বাংলাদেশে পরাজিত ইসলাম প্রসঙ্গ

image_pdfimage_print

কলংক গাদ্দারির

মুসলিম দেশে ইসলাম বিজয়ী হবে এবং মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠা পাবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। যেমনটি হয়েছিল নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরামের আমলে। এটিই তো সিরাতুল মুস্তাকীমের পথ। এটি না হলে প্রচণ্ড গাদ্দারি হয় মহান আল্লাহতায়ালা ও তার দ্বীন ইসলামের সাথে। তখন আসে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতা -যা জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছায়। অথচ অতি অপ্রিয় সত্য কথাটি হলো, বাংলাদেশে সে গাদ্দারিটাই হচ্ছে অতি প্রকট ভাবে। পরিতাপের বিষয় হলো, সে গাদ্দারি নিয়ে দেশের মোল্লামৌলবীগণও নীরব। যেন কিছুই হয়নি। এমন পথভ্রষ্টতার নেত্রীকে তারা কওমীদের জননীও বলছে। প্রশ্ন হলো, নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল করে কি এমন গাদ্দারির পাপ মোচন হয়? এমন গাদ্দারি যে ভয়ানক আযাব ও অপমান নিয়ে আসবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। বাংলাদেশে সে অপমান কি কম জুটেছে? বিশ্বের প্রায় দু’শতটি দেশের মাঝে দুর্নীতিতে ৫ বার প্রথম হওয়ার খেতাবটি কি কম অপমানের? এটি ভরা বাজারে পকেট মার রূপে ধরা পড়ার মত। এতবড় অপমান নিয়ে তো বাংলাদেশীদের বোধোদয় হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি। সে অপমান নিয়ে বাংলাদেশে কারো মাথা হেট হয়নি; কোন মাতমও হয়নি। ভাবটা এমন যেন কিছুই হয়নি। মানুষ ঈমানশূণ্য হলে লজ্জাশূণ্যও হয়। এজন্যই নবীজী লজ্জাকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। ঈমানশূণ্যদের কাছে মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের পরাজয় যেমন মাতম সৃষ্টি করে না, তেমন বিশ্বজোড়া অপমানেও তাদের মাতা হেট হয় না।

বাংলাদেশে ইসলামের পরাজয়টি নতুন নয়, সেটি ঔপনিবেশিক ইংরেজদের শাসনামল থেকেই। আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, প্রশাসন থেকে আল্লাহর আইন নির্মূল হয়েছে সে আমলেই। তখন থেকেই দেশে ব্যাভিচার শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। সূদও হারাম নয়। নাচ-গান, বিনোদন, সিনেমা-নাটকের নামে অশ্লিলতাও নিষিদ্ধ নয়। এজন্যই মুসলিম জীবনে ভয়ানক বিপদটি আসে কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়াতে। তখন সে অধিকৃত দেশে স্বপ্নপূরণ হয় কাফেরদের। অথচ ঈমানদার মুসলিমদের বাঁচতে হয় ভিন্নতর স্বপ্ন ও ভিন্নতর জীবনবোধ নিয়ে। সেটি যেমন অন্যায় ও দুবৃত্তির নির্মূল, তেমনি ইসলামের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা। এখানে ঈমানদারের আপোষ চলে না। দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি ও অর্থনীতির বহু বিষয় নিয়েই ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মাঝে পরস্পরে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু যা নিয়ে সামান্যতম বিরোধ থাকতে পারে না সেটি হলো ইসলামের বিজয় নিয়ে। কারণ,সেটি তো মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো, সে এজেন্ডার সাথে পুরাপুরি একাত্ম হওয়া। ইসলামকে পরাজিত দেখার মধ্যে আনন্দ থাকতে পারে একমাত্র কাফের ও মুনাফিকদের। কোন মুসলিমের নয়।

কে মুসলমান আর কে কাফের -সে বিচারটি কখনোই ব্যক্তির নাম বা পোষাক-পরিচ্ছদ দেখে হয় না। মুখে কে কি বললো -তা থেকেও নয়। বরং সে বিচার হয়, যেটি সে অন্তর থেকে চাইলো বা বাস্তবে করলো -তা থেকে। আর মহান আল্লাহতায়ালা তো মানুষের মনের ভাষা বুঝেন এবং কর্মও দেখেন। মুসলিম জীবনে প্রধানতম ভাবনা ও অঙ্গিকার হল, আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার ভাবনা। তার চেতনায় সবসময় কাজ করে, সে বিজয়ের লক্ষ্যে তাঁর সমগ্র সামর্থ্যের যথার্থ বিণিয়োগে নিয়ে। কারণ মুসলমান হওয়ার অর্থ, রাজনীতির ময়দানে দর্শক হওয়া নয়, বরং সক্রিয় মোজাহিদে পরিনত হওয়া। একাজে আত্মনিয়োগ ছাড়া কোন ব্যক্তি কি তার মহান আল্লাহকে খুশি করতে পারে? ইসলামে নীরব বা নিষ্ক্রিয় মুসলিম বলে কেউ নেই। তাই নবীজী (সাঃ)র এমন কোন সাহাবা ছিল না যিনি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বের রণাঙ্গণে যাননি।

ঈমানের প্রকাশ নিয়তে

নামায-রোযা বা দান-খায়রাতে অবশ্যই নিয়ত বাঁধতে হয়। তেমনি নিয়ত বা লক্ষ্য নিদ্ধারণ করতে হয় বাঁচা-মরা ও জীবন ধারনের ক্ষেত্রেও। ইবাদতের নিয়ত না থাকলে কোন ইবাদতই যেমন ইবাদত হয় না, তেমনি উচ্চতর নিয়ত না থাকলে বাঁচাটিও পশুদের বাঁচা থেকে ভিন্নতর হয়না। বোখারী শরিফের প্রথম হাদীসটি হলো, “সকল কাজের মর্যাদা বা মূল্যমান নির্ধারিত হবে তার নিয়ত থেকে।” তা্‌ই মানবের মূল্যমান ও মর্যাদাও নির্ধারিত হয় তার বাঁচবার নিয়ত থেকে। একজন কাফের থেকে একজন মুসলিমের মূল পার্থক্য তো এই নিয়তে। যে নিয়ত নিয়ে একজন কাফের বাঁচে, যুদ্ধ করে বা প্রাণ দেয়, সে নিয়ত নিয় মুসলিম কখনো বাঁচে না, যুদ্ধ করে না এবং প্রাণও দেয়না। মানুষের বাঁচা-মরার সে নিয়ত শেখাতেই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা আয়াত নাযিল করেছেন এবং বলেছেনঃ “বলুন (হে মহম্মদ)! আমার নামায, আমার কোরবানী এবং আমার জীবন-ধারণ ও মরণ –সব কিছুই সেই বিশ্ব-প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য।”–(সুরা আল-আনয়াম, আয়াত ১৬২।

উপরুক্ত আয়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। যে ব্যক্তি  এ আয়াত থেকে নির্দেশনা ন্যায় সে কখনোই ভাষা, বর্ণ, শ্রেণী বা ভূগোলের গৌরব বাড়াতে যুদ্ধ করে না। প্রাণও দেয় না। সেটি আল্লাহতায়ালাপ্রদত্ত আমানতের খেয়ানত।  ফলে সে খেয়ানতের শাস্তি জাহান্নাম। তাই কোন ঈমানদার কাফের দেশে গিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রশিক্ষণ নেয় না। তাদের অর্থ ও অস্ত্র নিয়ে কখনো যুদ্ধও করে না। এজন্য কোন আলেম ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে ওসমানিয়া খেলাফত ভাঙ্গতে যুদ্ধ যুদ্ধ করেনি। তেমনি ১৯৭১য়েও কোন আলেম, মাদ্রাসার কোন ছাত্র এবং কোন ইসলামী দলের কর্মী ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের সহচর রূপে যুদ্ধে নামেনি। সেটিকে তারা হারামা গণ্য করেছে।

এ পৃথিবী মানব কেন বাঁচবে, কেনই বা লড়বে, কেনই বা প্রাণ দিবে –এ প্রশ্নগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ। বরং বলা যায় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এগুলি। কোন ব্যক্তির পক্ষে তার সীমিত কান্ড-জ্ঞান নিয়ে এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর বের করা কঠিন। ফলে মানব জীবনে সবচেয়ে বড় ভূল হয় এ ক্ষেত্রটিতে। এবং সে ভূলে ব্যর্থ হয়ে যায় সমগ্র জীবনের বাঁচাটাই। মানুষ তখন প্রান দেয় ফিরাউন, হিটলার ও চেঙ্গিজদের বিজয়ী করতে। অথবা কোন সাম্রাজ্যবাদী, জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী যুদ্ধে। এমন ব্যক্তিদের পরিচয় যাই হোক, তাদের বাঁচা-মরাটি পশুদের চেয়েও নিকৃষ্টতর হয়। কারণ পশু নিজে শিকার ধরে নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য। কিন্তু  সে কখনো অন্যের হাতে গণহত্যা, জুলুম-নির্যাতন বা দেশ-দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয় না। আল্লাহতায়ালা এমন মানুষদের উদ্দেশ্যেই বলেছেন, “উলায়িকা কা আল-আনয়াম, বাল হুম আদাল।” অর্থঃ এরাই হল তারা যারা গবাদী পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ তো তাদের সেনা বাহিনী পূর্ণ করেছে এসব মানবরূপী পশুদের দিয়েই। মানুষ তাদের বাহিনীতে ভাড়ায় খেটেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দুই লাখের বেশী ভারতীয় মুসলিম এবং প্রায় দশ লাখ আরব মুসলিম যুদ্ধ করেছিল পবিত্র জেরুজালেমসহ মুসলিম ভূমির দখলদারি ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে দেয়ার জন্য। আজও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বজুড়ে আধিপত্য জমিয়েছে এসব পশুবৎ মানুষদের সাহায্য নিয়ে। এদের কারণেই মুসলিম দেশগুলিতে তারা সরকারের ভিতরে ও বাইরে বিপুল সংখ্যক কলাবোরেটর পাচ্ছে্। তাই মহান আল্লাহতায়ালাকে মানব জীবনের এ অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিতেও পথ নির্দেশনা দিতে হয়েছে। জীবনে বাঁচার নিয়তটি কি হওয়া উচিত –উপরুক্ত আয়াতে সেটি তিনি অতি স্পষ্টতর করেছেন। ফলে প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে বেঁধে দেওয়া সে নিয়তটিকে নিজের নিয়েত রুপে গ্রহণ করা। অন্যথায় তার বাঁচাটি হবে ভ্রান্ত পথে বাঁচা, তথা জাহান্নামের পথে বাঁচা।

 

অর্জিত পরাজয়

প্রকৃত ঈমানদার তাই নিছক বাঁচার জন্য বাঁচে না। সে বাঁচে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত লক্ষ্যটি পূরণ করার লক্ষ্যে। নিছক আহারের সন্ধান, ঘরবাধা বা বংশ বিস্তারের লক্ষ্য তো পশুরও থাকে। এরূপ লক্ষ্যে জীবন-ধারণ তাকে পশু-পাখি ও পোকা-মাকড় থেকে ভিন্নতর করে না, শ্রেষ্ঠতরও করে না। কোন রাষ্ট্রেই সকল নাগরিকের সম-মর্যাদা থাকে না। মর্যাদা নির্ধারিত হয় নাগরিকদের কাজের মর্যাদা থেকে। যে ব্যক্তিটি তার জীবনের সকল সামর্থ্যয ব্যয় করে নিছক নিজের বেঁচে থাকা ও সুখ-সাচ্ছন্দের খাতিরে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে যার কোন আগ্রহ বা সামর্থই অবশিষ্ঠ থাকে না -তাকে কি সে ব্যক্তির সম-মর্যাদা দেওয়া যায় যে তার সময় ও সামর্থ্য ব্যয় করে, এমনকি প্রাণও বিলিয়ে দেয় রাষ্ট্রের কল্যাণে? এ দুই ব্যক্তি কখনই কোন রাষ্ট্রে সম-মর্যাদা পায় না। ইসলামে শহিদের মর্যাদা এজন্যই অতুলনীয়। তারা তো জানমাল কোরবানী করে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে। সে বিজয়ে শান্তি নেমে আসে সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। আল্লাহপাক তাদেরকে মৃত্যুর পরও জীবিত রাখেন এবং পুরস্কৃত করেন জন্নাত দিয়ে। আল্লাহপাক তো চান, তার প্রতিটি বান্দাহ সে মহান লক্ষ্য নিয়ে বাঁচুক, এবং অর্জন করুক সে মহান মর্যাদা। প্রতিটি সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে প্রতিনিয়ত যা ঘটে তা হলো দুটি বিপরীত-মুখী জীবন লক্ষ্য নিয়ে বাঁচার যুদ্ধ। এর একটি মহান আল্লাহর লক্ষ্যে, অপরটি গায়রুল্লাহ তথা শয়তানের লক্ষ্যে। প্রথমটি মহা-সাফল্যের। এ পথ জান্নাতের। আর দ্বিতীয়টি চরম ব্যর্থতার -ব্যক্তিকে এটি জাহান্নামে পৌঁছে দেয়। তাই কোরআনে বলা হয়েছে, “যারা ঈমানদার তাঁরা লড়াই করে আল্লাহর লক্ষ্যে, আর যার কাফের তারা লড়াই করে শয়তানের লক্ষ্যে।”

উপরুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা কে ঈমানদার আর কে কাফের সেটি সংজ্ঞায়ীত করেছেন। সে পরিচয়টি সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পায় যুদ্ধে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে নিজেদের ঈমানদার রূপে দাবী করে এমন মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ। প্রতিনিয়ত লড়াই লেগে আছে রাজনীতির অঙ্গণে। কিন্তু কোথায় আল্লাহর পথে সে লড়াই। কোন দেশে বিশাল মুসলিম জনবসতি ও বিপুল সংখ্যক মসজিদ-মাদ্রাসা দিয়ে সে দেশে ইসলামের প্রতিষ্ঠা বা বিজয় নির্ণীত হয়? নির্ণীত হয়, দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, আইন-আদালত, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে কোন নীতি অনুসৃত হয় -তা থেকে। যেহেতু বাংলাদেশের বুকে এর কোনটিতেই ইসলামের কোন স্থান নাই, দেশের আদালত দখলে নিয়েছে কুফরি আইন এবং ইসলাম বন্দী হয়ে আছে মসজিদ-মাদ্রাসার চার দেয়ালের মাঝে –ফলে মুসলিমের জনসংখ্যা যত বিশালই হোক তার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশকে ইসলামী বলা যাবে?  বরং দেশে বিজয় বেড়েছে অনৈসলামের। সে সাথে গুরুতর পাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশে ইসলামের পরাজয় বেড়েছে কোন কাফের বাহিনীর যুদ্ধজয়ের কারণে নয়। বরং ইসলামের এ পরাজয় এসেছে তাদের হাতে যারা নিজেদেরকে মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। এখন তাদের কাজ হয়েছ. ইসলামের সে পরাজয়কে দীর্ঘায়ীত করা। একটি মুসলিম জনগোষ্ঠির জন্য এর চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে? পরিতাপের বিষয় হলো, সে অপমান নিয়েও দেশবাসীর মাঝে কোন ক্ষোভ নাই!  ৭.০৩.২০১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *