ভোটদানে বাঙালি মুসলিমের কবিরা-গুনাহ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

ভোট যখন অস্ত্র

কথা, কর্ম, লিখনী, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধবিগ্রহের মধ্য দিয়ে যেমন বড় বড় নেক কর্ম করা যায়, তেমনি সেগুলি পরিণত হতে পারে ভয়ানক কবিরা গুনাহর হাতিয়ার।  সকল নবী-রাসূলগণ তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মগুলি অর্থ, অস্ত্র ও দৈহিক বল দিয়ে করেননি; করেছেন জিহ্বা দিয়ে। সেটি সত্য দ্বীনের তাবলিগ এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে। এটিই হলো নবী-রাসূলদের সূন্নত।

একই ভাবে বিশাল নেক আমল ও ভয়ানক কবিরা গুনাহর হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে জনগণের ভোট। ভোট দিয়ে জনগণ বিজয়ী করতে পারে ভয়ানক খুনি, চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত, ফ্যাসিস্ট, দুর্বৃত্ত ও শয়তানের এজেন্টকে। অর্থাৎ অপরাধী শক্তির পক্ষে যুদ্ধে নেমে যেরূপ অপরাধ করতে পারতো, সেটি অনায়াসে করতে পারে ভোট দিয়ে। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশে ভোট নেক আমলের বদলে ভয়ানক অপরাধের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অতীতে যেসব অপরাধীগণ দেশে ক্ষমতার আসনে বসেছে তারা ফিরেশতাদের কাঁধে চড়ে ক্ষমতায় বসেনি, বসিয়েছে ভোটারগণ নির্বাচনে ভোট দিয়ে।

অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতির কারণে নয়। বরং জিহ্ববা দিয়ে, লেখনী দিয়ে বা ভোট দিয়ে মিথ্যা ধর্ম, মিথ্যা মতবাদ, অপরাধী রাজনীতিবিদদের পক্ষে সাক্ষ্যদান, ভোটদান, অর্থদান ও অস্ত্রহাতে যুদ্ধে নামার কারণে। ফিরাউনের যেসব অনুসারীগণ জাহান্নামে যাবে তাদের সবার অপরাধ এ নয় যে, তারা সবাই খুনি, ধর্ষক বা চোর-ডাকাত ছিল। বরং এজন্য যে তারা ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃ্ত্তের পক্ষ নিয়েছিল এবং তাকে ভগবানের আসনে বসিয়েছিল। এবং তারা হযরত মূসা (আ:)‌’য়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।  বাংলাদেশের বুকেও যারা মুজিবের ন্যায় গণতনন্ত্রের খুনি, বাকশালী ফ্যাসিস্ট, দুর্বৃ্ত্তদের লালনকর্তা, দুর্ভিক্ষের জনক, ইসলামের দুষমন এবং হিন্দুত্ববাদের সেবকদের পক্ষ নেয় ও তাকে পিতা, নেতা ও বন্ধুর আসনে বসায় -তারা কি পরকালে জান্নাত আশা করতে পারে? 

নির্বাচনে ভোটদান কোন মামূলী বিষয় নয়। এটি শুধু নাগরিক অধিকার নয়, এটি এক শক্তিশালী ধারালো অস্ত্র। এ অস্ত্র ব্যবহৃত হতে পারে রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের জিহদে। বস্তুত ভোটই হলো গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অবদান। ভোটের অধিকার দিয়ে গণতন্ত্র জনগণের হাতে শক্তিশালী হাতিয়ার তুলে দেয়। তবে সে হাতিয়ার হাতে পাওয়ার সাথে সাথে ব্যক্তির জীবনে চরম পরীক্ষাও শুরু হয়।‌ তখন পরীক্ষা হয় তাদের বিবেকের ও ঈমানের। ভোট কাকে দেয়া হলো বা বিজয়ী করা হলো -সেটি কোন মামূলী বিষয় নয়। সেটিরও হিসাব দিতে হবে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে।

পূর্বকালে কোন দুর্বৃত্ত জালেম শাসককে নির্মূল করতে হলে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে নামতে হতো। যুদ্ধে তাকে পরাজিত ও হত্যা করতে হতো।‌ এরূপ যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের প্রাণনাশ ঘটতো। বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হতো সম্পদেরও।  কিন্তু এখন সে যুদ্ধের প্রয়োজন নাই। গণতন্ত্রের বদৌলতে দুর্বৃত্ত, আযোগ্য ও জালেম শাসকদের অপসারণের সে কাজটি ভোট দিয়েই করা যায়।  রাষ্ট্রের নির্মাণে এবং রাষ্ট্র ভাঙ্গতেও এককালে বিশাল বিশাল যুদ্ধ করতে হতো। এখন সে কাজটি ভোট দিয়ে করা যায়।  সে ভোটের বলেই ১৯৪৭ সালে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। গণতন্ত্র এভাবেই মানব জাতির ইতিহাসে রক্ত ও অর্থের খরচ বিপুল ভাবে কমিয়েছে। এটিই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অবদান।

 

ভোটদান যখন কবিরা গুনাহ

অস্ত্রের ন্যায় ভোটের নাশকতার ক্ষমতাটিও বিশাল এবং ভয়ানক। অস্ত্র দিয়ে যেমন বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা এবং অপরাধীকে ক্ষমতায় বসানো যায়, তেমনি ভোটের মাধ্যমে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে পরাজিত এবং মুজিব-হাসিনার ন্যায় ফ্যাসিস্ট খুনিকে বিজয়ী করা যায়। ভোটের মাধ্যমেই হিটলারের ন্যায় ভয়ানক অপরাধী ক্ষমতায় এসেছিল। যে মার্কিন প্রসিডেন্ট হিরোশিমা ও নাগাসাকির ন্যায় দুটি শহরে আনবিক বোমা নিক্ষেপ করেছে সে ভয়ানক অপরাধীও জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল। এভাবেই ভোটদানের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয় অতি ভয়ানক অপরাধ।  ভোটদানের সে অপরাধ তখন জাহান্নামে নিয়ে হাজির করে।  ভোটদানের মধ্য দিয়ে এভাবেই পরীক্ষা হয় ব্যক্তির বিবেক, ঈমান ও আমলের। পরীক্ষা হয় তার প্রজ্ঞা ও বিবেকের।

মহান আল্লাহতায়ালা প্রতিটি মানুষকে বিস্ময়কর বিবেক, মেধা ও বোধশক্তি দিয়েছেন। সে সামর্থ্য দিয়ে মানব চাঁদে যেতে পারে। তা দিয়ে বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও করতে পারে। সম্পদে বিপুল প্রাচুর্যও আনতে পারে। তবে জান্নাতে যেতে হলে জরুরি হলো, সে সামর্থ্য দিয়ে ঈমানের পরীক্ষায় পাশ করতে হয়। মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই পাশ। ঈমানের পরীক্ষায় ফেল করে কেউ কি জান্নাতে যেতে পারে? চোরডাকাত, ভোটডাকাত, খুনি, ফ্যাসিস্ট ও ইসলামের শত্রুকে যারা ভোট দেয় -তারা যে সে পরীক্ষায় নিশ্চিত ফেল করেছে -তা নিয়ে কি সন্দেহ করা চলে?  

নির্বাচনে বিভিন্ন পক্ষ থাকে। প্রার্থীদের বহুবিধ এজেন্ডাও থাকে। ইসলামের পক্ষে তথা শরীয়ত প্রতিষ্ঠার পক্ষে যেমন প্রার্থী থাকে, তেমনি প্রার্থী থাকে ইসলামের বিপক্ষে এবং শরীয়ত প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে। নির্বাচনে কেউ যেমন মুসলিম রাষ্ট্রের সংহতির পক্ষে দাঁড়াতে পারে, ঠিক তেমনি দাঁড়াতে পারে মুসলিম রাষ্ট্রকে ভাঙ্গার পক্ষে। নির্বাচনে চোর-ডাকাত, ব্যাংক ডাকাত, খুনি, ধর্ষক, ধোকাবাজ অপরাধীরা যেমন প্রার্থী হতে পারে, তেমনি প্রার্থী হতে পারে একজন সুবোধ ঈমানদার ব্যক্তিও।‌ ভোটদানে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রার্থীর চরিত্র ও এজেন্ডাকে অবশ্যই বিচারে আনা। প্রার্থীর এজেন্ডা নিয়ে অজ্ঞ থাকা এবং দুর্বৃ্ত্তের পক্ষে ভোট দেয়া অতি গুরুতর অপরাধ। এটি ভয়ানক কবিরা গুনাহ। অথচ পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশে এ কবিরা গুনাহতে এমন কি তারাও লিপ্ত যারা নামাজ-রোজা এবং হজ্জ-যাকাত পালন করে। আলেমগণও এ কথা বলে না, দুর্বৃত্ত ও ইসলামের বিপক্ষ শক্তিকে ভোটদান কবিরা গুনাহ। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারাও নিরব। অথচ এরূপ নিরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা কি কম অপরাধ? এরূপ নিরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার মধ্য দিয়ে কি নিজেকে জান্নাতের যোগ্য করা যায়? জুটে কি মহান আল্লাহতায়ালা থেকে মাগফিরাত? আলেমদের ও নামাজীদের এ নিরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণেই বাংলাদেশে ইসলাম আজ পরাজিত। এবং শাসন চলছে ভয়ানক হয় অপরাধীদের।

 

বাঙালি মুসলিমের সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল

 পানাহারে হালাল-হারাম আছে। জাহান্নামে যাওয়ার জন্য চুরিডাকাতি, খুন ও ধর্ষণে নামার প্রয়োজন নাই। নিশ্চিত জাহান্নামে নেয় হারাম পানাহার। এখানে বিদ্রোহটি ঘটে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে। বস্তুত প্রতিটি বিদ্রোহের পথই হলো জাহান্নামের পথ। সেরূপ একটি বিদ্রোহ হতে পারে ভোটদানের ক্ষেত্রেও। কারণ, ভোটদানের ক্ষেত্রেও হারাম-হালাল আছে। এ বিষয়টি ইসলামে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে উম্মাহর বা রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারিত হয়।

প্রতি যুগে এবং প্রতি সমাজেই নমরুদ, ফিরাউন, আবু জেহল, আবু লাহাব ও ইয়াজিদ আছে। তাদের এজেন্ডা সত্য ও ন্যায়ের প্রতিরোধ এবং দুর্বৃত্তি ও মিথ্যার প্রতিষ্ঠা। তারা ইসলামের দুষমন। প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়ভার হলো এদেরকে চেনা এবং পরাজিত করা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তাদেরকে হারানোর সে কাজটি রণাঙ্গণে হয় না, হয় ভোটের মাধ্যমে। তাই হারাম হলো, যে কোন ধোকাবাজ, জালেম, ফ্যাসিস্ট, বেঈমান ও ইসলামের শত্রুকে ভোট দেয়া।

ঈমানদারের শ্রেষ্ঠ কর্ম হলো ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। সুবিচার ও সুশাসনের প্রতিষ্ঠা একমাত্র তখনই সম্ভব। জনগণের দায়িত্বটি এখানে বিশাল। তাদেরকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হয়। নইলে সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ ব্যর্থ হয়ে যায। আদালতে অপরাধীর পক্ষে সাক্ষী দিলে ন্যায়-বিচার ও সুশাসন মাঠে মারা পড়ে। তখন নিরপরাধ ব্যক্তিগণ শাস্তি পায় এবং অপরাধীগণ বিজয়ী হয়। দেশ তখন দুর্বৃত্তদের দিয়ে ভরে উঠে। তেমনটি ঘটে অপরাধীদের পক্ষে ভোট দিলেও।

নির্বাচনে বিশেষ কোন প্রার্থির পক্ষে ভোটদানও হলো এক প্রকারের সাক্ষ্যদান। ভোট দিয়ে ভোটার মাত্রই একজন প্রার্থীকে সৎ ও যোগ্য বলে সাক্ষ্য দেয়। এক্ষেত্রে দুর্বৃত্তের পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্যদানটি গুরুতর কবিরা গুনাহ। তাতে দুর্বৃত্তগণ বিজয়ী হয়। এবং পরাজিত হয় ইসলামের পক্ষের শক্তি। বাংলাদেশে আজ যেরূপ দুর্বৃত্তদের শাসন এবং গুম, খুন, ধর্ষণ, ও চুরিডাকাতির যে প্লাবন -তার কারণ তো এই অপরাধীদের নির্বাচনী বিজয়। বাংলাদেশে এ অপরাধীদের রাজনৈতিক দল রয়েছে। জনগণ তাদের সে দলকে অতীতের নির্বাচনে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে। অথচ গুরুতর কবিরা গুনাহ হলো এ হারাম কাজ।

কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় হলো, বাঙালি মুসলিমদের দ্বারা ভোটদানে ভয়ানক কবিরা গুনাহর কাজটি ঘটেছে অতীতের নির্বাচনগুলিতে। একমাত্র ব্যতিক্রম হলো, ১৯৪৬ সালের নির্বাচন। এই নির্বাচনে বাঙালী মুসলিমগণ বিপুল সংখ্যায় পাকিস্তানের ভোট পক্ষে ভোট দিয়েছিল। তাদের সে ভোটদানের কারণেই পৃথিবীর মানচিত্রে পাকিস্তান নামক বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। নির্মিত হয়েছিল জনসংখ্যা বিচারে চীন ও ভারতের পরই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। অথচ সে রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠায় কাউকে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়নি। নিঃসন্দেহে বলা যায়, সে নির্বাচনে বাঙালী মুসলিমগণ ঈমানের পরীক্ষায় বিজয়ী হয়েছিল।

অথচ সে সময়ও সেকুলারিস্ট, হিন্দুত্ববাদী, বামপন্থী এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী -এ পরিচয় নিয়ে বহু ব্যক্তি ভোটপ্রার্থী হয়েছিল। কিন্তু বাংলার মুসলিমগণ সে সময় তাদেরকে বর্জন করেছিল। ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে তারা মুসলিম উম্মাহর স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। তাতে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী পক্ষের পরাজয় হয়েছিল। এটিই হলো বাঙালি মুসলিমদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্ম। এবং সে নেক কর্ম কোন যুদ্ধে রক্তদান বা ভোটদানের মাধ্যমে ঘটেনি, ঘটেছিল ভোটদানের মধ্য দিয়ে। কিসে বাঙালি মুসলিম ও সে সাথে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ এবং কিসে মহা কল্যাণ -সে বিচারটি সেদনি তারা সঠিক ভাবে করতে পেরেছিল।

 

নেক আমলের পুরস্কার

বাঙালি মুসলিমের সে সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি বিশ্বের দরবারে তাদের মর্যাদাও বাড়িয়েছিল। বাঙালিগণ কোন কালেই নিজেদের দেশও তারা নিজেরা শাসন করেনি। ইসলামপূর্ব কালে শাসিত হয়েছে পাল ও সেনদের ন্যায় অবাঙালিদের দ্বারা। ইসলাম-পরবর্তী কালে শাসিত হয়েছে তুর্কী, আফগান, মোঘল ও ইংরেজদের দ্বারা। একমাত্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই তারা সুযোগ পেয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই মুসলিম রাষ্ট্রটির তিন বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। দেশটির স্পীকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রী, গৃহমন্ত্রী, বাণিজ্য মন্ত্রী, আইন মন্ত্রী ইত্যাদি পদেও তারা দায়িত্ব পেয়েছে।  কারণ দেশটিতে বাঙালি মুসলিমগণই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠি। ১৯৪৭’য়ের সে অখণ্ড পাকিস্তান আজ বেঁচে থাকলে সে সুযোগ তারা আরো পেত। এ ভাবে সুযোগ পেত বিশ্ব রাজনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার।

পাকিস্তানের সমস্যা ছিল সামরিক শাসন। এবং তা থেকে জন্ম নিয়েছিল দুই প্রদেশের মধ্যে বৈষম্য ও অবিচার। গৃহে সাপ ঢুকলে সাপকে তাড়াতে হয়। সাপের কারণে গৃহে আগুন দেয়াটি বেকুবি। পাকিস্তানে সে দুষ্ট সাপটি ছিল সামরিক শাসন। ১৯৭১’য়ে বাঙালি মুসলিমগণ ভারতের ন্যায় শত্রুদেশের এজেন্ডা পূরণ করতে গিয়ে সাপ না তাড়িয়ে গৃহই জ্বালিয়ে দিয়েছে। দেশের আয়তন কমলে ভূ-রাজনৈতিক ওজন এবং গুরুত্বও কমে। তাই ভূ-রাজনৈতিক ওজন ও গুরুত্ব কমেছে শুধু পাকিস্তানের নয়, বাংলাদেশীদেরও। মুসলিম দেশে ভূগোল ভাঙ্গা এজন্যই কবিরা গুনাহ। কারণ, তাতে দুর্বলতা ও পরাজয় বাড়ে মুসলিমদের। তাই মুসলিমগণ তাদের গৌরব কালে যুদ্ধ করেছে দেশের ভূগোল বাড়াতে, ভাঙ্গতে নয়। অথচ বাংলাদেশীরা একাত্তরে যুদ্ধ করেছে মুসলিম দেশের ভূগোল ভাঙ্গতে।    

 

প্রতিশ্রুত আযাব

কিন্তু ১৯৭০ সালের নির্বাচন বাঙালি মুসলিমগণ ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর পক্ষে অবস্থান নেয়নি। তারা ভেসে গেছে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের ন্যায় হারাম মতবাদের স্রোতে।  তারা সেদিন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের সংহতি ও প্রতিরক্ষার পক্ষে অবস্থান না নিয়ে একাত্ম হয়েছিল ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের এজেন্ডার সাথে। হিন্দুত্ববাদীদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয়টি তারা তুলে দিয়েছে। তাদের অপরাধ, তারা নেতা রূপে বেছে নিয়েছিল শেখ মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্রের হত্যাকারী, বাকশালী ফ্যাসিবাদের জনক, দুর্নীতির দায়ে আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত এবং ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের একনিষ্ঠ সেবক এক দুর্বৃত্তকে। সেদিন তারা তাকে নির্বা‌চনে বিপুল ভাবে বিজয় করেছিল। ভোটদানে যে হারাম-হালাল আছে -সে বিষয়টিকে বাঙালি মুসলিমগণ সেদিন আদৌ গুরুত্ব দেয়নি। বরং ইসলামের পথ ছেড়ে তারা সজ্ঞানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজমের হারাম পথটি বেছে নিয়েছে। এটি ছিল সাতচল্লিশের মুসলিম চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। বাঙালি মুসলিমের সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় অপরাধ কর্ম।

প্রতিটি পাপেরই প্রতিশ্রুত আযাব রয়েছে। পাপীকে সে আযাব দেয়াই তাঁর সূন্নত। পবিত্র কুর‌’আনে সে আযাবের হুশিয়ারীটি বার বার শোনানো হয়েছে। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে বিপুল ভোটে শেখ মুজিবের ন্যায় এক ভয়ানক ফ্যাসিস্ট দুর্বৃত্তকে নির্বাচিত করার পরিণতি হলো, বাংলাদেশে রচিত হলো গণতন্ত্রের কবর, প্রতিষ্ঠা পেল এক দলীয় বাকশালী ফ্যাসিবাদ, চেপে বসলো ভারতীয় আধিপত্যবাদ, লুন্ঠিত হলো দেশের সম্পদ, সংকুচিত হলো ইসলামী শিক্ষা, নাশকতা ঘটালো ভয়ানক দুর্ভিক্ষ এবং তাতে প্রাণ হারালো প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ। বাঙালি মুসলিমের জীবনের এ ভয়াবহ বিপদকে কি কখনো নিয়ামত বলা যায়? বস্তুত এসবই হলো কবিরা গুনাহর শাস্তি। বাংলাদেশের মানুষ আজও ভুগছে ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে তাদের কৃত কবিরা গুনাহর শাস্তি। তাদের মাথার উপর জেঁকে বসেছে শেখ হাসিনার ন্যায় এক ভোটডাকাত দূর্বৃত্তের নৃশংস শাসন।  ১৩/০৮/২০২৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *