কেন অসম্ভব হচ্ছে ইসলামের বিজয়?

image_pdfimage_print

নবীজী (সাঃ) সর্বশেষ্ঠ সূন্নত

মুসলিম মাত্রই ইসলামের বিজয় চায়। সে চা্‌ওয়ার মধ্যেই ঈমানের প্রকাশ। যারা ইসলামের বিজয় না চেয়ে পরাজয় চায় -তারা হয় কাফের, না হয় মুনাফিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসলামের কাঙ্খিত সে বিজয়টি কোন পথে? পথ একটিই, সেটি হলো নবীজী (সাঃ) দেখানো পথ। নামায-রোযা কি ভাবে পালন করতে হবে সেটি যেমন আবিস্কারের বিষয় নয়, তেমনি কীভাবে মহান আল্লাহতায়ালা দ্বীনের বিজয় আনতে এবং কীভাবে তাঁর  সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে সেটিও আবিস্কারের বিষয় নয়। ঘর-বাড়ী, রাস্তা-ঘাট কোথায়, কোন ডিজাইনে বা কোন সামগ্রী দিয়ে নির্মাণ করতে হবে -তা নিয়ে বিস্তর গবেষণার সুযোগ আছে। এসব খাতে প্রত্যেকেই নিজ নিজ প্রতিভার বিনিয়োগের আজাদীও রয়েছে। কিন্তু নবীজী (সাঃ) নিজ হাতে যে কাজে সূন্নত রেখে গেছেন, প্রতিটি ঈমানদারকে অনুসরণ করতে হবে সেটিই। নইলে ভ্রষ্টতা ও ফিতনা বাড়বে।

সঠিক পথে চলতে হলে সব পথে যেমন চলা যায় না, তেমনি সবাইকে অনুসরণও করা যায়। ইহকালে ও পরকালে সাফল্য তো সঠিক পথে চলা এবং সঠিক ব্যক্তিকে অনুসরণ করার মধ্যে। মানব জীবনে এটি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। সে সাথে অনিবার্য পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় পাশ যারা করেই পরকালে জান্নাত পেতে হয়। এবং ভূল হলে অনিবার্য হয় জাহান্নামের আযাব। অলিম্পিকে সোনার মেডেল পাওয়া বা আবিস্কারে নবেল প্রা্‌ইজ পাওয়ার চেয়েও কঠিন হলো সুস্থ্য রাষ্ট্র নির্মাণ এবং  জান্নাতের পথ চেনার ক্ষেত্রে নির্ভূল হওয়া। পানাহার ইতর পশুপাখিও সংগ্রহ করে, কিন্তু জান্নাতের পথ চেনার ক্ষেত্রে নবেল প্রাইজ বিজয়ীগণও ভূল করে। জনগণের মাঝে সে ভূলের ছড়াছড়ির কারণে ইতিহাসে ফিরাউন, নমরুদ, হিটলার, স্টাটিন এবং শেখ মুজিবের ন্যায় নৃশংস স্বৈরাচারিগণও কোটি কোটি সমর্থক পেয়েছে।

পথচেনার সে দুরুহ কাজটি সহজ ও নির্ভূল করতেই মহান আল্লাহতায়ালা পথ দেখানোর কাজটি কোন বান্দার হাতে না রেখে নিজ হাতে রেখেছেন। সে কাজটি সমাধা করতেই মানুষের মাঝে নবী-রাসূল নিয়োগ, নবী-রাসূলদের কাছে কিতাব প্রেরণ এবং ফিরশতা মারফত নিয়মত ওহি পাঠিয়েছেন। মহান আল্লাহতায়ালার সে মিশনকে পূর্ণাঙ্গ করতে মহা নবীজী (সাঃ) ছিলেন সর্বশেষ নবী এবং সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ মানব। তিনি ছিলেন সমগ্র মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ (উসওয়াতুন হাসানা)। জান্নাতের পথে চলা এবং জাহান্নামে আগুণ থেকে বাঁচার জন্য যা কিছু অপরিহার্য –সে বিষয়গুলি নিজ হাতে করে সমগ্র মানব জাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ রেখে যাওয়াই ছিল তার মূল দায়িত্ব। যেহেতু তিনি ছিলেন মহান আল্লাহতায়ালার, তিনি যা শিখিয়েছেন তাতেই প্রকাশ পেয়েছিল মহান রাব্বুল আলামীনের নিজের ই্চ্ছা। এবং বোধগম্য কারণেই তাঁর শিক্ষা স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় ইবাদত বন্দেগীর মাঝে সীমিত থাকেনি। শিখিয়ে গেছেন, মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে কীরূপে মানবের সবচেয়ে বড় কল্যাণ কাজে লাগাতে হয় সেটিও। শিখেয়েছেন, সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় জিহাদ এবং সে জিহাদে জানমালের কোরবানীর গুরুত্ব। নবীজীর হাদীসঃ প্রতিটি মানব শিশুরই জন্ম হয় মুসলিম রূপে। কিন্তু সে পরবর্তীতে অমুসলিম রূপে বেড়ে উঠে পরিবেশের গুণে। এবং পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিবেশের নির্মাণে সবচেয়ে শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি রাখে রাষ্ট্র। প্রতিটি সমাজ ও রাষ্ট্রেই প্রতি মুহুর্তে চলমান থাকে একটি সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং। রাষ্ট্র ইসলামী হলে সে সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের ফলে মানবশিশুদের পক্ষে সহজ হয় জান্নাতের পথে চলা। নইলে উল্টোটি হয়। শয়তানি শক্তির হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে এমন কি মসজিদ-মাদ্রাসাও ঘোড়ার আস্তাবল বা মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয় –যেমনটি অতীতে সোভিয়েত রাশিয়ায় হয়েছে। রাষ্ট্র থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতি। ফলে হিন্দুপরিবার ও হিন্দু রাষ্ট্রে জন্ম নেয়া অতি মেধাবী ব্যক্তির পক্ষেও অসম্ভব হয় পৌত্তলিকতার বন্ধন থেকে বেড়িয়ে আসা। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্ম-কর্মের নামে এসব রাষ্ট্রে গড়ে তোলা হয় পথভ্রষ্ট করার পদ্ধতি।

ফলে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে বা স্রেফ নামায-রোযা শিখিয়ে মানব শিশুদের এ ভয়াবহ বিপদ থেকে মুক্তি দেয়াটি অসম্ভব। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের ন্যায় এতবড় গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃত থাক এবং ব্যবহৃত হোক জনগণকে জাহান্নামের নেয়ার কাজে – সেটি কি মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রসূলের কাছে কখনো কাম্য হতে পারে?  মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এমন কি ব্যক্তি জীবনেও অসম্ভব হয় দ্বীনপালন। এ বিপদ থেকে বাঁচাতে নবীজী (সাঃ) নিজের কাজকে তাই শুধু দ্বীনের দাওয়াত ও কোরআন শিক্ষার মধ্যে সীমিত রাখেননি। শক্তিশালী রাষ্ট্রও গড়েছেন। এবং নিজে রাষ্ট্র-প্রধানও হয়েছেন। দেখিয়ে গেছেন, রাষ্ট্রের কাজ স্রেফ কৃষি, শিল্প বা অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি আনা নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো জাহান্নামের আগুন থেকে মানব সন্তানদের মুক্তি দেয়া এবং জান্নাতে পথ দেখানো। মানব জাতির কল্যাণে এটিই হলো মহান নবীজী (সাঃ)র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত। সাহাবায়ে কেরামের জান-মালের সবচেয়ে বড় কোরবানী হয়েছে এ কাজে। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা এ কাজে শহীদ হয়েছেন। মুসলিমগণ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছে মূলতঃ নবীজী (সাঃ)র সে আদর্শকে অনুসরণ করার কারণে।  

তাছাড়া নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের চেয়ে ইসলামী রাষ্ট্র ও তার অবকাঠামো নির্মাণের কাজটি হলো সবচেয়ে কঠিন ও জটিলতম ইবাদত। এ ইবাদত পালনের কোন সূন্নতী তরীকা রেখে না গেলে সেটি মানব জাতির জন্য আরেক মহাবিপর্যয়ের কারণ হতো। তখন তারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ইসলামি বিপ্লবের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নামতো। তাতে ব্যাপক অপচয় ঘটতো মানুষের অর্থ, মেধা, সময় ও রক্তের। আজও অনেক দেশে সেটিই হচ্ছে। সে শূণ্যতা দূর করতেই নবীজী (সাঃ) নিজ হাতে ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছেন এবং রাষ্ট্রপ্রধান রূপে সূন্নত রেখে গেছেন। সে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য নিজে বদর, ওহুদ, খন্দক ও হুনায়েনসহ বহুযুদ্ধ লড়েছেন এবং আহতও হয়েছেন। এভাবে উম্মাহর জন্য শিক্ষা রেখে গেছেন, রাষ্ট্রের মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানটি কখনোই ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে ছেড়ে দেয়া যায় না। ফলে যারা দ্বীন বলতে বুঝে স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল এবং দূরে থাকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদ থেকে -তারা যে নবীজী (সাঃ)র ইসলামে নাই তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে?   

 

শুরুটি ওহীর জ্ঞান দিয়ে

ইসলামী বিপ্লবের শুরু হতে হবে ব্যক্তির চেতনা রাজ্যের বিপ্লব দিয়ে। তাছাড়া, চেনতা রাজ্যের বিপ্লবই তো রাষ্ট্রে বিপ্লব আনে। এবং সে বিপ্লবটি আসে ওহীর জ্ঞানের জোয়ারে। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে মুসলিম বানানোর আগে জনগণের মগজ তথা ধ্যান-ধারনাকে প্রথমে মুসলিম বানাতে হয়। এটিই মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশমত মক্কী জীবনের ১৩ বছর যাবত নবীজী (সাঃ) সে কাজটিই করেছিলেন। এ কাজে সবচেয়ে কার্যকর ও অপরিহার্য  হাতিয়ার হলো পবিত্র কোর’আন। পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানে বিপ্লব আনতে হয় ব্যক্তির জীবনদর্শনে। তাই নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের পূর্বে মুসলিমদের উপর মহান আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম কোরআন-অধ্যয়ন ফরজ করেছেন। হাদীস পাকে বলা হয়েছে, “সবচেয়ে উত্তম জিহাদ হলো নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ।” মূলতঃ সব জিহাদের শুরু এখান থেকেই। তবে নফসের এ অঙ্গণে জিহাদের অস্ত্রটি কোন ঢাল-তলোয়ার বা গোলা-বারুদ নয়, বরং সেটি হলো পবিত্র কোরা’আনের জ্ঞান। এ জিহাদে বিজয়ী না হলে মানব সন্তানেরা নামাযী ও রোযাদার হয়েও শয়তানের সেপাহীতে পরিণত হয়। এবং যেদেশে নফসের বিরুদ্ধে জিহাদে বিজয়ীদের সংখ্যা অধীক, একমাত্র সেদেশেই শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদটিও শুরু হয়। এবং যে দেশে সে জিহাদটিই শুরু হয়নি, বুঝতে হবে সেদেশে নফসের বিরুদ্ধে বিজয়ী মোজাহিদদের সংখ্যা নগন্য। কারণ নফসের বিরুদ্ধে বিজয়ী মোজাহিদগণ কখনোই রাষ্ট্রের বুকে আল্লাহর দ্বীনের পরাজয় মেনে নেয় না। এটি তাদের স্বভাব-বিরুদ্ধ। তাদের উপস্থিতিতে জিহাদ এ জন্যই অনিবার্য হয়ে উঠে। এবং সে চুড়ান্ত জিহাদের পরণতিতেই বিজয়ী হয় আল্লাহর দ্বীন। তাই একটি দেশে লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা থাকাটি বড় কথা নয়। বড় কথা নয়, রোযাদার বা মুসল্লীর বিশাল সংখ্যাও। তাবলিগ জামাতের ইজতেমায় কত লক্ষ মুসল্লী জমা হলো -সেটিও এখানে কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। বরং অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশে ক’জন এরূপ নফসের বিরুদ্ধে বিজয়ী মোজাহিদ সৃষ্টি হলো সেটি।

বাংলাদেশে আল্লাহর দ্বীন আজ পরাজিত। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে বিজয়ী আদর্শ রূপে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, আইন-আদালত ও সংস্কৃতিতে যেটি জেঁকে বসে আছে সেটি ইসলাম নয়। সেটি সেক্যুলারিজম। এবং সেকুলারিষ্টদের আনন্দ ইসলামের পরাজয়ে। তাদের কারণে আইন-আদলতে আল্লাহর শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব নয় সূদী ব্যাংকের উৎখাত। সম্ভব নয় পতিতাবৃত্তির ন্যায় পেশাদারি ব্যাভিচারের নির্মূল। এবং সম্ভব নয় ঘুষ, সরকারি তহবিল তছরুফ, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসের ন্যায় নানাবিধ পাপাচারের উচেছদ। কারণ, সেকুলারিষ্টগণ বাঁচতে চায় ইহলৌকিক জীবনের সুখভোগ নিয়ে। সে ভোগের আনন্দ বাড়াতে সূদ, ঘুষ, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাস যেমন জরুরী, তেমনি জরুরী হলো ব্যাভিচারের উম্মুক্ত বাজার। এবং সে পাপাচার বাঁচিয়ে রাখতে জরুরী হলো শরিয়তী আইনের নির্মূল।

 

জরুরী হলো আত্মসমালোচনা 

যারা নিজেদের পরিচয় দেয় ইসলামের পক্ষের শক্তি রূপে, নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে তাদের আত্মসমালোচনা হওয়া উচিত। যে পথে আসছে অবিরাম ব্যর্থতা সে পথে হাজার বছর চললেও কি সফলতা আসবে? চলা থামিয়ে তাদের ভাবা উচিত। এ ভাবাটাই এখন বড় ইবাদত। প্রশ্ন করা উচিত, যে পথে তারা চলছে সেটি সঠিক তো? দেশে ইসলামের বিজয় আনার আগে তাদের জ্ঞানের ভূবনে ইসলামের বিজয় আসা উচিত। শুরু হওয়া উচিত নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ। অথচ এক্ষেত্রে ব্যর্থতা যে প্রকট সে প্রমাণ কি কম? নফসের উপর বিজয়ী মোজাহিদ গড়ার সফল কোন পদ্ধতি থাকলে অবশ্যই শুরু হত আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লড়াই। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। এটি বাঙালী মুসলিমদের ধর্মপালনের এক নিদারুণ ব্যর্থতা। যে কোন ধর্মপ্রাণ মানুষকে এ ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে হবে। প্রশ্ন হলো, ১৬ কোটি মুসলিমের দেশে ক’জন এমন মুসলিম যারা পবিত্র কোরআনের প্রথম পৃষ্টা থেকে শেষ পৃষ্টা পর্যন্ত একবার অর্থসহ বুঝে পড়েছে? এবং পাঠের সাথে তার উপর চিন্তা-ভাবনাও করেছে।

কোরআন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিপ্লবী গ্রন্থ। এ কিতাব পড়লে চিন্তাশীল পাঠকও বুঝতে পারে এ কিতাবের লেখক আর কেউ নন, লেখক সর্বশক্তিময় মহান আল্লাহ। এটিও সে বুঝতে পারে, এ মহান লেখকের প্রতিটি কথার কাঙ্খিত শ্রতা সে নিজে। তখন তার মনে প্রচণ্ড আগ্রহ বাড়তো আল্লাহর সে নির্দেশাবলীর অনুসরণে| তখন আমূল বিপ্লব শুরু হতো শুধু তার মন-জগতে নয়, বরং সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে। একারণেই নবীজীর আমলে সাহাবাগণ এ কিতাব পড়তে পড়তে অঝোরে কাঁদতেন। আল্লাহর ভয়ে কেঁপে উঠতো তাদের ক্বালব। পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক মোমেনের সে বাস্তব চিত্রটি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে, “ঈমানদার হচ্ছে একমাত্র তারাই, যাদের ক্বালব ভয়ে কেঁপে উঠে যখন তাদেরকে আল্লাহর নাম শুনানো হয়। এবং যখন তাদেরকে আল্লাহর আয়াত তেলাওয়াত করে শুনানো হয় তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায়। এবং তারা তাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপর ভরসা করে।” –সুরা আনফাল, আয়াত ২। -“এবং তারাই হচ্ছে সত্যিকার ঈমানদার। তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান, রয়েছে মাগফেরাত এবং মর্যাদাপূর্ণ রিযিক।” –সুরা আনফাল, আয়াত ২।      

তাই ইসলামের বিজয় বাড়াতে হলে কোরআনের চর্চা বাড়াতে হবে। তবে কোরআন চর্চার অর্থ নিছক কোরআন পাঠ নয়, বরং সেটি হলো কোরআনের জ্ঞানের গভীর আত্মস্থ্যকরণ। এজন্য সম্ভব হলে কোরআনের ভাষা আরবীকেও শিখতে হবে। কারণ কোরআনের অনুবাদ পাঠে হৃদয় ভয়ে কেঁপে উঠবে -সে সম্ভবনা কম। কারণ, যিনি অনুবাদ করেন তিনি তো মানুষ। অথচ কোরআনের রচিয়েতা তো মহান আল্লাহ। আল্লাহর ভাষা, ভাব ও বর্ণনাভঙ্গির অনুবাদ কি কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব? কোরআনের মধ্যে যে ইমোশনাল ফোর্স তার অনুবাদ কোন মানুষই করতে পারে না। এটি সম্ভব নয় বলেই বহু আলেম কোরআনের অনুবাদকে অসম্ভব গণ্য করেছেন। যারা কোরআন বুঝায় আগ্রহী, তাদের সে কাজটি করতে হবে নিজ উদ্যোগে আরবী ভাষা শিক্ষার মধ্য দিয়ে। মহান আল্লাহতায়ালার কথা সরাসরি বুঝার খাতিরে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, সূদান, লিবিয়া, মরক্কো, মালিসহ ২০টির বেশী দেশের মানুষ নিজেদের মাতৃভাষাকে দাফন করে আরবীকে নিজেদের ভাষা বানিয়ে নিয়েছিল। মহান আল্লাহতায়ালার লক্ষ কোটি সৃষ্টি, কিন্তু কোন সৃষ্টিই তাঁর বানী শোনায় না। শোনায় একমাত্র পবিত্র কোর’আন। ঈমানদার কি তার মহান রাব্বুল আলামীনের পবিত্র ও অমূল্য হিদায়েতের বানি বুঝায় অনাগ্রহী হতে পারে? তাই পাশ্চত্য দেশে যারাই ইসলাম কবুল করে, তাদের অনেকে আরব দেশে ছুটে যায় আরবী ভাষা শিখতে। কারণ, ভাল মুসলিম হতে হলে কোর’আন বুঝার বিকল্প নেই। তেমনি কোর’আনের বিকল্প নাই ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদকে শক্তিশালী করার। দলীয় নেতা-কর্মী, দলীয় তহবিল বা দলীয় অফিসের সংখ্যা বাড়িয়ে এ কাজ সম্ভব নয়। অথচ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অবহেলা হয়েছে কোরআন ও কোরআনের ভাষা বুঝার কাজে। ইসলামী দলগুলি ব্যস্ত শুধু কর্মী সংখ্যা বাড়াতে, কোর’আনের জ্ঞান বাড়াতে নয়। অন্যদিকে মোল্লা-মৌলবীগণ ওয়াজ করছেন, কোর’আন না বুঝে পড়লেও সওয়াব। অথচ না বোঝায় মহান আল্লাহতায়ালার সে পবিত্র ঘোষণাটির যে চরম অবাধ্যতা হয় সে হুশ কি আছে। বলা হয়েছেঃ “নিশ্চয়ই আমরা আয়াতকে বিষদ ভাবে বর্ণনা করেছি যাতে সেগুলি বুঝায় তোমরা নিজেদের আক্বলকে কাজে লাগাতে পারো।” –(সুরা হাদিদ, আয়াত ১৭)। মহান আল্লাহতায়ালার যা হুকুম সেটি তো বান্দার উপর ফরজ। অতএব প্রশ্ন হলো, না বুঝে তেলাওয়াতে কি বুঝার ফরজ আদায় হয়? হয় কি জাহেল থাকার পাপমুক্তি?   বাংলাদেশের নাগরিকগণ বিদেশী ভাষা যে শিখছে না -তা নয়, শিখছে চাকুরি-লাভ ও ব্যবসায়ীক স্বার্থে। ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে তাদের অনেকে মাতৃভাষাও ভূলে যা্চ্ছে। তাদের কাছে বিদেশী ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব পাচ্ছে নিছক পার্থিব স্বার্থ হাছিলের লক্ষ্যে। অথচ যে ভাষাটি শেখার সাথে জড়িত অনন্ত-অসীম জীবনে সফলতা লাভের বিষয়, সেটিই গুরুত্ব পাচ্ছে না!

 

ইসলামের বিজয়ে নির্বাচন কতটা সহায়ক?   

অনেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে ইসলামের বিজয়ের একমাত্র পথ মনে করছে। তাই নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা খরচেও তাদের আপত্তি নেই। অথচ এত টাকা দিয়ে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে খোলা যেত, কোরআন ও আরবী ভাষা শিক্ষার শিক্ষাকেন্দ্র। খোলা যেত টিভি কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠা করা যেত বহু পত্রিকা। পৌঁছে দেওয়া যেত লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে বীনামূল্যে কোরআনের অনুবাদ ও ইসলামের উপর লেখা বই। এভাবেই আসতে পারতো জ্ঞানের জোয়ার, সৃষ্টি হতে পারতো চেতনা রাজ্যে মহাবিপ্লব। আর এমন বিপ্লব আসলে সে বিপ্লবী মানুষটি ইসলামের বিজয় আনতে শুধু রায়ই দিত না, অর্থ, শ্রম, সময় -এমনকি প্রাণও দিত। এভাবে প্রতিটি ব্যক্তি পরিণত হতে পারতো সমাজ বিপ্লবের শক্তিশালী পাওয়ার হাউস। নবীজী (সাঃ) তার ১৩ বছরের মক্কী জীবনে তো সে কাজটিই করেছেন। একটি ক্ষুদ্র বীজের মধ্যে যেমন লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের বিশাল বটবৃক্ষ, তেমনি এক শিশুর মনে লুকিয়ে থাকে সমাজ বিপ্লবের বিশাল পাওয়ার হাউস। ইসলামের বিজয়ের লক্ষ্যে যেটি প্রয়োজন সেটি হলো, সে পাওয়ার হাউসগুলো সক্রিয় করা। আর সে কাজটি হতে পারে একমাত্র কোর’আনের জ্ঞান। কোর’আনই হলো মহান আল্লাহর দেওয়া একমাত্র সফটওয়ার যা বিস্ময়কর ভাবে ক্ষমতা বাড়ায় ব্যক্তির। এ সফটওয়ার ছাড়া মানুষ পশু থেকে সামান্যই উপরে উঠতে পারে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বরং নীচে নামে। ঈমান না থাকায়, মানবতা যে কতটা বর্বর ভাবে পশুর চেয়েও নীচে নামতে পারে সে স্বাক্ষর তো আজকের ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, কাশ্মীর, বসনিয়া, চেচনিয়া। কুকুর-বিড়ালের মুখে ভাষা থাকলে ফিলিস্তিনের গাজাতে যা হচ্ছে তারাও তার নিন্দা জানাতো। কিন্ত সে সামর্থ্য অধিকাংশ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের নেই। মুখে ভাষা থাকলে অন্ততঃ কোন পশুই শিশু ও বেসামরিক নারীপুরুষ হত্যাকারি ইসরাইলীদের সমর্থন করতো না। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন সেটিও করছে। তাদের সে ব্যর্থতার কারণ, তাদের মগজে যে সফটওয়ারটি কাজ করছে সেটি শয়তানি সফটওয়ার। মানবতার বেড়ে উঠার বিরুদ্ধে এটি এক প্রচণ্ড বাধা। অথচ কোরআনের গুণে আরবের নিরক্ষর মরুবাসী ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হতে পেরেছিলেন।

ইসলামে সবচেয়ে বড় পাপ হলো অজ্ঞতা। জাহেলদের পক্ষে ঈমানদার হওয়া অসম্ভব। অথচ সে পাপটি ছেয়ে আছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। এবং সে অজ্ঞতা অতি প্রকটতর হলো ইসলাম ও কোরআনকে নিয়ে। এমন অজ্ঞতায় আর যাই হোক কোন সমাজ-বিপ্লব হয় না। তখন সমাজে বেড়ে উঠে না শান্তি, বিবেকবোধ ও মানবতা। যে কোন সমাজ বিপ্লবের বড় বড় মূল কাজগুলি হয় জনগণের কাতার থেকে, দেশের প্রশাসন থেকে নয়। এবং সেটি জ্ঞানবিতরণ ও ব্যাপক সমাজসেবার মধ্য দিয়ে। ইসলামী আন্দোলন তখন এক ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। বুদ্ধিবৃত্তির মূল কাজটি তো সরকারের নয়, দেশের আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তিদের। অতীতে কোন কালেই এটি কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে হয়নি। তাফসির, ইসলামি দর্শন ও ফিকাহর ন্যায় ক্ষেত্রে যে বিশাল জ্ঞানভান্ডার, সেগুলী তো গড়ে উঠেছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় ১৬ কোটি মুসলমানের দেশে এ কাজটি হয়নি। নবীজী (সাঃ) কোরআনের জ্ঞান বিতরণ করতে গিয়ে মার খেয়েছেন, তাইয়েফে পাথরের আঘাতে রক্তাত্ব হয়েছেন, বহু সাহাবী শহিদও হয়েছেন। অথচ বাংলাদেশে বহু আলেম অর্থ না দিলে ঘর থেকে বেব হন না এবং ওয়াজ করেন না। বুদ্ধিবৃত্তির এ ময়দানটিতে প্রবল ভাবে কাজ করছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তি। তাদের কারণেই বার বার নির্বাচনী বিজয় ঘরে তুলছে দেশের সেক্যুলার রাজনৈতিক দলগুলি। এবং সে বিজয়ের ফলেই অসম্ভব হচ্ছে ইসলামের বিজয়।

নির্বাচনে যেটির প্রতিফলন ঘটে, সেটি তো জনগণের চলমান চেতনা বা বিশ্বাসের প্রতিফলন। যে দেশের মানুষ কোরআন বুঝার সুযোগই পেল না, জানতে পারলো না ইসলামের সামাজিক, রাজনৈতিক বা মানবিক কল্যাণের দিক, -তারা ইসলামের পক্ষে ভোট দিবে সেটি কি আশা করা যায়? গণতন্ত্রে নিয়ম হল, নির্বাচনে জিততে হলে বিজয় আনতে হবে ভোটগ্রহণের আগেই। সে বিজয়টি আনতে হয় মানুষের চেতনা-রাজ্যে ও রাজপথে। আর সে জন্য ব্যাপক ভাবে জিততে হয় বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। ইসলাম-বিরোধী সেকুলার পক্ষটি সে বিজয় এনেছে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বহু আগেই। ১৯৪৭ সালে তাদের ঘটেছিল সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ পরাজয়। এর পর তারা শুধু জিতেই চলেছে। ১৯৭০ য়ের নির্বাচনে ভোট গ্রহণের বহু আগেই তারা রাজপথ দখলে নিয়েছিল। তারা পাকিস্তানপন্থি ও ইসলামপন্থিগণকে হটিয়ে দিয়েছিল মিডিয়া ও রাজপথ থেকে। বুদ্ধিবৃদ্ধির ময়দানে এবং সে সাথে রাজপথে এমন একটি বিপ্লব আনার আগে নির্বাচনে যাওয়ার অর্থ নিজেদের শ্রম, অর্থ, সময় ও মেধার অপচয়। এমন প্রকাণ্ড অপচয়ে একটি আন্দোলনের শুধু দুর্বলতাই প্রকাশ পায় না, ক্ষতির অংকটিও বাড়ে। আর বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের সাথে সেটিই হচ্ছে।  

সমাজ-বিপ্লবের এ সহজ বিষয়টি মার্কসবাদীরা বুঝেছিল। তাই রাশিয়া, চীন, কিউবার ন্যায় কোন দেশেই তারা নির্বাচনের রাস্তা ধরেনি। বরং ধরেছিল সমাজ বিপ্লবের ধারা। এ সত্যটি বুঝেছিল ইরানের ইমাম খোমিনী ও তাঁর অনুসারিরাও। যে কোন সমাজ-বিপ্লবের ন্যায় ইসলামি সমাজ বিপ্লবেরও মূল হাতিয়ার যে জ্ঞান-সম্পদ বা বুদ্ধিবৃত্তি সেটি নবীজী (সাঃ) নিজ হাতে শিখিয়ে গেছেন। নবীজী (সাঃ) তার নবুয়ত জীবনের প্রথম ১৩টি বছর ধরে মক্কায় শুধু একাজটিই করেছেন। এ সময় তিনি কোন রাজনৈতিক সংঘাত বা প্রতিযোগিতায় অংশ নেননি। নীরবে নির্যাতন সয়েছেন, এবং সে সাথে অবিরাম জ্ঞান বিতরণের কাজ করেছেন। আর সে জ্ঞানের আলোকে ঈমানদারদের চরিত্র গড়েছেন। মক্কী জীবনে সে ১৩ বছরে তিনি দেড় শতের বেশী মানুষের বেশী তৈরী করতে পারেননি। কিন্তু তারাই ছিলেন ভবিষ্যৎ মুসলিম উম্মাহর মূল ইঞ্জিন। তারাই ছিলেন মানব জাতির ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষ। আগুণের উপর শুইয়ে দিয়েও কাফেরগণ তাদের ঈমান টলাতে পারেনি। অতি মুষ্টিমেয় হয়েও নিছক গুণের কারণে তারা জন্ম দিয়েছিলেন ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। বিশ্বের ১৫০ কোটি মুসলমানের কাছে আজও এটিই শ্রেষ্ঠ গর্বের। ফেরেশতাদের চেয়েও তারা শ্রেষ্ঠতর পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। আর তার কারণ ছিল কোরআনী জ্ঞান। জ্ঞানচর্চার কারণে মক্কার সে দরিদ্র মানুষদের প্রত্যেকে পরিণত হযেছিলেন জগত বিখ্যাত আলেমে। অথচ আজ বাংলাদেশের শত শত মাদ্রাসায় আজীবন জ্ঞানচর্চার পরও সে মাপের কোন জ্ঞানী ব্যক্তি গড়ে উঠছে না।

কারণ এসব মাদ্রাসাগুলোতে ফিকাহ, হাদীস বা বিভিন্ন মাজহাবী কিতাব গুরুত্ব পেলেও গুরুত্ব পায়নি কোরআন চর্চা। এবং সেগুলি পড়েন নিজেদের ফেরকা বা মজহাবকে অন্যদের মোকাবেলায় সেরা প্রমাণ করার গরজে। অথচ কোরআন হল চিকিৎসা বিজ্ঞানের কিতাবের ন্যায় আমল-ভিত্তিক কিতাব। রোগ চিকিৎসায় হাসপাতালে না বসে শুধু বই পড়ে ডাক্তারি শেখা যায় না। তেমনি নেক আমল ও জ্বিহাদে না নেমে কোরআন শিক্ষাও হয় না। তাই কোরআন চর্চা নিছক মাদ্রাসায় বসে হয় না। এজন্য রাজনীতি, সমাজনীতি, মিডিয়া, ব্যাবসা-বাণিজ্যসহ জ্বিহাদেও নামতে হবে। অথচ বাংলাদেশে আলেমদের দ্বারা সেটি হচ্ছে না। আরো সমস্যা হল, বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের মাঝে সে ব্যর্থতা নিয়ে উপলদ্ধিও নেই। ফলে বার বার ব্যর্থ হলেও নির্বাচনের পথ ছাড়তে তারা রাজী নয়। অর্ধ বা অল্প শিক্ষিত আলেম বা দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে লাঠিয়ালের কাজ চলে, কিন্তু তা দিয়ে সমাজ-বিপ্লব হয় না। অথচ তাদের অধিক মনযোগ মূলতঃ তাদের সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে।

বাংলাদেশের ইসলামি সংগঠনগুলোর মূল ব্যস্ততা কর্মীদের আনুগত্য বাড়াতে। সে সাথে তাদের উপর আরেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রূপে চেপেছে অর্থসংগ্রহের বিষয়টি। দলীয় কর্মীদের গুণাগুণ যাচায়ে আনুগত্য, ভোটজোগার ও অর্থসংগ্রহের সামর্থ্য যতটা গুরুত্ব পেয়েছে ততটা জ্ঞানার্জন পায়নি। ফলে দিন দিন বেড়ে উঠেছে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে ব্যাপক শূণ্যতা। ফলে দেশে ইসলামী পক্ষ থেকে পত্র-পত্রিকায় বের হলেও তাতে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে লেখার লোক নেই। তাদের পত্রিকায় লিখছে চিহ্নিত সেক্যুলারগণ। একই অবস্থা হয়েছিল ১৯৪৭-পরবর্তী মুসলিম লীগের। তারাও পত্রিকা বের করতো, কিন্তু সেগুলি দখলে নিত বামপন্থি সেক্যুলার লেখকেরা। ফলে ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের ইসলামি লেখকদের প্রচেষ্টায় প্যান-ইসলামী চেতনার যে প্রবল জোয়ার শুরু হয়েছিল সেটি দ্রুত ভাটার টানে সহসায় হারিয়ে যায়। ফলে একাত্তরে ভেঙ্গে যায় পাকিস্তান। দেহের পুষ্টির জন্য নিয়মিত খাদ্যগ্রহণ যেমন জরুরী, বুদ্ধিবৃত্তিক সুস্থ্যতা টিকিয়ে রাখার জন্য তেমনি অপরিহার্য হলো অবিরাম জ্ঞানচর্চা। একাজ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে হাদীসে বলা হয়েছে, সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে সামান্য ক্ষণের জ্ঞান-চর্চাও শ্রেষ্ঠতর। বাংলাদেশে জ্ঞানচর্চা মাদ্রাসাগুলোতে যেমন হয়নি, তেমনি হয়নি ইসলামি সংগঠনের দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝেও।            

রাজনীতির বাইরে বাংলাদেশে বিশাল জনশক্তি রয়েছে তাবলিগ জামাতের। অথচ তারা জ্ঞানচর্চার যে রেওয়াজ চালু করেছেন সেটি ইসলামের বিজয়ের পথে মারাত্মক বাধা। তারা যতটা ফাজায়েলে আমল পড়তে ব্যস্ত ততটা ব্যস্ত নয় কোরআন বুঝতে। মসজিদে মসজিদে তারা যে অসংখ্য তা’লীমী মজলিস করে সেখানেও কোরআনের আয়াত পড়ে শুনানো হয় না। বড় জোর কিছু হাদীস পাঠ করে শুনানো হয়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে পাঠ করা হয় ফাজায়েলে আমল। বক্তারা দাড়িয়ে যে ওয়াজ করেন তাতেও শুনানো হয় না কোরআনের আয়াত। অথচ, নবীজী (সাঃ)-র সূন্নত হল তিনি তাঁর বক্তৃতায় বেশীর ভাগ জুড়ে কোরআনের আয়াত শুনাতেন। নিজের কথা সামান্যই বলতেন। কারণ, মহান আল্লাহর চেয়ে আর কে তাঁর দ্বীনকে উত্তম ভাবে বুঝাতে পারেন? ফলে নবীজী (সাঃ)র জুম্মার দুটি খোতবায় প্রায় সবটুকু জুড়ে থাকতো পবিত্র কোরআনের আয়াত। অপরদিকে তাবলিগী জামাতের লোকেরা দাওয়াত দেয় নিছক নামাযের দিকে। অথচ আল্লাহর নবী (সাঃ) ডেকেছেন পরিপূণ ইসলামের দিকে। সেখানে যেমন নামায-রোযা ছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চা, সমাজসেবা, হিযরত এবং জিহাদও ছিল। অথচ তাবলিগ জামায়াতের নেতা-কর্মীদের শেষাক্তগুলীতে কোন মনযোগই নাই।

অনৈক্যে অনিবার্য হয় আযাব

ইসলামের বিজয়ের লক্ষ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মুসলিমদের একতা। একতা ছাড়া কোন আদর্শের বা দলেরই বিজয় আসে না। অনৈক্য শুধু পরাজয়ই আনে না, আল্লাহতায়ালার আযাবও আনে। সে হুশিয়ারিটি ধ্বনিত হয়েছে সুরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছেঃ “সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করে দেয়ার পরও যারা বিভক্ত হলো এবং মতভেদ গড়লো তাদের জন্য রয়েছে কঠিন আযাব।”  অথচ আজ মুসলিম উম্মাহ ভাষা, বর্ণ, গোত্র, ভূগোল, মাযহাব, ফেরকার নামে মতভেদ ও বিভক্তিতে জর্জরিত। এবং সে বিভক্তি নির্মূলের বদলে সেগুলি বাঁচাতে গড়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় দেয়াল এবং তা নিয়েই আজ দেশে দেশে বিজয় উৎসব। ফলে ঘিরে ধরেছে প্রতিশ্রুত আযাব। কথা হলো, একতার প্রতিষ্ঠা কি করে সম্ভব? সেটি সম্ভব নিয়তের পরিশুদ্ধির মধ্য দিয়ে। নিয়ত যদি হয় একমাত্র আল্লাহর দ্বীনের বিজয়, তখন আর একতার পথে বাধা থাকে না। একই গন্তব্যস্থলের দিকে সবাই হাটা শুরু করলে পথটিও তখন অভিন্ন হয়। ভিন্নতা তো আসে তখন, যখন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যটি আলাদা আলাদা। একসাথে বহু হাজার নবী প্রেরীত হলেও তাদের মাঝে কোন বিরোধ হত না। কোন দলের সদস্যপদ দিয়ে তাদের বাধার প্রয়োজন হত না। কারণ তাঁরা তো কাজ করতেন এক অভিন্ন লক্ষ্যে। সেটি একমাত্র আল্লাহকে খুশি করতে, এবং তারই দ্বীনের বিজয়ে। সে লক্ষ্যে তাঁরা তো অপর মুসলিম ভাইয়ের সাথে একতা গড়াকে ফরজ ইবাদত মনে করতেন। একই পরিবারের ভাই-বোনদের বাঁধতে কি বিশেষ কোন সংগঠনের সদস্য করার প্রয়োজন পড়ে? আল্লাহপাক এক মুসলমানকে অন্য মুসলমানের ভাই বলেছেন। নিজের সে ভাইটি যদি ভিন্ন ঘর, ভিন্ন দল, ভিন্ন দেশ বা ভিন্ন মহাদেশে বাস করে তবুও তার সাথে মিলিত হওয়ার আগ্রহটি হবে অতি প্রবল। আর সে প্রবল আগ্রহটিই হলো তার ঈমান যাচায়ের মাপকাঠি যা বলে দেয় তার ঈমানের গভীরতা। যে ব্যক্তির মধ্যে অন্য শহর, অন্য ভাষা, অন্য দল, অন্য দেশ ও অন্য মাজহাবের মুসলমান ভাইয়ের প্রতি প্রবল ভালবাসা নাই, বুঝতে হবে তার মধ্যে ঈমানের গভীরতাও নাই। ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের বন্ধনটি মজবুত করতে কি কোন দলীয় সদস্যপদের প্রয়োজন পড়ে? মুসলমানের ফরয এবাদত তো মুসলমানদের একতাবদ্ধ করা, দল গড়া নয়। ফিরকা গড়াও নয়। দল গড়া যেতে পারে শুধু সে ঐক্যকে শক্তিশালী করার স্বার্থে। কিন্তু দল যখন দলাদলি ও বিভক্তির মাধ্যমে পরিণত হয় তখন সেটি ফিতনায় পরিনত হয়। অথচ মুসলিম বিশ্বে আজ সেটিই হচ্ছে। ফলে দলের সংখ্যা বাড়লেও ঐক্য বাড়েনি। নবীজী (সাঃ)-এর আমলে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কোন দল ও দলের সদস্য-পদের প্রয়জন পড়েনি। অথচ এরপরও তারা জন্ম দিতে পেরেছিলেন সীসা ঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত একতা গড়তে। ইমাম খোমিনী দল ছাড়াই বিরাট বিপ্লব করেছেন। আর বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা দলের পর দল গড়ছে, কিন্তু ছিটকে পড়ছে ইসলামের বিজয় অর্জন থেকে।   

বাংলাদেশের মুসলমানদের অনৈক্যের মূল কারণ, মাজহাব, ফিরকা ও দলগত বিভক্তি। বিভক্ত এ মুসলমানেরা চায় নিজ দল, নিজ ফিরকা, নিজ মাজহাবের বিজয়। ফলে আল্লাহর আইন আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হলেও তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতনে হাত পড়লে হাজার হাজার মাদ্রাসা শিক্ষক ঢাকার রাস্তা গরম করে তোলেন। অথচ আল্লাহর আইন অপমানিত হলেও তা নিয়ে তাদের সামান্যতম ভ্রুক্ষেপ নেই। সংসদে বসেও ইসলামি দলের এমপিগণও অতীতে দাবী তোলেন নি আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা নিয়ে। খেলার মাঠে বা খাওয়ার মজলিসে নানা মাজহাব, নানা দল ও নানা ফিরকার মুসলমান একত্রে বসতে পারলেও তারা একত্রে বসতে পারে না বা কাজ করতে পারে না আল্লাহর দ্বীনের বিজয় নিয়ে। মুসলমানদের জন্য এ এক ভয়ংকর ব্যর্থতা। আর এ ব্যর্থতা তাদের ব্যর্থতা বাড়াবে আখেরাতেও। কারণ, রোজ হাশরের বিচার দিনে এ প্রশ্ন তো উঠবেই, আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে বা উম্মাহর একতার প্রতিষ্ঠায় কতটুকু ছিল তার নিজস্ব প্রচেষ্টা বা কোরবানী? মহান আল্লাহর দরবারে সেদিন তার সাথে কোন দলীয় বা মাজহাবী নেতা খাড়া হবে না, থাড়া হতে হবে তাকে একাকীভাবেই। সেদিন মহান আল্লাহতায়ালা তার উপরই বেশী খুশী হবেন যিনি একমাত্র তারই বিধানকে বিজয়ী করতে সর্বোচ্চ কোরবানী পেশ করেছেন এবং চেষ্টা করেছেন মুসলিম উম্মাহকে একতাবদ্ধ করতে।

 

ফরজ হলো একতা গড়া

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অতি পছন্দের হলো তাঁর নিজ বাহিনীর বিজয়। এবং অতি অপছন্দের হলো, তাঁর নিজ বাহিনীতে বিভক্তি। কারণ, বিভক্তি অসম্ভব করে বিজয়কে। ইতিহাস তো সেটিই প্রমাণ করে। তাই বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় আনতে হলে দলগত, ফিরকাগত বা মাজহাবগত বিভক্তির প্রাচীরকে ভাঙ্গতেই হবে। আঁকড়ে ধরতে হবে একমাত্র কোরআনকে। মহান আল্লাহপাক সেটিই বলেছেন পবিত্র কোরআনে, “এবং তোমরা সকলে মিলে আঁকড়ে ধর কোরআনকে, এবং বিভক্ত হয়ো না।”-সুরা আল-ইমরান। একতা স্থাপনের এটিই আল্লাহর নির্দেশিত প্রেসক্রিপশন। মুসলিম সমাজের বর্তমান বিভক্তি দেখে এ কথাটি নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, মুসলমানেরা আল্লাহর সে প্রেসক্রিপশনের সাথে যথাযথ আচরণ করেনি। বরং সেটির সাথে প্রচন্ড গাদ্দারিই করেছে। কোরআনকে আঁকড়ে ধরার অর্থ এ মহান কিতাবকে শক্তভাবে ধরে বার বার চুমু খাওয়া নয়, বরং তা থেকে জ্ঞান লাভ ও সে জ্ঞানের পূর্ণ প্রয়োগ। অথচ মুসলমানদের পক্ষ থেকে অতি অবহেলা হয়েছে উভয় ক্ষেত্রেই। না হয়েছে কোরআন থেকে যথাযথ জ্ঞান-লাভ, না হয়েছে কোরআনী হুকুমের প্রয়োগ। ফলে সাফল্য ও বিজয় না বেড়ে বেড়েছে পরাজয় ও অপমান। অথচ কোরআনই হল সমগ্র মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ নিয়ামত, – স্বর্ণ, তেল, গ্যাস বা অন্য কোন সম্পদ নয়। একমাত্র এ নিয়ামতটি পৌঁছাতেই মহান আল্লাহতায়ালা ২৩ বছর ধরে এ ধরাধামে তাঁর মহান ফিরেশতা জিবরাইল (আঃ)কে পাঠিয়েছেন, অন্য কোন সম্পদ পৌঁছাতে নয়। এ দানের বরকতেই আরবের নিঃস্ব ও বর্বর মানুষেরা শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হতে পেরেছিলেন। পেয়েছিলেন বিজেয়ের পর বিজয়ের সম্মান। কোরআনের সে ক্ষমতা আজও বর্তমান। সে কোরআনি শক্তির বিস্ফোরণ ঘটতে পারে যে কোন মুসলিম দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও। আর তখন বাংলাদেশের মানুষও পেতে পারে অভূতপূর্ব বিজয় ও ইজ্জত। একমাত্র এ পথেই বিলুপ্ত হতে পারে দূর্নীতিগ্রস্ত দেশ হওয়ার অপমান। তবে সে জন্য দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে খোদ বাংলাদেশের মানুষকে। কারণ আল্লাহর এ ভূমিতে এ দায়ভার একমাত্র তাদেরই। এবং সে দায়িত্বটি পালিত হতে পারে কোরআনী প্রেসক্রিপশনের পূর্ণ অনুসরণের মধ্য দিয়ে। আর ইসলামকে বিজয়ী করার এটিই হলো  একমাত্র পথ। ১১/০১/০৯, নতুন সংযোজন ৪/৩/২০১৯     

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *