অধ্যায় দশ: মুক্তিযুদ্ধে ইসলামশূণ্যতা

 সংকট ইসলামশূণ্যতার

বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে সবচেয়ে বড় সংকটটি ছিল আদর্শের। সেটি ইসলামশূণ্যতার। যে কোন মুসলিমের জন্য এটি এক বিশাল সমস্যা। ঈমানদারদের জন্য এ যুদ্ধে অংশ নেয়ার কোন জায়েজ পথ খোলা রাখা হয়নি। ঈমানদারদের জন্য প্রতিটি খাদ্যকে যেমন সম্পূর্ণ হালাল হতে হয়,তেমনি প্রতিটি যুদ্ধকেও বিশুদ্ধ জিহাদ হতে হয়। নইলে সে যুদ্ধে প্রাণ দূরে থাক একটি পয়সা, একটি ঘন্টা বা একটি মুহুর্তের বিনিয়োগও জায়েজ হয় না। মুসলমানের জান-মাল ও প্রতিটি সামর্থ্যই মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া নিয়ামত। ব্যক্তির উপর মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত এটি আমানতও। ব্যক্তি এখানে ট্রাস্টি বা রক্ষক মাত্র, মালিক নয়। প্রতিটি আমানত কীরূপ ব্যয় হলো সে হিসাবটি প্রকৃত প্রভূ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আখেরাতে দিতে হবে। তাই মুসলিম মাত্রই যুদ্ধে প্রাণ দিবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার পথে; নইলে সে মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের পথে -যা পরকালে জাহান্নাম প্রাপ্তিকে সুনিশ্চিত করবে।তাই ঈমানদারের প্রতিটি প্রচেষ্টা ও যুদ্ধকে হতে হয় ইসলামকে প্রতিষ্ঠা দেয়া বা মুসলিম ভূমিকে প্রতিরক্ষা দেয়ার স্বার্থে। ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা কোন সেক্যুলার লক্ষ্যে নয়। কারণ, মুসলিমের কাছে একমাত্র হালাল বা কোরআন-নির্ধারিত মতবাদটি হলো ইসলাম;জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, সেক্যুলারিজম বা কম্যুনিজম নয়।তাই মু’মিনের জানমাল ও সামর্থ্যের উপর ইসলাম ভিন্ন অন্য কোন মতবাদ ও ধর্মের অধিকার থাকে না।

ঈমানদার হওয়ার অর্থ, নিজের জানমাল ও শক্তি-সামর্থ্য কোথায় এবং কার স্বার্থে বিনিয়োগ হলো -সর্বমুহুর্তে সে জবাবদেহীতার চেতনা নিয়ে বাঁচা। ইসলামের বিজয়ে সে কতটা ভূমিকা রাখলো –মু’মিনের জীবনে মূল যিকর বস্তুত সেটিই।যার মধ্যে সে যিকর নাই,বুঝতে হবে তার মধ্যে ঈমানও নাই। মানব রূপে জন্ম নেয়ার এটিই বিশাল দায়ভার, এ দায়ভার পশুর থাকেনা। যে মানব সন্তানের মাঝে সে দায়ভার নাই,মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে তাকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি আমানতের উপর একমাত্র অধিকার তাঁর; ফলে প্রতিটি মুসলিমকে একমাত্র তাঁর নির্দেশিত পথে সে আমানতের ব্যয় নিয়ে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। নইলে সেটি পরিণত হয় ভয়ানক খেয়ানতে। এমন প্রতিটি খেয়ানতই কবিরা গুনাহ -পরকালে যা কঠিন শাস্তিকে অনিবার্য করে। তাই মু’মিন ব্যক্তির ঈমানী দায়ভার হলো,মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত প্রতিটি আমানতকে সর্বপ্রকার খেয়ানত থেকে বাঁচানো। এটিই প্রকৃত ঈমানদারী। তাই জীবনের প্রতি পদে, প্রতিটি কর্মে, প্রতিটি যুদ্ধে এবং রাজনীতির প্রতিটি অঙ্গনে মুসলিম ও ইসলামের কল্যাণের বিষয়টিকে সবার শীর্ষে রাখতে হয়। এমন এক মহৎ লক্ষ্যের কারণেই প্রতিটি মুসলিম রাজনীতিবিদই ইসলামের মুজাহিদ;এবং তার প্রতিটি যুদ্ধই পবিত্র জিহাদ। সে জিহাদে নিহত হলে প্রত্যেকেই শহিদ। মু’মিনের চেতনার এ ভূমি কি তাই জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম বা সমাজবাদের ন্যায় মতবাদ দ্বারা অধিকৃত হতে পারে? হয়নি একাত্তরেও। মুক্তিযুদ্ধের পিছনে যে দর্শনটি কাজ করেছিল,মু’মিনের চেতনা-রাজ্যে প্রবেশের সে সামর্থ্য তার ছিল না।

একাত্তরের মুক্তি যুদ্ধের দর্শনগত ভিত্তি ছিল ইসলামের বদলে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ। এর রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রকে খণ্ডিত করে ইসলামে অঙ্গীকারশূণ্য সেক্যুলার বাংলাদেশ নির্মাণ। যুদ্ধটির প্রশিক্ষণ, অর্থ ও অস্ত্রের জোগানদার ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্তিপূজারী অধ্যুষিত ভারত। সে যুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছিল তাদেরকে ভারত যে শুধু আশ্রয় দিয়েছিল তাই নয়, তাদের রাজনৈতিক অভিভাবক রূপেও আবির্ভূত হয়েছিল। কাফেরদের রাজনীতির মূল এজেন্ডা তো ইসলাম ও মুসলিমের ক্ষতিসাধন। যেখানেই তারা মুসলিমের সামান্যতম স্বার্থ দেখে,তারা তার বিরোধীতা করে। ভারতীয় হিন্দুগণ তাই শুরু থেকেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিল। এবং কখনোই চায়নি দেশটি বেঁচে থাকুক। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারিরা মুসলিম-বিরোধী ভারতের কোলে গিয়ে উঠে। প্রশ্ন হলো, এমন একটি কাফের নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধে ও কাফেরদের নেতৃত্বে জান ও মালের বিনিয়োগ কি জায়েজ? মহান আল্লাহতায়ালা কি তাতে খুশি হন? একাত্তরে এ প্রশ্নটি ছিল প্রতিটি ঈমানদারের। এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার কঠোর হুশিয়ারিটি হলো, “মু’মিনগণ যেন মু’মিনগণ ব্যতীত কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে ব্যক্তি এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না…।”–(সুরা আল ইমরান,আয়াত ২৮)। পবিত্র কোরআনে আরো বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না…।”–(সুরা মুমতাহানা আয়াত ১)। একাত্তরে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করলেও তাদের কাছে মহান আল্লাহতায়ালার এ কঠোর নির্দেশনামা কোনরূপ গুরুত্বই পায়নি। বরং পবিত্র কোরআনের নির্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই ছিল তাদের রাজনীতি। ফলে ভারতীয় কর্তা ব্যক্তিদের নিছক বন্ধু রূপে নয়, প্রভু রূপে গ্রহণ করেছিল। এবং সেটি ছিল নিছক গদির লোভে। ইসলাম ও মুসলিমের স্বার্থ এখানে গুরুত্ব পায়নি। ইসলামী চেতনাধারির কাছে বিষয়টি এতোটাই দৃষ্টুকটু ও হারাম গণ্য হয়েছিল যে তাদের একজনও ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়নি, এবং ভারতের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অংশও নেয়নি। একাত্তরে সেটি ছিল চোখে পড়ার মত বিষয়।

 

জিহাদ বনাম মুক্তিযুদ্ধ

আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেরাও কখনো একাত্তরের যুদ্ধকে জিহাদ বলে দাবী করেনি। যারা নিজেদেরকে একাত্তরের চেতনার ঝান্ডাবাহি মনে করে, তারা আজও সেটি বলে না। বরং তাদের ভাষায় এ যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইসলামী চেতনা ও সে চেতনা-নির্ভর পাকিস্তানের ধ্বংস করে একটি সেক্যুলার বাংলাদেশ নির্মাণ। এটিকেই তারা একাত্তরের চেতনা বলে দাবী করে। এ বিষয়গুলি একাত্তরে ইসলামী দলগুলির নেতাকর্মী ও আলেমদের কাছে অজানা ছিল না। এমন যুদ্ধে একজন ঈমানদার ব্যক্তি তাই অংশ নেয় কি করে? কেনই বা বিনিয়োগ করবে তার মহামূল্য জীবন? মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া মহান আমানতটি একজন ঈমানদার তো একমাত্র সে যুদ্ধেই বিনিয়োগ করবে যে যুদ্ধটিকে শতকরা শত ভাগ বিশুদ্ধ জিহাদ এবং সংঘটিত হয় একটি মুসিলম দেশের প্রতিরক্ষায় এবং মুসলিম উম্মাহ শক্তিবৃদ্ধিতে। এ বিষয়গুলিকে সামনে রেখেই তৎকালীন নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি ও কিশোরগঞ্জের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আতাহার আলী এবং আরো বহু আলেম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়াকে হারাম বলেছেন। যুদ্ধকালীন ৯ মাসের পত্রিকাগুলো খুললে সে সময়ের প্রসিদ্ধ আলেমদের এরূপ অভিমত বহু নজরে পড়বে। তারা বরং জিহাদ বলেছেন পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে লড়াই করাকে। একাত্তরে চোখে পড়ার মত বিষয়টি হলো, কোন একজন বিজ্ঞ আলেমও পাকিস্তান ভাঙ্গাকে জায়েজ বলেননি। দেশের ধর্মপ্রাণ জনগণ আলেমদের সে অভিমতকেই গ্রহণ করে নেয়। তারই প্রমাণ, ইসলামী জ্ঞানশূণ্য ও ইসলাম প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারশূণ্য বহু আওয়ামী লীগ কর্মী, বামপন্থী ক্যাডার ও নাস্তিক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও কোন একজন আলেম, মাদ্রাসার কোন ছাত্র, পীরের কোন মুরিদ এবং ইসলামী দলের কোন নেতা বা কর্মী ভারতে যায়নি এবং মুক্তিযুদ্ধেও যোগ দেয়নি। তারা বরং রাজাকার হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধকে তাই বাঙালী-অবাঙালীর যুদ্ধ বলাটি নিরেট মিথ্যা। এটি ছিল একটি আদর্শিক সংঘাত। তাই জেনারেল মানেক শ’, জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং জেনারেল জ্যাকবের ন্যায় বহু হাজার ভারতীয় অমুসলিম অবাঙালী যেমন বাঙালী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে লড়েছে, তেমনি বহু হাজার বাঙালী পূর্ব পাকিস্তানীরাও লড়েছে পশ্চিম পাকিস্তানী পাঞ্জাবী, পাঠান ও বেলুচী মুসলিমদের সাথে। ভাষার বিভেদ ও আঞ্চলিকতা তাদের মাঝে কোন দেয়াল খাড়া করেনি। অথচ বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের রচনায় এ যু্দ্ধটিকে নিছক বাঙালীর বিরুদ্ধে পাঞ্জাবীর যুদ্ধ বলে রটনা করা হয়েছে। অথচ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুই শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও জেনারেল নিয়াজী –এ দুই জনের কেউই পাঞ্জাবী ছিলেন না, তারা ছিলেন পাঠান।

জিহাদ বলতে একমাত্র সে যুদ্ধকেই বুঝায় যা লড়া হয় একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার লক্ষ্যে এবং তাঁরই নির্দেশিত পথে। কোন দল, জাতি, বর্ণ, ভাষা বা ভূগোল ভিত্তিক স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে নয়। অর্থদান, শ্রমদান, প্রাণদান কোন জাতির ইতিহাসেই নতুন কিছু নয়। অসংখ্য যুদ্ধ যুগে যুগে কাফের, ফাসেক, মুনাফিকগণও লড়েছে। আজও লড়ছে। বিপুল অর্থ, শ্রম ও রক্ত তারাও ব্যয় করে। কিন্তু তাদের সে ত্যাগ ও কোরবানী হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথে। ফলে তা হলো আমানতের খেয়ানত। সেক্যুলার দলের হাতে তাই কোন দেশ অধিকৃত হলে সেখানে সে খেয়ানতটাই প্রচণ্ড ভাবে বাড়ে। তখন যুদ্ধ হয় এবং বিপুল অর্থ ও রক্তের ব্যয়ও হয়।কিন্তু সেগুলি হয় ভাষা, ভূগোল, দল, গোত্র, বর্ণ ও শ্রেণী স্বার্থের নামে। তাতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পায় না,আর ইসলাম প্রতিষ্ঠা না পেলে কি মুসলিমের কল্যাণ হয়? তাতে খুশি হন কি মহান আল্লাহতায়ালা? অধিকাংশ মুসলিম দেশে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হচ্ছে তো মূলত এপথে। আওয়ামী লীগও তেমনি নিজেদের গদীর স্বার্থে এবং সে সাথে ভারতকে খুশি করতে গিয়ে জাতিকে এক প্রচণ্ড খেয়ানতের দিকে ধাবিত করেছে। কথা হলো, মহান আল্লাহর দরবারে তাদের জবাবটি কি হবে?

 

আপোষে অনাগ্রহ

বাঙালী মুসলিমের বহু ব্যর্থতাই অতি প্রকট ভাবে ধরা পড়ে একাত্তরে। তবে মূল ব্যর্থতাটি ধরা পড়ে ইসলামী চেতনা ও প্যান-ইসলামীক ভাতৃত্ব নিয়ে বেড়ে না উঠায়। প্রকাশ পায় আপোষে অনাগ্রহ। বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ আজও সে রোগ থেকে মুক্তি পায়নি। বরং দিন দিন তা আরো প্রকটতর হয়েছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সেক্যুলারিস্টগণ জনগণ ভাষা ও অঞ্চলের পরিচয়কেও জীবনের বড় পরিচয় গণ্য করে। ছুঁড়ে ফেলে দেয় মুসলিম ভাতৃত্বের পরিচয়। অথচ ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা অঞ্চলের ভিত্তিতে যে বন্ধন গড়ে উঠে সেটি প্রাক-ইসলামিক নিরেট জাহেলিয়াত তথা অজ্ঞতা। ইসলামের আগমন ঘটে এমন জাহিলিয়াতকে নির্মূল করতে, পরিচর্যা দিতে নয়। প্রশ্ন হলো, ঈমানদারের জীবনে এমন জাহিলী পরিচয় গুরুত্ব পায় কি? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার সুস্পষ্ট নির্দেশটি হলো মু’মিনকে বাঁচতে হবে পরস্পরে ভাইয়ের পরিচয় নিয়ে, শত্রু রূপে নয়। ভাতৃসুলভ সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে ঈমান, ভাষাভিত্তিক বা অঞ্চলভিত্তিক বন্ধন নয়। ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ হতেই পারে। মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ হলো সেগুলো নিয়ে ইসলাহ বা আপোষ করা।

সভ্য দেশে হাজার হাজার বিবাদের প্রতিদিন মীমাংসা হয় কোনরূপ যুদ্ধ বা সংঘাত ছাড়াই। মুসলিমদেরও উচিত,মীমাংসার পথ খুঁজে বের করা এবং নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ পরিহার করা। এটি এক ঈমানী দায়ভার। এর মধ্যেই তো বুদ্ধিমত্ততা। মুসলিমদের মাঝে প্রতিটি যুদ্ধই ভাতৃঘাতি। এমন যুদ্ধ স্রেফ কাফের শত্রুদের কামনা হতে পারে, মুসলিমের নয়। মু’মিন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইদের সাথে শুধু নামাযে দাঁড়ায় না, সমস্যা দেখা দিলে অধীর আগ্রহ ভরে আপোষেও বসে। এমন রাজনীতি দেশে যুদ্ধের বদলে শান্তি ও উন্নয়ন আসে। সমস্যা দেখা দেয় তখন যখন মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন পালনে আগ্রহ লোপের সাথে সাথে মুসলিম ভাইয়ের সাথে বিবাদে মীমাংসার আগ্রহটিও লোপ পায়; এবং সে বিবাদকে অজুহাত বানিয়ে কাফেরদের নেতৃত্বে মুসলিম ভাইয়ের হত্যায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নামা হয়। আপোষে আগ্রহ লোপের কারণ, মহান আল্লাহতায়ালার ভয় না থাকা। মু’মিন তো সেই, যার মাঝে প্রতিক্ষণ কাজ করে মহান আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতা থেকে বাঁচার ভয়। সে ভয়ের কারণে মু’মিন ব্যক্তি যেখানেই মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশনা দেখে, অধীর আগ্রহে সেটিকেই আঁকড়ে ধরে। ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলারিস্টদের মনে সে ভয় থাকে না, ফলে আগ্রহ থাকে না ধর্মীয় বিধান পালনে। ফলে জনগণ যতই ইসলামশূণ্য হয়,সমাজ বা রাষ্ট্র ততই বিবাদপূর্ণ ও সংঘাতপূর্ণ হয়। সেটি যেমন ১৯৭১’য়ে পূর্ব পাকিস্তানে হয়েছিল, তেমনি একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশেও হচ্ছে। একই কারণে জাহিলিয়াত যুগের আরবদের মাঝেও লাগাতর কলহ-বিবাদ ও যুদ্ধ ছিল। অথচ মীমাংসার পথেই মহান আল্লাহতায়ালার বিশেষ রহমত আসে -পবিত্র কোরআনে যা বার বার বলা হয়েছে। নিজেদের বিবাদ নিজেরা না মিটিয়ে মুসলিম ভূমিতে অমুসলিমদের ডেকে এনে যুদ্ধ শুরু করা কোন মুসলিমের কাজ নয়। এটি তো শত্রুরা চায়। এ পথে আসে কঠিন আযাব। আসে অপমান। দুঃখজনক হলো, ইসলামী চেতনাশূণ্য আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব ও তার সঙ্গিগণ সজ্ঞানে আযাবের পথটিই বেছে নিয়েছিলেন। আপোষের পথটি ছেড়ে তারা ভারতীয় উস্কানিতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পথটি বেছে নেন। ২৩ শে মার্চের ঢাকা বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও জনাব ভূট্টো উভয়ই ৬ দফা মেনে নিয়েছিলেন।-(Sisson and Rose, 1990]। কিন্তু শেখ মুজিব নিজেই তার ৬ দফাকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছেন। ৬ দফার বদলে তিনি এমন দাবি পেশ করেন -যার উপর জনগণ থেকে তিনি সত্তরের নির্বাচনে কোনরূপ ম্যান্ডেট নেননি। তার এ নীতিহীনতায় দেশে শান্তি আসেনি, এসেছে যুদ্ধ। আর যুদ্ধ কোন দেশেই একাকী আসে না। সাথে আনে ধ্বংস ও মৃত্যু। এবং যুদ্ধ শেষ হলেও আযাব শেষ হয়না। বাংলাদেশে লাগাতর আযাব এসেছে দুর্ভিক্ষ, সন্ত্রাস, ভিক্ষার ঝুলির অপমান, স্বৈরাচারের দুঃশাসন ও সীমাহীন দূর্নীতি রূপে।সে সাথে এসেছে অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ময়দানে ভারতীয় অধিকৃতি।এবং সে অধিকৃতি থেকে বাংলাদেশের জনগণের আজও মুক্তি মিলেনি।

 

শূন্যতা ঈমানী বন্ধনের

মহান আল্লাহতায়ালা,চান মুসলিমগণ ভাতৃত্বের বন্ধনটি গড়ে তুলুক ঈমানের ভিত্তিতে; ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। একাত্তরে বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ সে ঈমানী বন্ধন সৃষ্টিত ব্যর্থ হয়েছে। তাদের কাছে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাটি গুরুত্ব পায়নি। বাঙালী জাতীয়তার নামে আওয়ামী লীগ ধরেছিল এমন এক পথ যা মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ নয়। সেটি ছিল জাহিলিয়াতের তথা ইসলামপূর্ব অজ্ঞতার পথ। বরং উনিশ শ’ সাতচল্লিশে যে চেতনায় অবাঙালীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলার মুসলিমগণ পাকিস্তান নির্মাণ করেছিল -সেটিই ছিল ইসলামী পথ। মুসলিম ভাতৃত্বের চেতনায় ইসলাম যে কতবড় নৈতিক বিপ্লব এনেছিল এবং ইস্পাতসম মজবুত দেয়াল গড়েছিল সে পরিচয়টি হযরত আবু বকর (রাঃ)পাওয়া যায় হযরত আবু বকর (রাঃ) এর উক্তি থেকে। ইসলাম গ্রহণের পর একবার’য়ের পুত্র তাঁকে বলেছিলেন,“আব্বাজান, বদরের যুদ্ধে আমি তিন বার আপনাকে আমার তরবারির সামনে পেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমার শ্রদ্ধেয় পিতা। শৈশবে আপনার কত স্নেহ-আদর পেয়েছি। সেটি প্রতিবার মনে পড়ায় আঘাত না করে প্রতিবারই সরে দাঁড়িয়েছি।” শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন, “পুত্র, যদি তোমাকে একটি বার তরবারির সামনে পেতাম, নিশ্চিত দুই টুকরা করে ফেলতাম।”

হযরত আবু ওবাইদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ) ছিলেন প্রসিদ্ধ সাহাবী। তিনি ছিলেন আশারায়ে মোবাশ্বেরা; অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বেই তিনি জান্নাতপ্রাপ্তির সুখবর শুনেছিলেন। নবীজী (সাঃ) তাঁকে “আমিন” উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর বিশ্বস্ততার প্রতীক। তাঁকে হযরত ওমর (রাঃ) সিরিয়া অভিযানে তাকে রোমান বাহিনী বিরুদ্ধে সেনাপতি রূপে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনিই ছিলেন সিরিয়ায় প্রথম মুসলিম গভর্নর। সে বিশাল সিরিয়া প্রদেশ ভেঙ্গে আজ  সিরিয়া, জর্দান, লেবানন, ইসরাইল ও ফিলিস্তিন –এ ৫টি দেশ। মৃত্যুর সময় হযরত ওমর (রাঃ) বলেছিলেন, আজ যদি আবু ওবাইদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ) জীবিত থাকতেন তবে তাঁকেই খলিফা নিযুক্ত করতাম। সে প্রসীদ্ধ সাহাবীর পিতা মুসলমান হননি। বরং বদর যুদ্ধে কাফের বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে মুসলমানদের নির্মূলকল্পে অস্ত্র ধরেছিলেন।  হযরত আবু ওবাইদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পিতাকে সে যুদ্ধে নিজ হাতে হত্যা করেছিলেন। ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি এর চেয়ে বিশ্বস্ততা আর কি হতে পারে? তাঁর এক ভাই বদরের যুদ্ধে বন্দী হয়েছিল।এক আনসারি তাকে রশি দিয়ে বাঁধছিলেন। হযরত আবু ওবাইদুল্লাহ (রাঃ) সে আনসারি সাহাবী বল্লেন, “ওকে শক্ত করে বাঁধ। তার মা অর্থশালী, অনেক মুক্তিপণ আদায় করতে পারবে।” তাঁর কথা শুনে তার ভাই বললো, তুমি আমার ভাই; আর তুমি এরূপ কথা বলছো?” হযরত আবু ওবাইদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “না, তুমি আমার ভাই নও; আমার ভাই তো ঐ আনসারি যে তোমাকে বাঁধছে।” ঈমানের বন্ধন বন্ধুত্ব ও শত্রুর সংজ্ঞাটি এভাবেই ভিন্নভাবে চিহ্নত করে।

যুদ্ধের ময়দানে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর নিজ কাফের পুত্রকে হত্যার যে অভিব্যক্তিটি প্রকাশ করেছেন এবং হযরত আবু ওবাইদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ) তাঁর নিজ কাফের পিতাকে যেরূপ হত্যা করেছেন -তা হলো সাচ্চা ঈমানদারী। সে ঈমানদারীতে কোন রূপ সংশয় বা অপূর্ণতা ছিল না। অপর দিকে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর পুত্র যা বলেছেন সেটি ছিল জাহেলিয়াত। জাহেল ব্যক্তি ভাষা, বর্ণ, ভৌগোলিকতা, পরিবার বা গোত্রের মধ্যে সম্পর্ক খোঁজে। জাতীয়তাবাদ তাই আধুনিক নয়, বরং অতি সনাতন জাহেলিয়াত। প্যান-ইসলামীক চেতনার বিরুদ্ধে এটি হলো মারাত্মক ব্যাধি। মুসলমান রাষ্ট্রগুলিতে বিভেদ ও ভাঙ্গন ছাড়া এটি আর কোন কল্যাণটি করেছে? যেখানে এরূপ জাতীয়তাবাদী জাহেলিয়াতের বিকাশ ঘটেছে সেখানেই একাত্তরের ন্যায় আত্মঘাতি রক্তপাতও ঘটেছে। এক রাষ্ট্র ভেঙ্গে জন্ম নিয়েছে বহু রাষ্ট্র। এ ভাবে মুসলিম বিশ্বজুড়ে বেড়েছে ক্ষুদ্রতা। ক্ষীণতর হয়েছে বিশ্বশক্তি রূপে মুসলমান উম্মাহর উত্থানের সম্ভাবনা। অপর দিকে যেখানেই ইসলামের মৌলিক শিক্ষার বিকাশ ঘটেছে সেখানেই বেড়েছে প্যান-ইসলামীক চেতনা। তখন নানা ভাষাভাষী মুসলমানের মাঝে একতাও গড়ে উঠেছে। ১৯৪৭-পূর্ব ভারতীয় মুসলিমেদের মাঝেও সেটিই হয়েছিল। ফলে বাঙালী, বিহারী, পাঞ্জাবী, সিন্ধি,বেলুচী, পাঠান, গুজরাতী -সবাই কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে এক রাষ্ট্রের নির্মাণও করেছে। বাঙালী মুসলিমগণ সেদিন ভারত থেকে আসা ভাইদের জন্য সর্বপ্রকার সহায়তা দিয়েছে। এমন ভ্রাতৃত্বের বন্ধন নামিয়ে আনে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত নিয়ামত।সে নিয়ামতের বরকতেই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় হিন্দু কংগ্রেসের যৌথ বিরোধীতার মুখে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। নইলে নিরস্ত্র ও পশ্চাদপদ মুসলমানদের পক্ষে কি সম্ভব হত সে রাষ্ট্রের নির্মাণ? সুলতান মুহম্মদ ঘোরির হাতে দিল্লি বিজয়ের পর উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা; এবং সবচেয়ে বড় বিজয়।

 

দায়ী কি স্রেফ পশ্চিম পাকিস্তানীরা?

পাকিস্তান গড়ার পিছনে উচ্চতর ভিশন ছিল। শুধুমাত্র উপমহাদেশের মুসলিমদের কল্যাণে নয়, দেশটির প্রতিষ্ঠা কালে গুরুত্ব পেয়েছিল সারা পৃথিবীর মজলুম মুসলিমদের স্বার্থ সংরক্ষণে শক্তিশালী ভূমিকা নেয়ার বিষয়টিও। কিন্তু সে ভূমিকা পালনে পাকিস্তান ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদের কি সাহায্য করবে, দেশটি নিজেই টিকে থাকতে পারেনি। পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ায় মৃত্যু ঘটেছে একটি বিশাল স্বপ্নের –যা দেখেছিল উপমহাদেশের মুসলিমগণ। তবে সে ব্যর্থতার জন্য কি শুধু পশ্চিম পাকিস্তানীগণ দায়ী? পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানী হওয়ায় সে ব্যর্থতার জন্য বেশী দায়ী হলো পূর্ব পাকিস্তানীরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে অনেকে পাকিস্তানের ক্রিকেট এবং হকির টিমে সংখ্যানুপাতিক হারে পূর্ব পাকিস্তানী খেলোয়াড় নেয়ার দাবী তুলেছে। কিন্তু সে জন্য যে ভাল খেলোয়াড় হওয়ারও প্রয়োজন রয়েছে -সে বিষয়টি ক’জন অনুভব করেছে? এরূপ ব্যর্থতা সর্বক্ষেত্রে। ঠিকমত খেলেনি কোন খেলাই। রাজনীতির ময়দানে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের সদস্যগণ তো সংসদের ভিতরে খুনোখুনিও করে বসে। নিহত হয় ডিপুটি স্পীকার শাহেদ আলী। পশ্চিম পাকিস্তানে তখন ৪টি প্রদেশ ছিল, কিন্তু কোন প্রদেশের সংসদে কি এমন খুনোখুনি হয়েছে?

বিবাদ ও বিভক্তির সূত্রগুলো খুঁজে খুঁজে বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ সেগুলিকে শুধু রাজনীতিতেই কাজে লাগায়নি, তা নিয়ে দাঙ্গাও সৃষ্টি করেছে। অবাঙালীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে ও তাদের বিনিয়োগে রোধে বাঙালী-অবাঙালী দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে আদমজী জুটমিলে। পুঁজি চায় শিল্পাঙ্গণে নিরাপত্তা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে পরিবেশও বিনষ্ট করেছে। ফলে পাকিস্তান সৃষ্টির সাথে সাথে যে গতিতে পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প কারখানার প্রতিষ্ঠা শুরু হয়েছিল সেটিও দ্রুত কমিয়ে দিতে সমর্থ হয়। অথচ দাঙ্গার সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র ছিল করাচি। সেখানে সিন্ধি, মোহাজির, পাঠান, পাঞ্জাবী, আফগান, বাঙালী –এরূপ নানা ভাষাভাষি বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাস। মুসলিম বিশ্বের আর কোন শহরে এতো ভিন্নতা নাই। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো কসমোপলিটন হওয়া, তথা নানা ভাষাভাষী মানুষের সাথে শান্তিপূর্ণ বসবাসে অভ্যস্থ হওয়া। বিভক্তির দেয়াল ভেঙ্গে একাকার হওয়াই তো মুসলিম সংস্কৃতি। কিন্তু বাঙালী মুসলিমগণ সে কসমোপলিটন মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারিনি, বরং গড়েছে বিভক্তির দেয়াল। ফলে বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে এক ভাষা ও এক বর্ণের ট্রাইবাল দেশ রূপে। ফলে কয়েক লক্ষ বিহারী বাংলাদেশে নিরাপত্তা পায়নি। প্রাণ বাঁচাতে এসেও বাংলাদেশের সীমান্তে প্রবেশাধিকার পায়নি প্রতিবেশী মজলুম রোহিঙ্গাগণ। তাদের নৌকাগুলোকে সাগরে ভেসে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এমন স্বার্থপর মানসিকতা কি মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য আনে? করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালা তো তাদেরই সাহায্য করেন যারা তাঁর বিপন্ন বান্দাদের সাহায্য করে। -(হাদীস)। আরো বিপদ হলো, এরূপ চেতনাগত ও চারিত্রিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের মাঝে আত্মচিন্তা বা আত্মসমালোচনাও নাই। বরং বিপুল আয়োজন সে রোগকে আরো তীব্রতর করায়। নিজ রোগ নিয়ে রোগীর নিজের ভাবনা না থাকলে সর্বশ্রষ্ঠ প্রেসক্রিপশনই বা কি কল্যাণ করতে পারে? অথচ সে প্রেসক্রিপশনটি তো সর্বরোগের মুক্তিদাতা মহান আল্লাহতায়ালার।

মানব-সন্তান উন্নত মানবতা পায় উন্নত দর্শনের গুণে;ভাষা বা জলবায়ুর গুণে নয়। দর্শনই দেয় চিন্তা, চেতনা ও চরিত্রে পরিশুদ্ধি। সে দর্শনটি তাই বিশুদ্ধ ও উন্নত হওয়া জরুরী। সমগ্র মানব ইতিহাসে মুসলিমগণ শ্রেষ্ঠ এজন্য যে তাদের হাতে রয়েছে শ্রেষ্ঠ জীবন দর্শন -যা এসেছে মহাজ্ঞানী মহান রাব্বুল আলামীন থেকে। কিন্তু ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সে শ্রেষ্ঠত্ব থাকে না। ইসলামের গৌরব যুগে মুসলিমগণ ইসলামী আদর্শ ও প্যান-ইসলামীক ভাতৃত্বের পথ ধরেই মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়েছিলেন এবং সেসাথে বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছিলেন; জাতীয়তা বা সেক্যুলারিজমের মাধ্যমে নয়। মুসলিমদের সে গৌরবময় অতীত ইতিহাস থেকে বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ কোন শিক্ষাই নেয়নি। মানব-ইতিহাসে সর্বপ্রথম যে মিশরীয়গণ কাগজ আবিষ্কার করেছিল,নবীজীর (সাঃ) জন্মের কয়েক হাজার বছর আগে যারা ভাষা ও ভাষালিপির জন্ম দিয়েছিল এবং পিরামিডের ন্যায় বিস্ময়কর ইমারত গড়েছিল -তারাও ইসলামের সন্ধান লাভের সাথে সাথে নিজ ভাষা,নিজ সংস্কৃতি ও নিজ সনাতন বিশ্বাসকে কবরস্থ করেছিল। মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান কোরআনী জ্ঞান থেকে সমৃদ্ধ হওয়ার স্বার্থে তারা আরবী ভাষাকে নিজেদের ভাষা রূপে গ্রহণ করেছিল। একই পথ ধরেছিল সুদান, লিবিয়া, আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মৌরতানিয়াসহ সমগ্র উত্তর আফ্রিকার জনগণ। সে আমলের মুসলিমগণ বিশ্বশক্তি ও বিশ্বসভ্যতা রূপে প্রতিষ্ঠা পায় তো এভাবেই। শত শত নদী যেমন সাগরে মিশে বিশালতা দেয়, মুসলিম উম্মাহও তেমনি নানা জনগোষ্ঠীর মিলনে বিশালতা পায়। ইসলামী উম্মাহর মূল দর্শন তো এটিই।

বিভক্তি ও ভাতৃঘাতী সংঘাতই আজকের মুসলিমদের প্রধানতম রোগ যা তাদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে এবং সামর্থ কেড়ে নিয়েছে মাথা তুলে দাঁড়ানোর। এক ভাষা, এক বর্ণ, এক ধর্ম ও এক অখণ্ড ভূগোল হওয়া সত্ত্বেও আরবগণ ২২ টুকরোয় বিভক্ত। তাতে বিশ কোটির বেশী আরব এতটাই শক্তিহীন হয়েছে যে অর্ধকোটি ইহুদী তাদের মাথার উপর বিজয়ী শক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শক্তি একতার মাঝে;পাকিস্তান আজও তার উত্তম দৃষ্টান্ত। একাত্তরে পাকিস্তান খণ্ডিত হলেও প্যান-ইসলামী চেতনার দিক দিয়ে অবশিষ্ঠ পাকিস্তান আজও সমগ্র মুসলিম বিশ্বে অনন্য। পৃথিবীর ৫৭টি মুসলিম দেশের মাঝে পাকিস্তানই সবচেয়ে শক্তশালী দেশ। কারণ, এটিই একমাত্র দেশ যেখানে পাঞ্জাব, সিন্ধু, খায়বর-পাখতুন’খা ও বেলুচিস্তান -এ চারটি প্রদেশের বিভিন্ন ভাষাভাষি ১৯ কোটি মানুষ এক অভিন্ন রাষ্ট্রের পতাকা তলে বসবাস করছে। অথচ পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশই আলাদা রাষ্ট্র নির্মাণের সামর্থ রাখে। আলাদা হলে প্রত্যেকটির আয়োতন বিশ্বের শতকরা ৭০ ভাগ রাষ্ট্রের আয়োতনের চেয়ে বড় হত। দেশটির ৪টি প্রদেশের মাঝে দু’টির আয়োতন বাংলাদেশের চেয়ে বড়। তারপরও তারা একতাবদ্ধ আছে। দেশটি তার জন্ম থেকেই ভারতীয়, রোহিঙ্গা, আফগানসহ নানা দেশের মুসলিমদের নিজ দেশের নাগরিক রূপে বরণ করে নিয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে ৩০ বছরেরও বেশীকাল ধরে পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল ৩০ লাখের অধীক আফগান মোহাজির। রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১০ বছরের লড়াইয়ে অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেছে পাকিস্তানের নাগরিকগণ।আফগানিস্তানের জিহাদে বহু হাজার পাকিস্তানী শহীদ হয়েছে।দেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হককেও প্রাণ দিতে হয়েছে। দেশটির সরকার ও নাগরিকগণ আজও  সহায়তা দিয়ে যাচেছ ভারতীয় অধিকৃতির বিরুদ্ধে। নানারূপ ব্যর্থতার পরও এটি কি কম অর্জন? অথচ বাংলাদেশে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ও বিহারী মোহাজির নিদারুন অবহেলা ও দুর্দশার শিকার।

 

প্রতিবন্ধকতা বুদ্ধিবৃত্তিতে

বাঙলী সেক্যুলারিস্টদের মূল রোগটি হলো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতার। এমন প্রতিবন্ধকতার কারণে লোপ পেয়েছে নিজেদের ব্যর্থতাগুলি নিয়ে চিন্তা ভাবনার সামর্থ। সে ব্যর্থতাগুলোকে স্বচোখে দেখেও তা নিয়ে তারা গর্ব করে। এজন্যই তাদের প্রচণ্ড গর্ব মুজিবের ন্যায় বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যর্থ ও অপরাধী ব্যক্তিকে নিয়ে। যে ব্যক্তির দুঃশাসন একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ উপহার দিল, নারীদের বাধ্য করলো জাল পড়তে,চাপিয়ে দিল একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার, হত্যা করলো ৩০ হাজারের বেশী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, দেশকে পরিণত করলো ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি -তাকেই তারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলে। বাংলার সমগ্র ইতিহাসে আর কোন শাসকের হাতে এতো বড় ভয়ানক দুর্যোগ কি কখনো এসেছে? একই রূপ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতার কারণে একাত্তরের ব্যর্থতাগুলোও এসব বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তদের নজরে পড়েনি। বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা তাদেরকে শুধু বিবেকহীনই করেনি, অতিশয় ভীরুও বানিয়েছে। ফলে কাশ্মীরে ভারতীয় জুলুমবাজীর বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ করতেও ভয় পায়। ভারতে শত শত মুসলমান খুন হয়,মহিলাগণ ধর্ষিতা হয় এবং ধর্ষণের পর আগুণে নিক্ষিপ্ত হয়।সে নৃশংসতার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রবল প্রতিবাদও হয়।কিন্তু নিরব থাকে বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্ট সরকার ও মিডিয়া। মিয়ানমারে নির্মূলের মুখে পড়েছে সেদেশের রোহিঙ্গা মুসলিমগণ। সে বর্বরতার বিরুদ্ধেও তারা নিরব। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশের মজলুমদের প্রতি এই কি দায়িত্বপালনের নমুনা? আগ্রহ যেন হাত পেতে স্রেফ নেয়ায়, দেয়াতে নয়। অথচ জুলুমের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদটি স্রেফ রাজনীতি নয়, এটি গভীর ঈমানী দায়বদ্ধতা। ব্যক্তির বিবেক সুস্থ ও ইসলামি জ্ঞানে পরিপুষ্ট হলে জুলুমের বিরুদ্ধে সে ব্যক্তি প্রতিবাদী হবেই। সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পূর্বে সমগ্র বিশ্বে উদ্বাস্তুদের সর্ববৃহৎ আবাসস্থল ছিল পাকিস্তান। (সূত্রঃ জাতিসংঘ রিপোর্ট)। বর্তমানে সেটি তুরস্ক। দেশটি প্রতিষ্ঠার পরপরই প্রায় ৭০ লাখ ভারতীয় আশ্রয় নিয়েছিল। আশীর দশকে আশ্রয় পেয়েছে ৩০ লাখ আফগানী। একাত্তরে বাঙালী-অবাঙালী রক্তাক্ষয়ী সংঘাতের পরও বহুলক্ষ বাঙালী আজ পাকিস্তানে বসবাস করছে। এসব বাঙালীদের অধিকাংশই পাকিস্তানে গেছে একাত্তরের পর। নানা ব্যর্থতার পরও প্যান-ইসলামীক চেতনা যে দেশটিতে এখনও বেঁচে আছে এ হলো তার নজির।

একাত্তর নিয়ে যেসব লেখালেখি হয়েছে তাতে বাঙালীর দুর্বলতাগুলো তুলে ধরা হয়নি। বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সেটি সম্ভবও নয়। ফলে এ হিসাব কখনই নেয়া হয়নি, বাঙালী মুসলিমগণ হাত পেতে বিশ্ব থেকে যতটা নিয়েছে, ততটা দিয়েছে কি? দিয়েছে কি এক কালের নিজ দেশ পাকিস্তানের শিল্প, বাণিজ্য, সাহিত্য, শিক্ষা ও প্রতিরক্ষার উন্নয়নে? এমন কি খেলাধুলায়? অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে তাদের দেয়ার দায়িত্বটাই কি অধিক ছিল না? তাদের থেকে সেটিই কি পাকিস্তানের পাওনা ছিল না? আদমজী, বাওয়ানী, দাউদ, ইস্পাহানীদের ন্যায় অবাঙালীরা এসে কেন পূর্ব পাকিস্তানে এসে শিল্পায়ন করবে? তারা তো ছিল সংখ্যালঘু। সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বপাকিস্তানীদের কি পুঁজি, যোগ্যতা ও কারগরি দক্ষতা নিয়ে পশ্চিম-পাকিস্তানী ভাইদের শিল্পায়নে এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল না? পশ্চিম পাকিস্তানী সৈনিকেরা এসে কেন চোরাকারবারীদের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সীমানা পাহারা দিবে? অথচ ২৩ বছরের পাকিস্তানী আমলে সেটাই হয়েছে। এমনকি চোরাকারবারি রোধে ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যর্থতা দেখে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন জিওসি জেনারেল ওমরাও খানের কাছে সীমান্ত পাহারায় সেনাবাহিনী নিয়োগের অনুরোধ করেছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান।-(আতাউর রহমান খান, ২০০০)। বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের মনে এসব ব্যর্থতা নিয়ে কখনো কি কোন আত্মজিজ্ঞাসা উদয় হয়েছে? নিজেদের ব্যর্থতার কারণ ও তার প্রতিকারের চেষ্টা না করে তারা বরং দুর্বলতা ও দোষ অন্বেষণ করেছে অন্যদের। আর এটিই হলো সকল যুগের সকল ব্যর্থ ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীর চিরাচরিত খাসলত। প্রো-এ্যাকটিভ না হয়ে তারা বরং রিয়াকটিভ হয়। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার মহলটি আজও সে অসুস্থ চেতনারই পরিচর্যা দিচ্ছে।

 

বিভক্তি যে কারণে অনিবার্য হলো

বাঙালী বুদ্ধিীজীবীদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবদ্ধকতার মূল কারণটি বাঙালী জাতিয়তাবাদ। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ব্যক্তির দেখবার ও ভাবনার ভূবনে বিভক্তির বিশাল দেয়াল খাড়া করে। সেটি ভাষা, ভূগোল ও বর্ণের ভিত্তিতে। বিবেকে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তখন দেয়ালের ওপারে অন্যদের যেমন দেখা যায় না, তেমনি তাদের নিয়ে ভাবাও যায় না। ফলে ভাববার ও দেখবার জগত তখন অতি সীমিত হয়ে যায়। মানব জীবনে এর চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবদ্ধকতা আর  কি হতে পারে? তাই বাঙালী জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিদের চেতনারাজ্যে বিহারীদের জন্য যেমন স্থান নেই, তেমনি স্থান নেই কাশ্মীরী ও রোহিঙ্গাদের জন্যও। স্থান নেই স্বদেশী ইসলামপন্থীদের জন্যও। এরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবদ্ধকতায় ডঃ শহিদুল্লাহ তৎকালীন বাঙালী মুসলিম বুদ্ধিজীবীগণ যে কতটা আক্রান্ত হয়েছিল তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জনাব থেকে। তিনি লিখেছেন,“আমরা হিন্দু মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙালী। এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালীত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে তা মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো টি নেই।” (বদরুদ্দীন উমর, ১৯৭০)। এই হলো, ডঃ শহীদুল্লার বুদ্ধিবৃত্তি ও ইসলামী জ্ঞানের দশা! তিনি ঈমানী পরিচয়ের চেয়ে বেশী সত্য বানিয়ে দিলেন বাঙালী পরিচয়কে! পৌত্তলিক হিন্দুদের ন্যায় প্রকৃতিকেও তিনি মা বলেছেন।তাহলে বংকিম চন্দ্রের বন্দেমাতরম বা মাতৃবন্দনা থেকে তার পার্থক্য কোথায়? প্রশ্ন হলো এটি কি ঈমানের পরিচয়? অথচ তিনি বাঙালী মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের শিরোমণি।

মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে ব্যক্তির দৈহিক গঠনে আঞ্চলিকতার প্রভাবের কি আদৌ গুরুত্ব আছে? আদৌ গুরুত্ব পায় কি তার বর্ণ ও ভাষাভিত্তিক পরিচয়? তা নিয়ে কি বড়াই করা চলে? সেখানে গুরুত্ব পায়তো ঈমানদারী ও নেক আমল। গুরুত্ব পায় কে কতটা সাচ্চা মুসলিম -সেটি। কোন ভাষার,কোন দেশের,কোন বর্ণের বা কোন আকৃতির -তা নিয়ে পরকালে কোন বিচার বসবে না। কথা হলো, আখেরাতে যার মূল্য নেই সেটি ইহকালেই বা গুরুত্ব পায় কি করে? ঈমানদার ব্যক্তি কেন তার নিজের সময়, সম্পদ ও মেধা সেটির পিছনে খরচ করবে? ভাষা বা বর্ণের পরিচয়টি তাই গুরুত্বের দিক দিয়ে প্রথম হয় কী করে? ঈমানদার তো বাঁচবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার লক্ষ্যে। ফলে মু’মিনের জীবনে তো সেটিই গুরুত্ব পায় যা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে গুরুত্ব রাখে এবং পরকালের মুক্তিতে যা অপরিহার্য। ঈমানদারীর অর্থ তো বাঁচবার প্রতি মুহুর্তে এবং জীবনের প্রতি কর্মে এরূপ পরকাল সচেতনতা। আর এর বিপরীতে যেটি, তা হলো ইহজাগতিকতা বা সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজমে ব্যক্তি ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতা গুরুত্ব পায় এবং গুরুত্ব হারায় ধর্মের প্রতি অঙ্গীকার।

বাংলাদেশের মুসলিম রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ যে কতটা বিভ্রান্ত এবং ইসলামের মৌল দর্শনে যে কতটা অজ্ঞ ও অঙ্গীকারশূন্য -বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের গুরুতুল্য ব্যক্তি জনাব ড.শহিদুল্লাহর উপরের উদ্ধৃতি হলো তারই সুস্পষ্ট নমুনা। ফলে কায়েদে আযম মোহম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর নিজ ভাষা, নিজ বর্ণ, নিজ মাজহাব ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে যেরূপ নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন, বাঙালী জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতা ও বুদ্ধিজীবীগণ তা পারেনি। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে পাকিস্তানকে গড়ে তোলার বৃহত্তর দায়িত্ব ছিল বাঙালীদের উপরই। অথচ তারা আত্মসমর্পণ করেছেন ভাষাভিত্তিক ক্ষুদ্রতা, বিদ্বেষ ও সংকীর্ণতার কাছে। পাকিস্তানের উন্নয়নে তারা কি দিয়েছ বা তাদের কি করণীয় -সেটি তাদের কাছে আদৌ গুরুত্ব পায়নি। বরং গুরুত্ব পেয়েছে কি পায়নি -তা নিয়ে। সমৃদ্ধ পাকিস্তান গড়তে ২৩ বছরে বাঙালীগণ কি দিয়েছে -তা নিয়ে কোন প্রশ্ন নাই। সে বিশলা ব্যর্থতা নিয়ে বাংলাদেশের মুসলিম বুদ্ধিজীবী মহলে সমান্যতম আত্মসমালোচনাও নেই। বরং আছে শুধু অন্যদের উপর দোষারোপ।

পাকিস্তানের মূল সমস্যাটি তাই ভৌগলিক ব্যবধান ছিল না। ভাষা, বর্ণ, খাদ্য, পোষাক-পরিচ্ছদের ভিন্নতাও নয়। বরং সেটি ছিল চেতনাগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক বৈষম্য ও অসমতা। চেতনাগণ সে ভিন্নতার কারণেই বাঙালী মুসলিমগণ অবাঙালী মুসলিমদের সাথে একাত্ম হতে পারিনি। ফল ছিটকে পড়েছে মুসলিম শক্তি রূপে বেড়ে উঠার নানা ভাষাভাষি মুসলিমের সম্মিলিত মিশন থেকে। খাদ্য, পোষাক-পরিচ্ছদ বা ভাষাগত ভিন্নতা কি ভারতে কম? বরং সেটি বিশাল। ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব প্রান্তের দ্বীপটি থেকে পশ্চিম প্রান্তের দ্বীপের দূরত্ব ঢাকা-লাহোরের দূরত্বের চেয়েও অধিক। পাঞ্জাব থেকে বাংলাদেশের দূরত্বের চেয়েও অধিক হলো ভারতের পূর্ব সীমান্তের অরুনাচল প্রদেশ থেকে গুজরাটের দূরত্ব। ভারতে বিস্তর ভেদাভেদ ভাষার ক্ষেত্রেও। কিন্তু সে জন্য কি প্রশাসনে কোন অসুবিধা হচ্ছে? বাঙালীর ১৯০ বছরের রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল ইংল্যান্ডের সাথে। তাতেও কি প্রশাসনে কোন সমস্যা দেখা দিয়েছে? তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, শক্তিশালী মুসলিম শক্তি রূপে বেড়ে উঠার বিকল্প কি ক্ষুদ্রতর ও দুর্বলতর বাংলাদেশ? ক্ষুদ্রতর হওয়ার পথ বেছে নেয়ায় ভারতকে খুশি করা যায়, তা নিয়ে মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারীকেও ক্ষমতায় বসানো যায়। কিন্তু সে পথে কি মহান আল্লাহতায়াকেও খুশি করা যায়? তিনি তো চান মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য। বিভক্তি ও ক্ষুদ্রতার মাঝে যে মহান আল্লাহতায়ার ভয়ানক আযাব –সেটি তো মহান আল্লাহতায়ার হুশিয়ারি। (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৫ দ্রষ্টব্য)।

প্রশ্ন হলো, নিছক অবাঙালী হওয়ার কারণে কোন মুসলিম ব্যক্তি কি মুসলমানের দুশমন হতে পারে? দুশমন হওয়ার জন্য কি ভাষা বা বর্ণই মূল? স্বভাষী, স্বদেশী, এমনকি প্রতিবেশীও তো পরম দুশমন হতে পারে। নবীজীকে (সাঃ)কে যারা হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল তারা শুধু আরবই ছিল না, বরং ছিল তাঁর নিকটতম আত্মীয়, স্বগোত্রীয় এবং অতি নিকটতম প্রতিবেশী। অথচ নবীজী(সাঃ)র সাহায্যে যারা অর্থ ও নিজ প্রাণসহ সর্বস্ব দানে এগিয়ে এসেছিলেন তারা ছিলেন দূরবর্তী মদিনার মানুষ। তাঁর পাশে প্রাণপণে দাঁড়িয়েছিলেন রোমের শোহাইব, আফ্রিকার বেলাল এবং ইরানের সালমান। এটিই ইসলামের বিশ্বভাতৃত্ব। কিন্তু ভাষা, বর্ণ বা অঞ্চলভিত্তিক সংকীর্ণতা নিয়ে কি অতি কাছের ভিন্ ভাষী মুসলিমদের সাথেও একত্রে রাজনীতির সামর্থ্য আসে? ঘরের পাশে বসবাসকারি নিরপরাধ বিহারী ব্যক্তিটিও তখন শত্রু ও হত্যাযোগ্য বিবেচিত হয়। একাত্তরে সে অপরাধে বহু লক্ষ বিহারী মুসলিমের শুধু ঘরবাড়িই কেড়ে নেয়া হয়নি, বহু হাজার বিহারীর প্রাণও কেড়ে নেয়া হয়েছে। বহু অবাঙালী নারীর সম্ভ্রমও কেড়ে নেয়া হয়েছে। একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার মূল কারণটি তাই বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের এরূপ চেতনাগত প্রতিবদ্ধকতা এবং সে সাথে অবাঙালী বিরোধী ভয়ানক অপরাধ-প্রবনতা।তা থেকেই জন্ম নেয় চরম পাকিস্তান বৈরী মনোভাব। ৬ দফা মেনে নিয়েও তাই অখণ্ড পাকিস্তান বাঁচানো যায়নি। পাকিস্তানের বিভক্তি ও একাত্তরের বিপর্যয় বুঝতে হলে বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের এ বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।

 

গ্রন্থপঞ্জি

  • বদরুদ্দীন উমর,১৯৭০;পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, মাওলা ব্রাদার্স, বাংলা বাজার, ঢাকা-১।
  • Sisson, Richard and Leo Rose (1990): War and Secession: Pakistan, India and the Creation of Bangladesh, University of California; Berkeley.



অধ্যায় এগারো: পাকিস্তানের ব্যর্থতা ও বাঙালীর হিস্যা

বাঙালীর ব্যর্থতা

এ নিয়ে দ্বিমত নেই, পাকিস্তান বহু ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়ছে। কিন্তু সে ব্যর্থতার জন্য দায়ী কি শুধু পশ্চিম পাকিস্তানীরা? তাতে পূর্ব পাকিস্তানীদের হিস্যা কতটুকু? দেশের সাফল্যের ন্যায় ব্যর্থতার দায়ভারও তো জনগণের। অথচ বাঙালীদের মাঝে প্রবল প্রবনতাটি হলো, পাকিস্তানের সকল ব্যর্থতার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানীদের ঘাড়ে দোষ চাপানো। নিজেদের ব্যর্থতা দিকে তারা নজর দিতে রাজী নয়। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬% ভাগ ছিল পূর্ব পাকিস্তানী। ফলে নানারূপ ব্যর্থতা থেকে দেশকে বাঁচানোর সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানীদের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সমগ্র পাকিস্তানের শিক্ষা, শিল্প, কৃষি, বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের অগ্রগতিতে সংখ্যার অনুপাতে অংশ নেয়া দূরে থাক, এমনকি নিজ প্রদেশের নিজস্ব রাজনীতিতেও তারা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানের মত পূর্ব পাকিস্তানে চারটি প্রদেশ ছিল না। নানা ভাষা, নানা অঞ্চল ও নানা বর্ণের বিভক্তিও ছিল না। কিন্তু যেটি ছিল তা হলো ক্ষমতালোভীদের আত্মঘাতি রাজনীতি। আর রাজনীতিতে আত্মঘাত থাকলে সে দেশের ধ্বংসে কি বিদেশী শত্রুর প্রয়োজন পড়ে? সে আত্মঘাতি রাজনীতির কারণে বাঙালী পূর্ব পাকিস্তানীগণ নিজেদের ঘর গোছাতেই চরম ভাবে ব্যর্থ হয়। ফলে পশ্চিম পাকিস্তান যেখানে কৃষি, শিল্প ও শিক্ষায় দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে, পূর্ব পাকিস্তান সেখানে আত্মঘাতি রাজনীতির গভীরে লাগাতর ডুবতে থাকে। বড় কিছু করা দূরে থাক, খেলাধুলার ন্যায় হালকা বিষয়েও তারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পিছিয়ে পড়তে থাকে। বিপদের আরো কারণ, সে বিশাল বিশাল ব্যর্থতা ও আত্মঘাতি রাজনীতি নিয়ে বাঙালী রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে কোন আত্মজিজ্ঞাসা বা আত্মসমালোচনাও হয় নাই। নিজেদের ত্রুটিগুলোর দিকে নজর না দিয়ে তাদের প্রধান কাজটি হয় অবাঙালীদের ত্রুটি তালাশ।

পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতাদের স্বার্থপরতা ও বালখিল্যতার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন আওয়ীম লীগ, শেরে বাংলার কৃষক শ্রমিক প্রজা পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি, গণতন্ত্রি দল ও খেলাফতে রাব্বানী পার্টি ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তভাবে নির্বাচন করে। নির্বাচনে তারা ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাজিত করে বিপুল ভাবে বিজয় লাভ করে। ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৮টি আসন তারা লাভ করে। কিন্তু বিজয়ের পর পরই নেতারা লিপ্ত হয় আত্মঘাতি লড়াইয়ে। অঙ্গদলগুলি একে অপরের শত্রু মনে করতে থাকে। প্রত্যেক দলই চেষ্টা করে, অপরদলের নেতাদের কিভাবে ক্ষমতার মঞ্চ থেকে দূরে রাখা যায়। যুক্তফ্রন্টের পার্লামেন্টারী নেতা ছিলেন শেরে বাংলা। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে তাকেই সরকার গঠন করতে বলা হয়। ১৯৫৪ সালের ২রা এপ্রিল তিনি প্রথম মন্ত্রীসভা গঠন করেন মাত্র তিনজন মন্ত্রী নিয়ে। বাদ দিয়েছিলেন যুক্তফ্রন্টের প্রধান শরিক দল সোহরাওয়ার্দী ও ভাষানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগকে। তিনজন মন্ত্রীর মধ্যে একজন ছিল তার ভাগিনেয় সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া। এটি কি কম স্বজনপ্রীতি? সরকার গঠনের প্রায় দেড় মাস পর ১৫ই মে তিনি মন্ত্রীসভায় আওয়ামী লীগের সদস্যদের শামীল করেন। এরপর শেরে বাংলার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনে আওয়ামী লীগ। এরপর শেরে বাংলাকেও সরতে হয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হন শেরে বাংলার দল থেকেই জনাব আবু হোসেন সরকার। ১৯৫৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর তাঁকেও যেতে হয়। ক্ষমতায় আসেন আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান খান। তার ভাগ্যেও সরকারে থাকা বেশী দিন সম্ভব হয়নি। তাকে সরিয়ে ১৯৫৮ সালের ১৯শে জুন আবার ক্ষমতায় আসেন আবুল হোসেন সরকার। এবার তিন দিন পর ২২ জুন তারিখে আবার তাঁকেও সরতে হয়। -(সা’দ আহম্মদ, ২০০৬)।

এভাবে পূর্ব পাকিস্তানীরা সমগ্র পাকিস্তানের কি নেতৃত্ব দিবে, দারুন ভাবে ব্যর্থ হয় নিজ প্রদেশের রাজনীতিতে। ঘন ঘন সরকার গঠন ও ভাঙ্গা দেখে ভারতীয় নেতারা তখন ব্যঙ্গ করে বলতো,ভারতীয় রমনীরা যে রূপ শাড়ী বদল করে ঢাকায় তেমন সরকার বদল হয়। যুক্তফ্রন্টের অঙ্গদলগুলির মাঝে সংঘাত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে প্রাদেশিক পরিষদের মধ্যেই তারা খুনোখুনী করে। পরিষদের ডিপুটি স্পীকার জনাব শাহেদ আলীর মাথায় গুরুতর ভাবে আঘাত করে। পরে তিনি হাসপাতালে মারা যান। স্পীকারের অনুপস্থিতিতে সেদিন তিনিই সভাপতিত্ব করছিলেন। উল্লেখ্য, সেদিন প্রাদেশিক সংসদের সে খুনোখুনির জলসায় কোন অবাঙালী ছিল না, কোন পশ্চিম পাকিস্তানী বা পাঞ্জাবী আমলা বা সেনাকর্মকর্তাও ছিল না। এ খুনোখুনির কাণ্ডটি ঘটেছিল প্রকৃত অর্থেই সম্পূর্ণ বাঙালী ঘটনা, যা ঘটে বাঙালী সদস্যদের হাতে। যেহেতু বাঙালীর সকল দূর্ভোগের জন্য পাঞ্জাবীদের দায়ী করা হয়, এ বিষয়টি এজন্যই লক্ষ্য করার মত। আরো দুঃখজনক হলো, এ হত্যকাণ্ডটি ঘটেছিল প্রকাশ্য দীবালোকে, অথচ তার কোন বিচার বিভাগীয় তদন্ত সে সময়ের যুক্তফ্রন্ট সরকার করেনি। ফলে এ গুরুতর অপরাধের জন্য কারো কোন শাস্তি হয়নি, কাউকে গ্রেফতারও করা হয়নি। সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সঠিক সাক্ষী দেয়ার জন্যও কোন ব্যক্তি এগিয়ে আসেননি। অথচ কোন সভ্য দেশে মানুষ খুন হবে এবং তার বিচার হবে না -সেটি কি আশা করা যায়? এ নীতি তো জঙ্গলবাসী ডাকাতদের। আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা দেশটিকে যে কতটা মগের মুল্লুকে পরিণত করেছিল -এ হলো তার নমুনা।

 

কালিমা লেপনের রাজনীতি

অতি উদ্ভট ও লজ্জাজনক বিষয়, পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে প্রাদেশিক পরিষদের স্পীকারকে পাগল রূপে ঘোষণা দিয়েছিল। যেন ভোট দিয়ে একজন মানুষকে পাগলও বানানো যায়! এই হলো তাদের সংসদীয় গণতন্ত্র। পাকিস্তানের গণতন্ত্র চর্চা তাদের কাছে যে কতটা তামাশায় পরিণত হয়েছিল -এ হলো তার নমুনা। সত্তরের দশকে শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ একই ভাবে কালিমা লেপন করেছিল বাংলাদেশের মুখে। বহু দলীয় পার্লামেন্টারী পদ্ধতির ওয়াদা দিয়ে নির্বাচন করে কয়েক মিনিটের মধ্যে একদলীয় প্রেসেডেন্ট পদ্ধতি চালু করে। এ নিয়ে সংসদে আলোচনা করার প্রয়োজনও বোধ করেনি। এরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা জনগণ থেকে ম্যান্ডেট নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। দেশ পরিচালনায় এতোটাই অযোগ্যতার পরিচয় দেয় যে, দেশের জন্য অর্জন করে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির খেতাব।

পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী নাগরিকগণ দেখেছে, অনেক অবাঙালী তাদের পুঁজি ও মেধা বিনিয়োগ করছে পূর্ব পাকিস্তানে। কিন্তু নিজেরা পশ্চিম পাকিস্তানে একখানি কারখানাও নির্মাণ করেনি। নিজেদের সীমানাও যথাযথ পাহারা দিতে পারেনি। সে ব্যর্থতার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত সেদিন পরিণত হয়েছিল চোরাকারবারীদের স্বর্গরাজ্য। কি প্রশাসন, কি রাজনীতি, কি পার্লামেন্টারী বিতর্ক, কি সীমান্ত প্রতিরক্ষা, কি শিল্পায়ন – সব কিছুতে বাঙালীর ব্যর্থতা শুধু একাত্তর-পরবর্তী বিষয়ই নয়,ষোল কলায় বিকশিত হয়েছিল পাকিস্তানী আমলেও। সব সময়ই সকল ব্যর্থতার দায়ভার অন্যদের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্ঠা হয়েছে সর্বাত্মক ভাবে। পাকিস্তান আমলে প্রচণ্ড অহংকার চেপেছিল এ নিয়ে, সমগ্র পাকিস্তানে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ রূপে তাদের দায়ভার যে অন্য সবার চেয়ে বেশী -সে বিষয়টি তাদের রাজনীতিতে গুরুত্বই পায়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে তো যোগ্যতা লাগে না, কিন্তু যোগ্যতা লাগে দায়িত্ব পালনে। একটি ট্রেনের অর্ধেক বগি যদি সামনে ছুটে আর অর্ধেক যদি পিছনের দিকে ধেয়ে যায়,সে ট্রেন তো দুই টুকরো হবেই। পশ্চিম পাকিস্তানীদের তাড়না ছিল দ্রুত পারমানবিক অস্ত্রের অধিকারী হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম দেশে পরিণত হওয়ায়। আর বাংলাদেশীগণ ছুটেছে ভারতের আঁচলের নীচে থেকে দ্রুত তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি বা দুর্নীতিতে বিশ্বে অন্ততঃ ৫ বার প্রথম হওয়ায়। অতিশয় রুঢ় ও অপ্রিয় হলেও এটিই যে সত্য -তার প্রমাণ তো ইতিহাস।

শুরু থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে যে ব্যর্থতাটি প্রকট ভাবে দেখা দেয় তা হলো, একটি শাসনতন্ত্র তৈরীর ব্যর্থতা। অবশেষে সে কাজে সফলতা আসে ১৯৫৬ সালে। সেটি অবাঙালী প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে। অথচ সে সময়ও আওয়ামী লীগের ভূমিকা আদৌ সহায়ক ছিল না। সে সময়ের আওয়ামী লীগ নেতা জনাব অলি আহাদ তার বই “জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫” তে লিখেছেন, “১৯৫৬ সালে প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী  মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে পাকিস্তান মুসলিম লীগ, শেরে বংলা এ,কে,ফজলুল হকের নেতৃত্বে পরিচালিত যুক্তফ্রন্টভুক্ত কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ (আব্দুস সালাম খান পরিচালিত),সিডিউল কাষ্ট ফেডারেশন, পাকিস্তান কংগ্রেস, ইউনাইটেড প্রোগেসিভ পার্টি ও গণতন্ত্রী দলভুক্ত সদস্যবৃন্দের সমবেত ভোটে সংবিধান গৃহীত হয়। কিন্তু জনাব সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পরিচালিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সদস্যবৃন্দ প্রতিবাদে গণ-পরিষদ হল হতে “ওয়াক আউট করে ও চূড়ান্তভাবে গৃহীত শাসনতন্ত্রে স্বাক্ষরদানে বিরত থাকে।” -(অলি আহাদ)। স্বাক্ষর না করার কারণ,পূর্ব পাকিস্তানকে পর্যাপ্ত স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়নি। অথচ এই সোহরাওয়ার্দীই যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন তখন সে কথা সম্পূর্ণ ভূলে যান। ১৯৫৭ সালের ১৪ই জুন ঢাকার পল্টনে অনুষ্ঠিত জনসভায় দৃপ্তকন্ঠে ঘোষণা করেন, ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পূর্ব পাকিস্তানকে ৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে। আর তাঁর গণতান্ত্রিক মানসিকতার কথা? আওয়ামী লীগে তখন চরম অভ্যন্তরীণ বিরোধ। জনাব সোহরাওয়ার্দী তখনও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব ভাষানীর সাথে তাঁর বিরোধ তখন তুঙ্গে। বিষয়, পররাষ্ট্র নীতিসহ আরো বেশ কিছু বিষয়। মন্ত্রীত্ব বনাম এসব সাংগাঠনিক মতবিরোধ সম্পর্কে জনৈক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জনাব সোহরাওয়ার্দী বলেন, “আওয়ামী লীগ আবার কি? আমিই আওয়ামী লীগ।” অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বিস্ময়করভাবে অবলীলাক্রমে বলেন, “আমিই আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টো।”-(অলি আহাদ)।

                                                                                   

আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা

রাজনীতি ও গণতন্ত্র চর্চায় আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার শুরু স্রেফ মুজিব আমল থেকে নয়। বরং বহু পূর্ব থেকেই। ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে আওয়ামী লীগের বড্ড অহংকার। কিন্তু সেটি কি আদৌ সত্য? আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকেই কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৪৭ সালের ৫ই আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী পার্টি বৈঠকে খাজা নাজিমুদ্দীন ৭৫-৩৯ ভোটে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পরাজিত করে পার্লামেন্টারী পার্টির নেতা নির্বাচিত হন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী এ পরাজয় সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেননি। সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের পক্ষ থেকে প্রচার চালানো হয়, এটি ষড়যন্ত্র। তিনি ও তাঁর সদস্যগণ নিজ দলের গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতিও যে কতটা গোস্বা হয়েছিল এ হলো তার নমুনা। মনের দুঃখে প্রথমে তিনি ভারতে থেকে যাওয়ার মনস্থ্য করেন। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে তিন কোন স্থান পাননি। পরে পাকিস্তানে আসেন, তবে ঢাকাতে নয়। তিনি কোলকাতা থেকে সরাসরি লাহোর অভিমুখে রওনা দেন। কথা হলো, গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাহীন এমন নেতাদের হাতে কি গণতন্ত্র চর্চা নিরাপদ হয়? গণতন্ত্রের রায়কে তারা তখনই মানতে রাজী,যখন সেটি নিজেদের পক্ষে যায়। জনাব সোহরাওয়ার্দীর মাঝে সেরূপ অসুস্থ চেতনার উদাহরণও কি কম? ১৯৫৩ সালে গভর্নর জেনারেল গোলাম মহাম্মদ যখন জনাব খাজা নাজিম উদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে বরখাস্ত করেন তখন তার সে অগণতান্ত্রিক, অন্যায় ও অবৈধ পদক্ষেপকে জনাব সোহরাওয়ার্দী পল্টনে জনসভা ডেকে সমর্থন জানান। অথচ তখন দেশের গণপরিষদে জনাব নাজিম উদ্দিনের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন ছিল। বরখাস্ত করার আগে জনাব গোলাম মুহম্মদ প্রধানমন্ত্রী জনাব নাজিম উদ্দিনকে সংসদে সেটি প্রমাণেরও সুযোগ দেননি। লক্ষ্যণীয় হলো, জনাব সোহরাওয়ার্দীই পাকিস্তানের রাজনীতিতে মুজিবের ন্যায় পাকিস্তানের আজন্ম শত্রুদের পুনর্বাসিত করেন।

দেখা যাক, পাকিস্তানী আমলে শেখ মুজিবের গণতন্ত্র চর্চার নমুনা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হয়। যুক্তফ্রন্টের শরীক দল ছিল আওয়ামী লীগ। ১৯৫৬’য়ের সেপ্টম্বরে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক মন্ত্রীসভার মন্ত্রী হন। তখন প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আতাউর রহমান খান। শেখ মুজিব তখন আওয়ামী লীগেরও সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৫ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অধিবেশনে গৃহীত গঠনতন্ত্রের ৬৬ ধারা মোতাবেক শেখ মুজিবের উপর অবশ্য পালনীয় ছিল যে মন্ত্রী হওয়ার সাথে সাথে দলীয় পদ থেকে ইস্তাফা দিবেন। উক্ত ধারায় সুস্পষ্ট ছিল যে, অন্যথায় এক মাস পরে উক্ত কর্মকর্তার পদ শূন্য বলে গণ্য হবে। দলের অন্যান্য মন্ত্রী যেমন আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহম্মদ ও খয়রাত হোসেন দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করলেও মুজিব তা করেননি। -(অলি আহাদ)।

মানুষের আসল চরিত্র ধরা পড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে তার আচরণে। এমন কি অতিশয় দুর্বৃত্তরাও দুর্বৃত্তির বিশাল কাণ্ডটি জনসম্মুখে ঘটায় না। কারো বাড়ীতে আগুন লাগা দেখে অতি ডাকাত প্রকৃতির ব্যক্তিও মহল্লার অন্যদের সাথে মিলে সেটি নেভাতে যায়। কারণ এটি বিশাল ব্যাপার। এ কাজে এগিয়ে না আসলে তার বিবেকহীন পশু চরিত্রটি জনসম্মুখে প্রকাশ পায়। সমাজে কেউ কি এরূপ বিবেকহীন রূপে চিত্রিত হতে চায়? কিন্তু খুঁটিনাটি বিষয়ে দুর্বৃত্তরা ততটা সতর্ক থাকে না বলেই তাদের আসল চরিত্র ক্ষুদ্র বিষয়ে বেরিয়ে আসে। তাই ব্যক্তির গুনাগুণ যাচায়ে উত্তম উপায় হলো মামুলী বিষয়ে তার আচরণটি দেখা। যারা বড় মাপের নেতা, তাদের পক্ষে মাঠ পর্যায়ে নেমে কর্মীদেরকে পয়সা দিয়ে নিজের নামে প্লাকার্ড লিখতে বলার সময় হয় না। এমন কাজে তাদের রুচীও থাকে না। কিন্তু শেখ মুজিব এমন তুচ্ছ কাজেও ময়দানে নেমেছেন। সে কাজে ঢাকা থেকে ভৈরবের ন্যায় মফস্বলের শহরে ছুটে গেছেন। তার উদাহরণ দেয়া যাক। আগারতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী ও শেখ মুজিবের অতি ভক্ত আব্দুর রউফ তার বইতে লিখেছেন,“১৯৫০ সালে আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা শেখ মুজিবর রহমানের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ভৈরবে। আমি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। আওয়ামী লীগের জনসভা উপলক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে তখন ভৈরবে। ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা আসবেন। তাই আমরা সবাই একই সাথে প্রচুর উৎসাহ আর দারুণ উদ্বেগের মধ্যে কাজ করে চলেছি। কলেজ হোস্টেলে হলো আমাদের কাজের প্রধান কেন্দ্র। একদিন পোস্টার লেখা, প্লাকার্ড বানানো আর অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনার মুহুর্তে এক দীর্ঘাদেহী সুদর্শন যুবক ঢুকলেন রুমে। … মুজিব ভাইকে কাছে পেয়ে আমাদের সকলের কাজের উৎসাহ কয়েকগুণ বেড়ে গেল। ..যাওয়ার সময় ছাত্রকর্মী হায়দারের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, “তোরা কিছু খেয়ে নিস”। ..যেতে যেতে তিনি হেসে আমাদেরকে বললেন,“তোরা এতো পোস্টার-প্লাকার্ড বানাচ্ছিস, তোদের মুজিব ভাইয়ের নামে কি একটাও করবি না।” ইঙ্গিতেই কাজ হয়েছিল। জনসভার দিন দেখা গেল মওলানা ভাষানীর নামে প্লাকার্ড ছিল, শেখ মুজিবের নামে তার থেকে কম ছিল না, জিন্দাবাদ ধ্বনিও তার নামে কম দেয়া হয়নি।”-(আব্দুর রউফ, ১৯৯২)। এই হলো মুজিবের চরিত্র। নিজের ইমেজ তৈরীতে মেধা নয়, যোগ্যতাও নয়, এরূপ নীচু মানের সস্তা পথ বেছে নিয়েছিলেন।

 

পণ্ড হলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শেষ সুযোগ

শেখ মুজিব ও ভাষানীর ন্যায় ব্যক্তিদের আত্মঘাতি রাজনীতিই সামরিক শাসন দ্বিতীয়বার ডেকে এনেছিল ১৯৬৯ সালে। সে সময় শাসন ক্ষমতায় ছিল আইয়ুব খান। তাঁর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের উভয় প্রদেশে শুরু হয় চরম গণ-আন্দোলন। আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান সর্বদলীয় গোলটেবিল বৈঠক ডাকেন। তখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হত ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের ভোটে। আইয়ুব খান এর নাম দিয়েছিলেন মৌলিক গণতন্ত্র। সম্মিলিত বিরোধী দলের দাবী ছিল, সকল প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার এবং পার্লামেন্টারী পদ্ধতির শাসন। আইয়ুব খান এ দুটি দাবী মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব দাবী করে বসলেন,৬ দফাও মেনে নিতে হবে। নির্বাচনে যাওয়ার ধৈর্য্য তাঁর ছিল না। অথচ ৬ দফা নিয়ে বিরোধী দলগুলি মধ্যে ঐকমত্য ছিল না। ফলে আইয়ুব খানেরও সেটি মেনে নেয়ায় আগ্রহ ছিল না। ফলে সৃষ্টি হলো চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থা। অথচ মুজিব জেল থেকে মুক্তি পেলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তুলে নেয়া হয়েছিল সম্মিলিত বিরোধীদলের জোট পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক মুভমেন্ট (PDM)এবং DAC আন্দোলনের প্রেক্ষিতে। নইলে শেখ মুজিবসহ বহু আওয়ামী লীগ নেতা তখন জেলে ছিলেন। তখন আওয়ামী লীগের একার পক্ষে তেমন জোরদার অন্দোলন গড়ে তোলাও সম্ভব ছিল না। অথচ আওয়ামী লীগ সম্মিলিত বিরোধী দলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে পিছন থেকে চাকু ডুকিয়ে দেয়। পরের বছরেই প্রমাণ হলো, পাকিস্তানের জন্য এটিই ছিল গনতন্ত্রের শেষ ট্রেন। মুজিবের কারণে সেটিও হাতছাড়া হয়ে যায়। দেশ আবার নিক্ষিপ্ত হলো অস্থিতিশীল অবস্থায়। এমন অবস্থায় একমাত্র বিদেশী শত্রুরাই খুশি হয়। আর পাকিস্তানের জন্য এমন শত্রুর অভাব ছিল না। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট এবং ইসরাইল তেমন একটি অবস্থার জন্য পূর্ব থেকেই অপেক্ষায় ছিল। আইয়ুব চলে গেলেন কিন্তু জাতি ব্যর্থ হলো শান্তিপূর্ণ ভাবে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যেতে। ক্ষমতায় এলো আরেক সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ফলে পরের দিনগুলি আরো রক্তাত্ব হলো। তাই এ করুণ পরিণতির জন্য শুধু কি সামরিক বাহিনীকে দায়ী করা যায়?

 

ভাষানীর আত্মঘাতি রাজনীতি

সত্তরের নির্বাচনে মাওলানা ভাষানী ও তার দল চীনপন্থী ন্যাপ অংশ নেয়নি। তাতে তার নিজের দলের যেমন কল্যাণ হয়নি, তেমনি কল্যাণ হয়নি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেরও। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নির্বাচনের অংশ না নিলে কি দলের অস্তিত্ব থাকে? পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে শেখ মুজিবের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন ভাষানী। ভাষানীই ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ নেতাদের সাথে বনিবনা না হওয়ায় তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়েন। সোহরাওয়ার্দী পরে ভারত থেকে এসে দলটিতে যোগ দেন। পররাষ্ট্র নীতি ও স্বায়ত্বশাসন নিয়ে সোহরাওয়ার্দীর সাথে মাওলানা ভাষানীর বিরোধ শুরু হয় ও পরে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গড়ে তোলেন। দলটির নেতাকর্মীদের অনেকে প্রকাশ্যে ন্যাপ করলেও গোপনে কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সম্পর্ক খারাপ হয় ১৯৬২ সাল থেকে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছিল ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তান ভারতকে সহায়তা দিক –বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে মধ্য দিয়ে ভারতের উত্তরপূর্ব চীন সীমান্তে সৈন্য সমাবেশে। চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের খাতিরে আইয়ুব খান চীনাপন্থী কম্যুনিস্টদের উপর থেকে হুলিয়া তুলে নেন। এবং যারা জেলে ছিল তাদেরকে মুক্তি দেন। প্রতিদানে মাওলানা ভাষানী ১৯৬৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুবের প্রতিদ্বন্দী সর্বদলীয় বিরোধীদলীয় প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারনা থেকে দূরে থাকেন। আন্তর্জাতিক স্নায়ুযুদ্ধ এভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিকে দারুন ভাবে প্রভাবিত করে। সত্তরের নির্বাচন কালে দলটি প্রধান পাঁচটি উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বৃহত্তম উপদলটি ছিল দলটির সেক্রেটারি ছিলেন নোয়াখালীর মহম্মদ তোহা ও যশোরের আব্দুল হকের। নির্বাচন নিয়ে চীনপন্থী কম্যুনিস্টদের কোনরূপ আগ্রহই ছিল না, তাদের অনেকেই মার্কসবাদী লেলিনবাদী সন্ত্রাসের পথ ধরে। বিভক্ত দল নিয়ে নির্বাচনী বিজয়ে কোন সম্ভাবনা না দেখে মাওলানা ভাষানী নির্বাচনই বয়কট করেন। দাবী তুলেন, ভোটের আগে ভাত চাই। শুরু করেন “জ্বালাও পোড়াও”‘য়ের আন্দোলন। তার এরূপ অগণতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রচণ্ড লাভবান হয় শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ। শেখ মুজিবের যা জনপ্রিয়তা ছিল নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তার চেয়ে অনেক বেশী সিট অর্জন করে। ফলে দেশের রাজনীতি পুরাপুরি হাইজ্যাক হয়ে যায় শেখ মুজিবের হাতে। একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির ব্যাপারেও ন্যাপ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। দলের প্রবীন নেতা রংপুরের মশিউর রহমান যাদু মিয়া এবং যশোরের আব্দুল হক অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নেন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকে তারা এলাকায় ভারতীয় সাম্রাজ্যের বিস্তার বলে আখ্যায়ীত করে। নোয়াখালীর মহম্মদ তোয়াহার ন্যায় অনেকেই আবার পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেন। তবে নির্বাচন থেকে দূরে থাকায় একাত্তরে যুদ্ধ শুরুর আগে বা পরে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাওলানা ভাষানীর তেমন গুরুত্ব থাকেনি। একাত্তরে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন, এবং সাথে সাথে গৃহবন্দির শিকার হন। একাত্তরের পর দেশে ফিরেও তিনি তার ভাঙ্গা দলকে আর জোড়া লাগাতে পারেনি। ফলে তার মৃত্যুর আগেই তার রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটে। তার জীবদ্দশাতেই ন্যাপের নেতাকর্মীগণ তাকে ছেড়ে দলে দলে জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি’তে যোগ দেয়। কাজী জাফেরের ন্যায় অনেকে স্বৈরাচারী এরশাদের দলেও যোগ দেয়। রাশাদ খান মেননে ন্যায় অনেক আবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে মিশে গেছে।

 

শেরে বাংলার বিভ্রাট

দেখা যাক,তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের নীতি ভ্রষ্টতার আরো কিছু বিষয়। শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক ১৯৫৪ সালের ৩০শে এপ্রিল তারিখে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী থাকা কালে কলকাতায় এক সংবর্ধনা সভায় অত্যন্ত আবেগজড়িত বলেন, “রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশকে বিভক্ত করা যেতে পারে, কিন্তু বাঙালীর শিক্ষা, সংস্কৃতি আর বাঙালিত্বকে কোন শক্তিই কোনদিন ভাগ করতে পারবে না।”-(সা’দ আহম্মদ, ২০০৬)। তিনিই ভুলেই গেলেন, ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোরের মিন্টো পার্কে মুসলিম লীগের সম্মেলনে তিনিই পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। তখন পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে কায়েদে আযমের মূল যু্‌ক্তিটি হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের রাজনৈতিক বিবাদ ছিল না, বরং সেটি ছিল দুটি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক, আদর্শিক, শিক্ষাগত ও জীবনলক্ষ্যের ভিন্নতা। বাঙালী রূপে বেড়ে উঠার বিষয়টিই মুসলমানদের জীবনে মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নয়, বরং তাদের রাজনীতির মূল এজেন্ডা হলো নিজ দেশে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার বিষয়টি নিশ্চিত করা। আম গাছের জলবায়ুগত প্রয়োজনটি আঙ্গুর গাছ থেকে ভিন্নতর, তেমনি একজন মুসলমানের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত পরিবেশটি একজন অমুসলিম থেকে ভিন্নতর। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনটি দেখা দিয়েছিল এ ভিন্নতর প্রয়োজনটি মেটাতে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পিছনে এটিই ছিল মূল দর্শন বা ফিলোসফিকাল কনসেপ্ট। এ বিষয়টিই কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহ তার বক্তৃতায় বার বার তুলে ধরেছিলেন। ভারতীয় মুসলিমদের সে ধর্মীয় ও আদর্শগত প্রয়োজনটি মেটানোর তাগিদেই পাকিস্তানের জন্ম হয়। ভারতের সাধারণ মুসলিমগণ কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহর সে যুক্তিটি বুঝলেও শেরে বাংলা যে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন -সেটি ধরা পড়ে তার বক্তৃতায়। প্রশ্ন হলো, এমন বিভ্রান্তিকর চেতনা নিয়ে কি তিনি ইসলামের নামে অর্জিত পাকিস্তানের ন্যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের নেতা হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন? এমন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়ার জন্যই পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাঁর স্থান অতি সংকীর্ণ হয়ে যায়। কলিকাতায় দেয়া তাঁর ভাষণের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের এক সময়ের বাঙালী প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ আলী বোগড়া পর্যন্ত তাঁকে ভারতের দালাল বলেছেন। এরূপ বিভ্রান্তিকর চেতনার কারণে তাঁকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো এমনকি অনেক বাঙালী মুসলিম নেতাও বিপদজনক মনে করতেন। ফল দাঁড়ালো, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল তাঁকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করলেন। তবে শেরে বাংলা ফজলুল হকের বিভ্রান্তি শুধু কলকাতায় দেয়া বক্তব্যেই সীমিত ছিল না। এর পূর্বেও তিনি অতি বিভ্রান্তিকর চেতনার স্বাক্ষর রেখেছিলেন মুসলিম বিদ্বেষী চরম হিন্দু সাম্প্রদায়িক দল হিন্দু মহাসভার সাথে স্বাধীনতা-উত্তর অবিভক্ত বাংলার কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। তখন তিনি কোমর বেঁধে লেগেছিলেন, মুসলিম লীগকে ক্ষমতায় যাওয়া থেকে ঠ্যাকাতে।

 

সোহরাওয়ার্দীর অভিনব তত্ত্ব

দেখা যাক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কুশলতা ও মুসলিম প্রীতির নমুনা। ১৯৫৬ সালে যখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী; তখন ইসরাইল, বৃটেন ও ফ্রান্স একযোগে মিশরের উপর হামালা করে। হামলার কারণ, মিশর সরকার সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেছিল। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব সে হামলার নিন্দা করে। নিন্দা করে এমনকি তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশ। প্রবল ভাবে নিন্দা করে ভারত। এমনকি সে যুদ্ধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিনীদের চাপেই অবশেষে সে যুদ্ধ থেমে যায়। হামলাকারি ইসরাইল, ব্রিটেন ও ফ্রান্স তখন লেজগুটিয়ে সুয়েজ খাল এলাকা থেকে পালাতে বাধ্য হয়। মিশরের সরকার ও জনগণ অধীর আগ্রহে তাকিয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের দিকে। অথচ সে সময় আওয়ামী লীগ নেতা ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর সিদ্ধান্তটি ছিল সম্পূর্ণ কাণ্ডজ্ঞানবর্জিত। তিনি সে আগ্রাসনের নিন্দা না করে বলেছিলেন, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মোকাবিলার শক্তি মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর নাই। তখন তিনি অভিনব সূত্র শুনান, “শূণ্যের সাথে শূণ্যের যোগে শূণ্যই হয়।” এভাবে তিনি রাজনীতিতে পাটিগণিতের যোগবিয়োগের অংক নিয়ে আসেন। অথচ মুসলমান যত দুর্বলই হোক তাদের মধ্যে একতা গড়া ও একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া নিছক রাজনীতি নয়, পাটিগণিতের অংকও নয়, এটি পবিত্র ইবাদত। সে লক্ষ্যে কাজ করা প্রতিটি মুসলমানের উপর নামায-রোযার ন্যায় ফরয। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর চেতনায় তার লেশ মাত্র ছিল না। সাম্রাজ্যবাদীদের হামলার নিন্দা করার জন্য যে ন্যূনতম মূল্যবোধ দরকার সেটুকুও তিনি দেখাতে পারেননি। তাঁর এ নীতির ফলেই আরব বিশ্বের সাথে বিশেষ করে মিশরের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের দারুন অবনতি ঘটে। আজও সে অবনতি কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি। দেশটি এরপর থেকে ভারতমুখি হয়। আওয়ামী লীগের আত্মঘাতি রাজনীতির পাশাপাশি ব্যর্থ পররাষ্ট্র নীতির এ হলো এক নমুনা।

 

গণতন্ত্র বিনাশে আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগের গণতন্ত্র-প্রীতি নিয়ে আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৫৪ সালের কথা । মোহাম্মদ আলী বোগড়া তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রেসিডেন্ট না বলে ব্রিটিশ আমলের খেতাব অনুযায়ী গভর্নর জেনারেল বলা হত। পার্লামেন্টকে বলা হত গণপরিষদ। গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা ছিল তিনি ইচ্ছা করলে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিতে পারতেন। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বোগড়া গভর্নর জেনারেলের এ ক্ষমতা রহিত করে গণপরিষদে একটি বিল আনেন। বিল চূড়ান্ত বিবেচনার জন্য গণপরিষদে পেশ করার পর প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোটে গণপরিষদে সেটি পাশও হতে যাচ্ছিল। পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তখন গভর্নর জেনারেল ছিলেন প্রাক্তন আমলা জনাব গোলাম মোহম্মদ। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে গভর্নর জেনারেল এ বিল আইনে পরিণত হওয়ার আগেই ২৩শে অক্টোবর গণপরিষদই ভেঙ্গে দেন।

তখন গোলাম মহম্মদকে সহয়তা দেন সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল আইউব খান। পাকিস্তানী গণতন্ত্র চর্চার বিরুদ্ধে এটি ছিল গুরুতর ছুরিকাঘাত। এরপর গণতন্ত্রচর্চা পাকিস্তানে তার হৃত স্বাস্থ্য আর ফিরে পায়নি। সে সময় গণপরিষদের মূল দায়িত্বটি ছিল শাসনতন্ত্র প্রণয়ন। এটিই ছিল পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদ। কিন্তু সে কাজটি সমাধা করার সময় পায়নি। তখন পাকিস্তানের গণপরিষদের স্পীকার ছিলেন ফরিদপুরের মৌলবী তমিজ উদ্দীন খান। তিনি আদালতে গভর্নর জেনারেলের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সে  মামলায় সিন্ধুর হাইকোর্টে তিনি জিতলেও সুপ্রিম কোর্টে হেরে যান। সুপ্রিম কোর্টের এ রায়টি পাকিস্তানের বিচার-ইতিহাসে আজও বিতর্কিত। কিন্তু গভর্নরের সে অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের প্রতি অতি দ্রুত সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আসে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। তখন দলটির নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। “দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক ওসমানী করাচি থেকে এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক শাখার সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান ঢাকা হতে প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে গভর্নর জেনারেলের অগণতান্ত্রিক কাজকে সমর্থণ করেন। শেখ মুজিব তখন জেলে, তিনি তখন দলের পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটির সেক্রেটারি। ঢাকার সেন্ট্রাল জেল থেকে শেখ মুজিব টেলিগ্রাম যোগে পাকিস্তান গণপরিষদের অন্যায় ও অবৈধ বিলুপ্তিকে স্বাগত জানান। এমনকি গোলাম মোহাম্মদের এই বিধি বহির্ভূত অন্যায় ফরমানের পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষে আতাউর রহমান ঢাকা থেকে এবং মাহমুদুল হক ওসমানি করাচি থেকে বিদেশে অবস্থানরত শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও লন্ডনে অবস্থানরত মওলানা ভাসানীর সমীপে গমন করেন।…. ১৪ই নভেম্বর গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের ঢাকা আগমন উপলক্ষে পদচ্যুত মুখ্যমন্ত্রী ও রাজনীতি হতে অবসর গ্রহণের সুস্পষ্ট ঘোষণাকারী শেরে বাংলা এ,কে,ফজলুল হক ও জনাব আতাউর রহমান খান ঢাকা বিমান বন্দরে স্বৈরাচারী গভর্নর জেনারেলকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপনের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলেন। বিমান বন্দরে তাঁহাকে কে মাল্যভূষিত করবেন এই সমস্যায় জর্জরিত দুই নেতাকে উদ্ধার করলেন গভর্নর জেনারেল স্বয়ং। অর্থাৎ তিনি শেরে বাংলা ও আতাউর রহমান খানের দুই হাত একত্রিত করিয়া যুগপাৎ মাল্যদানের সুযোগ করিয়া দিয়া উভয়েরই ধন্যবাদার্হ হইলেন।”-(অলি আহাদ)

গ্রন্থপঞ্জি

  • সা’দ আহম্মদ।আমার দেখা সমাজ রাজনীতির তিনকাল (বৃটিশভারত,পাকিস্তান বাংলাদেশ),ঢাকা:খোশরোজ কিতাব মহল,২০০
  • অলি আহাদ।জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫,ঢাকা:বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিমিটেড।
  • আব্দুর রউফ।আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আমার নাবিক জীবন,ঢাকা:প্যাপিরাস প্রকাশনী, ১৯৯২।

 

 




অধ্যায় বারো: পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা এবং বাঙালী মুসলিমের লাভ-লোকসান

বৈষম্যের শুরুটি শতবছর আগে

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের মাঝে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প ও বুদ্ধিবৃত্তির ন্যায় নানা ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভাবে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়েছিল বাঙালী মুসলিমগণ। দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, বিহার -এসব প্রদেশে মুসলিমদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৫ বা ২০ ভাগের বেশী ছিল না। কিন্তু তারা শিক্ষাদীক্ষায় হিন্দুদের চেয়েও অগ্রসর ছিল। এলাহাবাদ, পাটনা, দিল্লি, বোম্বাইয়ের আদালতগুলোতে অনেক প্রতিষ্ঠিত মুসলিম আইনজ্ঞ ছিলেন। সেরূপ অবস্থা কলকাতায় ছিল না। মুষ্টিমেয় যে ক’জন বাঙালী মুসলিম লেখাপড়া শিখেছিল তাদের পক্ষে প্রতিবেশী অগ্রসর হিন্দুদের সাথে প্রতিযোগীতা করে চাকরিতে প্রবেশ করা এতোটা সহজ ছিল না। সহজ ছিল না শিল্প বা ব্যবসা-বাণিজ্যে সামনে এগুনো। পূর্ব থেকে প্রতিষ্ঠিত হিন্দুরা তাদের জন্য সামান্যতম স্থানও ছেড়ে দিতে রাজী ছিল না। চিত্তরঞ্জন দাশ একবার চাকরিতে মুসলমানদের জন্য সংখ্যানুপাতে বরাদ্দের কথা বলেছিলেন, কিন্তু বর্ণহিন্দুগণ সে প্রস্তাব তৎক্ষণাৎ নাকোচ করে দেয়। আজকের ভারতে আজও তারা দিচ্ছে না। ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ১৫ ভাগ হলে কি হবে, সরকারি চাকরিতে শতকরা ৩ ভাগও তারা নয়। ফলে ভারতের মুসলমানগণ আজ সে দেশের নমশুদ্র বা হরিজনদের থেকেও পশ্চাদপদ। সে ঘোষণাটি এসেছে সাবেক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কর্তৃক স্থাপিত সাচার কমিশনের রিপোর্টে।

বাঙলার মুসলিমদের পিছিয়ে পড়ার কিছু ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের শুরু বাংলা থেকেই। সেটি ১৭৫৭ সালে। অপর দিকে দিল্লি ও তার আশে পাশের উত্তর ভারত পরাধীন হয় ১৮৫৭ সালে অর্থাৎ বাংলার পরাধীন হওয়ার ১০০ বছর পর। পরাধীনতার এই একশ’ বছরে বাংলার মুসলমানগণ শুধু পিছিয়েছে, এগুনোর সুযোগ পায়নি। কারণ, তাদেরকে এগুনোর সুযোগ না দেয়াই সে সময়ের ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের পলিসি ছিল। তারা বরং সুযোগ করে দিয়েছিল হিন্দুদের। ভারতের উপর ব্রিটিশ অধিকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে লোকবলের প্রয়োজন ছিল। তারা সে লোকবল সংগ্রহ করেছে হিন্দুদের থেকে। মুসলিম শাসকদের থেকে সাম্রাজ্য কেড়ে নেয়ার কারণে মুসলিমগণ ব্রিটিশদের শত্রু মনে করতো,তাদের ন্যায় আগ্রাসী কাফের শক্তিকে সহায়তা দেয়াকে তারা শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম মনে করেছে।তেমনি ব্রিটিশেরাও শত্রু ভাবতো মুসলিমদের। মুসলিমগণ ব্রিটিশ স্বার্থের হেফাজতে কাজ করবে -সেটি বোধগম্য কারণেই তারা বিশ্বাস করেনি। ফলে উভয়ের মাঝে সহযোগিতার মানসিক প্রেক্ষাপট ছিল না। কিন্তু হিন্দুদের ক্ষেত্রে সেটি ছিল অর্থ ও প্রতিপত্তি লাভের সুযোগ। হিন্দুদের খুশি করে দলে রাখার জন্য ব্রিটিশ শাসকেরা মুসলিমদের থেকে জমি ছিনিয়ে হিন্দুদের জমিদার বানানো শুরু করে। মুসলিমদের সর্বক্ষেত্রে দাবিয়ে রাখার জন্য হিন্দু জমিদারগণ ব্যবহৃত হয় ব্রিটিশের লাঠিয়াল রূপে। শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিমদের অনগ্রসর রাখার জন্য মকতব-মাদ্রাসার নামে পূর্ব থেকে বরাদ্দকৃত খাজনামুক্ত জমিও ছিনিয়ে নেয়া হয়। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ম্যাক্সমুলারের মতে ইংরেজদের হাতে বাংলা অধিকৃত হওয়ার আগে বাংলার বুকে ৪০ হাজারের বেশী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু সেগুলির হাত থেকে বরাদ্দকৃত জমি কেড়ে নেওয়ায় সবগুলিই  বিলুপ্ত হয়ে যায়। ব্রিটিশের আগমনের আগে রাষ্ট্র ভাষা ও মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তির ভাষা ছিল ফার্সি। ফার্সি ভাষার বদলে ইংরেজী ভাষা চালু হওয়ায় শুরু হয় মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক অপুষ্টি। এভাবে মুসলিম সমাজে দ্রুত বৃদ্ধি পায় নিরক্ষরতার সাথে অশিক্ষা।

বাংলার মুসলিমদের ঘাড়ে ছিল গোলামী ও শোষণের দুটো জোয়াল। একটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের। অপরটি অত্যাচারি হিন্দু জমিদারদের। বাংলার মুসলিমগণ গোলামীর প্রথম ১০০ বছর যাবত স্রেফ দ্রুত নীচে নেমেছে। দিল্লি ও উত্তর ভারতের মুসলিমদের সৌভাগ্য যে সে সময় ব্রিটিশের গোলামী মুক্ত থাকার কারণে অন্তত সে ১০০ বছর যাবত নীচে নামার বিপর্যয় থেকে তারা রক্ষা পায়। অতি ধীরে হলেও শিক্ষা-দীক্ষায় সামনে এগুনোর ধারা তখনও তারা জারি রাখে। দিল্লি, লক্ষৌ, আগ্রা, লাহোর ও অন্যান্য উত্তর ভারতীয় জনপদ যখন স্বাধীনতা হারায় তখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে। ব্রিটিশগণ তখন বুঝতে পারে একমাত্র হিন্দুদের উপর নির্ভরশীল হওয়াটি তাদের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে হিন্দুদের হাতে পুরাপুরি জিম্মি হওয়া থেকে বাঁচার গরজেই মুসলিমদের থেকেও তারা লোক নিয়োগ শুরু করে। এজন্য মুসলিমদের শিক্ষিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। বাংলা পরাধীন হওয়ার ১০০ বছর পর তারা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করে ১৮৫৭ সালে। অথচ দিল্লি কবজা করার মাত্র ২১ বছর পরই মুসলমানদের জন্য আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের অনুমতি দেয়। গুণগত মান দিয়ে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্ব্রিজ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকদের ডেপুটেশনে এখানে নিয়োগ দেয়া হত। ফলে উত্তর ভারতের মুসলিমগণ দ্রুত সামনে এগুনোর সুযোগ পায়। সুযোগ পায় ব্রিটিশ প্রশাসনের বড় বড় পদে প্রবেশের। ১৮৬০ সালে লাহোরে প্রতিষ্ঠিত হয় কিং এডওয়ার্ড মিডিক্যাল কলেজ এবং ১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে। তাছাড়া বাংলার যে অংশ নিয়ে পাকিস্তান গড়া হয় সেটি ছিল বাংলার সবচেয়ে অনুন্নত এলাকা। এ এলাকাটি ব্যবহৃত হতো কলকাতা কেন্দ্রীক পশ্চিম বাংলার কাঁচামালের জোগানদার রূপে। ফলে ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন দেশটির যাত্রাই শুরু হয় একশত বছরের ব্রিটিশ শোষনের ফলে সৃষ্ট পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মাঝে বিশাল বৈষম্য নিয়ে। সেটি যেমন শিক্ষাখাতে,তেমনি অর্থনীতিতে। কারণ শিক্ষাগত উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন তো একত্রে চলে। অথচ এ বৈষম্যের জন্য বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাগণ ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ও হিন্দু জমিদারদের শোষণকে দায়ী না করে পাকিস্তানকে দোষারোপ করতে শুরু করে।

 

মাউন্টব্যাটেনের গ্রামীন বস্তি

উত্তর ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত এলাকার উপর ঔপনিবেশিক শাসন শুরুর শত বছর আগেই নির্মম ঔপনিবেশিক শোষণে বাংলার উপর দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ নেমে আসে।সে দুর্ভিক্ষে প্রায় এক তৃতীয়াংশ বাঙালীর মৃত্যু ঘটে।বাঙালী জনগণ তখন অর্থনৈতিক রক্তশূণ্যতায় নির্জীব।বিশেষ করে বাংলার মুসলিম জনগণ।ব্রিটিশ শাসনের ১৯০ বছরে যা কিছু শিল্পোন্নয়ন ও শিক্ষাউন্নয়ন হয় -সেটি কলকাতা ও তার আশেপাশে।পূর্ব পাকিস্তান ভূক্ত পূর্ব বাংলায় নয়।পূর্ব বাংলার মূল অর্থকরি ফসল ছিল পাট।কিন্তু পূর্ব বাংলায় কোন পাটকল ছিল না।এমন কি ছিল না কোন হাইড্রোলিক জুট প্রসেসিং কারখানা।সকল পাটকল ও পাট প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রী ছিল কলকাতায়।ফলে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানের সমুদয় পাট কলকাতায় মারোয়ারিদের কাছে পাঠাতে হত।এবং তাদের মাধ্যমেই পাকিস্তানের পাটজাত দ্রব্য আন্তর্জাতিক বাজারে যেত।ফলে পাটের সমুদয় রপ্তানি আয় নির্ভর করতো ভারতের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর।তখন অবস্থা কতটা নাজুক ছিল সেটি বুঝার জন্য এটিই যথেষ্ট যে,ভারতীয় বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের প্রধান পাকিস্তানী দলের প্রধানকে একবার দম্ভভরে বলেছিলেন,“ভারতের কাছে বিক্রয় ছাড়া পাট নিয়ে আপনারা আর কি করতে পারেন? পুড়িয়ে দিতে পারেন,অথবা বঙ্গোপসাগরে ফেলতে পারেন।” –(C. M. Ali, 1967)।উল্লেখ্য যে,পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার সে দৈন্যদশা থাকেনি।কয়েক বছরের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠা পায় বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ পাটকল;সে সাথে ষাটের বেশী বড় বড় পাটকল।দেশটি পাটজাত দ্র্রব্য রপ্তানিতে ভারতকে ছাড়িয়ে শীর্ষস্থান দখল করে।

কংগ্রেসের ন্যায় ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীও ভারত বিভাগ ও পাকিস্তান সৃষ্টি পুরাপুরি বিরোধী ছিল।ব্রিটিশগণ যখন দেখলো পাকিস্তান মেনে না নেলে তাদের পক্ষে ভারত থেকে নিরাপদে দেশে ফেরা অসম্ভব,তখন তারা আরেক ফন্দি আঁটে।কায়েদে আযমকে জানিয়ে দেয়,ভারত ভাগ হলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ও পাঞ্জাবকেও ভাগ করা হবে।কায়েদে আযম সেটি ভাবতেও পারেননি।কারণ,বাংলা ভাগ হলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পূর্ব বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠি অর্থাৎ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ।লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ভাষায় পূর্ববাংলা ছিল “The most useless part, a rural slum”। তিনি কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহকে বলেন,পূর্ব বাংলা হবে পাকিস্তানের জন্য বোঝা। অতএব জিন্নাহর কাছে যুক্তি পেশ করেন,বাংলার বিভক্তি এড়াতে হলে ভারত বিভক্তি ও পাকিস্তানের দাবী ছাড়তে হবে।–(Viceroy’s Ninth Miscellaneous Meeting, 1947 )। তখন বাংলার গভর্নর ছিলেন R G Casey। মাউন্টব্যাটেনের ন্যায় তিনিও একই যুক্তি পেশ করেন বাংলার মুসলিম লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দীর ও অন্যান্যদের কাছে। তাদেরকে তিনি পাকিস্তানের দাবী ছেড়ে অখণ্ড ভারতের পক্ষ নিতে পরামর্শ দেন।–(Transfer of Power, London, 1970)। বাংলার বিভক্তি যে পূর্ব বাংলার জন্য বিপদজনক সেটি কারো কাছেই কোন দুর্বোধ্য বিষয় ছিল না।বিভক্তি এড়াতে বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী কংগ্রেসের প্রাদেশিক সভাপতি শরৎ বোসের সাথে মিলে স্বাধীন অবিভক্ত বাংলার প্রস্তাব রাখেন।কিন্তু ভারতীয় কংগ্রেস নেতা গান্ধি ও নেহেরু সেটিরও বিরোধীতা করেন।

 

খুলে যায় নতুন দিগন্ত

পাকিস্তান সৃষ্টির সাথে সাথে পূর্ব বাংলার দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তানদের সামনে খুলে যায় সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। সামনে এগুনোর জন্য তারা পায় প্রতিযোগিতা-মুক্ত এক বিশাল খালী জায়গা। শুরু হয় বাংলার সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী সোসাল মবিলিটি। বিশাল বটবৃক্ষের পাশে ছোট গাছ বাড়তে পারে না। এ জন্য চাই আলাদা পরিচর্যা। হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের সন্তানদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলা মুসলিম কৃষক পরিবারের বেড়ে উঠাটি ব্রিটিশ আমলে প্রায় অসম্ভব ছিল।আজও সেটিই হচ্ছে ভারতে। পূর্ব বাংলার পশ্চাদপদ মুসলমানদের জন্য পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা এক মহাসুযোগের দরজা খুলে দেয়। ফলে পাকিস্তান আমলের মাত্র ২৩ বছরে পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষ যে বিপুল সংখ্যক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, উকিল ও অন্যান্য পেশাদার সৃষ্টি করতে সমর্থ হয় ভারতের ১৬ কোটি মুসলমান তার দশ ভাগের এক ভাগও সৃষ্টি করতে পারেনি। অথচ কি অদ্ভুদ আবিস্কার! আওয়ামী বাকশালী চক্রের কাছে পূর্ব বাংলার এ সময়টি সবচেয়ে শোষণমূলক যুগ রূপে চিত্রিত হয়। এ সময়টাকে তারা বলে ঔপনিবেশিক পাকিস্তানী শাসনের যুগ। যদিও সে ঔপনিবেশিক (!)শাসকদের মাঝে প্রধানমন্ত্রী রূপে তাদের নিজ দলের নেতা জনাব সোহরাওয়ার্দীও ছিলেন।

আওয়ামী বাকশালী চক্র এতোটাই চিন্তাশূন্য যে, পার্শ্ববর্তী ভারতীয় মুসলিমদের সাথে তুলনামূলক বিচারে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানী মুসলিমরা যে অনেক দ্রুত সামনে এগিয়ে গেল -সে কথা তারা বিবেচনায় আনতে রাজী নয়। ভারতে হাজার হাজার মুসলিম যুবক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ডিগ্রি নিয়েও আজ বেকার। সেদেশে মুসলিমদের চাকরি পাওয়াই কঠিন। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে দাঁড়াতে গেলেই উগ্র হিন্দুদের সন্ত্রাসের কবলে পড়তে হয়। তখন জান নিয়ে বাঁচাই দায় হয়ে যায়। অথচ পাকিস্তানে যোগ দানের ফলে বাঙালী মুসলিমদের ভাগ্য খুলে যায়। বাঙালী মুসলিমের দ্রুত উপরে উঠার একটি উদাহরণ দেয়া যাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. সাজ্জাদ হোসেন সাহেবের স্মৃতিচারণ থেকে। তিনি লিখেছেন, “হোসেন আলীকে চিনতাম ১৯৪৭ সাল থেকে। ১৯৪৭ সালে আমরা যে কজন তরুণ শিক্ষক পূর্ববঙ্গ অঞ্চল থেকে সিলেটের এম,সি, কলেজে যোগ দিয়েছিলাম হোসেন আলী তাদের অন্যতম। তার ডিগ্রি ছিল কেমিস্ট্রিতে। সিলেটের আম্বরখানায় আমি যে বাসা ভাড়া করেছিলাম প্রথম কয়েকদিনের জন্য তিনি সেখানে উঠে এসেছিলেন। আমার সঙ্গে আরো ছিলেন ইংরেজীর অধ্যাপক মঈদুল ইসলাম। তিনি বাসায় রয়ে গেলেন। হোসেন আলী এক রিক্সাওয়ালার সাথে মেস করেন। এ সময় অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সেন্ট্রাল সার্ভিসের জন্য অনেক অফিসার রিক্রুট করা হয়। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা অনুষ্ঠানের সময় ছিল না; কারণ তখনই কিছু লোক ট্রেনিং এর জন্য নিয়াগ করার প্রয়োজন দেখা দিল। এ প্রসঙ্গে বলা বোধ হয় প্রয়োজন যে, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী আই সি এস অফিসার একজনও ছিল না। সুতরাং শুধু ইন্টারভিউ করে কাউকে ফরেন সার্ভিস, কাউকে এডমিনিসট্রেটিভ সার্ভিস, কাউকে অডিট সার্ভিসে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের কলেজে কলেজে রিক্রুটমেন্ট টিম ঘুরে বেড়িয়ে লোক সংগ্রহ করে। এইভাবে হোসেন আলী পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন।… সেই হোসেন আলী নাটকীয় ভাবে (একাত্তরে) পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করলেন।-(সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন,১৯৯৩)। উল্লেখ্য, ১৯৭১য়ে হোসেন আলী কোলকাতায় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ডিপুটি হাই কমিশনার রূপে অবস্থান করছিলেন। তিনি সে পদ ছেড়ে মুজিব নগর সরকারে যোগ দেন।

আওয়ামী লীগ সবসময়ই প্রচার চালিয়েছে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে যে বৈষম্য তা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সৃষ্টি। তারা একটি বারের জন্যও বলেনি, এ বৈষম্য বিদ্যমান ছিল ১৯৪৭ য়ে পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্ব থেকেই। পূর্ব বাংলার মুসলিমগণ ছিল সমগ্র ভারতে সবচেয়ে পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী। অথচ ষাটের দশকে এসে তারা করাচি ও লাহোরের সাথে ঢাকার তুলনা করে। কিন্তু ১৯৪৭ য়ে করাচি ও লাহোরের তুলনায় ঢাকার অবস্থাটি কি আদৌ তুলনা করার মত ছিল। ৪৭-এ ঢাকা ছিল একটি অনুন্নত জেলা শহর। আর করাচি ও লাহোর ছিল বহু বছরের পুরোন প্রাদেশিক রাজধানী শহর। লাহোর বিখ্যাত ছিল মোগল আমল থেকেই। লাহোরের বিশাল বাদশাহী মসজিদ, শালিমার গার্ডেন, বিশাল বাদশাহী কেল্লা, সম্রাট জাহাঙ্গীর ও নূরজাহানের মাজার। এ কীর্তিগুলি স্বাক্ষ্য দেয়, শহরটি মোগল আমলেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল; লাহোরের অবস্থান ছিল দিল্লির পরই।১৯৪৭’য়ে স্বাধীনতা লাভের পর ঢাকার ন্যায় লাহোর বা করাচি শহরে টিনের চালার নীচে সেক্রেটারিয়েটর দফতর খুলতে হয়নি। অথচ আওয়ামী লীগের সমর্থকগণ করাচি ও লাহোরে গিয়েই পাটের গন্ধ আবিষ্কার করত। যেন পশ্চিম পাকিস্তানের শহরগুলো গড়ে উঠেছে পাটের অর্থে।

ষাটের দশকে এসে বলা হয়,সেনা বাহিনীতে বৈষম্যের কথা। অথচ ১৯৪৭ সালে সেনাবাহিনীতে যে হিমালয় সম বৈষম্য ছিল সে কথা বলে না। সে বৈষম্যটি সৃষ্টি হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। অথচ সে ব্রিটিশ আমলকে দোষারপ না করে আওয়ামী বাকশালীগণ দায়ভার চাপায় পাকিস্তানের উপর। ১৯৪৭-যে মেজর পদমর্যদার উপরে কোন বাঙালী অফিসার ছিল না। সেটিও মাত্র একজন। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানীদের মধ্যে ছিল জেনারেল পর্যায়ের অফিসার। তাদের ছিল বহু ব্রিগেডিয়ার ও কর্ণেল। বলা হয় প্রশাসনে উর্ধতন কর্মকর্তাদের মাঝে বৈষম্যের কথা। অথচ সেটিও আকাশচুম্বি ছিল ১৯৪৭’য়ের পূর্ব থেকেই। ১৯৪৭-য়ে হিন্দু অফিসারদের দেশ ত্যাগের ফলে মহা সংকটে পড়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার। তখন রেলগাড়ী চালানোর ড্রাইভারও ছিল না। তখন ভারত থেকে আগত মোহাজির দিয়ে অফিস আদালত, রেল, পোষ্ট অফিসসহ নানা সরকারি দফতর চালাতে হয়েছে। তারা একটি বারের জন্যও এ কথা বলে না, ১৯৪৭য়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে বিশাল বৈষম্য নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করেছিল।

১৯৪৭’য়ে অধিকাংশ ডিসি, পুলিশ কর্মকর্তা, রেলকর্মচারী অবাঙালী হলেও ১৯৭০’য়ে চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছিল। প্রায় সবগুলো জেলাতেই তখন বাঙালী ডিসি ও এসডিও। এমন কি ১৯৭১’য়ে ইসলামাদে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সেক্রেটারিয়েটে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ কর্মচারিই ছিল পূর্ব পাকিস্তানী। ১৯৭১ ঢাকার পতনের পর যে প্রায় ৪ লক্ষ বাঙালী পশ্চিম পাকিস্তানে আটকা পড়েছিল তারা নিশ্চয়ই সেখানে দিনমুজুরি করত না। তাদের বেশীর ভাগই ছিল সেখানে কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েটের কর্মচারি বা সামরিক বিভাগের লোক। এমন কি লন্ডন ও নিউয়র্কের পাকিস্তানের দূতাবাদগুলোতে প্রায় অর্ধেক কর্মচারী ছিল বাঙালী। সে চিত্র স্বচক্ষে দেখেছেন ড. সাজ্জাদ হোসেন। তিনি লিখেছেন,“লন্ডনে যেমন দেখেছিলাম দূতাবাসের কর্মচারীদের প্রায় অর্ধেক বাঙালী, নিউয়র্কেও তাই এবং সম্ভবতঃ বাঙালী কর্মচারীদের অনুপাত এখানে আরেকটু বেশী ছিল। ..অনেক বাঙালী শিক্ষকও এ্যাডহক এ্যাপোয়েন্টমেন্ট পেয়ে রাতারাতি ডিপ্লোমেট পদে উন্নীত হন। বার্মায় পাকিস্তানের প্রথম এ্যামবেসেডর ছিলেন বগুড়ার সৈয়দ মোহম্মদ আলী। তিনি পরে ওয়াশিংটনে এ্যামবেসেডর নিযুক্ত হন। (ইনিই পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন।) বার্মায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত যিনি হন তিনি ঢাকার আর্মানিটোলা হাইস্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক কমর উদ্দিন আহম্মদ। পরে এই কমর উদ্দিন আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এবং লিখেন,পূর্ব পাকিস্তানবাসীদের সামাজিক ইতিহাসে ইসলামের বিশেষ স্থান নেই।”-( সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, ১৯৯৩)।

 

শুরু হয় শিল্পোন্নয়ন

বৃটিশ শাসনের ১৯০ বছরে পূর্ব বাংলায় আন্তর্জাতিক মানের কোন বড় শহরই ছিল না। ছিল কিছু মফস্বলের জেলা শহর। পাট উৎপাদিত হতো পূর্ব বাংলায়। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে একটি জুটমিলও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ৪টি বস্ত্রকল ছিল। সেগুলো হলো ঢাকা জেলার চিত্তরঞ্জন কটন মিলস, লক্ষীনারায়ণ কটন মিলস, ঢাকেশ্বরী কটন মিলস এবং কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলস। ছিল ৪টি চিনি কল। এগুলো হলো, কুষ্টিয়া জেলার দর্শনার কেরু কোম্পানী, রাজশাহী জেলার গোপালপুরের উত্তরবঙ্গ সুগার মিলস, রংপুরের মহিমগঞ্জ সুগার মিলস এবং সেতাবগঞ্জের ইস্টবেঙ্গল সুগার মিলস। সবে ধন নীলমণি এই ক’টি মাত্র মিল ছাড়া এ অঞ্চলে আর কোন শিল্পকারখানাই ছিল না। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাত্র ২৩ বছরে এ এলাকায় ৭৬টি জুট মিল প্রতিষ্ঠিত হয়। আদমজী জুটমিল ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাটকল। কাপড়ের কল প্রতিষ্ঠিত হয় ৫৯টি। এগুলোর সাথে প্রতিষ্ঠিত করা হয় অনেক গুলো ইস্পাত কারখানা, ঔষধের কারখানা, রাসায়নিক শিল্প ও চামড়া ও জুতার কারখানা। ..১৯৭০ সালে যে শিল্পোৎপাদন ছিল সেটি বাংলাদেশ আমলে ১৯৮০ সালেও অর্জিত হয়নি। -(এস. মুজিবুল্লাহ, ইত্তেফাক ৩/০৯/৮০)।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সাথে তুলনা করলে পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পোন্নয়নের এ হার অন্যদের চেয়ে খুব একটা খারাপ ছিল না। বরং কোরিয়ার মত দেশের সাথে তখন পাল্লা দিয়ে এগুচ্ছিল পাকিস্তান। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর শিল্প খাতে উন্নয়নের স্থলে এসেছে প্রচণ্ড ধ্বস। আদমজী জুটমিলসহ বহু বড় বড় মিল ধ্বংস হয়ে গেছে। মোহিনী মিলসহ বহু কাপড়ের মিলগুলিতে লেগেছে তালা। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানভূক্ত এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মাত্র একটি। সেটি ঢাকায় এবং অতি ছোট আকারের। ছিল না কোন সামুদ্রিক বন্দর। ছিল না কোন মেডিকেল কলেজ, কৃষি ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়। ছিল না কোন আলিয়া মাদ্রাসা। ছিল না কোন ক্যান্টনমেন্ট। পাকিস্তান আমলের মাত্র ২০ বছরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৭টি বিশাল আকারের বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ একাত্তরের পর, বাংলাদেশের বিগত ৪৪ বছরের ইতিহাসে সে মাপের বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় একটিও প্রতিষ্ঠিত হয় নি। যা হয়েছে তা অতি ছোট মাপের; খুলনা, কুষ্টিয়া, বরিশাল ও সিলেটে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলি তারই উদাহরণ।

পাকিস্তান আমলের মাত্র ২৩ বছরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক মানের বিশাল আকারের ৭টি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠিত হয় বড় বড় ক্যাডেট কলেজ, জেলা স্কুল ও রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুল ও থানায় থানায় পাইলট স্কুল। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অনেকগুলি ক্যান্টনমেন্ট। নির্মিত হয়েছে দুটি সামুদ্রিক বন্দর। ১৯৪৭য়ের আগে ঢাকা শহরে বড় আকারের কোন বিল্ডিং ছিল না। ছিল না কোন আন্তর্জাতিক মানের হোটেল। ছিল না এক হাজার মানুষ একত্রে নামাজ পড়তে পারে এমন কোন মসজিদ। জাতীয় সংসদ, কমলাপুর রেল স্টেশন, বায়তুল মোকাররম মসজিদ, শাহবাগ হোটেল (এখন পিজি হাসপাতাল),শেরাটন হোটেল, হাইকোর্ট বিল্ডিং, ডিআইটি ভবনসহ শহরের বড় বড় এমারতগুলো গড়ে উঠেছিল পাকিস্তান আমলেই। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝের বৈষম্যটি যে পাকিস্তান আমলের সৃষ্ট নয়-সেটি বুঝার জন্য কি তাই গবেষণার প্রয়োজন পড়ে? সে বৈষম্য ছিল বহু শত বছরের পুরনো। কিন্তু মিথ্যাচারী মন কি সত্যকে মেনে নেয়? আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা এ বৈষম্যের জন্য ষোল আনা দায়ী করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকে। তবে সত্যকে তারা নিজেরা স্বীকার না করলে কি হবে, সেটি বেরিয়ে এসেছে এমনকি বহু ভারতীয় হিন্দু সাংবাদিকের মুখ থেকেও। সে উদাহরণও দেয়া যাক। একাত্তরের পর আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী ঢাকা থেকে নব্য প্রকাশিত “দৈনিক জনপদ” নামের একটি পত্রিকায় কলাম লিখতেন। তিনি লিখেছিলেন, ১৯৭১এর ১৬ই ডিসেম্বরের পর কোলকাতা থেকে কিছু সাংবাদিককে হেলিকপ্টারে তাড়াহুড়া করে ঢাকায় পাঠানো হয়। কয়েকজন ভারতীয় সাংবাদিকের সাথে আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ও ছিলেন। তাঁর সাথের ভারতীয় সাংবাদিকগণ ঢাকায় নেমে অবাক। তারা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী  জিজ্ঞেস করেছিলেন,“দাদা, আপনি আপনাদের কোলকাতাকে দেখেছেন। কোলকাতায় যা কিছু গড়া হয়েছে সেগুলি ১৯৪৭ এর আগে। ১৯৪৭ য়ের পর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার খুব কমই যোগ করেছে। আপনাদের ঢাকায় তো অনেক কিছু হয়েছে। এরপরও আপনারা কেন স্বাধীন হলেন?”

অধ্যাপক আবু জাফর লিখেছেনঃ “দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ যখন শুরু হলো আমি কলকাতা চলে যাই।.. আমরা গেলাম কলকাতা বেতারে। দেবদুলাল বন্দোপ্যাধ্যায়ের সঙ্গে আমার অনেকদিন থেকে পত্র-যোগাযোগ ছিল। .. বেতার থেকে বিদায় নিয়ে গেলাম কবি বুদ্ধদেব বসুর বাসাতে। .. বুদ্ধদেব এবং প্রতিভা বসু দু’জনার কাছে আমরা আশাতীত ভাবে সমাদৃত ও আপ্যায়ীত হলাম। ..বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের আগ্রহ ও কৌতুহলো খুব স্বাভাবিক কারণেই সীমাহীন। আর আমরা এরকম দু’জন উন্মুখ ও উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে আমরা দুইজন সহযাত্রী অবিরল ভাবে স্বাধীনতা-যুদ্ধের বর্ণনা দিয়ে চলেছি। কিন্তু হঠাৎ একটু ছন্দপতন ঘটলো। কথার ফাঁকে বুদ্ধদেব বললেন, কী এমন হলো যে তোমরা হঠাৎ পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে চাইছো। তোমাদের কত দিকে কত উন্নতি হচ্ছিল, ভালোই তো ছিলে। আমরাও তে দিল্লীর অনেক অন্যায়-অবিচারের শিকার, তাই বলে কি আলাদা হয়ে যাবো?-(আমার দেশঃ আমার স্বাধীনতা, পাক্ষিক পালাবদল)।

বাংলাদেশের শিল্পায়নের তিনটি যুগঃ ব্রিটিশ, পাকিস্তানী ও বাংলাদেশী যুগ। কথা হলো, যদি খোদ শেখ মুজিবকে বা অন্য কোন আওয়ামী লীগ নেতাকে জিজ্ঞেস করা হত, বাংলাদেশের সমগ্র ইতিহাসে কোন আমলে সবচেয়ে বেশী ও সবচেয়ে দ্রুত শিল্পায়ন হয়েছে? যদি এ প্রশ্নও করা হত, কোন আমলে পূর্ব বাংলায় সবচেয়ে বেশী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? সেটি বাংলাদেশী বা ব্রিটিশ আমলে হয়েছে -এ কথা বললে তাঁকে কি কেউ মানসিক দিক দিয়ে সুস্থ বলতো? বাংলার বুকে দুর্ভিক্ষ এসেছে যেমন ব্রিটিশ আমলে, তেমনি বাংলাদেশী আমলেও। এবং দুর্ভিক্ষ আসেনি একমাত্র পাকিস্তান আমলে। অথচ আওয়ামী লীগ মহলটি বাংলাদেশের এ যুগটিকেই চিত্রিত করছে পাঞ্জাবীদের ঔপনিবেশিক শাসনামল রূপে! আখ্যায়ীত করেছে বাংলাদেশের শশ্মান কাল রূপে।

গ্রন্থপঞ্জি

ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন।একাত্তরের স্মৃতি,ঢাকা:নতুন সফর প্রকাশনী,১৯৯৩।

 




অধ্যায় তেরো: নীতিহীনতা ও আত্মঘাতী অনৈক্য

আত্মঘাতী নীতিহীনতা                       

পাকিস্তানের ব্যর্থতার জন্য দেশটির শত্রুরাই শুধু দায়ী নয়, দায়ী তারাও যারা দেশটির প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বর্পূণ ভূমিকা রেখেছে।অতিশয় আত্মঘাতী ছিল বহু পাকিস্তানপন্থি ও ইসলামপন্থির রাজনীতি। রোগী অনেক সময় মারা যায় রোগের কারণে নয়, চিকিৎস্যকের ভুল চিকিৎসার কারণেও। পাকিস্তানের ক্ষতিটা হয়েছে দুই ভাবেই। পাকিস্তানের মূলে সর্বপ্রথম যে কুড়ালটি আঘাত হানে তা হলো মুসলিম লীগ নেতাদের আভ্যন্তরীন কোন্দল।দেশের মেরুদণ্ডে আঘাত হেনেছে সুযোগসন্ধানী আমলা কর্মকর্তা, সেনা কর্মকর্তা ও সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকগণ। দেশটির জন্য বিপদ বাড়িয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের নীতিহীনতা ও অযোগ্য নেতৃত্ব। কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর আর কোন নেতাই তেমন যোগ্যতা, সততা ও দুরদৃষ্টির পরিচয় দিতে পারেননি। জন্ম থেকেই পাকিস্তান অতি জটিল সমস্যার সম্মুখীন ছিল। দেশটির দুটি অংশ ১২০০ মাইলের দুরত্ব দিয়ে বিভক্ত ছিল। ছিল রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণের বিষয়। ছিল নতুন সংবিধান তৈরীর বিশাল কাজ। ছিল ভারতের ন্যায় আগ্রাসী শক্তির লাগাতর হামলার হুমকী। প্রতিবেশী ভারত পাকিস্তানের সৃষ্টির যেমন বিরোধী ছিল,তেমনি প্রচণ্ড বিরোধী ছিল দেশটির বেঁচে থাকার বিরুদ্ধেও।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে হাজার হাজার কংগ্রেস কর্মী,হিন্দু উগ্রবাদী ও কম্যুনিস্ট পার্টির কর্মী ১৯৪৭ সালের পরও থেকে যায় যারা পাকিস্তানের সৃষ্টির বিরোধীতা করেছিল। তারা ছিল ভারতের ট্রোজান হর্স। তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিল পাকিস্তানের দুর্বল মুহুর্তে মরণ-আঘাত হানার।একাত্তরে সে মোক্ষম সুযোগটিই তারা পেয়েছিল। তবে দেশ শয্যাশায়ী হলে রাজনৈতিক অসুস্থ্যতার শুরু কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর পরই। মুসলিম লীগ নেতারা ছিল কলহে লিপ্ত। পূর্ব বাংলায় তখন মুসলিম লীগের খাজা নাযিম উদ্দীন গ্রুপ ক্ষমতায়। নেতৃত্বের সে লড়াইয়ে সোহরাওয়ার্দী পরাজিত হয়ে ভারতেই থেকে যান। কিন্তু তার সমর্থকগণ নীরবে বসে থাকেননি। বসে থাকেননি বাংলার আরেক নেতা ফজলুল হক। ফজলুল হক মুসলিম লীগের বিরোধীতা করতে গিয়ে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণ্ড মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু মহসভার সাথে আঁতাত করেছিলেন। তার এ অদ্ভূদ কাণ্ড পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাঁকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে। কিন্তু তারপরও তিনি ক্ষমতার মোহ ছাড়েননি। পরাজিতরা সব সময়ই ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার আশায় নতুন বন্ধু খোঁজে। তখন শত্রুর যে কোন শত্রুই পরম বন্ধুতে পরিণত হয়। নিজের রাজনৈতিক দুর্দিনে পাকিস্তানের আজন্ম কংগ্রেসী শত্রুদেরকেও তিনি বন্ধু রূপে গ্রহণ করেন।

এককালে যারা মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন যেমন ভাষানী, আবুল মনসুর আহমদ, শেখ মুজিব তারা ক্ষমতাসীন খাজা নাযিমুদ্দীনের মোকাবেলায় গড়ে তোলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। নানা বিপর্যয়ের মাঝেও  নীতিবান মানুষেরা আপন নীতি নিয়ে আজীবন বেঁচে থাকে। নীতি থেকে তারা হেলে না। ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব তো নীতিতে এরূপ অটল থাকায়। মার্কিন রাজনীতিতে যারা রিপাবলিকান বা ডিমোক্রাট এবং ব্রিটিশ রাজনীতিতে যারা কনজারভেটিভ বা লেবার সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সে নীতিতে তাঁরা আজীবন অটল থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাঙালী মুসলিম নেতাদের চরিত্রে যেটি সবচেয়ে ঠুনকো সেটি হলো রাজনৈতিক বিশ্বাস ও নীতি। বাংলার ঘন ঘন ঋতু পরিবর্তন বা বাঙালী রমনীর শাড়ী পরিবর্তনের ন্যায় তাদের রাজনৈতিক চরিত্রেও আসে দ্রুত পরিবর্তন। কখনও প্যান-ইসলামী, কখনো বাঙালী জাতীয়তাবাদী, কখনও সেক্যুলার, কখনও সমাজতন্ত্রি, কখনও বা একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচারি  -এরূপ নানা রঙ্গে রঞ্জিত হয় তাদের রাজনীতি।এরূপ প্রচণ্ড নীতিহীনতাই তাদের নীতি।কোন নীতি নয়,ক্ষমতার মোহই তাদের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি।এসব নীতিহীন রাজনীতিদগণই পরিণত হয় পাকিস্তানের পরম শত্রুতে।বাইরের শত্রুরা শুধু কলকাঠি নেড়েছে মাত্র, কিন্তু দেশধ্বংসের বাকী কাজটি তারাই করেছে।

 

 

কংগ্রেসে দীক্ষা ও নাশকতা

বাংলার মাটিতে নীতিহীন রাজনীতির দুই বহুরূপী নেতা হলেন মাওলানা ভাষানী ও শেখ মুজিব। বাঙালী মুসলিমগণ আজ যে পর্যায়ে পৌছেছে তার জন্য বহুলাংশে দায়ী এই দুই নেতা। এ দুই নেতাকে না জেনে একাত্তরের ইতিহাস বুঝা তাই অসম্ভব। নিজেদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তারা বহুবার বহুরূপে হাজির হয়েছেন। শুরুতে উভয়ই মুসলিম লীগ করতেন। তখন ছিলেন প্রান-ইসলামি। ব্রিটিশ আমলে ভাষানী আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। আসামের রাস্তায় রাস্তায় লড়েছেন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে।আসামের সিলেট পাকিস্তানভূক্ত হয়েছে তাদেরই চেষ্টায়। মুজিব লড়েছেন কলকাতার রাস্তায়। তখন তাদের মুখে “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” শোভা পেত। তাদের উপস্থিতিতে “নারাযে তাকবীর, আল্লাহু আকবর” ছিল রাজপথের সবচেয়ে সোচ্চার স্লোগান। তখন মুসলিম লীগের নেতাকর্মীগণ স্লোগান দিতেন, “পাকিস্তান কা মতলব কিয়া, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। আল্লাহ ছাড়া কোন প্রভু নাই সে কথাটিও তারা বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিতেন। কিন্তু পরবর্তীতে এ দুই নেতাই সে নীতিতে অটুট থাকেননি। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে তারা দোষারোপ করেছেন, কিন্তু নিজেরাই বার বার বদলে গেছেন। কথা হলো, মহাপ্রভু মহান আল্লাহতায়ালাকে প্রভু মেনে নিলে তো বার বার নীতি বদলানো এবং মাও সে তুঙ বা গান্ধির অনুসারি হওয়ার প্রশ্ন উঠে না।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই ভাষানী ও মুজিব -এই দুই নেতা মুসলিম লীগ ভেঙ্গে আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়েন। দলটি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন ভাষানী; কিছুদিন পর সাধারণ সম্পাদক হন শেখ মুজিব।পরে সে আওয়ামী মুসলিম লীগের মুসলিম শব্দটি তাদের ভাল লাগেনি, কারণ তাতে হিন্দুদের ভোট পেতে অসুবিধা হচ্ছিল। মুসলিম শব্দটিকে তারা আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেন। দলে ভারি হওয়ার জন্য কংগ্রেসের নেতাকর্মীদেরই শুধু দলে টানেননি, কংগ্রেসের সেক্যুলার নীতিকেও তারা গ্রহণ করেন।আওয়ামী লীগের কাগমারি সম্মেলনে নিজেদের রাজনৈতিক ধর্মান্তরের বিষয়টি প্রকাশ করতে কংগ্রেসী নেতা গান্ধি ও সুভাষ বোসের নামে বিশাল তোড়ন নির্মাণ করেছিলেন। গান্ধির প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর অর্থ তো তার অখণ্ড ভারত নীতির প্রতিও শ্রদ্ধা দেখানো। এরূপ রাজনৈতিক ধর্মান্তরের ফলে আওয়ামী লীগের লাভ হয়েছিল প্রচুর। পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুগণ আওয়ামী লীগের স্থায়ী ভোটারে পরিণত হয়।

মুসলিম লীগের নীতি ছিল পাকিস্তান গড়া ও পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখা। কংগ্রেসী নীতি গ্রহণ করার পর এসব নব্য রাজনৈতিক কনভার্টদের নতুন কর্মসূচী হয় কংগ্রেসের মিশন পূরণ তথা পাকিস্তান ভাঙ্গা। মুসলিম লীগের প্যান-ইসলামিক নীতি  তাদের কাছে সাম্প্রদায়িক মনে হয়। পূর্ব পাকিস্তান মনে হয় পাঞ্জাবীদের উপনিবেশ। ফলে পাকিস্তান বাঁচানোয় আগ্রহটি তাদের  রাজনীতিতে ত্বরিৎ বিলুপ্ত হয়। তাই রাজনীতির শেষের পর্বটি তারা খেলেছেন পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে। ভাষানী নিজেকে পীর ও মাওলানা রূপে পরিচয় দিলেও দেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা বা ইসলামি নীতির বিজয় নিয়ে কোন কালেই কোন আগ্রহ দেখাননি। বাঙালী জাতীয়তাবাদে দীক্ষা নেয়ায় তাদের উভয়ের কাছে শত্রু গণ্য হয় ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা অবাঙালীগণ। ফলে একাত্তরে যখন বহু লক্ষ বিহারীকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে বস্তিতে পাঠানো হয় সে বর্বরতার নিন্দা মুজিব যেমন করেননি,ভাষানীও করেননি।বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনা নিয়ে মুজিবের বহুবছর আগেই ভাষানী পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিদায়ী সালাম জানিয়েছিলেন।ভাষানীর কিছু ভক্ত সে কারণে মাঝে মধ্যে তাকে স্বাধীনতার ঘোষক এবং জাতির পিতা বানানোরও দাবি তোলে। পরবর্তীতে তিনি চীনের মাও সে তুঙয়ের নীতিতে দীক্ষা নেন এবং রাজনৈতিক আশ্রয় দেন নাস্তিক কম্যুনিষ্ট ও সমাজতন্ত্রিদের ।কাশ্মীরের স্বাধীনতা যুদ্ধের চেয়ে তার কাছে বেশী গুরুত্ব পায় ভিয়েতনামীদের যুদ্ধ।তিনি সত্তরের নির্বাচনে অংশ নেননি, এভাবে আও য়ামী লীগের নিরংকুশ বিজয়টি সহজতর করেন।একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার মিশনটি সফল করতে আওয়ামী লীগ নেতাদের ন্যায় ভাষানীও ইন্দিরা গান্ধির মেহমানে পরিণত হন।

রাজনীতির নানা স্রোতে নানামুখি ভাসাটি ঈমানদারি নয়। বিশুদ্ধ ঈমান ও নীতি নিয়ে আমৃত্যু অটল থাকাটাই মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত বিধান। এটিই প্রকৃত ঈমানদারি। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অতি প্রিয় হলো সেসব ঈমানদার ব্যক্তি যারা বিশ্বাস ও নীতিতে অটল। ঈমানের দাবী যে কেউ করতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালা উপর ঈমানে যারা অটল একমাত্র তাদেরকেই তিনি সাচ্চা ঈমানদার বলেছেন। পবিত্র কোরআনে সে ঘোষণাটি এভাবে এসেছ,“একমাত্র তারাই ঈমানদার যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান আনলো এবং তারপর অটল থাকলো (অর্থাৎ কোনরূপ হেরফের করলো না) এবং জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করলো -ঈমাদের দাবীতে তারাই সাচ্চা।”–(সুরা হুজুরাত আয়াত ১৫)।ঈমানদার তাই অটল তার ধর্ম ও রাজনীতিতেও। তখন রাজনীতিতে প্রতিফলন ঘটে ঈমানদারির। তাই যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” সে রাজনীতিতে চীনমুখি বা ভারতমুখি হয় না। সে আমৃত্যু ইসলামমুখি হয়। ইসলামের প্যান-ইসলামি নীতি পরিহার করে সেক্যুলার বা জাতীয়তাবাদীও হয় না। মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গাও তার নীতি হয় না। কিন্তু যারা নীতিহীন তাদের পক্ষে কোন একটি নীতিতে অটল থাকাটাই অসম্ভব হয়। সে চিত্রটাই বার বার দেখা গেছে ভাষানী,মুজিব এবং তাদের অনুসারিদের রাজনীতিতে।

 

গুরুত্ব হারায় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা

মুসলিম রাজনীতির মূল লক্ষ্যটি হলো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা।সে সাথে সুশাসন এবং মুসলিম স্বার্থের সুরক্ষা। রাজনীতি এখানে হাতিয়ার রূপে কাজ করে। এজন্যই মুসলিমের রাজনীতি স্রেফ রাজনীতি নয়, এটি পবিত্র জিহাদ। কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য অমুসলিমদের ভোট প্রাপ্তিও যখন জরুরী হয়ে পড়ে তখন রাজনীতি থেকে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি বাদ পড়তে বাধ্য। কারণ ইসলামের প্রতিষ্ঠা, মুসলিম স্বার্থ রক্ষা এবং মুসলিমের গৌরব বৃদ্ধিতে অমুসলিম ভোটারদের আগ্রহ থাকার কথা নয়। ইসলামে অঙ্গীকার আছে এমন দলকে অমুসলিম ভোটারগণ ভোট দিবে সেটি কি আশা করা যায়? ফলে যারা অমুসলিমদের ভোট চায় তাদের নীতি বদলায়। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে অবিকল সেটিই ঘটেছে। ফলে যুক্ত নির্বাচন পদ্ধতিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা যেমন অসম্ভব ছিল, তেমনি অসম্ভব ছিল দেশটিকে বাঁচিয়ে রাখাও। স্রেফ হিন্দুদের মন জয়, নিজেদের ক্ষমতালাভ এবং ইসলামপন্থিদের পরাজয় সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী, ভাষানী, আবুল মনসুর আহমদসহ আওয়ামী লীগ নেতাগণ যুক্ত নির্বাচন প্রথাকে মেনে নিতে পাকিস্তান সরকারকে বাধ্য করেন। এভাবে চাকু বসিয়ে দেয়া হয় পাকিস্তানের আদর্শিক মেরুদণ্ডে। সে আঘাত নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে শক্ত ভাবে নিজ পায়ে দাঁড়ানো আর কোন কালেই সম্ভব হয়নি।

হিন্দুদের ভোট লাভের লক্ষ্যে মুসলিম প্রার্থীগণও হিন্দু এজেণ্ডাকে নিজেদের রাজনৈতিক এজেণ্ডা বানাতে পরস্পরে প্রতিযোগীতা করে। ফলে এক কালে যারা “পাকিস্তান কা মতলব কিয়া? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” ধ্বনি তুলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা যোগ দিয়েছিল তারাই ইসলামের পক্ষ নেয়াকে সাম্প্রদায়িকতা বলে গালীগালাজ শুরু করে। ফলে অভাব দেখা দেয় ইসলাম ও অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়ানোর লোকের। এরই পরিণতি হলো, লিয়াকত আলী খান প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে ইসলামী শাসনতন্ত্র নির্মাণের লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালে যে ২২ দফা ইসলামী মূল নীতি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল সেটি নিয়ে সামনে এগুনোর নেতা পাওয়া যায়নি। রাজনীতি তখন আর ইবাদত থাকেনি, পরিণত হয় নিছক ক্ষমতা দখলের নোংরা লড়ায়ে। এমন রাজনীতিতে শুরু হয় আল্লাহর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ও পাপাচার। বেগবান হয় সেক্যুলারিজম, সোসালিজম ও সর্বস্তরে দুর্নীতি। নীতি হয়ে পড়ে যে কোন ভাবে দলে ভারী হওয়া, নির্বাচনে বিজয় এবং ক্ষমতা লাভ। এমন সুবিধাবাদী নীতিতে কি কোন আদর্শভিত্তিক দেশ বাঁচে? যে প্যান-ইসলামিক চেতনার ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে আদর্শের অনুসারিদেরই চরম শূন্যতা দেখা দেয় পাকিস্তানে। যে পাকিস্তানের জন্য যারা এক সময় রাস্তায় রাস্তায় লড়াই করেছিল, তারাই লড়াই শুরু করে কি করে পাকিস্তানকে দ্রুত কবরে পাঠানো যায়।

 

বিভেদের রাজনীতি

মুসলিম লীগের নীতিহীনতাও কম দুঃখজনক ছিল না। যতটা নীতি বিসর্জনে তারা রাজী ছিল, ক্ষমতা বা নেতৃত্ব ছাড়তে ততটা রাজী ছিল না। ক্ষমতাসীন মুসলিমের লীগের প্রাদেশিক প্রধান ছিলেন মাওলানা  আকরাম খাঁ। প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জনাব নুরুল আমীন। তাদের মধ্যে লড়াই তখন তুঙ্গে। মাওলানা আকরাম খাঁর চেষ্টা ছিল আজীবন পদটা ধরে রাখা।স্রেফ নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে মুসলিম লীগের সাংগঠনিক প্রসার বা শক্তি সঞ্চয়কেও গুরুত্ব দেননি। জনাব নুরুল আমীনও তেমনি নিছক ব্যক্তিগত স্বার্থে মুসলিম লীগের অনেক নেতাকে মন্ত্রীত্ব দেননি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আসনে তখন খাজা নাজিমুদ্দীন। তিনিও জানতেন না কি করে আপোষ করতে হয়। তাই তিনিও দলে স্থান দেননি মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দীর অনুসারিদের।বিভেদের সংক্রামক জীবাণু ছিল ভাষানী ও সোহরাওয়ার্দীর মাঝেও। ফলে তারা উভয়ে মিলে যে আওয়ামী লীগ গড়লেন সে দলেও তারা একত্রে বেশী দিন থাকতে পারেননি। তুমুল লড়াই শুরু হয় ভাষানীর সাথে সোহরাওয়ার্দীর। আওয়ামী লীগ ছেড়ে ভাষানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গড়লেন। সেখানেও শুরু হলো বিভক্তি। চীনাপন্থি ও মস্কোপন্থিদের লড়াইয়ে এ দলটিও ভেঙ্গে গেল। এভাবে যে দলটিই ভাষানী গড়েছেন,সেখানে বিভেদও গড়েছেন। এমন বিভক্তির রাজনীতিতে কি দেশ বাঁচে?

এত বিভক্তির কারণ, রাজনীতি পরিণত হয়েছিল স্রেফ ক্ষমতা লাভের হাতিয়ারে।ক্ষমতার মোহে তারা নীতির উপর অটল থাকতে পারেননি। অথচ ইসলামে রাজনীতি হলো শরিয়ত প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম স্বার্থ রক্ষার কাজে পবিত্র যুদ্ধ তথা জিহাদ। রাজনীতি তাই নেক আমলের হাতিয়ার। অথচ ক্ষমতালোভীদের হাতে রাজনীতি পরিণত হয়েছিল ক্ষমতালাভ, অর্থলাভ ও যশলাভের ব্যবসায়।তাদের ছিল না আখেরাতের চিন্তা। ফলে রাজনীতিতে উপেক্ষিত হয়েছে জিহাদ তথা ইবাদতের প্রেরণা। উপেক্ষিত হয়েছে সে পবিত্র লক্ষে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার বুদ্ধিবৃত্তি। অথচ পাকিস্তান ছিল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের ফসল। এ আন্দোলনকে সফল করতে কাউকে একটি ঢিল বা তীরও ছুঁড়তে হয়নি।

 

 শত্রু উৎপাদনের ইন্ডাস্ট্রী

জনগণকে দৈহিক ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে যেমন লক্ষ লক্ষ টন খাদ্য শস্য চাই, তেমনি তাদের মনের সুস্থতা বাঁচাতেও চাই লক্ষ লক্ষ বই। চাই লাগাতর জ্ঞানের জোগান। এবং ঈমানদার রূপে টিকিয়ে রাখতে চাই প্রচুর ইসলামি বই। ইসলামে জ্ঞানার্জন তাই নামায-রোযা, হজ-যাকাতের পূর্বে ফরয করা হয়েছিল। কোরআনের আগে আরবী ভাষায় কোন গ্রন্থ ছিল না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম মনিষীগণ প্রচুর বই লেখেন,এবং গড়ে তুলেন জ্ঞানের বিশাল সমুদ্র। ভারতীয় মুসলমানদের সৌভাগ্য যে ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিন গুলোতে এক ঝাঁক আলোকিত বুদ্ধিজীবী পেয়েছিল যারা আসন্ন হিন্দু আধিপত্যের ভয়াবহতা বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লামা ইকবাল, মাওলানা মহম্মদ আলী, আকরাম খাঁ এবং আরো অনেকে ছিলেন এ বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের অতি সংগ্রামী যোদ্ধা। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বুদ্ধিবৃত্তিক রণাঙ্গনে নতুন যোদ্ধা দেখা যায়নি।নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়েনি ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিতে।ফলে জনগণ পুষ্টি পায়নি তাদের ঈমানে।

বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঘটেছে উল্টোটি। সরকার সেনাবাহিনী গঠনে ও কলকারখানা বৃদ্ধিতে মনযোগী হয়েছে। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তির রণাঙ্গন দখলে গেছে সেক্যুলারিস্ট ও বামপন্থিদের হাতে। তাদের পক্ষ থেকে নানা ভাবে আয়োজন বাড়ানো হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে। যে কোন আদর্শিক দেশই বিরুদ্ধ আদর্শকে দেশে প্রচার সুযোগ দেয়না। এটি নিজ দেহে বিষ ঢুকানোর মত। সোভিয়েত রাশিয়া ও চীন এজন্যই পুঁজিবাদী বইয়ের প্রকাশ ও প্রচারের সুযোগ দেয়নি। সুযোগ দেয়নি ইসলামী জ্ঞান প্রচারেরও। অথচ পাকিস্তান সরকার ষাটের দশকে দেশের সকল শহরে বিশেষ করে রেল-স্টেশন ও স্টীমার ঘাটে চীন ও সোভিয়েত রাশিয়া থেকে প্রকাশিত মার্কসবাদী বইয়ের নামে মাত্র মূল্যে বিতরণের সুযোগ করে দেয়। এভাবে পরিকল্পিত ভাবে লাগাতর প্রাণনাশী জীবাণু ঢুকানো হয় মুসলিম উম্মাহর দেহে। ফলে দেশ জুড়ে শুরু হয় মার্কসবাদের জোয়ার, বিশেষ করে ছাত্রদের মাঝে। আর মার্কসবাদিরা কি ইসলাম, মুসলিম ও কোন ইসলামি রাষ্ট্রের বন্ধু হতে পারে? এভাবে পাকিস্তান তার নিজ ঘরে নিজের শত্রু উৎপাদনে ইন্ডাস্ট্রী খোলে। এটি সম্ভব হয় দেশের রাজনীতি এবং সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন সেক্যুলারিস্টদের ন্যায় ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হওয়ায়।

পাকিস্তানের ২৩ বছরে যে হারে কল-কারখানা ও রাস্তাঘাট গড়া হয়েছে বা কৃষির উন্নয়ন হয়েছে সে হারে ইসলামী পুস্তকের প্রকাশনা হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানে কিছুটা হলেও পূর্ব-পাকিস্তানে সে তুলনায় তেমন কিছু হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানের আরেকটি সুবিধা ছিল, সেখানে উর্দু মাতৃভাষা না হলেও উর্দুর বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ হয়নি। ফলে ঈমানের পুষ্টি জোগাতে সমৃদ্ধ উর্দু সাহিত্য থেকে জনগণ প্রচুর লাভবান হয়েছে। ফলে পশ্চিম পাকিস্তান খণ্ডিত হওয়া থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের সে সামর্থ ছিল না।বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বাঙালী হিন্দুগণ গড়ে তুলেছিল নিজের সাংস্কৃতিক প্রয়োজন মেটাতে, মুসলমানদের ঈমান বাড়াতে নয়।তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা এমন ছিল, মুসলিম লীগের নেতারা পত্রিকা বের করেছেন,আর সে পত্রিকা অধিকৃত হয়ে গেছে তাদের শত্রুপক্ষের হাতে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদ ছিল মুসলিম লীগের নেতা নূরুল আমীনের পত্রিকা। দৈনিক পকিস্তান ছিল আইয়ুব খানের প্রতিষ্ঠিত প্রেসট্রাস্টের সরকারি পত্রিকা। ইংরাজী দৈনিক পাকিস্তান অবজার্ভারও ছিল পাকিস্তানপন্থির পত্রিকা। কিন্তু এগুলো দখল হয়ে যায় ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে।

 

 আত্মঘাতী অনৈক্য

ইসলামপন্থি ও পাকিস্থানপন্থিগণ ব্যর্থ হয়েছেন একতার রাজনীতি করতে। একতা অন্যদের কাছে রাজনীতি, কিন্তু ইসলামে এটি ফরজ ইবাদত। রাজনীতি হলো, পরস্পরে আপোষ ও সমঝোতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার বিজ্ঞান। মুসলিম রাজনীতির সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ারটি হলো একতা। একতা ও সমঝোতার পথ বেয়েই আসে মহান আল্লাহতায়ালার রহমত। ১৯৪৭ সালের আাগে বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু, বিহার, আসাম, সীমান্ত প্রদেশ ও উত্তর প্রদেশসহ সারা ভারতের মুসলমানেরা একতাবদ্ধ হয়েছিল বলেই তাদের উপর আল্লাহতায়ালার রহমত নেমে এসেছিল এবং সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান।সমাজতান্ত্রিক চেতনা ছাড়া সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাঁচে না। রাজার প্রতি আনুগত্য ছাড়া রাজতন্ত্র বাচেঁ না। তেমনি প্যান-ইসলামিক চেতনা ছাড়া পাকিস্তানের বেঁচে থাকাটিও অসম্ভব ছিল। কিন্তু সে হুশ মুসলিম লীগ নেতাদের ছিল না। যারা এদেশটির প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিল তারা সে অতি গুরত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়েও গাফলতি দেখিয়েছেন।

পাকিস্তানের ইতিহাসে ১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল ১৯৪৬ সালের মতই আরেক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। পাকিস্তানপন্থিগণ সেটি বুঝতে না পারলেও তাদের শত্রুগণ ঠিকই বুঝেছিল। ফলে এ নির্বাচনে তারা একতাবদ্ধ হয়েছিল। আওয়ামী লীগ নির্বাচন লড়েছিল তাদের সবার পক্ষ থেকে। কিন্তু একতাবদ্ধ হতে পারিনি পাকিস্থানপন্থি দলগুলি। রাজনীতির আকাশে যখন ঘন কালো মেঘ তখন মুসলিম লীগ বিভক্ত থেকেছে তিন টুকরোয়। জামায়াতে ইসলামি, নিজামে ইসলামি ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এর মত ইসলামি দলগুলো একত্রিত হতে পারেনি। আলেমগণও নির্লিপ্ত থেকেছে। পাকিস্তানপন্থি সবগুলি দল একতাবদ্ধ হলে ৭০ য়ের নির্বাচনের রায় হয়ত ভিন্নতর হত। যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহর বড় বড় পরাজয়গুলি জনবল বা অর্থবলের কমতিতে হয়নি। হয়েছে অনৈক্যের কারণে। অনৈক্য বিনাশ ঘটায় সকল সামর্থ্যের।সত্তরের  নির্বাচনে সেটিই নতুন করে প্রমানিত হয়েছে।

 




অধ্যায় চৌদ্দ: ভাষার নামে নাশকতা

ভাঙ্গার কাজের শুরু

মুসলিম ইতিহাসে বড় বড় ক্ষতিগুলো ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় বা সুনামীতে হয়নি। কলেরা,যক্ষা বা টাইফয়েডের ন্যায় রোগের মহামারিতেও হয়নি। হয়েছে বর্ণ, গোত্র, ভূগোল, ভাষা ও ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তার নামে। উসমানিয়া খেলাফত ভেঙ্গে ২৫টির বেশী রাষ্ট্র গড়া হয়েছে বিভিন্ন ভাষা ও গোত্রের নামে। যে কোন দেশের ন্যায় মুসলিম দেশেও বিস্তর সমস্যা ছিল। কিন্তু সমাধান খোঁজা হয়েছে বিভক্তির মাঝে। কিন্তু বিভক্তিতে যে পবিত্র কোরআনে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত আযাব ডেকে আনে -সে হুশ মুসলমানদের ছিল না। বিভক্তির কারণে মুসলিমদের উপর প্রতিশ্রুত আযাবের ঘোষণাটি এসেছে সুরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, “এবং তোমরা তাদের মত হয়োনা যারা সুস্পষ্ট নির্দেশনা (কোরআন) আসার পরও পরস্পরে মতভেদ করলো এবং বিভক্ত হলো; তাদের জন্য রয়েছে কঠোর আযাব। তাই মুসলিম দেশ বিভক্ত হলো অথচ তাদের উপর মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাঁর প্রতিশ্রুত আযাবটি এলো না -সেটি অভাবনীয়। আজকের মুসলিম বিশ্ব তো সে আযাবপ্রাপ্তিরই নজির। মুসলিম দেশের বিভক্তিতে সমস্যার সমাধান না হয়ে বরং বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়েছে শক্তিহীনতা, বেড়েছে শত্রুর হাতে মৃত্যু, ধ্বংস, ধর্ষণের ন্যায় নানারূপ বিপর্যয়। বেড়েছে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উপর শত্রুশক্তির দখলদারি। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম উম্মাহর বুক থেকে বিভক্তির দেয়াল নির্মূলের অঙ্গীকার নিয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নামলেই শত্রুপক্ষের বোমা বর্ষণ শুরু হয়। মুসলিম ভূমিতে আসন গেড়ে বসেছে ইসরাইল। বিভক্তির কারণেই ৫৫টির বেশী মুসলিম দেশের প্রায় দেড়শত কোটি মুসলিম আজ শক্তিহীন। জাতিসংঘের ন্যায় আন্তর্জাতিক ফোরামে সাড়ে ৫ কোটি ব্রিটিশ বা ৬ কোটি ফ্রান্সবাসীর যে প্রভাব ও প্রতিপত্তি, ১৫০ কোটি মুসলিমের তা নাই।

বিভিন্নি ভাষাভাষীদের নিয়ে গড়া পাকিস্তানের অস্তিত্বের বিরুদ্ধেও সবচেয়ে কঠোর আঘাতটিও হানা হয় ভাষার নামে। বস্তুত ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন থেকেই শুরু হয় পাকিস্তান ভাঙ্গার আন্দোলন। এ আন্দোলনে পশ্চিম পাকিস্তানীদেরকে বাঙালীর শত্রু রূপে চিহ্নিত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগটি বাঙালীর মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার। উর্দু ভাষা চিহ্নিত হয় বাঙালীর শত্রুর ভাষা রুপে। এতে বাড়তে থাকে বাঙালী-অবাঙালীর মাঝে মনের দুরত্ব এবং পাকিস্তানের রাজনীতিতে ধরে গভীর ফাটল। ভাষা আন্দোলনের লক্ষ্য নিছক বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেয়া ছিল না, বরং সেটি ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে ইস্যুটিকে কাজে লাগানো। সেটি পরে প্রমাণিতও হয়। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেয়া হলেও তাই পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্রে ভাটা পড়েনি। এ আন্দোলনের সাথে অতি সক্রিয় হয়ে পড়ে সেসব বুদ্ধিজীবী ও নেতৃবৃন্দ -যারা ১৯৪৭য়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রচণ্ড বিরোধীতা করেছিল এবং নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিল।

আন্দোলনটি শুরু করে তমুদ্দন মজলিশ নামে একটি সংগঠন যারা ইসলামী তাহজিব ও তমুদ্দনের কথা বলে। তারা ইসলামী শাসন ও চেতনার কথাও বলে। কথা হলো, আন্দোলনের জন্য দিনক্ষণটি কি যথার্থ ছিল? ভারতে তখনও রাষ্ট্র ভাষার ইস্যু নিয়ে কোন সমাধান হয়নি। কোন বিতর্কও শুরু হয়নি। অথচ সে বিতর্ক শুরু হলো পাকিস্তানে। শয়তান সব সময়ই মুসলিমদের পিছনে লাগে, কাফেরদের পিছনে নয় –এ হলো তার প্রমাণ। পাকিস্তান তখন তার ক্ষতবিক্ষত পোকায় খাওয়াদেহ নিয়ে সবে মাত্র যাত্রা শুরু করেছে।তখনও দেশটি তার নিজের ঘর গুছিয়ে নিতে পারেনি। ভারত থেকে পালিয়ে আসা লক্ষ লক্ষ মোহাজির পুনর্বাসন নিয়ে দেশটি তখন হিমসিম খাচেছ। সমাধান হয়নি দেশের শাসনতান্ত্রিক সমস্যার। দেশ পরিচালনার জন্য যে প্রশাসনিক অবকাঠামো দরকার,তখনও সেটি গড়ে উঠেনি। ওদিকে মরণ কামড় দিতে ওঁত পেতে বসে ছিল প্রতিবেশী শত্রু রাষ্ট্রটি। তারা তো চাচ্ছিল, কোন একটি ইস্যু নিয়ে দেশের দুটি অঙ্গের মাঝে বিভেদ গড়ে উঠুক। আর তখনই শুরু হলো ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের শুরু তমুদ্দন মজলিসের দ্বারা হলেও সে আন্দোলনের নেতৃত্ব অচিরেই পাকিস্তানের শত্রুদের হাতে চলে যায়।

রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি যে কোন দেশেই গুরুতর বিষয়। বিশ্বের বহু দেশে এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বছরের পর বছর ধরে চিন্তাভাবনা হয়। সমঝোতারও চেষ্টা হয়। রাজপথ উত্তপ্ত না করে এক উত্তেজনামুক্ত পরিবেশে দেশের চিন্তাশীল ব্যক্তিরা এ নিয়ে গভীর চিন্তা ভাবনা করেন, দেশের সবচেয়ে বিদগ্ধ ব্যক্তিগণ এ নিয়ে সেমিনারের পর সেমিনার করেন। এভাবে নিজেদের মাঝে মতের আদান প্রদানও করেন। অথচ তমুদ্দন মজলিশ ও তার সেক্যুলার মিত্ররা এ নিয়ে সময় দিতে রাজী হয়নি। আলাপ-আলোচনা ও চিন্তাভাবনার চেয়ে রাজপথে গোলযোগ সৃষ্টির পথটি তারা বেছে নেয়। গুরুত্ব পায় লাশের রাজনীতি। সে সুযোগটি তারাও পেয়ে যায়তৎকালীন সরকারের ভুল পলিসির কারণে। অথচ সংসদে বা আলাপ-আলোচনার টেবিলে সহজেই এ সমস্যার সমাধান বের করা যেত। শত্রুশক্তির সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যদি পাকিস্তান অর্জিত হতে পারে,তবে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি কেন নিজেদের মাঝে আলাপ-আলোচনায় সমাধান করা যাবে না?

 

ভাষা আন্দোলনের নাশকতা

ভাষা আন্দোলন যে ভাবে পাকিস্তানে আত্মঘাতি রূপ নেয়, ভারতে তেমনটি ঘটেনি। অথচ সে সমস্যাটি আরো জটিল ছিল ভারতে। কিন্তু সেটি নিয়ে ভারতে সমস্যাটি দানা বাঁধে অনেক দেরীতে। দক্ষিণের তামিলগণ হিন্দিকে রাষ্ট্র ভাষা রূপে মেনে নিতে রাজী ছিল না। তুমুল দাঙ্গা শুরু হয় মাদ্রাজসহ দক্ষিণ ভারতের বহু নগরে। কিন্তু ভাষার প্রশ্নটি যখন তুমুল আকার ধারণ করে, তখন ভারত তার মেরুদণ্ডকে শক্ত করে নিয়েছে। সেটির একটি সমাধানও বের করে। ভাষা নিয়ে রাজনৈতিক খেলা শুরুর সাথে সাথে সেখানকার নেতারা ভাষা আন্দোলনের নামে স্বাধীনতা-পরবর্তী দুর্বল সরকারকে লাল কার্ড দেখায়নি। দিল্লির সরকার এ সমস্যার সমাধানে দীর্ঘ সময় পেয়েছিল। হিন্দিভাষীদের বিরুদ্ধে অন্যদের মুখের ভাষা কেড়ে নেয়ার অভিযোগও তুলেনি। দেশ জুড়ে হরতাল ও ধর্মঘটের ন্যায় অরাজকতাও সৃষ্টি করেনি -যেটি পূর্ব পাকিস্তানে হয়েছে। অবশেষে সারা ভারতের জনগণ হিন্দিকে রাষ্ট্র ভাষা রূপে মেনে নেয়। মেনে নিয়েছে পশ্চিম বাংলার বাঙালীরাও। মেনে নিয়েছে দক্ষিণ ভারতের লোকেরা। অথচ এ ভাষার সাথে দক্ষিণ ভারতের লোকদের সম্পর্ক নাই। প্রথমে তারা হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা রূপে মেনে নেয়ার বিরোধীতা করলেও অবশেষে এ নিয়ে কোন লংকা কাণ্ড বাধায়নি,যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঘটেছে। পাকিস্তানের চেয়ে বহুগুণ বৃহৎ হলো ভারত, কিন্তু রাষ্ট্র ভাষা হলো একমাত্র হিন্দি। কিন্তু পাকিস্তানে  রাষ্ট্র ভাষা হলো দুটি। ভারতীয় ছাত্র-জনতা-বুদ্ধিজীবীগণ যেপ্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে তা পাকিস্তানের কপালে জোটেনি। আধুনিক ভারতের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। নইলে ভাষার সমস্যা নিয়ে পাকিস্তান যেমন ভেঙ্গে গেল,ভারতের কপালেও সেটি হতে পারতো।

অনুরূপ প্রজ্ঞার বলে উত্তর আমেরিকায় জন্ম নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র -যা আজ বিশ্বের প্রধানতম বিশ্বশক্তি। যুক্তরাষ্ট্রে বহু গর্বিত জনগোষ্ঠীর বসবাস। ইংরেজদের পাশাপাশি জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, স্পেনীশসহ নানা ভাষাভাষির মানুষ ইংরেজীকে রাষ্ট্র ভাষা রূপে গ্রহণ করেছে। অথচ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভাষারও রাষ্ট্র ভাষা হওয়ার যোগ্যতা ছিল। এতে তাদের ভাষাগুলি যে মারা গেছে তা নয়। বর্তমান পাকিস্তানের শতকরা প্রায় ষাট ভাগ মানুষের ভাষা পাঞ্জাবী। অথচ বাঙালীরা ছিল ৫৬%। কিন্তু তারা সংখ্যার জোরে পাঞ্জাবীকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবী তোলেনি। পাঞ্জাবী দ্বিতীয় রাষ্ট্র ভাষা হোক -সে দাবীও তারা তোলেনি। তারা বৃহত্তর পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার মধ্যেই পাঞ্জাবের কল্যাণ দেখেছে, ভাষার বিরোধ নিয়ে পাকিস্তানকে ক্ষুদ্রতর করায় মধ্যে নয়–যেমনটি বাঙালীরা ভেবেছিল। পাঞ্জাবীদের সে নীতির কারণেই পশ্চিম পাকিস্তান যে শুধু ভাঙ্গন থেকে বেঁচে গেছে তা নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ৫৭টি রাষ্ট্রের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র রূপে আজও বেঁচে আছে। একমাত্র পাকিস্তানের হাতেই রয়েছে আনবিক বোমা ও মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ সেনাবাহিনী। ১৬ কোটি বাংলাদেশী ১৮কোটি পাকিস্তানীর সাথে সে মিশনে শামিল হলে কি বাঙালী মুসলমানের গৌরব কমে যেত?

বাঙালীদের মনে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার গর্বটি এতোটাই প্রবল ছিল যে সে আমলে অনেক বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ উর্দুর বদলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর ভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করারও দাবী তুলেছিল। এবং ভাষার সে গর্ব নিয়েই অবশেষে তারা পাকিস্তানকেই ভেঙ্গে ফেললো। ভাষার ইতিহাসে অতি প্রাচীনতম ঐতিহ্যের দেশ হলো মিশর। নিজ মাতৃভাষা কবরস্থ করে আরবী ভাষাকে গ্রহণ করায় তারা বরং প্রচণ্ড লাভবানই হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান পবিত্র কোরআন থেকে তারা যেমন লাভবান হয়েছে, তেমনি নেতা রূপে আবির্ভূত হতে পেরেছে আরব বিশ্বের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে। ভাষার গর্ব নিয়ে মুসলিম উম্মাহর বুকে জাতীয়তাবাদের ফেতনাটি সর্ব প্রথম শুরু করে ইরান; তারাই মুসলিম বিশ্বে সর্বপ্রথম বিচ্ছিন্নতাবাদী। কিন্তু সে বিচ্ছিন্নতা তাদের কল্যাণ দেয়নি; বরং তাদের বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ থেকে। ফলে মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রই তারা পরিত্যক্ত।

ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক, এ আন্দোলনে প্রচুর মিথ্যাচার হয়েছে। ভাষার নামের দেশ জুড়ে গভীর ঘৃণা ও বিষ ছিটানো হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানীদের মাঝে রটিয়ে দেয়া হলো, পশ্চিম পাকিস্তানীরা বাঙালীর মুখের ভাষাকে কেড়ে নিতে চায়।অতএব তারা বাঙালীর শত্রু। বাঙালী-অবাঙালীর ঐক্য বিনাশে এটি ছিল এক বিশাল নাশকতা। ইসলামের শত্রুপক্ষ তো সেটিই চাচ্ছিল। অথচ বিচারে আনা হলো না, উর্দু ভাষা রাষ্ট্র ভাষা হওয়াতে পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পাঠান ও বেলুচীদের মুখের ভাষাকে কি তাদের মুখ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে? তাদের কি বোবা বানানো হয়েছে? ভারতের রাষ্ট্র ভাষা হিন্দি হওয়াতে কি বাংলা ভাষা আবর্জনার স্তূপে পড়েছে? অথচ এ কথা বলা হলো না, যে পশ্চিম পাকিস্তানের উপর এ অভিযোগ চাপানো হচ্ছে তাদের মাতৃভাষা উর্দু নয়। এরূপ নিরেট মিথ্যাকে ভিত্তি করে বাংলায় কত গান, কত কবিতা, কত ছড়া, কত গল্প ও নাটক লেখা হলো। তৈরী হলো কত সিনেমা। এতো বিষ, এতো ঘৃণা ও এতো মিথ্যাচার দেহে নিয়ে একটি জাতি কি সুস্থ্ থাকতে পারে? এর পরিণাম কি ভুল বুঝাবুঝি ও বিভেদ নয়? এরূপ ঘৃণা ও বিদ্বেষের জোয়ারে ভেসে যায় বাঙালী-অবাঙালী মুসলিমদের মাঝে পারস্পরিক ভ্রাতৃসুলভ শ্রদ্ধাবোধ ও ভালবাসা। দেয়ালের সিমেন্ট খসে পড়লে দেয়াল ভাঙ্গতে মেহনতের প্রয়োজন পড়ে না। জনগণের মাঝে তেমনি পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ বিলুপ্ত হলে সে দেশ ভাঙ্গতে কি বেগ পেতে হয়? একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে ভাষা আন্দোলন তো সে কাজটিই করেছে।

 

ভাষার দায়ভার

একটি দেশের বু্দ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাদের মূল দায়িত্ব, দেশবাসীর মাঝে সিমেন্ট লাগানো; সিমেন্ট খোলা নয়। সিমেন্ট লাগানোর কাজটি হয় যেমন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মাধ্যমে, তেমনি রাষ্ট্র ভাষার মাধ্যমে। সে সিমেন্টটি ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক দর্শন ও জ্ঞানের। এতে একতা, সংহতি ও সামাজিক সম্প্রীতি বাড়ে। যে কোন দেশে এটিই হলো গুরুত্বপূর্ণ সোসাল ক্যাপিটাল তথা সামাজিক পুঁজি। সমাজ উন্নয়নে আর্থিক পুঁজির চেয়ে এ সামাজিক পুঁজির গুরুত্বটি আরো অধিক। এ পুঁজির বলেই দেশ দ্রুত সামনে এগুয় এবং জনগণের জীবনে শান্তি আসে। একতা সৃষ্টির এমন কাজটি ইসলামে পবিত্র ইবাদত; এবং বিভেদ সৃষ্টির যে কোন কাজই হারাম। অথচ ভাষা আন্দোলনের নামে বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল জনজীবন থেকে সিমেন্ট সরানোর কাজে। ভাষার কাজ শুধু এ নয় যে, সে ভাষায় কেবল কথা বলা হবে। সাইনবোর্ড, রায় বা দলিল লেখা হবে। বরং প্রতিটি ভাষাকে এর চেয়ে আরো অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। নইলে সে ভাষার লোকদের ব্যর্থতার সীমা থাকে না। তখন সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি আসে মানুষ রূপে বেড়ে উঠায়।

ভাষার মূল কাজটি হলো জনগণের মনে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পুষ্টি জোগানো। সভ্যতর ভাবে বাঁচবার লক্ষ্যে উচ্চতর দর্শন জোগানো। নানা জাতির মাঝে মন ও মনন, চরিত্র এবং সংস্কৃতিতে যে বিশাল তারতম্য -তা তো সৃষ্টি হয় জ্ঞানভাণ্ডার ও জীবন দর্শনে তারতম্যের কারণে।খাদ্য-পানীয়, ভূমি বা জলবায়ুর কারণে নয়। মহান নবীজী (সাঃ) আরবের মানুষের খাদ্যতালিকা ও পোষাক-পরিচ্ছদে পরিবর্তন আনেননি। তাঁর আগমনে আরবের আবহাওয়া বা জলবায়ু্ও পাল্টে যায়নি। তিনি পরিবর্তন এনেছিলেন তাদের জীবন দর্শনে তথা বাঁচবার ফিলোসফিতে। তাদের কাছে পৌছে দিয়েছিলেন কোরআনী জ্ঞানের মহা জ্ঞানভাণ্ডার। সেটি আরবী ভাষায় নাযিলকৃত পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে। এতেই আরবদের ইতিহাস পাল্টে গেল। সে মরুভূমিতে জন্ম নিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। বাংলা ভাষায় বাঙালী কথা বলে ঠিকই, কিন্তু বাঙালীর মন ও মনন কি সেরূপ কোন পুষ্টি পেয়েছে? ভাতে,মাছে ও ফলমূলে দৈহিক ভাবে বাঁচাটি নিশ্চিত হলেও সে বাঁচার মধ্য দিয়ে সভ্যতা নির্মিত হয় না। উচ্চতর সংস্কৃতিও গড়ে উঠেনা। আন্দামান-নিকোবার ও পাপুয়া নিউগিনির আদিবাসীদের অনেকেই দৈহিক বলে ইউরোপীয়দের চেয়েও শক্তিশালী। কারণ, সে দেশের বনে জঙ্গলে ফলমূল ও শিকারযোগ্য জন্তুর এখনও অভাব পড়েনি। কিন্তু মনের পুষ্টিতে তাদের দৈন্যদশা এতোটাই প্রবল যে, তারা এখনও রয়ে গেছে প্রাচীন প্রস্তর যুগে। পশুদের ন্যায় সে বন্য নারী-পুরুষের দেহেও কোন বস্ত্র থাকে না। বনের মাঝে তাদের কোন ঘরও নাই। বনেজঙ্গলে জন্তু-জানোয়ারের মতই গাছের নীচে, ঝোপের মাঝে বা মাটির গুহায় তারা ঘুমায় ও জীবন কাটায়। ঘরবাড়ি বানাতে তারা শেখেনি,বস্ত্র তৈরী ও খাদ্য পাকানোর সামান্যতম জ্ঞানও তাদের নাই। তারা বেড়ে উঠেছে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে। বিগত হাজার হাজার বছরেও তাদের চিন্তা-চেতনা ও জ্ঞানের ভাণ্ডারে কোনরূপ পরিবর্তন আসেনি।

একটি জাতির দৈহিক স্বাস্থ্যের মানটি বুঝা যায় খাদ্য তালিকা দেখে। তেমনি চেতনা ও সভ্যতার মানটি বুঝা যায় সেদেশের বই-পুস্তকের মান দেখে। এ নিয়ে কোন সুষ্ঠ বিচারে বিশাল গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। পাঠ্য তালিকায় মহাজ্ঞানী আল্লাহর গ্রন্থ আল-কোরআন স্থান পেলে মানুষের মন ও মনন যে মান নিয়ে বেড়ে উঠে তাই কি পুথিঁ-পাঠ, কবিতা পাঠ, উপন্যাস পাঠ, রবীন্দ্র-সংগীত বা আউল-বাউলের গানে সম্ভব? ইসলামের আগমনে বিপ্লব এসেছিল আরবদের পাঠ্য তালিকায়। “হে বিধাতা,সাত কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করনি।” কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালীর ব্যর্থতা নিয়ে তাঁর রচিত কবিতার এ ছত্রটি প্রচণ্ড দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেটি বাঙালীর শারীরীক ভাবে বেড়ে উঠার ব্যর্থতা নিয়ে নয়। সে আফসোসটি মন ও মননে বেড়ে না উঠার কারণে। রবীন্দ্রনাথ বাঙালীর বেড়ে উঠার এ দারুন ব্যর্থতা নিয়ে কবিতা লেখেছেন। কিন্তু ব্যর্থতার কারণটি চিহ্নিত করেননি। তার মত একজন হিন্দুর পক্ষে সেটি জানা সম্ভবও ছিল না। সেটি না জানার কারণে বেড়ে উঠার প্রচণ্ড ব্যর্থতা ছিল খোদ রবীন্দ্রনাথেরও। চেতনার সে বিশাল ব্যর্থ নিয়েই কলকাতার রাস্তায় ঢাকা শহরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা রুখতে তিনি মিছিলে নেমেছিলেন। কিন্তু সে কারণটি বুঝতে মিশরীয়দের দেরী হয়নি। ইসলাম কবুলের সাথে সাথেই তারা সেটি বুঝেছিল। সেটি বুঝে যে কোন ঈমানদার ব্যক্তিই। পরিপূর্ণ ঈমানদার রূপে বেড়ে হওয়ার গরজেই মিশরীয়রা তাদের পাঠ্য তালিকা থেকে তাদের নিজ দেশের প্রাচীন মিশরীয় সাহিত্য ও ভাষা বাদ দিয়ে পবিত্র কোরআন ও তার ভাষাকে গ্রহণ করেছিল। মিশরীয়দের সমগ্র ইতিহাসে এটিই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তটি খুলে দেয় সিরাতুল মোস্তাকীম তথা জান্নাতপ্রাপ্তির দরজা। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ স্রেফ ব্যবসায়ীক, পেশাগত বা রাজনৈতিক কারণে ভাষা পাল্টায়। পাশ্চাত্যে বসবাসকারি বাঙালীগণ সেটিই করছে। কিন্তু মিশরীয়গণ তাদের মাতৃভাষা পরিত্যাগ করেছিল অনন্ত অসীম আখেরাত বাঁচাতে। আরবী ভাষাকে তারা গ্রহণ করেছিল মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত থেকে ফায়দা হাসিলের স্বার্থে। এজন্য তাদেরকে কেউ বাধ্যও করেনি। যে খাদ্য পুষ্টি জোগায় না সে খাদ্য গ্রহনে শ্রমদান ও অর্থদানে  লাভ আছে কি? বিষয়টি তেমনি ভাষার ক্ষেত্রেও। মিশরবাসীগণ সে প্রজ্ঞারই পরিচয় দিয়েছিল আরবী ভাষাকে গ্রহণ করে।অথচ তারা পিরামিড নির্মাণ, কাগজ আবিষ্কার, উন্নত চাষাবাদ, তূলাচাষ, উন্নত বস্ত্র নির্মাণ, বর্ণ ও লিখনরীতি আবিষ্কারে বিশ্বের সমগ্র জাতি থেকে তারা বহু হাজার বছর এগিয়ে ছিল। এজন্যই মিশরকে মানব সভ্যতার সূতিকাঘর বলা হয়। শুধু মিশরবাসী নয়, একই পথ ধরেছিল সিরিয়া, ইরাক, আলজিরিয়া, মরোক্কা, তিউনিসিয়া, মৌরতানিয়া, মালি, লিবিয়া ও সূদানের মুসলিমগণ। তাতে তাদেরও প্রচণ্ড লাভ হয়েছিল। সভ্যতর হওয়ার এ কোরআনী পথ ধরার কারণেই মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা –ইসলামী সভ্যতা নির্মাণে তারা নিজ নিজ অবদান রাখতে পেরেছিলেন।

 

বাঙালী মুসলিমের সাহিত্যসংকট

বাঙালী মুসলিমের প্রধান সংকটটি রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক নয়। সবচেয়ে বড় সংকটটি হলো সাহিত্যের। বাঙালী মুসলিমের অন্যান্য সংকটগুলির জন্ম মূলত সে সাহিত্যিক সংকট থেকেই। সাহিত্যের অর্থ কিছু কবিতা ও গান, কিছু গল্প বা উপন্যাস নয়। কিছু কবি,লেখক বা বিজ্ঞানীর নোবেল প্রাইজ পাওয়াতে সাহিত্যের এ সংকটটি দূর হয় না। সাহিত্যের গুরুত্ব আরো ব্যাপক। দৈহিক সুস্বাস্থের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য ও পানীয়ের তালাশ করতে হয়। বাঁচতে হয় দুষিত ও বিষাক্ত খাবার থেকে। তেমনি উন্নত দর্শন, সুস্থ চেতনা ও নৈতিক সুস্বাস্থ্যের জন্য শ্রেষ্ঠ জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠ দর্শনের তালাশ করতে হয়। বাঁচতে হয় কুসাহিত্যে ও কুদর্শন থেকে। এখানেই ভাষার গুরুত্ব। ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার তাড়নাই মুসলিম জীবনের মূল তাড়না। পানি ছাড়া যেমন কোন প্রাণী বা উদ্ভিদ বাঁচে না, তেমনি বিশুদ্ধ জ্ঞান ছাড়া কোন ব্যক্তির ঈমানও বাঁচে না। তখন অসম্ভব হয় মানব রূপে বেড়ে উঠা। দেহের খাদ্য কীট-পতঙ্গো ও পশুও জোগার করতে পারে। কিন্তু আত্মার খাদ্য জোগারের কাজটি একমাত্র মানুষের।এবং সে খাদ্যটি ক্ষেতে বা বনেজঙ্গলে মেলে না। সেটির একমাত্র উৎস হলো ওহীর জ্ঞান। মহান আল্লাহতায়ালা তাই কৃষিজ্ঞান, চিকিৎসাজ্ঞান বা বিজ্ঞানের জ্ঞান বাড়াতে কোন কিতাব নাযিল করেননি; কোন নবী বা রাসূলও পাঠাননি। বরং লক্ষাধীক নবী-রাসূল ও ৪ খানি আসমানী কিতাব পাঠিয়েছেন মানব জাতির আত্মায় সত্য-জ্ঞানের সে প্রয়োজনটি মেটাতে। তাই কোন ব্যক্তির শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞা শুধু দেহের পুষ্টিকর খাদ্যের সন্ধান লাভ নয়, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞা বা লাইফ স্কীল হলো মহান  আল্লাহতায়ার নাযিলকৃত সে ওহীর জ্ঞানের সন্ধান লাভ। নইলে মানুষ রূপে বাঁচাটিই শুধু ব্যর্থ হয় না, সে ব্যর্থতার ফলে অনন্ত অসীম কালের জন্য জাহান্নামের আগুণে গিয়ে পৌছাও অনিবার্য হয়ে উঠে। বস্তুত সে গভীর প্রজ্ঞার বলেই মিশরীয়, সিরিয়ান,ইরাকী, আলজিরিয়ান, মরোক্কান, লিবিয়ান ও সূদানী মুসলিমগণ ইসলাম কবুলের সাথে সাথেই আরবী ভাষাকে নিজেদর ভাষা রূপে গ্রহণ করেছিল। একই কারণে পাকিস্তানের পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধি ও বেলুচীরা নিজেদের মাতৃভাষার বদলে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা রূপে গ্রহণ করেছে। কারণ, চেতনায় পুষ্টি জোগানোর ক্ষেত্রে তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষার তূলনায় উর্দু ভাষার সামর্থটি বিশাল। সে সামর্থ্যটি বাড়াতেই উর্দু ভাষা গড়ে উঠেছিল বহু শত বছর ধরে সমগ্র উপমহাদেশের মুসলিমদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। এ ভাষাটির উন্নয়নে বিনিয়োগ ছিল ভারতের বিভিন্ন এলাকার মুসলিম শাসকদেরও। উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম চেতনায় জ্ঞানের পুষ্টি জোগানো। উর্দু বিহারীদের দান নয়, পাঞ্জাবীদেরও নয়। এ ভাষাটির উন্নয়নে অন্যদের পাশাপাশি এমনকি হাজার হাজার বাঙালী আলেম ও বুদ্ধিজীবী শত শত বছর ধরে কাজ করেছে। বাংলাদেশের সকল মাদ্রাসাতে উর্দু ভাষাতেই শিক্ষা দেয়া হত। অনেক উর্দু বইয়ের লেখকও তারা। উর্দু ব্যবহৃত হত উপমহাদেশের অন্যান্য প্রদেশেও। ফার্সীর পর উর্দুই স্বীকৃতি পায় উপমহাদেশের মুসলমানদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভাষা রূপে। কারণ ইসলামী জ্ঞানের দিক দিয়ে আরবী ভাষার পরেই হলো উর্দুর স্থান। বাংলা, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, গুজরাতি বা অন্য কোন ভাষায় সে কাজটি হয়নি। সেক্যুলার বাঙালীদের কাছে এ বিষয়টি আদৌ গুরুত্ব পায় নি। তবে গুরুত্ব না পাওয়ার বোধগম্য কারণও রয়েছে। কারণ,তাদের এজেন্ডা তো মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো। কারণ, ইসলামের প্রতিষ্ঠায় মুসলিমদের অঙ্গীকারহীন করাই তো তাদের রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতি। ফলে আরবী বা উর্দুর ন্যায় যে ভাষা মুসলিম চেতনায় কোরআনী জ্ঞানের পুষ্টি জোগায় সে ভাষার প্রতি তাদের আগ্রহ থাকার কথা নয়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে তো তারা সেটিই প্রমাণ করেছে।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকালে বাংলা ভাষার দৈন্যতাটি ছিল বিশাল। বাংলা ভাষায় তখন কোন তফসির গ্রন্থ ছিল না। অনুদিত হয়নি কোন হাদীস গ্রন্থ। রচিত হয়নি নবীজী(সাঃ)র কোন জীবনী-গ্রন্থ। বাংলা ভাষার মাধ্যমে ইসলামের মহান বীরদের জানার কোন উপায় ছিল না। বাংলা সাহিত্যের শুরু হয় চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, মনসা মঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, নাথ সাহিত্য, শ্রী চৈতন্যের কীর্তন, রাময়ন ও মহাভারতের অনুবাদের মধ্য দিয়ে। এসব সাহিত্যের নাড়ির টানটি মূলতঃ পৌত্তলিকতার সাথে। সপ্তদশ শতাব্দীতে ও তার পরে আলাওল, শাহ মুহাম্মদ সগীর, সৈয়দ সুলতান ও অন্যান্য মুসলমান সাহিত্যিকের হাতে কবিতা ও পুঁথি সাহিত্য রচিত হলেও সে সীমিত সাহিত্য ভাণ্ডার কি বিশাল বাঙালী মুসলিম জনগণের জন্য যথেষ্ঠ? প্রশ্ন হলো, সে প্রাচীন বা মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য আধুনিক মুসলিমের জন্য কতটুকু উপযোগী? তাছাড়া প্রতিযুগে সাহিত্যও তার সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট পাল্টায়। পরিবর্তন আসে শব্দ ভাণ্ডারে। সেসব নতুন প্রেক্ষাপটে চাই নতুন চিন্তা-ভাবনা ও নতুন শব্দ ভাণ্ডার নিয়ে নতুন সাহিত্য।সাহিত্যের ময়দানে তাই লাগাতর নবায়নটি জরুরী। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে সেটি ঘটেনি। মধ্যযুগীয় পুঁথি বা কবিতার প্রতি তাই আধুনিক যুগের মুসলিমদের আগ্রহ থাকার কথা নয়। আধুনিক কালে বাংলা সাহিত্যের যারা দিকপাল তাদের অধিকাংশই হিন্দু। ইশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, নবীন চন্দ্র, হেমচন্দ্র, বিহারীলাল, মাইকেল মধুসূদন,রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের ন্যায় বিপুল সংখ্যক সাহিত্যিকেরা বাংলা সাহিত্যকে গড়ে তোলে হিন্দুদের হিন্দু রূপে গড়ে তোলার প্রয়োজনে। তাতে মুসলিমদের জন্য মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার খোরাক ছিল না। বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্য বলতে যা বুঝাতো তা হলো মীর মোশাররফ হোসেন রচিত বিষাদ সিন্ধু ও কিছু পুঁথি সাহিত্য। তখন কোরআন-চর্চা বলতে যা হত, তা মূলত অর্থ না বুঝে স্রেফ তেলাওয়াত। এমন দরিদ্র্য জ্ঞানভাণ্ডার নিয়ে কি একটি জাতি মনের পুষ্টি পায়? বরং তাতে গড়ে উঠে ন্যাশনালিজম, সেক্যুলারিজম, সোসালিজম, ফ্যাসিবাদের ন্যায় ভয়ানক চেতনাগত রোগের উর্বর প্রেক্ষাপট।

হিন্দু রেনেসাঁর কবি-সাহিত্যিকগণ বাংলার মুসলিমদের বাঙালী রূপেও গণ্য করত না। নিজেদের ভাবনার মানচিত্রে বাঙালী মুসলিমদের জন্য তারা কোন স্থানই বরাদ্দ রাখেনি। যেমন শরৎ চন্দ্র চট্টপাধ্যায় লিখেছেন, ‌“আমাদের স্কুলে আজ বাঙালী ও মুসলমানদের মাঝে খেলা”। তাঁর এই একটি মাত্র বাক্যেই ফুটে উঠেছে সে আমলে বাঙালী রূপে কাদেরকে বুঝানো হত। নীরদচন্দ্র চৌধুরী লিখেছেন, “(অনুবাদঃ ১৯০৫ সালের আগে মুসলমানদের প্রতি হিন্দু ভদ্রলোকদের আচরণ চার রকম ছিল। … আমাদের চতুর্থ অনুভূতিটি ছিল মুসলিম প্রজাদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ, তাদেরকে আমরা গৃহপালিত পশু মনে করতাম। শব্দগুলো শক্ত,তবে সত্য।” –( Sarker, Sumit; 1973)।এমন ঘৃণাপূর্ণ চেতনা শুধু আচরণে নয়,তাতে পরিপূর্ণ ছিল হিন্দুদের রচিত সাহিত্য ও রাজনীতি।হিন্দু সাহিত্যিকদের রচিত বই পড়ে কেউ কি তাই মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার আত্মপ্রত্যয় পায়? বরং তাতে মৃত্যু ঘটে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার প্রেরণা। ইসলামী চেতনার সে মৃত্যুদশাটি তাই এত প্রবল রবীন্দ্রভক্ত বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের মাঝে।

জনগণের মাঝে ধর্মপ্রেম, দেশপ্রেম, উচ্চতর মূল্যবোধ ও সভ্য রীতিনীতি গড়ে তোলা কাজটি রাজনৈতিক নেতাদের নয়। প্রশাসনেরও নয়। মানব গড়া ও দেশ গড়ার সে বিশাল জিহাদটি তো হয় বুদ্ধিবৃত্তির রণাঙ্গনে। সে জিহাদে মূল হাতিয়ার হলো পবিত্র কোরআন ও যুগোপযোগী ইসলামী সাহিত্য। বুদ্ধিবৃত্তির রণাঙ্গনের লড়াকু মুজাহিদগণ হলেন বিজ্ঞ জ্ঞানীগণ। ইসলামে তাই জ্ঞানীর কলমের কালীকে বিশাল মর্যাদা দেয়া হয়েছে।তাদের মৃত্যুকে তূলনা করা হয়েছে আসমান থেকে একটি নক্ষত্র খসে পড়ার সাথে। বুদ্ধিবৃত্তির এ অঙ্গণ থেকেই রণাঙ্গনের শহীদ পয়দা হয়। অথচ সে বুদ্ধিবৃত্তিক রণাঙ্গনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছিল বিশাল শূন্যতা। বরং সে অঙ্গন অধিকৃত হয়েছিল ইসলামের শত্রু পক্ষের হাতে। তাদের অধিকাংশ ছিল সেক্যুলারিস্ট, সোসালিস্ট ও  জাতীয়তাবাদী। অনেকে ছিল পৌত্তলিক এবং অখণ্ড ভারতে বিশ্বাসী। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে তারাই বিজয়ী হয়েছে। ফলে রাজনীতির রণাঙ্গনে পর্যাপ্ত মুজাহিদ জুটেনি। বরং সৃষ্টি হয়েছে পৌত্তলিক কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে ভারেতর পাশে যুদ্ধ লড়ার হাজার হাজার সৈনিক। ফলে বাঁচেনি সাতচল্লিশের পাকিস্তান।

আলাদা একটি রাষ্ট্রের জন্য শুধু পৃথক ভূগোল হলে চলে না, আলাদা সাহিত্যও সে জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে রাষ্ট্র যদি পাকিস্তানের ন্যায় একটি আদর্শিক রাষ্ট্র হয়। সাহিত্য অভিন্ন হলে চেতনাও অভিন্ন হয়। তখন বিলুপ্ত হয় ভিন্ন রাজনীতি ও ভিন্ন ভূগোলের সাধ। এরই প্রমাণ, বাংলাদেশের বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ। তাদের চেতনার ভূগোলটি ভারতের সাথে এতোটাই মিশে গেছে যে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রই তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। ১৯৪৭’য়ের পূর্বে একই অবস্থা ছিল কংগ্রেসী মুসলিমদের। তাদের চেতনার রাজ্যটি হিন্দুদের থেকে অভিন্ন হওয়ায় তারাও সেদিন স্বাধীন পাকিস্তানের প্রয়োজনীতা বুঝেনি। অথচ হিন্দু ও মুসলমানের মাঝে সাহিত্যের দুটি ভিন্ন ধারা শুরু থেকেই বহমান। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎ চন্দ্রে এসে সাহিত্যের সে হিন্দু ধারাটি শেষ হয়নি, বরং বলবান হয়েছে। শ্রী কৃষ্ণ কীর্তন, মনসা মঙ্গল বা চৈতন্য দেবের ভক্তি মূলক গান বাংলার হিন্দুদেরকে মুসলিম হওয়া থেকে সফল ভাবে রুখেছে। বাঙালী মুসলিম জীবনে সে হিন্দুধারাই প্রবল ভাবে বিজয়ী হয়েছে। বাংলাদেশের স্কুল কলেজে পবিত্র কোরআনের আয়াত পাঠ তাই বাধ্যতামূলক নয়, বাধ্যতামূলক হলো রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনা বাংলা” গান। মুসলিম জনগণের জীবনে হিন্দু সাহিত্যকে এভাবে প্রতিষ্ঠা দিলে তাদের মুসলিম থাকাই শুধু বিপন্ন হয় না, বিপন্ন হয় মুসলিম দেশের অস্তিত্বও। পাকিস্তান একাত্তরে ভেঙ্গে গিয়ে বস্তুত সেটিই প্রমাণ করে গেছে। এধারাটি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশও যে বিলুপ্ত হবে -তা নিয়েও কি কোন সন্দেহ আছে?

 

 অধিকৃত চেতনা

ব্যক্তির কর্ম ও রাজনীতি দৈহিক গুণাগুণে পরিচালিত হয় না; পরিচালিত হয় তার চেতনা বা ভাবনার গুণে। এবং সে চেতনা বা ভাবনার রাজ্যে হুকুমটি চলে ধ্যান-ধারনা বা দর্শনের। তাই শুধু দেশের ভুগোল পাহারা দিলে চলে না, পাহারা দিতে হয় চেতনার ভূগোলকেও। আর সে চেতনার ভুগলোকে প্রতিরক্ষা দেয় বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধারা। সেটি করে সাহিত্য বা লেখনির মাধ্যমে। এ যোদ্ধারাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিল। বাঙালী মুসলিমদের বড় ব্যর্থতাটি হলো, দেশটিতে সেরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধা সৃষ্টি হয়নি। ফলে গড়ে উঠেনি ইসলামী দর্শনপুষ্ট সাহিত্য। ফলে অনায়াসেই শত্রুদের হাতে অধিকৃত হয়েছে বাঙালী মুসলিমের চেতনার ভূগোল। আর তাতে মহাসংকটে পড়েছে ইসলামী চেতনা নিয়ে বাঙালী মুসলিমের বেড়ে উঠাটি। এ ব্যর্থতার কারণেই হিন্দুদের রচিত বিশাল সাহিত্য পেয়েছে মুসলিম মননের খালি জায়গাটি সহজে দখলে নেয়ার। তাতে দখলে গেছে বাঙালী মুসলিমের রাজনীতি ও সংস্কৃতিও। এতে বাঙালী হিন্দুর চেতনার সাথে একাকার হয়েছে বাঙালী মুসলিমের চেতনা। এজন্যই সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ধ্যানধারণা বিচারে সেক্যুলার বাঙালী মুসলিমকে বাঙালী হিন্দু থেকে আলাদাটি করাটি দুরুহ। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সেরূপ  বিপর্যয় পশ্চিম পাকিস্তানে সৃষ্টি হয়নি। সেখানেও জাতীয়তাবাদী ছিল, সোসালিস্ট ছিল এবং প্রচুর  বিচ্ছিন্নতাবাদীও ছিল। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে সফল লড়াই লড়েছে এবং এখনো লড়ছে সেদেশের আলেম-উলামা ও ইসলামী বুদ্ধিজীবীগণ। ফলে একাত্তরে বাঙালী মুসলিমের জীবনে যেমন ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিকৃতি এসেছিল সেটি পশ্চিম পাকিস্তানীদের জীবনে আজও  আসেনি।

কলেরা ও যক্ষার ন্যায় সংক্রামক ব্যাধির মহামারি থেকে বাঁচতে হলে ভ্যাকসিন নিতে হয়। সেটি অবিকল সত্য কুফরি, শিরক, মুনাফিকির জীবাণু থেকে বাঁচার ক্ষেত্রেও। এক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের কাজ করে ইসলামী জ্ঞান। সে জ্ঞানকে কোরআন-হাদীস ও ইসলামী দর্শনের জ্ঞান হতে হয়। ভ্যাকসিনের সে কাজ কি হিন্দুদের রচিত সাহিত্যে সম্ভব? তাতে তো বরং উল্টোটি হয়। চেতনায় তখন শিরক ও কুফরির জীবাণু ঢুকে। তখন বেড়ে উঠে ইসলামের বিরুদ্ধে ইম্যুনিটি বা প্রতিরোধের ক্ষমতা। বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের ক্ষেত্রে তো সেটিই হয়েছে। তাদের চেতনায় তাই ইসলাম বাঁচেনি। বরং তারা দাঁড়িয়েছে ইসলামের প্রবল প্রতিপক্ষ রূপে। ঈমান বাঁচানোর সে গুরুতর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই অনেক বাঙালী মুসলিম সেদিন উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করা পক্ষে মত দিয়েছিলেন। সে চিন্তাটি ছিল বাঙালী মুসলিমের মন ও মননকে ইসলামী চেতনায় সমৃদ্ধ করার প্রেরণা থেকে। তাদের মাথায় বাঙালীর ক্ষতির চিন্তা ছিল না। বাঙালীর মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার নিয়েতও ছিল না। কিন্তু তাদের সে সদিচ্ছার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা হয়নি। বরং তাদেরকে চিত্রিত করা হয়েছে বাঙালী ও বাংলা ভাষার শত্রু রূপে। এটি ছিল তাদের নিয়তের উপর হামলা। উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ভাষাটি থেকে ঈমানদার ব্যক্তিগণ পুষ্টি পাক এবং তাদের চেতনার ভূমিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পাক -সেটি তারা চায়নি।

 

বিভক্তির দেয়াল

মিশরের জনগণ যদি ইসলাম গ্রহণের সাথে আরবী ভাষা গ্রহণ না করতো -তা হলে কি তারা কোরআনের এতো সান্নিধ্যে আসতে পারতো? বরং ভাষার নামে বিভক্তির একটি বিশাল দেয়াল তখন থেকেই যেত। যেমন রয়ে গেছে ইরানী বা তুর্কীদের সাথে আরবদের। আরবী ভাষা থেকে মিশরীয় যেমন লাভবান হয়েছে,তেমনি আরবী ভাষাও লাভবান হয়েছে মিশরীয়দের ভাষাচর্চা ও জ্ঞানচর্চা থেকে। আধুনিক যুগে আরবী ভাষায় জ্ঞানচর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের অধিকাংশই মিশরীয়। এক সময় মুসলিম বিশ্বে জ্ঞানচর্চায় নেতৃত্ব ছিল ইরানীদের হাতে। বড় বড় বিজ্ঞানী ও মনিষীর জন্ম হয়েছিল ইরানে। তাদের অবদানের কথা স্বীকার করে প্রখ্যাত সমাজ-বিজ্ঞানী ইবনে খলদুন লিখেছিলেন, ইসলামের জন্ম আরবে, কিন্তু ইসলামী সভ্যতার জন্ম ইরানে। তখন ইসলামী বিশ্বের সাথে তাদের সংযোগের মাধ্যম ছিল আরবী ভাষা। আল রাযী, ইবনে সিনা, আল ফারাবী, আত তাবারী,গাজ্জালীর ন্যায় ইসলামের ইতিহাসের বহু প্রখ্যাত মনিষীর জন্ম ইরানে। তাদের লিখনীর ভাষা ছিল আরবী। ইমাম আল গাজ্জালী একমাত্র কিমিয়ায়ে সা‌‌’দাত ছাড়া সমুদয় বই লিখেছেন আরবীতে। ইরানের কবিরাও কবিতা লিখতেন আরবীতে। আরবী ভাষার কারণে ইরানীরাও সে সময় জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রভূত উন্নতি করেছিল। অপরদিকে তারাও সমৃদ্ধ করেছেন আরবী ভাষাকে। তখন আরবী ভাষা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা। ভাষাগত সে সংযোগটির কারণে তারা যেমন অন্যদের থেকে জ্ঞানার্জনের সুযোগ পেয়েছিল, তেমনি সুযোগ পেয়েছিল মুসলিম জাহানের অন্যদের রাজনীতি,শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করার। আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে -বিশেষ করে খলিফা মামুনুর রশিদের আমলে রাজনীতি চলে যায় ইরানীদের হাতে। কিন্তু পরে আরবী ভাষার সাথে সংযোগ ছিন্ন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানীরা। ফার্সী ভাষাকে জিন্দা করে তারা শুধু মুসলিম একতাকেই বিনষ্ট করেনি, আবর বিশ্বের সাথে নিজেদের সংযোগটিও ছিন্ন করেছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ, জনগণ বিচ্ছিন্ন হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত কোরআন থেকে। সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ অবাঙালী মুসলিমদের থেকে বিচ্ছেদের দেয়াল খাড়া করতে চেয়েছিল এবং তাতে তারা সফলও হয়েছে। অথচ উর্দু ভাষাকে সমৃদ্ধ করার কাজে বাঙালীদের অবদানও কি কম ছিল? বহু বাংলাভাষী উর্দুতে কবিতা লিখেছেন। মওলানা আবুল কালাম আজাদের বিখ্যাত পত্রিকা আল হিলালসহ উর্দু ভাষায় বহু পত্র-পত্রিকা এবং উর্দু বই ছাপা হত বাংলার নগরী কলকাতা থেকে। উর্দু কবিতার লালন ভূমি লক্ষৌ, দিল্লি এলাহাবাদ ও দক্ষিণ ভারতের হায়দারাবাদ হলেও গদ্যচর্চার কাজটি জোরশোরে শুরু হয় কলকাতা থেকে। কলকাতা পরিণত হয়েছিল ভারতীয় মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের কেন্দ্রভূমি। আর সে কারণেই বাংলা পরিণত হয় মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনের মূল দুর্গ।

কথা বলা বা ভাব প্রকাশে সাহায্য করার পাশাপাশি ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কাজ বু্দ্ধিবৃত্তিক,অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক,ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন মেটানো।পশ্চিম বাংলার বাঙালীদের সে প্রয়োজন মিটাতে বাংলা ভাষার পাশাপাশি হিন্দি এবং ইংরেজী শিখতে হয়।ইউরোপীয়দেরও শিখতে হয় কয়েকটি ভাষা।মাতৃভাষা রূপে শতাধিক ভাষা বেঁচে আছে ব্রিটেনে।কিন্তু সেসব ভাষা মায়ের ভাষা হলেও শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভাষা নয়। বিলেতে শিক্ষা,সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যর ভাষা রূপে যেটির চর্চা হচ্ছে সেটি ইংরাজী।একই কারণে বাংলার শিক্ষিতজনেরা এক সময় ফার্সি ও উর্দু শিখতো।তাই অখণ্ড পাকিস্তানেও বাংলার পাশাপাশি উর্দু শেখারও প্রয়োজন ছিল।সেটি যেমন রাজনৈতিক কারণে,তেমনি ইসলামী চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠার প্রয়োজনে।পাকিস্তানের পাঞ্জাবী,সিন্ধি,পাঠান ও বেলুচ শিশুরাও একারণে উর্দু শিখছে। এতে কি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানী হওয়ার ক্ষেত্রে তারা কি বাঙালীদের চেয়ে পিছিয়ে আছে? তাদের মাতৃভাষাগুলিও কি তাতে বিলুপ্ত হয়েছে? অথচ যুক্তি দেখানো হয়েছিল, বাঙালী কিশোরদের এতো সামর্থ্য নেই যে উর্দুর ন্যায় একটি নতুন ভাষা শিখবে। এরূপ অভিমত আদৌ সঠিক ছিল না।এমন ধারণার ভিত্তি ছিল শিশুর মেধাগত সামর্থ্য নিয়ে ভুল ধারণা।শিশুর ভাষা শেখার সামর্থ্য নিয়ে পাশ্চাত্য দেশগুলিতে বহু গবেষণা হয়েছে। নিউয়র্কের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গবেষণা করে দেখেছে শিশুরা একই সাথে ইংরেজী,জার্মান,চাইনিজ,স্পানীশ -এরূপ চারটি ভাষা একত্রে শিখতে পারে।

উর্দু ভাষা শিক্ষায় বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের অনীহার মূল কারণ,উর্দুর বিরুদ্ধে গভীর বিদ্বেষ এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রতি শত্রুতা।যারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানে বিরোধীতা করেছিল তারা কখনোই চায়নি উর্দু ভাষাটি পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মানুষের মাঝে সেতু-বন্ধন গড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করুক।ফলে শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে উর্দুর বিরুদ্ধে একটি শত্রুপক্ষ সক্রিয় ছিল।তাদের দ্বারা ভাষা আন্দোলন ব্যবহৃত হয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নাশকতার কাজে।অথচ পশ্চিম বাংলার বাঙালীরা হিন্দির বিরুদ্ধে এতোটা নীচে নামেনি।সেখানে বাঙালী ছাত্র-ছাত্রীরা বাংলা ও ইংরেজীর সাথে হিন্দিও শিখছে;সেটি ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মানুষের সাথে একাত্ম হওয়ার প্রয়োজনে।অখণ্ড ভারত বাঁচাতে পশ্চিম বাংলার বাঙালী হিন্দুদের মাঝে যে প্রবল আগ্রহ,সেরূপ আগ্রহ পূর্ব পাকিস্তানীদের মাঝে পাকিস্তান বাঁচাতে ছিল না।অথচ হিন্দির চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ ভাষা হলো উর্দু। ব্রিটিশ আমলেও বাংলার মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষার মাধ্যম ছিল উর্দু।আল্লাহতায়ালার দরবারে সকল কাজকর্মের প্রতিদান নির্ধারিত হয় নিয়তের ভিত্তিতে।নিয়ত যেখানে ভাষাকে কেন্দ্র করে মুসলিম দেশের ঐক্য ও সংহতির মূলে আঘাত হানা -তখন সেটি শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন থাকে না,যে পাপ কবিরা গোনাহতে রূপ নেয়।সে নাশকতাটি শুধু নিজ দেশের বিরুদ্ধে হয় না,সংঘটিত হয় নিজ আখেরাতের পরিণামের বিরুদ্ধেও।ভাষার নামে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সেটিই হয়েছে।

 




অধ্যায় পনেরো: ঘরের শত্রুর নাশকতা

বিষাক্ত রাজনীতি

আওয়াম লীগের অনেক  নেতা পাকিস্তানকে তার প্রতিষ্ঠা থেকেই মেনে নিতে পারেননি। যদিও তারা একসময় মুসলিমের লীগের নেতা ছিলেন, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন এবং মন্ত্রীরূপে পাকিস্তানের অস্তিত্ব ও সংহতি রক্ষায় পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নামে কসম খেয়েছেন। পাকিস্তানের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে তাদের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ ছিল, বিষাক্ত বিষও ছিল। তারা বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তান হলো ১৯৪০ সালের গৃহীত লাহোর প্রস্তাবের সাথে গাদ্দারীর ফসল। এ ধরণের নেতাদের বিষপূর্ণ মনের পরিচয় পাওয়া যায় এ গ্রুপের প্রধান বুদ্ধিজীবী জনাব আবুল মনসুর আহমদের লেখায়। তিনি লিখেছেনঃ “মুসলিম লীগ ৪৬ সালে নির্বাচনে ৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের উপর ভোট নিয়া নির্বাচনে জিতিবার পরে গুরুতর ওয়াদা খেলাফ করিলেনঃ লাহোর প্রস্তাবে বর্ণিত পূর্ব-পশ্চিমে দুই মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের বদলে পশ্চিম-ভিত্তিক এক পাকিস্তান বানাইলেন।”-(আবুল মনসুর আহম্মদ, ১৯৮৯)। অর্থাৎ তার মতে অতি অপরাধ হয়েছে অখণ্ড এক বৃহৎ পাকিস্তান বানিয়ে। পাকিস্তানকে বলেছেন পশ্চিম পাকিস্তান ভিত্তিক পাকিস্তান। এসব কথা তারা প্রকাশ্যে বলতেন এবং বইয়ের পাতায় লিখতেন। তাদের মনের গভীরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের বিষ যে কত গভীর ছিল তা এ থেকেই অনুমেয়।

পাকিস্তান-এর প্রতি এরূপ গভীর ক্ষোভ নিয়ে কেঊ কি সে দেশের মঙ্গল করতে পারে? অথচ জনাব আবুল মনসুর আহম্মদ নিজে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হয়েছেন। কথা হলো, তাদের মত ব্যক্তিবর্গ যে মন্ত্রী হয়েছেন সেটি কি নিছক ক্ষমতার মোহে ও আখের গুছানোর তাগিদে? এটা ঠিক, লাহোর প্রস্তাবে পূর্ব বাংলার পাকিস্তান ভুক্তির কথা ছিল না। কিন্তু তিনি নিজের মতটা প্রমাণ করার তাগিদে ইচ্ছা করেই আরেকটি ঐতিহাসিক সত্যকে গোপন করেছেন। সে সত্যটি হলো, পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভুক্ত করা হয় অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের মুসলিম সদস্যদের ভোটে। কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহ বা অন্য কোন অবাঙালী নেতা বাঙালী মুসলমানদের উপর সে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি। পশ্চিম পাকিস্তান ভিত্তিক পাকিস্তান বানানো লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রও হয় নাই। সিদ্ধান্তটি নেয়া হয় ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের দিল্লি সম্মেলনে। সেখানে বাংলার পাকিস্তান ভুক্তির পক্ষে প্রস্তাব উত্থাপন করেন বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জনাব সোহরাওয়ার্দী এবং সে প্রস্তাবটি বিপুল ভোটে গৃহীত হয়। আবুল মনসুর আহম্মদের সে বিষয়টি জানা থাকার কথা। তাছাড়া জনাব সোহরাওয়ার্দী নিজেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং তিনি জনাব মনসুর আহম্মদের নেতাও ছিলেন।

তবে আবুল মনসুর আহমদের মত বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের চেতনায় মূল রোগটি হলো, তারা ইসলামের পুণর্জাগরণে বিশ্বাসী ছিলেন না। তারা চাইতেন না,মুসলিমগণ আবার বিশ্বশক্তি রূপে তাদের হারানো গৌরব ফিরে পাক। আর সে বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেতে হলে তো বৃহৎ ভূগোল চাই। অথচ বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের চেতনার ক্ষুদ্র ভূবনে বাঙালী ছাড়া অন্যভাষী মুসলিমের স্থান ছিল না। তাই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে বিশ্বের মানচিত্রে যেভাবে সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম হলো তাতে খুশি হতে পারেনি। বরং প্রচণ্ড বিষণ্ণ হয়েছেন এ জন্য যে, মুসলিম লীগের দিল্লি সম্মেলনে কেন লাহোর প্রস্তাবে সংশোধনী আনা হলো। মনের ক্ষেদে সে সিদ্ধান্তের কথাটি আবুল মনসুর আহমদ ইচ্ছা করেই ভূলে গেছেন। পাকিস্তানের বড্ড বদ নসিব যে এমন ক্ষুদ্র ও সীমিত চেতনার মানুষগুলো পাকিস্তানে নেতা ও মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এরাই ছিল পাকিস্তানের ঘরের শত্রু। জনগণের ভূল হলো, তারা লুকিয়ে থাকা এসব ঘরের শত্রুদের চিনতে ভূল করেছে।

 

চেতনায় ইসলামশূণ্যতা

পাকিস্তানের সংহতিতে বিশ্বাসের জন্য যেটি অপরিহার্য ছিল সেটি হলো প্যান-ইসলামীক চেতনা। মনের ভুবনটি এমন চেতনায় সমৃদ্ধ না হলে তার কাছে অপর ভাষা ও অপর দেশের মুসলমান নিতান্তই বিদেশী গণ্য হয়। অনেক সময় শত্রুও মনে হয় –যেমনটি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের ক্ষেত্রে ঘটেছে। অথচ একজন মুসলিম অন্য এক মুসলিম ভাইকে মনে করবে সেটিই মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ঈমানদারকে সেভাবেই চিত্রিত করেছেন। এরূপ চেতনাতেই পৃথিবীর বুকে নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মুসলিমদের মাঝে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত দেয়াল সৃষ্টি হয়। এ চেতনা নিয়েই তারা একত্রে রাষ্ট্র নির্মাণ করে, রাজনীতি করে এবং প্রয়োজনে শত্রুর বিরুদ্ধে একত্রে যুদ্ধও করে। মুসলিম উম্মাহ মাঝে এমন একতা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে যে কতটা প্রিয় সেটির ঘোষণা এসেছে পবিত্র কোরআনে এভাবেঃ “ইন্নাল্লাহা ইউহিব্বুল্লাযীনা ইউকাতিলুনা ফি সাবিলিল্লাহি সাফফান কা আন্নাহুম বুনিয়ানুন মারসুস”। অর্থঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা সে সব লোকদের ভালবাসেন যারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে সীসা ঢাকা দেয়ালের ন্যায় অটুট একতা নিয়ে।”

তাই কোন মুসলিমকে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন বর্ণ ও ভিন্ন এলাকার মুসলিমদের সাথে স্রেফ জায়নামাজে একত্রে দাঁড়ালে চলে না, তাকে রাজনীতি ও জিহাদের ময়দানেও একই জামাতে লড়াই করতে হয়। এটিই মুসলিমের ঈমানদারী। আরব, তুর্কী, কুর্দী, মিশরী, মুর, ইরানী শত শত বছর যে ভূগোলের আওতায় বসবাস করলো এবং একই রণাঙ্গণে জিহাদ করলো -তা তো সে শিক্ষার কারণেই। এটিই প্যান-ইসলামীক চেতনা। মুসলিমের ঈমান থেকে এ চেতনাকে কখনোই পৃথক করা যায় না। যখনই মুসলিম উম্মাহ সে চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে তখনই এসেছে ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল-ভিত্তিক বিচ্ছিন্নতা, সংঘাত ও বিভক্তি। এবং বিভক্তি ও সংঘাত কখনোই একাকী আসে না। সাথে আনে লাগাতর পরাজয়, অধিকৃতি ও অপমান। আজকের বাংলাদেশ এবং সে সাথে বিভক্ত মুসলিম বিশ্ব তো সে পরাজয় ও অপমানেরই সাক্ষী।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল এমন লোকদের দিয়ে যাদের অধিকাংশই ছিল আবুল মনসুর আহমদের ন্যায় সেক্যুলার চেতনার। তাদের কেউবা জাতীয়তাবাদী, কেউবা বামপন্থী, কেউবা সোসালিস্ট, কেউবা হিন্দু এবং কেউবা নাস্তিক। দলটির মুসলিম সদস্যদের অধিকাংশই ছিলেন ইসলামী জ্ঞানে অজ্ঞ। সেক্যুলারিস্টদের কাছে প্যান-ইসলামী তথা বিশ্ব-মুসলিম ভাতৃত্বের চেতনাটি হলো সাম্প্রদায়িকতা। তাদের দৃষ্টিতে সামাজিক বা রাজনৈতিক বন্ধন গড়ার ভিত্তিটি হবে ভাষা, বর্ণ, অঞ্চল বা সামাজিক শ্রেণীভেদ –এবং কখনোই ইসলাম নয়। ফলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে প্যান-ইসলামী তথা বিশ্ব-মুসলিম ভাতৃত্বের চেতনাটি ঘৃনীত, নিষিদ্ধ ও বর্জনীয় গণ্য হয়। ফলে দেশে ইসলামী চেতনার প্রসারের বিরুদ্ধে তারা এতটা আপোষহীন ও প্রতিহিংসা পরায়ন। শেখ মুজিব তাই ক্ষমতায় আসা মাত্রই ইসলামী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেন। মুজিব-কণ্যা হাসিনাও সে পথে চলেছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয় ভোটপ্রাপ্তি এবং সে সাথে ক্ষমতালাভ। সেটি পাকিস্তানের অস্তিত্ব বা মুসলিম স্বার্থের সাথে প্রতারণা করে হলেও। এমন একটি লক্ষ্য সামনে রেখেই তারা আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি কেটে দেয়। দলের নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা অমুসলিম, কম্যুনিস্ট, সোসালিস্ট, নাস্তিক ও অন্যান্য ইসলামবিরোধীদের কাছে স্পষ্টতর করে দেয়, ইসলামী চেতনা বা মুসলিম স্বার্থের প্রতি তাদের কোন অঙ্গীকার নেই। এতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান,মুনাফিক ও নাস্তিকদের ভোট পাওয়ার পথটি পরিষ্কার হয়ে যায়।

 

রাজনীতিতে ভারতমুখীতা

ক্ষমতার মোহে আওয়ামী লীগ শুধু হিন্দু ভোটের দিকেই শুধু ঝুঁকেনি, ঝুঁকেছে হিন্দুস্থানের দিকেও। হিন্দু ভোটপ্রাপ্তির জন্য ভারতমুখীতা অপরিহার্যও ছিল। কারণ হিন্দুগণ পাকিস্তানের রাজনীতিতে কাদের ভোট দিবে সেটি নির্ধারিত হত দিল্লি থেকে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে নয়। কারণ, তাদের কান আকাশবানীর দিকে। ক্ষমতার মোহ এভাবেই আওয়ামী লীগের নীতিতে লাগাতর পরিবর্তন আনে এবং দলটিকে পুরাপুরি দিল্লিমুখি করে। অপরদিক পরিকল্পিত ভাবেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ ঘৃণা সৃষ্টি করে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা ও জনগণের বিরুদ্ধে। কারণ হিন্দুদের ভোট ও হিন্দুস্থানের সাহায্য পাওয়ার জন্য এটিও জরুরী ছিল। প্রবাদ আছে, হিন্দুগণ মুসলিম হলে শুরুতে বেশী বেশী গরুর গোস্ত খায়। তেমনি মুজিবের ন্যায় যেসব নেতাকর্মী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেয় তারাও বেশী ভারত বন্দনায় লিপ্ত হয়। ভারতের নেতানেত্রী, ভারতের ছায়াছবি, ভারতের বুদ্ধিজীবী, ভারতের বইপুস্তক -সবই তাদের আছে প্রশংসার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তবে মুজিবের জন্য সেটি বেশী জরুরী ছিল। কারণ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গিরূপে ১৯৪৬’য়ে কলকাতায় তার ভূমিকা ভারতীয়দের কাছে অজানা ছিল না। ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে মুজিব ও তার অনুসারিগণ এরূপ ভারত বন্দনা তাই বেশী বেশীই করেছে। তাদের কাছে যা কিছু পাকিস্তানী তাই ঘৃনার বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। নিজেদের গোপন ঘরোয়া মিটিংগুলোতেই শুধু নয়, আওয়ামী লীগের নেতা ও বুদ্ধিজীবীগণ পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সে ঘৃণা প্রকাশ করতেন নিজেদের লেখনীতে। নিজেদের লেখনীতে বা বক্তৃতায় পশ্চিম পাকিস্তানীদেরকে “পশ্চিমা” বলে উল্লেখ করতেন। এভাবে প্রকাশ পেত তাদের মনে লুকানো বিষপূর্ণ ঘৃণা। এটি যে সাধারণ কর্মীদের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়, তাতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাগণও।

আওয়ামী লীগ শিবিরে বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানের গুরু ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। এমন ঘৃণা অহরহ প্রকাশ পেত তার লেখনিতে। অথচ মুসলিম হিসাবে অপর মুসলিমকে -তা যে ভাষা, যে বর্ণ বা যে ভূগোলেরই হোক তাকে “ভাই” বলে সম্বোধন করা শুধু ইসলামী আদবই নয়, ঈমানী দায়বদ্ধতাও। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে মুসলিমদের একে অপরের ভাই রূপে চিত্রিত করেছেন। সে ভাইয়ের উপহাস করাকে হারাম করেছেন এবং হারাম করেছেন এমন নামে ডাকা -যা তার নিজের কাছে অপছন্দনীয়। (সুরা হুজরাত, আয়াত ১১। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার উপর যার সামান্যতম ঈমান আছে সে কি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অবজ্ঞা বা উপহাস করতে পারে? ঈমানদার ব্যক্তির মাঝে তার মুসলিম ভাইটির প্রতি সম্মানজনক সম্বোধনের আদব শুধু তার সংস্কৃতি নয়, ঈমানের পরিচয়ও। কিন্তু ইসলামী চেতনাশূণ্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ সে আদবটুকুও দেখাতে পারেননি। আবুল মনসুর আহমেদের নিজের লেখা “আমাদের দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর”য়ে এমন ঘৃণাবোধের প্রকাশ ঘটেছে অসংখ্য বার। আওয়ামী লীগ কর্মীরা অবাঙালীদের অহরহই “ছাতু” বলতো, আর আবুল মনসুর আহমদ বলেছেন “পশ্চিমা”। এটিই হলো স্বভাবসুলভ আওয়ামী শালীনতা বা ভদ্রতা! কিন্তু সেরূপ ঘৃনা তারা ভারতীয় অবাঙালীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ করেননি।

ইংল্যান্ডে কালো ব্যক্তিকে কালো বা নিগার বলা ফৌজদারী অপরাধ। এটি চিত্রিত হয় রেসিজম বা বর্ণবাদ রূপে। কোন মন্ত্রী কালোদের বিরুদ্ধে এরূপ শব্দের প্রয়োগ করলে তার মন্ত্রীত্ব থাকে না। ইসলাম এরূপ বর্ণবাদকে হারাম ও অপরাধ ঘোষণা দিয়ে চৌদ্দ শত বছর আগেই। ছাতু বলা বা পশ্চিমা বলাতে কি কোন পশ্চিম পাকিস্তানী খুশি হতে পারেন? অথচ অওয়ামী-বাকশালী নেতা-কর্মীগণ অবাঙালীদের বিরুদ্ধে এরূপ ঘৃণাকে শুধু মুখের কথা,দলীয় অফিস বা কেতাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, সে তীব্র ঘৃণাকে অবাঙালীদের জানমালের উপরও প্রয়োগ করেছে। এ লক্ষ্যে তারা আদমজী জুট মিলে অবাঙালী নিধনে দাঙ্গা বাধিয়েছে। দাঙ্গা বাধায় সাধারণতঃ দুর্বৃত্ত প্রকৃতির অপরাধীরা। কোন রাজনৈতিক দল ও তার নেতারা সেটি ভাবতেও পারে না। কারণ,রাজনীতি তো মানব কল্যাণের ব্রত। কিন্তু আওয়ামী লীগ রাজনীতিকেও দাঙ্গা, সন্ত্রাস ও ঘৃণা ছড়ানোর হাতিয়ারে পরিণত করেছিল। এভাবে পূর্ব পাকিস্তানে অবাঙালীদের পুঁজি বিনিয়োগের পথ তারা বন্ধ করে দেয়। পশ্চিম পাকিস্তানী বিনিয়োগকারীগণ তখন বুঝতে পারে, যে দেশে তাদের জান ও ইজ্জতের নিরাপত্তা নেই -সেদেশে তাদের পুঁজি নিরাপত্তা পাবে কি করে? ফলে যে দেশটি দ্রুত শিল্পোন্নয়নে সমগ্র তৃতীয় বিশ্বে রেকর্ড গড়ছিল, পরিকল্পিত ভাবে সেখানে স্থবিরতা আনা হলো। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ৬০’য়ের দশকে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর শিল্পোন্নয়নের উপর একটি প্রচ্ছদ-নিবন্ধ ছেপেছিল। সে নিবন্ধে দুইটি দেশকে তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উন্নয়নমুখী দেশ রূপে চিহ্নিত করেছিল। দেশ দু’টির একটি হলো কোরিয়া এবং অপরটি পাকিস্তান। যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পাকিস্তান সে অগ্রগতির ধারা ধরে রাখতে পারিনি, কিন্তু কোরিয়া এগিয়ে গেছে। ভারত কখনোই পাকিস্তানের এরূপ দ্রুত শিল্পোন্নয়ন চায়নি। কারণ শিল্পোন্নয়ন হলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিও বাড়ে। পাকিস্তানের জন্ম থেকেই যারা দেশটির বিনাশে আগ্রহী তারা কি শিল্পোন্নয়ন সহ্য করতে পারে? ফলে পাকিস্তানের শিল্পধ্বংসে ভারত তার বিশ্বস্থ্ ট্রোজান হর্সদের ময়দানে নামিয়ে দেয়।ফলে অবাঙালী-বিরোধী দাঙ্গার নামে দেশের শিল্প ও অর্থনীতি বিনাশে যুদ্ধ শুরু হয়।সেটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী জুটমিলে। পাটজাত দ্রব্যের আন্তর্জাতিক বাজারে পাকিস্তানই ছিল ভারতের মূল প্রতিদ্বন্দি। তাই নিশ্চিত বলা যায়, ভারত ও তার ট্রোজান হর্সগণ যুদ্ধের ক্ষেত্র নির্বচনে ভূল করেনি।

 

রাজনীতিতে আত্মঘাত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আত্মঘাতের ইতিহাসটি বহু পুরানো।সেটির শুরু মীর জাফরের আমল থেকেই।সে আত্মঘাতই বাংলার রাজনীতিতে বার বার ফিরে এসেছে।একাত্তরের পর দেশীয় শিল্প ধ্বংস করে শেখ মুজিব ভারতের জন্য প্রতিযোগিতামুক্ত নিরাপদ বাজার সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। পাকিস্তান আমলে পাটশিল্পের আন্তর্জাতিক বাজারটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানী পাটের। কিন্তু মুজিব আমলে সেটিকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়। দেশী শিল্প ধ্বংসের কাজটি বাঙালী সেক্যুলারিস্টগন শুরু করেছিল পাকিস্তান আমল থেকেই। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র ২০ বছরের মধ্যে বাঙালী মুসলিমদের মাঝে প্রশাসন,অর্থনীতি,শিক্ষাদীক্ষা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে অধীক অগ্রগতি সাধিত হয়।ভারতের পশ্চিম বাংলার চেয়ে তা ছিল তূলনামূলক ভাবে অনেক বেশী। কিন্তু সে উন্নয়নের সাথে বাঙালীদের মাঝে অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশা।সে প্রত্যাশা পূরণ করার সহজ পথ সামনে ছিল না,আর তাতে বৃদ্ধি পায় অধৈর্য্যশীল বাঙালীর মাঝে দ্রুত রাজনৈতিক অস্থিরতা।সে অস্থিরতার কারণে অবস্থা এমন দাঁড়ায়,নিজেদের যে কোন দুরাবস্থার জন্য তারা পশ্চিম পাকিস্তানকে দায়ী করা শুরু করে।

দেশবিভাগের পূর্বে ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনে বেশ কিছূ অভিজ্ঞ মুসলিম প্রশাসক,অর্থনীতিবিদ ও শিল্পপতি ছিল। কিন্তু তাদের প্রায় সবাই ছিলেন অবাঙালী। ব্রিটিশ প্রশাসনের বাইরেও অনেকে ছিলেন হায়দারাবাদের নিজাম,ভূপালের রানী ও অন্যান্য ভারতীয় মুসলিম অঙ্গরাজ্যের অভিজ্ঞ প্রশাসনিক কর্মচারি।কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী রাজনীতিবিদ ও কর্মচারিগণ চাইতো না,তাদের অফিস আদালত ও প্রশাসনে ভারত থেকে আসা এসব অবাঙালীগণ নিয়োগ পাক।ফলে তাদের বেশীর ভাগই পশ্চিম পাকিস্তানে বসতি স্থাপন করে,এতে সে এলাকায় দক্ষ জনশক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।বাঙালীদের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয় পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পকলকারখানায় অবাঙালীদের শ্রমিক রূপে কাজ করার বিরুদ্ধেও।এরূপ বর্ণবাদী ঘৃনা পশ্চিম পাকিস্তানের কোন শিল্প এলাকায় কখনোই দেখা দেয়নি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে অবাঙালী ব্যবসায়ী ও পুঁজি বিনিয়োগকারিগণ চিত্রিত হন লুটেরা রূপে।লক্ষণীয় হলো,বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর যেসব কোরিয়ান,জাপানী ও ইউরোপীয়গণ বাংলাদেশে শিল্পকারখানা স্থাপন করেছে এবং সেসব কারখানা থেকে শত শত কোটি ডলার উপার্জন করে নিচ্ছে।নিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় কোম্পানীগুলোও। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ এরূপ ঘৃণা ছড়ায় না।তাদের ঘৃণাটি ছিল শুধু পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে।কারণ,ভারত সেটিই চাইতো।অথচ পাঞ্জাব,সিন্ধু,বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশে সেরূপ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ঘৃণা ও অস্থিরতা দেখা দেয়নি।ফলে পুঁজি নিরাপত্ত পায় পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে;এতে শিল্পোন্নয়নের ধারা সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের তূলনায় বেগবান হয়।পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্ব থেকেই পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম এ দুইটি অংশের মাঝে যে বিশাল বৈষম্য ছিল,সেটি ১৯৪৭ সাল থেকে কমতে শুরু করেছিল।কারণ পূর্ব পাকিস্তানেও বিনিয়োগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল।কিন্তু আওয়ামী লীগের বর্ণবাদী ও আত্মঘাতি নীতিতে যখন বিভিন্ন শিল্প এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ও দাঙ্গা শুরু হয়,সে বৈষম্য আবার বৃদ্ধি পেতে থাকে।

অর্থনীতিতে শুধু পুঁজির জোগান হলেই উন্নয়ন হয় না।সে জন্য অপরিহার্য হলো সামাজিক পুঁজি।সে সামাজিক পুঁজিটি হলো রাজনৈতিক অঙ্গণে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব,স্থিতিশীলতা ও শিষ্ঠাচার,এবং সে সাথে সামাজিক শৃঙ্খলা,জনগণের মাঝে ভাতৃত্ববোধ,ন্যায়পরায়ণতা ও শ্রদ্ধাবোধ।চাই শ্রমিকের কর্মকুশলতা,সততা ও দায়িত্বশীলতা। জনগণের মাঝে ঘৃণা,সন্ত্রাস,চাঁদাবাজি বা দাঙ্গার কালচার প্রসার পেলে সে সামাজিক পুঁজিটি ত্বরিৎ বিলুপ্ত হয়।এভাবে সামাজিক পুঁজি বিলুপ্ত হলে সে দেশ থেকে পুঁজি ও বিনিয়োগকারিগণ দ্রুত পলায়ন শুরু করে।তখন বাধাগ্রস্ত হয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন।ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে পূর্ব পাকিস্তানে মূলত সেটিই ঘটেছিল।আর তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ।এবং তাদের সাথে যোগ দেয় উগ্র বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নিস্টগণ।এরূপ পরিস্থিতির কারণে অবাঙালী প্রশাসকদের মনে ধারণা জন্মে,অনভিজ্ঞ পূর্ব পাকিস্তানীরা নিজেরা কোন কিছু করতে না পারলে অন্যরা এসে সেটি করে দিক -সেটিও তারা চায় না।

প্যান-ইসলামীক মুসলিম ভাতৃত্বের বিরুদ্ধে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মন-মগজ যে কতটা বিষর্পূণ তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। তখন ইয়াহিয়া খানের আমল। পাকিস্তান সরকারের নীতি নির্ধারকগণ অবশেষে উপলদ্ধি করেন, যে প্যান-ইসলামী চেতনার ভিত্তিতে উপমহাদেশের বাঙালী, বিহারী, গুজরাতি, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পাঠান ও অন্যান্য ভাষাভাষি মুসলিমগণ যেভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিল -সে চেতনাটিই দ্রুত দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। দেরীতে হলেও বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে বড় বিপদ এখানেই। প্যান-ইসলামী চেতনার অভাবে ভয়ানক শত্রু বেড়ে উঠছে নিজ ঘরেই। পূর্ববর্তী সরকারগুলোতে যারা ছিলেন তাদের অধিকাংশ ছিলেন মনে প্রাণে সেক্যুলার। তারা এসেছিলেন দেশের র‌্যাডিক্যাল সেক্যুলার ইনস্টিটিউশনগুলি থেকে। সেগুলি হলো ব্রিটিশের গড়া সেনাবাহিনী, সরকারি প্রশাসন ও জুডিশিয়ারি। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামের কোন প্রভাব শুরুতেই ছিল না। ফলে ইসলামী চেতনার বিকাশে এসব সেক্যুলারিস্টগণ কোন কাজই করেনি। ইসলামী চেতনার উপর তাদের নিজেদেরও কোন বিশ্বাস ছিল না। ব্রিটিশগণ ১৯৪৭সালে দেশ ছাড়লেও দেশ অধিকৃত হয় যায় তাদের হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেক্যুলারিস্টদের হাতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও চলছিল ব্রিটিশ প্রণীত সেক্যুলার শিক্ষানীতির উপর। ফল দাঁড়ায়, পাকিস্তানের ন্যায় একটি আদর্শিক রাষ্ট্র তার প্রশাসন ও রাজনীতি চালাতে প্যান-ইসলামীক চেতনাসমৃদ্ধ জনশক্তি পেতে ব্যর্থ হয়।

পাকিস্তানের ঘরের দরজায় যখন ভয়ানক বিপদ, দেশটি তখন দু’টুকরো হওয়ার পথে। তখন দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকিত কিছু ব্যক্তি অনুধাবন করেন, দেশের মূল রোগটি শিক্ষা ব্যবস্থায়। দেশের চলমান শিক্ষা-ব্যবস্থা ও তার পাঠ্যবই ছাত্রদের মনে ইসলামী চেতনার সৃষ্টি বা বৃদ্ধিতে কোন পুষ্টিই জোগাচ্ছে না। বরং উল্টোটি করছে। ইতিমধ্যে দেশ ছেয়ে গেছে ভারতীয়, রুশ ও চীনা বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকায়। পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত ঘিরে ভারত বসিয়েছে অনেকগুলি শক্তিশালী রেডিও সম্প্রচারকেন্দ্র। এ্যায়ার মার্শাল নূর খান তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। নতুন প্রজন্ম যাতে ইসলামী চেতনা ও পাকিস্তানের ইতিহাস নিয়ে সম্যক ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠে সে লক্ষ্যে তিনি নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। দেশের ইতিহাস নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে সরকার স্কুলের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করে“পাকিস্তানঃ ইতিহাস ও কৃষ্টি” নামে একটি বই। কিন্তু এতে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগ। তাদের দাবী, স্কুলের ছাত্রদেরকে সে বইটি পড়তে দেয়া যাবে না।এর অর্থ দাড়ায়,ছাত্রদের নিজ দেশের ইতিহাস পড়তে দিতেও তাদের আপত্তি। ছাত্র লীগ নূর খান শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক প্রতিবাদ সভা ডাকে। সেখানে প্রধান বক্তা ছিলেন শেখ মুজিবর রহমানের ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি। তিনে বলেন, “নূর খান শিক্ষানীতির লক্ষ্য, এ দেশে প্যান-ইসলামীক চিন্তাধারার বিকাশ। বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনার বিরুদ্ধে এটি এক গভীর ষড়যন্ত্র। তাই ছাত্র লীগ এ শিক্ষানীতি মেনে নিবে না। এ শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে আমাদের দুর্বার ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।” (লেখক সে মিটিংয়ে শ্রোতা রূপে উপস্থিত ছিলেন)।

 

ফ্যাসিবাদীর মুখে ইসলাম

উগ্র জাতীয়তাবাদেরই অপর নাম ফ্যাসীবাদ। সংযুক্ত পাকিস্তানের শেষের দিন গুলোতে উগ্র বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের সন্ত্রাস শুরু হয় দেশের ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে। ফ্যাসীবাদীদের পক্ষ থেকে শুধু যে রাজনৈতিক সভাসমিতেই হামলা হয়েছিল তা নয়, হামলা হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানেও। কারণ, তাদের ধারণা, প্যান-ইসলামী চেতনা আর জাতীয়তাবাদী চেতনা এক সাথে চলতে পারে না। তাদের ভয়, প্যান-ইসলামী চেতনা প্রবলতর হলে বাঙালী জাতীয়তাবাদ বিলুপ্ত হবে।  ফলে তারা রাজী ছিল না ইসলামী চেতনাধারীদের অস্তিত্বকে সহ্য করতে। তাদের নির্মূলে ফ্যাসীবাদী সন্ত্রাসীগণ অস্ত্র নিয়ে হাজির হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে। সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে প্যান-ইসলামী চেতনার ধারকদের বিরুদ্ধে। ছাত্র লীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন সম্মিলিত ভাবে ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলেছে নূর খান শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে। দুইটি ছাত্র সংগঠনেরই অভিন্ন অভিযোগ, এ শিক্ষানীতি ছাত্রদের মাঝে ইসলামী আদর্শের  প্রতি অঙ্গীকার বাড়াতে চায়। অভিযোগ, এটি বাঙালীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। অতএব সিদ্ধান্ত নেয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তা হতে দেয়া যাবে না। বাঙালী সেক্যুলার মহলটি এভাবে জানিয়ে দেয়, পাকিস্তানের জন্মের ইতিহাস জানায় তাদের সামান্যতম আগ্রহ নাই। সে বছরই (১৯৬৯ সালে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রের পক্ষ থেকে (টিএসসি) নূর খান শিক্ষানীতির উপর আলোচনা সভার আয়োজন হয়। সেখানে ছাত্র লীগ ও ছাত্র ইউনিয়নসহ আরো অনেক ছাত্র সংগঠনের ছাত্ররা নিজ নিজ অভিমত তুলে ধরে। নিজ মত তুলে ধরেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জনাব আব্দুল মালেকও। তিনি ছিলেন ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা শহর শাখার সভাপতি। তার বক্তব্য ছিল, দেশের নতুন শিক্ষা নীতিতে ইসলামী ধ্যান-ধারণায় প্রসারে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে এবং মুসলিম ছাত্রদের প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার কাজে শিক্ষানীতির মাধ্যমে সহায়তা দিতে হবে। কিন্তু তার সে বক্তৃতা শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ করতে দেয়া হয়নি। তাঁর বক্তৃতা চলা কালে চেয়ার ভেঙ্গে হামলা শুরু করে ছাত্র লীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা। জনাব আব্দুল মালেক সে হামলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে সেখান থেকে প্রস্থান করছিলেন। শুধুমাত্র নিজ মত তুলে ধরার কারণে এই নিরস্ত্র মেধাবী ছাত্রকে সোহরাওয়ার্দী উদ্দানে (সাবেক রেস কোর্স ময়দান) নৃশংস ভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সে সময় ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানটি যে কতটা সন্ত্রাস-কবলিত ছিল -এ হলো তার নজির। বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ যে কতটা ফ্যাসিস্ট ও সন্ত্রাসী, সেদিন সে স্বাক্ষর তারা রেখেছিল।

ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসে শুধু যে আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছিল তা নয়, চরম ভাবে আক্রান্ত হয়েছিল দেশের সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবী মহল। ফলে এতোবড় একটা হত্যাকাণ্ড দিনদুপুরে সংঘটিত হওয়ার পরও তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেক্যুলার বু্দ্ধিজীবী মহলে ও মিডিয়াতে তেমন আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি। ভাবটা এমন, ঢাকাতে যেন কিছুই ঘটেনি এবং তারা কিছুই দেখেনি। অবশেষে ফ্যাসিস্ট পক্ষই বিজয়ী হয়। পাঠ্য তালিকা থেকে সে নতুন বইটিকে সরকার তুলে নিতে বাধ্য হয়। মরণাপন্ন রোগী খাদ্য ও চিকিৎসা গ্রহণেও আগ্রহ হারায়। চেতনার ক্ষেত্রে তেমনই একটি শোচনীয় দুরাবস্থা ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারদের। পাকিস্তান তখনও তাদের দেশ। কিন্তু সেদেশের সৃষ্টি ও কৃষ্টির ইতিহাস জানাটাও তাদের কাছে অপ্রিয় হয়ে পড়েছিল। অথচ এরাই পাকিস্তানের বেতারে ইসলামী দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চার জন্য জিদ ধরেছিল। কথা হলো, নিজ দেশে এতো শত্রু থাকতে সে দেশ ভাঙ্গতে কি বিদেশী শত্রুর প্রয়োজন হয়?

 

গ্রন্থপঞ্জি

আবুল মনসুর আহম্মদ,১৯৮৯; আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর,পঞ্চম সংস্করণ,সৃজন প্রকাশনী লিমিটেড,করিম চেম্বার ৫ম তলা,৯৯ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা,ঢাকা ১০০০।

 




অধ্যায় ষোল: প্রতারণা দ্বি-জাতি তত্ত্বের সাথে

শ্বাশ্বত দ্বিজাতি তত্ত্ব

যে কোন বিশাল মহৎ কর্মের শুরুতেই প্রবল দর্শন বা যুক্তি চাই। নইলে সে কর্মে জনগণ নিজেদের অর্থ, শ্রম, মেধা ও জানের কোরবানি পেশ করে না। ফলে সে দর্শনের প্রতিষ্ঠায় কোন অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনও গড়ে উঠেনা। পাকিস্তান তো এক অপ্রতিরোধ্য গণআন্দোলনের ফসল। কিন্তু কী ছিল সে আন্দোলনের মূল দর্শন? সে দর্শনটি ছিল দ্বি-জাতি তত্ত্ব। সে দর্শনটিই এতোই প্রবল ছিল যে, সেটি উপমহাদেশের মানচিত্রই পাল্টে দেয়। সে দর্শনটি ব্রিটিশদের বাধ্য করে ভারত বিভাগে; এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় হিন্দুগণও বাধ্য হয় ভারত মাতার বিভক্তিকে মেনে নিতে। সে দর্শনের মূল কথা, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের থেকে মুসলিমগণ সর্বার্থেই একটি পৃথক জাতি। এ জাতির লোকদের বসবাস যেহেতু বিপুল সংখ্যায় এবং ভারতের বিশাল এলাকায় জুড়ে, তাদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রও চাই। মুসলিমগণ পৃথক জাতি শুধু ভিন্ন প্রকারের নাম ও নামকরণ পদ্ধতির জন্য নয়; বরং এজন্য যে, তাদের রয়েছে অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর জীবন-লক্ষ্য, আইন-কানূন, তাহজিব তামুদ্দন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং সে সাথে এ জীবনে সফলতা ও বিফলতা যাচাইয়ের মানদণ্ড।

মুসলিম ও হিন্দু -এ দুইটি জাতি যেমন একই লক্ষ্যে বাঁচে না, তেমনি একই লক্ষ্যে রাজনীতি, শিক্ষাদীক্ষা এবং যুদ্ধবিগ্রহও করে না। একই লক্ষ্যে তারা রাষ্ট্রও নির্মাণ করে না। মুসলিমকে শুধু তার নামায-রোযা, হজ-যাকাত নিয়ে বাঁচলে চলে না, তাকে বাঁচতে হয় মহান আল্লাহতায়ার পক্ষ থেকে অর্পিত অলংঘনীয় ঈমানী দায়বদ্ধততা নিয়ে। সে দায়বদ্ধতার পরিধিটি বিশাল। সে দায়বদ্ধতার মধ্যে অন্যতম দায়ভার হলো মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিশ্বময় প্রচার ও প্রতিষ্ঠা দেয়া। রাষ্ট্রের বুকে প্রতিষ্ঠা দিতে হয় শরিয়তি আইনকে। এখানে আপোষ চলে না। অন্যদের অধিকৃত রাষ্ট্রে বসবাসে সে দায়ভার পালিত হয় না। পরিপূর্ণ ধর্ম পালনের স্বার্থে তাদেরকেও রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হয়, প্রয়োজনে হিজরতও করতে হয়। শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত নিয়ে বাঁচলে পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচা হয় না। ঈমানী দায়ভারও পালিত হয় না। ঈমানী দায়ভার নিয়ে বাঁচতেই মহান নবীজী (সাঃ) কে ২০টির বেশী যুদ্ধ করতে হয়েছে এবং অধিকাংশ সাহাবাকে রণাঙ্গণে শহীদ হতে হয়েছে। এ জন্যই অমুসলিমদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর হলো মুসলিমের জীবনদর্শন ও রাজনৈতিক এজেন্ডা।হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসানধীন ভারতে সে মুসলিম এজেন্ডা পূরণ অসম্ভব। সে জন্য মুসলিমদের জন্য আলাদা দেশ পাকিস্তান চাই। এটিই হলো দ্বি-জাতি তত্ত্বের মূল কথা। সেটি যেমন জিন্নাহ বুঝতেন, তেমনি ভারতীয় মুসলিমগণও বুঝেছিলেন। ফলে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রবল আন্দোলন হয়েছিল। এবং সে আন্দোলন সফলও হয়েছিল।

দ্বি-জাতি তত্ত্বের জনক রূপে মুসলিম লীগ নেতা কায়েদ আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে চিহ্নিত করা হয়। এটি ইসলামের ইতিহাস ও কোরআনের জ্ঞানে অনভিজ্ঞ সেক্যুলারিস্টদের নতুন আবিস্কার। আসলে দ্বি-জাতি তত্ত্বের জনক জনাব জিন্নাহ নন; এ তত্ত্বের শুরু মানব সভ্যতার শুরু থেকে। বস্তুত মানব জাতির ইতিহাসে এটি অতি শ্বাশ্বত ও পুরাতন তত্ত্ব। এ তত্ত্বের ভিত্তিতে মানব ইতিহাসের শুরুতেই মোটা দাগে বিভাজন টানা হয়েছিল সমাজের হাবিল ও কাবিলদের মাঝে -তথা ইসলামী এবং ইসলামবিরোধী শক্তির মাঝে। সভ্যতা নির্মাণের এ হলো দু’টি ভিন্ন ধারা। ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনাব জিন্নাহ এ তত্ত্বটি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মাত্র; তিনি এর জনক বা আবিস্কারক নন। সে সত্যটি বহু মুসলিম বুঝতে ব্যর্থ হলেও অনেক হিন্দু সেটি বুঝতেন। তাই নীরদচন্দ্র চৌধুরী লিখেছেন, “The so-called two nation theory was long before Mr Jinnah or the Muslim League; in truth, it was not a theory at all, it was the fact of history. Every body knew this as early as the turn of the century. Even as children we knew it from before the Swadeshi movement.” –(Chaudhury, Nirod; 1951). অনুবাদঃ “তথাকথিত দ্বি-জাতিতত্ত্ব মি. জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের বহু আগেই বিরাজ করছিল। সত্য বলতে এটি কোন থিওরী ছিল না, এটি ছিল ইতিহাসের বাস্তব বিষয়। শতাব্দীর মোড় নেয়ার শুরুতেই প্রত্যেকে এটি জানতো। শৈশবে স্বদেশী অআন্দোলনের আগেই আমরা এটি জানতাম।” বঙ্কিম চন্দ্রের কাছেও সেটি অজানা ছিল না।তিনি লিখেছন, “হিন্দু জাতি ভিন্ন পৃথিবীতে আরো অনেক জাতি আছে। …যেখানে তাহাদের মঙ্গলে আমাদের অমঙ্গল। সেখানে আমাদের অমঙ্গল যাহাতে না হয় আমরা তাহাই করিব। ইহাতে পরজাতি পীড়ন করিতে হয় করিব।” –(বদরুদ্দীন উমর,১৯৮৭)।তাই নিজেদের এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে মুসলিম পীড়নটি বঙ্কিম চন্দ্রের অপরাধ মনে হয়নি। এটিই হলো বাঙালী হিন্দু মনের আসল  চিত্র।এমন এক সহিংস মন নিয়েই বাংলার হিন্দু মহাজন ও জমিদারগন মুসলিম পীড়নে নামে।

অন্যদের থেকে মুসলিমদের পরিচিতিটি শুরু থেকেই ভিন্নতর। সে ভিন্ন পরিচিতিটি এ জীবনে বাঁচবার সুনির্দিষ্ট ভিশন ও মিশনের কারণে। সে ভিশন ও মিশন বেঁধে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। মানুষ মাত্রই পানহার করে। তবে বাঁচার লক্ষ্যটি পানাহার নয়। যে লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্য নিয়ে বাঁচে সেটিই তার মিশন। মানব জীবনের সে সনাতন মিশনটি স্থির করে দিয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালা। সেটি মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে বাঁচার। এটিই মু’মিনের জীবনে মূল মিশন। অথচ কোন হিন্দু বা অন্য কোন অমুসলিম কি কখনো সে লক্ষ্যে বাঁচে? যাত্রাপথটি ভিন্ন হলে কেউ কি অন্যদের ট্রেনে উঠে? সে তো তার নিজ ট্রেনটি খোঁজে। কারণ হিন্দুদের এজেন্ডাই ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন,তাতে মুসলিমদের জন্য কোন স্থান ছিল।হিন্দুদের শাসনাধীনে অখণ্ড ভারতে বসবাস এজন্যই ভারতীয় মুসলিমদের কাছে অভাবনীয় ছিল। তাতে অসম্ভব হতো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নির্ধারিত মিশনটি নিয়ে বাঁচা। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সেদেশে শত শত বছরের জন্য অসম্ভব হতো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। ব্রিটিশের হাতে পরাজিত হওয়ার প্রথম দিন থেকেই ভারতীয় মুসলিমগণ সে গোলামী দশা থেকে পরিত্রাণের সুযোগ খুঁজছিল। সে জন্য জিহাদ তাদের উপর অনিবার্য ছিল। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদেরও সেটি বুঝতে অসুবিধা হয়নি। দেরীতে হলেও সে সত্যটি কংগ্রেস নেতা গান্ধি, নেহেরু ও অন্যান্যরা বুঝেছিলেন। তারা এটিও বুঝেছিলেন, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না পেলে ভারতীয় মুসলিমদের অবিরাম জিহাদ দেশটির প্রতিষ্ঠাকে অনিবার্য করবে। মুসলিম লীগের “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” ছিল সে জিহাদেরই ঘোষণা। মুসলিম লীগের সে ঘোষণাটি রাজনীতির স্লোগান ছিল না, ছিল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি ঈমানী দায়বদ্ধতার ঘোষণা। সে জিহাদের সামনে দাঁড়ানো সাহস ভারতীয় হিন্দুদের ছিল না, সে শক্তিও ছিল না। ভারতব্যাপী তেমন একটি জিহাদী পরিস্থিতি এড়াতেই ইসলামের চরমশত্রুরাও মেনে নিয়েছিল পাকিস্তান।

 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সুফল

ইসলামে রাজনীতির লক্ষ্য স্রেফ এক খণ্ড ভূখণ্ডের উপর স্বাধীনতা লাভ নয়। নবীজী (সাঃ) অতীতে সে লক্ষ্যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য শুধু এ নয়,সেখানে স্রেফ জান-মাল, ইজ্জত-আবরু, ঘর-বাড়ী, ব্যবসা-বাণিজ্য নিরাপত্তা পাবে। বরং রাষ্ট্র এ জন্য অনিবার্য, মহান আল্লাহতায়ালার বিধান অনুযায়ী সেখানে জীবন পরিচালনা করবে। এটি ইসলামি সভ্যতা নির্মাণের কাজ। সে বিশাল কাজটি বনেজঙ্গলে অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব সংখ্যাগরিষ্ঠ কাফেরদের দেশে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ অমুসলিম হলে সেদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার পরিবেশ ইসলামী হয় না। সেদেশে অসম্ভব হয় পরিপূর্ণ ইসলাম পালন ও পূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। তখন সেদেশের মুসলিমের জীবনে নেমে আসে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জিম্মিদশা। স্বাধীনতার ৬০ বছর পরও তেমনি এক জিম্মিদশায় ভুগছে ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম। ভারতীয় মুসলিমগণ এতোটাই নিরাপত্তাহীন যে, মুসলিম বিরোধী দাঙ্গায় হাজার হাজার মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হলেও ন্যূনতম ন্যায় বিচার তাদের জুটেনি। দেশটিতে গরুহত্যা দণ্ডনীয়, কিন্তু মুসলিম হত্যা নয়। দিন দুপুরে পুলিশের সামনে বাবরী মসজিদ গুড়িয়ে দেয়া হলেও সে অপরাধে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি; কারো কোন শাস্তিও দেয়া হয়নি। বরং আদালত থেকে মসজিদের ভিটায় মন্দির নির্মাণের অধিকার দেয়া হয়েছে। ভারতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কথা তো কল্পনাও করা যায় না। অথচ শরিয়ত পালন ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়?

১৯৪৭-য়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না পেলে ভারতীয় মুসলিমদের সে জিম্মিদশায় যোগ হত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের আরো প্রায় পঁয়ত্রিশ কোটি মুসলিম। ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল মূলত এ বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাওয়া লক্ষ্যে। সে লক্ষ্যে মূল যুক্তি বা দর্শনটি ছিল দ্বি-জাতিতত্ত্ব। এ যুক্তিটি এতোই শক্তিশালী ছিল যে, ব্রিটিশ শাসকেরাও তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতেই তারা দেয় পৃথক নির্বাচন। যার ফলে মুসলিম এমপি নির্বাচিত হতো মুসলিম ভোটে। এতে মুসলমানের রাজনীতিতে গুরুত্ব পায় মুসলিম স্বার্থ ও মুসলিম তাহজিব-তমুদ্দনের প্রতি অঙ্গীকার। ফল দাঁড়ায়, মুসলিম প্রার্থীগণ ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম মানুক আর না মানুক, মুসলমানদের কাছে নিজেকে ধর্মভীরু রূপে পেশ করার প্রতিদ্বন্ধিতা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা মিস্টারও তখন হাজির হয় মৌলবী রূপে। নেতাদের পোষাক-পরিচ্ছদেও কোট-প্যান্ট-টাইয়ের পরিবর্তে পাজামা-শেরওয়ানি-টুপি ও মুখে দাড়ীর গুরুত্ব পায়। মুসলিম লীগের নেতাদের মুখ দিয়ে তখন ধ্বনিত হতে থাকে,“কোরআনই আমাদের শাসনতন্ত্র” এবং “আল্লাহর দেয়া আইনই আমাদের আইন”। ভারতীয় মুসলিমগণ তখন দেখতে পায় ইসলামের নতুন জাগরণের সম্ভাবনা। স্বপ্ন দেখে, হারানো দিনের গৌরব ফিরে পাওয়ার। মুসলিম জাগরণের এ প্রভাব গিয়ে পড়েছিল এমন কি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের রাজনৈতিক দল ভারতীয় কংগ্রেসের উপরও। এ দলটিও স্রেফ মুসলিমদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ন্যায় একজন মাওলানাকে দলের সভাপতি করে। সেটি এক বছরের জন্য নয়, লাগাতর চার বছরের জন্য। সে সময় কংগ্রেস পেশ করেছিল, হিন্দু-মুসলিম মিলিত এক অভিনব ভারতীয় জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব। তাদের মুল কথা,ভারতে বসবাসকারি সকল হিন্দু, মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বিগণ প্রথমে ভারতীয়, তারপর তাদের ধর্মীয় বা ভাষাগত পরিচিতি। কংগ্রেস এ নীতিকে তুলে ধরেছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলে। কিন্তু মহান  আল্লাহতায়ালার দরবারে মূল বিচার বসবে সে কতটা সাচ্চা মুসলিম তা নিয়ে। ভাষা, ভূগোল বা জাতীয়তা নিয়ে সেদিন কোন প্রশ্নই উঠবে না। অতএব মুসলিমের রাজনীতিতে তার মুসলিম হওয়ার বিষয়টি যে সর্বপ্রথমে আসবে সেটিই তো স্বাভাবিক। অতএব কংগ্রেসের ভারতীয় জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব ভারতীয় মুসলিমদের কাছে সেদিন গ্রহনযোগ্যতা পায়নি।

 

প্রতারণা দ্বিজাতি তত্ত্বের সাথে

১৯৪৬ সালে নির্বাচন হয়েছিল মূলত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে এবং পাকিস্তান ইস্যুতে। অবিভক্ত বাংলার মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ৫৪% এবং তাদের ৯৮% ভাগ সেদিন পাকিস্তানের পক্ষে রায় দেয় (সিরাজুদ্দীন হোসেনঃ ইতিহাস কথা কও; পৃষ্ঠা ১৭)এবং প্রত্যাখান করে কংগ্রেসের পেশ করা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব। প্রত্যাখ্যান করে সেক্যুলারিজম। কিন্তু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দ্বি-জাতি তত্ত্বের সাথে শুরু হয় প্রতারণা। সেটি শুরু হয় মুসলিম লীগের সাবেক বাঙালী নেতাদের দ্বারা। হঠাৎ করেই তারা সেক্যুলারিজম ও বাঙালী জাতিয়তাবাদে দীক্ষা নেন এবং বিষোদগার শুরু করেন দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরুদ্ধে। তাদের এ নীতির পিছনে হঠাৎ কোন ফিলোসফি বা দর্শনের আবিস্কার ছিল না, ছিল স্রেফ ক্ষমতা দখলের রাজনীতি। তাতে প্রয়োজন পড়ে হিন্দু ভোটের।  ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে এ অস্ত্রটির প্রয়োজন এজন্যই বিশাল রূপে দেখা দেয়। ফলে তারা ভূলে যায় দ্বি-জাতি তত্ত্বের পক্ষে ব্রিটিশ শাসনামলে দেয়া তাদের নিজেদের দীর্ঘ দীর্ঘ বক্তব্যগুলো।

দ্বি-জাতি তত্ত্বের সাথে প্রতারণার বিষয়টি আলোচনায় এলে বাংলার দুই জন নেতার নাম অবশ্যই প্রথমে আসে। তারা হলেন মওলানা ভাষানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরোধীতায় তারাই প্রথম সারিতে ছিলেন। অথচ ব্রিটিশ আমলে তারা নিজেরাও হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনের কথা বলতেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই তাদের নীতিতে আসে প্রচণ্ড ডিগবাজি। মাওলানা ভাষানী নামের আগে মাওলানা এঁটে পীর-মুরিদী চালালেও তিনি নিজে একনিষ্ঠ মুরীদে পরিণত হন চীনের কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা চেয়্যারম্যান মাও সে তু্‌‌ঙয়ের।তার কাছে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও কোন গুরুত্ব পায়নি। মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা হওয়ার বদলে তিনি পরিণত হন চেয়্যারম্যান মাও সে তুঙয়ের খলিফায়। মাও সে তুঙয়ের প্রভাব তার উপর এতোটাই গভীর ছিল যে তার নির্দেশে তিনি নিজের স্বঘোষিত নীতিও পাল্টিয়েছেন। সে প্রমাণ পাওয়া যায় লন্ডন-প্রবাসী পাকিস্তানী বংশোদ্ভুদ বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও লেখক তারিক আলীর লেখা “Can Pakistan Survive?” বইয়ে। পাকিস্তানে তখন আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসন। স্বৈরাচারী শাসনের অবসানে পাকিস্তানের সকল বিরোধী দল একত্রে আন্দোলন করছে। ১৯৬৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির একক প্রার্থী ছিলেন কায়েদে আযম মুহাম্মদ অলী জিন্নাহর বোন মিস ফাতেমা জিন্নাহ। মাওলানা ভাষানীও তাকে সমর্থণ দিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি খামোশ হয়ে যান এবং ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষের নির্বাচনি প্রচার থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। এরূপ নিরব হওয়ার কারণটি জানা যায় তারিক আলীর বইয়ে। নির্বাচনের কিছুকাল আগে ১৯৬৩ সালে মাওলানা ভাষানী চীন সফরে যান এবং চেয়ারম্যান মাও সে তুং’য়ের সাথে সাক্ষাত করেন। চেয়ারম্যান মাও মাওলানা ভাষানীকে কি বলেছেন সেটি জানার জন্যই তারিক আলীর ঢাকায় গমন। ভাষানীর সাথে সাক্ষাতেই তিনি জানতে চান চেয়ারম্যান মাও তাকে কি বলেছেন? মাওলানা ভাষানী বলেন, পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে চীন বর্তমানে কিছু সমস্যায় আছে, তাই চেয়ারম্যান মাও’য়ের ই্চ্ছা প্রেসিডেন্ট আইয়ুবকে যেন বিব্রত করা না হয়। গণতন্ত্রের সে ক্রান্তিলগ্নে পাকিস্তানে গণত্ন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের চেয়ে চেয়ারম্যান মাও’য়ের সে নসিহতকেই মাওলানা ভাষানী বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ সে নির্বাচনটি পাকিস্তানের ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মিস ফাতেমা জিন্নাহ নির্বাচিত হলে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ হয়তো ভিন্নতর হত।

ইসলামের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন আছে। নিজে দীর্ঘ দশটি বছর রাষ্ট্রপ্রধান থেকে নবীজী (সাঃ) রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা রেখে যান। নীতিমালা রেখে যান খোলাফায়ে রাশেদাগণও। রাজনীতিতে প্রতিটি মুসলিমের কাছে সর্বকালে সেটিই অনুকরণীয়। কিন্তু মাওলানা ভাষানীর কাছে সেসব নীতিমালা গুরুত্ব পায়নি। গুরুত্ব পেয়েছে সমাজতন্ত্র। ফলে নিজের আশে পাশে আলেম বা ইসলামপন্থীদের স্থান দেননি। বরং নানা সংগঠনের নামে তিনি ছাতা ধরেছেন সমাজতন্ত্রি ও কম্যুনিস্টদের আশ্রয় দিতে। নইলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানে নাস্তিক সমাজতন্ত্রি ও কম্যুনিস্টদের পক্ষে জনগণের মাঝে স্থান করে নেয়া সেদিন অসম্ভব ছিল। বামপন্থীগণ পশ্চিম পাকিস্তানে এমন কোন মাওলানাকে আশ্রয়দাতা রূপে পাশে পায়নি। এমনকি ভারতেও পায়নি। ফলে বাংলাদেশে যেরূপ লক্ষ লক্ষ মুসলিম যুবক সমাজতন্ত্র ও কম্যুনিজমের ন্যায় ইসলাম বিরোধী মতবাদের স্রোতে বিপথগামী হয়েছে তা পশ্চিম পাকিস্তানী বা ভারতীয় মুসলিমদের ক্ষেত্রে ঘটেনি। যে সব সমাজতন্ত্রি ও কম্যুনিস্টদের তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থান করে দেন তাদের অধিকাংশের মনে পাকিস্তানে প্রতি সামান্যতম অঙ্গীকারও ছিল না। আরো লক্ষ্যণীয় হলো, ভাষানী নিজে বহু আন্দোলন, বহু জনসভা, বহু অনশন,বহু মিছিল করেছেন। কিন্তু একটি বারও আল্লাহর আইন (শরিয়ত) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ময়দানে নামেননি। অথচ ঈমানদারের রাজনীতির এটিই তো মূল এজেন্ডা। অথচ সেটিই বাদ থেকেছে তার দীর্ঘকালের রাজনীতি থেকে। তার রাজনীতি বৈপরীত্যে ভরা। শেখ মুজিব যখন ৬ দফা পেশ করেন তখন তার মধ্যে বিচ্ছিন্নতার গন্ধ পেয়ে সেটিকে পাকিস্তানকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র বলে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছিলেন।বলেছিলেন, “রোয কিয়ামত তক পাকিস্তান তার দুই অংশ নিয়েই বেঁচে থাকবে, তা’ ধ্বংস করার সাধ্য কারো নাই।” তিনি অধ্যাপক মাজহারুল ইসলামকে ধমকের সুরে বলেছিলেন,“বেশী বেশী বাংলা বাংলা বললে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবে। এটা আল্লাহর দেশ। পৃথিবীর বৃহত্তম রাষ্ট্র,এই দেশকে তোমরা ভাঙ্গতে চাও? তা আমি হতে দিব না।” (সূত্রঃ বঙ্গবন্ধুঃ অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম, পৃঃ ৩১৪)। চীন সফর থেকে ফিরে তিনি আইয়ুবের পররাষ্ট্র নীতির প্রশংসা শুরু করেন। অপর দিকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনিই প্রথম নেতা যিনি হিন্দুদের সাথে সুর মিলিয়ে পৃথক নির্বাচন বিলোপের দাবী তুলেন। অথচ পাকিস্তান ধ্বংসের পথে মূলত এটি ছিল প্রথম ষড়যন্ত্র। তিনিই মুজিবকে ৬ দফা ছেড়ে এক দফা তথা স্বাধীনতার পথ ধরতে বলেন।

নবীজীর (সাঃ) আমলে এবং তার পরবর্তীতে খোলাফায়ের রাশেদার আমলে মুসলিম দেশে বহু অমুসলিম বাস করত। তাদের সংখ্যার অনুপাতটি বাংলাদেশের হিন্দুদের চেয়েও বেশী ছিল। কিন্তু কে হবে খলিফা বা কীরূপ হবে আইন-আদালত ও রাজনীতি, সেটি নির্ধারণ করতেন মুসলিম জনগণ। তারা অমুসলিমদের জানমাল ও ব্যবসা- বাণিজ্যের পূর্ণ নিরাপত্ত দিয়েছেন, কিন্তু রাজনীতি, প্রতিরক্ষা ও ধর্মীয় বিধান প্রতিষ্ঠার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। মুসলিম উম্মাহর জীবনে প্রতিটি রাজনৈতিক ফয়সালাই অতি গুরুত্বপূর্ণ, এর উপর নির্ভর করে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় ও পরাজয়ের বিষয়টি। তাই এসব ফয়সালায় আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহী তাদের নিয়ে পরামর্শ করা যায় না। ইসলামের বিধানে কখনোই অনৈসলামের ভেজাল চলে না। সেগুলি শতভাগ ইসলামী হতে হয়। কিন্তু ইসলাম-সম্মত সিদ্ধান্ত কি হিন্দু বা অন্য কোন অমুসলিম থেকে জুটে? মওলানা ভাষানীর রাজনীতিতে আল্লাহকে খুশি করার বদলে গুরুত্ব পায় হিন্দু, সেক্যুলারিস্ট, নাস্তিক ও কম্যুনিষ্টদের খুশি করার বিষয়টি। বস্তুত তাদের পক্ষ হয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে মূল খেলাটি তিনিই প্রথম শুরু করেন। পরবর্তীতে শেখ মুজিবসহ আরো অনেকে সেটিকে ষোলকলায় পূর্ণ করেন।

মুসলিম লীগ ভেঙ্গে ভাষানীই আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়ায় নেতৃত্ব দেন। শুরুতে আওয়ামী মুসলিম লীগের নীতিতে যুক্ত নির্বাচনের দাবী ছিল না। ব্রিটিশ আমলে মুসলিম প্রার্থীগণ নির্বাচিত হতো স্রেফ মুসলিম ভোটারদের ভোটে, ফলে তাকে হিন্দু এজেণ্ডার কাছ মাথা নত করতে হতো না। হিন্দুপ্রার্থী নির্বাচিত হতো হিন্দুদের ভোটে। এরূপ পৃথক নির্বাচন ছিল মুসলিম লীগের রাজনীতির ভিত্তি। ফলে পাকিস্তান আন্দোলনকে সফল করতে হিন্দু ভোটারদের সমর্থণ নেয়ার প্রয়োজন পড়েনি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রধান দল রূপে আবির্ভূত হলেও দলটি সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ক্ষমতা পায় দ্বিতীয় বৃহত্তম দল শেরে বাংলার কৃষক-শ্রমিক-প্রজা দল। শেরে বাংলার দলকে সমর্থন দেয় সংখ্যালঘু সদস্যগণ। আওয়ামী লীগ নেতাগণ তখন বুঝতে পারে, সংখ্যালঘুদের দলে টানতে না পারলে তাদের পক্ষে ক্ষমতায় যাওয়া অসম্ভব। ফলে পরিবর্তন আসে দলের নীতিতে। সংখ্যালঘুগণ দাবী তুলে পৃথক-নির্বাচন প্রথা বাতিলের। সোহরাওয়ার্দী প্রথমে রাজী না হলেও পরে আত্মসমর্পণ করেন ভাষানীর কাছে। তখন মাওলানা ভাষানী ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রাদেশিক সভাপতি। পরে আওয়ামী মুসলিম লীগের “মুসলিম” শব্দটিও তাদের কাছে অসহ্য হয়ে পড়ে। ১৯৫৫ সালে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আয়োজিত অধিবেশনে মুসলিম নামটিকে তারা আবর্জনার স্তূপে ফেলে। আওয়ামী মুসলিম লীগ তখন পরিণত হয় আওয়ামী লীগে। পৃথক নির্বাচন প্রথা তুলে নেয়ার ফলে আওয়ামী লীগ ও তার মুসলিম প্রার্থীগণ তখন হিন্দু ভোটারদের কাছে পুরাপুরি জিম্মি হয়ে পড়ে। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দ্রুত প্রাধান্য পায় হিন্দু এজেণ্ডা। আর হিন্দু এজেণ্ডার অন্য নাম ভারতীয় হিন্দুদের এজেণ্ডা। কারণ বাঙালী হিন্দুর এজেণ্ডা কখনো ভারতীয় হিন্দু এজেণ্ডা থেকে পৃথক ছিল না। সেটি যেমন ১৯৪৭’য়ে, তেমনি ১৯৭১’য়ে। এবং আজও  নয়।

 

সেক্যুলারিজমের নাশকতা

দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরুদ্ধে বড় প্রতারণাটি শুরু হয় সেক্যুলারিজমের নামে। ১৯৫৬ সালের ৭-৮ ফেব্রেয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারি -বর্তমানে সন্তোষ’য়ে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগকে সেক্যুলার দল হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়। ইসলাম এবং মুসলিম স্বার্থের প্রতি যে চেতনা ও অঙ্গীকার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তান, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সে চেতনা ও অঙ্গীকার চিত্রিত হয় সাম্প্রদায়িকতা রূপে। পাকিস্তানের সৃষ্টির মূল ভিত্তিতে এটি ছিল একটি পাকিস্তানী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে অতি কঠোরতম আঘাত।এমন একটি সেক্যুলার যুক্তি মেনে নিলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে যেমন যুক্তি থাকে না, তেমনি দেশটির বেঁচে থাকার পক্ষেও কোন যুক্তি থাকে না। পাকিস্তানের অস্তিত্বের প্রতি বিপদসংকেত বেজে উঠে তখনই। আওয়ামী লীগের সে নীতিতে অতি প্রসন্ন হয় দিল্লির শাসকচক্র, এবং আনন্দ বাড়ে দেশের অভ্যন্তরে ওঁতপেত থাকা ভারতীয় ট্রোজেন হর্সদের –যারা ১৯৪৭ সাল থেকেই এমন একটি অবস্থার অপেক্ষায় ছিল। হিন্দু এজেণ্ডাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতালোভী রাজনীতিতে মুসলিম ও ইসলামের প্রতি অঙ্গীকার শুধু অসহনীয়ই নয়, বর্জণীয় গণ্য হয়। একই সাথে দুই নৌকায় পা’ দেয়া যায় না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ তখন থেকেই পাকিস্তানী নৌকা ফেলে ভারতীয় নৌকায় উঠা শুরু করে।একাত্তরে সেটিই ষোলকলায় পূর্ণ হয়। এবং সে ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

সেক্যুলারিজমকে তাঁরা সংজ্ঞায়ীত করে ধর্ম-নিপরপেক্ষতা রূপে। অথচ সেক্যুলারিজমের এ অর্থটি যেমন বিভ্রান্তিকর ও তেমনি প্রতারণামূলক। এ ব্যাখাটি চালু করা হয় মুসলিম জনগণকে স্রেফ ধোকা দেয়ার লক্ষ্যে। সেক্যুলারিস্টগণ যা বলে সেটি ইসলামের কথা নয়, বরং ইসলামের শত্রুপক্ষের কথা।মসজিদের চার দেয়ালের মাঝে তারা ইসলামকে বন্দী দেখতে চায় এবং শক্তিহীন রাখতে চায় মুসলিম উম্মাহকে।পৃথিবীতে যত রকমের ধর্মই থাক, মহান রাব্বুল আ’লামীনের কাছে একমাত্র মনোনীত ও স্বীকৃত ধর্ম হলো ইসলাম। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সে সুস্পষ্ট ঘোষণাটি এসেছে এভাবেঃ “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন রূপে মনোনীত করলাম।”-(সুরা মায়েদা,আয়াত ৩)।কোনটি সত্য ধর্ম,আর কোনটি মিথ্যা -তা নিয়ে খোদ মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে এ হলো সুস্পষ্ট সাক্ষ্য। এরূপ সাক্ষ্য আসার পরও কি কোন ঈমানদার নিরপেক্ষ থাকতে পারে? অন্য ধর্মের পক্ষ নেয়ার অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ পরিত্যাগ করা এবং শয়তানের পক্ষ নেয়া -সেটি কি উপরুক্ত আয়াত নাযিলের পরও বুঝতে বাঁকি থাকে? মহান আল্লাহতায়ালা তো চান তার প্রতিটি বান্দাহ শুধু ইসলামের পক্ষই নিবে না, প্রয়োজনে যুদ্ধও করবে। পৃথিবীতে মানুষ যত দলেই বিভক্ত হোক না কেন, মহান আল্লাহতায়ালার কাছে দল মাত্র দু’টি। একটি আল্লাহর দল, অপরটি শয়তানের। পবিত্র কোরআনের ভাষায় “হিযবুল্লাহ” এবং “হিযবুশ শায়তান”। মুসলমান হওয়ার অর্থই হলো মহান আল্লাহতায়ালার দলে শামিল হওয়া। তাই মুসলিমের জীবনে ধর্মনিরপেক্ষতা আসে কি করে? ঈমানের অর্থ তো ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধতা। এক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো নিরবতা বা নিস্ক্রীয়তা। কাফেরদের সাথে নবীজী (সাঃ)’র যখনই কোন লড়াই হয়েছে,সাহাবাগণ কি তখন নিরপেক্ষ দর্শক থেকেছেন? সেক্যুলারিস্টগণ পবিত্র কোরআনের এ শিক্ষাকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকতে চায়। তাদের মিথ্যাচারটি তাই খোদ আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে।

সেক্যুলারিজম আদৌ ধর্ম নিরপেক্ষ নয়; বরং ইসলাম বিরোধী। ইসলামের প্রতিষ্ঠার যারা বিরোধী একমাত্র তারাই এ মতবাদ গ্রহণ করতে পারে। সেক্যুলারিজমের লক্ষ্য মূলত দুটিঃ এক).মানুষকে পরকালের বদলে পার্থিবমুখি করা –আভিধানিক অর্থে এটি ইহজাগতিকতা। দুই). রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে ধর্মের প্রভাবমুক্ত রাখা। এ দু’টি অর্থেই এ মতবাদটি ইসলাম বিরোধী এবং  ইসলামের বুনিয়াদি বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। আখেরাত-সচেতনতা তথা পরকালে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে জবাবদেহীতার ভয়ই মানব জীবনে আধ্যাত্মিক বিপ্লব আনে এবং ভাল কাজে আগ্রহ বাড়ায়। অপর দিকে পার্থিবমুখিতা ভূলিয়ে দেয় পরকালের ভয়, মানুষ তখন স্বার্থপর ও দুর্বৃত্ত হয়। আরবের জনগণ মহান নবীজী (সাঃ)র জন্মের বহু শত আগে থেকেই মহান আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস করতো। সন্তানদের নাম আব্দুল্লাহ তথা আল্লাহর গোলাম রাখতো। কিন্তু বিশ্বাস ছিল না পরকালে। ফলে আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস করলেও ভয় ছিল না তাঁর কাছে জবাবদেহীতার। এর ফলে নির্ভয়ে পাপের কাজ করতো। এমন কি নিজের কণ্যাকে জীবিত দাফন করতো।  এবং সেটি স্রেফ পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে। অর্থাৎ তারা ছিল শতভাগ সেক্যুলার। নবীজী (সাঃ) তাদের সে দুর্বৃত্ত জীবনে আমূল বিপ্লব এনেছিলেন আখেরাতমুখি করে। অথচ আধুনিক সেক্যুলারিস্টগণ জাহিলিয়াত যুগের সে উগ্র সেক্যুলারিজমকেই আবার ফিরিয়ে আনতে চায়।

অপর দিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে ধর্মের প্রভাবমুক্ত রাখার বিপদটিও ভয়াবহ। রাষ্ট্রই হচ্ছে মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানটিকে ইসলামের নিয়ন্ত্রনের বাইরে রেখে কি ইসলাম পালন সম্ভব? ঘরে হাতি ঢুকলে সে হাতি ঘরের সাজানো গোছানো সবকিছুই তছনছ করে দেয়। তেমনি মানুষের ধর্মপালন, পরিবার পালন, শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি তছনছ করার ক্ষেত্রে হাতির চেয়েও শক্তিশালী হলো রাষ্ট্র। তাই সেটিকে নিয়ন্ত্রনে আনতে হয়। নইলে পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও রাষ্ট্রীয় হাতির মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের একটি জেলায় যত মসজিদ,খলিফায়ে রাশেদার আমলে সমগ্র মুসলিম জাহানে তা ছিল না। কিন্তু তাতে কি বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় এসেছে? প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কি আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইন? রাষ্ট্রীয় হাতির মোকাবেলা করার সামর্থ্য কি লাখ লাখ মসজিদ বা মাদ্রাসার আছে? সে জন্য রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রনে আনতে হয় সেটিকে ইসলামী করে। এটিই হলো মহান নবীজী(সাঃ)র অতি গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত। সে সূন্নতের প্রতিষ্ঠা ঘটাতে তিনি শুধু ধর্মীয় নেতা নয়, রাষ্ট্রীয় প্রধানও হয়েছেন। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী সে কাজে শহীদ হয়ছেন। অথচ সেক্যুলারিস্টদের দাবী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ইসলামের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। শয়তানকে খুশি করার এর চেয়ে মোক্ষম রাজনীতি আর কি হতে পারে? যার মধ্যে সামান্যতম ঈমান আছে সে কি এমন রাজনীতিতে অংশ নিতে পারে? অথচ আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের মাটিতে সে রাজনীতিকেই বাজারজাত করে। পাকিস্তানে নিজের শত্রু এভাবে নিজ ঘরেই বেড়ে উঠে।

 

 

সেক্যুলারিজমের নাশকতা

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় নাশকতাটির শুরু সেক্যুলার রাজনীতির মাধ্যমে। নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের বীজ বপন করা হয়েছিল ঢাকাতে। আর সে ঢাকা নগরীতেই রোপণ করা হয় দেশটির ধ্বংসের বীজও। সেটি ১৯৫৫ সালে সেক্যুলার আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। সেদিনের রোপণ করা বীজটিরই কাক্ষিত ফল রূপে দেখা দেয় ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের বিভক্তি। পূর্ব পাকিস্তানে সেক্যুলার রাজনী তির উপস্থিতি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বেও ছিল। সেটি ছিল হিন্দু বা বামপন্থীদের রাজনীতিতে। মুসলিমদের মাঝে সে রাজনীতি কখনোই জনপ্রিয়তা পায়নি। সেটি ঘটলে ১৯৪৭’য়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হতো না। মুসলিম দেশে সেক্যুলার রাজনীতির মূল এজেন্ডা হলো ইসলাম পালনে ও প্রতিষ্ঠায় মুসলিমদেরকে অঙ্গীকারহীন করা। অথচ অঙ্গীকারবদ্ধতার মাঝেই মু’মিনের ঈমানদারী।ইসলামে সেক্যুলার রাজনীতি তাই হারাম। নবীজী ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এমন রাজনীতি ছিল না। ইসলামে অঙ্গীকারহীন হলে অসম্ভব হয় ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম সংহতিতে অটল থাকা। তখন সংকটে পড়ে মুসলিম দেশের অস্তিত্ব। কিন্তু সে আত্মঘাতি সেক্যুলার রাজনীতিকে প্রবলতর করেন মাওলানা ভাষানী। পরিস্থিতি যখনই উপযোগী ভেবেছেন ভাষানী তখনই পাকিস্তান ভাঙ্গার গীত গেয়েছেন। পশ্চিম পাকিস্তানকে সর্বপ্রথম তিনিই আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে দেন। সেটি ১৯৫৫ সালের ১৭ জুন পল্টন ময়দানে আয়োজিত আওয়ামী লীগের জনসভায়। দ্বিতীয় বার জানান ১৯৫৬ সালে কাগমারি সম্মেলনে। সে সম্মেলনে তিনি গান্ধী, সুভাষবোস, চিত্তরঞ্জণ দাস প্রমুখ ভারতীয় নেতাদের নামে তোরণ নির্মাণ করেছিলেন। যেন বাংলার মুসলমানদের কল্যাণে এসব হিন্দু নেতাদের অবদানই বেশী। অথচ বাংলার মুসলিমগন নবজীবন লাভ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর।

পাকিস্তান সৃষ্টির মূলেই শুধু নয়, এ দেশটির বেঁচে থাকারও মূল প্রাণশক্তি ছিল মুসলিম ও ইসলামের প্রতি গভীর অঙ্গীকার। এ প্রাণশক্তি দুর্বল হলে পাকিস্তানের বেঁচে থাকার শক্তিটিও যে বিলুপ্ত হবে -সে সত্যটি শত্রুদেরও অজানা ছিল না। ফলে ভাষানীর প্রতিষ্ঠিত সে সেক্যুলার আওয়ামী লীগের মধ্যে ইসলামের শত্রুরা পাকিস্তানের মৃত্যুর পয়গাম শুনতে পায়। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ মুসলিম দেশটির সৃষ্টিতে সেক্যুলারিস্ট, সোসালিস্ট ও কোন বর্ণহিন্দুর ভূমিকা ছিল না। বরং প্রাণপণে তারা বিরোধীতা করেছিল। ১৯৪৭’য়ের পর তাদের লাগাতর চেষ্টা ছিল দেশটির বিনাশ। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে এবং নতুন জীবন ফিরে পায়। পাকিস্তানের বিনাশের রাজনীতিতে তারা ঘনিষ্ঠ মিত্র খুঁজে পায়। ফলে নিজেদের কথা বলার জন্য তাদের আর মুখ খুলতে হয়নি, সে কাজ আওয়ামী লীগই করেছে। ১৯৪৭ সালে তারা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা রোধ করতে পারিনি, কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর এবার দেশটির বেঁচে থাকাকে বিপন্ন করার মহা সুযোগ পেল। দলটি তখন পাকিস্তানের মাটিতে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির সম্মিলিত কোয়ালিশনে পরিণত হয়। সেটি প্রমাণিত হয় ১৯৭১’য়ে। ভাষানী ও সোহরাওর্দীর নেতৃত্বে এ দলটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথে হিন্দু, কম্যুনিষ্ঠ, নাস্তিক প্রভৃতি পদের ইসলাম বিরোধী বা ইসলামে অঙ্গীকারহীন ব্যক্তিবর্গ দলে দলে যোগ দিয়েছিল। ১৯৪৭-য়ের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে ইসলামের প্রতিপক্ষ শক্তি তখন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে শুধু নিরাপদ আশ্রয়ই পায়নি, অতিবিশ্বস্ত মিত্রও পেয়েছে।

আওয়ামী লীগের কাগমারি সম্মেলণে মাওলানা ভাষানী যাদের নামে তোড়ণ বানিয়েছিলেন তাদের তালিকায় কায়েদে আযম, আল্লামা ইকবাল বা নবাব সলিমুল্লাহর ন্যায় ব্যক্তিগণও স্থান পাননি। এমনকি নবীজী (সাঃ) বা খোলাফায়ে রাশেদারও কেউ নয়। এমন কি শাহজালাল (রহঃ) বা শাহ মোখদুম বা খান জাহান আলী (রহঃ)ও নন। তোরণ নির্মাণের মধ্য দিয়ে মূলত সবাইকে জানিয়ে দিলেন তার রাজনীতির কেবলা কোন দিকে। এবং কারা তাঁর তার স্মরণীয়, বরণীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। এভাবে জানিয়ে দেন পাকিস্তানের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে তার মনে কি পরিমাণ ক্ষোভ, ঘৃণা ও বিষ। এরপর গান্ধি বা নেহেরুর ভক্তরা পাকিস্তানের মাটিতে কংগ্রেসকে জীবিত করার প্রয়োজন বোধ করেনি। পাকিস্তানের চিহ্নিত শত্রুগণ তখন নিজ নিজ দল গুটিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়াকেই শ্রেয় মনে করে। তৃতীয়বার তিনি আর আসসালামু আলাইকুম বলেননি, সরাসরি স্বাধীনতারই ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেটি ১৯৭০’য়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর। এই হলো এক কালের মুসলিম লীগ নেতার নাশকতার কাণ্ড! ভাষানীর রাজনীতিতের বড় সমস্যাটি ছিল, তার রাজনীতিতে কোন দর্শন ছিল না। ছিল প্রচণ্ড ভাবাবেগ ও মাঠ উত্তপ্ত করার নেশা। দর্শন রাজনীতিতে শক্ত শিকড়ের কাজ করে। আর সে বিশ্বাসটি যদি ইসলাম হয় -তবে তার চেয়ে শক্ত শিকড় আর কি হতে পারে? ফলে যে ব্যক্তি মুসলিম ও প্যান-ইসলামী –সে বিশ্বাস তার মাঝে বেঁচে থাকে আজীবনের জন্যই।শিকড়হীন কচুরিপানার ন্যায় সে তখন নানা মতবাদের স্রোতে নানা বন্দরে ভাসে না। বরং ইসলামী দর্শনের বলে শক্ত ভাবে সেগুলির মোকাবেলা করে। ফলে রাজনীতিতে কখনো প্যান-ইসলামী, কখনো সেক্যুলার, কখনো বা বামপন্থী–এরূপ নানা মতবাদে দীক্ষা নেয়ার সুযোগ থাকে না।অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য, সময়ের তালে নানা শ্রোতে ভাসাটিই ছিল মাওলানার ভাষানীর নীতি। একই রূপ স্রোতে ভাসার রাজনীতি ছিল মুজিবের। তিনি এক সময় প্যান-ইসলামি রূপে অবাঙালীদের সাথে কাঁধে কাঁধ কলকাতার রাজপথে মুসলিম লীগের রাজনীতি করেছেন।পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের কথা বলেছন। সমাজতন্ত্রী রূপে দেশের কলকারখানা জাতীয়করণ করেছেন;আবার ভয়ংকর বাকশালী স্বৈরাচারি রূপেও আবির্ভূত হয়েছেন।

 

ফিতনার রাজনীতি

সৃষ্টিশীল রাজনীতির পরিবর্তে একাত্তরের আগে ও পরে বাংলার মাটিত প্রতিষ্ঠা পায় মূলতঃ ফিতনার রাজনীতি।পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা ফিতনাকে মানব হত্যার চেয়েও জঘন্য বলেছেন। ফিতনাকারিদের মূল অপরাধ, তারা নানা কৌশলে ও নানারূপ মতবাদের আড়ালে সাধারণ মানুষের জন্য পবিত্র কোরআনে বর্ণিত সিরাতুল মোস্তাকীমটি খুঁজে পাওয়াকে কঠিন করে এবং অসম্ভব করে সে পথে চলাক। ধর্ম পালন ও মুসলিম রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেও তারা বিপন্ন করে। স্রেফ নামায-রোযা বা হজ-যাকাত পালনে পরিপূর্ণ ধর্ম পালন হয় না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠাসহ ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বিজয়ে জান ও মালের বিনিয়োগও এ জন্য অপরিহার্য। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাগণ তো সেটিই করেছেন। ধর্মপালনের সেটিই কোরআনী মডেল। মাওলানা ভাষানী ও তার অনুসারিগণ সে কোরআনী মডেল ও নবীজী (সাঃ)র সে সূন্নতের দিকে যাননি। সাধারণ মানুষকে তিনি সিরাতুল মোস্তাকীমের দিকেও আহবান করেননি। বরং শিষ্যদের সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে সরিয়ে সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজমের পথে টেনেছেন। এভাবে জনগণকে যেমন ইসলাম থেকে দূরে টেনেছেন, তেমনি বিপন্ন করেছেন পাকিস্তানকেও।

বহু হাজার বা বহু লক্ষ মানুষের নিহত হওয়ার কারণে একটি জাতির জীবনে ধ্বংস বা পরাজয় আসে না। কিন্তু পরাজয় আসে আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও রাষ্ট্রে গোলযোগের কারণে। বাংলাদেশের ন্যায় কত দেশেই তো কত দুর্যোগ আসে। সে সব দুর্যোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুও হয়। শত শত কোটি টাকার সম্পদও বিনষ্ট হয়। কিন্তু তাতে কোন দেশ ভেঙ্গে যায়নি। মুসলিম উম্মাহও তাতে দুর্বল হয়নি। মানুষ সে বিপদ কাটিয়ে উঠে। দেশ ধ্বংস হয় বা বিপর্যয়ের শিকার হয় যদি ধর্ম-পালন বাধাগ্রস্ত করা হয়; এবং যুদ্ধ বা গোলযোগের মাধ্যমে মুসলিম রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে বিপন্ন করা হয়। ভাষানী ও তার সহিংস সহচরগণ ছিলেন  সে রকম বিদ্রোহ ও দেশ ধ্বংসের গুরু। সরকার গঠন ও সে লক্ষ্যে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর তিনি আর কোন কালেই নির্বাচনে আগ্রহী ছিলেন না। তার পারদর্শিতা ছিল শুধু একটি কাজেই –সেটি ফিতনা সৃষ্টি। ভারতের জন্য সহায়ক এমন একটি ভূমিকার জন্যই ১৯৭১’য়ে তিনি ভারত গমনে সাহস পান।

বিশ্বের মানচিত্র থেকে বিশাল খেলাফত যে কারণে হারিয়ে গেল তা কোন সুনামী, ভূমিকম্প, প্লাবন বা অন্য কোন বিপর্যয়ের কারণে নয়; বরং ভাষা, গোত্র ও এলাকা ভিত্তিক ফেতনার কারণে। মুসলিম উম্মাহর জীবনে সর্বনাশা সে নাশকতাটি ঘটেছিল জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের হাতে। ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভেঙ্গে গেল একই রূপ ফিতনার কারণে। মুসলিম উম্মাহর বিশাল এ ক্ষতিগুলি কি লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে পোষানো যায়? মসজিদ বা মাদ্রাসা গড়তে হাজার হাজার শহীদের প্রাণের কোরবানী লাগে না। কিন্তু সে কোরবানী লাগে এক ইঞ্চি ভূগোল বাড়াতে ও সে ভূগোলের প্রতিরক্ষা দিতে। কিন্তু মুসলিমগণ এতোটাই বিবেকশূণ্য যে ভূগোল ক্ষুদ্রতর করার সে বিষাদপূর্ণ দিনগুলোতেও বিজয় উৎসব করে! সে দিনে আনন্দ ভরে পতাকা উড়ায়। নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মুসলিমগণ যে পরস্পরে ভাই –মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া পরিচয়টিও তারা বেমালুম ভূলে যায়! বিশ্বের ১৫০ কোটি মুসলিমের শক্তিহীন ও ইজ্জতহীন হওয়ার কারণ যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত ভূগোল –সেটি বুঝবার সামর্থ্যও ইসলামী চেতনাশূণ্যদের নাই। নানা ভাষা ও নানা বর্ণে বিভক্ত ভারতীয় হিন্দুগণ শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করছে তাদের বৃহৎ ভূগোল ছোট হওয়া থেকে বাঁচাতে। রাশিয়া ও চীনসহ বিশ্বের আরো অনেক জাতি সেটি করছে। মহান নবীজী (সাঃ) মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোল পাহারা দেয়ার কাজে এক মুহুর্ত ব্যয়কে সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। অথচ বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ দেশের ভূগোল পাহারা দেয়ার বদলে যুদ্ধে কাফেরদের ডেকে এনেছে ভূগোল ছোট করার কাজে। যেন পাকিস্তানের বৃহৎ ভূগোলই ছিল বাঙালীর মূল সমস্যা। ১৯৭১’য়ে যে বিশাল বিজয়টি তারা ভারতের ঘরে তুলে দিয়েছে তা নিয়ে ভারতে প্রতি বছর বা প্রতি মাস নয়, প্রতি দিন ও প্রতি মুহুর্ত উৎসব হবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

 




অধ্যায় সতেরো: ভারতীয় ‘‌র’ এবং সি.আই.এ’য়ের ভূমিকা

পরিকল্পনাটি ভারতীয়

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনাটি ভারতীয়। আওয়ামী লীগ ব্যবহৃত হয়েছে সে ভারতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের হাতিয়ার রূপে। অথচ গণতান্ত্রিক সংগঠনের ক্ষেত্রে সেটি হওয়ার কথা নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল কথা রাজনীতিতে স্বচ্ছতা; বিদেশী এজেন্ডা পালন বা বিদেশী গুপ্তচরদের সাথে সংশ্লিষ্টতার বদলে গুরুত্ব পায় জনগণের সাথে সংশ্লিষ্টতা। অথচ শেখ মুজিবের রাজনীতির সাথে নিজ দলের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা ছিল অতি সামান্যই। কখনো তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন;সেটি ভাল না লাগায় সাথে সাথে প্রেসিডেন্টও হয়েছেন। কিন্তু তা নিয়ে দলীয় নেতাদের ডেকে পরামর্শ নেননি। সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং আবির্ভুত হয়েছেন নির্ভেজাল স্বৈরাচারী রূপে। স্রেফ ভোটের জন্য জনগণের কাছে ধর্ণা দিয়েছেন, কিন্তু দেশের ভাগ্য নির্ধারণে দেশের বিজ্ঞজন বা জনগণের মতামতের তোয়াক্কা করেননি। সেটি একাত্তরে যেমন নয়, তেমনি একাত্তরের আগে বা পরেও নয়। পরামর্শ করেছেন ভারতীয় গুপ্তচরদের সাথে। সে লক্ষ্যে ষাটের দশকেই তিনি ভারতে গেছেন। ভারত সরকার ১৯৪৭ থেকেই পাকিস্তান ভাঙ্গার চেষ্টায় ছিল। শেখ মুজিব সে কাজে ভারতের সহযোগী হন। এ নিয়ে শুধু ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’য়ের কর্মকর্তাগণই শুধু মুখ খুলেনি, মুখ খুলেছে বাংলাদেশের বহুনেতাও।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতীয় নাশকতা নিয়ে এক কালের আওয়ামী লীগ নেতা ও দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও পরবর্তীতে জাতীয় লীগ নেতা জনাব অলি আহাদ বলেন, “১৯৬২ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অবস্থানকালে ময়মনসিংহ নিবাসী রাজবন্দীদ্বয় আব্দুর রহমান সিদ্দিকী ও আবু সৈয়দের নিকট হইতে আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিষয়াদী অবগত হই। ভারতে মুদ্রিত বিচ্ছিন্নতাবাদ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন ময়মনসিংহ ও বিভিন্ন জেলায় বিতরণকালেই তাহারা গ্রেফতার হইয়াছিলেন।”-(অলি আহাদ)। যে মিথ্যাচারটি একাত্তরে দেশ জুড়ে ছড়ানো হয়েছে তা হলো, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বাংলাদেশের সৃষ্টি মূলত মুক্তিবাহিনীর অবদান। ভারতের নাম তারা সহজে মুখে আনে না। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশটি সৃষ্টির মূল কাজটি যে নেহায়েতই ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাজ -সে কথাটি ভারতীয় কতৃপক্ষও খুব একটা জোরে শোরে প্রচার করে না। তারা জানে,সেটি প্রকাশ পেলে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের কাছেই শুধু নয়, মুসলিম বিশ্বেও ভারত ভিলেন রূপে চিত্রিত হবে। এজন্যই বাংলাদেশ সৃষ্ঠিকে তারা বাংলাদেশেীদের একান্ত নিজেদের কাজ বলে চালিয়ে দিতে চায়। কিন্তু ভারত সরকার সত্য বিষয়টি লুকাতে পারেনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও বিপুল সংখ্যক রাজাকারদের কারণে সে পরিকল্পনা সফল হতে পারেনি। মুক্তিবাহিনীর কাঁধে বন্দুক রেখে পাকিস্তান বাহিনী বা রাজাকারদের পরাজয় করা সম্ভব হয়নি। একাত্তরের শেষদিকে তাই স্বয়ং ভারতীয় বাহিনীকেই যুদ্ধে নামতে হয়েছে। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বাঙালী ও পাকিস্তানীদের লড়াই না হয়ে পাকিস্তান ও ভারতের সরাসরি লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এ লড়ায়ে পাকিস্তানের পরাজয়ের ফলে সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ। সেটি আরো পরিস্কার হয়, রেসকোর্সের ময়দানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল অরোরা এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বভাগের কমান্ডার জেনারেল নিয়াজীর মধ্যকার চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে।এ চুক্তির মধ্য দিয়ে পাকিস্থানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

রেসকোর্সে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল ওসমানীর উপস্থিতি ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে যে অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক ছিল সেটির সুস্পষ্ট দলিল হলো ১৬ই ডিসেম্বরের এ চুক্তি। ভারত যেভাবে তার আগ্রাসী চরিত্রটি বিশ্ববাসীর কাছ থেকে লুকাতে চেয়েছিল সেটি সম্ভব হয়নি। ফলে মুসলিম বিশ্বের কোন দেশই বাংলাদেশকে প্রথমে স্বীকৃতি দেয়নি। অথচ এর আগে বা পরে অন্য কোন মুসলিম দেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি নিয়ে কখনোই্ এরূপ ঘটনা ঘটেনি। নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত মুসলিম দেশকে তাবত মুসলিম দেশ সাথে সাথে স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ, একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা-প্রাপ্তি শুধু সে দেশটির জনগণের জন্যই নয়,সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কাছেও সেটি অতিশয় আনন্দের ঘটনা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। না হওয়ার কারণ, তাদের কাছে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে অধিকৃত পূর্ব পাকিস্তান রূপে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অপসারণ এবং পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের পরই অন্য মুসলিম দেশগুলো বাংলাদেশের স্বীকৃতি দানে এগিয়ে আসে। অথচ এ বিষয়টি বাংলাদেশের ইতিহাসে নাই, ছাত্রদেরকে ইচ্ছা করেই তা পড়ানো হয় না। লক্ষ্যণীয় হলো ১৬ই ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনী যে সত্যটিকে লুকাতে পারিনি, বাংলাদেশের ইতিহাসের বইয়ে সেটিই লুকানো হচ্ছে। পাঠ্য পুস্তকে মুক্তিবাহিনীর সেক্টর কমান্ডারদের কোথায় কে লড়াই করেছেন সে বিবরণ থাকলেও ভারতীয় বাহিনীর হাজার হাজার সৈন্য ও তার কমান্ডারগণ কে কোথায় কি ভাবে যুদ্ধ করলো –সে বিবরণ নাই। বিবরণ নাই, ভারতীয় বিমান ও নৌবাহিনীর ভূমিকার। একাত্তরের যুদ্ধে কতজন ভারতীয় সৈন্য প্রাণ দিয়েছে, কতজন আহত হয়েছে -স্কুলের পাঠ্যবইয়ে সে তথ্যও নাই। বুঝা যায়, সরকার ইচ্ছা করেই কিছুই লুকাতে চেয়েছে। সেটি বাংলাদেশের জন্মে ভারতের ভূমিকার কথা। কারণটিও বোধগম্য। ষড়যন্ত্র কথা তো প্রকাশ করা যায় না; সেগুলো গোপন রাখাই নিয়ম।একাত্তরের যুদ্ধের বহু ঘটনাই তা ইতিহাসের বইয়ে নাই।

ইতিহাসের বইয়ে যে সত্য বিষয়টি কখনোই বলা হয়নি না তা হলো, ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশের পূর্বে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে ৯ মাসে পুরা বাংলাদেশ দূরে থাক একটি জেলা, একটি মহকুমা বা একটি থানাও মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। কোন জেলা শহরে মুক্তিবাহিনীর কোন সদস্য দিবালোকে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ঘুরতে পারিনি। একাত্তরের মূল লড়াইটি লড়েছে ভারতীয় সেনা বাহিনী। তবে ভারত শুরু থেকেই একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গার অপরাধ কাঁধে নিতে চায়নি। কারণ এটি জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের খেলাপ। একই কারণে চীনা বা রুশ বাহিনী ভিয়েতনামে প্রবেশ করেনি। একটি দেশের ভূগোলে কিভাবে পরিবর্তন আনতে হবে জাতিসংঘের বিধানে তার একটি বিধিবদ্ধ আইন আছে। সেটি কখনই কোন বিদেশী শক্তির আগ্রাসনের মাধ্যমে নয়। ভারত-ভাগের পূর্বে সে ইস্যুর উপর গণভোট হয়েছে, পাকিস্তানের ১৯৭১’য়ের নির্বাচন সেরূপ ছিল না। নির্বাচন হয়েছিল স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে। কিন্তু ভারত সে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। এজন্য যুদ্ধ চলা কালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের অধিকাংশ সদস্য পাকিস্তানের সংহতি ও অখণ্ডতার প্রতিসমর্থন জানিয়েছে। ভারতের পক্ষে থেকেছে শুধু সোভিয়েত রাশিয়া ও তার কিছু মিত্র দেশ।

 

 

লুকাতে পারিনি অপরাধ

ইতিহাসে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে -এ ভয়েই ভারত নিজেদের অর্থ, অস্ত্র ও লোকবল দ্বারা পাকিস্তান ভাঙ্গার এ যুদ্ধকে বাঙালীদের মুক্তিযুদ্ধ বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। ভারতীয় মুসলিমগণ পাকিস্তানের উপর এমন হামলার ঘোরতর বিরোধী ছিল। তবে ভারতীয় মুসলিমগণ যাই ভাবুক, ভারতের দুশ্চিন্তার মূল কারণ, পাকিস্তানের উপর ভারতের আগ্রাসন অন্যদেরও নৈতিক বৈধতা দিবে ভারত-ভাঙ্গার যুদ্ধে অংশ নেয়ার। এজন্যই রেসকোর্সের ময়দানে জেনারেল ওসমানীকে শামিল করাটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেলগণ অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক ভাবলেও ভারতের কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে তা ছিল বড় রকমের ভুল। মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের কাঁধে বন্দুক রাখার ন্যায় তাঁর উপস্থিতিরও লোক-দেখানো রাজনৈতিক প্রয়োজন ছিল। প্রখ্যাত ভারতীয় কূটনীতিবিদ এবং ভারতীয় ইনটেলিজেন্স এর সাবেক প্রধান Mr.J.N. Dixit তার রচিত “Liberation and Beyond” বইতে জেনারেল ওসমানীকে রেসকোর্সে শামিল না করাকে “major political mistake” বলে অভিহিত করেছেন। বাস্তবতা হলো, অতি সতর্কতার সাথে খুন করার পরও সব খুনিই খুনের আলামত ঘটনা স্থলে রেখে যায়। অপরাধ বিজ্ঞানীদের তাই বিশ্বাস, তদন্তে আন্তুরিক হলে কোন খুনিই গ্রেফতার এবং সে সাথে খুনের বিচার থেকে রেহাই পেতে পারে না। অন্যদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় আগ্রাসনের সে অপরাধ যতই লুকানোর চেষ্ঠা করুক, শত শত বছর ধরে ভারত শুধু বাংলাদেশী মুসলিমদের কাছেই নয়, সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের কাছেও শত্রু রূপে চিহ্নিত হবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

বাংলাদেশ সৃষ্টি নিয়ে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা “র”য়ের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মিস্টার বি. রমন লিখেছেনঃ “The R&AW’s success in East Pakistan, which led to the birth of Bangladesh, would not have been possible without the leadership of Kao and the ideas of Nair,”-(B.Ramon, 2007)। অনুবাদঃ “পূর্ব পাকিস্তানে ‘র’য়ের সাফল্যই জন্ম দেয় বাংলাদেশের; এবং কাউ’য়ের নেতৃত্ব এবং নায়ার’য়ের পরিকল্পনা ছাড়া সে সাফল্য অর্জন সম্ভব হত না।” একাত্তর নিয়ে মিস্টার বি. রমন’য়ের মূল্যায়নে বাংলাদেশের সৃষ্টিতে মুজিবের জন্য তারা কোন স্থানই রাখেনি। অথচ বাঙালী জাতীয়তাবাদী পক্ষটি “র”এর ভূমিকার কথা মুখে আনে না। এরও গুঢ় রহস্য রয়েছে। কারণ তারা নিজেরাও জানে,এ সম্পৃক্ততা প্রকাশ পেলে আজ হোক কাল মুসলিম ইতিহাসে তারা অপরাধী রূপে চিত্রিত হবেই। কারণ ভারতের ন্যায় একটি শত্রুদেশের গুপ্তচর সংস্থার সাথে সংশ্লিষ্টতা কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের জন্যই সুনাম বয়ে আনে না। যেসব ভারতীয় সেনা অফিসার ও সৈনিক কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যার নায়ক, তারাই একাত্তরে বাংলাদেশের সৃষ্টিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়েছিল এবং মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর সদস্যদের ট্রেনিং দিয়েছিল। কাশ্মীরের সে ভারতীয় খুনিদের কথা আওয়ামী ঘরানার নেতা-কর্মীরা আজ মুখেই আনে না। বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নিজেদের অর্জন বলে অহংকার দেখায়। অথচ র’য়ের দাবি,তাদের ভুমিকাই হলো মূল। এ ব্যাপারে মিস্টার বি. রমন তার বই The Kaoboys of the R&AW, Down Memory Lane’তে লিখেছেনঃ “The IB (Intellegence Bureau) before 1968 & the R&AW thereafter had built up a network of relationship with many political leaders and government officials of East Pakistan. The networking enabled the R&AW and the leaders and officials of East Pakistan to quickly put in position the required infrastructure for a liberation struggle consisting of a parallel government with its own fighters trained by the Indian security forces and its own bureaucracy. .. The only sections of the local population, who were hostile to India and its agencies, were the Muslim migrants from Bihar.” -(B.Ramon, 2007)। অনুবাদঃ ১৯৬৮ এর পূর্বে আইবি (ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো) এবং পরবর্তীতে ‘র’ পূর্ব পাকিস্তানের বহু রাজনৈতিক নেতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। সে নেটওয়ার্কটি ‘র’ এবং (আওয়ামী লীগের) রাজনৈতিক নেতৃবর্গ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয় ত্বরিৎ বেগে নিজেদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধা ও আমলাদের দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পাল্টা সরকার গঠনের জন্য একটি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে।….স্থানীয় লোকদের মধ্যে একমাত্র তারাই ভারত এবং তার এজেন্সীর প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিল যারা বিহার থেকে আগত মোহাজির।

 

প্রস্তুতিটি বহু বছরের

মিস্টার বি. রমনের কথায় এটি সুস্পষ্ট যে, একাত্তরে যা ঘটেছে তার পরিকল্পনা একাত্তরে হয়নি। প্রস্তুতিটি বহু বছরের। পূর্ব পাকিস্তানকে পৃথক করার কাজ ত্বরান্বিত করার লক্ষে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা আই,বি এবং ১৯৬৮এর পর “র” ষাটের দশকের শুরু থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে থাকে। বিচ্ছিন্ন আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাঙালী রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি কর্মচারিদের দিয়ে তারা বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং অবকাঠামো গড়ে তোলে। এমনকি ট্রেনিং দেয়ার কাজও শুরু করে। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা Director of Intelelligence Bureau (DIB) জানতে পারে যে কলকাতার ভবানীপুর এলাকার একটি বাড়ীতে – যা ছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার অপারেশনাল সদর দফতর, সেখানে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামে একটি সংগঠন কাজ করছে। তাদের লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা। -(মাসুদুল হক)।

মিস্টার বি. রমনের লেখা থেকে প্রমাণিত হয়, পাকিস্তানী গোয়েন্দাদের রিপোর্ট আদৌ মিথ্যা ছিল না। এ গোপন পরিকল্পনা মোতাবেক মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী রূপে দেখা ভারতের কাম্য ছিল না। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের পিছনে তারা যে বিশাল পুঁজি বিনিয়োগ করেছিল –বিশেষ করে ১৯৭০য়ের নির্বাচনে তার মূল লক্ষ্যটি ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গা, শেখ মুজিবকে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করা নয়। শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হলে মিস্টার বি. রমনের কথা অনুসারে র’ যেভাবে পূর্বপাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা এঁটেছিল তা সফল হত না। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার পক্ষ থেকে সে সময় ময়দানে মুজিবই একমাত্র খেলাওয়াড় ছিলেন না, ময়দানে ছিল আরো অনেকেই। ছাত্রলীগের নেতৃপর্যায়ে এদের পাল্লাই ছিল ভারি। তাদের দায়িত্ব ছিল শেখ মুজিবকে নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে “র”য়ের সে পরিকল্পনাটি থেকে কোনরূপ বিচ্যুত না হন। বস্তুত শেখ মুজিব তখন নিজেই এক পরাধীন ব্যক্তি, তিনি ছিলেন ভারতীয় “র” এবং ছাত্রলীগ নেতাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। তখন তার পক্ষে “র”এর কাছে কৃত ওয়াদা থেকে পিছুটান দেয়ার সামান্যতম সুযোগও ছিল না। বহু আগেই ছাত্রলীগের নেতারা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিল। মুজিবের কাজ ছিল একজন জিম্মির ন্যায় বিনা প্রতিবাদে তাদের অনুসরণ করা। মুজিব সেটি করেছিলেনও। গাড়ীতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা টানিয়ে ইয়াহিয়ার সাথে দেখা করতে এসেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সাথে আপোষে শেখ মুজিবের আদৌ কোন আগ্রহ ছিল না। কারণ তাতে আগ্রহ ছিল না ভারতের। আর ভারতের যাতে আগ্রহ নেই তাতে মুজিবেরই বা আগ্রহ সৃষ্টি হয় কি করে? ২৩ মার্চের বৈঠকে মুজিবের ৬ দফা ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভূট্টো উভয়ই মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও মুজিবের আগ্রহ ছিল না পাকিস্তানের অখণ্ডতা নিয়ে আলোচনাকে আরো সামনে এগিয়ে নেয়ার। ছাত্রলীগের নেতারা ইয়াহিয়া খান ও ভূট্টোর সাথে মুজিবের বৈঠককে স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী মনে করে। এবং তা নিয়ে আওয়ামী-বাকশালী শিবিরে কোন দ্বিমত নেই। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠন নিয়ে এজন্যই মুজিব আলোচনায় রাজী ছিল না। ফলে বৈঠক ভেঙ্গে যায়। কারণ ভারতীয় র’এবং ছাত্রলীগ নেতাদের গোলপোষ্ট তখন ভিন্ন। সেটি ৬ দফা নয়, বরং এক দফা তথা পাকিস্তান ভাঙ্গা। ইয়াহিয়া ও ভুট্টো সেটি বুঝতে পারে এবং মার্চের আলোচনা ব্যর্থ হয়।

কিন্তু এ বিষয়ে অতিশয় বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্গতি হলো তাদের,যারা মনে করে পাকিস্তান ভেঙ্গে গেছে স্রেফ স্বৈরাচারী ইয়াহিয়ার ভূলের কারণে। সে ভূলটি ছিল মুজিবের হাতে ক্ষমতা না দেয়া। যেন মুজিব ও তার দল পাকিস্তান রক্ষার জন্য দু‌ই‌পায়ে খাড়া ছিল! এবং মুজিবে হাতে ক্ষমতা দিলেই যেন পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়া থেকে বেঁচে থাকে! ভারত যে পাকিস্তান ভাঙ্গার ব্যাপারে কতটা আপোষহীন ছিল সেটি পরবর্তীতে আরো পরিস্কার হয়ে উঠে। শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য ইয়াহিয়া খান আন্তরিক ভাবেই চেষ্টা করেছিলেন। এমন কি যুদ্ধ এড়াতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশ্নে গণভোটের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। ইয়াহিয়া খানের পক্ষে এর চেয়ে বেশী ছাড় দেয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু ভারত তাতে রাজী হয়নি। বরং সেটি হতে দেয়নি। এমন কি যে সব উদ্বাস্তু ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের ফেরতও আসতে দেয়নি। এব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিন্জার লিখেছেন, “Despite Yahya’s proclamation of an amnesty India made the return of refugees to East Pakistan depend on a political settlement there. But India reserved the right to define what constituted an acceptable political settlement on the sovereign territory of its neighbor.” (The White House Years, page 858). অনুবাদঃ ইয়াহিয়া খানের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শণের পরও ভারত বলছে উদ্বাস্তুদের পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যাওয়াটি নির্ভর করছে রাজনৈতিক মীমাংসার উপর। কিন্তু ভারত তার প্রতিবেশী দেশের সার্বভৌম সীমানার মধ্যে সে রাজনৈতিক মীমাংসাটি গ্রহণযোগ্য হওয়ার বিষয়টি তার নিজস্ব এখতিয়ারে রাখছে।

স্বৈরাচারী ব্যক্তির ক্ষমতায় আসা বা গণতন্ত্র-দুষমন দুর্বৃত্তদের রাজনীতির কর্ণধার হওয়া কোন দেশেই অসম্ভব কিছু নয়। বিশ্বের বহু দেশেই সেটি হয়। একাত্তরের পর বাংলাদেশেও সেটি বার বার হয়েছে। কিন্তু সে জন্য দেশপ্রেমিক নাগরিকগণ সে দেশের মানচিত্র ভাঙ্গায় হাত দেয় না। এমন কাজ একমাত্র বিদেশী দুশমনদের হাতেই হতে পারে। পাকিস্তানে গণতন্ত্র-বিরোধী ষড়যন্ত্র শুরু হয় দেশটির প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই। দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল এরপরও ধৈর্যের সাথে দেশ গড়ার চেষ্ঠা করে গেছেন। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে জনাব নাজিমুদ্দিন, জনাব মোহম্মদ আলী বগুড়া ও জনাব সোহরাওয়ার্দী অপসারিত হয়েছেন, সামরিক আইন জারি হয়েছে এবং দেশের শাসনতন্ত্রও রহিত হয়েছে। কিন্তু সেজন্য নাজিমুদ্দিন, মোহাম্মদ আলী বগুড়া, সোহরাওয়ার্দি বা অন্য কোন নেতাই পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে নামেননি। এমনকি চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ও নয়।তাতে দেশ বেঁচে গেছে। আর দেশ বাঁচলেই তো রাজনীতি বাঁচে। কিন্তু একাত্তরে দেশের রাজনীতি আর দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের হাতে থাকেনি। দেশ না বাঁচায় রাজনীতিও বাঁচেনি। ৪৪ বছর পরও বঙ্গীয় এ দেশে পঞ্চাশের বা ষাটের দশকে যে রাজনীতি ছিল সে রাজনীতি এখন আর জীবিত নাই। ১৯৫৪ বা ১৯৭০’য়ের নির্বাচনের ন্যায় কোন নির্বচনের কথা তাই ভাবাই যায়না। একাত্তরের পূর্ব থেকেই দেশ দখলে গেছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র” এবং “র” প্রতিপালিত এজেন্টদের হাতে। বি. রমনের বই The Kaoboys of the R&AW, Down Memory Lane’ বা অশোক রায়না রচিত Inside R&AW সে কিচ্ছাতেই ভরপুর। ভারতের স্ট্রাটেজিক লক্ষ্য হলো, বিশ্বের দরবারে বৃহৎ শক্তির মর্যাদা লাভ। সে কথার স্বীকারোক্তি এসেছে মি. রমনের বইতে। তিনি এক্ষেত্রে “র” এর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেনঃ An emerging power such as India, which is aspiring to take its place by 2020 among the leading powers of the world, has to have an external intelligence agency which has the ability to see, hear, smell and feel far and near. (B. Ramon, 2007). অনুবাদঃ ভারতের মত একটি উদীয়মান শক্তি যা ২০২০সালের মধ্যেই নিজেকে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় শক্তিগুলোর মাঝে অন্তর্ভূক্ত করার আশা পোষণ করে তাকে অবশ্যই বৈদেশিক বিষয়ক এমন একটি গোয়েন্দা এজেন্সীর অধিকারি হতে হবে যার সামর্থ্য থাকবে দূরের বা নিকটের ঘটনাবলিকে দেখা, শ্রবন করা,ঘ্রাণ নেয়া ও অনুধাবন করার।

 

ভারতের স্বপ্ন ও স্ট্রাটেজী

১৯৬২ সালে চীনের হাতে অপমানজনক পরাজয়ের পর ভারতের বৃহৎ শক্তি রূপে বেড়ে উঠার স্বপ্নে প্রচণ্ড ভাটা পড়ে। এরপর ১৯৬৫ য়ে পাকিস্তান পরাজিত করতে না পারায় সে পুরোন অপমানের সাথে নতুন অপমান যোগ হয়। ভারত এরপর প্রচণ্ড ভাবে মনযোগী হয় পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে। তখন বিপুল বিনয়োগ হয় পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পঞ্চম বাহিনী বা ট্রোজান হর্স গড়ে তোলার কাজে।শেখ মুজিব ও তার অনুসারিগণ মূলত ব্যবহৃত হয়েছেন সে লক্ষ্য পূরণে। তবে ভারতের লক্ষ্য নিছক পাকিস্তানকে শক্তিহীন করা নয়, সেটি হলো উপমহাদেশের মুসলিমদের শক্তিহীন করা। তাই একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলেও ভারতীয় স্ট্রাটেজী শেষ হয়নি। তাই বর্তমান স্ট্রাটেজী বাংলাদেশকেও দুর্বল ও লাগাতর অধীনত রাখা। সে সাথে দুর্বল করা প্রতিবেশী নেপাল, ভূটান ও শ্রীলংকাকে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই একাত্তরে পাকিস্তান আর্মির ফেলে যাওয়া বহু হাজার কোটি টাকার অস্ত্র বাংলাদেশের আর্মির হাতে পোঁছতে দেয়নি। সেটি ছিল ভারতীয় পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্দ অংশ। প্রশ্ন হলো, একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানের যে পরিমান অস্ত্র মওজুদ ছিল,বাংলাদেশ সরকার কি আজও তা কিনতে পেরেছে? অথচ তা নিয়ে বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের মুখে সামান্যতম ক্ষোভ নাই। ভারতীয় ট্রোজান হর্স বা পঞ্চম বাহিনীর লোকদের তা থাকার কথাও নয়।

ভারতের ভয়, পাকিস্তানের ন্যায় বাংলাদেশেরও যদি সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পায় তবে সে খড়গ একমাত্র তাদের ঘাড়েই পড়বে। তারা জানে বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে কোন গুলী নিক্ষিপ্ত হলে সেটি ভারত ছাড়া অন্য কোথাও পড়বে না। তাই বাংলাদেশ সৃষ্টির শুরু থেকেই ভারত অতি সতর্ক। ভারত চায়,বাংলাদেশ সরকারের নিঃশর্ত আনুগত্য। তাই ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদি হওয়াটাই অপরাধ। মুজিব এবং তার আওয়ামী লীগ সেটি ভাল করেই বোঝে। তাই দূর্নীতি দমন,গুম-খুন, চুরি-ডাকাতি,পদ্মা বা তিস্তার পানি, পদ্মা সেতু নির্মাণ বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে আওয়ামী বাকশালীদের মাথা ব্যাথা নেই। তাদের মূল এজেণ্ডা ভারত-বিরোধীদের নির্মূল।ভারতের পক্ষ থেকে এটিই তাদের উপর অর্পিত দায়ভার। গদীতে থাকার স্বার্থে তাদের মূল কাজটি ভারতে খুশি রাখা। একারণেই, ভারতে মুসলিম নিধন বা মসজিদ ধ্বংসর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীগণ কোন প্রতিবাদ করে না। নিশ্চুপ থাকে কাশ্মীরে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অধিকৃত কাশ্মীরকে বিতর্কিত এলাকা বললে কি হবে, আওয়ামী-বাকশালী মহলটি সেখানে ভারতীয় অধিকৃতিকেই জায়েজ বলে মেনে নেয়।

 

মার্কিনী রোষানল

১৯৬২’য়ের ১৩ অক্টোবর চীন ভারতকে কাশ্মীরের লাদাখ সীমান্ত থেকে তার সৈন্য অপসারণের দাবী করে।ভারত সে দাবী মেনে না নেয়ায় ১৯৬২ এর ২০ই অক্টোবরে হামলা করে।২০শে নবেম্বরের মধ্যে লাদাখ এলাকার দুই হাজার বর্গমাইল এবং তিব্বত সীমান্তের NEFA এলাকার প্রায় দেড় হাজার বর্গমাইল এলাকা দখল করে নেয়।২৮ শে অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ.কেনেডি আইয়ুব খানকে ভারতের সাহায্যে এগিয়ে আসতে বলে।কিন্তু তিনি তা করেননি।এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে,চীন তখনও মার্কিন বিরোধীতার কারণে জাতিসংঘের সদস্য হতে পারেনি।পাকিস্তান সদস্য পদ লাভে চীনকে জোড়ালো সমর্থন করে।পেশোয়ারের কাছে ছিল সিআইয়ের গোপন ঘাঁটি,সেখান থেকে CIA U-2 গোয়েন্দা বিমান পাঠাতো রাশিয়ার অভ্যন্তরে।পাকিস্তান সে ঘাঁটিও বন্ধ করে দেয়।এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড ক্রোধ চাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে।অপর দিকে ১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্তে যুদ্ধে চীনের হাতে পরাজয়ের পর ভারতও প্রতিশোধের পরিকল্পনা নেয়।এবং সেটি যতটা না চীনের বিরুদ্ধে তার চেয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে।পরিকল্পনা নেয় পাকিস্তানের অঙ্গহানির।আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পনা নেয় আইয়ুব খানের অপসারণের ও পাকিস্তানকে দুর্বল করার।-(মাসুদুল হক)।প্রখ্যাত গবেষক ও পররাষ্ট্র বিজ্ঞানী এবং পাকিস্তানের সাবেক মন্ত্রী জনাব জি.ডব্লিও.চৌধুরী তার বই “Last Days of United Pakistan” বইতে দেখিয়েছেন,পাকিস্তানের কপালে একাত্তরে যা কিছু ঘটেছে সেটি নিছক একটি নির্বাচনের ফলাফল ছিল না। ছিল তৎকালীন আন্তর্জাতিক স্নায়ুযুদ্ধের ফলাফল।তাতে যুক্ত ছিল নিছক ভারত নয়,সোভিয়েত রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও।

তখন র`এবং সি.আই.এ -উভয়েরই প্রয়োজন পড়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাদের পক্ষে নিজ খেলোয়াড়ের। সে স্থানটি পূরণ করে শেখ মুজিব। ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই পাকিস্তানের রাজনীতির ময়দানে তাঁকে নিজেদের খেলোয়াড় রূপে বেছে নেয়। ১৯৬৬ সালের ৫ই ও ৬ই ফেব্রেয়ারিতে লাহোরে আইয়ুব বিরোধী দলসমুহের একটি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনে জনাব নুরুল আমীনের নেতৃত্বাধীন এনডিএফ, কাউন্সিল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী এবং আওয়ামী লীগ যোগ দেয়। তখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন পাঞ্জাবের নবাবজাদা জনাব নসরুল্লাহ খান। এ সভায় শেখ মুজিব হঠাৎ করেই ৬ দফা পেশ করেন। এমনকি আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছেও বিষয়টি বিস্ময়ের জন্ম দেয়। সাংবাদিক মাসুদুল হকের কাছে এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী  বলেন, “লাহোর যাত্রার প্রাক্কালে এমনকি লাহোরে গিয়েও এ সম্পর্কে মুজিব আমাদের সঙ্গে আলাপ করেননি। আমরা জানতাম না মুজিব এ ধরনের প্রস্তাব তুলবে।” -(মাসুদুল হক)

 

রহস্যময় ৬ দফা

ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে আওয়ামী লীগ ৬ দফাপন্থী এবং ৬ দফা বিরোধী দুই খন্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৭ জেলার মধ্যে ১৪ জেলা সভাপতি ৬ দফার বিরোধীতা করে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে। কিন্তু কে এবং কিভাবে ৬ দফা রচনা সে রহস্যের আজও সমাধা হয়নি। পাকিস্তানের গোয়ান্দা বিভাগ ডিআইবি এটিকে সিআইয়ের চাল হিসাবে মনে করে। ভাষানীপন্থী ন্যাপও সেটিই মনে করে। সে সময় ঢাকায় মার্কিন কনস্যাল জেনারেল ছিলেন মিস্টার ব্রাউন। তিনি একই সাথে সিআইয়ের স্টেশন চীফেরও দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার সাথে শেখ মুজিব ও ছাত্রলীগের একাংশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সে সময় মার্কিন কনসালে আরেক কর্মকর্তা ছিলেন কর্নেল চিশহোস। চিশহোসের বাসায় মাঝে মাঝে পার্টি দেয়া হত। এসব পার্টিতে বাছাই করা রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র নেতা ও পদস্থ বাঙালী কর্মকর্তাদের দাওয়াত দেয়া হত। এভাবে একদিকে ভারতীয় ‘র`এর তৎপরতা যেমন চরম আকার ধারণা করেছিল,তেমনি তৎপরতা বেড়েছিল মার্কিন সিআইয়ের। পরে পাকিস্তান সরকার কর্নেল চিশহোসকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে এবং দেশ থেকে বহিষ্কার করে দেয়। পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তা এ,টি,এস,সফদর জানান, শেখ মুজিব তাকে বলেছিলেন তেজগাঁও বিমান বন্দরে লাহোরগামী বিমানে উঠার আগে ৬ দফা প্রস্তাবের একটি টাইপ করা কপি রুহুল কুদ্দুস নামে একজন সিএসপি অফিসার তার হাতে তুলে দেন। উল্লেখ্য যে, রুহুল কুদ্দুস ছিলেন আগরতলা মামলার একজন আসামী এবং শেখ মুজিবের ইনার সার্কেলের লোক।-(মাসুদুল হক)।

সাপ্তাহিক মেঘনার (১৬/১২/৮৫) সাথে এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আব্দুল মালেক উকিল বলেন, ৬ দফা তিনি প্রথম দেখেন একটি টাইপকরা কাগজে শেখ মুজিবের পকেটে ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় কনভেনশনে যাওয়ার পথে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৬ দফা হলো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একাত্তরের ঘটনাবলী, পাকিস্তান ভাঙ্গা ও বাংলাদেশের সৃষ্টি – এসবের শুরু হয় মূলত ৬ দফা থেকে। অথচ এটির প্রণয়নে শেখ মুজিব নিজ দলের নেতাদের সাথেও কোনরূপ পরামর্শ করেননি। ৬ দফা প্রণয়নের প্রাক্কালে কোন দলীয় সম্মেলন বা পরামর্শ সভাও হয়নি। অথচ গণতান্ত্রিক রাজনীতির সেটিই প্রথাসিদ্ধ রীতি। কিন্তু সেটি প্রণিত হয় রুহুল কুদ্দুসের ন্যায় একজন সন্দেহভাজন চরিত্রের মানুষের দ্বারা যিনি বিদেশী শক্তির বিশ্বস্ত বন্ধুরূপে বহু পূর্ব থেকেই পরিচিত ছিলেন।

কোন পরিকল্পনা যখন বিদেশী ষড়যন্ত্রের অংশ রূপে অগ্রসর হয় তখন সে ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমুহ কখনোই প্রকাশ্যে নেয়া হয় না। দেশবাসীকে ও দেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সে প্রক্রিয়ায় জড়িত করা হয় না। সেটি ৬ দফা প্রণয়নের সময় যেমন হয়নি, তেমনি পাকিস্তান ভাঙ্গার ব্যাপারেও হয়নি। অথচ পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহিত হয়েছিল প্রকাশ্য জনসভায়। তার সাথে সম্পৃক্ত ছিল মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় নেতাকর্মীগণ। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে ৬ দফা প্রণয়ন ও পাকিস্তান ভাঙ্গার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেও কোন প্রকাশ্য বৈঠক হয়নি। ইতিহাসের লেখকদের দায়িত্ব হলো, এসব সিদ্ধান্তের গুঢ় রহস্যগুলি উদঘাটন করা। কারা ছিল নেপথ্যের নায়ক বা ভিলেন তাদের খুঁজে বের করা এবং সত্য থেকে মিথ্যাগুলোকে সতর্কতার সাথে আলাদা করা। বাংলাদেশে ইতিহাসের লেখকদের দ্বারা একাজটিও হয়নি। তারা বরং অতি পরিচিত মিথ্যাগুলোকেও পাঠ্য তালিকাভুক্ত করেছে। এভাবে মিথ্যাচর্চাও ইতিহাসের পাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধের প্রস্তুতিতে র’য়ের কি ভূমিকা ছিল -সে বিষয়ে আরো কিছু তথ্য দিয়েছেন ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রায়না তার “Inside RAW” বইতে। সেটি এরকমঃ…কিন্তু ততদিনে ভারতীয় এজেন্টরা পূর্ব পাকিস্তানের মুজিবপন্থী একটি অংশের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। আগরতলায় ১৯৬২-৬৩ সালে ভারতীয় এজেন্ট ও মুজিবপন্থীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পরবর্তী গৃহিত কার্যক্রম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। কর্নেল মেনন ( ইনি হলেন ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা র’এর দিল্লিস্থ পাকিস্তান ডেস্কের দায়িত্বশীল। তার আসল নাম কর্নেল শংকর নায়ার। মেনন তার ছদ্দ নাম) যিনি ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনী ও মুজিবপন্থী অংশের যোগাযোগ রক্ষাকারী ছিলেন। তিনি আগরতলা বৈঠকের পর ইঙ্গিত পান যে, মুজিবপন্থী গ্রুপ আন্দোলন শুরু করার জন্য অত্যন্ত উদগ্রীব। কর্নেল মেনন তাদের এই বলে সতর্ক করে দেন যে, তার সঠিক ফলদায়ক সিদ্ধান্তে আসার সময় এখনো হয়নি।.. তারা অস্ত্রের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে এবং ঢাকাস্থ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস অস্ত্রাগারে হামালা চালায়। কিন্তু এই প্রাথমিক প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আসলে এই পদক্ষেপ একটি ধ্বংসাত্মক ফলাফল ডেকে আনে, ঠিক যেরূপ কর্নেল মেনন ধারণা করেছিলেন। এর কয়েক মাস পর ৬ই জানুয়ারি ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে যে, ভারতের সাহায্যে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে আলাদা করার চক্রান্ত করার জন্য ২৮ জন পাকিস্তানীর বিচার করা হবে। শেখ মুজিবকেও বারদিন পর একজন দোষী হিসাবে জড়িত করা হয়। এই মামলাই পরবর্তীতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবে পরিচিত পায়।-(অশোকা রায়না, ১৯৯৬)

২৫শে মার্চের বহু পূর্ব থেকেই ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা র’ মুজিব বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল। যারা মনে করেন,পাকিস্তান আর্মির মিলিটারি এ্যাকশনের পরই মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার সিদ্ধান্ত নেন -তাদের ধারণা আদৌ সত্য নয়। অশোক রায়না লিখেছেন, “কর্নেল মেননের অবিরাম ভ্রমন ও যোগাযোগের জন্য সীমান্তব্যাপী র’য়ের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র খোলা হয় এবং কর্নেল মেননের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের ভিতরের প্রতিরোধ আন্দোলনকারীদের নিবিড় যোগাযোগ ঐ সমস্ত তরুণ, অবিশ্রান্ত ও উৎসর্গীকৃত গুপ্ত যোদ্ধাদের মনোবল দারুণ ভাবে বৃদ্ধি করে। … ইতিমধ্যে যখন বিভিন্ন কেন্দ্র স্থাপন শেষ হয় এবং পূর্ব পাকিস্তানের এজেন্টদের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু হয়, তখনই সেই ভয়াবহ ‘কালো রাত্রী’(২৫ শে মার্চ)’র পদধ্বনি শোনা যেতে থাকে।- (অশোক রায়না, ১৯৯৬)।একাত্তরের যুদ্ধটির শুরু তাই একাত্তরে নয়, শুরুটি হয়েছিল বহু পূর্ব থেকেই। তবে সব সময়ই এর পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ছিল ভারত। এবং মার্কিন কর্তৃপক্ষ ও তার গুপ্তচর সংস্থা তা থেকে অজ্ঞ ছিল না। তবে অজ্ঞ রাখা হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে। প্রতিটি ষড়যন্ত্রে তো তাই হয়ে থাকে।

 

গ্রন্থপঞ্জি

  • মাসুদুল হক; বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ,মৌল প্রকাশনী ৩৮/২ক, বাংলা বাজার, ঢাকা ১১০০।
  • অলি আহাদ; জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লি: ১২৫,মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা ১০০০।
  • Ramon, 2007;  The Kaoboys of the R&AW, Down Memory Lane, Lance Publishers & Distributors 2/42 Sarvapriya Vihar, New Delhi 11016.
  • অশোকা রায়না,১৯৯৬; ইনসাইড র’ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার অজানা অধ্যায়, (বাংলা অনুবাদ) অনুবাদ,লেঃ (অবঃ) আবু রুশদ রুমী প্রকাশনী।



অধ্যায় আঠারো: নির্বাচন থেকে যুদ্ধ ও ভারতীয় অধিকৃতি

রায় ছিনতাই

স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মূল যুক্তিটি হলো,১৯৭০’য়ের নির্বাচনী বিজয়।কিন্তু কিসের উপর নেয়া হয়েছিল সে গণরায়? সেটি কি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে? আওয়ামী লীগের সে নির্বাচনী বিজয়টি পাকিস্তান ভাঙ্গা বা স্বাধীনতার নামে অর্জিত হয়নি।পাকিস্তান ভাঙ্গা ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা শেখ মুজিবের নিজের গোপন অভিপ্রায় হতে পারে,গুপ্ত দলীয় এজেন্ডাও হতে পারে,কিন্তু যে নির্বাচনী মেনিফেস্টো জনসম্মুখে প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ নির্বাচন লড়েছিল তার কোথাও স্বাধীন বাংলাদেশের কথা বলা হয়নি।পাকিস্তান ভাঙ্গার কথাও বলা হয়নি।ভোট নিয়েছিল ৬ দফার নামে।৬ দফা ও স্বাধীনতা কি এক বিষয়? পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগের নির্বাচনি মেনিফেস্টোর কোথাও পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির কোন প্রমাণ পায়নি,ফলে দলটিকে নির্বাচনে অংশ নিতে কোনরূপ বাধা দেয়নি। নির্বাচনের পর গণরায়কে শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষে দলিল রূপে ব্যবহার করবেন -সেটি নির্বাচন কালে কোথাও বলেননি।এরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষযে রায় দেয়ার অধিকার ছিল একমাত্র জনগণের।কিন্তু জনগণ সে অধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি।জনগণের সে অধিকার নির্বাচনের নামে ছিনতাই হয়েছে।গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটি এক বড় রকমের জালিয়াতি।

সত্তরের নির্বাচনে জনগণ প্রার্থীদের ভোট দিয়েছিল পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য হতে, বাংলাদেশ সংসদের সদস্য হওয়ার জন্য নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার জন্যও নয়। সে নির্বাচনটি ছিল পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক সংকটের সমাধান কল্পে, আদৌ দেশ বিভক্তির জন্য নয়। নির্বাচনের পর পাকিস্তান ভাঙ্গা হবে -সমগ্র নির্বাচন কালে এমন কথা মুজিবের মুখ থেকে কোথাও প্রকাশ্যে শোনা যায়নি। কোন পত্রিকাতেও দেশ ভাঙ্গার বিষয়টি আসেনি। এর প্রমাণ, সে আমলের পত্রিকাগুলোর পুরনো কপি। যে লক্ষ্যে জনগণ থেকে ভোট নেয়া হলো শেখ মুজিব ও তার দল সে লক্ষ্যে কাজ না করে নির্বাচনী বিজয়কে ব্যবহার করেছেন নিজের এজেন্ডা পূরণে –যার সাথে জড়িত করেছেন আগ্রাসী ভারতকে। সে এজেন্ডা পূরণে প্রকাণ্ড যুদ্ধও ডেকে এনেছেন। ২৫ মার্চের রাতে সেনা বাহিনী নামার আগেই শেখ মুজিব ৭ই মার্চ যার কাছে যা আছে তা নিয়ে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ারও আহবান দিয়েছিলেন। “এবারের লড়াই স্বাধীনতার লড়াই” বলেছেন। অথচ সত্তরের নির্বাচন সে অধিকার মুজিবকে দেয়নি।বিষয়টি লন্ডনের টিকিট কিনে টোকিও’র পথে যাওয়ার মত।এটি ছিল নির্বাচনের মাধ্যমে মুজিবের উপর অর্পিত আমানতের খেয়ানত। সততা থাকলে শেখ মুজিবের উচিত ছিল স্বাধীনতার ইস্যুতে রিফারেন্ডামের মাধ্যমে জনরায় জেনে নেয়া। কিন্তু মুজিব সে পথে যাননি। গণরায় ছিনতাইয়ের এ এক অভিনব ইতিহাস।

সংসদ সদস্যদের সব ক্ষমতা থাকে না। তারা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সরকার গঠন করতে পারেন, দেশের শাসনতন্ত্র বা আইনে পরিবর্তন আনতে পারেন, বাজেট পাস এবং বিদেশ নীতি নিয়েও সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা শক্তির সাথে সংসদে দর কষাকষিও করতে পারেন। কিন্তু তারা দেশকে খণ্ডিত করবেন বা দেশের স্বাধীনতা বিলুপ্ত করবেন -সে অধিকার কোন দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের থাকে না। এটি সরাসরি রেফারেন্ডামের বিষয়। অথচ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী বিজয়কে স্বাধীনতার পক্ষে রায় বলে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষাণিটি ১৯৭১’য়ের ২৫ মার্চে দিয়ে চট্টগ্রামে প্রচারের জন্য পাঠিয়েছিলেন। অর্থাৎ আর্মির এ্যাকশনের আগেই? প্রশ্ন হলো, শেখ মুজিব ঘোষণাটি দিলেন কোন বিধি অনুযায়ী? এটি কি সংসদ সদস্যদের কার্যবিধির মধ্যে পড়ে? নির্বাচনে জনগণ প্রার্থীদের সংসদের সদস্য নির্বাচন করে, স্বাধীনতার ঘোষক নয়। এরূপ ঘোষণাকে বৈধতা দিলে বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে যে কেউ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে তাকেই বা অবৈধ বলা যাবে কি করে?

 

প্রতারণা নিজ অঙ্গীকারের সাথে

শেখ মুজিব ও তার দল ১৯৭০-এর নির্বাচনে অংশ নেয়ার পূর্বে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার দেয়া ৫ দফা লিগ্যাল ফ্রেমওংয়ার্ক অর্ডারে বিনা প্রতিবাদে স্বাক্ষর করেন।শর্তগুলো ছিল নিম্নরূপঃ ১).পাকিস্তানকে অবশ্যই ইসলামী আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।২).অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পর দেশের জন্য গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে হবে।৩).আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সংহতির বিষয়কে অবশ্যই শাসনতন্ত্রে গুরুত্ব দিতে হবে।৪).দেশের দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে অবশ্যই দূর করতে হবে।৫).কেন্দ্র ও প্রদেশগুলির মধ্যে ক্ষমতা অবশ্যই এমনভাবে বণ্টন করতে হবে যাতে প্রদেশগুলি সর্বাধিক পরিমাণ স্বায়ত্তশাসন পায়।কেন্দ্রকে আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষাসহ ফেডারেল দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট ক্ষমতা থাকতে হবে।

উপরুক্ত ৫ দফা লিগ্যাল ফ্রেমওংয়ার্ক অর্ডার ছিল একটি অঙ্গীকারনামা।এটি ছিল পাকিস্তানের আগামী শাসনতন্ত্রের জন্য ন্যূনতম ফর্মুলা –যা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারি দলগুলি মেনে নিয়ে নির্বাচনে নামে।১৯৭০ সালের নির্বাচনের মূল লক্ষ্যটি ছিল লিগ্যাল ফ্রেমওংয়ার্ক অর্ডারের শর্তগুলি পূরণ করা।নির্বাচনের পূর্বে পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক নেতাদের ন্যায় শেখ মুজিবও শর্তগুলো স্বেচ্ছায় মেনে নিয়ে দস্তখত করেছিলেন।কেউ তাকে এটি মেনে নিতে জবরদস্তি করেছে -সে প্রমাণ নাই।লেগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্ক অর্ডারের কোন একটি বিষয়ে শেখ মুজিবের সামান্যতম আপত্তি ছিল -সেটিও কোনদিন প্রকাশ করেননি।এ অঙ্গীকার নামা’র কোথাও উল্লেখ নাই যে নির্বাচনে বিজয়ী হলে মুজিবকে স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার অধিকার দেয়া হবে।এ কথাও বলা হয়নি,নির্বাচিত সদস্যদের অধিকার থাকবে পাকিস্তানের ভৌগলিক মানচিত্রে পরিবর্তন আনা।বরং বলা হয়েছিল,নির্বাচিত সদস্যগণ আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সংহতিরক্ষায় অধিক দায়বদ্ধ হবেন।পাকিস্তানকে ইসলামী আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত করবেন –সে অঙ্গীকারও তাদেরকে করতে হয়েছিল। ইসলামী আদর্শ বিষয়ক এ ধারাটি নিয়ে আওয়ামী লীগের সে সময় আপত্তি ছিল -শেখ মুজিব সে কথাটি কখনোই জনসম্মুখে বলেননি।ধর্মশূণ্য ও ইসলামে অঙ্গীকারশূণ্যদের ন্যায় ইসলামী মৌল বিশ্বাস বা আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ালে মুজিব কি কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোট পেতেন? মুজিব ও অনুসারিগণ যে সেসব নীতিমালা মেনে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন –সেটি কোন গোপন বিষয় নয়।ফলে প্রশ্ন উঠে,তা হলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটি কোথায়? মুজিব নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করতেন।মুসলিম কি কখনো তার নিজকৃত অঙ্গীকার বা ওয়াদা ভঙ্গ করে? তাতে কি ঈমান থাকে?

কোন একটি অঙ্গীকার নামায় স্বাক্ষর করার পর সেটি মেনে চলার দায়বদ্ধতা বিশাল।সাক্ষরিত প্রতিটি অঙ্গীকারনামাই একটি দলিল।যে কোন সভ্য দেশেই অঙ্গীকারভঙ্গটি দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ।যে কোন দায়িত্বশীল নেতার অঙ্গীরেরই মূল্য থাকা উচিত।নইলে বহুশ্রম,বহুমেধা ও বহুসময় ব্যয়ে অর্জিত চুক্তি বা সমঝোতার মূল্য কী? ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব তো নিজ অঙ্গীকারগুলোর উপর সর্বাবস্থায় অটল থাকাতে।নইলে ব্যক্তি তো ব্যক্তিত্বহীন হয়। কথা হলো,নিজ নিজ অঙ্গীকারের সাথে নিজেরা ওয়াদাভঙ্গ করলে মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করবে কীরূপে? তাতে সমাজ এবং রাষ্ট্রই বা পরিচালিত হবে কীরূপে? সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানই বা হবে কীরূপে? রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের কাছে ওয়াদাভঙ্গ করা বা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়া মামূলী ব্যাপার,বহু ধুর্ত নেতার কাছে সেটি রাজনীতির মোক্ষম হাতিয়ারও।কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এটি মানব চরিত্রের গুরুতর ব্যাধি।এ ব্যাধির কারণে বিলুপ্ত হয় ব্যক্তির ঈমান,নীতিবোধ ও মূল্যবোধ।মহান নবীজী (সাঃ)র কাছে ওয়াদাভঙ্গ গণ্য হয়েছে মুনাফেকির আলামত রূপে -যা কুফরির চেয়েও নিকৃষ্ট।কাফেরগণ অন্তত তাদের প্রকৃত পরিচয়কে গোপন করেনা,তারা যা সেটিই সবার সামনে প্রকাশ করে।মুজিবের ব্যর্থতাটি এক্ষেত্রে বিশাল,তিনি তার স্বাক্ষরিত অঙ্গীকারের উপর অটল থাকতে পারেননি।নির্বাচনের পর লিগ্যাল ফ্রেমওংয়ার্ক অর্ডারকে তিনি হয়তো পুনরায় পড়ে দেখার প্রয়োজনও বোধ করেননি।নির্বাচনী বিজয়ের পর পরই সেটিকে তিনি আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছিলেন।অথচ সে অঙ্গীকারনামাটি ছিল দেশের রাজনীতিতে নির্বাচন পরবর্তী সর্বদলীয় রোডম্যাপ।শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার কথা সে রোডম্যাপ অনুযায়ী।অথচ সে রোডম্যাপকে শেখ মুজিব গুরুত্বহীন ও অপ্রাসঙ্গিক করে ফেললেন।তার কাছে তখন গুরুত্ব পায় স্রেফ পাকিস্তান ভাঙ্গা।এবং সেটি বুঝা যায় ইয়াহিয়া খানের সাথে তার বৈঠকে। প্রশ্ন হলো,এটি কি রাজনৈতিক সততা? ভাবটা এমন,কোন অঙ্গীকারনামায় তিনি কোন কালেই স্বাক্ষর করেননি।তার দাবি,নির্বাচনে তিনিই বিজয়ী হয়েছেন,অতএব তিনি যা বলেন একমাত্র সেটিই সাড়ে সাত কোটি মানুষের কথা।সেটি ছাড়া অন্যসব কিছুই গুরুত্বহীন।এমন কি যেসব ওয়াদা করে তিনি নির্বাচন জিতেছিলেন সেগুলিও। এমনকি গুরুত্বহীন গণ্য করেন নির্বাচনপূর্ব তার নিজের স্বাক্ষরিত অঙ্গীকারগুলিও।পাকিস্তানের ভবিষ্যৎকে এভাবে নিজ এজেন্ডার কাছে জিম্মি করে ফেলেন।কিন্তু প্রশ্ন হলো,সত্তরের নির্বাচন তো পাকিস্তান ভাঙ্গা এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রশ্নে হয়নি,অতএব মুজিবের কথা ও জনগণের কথা এক হয় কি করে?

প্রশ্ন হলো,কোন দলিল বা অঙ্গিকানামাকে অস্বীকার বা অমান্য করলে সে দলিল অনুযায়ী অর্জিত বিষয়ের উপর কি সংশ্লিষ্ট পক্ষের কোন বৈধ অধিকার থাকে? বৈধতার ভিত্তি তো নির্বাচনপূর্ব অঙ্গীকারনামা।লিগ্যাল ফ্রেমওংয়ার্ক অর্ডার ছিল তেমনি একটি স্বাক্ষরিত দলিল।ফলে যে দলিলের উপর ভিত্তি করে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিজয়,সেটি অমান্য করলে কি সংসদের সদস্যপদ থাকে? তাছাড়া অঙ্গীকার পালনে একজন মুসলিমের দায়বদ্ধতাটি তো বিশাল।তার ঈমানদারীর মূল পরিচয়টি তো অঙ্গীকার পালনে।স্বেচ্ছায় এবং স্বহস্তে মুজিব যে অঙ্গীকার নামায় স্বাক্ষর করেন সে অনুযায়ী তিনি দায়বদ্ধ ছিলেন পাকিস্তানের সংবিধান তৈরীতে। পাকিস্তানের বৃহৎ দলের নেতা রূপে তার দায়ভারটি ছিল সর্বাধিক। আর সংবিধান তো কোন একটি দলের ও একটি প্রদেশের সংসদ সদস্যদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় নয়।সে জন্য প্রয়োজন ছিল দেশের অন্য ৪টি প্রদেশের সদস্যদের সাথে আলোচনায় বসা।কিন্তু আওয়ামী লীগ সে পথে যায়নি।তাদের সাথে আলোচনায় মুজিবের অনাগ্রহ ও অনগ্রসরতার কারণেই তো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বাধ্য হন জাতীয় পরিষদের বৈঠক মুলতবি করতে। অথচ সে মুলতবিকে বাহানা করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগ দেশের পরিস্থিতিকে চরম অরাজকতার দিয়ে নিয়ে যায় এবং অবশেষে যুদ্ধ শুরু করে।

প্রশ্ন হলো,কোথা থেকে শেখ মুজিব পেলেন পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণের অধিকার? জনগণ কখন দিল তাকে সে অধিকার? দিলে তার প্রমাণ ক্ই? সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং স্বাধীনতার ঘোষক হওয়া কি এক কথা? এটি কি তার সিদ্ধান্ত ছিল যে,নির্বাচনে একবার বিজয়ী হলে তিনি লিগ্যাল ফ্রেমওংয়ার্ক অর্ডারের দিকে আর ফিরে তাকাবেন না? এবং সে লিগ্যাল ফ্রেমওংয়ার্ক অর্ডারেকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিবেন? সেটি তো বিশাল জালিয়াতি।স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় এরূপ জালিয়াতির প্রয়োজন ছিল কি? এটি কি স্বচ্ছ ও ট্রান্সপ্যারেন্ট পদ্ধতিতে স্বাধীনতা অর্জনের পথ? ভারতের ন্যায় একটি আগ্রাসী দেশকে যুদ্ধে টেনে এনে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কেন ভারতের দান রূপে কংলকিত করা হলো? অনেকের পক্ষ থেকে বলা হয়,২৫শে মার্চ পাকিস্তান আর্মির হাতে ঢাকায় গণহত্যা পাকিস্তান ভাঙ্গাকে অনিবার্য করেছে।কথা হলো,২৫ শে মার্চ রাতে যত জন মারা যায়,মুজিব আমলে রক্ষি বাহিনীর হাতে তার চেয়ে বেশী মারা যায় উত্তরবঙ্গে।অনেক প্রাণহানী হয়েছিল আত্রাইয়ে।রক্ষিবাহিনীর হাতে শত শত বামপন্থী মারা গেছে পাবনায়।সে কারণে উত্তরবঙ্গের এমপিগণ কি তবে স্বাধীনতা ঘোষণা করবে?

 

রক্তপাতের পথে

আওয়ামী লীগ জেনে বুঝে রক্তপাতের পথটি বেছে নেয়। বিনা রক্তপাতে দেশ স্বাধীন করার পথটি ছিল রেফারেন্ডামের পথ। কিন্তু আওয়ামী লীগ জেনে বুঝেই সে পথে যায়নি। যখনই কোন মুসলিম রাষ্ট্রকে ক্ষুদ্রতর করার চেষ্টা হয় তখনই জনগণের মাঝে পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্তি আসে, যুদ্ধ শুরু হয় এবং প্রচুর রক্তপাতও ঘটে। যে কোন দেশে সেটি অনিবার্য। বিষয়টি এমন ছিল না যে, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই পাকিস্তান সরকার সে স্বাধীনতা মেনে নিবে। দেশটির সংহতির রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীই একমাত্র শক্তি ছিল না, লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষও পাকিস্তানের অখণ্ডতার জন্য যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিল। সেটি যেমন পশ্চিম পাকিস্তানে, তেমনি পূর্ব পাকিস্তানেও। মাত্র ২৩ বছর আগে যে বাংলার ৯৮% ভাগ ভোটার স্বেচ্ছায় পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করার জন্য ভোট দিল সে দেশটির সংহতি সংকট পড়লে সেটি রুখতে সপক্ষে যোদ্ধা পাবে না -সেটি কি ভাবা যায়? ভারত লক্ষ লক্ষ সৈন্য নিয়ে হামলা না করলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা কি দেশটিকে ভাঙ্গতে পারতো?  ৯ মাসের যুদ্ধে একটি জেলা দূরে থাক, একটি থানাকেও কি স্বাধীন করতে পেরেছিল? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যে ভারতীয় সেনা বাহিনীর পক্ষ থেকে যুদ্ধজয়ের ফল -তা কি অস্বীকারের উপায় আছে? ভারতের কাছে তাই স্বাধীন বাংলাদেশের দায়বদ্ধতাটি তাই বিশাল। সে জন্যই বাংলাদেশ থেকে ভারত ইচ্ছামত ফায়দা নিচ্ছে এবং মুজিব আমলে দেশকে ২৫ সালা দাসচুক্তিতে আবদ্ধ করেছিল -সেটি তো তারই ফল।

তাছাড়া একটি মুসলিম দেশকে খণ্ডিত করা সেক্যুলারিস্ট, সোসালিস্ট, জাতীয়তাবাদী, নাস্তিক এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টানদের কাছে যত প্রিয়ই হোক, ধর্মপ্রাণ মুসলিমের কাছে সেটি হারাম। আলেমদের মাঝে এ বিষয়ে সামান্যতম দ্বি-মত নেই। হারাম হওয়ার স্পষ্ট দলিল রয়েছে পবিত্র কোরআনে। এজন্য কোন আলেম বা কোন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের কোন একজন নেতা বা কর্মী ভারতে যায়নি। তারা মুক্তি বাহিনী বা মুজিব বাহিনীর সদস্যও হয়নি। আলেম, ইসলামী চিন্তাবিদ বা ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগ ও তার সেক্যুলারিস্ট জাতীয়তাবাদী সঙ্গিগণ যেরূপ ঢালাও ভাবে রাজাকার বলে তার মূলে তো একাত্তরের সে বাস্তবতা। একাত্তরের ইতিহাসে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ইসলামপন্থীগণ পরাজিত হলেও বিলুপ্ত হয়নি। অতএব পাকিস্তান ভাঙ্গার যুদ্ধ হলে সেটি যে রক্তাত্ব হবে সেটি আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও বুঝতেন। ষাটের দশকে শেখ মুজিব কারাবন্দী থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের হাল ধরে ছিলেন মিসেস আমেনা বেগম। তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদীকা। শেখ মুজিবের যে পথে এগুচ্ছেন তাতে যে গভীর রক্তপাত হবে -সে বিষয়ে তিনি মুজিবকে হুশিয়ার করে দিয়েছিলেন। কিন্ত মুজিবের সে রক্তপাত নিয়ে পরওয়া ছিলনা। জেনে বুঝেই তিনি সে পথটি বেছে নেন। এবং সেটি ভারতের সাহায্যে যুদ্ধের পথ।

পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে জনগণের সমর্থণ পাবেন –তা নিয়ে শেখ মুজিব কোন কালেই আশাবাদী ছিলেন না। তাই জনগণকে বোকা বানাতে তাকে প্রতি মিটিংয়ে জোর গলায় পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিতে হয়েছে। ১৯৭০’য়ের প্রথম নির্বাচনী জনসভাটি হয়েছিল ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্দানে জানুয়ারি মাসে। সে জনসভায় তিনি বলেছিলেন,“আমাকে বলা হয় আমি নাকি পাকিস্তান ভাঙতে চাই। আপনারা এমন জোরকন্ঠে পাকিস্তান জিন্দাবাদ আওয়াজ তুলুন যাতে পিণ্ডির শাসকদের কানে পৌঁছে যায়।” সে মিটিংয়ে লেখক নিজে উপস্থিত ছিলেন। এমনকি সেটি ১৯৭১’য়ের ৭ই মার্চের রেস কোর্সের বক্তৃতাতেও পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলেছেন। এ মিটিংয়েও লেখক উপস্থিত ছিলেন। জনগণকে এবং সে সাথে সরকারকে ধোকা দিতেই শেখ মুজিব লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্কেও স্বাক্ষর করেছেন। তবে মুজিবের রাজনীতিতে অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার রাজনীতি ছিল না। সেটি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৩ মার্চে শেখ মুজিবের সাথে তার শেষ বৈঠকে বুঝতে পারেন। এরপর বৈঠকে তিনি ইতি টানেন। মুজিবের রাজনীতি চলতে থাকে ভারতের দেয়া রোডম্যাপটি অনুসরণ করে। সে রোড ম্যাপে যেমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছিল, তেমনি পাকিস্তান ভাঙ্গাও ছিল। সে সাথে ব্যাপক ও বীভৎস ভাবে বিহারী হত্যাও ছিল। ভারত মুজিবের হাতে সে রোড ম্যাপটি তুলে দেয় নির্বাচনি বিজয়ের বহু পূর্বেই। মুজিব আগরতলা মামলায় ধরা পড়লেও সে রোডম্যাপটি কখনোই বর্জন করেননি। ভারত একাত্তরে বিশাল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধে নামে এবং পূর্ব পাকিস্তানকে অধিকৃত করে -সে ভারতীয় রোড ম্যাপের অংশ রূপেই।

বাস্তবতা হলো, ভারতের সামনে রক্তাত্ব পথ ছাড়া পাকিস্তান ভাঙ্গার ভিন্ন কোন রাস্তাও ছিল না। সেটি ভারত যেমন বুঝতো, তেমনি মুজিবও বুঝতো। ভারতের লক্ষ্য ছিল, যেভাবেই হোক পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে রক্তপাতের পথে টেনে আনা এবং রক্তপাতকে আরো গভীরতর করা। লক্ষ্য ছিল, ছাত্রলীগের ক্যাডার বাহিনীকে অবাঙালীদের বিরুদ্ধে আরো হিংস্র ও হত্যাপাগল করা। কারণ, ভারতের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানকে খণ্ডিত করা নয়, বরং উপমহাদেশের মুসলিমদের মাঝে গভীর ঘৃণা ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি। এরূপ লক্ষ্য অর্জনে  ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকগণ তাদের ১৯০ বছেরর শাসনে ব্যর্থ হলেও ভারত সফল হয়েছে। কারন ভারত পেয়েছিল হাজার হাজার বাঙালী ট্র্র্র্রোজান হর্স -যারা ছিল ভারতের আজ্ঞাবহ। ভারত জানতো, রক্তপাত যত গভীরতর হবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে তিক্ততা ততই তীব্রতর হবে। এবং তাতে রুদ্ধ হবে পাকিস্তানের দুই অংশের মাঝে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান। তখন অসম্ভব হবে দুই প্রদেশের মাঝে সংহতি। এর ফলে ভারতের প্রতি বাড়বে বাঙালী মুসলিমের আনুগত্য ও নির্ভরশীলতা। ভারত সে পরিকল্পনা নিয়েই এগুয়।

 

প্রস্তুতি বহু পূর্ব থেকেই

স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টিকে যারা পাকিস্তান আর্মির ২৫শে মার্চে অপারেশনের ফলশ্রুতি বলেন তারা সঠিক বলেন না। অনেকে বলেন, মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করাটাই সব সমস্যার মূল। তারাও সঠিক বলেন না। তারা সেটি বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে মার্চের বৈঠকে মুজিব কি চেয়েছিলেন সেটি না জেনেই। যারা মনে করেন ৬ দফা না মানাতেই সমস্যা দেখা দিয়েছিল –তারাও ঠিক বলেন না। মার্চে ইয়াহিয়া ও মুজিবের মাঝে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। ইয়াহিয়া এবং ভূট্টো উভয়ই ৬ দফা মেনে নিয়েছিলেন। -(Sisson and Rose 1990)। মুজিব চেয়েছিলেন শুধু পূর্ব পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা, সমগ্র পাকিস্তানের নয়। আরো চেয়েছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের উপর থেকে সামরিক আইন তুলে নেয়া হোক। তখন সুস্পষ্ট বোঝা যায়, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা নেয়া এবং অখণ্ড পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখা মুজিবের রোড ম্যাপের অংশ ছিল না। সেটি যেমন আওয়ামী বাকশালীদের অভিমত, তেমন মার্কিন গবেষক রিচার্ড সিসন এবং লিও রোজেরও অভিমত।-(Sisson and Rose 1990)। ভারতও সেটি চাইতো না। মার্চের বৈঠকের অনেক আগেই ৬ দফা এক দফাতে পরিণত হয়েছিল।

ইয়াহিয়া খান বহু ভূল করেছেন। পাকিস্তান আর্মি বহু নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করেছে এবং বহু মানুষের ঘর-বাড়ী এবং দোকানে আগুণ দিয়েছে। শেখ মুজিবকেও তিনি বহু নাজায়েজ ফায়দা দিয়েছেন। কিন্তু সেসব ভূলের কারণে ভারত একাত্তরে যুদ্ধ করেনি এবং ভারতীয় সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আসেনি। পুর্ব পাকিস্তানে রক্তপাত নিয়ে ভারতের আদৌ মাথাব্যাথা ছিল না;বেশী রক্তপাত হচ্ছে তো কাশ্মীরে। ভারত যুদ্ধ শুরু করেছে তার নিজস্ব এজেন্ডা পূরণে;এবং সেটি নিজস্ব পরিকল্পনা মাফিক। এরূপ আগ্রাসী যুদ্ধের পরিকল্পনা ১৯৭১’য়ে হয়নি; ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল বহু পূর্ব থেকেই। সে প্রমাণ এসেছে এমনকি আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্য থেকেও। আওয়ামী লীগ নেতা জনাব আব্দুর রাজ্জাক ১৯৮৭ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক মেঘনা পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আগেই বলেছি আমরা বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট করেছিলাম। (নেতৃত্বে সিরাজুল আলম খান ও কাজী আরেফ আহমেদও ছিল) …বঙ্গবন্ধুকে বলি ..আমাদের প্রস্তুতির জন্য ভারতের সাথে যোগাযোগ থাকা চাই। …আমাকে তিনি একটা ঠিকানা দিলেন। বললেন,“এই ঠিকানায় তুই যোগাযোগ করবি।” তিনি তখনই আমাদের বললেন ভারতের সাথে তার একটা লিংক আগে থেকেই ছিল- ১৯৬৬ সাল থেকে। “তারা তোদের সব রকম সাহায্য করবে। তুই এই ঠিকানায় গিয়ে দেখা করবি।” তখন তিনি চিত্ত রঞ্জণ সুতারের সঙ্গে দেখা করতে বললেন। (এই সেই চিত্তরঞ্জন সুতোর যে বাংলাদেশ ভেঙ্গে স্বাধীন বঙ্গভূমি বানানোর আন্দোলনের নেতা)। বললেন,“তোরা শিগগিরই একটি ট্রান্সমিশন বেতার কেন্দ্র পাবি। সেটা কোথা থেকে কার মাধ্যমে পাওয়া যাবে তাও বলে দিলেন।”-(সাপ্তাহিক মেঘনা,৪/০২/৮৭,পৃষ্ঠা ১৮)। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি তাই হঠাৎ করে ২৫শে মার্চ সামনে আসেনি। শেখ মুজিব ভারতীয় সাহায্য ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি পাকাপোক্ত করেছিলেন অনেক আগেই। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তো সে অভিযোগই আনা হয়েছিল। অথচ সে অভিযোগকে তিনি মিথ্যা বলেছিলেন। তিনি আগরতলা মামলাকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মামলা বলে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। আব্দুর রাজ্জাকের উপরুক্ত সাক্ষাৎকারের পরও কি বুঝতে বাকি থাকে কে ছিলেন মিথ্যাবাদী ও ষড়যন্ত্রকারী?

 

দেশের স্বার্থ বনাম দলীয় স্বার্থ

যে কোন সভ্য ও সুস্থ ধ্যান-ধারণায় ব্যক্তি বা দলের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থ বড়। তাই যে কোন সভ্য দেশে রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে দেশের স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। নইলে দেশ বিপদে পড়ে। কিন্তু আওয়ামী লীগ বা শেখ মুজিবের কাছে দলীয় স্বার্থ এবং দলীয় নেতাই বড়। তারা দেশের স্বার্থ নিয়ে ভাবেননি। সেটি যেমন পাকিস্তানের বেলায় তেমনি বাংলাদেশের বেলায়। সেটি বার বার দেখা যায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। ফলে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিজয়ে দেশ ও গণতন্ত্র বিপদে পড়ে। দলের স্বার্থকে তারা দেশের স্বার্থের চেয়ে ছোট করে দেখতে রাজী ছিল না। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ব্যক্তি ও দলের স্বার্থ বাঁচাতে দেশ এ দেশবাসীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে তখন একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলেও দেশের স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ বেশী প্রাধান্য পেয়েছে। প্রাধান্য পেয়েছে ভারতের স্বার্থও। সেটি স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পায় ১৯৭০’য়ের নির্বাচনের পর।

মার্চের শুরুতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ইয়াহিয়া খান কর্তৃক মুলতবি করাতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারগণ ঢাকা শহরে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে। শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন। শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাস ছাত্রদের সামরিক ট্রেনিং।  অথচ অধিবেশন মুলতবির এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল যা প্রেসিডেন্ট হিসাবে ইয়াহিয়া খানের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব ছিল না।  অধিবেশন মুলতবি হয়েছিল কিছু জটিল বিষয়ে আলোচনার আরো সুযোগ দেয়ার জন্য। অপর দিকে দেশে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টির জন্য আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের জঙ্গিবাহিনীর জন্য বাহানা দরকার ছিল। তারা এ মুলতবিকেই বাহানা রূপে ব্যবহার করে। পরবর্তীতে সে আওয়ামী জঙ্গিবাহিনী দেশে একটি যুদ্ধ ডেকে আনতে সমর্থ হয়। অথচ দেশের স্বার্থকে বড় ভেবেছিলেন প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের নেত্রী অঙ সাঙ সুচি। নব্বইয়ের দশকে নির্বাচনে তার দল বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় যেতে পারেননি। অঙ সাঙ সুচির হাতে ক্ষমতা না দিয়ে সেনা বাহিনী তাকে জেলে পাঠায়। কিন্তু সে জন্য কি তিনি এবং তার দল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে? সামরিক বাহিনীর সে হঠকারিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলে মিয়ানমারের অবস্থা কীরূপ হত?

কোন মুসলিম দেশ ভাঙ্গা ইসলামে হারাম। সেটি নিষিদ্ধ জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ীও। এজন্যই ভারতের হামলার পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যে অধিবেশন হয় সে অধিবেশনে ১০৪টি রাষ্ট্র পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সংহতির পক্ষ্যে ভোট দেয়। মাত্র ১০টি রাষ্ট্র বিরোধীতা করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পর মাত্র ৩টি রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং সে রাষ্ট্রগুলো হলো ভারত, ভূটান, সোভিয়েত রাশিয়া। কোন মুসলিম রাষ্ট্রই পাকিস্তানের বিভক্তির পক্ষে ভোট দেয়নি। শেখ মুজিব দেশভাঙ্গার রাজনীতিতে পা বাড়িয়েছেন বহু পূর্ব থেকেই। কিন্তু সেটি প্রকাশ্যে বলার সাহস তার ছিল না। দেশের সাধারণ মানুষের ইসলামী চেতনাকে তিনি ভয় করতেন। সে চেতনার প্রবল রূপটি তিনি স্বচোখে দেখেছিলেন চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলন চলা কালে। ফলে পাকিস্তান ভাঙ্গার গোপন অভিলাষটি ভারতীয় কর্তাদের বললেও সেটিকে নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত করার সাহস পাননি। প্রথম বার প্রকাশ্যে যখন বলেন তখন বাংলাদেশ লক্ষাধিক ভারতীয় সৈন্য দ্বারা অধিকৃত। সেটি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারিতে পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্দানের জনসভায়। সেদিনই তিনি প্রথম বারের মত মনের গোপন কথাটি প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, “স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের শুরু একাত্তর থেকে নয়, ১৯৪৭ সাল থেকে।” (লেখক নিজে শুনেছেন সে কথা)।

 

সুযোগটি আসে একাত্তরে

বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র হওয়ার কারণে পাকিস্তান জন্ম থেকেই শত্রুর টার্গেটে পরিণত হয়। শুধু ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার নয়, ইসরাইল এবং  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও। শত্রুরা শুরুতেই চেয়েছিল পাকিস্তানে ভূগোল ছোট করতে। কাশ্মীরকে এজন্যই পাকিস্তানকে দেয়া হয়নি। বৃহৎ ভূগোল হলো রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নবীজী (সাঃ) তাই সাহাবাদের ভূগোল বৃদ্ধির নসিহত দিয়ে যান। নসিহত করে যান রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানি কনসটান্টিনোপল দখলের। মুসলিমগণ তাই এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দিকে জিহাদে বের হন;এবং অতি দ্রুত বিশ্বশক্তিতে পরিণত হন। হাতির শক্তির উৎস বিপুল দেহ; ধারালো দাঁত বা লম্বা নখড় না থাকাতেও তার চলে। দেহের ভারেই বহু বাঘ-ভালুককে সে পদপিষ্ট করে। উসমানিয়া খেলাফতের হাতে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ছিল না। কিন্তু ছিল বিশাল সাম্রাজ্য। ফলে ব্রিটিশ, ফরাশী বা স্পেনীশদের ন্যায় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীদের উপনিবেশ খুঁজতে উসমানিয়া খেলাফতের অতি কাছের ভূমি ছেড়ে বহু হাজার মাইল দূরে বাংলার মত দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন দেশ খুঁজতে হয়েছে। শত্রুদেশগুলি এজন্যই মুসলিম দেশের ভূগোল ভাঙ্গতে চায়। শত্রুগণ অখণ্ড আরব  ভূখণ্ডকে তাই ২২ টুকরোয় বিভক্ত করেছে। প্রায় তিরিশ টুকরোয় বিভক্ত করেছে উসমানিয়া খেফাফতকে। ইসলামের শত্রুগণ চায়,মুসলিম বিশ্বের বিভক্ত মানচিত্রকে স্থায়ী করতে; এবং রুখতে চায় ঐক্যের যে কোন উদ্যোগকে। অপর দিকে মহান আল্লাহতায়ালার কড়া নির্দেশ,বিভক্তি থেকে বাঁচায়।তিনি এ হুশিয়ারিও শুনিয়েছেন, বিভক্তের পথে পা বাড়ালে সেটি হবে কঠিন আযাবের পথ। -(সুরা আল ইমরান,আয়াত ১০৫)।অতএব মুসলিম দেশ ভাঙ্গার পথটি আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার পথ নয়। বিভক্তির সে পথ খুশি করে ইসলামের শত্রুদের। মুজিব একাত্তরে শত্রুর খুশি করার সে পথটিই বেছে নেন। আর মুজিবের সে নাশকতায় এগিয়ো আসে ভারতও সোভিয়েত রাশিয়ার ন্যায় ইসলামের চিহ্নিত শত্রুপক্ষ ।

মুসলিম উম্মাহ আজ যে কারণে শক্তিহীন তা সম্পদের কমতিতে নয়;বরং খণ্ডিত ভূগোল। রাশিয়া ও ভারতের শক্তির মূলে হলো দেশ দুটির বিশাল ভূগোল। শক্তি বাড়াতেই ভারত কাশ্মীর এবং মুসলিম শাসিত গোয়া, মানভাদর ও হায়দারাবাদ দখলে নেয়। দখলে নিয়েছে সিকিম। এবং চেষ্টা চালিয়ে আসছে পূর্ব পাকিস্তান দখলেরও। নিজ দেশে সৈন্য পালনের চেয়ে প্রতিবেশী দেশে দালাল তথা ট্রোজান হর্স প্রতিপালনে খরচ কম;এবং তাতে লাভও অধীক। একাজে প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরে ভারতের বিনিয়োগটি তাই বিশাল। সে বিনিয়োগের ফলে পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একাত্তরে হাজার হাজার ট্রোজান হর্সে পরিণত হয়। পাকিস্তান ভাঙ্গার যুদ্ধে এরাই ভারতের পক্ষ নেয়।

তবে সামরিক অধিকৃতির পাশা পাশি অতি গুরত্বপূর্ণ হলো সাংস্কৃতিক অধিকৃতি। সে জন্যই সামরিক পরিকল্পনার পাশাপাশি ভারত শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দুর্বল ও নতজানু বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য নিজ অর্থ, নিজ অস্ত্র ও নিজ সেনাবাহিনী দিয়ে যুদ্ধ লড়তে ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই প্রস্তুত ছিল।একাত্তরের যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী বা মুজিব বাহিনীর ন্যায় কিছু বাহিনীর প্রয়োজন ছিল স্রেফ সাইড শো রূপে। সেটি আন্তর্জাতিক মহলে যুদ্ধকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য। প্রয়োজন ছিল বাংলা  মাটিতে হাজার হাজার মুজিব-তাজউদ্দীনের। ভারতের পরিচালিত যুদ্ধকে স্বাধীনতার যুদ্ধ বলবে এবং ভারতীয় অধিকৃতিকে স্বাধীনতা বলবে -এমন ভারতসেবী নেতৃত্ব পঞ্চাশের বা ষাটের দশকে বঙ্গীয় ভূমিতে ছিল না। দিল্লির শাসকচক্র সে সময় মুজিব-তাজউদ্দীনের ন্যায় রাজনীতিবিদ পায়নি। ভারতকে তাই নিজস্ব রোড ম্যাপ নিয়ে ২৩ বছর অপেক্ষ করতে হয়েছে। অবশেষে ১৯৭০’য়ে মুজিবের নির্বাচনী বিজয় সেটি সহজ করে দেয়। সহজ করে দেয় একাত্তরের যুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী অধিকৃতি। আগ্রাসী ভারতকে বাদ দিয়ে তাই মুজিবের রাজনীতি নিয়ে ভাবা যায় না, তেমনি ভাবা যায় না একাত্তরের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশ সৃষ্টির বিষয়টিও।

গ্রন্থপঞ্জি

Sisson, Richard and Leo Rose (1990): War and Secession: Pakistan, India and the Creation of Bangladesh, University of California; Berkeley.

 

 

 




অধ্যায় উনিশ: রক্তপাতের পথে দেশ

শুরু পঁচিশে মার্চের পূর্বে

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্ব গোপন সেল গঠন করা হয়েছিল যাটের দশকের মাঝামাঝিতে। জেলা শহরগুলিতেও গোপন সেল গড়ে তোলা হচ্ছিল। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা “র”য়ের শত শত গুপ্তচর ও ফিল্ড অপারেশনের দায়িত্ব প্রাপ্তরা তখন সারা পূর্ব পাকিস্তানে। তারা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তেসরা মার্চের অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক মুলতবি করায় তাদের জন্য সে সুযোগটি এসে যায়। ৭ই মার্চের ব্ক্তৃতায় শেখ মুজিব হাতের কাছে যা আছে তা দিয়ে লড়াইয়ে নামার হুকুম দেন। নির্দেশ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যদের ভাতে ও পানিতে মারার। ঘোষণা দেন, “এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এটি ছিল গোপন সেলের ক্যাডারদের জন্য মাঠে নামার তাগিদ। শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোনের পর্ব। শুরু হয় পাকিস্তান আর্মি এবং বিহারীদের উপর হামলা। বিশেষ বিশেষ অপারেশনের পরিকল্পনা নিয়ে অনুপ্রবেশ করে ভারতীয় গুপ্ত ঘাতকেরা। এভাবে রক্তপাতের শুরুটি মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই। পরিকল্পনা মাফিক ছাত্রলীগের ক্যাডারগণ ঢাকা শহরে একটি যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে। অখণ্ড পাকিস্তান বাঁচিয়ে রাখার জন্য ইয়াহিয়া সরকারের সাথে কোনরূপ বৈঠক হোক ও রাজনৈতিক সমাধান হোক –এরা ছিল তার ঘোরতর বিরোধী।

মার্চের শুরুতে ঢাকায় কয়েকজন সামরিক অফিসার সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়। সেনাবাহিনীর সদস্যদের ভাতে ও পানিতে মারার নির্দেশ পালনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডারগণ সেনানীবাসে খাদ্য সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত সেনা সদ্স্যগণ তখন বাজার করতো পাশ্ববর্তী কচুক্ষেত বাজার থেকে। সে বাজারটিও অচল করা হয়।–(এ.কে.খন্দকার,২০১৪)।বহু অবাঙালীর দোকানপাঠ লুঠ হয়।দেশজুড়ে নিদারুন অরাজকতা।কিন্তু সেনাবাহিনীর উপর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নির্দেশ, অবস্থা যতই প্রতিকূল হোক সামরিক ব্যবস্থা যেন না নেয়া হয়। পাকিস্তান সরকার তখন একটি সফল আলাপ-আলোচনার লক্ষ্যে সত্যই সচেষ্ট ছিল।-(Sarmila Bose, 2011)। মুজিব প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন,তিনি পাকিস্তান ভাঙ্গবেন না। লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কে স্বাক্ষর করে সেটির ঘোষণাও দিয়েছিলেন।মুজিব আরো বলেছিলেন,৬ দফা বাইবেল নয়।প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাই মুজিবের উপর বিশ্বাস রেখে শেষ অবধি বৈঠক চালিয়ে যান। ইয়াহিয়া খানের সরকার চাচ্ছিল সংসদে বৈঠক বসার আগে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে নেতাদের মাঝে কিছু মৌলিক বিষয়ে ঐক্যমত্য হোক। ১৯৭০এর নির্বাচনের পর নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের মূল দায়িত্ব ছিল একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন। সে কাজটির দায়বদ্ধতা মুজিবের একার ছিল না, ছিল সকল নির্বাচিত সদস্যের। কিন্তু শেখ মুজিবের তা নিয়ে মাথাব্যাথা ছিল না। আগ্রহ ছিল না শাসনতন্ত্র প্রণয়ন নিয়ে ভুট্টো, ইয়াহিয়া খান বা পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য নেতাদের সাথে আলোচনায়। অথচ আলোচনা ছাড়া শাসতান্ত্রিক সমাধান অসম্ভব ছিল। দেশটির অস্তিত্বই যখন কাম্য নয়,তখন আবার কিসের শাসনতন্ত্র? শেখ মুজিবের কাছে বিষয়টি ছিল এরূপ। অবশেষে ইয়াহিয়ার পীড়াপীড়িতে যখন বৈঠক বসলো, মুজিব তার অবস্থানে অনড়  থাকলেন। কোন রূপ ছাড় না দিয়ে মুজিব তার গোলপোষ্টই পাল্টে ফেলেন। ৬ দফা আঁস্তাকুড়ে ১ দফা তথা স্বাধীনতার পথ ধরলেন। অথচ বিফল আলোচনার দায়ভার চাপাচ্ছিলেন সরকারের উপর। তখন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ক্যাডারগণ দেশজুড়ে সংগঠিত হচ্ছিল এবং সে সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতিও নিচ্ছিল। অবশেষে ইয়াহিয়া খানেরও স্বপ্নভগ্ন হয়। যাদের হাতে তখন আওয়ামী লীগের রাজনীতি জিম্মি -সে উগ্র ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে অখণ্ড পাকিস্তান বহু আগেই মৃত্যু বরণ করেছিল। তাদের ভাবনায় তখন একটি মাত্র এজেন্ডা এবং সেটি দ্রুত পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের সৃ্ষ্টি। ঢাকার রাজপথে তখন বিপুল সংখ্যক ভারতীয় গুপ্তচর;খোদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ তখন তাদের হাতে জিম্মি।

ঢাকায় বসবাসকারি পশ্চিম পাকিস্তানী ও ভারত থেকে আগত বিহারীদের বিরুদ্ধে তখন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের প্রচণ্ড আক্রোশ। তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে প্রকাশ্যে রাস্তায় বেরুনো।তবে অবাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে চরম ঘৃণা সৃষ্টির কাজটির শুরু বহু আগে থেকেই। নিজেদের মাঝে আলোচনায় তারা তাদেরকে “ছাতুখোর” বলে অবজ্ঞা করত। অথচ তা ছিল ইসলামের আদবের পরিপন্থী। অবজ্ঞাভরে কাউকে তার নিজস্ব নামটি অন্য নামে বা খেতাবে ভাবে ডাকা ইসলামে হারাম। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সেটি কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ করেছেন।-(সুরা হুজরাত, আয়াত ১১)। ইসলামী চেতনাবর্জিত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ ক্যাডারদেগর মাঝে সে আদবের কোন ধারণাই ছিল না। ১৯৭০’য়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিজয়ের পর অবাঙালীদের বিরুদ্ধে সে অবজ্ঞা ও আক্রোশ তখন সহিংসতায় রূপ নেয়। ফলে অবাঙালী ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিগণ নিরাপত্তাহীনতায় ভূগতে থাকে। ফলে দলে দলে তারা পূর্ব পাকিস্তান ছাড়তে থাকে। তাদের সাথে প্রদেশ ছাড়তে থাকতে অবাঙালী ব্যবসায়ীদের পূঁজি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন-ভারতসহ বিশ্বের তাবত দেশগুলি যখন বিদেশী পূঁজির জন্য কাতর, শেখ মুজিব ও তার অনুসারিদের পলিসি হয় বাংলাদেশ থেকে অবাঙালীদের পুঁজি তাড়ানো। ভারতও সেটি মনেপ্রাণে চাইতো। কারণ, বাংলাদেশে শিল্পের বিনাশ ও দেশটির বাজারে নিজেদের পণ্যের একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য ভারতের জন্য সেটি জরুরী ছিল। ভারতের সে কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণে ভারতীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধজয়ের আগেই শেখ মুজিব ও তার দলীয় ক্যাডারগণ ভারতীয়দের চেয়ে অধীক ভারতীয় রূপে আবির্ভুত হয়। পুরা পরিস্থিতি তখন ভারতের পূর্ণ অনুকূলে। ক্যাম্পাস ছাড়তে থাকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যয়নরত অবাঙালী ছাত্র-ছাত্রীরা। শুধু পশ্চিম পাকিস্তানী ও বিহারী ছাত্র-ছাত্রীরাই নয়, যারা ফিলিস্তিন, মিশর, সিরিয়া, ইরান প্রভৃতি মুসলিম দেশ থেকে এসেছিল তারাও দ্রুত পূর্ব পাকিস্তান ছাড়ে।

 

রক্তপাতের প্রথম পর্ব

একাত্তরের রক্তপাত হয়েছিল তিনটি পর্বে। প্রথম পর্বটির শুরু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পক্ষ থেকে জাতীয় পরিবষদের তেসরা মার্চের ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য বৈঠক মুলতবি করার পর। সেটি ঘটে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এর মস্কোপন্থী ও চীন পন্থী গ্রুপ এবং ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী বাহিনীর হাতে। ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শেষের সাথে সাথে ঢাকা শহরের অবাঙালীদের বড় বড় বহু দোকান লুট হয়ে যায়। হামলা শুধু অবাঙালীদের উপর হয়নি, কোন কোন জায়গায় হামলা হয়েছে মুসলিম লীগ, জামায়াতের ইসলামী’র ন্যায় পাকিস্থানপন্থী ও ইসলামপন্থী নেতাকর্মীদের উপরও ছিল। মুজিবের সাথে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকা থেকে ফিরে যান। ২৫শে মার্চ রাস্তায় নামে সামরিক বাহিনী। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকা বা ক্যান্টনমেন্ট আছে এমন শহর গুলোর উপর দখল জমালেও অধিকাংশ মফস্বলের জেলা ও মহকুমা শহরগুলো তখন আওয়ামী লীগ বাহিনীর দখলে চলে যায়। ঢাকাতে সামরিক অ্যাকশনে বহু বাঙালী নিহত হয়। কিন্তু মফস্বল শহরগুলোতে সামরিক বাহিনী পৌঁছতে পারিনি। ফলে ভয়ানক বিভীষিকা নেমে আসে সেখানে অবস্থানরত অবাঙালীদের উপর। মফস্বল শহরগুলোতে সে সময় যে সব পাকসেনা ছিল তারাও প্রায় সবাই মারা পড়ে। লেখকের নিজ জেলা কুষ্টিয়ায় স্বল্প সংখ্যক সেনা সদস্য ছিল; তারা ঘেরাও হয় ইপিআর ও পুলিশের সশস্ত্র সেপাইদের দ্বারা। তাদের প্রায় সবাইকে হত্যা করা হয়। রাতে দুয়েক জন পালিয়ে যশোর সেনানিবাসে যাবার চেষ্টা করে; পথে তারাও নিহত হয়। হত্যা করা হয় মফস্বল শহরে কর্মরত বহু পশ্চিম পাকিস্তানী সিভিল সার্ভিস অফিসারকে। অনেক জেলাতেই তখন ডিসি, এডিসি এবং মহাকুমা শহরের এসডিও ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানী। সে সাথে চলছিল বিহারিদের মারার উৎসব। সে সময় কুষ্টিয়া জেলার এডিসি ছিলেন একজন পশ্চিম পাকিস্তানী। তার পেট ফেঁড়ে নাড়িভূরি বের করা হয়। তার লাশ পড়ে থাকে থানার সামনে। হত্যার আগে সে অবাঙালী অফিসারকে গাড়ীর সাথে বেঁধে রাস্তায় টানা হয়। কু্ষ্টিয়া শহরের বহু বিহারিকে হত্যা করে পাশের গড়াই নদীতে ফেলা হয়। পাকশি ও ভেড়ামারার শত শত বিহারীকে হত্যা করে তাদের লাশগুলোকে হার্ডিন্জ ব্রিজের নীচে পদ্মা নদীতে ফেলে পচতে দেয়া হয়। এসব লাশ কুকুর, শৃগাল ও শকুনের খাদ্যে পরিণত হয়। বাংলার মাটিতে সে সময় অতিশয় নৃশংস বর্বর কাণ্ডগুলি ঘটে; এবং সেটি বাঙালী মুসলিমদের হাতে। নিহত অবাঙালীগণও মুসলিম ছিল। নিহত মুসলিমদের জানাজা করা এবং তাদের কবর দেয়া জীবিতদের উপর ফরজ। সে ফরজ পালিত না হলে সবাই গুনাহগার হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্যাডারগণ সে ফরজ পালন করেনি এবং কাউকে পালন করতেও দেয়নি।

 

রক্তপাতের দ্বিতীয় পর্ব

এপ্রিলের শুরুতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বৃহত্তর দলগুলো সেনানীবাস থেকে মফস্বল শহরগুলিতে পৌঁছা শুরু করে এবং শহরগুলিকে আবার দখলে নেয়া শুরু করে। কিন্তু আসার পথে স্থানে স্থানে অবাঙালীদের শত শত পচা লাশের দৃশ্য তাদের নজরে পড়ে। এর ফলে ভয়ানক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় সেনা সদস্যদের মনে। তাদের অনেকে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে পড়ে। সেটি প্রকাশ পায়, সামনে যে শহরই পেয়েছে সে শহরের উপরইতারা এলোপাথারি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। কুষ্টিয়া শহরে প্রধান সড়কের পাশ দিয়ে বহু ঘরবাড়ী ও দোকন-পাট জ্বালানো হয়। কে পাকিস্তানপন্থী আর কে পাকিস্তান বিরোধী সেটি পাক-বাহিনী দেখেনি। অনেক পাকিস্তানপন্থীর ঘরবাড়ী যেমন পোড়ানো হয়, তেমনি হত্যা করা হয় অনেক পাকিস্তানপন্থীকেও। যেমন কুষ্টিয়ায় শহরে পুড়িয়ে দেয়া হয় জেলার প্রখ্যাত আইনবিদ জনাব সা’দ আহমদের দ্বি-তলবাড়ী ও গাড়ী। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় থেকেই তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। একসময় তিনি আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। শেখ মুজিব ৬ দফা পেশ করলে তিনি আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। ঢাকা শহরের দলীয় অফিস থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয় পাকিস্তানপন্থী ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের ঢাকা শহর শাখা ও ফরিদপুর জেলাশাখার সভাপতিকে। সারা দেশে এরূপ বহু ঘটনা ঘটেছে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী একে একে সবগুলি জেলার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। সেনাবাহিনীর এ সফলতার পর লুট-পাট ও হত্যাকাণ্ডে নামে প্রতিশোধ পরায়ন এবং শোকাহত বিহারীরা। বিহারীদের অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য ও আপনজন হারিয়েছিল বাঙালীদের হাতে। তাদের অনেককে অতি নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বহু বিহারী মহিলা ধর্ষণের শিকারও হয়েছিল। এতে বহু বিহারীই অতিশয় প্রতিশোধ পরায়ণ হয়। তাদের হাতে বহু নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু ঘটে। এ গ্রন্থের লেখকের সহোদর ভাই এবং এক ভাগ্নে নৃশংস হত্যার শিকার হয়েছে এমন হত্যাপাগল বিহারীদের হাতে। বিহারীগণও বাঙালীদের ন্যায় নিহতদের লাশ নদীতে বা ডোবায় ফেলে গায়েব করেছে। লেখকের পরিবারও তার ভাই ও ভাগ্নের লাশ পায়নি। সেনা বাহিনীর হাতে দ্রুত সকল জেলা, মহাকুমা ও থানা শহর পুনরায় দখলে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীগণ বুঝতে পারে, পাক-আর্মীর মোকাবেলা করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। তাছাড়া যারা হাজার বিহারী হ্ত্যা ও তাদের দোকানপাটে লুটতরাজের ন্যায় ভয়ানক অপরাধের সাথে যুক্ত ছিল তারা বুঝতে পারে, দেশে অবস্থান করলে তাদের শাস্তির মুখে পড়তে হবে। তখন শুরু হয় তাদের ভারতে আশ্রয় নেয়ার পালা। ভারত অভিমুখে শুরু হয় হিন্দু উদ্বাস্তুদের মিছিল। সে সাথে ভারতের মাটিতে শুরু হয় মুক্তি বাহিনীর ট্রেনিং। অপর দিকে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় যোগ দেয় হাজার হাজার রাজাকার। আস্তে আস্তে সমগ্র দেশ প্রবেশ করে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধাবস্থায়। তখন অসংখ্য মানুষ হতাহত হতে থাকে উভয়পক্ষেই।

মুক্তিবাহিনীর হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিজ-কালভার্ট, রেল লাইন, বিদ্যুৎ লাইন, লঞ্চঘাট, জাহাজ ঘাট, সরকারি ভবন এবং সে সাথে সেগুলির পাহারার কাজে লিপ্ত রাজাকারগণ। হামলা হতে থাকে অখণ্ড পাকিস্তানের সমর্থক শান্তি কমিটির নিরস্ত্র সদস্যগণ। মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম ও নিজামে ইসলামীর ন্যায় পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর বহু নেতাকর্মী। বহু অরাজনৈতিক আলেম ও সমাজকর্মী সে সময় মুক্তিবাহিনীর হামলায় নিহত হন। মোনায়েম খানের ন্যায় রাজনীতি থেকে অবসর নেয়া মুসলিম লীগের বহু বৃদ্ধ ব্যক্তিও মুক্তি বাহিনীর হামলা থেকে প্রাণে বাঁচেননি। আন্তর্জাতিক আইনে এগুলি ছিল যুদ্ধাপরাধ। অথচ আওয়ামী ক্যাডারদের কাছে এগুলো গণ্য হয় বীরত্বগাঁথা রূপে। অনেককে প্রাণ হারাতে হয় স্রেফ গ্রাম্য দলাদলির কারণে। তারা হত্যা করে এমন বহুব্যক্তিকে যারা সক্রিয় ভাবে কোন রাজনীতির সাথেই জড়িত ছিলেন না। উদাহরণ স্বরূপ প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা মোস্তাফা আল মাদানীর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। মাওলানা মোস্তাফা আল মাদানী সুদূর মদিনা থেকে বাংলায় এসেছিলেন নিছক আল্লাহর দ্বীনের তা’লীম দিতে। তার কর্মক্ষেত্র ছিল মূলত ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ,মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও তার আশেপাশের এলাকাতে। কিন্তু মুক্তি বাহিনী তাঁকেও ছাড়েনি। ইসলামের চেতনাবাহী এরূপ বহু অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে যুদ্ধকালীন সময়ে প্রাণ দিতে হয়। তাদের হত্যা করা হয় ঠান্ডা মাথায় এবং পরিকল্পিত ভাবে। সম্ভবতঃ এ হামলার লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামী চেতনা ও ইসলামের পক্ষের শক্তিকে নির্মূল করা। যে ইসলাম বিরোধী আক্রোশ নিয়ে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দাঙ্গার নামে আগুনে ফেলে মুসলিম নিধন ও বাবরী মসসিজদের ন্যায় মসজিদ ধ্বংসও উৎসবযোগ্য গণ্য হয়, একাত্তরে সে অভিন্ন ধারাটি প্রচণ্ড আকার ধারণ করে বাংলাদেশেও।

 

রক্তপাতের তৃতীয় পর্ব

রক্তপাতের তৃতীয় পর্ব এবং সবচেয়ে রক্তাত্ব পর্বটি শুরু হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজয়ের পর। তখন বিহারি, রাজাকার, শান্তি কমিটির সদস্য, পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপর নেমে আসে ভয়ানক হত্যাকাণ্ড। একাত্তরে কোন পক্ষে কতজন এবং কাদের হাতে কত জন মারা গেল -সে হিসাবটি জেনেবু্ঝেই তাই নেয়া হয়নি। সে হিসাবটি নেয়া হলে জানা যেত, বেশী হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল কাদের হাতে। সম্ভবতঃ বেশীর ভাগ হত্যাকাণ্ড হয়েছিল মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হাতে। আর সে সত্যটি লুকাতেই হত্যাকান্ডের কোন রেকর্ডই রাখা হয়নি। বাস্তব চিত্রের কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। লেখকের নিজ গ্রামে একাত্তরে ৪ জন নিহত হয়। এর মধ্যে দুই জন নিহত হয় বিহারীদের হাতে। এদের দুইজনই ছিল স্কুল ছাত্র। অপর দুই জন নিহত হয় মুক্তিবাহিনীর হাতে। তারা দুইজনই ছিল ভারতের পশ্চিম বাংলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা মোহাজির। তাদের একজন ছিলেন খাদ্যবিভাগের থানা পর্যায়ের কর্মকর্তা। আরেকজন পিতার কৃষিকাজ দেখাশোনা করতেন। তাদের কেউই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। পাশের গ্রামে নিহত হয় একজন, সে ছিল রাজাকার। সে মারা যায় মুক্তি বাহিনীর হাতে। তৃতীয় আরেকটি গ্রামে মারা যায় অতিশয় গরীব পরিবারের দুইজন সদস্য। তারা দুই জনই ছিল রাজাকার। তারা ছিল সহোদর দুই ভাই, বড় ভাইটি ছিল অত্যন্ত মেধাবী সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অনার্স পড়তো। তাদেরকে হত্যা করে মুক্তিবাহিনী। তাদের পিতামাতাও সন্তানদের লাশ আর খুজেঁ পায়নি, হত্যার পর মুক্তিবাহিনী তাদের লাশ কুষ্টিয়া শহরের সন্নিকটে গড়াই নদীতে ফেলে দেয়।

১৬ই ডিসেম্বরের পর হাজার হাজার রাজাকার এবং শান্তিকমিটির সদস্যদের শুধু হত্যাই করা হয়নি, লুটপাট করা হয় তাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য। বহু ঘটনা এমনও ঘটেছে, বাড়ীতে রাজাকারকে না পেয়ে তার নিরীহ পিতা ও ভাইদের হত্যা করা হয়েছে। মহাম্মদপুর, মীরপুর, রংপুরের সৈয়দপুরসহ সারাদেশে বিহারীদের হাজার হাজার ঘরবাড়ি তখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের দখলে চলে যায়। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাকর্মীদের দখলে যায় ধানমন্ডি, গুলশান, কান্টনমেন্ট ও বনানীতে অবস্থিত অবাঙালীদের বড় বড় বাড়ীগুলি। পরাজিত হওয়ার ফলে স্বভাবতই সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয় পাকিস্তানপন্থীগণ। দুর্যোগ কালে আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের ভারতে পালানোর পথ খোলা থাকলেও, পাকিস্তানপন্থীদের তেমন কোন আশ্রয়স্থলই ছিল না। তাদের জন্য সমগ্র দেশ পরিণত হয় জেলখানায়। পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ায় তাদের কোরবানি দিতে হয় নিজেদের জানমাল, সহায়-সম্পদ, চাকুরি-বাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য হারিয়ে।

এমনকি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাকিস্তানপন্থী শিক্ষকগণও হামলা থেকে রেহায় পায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ হোসেন এবং অধ্যাপক ড. হাসান জামানের মত প্রখ্যাত ব্যক্তিগণও নৃশংস নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। হাত পা ভেঙ্গে তাদের রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছিল। এতোটাই প্রহার করেছিল যে, তারা যে মারা যাবে -সেটি নিশ্চিত হয়েই তাদেরকে ফেলে রাখা হয়েছিল। হাজার হাজার নিরস্ত্র অবাঙালীকে তারা ঘর থেকে টেনে এনে হত্যা করে। মানুষ যত অপরাধীই হোক, তার উপরে আদালতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও তার লাশটি আপনজনদের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটি জীবিতদের উপর থেকে যায়। অথচ সে দায়িত্ব সেদিন পালিত হয়নি। যাদেরকে তখন এভাবে হত্যা করা হয়েছে তারা ছিল নিরস্ত্র। কথা হলো, নিরস্ত্র মানুষের সাথে এমন আচরণ কতটা মানবিক? এটি তো যুদ্ধাপরাধ। অথচ আওয়ামী সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা রচিত ইতিহাসে এমন যুদ্ধাপরাধের সামান্যতম উল্লেখও নেই। সে যুদ্ধাপরাধের শিকার হয়ে কয়েক লক্ষ অবাঙালী আজও নর্দমার পাশে ঝুপড়িতে বসবাস করছে। তাদের সে করুণ অবস্থা দেখে যে কোন সুস্থ্ বিবেকে ঝাঁকুনি লাগার কথা। ভারতের হিন্দুদের তাড়া খেয়ে নিঃস্ব হাতে যখন তারা পাকিস্তানে এসেছিল তখনও তাদের অবস্থা এতোটা খারাপ ছিল না। বিহারীদের করুণ অবস্থা দেখে বিদেশীরা বই লেখে, ফিল্ম বানায়, সাহায্যও পাঠায়। কিন্তু বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় সে করুণ চিত্র স্থান পায়না। বাঙালীরা তাদের জবরদখল করা ঘর-বাড়ীগুলো ছাড়তেও রাজী নয়। অথচ নবীজী (সাঃ)র হাদীস, যে ব্যক্তি থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে ঈমানদার নয়। হাদীসটির মূল কথা,প্রতিবেশীর জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার মাঝেই মু’মিন ব্যক্তির ঈমানদারী। কিন্তু বিহারী প্রতিবেশীগণ কি বাঙালী মুসলিমদের থেকে সে নিরাপত্তা পেয়েছে?

বাংলাদেশে মিডিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দান মূলত ইসলাম বিরোধীদের দখলে। তাদের সে  দখলদারি ১৯৪৭’য়ের পূর্বে আংশিক ভাবে হলেও সেটি বলবান হয় ১৯৪৭’য়ের পর। মুসলিম লীগের নেতাকর্মীরা যখন রাজনৈতিক বিবাদে লিপ্ত, ১৯৪৭-এর পরাজিত সেক্যুলার ও বামপন্থী শক্তি তখন বু্দ্ধিবৃত্তির ময়দানটি দখলে নেয়া নিয়ে ব্যস্ত। সে দখলদারির ফলে একাত্তরের পর তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিদ্বন্দিই থাকেনি। এরাই একাত্তরের ইতিহাস রচনার নামে তারা চালিয়েছে সীমাহীন মিথ্যাচার। মিথ্যাচারের সামর্থ বিশাল। মিথ্যাচারে শুধু ফিরাউনকে নয়, শাপ-শকুন,গরু-বাছুড় এমনকি মাটির মুর্তিকেও পুজনীয় করা যায়। এবং বিতাড়িত ও হত্যাযোগ্য করা যায় নবী-রাসূলদের। এমন মিথ্যাচারের ফলে বাংলাদেশে অতিশয় দুর্বৃত্ত ও স্বৈরাচারী নেতাগণও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে চিত্রিত হয়েছে। অপর দিকে ইসলামপন্থীদের চিত্রিত করা হয়েছে খুনি, চরিত্রহীন ও মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী রূপে। সে মিথ্যাচারটি এতোটাই সীমাহীন যে, নিজেদের নেতাদের বড় করতে গিয়ে তারা ভারতের অবদানকেও অস্বীকার করছে। বলছে,পাকিস্তান বাহিনীকে পরাজিত করেছে মুক্তিবাহিনী। অথচ সত্য হলো, পাকিস্তান বাহিনীকে পরাজিত করার পরই ভারতীয় বাহিনী কলকাতার হোটেলে আরাম-আয়াশে ব্যস্ত প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাদের হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় এনে ক্ষমতায় বসায়। কিন্তু সে ঐতিহাসিক সত্যকে তারা বাংলাদেশে ইতিহাসের পুস্তক থেকে বিলুপ্ত করেছে। নিজেরা ইতিহাসে হারিয়ে যাবে –এ ভয়ে ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবস পালন কালে তারা ভারতীয় বাহিনীর সে ভূমিকাকে মুখে আনেনা। মুসলিম উম্মাহর শক্তি খর্বকরণে এবং ভারতের চরণ তলে বাঙালী মুসলিমদের সঁপে দেয়ার কাজে শেখ মুজিব ও তার দল যা করেছে -উপমহাদেশের সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে তা বিরল। শুধু ভারতীয়দের কাছেই নয়, ইসলামবিরোধী সকল ব্যক্তি ও সকল শক্তির কাছে শেখ মুজিব ও তার অনুসারিগণ এজন্যই এতো প্রিয়।

 

গ্রন্থপঞ্জি

এ.কে.খন্দকার। ১৯৭১ ভেতরে বাইরে, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন, ২০১৪।

Bose, Sarmila; “Problems of Locating Sexual Violence in the 1971 War:The Problem of Numbers,” Economic and Political Weekly September 22, 2007