বিবিধ ভাবনা (২৫)

image_pdfimage_print

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ঈমানদারী ও বেঈমানী

ঈমানদারী ও বেঈমানী –এ দুটি ভিন্ন পরিচয় পরকালে মানবকে জান্নাত ও জাহান্নাত এ দুটি ভিন্ন স্থানে হাজির করবে। সেটি অনন্তকালের জন্য। তাই মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঈমানদারী কি এবং বেঈমানী কি – এ দুটো শব্দের অর্থ বুঝা। ঈমানদারীর  অর্থ হলো জীবনের প্রতি পদে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমগুলোকে মেনে চলা। এবং বেঈমানী হলো তাঁর যে কোন একটি হুকুমের অবাধ্যতা। ঈমানদারী জান্নাতে নেয় এবং বেঈমানী জাহা্ন্নামে নেয়। ঈমানদারী ও বেঈমানী গোপন থাকার বিষয় নয়। মানুষ নিজেই নিজের ঈমানদারী যেমন দেখতে পায়, তেমনি দেখতে পায় বেঈমানীও। বুদ্ধিমান তো তারাই -যারা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেয়ার আগেই নিজের ঈমানদারী ও বেঈমানীর হিসাব নেয়।

বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে জনগণ নিজেদেরকে ঈমানদার রূপে দাবী করে। কিন্তু সে ঈমানদারীর আলামত কই? আদালতে শরিয়ত ছাড়াই বিচার-আচার, সূদ দেয়া ও সূদ নেয়া, শত শত পতিতাপল্লী বাঁচাতে রাজস্ব দেয়া ও প্রহরা দেয়া, রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী ও সেক্যুলারিস্ট হওয়া এবং ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে উম্মাহকে বিভক্ত করা –এগুলো কি ঈমানদারীর আলামত? এগুলো তো সুস্পষ্ট বেঈমানী -যা জাহান্নামের আযাবকে অনিবার্য করে। অথচ বেঈমানীর এ ভয়াবহ বিপদ নিয়ে ভাবনা কই? সে বেঈমানী থেকে বাঁচার জন্য পেরেশানীই বা কই?

২.বিভক্তি নিয়ে উৎসব

মুসলিম মাত্রই মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক। তিনি চান, তাঁর সৈনিকদের মাঝে সীসাঢালা প্রাচীরসম একতা। পবিত্র কোর’আনের ভাষায় সেটি বুনিয়ানুন মারসুস। তিনি কঠোর ভাবে হারাম করেছেন তার সৈনিকদের মাঝে বিভক্তি। বিভক্তির সাজা স্বরূপ সুরা আল-ইমারানের ১০৫ নম্বর আয়াতে শুনিয়েছেন কঠিন আযাবের আগাম বার্তা। কিন্তু সে আযাবের পরওয়া ক’জনের? মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ ও তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত আযাবের ভয় থাকলে আরবগণ কি ২২ টুকরোয় বিভক্ত হতো? বাংলাদেশীরা কি একাত্তরের বিভক্তি নিয়ে প্রতি বছর উৎসব করতো? যারা প্রকৃত ঈমানদার তাদের তো এ বিভক্তি নিয়ে উৎসব নয়, মাতম করা উচিত।

নানা ভাষা-ভাষী মানুষের মাঝে সমস্যা থাকতেই পারে। তবে সেজন্য বিভক্তির আত্মঘাতী পথে মাধান হতে পারে না। আত্মহত্যার ন্যায় বিভক্তির এ পথটিও তো শতভাগ নিষিদ্ধ তথা হারাম পথ। হারাম পথে পা রাখা কখনোই জায়েজ হতে পারে না। সমাধান খুঁজতে হবে একমাত্র হালাল পথে। অথচ একাত্তরে শেখ মুজিব ও তার অনুসারীগণ বেছে নিয়েছে বিভক্তির সে হারাম পথটি। আর বাঙালীরা একাত্তরের সে হারাম কাজ নিয়ে গর্বভরে উৎসব করে। এটি তো মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের লক্ষণ।

৩. পাপ নিয়ে বাঁচা ও পাপের পাহারাদারী

সূদের বিরুদ্ধে ইসলামের বিধান অতি কঠোর। নবীজী (সা:) সূদ খাওয়াকে মায়ের সাথে জ্বিনার ন্যায় অতি জঘন্য পাপ বলেছেন। কিন্তু সে পাপের ভয়ই বা ক’জনের? সে ভয় থাকলে কি সূদী ব্যাংকে দেশ ভরে উঠতে। ইসলামের কঠোর বিধান ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে। ব্যাভিচারী ব্যক্তি বিবাহিত হলে তার শাস্তি হলো পাথর মেরে জনসম্মুখে হত্যা। অবিবাহিত হলে ১০০টি বেত্রাঘাত। অথচ বাংলাদেশে ব্যাভিচারদের শাস্তি না দিয়ে পাহারা দেয়া হচ্ছে। ব্যাভিচারীগণ তাদের পাপের বানিজ্য করছে বেশ্যালয়গুলোতে। আর বাংলাদেশের জনগণ রাজস্ব দেয় এবং পুলিশ নিয়োগ করে -সে বেশ্যলয়গুলোকে পাহারা দিতে। শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে কেউ কি এমন কাজ করতে পারে? অতএব এ নিয়ে জনগণের মাঝে কোন প্রতিবাদ নাই। আলেমগণও নীরব। তাদের ধর্মকর্ম নামায-রোযায় সীমিত। 

৪. ইসলাম ছাড়াই মুসলিম

মুসলিম হতে হলে নবীজী (সা:)’র ইসলাম নিয়ে বাঁচতে হয়। নিজে নিজে ইসলাম বানিয়ে নেয়া যায় না। ইসলামের নামে কিছু বানিয়ে নেয়াটি জাহান্নামের পথ। নবীজী (সা:)’র ইসলাম হলো সেই ইসলাম, যে ইসলামে ইসলামী রাষ্ট্র থাকবে, আদালতে শরিয়তী আইনের বিচার থাকবে, দুর্বৃত্তির নির্মূলে ও ইনসাফের প্রতিষ্ঠায় জিহাদ থাকবে এবং মুসলিমদের মাঝে ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে প্যান-ইসলামিক একতা থাকবে। নবীজী (সা:) এবং সাহাবায়ে কেরাম তো সে ইসলামকেই প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। অথচ আজকের মুসলিম জীবনে এর কোনটাই নাই। নবীজী (সা:)’র ইসলাম ছাড়াই তারা মুসলিম। তাদের চলার পথটি যে জান্নাতে চলার সিরাতুল মুস্তাকীম নয় বরং জাহান্নামের পথ –সে হুশটি ক’জনের? সিরাতুল মুস্তাকীম শুধু পরকালেই জান্নাতে নেয় না, দুনিয়ার বুকেও শান্তি, সন্মান ও বিজয় দেয়।

৫. একতার বল ও অনৈক্যের নাশকতা

একতা দেয় শক্তি, বিজয় ও ইজ্জত। হিন্দুদের ধর্ম হলো আদিম অজ্ঞতার ধর্ম। বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ দরিদ্র
জনগোষ্ঠির বসবাস ভারতে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারত আজ বৃহৎ শক্তি। এর কারণ, হিন্দুরা মুসলিমদের ন্যায় বিভক্ত নয়। তারা নানা ভাষা, নানা বর্ণ, নানা জাতপাতের হয়েও একত্রে এক ভূমিতে বসবাসের যোগ্যতা রাখে। কিন্তু সে যোগ্যতা মুসলিমদের নাই্। মুসলিমগণ তাই দেশে পরাজিত, অধিকৃত ও অপমানিত।

৬. পরাজয়ের কারণ

মুসলিমদের পরাজয়ের কারণ মূলত ২টি।  এক). তারা যে ইসলামের অনুসরণ করে সেটি নবীজী (সা:)’র ইসলাম নয়। এ ইসলাম তাদের নিজেদের মনগড়া। আর ইসলামের নামে মনগড়া কিছু করার যে হারাম রীতি -তা শুধু আযাবই বাড়ায়। নবীজী (সা:)’র ইসলাম পালনে আগ্রহ থাকলে তো ইসলামী রাষ্ট্র ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেত। জনগণের জীবনে তখন দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদ দেখা যেত –যেমনটি সাহাবাদের জীবনে দেখা গেছে। দুই).তারা একতার বদলে বেছে নিয়েছে ফেরকা, মজহাব, ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে বিভক্তির পথ। এরূপ বিভক্তি হারাম। এবং এ হারাম কাজটি মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত আযাব প্রাপ্তির পথ। তাই কৃষি, শিল্পে বা অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি এনে এ পরাজয় এড়ানো যাবে না। পরকালেও মুক্তি মিলবে না। সেজন্য নবীজী (সা:)’র ইসলামে যেমন ফিরতে হবে, তেমনি একতার পথও ধরতে হবে।

৭. সবচেয়ে কল্যাণকর কর্ম

কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হলে ধ্বংস করতে হয় জনগণের চরিত্র। জাতি ধ্বংসের ভয়ানক কাজটি রোগজীবাণুতে হয় না। কারণ রোগজীবাণু চরিত্র ধ্বংস করে না। সে কাজটি করে দুর্বৃত্তদের শাসন।  দুর্বৃত্তদের শাসনে রাষ্ট্র পরিণত হয় দুর্বৃত্ত উৎপাদনের ইন্ডাস্ট্রীতে। এবং দুর্বৃত্ত নেতাকর্মীগণ পরিণত হয় চরিত্রধ্বংসী ভাইরাসে। এবং তারই উদাহরণ হলো আজকের বাংলাদেশ।

তাই মানব জীবনে সবচেয়ে কল্যাণকর কাজটি হলো দুর্বৃত্ত শাসনের নির্মূল। ইসলামে সে কাজকে সর্বোচ্চ ইবাদত তথা জিহাদের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ঈমানের সবচেয়ে ব্যয়বহুল পরীক্ষাটি হয় দুর্বৃত্ত শাসকের নির্মূলে নিজ সামর্থ্যের বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে। সভ্য সমাজ তো এ পথেই নির্মিত হয়। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটিই হচ্ছ না।

 

৮. বই লেখা ও বই পড়ার গুরুত্ব

খাদ্যের ক্ষুধা বন্ধ হলে বুঝতে হবে মৃত্যু অতি নিকটে। জ্ঞানের ক্ষুধা বন্ধ হলে বুঝতে হবে ঈমান ও বিবেকের মৃত্যুও অতি নিকটে। একজন ব্যক্তির ঈমান ও বিবেক কতটা সুস্থ্য -সেটি বুঝা যায় তার জ্ঞানলাভের আয়োজন থেকে। জাতির ক্ষেত্রে সেটি বুঝা যায়, দেশে ভাল বই লেখা ও ভাল বই পড়ার আগ্রহ থেকে। মানব ইতিহাসে বড় বড় বিপ্লব তখনই এসেছে যখন জনগণের মাঝে জ্ঞানারর্জনে আগ্রহ বেড়েছে। এক্ষেত্রে ইসলামের ইতিহাস অনন্য। পবিত্র কোর’আনের পূর্বে আরবী ভাষায় কোন কিতাব ছিল না। অথচ কোর’আনে নাযিলের পর বিপ্লব এসেছিল জ্ঞানের রাজ্যে। বাংলাদেশের পতিতদশার কারণ এ নয়, দেশটির মাটি অনুর্বর এবং জলবায়ু প্রতিকুল। বরং ১৮কোটি মানুষ চরম ভাবে পিছিয়ে আছে বই লেখা ও বই পড়ার ক্ষেত্রে।  

৯. গণতন্ত্র কেন ব্যর্থ হয়?

গণতন্ত্র জনগণকে বিচারকের আসনে বসায়। ভোটের মাধ্যমে জনগণ রায় দেয়, কে যোগ্য এবং কে অযোগ্য, কে দৃর্বৃত্ত এবং কে সৎ -সে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। এজন্য বিচারকের ন্যায় জনগণকেও ভাল ও মন্দ, অপরাধী ও নিরোপরাধী, ন্যায় ও অন্যায়ের তারতম্য বুঝার সামর্থ্য থাকতে হয়। জনগণের সে সামর্থ্য না থাকলে গণতন্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য। তখন মুজিবের ন্যায় স্বৈরাচারি ফ্যাসিস্ট, খুনি এবং শত্রু শক্তির দালালও বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। তাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা দিতে হলে জনগণের যোগ্যতা বাড়াতে হয়।

আদালতের বিচারকের ভূল রায়ে কিছু নিরোপরাধ মানুষের প্রাণ যেতে পারে। কিন্তু জনগণের ভূল রায়ে সমগ্র দেশ শত্রু শক্তির হাতে অধিকৃত হতে। তখন নাশকতা ঘটে সমগ্র দেশবাসীর বিরুদ্ধে। সিকিম তো এভাবেই তার স্বাধীনতা হারিয়েছে। একই কারণে ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশের ভূমিতে বিজয় পেয়েছে ভারতীয় এজেন্ডা। এবং সেটি মুজিবের ন্যায় ভারতীয় এজেন্ট জনগণের ভোটে বিজয়ী হওয়াতে। সে ভয়ানক বিপদ থেকে বাঁচাতেই জনগণকে জ্ঞানবান করতে হয়। বাড়াতে হয় তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। জনগণকে জ্ঞানবান ও সচেতন করার সে কাজটি দুর্বৃত্ত বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের দিয়ে হয়না। ঘোড়ার আগে যেমন গাড়ী জোড়া যায় না, তেমন জনগণকে শিক্ষিত  করার আগে গণতনন্ত্র সফল করা যায় না। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটিই হয়নি। ফলে দেশ জিম্মি হয়ে গেছে দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদ ও বিভ্রান্ত জনগণের হাতে।

 

১০. বাঙালীর জীবনে অপরাধীর সন্মান

যে যুক্তি দেখিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানের পদক কেড়ে নেয়া হলো, তার চেয়ে বহুগুণ বেশী অপরাধ তো শেখ মুজিবের। মুজিবের অপরাধ তো গণতন্ত্র হত্যার। সে সাথে বিনা বিচারে তিরিশ হাজারের বেশী  বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী হত্যার। অপরাধ, মৌলিক মানবিক অধিকার কেড়ে নেয়ার। অপরাধ, ভারতের দালালীর। অপরাধ হলো, দুর্বৃত্ত প্রতিপালন ও দুর্নীতির মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ এবং লক্ষাধীক মানুষে জীবনে মৃত্যু ডেকে আনার। অতএব এ অপরাধীকে কি জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধুর খেতাব দেয়া যায়? বাংলাদেশের জনগণ কি মুজিবের ন্যায় এক অপরাধীকে সন্মান দিতে থাকবে? আজ না হোক, শত বছর পর নতুন প্রজন্ম অবশ্যই্ এ প্রশ্ন তুলবে, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা এতোই বিবেকশূণ্য ও নীতিশূণ্য ছিল যে, মুজিবের ন্যায় এক ঘৃণ্য অপরাধীকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলতো! ১৩/০২/২০২১।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *