বিবিধ ভাবনা (২৪)

image_pdfimage_print

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. যে কলংক বাংলাদেশের

 শান্তিপূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান চাঁদে রকেট পাঠানোর ন্যায় কঠিন কাজ নয়। দরিদ্র দেশ নেপালও সেটি পারে। কিন্ত বাংলাদেশ সেটি পারে না। সে বিশাল ব্যর্থতা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে দেখা গেছে। ২০১৪ সালে ১৫৩ সালে কোন নির্বাচনই হয়নি। সরকার তখন বলেছিল, এ নির্বাচন শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বহাল রাখার জন্য করা হলো, পরে আবার নির্বাচন দেয়া হবে। কিন্তু  সে ওয়াদাও রাখা হয়নি। ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট ডাকাতি করা হলো। শেখ হাসিনার সরকার বিশ্ববাসীদের সামনে দেখিয়ে দিল নিরপেক্ষ নির্বাচনের সামর্থ্য বাংলাদেশের নাই। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রকাশ করেছে নীতি ও নৈতিকতার দিক দিয়ে শেখ হাসিনা কতটা দেউলিয়া। এ কারণেই  নেপাল যা পারে তা হাসিনা পারে না্।

ভোটডাকাতি ও স্বৈরাচার তো অসভ্যতার প্রতীক। কোন সভ্য মানুষের কাছেই তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শেখ হাসিনা এরূপ অসভ্য শাসন প্রতিষ্ঠা দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশীদের মুখে চুনকালি লাগিয়েছে। এরপরও হাসিনা মিথ্যাচার করে, জনগণকে সে ভোটের অধিকার দিয়েছ। তার নিয়েত তো ভোটডাকাতি করা এবং বাকশালী স্বৈরাচারের অসভ্যতাকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। অথচ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে দেশ থেকে স্বৈরাচারের অসভ্যতা বিলুপ্ত হতো এবং বিশ্ববাসীর সামনে দেশবাসীর মুখ উজ্বল হতো। তখন প্রমাণিত হতো, শুধু নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও অন্যান্য দেশ নয়, বাংলাদেশের যোগ্যতা আছে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের।

 

২. আল্লাহর দল ও শয়তানের দল

 পবিত্র কোর’আনে মানব জাতির মাঝে মাত্র দুটি দলের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। একটি হিযবুল্লাহ তথা আল্লাহর দল, অপরটি হিযবুশ শায়তান তথা শয়তানের দল। তৃতীয় কোন দলের বর্ণনা নাই। নিরপেক্ষ বলেও কারো কোন পরিচিতি নাই। মানব জাতির এ দুটি দলের বর্ণনা দিয়ে প্রতিটি ব্যক্তিকে মহান আল্লাহতায়ালা সুযোগ দিয়েছেন উপরুক্ত দুটি দলের যে কোন একটিকে বেছে নেয়ার। আখেরাতে কোথায় স্থান হবে -সেটি নির্ভর করে এ পার্থিব জীবনে কোন দলে সে নিজেকে শামিল করলো তার উপর। যারা যোগ দিল শয়তানের দলে তারা যাবে জাহান্নামে। এবং জান্নাত শুধু আল্লাহর দলের সদস্যদের জন্য। তাই মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হলো সে দুটি দলের পরিচয় সঠিক ভাবে জানা।

আল্লাহর দলের পরিচিতি: “এবং যারা পক্ষ নিল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এবং ঈমান আনলো -তাঁরাই আল্লাহর পক্ষ। নিশ্চয়ই আল্লাহর দলই বিজয়ী।-(সুরা মায়েদা, আয়াত ৫৬)। শয়তানের দলের পরিচয়: “শয়তান দখলে নিয়েছে তাদেরকে,ভূলিয়ে দিয়েছে আল্লাহর যিকর।এরাই শয়তানের দল।নিশ্চয়ই শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত।(সুরা হজ্ব, আয়াত ১৯)। কোন দলই শুধু দলের জন্য নয়, প্রতিটি দল গড়া হয় বিশেষ একটি এজেন্ডাকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার জন্য। হিযবুল্লাহ তথা আল্লাহতায়ালার দলের এজেন্ডা হলো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব এবং অন্যান্য ধর্মের উপর ইসলামের বিজয়। দলের লক্ষ্য, অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। এবং সে লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা দেয় শরিয়তী শাসন। অপর দিকে শয়তানের দলের লক্ষ্য, ইসলামকে পরাজিত রাখা। এবং নানারূপ দলীয়, জাতীয়, গোত্রীয় বা মতাদর্শ-ভিত্তিক এজেন্ডাকে প্রতিষ্ঠা দেয়া।

পবিত্র কোর’আনে শয়তানের দলের মূল যে বৈশিষ্ঠটি তুলে ধরা হয়েছে তা হলো, সে দলের সদস্যরা বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার যিকর তথা তার স্মরণকে বাদ দিয়ে। মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ বলতে শুধু তাঁর নামের স্মরণ বুঝায় না, বরং বুঝায় তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতার স্মরণ। ব্যক্তিকে প্রতি মুহুর্ত যে স্মরণকে চেতনায় ধারণ করে বাঁচতে হয় তা হলো, মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে নিজ জীবনের এজেন্ডা নিয়ে বাঁচার। কিন্তু শয়তানের দলের লোকেরা বাঁচে চেতনায় শয়তানের এজেন্ডা নিয়ে।

 

 ৩. ভাল মানুষের পরিচয়

 দেশ দুর্বৃত্তদের দখলে গেল, শরিয়ত বিলুপ্ত হলো এবং প্রতিষ্ঠা পেল স্বৈরাচার, গুম, খুন ও সন্ত্রাসের রাজত্ব -এরপরও কোন ব্যক্তি যদি সে দুর্বৃত্ত সরকারের নির্মূলে সচেষ্ট না হয় -তবে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি নামাযী, আলেম, আল্লামা, মুফতি বা পীর হতে পারে, কিন্ত সে ব্যক্তি নেক বান্দাহ বা ভাল মানুষ নয়।

 

 ৪. অপরাধীকে সন্মান করলে প্রশ্রয় পায় অপরাধকর্ম

মানুষের চেতনা ও চরিত্র কখনোই গোপন থাকে না। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আবরার ফাহাদ যে সত্য কথাটি বলেছিল -তা ভারতের দালাল এবং বাকশালী স্বৈরাচারী মুজিব কখনোই মুখে আনেনি। মুজিবের অনুসারিগণও মুখে না। সে নিরেট সত্য কথাটি সাহস নিয়ে বলাতে আবরারকে শহীদ হতে হয়েছে।

শেখ মুজিবের অপরাধ বহু মুখী। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে একদলীয় বাকশালী শাসন প্রতিষ্ঠা ও ভারতের দালালীই মুজিবের একমাত্র অপরাধ নয়।তিরিশ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীর হত্যার সাথে সে জড়িত। সিরাজ শিকদারকে বিনা বিচারে হত্যার পর সংসদে বলেছেন, “কোথায় আজ সিরাজ শিকদার?” বাংলাদেশের মাটিতে বিনাবিচারে হত্যার শুরু তার হাতেই। তার অপরাধ ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে নিষিদ্ধ করার। তার ন্যায় একজন অপরাধীকে জাতির পিতা বা বঙ্গবন্ধু বললে তাঁর স্বৈরাচারি নীতি, বিনা বিচারে খুন ও ভারতের গোলামীকে সন্মান দেখানো হয়। দুনিয়ার কোন সভ্য জাতিই সেটি করে না।

অপরাধীকে সন্মানিত করলে অন্যরা ভয়ানক অপরাধী হতে উৎসাহ পায়। যারা আবরার ফাহাদকে নৃশংস ভাবে হত্যা করলো -সে ভয়ংকর খুনিরার তো খুনে উৎসাহ পেয়েছে মুজিবের ন্যায় অপরাধীকে সন্মানিত করার আওয়ামী সংস্কৃতি থেকে। তাই সভ্যদের সংস্কৃতি হলো আবরার ফাহাদের ন্যায় সাহসী দেশপ্রমিককে সন্মানিত করার। যে দেশে সাহসী দেশপ্রেমিকগণ সন্মানিত হয়, সে দেশের মানুষ সাহসী ও দেশপ্রেমিক হতে উৎসাহ পায়।

 

৫. আল্লাহর সৈনিক ও শয়তানের সৈনিক

 মাত্র ১৭ জন সৈনিক নিয়ে ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বাংলা জয় করেছিলেন। আজ ১৮ কোটি বাঙালী মুসলিম হিন্দুদের হাতে পরাজিত। ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বিস্ময়কর বিজয়ের কারণ, তিনি ছিলেন মহান আল্লাহতায়ালার নির্ভিক সৈনিক। মুসলিমগণ তো দেশে দেশে বিজয়ের এরূপ বিস্ময়কর ইতিহাস গড়েছেন। সে তুর্কী বীর বহু হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে বাংলার বুকে ছুটে এসেছিলেন ইসলামকে বিজয়ী করতে। ফলে তাঁর সাথে ছিল মহান আল্লাহতায়ালার গায়েবী সাহায্য। ফলে তাঁকে দেখেই কাফেরগণ ভয় পেত। ভয়ে সে আমলের বাংলার শাসক লক্ষণ সেন রাজ প্রাসাদের পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছিল।

কিন্তু আজকের মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক হতে। তারা যুদ্ধ করে শয়তানে সৈনিক রূপে শয়তানী আদর্শের বিজয় বাড়াতে। তারা যুদ্ধ করে ভাষা, গোত্র এবং ভূগোলের গৌরব বাড়াতে। তাদের যুদ্ধগুলো ইসলামকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নয়। তারা বন্ধু শয়তানী শক্তির। যেমনটি বাঙালী মুসলিমগণ যুদ্ধ করেছে ১৯৭১’য়ে শয়তানী ভারতীয়দের সাথে একাত্ম হয়ে। ফলে তাদের সাথে মহা শক্তিমান মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য নাই। ফলে তারা ভীতু হয় এবং ভয় পায় পৌত্তলিক কাফেরদের দেখে। এবং তাদের জীবনে লাগাতর পরাজয় ও অপমান আসে শাস্তি রূপে।

 

৬. পূর্ণ ইসলাম পালন

 মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ: “উদখুলু ফিস সিলমে কা’ফফা”। অর্থ: “পূর্ণভাবে প্রবেশ করো ইসলামে”। এর অর্থ হলো, মুসলিম হতে হলে ইসলামের সকল বিধানগুলোকে মানতে হবে। মসজিদের জায়নামাযে মুসলিম, রাজনীতির ময়দানে সেক্যুলারিস্ট বা জাতীয়তাবাদী, অর্থনীতিতে সূদখোর, সংস্কৃতিতে হিন্দু হলে তাতে মুসলিম হওয়ার কাজটি হয়না। এ ব্যর্থতা জাহান্নামে নেয়।

 

 ৭. হাসিনার প্রতিশোধের রাজনীতি

 বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার অভিযোগ, তার পিতার মৃত্যুতে তারা না কেঁদে মিষ্টি খেয়েছে। এমনকি তার দলের এক কালীন সভাপতি আব্দুর মালেক উলিক বলেছিলেন “ফিরাউনের পতন হয়েছে।” দলের নেতারা মুজিবের লাশ ফলে খোন্দকার মুশতাকের মন্ত্রী সভায় মন্ত্রীত্বের শপথ নিয়েছে। শেখ হাসিনার রাজনীতি হলো বদলা নেয়ার রাজনীতি। এবং বদলা নিচ্ছে জনগণের ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে এবং চুরিডাকাতি, গুম,খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণ দিয়ে কাঁদিয়ে।

 

৮. অসভ্য ও সভ্য সরকার

 সভ্য সরকারের কাজ শুধু জনগণকে উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও সুবিচার দেয়া নয়। বরং অতীব গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগণকে স্বাধীনতা দেয়া। স্বাধীনতা দেয়ার অর্থ: কথা বলা, বুদ্ধিবৃত্তি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার উপর থেকে সকল প্রকার বাধাকে অপসারন করা্। এবং সে স্বাধীনতাকে প্রতি মুহুর্তে প্রতিরক্ষা দেয়া। জনগণ যতই স্বাধীনতা পায় দেশ ততই সমৃদ্ধতর হয়্। নানা মেধার মানুষ তখন নিজেদের মেধাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পায়। মানুষ পশু নয় যে তার পায়ে রশি বেঁধে বন্দী করে রাখতে হবে। কিন্তু স্বৈরাচারি অসভ্য সরকার জনগণকে শত্রু ভাবে। ফলে তাদের কাজ হয় জনগণের স্বাধীনতা হরণ করে এবং স্বাধীনতা দেয় অপরাধীদের তাদের দুর্বৃত্তিতে। তখন দেশের আইন ও আদালতের কাজ হয় সরকারি বিরোধীদের দমন করা, সরকারের অপরাধকে দমন করা নয়।

 

9. সন্মানিত হচ্ছে অপরাধীগণ

 ইসলামের ফরজ বিধান হলো, চোখের সামনে কোন অপরাধ ঘটতে দেখলে অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া্। সাক্ষ্য গোপন করা কবিরা গুনাহ।এতে ন্যায় বিচার অসম্ভব হয়। খুন বা চুরিডাকাতি হতে দেখলে জোর গলায় খুনিকে খুনি এবং চোরকে চোর বলে সাক্ষী দেয়া তাই ঈমানী দায়িত্ব। অথচ বাংলাদেশে হয় উল্টেটি। বাকশালী স্বৈরাচারি ও খুনিকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলে সন্মানিক করা হয়, এবং ভোটচোরকে বলা হয় মাননীয় প্রধান মন্ত্রী।

অপরাধ শুধু অর্থচুরি নয়, গুরুতর অপরাধ হলো স্বাধীনতা ও ভোট চুরি। অর্থচুরিতে দেশের মালিক হওয়া যায় না। কিন্তু ভোটচুরিতে দেশের মালিক হওয়া যায় –যেমন হয়েছে শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে সেরূপ ভয়ানক অপরাধ রাজনীতির সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের সকল দেশেই চোরডাকাতদের অপরাধী বলা হয় এবং তাদেরকে কারাবন্দী করা হয়। অথচ বাংলাদেশে হচ্ছে উল্টোটি। এ দেশে বিচারে তোলা হয় তাদের -যারা চুরিডাকাতির কথা প্রকাশ করে দেয়। তাই অপরাধের প্রমাণ প্রকাশ করায় আদালতে মামলা করা হয়েছে আল-জাজিরার বিরুদ্ধে। ১১/০২/২০২১।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *