সভ্য ভাবে বাঁচার খরচ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা

image_pdfimage_print

সেরা কৃতিত্ব কেবল সভ্য-সমাজ নির্মাণে

মানব জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি স্রেফ পানাহারে বাঁচা নয়, সেটি হলো সভ্য ভাবে বাঁচা।  তবে সভ্য ভাবে বাঁচার খরচটি বিশাল। তখন ঘর বাঁধার পাশাপাশি  সভ্য সমাজ এবং সভ্য রাষ্ট্রও নির্মাণ করতে হয়। তখন প্রতিষ্ঠা দিতে  হয় আইনের শাসন। তখন স্রেফ হিংস্র পশু বা মশামাছি তাড়ালে চলে না; চোর-ডাকাত ও দুর্বৃত্তদেরও তাড়াতে হয়। তাড়ানোর সে লড়াইয়ে প্রাণও দিতে হয়। মানব সমাজে এটি হলো সবচেয়ে ব্যায়বহুল এবং সবচেয়ে পবিত্রতম কাজ। ইসলামে এর চেয়ে বড় ইবাদত নেই। পরকালে এ কাজটি দেয় সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার। এ কাজে শহীদ হলে জুটে বিনা হিসাবে জান্নাত। সভ্য সমাজ নির্মাণের গুরুত্ব বুঝতেন বলেই এ মহান কাজে ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)য়ের সাহাবীদের শতকরা ৭০ ভাগ শহীদ হয়ে গেছেন। তাদের সে ত্যাগের বিনিময়েই মানব ইতিহাসের বুকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মিত হয়েছিল। তখন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল আইনের শাসন। এবং নির্মূল হয়েছিল দুর্বৃত্তরা। অথচ অসভ্য ভাবে বাঁচায় সে খরচ নাই।সভ্য ভাবে বাঁচার যোগ্যতা না থাকায় অনেকেই তাই অসভ্যতার পথ বেছে নেয়। তাই নিকোবার, পাপুয়া নিউ গিনি ও আমাজানের গভীর জঙ্গলে বহু মানব সন্তান বসবাস করছে কোনরূপ ঘর, সমাজ ও রাষ্ট্র না গড়েই।

অতি অপ্রিয় হলেও সত্য হলো, বাংলাদেশ সর্বার্থেই একটি অসভ্য দেশ। এ অসভ্যতার প্রমাণ তো অসংখ্য। এ রাষ্ট্রটি বর্তমান শতাব্দীটি শুরু করেছে বিশ্বের প্রায় ২০০টি রাষ্ট্রকে হারিয়ে দুর্বৃত্তিতে ৫ বার প্রথম হয়ে। এদেশে নির্বাচন হলে ভোট ডাকাতি হয়। বিচার হলে নিরপরাধীদের ফাঁসীতে  ঝুলতে হয়। এবং নবেল প্রাইজ পাওয়া ব্যক্তিকেও জেলে তোলার নির্দেশ দেয়া হয়। এবং শত শত খুনি পয়দা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গণে। ফ্যাসিবাদের নিরেট অসভ্যতা নিয়ে দেশ চালাচ্ছে দেশের অবৈধ ও ভোট-ডাকাত প্রধানমন্ত্রী। ফেস বুকে মতামত দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গণে লাশ হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্ষণে সেঞ্চুরীর উৎসব হয় –যেমনটি জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়েছিল। এদেশে লুট হয় শেয়ার মার্কেট, ব্যাংক এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের কোষাগার। হংকংয়ে ২০ লাখ মানুষ মিটিং করলেও কোন লাশ পড়ে না। মিটিং করতে সরকার থেকে অনুমতি নিতে হয় না। এটি স্বীকৃত জনগণের মৌলিক অধিকার রূপে। অথচ বাংলাদেশে রাজপথে মিছিল মিটিং নিষিদ্ধ। জনসভা করলে কামান দাগা হয় –যেমনটি শাপলা চত্ত্বরে হয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ভিন্ন মতের টিভি। সরকারেরর সমালোচনা করে পত্রিকায় লিখলে গুম হতে হয়।

এদেশের সাধারণ মানুষ দূরে থাক, আলেমগণ সস্তায় বিক্রি হয়ে যায়। টাকা পেলে দুর্বৃত্তদের জননীকেও এরা কওমী জননী বা নিজেদের জননী বলা শুরু করে। অথচ যারা প্রকৃত ঈমানদার তাদের রীতি হলো জান্নাতের চেয়ে কম মূল্যে কারো কাছে নিজেকে বিক্রয় না করা। এদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান একজন গণতন্ত্র হত্যাকারি বাকশালী, ৩০ হাজার মানব হত্যাকারি জল্লাদ এবং দেশ বিক্রয়কারি এক দুর্বৃত্তকেও সর্বকালে সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলে। এই হলো বিদ্যাবুদ্ধির মান! প্রশ্ন হলো, এ মাপের অসভ্য দেশ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আছে কি? ক্যান্সার রোগীকে দেহে যে কান্সার আছে -সে সত্যটি মেনে নিয়েই চিকিৎসায় নামতে হয়। তেমনি বাংলাদেশ যে চরম একটি অসভ্য দেশ –সে সত্যটি মেনে নিয়েই বাংলাদেশীদের দেশের সংস্কারে নামতে হবে। তাই দায়ভারটি বিশাল। খরচের অংকও বিশাল। একাজে দুয়েক জন নয়, শত শত শহীদ আবরার চাই।

 

ভোট-ডাকাত হাসিনাঃ জনগণের সবচেয়ে বড় শত্রু

সভ্য সমাজ বা রাষ্ট্র নির্মাণের পথে সবচেয়ে বড় বাধাটি নর্দমার কীট বা হিংস্র জন্তু জানোয়ার থেকে আসে না। সেটি আসে দুর্বৃত্ত শাসকদের পক্ষ থেকে। এরাই মানব জাতির সবচেয়ে ঘৃণ্যতম দুষমন। নিজেদের গদি বাঁচাতে তারা শুধু নাগরিক অধিকারই কেড়ে নেয় না, গণহত্যা ও গণধর্ষণেও নামে। নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অটুট রাখতে এমন কি দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পুলিশ প্রশাসন, আদালত এবং মিডিয়াতেও নিজেদের আজ্ঞাবহ দুর্বৃত্তদের মোতায়েন করে। নবীরাসূলদেরও তাই কোন হিংস্র পশুদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়নি। লড়তে হয়েছে মানবরূপী এসব হিংস্র হায়েনাদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে মানবরূপী এ পশুগণ যে কতটা হিংস্র ও নৃশংস সেটি ২০১৩ সালে শাপলা চত্ত্বরে দেখা গেছে। তারা হিফাজতে ইসলামের শত শত নিরীহ মুসল্লীদের লাশ ফেলেছে কামান ও মেশিন গান দেগে। এবং লাশগুলো ময়লা ফেলার গাড়িতে করে অজানা স্থানে গায়েব করেছে। মুজিব আমলে  সে নৃশংসতা দেখে এ দুনিয়া থেকেই বিদায় নিয়েছে ৩০ হাজারের বেশী রাজনৈতীক কর্মী। নৃশংসতা দেখেছে সিরাজ সিকদার। মুজিব তাদেরকে ন্যায় বিচার দেয়া দূরে থাক, বাঁচার অধিকারটুকুও দেয়নি। নৃশংসতার নিদারুন বেদনা নিয়েই বিদায় নিল শহীদ আবরার ফাহাদ। সেটিও মুজিবের শিষ্যদের হাতে। কোন হিংস্র পশুও কি মানুষকে এতটো যাতনা দিয়ে হত্যা করে? অথচ বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশের মানুষগণ আশা করছে দেশের ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তগুলো তাদের কোলে ন্যায় বিচার তুলে দিবে? আহাম্মকগণ চিরকাল এভাবেই স্বপ্ন দেখে। এবং তাদের সে আহাম্মকির কারণেই যুগে যুগে দীর্ঘায়ু পেয়েছে অসভ্যদের নৃশংস শাসন ।

আইনের শাসন এবং ন্যায় বিচারে শেখ হাসিনার যদি সামান্যতম আগ্রহ থাকতো তবে ভোট-ডাকাত হাসিনা নিজেই ক্ষমতা ছেড়ে নিজের ডাকাতির অপরাধে শাস্তি পেতে স্বেচ্ছায় কারাগারে যেত। সে কি জানে না ২০১৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বরের রাতে কীরূপ ডাকাতি করে ক্ষমতায় গেছে? সম্প্রতি বাংলাদেশের নির্বাচনি কমিশন তাদের ওয়েব সাইটে গত নির্বাচনে ভোটের ফলাফল ছেপেছে। হাসিনা যে ভয়ানক ডাকাত সেটি প্রমাণের জন্য কোন সাক্ষী সাবুদের প্রয়োজন নেই। নির্বাচনি কমিশনের রিপোর্টই সে কাজে যথেষ্ট। এমন কি পুরা রিপোর্ট পড়ারও প্রয়োজন নাই। সে কাজে নীচে দেয়া দুটি তথ্যই যথেষ্ট। এক). বলা হয়েছে ১০৩টি আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে শতকরা ১০০ ভাগ ভোট পড়েছে। দুই). ১৪টি আসনে সবগুলো কেন্দ্রে অর্থাৎ ৭ হাজার ৬৮৯টি কেন্দ্রে শতকরা ৯০ থেকে ৯৯ ভাগ পড়েছে। নির্বাচনে সকল দল অংশ নিলেও বাংলাদেশের কোন নির্বাচনেই অতীতে শতকরা ৭০ভাগ ভোটও পড়েনি। ১০০% ভোট কি করে পড়ে? এটি একমাত্র ভোট ডাকাতিতেই সম্ভব। কারণ ভোট ডাকাতি স্রেফ ব্যালট পেপারের বান্ডিল লাগে, ভোটার নয়। ভোটার লিষ্টের বহু ভোটারই থাকে মৃত। ভাবটা এমন, কবর থেকে উঠে এসে মৃতরাও ভোট দিয়েছে। নইলে ভোট বাক্সে শতকরা ১০০ ভাগ ভোট পড়ে কি করে?

 

হাসিনাঃ সবচেয়ে বড় শত্রু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার

আবরার ফাহাদ শহীদ হওয়ার পর শেখ হাসিনা ও তার দলের মন্ত্রীগণ কোরাস ধরেছে, দেশে আইনের শাসন আছে এবং আইন অনুযায়ী বিচার হবে। এটি নিছক জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্য। সেটি রাস্তায় নামা ছাত্রদের ঘরে ফেরানোর জন্য। এ অবধি শত শত খুন ও গুমের ঘটনা হয়েছে। কয়টির বিচার হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সামান্যতম আগ্রহ থাকলে সে আইনের প্রয়োগ হতো ভোট ডাকাত হাসিনার বিরুদ্ধেও। তাতে হাসিনার শুধু প্রধানমন্ত্রীত্বই হারাতে হতো  না, তাকে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য জেলে যেতে হতো। চুরি-ডাকাতি করলে দেরীতে হলেও মৃত্যুর অবধি শাস্তি দেয়ার সুযোগ থাকে। হাসিনাই বা তা থেকে বাদ যাবে কেন? তাছাড়া অবৈধ ভাবে এতদিন যে ক্ষমতায় আছে, শাস্তি তো তাতেও বাড়ছে। সে শাস্তি কি তাকে পেতে হবে না? ইন্দিরা গান্ধি এতবড় ভোট ডাকাত ছিল না। তার শাসনামলে  মাত্র একটি  আসনে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। সেটি প্রমাণ হওয়ায় তার প্রধানমন্ত্রীত্ব গিয়েছিল এবং তাকে জেলে যেতে  হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশে এ ভোট ডাকাতগণ জেলের বাইরে থাকে এবং বড় বড় কথা বলে।       

যে ব্যক্তি বাংলাদেশে আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় শত্রু সে হলো শেখ হাসিনা। সে প্রমান প্রচুর। তবে একটি প্রমান ভূলবার নয়। সেটি উল্লেখ করেছেন এরশাদের এক কালের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খান। তিনি তার বইতে লিখেছেন, এরশাদের সাথে দেখা করতে শেখ হাসিনা তার দফতরে এসেছেন। বৈঠক শুরু হওয়ার আগে দাবী তুললেন খুনের কেসে শাস্তিপ্রাপ্ত ছাত্র লীগের দুই কর্মিকে প্রথমে মুক্তি দিতে হবে। নইলে তিনি এরশাদের সাথে বৈঠকে বসবেন না। কারা ছিল আদালতে শাস্তিপ্রাপ্ত ছাত্র লীগের সে দুই জন কর্মী? সে বিবরন দিয়েছেন জনাব আতাউর রহমান খান। আশির দশকে আবরারের মতই অতি নৃশংস ভাবে দুইজন শিবির কর্মীকে হত্যা করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তাদেরকে ইট দিয়ে গুতিয়ে সারা দেহ থেথলানো হয়। গুড়িয়ে দেয়া হয় তাদের মাথা খুলি। আদালতের বিচারে খুনিদের শাস্তি হয়। কিন্তু সে শাস্তি হাসিনার পছন্দ হয়নি। তাই  এরশাদকে দিয়ে সে জঘন্য অপরাধীদেরকে হাসিনা মুক্ত করে নেয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে হাসিনার শত্রুতা কতটা প্রকট -এ হলো তার প্রমাণ। এরশাদ চেয়েছিল নিজের অবস্থান মজবুত করতে। বিএনপির মোকাবেলায় সে তখন হাসিনাকে কাছে টানছিল। হাসিনাও এরশাদের সে দুর্বলতা টের পেয়েছিল। তাই এরশাদের কাছে খুনির শাস্তি দেয়ার চেয়ে অধীক গুরুত্ব পেয়েছিল নিজের গদি বাঁচানো।

ডাকাত সর্দার কখনোই নিজ দলের ডাকাতদের বিচার চায় না। বরং চায়, ডাকাতগণ খুনখারাবী করুক এবং দলে আবার ফিরে আসুক। খুনখারাবীর শাস্তি দিলে ডাকাত দল টিকে না। সেটি হলে কম্বলের পশম বাছার ন্যায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ –এসবই এতদিনে বিলুপ্ত হয়ে যেতো। হাসিনা সেটি বুঝে। তাই তার রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো, নিজ দলের খুনিদের আইনের উর্দ্ধে রাখা। হাসিনার সে নীতির কারণেই তার দলীয় খুনিরা এতটা বেপরোয়া ভাবে খুন-খারাবী করতে পারে। এবং বিচারের দাবী নিয়ে রাস্তায় না নামলে পুলিশ যেমন এ্যাকশনে আসে না, বিচারও তেমনি আদালতে উঠে না। তাছাড়া বিচারে শাস্তি হলেই কি সে শাস্তির প্রয়োগ হবে? বিচারের রায় বানচাল করার জন্য হাসিনার হাতে রয়েছে তার প্রতি অতি অনুগত এক গোলাম চরিত্রের প্রেসিডেন্ট। হাসিনা যাকেই মাফ করে দিতে বলবে, তাকেই মাফ করে দেয়ার জন্য সে দুই পায়ে খাড়া। তাই এক আবরার নয়, হাজারো আবরার শহীদ হলেও সেটি হাসিনার কাছে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বরং তার কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার দলের প্রতিটি খুনিকে বাঁচানো। নইলে তার দল বাঁচবে না, তখন তার ক্ষমতাও বাঁচবে না। যারা বাংলাদেশকে একটি  সভ্যদেশ রূপে গড়ে তুলতে চায় তাদেরকে এ সহজ সত্য বিষয়টিকে বুঝতে হবে। অপরাধমুক্ত ও খুন-খারাবীমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে খুনিদের যে জন্ম দেয় তাকে কাঠগড়ায় তুলতে হবে। এবং নির্মূল করতে হবে তার শাসন। এখানে ব্যর্থ হলো বাঁচতে হবে দুর্বৃত্তদের কাছে আত্মসমর্পণের অসভ্যতা নিয়ে। ১২/১০/২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *