অধ্যায় এক: কেন এ লেখা?

ঈমানী দায়বদ্ধতা

মৃত্যু,ধ্বংস বা বিপর্যয়কে কখনো কখনো ব্যক্তি বা জাতির জীবনে চাপিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু নিজেদের পক্ষ থেকে যখন ডেকে আনা হয় তখন সেটিকে আত্মঘাত বলা হয়। বাংলার মুসলিম জীবনে তেমন আত্মঘাত একাধীক বার এসেছে। যেমন ১৭৫৭ সালে, তেমনি ১৯৭১য়েও। কিন্তু কিভাবে সেটি এলো সেটি গুরুতর চিন্তাভাবনা ও গবেষণার বিষয়। কোন ব্যক্তির জীবনে আত্মঘাত ঘটলে তা নিয়ে বিচার বসেনা। কাউকে আসামীও করা হয় না। ফলে তার পোষ্টমর্টেমও হয় না। ব্যক্তির জীবনে আত্মঘাত সাধারণতঃ আত্মহত্যায় রূপ নেয়। নিজের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সব ঘটনার যবনিকা সে নিজেই টেনে দেয়। কিন্তু জাতীয় জীবনে যখন আত্মঘাত ঘটে তখন সে আত্মঘাতে দেশের সবাই জড়িত হয় না; বরং কিছু লোক ডেকে আনে মাত্র। ডেকে আনার সে কাজটি করে দেশের ভ্রষ্ট চরিত্রের কিছু স্বার্থপর নেতা-নেত্রী। তাদের কাছে নিজেদের স্বপ্ন বা স্বার্থ পূরণটিই মূল, জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, মহান আল্লাহতায়ালার বিধান, মুসলিম-স্বার্থ এবং ইসলামের প্রতিষ্ঠা বা গৌরব –এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাদের কাছে গুরুত্ব পায় না। এরাই হলো মুসলিম ইতিহাসের মীর জাফর। মীর জাফরগণকোন কালেই জনগণের মতামত নিয়ে নিজ দেশে শত্রুদের ডেকে আনেনি,যুগে যুগে তারা শত্রুদের পক্ষ নিয়েছে স্রেফ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে। সত্তরের নির্বাচনেও একটি প্রকাণ্ড যুদ্ধের বিষয় কখনোই আলোচিত হয়নি, তেমনি ভারতকে ডেকে আনার বিষয়ও সামনে আসেনি। অথচ একটি প্রকাণ্ড যুদ্ধকে জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ ভারতকে সাথে নিয়ে বহুবছর আগে থেকেই তেমন একটি যুদ্ধের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছিল। সে গুরুতর বিষয়টি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কিছুটা প্রকাশ পেলেও পুরাটি প্রকাশ পেয়েছে একাত্তরের পর। সে প্রকাশ না পাওয়াটিই ষড়যন্ত্র এবং জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।

কিছু লোকের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে প্রচণ্ড প্রাণনাশ ও ক্ষয়ক্ষতি হলেও তাতে জাতির পুরাপুরি মৃত্যু ঘটে না;বাঁচার সম্ভাবনা তখনও অবশিষ্ঠ থাকে। মুসলিম জনগণের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার স্বপ্নকিছুটা হলেও অবশিষ্ট থাকে। মুসলিমের জীবনে বাঁচার মূল এজেন্ডা তো সে স্বপ্নপূরণ।সে স্বপ্নের সাথে জড়িত থাকে তার ঈমানী দায়বদ্ধতা। প্রকৃত মুসলিমের জীবনে এজন্যই বিপ্লব আসে; এবং জিহাদও শুরু হয়। সে বিপ্লবের লক্ষ্য যেমন ইসলামের বিজয়, তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন। তবে আত্মঘাতি বিপর্যয় থেকে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে জরুরীহলো, সে আত্মঘাতের কারণ নিয়ে গবেষণা করা। রোগ থেকে বাঁচতে হলে সে রোগের কারণগুলো অবশ্যই জানতে হয়। চিকিৎসার পাশাপাশি সে রোগের জীবাণু থেকেও দূরে থাকতে হয়। নইলে সে রোগ বার বার হানা দেয়। জাতীয় জীবনে রোগমুক্তি বা বিপর্যয় থেকে বাঁচার পথটিও ভিন্নতর নয়। এক্ষেত্রে ইতিহাস বিজ্ঞানের কাজটি অতি বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের কাজ শুধু জাতীয় ঘটনাবলির কিসসা কাহিনী লিপিবদ্ধ করা নয়; নেতা-নেত্রীদের জীবনী লেখা বা গুণকীর্তনও নয়। বরং ঘটনার প্রেক্ষাপট, সফলতার বা বিফলতার কারণ, প্রতিবেশীর ষড়যন্ত্র এবং সে সাথে ঘটনার নায়কদের চিন্তা-চেতনা ও চরিত্রকেও লিপিবদ্ধ করা -যাতে ভবিষ্যতের প্রজন্ম তা থেকে শিক্ষা ও গবেষনার সামগ্রী পায়। জাতীয় জীবনে এভাবেই আসে ইতিহাসলব্ধ গভীর প্রজ্ঞা। মীর জাফরগণ তাদের কৃত অপরাধের জন্য আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো থেকে বাঁচলেও ইতিহাসের বিচার থেকে বাঁচে না। জ্ঞানী ব্যক্তির পা তাই একই গর্তে দুইবার পড়ে না। প্রজ্ঞাবান জাতিও তেমনি বার বার একই রূপ সংকটে বিপর্যস্ত হয় না। অতীতের আত্মঘাতের ঘটনা নিয়ে গবেষণার গুরুত্ব এজন্যই অপরিসীম। এছাড়া আত্মঘাত এড়ানোর বিকল্প পথ নেই। সেটি না হলে আত্মঘাতি ব্যক্তির ন্যায় আত্মঘাতি জাতিও শত্রুর হামলা ছাড়াই দুনিয়া থেকে হারিয়ে যেতে বাধ্য।এই গ্রন্থটি লেখার তাড়না এসেছে বস্তুত তেমনি এক চেতনা ও দায়ভার থেকে।

 

সাক্ষ্যদানের দায়ভার

মানব হিসাবে প্রত্যেকেরই কিছু দায়-দায়িত্ব থাকে। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে ব্যক্তির মর্যাদা বা মূল্যমানটি নির্ধারিত হয় কে কতটা সে দায়িত্ব পালন করলো তার ভিত্তিতে।তাছাড়া ঈমানদার ব্যক্তির কিছু বাড়তি দায়িত্বও থাকে। সে বাড়তি দায়িত্বটা হলো সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়া। ইসলামে এটিকে শাহাদতে হক তথা সত্যের পক্ষে সাক্ষ্যদান বলে। মুসলিম হওয়ার জন্য কালামে শাহাদত জনসম্মুখে পাঠ করতে হয়। লা-শরীক আল্লাহতায়ালা এবং তাঁর মহান রাসূল যে সত্য -কালেমায়ে শাহাদত পাঠের মধ্য দিয়ে সে সাক্ষ্যটিই প্রকাশ্যে দিতে হয়। তবে সে দায়িত্বটি কালেমায়ে শাহাদত পাঠে শেষ হয় না,শুরু হয় মাত্র। সত্যের পক্ষে প্রকাশ্য সাক্ষ্যদানের পরপ্রতিটি মুসলিমের জীবনে সেটিই তার আমৃর্ত্যু সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। মহান আল্লাহতায়ালাও চান, কারা সত্যের পক্ষে সাক্ষ্যদানকারি আর কারা মিথ্যার পক্ষে -সে বিষয়টিও স্পষ্টতর হোক। ফলে জীবনের আশে পাশে যে সত্যঘটনাগুলি ঘটে -ঈমানদার ব্যক্তিকে সেগুলিরও পক্ষ নিতে হয়; দাঁড়াতে হয় অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে। সত্যকে বিজয়ী করতে সে শুধু মসজিদে,জনপদে বা জিহাদের ময়দানেই যায় না, জনগণের বিবেকের আদালতেও যায়। সত্যের পক্ষে সে সাক্ষ্যদানে শহীদগণ নিজেদের প্রাণও বিলিয়ে দেয়।মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এজন্যই তারা এতো প্রিয়।যুগে যুগে তাদের কারণেই মিথ্যাচারীদের প্রচণ্ড বিরোধীতার মুখেও সত্য বিজয়ী হয়েছে।

কোন জনগোষ্ঠীর জীবনে যুদ্ধবিগ্রহ একাকী আসে না। যুদ্ধবিগ্রহ বা বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েই ঘটে ঈমান ও আমলের চুড়ান্ত পরীক্ষা। মূলত বিপদের মুখে ফেলে মহান আল্লাহতায়ালা বেছে নেন শহীদদের।তাই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষনাঃ “এবং এ দিনগুলোকে মানুষের মাঝে আমি পালাক্রমে আবর্তন ঘটিয়ে থাকি। এজন্য যে, আল্লাহ যাতে জানতে পারেন কারা সত্যিকার ঈমানদার; এবং (তাদের মধ্য থেকে) বেছে নেন শহীদদের।” –(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১৪০)। তাই প্রতি যুদ্ধে ঈমানদারগণ যেমন পায় মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে শহীদ রূপে দাঁড়াবার সুযোগ, তেমনি বেঈমানগণ পায়,ইসলামের প্রতিপক্ষ রূপে খাড়া হওয়ার সুযোগ। যুদ্ধকালে তাই ব্যক্তির মুখোশ খুলে পড়ে। সে তখন আসল রূপে হাজির হয়। এভাবে যুদ্ধ দেয় মানুষের চেতনা ও চরিত্রকে সঠিক রূপে চেনার সুযোগ। এবং সেটি যেমন একাত্তরে ঘটেছে। তেমনি পলাশির ময়দানেও ঘটেছিল। ফলে সত্তরের নির্বাচনে ও তার পূর্বে শেখ মুজিব ও তার সহচরদের মুখে যে মুখোশ ছিল, সেটি একাত্তরে এসে খসে পড়েছে। সত্তরের নির্বাচনে মুজিবের মুখে প্রতি জনসভায় পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি উঠেছিল। কোরআন-হাদীসের বিরুদ্ধে কোন আইন করা হবে না -সে কথাও তিনি বলেছেন। বলেছেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা। এসবই ছিল মুখোশ। কিন্তু সেটি খসে পড়ে নির্বাচনি বিজয়ের পর। একাত্তরে তিনি ও তার সহচরগণ পৌত্তলিক ভারতের কোলে গিয়ে উঠেছেন। অপরদিকে যেসব মাদ্রাসার ছাত্র, গ্রাম্য যুবক, পীরের মুরীদ ও নির্দলীয় ব্যক্তি রাজনীতি থেকে আজীবন দূরে থেকেছে তারাও সেদিন পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের এটি এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় দিক। যুদ্ধ এভাবেই বিভাজনটি স্পষ্টতর করে।

ইতিহাস রচনার কাজটি মূলত জনগণের আদালতে সাক্ষ্যদানের কাজ। সত্যের পক্ষে সাক্ষ্যদানের কাজটি যুগ যুগ বেঁচে থাকে লেখনীর মাধ্যমে। এজন্যই লেখক ও তার কলমের কালিকে ইসলামে অতি উচ্চ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি তেমন হয়নি। বরং এ মুসলিম দেশটিতে বেশী বেশী সাক্ষ্য দেয়া হয়েছে মিথ্যার পক্ষে। সরকারি ও বেসরকারি ভাবে শত শত বই লেখা হয়েছে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজে। ফলে একাত্তরে ৩০ লাখ নিহতের ন্যায় মিথ্যাটি প্রবল ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এবং সত্য পরাজিত হয়েছে দেশের সর্বত্র। বাংলাদেশের ইতিহাসে আগ্রাসী ভারত স্থান পেয়েছে বন্ধু রূপে। এরূপ মিথ্যার জোয়ারে ইসলাম ও ইসলামের পক্ষের শক্তি আজ পরাজিত। মিথ্যাচারীগণ প্রচণ্ড ভাবে ছেয়ে গেছে শুধু প্রশাসন, রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নয়,বুদ্ধিবৃত্তিতেও। যে সমাজে নামায রোযা আছে অথচ রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ নেয়া লোকের অভাব সে সমাজে সুবিচার ও সুনীতি বিজয়ী হয় না। শান্তিও আসে না। এমন দুর্বৃত্ত-অধিকৃত দেশে সুস্থ্ সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র নির্মিত হয় না। তাদের হাতে অধিকৃত হয় আদালতও। সে দেশে অতিশয় দুর্বৃত্তরাও তখন নেতা হয়,এমপি হয় এবং প্রধানমন্ত্রীও হয়।  দুর্বৃত্ত মিথ্যাজীবীরাও তখন বুদ্ধিজীবী রূপে গন্য হয়। দেশ তখন দুর্নীতিতে বার বার বিশ্ব রেকর্ড গড়ে। বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে তেমনই এক ব্যর্থ দেশে।

 

অসম্পূর্ণ ও বিকৃত ইতিহাস

জীবনের প্রতি পদে প্রতিটি ব্যক্তিকেই কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাকে রায়ও দিতে হয়। সেটি কখনো পরিবারে, কখনো সমাজে, আবার কখনো বা দেশের রাজনীতি ও ইতিহাস প্রসঙ্গে। তাই জীবনের কোন না কোন ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যক্তিকেই বিচারকের আসনে বসতে হয়। রাজনীতি, ইতিহাস ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে সে রায়ের গুরুত্ব আরো অধিক। কে কত দীর্ঘকাল বাঁচলো সেটাই বড় কথা নয়,কতটা সত্যের পক্ষ নিল এবং কী রূপে ঈমানী দায়িত্বপালন করল -সেটিই বড় কথা। যে সমাজে সঠিক দায়িত্ব-পালনকারির অভাব সে সমাজ ব্যর্থতায় রেকর্ড গড়ে। রায় প্রদানে বিচারকের নিজ অভিজ্ঞতা ও বিবেক-বুদ্ধিই যথেষ্ট নয়, আদালতে সত্যের পক্ষে সাক্ষ্যদানকারিও অপরিহার্য। নইলে বিলুপ্ত হয় ন্যায় বিচার। তখন আদালতের বিচারকও মিথ্যাচারীদের হাতে জিম্মি হয়। নিরেট অপরাধীরাও নির্দোষ রূপে মুক্তি পায়। একই কারণে জনগণও নিছক বিবেক-বুদ্ধির উপর ভরসা করে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সঠিক রায় দিতে পারে না। সে কাজে ঘটনার পক্ষে সঠিক সাক্ষী চাই। সে সাক্ষী পেশ করে ইতিহাসের লেখকেরা। বহুশত বছর পরও একাত্তরের ঘটনা নিয়ে জনগণ রায় দিবে –এবং সেটি ইতিহাসের গ্রন্থে প্রদত্ত সাক্ষ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি যথার্থ ভাবে হয়নি। রাজনীতি ও প্রশাসনের ন্যায় প্রচণ্ড দুর্বৃত্তি ঢুকেছে এ ক্ষেত্রটিতেও। ইতিহাস রচনার এ ময়দানটি যাদের হাতে অধিকৃত তারা মূলত বিজয়ী রাজনৈতিক পক্ষের সৈনিক। রাজনৈতিক নেতাদের ন্যায় তারাও মিথ্যাচারী।ফলে তাদের হাতে পরিকল্পিত ভাবে রচিত হয়েছে বিকৃত ইতিহাস। আর সে প্রকাণ্ড মিথ্যাচারটি ঘটেছে একাত্তরকে নিয়ে।

একটি জাতির জীবনে অতিগুরুত্বপূর্ণ হলো তার ইতিহাস। ইতিহাস-জ্ঞান একটি জাতিকে দেয় প্রজ্ঞা, দেয় দূরদৃষ্টি, দেয় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য। কে শত্রু, আর কে মিত্র -সে ধারণা তো আসে ইতিহাস থেকে।যে জাতি সঠিক ইতিহাস লিখতে জানে না, সে জাতি ইতিহাস থেকে সঠিক শিক্ষাও পায় না। এবং ব্যর্থ হয়,কে বন্ধু এবং কে শত্রু –দেশবাসীর সামনে সে সত্যটি তুলে ধরতে। এমন ব্যর্থতায় জাতির ভবিষ্যতের পথ চলাটি সঠিক হয় না, সুখেরও হয় না। তখন পদে পদে ভ্রান্তি হয়। তখন মুখোশধারি শত্রুও বন্ধু মনে হয়। জাতির জীবনে তখন পলাশি আসে বার বার। তখন দেশ দখলে যায় দেশী মীর জাফর ও বিদেশী ক্লাইভদের হাতে। ধর্ম,রাজনীতি, সমাজনীতি ও ন্যায়নীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও দিক-নিদের্শনাটি আসে ইতিহাস বিজ্ঞান থেকে; জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্য কোন শাখা থেকে না। পবিত্র কোরআন তাই মানব জাতিকে চিকিৎসা বিজ্ঞান, কৃষি বিজ্ঞান বা যন্ত্র আবিস্কারের শিক্ষা দিতে নাযিল হয়নি। বরং এসেছে তার চেয়েও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষা দিতে। কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞান, কৃষি বিজ্ঞান বা যন্ত্র আবিস্কারে ব্যর্থতার কারণে কোন জনগোষ্টি সভ্য ভাবে বেড়ে উঠতে ব্যর্থ হয় না। সে ব্যর্থতার কারণে মানব সন্তানেরা জাহান্নামমুখিও হয় না। বরং সে ব্যর্থতা থেকে বাঁচার জন্য অপরিহার্য হলো সিরাতুল মুস্তাকীমের রোডম্যাপ এবং সে রোডম্যাপে চলার ইতিহাসলব্ধ প্রজ্ঞা। মহান আল্লাহতায়ালা তাই আদম (আঃ) থেকে শুরু করে মানব জাতির ব্যর্থতার অসংখ্য কাহিনী তুলে ধরে দেখিয়ে দিয়েছেন ব্যর্থ মানুষদের অনুসৃত ভয়ংকর ভ্রান্ত পথগুলো। এবং বার বার সতর্ক করেছেন সে পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচতে। অথচ বাংলাদেশে ইতিহাসচর্চা জিম্মি হয়ে আছে মিথ্যাচারীদের হাতে। ইতিহাসের বইগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে দেশেবাসীকে বিভ্রান্ত করা ও তাদের মাঝে ঘৃণা ছড়ানোর কাজে।

তাই শুধু কৃষি, বাণিজ্য বা শিল্পে সমৃদ্ধি এনে জাতির বাঁচাটি আদৌ সুখের হয় না। সে লক্ষ্যে ইতিহাস-জ্ঞানও সঠিক হওয়া চাই। পবিত্র কোরআনে বিজ্ঞানের তেমন আলোচনা নেই, কিন্তু বিশাল ভাগ জুড়ে আসে ইতিহাস। কারণ, মানব রূপে বেড়ে উঠার জন্য ইতিহাস জ্ঞানটি অপরিহার্য। কিন্তু বাঙালী মুসলিমর জীবনে সে জ্ঞানটি সামান্য। এমনকি ভয়ানক অসম্পূর্ণতা ছিল পলাশীর বিপর্যয় নিয়েও। ইতিহাসে এরূপ অজ্ঞ রাখাটিই ছিল শত্রুর প্রকল্প। ঔপনিবেশিক শাসনের ১৯০ বছরে পলাশীর বিপর্যয় নিয়ে কনো সত্য নির্ভর গ্রন্থ লেখা হয়নি, বরং বহু বই লেখা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের ইমেজ বাড়াতে। ইতিহাসের জ্ঞানে সে অসম্পূর্ণতার কারণে দেশবাসীর অজানা রয়ে গেছে দেশটির নিজের জন্মের ইতিহাস। ভারত ভেঙ্গে কেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলো, কেনই বা পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ পাশের পশ্চিম বাংলার ন্যায় ভারতে যোগ না দিয়ে হাজার মাইল দূরের পশ্চিম-পাকিস্তানীদের সাথে পাকিস্তানে যোগ দিল –সে প্রেক্ষাপট নিয়ে অখণ্ড পাকিস্তানের ২৩ বছরে ভাল একখানি বইও লেখা হয়নি। কেন বহু লক্ষ বাঙালী-অবাঙালী ভারত থেকে বিতাড়িত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নিল -সে ইতিহাসও যথার্থ ভাবে তুলে ধরা হয়নি। সভ্য-মানুষেরা শুধু প্রতিবেশী দেশের মানুষের খবরই নেয় না, পাশের বনজঙ্গলের পশু-পাখিরও খবর রাখে। কিন্তু প্রতিবেশী হিন্দুস্থানের মুসলিমদের দুরাবস্থার কথা বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চায় গুরুত্ব পায়নি। ফলে লেখা হয়নি ভারতীয় মুসলমানদের দুর্দশা নিয়ে তেমন কোন বই। সেটি হলে ১৯৪৭’য়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা, পূর্ব-বাংলার পাকিস্তান ভূক্তি এবং একাত্তর ঘটনাবলি বুঝতে অনেক সহায়তা মিলতো। এবং বাংলাদেশের জন্য ভারতে বিলীন হওয়া যে কতটা আত্মঘাতি -সে বিষয়টি নিয়েও সঠিক ধারণা হতো।

অন্ধ মানুষকে এমনকি শিশুও ভ্রান্ত পথে টেনে নিতে পারে। তেমনি ইতিহাসের জ্ঞানে অজ্ঞব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, লেখক, বুদ্ধিজীবী, উকিল, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বা দেশের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হলেও তাকে যে কোন শত্রুশক্তিও কলুর বলদ বানাতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কলুর বলদের সংখ্যা কি কম? ইতিহাস-জ্ঞান এজন্যই অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞান। পদার্থ বিদ্যা, চিকিৎসা বিদ্যা, ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের ন্যায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখা পার্থিব জীবনে বেঁচে থাকাকে সহজতর করে মাত্র, কিন্তু রাজনীতি, সংস্কৃতি বা ধর্মকর্মে পথ দেখায় না। সত্য-মিথ্যা এবং শত্রু-মিত্র চিনতেএ সাহায্য করে না। অতীতে যারা পিরামিডের ন্যায় বিশ্বের বিস্ময়কর স্থাপনা গড়েছে তারাও একই কারণে সত্যকে নিরেট মিথ্যা থেকে আলাদা করতে পারিনি। গুহাবাসি অজ্ঞ ব্যক্তির ন্যায় তারাও ফিরাউনকে ভগবান বলেছে। অথচ ইতিহাস-জ্ঞান জাতীয় জীবনে পথ চলায় কম্পাসের কাজ করে। ইতিহাসের শুরু তো মানব সৃষ্টির শুরু আদম (আঃ) থেকে। ইতিহাস বিজ্ঞান শুধু সত্য-মিথ্যার পরিচয়ই দেয় না, উভয়ের দ্বন্দের ইতিহাসও পেশ করে। তাই যে জাতির জীবনে সঠিক ইতিহাস নাই, সে জাতির জীবনে পথ চলায় কম্পাসও নাই। তখন পথ চলায় বার বার ভূল হয়। বাংলাদেশে সে ব্যর্থতাটি ভয়ানক। ফলে জনগণ ব্যর্থ হচ্ছে ঘটনার বিচারে সঠিক তথ্য ও সাক্ষী পেতে। ফলে প্রচণ্ড ব্যর্থতা ফুটে উঠছে জনগণের রায়দানেও। দেশের রাজনীতি তাই বার বার স্বৈরাচারের গর্তে গিয়ে পড়ছে। জনগণকে শুধু বনের হিংস্র বাঘ-ভালুককে চিনলে চলে না, সমাজের মানবরূপী হিংস্র পশুদেরও চিনতে হয়। নইলে বনজঙ্গলের চেয়ে বেশী রক্তপাত হয় জনপদে। জনগণের রায়ে তখন দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারী,গণতন্ত্রের হত্যাকারি, একদলীয় শাসনের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাকস্বাধীনতা হরণকারী ব্যক্তিওতখন নেতা বা নেত্রী বা সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি রূপে গণ্য হয়। এমন ব্যক্তিগণ তখন জনগণের দ্বারা নির্বাচিত ও সম্মানিতও হয়। ইতিহাসের পাঠ নিতে ­-বিশেষ করে একাত্তরের মূল্যায়নে বাংলাদেশীদের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা যে কতটা গভীর –এসব হলো তারই প্রমাণ।

                        

ঘৃনা সৃষ্টির হাতিয়ার

যে কোন জাতির জীবনেই যুদ্ধ আসে। একাত্তরে তেমন একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এসেছিল বাংলাদেশেও। স্বভাবতই সে যুদ্ধে দুটি পক্ষ ছিল। একটি পক্ষ বিজয়ী হয়েছে, অপরটি পরাজিত। সভ্য দেশে বিজয়ীরা পরাজিতদের জন্যও জায়গা ছেড়ে দেয়। যেমন আদালতে বিবাদী বা আসামীকেও আত্মপক্ষ সমর্থনে কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়। এর ফলে একে অপরের বক্তব্য ও অনুভূতিকে বুঝতে পারে, মূল্যায়নেরও সুযোগ পায়। ধীরে ধীরে সমাঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। জাতি তখন অবিরাম বিভক্তি ও সংঘাত থেকে মুক্তি পায়। সুবিচারের লক্ষ্য বিবাদকে স্থায়ী রূপ দেয়া নয়; বরং শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করা।ইতিহাসের বিচারে তো সে কাজটিই হয়। এখানে বাদী-বিবাদী ঊভয়ের বক্তব্যকে সমান গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়। একটি বিবেকবান জাতির লক্ষ্য তো লাগাতর যুদ্ধ নিয়ে বাঁচা নয়, বরং শান্তি নিয়ে বাঁচা। সে শান্তির লক্ষ্যেই প্রকাণ্ড একটি গৃহযুদ্ধের পরও উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবার এক হয়ে গেছে। অবিরাম বিভক্তি একমাত্র শত্রুরই কাম্য হতে পারে, কোন দেশপ্রেমিকের নয়। যারা শুধু নিজেদের স্বার্থটি দেখে, দেশের নয় –একাজ তো তাদের। এমন শত্রুদের তো যুদ্ধ বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেই মহাতৃপ্তি। বাস্তবতা হলো, বাঙালী মুসলিমের যারা শত্রু তাদের যুদ্ধ একাত্তরে শেষ হয়নি। ফলে শেষ হয়নি যুদ্ধকালীন সংঘাতকে বাঁচিয়ে রাখার রাজনীতিও। এজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাত্তরের পরাজিত পক্ষের জন্য কোন জায়গাই রাখা হয়নি। স্থান দেয়া হয়নি ইতিহাসের বইয়েও। তাদের বিরুদ্ধে বরং অবিরাম নিক্ষিপ্ত হচ্ছে গালি-গালাজ। হরণ করা হয়েছে তাদের বাক স্বাধীনতা। ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে অনেকের নাগরিকত্বও। বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের রচিত ইতিহাসের বই তাই পরিণত হয়েছে নিছক ঘৃণা সৃষ্টির হাতিয়ারে। এমন ইতিহাস কি বিবেকমান মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়?

মহান আল্লাহতায়ালা আমাকে এ ক্ষুদ্র জীবনে বহু কিছুই কাছে থেকে দেখবার সুযোগ দিয়েছেন। একাত্তরের দুই পক্ষের অনেক নেতাকে যেমন নিজ চোখে দেখার সুযোগ পেয়েছি,তেমনি সুযোগ মিলেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সরাসরি জানার। সুয়োগ মিলেছে দীর্ঘ বহু দশক ধরে মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অবলোকনের। ফলে দায়ভারও বেড়েছে। কারণ দুর্বৃত্তি, সন্ত্রাস, মিথ্যাচার, অপরাধ ও ধোকাবাজির ঘটনা সবার পক্ষে স্বচোখে দেখার সুযোগ হয় না। কিন্তু যারা দেখেন তাদের দায়িত্বও বেড়ে যায়। তখন শুরু হয় ঈমানের পরীক্ষা। কারণ সাক্ষী গোপন করাটি কবিরা গুনাহ। যে সমাজে এরূপ কবিরা গুণাহ বেশী বেশী হয়, সে সমাজে ন্যায় বিচারেরও মৃত্যু ঘটে। তাই যারা কোন অপরাধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী তাদের দায়ভারটি হলো আদালতে সত্য সাক্ষী পেশ করা।তাই মুখ খুলতে হয়; সামর্থ থাকলে লিখতেও হয়। আর সেটি জনগণের আদালতে। সেটি শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্যই নয়,আগামী প্রজন্মের জন্যও। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সে দায়িত্ব আরো বেশী। জনগণের আদালতে যারা লাগাতর সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে তারা হলো ইসলামবিরোধী শক্তি। ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের পরাজিত দেখার মধ্যেই তাদের আনন্দ।

 

বিচারে অবিচার

বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় রুখতে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদীরা অস্ত্র হিসাবে বেছে নিয়েছে একাত্তরে ইসলামপন্থীদের ভূমিকা। সেক্যুলারিস্টদের ন্যায় ভারতও চায় না তার পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের ন্যায় আরেক শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পাক। তাই শক্তিশালী ইসলামী বাংলাদেশের নির্মাণে যারা বিশ্বাসী তাদেরকেই ভারত ও ভারতসেবী রাজনৈতিক দলগুলো নির্মূল করতে চায়। এটি তাদের গোপন বিষয়ও নয়। এজন্যই ইসলামপন্থীদের একাত্তরের ভূমিকাকে অপরাধ রূপে চিহ্নিত করে তাদেরকে আসামীর কাঠগড়ায় খাড়া করা হচ্ছে। তাদের আক্রোশ ইসলামের বিরুদ্ধেও। আক্রোশের কারণ, ইসলাম তাদের সেক্যুলার দর্শনকে বৈধতা দেয় না। সেক্যুলার দর্শনের আলোকে প্যান-ইসলামীক ভাতৃত্বের পক্ষে দাঁড়ানোটি চিহ্নিত হচ্ছে অপরাধ রূপে। যাদের মধ্যে তারা ইসলামের পক্ষে জেগে উঠার শক্তি দেখে তাদের বিরুদ্ধেই তারা বিচার বসায়। তাদের হাতে আদালত পরিণত হয়েছে ইসলামের পক্ষের শক্তির নির্মূলের হাতিয়ার। দেশের আদালতে তারাই উকিল, তারাই সাক্ষী এবং তারাই বিচারক। এরূপ অধিকৃত আদালতের মঞ্চ থেকে তাদের পক্ষে রায় দেয়াও অতি সহজ হয়েছে। বিচার কাজে তাদের প্রচণ্ড আগ্রহ এ কারণে যে, জনগণের চেতনায় প্রবল ভাবে বিজয়ী হয়েছে জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার দর্শন। এ দর্শনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পক্ষ নেয়াটিই অপরাধ; ফলে সে অপরাধে তাদের শাস্তি দেয়াও সহজ।

বিচারের কাজে আদলতে যেটি নিরবে কাজ করে সেটি বিচারকের নিজের দর্শন বা চিন্তার মডেল (conceptual paradigm)। বিচারকের দর্শন বা চিন্তার মডেল পাল্টে গেলে বিচারও পাল্টে যায়। ঘটনার বিচার-বিশ্লেষণে একই রূপ ঘটনা ঘটে জনগণের চিন্তারাজ্যে। চিন্তা-চেতনার সেক্যুলার মডেল ও ইসলামী মডেলের মাঝে পার্থক্যটি বিশাল। চেতনার দুই ভিন্ন মডেলে বিচার কখনোই একই রূপ হয় না। সেক্যুলার মডেলে নিরেট ব্যাভিচারও চিত্রিত হয় গভীর প্রেম রূপে। বাংলাদেশের কুফরি আইনে এটি কোন অপরাধই নয় -যদি তা উভয়ের সম্মতিতে হয়। তাই পতিতাবৃত্তির নানা ঘৃণ্য পাপাচারটি দেশের সেক্যুলার আইন অনুমোদিত একটি বৈধ পেশা। ঔপনিবেশিক কাফের শাসনামলে এ পাপ যে ভাবে প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যা পেয়েছে তা এখনও পাচ্ছে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কোরআনে ঘোষিত আইনে বিবাহিত ব্যক্তির ব্যাভিচার পাথর মেরে হত্যাযোগ্য অপরাধ। অবিবাহিতের জন্য রয়েছে জনসম্মুখে তার খালি পিঠে ৮০ চাবুক মারার শাস্তি। তেমনি সুদ খাওয়ার ন্যায় হারাম কাজটিও সেক্যুলার চেতনায় কোন পাপ নয়, নিষিদ্ধও নয়। অথচ ইসলামের সুদ খাওয়াকে মায়ের সাথে জ্বিনার চেয়েও জঘন্য বলা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সুদখোরের বিরুদ্ধে তাঁর নিজের যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন।কিন্তু কাফেরদের ন্যায় বাংলাদেশের সেক্যুলারদের কাছেও এ মহাপাপটি যেমন আইনসিদ্ধ, তেমনি নীতিসিদ্ধও। মানুষে মানুষে বিচারে যে প্রচণ্ড পার্থক্য -তা তো জীবন দর্শনে এরূপ ভিন্নতার কারণে। ধর্ম ও দর্শনের ভিন্নতার কারণে বিষাক্ত স্বর্প যেমন দেবীর আসন পায়, তেমনি ইসলামের চিহ্নিত শত্রুগণও বীরের মর্যাদা পায়। এরূপ অপরাধীদের থেকে ইসলামের পক্ষের শক্তি সুবিচার পাবে -তা কি আশা করা যায়? তাই কোন মুসলিম দেশে শরিয়তের বদলে কুফরি আইন চালু যেমন হারাম, তেমনি অমুসলিম, সেক্যুলারিস্ট বা ইসলামের বিপক্ষ ব্যক্তিকে বিচারক রূপে মেনে নেয়াও হারাম। নবীজী (সাঃ) ও খোলাফায়ে রাশেদার আমলে এমন গর্হিত কর্ম কখনোই ঘটেনি। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে সেটিই নিয়ম। ঔপনিবেশিক কাফের শক্তির বিচার ব্যবস্থাকেই বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে স্রেফ শয়তানকে খুশি করার জন্য।

এমন একটি সেক্যুলার দর্শনের আলোকে বিচার হয়েছে একাত্তরে ইসলামপন্থীদের ভূমিকা নিয়েও। সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ ও হিন্দুধর্মের মানদণ্ডে একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নেয়টি ছিল অপরাধ। এসব মতের অনুসারিগণ মহান কর্ম মনে করেছে পাকিস্তান ভাঙ্গাকে। মহান কর্ম মনে করে দেশের রাজনীতিতে ইসলামকে পরাজিত রাখাকেও। তারাই ১৯৪৭’য়ে মহান কর্ম গণ্য করেছিল অখণ্ড ভারত নির্মাণকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসলামী মানদণ্ডেও কি অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নেয়াটি অপরাধ? বাংলাদেশের শতকরা একানব্বই ভাগ জনগণ যেহেতু মুসলমান, একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে সকল পক্ষের বিচার হওয়া উচিত কোরআন-হাদীসের আইনে তথা শরিয়তের আইনে। মুসলিমের জীবনে ইসলাম বিরোধী সেক্যুলার আইনের স্থান দেয়া যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো সে আইন থেকে বিচার চাওয়া। মুসলমানের একমাত্র আনুগত্য তো মহান আল্লাহতায়ালার আইনের প্রতি; মানুষের নির্মিত কোন আইনের প্রতি নয়। কিন্তু বাংলাদেশের আদালতে সে শরিয়তি আইনের প্রয়োগ হয়নি। শরিয়তের আইনে কোন মুসলিম দেশ ভাঙ্গা বা মুসলিমদের মাঝে সংঘাত সৃষ্টি করাটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। কোরআনের পরিভাষায় এটি ফিতনা। পবিত্র কোরআনে এমন ফিতনাকে মানব হত্যার চেয়েও জঘন্য বলা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ “আল ফিতনাতু আশাদ্দু মিনাল কাতল”।–(সুরা বাকারা,আয়াত ১৯১)। অনুবাদঃ ফিতনা মানব হত্যার চেয়েও জঘন্য। ফিতনা তো রাষ্ট্রের বুকে এমন বিদ্রোহাত্মক পরিস্থিতি যা মুসলিম জীবনে শান্তি, ধর্মপালন,শরিয়তের প্রতিষ্ঠা তথা ইসলামের পূর্ণ বিজয়কে অসম্ভব করে; এবং মুসলিম ভূমিতে ডেকে আনে ইসলামের শত্রুপক্ষ তথা কাফের শক্তিকে। অথচ ইসলামে শাস্তিযোগ্য নিষিদ্ধ কর্ম হলো,মুসলিম দেশের ক্ষতি সাধনে কোন অমুসলিম কাফের শক্তিকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করা। পবিত্র কোরআনে সেটিকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। -(সুরা মুমতিহানা, আয়াত ১)।

বাংলাদেশে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির অপরাধ, সমাজ বা রাষ্ট্রজুড়ে তারা প্রতিবন্ধকতা গড়েছে জান্নাতের পথে চলায়। প্রশ্ন হলো, শরিয়ত পালন না হলে কি ইসলাম পালন হয়? নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাদের জীবনে একটি দিনও কি শরিয়তী আইনের বাইরে অতিবাহিত হয়েছে? অথচ সেটির বিরুদ্ধে সেক্যুলারিস্টদের যুদ্ধ! পবিত্র কোরআনে তাই কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে এমন ফিতনা সৃষ্টিকারিদের নির্মূলের। বলা হয়েছে, “তোমার তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর যে পর্যন্ত না ফিতনা নির্মূল হয় এবং আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হয়।” -সুরা বাকারা আয়াত ১৯৩)। কিছু লোকের নিহত হওয়াতে মুসলিম দেশ কাফের শক্তির পদানত হয় না। বরং তেমন যুদ্ধে বিজয়ী হলে দেশে ধর্মপালন,শরিয়ত পালন, ইসলামের নামে রাজনীতি বা কোরআনের জ্ঞানদান আরো ব্যাপককতর হয়। কিন্তু ভারতের ন্যায় একটি অমুসলিম শক্তি ও তাদের সেবাদাসদের আধিপত্য বাড়লে অসম্ভব হয় দ্বীন পালন। এবং নিষিদ্ধ হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে সংগঠিত হওয়া। একাত্তরের পর সে ফিতনাতেই ছেয়ে যায় দেশ;এবং সেটি ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের নেতৃত্বে। এ অবধি একাত্তরে নানা পক্ষের ভূমিকা নিয়ে যত বিশ্লেষণ হয়েছে ও যত বই লেখা হয়েছে তার প্রায় সবটুকু হয়েছে বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার চেতনা ও মূল্যবোধে। ফলে একাত্তরে তাদের কৃত অপরাধগুলোকে তুলে ধরা হয়নি। অথচ ইসলাম ১৪ শত বছর পূর্বেই এরূপ সেক্যুলার চেতনা ও মূল্যবোধকে মুসলিমগণ বিলুপ্ত করেছিল। ইসলামে রাষ্ট্র থেকে ইসলামকে পৃথক করা হারাম। অথচ সেক্যুলারিজম তথা ইহজাগতিকতা সে হারামের পক্ষে ওকালতি করে। তারা দাবিয়ে রাখে সংস্কৃতি, রাজনীতি ও আইন-আদালতে পরকালের কল্যাণ চিন্তা। অথচ মুসলিমের ধর্মকর্মই শুধু নয়, তার রাজনীতি, আইন-আদালত ও সংস্কৃতিও নির্ধারিত হয় আখেরাতে মুক্তির চেতনা ও কোরআনী বিধানের অনুসরণ থেকে–এটিই তো ইসলামের মৌলিক শিক্ষা।

 

এজেন্ডা সত্য প্রকাশের

বাংলাদেশে শুধু যে সুদ, ঘুষ, দুর্বৃ্ত্তি, পতিতাবৃত্তি ও সন্ত্রাসের ন্যায় নানারূপ হারাম কর্ম বেড়েছে তা নয়, দেশটির চেতনার ভুমিও সেক্যুলারিজমের ন্যায় হারাম চেতনাটি দ্বারা অধিকৃত। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে যারা প্রবল ভাবে বিজয়ী তারা এই হারাম চেতনার ধারকগণ। এজন্যই দেশে স্কুল-কলেজের পাঠ্য বইয়ে ও বু্দ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে একাত্তরের ঘটনাবলির উপর কোন বিশ্লেষণ নেই। অথচ মুসলিমের প্রতিটি কাজকর্মের বিচার হতে হবে ইসলামের ভিত্তিতে। ফ্যাসিবাদী পেশী শক্তির বলে সেটি এ যাবত বন্ধ রাখা হয়েছে। আজকের বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসের দেশ; এবং সেটি একাত্তর থেকেই। ফলে নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে সীমাহীন ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে। ইসলামের পক্ষের শক্তিও এ নিয়ে মুখ খুলছেন না। তারা ভাবছেন, অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করাই ভাল। অথচ অতীতকে কি ভূলা যায়? চেতনার মানচিত্রটি তো গড়ে উঠে ইতিহাসের জ্ঞান থেকে। তাই বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তির মূল লড়াইটি তো হবে একাত্তরকে নিয়ে। ইসলামপন্থীর সামনে এগুতে হলে এ লড়াইয়ে জিততেই হবে। তাছাড়া ইসলামের দর্শনগত বল তো অপ্রতিরোধ্য। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে পবিত্র কোরআনই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। অথচ কোরআনী জ্ঞান না থাকার কারণে বাঙালী মুসলিমের হাত আজ হাতিয়ারশূণ্য। যারা পৌত্তলিকতা, জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম, সমাজবাদ ও অন্যান্য মতবাদকে গ্রহণ করে এবং সেসব মতবাদের নেতা বা প্রবক্তাদের অভিভাবক রূপে গ্রহণ করে মহান আল্লাহতায়ালার দৃষ্টিতে তারা মাকড়সা। বলা হয়েছে, “যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের অভিভাবক রূপে গ্রহণ করে তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার ন্যায়। -(সুরা আনকাবুত,আয়াত ৪১)। আর মহান আল্লাহতায়ালা যাদেরকে মাকড়সা বলেছেন তাদের বিরুদ্ধে লড়তে ঈমানদারর ভয় থাকে কি? তাই মরুবাসী ক্ষুদ্র মুসলিম জনবসতি নির্ভয়ে সে আমলের সর্ববৃহৎ দুটি মাকড়সার জাল -রোমান ও পারসিক সাম্রাজ্যকে অতি সহজেও নির্মূল করতে পেরেছিলেন।

অথচ আজ সে মাকড়সাগুলোই নিজেদের জাল বিস্তার করে আছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। ইসলামের সৈনিকগণ ময়দানে নামলে মাকড়সার সে জাল যে সহসাই নির্মূল হয়ে যাবে -তা নিয়ে সামান্যতম সন্দেহ চলে কি? সন্দেহ করলে কি ঈমান থাকে? কারণ,ইসলামের পক্ষের শক্তির এমন বিজয়ের প্রতিশ্রুতি মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বার বার দিয়েছেন। বলা হয়েছে, “তোমরা হীন বল হয়ো না, এবং দুঃখিতও হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মু’মিন হয়ে থাক।” –(সুরা আল ইমরান,আয়াত ১৩৯)। কিন্তু বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের সমস্যাটি তাদের নিজেদের নিয়ে। তারা ইতিহাস থেকে যেমন শিক্ষা নেয়নি। তেমনি পবিত্র কোরআন থেকেও শিক্ষা নেয়নি। ফলে ইসলামবিরোধী ধ্যান-ধারণার স্রোতের মুখে শক্তভাবে দাঁড়াবার ঈমানী ও বুদ্ধিবৃত্তিক বল যেমন নাই, তেমনি সাহস ও আন্তরিক ইচ্ছাও নাই। তারা নিজেরাই বরং ভেসে চলেছে স্রোতের টানে; এবং আত্মসমর্পণ করেছে শত্রুর ছড়ানো মিথ্যাচারের কাছে। অনেকের আত্মসমর্পণ এতোটাই গভীর যে, নিজেদের একাত্তরের পরাজয় নিয়ে সেক্যুলারিস্টদের বিজয়ের দিনগুলোতেও রাস্তায় উৎসবে নামছে! মাকড়সার জাল না ভাঙলে তা দিন দিন আরো বিস্তৃত হয়। এভাবেই দিন দিন প্রবলতর হয়েছে মিথ্যাচারের জাল। এবং সে জালে আটকা পড়ছে ভবিষ্যতের প্রজন্ম। এমন কি আটকা পড়ছে তথাকথিত বহু ইসলামপন্থীও।

মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই তো চিরকালের। সে লড়াইয়ে সত্যের পক্ষ নেয়াই তোঈমানদারী। সত্য প্রকাশ না করার অপরাধে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে যে অভিযুক্তহতে হবে–সে সত্যটিও বহু মুসলিম ভূলে গেছে। এটিও তো সত্য,মিথ্যার স্তূপ যত বিশালই হোক সত্যের আগমনে তা দ্রুত বিলুপ্ত হতে বাধ্য। বাংলাদেশে মিথ্যার যে বিশাল বিজয় তার মূল কারণ, সত্যের আলো সেখানে যথার্থ ভাবে জ্বালানো হয়নি। আরবে হাজার হাজার বছর ধরে মিথ্যার যে স্তূপ জমেছিল তা সত্যদ্বীন আসার সাথে সাথেই বিলুপ্ত হয়েছিল। অথচ সত্যদ্বীন আগমনের পূর্বে কেউকি সেটি ভাবতে পেরেছিল? সত্য প্রতিষ্ঠা পেলে একাত্তরের আওয়ামী বাকশালী চক্রের ষড়যন্ত্রের ইতিহাসও যে প্রকাশ পাবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? তারা নিজেরাও সেটি বুঝে। তাই সত্যের প্রচারে তারা বাধা দেয়। পেশী শক্তিই তাদের মূল শক্তি। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “বলুন,সত্য এসে গেছে মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। আর মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ার জন্যই।”-(সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৮১)। তবে সে জন্য শর্ত হলো সত্যকে প্রবল বিক্রমে প্রকাশ করা। আর এ দায়িত্বটা প্রতিটি সত্যপন্থীর। শাহাদাতে হক্ব এজন্যই ইসলামে ফরয।

আজ  যারা জীবিত, শত বছর পর এদেশে তারা কেউই থাকবে না। কিন্তু থাকবে আজকের লেখা বই। নতুন প্রজন্মের আদালতে তখন একাত্তরের রাজনীতি ও নৃশংসতা নিয়ে আলোচনা হবে; এবং বিচারও বসবে। একাত্তরের ইতিহাস থেকে মিথ্যার আবর্জনা সরিয়ে তখনও তন্য তন্য করে সত্যকে খোঁজা হবে। সত্যকে তাই দৃশ্যমান ও সহজলভ্য করার দায়িত্বটি প্রতিটি ঈমানদারের।বিবেকের সে আদালতে শুধু ইসলাম-বিরোধী ও ভারতসেবীদের লেখা মিথ্যা-পূণ্য বইগুলি সাক্ষ্য দিলে বিচারের নামে বিশাল অবিচার হবে। আগামীদের সে আদালতেও সঠিক সাক্ষ্য চাই। তিরিশ লাখ নিহত ও তিন লাখ ধর্ষিতার মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারা যেরূপ নিজেদের অপরাধগুলোকে ঢেকেছে তার ফলে কেউ কি সত্যের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারবে? আজকের ন্যায় তখনও প্রশংসিত হবে আগ্রাসী ভারতের অধিকৃতি। এবং ভারতের সেবাদাস এবং ইসলামের শত্রুগণ চিত্রিত হবে বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তান রূপে।তখন অশ্লিল কুৎসা ও চরিত্রহননের শিকার হবে ইসলামের নিষ্ঠাবান সৈনিকেরা।মিথ্যার জোয়ারে মানুষ তখন ভূলে যাবে ভারতীয় লুণ্ঠন, তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি, প্রাণনাশী দুর্ভিক্ষ,ভারতসেবীদের সন্ত্রাস, বাকশালী স্বৈরাচার ও সীমাহীন দুর্বৃত্তির কথা। মানুষ ভূলে যাবে হাজার হাজার নিরস্ত্র অবাঙালীর বিরুদ্ধে পরিচালিত নৃশংস গণহত্যার কথা। ফিরাউনদের দুর্বৃত্তিগুলো ভূলে যাওয়ার বিপদ তো সাংঘাতিক। তখন ফিরাউনগণও পুঁজনীয় হয়।তাদের আদর্শও তখন দীর্ঘায়ু পায়। ইসলামের শত্রুগণ তো সেটিই চায়। এজন্যই বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে তাদের বিনিয়োগটি বিশাল। এবং প্রতিষ্ঠা করেছে বু্দ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস। ঈমানদারদের তাই শুধু মহাপ্রভু মহান আল্লাহতায়ালার কুদরতকে চিনলে চলে না। সত্যের দুষমন নমরুদ-ফিরাউনদেরও চিনতে হয়। মহান আল্লাহতায়ালা এজন্যই পবিত্র কোরআনে নিজের পরিচয় তুলে ধরার সাথে সাথে বার বার নমরুদ-ফিরাউনদের ন্যায় দুর্বৃত্তদের কাহিনী বার বার বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহতায়ালার সে সূন্নত পালনে কোন ঈমানদার কি উদাসীন হতে পারে?

তাই ঈমানদারকে শুধু সত্যকে নিয়ে বাঁচলে চলে না, বাঁচতে হয় ফিরাউনদের নৃশংস দুর্বৃত্তির ভয়ানক স্মৃতি নিয়েও। সেগুলো জনসমাজে সর্বত্র প্রকাশ করাও মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজ কতটুকু হচ্ছে? শত বছর বা বহুশত বছর পর যখন একাত্তর নিয়ে বিচার বসবে তখন ইতিহাসের বিচারকেরা অবাক হবে মিথ্যার তুলনায় অতি বিরল সত্য বিবরণ দেখে। ইসলামের শত্রুপক্ষ একাত্তর নিয়ে বইয়ের প্লাবন এনেছে।কিন্তু ইসলামের পক্ষের শক্তি ক’খানা লিখেছে? আগামী প্রজন্ম অবাক হবে সত্যকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ইসলামপন্থীদের নিরবতা ও নির্লিপ্ততা দেখে। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া অপরাধগুলোর সামনে নিরব থাকাটিও তো অপরাধ।সামর্থ থাকা সত্বেও মিথ্যার সামনে সত্য না বলাটিই তো পাপ। এমন নিরবতায় মিথ্যার প্রচারকগণ তখন আরো মিথ্যাচারে উৎসাহ পায়। তখন সত্যের উপর বিজয়ী হয় মিথ্যা। অথচ মিথ্যার কাছে আত্মসমর্পণ ইসলামে হারাম; এবং মিথ্যার স্তুপ সরনোর প্রতিটি প্রচেষ্টাই হলো জিহাদ। কিন্তু সে জিহাদে যারা সত্যের পক্ষে কথা বলবে সে সৈনিক কই? মিথ্যার বিরুদ্ধে জিহাদে বই হলো উত্তম হাতিয়ার। এ বইটি লেখা হয়েছে সত্যকে তুলে ধরার তেমন একটি চেতনা থেকে। তাই এ বইয়ের কাঙ্ক্ষিত পাঠক স্রেফ আজকের প্রজন্ম নয়, আগামী দিনেরও। লক্ষ্য, তাদের আদালতেও প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরা।

 

 

 

 




অধ্যায় দুই: ইতিহাসে নাশকতার উপকরণ

আত্মঘাতি ইতিহাস

কোন জাতি ভূমিকম্প, ঘুর্নিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা মহামারিতে ধ্বংস হয় না। ধ্বংসের বীজ থাকে তার নিজ ইতিহাসে। আত্মহননের সে বীজ থেকে জন্ম নেয় জনগণের মাঝে আত্মঘাতি ঘৃণা; এবং সে ঘৃণা থেকে জন্ম নেয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও হানাহানি।যতই সে বিষপূর্ণ ইতিহাস পা|ঠ করা হয় ততই বাড়ে জনগণের মাঝে যুদ্ধের নেশা। বাড়ে সত্যচ্যুতি ও ভ্রষ্টতা। এমন আত্মহনন ও পথভ্রষ্টতার ভয়ানক বীজ ছিল ইসলামপূর্ব আরবদের ইতিহাসে। সে ইতিহাসই আরবদের সভ্য ভাবে বেড়ে উঠাকে শত শত বছর যাবত পুরাপুরি অসম্ভব করে রেখেছিল। নানা গোত্রে বিভক্ত আরবগণ নিজ নিজ গোত্রের বীরত্ব গাথা নিয়ে প্রচুর কবিতা লিখতো। সে কবিতায় থাকতো প্রতিদ্বন্দী গোত্রের বিরুদ্ধে বিষপূর্ণ ঘৃনা। থাকতো নিজেদের নিয়ে মিথ্যা গর্ব। নিয়মিত আসর বসতো সে কবিতা পাঠের। আরব গোত্রগুলির মাঝে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আগুণ শত শত বাঁচিয়ে রাখার জন্য সে কবিতাগুলি পেট্রোলের কাজ দিত। একই রূপ আজ পেট্রোল ঢালছে বাংলাদেশের একাত্তরের ইতিহাস। তাই একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হলেও সে যুদ্ধের সহিংস চেতনাটি মারা পড়েনি। বরং সেটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তার মূলে নিয়মিত পানি ঢালা হচ্ছে। প্রেক্ষাপট তৈরি করা হচ্ছেবহু একাত্তরের। এমন দেশের বিনাশে কি বিদেশী শত্রু লাগে?

জাহিলিয়াত যুগের আরবদের শক্তিহীন রাখার জন্য বিদেশী শত্রুর পক্ষ থেকে হামলার প্রয়োজন পড়েনি। কারণ,তারা নিজেরাই দিনের পর দিন লিপ্ত ছিল আত্মবিনাশে। ইসলামের আগমনে তাদের সবচেয়ে বড় কল্যাণটি হয়,আত্মবিনাশের পথ ছেড়ে তারা আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ পায়। পায় পবিত্র কোরআনে প্রদর্শিত জান্নাতের পথ। ফলে কয়েক দশকের মধ্যে তারা বিশ্বের বুকে সবচেয়ে শক্তিশালী বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়। ইসলাম তার শ্বাশ্বত সামর্থ্য নিয়ে এখনও বিজয়ের সে পথটি খুলে দিতে সদা প্রস্তুত। ইসলামের পথ মানেই সভ্যতর মানুষ হওয়ার পথ, এবং বিশ্বশক্তি রূপে দ্রুত বেড়ে উঠার পথ। কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের এরূপ মিশন নিয়ে বেড়ে উঠাকে ভয় করে এমন শত্রুরা রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্ত ঘিরে। বাংলাদেশের জনগণকে ইসলামের পথে চলতে দিতে তারা রাজী নয়। বরং বাঙালী মুসলিমদের আত্মবিনাশেই তাদের বিপুল আনন্দ। আর সে আত্মবিনাশ বাড়াতে তারা একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে মনগড়া মিথ্যা ছড়াচ্ছে। তাদের সৃষ্ট একাত্তরে ঘৃণা এবং সে ঘৃণাসৃষ্ঠ সংঘাতের আগুণকে বাঁচিয়ে রাখতে লাগাতর পেট্রোলও ঢালছে। সেটি তাদের সৃষ্ট তাঁবেদার বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও মিডিয়াকর্মীদের মাধ্যমে।

 

লক্ষ্য সংঘাতকে জীবিত রাখা

বাংলাদেশের ইতিহাসে একাত্তরের ঘটনাবলি নিয়ে প্রচুর মিথ্যাচার হয়েছে।লেখা হয়েছে অসত্যে ভরপুর অসংখ্য গ্রন্থ,গল্প,উপন্যাস ও নাটক।নির্মিত হয়েছে বহু ছায়াছবি।এখনও সে বিকৃত ইতিহাস রচনার কাজটি জোরে শোরে চলছে।মিথ্যাকে বাঁচিয়ে রাখার কাজে শুধু ইতিহাসের গ্রন্থ নয়,সাহিত্য,শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মিডিয়াকেও ব্যবহৃত করা হচ্ছে হাতিয়ার রূপে।মিথ্যাচারে যে স্রেফ অপমানই বাড়ে,সম্মান নয় –সে সামান্য সত্যটুকু বুঝার সামর্থ্যও যে এসব বাঙালীদের লোপ পেয়েছে,সেটি বুঝা যায় মিথ্যার পর্বত সমান আয়োজন দেখে। প্রতি দেশেই যুদ্ধ ধ্বংস ও মৃত্যু ডেকে আনে, হিংসাত্মক ঘৃনাও জন্ম নেয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও হিংসাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সে ঘৃনার ভিত্তিতে দেশে যুদ্ধাবস্থা বছরের পর বাঁচিয়ে রাখা -কোন সভ্য দেশের কাজ নয়। এমন কাজ যে আত্মঘাতি,এবং সে এজেণ্ডাটি যে শত্রুপক্ষের –সেটুকু বুঝার সামর্থ্যও যে বেঁচে আছে,সে প্রমাণ অতি সামান্য। উপরুন্ত,ভারতের ন্যায় একটি আগ্রাসী হিন্দু দেশের পাশে ষোল কোটি মুসলিমের দেশ হওয়ার বিপদটিও বিশাল।বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে এ জন্য শত্রুর অভাব নেই। কোন দেশে ষোল কোটি মানুষ ইসলাম নিয়ে খাড়া হলে তাদের পাশে মহান আল্লাহতায়ালার ফেরেশতারাও দল বেঁধে হাজির হয়।তখন তারা বিশাল শক্তিতে পরিণত হয়।সে বিশাল সম্ভাবনাটি তো বাঙালী মুসলিমের। যে আরবগণ ১৪ শত বছর পূর্বে বিশ্বশক্তির জন্ম দিয়েছিল তারা আজকের বাঙালী মুসলিমদের চেয়ে বেশী স্বচ্ছল ছিল না।মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তো মানব সম্পদ।পাট,তূলা,গ্যাস,তেল বা স্বর্ণের উন্নয়নে যতই বিনিয়োগ হোক -সেগুলির মূল্য কতই বা বাড়ানো যায়? সর্বাধিক উন্নয়ন তো আসে তখন,যখন মূল্য সংযোজনটি ঘটে মানব জীবনে।সে উন্নত মানব তখন দ্রুত উচ্চতর সভ্যতা গড়ে তোলে।ইসলামেমূল প্রায়োরিটি তাই মানব উন্নয়ন।সে উন্নত মানব ভাঙ্গে ভাষা,বর্ণ ও গোত্রের নামে গড়া বিভেদের দেয়াল।প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ একতার পথেই গড়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।ইসলামের শত্রুগণ চায় না,বাঙালী মুসলিমগণও সে পথে বেড়ে উঠুক।তাদের ভয় তো বাংলাদেশের বেড়ে উঠা নিয়ে।ফলে তাদের এজেন্ডা শুধু ইসলাম থেকে দূরে সরানো নয়,একতার পথে থেকে হঠানোও।ফলে ইতিহাসে ঢুকানো হয়েছে নাশকতার বিশাল উপকরণ।এ নাশকতাটি বিভক্তির।ইতিহাস চর্চার নামে তাদের লক্ষ্য,একাত্তরের সৃষ্ট ঘৃণাকে শত শত বছর বাঁচিয়ে রাখা।

যুদ্ধ শেষে সব দেশেই শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৫ কোটির বেশী মানুষ নিহত হয়েছিল। মানব ইতিহাসে এতো বড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর কোন কালেই হয়নি।জাপানের দুটি শহরের উপর মার্কিনীরা আনবিক বোমা নিক্ষেপ করেছে এবং বহু লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে।মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিত্র বাহিনী জার্মানের বহু শহরকে প্রায় পুরাপুরি বিধ্বস্ত করেছে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে জাপান ও জার্মানী উভয়ই মার্কিনীদের মিত্রে পরিণত হয়। দাবী করা হয়,জার্মানীরা ৬০ লক্ষ ইহুদীকে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করেছে।কিন্তু আজ জার্মানই ইসরাইলের অতি ঘনিষ্ট মিত্র।ইউরোপীয়রা বিভেদের সীমান্ত বিলুপ্ত করে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন গড়েছে।পৃথিবীর অন্যরা এভাবে বিভক্তি ও সংঘাতের পথ ছাড়লেও,বাংলাদেশে বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের তাতে রুচি নাই। বাঙালী মুসলিমগণ চাইলেও প্রতিবেশী ভারত সেটি হতে দিবে না।ভারতীয় এজেন্ডা পালনে তাদের বাংলাদেশী তাঁবেদারগণ যুদ্ধের ৪৭ বছর পরও তাই নির্মূলমুখি।একাত্তরে তাদের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গা।কিন্তু সেটিই তাদের একমাত্র এজেন্ডা ছিল না।পরবর্তী এজেন্ডাটি হলো,ইসলামপন্থীদের নির্মূল।তাদের ভয়,সেটি না হলে পূর্ব সীমান্তে আরেক পাকিস্তান গড়ে উঠবে।সেটি হলে ভারতের বিপদটি আরো ভয়ানক হবে।পাকিস্তানের ওপারে বাংলাদেশের চেয়েও বড় ৭টি প্রদেশ নিয়ে গঠিত কোন ভারতীয় ভূ-ভাগ নেই।কিন্তু বাংলাদেশের ওপারে আছে।বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানটি ভারতের জন্য এজন্যই এতোটা বিপদজনক।ভারতীয় রাজনীতিতে এতোদিন মূল উপাদানটি ছিল প্রচণ্ড পাকিস্তান ভীতি।সেটি ১৯৪৭ সাল থেকেই।পাকিস্তান ভীতি নিয়েই কাশ্মীরে অবস্থান নিয়েছে ৬ লাখ ভারতীয় সৈন্য।একাত্তরের পর ভারতীয় রাজনীতিতে যোগ হয়েছে নতুন উপসর্গ।সেটি বাংলাদেশ ভীতি।যেখানেই মুসলিম সেখানেই ভারতের ভয়।বাংলাদেশের ১৭ কোটি মুসলিম তো সে তূলনায় বিশাল। এজন্যই দিল্লির কর্তাব্যক্তিগণ খোলাখুলি বলে,“বাংলাদেশকে আর ভারতীয় রাডারের বাইরে যেতে দেয়া হবে না।” ফলে বাংলাদেশেও চায়,কাশ্মীরের ন্যায় সার্বক্ষণিক যুদ্ধাবস্থা।তাই একাত্তরের পূর্বে গণতন্ত্র চর্চা সম্ভব হলেও এখন সেটি অসম্ভব হয়ে পড়ছে।কারণ,ভারতীয় রাডারের নীচে সেটি জুটে না।

একাত্তরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল।একটি পক্ষ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চেয়েছিল।আরেকটি পক্ষ ১৯৪৬ সালের গণভোটে শতকরা ৯৬ ভাগ বাঙালী মুসলিমের পাকিস্তানভূক্তির সিদ্ধান্তকে সঠিক মনে করে অখণ্ড পাকিস্তানের সাথে থাকাকেই নিজেদের স্বাধীনতা ভেবেছিল।পাকিস্তান থেকে বিচ্ছন্ন হওয়ার মধ্যে বরং ভারতীয় আধিপত্যের অধীনে চিরকালের গোলামীর ভয় দেখেছিল।একাত্তরে এরূপ দুটি ভিন্ন চেতনা নিয়েই যুদ্ধ হয়েছিল।পাকিস্তানী পক্ষের পরাজয়ের পর এখন আর কেউই বাংলাদেশকে পাকিস্তানভুক্ত করার লক্ষ্যে যুদ্ধ করছে না।কিন্তু যুদ্ধ থামলেও মিথ্যাচার থামেনি।সে মিথ্যাচার ঢুকেছে দেশের ইতিহাসেও।দিন দিন সেটি আরো হিংসাত্মক রূপ নিচ্ছে।পরিকল্পিত এ মিথ্যাচারের লক্ষ্য একটিই। আর তা হলো,দেশ-বিদেশের মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থেকে সত্যকে আড়াল করা।এবং যারা একাত্তরের লড়াইয়ে বিজয়ী,তাদের কৃত অপরাধগুলো লুকিয়ে ফেরেশতাতুল্য রূপে জাহির করা। সে সাথে যারা সেদিন অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তাদেরকে জনগণের শত্রু রূপে চিত্রিত করা। যারা ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ অবধি শাসনকালে দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত করলো, একদলীয় বাকশালী শাসন প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠালো, ডেকে আনলো ভয়ানক দুর্ভিক্ষ এবং মানুষকে পাঠালো ডাস্টবিনের পাশে কুকুরের সাথে উচ্ছিষ্ঠ খোঁজের লড়াইয়ে এবং নারীদের বাধ্য করলো মাছধরা জালপড়তে -তাদেরকে আজ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বলা হচ্ছে বস্তুত সে পরিকল্পনারই অংশ রূপে।

এরূপ মিথ্যাচারের আরেকটি বড় উদ্দেশ্য, একাত্তরে বাংলার মুসলামানদের মাঝে যে রক্তক্ষয়ী বিভক্তি সৃষ্টি হলো, সেটিকে স্থায়ী রূপ দেয়া। বিভক্তিকে স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্যই পরিকল্পিত ভাবে ঘৃণা ছড়ানো হচেছ। প্রশ্ন হলো, একাত্তরে যারা বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করলো তাদেরকে কি বাংলাদেশের দালাল বলা যায়? তেমনি অখণ্ড পাকিস্তানের জন্য যারা লড়াই করলো বা প্রাণ দিল তাদেরকেও কি পাকিস্তানের দালাল বলা যায়? অথচ জেনে বুঝে তাদের বিরুদ্ধে “দালাল” শব্দটির ন্যায় ঘৃনাপূর্ণ শব্দের প্রয়োগ বাড়ানো হয়েছে। অথচ ঘৃনা একটি সমাজে বারুদের কাজ করে। সেটি ছড়ানো হলে যে কোন সময়ে সে সমাজে সহজেই বিস্ফোরন শুরু হয়। একাত্তরে যারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তাদের অনেকেই বয়সের ভারে দুনিয়া থেকে ইতিমধ্যে বিদায় নিয়েছে।তবে মানুষ বিদায় নিলেও ঘৃণা বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকে চেতনার সংঘাতও। যারা ঘৃণা ছড়াচ্ছে তারা মূলত সে সংঘাতকেই বাঁচিয়ে রাখতে চায়। তাদের লক্ষ্য, বাংলাদেশকে অশান্ত ও দুর্বল করা। আর বাংলাদেশ দুর্বল হলে প্রচুর আনন্দ বাড়ে ভারতের। কারণ তারা বাংলাদেশে নিজেদের বাজার চায়। আর বাংলাদেশ দুর্বল হলে সে বাজারটি ধরে রাখাটিও সহজ হয়। একই লক্ষ্যে দালাল বলে তাদের বিরুদ্ধেও তীব্র ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে যাদের জন্ম বাংলাদেশ সৃষ্টির পর; এবং যারা দেশে ইসলামী চেতনার বিজয় চায়। এ নিয়ে বিবাদ নাই, দেশে দেশে যারা ইসলামের বিজয় চায় তারাই একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানে পক্ষ নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলেও ইসলামপন্থীদের নির্মূল করার বিষয়টি ভারত ও ভারতপন্থী সেক্যুলারিস্টদের এজেন্ডা থেকে বাদ পড়েনি। তাদের কাছে সেটি বাদ পড়ার বিষয়ও নয়। ইসলামের বিজয় ঠ্যাকাতেই ঘৃণা ছড়ানোর এ বিপুল আয়োজন। আর ধ্বংসাত্মক আয়োজনের অগ্রভাগে রয়েছে বাংলাদেশের ভারতপন্থী সেক্যুলারিস্টগণ। এরূপ ঘৃণা ছড়ানোর পিছনে শুরু থেকেই অন্য যে উদ্দেশ্যটি কাজ করেছিল তা হলো, পাকিস্তানপন্থী বাঙালী ও অবাঙালীদের বিরুদ্ধে তাদের কৃত নৃশংস কর্মগুলোকে জায়েজ রূপে গ্রহণযোগ্য করা।

 

প্রকল্প মিথ্যা রটনায়

একাত্তর নিয়ে মিথ্যা রটনাটি স্রেফ কিছু বই-পুস্তক রচনার মধ্যে সীমিত রাখা হয়নি। একাজটি করা হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলে; এবং সেটি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই, পত্র-পত্রিকা, টিভি, সাহিত্য, সিনেমা, নাটকসহ সর্বত্র ছেয়ে আছে এ মিথ্যাচার। অথচ মিথ্যার স্রোতে ভাসাটি কোন সভ্য, রুচিবান ও ন্যায়পরায়ন মানুষের কাজ নয়। অথচ এ জঘন্য পাপের কাজটি করা হচ্ছে ইতিহাস রচনার নামে।ইতিহাসের বইয়ের কাজ মিথ্যা রটনা নয়।ইতিহাস কোন দলের বা পক্ষের নয়;এটি তো জাতীয় জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির নিরপেক্ষ ইতিবৃত্ত।দেশের সরকার সাধারণত একটি দলের। তাদের থাকে দলীয় এজেন্ডাও। সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষে তাই নিরপেক্ষ হওয়া অসম্ভব; ফলে তাদের দ্বারা ইতিহাস রচনাও অসম্ভব। পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস আসলে কোন ইতিহাস নয়, বরং ব্যক্তি বা দলের পক্ষে চাটুকরিতা বা গুণকীর্তন। মিথ্যা ইতিহাস পড়ে অনেকে মিথ্যার ভক্ত ও প্রচারকে পরিণত হয়; কিন্তু বিবেকমান ব্যক্তিগণ সে মিথ্যাকে তারা ত্বরিৎ সনাক্ত করে ফেলে। তারা হতভম্ব হয় মিথ্যার কুৎসিত চেহারাটি দেখে।

মেঘের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়লেও সেটি স্বল্প সময়ের জন্য। মিথ্যা ভেদ করে সত্যের প্রকাশও তেমনি অনিবার্য। শর্মিলা বোস তাঁর “Dead Reckoning” বইতে সে সব অবিশ্বাস্য মিথ্যার কিছু উদাহরণ তুলে ধরেছেন; সে সাথে তুলে ধরেছেন তার নিজের মনের কিছু প্রতিক্রিয়া। জনৈক রশিদ হায়দার সংকলিত এবং বাংলা এ্যাকাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত ‘একাত্তরের স্মৃতি’ নামক বই থেকে ‘বাঘের খাচায় ছয়বার’ নামক নিবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লিখেছেন, “When I first read the title of a Bengali article “Bagher Khanchay Chhoybar” (Six times in the tiger’s cage) in a collection of memoirs of 1971, I thought the author was referring to being in a Pakistani prison six times. Bengali nationalist accounts usually refer to West Pakistani in terms of animals, and most of the accounts are written in flowery language in somewhat melodramatic style. Muhammad Shafiqul Alam Chowdhury, however, was referring to actual tigers. ..  Shafiqul Alam Chowdhury claims that he was an organiser of ‘sangram parishad’ in the unions of Saldanga and Pamuli and arranged for military training of youth with rifles taken from Boda police station. …He states that he was arrested, and over the next several days he was beaten during questioning at Thakurgaon cantonment and lost consciousness, and every time he came to sense, he found in a cage of 4 tigers. Alam writes, the tigers did nothing to him – in fact, he claims that a baby tiger slept with its head on his feet regularly! However, he writes that one day the military put fifteen people in the tiger’s cage and the tigers mauled a dozen of the prisoners. He claims the mauled prisoners were then taken out and shot… It beggars belief that the tigers would maul everyone else who was put into the cage but never touch Shafikul Alam –except to sleep on her feet – even though he was put in there on six different occasions. ..It is also not clear why those who were alleged shooting so many other prisoners did not shoot him too.” -(Sharmilla Bose, 2011). অনুবাদঃ “উনিশ শ’ একাত্তরের স্মৃতিকথার উপর প্রকাশিত একটি সংকলন থেকে যখন “বাঘের খাঁচায় ৬ বার” নামক প্রবন্ধটি প্রথম বার পড়লাম তখন ভাবলাম, লেখক বোধ হয় পাকিস্তানের জেলে ৬ বার বন্দি হওয়ার কথা বলেছেন। আমার সেরূপ ধারণা হওয়ার কারণ, বাঙালী জাতীয়তাবাদীরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাধারণত পশু রূপে চিত্রিত করে থাকে। তাদের লেখা অধিকাংশ কাহিনীর ভাষাই অতি আবেগপূর্ণ এবং অলংকারময়। তবে মুহাম্মদ শফিকুল আলম চৌধুরী  তার কাহিনীতে আসল বাঘের কথাই বলেছেন।… শফিকুল আলম চৌধুরী র দাবী, তিনি সালদাঙ্গা এবং পামুলী ইউনিয়নে সংগ্রাম পরিষদের সংগঠক ছিলেন এবং বোদা থানা থেকে ছিনিয়ে নেয়া রাইফেল দিয়ে যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার বর্ননা, তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং কয়েকদিন ধরে ঠাকুরগাঁ সেনানীবাসে প্রশ্নোত্তরের সময় তার উপর মারধর করা হয়। এর ফলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর যখনই জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন তখনই দেখেন একটি খাঁচায় ৪টি বাঘের সামনে। তবে জনাব আলম লিখেছেন, বাঘগুলো তাকে কিছুই করেনি, বরং শিশু বাঘটি তার পায়ের উপর মাথা রেখে নিয়মিত ঘুমাতো। এরপর বর্ণনা দিয়েছেন, সৈন্যরা একদিন ১৫ জন বন্দিকে বাঘের খাঁচায় রেখে যায়। বাঘগুলো তাদের মধ্য থেকে প্রায় ডজন খানেককে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। তার দাবী, আহত বন্দিদেরকে সেখান থেকে বের করে গুলি করে হত্যা করা হয়। অবিশ্বাস্য রকমের বিস্ময়টি হলো, বাঘগুলো খাঁচায় বন্দি প্রত্যেক ব্যক্তিকে ক্ষতবিক্ষত করে, কিন্তু শফিকুল আলমের পায়ের উপর ঘুমানো ছাড়া তারা তাকে কখনোই স্পর্শ করেনি, যদিও সেখানে তাকে ৬ বারের জন্য রাখা হয়েছিল।.. এটাও রহস্যময় যে, যাদের উপর গুলি করে অন্যান্য বহুবন্দির হত্যার অভিযোগ -তারা কেন তাকে হত্যা করলো না?” শফিকুল আলম চৌধুরী র কাহিনী যে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানায়োট সেটি বুঝবার জন্য কি বেশী লেখাপড়া ও কাণ্ডজ্ঞানের প্রয়োজন আছে? সূর্যের ন্যায় মিথ্যাও এখানে জ্বল জ্বল করছে। তবে তাজ্জবের বিষয়, এ মিথ্যা কাহিনীর প্রকাশক বটতলার কোন অর্থলোভী দুর্বৃত্ত প্রকাশক নয়, বরং খোদ বাংলা এ্যাকাডেমী -যার মূল দায়িত্ব জনস্বার্থে গবেষণামূলক বইয়ের প্রকাশনা। নিরেট মিথ্যা প্রচারে জনগণের অর্থে পরিচালিত দেশের সর্বোচ্চ এ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটিও যে কতটা তৎপর -এ হলো তার প্রমাণ। বাংলা এ্যাকাডেমীর ন্যায় একটি প্রতিষ্ঠানটির যখন এরূপ অবস্থা, অন্যদের অবস্থা যে কতটা খারাপ হতে পারে সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে? বরং এ প্রমাণ অসংখ্য, একাত্তর নিয়ে মিথ্যা রটনাটি পরিণত হয় এক বিশাল শিল্পে। এবং সে শিল্পের ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সে শিল্পের মূল কারিগর হলো সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিক, প্রশাসক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীগণ।

একাত্তরে সীমাহীন মিথ্যাচার হয়েছে মূলত দুটি লক্ষ্যেঃ এক).যারা প্রকৃত অপরাধি তারা সেটি করেছে নিজেদের অপরাধগুলোকে আড়াল করতে, অথবা সে অপরাধকে জনগণের কাছে জায়েজ করতে। দুই). রাজনৈতিক বিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে বিক্ষুব্ধ ও প্রতিশোধ পরায়ন করতে। সে বিশাল মিথ্যাচারের মাধ্যমেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাকরিচ্যুৎ ও গৃহচ্যুৎ করা, তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাঠ দখল করা, হ্যাইজাক করে মুক্তিপণ আদায় করা, কারারুদ্ধ করা, তাদের নাগরিকত্ব হরণ করা, এমন কি হত্যা ও হত্যার পর লাশগুলোকে কবর না দিয়ে নদীর পাড়ে বা ডোবায় পচিয়ে ফেলাও সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এমন বীভৎসতাই ছিল একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনা ও মূল্যবোধ। বৃটিশ শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ ঔপনিবেশিক শাসকদের কর্মচারী রূপে স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মীদের উপর অনেক জুলুম করেছে। পুলিশের চাকরি করতে গিয়ে অনেকে নিরস্ত্র ও নিরপরাধ দেশবাসীর উপর গুলিও চালিয়েছে। অনেকে বৃটিশের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করেছে। কিন্তু ১৯৪৭’য়ের পর কি এদের কাউকে সে জন্য দালাল বলা হয়েছে? তাদেরকে কি জেলে ঢুকানো হয়েছে? কারো কি চাকুরি, ঘরবাড়ি ও নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছে? সবাইকে বরং আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে একই বিভাগে বসানো হয়েছে। এটি যেমন পাকিস্তানে হয়েছে, তেমনি ভারতেও হয়েছে।

 

লক্ষ্য গৃহযুদ্ধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্শাল পেত্যাঁ জার্মান নাৎসীদের সহায়তায় ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলে ভিশিতে এক সরকার গঠন করেছিলেন। তাঁকেও বিজেতা জেনারেল দ্যাগল এ অপরাধে হত্যা করেননি। তার বিচার হয়েছিল। বিচারে তাকে জেল দেয়া হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেনাদক্ষ হিসাবে তিনি প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এ জন্য তাঁকে পরে মুক্তি দেয়া হয়। এবং মৃত্যুর পর তাঁকে বীরের মর্যাদা দেয়া হয়। -(সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, ১৯৯৩)। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে ফজলুল কাদের চৌধুরী,আব্দুস সবুর খান, শাহ আজিজুর রহমান,নূরুল আমীন, ডাঃ আব্দুল মোত্তালেব মালেক (যিনি ৭১-এ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন), মাহমুদ আলী (আসাম মুসলিম লীগের সেক্রেটারি) এবং আরো অনেক পাকিস্তানপন্থী নেতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পূর্ব বাংলার মুসলমানদের ভাগ্য পরিবর্তনে ১৯৪৭-এর পূর্বে ও পরে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অথচ তাদেরকে দালাল ও খুনি বলা হয়েছে। বলা হয়, ফজলুল কাদের চৌধুরী , আব্দুস সবুর খান, খাজা খয়ের উদ্দিন নাকি হুকুম দিয়ে মানুষ খুন করিয়েছেন। বৃদ্ধ ডাঃ আব্দুল মোত্তলেব মালেকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। ইসলামী দলগুলোর অনেক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা নাকি পাকিস্তানী সেনা অফিসারদের নারী সরবরাহ করতো। অথচ এ অভিযোগগুলির কোনটিই প্রমাণিত হয়নি। মুজিব আমলে নয়, পরেও নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মিথ্যার প্রচার থামেনি। আওয়ামী বাকশালী চক্র ও তাদের মিত্ররা আজও এ নিরেট মিথ্যাগুলোকে জোরে শোরে লাগাতর রটনা করে। ইতিহাসের বইয়ে এসব মিথ্যা ঢুকানোর পিছনে কাজ করেছে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। সে মিথ্যাচারটি হয়েছে শেখ মুজিব ও তার দলের ইমেজকে বড় করে দেখানোর প্রয়োজনে। মিথ্যাচার হয়েছে ভারতের অপরাধগুলো লুকিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কাছে দেশটিকে বন্ধু রূপে জাহির করার প্রয়োজনে। এবং সে সাথে বিরোধীদের চরিত্রহরণ ও তাদেরকে হত্যাযোগ্য প্রমাণ করার লক্ষ্যে। যে কোন দেশের রাজনীতিতে ঘৃনা, সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি হয় তো এভাবেই। এমন এক ঘৃণাপূর্ণ পরিবেশে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকগণও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের পাইকারি হারে ফাঁসির হুকুম বা যাবতজীবন কারাদণ্ড দিবে এবং বিপুল সংখ্যক জনতা সে রায় শুনে মিষ্টি বিতরণ করবে বা উৎসব করবে তাতেই বা সন্দেহ থাকে কি? মিথ্যাচর্চা যখন জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয় তখন সেটি যে জনগণের চরিত্রও মিথ্যায় অভ্যস্থ করবে -তাতেই বা বিস্ময় কি?

নানা প্রেক্ষাপটে প্রতিদেশেই বিভক্তি দেখা দেয়। সে বিভক্তি নিয়ে প্রকাণ্ড রক্তপাতও হয়। নবীজীর (সাঃ) আমলে আরবের মানুষ বিভক্ত হয়েছিল মুসলমান ও কাফের -এ দুটি শিবিরে। কিন্তু সে বিভক্তি বেশি দিন টেকেনি। সে বিভক্তি বিলুপ্ত না হলে মুসলিমগণ কি বিশ্বশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারতো? জার্মানরা বিভক্ত হয়েছিল নাজি ও নাজিবিরোধী -এ দুই দলে। সে বিভক্তিও বেশীদিন টেকেনি। তা বিলুপ্ত না হলে জার্মানগণ আজ ইউরোপের প্রধানতম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হতে পারতো? বিভক্তি দেখা দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও। সে বিভক্তি এতোটাই প্রবল ছিল যে আব্রাহাম লিংকনের আমলে উত্তর ও দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলোর মাঝে প্রকাণ্ড গৃহযুদ্ধ হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ তাতে নিহতও হয়েছিল। কিন্তু সে বিভক্তিও বেশী দিন টেকেনি। সেটি বিলুপ্ত না হলে দক্ষিণ আমেরিকার মত উত্তর আমেরিকাতেও উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া, পেরুর ন্যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু রাষ্ট্রের জন্ম হত। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ যেভাবে অপ্রতিদ্বন্দি বিশ্বশক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করছে তা কি সম্ভব হত? পারতো কি পৃথিবী জুড়ে প্রভাব সৃষ্টি করতে?

 

যে পাপ বিভক্তি ও বিদ্রোহে

আত্মপ্রতিষ্ঠা, আত্মসম্মান ও বিশাল বিজয় আসে একতার পথ ধরে। বিভক্তির মধ্য দিয়ে আসে আত্মহনন, আত্মগ্লানি ও পরাজয়। বাংলাদেশ আজ সে বিভক্তির পথ ধরেই অগ্রসর হচ্ছে। একটি দেশের জন্য এর চেয়ে বড় আত্মঘাত আর কি হতে পারে? একতার গুরুত্ব শুধু বিবেকবান মানুষই নয়, পশুপাখিও বোঝে। তাই তারাও দল বেঁধে চলে। একতা গড়া ইসলামে ফরয; এবং বিভক্তি গড়ার প্রতিটি প্রচেষ্টাই হলো হারাম। বিষয়টি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে একতার পথে চলা ও না-চলার বিষয়টি ব্যক্তির খেয়াল খুশির উপর ছেড়ে দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে অলংঘনীয় নির্দেশ এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। পবিত্র কোরআনে তিনি সুস্পষ্ট ভাবে বলেছেন,“ওয়া তাছিমু বিহাব্‌লিল্লাহে জামিয়াঁও ওয়ালাতাফাররাকু”।‌ ‌‌‌অর্থঃ “এবং তোমরা আল্লাহর রশি (আল্লাহর দ্বীন তথা পবিত্র কোরআন বা ইসলামকে) আঁকড়ে ধর এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়োনা..।”-(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৩)। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কঠোর আযাব প্রাপ্তির জন্য মুর্তিপুজারি বা কাফের হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সে জন্য বিভক্তির পথে পা বাড়ানোই যথেষ্ট। সে শাস্তির হুশিয়ারিও এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা তাদের মত হয়োনা যারা সুস্পষ্ট ঘোষণা আসার পরও পরস্পরে বিভক্ত হলো এবং মতবিরোধ সৃষ্টি করলো। তাদের জন্য রয়েছে কঠোর আয়াব।”-(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৫)। তাই কোন মুসলিম দেশকে খণ্ডিত করা কোন জায়েজ কর্ম নয়। ফলে সেটি ঈমানদারের কাজ নয়, সে কাজটি ইসলামের শত্রুদের। মুসলিম ভুমির একতা রক্ষার প্রতি এরূপ কোরআনী ঘোষণা থাকার কারণে উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া খলিফাদের আমলে অখণ্ড মুসলিম ভূগোল শত শত বছর বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছে। অথচ সে সময়েও বহু সমস্যা ছিল, বহু অনাচারও ছিল। কিন্তু সেসব কারণো বার বার সরকার পরিবর্তন হলেও সে অখণ্ড ভূগোল খণ্ডিত হয়নি। অথচ সে অখণ্ড আরব ভূমি আজ ২২ টুকরোয় বিভক্ত। আরব ভূমিতে বিভক্তির এরূপ অসংখ্য দেয়াল গড়া হয়েছে স্রেফ ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের সহযোগী সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট ও ট্রাইবালিস্ট নেতাদের দখলদারি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে। এ বিভক্তির লক্ষ্য মুসলিম স্বার্থ বা আরব স্বার্থকে প্রতিরক্ষা দেয়া ছিল না। লক্ষ্যণীয় হলো, এরূপ আত্মঘাতি বিভক্তির সাথে কোন ঈমানদার ব্যক্তি জড়িত ছিলেন না। কারণ ঈমানদার হওয়ার অর্থই তো প্যান-ইসলামীক হওয়া। অথাৎ ভাষা, বর্ণ, ভূগোল ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠা। বিভক্তি শুধু দুর্বলতা ও পরাধীনতাই বাড়ায়। ক্ষুদ্র ইসরাইলের হাতে এজন্যই তারা বার বার পরাজিত হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের সীসাঢালা দেয়ালের ন্যায় ঈমানদারদের একতাবদ্ধ হতে বলেছেন। কিসের ভিত্তিতে একতা গড়তে হবে সেটিও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। একতার ভিত্তিটি হলো ইসলাম; ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা ভূগোলভিত্তিক জাতীয়তা নয়। মহান আল্লাহতয়ালার প্রতিটি হুকুমই অলঙ্ঘনীয়। ফলে একতা প্রতিষ্ঠার প্রতিটি প্রয়াসই পবিত্র ইবাদত;তেমনি বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা গড়ার প্রতিটি প্রয়াসই হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ফলে হারাম। রাজার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে প্রাণদন্ড হয়। সমগ্র বিশ্বের মহাপ্রভু মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও কি তাই রহমত বয়ে আনে? এরূপ বিদ্রোহ যে শুধু পরকালে জাহান্নামে নেয় –তা নয়। দুনিয়ার বুকেও আযাবের কারণ হয়। জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের অপরাধটি তাই শুধু স্রেফ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল খোদ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধেও। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রমাণ শুধু এ নয় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের রাজস্বের অর্থে একটি মুসলিম দেশে সুদী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা পাবে। বা সে অর্থে বেশ্যাবৃত্তি বা জ্বিনার ন্যায় জঘন্য হারাম কর্মগুলি পুলিশী পাহারাদারি পাবে। বা আইন-আদালত থেকে আল্লাহতায়ালার আইনকে সরিয়ে ব্রিটিশদের রচিত কুফরি ফৌজদারি বিধি (পেনাল কোড) প্রতিষ্ঠা করা হবে। বরং মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ এবং মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অপরাধ ঘটেছে ভাষা, বর্ণ ও পৃথক ভূগোলের নামে বিভক্তি গড়ায় এবং মুসলিম উম্মাহকে শক্তিহীন করায়।

১৯৪৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমগণ ভাষা বা বর্ণকে নয়, ইসলামকে আঁকড়ে ধরেছিল। বাঙালী, বিহারী, পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধি, গুজরাটি, বালুচ -এরূপ নানা ভাষার মুসলিমগণ ভাষার বন্ধন ডিঙ্গিয়ে ঈমানী পরিচয় নিয়ে একাতাবদ্ধ হয়েছিল। তারা সেদিন ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিক ভিন্নতার সাথে ভূলে গিয়েছিল ধর্মীয় ফেরকা ও মাযহাবী বিরোধগুলোও। উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে এটি ছিল অতি বিশাল অর্জন। মুসলিম উম্মাহর মাঝে এমন ঈমানী ভাতৃত্ব সেদিন বিশাল পুরস্কার এনেছিল মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। সেটি হলো পাকিস্তান। সুলতান মুহাম্মদ ঘোরীর হাতে দিল্লি বিজয়ের পর উপমহাদেশের সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ মুসলিম রাষ্ট্রটি গড়তে একটি তীরও ছুড়তে হয়নি। কিন্তু সে প্যান-ইসলামীক ঐক্য ও পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ভারতীয় হিন্দুদের ভাল লাগেনি। সে ঐক্যের ভিত্তিতে উপমহাদেশের বুকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পাক বা দেশটি বেঁচে থাকুক সেটিও তারা চায়নি। অর্থাৎ শুরু থেকেই তারা ছিল উপমহাদেশের মুসলিমদের শত্রু। তারা চাইতো মুসলিমগণ ভারতীয় হিন্দুদের গোলাম রূপে বেঁচে থাকুক, স্বাধীন ভাবে নয়। ইসলামের শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে বাঁচার তো প্রশ্নই উঠে না। গরু গোশতো ঘরের রাখার মিথ্যা অভিযোগে সেদেশে নির্মম প্রহারে রাজপথে মুসলিমকে হত্যা করা হয়। সম্প্রতি ভারতীয় পত্রিকাগুলি সে খবর ছেপেছে। গরুর জীবনে যে নিরাপত্তা আছে, ভারতীয় মুসলিমের জীবনে সে নিরাপত্তাটুকুও নেই।

পবিত্র কোরআনে মুসলিমদের পরিচয় পেশ করা হয়ছে হিযবুল্লাহ বা আল্লাহর দল রূপে। এমনটি কি কখনো ধারণা করা যায়,মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর নিজ বাহিনীতে অনৈক্য চাইবেন? এবং সেটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, বর্ণ, পতাকা বা ভৌগলিক স্বার্থের নামে? মুসলিম উম্মাহর একতা, শক্তি ও বিজয়ের চেয়ে বিভক্তির এ উপকরণগুলি কি কখনো গুরুত্ব পেতে পারে? মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর বাহিনীতে একতার যে কোন উদ্যোগে যে খুশি হবেন -সেটিই তো স্বাভাবিক। মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তির যে কোন উদ্যোগ তাই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এমন বিদ্রোহ যে ভয়ানক শাস্তি আনবে সেটিও কি দুর্বোধ্য? ১৯৪৭’য়ে উপমহাদেশের মুসলমানদের একতা মহান আল্লাহতায়ালাকে এতোই খুশি করেছিল যে প্রতিদানে বিশাল রহমত নেমে এসেছিল। মহান আল্লাহতায়ালার সে করুণার কারণেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় কোন যুদ্ধ লড়তে হয়নি। অস্ত্র না ধরেই বিশাল শত্রু পক্ষকে সেদিন তারা পরাজিত করতে পেরেছিল। অথচ ইংরেজ ও হিন্দু -সে সময়ের এ দুটি প্রবল প্রতিপক্ষই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সর্বপ্রকার বিরোধীতা করেছে।

শেখ মুজিব ও তার দলীয় নেতাকর্মীগণ দেখেছে শুধু গদিপ্রাপ্তির স্বার্থটি। গদির লোভে মিথ্যা বলা এবং যে কোন শক্তির সাহায্য নিতেও তাদের কোন আপত্তি ছিল না। সেরূপ সাহায্য দিতে প্রতিবেশী ভারতও দু’পায়ে খাড়া ছিল। কারণ, পাকিস্তান ভাঙ্গার মাঝে ভারত তার নিজের বিশাল স্বার্থটি দেখেছিল। শেখ মুজিব ও তার সহচরদের এজেণ্ডায় বাঙালী মুসলিমদের স্বার্থ গুরুত্ব পায়নি। ফলে ভারতের ন্যায় একটি অমুসলিম দেশের অর্থ, অস্ত্র ও উস্কানিতে একটি মুসলিম ভূমিকে তারা বিভক্ত করেছেন। ইসলাম ধর্ম মতে এটি নিরেট পাপকর্ম। ফলে শুধু ভারতের গোলামী নয়, মহান আল্লাহতায়ালার আযাবও ডেকে এনেছেন। পরিণতিতে বাংলাদেশের ন্যায় সুজলা সুফলা একটি উর্বর দেশে নেমে আসে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। লক্ষ লক্ষ মানুষ সে দুর্ভিক্ষে মারা যায়। মুজিবের সে আত্মঘাতি রাজনীতিতে শুধু প্রাণহানি নয়, বাঙালী মুসলিমের চরম ইজ্জতহানিও হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দেশটি ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হয়। যে বাঙালী মুসলিমগণ ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের পুরা রাজনৈতিক চিত্রই পাল্টে দিল তাদের এরূপ ইজ্জতহানি বা অপমান কি কম বেদনাদায়ক? এ বিকট অপমান নিয়ে আজ থেকে হাজার বছর পরও কি ইতিহাসের পাতায় তাদের হাজির হতে হবে না? মুজিব ও তার সহচরদের চেতনায় সে ভাবনাটি কি কোন কালেও স্থান পেয়েছে?

 

অসহ্য ছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা

ইসলামের শত্রুপক্ষের কাছে ১৯৪৭’য়ের পরাজয় যেমন কাম্য ছিল না, তেমনি সহনীয়ও ছিল না। তাদের এজেন্ডা তো মুসলিম রাষ্ট্রগুলিকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করা। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইন্সটিটিউশন হলো খেলাফত। খেলাফতের মূলে ছিল প্যান-ইসলামীক মুসলিম ভাতৃত্ব; এবং ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার সীমানা ডিঙ্গিয়ে মুসলিম ঐক্য। সে সাথে লক্ষ্য ছিল বিশ্বশক্তি রূপে মজবুত প্রতিরক্ষা ও আত্মসস্মান নিয়ে বাঁচা। সংঘাতময় এ বিশ্বে যাদের সামরিক শক্তি নাই তাদের কি স্বাধীনতা ও ইজ্জত থাকে? খেলাফতের কারণেই ইংরেজ, ফরাসী, ডাচ, স্পানীশ, পুর্তগীজ ও ইউরোপের নানা ঔপনিবেশিক শক্তি এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বহু দেশে সাম্রাজ্য বিস্তারে সফল হলেও মধ্য এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার খেলাফতভূক্ত মুসলিম ভূমিতে প্রবেশের সুযোগ পায়নি। নেকড়ে বাঘ সব সময়ই ছাগল-ভেড়া খোঁজে, বিশাল হাতি নয়। সে খোঁজেই ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ পাশের ওসমানিয়া খেলাফত ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরের বিচ্ছন্ন বাংলায় গিয়ে পৌঁছে। একারণে শুরু থেকেই তাদের টার্গেট ছিল, খেলাফতের বিনাশ ঘটিয়ে সহজে শিকারযোগ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট নির্মান করা এবং সে রাষ্ট্রগুলির মাঝে ইসরাইলের ন্যায় স্যাটেলাইট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। সে সাথে লক্ষ্য ছিল, মুসলিম বিশ্বের বিশাল সম্পদের উপর অবিরাম সাম্রাজ্যবাদী শোষণের অবকাঠামো নির্মাণ। সে লক্ষ্য অর্জনে তারা ১৯২৩ সালে সফল হয়।ফলে জর্দান, কাতার, কুয়েত, দুবাই, বাহরাইনের মত বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূখণ্ড -যা এক সময় উসমানিয়া খেলাফতের অধীনে জেলার মর্যাদাও রাখতো না -সেগুলিকেও রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়। এরূপ বিভক্তির কারণেই মুসলিম ভূমির তেল ও গ্যাসের ন্যায় সম্পদ থেকে মুসলিমদের চেয়ে বেশী লাভবান হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি।

মুসলিম উম্মাহ আজ শক্তিহীন ও প্রতিরক্ষাহীন। জাতীয়তাবাদীদের সৃষ্ট বিভক্তিই মুসলিমদের এরূপ পঙ্গুত্ব ও অপমান বাড়িয়েছে। পবিত্র আল আকসা মসজিদসহ বিশাল মুসলিম ভূমি আজ অধিকৃত। আন্তর্জাতিক ফোরামে দেড়শত কোটি মুসলিমের কথা গুরুত্ব পায় না, অথচ গুরুত্ব পায় সাড়ে ৫ কোটি ব্রিটিশ ও ফরাশীদের কথা।মুসলিম উম্মাহর পঙ্গুত্ব বাড়াতেই খেলাফত ভেঙ্গে সৃষ্টি করা হয়েছে বিশের বেশী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। খেলাফত বিলুপ্ত হওয়ার সে দুর্দিনেই প্রতিষ্ঠা পায় নানা ভাষাভাষীর মুসলমানদের নিয়ে সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। তাদের চোখের সামনে পাকিস্তানের ন্যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটবে এবং সেটি টিকে থাকবে -সেটি তাদের কাছে অসহ্য ছিল। ফলে পাকিস্তান জন্ম থেকেই ইসলামবিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের টার্গেটে পারিণত হয়। ভারত সে লক্ষ্যে কাজ করছে ১৯৪৭ সাল থেকেই। আরবদেরকে এরাই বিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত করেছে। নব্যসৃষ্ট এসব দেশগুলির প্রতিটিতে এমন সব স্বৈরাচারী তাঁবেদারকে বসিয়েছে যাদের কাছে ব্যক্তিস্বার্থ বা গোত্রীয় স্বার্থ ছাড়া অন্য কোন মহত্তর ভাবনা গুরুত্ব পায় না। তাদের মূল কাজ, সাম্রাজ্যবাদীদের গড়া বিভক্ত ভূগোলকে টিকিয়ে রাখা। বিভক্তির প্রাচীর ভাঙ্গার যে কোন প্রয়াসই তাদের কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অপরাধে প্রাণদণ্ডও দেয়া হয়।

একই কারণে পাকিস্তানের ন্যায় ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশও আজ শত্রুশক্তির টার্গেট। বিশেষ করে ভারতের। ভারতের পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের ন্যায় আরেক শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের সৃষ্টিকে যে তারা মেনে নেবে না,তাদের সে ঘোষণাটিও সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের মানুষ আল্লাহর দেয়া শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করুক সেটিও তারা মানতে রাজী নয়। বাঙালী মুসলিমগণ আল্লাহর অনুগত বান্দাহ হোক ও তাঁর আইনের আপোষহীন অনুসারি হোক এতেও তাদের আপত্তি। ইসলামের এ অতি সনাতন রূপকে তারা ‘মৌলবাদ’ বলে। এজন্যই বাংলাদেশের অখণ্ড ভূগোল যেমন ভারতীয় আগ্রাসনের টার্গেট, তেমনি টার্গেট হলো একতাবদ্ধ মুসলিম জনগণও। যে কারণে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাদের প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল তেমনি আগ্রহ বাংলাদেশকে ব্যর্থ ও খণ্ডিত রাষ্ট্রে পরিণত করায়। এজন্যই ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরের পর পরই শুরু হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্যাপক লুণ্ঠন। তাদের হাতে পাকিস্তান আর্মির ফেলে যাওয়া অস্ত্রই শুধু লুট হয়নি। লুট হয়েছে অফিস-আদালত ও কলকারখানার বহু হাজার কোটি টাকার মালামাল। নিজেদের লক্ষ্য পূরণে পাকিস্তান ভাঙ্গাটি তাদের কাছে ছিল প্রথম পর্ব মাত্র, শেষ পর্ব নয়। বাংলাদেশকেও তারা ক্ষুদ্রতর ও দুর্বলতর করতে চায়। ভূগোল ভাঙ্গার লক্ষ্যে ভারতীয় সরকার ও পুলিশের সামনে পশ্চিম বাংলার মাটিতে প্রতিপালিত হচ্ছে “স্বাধীন বঙ্গভূমি” প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, বরিশাল এসব প্রাক্তন বৃহত্তর জেলাগুলোকে বাংলাদেশ থেকে পৃথক করে এরা স্বাধীন বঙ্গভূমি রাষ্ট্র গড়তে চায়। এদের নেতা চিত্তরঞ্জন সুতার আওয়ামী লীগের টিকেটে সংসদ সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশের মেরুদণ্ড ভাঙ্গার প্রকল্প শুধু সেটিই নয়, একই লক্ষ্যে ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহীদের নিজ ভূমিতে বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণও দিয়েছে। ভারতের একাত্তরের ভূমিকার বিশ্লেষণে এগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব ঘটনাবলিকে সামনে না রাখলে একাত্তরের সঠিক ইতিহাস রচনার কাজ ব্যর্থ হতে বাধ্য।

 

শেষ হবার নয় যুদ্ধ

মুসলিম উম্মাহকে লাগাতর বিভক্ত ও দুর্বল রাখাই ইসলামের শত্রুপক্ষের স্টাটেজী। সে লক্ষ্যে তাদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো, মুসলমানদের মাঝে বিভেদের সূত্রগুলো খুঁজে বের করা এবং সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযোগী হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে একাত্তরের বিরোধ। ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ চাইলে কি হবে, একাত্তরের ঘটে যাওয়া বিবাদ ও বিভক্তির সে বেদনা থেকে বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি নেই। বরং সে বিভক্তিকে আরো বিষাক্ত ও প্রকট করে ইসলামের শত্রুপক্ষ বাংলাদেশে আরেকটি গৃহযুদ্ধ বাধাতে চায়। তাই স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিতর্ক শেষ হবার নয়। বরং এ বিভেদ স্থায়ী রাখতে ভারত ও তাঁর তাঁবেদার পক্ষ অবিরাম ইন্ধন জোগাতেই থাকবে। ভারতের সাথে এখন যুক্ত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র পক্ষ। ইসলামের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে এরা সবাই মিলে গড়ে তুলেছে গ্লোবাল কোয়ালিশন। ইসলামকে এরা সবাই নিজেদের প্রতিপক্ষ শক্তি রূপে দাঁড় করিয়েছে। সবার অভিন্ন লক্ষ্য, ইসলামপন্থীদের চরিত্রহনন। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলমান যে মুসলিম উম্মাহর অংশ সে বিষয়টি বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টগণ ভুলে গেলেও তারা ভুলতে রাজি নয়। “বিভক্ত কর এবং শাসন করো” -এটাই শত্রুপক্ষের নীতি। ফলে যে লক্ষ্যে আরবদের বিভক্ত রেখেছে,সে একই লক্ষ্যে বাংলাদেশের মুসলমানদেরকেও তারা বিভক্ত করে রাখতে চায়। সে বিভক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যেই বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের বিনিয়োগের পরিমাণ শত শত কোটি ডলার। বিপুল বিনিয়োগে নেমেছে ভারত সরকারও। তবে ভারতের বিনিয়োগের খাত বাংলাদেশের কৃষি,শিল্প বা অর্থনীতি নয়;বরং সেটি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, টিভি চ্যানেল, মিডিয়াকর্মী, রাজননৈতিক নেতা এবং এনজিও পরিচালকগণ। ভারতের ইচ্ছা পূরণে তাদের কাজটি হলো, একাত্তরে বাঙালী মুসলিমদের ঘরে বিভক্তির যে আগুন লেগেছিল তাতে অবিরাম পেট্রোল ঢালা। বাংলাদেশে সে কাজটি কতটা সুচারু ভাবে হচ্ছে সেটি বুঝা যায়, ক্রমবর্ধমান ঘৃনা,প্রতিহিংসা ও নির্মূলমুখি রাজনীতি থেকে।

 

সাতচল্লিশের প্রজ্ঞা

স্বাধীনতার রক্ষা প্রতিটি দেশের জন্যই অতি ব্যয়বহুল। পাকিস্তানের মত বহুদেশের জাতীয় বাজেটের বিশাল ভাগ খরচ হয়ে যায় প্রতিরক্ষা খাতে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তো সে ব্যয়ভারে ভেঙ্গেই গেল। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত ধনী দেশও সে বিশাল বাজেট নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলি তাই সে ব্যয়ভার কমাতে পার্টনার খুঁজছে। যে কোন ক্ষুদ্র দেশের পক্ষে এ বিশাল ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব। মাথাপিছু আয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশী হওয়া সত্ত্বেও সে সামর্থ্য কাতার, কুয়েত, আমিরাত বা সৌদি আরবের নেই। এ দেশগুলোর তেল সম্পদ যত অঢেলই হোক, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূগোলই তাদেরকে স্বাধীন থাকাকে অসম্ভব করে রেখেছে। তাদের পরাধীনতা ফুটে উঠে সেখানে মার্কিনীদের ঘাঁটি দেখে। মুসলিম ভূমিতে স্থাপিত সেসব ঘাটিগুলোতে সার্বভৌমত্ব মার্কিনীদের;নিজ ভূমিতে হওয়া সত্ত্বেও কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, আমিরাত বা সৌদি আরবের বাদশাহ বা শেখদেরও সেখানে প্রবেশাধীকার নেই। ক্ষুদ্র হওয়ার এই হলো বিপদ। মুসলিম খেলাফত ১৪ শত বছর যাবত টিকেছিল প্যান-ইসলামী চেতনা, বিশাল ভূগোল এবং সে ভূগোলে বসবাসকারি বিশ্বের সর্ববৃহৎ জনসংখ্যার কারণে। বিশাল মুসলিম উম্মাহ বহন করতো সে খেলাফতের প্রতিরক্ষার ব্যয়ভার। তেমনি মোঘল সাম্রাজ্যও দীর্ঘ বহুশত বছর স্বাধীন ছিল তার বিশাল ভূগোল ও জনসংখ্যার কারণে। সে সাম্রাজ্য রক্ষার সবচেয়ে বড় খরচটি যেত সুবে বাংলা থেকে। আলীবর্দী খাঁর হাতে বাংলা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দারুন ভাবে দুর্বল হয় মোঘলদের প্রতিরক্ষা। কিন্তু তাতে বাংলার স্বাধীন থাকার সামর্থও বাড়েনি। বরং বেড়েছে পরাধীনতার বিপদ, এবং সেটিই প্রমাণিত হয় ১৭৫৭ সালে পলাশীতে। বস্তুত যখন থেকেই মোঘল সাম্রাজ্যের ভূগোল ছোট হতে শুরু হয়, তখন থেকেই বাড়তে থাকে ভারত জুড়ে পরাধীনতা। একই অবস্থা হয়েছে আরব দেশগুলির। দল থেকে বিচ্ছিন্ন ভেড়াটি যেমন সর্ব প্রথমে বাঘের পেটে যায়, তেমনি উপমহাদেশে সর্বপ্রথম ঔপনিবেশিক শাসনের খপ্পড়ে পড়ে মোঘল সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন বাংলা। সেটি ১৭৫৭ সালে। অথচ দিল্লি পরাধীন হয় ১০০ বছর পর ১৮৫৭ সালে। সেটিরই পুনরাবৃত্তি ঘটে ১৯৭১য়ে। ভারত তার ২৫ সালা চুক্তি, সীমান্ত বাণিজ্য ও দেশের মধ্য দিয়ে করিডোর ও অর্থনৈতিক আধিপত্য পাকিস্তান-ভূক্ত পাঞ্জাব, সিন্ধু বা বেলুচিস্তানের ন্যায় অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দিতে পারিনি। চাপাতে পারিনি পূর্ব পাকিস্তানের উপরও। কিন্তু চাপিয়েছে ১৬ কোটি মানুষের বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশের উপর। পাকিস্তান সীমান্তে কাউকে তারকাঁটার দেয়ালে ঝুলে লাশ হতে হয় না, কিন্তু সেটি হয় বাংলাদেশ সীমান্তে। এটিই হলো শক্তিহীন ও ক্ষুদ্রতর হওয়ার বিপদ। এ বিপদের ভাবনাই ১৯৪৭ ও ১৯৭১’য়ে বিপুল সংখ্যক বাঙালী মুসলিমকে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে টেনেছিল।

স্বাধীন থাকাটি অতি ব্যয়বহুল ও রক্তক্ষয়ী হলেও সেটিই মানব জীবনে সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ। পশু রাষ্ট্র গড়ে না, ফলে সভ্যতাও গড়ে না। কিন্তু মানব রাষ্ট্র গড়ে এবং সে সাথে সভ্যতারও নির্মাণ করে। স্বাধীনভাবে বাঁচার আনন্দটাই আলাদা। তাছাড়া মুসলমানদের কাছে নিজ ধর্ম, নিজ সংস্কৃতি ও নিজ এজেন্ডা নিয়ে বাঁচার জন্য স্বাধীনতা অপরিহার্যও। কোন কাফের দেশে পূর্ণাঙ্গ মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাই অসম্ভব। এজন্যই মর্যাদাশীল জাতি বিপুল অর্থ ও লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ দিয়ে হলেও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে। মদিনায় হিজরতের পর নবীজী (সাঃ) তাই ইসলামি রাষ্ট্র গড়েছেন এবং সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় লাগাতর লড়াই করেছেন।ইসলামে এমন লড়াইয়ের রয়েছে পবিত্র জিহাদের মর্যাদা। নিহত হলে রয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে শহীদ রূপে গণ্য হবার প্রতিশ্রুতি। স্বাধীন থাকার জন্য শুধু একখানি পতাকা, এক টুকরা ভূমি, একজন প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হলেই চলে না। স্বাধীনতা রক্ষার সামর্থ্যও থাকা চাই। পূর্ব বাংলার মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দেশটির ক্ষুদ্র ভূগোলে।১৯৪৭’য়ে বাংলার মুসলিম নেতৃবৃন্দ বাঙালী মুসলিমদের সে সীমিত সামর্থে অজ্ঞ ছিলেন না। স্বাধীন বাংলাদেশের বদলে অখণ্ড পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে তাদের মূল গরজটি ছিল একারণেই। লাহোর প্রস্তাবে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানে ভূক্ত করার সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু বাংলার মুসলিম নেতাগণই সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের দিল্লি সম্মেলনে লাহোর প্রস্তাবে সংশোধনী আনেন;তাদের দাবীতেই গৃহিত হয়পূর্ব বাংলাকে অখণ্ড পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্তির প্রস্তাব। এটি ছিল বাংলার মুসলিম নেতাদের বিচক্ষণতা ও দুরদৃষ্টির প্রমাণ।সেরূপ দুরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা কাশ্মীরের শেখ আব্দুল্লাহর ছিল না। ফলে কাশ্মীরীগণ আজও পরাধীনতার জোয়াল টানছে। অথচ ভারতসেবীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, একাত্তরে বাংলাদেশ সৃষ্টি হলো লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। বলা হয়, ১৯৪৬ সালে বাংলার পাকিস্তান ভূক্তির প্রস্তাবটি ছিল বাঙালীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা! অথচ পাকিস্তানভূক্তি যে ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলাকে ভারতভূক্ত হতে বাঁচিয়েছিল সে কথাটি তারা বলে না।

 

সাতচল্লিশের স্বাধীনতা ও একাত্তরের স্বাধীনতা

১৯৪৭’য়ে বাংলার মুসলিম লীগ নেতাদের লক্ষ্য ছিল প্রকৃত স্বাধীন হওয়া; সিকিম,ভুটান বা মেরুদণ্ডহীন বাংলাদেশ হওয়া নয়। একাত্তরে ২৫ বছরের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব ভারতকে যে কোন সময় বাংলাদেশে সৈন্য অনুপ্রবেশসহ সামরিক হস্তক্ষেপের পূর্ণ অধিকার দিয়েছিলেন। অথচ স্বাধীনতার হেফাজতে ভারতীয় হামলার বিরুদ্ধে পাকিস্তান দুই-দুইটি যুদ্ধ লড়েছে, ব্যয় করেছে হাজার হাজার কোটি টাকা। পারমানবিক বোমার অধিকারি এ দেশটি তেমন একটি লড়াইয়ে এখনও প্রস্তুত। কিন্তু সে সামর্থ্য কি বাংলাদেশের আছে? আর না থাকলে স্বাধীনতাই বা কতটুকু থাকে? স্বাধীনতার বিষয়টি আগ্রাসী শক্তির কাছে দয়াভিক্ষার বিষয় নয়। মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো স্বাধীনতা।এবং জানমালের সবচেয়ে বড় কোরবানী দিতে হয় সে স্বাধীনতার সুরক্ষায়;মসজিদ-মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট, নগর-বন্দর, কলকারখানা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে নয়। স্বাধীনতা রক্ষায় শুধু লোকবলই যথার্থ নয় -অর্থবল, অস্ত্রবল এবং ভূগোলের বলও চাই। আর সে বল না থাকলে জাতীয় জীবনে পরাধীনতা নেমে আসে। সে সীমিত সামর্থ্যের কথা ভেবেই ইউরোপের দেশগুলো একতাবদ্ধ ইউরোপীয় যুক্তরাষ্ট্রের বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্ম দিয়েছে। একই কারণে অখণ্ড ভারতে একীভূত হয়ে আছে ভারতের নানা ভাষার বিশটির বেশী প্রদেশ। নইলে ভারত ভেঙ্গে ২০টির বেশী বাংলাদেশ সৃষ্টি হতে পারতো। কিন্তু এভাবে ভূগোল ভেঙ্গে দেশের সংখ্যা বাড়ালে কি ইজ্জত বাড়ে? বাড়ে কি স্বাধীনতা?

ইসলাম তাই শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের বিধানই দেয়না, দেশের অখণ্ডতা ও স্বাধীনতার বিধানও দেয়। এজন্যই দেশভাঙ্গাকে ইসলামে হারাম ঘোষিত হয়েছে এবং দেশের অখণ্ডতা রক্ষাকে করা হয়েছে ফরজ। মহান নবীজীর হাদীসঃ মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষায় এক মুহুর্ত ব্যয় সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম। উমাইয়া, আব্বসীয় ও উসমানিয়া খেলাফতের বিশাল ভূখণ্ড শত শত বছর যাবত অখণ্ডতা নিয়ে বাঁচার সে সামর্থ্যটি পেয়েছে তো এরূপ গভীর ধর্মীয় চেতনার কারণেই। রাষ্ট্র গঠনের বুনিয়াদ ইসলাম হতে পারে না –এ যুক্তি যারা প্রচার করে তাদের সে যুক্তিকে ভিত্তিহীন প্রমাণ করে নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মুসলমানদের নিয়ে গড়া খেলাফত। পাকিস্তান ভাঙ্গার যুদ্ধে তাই কোন ইসলামী দল, পীর-মাশায়েখ, আলেম ও মাদ্রাসার ছাত্রকে পাওয়া যায়নি। সে যুদ্ধে যোদ্ধা খুঁজতে হয়েছে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টির ন্যায় সেক্যুলার ও বামপন্থী দলগুলির ইসলামী চেতনাশূণ্য ও ধর্মে অঙ্গীকারশূণ্য কর্মীদের মাঝ থেকে। বাংলাদেশের ইতিহাস রচনার কাজটিও তারাই হাতে নিয়েছে। ফলে প্যান-ইসলামী দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আলোচনায় আনা হয়নি। ফলে বিবেচনায় আনা হয়নি বাঙালী মুসলিমের কল্যাণে ইসলামের অনুসারিদের অঙ্গীকার ও কোরবানি। বরং গুরুত্ব পেয়েছে, জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজমের ধ্বজাধারীদের মহান করার বিষয়টি। সে সাথে গুরুত্ব পেয়েছে,স্বাধীনতার শত্রু রূপে ইসলামপন্থীদের খাড়া করা। ফলে একাত্তর নিয়ে তাদের রচিত সমুদয় বই ও সাহিত্য জুড়ে প্রচার পেয়েছে পক্ষপাতদুষ্ট হিংসাত্মক অভিমত। সেক্যুলারিজম, সোসালিজম ও জাতীয়তাবাদের বিবেচনায় ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানোই তো অপরাধ –সেটি সাতচল্লিশে হোক, একাত্তরে হোক বা আজ হোক। তাদের প্রতিটি লড়াই ও প্রতিটি প্রচেষ্ঠা চিত্রিত হয় সাম্প্রদায়িকতা রূপে। কথা হলো, মহান নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ ইসলামের জন্য এতো যে জিহাদ করলেন, প্রাণ ও মালের যে বিশাল কোরবানি দিলেন, পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যেকে পরাজিত করে ইসলামকে যেভাবে বিশ্বশক্তির মর্যাদা দিলেন -তাদেরকে কি বলা যাবে? সেটিও কি সাম্প্রদায়িকতা? সেটি কি জঙ্গিবাদ। অথচ সেটিই তো প্রকৃত ইসলাম। সে আমলের মুসলিমগণই তো সর্বযুগের মুসলিমদের অনুকরণীয় আদর্শ। একই কারণে তাদের রচিত ইতিহাসের বইয়ে ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়কদেরও মূল্যায়ন করা হয়নি। কারণ,পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের কোন ভূমিকাই ছিল না। তারা ছিল অখণ্ড ভারতের পক্ষে। প্রশ্ন হলো, তাদের রচিত একাত্তরের এ বিকৃত ইতিহাসটি জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্ট শিবিরে যতই পবিত্র গণ্য হোক,ধর্মপ্রাণ মুসলিমের কাছে কি তা আদৌ মূল্য রাখে?

কোন জাতি ভূমিকম্প, ঘুর্নিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা মহামারিতে ধ্বংস হয় না। ধ্বংসের বীজ থাকে তার নিজ ইতিহাসে। আত্মহননের সে বীজ থেকে জন্ম নেয় জনগণের মাঝে আত্মঘাতী ঘৃণা; এবং সে ঘৃণা থেকে জন্ম নেয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও হানাহানি।যতই সে বিষপূর্ণ ইতিহাস পা|ঠ করা হয় ততই বাড়ে জনগণের মাঝে যুদ্ধের নেশা। এবং বাড়ে সত্যচ্যুতি ও ভ্রষ্টতা। এমন আত্মহনন ও পথভ্রষ্টতার ভয়ানক বীজ ছিল ইসলামপূর্ব আরবদের ইতিহাসে। সে ইতিহাসই আরবদের সভ্য ভাবে বেড়ে উঠাকে শত শত বছর যাবত পুরাপুরি অসম্ভব করে রেখেছিল। নানা গোত্রে বিভক্ত আরবগণ নিজ নিজ গোত্রের বীরত্ব গাথা নিয়ে প্রচুর কবিতা লিখতো। সে কবিতায় থাকতো প্রতিদ্বন্দী গোত্রের বিরুদ্ধে বিষপূর্ণ ঘৃনা। থাকতো নিজেদের নিয়ে মিথ্যা গর্ব। নিয়মিত আসর বসতো সে কবিতা পাঠের। আরব গোত্রগুলির মাঝে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আগুণ শত শত বাঁচিয়ে রাখার জন্য সে কবিতাগুলি পেট্রোলের কাজ দিত। একই রূপ আজ পেট্রোল ঢালছে বাংলাদেশের একাত্তরের ইতিহাস।

তাই একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হলেও সে যুদ্ধের সহিংস চেতনাটি মারা পড়েনি। বরং সেটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তার মূলে নিয়মিত পানি ঢালা হচ্ছে। প্রেক্ষাপট তৈরি করা হচ্ছে বহু একাত্তরের।এমন দেশের বিনাশে কি বিদেশী শত্রু লাগে? জাহিলিয়াত যুগের আরবদের শক্তিহীন রাখার জন্য সে দেশে বিদেশী শত্রুর পক্ষ থেকে হামলার প্রয়োজন পড়েনি। তারা নিজেরাই লিপ্ত ছিল আত্মবিনাশে। ইসলামের আগমনে তাদের সবচেয়ে বড় কল্যাণটি হয়,আত্মবিনাশের পথ ছেড়ে তারা আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ পায়। পায় পবিত্র কোরআনে প্রদর্শিত জান্নাতের পথ। ফলে কয়েক দশকের মধ্যে তারা বিশ্বের বুকে সবচেয়ে শক্তিশালী বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়। ইসলাম তার শ্বাশ্বত সামর্থ্য নিয়ে এখনও বিজয়ের সে পথটি খুলে দিতে সদা প্রস্তুত। ইসলামের পথ মানেই সভ্যতর মানুষ হওয়ার পথ, এবং বিশ্বশক্তি রূপে দ্রুত বেড়ে উঠার পথ। কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের এরূপ মিশন নিয়ে বেড়ে উঠাকে ভয় করে এমন শত্রুরা রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্ত ঘিরে। বাংলাদেশের জনগণকে ইসলামের পথে চলতে দিতে তারা রাজী নয়। বরং বাঙালী মুসলিমদের আত্মবিনাশেই তাদের বিপুল আনন্দ। আর সে আত্মবিনাশ বাড়াতে তারা একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে মনগড়া মিথ্যা ছড়াচ্ছে। তাদের সৃষ্ট একাত্তরে ঘৃণা এবং সে ঘৃণাসৃষ্ঠ সংঘাতের আগুণকে বাঁচিয়ে রাখতে লাগাতর পেট্রোলও ঢালছে। সেটি তাদের সৃষ্ট তাঁবেদার বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও মিডিয়াকর্মীদের মাধ্যমে।

 

লক্ষ্য সংঘাতকে জীবিত রাখা

বাংলাদেশের ইতিহাসে একাত্তরের ঘটনাবলি নিয়ে প্রচুর মিথ্যাচার হয়েছে।লেখা হয়েছে অসত্যে ভরপুর অসংখ্য গ্রন্থ,গল্প,উপন্যাস ও নাটক।নির্মিত হয়েছে বহু ছায়াছবি।এখনও সে বিকৃত ইতিহাস রচনার কাজটি জোরে শোরে চলছে।মিথ্যাকে বাঁচিয়ে রাখার কাজে দেশের সাহিত্য,সংস্কৃতি ও মিডিয়া ব্যবহৃত হচ্ছে হাতিয়ার রূপে।প্রতি দেশেই যুদ্ধ ধ্বংস ও মৃত্যু ডেকে আনে, হিংসাত্মক ঘৃনাও জন্ম নেয়। যুদ্ধশেষ হওয়ার পরও হিংসাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সে ঘৃনার ভিত্তিতে দেশে যুদ্ধাবস্থা বছরের পর বাঁচিয়ে রাখা কোন সভ্যদেশের কাজ নয়। এমন কাজ তো শত্রুপক্ষের। কিন্তু সংখ্যায় ষোল কোটি হওয়ায় বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুর অভাব নেই। কোন দেশে ষোল কোটি মানুষ ইসলাম নিয়ে খাড়া হলে তাদের পাশে মহান আল্লাহতায়ালার ফেরেশতারাও দল বেঁধে হাজির হয়।তখন তারা বিশাল শক্তিতে পরিণত হয়।সে সম্ভাবনাটি তো বাঙালী মুসলিমের।যে আরবগণ ১৪শত বছর পূর্বে বিশ্বশক্তির জন্ম দিয়েছিল তারা আজকের বাঙালী মুসলিমদের চেয়ে বেশী স্বচ্ছল ছিল না।মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তো মানব সম্পদ।পাট,তূলা,গ্যাস,তেল বা স্বর্ণের উন্নয়নে যতই বিনিয়োগ হোক -সেগুলির মূল্য কতই বা বাড়ানো যায়? সর্বাধিক উন্নয়ন তো আসে তখন,যখন মূল্য সংযোজনটি ঘটে মানব জীবনে।সে উন্নত মানব তখন দ্রুত উচ্চতর সভ্যতা গড়ে তোলে।ইসলামে মূল প্রায়োরিটি তাই মানব উন্নয়ন।সে উন্নত মানব ভাঙ্গে ভাষা,বর্ণ ও গোত্রের নামে গড়া বিভেদের দেয়াল।প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ একতার পথেই গড়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।ইসলামের শত্রুগণ চায় না,বাঙালী মুসলিমগণও সে পথে বেড়ে উঠুক।তাদের ভয় তো,বাংলাদেশের বেড়ে উঠা নিয়ে।ফলে তাদের এজেণ্ডা শুধু ইসলাম থেকে দূরে সরানো নয়,একতার পথে থেকে হঠানোও।ফলে ইতিহাসে ঢুকানো হয়েছে নাশকতার বিশাল উপকরণ।এ নাশকতাটি বিভক্তির।ইতিহাস চর্চার নামে তাদের লক্ষ্য,একাত্তরের সৃষ্ট ঘৃণাকে শত শত বছর বাঁচিয়ে রাখা।

যুদ্ধ শেষে সবদেশেই শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৫ কোটির বেশী মানুষ নিহত হয়েছিল। মানব ইতিহাসে এতবড় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর কোন কালেই হয়নি।জাপানের দুটি শহরের উপর মার্কিনীরা আনবিক বোমা নিক্ষেপ করেছে এবং বহু লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে।মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনী জার্মানের বহু শহরকে প্রায় পুরাপুরি বিধ্বস্ত করেছে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে জাপান ও জার্মানী উভয়ই মার্কিনীদের মিত্রে পরিণত হয়। দাবী করা হয়,জার্মানীরা ৬০ লক্ষ ইহুদীকে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করেছে।কিন্তু আজ  জার্মানীরাই ইসরাইলের ঘনিষ্ট মিত্র।ইউরোপীয়রা বিভেদের সীমান্ত বিলুপ্ত করে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন গড়েছে।পৃথিবীর অন্যরা এভাবে বিভক্তি ও সংঘাতের পথ ছাড়লেও,বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের তাতে রুচি নাই। বাঙালী মুসলিমগণ চাইলেও প্রতিবেশী ভারত সেটি হতে দিবে না।ভারতীয় এজেন্ডা পালনে তাদের বাংলাদেশী তাঁবেদারগণ যুদ্ধের ৪৪ বছর পরও তাই নির্মূলমুখি।একাত্তরে তাদের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গা।কিন্তু সেটিই তাদের একমাত্র এজেন্ডা ছিল না।পরবর্তী এজেন্ডাটি হলো,ইসলামপন্থিদের নির্মূল।তাদের ভয়,সেটি না হলে পূর্ব সীমান্তে আরেক পাকিস্তান গড়ে উঠবে।সেটি হলে ভারতের বিপদটি আরো হবে ভয়ানক।পাকিস্তানের ওপারে বাংলাদেশের চেয়েও বড় ৭টি প্রদেশ নিয়ে গঠিত কোন ভারতীয় ভূ-ভাগ নেই।কিন্তু বাংলাদেশের ওপারে আছে।বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানটি ভারতের জন্য এজন্যই এতটা বিপদজনক।ভারতীয় রাজনীতিতে এতদিন মূল উপাদানটি ছিল প্রচণ্ড পাকিস্তান ভীতি।সেটি ১৯৪৭ সাল থেকেই।পাকিস্তান ভীতি নিয়েই কাশ্মীরে অবস্থান নিয়েছে ৬ লাখ ভারতীয় সৈন্য।একাত্তরের পর ভারতীয় রাজনীতিতে যোগ হয়েছে নতুন উপসর্গ।সেটি বাংলাদেশ ভীতি।যেখানেই মুসলিম সেখানেই ভারতের ভয়।কয়েক বছর আগে মাত্র ৫/৬ জন জিহাদী মুসলিম মোম্বাই শহরের প্রাণকেন্দ্রকে কয়েক দিনের জন্য অচল করে দিয়েছিল।বাংলাদেশের ১৭ কোটি মুসলিম তো সে তূলনায় বিশাল ভয়ের কারণ।এজন্যই দিল্লির কর্তাব্যক্তিগণ খোলাখুলি বলে, “বাংলাদেশকে আর ভারতীয় রাডারের বাইরে যেতে দেয়া হবে না।” ফলে তারা বাংলাদেশেও চায়,কাশ্মীরের ন্যায় সার্বক্ষণিক যুদ্ধাবস্থা।তাই একাত্তরের পূর্বে গণতন্ত্র চর্চা সম্ভব হলেও এখন সেটি অসম্ভব হয়ে পড়ছে।কারণ,ভারতীয় রাডারের নীচে থেকে তো সেটি জুটে না।

একাত্তরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল।একটি পক্ষ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চেয়েছিল।আরেকটি পক্ষ ১৯৪৬ সালের গণভোটে শতকরা ৯৬ ভাগ বাঙালী মুসলিমের পাকিস্তানভূক্তির সিদ্ধান্তকে সঠিক মনে করে অখণ্ড পাকিস্তানের সাথে থাকাকেই নিজেদের স্বাধীনতা ভেবেছিল।পাকিস্তান থেকে বিচ্ছন্ন হওয়ার মধ্যে বরং ভারতীয় আধিপত্যের অধীনে চিরকালের গোলামীর ভয় দেখেছিল।একাত্তরে এরূপ দুটি ভিন্ন চেতনা নিয়েই যুদ্ধ হয়েছিল।পাকিস্তানী পক্ষের পরাজয়ের পর এখন আর কেউই বাংলাদেশকে পাকিস্তানভুক্ত করার লক্ষ্যে যুদ্ধ করছে না।কিন্তু যুদ্ধ থামলেও মিথ্যাচার থামেনি।সে মিথ্যাচার ঢুকেছে দেশের ইতিহাসেও।দিন দিন সেটি আরো হিংসাত্মক রূপ নিচ্ছে।পরিকল্পিত এ মিথ্যাচারের লক্ষ্য একটিই। আর তা হলো,দেশ-বিদেশের মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থেকে সত্যকে আড়াল করা।এবং যারা একাত্তরের লড়াইয়ে বিজয়ী,তাদের কৃত অপরাধগুলো লুকিয়ে ফেরেশতাতুল্য রূপে জাহির করা। সে সাথে যারা সেদিন অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তাদেরকে জনগণের শত্রু ও দানব রূপে চিত্রিত করা। যারা ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ অবধি শাসনকালে দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত করলো, একদলীয় বাকশালী শাসন প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠালো,ডেকে আনলো ভয়ানক দুর্ভিক্ষ এবং মানুষকে পাঠালো ডাস্টবিনের পাশে কুকুরের সাথে উচ্ছিষ্ঠ খোঁজের লড়াইয়ে এবং নারীদের বাধ্য করলো মাছধরা জাল পড়তে -তাদেরকে আজ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বলা হচ্ছে বস্তুত সে পরিকল্পনারই অংশ রূপে।

এ মিথ্যাচারের আরেকটি বড় উদ্দেশ্য, একাত্তরে বাংলার মুসলামানদের মাঝে যে রক্তক্ষয়ী বিভক্তি সৃষ্টি হলো, সেটিকে স্থায়ী রূপ দেয়া। বিভক্তিকে স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্যই পরিকল্পিত ভাবে ঘৃণা ছড়ানো হচেছ। প্রশ্ন হলো, একাত্তরে যারা বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করলো তাদেরকে কি বাংলাদেশের দালাল বলা যায়? তেমনি অখণ্ড পাকিস্তানের জন্য যারা লড়াই করলো বা প্রাণ দিল তাদেরকেও কি পাকিস্তানের দালাল বলা যায়? অথচ জেনে বুঝে তাদের বিরুদ্ধে “দালাল” শব্দটির মত ঘৃনাপূর্ণ শব্দের প্রয়োগ বাড়ানো হয়েছে। অথচ ঘৃনা একটি সমাজে বারুদের কাজ করে। সেটি ছড়ানো হলে যে কোন সময়ে সে সমাজে সহজেই বিস্ফোরন শুরু হয়।একাত্তরে যারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তাদের অনেকেই বয়সের ভারে দুনিয়া থেকে ইতিমধ্যে বিদায় নিয়েছে।তবে মানুষ বিদায় নিলেও ঘৃণা বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকে চেতনার সংঘাতও । যারা ঘৃণা ছড়াচ্ছে তারা মূলত সে সংঘাতকেই বাঁচিয়ে রাখতে চায়। তাদের লক্ষ্য,বাংলাদেশকে অশান্ত ও দুর্বল করা। আর বাংলাদেশ দুর্বল হলে প্রচুর আনন্দ বাড়ে ভারতের। কারণ তারা বাংলাদেশে নিজেদের বাজার চায়। আর বাংলাদেশ দুর্বল হলে সে বাজারটি ধরে রাখাটিও সহজ হয়। একই লক্ষ্যে দালাল বলে তাদের বিরুদ্ধেও তীব্র ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে যাদের জন্ম বাংলাদেশ সৃষ্টির পর;এবং যারা দেশে ইসলামি চেতনার বিজয় চায়।এ নিয়ে বিবাদ নাই, দেশে দেশে যারা ইসলামের বিজয় চায় তারাই একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানে পক্ষ নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলেও ইসলামপন্থিদের নির্মূল করার বিষয়টি ভারত ও ভারতপন্থি সেক্যুলারিস্টদের এজেন্ডা থেকে বাদ পড়েনি। সেটি তাদের থেকে বাদ পড়ার বিষয়ও নয়। ইসলামের বিজয় ঠ্যাকাতেই ঘৃণা ছড়ানোর এ বিপুল আয়োজন। আর ধ্বংসাত্মক আয়োজনের অগ্রভাগে রয়েছে বাংলাদেশের ভারতপন্থি সেক্যুলারিস্টগণ। এরূপ ঘৃণা ছড়ানোর পিছনে শুরু থেকেই অন্য যে উদ্দেশ্যটি কাজ করেছিল তা হলো,পাকিস্তানপন্থি বাঙালী ও অবাঙালীদের বিরুদ্ধে তাদের কৃত নৃশংস কর্মগুলোকে জায়েজ রূপে গ্রহণযোগ্য করা।

 

প্রকল্প মিথ্যা রটনায়

একাত্তর নিয়ে মিথ্যা রটনাটি স্রেফ কিছু বই-পুস্তক রচনার মধ্যে সীমিত রাখা হয়নি। একাজটি একাজটি করা হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলে; এবং সেটি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই, পত্র-পত্রিকা, টিভি, সাহিত্য, সিনেমা, নাটকসহ সর্বত্র ছেয়ে আছে এ মিথ্যাচার। অথচ মিথ্যার স্রোতে ভাসাটি কোন সভ্য, রুচিবান ও ন্যায়পরায়ন মানুষের কাজ নয়। অথচ এ জঘন্য পাপের কাজটি করা হচ্ছে ইতিহাস রচনার নামে।ইতিহাসের বইয়ের কাজ মিথ্যা রটনা নয়।এটি তো জাতীয় জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির নিরপেক্ষ ইতিবৃত্ত।দেশের সরকার সাধারণত একটি দলের।তাদের থাকে দলীয় এজেন্ডাও।সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষে তাই নিরপেক্ষ হওয়া অসম্ভব; ফলে তাদের দ্বারা ইতিহাস রচনাও অসম্ভব। পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস আসলে কোন ইতিহাস নয়, বরং ব্যক্তি বা দলের পক্ষে চাটুকরিতা বা গুণকীর্তন। মিথ্যা ইতিহাস পড়ে অনেকে মিথ্যার ভক্ত ও প্রচারকে পরিণত হয়; কিন্তু বিবেকমান ব্যক্তিগণ সে মিথ্যাকে তারা ত্বরিৎ সনাক্ত করে ফেলে।তারা হতভম্ব হয় মিথ্যার কুৎসিত চেহারাটি দেখে।

মেঘের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়লেও সেটি স্বল্প সময়ের জন্য।অচিরেই সেটি প্রকাশ পায়। তেমনি মিথ্যা ভেদ করে সত্যের প্রকাশও অনিবার্য। শর্মিলা বোস তাঁর “Dead Reckoning” বইতে সে সব অবিশ্বাস্য কুৎসিত মিথ্যার কিছু উদাহরণ তুলে ধরেছেন; সে সাথে তুলে ধরেছেন তার নিজের মনের কিছু প্রতিক্রিয়া। জনৈক রশিদ হায়দার সংকলিত এবং বাংলা এ্যাকাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত ‘একাত্তরের স্মৃতি’ নামক বই থেকে ‘বাঘের খাচায় ছয়বার’ নামক নিবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লিখেছেন, “When I first read the title of a Bengali article “Bagher Khanchay Chhoybar” (Six times in the tiger’s cage) in a collection of memoirs of 1971, I thought the author was referring to being in a Pakistani prison six times. Bengali nationalist accounts usually refer to West Pakistani in terms of animals, and most of the accounts are written in flowery language in somewhat melodramatic style. Muhammad Shafiqul Alam Chowdhury, however, was referring to actual tigers. ..  Shafiqul Alam Chowdhury claims that he was an organiser of ‘sangram parishad’ in the unions of Saldanga and Pamuli and arranged for military training of youth with rifles taken from Boda police station. …He states that he was arrested, and over the next several days he was beaten during questioning at Thakurgaon cantonment and lost consciousness, and every time he came to sense, he found in a cage of 4 tigers. Alam writes, the tigers did nothing to him – in fact, he claims that a baby tiger slept with its head on his feet regularly! However, he writes that one day the military put fifteen people in the tiger’s cage and the tigers mauled a dozen of the prisoners. He claims the mauled prisoners were then taken out and shot… It beggars belief that the tigers would maul everyone else who was put into the cage but never touch Shafikul Alam –except to sleep on her feet – even though he was put in there on six different occasions. ..It is also not clear why those who were alleged shooting so many other prisoners did not shoot him too.” -(Sharmilla Bose, 2011). অনুবাদঃ “উনিশ শ’ একাত্তরের স্মৃতিকথার উপর প্রকাশিত একটি সংকলন থেকে যখন “বাঘের খাচায় ৬ বার” নামক প্রবন্ধটি প্রথম বার পড়লাম তখন ভাবলাম, লেখক বোধ হয় পাকিস্তানের জেলে ৬ বার বন্দি হওয়ার কথা বলেছেন। আমার সেরূপ ধারণা হওয়ার কারণ, বাঙালী জাতীয়তাবাদীরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাধারণত পশু রূপে চিত্রিত করে থাকে। তাদের লেখা অধিকাংশ কাহিনীর ভাষাই অতি আবেগপূর্ণ এবং অলংকারময়। তবে মুহাম্মদ শফিকুল আলম চৌধুরি তার কাহিনীতে আসল বাঘের কথাই বলেছেন।… শফিকুল আলম চৌধুরির দাবী, তিনি সালদাঙ্গা এবং পামূলী ইউনিয়নে সংগ্রাম পরিষদের সংগঠক ছিলেন এবং বোদা থানা থেকে ছিনিয়ে নেয়া রাইফেল দিয়ে যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার বর্ননা,তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং কয়েকদিন ধরে ঠাকুরগাঁ সেনানীবাসে প্রশ্নোত্তরের সময় তার উপর মারধর করা হয়। এর ফলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর যখনই জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন তখনই দেখেন একটি খাচায় ৪টি বাঘের সামনে। তবে জনাব আলম লিখেছেন, বাঘগুলো তাকে কিছুই করেনি, বরং শিশু বাঘটি তার পায়ের উপর মাথা রেখে নিয়মিত ঘুমাতো। এরপর বর্ণনা দিয়েছেন, সৈন্যরা একদিন ১৫ জন বন্দিকে বাঘের খাচায় রেখে যায়। বাঘগুলো তাদের মধ্য থেকে প্রায় ডজন খানেককে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। তার দাবী, আহত বন্দিদেরকে সেখান থেকে বের করে গুলি করে হত্যা করা হয়। অবিশ্বাস্য রকমের বিস্ময়টি হলো, বাঘগুলো খাচায় বন্দি প্রত্যেক ব্যক্তিকে ক্ষতবিক্ষত করে, কিন্তু শফিকুল আলমের পায়ের উপর ঘুমানো ছাড়া তারা তাকে কখনোই স্পর্শ করেনি, যদিও সেখানে তাকে ৬ বারের জন্য রাখা হয়েছিল।.. এটাও রহস্যময় যে, যাদের উপর গুলি করে অন্যান্য বহুবন্দির হত্যার অভিযোগ -তারা কেন তাকে হত্যা করলো না?” শফিকুল আলম চৌধুরির কাহিনী যে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানায়োট সেটি বুঝবার জন্য কি বেশী লেখাপড়া ও কাণ্ডজ্ঞানের প্রয়োজন আছে? সূর্যের ন্যায় মিথ্যাও এখানে জ্বল জ্বল করছে। তবে তাজ্জবের বিষয়, এ মিথ্যা কাহিনীর প্রকাশক বটতলার কোন অর্থলোভী দুর্বৃত্ত প্রকাশক নয়, বরং খোদ বাংলা এ্যাকাডেমী -যার মূল দায়িত্ব জনস্বার্থে গবেষণামূলক বইয়ের প্রকাশনা। সে সাথে একজন সম্পাদকও খুঁজে বের করেছে।নিরেট মিথ্যা প্রচারে জনগণের অর্থে পরিচালিত দেশের সর্বোচ্চ এ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটিও যে কতটা তৎপর -এ হলো তার প্রমাণ। অন্যদের অবস্থা যে কতটা খারাপ হতে পারে সেটি কি এরপরও প্রমাণের অপেক্ষা রাখে? বরং এ প্রমাণ অসংখ্য,একাত্তর নিয়ে মিথ্যা রটনাটি পরিণত হয় এক বিশাল শিল্পে।এবং সে শিল্পের ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সে শিল্পের মূল কারিগর হলো সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিক, প্রশাসক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীগণ।

আদালতে প্রকৃত খুনিও নিজেকে নির্দোষ রূপে দাবি করে, এবং সকল দোষ বিপক্ষের ঘাড়ে চাপায়। সেটি শাস্তি থেকে বাঁচার স্বার্থে। অপরাধীদের থেকে এরচেয়ে বেশী কিছু কি আশা করা যায়। এরূপ খাসলত না থাকলে তারা অপরাধ করবে কেন? একাত্তরে সীমাহীন মিথ্যাচার হয়েছে মূলত দুটি লক্ষ্যে। এক). যারা প্রকৃত অপরাধি তারা সেটি করেছে নিজেদের অপরাধগুলোকে আড়াল করতে, অথবা সে অপরাধকে জনগণের কাছে জায়েজ করতে। দুই). রাজনৈতিক বিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে বিক্ষুব্ধ ও প্রতিশোধ পরায়ন করতে। সে বিশাল মিথ্যাচারের মাধ্যমেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাকরিচ্যুৎ ও গৃহচ্যুৎ করা, তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাঠ দখল করা, হ্যাইজাক করে মুক্তিপণ আদায় করা, কারারুদ্ধ করা, তাদের নাগরিকত্ব হরণ করা, এমন কি হত্যা ও হত্যার পর লাশগুলোকে কবর না দিয়ে নদীর পাড়ে বা ডোবায় পচিয়ে ফেলাও সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এমন বীভৎসতাই ছিল একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনা ও মূল্যবোধ। বৃটিশ শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ ঔপনিবেশিক শাসকদের কর্মচারী রূপে স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মীদের উপর অনেক জুলুম করেছে। পুলিশের চাকরি করতে গিয়ে অনেকে নিরস্ত্র ও নিরপরাধ দেশবাসীর উপর গুলিও চালিয়েছে। অনেকে বৃটিশের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করেছে। কিন্তু ১৯৪৭এর পর কি এদের কাউকে সে জন্য দালাল বলা হয়েছে? তাদেরকে কি জেলে ঢুকানো হয়েছে? কারো কি চাকুরি, ঘরবাড়ি ও নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছে? সবাইকে বরং আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে একই বিভাগে বসানো হয়েছে। এটি যেমন পাকিস্তানে হয়েছে,তেমনি ভারতেও হয়েছে।

 

লক্ষ্য গৃহযুদ্ধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্শাল পেত্যাঁ জার্মান নাৎসীদের সহায়তায় ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলে ভিশিতে এক সরকার গঠন করেছিলেন।তাঁকেও বিজেতা জেনারেল দ্যাগল এ অপরাধে হত্যা করেননি। তার বিচার হয়েছিল। বিচারে তাকে জেল দেয়া হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেনাদক্ষ হিসাবে তিনি প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এ জন্য তাঁকে পরে মুক্তি দেয়া হয়। এবং মৃত্যুর পর তাঁকে বীরের মর্যাদা দেয়া হয়। -(সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন,১৯৯৩)। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে ফজলুল কাদের চৌধুরি,আব্দুস সবুর খান,শাহ আজিজুর রহমান,নূরুল আমীন,ডাঃ আব্দুল মোত্তালেব মালেক (যিনি ৭১-এ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন),মাহমুদ আলী এবং আরো অনেক পাকিস্তানপন্থি নেতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পূর্ব বাংলার মুসলমানদের ভাগ্য পরিবর্তনে ১৯৪৭-এর পূর্বে ও পরে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।অথচ তাদেরকে দালাল ও খুনি বলা হয়েছে। বলা হয়,ফজলুল কাদের চৌধুরি,আব্দুস সবুর খান,খাজা খয়ের উদ্দিন নাকি হুকুম দিয়ে মানুষ খুন করিয়েছেন। বৃদ্ধ ডাঃ আব্দুল মোত্তলেব মালেকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। ইসলামি দলগুলোর অনেক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা নাকি পাকিস্তানী সেনা অফিসারদের নারী সরবরাহ করতো। অথচ এ অভিযোগগুলির কোনটিই প্রমাণিত হয়নি। মুজিব আমলে নয়, পরেও নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মিথ্যার প্রচার থামেনি। আওয়ামী বাকশালী চক্র ও তাদের মিত্ররা আজও এ নিরেট মিথ্যাগুলোকে জোরে শোরে লাগাতর রটনা করে। ইতিহাসের বইয়ে এসব মিথ্যা ঢুকানোর পিছনে কাজ করেছে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। সে মিথ্যাচারটি হয়েছে শেখ মুজিব ও তার দলের ইমেজকে বড় করে দেখানোর প্রয়োজনে। মিথ্যাচার হয়েছে ভারতের অপরাধগুলো লুকিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কাছে দেশটিকে বন্ধু রূপে জাহির করার প্রয়োজনে। এবং সে সাথে বিরোধীদের চরিত্রহরণ ও তাদেরকে হত্যাযোগ্য প্রমাণ করার লক্ষ্যে। যে কোন দেশের রাজনীতিতে ঘৃনা, সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি হয় তো এভাবেই। এমন এক ঘৃণাপূর্ণ পরিবেশে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকগণও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের পাইকারি হারে ফাঁসির হুকুম বা যাবতজীবন কারাদণ্ড দিবে এবং বিপুল সংখ্যক জনতা সে রায় শুনে মিষ্টি বিতরণ করবে বা উৎসব করবে তাতেই বা সন্দেহ থাকে কি? মিথ্যাচর্চা যখন জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয় তখন সেটি যে জনগণের চরিত্র এভাবে পচিয়ে দিবে -তাতেই বা বিস্ময় কিসের? বাংলাদেশ যে দুর্বৃত্তিতে পর পর ৫ বার বিশ্বে শিরোপা পেল তা তো এমন পচনের কারণেই, ভূ-প্রকৃতি বা জলবায়ুর কারণে নয়।

নানা প্রেক্ষাপটে প্রতিদেশেই বিভক্তি দেখা দেয়। সে বিভক্তি নিয়ে প্রকাণ্ড রক্তপাতও হয়। নবীজীর (সাঃ) আমলে আরবের মানুষ বিভক্ত হয়েছিল মুসলমান ও কাফের -এ দুটি শিবিরে। কিন্তু সে বিভক্তি বেশি দিন টেকেনি। সে বিভক্তি বিলুপ্ত না হলে মুসলমানগণ কি বিশ্বশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারতো? জার্মানরা বিভক্ত হয়েছিল নাজি ও নাজিবিরোধী -এ দুই দলে। সে বিভক্তিও বেশীদিন টেকেনি। তা বিলুপ্ত না হলে জার্মানগণ আজ ইউরোপের প্রধানতম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হতে পারতো? বিভক্তি দেখা দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও। সে বিভক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে আব্রাহাম লিংকনের আমলে উত্তর ও দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলোর মাঝে প্রকাণ্ড গৃহযুদ্ধ হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ তাতে নিহতও হয়েছিল। কিন্তু সে বিভক্তিও বেশী দিন টেকেনি। সেটি বিলুপ্ত না হলে দক্ষিণ আমেরিকার মত উত্তর আমেরিকাতেও উরুগুয়ে,প্যারাগুয়ে,বলিভিয়া,পেরুর ন্যায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু রাষ্ট্রের জন্ম হত। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ যেভাবে অপ্রতিদ্বন্দি বিশ্বশক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করছে তা কি সম্ভব হত? পারতো কি পৃথিবী জুড়ে প্রভাব সৃষ্টি করতে?

 

বিভক্তি ও বিদ্রোহের পাপ

আত্মপ্রতিষ্ঠা, আত্মসম্মান ও বিশাল বিজয় আসে একতার পথ ধরে। বিভক্তির মধ্য দিয়ে আসে আত্মহনন, আত্মগ্লানি ও পরাজয়। বাংলাদেশ আজ সে বিভক্তির পথ ধরেই অগ্রসর হচ্ছে। একটি দেশের জন্য এর চেয়ে বড় আত্মঘাত আর কি হতে পারে? একতার গুরুত্ব শুধু বিবেকবান মানুষই নয়,পশুপাখিও বোঝে। তাই তারাও দল বেঁধে চলে। একতা গড়া ইসলামে ফরয;এবং বিভক্তি গড়ার প্রতিটি প্রচেষ্টাই হলো হারাম। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে একতার পথে চলা ও না-চলার বিষয়টি ব্যক্তির খেয়াল খুশির উপর ছেড়ে দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে অলংঘনীয় নির্দেশ এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। পবিত্র কোরআনে তিনি সুস্পষ্ট ভাবে বলেছেন,“ওয়া তাছিমু বিহাব্‌লিল্লাহে জামিয়াঁও ওয়া লাতাফাররাকু”।‌ ‌‌‌অর্থঃ “এবং তোমরা আল্লাহর রশি (আল্লাহর দ্বীন তথা পবিত্র কোরআন বা ইসলামকে) আঁকড়ে ধর এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়োনা..।”-(সুরা আল ইমরান,আয়াত ১০৩)।মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কঠোর আযাব প্রাপ্তির জন্য মুর্তিপুজারি বা কাফের হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বিভক্তির পথে পা’বাড়ানোই সে জন্য যথেষ্ট। সে শাস্তির হুশিয়ারিও এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা তাদের মত হয়োনা যারা সুস্পষ্ট ঘোষণা আসার পরও পরস্পরে বিভক্ত হলো এবং মতবিরোধ সৃষ্টি করলো। তাদের জন্য রয়েছে কঠোর আয়াব।”-(সুরা আল ইমরান,আয়াত ১০৫)।তাই কোন মুসলিম দেশকে খণ্ডিত করা কোন ঈমানদারের কাজ নয়, একাজ ইসলামের শত্রুদের। মুসলিম ভুমির একতা রক্ষার প্রতি এরূপ কোরআনী ঘোষণা থাকার কারণে উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া খলিফাদের আমলে অখণ্ড মুসলিম ভূগোল শত শত বছর বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছে।বার বার সরকার পরিবর্তন হলেও সে অখণ্ড ভূগোল খণ্ডিত হয়নি। অথচ সে অখণ্ড আরব ভূমি আজ ২২ টুকরোয় বিভক্ত।আরবভূমিতে বিভক্তির এরূপ অসংখ্য দেয়াল গড়ে হয়েছে স্রেফ ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের সহযোগী সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট ও ট্রাইবালিস্ট নেতাদের দখলদারি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে। মুসলিম স্বার্থ বা আরব স্বার্থকে প্রতিরক্ষা দেয়া এ বিভক্তির লক্ষ্য ছিল না। এরূপ আত্মঘাতি বিভক্তির সাথে কোন ঈমানদার ব্যক্তি জড়িত ছিলেন না। কারণ ঈমানদার হওয়ার অর্থই তো প্যান-ইসলামিক হওয়া। অথাৎ ভাষা, বর্ণ, ভূগোল ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠা। বিভক্তি শুধু দুর্বলতা ও পরাধীনতাই বাড়ায়। ক্ষুদ্র ইসরাইলের হাতে এজন্যই তারা পরাজিত।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের সীসাঢালা দেয়ালের ন্যায় ঈমানদারদের একতাবদ্ধ হতে বলেছেন।কিসের ভিত্তিতে একতা গড়তে হবে সেটিও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। একতার ভিত্তিটি হলো ইসলাম;ভাষা, বর্ণ বা ভূগোলভিত্তিক জাতীয়তা নয়। মহান আল্লাহতয়ালার প্রতিটি হুকুমই অলঙ্ঘনীয়। ফলে একতা প্রতিষ্ঠার প্রতিটি প্রয়াসই পবিত্র ইবাদত, তেমনি বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা গড়ার প্রতিটি প্রয়াসই হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। দেশের রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে প্রাণদন্ড হয়।সমগ্র বিশ্বের মহাপ্রভু মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও কি তাই রহমত বয়ে আনে? এরূপ বিদ্রোহ যে শুধু পরকালে জাহান্নামে নেয় –তা নয়। দুনিয়ার বুকেও আযাবের কারণ হয়। জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের অপরাধটি শুধু স্রেফ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিল না, সেটি ছিল খোদ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রমাণ শুধু এ নয় যে,সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের রাজস্বের অর্থে একটি মুসলিম দেশে সুদী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা পাবে। বা সে অর্থে বেশ্যাবৃত্তি বা জ্বিনার ন্যায় জঘন্য হারাম কর্ম পুলিশী পাহারাদারি পাবে। বা আইন-আদালত থেকে আল্লাহতায়ালার আইনকে সরিয়ে ব্রিটিশদের রচিত কুফরি ফৌজদারি বিধি (পেনাল কোড) প্রতিষ্ঠা করা হবে। বরং মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহটি এবং মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অপরাধটি তো ঘটেছে ভাষা, বর্ণ ও পৃথক ভূগোলের নামে মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি গড়ার মধ্য দিয়ে।

১৯৪৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমগণ ভাষা ও বর্ণকে নয়, ইসলামকে আঁকড়ে ধরেছিল। বাঙালী, বিহারী, পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধি, গুজরাটি, বালুচ এরূপ নানা ভাষার মুসলিমগণ ভাষার দূরে ফেলে ঈমানী পরিচয় নিয়ে একাতাবদ্ধ হয়েছিল। তারা সেদিন ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিক ভিন্নতার সাথে ভূলে গিয়েছিল ধর্মীয় ফেরকা ও মাযহাবী বিরোধগুলোও।উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে এটি ছিল অতি অনন্য অর্জন।মুসলিম উম্মাহর মাঝে এমন ঈমানী ভাতৃত্ব মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকেও বিশাল পুরস্কার এনেছিল। সেটি হলো পাকিস্তান। সুলতান মুহাম্মদ ঘোরীর হাতে দিল্লি বিজয়ের পর উপমহাদেশের সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ মুসলিম রাষ্ট্রটি গড়তে একটি তীরও ছুড়তে হয়নি। কিন্তু সে প্যান-ইসলামিক ঐক্য ও পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ভারতীয় হিন্দুদের ভাল লাগেনি। সে ঐক্যের ভিত্তিতে উপমহাদেশের বুকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পাক বা দেশটি বেঁচে থাকুক সেটিও তারা চায়নি। অর্থাৎ শুরু থেকেই তারা ছিল উপমহাদেশের মুসলিমদের শত্রু। তারা চাইতো মুসলিমগণ ভারতীয় হিন্দুদের গোলাম রূপে বেঁচে থাকুক, স্বাধীন ভাবে নয়। ইসলামের শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে বাঁচার তো প্রশ্নই উঠে না। গরু গোশতো ঘরের রাখার মিথ্যা অভিযোগে সেদেশে নির্মম প্রহারে রাজপথে মুসলিমকে হত্যা করা হয়। সম্প্রতি ভারতীয় পত্রিকাগুলি সে খবর ছেপেছে। গরুর জীবনে যে নিরাপত্তা আছে মুসলিমের জীবনে সে নিরাপত্তা নেই।

পবিত্র কোরআনে মুসলিমদের পরিচয় পেশ করা হয়ছে হিজবুল্লাহ বা আল্লাহর দল রূপে।এমনটি কি কখনো ধারণা করা যায় যে,মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর নিজ বাহিনীতে অনৈক্য চাইবেন? এবং সেটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, বর্ণ, পতাকা বা ভৌগলিক স্বার্থের নামে? মুসলিম উম্মাহর একতা, শক্তি ও বিজয়ের চেয়ে বিভক্তির এ উপকরণগুলি কি কখনো গুরুত্ব পেতে পারে? মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর বাহিনীতে একতার যে কোন উদ্যোগে যে খুশি হবেন -সেটিই তো স্বাভাবিক। মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তির যে কোন উদ্যোগ তাই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এমন বিদ্রোহ যে ভয়ানক শাস্তি আনবে সেটিও কি দুর্বোধ্য? ১৯৪৭য়ে উপমহাদেশের মুসলমানদের একতা মহান আল্লাহতায়ালাকে এতই খুশি করেছিল যে প্রতিদানে বিশাল রহমত নেমে এসেছিল। ফলে বিশাল শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ও এসেছিল। মহান আল্লাহতায়ালার সে করুণার কারণেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় কোন যুদ্ধ লড়তে হয়নি। অস্ত্র না ধরেই বিশাল শত্রুপক্ষকে সেদিন তারা পরাজিত করতে পেরেছিল। অথচ ইংরেজ ও হিন্দু -সে সময়ের এ দুটি প্রবল প্রতিপক্ষই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সর্বপ্রকার বিরোধীতা করেছে। অথচ বাঙালী জাতীয়তাবাদী ও সেক্যুলারিস্টদের চেতনায় মুসলিম ও ইসলামের স্বার্থচিন্তাটি আদৌ স্থান পায়নি। কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি তার রাজনীতি থেকে মুসলিম ও ইসলামের স্বার্থচিন্তা বাদ দিতে পারে? এ নিয়েই তো ঈমানদারের আমৃত্যু জিহাদ।

ক্ষমতালিপ্সু শেখ মুজিব ও দলীয় নেতাকর্মীগণ দেখেছে শুধু গদিপ্রাপ্তির স্বার্থটি। গদির লোভে শয়তানের সাহায্য নিতেও তাদের কোন আপত্তি ছিল না।সেরূপ সাহায্য দিতে প্রতিবেশী ভারতও দু’পায়ে খাড়া ছিল। কারণ, পাকিস্তান ভাঙ্গার মাঝে ভারত তার নিজের বিশাল স্বার্থটি দেখেছিল। বাঙালী মুসলিমদের সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনার সামর্থ শেখ মুজিব ও তার সহচরদের ছিল না। ফলে ভারতের ন্যায় একটি অমুসলিম দেশের অর্থ,অস্ত্র ও উস্কানিতে একটি মুসলিম ভূমিকে বিভক্ত করে মুজিব ও তার সহচরগণ শুধু ভারতের গোলামী নয়, মহান আল্লাহতায়ালার আযাবও ডেকে আনে। পরিণতিতে বাংলাদেশের ন্যায় সুজলা সুফলা একটি উর্বর দেশে নেমে আসে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ।লক্ষ লক্ষ মানুষ সে দুর্ভিক্ষে মারা যায়।মুজিবের সে আত্মঘাতি রাজনীতিতে শুধু প্রাণহানি নয়, বাঙালী মুসলিমের চরম ইজ্জতহানিও হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দেশটি ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হয়। যে বাঙালী মুসলিমগণ ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের পুরা রাজনৈতিক চিত্রই পাল্টে দিল তাদের এরূপ ইজ্জতহানি বা অপমান কি কম বেদনাদায়ক? এ বিকট অপমান নিয়ে আজ থেকে হাজার বছর পরও কি ইতিহাসের পাতায় তাদের হাজির হতে হবে না? মুজিব ও তার সহচরদের চেতনায় সে ভাবনাটি কি কোন কালেও স্থান পেয়েছে?

 

অসহ্য ছিল শত্রুর কাছে

ইসলামের শত্রুপক্ষের কাছে ১৯৪৭-এর পরাজয় যেমন কাম্য ছিল না, তেমনি সহনীয়ও ছিল না। তাদের এজেন্ডা তো মুসলিম রাষ্ট্রগুলিকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করা। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইন্সটিটিউশন হলো খেলাফত। খেলাফতের মূলে ছিল প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব;এবং ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার সীমানা ডিঙ্গিয়ে মুসলিম ঐক্য। সে সাথে লক্ষ্য ছিল বিশ্বশক্তি রূপে মজবুত প্রতিরক্ষা ও আত্মসস্মান নিয়ে বাঁচা। সংঘাতময় এ বিশ্বে যাদের সামরিক শক্তি নাই তাদের কি স্বাধীনতা ও ইজ্জত থাকে? খেলাফতের কারণেই ইংরেজ, ফরাসী, ডাচ, স্পানীশ, পুর্তগীজ ও ইউরোপের নানা ঔপনিবেশিক শক্তি এশিয়া,আফ্রিকা ও আমেরিকার বহুদেশে সাম্রাজ্য বিস্তারে সফল হলেও মধ্য এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার খেলাফতভূক্ত মুসলিম ভূমিতে প্রবেশের সুযোগ পায়নি। নেকড়ে সব সময়ই ছাগল-ভেড়া খোঁজে, বিশাল হাতি নয়। একারণে শুরু থেকেই তাদের টার্গেট ছিল, খেলাফতের বিনাশ ঘটিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তাঁবেদার রাষ্ট নির্মান করা এবং সে রাষ্ট্রগুলির মাঝে ইসরাইলের ন্যায় স্যাটেলাইট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।সে সাথে লক্ষ্য ছিল, মুসলিম বিশ্বের বিশাল সম্পদের উপর অবিরাম সাম্রাজ্যবাদী শোষণের অবকাঠামো নির্মাণ। চৌদ্দশত বছর পর অবশেষে ১৯২৩ সালে তারা সে লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়।ফলে জর্দান, কাতার,কুয়েত, দুবাই, বাহরাইনে মত বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এলাকা -যা এক সময় উসমানিয়া খেলাফতের অধীনে জেলার মর্যাদাও রাখতো না সেগুলিকেও রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়। এরূপ বিভক্তির কারণেই মুসলিম ভূমির তেল ও গ্যাসের ন্যায় সম্পদ থেকে মুসলিমদের চেয়ে বেশী লাভবান হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি।

মুসলিম উম্মাহ আজ শক্তিহীন ও প্রতিরক্ষাহীন। জাতীয়তাবাদীদের সৃষ্ট বিভক্তিই মুসলিমদের এরূপ পঙ্গুত্ব ও অপমান বাড়িয়েছে। পবিত্র আল আকসা মসজিদসহ বিশাল মুসলিম ভূমি আজ অধিকৃত। আন্তর্জাতিক ফোরামে দেড়শত কোটি মুসলিমের কথা কেউ আজ শোনে না। খেলাফত ভেঙ্গে প্রতিষ্ঠা প্রায় তিরিশটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। খেলাফত বিলুপ্ত হওয়ার কিছুদিন পরই প্রতিষ্ঠা পায় নানা ভাষাভাষীর মুসলমানদের নিয়ে সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। তাদের চোখের সামনে পাকিস্তানের ন্যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটবে এবং সেটি টিকে থাকবে সেটি তাদের কাছে অসহ্য ছিল। ফলে পাকিস্তান জন্ম থেকেই ইসলামবিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের টার্গেটে পারিণত হয়। ভারত সে লক্ষ্যে কাজ করছে ১৯৪৭ সাল থেকেই। আরবদেরকে এরাই বিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত করেছে। নব্যসৃষ্ট এসব দেশগুলির প্রতিটিতে এমন সব স্বৈরাচারি তাঁবেদারকে বসিয়েছে যাদের কাছে ব্যক্তিস্বার্থ বা গোত্রীয় স্বার্থ ছাড়া কোন মহত্তর ভাবনা গুরুত্ব পায় না। তাদের মূল কাজ, সাম্রাজ্যবাদীদের গড়া বিভক্ত ভূগোলকে টিকিয়ে রাখা। বিভক্তির প্রাচীর ভেঙ্গে এক অখণ্ড রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে কোন প্রয়াসই তাদের কাছে চরমশাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অপরাধে প্রাণদণ্ডও দেয়া হয়।

একই কারণে পাকিস্তানের ন্যায় ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশও আজ শত্রুশক্তির টার্গেট। বিশেষ করে ভারতের। ভারতের পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের ন্যায় আরেক শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের সৃষ্টিকে যে তারা মেনে নেবে না, তাদের সে ঘোষণাটিও সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের মানুষ আল্লাহর দেয়া শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করুক সেটিও তারা মানতে রাজী নয়। বাঙালী মুসলিমগণ আল্লাহর অনুগত বান্দাহ হোক ও তাঁর আইনের আপোষহীন অনুসারি হোক এতেও তাদের আপত্তি। ইসলামের এ অতি সনাতন রূপকে তারা ‘মৌলবাদ’ বলে। এজন্যই বাংলাদেশের অখণ্ড ভূগোল যেমন ভারতীয় আগ্রাসনের টার্গেট, তেমনি টার্গেট হলো একতাবদ্ধ মুসলিম জনগণও। যে কারণে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাদের প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল তেমনি আগ্রহ বাংলাদেশকে ব্যর্থ ও খণ্ডিত রাষ্ট্রে পরিণত করায়। এজন্যই ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরের পর পরই শুরু হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্যাপক লুণ্ঠন। তাদের হাতে পাকিস্তান আর্মির ফেলে যাওয়া অস্ত্রই শুধু লুট হয়নি। লুট হয়েছে অফিস-আদালত ও কলকারখানার বহু হাজার কোটি টাকার মালামাল। নিজেদের লক্ষ্য পূরণে পাকিস্তান ভাঙ্গাটি তাদের কাছে ছিল প্রথম পর্ব মাত্র, শেষ পর্ব নয়। তারা বাংলাদেশকেও ক্ষুদ্রতর করতে চায়। ভূগোল ভাঙ্গার লক্ষ্যে ভারতীয় সরকার ও পুলিশের সামনে পশ্চিম বাংলার মাটিতে প্রতিপালিত হচ্ছে “স্বাধীন বঙ্গভূমি” প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, বরিশাল এসব প্রাক্তন বৃহত্তর জেলাগুলোকে বাংলাদেশ থেকে পৃথক করে এরা স্বাধীন বঙ্গভূমি রাষ্ট্র গড়তে চায়। এদের নেতা চিত্তরঞ্জন সুতার আওয়ামী লীগের টিকেটে সংসদ সদস্য ছিলেন। শুধু সেটিই নয়, ভারত সরকার অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহীদের নিজ ভূমিতে বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ভারতের একাত্তরের ভূমিকার বিশ্লেষণ করতে হবে এসব বাস্তব ঘটনাবলিকে সামনে রেখে। নইলে একাত্তরের সঠিক ইতিহাস রচনার কাজ ব্যর্থ হবে।

 

এ সংঘাত শেষ হবার নয়

মুসলমানদের লাগাতর বিভক্ত রাখাই ইসলামের শত্রুপক্ষের স্টাটেজী। সে লক্ষ্যে তাদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো, মুসলমানদের মাঝে বিভেদের সূত্রগুলো খুঁজে বের করা এবং সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযোগী হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে একাত্তরের মতবিরোধ। ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ চাইলে কি হবে, একাত্তরের ঘটে যাওয়া বিবাদ ও বিভক্তির সে দহন বেদনা থেকে বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি নেই। বরং সে বিভক্তিকে আরো বিষাক্ত ও প্রকট করে ইসলামের শত্রুপক্ষ বাংলাদেশে আরেকটি গৃহযুদ্ধ বাধাতে চায়। তাই স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিতর্ক শেষ হবার নয়। বরং এ বিভেদ স্থায়ী রাখতে ভারত ও তাঁর তাঁবেদার পক্ষ অবিরাম ইন্ধন জোগাতেই থাকবে। ভারতের সাথে এখন যুক্ত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র পক্ষ। ইসলামের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে এরা সবাই মিলে গড়ে তুলেছে গ্লোবাল কোয়ালিশন। ইসলামকে এরা সবাই নিজেদের প্রতিপক্ষ শক্তি রূপে দাঁড় করিয়েছে। সবার অভিন্ন লক্ষ্য, ইসলামপন্থিদের চরিত্রহনন। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলমান যে মুসলিম উম্মাহর অংশ সে বিষয়টি বহু মুসলিম ভুলে গেলেও তারা ভুলতে রাজি নয়। “বিভক্ত কর এবং শাসন করো” -এটাই শত্রুপক্ষের নীতি। ফলে যে লক্ষ্যে আরবদের বিভক্ত রেখেছে সেই একই লক্ষ্যে বাংলাদেশের মুসলমানদেরকেও তারা বিভক্ত করে রাখতে চায়। সে বিভক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যেই বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের বিনিয়োগ শত শত কোটি ডলার। বিপুল বিণিয়োগে নেমেছে ভারত সরকারও। তবে শিল্পখাতে নয়। অর্থনীতির অন্য খাতেও নয়। বিনিয়োগ হচ্ছে দেশের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, টিভি চ্যানেল, মিডিয়াকর্মী, রাজননৈতিক নেতা এবং এনজিও পরিচালকদের উপর। এদের কাজ, একাত্তরে মুসলিম ঘরে বিভক্তির যে আগুন লেগেছিল তাতে অবিরাম পেট্রোল ঢালা। সে কাজটি কতটা সুচারু ভাবে হচ্ছে সেটি বুঝা যায়,মুসলিমদের মাঝে পরস্পরে ঘৃনা, হিংসা ও বিভক্তি কতটা তীব্রতা নিয়ে বেঁচে আছে তা থেকে।

 

সাতচল্লিশের প্রজ্ঞা

স্বাধীনতার রক্ষা প্রতিটি দেশের জন্যই অতি ব্যয়বহুল। পাকিস্তানের মত বহুদেশের জাতীয় বাজেটের বিশাল ভাগ খরচ হয়ে যায় প্রতিরক্ষা খাতে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তো সে ব্যয়ভারে ভেঙ্গেই গেল। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত ধনী দেশও সে বিশাল বাজেট নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এ দেশটি তাই সে ব্যয়ভার কমাতে পার্টনার খুঁজছে। যে কোন ক্ষুদ্র দেশের পক্ষে এ বিশাল ব্যয়ভার বহন করাটিই অসম্ভব। মাথাপিছু আয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশী হওয়া সত্ত্বেও সে সামর্থ্য কুয়েত, কাতার, আমিরাত বা সৌদিআরবের নেই। এ দেশগুলোর তেল সম্পদ যতই হোক,ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূগোলই তাদেরকে নতুন সফর প্রকাশনী ৪৪,পুরানা পল্টন দোতালা, স্বাধীন থাকাকে অসম্ভব করে রেখেছে। তাদের পরাধীনতা ফুটে উঠে সেখানে মার্কিনীদের ঘাঁটি দেখে। মুসলিম খেলাফত ১৪ শত বছর যাবত টিকেছিল প্যান-ইসলামি চেতনা, বিশাল ভূগোল এবং সে ভূগোলে বসবাসকারি বিশ্বের সর্ববৃহৎ জনসংখ্যার কারণে। বিশাল জনগন বহন করতো সে খেলাফতের প্রতিরক্ষার ব্যয়ভার। তেমনি মোঘল সাম্রাজ্যও দীর্ঘ বহুশত বছর স্বাধীন ছিল তার বিশাল ভূগোল ও জনসংখ্যার কারণে। সে সাম্রাজ্য রক্ষার সবচেয়ে বড় খরচটি যেত সুবে বাংলা থেকে। আলীবর্দী খাঁর হাতে বাংলা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দারুন ভাবে দুর্বল হয় মোঘল শাসন। কিন্তু তাতে বাংলার স্বাধীন থাকার সামর্থও বাড়েনি। বরং বেড়েছে পরাধীনতার বিপদ, এবং সেটিই প্রমাণিত হয় ১৭৫৭ সালে পলাশীতে। বস্তুত যখন থেকেই মোঘল সাম্রাজ্যের ভূগোল ছোট হতে শুরু হয়, তখন থেকেই বাড়তে থাকে ভারত জুড়ে পরাধীনতা। একই অবস্থা হয়েছে আরব দেশগুলির। দল থেকে বিচ্ছিন্ন ভেড়াটি যেমন সর্ব প্রথমে বাঘের পেটে যায়, তেমনি উপমহাদেশে সর্বপ্রথম ঔপনিবেশিক শাসনের খপ্পড়ে পড়ে মোঘল সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন বাংলা। অথচ দিল্লি পরাধীন হয় ১০০ বছর পর ১৮৫৭ সালে। সেটিরই পুনরাবৃত্তি ঘটে ১৯৭১য়ে। তাই ভারত তার ২৫ সালা চুক্তি, সীমান্ত বাণিজ্য ও দেশের মধ্য দিয়ে করিডোর ও অর্থনৈতিক আধিপত্য সিন্ধু বা বেলুচিস্তানের ন্যায় অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির উপর চাপাতে পারিনি তা চাপিয়েছে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশের উপর। পাকিস্তান সীমান্তে কাউকে তারকাটার দেয়ালে ঝুলে লাশ হতে হয় না, কিন্তু সেটি হয় বাংলাদেশ সীমান্তে। এটিই হলো শক্তিহীন ও ক্ষুদ্রতর হওয়ার বিপদ। এ বিপদের ভাবনাই ১৯৭১য়ে অনেককে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে টেনেছিল।

স্বাধীন থাকাটি ব্যয়বহুল ও রক্তক্ষয়ী হলেও সেটিই মানব জীবনে সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ। স্বাধীনভাবে বাঁচার আনন্দটাই আলাদা। তাছাড়া মুসলমানদের কাছে নিজ ধর্ম, নিজ সংস্কৃতি ও নিজ এজেণ্ডা নিয়ে বাঁচার জন্য স্বাধীনতা অপরিহার্যও। কোন কাফের দেশে পূর্ণাঙ্গ মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাই অসম্ভব। এজন্যই মর্যাদাশীল জাতি লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ দিয়ে হলেও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে। স্বাধীন থাকার জন্য শুধু একখানি পতাকা, একটুকরা ভূমি, একজন প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হলেই চলে না। স্বাধীনতা রক্ষার সামর্থ্যও থাকা চাই। পূর্ব বাংলার মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দেশটির ক্ষুদ্র ভূগোল। ১৯৪৭য়ে বাংলার মুসলিম নেতৃবৃন্দ বাংলার মুসলমানদের সে সীমিত সামর্থে অজ্ঞ ছিলেন না। স্বাধীন বাংলাদেশের বদলে অখণ্ড পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে তাদের মূল গরজটি ছিল একারণেই। লাহোর প্রস্তাবে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানে ভূক্ত করার সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু বাংলার মুসলিম নেতাগণই সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের দিল্লি সম্মেলনে লাহোর প্রস্তাবে সংশোধনী আনেন, এবং তাদের দাবীতেই গৃহিত হয় বাংলাকে অখণ্ড পাকিস্তানের মধ্যে অন্তর্ভূক্তির প্রস্তাব। সেকালের বাংলার মুসলিম নেতাগণ যে বিচক্ষণ ও দুরদৃষ্টির অধিকারি ছিলেন তারই প্রমাণ হলো,১৯৪৭য়ে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানে শামিল করা। সেরূপ দুরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা কাশ্মীরের শেখ আব্দুল্লাহর ছিল না। ফলে কাশ্মীর আজও ভারতের পদতলে পরাধীনতার জোয়াল টানছে। অথচ আজ বলা হচ্ছে, একাত্তরে বাংলাদেশ সৃষ্টি হলো লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। বলা হচ্ছে, ১৯৪৬ সালে বাংলার পাকিস্তান ভূক্তির প্রস্তাবটি ছিল বাংলার মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা!

 

সাতচল্লিশের স্বাধীনতা ও একাত্তরের স্বাধীনতা

১৯৪৭য়ে বাংলার মুসলিম লীগ নেতাদের লক্ষ্য ছিল প্রকৃত স্বাধীন হওয়া;সিকিম, ভুটান বা মেরুদণ্ডহীন বাংলাদেশ হওয়া নয়।একাত্তরে ২৫ বছরের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব ভারতকে যে কোন সময় বাংলাদেশে সৈন্য অনুপ্রবেশসহ সামরিক হস্তক্ষেপের পূর্ণ অধিকার দিয়েছিলেন। অথচ স্বাধীনতার হেফাজতে ভারতীয় হামলার বিরুদ্ধে পাকিস্তান দুই-দুইটি যুদ্ধ লড়েছে, ব্যয় করেছে হাজার হাজার কোটি টাকা। পারমানবিক বোমার অধিকারি এ দেশটি তেমন একটি লড়াইয়ে এখনও প্রস্তুত। কিন্তু সে সামর্থ্য কি বাংলাদেশের আছে? আর না থাকলে স্বাধীনতাই বা কতটুকু থাকে? স্বাধীনতার বিষয়টি আগ্রাসী শক্তির কাছে দয়াভিক্ষার বিষয় নয়। মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো স্বাধীনতা;সবচেয়ে বড় কোরবানী দিতে হয় সে স্বাধীনতার সুরক্ষায় -রাস্তাঘাট, নগর-বন্দর, কলকারখানা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে নয়। স্বাধীনতা রক্ষায় শুধু লোকবলই যথার্থ নয় -অর্থবল,অস্ত্রবল এবং ভূগোলের বলও চাই। আর সে বল না থাকলে জাতীয় জীবনে পরাধীনতা নেমে আসে। আজকের ইউরোপের দেশগুলো একতাবদ্ধ ইউরোপীয় যুক্তরাষ্ট্রের বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্ম দিয়েছে নিজেদের সে সীমিত সামর্থ্যের কথা ভেবেই। একই কারণে অখণ্ড ভারতে একীভূত হয়ে আছে ভারতের নানা ভাষার বিশটির বেশী প্রদেশ। নইলে ভারত ভেঙ্গে ২০টির বেশী বাংলাদেশ সৃষ্টি হতে পারতো। কিন্তু এভাবে দেশের সংখ্যা বাড়লে কি ইজ্জত বাড়ে? বাড়ে কি স্বাধীনতা?

তাই ইসলাম শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের বিধানই দেয়না,দেশের অখণ্ডতা ও স্বাধীনতার বিধানও দেয়। এজন্যই দেশভাঙ্গাকে ইসলামে হারাম ঘোষিত হয়েছে এবং দেশের অখণ্ডতা রক্ষাকে করা হয়েছে ফরজ। মহান নবীজীর হাদীসঃ মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষায় এক মুহুর্ত ব্যয় সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম। উমাইয়া, আব্বসীয় ও উসমানিয়া খেলাফতের বিশাল ভূখণ্ড শত শত বছর যাবত বাঁচার যে সামর্থ্য পেয়েছে তো এরূপ গভীর ধর্মীয় চেতনার কারণেই।রাষ্ট্র গঠনের বুনিয়াদ ইসলাম হতে পারে না –এ যুক্তি যারা প্রচার করে তাদের সে যুক্তিকে ভিত্তিহীন প্রমাণ করে নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মুসলমানদের নিয়ে গড়া খেলাফত। পাকিস্তান ভাঙ্গার যুদ্ধে তাই কোন ইসলামি দল, পীর-মাশায়েখ, আলেম ও মাদ্রাসার ছাত্রকে পাওয়া যায়নি। সে যুদ্ধে যোদ্ধা খুঁজতে হয়েছে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টির ন্যায় সেক্যুলার ও বামপন্থি দলগুলির ইসলামি চেতনাশূণ্য ও ধর্মে অঙ্গিকারশূণ্য কর্মীদের মাঝ থেকে। বাংলাদেশের ইতিহাস রচনার কাজটিও তারাই হাতে নিয়েছে।এভাবে নিজেদের পক্ষে তারা নিজেরাই উকিলে পরিণত হয়েছে। ফলে প্যান-ইসলামি দর্শনের গুরুত্বপূণূ বিষয়টিকে আলোচনায় আনা হয়নি। ফলে গুরুত্ব পায়নি এবং বিবেচনায় আনা হয়নি বাঙালী মুসলিমের কল্যাণে ইসলামের অনুসারিদের অঙ্গিকার ও কোরবানি। বরং গুরুত্ব পেয়েছে,কিভাবে ধর্মহীন জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজমের ধ্বজাধারীদের মহান করা যায় সে বিষয়টি। ফলে একাত্তর নিয়ে তাদের রচিত সমুদয় বই ও সাহিত্য জুড়ে প্রচার পেয়েছে পক্ষপাতদুষ্ট হিংসাত্মক অভিমত। সেক্যুলারিজম, সোসালিজম ও জাতীয়তাবাদের বিবেচনায় ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানোই তো অপরাধ –সেটি সাতচল্লিশে হোক, একাত্তরে হোক বা আজ হোক।তাদের লড়াই ও কোরবানি চিত্রিত হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা রূপে। কথা হলো, মহান নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ ও প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ ইসলামের জন্য এত যে জিহাদ করলেন, প্রাণ ও মালের যে বিশাল কোরবানি দিলেন, পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যেকে পরাজিত করে ইসলামকে যেভাবে বিশ্বশক্তির মর্যাদা দিলেন -তাদেরকে কি বলা যাবে? সেটিও কি সাম্প্রদায়িকতা? তারা যাই বলুন, সেটিই তো ইসলাম। মুসলিম তাদের রচিত ইতিহাসের বইয়ে তাই ব্রিটিশ বিরোধী সাতচল্লিশের স্বাধীনতার নায়কদের পরিকল্পিত ভাবেই মূল্যায়ন করা হয়নি।কারণ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এসব ইসলামচ্যুতদের কোন ভূমিকাই ছিল না। তারা ছিল অখণ্ড ভারতের পক্ষে। প্রশ্ন হলো,তাদের রচিত একাত্তরের এ বিকৃত ইতিহাসটি জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্ট শিবিরে যতই পবিত্র গণ্য হোক,ধর্মপ্রাণ মুসলিমের কাছে তা কি আদৌ কোন মূল্য রাখে?

 

গ্রন্থপঞ্জি

  • Bose, Sarmila. Dead Reckoning: Memories of the 1971 Bangladesh War, London: C. Hurst & Company, 2011.
  • ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন,একাত্তরের স্মৃতি,ঢাকা: নতুন সফর প্রকাশনী,১৯৯৩।

 




অধ্যায় তিন: নিহত তিরিশ লাখের কাহিনী

অপরাধ সত্য লুকানোর

প্রতি যুদ্ধেই রক্তপাত ঘটে; রক্তপাত একাত্তরেও ঘটেছিল। নিহত ও আহত হয়েছিল হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু। কিন্তু সে যুদ্ধে কতজন নিহত হয়েছিল সে সংখ্যা এখনও সঠিক ভাবে নির্ণীত হয়নি। ১৭ কোটি বাংলাদেশীর এটি এক বড় ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতা নিয়ে আজ থেকে বহুশত বছর পরও প্রশ্ন উঠবে। পশুপাখীরা নিজেদের মৃত সাথীদের লাশ গণনার সামর্থ্য রাখে না। এটি তাদের অসামর্থ্যতা। একই রূপ অসামর্থ্যতা ধরা পড়ে বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রেও। উন্নত দেশের সরকারগুলি দুর্যোগে গরু-ছাগল মারা গেলও তার সঠিক হিসাব রাখে। দেশে কতটা পশু সম্পদের ক্ষতি হলো এভাবে তার খতিয়ান নেয়। আজ থেকে শত শত বছর পর তখনকার প্রজন্ম বাংলাদেশীদের সে অসামর্থ্যতা দেখে কি বিস্মিত হবে না? বলা হয়, একাত্তরে নিহতদের সংখ্যা তিরিশ লাখ। অথচ তার কোন তথ্য-প্রমাণ নাই। কারণ, গ্রাম-গঞ্জে নেমে কেউই নিহতদের তালিকা তৈরি করেনি। সাহিত্য, পত্র-পত্রিকা, ফিল্ম ও ইতিহাসের বইয়ে তিরিশ লাখ নিহতের যে তথ্যটি দেয়া হয় সেটি মাঠ পর্যায়ে কোন রূপ জরিপ বা তথ্য সংগ্রহ না করেই। বলা হয় নিতান্তই লাগামহীন অনুমানের ভিত্তিতে। ফলে কোন বিবেকমান মানুষের কাছে কি সে তথ্য বিশ্বাসযোগ্য হয়? একাত্তরের যুদ্ধে কতজন নিহত হলো সেটি গণনা করার সামর্থ্য যে সরকারের ছিল না –বিষয়টি আদৌ তা নয়। তবে না করার কারণটি অন্যত্র। নিহতদের সংখ্যা নির্ণয়ের সে কাজটি তারা করেনি নিজেদের রটানো বিশাল মিথ্যাকে লুকানোর স্বার্থে। অথচ সত্য আবিস্কার করা প্রতিটি বিবেকমান মানুষের অতি মৌলিক দায়িত্ব। একমাত্র মিথ্যাচারীরাই সত্য আবিস্কারে উদাসীন হতে পারে। গুরুতর অপরাধটি এখানে সত্য লুকানোর –ইসলামে যা মহাপাপ।

তিরিশ লাখ নয়, এমন কি এক একজনের মৃত্যুও বেদনাদায়ক এবং অনাকাঙ্খিত। কিন্তু সে গভীর বেদনাটি মিথ্যা বলার ন্যায় পাপের অনুমতি দেয় না। কোন বেদনাদায়ক ঘটনার সাথে মিথ্যার মিশ্রন ঘটলে সেটি বরং কদর্যকর এবং নিন্দনীয় হয়। ঘটনা যত নৃশংস ও বেদনাদায়কই হোক, নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে বললে তাতে সম্মান বাড়ে না। বরং মিথ্যাবাদী রূপে দেশে-বিদেশে হেয় হতে হয়। মিথ্যার মিশ্রনে তখন কলংকিত হয় দেশের ইতিহাস। স্বাধীনতার মর্যাদা বাড়াতে সেটি জরুরীও নয়। তাছাড়া জনগণ ও নতুন প্রজন্মের উপর এমন মিথ্যাচারের কুফলটিও কি কম? এতে প্রতিষ্ঠা পায় মিথ্যা বলার সংস্কৃতি; এবং জন-জীবনে গড়ে উঠে প্রতি পদে মিথ্যা বলার অভ্যাস। তবে বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে মিথ্যা বলার বিশাল রাজনৈতিক উপযোগীতা আছে;সেটি ভারতের স্বার্থসেবী বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের কাছে। তাদের কাছে বিশাল আকারের মিথ্যার প্রয়োজনটি ছিল মূলত একাত্তরের যুদ্ধকালে বাঙালী মুসলিমদের মাঝে যে ভাতৃঘাতি বিভক্তি, যুদ্ধ ও ঘৃনা সৃষ্টি হয়েছিল সেটিকে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে। তাতে সহজ হয় বাংলাদেশীদের দীর্ঘকাল বিভক্ত ও পঙ্গু রাখা। শক্তিশালী বাংলাদেশের নির্মাণ রোধে ও ইসলামের উত্থান প্রতিরোধে এমন মিথ্যাচারই হলো তাদের প্রধান অস্ত্র। ভারত এবং ভারত-সেবী নেতাকর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা এজন্যই সে মিথ্যাকে বাঁচিয়ে রাখতে এতো সচেষ্ট। ফলে চায় না, নিহতদের সঠিক সংখ্যা নির্ণয়ে কোন জরিপ হোক।

 

কেন এ বিশাল মিথ্যা?

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত এবং ভারতপন্থী আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি হলো,একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সামরিক এ্যাকশনের মূল লক্ষ্যটি ছিল বাঙালী নির্মূল। বলা হয়, তারা নাকি শুধু বাংলার মাটি চাইতো,মানুষ নয়! নিহত তিরিশ লাখের কিসসা মূলত সে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে। যাদের বিরুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি বাঙালী নির্মূলের অভিযোগ, তাদের হাতে ৩০ লাখের কম নিহত হলে কি সে অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য বানানো যায়? হিটলার ৬০ লাখ ইহুদী হত্যা করেছিল। হিটলার যে ইহুদীদের নির্মুল চাইতো -সেটি অনেকেই তাই বিশ্বাস করে নিয়েছিল। ফলে নয় মাসে কমপক্ষে ৩০ লাখ বাঙালী নিহত না হলে পাকিস্তান সরকারর বিরুদ্ধে বাঙালী নির্মূলের অভিযোগটি দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য বানানো যায় কেমনে? তিরিশ লাখের তথ্যটি আবিস্কৃত হয়েছে তাই রাজনৈতিক প্রয়োজনে। মাঠে ময়দানে গণনাকারি নামিয়ে কত জন মারা গেল সে হিসাব নিলে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে মুজিবের অভিযোগটি ডাহা মিথ্যা প্রমাণিত হতো,সেটি খোদ মুজিবও জানতেন। তাই একাত্তরের নিহতদের সঠিক সংখ্যা সংগ্রহকে তিনি নিজের রাজনীতির জন্য অতিশয় ক্ষতিকর ভেবেছেন। মিথ্যাচারীরা একই কারণে প্রতি যুগে সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। একই চেতনা কাজ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝেও। নইলে আজও কি সঠিক পরিসংখ্যান বের করা এতো কঠিন? নিহত আপনজনদের কথা কোন পরিবার কি শতবছরেও ভূলে? ফলে একাত্তরের নিহতদের স্মৃতি মাত্র ৪০ বা ৫০ বছরেই তারা ভূলে বসবে -সেটিও কি বিশ্বাস করা যায়?

অনেকের বিশ্বাস, তিরিশ লাখের সংখ্যাটি আবিস্কার করেছে ভারত। ভারতের এজেন্ডা শুধু পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টি করাই ছিল না, পাকিস্তানীদেরকে বিশ্বের দরবারে হিংস্র, বর্বর ও কুৎসিত রূপে চিত্রিত করাটিও। সে সাথে নিজেকে মানবতার অবতার রূপে জাহির করা। অথচ ভারতে সংখ্যালঘু নির্মূলে বিগত ৬০ বছরে যতগুলি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে তা বিশ্বের তাবত দেশেও হয়নি। নিজের স্বার্থে ভারত চায়, উপমহাদেশের মুসলিমদের বাঙালী-অবাঙ্গলী, পাকিস্তানপন্থী ও পাকিস্তান-বিরোধী এরূপ নানা পরিচয়ে বিভক্ত রাখা। পাকিস্তান থেকে ফেরার পথে শেখ মুজিব যখন লন্ডন আসেন তখন ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে নিহত তিরিশ লাখের তথ্যটি তাঁর কানে প্রথমে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ভারতই যে এ সংখ্যার জনক সে অভিমতটি প্রখ্যাত মার্কিন গবেষক Professor Richard Sisson এবং Professor Leo Rose এর। ভারত-প্রদত্ত এ তথ্য নিয়ে সন্দেহ করার সাহস শেখ মুজিবের ছিল না। এবং ছিল না ভারতকে মিথ্যুক রূপে প্রমানিত করায় তাঁর সামান্যতম আগ্রহ। বরং মুজিব ও তার সহচরগণ তখন কৃতজ্ঞতায় ভারত বন্দনায় মগ্ন। তাছাড়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘৃনাকে বাঁচিয়ে রাখায় মধ্যে ভারতের ন্যায় তিনিও নিজের রাজনৈতিক লাভ দেখেছিলেন। তাই মুজিব সরকারের পক্ষ থেকে নিহত তিরিশ লাখের সংখ্যাটি প্রচার করা হয় এবং ইতিহাসের গ্রন্থাবলিতে তুলে ধরা হয় কোনরূপ জরিপ না করেই।

 

তিরিশ লাখ ও ইমেজ সংকট

নিহত তিরিশ লাখের তথ্যটি বিদেশী সাংবাদিকগণও প্রথম দিকে কোনরূপ বিচার-বিশ্লেষণ না করেই প্রচার করতে থাকে। বিভিন্ন দেশের পত্রিকায় নিহতদের সংখ্যা সে সময় তিরিশ লাখ বলেই ছাপা হয়। তবে তারা উল্লেখ করতো,পরিসংখ্যানটি বাংলাদেশ সরকারের দেয়া। সাংবাদিকগণ গবেষক,বিশেষজ্ঞ বা বিচারক নন। তাদের কাজ মাঠে নেমে জরিপ করা নয়। তাদের পেশা,দেশের ক্ষমতাসীন সরকার বা অন্য পক্ষ কি বলে সেটিই হুবহু প্রচার করা। মজার ব্যাপার হলো, আওয়ামী বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীগণ বিদেশী সাংবাদিকদের সেসব রিপোর্টগুলিকে আবার নিজেদের পরিসংখ্যানের পক্ষে দলিল রূপে পেশ করে। এবং সেগুলিকে আদালতে সাক্ষ্য রূপে পেশ করছে একাত্তরের পাকিস্তানপন্থীদের ফাঁসীতে ঝুলানোর লক্ষ্যে। কিন্তু বিদেশীদের কাছে এ সংখ্যাটি সহসাই অতি অবিশ্বাস্য বড় রকমের মিথ্যা রূপে গণ্য হয়। এতে সংকটে পড়ে বাংলাদেশের ইমেজ। প্লাবনে বা ভূমিকম্পে যে পরিবারের নিহতের সংখ্যা এক বা দুইজন, সে পরিবারটি যদি বাড়িয়ে চার জন বলে প্রচার করে -তবে কি সে পরিবারের সম্মান থাকে? আন্তর্জাতিক সমাজে বাংলাদেশের ইজ্জতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গ্লানিকর কটাক্ষ শুরু হয় মূলত নিহতের সংখ্যা তিরিশ লাখ রটনা করার পর থেকে। তার কিছু উদাহরন দেয়া যাক। সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড নিক্সন। তাঁর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। তিরিশ লক্ষটি মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে কতটা উদ্ভট ও অবিশ্বাস্য লেগেছিল সেটি ফুটে উঠেছে সে সময়ের মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট মন্ত্রী) মি. উইলিয়াম রজার্সের সাথে হেনরি কিসিঞ্জারের আলাপে। কিসিঞ্জার রজার্সকে বলেছিলেন: “Do you remember when they said there were 1000 bodies and they had the graves and they couldn’t find 20?” অনুবাদঃ আপনার কি মনে আছে যখন তারা (বাংলাদেশীরা) বলেছিল যে এক হাজার মৃতদেহ আছে এবং তাদের কবরও আছে। অথচ তারা খুঁজে বিশ জনও পায়নি। হেনরি কিসিঞ্জারের এই একটি বাক্যের মধ্য দিয়েই ফুটে উঠেছে নিহত তিরিশ লাখের তথ্যটি তাদের কাছে কতটা বড় রকমের অবিশ্বাস্য মিথ্যা মনে হয়েছে।

নিহতদের সংখ্যা ও গণকবর নিয়ে কঠাক্ষটি শুধু হেনরি কিসিঞ্জারের একার নয়। একই রূপ কঠাক্ষ করেছেন লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ানি পত্রিকার William Drummond। তিনি ১৯৭২ য়ের জুনে এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, “Of course, there are ‘mass graves’ all over Bangladesh. But nobody, not even the most rabid Pakistani-hater, has yet asserted that all these mass graves account for more than about 1,000 victims. Furthermore, because a body is found in a mass grave does not necessarily mean that the victim was killed by the Pakistani Army”. অনুবাদঃ “অবশ্যই বাংলাদেশ জুড়ে গণ-কবর রয়েছে। কিন্তু কেউই –এমনকি যারা চরম ভাবে পাকিস্তান বিদ্বেষী তারাও এতোটা প্রত্যয়ের সাথে বলতে পারিনি যে, সে সব গণকবরে সব মিলিয়ে এক হাজারের বেশী লাশ আছে। উপরুন্ত, গণকবরে লাশ পাওয়া গেলেই সেটি প্রমাণিত হয় না যে,সে ব্যক্তি পাকিস্তানে আর্মির হাতে নিহত হয়েছিল।”

তিনি আরো লিখেন, “Killing fields and mass graves were claimed to be everywhere, but none was forensically exhumed and examined in a transparent manner, not even the one in Dhaka University. Moreover, the finding of someone’s remain cannot clarify, unless scientifically demonstrated, whether the person was Bengali and non-Bengali, combatant or non-combatant, whether death took palce in the 1971 war, or whether it was caused by the Pakistan Army”. অনুবাদঃ “বলা হয়, বধ্যভূমি ও গণকবর ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। কিন্তু কোথাও এ অবধি লাশকে কবর থেকে বের করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ময়নাতদন্তের আয়োজন করা হয়নি। এমন কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও নয়। তাছাড়া কারো মরদেহের পেলেই সে কি বাঙালী না অবাঙালী ছিল, যোদ্ধা না অযোদ্ধা ছিল বা উনিশ শ’ একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিল -সেটি প্রমাণিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষার।” অথচ বাংলাদেশে সেরূপ কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষার আয়োজন হয়নি। কারা মারা গেল, কতজন মারা গেল এবং কাদের হাতে মারা গেল, সেটি নির্ধারিত হয়েছে নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। এবং গুজবের ভিত্তিতে। সে গুজবের পিছনে কাজ করেছিল রাজনৈতিক মতলব। তাই ইতিহাস থেকে ইচ্ছাকৃত ভাবেই বাদ দেয়া হয়েছে নিহত হাজার হাজার অবাঙালী ও পাকিস্তানপন্থীদের সংখ্যা।

William Drummond লেখেন, “The field investigation by the Home Ministry of Bangladesh in 1972 had turned up about 2,000 complaints of deaths at the hands of the Pakistan Army”. অনুবাদঃ “১৯৭২ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে, সে তদন্তে পাকিস্তান আর্মির হাতে প্রায় দুই হাজার নিহত হওয়ার অভিযোগ আসে।” তিনি আরো লেখেন “The Pakistan Army did kill, but the Bangladeshi claims were blown out of proportion undermining their credibility”. অনুবাদঃ “পাকিস্তান আর্মি মানুষ হত্যা করেছে, কিন্তু বাংলাদেশীরা নিহতদের সংখ্যা এতোটাই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পেশে করেছে যে তাতে সে দাবীর বিশ্বাস-যোগ্যতাই বিনষ্ট হয়েছে।”

১৯৭২ সালের ৬ জুন William Drummond লন্ডনের “The Guardian” পত্রিকায় “The Missing Millions” শিরোনামায় লিখেছিলেন, “This figure of three million deaths, which the Sheikh has repeated several times since he returned to Bangladesh in early January, has been carried uncritically in sections of world press. Through repeatation such a claim gains a validity of its own and gradually evolves from assertion to fact needing no attribution. My judgment, based on numerous trips around Bangladesh and extensive discussions with many people at the village level as well as in the government, is that the three million death figure is an exaggeration so gross as to be absurd.” অনুবাদঃ “নিহত তিরিশ লাখের তথ্যটি যা শেখ মুজিব বাংলাদেশের ফেরার পর জানুয়ারির প্রথম দিকে কয়েকবার বলেছেন তা বিশ্বের কোন কোন পত্র-পত্রিকা কোনরূপ বিচার-বিবেচনা না করেই প্রচার করেছে। বার বার প্রচারের ফলে এ দাবীটি গ্রহণযোগ্যতা পায়, এবং ধীরে ধীরে সেটি নিছক অনুমান থেকে সত্য ঘটনায় পরিণত হয়। অন্যরা এর নিয়ে অভিমত ব্যক্ত করার প্রয়োজনও বোধ করেনি। কিন্তু বাংলাদেশে অসংখ্যবার ভ্রমন এবং সেখানে গ্রাম পর্যায়ে ও সরকারি মহলে বহু লোকের সাথে বিষদ আলোপ আলোচনার প্রেক্ষিতে আমার ধারণা জন্মেছে, তিরিশ লাখ নিহত হওয়ার তথ্যটি অবিশ্বাস্য রকমের অতিরঞ্জিত।”

কারো কারো অভিমত, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে যাওয়ার পথে লন্ডনে এসে তিনি যুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। তখন তাঁর সাথে ছিল বিবিসির তৎকালীন সাংবাদিক জনাব সিরাজুর রহমান। তিনি তাঁকে আনুমানিক তিন লাখের কথা বলেছিলেন। সম্প্রতি লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত একটি চিঠিতে জনাব সিরাজুর রহমান সে কথাটি উল্লেখও করেছেন। তবে জনাব সিরাজুর রহমান যে তিন লাখের তথ্যটি দিয়েছেন সেটিও ছিল সম্পূর্ণ অনুমানের উপর। যুদ্ধকালীন ৯ মাসে তিনি একবারের জন্যও বাংলাদেশে যাননি, ফলে মাঠ পর্যায়ের কোন ধারণা তাঁরও ছিল না। তিন লাখের তথ্যটি তিনিও আবিস্কার করেছেন লন্ডন বসে,এবং সেটি যুদ্ধকালীন প্রচারিত গুজবের উপর ভিত্তি করে। অপরদিকে ঢাকায় নেমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিরাজুর রহমানের বলা সে তিন লাখকেই তিন মিলিয়ন তথা তিরিশ লাখ বলেছেন। শেখ মুজিবের মুখে তিরিশ লাখের কথা শুনে ঢাকা থেকে সে সংখ্যা নিয়ে রিপোর্ট করেছিলেন লন্ডনের “দি টাইম” পত্রিকার রিপোর্টার পিটার হ্যাযেলহার্স্ট, এবং তা ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। সেদিন যে রিপোর্টটি ছাপা হয়েছিল তা হলঃ In his first public rally in independent Bangladesh Mujib reported to have said, “I have discovered that they have killed three million of my people”. অনুবাদঃ “স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর প্রথম জনসভায় শেখ মুজিব বলেন, আমি জানতে পেরেছি তারা আমার তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে।” তাঁর সে রিপোর্টের পর সে সংখ্যাটি বিশ্বময় প্রচার পায়। শেখ মুজিব ভূলে তিন লাখকে তিন মিলিয়ন বলেছিলেন, না ইচ্ছা করেই তিরিশ লাখ বলেছিলেন সেটি একমাত্র তিনিই বলতে পারেন। তবে তিরিশ লাখের পিছনে যে কোন প্রামান্য দলিল নেই -সেটি নিয়ে এ বিশ্বের কারোই কোন দ্বিমত নেই। তাই শুরু থেকেই এ সংখ্যাটি ভূয়া এবং অবিশ্বাস্যই রয়ে গেছে। এখানে লক্ষনীয় হল, মুজিব শুধু পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতে নিহত বাঙালীর সংখ্যা তিন মিলিয়ন বলেছেন। যে বিপুল সংখ্যক অবাঙালীরা বাঙালীর হাতে নিহত হয়েছে সে তিন মিলিয়নের মাঝে তাদের উল্লেখ নাই। সম্ভবত অবাঙালীদের নিহত হওয়ার বিষয়টি তার দৃষ্টিতে কোন বেদনাদায়ক সহিংস ঘটনা মনে হয়নি।

 

২৫ মার্চের মিলিটারি এ্যাকশন এবং মিথ্যাচার

মিথ্যাচার যে শুধু একাত্তরের যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে হয়েছে তা নয়, প্রকাণ্ড মিথ্যাচার হয়েছে ২৫ মার্চের ঢাকায় রাতের হত্যাকাণ্ড নিয়ে। বলা হয়, পাক-বাহিনী ২৫শে মার্চের এক রাতেই ঢাকা শহরে ৬০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। বলা হচ্ছে, এ ৬০ হাজারের মধ্যে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক, এবং ঢাকায় বসবাসরত হিন্দুরা। কাদের সিদ্দিকীর দাবী, ২৫শে মার্চের মাত্র এক রাতে সারা দেশে তিন থেকে পাঁচ লাখ বাঙালীকে হত্যা করা হয়। ( কাদের সিদ্দিকী, ১৯৯৭)  হিটলার বহু লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল। তার হাতে অনেক গুলো গ্যাস চেম্বার ছিল। কিন্তু সে হত্যাকাণ্ডে হিটলারের কয়েকটি বছর লেগেছিল। আর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫শে মার্চের মাঝ রাতে হামলা শুরু করে সকাল হওয়ার আগেই ৬০ হাজার মানুষকে শুধু হত্যাই করেনি, তাদের লাশও নাকি গায়েব করেছিল! এবং এমন ভাবে গায়েব করেছিল যে আওয়ামী লীগের সরকার তাদের শাসনামলে সে ৬০ হাজার মানুষের কবর বা হাড্ডির সন্ধান করতে পারলো না! কোন সুস্থ বিবেক বুদ্ধির মানুষ কি এমন কাহিনী বিশ্বাস করতে পারে? অথচ ভারত-ভক্ত বাঙালীরা সেটি শুধু বিশ্বাসই করে না, তা নিয়ে সাহিত্য রচনা করে,ইতিহাস লেখে, নাটক করে এবং ফিল্মও বানায়। বাংলাদেশের ইতিহাস এরূপ কাহিনীতে ভরপুর। এটি সত্য, পাক বাহিনী একাত্তরে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিল। কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ কি এ অনুমতি দেয়, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলতে হবে? আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের আরো দাবী, একাত্তরের ৯ মাসে ধর্ষিতা বা শ্লীলতাহানীর শিকার হয়েছিল আড়াই লক্ষ বাঙালী মহিলা।-(Shahriar Kabir, 2010)। ধর্ষিতাদের সংখ্যা বাড়িয়ে কেউ ৪ লাখ, কেউ বা ৫ লাখও বলছে। সংখ্যা নিয়ে কে কতটা হাঁক দিবে সেটা যেন খেয়াল খুশির ব্যাপার। প্রমাণ বা পরিসংখ্যান পেশের যেহেতু বাধ্যবাধকতা নেই, ফলে বাতিক বেড়েছে সংখ্যা বাড়িয়ে চমক সৃষ্টি করা! যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশে একদিনের জন্য না থাকলে কি হবে, শেখ মুজিবও তেমনি হাঁক দিয়েছিলেন ৩০ লাখের। এভাবে কি কোন দেশের ইতিহাস লেখা হয়? অথচ বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে।

বলা হয়, একাত্তরের ২৫ মার্চের রাতে ঢাকার রাস্তায় নামে পাকিস্তান আর্মীর ট্যাংকের বহর। নেমেছিল হাজার হাজার সৈনিক। ট্যাংকের গোলায় ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। তাতে মারা পড়েছিল ৬০ হাজার মানুষ। যার মধ্যে বিপুল সংখ্যায় ছিল ছাত্র-ছাত্রি। কিন্তু সে রাতে কতগুলি ট্যাংক রাস্তায় নেমেছিল, কোন কোন রাস্তা দিয়ে সে ট্যাংকগুলো গিয়েছিল এবং সে ট্যাংকের গোলায় কতগুলো ঘরবাড়ী, দালানকোঠা ধ্বংস হয়েছিল সে হিসাব বাংলাদেশের ইতিহাসে মেলে না। নিহত মানুষের নাম-ঠিকানাও মেলেনা। কতজন সৈন্য রাস্তায় নেমেছিল সে ইতিহাসও নেই। পঁচিশে মার্চ রাতের ইতিহাস সংগ্রহ করেছেন গবেষক শর্মিলা বোস। সে কাজে তিনি পাকিস্তান গিয়েছিলেন। ২৫ মার্চের রাতে সেনাবাহিনীর যে অফিসারের অপারেশনের উপর দায়িত্ব ছিল তাঁর নাম লে. কর্নেল (পরে ব্রিগেডয়ার) তাজ। অপারেশন চালিয়েছিল ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট। তাঁর রিপোর্ট অনুযায়ী সে অপারেশনে ইকবাল হলে মারা যায় ১২ জন, জগন্নাথ হলে ৩২ জন এবং রোকেয়া হলে ৭ জন। রোকেয়া হলে মৃতদের সবাই ছিল সে হলের পুরুষ কর্মচারি। কোন ছাত্রী বা নারী সেখানে মারা যায়নি। সর্বমোট মারা যায় ৩০০ জন। সামরিক অফিসারদের ওয়ারলেস আলোচনার রেকর্ড থেকেও জানা যায় মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০ জন।–(শর্মিলা বোস, ২০১১)। ২৫ মার্চের রাতে নিহত প্রফেসর জোতির্ময় গুহাথাকুরতার কন্যা প্রফেসর মেঘনা গুহাথাকুরতাও বলেন সে রাতে মারা গিয়েছিল ৩০০ জন।–(মেঘনা গুহাথাকুরতা)। ২৫ মার্চ রাতে ট্যাংক বাহিনীর সাথে যিনি ছিলেন তার সাথে শর্মিলা বোস নিজে কথা বলেছেন। উক্ত অফিসারের নাম, লে. মুহাম্মদ আলী শাহ। তিনি ছিলেন ১৮ পাঞ্জাবের। তাঁর কথা, “ঐ রাতে সমগ্র ঢাকা শহরে নামানো হয় মাত্র তিনটি ট্যাংক। এ ট্যাংকগুলোর মূল কাজ ছিল শক্তির প্রদর্শনী”। তিনি আরো বলেন, “সে রাতে ঐ ট্যাংকগুলোর মুল কামানটি একটি বারের জন্যও ব্যবহৃত হয়নি। তবে আওয়াজ সৃষ্টির জন্য পাশের দুটো ছোট কামান থেকে মাঝে মাঝে গোলা ছোড়া হয়েছিল”। তিনি আরো বলেন, “তাঁর লোকেরা ট্যাংক তিনটি নিয়ে শুধু প্রধান প্রধান রাস্তা দিয়েই চলেছিল, কোন আবাসিক এলাকাতে ঢুকেনি। নিউ মার্কেট বা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও নয়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ছাত্রীদের উপর পাকিস্তানী সৈন্যদের বলাৎকার এবং বলৎকার শেষে হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বহুল আলোচিত বিষয়। সে অভিযোগ কতটুকু সত্য সেটি গুরুতর গবেষণা ও বিবেচনার বিষয়। সে সময় রোকেয়া হলের প্রোভোষ্ট ছিলেন বেগম আখতার ইমাম। তিনি বলেন, রোকেয়া হলে সর্বমোট ৮০০ জন ছাত্রীর জন্য স্থান ছিল। ২৫ মার্চের আগেই প্রায় সকল ছাত্রী হোস্টেল ত্যাগ করে। মাত্র ৭ জন ছাত্রী থেকে যায়। তাদেরকে সাহেরা খাতুন নামে একজন হাউস টিউটরের বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়। তাদের সবাই নিরাপদ ছিল এবং ২৭ মার্চ তারা তাদের অভিভাবকদের সাথে হোস্টেল থেকে চলে যায়। একই রূপ বিবরণ দিয়েছেন,তৎকালে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর জনাব ড. সাজ্জাদ হোসেন তাঁর “একাত্তরের স্মৃতি” বইতে।

 

প্রতি ২৫ জনে একজনের মৃত্যু!

তিরিশ লাখের অর্থ তিন মিলিয়ন। একাত্তরে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি অর্থাৎ ৭৫ মিলিয়ন। যে কোন স্কুল ছাত্রও হিসাব করে বের করতে পারে, সাড়ে ৭ কোটির (৭৫ মিলিয়ন) মাঝে তিরিশ লাখ (তিন মিলিয়ন) মানুষের মৃত্যু হলে প্রতি ২৫ জনে একজনকে মারা যেতে হয়। যে গ্রামে ১ হাজার মানুষের বাস সে গ্রামে মারা যেতে হয় ৪০ জনকে। ঘটনাক্রমে সে গ্রামে কেউ মারা না গেলে পরবর্তী গ্রামটি যদি হয় ১ হাজার মানুষের বসবাস তবে সেখান থেকে মারা যেতে হবে কমপক্ষে ৮০ জনকে। যে থানায় ১ লাখ মানুষের বাস সেখানে মারা যেতে হবে ৪ হাজার মানুষকে। প্রতি থানায় ও প্রতি গ্রামে মৃত্যুর সংখ্যা এ হারে না হলে ৩০ লাখের সংখ্যা পূরণ হবে না। তাছাড়া ৯ মাসে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করতে হলে প্রতিদিন গড়ে ১১, ১১১ জনকে হত্যা করতে হয়। ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ ছিল একটি গ্রামীন জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি দেশ যার প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ জনগণই বাস করতো গ্রামে। সেনাবাহিনীর পক্ষে যেহেতু প্রায় ৭০ হাজার গ্রামের মাঝে ১০% গ্রামে পৌঁছাতে হলে নদীনালা, দ্বীপ, বিল, হাওর ও চরে পরিপূর্ণ ৭ হাজার গ্রামে পৌঁছতে হয়। সেটি কি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে ৯ মাসে পৌঁছা সম্ভব ছিল? ফলে সহজেই ধারণা করা যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী শতকরা ৯৫ ভাগ গ্রামেও পৌঁছতে পারিনি। ফলে তিরিশ লাখের বিপুল হত্যাকান্ডটি ঘটাতে হতো জেলা, মহকুমা বা উপজেলা শহরে। তখন পাড়ায় পাড়ায় অসংখ্য নারীকে ধর্ষিতা হতে হতো। এটি কি তাই বিশ্বাসযোগ্য? সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাক-বাহিনীর প্রকৃত সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৫ হাজার। -(জেনারেল নিয়াজী, ২০০১)। যুদ্ধবন্ধি রূপে যেসব পাকিস্তানীদের ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের মধ্যে অনেকে ছিল বেসামরিক ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য। ৪৫ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যের পক্ষে কি সম্ভব ছিল বিল-হাওর,নদী-নালা,দ্বীপ ও চরাভূমিতে পরিপূর্ণ একটি দেশের প্রায় ৭০ হাজার গ্রামে পৌছানো? প্রতিটি গ্রাম দূরে থাক প্রতিটি ইউনিয়নেও কি তারা যেতে পেরেছিল? প্রকৃত সত্য হল, যুদ্ধকালীন ৯ মাসে অধিকাংশ গ্রাম দূরে থাক, অধিকাংশ ইউনিয়নেও পাক বাহিনী পৌঁছতে পারিনি। প্রতিটি গ্রামে ও ইউনিয়নে গেলে সীমান্তে যুদ্ধ করলো কারা? কারা পাহারা দিল দেশের বিমান বন্দর, নদীবন্দর, সবগুলো জেলা-শহর ও রাজধানী? ৩০ লাখ মানুষের নিহত হওয়ার এ তথ্য বিশ্বের দরবারে গ্রহণযোগ্য হওয়া দূরে থাক, বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেনি বহু ভারতীয় সামিরিক অফিসারের কাছেও। ভারতীয় রাজনীতিবিদগণ তিরিশ লাখের পক্ষে যতই বলুক, যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কোন কোন ভারতীয় জেনারেলদের কাছে এটি হাস্যকর মিথ্যা। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাদের সে অভিমত একবার নয়, বহুবার প্রকাশ পেয়েছে।

 

পাকিস্তান সরকারের রিপোর্ট

একাত্তরের নিহতদের নিয়ে বাংলাদেশে সরকার কোন হিসাব নিকাশের ব্যবস্থা না করলেও পাকিস্তান সরকার সেটির অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। সে কমিশনের প্রধান ছিলেন পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হামদূর রহমান। ইনি নিজে একজন বাঙালী। উক্ত কমিশন একাত্তরে তিরিশ লাখের সংখ্যাটিকে “altogather fantastic and fanciful” বলেছেন। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় “সম্পূর্ণ উদ্ভট এবং কল্পনাপ্রসূত”। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টারের হিসাব মতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যাটি পাওয়া যায় তৎকালীন আর্মির পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের পক্ষ থেকে হেড কোয়ার্টারকে দেয়া প্রতিদিনের সিচুয়েশন রিপোর্ট থেকে। তবে বিচারপতি হামদূর রহমান মনে করেন এ সংখ্যাটিও অতিরঞ্জিত। কারণ তখন আর্মির লোকেরা বিভিন্ন অপরাশেনে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের অপারেশনকে গুরুত্বপূর্ণ ও সফল দেখাতে গিয়ে নিহত শত্রুর সংখ্যা বেশী বেশী করে দেখাতে পারে। তবে এ ২৬ হাজারের মাঝে বাঙালীদের হাতে নিহত বিহারী বা অবাঙালীদের কোন পরিসংখ্যান নাই। নিহত অবাঙালীদের সংখ্যা অনিবার্য কারণেই এর চেয়ে অনেক বেশী হবে। কারণ, খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিল, শান্তাহার, চট্টগ্রাম, যশোর, পাকশি, সৈয়দপুর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়ার ন্যায় প্রতিটি স্থানে অবাঙালীদের থেকে বেছে বেছে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের হত্যা করা হয়নি, বরং গণহত্যার শিকার হয়েছিল অবাঙালী নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা। শর্মিলা বোস মনে করেন,একাত্তরে নিহতদের সর্বমোট সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে এক লাখ হতে পারে। এর মধ্যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যরাও রয়েছে। ভারতীয় জেনারেল জ্যাকবের হিসাব মতে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্য মারা গেছে ৬,৭৬১ জন। -(Jacob, 2001)। আহত হয়েছে ৮ হাজার। আর জেনারেল নিয়াজীর হিসাব মতে তেসরা ডিসেম্বর অবধি প্রায় ৪ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যের মৃত্যু ঘটে, আহত হয় আরো ৪ হাজার।-(Niazi, 1998)।

 

পরিকল্পিত মিথ্যাচার

একাত্তরের হতাহতদের নিয়ে মিথ্যাচারটি যেমন বাঙালীদের দ্বারা হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হয়েছে মতলববাজ অমুসলিম সাংবাদিকদের দ্বারা। মুসলিমদের গায়ে কালিমা লেপনেই তাদের আনন্দ। একাত্তরে সে সুযোগ পেয়ে তারা নামে পরিকল্পিত মিথ্যাচারে। এমন একজন সাংবাদিক ছিলেন লন্ডনের “দি টাইম” পত্রিকার এন্থনী ম্যাসক্যারেনহাস। তিনি ছিলেন করাচীতে বসবাসরত একজন পাকিস্তানী নাগরিক। ধর্মে ছিলেন খৃষ্টান। তিনি রিপোর্ট করেন, পাকিস্তানী আর্মি ২৬ মার্চের রাতে ঢাকার শাখারি পাড়ায় ৮ হাজার মানুষকে হত্যা করে। ভদ্রলোক এ রিপোর্টটি করেছেন সেখানে সরেজমিনে না গিয়েই। অর্থাৎ তিনি সাক্ষি সেজেছেন ঘটনাস্থলে কোন হত্যাকাণ্ড নিজ চোখে না দেখে। আরো দুঃখজনক হল, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আজও এ ঘটনার উপর কোনরূপ তদন্ত হয়নি। ফলে শাখারী পাড়ায় সে রাতে কারা মারা গেল, এবং কি তাদের নামঠিকানা -সে বিষয়ে আজও কোন খোঁজ-খবর নেয়া হয়নি। এ জরুরী কাজটি না করে সরকার যেটি করেছে সেটি হল ভিত্তিহীন মিথ্যার প্রচার। অথচ শাখারী পাড়ার হত্যাকাণ্ডের উপর একমাত্র গবেষণা-মূলক কাজটি করেছেন শর্মিলা বোস। তিনি সরেজমিনে শাখারি পট্টিতে গেছেন। যারা সেদিন আর্মি এ্যাকশন নিজ চোখে দেখেছেন সেখানে গিয়ে সেসব হিন্দুদের সাথে তিনি সরাসরি কথা বলেছেন। শাখারি পাড়ার হত্যাকাণ্ড নিয়ে এন্থনী ম্যাসক্যারেনহাসের রিপোর্টটি মিথ্যাপূর্ন ছিল, সেটি বেরিয়ে এসেছে তাঁর রিসার্চে। পাকিস্তানী হয়েও আন্তর্জাতিক বিশ্বে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী কালিমা লেপন করেছিলেন তিনিই। এ কালিমা লেপনের পর ত্বরিৎ তিনি পাকিস্তান ছেড়েছিলেন। শর্মিলা বোস শাখারি পাড়ার হিন্দুদের থেকে জানতে পারেন যে, সে রাতে পাকিস্তানী আর্মির হাতে মৃতের সংখ্যা ৮ হাজার নয়, বরং ১৪ বা ১৫ জন পুরুষ। মৃতদের মধ্যে একজন শিশুও ছিল। -(শর্মিলা বোস, ২০১১)। প্রতি যুদ্ধেই সত্য মারা পড়ে,এবং প্রচার পায় মিথ্যা। তবে প্রকৃত সত্যের মৃত্যু একাত্তরে কতটা ব্যাপক ভাবে হয়েছিল -এ হল তার নমুনা। ইতিহাসবিদদের কাজটি মিথ্যা ভাষ্যকে ইতিহাসের বইয়ে লিপিবদ্ধ করা নয়, বরং সত্যকে অন্বেষণ করা। অথচ সে কাজটিই বাংলাদেশে হয়নি।

 

চুকনগরের হত্যাকাণ্ড  

একাত্তরের নয় মাসে পাকিস্তান আর্মির হাতে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে খুলনা-যশোর এলাকার চুকনগরে ২০শে মে তারিখে। হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন সেনা সদস্যের হাতে। সেখানে সেদিন তারা নির্মম হত্যা করেছিল ভারত অভিমুখে যাওয়া হিন্দু শরণার্থীদের। শর্মিলা বোস সেখানে গিয়ে সেদিন বেঁচে যাওয়া হিন্দুদের সাথে কথা বলেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী কেউ কেউ বলেন, এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সামরিক পোষাকধারি বিহারীরা। হতে পারে মার্চ-এপ্রিলে খুলনা-যশোরে ঘটে যাওয়া বিহারী গণহত্যার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ এটি ছিল প্রতিশোধ হামলা। তবে শর্মিলা বোসের কথা, এ হ্ত্যাকাণ্ড নিয়েও অতি বড় রকমের অতিরঞ্জন ঘটেছে। কোন কোন বাংলাদেশী লেখকের পক্ষ থেকে বলা হয়, সেখানে ১০ হাজার হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছিল। অথচ শর্মিলার বোসের কাছে বেঁচে যাওয়া হিন্দুরা বলেন, সেখানে সেদিন সর্বমোট ৮ থেকে ১০ হাজার নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ শরণার্থী ছিল। হত্যাকারিরা শুধু প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের হত্যা করেছিল। কোন নারী ও শিশুকে নয়। হত্যাকারিরা কোন মহিলাকে স্পর্শ করিনি। অথচ ৮-১০ হাজার শরণার্থীর মধ্যে নারী ও শিশুদের সংখ্যাই ছিল অধিক। নিহতদের লাশগুলো সেদিন পাশের নদীতে ফেলেছিল ওয়াজেদ আলী এবং শের আলী নামক দুই ভাই। তারা ছিল চুকনগরের বাসিন্দা। তাদেরকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এ লাশগুলো নদীতে ফেলার জন্য ৪ হাজার টাকার ওয়াদা দিয়েছিল। অবশেষে দিয়েছিল ২ হাজার টাকা। শর্মিলা বোস এ হত্যাকাণ্ডের বিবরণ শুনেছেন ওয়াজিদ আলীর নিকট থেকে। শর্মিলা বোসের অভিমত, এ দুই ভাইয়ের পক্ষে ১০ হাজার লোকের লাশ একদিনে নদীতে ফেলা অসম্ভব। তাই অতিশয় অতিরঞ্জন ঘটেছে এখানেও। তাঁর মতে নিহতদের সংখ্যা কয়েক শত হতে পারে,৮ বা ১০ হাজার নয়। -(শর্মিলা বোস, ২০১১)।

তবে চুকনগরের হত্যাকাণ্ডের মটিভ কি ছিল সেটি অজানাই রয়ে গেছে। ঐদিন বেঁচে যাওয়ার কোন কোন হিন্দুর মতে, নিছক ডাকাতির স্বার্থে স্থানীয় মুসলিম খবর দিয়ে আর্মিকে ডেকে আনে। এব্যাপারে সবাই একমত যে, আর্মি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ত্বরিৎ চলে যায়। এরপর উদ্বাস্তুদের সহায় সম্বল লুণ্ঠনে নামে স্থানীয় বাঙালী মুসলমানেরা। এমন কি তারা আহত অথচ বেঁচে আছে এমন মানুষের পকেট ও ব্যাগ হাতড়িয়ে টাকা পয়সা লুণ্ঠন করেছিল। তখন ভারতের পথে যাত্রারত হিন্দু উদ্বাস্তুদের লুণ্ঠন করা সমাজের দুর্বৃত্ত প্রৃকৃতির লোকদের পেশায় পরিণত হয়। এমন ঘটনা দেশের নানা স্থানে ঘটতে থাকে। সাক্ষাতদাতাদের একজন শর্মিলা বোসকে বলে, সেদিন মৃত উদ্বাস্তুদের পকেট ও বাক্স থেকে সে ৮ লাখ টাকা ও ৪ কিলো স্বর্ণ পেয়েছিল। তবে সে অর্থ তার নিজের কাছে থাকেনি, অন্যরা নিয়ে নেয়। এ শরণার্থীদের অনেকেই ভারতে যাচ্ছিল বরিশালের মঠবাড়িয়া ও অন্যান্য এলাকা থেকে। তারা সাথে নিজেদের নৌকা এনেছিল। সে নৌকাগুলো স্থানীয় মুসলমানরা নিয়ে নেয়। সে সময় পাকিস্তান আর্মির স্থানীয় ব্রিগেড কমাণ্ডার ছিলেন ব্রিডেডিয়ার মুহাম্মদ হায়াত। ছিলেন মেজর (পরে কর্নেল) সামিন জান বাবর এবং  লে. (পরে লে. জেনারেল) গোলাম মোস্তাফা। তারা শর্মিলা বোসের কাছে বলেন, চুকনগরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তারা পূর্বে কখনো শুনেননি।-(শর্মিলা বোস, ২০১১)।

 

ভারতীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধ

প্রচণ্ড মিথ্যাচার হয়েছে একাত্তরের যুদ্ধে ভারতের যুদ্ধাপরাধ গুলো আড়াল করার ক্ষেত্রেও। তারও কিছু উদাহরন দেয়া যাক। ঢাকা শহরের কেন্দ্রে ছিল একটি বিশাল ইসলামী ইয়াতিম খানা। সে ইয়াতিম খানার উপর ৯ই ডিসেম্বর ভারতীয় যুদ্ধবিমান ৫০০ কিলোগ্রাম থেকে ১০০০ কিলোগ্রাম ওজনের একটি বোমা ফেলে। এতে মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয় ৩০০ জন ইয়াতিম বালক ও বালিকা। লন্ডনের দি অবজার্ভার পত্রিকায় ১২ ডিসেম্বর সে হামলার খবরটি ছাপা হয়েছিল এভাবেঃ “The worst of it till now is the horror of the Islamic orphanage, hit by Indian bombs at 4 o’clock this morning. Three hundred boys and girls are dead. I saw the place soon after dawn. Bombs had ploughed everyone into a vast and hideous mud-cake, most of them dead… Bombing at night is a deadly thing, and unnecessary here. These bombs were aimed at the airport runway, but the Indians had been attacking it for five days by daylight. Only at midday today did finally put a bomb right on it. But up to then, we had all agreed with an Australian correspondent here who muttered on the first day: “The Indians couldn’t hit a bull in the bum with a banjo”. অনুবাদঃ “এ যাবত কালের সবচেয়ে ভয়ানক ঘটনাটি হল ইসলামী ইয়াতিম খানার। ভারতীয় বোমা সেখানে সকাল ভোর ৪ টায় আঘাত হানে। নিহত হয় তিন শত বালক-বালিকা। আমি স্থানটি সকালে সূর্যোদয়ের পরই দেখতে যাই। বোমার আঘাতে বিশাল এলাকার মাটি উলোট পালোট হয়ে গেছে। অতি ভয়ানক হল রাতে বোমার আঘাত। এ বোমটি পড়ার কথা বিমানবন্দরের রানওয়ের উপর, যার উপর গত ৫দিন ধরে ভারত দিনের আলোতে আঘাত হানছিল। অবশেষে কেবল আজই দুপুর বেলা সেখানে তারা একটি বোমা ফেলতে সফল হল। এবং সে সময় পর্যন্ত আমরা সবাই সেই অস্ট্রালিয়ান সাংবাদিকের সাথে একমত ছিলাম যে প্রথম দিনই বিড় বিড় করে বলছিল, “ভারতীয়রা একটি ষাড়ের পিছন দিকেও বেহালা দিয়ে আঘাত করতে না।”

ইয়াতিম খানার ন্যায় বেসামরিক এলাকার উপর এরূপ বোমাবর্ষণ আন্তর্জাতিক আইনে গুরুতর যুদ্ধাপরাধ। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের বইগুলোতে ৯ ডিসেম্বরের এ যুদ্ধাপরাধের উল্লেখ নেই। পাকিস্তান আর্মির হাতে ৭১’য়ের ১৯ মার্চে জয়দেবপুরে মারা পড়েছিল দুই জন, অথচ শেখ মুজিব সেটিকে ১০ গুণ বাড়িয়ে বলেছিলেন ২০ জন। অথচ ইয়াতিম খানার ৩০০ জন ইয়াতিম বালক-বালিকার সে তথ্যকে তিনি হিসাব থেকেই বাদ দিয়েছেন। কোথাও সেটির উল্লেখ থাকলেও সেটি চোখে পড়ার মত নয়। বরং উল্টো আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউ কেউ এ জঘন্য যুদ্ধাপরাধের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে। তারা বলে এ বোমা বর্ষণ নাকি করেছিল পাকিস্তানী বিমান বাহিনী। শর্মিলা বোস যখন ঢাকায় তাদের কাছ থেকে এরূপ কথা শোনেন তখন তাদের প্রশ্ন করেন,“পাকিস্তান বিমান বাহিনী তো ৬ ডিসেম্বরই পঙ্গু হয়ে যায়, ফলে তাদের তো হামলার সামর্থ্যই ছিল না। তারা বোমা ফেল্লো কি করে?” তখন তারা বলে, “পাকিস্তানীরা হেলিকপ্টার দিয়ে এ বোমা ফেলেছিল।” শর্মিলা বোস পাকিস্তানে গিয়েও সেনা-অফিসারদের কাছে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের বিমান বাহিনীতে হেলিকপ্টার কখনই বোমা ফেলার কাজে ব্যবহৃত হয়নি। ভারতপন্থীদের এমন প্রপাগাণ্ডার কারণ, ভারতীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধকে আড়াল করা। যেমন ভারত আড়াল করেছে মুক্তিবাহিনীর অপরাধকে। তাই ভারতের হাতে ৩০০ জন ইয়াতিম হত্যা যেমন মুক্তিবাহিনী বা আওয়ামী লীগনেতাদের কাছে অপরাধ গণ্য হয়নি, তেমনি কাদের সিদ্দিকীর ও তার সহযোগী মুক্তিযোদ্ধারা যখন ঢাকা স্টেডিয়ামে হাতপা বাঁধা ৪ জন রাজাকারকে হত্যা করলো তখন সে অপরাধ ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কাছে কোন অপরাধ গণ্য হয়নি। অপরাধ গণ্য হয়নি দেশের নানা প্রান্তে বিহারী এবং রাজাকার হত্যাও। অথচ দখলদার বাহিনী রূপে ভারতীয় বাহিনীর দায়িত্ব ছিল বাঙালী-অবাঙালীর সবার জানমালের নিরাপত্তা দেয়া।

ভারতীয় বিমানবাহিনী আরেক নৃশংস যুদ্ধাপরাধ ঘটিয়েছিল নারায়নগঞ্জে। ভারত-অনুগত বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা সে জঘন্য অপরাধকে আড়াল করেছে। নারায়নগঞ্জের পাওয়ার স্টেশনে বোমা ফেলতে গিয়ে বোমা ফেলা হয়েছিল আধা মাইল দূরে অবস্থিত ছিন্নমূল মানুষের আবাসিক বস্তিতে। সে হামলায় ৪শত থেকে ৫শত নিরীহ বেসামরিক মানুষকে সেদিন হত্যা করা হয়েছিল। দেড় শত আহত মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। লন্ডনের দি অবজার্ভার পত্রিকার রিপোর্টার তাঁর “ঢাকা ডায়েরী”তে লিখেছিলেন, “Bombing at night: Indian pilots had hit the sleeping heart of a pauper residential area half a mile from a power-station. Four or five hundred civilians were killed and 150 were in hospital. -(The Observer, 12 December, 1971). অনুবাদঃ “রাতের বোমাবর্ষনে: ভারতীয় পাইলট পাওয়ার স্টেশন থেকে প্রায় আধা মাইল দূরে দরিদ্র আবাসিক এলাকার হৃৎপিণ্ডে আঘাত হানে। নিহত হয় চারশত থেকে পাঁচশত নিরপরাধ মানুষ। ১৫০ আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেয়া হয়।”

 

ব্যর্থতা বিবেক নিয়ে বেড়ে উঠায়

একাত্তরে বাঙালীর বহু ব্যর্থতাই অতি প্রকট ভাবে প্রকাশ করেছে। সবচেয়ে প্রকট ভাবে প্রকাশ পেয়েছে সুস্থ বিবেক নিয়ে বেড়ে না উঠার ব্যর্থতাটি। প্রকাশ পেয়েছে মিথ্যার প্রতি মোহ,সত্যে অনাগ্রহ এবং নৃশংসতা।ব্যক্তির বিবেকের সুস্থতা ও উন্নত মানবিক গুণের পরিচয় মেলে সত্যের পক্ষ নেয়া ও মিথ্যা বর্জনের সামর্থ্যে। বিবেকের সে গুণটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে প্রকাশ পায় না, স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণ এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও নয়। রাষ্ট্র নির্মাণ, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিস্ময়কর সাফল্য দেখাতে পারে অতিশয় মিথ্যাবাদি, চরিত্রহীন ও গণহত্যার ভয়ংকর দানবগণও। ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলি যখন সাম্রাজ্যবাদী, ফ্যাসিবাদী, বর্ণবাদী ও উপনিবেশিক শোষকদের হাতে অধিকৃত হয় তখন সে দেশগুলি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও অর্থনীতিতে বিশাল বিপ্লব এনেছিল। হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানী তো আবিষ্কার ও উন্নয়নে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল। মানবরূপী এ দানবগণ যে কতটা মানবশূণ্য সেটির প্রমাণ রেখেছিল মাত্র দুটি বিশ্বযুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি মানুষ হত্যা করে। তারা চরিত্রের কদর্যতা রেখেছে আনবিক বোমা নিক্ষেপ করে। ইতিহাস গড়েছে গ্যাসচেম্বারে লক্ষ লক্ষ মানুষকে জীবন্ত জ্বালিয়ে। অথচ সত্যের আবিস্কার ও মিথ্যার বর্জনে ইতিহাস গড়েছিল আরবের নিরক্ষর মানুষ। সে সফলতার কারণেই তারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়তে পেরেছিলেন। সভ্যতার মান এতোটা উচ্চে পৌঁছেছিল যে, বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের খলিফা হযরত উমর (রাঃ) তার সঙ্গি ভৃত্যকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে উঠের রশি ধরে টেনেছেন। অথচ সে রাষ্ট্র ভেঙ্গে বাংলাদেশের ন্যায় অন্তত ৫০টি বাংলাদেশ গড়া যেত। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালাও তাদের প্রশংসা করেছেন।

সত্যের আবিস্কার ও তার প্রতিষ্ঠার কাজটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ ও মহামূল্যবান যে মহান আল্লাহতায়ালা সে কাজের সফলতার পুরস্কার দেন অনন্ত অসীম কালের জন্য নিয়ামত ভরা জান্নাত দিয়ে। শত শত বৈজ্ঞানিক আবিস্কারেও সে পুরস্কার জু্টে না। অপর দিকে মিথ্যার প্রচারক হওয়ার শাস্তিটি ভয়ানক। তখন জু্টে জাহান্নামের আগুণ। সেটি শুধু কোটি কোটি বছরের জন্য নয়, বরং অনন্ত অসীম কালের জন্য। কিন্তু সত্যের আবিষ্কারে ও সত্যের পক্ষ নেয়ায় বাংলাদেশীদের ব্যর্থতাটি বিশাল। ফলে আবিষ্কৃত হয়নি একাত্তরে নিহতদের সঠিক তথ্য। তারা ব্যর্থ হয়েছে কোরআনী সত্যের পক্ষ নিতেও। ফলে দূরে সরেছে শরিয়ত ও জিহাদের ন্যায় ইসলামের শ্রেষ্ঠ বিধান থেকে। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে পরাজিত হয়েছে ইসলাম। জনগণ ব্যর্থ হয়েছে রাজনীতির ময়দানে মহান আল্লাহতায়ালার নির্ধারিত জীবনবিধান ইসলামের পক্ষ নিতে। বরং তাদেরই অর্থে ও ভোটে বার বার বিজয়ী হয়েছে মিথ্যার প্রচারকগণ।এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নিহত তিরিশ লাখের ন্যায় অসংখ্য মিথ্যা।

বাংলাদেশ জুড়ে নিহত তিরিশ লাখের প্রকাণ্ড মিথ্যাটি যেরূপ ব্যাপক ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে -সেটি কি স্রেফ মুজিবের কাজ? বরং সে কাজ তো সেসব পুরোহিতদেরও যারা নিজেদেরকে গুরুজন, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী বা দেশের মেধা রূপে গণ্য করেন! মিথ্যার প্রচারক শুধু শেখ মুজিব ও তার বাকশালী সহচরগণই নয়, বরং সে পাপাচারে বিপুল সাফল্য দেখিয়েছে তারাও যারা দেশে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, লেখক, শিক্ষক, মিডিয়াকর্মী, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, রাজনীতিবিদ ও আইনবিদ। নিহত তিরিশ লাখের মিথ্যাটি নিয়ে তাদের মাঝে কোন প্রতিবাদ নাই। বরং আছে সে বিকট মিথ্যার কাছে সচেতন আত্মসমর্পণ। কোথাও কিছু বলা বা লেখার সুযোগ পেলেই তথাকথিত এ শিক্ষিতজনেরা সে বিশাল মিথ্যাটির পক্ষে প্রচারণা শুরু করে। ঈমানদারের মুখে প্রতিনিয়ত লা-শরীক মহান আল্লাহতায়ালা এবং তাঁর রাসূলের পক্ষে সাক্ষ্যদানের কালেমা ধ্বনিত হয়।এ কালেমা ছাড়া কারো ঈমান বাঁচে না। মিথ্যার উপাশকদের মুখেও তেমনি কালেমা থাকে। সেটি মিথ্যার পক্ষে সাক্ষ্যদানের কালেমা। বাংলাদেশে মিথ্যাচারিদের সে প্রধান কালেমাটি হলো একাত্তরে তিরিশ লাখ নিহতের কথা। এ কালেমা ছাড়া এসব মিথ্যাচারিদের একাত্তরের চেতনা বাঁচে না। এটি কি কম অপরাধ? বাঙালী মুসলিমের এটি এক বিশাল ব্যর্থতা। বাংলাদেশে মিথ্যা যে কতটা বিজয়ী এবং সত্য যে কতটা পরাজিত -সেটি প্রমাণের জন্য এরপরও কি কোন গবেষণার প্রয়োজন আছে? চেতনার এরূপ রুগ্ন অবস্থায় নিহত তিরিশ লাখের ন্যায় বিশাল বিশাল মিথ্যা্গুলিও যে দেশজুড়ে ব্যাপক স্বীকৃতি পাবে তা নিয়েও কি সন্দেহ থাকে?

গ্রন্থপঞ্জি

  1. Bose, Sarmila, 2011: Dead Reckoning: Memories of the 1971 Bangladesh War, C. Hurst & Company, London.
  2. Sisson, Richard and Leo Rose (1990): War and Secession: Pakistan, India and the Creation of Bangladesh, University of California; Berkeley.
  3. Niazi, Lt Gen AA K (2002); The Betrayal of East Pakistan, Oxford University Press, Karachi.
  4. General Niazi, 2001: spoke to India Abroad — the Indian-American newspaper, which is owned by com – in December 2001: interview conducted by Amir Mir.
  5. Shahriar Kabir, 2010; “Bangladesh Holocaust of 71” published in Forum, a monthly publication of The Daily Star, Vol. 4, Issue 12, Dec. 2010.
  6. Hamoodur Rehman Commission (HRC); Report of Inquiry into the 1971 War, Vanguard Books Lahore, 513
  7. কাদের সিদ্দিকী, ১৯৯৭; স্বাধীনতা ‘৭১, অনন্যা, ৩৮/২ বাংলা বাজার, ঢাকা।

 




অধ্যায় চার: বাঙালী নির্মূল ও গণহত্যার প্রসঙ্গ

 যুদ্ধ কি বাঙালীর বিরুদ্ধে পাঞ্জাবীর?

বাংলাদেশের সেক্যুলারিষ্টদের পক্ষ থেকে একাত্তরের সংঘাতকে দেখা হয়েছে বর্ণবাদী জাতিয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এ লড়াইকে বলা হয়েছে বাঙালীর সাথে পাঞ্জাবীর লড়াই। আসলেই কি তাই? নুরুল আমীন, ডা. অব্দুল মোত্তালেব মালেক, আব্দুর সবুর খান, শাহ আজিজুর রহমান, ফজলুল কাদের চৌধুরী র ন্যায় হাজার হাজার ব্যক্তি, মুসলিম লীগ, পিডিপি, জামায়াতে ইসলামী, নিজামে ইসলামীর ন্যায় বহু সংগঠন, রাজাকার বাহিনীর লক্ষাধিক সদস্য যে পাকিস্তানের পক্ষে লড়লো -সে তথ্য কি তারা ভূলে গেছেন। অপর দিকে সকল পশ্চিম পাকিস্তানীরাও কি পাঞ্জাবী ছিল? খোদ জেনারেল ইয়াহিয়া খানও পাঞ্জাবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন পাঠান। পাকিস্তান আর্মির পূর্বাঞ্চলীয় কমাণ্ডার ছিলেন আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী। তিনিও ছিলেন পাঠান। ঢাকার কমাণ্ডার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব। তিনিও ছিলেন পাঠান। একাত্তরের যুদ্ধে উচ্চ পর্যায়ের কমাণ্ডারদের মধ্যে পাঞ্জাবী ছিলেন জেনারেল জগতজিৎ সিং অরোরা। এবং তিনি ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর। ফলে একাত্তরের যুদ্ধ পাঞ্জাবীর সাথে বাঙালীর যুদ্ধ হয় কি করে? একাত্তরের মিথ্যাচারিদের মিথ্যাচারটি এখানেও। বস্তুত এটি ছিল একটি রাজনৈতিক লড়াই। অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষের লোকদের সাথে বাঙালী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লড়াই। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক্ষেত্রেও মিথ্যাচার হয়েছে; প্রকৃত সত্যটি তুলে ধরা হয়নি।

 

পশু রূপে ইয়াহিয়া

বাংলাদেশের ইতিহাসে অতি কুৎসিত ভাবে চিত্রিত করা হয়েছে ইয়াহিয়া খানকে। পোষ্টারে তাকে বড় বড় দাঁত ও শিংওয়ালা পশুর ন্যায় এঁকে সারা বাংলাদেশের দেয়ালে দেয়ালে লাগানো হয়েছে। পশু রূপে চিত্রিত করা হয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সৈন্যদের। অপরদিকে সর্বকালের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে চিত্রিত করা হয়েছে মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ নিয়েও কি কম মিথ্যাচার! যে পাকিস্তানী সৈন্যদের শেখ মুজিব ও তাঁর ভক্তরা পশু রূপে চিত্রিত করেছেন তারা ২৫ মার্চ তারিখে তাঁকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। তার গায়ে সেদিন তারা একটি আঁচড়ও দেয়নি। দেহে কোন আঘাতের চিহ্ন না নিয়েই তিনি ফিরে এসেছিলেন পাকিস্তানের জেল থেকে। অথচ সে সময় পাকিস্তানীদের কাছে তাঁর পরিচয় ছিল একজন গাদ্দার তথা বিশ্বাসঘাতক রূপে। যুদ্ধকালীন ৯ মাস মুজিবের পরিবার ঢাকা শহরেই নিরাপদে বসবাস করেছে। পাকিস্তান সরকার মুজিব পরিবারের জন্য মাসিক ভাতারও ব্যবস্থা করেছে। অপর দিকে শেখ মুজিব –যাকে চিত্রিত করা হয় জাতির পিতা রূপে, তাঁকে ও তাঁর পরিবারে সদস্যদের নিহত করেছে মুক্তিবাহিনীর সেসব বাঙালী সদস্যরা যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছে। শেখ মুজিব শুধু একা নয়, ৪ লাখেরও বেশী সামরিক ও বেসামরিক বাঙালী নাগরিক পাকিস্তান থেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরেছেন। তাদের ঘরবাড়ীর উপর হামলা হয়েছে বা বাংলাদেশে বসবাসরত বিহারীদের ন্যায় তাদের বস্তিতে পাঠানো হয়েছে -সে প্রমাণ একটিও নাই। তা হলে সত্যটি কি দাঁড়ালো?

মার্কিন গবেষক ও প্রফেসর Richard Sisson এবং Leo Rose এর অভিমত, ইয়াহিয়া খান আন্তরিক ভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চনার প্রতিকারে আন্তরিক ছিলন।-(Sisson & Rose, 1990)। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইচ্ছাকৃত ভাবেই অবিচার হয়েছে তাঁর মূল্যায়নে। একথা অস্বীকারের উপায় নেই, তিনিই একমাত্র পাকিস্তানী রাষ্ট্রপ্রধান যিনি পূর্ব পাকিস্তানের সাথে বৈষম্য ও অবিচারকে মনেপ্রাণে স্বীকার করে নেন এবং প্রতিকারেরও ব্যবস্থা করেন। একমাত্র তিনিই এক রাষ্ট্রনায়ক যিনি এক ব্যক্তি এক ভোটের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের শতকরা ৫৬ ভাগ সদস্য পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত করার বিধান প্রণোয়ন করেন। এর ফলে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম দেশের শাসনক্ষমতার উপর বাঙালী মুসলমানদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার এই প্রথম সুযোগ আসে। ফলে সুযোগ আসে পাকিস্তানের উপর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব এবং সে সাথে বিশ্ব-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার। ইয়াহিয়া খানের নেয়া এ নতুন পদক্ষেপের কারণে ভূট্টোর ন্যায় পশ্চিম পাকিস্তানের বহু সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি তাঁর উপর খুশি ছিলেন না। ১৯৫৬ সালের সংবিধান তৈরী কালে দুই প্রদেশের নেতাগণ বহু দর কষাকষি করে এক কক্ষ বিশিষ্ঠ জাতীয় সংসদে সমতার বিধানটি মেনে নেন। এবং শর্তরূপে বিলুপ্ত হয় পশ্চিম পাকিস্তানের ৪টি প্রদেশ ও সংসদের উচ্চ পরিষদ। কারণে উচ্চ পরিষদে পূর্ব বাংলার একটি প্রদেশের তূলনায় পশ্চিম পাকিস্তানের ৪টি প্রদেশের অধীক প্রতিনিধিত্ব ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের বহু নেতার অভিযোগ ছিল, ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানীদেরকে পূর্ব পাকিস্তানের মিজরটি শাসনের পদদলে সঁপে দিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা জনাব সহরোয়ার্দী যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তখন স্বায়ত্বশাসনের দাবী তুলেছিলেন মাওলানা ভাষানী। তাঁর সে দাবীর জবাবে জনাব সহরোওয়ার্দী বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৯৮ ভাগ স্বায়্ত্ত্বশাসন দেয়া হয়ে গেছে। ইয়াহিয়া খানই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান যিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনে পূর্ব পাকিস্তানীদের দ্রুত প্রমোশন দিয়ে ইসলামাবাদে কেন্দ্রীয় সরকারের সেক্রেটারিয়েটে সমতা আনার আন্তরিক চেষ্টা করেছিলেন। লন্ডন এবং নিউয়র্কের দূতাবাস গুলোতে পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা তখন প্রায় অর্ধেকে পৌঁছে যায়।-(সাজ্জাদ হোসেন, ১৯৯৩)। বাঙালী মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুজিবের বড় অপরাধ, তিনি তাদেরকে পাকিস্তানের মত বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছেন, -যা আজ পারমাণবিক শক্তিও বটে। এবং সঁপে দিয়েছেন ভারতের চরণতলে। সেটি নিছক ক্ষমতার লোভে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জেনারেল ইয়াহিয়া খান হঠাৎ একাত্তরের ২৫ মার্চে নাযিল হননি। পূর্ব পাকিস্তানের সাথে তার সম্পৃক্ততা ছিল বহু বছরের। তিনি তাঁর কর্ম জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় পূর্ব পাকিস্তানে কাটিয়েছেন। তখন বাঙালীদের সাথে কীরূপ ছিল তাঁর আচরণ? বাংলাদেশের ইতিহাসের বড় অজ্ঞতা হল, যে ব্যক্তিকে বাঙালীর সবচেয়ে বড় শত্রু রূপে চিহ্নিত করা হয় তাঁর সম্মদ্ধেও তাদের ইতিহাস জ্ঞান অতি সামান্য। অজ্ঞতার গভীরতা এতোটাই প্রকট যে তার মত একজন পাঠানকেও বলা হয় পাঞ্জাবী। এক সময় তিনি পূর্ব-পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর ব্রিগেড কমাণ্ডার ছিলেন। তখন নির্দেশ দিয়েছিলেন,“তাঁর বাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে কোনরূপ বিদ্বেষ ছড়ানো যাবে না।সেটি কেউ করলে তাঁর অধিনে তার চাকুরি থাকবে না।” একবার সে অভিয়োগ উঠেছিল ২জন পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসারের বিরুদ্ধে। তিনি সাথে সাথে তাদেরকে তাঁর বাহিনী থেকে ট্রান্সফার করেছিলেন।–(শর্মিলা বোস, ২০১১)। তাছাড়া শেখ মুজিবের নির্বাচনী বিজয়ের পর ইয়াহিয়া খান সাংবাদিকদের সামনে শেখ মুজিবকে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী রূপে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

 

মুজিবের প্রলোভন ও ফায়দালাভ

মজার ব্যাপার হল, শিল্পি কামরুল হাসান যে ব্যক্তির ছবি হিংস্র পশু রূপে এঁকে সারা দেশব্যাপী প্রচার করে,শেখ মুজিব তাকেই এক সময় পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।-(GW Chowdhury, 1974)।অবশ্য মুজিবের সে প্রস্তাবের পিছনে রাজনৈতিক কুমতলব ছিল। সে প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে ইয়াহিয়া খানের সরকার থেকে শেখ মুজিব সন্ত্রাসের অবাধ লাইলেন্স পেয়েছিলেন। নির্বাচনি বিজয়ের জন্য একটি সামরিক সরকারের সহযোগিতা মুজিবের কাছে অতি জরুরী বিবেচিত হয়েছিল। এবং মুজিব সে সহায়তা যথাযথ পেয়েছিলেনও। মুজিবের লক্ষ্য ছিল, যে কোন রূপে নির্বাচনি বিজয়। সে লক্ষ্যেই তিনি সামরিক সরকারের সাথে সখ্যতা গড়েন।

তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন এ্যাডমিরাল আহসান। এ্যাডমিরাল আহসানের বাসভবনে গিয়ে ছুটির দিনে আওয়ামী লীগ নেতা ড. কামাল হোসেন নিয়মিত আডডা দিতেন। এ তথ্য দিয়েছিল বিলেতে অধ্যয়নরত এ্যাডমিরাল আহসানের কণ্যা। (সূত্রঃ লেখকের বন্ধু যিনি বিলেতের একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতেন। এ্যাডমিরাল আহসানের কণ্যা তাকে জানায়,“কামাল আংকেল আমাদের বাসায় ছুটির দিনে প্রায়ই আসতেন ও পিতার সাথে আড্ডা দিতেন।”) ফলে নির্বাচনি বিজয়ের আগেই আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের গুন্ডাবাহিনী দেশের রাজপথ দখলে নিয়ে নেয়। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের গুন্ডাদের হামলায় অন্যান্য দলগুলির শত শত নির্বাচনি জনসভা পন্ড হয়ে গেছে। খোদ ঢাকাতে এ দলগুলি কোন বড় আকারের জনসভাই করতে পারিনি। শেখ মুজিবের সন্ত্রাসী ক্যাডারগণ ঢাকার পল্টন ময়দানে ফজলুল কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ, নুরুল আমীন সাহেবের পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টি (পিডিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর জনসভা তছনছ করে দিয়েছিল। অথচ পল্টন ময়দানটি দেশের প্রত্যন্ত কোন জেলা শহরে নয়, সেটি গভর্নর হাউসের সামনেই। আওয়ামী লীগের সে সন্ত্রাস দেখেও তৎকালীন গভর্নর আহসান না দেখার ভান করেছেন। এবং কোন ব্যবস্থা নেননি। ১৯৭০ য়ের ১৮ই জানুয়ারি পল্টন ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর জনসভায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের গুন্ডাগণ মফস্বল থেকে আগত তিন জন জামায়াত কর্মীকে হত্যা করে এবং শত শত কর্মীকে আহত করে। কিন্তু সে অপরাধে তৎকালীন সামরিক সরকার কোন হামলাকারিকেই গ্রেফতার করেনি। অথচ হামলার সময় পল্টন ময়দানে বহু পুলিশ উপস্থিত ছিল। তৎকালীন ইয়াহিয়া সরকার শেখ মুজিবের গলার রশি যে কতটা ঢিল ছেড়ে দিয়েছিল এ হলো তার নমুনা।

 

গণহত্যার সংজ্ঞা ও প্রকৃত নায়ক

একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও পাকিস্তানপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা গণহত্যার অপরাধে অপরাধী। এ অভিযোগে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী ও কিছু বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কয়েক জন শীর্ষনেতাকে ফাঁসিও দেয়া হয়েছে। আরো কয়েকজন ফাঁসির হুকুম নিয়ে মৃত্যুর দিন গুনছেন। গণহত্যার এ অভিযোগ গুরুতর। তাই এর উপর বিষদ গবেষণা হওয়া উচিত, এবং বস্তুনিষ্ঠ বিচার হওয়া উচিত সে অভিযোগ কতটা সত্য। ইংরাজীতে যাকে বলা হয় জেনোসাইড বাংলা ভাষায় সেটিই গণহত্যা। তারও একটি নিজস্ব সংজ্ঞা রয়েছে এবং সেটি বেঁধে দিয়েছে জাতিসংঘ। United Nations Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide of 1948 গণহত্যার যে সংজ্ঞাটি নির্ধারিত করেছে তা হলঃ “Genocide means any of the following acts committed with intent to destroy, in whole or in part, a national, ethnical, racial or religious group as such:

  1. Killing members of the group,
  2. Causing serious bodily and mental harm to members of the group,
  3. Deliberately inflicting on the group conditions of life calculated to bring about its physical destruction in whole or in part,
  4. Imposing measures intended to prevent births within the group,
  5. Forcibly transferring children of the group to another group.

তাই শুধু হত্যা হলেও সেটি গণহত্যা হয়না। সে হত্যার মাঝে কোন একটি জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও গোত্রের লোককে সমূলে বা আংশিক ভাবে বিলুপ্ত করার মটিভ বা উদ্দেশ্য থাকতে হয়। তখন সে বিলুপ্তকরণ প্রক্রিয়া থেকে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধদেরও রেহাই দেয়া হয় না। হিটলারের আচরণ যেমনটি ছিল সেদেশের ইহুদীদের বিরুদ্ধে। ফলে ইহুদী নারী, শিশু ও বৃদ্ধও সে গণহত্যা থেকে রেহাই পায়নি। যে খুনের বিচারে তাই শুধু লাশ দেখলে চলে না, খুনের মটিভও দেখতে হয়। প্রশ্ন হল, বাঙালীদের নির্মূল করার কোন মটিভ বা পরিকল্পনা কি পাকিস্তানী সরকার বা সেনাবাহিনীর ছিল? থাকলে তারা ডাঃ আব্দুল মোত্তালেব মালেকের ন্যায় বাঙালীকে কেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর বানাবে? জনাব মালেকের কাবিনেটের সকল মন্ত্রীই ছিলেন বাঙালী। বাঙালীদের গভর্নর ও মন্ত্রী করলে কি বাঙালী নির্মূলের কাজ সহজ হয়? জেনারেল ইয়াহিয়ার বিদায়ের পর জুলফিকার আলী ভূট্টো যখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন জনাব নুরুল আমীনের ন্যায় একজন বাঙালীকে কেনই বা তারা ভাইস প্রেসিডেন্ট বানালো? তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে কবর দেয়া হয়েছে কায়েদে আযমের কবরের পাশে। যারা বাঙালীদের নির্মূল করতে চায় তারা একজন বাঙালীকে এরূপ সম্মান দিবে কেন?

একাত্তরে জনাব ভূট্টোর সাথে বাঙালী শাহ আজিজুর রহমান এবং সিলেটের জনাব মাহমুদ আলীকেই বা কেন জাতিসংঘে পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলতে পাঠানো হল? তাছাড়া লক্ষাধিক রাজাকারের হাতেই বা কেন পাকিস্তানী সরকার অস্ত্র তুলে দিল? বাঙালীর উপর এমন বিশ্বাস কি নির্মূলের চেতনা থেকে কি গড়ে উঠে? হিটলার কি কোন ইহুদীকে কোন একটি জার্মান প্রদেশের গভর্নর বা মন্ত্রী বানিয়েছে? কোন একজন ইহুদীর হাতে কি অস্ত্র তুলে দিয়েছে?জার্মানের দূত রূপে কোন ইহুদীকে বিদেশে পাঠিয়েছে? বরং তাদেরকে খুঁজে খুঁজে বের করে গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হয়েছে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার জন্য। পাকিস্তান সেনাবাহিনী কোন গ্রামে গিয়ে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা করেছে সে প্রমাণ নেই। অনেক স্থানে পাকিস্তান আর্মির উপর হামলার অভিযোগে যুবকদের গ্রেফতার বা হত্যা করা হলেও নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের তারা বেছে বেছে ছেড়ে দিয়েছে। -(শর্মিলা বোস, ২০১১)। অথচ ভারত ও তার সহচর আওয়ামী রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ তাদের বক্তৃতা ও লেখনিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে হিটলারের বাহিনীর সাথে তুলনা করে। এবং বলে জার্মানীতে ইহুদীদের বিরুদ্ধে যে হলোকাস্ট বা গণহত্যা ঘটেছে, একাত্তরে সেটিই ঘটেছে বাঙালীদের বিরুদ্ধে। এটি হল জার্মানীর হলোকাস্টে নিহত ইহুদীদের প্রতি যে চরম অবমাননা এবং হিটলারের নৃশংস বর্বরতাকে যে খাটো করে দেখা -সে হুশ কি এসব বুদ্ধিজীবীদের আছে?

 

গণহত্যার অভিযোগ ও ভারতীয় এজেন্ডা

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে একাত্তরের যুদ্ধটি ছিল পাকিস্তানকে আসন্ন বিভক্তি থেকে বাঁচানোর যুদ্ধ। সেনাবাহিনীর সদ্স্য রূপে এটি ছিল তাদের দায়বদ্ধতা। তাদের হাতে অকাট্য প্রমাণ ছিল, একাত্তরের যুদ্ধটি ভারত সরকারের সৃষ্ট,এবং সেটির ব্যাপক প্রস্তুতি চলছিল একাত্তরের বহু পূর্ব থেকেই। ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রায়না তার Inside RAW তে সে ষড়যন্ত্রের কথা তুলে ধরেছেন। এবং তুলে ধরেছেন ভারতের সে ষড়যন্ত্রের সাথে আওয়ামী লীগ নেতাদের দীর্ঘ সংশ্লিষ্টতার কথা। আগরতলা ষড়যন্ত্র যে সত্য ছিল সেটি নিয়ে আজ আর কোন দ্বিমত নেই। খোদ আওয়ামী লীগ নেতারাই সেটির সত্যতা এখন স্বীকার করেন। ফলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে একাত্তরের যুদ্ধটি যে ভারতীয় ষড়যন্ত্রমূলক হামলা থেকে পাকিস্তানকে বাঁচানোর যুদ্ধ ছিল, সে দাবীকে মিথ্যা বলা যায় কি করে? ফলে একাত্তরের যুদ্ধকে পাঞ্জাবীদের বাঙালী নির্মূলের যুদ্ধ বলার কোন যুক্তি থাকে কি? তাছাড়া পাঞ্জাবীদের তেমন একটি লক্ষ্য থাকলে সেটির শুরু একাত্তর থেকে হবে কেন? সে জন্য সত্তরের নির্বাচন দেয়ার প্রয়োজনই বা হবে কেন? নির্বাচন দিলে কি নির্মূলের কাজ সহজ হয়? নির্মূলের লক্ষ্য থাকলে সে কাজ তো ১৯৪৭ সাল থেকেই তারা শুরু করতে পারতো। একাত্তরে পাকিস্তান আর্মিতে যত বাঙালী অসিসার ও সেপাই ছিল ১৯৪৭’য়ে তো তার দশভাগের একভাগও ছিল না। বাঙালীর নির্মূলই যদি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লক্ষ্য হয়ে থাকে তবে ইয়াহিয়া খান এক ব্যক্তি এক ভোটের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের জাতীয় পরিষদে ৫৬% আসন দিয়ে সমগ্র পাকিস্তানের উপর শাসনের বৈধ অধিকার দিলেন কেন? পাকিস্তান সরকারের তেমন একটি উদ্যোগকে কি বাংলার মাটি থেকে বাঙালী নির্মূলের পরিকল্পনা বলা যায়? কোন সুস্থ মানুষ কি সাড়ে সাত কোটি মানুষের নির্মূলের কথা ভাবতে পারে? এটি কি বিবেচনায় আনা যায়? অথচ সে অভিযোগ তোলা হয়েছে ইয়াহিয়া খান ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে।

পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল পূর্ব পাকিস্তানি। ফলে সে দেশের মাটি থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নির্মূলের এমন উদ্ভট কথা কি কোন সুস্থ মানুষের কল্পনাতে আসে? চিন্তাশূণ্য কিছু দাস চরিত্রের মানুষই শুধু সেটি ভাবতে পারে। দাসদের সমস্যা হল, চিন্তা-ভাবনার ন্যায় জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তারা প্রভুর উপর ছেড়ে দেয়। সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রভু, পুরোহিত বা বুদ্ধিজীবীগণ যদি শাপ-শকুন, নদ-নদী, পাহাড়-পর্ব্বত ও গরুবাছুরকে দেবতা বললে, তারাও তাই বলে। ফিরাউন-নমরুদের সময় সাধারণ মানুষের মাঝে ধর্মের নামে নিরেট মিথ্যা কথাগুলোও বিপুল গ্রহণ-যোগ্যতা পেয়েছিল তেমন একটি চেতনাশূণ্যতা ও বিবেকশূণ্যতার কারণেই। একই কারণে বাংলাদেশেও বিপুল গ্রহণ যোগ্যতা পেযেছে তিরিশ লাখের কিসসা। এ মিথ্যাটিকে বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও ছাত্র, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও আইনবিদ, সংসদ সদস্য ও রাজনীতিবিদ, পত্রিকার সম্পাদক ও কলামিস্ট এবং নিরক্ষর কৃষক বা অন্ধ ভিখারির মাঝে কোন পার্থক্য নাই। কোন একটি মিথ্যা কথা কিছু লোক বার বার বলা শুরু করলে এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না হলে সে মিথ্যা ছেয়ে যায় সমগ্র দেশব্যাপী। তখন সে মিথ্যার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ দলিল তালাশ করে না এবং বিবেকবুদ্ধিকেও কাজে লাগায় না। সে উদ্ভট মিথ্যাটি তখন সত্য রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। সে মিথ্যার বিরুদ্ধে কথা বললেই তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস শুরু হয়। মিথ্যার শক্তি যে কত প্রবল হতে পারে -এ হল তার নমুনা। অতীতে নবী-রাসূলদেরও এমন মিথ্যাপাগলদের মোকাবেলা করতে হয়েছে। আজকের সমাজেও মিথ্যার প্রচারক আবু লাহাব এবং আবু জেহেলগণ যে কতটা প্রবল ভাবে বেঁচে আছে বাংলাদেশ হল তারই প্রমাণ। গরুরাও যে ভারতে দেবতার সম্মান পায় তা তো মিথ্যার প্রতি প্রবল আসক্তির কারণেই। শশানবাসী উলঙ্গ সন্যাসী আর হিন্দু বিজ্ঞানী, বিচারক, বুদ্ধিজীবী বা প্রফেসরের মাঝে এ আদিম মিথ্যাকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কি কোন পার্থক্য আছে? হয়তো কোন কালে কোন অজ্ঞ ব্যক্তি তার আদিম অজ্ঞতা নিয়ে শাপ-শকুন-গরু, নদ-নদী ও পাহাড়-পর্বতকে দেবতা রূপে প্রচার করেছিল, এবং সেগুলির পূজাকে ধর্ম বলেও আখ্যায়ীত করেছিল। সে সময়ে তার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ না হওয়ায় আজ সেটি শত কোটি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে তিরিশ লাখের কিসসা নিয়ে মূলত সেটিই ঘটেছে। মুজিব না জেনে ও না বুঝে যা উচ্চারণ করেছে বাঙালীগণ সেটিরই প্রচারে নেমেছে। শর্মিলা বোস এটিকে “gigantic rumour” তথা এক বিশাল গুজব বলে আখ্যায়ীত করেছেন।

 

বিহারী বিরোধী গণহত্যা

সত্য হল, একাত্তরে প্রকৃত গণহত্যার শিকার হল বিহারীরা। জাতিসংঘ যেভাবে গণহত্যাকে সংজ্ঞায়ীত করেছে বিহারীদের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। অগণিত শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা সে গণহত্যা থেকে বাঁচেনি। সে গণহত্যার সাক্ষী বহু বাঙালী। সে গণহ্ত্যার বিররণ নিয়ে বিহারীগণও বই লিখেছে। তারা মারা যায় দুটি পর্বে। প্রথম পর্বটি শুরু হয় পহেলা মার্চ থেকে। তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সবটুকু জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের দলীয় ক্যাডারদের শাসন। সেটি চলতে থাকে সেনাবাহিনীর পুনঃনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত, অর্থাৎ এপ্রিলের প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় ১৬ ই ডিসেম্বরে। এবং সেটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজয়ের পর। দ্বিতীয় পর্বের হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনটি চলে প্রথম পর্বের চেয়েও বেশী কাল ধরে। সেটি সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। প্রথমপর্বে ঢাকা শহরের মীরপুর, মোহম্মদপুর, উত্তর বঙ্গের সৈয়দপুরের ন্যায় বিহারী সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলি হত্যাকাণ্ড ও লুঠতরাজ থেকে বাঁচলেও দ্বিতীয় বারে বাঁচেনি। এবার হয় তাদের হত্যা করা হয়, নতুবা ঘরবাড়ী, সহায়-সম্পদ কেড়ে নিয়ে বস্তিতে পাঠানো হয়। খুলনা শহরে তেমন একটি হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ দিয়েছেন শর্মিলা বোস। “১৯৭২ সালের ১০ই মার্চ খুলনা জুটমিলের বিহারী শ্রমিকদের নিউ টাউন কলোনীতে বাঙালীরা ঘেরাও করে। সকাল ১১টা থেকে শুরু করে দুপুর ১টা অবধি সেখানে অবস্থানরত বিহারী পুরুষ,নারী ও শিশুদের হত্যা করার কাজ। বেঁচে যাওয়া বিহারীদের কাছ থেকে শর্মিলা বোস জানতে পারেন, কয়েক হাজার বিহারীকে সেখানে হত্যা করা হয়। সে হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয় শহীদ নামে এক মুক্তিযোদ্ধা। বহু বিহারীদের ঘেরাও করা হয় খুলনার ওল্ড টাউন কলোনীতেও। কিন্তু সেখানকার ম্যানেজার জনৈক রহমান সাহেব তাদেরকে হত্যা না করে রিফিউজী ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়। -(শর্মিলা বোস, ২০১১)।

জাতিসংঘ কর্তৃক সংজ্ঞায়ীত জেনোসাইড বা গণহত্যাটি যে বাঙালীদের দ্বারা ঘটেছে -সে প্রমাণ প্রচুর। তার কিছু বিবরণ পাওয়া যায় শর্মিলা বোস থেকে। বাঙালীদের হামলা থেকে খুলনা, শান্তাহার, চট্টগ্রাম, বাহ্মনবাড়িয়া, সৈয়দপুর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, পাকশীর ন্যায় নানা শহরে বিহারী নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা যেমন রেহাই পায়নি, তেমনি রেহাই পায়নি তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ঘরবাড়ী। মীরপুর, মোহম্মদপুর, ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানীসহ ঢাকা শহরের যেখানেই অবাঙালীদের বাড়ীঘর ছিল সেগুলো থেকে তাদের বলপূর্বক নামিয়ে দখল নিয়েছে বাঙালীরা। আসল মালিকদের হয় হত্যা করা হয়েছে অথবা বস্তিতে পাঠানো পাঠিয়েছে। যারা অতি ভাগ্যবান তারা সেদিন পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে বেঁচেছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের ঢাকার অভিজাত এলাকায় আজ যে বিশাল বিশাল বাড়ী সেগুলো কি তাদের জমিদারি, ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকুরি-বাকুরি থেকে অর্জিত পয়সা থেকে কেনা? তাদের ক’জনের সেরূপ ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকুরি ছিল? আজও একটি জরিপ চালালে তাদের বিশাল বিশাল ঘরবাড়ির মালিক হওয়ার মূল রহস্যটি বেরিয়ে আসবে। একটি জনগোষ্টির বিরুদ্ধে যখন গণহত্যা হয় তখন তো এগুলোই ঘটে। যারা হামলার শিকার তারা প্রাণ হারায়, ইজ্জত হারায়, ঘরবাড়ী ও ব্যবসা-বাণিজ্যও হারায়। জার্মানীর ইহুদীদের সাথে তো সেটিই ঘটেছিল। প্রাণ বাঁচাতে তাদের দেশ ত্যাগ করতে হয়েছিল। আর তাদের ঘরবাড়ী ও ব্যবসা বাণিজ্যের দখল নিয়েছিল জার্মানারা। একই রূপ নির্মম নৃশংসতা ঘটেছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত অবাঙালী নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ ও শিশুদের সাথে। পাঞ্জাবীদের দ্বারা বাঙালীর বিরুদ্ধে গণহত্যা পরিচালিত হলে শুধু বাঙালীর প্রাণনাশই হতো না, তাদের ঘরবাড়ী, ব্যাবসা-বাণিজ্য, চাকুরি-বাকুরিও হারাতে হতো। সেগুলো না হলে তো জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যা হয় কি করে? কিন্তু ক’জন বাঙালীর ক্ষেত্রে সেটি ঘটেছে? বরং সেদিন তো অধিকাংশ বাঙালী নিজ নিজ ব্যবসা-বাণিজ্য করেছে, নিজ ঘরে থেকেছে, অফিসে গেছে এবং অনেকে মন্ত্রীও হয়েছে! শেখ মুজিবের নিজের বাড়ীটিও তো সেদিন অক্ষত থেকেছে।

 

সত্যের বিরুদ্ধে নাশকতা

একাত্তরের যুদ্ধে বিস্তর প্রাণহানী ও সম্পদহানী হয়েছে। কিন্তু এ বিপুল হানাহানির মাঝে যেটি সবচেয়ে বেশী মারা পড়েছে সেটি হল সত্য। সে মৃত সত্যগুলো কবরস্থ হয়েছে ইতিহাসের বইয়ে। আর সত্যের বিরুদ্ধে সে নাশকতাটি ঘটেছে বাংলাদেশের সেক্যুলার রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও ইতিহাস রচনাকারিদের হাতে। তবে দেশের চরিত্রহীন রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মিথ্যাচারকে বিজয়ী করার স্বার্থে সেরূপ সত্যবিনাশ অনিবার্যও ছিল। কারণ, সূর্য অস্ত না গেলে রাতের আঁধার জেঁকে বসতে পারে না। তেমনি সত্যকে দাফন না করলে দেশ মিথ্যার প্লাবনে ডুবে না, তাতে মিথ্যুকদেরও নাম যশ বাড়ে না। একাত্তরের লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা। বিজয়ের পর তারা শুধু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনই দখলে নেয়নি, দখলে নিয়েছে ইতিহাস রচনার ন্যায় একাডেমিক বিষয়ও। আওয়ামী শাসনামলে সরকারি অর্থে সরকারি লোকদের লাগানো হয়েছিল ইতিহাস রচনার কাজে। ফলে যা রচনা হয়েছে সেটি আর ইতিহাস থাকেনি। পরিণত হয়েছে দলীয় প্রশংসা-গাঁথায়। এককালে স্বৈরাচারী রাজা-বাদশাহগণ দরবারে কবি ও ইতিহাস লেখক প্রতিপালন করে তাদের দ্বারা একাজটিই করাতো। বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চার নামে সে কাজটিই হয়েছে।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের সামরিক এ্যাকশনের সিদ্ধান্তটি ছিল নিতান্তই সামরিক বাহিনীর। দেশের পাকিস্তানপন্থী এবং ইসলামপন্থী দলগুলো সে এ্যাকশনের সাথে সংশ্লিষ্ঠ ছিল না। সে রাতে যা ঘটেছে তা যেমন দুঃখজনক, তেমনি অনাকাঙ্খিত। কিন্তু সামরিক বাহিনীর সে এ্যাকশনের সাথে অতিরঞ্জিত মিথ্যার সংমিশ্রন ঘটিয়ে পরবর্তীতে ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসনের ন্যায় ভয়ানক অপরাধকে জায়েজ করা হয়।ঐ রাতে যা ঘটেছে তা নিয়ে সত্য বেরিয়ে আসা উচিত। কিন্তু সেটি হয়নি। বরং গুজবকে বেশী বেশী প্রচার করা হয়েছে। প্রকৃত সত্যকে ইচ্ছা করেই সেদিন আবিস্কার করা হয়নি। কারণ, তারা জানতো প্রকৃত সত্যকে মিথ্যা গুজবের ন্যায় কখনোই এতোটা বীভৎস করা যায় না। পাকিস্তান আর্মির বিরুদ্ধে বাঙালী নির্মূলের অভিযোগটি সত্য হলে সেটি তো ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট থেকেই শুরু হওয়া উচিত ছিল। নির্মূলের শুরু ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ থেকে কেন? এক রাতে ঢাকা শহরের ৬০ হাজার মানুষ হত্যার যে তথ্য পেশ করা হয় তাদেরই বা পরিচয় কোথায়? কোন আবাসিক হল ও কোন মহল্লা থেকে কতজন হত্যা করা হয়েছিল -সে হিসাবটি কোথায়? এতো বিশাল সংখ্যক মানুষের লাশ গেল কোথায়?কোন বদ্ধ ভূমিতে ফেললেও তাদের হাড্ডি পাওয়া যেত। গণনাও করা যেত। আওয়ামী লীগ বহু বছর ক্ষমতায় থেকেছে, কিন্তু সে পরিসংখ্যান কি দিতে পেরেছে?

নব্বইয়ের দশকে বসনিয়ায় নিহত হাজার হাজার মুসলমানের লাশ বর্বর সার্ব বাহিনী মাটিচাপা দিয়েছিল। কিন্তু সেগুলি খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়নি। প্রতিটি লাশকে তারা সনাক্ত করেছে, তাদের নাম ঠিকানা বের করে আপনজনদের তা জানিয়েছে। কিন্তু ঢাকায় সে ৬০ হাজার মানুষের কবর মেলেনি, হাড্ডিও মেলেনি। একাত্তরে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকের সংখ্যা সর্বসাকূল্যে ৬০ হাজারের অর্ধেক তথা ৩০ হাজারও ছিল না। তবে কি পাক বাহিনী তাদের সবাইকে হত্যা করেছিল? আর কোথায় হিন্দুদের বসতি যেখান থেকে খুঁজে খুঁজে হিন্দুদের হত্যা করেছিল? পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যদের পক্ষে কি সম্ভব ছিল এক রাতে বেছে বেছে হাজার হাজার হিন্দু হত্যা করা? বলা হয়, একাত্তরে এক কোটি মানুষকে ভারতে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যার মাঝে এক কোটিকে ভারতে যেতে বাধ্য করা হলে প্রতি ৮ জনের মাঝে কমপক্ষে একজনকে ভারতে যেতে হয়। যে গ্রামে ৮ শত মানুষের বাস সে গ্রাম থেকে কম পক্ষে ১০০ জনকে ভারতে যেতে হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রায় ৭০ হাজার গ্রামের প্রতি গ্রামে সে হারে ভারত-গমন ঘটতে হবে, নইলে এক কোটির সংখ্যা কি পূরণ হওয়া কি সম্ভব? কোন গ্রাম থেকে কেউ ভারতে না গেলে পরবর্তী গ্রামটি থেকে দ্বিগুণ হারে যেতে হবে। অথচ বাংলাদেশে এমন গ্রামের সংখ্যা তো হাজার হাজার যেখান থেকে একজনও একাত্তরে ভারতে যায় নি।

 

গ্রন্থপঞ্জি

  1. Sisson, Richard and Leo Rose (1990): War and Secession: Pakistan, India and the Creation of Bangladesh, University of California; Berkeley.
  2. Bose, Sarmila, 2011: Dead Reckoning: Memories of the 1971 Bangladesh War, Hurst & Company, London.
  3. W. Chowdhury, 1974:  The Last Days of United Pakistan, C. Hurst & Company, London.
  4. ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন,১৯৯৩;একাত্তরের স্মৃতি,নতুন সফর প্রকাশনী ৪৪,পুরানা পল্টন দোতালা,ঢাকা, ১০০০।



অধ্যায় পাঁচ: শেখ মুজিবের মুখোশ ও রাজনীতি

মুখোশের আড়ালে ষড়যন্ত্র

শেখ মুজিব প্রায়ই বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলতেন।বলতেন,‍জনগণের বাকস্বাধীনতাসহ মৌলিক অধিকারের কথা।বলেছেন শক্তিশালী পাকিস্তানের কথাও।প্রতিটি নির্বাচনি জনসভায় –এমন কি নির্বাচনের পর একাত্তরের ৭ই মার্চে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্দানের জনসভাতেও উচ্চকন্ঠে “‍‍‍‍‌‍পাকিস্তান জিন্দাবাদ” ধ্বনি দিয়েছেন।তবে এসবই ছিল তার রাজনীতির মুখোশ।সে মুখোশের আড়ালে ছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ নির্মানের প্রকল্প।ছিল,একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার নেশা।ছিল নানারূপ ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। মুজিবের সে রাজনীতিতে বিরোধীদের জন্য কোন স্থান ছিল না।তার শাসনামলে বিরোধী পত্র-পত্রিকার জন্যও কোন স্থান ছিল।বরং নিজের রাজনীতিতে স্থান করে দিয়েছেন বিদেশী শত্রুদের।ভোটের আগে যা বলেছেন,নির্বাচনি বিজয়ের পর করেছেনে তার উল্টোটি।ফলে “পাকিস্তান জিন্দাবাদ”য়ের বদলে স্থান পায় পাকিস্তান ধ্বংসের রাজনীতি।পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে তিনি যে আগরতলায় গিয়েছিলেন এবং তৎকালীন ভারতীয় সরকারের কাছের যে সাহায্য চেয়েছিলেন -সেটি আজ আর গোপন বিষয় নয়।

গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল কথা,দেশ ও দেশের রাজনীতি পরিচালিত হবে জনগণের রায়ের ভিত্তিতে।এখানে ক্ষমতাসীনদের খেয়ালখুশি চলে না।সেটি হলে তাকে গণতন্ত্র না বলে নিরেট স্বৈরাচার বলা হয়।শেখ মুজিব জনগণ থেকে রায় নিয়েছেন ঠিকই,কিন্তু যে ওয়াদা দিয়ে রায় নিয়েছেন,নির্বাচনের পর তার ধারে কাছেও যাননি।নির্বাচনি বিজয়ের পর নিজের রাজনৈতিক গোলপোষ্টই পাল্টে ফেলেছেন।পাকিস্তান ভাঙ্গার সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন নির্বাচনের বহুবছর আগেই।নিজের রাজনীতির গোলপোষ্ট পরিবর্তনের সময় জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দিকে তাকাননি।সত্তরের নির্বাচনে তিনি ভোট নিয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য অধিক প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন আদায়ের ওয়াদা দিয়ে। কোন নির্বাচনি জনসভাতেই স্বাধীনতার কথা বলেননি।বরং আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতিহারে ছিল পাকিস্তানকে মজবুত করার অঙ্গীকার।অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে শেখ মুজিব ৮ দফা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কেও স্বাক্ষর করেছেন।পূর্ব পাকিস্তানের অধিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে এমন কি অখণ্ড পাকিস্তানের অস্তিত্বে বিশ্বাসীর আপত্তি থাকার কথা নয়;ফলে তাদেরও অনেকে সরল বিশ্বাসে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে।কিন্তু মুজিব তাদেরকে ধোকা দিয়েছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে যারা জাতীয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রি ও তীব্র ইসলাম বিরোধী তাদের পক্ষ থেকে সচারাচর বলা হয়, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগেরবিজয় ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পক্ষে গণরায় বা রেফারেন্ডাম। বলা হয়, এ গণরায় বাস্তবায়ন করতেই নাকি একাত্তরের যুদ্ধ। বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। তারা একথাও বলে, সে চেতনাটির নাকি বিজয় ঘটেছিল সত্তরের নির্বাচনে। তাদের কাছে মুজিবের অপরাধ, নির্বাচনে বিজয়ের পরও কেন তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক সমস্যা ও কেন্দ্রে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর সাথে আলাপে বসেছেন? সুতারাং তাদের অভিযোগ, মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। অভিযোগ, স্বাধীনতা চাইলে তিনি ভারতে না গিয়ে কেন পাকিস্তানীদের কাছে ধরা দিলেন? এ অপরাধে তাদের অনেকে মুজিবকে স্বাধীনতার শত্রু বলে অভিহিত করে থাকে। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ মূলত সেসব চীনপন্থীদের,যারা এক সময় ভাষানী ন্যাপের সাথে জড়িত ছিল এবং পরে জিয়াউর রহমানের গড়া বিএনপি’তে যোগ দেয়। তাদের এরূপ প্রচারের মূল মতলবটি হলো,স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় মুজিবর রহমানের চেয়ে জিয়াউর রহমানকে বড় করে দেখানো। সে লক্ষ্য পূরণে জিয়াউর রহমানকে তারা স্বাধীনতার ঘোষক বলে অধিক গুরুত্ব দেয়। এসব কথা বিএনপি প্রতিষ্ঠার আগে ও মুজিবের জীবদ্দশাতে তেমন প্রচার পায়নি। অথচ চীন যে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টিকে ভারতীয় আধিপত্যবাদী প্রজেক্ট মনে করতো এবং আজকের বাংলাদেশ যে তারই শিকার -সে কথাটি এসব বামপন্থীরা বলে না।

 

নির্বাচন ও প্রতারণা

প্রশ্ন হলো, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে কি আদৌ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষে গণরায় বলা যায়? এ নিয়ে মিথ্যাচারটি বিশাল। বিষয়টি তাই বিচারের দাবী রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে সে বিচার আজও হয়নি। অগণিত মানুষ এখনো মিথ্যার জোয়ারে ভাসছে। সত্য তাদের কাছে এখনো তুলে ধরা হয়নি। প্রশ্ন হলো, বিষয়টি কি এতোই দুর্বোধ্য? সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়টি স্বাধীনতার প্রশ্নে জনগণের রায় বা রেফারেন্ডাম গণ্য হলে শেখ মুজিব কেন মার্চে ইয়াহিয়া খান ও ভূট্টোর সাথে পাকিস্তানে সরকার গঠন ও শাসনতন্ত্র নিয়ে আলোচনায় বসলেন? অথচ রেফারেন্ডাম হলে সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশে স্বাধীন দেশ রূপে নির্বাচনের পরপরই আত্মপ্রকাশ করতো। তা নিয়ে কারো মনে কোন সংশয় বা প্রশ্ন উঠতো না। নির্বাচনের পর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও হত না। এবং হাজার হাজার পূর্বপাকিস্তানী পাকিস্তান বাঁচাতে রাজাকার হত না। একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জনগণের মাঝে যে বিভক্তি জন্ম নিয়েছে তা তো মূলত রেফারেন্ডাম না হওয়ার কারণে। এমন কি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও সত্তরের নির্বাচনে স্বাধীন বাংলাদেশের ইস্যু তোলা হয়নি। ভোট চাওয়া হয়েছে, ৬ দফার আলোকে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। আওয়ামী লীগযে নির্বাচনি মেনিফেস্টো প্রকাশ করে,তাতেও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কোনরূপ অঙ্গীকার ছিল না। সে মেনিফেস্টোতে কোন চেতনার কথাও ছিল না। বরং ছিল কোরআন-সূন্নাহ বিরোধী কোন আইন না তৈরির অঙ্গীকার।

পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকোন মামুলি বিষয় ছিল না, এটি ছিল অতি গুরুতর বিষয়। বাঙালীদের উপর পাকিস্তানের মানচিত্রটি কোন পশ্চিম পাকিস্তানী জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়নি। ১৯৪৭ সালে কোন পাঞ্জাবী সেনাদল যুদ্ধ করে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করেনি। বরং পাকিস্তানের সৃষ্টিতে মূল ভূমিকাটি ছিল বাঙালী মুসলিমদের। মাত্র ২৪ বছর আগে ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রশ্নে শতকরা প্রায় ৯৬% ভাগ বাঙালী মুসলিম ভোটার ভোট দিয়ে দেশটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফলে সে দেশটির বিনাশ কি একটি সাধারণ নির্বাচনের ভোটে করা যায়? সাধারণ নির্বাচন হয় রাজনীতি,অর্থনীতি, বিদেশনীতির নানা ইস্যু নিয়ে; দেশটি থাকবে কি থাকবে না সে ইস্যুতে নয়। এরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যে কোন দেশের বুদ্ধিজীবী, সমাজবিজ্ঞানী, আলেম-উলামা, রাজীনীতিবিদ ও সাধারণ জনগণ দেশভাঙ্গার পরিণতি নিয়ে বহুবছরধরে চিন্তা-ভাবনা করে। পরস্পরে পক্ষে-বিপক্ষে বিষদ আলাপ-আলোচনা হয়। জমি কেনা, ভিটায় ঘর তোলা বা নতুন ব্যবসা শুরুর ব্যাপারেও মানুষ মাসের পর মাস চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। আর দেশের মানচিত্র বদলানোর বিষয় তো বিশাল। এর সাথে জড়িত দেশবাসীর শত শত বছরের ভবিষ্যৎ। পাকিস্তান নামে নতুন একটি

রাষ্ট্র নির্মাণ নিয়ে ভারতীয় মুসলিমগণ কয়েক দশক ব্যাপী চিন্তাভাবনা করেছে। পক্ষে-বিপক্ষে তা নিয়ে চুলচেড়া বিচার-বিশ্লেষণও হয়েছে। ভারত ভেঙ্গে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলি নিয়ে আলাদা রাষ্ট্রের প্রস্তাবটি প্রথমে পেশ করেন দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবাল। রাজনীতির ময়দানে পাকিস্তান গড়ার প্রস্তাবটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রূপে প্রথমে পেশ করা হয় ১৯৪০ সালে লাহোরের মিন্টো পার্কে মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় সম্মেলনে।সে প্রস্তাবটি রাখেন বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা ফজলুল হক। এরপর ৬ বছর ধরে চলে পক্ষে-বিপক্ষে লাগাতর বিতর্ক ও চিন্তাভাবনা। বিষয়টির উপর জনমত যাচায়ে ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় রেফারেন্ডাম। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিষয়টি যখন রিফারেন্ডামে ৯৬% ভাগের বেশী ভোটে অনুমোদিত হয় তখন তৎকালীন ব্রিটিশ শাসক ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কাছে সে রায়ের বিরোধীতায় আর কোন দলিল থাকেনি।

 

ফ্যাসিবাদ ও জালিয়াতি

কিন্তু পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সে বিষয়ে কোন রূপ জনমত যাচাই না করেই। জনগণের বিরুদ্ধে এটি হলো আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অপরাধ। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে তারা ভোট নিয়েছে পাকিস্তানের জন্য শাসনতন্ত্র নির্মাণের অঙ্গীকার দিয়ে, অথচ সে সাংসদগণ শাসনতন্ত্র তৈরি করেছেন বাংলাদেশের। এভাবে বাংলাদেশের সৃষ্টিতেই ঘটেছে বিশাল জালিয়াতি। বিষয়টিকে তারা দলের কিছু নেতার গোপন বিষয় রূপেই রেখেছে। এবং জনগণকে আস্থায় নেয়নি। জনগণের বদলে মুজিব আস্থায় নিয়েছেন ভারত সরকার ও ভারতীয় গুপ্তচরদের। তাই ১৯৭০য়ের নির্বাচনকে স্বাধীনতার প্রশ্নে রেফারেন্ডাম বা গণরায় বলার প্রশ্নই উঠেনা। হঠাৎ করেই একাত্তরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে দলটির নেতাকর্মীগণ পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলা শুরু করে। শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানোর উৎসব। আওয়ামী লীগের বাইরেও দেশে বহুদল ছিল, বহু আলেম-উলামা ও বুদ্ধিজীবী ছিল, এবং ছিল বিশাল জনগণ। কিন্তু তাদেরকে এ বিষয়ে মত প্রকাশের সুযোগ দেয়া হয়নি। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’য়ের ন্যায় পাকিস্তান বিরোধী দলগুলোও দেশটির প্রতিষ্ঠা রুখতে সর্বশক্তি দিয়ে প্রচার চালানোর সুযোগ পেয়েছিল। অথচ আওয়ামী লীগের জঙ্গিদের পক্ষ থেকেই মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করা হয়। এবং বিলুপ্ত হয় শান্তিপূর্ণ সভা-সমিতি ও আলাপ-আলোচনার পরিবেশ। দেশে প্রতিষ্ঠা পায় প্রচণ্ড ফ্যাসিবাদী প্রক্রিয়া। সৃষ্টি হয় ত্রাসের রাজত্ব। দেশ কোন দিকে যাবে বা দেশের ভবিষ্যৎ কি হবে -তা নিয়ে কথা বলেছে একমাত্র মুজিব ও তার সঙ্গিরা। ছিনতাইকারির কবলে পড়লে অধিকাংশ মানুষের মুখে ভাষা থাকে না; সবাই টের পায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীর সাথে আলোচনা অর্থহীন। চারিদিকে তখন নিরবতা ছেয়ে যায়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দি দলগুলোর নেতাকর্মীদের অবস্থাটি ছিল অবিকল তাই। উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় ছিনতাইয়ের ঘটনা। অথচ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বহু প্রবীন রাজনীতিবিদ,আলেম-উলামা ও বুদ্ধিজীবী ছিলেন। ফ্যাসিবাদের উগ্রমুর্তি দেখে তারাও সেদিন নিরব হয়ে যান। নিরব হয়ে যায় সাধারণ জনগণও।সন্ত্রাসের সামনে সে নিরবতাকেই বাঙলী জাতীয়তাবাদীগণ তাদের পাকিস্তান ভাঙ্গার প্রজেক্টের প্রতি গণসমর্থণ বলেছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি কালে এভাবে কাউকে নিরব হতে হয়নি।

স্বাধীনতার বিষয়টিকে নির্বাচন কালে আলোচিত না হলেও নির্বাচনের পর এটিকেই মূল ইস্যু বানানো হয়। জনগণের উপর দলীয় সিদ্ধান্তকে চাপিয়ে দেয়া হয়।এতোবড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিছক আওয়ামী লীগ, মস্কোপন্থী ন্যাপ, চীনপন্থী ন্যাপের একাংশ এবং কম্যুনিস্ট পার্টির ন্যায় ইসলাম থেকে দূরে সরা দলগুলির নিজস্ব প্রজেক্টে পরিণত হয়। এভাবে স্বাধীনতার প্রশ্নে যুদ্ধ শুরু করা হয় জনগণের রায় না নিয়েই। এভাবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাটি শুরু হয় জনগণের মাঝে গভীর বিভক্তি নিয়ে।এবং সে বিভক্তিকে আজও নানা ভাবে গভীরতর করা হচ্ছে। ১৯৭১’য়ের মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই সমগ্র দেশে নিরস্ত্র অবাঙালী এবং তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা শুরু  হয়। অপরদিকে ভীতসন্ত্রস্থ রাখা হয় পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের। সৃষ্টিকরা হয় আইনশৃঙ্খলাহীন এক যুদ্ধকালীন অবস্থা। সমাজের দুর্বৃত্তদের জন্য সৃষ্টি হয় লুটপাটের মোক্ষম সময়। এরূপ অবস্থায় কি রাজনৈতিক বিচার-বিবেচনার সুযোগ থাকে? যুদ্ধ শুরুর কারণ, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের (পার্লামেন্ট) ৩রা মার্চ অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকটি ১লা মার্চ মুলতবি করেছিলেন। কিন্তু সেটি কি পাকিস্তান ভাঙ্গা ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর কারণ হতে পারে? বৈঠক মুলতবি হলে সেটি আবার শুরুও করা যায়। কিন্তু দেশ ভেঙ্গে গেলে তা কি আবার জোড়া লাগানো যায়? কিন্তু ইয়াহিয়া খানের বৈঠক মুলতবি করার ঘোষণাটিকেই স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর কারণ রূপে ঘোষণা দেয়া হয়।

 

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের রাজনীতি

নির্বাচনি বিজয়ের পর শেখ মুজিবের হাতে কেন সেদিন ক্ষমতা দেয়া হয়নি –আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের সেটিই মূল অভিযোগ। জাতীয় পরিষদ তথা সংসদের বৈঠককে মুলতবি করাকে তারা মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করে। ইয়াহিয়া খান কেন বৈঠক কেন মুলতবি করলেন -সেটির কারণও তারা খতিয়ে দেখতে রাজী নয়। মনে রাখতে হবে, তখন দেশে কোন শাসনতন্ত্র ছিল না। তাই সত্তরের নির্বাচনের পর নির্বাচিতদের প্রথম দায়িত্বটি ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের জন্য একটি শাসনতন্ত্র তৈরি। স্মরণযোগ্য হলো, যে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক দলিলটি স্বাক্ষর করে শেখ মুজিব ও তার দল নির্বাচনে অংশ নেয় তাতে নির্বাচনের পর পরই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের শর্ত ছিল না। দেশের সামরিক শাসক রূপে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দেশ চালাতেন সামরিক আইন অনুযায়ী; ক্ষমতা হস্তান্তর হলে সে আইনও তুলে নিতে হত।প্রশ্ন হলো, নির্বাচন শেষে সাথে সাথে ক্ষমতা অর্পণ করলে দেশ চলতো কোন আইন অনুযায়ী? ফলে একমাত্র শাসনতন্ত্র তৈরির পরই সুযোগ ছিল সে শাসনতন্ত্র অনুযায়ী দেশ শাসনে নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের।শাসনতন্ত্র তৈরির জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল ১২০ দিন তথা ৪ মাস। এটিই ছিল ৮ দফা লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্কের সুনির্দিষ্ট বিষয়। শাসতন্ত্র তৈরির কাজ শেষ না অবধি এ ৪ মাস দেশ চলবে সামরিক আইন অনুযায়ী –এ নীতিমালায় স্বাক্ষর করেই শেখ মুজিব নির্বাচনে অংশ নেন। অথচ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর শেখ মুজিব নিজের স্বাক্ষীরিত সে নীতিমালাকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেন এবং ইচ্ছকৃত ভাবেই ভূলে যান, সেরূপ কোন নীতিমালা আদৌ ছিল এবং তাতে তিনি স্বাক্ষর করেছিলেন। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর সাথে আলোচনা চলা কালে দাবি তোলেন, সামরিক আইন তুলে নেয়ার ও আশু ক্ষমতা হস্তান্তরের। ইতিহাসে মুজিবের এরূপ আচরণ যে তার নিজ ওয়াদার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা গণ্য হবে –তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? বাঙালী সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীগণ মুজিবের এরূপ ওয়াদাভঙ্গের বিষয়টিকে ইচ্ছাকৃত ভাবেই ইতিহাসের বই থেকে লুকিয়েছেন।

যে কারণে সংসদের বৈঠক মুলতবি করা হয়েছিল –তা নিয়েও কি কোন নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হয়েছে? বৈঠক মুলতবির ঘোষণাকে বাঙালী বা মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলা হয়েছে। বিষয়টি কি তাই? মুলতবির কারণটি ছিল, মুজিব, ভূট্টো ও পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মাঝে শাসনতান্ত্রিক ইস্যুগুলি নিয়ে অচলাবস্থা। পাকিস্তানে তখন ৫টি প্রদেশ। কোন একটি প্রদেশ কি অন্য প্রদেশগুলির উপর তার নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে? সেটি তো সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার। ভারতীয় হিন্দুগণ তেমন একটি স্বৈরাচার মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিবে -সে ভয়েই তো পাকিস্তান সৃষ্টি হলো। গণতন্ত্রের রাজনীতি হলো আপোষরফা ও সমাঝোতার রাজনীতি। এ রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘিষ্ঠ –উভয়ের স্বার্থই গুরুত্ব পায়; কেউ কারো উপর অবিবেচক হয় না। তাই পাকিস্তানের আর ৪টি প্রদেশের নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা না করে শাসনতন্ত্র তৈরী অসম্ভব ছিল। অথচ মুজিব তাতে রাজী ছিল না। মুজিব ও তার আওয়ামী লীগের দাবী ছিল, যেহেতু তার দল পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের মেজোরিটি, অতএব শাসনতন্ত্র রচনার দায়িত্বটি তাদের। এবং অন্য কারো সে অধিকারে হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। এমন একটি সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র রচনার সময়।তখনও ছিল ৫টি প্রদেশ। ভারতীয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের অনুকরণে সংসদের নিন্ম ও উচ্চ পরিষদ রাখার কথা উঠেছিল। নিন্ম পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হবে জনসংখ্যার অনুপাতে,কিন্তু উচ্চ পরিষদে প্রতিটি প্রদেশ সমান সংখ্যক সদস্য পাঠাবে যেমনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে হয়ে থাকে। এরূপ শাসনতন্ত্রে শর্ত থাকে,নিন্ম পরিষদে পাশ হওয়া যে কোন আইনকে অবশ্যই উচ্চ পরিষদ দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে। তখন পূর্ব পাকিস্তানে ছিল মাত্র একটি প্রদেশ, এবং  পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান -এ ৪টি প্রদেশ। ফলে নিন্ম পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও উচ্চ পরিষদে তাদের আসন সংখ্যা হত ৫ ভাগের মাত্র এক ভাগ। তখন সে সমস্যা এড়াতে দেশের উভয় অংশের সংসদ সদস্যদের মাঝে আপোষরফা হয়। মীমাংসা হয়, পশ্চিম পাকিস্তানের ৪টি প্রদেশকে ভেঙ্গে একটি প্রদেশ করার এবং দেশের জাতীয় সংসদে পূর্ব ও পশ্চিমের উভয় প্রদেশের সমান সংখ্যক আসন বরাদ্দের। আওয়ামী লীগের নেতা সোহরাওয়ার্দীসহ অন্যান্য পূর্ব পাকিস্তানীরা সে সমতার বিধানকে মেনে নেন। কিন্তু ১৯৭১য়ে এসে সে মীমাংসিত বিষয়গুলো আবার নতুন করে উত্থিত হয়। এবং উত্থিত হয় নানা প্রদেশ থেকে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের বিষয়ও। তাই বিষয়টি এতো সহজ-সরল ছিল না যে, সংসদের বৈঠক বসবে এবং সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ নিজেদের ইচ্ছা মত একটি সংবিধান প্রণোয়ন করে ফেলবে। অথচ আওয়ামী লীগ সেটিই চাচ্ছিল। তেমন প্রচেষ্টা হলে অন্য প্রদেশের সংসদ সদস্যগণ যে সে সংসদে যোগ দিবে না –সে ঘোষণাটিও বার বার দেয়া হচ্ছিল। তাই জরুরী ছিল সংসদের বৈঠক বসার আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে আপোষরফা।

 

ট্রোজান হর্সদের দখলদারি

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান চাচ্ছিলেন, সংসদে বসার আগে নানা দলের মাঝে বিরাজমান বিরোধগুলি নিয়ে আলোচনা ও সমাঝোতার একটি পরিবেশ সৃষ্টি হোক। তাছাড়া শাসনন্ত্র প্রণয়োনের জন্য বরাদ্দকৃত সময়টি ছিল মাত্র ১২০দিন। পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচনায় লেগেছিল ৯ বছর। সংসদে প্রবেশের আগে বিরোধগুলির মীমাংসা না হলে রাজপথের হিংসাত্মক লড়াই তখন সংসদের অভ্যন্তরে শুরু হতো। সংসদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল ঢাকায়। রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে এমন সহিংস লড়াইয়ে ঢাকায় ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের বৈঠকে ডেপুটি স্পীকার জনাব শাহেদ আলী খুন হয়েছিলেন। সে খুনে আওয়ামী লীগের নেতারা জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আরো সময় দেয়াই ছিল জাতীয় পরিষদের বৈঠক মুলতবির মূল উদ্দেশ্য। অথচ ক্ষমতা হাতে পেতে দেরি হওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তখন পাগলপ্রায়। কোনরূপ দেরি তাদের সইছিল না। ইয়াহিয়ার পক্ষ থেকে সে মুলতবিকে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বাঙালীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রূপে আখ্যায়ীত করে এবং গোটা পরিস্থিতিকে আরো অস্থির করে তোলে।

একাত্তরের মার্চের শুরুতেই মনে হচ্ছিল একটি সুযোগসন্ধানী মহল স্রেফ যুদ্ধাবস্থা ও অরাজকতা সৃষ্টির বাহানা খুঁজছিল। এরা ছিল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একটি জঙ্গি গ্রুপ,অখণ্ড পাকিস্তানের নিয়ে যাদের কোন আগ্রহই ছিল। তাদের পাকিস্তানে ভাঙ্গার প্রকল্প ছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকেই। -(আব্দুর রাজ্জাক, ১৯৮৭)। ইয়াহিয়া খানের বৈঠক মুলতবি ঘোষণাটিকে তারা নিজেদের লক্ষ্য পূরণে মোক্ষম বাহানা হিসাবে বেছে নেয়।সুযোগসন্ধানী ভারতও তেমন একটি মওকার অপেক্ষায় ছিল। এ জঙ্গিগ্রুপের নেতাকর্মীরা ছিল ভারতের ট্রোজান হর্স (Trojan Horse)-যারা পাকিস্তানের ধ্বংসকল্পে দীর্ঘকাল উৎপেতে বসে ছিল। খোদ আওয়ামী লীগ এদের হাতে জিম্মিতে পরিণত হয়। হঠাৎ শুরু করা পাকিস্তান ভাঙ্গার এ যুদ্ধকে জায়েজ করতেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ বলা শুরু করে সত্তরের নির্বাচনই স্বাধীনতার পক্ষে রেফারেন্ডাম। অথচ এটি ছিল রিফারেন্ডামের ভূল ব্যাখ্যা। পাকিস্তান ভাঙ্গা ও স্বাধীন বাংলাদেশ গড়া নিয়ে রেফারেন্ডাম হলে সাধারণ মানুষতাতে বিপুল হারে অংশ নিত। কারণ পাকিস্তান ভাঙ্গার বিষয়টি মামুলি বিষয় ছিল না। সেটি ছিল বাঙালী মুসলমানদের আগামী বহুশত বছরের জন্য ভাগ্য নির্ধারণের বিষয়। নিছক ক্ষমতা দখলের নির্বাচনে অনেকেই ভোট কেন্দ্রে যায় না এবং ভোটও দেয় না। সত্তরের নির্বাচনে প্রধান বিষয়গুলি ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন লাভ, কেন্দ্রীয় সরকারে ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব এবং পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মাঝে বৈষম্য কমিয়ে আনা। সে নির্বাচনটি কখনোই পাকিস্তান ভাঙ্গার বিষয় রূপে বিবেচিত হয়নি। এবং এ বিষয়টি ধরা পড়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সে সময়ের পত্রিকাগুলির পাতায় নজর বুলালে।

 

নির্বাচন ও মুজিবের মুখোশ

সরকার গঠনে নির্বাচন আর স্বাধীনতা ইস্যুতে জনমত যাচাই –এ দুটি বিষয় এক নয়।সরকার গঠনে একটি দল কতটি আসন পেল মাত্র সেটিই গণনায় আনা হয়, প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত নয়।যে দলটি বেশী সিট পায় তাকেই সরকার গঠন করতে বলা হয়। তাই বহুদলীয় নির্বাচনে ভোট ভাগাভাগীর ফলে শতকরা তিরিশ বা পঁয়ত্রিশ ভাগ ভোট পেলেই সরকার গঠন করা যায়, শতকরা ৫১ ভাগ ভোট লাগে না। বিলেত,ভারত বা বাংলাদেশের নির্বাচন তার উদাহরণ। কিন্তু কোন একটি বিষয়ে রেফারেন্ডাম হলে তাতে বিজয়ী হতে কমপক্ষে ৫১% ভাগ ভোট লাগে। সত্তরের নির্বাচনে শতকরা মাত্র ৫৬ জন পূর্ব পাকিস্তানী ভোটার ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়েছিল। ভাষানী ন্যাপসহ অনেকেই নির্বাচন বর্জন করেছিল। অর্থাৎ শতকরা ৪৪ জন ভোটারের কাছে নির্বাচন কোন আকর্ষণই সৃষ্টি করতে পারিনি। তাদের মধ্যে শতকরা ৭৫ জন ভোট দিয়েছিল আওয়ামী লীগকে। এর অর্থ দাঁড়ায়, আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তালিকাভূক্ত সমগ্র ভোটারের শতকরা মাত্র ৪২ ভাগ। ভোটদাতাদের অধিকাংশ তথা শতকরা ৫৮ ভাগ আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি। অথচ মাত্র ৪২% ভাগ ভোট পেয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলটি সিট পেয়েছিল মাত্র ২টি সিট বাদে সবগুলি। বহুদলীয় নির্বাচনে সচারাচর এমনটিই ঘটে। ফলে এ কথা কি করে বলা যায়, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষে ভোট দিয়েছিল? তাছাড়াও কথা রয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা তো নির্বাচনে কোন ইস্যুই ছিল না।

১৯৭০’য়ের নির্বাচনে স্বাধীনতা কোন ইস্যু হলে তার পক্ষে-বিপক্ষে সেদিন একটি রেফারেন্ডাম অপরিহার্য ছিল। রেফারেন্ডামে প্রার্থী থাকে না। ভোট হয় একটি বিশেষ ইস্যুর পক্ষে বা বিপক্ষে। ফলে প্রার্থীর মাঝে ভোট বিভক্ত হয় না। যদি পাকিস্তান ভাঙ্গানিয়ে রেফারেন্ডাম হত তখন মুসলিম লীগের তিন গ্রুপ, নুরুল আমীনের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, নিজামে ইসলামী, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামীর মত তৎকালীন পাকিস্তানপন্থী দলগুলোর মধ্যে কি ভোট ভাগ হত? দেশের আলেম-উলামা ও পীর-মাশায়েখগণযারা মুসলিম দেশের বিভক্তিকে হারাম মনে করেছিলেন -তারা কি নির্লিপ্ত থাকতেন? এমন কি  আওয়ামী লীগেরও বহু প্রবীন সদস্য অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে থাকতো। মুজিব যখন ৬ দফা প্রস্তাব পেশ করেন তখন পূর্ব পাকিস্তানের ১৭টি জেলার মাঝে ১৪টি জেলার আওয়ামী লীগ নেতাই দলে ছেড়ে দিয়েছিল। -(আব্দুর রাজ্জাক, ১৯৮৭)। তখন দলটি ৬ দফাপন্থী ও পিডিএমপন্থী -এ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। (পিডিএম: এটি হলো পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক মুভমেন্ট -যা ছিল আইয়ুবের স্বৈরাচার বিরোধী বহুদলীয় জোট)। তাই পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি নিয়ে রেফারেন্ডাম হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলিম যে ১৯৪৬’য়ের ন্যায় অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে রায় দিত –তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? খোদ মুজিব সেটি বুঝতেন –তাই পাকিস্তান ভাঙ্গার বিষয়টি তিনি নিজ মনে গোপন রেখেছেন। তা নিয়ে রেফারেন্ডামের কথা তিনি কখনোই মুখে আনেননি। নির্বাচন কালে তার মুখোশটি ছিল একজন পাকিস্তানীর। তাই যখনই তাকে প্রশ্ন করা হয়েছে যে ৬ দফা পাকিস্তানকে দুর্বল করবে তখনই বলেছেন, ৬ দফা পাকিস্তানকে আরো মজবুত করবে। অথচ নির্বাচনের পর তিনি পুরা নির্বাচনী ফলাফলকেই হাইজ্যাক করেছেন। পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র নির্মানের ওয়াদা দিয়ে নির্বাচন জিতে সে নির্বাচনের ফলাফকে পাকিস্তান ভাঙ্গার হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। পার্লামেন্ট কাউকে প্রধানমন্ত্রী বানাতে পারে, আইন বা বাজেট বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু দেশকে বিভক্ত করতে বা অন্যদেশের কাছে বিক্রয় করতে পারে না। সেটি আদৌ পার্লামেন্টারী বিষয় নয়, বরং দেশের জনগণের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়। অথচ মুজিব এক্ষেত্রে জনগণকে সে অধিকার দেননি। পাকিস্তান ভাঙ্গা বা স্বাধীনতার বিষয়ে জনগণ থেকে কোন কালেই রায় নেয়া হয়নি। এমনকি তার নিজ দলেও এ নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি। সিদ্ধান্ত তিনি একা নিয়েছেন। নির্বাচনে বিজয়ের পর তিনি তার রাজনীতির গোলপোষ্টই পাল্টিয়ে ফেলেছেন। লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের যে রুল মেনে তিনি নির্বাচনে নেমেছেন সেটি রুলগুলিও তিনি মানেননি। এটি কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির নীতি?

 

মুখোশটি প্রতারণার

মুজিবের মুখোশটি ছিল প্রতারণার। তিনি বলতেন গণতান্ত্রিক রাজনীতির কথা। অথচ তার ভিতরের রূপটি ছিল স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্টের।তবে সে মুখোশটি খসে পড়তে যেমন দেরী হয়নি;ফলে তার মূল চরিত্রটি জনগণের কাছে বেশী দিন গোপন থাকেনি। মুজিবের রাজনীতির লক্ষ্যটি ছিল স্রেফ নিজ স্বার্থ হাসিল। জনগণের মতামতের প্রতি তার সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ ছিল না।একবার নির্বাচিত হলে তিনি আর জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা করতেন না। ভাবতেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাকে যা ইচ্ছা তাই করবার অধিকার দিয়ে দিয়েছে। রাজনীতি নিয়ে তার নিজের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু নিজের সে স্বপ্নের কথা জনগণকে বলেননি। জনগণ থেকে সে স্বপ্নের পক্ষে অনুমোদনের প্রয়োজনও বোধ করেননি। অথচ সে স্বপ্ন পূরণে দেশের চিহ্নিত শত্রু বা শয়তানের সাহায্য নিতেও তার আপত্তি ছিল না। নিজের সে স্বপ্ন পূরণে যুদ্ধ, মানব হত্যা বা গণতন্ত্র হত্যাতেও তার বিবেকে দংশন হত না। সেটিই মুজিবের রাজনীতিতে বার বার দেখা গেছে। বাংলাদেশীদের জীবনে একাত্তরের যুদ্ধ, বাকশালী স্বৈরাচার ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ তো তখন এসেছে যখন তিনি ছিলেন দেশটির রাজনীতির কর্ণধার। ইচ্ছা করলে তিনি এগুলো রুখতে পারতেন। তিনি বরং ষড়যন্ত্র করেছেন ভারতীয় গুপ্তচরদের সাথে মিলে -যা ছিল এমন কি আওয়ামী লীগের দলীয় নীতিবিরুদ্ধ।–(অশোক রায়না, ১৯৯৬)। জনগণ ও জনমতের বিরুদ্ধে মুজিবের অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধার বিস্ফোরণটি ঘটে তার শাসনামলে।

শেখ মুজিবের মনে পাকিস্তান ভাঙ্গার স্বপ্নটি ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই। সেটি ১৯৪৭ সাল থেকেই।  সে কথাটি তিনি সদর্পে বলেছেন পাকিস্তান থেকে ফেরার পর ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি রেসকোর্সের জনসভায়। (মুজিবের সে উক্তিটি লেখক নিজ কানে শুনেছেন।) পাকিস্তান ভাঙ্গার স্বপ্নটি দেখতো ভারতও। ফলে ভারতের সাথে অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করাটি মুজিবের কাছে সহজ হয়ে যায়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তান ভাঙ্গার স্বপ্ন না দেখে ১৪ আগষ্ট উদযাপন করেছে স্বাধীনতা দিবস রূপে। একাকী স্বপ্ন দেখা আর গণতান্ত্রিক রাজনীতি করা তো এক কথা নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতি চলে জনগণের মতামত ও রায়ের ভিত্তিতে, কারো গোপন স্বপ্নের ভিত্তিতে নয়। নিজ স্বপ্নের ভিত্তিতে শত্রু দেশের সাথে ষড়যন্ত্র করা যায়,কিন্তু সেটি তো গণতান্ত্রিক রাজনীতির রীতি নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতি চলে জনগণের স্বপ্নে ভিত্তিতে। মুজিবের স্বপ্নে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন থাকলে -সেটি তার নিজের ব্যক্তিগত বিষয়।বাংলাদেশের জনগণ কেন তার ভূক্তভোগী হবে? তার স্বপ্নের ভূবনে ভারতের গোলামী মধুর লাগলে সেটিও তার নিজের ব্যাপার, জনগণ কেন তা কবুল করবে? অথচ তিনি তার নিজের পছন্দের বিষয়কে জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। এখানেই মুজিবের গুরুতর অপরাধ। ভয়ানক অপরাধীরাও সমাজে বন্ধু পায়, দলে লোকও পায়। কিন্তু তাতে অপরাধ কি জায়েজ হয়?

মুজিবের উচিত ছিল, পাকিস্তান ভাঙ্গা নিয়ে তার নিজ স্বপ্নের কথাটি ১৯৭০ এর নির্বাচনের বহু বছর পূর্বেই জনগণকে জানিয়ে দেয়া। তাতে জনগণ একটি যুদ্ধ থেকে বেঁচে যেত। গণতান্ত্রিক রাজনীতির সেটিই তো রীতি। নিজ স্বপ্ন মনে লুকিয়ে রেখে অন্য কথা বলে জনগণকে ধোকা দেয়াটি নিরেট ষড়যন্ত্র, রাজনীতি নয়। মুজিবের রাজনীতি ছিল মূলত সেরূপ একটি গভীর ষড়যন্ত্র –যা করা হয়েছিল ভারতীয় গুপ্তচরদের সাথে নিয়ে, বাংলাদেশের জনগণকে নিয়ে নয়।মুসলিম লীগ স্বাধীন পাকিস্তান সৃষ্টির কথাটি বলেছিল সাতচল্লিশের ৭ বছর আগে ১৯৪০ সালে। অথচ মুজিব ঘুনাক্ষরেও স্বাধীন বাংলাদেশের কথা মুখে আনেননি। বরং প্রতি জনসভায় পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়েছেন। এমনকি রেসকোর্সের ময়দানে ১৯৭০’য়ের নির্বাচনি জনসভাতে এবং ১৯৭১’য়ের ৭ই মার্চের জনসভাতেও দিয়েছেন। (লেখক নিজে সে জনসভা দু’টিতেই উপস্থিত ছিলেন এবং মুজিবের সে উক্তিও নিজ কানে শুনেছেন)। জনগণের সামনে তিনি হাজির হয়েছেন নিরেট পাকিস্তানী রূপে। এসবই ছিল মুখোশ পরা রাজনৈতিক অভিনয়; এবং সেটি জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্য। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার দেয়া ৮ দফা লিগাল ফ্রেমওয়ার্কে স্বাক্ষর করে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে তিনি লিখিত ভাবে কসম খেয়েছেন। আওয়ামী লীগের ১৯৭০’য়ের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতেও অখণ্ড পাকিস্তানের প্রতি অঙ্গীকার ছিল। এসব দেখার পর কি কারো মনে সন্দেহ জাগে যে মুজিব পাকিস্তান ভাঙ্গার স্বপ্ন দেখতেন ১৯৪৭ সাল থেকে? তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানীরা সেটি ভাবেনি। পাকিস্তান সরকারও সেটি ভাবেনি। কথা হল, কোন মুসলমান যখন কোন কিছুতে স্বাক্ষর দেয় বা ওয়াদা দেয় -সেটি কি এতোই তুচ্ছ? মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় সেটি তো তার জন্য এক অলংঘনীয় কসম বা অঙ্গীকারে পরিণত হয়। কোন মুসলমান কি সে কসম বা অঙ্গীকার ভাঙ্গতে পারে? ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে জনগণ তো তাকে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষের ব্যক্তি রূপে জেনেই ভোট দিয়েছে। অথচ ১৯৭০’য়ের নির্বাচনের পর সে স্বাক্ষরিত কসম বা অঙ্গীকার ভঙ্গ আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল এজেন্ডায় পরিণত হয়। কথা হলো,নেতাগণই যদি ওয়াদা ভঙ্গ করেন এবং বিশ্বাসযোগ্য না হন -তবে সে সমাজের রাজনীতি,রীতি নীতি ও ব্যবসাবাণিজ্যে পারস্পারিক আস্থা বা বিশ্বাস বেঁচে থাকে কি করে? ঈমান বা বিশ্বাসই মুসলিমের প্রধান গুণ। কিন্তু ওয়াদাভঙ্গই যাদের রাজনীতি তাদের সে ঈমানটি কোথায়?

 

অপরাধ নিহতদের বিরুদ্ধে

দূর্যোগে বা যুদ্ধে নরনারী দূরে থাক গবাদী পশু মারা গেলেও সভ্য দেশে একটি শুমারি হয়, ক্ষয়ক্ষতিরও পরিমাপ হয়। অথচ একাত্তরের গৃহযুদ্ধে কতজন মানুষ মারা গেল সে পরিসংখ্যান গ্রাম-গঞ্জ থেকে তিনি নেয়া হয়নি। অসংখ্য মানুষ যেমন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে মারা গেছে, তেমনি মারা গেছে মুক্তি বাহিনীর হাতেও। হাজার হাজার বিহারি যেমন মারা গেছে, তেমনি মারা গেছে হাজার হাজার বাঙালী মুসলমান ও হিন্দু। লুটতরাজ ও দেশত্যাগের মুখে পড়েছে যেমন বহু লক্ষ হিন্দু, তেমনি লুটতরাজ ও নিজ ঘর থেকে বহিষ্কারের মুখে পড়েছে বহু লক্ষ অবাঙালীও। তাদের সবাই ছিল মানুষ। এসব ভয়ানক অপরাধগুলি শুধু পাক-আর্মি বা বিহারীদের হাতে ঘটেনি। মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতেও ঘটেছে। অন্ততঃ মৃতের খাতায় তাদের প্রত্যেকের নামটি আসা উচিত ছিল। দেশের প্রতিটি জেলা, প্রতিটি থানা ও প্রতিটি ইউনিয়নের লোকদের জানার অধিকার ছিল একাত্তরে তাদের মধ্য থেকে কতজন নিহত হয়েছিল। আফগানিস্তান ও ইরাকের উপর হামলায় মার্কিন বাহিনী কতজন আফগান ও ইরাকীকে হত্যা করেছে সে হিসাব রাখেনি। মশা-মাছি মারলে যেমন গণনা হয় না, তেমনি গণনা হয়নি নিহত আফগান ও ইরাকীদেরও। কিন্তু নিজেদের লোকদের মাঝে কত হাজার নিহত বা আহত হয়েছে সে হিসাব তারা ঠিকই রেখেছে। ইরাকীদের মার্কিনীরা যে কতটা তুচ্ছ ভাবতো এবং তাদের সাথে তাদের আচরণ যে কতটা বিবেকহীন ছিল এ হল তার প্রমাণ। সে দেশ দুটিতে  মার্কিনারা ছিল আগ্রাসী হানাদার। প্রশ্ন হলো, একাত্তরে মৃত নরনারী ও শিশুদের সাথে মুজিবের আচরণও কি ভিন্নতর ছিল?

বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ শুধু এ নয় যে, যুদ্ধে তারা আপনজনদের হারিয়েছে। বরং বড় দুঃখ, তাদের মৃত আপনজনেরা সরকারের কাছে কোন গুরুত্বই পেল না। কোথায়, কিভাবে এবং কাদের হাতে তারা মারা গেল সে হিসাবটিও হল না। কোন রেজিস্টারে বা নথিপত্রে তাদের কোন নাম নিশানাও থাকলো না। শেখ মুজিব ও তাঁর সরকারের অপরাধ তাই নিহতদের সাথেও। গদীদখল ছাড়া আর সব কিছুই যে শেখ মুজিব ও তার দলের কাছে গুরুত্বহীন -এটি হলো তারই প্রমাণ। আওয়ামী বাকশালী পক্ষ শুধু নিজ দলের ক্ষয়ক্ষতিটাকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। অন্য পক্ষের ব্যথা-বেদনা ও ক্ষয়ক্ষতি সামান্যতম ধর্তব্যের মধ্যেও আনেনি। পরিবারের প্রতি সদস্যই জানতে চায় তার আপনজন কিভাবে মারা গেল এবং কে তার হত্যাকারি। বাংলাদেশের ইতিহাসে মুজিব ও তার দলীয় নেতাদের প্রচণ্ড গুণকীর্তন থাকলেও অতি প্রয়োজনীয় সে তথ্যটিই নেই। জাতির তথ্যভাণ্ডার এক্ষেত্রে শূন্য। আর এভাবে অসম্ভব করা হয়েছে সঠিক ইতিহাস রচনা। অথচ তথ্য সংগ্রহ ও তা সংরক্ষণের দায়িত্ব ছিল মুজিব সরকারের। কোন দেশপ্রেমিক সরকার কি এতোটা দায়িত্বহীন হতে পারে? কথা হল, বাংলাদেশের মত একটি জনবহুল দেশে কি গণনাকারিরও অভাব ছিল? বস্তুত যেটির অভাব ছিল সেটি সরকারের সদিচ্ছার। বরং প্রকট ভাবে কাজ করেছে সত্যকে গোপন করার তাড়না। তাই সঠিক পরিসংখ্যান এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ না করেই চলছে ইতিহাস লেখার কাজ।

 

যে প্রশ্ন হাজার বছর পরেও উঠবে

মিথ্যা ভাষণে পরিসংখ্যান লাগে না।মাঠঘাট ও গ্রামগঞ্জ খুঁজে তথ্য সংগ্রহ করাও লাগে না। সেজন্য প্রয়োজন একখানি জ্বিহবা এবং লাগামহীন খেয়াল খুশি। নিখুত পরিসংখ্যানের গরজতো তাদেরই যারা সত্য বলায় অভ্যস্থ, সে সাথে মিথ্যা পরিহারেও সতর্ক। স্বাধীনতার লক্ষ্যে রক্তদান যে কোন জাতির জন্যই অতি গর্বের। কিন্তু রক্তদানের নামে মিথ্যাচার হলে তাতে ইজ্জত বাড়ে না, বরং বিশ্বব্যাপী পরিচিতি বাড়ে নীতিভ্রষ্ট মিথ্যুক রূপে। আর প্রতিটি সভ্য মানুষই মিথ্যুককে ঘৃনা করে। ফলে মিথ্যাচারে যা বৃদ্ধি পায় তা হলো বিশ্বজোড়া অপমান। মুজিব নিজে অসত্য তথ্য দিয়ে সেটিই বাড়িয়েছেন। আর মিথ্যা তো সর্বপ্রকার দুর্বৃত্তির জনক। বাংলাদেশ যে ভাবে পরপর ৫ বার বিশ্ব মাঝে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের খেতাব পেল -তার ভিত্তিমূলটি তো এরূপ মিথ্যাচর্চার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল। ভূয়া গর্ব বাড়ানোর সহজ হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হয় মিথ্যা। সে তাগিদে শেখ মুজিবও তাঁর চিরাচিরত অভ্যাসটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি, মুখে যা এসেছে তাই বলেছেন। তিরিশ লাখ নিহতের তথ্যটি যে বিশ্বাসযোগ্য নয় -সেটিও তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। বুঝার চেষ্টাও করেননি। সম্ভবতঃ তার বিশ্বাস ছিল, পাকবাহিনী এখন পরাজিত, দেশবাসীও তার অনুগত, ফলে তিরিশ লাখ বা ষাট লাখের কথা বললেও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস ক’জনের? সেটিকে আরো রঙ চঙ লাগিয়ে বিশ্বময় প্রচারের কাজে মোসাহেবী লেখকের সংখ্যাও বাংলাদেশে সেদিন কম ছিল না। কেউ সেদিন প্রতিবাদ করেনি ঠিকই, কিন্তু এতে তাঁর নিজ চরিত্র যে নিরবে মারা গেল সে হুশ কি তার ছিল? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তিনি চিহ্নিত হয়ে গেলেন মিথ্যুক রূপে।

শত শত বছর পরও প্রশ্ন উঠবে –শেখ মুজিব কোথা থেকে পেলেন তিরিশ লাখ নিহতের সংখ্যা? প্রশ্ন উঠবে,কারা, কবে, কিভাবে এবং কতদিনে তিরিশ লাখ মানুষ গণনার কাজটি সমাধা করেছিল? কোথায় সে গণনার কাগজপত্র? তারা তখন নিহতদের পরিচয় জানতে চাইবে। অসত্য চর্চার নায়কগণ ইতিহাসে এভাবেই সবার সামনে বিবস্ত্র  ও ব্যক্তিত্বহীন হয়। ইসলামের ইতিহাসে অতি বিজ্ঞ ব্যক্তি হলেন হযরত আলী (রাঃ)। তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নিয়ে মহান নবীজী (সাঃ) বলেছিলেন, “আমি ইলমের ঘর, আর আলী হল তার দরজা।” হযরত আলী (রাঃ)’র জ্ঞানসমৃদ্ধ বহু মূল্যবান কথা আজও মুসলিম বিশ্বে বহুল প্রচারিত। মানুষের ব্যক্তিত্বের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন,“ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব তার জিহ্বাতে।” অর্থাৎ ওয়াদা পালন ও সত্য কথনে। যে কারণে ব্যক্তির ঈমান ভেঙ্গে যায় সেটি মিথ্যা বলায়। মিথ্যুক ওয়াদা ভঙ্গকারীগণ তাই শুধু ঈমানহীনই নয়, ব্যক্তিত্বহীনও। মানুষের মূল্যমান নির্ধারণে আজও সত্যাবাদিতাই সবচেয়ে বড় মাপকাঠি;বিপুল দেহ, দেহের বল বা বড় বড় বক্তৃতামালা নয়। একজন ব্যক্তি যে দুর্বৃত্ত সেটি প্রমাণের জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে সে মিথ্যাবাদী। দুর্বৃত্তদের মাঝে তার যত সমাদরই থাক,সভ্য সমাজে সে তখন মূল্য হারায়। কোন মিথ্যাচারী ব্যক্তিকে ভক্তি করা বা মান্য করা কোনঈমানদারী নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে কোন মিথ্যাবাদির হাতে শাসনক্ষমতা দেয়া দূরে থাকে, তাকে আদালতে সাক্ষ্যদানের অধিকারও দেয়া হয় না। কোন হাদীস বর্ণনাকারি মিথ্যাচারী প্রমাণিত হলে তার থেকে বর্ণিত কোন হাদীসই গ্রহণ করা হয় না। বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্মানজনক স্থানলাভে এখানেই মুজিবের মূল বাধা। এবং সেটি তার নিজের সৃষ্ট। তাই মুজিবকে নিয়ে তার ভক্তরা যাই বলুক, মুজিব তার নিজের মান নিজেই নির্ধারণ করে গেছেন।

গ্রন্থপঞ্জি

আব্দুর রাজ্জাক।সাক্ষাতকার,সাপ্তাহিক মেঘনা;ঢাকা: ১৯৮৭,৪ঠা জানুয়ারি।

অশোকা রায়না।ইনসাইড ’:ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার অজানা অধ্যায়, (বাংলা অনুবাদ) অনুবাদ, লেঃ (অবঃ) আবু রুশদ,ঢাকা:রুমী প্রকাশনী,১৯৯৬।

 

 

 




অধ্যায় ছয়: ভারতের চাপানো যুদ্ধ

হিন্দু প্রতিহিংসা

ভারতীয় হিন্দুগণ মুসলিমদের দিল্লি-বিজয় এবং ভারতের বুকে প্রায় সাড়ে ছয় শত বছরের মুসলিম শাসনকে কখনোই মেনে নিতে পারিনি। মুসলিম শাসনের সে স্মৃতি এখনো প্রতিদিন ও প্রতিমুহুর্তে তাদেরকে পীড়া দেয়। তাদের কাছে পুরা মুসলিম শাসনামলটাই পরাধীনতার কাল। হিন্দু ছাত্রছাত্রীদের কাছে অতি অসহ্য হলো, স্কুল-কলেজের পাঠ্য বইয়ে তাদের পড়তে হয় মুসলিমদের ভারত বিজয় ও ভারত শাসনের ইতিহাস। সারা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মুসলিম শাসনের বিশাল বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ। বিশাল গর্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাজমহল, ফতেহপুর সিক্রি, দিল্লির লাল কেল্লা, জামে মসজিদ ও কুতুব মিনারের ন্যায় অসংখ্য কীর্তি। তাদের চক্ষুশূল হলো, প্রতিনিয়ত সেগুলি তাদের দেখতে হয়। তাদের মনের যাতনা আরো বেড়ে যায় ১৯৪৭ সালে, এ বছরটিতেই ভারতের বুক চিড়ে প্রতিষ্ঠা পায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। শত চেষ্টাতেও পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা রুখতে পারিনি। তারা তো চেয়েছিল অখণ্ড ভারত, কিন্তু সেটি ব্যর্থ হওয়ায় তাদের মনকষ্ট বহুগুণ বেড়ে যায়। ভারতীয় হিন্দুগণ সে মনকষ্ট থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখতো মুসলিমদের বিরুদ্ধে আশু বিজয় এবং বদলা নেয়ার মধ্যে। ব্রিটিশ শাসনের বিদায়ের পর ভারতের বুকে প্রতিষ্ঠা পায় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ফলে এ রাষ্ট্রের মুসলিমগণ হিন্দু শাসনের বর্বরতা থেকে রক্ষা পেলেও বাঁচেনি ভারতীয় মুসলিমগণ।সহসাই তারা সহিংস হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। শুরু হয়, মুসলিমদের বিরুদ্ধে বদলা নেয়ার পালা। সংঘটিত হয় হাজার হাজার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সেসব দাঙ্গায় মুসলিম গণহত্য,নারী ধর্ষণ ও লুটতরাজ। শুরু হয় ভারত থেকে মুসলিম বিতাড়ন ও মুসলিম রাজ্যগুলি দখল। যে মুসলিম প্রদেশগুলো ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ভূক্ত হয়েছিল সে যাত্রায় সেগুলি বেঁচে যায়। কিন্তু ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাঁচেনি বিচ্ছিন্ন কাশ্মীর, হায়দারাবাদ ও মানভাদড়।

তবে হিন্দুদের প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তু স্রেফ ভারতীয় মুসলিমগণই ছিল না, মূল টার্গেট ছিল পাকিস্তান। এবং ভারতীয় আগ্রাসনের লক্ষ্য শুধু পশ্চিম পাকিস্তানে আঘাত হানা ছিল না, বরং মূল টার্গেট ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করাও। এবং সেটির বোধগম্য কারণও ছিল। কারণটি স্রেফ দ্বি-জাতিতত্বকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা নয়, বরং বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে বদলা নেয়া। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকাটি ছিল বাঙালী মুসলমানদের, পাঞ্জাবী বা পাঠানদের নয়। বেলুচ বা সিন্ধিদেরএ নয়। মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল ১৯০৬ সালে ঢাকাতেই, ভারতের অন্য কোন শহরে নয়। এবং অবিভক্ত বাংলাই ছিল মুসলিম লীগের মূল দুর্গ। বাঙালী মুসলিমদের রাজনীতিই ১৯৪৭ সালে ভারতের ভূগোল ভেঙ্গে দেয়। তাদের কারণেই অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রীর আসনে কোন হিন্দু বসতে পারি। বসেছে শেরে বাংলা ফজলুল হক, জনাব সোহরাওয়ার্দী ও জনাব খাজা নাজিমুদ্দীন।

 

প্রতিশোধ বাঙালী মুসলিম থেকে

উপমহাদেশের সর্বাধিক মুসলিমের বাস বাংলায়;এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় কোরবানী পেশ করেছে বাঙালী মুসলিম। পাকিস্তানের দাবী নিয়ে ভারতের আর কোথাও এতো মুসলিমের রক্ত ঝরেনি। সেটি কলকাতার রাজপথে ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগষ্ট কায়েদে আযম ঘোষিত প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসে। বাংলায় তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুসলিম লীগ  সরকার।মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে ঐদিন কলকাতার গড়ের মাঠে আয়োজিত হয়েছিল বিশাল জনসভা। জনসভা থেকে ফেরার পথে তাদের উপর নৃশংস হামলা হয় হিন্দু গুন্ডাদের পক্ষ থেকে।সে হামলায় পাঁচ থেকে সাত হাজারের বেশী  মুসলিম নিহত হয়-যাদের অধিকাংশই ছিল পূর্ব বাংলার মফস্বল থেকে আসা দরিদ্র্য মুসলিম।অনেকেই কাজ করতো কলকাতা বন্দরে শ্রমিক রূপে।কলকাতার হিন্দুদের মন যে কতটা মুসলিম বিদ্বেষপূর্ণ ও দাঙ্গাপাগল সেটিরই সেদিন বীভৎস প্রকাশ ঘটেছিল।দাঙ্গা চলেছিল ৫ দিন ব্যাপী।নিজ চোখে-দেখা সে দাঙ্গার কিছু ভয়াবহতা বর্ণনা করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বাঙালী প্রফেসর ড.তপন রায় চৌধুরী তার “বাঙাল নামা” বইতে। প্রফেসর ড.তপন রায়চৌধুরী লিখেছেন,“নিজের চোখে দেখা ঘটনার বিবরণে ফিরে যাই। হোস্টেলের বারান্দা থেকে দেখতে পেলাম রাস্তার ওপারে আগুন জ্বলছে।বুঝলাম ব্যাপারটা আমার চেনা মহাপুরুষদেরই মহান কীর্তি। হোস্টেলের ছাদে উঠে দেখলাম –আগুন শুধু আমাদের পাড়ায় না,যতদূর চোখ যায় সর্বত্র আকাশ লালে লাল। তিন দিন তিন রাত কলকাতার পথে ঘাটে পিশাচনৃত্য চলে।… দাঙ্গার প্রথম ধাক্কা থামবার পর বিপজ্জনক এলাকায় যেসব বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন ছিলেন,তাঁদের খোঁজ নিতে বের হই। প্রথমেই গেলাম মুন্নুজন হলে।..নিরঙ্কুশ হিন্দু পাড়ার মধ্যে ওদের হস্টেল। তবে ভদ্র বাঙালি পাড়া।সুতরাং প্রথমটায় কিছু দুশ্চিন্তা করিনি। কিন্তু দাঙ্গা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শিক্ষিত বাঙালির রুচি-সংস্কৃতির যেসব নমুনা দেখলাম,তাতে সন্দেহ হল যে,মুন্নুজান হলবাসিনী আমার বন্ধুদের গিয়ে আর জীবিত দেখবো না।…হোস্টেলের কাছে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে ভয়ে আমার বাক্যরোধ হল।বাড়ীটার সামনে রাস্তায় কিছু ভাঙা স্যুটকেস আর পোড়া বইপত্র ছড়ানো।বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে।ফুটপথে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন।বললেন –একটু আগে পুলিশের গাড়ি এসে মেয়েদের নিয়ে গেছে।…শুনলাম ১৬ই আগষ্ট বেলা এগারোটা নাগাদ একদল সশস্ত্র লোক হঠাৎ হুড়মুড় করে হোস্টেলে ঢুকে পড়ে।প্রথমে তারা অশ্রাব্য গালিগালাজ করে যার মূল বক্তব্য –মুসলমান স্ত্রীলোক আর রাস্তার গণিকার মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। …হামলাকারিরা অধিকাংশই ছিলেন ভদ্র শ্রেণীর মানুষ এবং তাঁদের কেউ কেউ ওঁদের বিশেষ পরিচিত,পাড়ার দাদা।”–(তপন রায়চৌধুরী,২০০৭)।কলকাতায় মুসলিম গণহত্যায় অতি প্রসন্ন হয়েছিলেন কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক নেতৃবৃন্দ।তখন বল্লব ভাই প্যাটেল ছিলেন কংগ্রেসের উচ্চ সারির নেতা।স্বাধীনতার পর তিনি ভারতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হন।কলকাতার মুসলিম নিধনে তিনি যে কতটা খুশি হয়েছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় রাজমোহন গান্ধী রচিত “Understanding the Muslim Mind” বইয়ে। তিনি লেখেন,“Vallabbhai Patel wrote in a letter to Raja Gopalachari: This Calcutta Killing will be good lesson fo the (Muslim) League; because I hear that the proportion of the Muslims who have suffered death is much larger.”

বাঙালী মুসলিমের সে বিশাল কোরবানীই হিন্দুদের অখণ্ড ভারত মাতার স্বপ্নকে পুরাপুরি দাফন করে দেয়।এরপর পাকিস্তানের দাবী নিয়ে মুসলিম লীগকে ভারতের আর কোথাও কোন দিবস পালন বা জনসভা করতে হয়নি। ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেসী নেতাদের বুঝাতে কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে আর কোন যুক্তি পেশের প্রয়োজন পড়েনি। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় এ ছিল বাঙালী মুসলিমদের কোরবানী। কংগ্রেস নেতা মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধি ও নেহেরু এবং সর্বশেষ ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটন ভারত বিভাগ ও মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবী ত্বরিৎ মেনে নেন। লর্ড মাউন্ট ব্যাটন বুঝতে পারেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা মেনে না নিলে ব্রিটিশদের পক্ষে নিরাপদে ভারত ত্যাগ অসম্ভব হবে। গান্ধি এবং নেহেরুও তখন বুঝতে পারেন, মুসলিমগণ কখনোই হিন্দুদের শাসন বিনা যু্দ্ধে– মেনে নিবে না। সংঘাতের যে আগুণ ব্রিটিশ প্রশাসন থামাতে ব্যর্থ হচ্ছে, স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর হিন্দু প্রশাসনের পক্ষে সেটি থামানো আরো অসম্ভব হবে।

বাঙালী মুসলিমের সে কোরবানীর ফলেই মুহম্মদ ঘোরীর হাতে দিল্লি বিজয়ের পর উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এরূপ বিশাল কোরবানী পাঞ্জাবী, সিন্ধুী, বেলুচ বা পাঠান মুসলিমগণ পেশ করেনি। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় বাঙালী মুসলিমের সে অবদানের কথা বহু বাংলাদেশী না জানলেও ভারতীয় রাজনীতির হিন্দু কর্ণধারগণ কোনকালেই ভূলেনি। তেমন এক জ্বলন্ত স্মৃতি নিয়েভারতীয় হিন্দুগণ বাঙালী মুসলিমদের কল্যাণে যুদ্ধ লড়ে স্বাধীন দেশ গড়ে দিবে -সেটি কি বিশ্বাস করা যায়? বরং পাকিস্তান ভেঙ্গে উপমহাদেশের মুসলিম শক্তির মেরুদণ্ড দুর্বল করবে,সীমাহীন লুণ্ঠনে নিদারুন দুর্ভিক্ষ উপহার দিবে এবং বাংলার মুসলিম ভূমিকে নিজেদের পদতলে রাখবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? আজকের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে হিন্দুস্থানের পলিসি কি সেটিই প্রকাশ করে না? সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, সে বেড়ায় বাংলাদেশীদের লাশ, পদ্মা-তিস্তাসহ বাংলাদেশের নদীগুলি থেকে পানি তুলে নেয়া কি বন্ধুত্বের প্রতীক?

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারতীয় বর্ণ হিন্দুগণ লাগাতর সুযোগ খুঁজছিল বদলার নেওয়ার। সে বদলাটি শুধু পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে নয়, বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধেও। ভারতের হাতে সে মোক্ষম সুযোগটি এসে যায় ১৯৭১ সালে। একাত্তরের যুদ্ধের মূল প্রেক্ষাপট মূলত সেটিই। এবং আগ্রাসী হিন্দুস্থানের হাতে সে সুযোগটি তুলে দেন শেখ মুজিব। মুজিব এজন্যই ভারতীয় হিন্দুদের কাছে এতো প্রিয়। একাত্তরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কেন একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চাপানো হলো, কেন ব্যাপক লুন্ঠন হলো, কেন বাংলাদেশ তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত এবং কেনই বা দেশটিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে এলো এবং সে দুর্ভিক্ষে কেন লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হলো -এ বিষয়গুলি বুঝতে হলে হিন্দু মানস, হিন্দুদের মুসলিম বিদ্বেষ ও ভারত সরকারের মুসলিম বিরোধী পলিসিকে অবশ্যই বুঝতে হবে। নইলে একাত্তরের ঘটনাবলির মূল্যায়নের চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। অথচ বাংলাদেশ সরকার ও আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের মূল কাজ হয়েছে জনগণ ও স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের নজর থেকে হিন্দু মানস, বর্ণ হিন্দুদের মুসলিম বিদ্বেষ ও ভারত সরকারের মুসলিম বিরোধী পলিসিকে লুকানো। তাদের সবগুলো কামানের মুখ এবং মনের সমগ্র বিষ শুধু পাকিস্তান ও ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে। তাদের কথা, বাংলাদেশের ইতিহাসের শুরু যেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে এবং মুজিবই বাংলার একমাত্র ব্যক্তিত্ব। তাই তাদের লেখনীতে ১৯৫২ পূর্ববর্তী মুসলিমদের দীর্ঘ লড়াই ও কোরবানীর বিবরণ নাই। এবং মুজিব ভিন্ন অন্য কোন নেতাও তাদের মূল্যায়নে গুরুত্ব পায়নি। শুধু তাই নয়, ভারতীয় আধিপত্য, লুন্ঠন ও চক্রান্ত্র নিয়েও তারা নিরব। এদের কারণেই একাত্তরের মুল ইতিহাস জানা অসম্ভব হয়েছে; এবং অসম্ভব হয়েছে একাত্তরের মূল অপরাধীদের চেনা।

 

ভারতের রণপ্রস্তুতি

পাকিস্তান ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টিলেজিসেন্স ডিপার্টমেন্ট একাত্তরের আগষ্ট মাসে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পায়, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিশাল আকারের সামরিক হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। -(G W Choudhury, 1974)। পাকিস্তান ইন্টিলেজিসেন্স একথাও জানতে পারে যে, আগষ্টের মাঝামাঝিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি ভারতের সেনা বাহিনী প্রধান জেনারেল মানেক শ’কে পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সেনা প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছেন। এর একমাস পর সেপ্টেম্বরে জেনারেল মানেক শ’ ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে অধিকহারে সামরিক অপারেশনের নির্দেশ দেন। -(Sisson and Rose, 1990)। পাকিস্তানের পক্ষে ইতিমধ্যেই প্রচণ্ড দেরী হয়ে গেছে। ইন্দিরা গান্ধি এরই মধ্য  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ই্উরোপ ও রাশিয়া ঘুরে এসেছেন। তার সফরের মূল উদ্দেশ্যটি ছিল সে সব দেশের সরকারগুলিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা এবং ভারতের পক্ষে আনা। তাতে তিনি সমর্থও হয়েছিলেন। তাকে সে কাজে সহয়তা দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী ইসরাইলী লবি ও ইহুদী প্রভাবিত মিডিয়া। ইসরাইলও চাচ্ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের আশু বিলুপ্তি। কারণ, তাদের কাছে শক্তিশালী পাকিস্তানের অর্থই হলো মুসলিম বিশ্ব এবং সে সাথে আরব বিশ্বের শক্তিবৃদ্ধি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ডিমোক্রাট দলীয় অধিকাংশ সদস্য ছিলেন ভারতের পক্ষে। তারা ছিল পাকিস্তানকে কোনরূপ সামরিক সাহায্যদানের প্রচণ্ড বিরোধী। চীনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপনে মধ্যস্থতার কাজে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন পাকিস্তানের পক্ষে কোন সাহায্যই করেনি। কারণ, চাকর-বাকরের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানো কি কখনো কর্তা ব্যক্তির রীতি? অপর দিকে ব্রিটিশগণ তো পাকিস্তানের সৃষ্টিরই বিরোধীতা করেছিল। ফলে দেশটির অখণ্ড অস্তিত্ব নিয়ে আগ্রহ থাকবে -সেটি কি সম্ভব? অপর দিকে সোভিয়েত রাশিয়া এ হামলার জন্য ভারতকে সর্বাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করছিল। তৎকালীন স্নায়ু যুদ্ধের যুগে সোভিয়েত রাশিয়া পাকিস্তানকে মার্কিন শিবিরের দেশ রূপে গণ্য করতো। ফলে মার্কিনীদের বিরুদ্ধে লালিত প্রচণ্ড ক্ষোভ গিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানের উপর। ভারতের সাথে ইতিমধ্যে সোভিয়েত রাশিয়া নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করে। অপর দিকে চীন তখন নিজের ঘর গোছাতে ব্যস্ত। তাছাড়া সেসময় আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাব ফেলার মত সামরিক ও অর্থনৈতিক বল চীনের ছিল না। ফলে আগ্রহ ছিল না সে মুহুর্তে পাকিস্তানকে সাহায্য করায়।

 

চাপানো হলো যুদ্ধ

একাত্তরে পাকিস্তান ছিল প্রকৃত অর্থেই বন্ধুহীন। ভারতের সাথে আসন্ন যুদ্ধের জন্য দেশটির নিজের প্রস্তুতিও ছিল না। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইয়াহিয়া খানের নিজের ব্যস্ততাটি ছিল একটি সর্বদলীয় নির্বাচন এবং নির্বাচন শেষে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে। দেশের বিমান বাহিনীর জন্য কোন নতুন বিমান ক্রয়,সেনা বাহিনীতে নতুন ট্যাংক সংযোজন এবং নৌ-বাহিনীর জন্য কোন যুদ্ধ নৌ-জাহাজ -তার ক্ষমতায় থাকাকালে ঘটেনি। শুরুতে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনা বাহিনীর মাত্র এক ডিভিশন সৈন্য ছিল। এবং তাতে সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪ হাজার।-(এ.কে.খন্দকার,২০১৪) এবং (Williams, L. Rushbrook, 1972)।পরে সেটিকে বাড়িয়ে ৪৫ হাজার করা হয় –যা জেনারেল নিয়াজী তার বই “The Betrayal of East Pakistan” বইতে উল্লেখ করেছেন। অনেকে ভাবেন, যুদ্ধ শেষে যে ৯০ হাজার পাকিস্তানী বন্দী হয়ে ভারতে যায় -তারা সবাই সৈনিক ছিল। সেটি সঠিক নয়। তাদের মাঝে প্রায় অর্ধেকই ছিল অবাঙালী বেসামরিক ব্যক্তি। তারা ছিল নানা পেশার। মুক্তি বাহিনীর হাতে নিহত হওয়া থেকে বাঁচতে এসব অবাঙালী বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ ১৬ই ডিসেম্বরের আগেই সেনানিবাসে আশ্রয় নেয়। এবং যুদ্ধ বন্দী রূপে সৈন্যদের সাথে ভারতে যাওয়াকে বরং শ্রেয় মনে করে।

যুদ্ধ আসন্ন দেখে জেনারেল নিয়াজী ইয়াহিয়া খানের কাছে বার বার আরো সৈন্য ও অস্ত্র চেয়েও পাননি। অবশেষে ইয়াহিয়া খান তাকে আল্লাহর উপর ভরসা করতে বলেন। -(General Niazi, 1998)। এ স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে মুক্তি বাহিনীকে বড় জোর দমনে রাখা যায়, কিন্তু তা দিয়ে কি ভারতের বিশাল বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করা যায়? বিষয়টিকে জেনারেল নিয়াজী তার বইয়ে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা রূপে চিত্রিত করেছেন। ভারত মাত্র এক কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত কাশ্মিরে ৬-৭ লাখের বেশী সৈন্য নিয়ে কাশ্মিরী মুজাহিদদের বিরুদ্ধে ২০ বছরের অধিক কাল লড়ছে। এবং সে লড়াইয়ে এখনো বিজয় মেলেনি। অথচ পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ৪৫ হাজার সৈন্য! প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান চাচ্ছিলেন যে কোন ভাবে ভারতের সাথে যুদ্ধ এড়াতে। পাকিস্তান তখন গভীর শাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত। পূর্ব পাকিস্তানে সে বছরটিতে আসে ভয়াবহ বন্যা। এ অবস্থায় কি কোন দেশের সরকার যুদ্ধ ডেকে আনে? অবস্থা নাজুক দেখে ইয়াহিয়া খান শান্তিপূর্ণ সমাধানের নানারূপ উদ্যোগ নেন। ভেবেছিলেন যুদ্ধ এড়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করবে। কিন্তু মুসলিম দেশের পরাজয় ও ভাঙ্গন ঠ্যাকাতে কি কোন কাফের দেশ এগুয়? বরং তেমন একটি যুদ্ধ শুরু হোক এবং তাতে মুসলিম দেশের পরাজয় হোক –তা তো তাদের জন্য প্রচণ্ড উৎসবের কারণ। একাত্তরে সেটিও প্রমাণিত হয়।

নভেম্বরের মাঝামাঝিতে ভারতের নতুন হাইকমিশনার জয় কুমার অটাল ইসলামবাদে নিজের পরিচয়পত্র পেশ করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মি. অটালের কাছে ৫ দফা গোপন প্রস্তাব পেশ করেন। তাতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির কাছে শেখ মুজিবকে বিনাশর্তে মুক্তি এবং পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রশ্নে একটি রেফেরেন্ডামের প্রস্তাব দেন। আরো প্রস্তাব রাখেন অতিশীঘ্র পাকিস্তানে একটি সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের। এবং প্রস্তাব দেন জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ভারত থেকে সকল উদ্বাস্তুদের ত্বরিৎ ফিরিয়ে নেয়ার। -(G W Choudhury, 1974)। এমনকি ইসলামাবাদে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, যুদ্ধ এড়াতে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের স্বার্থে পূর্ব পাকিস্তান থেকে এক তরফা সৈন্য অপসারণেও পাকিস্তান রাজী। -(Sisson & Rose, 1990)।কিন্তু ইন্দিরা গান্ধি ইয়াহিয়া খানের সকল আপোষ প্রস্তাবগুলি নাকচ করে দেন। তখন ভারতের যুদ্ধ প্রস্তুতির ষোল আনা সম্পন্ন। ইন্দিরা গান্ধি ও ভারতের অন্যান্য নেতাদের মগজে তখন ১৯৪৭’য়ের বদলা নেয়ার নেশা। তখন শান্তিপূর্ণ সমাধান নিয়ে তাদের ভাবনার সময় ছিল না। তাই ইন্দিরা গান্ধি স্বাধীনতা প্রসঙ্গে রেফারেন্ডামের প্রস্তাবও গ্রহণ করেননি। তার যুক্তি, সত্তরের নির্বাচনে সে ফয়সালা হয়ে গেছে এবং আর কোন রেফারেন্ডামের প্রয়োজন নেই। অথচ ইন্দিরা গান্ধির সে যুক্তিটি ছিল পুরাপুরি ভূয়া। কারণ ১৯৭০’য়ের নির্বাচন স্বাধীনতা প্রসঙ্গে হয়নি। বাংলাদেশের মাটিতে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এভাবেই অনিবার্য হয়ে উঠে। তাছাড়া যুদ্ধ না হলে কি একটি দেশের মেরুদ্ণ্ড ভাঙ্গা যায়? যুদ্ধ না হলে সৃষ্টি হতো পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতীয় অধিকৃতির সুযোগ। সেট না হলে কি নির্মিত হতো যুদ্ধ শেষে ভারতীয় লুণ্ঠন এবং ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকৃতির স্থায়ী অবকাঠামো? যুদ্ধ-পরবর্তী সে শোষণের অবাধ সুযোগটি না পেলে বাংলাদেশকে কি তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি বানানো যেত? উপহার দেয়া যেত কি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ? একাত্তরের যুদ্ধটি ভারতের জন্য তাই অনিবার্য ছিল। যুদ্ধ চাপানো হয়েছিল ভারতের সে অনিবার্য প্রয়োজনটি পূরণে।এাএভোএকাত্তরের

 

কালীমা লেপন

যুদ্ধ এড়াতে ইয়াহিয়া খান সর্বশেষ উদ্যোগেটি নেন মার্কিন দূতাবাসের মধ্যস্থায় শেখ মুজিব ও কলকাতাস্থ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে সরাসরি আপোষরফায়।শেখ মুজিবের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব দেয়া হয় আগরতলা মামলায় তার উকিল ও পাকিস্তানের সাবেক আইনমন্ত্রী জনাব এ কে ব্রোহীর উপর। কলকাতায় তখনও এমন কিছু আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন যারা পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রবেশ চাইতো না।খোন্দকার মুশতাক আহমদের ন্যায় অনেকেই বাংলাদেশের বুকে ভারতীয় ভয়ানক আগ্রাসনটি চাইতেন না।কিন্তু ইন্দিরা গান্ধি সে উদ্যোগও সফল হতে দেয়নি।কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদেরও কিছু করার ছিল না।তারা তখন ভারত সরকারের হাতে জিম্মি।ভারত তখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য দু’পায়ে খাড়া।লক্ষ্য,পাকিস্তানের সে দুর্বল মুহুর্তটিতে প্রতিদ্বন্দি পাকিস্তানকে খণ্ডিত করা।লক্ষ্য,বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রকে পরাজিত করা এবং দেশটির ৯০ হাজার মুসলিম নাগরিককে যুদ্ধবন্দী করে ভারতে নিয়ে দিল্লি জয়ের বদলা নেয়া।

সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে এ ছিল অতি লজ্জাজনক ও বেদনাদায়ক ঘটনা। এভাবে কালিমা লেপন হলো শুধু পাকিস্তানের ইতিহাসে নয়,বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে। কিন্তু সে হুশ সে ইসলামী চেতনাশূণ্য বাঙালী সেক্যলারিস্টদের আছে? মুসলিম উম্মাহর মুখে এরূপ কালিমা লেপনে ভারতীয় হিন্দুদের বিশ্বস্ত কলাবোরেটরের ভূমিকায় নামে আওয়ামী লীগ ও তার সহচর সেক্যুলার এবং বামপন্থী বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। মুর্তিপুজারি মুশরিকদের দোসর হয়ে নিজ দেশে তাদেরকে ডেকে আনা এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশকে পরাজিত ও খণ্ডিত করার কাজে বাঙালী মুসলিমদের এরূপ জড়িত হওয়ার বিষয়টি সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে কিয়ামত অবধি অতিশয় নিন্দনীয় ঘটনা রূপে বেঁচে থাকবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? ভারতীয় হিন্দুদের ইতিহাসে এটি ছিল মুসলিমদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয়। তাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের পর ভারতীয় পার্লামেন্টে উল্লাসধ্বনি উঠেছিল,“হাজার সাল কি বদলা লে লিয়া”। তবে এ যুদ্ধের মূল লক্ষ্যটি শুধু পাকিস্তানের মেরুদন্ড ভাঙ্গা ছিল না। লক্ষ্য ছিল,বাংলাদেশের মেরুদণ্ড ভাঙ্গাও।এভাবে চিরকালের জন্য বাংলাদেশকে দুর্বল রাখা।তেমন একটি লক্ষ্য পূরণে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাক-বাহিনীর অব্যবহৃত বহুহাজার কোটি টাকার অস্ত্র ভারতে নিয়ে যায়। শুধু অস্ত্র নয়,লুণ্ঠন করে বিপুল অর্থ ও সম্পদও। লুন্ঠিত হয় শত শত কলকারখানা,অফিসআদালত ও ব্যাংকগুলির রিজার্ভ।এবং বাংলাদেশকে গোলামীর জালে বাঁধা হয় ২৫ সালা দাসচুক্তির বাঁধনে। এভাব নির্মিত হয় তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পঙ্গু রাখার অবকাঠামো।

 

একাত্তর ও অধিকৃত বাংলাদেশ

একাত্তরে যুদ্ধে ভারত তার বহুদিনের কাঙ্খিত লক্ষ্যসাধনে প্রচণ্ড সফল হয়েছে। এযুদ্ধে পাকিস্তান যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার চেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে বাংলাদেশে, পাকিস্তানে নয়। তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান নয়। একাত্তরের যুদ্ধ পাকিস্তানকে অতি রুঢ় শিক্ষা দিয়েছে। যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান দ্রুত মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর শক্তি পেয়েছে। দেশটি এখন আর একাত্তরের দুর্বল পাকিস্তান নয়; বরং তার অস্ত্রভাণ্ডারে রয়েছে শতাধিক আনবিক বোমা। দেশটি নিজেই হেলিকপ্টার, বোমারু বিমান ও ট্যাংক তৈরী করে। আনবিক বোমা বহনকারি দূরপাল্লার মিজাইলও তৈরী করে। পাকিস্তান এখন ভারতের সামনে সদর্পে দাঁড়ানোর সামর্থ রাখে। একাত্তরে যেরূপ যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল, ভারত তা এখন ভাবতেও পারে না। এটি এখন সর্বজন স্বীকৃত, পাকিস্তানই ৫৭টি মুসলিম দেশের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। স্মরণীয় যে, সে পাকিস্তানে অতীতে তিনবার প্রধানমন্ত্রী ও দুইবার রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছিল বাংলার মুসলিম। অথচ আজ  জনসংখ্যায় প্রায় সমান হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো মেরুদণ্ড নিয়ে খাড়া হতে পারিনি। বরং বেড়েছে ভারতের সামনে সার্বক্ষণিক আাত্মসমর্পণ। বেড়েছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকৃতি। তাই দেশের মাঝখান দিয়ে ভারত ইচ্ছামত করিডোর নেয়। ইচ্ছামত রাজনৈতিক বিপ্লবও ঘটায়। সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে প্রতিষ্ঠা করে ভারতীয় পণ্যের বাজার। আটকিয়ে দেয় বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলির পানিও। তাছাড়া একাত্তরে যুদ্ধ কি একাত্তরেই শেষ হয়েছে? ভারতীয় অধিকৃতি থেকে কি আদৌ মুক্তি মিলেছে?  প্রশ্ন হলো, এমন এক সর্বগ্রাসী অধিকৃতিকে চিরস্থায়ী করার জন্যই কি ভারত একাত্তরে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়নি?

 

গ্রন্থপঞ্জি

  1. W. Chowdhury, 1974:  The Last Days of United Pakistan, C. Hurst & Company, London.
  2. Sisson, Richard and Leo Rose (1990): War and Secession: Pakistan, India and the Creation of Bangladesh, University of California; Berkeley.
  3. Niazi, Lt Gen AA K (2002); The Betrayal of East Pakistan, Oxford University Press, Karachi.
  4. Williams, L. Rushbrook. The East Pakistan Tragedy, London: Tom Stacy Ltd, 1972.
  5. এ.কে.খন্দকার।১৯৭১ ভেতরে বাইরে, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন, ২০১৪।

 

 

 




অধ্যায় সাত: ইতিহাসে প্রতিহিংসা

সহিংস মানস

কোন সভ্য আদালতই এমন কি নৃশংস খুনির বিরুদ্ধেও মিথ্যা বলার অধিকার দেয় না। কারণ আদালতে মিথ্যা বলা শুরু হলে মৃত্যু ঘটে ন্যায়-বিচারের। তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে সামাজিক শান্তি ও সভ্য সমাজের নির্মাণ। একই কারণে মিথ্যা চলে না ইতিহাসের আদালতেও। এখানে বিচার বসে ইতিহাসের ঘটনাবলি ও তার মূল নায়কদের। ইতিহাস লেখার কাজ তো বিচারকের কাজ। প্রতিটি যুদ্ধেই পক্ষ ও বিপক্ষের মাঝে রক্তাত্ব সংঘাত থাকে; নৃশংস অপরাধও ঘটে। উভয় পক্ষের নেতা-নেত্রী ও যোদ্ধাদের মনে প্রচণ্ড সহিংসতাও থাকে। সে সহিংস মানস নিয়ে কেউ কি নিরপেক্ষ ইতিহাস লিখতে পারে? তাদের লেখনিতে বরং যা ফুটে উঠে তা হলো তাদের প্রতিহিংসা-পরায়ণ মানস। আগুণের কাজ আশেপাশে আগুণ লাগানো; সহিংস লেখনিও তেমনি রাষ্ট্র জুড়ে সংহিসতা ছড়ায় ও যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে। তাই মানব সমাজের অতি ভয়ংকর অনাসৃষ্টি হলো সহিংস ইতিহাস ও সাহিত্য। এরূপ ইতিহাস ও সাহিত্য জাতিকে আত্মবিনাশী করে। ইতিহাস রচনার বাংলাদেশে বস্তুত সেটিই হয়েছে।

নিরপেক্ষ বিচারের ন্যায় নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনার কাজটি কখনোই পক্ষপাতদুষ্ট চাটুকর বা মোসাহেবদের দ্বারা হয় না। বিচারক যেমন আদালতে বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের কথা শোনেন, তেমনি ইতিহাসের লেখককেও দুই পক্ষের কথাই লিপিবদ্ধ করতে হয়। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। দেশে যারা ইসলামের পক্ষের শক্তি এবং যারা ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশের সৃষ্টির বিরোধীতা করল -তাদের কোন কথাকেই ইতিহাসের বইয়ে স্থান দেয়া হয়নি। এটা ঠিক, একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানপন্থীগণ পরাজিত শক্তি। কিন্তু পরাজিত হওয়ার অর্থ তো ভ্রান্ত, দুর্বৃত্ত বা অপরাধী হওয়া নয়। হাজার হাজার পয়গম্বরও পরাজিত হয়েছেন; দেশত্যাগী বা নিহতও হয়েছেন। তেমনি বিজয়ী হওয়ার অর্থ সঠিক, সত্যপন্থী বা নিরপরাধ হওয়া নয়। হালাকু-চেঙ্গিজের ন্যায় বহু নৃশংস দুর্বৃত্তও বার বার বিজয়ী হয়েছে। ইতিহাসে তাই শুধু বিজয়ীদের স্থান দিলে চলে না, বিজয়ীদের পাশাপাশি যারা পরাজিত ও নিহত হলো তাদেরও তো স্থান দিতে হয়। তাদের দর্শন, স্বপ্ন ও চরিত্রকেও তুলে ধরতে হয়। নইলে সে ইতিহাস গ্রহণযোগ্য হয় না। তাছাড়া যারা একাত্তরে বাংলাদেশের বিরোধীতা করলো তারা কি স্বৈরাচারী বা ভোট ডাকাত ছিল?

ইতিহাস কোন দলের নয়, কোন বিজিত পক্ষেরও নয়। এটি সর্বদলের ও সর্বজনের। আর সেটি না হলে সে ইতিহাসের বই স্থান পায় আবর্জনার স্তূপে। যেমনটি ঘটে আদালতে মিথ্যা সাক্ষীদের বেলায়। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে মিথ্যাদূষণের কাজটিই বেশী বেশী ঘটেছে। বিপক্ষ পক্ষের লোকেরাও যে দেশপ্রেমিক নাগরিক, তাদের অভিমত এবং তাদের চিন্তাচেতনারও যে ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে সেটি তাদের রচিত ইতিহাসে স্বীকার করা হয়নি। বরং তাদের চিত্রিত করা হয়েছে ঘাতক,দুষমন ও যুদ্ধাপরাধী রূপে। অভিধান খুঁজে খুঁজে সবচেয়ে ঘৃণাপূর্ণ শব্দগুলো তাদের চরিত্রহননের জন্য বেছে নেয়া হয়েছে। এভাবে জাতীয় জীবনে বিভক্তি ও রক্তঝরা ক্ষতগুলোকে স্থায়ী রূপ দেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা হয়েছে। সে ক্ষতে বরং নিয়মিত মরিচ লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে একাত্তরকে ঘিরে কার্যতঃ দেশ বিভক্ত হয়েছে ইসলামের পক্ষ ও বিপক্ষ –এ দ্বি-জাতিতে। এবং সে বিভক্তি দূরের কোন উদ্যোগই নেই। বরং উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে দিন দিন সে বিভক্তিকে গভীরতর ও রক্তাত্ব করার লক্ষ্যে। এমন অব্যাহত বিভক্তিতে একমাত্র শত্রুই খুশি হতে পারে। ফলে বাংলাদেশের এরূপ বিভক্ত অবস্থায় ভারতের ন্যায় সুযোগ সন্ধানীদের উৎসবের দিন -যেমন উৎসব মুখর হয়েছিল একাত্তরের বিজয়ে। জাতির এ বিভক্ত অবস্থাকে কাজে লাগাতে এবং সেটিকে আরো প্রবলতর করতে ভারতের মদদপুষ্টরা আরেকটি রক্তাত্ব লড়াইয়ের ডাক দিচ্ছে। ভাবছে, ইসলামপন্থী ও প্রাক্তন পাকিস্তানপন্থীদের নির্মূল করা এবং তাদের রক্তে আবার প্লাবন সৃষ্টির এখনই মোক্ষম সময়। আর এ বীভৎস রক্তপিপাসাকে তারা বলছে একাত্তরের চেতনা। বিদ্বেষ, ঘৃনা, বিভক্তি,সহিংসতা ও রক্তক্ষয় বাড়িয়ে কি জাতীয় জীবনকে সুশৃঙ্খল ও শান্তিময় করা যায়? এমন ঘৃনার মাঝে কারো জীবনে কি নিরাপত্তা বাড়ে? ঘৃনা কেবল ঘৃনাই জন্ম দেয়। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ অতীতে সে পথেই চলেছিল। কিন্তু সে নীতি তাদের জীবনেও মহা বিপর্যয় এনেছে। ১৫ই আগস্টের জন্ম তো এভাবেই হয়েছে।

 

 প্রতিহিংসার বীজ

জাতীয় জীবনে যখনই কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আসে, দেশের সব নাগরিক তখন একই রূপ সিদ্ধান্ত নেয় না। কারণ ভবিষ্যৎ নিয়ে সবার ভাবনা যেমন এক নয়, সবার সিদ্ধান্তও তেমনি এক নয়। ব্যক্তির সিদ্ধান্তে প্রতিফলন ঘটে তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন, দর্শন, বিশ্বাস ও কাণ্ডজ্ঞানের। কিন্তু সে ভিন্ন অভিমত ও ভিন্ন বিশ্বাসের কারণে কাউকে কি ঘাতক, দেশের বা জনগণের শত্রু বলা যায়? প্রক্তন মুখ্যমন্ত্রী জনাব নুরুল আমীন, সাবেক গভর্নর ডাঃ আব্দুল মোত্তালেব মালেক, শাহ আজিজুর রহমান, আব্দুর রহমান বিশ্বাস, খান আব্দুস সবুর, ফজলুল কাদের চৌধুরী,মাহমূদ আলী, মৌলভী ফরিদ আহমেদের ন্যায় বহু নেতা ১৯৭১’য়ে প্রেক্ষাপটে ভিন্ন মত রাখতেন। বাঙালী মুসলিমদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা ভিন্নরূপ স্বপ্ন দেখতেন। মুজিব ও তার অনুসারিদের থেকে সে স্বপ্ন ভিন্নতর ছিল। সে অভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে তারা রাজনীতি করেছেন ১৯৪৭ সালের পূর্ব থেকেই। মুসলিম লীগ, পিডিপি, জামায়াতে ইসলামী,নেজামে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, আব্দুল হকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের কম্যুনিষ্ট পাটির ন্যায় বহু দল এবং বহু নির্দলীয় আলেম-উলামা, ইমাম, কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, আইনজীবী এবং সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি তখন শেখ মুজিব ও তার দল থেকে ভিন্নতর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সে জন্য কি তাদেরকে ঘাতক বলা যায়? মুজিবের অনুসারিগণ যেমন অস্ত্র তুলে নিয়েছিল, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার্থে তারাও অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। কারণ, তাদের বিরুদ্ধে হামলাটিও নিরস্ত্র ভাবে হয়নি, বরং অতি সশস্ত্র ভাবেই হয়েছিল। তাদের কাছে পাকিস্তান ছিল তাদের নিজেদের দেশ; যেমনটি ছিল পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ এবং ভারত থেকে আগত মোহাজিরদের। নিজেদের দেশ বাঁচাতে যে ব্যক্তি জীবন দিতে রাজি, তাকে কি অন্যদের দালাল বলা যায়? পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র তুলে নেয়ার কারণে কাউকে ঘাতক বলা হলে যারা বাংলাদেশের জন্য অস্ত্র তুলে নিল তাদেরকেও তো ঘাতক বলতে হয়।

একাত্তরের ইতিহাসের রচনাকারিগণ শুধু পক্ষপাতদুষ্টই নয়, প্রচণ্ড প্রতিহিংসা-পরায়নও। অথচ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কায়দে আযমসহ মুসলিম লীগ নেতাদের মানবিক গুণটি চোখে পড়ার মত। সেদিন শ্রী মনোরঞ্জন ধরের মত কংগ্রেসের যেসব শত শত নেতা-কর্মী সর্বশক্তি দিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিল -তাদের কাউকেই জেলে পাঠানো হয়নি। কাউকে দালাল বলা হয়নি। তাদের নাগরিগকত্বও হরণ করা হয়নি। তাদের ঘরবাড়ী লুটতরাজ ও দখল করা হয়নি। বরং তারা সংসদে সন্মানের সাথে বসা এবং সে সাথে মন্ত্রী হওয়ার মর্যাদা পেয়েছিলেন। অথচ পাকিস্তানে ভাঙ্গার বিরোধীতাকারিদের হয় নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে অথবা কারাবন্দী করা হয়েছে। শেখ মুজিব পাকিস্তানের জেল থেকে জীবন্ত ও অক্ষত অবস্থায় ফেরত আসলেও বহু পাকিস্তানপন্থী নেতা-কর্মীগণ মুজিব ও মুজিবভক্তদের হাত থেকে জান্ত ফিরে আসতে পারিনি। মুজিবের শাসনামলে নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগ সভাপতি জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী কে প্রাণ দিতে হয়েছে ঢাকার কারাগারে। নিজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা জনাব এ্যাডভোকেট ফরিদ আহম্মদকে অতি নিষ্ঠুর ভাবে প্রান দিতে হয়েছে সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে। নির্মম ভাবে হত্যা করার পর গুম করা হয়েছে তার লাশকে। বহু নিরীহ আলেম, মসজিদের বহু ইমাম, মাদ্রাসার বহু শিক্ষক ও ছাত্র এবং হাজার হাজার রাজাকারদের অতি নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাদের ঘরবাড়িও লুট করা হয়েছে। হনন করা হয়েছে অনেকের নাগিরকত্ব।এভাবে লুন্ঠন করা হয়েছিল বাংলাদেশের মাটিতে তাদের বসবাসের অধিকার। নাগরিকত্ব একজন ব্যক্তি জন্মসূত্রে অর্জন করে।এজন্য কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সে দেশের ভৌগলিক বা রাজনৈতিক মানচিত্রের সমর্থক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তাই ১৯৪৭’য়ের পর পূর্বপাকিস্তানে বসবাসকারি হিন্দুগণ অখণ্ড ভারতের বিশ্বাস নিয়েও পাকিস্তানের বৈধ নাগরিক হতে পেরেছিলেন। এটাই যে কোন সভ্য দেশের নীতি। কিন্তু সে নীতি কবরস্থ হয়েছিল মুজিব আমলে। বহুলক্ষ আইরিশ নাগরিক আয়ারল্যান্ডের বিট্রিশভুক্ত হওয়ারই ঘোরতর বিরোধী। তারা আয়ারল্যান্ডকে ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীন করতে চায়। এজন্য তারা বহুযুগ ধরে লড়াই করেছে, প্রাণও দিয়েছে। কিন্তু তারপরও তাদেরকে ব্রিটিশ নাগরিকত্বকে হরণ করা হয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরী জনগণ পাকিস্তানের যোগ দিতে চায়। কিন্তু তাই বলে তাদের হাত থেকে ভারতের পাসপোর্ট কি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে? পৃথিবী জুড়ে এরূপ অসংখ্য উদাহরণ। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসটি ভিন্ন। স্রেফ রাজনৈতিক কারণে শেখ মুজিব বহু বাঙালী মুসলিমের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারা যে কতটা বিবেকশূন্য, মানবতাশূন্য ও প্রতিহিংসা পরায়ন -এসব হল তার দলিল।

 

সন্ত্রাসের হাতিয়ার

শেখ মুজিবের মাঝে একাত্তরে যেটি প্রবল ভাবে কাজ করছিল সেটি হল তাঁর অযোগ্যতা-জনীত ভীতি। যে ব্যক্তি সাঁতার জানে না,সে সমুদ্রে বা নদীতে নামতে ভয় পায়। সে খোঁজে হাঁটু পানির খাদ। শেখ মুজিবের যোগ্যতা ছিল না বাংলাদেশের মত একটি ছোট দেশ পরিচালনার। ক্ষমতায় আসীন হওয়া মাত্রই সে অযোগ্যতার প্রমাণটি তিনি দিয়েছেন। দেশবাসী এবং সে সাথে বিশ্ববাসী স্বচক্ষে দেখেছে তার সে সীমাহীন অযোগ্যতা। বাংলাদেশের বহু হাজার বছরের ইতিহাসে যা ঘটেনি তিনি দেশটিকে সেটিই উপহার দিয়েছেন। তার কথিত সোনার বাংলাকে তিনি নিজ হাতে ‘তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি’তে পরিণত করেছেন। সুজলা সুফলা বাংলার মানুষকে তখন খাদ্যের জন্য কুকুর বিড়ালের সাথে আস্তাকুরে লড়াই করতে হয়েছে। মহিলাদের কাপড়ের অভাবে জাল পড়তে হয়েছে।

নিতান্ত উম্মাদ না হলে নিজের অক্ষমতা কারোই অজানা থাকে না। তাই অন্যরা না জানলেও মুজিব ঠিকই জানতেন, পাকিস্তানের মত বিভিন্ন ভাষাভাষি নিয়ে গঠিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রটির শাসনভার চালানোর যোগ্যতা তাঁর নাই। তাই সেটিকে ভেঙে নিজ সামর্থ্যের উপযোগী করা তাঁর রাজনীতির বড় উদ্দেশ্য ছিল। দেশ বা দেশবাসীর অধিকার নিয়ে তার কোন আগ্রহ ছিল না। অন্যের অধিকারের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা থাকলে কি তিনি একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতেন? অধিকার বা সার্বভৌমত্ব বলতে তিনি যা বলতেন সেটি তাঁর নিজের, নিজ পরিবারের ও নিজ দলের। জনগণের নয়। দেশেরও নয়। তাঁর চেতনার মানচিত্র ছিল অতিক্ষুদ্র। তাই পাকিস্তানের বিশাল মানচিত্র তার কাছে অসহ্য ছিল। ক্ষুদ্র কীট যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খাদ্য কণাকে খুঁজে, এবং বড় টুকরো পেলে সেটিকে যেমন ক্ষুদ্রতর করে মুখে পুরে, তেমনি দশা ক্ষুদ্রমাপের এসব মানুষদেরও। গড়া নয়, ভাঙ্গাতেই তাদের অহংকার।

মুসলিম বিশ্ব আজ যেরূপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশে বিভক্ত, শক্তিহীন ও ইজ্জতহীন -তা তো এসব ছোট চেতনার ছোট ছোট ব্যক্তিদের জন্যই। এদের শক্তির মুল উৎসটি নিজের যোগ্যতা নয়, বরং অপরের চরিত্রহনন। অপরের নির্মূলের মাঝেই এরা নিজেদের প্রতিষ্ঠার পথ খুঁজে।এদের কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও ইতিহাস রচনায় ইসলামপন্থীদের চরিত্রে কালিমা লেপনের এতো আয়োজন। সৃষ্টি হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নির্মূল, ফাঁসি বা সহিংস হামলার প্রেক্ষাপট। কাউকে খুনি বা যুদ্ধাপরাধী আখ্যায়ীত করে আদালতের নিয়ে ফাঁসীর আয়োজন করা হলে -তাতে দেশে-বিদেশে প্রতিবাদ না হওয়ারই কথা। দেশে মিথ্যাপূর্ণ ইতিহাসের বই, পত্র-পত্রিকা ও মিড়িয়া তো সে কাজটিই করে। ইতিহাসের বইগুলো তখন পূর্ণ হয় প্রতিহিংসার বীজে; পরিণত হয় সন্ত্রাসের হাতিয়ারে। ইতিহাস চর্চায় তখন জ্ঞানে বৃদ্ধি ঘটে না, প্রজ্ঞাও জন্ম নেয় না; বরং ছাত্রদের প্রচণ্ড প্রতিহিংসা পরায়ণ করে। বাংলাদেশে ইতিহাসচর্চা এভাবেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফাঁসিতে ঝুলানোর পেক্ষাপট তৈরীতে ব্যবহৃত হয়।

 




অধ্যায় আট: ইয়াহিয়া-মুজিব-ভূট্টোর ব্যর্থ বৈঠক

 অবিশ্বাসের রাজনীতি

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় কায়েদে আযম মুহ্ম্মদ আলী জিন্নাহ ঈমান, একতা ও শৃঙ্খলার উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সে নীতির ভিত্তিতেই বহু ভাষা, বহু বর্ণ, বহু প্রদেশ ও বহু মজহাবে বিভক্ত ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে তিনি একতা গড়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা-অবধি সে একতা ও বিশ্বাস অটুট ছিল। ফলে বাঙালী, আসামী, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পাঠান, বিহারী, গুজরাতী এরূপ নানা ভাষার শিয়া-সূন্নী-দেওবন্দি-বেরেলভী মুসলমানেরা তাঁকে অবিসংবাদিত নেতা রূপে বরণ করে নেয়। ভারতীয় উপমহাদেশের বহু শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে এমন একতা আর কোন কালেই প্রতিষ্ঠা পায়নি। কায়েদে আযম এক্ষেত্রে এক অবিস্মরণীয় নেতা। একতার শক্তি অসামান্য। সে একতার বলেই তিনি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ও সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দুদের প্রবল বাধা সত্ত্বেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হন। মুসলিম একতার সবচেযে বড় নিয়ামতটি হলো, এটি মহান আল্লাহতায়ালার অপার রহমত নামিয়ে আনে। আর অনৈক্য নামিয়ে আনে কঠিন আযাব -যার হুশিয়ারি মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন। বলা হয়েছে, “তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা স্পষ্ট নিদর্শন আসার পরও পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হলো এবং নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করলো। তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।”–(সুরা আল ইমরান আয়াত ১০৫)। অর্থাৎ মুসলমানদের মাথার উপর মহান আল্লাহতায়ালার আযাব নামিয়ে আনার জন্য অনৈক্যের ন্যায় কবিরা গুনাহটিই যথেষ্ট।

তবে বাস্তবতা হলো, মুসলিম ইতিহাসে যেমন নানা ভাষা, নানা অঞ্চল ও নানা বর্ণের মানুষের মাঝে সীসাঢালা দেয়ালের মত অটুট ঐক্যর ইতিহাস আছে, তেমনি রক্তাত্ব সংঘাতের ইতিহাসও আছে। মুসলমানদের মাঝে সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধই ভাতৃঘাতি। সেরূপ ঘটনা যে কেবল হযরত মোয়াবিয়া (রাঃ) এবং তার পুত্র এজিদের হাতে ঘটেছে তা নয়। পরেও বহুবার ঘটেছে। এরূপ ভাতৃঘাতি সংঘাত কীরূপে মহান আল্লাহতয়ালার আযাব ঢেকে আনে পবিত্র কোরআনে যে চিত্রটি বার বার তুলে ধরা হয়েছে –বিশেষ করে বনি ইসরাইলের ইতিহাস থেকে। সমগ্র মানব জাতির জন্য সেটি এক শিক্ষণীয় দিক। তারা নিজেরা নানা গোত্রে বিভক্ত হয়েছে এবং নিজ হাতে নিজ গোত্রের নবীদেরকে হত্যা করেছে। এমন কি হযরত ঈসা (আঃ)এর মত মহান নবীকে রোমান কাফেরদের হাতে তুলে দিয়েছে, এবং তাকে শূলে চড়িয়ে হত্যার জন্য জেরুজালেমের রোমান শাসকের উপর চাপও দিয়েছে। একই রূপ সংঘাতের দিকে দ্রুত এগুতে থাকে পাকিস্তানের রাজনীতিও। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছর এক মাস পর কায়েদে আযমের ইন্তেকাল ঘটে। তার মৃত্যুর কিছুদিন পরই রাওয়ালপিণ্ডির এক জনসভায় আততায়ীর হাতে প্রাণ হারান পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নবার লিয়াকত আলী খান। পাকিস্তানের সামনে তখন শাসনতন্ত্র রচনার ন্যায় বহু জটিল সমস্যা। সে জটিল সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজন ছিল পাকিস্তানের সর্ব-এলাকায় গ্রহণযোগ্য বলিষ্ঠ, সৎ এবং যোগ্য নেতৃত্ব। কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর তেমন নেতৃত্বের অবসান ঘটে।তাঁর শূণ্যস্থান পূরণের মত সমমানের কোন নেতা সে সময় সমগ্র পাকিস্তানে ছিল না। গান্ধির জন্ম না হলেও ভারত নিশ্চিত স্বাধীন হতো, কিন্তু কায়েদে আয়ম না হলে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হয়তো আদৌ হত না। তাঁর মৃত্যুতে দুর্যোগ ঘনিয়ে আসে দেশটির বেঁচে থাকাতেও। জিন্নাহর মৃত্যুর পর পারস্পারীক একতা ও বিশ্বাসের সে রাজনীতি আর অটুট থাকেনি। পাকিস্তানীরা দারুন ভাবে ব্যর্থ হয় জিন্নাহর মত সর্ব-পাকিস্তান ভিত্তিক জনপ্রিয় দ্বিতীয় একজন নেতার জন্ম দিতে। একটি দেশ বিজ্ঞানী, ডাক্তার-ইঞ্জিনীয়ার বা কবি-সাহিত্যিক জন্ম দিতে না পারলেও হয়তো বেঁচে থাকে।কিন্তু বিপর্যয় ঘটে যোগ্য নেতা জন্ম না দিলে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে এটিই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। জিন্নাহর মৃত্যুর পর বাঁকি নেতাদের সবচেয়ে বড় দৈন্যতাটি হলো, তাদের পরিচিত ও রাজনীতি ছিল তাদের নিজ নিজ প্রদেশে সীমিত। নিজ নিজ ভাষা, গোত্র এবং ক্ষুদ্র ভূগোলের উর্দ্ধে উঠার সামর্থ যেমন ছিল না, তেমন ইচ্ছাও তাদের ছিল না। বরং নিজেদের প্রদেশভিত্তিক নেতৃত্বকে মজবুত করতে গিয়ে তারা অখণ্ড পাকিস্তানের কল্যাণ ভূলে নিজ নিজ এলাকার স্বার্থকে অধিক গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। ফলে দ্রুত বেড়ে উঠে আঞ্চলিকতা এবং শুরু হয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যের সাথে বেঈমানী। শুরু হয় অনৈক্য ও অবিশ্বাসের রাজনীতি। পাকিস্তানের ধ্বংসে যে কোন বিদেশী শত্রুর চেয়ে তাদের নিজেদের ভূমিকাই তখন বেশী বিধ্বংসী রূপ নেয়।

এসব আঞ্চলিক নেতাদের রাজনীতি এতোটাই নিজ নিজ এলাকায় বন্দী হয়ে পড়েছিল যে, ১৯৭০এর নির্বাচনে শেখ মুজিব এবং জুলফিকার আলী ভূট্টোর মত প্রধান নেতাগণ নিজ নিজ প্রদেশের বাইরে অন্য প্রদেশে নির্বাচনী প্রচারনায় নামার প্রয়োজনও বোধ করেনি। সর্ব-পাকিস্তানী নেতা রূপে আবির্ভাবের কোন আগ্রহও তাদের মধ্যে জাগেনি। ১৯৭১ এসে তাদের মাঝে পারস্পারীক অবিশ্বাস এতোটাই চরম পর্যায়ে পৌছেছিল যে, এক নেতা অপর নেতার সাথে আলোচনায় বসা দূরে থাক, মুখ পর্যন্ত দেখতে চায়নি। তারই এক বর্ণনা দিয়েছেন মার্কিন গবেষক এবং প্রফেসর রিচার্ড সিশন এবং প্রফেসর লিও রোজ তাঁদের বইতে। এ দুই মার্কিন প্রফেসর একাত্তরের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সৃষ্টি নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী বই লিখেছেন। বইয়ের নাম “War and Secession: Pakistan, India and the Creation of Bangladesh”। তথ্য সংগ্রহে তাঁরা দুইজন পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের সেসব ব্যক্তিদের সাথে দেখা করেছেন যারা ছিলেন সে সময়ের রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক। সাক্ষাতদাতাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রেসডেন্ট ইয়াহিয়া খান, লে.জেনারেল নিয়াজী, এয়ার মার্শাল নূর খান, লে.জেনারেল হামিদ খান, লে.জেনারেল পীরজাদা, লে.জেনারেল সাহেবযাদা ইয়াকুব খান, এডমিরাল আহসান, মেজর জেনারেল রাও ফারমান আলী, অধ্যাপক গোলাম মাওলা চৌধুরী , একে ব্রোহী, মিয়া মমতাজ দৌওলাতানা, মমতাজ ভূট্টো, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি, লে. জেনারেল অরোরা, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম, পূর্ব পাকিস্তান বিষয়ক ভারতীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কে.সি পান্ত, পশ্চিম পাকিস্তান বিষয়ক প্রতিমন্ত্রি রাম নিবাস মির্ধা, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আমলা পি.এন.হাকছার, পি.এন.ধর এবং বাংলাদেশের জেনারেল ওসামানি, ড.কামাল হোসেন, প্রশাসনিক আমলা শফিউল আযম, অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানসহ বহু ব্যক্তি। এ বইতে বেরিয়ে এসেছে ইতিহাসের বহু অজানা কথা।

 

আলোচনায় অনীহা

রাজনীতি মানব ইতিহাসের অতি উচ্চাঙ্গের আর্ট বা শিল্প। ইসলামে এটি পবিত্র ইবাদত। কিন্তু ভয়ানক বিপর্যয় দেখা দেয় যখন সেটি ইয়াজিদ বা মীরজাফরদের মত দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হয়। যারা ছোট চেতনার ছোট ছোট মানুষ তাদের মনে থাকে শুধু নিজের ঘর, নিজের কর্ম ও নিজের বাণিজ্য নিয়ে ভাবনা। এ ভাবনার মধ্যেই তারা ডুবে যায় এবং পশু-পাখি ও উদ্ভিদের ন্যায় ইতিহাস থেকেও হারিয়ে যায়। একারণেই সভ্যতা নির্মানের সামর্থ্য সকল দেশের সকল নাগরিকদের থাকে না। তাই বহু দেশের বহুশত কোটি মানুষ ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে কোন সভ্যতার চিহ্ন না রেখেই। অথচ চিন্তা-চেতনায় যারা উচ্চতর,তারা শুধু নিজের ঘর, কর্ম বা বাণিজ্য নিয়ে ভাবে না। তারা ভাবে এবং সে সাথে নিজেদের সর্ববিধ সামর্থের বিনিয়োগ করে একটি উচ্চতর সভ্যতা গড়া নিয়ে। তবে সভ্যতা গড়ার কাজ একাকী হয় না। ক্ষুদ্র দেশের সীমিত জনগোষ্ঠী দিয়েও হয় না। নিজ ভাষা, নিজ অঞ্চল ও নিজ বর্ণের ক্ষুদ্রতা ডিঙ্গিয়ে অন্যভাষা, অন্য অঞ্চল ও অন্য বর্ণের মানুষের সাথে একাত্ম হতে হয়। গ্রীকরা তখনই সভ্যতা গড়তে পেরেছিল যখন তারা আলেকজাণ্ডারের নেতৃত্বে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে এক বিশাল রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পেরেছিল। গ্রীসের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রের পক্ষে এমন একটি যুগান্তকারি সভ্যতার নির্মাণ সম্ভব ছিল না। ইসলামী সভ্যতার নির্মানেও মুসলমানদের তাই মক্কা-মদিনার ক্ষুদ্র পরিসর থেকে বেরিয়ে বাইরে আসতে হয়েছিল। ইরান, তুরান, আফগানিস্তান, আফ্রিকা, ভারত, মধ্য-এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিভা ও সামর্থের মিলন ঘটাতে হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে এমন একটি মহত্তর প্রেরণা নিয়েই বাংলার মুসলিমগণও উপমহাদেশের অন্যভাষী মুসলিমদের সাথে একাত্ম হয়েছিল। বাংলার মুসলিম ইতিহাসে এটি ছিল এক বিপ্লবী সিদ্ধান্ত। কিন্তু ইসলামী সমাজ ও সভ্যতা-বিমুখ মানুষের কাছে সেটি ১৯৪৭ সালেও যেমন ভাল লাগেনি, তেমনি ভাল লাগেনি ১৯৭১ সালেও। তাদের কাছে বাঙালীর ভাষা ও ভূগোলের পরিচয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এর বাইরে যেতে তারা রাজী ছিল না। অথচ মুসলমানের জীবনে অতিশয় মহান কর্ম হল শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র-নির্মাণ। ইসলামে এটি পবিত্র জিহাদ। মুসলমান জান্নাত পায় এ মহান কর্মে আত্মত্যাগের কারণে। প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় কোরবানীটা হয়েছে একাজে। নবীজী (সাঃ) অধিকাংশ সাহাবী সে কাজে শহীদ হয়ে গেছেন; নামায-রোযার প্রসার বাড়াতে এতো রক্ত কোন কালেই ব্যয় হয়নি। তাদের সে আত্মত্যাগের ফলেই গড়ে উঠেছে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। আর মুসলিমগণ যুগে যুগে সে প্রেরণাটি পেয়েছে তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও দর্শন থেকে। বস্তুত সে বিশ্বাস ও প্যান-ইসলামীক দর্শনই তাঁদের রাজনীতির মূল ভিত্তি।

মুসলিম রাজনীতির মূল কথা, ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে ক্ষমতা দখল নয়। বরং শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র নির্মানের লক্ষ্যে মানুষের মাঝে সংযোগ, সমঝোতা ও একতা গড়া। উচ্চতর সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার নির্মানে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা। রাজনীতির এটাই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিশীলতা। অন্য যে কোন পেশার চাইতে রাজনীতি এজন্যই শ্রেষ্ঠ। তাই মুসলিম সমাজে এমন রাজনীতির হাল ধরেছেন নবীজী (সাঃ) স্বয়ং এবং তার শ্রেষ্ঠ সাহাবারা। এমন সৃষ্টিশীল রাজনীতি ছাড়া উচ্চতর সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার জন্ম নেয় না, সুস্থ সমাজ বা সভ্যতা টিকেও থাকে না। বরং এমন সৃষ্টিশীল রাজনীতির অভাবে সমাজে রক্তাত্ব বিভক্তি ও সংঘাত দেখা দেয়। রাষ্ট্র তখন নানা গোত্র,নানা বর্ণ ও নানা ভাষাভাষীর বিভিন্নতায় টুকরো টুকরো হয়ে যায়। রাজনীতিতে এমন বিভক্তি এবং সংঘাতের কারণে সামাজিক শান্তি বা গৌরবই শুধু বিপন্ন হয় না, রাষ্ট্র তখন পরাজয়ের মুখে পড়ে, এমনকি ইতিহাস থেকেও হারিয়ে যায়। ভারতের নানা ভাষা ও নানা অঞ্চলে বিভক্ত মুসলমানেরা ১৯৪৭ সালে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রটির জন্ম দিয়েছিল সে সৃজনশীল রাজনীতির কারণে। তাদের চেতনায় তখন বিশ্বমাঝে আবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু সে রাজনীতি তার সুস্থ সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলে স্বার্থপর নেতাদের কারণে। রাজনীতিকে সৃজনশীল করতে হলে নেতাদের মাঝে যে গুণটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তা হলো দেশ নিয়ে নিঃস্বার্থ ভাবনা, আলাপ-আলোচনা, সমঝোতা ও ত্যাগ-স্বীকারের সামর্থ্য। চাই উচ্চতর দর্শন। সেটি যেমন ট্রাইবাল নেতাদের দ্বারা সম্ভব নয়। তেমনি স্রেফ দলীয় চেতনাতেও সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে জরুরী হলো,ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থের জিঞ্জির ভেঙ্গে নানা ভাষা, নানা অঞ্চল ও নানা বর্ণে বিভক্ত মানুষের মাঝে একতা গড়ার প্যান-ইসলামীক চেতনা। উদ্ধত জ্বালাময়ী বক্তৃতার সামর্থ একজন ট্রাইবাল নেতা ও দুর্বৃত্ত প্রতারকেরও থাকে। বরং এমন বক্তৃতাকে তারা প্রতিষ্ঠা লাভের বড় হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের যোগ্যতার প্রকৃত বিচার হয় দেশবাসীর মাঝে ভাতৃত্ব, মানবপ্রেম, উচ্চতর চরিত্র ও আত্মত্যাগ সৃষ্টির সামর্থ এবং ঘোরতর প্রতিদ্বন্দীর সাথেও সমঝোতা স্থাপনের কুশলতা দেখে। রাজনৈতিক নেতাগণ আবিস্কারক হবেন, ভালো ব্যবসায়ী বা দার্শনিক হবেন -সেটি আশা করা যায় না। তবে এটুকু অবশ্যই আশা করা হয়, তারা সৎ হবেন, ওয়াদা পালনে নিষ্ঠাবান হবেন এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ভদ্র এবং শান্তভাবে গঠনমূলক মতবিনিময়ের সামর্থ্য রাখবেন। তারা যেমন রাজনৈতিক ময়দানের অন্যান্য খেলোয়াড়দের সাথে একত্রে বসবেন,তেমনি বিভিন্ন জটিল বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি আপোষরফায়ও পৌঁছবেন। একমাত্র এ পথেই একটি দেশের জনগণ ভয়ানক রক্তক্ষয় থেকে বাঁচে। আপোষে অনিহা থাকলে তখন শুধু সংঘাতই অনিবার্য হয়। এরূপ যোগ্যতার বলেই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান স্থাপনে সফল হয়েছিলেন। তিনি যেমন গান্ধির সাথে আলোচনায় বসেছেন, তেমনি বসেছেন মাউন্টব্যাটেনের সাথেও। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের সাথে আলোচনা করার লক্ষে সে সময় মহম্মদ আলী জিন্নাহ, আল্লামা ইকবাল, মাওলানা মহম্মদ আলী জওহর, মাওলানা শওকত আলী ও করম চাঁদ গান্ধির ন্যায় ভারতের স্বাধীনতাকামী নেতাগণ সাতসমূদ্র পাড়ি দিয়ে সূদুর লণ্ডনে গিয়েছেন। ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এ বৈঠকগুলো গোল টেবিল বৈঠক রূপে পরিচিত।

 

সংকট রাজনৈতিক ভদ্রতায়

কিন্তু পাকিস্তানের রাজনীতিতে সে কালচারটি তেমন গড়ে উঠেনি। আলোচনার বৈঠকে বসার রুচী যেমন শেখ মুজিবের ছিল না, তেমনি ভূট্টোরও ছিল না। এমনকি ভাষানীরও ছিল না। তাদের মাঝে উচ্চতর রাজনৈতিক দর্শনও ছিল না। পাকিস্তানের যখন ভয়ানক দুর্দিন সে মুহুর্তটিতেও শেখ মুজিব এবং জূলফিকার আলী ভূট্টো একত্রে বসতে রাজী হননি। মুজিব যেমন পশ্চিম পাকিস্তানে যেতে রাজী হননি, ভূট্টোও তেমনি পূর্ব পাকিস্তানে আসতে রাজী হয়নি। শেখ মুজিব দেশের প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনায়ও তেমন আগ্রহ দেখাননি। নিতান্তই চাপের মুখে যখন আলোচনায় বসেছেন তখন ভদ্রভাবে একে অপরের সাথে কথা বলতেও রাজী হননি। তাদের সে অনাগ্রহটি তুলে ধরেছেন প্রফেসর রিচার্ড সিশন এবং প্রফেসর লিও রোজ। ১৯৭১ এর ফেব্রেয়ারির শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মুজিবের সাথে সাক্ষাতের জন্য ইসলামাবাদে যাওয়ার জন্য দাওয়াত করেন। কিন্তু মুজিব সেখানে যেতে অস্বীকার করেন। পাকিস্তানের ৫টি প্রদেশের ৪টি পশ্চিম পাকিস্তানে, ফলে সেখানে গেলে পাকিস্তানের জাতীয় নেতা রূপে তার ভাবমুর্তি বৃদ্ধির সম্ভাবনা ছিল। সরকার গঠনে তিনি হয়তো ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নেতা মূফতি মাহমুদ, কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা পাঞ্জাবের মমতাজর দৌলতানার সমর্থন হয়তো পেতেন। কিন্তু তা নিয়ে তাঁর কোন আগ্রহই ছিল না। শেখ মুজিবকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে সাক্ষাতের গুরুত্ব তুলে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর এ্যাডমিরাল আহসান। শেখ মুজিব এরপরও বৈঠকে রাজী হননি। মুজিবের অহংকার, তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নিরুংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা। তাঁর কথা, তাঁর সাথে দেখা করার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে বরং ঢাকায় আসতে হবে। একজন মানুষের সবচেয়ে বড় বদ গুণ অহংকার। এ বদগুণটি ফিরাউন ও নমরুদের ছিল -যা তাদের জন্য আযাব ডেকে এনেছিল। আল্লাহতায়ালা মানুষের বহু গুনাহ মাফ করেন। কিন্তু অহংকারকে নয়। নবীজীর (সাঃ)র হাদীসঃ অহংকারিদের জন্য জান্নাতের দরজা বন্ধ। অথচই সে অহংকার চেপে বসেছিল সে সময়ের দুই নেতার ঘাড়ে। পরিণতিতে এ অহংকার তাদেরও নিজেদের জীবনেও বিশাল অক্যাণ ডেকে এনেছে।

শুরু থেকেই শেখ মুজিবের মনে শুধু যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উপর অবিশ্বাস ছিল তা নয়, অবিশ্বাস ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য নেতাদের উপরও। মুজিবের ধারণা ছিল, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জনাব ভুট্টোকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন। জনাব ভূট্টো শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রীসভায় যোগ দিতে আগ্রহী ছিলেন। ইয়াহিয়া খানও চাচ্ছিলেন একটি জাতীয় সরকার গঠিত হোক। শেখ মুজিবের যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলীর কোন সদস্যই ছিল না, আওয়ামী লীগের একক সরকার গঠিত হলে সেটি পশ্চিম পাকিস্তানের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর শাসন রূপে চিত্রিত হতো। ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে কোন সময়েই কেন্দ্রে কোন একক প্রদেশের লোক নিয়ে সরকার গঠিত হয়নি। পূর্ব পাকিস্তান থেকে যখন কেউ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তখন গভর্নর জেনারেল বা প্রেসিডেন্ট হয়েছেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল –এ দাবীতে কেন্দ্রে শুধু এ দলটি নিয়ে কোন একক দলীয় সরকার গঠিত হলে সেটি গণতান্ত্রিক ভাবে সিদ্ধ হলেও নৈতিক বা রাজনৈতিক ভাবে সিদ্ধ হতো না। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানীদের কাছে গৃহিত হতো না।

পাকিস্তান বাংলাদেশের ন্যায় একটি মাত্র প্রদেশ ভিত্তিক কোন দেশ নয়। সে সময় পাকিস্তানে ছিল ৫টি প্রদেশ। তাই দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে শুধু একটি মাত্র প্রদেশে জনপ্রিয় হলে চলে না, অন্যান্য প্রদেশের জনগণকেও সাথে নেয়ার দায়িত্বটিও তাকে বহন করতে হয়। কিন্তু সে দায়িত্ব বহনের সামর্থ্য আওয়ামী লীগের ছিল না, তা নিয়ে আগ্রহও ছিল না। সে সামর্থ্যটি বিলুপ্ত হয় মুজিবের নেতৃত্বাধীনে।তিন দলটিকে নিছক একটি প্রাদেশিক দলে পরিণত করেন। অথচ মুজিবের আগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন পাঞ্জাবের নবাবজাদা নাসরুল্লাহ খান। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে দলটি জিতেছিল একটি মাত্র প্রদেশ থেকে। ফলে পাকিস্তানের অন্য ৪টি প্রদেশে দলটির কোন গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। যে কোন গণতান্ত্রিক দেশে এমন অবস্থায় কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। অথচ সেরূপ কোয়ালিশনেও আওয়ামী লীগের আগ্রহ ছিল না। বরং জিদ ধরেছিল, যেহেতু পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল,অতএব শাসনতন্ত্র রচনা এবং দেশ শাসনের একক অধিকার একমাত্র তাদের। তাদের দাবী, অন্যদের উচিত তাদের শাসন এবং তাদের রচিত শাসনতন্ত্র বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়া। গণতন্ত্র বলতে তারা এটুকুই বুঝতো। এ বিষয়ে শেখ মুজিব কোনরূপ আপোষরফায় রাজী ছিলেন না। অথচ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া চাচ্ছিলেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে দুই প্রদেশের নেতাদের সাথে একটা সমঝোতা হোক। আর সে সমঝোতা না হওয়ায় ইয়াহিয়া খানকে জাতীয় পরিষদের বৈঠককে মুলতবি করতে হয়েছিল। কিন্তু সে মুলতবির পর শুরু হয় চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকট। সে সময় ভূট্টোকে ক্যাবিনেটে অংশ দেয়ার বিরুদ্ধে মুজিবের যুক্তি ছিল ‘ভূট্টো হলো একটি “ট্রোজান হর্স”। অপরদিকে ভূট্টোর অবিশ্বাসও কমছিল না। তার দুর্ভাবনা ছিল,আর্মি হয়তো তাকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখবে। তাই আর্মির বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করতে তিনি মুজিবকে বলেছিলেন, “আর্মি কখনই বাঙালীর হাতে ক্ষমতা দিবে না।” শেখ মুজিবও চেষ্টা করেছেন আর্মির বিরুদ্ধে জনাব ভূট্টোকে খ্যাপাতে। শেখ মুজিব ভূট্টোকে বলেছিলেন আর্মিকে বিশ্বাস না করতে। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে হুশিয়ার করে দিয়ে শেখ মুজিব ভূট্টোকে বলেছিলেন, “সেনাবাহিনী আমাকে ধ্বংস করতে পারলে আপনাকেও ধরবে।” -(Sisson and Rose, 1990)। এই হলো সে সময়কার নেতাদের পারস্পারিক অবিশ্বাসের নমুনা।

 

বাঙালী শাসনের ভয়

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি ছিল প্যান-ইসলামী চেতনা। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার স্থান এ আন্দোলনে ছিল না। তখন ভাষা ও প্রদেশভিত্তিক বিভিক্তকে মুসলিম উম্মাহর জন্য অতি আত্মবিনাশী এবং ইসলাম বিরোধী রূপে চিত্রিত করা হতো। বিভিন্ন ভাষা ও বিভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত হিন্দুরাও সেদিন এক হিন্দুস্থানী জাতীয়তার ভিত্তিতে একতাবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীরা ভাসতে শুরু করে বাঙালী জাতীয়তাবাদের জোয়ারে। ফলে দেশটির জন্য দ্রুত দূর্দিনও ঘনিয়ে আসতে শুরু করে। এমন ভাষাভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রথম জোয়ারটি শুরু হয় ১৯০৫ সালে,যখন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বাংলাকে বিভক্ত করে এবং পূর্ব বাংলা ও আসামকে নিয়ে আলাদা প্রদেশ গড়ে। এ আন্দোলনের নেতাকর্মীরা ছিল মূলত হিন্দু। বাংলার বিভক্তিতে হিন্দুদের স্বার্থহানি হবে -সে বিশ্বাস নিয়েই তারা বাঙালী জাতীয়তার শ্লোগান নিয়ে তুমুল আন্দোলন শুরু করেছিল। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সে আন্দোলনে মাঠে নেমেছিলেন। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তিনি গান ও কবিতা লিখেছেন। অবশেষে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকারকে তারা বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য করে। কিন্তু হিন্দুরাই আবার সে বাঙালী জাতিয়তাবাদ পরিত্যাগ করে ১৯৪৭ সালে। তখন ভাষাভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তাবাদ বর্জন করে তারা হিন্দু ধর্মভিত্তিক হিন্দুস্থানী জাতীয়তাকে গুরুত্ব দেয় এবং ধর্মের ভিত্তিতে বাংলাকে খণ্ডিত করাকে অনিবার্য করে তোলে। তখন পূর্ব বাংলার বাঙালীদের পরিত্যাগ করে তারা অবাঙালী হিন্দুদের সাথে ভারতে যোগ দেয়। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাঙালী জাতীয়তাবাদের সে পতাকাটি তুলে নেয় বাঙালী হিন্দুদের বদলে বাঙালী মুসলমানেরা এবং সেটি প্রবল আকার ধারণ করে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পর। সে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে যখন তৎকালীন পাকিস্তান সরকার উর্দুকে রাষ্ট ভাষা করার ঘোষণা দেয়। তৎকালীন সরকার উর্দুকে রাষ্টভাষার ঘোষণা দিয়েছিল পাকিস্তানের সংহতি মজবুত করার লক্ষ্যে, বাংলা ভাষাকে বিলুপ্ত করার জন্য নয়। বাংলা ভাষা সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানীর ভাষা হলেও সেটির চর্চা বাংলার বাইরে ছিল না। একই অবস্থা ছিল পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পশতু এ বেলুচ ভাষার। অথচ উর্দু ভাষা পাকিস্তানের প্রতি প্রদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত মুসলিম বুঝতেো। পাকিস্তানের সকল প্রদেশের সকল মাদ্রাসাতে উর্দু ভাষাতে শিক্ষা দেয়া হত। সে সময় একমাত্র ঢাকা শহরে যত উর্দু ভাষী ছিল এবং এ ভাষায় যত বই ছাপা হত পূর্ব পাকিস্তানের বাইরে সমগ্র পাকিস্তানে ততজন বাংলাভাষী ছিল না এবং বাংলার চর্চাও ছিল না। কিন্তু নিছক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাঙালীরা তখন সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠার দাবী তোলে।

ব্রিটিশ শাসনের বিদায় ঘন্টা যখন বাজতে শুরু করে তখন মুসলিমদের মনে প্রচণ্ড ভয় সৃষ্টি হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শাসনের বিরুদ্ধে। ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতে তখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলছে। আর গণতন্ত্রের মূল কথা সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। সার্বভৌমত্ব বলতে বুঝায় সংখ্যাগরিষ্ঠের সার্বভৌমত্ব। সংখ্যালঘিষ্টদের দাবী যত যৌক্তিকই হোক -সেটি মেনে নেয়ায় গণতন্ত্রে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা -তা যত অযৌক্তিক এবং অমানবিকই হোক, সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে সেটির প্রতিষ্ঠাই যে সাংবিধানিক বৈধতা পাবে সে ভয় ছিল ভারতীয় মুসলমানদের মনে। তাদের সে ভয় আদৌ অমূলক ছিল না, বরং অতি সঠিক ছিল তার বড় প্রমাণ আজকের ভারত। মুখে সেক্যুলারিজমের কথা বললেও ভারতীয় নেতাগণ ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা প্রাপ্তির সাথে সাথে হিন্দুধর্মের পৌরাণিক বিশ্বাস, দর্শন ও মুর্তিকে জাতীয় মর্যাদা দেয়। মুসলিমদের বাধ্য করা হয় ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক জাতীয় সঙ্গিত বন্দেমাতরম গানটি গাইতে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুনেতাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি বাবরী মসজিদের ন্যায় একটি মসজিদের নিরাপত্তা দানের বিষয়টি। শিক্ষাদীক্ষা ও চাকুরিতে মুসলমানদের উন্নয়ন দূরে থাক, তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি এমন কি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে মুসলমানদের জানমাল ও ইজ্জত-আবরু বাঁচানোর ন্যায় অতি মৌলিক মানবিক বিষয়গুলিও। একই কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীদের বিরুদ্ধে ভয় দানা বাঁধতে থাকে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশবাসীদের মনে। আর সে ভয়ই তীব্রতর হয় ভাষা আন্দোলনের পর। সে ভয় আরো তীব্রতর হয় ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় এবং বিজয় শেষে শাসনতন্ত্র রচনায় ও সরকার গঠনে শেখ মুজিবের আপোষহীন মনভাবের কারণে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই কোন কোন বাঙালী বুদ্ধিজীবী দাবী তোলেন, সমগ্র পাকিস্তানের উপর বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা দিতে হবে। তাদের যুক্তি, বাংলা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা। পাঞ্জাবী, সিন্ধু, পাঠান,বেলুচ এবং ভারত থেকে আগত গুজরাতি, রাজস্থানী, বিহারী, মারাঠী ইত্যাদী ভাষাভাষীদের কারোই মাতৃভাষা উর্দু ছিল না। কিন্তু মাতৃভাষা না হলেও উর্দূ বর্ণমালা ও সাহিত্যের সাথে তাদের পুরনো পরিচিত ছিল। কিন্তু সে অবস্থান বাংলা ভাষার ছিল না।

 

সেনাবাহিনীর দুশ্চিন্তা

সত্তরের নির্বাচন কালে পাকিস্তান আর্মির দুটো মৌলিক বিষয় নিয়ে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা ছিল -যার নিষ্পত্তি তারা সে নির্বাচনের যারা বিজয়ী হয়েছিল তাদের কাছ থেকে আশা করছিল। তা ছিল, এক). পাকিস্তানের সংহতি, দুই). পাকিস্তান আর্মির বাজেট, সেনাবাহিনীর অফিসারদের প্রমোশন, পোষ্টিং ও লজিস্টিক নিয়ে আর্মির স্বাধীনতার বিষয়। এ দুটি বিষয়ের বাইরে প্রদেশগুলির স্বায়ত্বশাসনের বিষয়ে ইয়াহিয়া খান এবং তাঁর সহকর্মিরা ছিল পূর্ববর্তী সরকারগুলোর তুলনায় অনেক বেশী উদার। ফলে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসেই পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট ভেঙে দেন এবং পুনরায় পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্তপ্রদেশ এবং বেলুচিস্তান এ চারটি প্রদেশের জন্ম দেন। অথচ এ চারটি প্রদেশ ভেঙ্গে এক পশ্চিম পাকিস্তান গড়া হয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ট পূর্ব পাকিস্তানীদের বিরদ্ধে অবাঙালীদের একতাবদ্ধ শক্তি রূপে খাড়া করার জন্য। ইয়হিয়া খান এক ব্যক্তি এক ভোটের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানর জন্য জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নির্ধারিত করেন। ইয়াহিয়া খানের এরূপ সিদ্ধান্তের কারণে শেখ মুজিবও তাঁর উপর এতোটাই খুশি ছিলেন যে, তাঁকে নাকি শাসনতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট করার প্রস্তাবও দেন। তবে সে প্রস্তাব পেশে নির্বাচনে ইয়াহিয়া খান ও তাঁর সেনাবাহিনীর সুনজর ও সহযোগিতা লাভের বিষয়টিই সম্ভবতঃ মুজিবের কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আওয়ামী লীগ ইয়াহিয়া সরকারের নিকট থেকে সে সহযোগিতা পেয়েছিলও প্রচুর। ইয়াহিয়া সরকারের প্রশ্রয়ের ফলে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা নির্বাচনি প্রচারে অন্যান্য দলগুলোকে তেমন নামতেই দেয়নি।

১৯৭০এর নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানের রাজনীতির চিত্রই পাল্টে দেয়। এ নির্বাচন শুধু সরকারকেই হতবাক করেনি, হতবাক করেছিল শেখ মুজিব এবং ভূট্টোকেও। শেখ মুজিব এবং জুলফিকার আলী ভূট্টো –এ দুজনের কেউই ভাবতে পারিনি তারা এতো বিপুল আসনে নির্বাচিত হবেন। নির্বাচনের আগে ভূট্টোর অবস্থা এমন ছিল যে, জনাব মমতাজ দৌলতানার কাউন্সিল মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে পাঞ্জাবে তার দলকে মাত্র ২০টি সিট ছেড়ে দিলে তিনি তাঁর সাথে আপোষ করতে রাজী ছিলেন। কিন্তু দৌলতানা ভেবেছিলেন, ভূট্টোর দল পাঞ্জাবে ২০ সিটেও নির্বাচনী লড়াই পরিচালনার অর্থ জোগাতে পারবে না। ফলে তিনি ২০ সিঠ দিতেও রাজী হননি। কিন্তু শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে ভূট্টোরও। পশ্চিম পাকিস্তানী ব্যবসায়ীরা ভূট্টোকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী শাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিদ্বন্দি মনে করে এবং মুসলিম লীগের প্রবীন নেতাদের বদলে তাঁকে অর্থ জোগায়। ফলে নির্বাচনে দৌলাতানাদের অনুমান ভূল প্রমানিত হয়।-(Sisson and Rose, 1990)।

 

ভূট্টোর ক্ষমতালিপ্সা

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১৯৭০ সালের ১২ জানুয়ারি তিন দিনের জন্য ঢাকার আসেন এবং শেখ মুজিবের সাথ দুই বার দেখা করেন। একবার ছিল ইয়াহিয়া খান ও শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত বৈঠক। দ্বিতীয় বৈঠকটি ছিল তিন ঘন্টার। সে বৈঠকে আওয়ামী লীগের হাই কমাণ্ড উপস্থিত ছিল। ইয়াহিয়া খানের সাথে ছিল তাঁর দুইজন সহকারি। ঢাকার অবস্থান শেষে যাওয়ার আগে শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী রূপে ঘোষণা দেন এবং একথাও বলেন তার কাজ এখন শেষ এবং প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রস্থানের। অপর দিক নির্বাচনে আশীতীত সাফল্যের পর ভূট্টোর ক্ষমতালিপ্সা এতোটাই প্রচণ্ড ছিল যে, ইয়াহিয়া খানকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, “আমি অপেক্ষা করতে পারবো না, এখনই ক্ষমতা চাই।” তিনি এ আভাসও দেন, পাকিস্তানের নেতৃত্ব দেয়াই তার অদিষ্ট এবং সেকাজে কোন রূপ বিলম্ব হতে দিতে রাজী নয়। সরকারের এক উচচ পর্যায়ের কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, এক বছরের মধ্যে গদী না পেলে ভূট্টো বদ্ধ পাগল হয়ে যাবেন‍। মার্চের দিকে ভূট্টো অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও সংঘাতমুখি হয়ে পড়েন। জাতীয় পরিষদে তার পার্টি একটি সংখ্যালঘিষ্ট পার্টি রূপে আবির্ভূত হলেও তিনি পিপলস পার্টিকে দুই মেজোরিটি পার্টির একটি রূপে দাবী করেন। শেখ মুজিবের সাথে জানুয়ারির সাক্ষাতে মুজিবকে কেন পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল তাতে তিনি ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ ছিলেন। -(Sisson and Rose, 1990)। জনাব ভূট্টো একথাও বলেন, আওয়ামী লীগ শুধু একমাত্র প্রদেশের দল, অতএব কি করে সে দল সমগ্র পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কথা বলার অধিকার রাখে? তার দাবী, পিপলস পার্টি পাঞ্জাব ও সিন্ধু এ দুটি প্রদেশ থেকে নির্বাচিত হয়েছে। অতএব যে কোন সরকার গঠনে অবশ্যই পিপলস পার্টির অংশদারিত্ব থাকতে হবে। অপরদিকে শেখ মুজিবের দাবী ছিল, নির্বাচন ছিল ৬ দফার উপর রিফারেণ্ডাম, বিশ্বের কোন শক্তি ৬ দফার বাস্তবায়ন রুখতে পারবে না। সরকার প্রতিষ্ঠায় তিনি জনাব ভূট্টো থেকে কোনরূপ সহযোগিতা নিতে আগ্রহী ছিলেন না। সরকার গঠন নিয়ে তাই ভূট্টোর সাথে কোনরূপ আলাচনায় বসতে রাজী হননি।

অখণ্ড পাকিস্তানের শেষ দিনগুলিতে শেখ মুজিব এবং জনাব ভূট্টোর মধ্যে কোন রূপ যোগাযোগোই ছিল না। এমনকি তাদের মধ্যে সৌজন্যমূলক আচরণও লোপ পেয়েছিল। এবং সে বিবরণটিও দিয়েছেন Sisson and Rose। ইয়াহিয়া খান ১৫ই মার্চ ঢাকায় আসেন। পরের দিন তিনি প্রেসিডেন্ট হাউসে শেখ মুজিবকে আলোচনায় ডাকেন, এবং একটি শান্তিপূর্ণ আলাপ আলোচনার গুরুত্বটি তুলে ধরেন। ১৯ মার্চ শেখ মুজিব জানান তিনি ভূট্টোর সাথে আলোচনায় বসতে রাজী আছেন। সে খবর ভূট্টোকে জানানোর পর ২১ মার্চ ঢাকায় আসেন। ঢাকার পরিস্থিতি তখন খুবই থম থমে। সেনা-পাহারায় তাঁকে বিমান বন্দর থেকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আনা। হোটেলের বাঙালী স্টাফগণ তাঁর সাথে কথা বলতে এবং কোনরূপ আপ্যায়ন করতে অস্বীকৃতি জানায়। এ ছিল এক অদ্ভুদ অবস্থা। ভূট্টো ও তাঁর দলের নেতাদের হোটেলের সর্বোচ্চ তালায় নেয়া হয়। অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে অবশেষে ২২ মার্চ প্রেসিডেন্ট ভবনে বৈঠক বসে। আলোচনা কক্ষে বসে শেখ মুজিব ও জনাব ভূট্টো একে অপরের দিকে সরাসরি না তাকিয়ে চেয়ারে আধাআধি ঘুরে বসে থাকেন। শেখ মুজিবের ঘোরতর আপত্তি, কেন ভূট্টোকে ডাকা হয়েছে। অপরদিকে ভূ্ট্টোর অভিযোগ, শেখ মুজিব যখন তাঁর সাথে আলোচনায় বসতে রাজী নয় তবে কেন তাকে ঢাকায় ডেকে আনা হলো? উভয়ের অভিযোগ ও অবিশ্বাস ইয়াহিয়া খানের উপর। আলোচনায় অচলাবস্থা দেখে ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিব এবং জনাব ভূট্টোর হাত ধরে একে অপরের কাছে টানেন এবং সামাজিক সৌজন্য ও ভদ্রতার বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেন। তাতে আলোচনা কিছুটা শুরু হলেও সেটি কোনরূপ আপোষ-রফার জন্য উপযোগী ছিল না। অবশেষে ভূট্টো ও মুজিব উভয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে বারান্দায় পায়াচারি শুরু করেন। সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব ভূ্ট্টোকে সেনাবাহিনীকে বিশ্বাস করার ব্যাপার হুশিয়ার করে দেন। অপরদিকে ভূট্টো শেখ মুজিবের আর্মির উপর অবিশ্বাসকে আরো তীব্রতর করেন, আর্মির সাথে সমাঝোতা যে তার জন্য বোকামী হবে সেটিও তাকে বলেন।-(Sisson and Rose, 1990)।

 

স্বাধীনতার পতাকা টানিয়ে মুজিব

আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয় মূলত একাত্তরের ২৩ মার্চ। ঐদিনটি পাকিস্তানের ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের ইতিহাসে ঐ দিনটি পরিচিত পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রি দিবস রূপে। ১৯৪০ সালের ঐদিনে লাহোরের মিন্টো পার্কে মুসলিম লীগের সন্মেলনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। সে প্রস্তাবটি পেশ করেছিলেন বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জনাব শেরে বাংলা ফজলুল হক। ঐদিন পাকিস্তানে সরকারি ভবনগুলোতে পাকিস্তানের চাঁদতারা খচিত সবুজ পতাকা উত্তোলনের দিন। আওয়ামী লীগ ঐদিনকে প্রতিরোধ দিবস রূপে ঘোষণা দেয়। ঐদিন ঢাকায় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়, এবং নানা স্থানে পদদলিত করা হয় পাকিস্তানের পতাকাকে। পাকিস্তানের পতাকা সেদিন শুধুমাত্র সামরিক স্থাপনাগুলিতেই উড়তে দেখা যায়। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ঐদিন স্বাধীনতা ও সামরিক প্রতিরোধের ঘোষণা দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হাজার হাজার কর্মী প্যারেড, কুচকাওয়াজ ও মিছিল করে। রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্র তখন “ঢাকা রেডিও” নামে নিজস্ব সম্প্রচার চালাতে থাকে। ঐদিনের ঘটনাবলিতে পাকিস্তান আর্মির মধ্যে উদ্বেগ গুরুতর আকার ধারণ করে। সে উদ্বেগের অন্যতম কারণ, অবসরপ্রাপ্ত দুই বাঙালী অফিসার কর্নেল ওসমানি এবং মেজর জেনারেল মজিদ সামরিক বাহিনীর সাবেক সেনাদের নিয়ে ঢাকাতে এক সমাবেশ করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে তাদের এগিয়ে যেতে বলেন। সমাবেশ শেষে তারা মিছিল করে শেখ মুজিবের ধানমণ্ডির বাসায় যান এবং তাঁর শুভেচ্ছা নেন। ঐদিন ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে গঠিত জয়বাংলা ব্রিগেড পল্টন ময়দানে এক সমাবেশ করে এবং ছাত্রলীগের চার নেতার নেতৃত্বে শেখ মুজিবের বাসায় গিয়ে তার থেকে শুভেচ্ছা গ্রহণ করে।

পাকিস্তান আর্মির জন্য অবস্থা চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে তখন যখন শেখ মুজিব নিজে তাঁর নিজের গাড়ীতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ইয়াহিয়া খানের সাথে বৈঠক করতে প্রেসিডেন্ট ভবনে আসেন। সেনাবাহিনীর মধ্যে এতোদিনও যারা একটি আপোষরফা নিয়ে আশাবাদী ছিলেন তাদের কাছে শেখ মুজিবের এ আচরণ অতি অপমানজনক মনে হয়েছিল। সেটি অতিশয় বিদ্রুপ ছিল পাকিস্তানের প্রতিও। অপরদিকে আলোচনা এমন এক পর্যায়ে পৌছেছিল যে, ইয়াহিয়া খান এবং ভূট্টো উভয়ই শেখ মুজিবের ৬ দফা মেনে নেন। তারা আওয়ামী লীগের এ দাবীও মেনে নেন যে পূর্ব পাকিস্তানে একটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত বিদেশী মূদ্রা গচ্ছিত রাখার জন্য একটি পৃথক ফাণ্ডও থাকবে। ভূট্টোর দলও এসব নিয়ে আর কোন আপত্তি তোলেনি। ইয়াহিয়া খান তখন তার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এম.এম আহম্মদকে নির্দেশ দেন ৬ দফার ভিত্তিতে অর্থনীতিকে সাজানোর খসড়া প্রণয়নে। সরকার এসব নিয়ে একটি মেমোরেণ্ডাম অফ আন্ডারস্টডিং স্বাক্ষরেরও প্রস্তুতি নিচ্ছিল। -(Sisson and Rose, 1990)। সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনা শুরু হয় কিভাবে কেন্দ্রে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায় তা নিয়ে। ইয়াহিয়া খান চাচ্ছিলেন,শেখ মুজিবকে প্রধানন্ত্রী করে সত্বর একটি কোয়ালিশন সরকার গঠিত হোক। সে কোয়ালিশনে ভূট্টো বা পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যদলের সদস্যরাও থাকবে এবং সত্বর একটি শাসনতন্ত্র রচনার কাজ শুরু করবে।

 

পাল্টে গেল গোলপোষ্ট

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এবং জনাব ভূট্টো আওয়ামী লীগের ৬ দফা পুরোপুরি মেনে নিলেও আলোচনা ধেয়ে চলে চরম ব্যর্থতার দিকে। আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে তার গোলপোষ্টই পাল্টিয়ে ফেলে। শেখ মুজিব তখন নিজেই তাঁর ৬ দফার কথা ভূলে যান। তিনি ইয়াহিয়া এবং জনাব ভূট্টোর কাছে এমন সব নতুন নতুন দফা পেশ করেন যা তিনি পূর্বে কখনই জনসম্মুখে বলেননি, নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে ঘোষণা দেননি এবং জনগণের পক্ষ থেকে তার পক্ষে কোন ভোটও নেননি। তিনি তখন আর কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। বরং দাবী তুলেন দুই প্রদেশে দুইটি পৃথক “Constituent Conventions” গঠনের এবং সে সাথে সত্বর প্রাদেশিক পর্যায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের। শেখ মুজিব ভূলেই যান, যে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক স্বাক্ষর করে তিনি ১৯৭০এর নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তাতে প্রথমে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ছিল না। শর্ত ছিল, নির্বাচনের পর নির্বাচিত সদস্যগণ প্রথমে একটি শাসনতন্ত্র রচনা করবে। সে কাজটি সফল ভাবে সমাধা হওয়ার পরই তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা আসবে। কিন্তু ক্ষমতা-পাগল নেতারা তাদের সে ওয়াদা এবং দায়িত্বের কথা তারা সম্পূর্ণ ভূলে যান। মূল দাবী হয়ে দাঁড়ায়, দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের।

শেখ মুজিব আরো দাবী তোলেন, জাতীয় পরিষদের বৈঠক জাতীয় ভাবে বসবে না, সেটি বসবে প্রাদেশিক ভাবে এবং পৃথক পৃথক ভাবে। প্রাদেশিক ভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর সত্বর সামরিক আইন তুলে নিতে হবে। শাসনন্ত্র তৈরীর বিষয়টি তারা ভূলেই যান। প্রশ্ন হলো, দেশে তখন শাসনতন্ত্র ছিল না। তখন দেশ চলতো সামরিক শাসন অনুযায়ী। শাসনতন্ত্র তৈরীর আগে সামরিক শাসন তুলে নিলে নতুন সরকার দেশ চালাবে কোন আইনে? কিন্তু ক্ষমতা-পাগল নেতাদের সে ভাবনা লেশ মাত্র ছিল না। ইয়াহিয়া খানের পক্ষ থেকে প্রস্তাব রাখা হয়েছিল সংসদ সদস্যরা পাকিস্তানের অখণ্ডতা এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের শপথ নিবে। শেখ মুজিব ও তাঁর দল তাতেও রাজী হয়নি। বরং আওয়ামী লীগের দাবি ছিল, সংসদ সদস্যগণের অঙ্গীকার থাকবে স্রেফ শাসনতন্ত্রের প্রতি, পাকিস্তানের প্রতি নয়। অথচ তখনও দেশে কোন শাসনতন্ত্র তৈরীই হয়নি। ফলে এদাবী অনুযায়ী শপথ নেয়ার প্রশ্নই উঠে না। এভাবেই কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয় জাতীয় পরিষদের সদস্য ও মন্ত্রীদের শপথ নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের নাম হবে “Federation of Pakistan” ।কিন্ত আওয়ামী লীগের দাবী ছিল সেটি হবে “Confedaration of Pakistan”। সরকারি পক্ষ Confedaration এর বদলে ভারতীয় আদলে “Union” শব্দটি মেনে নিতে রাজী ছিল। কিন্তু শেখ মুজিবের জিদ ধরেন,“কনফেডারেশন” শব্দটিই রাখতে হবে। -(Sisson and Rose, 1990)।

সরকারি পক্ষের কথা ছিল, কনফেডারেশন হয় দুটি স্বাধীন দেশের মধ্যে, কখনই একই দেশের দুইটি প্রদেশের মধ্যে নয়। ইয়াহিয়া খান ও তাঁর টিমের কাছে শেখ মুজিবের এসব প্রস্তাব সাংবিধানিক ভাবে বিচ্ছিন্নতার ষড়যন্ত্র মনে হয়। তাদের মনে বিশ্বাস জন্মে, মুজিবের দাবী মেনে নিয়ে সামরিক শাসন তুলে নেয়ার সাথে সাথেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে আর কোন বাধাই থাকবে না। তখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আর কোন রূপ আইনগত ক্ষমতাই থাকবে না, এবং সে সাথে আইনগত বৈধতাও থাকবে না। কারণ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতার মূল উৎস ছিল সামরিক আইন। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন না করে দুই প্রদেশে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে এবং সামরিক আইন তুলে নিলে শুধু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াই ক্ষমতা হারাবেন না, সে সাথে অখণ্ড পাকিস্তানেরও আইনগত বিলুপ্ত ঘটবে। বিষয়টি এতোই সুস্পষ্ট ছিল যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানই শুধু নয়, জনাব ভূট্টোও এরূপ দাবী মেনে নিতে রাজী ছিলেন না। মানতে রাজী ছিলেন না ন্যাপের জনাব আব্দুল ওয়ালী খানসহ পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও। এ বিষয়ে জনাব ভূট্টো লিখেছেন, “Martial Law was the source of law then obtaining in Pakistan and the very basis of the President’s authority; and with the proclaimation lifting Martial Law, the President and the Central Government would have lost their legal authority and sanction. There would thus be a vacuum unless the National Assembly was called into being to establish a new source of sovereign power on the national level. If, in the absence of such national source, power were transferred as proposed in the provinces, the government of each province could acquire de facto and de jure sovereign status.”  -(Bhutto, Great Tragedy, p.43)  অর্থঃ “তখন পাকিস্তানে আইনের উৎস ছিল সামরিক আইন, এবং এটাই ছিল প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মূল ভিত্তি। ফলে সামরিক আাইন তুলে নেয়ার ঘোষণার সাথে সাথে প্রেসিডেন্ট এবং কেন্দ্রীয় সরকার তার আইনগত ক্ষমতা এবং অর্পিত অধিকার হারিয়ে ফেলতো। জাতীয় পরিষদের বৈঠক আহবান করে জাতীয় পর্যায়ে সার্বভৌম ক্ষমতার নতুন উৎস প্রতিষ্ঠা না করলে ক্ষমতার শূণ্যতা সৃষ্টি হতো। জাতীয় পর্যায়ে সার্বভৌম ক্ষমতার এমন শূণ্যতা নিয়ে প্রদেশগুলির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলে প্রত্যেকটি প্রদেশের সরকারই কার্য্যতঃ এবং আইনতঃ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি হতো।” অথচ শেখ মুজিব ও তার দল সেটিই চাচ্ছিলেন। জনাব ভূট্টোকে এটাকেই বলেছেন “constitutional secession” বা শাসনন্ত্রিক বিচ্ছিন্নতা।

২৩শে মার্চের রাতে প্রেসিডেণ্ট ইয়াহিয়া খান ছোট ছোট দলের নেতাদের সাথে মিলিত হন। তিনি তাদের কাছে শেখ মুজিবের আপোষহীন মনোভাবের কথা তুলে ধরেন। তাদেরকে একথাও বলেন, শেখ মুজিবের দাবী মেনে নিলে বিশ্ববাসী হাঁসবে এবং তাঁকে বোকা বলে উপহাস করবে। ২৪শে মার্চ ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান এবং গাওস বকস বিজেঞ্জো শেখ মুজিবের সাথ দেখা করেন। তাঁরা তাকে দুই Constituent Conventions এবং Confedaration of Pakistan এর দাবী প্রত্যাহারের পরামর্শ দেন। কিন্তু তাদের সে প্রস্তাব শেখ মুজিব মানেন নি। শেষ আলোচনা হয় ২৪ তারিখে। তাজউদ্দীন আহমেদ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে চুড়ান্ত প্রস্তাব পেশ করেন। কিন্তু তাতে আলোচনা আর সামনে এগুয়নি। এরপর অধিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া ইয়াহিয়া খানের কাছে অনর্থক মনে হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান প্রচণ্ড আশাহত হন। তাঁর আশা ছিল, শেখ মুজিব পাকিস্তানকে বাঁচানোর ব্যাপারে অন্ততঃ আন্তরিক হবেন। এমন একটি ধারণা শেখ মুজিবই ইয়াহিয়া খানকে দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবই তাঁকে বলেছিলেন, ৬ দফা কোন বাইবেল নয়। শেখ মুজিবের সে কথাটিকে তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাসও করেছিলেন। ফলে পাকিস্তান মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সির গুপ্তচরেরা যখন মুজিবের পাকিস্তান বিধ্বংসী পরিকল্পনার ক্যাসেট শুনেয়েছিল তখনও তিনি সেটি বিশ্বাস করেননি। বলেছিলেন, মুজিব আমাকে ওয়াদা দিয়েছে।

তিনি শুধু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে নয়, অনেককেই মিথ্যা ওয়াদা দিয়েছিলেন। সবচেয়ে বেশী বোকা বানিয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোটি কোটি জনগণকে। মুজিবের ধোকা দেয়ার ধরণ নিয়ে একটি উদাহরণ দেয়া যাক। দৈনিক ইনকিলাবের ফিচার সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুল গফুরর বাড়ি বৃহত্তর ফরিদপুরের রাজবাড়ীতে। তিনি মুজিবের সাথে ঘনিষ্ট ভাবে পরিচিত ছিলেন। তমুদ্দন মজলিসের অফিসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে – সেখানে এ গ্রন্থের লেখকও উপস্থিত ছিলেন, স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলছিলেন, “শেখ মুজিবের ধানমণ্ডির বাসায় একবার তাঁর সাথে দেখা করতে গেলাম। বাসায় প্রবেশের পর বারান্দায় দাঁড়িযে দেয়ালে টানানো কিছু ফটো দেখছিলাম। হঠাৎ করে কে যেন পিছন দিক থেকে আমার চোখ চেপে ধরলো। বুঝলাম এ কাজ শেখ মুজিবের। চোখ ছাড়লে আমি তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি সত্যই পাকিস্তান ভাঙ্গতে চান।” মুজিব বললেন, “তুইও কি তাই বিশ্বাস করিস? যে পাকিস্তান নিজ হাতে বানিয়েছি সেটি কি আমি ভাঙ্গতে পারি?” অথচ এই সেই শেখ মুজিব পাকিস্তানের জেল থেকে ১৯৭২ সালে ফেরার পর ঢাকার সহরোয়ার্দি উদ্দানের জনসভায় বল্লেন, “পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির কাজের শুরু একাত্তর থেকে নয়, ১৯৪৭ সাল থেকে।”

শেখ মুজিবের সে কথাটি অধ্যাপক আব্দুল গফুর বিশ্বাস করেছিলেন কি না -তা তিনি বলেননি। তবে শেখ মুজিবের এমন কথা বাংলার বহু মানুষই বিশ্বাস করেছিল। এমন কথা শেখ মুজিব শুধু অধ্যাপক আব্দুল গফুরকেই বলেননি, ইয়াহিয়া খানকেও বলেছিলেন। এবং ইয়াহিয়া খান সেটি পুরাপুরি বিশ্বাসও করেছিলেন। পাকিস্তানের ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্টের সংগৃহীত মুজিবের পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে পেশ করা বক্তব্যের ক্যাসেটও তার বিশ্বাসে ফাটল ধরাতে পারেনি। তবে ইয়াহিয়া খানের গুরুতর অপরাধ, শেখ মুজিবকে তিনি শুধু বিশ্বাসই করেননি, তাকে রাজপথের উপর দখলদারি ও অন্যান্য দলের নির্বাচনি জনসভাগুলোকে পণ্ড করার পূর্ণ অধিকারও দিয়েছিলেন। ইয়াহিয়া খান ভেবেছিলেন মুজিব তাকে সাংবিধানিক প্রেসিডেন্ট বানাবে। সে খোশ খেয়ালে মুজিবকে তিনি অবাধ ছাড় দিয়েছেন। তিনিই আওয়ামী লীগের জন্য সুযোগ করে দিয়েছিলেন ব্শিাল নির্বাচনি বিজয়ের -যা মুজিব নিজেও কখনো ভাবেননি।

 

ব্যর্থ হলো বৈঠক

শেষ মুহুর্তে শেখ মুজিবের আসল রূপ ইয়াহিয়া খানের কাছেও সুস্পষ্ট হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও তাঁর টিমের ধারণা জন্মে, আলোচনায় আওয়ামী লীগের কোনরূপ সততা নেই এবং অখণ্ড পাকিস্তান বাঁচানোর কোন ভাবনাও নাই। দুটি পক্ষ সম্পূর্ণ দুটো বিপরীত এজেন্ডা নিয়ে আলোচনায় বসছিল যার মধ্যে কোনরূপ আপোষ সম্ভব ছিল না। ফলে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় ইয়াহিয়া-মুজিব-ভূট্টো আলোচনা। ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেন। আর পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হয় রক্তাত্ব পথে। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য কে দায়ী তা নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন বিবরণ নাই। যা আছে তা স্রেফ আওয়ামী লীগের নিজের ভাষ্য, যাতে প্রকৃত সত্য নেই। তাই আজও  প্রশ্ন, কার অপরাধে দেশ সেদিন রক্তাত্ব হলো? প্রশ্ন হলো, আলোচনা ব্যর্থ হলে দেশ যে রক্তাত্ব পথে এগুবে সেটি কি শেখ মুজিবের জানতেন না? আলোচনা ব্যর্থ হলে দেশে যে ভয়ানক যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হবে সেটি মুজিব না বুঝলেও ইয়াহিয়া খান বুঝেছিলেন। সে যুদ্ধাবস্থা এড়াতেই তিনি ৬ দফা মেনে নিয়েছিলেন। অপরদিকে শেখ মুজিব নিজেই তার নিজের ৬ দফাকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। অথচ ১৯৭০-এর নির্বাচনে তিনি ম্যান্ডেট নিয়েছিলেন ৬-দফার উপর, পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে নয়। কিন্তু শেখ মুজিবের সমস্যা হলো ৬ দফার ম্যান্ডেটের বাইরেও তাঁর কাঁধে আরেকটি অর্পিত বড় দায়ভার ছিল। সেটি পাকিস্তান ভাঙ্গার। পাকিস্তান ভাঙ্গা নিয়ে জনগণের কাছে তিনি দায়বদ্ধ না হলেও তা নিয়ে প্রচণ্ড দায়বদ্ধ ছিলেন দিল্লীর শাসকচক্রের কাছে। ষাটের দশকে তিনি আগরতলা গিয়েছিলেন সে দায়বদ্ধতা পাকা করতে। ইতিহাসে সেটি আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে পরিচিত। ফলে শেখ মুজিবের ৬ দফা সেদিন আর ৬ দফাতে থাকেনি, এক দফাতে পরিনত হয়।

 

যুদ্ধের পথে দেশ

প্রশ্ন হলো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান না হয় ৬ দফাকে জনগণ-প্রদত্ত ম্যান্ডেট মনে করে মেনে নিতে পারেন, এবং মেনে নেয়ার পক্ষে গণতান্ত্রিক রায়ের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানের ৬-দফা বিরোধীদের বুঝাতেও পারতেন। কিন্তু দেশবিভক্তির একদফাকে তিনি মেনে নিবেন কোন যুক্তিতে? দেশের প্রেসিডেন্টের উপর অর্পিত প্রধান দায়িত্বটা দেশের স্বাধীনতা ও সংহতির সুরক্ষা; স্বাধীনতা বিলিয়ে দেয়া নয়, দেশকে বিভক্ত করাও নয়। একাজ তো গাদ্দার বা মীরজাফরদের। অথচ মুজিব চাচ্ছিলেন, ইয়াহিয়া খানের দ্বারা সে গাদ্দারীই সাধিত হোক। কিন্তু ইয়াহিয়া খান সে পথে এগুননি। বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র তাঁর হাতে ধ্বংস হোক সে অপরাধ তিনি নিজ কাঁধে নিতে চাননি। দেশের এমন সংকটে সামান্য দেশপ্রেম আছে এমন মানুষও ভয়ানক যু্দ্ধের ঝুঁকি নিজ কাঁধে তুলে নেয়। এমন কি সে যুদ্ধে নিজের মৃত্যু বা পরাজয়ও বরণ করে নেয়। নিজ দেশের সাথে গাদ্দারী সে মেনে নেয় না।

মুজিবই বা কি করে বুঝলেন, পাকিস্তান ভাঙ্গার চেষ্টা হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরবে বসে শুধু আঙুল চুষবে? একাত্তরে পাকিস্তানে আর্মির সামনে বিশাল প্রতিবন্ধকতা ছিল। জনগণের বিরাট অংশ তাদের বিরুদ্ধে চলে যায়। বড় বড় দুষমন ছিল আন্তর্জাতিক মহলেও। ভয়ানক বন্যায় ধ্বসিয়ে দিয়েছিল দেশের অর্থনীতি ও যোগযোগ ব্যবস্থা। যুদ্ধের জন্য একাত্তর আদৌও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য উপযোগী ছিল না। কিন্তু এরপরও নিরব থাকার সুযোগ ছিল না। দেশ এরূপ বিভক্তির মুখে পড়লে যে কোন দেশের সেনাবাহিনীই হাতের কাছে যা কিছু পায় তা নিয়েই ময়দানে নামে। পাকিস্তানের এমন একটি অবস্থার জন্য দায়ী মূলত শেখ মুজিব ও তাঁর দল। তিনি জেনে বুঝে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে একটি রক্তাত্ব যুদ্ধ, যুদ্ধজনীত বিপুল ক্ষয়ক্ষতি এবং লজ্জাজনক পরাজয়ের দিকেই ধাবিত করেন। আর সে যুদ্ধে রক্তাত্ব হয় বাংলাদেশের মাটিও। মুজিব মূলত সেটিই চাচ্ছিলেন।

 

শেখ মুজিবের যুদ্ধাপরাধ

২৫শে মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মাঠে নামার আগেই শেখ মুজিব ৭ই মার্চে সহরোওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় “এবারের যুদ্ধ স্বাধীনতার যুদ্ধ” বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যার যা সামর্থ আছে তা নিয়ে জনগণকে ময়দানে নামার আহবান জানিয়েছেন। “আমরা ওদেরকে ভাতে মারবো, পানিতে মারবো” বলে প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছিলেন। তার সে ঘোষণার পর সেনাবাহিনীর ক্যান্টমেন্টগুলোতে খাদ্য-পানীয়’র সরবাহ বন্ধ করা হয়েছিল। বহু বিহারী এবং সেনা বাহিনীর বহু সদস্যকে সে সময় হত্যা করা হয়েছিল। যে কোন অন্যায্য যুদ্ধই মানব জাতির বিরুদ্ধে ভয়ানক বড় অপরাধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধ নিয়ে নুরেমবার্গে যে আদালত বসেছিল সে আদালতের বিচারকদের সেটিই রায় ছিল। তাই শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ পরিহার করে যুদ্ধের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করা বা মানুষকে যুদ্ধে প্ররোচিত করাটাই যুদ্ধাপরাধ। শেখ মুজিব মুলত সেটিই করেছেন। হিটলার নিজ হাতে কোন শহরে বোমা ফেলেছেন বা কোন গ্যাস চেম্বারে ইহুদীদের পুড়িয়ে মেরেছেন সে প্রমাণ নাই। কিন্তু তাঁর প্ররোচনায় বহু জনপদ বিরাণ হয়েছে এবং বহু লক্ষ ইহুদী ও বহু দেশের বহু লক্ষ নিরাপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তেমনি শেখ মুজিবের “আমরা ওদেরকে ভাতে মারবো, পানিতে মারবো” ঘোষণায় খুলনা, যশোর, শান্তাহার, পাকশী, পাবনা, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংসহ বাংলাদেশের বহু জেলার হাজার হাজার নিরপরাধ বিহারী নিহত হয়েছে। বহুলক্ষ বিহারী নিজের বাড়ি ঘর হারিয়ে পথে বসেছে। অথচ বিহারীরা বাঙালীদের উপর ২৫ মার্চের আগে কোথাও হামলা করেছে বা কাউকে হত্যা করেছে সে প্রমাণ নেই। একমাত্র ভাষার ভিন্নতা ছাড়া তাদের আর কি অপরাধ ছিল?

অথচ এরূপ প্রত্যেকটি ঘটনাই ভয়ানক যুদ্ধাপরাধ। ইসলামে একজন মানুষ হত্যাই গুরুতর অপরাধ। আর একটি মুসলিম দেশ বিনাশ তো আরো গুরুতর অপরাধ। দেশকে বিভক্তি ও বিনাশের ন্যায় গুরুতর অপরাধ থেকে বাঁচাতে অতীতে হাজার হাজার মুসলিমকে প্রাণ দিতে হয়েছে। শেখ মুজিব ২৫ মার্চ জেলে গিয়ে উঠেছেন, কিন্তু পাকিস্তান ভাঙ্গার বাঁকী কাজটি সঁপে দিয়েছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে। এবং জেল থেকে ফিরেই তিনি রেডিমেট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গিয়ে বসেছেন। সেদিন লাভের ফসল একমাত্র ভারতই ঘরে তুলেছিল। সে লাভের বলেই ভারত আজ বিশ্বশক্তি হওয়ার পথে। ভারত সেদিন কইয়ের তেল কই ভেঝেছিল। সে যুদ্ধে বিশাল সম্পদহানী, প্রাণহানী ও ইজ্জতহানীর শিকার শুধু পাকিস্তানই হয়নি, বাংলাদেশও হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধের ফলেই বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী “তলাহীন ভিক্ষার থলি”র উপাধি পায়। যুদ্ধে পরাজয়ের চেয়ে এটি কি কম অপমানজনক?

 

অপরাধ উম্মাহর বিরুদ্ধে

উম্মতে ওয়াহেদা হওয়ার কারণে মুসলিম উম্মাহর জয়-পরাজয়ের কোন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সীমা-সরহাদও নেই। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রফেসর আর্নল্ড টয়েনবীর ভাষায়, একটি সভ্যতার ইতিহাস একত্রে উঠানামা করে। সেটি যেমন পাশ্চাত্য সভ্যতার বেলায়, তেমনি মুসলিম সভ্যতার বেলায়ও। আর মহান আল্লাহর ভাষায় মুসলমান তো অভিন্ন উম্মাহর অংশ। ফলে মুসলিম মাত্রই অভিন্ন মুসলিম সভ্যতার শরীক। আর পাক-ভারতের মুসলমানদের ইতিহাস তো এক্ষেত্রে একসূত্রে বাঁধা। তাই ১৯৪৭ সালে পাঞ্জাবী, সিন্ধি, বিহারী, বেলুচ, পাঠান ও গুজরাতি মুসলমানের সাথে বাঙালী মুসলমানের এক কাতারে স্বাধীনতার লড়াই করতে সমস্যা হয়নি। অবাঙালী সিরাজুদ্দৌলা বা বখতিয়ার খিলজিকেও তাই বাঙালী মুসলমানের ইতিহাস থেকে আলাদা করে দেখার উপায় নাই। পাকিস্তানের জয়-পরাজয়ের ইতিহাস থেকেও তাই বাঙালী মুসলমান বিস্মৃত হতে পারেনা। কারণ পাকিস্তানের সৃষ্টির সাথে বাঙালী মুসলিমগণ জড়িত। সে স্মৃতি ভূলে যাওয়া নাস্তিক বা ইসলামে অঙ্গীকারশূণ্য সেক্যুলারিস্টদের কাজ হতে পারে, ঈমানদার মুসলমানের নয়। নবীজী (সাঃ)র হাদীস, মুসলিম উম্মাহ একটি দেহের মত, এক অংশে আঘাত লাগলে সে ব্যাথা অন্য অঙ্গও অনুভব করে। আরবদের বিভক্তি ও পরাজয় শুধু আরবদেরই শক্তিহীন ও ইজ্জতহীন করেনি, শক্তিহীন, ইজ্জতহীন এবং ব্যাথীত করেছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহকেই।

তাই একাত্তরের যুদ্ধে একটি অমুসলিম শক্তির হাতে শুধু পাকিস্তানের পরাজয় ঘটেনি, তাতে দুর্বল হয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ। বিশেষ করে উপমহাদেশের মুসলিম। মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভূমিতে সেদিন ভারতের ন্যায় অমুসলিম শক্তি বিজয়ী হয়েছিল; তা নিয়ে ভারতসহ ইসলামের বিপক্ষ শক্তির আজো তাই উৎসব।মুজিবের হাত দিয়ে পরাজয় ও অপমানের কালিমা সেদিন শুধু পাকিস্তানীদের গায়েই লাগেনি, লেগেছিল মুসলিম উম্মাহর গায়েও। ইসলাম ও বিশ্ব-মুসলিমের বিরুদ্ধে শেখ মুজিব ও তাঁর অনুসারিদের এটি এক বিশাল অপরাধ। হালাকু-চেঙ্গিজ-হিটলার-মীরজাফরগণ আদালতের বিচার থেকে বেঁচে গেছে, কিন্তু ইতিহাসের বিচার থেকে তারা বাঁচেনি। তেমনি আদালতের বিচার থেকে মুজিবও বেঁচে গেছেন। ষাটের দশকে বেঁচে গেছেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকেও।তবে মুসলিম ইতিহাসে তিনি যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন;সেটি অপরাধের গ্লানি বহন করেই।

গ্রন্থপঞ্জি

  • Sisson, Richard and Leo Rose (1990): War and Secession: Pakistan, India and the Creation of Bangladesh, University of California; Berkeley.
  • W. Chowdhury, 1974:  The Last Days of United Pakistan, C. Hurst & Company, London

 

 

 




অধ্যায় নয়: আত্মবিনাশী ইতিহাস প্রকল্প

 বেঁচে আছে যুদ্ধ

একাত্তরের যুদ্ধ বহু দশক পূর্বে শেষ হলেও এখনো সেটি বেঁচে আছে। সেটি যেমন দেশের ইতিহাসের বইয়ে, তেমনি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও চেতনা রাজ্যে। দেশ জুড়ে আজও তাই সংঘাতময় যুদ্ধাবস্থা। ইতিহাস রচনার নামে ইতিহাসের বইয়ে প্রতিনিয়ত বিস্ফোরক ঢালা হচ্ছে। সেটি যেমন মিথ্যাচারের, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার। ফলে বাংলাদেশে অতি দুঃসাধ্য বিষয়টি হলো রাজনীতিতে শান্তি ও সম্প্রীতির অবস্থা ফিরিয়ে আনা। আরো অসম্ভব হলো, একাত্তরে কি ঘটেছিল তার সঠিক বিবরণটি জানা। ৯ মাসের যুদ্ধে সঠিক কত জন মারা গেল; এবং তারা কোথায়, কীভাবে এবং কাদের হাতে প্রাণ হারালো সে হিসাবটি যেমন নাই, তেমনি একাত্তরের মার্চে ইয়াহিয়া-মুজিব-ভূট্টোর বৈঠকে কি আলোচিত হয়েছিল এবং সে বৈঠক কেন ব্যর্থ হলো -সে বিষয়ে সঠিক রেকর্ডও বাংলাদেশের ইতিহাসে নেই। যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কি পরিমান অস্ত্রশস্ত্র অব্যবহৃত ছিল এবং সেগুলো কোথায় গেল -সে বিবরণও কোথাও লিপিবদ্ধ করা হয় নাই। বলা হয়, বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে তারা নিজ শক্তি বলে দেশের কোন কোন জেলাগুলি এবং কোন কোন উপজেলাগুলি স্বাধীন করেছিল এবং সেটি কোন কোন তারিখে -সে বিষয়েও কোন তথ্য নেই। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুক্তিবাহিনী নিজ শক্তিতে পাকিস্তান বাহিনীকে পরাজিত করলে ভারতীয়দের কাছে বাংলাদেশীদের কেন এতো নতজানু দায়বদ্ধতা? সে দায়বদ্ধতা পূরণ করতে বাংলাদেশকে কেন ভারতকে করিডোর দিতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাগণ দেশ স্বাধীন করলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকাটি কি ছিল? কি পরিমান সম্পদ, যানবাহন ও অস্ত্রশস্ত্র বাংলাদেশ থেকে লুণ্ঠন করে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়-এসব মোটা দাগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে নেই। ইতিহাসের নামে যা চর্চা হয় -তার বেশীর ভাগই গুজব বা বানায়োট কাহিনী নির্ভর। সেটিও দেশের ভারতসেবী পক্ষের রাজনৈতিক স্বার্থে। সেটি যেমন যুদ্ধে তিরিশ নিহত হওয়ার কাহিনী। তেমনি ২৫শে মার্চ এক রাতে ঢাকায় ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু কাহিনী। কাদের সিদ্দিকীর দাবি ২৫ শে মার্চের এক রাতেই পাকিস্তান আর্মি সারা দেশে তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষকে হত্যা করে। (কাদের সিদ্দিকী, ১৯৯৭)।  তেমনি দুই বা তিন লাখ নারীর ধর্ষিতা হওয়ার কাহিনী। বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এগুলি হলো ব্যর্থতার দলিল। একাত্তরের ইতিহাসে যা কিছু বলা হয়েছে বা লেখা হয়েছে -তা আজ ও তাই প্রশ্নবিদ্ধ।

বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাস রচনার কাজটি প্রতিযুগে এবং প্রতিদেশেই অতি বিজ্ঞ, নিরপেক্ষ ও আপোষহীন তথ্য অনুসন্ধানকারিদের কাজ। রাজনৈতিক দলের সমর্থকগণ ইতিহাস রচনায় নামলে কল্যাণের চেয়ে মহাকল্যাণটি ঘটে। ইতিহাস তখন কলুষিত হয় এবং বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। একাত্তরের যুদ্ধ বা ঘটনাবলির উপর যারা বই লিখেছেন তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকইপ্রকৃত সত্যকে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছেন। সে সুযোগ স্বৈরাচারী শাসনামলে থাকে না। তারা বরং খেটেছে একাত্তর নিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের পছন্দসই একটি বিবরণকে তুলে ধরতে। কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণার অংশরূপে বা নিজ উদ্যোগে একাত্তর নিয়ে গবেষণা বা লেখালেখি করেছেন বাংলাদেশে সে ঘটনাটি বিরল। ইতিহাস লেখার কাজে অনেককে লাগানো হয়েছিল নিছক সরকারি প্রজেক্টের সদস্য রূপে। তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বটি বস্তুনিষ্ঠ ভাবে সত্যকে তুলে ধরা ছিল না। বরং সরকারি কর্মচারি ও রাজসভার কবির ন্যায় তাদেরও কাজ হয়ে দাঁড়ায়, সরকারি দলের নেতাদের খুশি করতে প্রকৃত ঘটনার উপর ইচ্ছামত মিথ্যার রং চং লাগিয়ে দেয়া।

একাত্তর থেকে ১৯৭৫ সাল অবধি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণ এবং একাত্তর নিয়ে লেখালেখির ক্ষেত্রটি পুরাপুরি দখলে ছিল ভারতসেবী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের। শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার পর সাড়ে চার দশক পরও বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণ এখন সে দখলদারি থেকে মুক্ত হয়নি। শেখ মুজিবের একদলীয় বাকশালী শাসনামলে জনগণের বাকস্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়া হয়। স্বৈরাচারী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয় শুধু কথা বলার উপর নয়, লেখনির উপরও। শুধু রাজনীতিতে নয়, ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্থান করে নেয়ার বাতিকও মুজিবের মাঝে ছিল অতি প্রগাঢ় ও অপ্রতিরোধ্য। তার আমলে সরকারি লেখকদের দৃষ্টিতে শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগের কোন দোষই ধরা পড়েনি। শেখ মুজিব যে গণতন্ত্র কবরে পাঠিয়ে একদলীয় স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করলেন, বাকস্বাধীনতা রহিত করে সকল বিরোধী পত্রিকা বন্ধ করলেন, ভারতীয় বাহিনীর অবাধ লুটপাটের অনুমতি দিলেন, দুর্ভিক্ষ ডেকে এনে বহু লক্ষ মানুষের মৃত্যু ডেকে আনলেন -সে বর্ণনাও তাদের রচিত ইতিহাসে নেই। কারণ সেটি হলে তো শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগের কুখ্যাতি হয়। এবং কুখ্যাতি হয় তার রাজনৈতিক অভিভাবক ভারতের। তাতে প্রকাশ পায় মুজিবের নিজ অযোগ্যতার। যে কোন স্বৈরাচারী শাসকের কাছে অতি অসহ্য হলো তার নিজ অযোগ্যতা ও দুর্বৃত্তির প্রচার। ফলে শেখ মুজিবের স্বৈরাচারী শাসনামলে সেটির প্রকাশ অসম্ভব ছিল। মুজিব-বিরোধী যে কোন মতামতের প্রকাশ গণ্য হয়েছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসের বইয়ে মুজিবামলের ভয়ানক দুর্ভিক্ষের কোন বিবরণ নেই। লুণ্ঠন, সন্ত্রাস, দূর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইতিহাসও নেই। স্বৈরাচারী শাসকদের ন্যায় মুজিব এবং তার অনুসারিগণও চেয়েছে নিরঙ্কুশ চাটুকারিতা; নিন্দাবাক্য বা সমালোচনা নয়। ফ্যাসিবাদী রাজনীতিতে এরূপ সমালোচনা ও নিন্দার সুযোগ থাকে না। তাদের কথা, ইতিহাসের বইয়ে সর্বপ্রকার নিন্দাবাক্য ও কুৎসিত ভাষা তো ব্যবহৃত হবে মুজিব-বিরোধীদের বদনাম বাড়াতে। স্বৈরাচারীদের কাছে কদর তো পক্ষপাতদুষ্ট দরবারি চাটুকারদের; এবং অসহ্য হলো নিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবিদগণ। এরূপ দরবারি চাটুকারদের হাতে ইতিহাসের নামে হাজার হাজার পৃষ্ঠা লেখা হলেও একাত্তরের ইতিহাসের বইয়ে সমৃদ্ধি আসেনি। বরং বেড়েছে মিথ্যাদূষণ। ইতিহাসের বইয়ে মূল উপাদান তো ঘটনার সত্য বিবরণ ও তার বিশ্লেষণে বুদ্ধিবৃত্তির নিরপেক্ষ প্রয়োগ। সেটি না হলে কি ইতিহাসের গ্রন্থ রূপে স্বীকৃতি মেলে?

ইতিহাসের মূল্যায়নটি প্রত্যেকের কাছেই ভিন্ন ভিন্ন হয়। কারণ,এখানে কাজ করে ব্যক্তির নিজস্ব দর্শন, মূল্যবোধ ও চিন্তার মডেল। তাই একই ঘটনার রায় ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভিন্নতর হয়। জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে আনবিক বোমা নিক্ষেপ মার্কিনীদের কাছে শুধু ন্যায্যই মনে হয়নি, উৎসবযোগ্যও গণ্য হয়েছে। ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিন যৌথ আগ্রাসন, হত্যা ও বোমাবর্ষণ ইরাকীদের কাছে যত নিষ্ঠুরই হোক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট, ব্রিটেন ও তাদের মিত্রদের কাছে গণ্য হয়েছে মহৎ কর্ম রূপে। এরূপ গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে তারা সভ্যতা ও গণতন্ত্রের বিজয় দেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের এ নিয়ে কত অহংকার! এমন দুটি ভিন্ন ধরনের রায় এসেছে একাত্তরের লড়াই নিয়েও। একাত্তরে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরিত মুখী চেতনা কাজ করছিল। একটি ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনা। সে চেতনায় পাকিস্তান ভাঙ্গা, পাকিস্তানপন্থী এবং অবাঙালীদের হত্যা করা ও তাদের ঘরবাড়ী ও দোকানপাট দখলে নেয়া ন্যায্য কর্ম গণ্য হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ অবাঙালীকে তাদেরকে বাড়ী থেকে উচ্ছেদ করে বস্তিতে পাঠিয়ে দেয়াও কোন রূপ অন্যায় বা অসভ্যতা মনে হয়নি। যদিও যে কোন দেশের সভ্য ও বিবেকমান মানুষের কাছে এমন হত্যা, এমন উচ্ছেদ ও এমন জবরদখল অতি জঘন্য অপরাধ। আন্তর্জাতিক আইনে এরূপ কর্ম যুদ্ধাপরাধ। অথচ বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের কাছে তা অতিশয় বীরত্বের কাজ মনে হয়েছে। সে বীরত্বের পুরস্কারস্বরূপ এসব লুণ্ঠিত সম্পত্তির অবৈধ দখলকারিদেরকে বাংলাদেশের সরকার নিজ হাতে মালিকানার দলিল পৌঁছে দিয়েছে। সভ্য দেশে পশু নির্যাতন হলে সেটিও খবর হয়। কিন্তু বিহারীর উপর যে নির্যাতন হয়েছে সে বিবরণ ইতিহাসে স্থান পায়নি। অবাঙালীগণ যে ভারতীয় মুসলিম নিধন থেকে বাচঁতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল এবং বাঙালীদের হাতে গৃহহীন হয়েছে এবং হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে একাত্তরের ইতিহাসে এরূপ যুদ্ধাপরাধের সামান্যতম উল্লেখও নেই।

 

প্রপাগান্ডার হাতিয়ার

বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের রচিত একাত্তরের ইতিহাসের বইগুলো যেমন পক্ষপাতদুষ্ট, তেমনি প্রপাগান্ডার হাতিয়ার। এসব বইয়ের লক্ষ্য ছাত্র-ছাত্রীদের জ্ঞানদান নয়। বরং যারা হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন ও সীমাহীন দুর্নীতির নায়ক এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের জনক -তাদের চিত্রিত করা হয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে। উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনায় ব্যক্তির বিচারবোধ যুগে যুগে এভাবেই বিকৃত হয়েছে। জার্মান জাতি অশিক্ষিত ছিল না। বরং হিটলারের আমলে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমগ্র বিশ্বে তারাই সবার চেয়ে অগ্রসর ছিল। কিন্তু হিটলারের ন্যায় মানব ইতিহাসের এই বর্বর ব্যক্তিটিও তাদের কাছে নেতা রূপে গণ্য হয়েছে। নির্বাচনে তার দল বিজয়ী হয়েছে। বহুলাখ ইহুদীকে গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে হত্যা করাটিও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছে।জার্মানীর নগরে বন্দরে এমন নৃশংস বর্বরতার বিরুদ্ধে জনগণ প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমেছে -সে নজির নেই। জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিবেকের মৃত্যু যে কতটা মহামারী আকারে ঘটে -এ হলো তার প্রমাণ। একাত্তরে সে মড়ক লেগেছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের বিবেকেও। বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনায় বাঙালী হওয়া এবং অন্য যারা বাঙালী তারা পৌত্তলিক, নাস্তিক, খুনি বা ধর্ষণকারি হোক বা কম্যুউনিস্ট হোক -তাদের সাথে বন্ধন গড়াটি গুরুত্ব পায়; এবং ঘৃনীত হয় ইসলামী হওয়া। কারণ ইসলাম ব্যক্তিকে তো ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠাকে বাধ্যতামূলক করে। কিন্তু সেটি হলে তো জাতীয়তাবাদ বাঁচে না। বাঁচেনা তাদের ক্ষমতার রাজনীতিও। এজন্যই ইসলামের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদীদের এতো দুশমনি।

পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাসের গ্রন্থে বাঙালী যুবকগণ কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হলো এবং কিভাবে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিল –সে বিষয়টি বিষদ ভাবে আলোচিত হয়েছে। ভারতের নিমক খাওয়া ও ভারত থেকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নেয়া জীবনের বিশাল অর্জন রূপে চিত্রিত হয়েছে। কিন্তু হাজার হাজার বাঙালী সন্তান কেন ভারতে না গিয়ে বরং পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিরোধীতা করল, এবং কেন তারা রাজাকার হয়ে পাকিস্তানের একতা রক্ষায় সচেষ্ট হলো, এমনকি প্রাণও দিল –তার তাত্ত্বিক বা দর্শনগত বিশ্লেষণ এ ইতিহাসে নেই। তাদের নিয়েত ও চেতনার গভীরে নজর দেয়া হয়নি। কেনই বা দেশের প্রতিটি ইসলাম দল এবং প্রায় প্রতিটি ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও আলেম পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধীতা করল -তারও কোন বস্তুনিষ্ঠ ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখা এ ইতিহাসে নেই। বরং নিজেদের মনগড়া একটি কুৎসিত গালিগালাজ ও মটিভ ইসলামপন্থীদের গায়ে এঁটে দিয়েছে। তাদেরকে চিত্রিত করা হয়েছে পাকিস্তানের দালাল ও অপরাধী রূপে। লক্ষ্য, স্রেফ চরিত্র হনন। এ ইতিহাসের লেখকগণ তাদেরকে চিত্রিত করেছে খুনি, পাঞ্জাবী সৈনিকদের নারী সরবরাহকারি রূপে। এ অভিযোগ থেকে এমনকি ইসলামী দলসমূহের প্রবীণ নেতা-কর্মী ও ধর্মপ্রাণ বৃদ্ধ আলেমদেরও রেহাই দেয়া হয়নি। অথচ তাদের দাবির স্বপক্ষে একটি প্রমাণও হাজির করতে পারিনি।

 

লুকানো হয়েছে অপরাধ

তিহাসের বইয়ে শুধু একটি জনগোষ্ঠীর কর্ম বা অর্জনগুলি তুলে ধরলে চলে না; তাদের ভয়ানক রোগগুলিও তুলে ধরতে হয়। বরং চরিত্রের রোগগুলি তুলে ধরার গুরুত্ব আরো বেশী। কারণ স্বাস্থের কারণে কারো মৃত্যু ঘটে না, মৃত্যু ঘটে তো প্রানবিনাশী রোগের কারণে। চিকিৎসা শাস্ত্রে তাই বিশাল বিশাল বই লেখা হয়েছে মানব দেহের বিচিত্র রোগ সমূহের বিবরণ ও চিকিৎসার বর্ণনা দিতে; স্বাস্থের বর্ণনা দিতে নয়। সেটি সত্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক রোগগুলির ব্যাপারেও। ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের বইয়ে সে রোগগুলি বিষদ ভাবে আলোচিত না হলে ভবিষ্যতে তা থেকে বাঁচার পথই বা কীরূপে আবিস্কৃত হবে? বাংলাদেশে আজ যে একদলীয় শাসন, বিদেশী দখলদারি ও স্বৈরাচার –তা তো হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। বরং সেটি ঘটেছে দিন দিন বেড়ে উঠা সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক ব্যাধিগুলোর কারণে –যার অধিকাংশেরই আলামত প্রকাশ পেয়েছিল উনিশ শ’ একাত্তরে। কিন্তু একাত্তরে প্রকাশ পাওয়া সে ভয়ানক রোগগুলি বাংলাদেশের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়নি, ফলে চিকিৎসাও হয়নি। বরং কীর্তন গাওয়া হয়েছে স্বৈরাচারী মুজিব ও তার ভ্রষ্ট রাজনীতির। তাতে দেশের উপর পুনরায় বাকশালী স্বৈরাচার চেপে বসার পথ উম্মুক্ত হয় -তার প্রমাণ তো ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সালের বাংলাদেশ। দেহে ক্যান্সার লুকিয়ে রেখে লাভ হয় না,তাতে বরং ত্বরিৎ মৃত্যু ঘটে। তাই ইতিহাসের বইয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবতাবিনাশী রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও দর্শনগত রোগের বিবরণগুলো নিখুঁত ভাবে তুলে ধরা। এবং স্কুল-কলেজে সেগুলী পাঠ্য করা। নইলে মিথ্যামুক্তি ঘটে না;একই অপরাধ তখন বার বার ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের বইয়ে সেটি হয়নি; বরং বাঙালীর হাতে একাত্তরে ঘটে যাওয়া বহু ভয়ানক অপরাধ লুকানো হয়েছে। তালাশ করা হয়েছে স্রেফ পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও বিহারীদের দোষগুলো। অন্যের দেহের ক্যান্সার ও ক্ষতগুলো নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কি? বিশেষ করে নিজ দেহের ক্যান্সারটি যখন ভয়ানক।এ বিষয়টি একাত্তরের ইতিহাসে গুরুত্ব না পাওয়ায় এটি এখন আত্মবিনাশের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের মাটিতে একাত্তরে এমন বহু অমানবিক নৃশংস ঘটনা ঘটেছে -যা পূর্বে কখনোই ঘটেনি। সেটি যেমন অবাঙালীদের পক্ষ থেকে তেমনি বাঙালীদের হাতে। এমন ঘটনাও ঘটেছে যা ইসলামী চেতনা ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে। কোরআন-হাদীসের শিক্ষা থেকে সেগুলো ছিল বহু দূরে। একজন মুসলমান কি তা ভাবতে পারে? আজ থেকে ১৩ শত বছর আগে আরব, কুর্দ, তুর্ক ও ইরানী অধ্যুষিত মুসলিম রাষ্ট্রের মানচিত্র ভাঙ্গার কাজে কেউ যদি একাত্তরের বাঙালীদের ন্যায় মুর্তিপূজারীদের সাথে কোয়ালিশন গড়তো -তবে তাদেরকে কি বলা হত? মুসলমানদের রাষ্ট্র ভাঙ্গার কাজ যুগে যুগে যে হয়নি -তা নয়। তবে কোন কালেই সে কাজটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের পক্ষ থেকে হয়নি। মুসলমানগণ বরং নানা ভাষাভাষি ও নানা এলাকার মানুষের মাঝে মিলন গড়েছে –যেমনি ১৯৪৭ সালে ভারতের বুকে হয়েছিল। এটিই ইসলামের ঐতিহ্য। বিভক্তির পথ সব সময়ই হারাম পথ রূপে বিবেচিত হয়েছে। তাই অতীতে মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি গড়েছে ইসলামের শত্রুগণ; এবং তাদের সহায়তা দিয়েছে ভণ্ড মুসলিমগণ। সেসব চিহ্নিত শত্রুদের সাথে মৈত্রী গড়েছে জাতীয়তাবাদী ও ট্রাইবাল রাজনীতির অনুসারিগণ। মুসলিম ভূগোল সর্বশেষে টুকরো টুকরো হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনেবিশিকদের হাতে। আরব বিশ্বকে তারাই বিশেরও বেশী টুকরায় ভেঙ্গেছে। মুসলিম দেশ কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় কুফল। ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে তারা অনেক দূরে নিয়ে যায়। অতিশয় হারাম কাজকেও তারা সহজ করে দেয়। মুসলিম ভূমিতে ব্যাভিচারও তখন বাণিজ্য রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সূদ ও কুফরী আইন। কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে ভণ্ড মুসলিমগণ অন্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে ও তাদের হত্যা করেছে –এমন গর্হিত কর্মটি সচারচার কোন মুসলিম দেশে ঘটে না। সেটি একমাত্র তখনই ঘটে যখন কোন মুসলিম ভূমি কাফেরদের হাতে অধিকৃত হয়। তাই কাফেরদের অধিকৃতির বিরুদ্ধে যে কোন যুদ্ধই পবিত্র জিহাদ। তবে উনিশ শ’ একাত্তরে বাংলাদেশের বুকে  যেটি ঘটেছে -সেটি কোন মুসলিম দেশে ঘটে না। সেটি হলো, পৌত্তলিক কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার আগেই ইসলামচ্যুৎ বাঙালী মুসলিমগণ তাদের অস্ত্র নিয়ে মুসলিম হত্যা ও মুসলিম দেশের বিনাশে নেমেছে। সেটি ঘটেছে তাদের হাতে যাদের চেতনার ভূমি বহু পূর্বেই অধিকৃত হয়েছিল সেক্যুলারিজম, ন্যাশনালিজম, সোসালিজম ও কম্যুউনিজমের ন্যায় ইসলাম বিরোধী ধ্যান-ধারণায়।

 

মুসলিম ভাতৃত্বের বিলুপ্তি

রাষ্ট্র দূরে থাক, ইসলাম কোন মুসলমানের ঘর ভাঙতেও অনুমতি দেয় না। মুসলমান হওয়ার অর্থ শুধু মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান ও তাঁর ইবাদত নয়; ঈমান ও ইবাদত পালনের সাথে অন্য ঈমানদারকে ভাই রূপেও গণ্য করতে হয়। অন্য মুসলমান –তা যে ভাষা, যে বর্ণ বা যে অঞ্চলেরই হোক, সে যে তার প্রাণপ্রিয় ভাই।সেটি তার পিতা, নেতা বা পীরের কথা নয়; সে ঘোষণাটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “মুসলিম মাত্রই পরস্পরে ভাই। অতঃপর নিজ ভাইদের মাঝে পরস্পরে কল্যাণ কর। এবং আল্লাহর প্রতি নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে যত্মবান হও -যাতে তোমরা তাঁর রহমত পেতে পার।”–(সুরা হুজরাত, আয়াত ১০)। প্রতিটি মুসলিমের উপর ঈমানী দায়ভার তাই মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া ভাতৃত্বের পরিচয়ের প্রতি সম্মান দেখানো। সেটি না হলে প্রচণ্ড অসম্মান ও অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র হুকুমের বিরুদ্ধে। ঈমানদারগণ কি তাই নিজ ভাইদের মাঝে বিভেদের দেয়াল গড়তে পারে? ভিন্নভাষী প্রিয় ভাইকে দেখা মাত্র একজন সুস্থ ব্যক্তির প্রতিক্রিয়াটি কি এরূপ হবে,সে মুখ ফিরিয়ে নিবে? ভিন্ দেশী ও ভিন্ ভাষী ভাইকে মারতে উদ্যত হবে? তার সম্পদ কেড়ে নিবে এবং তাকে তার বসত ঘর থেকে নামিয়ে সে ঘরটি নিজের দখল নিবে? অথচ একাত্তরে অবাঙালীদের সাথে বাঙালী মুসলিমগণ তো সেটিই করেছে! বাঙালী মুসলিমের এ এক বিশাল ব্যর্থতা। বাংলার মাটিতে মুসলিম ভাতৃত্বের এ এক বিষাদময় বিলুপ্তি। এমন ব্যর্থতা নিয়ে বাঙালী মুসলিমগণ মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে মুসলিম রূপে মুখ দেখাবে কি করে? অথচ একাত্তরের সে ব্যর্থতা নিয়ে একাত্তরের ইতিহাসে সামান্যতম উল্লেখ নেই।কোন রূপ ক্ষোভও নাই। এবং সে চারিত্রিক রোগের কোন চিকিৎসাও হয়নি। বরং গর্ব বেড়েছে জাতীয়তাবাদের রোগ নিয়ে!

ঈমানের লক্ষণঃ ভিন্ দেশী, ভিন্ বর্ণ ও ভিন্ ভাষী ভাইকে দেখে ঈমানদারের মুখই শুধু হাসবে না, তার আত্মাও আনন্দে আন্দোলিত হবে। সে তার কল্যাণে সাধ্যমত সাহায্য করবে। মহান আল্লাহতায়ালার উচ্ছা পালনে মু’মিন ব্যক্তি তো প্রতি দিন ও প্রতি মুহুর্তে এরূপ ব্যাকুল থাকবে। অন্তরে যে ঈমান বেঁচে আছে সেটির প্রমাণ তো আপন ভাইয়ের কল্যাণে এরূপ ব্যস্ততা। মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু নামাযী বা রোযাদার হওয়া নয়; নিজ ভাষা,নিজ গোত্র ও নিজ ভূগোলের সীমানা ডিঙ্গিয়ে অন্য ভাষা ও অন্য ভূগোলের মুসলমানের সাথে একাত্ব হওয়াও। এটিই ইসলামের বিশ্বভাতৃত্ব তথা প্যান-ইসলামীজম। মহান আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাসী হওয়ার অর্থ, ইসলামের এ বিশ্বভাতৃত্বের চেতনায় সমৃদ্ধ হওয়াও। ব্যক্তির কর্ম, চেতনা ও রাজনীতিতে সেরূপ ভাতৃত্বের প্রকাশ না ঘটলে নিশ্চিত বুঝতে হবে তার ঈমানের ভাণ্ডারে প্রচণ্ড ফাঁকিবাজি ও শূন্যতা রয়ে গেছে। প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ এমন ভাতৃত্বের চেতনা নিয়েই ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে গড়ে উঠা বিভেদের দেয়ালগুলো ভেঙ্গেছিলেন। মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয় শত শত বছর ব্যাপী পরস্পর যুদ্ধ করেছে। মুসলমান হওয়ার সাথে সাথে সে আত্মঘাতি যুদ্ধ থেমে যায়, গড়ে ওঠে অটুট ভ্রাতৃত্ব। তাঁরা প্রাণপ্রিয় ভাই রূপে গ্রহণ করেছিল মক্কার মোহাজিরদেরকে। নিজের একমাত্র ঘরখানিও ঘরহীন মোহাজির ভাইদের সাথে ভাগ করে নিয়েছিলেন। এটিই তোঈমানদারী। ১৯৪৭ সালে এমন এক ইসলামী চেতনা ও ঈমানদারী কাজ করেছিল বাঙালী মুসলিমদের মাঝেও। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিমগণ সেদিন ঢাকার মীরপুর, মোহাম্মদপুরের ন্যায় প্রায় প্রতি জেলায় বিশাল বিশাল এলাকা ছেড়ে দিয়েছিল হিন্দুস্থান থেকে আগত তাদের নির্যাতিত মোহাজির ভাইদের বাসস্থান নির্মাণে। কিন্তু একাত্তরে সে ইসলামী চেতনা মারা পড়ে সেক্যুলারিজম ও জাতিয়তাবাদের সংক্রামক ভাইরাসে। জীবাণূ দেহে ঢুকলে সুঠাম দেহও মৃত্যুর কোলে ঢুলে পড়ে। তেমনি জাতীয়তাবাদী চেতনার বীজ মগজে ঢুকায় মারা যায় ইসলামের বিশ্বভাতৃত্বের চেতনা। কিন্তু একাত্তরের ইতিহাসে ঈমানধ্বংসী সে মহামারির সামান্যতম বিবরণও নেই। বাংলাদেশের ইতিহাস বই পড়লে মনেই হয় না বাংলাদেশের বুকে এতো বড় বীভৎস কাণ্ডটি ঘটেছে। অবাঙালী মুসলিমদের মাঝেও বহু দোষত্রুটি ছিল।দুর্বৃত্ত মানুষের সংখ্যা কি বাঙালীদের মাঝে কম? সে জন্য কি একটি বিশেষ ভাষার মানুষদের বিরুদ্ধে নির্মূলে বা অত্যাচারে নামতে হবে?

মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহর বর্ণনা দিয়েছেন সীসাঢালা দেয়াল রূপে -যারা দেয়ালের সে অটুট ঐক্য নিয়ে জিহাদে অংশ নেয়। কোরআনের ভাষায় সে দেয়ালটি হলো “বুনিয়ানুম মারসুস”। নবীজীর (সাঃ) যুগে এমন কোন সাহাবী ছিলেন না যারা সীসাঢালা দেয়ালের ন্যায় ঐক্য নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার পথে জিহাদে নিজ শ্রম, নিজ অর্থ ও নিজ মেধার বিনিয়োগ করেননি। অধিকাংশ সাহাবী এ কাজে শহীদ হয়েছেন। যে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা মুসলিম উম্মাহর দেয়ালে ফাটল ধরায় -ইসলামে সেটি হারাম। যার মাঝে পবিত্র কোরআনের জ্ঞান আছে তার দ্বারা এমন গর্হিত কাজ কি সম্ভব? অনৈক্য ও ভাতৃঘাতি সংঘাত তো ইসলামী চেতনাশূন্য ও কোরআনের জ্ঞানে অজ্ঞদের সংস্কৃতি। ঈমানশূন্য ও ইসলাম থেকে দূরে সরা ব্যক্তিদের দ্বারাই এমন পাপাচার সম্ভব। ইসলাম থেকে দূরে সরার কারণেই ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজটি জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিষ্টদের কাছে উৎসবে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ইসলামের পক্ষের শক্তি তা থেকে সযত্নে দূরে থেকেছে। বরং আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল দেশটির হেফাজতে। একাত্তরে ইসলামপন্থীদের ভূমিকার এটিই হলো দার্শনিক ভিত্তি –যা তাদেরকে অন্যান্য বাঙালীদের থেকে পৃথক করে। ইতিহাসের বইয়ে ইসলামপন্থীদের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রচণ্ড চরিত্রহনন হলেও তাদের জীবনে ইসলামী দর্শনের এ গভীর প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়নি। হয়তো এ ভয়ে, তাতে তাদের নিজ জীবনের ভ্রষ্টতা ও ইসলামের সাথে প্রতারণা সামনে এসে যাবে।

 

সবাই স্রোতে ভাসেনি

পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির আন্দোলনটি ছিল সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানী বাঙালীর -এটিও আরেক মিথ্যাচার। বরং সত্য হলো, সবাই সেদিন বাঙালী জাতীয়তাবাদের স্রোতে ভেসে যায়নি। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের দৃড় ইসলামী বিশ্বাস নিয়ে বরং স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। তাদের কারণেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোন জেলা দূরে থাক,কোন থানাও মুক্তি বাহিনী দখলে নিতে পারেনি। দেশ দখলে যায় একমাত্র ভারতের বিশাল স্থল, বিমান ও নৌ বাহিনীর দ্বারা পুরা দেশ অধিকৃত হওয়ার পর। অথচ একাত্তরের ইতিহাসে সে বিবরণও নাই। বরং ইসলামী বিশ্বাস নিয়ে দাঁড়ানোটি চিত্রিত হয়েছে মানবতা বিরোধী অপরাধ রূপে। অথচ মুসলমান হওয়ার মূল দায়বদ্ধতাটি হলো, পবিত্র কোরআনে বর্ণীত মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম পালন –এমন কি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রায়ের বিরোধীও হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা মহান নবী করীম (সাঃ)কে সতর্ক করে দিয়েছেন এই বলে,“ওয়া ইন তু’তি আকছারা মান ফিল আরদে ইউদিল্লুকা আন সাবিলিল্লাহ” অর্থঃ “এবং আপনি যদি এ জমিনে বসবাসকারি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের অনুসরণ করেন তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে যাবে।” তাই জনস্রোতে ভাসাটি আদৌ ঈমানদারী নয়; এটি পথভ্রষ্টতার পথ। ঈমানদারকে তো প্রতি মুহুর্তে চলতে সিরাতুল মুস্তাকীমের পথে; সেটি একাকী হলেও।একাত্তরে তাই দেশের ইসলামপন্থীদের মাঝে ভারতে যাওয়া ও মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়ার ঢল সৃষ্টি হয়নি। বরং তাদের মাঝে রাজাকার সৃষ্টি হয়েছে।

যারা সেক্যুলার ও ইসলামী চেতনাশূন্য তাদের কথা ‘জনগণ কখনও ভুল করে না’। এটি স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি দায়শূন্য ও জবাবদেহীতার ভয়শূণ্য গণমুখীতার কথা; আদৌ ঈমানদারীর কথা নয়। একাত্তরে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠের পথটি অনুসরণ করেনি তাদেরকে এরূপ ঈমানশূণ্যগণই বিশ্বাসঘাতক বলে চিত্রিত করে। তাদের এরূপ দাবী যে কতটা মিথ্যা ও কোরআন-বিরোধী সেটি কি পবিত্র কোরআনের উপরুক্ত আয়াতটি শোনার পরও বুঝতে বাঁকী থাকে? সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যে সিদ্ধান্ত নিতে কত বড় বড় বিশাল ভুল করে বাংলাদেশের জনগণ সেটি যেমন ১৯৭০ ও ১৯৭১’য়ে প্রমাণ করেছে, তারপরও বহুবার প্রমাণ করেছে। গণতন্ত্র হত্যাকারি বাকশালী মুজিব কে কারা নির্বাচিত হয়েছিল? বিগত সংসদ নির্বাচনগুলিতে এরশাদের ন্যায় সাজাপ্রাপ্ত দুর্বৃত্তকে কারা বিপুল ভোটেবিজয়ী করেছে? সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই কি হিটলার, জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের ন্যায় নৃশংস হত্যাকারিদের নির্বাচিত করেনি? হযরত মুসা (আঃ)’য়ের নির্মূলে এবং ফিরাউনের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই কি অস্ত্র ধরেনি?

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন ইসলামের নবী হযরত মহাম্মদ (সাঃ)ও। মক্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রচণ্ড বিরোধীতা ও বয়কটের কারণেই নবীজী (সাঃ) কে মাতৃভূমি ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করতে হয়েছিল। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো, কচুরিপানা বা খড়কুটোর ন্যায় গণ-স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে বাঁচা। ইসলাম ও মুসলিমের জন্য যা কিছূ কল্যাণকর, শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও সেটির উপর অটল থাকাই হলো ঈমানদারী। প্রশ্ন হলো, দুনিয়ার সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিনাশে কি কোন কল্যাণ থাকতে পারে? এতে ফায়দা তো ইসলামের শত্রুপক্ষের। তাই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার মধ্যে অথ অকল্যাণই দেখেছে ইসলামী চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তিরা। ফলে প্রচণ্ড বিরোধীতা করেছে পাকিস্তান ভাঙ্গার। তাদেরকে সেদিন জীবনের প্রচণ্ড ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ার অর্থ ছিল, ভারতীয় এজেন্টদের হামলার মুখে পড়া। ঘরবাড়ি ও দোকান-পাট লুট হবে এবং নিজেদেরও নিহত হতে হবে– সে সম্ভাবনাও ছিল। সেটি প্রমাণিত হয়েছে যুদ্ধচলাকালীন ৯ মাসে এবং ১৯৭১ য়ের ১৬ ডিসেম্বরের পর। তারপরও তারা ঝুঁকি নিয়েছে। কথা হলো, এমন চেতনাসমৃদ্ধ আত্মত্যাগী মানুষদেরকে কি দালাল ও নারী সরবরাহকারি বলা যায়? অথচ দেশের সেক্যুলারিস্টগণ সেটিই বলে আসছে। অথচ একাত্তরের পূর্বে তাদের বিরুদ্ধে এরূপ কদর্য চরিত্রের অভিযোগ ছিল না। অবশ্য এসব কথা যে তারা বিবেকের তাড়নায় বলছে তা নয়, বলছে নিজেদের রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণে। রাজনীতিতে বেঁচে থাকার স্বার্থে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে এমন মিথ্যাচারকে তারা অপরিহার্য মনে করে।

পশ্চিমা ওরিয়েন্টালিস্ট তথা প্রাচ্যবিদগণ এককালে প্রচুর বই লিখেছে ইরানীদের এ কথা বুঝাতে যে,আরবরা তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন ও প্রকাণ্ড হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এদেরই আরেক দল বই লিখেছে আরবদের এ কথা বুঝাতে যে ইরানীরা কতটা বর্ণবাদী, আরববিদ্বেষী ও ষড়যন্ত্রকারি। এভাবে দুই অঞ্চলের দু’টি ভিন্ন ভাষাভাষি মানুষের মাঝে তারা বিভেদকে অতিশয় গভীর ও প্রতিহিংসাপূর্ণ করেছে। এরা আপোষে ভাগাভাগী হয়ে বিবাদমান দুই মুসলিম দলেই খেলেছে। যাতে মুসলিম উম্মাহর মাঝে ভাতৃঘাতী লড়াই স্থায়ী হয় এবং রক্তাত্বও হয়। মুসলিম ভূমিতে ভাতৃঘাতী সংঘাতকে দীর্ঘ ও রক্তাত্ব করতে তারা নিজ অনুগতদের হাতে যেমন অস্ত্র তুলে দিয়েছে, তেমনি প্রশিক্ষণও দিয়েছে। মুসলিমদের ত্রুটি নিয়ে তারা বিস্তর লিখলেও নিজেদের অতিশয় ঘৃণ্য অপরাধগুলি নিয়ে আলোচনা করেনি। তাই তাদের ইতিহাসে নাই সাম্রাজ্যবাদী শোষণ, শাসন ও দুর্বৃত্তির বিবরণ। আজও লিখিত হচ্ছে না আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিনের ন্যায় বিশ্বের কোণে কোণে তাদের কৃত বীভৎস বর্বরতার কথা। এ নীতিতে আজও তারা অটল। ভারতীয় লেখকগণও একই পথ ধরেছে। তারা বাংলাদেশে অবাঙালী মুসলিমদের শোষক, নির্যাতনকারি ও খুনি রূপে পেশ করছে। অথচ এ কথা লিখছে না, পূর্ব পাকিস্তানে অবাঙালী মুসলিমগণ যত কলকারখানা গড়েছে, বৃটিশগণ ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনে তার শত ভাগের এক ভাগও গড়েনি। এমনকি পাকিস্তানের ২৩ বছরে খোদ বাঙালী পুঁজিপতিরা তার সিকি ভাগও গড়েনি। অপরদিকে তারা ভারত ও পাকিস্তানের অবাঙালীদেরকে বুঝাচ্ছে বাঙালীরা কতটা কলহপ্রবন, সহিংস ও অবাঙালী-বিদ্বেষী সেটি। ফলে বাংলাদেশের মানুষদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে পারছে না পাকিস্তান ও ভারতের অবাঙালী মুসলিমগণও। একাত্তরের ইতিহাস এভাবে মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিষ ছড়ানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এতে বাঙালী মুসলিমের বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে অন্যভাষী মুসলিম ভাইদের থেকে। একাত্তরের ইতিহাসের নাশকতাটি তাই বিশাল। এতে শুধু দেশবাসীর মাঝে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও ঐক্য গড়ার কাজটিই ব্যহত হচ্ছে না, বরং ব্যহত হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর সাথে ভাতৃসুলভ সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়টিও। ইসলাম ও মুসলিমের শত্রুপক্ষ তো সেটিই চায়। আর তাদেরই লাঠিয়াল রূপে কাজ করছে বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ।

গ্রন্থপঞ্জি:

কাদের সিদ্দিকী, ১৯৯৭: স্বাধীনতা ‘৭১, অনন্যা, ৩৮/২  বাংলাবাজার, ঢাকা।

 

 




অধ্যায় দশ: মুক্তিযুদ্ধে ইসলামশূণ্যতা

 সংকট ইসলামশূণ্যতার

বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে সবচেয়ে বড় সংকটটি ছিল আদর্শের। সেটি ইসলামশূণ্যতার। যে কোন মুসলিমের জন্য এটি এক বিশাল সমস্যা। ঈমানদারদের জন্য এ যুদ্ধে অংশ নেয়ার কোন জায়েজ পথ খোলা রাখা হয়নি। ঈমানদারদের জন্য প্রতিটি খাদ্যকে যেমন সম্পূর্ণ হালাল হতে হয়,তেমনি প্রতিটি যুদ্ধকেও বিশুদ্ধ জিহাদ হতে হয়। নইলে সে যুদ্ধে প্রাণ দূরে থাক একটি পয়সা, একটি ঘন্টা বা একটি মুহুর্তের বিনিয়োগও জায়েজ হয় না। মুসলমানের জান-মাল ও প্রতিটি সামর্থ্যই মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া নিয়ামত। ব্যক্তির উপর মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত এটি আমানতও। ব্যক্তি এখানে ট্রাস্টি বা রক্ষক মাত্র, মালিক নয়। প্রতিটি আমানত কীরূপ ব্যয় হলো সে হিসাবটি প্রকৃত প্রভূ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আখেরাতে দিতে হবে। তাই মুসলিম মাত্রই যুদ্ধে প্রাণ দিবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার পথে; নইলে সে মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের পথে -যা পরকালে জাহান্নাম প্রাপ্তিকে সুনিশ্চিত করবে।তাই ঈমানদারের প্রতিটি প্রচেষ্টা ও যুদ্ধকে হতে হয় ইসলামকে প্রতিষ্ঠা দেয়া বা মুসলিম ভূমিকে প্রতিরক্ষা দেয়ার স্বার্থে। ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা কোন সেক্যুলার লক্ষ্যে নয়। কারণ, মুসলিমের কাছে একমাত্র হালাল বা কোরআন-নির্ধারিত মতবাদটি হলো ইসলাম;জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, সেক্যুলারিজম বা কম্যুনিজম নয়।তাই মু’মিনের জানমাল ও সামর্থ্যের উপর ইসলাম ভিন্ন অন্য কোন মতবাদ ও ধর্মের অধিকার থাকে না।

ঈমানদার হওয়ার অর্থ, নিজের জানমাল ও শক্তি-সামর্থ্য কোথায় এবং কার স্বার্থে বিনিয়োগ হলো -সর্বমুহুর্তে সে জবাবদেহীতার চেতনা নিয়ে বাঁচা। ইসলামের বিজয়ে সে কতটা ভূমিকা রাখলো –মু’মিনের জীবনে মূল যিকর বস্তুত সেটিই।যার মধ্যে সে যিকর নাই,বুঝতে হবে তার মধ্যে ঈমানও নাই। মানব রূপে জন্ম নেয়ার এটিই বিশাল দায়ভার, এ দায়ভার পশুর থাকেনা। যে মানব সন্তানের মাঝে সে দায়ভার নাই,মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে তাকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি আমানতের উপর একমাত্র অধিকার তাঁর; ফলে প্রতিটি মুসলিমকে একমাত্র তাঁর নির্দেশিত পথে সে আমানতের ব্যয় নিয়ে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। নইলে সেটি পরিণত হয় ভয়ানক খেয়ানতে। এমন প্রতিটি খেয়ানতই কবিরা গুনাহ -পরকালে যা কঠিন শাস্তিকে অনিবার্য করে। তাই মু’মিন ব্যক্তির ঈমানী দায়ভার হলো,মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত প্রতিটি আমানতকে সর্বপ্রকার খেয়ানত থেকে বাঁচানো। এটিই প্রকৃত ঈমানদারী। তাই জীবনের প্রতি পদে, প্রতিটি কর্মে, প্রতিটি যুদ্ধে এবং রাজনীতির প্রতিটি অঙ্গনে মুসলিম ও ইসলামের কল্যাণের বিষয়টিকে সবার শীর্ষে রাখতে হয়। এমন এক মহৎ লক্ষ্যের কারণেই প্রতিটি মুসলিম রাজনীতিবিদই ইসলামের মুজাহিদ;এবং তার প্রতিটি যুদ্ধই পবিত্র জিহাদ। সে জিহাদে নিহত হলে প্রত্যেকেই শহিদ। মু’মিনের চেতনার এ ভূমি কি তাই জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম বা সমাজবাদের ন্যায় মতবাদ দ্বারা অধিকৃত হতে পারে? হয়নি একাত্তরেও। মুক্তিযুদ্ধের পিছনে যে দর্শনটি কাজ করেছিল,মু’মিনের চেতনা-রাজ্যে প্রবেশের সে সামর্থ্য তার ছিল না।

একাত্তরের মুক্তি যুদ্ধের দর্শনগত ভিত্তি ছিল ইসলামের বদলে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ। এর রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রকে খণ্ডিত করে ইসলামে অঙ্গীকারশূণ্য সেক্যুলার বাংলাদেশ নির্মাণ। যুদ্ধটির প্রশিক্ষণ, অর্থ ও অস্ত্রের জোগানদার ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্তিপূজারী অধ্যুষিত ভারত। সে যুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছিল তাদেরকে ভারত যে শুধু আশ্রয় দিয়েছিল তাই নয়, তাদের রাজনৈতিক অভিভাবক রূপেও আবির্ভূত হয়েছিল। কাফেরদের রাজনীতির মূল এজেন্ডা তো ইসলাম ও মুসলিমের ক্ষতিসাধন। যেখানেই তারা মুসলিমের সামান্যতম স্বার্থ দেখে,তারা তার বিরোধীতা করে। ভারতীয় হিন্দুগণ তাই শুরু থেকেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিল। এবং কখনোই চায়নি দেশটি বেঁচে থাকুক। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারিরা মুসলিম-বিরোধী ভারতের কোলে গিয়ে উঠে। প্রশ্ন হলো, এমন একটি কাফের নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধে ও কাফেরদের নেতৃত্বে জান ও মালের বিনিয়োগ কি জায়েজ? মহান আল্লাহতায়ালা কি তাতে খুশি হন? একাত্তরে এ প্রশ্নটি ছিল প্রতিটি ঈমানদারের। এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার কঠোর হুশিয়ারিটি হলো, “মু’মিনগণ যেন মু’মিনগণ ব্যতীত কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে ব্যক্তি এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না…।”–(সুরা আল ইমরান,আয়াত ২৮)। পবিত্র কোরআনে আরো বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না…।”–(সুরা মুমতাহানা আয়াত ১)। একাত্তরে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করলেও তাদের কাছে মহান আল্লাহতায়ালার এ কঠোর নির্দেশনামা কোনরূপ গুরুত্বই পায়নি। বরং পবিত্র কোরআনের নির্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই ছিল তাদের রাজনীতি। ফলে ভারতীয় কর্তা ব্যক্তিদের নিছক বন্ধু রূপে নয়, প্রভু রূপে গ্রহণ করেছিল। এবং সেটি ছিল নিছক গদির লোভে। ইসলাম ও মুসলিমের স্বার্থ এখানে গুরুত্ব পায়নি। ইসলামী চেতনাধারির কাছে বিষয়টি এতোটাই দৃষ্টুকটু ও হারাম গণ্য হয়েছিল যে তাদের একজনও ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়নি, এবং ভারতের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অংশও নেয়নি। একাত্তরে সেটি ছিল চোখে পড়ার মত বিষয়।

 

জিহাদ বনাম মুক্তিযুদ্ধ

আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেরাও কখনো একাত্তরের যুদ্ধকে জিহাদ বলে দাবী করেনি। যারা নিজেদেরকে একাত্তরের চেতনার ঝান্ডাবাহি মনে করে, তারা আজও সেটি বলে না। বরং তাদের ভাষায় এ যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইসলামী চেতনা ও সে চেতনা-নির্ভর পাকিস্তানের ধ্বংস করে একটি সেক্যুলার বাংলাদেশ নির্মাণ। এটিকেই তারা একাত্তরের চেতনা বলে দাবী করে। এ বিষয়গুলি একাত্তরে ইসলামী দলগুলির নেতাকর্মী ও আলেমদের কাছে অজানা ছিল না। এমন যুদ্ধে একজন ঈমানদার ব্যক্তি তাই অংশ নেয় কি করে? কেনই বা বিনিয়োগ করবে তার মহামূল্য জীবন? মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া মহান আমানতটি একজন ঈমানদার তো একমাত্র সে যুদ্ধেই বিনিয়োগ করবে যে যুদ্ধটিকে শতকরা শত ভাগ বিশুদ্ধ জিহাদ এবং সংঘটিত হয় একটি মুসিলম দেশের প্রতিরক্ষায় এবং মুসলিম উম্মাহ শক্তিবৃদ্ধিতে। এ বিষয়গুলিকে সামনে রেখেই তৎকালীন নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি ও কিশোরগঞ্জের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আতাহার আলী এবং আরো বহু আলেম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়াকে হারাম বলেছেন। যুদ্ধকালীন ৯ মাসের পত্রিকাগুলো খুললে সে সময়ের প্রসিদ্ধ আলেমদের এরূপ অভিমত বহু নজরে পড়বে। তারা বরং জিহাদ বলেছেন পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে লড়াই করাকে। একাত্তরে চোখে পড়ার মত বিষয়টি হলো, কোন একজন বিজ্ঞ আলেমও পাকিস্তান ভাঙ্গাকে জায়েজ বলেননি। দেশের ধর্মপ্রাণ জনগণ আলেমদের সে অভিমতকেই গ্রহণ করে নেয়। তারই প্রমাণ, ইসলামী জ্ঞানশূণ্য ও ইসলাম প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারশূণ্য বহু আওয়ামী লীগ কর্মী, বামপন্থী ক্যাডার ও নাস্তিক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও কোন একজন আলেম, মাদ্রাসার কোন ছাত্র, পীরের কোন মুরিদ এবং ইসলামী দলের কোন নেতা বা কর্মী ভারতে যায়নি এবং মুক্তিযুদ্ধেও যোগ দেয়নি। তারা বরং রাজাকার হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধকে তাই বাঙালী-অবাঙালীর যুদ্ধ বলাটি নিরেট মিথ্যা। এটি ছিল একটি আদর্শিক সংঘাত। তাই জেনারেল মানেক শ’, জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং জেনারেল জ্যাকবের ন্যায় বহু হাজার ভারতীয় অমুসলিম অবাঙালী যেমন বাঙালী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে লড়েছে, তেমনি বহু হাজার বাঙালী পূর্ব পাকিস্তানীরাও লড়েছে পশ্চিম পাকিস্তানী পাঞ্জাবী, পাঠান ও বেলুচী মুসলিমদের সাথে। ভাষার বিভেদ ও আঞ্চলিকতা তাদের মাঝে কোন দেয়াল খাড়া করেনি। অথচ বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের রচনায় এ যু্দ্ধটিকে নিছক বাঙালীর বিরুদ্ধে পাঞ্জাবীর যুদ্ধ বলে রটনা করা হয়েছে। অথচ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুই শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও জেনারেল নিয়াজী –এ দুই জনের কেউই পাঞ্জাবী ছিলেন না, তারা ছিলেন পাঠান।

জিহাদ বলতে একমাত্র সে যুদ্ধকেই বুঝায় যা লড়া হয় একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার লক্ষ্যে এবং তাঁরই নির্দেশিত পথে। কোন দল, জাতি, বর্ণ, ভাষা বা ভূগোল ভিত্তিক স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে নয়। অর্থদান, শ্রমদান, প্রাণদান কোন জাতির ইতিহাসেই নতুন কিছু নয়। অসংখ্য যুদ্ধ যুগে যুগে কাফের, ফাসেক, মুনাফিকগণও লড়েছে। আজও লড়ছে। বিপুল অর্থ, শ্রম ও রক্ত তারাও ব্যয় করে। কিন্তু তাদের সে ত্যাগ ও কোরবানী হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথে। ফলে তা হলো আমানতের খেয়ানত। সেক্যুলার দলের হাতে তাই কোন দেশ অধিকৃত হলে সেখানে সে খেয়ানতটাই প্রচণ্ড ভাবে বাড়ে। তখন যুদ্ধ হয় এবং বিপুল অর্থ ও রক্তের ব্যয়ও হয়।কিন্তু সেগুলি হয় ভাষা, ভূগোল, দল, গোত্র, বর্ণ ও শ্রেণী স্বার্থের নামে। তাতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পায় না,আর ইসলাম প্রতিষ্ঠা না পেলে কি মুসলিমের কল্যাণ হয়? তাতে খুশি হন কি মহান আল্লাহতায়ালা? অধিকাংশ মুসলিম দেশে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হচ্ছে তো মূলত এপথে। আওয়ামী লীগও তেমনি নিজেদের গদীর স্বার্থে এবং সে সাথে ভারতকে খুশি করতে গিয়ে জাতিকে এক প্রচণ্ড খেয়ানতের দিকে ধাবিত করেছে। কথা হলো, মহান আল্লাহর দরবারে তাদের জবাবটি কি হবে?

 

আপোষে অনাগ্রহ

বাঙালী মুসলিমের বহু ব্যর্থতাই অতি প্রকট ভাবে ধরা পড়ে একাত্তরে। তবে মূল ব্যর্থতাটি ধরা পড়ে ইসলামী চেতনা ও প্যান-ইসলামীক ভাতৃত্ব নিয়ে বেড়ে না উঠায়। প্রকাশ পায় আপোষে অনাগ্রহ। বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ আজও সে রোগ থেকে মুক্তি পায়নি। বরং দিন দিন তা আরো প্রকটতর হয়েছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সেক্যুলারিস্টগণ জনগণ ভাষা ও অঞ্চলের পরিচয়কেও জীবনের বড় পরিচয় গণ্য করে। ছুঁড়ে ফেলে দেয় মুসলিম ভাতৃত্বের পরিচয়। অথচ ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা অঞ্চলের ভিত্তিতে যে বন্ধন গড়ে উঠে সেটি প্রাক-ইসলামিক নিরেট জাহেলিয়াত তথা অজ্ঞতা। ইসলামের আগমন ঘটে এমন জাহিলিয়াতকে নির্মূল করতে, পরিচর্যা দিতে নয়। প্রশ্ন হলো, ঈমানদারের জীবনে এমন জাহিলী পরিচয় গুরুত্ব পায় কি? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার সুস্পষ্ট নির্দেশটি হলো মু’মিনকে বাঁচতে হবে পরস্পরে ভাইয়ের পরিচয় নিয়ে, শত্রু রূপে নয়। ভাতৃসুলভ সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে ঈমান, ভাষাভিত্তিক বা অঞ্চলভিত্তিক বন্ধন নয়। ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ হতেই পারে। মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ হলো সেগুলো নিয়ে ইসলাহ বা আপোষ করা।

সভ্য দেশে হাজার হাজার বিবাদের প্রতিদিন মীমাংসা হয় কোনরূপ যুদ্ধ বা সংঘাত ছাড়াই। মুসলিমদেরও উচিত,মীমাংসার পথ খুঁজে বের করা এবং নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ পরিহার করা। এটি এক ঈমানী দায়ভার। এর মধ্যেই তো বুদ্ধিমত্ততা। মুসলিমদের মাঝে প্রতিটি যুদ্ধই ভাতৃঘাতি। এমন যুদ্ধ স্রেফ কাফের শত্রুদের কামনা হতে পারে, মুসলিমের নয়। মু’মিন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইদের সাথে শুধু নামাযে দাঁড়ায় না, সমস্যা দেখা দিলে অধীর আগ্রহ ভরে আপোষেও বসে। এমন রাজনীতি দেশে যুদ্ধের বদলে শান্তি ও উন্নয়ন আসে। সমস্যা দেখা দেয় তখন যখন মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন পালনে আগ্রহ লোপের সাথে সাথে মুসলিম ভাইয়ের সাথে বিবাদে মীমাংসার আগ্রহটিও লোপ পায়; এবং সে বিবাদকে অজুহাত বানিয়ে কাফেরদের নেতৃত্বে মুসলিম ভাইয়ের হত্যায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নামা হয়। আপোষে আগ্রহ লোপের কারণ, মহান আল্লাহতায়ালার ভয় না থাকা। মু’মিন তো সেই, যার মাঝে প্রতিক্ষণ কাজ করে মহান আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতা থেকে বাঁচার ভয়। সে ভয়ের কারণে মু’মিন ব্যক্তি যেখানেই মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশনা দেখে, অধীর আগ্রহে সেটিকেই আঁকড়ে ধরে। ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলারিস্টদের মনে সে ভয় থাকে না, ফলে আগ্রহ থাকে না ধর্মীয় বিধান পালনে। ফলে জনগণ যতই ইসলামশূণ্য হয়,সমাজ বা রাষ্ট্র ততই বিবাদপূর্ণ ও সংঘাতপূর্ণ হয়। সেটি যেমন ১৯৭১’য়ে পূর্ব পাকিস্তানে হয়েছিল, তেমনি একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশেও হচ্ছে। একই কারণে জাহিলিয়াত যুগের আরবদের মাঝেও লাগাতর কলহ-বিবাদ ও যুদ্ধ ছিল। অথচ মীমাংসার পথেই মহান আল্লাহতায়ালার বিশেষ রহমত আসে -পবিত্র কোরআনে যা বার বার বলা হয়েছে। নিজেদের বিবাদ নিজেরা না মিটিয়ে মুসলিম ভূমিতে অমুসলিমদের ডেকে এনে যুদ্ধ শুরু করা কোন মুসলিমের কাজ নয়। এটি তো শত্রুরা চায়। এ পথে আসে কঠিন আযাব। আসে অপমান। দুঃখজনক হলো, ইসলামী চেতনাশূণ্য আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব ও তার সঙ্গিগণ সজ্ঞানে আযাবের পথটিই বেছে নিয়েছিলেন। আপোষের পথটি ছেড়ে তারা ভারতীয় উস্কানিতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পথটি বেছে নেন। ২৩ শে মার্চের ঢাকা বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও জনাব ভূট্টো উভয়ই ৬ দফা মেনে নিয়েছিলেন।-(Sisson and Rose, 1990]। কিন্তু শেখ মুজিব নিজেই তার ৬ দফাকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছেন। ৬ দফার বদলে তিনি এমন দাবি পেশ করেন -যার উপর জনগণ থেকে তিনি সত্তরের নির্বাচনে কোনরূপ ম্যান্ডেট নেননি। তার এ নীতিহীনতায় দেশে শান্তি আসেনি, এসেছে যুদ্ধ। আর যুদ্ধ কোন দেশেই একাকী আসে না। সাথে আনে ধ্বংস ও মৃত্যু। এবং যুদ্ধ শেষ হলেও আযাব শেষ হয়না। বাংলাদেশে লাগাতর আযাব এসেছে দুর্ভিক্ষ, সন্ত্রাস, ভিক্ষার ঝুলির অপমান, স্বৈরাচারের দুঃশাসন ও সীমাহীন দূর্নীতি রূপে।সে সাথে এসেছে অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ময়দানে ভারতীয় অধিকৃতি।এবং সে অধিকৃতি থেকে বাংলাদেশের জনগণের আজও মুক্তি মিলেনি।

 

শূন্যতা ঈমানী বন্ধনের

মহান আল্লাহতায়ালা,চান মুসলিমগণ ভাতৃত্বের বন্ধনটি গড়ে তুলুক ঈমানের ভিত্তিতে; ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। একাত্তরে বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ সে ঈমানী বন্ধন সৃষ্টিত ব্যর্থ হয়েছে। তাদের কাছে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাটি গুরুত্ব পায়নি। বাঙালী জাতীয়তার নামে আওয়ামী লীগ ধরেছিল এমন এক পথ যা মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ নয়। সেটি ছিল জাহিলিয়াতের তথা ইসলামপূর্ব অজ্ঞতার পথ। বরং উনিশ শ’ সাতচল্লিশে যে চেতনায় অবাঙালীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলার মুসলিমগণ পাকিস্তান নির্মাণ করেছিল -সেটিই ছিল ইসলামী পথ। মুসলিম ভাতৃত্বের চেতনায় ইসলাম যে কতবড় নৈতিক বিপ্লব এনেছিল এবং ইস্পাতসম মজবুত দেয়াল গড়েছিল সে পরিচয়টি হযরত আবু বকর (রাঃ)পাওয়া যায় হযরত আবু বকর (রাঃ) এর উক্তি থেকে। ইসলাম গ্রহণের পর একবার’য়ের পুত্র তাঁকে বলেছিলেন,“আব্বাজান, বদরের যুদ্ধে আমি তিন বার আপনাকে আমার তরবারির সামনে পেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমার শ্রদ্ধেয় পিতা। শৈশবে আপনার কত স্নেহ-আদর পেয়েছি। সেটি প্রতিবার মনে পড়ায় আঘাত না করে প্রতিবারই সরে দাঁড়িয়েছি।” শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন, “পুত্র, যদি তোমাকে একটি বার তরবারির সামনে পেতাম, নিশ্চিত দুই টুকরা করে ফেলতাম।”

হযরত আবু ওবাইদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ) ছিলেন প্রসিদ্ধ সাহাবী। তিনি ছিলেন আশারায়ে মোবাশ্বেরা; অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বেই তিনি জান্নাতপ্রাপ্তির সুখবর শুনেছিলেন। নবীজী (সাঃ) তাঁকে “আমিন” উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর বিশ্বস্ততার প্রতীক। তাঁকে হযরত ওমর (রাঃ) সিরিয়া অভিযানে তাকে রোমান বাহিনী বিরুদ্ধে সেনাপতি রূপে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনিই ছিলেন সিরিয়ায় প্রথম মুসলিম গভর্নর। সে বিশাল সিরিয়া প্রদেশ ভেঙ্গে আজ  সিরিয়া, জর্দান, লেবানন, ইসরাইল ও ফিলিস্তিন –এ ৫টি দেশ। মৃত্যুর সময় হযরত ওমর (রাঃ) বলেছিলেন, আজ যদি আবু ওবাইদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ) জীবিত থাকতেন তবে তাঁকেই খলিফা নিযুক্ত করতাম। সে প্রসীদ্ধ সাহাবীর পিতা মুসলমান হননি। বরং বদর যুদ্ধে কাফের বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে মুসলমানদের নির্মূলকল্পে অস্ত্র ধরেছিলেন।  হযরত আবু ওবাইদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পিতাকে সে যুদ্ধে নিজ হাতে হত্যা করেছিলেন। ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি এর চেয়ে বিশ্বস্ততা আর কি হতে পারে? তাঁর এক ভাই বদরের যুদ্ধে বন্দী হয়েছিল।এক আনসারি তাকে রশি দিয়ে বাঁধছিলেন। হযরত আবু ওবাইদুল্লাহ (রাঃ) সে আনসারি সাহাবী বল্লেন, “ওকে শক্ত করে বাঁধ। তার মা অর্থশালী, অনেক মুক্তিপণ আদায় করতে পারবে।” তাঁর কথা শুনে তার ভাই বললো, তুমি আমার ভাই; আর তুমি এরূপ কথা বলছো?” হযরত আবু ওবাইদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “না, তুমি আমার ভাই নও; আমার ভাই তো ঐ আনসারি যে তোমাকে বাঁধছে।” ঈমানের বন্ধন বন্ধুত্ব ও শত্রুর সংজ্ঞাটি এভাবেই ভিন্নভাবে চিহ্নত করে।

যুদ্ধের ময়দানে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর নিজ কাফের পুত্রকে হত্যার যে অভিব্যক্তিটি প্রকাশ করেছেন এবং হযরত আবু ওবাইদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ) তাঁর নিজ কাফের পিতাকে যেরূপ হত্যা করেছেন -তা হলো সাচ্চা ঈমানদারী। সে ঈমানদারীতে কোন রূপ সংশয় বা অপূর্ণতা ছিল না। অপর দিকে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর পুত্র যা বলেছেন সেটি ছিল জাহেলিয়াত। জাহেল ব্যক্তি ভাষা, বর্ণ, ভৌগোলিকতা, পরিবার বা গোত্রের মধ্যে সম্পর্ক খোঁজে। জাতীয়তাবাদ তাই আধুনিক নয়, বরং অতি সনাতন জাহেলিয়াত। প্যান-ইসলামীক চেতনার বিরুদ্ধে এটি হলো মারাত্মক ব্যাধি। মুসলমান রাষ্ট্রগুলিতে বিভেদ ও ভাঙ্গন ছাড়া এটি আর কোন কল্যাণটি করেছে? যেখানে এরূপ জাতীয়তাবাদী জাহেলিয়াতের বিকাশ ঘটেছে সেখানেই একাত্তরের ন্যায় আত্মঘাতি রক্তপাতও ঘটেছে। এক রাষ্ট্র ভেঙ্গে জন্ম নিয়েছে বহু রাষ্ট্র। এ ভাবে মুসলিম বিশ্বজুড়ে বেড়েছে ক্ষুদ্রতা। ক্ষীণতর হয়েছে বিশ্বশক্তি রূপে মুসলমান উম্মাহর উত্থানের সম্ভাবনা। অপর দিকে যেখানেই ইসলামের মৌলিক শিক্ষার বিকাশ ঘটেছে সেখানেই বেড়েছে প্যান-ইসলামীক চেতনা। তখন নানা ভাষাভাষী মুসলমানের মাঝে একতাও গড়ে উঠেছে। ১৯৪৭-পূর্ব ভারতীয় মুসলিমেদের মাঝেও সেটিই হয়েছিল। ফলে বাঙালী, বিহারী, পাঞ্জাবী, সিন্ধি,বেলুচী, পাঠান, গুজরাতী -সবাই কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে এক রাষ্ট্রের নির্মাণও করেছে। বাঙালী মুসলিমগণ সেদিন ভারত থেকে আসা ভাইদের জন্য সর্বপ্রকার সহায়তা দিয়েছে। এমন ভ্রাতৃত্বের বন্ধন নামিয়ে আনে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত নিয়ামত।সে নিয়ামতের বরকতেই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় হিন্দু কংগ্রেসের যৌথ বিরোধীতার মুখে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। নইলে নিরস্ত্র ও পশ্চাদপদ মুসলমানদের পক্ষে কি সম্ভব হত সে রাষ্ট্রের নির্মাণ? সুলতান মুহম্মদ ঘোরির হাতে দিল্লি বিজয়ের পর উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা; এবং সবচেয়ে বড় বিজয়।

 

দায়ী কি স্রেফ পশ্চিম পাকিস্তানীরা?

পাকিস্তান গড়ার পিছনে উচ্চতর ভিশন ছিল। শুধুমাত্র উপমহাদেশের মুসলিমদের কল্যাণে নয়, দেশটির প্রতিষ্ঠা কালে গুরুত্ব পেয়েছিল সারা পৃথিবীর মজলুম মুসলিমদের স্বার্থ সংরক্ষণে শক্তিশালী ভূমিকা নেয়ার বিষয়টিও। কিন্তু সে ভূমিকা পালনে পাকিস্তান ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদের কি সাহায্য করবে, দেশটি নিজেই টিকে থাকতে পারেনি। পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ায় মৃত্যু ঘটেছে একটি বিশাল স্বপ্নের –যা দেখেছিল উপমহাদেশের মুসলিমগণ। তবে সে ব্যর্থতার জন্য কি শুধু পশ্চিম পাকিস্তানীগণ দায়ী? পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানী হওয়ায় সে ব্যর্থতার জন্য বেশী দায়ী হলো পূর্ব পাকিস্তানীরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে অনেকে পাকিস্তানের ক্রিকেট এবং হকির টিমে সংখ্যানুপাতিক হারে পূর্ব পাকিস্তানী খেলোয়াড় নেয়ার দাবী তুলেছে। কিন্তু সে জন্য যে ভাল খেলোয়াড় হওয়ারও প্রয়োজন রয়েছে -সে বিষয়টি ক’জন অনুভব করেছে? এরূপ ব্যর্থতা সর্বক্ষেত্রে। ঠিকমত খেলেনি কোন খেলাই। রাজনীতির ময়দানে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের সদস্যগণ তো সংসদের ভিতরে খুনোখুনিও করে বসে। নিহত হয় ডিপুটি স্পীকার শাহেদ আলী। পশ্চিম পাকিস্তানে তখন ৪টি প্রদেশ ছিল, কিন্তু কোন প্রদেশের সংসদে কি এমন খুনোখুনি হয়েছে?

বিবাদ ও বিভক্তির সূত্রগুলো খুঁজে খুঁজে বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ সেগুলিকে শুধু রাজনীতিতেই কাজে লাগায়নি, তা নিয়ে দাঙ্গাও সৃষ্টি করেছে। অবাঙালীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে ও তাদের বিনিয়োগে রোধে বাঙালী-অবাঙালী দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে আদমজী জুটমিলে। পুঁজি চায় শিল্পাঙ্গণে নিরাপত্তা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে পরিবেশও বিনষ্ট করেছে। ফলে পাকিস্তান সৃষ্টির সাথে সাথে যে গতিতে পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প কারখানার প্রতিষ্ঠা শুরু হয়েছিল সেটিও দ্রুত কমিয়ে দিতে সমর্থ হয়। অথচ দাঙ্গার সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র ছিল করাচি। সেখানে সিন্ধি, মোহাজির, পাঠান, পাঞ্জাবী, আফগান, বাঙালী –এরূপ নানা ভাষাভাষি বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাস। মুসলিম বিশ্বের আর কোন শহরে এতো ভিন্নতা নাই। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো কসমোপলিটন হওয়া, তথা নানা ভাষাভাষী মানুষের সাথে শান্তিপূর্ণ বসবাসে অভ্যস্থ হওয়া। বিভক্তির দেয়াল ভেঙ্গে একাকার হওয়াই তো মুসলিম সংস্কৃতি। কিন্তু বাঙালী মুসলিমগণ সে কসমোপলিটন মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারিনি, বরং গড়েছে বিভক্তির দেয়াল। ফলে বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে এক ভাষা ও এক বর্ণের ট্রাইবাল দেশ রূপে। ফলে কয়েক লক্ষ বিহারী বাংলাদেশে নিরাপত্তা পায়নি। প্রাণ বাঁচাতে এসেও বাংলাদেশের সীমান্তে প্রবেশাধিকার পায়নি প্রতিবেশী মজলুম রোহিঙ্গাগণ। তাদের নৌকাগুলোকে সাগরে ভেসে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এমন স্বার্থপর মানসিকতা কি মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য আনে? করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালা তো তাদেরই সাহায্য করেন যারা তাঁর বিপন্ন বান্দাদের সাহায্য করে। -(হাদীস)। আরো বিপদ হলো, এরূপ চেতনাগত ও চারিত্রিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের মাঝে আত্মচিন্তা বা আত্মসমালোচনাও নাই। বরং বিপুল আয়োজন সে রোগকে আরো তীব্রতর করায়। নিজ রোগ নিয়ে রোগীর নিজের ভাবনা না থাকলে সর্বশ্রষ্ঠ প্রেসক্রিপশনই বা কি কল্যাণ করতে পারে? অথচ সে প্রেসক্রিপশনটি তো সর্বরোগের মুক্তিদাতা মহান আল্লাহতায়ালার।

মানব-সন্তান উন্নত মানবতা পায় উন্নত দর্শনের গুণে;ভাষা বা জলবায়ুর গুণে নয়। দর্শনই দেয় চিন্তা, চেতনা ও চরিত্রে পরিশুদ্ধি। সে দর্শনটি তাই বিশুদ্ধ ও উন্নত হওয়া জরুরী। সমগ্র মানব ইতিহাসে মুসলিমগণ শ্রেষ্ঠ এজন্য যে তাদের হাতে রয়েছে শ্রেষ্ঠ জীবন দর্শন -যা এসেছে মহাজ্ঞানী মহান রাব্বুল আলামীন থেকে। কিন্তু ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সে শ্রেষ্ঠত্ব থাকে না। ইসলামের গৌরব যুগে মুসলিমগণ ইসলামী আদর্শ ও প্যান-ইসলামীক ভাতৃত্বের পথ ধরেই মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়েছিলেন এবং সেসাথে বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছিলেন; জাতীয়তা বা সেক্যুলারিজমের মাধ্যমে নয়। মুসলিমদের সে গৌরবময় অতীত ইতিহাস থেকে বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ কোন শিক্ষাই নেয়নি। মানব-ইতিহাসে সর্বপ্রথম যে মিশরীয়গণ কাগজ আবিষ্কার করেছিল,নবীজীর (সাঃ) জন্মের কয়েক হাজার বছর আগে যারা ভাষা ও ভাষালিপির জন্ম দিয়েছিল এবং পিরামিডের ন্যায় বিস্ময়কর ইমারত গড়েছিল -তারাও ইসলামের সন্ধান লাভের সাথে সাথে নিজ ভাষা,নিজ সংস্কৃতি ও নিজ সনাতন বিশ্বাসকে কবরস্থ করেছিল। মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান কোরআনী জ্ঞান থেকে সমৃদ্ধ হওয়ার স্বার্থে তারা আরবী ভাষাকে নিজেদের ভাষা রূপে গ্রহণ করেছিল। একই পথ ধরেছিল সুদান, লিবিয়া, আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মৌরতানিয়াসহ সমগ্র উত্তর আফ্রিকার জনগণ। সে আমলের মুসলিমগণ বিশ্বশক্তি ও বিশ্বসভ্যতা রূপে প্রতিষ্ঠা পায় তো এভাবেই। শত শত নদী যেমন সাগরে মিশে বিশালতা দেয়, মুসলিম উম্মাহও তেমনি নানা জনগোষ্ঠীর মিলনে বিশালতা পায়। ইসলামী উম্মাহর মূল দর্শন তো এটিই।

বিভক্তি ও ভাতৃঘাতী সংঘাতই আজকের মুসলিমদের প্রধানতম রোগ যা তাদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে এবং সামর্থ কেড়ে নিয়েছে মাথা তুলে দাঁড়ানোর। এক ভাষা, এক বর্ণ, এক ধর্ম ও এক অখণ্ড ভূগোল হওয়া সত্ত্বেও আরবগণ ২২ টুকরোয় বিভক্ত। তাতে বিশ কোটির বেশী আরব এতটাই শক্তিহীন হয়েছে যে অর্ধকোটি ইহুদী তাদের মাথার উপর বিজয়ী শক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শক্তি একতার মাঝে;পাকিস্তান আজও তার উত্তম দৃষ্টান্ত। একাত্তরে পাকিস্তান খণ্ডিত হলেও প্যান-ইসলামী চেতনার দিক দিয়ে অবশিষ্ঠ পাকিস্তান আজও সমগ্র মুসলিম বিশ্বে অনন্য। পৃথিবীর ৫৭টি মুসলিম দেশের মাঝে পাকিস্তানই সবচেয়ে শক্তশালী দেশ। কারণ, এটিই একমাত্র দেশ যেখানে পাঞ্জাব, সিন্ধু, খায়বর-পাখতুন’খা ও বেলুচিস্তান -এ চারটি প্রদেশের বিভিন্ন ভাষাভাষি ১৯ কোটি মানুষ এক অভিন্ন রাষ্ট্রের পতাকা তলে বসবাস করছে। অথচ পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশই আলাদা রাষ্ট্র নির্মাণের সামর্থ রাখে। আলাদা হলে প্রত্যেকটির আয়োতন বিশ্বের শতকরা ৭০ ভাগ রাষ্ট্রের আয়োতনের চেয়ে বড় হত। দেশটির ৪টি প্রদেশের মাঝে দু’টির আয়োতন বাংলাদেশের চেয়ে বড়। তারপরও তারা একতাবদ্ধ আছে। দেশটি তার জন্ম থেকেই ভারতীয়, রোহিঙ্গা, আফগানসহ নানা দেশের মুসলিমদের নিজ দেশের নাগরিক রূপে বরণ করে নিয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে ৩০ বছরেরও বেশীকাল ধরে পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল ৩০ লাখের অধীক আফগান মোহাজির। রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১০ বছরের লড়াইয়ে অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেছে পাকিস্তানের নাগরিকগণ।আফগানিস্তানের জিহাদে বহু হাজার পাকিস্তানী শহীদ হয়েছে।দেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হককেও প্রাণ দিতে হয়েছে। দেশটির সরকার ও নাগরিকগণ আজও  সহায়তা দিয়ে যাচেছ ভারতীয় অধিকৃতির বিরুদ্ধে। নানারূপ ব্যর্থতার পরও এটি কি কম অর্জন? অথচ বাংলাদেশে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ও বিহারী মোহাজির নিদারুন অবহেলা ও দুর্দশার শিকার।

 

প্রতিবন্ধকতা বুদ্ধিবৃত্তিতে

বাঙলী সেক্যুলারিস্টদের মূল রোগটি হলো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতার। এমন প্রতিবন্ধকতার কারণে লোপ পেয়েছে নিজেদের ব্যর্থতাগুলি নিয়ে চিন্তা ভাবনার সামর্থ। সে ব্যর্থতাগুলোকে স্বচোখে দেখেও তা নিয়ে তারা গর্ব করে। এজন্যই তাদের প্রচণ্ড গর্ব মুজিবের ন্যায় বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যর্থ ও অপরাধী ব্যক্তিকে নিয়ে। যে ব্যক্তির দুঃশাসন একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ উপহার দিল, নারীদের বাধ্য করলো জাল পড়তে,চাপিয়ে দিল একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার, হত্যা করলো ৩০ হাজারের বেশী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, দেশকে পরিণত করলো ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি -তাকেই তারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলে। বাংলার সমগ্র ইতিহাসে আর কোন শাসকের হাতে এতো বড় ভয়ানক দুর্যোগ কি কখনো এসেছে? একই রূপ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতার কারণে একাত্তরের ব্যর্থতাগুলোও এসব বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তদের নজরে পড়েনি। বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা তাদেরকে শুধু বিবেকহীনই করেনি, অতিশয় ভীরুও বানিয়েছে। ফলে কাশ্মীরে ভারতীয় জুলুমবাজীর বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ করতেও ভয় পায়। ভারতে শত শত মুসলমান খুন হয়,মহিলাগণ ধর্ষিতা হয় এবং ধর্ষণের পর আগুণে নিক্ষিপ্ত হয়।সে নৃশংসতার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রবল প্রতিবাদও হয়।কিন্তু নিরব থাকে বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্ট সরকার ও মিডিয়া। মিয়ানমারে নির্মূলের মুখে পড়েছে সেদেশের রোহিঙ্গা মুসলিমগণ। সে বর্বরতার বিরুদ্ধেও তারা নিরব। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশের মজলুমদের প্রতি এই কি দায়িত্বপালনের নমুনা? আগ্রহ যেন হাত পেতে স্রেফ নেয়ায়, দেয়াতে নয়। অথচ জুলুমের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদটি স্রেফ রাজনীতি নয়, এটি গভীর ঈমানী দায়বদ্ধতা। ব্যক্তির বিবেক সুস্থ ও ইসলামি জ্ঞানে পরিপুষ্ট হলে জুলুমের বিরুদ্ধে সে ব্যক্তি প্রতিবাদী হবেই। সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পূর্বে সমগ্র বিশ্বে উদ্বাস্তুদের সর্ববৃহৎ আবাসস্থল ছিল পাকিস্তান। (সূত্রঃ জাতিসংঘ রিপোর্ট)। বর্তমানে সেটি তুরস্ক। দেশটি প্রতিষ্ঠার পরপরই প্রায় ৭০ লাখ ভারতীয় আশ্রয় নিয়েছিল। আশীর দশকে আশ্রয় পেয়েছে ৩০ লাখ আফগানী। একাত্তরে বাঙালী-অবাঙালী রক্তাক্ষয়ী সংঘাতের পরও বহুলক্ষ বাঙালী আজ পাকিস্তানে বসবাস করছে। এসব বাঙালীদের অধিকাংশই পাকিস্তানে গেছে একাত্তরের পর। নানা ব্যর্থতার পরও প্যান-ইসলামীক চেতনা যে দেশটিতে এখনও বেঁচে আছে এ হলো তার নজির।

একাত্তর নিয়ে যেসব লেখালেখি হয়েছে তাতে বাঙালীর দুর্বলতাগুলো তুলে ধরা হয়নি। বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সেটি সম্ভবও নয়। ফলে এ হিসাব কখনই নেয়া হয়নি, বাঙালী মুসলিমগণ হাত পেতে বিশ্ব থেকে যতটা নিয়েছে, ততটা দিয়েছে কি? দিয়েছে কি এক কালের নিজ দেশ পাকিস্তানের শিল্প, বাণিজ্য, সাহিত্য, শিক্ষা ও প্রতিরক্ষার উন্নয়নে? এমন কি খেলাধুলায়? অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে তাদের দেয়ার দায়িত্বটাই কি অধিক ছিল না? তাদের থেকে সেটিই কি পাকিস্তানের পাওনা ছিল না? আদমজী, বাওয়ানী, দাউদ, ইস্পাহানীদের ন্যায় অবাঙালীরা এসে কেন পূর্ব পাকিস্তানে এসে শিল্পায়ন করবে? তারা তো ছিল সংখ্যালঘু। সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বপাকিস্তানীদের কি পুঁজি, যোগ্যতা ও কারগরি দক্ষতা নিয়ে পশ্চিম-পাকিস্তানী ভাইদের শিল্পায়নে এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল না? পশ্চিম পাকিস্তানী সৈনিকেরা এসে কেন চোরাকারবারীদের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সীমানা পাহারা দিবে? অথচ ২৩ বছরের পাকিস্তানী আমলে সেটাই হয়েছে। এমনকি চোরাকারবারি রোধে ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যর্থতা দেখে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন জিওসি জেনারেল ওমরাও খানের কাছে সীমান্ত পাহারায় সেনাবাহিনী নিয়োগের অনুরোধ করেছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান।-(আতাউর রহমান খান, ২০০০)। বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের মনে এসব ব্যর্থতা নিয়ে কখনো কি কোন আত্মজিজ্ঞাসা উদয় হয়েছে? নিজেদের ব্যর্থতার কারণ ও তার প্রতিকারের চেষ্টা না করে তারা বরং দুর্বলতা ও দোষ অন্বেষণ করেছে অন্যদের। আর এটিই হলো সকল যুগের সকল ব্যর্থ ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীর চিরাচরিত খাসলত। প্রো-এ্যাকটিভ না হয়ে তারা বরং রিয়াকটিভ হয়। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার মহলটি আজও সে অসুস্থ চেতনারই পরিচর্যা দিচ্ছে।

 

বিভক্তি যে কারণে অনিবার্য হলো

বাঙালী বুদ্ধিীজীবীদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবদ্ধকতার মূল কারণটি বাঙালী জাতিয়তাবাদ। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ব্যক্তির দেখবার ও ভাবনার ভূবনে বিভক্তির বিশাল দেয়াল খাড়া করে। সেটি ভাষা, ভূগোল ও বর্ণের ভিত্তিতে। বিবেকে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তখন দেয়ালের ওপারে অন্যদের যেমন দেখা যায় না, তেমনি তাদের নিয়ে ভাবাও যায় না। ফলে ভাববার ও দেখবার জগত তখন অতি সীমিত হয়ে যায়। মানব জীবনে এর চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবদ্ধকতা আর  কি হতে পারে? তাই বাঙালী জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিদের চেতনারাজ্যে বিহারীদের জন্য যেমন স্থান নেই, তেমনি স্থান নেই কাশ্মীরী ও রোহিঙ্গাদের জন্যও। স্থান নেই স্বদেশী ইসলামপন্থীদের জন্যও। এরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবদ্ধকতায় ডঃ শহিদুল্লাহ তৎকালীন বাঙালী মুসলিম বুদ্ধিজীবীগণ যে কতটা আক্রান্ত হয়েছিল তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জনাব থেকে। তিনি লিখেছেন,“আমরা হিন্দু মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙালী। এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালীত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে তা মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো টি নেই।” (বদরুদ্দীন উমর, ১৯৭০)। এই হলো, ডঃ শহীদুল্লার বুদ্ধিবৃত্তি ও ইসলামী জ্ঞানের দশা! তিনি ঈমানী পরিচয়ের চেয়ে বেশী সত্য বানিয়ে দিলেন বাঙালী পরিচয়কে! পৌত্তলিক হিন্দুদের ন্যায় প্রকৃতিকেও তিনি মা বলেছেন।তাহলে বংকিম চন্দ্রের বন্দেমাতরম বা মাতৃবন্দনা থেকে তার পার্থক্য কোথায়? প্রশ্ন হলো এটি কি ঈমানের পরিচয়? অথচ তিনি বাঙালী মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের শিরোমণি।

মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে ব্যক্তির দৈহিক গঠনে আঞ্চলিকতার প্রভাবের কি আদৌ গুরুত্ব আছে? আদৌ গুরুত্ব পায় কি তার বর্ণ ও ভাষাভিত্তিক পরিচয়? তা নিয়ে কি বড়াই করা চলে? সেখানে গুরুত্ব পায়তো ঈমানদারী ও নেক আমল। গুরুত্ব পায় কে কতটা সাচ্চা মুসলিম -সেটি। কোন ভাষার,কোন দেশের,কোন বর্ণের বা কোন আকৃতির -তা নিয়ে পরকালে কোন বিচার বসবে না। কথা হলো, আখেরাতে যার মূল্য নেই সেটি ইহকালেই বা গুরুত্ব পায় কি করে? ঈমানদার ব্যক্তি কেন তার নিজের সময়, সম্পদ ও মেধা সেটির পিছনে খরচ করবে? ভাষা বা বর্ণের পরিচয়টি তাই গুরুত্বের দিক দিয়ে প্রথম হয় কী করে? ঈমানদার তো বাঁচবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার লক্ষ্যে। ফলে মু’মিনের জীবনে তো সেটিই গুরুত্ব পায় যা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে গুরুত্ব রাখে এবং পরকালের মুক্তিতে যা অপরিহার্য। ঈমানদারীর অর্থ তো বাঁচবার প্রতি মুহুর্তে এবং জীবনের প্রতি কর্মে এরূপ পরকাল সচেতনতা। আর এর বিপরীতে যেটি, তা হলো ইহজাগতিকতা বা সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজমে ব্যক্তি ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতা গুরুত্ব পায় এবং গুরুত্ব হারায় ধর্মের প্রতি অঙ্গীকার।

বাংলাদেশের মুসলিম রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ যে কতটা বিভ্রান্ত এবং ইসলামের মৌল দর্শনে যে কতটা অজ্ঞ ও অঙ্গীকারশূন্য -বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের গুরুতুল্য ব্যক্তি জনাব ড.শহিদুল্লাহর উপরের উদ্ধৃতি হলো তারই সুস্পষ্ট নমুনা। ফলে কায়েদে আযম মোহম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর নিজ ভাষা, নিজ বর্ণ, নিজ মাজহাব ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে যেরূপ নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন, বাঙালী জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতা ও বুদ্ধিজীবীগণ তা পারেনি। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে পাকিস্তানকে গড়ে তোলার বৃহত্তর দায়িত্ব ছিল বাঙালীদের উপরই। অথচ তারা আত্মসমর্পণ করেছেন ভাষাভিত্তিক ক্ষুদ্রতা, বিদ্বেষ ও সংকীর্ণতার কাছে। পাকিস্তানের উন্নয়নে তারা কি দিয়েছ বা তাদের কি করণীয় -সেটি তাদের কাছে আদৌ গুরুত্ব পায়নি। বরং গুরুত্ব পেয়েছে কি পায়নি -তা নিয়ে। সমৃদ্ধ পাকিস্তান গড়তে ২৩ বছরে বাঙালীগণ কি দিয়েছে -তা নিয়ে কোন প্রশ্ন নাই। সে বিশলা ব্যর্থতা নিয়ে বাংলাদেশের মুসলিম বুদ্ধিজীবী মহলে সমান্যতম আত্মসমালোচনাও নেই। বরং আছে শুধু অন্যদের উপর দোষারোপ।

পাকিস্তানের মূল সমস্যাটি তাই ভৌগলিক ব্যবধান ছিল না। ভাষা, বর্ণ, খাদ্য, পোষাক-পরিচ্ছদের ভিন্নতাও নয়। বরং সেটি ছিল চেতনাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক বৈষম্য ও অসমতা। চেতনাগণ সে ভিন্নতার কারণেই বাঙালী মুসলিমগণ অবাঙালী মুসলিমদের সাথে একাত্ম হতে পারিনি। ফল ছিটকে পড়েছে মুসলিম শক্তি রূপে বেড়ে উঠার নানা ভাষাভাষি মুসলিমের সম্মিলিত মিশন থেকে। খাদ্য, পোষাক-পরিচ্ছদ বা ভাষাগত ভিন্নতা কি ভারতে কম? বরং সেটি বিশাল। ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব প্রান্তের দ্বীপটি থেকে পশ্চিম প্রান্তের দ্বীপের দূরত্ব ঢাকা-লাহোরের দূরত্বের চেয়েও অধিক। পাঞ্জাব থেকে বাংলাদেশের দূরত্বের চেয়েও অধিক হলো ভারতের পূর্ব সীমান্তের অরুনাচল প্রদেশ থেকে গুজরাটের দূরত্ব। ভারতে বিস্তর ভেদাভেদ ভাষার ক্ষেত্রেও। কিন্তু সে জন্য কি প্রশাসনে কোন অসুবিধা হচ্ছে? বাঙালীর ১৯০ বছরের রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল ইংল্যান্ডের সাথে। তাতেও কি প্রশাসনে কোন সমস্যা দেখা দিয়েছে? তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, শক্তিশালী মুসলিম শক্তি রূপে বেড়ে উঠার বিকল্প কি ক্ষুদ্রতর ও দুর্বলতর বাংলাদেশ? ক্ষুদ্রতর হওয়ার পথ বেছে নেয়ায় ভারতকে খুশি করা যায়, তা নিয়ে মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারীকেও ক্ষমতায় বসানো যায়। কিন্তু সে পথে কি মহান আল্লাহতায়াকেও খুশি করা যায়? তিনি তো চান মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য। বিভক্তি ও ক্ষুদ্রতার মাঝে যে মহান আল্লাহতায়ার ভয়ানক আযাব –সেটি তো মহান আল্লাহতায়ার হুশিয়ারি। (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৫ দ্রষ্টব্য)।

প্রশ্ন হলো, নিছক অবাঙালী হওয়ার কারণে কোন মুসলিম ব্যক্তি কি মুসলমানের দুশমন হতে পারে? দুশমন হওয়ার জন্য কি ভাষা বা বর্ণই মূল? স্বভাষী, স্বদেশী, এমনকি প্রতিবেশীও তো পরম দুশমন হতে পারে। নবীজীকে (সাঃ)কে যারা হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল তারা শুধু আরবই ছিল না, বরং ছিল তাঁর নিকটতম আত্মীয়, স্বগোত্রীয় এবং অতি নিকটতম প্রতিবেশী। অথচ নবীজী(সাঃ)র সাহায্যে যারা অর্থ ও নিজ প্রাণসহ সর্বস্ব দানে এগিয়ে এসেছিলেন তারা ছিলেন দূরবর্তী মদিনার মানুষ। তাঁর পাশে প্রাণপণে দাঁড়িয়েছিলেন রোমের শোহাইব, আফ্রিকার বেলাল এবং ইরানের সালমান। এটিই ইসলামের বিশ্বভাতৃত্ব। কিন্তু ভাষা, বর্ণ বা অঞ্চলভিত্তিক সংকীর্ণতা নিয়ে কি অতি কাছের ভিন্ ভাষী মুসলিমদের সাথেও একত্রে রাজনীতির সামর্থ্য আসে? ঘরের পাশে বসবাসকারি নিরপরাধ বিহারী ব্যক্তিটিও তখন শত্রু ও হত্যাযোগ্য বিবেচিত হয়। একাত্তরে সে অপরাধে বহু লক্ষ বিহারী মুসলিমের শুধু ঘরবাড়িই কেড়ে নেয়া হয়নি, বহু হাজার বিহারীর প্রাণও কেড়ে নেয়া হয়েছে। বহু অবাঙালী নারীর সম্ভ্রমও কেড়ে নেয়া হয়েছে। একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার মূল কারণটি তাই বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের এরূপ চেতনাগত প্রতিবদ্ধকতা এবং সে সাথে অবাঙালী বিরোধী ভয়ানক অপরাধ-প্রবনতা।তা থেকেই জন্ম নেয় চরম পাকিস্তান বৈরী মনোভাব। ৬ দফা মেনে নিয়েও তাই অখণ্ড পাকিস্তান বাঁচানো যায়নি। পাকিস্তানের বিভক্তি ও একাত্তরের বিপর্যয় বুঝতে হলে বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের এ বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।

 

গ্রন্থপঞ্জি

  • বদরুদ্দীন উমর,১৯৭০;পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, মাওলা ব্রাদার্স, বাংলা বাজার, ঢাকা-১।
  • Sisson, Richard and Leo Rose (1990): War and Secession: Pakistan, India and the Creation of Bangladesh, University of California; Berkeley.