মুসলিম নিহত হলে, পুলিশ ও আদালতের আগ্রহ নাই খুনিদের শাস্তি দেয়ায় –এ হলো বাস্তবতা। বরং পত্রিকায় প্রকাশ, পেহলু খান ও তার দুই ছেলেকে শাস্তি দিতে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কেস তুলেছে গরু পাচারের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে। এতে বুঝা যায়, মুসলিম নিধন-পাগল গুন্ডারা শুধু রাজপথই দখলে নেয়নি, শুধু প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আসনেই বসেনি, বরং নিজেদের দখলে নিয়েছে দেশের পুলিশ বিভাগ এবং আদালতও।      

ভারতে ভোট বৃদ্ধির আরেক মোক্ষম কৌশল হলো পাকিস্তান বিরোধী হুংকার দেয়া। সামনে ছিল ২০১৯ সালের নির্বাচন। তাই জনপ্রিয়তা বাড়াতে নরেন্দ্র মোদি শুধু রণ-হুংকারই দেয়নি, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলাও করে বসে। এতে দ্রুত তুঙ্গে উঠে মোদির জনপ্রিয়তা। তাছাড়া ২০১৯ সালের নির্বাচনে বেছে বেছে এমন সব যুদ্ধাংদেহীদের মনোনয়ন দেয়া হয় -যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে মুসলিম হত্যার ফৌজদারি মামলা। ভূপালের প্রাজ্ঞ ঠাকুর, গুজরাতের অমিত শাহ তো তারই উদাহরণ। হিটলারের ন্যায় নরেন্দ্র মোদিও হত্যাপাগল অপরাধীদের বিপুল সংখ্যায় রাজনীতির ড্রাইভিং সিটে বসিয়েছে। ফলে মুসলিম হত্যায় ভারত সরকারকে হিটলারের ন্যায় গ্যাস চেম্বার নির্মাণ করতে হচ্ছে না। বরং দেশের রাস্তাঘাট এবং জনপদগুলোই পরিণত হয়েছে গণহত্যা, গণধর্ষণ ও নির্যাতনের অভয় অরণ্যে। হিটলার জার্মানদের এতোটা অসভ্য ও নৃশংস করতে পারিনি। ফলে তাকে গ্যাস চেম্বার খুলতে  হয়েছে লোক চক্ষুর অন্তরালে। কিন্তু ভারতে এ নৃশংস অসভ্যতা নিয়ে লজ্জা-শরমের বালাই না।      

এতদিন বিজেপির ক্যাডারগণ মুসলিমদের হাতে গরু দেখলেই পিঠিয়ে মেরে ফেলতো। এরপর মাথা টুপি দেখলে তাদের মাথা থেকে টুপি কেড়ে নিয়ে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করতো। এখন হিন্দুদের হাতে পথে-ঘাটে লাঞ্ছিত বা মার খেয়ে মরার জন্য হাতে গরুর রশি বা মাথায় টুপি থাকার প্রয়োজন নাই, মুসলিম নাম হলেই যথেষ্ঠ। টিকিট কিনে ট্রেনে উঠে নিজের সিটটি ছেড়ে দিতে হয় মুসলিম যাত্রীদের। সে সাথে  গালিও খেতে হয়। তবে কাশ্মীরীদের বিরুদ্ধে বাড়তি রাগের কারণ, তারা ভারতে থাকার বিরোধী। তারা যোগ দিতে চায় পাকিস্তানে। ফলে তারা পরিণত হয়েছে হত্যা ও ধর্ষণ-পাগল গুন্ডাদের হাতে জিম্মি পাকিস্তানীতে।   

 

গুজরাতের নৃশংসতা

মুসলিমদের বিরুদ্ধে নরেন্দ্র মোদি ও তার দলীয় ক্যাডারদের ঘৃণা যে কতটি তীব্র -সেটি দেখা গেছে মোদির শাসনামলে গুজরাতে। সেখানে ধর্ষণ পরিণত হয়েছিল যুদ্ধাস্ত্রে। ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন তার নেতৃত্বে মুসলিম নিধন এবং মুসলিম নারীদের গণধর্ষণের উৎসব শুরু হয়। ২ হাজারের বেশী মুসলিমকে সেখানে হত্যা করা হয় -যার মধ্যে বহু নারী এবং শিশুও ছিল। ধর্ষিতা হয়েছে শত শত। সে বর্বরতার এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন প্রখ্যাত লেখিকা  অরুনদ্ধতি রায়। সোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল হ্‌ওয়া এক বক্তৃতায় তিনি তুলে ধরেন, কীরূপ বর্বরতার সাথে প্রাদেশিক পরিষদের একজন বিধায়ককে জীবন্ত আগুনে ফেলে হত্যা করা হয়। এহসান জাফরী নামক উক্ত বিধায়কের অপরাধ ছিল তিনি মুসলিম ছিলেন এবং তার ঘরে প্রাণ বাঁচাতে বহু মুসলিম নারী, শিশু, বৃদ্ধ আশ্রয় নিয়েছিল। আশ্রয়কারীরা ভেবেছিল, এহসান জাফরী যেহেতু বিধায়ক, তার গৃহে আশ্রয় নিলে প্রাণে বাঁচা যাবে। এহসান জাফরীর গৃহ হত্যাপাগল বিজিপির গুন্ডা ও ধর্ষনকারীদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে যায়। পরিস্থিতি গুরুতর দেখে তিনি অনেক সরকারি কর্মকর্তাকে ফোন করেন। ফোন করেন কংগ্রস-নেত্রী সোনিয়া গান্ধিকেও। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নিজে ঘর থেকে বের হয়ে তিনি ঘেরাওকারীদের বলেন, তোমরা আমার সাথে যা ইচ্ছা করতে চাও করো, কিন্তু যারা আমার ঘরে আশ্রয় নিয়েছে তাদের বাঁচতে দাও। কিন্তু এহসান জাফরীর সে আবেদনে কাজ হয়নি; হামলা হয়েছে তার গৃহে। আশ্রয় নেয়া শিশু, মহিলা এবং বৃদ্ধদের কাউকেই বাঁচতে দেয়া হয়নি। ঘরে ফিরতে দেয়া হয়নি এহসান জাফরীকেও, তার হাত পা কাটা হয়েছে এবং হত্যা করা হয়েছ জীবন্ত আগুনে ফেলে। এ হলো মোদি এবং তার কর্মীদের নৃশংস অসভ্যতার মান। এরূপ অসংখ্য নৃশংসতা  হয়েছে পুলিশের চোখের সামনে এবং চলেছে কয়েক সপ্তাহ ধরে। যেসব পুলিশ অফিসার বিবেকের তাড়নায় মুসলিম-নিধন ও ধর্ষণ থামাতে উদ্যোগী হয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ অন্যত্র বদলী করেছে। এ নরেন্দ্র মোদিকে শেখ হাসিনা নিয়মিত ভেট পাঠায় বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ পাঞ্জাবী আর আমের ঝুড়ি সাজিয়ে। খুনিরা কখনোই খুনের উস্তাদকে সমীহ করতে ভূল করেনা। তাই শাপলা চত্ত্বরের খুনি হাসিনা গুজরাতের খুনি মোদিকে উপঢৌকন পাঠাবে –সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? 

 

অসভ্যতা শুধু বিজিপির নয়

তবে ইতিহাসের আরেক সত্য হলো, মুসলিম হত্যার নৃশংস অসভ্যতা শুধু বিজেপী, আর এস এস, বজরং দল, বিশ্বহিন্দু পরিষদ বা শিবসেনাদের বিষয় নয়; সে অসভ্যতা কংগ্রেসী এবং বামপন্থি হিন্দুদেরও। ভারতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বড় মুসলিম গণহত্যাটি হয়েছে কংগ্রেসের শাসনমালে। সেটি ১৯৪৮ সালে, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জওহারলাল নেহেরু। সেটি ঘটেছিল মুসলিম শাসক নিযামের শাসনাধীন হায়দারাবাদকে ভারতভূক্ত করার সময়। কোন কোন তথ্য মতে মৃতের সংখ্যা ৫০ হাজার, অনেকের মতে এক লাখের বেশী।

এতবড় গণহত্যা ও গণধর্ষণের পরও কারো কোন বিচার হয়নি, শাস্তি হয়নি। কোন তদন্তও হয়নি। নিহত মশামাছিদের যেমন কেউ গণনা করে না, ভারত সরকারও তেমনি নিহতদের উপর কোন তথ্য সংগ্রহ করেনি। হত্যাকান্ডটি ঘটে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে। মুসলিম নারীদের উপর গণধর্ষণে নামানো হয় হিন্দু ও শিখ গুণ্ডাদের। ইতিহাসে এটি পরিচিত  ভারতের গোপন হত্যাকান্ড নামে। সে গণহত্যার মূল নায়ক ছিল ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উপপ্রধানমন্ত্রী আরেক গুজরাতি সর্দার বল্লব ভাই পাটেল। সে উগ্র সাম্প্রদায়িক খুনি পাটেল হলো বিজিপি বা আর এস এসের নেতাকর্মীদের কাছে অতি পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। ছিল কংগ্রেসেরও অন্যতম প্রধান কেন্দ্রীয় নেতা। আর এস এসের চেতনাধারীগণ শুধু বিজিপিতে নয়, কংগ্রসের মধ্যেও যে কতটা উচ্চাসনে স্থান পেয়েছে -এ হলো তারই নজির। সে খুনিকে সম্মানিত করতে গুজরাতে নির্মাণ করা হয়েছে ৬০০ ফুট লম্বা মুর্তি। সমগ্র পৃথিবীতে সর্বকালের এটিই হলো সবচেয়ে বড় মুর্তি।

অপর দিকে ১৯৮৩ সালের ১৮ই ফেব্রেয়ারীতে আসামের নওগাঁও জেলার নেলীতে বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে নৃশংস গণহত্যাটি ঘটেছিল -সেটিই হলো আসামের সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণহত্যা। সেটিও ঘটেছিল কংগ্রেসের শাসনামলে। তখন কেন্দ্রে ও আসামে –উভয় স্থলেই ছিল কংগ্রেসের সরকার। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিল ইন্দিরা গান্ধি। সে গণহত্যায় মৃতের সংখ্যা সরকারি ভাবে ২,১৯১ জন বলা হলেও বেসরকারি হিসাবে তা ছিল ১০ হাজারের উপর। ১৮ই ফেব্রেয়ারীর সকালে মুসলিম নির্মূলের উদ্দেশ্য নিয়ে স্থানীয় হিন্দুগণ পরিকল্পিত ভাবে হামলা করে ১৪টি গ্রামের উপর। নারী-শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কেউই রেহাই পায়নি। পশুদের মাঝে কেউ খুন বা ধর্ষিক হলে পশুসমাজে তা নিয়ে বিচার বসে না। মুসলিম নর-নারী খুন বা ধর্ষিতা ভারতের আদালতেও সেটি হয়। নরেন্দ্র মোদির পূর্বে কংগ্রেসও তেমনি এক নিরেট অসভ্যতা নামিয়ে এনেছিল যেমন হায়দারাবাদে, তেমনি আসামের নেলীতে।

তাই নেলীতে অতি নৃশংস গণহত্যার পরও তা নিয়ে আদালতে কোন বিচার বসেনি। কারো কোন শাস্তিও দেয়া হয়নি। সে সময় মুসলিমদের পক্ষ থেকে থানায় ৬৮৮টি হত্যা মামলা হয়েছিল, সরকার সবগুলো মামলাই খারিজ করে দেয়। এবং সেটি করা হয় গণহত্যর মূল আয়োজক চরম মুসলিম বিরোধী ছাত্র সংগঠন “অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন”র (AASU) উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতাদের তুষ্ট করতে। এবং ১৯৮৫ সালে সেটি করে আরেক কংগ্রেসী প্রধানমন্ত্রী এবং ইন্দিরার পুত্র রাজিব গান্ধি। ইন্দিরার আমলে তেওয়ারীর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়; ৬০০ পৃষ্টার একটি রিপোর্টও লেখা হয়। সে রিপোর্টের মাত্র তিনটি কপি রয়েছে; তবে কোনটিই আজ অবধি আলোর মুখ দেখেনি। সে রিপোর্টটি পরিকল্পিত ভাবে গোপন করা হয়েছে অপরাধীদের ভয়ানক অপরাধগুলিকে গোপন করার জন্য। এভাবে গণহত্যার নায়কগণই শুধু শাস্তি থেকে মুক্তি পায়নি, সরকারকে নিষ্কৃতি দেয়া হয়েছে সে গণহত্যার শিকার মুসলিম পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দায়বদ্ধতা থেকে। কোথাও মুসলিম বিরোধী গণহত্যা হলে তদন্তের নামে এরূপ কমিটি করা এবং সে কমিটির রিপোর্টকে গোপনা করাই হলো প্রতিটি সরকারের চিরাচরিত নীতি। সেটি যেমন কংগ্রেসের, তেমনি বিজিপির। বরং মুসলিম নির্মূলের লক্ষকে সামনে রেখে আসামের পরিস্থিতিকে এখন অন্যদিকে ঘোরানো হচ্ছে। আসামে চলমান গণহত্যাগুলি থেকে যেসব মুসলিম এতোদিন বেঁচে এসেছে এখন তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে ভারত থেকে তাড়ানোর ফন্দি করা হচ্ছে। তাদেরকে বাদ দেয়া হয়েছে ভারতীয় নাগরিকের তালিকা থেকে। এবং বহু আগেই বাদ দেয়া হয়েছে ভোটের তালিকা থেকে। এদের সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষ। বাংলাদেশ সরকার তাদের নিতে রাজী না তাদেরকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। তখন তাদের বাঁচতে হবে নাগরিকত্বহীন, ভোটাধিকারহীন, মানবাধিকারহীন পশুর জীবন নিয়ে। মায়ানমারের সরকার যা করেছে রোহিঙ্গাদের সাথে -ভারত সরকার অবিকল সেটিই করতে যাচ্ছে আসামের মুসলিমদের সাথে।   

অপরদিক বাবরি মসজিদে ভেঙ্গে মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার কাজটিও বিজিপি আমলে হয়নি, হয়েছে কংগ্রেসের শাসনামলে। তখন ভারতে কংগ্রেস দলীয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নরসিমা রাও। মসজিদ ভাঙ্গার কাজটি চলে সারাদিন ধরে। চলে প্রচণ্ড উৎসবভরে। সে সন্ত্রাসী ঘটনাটি সারা বিশ্বের মানুষ টিভিতে দেখেছে। দেখেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী পরিষদ সদস্য, লোকসভার সদস্য এবং প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্মকর্তাগণ।কিন্তু ঐতিহাসিক মসজিদ ধ্বংসের সন্ত্রাস থামাতে কেউই কোন উদ্যোগই নেয়নি। তাদের সবাই সে বর্বরতাটি নীরবে দেখেছে। এরূপ নৃশংসক অসভ্যতা কি কোন সভ্য দেশে আশা করা যায়? অথচ সেটিই হলো ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নীতিবোধ। কংগ্রেসের শাসনামলেই বহু হাজার শিখকে হত্যা করা হয় ইন্দিরা গান্ধি হত্যার প্রতিশোধ নিতে। সে হ্ত্যাকান্ডেরও কোন বিচার হয়নি। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা নিয়ে আন্দোলন বিজিপি নেতা আদভানি শুরু করলেও হিন্দুদের জন্য মসজিদের দরজা প্রথম খুলে দেয় রাজীব গান্ধি। এবং এতেই পরবর্তীতে উৎসাহ পায় বিজেপি নেতাকর্মীগণ।

 

যে অপরাধ বামপন্থিদের

বামপন্থিগণ নিজেদের অসাম্প্রদায়িক রূপে পরিচয় দেয়।  কিন্তু মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের কান্ড কি কম সাম্প্রদায়িক ও কম  হৃদয়বিদারক? পশ্চিম বাংলায় বাপফ্রন্ট ক্ষমতায় ছিল ৩৪ বছর। মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় শতকরা তিরিশ ভাগ হলেও পশ্চিম বাংলার সরকারি চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও নয়। সরকারের যেখানে খরচ সেখানেই আয়। সরকারি চাকুরিতে স্থান পেলে তাই জনগণের বঞ্চনা বাড়ে। পশ্চিম বাংলার মুসলিমদের এ বঞ্চনা গুজরাতের মুসলিমদের চেয়েও অধিক। এটি কি বামপন্থিদের অসাম্প্রদায়িক নীতির প্রকাশ? বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা শতকরা ৯ ভাগ; অথচ তাদের সংখ্যা চাকুরিতে শতকরা ২০ ভাগেরও বেশী। তাছাড়া বামপন্থিগণও যে কতটা সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন তার প্রমাণ তারা রেখেছে ২০১৯ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে। গত নির্বাচনে পার্লামেন্টের একটি আসনেও সিপিএম এবং তার শরীক বামপন্থিরা বিজয়ী হতে পারিনি। বামপন্থিদের ভোট পড়েছে বিজিপীকে বিজয়ী করতে। ফলে পশ্চিম বাংলায় বিজিপির আসন ২ থেকে বেড়ে ১৮তে উন্নীত হয়েছে।

ভারতে আরেক অন্যতম  প্রধান বামপন্থি সংগঠন হলো উত্তর প্রদেশের মুলায়াম সিং ইয়াদবের সমাজবাদী দল। এ দলটির হাতেও ক্ষমতা গিয়েছিল উত্তর প্রদেশে। এবং তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পিছনে ছিল উত্তর প্রদেশের প্রায় ২০% ভাগ মুসলিম ভোট। অথচ সে দলটির শাসনামলেই ২০১৩ সালে অতি নৃশংস মুসলিম গণহ্ত্যা ঘটে মুজাফ্ফর নগরে। প্রায় ২০০ জন মুসলিমকে হত্যা করা হয় এবং গৃহহীন করা হয় ৫০ হাজারকে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলে সে গণহত্যা। কিন্তু সে গণহত্যা থামাতে উত্তর প্রদেশের বামপন্থি সরকার কার্যকর কোন ভূমিকাই পালন করেনি। দাঙ্গা শেষে উদ্বাস্তুদেরকে তাদের নিজ ঘরে ফেরার নিরাপত্তাও দেয়নি। ফলে ৬ বছর পরও তাদের অধিকাংশই এখনো ক্যাম্পে উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছে। এ হলো ভারতীয় বামপন্থিদের মানবতার মান।       

 

গণহত্যা ও গণধর্ষণ কি অভ্যন্তরীণ বিষয়?

গণহত্যা, গণধর্ষণ বা গণনির্যাতন – এ অপরাধগুলির কোনটিই কোন দেশেরই অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। ভারতেরও নয়। এগুলি মানবতা বিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ। এগুলি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের এবং সে রাষ্ট্রের বুকে নিহত মানবতার সুস্পষ্ট আলামত। কোন অপরাধীই নিজের অপরাধ-প্রবনতাকে নিজের মধ্যে সীমিত রাখে না, বরং সমাজে হত্যা, ধর্ষণ ও চুরি-ডাকাতি নিয়ে বাঁচাই তার সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। এমন অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে অপরাধ কর্মের প্লাবন আসে রাষ্ট্র জুড়ে। তাই গণহত্যা, গণধর্ষণ বা গণনির্যাতন শধু কাশ্মীরে সীমিত নয়, সে বর্বরতা অতি বীভৎস রূপে ঘটছে গুজরাত, আসাম, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্রসহ সমগ্র ভারত জুড়ে। শুধু মুসলিমদের বিরুদ্ধে নয়, খৃষ্টান, আদিবাসী এবং নিম্ম বর্ণের দুর্বল মানুষদের বিরুদ্ধেও।

পাশের বাড়ীতে খুন, ধর্ষণ বা অগ্নিসংযোগ ঘটলে তা কখনোই সে গৃহের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। সেটি থামাতে প্রতিবেশীদের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে পড়ে। এবং সেটি রাষ্ট্রের ব্যাপারেও। তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সরকার যদি শেখ মুজিব বা শেখ হাসিনার ন্যায় নিজেরাই খুন-গুমের রাজনীতির ফ্যাসিবাদী দুর্বৃত্ত হয় তবে অন্য কথা। এরা তখন ফ্যাসিবাদকে তীব্রতর করতে প্রতিবেশী ফ্যাসিস্টদের কোয়ালিশন গড়ে। হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদীর মাঝে সেটিই হয়েছে। তাই বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদী হাসিনা যে নরেন্দ্র মোদীর ফ্যাসিবাদী নৃশংসতায় সর্বাত্মক সহায়তা দিবে –সেটি শুধু স্বাভাবিকই নয়, কাঙ্খিত বিষয়ও। তাই হাসিনার সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা, বাংলাদেশের জনগণ যাতে কাশ্মীরীদের প্রতি সমর্থণ জানাতে ভারতের বিরুদ্ধে মারমুখী না হয়।    

কোন দেশে গণহত্যা, গণধর্ষণ বা গণনির্যাতনের অপরাধগুলি ঘটায় সে দেশের ফাসিস্ট সরকার। সে অপরাধের শিকার হয় অসহায় দুর্বল জনগণ। ভারতে সে অসহায় জনগোষ্ঠি হলো মুসলিম জনগণ। এবং অপরাধী পক্ষটি হলো নরেন্দ্র মোদীর সরকার ও তার দল বিজিপি। সাথে রয়েছে আর এস এস, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরং দল ও শিব সেনাসহ সকল হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। যারা বিশ্বে শান্তি চায় তারা এমন একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের নিদারুন নৈতিক ব্যর্থতা ও নৃশংস বর্বরতা নিয়ে কখনোই নিশ্চুপ থাকতে পারেনা। নিশ্চুপ থাকলে এ নৃশংস অপরাধগুলি ঘটাতে বেপরোয়া হবে সে দেশের ভয়ংকর অপরাধীগণ। তখন সংঘটিত হবে ইতিহাসের অতি বর্বরতম গণহত্যা -যা নিকট অতীতে ঘটেছে রুয়ান্ডা ও বসনিয়াতে। তখন ভারত থেকে নির্মূল হবে সেদেশে ২০ কোটি মুসলিম।  

 

ঈমানের পরীক্ষা বাংলাদেশীদের

হত্যা, গুম, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার মজলুম মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোটি মুসলিম উম্মহর রাজনীতির বিষয় নয়, এটি দ্বীনি ফরজ তথা বাধ্যতামূলক। স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত আদায়ে ঈমান বাঁচে না; ঈমান বাঁচাতে দায়িত্ববান হতে হয়। মুসলিম উম্মাহ একটি দেহের ন্যায়। ফলে এক হাতে কেউ আঘাত হানলে অন্য হাত ত্বরিৎ বাধা দেয়। ফলে কোন মুসলিমের উপর হামলা হলে নিষ্ক্রীয় ও নীরব থাকাটি ঈমানদারী নয়। ফলে মজলুম কাশ্মীরীদের বাঁচাতে ময়দানে নামার দায়িত্বটি শুধু পাকিস্তানীদের নয়, বাংলাদেশীদেরও। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমদেরও। সে দায়িত্ব পালনে অবহেলার অর্থ বেঈমানী নিয়ে বাঁচা।

যে কোন যুদ্ধের তিনটি রূপ থাকে। এক) সামরিক; ২) অর্থনৈতিক; ৩) বুদ্ধিবৃত্তিক। বাংলাদেশের জনগণ অন্ততঃ অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। এ মুহুর্তে বাংলাদেশের নাগরিকদের উপর ফরজ হলো ভারতের পণ্য বর্জন করা। ভারতের পণ্য কেনার অর্থ হলো, মুসলিম হত্যায় ভারতকে যুদ্ধের রশদ সংগ্রহ এবং অস্ত্র নির্মাণে বা ক্রয়ে সাহায্য করা। অতএব এটি ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধ এবং ধর্মীয় ভাবে হারাম। এর অর্থ দাড়ায়, যে ব্যক্তি ভারতীয় পণ্য কিনবে সে বস্তুতঃ সরাসরি শরীক হবে সকল প্রকার ভারতীয় অপরাধের সাথে। এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে যত মুসলিম নিহত, ধর্ষিত বা নির্যাতিত হবে –ভারতীয় পণ্যের সে ক্রেতা জড়িত হবে সেসব অপরাধের সাথেও। ফলে কোন মুসলিম কি জেনে বুঝে ভারতীয় পণ্য কিনতে পারে?

বাংলাদেশের হাসিনা সরকারকে বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত করেনি। এ সরকার বস্তুতঃ ভারতের মদদপুষ্ট সরকার। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে আছে ভারত সরকার ও ভারতীয় গোয়েন্দাদের সহায়তা নিয়ে। ফলে ভারতে মুসলিমগণ যতই খুন, ধর্ষণ ও নির্মম অত্যাচারের মুখে পড়ুক না কেন, -যে কোন ভারতীয় গুণ্ডার ন্যায় হাসিনাও সেটিকে সমর্থন কররে। হাসিনার সরকার বরাবরই বলে আসছে কাশ্মীরে যা কিছু হচ্ছে তা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। অথচ কোন দেশে মুসলিমদের উপর হত্যা, ধর্ষণ বা অত্যাচার হলে তাদেরকে তা থেকে বাঁচানো প্রতিটি মুসলিমের কাছে তার ঈমানদারীর বিষয়ে পরিণত হয়। সেটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতিতে পরিণত হয় প্রতিটি মুসলিম দেশের। তাই যারা ভারতের দাস তারা চুপ থাকলেও কোন মুসলিমের কাছে সেরূপ আত্মসমর্পণের নীতি কি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে? কারণ ঈমানদারকে শুধু মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসুলের পক্ষে সাক্ষ্য দিলে চলে না, দাঁড়াতে হয় জালেমের বিরুদ্ধেও। ১৭/০৮/২০১৯

 




বাংলাদেশে অসভ্যদের শাসন ও বর্ধিষ্ণু কলংক

রাজত্ব অসভ্যদের

পৃথিবী পৃষ্টে প্রতি যুগে এবং প্রতি দেশে সভ্য ও অসভ্যদের উপস্থিতি ছিল। উভয়ের সুস্পষ্ট পরিচিতি এবং সংজ্ঞাও ছিল। সে মানদণ্ড নিয়েই প্রতি যুগে এবং প্রতি সমাজে কে সভ্য এবং কে অসভ্য -সে বিচারটি হয়। পশুরা অসভ্য ও ইতর। কারণ, আইন বা আইনের শাসন –এসব তারা কিছু বুঝে না। আইন থাকলেও তারা তা মানে না। সেখানে শাসন চলে যারা অধীক বলবান ও হিংস্রদের। ফলে যে পশুর দেহটি বিশাল, দাঁতগুলো ধারালো এবং নখরও দীর্ঘ -সে হয় ক্ষমতার মালিক। সিংহ তাই বনের রাজা। সে সমাজে দুর্বলেরা যেমন ক্ষমতাহীন, তেমনি নিরাপত্তাহীনও। অসভ্য বন্য জীবনে বাঁচার অধিকার, প্রতিবাদ ও ন্যায় বিচার লাভের অধিকার কারোই থাকে না। সে সমাজে দুর্বলরা বাঁচে সবলদের কৃপা নিয়ে এবং তাদের ক্ষুধা মেটাতে। এটিই জঙ্গলের রীতি ও অসভ্যতা। তেমন এক অসভ্য ও ইতর অবস্থা আধুনিক যুগেও যে কতটা বীভৎস রূপে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে –আজকের বাংলাদেশ হলো তারই উদাহরণ।

সভ্য সমাজে প্রত্যেকের যেমন বৈধ পিতা থাকে, তেমনি গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিটি সরকারের পিছনেও বৈধ ভোট থাকে। ফলে জারজ সন্তানের ন্যায় কোন জারজ সরকারের অস্তিত্ব কোন গণতান্ত্রিক দেশে ভাবা যায় না। সেটি অসভ্য স্বৈরাচারের প্রতীক। অথচ বাংলাদেশে সে অসভ্য স্বৈরাচারই চেপে বসেছে অতি নৃশংসতা নিয়ে। এবং সেটি ভোট-ডাকাত শেখ হাসিনার অবৈধ সরকারের নেতৃত্বে। ফলে দেশ ও দেশবাসীর ললাটে যোগ হয়েছে নতুন কলংক। অথচ সে কলংক প্রতিবেশী ভূটান বা নেপালের নেই। শ্রীলংকা ও পাকিস্তানেরও নাই। শেখ হাসিনা, তার দল আওয়ামী লীগের কাজ হয়েছে সে কলংককে শুধু স্থায়ী করা নয়, বরং সেটিকে দিন দিন আরো কুৎসিত করা। তবে আওয়ামী লীগের শাসনামলে  দেশের গায়ে এরূপ কলংকলেপন নতুন ঘটনা নয়। দলটির জন্ম থেকে এটিই তাদের লিগ্যাসি বা ঐতিহ্য। পাকিস্তান আমলেও সংসদের অভ্যন্তরে ডেপুটি স্পিকারকে তারা পিটিয়ে হত্যা করেছিল। শেখ মুজিবের হাতে সে কলংক বেড়েছিল শুধু গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা ও আইনের শাসন কবর দেয়াতে নয়, বরং দেশকে ভিক্ষার তলাহীন ঝুড়ি এবং ভারতের অধীনস্থ্য এক গোলাম রাষ্ট্র বানোনার মাধ্যমে।   

বাংলাদেশের বুকে অতি শক্তিহীন, অধিকারহীন ও অসহায় হ.লো দেশের জনগণ। তাদের হাতে যেমন অস্ত্র নেই, তেমনি পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসন এবং আইন-আদালতও নাই। প্রতিটি সভ্য সমাজে জান-মাল ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচার অধিকার যেমন থাকে, তেমনি থাকে ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার। সে অধিকার না থাকলে তাকে কি সভ্য সমাজ বলা যায়?  কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনটাই নাই। আদালতে রায় লেখা হয় -সরকার যা চায় সেদিকে খেয়াল রেখে। যেমন আব্দুল কাদের মোল্লার জেলের রায়কে ফাঁসির রায়ে পরিবর্তন করা হয়েছে সরকারি দলের চাপে। তবে বাংলাদেশে এরূপ অসভ্যতা কোন স্বল্পকালীন বিষয় নয়, বরং  প্রতিদিন এবং প্রতিক্ষণের বিষয়। বন্য পশু থেকে তার পশুত্বকে কখনোই আলাদা করা যায় না। তেমনি জালেম সরকার থেকে আলাদা করা যায় না তার অসভ্য অপসংস্কৃতিকে । জালেম শাসকের রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচার-আচার চলে বস্তুতঃ  সে অসভ্যতা নিয়েই।

তাই শেখ হাসিনা ও তার দলের অসভ্যতা শুধু ২০১৮ সালের ৩০’শে ডিসেম্বরের ভোট-ডাকাতি নয়। একাত্তরে লক্ষাধিক বিহারী হত্যা, হাজার হাজার রাজাকার হত্যা, মুজিবামলে ৩০ হাজার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যা, শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যা, চলন্ত বাসে আগুন দেয়া, লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথ রক্তাত্ব করা, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বিরোধীদলীয় নেতাদের হত্যা এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীর বাসার সামনে বালির ট্রাক দিয়ে ঘেরাও করার বিষয়ও নয়। বরং সেটি হলো আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের প্রতিদিন ও প্রতিমুহুর্তের রাজনৈতিক নীতি ও সংস্কৃতি। ডেঙ্গুজ্বরের ভাইরাস যেমন প্রচণ্ড জ্বর, মাথা-ব্যাথা, রক্তপাত নিয়ে হাজির হয়, তেমনি রাজনীতির অঙ্গণে আওয়ামী লীগও হাজির হয় গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস এবং ফ্যাসিবাদের জীবাণু নিয়ে।          

লজ্জাহীনতাও যেখানে অহংকার

সাধারণ চোর-ডাকাতদেরও কিছু লজ্জাশরম থাকে। তাই দিনে নয়, রাতের আঁধারে মুখে মুখোশ পড়ে চুরি-ডাকাতি করে। কিন্তু এ দিক দিয়ে হাসিনা ও তার দলের নেতাকর্মীগণ অসাধারণ; লজ্জাশরমের লেশমাত্রও নাই। ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষে চোখের সামনে প্রকাশ্যে ভোট ডাকাতিতে নামতে পেরেছে। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ “লজ্জা হলো ঈমানের অর্ধেক”। ঈমান দেখা যায় না; কিন্তু প্রকাশ পায় লজ্জা-শরমের মাঝে। তাই যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, সন্ত্রাস বা দেহব্যবসায় নামে -বুঝতে হবে তার ঈমানের ভান্ডারটি শূণ্য। এরা বাঁচে উগ্র বেঈমানি নিয়ে। সে বেঈমানি টুপি, কালো পট্টি, নামায-রোযা, হজ্ব বা উমরাহ করে ঢাকা যায় না। খুন, গুম,ধর্ষণ, ব্যাংক লুট, শেয়ার মার্কেট লুট, অর্থপাচার ও শত্রু রাষ্ট্রের সেবাদাস হওয়ার ন্যায় ভয়ানক অপরাধগুলিও তখন মামূলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

তবে এরূপ লজ্জহীনতা স্রেফ হাসিনা বা দলীয় কর্মীদের মাঝ সীমিত নয়। বরং প্রকট দেশের প্রশাসন, পুলিশ, আদালত, সেনাবাহিনী ও মিডিয়ার মাঝেও। এরূপ লজ্জহীনতার মাঝেই জন্ম নেয় অসভ্য সংস্কৃতি; তখন চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন বা ধর্ষণ কোন অপরাধ গণ্য হয় না। বরং বৈধ ও সভ্য কর্ম মনে হয়। হাসিনা ও তার দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে তাই ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতি নিয়ে কোন অপরাধবোধ নাই; বরং বড্ড উৎসব-মুখর। এ ঘৃণ্য অপরাধকেও তারা ন্যায় ও আইনসিদ্ধ মনে করে। চোর-ডাকাতদের হাতে দেশ শাসনের এখানেই মহা বিপদ। চুরিডাকাতি, খুন-ধর্ষণই তাদের মূল অপরাধ নয়, তারা হত্যা করে বিবেকবোধ ও মূল্যবোধকে। নির্মূল করে এমন কি নৃশংস অপরাধকেও ঘৃণা করার সামর্থ্য। ধ্বংস করে ঈমান। যুগে যুগে দুর্বৃত্ত ফিরাউনগণ এভাবেই সমাজে ভগবান রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বাকশালী মুজিব যে ভারতের সেবাদাস, নৃশংস খুনি এবং গণতন্ত্র হত্যাকারি –তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? বামপন্থি নেতা সিরাজ শিকদারকে হত্যার পর সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব বলেছিল, কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? শুধু তাই নয়, ৩০ হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী হত্যা করে রক্ষি বাহিনীকে দিয়ে। কিন্তু সে অপরাধী মুজিব পেয়েছে জাতির  পিতা ও বঙ্গবন্ধুর খেতাব। সেটি সম্ভব হয়েছে বিপুল সংখ্যক মানুষের বিবেক মারা পড়াতে। সে অভিন্ন পথটি ধরেছে শেখ হাসিনাও। মুজিবের ন্যায় হাসিনাও চায় দেশ জুড়ে ঈমান ও বিবেক নাশের মহামারিটি তীব্রতর করতে। এজন্যই কোর’আনের তাফসিরের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। নিষিদ্ধ করেছে পিস টিভি ও ইসলাম চ্যানেল। জিহাদ বিষয়ক বই এবং কোর’আনের তাফসির বাজেয়াপ্ত করার কাজে মহল্লায় পুলিশ নামিয়েছে।  কারণ, বিবেকের খাদ্য তো কোর’আনের জ্ঞান। কোর’আনের জ্ঞানশূণ্য মানুষেরা গরুর ন্যায় ইতর পশুকেও ভগবান বলে। পুংলিঙ্গকেও পূজা দেয়। এমন জাহেলগণ হাসিনাকে মহামান্য প্রধানমন্ত্রী রূপে সম্মান দিবে –তাতেই বা বিস্ময়ের কী? একারণেই হাসিনার সাফল্যটি এক্ষেত্রে বিশাল।  বহু লক্ষ মানুষ –যার মধ্যে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, সেনা অফিসার, আদালতের বিচারপতি এবং সংসদ সদস্য, তার মত ডাকাত সর্দারনীকেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে সালাম দেয়। এমন কি মসজিদ-মাদ্রাসার বহু হাজার হুজুরও তাকে কওমী জননী বলে।

অথচ কোন সভ্য দেশে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাত সন্মান পাবে বা প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসবে -সেটি কি ভাবা যায়? ভাবা যায় কি ভোটমুক্ত কোন নির্বাচনের কথা? যে কোন সভ্য দেশের আইনেই ভোট-ডাকাতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন কি বাংলাদেশের আইনেও। অথচ বাংলাদেশে সে ডাকাতি হয়েছে দশ-বিশটি কেন্দ্রে নয়; সমগ্র দেশজুড়ে। কিন্তু দেশের কোথাও তা নিয়ে কোন বিচার হয়নি এবং কারো কোন শাস্তি হয়নি। যেমন ভোট-ডাকাতি কোন অপরাধই নয়। অথচ হাজার হাজার গৃহস্থের গৃহে ডাকাতির চেয়ে এটি যে শতগুণ জঘন্য অপরাধ –তা নিয়ে কি বিতর্ক চলে? ঘরে ঘরে ডাকাতি হলে অর্থহানি হয় বটে, কিন্তু তাতে দেশবাসীর স্বাধীনতা লুণ্ঠিত হয় না। অথচ ভোট-ডাকাতিতে শুধু স্বাধীনতাই লুণ্ঠিত হয় না, লুণ্ঠিত হয় দেশের রাজস্বভান্ডার, ব্যাংক-বীমা, প্রশাসন ও আইন-আদালত। তখন আদালত  থেকে উধাও হয় আইনের শাসন, এবং বিচারে রায় লেখা হয় ডাকাতদের হুকুম মোতাবেক। নিরপরাধ মানুষকেও তখন ফাঁসিতে ঝুলতে হয়। তখন সরকার পায়, যাকে ইচ্ছা তাকে গুম, হত্যা এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের অধিকার। ফলে তখন অসম্ভব হয় সভ্য ও স্বাধীন ভাবে জীবন যাপন। সব চেয়ে বড় কথা, এরূপ অসভ্য শাসনে দেশ ও দেশবাসীর কলংক বাড়ে বিশ্ব জুড়ে। এবং সে কলংক ইতিহাসের বই থেকে কখনো মুছে যায় না।     

 

শ্রেষ্ঠত্ব দুর্বৃত্ত নির্মূলে

দেশের কলংক শুধু সরকারের অপরাধের কারণে বাড়ে না, বাড়ে জনগণের ব্যর্থতার কারণেও। এক্ষেত্র বাংলাদেশের জনগণের ব্যর্থতাটি কি কম? যারা সভ্য ও ভদ্র তারা কি শুধু ভাত-মাছ খায়? তাদের বড় পরিচয়টি হলো, তারা অসভ্য, অভদ্র, চোর-ডাকাত ও সকল জাতের অপরাধীদেরকে ঘৃণা করে। মুসলিম জীবনে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল। মানুষের ঈমান, আমল ও চরিত্রের বড় পরীক্ষাটি হয় এখানে। এখানেই প্রকাশ পায় ঈমানের বল। অনেক চোর-ডাকাত, দেহব্যবসায়ী, সুদখোর, ঘুষখোরও হাজার টাকা দান করে। কিন্তু  অন্যায়কে ঘৃণা করার সামর্থ্য তাদের থাকে না। অথচ সে সামর্থ্য না থাকাতে সে নিজেও অসভ্য, অভদ্র এবং অপরাধী হয়। বড় বাড়ী, দামী পোষাক ও ক্ষমতার দাপট দিয়ে কি এ অসভ্যতা কখনো ঢাকা যায়? এরূপ অসভ্য ও অপরাধীদের পক্ষে অসম্ভব হয় ঈমানদার হওয়া। কারণ, ঈমানদারকে শুধু আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলকে বিশ্বাস করলে চলে না। শুধু নামায-রোযা এবং হজ্ব-যাকাত পালন করলেও চলে না। তাঁকে বাঁচতে হয় যেমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে ঘৃণার সামর্থ্য নিয়ে, তেমনি লড়তে হয় তাদের নির্মূল করার অঙ্গিকার নিয়েও। ঘৃণার সে সামর্থ্য এবং লড়াইয়ের সে অঙ্গিকার না থাকলে –এমন ব্যক্তি যেমন বেঈমান হয়, তেমনি অসভ্য এবং অপরাধী হয়। এরাই চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের দলে শামিল হয়। প্রশ্ন হলো, এরূপ অসভ্য অপরাধীদের দিয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর পবিত্র জান্নাত ভরবেন? তাদেরকে কি জান্নাতের ধারে কাছেও আসতে দিবেন?

বাংলাদেশে এরূপ অপরাধীদের সংখ্যাটি বিশাল। বিশ্বের অন্য যে কোন দেশের তুলনায় বিশাল বলেই বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে পর পর ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে। নইলে এতটা নীচে নামা মামূলী বিষয় ছিল না। সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে এরূপ অর্জনটি একমাত্র বাংলাদেশেরই। মুজিব আমলে এরূপ ডাকাতগণই এক কালের সুজলা সুফলা দেশকে বিশ্বব্যাপী তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি রূপে পরিচিত করেছিল। যে রূপ নির্বাচন ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলো সেটিও কি বিশ্বের আর কোথাও হয়েছে? তবে এ কলংকটি কি শুধু শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও তাদের দল আওয়ামী লীগের কামাই? দেশের প্রশাসন, পুলিশ, আদালত, সেনাবাহিনী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়াতে যে অসংখ্য অসভ্যদের উপস্থিতি – একাজ তো তাদেরও। হাসিনার ন্যায় প্রমাণিত ডাকাতকে ঘৃণা করা দূরে থাক, তারা বরং তার পক্ষে ডাকাতিও করছে। আজ্ঞাবহ লাখ লাখ ডাকাত থাকলে কি ডাকাত সর্দারনীকে স্বশরীরে ডাকাতীতে নামার প্রয়োজন পড়ে? তখন প্রয়োজন পড়ে হুকুমের। হুকুম পেলে নিজেরাই ডাকাতি করে তারা ডাকাতির মাল সর্দারনীর ঘরে পৌছে দেয়। ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর সমগ্র দেশজুড়ে যে ভোটডাকাতি হলো -সেটি তো এভাবেই হয়েছে। শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যাটিও হয়েছিল এ খুনি ডাকাতদের হাতে।     

অপমান, অসভ্যতা এবং কলংক যেমন দুর্বৃত্তদের শাসন মেনে নেয়ায়, তেমনি শ্রেষ্ঠত্ব তাদের নির্মূলে। সুরা আল ইমরানের ১১০ আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের শ্রেষ্ঠ জাতি বলে অভিহিত করেছেন। সে বিশেষ মর্যাদাটি এজন্য নয় যে, তারা বেশী বেশী নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন করে। বরং এজন্য যে, তারা অন্যায়কে তথা অন্যায়ের নায়কদেরকে নির্মূল করে এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা দেয়। অথচ বাংলাদেশীগণ নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দিলেও তারা এ পথে নাই। তারা চলছে সম্পূর্ণ বিপরীত এজেন্ডা নিয়ে। অতীতে মুসলিমগণ যে শুধু নিজেদের জন্মভূমি থেকে অপরাধীদেরকে নির্মূল করেছিলেন তা নয়, নির্মূল করেছিলেন এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বহু দেশ থেকে। কারণ, ইসলামের এজেন্ডা কোন ভাষা বা ভূগোলের সীমারেখা দ্বারা সীমিত নয়। সেটি হলে কি তুর্কী বীর ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলা বিজয়ে আসতেন? আর না এলে ভয়ানক বিপদটি হতো বাংলার মুসলিমদের। তারা বঞ্চিত হতো ইসলাম থেকে। তখন ধর্মের নামে তারা মগ্ন হতো গরুপূজা, শর্পপূজা, মুর্তিপূজা ও লিঙ্গপূজা নিয়ে।

                                                                                                    

মাছি-চরিত্রের মানুষ ও নাশকতা

মহান আল্লাহতায়ালার ক্ষুদ্র দুটি সৃষ্টি হলো মাছি ও মৌ’মাছি।  এ দুটি ক্ষুদ্র প্রাণীর উল্লেখ রয়েছে পবিত্র কোর’আনেও। মৌ’মাছির নামে একটি সুরার নামকরণও করা হয়েছে। সেটি হলো সুরা নামল। পবিত্র কোর’আন কোন বিজ্ঞান বা জীব বিজ্ঞানের বই নয়; এটি হিদায়েতের গ্রন্থ। পবিত্র এ কিতাবে নানা জীবের উল্লেখ করা হয়েছে যাতে মানব তাদের জীবন থেকে হিদায়েত নেয়। প্রশ্ন হলো, মাছি ও মৌ’মাছি থেকে শিক্ষণীয় বিষয়টি কি? মৌ’মাছির জীবনে বাঁচার মূল মিশনটি হলো মানব কল্যাণ। সে লক্ষ্যে মৌ’মাছি আমৃত্যু মেহনত করে । এবং হাজার হাজার ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌচাক গড়ে। তারা বাঁচে জামায়াতবদ্ধতা নিয়ে। মৌচাকের মধু মৌ’মাছি নিজে খায় না, মানুষকে খাওয়ায়। মানুষের জন্য মধুতে রয়েছে বহুমুখি কল্যাণ। শিক্ষণীয় আরেকটি বিষয় হলো, মৌ’মাছি কখনোই আবর্জনায় বসে না; খুঁজে ফুল। মৌ’মাছির ন্যায় ঈমানদারগণও তাই বর্জন করবে আবর্জনা, মানব কল্যাণে হবে নিবেদিত প্রাণ এবং বাঁচবে জামাতবদ্ধ এক সুশৃঙ্খল জীবন নিয়ে। একমাত্র তখনই দেশ কল্যাণ কর্মে ভরে উঠে।

অপর দিকে মাছি বাঁচে নানারূপ অকল্যাণ নিয়ে। সে কখনোই ফুলের উপর বসে না; খুঁজে দুর্গন্ধময় গলিত আবর্জনার স্তুপ। আবর্জনার মাঝেই  তার বসবাস ও বংশবিস্তার। রোগ-জীবাণু ছড়ানো এবং মানব বসতিকে বাসের অযোগ্য করাই তার আমৃত্যু মিশন। মাছি মালেরিয়া, ডেঙ্গু, কলেরা ও ডায়োরিয়ার ন্যায় বহু ভয়াবহ রোগের মহামারি ঘটায়। লক্ষণীয় হলো, সমাজে অবিকল মাছি-চরিত্র নিয়ে বাস করে চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত, খুনি, ধর্ষক, ঘুষখোর, সূদখোর, দেহব্যবসায়ী তথা সমাজের সকল অসভ্য অপরাধীগণ। এরা পাপাচারের প্রতিষ্ঠান খুঁজে এবং সযত্নে দূরে থাকে মসজিদ, মাদ্রাসা, কোরআনের ক্লাস, ইসলামি সংগঠন থেকে। এমন কি অতীতে এরা নবী-রাসূলদের পাশেও ভিড়েনি। মশামাছির ন্যায় রাষ্ট্রের বুকে এদের বংশ বিস্তার ও দখলদারি বাড়লে, ভয়ানক বিপদ বাড়ে জনগণের। তখন গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের রাজনীতি দেশের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। সভ্য সমাজের নির্মাণে এজন্যই মশামাছির নির্মূলের ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো এ অসভ্য অপরাধীদের নির্মূল। ইসলামে এ নির্মূলের কাজটিই হলো পবিত্র জিহাদ। যে সমাজে এ জিহাদ নাই সে সমাজে রাস্তাঘাট, ক্ষেতখামার, ঘরবাড়ী, কলকারখানা বাড়লেও সভ্য রাষ্ট্র ও সভ্যতা নির্মিত হয় না। 

মশামাছি কখনোই তাদের কাঙ্খিত বাসস্থানটি চিনতে ভূল করে না। তেমনি ভূল করে না অপরাধীগণও। তারা খুঁজে অপরাধীদের হাতে অধিকৃত রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশের অপরাধীগণ তাই আওয়ামী লীগকে চিনতে কোন কালেই ভূল করেনি। সেটি মুজিব আমলে যেমন নয়, তেমনি হাসিনার আমলেও নয়। ফলে দেশজুড়ে লুটপাট ও ভোট-ডাকাতিতে মুজিব ও হাসিনার কোন কালেই লোক বলের অভাব হয়না। লোক বলের অভাব হয় না লগি-বৈঠা নিয়ে রাস্তায় দলীয় ক্যাডার নামাতে। মশামাছি কখনোই মৌ’মাছির সাথে মেশে না; তাদের থাকে নিজস্ব দল ও নিজস্ব রুচি। সে দল ও রুচি নিয়েই  তাদের চলাফেরা। একই রূপ চরিত্র অপরাধ জগতের নেতা-কর্মীদেরও। ফলে অতি নৃশংস অপরাধীদের ঘৃণার সামর্থ্য তাদের থাকে না। এটির কারণ, নৈতিক মৃত্যু। দেহ নিয়ে বাঁচলেও তারা নীতি-নৈতিকতা ও ঈমান নিয়ে বাঁচে না। এজন্যই প্রতিবেশী ভারতে মুসলিমগণ হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হলেও হাসিনা ও তার দলীয় নেতাকর্মীদে মুখে প্রতিবাদ নাই। বরং হাসিনার এজেন্ডা, অপরাধীদের সাথে বন্ধুত্ব মজবুত করা। গুজরাতে মুসলিম বিরোধী গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদী এজন্যই হাসিনার এতো ঘনিষ্ট বন্ধু। মোদির ন্যায় খুনির সাথে মিতালী দৃঢ়তর করতে হাসিনা নিয়মিত আম ও পাঞ্জাবী পাঠায়। (মোদি সে কথাটি মিডিয়াকে বলেছে এবং যা প্রকাশও পেয়েছে।) খুনিকে ঘৃণা করার মত সামান্য বিবেকবোধ যার মধ্যে আছে -সে কি কখনো মোদির ন্যায় গণহত্যার নায়ককে বন্ধু রূপে গ্রহণ করতে পারে? বস্তুতঃ যারা শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যা করতে পারে তারাই গুজরাতের গণহত্যার নায়কের বন্ধু হতে পারে।

 

অসভ্যতা অপরাধীদের নির্মূলে ব্যর্থতায়

চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, খুন-গুম, ধর্ষণ, সন্ত্রাস তথা নানা রূপ অপরাধ কর্মে অংশ নেয়াটাই শুধু অপরাধ নয়, অপরাধ ও অসভ্যতা হলো সেরূপ অপরাধীদের মাথায় তুলে মান্যতা দেয়া। সে অসভ্য কাজটি হয় তাদেরকে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি, নেতা বা প্রশাসনের কর্মকর্তা করার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। দুর্গন্ধময় আবর্জনাকে যারা আবর্জনার স্তুপে না ফেলে গৃহে জমা করে -তাদরকে কি সভ্য, ভদ্র বা সংস্কৃতবান বলা যায়? অসভ্যতাদের নির্মূল না করাটাই চরম অসভ্যতা। সমাজের সবচেয়ে ক্ষতিকর জীবগুলো শুধু মশামাছি নয়, চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত, ধর্ষক এবং খুন-গুমের নায়কগণও। সভ্য সমাজে তাদেরকে গৃহের চাকর-বাকর বা রাস্তার ঝাড়ুদারও করা হয় না। তাদের পাঠানো হয় কারাগারে বা কবরস্থানে। অথচ বাংলাদেশে তাদেরকে মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, এমপি তথা সরকারের উচ্চাসনে বসা হয়। তাদের নির্মূলে ইসলামের এজেন্ডাটি অতি সুস্পষ্ট। পবিত্র কোর’আন শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ফরজ করতে নাযিল হয়নি; নাযিল হয়েছে শরিয়তের আইন প্রতিষ্ঠা দিতে। শরিয়তের আইন হলো অপরাধীদের নির্মূলে মহান আল্লাহপ্রদত্ত হাতিয়ার। এ হাতিয়ারের প্রয়োগ না হলে দেশ অপরাধীদের দখলে যায় এবং জোয়ার আসে অসভ্যতার। তাতে ব্যর্থ হয় ইসলামের মূল এজেন্ডা। তাই খোলেফায়ে রাশেদার আমলে একটি দিনও কি শরিয়তের আইন ছাড়া চলেছে? এমন কি ভারতে মুসলিম শাসনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজির আদালতে শরিয়তের আইন প্রতিষ্ঠিত ছিল। সে আইন বিলুপ্ত করেছিল ইংরেজ কাফেরগণ। ইংরেজগণ শুধু ইসলামে অবিশ্বাসী ছিল না; বিশ্বব্যাপী আগ্রাসন, দস্যুবৃত্তি, খুন, বর্ণগত নির্মূল, ব্যাভিচার ও নানারূপ অপরাধ ছিল তাদের মজ্জাগত। তারা যে শরিয়তের বিলুপ্তি ঘটাবে -সেটিই ছিল স্বাভাবিক। তারা আইন বানিয়েছিল নিজেদের আগ্রাসন, কুফরি বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও অপরাধ কর্মগুলি বাঁচাতে। ফলে তাদের আইনে সাম্রাজ্যবাদি দস্যুবৃত্তি, বেশ্যাবৃত্তি, মানব খুন, অত্যাচার, জুয়া, মদ্যপানের ন্যায় নানারূপ অপরাধও বৈধতা পেয়েছে। বাংলাদেশে ইংরেজ শাসনের বিলুপ্তি ঘটেছে; কিন্তু বিলুপ্ত হয়নি তাদের দর্শন ও জীবনধারার অনুসারি সেক্যুলারিস্ট খলিফাদের শাসন। ফলে ইংরেজদের প্রণীত কুফরি আইন ও বিচারব্যবস্থা বাংলাদেশে আজও বেঁচে আছে; এবং আজও বহাল রয়েছে শরিয়তের বিলুপ্তি। বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতা অনেক। তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না দেয়া। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা মুসলিম জীবনে এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার সুস্পষ্ট হুশিয়ারিটি হলোঃ “আমার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচার করে না তারা কাফের।…তারা জালেম। …তারা ফাসেক।” –(সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭)। মুসলিম রাষ্ট্রের মেরুদ্ন্ড হলো এই শরিয়ত; একমাত্র এটিই কাফের রাষ্ট্র থেকে তাকে পৃথক করে –মুসলিম জনসংখ্যা নয়। তাই শরিয়ত ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়?

আদালতে শরিয়তের বিচার না থাকায় দেশবাসীর ক্ষয়ক্ষতির অংকটি হয় বিশাল। দেশের সকল চোর-ডাকাতদের চুরি-ডাকাতির ফলে দেশ ও দেশবাসীর এ যাবত যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে –ভোট-ডাকাতদের শাস্তি না দেয়াতে ক্ষতিটি হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ অধীক। ডাকাতি হয়ে গেছে সমগ্র দেশ। অথচ জনগণের দেয়া শত শত কোটি টাকার রাজস্বের অর্থ ব্যয় হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী, সেনা বাহিনী, প্রশাসনিক বাহিনী এবং আদালতের বিচারক পালতে।  কিন্তু এ ভোট-ডাকাতি রুখতে ও ডাকাতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে তাদের অবদানটি শুণ্য। বরং তারা পরিণত হয়েছে ডাকাতদের লাঠিয়ালে। ইসলামে চুরির শাস্তি হলো হাত কেটে দেয়া। কিন্তু যারা সমগ্র দেশের উপর ডাকাতি করে তাদের শুধু হাত কাটলে কি ন্যায় বিচার হয়? সভ্য দেশে তাদের মৃত্যুদন্ড বা প্রাণদন্ড দেয়া হয়। কিন্তু সে বিচার ব্যবস্থা বাংলাদেশে নাই। ফলে বাংলাদেশে চোর-ডাকাতেরাই শাসকের আসনে জেঁকে বসেছে। এবং এসব চোর-ডাকাতদের বিরুদ্ধে কথা বলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হচ্ছে এবং অপহরণ, হত্যা, গুম ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নিরপরাধ মানুষ।  

শেখ হাসিনার আদর্শ হলো তার পিতা শেখ মুজিব। কিন্তু তার ডাকাতিটাও কি কম নৃশংস ছিল?  তার ডাকাতিতে প্রাণ হারিয়েছিল গণতন্ত্র। জনগণ থেকে ভোট না নিয়েই নিজেকে তিনি আজীবনের জন্য প্রেসিডন্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন। জনগণের ভোটের উপর ডাকাতিকে তিনি জায়েজ করিয়ে নিয়েছিলেন নিজ দলের কলাবোরেটরদের দিয়ে। নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দলগুলিকে। নিজে শত শত মিছিল-মিটিং করলেও তিনি কেড়ে নিয়েছিলেন বিরোধীদের মিছিল-মিটিং করা ও ভোট দানের স্বাধীনতা। নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দলীয় পত্রিকা। প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন এক দলীয় বাকশালী শাসক। সেটি ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এদিনটি ছিল আরেক    দেশ-ডাকাতির দিন। আওয়ামী লীগের শাসন মানেই ডাকাতদের শাসন। এবং ডাকাতগণই ছিল একাত্তরের নায়ক। তাদের হাতে ১৯৭০-য়ে জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি করেছিল গণতন্ত্র ও স্বায়ত্বশাসনের মুখোশ পড়ে। একাত্তরের যুদ্ধ, মুজিবের হাত দিয়ে অর্জিত ভারতের গোলামী এবং সে সাথে বাংলাদেশের আজকের ফ্যাসিবাদী রাজনীতি –এসবই হলো সে বিশাল ডাকাতীর ধারাবাহিকতা। তাদের না জানলে অজানা থেকে যায় বাংলাদেশের ইতিহাস।

যারা গণতন্ত্রের শত্রু, তারা জনগণেরও শত্রু। শেখ হাসিনা তারই প্রমাণ। জনগণের বন্ধু হলে সে কি জনগণের ব্যালটের উপর ডাকাতি করতো? মিছিল-মিটিং ও কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নিত? গুম-খুন ও সন্ত্রাসের রাজনীতি চালু করতো? যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা দিয়েছে ভোট-ডাকাত রূপে -তাদের থেকে এর চেয়ে সভ্য কিছু কি আশা করা যায়? ১৬/৬/২০১৯ তারিখে ২০ লাখ মানুষের মিছিল হয়েছে হংকং’য়ে। অথচ হংকং’য়ের জনসংখ্যা ঢাকার সিকি ভাগও নয়। কিন্তু সে রকম মিছিল ঢাকাতে অসম্ভব। কারণ, হংকং’য়ে ঢাকার ন্যায় অপরাধীদের শাসন নাই। জনগণ সেখানে মানবিক অধীকার নিয়ে বাঁচে। ফলে মিছিল-মিটিং ও বাক-স্বাধীনতা তাদের সংস্কৃতির অঙ্গ। অথচ  ঢাকায় সে রকম মিছিল হলে সেটি শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যাতে পরিণত হতো। বাংলাদেশের মানুষ আর কতকাল এক ডাকাত সর্দারনীকে প্রধানমন্ত্রী রূপ সন্মান দেখাতে থাকবে? মানব রপ্তানি, পোষাক রপ্তানি, চিংড়ি রপ্তানি বাড়িয়ে বা দুয়েকটি ক্রিকেট ম্যাচ জিতে কি সে অপমান দূর করা যায়? বস্তুতঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো এটি। এবং সে ব্যর্থতার কথা ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী।  

 

দুর্বৃত্ত শাসনের বড় নাশকতাটি

গরু-ছাগলেরা চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে না; তারা ঘাস পেলেই খুশি। অথচ সভ্য মানুষের আচরণটি ভিন্নতর। মহল্লায় চোর-ডাকাত ঢুকলে তাদের ধরা ও শাস্তি দেয়ার মধ্যেই মানবিক পরিচয়। সেটি না হলে দেশ অপরাধীদের দখলে যায় এবং অসভ্যতায় ভরে উঠে। এতে দেশ দ্রুত বাসের অযোগ্য হয়। কিন্তু স্বৈরাচারি শাসকগণ নিজেরাই যেহেতু অপরাধী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের এ ঘৃণা ও প্রতিরোধকে তারা ভয় পায়। তারা চায়, গরুছাগলের ন্যায় জনগণও ভোজন-সর্বস্ব পশুতে পরিণত হোক এবং বিলুপ্ত হোক বিবেকবোধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণাবোধ। চায়, জনগণ তাদের কু-কর্মে সহায়ক শক্তিতে পরিণত হোক। দুর্বৃত্তদের শাসনের এটিই সবচেয়ে বড় নাশকতা। তাদের শাসন দীর্ঘকাল চললে জনগণ পানাহারে বাঁচলেও বিবেকশূণ্য ও মানবতাশূণ্য হয়। তখন জনগণের গলায় গোলামীর রশি পড়িয়ে কিছুটা বেতন বাড়ায়। হাসিনার সরকারও তাই স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে বেতন বাড়িয়েছে। তাছাড়া বেতনের অর্থ তো আর তার নিজের পকেট থেকে আসছে না। গরু ঘাস পেলে যেমন লাঙ্গল টানে; মানব রূপী এরূপ আত্মসমর্পিত পশুগণও তেমনি বেতন পেলে সরকারি দলের ডাকাতে পরিণত হয়। তখন স্বৈরাচারি সরকার বাঁচাতে ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন বা গণহত্যা চালাতেও তাদের মনে সামান্যতম দংশন হয় না।

পাকিস্তানের ন্যায় বাংলাদেশ ভারতের প্রতিদ্বন্দী একটি পারমানবিক শক্তি হতে পারিনি -বাংলাদেশের জন্য সেটিই মূল ব্যর্থতা নয়। দেশবাসীর সবচেয়ে কলংকজনক ব্যর্থতাটি হলো চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের ন্যায় অসভ্যদের শাসন নির্মূলের ব্যর্থতা। চোর-ডাকাত মাত্রই অসভ্য ও নৃশংস হয়। সভ্য জনগণ তাই সমাজ থেকে শুধু আবর্জনাই সরায় না, চোর-ডাকতদেরও সরায়। নইলে সভ্য ভাবে বাঁচাটি অসম্ভব হয়; সমাজ তখন কানায় কানায় পূর্ণ হয় অসভ্যতায়। অতীতে সে পথ ধরেই বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে পাঁচ বার বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে।  বাংলাদেশীদের সাম্প্রতিক কলংকটি হলো, তারা এক ডাকাত সর্দারনীকে প্রধানমন্ত্রী রূপে স্থান দিয়েছে। কোন সভ্য দেশে কোন কালেও কি এমনটি ঘটেছে?

বাংলাদেশীদের জন্য বিপদের আরো কারণ হলো, দেশটির অসভ্য ও অপরাধী শাসকগণ একাকী নয়। তাদের পিছনে রয়েছে আরেক ভয়ানক অপরাধী সরকার। সেটি ভারতের বিজিপি সরকার। ভারত তার নিজ দেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লাগাতর যুদ্ধ শুরু করেছে। সেদেশে মুসলিমদের হত্যা করা, ঘরাড়ি থেকে বহিস্কার করা, তাদের গৃহে আগুণ দেয়া এবং মুসলিম নারীদের ধর্ষণ করা বস্তুতঃ সে যুদ্ধেরও অংশ। গরুর রশি হাতে দেখলে মুসলিমদের পিঠিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। মাথায় টুপি থাকলে টুপি কেড়ে  নিয়ে ‘জয় রামজি’ ও ‘পাকিস্তান মুর্দাবাদ’ বলতে বাধ্য করা হচ্ছে। এবং তাদের রাস্তায় পিটিয়ে  হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিম নির্মূলের এ যুদ্ধে মূল সেনাপতি হলো নরেন্দ্র মোদি। মোদি তার শাসনমালে গুজরাতে ২০০২ সালে ২ হাজারের বেশী মুসলিমকে হত্যার ব্যবস্থা করে। মোদির লক্ষ্য, মুসলিমদের মুসলিম রূপে বাঁচাটিই অসম্ভব করা। কোন মুসলিম কি এমন খুনির বন্ধু হতে পারে?

পরকাল বাঁচানোর জিহাদ

খুনির বন্ধু হতে হলে তো তাকেও খুনি বা খুনের সমর্থক হতে হয়। হত্যা করতে হয় তার ঈমানকে। ঈমান শুধু ব্যক্তিকে নামায-রোযার ন্যায় ইবাদতেই উদ্বুদ্ধ করে না, বরং বিশ্বের নানা প্রান্তের মজলুম মুসলিমের প্রতি সহমর্মিতা নিয়ে বাঁচতে শেখায়। সে সহমর্মিতাই প্রমাণ করে সে মুসলিম উম্মাহর অংশ। দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হাত-পা দেহের ব্যাথা অনুভব করে না। তেমনি মুসলিম উম্মাহ থেকে বিচ্ছন্ন ব্যক্তিও অনুভব করে না অন্য মুসলিমের বেদনা। বেদনার সে অনুভুতিটি  আসে ঈমান থেকে। তাই কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, মায়ানমার, ভারত বা অন্য যে কোন দেশের গুলিবিদ্ধ, ধর্ষিতা, অত্যাচারিত মুসলিমের বেদনা যদি কেউ হৃদয়ে অনুভব  না করে -তবে বুঝতে হবে সে ঈমানদার নয়। এমন ব্যক্তি বাঙালী, ভারতীয়, পাকিস্তানী, আরব  বা অন্য কিছু হতে পারে –কিন্তু সে মুসলিম নয়। সে বেদনা না থাকাটাই শত ভাগ প্রমাণ করে তার অন্তরে ঈমানের লেশ মাত্র নাই। অথচ ভারতে রাস্তায় নেমে সে বেদনার প্রকাশ করাটি যেমন শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তেমনি অবস্থা বাংলাদেশেও। এভাবেই হাসিনা অসম্ভব করছে বাঙালী মুসলিমদের শুধু মুসলিম রূপে বাঁচা নয়, সভ্য মানুষ রূপে বাঁচাও। তাই বাংলাদেশের বুকে তার শাসন যতই দীর্ঘায়ীত হবে –বাংলাদেশীরা ততই পরিণত হবে গণতন্ত্রমুক্ত, ঈমানশূন্য ও মানবতাশূণ্য ভোজন-বিলাস জীবে। এভাবে তারা দূরে সরছে শুধু ইসলাম থেকে নয়, বরং মানবিক পরিচয় থেকেও। হাসিনা এভাবে বাঙালী মুসলিম জীবনে শুধু বিচ্যুতি ও কলংকই বাড়াচ্ছে না, ধাবিত করছে পরকালীন আযাবের দিকেও। তাই দেশ থেকে অসভ্য-অপরাধীদের শাসন নির্মূল স্রেফ রাজনীতির বিষয় নয়, এটি পরকাল বাঁচানোর জিহাদ। ১১/০৮/২০১৯




রবীন্দ্রসাহিত্যের নাশকতা এবং বাঙালী মুসলিমের আত্মপচন

বাঙালীর রবীন্দ্র-আসক্তি ও আত্মপচন

দৈহিক পচনের ন্যায় আত্মপচনের আলামতগুলিও গোপন থাকে না। আত্মপচনে মৃত্যু ঘটে বিবেকের; তাতে বিলুপ্ত হয় নীতি ও নৈতিকতা। চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, সন্ত্রাস, গুম, হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্ষণে উৎসব,লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথে হত্যা, পুলিশী রিম্যান্ডে হত্যা, ক্রসফায়ারে হত্যা–এ রূপ নানা নিষ্ঠুরতা তখন নিত্তনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অতি নির্মম ও নিষ্ঠুর কাজেও তখন বিবেকের পক্ষ থেকে বাঁধা থাকে না। এর ফলে রাস্তাঘাটে শুধু অর্থকড়ি,গহনা ও গাড়ি ছিনতাই হয় না, নারী ছিনতাইও শুরু হয়। পত্রিকায় প্রকাশ, মাত্র গত তিন মাসে দেশে ১২৩ জন মহিলা ছিনতাই ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। (দৈনিক আমার দেশ, ২৬/০৫/১৫)। তবে সব ধর্ষিতাই যে থানায় এসে নিজের ধর্ষিতা হওয়ার খবরটি জানায় -তা নয়। কারণ তাতে অপরাধীর শাস্তি মেলে না বরং সমাজে ধর্ষিতা রূপে প্রচার পাওয়ায় অপমান বাড়ে। অধীকাংশ ধর্ষণের ঘটনা তাই গোপনই থেকে যায়।ফলে ধর্ষিতা নারীদের আসল সংখ্যা যে বহুগুণ বেশী –তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়।জাহিলিয়াত যুগের আরবগণ এরূপ আত্মপচনের ফলে নানারূপ নিষ্ঠুরতায় ডুবেছিল। কন্যাদের তারা জীবন্ত দাফন দিত। সন্ত্রাস, রাহাজানি, ব্যাভিচারি, কলহ-বিবাদ ও গোত্রীয় যুদ্ধে ডুবে থাকাই ছিল তাদের সংস্কৃতি।

তবে জাহেলিয়াত যুগের আরবগণ আত্মপচন থেকে শুধু যে রক্ষা পেয়েছিল তা নয়,সমগ্র মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতারও জন্ম দিয়েছিল। তারা যে দ্রুত বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল সেটিই মূল নয়,নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রেও যে উচ্চতায় তারা পৌঁছেছিল -অন্য কোন জাতি সে স্তরে কোন কালেই পৌঁছতে পারিনি। কীরূপে তারা সে পচন থেকে রক্ষা পেল,কীভাবে তারা এত উপরে উঠলো এবং বাঙালী মুসলিমেরাই বা কেন এত দ্রুত নীচে নামছে -সেটিই আজ সমাজ বিজ্ঞানের অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।পতিত আরবদের এত দ্রুত উপরে উঠার মাঝেই নিহীত রয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ শয্যাশায়ী কান্সারের রোগীও যে ঔষধে সুস্থ্য হয়ে উঠে সে ঔষধ থেকে মানব জাতি দৃষ্টি ফেরায় কি করে? আরবগণ  জেগে উঠে প্রমাণ করে গেছে আত্মপচনেরও মোক্ষম চিকিৎসা আছে। মানবজাতির জন্য তাদের সে শিক্ষাটিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা। আকাশে উড়া,চাঁদে নামা ও আনবিক বোমার তৈরীর বিদ্যা না শিখিয়ে তারা শিখিয়ে গেছে আত্মপচনের পর্যায় থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক রূপে বেড়ে উঠার বিদ্যা। এর চেয়ে উপকারি বিদ্যা আর কি হতে পারে? দেহে যে রোগ আছে শুধু এটুকু জেনে লাভ কী? লাভ তো রোগের সুচিকিৎসাটি জানায়। বাঙালী মুসলিমের এখানেই ব্যর্থতা। গার্মেন্টস শিল্পে বাংলাদেশে বিশ্বে দ্বিতীয়, মৎস্য উৎপাদনে চতুর্থ। পাঠ উৎপাদনে শীর্ষে। কিন্তু দুর্বৃত্ত উৎপাদন বিপুল সংখ্যায় হওয়ায় অন্যসব অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দুর্বৃত্তদের কারণে বাংলাদেশ দ্রুত বাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার বাঙালী মুসলমান দেশ ছাড়ছে রহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে।নিজ দেশ ছেড়ে তারা গভীর সমুদ্রে গিয়ে ভাসছে, অন্য দেশে আশ্রয় না পেয়ে প্রাণ বাঁচাতে মূত্রপান করছে।আরবদের পচনটি কোন কালেই কি এ পর্যায়ে পৌছেছে? নিজ দেশ ছেড়ে তারা কি কখনো সাগরে গিয়ে ভেসেছে? গভীর সংকটের আরো  কারণ,এরূপ ভয়ানক বিপর্যের মাঝে পড়েও বাঙালী মুসলিমের আগ্রহ নেই রোগের কারণ ও তার চিকিৎসা নিয়ে। দেশে কৃষিপণ্য,শিল্পপণ্য,মৎস্য চাষ, গরুমহিষের আবাদ বা মনুষ্যজীবের রপ্তানি বেড়েছে। কিন্তু তা দিয়ে কি আত্মপচন থেকে বাঁচা যায়? আত্মপচনের কারণটি অর্থাভাব, খাদ্যাভাব, দেহের অপুষ্টি বা রোগব্যাধী নয়। বরং সেটি মনের প্রচন্ড অপুষ্টি ও অসুস্থ্যতা। মনের সে অপুষ্টি ও অসুস্থ্যতার কারণ,জ্ঞানশূণ্যতা। এবং সে জ্ঞানশূণ্যতাটি পবিত্র ওহীর জ্ঞানের। দেহ বল পায় পুষ্টিকর খাদ্য থেকে; এবং বিবেক পুষ্টি পায় সত্যজ্ঞান ও সঠিক দর্শন থেকে। নিরেট সত্য ও সঠিক দর্শনের উৎস্য তো মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত গ্রন্থ। চেতনার রোগ সারাতে ও বিবেককে সবল করতে সে নাযিলকৃত সত্যের সামর্থটি বিশাল। সেটি প্রমাণিত হয়েছে আজ থেকে সাড়ে ১৪ শত বছর আগে। মুসলিম মন তখন প্রবল পুষ্টি পেয়েছিল পবিত্র কোরআন থেকে। তাতে দূর হয়েছিল আরব মনের অসুস্থ্যতা। ফলে এককালের অসভ্য আরবগণ অতিদ্রুত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবে পরিণত হতে পেরেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাঙালী মনের সে অসুস্থ্যতা সারাতে বাংলাদেশে সত্যজ্ঞান ও দর্শনের উৎস্যটি কি? সেটি কি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান? সেটি কি সেক্যুলার বাঙালী সাহিত্যিকদের লেখা প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস? সেটি কি মুক্তমনা নাস্তিকদের দর্শন? সেক্যুলার বাঙালীরা তো ভেবেছে এগুলিই তাদের শান্তি ও প্রগতির পথ দেখাবে। কিন্তু সেটি যে মিথ্যা সেটি প্রমাণ করতে কি আরো নীচে নামতে হবে? আরো কত হাজার বাঙালীকে সমুদ্রে ভেসে মূত্রপান করতে হবে? আরো কত হাজার নারীকে ধর্ষণ ও সে ধর্ষণের ইতর উৎসব দেখতে হবে? শাপলা চত্বরের গণহত্যাই আর কত বার সহ্য করবে? কতবার দেখবে ভোট-ডাকাতির নির্বাচন?

নাশকতা সেক্যুলার রাজনীতির
বাংলাদেশে আজ যে ভয়ানক আত্মপচন তার মূল কারণঃ চেতনায় ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ভয়ানক বিষক্রিয়া। আর সেটি সেক্যুলার রাজনীতি ও কুসাহিত্যের কারণে। পানির পাইপ যেমন গৃহে গৃহে দূষিত পানির সরবরাহ বাড়ায়, তেমনি কুসাহিত্যের মাধ্যমে নরনারীর চেতনাতেও লাগাতর বিষপান ঘটে। বাংলাদেশে সে কাজটি প্রচন্ড ভাবে হয়েছে। বিগত শত বছরে বাঙালীর ভাত-মাছ-ডাল-শাক-সবজি তথা খাদ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি। বাংলার গাছপালা,আলোবাতাস বা জলবায়ুতেও তেমন পরিবর্তন আসেনি।কলেরা-টাইফয়েড-ম্যালেরিয়ার স্থলে কোন নতুন রোগেরও আবির্ভাব হয়নি। ফলে বর্তমান বিপর্যয়ের জন্য এর কোনটিকেও দোষ দেয়া যায় না।  বিগত শত বছরে বাংলার বুকে বিশাল পরিবর্তন এসেছে মূলতঃ দুটি ক্ষেত্রে। এক). বাংলার মুসলিম গৃহে শত বছর আগে রবীন্দ্র সাহিত্য ও রবীন্দ্রসঙ্গিতের চর্চা ছিল না। নাচগানও ছিল না। নাচগান সীমিত ছিল হিন্দু ও পতিতাপল্লির বাইজীদের গৃহে। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গিত ও নাচগান এখন নেমে এসেছে সাধারণ মানুষের গৃহে। সমগ্র দেশজুড়ে হাজার হাজার এনজিও গড়ে উঠেছে যাদের কাজ হয়েছে সেগুলি শেখানো।দুই). শত বছর আগে বাংলার রাজনীতিতে সেক্যুলারিস্টদের স্থান ছিল না। রাজনীতিতে তখন ইসলামের প্রতি প্রবল অঙ্গিকার ছিল। ফলে বাংলার মাটিতে সেদিন গড়ে উঠেছিল খেলাফত আন্দোলন ও  পাকিস্তান আন্দোলনের ন্যায় দুটি বিশাল গণআন্দোলন। অথচ আজ  দেশ অধিকৃত হয়ে আছে ধর্মচ্যুৎ ও ইসলামচ্যুৎ উগ্র সেক্যুলারিস্টদের হাতে। তাদের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে। কোরআনে তাফসির বন্ধ করা, জিহাদবিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করা, ইসলামপন্থিদের ফাঁসিতে ঝুলানো,মুসল্লিদের হত্যাকরা এবং তাদের লাশকে ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করাই তাদের সংস্কৃতি। তাদের নেতৃত্বে দেশে যা শুরু হয়েছে তা মূলত পৌত্তলিক সাহিত্য ও সেক্যুলার রাজনীতিরই ভয়ানক বিষক্রিয়া। বাঙালী মুসলমানের আজকের আত্মপচনের মূল কারণ হলো এটি।

দেশে আজ স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পত্র-পত্রিকার সংখ্যা বিপুল। কিন্তু তাতে সত্যজ্ঞান ও সত্য-দর্শনের আবাদ বাড়েনি; বরং বেড়েছে ঈমানবিনাশী বিষপানের মহা আয়োজন। জনগণের জীবনে এখন শুরু হয়েছে তারই বিষক্রিয়া। ইসলামের পূর্বে আরবী সাহিত্যে বিষপানের যে আয়োজনটি ছিল, সে তুলনায় বাংলাভাষার ভাণ্ডারটি বিশাল। পৌত্তলিকদের এতবড় সাহিত্যভাণ্ডার বিশ্বের আর কোন ভাষায় নেই। এ কাজে রবীন্দ্রনাথের তো নবেল প্রাইজও মিলেছে। তবে এ ভাণ্ডার শুধু রবীন্দ্রনাথ বা বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্ট নয়,বরং গড়ে উঠেছে শত শত বাঙালী পৌত্তলিক সাহিত্যিকের সম্মিলিত চেষ্টায়।আধুনিক বাংলা গড়ে উঠেছে মূলত হিন্দুদের দ্বারা। এবং সেটি হিন্দুদের গোড়া হিন্দু রূপে গড়ে তোলার প্রয়োজনে। বাংলা ভাষার শতকরা ৯০ ভাগের বেশী বইয়ের লেখক তারাই। ফলে বেদ, পুরান, গীতা,উপনিষদ, রামায়ন, মহাভারতের চরিত্রগুলি তাই বাংলা সাহিত্যে অতি সরব ও সোচ্চার। শুধু বঙ্কিম সাহিত্যে নয়, রবীন্দ্র সাহিত্যেও হিন্দু ধর্ম, হিন্দু একতা ও হিন্দুরাজের চেতনাটি যে কতটা প্রকট সেটিও এ প্রবন্ধে নীচে তুলে ধরা হয়েছে।

ঈমান,আমল ও সৎ চরিত্র নিয়ে বাঁচতে হলে চেতনার সুস্বাস্থটি জরুরী। চেতনার মানচিত্রে লাগাতর বিষ ঢুকলে সেটি  সম্ভব নয়, অথচ পৌত্তলিক সাহিত্য পাঠে তো সেটিই ঘটে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ অতীতে এ বিষের ভাণ্ডারকে তাই সতর্কতার সাথে পরিহার করেছে। তারা বরং চেতনায় পুষ্টি জুগিয়েছে উর্দু ও ফার্সী ভাষা থেকে। কিন্তু ১৯৭১য়ের ডিসেম্বরে যুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিকৃতি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর সংযোগ গড়া হয় হিন্দুদের গড়া পৌত্তলিক বিষ ভান্ডারের সাথে। জ্ঞানচর্চার অঙ্গণে সংযোগ ছিন্ন করা হয় পবিত্র কোরআনের সাথেও। বাঙালী মুসলিমের চেতনায় তখন বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় ঢুকানো হয় পৌত্তলিক সাহিত্য, সিনেমা ও গান। পৌত্তলিক চেতনায় সমৃদ্ধ বরীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দেয়া হয়।অথচ সে লক্ষে এ গানটি লেখা হয়নি।

বিবেকে বিষক্রিয়া

শিক্ষা ও সাহিত্যের নামে লাগাতর বিষপান হলে বিবেকে বিষক্রিয়া দেখা দিবে –সেটিই তো স্বাভাবিক। তখন সৃষ্টি হয় চরম নৈতিক বিপর্যয়। মুসলিম শিশুদের মুসলিম রূপে গড়ে তোলার কাজটি বিশাল। একাজ শুধু পিতামাতা ও মসজিদ-মাদ্রাসার দ্বারা হওয়ার নয়। বরং সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টিভি,পত্রপত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থার। ছাত্রদের শুধু বিষপান থেকে বাঁচালে চলে না, তাদের চেতনায় কোরআনী জ্ঞানের পুষ্টিও জোগাতে হয়।রাষ্ট্রের ঘাড়ে এটিই সবচেয়ে বড় দায়ভার। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে সরকারের পক্ষ থেকে সে দায়িত্ব পালিত হয়নি। মুসলিম শিশুকে মুসলিম রূপে গড়ে তোলার কাজটি সরকারি মহলে সাম্প্রদায়িকতা গণ্য হয়।অথচ স্কুল-কলেজে পৌত্তলিক সাহিত্য পড়ানোর কাজটি সরকার নিজ কাঁধে নিয়েছে। অতি পরিকল্পিত ভাবেই ছাত্র-ছাত্রীদের কোরআন বুঝার সামর্থ বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া হয়নি।অথচ সে সামর্থ অর্জনটি প্রতিটি মুসলমান নরনারীর উপর ফরজ। সরকারের এরূপ ইসলামবিরোধী শিক্ষানীতির কারণে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, কৃষিবিদ, আইনবিদ,হিসাববিদ ও অন্যান্য পেশাধারি তৈরী হলেও সত্যিকার মুসলিম তৈরী হচ্ছে খুব কমই। যারা হচ্ছে তারা নিজ উদ্যোগে।কোরআনী জ্ঞানের জ্ঞানশূণ্যতায় কি ঈমান বাঁচে? বাঁচে কি চরিত্র? ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ঈমাননাশ ও চরিত্রনাশের মহামারি ছেয়ে গেছে সমগ্র দেশ জুড়ে। ফলে জাহেলী যুগের আরবদের চেয়েও ভয়াবহ দুর্বৃত্তি নেমে এসেছে বাংলাদেশের উপর।লাগাতর বিষপানের পরিণতিতে এ ভয়ানক বিষক্রিয়া। ইসলামপূর্ব যুগে আরবের জাহেলগণ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে শিরোপা পেয়েছে -সে প্রমাণ ইতিহাসে নেই। লুন্ঠনে লুন্ঠনে দেশের বুকে তারা দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছে বা মহিলাদের মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য করেছে -সে প্রমাণও নেই। বরং জাহিলিয়াতের যুগেও মেহমানদারিতে তাদের সুনাম ছিল, হাতেম তায়ীর মত ব্যক্তিও তাদের মাঝে জন্ম নিয়েছে। বিদেশীদের ঘরে তারা কখনোই নিজেদের কন্যা, বোন বা স্ত্রীদেরও রপ্তানি করেনি। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশী জাহেলদের নীচে নামার অর্জনটি তো বিশাল। দুর্বৃত্তিতে তারা বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে। ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়েছে; কাপড়ের অভাবে মহিলারা বাধ্য হয়েছে মাছধরা জাল পড়তে। এবং নারী রপ্তানি পরিণত হয়েছে দেশের অর্থনীতিতে।

হাসিনা বর্বরতার আরেক ইতিহাস গড়েছে অন্য ভাবে। সেটি প্রাণ বাঁচাতে আসা ও সমুদ্রে ভাসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বঙ্গীয় উপকূলে উঠতে না দিয়ে। সে বর্বরতাটিও বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। এমন কি জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল মিষ্টার বান কি মুনও তাকে এরূপ নিষ্ঠুর আচরন পরিহারে আহবান জানিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের প্রতি সদয় হতে বলেছিলেন। কিন্তু বিবেকহীন নিষ্ঠুরতাই যার রাজনীতির মূলমন্ত্র, তার কাছে কি মানবতা বা কারো সুপরামর্শ গুরুত্ব পায়? এখন রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে খোদ বাংলাদেশীরা কদর্য ইতিহাস গড়ছে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও নানা দেশে চাকুরির সন্ধানে নেমে। মালয়েশিয়ার সরকারের দাবী,সমূদ্রে ভাসা উদ্বাস্তুদের শতকরা ৭০ ভাই বাংলাদেশী।(এ প্রবন্ধের লেখক নিজে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় এমন বাংলাদেশীদের দেখেছেন যারা নিজেরাই লেখককে বলেছে,রোহিঙ্গা পরিচয় দিয়ে তারা তুরস্কের সরকার থেকে নিয়মিত ভাতা নিচ্ছে এবং সে সাথে কারখানায় কাজও করছে।) অপর দিকে বিহারীদের সাথে কৃত নিষ্ঠুরতা কি কম? স্রেফ অবাঙালী হওয়ার কারণে প্রায় ৪ লক্ষ বিহারীকে তাদের ঘরবাড়ী ও দোকান-পাট থেকে নামিয়ে সেগুলির দখল করে নিয়েছে বাঙালীরা। অথচ ১৯৭১য়ের পর সে পাকিস্তানে অবাঙালীদের মাঝে গিয়ে উঠেছে ১০ লাখের বেশী বাঙালী।

কোন দেশই দুয়েকজন নাগরিকের আত্মপচন, চুরিডাকাতি ও খুনখারাবীর কারণে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে না। সেরূপ রেকর্ড গড়তে আত্মপচনটি মহামারি রূপে দেখা দেয়া জরুরী। তেমনি এক আত্মপচনের মহামারি ছেয়ে গেছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। ফলে দেশজুড়ে ভোট ডাকাতি, ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ার মার্কেট লুট বা শাপলা চত্বরের ন্যায় নৃশংস গণহত্যাও তখন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।বিবেকের এ মহামারিতে চিকিৎসাতেও কোন আগ্রহ থাকে না।চোর-ডাকাতদের পাড়ায় চুরি-ডাকাতি,খুন-ধর্ষণ ও সন্ত্রাস নিয়ে তাই কখনো বিচার বসে না। তা নিয়ে কারো লজ্জাবোধও হয় না।বরং সে মহল্লায় পাপকর্মে যার অধীক সামর্থ তাকে নিয়ে গর্ব হয়;এবং উৎসবেরও আয়োজন হয়।জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসব এবং এবারের বাংলা নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে মহিলাদের কাপড় খুলে শ্লীলতাহানির উৎসবের পিছনে তো তেমনি এক অসুস্থ্য চেতনা কাজ করেছে। ধর্ষকদের কাছে প্রতিটি সফল ধর্ষণ এবং ডাকাতদের কাছে প্রতিটি সফল ডাকাতিতেই তো উৎসব। তাই যে দুর্বৃত্তপাড়ায় ধর্ষণ হয় বা ডাকাতি হয় সেখানে প্রচণ্ড উৎসবও হয়। ডাকাতিতে সফল নেতৃত্বের জন্য সর্দার বা সর্দারনীকে বিপুল সংবর্ধনাও দেয়া হয়।তাই প্রতিদিন উৎসব লেগে আছে বাংলাদেশের মন্ত্রীপাড়ায়, সরকারি দলের অফিসে, দলীয়কর্মীদের ঘরে ঘরে এবং সরকারি প্রশাসনে।এমন উৎসবমুখর মহলে ভোটডাকাতি,ব্যাংকডাকাতি, দুর্বৃত্তি,সন্ত্রাস,মানবপাচার,নারীপাচার,গভীর সমূদ্রে ভাসমান হাজার হাজার বাংলাদেশী ও জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গাদের প্রস্রাবপান নিয়ে তাদের মাঝে দুশ্চিন্তা থাকার কথা নয়।লজ্জা-শরম থাকারও কথা নয়। বরং যা হবার তাই হচ্ছে। সেটি ভোট-ডাকাতিতে সফল নেতৃত্ব দেয়ায় ও দলীয় নেতাকর্মীদের চুরিডাকাতির সুযোগ করে দেয়ায় হাসিনার বিপুল সংবর্ধনার। আত্মপচনের এর চেয়ে বড় আলামত আর কি হতে পারে?

রবীন্দ্র সাহিত্যের বিষভান্ডার

রবীন্দ্রসাহিত্যে হিন্দুদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রচুর উপকরণ থাকলেও বাঙালী মুসলিমদের জন্য তা ছিল এক বিশাল বিষভান্ডার। রবীন্দ্রনাথ যে কতটা মুসলিম বিরোধী ছিলেন সেটি কোন গোপন বিষয় নয়, নানা ভাবে তার প্রকাশ ঘটেছে। সে চেতনাটির প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৯০৫ সালে। বিহার,বাংলা এবং আসাম নিয়ে তখন বৃহত্তর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রদেশ ছিল। ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে বিশাল এ প্রদেশের উপর প্রশাসনিক নজরদারী রাখা তখন কঠিন পড়ে। তাই নিজেদের প্রশাসনিক স্বার্থে তারা প্রদেশটিকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়, এবং ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে গঠন করে একটি নতুন প্রদেশ। এ নতুন প্রদেশের রাজধানি হয় ঢাকা।এ সিদ্ধান্তের পিছনে ব্রিটিশদের মনে কোনরূপ মুসলিমপ্রীতি কাজ করেনি, বরং কাজ করেছে সাম্রাজ্যবাদি স্বার্থ। কিন্তু হিন্দুরা বিষয়টিকে হিন্দু স্বার্থের বিরুদ্ধে  ক্ষতিকর রূপে গণ্য করে। পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিল দরিদ্র মুসলিম। পূর্ব বাংলার সম্পদে পশ্চিম বাংলার মানুষের উন্নতি ঘটলেও পূর্ব বাংলার মানুষের তাতে কোন পরিবর্তন ঘটেনি। পূর্ববাংলা ছিল কলকাতা কেন্দ্রীক কলকারখানার কাঁচা মালের প্রধানতম উৎস,কিন্তু তাদের উন্নয়নে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ১৯০৫ সালে নতুন প্রদেশ সৃষ্ট হওয়াতে পূর্ব বাংলার মুসলিমগণ শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অঙ্গণে কিছুটা উন্নয়নের মুখ দেখেছিল। কিন্তু সেটি গণ্য হয় বহু যুগ ধরে প্রতিষ্ঠিত বর্ণহিন্দুদের কায়েমি স্বার্থের উপর প্রচন্ড আঘাত রূপে। তখন বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের অজুহাত খাঁড়া করে বর্ণ হিন্দুরা নতুন এ প্রদেশকে বাতিল কররা দাবীতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে আন্দোলনে সকল হিন্দু জমিদার, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক,সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা এক হয়ে যান। সেই সময় ভারতীয় কংগ্রেস শুরু করে স্বদেশী আন্দোলন। সে আন্দোলনে প্রয়োজন ছিল একজন জাতীয় হিন্দু নেতার মডেল। সে প্রয়োজন তারা ইতিহাস থেকে তুলে আনেন শিবাজীর ন্যায় ভারতের মুসলিম শাসনের কট্টোর বিরোধী ও সন্ত্রাসী শিবাজীকে। কংগ্রেসি নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক শিবাজীকে ভারতীয় হিন্দু-জাতীয়তাবাদের জনক রূপে খাড়া করেন। তখন থেকেই রাজনীতির ময়দানে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গোড়াপত্তন। শিবাজীকে ভারতীয় হিন্দুদের জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে চালু করা হয় শিবাজী উৎসব। এর আগে ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় “গো-রক্ষিণী সভা”। এ সব আয়োজনের মাধ্যমে হিন্দু মুসলিমের মধ্যে তৈরি হয় সাম্প্রদায়িক হানাহানির পরিবেশ। ব্রিটিশ সরকার ১৮৯৭ সালে এর জন্য তিলককে গ্রেফতার করে। রবীন্দ্রনাথের সাম্প্রদায়িক চেতনা তখন আর গোপন থাকেনি।  ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জনক তিলককে মুক্ত করতে তিনি তখন রাস্তায় নেমে পড়েন। তাকে মুক্ত করার জন্য অর্থ সংগ্রহে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতেও তিনি  দ্বিধা করেননি। শুধু অর্থ ভিক্ষা নয়,তিলকের আবিষ্কৃত শিবাজীর পথকেই ভারতীয় হিন্দুদের মুক্তির পথ রূপে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি নিজে মেতে উঠেছিলেন শিবাজী বন্দনায়।

রবীন্দনাথের নিজের একটি রাজনৈতিক দর্শন ছিল, ভারতীয় রাজনীতিতে সে দর্শন নিয়ে একটি প্রবল পক্ষ ছিল এবং সে পক্ষের সাথে রবীন্দ্রনাথের গভীর একাত্মতাও ছিল।  সে রাজনৈতিক দর্শনের প্রবল প্রকাশ ঘটেছে তার লেখা কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও গানে। “শিবাজি উৎসব” কবিতাটি হলো রবীন্দ্রনাথের তেমনি এক রাজনৈতিক দর্শনের কবিতা। সে দর্শনটি ছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদের। এ কবিতাটিতে প্রকাশ পেয়েছে তার রাজনৈতিক ভাবনার সাথে তার পূজনীয় বীরের ছবি। বাঙালী হলেও রবীন্দ্রনাথ ভাবনাটি বাংলার আলো-বাতাস ও ভূগোল দিয়ে সীমিত ছিল না। তিনি ভাবতেন অখন্ড ভারত নিয়ে। অখন্ড ভারতের সে মানচিত্রে মুসলমানদের জন্য কোন স্থান ছিল না। রবীন্দ্রনাথের পিতা ও পিতামহ ব্রাহ্মধর্মের অনুসারি হলেও রবীন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখতেন একজন গোঁড়া হিন্দু রূপে। তার স্বপ্নটি ছিল সমগ্র ভারতজুড়ে হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার। সে হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে যিনি বীর রূপে যিনি গণ্য হয়েছেন তিনিও বাঙালী নন, বরং সূদুর মহারাষ্ট্রের অবাঙালী শিবাজী। “শিবাজি-উৎসব” কবিতাটিতে প্রকাশ পেয়েছে শিবাজির সে রাজনৈতিক মিশনের সাথে রবীন্দ্রনাথের একাত্মতা। শিবাজিকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন,

মারাঠার কোন শৈলে অরণ্যের অন্ধকারে ব’সে,

হে রাজা শিবাজি,

তব ভাল উদ্ভাসিয়া এ ভাবনা তড়িৎপ্রভাবৎ

এসেছিল নামি-

“এক ধর্মরাজ্য পাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত

বেধে দিব আমি।”

“খণ্ড চ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত” ভারতকে আবার এক অখণ্ড হিন্দু ধর্মরাজ্য রূপে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন শিবাজি দেখেছিল সেটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের নিজের স্বপ্ন। সে অভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আর শিবাজির চেতনা একাকার হয়ে গেছে।এখানেই রবীন্দ্রনাথ দাড়িয়েছেন শিবাজির ন্যায় ইসলাম ও মুসলমানের প্রতিপক্ষ রূপে। ভারত জুড়ে তখন মোগলদের শাসন। হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিবাজী বেছে নেয় মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসের পথ। শিবাজির  মুসলিম শাসনবিরোধী সে বিদ্রোহ ও সন্ত্রাস শতাধিক বছর পূর্বে হলেও রবীন্দ্রনাথের মনে তা নিয়ে উৎসব মুখর হয়ে উঠে। “শিবাজি-উৎসব” কবিতায় তো সেটিরই প্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্র সাহিত্যে এভাবেই মুসলিম বিরোধী নাশকতার শুরু। রবীন্দ্রনাথের মাঝে এ নিয়ে প্রচন্ড দুঃখবোধ ছিল যে,বাঙালীগণ সে সময় শিবাজিকে চিনতে পারিনি এবং তার স্বপ্ন ও সন্ত্রাসের সাথে একাত্ম হতে পারিনি।রবীন্দ্রনাথ তার কবিতাটিতে বাঙালী বলতে যাদের বুঝিয়েছেন সেখান বাংলাভাষী মুসলমানদের কোন স্থান ছিল না । বাঙালী বলতে তিনি একমাত্র হিন্দুদেরই বুঝিয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র তার লেখায় “আমাদের পাড়ায় বাঙালী ও মুসলমানদের খেলা” যে বাঙালীদের বুঝিয়েছিলেন সে বাঙালীদের মাঝেও বাঙালী মুসলমানদের জন্য কোন স্থান ছিল না।

বাঙালী মুসলিমের বিষপান

রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন।অখণ্ড ভারত জুড়ে শিবাজির ন্যায় তার মনেও হিন্দুধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠায় প্রচণ্ড আগ্রহ জাগবে  -তাতেই দোষের কি? হিন্দু মন্দির গড়বে, হিন্দু ধর্মরাজ্য গড়বে সেটিই তো স্বাভাবিক। বাঙালী ও মুসলমানদের মাঝে চেতনার পরিচয়ে যে বিভাজন রেখা টানবেন –তাতেই বা দোষের কি? মানুষে মানুষে বিভাজন তো গড়ে উঠে ধর্ম, সংস্কৃতি ও চেতনার সে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে। সে ভিন্ন পরিচয় নিয়ে বাঙালী হিন্দু  ও মুসলমানগণ যে সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন ধারার এবং তাদের মাঝে মিলন যে অসম্ভব –সেটি রবীন্দ্রভক্ত বাঙালী মুসলিমগণ না বুঝলেও রবীন্দ্রনাথ বুঝতেন। ফলে রবীন্দ্রনাথ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় হিন্দুত্বের সে ধারায় গিয়ে মিশে গেছেন। যে কোন মিশনারীর ন্যায় রবীন্দ্রনাথও চাইতেন অন্যরাও তার সে হিন্দুত্বের ধারায় মিশে যাক। হিন্দুত্বের সে ধারাটিতে রয়েছে ভারতের বুকে মুসলিম প্রভাবের বিলুপ্তির প্রবল ব্যগ্রতা। রয়েছে হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীনতা। এমন রবীন্দ্রনাথের ন্যায় এমন এক উগ্র হিন্দুর সাহিত্যকে আপন রূপে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এখানেই মুসলমানদের মূল সমস্যা। এটি তো বিষপান। হিন্দুধর্ম রাজ্যের এমন এক উগ্র ধ্বজাধারিকে একজন মুসলমান তার নিজ চেতনার প্রতিনিধি রূপে গ্রহণ করে কি করে? তার লেখা গান ও  কবিতাই একজন মুসলমান গায় কি করে? তার জন্ম দিনে উৎসবই বা করে কি করে? ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে রবীন্দ্রভক্ত বাংলাদেশীদের এখানেই বড় গাদ্দারি। এ গাদ্দারগণই মুসলিম চেতনায় লাগাতর বিষ ঢালছে।

স্বপ্নটি হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠার

শিবাজি মারা গেছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার দর্শন ও রাজনৈতিক অভিলাষটি মারা পড়েনি। ভারতে সে চেতনাটি বেঁচে আছে শিবসেনা, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ,বজরং দল ও ভারতীয় জনতা পার্টির ন্যায় বিভিন্ন উগ্র হিন্দুবাদি দলগুলোর মাঝে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও যে ভূগোলের স্বপ্নটি দেখতেন সেটি অবিভক্ত বাংলার নয়। সেটি অখণ্ড হিন্দু ধর্মরাজ্য ভারতের। নিজের  জীবদ্দশাতে রবীন্দ্রনাত সে হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকারটি দেখতে পেয়েছিলেন বাল গঙ্গাধর তিলকের রাজনীতিতে।তিলক তার কাছে গণ্য হয়েছিল শিবাজি’র মিশনকে এগিয়ে নেয়ার রাজনীতিতে আদর্শ নেতা রূপে। শিবাজী সে মিশনকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থেই তিলক নিজ রাজ্য মহারাষ্ট্রে শিবাজি উৎসবের শুরু করেন। সে উৎসবের সাথে একাত্মতার ঘোষণা দিতে বাঙালী কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্রনাথ বানার্জি ছুটে যান বোম্বাইয়ে। মারাঠীদের ন্যায় কলকাতার বাঙালী হিন্দুদের উদ্যোগে শিবাজি উৎসব শুরু হয় বাঙলার বুকেও।

শিবাজী তার হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার যুদ্ধটি শুরু করে মোগল সম্রাট আরোঙ্গজেবের সময়। কিন্তু সে প্রচেষ্ঠা ব্যর্থ হয়। বাংলার মানুষই শুধু নয়, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরাও শিবাজীর সে আন্দলনে সারা দেয়নি। শিবাজির মিশনটিকে চিনতে বাঙালীর সে ব্যর্থতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনে প্রচন্ড আফসোস ছিল। কিন্তু এবারে তার মনে গভীর আনন্দ।এবং মনের সে বিপুল আনন্দ নিয়েই রবীন্দ্রনাথের শিবাজি উৎসব কবিতা। সেটি একারণে যে,বাঙালীরা শিবাজিকে চিনতে পেরেছে এবং তার দর্শন নিয়ে মারাঠীদের সাথে মিলে উৎসব শুরু হয়েছে। তবে বাঙালীদের থেকে রবীন্দ্রনাথের চাওয়াটি আরেকটু গভীর। তিনি চান, বাঙালীগণ আবির্ভূত হোক হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার সৈনিক রূপে। রবীন্দ্রনাথ এখানে আবির্ভূত হয়েছেন স্রেফ কবি হিসাবে নয়, বরং হিন্দু ধর্মরাজ্যে স্বপ্নদ্রষ্টা ও রাজনৈতিক নেতা রূপে। তাই তিনি লিখেছেন,

“মারাঠার প্রান্ত হতে একদিন তুমি ধর্মরাজ,

ডেকেছিলে যবে

রাজা ব’লে জানি নাই, মানি নাই, পাই নাই লাজ

হে ভৈরব রবে।

তোমারে চিনেছি আজি, চিনেছি চিনেছি হে রাজন,

তুমি মহারাজ।

তব রাজকর লয়ে আট কোটি বঙ্গের নন্দন

দাঁড়াইবে আজ।”

 

বাল গঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বে হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলনটি রবীন্দ্রনাথের মনে যে কীরূপ উম্মাদনা সৃষ্টি করে সেটিই প্রকাশ পায় শিবাজি-উৎসব কবিতায়। মনের মাধুরি মিশিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

“সেদিন শুনিনি কথা
আজি মোরা তোমার আদেশ
শির পাতি লব,
কণ্ঠে কণ্ঠে বক্ষে বক্ষে
ভারতে মিলিবে সর্বশেষ ধ্যান-মন্ত্র তব।
ধ্বজা ধরি উড়াইব বৈরাগীর উত্তরী বসন
দরিদ্রের বল,
এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে
এ মহাবচন করব সম্বল।
মারাঠির সাথে আজি,হে বাঙ্গালী
এক কণ্ঠে বল ‘জয়তু শিবাজী।
মারাঠির সাথে আজি,হে বাঙ্গালি,
এক সঙ্গে চলো মহোৎসবে সাজি।
আজি এক সভা তলে
ভারতের পশ্চিম পুরব দক্ষিণ ও বামে
একত্রে করুক ভোগ এক সাথে একটি গৌরব
এক পুণ্য নামে।—

শিবাজীর মিশন থেকে আর দূরে থাকা নয়, রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে এবার ঘোষিত হলো শিবাজী’র উগ্রহিন্দুত্বের দর্শন ও আন্দোলেনের সাথে “কণ্ঠে কণ্ঠে বক্ষে বক্ষে” পূর্ণ একাত্মতার ঘোষণা। সে  সময় তিলক ও অন্যান্য হিন্দু সাম্প্রদায়িক নেতাগণ শুরু করেন হিন্দুদের গো-দেবতা বাঁচানোর লড়াই। হিন্দুদের এ লড়াইয়ে আক্রমণের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় মুসলমানগণ। কারণ, মুসলিমরা গরু জবাই করে গরুর গোশতো খায় অথচ গরু হিন্দুদের উপাস্য। গো-দেবতা হত্যা বন্ধ ও হত্যার প্রতিশোধ নিতে গড়ে তোলা হলো গরু রক্ষা সমিতি। এতে গরুর নিরাপত্তা বাড়লেও ভারত জুড়ে নিরাপত্তা হারালো মুসলিমের জানমাল ও ইজ্জত-আবরু। অথচ তাদের গো-দেবতার ভক্ষক শুধু মুসলিম ছিল না, ছিল খৃষ্টানগণও। অর্থাৎ খৃষ্টান ইংরেজগণ।কিন্তু হিন্দু নেতাদের দ্বারা খৃষ্টান বা ইংরেজগণ দেবতার ভক্ষক রূপে চিত্রিত হয়নি, ফলে তাদের বিরুদ্ধে উগ্রবাদি হিন্দুদের কোনরূপ অভিযোগ বা  উচ্চবাচ্য ছিল না। ফল দাঁড়ালো,এ আন্দোলনের ফলে হিন্দু ও মুসলিমনগণ একে অপরের শত্রু রূপে চিহ্নিত হলো। শুরু হলো সংখ্যালঘিষ্ট মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম ঘৃনা ও প্রতিশোধের স্পৃহা। শুরু হলো ভারত জুড়ে মুসলিম নির্মূলের দাঙ্গা।

মুসলিম বিদ্বেষী উগ্র রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের মুসলিম বিদ্বেষী ও উগ্র হিন্দুত্বের চেতনাটি শুধু শিবাজি-উৎসব কবিতায় সীমিত নয়। সেটির প্রকাশ পেয়েছে তার “বিচার”,“মাসী”,“বন্দীবীর”,“হোলীখেলা” কবিতায় এবং “সমস্যা পুরাণ”,“দুরাশা”,“রীতিমত নভেল” ও “কাবুলিওয়ালা” গল্পে। মুসলিমদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের ধারণাটি কীরূপ ছিল সেটি প্রকাশ পায় “রীতিমত নভেল” নামক একটি ছোটগল্পে। তিনি লিখেছেনঃ “আল্লাহো আকবর শব্দে বনভূমি প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠেছে। একদিকে তিন লক্ষ যবন সেনা অন্য দিকে তিন সহস্র আর্য সৈন্য। … পাঠক, বলিতে পার … কাহার বজ্রমন্ত্রিত ‘হর হর বোম বোম’ শব্দে তিন লক্ষ ম্লেচ্ছ কণ্ঠের ‘আল্লাহো আকবর’ ধ্বনি নিমগ্ন হয়ে গেলো। ইনিই সেই ললিতসিংহ। কাঞ্চীর সেনাপতি। ভারত-ইতিহাসের ধ্রুব নক্ষত্র।” রবীন্দ্রনাথের ‘দুরাশা’ গল্পের কাহিনীটি আরো উৎকট মুসলিম বিদ্বেষে পূর্ণ। এখানে তিনি দেখিয়েছেন, একজন মুসলিম নারীর হিন্দু ধর্ম তথা ব্রাহ্মণদের প্রতি কি দুর্নিবার আকর্ষণ এবং এই মুসলিম নারীর ব্রাহ্মণ হওয়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্ঠার চিত্র। রবীন্দ্রনাথে শেষ জীবনে যে মুসলমানির গল্পটি লিখিয়েছিলেন সে গল্পের নায়ক ছিলেন হবি খাঁ। হবি খাঁ’র মধ্যে তিনি উদারতার একটি চিত্র তূল ধরেছেন। তবে সে উদারতার কারণ রূপে দেখিয়েছেন,হবি খাঁ’র মা ছিল হিন্দু অভিজাত রাজপুতিনী। এভাবে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন,মুসলিম একক ভাবে মহৎ হতে পারেনা।

মুসলমান সমাজের প্রতি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির নিখুঁত পরিচয়টি পাওয়া যায় ‘কণ্ঠরোধ’ (ভারতী, বৈশাখ-১৩০৫) নামক প্রবন্ধে। সিডিশন বিল পাস হওয়ার পূর্বদিনে কলকাতা টাউন হলে এই প্রবন্ধটি তিনি পাঠ করেন। এই প্রবন্ধে উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবাদী যবন, ম্লেচ্ছদের একটি ক্ষুদ্র দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন,“কিছুদিন হইল একদল ইতর শ্রেণীর অবিবেচক মুসলমান কলিকাতার রাজপথে লোষ্ট্র খন্ড হস্তে উপদ্রবের চেষ্টা করিয়াছিল। তাহার মধ্যে বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে- উপদ্রবের লক্ষ্যটা বিশেষরূপে ইংরেজদেরই প্রতি। তাহাদের শাস্তিও যথেষ্ট হইয়াছিল। প্রবাদ আছে- ইটটি মারিলেই পাটকেলটি খাইতে হয়; কিন্তু মূঢ়গণ (মুসলমান) ইটটি মারিয়া পাটকেলের অপেক্ষা অনেক শক্ত শক্ত জিনিস খাইয়াছিল। অপরাধ করিল, দণ্ড পাইল; কিন্তু ব্যাপারটি কি আজ পর্যন্ত স্পষ্ট বুঝা গেল না। এই নিম্নশ্রেণীর মুসলমানগণ সংবাদপত্র পড়েও না, সংবাদপত্রে লেখেও না। একটা ছোট বড়ো কাণ্ড – হইয়া গেল অথচ এই মূঢ় (মুসলমান) নির্বাক প্রজা সম্প্রদায়ের মনের কথা কিছুই বোঝা গেল না। ব্যাপারটি রহস্যাবৃত রহিল বলিয়াই সাধারণের নিকট তাহার একটা অযথা এবং কৃত্রিম গৌরব জন্মিল। কৌতূহলী কল্পনা হ্যারিসন রোডের প্রান্ত হইতে আরম্ভ করিয়া তুরস্কের অর্ধচন্দ্র শিখরী রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত সম্ভব ও অসম্ভব অনুমানকে শাখা পল্লবায়িত করিয়া চলিল। ব্যাপারটি রহস্যাবৃত রহিল বলিয়াই আতঙ্ক চকিত ইংরেজি কাগজে কেহ বলিল, ইহা কংগ্রেসের সহিত যোগবদ্ধ রাষ্ট্র বিপ্লবের সূচনা; কেহ বলিল মুসলমানদের বস্তিগুলো একেবারে উড়াইয়া পুড়াইয়া দেয়া যাক, কেহ বলিল এমন নিদারুণ বিপৎপাতের সময় তুহিনাবৃত শৈলশিখরের উপর বড়লাট সাহেবের এতটা সুশীতল হইয়া বসিয়া থাকা উচিত হয় না।” -এই হলো হলো নির্ভেজাল রবীন্দ্র চেতনা। মুসলিম এবং ইসলামের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের মগজ যে কতটা বিষপূর্ণ ছিল সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাঁকি থাকে?

গুরু মুসলিম নির্মূলের

রবীন্দ্রনাথের পরিবারের জমিদারী ছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পাবনার শাহজাদপুর, রাজশাহীর পতিসর প্রভৃতি অঞ্চলে। আর এই অঞ্চলগুলি ছিল মুসলিম প্রধান। মুসলিম প্রজাগণই তার রাজস্ব জোগাতো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ব্যর্থ হন সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজাদের সাথে মনের সংযোগ বাড়াতে। তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়েও তিনি কোনদিন মাথা ঘামাননি। প্রজাদের জোগানো অর্থ দিয়ে মুসলিম প্রধান কুষ্টিয়া, পাবনা বা রাজশাহীতে তিনি একটি প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন –তার প্রমাণ নাই। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন হিন্দুপ্রধান পশ্চিম বাংলার বোলপুরে। উল্টো তার সাহিত্যে প্রকাশ পেয়েছে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের বিরুদ্ধে উগ্র সাম্প্রদায়িক মনভাব। উৎকট মুসলিম বিরোধী সংলাপ দেখা যায় তার নাটকে। নাটকের নট-নটিরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে যা বলে তা তাদের নিজেদের কথা নয়।নিজেদের ইচ্ছায় কিছু বলার অধিকার তাদের থাকে না। তারা তো তাই বলে যা নাট্যকার তাদের মুখ দিয়ে বলাতে চায়। ফলে নাটকের সংলাপের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় নাট্যকারের মনের চিত্রটি। মুসলিম বিরোধী রবীন্দ্রমনের সে কুৎসিত চিত্রটি প্রকাশ পেয়েছে তার রচিত ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নাটকে। প্রতাপাদিত্যের মুখ দিয়ে তিনি উচ্চারন করান,“খুন করাটা যেখানে ধর্ম, সেখানে না করাটাই পাপ। যে মুসলমান আমাদের ধর্ম নষ্ট করেছে তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম।” সাহিত্যের নামে এ ছিল মুসলিম নিধনে রবীন্দ্রনাথের পক্ষ থেকে খোলাখোলি উস্কানি। এ হলো রবীন্দ্রমানস! 

ভারতের বুকে মুসলিম শাসন আমলে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। একই শহরে ও একই গ্রামে হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি শত শত বছর শান্তিপূণ ভাবে বসবাস করেছে।রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু এক ধর্মের লোক অন্যধর্মের মানুষের ঘরে বা দোকানে আগুন দিয়েছে সে ঘটনা ঘটেনি। এমনকি হিন্দুদের রচিত ইতিহাসের বইয়েও তার উল্লেখ নাই। উল্লেখ নেই ইংরেজদের রচিত ইতিহাসের বইয়েও। দাঙ্গা সৃষ্টির জন্য চাই ঘৃনাপূর্ণ হিংস্র মনের মানুষ। সেরূপ মানুষ সৃষ্টির জন্য চাই বিষপূর্ণ সাহিত্য। আর মুসলিম শাসনামলে সেরূপ সাহিত্যই সৃষ্টি হয়নি। সে বিষপূর্ণ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে ব্রিটিশ আমলে এবং রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ন্যায় অসংখ্য মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু সাহিত্যিকদের দ্বারা। রাজনীতির অঙ্গনে দাড়িয়ে শিবসেনা নেতা বাল ঠ্যাকারে বা বিজিপী নেতা নরেন্দ্র মোদি যেরূপ মুসলিম বিরোধী উক্তি উচ্চারন করেন,তার চেয়েও বিষপূর্ণ লিখনি লিখেছেন তারা। ফলে মুসলিম নিধনের লক্ষ্যে দাঙ্গাগুলির শুরু গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ বা বিহারে হয়নি, সেটি হয়েছে বাংলায়। এবং সেটি ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের আগেই। কলকাতার রাজপথে ১৯৪৬ সালের আগষ্টে কলকাতায় হিন্দু গুন্ডারা যেভাবে মুসলিম হত্যা করে সেরূপ হত্যাকান্ড আজও ভারতের অন্য কোন শহরে ঘটেনি। একদিনেই ৫ হাজারের বেশী মুসলমানকে হত্যা করা হয়। যাদের অধিকাংশই ছিল নোয়াখালির দরিদ্র মুসলিম যারা কলকাতায় শ্রমিকের কাজ করতো।

কলকাতার সে দাঙ্গার কিছু নিজ চোখে-দেখা ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বাঙালী প্রফেসর ড. তপন রায় চৌধুরী তার “বাঙাল নামা” বইতে। প্রফেসর ড.তপন রায়চৌধুরি লিখেছেন, “নিজের চোখে দেখা ঘটনার বিবরণে ফিরে যাই। হস্টেলের বারান্দা থেকে দেখতে পেলাম রাস্তার ওপারে আগুন জ্বলছে। বুঝলাম ব্যাপারটা আমার চেনা মহাপুরুষদেরই মহান কীর্তি। হস্টেলের ছাদে উঠে দেখলাম –আগুন শুধু আমাদের পাড়ায় না, যতদূর চোখ যায় সর্বত্র আকাশ লালে লাল। তিন দি্ন তিন রাত কলকাতার পথে ঘাটে পিশাচনৃত্য চলে। … দাঙ্গার প্রথম ধাক্কা থামবার পর বিপজ্জনক এলাকায় যেসব বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন ছিলেন, তাঁদের খোঁজ নিতে বের হই। প্রথমেই গেলাম মুন্নুজন হলে। ..নিরঙ্কুশ হিন্দু পাড়ার মধ্যে ওদের হস্টেল। তবে ভদ্র বাঙালি পাড়া। সুতরাং প্রথমটায় কিছু দুশ্চিন্তা করিনি। কিন্তু দাঙ্গা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শিক্ষিত বাঙালির রুচি-সংস্কৃতির যেসব নমুনা দেখলাম, তাতে সন্দেহ হল যে, মুন্নুজান হলবাসিনী আমার বন্ধুদের গিয়ে আর জীবিত দেখবো না। …হোস্টেলের কাছে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে ভয়ে আমার বাক্যরোধ হল। বাড়ীটার সামনে রাস্তায় কিছু ভাঙা স্যুটকেস আর পোড়া বইপত্র ছড়ানো। বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে। ফুটপথে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন – একটু আগে পুলিশের গাড়ি এসে মেয়েদের নিয়ে গেছে।…শুনলাম ১৬ই আগষ্ট বেলা এগারোটা নাগাদ একদল সশস্ত্র লোক হঠাৎ হুড়মুড় করে হস্টেলে ঢুকে পড়ে। প্রথমে তারা অশ্রাব্য গালিগালাজ করে যার মূল বক্তব্য –মুসলমান স্ত্রীলোক আর রাস্তার গণিকার মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। …হামলাকারিরা অধিকাংশই ছিলেন ভদ্রশ্রেণীর মানুষ এবং তাঁদের কেউ কেউ ওঁদের বিশেষ পরিচিত, পাড়ার দাদা। ” –(তপন রায়চৌধুরী, বাঙাল নামা, ২০০৭)।

তিনি আরো লিখেছেন, “খুনজখম বলাৎকারের কাহিনী চারি দিক থেকে আসতে থাকে। …বীভৎস সব কাহিনী রটিয়ে কিছু লোক এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পায়। তার চেয়েও অবাক হলাম যখন দেখলাম কয়েকজন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত লোক মুসলমানদের উপর নানা অত্যাচারের সত্যি বা কল্পিত কাহিনি বলে বা শুনে বিশেষ আনন্দ পাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে দু-তিনজন রীতিমত বিখ্যাত লোক। প্রয়াত এক পন্ডিত ব্যক্তি, যাঁর নাম শুনলে অনেক নিষ্ঠাবান হিন্দু এখনও যুক্তকরে প্রণাম জানায়, তাঁকে এবং সমবেত অধ্যাপকদের কাছে নিকাশিপাড়ার মুসলমান বস্তি পোড়ানোর কাহিনি বলা হচ্ছিল। যিনি বলছিলেন তিনি প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিশ্বাসযোগ্য লোক। বেড়া আগুন দিয়ে বস্তিবাসীদের পুড়িয়ে মারা হয়। একজনও নাকি পালাতে পারিনি। ছেলেটি বলছিল, কয়েকটি শিশুকে আগুনের বেড়া টপকে তাদের মায়েরা আক্রমণকারীদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যাতে ওদের প্রাণগুলি বাঁচে। বাচ্চাগুলিকে নির্দ্বিধায় আবার আগুনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়।আমরা শুনেছিলাম,এই কুকীর্তির নায়ক কিছু বিহারী কালোয়ার। তার ভয়াবহ বর্ণনাটি শুনে সুশোভনবাবু মন্তব্য করেন,“এর মধ্যে নিশ্চয়ই বাঙালি ছেলেরা ছিল না?” শুনে সেই পন্ডিতপ্রবর গর্জে উঠলেন,“কেন, বাঙালি ছেলেদের গায়ে কি পুরুষের রক্ত নেই?” –(তপন রায়চৌধুরী, বাঙাল নামা,২০০৭)।এই হলো বাঙালী বাবুদের কাণ্ড।“খুন করাটা যেখানে ধর্ম, সেখানে না করাটাই পাপ। যে মুসলমান আমাদের ধর্ম নষ্ট করেছে তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম।” রবীন্দ্রনাথের এরূপ বিষপূণ্য সাহিত্য যে মুসলিম নিধনের জন্য হিন্দুদেরকে অতি হিংস্র ভাবে প্রস্তুত করেছিল –এ হলো সে হিংস্রতারই বহিঃপ্রকাশ।গুজরাত, মোম্বাই বা মিরাতের কোথাও একদিনে এত মুসলিমকে হত্যা করা হয়নি। “খুন করাটা যেখানে ধর্ম, সেখানে না করাটাই পাপ। যে মুসলমান আমাদের ধর্ম নষ্ট করেছে তাদের যারা মিত্র তাদের বিনাশ না করাই অধর্ম।” -রবীন্দ্রনাথের এরূপ বিষপূণ্য সাহিত্য যে মুসলিম নিধনের জন্য হিন্দুদেরকে অতি হিংস্র ভাবে প্রস্তুত করেছিল -তারই নৃশংস বহিঃপ্রকাশ ঘটে কলকাতার দাঙ্গায়।

বিনিয়োগে লাভ ও বিজয় উৎসব

মুসলিম নিধন ও হিন্দু ধর্মরাজ্য নির্মাণের লক্ষ্যে শিবাজি মারাঠায় যে সন্ত্রাস শুরু করেছিল, রবীন্দ্রনাথ তো সেটিই চাইতেন বাংলার বুকে। বিশ শতকের প্রথম দশক থেকে শুরু হওয়া হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার মূল দায়ভার যে রবীন্দ্রনাথ ও বংকীম চন্দ্রের ন্যায় সাহিত্যিকদের –সেটি কি অস্বীকারের উপায় আছে। সাহিত্যকে তারা ব্যবহার করেছেন হিন্দুদের মনে ঘৃণার আগুণ জ্বালাতে। মুসলিম বিরোধী যে সন্ত্রাস ও দাঙ্গা বাংলার বুকে শুরু হয়েছিল সেটিই ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে তীব্র গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। শিবসেনা নেতা বাল ঠ্যাকারে বা বিজিপী নেতা নরেন্দ্র মোদিদের কাছে রবীন্দ্রনাথ ও বংকীমেরা তো এজন্যই এত প্রিয়। এরাই হলো ভারতীয় উগ্র হিন্দুদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুরু। এবং তার স্বীকৃতি মেলে বঙ্কিমের “বন্দেমাতরম” গান এবং রবীন্দ্রনাথের “জনগণ মনোঅধিনায়ক ভারত ভাগ্যবিধাতা” গানকে ভারতের জাতীয় সঙ্গিত রূপে মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। ফলে মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যে ভারতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি রূপে প্রতিষ্ঠা পাবে -তা নিয়েও কি তাই সন্দেহ থাকে? বাংলাদেশের বুকে এমন রবীন্দ্র চেতনার চাষাবাদ বিপুল ভাবে বাড়াতে নরেন্দ্র মোদির সরকার সিরাজগঞ্জে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে অর্থ জোগাবে –তাতে আর বিস্ময়ের কি আছে? এ তো সামান্য বিনিয়োগ, কিন্তু লাভটি বিশাল। এটি তো ১৬ কোটি বাংলাদেশী মানুষের চেতনার মানচিত্র জুড়ে এক বিশাল ভূগোল জয়ের।

রবীন্দ্র নাথ আজ বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে তার গান গাওয়া দেখে বা তার নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা দেখে তিনি নিজেই যে বিস্ময়ে অট্টহাসি দিতেন -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? বাঙালী মুসলমানের আত্মপচন যে সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে সেটি দেখেও হয়তো তিনি প্রচুর পুলক পেতেন! কারণ ইসলামের শত্রুগণও কি মুসলিমদের এতো পচন অতীতে কখনো দেখেছে? রবীন্দ্রনাথ নিজেও হয়তো বাঙালী মুসলমানদের এরূপ পচন আশা করেননি। বিগত ১৪ শত বছরের অধীক কালের মুসলিম ইতিহাসে কোন মুসলিম জনগোষ্ঠি কি কোন পৌত্তলিকের গানকে মনের মাধুরি মিষিয়ে এভাবে গেয়েছে? পৌত্তলিকদের ন্যায় তারা কি কখনো মঙ্গলপ্রদীপ হাতে মিছিলে নেমেছে? রবীন্দ্রনাথ ও তার অনুসারিদের এখানেই বিশাল সফলতা। অজ্ঞান মানুষের মুখে বিষ ঢালা সহজ। আর বিষঢালার সে কাজটি করছে ভারতীয় আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে পালিত বিপুল সংখ্যক চাকর-চাকরেরা। বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, প্রশাসন ও মিডিয়া জগতে তারাই তো বিজয়ী শক্তি। বাঙালী মুসলমানের অজ্ঞানতার কারণ ইসলামি চেতনাশূণ্যতা –যা জন্ম নিয়েছে কোরআনি জ্ঞানের অভাবে।এর ফলে বিষকে বিষ,কাফেরকে কাফের এবং শত্রুকে শত্রু রূপে সনাক্ত করার সামর্থটি লোপ পেয়েছে বহু আগেই। ফলে পৌত্তলিক চেতনাসিক্ত রবীন্দ্রসাহিত্যে অবগাহন বা তার “শিবাজি-উৎসব’ কবিতা ও “আমার সোনার বাংলা”গানটি রবীন্দ্রভক্ত উগ্র হিন্দুগণ এখন আর একাকী গায় না,গাচ্ছে বাঙালী মুসলিমগণও।হিন্দু না বানাতে না পারলেও ইসলাম থেকে এরূপ দূরে সরানোর আনন্দ কি শত্রু মহলে কম? বাংলাদেশের মত একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মুসল্লি হত্যায় ও মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা রুখতে তাই কোন অমুসলিমকে অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে না। বাংলাদেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি,মিডিয়া ও রাজনীতিতে তাদের বিনিয়োগ তাই ব্যর্থ হয়নি। ইসলামের শত্রুদের ঘরে এজন্যই আজ এতো বিজয় উৎসব। ৩১/০৫/২০১৫




রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক চেতনা এবং বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত

সংক্রামক রবীন্দ্র-চেতনা

মানুষ শুধু তার দেহ নিয়ে বাঁচে না। বাঁচে তার চেতনা নিয়েও। সে চেতনাটি নিয়ে এ জীবন ও জগতের সর্বত্র তার বিচরণ। সেটি যেমন ধর্ম-কর্ম,রাজনীতি,সংস্কৃতি ও পোষাক-পরিচ্ছদে,তেমনি তার গদ্য,পদ্য,কথা ও গানে। কোন ব্যক্তিকে তার রুহ থেকে যেমন আলাদা করা যায় না,তেমনি আলাদা করা যায় না তার চেতনা থেকেও। মানুষ বেড়ে উঠে এবং তার মূল্যায়ন হয় সে চেতনার গুণে। ইসলামের পরিভাষায় সেটিই হলো তার ঈমান ও আক্বীদা। নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের আগে রোজহাশরে আল্লাহর কাছে প্রথমে হিসাব হবে ঈমান ও আক্বীদার। এখানে অকৃতকার্য হলে পাশের আর কোন সম্ভবনাই নাই। শত বছরের ইবাদত দিয়েও সেটি পূরণ হওয়ার নয়। মানুষের ধর্ম,কর্ম,সংস্কৃতি ও আচরনে বিপ্লব আসে তো ঈমান ও আক্বীদের গুণে। এখানে ভেজাল থাকলে ব্যক্তির ইবাদতে বা চরিত্রেও পরিশুদ্ধি আসে না। শিরক তো সে মহাবিপদই ঘটায়। রবীন্দ্রনাথের একটি বিশ্বাস ও চেতনা ছিল। এবং সেটি পৌত্তলিকতার।সে চেতনাটি প্রবল ভাবে ছড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে। তাঁর রচিত নাটক,ছোটগল্প ও গানে। আলোচ্য নিবন্ধে তাঁর “আমার সোনার বাংলা গান” থেকেই তার কিছু উদাহরণ দেয়া হবে।

যক্ষা,কলেরা ও এ্যাইডসের ন্যায় শারীরীক রোগই শুধু সংক্রামক নয়,বরং অতি সংক্রামক হলো চেতনার রোগ। বাংলাদেশের ভয়ানক বিপদটি মূলতঃ এখানেই। বাংলাদেশ ৫ বার বিশ্বের সবচেয়ে দূর্বৃত্ত কবলিত দেশের যে শিরোপা পেল বা সম্প্রতি বিশ্ববাংক থেকে দূর্নীতির যে অপমানকর সার্টিফিকেট পেল এবং সেসাথে পদ্মা সেতু ঋণ থেকে বঞ্চিত হলো -সেটি যক্ষা,কলেরা ও এ্যাইডসের ন্যায় দৈহীক ব্যাধির কারণে নয়। বরং ব্যাধিগ্রস্ত চেতনা ও চরিত্রের কারণে। চেতনা রোগাগ্রস্ত হয় ভ্রান্ত ধর্ম ও দর্শনে। মানব জীবনে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোন বিষয় নাই। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে একজন মুসলমানকে প্রতি নামাজের প্রতি রাকাতে সে ভ্রান্ত ধর্ম ও দর্শন থেকে বাঁচার জন্য দোয়া পাঠ করতে হয়। মহান আল্লাহর কাছে চাইতে হয় সিরাতুল মোস্তাকীম। সেটি সুরা ফাতেহা পাঠের মধ্য দিয়ে। অথচ এর বিপরীতে ছাত্র-শিক্ষক, নারী-পুরুষ সবার মধ্য রোগ ছড়ানো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় খরচে। পৌত্তলিক চেতনায় বিশ্বের কোথাও উন্নত চরিত্র গড়ে উঠেছে বা উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয় তার প্রমাণ নাই। সেটি তো আদিম জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার পথ। ১৪০০ শত বছর আগেই নবীজী ও তার সাহাবাগণ আরবের বুকে এমন একটি চেতনার কবর রচনা করেছিলেন। অথচ তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনাকে বাংলাদেশের বাঙালী জাতীয় সঙ্গিত রূপে মাথায় তুলেছে। রবীন্দ্রনাথের সংক্রামক পৌত্তলিক চেতনাটি ছড়ানো হচ্ছে তাঁর গানকে যেমন জাতীয় সঙ্গিত করে,তেমনি তাঁর রচিত গান,নাটক ও সাহিত্যকে জনগণের রাজস্বের অর্থে বিপুল ভাবে প্রচার করে। কোটি কোটি কণ্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গিত গেয়ে এবং স্কুল-কলেজে তাঁর সাহিত্য পড়িয়ে যে কোন চারিত্রিক বা নৈতিক বিপ্লব আসে না এবং বাংলাদেশে যে বিগত ৪০ বছরেও আসেনি সেটি কি এখনও প্রমাণিত হয়নি?

মুসলমান হওয়ার প্রকৃত অর্থটি হলো প্রবল এক ঈমানী দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচা। সে দায়বদ্ধতাটি প্রতি মুহুর্তের। বেঈমান থেকে ঈমানদারের মূল পার্থক্যটি এখানেই। বেঈমান ব্যক্তি মনের খুশিতে যা ইচ্ছা যেমন খেতে বা পান করতে পারে,তেমনি গাইতে, বলতে বা লিখতেও পারে। তার জীবনে কোন নিয়ন্ত্রন নাই।মহান আল্লাহর কাছে তার কোন দায়বদ্ধতার চেতনাও নাই। অথচ মু’মিনের জীবনে নিয়ন্ত্রন সর্বক্ষেত্রে। ঈমানের প্রথম আলামতটি শুরু হয় জিহ্ববার উপর নিয়ন্ত্রন থেকে। সে নিয়ন্ত্রনটি শুধু কালেমায়ে শাহাদত পাঠে সীমিত নয়। বরং সেটি তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি বাক্যের উপর। তাই কোন ব্যক্তির কাফের হওয়ার জন্য মন্দিরে গিয়ে মুর্তিকে পুজা দেয়া প্রয়োজন পড়ে না। জ্বিনা,উলঙ্গতা,মদ্যপান বা সূদ-ঘুষে লিপ্ত হওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না,বরং জিহ্ববা দিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কিছু বলা বা পৌত্তলিক চেতনাপূর্ণ কিছু উচ্চারণ করাই সে জন্য যথেষ্ট। তাই মু’মিন ব্যক্তিকে শুধু পানাহার,পোষাকপরিচ্ছদে বা ইবাদতে সতর্ক হলে চলে না,নিজের রচিত প্রতিটি গানে,কবিতায়,কথা বলায় বা লেখনিতেও লাগাতর সর্বদা সতর্ক থাকতে হয়। কাফের ব্যক্তি নোবেল প্রাইজ পেলেও তার জীবনে সে ঈমানী নিয়ন্ত্রন থাকে না। কারণ বড় কবি হওয়া বা নোবেল প্রাইজ পাওয়ার জন্য সেটি কোন শর্তও নয়। ইমরুল কায়েসে মত এক কাফেরও আরবের অতি বিখ্যাত কবি ছিল। কিন্তু সে ইমরুল কায়েস মুসলমানদের কাছে গুরুর মর্যাদা পায়নি। তাই কাফের বক্তি যত প্রতিভাবানই হোক তাঁর গানকে মুসলিম দেশের জাতীয় সঙ্গিত বানানো যায় না। কারণ তাতে সংক্রামিত হয় তার কুফরি চেতনা। অথচ বাংলাদেশে তো সে বিপদটি প্রকট ভাবে ঘটেছে।

জাতীয় সঙ্গিতের অর্থ শুধু ভাব,ভাষা,ছন্দ এবং আবেগের প্রকাশ নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় জাতির সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের আক্বিদা-বিশ্বাস,আশা-আকাঙ্খা,দর্শন,ভিশন ও মিশন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন “আমার সোনার বাংলা” গানটি লিখেছিলেন তখন বাংলাদেশ বলে কোন স্বাধীন দেশ ছিল না,বরং বাংলা ছিল ভারতের একটি প্রদেশ। সে প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলমান হলেও তাদের সংখ্যা শতকরা ৯০ ভাগ ছিল না।তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিজেও সে গানটিতে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ,দর্শন,চেতনা বা স্বপ্নের প্রকাশ ঘটাতে লেখেনি। সেটি যেমন তার লক্ষ্য ছিল না,সে লক্ষ্যে তাঁর প্রস্তুতিও ছিল না। বরং লিখেছেন একান্ত তাঁর নিজের ভাব ও আবেগের প্রকাশ ঘটাতে। ফলে সে গানে যা প্রকাশ পেয়েছে সেটি রবীন্দ্রনাথের একান্ত নিজের।বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নয়।রবীন্দ্রনাথ মুসলমান ছিলেন না। ফলে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিশ্বাস,দর্শন,স্বপ্ন,ভিশন ও মিশনের প্রতিনিধিত্ব করা বা সেগুলির প্রকাশ ঘটানোর সামর্থও তার ছিল না।

পৌত্তলিক রবীন্দ্র-চেতনা

পারিবারিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম হলেও কার্যতঃ ছিলেন পৌত্তলিক মুশরিক। আর এ জগতটাকে একজন মুসলমান যেভাবে দেখে,একজন পৌত্তলিক সেভাবে দেখে না। উভয়ের বিশ্বাস যেমন ভিন্ন,তেমনি চেতনার জগতটাও ভিন্ন। আর কবিতা ও গানে তো সে বিশ্বাসেরই প্রকাশ ঘটে।একজন মুসলমানের কাছে এ পৃথিবীর ভূমি,আলোবাতাস,মাঠঘাট,গাছপালা,ফুল-ফল,নদী-সমুদ্র এবং সেগুলির অপরূপ রূপ –এ সবকিছুই মহান আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন। এসব নিদর্শন দেখে সে মহান আল্লাহর কুদরত যে কত বিশাল সে ছবকটি পায়। ফলে স্রষ্টার এ অপরূপ সৃষ্টিকূল দেখে মু’মিন ব্যক্তি সেগুলিকে ভগবান বা মা বলে বন্দনা করে না,বরং হামদ ও নাত গায় সেগুলির সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর “আমার সোনার বাংলা” গানটিতে লিখেছেন:

আমার সোনার বাংলা,

আমি তোমায় ভালবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ,

তোমার বাতাস

আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।

ও মা,

ফাগুনে তোর আমের বনে

ঘ্রানে পাগল করে–

মরি হায়, হায় রে

ও মা,

অঘ্রানে তোর ভরা খেতে,

আমি কি দেখেছি মধুর হাসি।।

কি শোভা কি ছায়া গো,

কি স্নেহ কি মায়া গো–

কি আঁচল বিছায়েছ

বটের মূলে,

নদীর কূলে কূলে।

মা, তোর মুখের বাণী

আমার কানে লাগে

সুধার মতো–

মরি হায়, হায় রে

মা, তোর বদনখানি মলিন হলে

আমি নয়ন জলে ভাসি।।

রবীন্দ্রনাথের এ গানে ভাব আছে, ভাষা আছে, ছন্দও আছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু আছে যা একজন মুসলমানের ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক। এ গানে তিনি বন্দনা গেয়েছেন বাংলার ভূমির,এবং সে ভূমির আলো-বাতাস,নদীর কূল,ধানের ক্ষেত,আমবাগান ও বটমূলের। কিন্তু যে মহান আল্লাহতায়ালা সেগুলির স্রষ্টা,সমগ্র গানে একটি বারের জন্যও তাঁর বন্দনা দূরে থাক তাঁর নামের উল্লেখ পর্যন্ত নাই।একজন পৌত্তলিকের জন্য এটিই স্বভাবজাত। পৌত্তলিকের এখানেই মূল সমস্যা। এখানে পৌত্তলিকের ভয়ানক অপরাধটি হলো নানা দেবদেবী ও নানা সৃষ্টির নানা রূপ বন্দনার মাঝে মহান আল্লাহকে ভূলিয়ে দেয়ার। এটিই তার শিরক। এবং এজন্যই সে মুশরিক। মহান আল্লাহর বান্দার বহু বড় বড় গোনাহ মাফ করে দিবেন কিন্তু শিরকের গুনাহ কখনই মাফ করবেন না। নবীজী (সাঃ) সে হুশিয়ারিটি বহুবার শুনিয়েছেন। পৌত্তলিক ব্যক্তিটি তার মনের গহীন অন্ধকারের কারণে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে অসংখ্য সৃষ্টি দেখতে পেলেও সে সৃষ্টিকূলের মহান স্রষ্টাকে খুঁজে পায় না। রবীন্দ্রনাথও সে সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে উঠতে পারেননি। তাছাড়া গদ্য,পদ্য কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মুখ বা জিহবা কথা বলে না বরং কথা বলে তার চেতনা বা বিশ্বাস। ফলে সে কবিতা ও গানে ব্যক্তির আক্বিদা বা ধর্মীয় বিশ্বাস ধরা পড়ে। তাই “আমার সোনার বাংলা” গানে যে চেতনাটির প্রকাশ ঘটেছে সেটি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের। কোন মুসলমানের নয়। গানে ইসলামী চেতনার প্রকাশের সামর্থ থাকলে তো রবীন্দ্রনাথ মুসলমান হয়ে যেতেন। পৌত্তলিক চেতনা নিয়েই একজন পৌত্তলিক কবি কবিতা ও গান লিখবেন বা সাহিত্যচর্চা করবেন সেটিই তো স্বাভাবিক। এমন একটি চেতনার কারণেই পৌত্তলিক ব্যক্তি শাপ-শকুন,গরু, বানর-হনুমান,নদ-নদী,বৃক্ষ,পাহাড়-পর্বতকে উপাস্য রূপে মেনে নেয় এবং তার বন্দনাও গায়।এ গানের ছত্রে ছত্রে তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনারই প্রবল প্রকাশ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের কলমে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে তাঁর নিজ চেতনার সাথে আদৌ গাদ্দারি করেননি। কিন্তু ইসলামি চেতনার সাথে একজন মুসলমানের গাদ্দারি তখনই শুরু হয় যখন পৌত্তলিক চেতনার এ গানকে মনের মাধুরি মিশিয়ে সে গাওয়া শুরু করে।

আমার সোনার বাংলা গানের প্রেক্ষাপট

“আমার সোনার বাংলা” গানটি রচনার একটি ঐতিহাসিক পেক্ষাপট আছে। গানটি রচিত হয়েছিল ১৯০৫ সালের পর। বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয় ১৯০৫ সালে। পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় অর্থনীতি ও শিক্ষাদীক্ষায় অতি পশ্চাদপদ ছিল পূর্ব বঙ্গ। পূর্ববঙ্গের সম্পদে দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি ঘটছিল কোলকাতার। শুধু প্রশাসনই নয়,শিক্ষা ও শিল্প গড়ে উঠছিল শুধু কোলকাতাকে কেন্দ্র করে। মুসলমানদের দাবী ছিল বাংলাকে বিভক্ত করা হোক এবং পূর্ববঙ্গের রাজধানি করা হোক ঢাকাকে। সে দাবীর ভিত্তিতে ভারতের তৎকালীন ভাইস রয় লর্ড কার্জন পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিযে একটি আলাদা প্রদেশ গঠিত করেন। এ নতুন প্রদেশের রাজধানী রূপে গৃহীত হয় ঢাকা নগরী। শহরটি রাতারাতি জেলা শহর থেকে রাজধানী শহরে পরিণত হয়। তখন ঢাকায় কার্জন হলসহ বেশ কিছু নতুন প্রশাসনিক ইমারত এবং হাই কোর্ট ভবন নির্মিত হয়। নির্মিত হয় কিছু প্রশস্ত রাজপথ। প্রদেশটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলার এবং সে সাথে আসামের মুসলমানদের মাঝে আসে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যয়। ১৯০৬ সালে গঠিত হয় মুসলিম লীগ যা শুধু বাংলার মুসলমানদের জন্যই নয়, সমগ্র ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে সৃষ্টি করে নতুন আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনা। মুসলমানদের এ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং কোলকাতাকে ছেড়ে ঢাকার এ মর্যাদা-বৃদ্ধি কোলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি।কবি রবীন্দ্রনাথেরও ভাল লাগেনি। পূর্ব বাংলা পশ্চাদপদ মুসলমানদের প্রতি অগ্রসর বাঙালী হিন্দুদের কোন দরদ না থাকলেও খণ্ডিত বাংলার প্রতি তখন তাদের দরদ উপচিয়ে পড়ে। বাংলার মাঠঘাট,আলোবাতাস,জলবায়ু,বৃক্ষরাজী ও ফলমূলের প্রতি আবেগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন এ গান। তাই এ গানের একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। সেটি বাংলার বিভক্তির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। বাঙালী হিন্দুরা তখন অখণ্ড বঙ্গের দাবী নিয়ে রাজপথে নামে। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ভারত ভ্রমনে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভারত উপলক্ষে “জনগণ মনোঅধিনায়ক ভারত ভাগ্যবিধাতা” নামে কবিতা লেখেন। ভারতের সেটিই আজ জাতীয় সঙ্গিত।

রবীন্দ্রনাথ ও  বাঙালী হিন্দুদের সে দাবী রাজা পঞ্চম জর্জ মেনে নেন এবং আবার বাংলা একীভূত হয়। প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা নেমে আসে পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের মাঝে। বিক্ষুদ্ধ এ মুসলমানদের শান্ত করতে ভারতের ব্রিটিশ সরকার তখন ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়।কিন্তু সেটিও কোলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি। তার মধ্যেও তারা কোলকাতার শ্রীহানীর কারণ খুঁজে পায়। ফলে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও বাঙালী বাবুগণ তখন রাজপথে নামেন। খোদ রবীন্দ্রনাথে মিছিলে নেমেছিলেন কোলকাতার সড়কে। এই হলো রবীন্দ্র মানস। সে সাথে বাঙালী হিন্দুর মানস। আর সে মানসকে নিয়ে রচিত সঙ্গিত এখন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত।

আজকের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের আমলের অবিভক্ত বাংলা যেমন নয়,তেমনি দেশটি ভারতভূক্তও নয়। রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৫৫ ভাগের বেশী ছিল না। সে আমলের বাংলা ঢাকাকেন্দ্রীকও ছিল না। এখন এটি এক ভিন্ন চরিত্রের বাংলাদেশ -যে দেশে রবীন্দ্রনাথ একদিনের জন্যও বাস করেননি। কোনদিনও তিনি এদেশের নাগরিক ছিলেন না। এদেশের স্বাধীনতার কথা তিনি যেমন শোনেননি,তেমনি এ দেশের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানদের নিয়ে তিনি কোন স্বপ্নও দেখেননি। ফলে বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া,স্বাধীনতা বা স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব? তাছাড়া এ সঙ্গিতটি সে উদ্দেশ্যে লেখাও হয়নি। জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের বিষয়টি দোকান থেকে ‘রেডিমেড’ সার্ট কেনার ন্যায় নয়। এটিকে বরং বিশেষ রুচী,বিশেষ আকাঙ্খা,বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে অতি বিশেষ গুণের ‘tailor made’ হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে সে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। বরং এখানে গুরুত্ব পেয়েছে রবীন্দ্রভক্তি ও রবীন্দ্রপুঁজার মানসিকতা।

বড় ব্যর্থতা ও বড় বিদ্রোহ

বাংলাদেশের মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা এবং সে সাথে মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহটি শুধু এ নয় যে,তারা রাষ্ট্রের বুকে সূদী ব্যাংক,পতিতাপল্লি,মদের দোকান,অশ্লিল ছায়াছবি এবং দেশের আদালতে কুফরি আইনকে আইনগত বৈধতা দিয়েছে এবং মেনে নিয়েছে। আরেক বড় ব্যর্থতা এবং মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে আরেক বড় বিদ্রোহ হলো জাতীয় সঙ্গিত রূপে গেয়ে চলেছে রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক চেতনাপুষ্ট এ গানটিকে। যারা বেঈমান ও বিদ্রোহী হয় তাদের সে বেঈমানী ও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রেই। সেটি যেমন দেশের আইন-আদালতে কুফরি আইন অনুসরণে এবং রাষ্ট্রে পতিতাপল্লি ও সূদী ব্যংক বহাল রাখার মধ্যে,তেমনি মনের আবেগ ও মাধুারি মিশিয়ে জাতীয় সঙ্গিত রূপে পৌত্তলিক চেতনা সমৃদ্ধ গান গাওয়াতেও। মহান আল্লাহর সাথে তাদের সে বেঈমান-সুলভ গাদ্দারিটা তখন শুধু রাজনীতিতে সীমিত থাকে না,বরং সর্বক্ষেত্রেই সেটি ধরা পড়ে। মুসলিম সংহতির বুকে কুড়াল মারা এবং মুসলিম রাষ্ট্রের বিনাশের ন্যায় হারাম কাজটিও তখন এমন বিদ্রোহীদের কাছে উৎসবে পরিণত হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে এ গানটিকে যে শেখ মুজিব ও তাঁর দলবল নির্বাচন করেছিলেন ইসলামে সাথে তাদের গাদ্দারি কি কম পরিচিত? বাংলাদেশে ইসলামের নামে দলবদ্ধ হওয়া এবং ইসলামের শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে মুজিব সাংবিধানিক ভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলি তাঁর কাছে বরদাশত হয় হয়নি। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে যেমন কোরআনের আয়াতকে সরিয়েছেন,তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলিও সরিয়েছেন। তাই তাঁর হাতে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল হয়ে যায় সলিমুল্লাহ হল। জাহিঙ্গরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় জাহ্ঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং নজরুল ইসলাম কলেজ হয় নজরুল কলেজ। মুজিবের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ পেয়েছিল ভারতকে খুশি করা,আল্লাহকে খুশি করা নয়।

ইসলামের বিরুদ্ধে মুজিবের শুরু করা সে যুদ্ধটি এখন চালিয়ে যাচ্ছে তার কন্যা শেখ হাসিনা ও দলীয় কর্মীরা। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ বা ভারতের হিন্দু কাফেরদের থেকেও তারা বেশী ইসলাম বিদ্বেষী। ব্রিটিশ ও হিন্দু ভারতে মুসলমানদের উপর ইসলামের নামে দল গড়ায় নিষেদ্ধাজ্ঞা কোন কালেই ছিল না এবং আজও  নাই। মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, জামায়াতে ইসলামীসহ বহু মুসলিম প্রতিষ্ঠান ভারতে আজও বেঁচে আছে মুসলিম নাম নিয়ে।অথচ মুজিব বেঁচে থাকতে সে অধিকার বাংলাদেশের মুসলমানদের তিনি দেননি। মুজিব ও তাঁর অনুসারিদের চেতনা যে সিক্ত ছিল রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক চেতনায় -সেটি কি এ গানের নির্বাচন থেকেই সুস্পষ্ট নয়?

গুরুত্ব পায়নি মহান আল্লাহর নির্দেশ ও নবীজী (সাঃ)র সূন্নত

নবীজীর আমলেও আরব দেশে বিস্তৃত ভূমি,চন্দ্র-সূর্য্য ও আকাশ-বাতাস ছিল। সে ভূমিতেও মাঠ-ঘাট,ফুল-ফল ও বৃক্ষরাজিও ছিল। কিন্তু মহান নবীজী (সাঃ) কোন সময়ও কি সেগুলিকে মা বলে সম্বোধন করেছেন? বরং আজীবন হামদ-নাত ও প্রশংসা গীত গেয়েছেন সে সৃষ্টিকূলের মহান স্রষ্টার। আল্লাহর অনুগত বান্দাহ রূপে মুসলমানের বড় দায়িত্ব হলো আল্লাহর নামকে সর্বত্র প্রবল ভাবে প্রকাশ করা বা বড় করা। হেদায়াতপ্রাপ্তির চেয়ে ব্যক্তির জীবনে মহান আল্লাহর বড় নেয়ামত নেই। পথভ্রষ্ট হওয়ার চেয়ে এ জীবনে বড় ব্যর্থতাও নেই। হেদায়াত প্রাপ্তির শুকরিয়া জানাতে ঈমানদার ব্যক্তি আমৃত্যু তাই আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করে। এ জন্য সর্বত্র আল্লাহু আকবর বলে। পবিত্র কোরআনে সেটির নির্দেশও রয়েছে। বলা হয়েছে,“তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন তোমরা আল্লাহর নামে তাকবির বল (অর্থাৎ আল্লাহ যে মহিমাময় সর্বশ্রেষ্ঠ সেটি মুখ দিয়ে প্রকাশ কর), যাতে তোমরা এভাবে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার।” –সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৫। তাই মুসলমান “আল্লাহু আকবর” বলে শুধু জায়নামাজে তাকবির ধ্বণি দেয় না,রাজপথের মিছিলে বা জনসভাতেও দেয়। রাজনীতি,অর্থনীতি সংস্কৃতি,শিক্ষাদীক্ষা,কবিতা ও গানেও বলে। এটি শুধু তাঁর রাজনৈতিক শ্লোগান নয়, বরং ইবাদত। মুসলমান তাই কোথাও সমবেত হলে “জয় বাংলা” বা “জয় হিন্দ” বলে না বরং সর্বশক্তিতে গগন কাঁপিয়ে “নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার” বলে।একজন মুসলমান তো এভাবেই একজন কাফের বা মুনাফিক থেকে ভিন্ন পরিচয় নিয়ে ধর্মকর্ম,রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চা করে।কিন্তু বাংলাদেশের সেক্যুলার পক্ষের বড় সাফল্য হলো ইসলামের সে বিশুদ্ধ চেতনাকে বহুলাংশে তারা বিলুপ্ত করতে সমর্থ হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি,শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত যে জয়ধ্বণিটি ঘোষিত হয় সেটি মহান আল্লাহর নয়,বরং শয়তানি বিধানের।

ব্যক্তির নাম থেকেই তার ধর্ম,চেতনা ও বিশ্বাসের পরিচয় জানা যায়। এ পরিচয়টুকু জানার জন্য তখন আর বাড়তি প্রশ্নের প্রয়োজন পড়ে না। সে নামটি আজীবন তার ধর্ম বা বিশ্বাসের পক্ষে সাইনবোর্ড রূপে কাজ করে। তেমনি জাতির জীবনে হলো জাতীয় সঙ্গিত। জাতীয় সঙ্গিত থেকেই পরিচয় মেলে জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও চেতনার। তাই নাস্তিকের ও আস্তিকের ধর্মীয়,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন যেমন এক হয় না,তেমনি এক হয় না জাতীয় সঙ্গিতও। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিতটি নির্বাচনের একটি ইতিহাস আছে। সেটি গৃহীত হয়েছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর। যারা এ সঙ্গিতটিকে গ্রহণ করেছিল তারা ছিল বাঙালী জাতিয়তাবাদী সেক্যুলার। তাদের চেতনায় ও রাজনীতিতে ইসলামের কোন প্রভাব ছিল না। বরং তারা ইতিহাসে পরিচিতি পেয়েছে ভারতপ্রীতি,রবীন্দ্রপ্রীতি,এবং ইসলামি চেতনার নির্মূলে আপোষহীনতার কারণে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিও শেখ মুজিবের কোন শ্রদ্ধাবোধ ছিল না।তিনি যে শুধু রাজনীতিতে স্বৈরাচারি ছিলেন তা নয়।বরং প্রচণ্ড স্বৈরাচারি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও। তাই দেশের উপর তিনি শুধু একদলীয় বাকশালই চাপিয়ে দেননি,বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে চাপিয়ে দিয়েছেন পৌত্তলিক সংস্কৃতির আগ্রাসনও। রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে জাতীয় সঙ্গিত রূপে চাপানো হয়েছে তেমন এক স্বৈরাচারি মানসিকতা থেকে।

গুরুত্ব পায়নি বাঙালী মুসলমানের স্বপ্ন

প্রতিটি দেশের শুধু একটি রাজনৈতিক,ভৌগলিক ও ভাষাগত পরিচয়ই থাকে না,সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ও থাকে।জনগণের চেতনায় যেমন সুনির্দ্দিষ্ট দর্শন থাকে,তেমনি সে দর্শনের আলোকে রাজনৈতিক স্বপ্নও থাকে।সভ্যতা নির্মানের সে দেশের জনগণের একটি গুরুতর দায়বদ্ধতাও থাকে। সে বিচারে প্রতিটি দেশই অনন্য।সে অনন্য বৈশিষ্ঠের কারণেই আজকের বাংলাদেশ পশ্চিম বাংলা থেকে ভিন্ন। এবং সে ভিন্নতার ফলেই পশ্চিম বাংলার ন্যায় বাংলাদেশ ভারতের অংশ নয়।পশ্চিম বাংলার সাথে বাংলাদেশের পার্থক্যটি এখানে ভূমি,জলবায়ু বা আলোবাতাসের নয়,বরং দর্শন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ভিশন ও মিশনের। পার্থক্যটি ভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার। সে ভিন্ন স্বপ্নের কারণেই ১৯৪৭য়ে পশ্চিম বাংলার হিন্দুগণ যখন ভারতে যোগ দেয় তখন পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ অতি সচেতন ভাবেই বাঙালী হিন্দুদের সাথে প্রতিবেশী ভারতে যায়নি। গিয়েছে পাকিস্তানে। সাতচল্লিশের সে ভাবনার সাথে দেশের ৯০% ভাগ মুসলমানের সমর্থণ ছিল। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক শেখ মুজিবও সেদিন সে ভাবনার সাথে একাত্ম হয়েছিলেন। প্রতিবেশী বাঙালী হিন্দুদের সাথে না গিয়ে তারা তখন ১২০০ মাইল দূরের অবাঙালী পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে গেছে।সেটি এক অনস্বীকার্য ইতিহাস।

বাঙালী মুসলমানদের যে প্রতিবেশী হিন্দুদের থেকে যে ভিন্নতর পরিচয় ও স্বপ্ন ছিল সেটি তাই ইতিহাসের গোপন বিষয় নয়। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রচিত হতে হবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সে বিশিষ্ঠ পরিচয় ও স্বপ্নগুলো তুলে ধরতে এবং প্রবলতর করতে। এমন সঙ্গিতের প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি উচ্চারণ থেকে প্রতিটি নাগরিক তখন পাবে নতুন প্রত্যয় ও নতুন প্রেরণা। পাবে স্বপ্নের সে পথটিতে অবিরাম টিকে থাকার মানসিক বল। কিন্তু জাতীয় সঙ্গিতের নির্বাচনে বাংলাদেশের মুসলমানদের সে ভিন্নতর পরিচয়কে মেনে নেয়া হয়নি। এ সঙ্গিতে যে সুর,যে দর্শন,যে বর্ণনা এবং যে আকুতি ধ্বণিত হয়েছে সেটি কোন মুসলমানের নয়,সেটি নিতান্তই একজন পৌত্তলিকের। এমন সঙ্গিত থেকে মুসলমান অনুপ্রেরণা না পেয়ে পায় চরম পথভ্রষ্টতা। পায় শিরকের ছবক। যে ভ্রষ্টতার কারণে পৌত্তলিক মানুষটি বিষধর সাপকে দেবতা রূপে গ্রহণ করার অনুপ্রেরণা পায়,তেমনি এ সঙ্গিত পাঠকারি বাংলাদেশীও উৎসাহ পায় ভারতের ন্যায় একটি শত্রুদেশকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করায়।

স্ট্রাটেজী ভারতীয় অধিকৃতির

ভারত থেকে আলাদা মানচিত্র নিয়ে বাংলাদেশ বেড়ে উঠুক ভারত সেটি ১৯৪৭য়ে যেমন চায়নি,আজও  চায় না। ভারতের এ আগ্রাসী নীতি শুধু অধিকৃত কাশ্মির, হায়দারাবাদ,গোয়া,মানভাদড় বা সিকিমের ক্ষেত্রে নয়,বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। কাশ্মিরে ভারত যে ৭ লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী মোতায়েন করেছে সেটি সেখানে গণতন্ত্র বা অর্থনীতি বাড়াতে নয়। বরং ভারতের অধিকৃতি নিশ্চিত করতে। ভারত একাত্তরে যে বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়োজিত করেছিল এবং যেরূপ আজ মোতায়েন করে রেখেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে লক্ষ লক্ষ অনুগত এজেন্ট সেটিও বাংলাদেশে স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র বাড়াতে নয়। কাশ্মিরে ভারতের বিপদটি হলো সেখানে তারা কাশ্মিরীদের মধ্য থেকে এতটা সেবাদাস এজেন্ট পায়নি যতটা পেয়েছে বাংলাদেশে। ফলে এক কোটি মানুষের কাশ্মির দখলে রাখতে হাজার হাজার কোটি রুপি ব্যয়ে পাঞ্জাব,রাজস্থান,বিহার,গুজরাত,মহারাষ্ট্র,উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশসহ ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে ৭ লাখ সৈন্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। সে সাত লাখ সৈন্যের পানাহার, চলাচল ও লজিস্টিকের পিছনে প্রতি বছর বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে বহু হাজার কোটি রুপি। অথচ সাড়ে সাত কোটি মানুষের পূর্ব পাকিস্তানে একাত্তরে এক লাখ পাকিস্তানী সৈন্যও ছিল না। কাশ্মিরে এক লাখ ভারতীয় সৈন্য পালতে যত অর্থ ব্যয় হয় তা দিয়ে বাংলাদেশে অন্ততঃ দশ লাখ দালাল পালা সম্ভব। এজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি,মিডিয়া,প্রশাসন,সেনাবাহিনী,পুলিশ বাহিনী,শিক্ষাঙ্গণ,সংস্কৃতি ও আদালত প্রাঙ্গণে এত ভারতীয় দালালের ছড়াছড়ি।বাংলাদেশের মাটি এক্ষেত্রে অতি উর্বর। সে উর্বরতা বাড়িয়েছে বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেকুলারিস্টগণ। বাংলাদেশে আওয়ামী-বাকশালী দাসদের কারণে ভারত অতি অল্প খরচে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশকে অধিকৃত রাখতে পেরেছে। ফলে বাংলাদেশের বুক চিরে করিডোর নিতে বা দেশের সমূদ্রবন্দর ও নদীবন্দরের উপর দখল নিতে ভারতকে একটি তীরও ছুড়তে হয়নি।

জাতীয় সঙ্গিতের রাজনৈতীক এজেন্ডা

গলিত আবর্জনার স্তুপে যেমন অসংখ্য মশামাছি রাতারাতি বেড়ে উঠে তেমনি সেক্যুলারিজমের মাঝে বিপুল ভাবে বেড়ে উঠে ইসলামের দুষমনেরা। তখন সর্বত্র জুড়ে কিলবিল করে ভারতসেবী, মার্কিনসেবী, ইসরাইলসেবী দাস চরিত্রের ঘৃণীত জীব। তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাড়ে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে রাজনৈতিক মিত্রতা। তাই ১৯৭১য়ে আওয়ামী বাকশালীরা মুসলিম দেশে কোন বন্ধু খুঁজে না পেলে কি হবে,মুসলিম নিধনকারি ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ায় তারা প্রচুর মিত্র খুঁজে পেয়েছে।অথচ দালালের আবাদ বাড়াতে কাশ্মিরে ভারত সে উর্বরতা পায়নি। কারণ, সেখানে রয়েছে প্রবল ইসলামী চেতনা। গড়ে উঠেছে  ভারত বিরোধী প্রচণ্ড বিদ্রোহ। ফলে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারত যত সহজে নিরাপদ করিডোর এবং সমুদ্রবন্দর ও নৌবন্দর ব্যবহারের সুযোগ নিয়েছে,কাশ্মিরে ৭ লাখ সৈন্য মোতায়েন করেও যানবাহন চলাচলে সে নিরাপত্তা পায়নি। সে নিরাপত্তা পাচ্ছে না কোন শহরে বা গ্রামে। অথচ বাংলাদেশে তারা বাংলাদেশীদের চেয়েও পাচ্ছে অধিক নিরাপত্তা। ভারতীয় সীমান্তরক্ষির হাতে বাংলাদেশীরা অহরহ লাশ হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয়দের সে বিপদ নাই। বিপুল সংখ্যক সেক্যুলারিস্টদের চেতনা-রাজ্য ইতিমধ্যেই ভারতের হাতে অধিকৃত। অখন্ড ভারতের বাইরে বাংলাদেশের আলাদা মানচিত্রকে যে গান্ধি, নেহেরু বা রবীন্দ্রনাথ শুরু থেকেই বিরোধীতা করেছিল তারা বরং এ ভারতভক্তদের কাছে পুঁজনীয়।

রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে বাংলার বিভক্তিকে মেনে নেননি। মেনে নেননি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকেও। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় তিনি রাজপথে নেমেছেন। কারণে তাতে মুসলমানদের কল্যাণের সম্ভাবনা ছিল।বাংলার অখণ্ড ভূগোল ১৯০৫ সালে তাঁর কাছে তখন পুঁজনীয় ছিল। “আমার সোনার বাংলা” গানটি লেখা হয়েছে তেমনি এক চেতনা নিয়ে। কিন্তু সে অখণ্ড ভূগোলকে রবীন্দ্রভক্ত বাঙালী হিন্দুগণই ১৯৪৭য়ে বিভক্ত করে। ১৯০৫য়ে বাংলাকে অখণ্ড রাখা এবং ১৯৪৭য়ে আবার খণ্ডিত করার মধ্যে তাদের রাজনীতি ছিল। সে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো বাংলার এ ভূখণ্ডে বাঙালী হিন্দুর স্বার্থ সংরক্ষণ।তেমনি একটি আগ্রাসী রাজনীতি আছে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটির পৌত্তলিক চেতনাকে বাংলাদেশের মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়ায়।সে রাজনৈতিক লক্ষটি হলো,যে অখণ্ড বাংলার চেতনা নিয়ে ১৯০৫ সালে গানটি লেখা হয়েছিল সে দিকে ফিরিয়ে নেয়ার।

পৌত্তলিকতার আগ্রাসন ও সংকট

বাঙালী মুসলমানের চেতনা রাজ্যে ভারতের পক্ষে প্রবল অধিকৃতি জমানোর কাজটি করেছে সেক্যুলার বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা। ইমারত একবার নির্মিত হলে সেটিকে খাড়া রাখার খরচ অনেক কমে যায়। এমন চেতনা নির্মাণের কাজে ভারতের বিনিয়োগ ১৯৪৭ থেকেই। সেক্যুলার বাংলাদেশ নির্মাণের পর এখন ভারতের সে খরচ বিপুল ভাবে কমেছে। এখন সে কাজে ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলমানদের নিজেদের রাজস্বের পুঁজি। ভারতের লক্ষ্য,নিজেদের সে প্রতিষ্ঠিত অধিকৃতিকে লাগাতর বজায় রাখা। বাংলাদেশের উপর ভারতের দখলদারিটি শুধু সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনতিক নয়,বরং সাংস্কৃতিক।সে অধিকৃতিরই প্রতীক হলো জাতীয় সঙ্গিত রূপে চাপিয়ে দেয়া পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের গান। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অখণ্ড ভারতের ধ্বজাধারি। সে অখণ্ড ভারতের চেতনা থেকেই ভারত থেকে মুসলিম নির্মূলের প্রবক্তা মারাঠী শিবাজীকে তিনি জাতীয় বীরের মর্যাদা দিয়েছেন। শিবাজীকে বন্দনা করে তিনি কবিতাও লিখেছেন। গান্ধীকে পরামর্শ দিয়েছেন হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্র ভাষা করতে। এখন সে রবীন্দ্রনাথকে ভারত ব্যবহার করছে বাংলাদেশের উপর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনের যোগসূত্র রূপে। এজন্যই বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা ও রবীন্দ্রঅর্চনা বাড়াতে ভারত সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের এত বিনিয়োগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের রাজস্বের অর্থে বাংলা এ্যাকাডেমীর কাজ হয়েছে প্রতিবছর পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের উপর শত শত বই প্রকাশ করা। অথচ ইসলামের মহান নবীজী(সাঃ)এবং মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষটির উপর কি এর দশ ভাগের এক ভাগ বই ছাপানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

বাংলাদেশের শিশু-সন্তান ও নাগরিকের বিরুদ্ধে বড় জুলুমটি নিছক রাজনৈতিক,প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক নয়। বরং সেটি আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক। সে জুলুমের অংশ রূপেই একজন পৌত্তলিকের রচিত সঙ্গিতকে বাংলাদেশের মুসলমান নারীপুরুষ ও শিশুদের দিনের পর দিন জাতীয় সঙ্গিত রূপে গাইতে হচেছ,এবং ফলে তারা ব্যর্থ হচ্ছে জীবনের সে স্মরণীয় মুহুর্তগুলোতে মহান আল্লাহকে স্মরণ করতে। শয়তান তো এভাবেই মানুষের মনের ভূবনে অধিকৃতি জমায়। এবং পথভ্রষ্টতা বাড়ায় মহান আল্লাহর প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে। জাতীয় সঙ্গিত পাঠের নামে এভাবেই পরিকল্পিত ভাবে ইসলামের মূল আক্বিদা ও শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে ছাত্র-ছাত্রী,শিক্ষক-সেনা এবং সাধারণ মানুষকে দূরে হটানো হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিই শুধু নয়,সাধারণ মানুষের চেতনার মানচিত্রও যে অভিন্ন ভাষা ও অভিন্ন সাহিত্যের নামে পৌত্তলিক হিন্দুদের হাতে অধিকৃত এ হল তার নমুনা। বাঙালী মুসলমানের চেতনায় ইসলাম তার সনাতন রূপ নিয়ে বেঁচে থাকলে পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের এ গান কি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে গ্রহণযোগ্যতা পেত?

বস্তুতঃ সাহিত্য এবং সে সাথে জাতীয় সঙ্গিত পরিনত হয়েছে ঈমান ধ্বংসের এক নীরব হাতিয়ারে। ফলে পথভ্রষ্টতা বাড়ছে শুধু ধর্মপালনে নয়,বরং দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, আইন-আদালত ও প্রশাসনে।বাঙালী মুসলমানের জীবনে এভাবেই বাড়ছে মহাসংকট। দিন দিন বাড়ছে নবীজী (সাঃ)র আমলের সনাতন ইসলামের সাথে সাধারণ মানুষের দুরুত্ব। সে সাথে প্রবলতর হচ্ছে রাজনীতি,সংস্কৃতি ও প্রশাসনসহ দেশের সর্বত্র ইসলামের শত্রু পক্ষের অধিকৃতি।ফলে দেশ গড়ছে দূর্নীতিতে বিশ্ব রেকর্ড।বাড়ছে দুনিয়াব্যাপী দুর্নাম ও অপমান। ইসলামি রাষ্ট্র,আল্লাহর সার্বভৌমত্ব,শরিয়তি আইন, মুসলিম উম্মাহর একতা,প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভ্রাতৃত্ব এবং জিহাদ –ইসলামের এসব মৌলিক বিষয়গুলো চিত্রিত হচ্ছে সন্ত্রাসী চেতনা রূপে। প্রতিবেশী রোহিঙ্গা মুসলমানেরা হত্যা,ধর্ষণ,নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে এসেও বাংলাদেশে আশ্রয় পাচ্ছে না। একটি মুসলিম দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠির এর চেয়ে বড় অধঃপতন ও বিপর্যয় আর কি  হতে পারে? মহান আল্লাহর দরবারে মূক্তিই বা মিলবে কীরূপে? ১৫/০৭/২০১২

 




বাঙালী মুসলিমের ভয়ংকর সাহিত্য-সংকট

গভীর সংকটটি সাহিত্যে

 কোন ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠি কীরূপ শারীরীক বল বা সুস্থ্যতা পাবে -সেটি নির্ভর করে কি খায় বা পান করে তার উপর। কিন্তু কীরূপ চরিত্র পাবে তা নির্ভর করে কি সে পাঠ করে তার উপর। অনাহারে যেমন দেহ  বাঁচে না, তেমনি জ্ঞানের অভাবে বিবেক বাঁচে না। অথচ মৃত বা অসুস্থ্য বিবেক নিয়ে মুসলিম হওয়া দূরে থাক মানবিক পরিচয় বেড়ে উঠা্‌ও অসম্ভব হয়। পবিত্র কোর’আনে এদেরকেই পশুর চেয়ওও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা তাই পানাহার ফরজ করতে কোর’আন বা কোন ওহী নাযিল করেনি। প্রাণী মাত্রই পানাহারের গুরুত্বটি বুঝে। কিন্তু লক্ষাধিক নবী পাঠিয়েছেন এবং ওহী নাযিল করেছেন যেমন জ্ঞানার্জনকে ফরজ করতে, তেমনি সে বিশুদ্ধ জ্ঞানের একটি বিশাল ভান্ডারকে সুনিশ্চিত করতে। কিন্তু যখনই কোন জনগোষ্ঠি সে জ্ঞানের ভান্ডার থেকে দূরে সরে তখনই তাদের যাত্রা শুরু হয় নীচে নামার দিকে। তখন তারা রেকর্ড গড়ে শুধু দুর্বৃত্তিতেই নয়, বরং নৃশংস স্বৈরাচার, সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি, গুম-খুনের অসভ্যতা। বাংলাদেশের আজকের যাত্রা তো সে পথেই।

বাঙালী মুসলিমের আজকের সংকটটি যেমন খাদ্য বা সম্পদে নয়; তেমনি ভূমি বা জলবায়ূতেও নয়। বরং সেটি দেশের সাহিত্যে। সাহিত্যে দূষন দেখা দিলে চরম দূষন দেখা দেয় দেশবাসীর বিবেক, আচার-আচরণ, দর্শন, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও মূল্যবোধ। তখন সাহিত্য পাঠের নামে গণহারে বিষ পান হয়। তখন নৈতীক মড়ক আসে শুধু নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর মাঝেই নয়, বরং অত্যাধীক বিষ পানের ফলে বিবেক ও মূল্যবোধে মহামারি আসে বেশী বেশী ডিগ্রিধারি, সাহিত্যসেবী ও অর্থশালীদের মাঝে। দেশের কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের বিচারপতি, দেশের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী এবং সংসদ-সদস্যগণও তখন প্রচণ্ড দুর্বৃত্ত ও সন্ত্রাসী হয়। তখন সমগ্র জাতি অসুস্থ্য হয় নীতি ও নৈতিকতায়। দেহের রোগ যেমন জ্বর, দুর্বলতা, ক্ষুধা-হ্রাস ও ওজন-হ্রাসের ন্যায় নানারূপ লক্ষণ নিয়ে হাজির হয়, তেমনি নানারূপ লক্ষণ দেখা দেয় চেতনার রোগেও। দেশ তখন দূর্নীতিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে। প্রচণ্ডতা পায় পাপাচার। রাজনীতিতে বাড়ে স্বৈরাচার ও সন্ত্রাস।

বাংলাদেশে ব্যাপক দূর্নীতি, সন্ত্রাস, স্বৈরাচার ও নানাবিধ অপরাধের বিস্তার দেখে এটুকু সঠিক ভাবেই বলা যায়, বিপুল সংখ্যক মানুষের চেতনা,নৈতিকতা এবং বিবেক আদৌ সুস্থ্য নয়।এবং এটি কোন মামূলী বিষয়ও নয়। বাঙালী মুসলমানের সকল রাজনৈতিক, সমাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার জন্ম গুরুতর এই নৈতিক অসুস্থ্যতা থেকেই।এর ফলে বিশ্বমাঝে মাথা তুলে দাঁড়ানো দূরে থাক,ইজ্জত নিয়ে বাঁচাই দিন দিন কঠিনতর হচ্ছে। ইতিমধ্যে দূর্নীতিতে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বাবাসীর পরিস্কার হয়ে গেছে নৈতিক সে রোগটি বাংলাদেশে কতটা প্রবল। বিপদের আরো ভয়াবহতা হল, বাঙালী মুসলিমদের মাঝে এ বিশাল সংকট নিয়ে চিন্তা-ভাবনা যেমন নেই, তেমনি ভাবনা নেই এ বিপদ থেকে কীরূপে উদ্ধার মিলবে তা নিয়েও। শয্যাগত মুমূর্ষরোগীর নিজের চিকিৎস্যা নিয়ে ভাবনা থাকে না। বোধও থাকে না। কোথায় এবং কীরূপে চিকিৎসা সম্ভব সে হুশটি লোপ পায় অনেক আগেই। লোপ পায় তার নিজের কল্যাণ চিন্তাও। এমন কি পানাহারের জন্যও তাকে নির্ভর করতে হয় অন্যের উপর। অনুরূপ অবস্থা হয় অধঃপতিত জাতিরও। দূর্নীতিতে ডুবা এমন অসুস্থ্য জাতির জীবনে দূর্নীতি মুক্তি নিয়ে কোন তাড়না থাকে না।

ব্যক্তি, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সাহিত্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে ভাবনাই বা ক’জনের? অথচ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বাঙালী মুসলমানের প্রচণ্ড গর্ব। জাতীয় জীবনে দিন দিন বিপর্যয় বাড়লে কি হবে,রাষ্ট্র-ভাষা রূপে বাংলার প্রতিষ্ঠাতেই অনেকের আনন্দ। ভাষার প্রয়োজনীতাটি কি নিছক সে ভাষায় কথাবলা? সরকারি নথি, চিঠিপত্র ও দলিল-দস্তাবেজ লেখা? কথোপকথোন, দোকান-পাঠ-অফিস বা ব্যাবসা-বাণিজ্যের কাজ চালনা ছাড়াও ভাষাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। ক্ষেতখামারের কাজ যেমন দেশবাসীর পেটে খাদ্য জোগানো, ভাষার কাজ তেমনি চেতনায় পুষ্টি জোগানো। নইলে চরিত্র ও চেতনায় অসুস্থ্যতা অনিবার্য। ইতিহাসের বড় ছবক হলো, দেশের ভূমি যত উর্বর ও সুজলা-সুফলাই হোক, ভাষা ও সাহিত্যে সমৃদ্ধি না এলে সে দেশে যেমন চেতনাসমৃদ্ধ মানুষ যেমন গড়ে উঠে না, তেমনি উচ্চতর সভ্যতাও গড়ে উঠে না। তাই ইসলামী সভ্যতার নির্মাণ ও বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থান জনবিরল আরব মরুর বুকে সম্ভব হলেও বাংলাদেশের ন্যায় মাঝে উর্বর ও শস্য-শ্যামল বিশাল মুসলিম জনসংখ্যার দেশে সম্ভব হয়নি। বস্তুতঃ ভাষা ও ভাষালব্ধ দর্শন ও সাহিত্যের বিচারে সেকালের আরব এবং বাংলাদেশের মাঝে বিরাজমান বিশাল পার্থক্যের প্রতিফলন ঘটেছে সভ্যতার নির্মানে বাঙালী মুসলিমদের বিফলতায়। আরবী ভাষা যখন শ্রেষ্ঠতায় বিশ্বে অনন্য, বাংলা ভাষার তখনও জন্মই হয়নি।

আরবী ভাষার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ, সে ভাষায় লেখা নিছক মানব রচিত সাহিত্য নয়। বরং মূল কারণটি হলো, এ ভাষাতেই অবতীর্ন হয়েছে মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দান এবং মানব ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল-কোরআন। বিশাল এক সোনার খনি একটি দেশের অর্থনৈতিক ভাগ্য পাল্টে দিতে পারে। কিন্তু জ্ঞানের ভূবনে বিপ্লব এলে, বিপ্লব আসে জাতির শিক্ষা, সংস্কৃতি, চরিত্র ও সভ্যতায়।  তবে জ্ঞানের সে সূত্রটি মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত আল-কোরআন হয় তবে বিপ্লবটি ঘটে আরো ব্যাপক ভাবে। তখন খোদ মানুষ পরিনত হয় খাঁটি সোনার চেয়েও দামী।

তবে সাহিত্যের অঙ্গণে বাংলা ভাষার দারিদ্র্যতা অতি প্রকট। বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম উপকরণ কোরআন নয়। হাদিসও নয়। হাফিজ শিরাজী, রুমী, সাদী, গালিব বা ইকবালের ন্যায় কবিদের উচ্চতর দর্শন-নির্ভর সাহিত্যও নয়। বরং সেটি হল শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, মনসা-মঙ্গল, চণ্ডি-মঙ্গল, বৈষ্ণব পদাবলী, খনার বচন,পুঁথি-সাহিত্য,বঙ্কিম-সাহিত্য,রবীন্দ্র-সাহিত্য, ইত্যাদী। এ সাহিত্যে কি উন্নত চেতনা,দর্শন,মূল্যবোধ ও সভ্যতা গড়ে উঠার সামগ্রী কতটুকু? পাইপ লাইনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি যেমন পৌঁছতে পারে, তেমনি পৌঁছতে পারে দূষিত পানিও। তেমনি সাহিত্যের মাধ্যমে ঘরে ঘরে যেমন ব্যক্তির উন্নত দর্শন, মূল্যবোধ ও জ্ঞান-বিজ্ঞানকে পৌছাতে পারে, মিথ্যা মতবাদ, ভ্রান্ত দর্শন, কুসংস্কার এবং মানব মনের অশ্লিল ও কুৎসিত বার্তাগুলোও পৌছাতে পারে। সাহিত্য এভাবে আলোর বদলে আঁধারের দিকেও যেমন টানতে পারে। মানব মনে ভয়ানক আবর্জনাও পৌঁছাতে পারে। ফলে দুষিত সাহিত্য সভ্যতার নির্মানে সহায়ক না হয়ে বরং দুর্গতি ও অবক্ষয়েরও কারণ হতে পারে। কিন্তু সে চিন্তা ক’জনের? যখন বাংলা ভাষার ন্যায় বহু আধুনিক ভাষার জন্মই হয়নি, তখনও শত শত রাষ্ট্র, সমাজ ও গোত্র গড়ে উঠেছে। বহু হাজার বছর ধরে সে সব রাষ্ট্র, সমাজ ও গোত্রের কার্যাবলী যেমন সমাধা হয়েছে তেমনি জনগণের মনের যোগযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কথোপকথনও হয়েছে। কিন্তু সব ভাষায় ও সব রাষ্ট্রে সভ্যতা গড়ে উঠেনি। উন্নত সভ্যতা তখনই নির্মিত হয়েছে যখনই কোন ভাষা উন্নত দর্শন ও সাহিত্যের বাহন হয়েছে এবং জনগণের চেতনা, কর্ম, আচরণ, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতে আমূল বিপ্লব এনেছে। 

সমগ্র সৃষ্টির মাঝে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব দেহের গুণে নয়; সেটি চিন্তা-ভাবনা বা দর্শনের গুণে। এই গুণটিই মানুষকে পশু থেকে পৃথক করে। উন্নত সভ্যতার নাগরিকগণ এ গুণের বলেই অনুন্নত বা বর্বরদের থেকে মাথা তুলে দাঁড়ায়। চিন্তা-ভাবনার সে বিস্ময়কর সামর্থ্য থেকেই জন্ম নেয় জ্ঞান-বিজ্ঞান। গড়ে তোলে সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি। নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। গাছ যেমন প্রতিদিন বাড়ে, তেমনি প্রতিদিন বেড়ে উঠতে হয় ব্যক্তিকেও। সেটি শুধু দেহের গুণে নয়, নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক গুণেও। বেড়ে উঠার সামর্থ্য বাড়াতে প্রতি মুহুর্তে তাকে নতুন কিছু যেমন শিখতে হয়, তেমনি ভাবনা ও কর্মের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টিও করতে হয়। বেড়ে উঠার বিষয়টি ইসলামে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে ইসলামের নবী (সাঃ)বলেছেন, “যার জীবনে পর পর দুটি দিন অতিবাহিত হল অথচ তার জ্ঞানের রাজ্যে কোন বৃদ্ধি এলো না তার জন্য বড়ই বিপদ।” সম্পদের উপর প্রতিদিনের সংযোজিত সমৃদ্ধিকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় এ্যাডেড ভ্যালু বা সংযোজিত মূল্য। জাতির জিডিপ (গ্রস ডমিস্টিক প্রোডাক্ট) হল সে সংযোজিত মূল্যের যোগফল। তবে উচ্চতর সভ্যতার নির্মানে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ঘটে অন্যত্র। মূল্য সংযোজনের সে মহা গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ঘটে প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে। সুস্থ্য ব্যক্তির জীবনে এমন সৃষ্টিশীলতা চলে আজীবন। সেটি যেমন তার জ্ঞানের রাজ্যে,তেমনি কৃষি,শিল্প,সংস্কৃতি,রাজনীতি ও অর্থনীতিতে।শিক্ষা ও সাহিত্যের কাজ হল, সে সৃষ্টিশীলতা বা মূল্য সংযোজনের কাজে জনগণের সামর্থ্য  বাড়ানো। সেটি যেমন বিদ্যালয়ে ও তেমনি বিদ্যালয়ের বাইরেও। বিদ্যালয়ের বাইরের সে কাজটি বেগবান করে সাহিত্য।

সৃষ্টিশীলতার বিপরীত যেটি সেটি হল স্থবিরতা। স্থবিরতা প্রাণহীন জড় বস্তু বা মৃত ব্যক্তির গুণ,জীবিতের নয়।জাতীয় জীবনে এমন স্থবিরতা ব্যাপকতর হলে অনিবার্য হয় সে পতন। অপরদিকে অতিক্ষুদ্র পরমাণুর উপর যখন সৃষ্টিশীলতা বা এ্যাডেড ভ্যালু যোগ হয়,তা থেকে জন্ম নেয় বিস্ময়কর পারমাণবিক শক্তি। সে এ্যাডেড ভ্যালু যখন কোন ব্যক্তির জীবনে যোগ হয়, সে মানুষটি ফেরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর হয়।এমন লাগাতর সৃষ্টিশীলতার ফলেই সৃষ্টিশীল বিপ্লব আসে ব্যক্তি,সমাজ ও রাষ্ট্রে। সমৃদ্ধি আসে অর্থনীতি,সংস্কৃতি ও সাহিত্যে। একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিমাপ হয় সে দেশের সম্পদের উপর বছরে সর্বসাকুল্যে কতটা মূল্য সংযোজিত হল বা নতুন সম্পদ সৃষ্টি হল তা থেকে। আর জাতির মানবিক উন্নয়নের পরিচয়টি মেলে মানবিক গুণে জনগণের জীবনে সর্বসাকুল্যে কতটা সমৃদ্ধি আসলো এবং চারিত্রিক ও নৈতিকতার উপর কতটা উন্নয়ন ঘটল তা থেকে।সেটি ব্যাপক ভাবে বাড়লে তখন বিপ্লব আসে দেশের সংস্কৃতি,সমাজনীতি,অর্থনীতি ও রাজনীতিতে।তখন গড়ে উঠে উচ্চতর সাহিত্য।আর সাহিত্য তো তাই যা গড়ে উঠে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাবনা,কল্পনা ও আবেগের সাথে ব্যক্তির সৃষ্টিশীল প্রতিভার সংযোজনের ফলে।হাফিজ শিরাজী,জালালুদ্দীন রুমী,গালিব বা ইকবাল তাদের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য গড়ে তুলেছেন তো এ পথেই।এমন সাহিত্য নিজেই যেমন এক অমূল্য সৃষ্টিশীলতা,এবং তা থেকে অনুপ্রেরণা পায় বিপুল সংখ্যক সৃষ্টিশীল মানুষও।

অপর দিকে মুসলিম হওয়ার অর্থই হল সৃষ্টিশীল হওয়া। এটিই হলো তার ফিতরাত। তবে সৃষ্টিশীলতার জন্য চিন্তাশীলতাও জরুরী। চিন্তাশীলতার অভাবে মানুষ পরিণত হয় ইতর জীবে। যার মধ্যে চিন্তাশীলতা নেই, পবিত্র কোরআন থাকে তাকে পশুর চেয়েও অধম বলেছে। চিন্তাশীলতার মধ্য দিয়ে যা বাড়ে তা হল ঈমান ও তাকওয়া। ঈমানের বলেই মোমেন পায় লাগাতর নেক আমলের প্রেরণা তথা সৃষ্টিশীলতা। মোমেনের প্রতিটি নেক আমল মূলতঃ সে সৃষ্টিশীলতারই ফসল। প্রতিটি দিন এবং প্রতিটি মুহুর্তই ব্যক্তির জীবনে হাজির হয় নেক আমল তথা সৃষ্টিশীলতার বিশাল সুযোগ নিয়ে। একটি দিন অতিবাহিত হলো, অথচ সে কিছু শিখলো না, কাওকে কিছু শেখালোও না, কিছু করলোও না -এতে অপচয় ঘটে তাঁর জীবনের মূল্যবান একটি দিনের। অর্থের অপচয়ের চেয়েও এ অপচয়টি কি কম ক্ষতিকর? মহান আল্লাহর কাছে অতি অপছন্দের হলো এ অপচয়। নবীজী এমন অপচয়কারিদের শয়তানের ভাই বলেছেন। 

ঈমানদার তার প্রতিটি সৃষ্টশীল কর্মে প্রেরণা পায়, নির্দেশনা পায় এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানটি পায়টি পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান থেকে। কোর’আনী জ্ঞানের মূল কথাটি হল, এ জীবন মানুষের জন্য পরীক্ষাস্থল। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে সে কথাটি বলেছেন এভাবে, “আল্লাযী খালাকাল মাওতা ওয়াল হায়াতা লি ইয়াবলুয়াকুম আইয়োকুম আহসানা আমালা।” -(সুরা মুলক,আয়াত ১)। অর্থঃ তিনিই সেই (মহান আল্লাহ) যিনি মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমাদের মধ্যে কে কর্মের দিক দিয়ে উত্তম -সেটির পরীক্ষা হয়। ফলে এ পার্থিব জীবনে প্রতিটি ব্যক্তিই একজন পরীক্ষার্থী। আর পরীক্ষায় বসে পরীক্ষার্থীর লক্ষ্য হয়,প্রতি মুহুর্তে পরীক্ষার খাতায় নাম্বার বা স্কোর বাড়ানো। একই ভাবে ঈমানদার ব্যক্তি প্রতি মুহুর্তে স্কোর বাড়ায় তার আমলনামায়। সেটি নেক আমলের মাধ্যমে। যেমন সৎ কর্মে, তেমনি জ্ঞানের রাজ্যে। দুইটিই অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। লক্ষ্য,পরকালে জান্নাত লাভ। তাই যে দেশে ঈমানদারের সংখ্যা বাড়ে সেদেশে নেক আমল ও জ্ঞানের রাজ্যেও সমৃদ্ধি আসে। ইসলামের বিজয়ের আরবে তো সেটাই ঘটেছিল। তাই কোন দেশে মুসলমানের সংখ্যা বাড়লো অথচ সেদেশে সম্পদে ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধি আসলো না সেটি অভাবনীয়। এমনটি হলে বুঝতে হবে, সমস্যা রয়েছে জনগণের ইসলাম পালনে।  

মুসলিম হওয়ার অর্থ তাই শুধু নামায-রোযা ও তাসবিহ পাঠে মনযোগী হওয়া নয়। বরং সেটি হলো নেক আমল বৃদ্ধির কাজে আমৃত্যু এবং প্রতি মুহুর্ত লেগে যাওয়া। সৃষ্টিশীল এমন মিশনে লেগে থাকার কারণেই ব্যক্তির জীবনে লাগাতর উৎকর্ষ আসে; যেমন তার কর্মে, তেমনি তার ভাবনায়। আরবের মানুষগুলো ঈমান ও আমলে অতি দ্রুত উপরে উঠেছিল তো এ পথেই। তাঁরা পরিণত হয়েছিলেন মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানবে। যারা এক কালে নিজেদের কন্যাকে জীবন্ত কবর দিত, তাঁরাই হাজার হাজার মাইল দূরের মানুষদের জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন। দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন বড় বড় পাহাড়-পর্বত, নদীনালা ও মরুপ্রান্তর অতিক্রম করে। বাংলাদেশের চেয়ে ৫০ গুণ বৃহৎ রাষ্ট্রের খলিফা তার ভৃত্যুকে উঠের চড়িয়ে নিজে উঠের রশি ধরে টেনেছেন। খলিফা নিজে আটার বস্তা কাঁধে নিয়ে ক্ষুদার্ত মানুষে জনগণের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। এ ছিল তাঁদের সভ্যতার মান। সে সময় যে দেশেই ইসলামের প্রবেশ ঘটেছিল সে দেশেই এসেছিল এরূপ মানবিক গুণের বিপ্লব।এসেছিল প্রচণ্ড সৃষ্টিশীলতা ও চিন্তাশীলতা। আরবী ভাষায় পবিত্র কোরআনের পূর্বে কোন গ্রন্থ ছিল না। কিন্তু আরবদের ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে সে দেশে শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাত আসেনি, বিপুল সমৃদ্ধি এসেছে তাদের ভাষা ও সাহিত্যে। ফলে আরবী ভাষায় অতি অল্প সময়ে গড়ে উঠে এক বিশাল জ্ঞান-ভান্ডার। আর এ ফলে গড়ে উঠে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। অথচ কোর’আনের পূর্বে আরবী ভাষায় কোন গ্রন্থ ছিল না। ইসলামের প্রবেশের ফলে সাহিত্য ও বিজ্ঞানে দ্রুত বিপ্লব এসেছিল ইরান দেশেও। ইরানের ইতিহাস বহু হাজার বছরের। কিন্তু সে দেশের মানুষের যা কিছু মহান সৃষ্টি তা গড়ে উঠেছে ইসলাম আগমনের পর। ইসলাম মহান বিপ্লব এনেছিল তুর্কীদের মাঝেও। তারা গড়ে তুলেছিল ওসমানিয়া খেলাফত যা ছিল বহুশত বছর ধরে সমগ্র বিশ্বের প্রধানতম বিশ্বশক্তি। ইসলাম কবুলের পর বিপ্লব এসেছিল আফগানদের জীবনেও। সুলতান মাহমুদের সময় তার রাজ্যে যত বিজ্ঞানীর বসবাস ছিল, তা সমগ্র বাঁকি বিশ্বে ছিল না।

কোন জাতির সংস্কৃতি,মূল্যবোধ ও মানবিক উন্নয়নের মান যাচায়ে সে জাতির লোকসংখ্যা,রাস্তাঘাট, মাঠঘাট বা কলকারখানার খতিয়ান নেয়াটি জরুরী নয়। বরং সে পরিচয় মেলে সে জাতির ভাষা ও সাহিত্য থেকে। গাড়ীর আগে যেমন ঘোড়া দৌড়ায়,তেমনি জাতির বিজয় বা উন্নয়নের আগে সে জাতির জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যের ঘোড়াটি দৌড়ায়। ভাষার মধ্যেই ধরে পড়ে জাতির ধর্ম-কর্ম, চরিত্র, বুদ্ধিবৃত্তি ও মূল্যবোধ। পরবর্তী বংশধরদের জন্য সাহিত্যের মধ্যে থাকে াভাস সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার। তবে সে উত্তরাধিকার যেমন কল্যাণকর হতে পারে,তেমনি অকল্যাণকরও হতে পারে। সন্তানের দেহে পিতামাতা যেমন সংক্রামক ব্যাধীর বীজ ছড়িয়ে মারা যেতে পারে, তেমনি শিশুর চেতনায় সংক্রামক অজ্ঞতা,পথভ্রষ্টতা বা কুসংস্কার রেখেও মারা যেতে পারে। শত শত বছর ধরে মানব সমাজে নানারূপ অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা যে বেঁচে থাকে তা তো এমন পারিবারীক বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায়।পাপুয়া নিউগিনির মানুষ আজও  যেরূপ উলঙ্গ ভাবে বনে জঙ্গলে জীবন কাটায় সেটি তো একারণেই। পূর্বপুরুষ অগ্নিপুঁজা,পুতুলপুঁজা,সর্পপুঁজা,গরুপুঁজার বা নাস্তিকতার ঐতিহ্য পরিবারে রেখে মারা গেলে পরবর্তী বংশধরগণও গর্বভরে সেটাই অনুসরণ করে। সেটি বেঁচে থাকে দেশের আবহমান ধর্ম, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের মাধ্যমে। মুসলিমদের কাজ শুধু ইসলাম প্রচার নয়,বরং সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নামে যে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার মানুষকে পথভ্রষ্ট করে সেগুলির বিলুপ্তি ঘটানো। সে কাজটি যথার্থ ভাবে না হলে অসম্পূর্ণ থেকে যায় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মানের কাজটি। পানাহারের নামে বিষপানের ন্যায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির নামে পথভ্রষ্টতাও তখন প্রবলতর হয়। এমন এক অপরিহার্য তাগিদেই মিশর, ইরান, আফগানিস্তানের মানুষ ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে তাদের বহু শত বছরের পুরনো ভাষা, সাহিত্য ও ঐতিহ্যের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল। ইসলামের প্রবেশের আগে মিশরীদের নিজস্ব ভাষা ছিল,সে ভাষায় শত শত বছর ধরে ফিরাউনদের রাষ্ট্রও পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু মিশরীয়রা সে মাতৃভাষাকে ত্যাগ করে তারা আরবীকে গ্রহণ করেছিল। নিজস্ব ভাষা ছিল ইরানীদেরও,সেটি ছিল ‘দারী’ ভাষা।সে ভাষায় সে আমলের বিশ্বশক্তি সাসানীদের রাজকার্য,ধর্ম-কর্ম ও শিক্ষার কাজ চলতো। কিন্তু ইরানীরা ইসলাম কবুলের সাথে সাথে ‘দারী’ বর্জন করে কোরআনের শব্দ, উপমা ও দর্শন নিয়ে নতুন ভাষা ফার্সীর জন্ম দেয়। ফার্সী ভাষার শতকরা ৭০ ভাগেরও বেশী শব্দ আরবী। ভারতে মুসলিমদের যখন আগমন ঘটে তখন এদেশে যে ভাষা বা সাহিত্য ছিল না তা নয়। তখন সংস্কৃত ভাষা ছিল, সে ভাষায় সাহিত্যও ছিল। তবে সংস্কৃত ভাষা ও সে ভাষায় রচিত রামায়ন, মহাভারত, বেদ,উপনিষদের কেচ্ছাকাহিনীপূর্ণ সাহিত্য দিয়ে চেতনা পূর্ণ করলে মুসলিমদের পক্ষে ঈমান বাঁচানোই অসম্ভব হত। ঈমান বাঁচাতে গিয়ে ভারতীয় মুসলিমগণ তাই নতুন ভাষা উর্দুর জন্ম দিয়েছে এবং সে ভাষায় বিশাল সাহিত্য-ভান্ডারও গড়ে তুলেছে। উর্দুর পাশাপাশি সাহায্য নিয়েছে আরবী ও ফার্সীর। মুসলিমরা এভাবে যেখানেই গেছে সেখান শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা ও রাষ্ট্র নির্মান করেনি,নতুন নতুন ভাষা এবং সে ভাষায় সমৃদ্ধ সাহিত্যেরও জন্ম দিয়েছে।

বাঙালী মুসলিমদের বিপদ

কিন্তু মিশর, ইরান, আফগানিস্তান বা তুরস্কে যা ঘটেছে,বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি।বাঙালী মুসলিমদের মূল বিপদটি এখানেই।আধুনিক বাংলা ভাষাটি গড়ে উঠেছে মূলত বাঙালী হিন্দুদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে। সেটির প্রমাণ মেলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে। বাংলা সাহিত্যের জন্ম বৌদ্ধদের দ্বারা। এবং সেটি চর্যাপদের মাধ্যমে। ১৯০৭ সালে হর প্রাসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজকীয় পাঠাগারে ২৩ জন কবীর ৪৭টি চর্যাপদের সন্ধান পেয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের সেটাই প্রাচীন কাল এবং এ চর্যাপদগুলিই সে আমলের সাহিত্য-ভান্ডারের একমাত্র সঞ্চয়। বলা হয়ে থাকে,এগুলো রচিত হয়েছিল দশম শতাব্দীতে। কিন্তু এরপর বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধদের অবদান আর নজরে পড়ে না। সম্ভবতঃ এ কারণে যে,হিন্দুদের দ্বারা ব্যাপক বৌদ্ধনির্মূল শুরু হলে তাদের দ্বারা সাহিত্য সৃষ্টি দূরে থাক,প্রাণে বাঁচাই কঠিন হয়ে পড়ে। তখন বাংলায় বৌদ্ধ পাল রাজাদের শাসনই শুধু বিলুপ্ত হয়নি,প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল বৌদ্ধ ধর্মও। জীবন বাঁচাতে বৌদ্ধরা তখন নেপাল, ভূটান, শ্রীলংকা, বার্মা ও অন্যান্য দেশে আশ্রয় নেয়। শরণার্থী বৌদ্ধদের সাথে চর্যাপদগুলি নেপালে পৌঁছানোর ফলে সেগুলি বেঁচে যায়। এরপর শুরু হয় বাংলা সাহিত্যের মধ্য যুগ। মধ্যযুগীয় সে সাহিত্যের প্রায় সবটুকুই বাঙালী হিন্দুদের সাহিত্য। সেটি বুঝা যায় সে সাহিত্যের উপকরণগুলির দিকে তাকালে। সেগুলি হলঃ এক)বৈষ্ণব সাহিত্য, দুই) শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন,তিন) বিদ্যাপতির পদাবলী, চার)চন্ডিদাশ পদাবলী, পাঁচ) মঙ্গল কাব্য, ছয়) সংস্কৃত সাহিত্য থেকে অনুবাদ, সাত) মহাভারতের অনুবাদ, এবং আট) বাউল গান। সে সাহিত্যে স্থান পেয়েছিল শ্রীকৃষ্ণ, রাম,শর্প, মনসা, রামায়ন ও মহাভারতের কথা। বাঙালী মুসলিমদের পক্ষে সে সাহিত্য থেকে চেতনায় পুষ্টি লাভ দূরে থাক,সে গুলির ভাষা, উপমা ও চরিত্র থেকে অর্থ-উদ্ধারই দূরুহ। শুধু একালে নয়, সেকালেও সেগুলি দূর্বোধ্য ছিল। বাংলায় মুসলিমদের বিজয় ত্রয়দশ শতাব্দীতে হলেও মুসলিম কবিদের সাহিত্যচর্চার শুরু হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে। প্রশ্ন হল, ত্রয়দশ থেকে পঞ্চদশ এ দুইশত বছর ধরে বাঙলার মুসলিমদের চেতনায় পুষ্টি জোগানো হল কি ভাবে? পঞ্চদশ শতাব্দীতে যে সাহিত্য রচনা শুরু হল সে সাহিত্যই বা কতটা সমৃদ্ধ ছিল? পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম সারীর কবি হলেন শাহ মুহম্মদ ছগির।তিনি রচনা করেন ইউসুফ জুলেখা। পবিত্র কোরআনে ইউসুফ জুলেখার বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু শাহ মুহম্মদ ছগির তার “ইউসুফ জুলেখা”য় যা লেখেন তা তাঁর নিজস্ব কল্পনাপ্রসূত। এ আমলের অন্যরা হলেন দৌলত উজির বাহরাম খান,শাহ বারিদ খান,মুহম্মদ কবীর প্রমুখ। দৌলত উজির বাহরাম খান রচনা করেন লায়লী মজনু, শাহ বারিদ খান লেখেন বিদ্যাসুন্দর এবং হানিফা-কয়রপরী কাব্য। মুহম্মদ কবীর রচনা করেন মধু মালতী। দুই শতাব্দী ধরে মাত্র ৫ জন কবির হাতে রচিত হয় মাত্র ছয়খানি আখ্যানকাব্য। (সুত্রঃ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ২য় খণ্ড,২০০৮;বাংলা একাডেমী প্রকাশিত)।মধ্য যুগে অন্যান্য মুসলিম কবিগণ হলেন আলাওল, সৈয়দ সুলতান, মুজাম্মিল, ফয়জুল্লাহ প্রমুখ। এ আমলে মুসলিমদের রচিত সাহিত্যের কলেবর যেমন নগন্য,তার চেয়েও নগন্য হল জনগণের উপর তার প্রভাব।

এর পর শুরু হয় বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ। প্রাচীন ও মধ্য যুগের ন্যায় আধুনিক যুগের সাহিত্যকর্মের শুরুও অমুসলিমদের হাতে। শুরুর কাজটি এবারও ঘটে ধর্মীয় প্রয়োজনে। তবে সেটি খৃষ্টানদের হাতে এবং খৃষ্টান ধর্মের প্রচারের স্বার্থে। শুরু হয় শ্রীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে। খৃষ্টানগণই সর্বপ্রথম এদেশে ছাপা খানা গড়ে তোলে এবং পত্রিকার প্রকাশও শুরু করে। খৃষ্টানদের মাঝে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন উইলিয়াম কেরী। তাদের দ্বারাই সর্ব প্রথম গদ্য সাহিত্যের জন্ম। এ আমলের সাহিত্য জগতের উল্লেখযোগ্য তারকা হলেন রাম মহন রায়, ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজ নারায়ন বসু,অক্ষয় কুমার দ্ত্ত, পেয়ারী চাঁদ মিত্র, কালী প্রসন্ন সিংহ, মাইকেল মধুসূদন, ইশ্বরচন্দ্র গুপ্ত,বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জী,হেমচন্দ্র,নবীনচন্দ্র,বিহারীলাল চক্রবর্তী,দীনবন্ধু মিত্র,গিরিশচন্দ্র ঘোষ,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,মোশাররফ হোসেন,শরৎচন্দ্র,সত্যন্দ্রনাথ দত্ত,মোহিতলাল মজুমদার,দ্বিজেন্দ্রলাল রায়,নজরুল ইসলাম,বিভূতি ভূষন বন্দোপাধ্যয়,তারাশংকর বন্দোপাধ্যয়, মানিক বন্দোপাধ্যয় এবং আরো অনেকে।

সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দু সাহিত্যিকদের রচিত গল্প, উপন্যাস, নাটক, কাব্য ও মহাকাব্যের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোকে শক্তিশালী করা এবং তাদের কল্যাণচিন্তাকে বলবান করা। সে সাহিত্যের প্রভাবেই বাংলার হিন্দুদের মাঝে দেখা দেয় রেনাসাঁ।সেটি যেমন শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে,তেমনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও। মুসলমানের মনে পুষ্টি জোগানো দূরে থাক,সে সাহিত্যে মুসলিমদের উল্লেখটিও ছিল অতি সামান্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে উল্লেখগুলি ছিল মুসলিমদের চরিত্রহননের লক্ষ্যে। বরং বাস্তবতা হল, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ যে মুসলিম সেটি হিন্দুদের রচিত মধ্য যুগীয় ও আধুনিক কালের বাংলা সাহিত্যে পড়লে বোঝাই যায় না। বাংলার মাঠঘাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, নগর-বন্দর ও অফিস-আদালতসহ সর্বত্র জুড়ে যেন শুধু হিন্দুই,মুসলমানের খোঁজ সে সাহিত্যে তেমন মেলে না। তাই মুসলিমদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রয়োজন মেটোনোর সামর্থ্য  এ সাহিত্যের ছিল না। বরং বিস্তর সামর্থ্য  ছিল মুসলিমদের মনবল ভেঙ্গে দেয়ার।মীর মোশাররফ হোসেনের মত ব্যক্তিদের রচিত সাহিত্যও মুসলিমদের কল্যাণে কাজের কাজ কিছুই করেনি। ইসলামের ইতিহাসের অতি বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটেছিল কারবালায়। কারবালার সে ঘটনাকে তিনি রংচঙ চড়িয়ে ‘বিষাদ সিন্ধু’ রচনা করলেও সে গ্রন্থে কারবালার মূল শিক্ষাকে তিনি আড়াল করেছেন। কারবালার সে অতি করুণ ঘটনাকে তিনি প্রেমের কেচ্ছা বানিয়েছেন।সাহিত্যকে তিনি বিনোদনের বাহন বানিয়েছেন, জনগণের চেতনা ও দর্শনে সুস্থ্যতা বাড়ানোর কাজে তার অবদান তাই নগণ্য।

সাহিত্যের অবদানঃ চেতনায় প্রতিরোধ

মুসলমানের প্রতি কাজেই থাকে ইবাদতের প্রেরণা। পরীক্ষার খাতায় প্রতি শব্দ লেখার মধ্যে যেমন থাকে পাশের চিন্তা, তেমনি ঈমানদারের প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি উচ্চারণ ও প্রতিটি ভাবনার মধ্যেও থাকে আখেরাতে মুক্তির ভাবনা। তাই যারা ঈমানদার কবি-সাহিত্যিক তারা শুধু সাহিত্যিকই নন, সাধক, দার্শনিক এবং মোজাহিদও। কবি ইকবাল তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সাহিত্যের মূল কাজ শুধু ঈমানে পুষ্টি জোগানো নয়,বরং অসুস্থ্য ভাবনা,মিথ্যা দর্শন,সামাজিক কুসংস্কার এবং অসত্য ও অধর্মের বিরুদ্ধে মানব মনে প্রতিরোধ বাড়ানো। ইসলামী সাহিত্য এভাবেই মানব মনে ভ্যাকসিনেশনের কাজ করে। সে ভ্যাকসিন ইম্যুনিটি বা প্রতিরক্ষা দেয় মিথ্যা, পাপাচার ও অধর্মের বিরুদ্ধে। পাপাচার কবলিত সমাজে সুস্থ্যতা নিয়ে বাঁচার জন্য এমন ইম্যুনিটি জরুরী। মুসলিমদের সবচেয়ে বড় সম্পদ তেল গ্যাস নয়,জন-সম্পদও নয়।সেটি হলো পবিত্র কোরআন-হাদীস,এবং সে কোরআন-হাদীসের ভিত্তিতে রচিত ইসলামী সাহিত্য। এ সাহিত্য থেকে সে পায় ঈমানের বল। তেল-গ্যাসের অর্থে এমন ইম্যুনিটি আসে না। বরং বিপদ হল,সাহিত্যের বদলে দেশে অপ-সাহিত্য গড়ে উঠলে সেটি অসুস্থ দর্শন,মিথ্যা মতবাদ,দুষিত সংস্কৃতি এবং পাপের বাহনও হতে পারে। বইয়ের পাতা বয়ে কোটি কোটি মানুষের চেতনায় তখন পৌঁছে বিষাক্ত বিষ। এমন বিষ প্রচণ্ডতা নেশাগ্রস্ততাও আনে। সে নেশাগ্রস্ততা হিরোইনের চেয়ে কম নয়। হিরোইনসেবীরা যেমন পুষ্টিকর খাদ্যে রুচী হারায়, তেমনি অপসাহিত্যের নেশাগ্রস্ত পাঠকগণ রুচী হারায় কল্যাণকর সাহিত্যে। জাতীয় জীবনে তখন বিপর্যয় নেমে আসে ভয়ানক ভাবে। কবি, নাট্যকার ও উপন্যাসিকের ছদ্দবেশে বাংলাদেশে এমন বিষ-ব্যাবসায়ী বা হিরোইন-ব্যবসায়ীর সংখ্যা কি কম?  দূষিত খাদ্য-পানীয়ের ন্যায় দুষিত সাহিত্যও পরিহার এজন্যই জরুরী। আরবের মুসলিমগণ তাই ইমরুল কায়সদের মত কবিদের সৃষ্ট অসুস্থ্য ও অশ্লিল সাহিত্যের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। অথচ অসুস্থ্য ও অশ্লিল সাহিত্য জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বাংলাদেশে। সাহিত্য পরিণত হয়েছে নিছক বিনোদনের মাধম্যে। কোন কোন ক্ষেত্রে সেটি অশ্লিলতার আশ্রয়ে।ফলে এ সাহিত্য জনমনে ইম্যুনিটি না বাড়িয়ে বরং সেটির ব্যাপক বিনাশ ঘটাচ্ছে। এইডস ভয়ানক রোগ,কারণ এ রোগটি দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বিলুপ্ত করে। সুস্থ্য মানুষ দীর্ঘ কাল বাঁচে কোন ঔষধের গুণে নয়।বরং সেটি আল্লাহপ্রদত্ত প্রতিরোধ ক্ষমতার গুণে। সুস্থ্য দেহের নানা স্থানে লক্ষ লক্ষ জীবানূর বাস, কিন্তু সেগুলি দেহের প্রতিরক্ষা বুহ্য ভেদ করতে পারে না। ফলে সে জীবনূগুলো শরীরের অভ্যন্তরে বছরের পর বছর বাস করলেও তা থেকে রোগ সৃষ্টি হয় না। কিন্তু এইডস রোগীর জীবনে এ দুর্বল জীবানূগুলিই ত্বরিৎ মৃত্যু ডেকে আনে। চেতনা রাজ্যে তেমনি এইডস সৃষ্টি করে অপ-সাহিত্য। বাংলাদেশে সে বিনাশী কর্ম যে কতটা ভয়ানক ভাবে হচ্ছে সেটি বুঝা যায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দুরাবস্থা ও দুর্নীতির ব্যাপক প্রচার দেখে। নৈতিক ইম্যুনিটি বিনষ্ট হওয়ার ফলেই বাংলাদেশ দূর্নীতে বিশ্ব-রেকর্ড গড়ছে। নবীজী (সাঃ)র আমলে মুসলিমগণ প্রথম ১৩টি বছর কাটিয়েছেন মক্কায়। সেখানে যেমন মদ-জুয়া ছিল,তেমনি উলঙ্গতা,অশ্লিলতা, দুর্বৃত্তি এবং ধর্মের নামে অধর্মও ছিল। সে সমাজ ছিল নৈতিক ব্যাধীতে পরিপূর্ণ। কিন্তু সেগুলি ঈমানদারদের স্পর্শ করতে পারেনি। ব্যর্থ হয়েছে তাদের মাঝে নৈতিক রোগ সৃষ্টি করতে। সেটি সম্ভব হয়েছিল তাদের চেতনায় প্রবল ইম্যুনিটির কারণে। আর সে ইম্যুনিটি প্রবল ভাবে বেড়েছিল আল-কোরআনের জ্ঞানে। অতীতে ভারতে আগত শক,হুন,জৈন,আর্য-অনার্য -নানা ধর্মের মানুষ ভারতীয় হিন্দুদের মাঝে হারিয়ে গেছে। কিন্তু হারিয়ে যায়নি মুসলিমগণ। হারিয়ে যাওয়া থেকে মুসলিমগণ বেঁচে গেছে কোরআনী জ্ঞানলব্ধ ইম্যুনিটির কারণে।কিন্তু সে ইম্যুনিটি বিনাশের লক্ষ্যে প্রচণ্ড আগ্রাসন শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। আর সে লক্ষ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে সাহিত্য। এবং সে সাথে জনগণকে পরিকল্পিত ভাবে দূরে সরানো হচ্ছে কোরআন-হাদিসের জ্ঞান থেকে।

অধিকৃত চেতনাঃ সাহিত্য যেখানে হাতিয়ার

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অমুসলমানের সাথে মুসলমানের পানাহার যেমন একত্রে চলে না, তেমনি সাহিত্যও চলে না। কারণ উভয়ের প্রয়োজনটা যেমন ভিন্ন, তেমনি ভিন্ন হল কোনটি ক্ষতিকর আর কোনটি উপকারি সে ধারণাটিও। মুসলিম ও অমুসলমানের পানাহার ভিন্ন ভিন্ন টেবিলে বা পৃথক কক্ষে হলে হালাল-হারামের বাছবিচারে এতটা মনযোগী না হলেও চলে। কিন্তু যখন সেটি হয় একই টেবিলে, তখন খাদ্য গ্রহনে ঈমানদারকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হয়। তখন টেবিলের নানা কোন থেকে হালাল খাদ্যগুলো বেছে বেছে নিতে হয়। একাজে সামান্য অসতর্ক হলে হারাম খাদ্য ভক্ষণও অস্বাভাবিক নয়। তেমনটি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও। সাহিত্যের ক্ষেত্রে বাছবিচারের বিষয়টি সহজতর করতে গিয়েই দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সকল অবাঙালী মুসলমানেরা শিক্ষার ভাষা, ধর্মের ভাষা ও সংস্কৃতির ভাষা রূপে উর্দুকে গ্রহন করেছে। উর্দুর আগে গ্রহণ করেছিল ফার্সীকে। আর হিন্দুরা গ্রহন করেছে হিন্দিকে। পাঞ্জাবের শিখরা তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভাষা রূপে পাঞ্জাবীকে গ্রহণ করেছে। আর পাঞ্জাবের মুসলমানেরা গ্রহণ করেছে উর্দুকে। কিন্তু এক্ষেত্রে ভিন্নতর হল বাঙালী মুসলিমগণ। তারা প্রতিবেশী হিন্দুদের সাথে একত্রে বসে একই টেবিল থেকে তাদের নিজ চেতনার খাদ্যগুলো গ্রহণ করছে। এবং কোন রূপ বাছবিচার ছাড়াই। আর বাঙালী মুসলমানের জীবনে ভয়ানক বিপদটি ঘটছে এখানেই। সাহিত্য পাঠের নামে এখানেই ঘটছে বিষপান।এমন কি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিতটিও নেয়া হয়েছে একজন পৌত্তলিক হিন্দু থেকে। সাহিত্যের মধ্য দিয়েই একটি চেতনা কথা বলে। তাই পৌত্তলিকের সাহিত্য এজন্যই ঈমানদারের সাহিত্য থেকে ভিন্নতর হয়। ইকবাল, গালিব বা হাফিজের কবিতার মধ্য দিয়ে যেমন তাদের মুসলিম মানস কথা বলে, তেমনি রবীন্দ্র-সাহিত্যে গোপন থাকেনি তাঁর প্রচণ্ড হিন্দুত্ব ।   

রবীন্দ্রনাথ বাঙালী হলেও তার স্বপ্ন ছিল অখণ্ড ভারতব্যাপী হিন্দু সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও হিন্দুত্বের বিজয়।তাঁর চেতনার সে মানচিত্রে মুসলমানের যেমন স্থান ছিল না,তেমনি ছিল না স্বাধীন বাংলাদেশের ধারণাও। গান্ধীর এক প্রশ্নের জবাবে তিনিই হিন্দি ভাষাকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।রাজনৈতিক নেতা না হলেও রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দর্শন বা অঙ্গিকার যে কতটা গভীর ছিল সেটির প্রমাণ হল তাঁর সাহিত্য। তাঁর কাছে অনুকরণীয় মডেল রূপে যিনি স্থান পেয়েছিলেন তিনি কোন বাঙালী ছিলেন না। গান্ধিও নন। তিনি হলেন ভারত থেকে মুসলিম-নির্মূলের নায়ক শিবাজী। শিবাজীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাভরে তিনি ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতা লেখেন। তাঁর মত কবি-সাহিত্যিক ও রাজনৈতিকদের উৎসাহে মারাঠার ন্যায় বাংলাতেও শিবাজী উৎসব শুরু হয়।রবীন্দ্রনাথের শিবাজী উৎসব কবিতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়, শিবাজীর প্রতি তার নিজের ভক্তিটা কত গভীর এবং তার হিন্দুত্ব কতটা বিশাল। তিনি লেখেন:

“আমি কবি এ পূর্ব ভারতে

কী অপূর্ব হেরি,

বঙ্গের অঙ্গন দ্বারে কেমনে ধ্বনিল কোথা হতে

তব জয় ভেরি।

শুধু তব নাম আজি পিতৃলোক হতে এল নামি

করিল আহবান-

মুহুর্তে হৃদয়াসনে তোমারেই বরিল হে স্বামী,

বাঙালীর প্রাণ।

তোমারে চিনেছি আজি চিনেছি হে রাজন

তুমি মহারাজ।

তব রাজ করলয়ে আট কোটি বঙ্গের নন্দন

দাঁড়াইবে আজ ।

মারাঠির সাথে আজি হে বাঙালি, এক কন্ঠে বলো

‘জয়তু শিবাজী’

মারাঠির সাথে আজি হে বাঙালি, এক সঙ্গে চলো

মহোৎসবে আজি।”

অথচ এ মাত্র ৫ বছর পূর্বে ‘পণরক্ষা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ মারাঠাদের দস্যু রূপে চিত্রিত করে লিখেছেন:

“মারাঠা দস্যু আসিছিরে ঐ

করো করো সবে সাজ।”

মারাঠাদের দস্যু চরিত্র রবীন্দ্রনাথের অজানা ছিল না। সে সাথে এটিও তাঁর অজানা ছিল না যে, মারাঠা নেতা শিবাজী মুসলিম নির্মূলের নায়ক। এবং তিনি হিন্দু পুনর্জাগরনের নেতা। লক্ষণীয় হল,শিবাজী উৎসব কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ৮ কোটি বাঙালীকে এক সঙ্গে ‘জয়তু শিবাজী’ ধ্বণি দিতে বলেছেন। এখানে অর্থ দাড়ালো কি? রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় বাঙালী হিন্দুর সংখ্যা ৮ কোটি ছিল না।এবং এখনও তারা ৮ কোটি নয়। তবে কি তিনি ‘জয়তু শিবাজী’ ধ্বনি দিতে মুসলিমদেরকেও আহবান করছেন? তবে কি তিনি চান,অখন্ড ভারত জুড়ে হিন্দু-রাজ্য নির্মানে শিবাজীর ন্যায় মুসলিম নির্মূলের নায়কের অনুসারি হয়ে বাঙালী মুসলমানেরাও শামিল হোক? মুসলিমদের সাথে এর চেয়ে নির্মম মস্করা আর কি হতে পারে? এটি তো মুসলিমদের নিজ কবর নিজ হাতে খনন করতে বলা। ভারতীয় শিব সেনা, বিজেপী, বজরং দল, বিশ্বহিন্দু পরিষত তো সেটিই চায়।কথা হল,এমন উগ্রহিন্দু চেতনাধারির রচিত গান বাঙালী মুসলমানের জাতীয় সঙ্গীত হয় কি করে?

হিন্দু মারাঠাদের পরিচালিত মুসলিম নির্মূল প্রক্রিয়াটি মুসলিমদের মনে এতটাই আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল যে হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভি (রহঃ) তৎকালীন আফগান শাসক আহম্মদ শাহ আবদালীকে মারাঠাদের দমনে ভারতে আসতে আহবান জানান।সে সময় ছিল মোগল শাসনের মুমূর্ষ অবস্থা, মারাঠাদের হামলার মুখে মোগলদের অবস্থা তখন অসহায়। ভারতে মুসলিম শাসনের সে দূর্দীনে আহম্মদ শাহ আবদালী সেদিন মারাঠা শক্তি নির্মূল করে আফগানিস্তান ফিরে যান। ভারতের মুসলিম ইতিহাসে এ যুদ্ধটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,মারাঠা শক্তি বিনাশের ফলেই ভারতীয় মুসলিমগণ সে যাত্রায় নির্মূল প্রক্রিয়া থেকে বেঁচে যায়। নইলে ভারতীয় বৌদ্ধদের পরিনতি নেমে আসতো মুসলিমদের জীবনেও। কিন্তু উগ্র হিন্দুদের কাছে শিবাজী প্রতিষ্ঠা পায় মুসলিম বিরোধী রাজনীতির বীর পুরুষ রূপে। এবং সেটি রবীন্দ্রনাথের কাছেও। চরম মুসলিম-বিদ্বেষী আরেক মারাঠা শ্রী বাল গঙ্গাধর তিলক ১৮৯৩ সালে পুনা শহরে শিবাজীর জন্মস্থানে শিবাজী উৎসব প্রবর্তন করেন। শিবাজী পরিনত হন সারা ভারতে হিন্দু পুনরুজ্জীবনের প্রতীক রূপে। শিবাজী উৎসব আমদানী হয় কলিকাতা শহরেও। রবীন্দ্রনাথসহ অধিকাংশ হিন্দু বুদ্ধিজীবীগণই তাতে সাগ্রহে অংশগ্রহণ করেন।হিন্দু জাগরণ,মুসলিম নির্মূল এবং অখন্ড ভারতের বিষয়টি রবীন্দ্রনাথের কাছে এতটাই বড় হয়ে দাঁড়ায় যে দস্যূ শিবাজীকে তিনি অতি শ্রদ্ধাভরে ‘জয়তু শিবাজী’ বলেছেন। এভাবে সেদিন দিনের আলোর ন্যায় সুস্পষ্ট হয় রবীন্দ্র মানস। বিস্ময়ের বিষয় হল,সে রবীন্দ্রনাথের গানই বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত! কোন মুসলিম নেতা বা বুদ্ধিজীবী এমন একটি গানকে কি মুসলিমদের জাতীয় সঙ্গিত রূপে গ্রহণ করতে পারে?

জাতীয় সঙ্গিতের সুর,ছন্দ বা কবিত্বই বড় কথা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হল, সে সঙ্গিতের মধ্য দিয়ে জাতির ভিশন,মিশন,ধর্ম,জীবন-দর্শন ও আশা-আকাঙ্খার কতটা প্রকাশ ঘটল সেটি। জাতীয় সঙ্গিতের মাঝে প্রতিফলিত হয় দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের চেতনা। জাতীয় সঙ্গিতের লেখককে এজন্য নবেল-প্রাইজ বিজয়ী হওয়াটি জরুরী নয়। বিশ্বের দুই শত বেশী রাষ্ট্রের মধ্যে কয়টির দেশের জাতীয় সঙ্গিতের লেখক নবেল প্রাইজ বিজয়ী? এক্ষেত্রে জরুরী হল দেশবাসীর চেতনা ও বিশ্বাসের প্রতিনিধি হওয়ার সামর্থ্য  থাকা। কিন্তু সে সামর্থ্য  কি রবীন্দ্রনাথের ছিল? রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বিশাল। হাজার হাজার পৃষ্ঠা তিনি লিখেছেন। যখন তিনি লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত তখন তার চোখের সামনেই এদেশের উপর চলছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জুলুমটি। সেটি সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসন। সে শাসন সাথে এনেছিল অর্থনৈতিক শোষন। এনেছিল নীল চাষ। এনেছিল দেশীয় শিল্প, কৃষি ও শিক্ষার ধ্বংসের অভিনব কৌশল। বাংলার মসলিন শিল্পের ধ্বংসে তারা তাঁতীদের হাতের আঙ্গুল পর্যন্ত কেটেছে। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শোষন, শাসন ও জুলুমের বিরুদ্ধে নিন্দাজ্ঞাপনের জন্য বেশী মানবতা লাগেনা। বিবেকের সে সামর্থ্য  বাংলার বহু সাধারণের ছিল। সে জুলুম, শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে বাংলার ফকিরগণ বিদ্রোহ করেছে। সাঁওতালরা বিদ্রোহ করেছে। সিপাহীরাও বিদ্রোহ করেছে। হাজার হাজার ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু সে জুলুম ও শোষন রবীন্দ্রনাথের বিবেককে স্পর্ষ করেনি। সাম্রাজ্যবাদী জুলুমের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামা দূরে থাক একটি কবিতা, গান বা প্রবন্ধও লেখেননি। বরং ১৯১১ সালে যখন ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ দিল্লি আসেন তখন যে গানটি গেয়ে সে সাম্রাজ্যবাদী শাসককে অভিনন্দন জানানো হয়েছিল সে জ্ঞানটির লেখক ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। এই হল রবীন্দ্রনাথের চেতনা ও বিবেকের মান।

শুধু তাই নয়। দেশে শিক্ষার বিস্তার কে না চায়? দেশের যে কোন প্রান্তে একটি স্কুল বা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা পেলে এমন কি পথের মানুষও আনন্দে আত্মহারা হয়। কিন্তু সে চেতনাটি কি রবীন্দ্রনাথের ছিল? ১৯১২ সালে পূর্ব বাংলার বিক্ষুব্ধ মুসলিমদের শান্ত করার জন্য ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোলকাতার রাস্তায় নেমেছিলেন। এবং তারও একটি প্রেক্ষাপট আছে। ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে এসে ১৯০৫ সালে কৃত বঙ্গভঙ্গকে রদ করে দেয়। এতে বিক্ষুব্ধ হয় পূর্ব বাংলার মুসলিম। ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ হওয়াতে ঢাকা কেন্দ্রীক উন্নয়ন শুরু হয়েছিল। সেটি বহাল থাকলে বাংলার সম্পদ শুধু কোলকাতায় কেন্দ্রীভূত না হয়ে ঢাকায়ও কিছু জমা হত। এতে ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলার মানুষ ঢাকা এবং সে সাথে পূর্ব বাংলাকে অনেকটা ভিন্ন ভাবে পেত। ঢাকায় এবং সে সাথে পূর্ব বাংলায় শিক্ষা, শিল্প, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক অবকাঠামা গড়ে উঠত, যেমনটি যে কোন রাজধানীতে গড়ে উঠে। সাতচল্লিশের ঢাকা কোন রাজধানী নগরী ছিল না। ছিল একটি জেলা শহর মাত্র।কিন্তু ঢাকা ও পূর্ব বাংলার উন্নয়ন কোলকাতা কেন্দ্রীক হিন্দুদের পছন্দ হয়নি। পছন্দ হয়নি রবীন্দ্রনাথেরও। তাই রবীন্দ্রনাথও বঙ্গভঙ্গ রদের দাবীতে রাস্তায় নেমেছিলেন। এরপর যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ওয়াদা দেয়া হয়, সেটির বিরোধীতাতে তিনি কোলকাতার রাজপথে মিছিল করেছেন। এসবই হল ইতিহাস। এবং এই হল রবীন্দ্র মানস ও রবীন্দ্র বিবেক। এ রবীন্দ্র মানস ও বিবেককে আলাদা করে কি তাঁর রচিত জাতীয় সঙ্গিত গাওয়া যায়? হিটলারের বক্তৃতা থেকে যেমন তার চরিত্র ও চেতনাকে আলাদা করা যায় না তেমনি পৃথক করা যায় না রবীন্দ্রনাথের রচিত গান থেকে তাঁর চরিত্র ও চেতনাকে।

আরো কথা হল,আজকের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলা যেমন নয়, তেমনি দেশটি ভারতও নয়। রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমদের সংখ্যা ৫৫% ভাগের বেশী ছিল না। সে বাংলা ঢাকাকেন্দ্রীকও ছিল না। এখন এটি এক ভিন্ন চরিত্রের বাংলাদেশ,-যে দেশে রবীন্দ্রনাথ একদিনের জন্যও বাস করেননি। কোনদিনও তিনি এদেশের নাগরিক ছিলেন না। এদেশের স্বাধীনতার কথা তিনি যেমন শোনেননি,তেমনি এ দেশের ৯১% ভাগ মুসলিমদের নিয়ে তিনি কোন স্বপ্নও দেখেননি। ফলে তাঁর পক্ষে বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া, স্বাধীনতা, আকাঙ্খা বা স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করা কি সম্ভব? তাছাড়া এ সঙ্গিতটি সে উদ্দেশ্যে লেখাও হয়নি। জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের বিষয়টি দোকান থেকে ‘রেডিমেড’ সার্ট কেনার ন্যায় নয়। এটিকে বরং বিশেষ রুচী, বিশেষ আকাঙ্খা,বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে অতি বিশেষ গুণের ‘tailor made’ হতে হয়। প্রতিটি দেশেরই একটি রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় থাকে। বিশেষ কিছু স্বপ্নও থাকে। সে বিচারে প্রতিটি দেশই অনন্য। সে অনন্য বৈশিষ্ঠের কারণেই পশ্চিম বাংলার ন্যায় বাংলাদেশে ভারতের অংশ নয়। জাতীয় সঙ্গিত রচিত হয় সে বিশিষ্ঠ পরিচয় ও স্বপ্নগুলো তুলে ধরতে। এমন সঙ্গিতের প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি উচ্চারণ থেকে প্রতিটি নাগরিক পায় নতুন প্রত্যয়, পায় নতুন প্রেরণা। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিতের যে সুর,যে দর্শন,যে বর্ণনা এবং যে আকুতি সেটি নিতান্তই একজন পৌত্তলিক হিন্দুর,কোন মুসলমানের নয়। দেশের ভূমি,নদ-নদী,আলো-বাতাস,জলবায়ু –সব কিছুই মহান স্রষ্টার একক সৃষ্টি।এসব একমাত্র তাঁরই নেয়ামত। সর্বশ্রেষ্ঠ সে মহান স্রষ্টার সুপরিচিত নামও রয়েছে। সে নামটি ‘আল্লাহ’। মুসলিম তাঁর প্রতিকর্মে সে আল্লাহকেই স্মরণ করে এবং তাঁরই ইবাদত করে। সকল নেয়ামতের জন্য তারই শুকরিয়া আদায় করে। এবং সে স্মরণ এবং সে শুকরিয়া নিজ দেশের যে কোন কল্যাণ কর্মেও। এটিই ইসলামের সংস্কৃতি। সে সংস্কৃতিরই প্রকাশ ঘটে মুসলিম দেশের জাতীয় সঙ্গিতে। অথচ সে মহান আল্লাহ একজন হিন্দুর কাছে অপরিচিত। এবং অপরিচিত হল তাঁর স্মরণ ও তাঁর প্রতি শুকরিয়া জানানোর পদ্ধতিও। এ রবীন্দ্রগানটিতে বরং পুঁজনীয় হয়ে উঠেছে মহান আল্লাহর সৃষ্ট প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক নৈসগ্য। আরধ্য হয়ে উঠেছে ভূমি,ফুল ও ফল,আলো-বাতাস এবং নদ-নদী। এখানেই হিন্দু রবীন্দ্রনাথের সাথে একজন মুসলিম বাংলাদেশীর পার্থক্য। এমন প্রকৃতি পুঁজা ইসলামে হারাম। অথচ রবীন্দ্রনাথের কাছে শুধু দেশ ও দেশের মাটির নয়, শাপ-শকুন-গরুও দেবতাতূল্য। বাংলাদেশের শিশু-সন্তান ও নাগরিকের বিরুদ্ধে বড় জুলুমটি হল, একজন পৌত্তলিকের রচিত জাতীয় সঙ্গিতটি তাদেরকে দিনের পর দিন গাইতে হচেছ,এবং তারা ব্যর্থ হচ্ছে সে স্মরণীয় মুহুর্তে মহান আল্লাহকে স্মরণ করতে। অথচ মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মহান আল্লাহর স্মরণ তথা যিকর। নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাতসহ সকল ইবাদতের মূলটি লক্ষ্য হলো সে যিকরকে লাগাতর করা ও তীব্রতর করা। যিকর হলো পবিত্র কোর’আন পাঠ। যিকরের অর্থ ভাবনা শূণ্য মন নিয়ে স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার নাম জপা নয়। বরং সেটি হলো তাঁর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচার ধ্যানমগ্নতা। অথচ বাংলাদেশের সাহিত্য-সঙ্গিত, শিক্ষা-সংস্কৃতির কাজ হয়েছে সে যিকর বা ধ্যানমগ্নতা বিলুপ্ত করা। এমন কি বিলুপ্তির সে কাজটি হয় এক পৌত্তলিক কবির রচিত জাতীয় সঙ্গিত গাওয়ার নামেও। দেশের জাতীয় সঙ্গিতে দেশের মাটি, গাছ-পালা, ফলমূল ও আলো-বাতাসের বন্দনা থাকলেও যিকর নাই সেই মহান করুণাময় স্রষ্টার যিনি সেগুলি সৃষ্টি করেছেন। এভাবেই মহান আল্লাহতায়ালার যিকর ও ইসলামের মূল আক্বিদা থেকে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-সেনা এবং সাধারণ মানুষকে দূরে হটানো হচ্ছে। সে সাথে জন্ম দেয়া হচ্ছে শিরক তথা পৌত্তলিকতার। অথচ তা নিয়ে মোল্লা-মৌলভী, আলেম,পীর, মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার ছাত্র, ইসলামী দলগুলির নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মুসল্লীদের মাঝে সামান্যতম প্রতিবাদ নাই। রাজনীতি ও অর্থনীতিতেই শুধু নয়, সাধারণ মানুষের চেতনার মানচিত্রও হিন্দু আগ্রাসীদের হাতে কতটা অধিকৃত এ হল তার নমুনা। সাহিত্য পরিনত হয়েছে এখানে ঈমান ধ্বংসের নীরব হাতিয়ারে। বাঙালী মুসলমানের সাহিত্য সংকট এভাবেই এক ভয়ংকর জাতীয়-সংকট সৃষ্টি করছে। ১৯/০২/১১; দ্বিতীয় সংস্করণ ৪/৮/২০১৯

 




প্রিয়া সাহার স্পর্ধা ও নতজানু বাংলাদেশ সরকার

অপরাধ মিথ্যা দোষারোপের

দেশের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ, বিদ্রোহ বা নাশকতা শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না; সেটি হয় কথা বা লেখনীর সাহায্যেও। মানব ইতিহাসে বড় বড় নাশকতাগুলো ঘটেছে এভাবে। তাই যে কোন সভ্য দেশে সেরূপ ক্ষতিকর কথা ও লেখনীর জন্য অপরাধী ব্যক্তিকে আদালতে তোলা হয় এবং গুরুতর শাস্তিও হয়। প্রিয়া সাহার গুরুতর অপরাধটি হলো, তিনি বিদেশের মাটিতে এক বিশাল গণহত্যার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশকে বিদেশের আদালতে অপরাধী রূপে খাড়া করেছেন এবং সে সাথে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বিচারও চেয়েছেন। সেটি করে তিনি বস্তুতঃ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি বিদেশী শক্তিকে হস্তক্ষেপের দাওয়াত দিয়েছেন। এটি এক গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভারতে বা অন্য কোন দেশের বিরুদ্ধে এমনটি হলে তার বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তির ব্যবস্থা হতো। রাস্তায় প্রতিবাদি মিছিল শুরু হতো। বাংলাদেশ পৃথিবী পৃষ্টে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত; দেশটিতে রয়েছে আইন-আদালত। দেশের কোন নাগরিকদের বিরুদ্ধে কোন অপরাধ ঘটলে, যে কোন নাগরিকের দায়িত্ব হলো তা নিয়ে দেশের আদালতে বিচার প্রার্থণা করা। তা নিয়ে বিতর্কের আয়োজন হতে পারতো সংসদেও। দেশের সাংবাদিক বা বুদ্ধিজীবী মহলেও এ নিয়ে আলোচনা বা লেখালেখি আলোচনা হতে  পারতো। কিন্তু সোটি না করে প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন। যেন বাংলাদেশ মার্কিন সরকারের তালুক, এবং বিচারক ডোনাল্ড ট্রাম্প।  

প্রিয়া সাহার আরেক গুরুতর অপরাধ, দেশের জন্য অতিশয় ক্ষতিকর ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা তিনি বলেছেন। অথচ মিথ্যা কথা বলা কোন মামূলী বিষয় নয়, যে কোন সভ্য দেশের আইনেই তা শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধ। অস্ত্রের সাহায্যে দেহহত্যা হয়। আর মিথ্যার সাহায্যে হত্যা করা হয় জ্ঞান, শ্রম, মেধা ও অর্থের বিনিয়োগে অর্জিত ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকে। এভাবে ব্যক্তির বেঁচে থাকার আনন্দকেই নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানে মিথ্যা কথা বলা তাই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কারো বিরুদ্ধে ব্যাভিচারের মিথ্যা অভিযোগ আনার শাস্তিটি তাই ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়ার শাস্তির সমান। অবিবাহিত হলে তাকে তখন ১০০টি চাবুকের আঘাত প্রকাশ্যে কোন ময়দানে খেতে হয়। বিবাহিত হলে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হয়। মিথ্যার সাহায্যে একই রূপ ভয়ানক ক্ষতি হতে পারে দেশের বিরুদ্ধেও। মিথ্যুকের শাস্তি দেয়াটি তাই যে কোন সভ্য সমাজেরই রীতি। কিন্তু মিথ্যুকদের হাতে অধিকৃত দেশে কি সেটি সম্ভব? এ দেশে ক্ষমতায় টিকে থাকার মাধ্যমই তো হলো মিথ্যা নির্বাচন। মিথ্যার মাধ্যেম নিরেট ভোট-ডাকাতির নির্বাচনকেও সুষ্ঠ নির্বাচন বলা হয়। মিথ্যচর্চা দেশটিতে রাজনৈতিক কালচারে পরিণত হয়েছে। ফলে শাস্তি না দিয়ে মিথ্যুকদের ক্ষমতায় বসানোই নীতিতে পরিণত হয়ে পড়েছে। সেটি জেনেই প্রিয়া সাহা অতি লাগামহীন মিথ্যা কথাটি অতি নির্ভয়ে বলেছেন।   

কি বলেছেন প্রিয়া সাহা?

ঢাকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন প্রিয়া সাহা। সুযোগ পেয়ে তিনি যা বলেছেন -সেটির ভিডিও বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। অতএব লুকানোর সুযোগ নাই। তিনি অভিযোগ তুলেছেন, বাংলাদেশ থেকে ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু নাগরিককে গায়েব করা হয়েছে। বলেছেন, “আমরা দেশ ছাড়তে চাই না, সেখানে বাঁচতে চাই। আমাদের সাহায্য করুণ।” ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু নাগরিকের গায়েব হওয়ার বিষয়ে নিজের শিশুসুলভ অজ্ঞতা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রিয়া সাহার কাছে জানতে চান, কারা তাদেরকে গায়েব করলো? প্রিয়া সাহা বলেন, সেটি করেছে মুসলিম মৌলবাদীরা। সে সাথে তিনি আরো বলেন, তারা সেটি করেছে সরকারি প্রটেকশনে। প্রিয়া সাহার অভিযোগ করেন, তারা সব সময়ই সরকারি প্রটেকশন পায়। সে সাথে এটিও উল্লেখ করেন, তার নিজের বাড়ীও জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।

৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু গায়েব হওয়ার বিষয়টি এক বিশাল গণহত্যার বিষয়।  স্পেন থেকে মুসলিম নির্মূল, আমেরিকা থেকে রেড ইন্ডিয়ান নির্মূল এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে অ্যাব অরিজিনদের নির্মূলের পর আধুনিক বিশ্বে কোথাও এমন নির্মূলের ঘটনা ঘটেনি। এমনকি হিটলারের আমলে জার্মানীতেও ইহুদীদের এরূপ বিশাল সংখ্যায় নির্মূল হতে হয়নি। এমন কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও এত মানুষ মারা যাযনি। ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়াতে যে প্রায় বিশ বছর ধরে যুদ্ধ হচ্ছে তাতেও এতো লোকের প্রাণহানি হয়নি। নব্বইয়ের দশকে আফ্রিকার রুয়ান্ডাতে ১০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়। তাতেই সেটি নৃশংস বর্বরতার ইতিহাস হয়ে আজও বেঁচে আছে। ফলে বাংলাদেশে এত মানুষ গায়েব হলে বিশ্বজুড়ে অবশ্যই এক বিশাল খবর হতে পারতো। বাংলাদেশের সরকার তখন একটি জেনোসাইডাল সরকার রূপে পরিচিতি পেত। কিন্তু সেটি হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও সেটি জানা ছিল না। ফলে বিস্ময়ে তাকে প্রিয়া সাহাকে জিজ্ঞাসা করতে হয়েছে। অথচ এতবড় নির্মূলের কাজ কোথাও ঘটলে শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন, বিশ্বের প্রতিটি শিক্ষিত মানুষ –এমন কি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরাও সেটি জানতো। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও একজন প্রমাণিত মিথ্যাবাদি। কিন্তু তার কাছেও প্রিয়া সাহার মিথ্যাটি বিস্ময়কর মনে হয়েছে।

মতলবটি রাজনৈতিক

প্রিয়া সাহার লক্ষ্য শুধু ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘুর গায়েব হওয়ার কথাটি তুলে ধরা ছিল না। সে সাথে উদ্দেশ্য ছিল বাঙালী মুসলিমদের খুনের আসামী রূপে খাড়া করাও। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দু’টি পক্ষ। একটি ভারতসেবী পক্ষ; অপরটি বাংলাদেশসেবী পক্ষ। প্রিয়া সাহা যেহেতু ভারতসেবী শিবিরের, তাই তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি সন্ত্রাসী দেশ এবং বাংলাদেশের ভারত বিরোধী দেশপ্রেমিক পক্ষকে সন্ত্রাসী পক্ষ রূপে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা। তিনি ধারণা করেছিলেন, সন্ত্রসবিরোধী যুদ্ধের নামে মার্কিনীদের যে মুসলিম বিরোধী যুদ্ধ চলছে, এভাবে তাদের যুদ্ধে মিত্র হওয়া যাবে।  বিরোধে শিবিরে থাকা কালে শেখ হাসিনা ও শাহরিয়ার কবিরেরাও একই কাজ করেছে। শেখ হাসিনা থেকে অনুপ্রানিত হয়েই যে প্রিয়া সাহা এমন ভিত্তিহীন কথাটি বলেছেন, সেটি নিজ বক্তব্যের পক্ষে সাফাই রূপে নিজের পক্ষ থেকে ছাড়া ভিডিওতে তিনি বলেছেন। ট্রাম্পের কাছে পেশকরা নালিশে তার অভিযোগ ছিল, এ নির্মূলকরণ প্রক্রিয়াটি ঘটেছে দেশের মুসলিম মৌলবাদীদের হাতে। তার আরো অভিযোগ, মৌলবাদীগণ সবসময়ই পেয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা।  প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে মুসলিম মৌলবাদী কারা? নিশ্চয়ই জামায়াতে ইসলামী, হিফাজতে ইসলাম এবং মসজিদ-মাদ্রাসার হুজুর ও ছাত্রগণ। কথা হলো, কারা তাদেরকে দিল কথিত সরকারি প্রটেকশন? নিশ্চয়ই প্রিয়া সাহা বুঝাতে চেয়েছেন, সেটি আওয়ামী লীগের সরকার নয়, আওয়ামী লীগের মিত্র জাতীয় পার্টির সরকারও নয়। বরং সেটি বিএনপি’র সরকার।

 

এ ভূয়া তথ্যের ভিত্তি কোথায়?

প্রশ্ন হলো,  বাংলাদেশে কি কোন কালেও ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু ছিল? সেটি যেমন আজ নাই, তেমনি আজ থেকে ৭০ বছর আগেও ছিল না। ফলে যা ছিল না তা গায়েব হলো কি করে? ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সৃষ্টিকালে দেশটির সর্বোমোট জনসংখ্যা ছিল  সাড়ে সাত কোটি। অপর দিকে ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পায় তখনও পূর্ব পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা তিন কোটি ৭০ লাখ ছিল না। ফলে প্রশ্ন হলো, ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারি সংখ্যালঘুদের থেকে ৩ কোটি ৭০ লাখ গায়েব হয় কি করে? গায়েব হলে বর্তমানের সংখ্যালঘু জনসংখ্যা এক কোটি ৮০ লাখ হয় কি করে?

আরো প্রশ্ন হলো,  কিভাব গায়েব করা হলো ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ? হিটলার তার দেশের কয়েক লাখ ইহুদী হত্যা করতে গ্যাস চেম্বারের ন্যায় বিশাল বিশাল প্লান্ট নির্মাণ করেছিল। মানব হত্যা তখন এক ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছিল। ভারত থেকে মুসলিম নির্মূল করতে দেশটি হিন্দু গুণ্ডারাও গড়ে তুলেছে এক দেশজ প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ার অধীনে শত শত দাঙ্গা করছে। এমন এক দাঙ্গায় গুজরাতে ২ হাজার মুসলিম নর-নারীকে হত্যা করা হয়। ১০ লাখ রোহিঙ্গা নির্মূল করতে মায়ানমার সরকারকে কয়েক হাজার মুসলিম গ্রামে হাজার হাজার সৈন্য নামাতে হয়েছে। ক্ষেপিয়ে দিতে হয়েছে স্থানীয় বৌদ্ধদের। তাদের দিয়ে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ীতে আগুণ দিতে হয়েছে। ফলে মুসলিমদের মাঝে তখন শুরু হয়েছে নীরবে দেশ ছাড়ার পালা। কথা হলো, বাংলাদেশে সেরূপ নির্মূল প্রক্রিয়া কোথায় এবং কীরূপে অনুষ্ঠিত হলো? গুজরাতের ন্যায় দাঙ্গা কি বাংলাদেশে কোথাও কোন কালে হয়েছে? তবে কি মুসলিম মৌলবাদীরা এতবড় নির্মূলকর্ম গোপনে সাধন করেছে? এতবড় নির্মূলের কাজ কি গোপনে হয়? ৩ কোটি ৭০ লাখ নির্মূল হলে তাদের লাশ এবং হাড্ডিগুলোই বা কোথায় গেল? তেমন ভয়াবহ কিছু হলে একজন হিন্দুও কি বাংলাদেশে বসবাস করতো? সেটি হলো প্রতিবাদ উঠতো ভারত সরকারের মুখ থেকেও। বাংলাদেশে কোথাও কোন মন্দির ভাঙ্গা হলে তা নিয়ে হিন্দুস্থান প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখায়। সেদেশর পত্রিকায় ও মিডিয়ায় লেখার ঝড় বইতে শুরু করে। কিন্তু এ অবধি নরেন্দ্র মোদীর সরকারও কি এমন অভিযোগ করেছে -যা প্রিয়া সাহার মুখে শোনা গেল? তাছাড়া বিদেশী দূতাবাসের যেসব দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ ঢাকাতে বসে আছেন -তারাও কি কখনো এমন অভিযোগ এনেছে?     

একা নয় প্রিয়া সাহা

প্রিয়া সাহার কথায় যেটি সুস্পষ্ট প্রকাশ পেয়েছে সেটি হলো, মুসলিমদের রাষ্ট্র, আচার ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি গভীর ঘৃণা। এরূপ ঘৃণা নিয়েই ১৯৪৭ সালে সে সময়ের প্রিয়া সাহাগণ বাঙালী মুসলিমদের সঙ্গ ছেড়ে অবাঙালীদের সাথে ভারত মাতার দেহে লীন হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূরণ বিষয় বেরিয়ে এসেছে। সেটি হলো, প্রতিটি মুসলিম দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কর্মচারীদের মূল কাজটি হলো এরূপ মুসলিম বিদ্বেষীদের তন্ন তন্ন করে খোঁজা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নিজেদের চলমান যুদ্ধে সৈনিক রূপে রিক্রুট করা। প্রিয়া সাহা তেমনি এক আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের সৈনিক।

তাই প্রিয়া সাহা এক নয়। তাদের বাহিনীতে লোকের সংখ্যা অনেক। তারা লড়ছে মজবুত বিদেশী খুঁটির জোরে। তাদের পিছনে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেমনি ভারতের মোদি সরকার। তাই প্রিয়া সাহার মাথার একটি চুল ছেঁড়ার সামর্থ্যও হাসিনার নাই। ঢাকার আদালতে প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে মামলা উঠেছিল; বিচারকগণ তা খারিজ করে দিয়েছে। হাসিনার পক্ষ থেকে নির্দেশ এসেছে তার বিরুদ্ধে কোন মামলা না নেয়ার। হাসিনা যাদের প্রতি গোলামী নিয়ে ক্ষমতায় আছে, প্রিয়া সাহা তাদেরই আপন লোক। গোলামগণ তাই তাদের বিরুদ্ধে অসহায়। প্রিয়া সাহা যে তাদের আপনজন সে বিশ্বাসটি বাড়াতেই ঢাকাস্থ্য মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাতের জন্য পাঠানো হয়েছিল। তাই হোয়াইট হাউসের উগ্র মুসলিম বিরোধী পরিবেশে নিজের মুসলিম বিরোধী তীব্র ঘৃণাটি তিনি অতি সাবলিল ভাবেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে প্রকাশ করতে পেরেছেন। এক শৃগাল আরেক শৃগাল দেখলে যেমন হাঁক ছাড়ে, তেমনি অবস্থা হয়েছিল প্রিয়া সাহার। যে তীব্র ঘৃণা নিয়ে ভারতের বিজেপী’র খুনিরা রাজপথে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করছে, সে ঘৃণা নিয়েই সেদিন বাংলাদেশের মুসলিমদের হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ট পরিবেশে খুনি রূপে পেশ করেছেন। প্রশ্ন হলো, এতো ঘৃণা নিয়ে তারা এদেশে বাস করে কি করে? সরকারি অফিস আদালতে চাকুরিই বা করে কি করে?

প্রিয়া সাহার কথা থেকে বুঝা যায়, প্রতিবেশী মুসলিমদের এরা সুস্থ্য ও হৃদয়শীল মানুষ ভাবতেও রাজী নয়। অথচ ভারতে মুসলিমদের সাথে যে নির্মম আচরণটি হচ্ছে সেটি কি তারা দেখে না? তা নিয়ে কি তারা একটুও ভাবে না? ভাবলে সেটি কেন সেদিন ট্রাম্পের সামনে বললো না? ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৫%। অথচ সরকারিতে তারা ৫% ভাগেরও কম। গরুর গোশতো খাওয়ার অভিযোগে তাদের রাজপথে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিম নির্মূলের দাঙ্গা হচ্ছে বার বার। শুধু ঘরবাড়ি নয়, তাদের মসজিদগুলিও নির্মূল করা হচ্ছে। মুসল্লীদের মাথার টুপি কেড়ে নিয়ে “রামজি কি জয়” বলতে বাধ্য করা হচ্ছে। অপর দিকে বাংলাদেশে তারা যে কতো রকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে -তারা কি সেটি দেখে না? বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, দেশে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা ৯.৫%, কিন্তু সরকারি চাকুরিতে তারা ২৫%। প্রশ্ন হলো, তারা কি চায়? তারা কি চায় ভারতের ন্যায় বাংলাদেশ থেকেও মুসলিম নির্মূল? চায় কি সে নির্মূল-কাজে মার্কিন বাহিনীকে ডেকে আনতে? চায় কি বাংলাদেশকে হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে? ২৫/০৭/২০১৯

 

 




ভোট-ডাকাতদের অসভ্য অধিকৃতিঃ জনগণ কি বাঁচবে আত্মসমর্পণ নিয়ে?

অপরাধঃ নৃশংস দেশ ডাকাতির

বাংলার মানুষ দেশটির সমগ্র ইতিহাসে দুইবার ভয়াবহ অপরাধকর্মের শিকার হয়েছে। প্রথমবার সেটি ঘটে ১৭৫৭ সালে ঔপনিবেশিক ইংরেজ ডাকাতদের হাতে। তাতে বাংলার স্বাধীনতার উপরই শুধু ডাকাতি হয়নি, ডাকাতিতে নিঃস্ব হয়ে গেছে দেশের রাজভাণ্ডার, গ্রামে-গঞ্জে জনগণের অর্থভাণ্ডার এবং কৃষিভাণ্ডার। তাতে নেমে আসে ১১৭৬ সালের ভয়ানক দুর্ভিক্ষ -তাতে মারা যায় দেশটির এক-তৃতীয়াংশ জনগণ। দ্বিতীয়বার ভয়ানক অপরাধকর্মটি ঘটে ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরে। সেটি ঘটে দেশীয় ডাকাতদের হাতে। তাতে ডাকাতির খপ্পরে পড়ে সমগ্র দেশ; ডাকাতির শিকার হয় প্রতিটি প্রাপ্ত-বয়াস্কা নর-নারী। সেদিনটিতে ছিনতাই হয়ে যায় দেশের ভাগ্য নির্ধারণে জনগণের স্বাধীনতা। সে নৃশংস ভোট-ডাকাতির ফলে জনগণ পরিণত হয় ডাকাতদের হাতে জিম্মি দর্শকে। দেশের রাজস্বভাণ্ডার, বিদেশ থেকে পাওয়া লোনের অর্থ, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও বীমা কোম্পানী, সরকারি জায়গাজমি এবং বনভূমির উপর পূর্ণ-দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হয় ক্ষমতাসীন ডাকাতদের।

বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় ঘটনারূপে এ বর্বর ঘটনাও যুগ যুগ বেঁচে থাকবে যে, ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর দেশে একটি সংসদীয় নির্বাচন হয়েছিল। সে নির্বাচনের বিজয়ী হওয়ার দাবী নিয়ে শেখ হাসিনা আজ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে সংসদীয় নির্বাচনের দোহাই দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় অধিষ্টিত -সেটি যে আদৌ কোন নির্বাচন ছিল না তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? নির্বাচন সুষ্ঠ হওয়ার শর্ত হলো তাতে প্রতিফলন ঘটতে হবে জনগণের রায়ের। কিন্তু সে নির্বাচনে সেটি হয়নি। বরং তাতে প্রকাশ পেয়েছে স্রেফ ভোট-ডাকাতদের ইচ্ছার। সেদিনের সে বিশাল ভোট-ডাকাতির অপরাধটি আজ দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে দিনের আলোয় প্রকাশ পাচ্ছে। সেরূপ এক অকাঠ্য প্রমাণ ২৩/০৭/১৯ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো প্রকাশ করেছে; এবং সেটি সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’য়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত রিপোর্টের বরাত দিয়ে।

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোট-ডাকাতির সে নগ্ন চিত্রটি হলোঃ ১). ১ হাজার ২৮৫টি ভোট কেন্দ্রে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে কোনো ভোটই পড়েনি; ২). ধানের শীষ ১ শতাংশের কম ভোট পেয়েছে ৬ হাজার ৭৫টি কেন্দ্রে; ৩). বিএনপি জোটের প্রার্থীরা ১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন ৩ হাজার ৫০১টি কেন্দ্রে এবং ৪). ২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ৫৩৫টি কেন্দ্রে। ৪০ হাজার ১৫৫টি কেন্দ্রের ফলাফল বিশ্লেষণ করে সুজন বলছে, অধিকাংশ কেন্দ্রেই নৌকা ও ধানের শীষের ভোটের পার্থক্যটি অস্বাভাবিক। তাদের অভিমত হলো, যে কোন বিচারে নির্বাচনের ফলাফলটি বিস্ময়কর। বিএনপির প্রার্থীগণ দেশের কোন একটি কেন্দ্রে শূণ্য ভোট পাবে বা প্রদত্ত ভোটের মধ্যে মাত্র থেকে ২ শতাংশ ভোট পাবে সেটি কি বিশ্বাসযোগ্য? কিন্তু সে অবিশ্বাস্য কাণ্ডটিই সেদিন ঘটেছে নির্বাচনের নামে। এরূপ বিস্ময়কর কাণ্ড একমা্ত্র ডাকাতির মাধ্যমেই সম্ভব, কোন নির্বাচনে নয়। ডাকাতির মাধ্যমে নিঃস্ব মানুষও মুহুর্তের মধ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়; এবং বহু কোটি টাকার মালিক মুহুর্তের মধ্যে নিঃস্ব ভিখারীতে পরিণত হয়। গত নির্বাচনে সেটিই করা হয়েছে অতি পরিকল্পিত ভাবে। আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলগুলি সেদিন পরিণিত হয়েছিল এক ভয়াবহ ডাকাত দলে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ বর্বরতাও যুগ যুগ বেঁচে থাকবে।       

নির্বাচনের পরদিন ৩১ ডিসেম্বর বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন আসনের ফলাফলে নৌকা প্রতীকের বিপরীতে ধানের শীষের যে ভোট পড়েছে, সেটি বিস্ময়কর। অনেক আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী যত ভোট পেয়েছেন, বিএনপির প্রার্থী তার মাত্র ১০ ভাগের ১ ভাগ ভোট পেয়েছেন বলে নির্বাচন কমিশনের ফলাফলে দেখানো হয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির প্রার্থীদের অভিযোগ, এমনটি সম্ভব হয়েছে ভোটের আগের রাতে নৌকায় সিল দিয়ে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার কারণে। কয়েকটি আসনের ভোট পর্যালোচনা করে বিবিসি তার প্রতিবেদনে বলে, সিরাজগঞ্জ-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন বিএনপির রুমানা মাহমুদ ও আওয়ামী লীগের হাবিবে মিল্লাত। হাবিবে মিল্লাত পেয়েছেন ২ লাখ ৯৪ হাজার ৮০৫ ভোট। অন্যদিকে রুমানা মাহমুদ পেয়েছেন মাত্র ১৩ হাজার ৭২৮ ভোট। অর্থাৎ বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ ২ লাখ ৮১ হাজার ৭৭ ভোট বেশি পেয়েছে। অথচ এ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির রুমানা মাহমুদ প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

নরসিংদী-২ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান ১৯৯১ সাল থেকে পরপর তিনটি নির্বাচনে জয়ী হন। ২০০৮ সালে এ আসনে বিএনপি পরাজিত হলেও আবদুল মঈন খান ৭০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৭ হাজার ১০০ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ভোট। সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। সিলেট-১ আসনটিতে অধিকাংশ ভোটার সিলেট মহানগর এলাকায় বসবাস করেন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে একই জায়গায় বিএনপির প্রার্থী কীভাবে এত বিশাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেন, সেটি অনেকের কাছে বিস্ময়কর ঠেকেছে। ৩ জানুয়ারি প্রথম আলো রিপোর্ট করে, ভোটের ব্যবধানে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবারের নির্বাচন। চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট যেখানে ৮৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে, সেখানে বিএনপি জোট পেয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ ভোট। অথচ এর আগের নির্বাচনগুলোতে এই দুই দলের ভোট ছিল প্রায় সমান। ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে ৪টিতে জিতেছিল। সেবার তারা চট্টগ্রামে ৪৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। আওয়ামী লীগ জোট জিতেছিল ১১টি আসনে। তাদের ভোট ছিল ৪৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ওই ১৬টি আসনেই আওয়ামী লীগ ও তার জোটের প্রার্থীরা জয়ী হন। এবার আওয়ামী লীগ জোট মোট প্রদত্ত ভোটের ৮৫ দশমিক ১৮ শতাংশ ভোট পায়। অন্যদিকে ১৬টি আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থীরা পেয়েছেন প্রদত্ত ভোটের ১০ দশমিক ৩৯ শতাংশ ভোট। জামানত হারিয়েছেন ১০ জন প্রার্থী।

নির্বাচন কমিশন কেন্দ্র-ভিত্তিক  ফলাফল প্রকাশ করেছে। সেটি পর্যালোচনা করে সুজন বলছে, ৭৫টি আসনের ৫৮৬টি কেন্দ্রে যতগুলো বৈধ ভোট পড়েছে, তার সবগুলোই পেয়েছে নৌকা মার্কার প্রার্থীরা। এসব কেন্দ্রে ধানের শীষ কিংবা অন্য প্রার্থী কোন ভোটই পাননি। সুজন তুলে ধরেছে, চট্টগ্রাম-১০ আসনের কথা। এই আসনে গণসংহতি আন্দোলনের সৈয়দ মারুফ হাসান রুমী শূন্য ভোট পেয়েছেন। সেটি জানিয়েছিলেন রিটার্নিং অফিসার। কিন্তু নির্বাচন কমিশন থেকে কাশিত কেন্দ্র-ভিত্তিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, তিনি ২৪৩ ভোট পেয়েছেন। সেটি জানিয়েছে সুজন।সুজনের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ১০৩ টি আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। এ বিষয়টিও কি বিশ্বাসযোগ্য?এরূপ শতভাগ ভোট তো তখনই পড়ে যখন ভোট দিতে ভোটারকে আসতে হয় না, সে কাজটি করে রাতের আঁধারে বসে ডাকাতেরা।

মীর জাফর সুলভ ভূমিকা নির্বাচনি কমিশনের

বাংলাদেশের রাজনীতিতে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের মত অপরাধীদের সংখ্যাটি বিশাল। ফলে নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হওয়ার সম্ভাবনাটিও বিশাল। কিন্তু ডাকাত ধরার দায়িত্ব তো নির্বাচনি কমিশনের। সে কাজে তাকে সহায়তা দেয়ার কাজে নিয়োজিত ছিল দেশের বহু লক্ষ সামরিক ও বেসামরিক মানুষের জনবল। যাতে ছিল প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর লোকেরা। তবে দলে লোকবল থাকলেই চলে না, নির্বাচনি কর্তাব্যক্তির ডাকাত ধরার যুদ্ধে আপোষহীন ইচ্ছাও থাকতে হয়। বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মীর জাফরের ন্যায় ময়দানে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলে যুদ্ধ জয় না। নির্বাচন কমিশনার বস্তুতঃ সেটিই করেছেন।  চোখের সামনে ডাকাতি হলেও ডাকাত ধরায় তিনি কোন সদিচ্ছা দেখাননি। বরং ডাকাত না ধরে তিনি ডাকাতির কাজটি নিরাপদে করতে দিয়েছেন। এবং এভাবে দেশবাসীকে উপহার দিয়েছেন ভোট-ডাকাতির নির্বাচন।

সুষ্ঠ নির্বাচন এবং ডাকাতির নির্বাচনের ফলাফলের মাঝে পার্থক্যটি যে কতটা বিস্ময়কর বা অস্বাভাবিক হতে পারে –৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনটি ছিল তারই প্রমাণ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাও সাংবাদিকদের একথা বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, বিভিন্ন কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়া স্বাভাবিক  ঘটনা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীরূপে ঘটলো সে অস্বাভাবিক ঘটনা? শত ভাগ ভোট বিশেষ একটি দলের পক্ষে পড়া যে স্বাভাবিক নয় –এটুকু বললেই কি নির্বাচনি কমিশনারের দায়িত্ব শেষ হয়? তাঁর দায়িত্ব কি স্রেফ ফলাফল ঘোষণা করা? ভোট কেন্দ্রগুলিতে কেন এবং কীরূপে এরূপ অস্বাভাবিক ফলাফল ঘটলো –সে বিষয়ে তদন্তের দায়িত্বটি তো জনগণের নয়। বিরোধী দলেরও নয়। বরং সে দায়িত্ব তো নির্বাচনি কমিশনারের। সে কাজের জন্যই তিনি বেতন পান। অথচ সে সাংবিধানিক দায়িত্বটি তিনি ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছেন –যেন নির্বাচনে অনিয়মের কিছুই ঘটেনি। তার সে নিষ্ক্রিয়তার মধ্যেও একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল –যেমনটি ছিল মীর জাফরের। সেটি ছিল আওয়ামী লীগের ঘরে নির্বাচনি বিজয়কে পৌঁছে দেয়া।

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন যে আদৌ সঠিক ভাবে হয়নি তা নিয়ে কারো মনেই কোন রূপ সন্দেহ থাকার কথা নয়। সুজনের রিপোর্ট সেটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ভোট-ডাকাতির অপরাধকে শেখ হাসিনা আদৌ লুকাতে পারেনি। ভোট ডাকাতি যে বিশাল ভাবে হয়েছে সে প্রমাণ বিপুল ভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত কর্মকর্তাগণ যেমন সেগুলি নিজ চোখে দেখেছে। তেমনি টের পেয়েছে জনগণও। তাছাড়া যত চেষ্টাই হোক, অপরাধীরা কখনোই তাদের অপরাধের আলামত পুরাপুরি লুকাতে পারে না।

ভোট-ডাকাতরাও জানে তাদের ডাকাতি কতটা ব্যাপক ও নৃশংস ভাবে হয়েছে। কিন্তু সেটি তারা কখনোই স্বীকার করে না; সেটি করে ডাকাতের মাল ঘরে রাখার স্বার্থ্যে। ডাকাতেরা তাই শুধু অতি জালেম ও নৃশংসই হয় না, অতিশয় মিথ্যাবাদীও হয়। তাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের নেতাগণ বলছে, ধানের শীষের প্রার্থীদের শূণ্য ভোট পাওয়ার কারণ, বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বয়কট করেছে এবং তাদের ভোটারগণ ভোটই দিতে আসেনি।

কে দিবে অপরাধীদের শাস্তি?

২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর বাংলাদেশের মাটিতে যে ভয়ংকর অপরাধ ঘটে গেছে এবং তাতে দেশ যে ডাকাতদের হাতে অধীকৃত হয়েছে -তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? সভ্য ও সুশীল সমাজের আলামত হলো সেখানে প্রতিষ্ঠা পায় আইনের শাসন এবং কার্যকর হয় অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার রীতি। সেটি না থাকাটিই জঙ্গলের অসভ্যতা। সভ্য মানুষের পরিচয় তাই শুধু পোষাক-পরিচ্ছদ, পানাহারে বা গৃহনির্মাণে ধরা পড়ে না। স্রেফ টুপি-দাড়ি ও নামায-রোযাতেও ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে অপরাধীদের নির্মূলের আয়োজন দেখে। তাছাড়া মশামাছি নির্মূলে ব্যর্থ হলে তার আযাবটিও কি কম? তখন রোগব্যাধীর মহামারিতেই লক্ষ লক্ষ মানুষকে অকালে মরতে হয়। তেমনটি ঘটে অপরাধীদের নির্মূলে ব্যর্থ হলে। তখন চোর-ডাকাত, খুনি, ধর্ষকগণও দেশের নেতা, পিতা, বন্ধু ও শাসকের পরিচয় নিয়ে ঘাড়ের উপর চেপে বসে। তখন পথে ঘাটে নিরপরাধ মানুষকে গুম, খুণ ও ধর্ষিত হতে হয়। তখন বিচারের নামে কারাবাসে বা ফাঁসিতে ঝুলেও মরতে হয়। বাংলাদেশে তো অবিকল সেটিই হচ্ছে্।

অপরাধীদের নির্মূলে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশনামাও কি কম গুরুত্বপূর্ণ? পবিত্র কোরআনে সুরা ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। এবং কেন তাদের প্রাপ্য এ বিশেষ মর্যাদাটি, সেটিও তিনি উক্ত আয়াতে উল্লেখ করেছেন। এ বিশেষ মর্যাদার কারণ এ নয় যে, মুসলিমেরা বেশী বেশী নামায-রোযা পালন করে, হজ্বে যায় বা দান-খয়রাত করে। বরং সে কারণটি হলো, তারা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা দেয় এবং রাষ্ট্রের বুক থেকে নির্মূল করে অপরাধীদের। অথচ বাংলাদেশে হচ্ছে উল্টোটি। যারা চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাত এবং যারা খুন-গুম-সন্ত্রাসের রাজনীতির হোতা -তাদেরকে নির্মূল না করে শাসক রূপে মেনে নেয়া হচ্ছে। এমন কি বিচার চাওয়া হচ্ছে চোর-ডাকাতদের কাছে! তাদেরকে মহামান্যও বলা হচ্ছে। চোর-ডাকাতদের এভাবে মাথায় তোলার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় দুই শতটি রাষ্ট্রকে হারিয়ে দুর্নীতিতে ৫ বার প্রথম হয়েছে। এ হলো অপরাধীদের মেনে নেয়া এবং অপরাধ পরিচর্যা দেয়ার ফল। তারা অপরাধে বেঈমান কাফেরদেরও হার মানিয়েছে! এ জগতজোড়া ব্যর্থতা নিয়ে তারা পরকালেই বা মুখ দেখাবে কী করে?

গত নির্বাচনে অতি কুৎসিত ও অস্বাভাবিক কাণ্ডটি ঘটিয়েছে নির্বাচনি কমিশনার নিজে। এটি নিজেই শাস্তিযোগ্য এক বিশাল অপরাধ। সেটি হলো, শতভাগ ভোট পড়া যে একমাত্র ভোট-ডাকাতিতেই সম্ভব –সেটি অন্যরা বুঝলেও তা নিয়ে তিনি কোন কথাই বলেননি। বরং সে অস্বাভাবিক ডাকাতির নির্বাচনকে তিনি সুষ্ঠ নির্বাচন বলে চালিয়ে দিয়েছেন। এবং এভাবে তিনি ভোট-ডাকাতদের হাতে বিজয় তুলে দিলেন। এটি যে তার সাংবিধানিক দায়িত্বের সাথে চরম গাদ্দারি -সেটি বুঝার সামর্থ্য কি তার আছে? বিবিসির সাংবাদিক ও কোটি কোটি সাধারণ মানুষ সেটি টের পেলেও তিনি নিজে টের না পাওয়ার ভান করেছেন। এটি হলো এক চরম বিবেকশূণ্যতা। এমন বিবেকশূণ্য মানুষেরা চোখের সামনে ডাকাতি হতে দেখেও সেটি না দেখার ভান করে। বরং ডাকাতকে বাঁচাতে ডাকাতদের পক্ষ নেয়।

নিজের দায়িত্ব এড়াতে নির্বাচনি কমিশনার বলেছেন, নির্বাচনকালীন অথবা গেজেট প্রকাশের আগে কেউ যদি সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করতো, তবে নির্বাচনকমিশন তা তদন্ত করে দেখতো। তার কথা, যে বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি বা কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি, গেজেট নোটিফিকেশন করার পরে আর কিছু করার থাকে না। এমন অস্বাভাবিক কথা একমাত্র চরম দায়িত্বহীন ব্যক্তিরাই বলতে পারে। কথা হলো, তার অবস্থান ছিল অপরাধের ঘটনাস্থলে এবং অপরাধীদের মাঝে। সংঘটিত অপরাধকে নিজ চোখে দেখার যে সুযোগ তার হয়েছে সেটি দেশের অন্য কোন ব্যক্তির ভাগ্যে জুটেনি। কিন্তু তিনি দেখেও না দেখার ভান করেছেন। এটিও কি কম অপরাধ।

কথা হলো, অপরাধ কি কখনোই তামাদি হয়? যত দেরীতেই হোক অপরাধীকে শাস্তি দেয়াই সভ্য সমাজের রীতি। চুরি-ডাকাতি বা খুনের সাথে জড়িত অপরাধীগণ ১০ বা ২০ বছর পরে ধরা পড়লেও তাদেরকে শাস্তি পেতে হয়। তাছাড়া কোথাও চুরি-ডাকাতি বা হত্যার ঘটনা ঘটলে অপরাধীদের ধরার কাজটি দুয়েক দিনের মধ্যেই শেষ করতে হবে -সেটি কি কোন সভ্য আইন-আদালতের বিধান? বরং সুবিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে অপরাধীদের ধরার কাজে ইতি টানা যায় না, বরং বছরের পর বছর লেগে থাকতে হয়। অতীতে এমন কি বাংলাদেশেও দেখা গেছে নির্বাচিত হওয়ার দুই-তিন বছর পরও বিজয়ী প্রার্থীর বিজয়কে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

জনগণ কি বাঁচবে আত্মসমর্পণ নিয়ে?

চোর-ডাকাতদের ধরার কাজটি তো রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রকে তাই বাদী হয়ে আসামীদের ধরতে হয় এবং তাদের শাস্তিও দিতে হয়। জনগণ রাষ্ট্র থেকে ঘরবাড়ি ও পানাহার চায় না, চায় সুবিচার। এজন্যই জনগণ সরকারকে রাজস্ব দেয়। কিন্তু গত নির্বাচনে নির্বাচনির কমিশন সে দায়িত্বটি আদৌ পালন করেনি। বরং পাশে দাড়িয়েছে ডাকাতদের। ফলে দেশ অধিকৃত হয়েছে ভয়ানক ভোট-ডাকাতদের হাতে। কোন সভ্য দেশেই ডাকাতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বা ক্ষমতার মালিক কোনদিনই কোন ডাকাত হতে পারে না। সেটি দশ বছর বা বিশ বছর পরে হলেও। যে দেশে আইন-আদালত আছে সেদেশের নিয়ম তো এটাই, স্রেফ ডাকাতির মাল ফেরত নিলেই বিচার শেষ হয় না। ডাকাতি করার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও ডাকাতদের দিতে হয়। কিন্তু সে সভ্য কাজটি কি বাংলাদেশের চলমান অসভ্য প্রেক্ষাপটে সম্ভব?

ডাকাতদের হাতে যখন দেশ অধিকৃত হয়, তখন তাদের হাতে অধিকৃত হয় দেশের আইন-আদালতও। কাদেরকে আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হবে এবং বিচারের নামে শাস্তি দেয়া হবে -সে হুকুমটিও তখন ডাকাতদের পক্ষ থেকে আসে। তখন বিচারের নামে শাস্তি দেয়া হয় সরকার বিরোধীদের। তাই এমন আদালত থেকে বিচার চাওয়াটিও চরম বুদ্ধিহীনতা। বিচারের দায়িত্ব তখন জনগণকে নিতে হয়। তাছাড়া ডাকাতগণ ডাকাতির মাল কখনোই স্বেচ্ছায় ফেরত দেয়। আদায় করে নিতে হয়। ফেরত নেয়ার সে কাজটি অতি ব্যয়বহুল। সে কাজ তাই দায়িত্বশীল প্রতিটি সভ্য রাষ্ট্রের। কিন্তু সেরূপ সভ্য রাষ্ট্র কখনোই স্রেফ জনগণের রাজস্ব দানে বা ভোট দানে গড়ে উঠে না। একাজে ব্যয় হয় জনগণের অর্থ, রক্ত, শ্রম ও মেধা। ইসলামে এটি সর্বোচ্চ ইবাদত তথা জিহাদ; এ পথেই অপরাধীদের শাসন নির্মূল হয় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায়। তখন নির্মিত  হয় উচ্চতর সভ্যতা। এটিই নবী-রাসূলদের পথ। মুসলিমদের হাতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মিত হয়েছিল তো এ পথেই।

নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় সকল ইবাদতের কাজ হলো এরূপ সর্বোচ্চ ইবাদতের জন্য ঈমানদার তৈরি করা। এ পবিত্র কাজে যারা প্রাণ দেয় তারা পায় বিনা হিসাবে জান্নাত। পবিত্র কোরআনে সে প্রতিশ্রুতি এসেছে বার বার। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ সেটি বুঝতেন এবং তার উপর আমলও করতেন। ফলে এ পবিত্র জিহাদে শতকরা ৭০ ভাগেরও বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। যাদের মাঝে সে বিনিয়োগ নাই, তাদেরকে বাঁচতে হয় চোর-ডাকাতদের কাছে নীরব আত্মসমর্পণ নিয়ে। চোর-ডাকাতগণ তখন মাথায় উঠে এবং জনগণের অর্থে তারা বিরামহীন বিজয়োৎসবও করে। তখন অসম্ভব হয় সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জনগণ কি বাঁচবে ভোট-ডাকাতদের কাছে এরূপ অসভ্য আত্মসমর্পণ নিয়ে?  ২৪/০৭/২০১৯