এক বাকশালী বুদ্ধিজীবীর অসভ্য মানস ও রণহুংকার প্রসঙ্গ

image_pdfimage_print

এটি কি বুদ্ধিজীবী বা শিক্ষকের ভাষা?

হযরত আলী (রাঃ)র মহামূল্যবান বহু উক্তির মাঝে আরেকটি অতি মূল্যবান উক্তি হলোঃ “মানুষের ব্যক্তিত্ব তার জিহবাতে”। অর্থাৎ যখন সে জিহ্বা নড়ায় তখন প্রকাশ পায় তার ব্যক্তিত্ব । তাই  সভ্য বা অসভ্য মানুষের পরিচয়টি দেহের অবয়বে ও পোষাকপরিচ্ছদে ধরা পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিতেও নয়। ধরা পড়ে মুখের কথা ও লেখনিতে। লেখনির মধ্য দিয়েই কথা বলে ব্যক্তির চেতনা ও ঈমান। মানব ইতিহাসে ভয়ানক অপরাধগুলি শুধু মারণাস্ত্র দিয়ে হয়নি, হয়েছে মুখের ভাষা ও লেখনি দিয়ে। অপরদিকে কথা ও লেখনি দিয়েই সংঘটিত হয়েছে সত্যপ্রচার, সত্য-প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যার প্রতিরোধের ন্যায় বড় বড় মহান কাজ। জান্নাত লাভের মূল কাজটির শুরুও তো হয় মুখের কথা দিয়েই। সেটি মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূল ও তাঁর কিতাবের প্রতি বিশ্বাসভরা কালেমা পাঠ করে। তেমনি জাহান্নামে পৌঁছার জন্য জিহ্বার পাপই যথেষ্ট। দেহের এই ক্ষুদ্র অঙ্গ দিয়েই জঘন্য পাপীরা মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দেয়। আল্লাহতায়ালা, তাঁর রাসূল ও তাঁর দ্বীনকে অস্বীকার করা, অপমান করা বা গালী দেয়ার ন্যায় অপরাধে কি কোন মারাণাস্ত্র লাগে? মুখের কথা ও লেখনি তো সেজন্য যথেষ্ট। তাই রোজ হাশরের বিচার দিনে পাল্লায় তোলা হবে ব্যক্তির কথা ও লেখনিকেও। এমন কি সভ্যদেশের আদালতেও শুধু অস্ত্র ও অর্থের ব্যবহারটাই বিচারে আনা হয় না, বিচারে আনা হয় মুখের ভাষা ও লেখনির প্রয়োগকেও।

মিথ্যাচার ও অশ্রাব্য গালিগালাজ কখনোই চরিত্রের অলংকার নয়। সেটি বরং নিখুঁত পরিমাপ দেয় সে কতটা অসভ্য, ইতর ও অপরাধী। সকল অপরাধের শুরু হয় মিথ্যাচার ও গালিগালাজ দিয়ে। মানব ইতিহাসের বড় বড় বিপর্যয়ের কারণগুলি নিছক যুদ্ধবিগ্রহ, হত্যা, চুরি-ডাকাতি ও ব্যাভিচার নয়। বরং বহু বিপর্যেয়ের কারণ মিথ্যাচার। এবং সত্য-পরায়ন মানুষদের চরিত্র হনন। সত্যকে বেড়ে উঠা ও তার প্রতিষ্ঠাকে তো এভাবেই রুখা হয়। মহান নবীজী (সাঃ)র বিরুদ্ধে মক্কার কাফেরগণ তো সে দুষ্কর্মটিই বেশী বেশী করেছে। মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ এ মানুষটিকে তারা পাগল, যাদুকর, মিথ্যাচারি, সমাজের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারি বলে গালিগালাজ করেছে। আজকের কাফের ফাসেক ও মুনাফিকদেরও তো সেটাই রীতি। এরূপ মিথ্যাচারিদের কারণেই সামাজিক শান্তি লংঘিত হয় এবং সাধারণ মানুষও সত্যের সৈনিকদের বিরুদ্ধে সংহিস হয়ে উঠে। নবী-রাসূলের বিরুদ্ধে তো সেটিই ঘটেছে। নবীজী (সাঃ) এজন্যই মিথ্যাচারকে সকল পাপের মা বলেছেন। অস্ত্রে দেহ খুন হয়, আর মিথ্যাচারে খুন হয় চরিত্র। সেটি হয় কথা ও লেখনীর মধ্য দিয়ে। তাই রাষ্ট্রে শুধু চুরি-ডাকাতি, হত্যা ও ধর্ষণ রোধে আইন থাকলে চলে না, কঠোর আইন থাকতে হয় মিথ্যাচারির শাস্তি বিধানেও। মহান আল্লাহতায়ালার বিধানে এটি ভয়ানক অপরাধ। এজন্যই হত্যা, চুরি-ডাকাতি বা ব্যভিচারীর শাস্তির পাশাপাশি পবিত্র কোরআনে চরিত্র হননকারি মিথ্যাচারীর বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তি ঘোষিত হয়েছে।

 

মুন্তাসির মামুনের অপরাধ

সম্প্রতি এক গুরুতর অপরাধ করেছেন আওয়ামী ঘরানার প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী মুন্তাসির মামুন। তার একটি প্রবন্ধ গত ৩১ অক্টোবর তারিখে দৈনিক জনকন্ঠে ছাপা হয়েছে। মানসিক ভাবে তিনি যে কতটা অসুস্থ্য ও অপরাধী -সেটিই প্রকাশ পেয়েছে তার সে প্রবন্ধে। উক্ত নিবন্ধে বেরিয়ে এসেছে তার অপরাধী মনের বিষাক্ত আবর্জনা। গোখরা সাপের ন্যায় তার অসুস্থ্য মনটি কানায় কানায় বিষপূর্ণ। তবে সে বিষ শুধু ইসলাম ও বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে নয়, বিএনপিসহ সকল বিরোধী দলের বিরুদ্ধেও। উক্ত প্রবন্ধে তিনি জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের “পাকি জারজ” বলেছেন। এটি কি কোন সভ্য মানুষের ভাষা? কোন শিক্ষিত মানুষ কি এরূপ ভাষায় কথা বলে? এতো অতি অসভ্য ও ইতর মানুষের ভাষা। প্রশ্ন হলো এরূপ ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হয় কি করে?

অথচ এ সত্য কি অস্বীকারের উপায় আছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে পথঘাটে মানুষের লাশ তখনই বেশী বেশী পড়ে যখন দেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের হাতে যায়। সেটি যেমন মুজিবামলে দেখা গেছে, তেমনি হাসিনার আমলেও। মুজিবের রক্ষিবাহিনীর হাতে মারা গেছে ৩০—৪০ হাজারের বেশী নিরীহ মানুষ। শাপলা চত্বরের সমাবেশে হাসিনা সরকারের হাতে হতাহত হয়েছে বহুহাজার। র‌্যাব, পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হাতে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। বহুনেতা ইতিমধ্যে খুন হয়েছেন, গুম হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন। কিন্তু কোন হত্যার কি বিচার হয়েছে? হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধেও মুন্তাসির মামূনের দারুন ক্ষোভ। ক্ষোভের কারণ, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কথিত  অত্যাচারের  নাকি বিচার হয়নি। আরো অভিযোগ, শেখ হাসিনা কেন সরকার বিরোধীদের এখনো কেন নির্মূল করেনি। তার অভিযোগ, নির্মূলের সুযোগ ছিল, কিন্তু হাসিনা তা থেকে ফায়দা উঠায়নি। নিবদ্ধটিতে লিখেছেন,“দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা, শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড ছুড়ে হত্যার প্রচেষ্টা, রমনা পার্কে বোমা মেরে হত্যা কোনটার বিচারই আওয়ামী লীগ সম্পন্ন করতে পারেনি নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও অদক্ষতার জন্য।” জামায়াত ও বিএনপি নির্মূলে শেখ হাসিনার সরকারের সে ব্যর্থতার ক্ষোভ তাকে এতটা পাগল করে ফেলেছে যে ন্যূনতম ভদ্রতার ভাষাও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। তাদেরকে তিনি এতকাল রাজাকার বলতেন। এবার “পাকি জারজ” বলেছেন। বিরোধী দল নাকি রাজনীতি করছে শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতার কারণেই। তিনি লিখেছেন,“বেগম খালেদা জিয়া বাঙালীদের ওপর যে অত্যাচার চালিয়েছিলেন, যে যন্ত্রণা দিয়েছিলেন তার কোন সুরাহা আওয়ামী লীগ করেনি। করলে আজ জামায়াত-বিএনপি গণতন্ত্রবিরোধী “পাকি জারজ”দের রাজনীতি করতে পারত না।” এই হলো মুন্তাসির মামূনের ভাষা!

শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ব্যাভিচারের শাস্তি হলো পাথর মেরে হত্যা -যদি সে ব্যাভিচারি ব্যক্তিটি বিবাহিত হয়। অবিবাহিত হলে সে শাস্তিটি প্রকাশ্য জনসমাবেশে পিঠের উপর ১০০টি চাবুক। জ্বিনার শাস্তির ন্যায় কাউকে ব্যাভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তিও কঠোর। তাকেও জনতার সমাবেশে পিঠে ৮০টি চাবুক মারা হয়।এটিই মহান আল্লাহতায়ালার বিধান যা পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে। ইসলামি পরিভাষায় এটিই হলো হদুদ। এরূপ কঠোর শাস্তির কারণে রক্ষা পায় নিরাপরাধ মানুষের চরিত্র। মহা-অকল্যাণ এ বিধানের অবাধ্যতায়। সমাজে তখন আযাব নেমে আসে। আল্লাহর নাযিলকৃত এ বিধানকে যারা অনুসরণ করে না পবিত্র কোরআনে তাদেরকে কাফির, ফাসিক ও যালিম বলা হয়েছে। ঘোষিত হয়েছে “আল্লাহ যে বিধান দিয়েছেন তা দিয়ে যারা (বিচারের) হুকুম দেয় না তারাই কাফের।… তারাই যালিম। …তারাই ফাসিক বা দুর্বৃত্ত।–(সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪, ৪৫ ও ৪৭)। কোন প্রকৃত ঈমানদার কি মহান আল্লাহর এ সুস্পষ্ট কোরআনী হুকুমের অবাধ্য হতে পারে? হতে পারে কি তার শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠায় অমনযোগী?

মুন্তাসির মামূনের অপরাধ, বিএনপি ও জামায়াতের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীকে তিনি “পাকি জারজ” বলে তাদের পিতামাতার বিরুদ্ধে ব্যভিচারের গুরুতর মিথ্যা আরোপ করেছেন। উক্ত নিবন্ধে এ গালিটি একবার নয় কয়েকবার দিয়েছেন। জারজেরা তো ব্যভিচারের ফসল। মুন্তাসির মামূনের একার পক্ষে বিএনপি ও জামায়াতের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর জন্ম-ইতিহাস জানা সম্ভব নয়। ফলে না জেনে তিনি নিরেট মিথ্যাচার করেছেন। একজনের বিরুদ্ধে জ্বিনা বা ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ তুললে তাকে ৮০টি চাবুক খেতে হয়।এক্ষেত্রে মুন্তাসির মামূনের পাওনা তো বহুলক্ষ চাবুকের আঘাত। কারণ তিনি মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন বহুলক্ষ নিরাপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে। এরূপ ভয়ানক মিথ্যাচারির শাস্তি শুধু শরিয়তের বিধানই দেয় না, শাস্তি রয়েছে যে কোন সভ্য দেশের আইনেও। প্রশ্ন হলো এতবড় অপরাধী শাস্তি না পেলে বাংলাদেশের আদালতের আর কোন অপরাধীর শাস্তি দেয়ার অধিকার থাকে কি?

 

অপরিহার্য হলো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা

সভ্য মানুষ যেখানে যায় সেখানে গায়ের বস্ত্রটি পরিধান করে যায়। নইলে তাকে বিবস্ত্র বা নগ্ন বলা হয়। তেমনি ধর্মপরায়ন মানুষও সর্বত্র ধর্ম নিয়েই চলাফেরা করে। নইলে তাকে অধার্মিক বা পাপাচারি বলা হয়। মুসলমানের ধর্ম শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাত পালন নয়, শরিয়তের বিধান পালনও। তাই ইখতিয়ার বিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি যথন বাংলা বিজয় করেন তখন তিনি শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বিধানই আনেননি,এনেছিলেন শরিয়তের বিধানও।বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রথম দিন থেকেই আদালতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সে কোরআনি আইন। নবাব সিরাজুদ্দৌলার শাসন অবধি সে আইন বলবত ছিল। শরিয়তের বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য কোন দেশেই শতকরা শতভাগ মানুষের মুসলমান হওয়ার প্রয়োজন নেই। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে খোদ আরবেও মুসলমানদের সংখ্যা সে অবস্থায় পৌঁছেনি। সেরূপ অবস্থা উমাইয়া বা আব্বাসীয় আমলেও ছিল না। মুসলমানদের মাঝে বহু অমুসলমানও ছিল। তাই বলে কি শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বন্ধ ছিল? বাংলাদেশে অমুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ১০ জনের চেয়ে কম। অথচ মিশর, ইরাক, সিরিয়ার বহু মুসলিম দেশে অমুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ১০ জনের অধিক। লেবাননে এক-তৃতীয়াংশ। হাজার বছর আগে সে সংখ্যা আরো বেশী ছিল। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা কি তাতে বন্ধ থেকেছে? মুসলমানেরা যে দেশই জয় করেছে প্রথম দিন থেকেই সেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করেছে। নামায-রোযা পালনের ন্যায় প্রতিটি মুসলমানের ঘাড়ে এটিও এক অলঙ্ঘনীয় দায়বদ্ধতা।

মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের অপরাধটি শুধু এ নয় যে তারা এদেশের বুক থেকে মুসলিম শাসনকে অপসারিত করেছে। বরং মুসলিম বিরোধী ভয়ানক অপরাধটি হলো, এদেশের আদালতে থেকে শরিয়তি শাসনকেও বিলুপ্ত করেছে। সে স্থলে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের কুফরি আইন। আর বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের অপরাধটি হলো, ব্রিটিশের সে কুফরি আইনকেই আজ অবধি বলবৎ রেখেছে। শরিয়ত আইনী প্রতিষ্ঠা না করে ইসলামের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের কৃত অপরাধকেই তারা শাসতান্ত্রিক বৈধতা দিয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় গাদ্দারি আর কি হতে পারে? আর জনগণের অপরাধ হলো, শরিয়তের প্রতিষ্ঠাবিরোধী রাজনৈতীক দল ও ব্যক্তিদেরকেই তারা বার বার নির্বাচিত করছে। ফলে বাংলাদেশের ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে আল্লাহর দ্বীনের পরাজয়ের জন্য সরকার ও জনগণ উভয়ই দায়ী। এ অপরাধের দায়ভার নিয়ে কি আল্লাহর সামনে তাদের দাঁড়াতে হবে না? সে ভাবনাই বা ক’জনের? শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না থাকায় বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে শাস্তি যোগ্য অপরাধের সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে। পাল্টে গেছে আদালতের সংস্কৃতিও। ফলে মিথ্যাচার ও জ্বিনা-ব্যাভিচারের ন্যায় ভয়ানক অপরাধগুলোও বাংলাদেশের আদালতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। এতে দ্রুত বেড়ে চলেছে অপরাধীদের সংখ্যা। আর এ অপরাধীদের হাতেই অধিকৃত আজ বাংলাদেশের সরকার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ও আদালতসহ দেশের সকল প্রতিষ্ঠান। মুন্তাসির মামূন তো তাদেরই একজন। এতবড় ভয়ানক অপরাধীরা শাস্তি না পেলে খুনি, চোর-ডাকাত ও অন্যান্য অপরাধীদের শাস্তি হবে কীরূপে?

মুন্তাসির মামূনদের ন্যায় ব্যক্তিগণ যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সে দেশটি দুর্বৃত্তে বার বার বিশ্বরেকর্ড গড়বে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? কারণ এরূপ শিক্ষক থেকে ছাত্র ভাল কিছু শিখবে কি? এমন দেশের পথেঘাটে লগিবৈঠা, পিস্তল ও বোমাধারিদের সংখ্যা বাড়বে এবং তাদের হাতে মানুষ খুন হবে, গুম হবে ও নারীরা ধর্ষিতা হবে সেটিই তো স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগ ও তাদের মিত্র সংগঠনে তো এমন সহিংস জীবের সংখ্যা অসংখ্য। হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসায় জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন এক দুর্বৃত্ত ধর্ষনে সেঞ্চুরির উৎসব করেছিল। সে উৎসবের খবর বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছিল। হাসিনা সে দুর্বৃত্তের কোন বিচার করেনি। পুলিশ তার খোঁজে কোখাও তদন্তের প্রয়োজন বোধ করেনি। অথচ পুলিশের ব্যস্ততার অন্ত নেই ইসলামপন্থিদের গ্রেফতার ও ইসলামবিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করায়। এ কারণেই আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় যায় তখনই পথে ঘাটে লাশ পড়া শুরু হয়। লাগাতর গুম হওয়া শুরু হয় বিরোধী দলীয় শিবিরে। লুন্ঠিত হয় ব্যাংক ও শেয়ার বাজার। সেটি যেমন মুজিব আমলে হয়েছে তেমনি হাসিনার আমলেও হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে বিপদের বড় কারণ, অপরাধপ্রবন হিংস্রতা শুধু আওয়ামী লীগের মাঠকর্মীদের মাঝেই প্রকট নয়। হিংস্রতায় আক্তান্ত শুধু মুন্তাসির মামূনের ন্যায় আওয়ামী শিবিরে দুয়েকজন গুরুই নয়।এমন ইতর ও অসভ্য মুন্তাসির মামূনদের সংখ্যা আওয়ামী লীগ শিবিরে হাজার হাজার। এদের সংখ্যা তাদের মাঝে যে কত বেশী সেটি বুঝা যায় ইন্টারনেটে গিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই। নানা ওয়েবসাইট ও ব্লগে এরা দেশের বিবেকমান ও রুচিশীল লেখকদের এমন অশালীন ভাষায় গালীগালাজ করে যা কোন সভ্য মানুষ ভাবতেও পারে না। তখন বুঝা যায় জামায়াত-শিবির-বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে জারজ বলাটিও শুধু মুন্তাসির মামূনের একার অসভ্যতা নয়। বাংলাদেশে স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পথে এরাই বড় বাধা। আবর্জনার স্তুপে যেমন আশেপাশের সকল মশামাছি জমা হয়, আওয়ামী লীগেও তেমনি জমা হয়েছে দেশের বেশীর ভাগ অসভ্য ও ইতর মানুষ।

 

যে অসভ্যতা আওয়ামী লীগের নিজস্ব

উপমহাদেশের রাজনীতিতে সংঘাত এই প্রথম নয়। প্রথম নয় মুসলিম ইতিহাসেও। নবীজী (সাঃ)র আমলে যে রক্তাত্ব লড়াইয়ে শুরু তখনও কোন সাহাবীকে কেউ জারজ বলে গালী দেয়নি। রক্তাক্ষয়ী সংঘাত হয়েছে ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান করতে গিয়েও। সে সংঘাতে বহু লক্ষ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। হিন্দু ও মুসলিম উভয় পক্ষের লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিজেদের ভিটামাটি ত্যাগ করে সীমান্ত অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু সে সময় কি কেউ কাউকে জারজ বলে গালি দিয়েছে? কংগ্রেসের কোন হিন্দু নেতাও কি কোন মুসলিম লীগের নেতাকর্মীকে সে অসভ্য ভাষায় গালি দিয়েছে? পাকিস্তানের বিরোধী হলেও সে কাফের নেতারা মুন্তাসির মামূনের ন্যায় এতটা ইতর ও অসভ্য ছিল না। সভ্য মানুষেরা সভ্য ভাষায় মননশীল যু্ক্তি দিয়ে লড়াই করে। অশ্রাভ্য ভাষায় গালিগালাজ দিয়ে নয়। পাকিস্তান নিয়ে হিন্দুদের বিরোধ থাকলেও মুসলিম লীগের নেতাকর্মীদের জন্মের বৈধতা নিয়ে কোনকালেই তারা কোন প্রশ্ন তোলেনি। সেটি রাজনীতির বিষয়ও নয়। কিন্তু মশামাছি তো আবর্জনা খোঁজে। ফলে যে ইতর ও অসভ্য মানস নিয়ে মুন্তাসির মামূন ও তার আওয়ামী বন্ধুরা গালিগালাজ করে সেটি একান্তই তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি।তারা সেটি পেয়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় সংস্কৃতি থেকে। ১৪ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে এত ইতর স্বভাবের মানুষেরা মুসলিম দেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষাকতায় নামেনি। ফলে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হওয়ার যে রেকর্ডটি বাংলাদেশ গড়লো সেটিও সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ১৪ শত বছরের ইতিহাসে এই প্রথম।

ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে হিংস্র ও ভয়ানক শত্রু হলো মুনাফিকরা। তারা নিজেদের মুসলমান বলে জাহির করে শুধু নিজেদের আসল চেহারা গোপন রাখার লক্ষ্যে। ইসলামের ক্ষতি সাধনই তাদের মূল উদ্দেশ্য। এরাই ঘরের শত্রু। এরা নামাযে হাজির হয়, হজ করে, মাথায় টুপি পড়ে বা কালো পট্টি বাঁধে শুধু জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্য। আজ দেশে দেশে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলো হচ্ছে এরূপ মুনাফিকদের হাতে। কোন মুসলিম দেশে আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার সাহস কি কোন হিন্দুর আছে? অথচ সে কাজ অনায়াসে করছে মুনাফিকরা। আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠাকামীদের বিরুদ্ধে তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান। কোন মুসলিম ভূমি কাফেরদের হাতে অধিকৃত বা খন্ডিত হলে আনন্দে তারা ডুগডুগি বাজায়। আরাকানের মজলুম মুসলমানদের জন্য তাদের মনে যেমন কোন স্থান নেই তেমনি সামান্যতম দরদ নাই ভারত বা কাশ্মিরের অসহায় মুসলমানদের জন্যও। আজ এরাই বাংলাদেশের মাটিতে একাত্তরের ন্যায় ভারতের আরেকটি আগ্রাসন মনেপ্রাণে চায়।এবং সেটি তাদের মনের গোপন বিষয়ও নয়। ইসলামপন্থিদের দ্রুত বেড়ে উঠাতে তারা ভীতু। তারা জানে, নিজ শক্তিতে ইসলামপন্থিদের পরাজয় করার সামর্থ তাদের নেই। ফলে তারা আতংকিত। সেজন্যই প্রতিবেশী কাফের দেশে তারা মিত্র খুঁজছে, যেমনটি একাত্তরে করেছিল।

 

মুন্তাসির মামূন নিজেই একটি রোগ

মুন্তাসির মামূন নিজেই একটি রোগ। এ রোগ ভয়ানক সংক্রামকও। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, বাংলাদেশের পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির ও সেনাবাহিনীর বহু সদস্য এ রোগে আক্রান্ত। আক্রান্ত মুন্তাসির মামূন, শাহরিয়ার কবিরের ন্যায় অসংখ্য আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া কর্মী। এক কালে কলেরায় বাংলাদেশের গ্রামগুলি মানব শুণ্য হতো। আর এ রোগে দেশ মানবশূণ্য না হলেও মানবতা শূণ্য হচ্ছে। লাশ পড়ছে শাপলা চত্বরে। এ রোগের আক্রমণে শুধু জামায়াত শিবির, হেফাজত বা বিএনপির নেতাকর্মীরাই লাশ হয় না। লাশ হয় বিশ্বজিতেরাও। বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে, যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ দেয়া হয়, লগিবৈঠা দিয়ে  মানুষ খুনের উৎসব হয়, হরতালের দিনে পথচারিকে উলঙ্গ করা হয় এবং ধর্ষণে সেঞ্চুরি হয় তো এ রোগের প্রকোপেই। এ রোগের এরূপ প্রাদুর্ভাব নিয়ে কোন সভ্য নাগরিক কি নীরব থাকতে পারে? এ রোগের একমাত্র ঔষধ শরিয়তি আইন। এটিই মহান রাব্বুল আলামীনের দেয়া চিকিৎসা। শরিয়তের আইনই মক্কার কাফেরদের পূর্ণ আরোগ্য দিয়েছিল। বাংলাদেশের রোগাগ্রস্তদের জন্যও ভিন্ন চিকিৎসা নেই।

মুন্তাসির মামূনের প্রচন্ড আক্রোশ ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি তো তার রোগ নিয়েই বাঁচতে চান। তাই শরিয়তের আইনের বিরুদ্ধে তার প্রচন্ড আক্রমণ। মুন্তাসির মামুনের অভিযোগ বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধেও। তার অভিযোগ,“এ দেশের মানুষ তো আবার কথায় কথায় ইসলামের কথা তোলে। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- ক্ষমতার জন্য রসুল (দ) ওফাতের পর থেকে তার প্রাণের আত্মীয়-স্বজন একে অপরের বিরুদ্ধে লড়েছে, বাবা ছেলেকে ছেলে বাবাকে হত্যা করেছে।” কতবড় মিথ্যাচারি এই মুন্তাসির মামূন! তার মিথ্যাচার এখানে নবীজী (সাঃ)র আত্মীয় স্বজনদের বিরুদ্ধেও। প্রশ্ন, নবীজী (সাঃ)র কোন আত্মীয়টি তাঁর পিতাকে স্রেফ ক্ষমতার জন্য হত্যা করেছে? রণাঙ্গনে কোন পিতা, পুত্র বা ভাই ইসলামের বিজয় রুখতে অস্ত্র ধরলে তাকে নিস্তার দেয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। সেটিই তো ঈমানদারি। বাংলাদেশের বহু মুসলিম পরিবারে যেমন অসংখ্য ইসলাম-দুষমণ ঘৃণ্য জীব জন্ম নিয়েছে তেমনি আরব, ইরান, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের প্রতিদেশেই অসংখ্য মুনাফিক ও খুনি জন্ম নিয়েছে। অতীতে পয়গম্বরদের পরিবারেও সেটি হয়েছে। সে জন্য কি ইসলামকে দায়ী করা যায়? তাছাড়া ঘন ঘন ইসলামের নাম নেয়া, আল্লাহকে স্মরণ করা তো মু’মিনের যিকর। সে যিকরের হুকুম তো এসেছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। মুন্তাসির মামুনদের রাজনীতিতে যেমন কথায় কথায় একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, মুজিব,আওয়ামী লীগ, ভারত, গান্ধি, রবীন্দ্রনাথ, সেক্যুলারিজম ও জাতিয়তাবাদের যিকর তেমনি মুসলমানের রাজনীতিতে বেশী বেশী আল্লাহ ও তাঁর শরিয়ত প্রতিষ্ঠার যিকর। এর মধ্যেই তো মু’মিনের ঈমানদারি।

ভয় অস্তিত্ব বিলুপ্তির

মুন্তাসির মামূনের মনে প্রচন্ড ভয়। সে ভয়টি নিজের ও তার সমমনাদের নির্মূলের। সে ভয়টি অমূলকও নয়। কারণ ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ আজ যতটা মারমুখী তা পূর্বে আর কোন সময়ই এতটা তীব্র ছিল না। সে ভয় নিয়েই তিনি লিখেছেন,“আওয়ামী লীগ যদি হারে তা’হলে আওয়ামী লীগ, সমর্থক, হিন্দু এবং যুদ্ধাপরাধী নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের সবাইকে নিকেশ করে দেয়া হবে।” সে ভয়টি কতটা বাস্তব সেটি প্রমাণ করতে গিয়ে লিখেছেন, “এই লেখা যখন লিখছি তখন খবর পেলাম শাহরিয়ার কবিরের, সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিকের বাসায় বোমা রেখে যাওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতেই এই অবস্থা। না থাকলে কি হতো তা অনুমেয়।” এ ভয় শুধু মুন্তাসির মামূনের একার নয়, সমগ্র আওয়ামী শিবির জুড়ে। তাদের ভয়, ১৯৭৫য়ে ১৫ই আগষ্টের ঝড়ে শুধু মুজিব পরিবার বিধস্ত হয়েছিল। এবার শিকড় উপড়ে যাবে সমগ্র আওয়ামী লীগ ও তার নেতাকর্মীদের। অপরাধীদের অপরাধ অন্যরা না পুরাপুরি না জানলেও তারা নিজেরা জানে। ফলে তাদের নিজের মনে থাকে সে অপরাধ থেকে বাঁচার ভয়। চোরডাকাতের মনে এজন্য থাকে সবসময় ধরা পড়ার ভয়। খুনিরা তো সে ভয় নিয়ে আত্মগোপন থাকে এবং রাস্তায় নামে না। ইসলাম, মুসলমান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ভয়ংকর অপরাধগুলি অন্যরা যতটা জানে তার চেয়ে বেশী জানে তারা নিজেরা। তাই আওয়ামী লীগের কাছে মূল ইস্যুটি এখন আর তত্ত্বাবধায় সরকারের বিষয় নয় বরং নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচানোর। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মগজে এ ভয়টি এতই তীব্র যে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের দাবী মেনে নেয়াটি গণ্য হচ্ছে নিজেদের মৃত্যু ডেকে আনা। তাই জীবন বাঁচানোর স্বার্থে তারা চায় যে কোন মূল্যে ও যে কোন ভাবে আওয়ামী লীগের বিজয়। চায় দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রন। এ বিষয়ে কোন ছাড় দিতে তারা রাজি নয়।

হুংকার চুড়ান্ত যুদ্ধের

মুন্তাসির মামূন কোন আপোষ চান না। কারণটিও অনুমেয়। বিরোধী দলের সাথে আপোষ যে হাসিনার পরাজয়কেই ত্বরান্বিত করবে সেটি তিনি বুঝেন। তিনি জানেন, নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় অসম্ভব। ফলে মতলবটি হলো, সহিংস পথে ক্ষমতায় টিকে থাকা। সেটি যুদ্ধের পথে হলেও। তার হিসাব-নিকাশে আওয়ামী লীগারদের সামনে প্রাণ বাঁচানোর এটিই একমাত্র পথ। তাই লিখেছেন, “আমরা বলব, সংবিধান অনুযায়ী যদি তারা নির্বাচন ইচ্ছুক হয় ভাল কথা না হলে সেই আলোচনায় সময় নষ্ট না করাই উচিত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেরও রাস্তাঘাটে প্রতিরোধে প্রস্তুত থাকা বাঞ্ছনীয়। সুশীলদের অনেকে বলেন, সমঝোতা না হলে গৃহযুদ্ধ হবে। …যদি দাঙ্গা হাঙ্গামা হয়, হবে। তাতে আমাদের অনেকেই মারা যাব, তাতে কি আছে? … মৃত্যু তো নির্দিষ্ট এবং একমাত্র সত্য। কিন্তু এক বারের মতো ফয়সালা হয়ে যাক।“

মুন্তাসির মামূন চান আরেকটি যুদ্ধ সত্বর শুরু হোক। এটিকে বলছেন একাত্তরের অসমাপ্ত যুদ্ধ। লক্ষ্য, একাত্তরে যাদের হত্যার সুযোগ হয়নি তাদেরকে হত্যা করা। আরো লক্ষ্য হলো, সে হত্যাকান্ডে ভারতের সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা। ইতিমধ্যে মুন্তাসির মামূনেরই সতীর্থ কলামিস্ট সুদিব ভৌমিক ভারতের “টাইমস অব ইন্ডিয়া”য় ১/১১/১৩ তারিখে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভারতের প্রতি সম্ভাব্য সকল উপায়ে হস্তক্ষেপের আহবান জানিয়েছেন। নইলে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ বিপদে পড়বে সে কথাটিও সে নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন। ভারতের স্বার্থের মাঝেই আওয়ামী ঘরানার এসব বুদ্ধিজীবীরা যে নিজেদের স্বার্থ দেখে সে বিষয়টিও সে নিবন্ধে গোপন থাকেনি।

জমিতে চাষ না দিলে আগাছা জন্মে। কৃষকের লাঙ্গল তাই আগাছা নির্মূলের হাতিয়ার। একই ভাবে আল্লাহর শরিয়তি বিধানটি আগাছা নির্মূল করে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে। তাই আল্লাহর শরিয়তি আইন স্রেফ কিতাবে লিপিবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। সেটির প্রয়োগ শুধু জরুরীই নয়, অপরিহার্য। আজ বাংলাদেশে ইসলামের দুষমন ভয়ানক অপরাধিরা বেড়ে উঠেছে তো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না থাকাতেই। নবীজী ও খোলাফায়ে রাশেদার সময় মুনাফিরা যে ষড়যন্ত্রটি লুকিয়ে লুকিয়ে করতো এখন তারা সেটি করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বসে। এবং প্রকাশ্যে ও বীরদর্পে। গর্তের বিষাক্ত শাপগুলো আজ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সংবিধান থেকে আল্লাহর নাম সরানোর সাহস কি কোন হিন্দুর আছে? আছে কি কোরআনের তাফসির মাহফিল বন্ধ করার সাহস? কিন্তু সে সাহস আছে বাংলাদেশের মুনাফিকদের। কারণ তাদের হাতে রয়েছে নিজেদের মুসলিম পরিচয়ের ঢাল। আছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা।

মুনাফিকদের মুনাফিক বলাই মহান আল্লাহর সূন্নত, মুসলমান বলা নয়। মুসলমান পরিচয় পেতে হলে রাসূলের সাহাবীদের ন্যায় ইসলামের ঝান্ডা নিজ কাঁধে তুলে নিতে হয়। আল্লাহর শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় ও ইসলামের বিজয়ে নির্ভয়ে কথা বলতে হয়। অর্থ,শ্রম ও মেধার বিপুল বিণিয়োগও করতে হয়। প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে হাজির হতে হয়। এসবই নবীজীর সূন্নত। সাহাবাগণ তো সে পথেই ইসলামের বিজয় এনেছেন। যারা সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বানি সরায় এবং আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে তাদেরকে মুসলমান বলা কি আল্লাহর সূন্নত? ইসলামের চিহ্নিত এসব শত্রুদেরকে মুসলমান বললে যারা ইসলামের বিজয় আনতে লড়াই করে ও শহীদ হয় তাদেরকে কি বলা যাবে? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা কত সুন্দর করেই না মুনাফিকদের চিত্রটা তুলে ধরেছেন। বলেছেন,“তারা নিজেদের (আল্লাহ ও রাসূলের উপর বিশ্বাসী হওয়ার) শপথকে ঢাল রূপে ব্যবহার করে, অতঃপর মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামি করে। তারা যা করে তা কতই না নিকৃষ্ট!” –(সুরা সুরা মুনাফিকুন, আয়াত ২)। মুন্তাসির মামূনেরা তো সেটিই করছেন। তারা নিজেদের মুসলমান বলে জাহির করে, কিন্তু সেটি ইসলামের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য নয়। ইসলামের গৌরববৃদ্ধি বা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্যও নয়। বরং ইসলামের পথ থেকে মুসলমানদের দূরে সরানোর লক্ষ্যে। কোরআনের তাফসির মহফিলের উপর নিষেধাজ্ঞা, ইসলামি টিভি চ্যানেল বন্ধ, আলেমদের লাঠিপেটা, গ্রেফতারি ও হত্যা, মসজিদ-মাদ্রাসার উপর হামলা, ইসলামি বই বাজেয়াপ্ত –এসব কি কোন কাফিরের হাতে হয়েছে?

ইস্যু স্রেফ নির্দলীয় সরকার নয়

বাংলাদেশে সংকটের মূল কারণটি এ নয় যে, দেশটি আজ স্বৈরাচার কবলিত। বরং সেটি হলো, দেশের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনসহ সকল প্রতিষ্ঠান আজ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত। ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখাই তাদের মূল কাজ। তাই ঈমানদারদের সামনে মূল ইস্যূটি স্রেফ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়। এরূপ নির্বাচন পূর্বেও একাধিকবার হয়েছে। কিন্তু তাতে কি দেশ আবর্জনা মুক্ত হয়েছে? মূল ইস্যুটি দেশের উপর থেকে ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলদারি নির্মূল। এটি এক দীর্ঘকালীন লড়াই। এ লড়াইযে জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হবে। কারণ ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানোর লক্ষ্যে শত্রুপক্ষের প্রস্তুতিও বিশাল। তাছাড়া বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় রুখতে বিদেশী শত্রুরাও নিজেদের বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, যেমনটি আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে করছে। ভারত তো ইতিমধ্যেই হাজার কোটি টাকা বাজেট ঘোষণা করেছে।

তবে মু’মিনের পক্ষে মহান আল্লাহতায়ালা। তাঁর অপার শক্তির সামনে সেসব শক্তি কোন শক্তিই নয়। ফিরাউনের বিশাল বাহিনী যখন বনি ইসরাইলের নিরস্ত্র মানুষদের ধাওয়া করেছিল তখন সামনে ছিল সমূদ্র আর পিছনে ছিল বিশাল সেনাদল। অনেকেই ভেবেছিল, এবার নিস্তার নেই। কিন্তু হযরত মূসা (আঃ)বলেছিলেন, ভয় নেই, আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন। সেদিন ফিরাউনের বিশাল বাহিনী বনি ইসরাইলের কাউকেই কোন ক্ষতি করতে পারিনি। সে বিশাল শত্রুবাহিনীর কাউকেই মহান আল্লাহতায়ালা জীবন্ত ঘরে ফেরার সুযোগ দেননি। সবাইকে সমূদ্রে ডুবিয়ে হত্যা করেছিলেন। একই ভাবে নমরুদের খপ্পর থেকে তিনি হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে রক্ষা করেছিলেন। তেমনি খন্দকের যুদ্ধে আরবের সকল গোত্রের সম্মিলিত হামলার মুখে রক্ষা করেছিলেন মদিনার ক্ষুদ্র মুসলিম বসতিকে। মহান আল্লাহতায়ালা নিরস্ত্র ও দুর্বল ঈমানদারকে তো এভাবেই বিজয়ী করেন। কিন্তু এরূপ সাহায্য কি স্রেফ নির্দলীয় সরকার বা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জোটে?সে জন্য লড়াইকে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের পথে এগিয়ে নিতে হয়।লড়াই তো তখনই খালেছ জিহাদে পরিণত হয়। মুসলমানের কাজ তো খালেছ নিয়তে মহান আল্লাহতায়ালার পরিপূর্ণ গোলামে পরিণত হওয়া। এবং তাঁর দ্বীনের বিজয়ে আত্মনিয়োগ করা। তখন বাকি জিম্মাদারিটা খোদ মহান আল্লাহতায়ালা নিজ হাতে নিয়ে নেন।

হাসিনা ফিরাউনের চেয়ে বেশী শক্তিশালী নয়। বাংলাদেশের মুসলিমও বনি ইসরাইলের চেয়েও দুর্বল নয়। এ মুহুর্তে মূল দায়িত্বটি হলো, এ লড়াইকে স্রেফ আল্লাহর রাস্তায় বিশুদ্ধ জিহাদে পরিনত করা। মু’মিনের জীবনে জিহাদ ছাড়া কোন লড়াই নাই, জিহাদ ছাড়া কোন রাজনীতিও নাই। নিয়তের এ ক্ষেত্রটুকুতে ভেজাল থাকলে পরকালে কোন ফসল তোলা যাবে না। তেমনি একালেও আল্লাহর সাহায্য জুটবে না। সেক্যুলার চেতনায় এমনি একটি বিশুদ্ধ জিহাদ কি সম্ভব? সেক্যুলারিজম তো পরকালের ভাবনাকেই ভূলিয়ে দেয়। সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ তো ইহজাগতিকতা। পরকালের ভাবনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক।  সে জন্য তো চাই রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিপূর্ণ ইসলামিকরণ। একমাত্র বিশুদ্ধ জিহাদেই প্রতি মুহুর্তের শ্রম, প্রতিটি কথা, প্রতিটি লেখনি, প্রতিবিন্দু রক্ত ও প্রতিটি অর্থদান পরকালে বিশাল পুরস্কার দেয়। তথন আন্দোলন ব্যর্থ হলেও কোরবানী ব্যর্থ হয় না। জানমালের সে কোরবানিই অনিবার্য করবে জান্নাতপ্রাপ্তি। নইলে হাজির হতে হবে জাহান্নামে। এ নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তো সে হুশিয়ারিই বার বার শুনিয়েছেন। ০৩/১১/২০১৩

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *