অখণ্ড-ভারতের মোহ ও বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভাবনা

image_pdfimage_print

আসন্ন কি আরেক বিপর্যয়? – 

বাংলাদেশী মুসলমানের চেতনার বিভ্রাট যে দিন দিন ভয়ানক রূপ নিচ্ছে সে প্রমাণ প্রচুর। রোগ নিয়ে জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার তখনই প্রয়োজন হয় যখন সেটি দেহের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানের চেতনার রোগটি এখন আর লুকিয়ে নেই, বরং সর্ববিধ সিম্পটম নিয়ে তার উপস্থিতি জাহির করছে। জাতীয় জীবনে কোন রোগই -তা সে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা নৈতিক হোক, হঠাৎ আসে না। বাড়ে বহুকাল ধরে। ঝড় শুরু হওয়ার আগে থেকেই আকাশে যেমন কালো মেঘ জমতে শুরু করে তেমনি জাতির জীবনেও কালো মেঘ জমতে থাকে বিপর্যের বহু আগে থেকেই। কালো মেঘ দেখেও ঝড়ের আলামত টের না পাওয়াটি অজ্ঞতা। তেমনি মানব জীবনের ভয়ানক অজ্ঞতা হল, প্রচণ্ড বিচ্যুতি ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে থেকেও তা নিয়ে বোধোদয় না হওয়া। এ অজ্ঞতা নিরক্ষরতার চেয়েও ভয়ানক। অথচ বাংলাদেশে সেটিই হচ্ছে। এমন অজ্ঞতা যে শুধু দেশের সেক্যিউলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে বিরাজ করছে তা নয়, প্রকট রূপ ধারণ করেছে তাদের মাঝেও যারা নিজেদেরকে ধর্মভীরু মুসলিম ও ইসলামি আন্দোলনের কর্মী বা সমর্থক বলে দাবী করে।

কর্পুর যেমন দিন দিন হাওয়ায় হারিয়ে যায়, বাংলাদেশের মানুষের আক্বিদা ও আচরণ থেকে ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধও যেন হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে আজ থেকে ৫০ থেকে বছর আগে বাংলার মানুষ ইসলামের যতটা কাছে ছিল এখন ততটাই দূরে। তখন বিছমিল্লাহ বা আল্লাহর উপর আস্থা নিয়ে অন্ততঃ মুসলমানদের মাঝে বিরোধ ছিল না। অথচ এখন ঈমানের সে মৌল বিশ্বাসটি দেশের শাসনতন্ত্রে উল্লেখ করাও অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ইসলাম থেকে বাংলাদেশের মানুষ যে কতদূর দূরে সরেছে এ হল তার নমুনা। আর এ অবস্থা সৃষ্টির জন্য যেটি সফল ভাবে কাজ করেছে সেটি সেক্যিউলার শিক্ষা ব্যবস্থা। এ শিক্ষা ব্যবস্থার মূল প্রবর্তক ছিল ব্রিটিশ শাসকেরা। এর মূল কাজটি মুসলমানদের ঈমান বা আল্লাহর উপর আস্থা বাড়ানো ছিল না, ছিল ইসলাম থেকে দ্রুত দূরে সরানো। মহান আল্লাহপাক ও তার রাসূল কি বললেন সেটি অতীতে যেমন গুরুত্ব পায়নি, এখনও পাচ্ছে না। বরং গুরুত্ব পাচ্ছে ডারউইন, ফ্রয়েড, মার্কস,এঙ্গেলস, ল্যাস্কী, রাসেল বা উইলসনের মত অমুসলিম ব্যক্তিবর্গ কি বললো সেটি। বিষ যেমন দেহের অভ্যন্তুরে ঢুকে দেহের প্রাণশক্তি বিনষ্ঠ করে, সেক্যিউলার শিক্ষা ব্যবস্থাও তেমনি বিনষ্ট করছে ঈমান। তাই আল্লাহর উপর আস্থা বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে সেক্যিউলার ও নাস্তিকদের আর লাঠি ধরতে হচ্ছে না,দেশের শিক্ষ্যাব্যবস্থাই সেটি ত্বরিৎ সমাধা করছে। ফলে দেশে ৯০ ভাগ মুসলমান -এ পরিসংখ্যানটি নিছক বইয়ের পাতায় রয়ে যাচ্ছে; দেশবাসীর কাজ-কর্ম, ঈমান-আক্বীদা, নীতি-নৈতীকতায় নয়। বরং বাড়ছে মঙ্গল প্রদীপের কদর। এ শিক্ষা ব্যবস্থার ফলেই সফল ভাবে সমাধা হয়েছে কোট-কাছারি, আইন-আদালত, প্রশাসন ও রাজনীতি থেকে ইসলাম সরানোর কাজ। আল্লাহর দ্বীনটির এমন নিষ্ঠুর অবমাননা স্বচক্ষে দেখার পরও রুখে দাঁড়ানোর লোক দেশে শতকরা ২ জনও নাই। থাকলে ঢাকা শহরে শরিয়তের পক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের মিছিল হত। আর শতকরা ৯০ জন মুসলমানের দেশের ইসলামের এরূপ পরাজয় ডেকে আনার জন্য ভারত, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তাবত ইসলামী বিরোধী শক্তির কাছে কদর বাড়ছে দেশের সেক্যিউলার রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও এনজিও কর্মীদের। ভূয়শী প্রশংসা পাচ্ছে ইসলামকে পরাজিত করার এ বাংলাদেশী মডেল। ফলে র‌্যাব বা পুলিশের হাতে ভয়ানক ভাবে মানবাধিকার লংঘিত হলেও তা নিয়ে পাশ্চাত্যে শাসকগণ নিন্দা দূরে থাক, মুখ খুলতেই রাজী নয়।

 

কুশিক্ষার বিপর্যয়

শূণ্যস্থান বলে এ জগতে কিছু নেই। শূণ্য স্থান থাকে না চেতনা রাজ্যেও। সুশিক্ষার ব্যবস্থা না হলে দেশবাসীর মনের ভূবন কুশিক্ষার দখলে যাবেই। তখন ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়ে অর্থদান, শ্রমদান ও রক্তদানের কাজটি কুশিক্ষাপ্রাপ্ত জনগণই নিজ গরজে সমাধা করে দেয়। কুশিক্ষা তখন ইসলামকে পরাজিত করার কাজে সফল হাতিয়ার রূপে কাজ দেয়। একারণে যারা ইসলামের বিজয় চায় তারাও সর্ব প্রথম যেটিকে গুরুত্ব দেয় সেটি দেশবাসীর সুশিক্ষা। এবং বন্ধ করে দেয় কুশিক্ষার সকল প্রতিষ্ঠানকে। এরূপ কাজটি ছিল নবী-রাসূলদের। মুসলমানদের দায়ভার তো সে কাজকে চালু রাখা। মহান আল্লাহতায়ালাও তাঁর সর্বশেষ নবী (সাঃ)কে সর্বপ্রথম যে পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তা নামায-রোযার নয়, বরং জ্ঞানার্জনের। সাম্প্রতিক কালে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব এবং সেক্যিউলার শিক্ষার কুফল যারা সবচেয়ে বেশী বুঝেছিলেন তারা হল ইরানী আলেমেরা। মহম্মদ রেজা শাহের প্রতিষ্ঠিত দেশের সকল সেক্যিউলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তিন বছরের জন্য তাঁরা বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু ইসলামের নামে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেলেও দেশটির নেতাদের দ্বারা সেটি হয়নি। যারা ইসলামের পক্ষের শক্তি ছিল তারাও বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি, ফলে ইসলামী শিক্ষার প্রবর্তন নিয়ে আন্দোলনও করেননি। এরফলে বহাল তবিয়তে থেকে যায় ব্রিটিশের প্রবর্তিত সেক্যিউলা শিক্ষাব্যাবস্থা। পাশ্চাত্যের যৌন ফিল্ম এবং রাশিয়া ও চীনের সমাজতান্ত্রিক বই ও পত্র-পত্রিকা যাতে অবাধে প্রবেশ করতে পারে সেজন্য দেশের দরজা পুরাপুরি খুলে দেয়া হয়। যুবকদের চেতনায় মহামারি বাড়াতে এগুলোই পরবর্তীতে ভয়ানক জীবানূর কাজ করে। পাকিস্তান আমলে দেশের রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটগুলোকে সে জীবাণূ-ব্যবসায়ীদের হাতে লিজ দেয়া হয়েছিল। এভাবে দেশের এবং সেসাথে ইসলামের ঘরের শত্রু বাড়ানো হয়েছিল বিপুল হারে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই যারা প্রবল বিরোধীতা করেছিল তারা হল সেক্যিউলার এবং সমাজতন্ত্রিরা। সমাজতন্ত্র মারা গেছে, কিন্তু মারা যাওয়ার আগে মরণ ছোবল মেরে যায় পাকিস্তানের বুকে।

পাকিস্তানে ছিল একটি আদর্শিক রাষ্ট্র যার ভিত্তি ছিল ইসলাম। ইসলামই ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে একমাত্র যোগসূত্র। এমন একটি আদর্শিক দেশের প্রতি সেক্যিউলার ও ইসলামবিরোধীদের দরদ থাকার কথা নয়। বরং এমন দেশে তাদের রাজনৈতিক মৃত্যু অনিবার্য। সেটি তারা বুঝতো বলেই দিবারাত্র খেটেছে দেশটির ত্বরিৎ ধ্বংসে। সেক্যিউলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেদিন যারা বের হয়েছেন তারা পাকিস্তানের বা ইসলামের পক্ষে লাঠি না ধরে নিজেদের শ্রম ও মেধার বিণিয়োগ করেছেন তার বিনাশে। ষাটের দশকে তারা লাঠি ধরেছিলেন সোভিয়েত রাশিয়া বা চীনের পক্ষে। আর এখন খাটছেন ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণে। একটি উদাহরণ দেয়া যাক। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সর্ব প্রথম যে বাঙালীকে পাকিস্তান সরকার বৃত্তি দিয়ে বিলেতে পাঠান তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক জনাব আব্দুর রাজ্জাক। অথচ এ আব্দুর রাজ্জাকই বিলেত থেকে ফিরে এসে যে কাজটি লাগাতর করেছেন তা হল পাকিস্তানের শিকড় কাটার কাজ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এরকম আব্দুব রাজ্জাক ছিলেন প্রচুর। এদেরই অনেকেই এখন খাটছেন ভারতের পক্ষে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এদের দ্বারাই ইসলাম-বিরোধীদের দুর্গে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলেও তাদের মিশন শেষ হয়নি। বাংলাদেশের ভুগোলের মধ্যেও তারা ১৯৪৭ য়ের গন্ধ টের পায়। আর যা কিছু পাকিস্তানী তাই তো তাদের কাছে ঘৃণ্য।

 

হিন্দুদের এজেণ্ডা ও মুসলমানের এজেণ্ডা

উপমহাদেশের রাজনীতিতে সবসময়ই দুটি পক্ষ ছিল। দুই পক্ষের দুটি ভিন্ন এজেণ্ডাও ছিল। ফলে ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র নির্মানের দুটি বিপরীত ধারাও ছিল। একটি ছিল অখণ্ড ভারত নির্মানের ধারা। এধারার নেতৃত্বে ছিল কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ। অপরটি ছিল প্যান-ইসলামিক মুসলিম ধারা। শেষাক্ত এ ধারাটির ফলেই জন্ম নেয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের নির্মানের মূল ভিত্তি ছিল জিন্নাহর দেয়া দ্বি-জাতি তত্ত্ব, যার মূল কথা হলঃ চিন্তা-চেতনা,মন ও মনন,নাম ও নামকরণ,তাহজিব ও তামুদ্দুদের বিচারে মুসলমানগণ হল হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন জাতি। তাদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র নির্মানে লক্ষ্য, ভিশন ও মিশন তাই এক ও অভিন্ন হতে পারে। তাই অখণ্ড ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু-ভারতের কাঠামোর মাঝে মুসলমানদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শরিয়ত অনুসরণের অভিলাষ পূরণ অসম্ভব। পৃথক ও স্বাধীন পাকিস্তান এ অভিলাষ পূরণে অপরিহার্য। হিন্দু কংগ্রেস ও ব্রিটিশ শাসকদের প্রচণ্ড বিরোধীতা সত্ত্বেও ১৯৪৭য়ে দ্বি-জাতির সে চেতনাই বিজয়ী হয় এবং প্রতিষ্ঠা পায় পাকিস্তান। কিন্তু অখণ্ড-ভারত নির্মানের হিন্দু নেতারা ১৯৪৭য়ের সে পরাজয়কে মেনে নেয়নি।সুযোগ খুঁজতে থাকে মুসলমানদের সে বিজয়কে উল্টিয়ে দেয়ার। সে সুযোগ আসে ১৯৭১য়ে। ১৯৭১য়ে তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক বিজয় লাভ করে দেশটির পূর্বাঞ্চলে। ফলে পাকিস্তানী চেতনার স্থলে এ অঞ্চলে আবার বেগবান হয় অখণ্ড ভারতের হিন্দু ধারা। তবে হিন্দুরা তাদের সে সাম্প্রদায়ীক প্রকল্পকে মুসলমানদের কাছে আকর্ষণীয় করতে গায়ে সেক্যিউলারিজমের লেবাস লাগায়। সেক্যিউলারিজমের মুসলিম বিরোধী আদিরূপটি নিয়ে বাংলাদেশের মুসলমানদের মনে প্রচণ্ড অজ্ঞতা থাকলেও সে অজ্ঞতা ভারতীয় মুসলমানদের নেই। বরং ভারতের মুসলিম শিশুরাও সেটি বুঝে। তারা সেটি বুঝেছে হিন্দুদের দ্বারা সংঘটিত মুসলিম বিরোধী অসংখ্য দাঙ্গায় সহায়-সম্পদ ও আপনজনদের হারিয়ে;চোখের সামনে মা-বোনদের ধর্ষিতা হতে দেখে। কিন্তু হিন্দু-ভারতের সে কুৎসিত ভয়ংকর রূপটি পর্দার আড়ালে রাখা হয়েছে বাংলাদেশের মুসলমানদের থেকে। বরং কুৎসিত রূপে চিত্রিত করা হয়েছে দেশের ইসলামপন্থি এবং একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিদের। আর এভাবে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর মনে যেমন সৃষ্টি করা হয়েছে পাকিস্তান-বিরোধী প্রচণ্ড ঘৃনা,তেমনি লালন করা হয়েছে অখণ্ড ভারতের প্রতি মোহ। লাগাতর প্রচারণার ফলে বাংলাদেশী মুসলমানদের মনে এ বিশ্বাসও জন্ম নিয়েছে যে,পাকিস্তানের সৃষ্টিই ভূল ছিল এবং ভূল ছিল জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্ব।

পাকিস্তানকে যারা অনর্থক অনাসৃষ্টি বলে তারা যে শুধু ভারতীয় কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ তা নয়। তাদের সাথে সুর মিলিযে একই কথা বলে বাংলাদেশের কম্যিউনিষ্ট,নাস্তিক,জাতিয়তাবাদী এবং মুসলিম নামধারি সেক্যিউলারিষ্টগণ। হিন্দু-মুসলিম মিলন ও অখণ্ড ভারতের পক্ষে নানা গূণগানের কথাও তারা বলে। ১৯৭১য়ে থেকে বাংলাদেশের সকল ছাত্র-ছাত্রী এবং জনগণ শুধু তাদের সে ক্যাসেটটিই লাগাতর শুনে আসছে। অথচ কেন যে বাংলার মুসলমানগণ ১৯৪৭ সালে বিপুল ভোটে পাকিস্তানের পক্ষ নিল সে কথা তারা বলে না।সে সময় শেখ মুজিব স্বয়ং কেন পাকিস্তানের পক্ষ নিলেন সে কথাও তারা বলে না। বরং বলে, পাকিস্তান সৃষ্টিই ভূল ছিল। তাদের সে নিরচ্ছিন্ন প্রচারণা কাজও দিয়েছে। ফল দাঁড়িয়েছে, এখন সে প্রচরণায় প্লাবনে ভেসে গেছে বহু ইসলামপন্থিরাও। ফলে তাদের সাথে সূর মিলিয়ে একই কথা বলা শুরু করেছে তারাও যারা নিজেদের ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মী বা সমর্থক বলে দাবী করেন। এদের অনেকে আবার খেলাফা প্রতিষ্ঠার কথাও বলেন। ভারতপন্থিদের সাথে তাঁরাও ভারতীয় বাহিনীর বিজয়ের দিনে উৎসবে নেমেছেন। বাংলাদেশে ইসলামি ধারার রাজনীতিতে এটি এক গুরুতর বিচ্যুতি, এবং এক বিশাল চেতনা-বিভ্রাট। তারা এখান যা বলেন একাত্তরের পূর্বে কোন ইসলামপন্থির মুখে তা কখনই শোনা যায়নি।

অমুসলিম পরিবেষ্ঠিত এক ক্ষুদ্র দেশে নিজেদের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে বাঁচতে হলে চিন্তা-চেতনায় বলিষ্ঠ ইম্যুনিটি তথা প্রতিরোধ শক্তি চাই। রোগের বিরুদ্ধে মানব দেহে ভ্যাকসিন বা টিকা সে ইম্যুনিটিই বাড়ায়। তখন কলেরা,যক্ষা বা পলিওর মত ভয়ংকর রোগের মধ্যে থেকেও মানুষ নিরাপদে বাঁচতে পারে।কোরআনের জ্ঞান ও ইসলামের দর্শন মূলত ঈমানদারের চেতনায় সে ইম্যুনিটিই তীব্রতর করে। তখন উলঙ্গতা, অশ্লিলতা ও নানা রূপ কুফরির মাঝেও মুসলমানগণ ঈমান নিয়ে বাঁচতে পারে। হিজরতের আগে মক্কার মুসলমানগণ তো তেমন এক ইম্যুনিটির কারণেই বলিষ্ঠ ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন। অথচ মুসলিম অধ্যুষিত সেক্যিউলার রাষ্ট্রগুলোতে ইম্যুউনিটি গড়ার সে কাজটি কঠিন। সাম্প্রদায়ীক বা মৌলবাদ আখ্যা দিয়ে সেটি বাংলাদেশের ন্যায় বহু দেশে অসম্ভব করা হয়েছে। মক্কার কাফের সমাজে নবীজীকে সে কাজ লুকিয়ে লুকিয়ে করতে হত। এমন প্রকাশ্যে নামায পড়াও বিপদজনক ছিল। দ্বীনের এ অপরিহার্য কাজের জন্য যে ব্যাপক অবকাঠামো দরকার সেটি যেমন কাফের অধ্যুষিত মক্কায় সম্ভব হয়নি, তেমনি কোন অমুসলিম রাষ্ট্রেও সম্ভব নয়। নবীজীকে তাই মদিনায় গিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রের কাজ নিছক হাসপাতাল,রাস্তাঘাট বা  কলকারখানা নির্মান নয়। বরং সেটি হল,ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা;অনৈসলামের বিরুদ্ধে প্রতিটি নাগরিকের মনে ইম্যুউনিটি গড়ে তোলা। কোন রাষ্ট্রের এর চেয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। খাদ্য-পানীয় তো বিশ্বের সবদেশেই জুটে।এমন কি পশুও না খেয়ে মরে না। কিন্তু মুসলিম মন ও মানস প্রকৃত নিরাপত্তা পায় এবং ঈমানী পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠে একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্রে। ইসলাম রাষ্ট্র নির্মান তো এজন্যই ফরয। নইলে কুফরির বিশ্বব্যাপী স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। তখন সে শুধু বেঁচে থাকে পৃতৃদত্ত মুসলিম নামটি নিয়ে, মুসলিম চরিত্র নিয়ে। সোভিয়েত রাশিয়ার কম্যুউনিস্ট কবলিত মুসলমানগণ তো বহুলাংশে হারিয়ে গেছে তো একারণেই। একই কারণে তারা হারিয়ে যাচ্ছে পাশ্চত্যের দেশগুলিতেও।

বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট একটি দেশ হলে কি হবে, ১৯৭১য়ে যে দর্শনের উপর দেশটি জন্ম নিয়েছিল তাতে মুসলিম রাষ্ট্রের কাঙ্খিত সে মূল কাজটিই গুরুত্ব হারিয়েছিল। বরং মাথায় তোলা হয়েছিল বাঙালী জাতিয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষবাদ। অথচ কোরআন ও সূন্নাহ মতে এ রাষ্ট্রের এ তিনটি মতবাদের বিশ্বাস করাই কুফরি। মুসলমান হওয়ার অর্থ ধর্ম-নিরপেক্ষ হওয়া নয়, বরং সর্ব-অবস্থায় ইসলামের পক্ষ নেয়া। এবং সে পক্ষ নেয়া অর্থ, ইসলামের বিজয়ে নিজের অর্থ, শ্রম ও রক্ত দেয়া। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী তো সে কাজে শহিদ হয়েছেন। মুসলমান কখনও জাতীয়তাবাদী হয় না,হয় প্যান-ইসলামিক। সে তার পরিচয় ভাষা বা ভূগোল থেকে পায় না, বর্ণ বা গোত্র থেকেও নয়। পায় ঈমান থেকে। আর সমাজতন্ত্র? সেটি আজ  খোদ সোভিয়েত রাশিয়াতেই আবর্জনার স্তুপে গিয়ে পড়েছে। অথচ শেখ মুজিব সে আবর্জনাও মুসলমানদের মাথায় চাপিয়েছিলেন। এবং সে জন্য জনগণ থেকে কোন রায়ও নেননি। ১৯৭০য়ের নির্বাচনে এটি কোন ইস্যুও ছিল না। শেখ মুজিব বাঙালী মুসলমানদের মাথার উপর এ কুফরি মতবাদগুলি চাপিয়েছেন নিছক তার প্রভু দেশ ভারত ও রাশিয়াকে খুশি করার জন্য। তাঁর অপরাধ, একাত্তরের পর ছাত্র-ছাত্রীদের মনে কুফরি ধ্যান-ধারণা বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন না দিয়ে বরং টিকা লাগিয়েছেন ইসলামের বিরুদ্ধে। আর সে অপরাধ কর্মটি করেছেন জনগণের দেয়া রাজস্বের টাকায়। এ ভাবে কঠিন করা হয়েছে বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের মনে ইসলামের মৌল শিক্ষার প্রবেশ। জিহাদ বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার ন্যায় ইসলামের এ মৌল বিষয়গুলো বাংলাদেশের মানুষের কাছে আজ  গ্রহন-যোগ্যতা পাচ্ছে না তো একারণেই। এবং নতুন প্রজন্ম পাচ্ছে না ইসলামিক ইম্যুউনিটি। ফলে জোয়ারের পানির ন্যায় তাদের চেতনায় ঢুকেছে হিন্দু রাজনীতির দর্শন -যার মূল কথাটি আজও অবিকল তাই যা তারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে বলতো। যে দেশটি ইসলামী নয় সেদেশে ইম্যুনিটি গড়ার সে ফরয কাজটি করে মসজিদ-মাদ্রাসা, আলেম-উলামা, ইসলামি সংগঠন,লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ। তাঁরা সেটি করেন কোরআন-হাদিস ও ইসলামী দর্শনের জ্ঞান বাড়িয়ে। নবীজী (সাঃ)র মক্কী জীবন তো সেটিরই সূন্নত পেশ করে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার যেমন সে কাজ করেনি, সঠিক ভাবে সেটি হয়নি আলেম-উলামাদের দ্বারাও। ইসলামি সংগঠনগুলো ব্যস্ত ক্যাডার-বৃদ্ধি,অর্থ-বৃদ্ধি ও ভোট-বৃদ্ধির কাজে, কোরআনের জ্ঞান ও ইসলামী দর্শন বাড়াতে নয়। তাদের অর্থের বেশীর ভাগ ব্যয় হয় দলীয় আমলা প্রতিপালনে। সে সাথে দেশের মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোও অধিকৃত। সেখানে দখল জমিয়ে বসে আছে সেক্যিউলার মোড়ল-মাতবর, রাজনৈতিক ক্যাডার ও আলেমের লেবাস ধারী কিছু রাজনৈতিক বোধশূন্য ব্যক্তি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়লেও ইসলামের বিজয় বাড়ছে না। বরং মুসলমানদের চেতনা রাজ্যে দূষণ বাড়ছে ভয়ানক ভাবে। এমন এক দূষণ প্রক্রিয়াই ফলেই অখণ্ড ভারতের মোহ জেগে উঠছে এমন কি ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মাঝেও।

১৯৭১য়ে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের যে বিশাল সামরিক বিজয় এসেছিল তাতে শুধু পাকিস্তানের ভূগোলই পাল্টে যায়নি,পাল্টে গেছে বাংলাদেশী মুসলমানদের মনের ভূগোলও। ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়-উৎসবের সাথে ভারত আরেকটি মহা-উৎসব করতে পারে চেতনা রাজ্যের এ বিশাল বিজয় নিয়ে। বাঙালী হিন্দুর যখন রেনেসাঁ,মুসলমানদের উপর এমন আদর্শিক বিজয় তারা তখনও পায়নি। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের সবচেয়ে বড় অপরাধ হল,হিন্দুদের কোলে তিনি এরূপ একটি সহজ বিজয় তুলে দিয়েছেন। সামরিক বিজয় পরাজিত দেশে কখনই একাকী আসে না। সাথে আনে আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিজয়ও। বাংলাদেশের ভূমিতে ভারতের বিশাল বিজয় তাই একাত্তরে এসে থেমে যায়নি। বিজয়ের পর বিজয় আসছে সর্বক্ষেত্রে। একাত্তরে তাদের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানের বিনাশ ছিল না, ছিল ইসলামী চেতনার বিনাশও। তাছাড়া তাদের এ যুদ্ধটি নিছক পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও ছিল না, ছিল ইসলাম ও বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধেও। পাকিস্তান-বিরোধী যুদ্ধটি শেষ হয়েছে একাত্তরেই। কিন্তু শেষ হয়নি বাংলাদেশের মাটি থেকে ইসলামপন্থিদের নির্মূলের কাজ। তাই ভারত তার পদলেহীদের দিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ একটা অস্থির অবস্থা বজায় রেখেছে সেই ১৯৭১ থেকেই। তাছাড়া আওয়ামী লীগের আচরণ দেখেও বোঝা যায়, ভারতের পক্ষ থেকে বাঁকি কাজটি সমাধার মূল দায়িত্বটি পেয়েছে তারাই। বেছে বেছে ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধকরণ, ইসলামী নেতাদের বীনা বিচারে গ্রেফতার, মাদ্রাসার পাঠ্যসূচী ও মসজিদে খোতবার উপর নিয়ন্ত্রণ, অফিসে ও ঘরে ঘরে গিয়ে ইসলামী বই বাজেয়াপ্ত করা -ইত্যাদী নানা কর্মসূচী নিয়ে এগুচ্ছে তারা।

 

ভারতের বাংলাদেশ ভীতি

বাংলাদেশের ভূমিতে ভারতীয়দের এত তৎপরতার মূল কারণ,তাদের বাংলাদেশে ভীতি। ভয়ের সে মূল কারণটি হল ইসলাম। ভারতীয়রা বোঝে, ইসলামী দর্শন এবং কোরআনের জ্ঞানই যুগ যুগ ধরে জোগাতে পারে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি। অতীতে আফগান জনগণ যে শক্তির বলে ব্রিটিশ বাহিনী ও পরে সোভিয়েত বাহিনীকে পরাজিত করেছিল সেটি অস্ত্রবল নয়। অর্থবলও নয়। বরং সেটি ইসলামী চেতনার বলে। আজও তারা মার্কিনীদের পরাজয় করে চলেছে সে শক্তির বলেই। ১০ বছরের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও তার ৪০টি মিত্রদেশকে বিন্দুমাত্র বিজয়ের কাছে ভিড়তে দেয়নি। আর বাংলাদেশীরা আফগানদের থেকে সংখ্যায় ৭ গুণ অধিক। এতবড় বিশাল জনশক্তির মাঝে ইসলামি চেতনার বিস্ফোরণ হলে তাতে কেঁপে উঠবে সমগ্র ভারত। বাংলাদেশের মূল শক্তি তার ভূগোল নয়, সম্পদও নয়। বরং এ জনশক্তি। আর এ জনশক্তির সাথে ইসলামের যোগ হলে জন্ম নিয়ে এক মহাশক্তি। মরুর নিঃস্ব আরবেরা তো বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল এমন এক মিশ্রণ হওয়াতেই। ভারত তাই বাংলাদেশের মানুষকে কোরআনের জ্ঞান থেকে দূরে সরাতে চায়। আর একাজে ভারতের সুবিধা হল, আওয়ামী লীগকে তারা অতি আগ্রহী কলাবোরেটর রূপে পেয়েছে। বাঙালী হিন্দুদের চেয়েও এ কাজে তারা বেশী বিশ্বস্থ ও তাঁবেদার। ভারত সে সুযোগটির সদ্ব্যাবহার করতে চায়। একাত্তরের বিজয়কে যুগ যুগ ধরে রাখার স্বার্থে আওয়ামী লীগের কাঁধে লাগাতর বন্দুক রাখাটিকে তারা অপরিহার্যও ভাবে। তবে এলক্ষ্যে তারা যে শধু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের উপরই পুঁজি বিণিয়োগ করছে তা নয়। তাদের স্ট্রাটেজী, সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা নয়। তাই বিশাল পুঁজি বিণিয়োগ করেছে দেশের মিডিয়া, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যকর্মী, আলেম-উলামা, ছাত্রশিক্ষক, এমন কি ইসলামী দলগুলোর উপরও। সে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে তারা ভারতে পড়ার সুযোগও করে দেয়েছে। এখন বিপুল পুঁজি বিণিয়োগ করছে দেশের ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মী,বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার উপর। ভারত জানে, তাদের হাত থেকে আওয়ামী লীগ হারিয়ে যাওয়ার নয়। ক্ষমতায় থাকার সার্থে এ দলটি নিজ গরজেই ভারতে পক্ষ নিবে।কারণ,ভারতে হাতে রয়েছে বাংলাদেশের হিন্দু ভোট। আছে বিশাল রাষ্ট্রীয় পুঁজি, আছে ভারত-প্রতিপালীত বিশাল মিডিয়া। নির্বাচনী জয়ের জন্য এগুলো জরুরী। তবে ভারত চায়,অন্যদেরও পক্ষে আনতে।

 

পাকিস্তান আমলের ব্যর্থতা

পাকিস্তান আমলের বড় ব্যর্থতাটি অর্থনৈতিক ছিল না। প্রশাসনিকও নয়। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে। সে সময় বহু বিশ্ববিদ্যালয়, বহু কলেজ-ক্যাডেট কলেজ, স্কুল, ক্যান্টনমেন্ট ও কলকারাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ২৩ বছরে একখানি বইও এ নিয়ে লেখা হয়নি যে কেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা হল। ভারত তো ১৯৪৭ সালের আগে অখণ্ডই ছিল। কিন্তু কেন ভাঙ্গার প্রয়োজন দেখা দিল? ২৩ বছরেও এ প্রশ্নটির জবাব দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের ছাত্ররা দেশে বিদেশে কত জীবজন্তু, লতা-পাতা, কবিতা-পুথির উপর গবেষণা করে, পিএইচডি ডিগ্রিও নেয়। কিন্তু অখণ্ড ভারত ভেঙ্গে কেন পাকিস্তান সৃষ্টি হল তা নিয়ে কোন গবেষণা করা হয়নি। তেমন কোন বইও লেখা হয়নি। আজ যে অখণ্ড ভারতের কথা বলা হচেছ এবং যেভাবে বাঙালী মুসলমানের মনে বাড়ছে অখণ্ড ভারতের মোহ, সেটি কখনই এতটা প্রতিষ্ঠা পেত না যদি সে সময় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা নিয়ে ছাত্রদের প্রকৃত ইতিহাস জানানো হত।রাতের অন্ধকারে সুবিধা হয় চোর-ডাকাত-দুর্বিত্তদের, তেমনি অজ্ঞতায় মহা সুবিধা পায় বিদেশী শত্রুরা। তখন জনপ্রিয়তা পায় তাদের ধোকাপূর্ণ বুলি এবং ক্ষতিকর ধ্যান-ধারণা। অখণ্ড ভারতের মোহ তো সে কারেণই বাড়ছে। ইসলামে অজ্ঞ থাকা তাই কবীরা গুনাহ।

“পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না হলেই ভাল হত। অখণ্ড ভারতে মুসলমানরা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হত -এ বিশাল জনসংখ্যা শক্তিশালী মুসলিম শক্তির জন্ম ঘটাতো।” এরূপ নানা প্রশ্ন অনেকের। তাদের জিজ্ঞাসা,“পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের কোন কল্যাণটি হয়েছে?” কিন্তু প্রশ্ন হল,অখণ্ড ভারতে বসবাস হলে কি উপমহাদেশের মুসলমানগণ সত্যই শক্তিশালী হত? ভারতে বসবাসকারি প্রায় ২০ কোটি মুসলমানেরই বা কোন কল্যাণটি হয়েছে? বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে যত মুসলমানের বাস তার চেয়ে বেশী মুসলমানের বাস ভারতে। কিন্তু ভারতে বসবাসরত মুসলমানদের শক্তি কতটা বেড়েছে? বরং বঞ্চনা সেখানে সর্বত্র।প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ভারতের সংখ্যালঘুদের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য কিছু বছর আগে একটি তদন্ত কমিশন ঘটনা করেছিলেন। সে তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে যে তথ্যগুলো বেরিয়ে এসেছে তা করুণ। শিক্ষা ও চাকুরিতে মুসলমানদের অবস্থা ভারতের অচ্ছুত নমশুদ্রদের চেয়েও খারাপ। ১৯৪৭য়ে ভারতের মুসলমানদের যে অবস্থা ছিল তা থেকে তারা অনেক নিচে নেমেছে। অর্থনৈতিক বঞ্চনার পাশাপাশি তারা নিয়মিত মারা যাচ্ছে এবং লুটপাঠ ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গায়। ভারতীয় জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ মুসলমান হলেও চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও নয়। পাকিস্তানের ব্যর্থতা অনেক। তবে দেশটির অর্জন কি এতই তুচ্ছ? পাকিস্তানের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালগুলিতে যত মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করে ভারতে মুসলিম ছাত্রদের সংখ্যা তার ৫০ ভাগের এক ভাগও নয়। অথচ একটি দেশের মানুষ কতটা সামনে এগুচ্ছে বা কীরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক শক্তিসঞ্চয় করছে তা পরিমাপের একটি নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা। ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে চাকুরিজীবী প্রফেশনালদের সংখ্যাও অনি নগন্য। পাকিস্তানের একমাত্র করাচী শহরে যত ডাক্তার, শিক্ষক, প্রকৌশলী,আইনবিদ,প্রফেসর, বিজ্ঞানী ও সামরিক অফিসারের বসবাস সমগ্র ভারতে মুসলমানদের মাঝে তা নেই। তাছাড়া পাকিস্তানে যতজন পারমাণবিক বিজ্ঞানী বা পদার্থ বিজ্ঞানীর বসবাস তা ভারতীয় মুসলমানের মাঝে দূরে থাক, ৫০টির বেশী মুসলিম দেশের মধ্যে আর কোন দেশেই নাই। সম্প্রতি ব্রিটিশ পত্রিকায় প্রকাশ, পাকিস্তানের আনবিক বোমার সংখ্যা ফ্রান্সের প্রায় সমকক্ষ। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একমাত্র তাদের হাতেই রয়েছে আনবিক বোমাধারি দূরপাল্লার মিজাইল যা ভারতীয় প্রযুক্তির চেয়ে অগ্রসর। একাত্তর থেকে পাকিস্তানে তাই অনেক সামনে এগিয়েছে। দেশটি আজও বেঁচে আছে সে সামরিক শক্তির জোরেই। নইলে ভারত ইতিমধ্যে আরো কয়েক টুকরোয় বিভক্ত করে ফেলতো। একাত্তরের পর ভারতীয় র’ সেটির পরিকল্পনাও এঁটেছিল। ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রায়না তার বই “Inside RAW”য়ে সে বিষয়ে বিস্তর বিবরণ তুলে ধরেছেন।সামরিক শক্তির বিচারে পাকিস্তানই হল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। আর এ কারণেই দেশটি তার জন্ম থেকেই সকল আন্তর্জাতিক ইসলাম-বিরোধী শক্তির টার্গেট। অখণ্ড ভারতে বসবাস করলে মুসলমানদের কি এরূপ শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ মিলতো? শক্তি সঞ্চয়ের জন্য তো নিজের পায়ের তলায় মাটি চাই, স্বাধীনতাও চাই। ভারতের মুসলমানদের কি সেটি আছে? বন্দীদের সংখ্যা জেলে যতই বৃদ্ধি পাক তাতে কি তাদের শক্তি বাড়ে?

বীজ সব জায়গায় গজায় না,বেড়েও উঠে না।বনেজঙ্গলে পড়লে গজালেও বেড়ে উঠে না। ভারতে মুসলিম প্রতিভা যে নাই তা নয়। প্রতিটি শিশুরই থাকে বিপুল সম্ভাবনা। কিন্তু ভারতে মুসলিম শিশুর বেড়ে উঠার অনুকূল পরিবেশই নাই। হিজরত এজন্যই ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মক্কার বন্দী জীবন ছেড়ে হিজরত এজন্যই আল্লাহপাক ফরয করেছিলেন। হিজরতের মাধ্যমেই তাঁরা সেদিন পেয়েছিলেন উর্বর ভূমিতে গিয়ে নিজ প্রতিভা নিয়ে বেড়ে উঠার সামর্থ। এর ফলে পেয়েছিলেন শক্তিশালী সভ্যতার নির্মান ও বিশ্বশক্তি রূপে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সামর্থ। সাতচল্লিশের পর ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলমান ভারত থেকে হিযরত করে পাকিস্তান গিয়েছিলেন এমন এক চেতনায়। তাছাড়া পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা অনর্থক গণ্য হলে শুধু পাকিস্তান নয়, স্বাংধীন বাংলাদেশের প্রয়োজনীতাও অনর্থক হয়ে দাঁড়ায়। তাই পাকিস্তানের সৃষ্টিকে অনর্থক বা অনাসৃষ্টি বলা বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর চিন্তা। বাংলাদেশ তার সমগ্র মানচিত্রটা পেয়েছে মূলত পাকিস্তান থেকে। বাংলাদেশীলা একাত্তরে বা তার পরে এ একইঞ্চি ভূমিও এ মানচিত্রে বাড়ায়নি। তাই বাংলাদেশী মুসলমানদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ১৯৪৭য়ে অর্জিত স্বাধীনতা। ১৯৭১য়ে এসে পাকিস্তান থেকে শুধু বিচ্ছিনতা জুটেছে, স্বাধীনতা নয়। ১৯৭১য়ের ১৬ই ডিসেম্বরকে স্বাধীনতা দিবস বললে তার পূর্বের পাকিস্তানী ২৩ বছরকে উপনিবেশিক বিদেশী শাসন বলে প্রমাণিত করতে হবে। কিন্তু সে পাকিস্তানী আমলকে উপনিবেশিক বিদেশী শাসনামল বললে কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর ঢাকার খাজা নাযিম উদ্দিন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হন কি করে? বগুড়ার মহম্মদ আলী এবং আওয়ামী লীগের সোহরোয়ার্দী প্রধানমন্ত্রীই বা হন কি করে? মিথ্যা কথায় হিসাব মিলানো যায় না। মিথ্যা কথা বলায় আওয়ামী লীগের নিদারুণ দায়বদ্ধতা আছে। সে দায়বদ্ধতা নিজেদের কৃত অপরাধকে গৌরবময় করার স্বার্থে। আরো দায়বদ্ধতা হল ভারতের আগ্রাসী চরিত্রকে আড়াল করার। কিন্তু যারা আওয়ামী লীগের সে অপরাধের সাথে জড়িত নয় এবং লিপ্ত নয় ভারতের লেজুড়বৃত্তিতে, অন্তত তাদের তো সত্য কথাগুলো নির্ভয়ে বলা উচিত।

বরং একাত্তরে যেটি জুটেছে সেটি হল, ভারতীয় প্রভাব বলয়ে প্রবেশ। ১৯৭১য়ের পর থেকে ভারত বাংলাদেশকে গণ্য করে তার প্রতিরক্ষা সীমানার অন্তভূক্ত একটি দেশ। যেমন হায়দারাবাদেরর নিযামের রাজ্য গন্য হত উপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের কাছে। হায়দারাবাদের নিযাম সে আমলে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন। অথচ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নিজদেশের প্রতিরক্ষায় দূরপাল্লার একখানি কামানও কিনতে দেয়নি। দেশটির মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নিতে জালের মত রেল লাইন বসিয়েছিল। তাই ১৯৪৮ সালে ভারত-ভূক্ত করতে ভারতকে একটি বুলেটও ছুড়তে হয়নি। এক দুর্বল আশ্রিত রাষ্ট্রের অবকাঠামো ব্রিটিশেরা পূর্ব থেকেই সেদেশে নির্মান করে গিয়েছিল। বাংলাদেশেও তেমনি এক অবকাঠামো নির্মান করছে ভারত ও তার বাংলাদেশী সহযোগীরা। সেটি যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক, তেমনি সাংস্কৃতিক ও সামরিক। একমাত্র অজ্ঞতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মহাবিভ্রাটই এ বাস্তব অবস্থাটিকে ভুলিয়ে দিতে পারে। অথচ বাংলাদেশের ভারতপন্থিরা সে বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রাটই বাড়িয়ে চলেছে। আর সে অজ্ঞতা ও বিভ্রাটের কারণেই ভারতের জালে আটকা বন্দীদশা নিয়েও আজ  ভারতপন্থি মহলে হচ্ছে মহাউৎসব।

 

জিন্নাহ নিয়ে বিতর্ক ও সাতচল্লিশের প্রজ্ঞা

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকে যেসব ইসলামপন্থি বা খেলাফতপন্থিরা বিরোধীতা করেন তারা সেটির পক্ষে দলিল খাড়া করতে গিয়ে বলেন, “কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ইসলামে নিষ্ঠাবান ছিলেন না।” কিন্তু কথা হল, আদালতে মামলা লড়তে গিয়ে কেউ কি উকিলের ধর্মজ্ঞানের খোঁজ নেন? বরং তাঁর উকালতির যোগ্যতা দেখেন। দেখেন, তিনি তাঁর মামলাটি জিতে দিতে পারবেন কিনা। ১৯৪৭য়ে ভারতীয় মুসলমানদের সামনে লক্ষ্য খেলাফত প্রতিষ্ঠা ছিল না,শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও ছিল না। বরং ছিল এমন একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যেখানে তারা স্বাধীন ভাবে বাঁচবার সুযোগ পাবে। সুযোগ পাবে ভবিষ্যতে সে দেশটিকে ইসলামের দুর্গ রূপে গড়ে তোলার। সে সময় প্রয়োজন ছিল ভারতীয় মুসলমানদের ঐক্য;সে সাথে প্রয়োজন ছিল এমন একজন নেতার যিনি সে ঐক্য গড়ে তোলার যোগ্যতা রাখেন। আরো প্রয়োজন ছিল, স্বাধীন পাকিস্তানের সে কেসটি ব্রিটিশ শাসকদের দরবারে বুদ্ধিমত্তার সাথে পেশ করার। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়াটি বেওকুপি। প্রথমে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, তারপর সেটির ইসলামীকরণ। তথন শরিয়ত বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবী তুললে সেটির বিরুদ্ধে প্রবল বিরোধীতা আসতো ভারতীয় হিন্দুদের পক্ষ থেকে নয়, বরং ব্রিটিশের পক্ষ থেকে। যে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ উসমানিয়া খেলাফতকে ধ্বংস করলো তাদের শাসনাধীনে থেকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবী তুললে সেটি কি তারা মেনে নিত? তখন বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রকল্পই নর্দমায় গিয়ে পড়তো।

ব্রিটিশের আদালতে ভারতের মুসলমানদের মামলাটি কে সুন্দর ভাবে পেশ করতে পারবে সে প্রশ্নটি সেদিন অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখন মুসলিম লীগ ছিল বহু ভাগে বিভক্ত। মুসলিম নেতাদের মাঝে তখন প্রতিটি প্রদেশে চলছিল প্রচণ্ড বিবাদ। বাংলায় ফজলুল হকের মত নেতা নিছক ক্ষমতার লোভে জোট বেঁধেছিলেনে হিন্দু মহাসভার মত প্রচণ্ড মুসলিম বিদ্বেষীদের সাথে,গড়েছিলেন শ্যামা-হক কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা। সবচেয়ে বেশী মুসলমানের বাস ছিল বাংলায়। কিন্তু তাঁরা সমগ্র ভারতের মুসলমানদের কি নেতৃত্ব দিবে,নিজেরাই লিপ্ত ছিল প্রচণ্ড কলহবিবাদে। ভারতের ইতিহাসে তখন ক্রান্তিলগ্ন। আগামী বহু শত বছরের জন্য তখন ভারতের নতুন ভৌগলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নির্মিত হতে যাচ্ছে। কোন জাতিকে এমন  মুহুর্তের জন্য শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়। ব্রিটিশেরা তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা ভারতের শাসনভার ভারতীয়দের হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে। যদি ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের হাতে যায় তবে মহা বিপর্যয় নেমে আসবে ভারতের মুসলমানদের উপর। সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে তারা তখন যা ইচ্ছে তাই করার সুযোগ পাবে। এমনটি হলে মুসলমানদের জন্য তখন শুধু মনিব বদল ঘটবে, স্বাধীনতা আসবে না। বাংলার মুসলমানরা হিন্দু-মানস ও হিন্দু জমিদারদের নির্মম অত্যাচার ও শোষণ দেখেছে নিজ চোখে এবং নিজ ঘরের আঙিনায়। সেটির বিরুদ্ধে তবুও ব্রিটিশ আদালতে অভিযোগ তোলা যেত। কিন্তু সমগ্র ভারতের শাসন যদি হিন্দুদের হাতে যায় তখন দুর্বিসহ এক মহাবিপর্যয় নেমে আসবে ভারতীয় মুসলমানদের জীবনে। তাই হিন্দুদের হাতে রাষ্ট্রের শাসনভার গেলে তার পরিনতি যে ভয়াবহ হবে তা নিয়ে বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে সামান্যতম সংশয়ও ছিল না। বাংলার মুসলমানদের মাঝে শিক্ষার হার তখন শতকরা ৭ ভাগও ছিল না। কিন্তু সে নিরক্ষরতা সত্বেও হিন্দু শাসনের ভয়ানক ভবিষ্যৎ আলামত টের পেতে ভূল করেনি। তাই গান্ধি বা নেহেরুকে তারা বন্ধু রূপে গ্রহণ করেননি। অথচ বাংলাদেশে আজ  বহু শত প্রফেসর, বহু বিচারপতি, বহু হাজার আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবী। ১৯৪৭য়ে এদের সংখ্যা আজকের তুলনায় শত ভাগের এক ভাগও ছিল না। কিন্তু আজকের এ ডিগ্রিধারিরা যে কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিচ্ছেন বাংলার নিরক্ষর গ্রামীন জনগণ ১৯৪৭ সালে তার চেয়ে অধিক কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছিলেন। কাণ্ডজ্ঞান আসে বিবেকের সুস্থ্যতা, চিন্তাভাবনার সামর্থ, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নৈতিক সততা থেকে। নিছক সার্টিফিকেট থেকে নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ ছিলেন মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। বিশ্ববিদ্যালয়ের কুশিক্ষা বরং মনের সে মহৎগুলো ধ্বংসও করে দিতে পারে। বাংলাদেশের আজকের শিক্ষাব্যবস্থা তো সে ধ্বংস প্রক্রিয়াকেই প্রকট ভাবে বাড়িয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশ তো মূলত তাদেরই নিজ হাতের সৃষ্টি।

১৯৪৭ সালে বাংলার নিরক্ষর মানুষগুলো সেদিন তারা ভাষা ও আঞ্চলিক ক্ষুদ্রতার উর্ধ্বে উঠে এক অবাঙালী জিন্নাহকে নিজেদের নেতা রূপে গ্রহণ করেছিলেন, কোন ভারতীয় সেবাদাসকে নয়। গণতন্ত্রের হত্যাকারি কোন ফাসিষ্ট নেতাকেও নয়। এ এক অপূর্ব বিচক্ষণতা। নইলে সেদিন পাকিস্তানই প্রতিষ্ঠা পেত না।জনাব জিন্নাহ ছিলেন সর্বভারতে অন্যতম সেরা আইনজীবী। তাঁর ছিল মুসলিম স্বার্থের প্রতি অটুট অঙ্গিকার। সে অঙ্গিকারটি যখন তিনি কংগ্রেস করতেন তখনও দেখিয়েছেন। মুসলিম স্বার্থের সুরক্ষায় তিনিই ১৪ দফা পেশ করেছিলেন। মহান দার্শনিক আল্লামা ইকবালের দৃষ্টিতে জিন্নাহর সে গুণটি ধরা পড়েছিল বলেই তিনি তাঁকে ভারতের বিপর্যস্ত মুসলমানদের নেতৃত্বের দায়ভার নিতে অনুরোধ করেছিলেন। এ বিষয়টি হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহঃ)ও বুঝতেন। তিনিও কংগ্রেসপন্থি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বিরোধীতার মুখে জিন্নাহর প্রতি সমর্থন দেয়ার জন্য ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। সে সময় তাঁর মত সুন্দর করে ও বলিষ্ঠ ভাবে আর কে মুসলমানদের দাবীটি উত্থান করতে পেরেছিলেন? অখণ্ড ভারতপন্থিরা জিন্নাহর বিরোধীতা করবে সেটি স্বাভাবিক। কারণ সেটি তাদের রাজনীতির মূল বিষয়। ভারতের মদদপুষ্ট বাঙালীবাদীরাও তাঁকে ঘৃনা করবে সেটিও স্বাভাবিক। সেটি রাজনীতির বিষয় তাদের কাছেও। কিন্তু যারা ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতা ও কল্যাণ দেখতে চান তারাও কি জিন্নাহর মহান অবদানকে অস্বীকার করতে পারেন? তার নেতৃত্বেই গড়ে উঠে ছিল বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। তিনিই কি একমাত্র নেতা যিনি ভারতের সূন্নী-শিয়া, দেওবন্দী-বেরেলভী, বাঙালী-বিহারী, পাঞ্জাবী-পাঠান, সিন্ধি-বেলুচ তথা নানা ফেরকা ও নানা ভাষার মুসলমানদের একত্রিত করতে পেরেছিলেন। এটি ছিল এক বিশাল কাজ। একাজটি অন্য আর কার হাতে হয়েছে? কার হাতেই বা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল? বহু নেতা ও বহু আলেম এমন মহান কাজে উদ্যোগ নেয়া দূরে থাক, আগ্রহ পর্যন্ত দেখাননি। ব্যস্ত থেকেছেন নিজেদের মাদ্রাসা বা হুজরা নিয়ে। সমগ্র ভারতের মুসলমানদের একতাবদ্ধ করা দূরে থাক, অধিকাংশ নেতা বা আলেমগণ তো নিজ ফেরকা¸ নিজ মজহাব বা নিজ প্রদেশের মুসলমানদের একতাবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও তেমন যোগ্যতাই দেখাতে পারেননি। বরং ফেরকা ও মজহাবের নামে বাড়িয়েছেন বিভক্তি ও বিভেদ। অথচ বিভক্তি ও বিভেদ গড়া হারাম।

 

খাঁচার জীবন ও স্বপ্ন দেখার সামর্থ

খাঁচার পাখি বাসা বাঁধার চিন্তা করে না। খাবার খোঁজার চিন্তাও করে না। খাঁচার বন্দীদশায় সে সামর্থ থাকে না। ফলে সে ভাবনাও থাকে না। কিন্তু খাঁচার বাইরের স্বাধীন পাখিকে সে ভাবনা প্রতিমূহুর্তে করতে হয়। মুসলমান রাষ্ট্র গড়ে এজন্য নয় যে, সেখানে সে শুধু ঘর বাঁধবে, সন্তান পালন করবে ও ব্যবসা-বাণিজ্য করবে। বরং তাঁর দায়-ভার আরো বিশাল। সেটি ইসলামী রাষ্ট্র গড়া এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করা। ঈমানদার হওয়ার এটিই তো মূল দায়ভার। এ দায়ভার পালন করতে গিয়েই মুসলমানগণ নিজ মাতৃভূমি থেকে হিজরত করে মদিনায় গিয়েছিলেন। এবং নিজ অর্থ, নিজ শ্রম ও নিজ রক্তের বিণিয়োগ ঘটিয়েছিলেন। নবীজী (সাঃ)র আমলে শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন সে দায়ভার পালনে। খাঁচার বন্দিদশা সিংহকে যেমন শিকার ধরার দায়ভার থেকে দূরে রাখে, তেমনি অমুসলিম দেশের বন্দিদশী মুসলমানকে ভুলিয়ে দেয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দায়ভার। কেড়ে নেয় ইসলামী সমাজ ও সভ্যতার নির্মানের সামর্থ। তাই কোন অমুসলিমের দেশে ও অমুসলমানদের শাসনাধীনে শরিয়ত বা ইসলামী সভ্যতার প্রতিষ্ঠা ঘটেছে ইতিহাসে তার নজির নেই। তাই ব্রিটিশ ভারতের মুলমানরা সে পরাধীনতার দিনে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্টা দূরে থাক, তার স্বপ্নও দেখতে পারিনি। সে স্বপ্ন যেমন হোসেন আহম্মদ মাদানীর ন্যায় দেওবন্দি আলেমগণ দেখতে পারিনি, তেমনি মাওলানা মওদূদীও দেখতে পারিনি। তাবলিগ জামায়াতের মাওলানা ইলিয়াসও দেখতে পারেননি। তারা বড় জোর মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, বই লেখা, পত্রিকা প্রকাশ করা বা ওয়াজ-নসিহতের আয়োজন করতে পারতেন। কিন্তু  ইসলামের মিশন বা নবীজী (সাঃ)র সূন্নত শুধু এগুলো নয়। খাঁচার পরাধীনতার সবচেয়ে বড় কুফল হল, স্বাধীন জীবনের সে সাধই কেড়ে নেয়। কেড়ে নেয় লড়বার আগ্রহ। আনে স্থবিরতা। খাঁচার বাঘকে তাই ছেড়ে দিলেও সে খাঁচা ছেড়ে সহজে বেড়িয়ে আসতে চায় না। তাই যখন উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশের খাঁচা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার দিন ঘনিয়ে এল তখনও দেওবন্দী ওলামাদের অনেকে স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে মেনে নিতে পারিনি। তারা শুধু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতাই করেনি, বরং হিন্দুদের অধীনে আরেক খাঁচায় ঢুকাটিকেই শ্রেয়তর মনে করলো। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় ফায়দাটি হল, ১৯৪৭য়ের ১৪ই আগষ্টের পর দেশটির বিশাল মূসলিম জনগোষ্ঠির স্বপ্নই পাল্টে গেল। ফলে যেসব দেওবন্দী আলেম বা জামায়াতে ইসলামীর যে সব নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানে হিজরত করলেন তারা তখন স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন ইসলামী রাষ্ট্র নির্মানের। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এ হল প্রথম এবং সবচেযে বড় সুফল। দীর্ঘ গোলামী জীবনের পার এল এক মহা সুযোগ। জামায়াতে ইসলামের নেতারা তখন ব্রিটিশ শাসনাধীন গোলামী জীবনের দলীয় গঠনতন্ত্র তাড়াতাড়ি পাল্টিয়ে ফেললেন। সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানের রাজনীতিতে অংশ নেয়ার এবং পাকিস্তানকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার। অপর দিকে ভারতের জামায়াত বা জমিয়তে উলামা হিন্দের অবস্থা? তারা এখনও কিছু মাদ্রাসা-মসজিদ গড়া, বই লেখা, ওয়াজ মহফিল করা নিয়ে ব্যস্ত। এর বাইরে স্বপ্ন দেখার সামর্থও তাদের সামান্য।

 

পাশ্চাত্যের পাকিস্তানভীতি?

কোনটি খাঁচার পাখি আর কোনটি বনের পাখি সেটি বুঝতেও বেশী বিদ্যাবুদ্ধি লাগে না। তেমনি কে স্বাধীন দেশের মুসলমান আর কে পরাধীন দেশের মুসলমান সেটিও বুঝতে বেগ পেতে হয় না। উভয়ের মাঝের ভিন্নতাটি দেহের নয়, পোষাক-পরিচ্ছদ বা খাদ্যের নয়, বরং চেতনার এবং সামর্থের। পাকিস্তান নিয়ে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদী মহল ও তার দোসররা বড় চিন্তিত। অথচ তাদের সে চিন্তা ভারতীয় মুসলমানদের নিয়ে নেই। খাঁচার বাঘকে নিয়ে কি কেউ চিন্তা করে? যত ভয় তো বনের মূক্ত বাঘকে নিয়ে। ফলে ইসলামের শত্রু পক্ষের চিন্তার কারণ, পাকিস্তানে জিহাদী চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠা বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিয়ে। তাদের সামর্থ তারা দেখেছে আফগানিস্তানের জিহাদে। আফগান মোজাহিদদের সাথে নিয়ে তারাই সোভিয়েত রাশিয়াকে পরাস্ত করে ছেড়েছে। তারাই গড়ে তুলেছিল আন্তর্জাতিক জিহাদ। সে লড়াইয়ে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে অন্যান্য দেশের মুসলমানদের। তারই ফলে হাজার হাজার মুসলমান ছুটে এসেছে সূদুর আল-জিরিয়া, সৌদি আরব, মিশর, লিবিয়া, জর্দান, সিরিয়া থেকে। এটি ছিল এমন এক নিরেট জিহাদ যা নিয়ে কারো কোন সন্দেহ ছিল না। জিহাদটি ছিল সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন কম্যিউনিষ্ট কাফের কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত মুসলমানদের। কিন্তু প্রশ্ন হল, ক’জন ভারতীয় সে জিহাদে যোগ দিয়েছে? অথচ ভারত আলজিরিয়া, মিশর বা সৌদি আরবের ন্যায় আফগানিস্তান থেকে দূরের দেশ নয়। কিন্তু ভারত থেকে কেউ আসেনি। খাঁচায় বন্দী মানুষ সামনে মানুষ খুন হতে দেখেও তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করে না। কারণ সে সামর্থও তাঁর থাকে না। ফলে কোন সাধারণ ভারতীয় মুসলমান দূরে থাক সেদেশের কোন বিখ্যাত আলেমের মাঝেও সে জিহাদী চেতনা জাগেনি। অথচ বহু হাজার সাধারণ পাকিস্তানীরা সে জিহাদে শহিদ হয়েছেন। শহিদ হয়েছেন এমনকি সেদেশের প্রেসিডেন্ট জেয়াউল হক। তাদের সে রক্ত ও কোরবানীর বরকতেই দুনিয়ার মানচিত্র থেকে সোভিয়েত রাশিয়া বিলুপ্ত হয়েছে। অথচ এর আগেও সোভিয়েত রাশিয়া হাঙ্গেরী ও চেকোস্লাভাকিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছিল। দেশ দুটিকে দখলও করেছিল। কিন্তু সে সময় সোভিয়েত রাশিয়ার গায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিপুল বিণিয়োগ সত্ত্বেও একটি আঁচড়ও কি কাটতে পেরেছে? কারণ সেখানে বহু মিত্র দেশ থাকলেও পাকিস্তান ছিল না।

পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলোতে যে ইসলামের চর্চা হয় সেখানে নামায-রোযা, হজ-যাকাতের পাশাপাশি জিহাদ আছে। শরিয়তের প্রতিষ্ঠার তাগিদও আছে। আর সে ইসলামী জ্ঞান চর্চায় যোগ দিচ্ছে বিশ্বের নানা দেশের যুবক। এখানেই মার্কিনীদের ভয়। তারা চায়, মুসলমানদের ইসলাম চর্চায় নামায-রোযা, হজ-যাকাত, বিয়ে-শাদী ও বিবি তালাকের মসলা থাকবে -সেটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও জিহাদ থাকবে এবং খেলাফতের প্রতিষ্ঠা থাকবে -সেটি হতে পারে না। ভারতে ব্রিটিশ শাসকরা তাদের দীর্ঘ শাসনামলে ইসলাম চর্চাকে এর বাইরে যেতে দেয়নি। মুসলমানদের স্বাধীন কোরআন চর্চাকে তারা মেনে নিতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা পাকিস্তানসহ সকল মুসলিম দেশের স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার সিলেবাসে সংশোধন আনতে চাপ দিচ্ছে। তারা জানে, জিহাদ থাকলে আগ্রাসী দেশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধও থাকবে। জিহাদ শুরু হবে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়েও। শরিয়ত হল সেক্যিউলার আইন-আদালতের বিরুদ্ধে এক বিকল্প বিধান, এটি একটি বিকল্প মূল্যবোধ। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য তাদের আইন-আদালত ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে কোন বিকল্প বিধান মেনে নিতে চায় না। আফগানিস্তানে মার্কিনী হামলার মূল কারণ তো সেটাই। তারা বিশ্বটাকে একটি গ্লোবাল ভিলেজ মনে করে। চায়, সে গ্লোবাল ভিলেজে অভিন্ন পাশ্চাত্য মূল্যবোধ ও আাইনের প্রতিষ্ঠা। তাদের ব্যাভিচারী বা মদ্যপায়ী নাগরিকগণ কোন মুসলিম দেশে বেড়াতে গিয়ে শরিয়তি আইনের মুখে পড়ুক সেটি তারা মেনে নিতে পারেনা। মার্কিনীরা এজন্যই যে কোন দেশে ইসলামী শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরোধী। তাদের অবস্থান তাই আল্লাহর বিরুদ্ধে। আর মার্কিনীরা যেটা পাকিস্তানে বা অন্যান্য মুসলিম দেশে চায়, ভারত সেটিই বাস্তবায়ন করছে তার খাঁচায় অন্তরীণ ভারতীয় মুসলমানদের উপর। ফলে ভারতীয় মুসলমানদের ইসলাম চর্চায় নামায-রোযা আছে, হজ-যাকাত এবং তাবলিগও আছে। কিন্তু শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কোন ভাবনা নেই। জিহাদও নেই। ফলে এ এক অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম। ভারত সরকার ইসলামের সে মডেলই আওয়ামী লীগারদের দিয়ে বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করাতে চায়। বাংলাদেশের রাজপথে তাই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে সড়কে মানুষ না নামলে কি হবে, লাগাতর বেড়ে চলেছে তাবলিগ জামাতের ইজতেমায় লোকের সমাগম। এটি ঠিক, পাকিস্তান আজও  একটি ইসলামী রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠা পায়নি। তবে যা  প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেটিও কি বাংলাদেশে বা ভারতে কি ভাবা যায়? অন্য কোন মুসলিম দেশও কি এতটা এগিয়েছে। তুরস্কে তো মেয়েদের মাথায় উড়না পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কর্মস্থলে যাওয়া নিষিদ্ধ। অপর দিকে ভারত? সেখানে মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মান করার সহজে অনুমতি মেলে না। ফলে দিল্লি, মোম্বাইয়ের ন্যায় অনেকে শহরে মানুষ জুম্মার নামায পড়ছে রাজপথে দাঁড়িয়ে। গরু কোরবানী নিষিদ্ধ করা হয়েছে বহু প্রদেশে। অনেক শহরে মাইকে আযানও দেওয়ার অনুমতিও নেই। এই হল ভারতীয় মুসলমানদের স্বাধীনতা।

পাকিস্তান প্রতিষ্টার কয়েক বছরের পর সমগ্র উলামা একত্রিত হয়ে ২২ দফা ইসলামী মূল নীতি অনুমোদন করে। আজও সেটি পাকিস্তানে শাসনতন্ত্রের মৌলিক অংশ যা ধাপে ধাপে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে সরকারের উপর বাধ্যতামূলক করে রেখেছে। এবং অসম্ভব করে রখেছে শরিয়তের বিরুদ্ধে কোন আইন প্রণয়ন। ফলে পাকিস্তানে শরিয়ত পরিপূর্ণ ভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে কি হবে, সে সম্ভাবনা এখনও বিলুপ্ত হয়নি। প্রবর্তিত করেছে ব্লাফফেমী আইন।।আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লিখলে বা বললে প্রাণদণ্ড হয়। অথচ ভারতে সেটি ভাবাও যায়। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে স্বপ্নও দেখা যায় না। বিল্ডিং প্রতিষ্ঠা করতে হলে ভূমি চাই। পাকিস্তান মুসলমানদের জন্য সেই ভূমিটা দিয়েছে। তাই যতদিন পাকিস্তানে থাকবে সে সম্ভাবনাও থাকবে। অথচ বাংলাদেশে আজ শরিয়ত দূরে থাক, গঠনতন্ত্রে বিসমিল্লাহ রাখাই অসম্ভব হচ্ছে। অসম্ভব হয়েছে জিহাদের উপর বই প্রকাশ করা। জিহাদকে বলা হচ্ছে সন্ত্রাস। ইসলামী সংগঠনগুলোকে জিহাদী সংগঠন বলে তার নেতাদের জেলে ঢুকানো হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রকৃত অবস্থা, রাজা যা করে সভাসদ করে শতগুণ। সভাসদরা নির্যাতনে বাড়াবাড়ি করে রাজার মন জুগানোর সার্থে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তাই ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয়। তারা ব্যস্ত ভারতীয় মনিবদের খুশি করা নিয়ে। ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতকে খুশি করাটিকে তারা অপরিহার্য মনে করে। তাই ভারতে হিজাব, ইসলামী সংগঠন বা ইসলাম চর্চার বিরুদ্ধে যা হচ্ছে, বাংলাদেশে হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশী।

 

অরক্ষিত বাংলাদেশ

বাঘের পাল দ্বারা ঘেরাও হলে বিশাল হাতিও রেহাই পায় না। তাই যে জঙ্গলে বাঘের বাস সে জঙ্গলের হাতিরাও দল বেঁধে চলে। বাংলাদেশের বাস্তবতা হল, মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এক দেশ। ঘেরাও হয়ে আছে আগ্রাসী হিন্দুদের দ্বারা। ফলে বাংলাদেশ এক অরক্ষিত দেশ। এদেশটির সীমাবদ্ধতা প্রচুর। যে কোন দেশের প্রতিরক্ষার খরচ বিশাল। আর ভারতের মত একটি বিশাল আগ্রাসী দেশের বিরুদ্ধে সে খরচ তো আরো বিশাল। এ বাস্তবতার দিকে খেয়াল রেখেই বাংলার তৎকালীন নেতা খাজা নাযিমউদ্দিন, সোহরোয়ার্দি, আকরাম খান প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী সভায় লোহোর প্রস্তাবে সংশোধনী এনেছিলেন এবং পাকিস্তানে যোগ দেবার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পূর্ব বাংলা এভাবেই পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিল সেদেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশে রূপে। অথচ এরূপ পাকিস্তানভূক্তিকেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বলছে পাকিস্তানে উপনিবেশিক শাসন। নিরেট মিথ্যাচার আর কাকে বলে? কোন দেশে উপনিবেশিক শাসন গড়তে হলে যুদ্ধ লড়তে হয়। প্রয়োজন পড়ে মীর জাফরদের। প্রয়োজন পড়ে লর্ড ক্লাইভ ও পলাশির। প্রশ্ন হল, ১৯৪৭য়ে কে ছিল সেই মীর জাফর? কে ছিল ক্লাইভ? সে মীর জাফর কি ছিলেন সোহরোয়ার্দী? খাজা নাজিমুদ্দিন বা আকরাম খাঁ যারা বাংলাকে পাকিস্তান ভূক্ত করেছিলেন? আর উপনিবেশিক বাহিনীই বা কোথায়? মেজর জিয়া, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর আব্দুল জলিল, মেজর খালিদ মোশার্রফ কি তবে সে উপনিবেশিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন? এটি এক নিরেট মিথ্যাচার।

১৯৪৭য়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর দেশটির প্রধানতম সমস্যা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। সে সমস্যার সমাধানটি আদৌ বিভক্ত হওয়ার মধ্যে ছিল না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ রূপে শুধু পাকিস্তানের রাজনীতিকে নয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর রাজনীতিতে এবং সে সাথে বিশ্ব রাজনীতিতেও বাঙালী মুসলমানরা প্রভাব ফেলতে পারতো। কিন্তু শেখ মুজিব সে সুযোগ থেকেও তাদেরকে বঞ্চিত করেছেন। এটি তাঁর আরেক অপরাধ। তবে এক্ষেত্রে জনগণও নির্দোষ নয়। জনগণের অপরাধ, তারা নির্বাচিত করেছে গণতন্ত্র হত্যাকারি এক ফাসিস্টকে। শুধু যে ভোট দিয়েছে তা নয়, অর্থ এবং রক্তও দিয়েছে। সে সাথে পরম বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে ভারতীয়দের। অপর দিকে ভারতের মোহ শুধু একাত্তরে নয়, আজও  তা বেঁচে আছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। সেটি গ্রাস করছে শুধু সেক্যিউলারদেরই নয়,বহু ইসলামপন্থিকেও। তাদের বিভ্রাট,ভারতের বিজয় এবং বাংলাদেশের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের আধিপত্যকেও তারা নিজেদের বিজয় ও নিজেদের অর্জন বলে উৎসবও করছে। চিন্তা-চেতনার এ এক ভয়ানক আত্মঘাতি রূপ। রোগ না সারলে সেটি প্রতিদিন বাড়ে। তেমনি বাড়ে চেতনার রোগও। তাই যে রোগ এক সময় ভারতপন্থিদের ছিল সেটি এখন অন্যদেরও গ্রাস করছে। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এর চেয়ে ভয়ানক হুমকি আর কি হতে পারে? ০৭/০৬/২০১১

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *