বিবিধ ভাবনা (৪১)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 ১.  ঈমানদার ও বেঈমানের  রাজনীতি

ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা ও আশা-আকাঙ্খা কখনোই গোপন থাকে না; সেগুলির সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে রাজনীতিতে। ঈমানদারের রাজনীতিতে ঘটে ঈমানের প্রকাশ।  তাতে প্রকাশ ঘটে মহান আল্লাহতায়ালা কি চান –সেটির। মহান আল্লাহতায়ালা চান তাঁর দ্বীনের বিজয়, চান আদালতে তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। চান, মুসলিমদের ঐক্য। তাই ঈমানদারের রাজনীতি থাকে মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধির প্রচন্ড ভাবনা। তাই তাঁর রাজনীতিতে কখনোই মুসলিম দেশের ভূগোল ভাঙ্গার ভাবনা থাকে না, বরং থাকে ভূগোল বৃদ্ধির ভাবনা। থাকে সর্ব শক্তি দিয়ে শত্রুশক্তির ভূগোল ভাঙ্গার রাজনীতির বিরোধীতা। একাত্তরে সে ভাবনা থেকেই প্রতিটি ইসলামী দল, প্রতিটি হকপন্থী আলেম ও ঈমানদার ব্যক্তি পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধীতা করেছে এবং বহু হাজার ব্যক্তি রাজাকার হয়েছে। অতীতে সে ভাবনা থেকেই মুসলিমগণ সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তির জন্ম দিয়েছে।

মুসলিমদের শুধু ঈমানদারদের চিনলে চলে না; চিনতে হয় বেঈমানদেরও। নইলে শত্রু ও মিত্র চেনার কাজটি হয় না। বেঈমানদের চেনার কাজটি সহজ হয় তাদের রাজনীতি দেখে। এদের রাজনীতিতে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা পূরণের কোন ভাবনা থাকে না। বরং থাকে ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতি করার ভাবনা। থাকে, যে কোন ভাবে ক্ষমতা দখলের এজেন্ডা। এবং সেটি কাফেরদের সাহায্য নিয়ে মুসলিম দেশকে খন্ডিত করার মধ্য দিয়ে হলেও। মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বেঈমানগণ সে কাজটিই করেছে একাত্তরে। তারা সেটি করেছে ভারতের ন্যায় কাফের দেশের মুসলিম বিরোধী এজেন্ডা পূরণের মধ্য দিয়ে। ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তান ভাঙ্গতে চেয়েছে; তারা অপেক্ষায় ছিল একজন মুজিবের। ১৯৭১’য়ে ভারতের অস্ত্র নিয়ে ভারতের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুজিবপন্থীগণ সেদিন যুদ্ধ করেছে। সামান্য ঈমান থাকলে কেউ কি এরূপ কাজ করতে পারে? ইসলামের প্রতি নিজেদের বেঈমানীটিট জানিয়েছে ইসলামের পক্ষ ছেড়ে এবং জাতীয়তাবাদের ন্যায় কুফরি মতবাদে দীক্ষা নিয়ে।  

প্রশ্ন হলো যারা কাফেরদের বিজয়ী করতে ও তাদের এজেন্ডা পূরণে তাদের দেয়া অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করে তাদেরকে কি ঈমানদার বলা যায়? বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরাই হলো ভারতের পদলেহী তাঁবেদার পক্ষ। ইসলাম ও মুসলিমের পরাজয় নিয়ে এরা ভারতীয় কাফেরদের সাথে মিলে উৎসব করে। প্রতিবছর সেটি দেখা যায় ১৬ই ডিসেম্বর এলে। দক্ষিণ এশিয়ার বুকে ভারত আজ বৃহৎ শক্তি –সেটি তো তাদের ভারতসেবী রাজনীতির কারণে। এরা শুধু পাকিস্তানের শত্রু নয়, বরং ভয়ানক শত্রু হলো ইসলাম ও বাঙালী মুসলিমদের। সে সাথে শত্রু গণতন্ত্রের।  বাঙালী মুসলিমদের মুসলিম রূপে বাঁচতে হলে এ শত্রুদের নির্মূল করতেই হবে। প্রতিটি মুসলিম জীবনে জিহাদ থাকে। বাঙালী মুসলিম জীবনে সে জিহাদটি হলো এ বেঈমানদের বিরুদ্ধে। লক্ষ্য এখানে পুণরায় পাকিস্তান বানানো নয়, বরং বাঙালী মুসলিমদের মাথা তুলে দাঁড়ানো। দায়িত্ব এখানে প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলা, আসাম, বিহার ও আরাকানে বসবাসকারী ২২ কোটি মুসলিমের নেতৃত্ব দেয়া।

২. যে পাপ বাঙালী মুসলিমের

বাংলাদেশে নিজ দল, নিজ জামায়াত, নিজ ফিরকা, নিজ মাযহাব, নিজ পীর ও নিজ নেতাকে বিজয়ী করতে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ করছে। দেশের পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী, বিজিবি, প্রশাসন, বিচারক বাহিনী তাদের সর্বশক্তি বিনিয়োগ করছে ভোটচোর অবৈধ হাসিনার প্রতিটি হুকুমকে প্রতিষ্ঠিত দিতে। কিন্তু দেশে লোক নাই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমকে বিজয়ী করার । ফলে বাংলাদেশের বুকে বিজয়টি ইসলামের শত্রুদের। বাঙালী মুসলিমগণ এভাবেই পরাজয় বাড়িয়েছে ইসলামের। এবং অসম্মান বাড়িয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার। এ পাপ তো বিশাল। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত দিয়ে কি এ পাপ মোচন হয়?

৩. গোলামীর পথে বাঙালী মুসলিম

ঈমান থাকলে জিহাদও আসে। কারণ জিহাদ ঈমানের অংশ। তাই নবীজী (সা:) ও তাঁর প্রতিটি সাহাবার জীবনে জিহাদ ছিল। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। জিহাদ মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য আনে। ফলে বিজয় আসে। তখন বিজয়ী হয় মুসলিম এবং প্রতিষ্ঠা পায় ইসলাম। এবং জিহাদ না থাকলে আসে পরাজয়। বাঙালী মুসলিম জীবনে জিহাদ নাই, ফলে বাঙালী মুসলিম জীবনে বিজয়ও নাই। তাদের বাঁচতে হয় শয়তানী শক্তির গোলামী নিয়ে। বাঙালীরা মুসলিমগণ ১৯৭১ থেকে ভারতের গোলামীর পথটাই বেছে নিয়েছে। তাই নির্যাতন, জেল ও মৃত্যু নেমে এসেছে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের জীবনে।  

৪. খুনিদের উৎসব

হাসিনা ঢাকার খুনি। সে শত শত মুসলিমের লাশ ফেলছে। আর নরেন্দ্র মোদি হচ্ছে গুজরাতের খুনি। সে যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন ৫ হাজার মুসলিমের লাশ ফেলেছে। বাবরী ধ্বংসের কাজেও সে অংশ নেয়। দুই খুনি এখন ঢাকায় উৎসব করছে। জনগণকে রাস্তায় নামতে নিষেধ করেছে।

বন্ধুত্ব গড়তে সবাই মনের মিলটা দেখে। এজন্যই দুর্বৃত্তরা সব সময় দুর্বৃত্তদের ভালবাসে। কারণ,তারাই তাদের মনের অতি কাছের মানুষ। মাছি যেমন মলমুত্র খোঁজে, দুর্বৃত্তও তেমনি দুর্বৃত্ত খোঁজে। তেমনি খুনি খোঁজে আরেক খুনিকে। এজন্যই খুনি হাসিনা তার পিতার জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে কোন ভাল মানুষকে নয়, গুজরাতের কুখ্যাত খুনি নরেন্দ্র মোদিকে অতিথি করেছে। হাসিনা জানে, নরেন্দ মোদি তাকে যেমন ভালবাসে, দুনিয়ার কোন সভ্য মানুষই সেরূপ ভালবাসে না।বরং নিজের অসভ্য ও বর্বর কর্মের জন্য প্রতিটি সভ্য মানুষের কাছেই সে ঘৃণার পাত্র।

৫.অবমাননা মহান আল্লাহতায়ালার এবং বিজয় শয়তানের

বাংলাদেশে আইন অমান্য করলে বা কোন দুর্বৃত্ত বিচারপতির হুকুমের অবমাননা করলে শাস্তি হয়। দেশের পুলিশ বাহিনী ও আদালত সে অবমাননাকারীকে জেলে তুলতে তৎপর। অথচ দেশটিতে  দিনরাত বিদ্রোহ ও অবমাননা হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম ও তাঁর শরিয়তি আইনের। অথচ তার কোন বিচার নাই; কারো কোন শাস্তিও নাই। কোন প্রকৃত ঈমানদার কি তাঁর মহান প্রভুর এরূপ অবমাননা কখনো সইতে পারে? সইলে কি ঈমান থাকে?

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মু’মিনের পরিচয় হলো, সে তাঁর পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফা ও সৈনিকের। সৈনিকের কাজ তো রাজার আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের ধরে ধরে শাস্তি দেয়া। নইলে ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটি শুধু কিতাবেই থেকে যায়।  নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের যুগে  কেউ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম ও তাঁর শরিয়তি আইনের বিরুদ্ধে এরূপ অবমাননা ও বিদ্রোহ করলে কি তার ঘাড়ে মাথাটি থাকতো? অথচ বাংলাদেশে আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে বাঁচাটিই সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এরপরও তারা গর্ব করে বলে, তারা ঈমানদার? নবীজী (সা:)’র যুগে প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ ছিল মুনাফিক -যারা নবীজী (সা:)’র পিছনে মসজিদে নববীতে নামায পড়তো। বাংলাদেশে এ মুনাফিকদের সংখ্যা যে বিপুল -তা কি নিয়ে সন্দেহ আছে?  দেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও আইন-আদালতে তো এরাই বিজয়ী শক্তি। তাই বাংলাদেশে উৎসবটি শয়তান ও তার অনুসারীদের।

৬. জিহাদ বাছাই কাজ করে ঈমানদারদের

নামাযে অর্থ ও রক্তের খরচ নাই, তাই সেখানে সুদখোর, ঘুষখোর ও মিথ্যুক দুর্বৃত্তদের দেখা যায়। মুনাফিকদেরও দেখা যায়। তাদের থেকে প্রকৃত ঈমানদারদের আলাদা করার ক্ষেত্রটি হলো জিহাদ। জিহাদে তারাই যোগ দেয় -যারা প্রকৃত ঈমানদার। তাঁরা বাঁচে ও প্রাণ দেয় মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে এবং তাঁর বিধানকে বিজয়ী করতে। জিহাদে তো তারাই যোগ দেয় যারা বিনা বিচারে জান্নাতে যেতে চায়। বেঈমান কখনোই আল্লাহকে খুশি করার লক্ষ্যে বাঁচে না। তারা বাঁচে নিজেকে এবং নিজের পরিবার, দল ও নেতাকে খুশি করতে।

৭. ঈমানদারের জিহাদ ও বেঈমানের যুদ্ধ

সবার জীবনেই যুদ্ধ থাকে। অনেকের যুদ্ধ স্রেফ বাঁচার যুদ্ধ। বেঈমানের যুদ্ধটি তাকে জাহান্নামে নেয়। বেঈমানের সে যুদ্ধটি হয় ভাষা, গোত্র, অঞ্চল, দল ও নেতার নামে। ঈমানদারের যুদ্ধ তাঁকে জান্নাতে নেয়। ঈমানদারের প্রতিটি যুদ্ধই জিহাদ। জিহাদের লক্ষ্য ইসলামের প্রতিষ্ঠা, মুসলিম দেশের প্রতিরক্ষা ও জান-মালকে সুরক্ষা দেয়া। জিহাদই ইসলামে শ্রেষ্ঠ ইবাদত। ইবাদত এখানে শয়তানী পক্ষকে পরাজিত করার। জিহাদে যারা প্রাণ দেয় তারা শহীদ হয় এবং বিনা হিসাবে জান্নাত পায়।

১৯৭১’য়ে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধটি জিহাদ ছিল না। সে যুদ্ধটি ছিল সেক্যুলারিজম ও বাঙালী জাতীয়তাবাদের নামে। সে যুদ্ধে ইসলাম কোন বিষয়ই ছিল না। মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধিও এ যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল না। যুদ্ধের অস্ত্রদাতা, অর্থদাতা ও মূল পৃষ্ঠপোষক ছিল ভারতীয় কাফেরগণ এবং পরিচিত শত্রুদেশ রাশিয়া। তাদের যুদ্ধে লাভবান হয়েছে ভারত। এ যুদ্ধে তাদের ও মুক্তিবাহিনীর যারা মারা গেছে ভারতীয় কাফেরগণ তাদের শহীদ বলে।  অথচ শহীদ একটি কোর’আনী পরিভাষা, হিন্দুদের ধর্মীয় বইয়ে শহীদ বলে কোন শব্দ নাই। তাই যারা প্রকৃত শহীদ হতে চায় তারা একাত্তরে ভারতের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করা থেকে সযত্নে দূরে থেকেছে। কারণ মুসলিমের প্রতিটি খাবার যেমন হালাল হতে হয়, তেমনি প্রতিটি যুদ্ধকে শতভাগ হালাল হতে হয়। এবং যুদ্ধতো তখনই হালাল হয় যখন সেটি বিশুদ্ধ জিহাদ হয়। তাছাড়া মুসলিম দেশ বাঁচানোর যুদ্ধ জিহাদ হয়, ভাঙ্গার যুদ্ধ কখনোই জিহাদ হয় না। সে হুশ থাকার কারণেই কোন আলেম এবং ইসলামপন্থী কোন দল ও ব্যক্তিকে মুক্তিবাহিনীতে দেখা যায়নি।

৮. জিহাদ বিরামহীন

ঈমানদারের জীবনে জিহাদ অবিরাম। কখনো সেটি বুদ্ধিবৃত্তিক, কখনো অস্ত্রের। কখনো সেটি নফসের বিরুদ্ধে, কখনো সেটি সশস্ত্র শত্রুর বিরুদ্ধে। নামায দিনে ৫ বার। রোযা  বছরে ১ মাস। এবং হজ্জ জীবনে একবার। কিন্তু জিহাদ প্রতি দিন ও প্রতিক্ষণ। জিহাদে ক্বাজা নাই। জিহাদ না থাকার অর্থ, শত্রুর হাতে পরাজয় ও আত্মসমর্পণ। দেশ যখন ইসলামের শত্রু শক্তির দখলে তখন জিহাদ থেকে দূরে থাকা বেঈমানী। তখন বিজয়ী হয় শয়তান। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে।

নামায-রোযা করেও বহু মানুষ মুনাফিক হয়। নবীজী (সা:)র পিছনে নামায আদায় করেও অনেকে মুনাফিক হয়েছে। এরা কাফিরদের চেয়েও নিকৃষ্ট। ন্যায়ের পক্ষে থাকা এবং জিহাদে যোগ দেয়ার সামর্থ্য এদের থাকে না। এরা অপরাধী; এরা যুদ্ধ করে চোরডাকাত, ভোটডাকাত ও দুর্বৃত্তদের বিজয়ী করার লক্ষ্যে।

৯. ফরজে অবহেলা এবং আসক্তি হারামে

ইসলামে ফরজ হলো একতা গড়া। এবং হারাম হলো অনৈক্য গড়া। বাঙালী মুসলিম জীবনে অনৈক্য দেখে বুঝা যায় অনৈক্য গড়ার ন্যায় হারাম কাজে তাদের কত আগ্রহ। দেশ ডাকাতদের দখলে গেছে, ডাকাত তাড়াতে তবুও রাজী নয় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো! একতায় রাজী নয় দেশের আলেম সমাজ। অনৈক্যের হারাম নিয়ে বাঁচাই যেন তাদের নীতি।অনৈক্যে এরূপ ডুবে কি আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা যায়? মিলবে কি জান্নাত?

১০. উৎসব কি পরাধীনতা নিয়ে?

বাংলাদেশে কোথায় স্বাধীনতা? মিছিল করতে গেলে লাশ হতে হয়। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে গুম হতে হয়। এবং ভোট ডাকাতি হয়ে যায়। কথা হলো, এসব কি স্বাধীনতার লক্ষণ? এমন দেশে আবার কিসের উৎসব? দেশবাসীকে পরাধীন করে হাসিনা তার প্রভু নরেন্দ্র মোদিকে পদসেবা দিচ্ছে নিরীহ মানুষকে বলি দিয়ে। নরেন্দ্র মোদির আগমন কালে ২১জন নিরীহ মানুষকে হাসিনা করেছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে অপরাধী ব্যক্তি হচ্ছে হাসিনা। এ ভয়ানক অপরাধীকে দেশবাসী কি শাস্তি দিবে না? ০৯/০৪/২০২১

 




বিবিধ ভাবনা (৪০)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. অপরাধীদের দখলদারী ও জনগণের ব্যর্থতা

মানব সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গণটি হলো রাজনীতি। জাতি কোন দিকে যাবে -তা ক্ষেত-খামার, হাট-বাজার, কলকারখানা বা স্কুল-কলেজ থেকে নির্ধারিত হয় না। সেটি নির্ধারিত হয় রাজনীতি থেকে।  তাই যারা দেশ ও দেশবাসীর ভাগ্য পাল্টাতে চায় তারা রাজনীতিতে যোগ দেয়। সমাজ বিপ্লবের এটিই হাতিয়ার। ইসলাম যেহেতু মানুষের জীবনধারাই পাল্টাতে চায়, রাজনীতিকে তাই জিহাদের মর্যাদা দিয়েছে। রাষ্ট্রের অঙ্গণে ইসলাম বিজয়ী হবে না পরাজিত হবে –সেটিই নির্ধারিত হয় রাজনীতি বা জিহাদের ময়দান থেকে। যাত্রীবাহী বাসে চালকের যে ভূমিকা, দেশের ক্ষেত্রে সে ভূমিকাটি হলো রাজনৈতিক নেতা বা সরকার-প্রধানের। বাসের চালক যদি সুস্থ্য থাকে তবে সকল যাত্রী মদ খেয়ে বেহুশ হয়ে পড়লেও তাতে গাড়ি খাদে পড়ে না। দুর্ঘটনাও ঘটে না। সুস্থ্য চালকের কারণে বাস তখন সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে। কিন্তু বাসের চালক যদি মদ খেয়ে ঢলে পড়ে তবে দুর্ঘটনা ঘটবেই। তাতে প্রাণনাশও হতে পারে। তখন যাত্রীদের ক্রন্দন বা দোয়া-দরুদে লাভ হয় না।

একই কারণে ভয়ানক বিপদ ঘটে দুর্বৃত্তকে ক্ষমতায় বসালে। তখন সমগ্র দেশ ডাকাতি হয়ে যায়। সে বিপদ থেকে বাঁচতেই সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে  রাষ্ট্রনায়কের সিটে বসাতে হয়। এটিই হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ। দেশবাসীর প্রজ্ঞার প্রকাশ তো এভাবেই ঘটে। এবং সেটিই হলো নবীজী (সা:)’র সর্বশ্রেষ্ঠ সূন্নত। মুসলিমগণ অতীতে যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিল সেটি মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ার কারণে নয়। সেটি হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আসন থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূল ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দেয়ার কারণে।

নবীজী(সা:) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন ততদিন তিনিই ছিল ছিলেন মুসলিমদের রাজনৈতিক নেতা এবং সে সাথে রাষ্ট্রপ্রধান। নবীজী (সা:)’র ইন্তেকালের পর সে আসনে বসেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ। কিন্তু বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে নবীজী (সা:)’র বহু সূন্নত বেঁচে থাকলেও অতি গুরুত্বপূর্ণ সে সূন্নতটি বেঁচে নাই। চোর-ডাকাত-দুর্বৃত্তদের সন্মানিত করা ও তাদেরকে শাসন ক্ষমতায় বসানো তো দুর্বৃত্তদের সংস্কৃতি। অথচ বাংলাদেশে সেটিই এখন বিজয়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ফলে নবীজী (সা:)’র সে পবিত্র শাসনটি হাইজ্যাক হয়েছে ভোটডাকাত দুর্বৃত্তদের হাতে। জনগণের মাঝে তা নিয়ে কোন বিদ্রোহ নাই। মুসলিম দেশগুলিতে ইসলামের পরাজয়ের মূল কারণ তো এই দুর্বৃত্তদের অধিকৃতি ও জনগণের আত্মসমর্পণ।  

পুরা একটি দেশকে হাইজ্যাক করার লক্ষ্যে শাসন ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনটি দখলে নিলেই চলে। সারা দেশ তখন দখলে এসে যায়। হাসিনার নেতৃত্বে ভোটডাকাতগণ সে ভাবেই বাংলাদেশকে হাইজ্যাক করেছে। ফলে দেশ এখন তাদেরই দখলে। তাই জনগণকে শুধু দেশের সীমান্ত পাহারা দিলে চলে না, পাহারা দিতে হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনটিকেও। প্রয়োজনে সে জন্য যুদ্ধ করতে হয়। সভ্য দেশের নাগরিকদের এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অথচ বাংলাদেশের জনগণ সে দায়িত্ব পালনে পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে আছে একজন ভোটডাকাত।

তাছাড়া যে পবিত্র আসনে খোদ নবীজী (সা:) বসেছেন, সে আসনে কি কোন চোর-ডাকাত-দুর্বৃত্তকে বসানো যায়? তাতে যেমন নবীজী (সা:)’র সূন্নতের অবমাননা হয়, তেমনি অবমাননা হয় সে পবিত্র আসনের। সেরূপ অবমাননা আযাব ডেকে আনে। তাছাড়া চুরি করা যেমন অপরাধ, তেমনি অপরাধ হলো সে চুরিকে বৈধতা দেয়া। রাষ্ট্রের উপর চোরডাকাতদের সে অবৈধ অধিকৃতির বৈধতা দেয়ার অপরাধটি ঘটে তখন, যখন সে অপরাধীদের না হটিয়ে তাদের শাসন বাঁচাতে রাজস্ব দেয়া হয়। অথচ ডাকাতদের ভোট দেয়া যেমন অপরাধ, তেমন অপরাধ হলো তাদেরকে রাজস্ব দিয়ে প্রতিপালন দেয়া। সে অপরাধের জন্য শাস্তি পেয়েছিল ফিরাউনের প্রজারা। বাংলাদেশের জনগণ একই গুরুতর অপরাধ করছে হাসিনার ন্যায় এক ভোটডাকাত দুর্বৃত্তকে রাজস্ব দিয়ে প্রতিপালন করে। তবে বাংলাদেশে জনগণের আরো অপরাধ হলো, তারা নিজেরাও অনেক সময় দুর্বৃত্তদের সক্রিয় সহযোগী হয়ে পড়ে। ডাকাতেরা একাকী ডাকাতি করতে পারে না; ডাকাতিতে তাদেরও লোক বল চাই। হাসিনার ডাকাতিতে লোকবল জুগিয়েছে বাংলাদেশের সেনবাহিনী, পুলিশ, প্রশাসন ও আদালতের লোকজন। অপর দিকে শেখ মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারি, খুনি, গণহত্যাকারী এবং ভারতীয় দালালও একাকী রাষ্ট্রক্ষমতা হাইজ্যাক করেনি। সে কাজে সহায়তা দিয়েছে দেশের জনগণ।

জনগণের দয়-দায়িত্বটি বিশাল। ব্যক্তির মর্যাদা তো সে দায়িত্ব নিয়ে বাঁচায়। মহান আল্লাহতায়ালা শুধু ঈমানই দেখেন না, আমলও দেখেন। জান্নাতে তো তারাই যাবেন যারা ঈমান ও আমল – এ উভয় ক্ষেত্রেই উন্নত। আমলের মধ্যেই ধরা পড়ে ব্যক্তির বিবেক, চরিত্র ও ঈমানের মান। এবং নেক আমল শুধু দান-খয়রাত নয়, সবচেয়ে বড় নেক আমল হলো দেশের শাসন ক্ষমতা থেকে শয়তান নির্মূল করা। দেশ সভ্যতর হয় তো এ আমলের গুণে। প্রাসাদসম মসজিদ গড়ে দেশ পাল্টানো যায় না, বিপ্লব আনতে হয় দেশের রাজনীতিতে। বাসের চালক দুর্ঘটনা ঘটালে কিছু যাত্রী মারা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের চালক দুর্ঘটনা ঘটালে লাখ লাখ লোকের মৃত্যু হয়। দেশ তখন আযাবের যন্ত্রে পরিণত হয়। তাই সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হলো, কোন দুর্বৃত্তকে সরকার-প্রধানের আসনে বসানো। এবং এ কারণেই সবচেয়ে বড় নেক আমলটি পথের কাঁটা সরানো বা বাঘ তাড়ানো নয়, সেটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আসন থেকে অপরাধী ব্যক্তিদের নির্মূল করা। ইসলামের একাজে পবিত্র জিহাদের মর্যাদা রয়েছে। শয়তানকে তো এভাবেই পরাজিত করা যায়। বাজারে সামান্য মাছ কিনতে গেলেও কোনটি পচা এবং কোনটি ভাল –সেটি যাচাই-বাছাই করে কিনতে হয়।  নইলে পচা মাছে স্বাস্থ্যহানী ঘটে। সে নিখুঁত যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি করতে হয় রাজনীতির ময়দানে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কাকে বসানো হয় –সেটি খুঁতিয়ে দেখার মধ্যেই দেশের মহা কল্যাণ। এখানে ব্যর্থ হলে ভয়ানক শত্রু এবং দুর্বৃত্তও শাসকে পরিনত হয়। সে কাজে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতাটি বিশাল। বাংলাদেশে আজ যে ভয়ানক দুঃশাসন -সেটি এক দিনের কামাই নয়। এবং সেটি শুধু সরকারের ব্যর্থতাও নয়। বরং সে জন্য দায়ী বহুদিন ধরে চলা জনগণের নিজেদের ব্যর্থতাও।

 ২. রাজনীতিবিমুখ বাঙালী মুসলিম

জনগণের কান্ডজ্ঞান, ধর্মপ্রেম, দেশপ্রেম ও বিবেকবোধ বোঝা যায় রাজনীতিকে তারা কতটা গুরুত্ব দেয় তা থেকে। সত্যের জয়-পরাজয়ের ন্যায় মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধান জিতবে না হারবে –সেটি মসজিদ-মাদ্রাসায় স্থির হয় না, নির্ধারিত হয় রাজনীতির ময়দানে। অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার ন্যায় মুসলিম জীবনের যে মূল মিশন –সে মিশন নিয়ে বাঁচার পূরণে মূল হাতিয়ারটি হলো রাজনীতি। এজন্যই নবীজী (সা:) নিজে ছিলেন রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্রনায়ক। রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন তাঁর সকল সাহাবাগণ। তাই রাজনীতি থেকে দূরে থাকাটি ইসলামের মিশনের সাথে বেঈমানী। সেটি নবীজী(সা)র সূন্নতের সাথে গাদ্দারী। তাতে বিজয়ী হয় শয়তানের পক্ষ।

তাছাড়া ঈমানের মূল পরীক্ষাটি হয় রাজনীতিতে। নামায-রোযা-হজ্জ অনেক ঘুষখোর, সূদখোর ও হাসিনার ন্যায় ভোটচোর জালেমও করে, কিন্তু রাজনীতিতে ধরা পড়ে সে আসলে কোন পক্ষের সৈনিক। রাজনীতির ময়দানে এক সাথে দুই পক্ষে লড়াই করা যায়না, যে কোন এক পক্ষ বেছে নিতে হয়। ঈমানদারকে যোগ দিতে হয় ইসলামকে বিজয়ী করার পক্ষে। এটি পবিত্র জিহাদ। এ জিহাদে ঈমানদারকে শুধু ভোট দিলে চলে না, বিনিয়োগ করতে হয় তাঁর দৈহিক, আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য। এমন কি বিলিয়ে দেয় তার রক্ত ও প্রাণ। অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। ঈমানদারের ঈমানদারী এভাবেই খালি চোখে দেখা যায় তাঁর রাজনীতিতে।

অথচ অধিকাংশ বাঙালী মুসলিমের রাজনীতিতে রুচি নাই। রাজনীতির ময়দানে নাই অধিকাংশ আলেম ও তাবলিগ জামায়াতের লোকেরা, এটিকে তারা দুনিয়াদারী মনে করেন। নবীজী (সা:)’র রাজনৈতিক সূন্নতের ধারে কাছেও তারা নাই। যারা নিজেদের নামাযী ও রোযাদার ভাবেন, তারাও ইসলামকে বিজয়ী করা নিয়ে ভাবেন না। এজন্যই রাজনীতিতে তাদের তেমন বিনিয়োগও নাই। নির্বাচন কালে বড় জোর ভোট দেন। এবং তাদের অধিকাংশই ভোট দেন তাদেরকে যারা সেক্যুলারিস্ট রূপে পরিচিত এবং যাদের এজেন্ডা হলো ইসলাম ও তার শরিয়তী বিধানকে পরাজিত রাখা। বস্তুত তাদের  কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিরংকুশ বিজয়টি ইসলামের শত্রুপক্ষের।  

 

৩. পালিত হয়নি দায়িত্ব

গণতন্ত্রের সুফলটি বিশাল, এটি জনগণের ক্ষমতায়ন করে। দায়িত্ব দেয় সরকার নির্বাচনের। এ দায়িত্বটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে বাড়ে জনগণের নিজ দায়িত্বও। সে দায়িত্বটি সঠিক ভাবে পালন না করাটিও গুরুতর অপরাধ। দায়িত্ব এখানে যোগ্য, সৎ ও ঈমানদার মানুষকে নির্বাচিত করার। সেটি না হলে অপরাধটি হয় ইসলাম, দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে। পাপটি তখন ফিরাউন ও নমরুদের ন্যায় দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকদের পক্ষে দাঁড়ানোর ও ইসলামকে পরাজিত করার। তাই পাপটি এখানে ভয়নাক। এ পাপই জনগণকে জাহান্নামে টানে। সে পাপের কারণেই বাংলাদেশের জনগণের ইসলামী শাসনের সুফল থেকে তারা বঞ্চিত এবং ঘানি টানছে বর্বর স্বৈরশাসনের।

লক্ষণীয় হলো, শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ন্যায় নৃশংস স্বৈরশাসক বন্দুকের জোরে ক্ষমতায়  আসেনি। এসেছে কখনো বা জনগণের ভোটে, কখনো বা ভোটডাকাতি করে। ভোট দিয়ে মুজিব ও হাসিনার ন্যায় অপরাধীদের নির্বাচিত করার অপরাধটি অতি গুরুতর। এটি রুচিহীন অসভ্য কর্ম। অপরাধটি এখানে বাংলাদেশের জনগণের। আদালতে দাঁড়িয়ে খুনি ও চোরডাকাতকে ভাল মানুষ বলে সাক্ষী দিয়ে জেল থেকে তাদেরকে মুক্ত করাটি জঘন্য অপরাধ। তাতে সমাজ জুড়ে অপরাধ ও অশান্তি বাড়ে। তেমনি গুরুতর অপরাধ হলো স্বৈরাচারি ভোট-ডাকাতদের পক্ষে ভোট দিয়ে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসানো।

৪. চেনা হয়নি শত্রুদের

প্রতিটি মানুষকেই কিছু দায়-দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে হয়। দায়-দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে হয় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও আলেম সমাজকেও। তাদের কাজটি হলো দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জনগণের সামর্থ্য বাড়ানো। সে সাথে তাদের আরো দায়িত্ব হলো যেসব দুর্বৃত্তগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসতে চায় তদের আসল রূপকে জনগণের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিও হয়নি। বরং যাদের দায়িত্ব ছিল দুর্বৃত্তদের মুখোশ উম্মোচন করা, তারাই দুর্বৃত্তদের সাফাই গায়। অথচ চুরি করা যেমন অপরাধ, তেমনি অপরাধ হলো চোরকে সাহায্য করা। ফলে তাদের এ ব্যর্থতার কারণে চেনা হয়নি দেশের শত্রুদের। অথচ সভ্য সমাজ নির্মাণের কাজে শুধু হিংস্র পশুদের চিনলেই চলে না, চিনতে হয় মানবরূপী ভয়ানক শত্রুদেরও। সে ক্ষেত্রে ভূল দেশে গণহত্যা ঘটে এবং দেশের উপর স্বৈরাচারি বর্বরতা ও অসভ্যতার প্লাবন নেমে আসে। অথচ জনগণের সে অপরাধের কারণেই হাসিনা যেমন ক্ষমতায় এসেছে, অতীতে মুজিবও এসেছে। হাসিনাকে চিনতে জনগণ যেমন দারুন ভাবে ব্যর্থ হয়েছে তেমনি ব্যর্থ হয়েছে মুজিবকে চিনতেও।

কীরূপ ছিল মুজিব? কীরূপ ছিল তার রাজনীতি? শেখ মুজিবের রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যটি ছিল যে কোন রূপে ক্ষমতা-দখল দেশের স্বাধীনতা, অখন্ডতা, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবিষয়গুলি তার কাছে কোন কালেই গুরুত্ব পায়নি। মুজিব ভারতকে সাথে নিয়ে পাকিস্তান ভেঙ্গেছে বাংলাদেশীদের জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি বা গণতন্ত্র দেয়ার জন্য নয়। বরং সেটি ছিল স্রেফ শাসন ক্ষমতা নিজ হাতে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে। ক্ষমতার লোভে এমন কি শত্রু দেশের সাথে ষড়যন্ত্র করাও তার কাছে গর্হিত মনে হয়নি। ভারতের সাথে মিলে আগরতলা ষড়যন্ত্র্ করেছে ক্ষমতা-লাভকে প্রতিদ্বন্দিতাহীন করতে খুন করা হয়েছে ৩০ হাজারের বেশী মানুষকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সকল বিরোধী দলকে এবং কবরে পাঠানো হয়েছে গণতন্ত্রকে

বাঘ-ভালুকের চেয়ে বহুগুণ অধিক প্রাণনাশী হলো স্বৈরাচারি শাসকেরা। তারাই ইতিহাসে গণহত্যা, গণধর্ষণ, গুম-খুনের নায়ক।  বাংলাদেশেও তাই লাশ পড়ে স্বৈরাচারি শাসকের হাতে, বাঘ-ভালুকের হাতে নয়। প্রতিটি সভ্য দেশে এজন্যই স্বৈরাচারি শাসকদের ঘৃণা করা হয়। এবং ইতর  ও অসভ্য গণ্য করা হয় তাদের যারা তাদের প্রতি  শ্রদ্ধা দেখায়। হিটলারের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো এজন্যই জার্মানীতে অপরাধ। জাহান্নামে যাওয়ার জন্য শয়তানকে ভালবাসাই যথেষ্ট। বস্তুত ব্যক্তির সভ্য ও অসভ্য রূপটি চেনার জন্য কোন গবেষণা লাগে না, সেটি দেখা যায় কাকে সে ভাল বাসে বা ঘৃণা করে -সেটি দেখে। মানুষের চরিত্র তো এভাবেই দর্শনীয় হয়। বাঙালীর সে চরিত্রটি দেখা যায় মুজিবের ন্যায় একজন নৃশংস স্বৈরচারীকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলার মধ্য দিয়ে। তার ন্যায় একজন গুরুতর অপরাধীকে কোন সভ্য মানুষ জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলবে সেটি কি ভাবা যায়? মুজিবের অপরাধ তো শুধু বাকশালী স্বৈরাচার নয়, ৩০ হাজার মানুষের প্রাণনাশ নয় এবং মানবিক অধিকার কেড়ে নেয়াও নয়। বরং তার অপরাধ তো ১৮ কোটি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে তাদেরকে ভারতের ন্যায় শত্রুশক্তির দাস বানানোর। তার কারণেই সমগ্র বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে একটি ভারতীয় জেলখানায়। অপরাধ তো স্বাধীন মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার অধিকার কেড়ে নেয়ার।

 

৫. মিলবে কি গণতন্ত্রের সুফল?

গণতন্ত্রের সুফল পেতে হলে জনগণকে প্রথমে শিক্ষিত ও বিবেকবান হতে হয়। শত্রু ও মিত্র, যোগ্য ও অযোগ্য এবং সত্য ও মিথ্যা –এ গুলি চেনার সামর্থ্য অর্জন করতে হয়। নইলে দুর্বৃত্তগণ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। নির্বাচন তখন ধুর্ত চোরডাকাতদের জন্য ক্ষমতার শীর্ষে উঠার সিঁড়িতে পরিণত হয়। ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়া যায়না। তেমনি জনগণকে সুশিক্ষিত নাগরিক রূপে গড়ে তোলার আগে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা দেয়া যায় না। অথচ বাংলাদেশে জনগণের মাঝে সে সামর্থ্য সৃষ্টির কাজটি হয়নি। বরং আগে যা ছিল সেটি দুষ্ট শিক্ষা ও প্রচারনায় বিনষ্ট করা হয়েছে।

পাশ্চত্যের যেসব দেশে গণতন্ত্র সফল ভাবে কাজ করছে -সেসব দেশে জনগণকে শিক্ষিত করার কাজটি শত বছর আগেই সমাধা করা হয়েছে। সেসব দেশে জনগণের মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে নৈতিকতা ও বিবেক বোধ। ফলে স্বৈরাচারি শাসকদেরকে তারা গভীর ভাবে ঘৃণা করে। ঘৃণা করে দুর্বৃত্তদের। ফলে সেসব দেশে কোন স্বৈরচারী দুর্বৃত্তকে জাতির পিতা, নেতা ও বন্ধু বলা হয়না। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের লোকেরা ভোটডাকাতিতে সাহায্য করবে -সেটিও ভাবা যায় না। আদালতের বিচারপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ভোটডাকাতির নির্বাচনকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলে রায় দিবে -সেটিও সেদেশগুলিতে কল্পনা যায়না। কিন্তু বাংলাদেশে সেটিই সংস্কৃতি।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে কি সেরূপ নৈতিকতা ও বিবেকবোধ নিকট ভবিষ্যতে গড়ে উঠবে? সে সম্ভাবনা তো ক্ষীণ। কারণ, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো জনগণকে শিক্ষিত করায় যাদের দায়িত্ব তাদের নিয়ে। দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিজেদেরই শিক্ষিত হওয়াতে অনেক ব্যর্থতা রয়েছে। তারাই দেশের অন্যতম নীতিহীন ও বিবেকহীন শ্রেণী। তারাই ভোটডাকাতিকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলে এবং ভোটডাকাত হাসিনাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে। ফলে তারাই গণতন্ত্রের বড় শত্রু। রোগী যেমন রোগ ছড়ায়, এরাও তেমন নীতিহীনতা ও বিবেকহীনতা ছড়াবে। এরূপ নীতিহীনতা ও বিবেকহীনতায় কি কোন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়? নির্মিত হয় কি সভ্য সমাজ? দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে এ নিয়ে ভাবা উচিত। ০৩/০৪/২০২১

 




জিহাদ বিলুপ্তির নাশকতা

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

আক্রোশ কেন জিহাদের প্রতি?

দুর্বৃত্ত শাসনের সবচেয়ে বড় নাশকতাটি স্রেফ দুর্বৃত্তির বিস্তার নয়; বরং সেটি হলো জিহাদের ন্যায় মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটির বিলুপ্তি। তখন পন্ড হয় সভ্যতর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব প্রকল্প। তখন বিজয়ী হয় শয়তানী পক্ষ; এবং প্লাবন আসে দুর্বৃত্তির। তখন দুর্বৃত্তি নির্মূলের প্রচেষ্ঠাগুলো গণ্য হয় দন্ডনীয় অপরাধ রূপে। যেমন বাংলাদেশে গুম, খুন, নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার হতে হয় হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতের বিরুদ্ধে রাজপথে অবস্থান  নেয়াতে। যেমন নমরুদ ও ফিরাউনের সামনে মহান আল্লাহকে প্রভু বলাও হত্যাযোগ্য অপরাধ গণ্য হয়েছে। শয়তানপন্থীদের হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই সবচেয়ে বড় বিপদ।

অপর দিকে ইসলামে জিহাদ হলো, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মহান আল্লাহর নির্দেশিত একমাত্র হাতিয়ার। এটিই ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। হাতিয়ার ছাড়া যুদ্ধ লড়া যায় না; তেমনি জিহাদ ছাড়া ইসলামকে বিজয়ী করা যায় না। ইসলাম যে শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম, সেটি জিহাদ ছাড়া কখনোই প্রতিষ্ঠা দেয়া যায়না। এ পবিত্র ইবাদতে বিনিয়োগ ঘটে মু’মিনদের মেধা, অর্থ, শ্রম, সময় ও রক্তের। একমাত্র এ বিনিয়োগের ফলেই রাষ্ট্র দুর্বৃত্তমুক্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠা পায় শরিয়তী বিধান। সভ্যতর সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতা তো এভাবেই নির্মিত হয়। স্রেফ নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলে সেটি হয় না। লক্ষ লক্ষ মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়েও সেটি হয় না। সে সুফলটি পীরদের শত শত আস্তানা বা সুফি খানকা গড়েও জুটে না। আজকের মুসলিম দেশগুলিতে সেগুলি কি কম? কিন্তু কোথায় সে সভ্যতার উৎকর্ষ?

জিহাদ যেহেতু দুর্বৃত্তির নির্মূল ঘটায়; সকল দুর্বৃত্ত শক্তির আক্রোশ তাই জিহাদের বিরুদ্ধে। জিহাদ দেয় আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জজবা এবং দেয় লড়াইয়ের ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তি। তাই তাবত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি জিহাদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ। মজলুমের এ প্রতিরোধ যুদ্ধকে তারা বলে সন্ত্রাস। বলে জঙ্গিবাদ। আগ্রাসী যুদ্ধকে প্রতিরোধহীন করার লক্ষ্যে তারা চায় মুসলিম জীবন থেকে জিহাদের বিলুপ্তি। জিহাদ বিষয়ক কোর’আন-হাদীসের আয়াতগুলিকে বাদ দিতে চায় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার সিলেবাস থেকে। অথচ সেরূপ আক্রোশ নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলের বিরুদ্ধে নাই। সে ক্রোধ তাবলিগ জামায়াত, পীরদের আস্তানা বা সুফি খানকার বিরুদ্ধেও নাই।

বাংলাদেশে জিহাদের বিরুদ্ধে সে আক্রোশটি দেখা যায় ক্ষমতাসীন সেক্যুলারিস্ট শিবিরে। তাদের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে সবচেয়ে বড় দুর্বৃত্তিটি হলো, শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা। জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত গণ্য করে ফৌজদারি অপরাধ রূপে। ঘরে স্রেফ জিহাদ বিষয়ক বই রাখাকে অপরাধ চিহ্নিত করে ছাত্র-ছাত্রীদের জেলে তোলা হচ্ছে। আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় বিদ্রোহ আর কি হতে পারে? বিস্ময়ের বিষয়, এমন ইসলামবিরোধী সরকারও বেঁচে আছে মুসলিম জনগণের রাজস্বের অর্থে! বহুকোটি মানুষ তাদের ভোট দেয়। তাদের সভা-সমাবেশেও বিপুল সংখ্যায় হাজির হয়। ফলে ইসলামের বিরুদ্ধে গাদ্দারীটা শুধু সরকারের নয়, বিপুল সংখ্যক জনগণেরও। কথা হলো, এমন গাদ্দারী কি মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পুরস্কার আনে? আনে কি নিয়ামত? বরং যা আনে -তা হলো পরাজয় ও অপমান।

সমাজ ও রাষ্ট্রের পবিত্রতা বিধানের কাজটি নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও তাসিবহ-তাহলিলে হয় না; এগুলির কাজ ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি আনা। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি, কল্যাণ ও পরিশুদ্ধি আনতে হলে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিকল্প নাই। শরিয়তী বিধান হলো দুর্বৃত্তি বিলুপ্তির হাতিয়ার। তখন পবিত্রতা আসে সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। শরিয়ত ছাড়া তাই ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র তাই পূর্ণাঙ্গ হয় না। এমন শরিয়তী শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল নবীজী(সা:) ও তাঁর সাহাবাদের শাসনামলে। ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনের এটিই হলো মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ মডেল। এটি শুধু কল্যাণধর্মী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারই পথ নয়; জান্নাতে পৌঁছার পথও। শরিয়ত ছাড়া সিরাতুল মুস্তাকীমের কথা ভাবা যায় না। যে রাষ্ট্রে শরিয়ত নাই –বুঝতে হবে সেখানে পথটি জাহান্নামের।

 

ব্যর্থতা সুস্থ সংস্কৃতির নির্মাণে

সংস্কৃতি একটি বিশেষ জীবনবোধ, রুচিবোধ ও দর্শন নিয়ে বাঁচতে অভ্যস্থ কর। লতাপাতা যেমন স্রোতে ভাসে, দেশের অধিকাংশ মানুষ ভাসে আবহমান সাংস্কৃতিক স্রোতে। তাই মুসলিমদের শুধু ঘর ও রাষ্ট্র গড়লে চলে না, সংস্কৃতিও নির্মাণ করতে হয়। আনতে হয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব। বাংলাদেশের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি বস্তুত সুস্থ সংস্কৃতির নির্মাণে। সাংস্কৃতিক ব্যর্থতার কারণে চরম ব্যর্থতা আসে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ায়। মুসলিম সংস্কৃতির উপাদান কোন কালেই গান-বাজনা, নৃত্য, সংঙ্গীত ও ভাস্কর্য ছিল না। এগুলো তো মানুষকে আল্লাহবিমুখ করা ও পরকাল ভূলানোর সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতিতে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা গুরুত্ব পায় না। বরং গুরুত্ব পায় আকন্ঠ জীবন সম্ভোগ। আর এ আকন্ঠ সম্ভোগটাই হলো সেক্যুলারিজমের মূল কথা। সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত করার এটিই শয়তানী প্রকল্প। শরিয়তী বিধান এমন প্রকল্পে বাধা দেয় বলেই সেক্যুলারিস্টগণ শরিয়তের বিরোধী। বাংলাদেশে এমন সেক্যুলার সংস্কৃতির প্রসারে সরকারী ও বেসরকারী বিনিয়োগট বিশাল। শয়তান শুধু রাজনীতির পথই গড়ে না, সংস্কৃতির পথও গড়ে। মানুষকে মন্দিরে নিতে না পারলেও সংস্কৃতির পথে টেনে কোটি কোটি মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে দূরে সরায়। সাংস্কৃতিক অঙ্গণগুলো বস্তুত শয়তানের শিক্ষালয় রূপে কাজ করে। বাংলাদেশে শয়তানে এ প্রজেক্ট বিপুল ভাবে বিজয়ী।

অথচ ইসলামের সংস্কৃতি হলো জিহাদের সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি যেমন দুনিয়ার বুকে জান্নাতের রাস্তা গড়ার সংস্কৃতি; তেমনি উন্নত মানব, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ারও। অথচ বাঙালী মুসলিম সমাজে সে সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। ফলে গড়ে উঠেনি ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র। বরং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে দুর্বৃত্ত-অধিকৃত রাষ্ট্র। জোয়ার বইছে পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদের সংস্কৃতির। আল্লাহপাক এমন পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদেরকে সুরা ফাতেহা’তে দোয়াল্লিন (পথভ্রষ্ট) ও মাগদুব (অভিশপ্ত) বলেছেন। জান্নাত পাওয়ার জন্য সিরাতুল মুস্তাকীম পাওয়াটি যেমন জরুরি; তেমনি জরুরি হলো পথভ্রষ্টদের পথ থেকে বাঁচাটিও। তাই নামাযের প্রতি রাকাতে সিরাতুল মুস্তাকীম পাওয়ার দোয়া পাঠ যেমন বাধ্যতামূলক, তেমনি বাধ্যতামূলক হলো পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদের পথ থেকে বাঁচার দোয়াটিও।

কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের জীবনে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার কাজটি যেমন সঠিক ভাবে হয়নি, তেমনি হয়নি পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদের পথ থেকে বাঁচাটিও। ফলে বাঙালী মুসলিমদের হাতে নির্মিত হয়েছে ১৪ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে কদর্য ইতিহাস। তারা দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়ে রেকর্ড গড়েছে, রেকর্ড গড়েছে ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে ১৯০ বছরের জন্য গোলাম হয়ে। কাফেরদের গোলাম হওয়ার চেয়ে মুসলিম জীবনে বড় আযাব আর কি হতে পারে? তখন শুধু নির্যাতিতই হতে হয় না, ঈমানও হারাতে হয়। অথচ এ আযাব থেকে বাঁচার জন্যই মহান আল্লাহতায়ালা জিহাদকে ফরজ করেছেন। অন্যরা যুদ্ধে মরলে জাহান্নামে যায়। অথচ মুসলিমগণ মরে না; শহীদ হয় এবং জান্নাতে যায়। এটি কি কম পুরস্কার? দেশরক্ষায় সামান্য সময়ের পাহারাদারীকে সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। অথচ সে দেশরক্ষায় বাঙালী মুসলিমের আগ্রহ কই? এবং যারা জিহাদ থেকে দূরে সরে তাদেরকে ঘিরে ধরে প্রতিশ্রুত আযাব। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন শেষ হয়েছে; এখন নতুন আযাব এসেছে ভারত ও তার সেবাদাসদের গোলাম রূপে।

 

হারাম বন্ধুত্ব ও যুদ্ধ

আফগানদের সংখ্যা বাঙালী মুসলিমদের সিকি ভাগও নয়। কিন্তু তারা কি এক দিনের জন্যও কি কোন কাফের শক্তির শাসন মেনে নিয়েছে? অথচ সে দেশে কাফেরদের হামলা যে হয়নি -তা নয়। কিন্তু কাফের আগ্রাসন শুরুর সাথে সাথেই শুরু হযেছে প্রচন্ড প্রতিরোধ। সেটি হয়েছে আম জনতার পক্ষ থেকে। তারা যেমন বীরদর্পে ব্রিটিশ হামলার মোকাবেলা করেছে, তেমনি যুদ্ধ লড়েছে রুশ ও মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও। প্রানদানে তারা পিছুপা হয়নি। অথচ বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে সম্পর্ণ বিপরীত সংস্কৃতি। সেটি হয়েছে নিজ দেশে কাফেরদের সামরিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দখলদারি প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালে সেটিই প্রকট ভাবে হয়েছে একটি মুসলিম দেশে ভেঙ্গে ভারতীয় কাফেরদের বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে। এমনকি কাফেরদের বিজয়কে নিজেদের বিজয় রূপে উৎসব করা হচ্ছে। মদ, জ্বিনা, সূদ যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো মুসলিম দেশ ভাঙ্গা। এটি তো শরিয়তের মৌল বিধান। কোন ঈমানদার কি সে পথে যেতে পারে?

সুরা আল –ইমারানে ঘোষিত “লা তাফাররাকু” অর্থাৎ “বিভক্ত হয়োনা” –এটি মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম। সুরা মুমতাহিনায় রাব্বুল আলামিনে আরেকটি হুশিয়ারি “লা তাত্তিখিজু আদুউ’য়ী ও আদুউ’য়াকুম আউলিয়া।” অর্থ: “তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করোনা।” মূর্তি পূজারীগণ যে আল্লাহর শত্রু তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? ভারতীয় হিন্দুগণ যে বাংলাদেশীদের শত্রু -সেটিও কি তারা এতো দিন প্রমাণ করেনি? যারা ঈমানশূণ্য সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও ন্যাশনালিস্ট –তারা না হয় ভারতকে তাদের বন্ধু করতে পারে, কিন্তু যাদের হৃদয়ে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে -তারা কি মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমকে অমান্য করে কাফেরদের কলাবোরেটর হতে পারে? ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের নামে রাষ্ট্র গড়া জায়েজ হলে উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া খেলাফত শত শত বছর বাঁচতো না। ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও অঞ্চলের পরিচয়ে ১৪ শত পূর্বেই আলাদা আলাদা রাষ্ট্র গড়ে উঠতো। মুসলিম দেশ ভাঙ্গার মিশনটি কাফেরদের; এরাই মধ্যপ্রাচ্যকে ২২ টুকরোয় বিভক্ত করেছে। তাদের কলাবোরেটর হয়েছে কিছু গোত্রপূজারী আরব। মুসলিমদের আজকের যে পরাজয় ও পতিতদশা তার কারণ যে ৫৭ দেশে বিভক্ত ভূগোল তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? মুসলিম বিশ্বে সম্পদ ও জনসংখ্যা যা আছে তা থেকে হাজার গুণ বৃদ্ধি ঘটলেও কি বিভক্ত মানচিত্রের এ দুর্বলতা দূর করা যাবে? সেটি যে অসম্ভব সেটি মহান আল্লাহর চেয়ে আর কে ভাল জানে। তাই তিনি বিভক্তিকে হারাম করেছেন। অথচ মুসলিমগণ সে হারাম পথেই পা বাড়িয়েছে। একই হারাম পথে বাঙালী মুসলিমদের বিরাট অংশ পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে ভারতীয় মুশরিকদের কলাবোরেটর হয়েছে। তারা যে মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় আখেরাতে কাফেরদের কলাবোরেটর হিসাবেই চিহ্নিত হবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

 

সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি

মুসলিম জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতিরক্ষা দেয়া। নবীজী (সা:)’র হাদীস: একাজে সামান্যতম মুহুর্ত ব্যয় সারা রাতের নফল নামাযের চেয়ে উত্তম। এবং সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার আযাবটি অতি করুণ। তখন শত্রুর হাতে শুধু গণহত্যা ও গণধর্ষণের শিকারই হতে হয় না, হারাতে হয় ঈমান-আমলও। সে ব্যর্থতার কারণেই অতীতে বিপদ চেপে বসেছিল স্পেন, রাশিয়া, চীন ও ভারতের বহু কোটি মুসলিমের জীবনে। শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ার দায়িত্বটি শুধু বেতনভোগী সৈনিকদের নয়, বরং প্রতিটি ঈমানদারের। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের মোকাবেলার দায়ভারটি শুধু নবাব সিরাজুদ্দৌলা ও তাঁর সেনাবাহিনীর ছিল না, ছিল প্রতিটি মুসলিমের। মুসলিমগণ যখন রোমান বা পারসিক সাম্রাজ্যের ন্যায় বিশাল বিশাল দেশের সামরিক বাহিনীর মোকাবেলা করেছে তখন মুসলিম বাহিনীতে কোন বেতনভোগী সৈনিকই ছিল না। তাদের সবাই ছিলেন যেমন নামায-রোযা পালনকারী, তেমনি সবাই ছিলেন যোদ্ধা। কিন্তু বাঙলার মুসলিমদের আচরণ ছিল এর বিপরীত। শহিদ তিতুমীরের প্রতিরোধ ও ফকির বিদ্রোহের মত কিছু বিচ্ছিন্ন জিহাদ ছাড়া তারা যে শুধু জিহাদ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে তা নয়, বরং হাজার হাজার মুসলিম যুবক শত্রু সেনাবাহিনীতে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছে। সেটি শুধু বাংলা বা ভারতে ব্রিটিশ দখলদারিকে স্থায়িত্ব দিতে নয়, বরং ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনসহ এশিয়া-আফ্রিকার বহু মুসলিম দেশে সাম্রাজ্যবাদী দখলদারি বাড়াতে। অথচ এরূপ আত্মবিক্রীত সেবাদাসদের অনেককে বাঙালী মুসলিমগণ গৌরবের প্রতীক গণ্য করে। নিজ ধর্মের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা কতটা গভীর হলে সেটি হতে পারে – সেটি কি বুঝতে কি থাকে?

 

শেষ হয়নি শত্রুর দখলদারী

মুসলিমদের দায়ভার শুধু ভৌগলিক মানচিত্রের উপর ইসলামের বিজয়কে সুনিশ্চিত করা নয়, বরং সেটি জনগণের চেতনার মানচিত্রেও সুসংহত করা। প্রতিটি বিজয়ী সেনাবাহিনীই সেটি করে। ইংরেজগণ তাই শুধু বাংলার ভৌগলিক মানচিত্রের উপরই দখল জমায়নি, দখল জমিয়েছে বাঙালীর চেতনার মানচিত্রেও। ব্রিটিশের সামরিক দখলদারীটা ১৯৪৭ সালে শেষে হয়েছে। কিন্তু চেতনা রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত  সে দখলদারীটা এখনো প্রবল ভাবে বেঁচে আছে। শত্রুর সে বুদ্ধিবৃত্তিক দখলদারী হটিয়ে রাজনীতি, প্রশাসন, আইন-আদালত, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির কোন একটি অঙ্গণেও ইসলাম বিজয়ী হতে পারিনি। ব্রিটিশের এ অব্যাহত দখলদারী বাঁচিয়ে রেখেছে বাঙালী সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী, বিচারক, আইনবিদ, রাজনীতিবিদ এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাগণ। সে লক্ষ্যে কাজ করছে বহু হাজার এনজিও নেতাকর্মীগণ। বাংলাদেশে ইংরেজগণ তাদের ১৯০ বছরের শাসনেও ঘরে ঘরে সূদ খাওয়া ও সূদ দেয়ার ন্যায় হারাম কাজের আাবাদ বাড়াতে পারিনি। কিন্তু এনজিওগুলোর কারণে সেটি সহজেই সম্ভব হয়েছে। অথচ সূদ খাওয়া ও সূদ দেয়া সামান্য পাপ নয়, নবীজী (সা:) সূদকে মায়ের সাথে জ্বিনার ন্যায় পাপ বলেছেন।–(হাদীস)। তাই কোন মুসলিম যেমন ব্যাভিচারি হতে পারে না, তেমনি সূদখোরও হতে পারে না। এটিই তো মুসলিমের ঈমান। কিন্তু মুসলিমের সে ঈমান এবং ইসলামের সে ভিত্তিমূলটি গুড়িয়ে দিয়েছে দেশের সেক্যুলারিস্টগণ। অপর দিকে বাংলাদেশের আদালতে এখনো পূর্ণ দখলদারী ব্রিটিশদের প্রবর্তিত কুফরি আইন ও তাদের রসম-রেওয়াজের। সে আইনে পতিতাবৃত্তি যেমন হালাল, তেমনি হালাল হলো সূদ, মদ ও জুয়া। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইনের সেখানে কোন দখলদারী চলে না।

শরিয়তী আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালার অধিক অসম্মান আর কি হতে পারে? কোন রাজার রাজ্য যদি তাঁর হুকুমই না চলে তবে সে রাজার কি কোন ইজ্জত থাকে? এ বিশ্ব তো মহান আল্লাহতায়ালার রাজত্ব এবং শরিয়ত তাঁর আইন। ফলে তাঁর মহান ইজ্জতের উপর এর চেয়ে বড় হামলা ও অবমাননা আর কি হতে পারে যদি তার শরিয়তী আইনই মানা না হয়? এটি তো অতি জঘন্য অপরাধ। এরূপ জঘন্য কাজ যারা করে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে তাদেরকে কাফের, জালেম ও ফাসেক এ তিনটি বিশেষ পরিচয়ে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ তারা শুধু কাফেরই নয়, তারা সে সাথে জালেম ও ফাসেকও। অথচ আদালত থেকে শরিয়তী আইন বিলুপ্ত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সে অপরাধটিই লাগাতর করা হচ্ছে। মহান আল্লাহতায়ালার আইনের এরূপ অবমাননা নিয়ে কি মুসলিম থাকা যায়? সাহাবায়ে কেরামের যুগে এমনটি কি কল্পনা করা যেত?

শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখাই যে সেক্যুলারিস্টদের মূল এজেন্ডা -সেটি কোন গোপন বিষয় নয়। সেটি বরং তারা জোরে সোরেই বলে। শাসনতন্ত্রে আল্লাহর আইন দূরে থাক, মহান রাব্বুল আলামীনের নামটিও তাদের কাছে অসহ্য। ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদকে তারা ফাঁসির যোগ্য ফৌজদারি অপরাধ গণ্য করে। অথচ মানবাধিকার রূপে গণ্য হচ্ছে পতিতাবৃত্তি, সমকামিতা, মদ্যপান, জুয়া ও সূদের ন্যায় পাপাচার। আল্লাহর দেয়া আলো-বাতাসে বাস করেও কাফেরগণ যেমন শয়তানের গোলামী করে, এরাও তেমনি মুসলিম ভূমিতে বাস করে গোলামী করে অমুসলিম সংস্কৃতি ও ধ্যান-ধারণার। মিশরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কর্তা ব্যক্তি লর্ড ক্রমার এ শ্রেণীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক গোলামদের নিয়ে বড় আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। ইসলামে অঙ্গিকারহীন এরূপ গোলাম শ্রেণী তৈরী না হওয়া অবধি কোন অধিকৃত মুসলিম ভূমিকে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতা দিবে না -সে ঘোষণাও তিনি দিয়েছিলেন। লর্ড ক্রমারের সে কথাই এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশেরা চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু শাসন ক্ষমতা, শিক্ষাব্যবস্থা ও বিচার ব্যবস্থা দিয়ে গেছে এরূপ মানসিক গোলামদের হাতে। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।  

দেহের স্বাস্থ্য বাঁচাতে হলে শুধু প্রাণনাশী রোগজীবাণুগুলি চিনলে চলে না। সেগুলির নির্মূলে চিকিৎসাও জরুরি। তেমনি মুসলিম উম্মাহর স্বাস্থ্য বাঁচাতে হলে শুধু বিদেশী শত্রুদের চিনলে চলে না; ঘরের শত্রুদেরও চিনতে হয়। নবীজী (সা:)’র আমলে শুধু চেনার কাজই হয়নি; তাদের নির্মূলের কাজও হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিও যথার্থ ভাবে হয়নি। হয়নি বলেই ঈমানবিনাশী ও দেশবিনাশী এসব ভয়ংকর জীবাণুগণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু ভোটই পায় না, হৃদয়েও স্থান পায়। জাতির নেতা, জাতির পিতা ও দেশের বন্ধু রূপেও গৃহিত হয়।    

 

জিহাদ ও জিহাদভীতি  

মুসলিম দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আইন আদালত যখন ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত হয়, জিহাদ তখন নামায-রোযার ন্যায় সবার উপর ফরজ হয়ে যায়। নইলে সে অধিকৃত ভূমিতে পূর্ণ ইসলাম পালন অসম্ভব হয়। রাষ্ট্র তখন শয়তানের বাহনে পরিণত হয়; এবং সে রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটটি তখন সরাসরি শয়তানের দখলে যায়। মুসলিম জীবনে সবচেয়ে সর্বনাশা বিপর্যয় তখনই শুরু হয়। তাই সভ্য নাগরিকের দায়িত্ব শুধু নিজের ঘরকে ডাকাতমুক্ত করা নয়, বরং রাষ্ট্রকে শয়তানের অধিকার মুক্ত করা। মু’মিনের জীবনে এখানেই ঘটে ঈমানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় পাশ করতে শতকরা ৬০ ভাগের বেশী শহীদ হয়ে গেছেন। হযরত আবু বকর (রা:)’র শাসনামলে কিছু লোক রাষ্ট্রীয় ভান্ডারে যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিলেন। আর তাতেই তাদের বিরুদ্ধে তিনি জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন।

বাংলাদেশের মুসলিমদের জিহাদ কোন কাফের দেশ দখল করা নিয়ে নয়। বরং সেটি নিজ দেশকে ইসলামের শত্রুশক্তির দখলদারি থেকে মুক্ত করার। জিহাদ এখানে আল্লাহর পরাজিত বিধানকে পুণঃপ্রতিষ্ঠিত করার।এ জিহাদে যোদ্ধা হওয়া তাই প্রতিটি মুসলিমের উপর নামায-রোযার ন্যায় ফরজ। নামায-রোযায় কাজা আছে কিন্তু এ ফরজে কাজা নাই। অথচ সে পবিত্র ফরজ জিহাদে যোদ্ধা হওয়াকেই অপরাধ ও সন্ত্রাস বলা হচ্ছে। জিহাদ নিয়ে এ ব্যাখাটি নিতান্তই শয়তানি শক্তির নিজস্ব আবিস্কার। ইসলামের শত্রুপক্ষটি এরূপ প্রচার চালাচ্ছে একটি বিশেষ লক্ষ্যকে সামনে রেখে। সেটি শুধু তাদের স্বৈরাচারি শাসনকে দীর্ঘায়ীত করার লক্ষ্যে নয়, বরং বাংলাদেশের বুকে বিদেশী কাফের শক্তির আগামী আগ্রাসনকে প্রতিরোধহীন করার লক্ষ্যে। কারণ, তারা তো সে কাফের শক্তিরই সেবাদাস।

জিহাদই দেয় মুসলিম বাহিনীকে বিপুল লড়াকু জনবল। সাধারণ প্রজারা তখন নিজেদের অর্জিত অর্থ, খাদ্য এবং অস্ত্র সাথে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ছুটে। সেটিকে তারা জান্নাতে প্রবেশের দরওয়াজা গণ্য করে। জিহাদ এভাবে জনগণের ব্যাপক ক্ষমতায়ন ঘটায়। প্রতিটি নাগরিক তখন যোদ্ধায় পরিণত হয় –যেমনটি নবীজী (সা:)’র আমলে হয়েছিল। সে ইতিহাস জানে বলেই ইসলামের শত্রুপক্ষের মনে এতো ইসলামভীতি ও জিহাদভীতি। জিহাদের চেতনা বিলুপ্তিতে এজন্যই তাদের এতো আয়োজন। বিলুপ্ত করতে চায় ওয়াজ ও আলোচনায় জিহাদ শব্দের ব্যবহার। এমন কি আইনগত ভাবে নিষিদ্ধ করতে চায় জিহাদকে। কারণ, জিহাদ নিষিদ্ধ হলে এ পবিত্র ইবাদতটি তখন আদালতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হবে। ভারতে যখন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের শাসন, তারাও নিষিদ্ধ করেছিল জিহাদকে। একই উদ্দেশ্য নিয়ে মার্কিন যক্তরাষ্ট্র মুসলিম দেশের স্কুল ও মাদ্রাসায় সিলেবাস বদলানোতে হাত দিয়েছে। 

বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের চেতনার ভূগোলটি বহু আগেই ভারতীয় কাফেরদের চেতনার সাথে মিশে গেছে। এখন শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূগোল একাকার করার কাজটি বাঁকি। ভারতীয় বা পাশ্চাত্যের কাফেরদের ধ্যানধারণা ও সংস্কৃতির চেয়ে ইসলাম ও ইসলামের সংস্কৃতিই তাদের কাছে বেশী বিদেশী মনে হয়। অথচ আগ্রাসী ভারতীয়দের হাতে বাংলাদেশ একাত্তরের ন্যায় আবার অধিকৃত হলে বাঙালী মুসলিমদের জীবনে যে ভয়ানক আযাব ও অপমান নেমে আসবে তাতেও কি কোন সন্দেহ আছে? একাত্তরে অধিকৃত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী খেতাব জুটেছিল ভিক্ষুকের তলাহীন ঝুলির। এতবড় অপমান কোন কালেই কোন মুসলিম দেশের জুটেনি। সেটিই পরিমাপ দেয় আগ্রাসী ভারতীয়দের দস্যুবৃত্তি একাত্তরে কতটা নির্মম ছিল। কিন্তু পুণঃরায় অধিকৃত হলে আবার নেমে আসবে সে আযাব।

মুসলিম রাষ্ট্রের অতিক্ষুদ্র অঙ্গণকেও কাফেরদের হাতে অধিকৃত থাকতে দেয়ার বিধান ইসলামে নেই। না সামরিক ভাবে, না সাংস্কৃতিক বা আদর্শিক ভাবে। বাংলার নবাব যখন কয়েকটি গ্রামের মালিকানা ইংরেজদের হাতে তুলে দেয় তখন থেকেই শুরু হয় খাল কেটে কুমির আনার কাজ। তখন ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে বাংলার উপর ইংরেজদের দখলদারি। একই ভাবে ধীরে ধীরে সমগ্র ফিলিস্তিন অধিকৃত হয়েছে ইহুদীদের হাতে। ধর্মীয়, আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগলিক ময়দানের কোন একটি ক্ষেত্রও যদি শত্রুশক্তির দখলদারিতে যায় তখন সেটি যে কতবড় ভয়ানক বিপর্যয় ঘটায় -এ হলো তার নমুনা। মুসলিমদেরকে তাই মুসলিম ভূমির প্রতি ইঞ্চিকেই সুরক্ষা দিতে হয়। শুধু দেশের ভূগোল পাল্টালে চলে না, মনের ভূগোলও ইসলামী করতে হয়। নিরংকুশ বিজয় আনতে হয় দেশবাসীর চিন্তা-চেতনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গণেও। অথচ বাংলাদেশে সে বিজয় কোন কালেই অর্জিত হয়নি। বাঙালী মুসলিমের এখানেই বড় ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার কারণে, অনৈসলামিক চেতনা বেঁচে আছে বিপুল সংখ্যক মানুষের মনের মানচিত্রে।

ইসলামের জিহাদ তাই শুধু সামরিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিকও। বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধাদের কাজ হয় কোটি কোটি মুসলিমের চেতনার ভূমিকে প্রতিরক্ষা দেয়া। সে কাজটি যথাযথ না হলে মুসলিমগণও শত্রু বাহিনীর সৈনিকে পরিণত হয়। সব পরাজয়ের শুরু তো চেতনার ভূমি থেকেই। জ্ঞানীর কলমের কালি তাই শহীদের রক্তের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে বাঙালী মুসলিম সৈনিকদের সংখ্যাটি অতি নগন্য। ফলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের সবচেয়ে বড় পরাজয় এবং শত্রুশক্তির সবচেয়ে বড় দখলদারিটি ঘটেছে জনগণের চেতনার ভূবনে। চেতনার মানচিত্রটি এভাবে শত্রুশক্তির দখলে গেলে রাজনৈতিক মানচিত্রের উপরও কি দখলদারি থাকে? তখন পুরা দেশ পরিণত হয় শত্রুশক্তির অধিকৃত ভূমিতে।  রাষ্ট্রের উপর ইসলামের নিরংকুশ বিজয় নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব ঘোষণাটি হলো: “তিনিই সেই সত্ত্বা যিনি হিদায়েত ও সত্যদ্বীনসহ তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন। এবং সেটি এজন্য যে সেটি বিজয়ী হবে সকল দ্বীন তথা ধর্মের উপর।..”।–(সুরা সাফ, আয়াত ৯)। তাই বিজয় শুধু ভৌগলিক হলে চলে না, আদর্শিক ও ধর্মীয়ও হতে হয়। মুসলিম ভূমিতে তাই কোন রাজা, কোন স্বৈরাচারি শাসক বা কোন জনগোষ্ঠির সার্বভৌমত্ব যেমন প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না, তেমনি বৈধতা পেতে পারে না ইসলাম ভিন্ন অন্যকোন ধর্মমত বা মতাদর্শের বিজয়। বিজয়ী হওয়ার বৈধ অধিকার রাখে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন। প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব হলো ইসলামকে বিজয়ী করার লড়াইয়ে সৈনিক হয়ে যাওয়া। মুসলিম জীবনে এর  চেয়ে গুরুত্পূর্ণ কোন কাজ নাই।

 

জিহাদশূণ্যতা ও হারাম রাজনীতি

আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার দায়ভার ফেরেশতাদের নয়, সে দায়ভারটি ঈমানদারদের। কারণ, এ পৃথিবী ফেরেশতাদের পরীক্ষাস্থল নয়; এখানে পরীক্ষা হয় তাদের যারা নিজেদের ঈমানদার রূপে দাবী করে। এবং  পরীক্ষাটি হয় অর্পিত দায়ভার পালনের মধ্য দিয়ে। ফলে ঈমাদারকে শুধু নামাযী ও রোযদার হলে চলে না, মুজাহিদও হতে হয়। মু’মিনের বাঁচার ভিশনটি কি, সে সাথে তাঁর রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির মিশনই বা কি –সেটি সুরা সাফ’য়ের উপরুক্ত আয়াতটিতে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এরূপ একটি মিশনকে মু’মিনের জীবনে ফরজ করার জন্য পবিত্র কোর’আনের উপরুক্ত ঘোষণাটি মাত্র একবার ঘোষিত হওয়াই যথেষ্ট ছিল। অথচ মহান আল্লাহতায়লা সেটি ঘোষণা শুনিয়েছেন তিন বার। ইসলামকে বিজয়ী করার কাজে দেশে দেশে ও যুগে যুগে মু’মিনদের জীবনে যে লাগাতর লড়াই –সেটির ধর্মীয়, নৈতিক ও দার্শনিক যৌক্তিকতা তো মহান আল্লাহতায়ালার এ ঘোষণা।

ইসলাম-অনৈসলামের দ্বন্দে ঈমানদারের জন্য নিরব ও নিষ্ক্রীয় থাকাটি যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো নিরেপক্ষ থাকা। কারণ, তাতে ইসলামের বিজয় আসে না। এজন্য ফরজ হলো লড়াইয়ের প্রতি অঙ্গণে ইসলামের পক্ষ নেয়া। ইসলাম কবুলের সাথে সাথে ঈমানদারের জীবনে তাই নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের সাথে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদও এসে যায়। সে সাথে কিতাল বা সশস্ত্র যুদ্ধও আসে। সেগুলি যেমন নবীজী (সা:)’র জীবনে এসেছিল, তেমনি এসেছিল প্রতিটি সাহাবীর জীবনেও। মুসলিম নামধারী হয়েও যারা রাজনীতিতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করতে চায়, তারা কি একবারও ভেবে দেখেছে, নবীজী (সা:) বেঁচে থাকতে কার হাতে ছিল মুসলিম উম্মাহর রাজনীতি? কে ছিলেন ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান? কে পরিচালনা করতেন জিহাদ? তখন তো নিষিদ্ধ হয়েছিল তাদের রাজনীতি -যাদের লক্ষ্য জনগণকে জাহান্নামে নেয়া। এটি তো ভয়ানক অপরাধের রাজনীতি। তাদের এ অপরাধ তো চোরডাকাতদের অপরাধের চেয়েও ভয়ানক। চোরডাকাতগণ মানুষের অর্থে হাত দিলেও কাউকে জাহান্নামে নেয় না। এ কাজটি তো তাদের -যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করে। নবীজী(সা:) ও সাহাবাযে কেরামের শাসনামলে মুসলিম ভূমিতে তাই এরূপ অপরাধীদের রাজনীতিকে কখনো অনুমতি দেয়া হয়নি। ইসলামের রাজনীতি নিষিদ্ধের নামে বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ যা করতে চায় -তা হলো নবী-আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। শরিয়ত বিরোধীতার এ রাজনীতি শত ভাগ হারাম –যেমন হারাম হলো পতিতাবৃত্তি, মদপান, জুয়া ও সূদ। কোন মুসলিম দেশে এ রাজনীতি বৈধতা পেতে পারে না। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোতে এ হারাম রাজনীতিই বিজয়ী। আর এ হারাম রাজনীতির বিজয়ের মূল কারণ, মুসলিম জীবনে জিহাদশূণ্যতা। এবং একমাত্র জিহাদের মাধ্যমেই বিজয়কে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে।

 

পরাজয় যেরূপে অনিবার্য হয়

রাষ্ট্রের অঙ্গনে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হবে, না অন্য ধর্ম বা বিধান প্রতিষ্ঠা পাবে -সে ফয়সালাটি কখনোই মসজিদ-মাদ্রাসার মেঝেতে হয় না। পীরের খানকাহ, তাবলিগের ইজতেমা বা সুফির আস্তানাতেও হয় না। সেটি নির্ধারিত হয় জিহাদের ময়দানে। তাই ইসলামের বিজয় নিয়ে যাদের সামান্যতম ভাবনা আছে তারা কি কখনো নিজেদের ইবাদত-বন্দেগী মসজিদ-মাদ্রাসা, পীরের খানকাহ, সুফির আস্তানা বা তাবলিগ ইজতেমায় বন্দি রাখতে পারে? তারা তো সকল সামর্থ্য নিয়ে হাজির হয় জিহাদের ময়দানে। নবীজীকেও তাই বদর,ওহুদ¸খন্দক খায়বর ও হুনায়ুনের যুদ্ধের ন্যায় বহু যুদ্ধে নামতে হয়েছে। নামতে হয়েছে লাগাতর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়েও।

ব্যক্তির যুদ্ধ, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি থেকেই ধরা পড়ে সে মূলত কোন পক্ষের। তাছাড়া কোন দল ও কোন মতাদর্শের প্রতিষ্ঠায় সে রায় দেয়, অর্থ দেয় বা শ্রম ও রক্ত দেয় –সেটিও কি গোপন থাকার বিষয়? মু’মিনের ঈমানদারী এবং কাফেরদের বেঈমানী তো এভাবেই প্রকাশ পায়। মদিনার মুনাফিকগণ নবীজী (সা:)’র পিছনে নিয়মিত নামায পড়েছে। কিন্তু তাদের মুনাফিকি ধরা পড়েছে রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধের ময়দানে। ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো, জনগণের জীবন থেকে যখনই জিহাদ বিলুপ্তি হয়, তখনই ইসলাম বিলুপ্ত হয় দেশের রাজনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রশাসন থেকেও। দেশ এভাবেই অধিকৃত হয়ে যায় ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। ইসলাম ও মুসলিমের পরাজয় তো এভাবেই অনিবার্য হয়। এবং আজকের বাংলাদেশ তো তারই উদাহরণ। ১ম সংস্করণ ২২/০৩/২০১৪; ২য় সংস্করণ ০৪/০২/২০২১।




বিবিধ ভাবনা (৩৯)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ইসলামের বিপক্ষ শক্তির বিজয় উৎসব 

বাংলাদেশে ইসলামের বিপক্ষের শক্তির বিজয়গুলো বিশাল। বাংলাদেশে বহু কোটি মানুষের পেটে দুই বেলা ভাত না জুটলে কি হবে, সে বিজয় নিয়ে বাংলাদেশে এখন শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে উৎসব হচ্ছে। এ উৎসবে প্রধান অতিথি হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও গুজরাতের মুসলিম গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদি। নরেন্দ্র মোদি প্রতিনিধিত্ব করে ভারতের মুসলিম নিধনকারী হিন্দুত্ববাদী আর,এস,এস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজিপি’র সম্মিলিত অক্ষ শক্তির। এরাই আসাম ও পশ্চিম বাংলা থেকে বাঙালী মুসলিমদের বাংলাদেশী বলে বহিস্কারের ষড়যন্ত্র করছে। এরাই বাবরি মসজিদকে ধুলির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের ইসলামের শত্রু শক্তির কাছে ভারতের মুসলিম বিরোধী এ উগ্র শক্তিটি যে কতটা কাছের -তা নরেন্দ্র মোদিকে প্রধান অতিথি করে সেটিই প্রমাণ করলো। ভারতে মুসলিম গণহত্যা হলে বা সীমান্তে বাংলাদেশীকে হত্যা করা হলে -এ জন্যই এরা সেগুলির নিন্দা করেনা।

এদের আরেক বিজয় হলো, বাঙালী মুসলিমদের তারা সফল ভাবে দূরে সরাতে পেরেছে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে। ফলে শরিয়ত ও জিহাদের কথা কেউ মুখে আনে না। যেন শরিয়ত ও জিহাদ -এ দুটি ইসলামের কোন অংশই নয়। দেশের আদালতে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা না দিলে যে মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় কাফের, ফাসেক ও জালেম গণ্য হতে হয় -সে হুশও জনগণের চেতনা থেকে তারা বিলুপ্ত করতে পেরেছে। দাফন দিতে পেরেছে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব। ফলে অবাঙালী মুসলিমগণ তাদের কাছে ঘৃণার বস্তু। একাত্তরে এরাই উৎসব ভরে তাদের হত্যা ও ধর্ষণ করেছে। এবং তাদেরকে ঘরবাড়ী থেকে তাড়িয়ে সেগুলি দখলে নিয়েছে। হিন্দুদের ন্যায় মূর্তি নির্মাণ ও মূর্তির পদতলে ফুল চড়ানো এখন তাদেরও সংস্কৃতি। ইসলামপন্থীদের ফাঁসি, শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যা, নিষিদ্ধ কোর’আনের তাফসির –এ গুলোও কি কম বিজয়?

তাদের সবচেয়ে বড় বিজয়টি আসে ১৯৭১’য়ে। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ইসলামের শত্রু পক্ষের এটিই ছিল সবচেয়ে বড় নাশকতা। সে কাজে তারা সাথে পায় আগ্রাসী ভারতীয় কাফেরদের। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমগণ ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে মুসলিম শক্তি রূপে উত্থানের স্বপ্ন দেখেছিল এবং সে স্বপ্নের বাস্তবায়নে জন্ম দিয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তান। ভারতের কাফেরগণ চায়নি, পাকিস্তান সৃষ্টি হোক এবং বেঁচে থাকুক। চায়নি, বাংলাদেশের ইসলামবিরোধী শক্তিও। ১৯৭১’য় ভারতীয় আগ্রাসী শক্তির সাথে কোয়ালিশন গড়ে তারা সফল হয় উপমহাদেশের মুসলিমদের সে স্বপ্নকে পন্ড করতে। তাতে বিজয়ী হয়েছিল ভারত। ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর বিজয়ে উল্লসিত হয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি পার্লামেন্টে দাঁড়িয় বলেছিল, “হাজার সালকা বদলা লে লিয়া।” ইন্দিরা গান্ধির সে বদলাটি ছিল ভারতের বুকে মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দুদের প্রতিশোধ। প্রশ্ন হলো, হিন্দুদের সে বদলা নেয়ার যুদ্ধে একজন মুসলিম কীরূপে জড়িত হয়? লক্ষণীয় হলো, বাংলাদেশের কোন আলেম বা কোন ইসলামী দল তাতে জড়িত হয়নি। কিন্তু জড়িত হয় এবং সহায়তা দেয় বাংলাদেশের ইসলাম বিরোধী শক্তি। একাত্তরের সে প্রতিশোধের যুদ্ধে তারাই ভারতে ঘরে বিজয় তুলে দেয় এবং সে বিজয় নিয়ে ভারতীয় কাফেরদের সাথে মিলে এখন উৎসব করছে।

প্রশ্ন হলো, যে উৎসবটি কাফেরদের সাথে নিয়ে হয়, তাতে শয়তান খুশি হলেও মহান আল্লাহতায়ালা কি খুশি হন? সে ভাবনাই বা ক’জন বাংলাদেশীর? সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে কখনো কি এমন হয়ছে, মুসলিমগণ কাফেরদের সাথে একত্রে বিজয় উৎসব করেছে? মুসলিম ও কাফেরদের বিজয় ও পরাজয়েরে বিষয়গুলো তো ভিন্ন ভিন্ন। কাফেরদের যাতে বিজয়, তাতে তো মুসলিমদের পরাজয়।   

 

২. ইসলামপন্থীদের পরাজয়

বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের পরাজয়গুলো বিশাল ও ভয়ানক। সে পরাজয়গুলো নিয়ে তাদের মাতম হওয়া উচিত। তারা ব্যর্থ হয়েছে ঐক্যবদ্ধ হতে। ব্যর্থ হয়েছে দেশের আদালতে শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা দিতে। ব্যর্থ হয়েছে অন্যায় ও দুর্বৃত্তির নির্মূলে এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। অথচ অন্যায় ও দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা নিয়ে বাঁচাটাই তো মুসলিম জীবনের মূল মিশন। এ মিশন নিয়ে বাঁচার জন্যই তারা মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় শ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা পায়। একমাত্র এ পথেই নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। সে মিশন নিয়ে বাঁচার কারণেই মুসলিমগণ অতীতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। অথচ আজ বাঙালী মুসলিমগণ জন্ম দিচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের। এবং শাসক রূপে মেনে নিয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় ডাকাতকে।

তাদের বিশাল ব্যর্থতা পবিত্র কোর’আনকে বুঝায় এবং কোর’আনের জ্ঞানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ায়। কোর’আন না বুঝে তারা শুধু তেলাওয়াতে দায় সারছে। পবিত্র কোর’আনের সাথে এর চেয়ে বড় বেয়াদবী আর কি হতে পারে? এরূপ বেয়াদবদের কি মহান আল্লাহতায়ালা কখনো ইজ্জত দেন? আল্লাহতায়ালা কোর’আনের জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন, না বুঝে তেলাওয়াতকে নয়।

ঈমানদারের পরীক্ষা কি শুধু নামায-রোযা পালনে হয়? নামায-রোযা তো নবীজী(সা:)’র যুগে মুনাফিকদের জীবনেও ছিল। সূদখোর, ঘুষখোরও তো নামায পড়ে। তাকে তো বিজয়ী হতে হয় ইসলামের বিজয় আনার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা ব্যর্থ হয়েছে নবীজী(সা:)’র ইসলাম নিয়ে বাঁচায়। তারা যে ইসলাম নিয়ে বাঁচছে সেটি তো নবীজী(সা:)’র ইসলাম নয়; সেটি তো তাদের নিজেদের মনগড়া ইসলাম। নবীজী (সা:)’র ইসলামে ইসলামী রাষ্ট্র ছিল, জিহাদ ছিল, শাহাদত ছিল, শরিয়ত ও হুদুদের পালন ছিল এবং প্যান-ইসলামিক মুসলিম ঐক্য ছিল। বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের মাঝে এর কোনটাই নাই। তাদের মাঝে বেঁচে আছে ফেরকাপরস্তি, পীরপরস্তি, মজহাবপরস্তি, ইত্যাদি। নবীজী (সা:)’র ইসলাম নিয়ে বাঁচতে হলে জান ও মালের বিশাল খরচ পেশ করতে হয়। সাহাবাদের শতকরা ৬০ ভাগের বেশী তাই শহীদ হয়েছেন।

 ৩. কবিরা গুনাহ

মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও দুর্বৃত্তি নির্মূলের হুকুম দিয়েছেন। প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ হলো, সে হুকুমগুলো মেনে চলা। অথচ বাংলাদেশের মানুষ বাঁচছে সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে। উল্লেখ্য হলো, যারা তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী, তাদেরকে পবিত্র কোর’আনে কাফের ও ফাসেক বল হয়েছে। কাফের, ফাসেক ও জালেম বলা হয়েছে তাদেরও যারা শরিয়তের হুকুম মানে না। ইসলামের এগুলো অতি মৌলিক বিষয়।

অথচ বাংলাদেশে মুসলিমদের দ্বারা মহান আল্লাহতায়ালার সে হুকুম মানার কাজটি হয়নি। দুর্বৃত্তদের নির্মূল না করে জনগণ তাদের প্রতিপালনে রাজস্ব দেয় এবং বিপুল সংখ্যায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী প্রতিপালনের খরচ জোগায়। দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কাজ হয়েছে রাস্তায় জনগণকে পেটানো এবং নির্বাচন কালে ভোটডাকাতি করে দুর্বৃত্তদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া। ২০১৩ সালে এদের দেখা গেছে শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যায়। এমন দুর্বৃত্তদের প্রতিপালন করা তো কবিরা গুনাহ।

৪. সবচেয়ে বড় বাঁচা মুনাফিকি থেকে বাঁচা

সবচেয়ে বড় বাঁচাটি হলো মুনাফিকি থেকে বাঁচা। নামায-রোযা করা সহজ। ঘুষখোর, সূদখোর এমনকি দুর্বৃত্ত বেঈমানেরাও নামায পড়ে এবং রোযা রাখে। নবীজী (সা:)’র যুগে অতি দুর্বৃত্ত মুনাফিকগণ নামায পড়তো। তারা নামায পড়তো এমন কি নবীজী (সা:)’র পিছনে জামাতের প্রথম সারীতে। নামায পড়লেও তারা ইসলামের পরাজয় চাইতো। নবীজী (সা:)কে হত্যা ও মুসলিমদের পরাজিত করার লক্ষ্যে তারা কাফের ও ইহুদীদের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করতো। এরা কাফেরদের চেয়ে্ও নিকৃষ্ট। এরাই ঘরের শত্রু। পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে, এদের স্থান হবে জাহান্নামে কাফেরদের চেয়েও নীচে তথা অধিকতর ভয়ানক স্থানে।

এমন মুনাফিকদের সংখ্যা কি বাংলাদেশে কম? বাংলাদেশে যারা ইসলামকে পরাজিত রেখেছে, তাদের সবাই কি মূর্তিপূজারী কাফের? তাদের অনেকেই নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং যাকাত দেয়। অথচ এদের অনেকই ১৯৭১’য়ে দেখা গেছে ভারতীয় কাফেরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে। কাফেরদের এজেন্ডা ও তাদের এজেন্ডা সেদিন একাকার হয়েছিল। এমনটি কোন ঈমাদারের জীবনে এক মুহুর্তের জন্যও ঘটে? তেল ও পানি যেমন একত্রে মেশে না, তেমনি মুসলিমের এজেন্ডা ও কাফেরদের এজেন্ডা কখনোই একত্রে মেশে না। মুসলিম ভূমিতে যুদ্ধ শুরু হলে এভাবেই মুনাফিকদের চরিত্র ধরা পড়ে। তাই এ জীবনে সবচেয়ে কঠিন হলো মুনাফিকি থেকে বাঁচা। নবীজী (সা:)’র যুগে ১ হাজারের মাঝে ৩০০ জন মুনাফিক রূপে ধরা পড়েছিল। এটি এত বিশাল সংখ্যা; এবং সেটি নবীজী (সা:)’র উপস্থিতিতে। এখন সে সংখ্যাটি তা থেকে বহুগুণ বেশী।

জিহাদ মুনাফিকদের আলাদা করতে অব্যর্থ ফিল্টারের ন্যায় কাজ করে। ঈমান থাকলে জিহাদ থাকতেই হবে। যার মধ্যে জিহাদ নাই, বুঝতে তার মধ্যে ঈমানও নাই। বিষয়টিকে মহান আল্লাহতায়ালা সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে অতি সুস্পষ্ট ভাবে ব্যক্ত করেছেন। এ আয়াতে জিহাদকে তিনি ঈমানের অঙ্গ এবং ঈমান যাচা্ইয়ের শর্ত রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। মুনাফিকি তাই দেখা যায়। শত্রুর নির্মূলে ও ইসলামের বিজয় সাধনে যার জীবনে জিহাদ নাই, সে ব্যক্তি যতই নামায-রোযা করুক -সে ব্যক্তি মুনাফিক।

৫. খাড়া হও আল্লাহর রাস্তায়

“(হে নবী, ঈমানদের) বলুন, “তোমাদের জন্যএকটি মাত্র ওয়াজ (নসিহত): খাড়া হও আল্লাহর জন্য জোড়ায়ূ জোড়ায় অথবা একাকীই; অতঃপর চিন্তাভাবনা কর।”-(সুরা সাবা, আয়াত ৪৬)। আল্লাহর জন্য খাড়া হওয়ার অর্থ ইসলামের বিজয়ে তাঁর সৈনিক রূপে খাড়া হওয়া। তাই মুসলিমকে শুধু নামাযে খাড়া হলে চলে না, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধের ময়দানে ইসলামের পক্ষে খাড়া হতে হয়।

তবে খাড়া হওয়ার জন্য শর্ত এ নয়, তাকে বিশাল কোন দলের সদস্য হতে হবে। যার যা সামর্থ্য আছে তা নিয়েই খাড়া হতে হবে। উপরুক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, সাথী না জুটলে, একাকীই খাড়া হতে হবে। যুদ্ধ নানা ভাবে হয়। অস্ত্রের হতে পারে, বুদ্ধিবৃত্তিকও হতে পারে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কোন একটি স্ট্রাটেজী অবশ্যই বেছে নিতে হবে। ইসলামে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকার কোন অবকাশ নাই। ঈমান নিয়ে বাঁচতে হলে জিহাদ নিয়েই বাঁচতে হবে। নিষ্ক্রীয় থাকার পথটি মুনাফিকির পথ।

নমরুদের সামনে খাড়া হয়েছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আ:) নিতান্তই একাকী। তাঁর সাথে কেউ ছিল না। ফিরাউনের সামনে খাড়া হয়েছিলেন হযরত মূসা (আ:) ও হযরত হারুন (আ:) –মাত্র এই দুই ভাই। এরাই তো মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ নক্ষত্র। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তাদের সে সাহসী ভূমিকা অত্যন্ত ভাল লেগেছিল এবং পবিত্র কোর’আনে তাদের সে সাহসিকতাকে তিনি চিরকালের জন্য অক্ষয় করে রেখেছেন। এবং দেখিয়েছেন, ঈমান কাকে বলে?

৬. বাংলাদেশীদের ব্যর্থতা

 গৃহে গলিত আবর্জনার স্তুপ দেখে শতভাগ সঠিক ভাবেই বলা যায়, সে গৃহে কোন সভ্য মানুষ বাস করে না। কোন সভ্য মানুষ কখনোই ঘরে আবর্জনা স্তুপ নিয়ে বসবাস করেনা। আবর্জনা সরানোই তাঁর সংস্কৃতি। তেমনি কোন দেশে ভোটডাকাতদের শাসন দেখেও নিশ্চিত বলা যায়, সে দেশে কোন সভ্য জনগণ বাস করেনা। সভ্য জনগণ বাস করলে সেদেশে ডাকাত তাড়ানোর যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। অথচ তেমন একটি যুদ্ধ বাংলাদেশে নাই। ফলে বাংলাদেশ কেমন দেশ -সেটি কি বিশ্বাবাসীর কাছে কোন গোপন বিষয়? আজ শত শত কোটি টাকা খরচ করে ৫০ বছরের পুর্তি উৎসব হচ্ছে। কিন্তু ভোটডাকাতদের শাসনের যে অসভ্যতা -তা কি তাতে দূর হবে? এটি ঘরে গলিত আবর্জনার স্তুপ রেখে মুখে কসমেটিক লাগানোর মত।

৭. সবচেয়ে বড় নেক কর্ম

কাউকে কিছু পানাহার বা অর্থ দিয়েই অনেকে ভাবেন -কতই না সে উপকার করলো। কিন্তু ঈমানদারের ভাবনাটি বিশাল। সে ভাবে শুধু তার দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেয়া নিয়ে নয়, বরং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো নিয়ে। সে কাজের ছওয়াব এতোই বেশী যে মহান আল্লাহতায়ালা তাকেও জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করেন। সে কল্যাণ কর্মের ভাবনা নিয়েই যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ এসেছিলেন। তাদের মিশনের লক্ষ্য অর্থনৈতিক বিপ্লব ছিল না, বরং সে্টি ছিল জান্নাতের যোগ্য রূপে মানবকে গড়ে তোলা। মাথা টানলে যেমন কান আসে, তেমনি জান্নাতের উপযোগী মানুষ সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রও তখন শান্তি ও সৃষ্টিশীল কর্মে ভরে উঠে।

রাষ্ট্র ইসলামী হলে সে বিশাল কাজটিই অতি সহজ হয়ে যায়। কারণ রাষ্ট্রই হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান; মানবের কল্যাণে ও অকল্যাণে রাষ্ট্রের ক্ষমতাটি বিশাল। ফলে এ রাষ্ট্রকে দুর্বৃত্ত শক্তির কবজায় রাখার বিপদটি ভয়াবহ। রাষ্ট্রকে তখন জাহান্নামে নেয়ার বাহনে পরিণত হয়। ইসলামে তাই সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি মসজিদ বা মাদ্রাসা গড়া নয়, সেটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ। এটিই মানব সভ্যতার সবচেয়ে ব্যয়বহুল কাজ। তখন দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত, প্রশাসন, অর্থনীতি, পুলিশ ও সেনাবাহিনী যেমন মানুষকে শয়তানী শক্তির হাত থেকে রক্ষা দেয় তেমনি প্রস্তুত করে জান্নাতের উপযোগী করে। ২৭/০৩/২০২১




বিবিধ ভাবনা (৩৮)

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. চাকুরীজীবী রাজনীতিবিদদের পঙ্গুত্ব ও দুর্বৃত্তদের স্বর্গরাজ্য

 যেসব সংগঠনে সার্বক্ষনিক নেতাকর্মীর নামে চাকুরীজীবী পালা হয় -সেসব সংগঠনে গড়ে উঠে চাকুরীজীবীদের পাশাপাশী বিপুল সংখ্যক আনুগত্যজীবী। আনুগত্যজীবীদের বলা হয় দলীয় ক্যাডার। আনুগত্যজীবীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় চাকুরীজীবীদের উৎসাহে। কারণ দলে নিজ নিজ পদে নিজেদের চাকুরী স্থায়ী করার জন্য এরূপ আনুগত্যজীবীদের প্রতিপালন দেয়াকে জরুরি মনে করা হয়। এরা দলে নেতাদের অনুগত পাহারাদার রূপে কাজ করে।

এসব সংগঠন দীর্ঘকাল বেঁচে থাকলেও তাদের দ্বারা কোন গণ-আন্দোলন বা বিপ্লব হয়না। কারণ গণ-আন্দোলন বা বিপ্লব ঘটাতে হলে রাজপথে লড়াইয়ে নামতে হয়। তখন দলের দরজা খুলে দিতে হয় নতুনদের জন্য। কিন্তু চাকুরীজীবী সংগঠনে সেটি সম্ভব নয়। চাকুরীজীবীগণ ও তাদের সহচর আনুগত্যজীবীগণ দরজায় পাহারাদার রূপে দাঁড়ায় যাতে অন্যদের বিপুল সংখ্যায় প্রবেশে তাদের চাকুরী বিপদে না পড়ে। এজন্যই এসব চাকুরীজীবীদের সংগঠনে কোন নতুন মুখ বা নেতা দেখা যায় না। পুরোন ক্যাডারদের থেকেই নেতা হয়।

তাছাড়া আন্দোলনে দেশ অস্থির হলে দলের আয়ে ঘাটতি, চাকুরীজীবীদের বেতন হ্রাস ও চাকুরী হারানোর ভয় থাকে। তাই তারা ঝুঁকি নেয় না। এজন্যই দেশে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন যতই তীব্র হোক না কেন এবং নিজেদের নেতাকর্মীগণ যতই ফাঁসিতে ঝুলুক বা নির্যাতিত হোক না কেন -এসব চাকুরীজীবীদের সংগঠন আন্দোলনে যায় না।

নবীজী (সা:)’র সাহাবীগণ কোন সংগঠনের চাকরীজীবী ছিলেন না। তারা নিজেদের জানমাল বেঁচে দিয়েছিলেন মহান আল্লাহতায়ালার কাছে। সমাজ বিপ্লবের কাজে তাঁরা অর্থ দিতেন, নিতেন না। প্রতিদান চাইতেন একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। দুর্বৃত্ত শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইকে তাঁরা পবিত্র জিহাদ মনে করতেন। এমন আত্মত্যাগী মানুষ সৃস্টি না হলে কোন বিপ্লব হয় না, বিজয়ও আসে না। নবীজী (সা:)’র আমলে এরূপ আত্মত্যাগী মানুষের সংখ্যা সমগ্র মানব ইতিহাসে সর্বাধিক ছিল বলেই সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি সেদিন সংঘটিত হয়েছিল। বাংলাদেশে সে রকম মানুষ নাই, ফলে কোন বিপ্লবও নাই। তাই দেশ হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতদের স্বর্গরাজ্য।

২. আন্দোলন হোক অসভ্যতার নির্মূলে

জনপদে নেকড়ে বা ডাকাত ঢুকলে সবাই যুদ্ধে নামে। এটিই সভ্য সমাজের রীতি। স্বৈরচারী দুর্বৃত্ত ও ভোটডাকাত ক্ষমতায় বসলে জনগণ তেমন একটি যুদ্ধ শুরু করবে -সেটিও সভ্য সমাজে অতি কাঙ্খিত। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। এখানেই ধরা পড়ে বাংলাদেশীদের নৈতিক দিক দিয়ে দারুন ভাবে পিছিয়ে পড়াটি।

তবে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতাটি আরো গুরুতর। ব্যর্থতাটি স্রেফ দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নয়; বরং তাদের ঘৃণা করার সামর্থ্যে। লড়াইয়ের জন্য চাই দৈহিক বল, ঘৃণার জন্য চাই নৈতিক বল। চোর-ডাকাতদের ঘৃনা করার জন্য শিক্ষিত হওয়া লাগে না। নিরক্ষরেরও সে সামর্থ্য থাকে। কিন্তু সে সামর্থ্য নাই বাংলাদেশের আদালতের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সেনা অফিসার, প্রশাসনের কর্মচারি ও পুলিশ বিভাগের লোকদের। তারা বরং ভোটচোর হাসিনা ও তার সহচর দুর্বৃত্তদের গুণ গায় এবং প্রটেকশন দেয়। বিষয়টি গুরুতর। বাংলাদেশের সমস্যা শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং ভয়ানক নৈতিক। এটি নিতান্তই বিকট অসভ্যতা। তাই বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় আন্দোলনটি হওয়া উচিত এই অনৈতিকতা ও অসভ্যতার নির্মূলে।

আর অসভ্য মানুষদের সভ্য করার কাজে সবচেয়ে সফল প্রেসক্রিপশনটি হলো কোর’আন। এ হাতিয়ারটি দিয়েছেন মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা। আরবের অসভ্য মানুষদের এ প্রেসক্রিপশন মহামানবে পরিণত করেছিল। তাই বাংলাদেশে অবশ্যই সবচেয়ে বড় আন্দোলনটি হওয়া উচিত কোর’আন বুঝা ও কোর’আন বুঝানো নিয়ে। এ আন্দোলন সফল না হলে স্রেফ মুসলিমদের মুসলিম হওয়া বিফল হবে না, বিফল হবে সভ্য মানুষ রূপে বেড়ে উঠাও। এ কাজটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে সমগ্র মানব ইতিহাসে একমাত্র এ কাজের জন্যই মহান আল্লাহতায়ালা নবী-রাসূল ও জিব্রাইল (আ:)কে এ পৃথিবী পৃষ্ঠে পাঠিয়েছিলেন।

৩. ব্যর্থতা মুসলিম হওয়ায়

ডাক্তারী বই না পড়িয়ে কাউকে ডাক্তার বানানো যায় না। তেমনি কোর’আন না বুঝিয়ে কাউকে মুসলিম করা যায়না। তাই নামায-রোযার আগে কোর’আন বুঝা ফরজ করা হয়েছে। ইকরা (পড়) তাই ওহীর প্রথম শব্দ। নামায ফরজ হয়েছে ইলম ফরজ হ্‌ওয়ার ১১ বছর পর। অথচ মুসলিমগণ কোর’আন না বুঝে পড়ে। ফলে অসম্ভব হয়েছে্ মুসলিম হওয়া। কেউ মুসলিম না হলে শয়তানে পরিণত হবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। এদের কারণেই তো বাংলাদেশে ইসলাম পরাজিত এবং বিজয় ইসলামবিরোধীদের।

মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্দোলনটি হলো মানুষকে ঈমানদার বানানোর আন্দোলন। এ আন্দোলন মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর। ফলে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রেষ্ঠ নেক কর্ম আর কি হতে পারে? এ কাজে অংশ নেয়া সবার উপরে ফরজ। এ কাজ নবী-রাসূলদের। এ কাজে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে রাষ্ট্র। এবং সেটি কোর’আন শিক্ষাকে ব্যাপকতর করার মধ্য দিয়ে।

৪.শত্রুর ষড়যন্ত্র

জিহাদ এবং শাহাদা – এ দুটি ইসলামের অতি মৌলিক বিষয় যার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে পবিত্র কোর’আনে। মুসলিম ইতিহাসে যা কিছু মহৎ কর্ম সাধিত হয়েছে -তা সম্ভব হয়েছে বিপুল সংখ্যক মানুষের জিহাদে অংশ নেয়া ও শহীদ হওয়ার কারণে। এ দুটি বাদ দিলে ইসলাম বাঁচে না। জিহাদই ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। শহীদরাই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানব। তারা জান্নাত পায় বিনা হিসাবে। অথচ জিহাদ এবং শাহাদা’র বিষয়টি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বাদ দিতে চাপ দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল কাফের শক্তি। তারা মুসলিম দেশগুলির স্কুল ও মাদ্রাসার সিলেবাস পাল্টানোয় হাত দিয়েছে।  

৫.চাই রাজনৈতিক শক্তি

ভেড়ার সংখ্যা কোটি কোটি হলেও তাদের ভাগ্যে পরিবর্তন আসে না। আগের মতই ভেড়া ঘাস খায়। ভেড়া জন্মায় জবাই হওয়ার জন্য। তাই শুধু জনসংখ্যায় বাড়লেই হয় না, ভাগ্য পরিবর্তনে রাজনৈতিক শক্তি লাগে। পশু থেকে মানুষ উন্নত এই রাজনৈতিক শক্তির কারণে। এরিস্টোটল তাই মানুষকে রাজনৈতিক পশু বলেছিলেন। ১৭ কোটি বাংলাদেশীর সে রাজনৈতিক শক্তি নাই। তারাও ভেড়াতে পরিণত হয়েছে। তাই ঘাড়ের উপর দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতগণ বসলেও ভেড়ার মত তারাও প্রতিরোধহীন থাকে।

৬.পকেট ভরছে ডাকাতদের এবং দেনা বাড়ছে জনগণের

শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার আগে ৩৮ বছরে বিদেশের কাছে বাংলাদেশের মোট লোন হয়েছিল প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। শেখ হাসিনা তার ১২ বছরের শাসনে লোন নিয়েছে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের এখন মোট লোন ৫৭ বিলিয়ন ডলার। এ লোন হাসিনা নিজে শোধ করবে না, শোধ করবে দেশের জনগণ।

হাসিনা ইতিমধ্যেই দেশের সরকারি ব্যাংক গুলোর ভান্ডার খালি করেছে। কিন্তু তার নিজের এবং দলীয় ডাকাতদের অর্থের লোভ কমেনি। তাই অর্থ সংগ্রহে হাত বাড়িয়েছে বিদেশীদের কাছে। বিদেশীদের লাভ, লোন দিলে তারা মোটা অংকের সূদ পাবে। লোনের টাকায় পকেট ভর্তি হচ্ছে হাসিনার ও তার দলীয় ডাকাতদের এবং দেনা বাড়ছে জনগণের।

৭ যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে

 যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিবর্গ মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র নিয়ে ভাবে না। তারা ভাবে ইসলাম দমন নিয়ে। যারা ইসলামপন্থীদের দমনের কাজটি নিষ্ঠুর ভাবে করবে -তাদেরকে তারা সর্বভাবে সমর্থণ দিবে। তাই হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাত ফ্যাসিবাদীকে বা মিশরের জেনারেল সিসি’র ন্যায় বর্বর শাসককেও এরা সমর্থন দেয়।

এখন এটি পরিস্কার, ইসলামপন্থীগণ কোন দেশে জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসলেও পাশ্চাত্যের কাফের শক্তি তাদের মেনে নিতে রাজী নয়। সেটি দেখা গেছে আলজিরিয়া, ফিলিস্তিন ও মিশরের নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয়কে পন্ড করার ক্ষেত্রে। অপর দিকে স্বৈরাচারি শাসক যত ফ্যাসিস্টই হোক না কেন, তাদের মেনে নিতে কোন আপত্তি নাই -যদি সে সরকার ইসলামপন্থীদের নির্মূলে উদ্যোগী হয়। ফলে তাদের যুদ্ধটা ইসলামের বিরুদ্ধে। মুসলিমদের দায়িত্ব হলো তাদের মূল শত্রুকে চেনা। ২২/০৩/২০২১।




বিবিধ ভাবনা (৩৭)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 ১. পরাধীনতা নিয়ে উৎসব

বাংলাদেশের সরকার বিরাট ধুমধামে স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকী উৎসব করতে যাচ্ছে। খবরে প্রকাশ ১২ কোটি টাকা ব্যয় করবে দুবাইয়ের বিশ্ববিখ্যাত টাউয়ার বুর্জে খলিফায় আলোক সজ্জা দিতে। কিন্তু এ উৎসব কার স্বাধীনতা নিয়ে? কোন একটি দেশ স্বাধীনতা পেলে স্বাধীনতা পায় সে দেশের জনগণ। কিন্তু বাংলাদেশে কোথায় সে স্বাধীনতা? দেশের জনগণ স্বাধীন ভাবে কথা বলতে পারে না, লিখতে পারে না এবং মিছিল-মিটিং করতে পারে না। দেশ জুড়ে ভোট ডাকাতি করলে সামান্যতম শাস্তিও হয়না। কিন্তু স্বাধীন ভাবে কথা বললে গুম হতে হয়, জেলে যেতে হয়, নির্যাতিত হতে হয় এবং নির্মম ভাবে লাশ হতে হয়। লাশ হয়েছে বুয়েটের ছা্ত্র আবরার ফাহাদ। সম্প্রতি লাশ হলো মুশতাক আহম্মদ। ভোটের অধিকার ছিনতাই হয়েছ বহু আগেই। এতো নিরেট পরাধীনতা! জনগণ কেন এ পরাধীনতা উদযাপনে রাজস্ব দিয়ে অর্থ জোগাবে?

যারা স্বাধীনতা পেয়েছে তারা বাংলাদেশের জনগণ নয়, তারা হলো চোরডাকাত, ভোটডাকাত  ও গুম-খুন-সন্ত্রাসের নায়কগণ। পূর্ণ স্বাধীনতা ডাকাত সর্দারনী হাসিনা। জনগণ এ ডাকাত সর্দারনীর হাতে জিম্মি। ডাকাতদের সাথে অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছে ভারত। ভারত স্বাধীনতা পেয়েছে বাংলাদেশের পদ্মা ও তিস্তাসহ ৫৪টি নদীর পানি তুলে নিতে। তারা স্বাধীনতা পেয়েছে বাংলাদেশে মধ্য দিয়ে  বাস ও ট্রাক নিয়ে এপার-ওপার করিডোরের সুবিধা ভোগের। স্বাধীনতা পেয়েছে বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দগুলি ব্যবহারের।

৩. কেন পতনের পথে মুসলিমগণ?

মুসলিম উম্মাহর অবস্থা এমন এক বিশাল বাগানের ন্যায় যেখানে রয়েছে ১৫০ কোটি গাছ। কিন্তু সে বাগানের সব গাছ ফল দেয় না; ফল দেয় গুটি কয়েক মাত্র। কিন্তু বাগানের মালিক মহান আল্লাহতায়ালা চান ফল দিবে বাগানের প্রতিটি গাছ, কারণ পানাহার ও আলোবাতাস নিচ্ছে তো সব গাছগুলোই।

নিছক পানাহারে বাঁচার মধ্যে কোন কল্যাণ নাই। সংখ্যায় বৃদ্ধিতেও কোন মর্যদা নাই। মর্যাদা তো কর্মের কারণে। কোর’আনে তাই বলা হয়েছে, “ওয়া লি কুল্লি দারাজাতিন মিম্মা আমিলু।” অর্থ: সকল মর্যাদা আমলের মধ্যে। সে মর্যাদা যেমন জুটে এ দুনিয়ায়, তেমনি আখেরাতে। আর নবীজী (সা:)’র হাদীস: সবচেয়ে মর্যাদাকর আমল হলো জ্ঞানার্জন করা ও জ্ঞানদান করা। তাই যারা জ্ঞানের রাজ্যে্ এগোয় তারাই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মর্যাদা পায়। সে জ্ঞানীরা মর্যাদা পায় বিশ্বমাঝেও। অপর দিকে জ্ঞানহীনতা নেয় পতনের পথে। মুসলিমদের আজকের পতন, পরাজয় ও মর্যদাহীনতার মূল কারণ, জ্ঞানের রাজ্যে পশ্চাদপদতা। প্রশ্ন হলো, এ জ্ঞানহীনেরা কি আখেরাতে কোন মর্যাদা পাবে?  

৩. বাংলাদেশের রেকর্ড

পশু তাড়ানোর লোক না থাকলে জনপদ জুড়ে পশুরা রাজত্ব পায়। তেমনি দেশে চোরডাকাত তাড়ানো ও তাদের শাস্তি দেয়ার লোক না থাকলে রাজত্ব পায় চোরডাকাতেরা। তারই পারফেক্ট উদাহরণ হলো আজকের বাংলাদেশ। দেশের পুলিশ, আদালত ও সেনাবাহিনীর কাজ হয়েছে ডাকাতদের সুরক্ষা দেয়া। ফলে বাংলাদেশে জনগণের ভোট নির্বাচনের আগের রাতে ডাকাতি হয়ে গেলেও কেউ গ্রেফতার হয়না। সে অপরাধে কারো কোন শাস্তিও হলো না। জনগণের কাজ হয়েছে এ চোরডাকাতকে না তাড়িয়ে ডাকাত সরদারনীকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা। কোন সভ্য ব্যক্তি কি এমনটি করে? এটি তো ডাকাতপাড়ার সংস্কৃতি। অথচ এ অসভ্য সংস্কৃতিই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।    

৪. ডাকাত দলের রীতি

ডাকাত দলের সরদার কখনোই তার ডাকাত দলে ভাল লোককে নেয় না। কারণ, তাতে ডাকাতিতে সাহায্য মেলে না। তাই সে খোঁজে জঘন্য চরিত্রের অতিশয় ঝানু ডাকাতকে। তখন কদর পায় ডাকাতগণ। এবং অসম্ভব করা হয় ভাল মানুষের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচা। তখন ভাল লোকের পক্ষে রাজনীতি ও সরকারে থাকা অসম্ভব হয়। দেশ তখন একটি জঙ্গলে পরিণত হয়। চোরডাকাত ও ভোটডাকাতদের হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। এজন্যই হাসিনার কাছে জেনারেল আজিজের এতো কদর। কারণ, আজিজ উঠে এসেছে ডাকাত পরিবার থেকে; তার ৪ ভাই খুনি। এবং সে সাথে সে তার ডাকাতি কাজে বিপুল সামর্থ্য দেখিয়েছে ২০১৮ সালে ভোট ডাকাতিতে।

৫. জান্নাতের পথ ও জাহান্নামের পথ

জান্নাতে নানা বর্ণ, নানা অঞ্চল ও নানা ভাষার মানুষ পরস্পরে ভাইয়ের মত সৌহার্দ ও সম্পৃতি নিয়ে বসবাস করবে। সেখানে কোন বিবাদ ও বিভক্তি থাকবে না। ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের উর্দ্ধে উঠে তাদের একটিই পরিচয় হবে যে তারা মুসলিম। ঈমানদারদের জন্য এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া একমাত্র পরিচয়। তাই যারা জান্নাতের যোগ্য হতে চায় তাদেরকে দুনিয়ার বুকে্ও সে ভাবে ভাতৃসুলভ মুসলিম পরিচয় নিয়ে বাঁচার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।

সাহাবাগণ সে কাঙ্খিত সামর্থ্যটি অর্জন করেছিলেন। তারা বর্ণ, ভাষা, গোত্র ও আঞ্চলিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠতে পেরেছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া সে পরিচয় আজকের মুসলিমদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। তারা বেছে নিয়েছে বর্ণ, ভাষা, গোত্র ও আঞ্চলিক পরিচয়ে বিভক্তির দেয়াল গড়ার পথ। মুসলিম উম্মাহ তাই ৫৭টি জাতীয় ও গোত্রী রাষ্ট্রে বিভক্ত। বাঙালী, আরব, কুর্দি, ইরানী, মালয়ী ইত্যাদি পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠাটাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিভক্তির পথ মাত্রই আযাবের পথ –সে কথা পবিত্র কোর’আনে সুস্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে। যারা পরকালে জান্নাত পেতে চায় তারা কি সে পথ বেছে নিতে পারে?

৬. বিশ্বের সবচেয়ে বড় জেলখানা

যখন কোন ভূমির চারপাশে দেয়াল বা কাঁটা তারের বেড়া দেয়া হয় তখন সে জায়গাটা গরুছাগলের খোয়ার অথবা জেলখানায় পরিণত হয়। জেলের চার পাশে উঁচু দেয়াল বা কাঁটাতারের বেড়া থাকে। বাংলাদেশের চারপাশে সে বেড়া দিয়েছে ভারত। পাকিস্তানী আমলে ভারত এরূপ বেড়া দেয়নি। এ দেয়াল একাত্তরের অর্জন। ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জেলখানায়।

জেলখানার বাসিন্দাদের কথাবলা, লেখালেখি ও মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা থাকে না। নির্বাচনে অংশ নেয়া ও ভোটদানের স্বাধীনতা থাকে না। বাংলাদেশীদেরও সে স্বাধীনতা নাই। এদেশে স্বাধীন ভাবে কথা বললে, লেখালেখি করলে বা মিটিং-মিছিল করলে নির্যাতিত হতে হয় এবং লাশ হতে হয়। এ হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার অবস্থা –যা নিয়ে আবার উৎসবও হচ্ছে!

৭. দশের ও দেশের ভাবনা নিয়ে বাঁচা

নিজের স্বার্থে ও নিজ পরিবারের স্বার্থে সবাই কিছু না কিছু করে। সেরূপ কাজটি পশু-পাখীও করে। কিন্তু দেশের কল্যাণে কে কতটুকু করে -সে হিসাব বা সে ভাবনা ক’জনে? সে ভাবনা নাই বলেই বাংলাদেশ আজ চোরডাকাতদের দখলে। অথচ কে কতটা কাজ দশের জন্য ও দেশের জন্য করলো -পরকালে সে হিসাবই গুরুত্ব পাবে। সে কাজের ভিত্তিতে জান্নাত জুটবে।

৮. পরাজয়ের পথ

মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের একতা পছন্দ করেন। এবং তিনি ঘৃনা করেন তাদের অনৈক্যকে। যারা একতাবদ্ধ হয়, তাদেরকে তিনি বিজয় দেন। যারা বিভক্ত হয় তাদের পরাজয় দেন। মুসলিমগণ বিভক্তির পথ ধরেছে। ফলে তারা সর্বত্র পরাজিত। ১৯/০৩/২০২১।




পতনের পথ ও বিজয়ের পথ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

কীভাবে শুরু হলো পতনযাত্রা?

মুসলিমদের পতনের পথে যাত্রা বহুশত বছর পূর্বে শুরু হলেও এখনো শেষ হয়নি। পতনমুখী এ জাতির উত্থান নিয়ে যারা চিন্তিত তাদের প্রশ্ন, উত্থানের কাজ কোথা থেকে শুরু করতে হবে? এ নিয়েও নানা জন নানা মতে বিভক্ত। অন্য নানা বিষযের ন্যায় এ বিষয়েও নির্ভূল নির্দেশনা মেলে মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত ও নবীজীর (সা:) সূন্নত থেকে। সে সূন্নতের অনুসরণ শিল্প, কৃষি বা বিজ্ঞানের উন্নতি দিয়ে নয়; সেটি অজ্ঞতার দূরীকরণ ও জ্ঞানের উন্নয়ন দিয়ে। এবং সে জ্ঞানটি হলো কোর’আনের জ্ঞান। ব্যক্তি ও জাতির উন্নয়নে নির্ভূল ও অতীতে সফল-প্রমাণিত রোড ম্যাপ হলো পবিত্র কোর’আন। সে রোড ম্যাপের যে স্থান থেকে মহান নবীজী (সা:) তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন আমাদেরও জাতি গঠনের কাজ সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। আর সে নির্দেশনা হলো ’ইকরা’ তথা ’পড়’। “ইকরা” একটি প্রতিকী শব্দ। পড়া বা অধ্যয়ন যেহেতু জ্ঞানার্জনের চাবি, পবিত্র কোর’আনের প্রথম শব্দ রূপে এ শব্দটি তাই বুঝিয়েছে জ্ঞানার্জনের অপরিসীম গুরুত্বের কথা। জ্ঞান দেয় মনের আলো। মনের সে আলো দেয় নানা পথের ভিড়ে সত্য পথটি চিনে নেয়ার সামর্থ্য। মানুষ তখন পায় হিদায়াত। অন্ধকার আচ্ছন্ন করে রাতের পৃথিবীকে, অজ্ঞতাও তেমনি আচ্ছন্ন করে মনের ভুবনকে। অজ্ঞতা তখন অসম্ভব করে সত্য পথটি চেনা এবং সে পথে পথচলা। তখন জীবনে আসে ভয়ানক বিচ্যুতি। অন্ধকার শিকারের সুযোগ করে দেয় হিংস্র পশুদের, মনের অন্ধকার তেমনি সুযোগ করে দেয় মনুষ্যরূপী শয়তানদের।

শিকারী পশুর ন্যায় শয়তানেরাও এমন একটি অন্ধকার অবস্থার অপেক্ষায় থাকে। সেরূপ একটি অবস্থা সৃষ্টির জন্যই তারা কোর’আনী জ্ঞানের পরমতম শত্রু। শিকার ধরার কাজে তারা ওঁত পেতে থাকে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ন্যায় জীবনের প্রতিটির ক্ষেত্র জুড়ে। শয়তানের ফাঁদগুলো চিনে জীবন বাঁচানোর জন্য চাই জ্ঞান; এবং কোর’আনী জ্ঞান চাই ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য, শিষ্ঠ-অশিষ্ঠের পার্থক্য বুঝবার জন্যও। পবিত্র কোর’আনের অপর নাম ফুরকান; ফুরকান হলো সেই মানদন্ড যা দেয় ন্যায় ও অন্যায় এবং সত্য ও অসত্যের মাঝে বাছবিচারের সামর্থ্য। ফলে যার মধ্যে পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান নাই, তার কাছে অন্যায়ও ন্যায় এবং অসত্যও সত্য মনে হয়। জাহান্নামের পথও তখন সঠিক মনে হয়। মনের অন্ধকার নিয় বাঁচার এটিই তো ভয়াবহতা। মহান আল্লাহতয়ালা ঈমানদারদের রক্ষা করেন সে বিপদ থেকে; তিনি দেখান আলোর পথ। পবিত্র কোর’আনে পাকে সুরা বাকারায় বলা হয়েছে, ‘‘আল্লাহু ওয়ালী উল্লাযীনা আ’মানু ইয়ুখরিজুহুম মিনায যুলুমাতি ইলান্নূর।’’ অর্থ: ‘‘আল্লাহপাক ঈমানদারের বন্ধু। তিনি তাকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে আসেন।’’ যে আলোর কথা এখানে বলা হয়েছে সেটি সেই মনের আলো‌ তথা জ্ঞান। এ জ্ঞান থেকেই জুটে হেদায়াত বা সত্য পথপ্রাপ্তী। মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান আনার প্রতিদানে এটিই হলো বান্দাহর প্রতি মহান আল্লাহর সর্বোত্তম পুরস্কার। ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি বা চেহারা-সুরত নয়। অপরদিকে ঈমানশূণ্যদের বন্ধু হলো শয়তান। শয়তান তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়। সে পথে সে জাহান্নামে নেয়। ফলে অজ্ঞতা তাই শয়তানের বড় হাতিয়ার। ফলে যেখানে জাহিলিয়াত বা অজ্ঞতা বেড়েছে সেখানেই বেড়েছে ইসলামবিরোধী শয়তানদের আধিপত্য। এই অজ্ঞতার পথ ধরেই মুসলিম বিশ্ব জুড়ে এসেছে আল্লাহর দ্বীনের পরাজয়; এসেছে শরিয়তের বিলুপ্তি। এসেছে শত্রু শক্তির বিজয়।

পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানে জ্ঞানবান হওয়াই হলো মহান আল্লাহতায়ালার নিয়ামত প্রাপ্তির সবচেয়ে বড় আলামত। এবং অজ্ঞতা হলো অভিশপ্ত জীবনের আলামত। নামে মুসলিম হলেও দূর্বৃত্তময় জীবন দেখে তাই নিশ্চিত বলা যায়, সত্যিকার ঈমান ও আল্লাহর নেয়ামতের কোনটিই এমন ব্যক্তির জুটেনি। আজকের মুসলিমদের সেটিই প্রকৃত চিত্র। অথচ আল্লাহর সে নিয়ামতের কারণেই অন্যায়, অসত্য ও অসুন্দরকে মরুর নিরক্ষর মুসলিমরা আজ থেকে ১৪ শত বছর পূর্বে সনাক্ত করতে পেরেছিলেন। ফলে শয়তানের বিছানো ফাঁদ থেকে নিজেদের বাঁচাতে পেরেছিলেন। সে দুর্বৃত্তি থেকে বাঁচাটিই ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা। অথচ আজ সে সফলতা মুসলিম নামধারি পন্ডিতজনদের জুটছে না। জুটছে না পাশ্চাত্যের এমনকি নবেল-বিজয়ী জ্ঞানীদেরও। ফলে মুসলিম নামধারী শিক্ষিতরা বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশকে দূর্নীতিতে যেমন বিশ্বের শীর্ষে নিয়ে গেছে, তেমনি পাশ্চাত্যের শিক্ষিতরাও ব্যভিচার, ফ্রি-সেক্স, হোমোসেক্সুয়ালিটি, জুয়া ও মদপানের মত আদিম পাপাচারকেও সভ্য আচার রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কোর’আনের জ্ঞানার্জন এতোই জরুরি যে, এ ছাড়া ব্যক্তির জীবনে অন্য ফরজগুলোও যথাযত পালিত হয় না। ইসলাম খৃষ্টান ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের ন্যায় নয় যে গীর্জার যাযক বা মন্দিরের ঠাকুরকে দিয়ে ইবাদত-বন্দেগী করিয়ে নেওয়া যাবে। ইবাদতের দায়িত্ব ব্যক্তির নিজের, কাউকে দিয়ে এ দায়িত্ব পালন হওয়ার নয়। তাই ইসলামের খলিফাকেও প্রজার ন্যায় একইভাবে নামায, রোযা ও অন্য ইবাদত করতে হয়েছে। আর অজ্ঞতা নিয়ে ইবাদত হয় না, ইবাদতের সামর্থ্য অর্জনে জ্ঞানার্জন তাই অপরিহার্য। জ্ঞানার্জন এজন্যই ইসলামে বাধ্যতামূলক। জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য শুধু পড়া, লেখা বা হিসাব নিকাশের সামর্থ্য বৃদ্ধি নয়; বরং সেটি হলো মনের অন্ধকার দূর করা। ব্যক্তির দেখবার ও ভাববার সামর্থ্যে সমৃদ্ধি আনা। মনের অন্ধকার নিয়ে মহান আল্লাহতায়ার বিশাল বিশাল কুদরতকে দেখা যায় না, দেখা যায় না তাঁর মহান সৃষ্টি-রহস্যকেও। জাহেল ব্যক্তি এজন্যই আল্লাহতায়ালার অসীম সৃষ্টি জগতের মাঝে বসেও তাঁর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে ইসলাম মানুষের মনের এ অন্ধকার দূর করতে চায়। তাই জ্ঞানার্জন ইসলামে নিজেই কোন লক্ষ্য নয়, বরং এটি লক্ষ্যে পৌঁছবার মাধ্যম মাত্র। আর সে লক্ষ্যটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন। আর যে ব্যক্তি তাঁকে সন্তুষ্ট করে, সেই তো জান্নাত পায়। এজন্য এটি মু’মিনের জীবন লক্ষ্য। চালক যেমন তার গাড়ীকে চালনার পূর্বে গন্তব্যের লক্ষ্য ও সে লক্ষ্যে পৌঁছবার রোড-ম্যাপকে জেনে নেয়, তেমনি একজন মুসলিমকেও জান্নাতে পৌঁছবার সঠিক রোড-ম্যাপকে জানতে চায়। আর সে রোড-ম্যাপের সঠিক জ্ঞানলাভই মুসলিমের জ্ঞানার্জনের মূল উদ্দেশ্য। রোড-ম্যাপের এ প্রাথমিক জ্ঞানলাভটুকু সঠিক না হলে জীবনে বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি আসবে এবং পরকালে জাহান্নামে নিবে -সেটিই স্বাভাবিক। বিজ্ঞানের বৈপ্লবিক অগ্রগতির পরও অসংখ্য মানব যে আজ সীমাহীন বিভ্রান্তির শিকার তার মূল কারণ তো কোর’আনী রোডম্যাপ নিয়ে অজ্ঞতা।

 

জ্ঞানের ইসলামী সংজ্ঞা

ইসলামে জ্ঞানের নিজস্ব সংজ্ঞা রয়েছে। জ্ঞানের অর্থ এই নয়, তাতে শুধু উপার্জনের সামর্থ্য বাড়বে বা কলাকৌশলে দক্ষতা দিবে। জ্ঞানের মোদ্দা কথা হলো, তাতে ভয় সৃষ্টি হয় আল্লাহতায়ালার। সাহায্য করে সত্য ও মিথ্যাকে চিনতে। এবং চেনায় জান্নাতের ও জাহান্নামের পথ। যে জ্ঞান ব্যক্তির মনে আল্লাহর ভয় সৃষ্টিতে ব্যর্থ -সে জ্ঞান জ্ঞানই নয়। এটি কোন কারিগরী দক্ষতা বা ট্রেড স্কিল হতে পারে তবে -সেটি যথার্থ জ্ঞান বা ইলম নয়। অনেক পশুপাখি বা জীবজন্তুরও বহু দক্ষতা থাকে যা মানুষেরও নেই। কুকুর যেভাবে লুকানো মাদক দ্রব্য বা অপরাধীকে সনাক্ত করে তা মানুষ বা মানুষের তৈরী আধুনিক যন্ত্রের নেই। কিন্তু এর জন্য কুকুরকে জ্ঞানী বলা হয় না। আল্লাহতায়ালা কোর’আন মজিদে বলেছেন, একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে। এ থেকে এটিই বুঝা যায় আল্লাহপাক জ্ঞান বলতে কি বুঝাতে চান। যার মধ্যে আল্লাহতায়ালার ভয় নেই তার মধ্যে ইলমও নেই। আল্লাহপাক কোরআন মজীদে আরো বলেছেন, “নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টি ও রাত-দিনের ঘুর্ণায়নের মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে আয়াত তথা নিদর্শন।” অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার বিশাল গ্রন্থ হলো এ বিশ্ব চরাচর; এ গ্রন্থের প্রতিটি ছত্রে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য আয়াত বা নিদর্শন। এবং জ্ঞানী একমাত্র তারাই যারা স্রষ্টার সে গ্রন্থ পাঠের সামর্থ্য রাখে। নানা ভাষার গ্রন্থ পাঠের যাদের সামর্থ্য রয়েছে অথচ আল্লাহতায়ালার এ বিশাল গ্রন্থ পাঠের যোগত্য নেই -তাদেরকে আর যাই হোক জ্ঞানী বলা যায় না। ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞানী তিনিই যার রয়েছে বিশ্ব-চরাচরে ছড়ানো ছিটানো আল্লাহর নিদর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়ার সামর্থ্য। এ জ্ঞানটুকু না থাকলে সিরাতুল মোস্তাকীমে চলতে মহান আল্লাহতায়ালার আয়াতগুলো বিশ্বচরাচরের নানা প্রান্ত থেকে যে সিগনাল দেয় -তা বুঝতে সে ব্যর্থ হয়। নবীজীর (সা:) আমলে মুসলিমদের মাঝে স্বাক্ষরতার হার তেমন ছিল না। তবে আল্লাহতায়ালার জ্ঞান-সমৃদ্ধ গ্রন্থ থেকে পাঠ লাভের সামর্থ্যটি আজকের শিক্ষিতদের চেয়ে বেশী ছিল। ফলে সেদিন যেরূপ বিপুল সংখ্যক উঁচু মাপের জ্ঞানীর সৃষ্টি হয়েছিল -তা মানব ইতিহাসের কোন কালেই হয়নি।

আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “জ্ঞানী আর অজ্ঞ ব্যক্তি কখনই এক নয়।” -(সুরা যুমার, আয়াত ৯)। অন্যত্র বলেছেন, “আল্লাহতায়ালা যে ব্যক্তির কল্যান চান তার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দেন।” -(সুরা মুযাদিলা, আয়াত ১১)। অর্থাৎ মানুষের জন্য জ্ঞানের চেয়ে কল্যানকর কিছু নেই। তাই নিছক সম্পদের অন্বেষণে জীবনের সামর্থ্য বিনিয়োগে মানবতা নেই, এটি পশু থেকেও নীচুতে পৌছে দেয়। পশুর পেট পূর্ণ হলে সে আর খাদ্য তালাশ করে না। কিন্তু মানুষ সম্পদের পাহাড়ে বসেও আরো চায়। জ্ঞানার্জন এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, মহান আল্লাহতায়ালা তার অনুগত বান্দাদেরকে তাঁর কাছে দোওয়া চাওয়ার ভাষাও শিখিয়ে দিয়েছেন। যেমন: “হে রব, আমার জ্ঞানে বৃদ্ধি করে দাও।” -(সুরা ত্বা হা, আয়াত ১১৪)। আল্লাহতায়ালার শেখানো দোয়ার ভাষা থেকে এটিও সুস্পষ্ঠ যে, জ্ঞান থাকাটাই বড় কথা নয়, উত্তরোত্তর সে জ্ঞানের বৃদ্ধি হওয়া চাই। একটি জাতিকে বিজয়ী জাতি হিসাবে টিকে থাকার জন্য এমন অবিরাম শিক্ষা শুধু জরুরি নয়, অপরিহার্যও। জ্ঞানের বৃদ্ধি যে দিন থেমে যায়, ব্যক্তির মন ও মননের পচনও সেদিন থেকে শুরু হয়। এটি অনেকটা দেহের খাদ্য গ্রহণের মত। খাদ্য গ্রহণ বন্ধ হলে ব্যক্তির জীবনে যেটি অনিবার্যরূপে আবির্ভূত হয় সেটি মৃত্যু। নবীপাক (সা:) এই জন্যই বলেছেন, আফসোস সে ব্যক্তির জন্য যার জীবনে একটি দিন অতিবাহিত হলো অথচ তার ইলমে বৃদ্ধিই ঘটলো না। বলেছেন, ”উতলুবুল ইলম মিনাল মাহদে ইলাল লাহাদ।” অর্থ: “কবর থেকে দোলনা পর্যন্ত জ্ঞান লাভ কর।” অর্থাৎ জ্ঞানার্জন  শিশুর জন্য যেরূপ জরুরি তেমন জরুরি হলো বৃদ্ধের জন্যও। অর্থাৎ দেহে যতদিন প্রাণ আছে, খাদ্য-পানীয় সংগ্রহের যতদিন সামর্থ আছে, জ্ঞানার্জনও ততদিন চালিয়ে যেতে হবে। এ হাদীসটি নিছিক নসিহত নয়; এসেছে নির্দেশের ভাষায়। কথা হলো, নবীজীর (সা:) উম্মতরূপে পরিচয় দিতে যে মুসলিমগণ এতো উচ্চকন্ঠ তাদের মধ্যে এ নির্দেশ পালনে আগ্রহ কতটুকু? আর থাকলে জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চাৎপদতার রেকর্ড গড়ে কি করে? হযরত আলী (রা:) বলেছেন, “সম্পদ মানুষকে পাহারাদার বানায় কিন্তু জ্ঞান মানুষকে পাহারা দেয়।” ফলে বিচ্যুতি, বিপদ তথা জাহান্নামের রাস্তা থেকে বাঁচানোর কাজে জ্ঞানহীদের জীবনে কোন পাহারাদার থাকে না। ফলে শয়তানের ছোবলে পড়ে এবং বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি তাদের জীবনে নিত্য সহচর হয়। প্রকৃত মুসলিমের শিক্ষা তাই স্বল্পকালীন নয়, বরং আমৃত্যু। যতদিন পানাহার চলে, ততদিন জ্ঞানার্জনও চলে।

হযরত আলী (রা:) আরো বলেছেন, সম্পদ  চুরি হয়, কিন্তু জ্ঞান চুরি হয় না। কোন ডাকাত সেটি ছিনিয়ে নিতে পারে না। জ্ঞান কাউকে দিলে কমে না, বরং বৃদ্ধি পায়। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা আজ থেকে ১৪শত বছর পূর্বে বিদ্যাশিক্ষাকে সার্বজনীন ও ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক করেছিল। ফলে মাত্র কয়েক শতাব্দিতে তারা জ্ঞানবিজ্ঞানে অভূতপূর্ব বিপ্লব আনে। যে আরবী ভাষায় কোর’আনের পূর্বে কোন গ্রন্থ ছিল না সে আরবী ভাষায় জ্ঞানের এক এক বিশাল ভান্ডার গড়ে তোলে।। রাসূলে পাক (সা:) বলেছেন, “একমাত্র দুই ব্যক্তিকে নিয়ে হিংসা করা যায়: এর মধ্যে এক ব্যক্তি হলেন তিনি যাকে আল্লাহতায়ালা জ্ঞানদান করেছেন এবং তিনি জ্ঞানের আলোকে জীবন পরিচালনা করেন এবং তা অন্যদের শেখান।” -(সহিহ বুখারী ও মুসলীম)। হাদীস পাাকে আরো বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে পথে বের হন, আল্লাহতায়ালা তাঁর জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” -(সহীহ মুসলিম)।  তিরমিযী শরিফে বলা হয়েছে, নবীপাক (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনে ঘর থেকে বের হয় সে ব্যক্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অবস্থান করে। আরো বলা হয়েছে, “জ্ঞানীর ঘুম একজন অজ্ঞ এবাদতকারীর নফল নামাযের চেয়ে উত্তম। যিনি ইলম শিক্ষা দেন তার জন্য আল্লাহতায়ালা রহমত নাযিল করেন। ফেরেশতাকুল, জমিন ও আসমানের বাসিন্দা, এমনকি পিপিলিকা এবং মাছও তাদের জন্য দোয়া করতে থাকে।” -(তিরমিযী শরিফ)। কোন নফল ইবাদতকারীর জন্য সেটি ঘটে না।

 

বিজয়ের একমাত্র পথ

ইসলামের গৌরবকালে মুসলিমদের বিস্ময়কর সফলতার মূল কারণ, এই কোরআনী জ্ঞান। বিশ্বের কোন জ্ঞানই তার সমকক্ষ হওয়া দুরে থাক, তুলনীয়ও হতে পারে না। মানুষের সামর্থ্য অতি সামান্য। যতবড় জ্ঞানী বা বিজ্ঞানীই হোক না কেন সে নিজেই জানে না আগামী কাল বাঁচবে কি বাঁচবে না। তার দৃষ্টি পাতলা কাগজের দেয়ালও ভেদ করতে পারে না। অপর দিকে কোর’আন এসেছে সেই মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা থেকে যার কাছে আসমান জমিনের দৃশ্য অদৃশ্য কোন কিছুই অজানা নয়। সেই মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা মানুষের বোধশক্তির উপযোগী করে পাঠিয়েছেন পবিত্র আল-কোর’আন। এটি মানুষের সামর্থ্য বাড়াতে পারে বিস্ময়কর ভাবে। মগজকে যদি হার্ডডিস্ক বলা যায় তবে কোর’আনকে হলো সেটির জন্য সর্বোত্তম সফটওয়ার। কম্পিউটার শক্তিশালী হলেও সফটওয়ার ছাড়া কিছু করার সাধ্য নেই। অথচ সফটওয়ারের কারণে যাদুকেও হার মানায়। অবশ্য এজন্য সফটওয়ারকেও হার্ডডিস্কের উপযোগী হতে হয়। এজন্যই সফটওয়ারের আবিস্কারককে হার্ডডিস্কে বিশেষজ্ঞ হতে হয়। আর মহান স্রষ্টা আাল্লাহতায়ালার চেয়ে মানুষের মগজের সে খবর আর কে বেশী রাখেন? ফলে মগজকে সৃষ্টিশীল করার কাজে পবিত্র কোর’আনের চেয়ে নির্ভূল সফটওয়ার আর কি হতে পারে? মুসলিমগণ অতি অল্প সময়ে উন্নয়নের যে রেকর্ড গড়েছিল সেটিতো এ সফটওয়ার সঠিক প্রয়োগের কারণেই। অথচ নিজ ক্ষুদ্রতা নিয়ে মানুষ যখনই কিছু করতে ­­চেষ্টা করেছে তখন শুধূ ব্যর্থতাই বাড়িয়েছে। এমন কি সত্য-অসত্য, ন্যায়-অন্যায় ও শ্লিল-অশ্লিলের তারতম্যও নির্ণয় করতে পারেনি। বুঝতে পারেনি উলঙ্গতা, ফ্রিসেক্স, পর্ণোগ্রাফি, হোমোসেক্সৃয়ালিটি, মদ্যপান মানব জাতির জন্য কত বীভৎস ও ক্ষতিকর। এরূপ অজ্ঞতার প্রমাণ মানবসৃষ্ট নানা মতবাদের মাঝে। কম্যুনিজম, জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ ও ফ্যাসীবাদের মত ভ্রান্ত মতবাদের পিছে প্রাণনাশ হয়েছে কোটি কোটি মানুষের। মানব জাতির এ এক করুণ ব্যর্থতা। খরচের অংক তারা বিস্ময়কর ভাবে বাড়িয়েছে। একমাত্র দুটি বিশ্বযুদ্ধেই সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করেছে।

ফলে বিজ্ঞানের বিশাল অগ্রগতিতেও বিপদমুক্তি ঘটেনি মানুষের। বরং এককালে যে হিংস্রতা নিয়ে বনের হিংস্র পশুগুলো হামলা করতো তার চেয়েও অধিক হিংস্রতা নিয়ে হামলা করছে মনুষ্যরূপী পশুরা। ফিলিস্তিন, বসনিয়া, চেচনিয়া, কসভো, কাশ্মির, আফগানিস্তান, ইরাক, মায়ানমার, চীন এবং সিরিয়ায় মানুষরূপী যে দানবেরা হিংস্রতা দেখাচ্ছে বা দেখিয়েছে তা কি পশুর চেয়ে কম হিংস্র? আর এ ব্যর্থতার মূল কারণ, শান্তির লক্ষ্যে মানুষের মগজের উপযোগী যে সফটওয়ার আল্লাহতায়ালা দিয়েছিলেন মানুষ সেটিকে কাজে লাগায়নি। ফলে বেড়েছে নানারূপ বিপর্যয় ও অশান্তি। অথচ আরবের মরুবাসী জনগণ এটির প্রয়োগ করে শান্তি, সমৃদ্ধি ও মানবতার উৎকর্ষে বিস্ময়কর রেকর্ড স্থাপন করেছিলেন। বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে শিক্ষার নামে যা হয়েছে তাতে কুশিক্ষাই বেড়েছে। ফলে দেশে স্কুল বেড়েছে, বিপুল সংখ্যায় বেড়েছে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ও, কিন্তু আলোকিত মানুষ বাড়েনি। বরং বেড়েছে দুর্বৃত্তদের সংখ্যা; এবং দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্ব রেকর্ড করেছে। অথচ ইসলাম জ্ঞানদান পদ্ধতিকে পরিপূর্ণ মানুষ তৈরীর হাতিয়ার বানায়। ইসলামী পরিভাষায় এরূপ পরিপূর্ণ মানুষই হলো ইনসানে কামেল। সে ইনসানে কামেল যেমন খানকার দরবেশ নন, তেমনি পীর সাহেবও নন।

 

 ফিরতে হবে কোর’আনের প্রেসক্রিপশনে

একজন বিজ্ঞানীর জ্ঞান একটি বিশেষ বিষয়ে বিস্ময়কর হলেও ধর্ম বিষয়ে তার অজ্ঞতা হাজার বছর পূর্বের আদিম মানুষের চেয়ে আদৌ কম নয়। অপরদিকে মাদ্রাসার ছাত্র বেড়ে উঠছে বিজ্ঞানের বহু মৌল বিষয়ের উপর সীমাহীন অজ্ঞতা নিয়ে। জ্ঞানার্জনের এ পদ্ধতি মানুষকে অতি অপূর্ণাঙ্গ করে গড়ে তুলছে। কিন্তু ইসলাম মানুষকে চায় পূর্ণাঙ্গ তথা কামেল করতে। আজকের আলেমদের ন্যায় পূর্বকালের আলেমগণ এতটা অপূর্ণাঙ্গ ছিলেন না। তারা যেমন শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন, তেমনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, জেনারেল এবং রাজনীতিবিদ। তাদের জীবনে সমন্বয় ঘটেছিল বহুমুখী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার। মসজিদের নামাযে যেমন আওয়াল-ওয়াক্তে হাজির হতেন, যুদ্ধের ময়দানেও তেমনি ফ্রন্ট লাইনে থাকতেন। অথচ আজকের আলেমদের ক’জন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আছেন, এবং তাদের বিরুদ্ধে একটি ঢিল ছুঁড়েছেন?  বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে ইসলামকে বিজয়ী করতে ক’জন ভূমিকা রাখছেন? তাদের এ ব্যর্থতার কারণ ইলমের ক্ষেত্রে তাদের অপূর্ণাঙ্গতা। তাদের ইলম তাদের জীবনে ইঞ্জিনের কাজ করেনি ইসলামী পরিভাষায় এমন অপূর্ণাঙ্গ মানুষদের বলা হয় “ইনসানে নাকেছ”। অথচ এ অপূর্ণাঙ্গতা দূরীকরণে নবীজী (সা:) কোরআন-হাদিসের বাইরেও জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত করেছেন। এমনকি নিজেও শিখেছেন অন্যদের থেকে। খন্দকের যুদ্ধে পরীখা নির্মাণের কৌশল শিখেছিলেন ইরানী সাহাবা সালমান ফারসী থেকে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা সেকালে গ্রীক ভাষা শিখে এরিস্টোটল, প্লেটোসহ বহু গ্রীক বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের গ্রন্থকে তাঁরা আরবী ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। অনেকে ভারতের ভাষা শিখে হিন্দু পন্ডিতদের বহু বই-পুস্তক তরজমা করেছিলেন। অথচ আজ তেমনটি হচ্ছে না। কারণ, যে জ্ঞান জাতিকে সামনে টেনে নেয় সেটির চর্চাই লোপ পেয়েছে। ক’জন আলেম আজ সেরূপ জ্ঞানার্জনে সচেষ্ট?

জ্ঞানার্জনের একটি মাত্র মাধ্যম হলো বই পড়ে শেখা। এছাড়া আরো বহু মাধ্যম রয়েছে। যেমন দেখে শেখা, শুনে শেখা এবং নিজ হাতে কাজ করতে করতে শেখা। তবে জ্ঞানার্জনের অতি কার্যকর মাধ্যম হলো ছাত্রদের ভাবতে বা চিন্তায় অভ্যস্থ করা। চিন্তার সামর্থ্য জ্ঞানের বৃদ্ধিতে জেনারেটরের কাজ করে। পাঠ্যপুস্তক বা শ্রেণীকক্ষের যে বক্তৃতা ছাত্রকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে না -তা কি জ্ঞানার্জনে সহায়ক? এতে সার্টিফিকেট লাভ হলেও তাতে জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়ে না। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজই হলো ছাত্রের মনে জ্ঞানের নেশা সহজতর ধরিয়ে দেওয়া যা তাকে আজীবন জ্ঞানপিপাসু করবে। কিন্তু মুসলিম দেশের আজকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা পারিনি। ফলে বাড়েনি জ্ঞানের প্রতি সত্যিকার আগ্রহ। এমন জ্ঞানবিমুখী চেতনাই জাতির পতন ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট।

উড়তে হলে পাখীর দুটো ডানাই যেমন সবল ও সুস্থ থাকা অপরিহার্য, তেমনি সুস্থ ও উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণে অপরিহার্য হলো কোর’আন ও বিজ্ঞান -এ দুটো শাখাতেই ভারসাম্যমূলক অগ্রগতি। কিন্তু মুসলিম দেশগুলোতে তা হয়নি। ধর্মবিবর্জিত যে শিক্ষার কারণে পাশ্চাত্য-সমাজ আজ বিপর্যয়ের মুখে, সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় মুসলিমগণও সেদিকেই ধাবিত হচ্ছি। ফলে বিপর্যয় মুসলিমদেরও ধাওয়া করছে। ফলে বাড়ছে পতনের পথে গতি। ধ্বংসমুখী এই মুসলিম উম্মাহর উদ্ধারে ও উত্থানে সামনে একটিই মাত্র পথ। আর সেটি হলো, ফিরে যেতে হবে ১৪ শত বছর পূর্বের সেই কোর’আনী প্রেসক্রিপশনে। এটা জরুরি শুধু মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্যই নয়, ধ্বংসমুখী পতন-যাত্রা থেকে বাঁচতেও। বিজয়ের পথে এটিই একমাত্র পরীক্ষিত পথ। ১ম সংস্করণ ২৭/০৫/২০০৭; ২য় সংস্করণ ১৭/০৩/২০২১।




বিবিধ ভাবনা (৩৬)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. বাঙালীর চরিত্র

নিজের সুস্বাস্থ্যের কথা বাইরে প্রচার করায় স্বাস্থ্য বাড়ে না। বরং ভাবতে হয়, অন্যকে বলতে হয় এবং ত্বরিৎ ডাক্তারের কাছে যেতে হয় -যদি রোগ দেখা দেয়। রোগকে অবহেলা করলে বা গোপন রাখলে ভয়ানক ক্ষতি হয়। তাতে যেমন চিকিৎসা হয় না, তেমনি রোগ বাড়ে ও মৃত্যু ঘটায়। অনেক সময় রোগ গোপন করার পিছনে থাকে নিজেকে সুস্থ্য রূপে জাহির করে গর্ব করার বাতিক। দেহকে সুস্থ্য রাখার জন্য জরুরি হলো শরীরের দিকে নিয়মিত নজর রাখা। অনিয়ম দেখা দিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। 

বিষয়টি তেমনি একটি জাতির ক্ষেত্রেও। মানব দেহের ন্যায় জাতির দেহেও অনেক রোগ-ব্যাধী দেখা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে রোগ-ব্যাধী নিয়ে তল্লাশীর কাজটিই হয়নি। বরং জাতীয় জীবনের রোগগুলিকে গোপন রাখার কাজটিই বেশী বেশী হয়েছে। দেশটিতে এমন লোকের অভাব নাই -যারা মনে করে বাঙালীরাই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। অন্যরা ভাষার জন্য প্রাণ দেয়না, বাঙালীরা দেয় –তা নিয়ে কত গর্ব! অনেকে বলে একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা শ্রেষ্ঠ বাঙালী। এবং অনেকে আবার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলে শেখ মুজিবকে। কিন্তু তাদের অপরাধগুলো কি কখনো খুঁতিয়ে দেখা হয়েছে? তাদের হাতে কত নিরপরাধ মানুষ খুন হয়েছে, কত মিথ্যাচার হয়েছে এবং কত দুর্নীতিত হয়েছে -সে হিসাব কি কেউ নিয়েছে? ইতিহাসের বইয়ে ফুলিয়ে ফাঁফিয়ে শুধু বিজয় গাঁথা লিখলে চলে না, ভূলভ্রান্তি ও ভয়ানক অপরাধের কথাগুলোও লিখতে হয়। নইলে ইতিহাস থেকে শেখার তেমন কিছু থাকে না। ফলে জাতীয় জীবনে পরিশুদ্ধিও আসে না।

বাংলাদেশীদের জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে ১৯৭১’য়ে। দেশে যখন পুলিশ, আদালত ও প্রশাসন কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়, তখন জনগণের আসল রূপটি দেখা যায়। বাঘও খাঁচার মধ্যে শান্ত দেখায়, কিন্তু তার হিংস্র রূপটি দেখা যায় খাঁচা থেকে বের করলে। বাঙালীর আসল চরিত্রটি দেখা গিয়েছিল একাত্তরে –যখন তাদের অপরাধ কর্মে বাধা দেয়ার কেউ ছিল না। তাই যারা বাঙালীর আসল চরিত্র জানতে চায় -তাদের জন্য একাত্তরের ইতিহাস অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে সে ইতিহাস নিয়ে কোন গবেষণা হয়নি। সে কাজে কারো আগ্রহ আছে -সেটিও নজরে পড়ে না। বিষয়টি অবিকল ঘরের আবর্জনাকে কার্পেটের নীচে চাপা দেয়ার মত। বরং একাত্তরের সকল দোষ চাপানো হয়েছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও অবাঙালীদের উপর।

১৯৭১’য়ে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশে অপরাধ রুখার ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষার কেউ ছিল না। পুলিশ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা তখন ভেঙ্গে পড়ে। তারা তখন দেশ জুড়ে অসহযোগে। দেশ তখন অপরাধীদের জন্য স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। সে সুযোগ থেকে ফায়দা নিতে দেখতে যারা শিক্ষিত ও ভদ্র দেখায় তারাও চোরডাকাত, খুনি ও ধর্ষকে পরিণত হয়। সে সময় সবচেয়ে অসহায় ও প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়ে বিহারীরা। কেউ তাদের হত্যা করলে, ঘরবাড়ী ও দোকান লুটপাঠ করলে এবং তাদের মহিলাদের ধর্ষণ করলে –কেউ ছিল না রক্ষা দেয়ার। একাত্তরে বহু বাঙালী নিহত হয়েছে, অনেক বাঙালীর ঘরবাড়ী জ্বালানো হয়েছে এবং অনেক বাঙালী মহিলা ধর্ষিতাও হয়েছে। কিন্তু বিহারীগণ যেরূপ খুন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে তার তূলনা হয়না। একাত্তরে সবচেয়ে জঘন্য গণহত্যার শিকার হয়েছে তারাই। অথচ এখানে কি মিথ্যাচার কম হয়েছে? একাত্তরের ইতিহাস লেখা হয়েছে সে বীভৎসতার বিবরণ না দিয়েই।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ক্ষমতায় এসেছেন শেখ মুজিব। কিন্তু বিহারীদের ঘরবাড়ী ও দোকান-পাটের উপর যে ডাকাতী হলো -তার কোন বিচার তিনি করেননি। ডাকাতদের শাস্তি না দিয়ে ডাকাতী করা ঘরবাড়ীর মালিকানা দেয়া হয়েছে ডাকাতদের। মুজিবের পর ক্ষমতায় এসেছেন জেনারেল জিয়া। তিনিও অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে বরং ডাকাতদের হাতে বিহারীদের ঘরবাড়ীর মালিকানা দলিল তুলে দিয়েছেন। কোন সভ্য দেশে কি চোরডাকাতদের এভাবে পুরস্কৃত করা হয়? যার মধ্যে সামা্ন্য ঈমান আছে সে কি এমন কাজ করতে পারে? অথচ বাংলাদেশে সেটিই পরিণত হয়েছে সংস্কৃতিতে। ফলে জনগণ নিজেই আজ গুম, খুন ও ডাকাতির শিকার।    

ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতার বিবরণ দেয়া যাক। ১৯৭১’য়ের মার্চের প্রথম তারিখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের (পার্লামেন্টের) আসন্ন অধিবেশন মুলতবীর করার ঘোষণা দেন। ঐদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে হচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের সাথে পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচ। আমি তখন স্টেডিয়ামের পশ্চিম দিকের গ্যালারীতে বসে খেলা দেখছিলাম। বিকেল তিনটার দিকে স্টেডিয়ামের পূর্বপাশের প্যান্ডেল কিছু যুবক আগুণ ধরিয়ে দেয়। খেলাওয়ারগণ দৌড়ে মাঠ ছাড়ে; আমরা দ্রুত বেড়িয়ে গেলাম। তখন জিন্নাহ এভেনিউ (আজকের মুজিব এভেনিউ)তে গ্যানীস নামে অবাঙালীদের একটি বড় দোকান ছিল। দেখলাম, বিপুল সংখ্যক মানুষ লুটপাটে লেগে গেছে। এদের কাউকে দেখে বস্তির লোক মনে হচ্ছিল না, প্যান্টসার্ট বড়া কেতুদুরস্তই দেখাচ্ছিল। শহরের নানা স্থানে সেদিন অবাঙালীদের দোকানগুলো বেছে বেছে লুট করে হয়েছে। তখন ঢাকার নবাবপুর ও ইসালামপুর রোডে বড় বড় দোকান ছিল অবাঙালীদের। সেগুলোও লুট হয়েছে। রাস্তায় স্লোগান দেয়া হচ্ছে “একটা একটা মাওরা (বিহারী/অবাঙালী) ধরো, সকাল বিকাল নাশতা করো।” সে এক সহিংস অবস্থা। সে সময়ে অনেকে ঢাকা ছেড়ে বিমানে পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ী দেয়ার চেষ্টা করেছে, এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে তাদের পকেট হাতড়িয়ে লুট করা হয়েছে।

এতো গেলে রাজপথের কথা। দেশে যখন এরকম অবস্থা হয় তখন নেতাদের কিছু দায়দায়িত্ব থাকে। তখনো প্রধান দুই নেতা শেখ মুজিব ও ভাষানীসহ দেশের সকল রাজনৈতিক নেতাগণ মুক্ত। তখনও দৈনিক পত্র-পত্রিকা গুলো নিয়মিত ছাপা হচ্ছে। দেশে বহু বুদ্ধিজীবীও ছিল। তাদের চোখের সামনেই চলছে অবাঙালীদের উপর হিংস্র অপরাধ কর্ম। অথচ লক্ষণীয় বিষয় হলো, সে অপরাধ থামাতে না মুজিব কোন বিবৃতি দিয়েছেন, না ভাষানী। কেউ অসহায় বিহারীদের পাশে দাঁড়ায়নি। যেন তারা কিছুই দেখেননি। এ হলো নেতাদের বিবেকের মান। রাজনীতি যে কত বিবেকহীন মানুষের হাতে জিম্মি ছিল -এ হলো তার নমুনা। এ অপরাধ থামাতে পত্রিকাগুলোও কোন প্রতিবেদন ছাপেনি; কোন উপসম্পাদকীয় লেখেনি। অবাঙালী হওয়াটাই বিহারীদের জন্য যেন অপরাধ; তাদের উপর সকল প্রকার নৃশংসতাই যেন জায়েজ। অথচ তখনও পাকিস্তান আর্মি কোন অপারেশনে যায়নি। বিহারীরা কোথাও বাঙালীদের উপর অত্যাচারে নেমেছে -সেরূপ ঘটনাও তখন ঘটেনি। ২৫মার্চ পর্যন্ত বিহারীদের উপর সব নৃশংসতাই সংঘটিত হয়েছে বিনা উস্কানীতে। 

তূলনামুলক একটি বিবরণ দেয়া যাক। কারণ, তুলনা ছাড়া মানবতায় নীচে নামাটি বুঝা যায় না। চিকিৎসক রূপে ১০ বছর ইরানে থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার। ১৯৮০ সালে যখন ইরান পৌঁছি, দেশটিতে ১৯৭৯ সালে ঘটে যায় বিরাট বিপ্লব। ইরানের বাদশাহ মহম্মদ রেজা শাহ দেশ থেকে পালিয়ে গেলেও তারা হাজার হাজার সমর্থক, তাঁর সমর্থক রাস্তাখিজ পার্টির বহু নেতাকর্মী্‌ তখনোও ইরানে ছিল্। শাহপন্থীদের বহু দোকান-পাট ও বিলাসবহুল ঘরবাড়ীও ছিল। ছিল গোয়েন্দা বাহিনী সাভাক ও সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সদস্য। কিন্তু তাদের কারো বাড়ী লুটপাট হয়েছে, তাতে আগুণ দেয়া হয়েছে বা তাদের ঘরবাড়ী জবর দখল করা হয়েছে –এমনটি ঘটেনি। অথচ তাদের প্রতিরক্ষা দেয়ার জন্য থানায় কোন পুলিশ ছিল না, রাস্তায় সেনাবাহিনীও ছিল না। পুলিশ থানা ছেড়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু জনগণ এরপরও রাস্তায় চুরিডাকাতি ও ঘরবাড়ী দখলে নামেনি। রাস্তায় প্রতিটি দোকানপাট অক্ষত থেকেছে –একমাত্র মদের দোকানগুলি ছাড়া। অথচ একাত্তরে অবাঙালী পরিবারের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও শিশুদের রাস্তায় বসিয়ে তাদের ঘরবাড়ী দখলে নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান ও পরকালের ভয় আছে -সে কি কখনো এমন ডাকাতিতে নামতে পারে?

আজ দেশ আছে। এ দেশে অবাঙালী তেমন নাই। যারা আছে তারা আজ সহায়সম্পদহীন বস্তির বাসিন্দা। কিন্তু দুর্বৃত্তরা বেড়েছে বিপুল হারে। এসব দুর্বৃত্তদের চোখে বাঙালীর অর্থ ও বাঙালী নারী কি অবাঙালীর অর্থ ও অবাঙালী নারীর চেয়ে চেয়ে কম লোভনীয়? যে ডাকাতেরা ডাকাতি করেছে অবাঙালীদের উপর এবং ধর্ষণ করেছে অবাঙালী নারীদের -তারাই এখন ডাকাতী ও ধর্ষণে নেমেছে বাঙালীদের উপর। কারণ দুর্বৃত্তরা তো দুর্বৃ্ত্তির নেশা ছাড়তে পারে না। তাছাড়া দেশ তে তাদের হাতে অধিকৃত; ফলে তাদের সামর্থ্য বেড়েছে বিপুল ভাবে। পুলিশের কাজ হয়েছে তাদের প্রতিরক্ষা দেয়া। রোগ না সারালে তো রোগ বাড়বেই। তাই দ্রুত বেড়ে চলেছে ডাকাতের সংখ্যা ও ডাকাতদের নৃশংসতার মাত্রা। দেশ জুড়ে আজ গুম, খুন ও ধর্ষণের প্লাবন, ডাকাতি হয়েছে জনগণের ভোট এবং ডাকাতি হয়ে গেছে পুরা দেশ -এসবই হয়েছে বাঙালী ডাকাতদের হাতে। যে কোন সভ্য দেশে এরূপ ভয়ানক অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে সচেতন মানুষেরা ময়দানে নেমে আসে; কিন্তু বাংলাদেশে সে সবের কোন বালাই নাই। একাত্তরের ইতিহাস থেকে জাতি যদি শিক্ষা নিত, তবে দেশ আজ যেখানে পৌঁছেছে সেখানে কি পৌঁছতো? অন্য যে কোন বিজ্ঞানের চেয়ে ইতিহাস বিজ্ঞানের গুরুত্ব তাই অধিক। ইতিহাসের কাজ তো অতীতের ভূলগুলো তুলে ধরা এবং ভবিষ্যতের পথ চলায় সঠিক সিগনাল দেয়া। যারা সে শিক্ষা নেয় না, তাদের পা একই গর্তে বার বার পড়ে। বাকশালী অসভ্যতা থেকে তাই মুক্তি মিলছে না।    

২.ছোট লোক ও বড় লোক

মানুষ কতটা ছোট বা বড় মাপের -সেটি দৈহিক মাপে বুঝা যায় না। সেটি বুঝা যায় তাদের চেতনার মানচিত্র দেখে। ছোট লোকেরা পশুর ন্যায় পেট নিয়ে ভাবে, দেশ নিয়ে ভাবে না। দেশ ডাকাতদের দখলে গেলেও এরা ডাকাত তাড়াতে রাস্তায় নামে না। এরা বরং ডাকাতদের চাটুকরে পরিণত হয়। ডাকাত যতই বড় মাপের হয়, এ চাটুকরগণ ততই বেশী পদলেহন দেয়। এবং সে চিত্রটা দেখা যায় বাংলাদেশে। তাই হাসিনার ন্যায় দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতও দেশের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সেনা অফিসার, পুলিস অফিসার ও মিডিয়া কর্মীদের কাছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রূপে গণ্য হয়।

কোন ভদ্র লোকই চোরডাকাতকে কেউ ভাল মানুষ বলে না। তাদের পক্ষে কোন ভাল মানুষ কখনো সাক্ষীও দেয় না। চোরডাকাতদের পক্ষে সাক্ষী দেয় একমাত্র চোরডাকাতগণ। কিন্ত বাংলাদেশ যারা ভোটডাকাতির মাধ্যমে সমগ্র দেশ ডাকাতী করে নিল -তাদের পক্ষে সাক্ষী দিয়েছে এবং ভোটডাকাতিকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলেছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা, আদালতের বিচারপতি ও সেনাপ্রধান। এ হলো তাদের বিবেকে মান। এমন দেশে সততা ও দেশপ্রেম বাঁচে না। এবং অসম্ভব হয় বিবেকবোধ, গণতন্ত্র এবং মানবিক অধিকার নিয়ে বাঁচা।

৩. ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব

জালেমে বিরুদ্ধে হক কথা বলা উত্তম জিহাদ। -(হাদীস)। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা দেশবাসী, বিশ্ববাসী তথা মানবতার কল্যাণে অর্থদান, শ্রমদান, মেধাদান ও রক্তদানকে ফরজ করেছে। যারা একাজে নিহত হয় তাদেরকে শহীদ বলে। অপরদিকে হারাম করেছে দুর্বৃত্তের সমর্থক ও সাহায্যকারী হওয়াকে। মানব কল্যাণে নিজ সামর্থ্যের এমন বিনিয়োগ হলো পবিত্র জিহাদ। ইসলাম যে শান্তি ও মানব কল্যাণের ধর্ম -সেটি তো এভাবেই প্রমাণিত হয়।  জিহাদ হলো দুর্বৃত্ত শক্তির দখলদারী মুক্ত করে সত্য ও  ন্যায় প্রতিষ্ঠার খোদায়ী প্রজেক্ট। তাই যে দেশে জিহাদ নাই -সেদেশে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা নাই। সেদেশে  চেপে বসে দুর্বৃত্তদের শাসন।

দুর্বৃত্তগণ ইসলামের মিশনকে শুধু নামায,রোযা, হজ্জ ও যাকাতের মধ্যে সীমিত রাখতে চায়। এরা জিহাদকে বলে সন্ত্রাস। অথচ জিহাদ নিষিদ্ধ করার অর্থ হলো, অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় ইসলামের যে পবিত্র এজেন্ডা -সেটিকে পন্ড করে দেয়া। লক্ষ্য এখানে শয়তানী প্রজেক্টকে বিজয়ী করা। 

৪. সন্ত্রাসী সরকার ও জাতিসংঘের দায়ভার   

খবরে প্রকাশ: বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের কাছ সন্ত্রাস দমনে উন্নত প্রযুক্তি সাহায্য চেয়েছে। অথচ দেশে সরকার নিজেই হলো সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী। তাদের সন্ত্রাসের শিকার দেশের জনগণ। মানুষ গুম, খুন, ধর্ষিতা এবং নির্যাতিত হচ্ছে সরকারী সন্ত্রাসীদের হাতে। সে সন্ত্রাসে হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশের পুলিশ, সেনাবাহিনী, আদালত বাহিনী ও সরকারী দলের ক্যাডার বাহিনী। নতুন প্রযুক্তি হাতে পেলে সন্ত্রাসে সরকারের সামর্থ্য বাড়বে; এবং সেটি ব্যবহৃত হবে বিরোধী দল দমনে। জাতিসংঘের উচিত জনগণের পাশে দাঁড়ানো। সামর্থ্য থাকলে তাদের উচিত জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি থেকে প্রটেকশন দেয়া এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। দেশ একমাত্র তখনই সন্ত্রাস মুক্ত হবে।

৫. অনৈক্যের নাশকতা

আল্লাহ মুসলিমদের একতা চান। শয়তান চায় অনৈক্য। মুসলিমগণ শয়তানের অনুসরণ করছে, তাই তারা ৫৭টি দেশে বিভক্ত। শয়তান কাফেরদের একতা চায়। তাই ভারতের ১২০ কোটি হিন্দু একতাবদ্ধ। স্পেনে মুসলিমদের ৭ শত বছরের শাসন বাঁচেনি। কারণ, তারা ছিল নানা দলে বিভক্ত। পুত্র পিতার বিরুদ্ধে এবং ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। অপরদিকে খৃষ্টানগণ ছিল একতবদ্ধ। ফলে মুসলিমদের বিপুল সম্পদ ও অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও নির্মূল হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা ঐক্যকে ফরজ করেছেন এবং বিভক্তিকে হারাম করেছেন।

কিন্তু মুসলিমগণ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি ভ্রক্ষেপ করিনি; বরং তারা বেছে নিয়েছে হারাম পথকে। তারা বেছে নিয়েছে পরাজয় ও নির্মূলের পথ। নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ কি নির্মূল হওয়া থেকে মুক্তি দেয়? অতীতে মুক্তি দেয়নি; ভবিষ্যতেও দিবে না। কারণ, এগুলো তো ঐক্যের বিকল্প নয়। অনৈক্য যে আযাব আনে -সেটি তো পবিত্র কোর’আনের কথা। এবং সে আযাব আসে শত্রুশক্তির হাতে পরাজয় রূপে। অতীতে সেটি বার বার হয়েছে। কিন্তু সে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ায় আগ্রহ কই?  

৬. ঈমানদারীর ও বেঈমানীর লক্ষণ

ঈমানদারী ও বেঈমানী সুস্পষ্ট দেখা যায়। ঈমানদারীর লক্ষণ: চেতনায় থাকে জাহান্নামে আগুণ থেকে বাঁচার ভাবনা। থাকে মৃত্যুর জন্য সদা প্রস্তুতি। কারণ, মৃত্য যখন তখন বিনা নোটিশে হাজির হয়। ফলে ঈমানদারের জীবনে থাকে নেক আমলের সার্বক্ষণিক তাড়াহুড়া। বেঈমানীর লক্ষণ: ভাবনাশূণ্যতা মৃত্যু নিয়ে। তার সকল তাড়াহুড়া পেশাদারী সাফল্য, সন্তানদের প্রতিষ্ঠা ও সম্পদের বৃদ্ধি নিয়ে।

ঈমানদারীর প্রকাশ ইবাদত, ঐক্য, ইসলামী রাষ্ট্র, জিহাদ ও শরিয়ত পালন নিয়ে বাঁচায়। এবং বেঈমানীর প্রকাশ সেক্যুলার রাজনীতি, বিভক্ত ভূগোল, কুফরী আইন, পতিতালয়, সূদী ব্যাংক, মদ,জুয়া ইত্যাদি হারাম কাজ নিয়ে বাঁচায়। এ পথ জাহান্নামের। কিন্তু এরূপ বেঈমানী থেকে বাঁচার ভাবনা ক’জনের?

৭. নবীজী (সা:)’র রাজনৈতিক সূন্নত

নবীজী (সা:) নিজে রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাই তাঁর পক্ষে রাজনীতিতে নিষ্ক্রীয় বা নিরপেক্ষ থাকার প্রশ্নই উঠেনা। তিনি ছিলেন মুসলিম সেনাবাহিনীর সেনাপতি। দূত পাঠিয়েছেন নানা দেশে। প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন শরিয়ত। যারা নিজেদের নবীজী (সা:)’র উম্মত মনে করে তাদের জীবনে নবীজী (সা:)’র সে রাজনীতি কই? যেসব আলেমগণ নবীজী (সা:)’র সূন্নত নিয়ে বড় বড় ওয়াজ করেন তাদের জীবনে নবীজী (সা:)’র সে গুরুত্পূর্ণ সে সূন্নত কই? অথচ ইসলামকে বিজয়ী করার একমাত্র পথ হলো নবীজী (সা:)’র এ সূন্নত। যাদের জীবনে এ সূন্নত নাই তারা পরাজয় বাড়ায় ইসলামের এবং বিজয়ী করে শয়তানী পক্ষকে। ১৪/০৩/২০২১।




বিবিধ ভাবনা (৩৫)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. পাকিস্তান কেন ভেঙ্গে গেল?

পাকিস্তান ভেঁঙ্গে যাওয়ার কারণ যতটা অর্থনৈতিক বৈষম্য, তার চেয়ে অনেক বেশী নৈতিক ও চেতনার বৈষম্য। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে moral and intellectual disparity ছিল বিশাল। মানুষ পানাহার ও পোষাক-পরিচ্ছদের ভিন্নতা নিয়েও একই ভূমিতে একত্রে বসবাস করতে পারে; কিন্তু সেটি অসম্ভব হয় নৈতিক ও চেতনার ভিন্নতায়। একত্রে বসবাসের জন্য শুধু রাজনৈতিক ভূগোলটি এক হলে হয় না, চেতনার ভূগোলটিও এক হতে হয়। বাঙালী মুসলিমদের সমস্যা হলো অন্য ভাষার মুসলিমদের সাথে বসবাসের নৈতিক সামর্থ্য তাদের নাই। এর কারণ, বাংলার বুকে অন্য ভাষী মানুষের বসবাস না থাকাতে সে সামর্থ্য ও অভ্যাস তাদের গড়েই উঠেনি। তারা বাস করছে অন্য মুসলিমদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই; তাদের আপন করে নিতে পারেনি। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে পাঞ্জাবী, সিন্ধু, পাঠান ও বেলুচদের পাশাপাশি বসবাস শত শত বছর ধরে। ফলে চেতনায় তারা অনেক কসমোপলিটান ও প্যান-ইসলামিক। সে তূলনায় বাঙালীরা অতি আঞ্চলিক ও সংকীর্ণ মনের।

নিজ অভিজ্ঞতা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের সে কসমোপলিটান চেতনার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। লাহোরের কিং এডওয়ার্ড মেডিক্যাল কলেজ হলো পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে পুরাতন মেডিক্যাল কলেজ। সে্টি এখন বিশ্ববিদ্যালয়। কলেজের ৯০% য়ের বেশী ছাত্র-ছাত্রীই পাঞ্জাবী। আমি যখন সে কলেজের ছাত্র, তখন সে প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বৃহৎ ছাত্র সংগঠনের প্রধান ছিলেন একজন বাঙালী। সংসদ নির্বাচনে সে ছাত্র সংগঠটিই বিজয়ী হতো। আরো বিস্ময়, লাহোরের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় হলো সমগ্র পাকিস্তানের সবচেয়ে পুরোন ও বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তারিকুর রহমান নামে বাংলাদেশের নলিতাবাড়ির এক ছাত্র। আরেক বিস্ময়: করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মহিউদ্দীন নামে নোয়াখালীর এক ছাত্র। এ বিষয়গুলো সামান্য নয়, এগুলি একটি জনগোষ্ঠির চেতনার পরিচয় দেয়। বাংলাদেশে কি এটা ভাবা যায়, কোন বিহারী বা অন্য কোন অবাঙালী ছাত্র বাংলাদেশের কোন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংসদে ছাত্রদের ভোটে নির্বাচিত হবে? কিন্তু পাকিস্তানে সেটি সম্ভব। অথচ এ বাঙালীরা সত্তরের দশকে স্লোগান দিত তারা নাকি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি! কিন্তু সেটি কিসের বলে? শ্রেষ্ঠ হতে হলে তো মনটাও বড় হতে হয়। পাকিস্তানে এখন ১০ লাখের বেশী বাঙালীর বসবাস। অনেকের মতে ১৫ লাখ। এরা গেছে ১৯৭১’য়ের পর। একাত্তরে প্রায় ৪ লাখ বাঙালী ছিল; তারা ১৯৭৪’য়ের মধ্যেই বাংলাদেশে ফিরে গেছে। তাদের কারো হত্যা করা হয়েছে, ধর্ষণ করা হয়েছে বা তাদের ঘরবাড়ী কেড়ে রাস্তায় বসানো হয়েছে তার প্রমাণ নাই। অথচ সেটি বাংলাদেশে হয়েছে বিহারীদের সাথে।  

পাকিস্তানের জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৬০ জন পাঞ্জাবী। অথচ দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একজন পাঠান। পাকিস্তানে পাঠানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ। অথচ তাঁর দল পাঞ্জাবী নওয়াজ শরীফকে হারিয়ে শুধু পাকিস্তানে নয়, পাঞ্জাব প্রদেশেও ক্ষমতাসীন। সিন্ধিদের সংখ্যা শতকরা ১৬ ভাগ। জুলফিকার আলি ভূট্টো ও তাঁর মেয়ে বেনজির ভূট্টো সিন্ধি হয়েও তারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু। অথচ দেশটির শতকরা ১০ ভাগ মানুষের মাতৃ ভাষা্ও উর্দু নয়। যে পাঞ্জাবীরা শতকরা ৬০ জন, তারা কখনোই এ দাবী তুলেনি যে পাঞ্জাবীকে দেশের রাষ্ট্র ভাষা করতে হবে। বাঙালীরা কি কোনদিন সেটি মেনে নিত? পাঞ্জাবী দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছে, ক্ষুদ্র আঞ্চলিক স্বার্থকে নয়।

Moral and intellectual disparity ’র বড় কারণ, বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ বিশ্বটাকে দেখে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে। ফলে পৌত্তলিক ভারতের প্রতি রবীন্দ্রনাথের মত তাদেরও আনুগত্য আছে। আছে ভারত বন্দনাও। রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক গান তাই বাংলাদেশীদের জাতীয় সঙ্গীত। অনেক বাঙালীরাই ভারতকে দেখে বাংলাদেশের জন্মদাতা রূপে। ভারত্ও তাই মনে করেন। এরই প্রমাণ, ভারতের The Time of India একাত্তরে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল ম্যানেক শ’কে নিয়ে একটি বিশাল নিবন্ধ প্রকাশ। তাতে তাকে father of a nation বলে আখ্যায়ীত করেছিল। বাংলাদেশ সরকার তার প্রতিবাদ করেনি্। তবে প্রতিবাদ না করার কারণও রয়েছে। মুক্তিবাহিনী একটি জেলা দূরে থাক, ভারতীয় আর্মীর অনুপ্রবেশের আগে একটি থানাও মুক্ত করতে পারিনি্। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছে ভারতী সেনাবাহিনী। অথচ আফগানিস্তানে যখন ১ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন সৈন্যের অবস্থান, তখনও তালেবানরা শতকরা ৬০ ভাগ ভূ-খন্ডের উপর নিজেদের দখল বজায় রেখেছে। এজন্যই বাকশালীগণ বলে, ক্বিয়ামত অবধি ভারতের ঋণ শোধ দেয়া যাবে না। কথা হলো, পিতার ঋণ কি কখনো শোধ দেয়া যায়? যে পিতা, সে তো সব সময়ের জন্যই পিতা। এজন্যই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ বাংলাদেশের পাশে কোন শত্রু দেখে না। কারণ, পিতাকে তো শত্রু ভাবা যায় না। অপর দিকে পশ্চিম পাকিস্তানীরা বিশ্বটাকে দেখে আল্লামা ইকবালের দৃষ্টিতে। ফলে তাদের আছে মাথা তুলে দাঁড়ানোর জজবা। তারা ভারতকে দেখে প্রতিদ্বন্দী শত্রু রূপে। ফলে ভারত যখন পারমানবিক বোমা বানায় তখন পাকিস্তান্ও বানায় ফলে দেশটি পরিণত হয়েছে ৫৭টি মুসলিম দেশের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে। অথচ বাংলাদেশ একটি রাইফেলও নিজে বানানোর প্রয়োজনীতা বোধ করে না। দেশটির নীচে নামার কি শেষ আছে? দক্ষিণ এশিয়ার ৩টি দেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশের অন্তর্ভূক্ত্ করা হয়েছে। সে দেশটি হলো নেপাল, ভূটান ও বাংলাদেশ।সে তালিকায় পাকিস্তান নাই। অথচ আওয়ামী নেতাদের দাবী, তারা পাকিস্তানের চেয়ে বেশী উন্নতি করছে।       

২. মিথ্যার নাশকতা ও মিথ্যার স্রোতে ভাসা মানুষ

অধিকাংশ মানুষই চলমান স্রোতের টানে ভাসে। সে স্রোতটি সুস্পষ্ট মিথ্যার হলেও -তা নিয়ে তারা চিন্তাভাবনা করতে রাজী নয়। সে মিথ্যাকেই তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। হিন্দুরা মুর্তিপূজা করে, গরুকে ভগবান মনে করে, গো-মুত্র সেবন করে এবং গোবর দিয়ে ঘর পবিত্র করে –এর কারণ এই চলমান স্রোতে-ভাসা স্বভাব। ভারতের স্কুল-কলেজে এখন পড়ানো হয়, বহু হাজার বছর আগে থেকেই ভারতের মুনি-ঋষিরা আকাশে উড়তো। তারা বিমান আবিস্কার করতে জানতো। মানুষ যদি চিন্তাভাবনায় অভ্যস্থ না হয় তবে এরূপ মিথ্যার স্রোতে ভাষা থেকে সে রক্ষা পায় না; বরং সে মিথ্যার প্রচারকে পরিণত হয়। এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রিও তাকে মিথ্যাসেবী হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে না। ভারতে যারা গরুকে ভগবান বলে ও গো-মুত্র সেবন করে -তাদের সবাই যে নিরক্ষর,তা নয়। তাদের অনেকেই পিএইচডিধারী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

একই রূপ মিথ্যার স্রোতে ভাসছে কোটি কোটি বাংলাদেশী। তারা মনে করে ১৯৭১ তিরিশ লাখ বাঙালী পাক সেনাবাহিনীর হাতে মারা গিয়েছিল। একথা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যেমন বলে, তেমনি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও বলে। বলে দেশটির বুদ্ধিজীবীরাও। মিথ্যার সে স্রোতটি সৃষ্টি করেছিল মুজিব; মুজিব-ভক্তদের কাজ হয়েছে সে মিথ্যাকে বাঁচিয়ে রাখা। গরু যেমন ভগবান রূপে হিন্দুদের মাঝে বেঁচে আছে, তেমনি ৩০ লাখের মিথ্যাও বাঙালীর মাঝে বেঁচে আছে। এ মিথ্যাসেবীরা ভাবতে রাজী নয়, ৩০ লাখ মরতে হলে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের দেশে প্রতি ২৫ জনে একজন মারা যেতে হয়। এবং ৯ মাস যুদ্ধের প্রতিদিন ১১ হাজারের বেশী মানুষকে মরতে হয়। মিথ্যা থেকে তে তারাই বাঁচে যারা চিন্তা-ভাবনা ও হিসাব-নিকাশ করতে আগ্রহী। কিন্তু মিথ্যাসেবীদের সে আগ্রহ থাকে না।  

৩. জাহান্নামে নেয় চেতনার অসুস্থ্যতা

 রোজহাশরের বিচার দিনে দৈহিক স্বাস্হ্যের বিচার হবে না। বিচার হবে চেতনার স্বাস্হ্যের। ইসলামী পরিভাষায় সেটিই হলো ঈমান ও আক্বিদা। নামায-রোযা আসে পরে, ঈমান-আক্বিদা আসে আগে। চেতনা তথা ধ্যান-ধারণার অসুস্থতার কারণে মানুষে জাহান্নামের আগুণে যাবে। মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি তাই, চেতনাকে সুস্থ্য রাখা। এবং সবচেয়ে ঘৃন্য ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো চেতনাকে অসুস্থ্য করা। অসুস্থ্য করার কাজে মিথ্যা হলো মূল হাতিয়ার; সত্যের পথ তথা জান্নাতের পথ এটি বন্ধ করে দেয়। মিথ্যাকে এজন্যই সকল পাপের মা বলা হয়। মিথ্যুকেরাই হলো সবচেয়ে বড়পাপী। গরু, সাপ, মুর্তি, ইত্যাদি ভগবান রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মিথ্যার কারণে। কোন এক মিথ্যুক আদি কালে সে মিথ্যাকে চালু করেছিল, অন্য মিথ্যুকেরা সেটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই জাহান্নামে যাওয়ার জন্য মানব-হত্যা ও নারী ধর্ষণের প্রয়োজন পড়ে না, মিথ্যুক হওয়াই সে জন্য যথেষ্ট্। শেখ মুজিবের অপরাধ শুধু এ নয়, সে গণতন্ত্র হত্যা ও ভারতের দালালী করেছে। বরং সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো, সে ৩০ লাখের মিথ্যার জন্ম দিয়েছে; এবং কোটি কোটি বাঙালীকে মিথ্যুকে পরিণত করেছে।

মহান আল্লাহতায়ালা লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। সেটি মানুষকে বিজ্ঞান শেখাতে নয়; বরং সত্যসেবী করতে এবং জনগণের চেতনায় সুস্থ্যতা দিতে। চেতনা পুষ্টি পায় ওহীর জ্ঞান থেকে। জ্ঞানের বলে জ্ঞানীরা তখন স্রোতের উজানে সাঁতরায়। সে জ্ঞানদান নিশ্চিত করতেই মহান আল্লাহতায়ালা আসমানী কিতাব পাঠিয়েছেন। পবিত্র কোর’আন হলো সে লক্ষ্যে সর্বশেষ কিতাব। যারা সে কোর’আনের জ্ঞান পায়, তারাই সত্যের সন্ধান পায় এবং তাদের চেতনা পায় সুস্থ্যতা। বাঙালী ফ্যাসিস্টদের অপরাধ হলো, সে কোর’আনী জ্ঞানের প্রতিষ্ঠা দিতে তারা রাজী নয়।

৪. ঈমানদারের পরিচয়

ঈমানদারের ব্যস্ততার দুটি প্রধান খাত: এক). কোর’আনী জ্ঞানের বৃদ্ধি। কারণ, জ্ঞানই চেতনায় পুষ্টি ও সুস্থ্যতা দেয় এবং আমলের ওজন বাড়ায়। এবং পথ দেখায় জান্নাতের। দুই). নেক আমল। নেক আমলে তাড়াহুড়া আসে মহান আল্লাহকে খুশি করা ও আখেরাতে সঞ্চয় বৃদ্ধির প্রেরণা থেকে। অপর দিকে বেঈমানের পরিচয় হলো: সে আগ্রহহীন কোর’আন বুঝায়। তার সর্বক্ষণের চিন্তা ও ব্যস্ততা সম্পদের বৃদ্ধিতে। সে নিজে পরিণত হয় সম্পদের পাহারাদারে।

৫. চোরডাকাতদের সমর্থণে!

 কোন সভ্য মানুষই চোরডাকাতদের চুরিডাকাতিকে সমর্থণ করে না।এরূপ কাজ চোরডাকাতদের। সভ্য ও ভদ্র লোকদের এ চারিত্রিক বলটি থাকতেই হয়। অথচ সে সামর্থ্য বিলুপ্ত হয়েছে তাদের মধ্য থেকে যারা নিজেদের শিক্ষিত বলে পরিচয় দেয়। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের বিপুল সংখ্যক শিক্ষক বিবৃতি দিয়েছে ২০১৮ সালের নির্বাচর সুষ্ঠ হয়েছে। এবং সমর্থণ দিচ্ছে ভোট ডাকাত হাসিনাকে। সমর্থণ দিচ্ছে নির্বাচনি কমিশনার, আদালতের বিচারকগণ, বুদ্ধিজীবী এবং সেনাপ্রধান! ডাকাত পাড়ার সংস্কৃতি কীরূপে ছেয়ে গেছে -এ হলো তার নমুনা।  

৬. বিশ্বমিথ্যুক ও বিশ্বভীরু

 মিথ্যার জন্য বিশ্বমিথ্যুক রূপ খেতাব পাওয়া উচিত ভোটডাকাত হাসিনার। অপর দিকে বিশ্বভীরু রূপে আখ্যায়ীত হওয়া উচিত বাংলাদেশের জনগণের। কি বিস্ময়! দেশের ১৬ কোটি মানুষ রুখতে পারলো না ভোটডাকাতদের! শুধু তাই নয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলছে ভোটচোরকে!

৭. চরিত্র দেখা যায়

 চরিত্র দেখা যায় দুর্বলের সাথে আচরণ দেখে। সবলের সামনে অতি অসভ্য দুর্বৃত্ত ব্যক্তিও ভদ্র আচরণ করে। অথচ পা ভাংঙ্গা হাঁসকে শিশুও লাথি মারে। বাঙালীর সে চরিত্রটি অতি নগ্ন ভাবে দেখা গেছে প্রতিরক্ষাহীন বিহারী নারী-পুরুষ ও শিশুদের উপর হত্যা, ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ী ও ব্যবাসা-বাণিজ্য দখল করার মধ্য দিয়ে। একই কারণে দুর্বল নারীকে অতি ভীরু এবং কাপুরুষও পিটাতে পারে। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় প্রকাশ, নারী নির্যাতন ও নারী হত্যায় ভারত বিশ্বে প্রথম। ফলে দেশটি সংকটের মুখে পড়েছে অসহায় মুসলিম ও দলিত শ্রেণী। কাপুরুষেরা দুর্বলদের পেলে অতিশয় নৃশংস হয়। তেমন এক নৃশংস হিংস্রতা নিয়ে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজিপি ও আর.এস.এস স্লোগান দেয়: মুসলমান কি লিয়ে দো স্থান- কবরস্থান ইয়া পাকিস্তান। অর্থ: মুসলমানদের জন্য দুই জায়গা: হয় পাকিস্তান, অথবা কবরস্থান। অথচ সে ভারতের বন্ধু হলো শেখ হাসিনা।

৮. উপেক্ষিত মুসলিম অবদান

 ভারতীয় মুসলিমদের জন্য বড়ই দুর্দিন। তাদেরকে বহিরাগত ও দেশের শত্রু ভাবা হয়। অথচ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বেশী অবাদান মুসলিমদের। দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে ৯২,৩৫৩ জনের নাম লেখা আছে যারা প্রাণ দিয়েছে ভারতের স্বাধীনতার জন্য। তাদের মধ্যে ৬২,৯৪৫ জন মুসলিম। অথচ নরেন্দ্র মোদির বিজিপি মুসলিমদের সে অবদানের কথা বলে না। এমন কি বলেনা ভারতীয় মিডিয়া।  ১১/০৩/২০২১।

 

 




বিবিধ ভাবনা (৩৪)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. নবীজী (সা:)’র ইসলাম ও আজকের ইসলাম

সৈনিককে শুধু প্রশিক্ষণ নিলে চলে না, দেশরক্ষায় যুদ্ধেও নামতে হয়। সেটি না হলে দেশের সাথে গাদ্দারী হয়। সেরূপ গাদ্দার সৈনিকদের সংখ্যাবৃদ্ধিতে দেশের স্বাধীনতা বাঁচে না। তেমনি মুসলিম জীবনে শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত থাকলে চলে না। অসত্যের নির্মূল, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও আদালতে শরিয়ত পালন করতে জিহাদেও নামতে হয়। এটিই নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামের ইসলাম। মুসলিমগণ বিশ্বশক্তি রূপে খাড়া হয়েছিল তো এ ইসলাম নিয়ে বাঁচার কারণে।

আজকের মুসলিমগণ যে ইসলাম নিয়ে বেঁচে আছে -সেটি নবীজী (সা:)’র ইসলাম নয়। আজকের ইসলামে নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত আছে, কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, ঐক্য ও জিহাদ নাই। মুসলিমগণ বাঁচছে নবীজী (সা:)’র ইসলামের সাথে গাদ্দারী নিয়ে। ফলে তাদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সে শক্তি ও ইজ্জত নাই। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় কি তারা মুসলিম রূপে গণ্য হবে? স্থান পাবে কি জান্নাতে? জান্নাতে যেতে হলে তো নবীজী (সা:)’র ইসলামের অনুসারি হতে হয়।

 

২. বিজয় ডাকাতদের

বাংলাদেশে গণতন্ত্র কবরে গেছে; চলছে ডাকাততন্ত্র। এবং বিজয়ী ডাকাতাগণ। ডাকাততন্ত্রে ভোট লাগে না, লাগে ডাকাতির সামর্থ্য। সে সামর্থ্য রয়েছে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার। পুলিশ এবং সেনাবাহিনীও এখন হাসিনার ডাকাত বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ডাকাতপাড়ায় দালানকোঠা দেখে বলা যায় না যে উন্নতি হয়েছে। উন্নয়নের পরিমাপে জরুরি হলো গণতন্ত্র্ কতটা প্রতিষ্ঠা পেল এবং জনগণ কতটা মানবিক অধিকার পেল সেটি। ডাকাতের গ্রামকে সভ্য গ্রাম বলা হয় না। তেমনি ডাকাত অধিকৃত দেশকেও সভ্য দেশ বলা যায় না। দেশে তখন প্রতিষ্ঠা পায় ডাকাত পাড়ার সংস্কৃতি। সে সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠা ও সন্মান পায় ডাকাতগণ। ডাকাত বিরোধীদের তখন গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। 

 ৩. ছোট ডাকাত ও বড় ডাকাত

ছোট ডাকাতেরা মানুষের অর্থ ডাকাতি করে। বড় ডাকাতেরা জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি করে। তখন সমগ্র দেশ ও দেশের সম্পদ ডাকাতদের হাতে চলে যায়। আমলা বাহিনী, আদালত বাহিনী, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীও তখন ডাকাতদের বাহিনীতে পরিণত হয়। জনগণকে তখন সে ডাকাত প্রতিপালনে রাজস্ব জোগাতে হয়।

বাংলাদেশে ডাকাতদের জৌলুস বাড়ছে এবং গরীব মানুষ আরো দরিদ্র হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশ, অভাবের তাড়নায় মানুষ সন্তান বিক্রি করছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন মেজর মটর সাইকেল  চালায়, আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজরকে দেয়া হয় ৫০ লাখ টাকার জিপ ও সে সাথে জোগানো হয় তেলের খরচ। মুজিব আমলেও সেটিই হয়েছিল। ক্ষুধায় মানুষ বুমি খেয়েছে, আর মুজিব সোনার মুকুট পড়িয়ে ছেলের বিয়ে দিয়েছে। দেশ ডাকাতদের দখলে যাবে এবং তাদের জৌলুস বাড়বে না –সেটি কি হয়? তাই কিছু রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়িয়ে বাংলাদেশে শান্তি আনা যাবে না, সে জন্য ডাকাত তাড়াতে হবে।

৪. উৎসব ভাংঙ্গা নিয়ে

মুসলিমকে শুধু নামায-রোযা নিয়ে ভাবলে চলে না। তাকে ভাবতে হয় মুসলিম উম্মাহর ইজ্জত ও নিরাপত্তা নিয়েও। ন্ইলে শত্রুশক্তির গোলাম হতে হয়। সভ্য মানুষেরা তাই যেমন মজবুত ঘর গড়ে তেমনি শক্তশালী রাষ্ট্রও গড়ে। অতীতে তাই মুসলিমগণ তাদের জানমালের বিশাল ভাগ বিনিয়োগ করেছিলেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। বৃহৎ ভূগোলের যে শক্তি সে শক্তি শত কোটি বিচ্ছিন্ন মানুষের থাকে না। সে শক্তি হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসারও থাকে না। একেই বলে power of geopolitics। ভূগোল বাড়লেই শক্তি বাড়ে। অতীতের মুসলিমগণ সেটি বুঝতেন; তাই ভূগোল বাড়াতে তারা বিপুল অর্থ ও রক্ত ব্যয় করেছেন। সে সুস্থ্য বিবেক বোধ দেখা গিয়েছিল ১৯৪৭ সালে বাঙালী মুসলিম লীগ নেতাদের মাঝে। আর আজকের মুসলিমগণ রক্ত ব্যয় করে ভূগোল ভাংঙ্গতে। তাদের উৎসব দেশ ভাংঙ্গা নিয়ে, গড়া নিয়ে নয়। ১৯৭১’য়ের পর সে উৎসবটি ব্যাপক ভাবে দেখা যায় বাংলাদেশের বাঙালী মুসলিমদের মাঝে।

মহান আল্লাহতায়ালা শুধু ব্যক্তির নামায-রোযার হিসাবই নেন না, হিসাব নেন কিসে তার আনন্দ-উৎসব সেটিরও। কারণ, আনন্দ-উৎসবের মধ্যে ধরা পড়ে তার প্রকৃত ঈমান ও চেতনা। মুসলিম দেশ ভাংঙ্গলে সাহস ও শক্তি বৃদ্ধি পায় কাফেরদের। তাতে পরাজয় ও গোলামী বাড়ে মুসলিম উম্মাহর। তাই যারা মুসলিম দেশ ভাংঙ্গাকে সমর্থন করে ও তা নিয়ে উৎসব করে -তারা বাঙালী, আরব, কুর্দি, হিন্দু, খৃষ্টান ও বৌদ্ধ হতে পারে কিন্তু প্রকৃত মুসলিম হতে পারে না। তারা মিত্র কাফের শক্তির। যেমনটি দেখা গেছে মুজিব ও তার অনুসারিদের ক্ষেত্রে। একখানি প্লেট ভাংঙ্গলেও একজন সুস্থ্য মানুষের মনে কষ্ট হয়। একটি মুসলিম দেশ ভেংঙ্গে গেল অথচ মনে কষ্ট পেল না, সেটি কি করে সম্ভব? সেটি সম্ভব একমাত্র ঈমান না থাকাতে। 

একাত্তরে তাই কোন ইসলামী দল ও আলেম পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেনি। এটি ছিল ভারতপন্থী ও রুশপন্থী আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টির কাজ। বিশ্বের কোন মুসলিম দেশও দেশভাংঙ্গার এ কাজকে সমর্থন করেনি; সমর্থন করেছে ভারত, সোভিয়েত রাশিয়া ও ভূটানের ন্যায় কাফের রাষ্ট্র।   

৫. আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুতি ও মুসলিমদের গাদ্দারী

সুরা বাকারায় মহান আল্লাহতায়ালার ওয়াদা: “ফাজকুরুনি, আজকুরুকুম”। অর্থ: তোমরা আমার স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো। এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর স্মরণে থাকার জন্য কোন পীরদরবেশের মধ্যস্থতার দরকার নেই। আল্লাহতায়ালার স্মরণ নিয়ে বাঁচার অর্থ শুধু তাঁর নাম ও কুদরতের স্মরণ নিয়ে বাঁচা নয়। বরং সেটি হলো, তাঁর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়বদ্ধতাটি সর্বদা স্মৃতিতে নিয়ে বাঁচা। সে দায়িত্ব থেকে গাফেল হয়ে যাওয়ার ভয়টিই হলো তাকওয়া।

প্রতিটি ঈমানদারের উপর সে অর্পিত দায়ভারটি হলো, নিজ নিজ জনপদে তাঁর খলিফা তথা প্রতিনিধি রূপে দায়িত্ব পালন। সে দায়িত্বপালনে মুমিন ব্যক্তি পরিণত হয় আমৃত্যু তাঁর সৈনিকে। সে তখন বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনকে বিজয়ী করার স্মরণ নিয়ে। আর যে ব্যক্তি প্রতি মুহুর্ত বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা নিয়ে, বস্তুত তাঁর প্রতি হলো তাঁর এ বিশেষ ওয়াদা। যারা তাঁর আইনকে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে বিজয়ী করতে আত্মনিয়োগ করে, নিশ্চয়ই তিনি তাদেরকে বিজয়ী করবেন আখেরাতে।

অথচ মুসলিম জীবনে এক্ষেত্রে গাদ্দারীটি বিশাল। তারা বাঁচছে স্মৃতিতে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি দায়বদ্ধতার কথা ধারণ না করেই। তারা যে তাঁর খলিফা -সে ধারণাটিও বিলুপ্ত হয়েছে। তারা রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী ও সেক্যলারিস্ট, অর্থনীতিতে সূদখোর, প্রশাসনে ঘুষখোর, সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানী এবং আদালতে কাফেরদের আইনের অনুসরারি। সর্বত্রই বিদ্রোহ। স্মৃতিতে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থাকলে কি এমনটি হতো? 

৬. রাষ্ট্রের গুরুত্ব ও মুসলিমের ব্যর্থতা

মানুষের সবচেয়ে বড় উপকারটি অর্থদানে হয়না। সেটি হয় জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর মধ্য দিয়ে। সেটি সম্ভব হয় কোরআনের জ্ঞান দিয়ে। সে কাজটি একজন ব্যক্তি যেমন করতে পারে, তেমনি একটি সংগঠনও করতে পারে। কিন্তু পৃথিবী পৃষ্টে জান্নাতে নেয়ার সর্ববৃহৎ ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকল্পটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র। সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তখন কাজ হয়, অসত্যের নির্মূল ও সত্যের প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা, মিডিয়া তখন মানুষকে জান্নাতের পথে নেয়ার বাহনে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রই হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানকে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে রেখে ইসলামী বিধানকে প্রতিষ্ঠা দেয়া অসম্ভব। বিষয়টি নবীজী (সা:) বুঝতেন এবং আল্লাহতায়ালাও চাইতেন বলেই মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর প্রথম কাজ হয় নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দেয়া। মুসলিমগণ যে তৎকালে সুপার পাওয়ারে পরিণত হয় তার কারণ হলো এই ইসলামী রাষ্ট্র। লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে কি সেটি সম্ভব হতো? বিজয় ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে হলে শুধু নামায-রোযা বুঝলে চলে না, বুঝতে হয় রাষ্ট্রের গুরুত্ব এবং power of geopolitics। মুসলিমদের আজকের ব্যর্থতা এখানেই। তারা ব্যর্থ হয়েছে নবীজী(সা:)’র আদর্শে ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে্। রাষ্ট্র অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে তথা জাহান্নামে নেয়ার কাজে। ফলে রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে মানবের সবচয়ে বড় শত্রুতে। কোন হিংস্র পশুর হাতে এতো বড় ক্ষতি হচ্ছে না।  

৭. ঈমানদারী ও বেঈমানীর পরিচয়

ঈমানদারের পরিচয় হলো ইসলামকে বিজয়ী করার কাজে সে সবার সামনে থাকে। তাকে দেখা যায় অন্যায়ের নির্মূলে ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। দেখা যায় মুসলিমদের মাঝে ঐক্য গড়তে। সে চেতনায় প্যান-ইসলামীক হয়। তার নৈতিক সামর্থ্যটি দেখা যায় ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে অন্যদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ায়। বেঈমানের পরিচয় হলো, সে প্রচণ্ড স্বার্থপর। নিজের স্বার্থ হাছিলে তাকে সবার আগে আগে দেখা যায়। এবং ইসলামকে বিজয়ী করার বদলে তারা প্রচেষ্টা হয় ইসলাম ও মুসলিমকে পরাজিত করায়। তার রাজনীতিতে থাকে ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে মুসলিম উম্মাহর দেহে বিভক্তির দেয়াল গড়ার এজেন্ডা। মুসলিম দেশগুলোতে এরাই বিজয়ী। মুসলিম উম্মাহর এরাই ঘরের শত্রু।  ০৯/০৩/২০২১।