নামাযে নিদারুণ ব্যর্থতার বিষয়গুলি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

নামাযের কেন এতো গুরুত্ব?

যে ইবাদতটি অমুসলিম থেকে মুসলিমকে পৃথক করে -তা হলো নামায। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নামায কাফের ও মুসলিমের মাঝে দেয়াল রূপে কাজ করে। নামায না থাকলে মুসলিম আর অমুসলিমের মাঝে কোন পার্থক্যই থাকে না, উভয়ে একাকার হয়ে যায়। ব্যক্তির ঈমান দেখা যায় না। রোযাও দেখা যায় না –যদি সে নিজে থেকে তা প্রকাশ না করে। তেমনই কে যাকাত দেয়, সেটিও বুঝা যায় না –যদি না সে ব্যক্তি অন্যদের জানিয়ে দেয়। আর হজ্জ তো সবার জন্য ফরজ নয়; ফলে হজ্জ না করাতে কেউ অমুসলিম হয় না। কিন্তু নামায দেখা যায়। কারণ নামাযে যে শুধু দৃশ্যমান ক্বিয়াম, রুকু, সিজদা ও বৈঠক আছে –তা নয়। নামায পড়তে হয় লোকালয়ের মসজিদে হাজির হয়ে। ঘরে বা দোকানে নামায পড়লেও তা অন্যদের নজরে পড়ে। তাই কে নামাযী আর কে বেনামাযী -সমাজে সেটি গোপন থা্কে না। অপর দিকে নামাযই ব্যক্তির ঈমানের পরিমাপ দেয়; মুসলিম না অমুসলিম -সেটিও প্রকাশ করে দেয়। প্রতিদিনের প্রশিক্ষণে যদি কোন সৈনিক হাজির না হয় তবে সৈনিকের খাতায় তার নাম থাকে না। কারণ, সৈনিক জীবনে থাকে যুদ্ধের দায়বদ্ধতা। দায়িত্ব পালনের সে সামর্থ্য কখনোই প্রশিক্ষণ ছাড়া সৃষ্টি হয়না। ফলে প্রশিক্ষণে আগ্রহ নাই -এমন ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভর হয় সৈনিক হওয়া। ফলে বহিস্কৃত হয় সেনা বাহিনী থেকে। তেমনি মসজিদের জামায়াতে যে ব্যক্তি হাজির হয় না -তাকেও কি মুসলিম বলা যায়? মুসলিম মাত্রই তো মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক; এবং তাঁর জীবনে আমৃত্যু যুদ্ধটি হলো অন্যায়ের নির্মূলে ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। সে যুদ্ধেও তো সামর্থ্য ও কোরবানী চাই। চাই তাকওয়ার বল। নামায-রোযা এবং হজ্জ-যাকাতের ইবাদত তো সে তাকওয়া, সামর্থ্য ও কোরবানী বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ। এরূপ প্রশিক্ষণে মুনাফিকদের অংশগ্রহণ থাকে না। তারা হাজির হয়না মসজিদে ৫ ওয়াক্ত নামাযে –বিশেষ করে ফজর ও এশার নামাযে। ফলে তাদের দেখা যায়না ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদে। এভাবেই প্রকাশ পায় তাদের মুনাফিকি।  

কোন বেনামাযী যে জান্নাতে যাবে না -তা নিয়ে বিতর্ক নাই। কারণ, জান্নাত তো একমাত্র ঈমানদারদের জন্য। সে পবিত্র স্থানে বেঈমানের কোন স্থান নেই। আর ঈমানদার তো সেই যে নামায পড়ে। আগুন জ্বললে, উত্তাপ দিবেই। তেমনি হৃদয়ে ঈমান প্রবেশ করলে, সে ব্যক্তির জীবনে নামায-রোযা আসবেই। আগুন থেকে যেমন তার উত্তাপকে আলাদা করা যায় না, তেমনি ঈমানদার থেকে পৃথক করা যায় না তার নামাযকে। হাদীসে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম যে ইবাদতের হিসাব নিবেন সেটি হলো নামায। সুরা মুলকে বলা হয়েছে, জাহান্নামবাসীদের জিজ্ঞাসা করা হবে তোমরা কীরূপে এখানে পৌঁছলে? সর্বপ্রথম যে কারণটিকে তারা উল্লেখ করবে তা হলো, তারা নামায পড়তো না। নামাযের মূল্য বেনামাযীগণ ইহকালে না বুঝলেও বুঝবে জাহান্নামে পৌঁছার পর। জাহান্নামবাসীদের সে বেদনাদায়ক উপলব্ধিকে মহান আল্লাহতায়ালা কুর’আনে উল্লেখ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। সেটি হলো, যাদের জীবনে এখনো মৃত্যু আসেনি তাদেরকে সাবধান করতে। জাহন্নামে পৌঁছার আগে তথা দুনিয়ার বুকে থাকতেই তারা যেন বুঝতে পারে নামাযের গুরুত্ব। নইলে জাহান্নামে পৌঁছে শুধু আফসোসই হবে, করার কিছু থাকবে না। কুর’আন মজীদ মানব জীবনের রোডম্যাপ। এ রোডম্যাপ শুধু জান্নাতের পথই দেখায় না, পথ চলায় ভূল হলে -সে ভূলটিও তুলে ধরে। সামনে অপেক্ষামান জাহান্নামের বিপদের কথাও বলে।    

 

কীরূপে ব্যর্থ হয় নামায?                                                                 

আঁখ চিনিকলে নিক্ষিপ্ত হলে চিনিতে পরিণত হয়। সেরূপ না হলে বুঝতে হবে চিনিকলে ত্রুটি রয়েছে? নামাযের মধ্যেও তেমনি একটি প্রক্রিয়া কাজ করে -যা পরিশুদ্ধি আনে ব্যক্তির জীবনে। সে পরিশুদ্ধি না এলে বুঝতে হবে নামাযে ত্রুটি আছে। এবং ত্রুটি কোথায়, সেটি বুঝতে হলে নামাযকে মিলিয়ে দেখতে হয় সাহাবীদের নামাযের সাথে। কারণ, তাঁরাই হলেন নামাযসহ সকল ইবাদত-বন্দেগীর অনুকরণীয় মডেল। নামাযের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ শুধু ক্বিয়াম, রুকু, সিজদা বা বৈঠক নয়। স্রেফ সুরা পাঠ, তাশাহুদ পাঠ, দরুদ ও তাসবিহ পাঠও নয়।  বরং সেটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে নামাযীর মনের সংযোগ। এবং সে সংযোগটি ঘটে তাঁর রহমত, কুদরত, ফজিলত ও আয়াত সমূহের স্মরণের মধ্য দিয়ে। সুরা বাকারা’য় বলা হয়েছে, “ফাযকুরুনি আযকুরুকুম” অর্থ: “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো।” এটি বান্দার প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ঘোষিত পবিত্র ওয়াদা। আর ওয়াদা পালনে তাঁর চেয়ে আর কে শ্রেষ্ঠ হতে পারে? সুরা যুখরুফে বলা হয়েছে, কারো মন থেকে যখন আল্লাহতায়ালার স্মরণ বিলুপ্ত হয় তখন তার উপর শয়তান নিযুক্ত করে দেয়া হয়। এবং সে শয়তান তাকে জাহান্নামে নেয়। সুরা হাশরে বলা হয়েছে যারা মহান আল্লাহতায়ালাকে ভূলে থাকে তাদের জীবন থেকে ভূলিয়ে দেয়া হয় নিজেদের  কল্যাণের বিষয়গুলি। নামাযের মুল কাজ তো ঈমানদারের মনে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণকে জাগ্রত করা। সেটি শুরু হয় নামাযের আযান ও ওযু থেকে। নামাযে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণের মাধ্যমে ঈমানদার নিজেও স্থান করে নেয় মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণে। এটিই তো নামাযের শ্রেষ্ঠ দান।

কিন্তু নামাযীর মন থেকে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ বিলুপ্ত হলে কি সে নামাযের কোন মূল্য থাকে? সেটি তো মনের এক চেতনাহীন বেহাল অবস্থা। সেরূপ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পবিত্র কুর’আনে  বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ, তোমরা মাদকাসক্ত অবস্থায় নামাযের নিকটবর্তী হয়োনা -যতক্ষণ না তোমরা যা পড় তা বুঝতে না পারো…”। –(সুরা নিসা, আয়াত ৪৩)। উপরুক্ত আয়াতে রয়েছে চিন্তা-ভাবনার এক গুরুতর বিষয়। আয়াতটি যখন নাযিল হয়, মদ তখনও হারাম হয়নি। ফলে নবীজী (সা:)’র অনেক সাহাবী মাতাল অবস্থায় মসজিদে হাজির হতেন। মদপানের কুফল হলো, এতে বিলুপ্ত হয় চিন্তা-ভাবনার ক্ষমতা। তখন নামাযীর মন থেকে বিলুপ্ত হয় মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ। এবং বিলুপ্ত হয় মহান মা’বুদের সাথে বান্দার মনের সংযোগ। ফলে নামাযে পবিত্র কুর’আন থেকে যা কিছু তেলাওয়াত হয় -তাতে মনযোগ দেয়া তখন অসম্ভব হয়। তখন অসম্ভব হয় চেতনায় জাগরন বা পরিশুদ্ধি। আর চেতনায় পরিশুদ্ধি না আসলে চরিত্রে পরিশুদ্ধি আসবে কীরূপে? অথচ কুর’আন নিজেই যিকরের কিতাব। সে যিকরের সাথে নিজেকে জড়িত করতে তো যিকির রত মন চাই। সুরা ক্বাফে বলা হয়েছে, “ইন্না ফি যালিকা লা যিকরা লিমান কানা লাহু ক্বালবুন আও আলকাস সাময়া ওয়া হুয়া শাহীদ।” অর্থ: নিশ্চয়ই এ কিতাব (কুর’আন)’র মধ্যে রয়েছে যিকর; (এবং সেটি) তাদের জন্য যাদের রয়েছে ক্বালব এবং যারা কাজে লাগায় শ্রবনশক্তিকে এবং সাক্ষ্য দেয় সত্যের পক্ষে। –(সুরা ক্বাফ, আয়াত ৩৭)। অর্থাৎ কুর’আন থেকে শি্ক্ষা নিতে চাই জাগ্রত ক্বালব, তীক্ষ্ণ শ্রবনশক্তি এবং সত্যকে সত্য রূপে দেখার দৃষ্টিশক্তি। মাদক-সেবন এর সবগুলিই কেড়ে নেয়। ফলে ব্যহত হয় সুস্থ্য বিবেক নিয়ে ও প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। পবিত্র জায়নামাযে নামাযীর এরূপ মাদকাসক্তি ও মনযোগহীনতা মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহাতায়ালার কাছে ভাল লাগেনি। তাই হুকুম দিয়েছেন মাদকাসক্ত চেতনাহীনতা নিয়ে নামাযে না দাঁড়াতে।

শ্রেষ্ঠ যিকর

মু’মিনের উত্তম যিকর হলো তাঁর নামায। এরূপ পবিত্র যিকির পীরের খানকায়, সুফি হালকায় বা বনে-জঙ্গলে সম্ভব নয়। তাই পবিত্র কুর’আনে  সে সব খানকায়, হালকায় ও বনে-জঙ্গলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি। বরং নির্দেশ এসেছে নামাযে ছুটে যাওয়ার। সুরা জুম্মায়াতে বলা হয়েছে, “যখন জুম্মার দিনে নামাযের জন্য ডাকা (আযান দেয়া) হয়, তখন তোমরা আল্লাহর যিকিরে ( অর্থাৎ নামাযে) ছুটে যাও।” নামায ঈমানদারকে প্রতিদিন ৫ বার সে যিকরে হাজির করে। ঈমানদার ব্যক্তি এভাবে শুধু নিজেই মহান আল্লাহতায়ালার যিকর করে না, বরং অন্ততঃ দিনে ৫ বার মহা প্রভুর স্মরণে জায়গা করে নেয়। এভাবেই গড়ে উঠে মা’বুদের সাথে বান্দার গভীর সম্পর্ক।

বস্তুত প্রতিটি ইবাদতই হলো মহান আল্লাহতায়ালার যিকর। রোযার যিকর হয় সমগ্র দিন ব্যাপী; এবং সেটি সমগ্র রমযানের মাস জুড়ে। হজ্জে সে যিকর চলে হজ্জের ইহরাম বাধাকালীন সময়ে। মহান আল্লাহতায়ালার যিকর তখনও হয় যখন বান্দা যাকাত দেয়। এদিক দিয়ে নামায অনন্য; যিকরের আয়োজন হয় কম পক্ষে দিনে ৫ বার এবং চলে আমৃত্যু। যারা তাহাজ্জুদ ও নফল নামায পড়ে -তাদের জীবনে যিকরের মাত্রা আরো অধিক ও দীর্ঘ। অপর দিকে একমাত্র নামাযেই যিকরের কিতাব তথা পবিত্র কুর’আন থেকে পাঠ করাটি বাধ্যতামূলক; রোযা, হজ্জ বা যাকাতের ন্যায় অন্য কোন ইবাদতে সে হয়না।

সর্বকালে ও সর্বজনপদে মানবের মনে যিকর তথা ধ্যানমগ্নতাকে প্রতিষ্ঠা দেয়াই হলো মহান আল্লাহতায়ালার নীতি। কারণ এ যিকরই দেয় জান্নাতের পথে চলার আগ্রহ। দেয় সত্য পথের সন্ধান। এবং মজবুত করে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে বন্ধন। সে যিকর প্রতিষ্ঠায় প্রতি যুগেই নামায গণ্য হয়েছে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম রূপে। তাই হযরত মূসা (সা:)’র সাথে প্রথম বাক্যালাপেই তাঁকে যে নির্দেশটি দেন সেটি হলো নামাযের। হযরত মূসা (সা:)’র সাথে মহান আল্লাহতায়ালার প্রথম বাক্য বিনিময় হয় পবিত্র তুয়া উপত্যাকায়। নিজ পরিবারকে নিয়ে তখন তিনি মিশরে ফিরছিলেন। হযরত মূসা (সা:)কে নির্দেশ দেয়া হয়, “নিশ্চয় আমিই আল্লাহ এবং আমি ছাড়া আর কোন ইলাহা নাই। অতএব আমার ইবাদত করো এবং প্রতিষ্ঠা দাও নামাযকে –যাতে আমার যিকর করতে পার।” –(সুরা ত্বাহা, আয়াত ১৪)।  

নামাযে যিকরের মূল ভূমি হলো কুর’আনে র আয়াত। নামাযীর মনের গভীরে মহান আল্লাহাতায়ালা তাঁর পবিত্র বাণীগুলি গেঁথে দেন পবিত্র কুর’আনের আয়াতগুলির মাধ্যমে। নামাযীর চেতনার সাথে হয় মহাপ্রভুর সংলাপ। তখন ধ্যানমগ্ন হয় নামাযীর মন। কিন্তু ধ্যানের সে সামর্থ্য মাতাল ব্যক্তির অবচেতন মনের থাকে না। তখন ব্যর্থ হয় নামাযের মূল উদ্দেশ্য। সে ব্যর্থতা থেকে বাঁচাতেই মদ পান করে নামাযে আসা হারাম। এবং পরবর্তীতে পুরাপুরি হারাম ঘোষিত হয় মদ্যপান। তবে দুর্ভাবনার আরেকটি গুরুতর কারণ হলো, মানব মনের যিকরের সে সামর্থ্যটি শুধু মদই কেড়ে নেয়, একই ভাবে কেড়ে নেয় কুর’আন বুঝার অক্ষমতাও। তখন নামায ব্যর্থ হয় নামাযীর জীবনে কাঙ্খিত চারিত্রিক বিপ্লব আনতে।

তাই কত কোটি লোক নামায পড়লো সেটিই বড় কথা নয়। কতজন দুর্বৃত্তকে নামায চরিত্রবান করলো, কতজনকে ফিরালো পাপকর্ম থেকে এবং কতজনকে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার মুজাহিদে পরিণত করলো -সেটিই মূল কথা। এক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলির কোটি কোটি নামাযীর ব্যর্থতাটি বিশাল। ব্যর্থতার দলিল হলো: নামায পড়েও কোটি কোটি মানুষ মিথ্যা বলছে, ঘুষ খাচ্ছে, সূদ খাচ্ছে, দুর্নীতি করছে এবং শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে রাজনীতিও করছে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলি রেকর্ড গড়ছে দুর্বৃত্তিতে। এক্ষেত্রে ব্যর্থতাটি নামাযের নয়, বরং যারা নামায পড়ে তাদের। নামাযী ব্যর্থ হচ্ছে নামাযে দাঁড়িয়ে ধ্যানমগ্ন হতে। নামাযী ব্যর্থ হচ্ছে নামাযে দাঁড়িয়ে নিজ জীবনের হিসাব নিতে। এরূপ ব্যর্থতার মূল কারণ, নামাযীদের কুর’আন বুঝার অক্ষমতা। মদের প্রভাব কয়েক ঘন্টায় শেষ হয়। কিন্তু কুর’আন বুঝার ক্ষেত্রে যে অক্ষমতা, সেটি ব্যক্তিকে অক্ষম রাখে আমৃত্যু। এ অক্ষমতা ডেকে আনে মানব জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক ব্যর্থতা।সেটি জাহান্নামে পৌঁছার। ঈমান পুষ্টি পায় পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান থেকে। তাই মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো কুর’আন বুঝার সক্ষমতা অর্জন। এজন্যই নামায-রোযার পূর্বে কুর’আনে র জ্ঞান লাভ ফরজ করে হয়েছে। সে ভয়ানক ব্যর্থতা থেকে বাঁচতেই মিশর, ইরাক, সিরিয়া, সূদান, মরক্কো, আলজিরিয়া, লিবিয়া, মালি, তিউনিসিয়ার ন্যায় বহু দেশের জনগণ মাতৃভাষাকে দাফন করে কুর’আনের ভাষাকে আপন করে নেয়। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, ভাষাপ্রেম তাদের জান্নাতে নিবে না। বরং জান্নাতে নিবে কুর’আনের জ্ঞান।           

মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান হলো পবিত্র কুর’আন। এ কুর’আনই দেখায় জান্নাতের পথ। দেয় সভ্যতর ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের রোডম্যাপ। কুর’আনে র কারণেই নামাযের শ্রেষ্ঠত্ব। প্রতিটি নামাযীকে নামাযের প্রতি রাকাতে কুর’আনে র কিছু অংশ পাঠ করতে হয়। নইলে নামাযই হয় না। নামাযের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো ক্বিয়াম অর্থাৎ জায়নামাযে দাঁড়ানো থাকাকালীন সময়। এ সময়টিতে কুর’আন থেকে কিছু পাঠ করা হয়। কুর’আন পাঠের সে কাজটি রুকু, সিজদা বা বসাকালীন সময়ে হয় না। তাই যে নামাযে দীর্ঘ সময় ক্বিয়ামে কাটানো হয় -সে নামাযের ওজন অধিক। নামাযের সাথে কুর’আনে র গভীর সম্পর্কের বর্ণনাটি এসেছে সুরা আরাফে। বলা হয়ছে, “এবং যারা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলো কুর’আনকে এবং প্রতিষ্ঠা দিল নামাযকে, নিশ্চয়ই আমরা (এরূপ) সৎকর্মশীলদের প্রতিদানকে নষ্ট করিনা।”–(আয়াত ১৭০)। একই রূপ বর্ণনা এসেছে সুরা আনকাবুতে। বলা হয়েছে, “(হে মুহম্মদ), তোমার উপর ওহী রূপে যা নাযিল করেছি তা পাঠ করো কিতাব থেকে (অর্থাৎ কোরআনকে) এবং প্রতিষ্ঠা দাও নামাযকে। নিশ্চয়ই নামায বাঁচায় ফাহেশা (অশ্লিলতা, জ্বিনা, পাপাচার) ও দুর্বৃত্তি থেকে। এবং নিশ্চয়ই আল্লাহর যিকরই সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম। এবং আল্লাহ জানেন যা কিছু তোমরা করো। –(সুরা আনকাবুত, আয়াত ৪৫)। উপরুক্ত দুটি আয়াতে  পবিত্র কুর’আন এবং নামাযে কুর’আন পাঠের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দিনের অন্য সময়ে কুর’আন পাঠের সুযোগ না মিললেও সেটিকে ৫ বার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে নামাযে সুরা তেলাওয়াতের মাধ্যমে। রোগের ভ্যাকসিন নিলে সে রোগ থেকে বাঁচা যায়। তখন শরীরে বাড়ে রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা। কুর’আনের জ্ঞান ব্যক্তির চেতনা রাজ্যে তেমনি এক ভ্যাকসিনের কাজ করে। তখন বাড়ে দুষ্ট মতবাদ, মিথ্যা ও ফাহেশার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা। ফলে যে ব্যক্তি কোর’আন বুঝার সক্ষমতা নিয়ে প্রতিদিনে ৫ ওয়াক্ত নামায আদায় করে সে বাঁচে সকল প্রকার অশ্লিলতা, জ্বিনা, মিথ্যাচার, পাচার ও দুর্বৃত্তি থেকে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়েছে মিরাজের পর অর্থাৎ হিজরাতের মাত্র এক বা দেড় বছর আগে। প্রশ্ন হলো, এর আগে প্রায় ১১ বছর যাবত মক্কায় অবস্থান কালে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ কি করতেন? সে সময় কি ছিল তাঁদের ইবাদতের ধরণ? সে সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি ছিল পবিত্র কুর’আন পাঠ তথা কুর’আনের জ্ঞানার্জন। জ্ঞানই গড়ে চেতনা ও চরিত্র। অজ্ঞ ও জ্ঞানী ব্যক্তির চেতনা-চরিত্র কখনোই একই রূপ হয়না। সাহাবায়ে কেরাম যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব গড়ে উঠতে পরেছিলেন তার মূলে ছিল পবিত্র কুর’আনের গভীর জ্ঞান। নবুয়ত লাভের পর প্রথম যে কয়েকটি সুরা নাযিল হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম হলো সুরা মুজাম্মিল। এ সুরায় নবীজী (সা:)’র উপর নির্দেশ এসেছে যেন তিনি রাতের অর্ধেক অংশ বা তার চেয়ে কিছু বেশী বা কম অংশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পবিত্র কুর’আন থেকে আস্তে আস্তে তেলাওয়াত করেন। সাহাবাগণও সেটিই করতেন। ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজ হওয়ার পূর্বে ১১ বছর ধরে সে কাজ অবিরাম ভাবে চলতে থাকে। এভাবেই সাহাবাদের হৃদয়ে গভীর ভাবে স্থান করে নেয় পবিত্র কুর’আনে র জ্ঞান। সে জ্ঞানের উপর নির্মিত হয় তাদের বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও চারিত্রিক কাঠামো। এভাবে তারা বেড়ে উঠেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে।

যে নামায কল্যাণ আনে

নামায মুসলিম জীবনে কল্যাণ দিবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আজকের মুসলিম জীবনে নামাযের সে কল্যাণ কতটুকু? বাস্তবতা হলো, কোটি কোটি মানুষ নামায পড়লেও সবার নামায একই রূপ হয় না। সকল নামাযীর চেতনায় ও চরিত্রে একই রূপ বিপ্লবও আসে না। বরং অনেক নামাযীর জীবনে আসে মারাত্মক স্খলন। নামাযকে সফল করতে হলে যত্নবান হতে হয় নামাযের প্রতিটি ধাপে। প্রতি ওয়াক্ত নামাযের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট সময়; খেয়াল রাখতে হয় ওয়াক্তের দিকে। যেমন বলা হয়েছে, “নামায নির্দিষ্ট সময়ে আদায়ের জন্য মু’মিনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” –(সুরা নিসা, আয়াত ১০৩)। তবে জরুরি শুধু নির্দিষ্ট সময়ই নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো নামাযের জন্য নির্দিষ্ট স্থান মসজিদে গিয়ে নামায আদায়। এজন্যই জরুরি হলো, নামাযের আযান শুনে মসজিদের দিকে ধাবিত হওয়া। তাই মসজিদে নামায পড়া ও সঠিক ওয়াক্তে নামায পড়ার ক্ষেত্রে যারা গাফেল -তাদের রোগটি ঈমানে।

হাদীসে বলা হয়েছে, “যখন কোন মু’মিন ব্যক্তি নামাযের জন্য মসজিদ অভিমুখে রওয়ানা দেয়, তখন থেকেই সে নামাযে দাখিল হয়ে যায়। এবং প্রতি কদমে বৃদ্ধি করা হয় তার মর্যাদা। এবং মসজিদে গিয়ে নামাযের অপেক্ষায় বসে থেকেও সে নামাযের সওয়াব পায়।” মসজিদে নামায আদায়ের সওয়াব ঘরে নামায আদায়ের চেয়ে ২৭ গুণ অধিক। এমন কি অন্ধ ও পঙ্গুদেরও মসজিদে গিয়ে নামায আদায়ের উৎসাহ দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মকতুম (রা:) ছিলেন অন্ধ। তিনি নবীজী (সা:)কে বল্লেন, “আমি তো চোখে দেখিনা, ফলে মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করা কঠিন। আমি কি অনুমতি পেতে পারি ঘরে নামায পড়ার?” নবীজী (সা:) জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি ঘর থেকে আযান শুনতে পান?” বল্লেন, “হাঁ, আমি আযান শুনতে পাই।” নবীজী (সা:) বল্লেন, “তবে আপনাকে মসজিদে এসেই নামায পড়তে হবে।” –(আবু দাউদ শরীফ)। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণীত হাদীস: নবীজী (সা:)  বলেন, “আমার ইচ্ছা হয়, জ্বালানী কাঠ সংগ্রহের নির্দেশ দেই্। এরপর আযানের পর কাউকে ইমামতির দায়িত্ব দিয়ে ঐসব লোকদের বাড়ীতে যাই যারা মসজিদে নামাযে আসেনি এবং তাদের ঘরগুলি জ্বালিয়ে দেই।”–(বুখারী ও মুসলিম শরীফ)। আবু দাউদ শরীফের হাদীস: “যদি কোন মহল্লায় তিন জন মুসলিমও বাস করে তবে তাদের উচিত জামায়াতবদ্ধ ভাবে নামায আদায় করা।

তাছাড়া মসজিদে নামায আদায়ে মনের যে একাগ্রতা ও ধ্যানমগ্নতা থাকে -তা ঘর, অফিস বা দোকানের নামাযে থাকে না। কারণ, ঘর, অফিস ও দোকানে অন্যদের শোরগোল, কথা-বার্তাসহ দৃষ্টি কেড়ে নেয়ার মত অনেক কিছুই থাকে। ফলে সেখানে থাকে না যিকিরের পরিবশে। কিন্তু মসজিদ সাঁজানো হয় নামাযের জন্য। তাছাড়া মসজিদে বসে অন্যের নামায দেখে শেখারও অনেক কিছু থাকে। নামাযরত পাশের ব্যক্তির একাগ্রতা, ধ্যানমগ্নতা ও দীর্ঘ রুকু-সেজদা দেখে নিজের মনেও ভাল নামায আদায়ের আকাঙ্খা জাগে। তাছাড়া নেকড়ের পাল যেমন বিশাল মহিষকে একাকী পেলে ঘিরে ধরে, তেমনি ঈমানদারকে একাকী পেলে ঘিরে ধরে শয়তানও। তখন বান্দাহর উপর শয়তানের বিজয় সহজ হয়ে যায়।

 

মুসলিমের মিশন ও নামায

ইসলাম শুধু ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি চায় না। পরিশুদ্ধি চায় সমাজ ও রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতেও। চায়, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে চায়, ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। সেরূপ একটি প্রকল্পকে বিজয়ী করতে প্রতিটি ঈমানদারকে তাই অভিন্ন ভিশন ও মিশন নিয়ে বাঁচতে হয়। মুসলিমের মিশন তো তাই যা মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন। পবিত্র কুর’আনে  ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার সে পবিত্র ভিশনটি হলো “লি’ইউযহিরাহু আলাদ্দিনি কুল্লিহি” অর্থাৎ সকল দ্বীনের উপর তাঁর দ্বীন তথা ইসলামের বিজয়। ঈমানদারের দায়বদ্ধতা হলো সে ভিশন নিয়ে বাঁচা। ফলে মুসলিমের বাঁচার মিশনে লড়াই তখন অনিবার্য হয়ে পড়ে। কারণ, ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলে যে ভূমি সেটি তারা বিনা যুদ্ধে ছাড়তে রাজী নয়। ফলে জিহাদ ছাড়া মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন নিয়ে সামনে এগুনোর আর কোন রাস্তা থাকে না। এবং যেখানেই যুদ্ধ,  সেখানে দুর্গ, সৈন্য ও সৈন্যের প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। মসজিদ হলো সেই দুর্গ, প্রতিটি নামাযী হলো সেই সৈনিক এবং ৫ ওয়াক্ত নামায হলো সেই প্রশিক্ষণ।

প্রশিক্ষণের অর্থ শুধু সামরিক কলাকৌশল শেখানো নয়, বরং মূল বিষয়টি হলো ইসলামের বিজয়ে জান, মাল, মেধাসহ সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগে নামাযীকে প্রস্তুত করা। এবং লক্ষ্য, নামাযীদের মাঝে সিসাঢালা দেয়ালসম অটুট ঐক্যের প্রতিষ্ঠা দেয়া। অতীতে মুসলিমগণ যখন একের পর বিজয় এনেছে, তখন মসজিদ ছাড়া তাদের কোন দুর্গ বা ক্যান্টনমেন্ট ছিল না। নামায ছাড়া তেমন নিয়মিত কোন প্রশিক্ষণও ছিল না। মসজিদের জায়নামাযে বসে জিহাদের প্রস্তুতি নেয়া হতো। তখন রাজস্বের সিংহভাগ খরচ করে কোন সেনাবাহিনী পালতে হয়নি। নামাযীগণ তখন নিজ অর্থ, নিজ খাদ্য, নিজ বাহন ও নিজ অস্ত্র নিয়ে রণাঙ্গণে হাজির হতো। তারা সেটিকে জান্নাতে প্রবেশের বাহন মনে করতো। মুসলিমদের মাঝে একতা, শৃঙ্খলা, আত্মনিয়োগ ও কোরবানীর সে সামর্থ্য গড়ে উঠেছিল নামাযের জায়নামাযে। আজ মুসলিম দেশগুলিতে বিপুল অর্থব্যায়ে ক্যান্টনমেন্টের সংখ্যা বেড়েছে, সৈন্য সংখ্যা ও তাদের প্রশিক্ষণের আয়োজনও বেড়েছে। কিন্তু তাতে বিজয় বাড়েনি বরং বেড়েছে পরাজয়। বরং বহু মুসলিম দেশে এ সৈনিকেরা পরিণত হয়েছে দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকচক্রের সেবাদাসে।

অন্য ধর্মের অনুসারিগণ ক্লাবে বা মদ্যশালায় বন্ধুত্ব গড়ে ও জোটবদ্ধ হয়। ইসলাম ভাতৃত্বের বন্ধন গড়ে মসজিদের পবিত্র মেঝেতে। জায়নামাযে ভাষা, গোত্র, বর্ণ ও এলাকাভিত্তিক কোন বিভক্তি থাকে না। সব নামাযীকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাতার বাঁধতে হয়। হাদীসে বলা হয়েছে, কাতারে ফাঁক থাকলে সেখানে শয়তান ঢুকে পড়ে। এবং জামাতবদ্ধ হওয়ার এ রীতি শুধু জায়নামাযে সীমিত রাখলে চলে না, সেরূপ একতাকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গণেও প্রতিষ্ঠা দিতে হয়। প্রতিষ্ঠা দিতে হয় রণাঙ্গণে। জামাতবদ্ধ নামাযের সেটিই তো গুরুত্পূর্ণ  শিক্ষা। মুসলিম মনে এমন একটি প্যান-ইসলামিক চেতনা বলবান হলে মুসলিমদের ভূগোলের আয়োতন বাড়লেও তখন ভূগোল খন্ডিত হয় না।

কিন্তু আজ মুসলিম উম্মাহর মাঝে যে বিভক্তি, তা দেখে নিশ্চিত বলা যায়, নামায থেকে তারা কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেনি।  তাদের নামায ব্যর্থ হয়েছে তাদের মাঝে সীসাঢালা দেয়ালসম একতা গড়তে। ফলে মুসলিম উম্মাহ আজ ৫৭টি রাষ্ট্রে খন্ডিত। অথচ বিভক্তি গড়া যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো বিভক্ত মানচিত্র নিয়ে বাঁচা। এবং পবিত্র ইবাদত হলো বিভক্তির দেয়াল ভেঙ্গে একতা গড়া –সেটি যেমন রাজনৈতিক তেমনি ভৌগলিক। মুসলিম রূপে বাঁচায় শুধু পানাহার হালাল হলে চলে না, হালাল হতে হয় দেশের ভৌগোলিক মানচিত্রও। পরিতাপের বিষয় হলো আজকের মুসলিমগণ বাঁচছে হারাম মানচিত্র নিয়ে। মুসলিম মানচিত্রের ভিত্তি হতে হবে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব; ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতা ভিত্তিক বিভক্তি নয়। নবীজী (সা:) তাঁর সাহাবাদের যুগে কি এরূপ বিভক্ত মানচিত্র গড়ার কথা ভাবা যেত? অথচ তাদের গড়া সে বিশাল ভূগোল ভেঙ্গে ৫০টির বেশী বাংলাদেশ গড়া যেত। কিন্তু তারা সেরূপ হারাম মানচিত্র নির্মাণের পথে পা বাড়াননি। আজকের মুসলিমগণ মুসলিম বিশ্বের ভৌগলিক আয়োতন এক ইঞ্চিও বাড়ায়নি, বরং বাড়িয়েছে রাষ্ট্রের সংখ্যা। বিভক্তির সে হারাম কাজে ঘটেছে গভীর রক্তপাত এবং ডেকে আনা হয়েছে কাফের শত্রুদের -যেমনটি ১৯১৭ সালে আরবভূমিতে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। মুসলিমদের আজকের পরাজয় ও পতনের মূল কারণ তো এই বিভক্তির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা হারাম মানচিত্র। আর হারাম নিয়ে যখন বসবাস তখন কি মহান আল্লাহতায়ালার রহমত পাওয়া যায়? তখন যেটি জুটে সেটি তো আযাব –সে হুশিয়ারিটি শোনানো হয়েছে সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। কিন্তু তা নিয়ে ভ্রুক্ষেপ ক’জনের? বাংলাদেশীদের উপর আযাবের সে দৃশ্যমান হাতিয়ার হলো ভারত; এবং ইসরাইলের হাতে সে আযাব পাচ্ছে আরবগণ।

যে নামায আযাব ডেকে আনে

নামায শুধু ঈমাদারগণই পড়ে না। মুনাফিকগণও পড়ে। মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন মু’মিনদের নামাযে এবং প্রচন্ড অখুশি হন মুনাফিকদের নামাযে। নামায তখন সওয়াবের বদলে আযাব ডেকে আনে। তাই শুধু নামায পড়লেই চলে না, নজর রাখতে হয় নামায যেন মুনাফিকের নামাযে পরিণত না হয়। কি ধরণের নামায মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ধ্বংস ও অভিসম্পাত ডেকে আনে -সে বিষয়টি জানানো হয়েছে সুরা মাউনে। বলা হয়েছে, “ফা ওয়াইলুল্লিল মুছাল্লীন। আল্লাযীনা হুম আন সালাতিহিম সা’হুন। আল্লাযীনা হুম ইউরাউন।” অর্থ: “অতঃপর ধ্বংস ঐসব নামাযীদের জন্য -যারা অমনযোগী বা দেরী করে নামায আদায়ে। তারা নামাযে খাড়া হয় লোক দেখানোর জন্য।”- (সুরা মাউন, আয়াত ৪-৬)।

নামায না পড়লে গর্দান থেকে ইসলামের রশি ছিন্ন হয়ে যায়। নবীজী (সা:)র জামানায় নামায গণ্য হতো মুসলিমের মূল পরিচিতি রূপে। যারা নামায পড়তো না, তারা গণ্য হতো কাফের রূপে। মুসলিম সমাজে কাফের রূপে পরিচিত হওয়ার বিপদ বুঝে মুনাফিকগণও তখন নামাযকে বেছে নিত ঢাল রূপে। তারা শুধু নামাযই পড়তো না, বরং নবীজী (সা:)র পিছনে প্রথম কাতারে হাজির হতো। লোক-দেখানো সে নামাযের মধ্য দিয়ে তারা মুসলিমদের ধোকা দিত। এবং ধোকা দিত মহান আল্লাহতায়ালাকেও। নামায নিয়ে মুনাফিকদের সে ষড়যন্ত্রকে ফাঁস করেছে সুরা নিসা। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই মুনাফিকগণ আল্লাহকে ধোকা দেয়, আসলে তিনিই (আল্লাহ) তাদেরকে ধোকা দেন। এবং যখন তারা নামাযে দাঁড়ায়, দাঁড়ায় আলস্য নিয়ে এবং লোক-দেখানোর উদ্দেশ্য। আল্লাহকে তারা সামান্যই স্মরণ করে।” –(আয়াত ১৪২)।

তাই নামায বা অন্য কোন নেক আমল করলেই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তা গৃহিত হবে -বিষয়টি তেমন সহজ সরল নয়। নেক আমল কবুলের কিছু শর্ত আছে। সে শর্তের কথা শুনানো হয়েছে সুরা তাওবাতে। বলা হয়েছে, “তাদের দান আল্লাহর কাছে গৃহিত হওয়া থেকে কোন কিছুই বাধা দেয় না -একমাত্র এছাড়া যে, তারা অস্বীকার করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে, নামাযে দাঁড়ায় আলস্য নিয়ে এবং দান করে অনিচ্ছা নিয়ে।” –(আয়াত ৫৪)। ইবাদত রূপে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে নামাযীকে তাই জায়নামাযে দাঁড়াতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি গভীর আত্মনিবেদন ও আত্মসমর্পণ নিয়ে। পবিত্র কুর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “নিশ্চয়ই কামিয়াবী মু’মিনদের জন্য। যারা নামাযে আত্মনিবেদিত।”–(সুরা মু’মিনুন, আয়াত ১-২)। এবং সে আত্মনিবেদন ও আত্মসমর্পণ শুধু নামাযে সীমিত রাখলে চলে না, প্রতিষ্ঠা দিতে হয় নামাযের বাইরেও। প্রকাশ ঘটাতে হয় পরিবার, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত ও ব্যবসা-বানিজ্যেসহ সর্বত্র। নইলে গাদ্দারী হয়। নামাযের সাথে সে নগ্ন গাদ্দারীটি ধরা পড়ে যখন রাজনীতিতে সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ ও স্বৈরাচার, অর্থনীতিতে সূদ, সংস্কৃতিতে অশ্লিলতা, অফিসে ঘুষ এবং আদালতে শরিয়তি আইনের বদলে কুফরি আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়।

 

নামায দেয় দোয়ার সুযোগ

দোয়া সর্বাবস্থায় করা যায়। চলতে ফিরতে, কর্মস্থলে, এমন কি বিছানায় শুয়েও মহান আল্লাহর দরবারে আরজী পেশ করা যায়। মু’মিনের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার দরবার সব সময় খোলা। তবে দোয়ার শ্রেষ্ঠতম সময় যেমন নামাযে, তেমনি নামায শেষে জায়নামাযে। নামায গড়ে আল্লাহতায়ালার সাথে সরাসরি সংযোগ। সে জন্য পীর বা দরবেশের মধ্যস্থতা লাগে না। মহান দয়াময়ের স্মরণের জায়গাতে নামায মু’মিনের জন্য স্থান করে দেয়। ফলে সৃষ্টি করে দোয়া কবুলের যথার্থ পরিবেশ। মহান আল্লাহতায়ালা চান, নামাযের মাধ্যমে তাঁর ঈমানদার বান্দাহ তাঁর দরবারে আবেদনটি পেশ করুক। এটিই হলো বান্দার জন্য নামাযের সবচেয়ে বড় দান। নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা ছবর ও নামাযের সাহায্যে সাহায্য চাও। নিশ্চ্য়ই আল্লাহ ধৈয্যশীলদের সাথে।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৩)। মহান আল্লাহতায়ালা থেকে মাগফিরাত লাভের এটিই হলো তাঁর নিজের দেখানো পথ। তাই দয়াময় রাব্বুল আ’লামীনের দরবারে দোয়া পেশের জন্য যেমন ছবর চাই, তেমনি চাই নামায। নামায ছেড়ে যারা পীরের মাজারে বা সুফি হালকায় দোয়া কবুলের জন্য ধর্না দেয়, তাদের জন্য এ আয়াতে রয়েছে চরম হুশিয়ারি।

দোয়ার গুরুত্ব কি, দোয়া কি ভাবে করতে হয় এবং কোন দোয়াটি শ্রেষ্ঠ সেটিও শিখিয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালা। সে শিক্ষাটি দেয়া হয়েছে সুরা ফাতেহা’তে -যা পাঠ করতে হয় নামাযের প্রতি রাকাতে। এ সুরা পাঠ না করলে নামাযই হয় না। তাই জরুরি শুধু সুরা ফাতেহা পাঠ নয়, বরং এ সুরার প্রতিটি বাক্যের অর্থ হৃদয়ে গভীর ভাবে ধারণ করা। সুরা ফাতেহা’র মূল বিষয় তিনটি। এক). প্রথমে বর্ণিত হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার মর্যাদা। বলা হয়েছে,“আল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন”।  অর্থ: সকল প্রশংসা একমাত্র মহান আল্লাহর। তিনিই “রাহমানির রাহীম”, তিনিই “মালিকি ইওয়ামিদ্দিন।” অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা হলেন সবচেয়ে দয়াময় এবং দয়া করাই তার নীতি। এবং তিনি রোজ হাশরের দিনের সর্বসময় কর্তা। দুই). দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এ সুরায় বর্ণিত হয়েছে তা হলো মুসলিম জীবনের মিশন। সে মিশনটি হলো: “ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা না’স্তায়ীন।” অর্থাৎ আমরা ইবাদত করি একমাত্র মহান আল্লাহর এবং একমাত্র আল্লাহ থেকেই আমরা সাহায্য ভিক্ষা করি। তিন). তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো দোয়া। এবং সে দোয়াটি হলো “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম”। অর্থঃ “(হে মহান আল্লাহ), আমাকে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের পথটি দেখান।” এটিই হলো মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া। যে ব্যক্তি সিরাতুল মুস্তাকীম পেল, সেই জান্নাত পেল। এর চেয়ে বড় পাওয়া সমগ্র মানব জীবনে আর কি হতে পারে? ধনসম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও সুঠাম স্বাস্থ্য তো কাফেরও পায়। কিন্তু তা কি জান্নাতে নেয়। যে ব্যক্তি ব্যর্থ হলো সিরাতুল মুস্তাকীম পেতে, সে পৌঁছে জাহান্নামে। এর চেয়ে বড় ক্ষতিই বা কি হতে পারে? নামায তাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি থেকে যেমন বাঁচতে শেখায়, তেমনি দেখায় সবচেয়ে বড় কল্যাণের পথ। নামায এভাবেই কাজ করে জান্নাতে চাবি রূপে। ১০/১২/২০২০।

 




বিবিধ ভাবনা (৪৪)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. বাংলাদেশে দুর্বৃত্ত শাসন ও অসভ্য রীতি

 যে কোন সভ্য দেশে চোরডাকাত-ভোটডাকাতদের ন্যায় দৃর্বৃত্ত ও অপরাধীদের জেলে বন্দী করা হয়। দেশকে অসভ্য ও অপরাধীদের হাত থেকে বিপদমুক্ত রাখা্র এটিই হলো সভ্য রীতি। কিন্তু বাংলাদেশে যা ঘটছে তা হলো সম্পূর্ণ উল্টো। এদেশে চোরডাকাত-ভোটডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীদের শাস্তি হয়না। তাদের জেলে নেয়া হয় না। ছাত্রলীগের জসিমুদ্দীন মানিক তাই জাহাঙ্গির নগর বিশ্বিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরি করেও কোন শাস্তি পায়নি। জেনারেল আজিজের ভাই খুনের অপরাধে জেলে গিয়েও বেকসুর মুক্তি পেয়েছে। বরং জেল হয়, হত্যা বা গুম করা হয় এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয় তাদের যারা চোরডাকাত-ভোটডাকাত দৃর্বৃত্তদের নিন্দা করে এবং রাজপথে তাদের নির্মূলের দাবী তুলে। আবরার ফাহাদ লাশ ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্টাটাস দেয়ায়। দেশ দখলে গেছে অপরাধীচক্রের সিন্ডিকেটের হাতে। তারা চায়, বাংলাদেশকে বিশ্বমাঝে সবচেয়ে অসভ্য দেশ বানাতে। এবং সে কাজে তারা সাফল্য যে বিশাল–সে প্রমাণও কি কম?

যে কোন সভ্য মানুষের স্বভাব হলো, অসভ্য ও দুর্বৃত্তদের নির্মূলে তাঁর আপোষহীন। অথচ অসভ্য সমাজে তাদের নির্মূল না করে প্রতিপালন দেয়া হয়। শেখ হাসিনার অপরাধ এক্ষেত্রে অতি ভয়ানক। সে শুধু গণতন্ত্রকেই কবরে পাঠায়নি, ভদ্র রীতি-নীতিকেও কবরে পাঠিয়েছে। দেশ পরিণত হয়েছে গহীন জঙ্গলে। জঙ্গলে যেমন হিংস্র পশুগণ নিরাপত্তা পায় ও প্রাণ হারাম নিরস্ত্র মানুষ, বাংলাদেশেও তেমনি নিরাপত্তা পায় হিংস্র দুর্বৃত্তগণ ও লাশ হয় আবরার ফাহাদগণ। আল জাজিরা ডক্যুমেন্টারী চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ ও তার ভাইদের খুনখারাবী ও দুর্বৃত্তির কাহিনী। কিন্তু সরকার কাউকেই শাস্তি দেয়নি। সে কাজে হাসিনা সরকারের সামান্যতম আগ্রহও নাই। জেনারেল আজিজ তার পদে এখনো আসীন। শাস্তি থেকে মুক্ত তার খুনি ভাইগণও। কোন সভ্য দেশে কি এরূপ অসভ্য রীতি আশা করা যায়?   

আওয়ামী বাকশালীদের সবচেয়ে জঘন্য নাশকতাটি এই নয়, তারা চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম-খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের ন্যায় দুর্বৃত্তিকেই প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। বরং সবচেয়ে বড় দুর্বৃ্ত্তি ও নাশকতাটি হলো, মানব সমাজে হাজার হাজার বছর ধরে যে অপরাধগুলি ঘৃণিত হয়ে আসছে -সে গুলিকে ঘৃণা করাও দন্ডনীয় অপরাধে পরিণত করেছে। ধ্বংস করেছে মানুষের বিবেকবোধকে। হিংস্র পশুরা প্রাণ সংহার করলেও এরূপ বিবেক হত্যা করে না। বাংলাদেশীদের সামনে মূল ইস্যু তাই স্রেফ গণতন্ত্র বাঁচানো নয়, বরং সেটি অসভ্যদের নির্মূলের।

২. জিহাদ কী? 

জিহাদ হলো অন্যায়ের নির্মূল (নেহী আনিল মুনকার) ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা (আ’মিরু বিল মারুফ) –পবিত্র কোর’আনে নির্দেশিত এ মিশন নিয়ে বাঁচার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। এটি হলো সকল অনৈসলামিক বিধান নির্মূল করে আল্লাহর শরিয়তি বিধানকে বিজয়ী করার আমৃত্যু লড়াই। এটি বস্তুত একটি রাষ্ট্রকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার যুদ্ধ। এরূপ জিহাদে ঈমানদারগণ বিনিয়োগ করে তাদের অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্তের। এটিই হলো নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের অনুসৃত ইসলাম। ব্যক্তির পরিশুদ্ধির জন্য ইসলামের প্রেসক্রিপশন হলো নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত। আর সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির জন্য প্রেসক্রিপশন হলো জিহাদ। তাই যে দেশে জিহাদ না্‌ই সে দেশে নামাযী, রোযাদার, হাজী, তাবলিগী ও মসজিদ-মাদ্রাসা বিপুল সংখ্যায় হলেও সে দেশ দুর্বৃত্তিতে ভরে যায়। বাংলাদেশে হলো তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

অনেকে যে কোন উত্তম কর্মে প্রচেষ্টা করাকে জিহাদ বলে। সেটি ঠিক নয়। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই অনেক কাফের, ফাসেক ও মুশরিকগণও করে। কিন্তু সেগুলি জিহাদ হয়না। জিহাদী হতে হলে প্রথমে ঈমানদার হতে হয়। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে জিহাদকে “জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর পথে জিহাদ বলে উল্লেখ করেছেন। কোন কিছু মহান আল্লাহতায়ালার পথে হওয়ার অর্থ, সে কর্মের মধ্যে থাকতে হবে তাঁর এজেন্ডাকে বিজয়ী করার নিয়েত। পবিত্র কোর’আনে এরূপ জিহাদের কথা বার বার বলা হয়েছে। জিহাদ ইসলামের কোন পৃথক স্তম্ভ নয়; বরং মিশে থাকে ঈমানের মাঝে। জিহাদ ঈমানের এতটাই অবিচ্ছদ্দ্য অঙ্গ যে, সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ঈমানের দাবীতে একমাত্র তারাই সাচ্চা যাদের মাঝে রয়েছে জান ও মালের জিহাদ।

তাই শুধু ঈমানের দাবী করলেই কেউ ঈমানদার হয়না, সাথে জিহাদও থাকতে হয়। এ নিয়ে সম্পূরক হাদীস রয়েছে নবীজী (সা:)’র। নবীজী (সা:)বলেছেন, যে ব্যক্তি জিহাদ করলো না, এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না, সে ব্যক্তি মুনাফিক। -(মুসলিম শরীফ)। তাই নবীজী (সা:)’র প্রত্যেক সাহাবার জীবনে জিহাদ ছিল এবং শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। সমাজে পরিশুদ্ধি এসেছিল জিহাদের বিনিময়ে। পবিত্র কোর’আনে এ ঘোষণাও বার বার দেয়া হয়েছে, “ঈমান এনেছি এ কথা বললেই কি ছেড়ে দেয়া হবে এবং পরীক্ষা নেয়া হবে না?” ঈমানের সে পরীক্ষাটি হয় জিহাদের ময়দানে। যারা জিহাদে শহীদ হয় তাদেরকে জীবিত বলা হয়েছে এবং বিনা হিসাবে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। তাই যে ইসলামে জিহাদ নাই সেটি নবীজী (সা:)’র ইসলাম নয়। সেটি ভন্ডদের বানাওয়াট ইসলাম।

৩. কোর’আনের মর্যাদা

মহান আল্লাহতায়ালা সন্তান-সন্ততি, পানাহার ও বিপুল সম্পদ কাফেরদেরও দেন। তবে মানব জাতির জন্য তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ দানটি হলো পবিত্র কোর’আন। এবং এ কোর’আন থেকে ফায়দা নেয়ার যোগ্যতা রাখে কেবল ঈমানদারগণ। কোন কিছুই জান্নাতে নিবে না, নিবে একমাত্র পবিত্র কোর’আন। পবিত্র কোর’আন হলো মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ভাষায় “হাবলিল্লাহ” তথা আল্লাহর রশি। যারা এ রশিকে আঁকড়ে ধরবে তাঁরাই পাবে জান্নাতের পথ। নইলে অনিবার্য হয় জাহান্নাম। তাই ঈমানদারদের উদ্দেশ্যে সুরা আল ইমরানে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “সবাই মিলে আঁকড়ে ধরো আল্লাহর রশিকে এবং পরস্পরে বিচ্ছন্ন হয়ো না।” কোর’আন আঁকড়ে ধরার অর্থ হলো কোর’আনের অনুসরণ।

এ বিশ্ব চরাচরে মহান আল্লাহতায়ালার অসংখ্য বিস্ময়কর সৃষ্টি। সেগুলি নিরবে সাক্ষ্য দেয় তাঁর অস্তিত্বের পক্ষে। এবং মহান আল্লাহতায়ালা নিজে কথা বলেন পবিত্র কোর’আনের মাধ্যমে। তাই যারা মহান আল্লাহতায়ালার প্রকৃত আশেক তারা কোর’আন থেকে তাঁর সে কথাগুলি বুঝার জন্য পাগল। কে জান্নাতে পথ পাবে এবং কে জাহান্নামে যাবে -তা নির্ভর করে কোর’আন বুঝা ও তা অনুসরণের উপর। মানব জীবনে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই ওহী নাযিল শুরু হওয়ার পর মুসলিমদের উপর কোর’আন বুঝাকে সর্বপ্রথম ফরজ করা হয়েছিল। নামায-রোযা ফরজ হয়েছিল তার ১১ বছর পর। তাই ইবাদত শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত নয়, সেটি কোর’আন বুঝাও। এবং বুঝতে হবে, মহান আল্লাহতায়ালা কি বলেন -তা না বুঝে তেলাওয়াতে জানা যায় না। ফলে তাতে জ্ঞানার্জনের ফরজও আদায় হয়না।

৪. তামাশা ইসলাম নিয়ে

 ইসলাম নিয়ে প্রচুর তামাশা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ওমুক দোয়া পাঠ করলে জান্নাতের ৮টি দরজা খুলে দেয়া হবে। স্রেফ দোয়া পাঠের মধ্যে জান্নাতপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি শোনানো হচ্ছে। রমযান মাসে সে কথাগুলো আরো বেশী বেশী শোনানো হয়। এটি এক বিশাল ব্যাপার। সেটি সত্য হলে সে বিশাল ঘোষণাটি আসা উচিত ছিল মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কোর’আনে। কিন্তু সে বিষয় নিয়ে পবিত্র কোর’আনে কোন ঘোষণাই নাই। অথচ দোয়া কবুলের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারায় বলা হয়েছে, মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দার দোয়া অবশ্যই শোনেন। তবে দোয়া করলেই তা কবুল হয় না এবং জান্নাতের দরজাও খুলে দেয়া হয়না। দোয়া কবুলের শর্ত হলো, দোয়াকারী বান্দা মান্য করবে তাঁর কোর’আনে ঘোষিত কথাগুলো। মহান আল্লাহতায়ালার কথা মান্য করার অর্থ, তাঁর বিধানকে নিজ জীবনে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা দেয়ায় আত্মনিয়োগ করা।

পবিত্র কোর’আনে তাই বার বার বলা হয়েছে, জান্নাত পেতে হলে জিহাদের ময়দানে জান ও মালের পরীক্ষায় অবশ্যই পাশ করতে হবে। প্রশ্ন হলো, স্রেফ দোয়া পাঠে কি জান ও মালের সে কাঙ্খিত পরীক্ষাটি হয়? তাছাড়া দোয়া কবুলের আগে দেখা হয়, কতটা মানা হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার কথাগুলো রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী, আদর্শে সেক্যুলারিস্ট, সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানী, অর্থনীতিতে সূদ-ঘুষ, আদালতে কুফরি আইন, ব্যবসার নামে বেশ্যাবৃত্তি এবং শিক্ষা-দীক্ষায় কোর’আন-বর্জন –এগুলি তো বিদ্রোহের আলামত। এরূপ বিদ্রোহীদের দোয়া কি মহান আল্লাহতায়ালা কখনো কবুল করেন? বিদ্রোহীদের জন্য যা বরাদ্দ তা তো আযাব ও অপমান।

তাছাড়া মুসলিম বিশ্ব জুড়ে দোয়া কি কম হচ্ছে? চোখের পানিও কি কম ফেলা হচ্ছে? প্রতি নামাযে দোয়া। রোযা কালীন দোয়া। হজ্জে গিয়ে দোয়া। প্রতি বছর ২০ লাখের বেশী মুসলিম চোখের পানি ফেলছে দোয়া কবুলের স্থান আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে। কিন্তু দোয়া কবুলের আলামত কই? দোয়া কবুল হলে কি মুসলিম ভূমি শত্রুদের হাতে অধিকৃত হতো? বিধ্বস্ত হতো কি মুসলিম নগর-বন্দর ও গ্রাম? নিহত, ধর্ষিতা ও নিজ ঘর থেকে বহিস্কৃত হতো কি মুসলিম নর-নারী?

৫. গাদ্দারী নিয়ামতের সাথে

 প্রতিটি মানুষকে মহান আল্লাহতায়ালা নানাবিধ সামর্থ্য দেন -যা দিয়ে সে নিজেকে জান্নাতের যোগ্য রূপে গড়ে তুলতে পারে। প্রকৃত বুদ্ধিমান তো তারাই যারা সে সামর্থ্যকে কাজে লাগায় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য। এবং সবচেয়ে বড় আহাম্মক হলো তারা্ যারা সে সামর্থ্যকে কাজে লাগায় অর্থপূজা, নেতাপুজা, দলপূজায়, পেশাপূজা ও দেশপূজায়। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া নিয়ামতের সাথে এর চেয়ে বড় গাদ্দারী আর কি হতে পারে? বস্তুত এরূপ গাদ্দারীই ব্যক্তিকে জাহান্নামের উপযোগী করে।

৬. ছোট লোকের ছোট ভাবনা

কে কতটা মহান ও ক্ষুদ্রতর –সেটি দেখা যায় তার বাঁচার এজেন্ডার দিকে নজর দিলে। ঈমানদার বাঁচে ইসলামকে বিজয়ী করার প্রবল বাসনা নিয়ে। সে কাজে সে তাঁর সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগ করে। কিন্তু যাদের জীবনে এরূপ মহান কিছু করার সামর্থ্য ও ইচ্ছা থাকেনা তাঁরাই বাঁচে অর্থপূজা, ব্যক্তিপূজা, ফেরকাপূজা ও দলপূজা নিয়ে। তারাই প্রচন্ড স্বার্থপর ও চিন্তা-চেতনায় ছোটলোক হয়। বাংলাদেশে এদের সংখ্যা বেশী। ফলে দেশটিতে ইসলামকে বিজয়ী করার কাজে জনবলের দারুন অভাব। এবং লোকবলের বড্ড অভাব স্বৈরাচারমুক্ত সভ্যতর সমাজ গড়ার কাজেও। এদের কারণে বিপুল হারে ভোটডাকাত, চোরডাকাত, গুন্ডা, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীর ভীড় দেখা দেয় হাসিনার ন্যায় স্বৈরাচারীর শিবিরে।  

৭. ঝান্ডা বিদ্রোহের

ঈমান ও মহান আল্লাহতায়ালার ভয় সুস্পষ্ট দেখা যায়। কোন মহিলার হৃদয়ে শরিষার দানা পরিমান আল্লাহর ভয় থাকলে -সে কি কখনো বেপর্দা হতে পারে? সে কি পারে দেহের নিষিদ্ধ স্থানগুলো জনসম্মুখে দেখাতে? বেহিজাবী তথা পর্দাহীনতা তো মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা। এরূপ বিদ্রোহীদের নামায-রোযার কি আদৌ মূল্য আছে? বিদ্রোহীদের স্থান তো জাহান্নামে।

ঈমানদারের লক্ষণ, সে গুরুত্ব দেয় নিজের খেয়াল-খুশির বদলে মহান আল্লাহতায়ালার বিধান মেনে চলাকে। এজন্যই ঈমানদার নারীগণ পর্দানশীন হয়। অথচ বেঈমানের কাছে গুরুত্ব পায় নিজের ইচ্ছার গোলামী। এরাই বেছে নেয় বেপর্দা হওয়ার পথ এবং তুলে নেয় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা। দেহ জুড়ে বিদ্রোহের এ প্রকাণ্ড ঝান্ডা দেখেও কি তাদের বেঈমানী নিয়ে কোন গবেষণার প্রয়োজন পড়ে? অথচ প্রতিটি মহিলাই হলো গৃহশিক্ষক। শিশুরা গড়ে উঠে তাদের হাতে। কিন্তু এদের কারণে মুসলিম দেশের কোটি কোটি ঘর পরিণত হয়েছে বিদ্রোহীদের ঘাঁটিতে। ফলে পরাজিত হচ্ছে ইসলাম এবং বিনা যুদ্ধে বিজয় বাড়ছে শয়তানের। ১৮/০৪/২০২১

 

 




বিবিধ ভাবনা (৪৩)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. অভাব সভ্য রুচির

বাঘ এক বারে মাত্র একটা শিকার ধরে। সেটি হজম করার পর আরেকটি ধরে। সে রীতি স্বৈরাচারি শাসকদেরও। তারাও একটা একটা করে রাজনৈতিক শত্রুদের ঘাড় মটকায়। ফ্যাসিবাদী হাসিনা তার শিকার ধরার কাজটি কর্নেল ফারুক ও তাঁর সাথীদের দিয়ে শুরু করেছিল। জামায়াত, বিএনপি ও হেফাজতের নেতাকর্মীগণ তখন হাসিনার রাজনৈতিক শত্রু নির্মূলের সে নিষ্ঠুর তান্ডবটি নীরবে দেখছিল। এরপর আসে জামায়াত নেতাদের ফাঁসীতে চড়ানোর পালা। তখন বিএনপি ও হেফাজতে নেতাকর্মীগণ সেটিকেও নীরবে দেখেছে। হয়তো তারা ভেবেছিল জামায়াত তো তাদের লোক নয়। অতএব তাদের নির্মূলে ক্ষতি কি? তাছাড়া বিএনপি নেতৃত্বে রয়েছে ভাষানীপন্থী বামদের প্রভাব। এ বামেরা কোনকালেই জামায়াতের বন্ধু ছিল না। এরপর এলো বিএনপি এবং হিফাজতের নেতা-কর্মীদের গুম ও খুন করার পালা। দেশের জনগণ সেটিকে নীরবে দেখেছে; স্বৈরাচার তাড়াতে তারা কখনোই রাস্তায় নামেনি। এখন হামলা হচ্ছে জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের উপর। ডাকাতি হয়ে গেল জনগণের ভোট এবং কবরে গেল গণতন্ত্র। প্লাবন এসেছে গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের। দেশ এখন দুর্বৃত্তদের জন্য আপদমুক্ত। তারা যা চায়, এখন বিনা বাধায় তা করতে পারে।

নেকড়ে যেমন কারো বন্ধু নয়, তেমনি স্বৈরাচারি দুর্বৃত্ত শাসকগণও কারো বন্ধু নয়। তারা সবার শত্রু। তাই মহল্লায় নেকড়ে ঢুকলে বিভক্ত হলে চলে না। তখন ঐক্যবদ্ধ ভাবে নেকড়ে বধ করতে হয়। স্বৈরাচারি শাসকগণ হিংস্র পশুর চেয়েও বেশী হিংস্র। পশু গণহত্য বা গণধর্ষণ করে না। কিন্তু মানবরূপী পশুগণ করে। তাই স্বৈরাচারি শাসক তাড়াতে সভ্য জনগণকে একতাবদ্ধ হতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতাটি বিশাল। ঘরবাড়ী থেকে আবর্জনা সরানোর জন্য সভ্য রুচি লাগে। তেমনি রুচি লাগে দুর্বৃত্তের শাসন থেকে মুক্ত হয়ে সভ্য দেশ গড়তে। বাংলাদেশীদের ব্যর্থতা এখানেই। সভ্য রুচি থাকলে তারা কি কখনো গণতন্ত্রের শত্রু বাকশালী মুজিবকে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা বলতো?  

২. তান্ডব গুন্ডা রাজত্বের

আল জাজিরা ডক্যুমেন্টারীতে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের ভাই খুনি হারিসকে বলতে শুনা গেল, “পুলিশই তো বড় গুন্ডা। পুলিশ থাকতে কি গুন্ডা লাগে?” ২৬ মার্চে মোদীর ঢাকায় আগমনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ মিছিল হয়। ব্রাহ্মনবাড়িয়া ও হাটহাজারীতে মিছিলের উপর বাংলাদেশের পুলিশ গুলী করে ২১ জনকে হত্যা করে। এভাবে প্রমান করে, খুনি হারিস পুলিশের চরিত্র নিয়ে যা বলেছে তা কতটা বাস্তব। বরং পুলিশ যে গুন্ডাদের চেয়েও বেশী গুন্ডা –সেটিও তারা প্রমাণ করেছে। তাদের কারণেই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নিরেট গুন্ডারাজত্ব। এবং গুন্ডারাজত্বে যা অসম্ভব হয় -তা হলো সভ্য ভাবে জীবন-যাপন। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনগণ রাজস্ব দেয় পুলিশবেশী নৃশংস গুন্ডা প্রতিপালনে।

৩. নিকৃষ্টতর পশুর চেয়েও

গরু-ছাগলের পানাহার হলেই চলে। পানাহার পেলে গলায় দড়ি নিয়ে বাঁচতে তাদের অসুবিধা হয়না। তখন দড়ি ছিঁড়তে্ তারা চেষ্টাও করেনা। অথচ সভ্য মানুষের পরিচয় তো এটাই, তারা শুধু পানাহার নিয়ে ভাবে না, ভোটের অধিকার ও স্বাধীন ভাবে কথা বলা ও লেখালেখির অধিকারও চায়। তবে মানুষ যখন গরুছাগলের পর্যায়ে পৌঁছে, তারাও তখন স্রেফ পানাহার নিয়ে ভাবে। গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকার নিয়ে তারা ভাবে না। এরূপ মানুষেরা গণতন্ত্র উদ্ধারে কখনো রাস্তায় নামে না। গরুছাগলের সংখ্যাবৃদ্ধিতে যেমন স্বৈরচারি শাসক বিপদে পড়ে না, তেমনি বিপদে পড়ে না এরূপ পশুচরিত্রের মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধিতে। বাংলাদেশে তাই জনসংখ্যা বাড়লে কি হবে, দুর্বৃত্তদের শাসন তাতে নির্মূল হয়নি। এবং বাড়েনি মানবিক অধিকার ও গণতন্ত্রচর্চা।

মানুষ গরুছাগলের স্তরে পৌঁ‌ছে চেতনাশূণ্যতার কারণে। স্বৈরাচারি শাসকদের মূল কাজ তাই জনগণের চেতনার আগ্রাসন করা। চেতনার ভূমি বিধ্বস্ত হলে জনগণ পরিনত হয় গরুছাগল বা তার চেয়েও নিকৃষ্ট জীবে। বাংলাদেশে চেতনা বিনাশের সে কাজটি এতই সফল ভাবে হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষক, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বহু বিচারপতি, সেনাবাহিনীর বহু জেনারেল এবং বহু বুদ্ধিজীবী ২০১৮ সালের ভোটডাকাতির নির্বাচনকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলে। গরুছাগলও কখনো এভাবে দুর্বৃত্তদের পক্ষ নেয় না। পবিত্র কোর’আনে এ ধরণের মানুষদেরকে গরুছাগলের চেয়েও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে। তাদের চরিত্র নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ভাষ্যটি হলো: “উলায়িকা কা’আল আনয়াম, বালহুম আদাল।” অর্থ: “তারাই হলো গবাদী পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট।” মহান আল্লাহতায়ালার এ কোর’আনী বানী যে কতটা নির্ভূল –তারই নিখুঁত প্রদর্শনী হচ্ছে বাংলাদেশে। মানুষরূপী এ পশুগুলো বনজঙ্গলে বাস করে না। বরং বাস করে জনপদে। তাদের অবস্থান শুধু সংসদে নয়, বরং দেশের আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তি ও প্রশাসনে। বাংলাদেশ তো এদের হাতেই অধিকৃত। পশুগণ কখনোই গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকার কেড়ে নেয় না, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানবরূপী এ পশুগণ।  

৪. সবচেয়ে বড় অপরাধী হলো সরকার

সভ্য দেশে আইন বানানো হয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য। সভ্য সরকারের কাজ শুধ জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের সুরক্ষা দেয়া নয়, বরং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতিরক্ষা দেয়াও। আর অসভ্য দেশে আইন বানানো হয় সে অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য। অথচ কেড়ে নেয়ার সে কাজই বেশী বেশী হচ্ছে বাংলাদেশে। তাই জনগণের অধিকার নাই স্বাধীন ভাবে কথা বলা, লেখালেখি ও মিটিং-মিছিলের। সে অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য ডিজিটাল আইন বানানো হয়েছে।

অথচ অপরাধ শুধু মানুষের প্রাণ ও অর্থ কেড়ে নেয়া নয়, অপরাধ হলো স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়াও। এদিক দিয়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে অপরাধী চক্রটি চোর-ডাকাতদের দলগুলি নয়; বরং সেটি হলো দেশের সরকার। হাসিনা সরকার এ কাজে মাঠে নামিয়েছে তার দলীয় গুন্ডা বাহিনীকে। এদের হাতেই নৃশংস ভাবে লাশ হতে হলো আবরার ফাহাদকে। কোন সভ্য দেশে কি এমনটি ঘটে? স্বৈর শাসকগণ একটি দেশে যে কীরূপ অসভ্য শাসন প্রতিষ্ঠা দিতে পারে –বাংলাদেশ হলো তারই নজির।

৫. সংকট অপূর্ণাঙ্গ মুসলিম হওয়ায়

মুসলিম জীবনে ইবাদতের পরিধিটি বিশাল। তাকে শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত পালন করলে চলে না। এরূপ ইবাদতের লক্ষ্য হলো, ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি আনা। কিন্তু মুসলিমকে বাঁচতে হয় এর চেয়ে বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রেখে। সেটি হলো সমাজ ও রাষ্ট্র্রের বুকে পরিশুদ্ধি আনা। সভ্যতর সমাজ ও সভ্যতার নির্মাণের কাজ তো একমাত্র তখনই সম্ভব হয়। এবং ইসলাম একমাত্র তখনই বিজয়ী হয়। সে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মুসলিম জীবনে অনিবায় হয় জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। তখন ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ, অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, শরিয়তের প্রয়োগ ও ঐক্যগড়া ইত্যাদি বহু ফরজ কাজ তার জীবনের মিশনে পরিণত হয়। এরূপ কাজে না নামলে পূর্ণ মুসলিম হওয়া যায় না। দেশে পূর্ণ মুসলিম না বাড়লে বিজয়ী হয় শয়তান।

মুসলিমদের আজকের বড় সমস্যাটি হলো তাদের ধর্মকর্ম ও ইবাদত স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে সীমিত হয়ে গেছে। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র দখলে গেছে শয়তানী শক্তির হাতে। অথচ রাষ্ট্র ও সমাজ শয়তানী শক্তির দখলে গেলে ব্যক্তিও নিরাপদ থাকে না। রাষ্ট্র যে স্রোতে ভাসে ব্যক্তিকেও তখন সে স্রোতে ব্যক্তিকেও ভাসতে হয়।

৬. বাঙালীর বেওকুপি

শিকার ধরাই বাঘের স্বভাব। বাঘকে কখনোই পোষ মানানো যায় না, তার সাথে দোস্তিও চলে না। তেমনি স্বভাব হলো ভারতের ন্যায় আগ্রাসী দেশগুলোর। তাই শুধু বাঘ-ভালুকের ন্যায় হিংস্র পশুগুলিকে চিনলে চলে না, দানবের ন্যায় দেশগুলোকেও চিনতে হয়। বাঘকে ভেড়া মনে করে যারা গলা জড়িয়ে ধরে -তারাই বাঘের পেটে যায়। এরূপ বেওকুপের সংখ্যা বাংলাদেশে

অতি বিশাল। এদের হাতেই বাংলাদেশে রাজনীতি্ ও বুদ্ধিবৃত্তি। এরাই ১৯৭১’য়ে ভারতের গলা জড়িয়ে ধরেছিল। ভারতী সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে এনেছিল এবং ভারতীয় বাহিনীকে বিজয়ী করেছিল। ভারতের পেটে ঢুকার পর এরাই এখন ভারতকে গালি দেয়। ১৪/০৪/২০২১




কাঙ্খিত লক্ষ্যে রোযা কতটুকু সফল?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

কতটুকু অর্জিত হচ্ছে তাকওয়া?

রোযার লক্ষ্য কি শুধু এটুকু, মানুষ সকাল থেকে সন্ধা অবধি পানাহার বন্ধ রাখবে? তারাবিহ পড়বে এবং কোর’আন তেলাওয়াত করবে? এবং রমযান শেষে মহা ধুমধামে ঈদ উদযাপন করবে? পথচলায় কত হাজার মাইল পথ চলা হলো -সেটিই কি শুধু গুরুত্বপূর্ণ? সাফল্য যাচায়ে তো গুরুত্বপূর্ণ হলো, কাঙ্খিত লক্ষ্যে আদৌ পৌঁছলো কিনা। রোযার মূল লক্ষ্য, তাকওয়া অর্জন। মহান আল্লাহতায়ালা সে লক্ষ্যটি ব্যক্ত করেছেন এভাবে: ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’’ -(সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)। উপরুক্ত আয়াতে যেটি সুস্পষ্ট তা হলো, তাকওয়াই রোযার মূল লক্ষ্য। প্রশ্ন হলো, তাকওয়া বলতে আমরা কি বুঝি? তাকওয়া অর্থ ভয়। তবে সে ভয় এমন নয়, হঠাৎ বাঘের সামনে পড়া ভীতিগ্রস্থ ব্যক্তির ন্যায় তা বাকশূণ্য করবে। সে ভয় এমনও নয়, হঠাৎ গভীর সমুদ্রে পড়া ব্যক্তির ন্যায় আতংকিত ও বিচলিত করবে। তাকওয়া হলো আল্লাহ-সচেতনতার এমন এক মানসিক অবস্থা যা সর্বদা স্মরণে রাখে জাহান্নামের আযাব, ফেরায় সকল প্রকার ভ্রষ্টতা ও পাপ থেকে এবং প্রেরণা জোগায় নেক-আমলে। তখন জন্ম নেয় আল্লাহকে খুশী করার সার্বক্ষণিক ব্যস্ততা। সৃষ্টি করে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে জবাবদেহীতার চেতনা। এমন চেতনায় জীবনের প্রতিটি দিন ও প্রতিটি মুহুর্ত মনে হয় মহান আল্লাহতায়ালার অমূল্য নেয়ামত রূপে; এবং এ জীবন গণ্য হয় অবিরাম পরীক্ষাপর্ব রূপে। তখন বিরামহীন ব্যস্ততা বাড়ে সে পরীক্ষায় কি করে ভাল ভাবে তকার্য হওয়া যায় তা নিয়ে। যখন কোন ব্যক্তি মটর হাই্ওয়েতে দ্রুত গাড়ি চালায় তখন একটি ভয় তার মনে সব সময়ে কাজ করে। সেটি হলো, সামান্য নিমিষের অসতর্কতা তার গাড়িকে গভীর খাদে নিয়ে ফেলবে এবং ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটাবে। মুহুর্তের মধ্য সে দুর্ঘটনা তার নিজের ও অন্যান্য আরোহীর জীবনে মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। এমন একটি দূর্ঘটনার জন্য দীর্ঘ মেয়াদী কোন ভূলের প্রয়োজন পড়ে না। সামাণ্য ক্ষণের ভূল, অসচেতনতা বা ঘুমই সে জন্য যথেষ্ট। চালককে তাই প্রতি মুহুর্তে চোখ ও মন খোলা রাখতে হয়। মৃত্যূর ভয়ে তাকে সর্বমুহুর্ত সতর্ক থাকতে হয়। চালকের জন্য এটাই হলো তাকওয়া।

আর মু’মিনের জীবনে তাকওয়া হলো সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হওয়ার সার্বক্ষণিক ভয়। যে কোন মুহুর্তে সেও বিচ্যুত হতে পারে মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে; অবাধ্য হতে পারে তাঁর হুকুমের। রোযার মূল কাজ এমন ভয় তথা তাকওয়ার বৃদ্ধি। তাই তাকওয়া নিছক ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও যৌনতাকে দমিয়ে রাখার সামর্থ্য নয়, বরং সর্ব প্রকার জৈবিক,আত্মিক ও আর্থিক কুপ্রবৃত্তি দমনের ঈমানী শক্তি। এমন তাকওয়া থেকেই প্রেরণা আসে আল্লাহপাকের হুকুমগুলি জানার এবং সে সাথে সেগুলি অনুসরণের। কোর’আনের জ্ঞানার্জনকে তাকওয়া-সমৃদ্ধ সে ব্যক্তিটি তখন নিজ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্ম রূপে গ্রহণ করে। কারণ সে বুঝে, অজ্ঞতা নিয়ে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা সম্ভব নয়। কারণ হাজারো পথের মাঝে কোনটি সিরাতুল মুস্তাকীমের পথ আর কোনটি ভ্রষ্টতার পথ -সেটি জানতে বা বুঝতে হলেও তো জ্ঞান চাই। পথচলায় যে সিগনাল বা বিধিনিষেধ থাকে সেগুলোও তো জানতে হয়। নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের মাঝে ইসলামের জ্ঞানে তাই কোন অজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন না। তাদের শতকরা শতভাগই ছিলেন আলেম। অজ্ঞতা নিযে ইবাদতও সঠিক ভাবে হয় না। তাই নামায-রোযার আগে কোর’আনের জ্ঞানার্জনকে ফরজ করা হয়েছে। সাহাবাদের জীবনে এমন একটি সময় ছিল যখন নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত ছিল না। জিহাদও ছিল না। ইবাদত বলতে বুঝাতো রাতের একটি বড় অংশে দাঁড়িয়ে বার বার পবিত্র কোর’আনের আয়াতগুলোকে ধীরে ধীরে নিবিষ্ট মনে আবৃত করা এবং আল্লাহর সে হেদায়েতের বাণীগুলোকে হৃদয়ের গভীরে বসিয়ে দেয়া। সে হুকুম এসেছে নবুয়তের অতি প্রথম দিকে নাযিলকৃত সুরা মুজাম্মিল। বলা হয়েছে, “হে বস্ত্রে আচ্ছাদিত (মুহম্মদ), রাতে খাড়া হয়ে যাও, কিছু অংশ বাদে। রাতের অর্ধেক ভাগ, অথবা তা থেকে কিছুটা কম সময়ের জন্য। অথবা তার চেয়ে কিছু অধিক সময়ের জন্য; এবং তেলাওয়াত করো কোর’আন থেকে ধীরে ধীরে সুরভিত কন্ঠে।” -(সুরা মুজাম্মিল, আয়াত ১-৪)। সে সময় খোদ নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের কাছে সমগ্র কোর’আন ছিল না। ছিল সদ্য নাযিলকৃত কিছু সুরা বা আয়াত। তখন তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বটি ছিল, সেগুলোকে হৃদয়ে গেঁথে নেয়া, সেগুলো পূর্ণ অনুসরণ করা এবং অন্যদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া। সে দায়িত্বপালন গণ্য হতো ইবাদত রূপে। ইসলামের ১৪ শত বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আলেম তো গড়ে উঠেছে কোর’আনেকে বুঝা ও কোর’আন অনুসরণের সে অদম্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এ পর্যায়ে হযরত সুমাইয়া ও হযরত ইয়াসিরের মত কিছু সাহাবা কাফেরদের নির্যাতনে শহীদ হয়ে যান।

 

ভ্রষ্টতা যেখানে ইবাদতে

ঘোড়ার আগে যেমন গাড়ী জোড়া যায় না, তেমনি কোর’আন কোর’আনী জ্ঞানার্জনের আগে ইবাদতও যথার্থ হয়না। অথচ আজ সে জ্ঞানার্জনের দায়ভার চাপানো হয়েছে স্রেফ মসজিদের ইমাম বা মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের উপর। জ্ঞানার্জন যে প্রতিটি মুসলিম নরনারীর উপর ফরজ সেটিও ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে। সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে ভ্রষ্টতার শুরু মূলত এখান থেকেই। ফলে প্রচন্ড ভ্রষ্টতা বেড়েছে ইবাদতে। রোযা রেখে দোকানে বসে যে ব্যক্তিটি দ্রব্যমূল্য বাড়ায় বা পণ্যে ভেজাল মেশায় বা অফিসে বসে ঘুষ খায় এমন ব্যক্তি যে তাকওয়াশূণ্য এবং রোযা থেকে সে যে কোন কিছুই লাভ করেনি -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে? সে তো পথভ্রষ্টতার পথ বেছে নিয়েছে। এখানে কাজ করছে তার অজ্ঞতা ও তাকওয়াশূণ্যতা। রোযা তার কাছে নিছক উপবাস ছাড়া কি অন্য কিছু উপহার দিয়েছে? অথচ তাকওয়া-সম্পন্ন ব্যক্তির অদম্য অনুপ্রেরণা হলো, প্রতি মুহুর্তে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলায়। সর্ব মুহুর্তে তাঁর সতর্কতা থাকে সর্বপ্রকার হারাম কাজ থেকে দূরে থাকায়। যার মনে সে সতর্কতা নাই, বুঝতে হবে তার মনে তাকওয়াও নাই। অনেক গাছই ফল দেয় না। তেমনি অনেকের নামায-রোযা এবং হজ্জ-যাকাতও জীবনে কোন পরিবর্তন আনে না। এরা নামায-রোযা আজীবন করেও বাঁচে পথভ্রষ্টতা নিয়ে। নামে মুসলিম হলেও কর্মজীবনে এরা ফাসেক (অবাধ্য, বিদ্রোহী), জালেম ও মুনাফিক হয়। এদের কারণেই মুসলিম দেশগুলোতে আল্লাহর শরিয়তী বিধান আজ পরাজিত; এবং মুসলিম ভূমি অধিকৃত হয়েছে ইসলামে শত্রুপক্ষের হাতে। অথচ তাকওয়া সম্পন্ন ব্যক্তি গভীর দায়িত্ববোধ পায় আল্লাহর সৈনিক রূপে ইসলামের বিজয়ে পূর্ণ আত্ম-বিনিয়োগে। নবীজীর (সা:) আমলে সে সামর্থ্য পেয়েছিলেন প্রতিটি সাহবা। তাদের জীবনে সর্বক্ষণের প্রচন্ড তাড়াহুড়া ছিল বেশী বেশী নেক আমলের।  

তাকওয়া মানব মনে বা দেহে গোপন থাকার বিষয় নয়। সেটি নানা ভাবে প্রকাশ পায় নেক আমলের মধ্য দিয়ে। ইসলাম কবুলের পর মু’মিন ব্যক্তির জীবনে যেটি অনিবার্য রূপে দেখা দেয় সেটি নেক আমলের প্রতি দুর্বার মোহ ও প্রতিযোগিতা। সে তখন প্রস্তুত হয়ে যায় শুধু মালের কোরবানিতে নয়, জানের কোরবানিতেও। অপর দিকে বদ আমল তা যত ক্ষুদ্রই হোক তার মাঝে ঈমানদার ব্যক্তিটি জাহান্নামের আগুনের পূর্বাভাস দেখতে পায়। ফলে তার সর্বক্ষণের সাধনা হয় তা থেকে বাঁচার। যে ব্যক্তির মাঝে বদ আমল থেকে বাঁচায় ও নেক আমলে তাড়াহুড়া নাই, বুঝতে হবে তার মাঝে তাকওয়াও নাই্।এবং পরকালের উপর ঈমানও নাই। ঈমানের দাবীতে সে যত সোচ্চারই হোক, তার সে ঈমানদারী নিতান্তই মেকী। নেক আমলের প্রেরণায় সাহাবাগণ এতটাই অস্থির থাকতেন যে, মাঝ রাতে না ঘুমিয়ে আটার বস্তা কাঁধে নিয়ে গরীবের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সে কাজ করেছেন এমন কি রাষ্ট্রপ্রধান তথা আমীরুল মো’মিনুনও। নিজেরা অভূক্ত থেকে তারা মেহমানকে খাইয়েছেন। নিজের অসংখ্য ফলবান গাছের বিশাল বাগানকে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিয়েছেন। জিহাদের ময়দানে আহত ও অতি তৃষ্ণার্ত হয়ে পানি নিজে না পান করে পাশের তুষ্ণার্ত মুজাহিদকে দিতে বলেছেন। সর্বোপরি তারা ছটফট করতেন অর্থের পাশাপাশি নিজের জীবনকে আল্লাহর পথে জিহাদে বিলিয়ে দেয়ায়। এরাই হলেন তেমন ব্যক্তি যাদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে বলেছেন, তাদের জানমাল তিনি ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। এমন মানুষদের  আধিক্যের কারণেই তখন নেক আমলের প্লাবন এসেছিল সমগ্র মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। তাকওয়ার সে গুণেই ইসলাম যেমন গড়ে তুলেছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, তেমনি সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।

 

শ্রেষ্ঠ দান ও প্রত্যাশা

মাহে রমযান হলো রহমত ও মাগফেরাতের মাস। এ মাসেই নাযিল হয়েছিল পবিত্র কোর’আন –  অর্থাৎ মর্তের বুকে নেমে এসেছিল মহান আল্লাহর নিজস্ব বাণী। এভাবে মানব জাতি পেয়েছিল মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত – মূক্তি ও সফলতার একমাত্র এবং সর্বশেষ পথ। ইসলামী পরিভাষায় যা হলো সিরাতুল মুস্তাকীম। মানব জাতির কল্যাণে আর কোন ঘটনা কি এতটা গুরুত্বপূর্ণ? মানব জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল এ কোর’আনের বরকতেই। এই একটি মাত্র ঘটনাই রমযানের এই মাসটিকে অন্য যে কোন মাসের তুলনায় অতি সম্মানিত করেছে। এ ঘটনাটির বরকতেই এ মাসটিতে মহান আল্লাহতায়ালার অতি প্রিয় কাজটি হলো তিনি তাঁর বান্দার প্রার্থনাকে কবুল করা। এভাবেই এ মাসটি সম্মানিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে। এবং সে সন্মানেরই প্রতীক হলো, এ মাসেই রয়েছে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রাত লায়তুলু ক্বদর। দোয়া কবুলের এটিই শ্রেষ্ঠ রাত।

তবে দোয়া কবুলটি নিঃশর্ত নয়। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সে শর্তটি হলো, কোর’আনে বর্নীত নির্দেশাবলীর পূর্ণ অনুসরণ। পবিত্র কোর’আনে সে শর্তটি বলা হয়েছে এভাবে, “..(হে মহম্মদ) এবং যখন আমার বান্দারা আমার ব্যাপারে আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, (তাদেরকে আপনি বলে দিন) বস্তুত আমি রয়েছি অতি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা আমি কবুল করি। অতএব তাদেরও অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হলো, আমার হুকুম পালন করা এবং আমার উপর ঈমান আনা।” (-সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)। এ আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, তিনি প্রতিটি বান্দার অতি নিকটে। সুরা ক্বাফে বলা হয়েছে তিনি গর্দানের রক্তের শিরার চেয়েও নিকটবর্তী। তিনি যে শুধু বান্দার প্রতিটি দোয়া শুনেন তাই নয়, সে দোয়া কবুলও করেন। এবং সে ওয়াদাটি অতি সুস্পষ্ট ভাবে ঘোষিত হয়েছে এ আয়াতে। তবে সে সাথে তিনি সুস্পষ্ট শর্তও রেখেছেন। শর্ত হলো, হুকুম পালন করা এবং তাঁর উপর পরিপূর্ণ ঈমান আনা। অর্থাৎ সর্বসামর্থ্য দিয়ে আল্লাহর পক্ষে খাড়া করা। সে জন্য কোন দল বা নেতার অপেক্ষায় বসে থাকারও অনুমতি নাই। তাই পবিত্র কোর’আনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “(হে মহম্মদ) বলে দিন, “তোমাদের জন্য আমার একটি মাত্র ওয়াজ (নসিহত): খাড়া হও আল্লাহর জন্য (আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য) জোড়ায় জোড়ায় অথবা (সেটি সম্ভব না হলে) একাকীই; অতঃপর তোমরা চিন্তাভাবনা করো।”–(সুরা সাবা, আয়াত ৪৬)।

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে বান্দার চাওয়া-পাওয়ার তালিকাটি বিশাল। কিন্তু বান্দার কাছেও তাঁর প্রত্যাশা আছে। সে ন্যূনতম প্রত্যাশাটি হলো, তাঁরা দাঁড়াবে তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার কাজে –যেমনটি দাঁড়িয়েছিলেন নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ। তাঁরা যখন এরূপ দাঁড়ায়, তখন তিনিও তাদের ডাকে সাড়া দেন। সেটিই তাঁর সূন্নত। সাহাবাদের ডাকে তাই তিনি ফিরেশতা পাঠিয়েছিলেন এবং বিশাল বিশাল শত্রুবাহিনীর উপর বিজয় দিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার ডাকে সাড়া দিতে। বরং তারা সাড়া দিয়েছে শয়তানের ডাকে; এবং বিজয়ী করেছে শয়তানের এজেন্ডাকে। এবং যারা শয়তানের পক্ষে দাঁড়ায়, তাদের জীবনে নেমে আসে প্রতিশ্রুত আযাব -সেটি শুধু এ দুনিয়ার জীবনে নয়, অনন্ত-অসীম আখেরাতের জীবনেও। পবিত্র কোর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে বার বার। কথা হলো, আজকের মুসলিমগণ মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে খাড়া হওয়ার বদলে যে শয়তানের পক্ষে খাড়া হয়েছে -সে প্রমাণ কি কম? মুসলিম ভূ-খন্ড আজ বিভক্ত, শরিয়ত বিলুপ্ত, বিজয় জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজমের, প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সূদ, ঘুষ, জুয়া, মদ ও দেহব্যবসা –এগুলো কিসের আলামত? মুসলিম ভূমিতে তারা যে শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করেছে –এগুলো কি তারই প্রমাণ নয়? তবে কি তাদের দোয়া কবুল করে শয়তানের বিজয়কে আরো বাড়িয়ে দিবেন?  

 

রেকর্ড দুর্বৃত্তি ও বিদ্রোহে

নামায-রোযা নিয়মিত আদায় করে এমন মুসলিমদের সংখ্যা আজ পৃথিবীতে কোটি কোটি। কিন্তু সে তুলনায় তাকওয়া অর্জিত হচ্ছে কতটুকু? কতটুকু বেড়েছে নেক আমল? বরং বিপরীতমুখী কর্ম ও চরিত্রই কি প্রবলতর হচ্ছে না? নেক-আমলের বিপরীত হলো, মিথ্যা, সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি, ব্যভিচার , ঘুষ ও ধোকাবাজির ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বা দুর্বৃত্তি। ইসলামী পরিভাষায় এগুলো হলো মুনকার। মুসলিম দেশ হওয়ার বরকতে এটাই  কি কাঙ্খিত ছিল না যে, এদেশগুলি সুনীতি, সত্যবাদীতা ও সৎকর্মে বিশ্বে রেকর্ড গড়বে? সৃষ্টি হবে নেক আমলের প্লাবন। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টোটি। বেড়েছে দূর্নীতি। ফলে রোযা যে তার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হচ্ছে না -তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে?  তবে এ বিফলতা নিয়েই বা ক’জন ভাবছে? আল্লাহতায়ালার নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রতিটি বিদ্রোহই তো শয়তানের অনুসরণ। এমন বিদ্রোহে বিজয়ী হয় শয়তান ও তার অনুসারীরা। অথচ প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে চলছে সে প্রবল বিদ্রোহ। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ  প্রকাশ পাচ্ছে প্রতিটি মিথ্যা, পাপ ও দূর্নীতির মধ্য দিয়ে। এমন বিদ্রোহে মুসলিমরা বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। কাফেরদের হারিয়ে দূর্নীতিতে তারা বিশ্বে প্রথম হয়েছে। বাংলাদেশ প্রথম হয়েছে ৫ বার। প্রতিটি মুসলিম দেশে এমন বিদ্রোহীরাই বার্থ করে দিচেছ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার প্রতিটি উদ্যোগ। শুরুতে মুসলিমদের একাধিক রাষ্ট্র ছিল না, কিন্তু যেটি ছিল সেটি প্রতিষ্ঠিত ছিল শরিয়ত তথা আল্লাহর আইনের উপর। কোর’আনে বর্নীত আল্লাহর হুকুমকে তারা শুধু পাঠই করতো না, সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রয়োগও করতো।  কিন্তু আজ শুধু পাঠই হয়, প্রয়োগ নেই। মুসলিম রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে নানা ভাষা ও নানা জাতীয়তার নামে বহু জাতীয় ঝান্ডা। এবং সে সাথে বেড়েছে আল্লাহর হুকুমের তথা শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডাও। সে ঝান্ডা উড়িয়েছে মুসলিম দেশের ব্যাংকগুলো সূদকে হালাল করে। বিদ্রোহের ঝান্ডা উড়িয়েছে পতিতালয়গুলো। সে বিদ্রোহ মুসলিম দেশের আদালতগুলোতেও। সেটি কোর’আনী আইনের স্থলে কাফেরদের প্রণীত আইন প্রয়োগ করে -যে আইনে ব্যভিচার বা পতিতাবৃত্তিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়।

সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা তুলতে মহিলারাও পিছিয়ে নেই। তারা সে ঝান্ডা তুলেছে পর্দার হুকুম অমান্য করে এবং নারী-পুরুষের মাঝে অবাধ মেলামেশার মধ্য দিয়ে। বেপর্দাগী নিজেই আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা। এবং সে ঝাণ্ডা উড়িয়ে যারা প্রকাশ্যে চলাফেরা করে তাদেরকে এসব নামাযী ও রোযাদার মুসলিমগণ নেত্রী গণ্য করে এবং তাদেরকে ভোটে নির্বাচিতও করে। তাদের পিছনে রাজপথে মিছিলও করে। আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহী তাদের ভোট দিলে বা তাদের রাজনীতিকে সমর্থন করলে কি নামায-রোযা পালনের অর্থ থাকে? বান্দার মনে ইবাদত আনুগত্য বাড়াবে সেটাই কি কাঙ্খিত নয়? কিন্তু কোথায় সে আনুগত্য? কোথায় মহান আল্লাহতায়ালার পথে নিবেদিত প্রাণ সে সৈনিক? বরং অধিকাংশ মুসলিম যেন তাদের কর্ম, চরিত্র, রাজনীতি, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ঘোষণা দিচ্ছে, আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি তাদের কোন পরওয়া না্ই। যা গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো তাদের ব্যক্তিগত, দলগত, জাতিগত ও গোষ্ঠিগত স্বার্থচিন্তা; আল্লাহতায়ালার হুকুম নয়। মহান প্রভুর হুকুমকে তারা সীমাবদ্ধ রেখেছে জায়নামায, বিয়ে-শাদী, মুর্দাদাফন, মসজিদের নামায এবং রোযা-হজ্জ পালনে। এবং তাঁর বিধানের প্রয়োগ নিষিদ্ধ করেছে শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও আইন-আদালতের অঙ্গণে। এমন আচরণ কি মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ নয়? এমন বিদ্রোহী বান্দারা – পোষাক-পরিচ্ছদ ও নামে যতই মুসলিম হোক, যদি সারা মাস রোযা রাখে, সারা রাত নামায পড়ে  এবং সারা রাত কেঁদে কেঁদে মোনাজাত করে, তবে কি সে ইবাদত ও মোনাজাত রাব্বুল আলামিনের কাছে কবুল হয়? কবুল যে হচ্ছে না সে প্রমাণই কি কম? কবুল হওয়ার নমুনা কি এই – মুসলিম দেশে আগ্রাসী বিদেশী শক্তি আধিপত্য পাবে এবং মুসলিম নর-নারি প্রতিদিন নিহত,আহত, ধর্ষিতা ও পদপিষ্ট হবে?

 

দোয়া কবুলের শর্ত

তিরমীযি শরিফের হাদীসে আছে: তিন ব্যক্তির দোয়া কখনোই বৃথা যায় না। সে তিন প্রকার ব্যক্তি হলো: রোযাদার, ন্যায় পরায়ন শাসক এবং যিনি মজলুম। কিন্তু এ হাদীসটির পাশাপাশি এ হাদীসটিও এসেছে যে, দোয়া কবুলের শর্ত হলো তার রিযিক হালাল অবশ্যই হতে হবে। ফলে যে ব্যক্তির সেহরী ও ইফতার যদি হয় ঘুষ, সূদ, মদবিক্রয়, জুয়া, ধোকাবাজি ও  নানা দূনীতির মধ্য দিয়ে উপার্জিত অর্থে হয়; এবং বসবাস যদি হয় সূদী অর্থে কেনা বা জবরদখল ও দূর্নীতির মধ্য দিয়ে অর্জিত গৃহে, তবে তার দোয়া কি কবুল হয়? দোয়া কবুলের জন্য রোযাদার হওয়ার পাশাপাশি ঈমানদার ও নেককার হওয়াও তো শর্ত। পবিত্র কোর’আনে একবার নয়, বহুবার বলা হয়েছে, যারা ফাসেক ও জালেম তাদের দোয়া কবুল দূরে থাক, মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে হিদায়েত দেন না। হিদায়েত  লাভের শর্ত হলো,পাপের পথ তথা দূর্নীতি থেকে প্রথমে ফিরতে হবে। ঔষধের আগে বিষ-পান ত্যাগ যেমন জরুরি, তেমনি হিদায়াত লাভের জন্য জরুরি হলো পুরাপুরি বর্জন করতে হয় পাপের পথকে। মহান আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে বড় দান ধন-দৌলত, সন্তান-সন্ততি বা প্রতিপত্তি নয়, বরং সেটি হিদায়েত। সে হিদায়েত লাভের জন্যই প্রতি নামাযের প্রতি রাকাতে “ইহদিনাস সিরাতুল মুস্তাকীম” বলে দোয়া করতে হয়। এর চেয়ে বড় দোয়া যেমন নেই, তেমনি হিদায়েত প্রাপ্তির চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে শ্রেষ্ঠতর প্রাপ্তিও নাই। এই হিদায়েত প্রাপ্তিই ঈমানদারকে একজন কাফের থেকে আলাদা করে। হিদায়েত লাভের ফলেই সম্ভব হয় সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা। কাফের, জালেম ও ফাসেকের জীবনে হিদায়েত নাই; ফলে তাদের জীবনে যা বাড়ে তা নিছক বিভ্রান্তি। এমন বিভ্রান্তিতে কেবল জাহান্নামে পৌঁছা সম্ভব, জান্নাতে নয়। কারণ, জান্নাতের জন্য তো চাই সিরাতুল মুস্তাকীম। আর ফাসেক ও জালেম তো তারাই যারা সমাজে দুবৃর্ত্ত ও দূর্নীতিবাজ এবং আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। ফলে যে দেশটি দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হয়, সে দেশের মসজিদগুলো মুসল্লিতে যতই পূর্ণ হোক না কেন -তারা কি রহমত পায়? হিদায়েত লাভের জন্য শুধু মুখে কালেমা পড়লেই চলে না। শুধু মূর্তিপুঁজা ছাড়াটাই যথেষ্ট নয়। দূর্নীতি ছেড়ে সুনীতি এবং দুষ্কর্ম ছেড়ে নেক আমলের পথও ধরতে হয়। দোয়া কবুল তো এ পথেই আসে। 

রোযার পরিপূর্ণ ফায়দা নিতে যা জরুরি তা হলে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়া। রোযা পালনের কোর’আনী আহবান তো এসেছে ঈমানদারদের উদ্দেশ্য -জালেম, ফাসেক, কাফের ও মুনাফিকদের উদ্দেশ্যে নয়। মূল লক্ষ্য, ঈমানদারের তাকওয়া বৃদ্ধি। প্রাসাদ গড়তে ভিতটা প্রয়োজন, তাকওয়ার নির্মাণে ঈমান হলো সেই ভিত। তবে ঈমানদারীর অর্থ শুধু আল্লাহকে বিশ্বাস করা নয়। মক্কার কাফেরগণও আল্লাহকে বিশ্বাস করতো। সন্তানদের নাম নবীজীর (সা:) জন্মের পূর্বেও তাদের আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান রাখত। কিন্তু কাফেরদের এ বিশ্বাস  বেশীদূর এগুয়নি। এ বিশ্বাসে তাই তাকওয়া সৃষ্টি হয়নি, ফলে ব্যক্তি ও সমাজ কোনটাই বিশুদ্ধ হয়নি। আল্লাহর উপর ঈমান আনাতে ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি শুরু হয় মাত্র,পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্য মুসলিমকে আরো অনেক দূর এগুতে হয়। তাকে পরিপূর্ণ অংশ নিতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার পরিকল্পিত প্রশিক্ষণে। শুধু একদিন দুদিন নয়, বরং জীবনের সবগুলো দিন ধরে। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, জিহাদ হলো সে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।  

 

রোযার ট্রেনিং কেন অপরিহার্য?

ভালো মানের কৃষক, শ্রমিক, ডাক্তার বা ইঞ্জিনীয়ার গড়ার জন্য লাগাতর ট্রেনিং চাই। তেমনি ট্রেনিং চাই নিষ্ঠাবান মুসলিম গড়ার জন্যও। সে ট্রেনিংয়ের মূল কথা হলো জিহ্বা, পেট ও যৌনতার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। জিহ্ববার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া মিথ্যাচার, গিবত ও কলহ-বিবাদ থেকে নাযাত মেলে না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে অশান্তির মূল কারণ হলো লাগামহীন জিহ্ববা। তেমনি পেটের লালসার উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে পানাহারে অবাধ্যতা হয় শরিয়তী বিধানের। মানুষ তখন উপার্জনে দূর্নীতির আশ্রয় নেয়। তেমনি যৌন লালসার উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে মানুষ ব্যাভিচারে ধাবিত হয়। নবীজী (সা:) বলেছেন, অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে জিহ্ববা ও যৌনাঙ্গের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে। রমযানের মাস ব্যাপী রোযা মূলত সে নিয়ন্ত্রণকেই প্রতিষ্ঠা করে। রমযানের রোযা যদি সে নিয়ন্ত্রণ স্থাপনেই ব্যর্থ হয় তবে বুঝতে হবে রোযাদারের মাসব্যাপী ট্রেনিং সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেছে। রোযা তাকে দিনভর উপবাসের কষ্ট ছাড়া আর কিছু্ই দেয়নি। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের রোযা যে তাদের জীবনে কোনরূপ নিয়ন্ত্রণ আনতে পারিনি তা শুধু রমযানের মাসে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতিতে ধরা পড়ে না, প্রকট ভাবে ধরে বিশ্বব্যাপী দূর্নীতিতে প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়েও।

কোন প্রশিক্ষণই নিছক শারীরিক কসরতের বিষয় নয়। চাই জ্ঞান। রমযানের প্রশিক্ষণের সাথে অপরিহার্য হলো তাই কোর’আনের জ্ঞান। আর রমযান তো কোর’আন নাযিলের মাস। ওহীর এ জ্ঞান আনে ঈমানদারের মনোজগতে রুহানী বা আধ্যাত্মিক বিপ্লব। যেখানেই পরিশুদ্ধি ও পরিমর্জিত জীবন কাম্য, সেখানেই এরূপ কোর’আনী জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। লাগাতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া মানুষের জীবনে উৎকর্ষ অসম্ভব। পশু পশুরূপে জন্ম নেয়, মারাও যায় পশু রূপে। এদের জীবনে জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি কোনরূপ চারিত্রিক উৎকর্ষ নেই। তাই পশুকুলে সমাজ গড়ে উঠে না, সভ্যতাও নির্মিত হয় না। কিন্তু মানুষকে পশু থেকে ভিন্নতর ও উন্নততর হতে হয়। এটিই জীবনের মূল সাধনা। নইলে মানুষরূপে জন্ম নিয়েও সে মারা যেতে পারে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট হয়ে। মানব সমাজে যে সেটি ঘটে সে সাক্ষ্যটি দিচ্ছেন খোদ আল্লাহতায়ালা। তাদের বিষয়েই পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে ‘‘উলায়িকা কা’আল আনয়াম, বাল হুম আদাল।’’ অর্থ: “তারাই পশুর ন্যায় বরং পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট’’। অর্থাৎ এদের জীবনে উপরে উঠার কাজটাই হয়নি। বয়স বাড়ার সাথে তাদের ঈমান ও আমল বাড়েনি, বরং বেড়েছে নীচে নামাটি।

অপর দিকে জ্ঞান-সাধনায় অর্জিত উচ্চতর গুণে মানুষ ফেরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর হতে পারে। এবং সে সামর্থ্য অর্জনের কাজটি ব্যক্তিকে জীবনভর করতে হয়। উচচতর সমাজ ও সভ্যতা নির্মিত হয় তো এমন মানুষের আধিক্যেই। আর এরূপ উচ্চতর মানুষ ও উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণের মধ্য দিয়েই তো যাচাই হয় মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব; সাম্রাজ্য বিস্তার বা পারমানবিক বোমা নির্মাণের সামর্থ্য দিয়ে সেটি হয় না। বস্তুত ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের আমৃত্যু আয়োজনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি পায় নেক আমলের সামর্থ্য। নেক আমল তখন ব্যক্তির জীবন-সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। এমন সংস্কৃতির নির্মাণে রোযার অবদান অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোযায় শেখায় জীবন যাপনে সংযম, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তীতা। আনে আল্লাহ সচেতনতা, এবং সেটি সমগ্র দিন জুড়ে। প্রতি ওয়াক্তের নামায মাত্র কয়েক মিনিটের। এদিক দিয়ে রোযা সবচেয়ে দীর্ঘ ইবাদত। এবং সে ইবাদত ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও সংযমের মধ্য দিয়ে। একান্ত নির্জনেও ক্ষুধাগ্রস্ত ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে মুখে খাদ্য তুলে নেয় না। আল্লাহতায়ালা যে সব কিছু দেখেন -সে চেতনা এভাবেই রোযাদারের মনে আজীবন বদ্ধমূল হয়। সর্বকাজে এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর এমন ভয় এবং এমন আল্লাহ-সচেতনতাই হলো তাকওয়া। এমন তাকওয়া অর্জিত হলেই বুঝতে হবে রোযাদারের রোযা সফল হয়েছে।   

ব্যর্থ হচ্ছে কেন এ প্রশিক্ষণ?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সৈনিকের খাতায় নাম লেখালে বা প্রশিক্ষণ নিলেই কেউ ভাল সৈনিক রূপে গড়ে উঠে না। ভাল সৈনিক হতে হলে সৈনিক জীবনের মূল দর্শন ও মিশনের সাথেও সম্পূর্ণ একাত্ব হতে হয়। দেশের স্বাধীনতা ও সংহতিতে তাকে পূর্ণ বিশ্বাসী হতে হয়। এখানে আপোষ চলে না। সৈনিকের জীবনের মূল মিশন তো দেশের স্বাধীনতা ও সংহতির সংরক্ষণ। কিন্তু এ ক্ষেত্রটিতেই যদি সংশয় থাকে তবে ভাল সৈনিক হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। সৈনিকবেশী এমন ব্যক্তিটির পক্ষে তখন বিদেশী শত্রুর চর হিসাবে কাজ করাও রুচিসিদ্ধ মনে হয়। কোর’আনের কসম খেয়েও এরা গাদ্দারী করে। এরাই কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। মুসলিম দেশকে এরা খন্ডিত করে বা পরাধীন  করে। এবং উল্লাস ভরে মুসলিম হত্যাও  করে। মুসলিম ইতিহাসে এমন বিশ্বাসঘাতক সৈনিকের সংখ্যা কি কম? তেমনি জীবনভর নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাতের প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েও বহু মানুষের জীবনে পরিশুদ্ধি আসে না। পরিশুদ্ধি তো একমাত্র তখনই আসে যখন নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাতের পাশপাশী একাত্ব হয় জীবন ও জগত নিয়ে ইসলামের মূল দর্শনের সাথে। কথা হলো, সে দর্শনটি কি? সেটি হলো, আল্লাহকে একমাত্র প্রভূ, প্রতিপালক, আইনদাতা ও রেযেকদাতারূপে মেনে নেওয়া এবং তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নিজেকে আত্মসমর্পিত সৈনিক রূপে পেশ করা।

মুসলিমের মিশন মূলত আল্লাহর কাছে এক আত্মসমর্পিত গোলামের মিশন। সে দায়িত্ব নিছক নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে পালিত হয় না। সে দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রটি বরং বিশাল। সেটি সমগ্র দেশ, সমগ্র সমাজ, সমগ্র রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি জুড়ে। দায়িত্বপালনের লক্ষ্যে কখনো তাকে দ্বীনের প্রচারক হতে হয়, কখনো রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা হতে হয়, আবার কখনো সৈনিক বা জেনারেলের বেশে যুদ্ধও লড়তে হয়। মুসলিম শব্দটির উদ্ভব তো হয়েছে আত্মসমর্পণ থেকে, যার নমুনা পেশ করেছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আ:)। যিনি আল্লাহর প্রতিটি হুকুমে – সেটি শিশু পুত্রের কোরবানি হোক বা নিজ দেশ ছেড়ে হিজরত হোক – সব সময়ই লাববায়েক (আমি হাজির এবং মেনে নিলাম) বলেছেন। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের মত কোর’আনী প্রশিক্ষণ তো এমন আত্মসমর্পিত মুসলিমদের জন্যই; বেঈমান ও মুনাফিকদের জন্য নয়। যারা জান্নাত চায়, মহান আল্লাহতায়ালার এ প্রশিক্ষণ তো তাদেরকে সে মহাপুরস্কার লাভের জন্য যোগ্য করে গড়ে তোলে। প্রতিটি ঈমানদার যেমন এ প্রশিক্ষণ থেকে ফায়দা পায়, তেমনি এর সাথে একাত্মও হয়।  

 

অবমাননা যেখানে কোর’আনের

প্রশ্ন হলো, কোর’আনের জ্ঞান ছাড়া আল্লাহর নির্দেশিত প্রশিক্ষণ থেকে লাভবান হওয়া কীরূপে সম্ভব? চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান ছাড়া কেউ কি রোগ-চিকিৎসার প্রশিক্ষণে যোগ্য বিবেচিত হয়? প্রচন্ড পরিহাসের বিষয়, মহান আল্লাহতায়ালা কোর’আনী জ্ঞানার্জনের তাগিদ দিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন বার বার, কিন্তু সে দিকে মুসলিমদের ভ্রুক্ষেপ নেই্। অনেক মুসলিমদের ব্যস্ততা দেখা  যায় শুধু তেলাওয়াতে, কিন্তু কোর’আন বুঝায় নয়। তারাবিহ নামাযে কোর’আন খতমের আয়োজন হয় মসজিদে মসজিদে। কিন্তু আয়োজন নেই তেলাওয়াতকৃত আয়াতের অর্থ বুঝায়। কোর’আনের প্রতি এর চেয়ে বড় অবমাননা আর কি হতে পারে? অথচ সারা রমযান জুড়ে মুসলিম দেশগুলিতে পবিত্র কোর’আনের প্রতি সে অবমাননাটাই হচ্ছে। না বুঝে কোন শিশুও কোন বই পাঠ করে না। অথচ না বুঝে কোর’আন পাঠ হচ্ছে ঘরে ঘরে। কোর’আনী জ্ঞানের সে শূণ্যতাটি দেখা যায এমন কোর’আন পাঠকের আমলে, চরিত্রে ও রাজনীতিতে। ফলে এমন কোর’আন পাঠকারি ব্যক্তি মাসভর রোযা রাখলে কি হবে, আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠার পক্ষে সে কথা বলে না, বরং পক্ষ নেয় ইসলামের বিপক্ষ শক্তির বিজয় আনতে।

কথা হলো, যে ব্যক্তিটি চিন্তা-চেতনায় সেক্যুলার, যার সকল কর্মকান্ড ও অঙ্গিকার হলো আল্লাহর বিধানকে আইন-আদালত, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ সকল অঙ্গণে পরাজিত করা -সে ব্যক্তি আজীবন নামায-রোযায় লিপ্ত হয়েও কি কোন পরিশুদ্ধি পায়? সে তো বরং কর্ম জীবনে মিথ্যুক, স্বৈরাচারি, জালেম ও দূর্নীতিবাজ হয়। রাজনীতিতে এরাই শয়তানী শক্তির একনিষ্ঠ সহযোগী হয়। এদের কারণেই শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের দেশ হয়েও বাংলাদেশ দূর্নীতিতে বিশ্বে বার বার প্রথম হয়। দেশে মসজিদ বাড়ছে। মসজিদে নামাযী ও রোযাদারদের সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু তাতে দেশের ইজ্জত বাড়ছে না। যে সমাজ ও রাষ্ট্র চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাত দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত সে সমাজে রোযা যে তার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে -সেটি কি প্রমাণের অপেক্ষা রাখে? এ ব্যর্থতার কারণেই বছর ঘুরে বার বার মাহে রমযান এলেও মুসলিম সমাজে পরিশুদ্ধি আসছে না। এবং সমাজও সভ্যতর হচ্ছে না। বরং দিন দিন দুর্বৃত্তি এবং বিশ্বজুড়া অপমানই প্রকটতর হচ্ছে। ২২/০৭/২০১২




বিবিধ ভাবনা (৪২)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. আসক্তি হারাম রাজনীতিতে

মহান আল্লাহতায়ালা শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের হুকুমই দেন না। একতাবদ্ধ হওয়ার হুকুমও দেন। ঈমানদারের উপর তাঁর মহান প্রভুর প্রতিটি হুকুম মানাই বাধ্যতামূলক। সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়া হারাম -যা অনিবার্য করে আযাব। বিদ্রোহের এ পথ শয়তানের। রাস্তায় গাড়ি চালনায় কোন একটি ট্রাফিক সিগনাল অমান্য করলে দুর্ঘটনা ঘটে। বিষয়টি তেমন জীবন চালনার ক্ষেত্রেও। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধি আসে ব্যক্তি জীবনে। কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার নির্মাণের কাজটি একাকী হয় না। দুর্বৃত্তদের নির্মূল ও সমষ্ঠির মাঝে পরিশুদ্ধি আনার সে কাজে অপরিহার্য হলো বহু মানুষের ঐক্য। ঐক্যের সে পরিসর যতটা বাড়ে অর্থাৎ যত বেশী মানুষ একতাবদ্ধ হয় ততই বাড়ে সৃষ্টিশীল কর্মের সামর্থ্য। এজন্যই ফরজ হলো ঐক্যবদ্ধ হওয়া।   

অপর দিকে শয়তান চায় কাফেরদের ঐক্য। ভারতের ১১০ কোটি হিন্দু তাই বর্ণ, ভাষা ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে একতাবদ্ধ। অথচ ভারত ভেঙ্গে ১০টির বেশী বাংলাদেশ হতে পারতো। শয়তান চায়, মুসলিমদের বিভক্তি। মুসলিমগণ মেনেছে শয়তানের হুকুমকে। মহান আল্লাহতায়ালার একতার হুকুমের সাথে গাদ্দারী করে তারা টুকরো টুকরো করেছে মুসলিম ভূগোলকে। আরব ভূখন্ডকে বিভক্ত করছে বিশের বেশী টুকরোয়। বিভক্তি একাকী আসে না, সাথে আনে পরাজয় এবং গোলামীও। আরবদের বিভক্তির কারণেই তাদের ঘাড়ের উপর আজ ইসরাইল। এ গোলামী তাদের নিজ হাতের কামাই। বাঙালী মুসলিমগণ তেমনি কাফেরদের এজেন্ডা পূরণে ও তাদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে পাকিস্তান ভেঙ্গেছে। এ কাজটি ছিল শতভাগ হারাম। এ হারাম কাজে খুশি হয়েছে শয়তান ও ভারতীয় কাফেরগণ। এবং ক্ষতি হয়েছে মুসলিম উম্মাহর। এর পিছনে ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ -যা হলো শতভাগ হারাম। হারাম পানাহারে যেমন অকল্যাণ, তেমনি অকল্যাণ আনে হারাম মতবাদও।

ইসলাম মানুষকে ভাষা, ভূগোল, গোত্রীয় পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে প্যান-ইসলামীক মুসলিম হতে শেখায়। এটিই মুসলিমদের গৌরব যুগের লিগ্যাসী। আরব, ইরানী, কুর্দি, তুর্কি ইত্যাদি নানাভাষী মানুষ বিভক্তি না হয়ে একত্রে কাজ করেছে। জাতীয়তাবাদ ইসলামে অঙ্গিকারহীন, বিদ্রোহী ও বিভক্ত হতে শেখায়। সে বিদ্রোহ নিয়ে ভারতের ন্যায় কাফেরদের সাথে একাত্ম হতেও আপত্তি থাকেনা। বাঙালী মুসলিম জীবনে সেটাই দেখা গেছে একাত্তরে। সে হারাম পথে চলার ফল হলো, বাংলাদেশ আজ ভারতের অধীনত এক গোলাম রাষ্ট্র। বাঙালী মুসলিমদের ঘাড়ের উপর এখন ভারতের নওকরদের শাসন। এ থেকে কি সহজে মুক্তি আছে? এটি হলো, বাঙালী মুসলিমদের নিজ হাতের অর্জিত আযাব। অবাক করার বিষয় হলো, সে গোলামী নিয়েও মার্চ ও ডিসেম্বর এলেই উৎসব হয়। মানুষ বিভ্রান্ত হলে নিজের ভাল-মন্দ বোঝার সামর্থ্য থাকেনা। তখন গোলামীও স্বাধীনতা মনে হয়। খুনিরাও বন্ধু মনে হয়। নরেন্দ্র মোদীর  ন্যায় খুনিরাও তখন সন্মানিত হয়।

মুসলিমদের বিভক্তিতে খুশি হয় কাফের শক্তি। তাই একাত্তরে বাঙালী মুসলিমরা বিজয়ের বিপুল সামগ্রী জুগিয়েছে দিল্লির শাসক মহলে। বিভক্তি মানেই দুর্বলতা ও পরাধীনতা । নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ আদায় করে বিভক্তির আযাব থেকে বাঁচা যায় না। তখন বাঁচতে হয় ঘাড়ে গোলামীর জোয়াল নিয়ে। বাঙালী মুসলিমগণ সজ্ঞানে গোলামীর সে পথই বেছে নিয়েছে। তবে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার জন্য বড় আযাবটি আখেরাতে।

২. বিজয় হারাম রাজনীতির ও ভাবনাশূণ্যতার

পানাহারের ন্যায় রাজনীতিতেও হালাল-হারাম আছে। হারাম হলো জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম ও মুসলিম দেশ ভাঙ্গার রাজনীতি। কোর’আন-হাদীস খুঁজে এ হারাম রাজনীতির পক্ষে একটি দলিলও পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে একাত্তরে হারাম রাজনীতিই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে। সে হারাম রাজনীতিরই ফসল হলো ভোটচোর স্বৈরাচারি হাসিনা।

মশামাছি মলমূত্রে বসে ও রোগজীবাণু ছড়ায়। এতে রোগব্যাধীর মহামারি শুরু হয়। বেঈমানেরা তেমনি মিথ্যায় বিশ্বাসী হয় এবং মিথ্যা ছড়ায়। তাতে বাড়ে নৈতিক রোগের মহামারি। একটি দেশে বেঈমানদের সংখ্যা ও তাদের বিপুল বিজয়টি বুঝা যায় মিথ্যার বাজার দেখে। বাংলাদেশে মিথ্যার বাজারটি যেমন বিশাল; তেমন বিশাল হলো মিথ্যায় বিশ্বাসীর সংখ্যা। দেশবাসী মিথ্যাকে যে কতটা বিশ্বাস করে -সেটি বুঝা যায় একাত্তরে ৩০ লাখের মৃত্যুর ন্যায় মিথ্যার বিশাল বাজার দেখে। মিথ্যার বড় নাশকতা হলো, সেটি মানুষকে চিন্তা শূণ্য করে। চিন্তাশূণ্যতার ফল হলো, গরু, সাপ, মুর্তি, ইত্যাদিও ভগবান গণ্য হয়। ফিরাউনের না্য় মানুষও তখন ভগবানে পরিণত হয়। অথচ তারা বুদ্ধিশূণ্য ছিল না; বিস্ময়কর পিরামিড তো তারাই নির্মাণ করেছিল। বিদ্যাবুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও মানুষ যেমন মিথ্যাবাদী হয়, তেমনি চিন্তাশূণ্যও হয়।

সেরূপ চিন্তাশূণ্যতার কারণেই বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, প্রশাসনের সচিব এবং সেনাবাহিনীর জেনারেলগণও মনে করে একাত্তরে তিরিশ লাখ বাঙালী মারা গেছে। তারা ভাবতে ব্যর্থ হয়, ৯ মাসে ৩০ লাখ মারা গেলে প্রতি দিন ১১ হাজার নিহত হতে হয়। একথাও তারা ভাবে না, সাড়ে সাত কোটির (৭৫ মিলিয়ন) মাঝে ৩০ লাখ (৩ মিলিয়ন) মারা গেলে প্রতি ২৫ জনে একজনকে মারা যেতে হয়। বাঙালীল ইতিহাসে আরেক বড় মিথ্যা হলো, মুক্তিবাহিনী নাকি বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। অথচ মুক্তিবাহিনী একটি জেলা দূরে থাক একটি থানাও কি স্বাধীন করতে পেরেছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পৃথক করে বাংলাদেশ বানিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। বিপুল সংখ্যক বাঙালী যে কতটা মিথ্যসেবী ও চিন্তাশূণ্য সেটি বুঝার জন্য কি কোন গবেষণার প্রয়োজন আছে? এমন মিথ্যসেবী ও চিন্তাশূণ্য চরিত্র নিয়ে কি কোন জনগোষ্ঠি সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে পারে? বাঙালীর কল্যাণ যারা চায় তাদের প্রচেষ্ঠা হওয়া উচিত এ রোগমুক্তির জন্য জিহাদে নামা। জিহাদের এটি এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। 

৩. রাজাকার প্রসঙ্গ ও কিছু বেঈমানের কান্ড

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতি স্বাভাবিক ব্যাপার হলো, রাজাকারদের গালী দেয়া। যারা ভারতের দালালী  করেএমন কি তাদেরও ভারতের রাজাকার বলে গালি দেয়া হয়। যেন রাজাকার শব্দটি একটি গালির শব্দ। বিষয়টি কি যথার্থ? যারা চিন্তাশীল ও দেশপ্রেমিক – এনিয়ে তাদের চিন্তা করা উচিত। একাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয়ের পর রাজকারদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে এবং তাদেরকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হলেও রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হয়নি। সে কাজটি তারাই বেশী বেশী করে যারা একাত্তরে ভারতে গিয়েছিল, ভারতের হাতে প্রতিপালিত হয়েছিল এবং ভারতের এজেন্ডা পূরণে তাদের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছিল। অপরদিকে রাজাকারগণ অস্ত্র ধরেছিল ভারত ও তার দালালদের বিরুদ্ধে। ভারত যে মুসলিমদের শত্রু এবং কখনোই বন্ধু হতে পারে না –সে সত্যটি সেদিন রাজাকারগণ যথার্থ ভাবে বুঝতে পেরেছিল। অথচ সে সত্যটি বুঝতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বাঙালী প্রফেসর,বহু রাজনীতিবিদ ও বহু প্রবীন বাঙালী বুদ্ধিজীবী।

বাংলাদেশের বুকে ভারতের আজ যে দখলদারী এবং বাঙালী মুসলিম জীবনে আজ যে গোলামী -সেটি রাজকারগণ একাত্তরেই বুঝতে পেরেছিল। অখন্ড পাকিস্তানের মধ্যে তারা বাঙালীর কল্যাণ দেখেছিল। কোন একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গা যে হারাম ও সে কাজে জড়িত হওয়া যে সুস্পষ্ট বেঈমানী -সেটি রাজাকারগণ মনে প্রাণে বিশ্বাস করতো। মুসলিমদের আজকের দুর্গতির মূল কারণ তো বিভক্তির এ হারাম পথ। রাজাগণ সেটি বুঝতো বলেই তারা একাত্তরে ভারতে যায়নি। মুসলিম দেশ ভাংগার হারাম রাজনীতিও করেনি। তারা পরাজিত হতে পারে কিন্তু তাদের বিশ্বাসকে তো মিথ্যা বলা যায় না। এজন্য কি রাজাকারকে কি গালী দেয়া যায়? সেটি তো ইসলামের মূল বিশ্বাসের সাথে বেঈমানী। ভারতীয় কাফেরদের সেবাদাসগণ রাজাকারকে গালী দিবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি কি কোন ঈমানদারের কাজ হতে পারে?

৪. ঈমান ও বেঈমানীর রূপ

ব্যক্তির ঈমানদারী ও বেঈমানী খালি চোখে দেখা যায়। ঈমান দেখা যায় ব্যক্তির চরিত্র, কর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতির মধ্যে। সেটি দেখা যায়, দুর্বৃত্ত শাসকের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃনা ও লাগাতর জিহাদে। দেখা যায়, দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদে অর্থদান, শ্রমদান, রক্তদান ও বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যে। অপর দিকে বেঈমানী দেখা যায় দুর্বৃত্ত শাসকের পক্ষে ভোট দেয়া, তাদের পক্ষে লড়া্‌ই করা ও তাদের রাজনীতিকে সমর্থন দেয়ার মধ্যে।

চুরিডাকাতি করাই শুধু অপরাধ নয়, অপরাধ হলো চুরিডাকাতিকে সমর্থন করাও। সামান্যতম ঈমান থাকলে কেউ কি সেটি করে? তেমনি চরম বেঈমানী ও অপরাধ হলো স্বৈরাচারকে সমর্থন করা। এরূপ বেঈমানেরা নামায-রোযা করলেও তারা বেঈমান। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিজয়ী হলো বেঈমানেরা এবং পরাজিত হয়েছে ঈমানদারেরা।

৫. বিজয় হারাম রাজনীতির

পানাহারের ন্যায় রাজনীতিতেও হালাল-হারাম আছে। হারাম হলো জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম, স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও মুসলিম দেশ ভাঙ্গার রাজনীতি। একাত্তরে হারাম রাজনীতি প্রবল ভাবে বিজয়ী হয়েছে। হারাম রাজনীতির ফসল হলো ভোটচোর হাসিনা ও তার দুর্বৃত্তির শাসন। এবং তাতে মারা পড়েছ গণতন্ত্র ও মৌলিক মানবিক অধদিকার। বাংলাদেশ চলছে সেক্যুলারজিমের রাজনীতি। দেশটির জন্মও সেক্যুলারিজমে। সেক্যুলারিজমে ব্যভিচার যেমন প্রেম, তেমনি মুসলিম দেশ ভাঙ্গার হারাম রাজনীতিও সিদ্ধ। তাই দেশটিতে কাফেরদের সাথে জোট বেঁধে পাকিস্তান ভাংঙ্গা ও ভারতের গোলামী করাও গণ্য হয় স্বাধীনতা রূপে।

৬. অভাব ঈমানদার মানুষের

বাংলাদেশে ঈমানদার মানুষের বড্ড অভাব। ঘরে আবর্জনা দেখে বলা যায়, সে ঘরে কোন সভ্য মানুষ বাস করে না। কারণ, সভ্য মানুষ কখনো আবর্জনার মাঝে বাস করে না। তেমনি দেশে দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতের শাসন দেখে বলা যায় দেশে ঈমানদার নাই। কারণ, ঈমানদার থাকলে অবশ্যই বেঈমান তাড়াতো।

৭. অপরাধীর কান্ড

চুরি-ডাকাতি করে যে চোর বা ডাকাত মসজিদ বানায় -তাতে কি চুরি-ডাকাতির অপরাধ মাফ হয়? হাসিনা ভোটডাকাতি করেছে। ভোটডাকাতির মাধ্যমে পুরা দেশ ডাকাতি করেছে। এখন পদ্মা ব্রিজ নিয়ে নিজের কৃতিত্ব জাহির করছে। কথা হলো, পদ্মা ব্রিজ কি তার নিজের বা পিতা শেখ মুজিবের টাকার? ডাকাতির অপরাধ কি তাতে মাফ হয়? বরং হাসিনার সহচরদের দুর্বৃত্তির কারণে বিশ্ব ব্যাংক দূরে সরেছে এবং তাতে পদ্মা ব্রিজ নির্মাণের কাজ এক যুগ পিছিয়ে গেছে। সে সাথে বহুগুণ বেড়েছে নির্মাণ-খরচ। বিশ্ব ব্যাংক না হঠলে পদ্মা ব্রিজের উপর দিয়ে বহু আগে থেকেই গাড়ি চলতো।

৮. বাঙালীর ব্যর্থতা ও অর্জিত আযাব

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ থামাতে ২০ লাখ মানুষ লন্ডনে মিছিল করেছিল। অনেকে বলে, সেটি ছিল তিরিশ লাখ মানুষের মিছিল। বাংলাদেশের মানুষের উপর চলছে হাসিনার নৃশংস যুদ্ধ। ২০ লাখ মানুষ ঢাকার রাজপথে নামলে কি হাসিনা থাকতো? তখন বিনা রক্তপাতে হাসিনার পতন ঘটতো। ঢাকার লোকসংখ্যা তো লন্ডনের দ্বিগুণ। গণতন্ত্র নিয়ে সভ্য ভাবে বাঁচার একটি খরচ আছে। সে খরচ দিতে মায়ানমারের লোকেরা প্রতিদিন রক্ত দিচ্ছে। বাঙালী গণতন্ত্র চায়, কিন্তু তার মূল্য দিতে তারা রাজী নয়। এখানেই বাঙালীর ব্যর্থতা।

জঙ্গলে বাঘ-ভালুকের বিরুদ্ধে মিছিল হয়না। দেশ যখন জঙ্গলে পরিণত হয় তখন ডাকাতদের বিরুদ্ধেও লড়াই হয় না। কারণ সেরূপ লড়াই নিয়ে বাঁচাটি তো সভ্য মানুষদের কাজ। যে দেশ দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়, যে দেশে ভোটডাকাতি, শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যা ও গুম-খুনের রাজনীত হলেও প্রতিবাদ হয়না –সে দেশে কি সভ্য সমাজ নির্মিত হয়? বরং সত্য হলো, এরূপ দেশে দুর্বৃত্তি ও স্বৈরাচার নিয়ে বাঁচাটাই সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। 

দেশকে ডাকাত মুক্ত করার দায়ভার কোন দলের নয়, এ দায়ভার প্রতিটি নাগরিকের। কিন্তু নাগরিকগণ যখন সে দায়ভার পালন করে না -তখন অসভ্য সমাজের আযাব তাদেরকে ঘিরে ধরে। তখন শুধু বিরোধী নেতারাই গুম-খুন হয় না, জনগণও তখন গুম, খুন, নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়। এসবই হলো অর্জিত আযাব।

৯. ভারতের চাওয়া ও পাওয়া

বাংলাদেশে ভারত শুধু তার সেবাদাস আওয়ামী-বাকশালীদের স্বাধীনতা দেখতে চায়। জনগণ ভোটের আজাদী পেলে ভারতের দালালগণ যে নির্বাচনে পরাজিত হবে -সেটি ভারত জানে। ভারতীয়দের মনে এজন্য  গণতন্ত্রভীতি। তাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু হলো ভারত ও তার সেবাদাস আওংয়ামী-বাকশালী গোষ্ঠি।

নিরপেক্ষ নির্বাচন কোন জটিল রকেট সায়েন্স নয়। নেপালেও সেটি সম্ভব। সেরূপ একটি নির্বাচন হচ্ছে পাশ্ববর্তী পশ্চিম বাংলাতেও। অথচ ভারত সেরূপ নির্বাচন বাংলাদেশে হতে দিতে রাজী নয়। বরং বাংলাদেশে যা চায় তা হলো ভোট ডাকাতির নির্বাচন। চায়, নির্বাচনের নামে ব্যালেট ডাকাতি করে আওয়ামী বাকশালীদের বিপুল বিজয়। তেমন একটি নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে। সে ভোটডাকাতিকে জায়েজ করতে ভারতীয় দূতাবাসগুলি ও মিডিয় বিশ্বজুড়ে প্রচারে নেমেছিল। ভারত চায়, বাংলাদেশ বেঁচে থাকুক একটি জেলখানা রূপে। জেলখানার লোকদের ভোটের অধিকার থাকে না। তেমনি ভোটাধিকার নাই বাংলাদেশীদেরও। ১২/০৪/২০২১ 




বিবিধ ভাবনা (৪১)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 ১.  ঈমানদার ও বেঈমানের  রাজনীতি

ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা ও আশা-আকাঙ্খা কখনোই গোপন থাকে না; সেগুলির সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে রাজনীতিতে। ঈমানদারের রাজনীতিতে ঘটে ঈমানের প্রকাশ।  তাতে প্রকাশ ঘটে মহান আল্লাহতায়ালা কি চান –সেটির। মহান আল্লাহতায়ালা চান তাঁর দ্বীনের বিজয়, চান আদালতে তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। চান, মুসলিমদের ঐক্য। তাই ঈমানদারের রাজনীতি থাকে মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধির প্রচন্ড ভাবনা। তাই তাঁর রাজনীতিতে কখনোই মুসলিম দেশের ভূগোল ভাঙ্গার ভাবনা থাকে না, বরং থাকে ভূগোল বৃদ্ধির ভাবনা। থাকে সর্ব শক্তি দিয়ে শত্রুশক্তির ভূগোল ভাঙ্গার রাজনীতির বিরোধীতা। একাত্তরে সে ভাবনা থেকেই প্রতিটি ইসলামী দল, প্রতিটি হকপন্থী আলেম ও ঈমানদার ব্যক্তি পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধীতা করেছে এবং বহু হাজার ব্যক্তি রাজাকার হয়েছে। অতীতে সে ভাবনা থেকেই মুসলিমগণ সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তির জন্ম দিয়েছে।

মুসলিমদের শুধু ঈমানদারদের চিনলে চলে না; চিনতে হয় বেঈমানদেরও। নইলে শত্রু ও মিত্র চেনার কাজটি হয় না। বেঈমানদের চেনার কাজটি সহজ হয় তাদের রাজনীতি দেখে। এদের রাজনীতিতে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা পূরণের কোন ভাবনা থাকে না। বরং থাকে ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতি করার ভাবনা। থাকে, যে কোন ভাবে ক্ষমতা দখলের এজেন্ডা। এবং সেটি কাফেরদের সাহায্য নিয়ে মুসলিম দেশকে খন্ডিত করার মধ্য দিয়ে হলেও। মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বেঈমানগণ সে কাজটিই করেছে একাত্তরে। তারা সেটি করেছে ভারতের ন্যায় কাফের দেশের মুসলিম বিরোধী এজেন্ডা পূরণের মধ্য দিয়ে। ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তান ভাঙ্গতে চেয়েছে; তারা অপেক্ষায় ছিল একজন মুজিবের। ১৯৭১’য়ে ভারতের অস্ত্র নিয়ে ভারতের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুজিবপন্থীগণ সেদিন যুদ্ধ করেছে। সামান্য ঈমান থাকলে কেউ কি এরূপ কাজ করতে পারে? ইসলামের প্রতি নিজেদের বেঈমানীটিট জানিয়েছে ইসলামের পক্ষ ছেড়ে এবং জাতীয়তাবাদের ন্যায় কুফরি মতবাদে দীক্ষা নিয়ে।  

প্রশ্ন হলো যারা কাফেরদের বিজয়ী করতে ও তাদের এজেন্ডা পূরণে তাদের দেয়া অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করে তাদেরকে কি ঈমানদার বলা যায়? বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরাই হলো ভারতের পদলেহী তাঁবেদার পক্ষ। ইসলাম ও মুসলিমের পরাজয় নিয়ে এরা ভারতীয় কাফেরদের সাথে মিলে উৎসব করে। প্রতিবছর সেটি দেখা যায় ১৬ই ডিসেম্বর এলে। দক্ষিণ এশিয়ার বুকে ভারত আজ বৃহৎ শক্তি –সেটি তো তাদের ভারতসেবী রাজনীতির কারণে। এরা শুধু পাকিস্তানের শত্রু নয়, বরং ভয়ানক শত্রু হলো ইসলাম ও বাঙালী মুসলিমদের। সে সাথে শত্রু গণতন্ত্রের।  বাঙালী মুসলিমদের মুসলিম রূপে বাঁচতে হলে এ শত্রুদের নির্মূল করতেই হবে। প্রতিটি মুসলিম জীবনে জিহাদ থাকে। বাঙালী মুসলিম জীবনে সে জিহাদটি হলো এ বেঈমানদের বিরুদ্ধে। লক্ষ্য এখানে পুণরায় পাকিস্তান বানানো নয়, বরং বাঙালী মুসলিমদের মাথা তুলে দাঁড়ানো। দায়িত্ব এখানে প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলা, আসাম, বিহার ও আরাকানে বসবাসকারী ২২ কোটি মুসলিমের নেতৃত্ব দেয়া।

২. যে পাপ বাঙালী মুসলিমের

বাংলাদেশে নিজ দল, নিজ জামায়াত, নিজ ফিরকা, নিজ মাযহাব, নিজ পীর ও নিজ নেতাকে বিজয়ী করতে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ করছে। দেশের পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী, বিজিবি, প্রশাসন, বিচারক বাহিনী তাদের সর্বশক্তি বিনিয়োগ করছে ভোটচোর অবৈধ হাসিনার প্রতিটি হুকুমকে প্রতিষ্ঠিত দিতে। কিন্তু দেশে লোক নাই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমকে বিজয়ী করার । ফলে বাংলাদেশের বুকে বিজয়টি ইসলামের শত্রুদের। বাঙালী মুসলিমগণ এভাবেই পরাজয় বাড়িয়েছে ইসলামের। এবং অসম্মান বাড়িয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার। এ পাপ তো বিশাল। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত দিয়ে কি এ পাপ মোচন হয়?

৩. গোলামীর পথে বাঙালী মুসলিম

ঈমান থাকলে জিহাদও আসে। কারণ জিহাদ ঈমানের অংশ। তাই নবীজী (সা:) ও তাঁর প্রতিটি সাহাবার জীবনে জিহাদ ছিল। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। জিহাদ মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য আনে। ফলে বিজয় আসে। তখন বিজয়ী হয় মুসলিম এবং প্রতিষ্ঠা পায় ইসলাম। এবং জিহাদ না থাকলে আসে পরাজয়। বাঙালী মুসলিম জীবনে জিহাদ নাই, ফলে বাঙালী মুসলিম জীবনে বিজয়ও নাই। তাদের বাঁচতে হয় শয়তানী শক্তির গোলামী নিয়ে। বাঙালীরা মুসলিমগণ ১৯৭১ থেকে ভারতের গোলামীর পথটাই বেছে নিয়েছে। তাই নির্যাতন, জেল ও মৃত্যু নেমে এসেছে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের জীবনে।  

৪. খুনিদের উৎসব

হাসিনা ঢাকার খুনি। সে শত শত মুসলিমের লাশ ফেলছে। আর নরেন্দ্র মোদি হচ্ছে গুজরাতের খুনি। সে যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন ৫ হাজার মুসলিমের লাশ ফেলেছে। বাবরী ধ্বংসের কাজেও সে অংশ নেয়। দুই খুনি এখন ঢাকায় উৎসব করছে। জনগণকে রাস্তায় নামতে নিষেধ করেছে।

বন্ধুত্ব গড়তে সবাই মনের মিলটা দেখে। এজন্যই দুর্বৃত্তরা সব সময় দুর্বৃত্তদের ভালবাসে। কারণ,তারাই তাদের মনের অতি কাছের মানুষ। মাছি যেমন মলমুত্র খোঁজে, দুর্বৃত্তও তেমনি দুর্বৃত্ত খোঁজে। তেমনি খুনি খোঁজে আরেক খুনিকে। এজন্যই খুনি হাসিনা তার পিতার জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে কোন ভাল মানুষকে নয়, গুজরাতের কুখ্যাত খুনি নরেন্দ্র মোদিকে অতিথি করেছে। হাসিনা জানে, নরেন্দ মোদি তাকে যেমন ভালবাসে, দুনিয়ার কোন সভ্য মানুষই সেরূপ ভালবাসে না।বরং নিজের অসভ্য ও বর্বর কর্মের জন্য প্রতিটি সভ্য মানুষের কাছেই সে ঘৃণার পাত্র।

৫.অবমাননা মহান আল্লাহতায়ালার এবং বিজয় শয়তানের

বাংলাদেশে আইন অমান্য করলে বা কোন দুর্বৃত্ত বিচারপতির হুকুমের অবমাননা করলে শাস্তি হয়। দেশের পুলিশ বাহিনী ও আদালত সে অবমাননাকারীকে জেলে তুলতে তৎপর। অথচ দেশটিতে  দিনরাত বিদ্রোহ ও অবমাননা হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম ও তাঁর শরিয়তি আইনের। অথচ তার কোন বিচার নাই; কারো কোন শাস্তিও নাই। কোন প্রকৃত ঈমানদার কি তাঁর মহান প্রভুর এরূপ অবমাননা কখনো সইতে পারে? সইলে কি ঈমান থাকে?

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মু’মিনের পরিচয় হলো, সে তাঁর পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফা ও সৈনিকের। সৈনিকের কাজ তো রাজার আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের ধরে ধরে শাস্তি দেয়া। নইলে ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটি শুধু কিতাবেই থেকে যায়।  নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের যুগে  কেউ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম ও তাঁর শরিয়তি আইনের বিরুদ্ধে এরূপ অবমাননা ও বিদ্রোহ করলে কি তার ঘাড়ে মাথাটি থাকতো? অথচ বাংলাদেশে আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে বাঁচাটিই সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এরপরও তারা গর্ব করে বলে, তারা ঈমানদার? নবীজী (সা:)’র যুগে প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ ছিল মুনাফিক -যারা নবীজী (সা:)’র পিছনে মসজিদে নববীতে নামায পড়তো। বাংলাদেশে এ মুনাফিকদের সংখ্যা যে বিপুল -তা কি নিয়ে সন্দেহ আছে?  দেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও আইন-আদালতে তো এরাই বিজয়ী শক্তি। তাই বাংলাদেশে উৎসবটি শয়তান ও তার অনুসারীদের।

৬. জিহাদ বাছাই কাজ করে ঈমানদারদের

নামাযে অর্থ ও রক্তের খরচ নাই, তাই সেখানে সুদখোর, ঘুষখোর ও মিথ্যুক দুর্বৃত্তদের দেখা যায়। মুনাফিকদেরও দেখা যায়। তাদের থেকে প্রকৃত ঈমানদারদের আলাদা করার ক্ষেত্রটি হলো জিহাদ। জিহাদে তারাই যোগ দেয় -যারা প্রকৃত ঈমানদার। তাঁরা বাঁচে ও প্রাণ দেয় মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে এবং তাঁর বিধানকে বিজয়ী করতে। জিহাদে তো তারাই যোগ দেয় যারা বিনা বিচারে জান্নাতে যেতে চায়। বেঈমান কখনোই আল্লাহকে খুশি করার লক্ষ্যে বাঁচে না। তারা বাঁচে নিজেকে এবং নিজের পরিবার, দল ও নেতাকে খুশি করতে।

৭. ঈমানদারের জিহাদ ও বেঈমানের যুদ্ধ

সবার জীবনেই যুদ্ধ থাকে। অনেকের যুদ্ধ স্রেফ বাঁচার যুদ্ধ। বেঈমানের যুদ্ধটি তাকে জাহান্নামে নেয়। বেঈমানের সে যুদ্ধটি হয় ভাষা, গোত্র, অঞ্চল, দল ও নেতার নামে। ঈমানদারের যুদ্ধ তাঁকে জান্নাতে নেয়। ঈমানদারের প্রতিটি যুদ্ধই জিহাদ। জিহাদের লক্ষ্য ইসলামের প্রতিষ্ঠা, মুসলিম দেশের প্রতিরক্ষা ও জান-মালকে সুরক্ষা দেয়া। জিহাদই ইসলামে শ্রেষ্ঠ ইবাদত। ইবাদত এখানে শয়তানী পক্ষকে পরাজিত করার। জিহাদে যারা প্রাণ দেয় তারা শহীদ হয় এবং বিনা হিসাবে জান্নাত পায়।

১৯৭১’য়ে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধটি জিহাদ ছিল না। সে যুদ্ধটি ছিল সেক্যুলারিজম ও বাঙালী জাতীয়তাবাদের নামে। সে যুদ্ধে ইসলাম কোন বিষয়ই ছিল না। মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধিও এ যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল না। যুদ্ধের অস্ত্রদাতা, অর্থদাতা ও মূল পৃষ্ঠপোষক ছিল ভারতীয় কাফেরগণ এবং পরিচিত শত্রুদেশ রাশিয়া। তাদের যুদ্ধে লাভবান হয়েছে ভারত। এ যুদ্ধে তাদের ও মুক্তিবাহিনীর যারা মারা গেছে ভারতীয় কাফেরগণ তাদের শহীদ বলে।  অথচ শহীদ একটি কোর’আনী পরিভাষা, হিন্দুদের ধর্মীয় বইয়ে শহীদ বলে কোন শব্দ নাই। তাই যারা প্রকৃত শহীদ হতে চায় তারা একাত্তরে ভারতের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করা থেকে সযত্নে দূরে থেকেছে। কারণ মুসলিমের প্রতিটি খাবার যেমন হালাল হতে হয়, তেমনি প্রতিটি যুদ্ধকে শতভাগ হালাল হতে হয়। এবং যুদ্ধতো তখনই হালাল হয় যখন সেটি বিশুদ্ধ জিহাদ হয়। তাছাড়া মুসলিম দেশ বাঁচানোর যুদ্ধ জিহাদ হয়, ভাঙ্গার যুদ্ধ কখনোই জিহাদ হয় না। সে হুশ থাকার কারণেই কোন আলেম এবং ইসলামপন্থী কোন দল ও ব্যক্তিকে মুক্তিবাহিনীতে দেখা যায়নি।

৮. জিহাদ বিরামহীন

ঈমানদারের জীবনে জিহাদ অবিরাম। কখনো সেটি বুদ্ধিবৃত্তিক, কখনো অস্ত্রের। কখনো সেটি নফসের বিরুদ্ধে, কখনো সেটি সশস্ত্র শত্রুর বিরুদ্ধে। নামায দিনে ৫ বার। রোযা  বছরে ১ মাস। এবং হজ্জ জীবনে একবার। কিন্তু জিহাদ প্রতি দিন ও প্রতিক্ষণ। জিহাদে ক্বাজা নাই। জিহাদ না থাকার অর্থ, শত্রুর হাতে পরাজয় ও আত্মসমর্পণ। দেশ যখন ইসলামের শত্রু শক্তির দখলে তখন জিহাদ থেকে দূরে থাকা বেঈমানী। তখন বিজয়ী হয় শয়তান। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে।

নামায-রোযা করেও বহু মানুষ মুনাফিক হয়। নবীজী (সা:)র পিছনে নামায আদায় করেও অনেকে মুনাফিক হয়েছে। এরা কাফিরদের চেয়েও নিকৃষ্ট। ন্যায়ের পক্ষে থাকা এবং জিহাদে যোগ দেয়ার সামর্থ্য এদের থাকে না। এরা অপরাধী; এরা যুদ্ধ করে চোরডাকাত, ভোটডাকাত ও দুর্বৃত্তদের বিজয়ী করার লক্ষ্যে।

৯. ফরজে অবহেলা এবং আসক্তি হারামে

ইসলামে ফরজ হলো একতা গড়া। এবং হারাম হলো অনৈক্য গড়া। বাঙালী মুসলিম জীবনে অনৈক্য দেখে বুঝা যায় অনৈক্য গড়ার ন্যায় হারাম কাজে তাদের কত আগ্রহ। দেশ ডাকাতদের দখলে গেছে, ডাকাত তাড়াতে তবুও রাজী নয় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো! একতায় রাজী নয় দেশের আলেম সমাজ। অনৈক্যের হারাম নিয়ে বাঁচাই যেন তাদের নীতি।অনৈক্যে এরূপ ডুবে কি আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা যায়? মিলবে কি জান্নাত?

১০. উৎসব কি পরাধীনতা নিয়ে?

বাংলাদেশে কোথায় স্বাধীনতা? মিছিল করতে গেলে লাশ হতে হয়। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে গুম হতে হয়। এবং ভোট ডাকাতি হয়ে যায়। কথা হলো, এসব কি স্বাধীনতার লক্ষণ? এমন দেশে আবার কিসের উৎসব? দেশবাসীকে পরাধীন করে হাসিনা তার প্রভু নরেন্দ্র মোদিকে পদসেবা দিচ্ছে নিরীহ মানুষকে বলি দিয়ে। নরেন্দ্র মোদির আগমন কালে ২১জন নিরীহ মানুষকে হাসিনা করেছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে অপরাধী ব্যক্তি হচ্ছে হাসিনা। এ ভয়ানক অপরাধীকে দেশবাসী কি শাস্তি দিবে না? ০৯/০৪/২০২১

 




বিবিধ ভাবনা (৪০)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. অপরাধীদের দখলদারী ও জনগণের ব্যর্থতা

মানব সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গণটি হলো রাজনীতি। জাতি কোন দিকে যাবে -তা ক্ষেত-খামার, হাট-বাজার, কলকারখানা বা স্কুল-কলেজ থেকে নির্ধারিত হয় না। সেটি নির্ধারিত হয় রাজনীতি থেকে।  তাই যারা দেশ ও দেশবাসীর ভাগ্য পাল্টাতে চায় তারা রাজনীতিতে যোগ দেয়। সমাজ বিপ্লবের এটিই হাতিয়ার। ইসলাম যেহেতু মানুষের জীবনধারাই পাল্টাতে চায়, রাজনীতিকে তাই জিহাদের মর্যাদা দিয়েছে। রাষ্ট্রের অঙ্গণে ইসলাম বিজয়ী হবে না পরাজিত হবে –সেটিই নির্ধারিত হয় রাজনীতি বা জিহাদের ময়দান থেকে। যাত্রীবাহী বাসে চালকের যে ভূমিকা, দেশের ক্ষেত্রে সে ভূমিকাটি হলো রাজনৈতিক নেতা বা সরকার-প্রধানের। বাসের চালক যদি সুস্থ্য থাকে তবে সকল যাত্রী মদ খেয়ে বেহুশ হয়ে পড়লেও তাতে গাড়ি খাদে পড়ে না। দুর্ঘটনাও ঘটে না। সুস্থ্য চালকের কারণে বাস তখন সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে। কিন্তু বাসের চালক যদি মদ খেয়ে ঢলে পড়ে তবে দুর্ঘটনা ঘটবেই। তাতে প্রাণনাশও হতে পারে। তখন যাত্রীদের ক্রন্দন বা দোয়া-দরুদে লাভ হয় না।

একই কারণে ভয়ানক বিপদ ঘটে দুর্বৃত্তকে ক্ষমতায় বসালে। তখন সমগ্র দেশ ডাকাতি হয়ে যায়। সে বিপদ থেকে বাঁচতেই সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে  রাষ্ট্রনায়কের সিটে বসাতে হয়। এটিই হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ। দেশবাসীর প্রজ্ঞার প্রকাশ তো এভাবেই ঘটে। এবং সেটিই হলো নবীজী (সা:)’র সর্বশ্রেষ্ঠ সূন্নত। মুসলিমগণ অতীতে যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিল সেটি মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ার কারণে নয়। সেটি হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আসন থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূল ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দেয়ার কারণে।

নবীজী(সা:) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন ততদিন তিনিই ছিল ছিলেন মুসলিমদের রাজনৈতিক নেতা এবং সে সাথে রাষ্ট্রপ্রধান। নবীজী (সা:)’র ইন্তেকালের পর সে আসনে বসেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ। কিন্তু বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে নবীজী (সা:)’র বহু সূন্নত বেঁচে থাকলেও অতি গুরুত্বপূর্ণ সে সূন্নতটি বেঁচে নাই। চোর-ডাকাত-দুর্বৃত্তদের সন্মানিত করা ও তাদেরকে শাসন ক্ষমতায় বসানো তো দুর্বৃত্তদের সংস্কৃতি। অথচ বাংলাদেশে সেটিই এখন বিজয়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ফলে নবীজী (সা:)’র সে পবিত্র শাসনটি হাইজ্যাক হয়েছে ভোটডাকাত দুর্বৃত্তদের হাতে। জনগণের মাঝে তা নিয়ে কোন বিদ্রোহ নাই। মুসলিম দেশগুলিতে ইসলামের পরাজয়ের মূল কারণ তো এই দুর্বৃত্তদের অধিকৃতি ও জনগণের আত্মসমর্পণ।  

পুরা একটি দেশকে হাইজ্যাক করার লক্ষ্যে শাসন ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনটি দখলে নিলেই চলে। সারা দেশ তখন দখলে এসে যায়। হাসিনার নেতৃত্বে ভোটডাকাতগণ সে ভাবেই বাংলাদেশকে হাইজ্যাক করেছে। ফলে দেশ এখন তাদেরই দখলে। তাই জনগণকে শুধু দেশের সীমান্ত পাহারা দিলে চলে না, পাহারা দিতে হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনটিকেও। প্রয়োজনে সে জন্য যুদ্ধ করতে হয়। সভ্য দেশের নাগরিকদের এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অথচ বাংলাদেশের জনগণ সে দায়িত্ব পালনে পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে আছে একজন ভোটডাকাত।

তাছাড়া যে পবিত্র আসনে খোদ নবীজী (সা:) বসেছেন, সে আসনে কি কোন চোর-ডাকাত-দুর্বৃত্তকে বসানো যায়? তাতে যেমন নবীজী (সা:)’র সূন্নতের অবমাননা হয়, তেমনি অবমাননা হয় সে পবিত্র আসনের। সেরূপ অবমাননা আযাব ডেকে আনে। তাছাড়া চুরি করা যেমন অপরাধ, তেমনি অপরাধ হলো সে চুরিকে বৈধতা দেয়া। রাষ্ট্রের উপর চোরডাকাতদের সে অবৈধ অধিকৃতির বৈধতা দেয়ার অপরাধটি ঘটে তখন, যখন সে অপরাধীদের না হটিয়ে তাদের শাসন বাঁচাতে রাজস্ব দেয়া হয়। অথচ ডাকাতদের ভোট দেয়া যেমন অপরাধ, তেমন অপরাধ হলো তাদেরকে রাজস্ব দিয়ে প্রতিপালন দেয়া। সে অপরাধের জন্য শাস্তি পেয়েছিল ফিরাউনের প্রজারা। বাংলাদেশের জনগণ একই গুরুতর অপরাধ করছে হাসিনার ন্যায় এক ভোটডাকাত দুর্বৃত্তকে রাজস্ব দিয়ে প্রতিপালন করে। তবে বাংলাদেশে জনগণের আরো অপরাধ হলো, তারা নিজেরাও অনেক সময় দুর্বৃত্তদের সক্রিয় সহযোগী হয়ে পড়ে। ডাকাতেরা একাকী ডাকাতি করতে পারে না; ডাকাতিতে তাদেরও লোক বল চাই। হাসিনার ডাকাতিতে লোকবল জুগিয়েছে বাংলাদেশের সেনবাহিনী, পুলিশ, প্রশাসন ও আদালতের লোকজন। অপর দিকে শেখ মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারি, খুনি, গণহত্যাকারী এবং ভারতীয় দালালও একাকী রাষ্ট্রক্ষমতা হাইজ্যাক করেনি। সে কাজে সহায়তা দিয়েছে দেশের জনগণ।

জনগণের দয়-দায়িত্বটি বিশাল। ব্যক্তির মর্যাদা তো সে দায়িত্ব নিয়ে বাঁচায়। মহান আল্লাহতায়ালা শুধু ঈমানই দেখেন না, আমলও দেখেন। জান্নাতে তো তারাই যাবেন যারা ঈমান ও আমল – এ উভয় ক্ষেত্রেই উন্নত। আমলের মধ্যেই ধরা পড়ে ব্যক্তির বিবেক, চরিত্র ও ঈমানের মান। এবং নেক আমল শুধু দান-খয়রাত নয়, সবচেয়ে বড় নেক আমল হলো দেশের শাসন ক্ষমতা থেকে শয়তান নির্মূল করা। দেশ সভ্যতর হয় তো এ আমলের গুণে। প্রাসাদসম মসজিদ গড়ে দেশ পাল্টানো যায় না, বিপ্লব আনতে হয় দেশের রাজনীতিতে। বাসের চালক দুর্ঘটনা ঘটালে কিছু যাত্রী মারা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের চালক দুর্ঘটনা ঘটালে লাখ লাখ লোকের মৃত্যু হয়। দেশ তখন আযাবের যন্ত্রে পরিণত হয়। তাই সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হলো, কোন দুর্বৃত্তকে সরকার-প্রধানের আসনে বসানো। এবং এ কারণেই সবচেয়ে বড় নেক আমলটি পথের কাঁটা সরানো বা বাঘ তাড়ানো নয়, সেটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আসন থেকে অপরাধী ব্যক্তিদের নির্মূল করা। ইসলামের একাজে পবিত্র জিহাদের মর্যাদা রয়েছে। শয়তানকে তো এভাবেই পরাজিত করা যায়। বাজারে সামান্য মাছ কিনতে গেলেও কোনটি পচা এবং কোনটি ভাল –সেটি যাচাই-বাছাই করে কিনতে হয়।  নইলে পচা মাছে স্বাস্থ্যহানী ঘটে। সে নিখুঁত যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি করতে হয় রাজনীতির ময়দানে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কাকে বসানো হয় –সেটি খুঁতিয়ে দেখার মধ্যেই দেশের মহা কল্যাণ। এখানে ব্যর্থ হলে ভয়ানক শত্রু এবং দুর্বৃত্তও শাসকে পরিনত হয়। সে কাজে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতাটি বিশাল। বাংলাদেশে আজ যে ভয়ানক দুঃশাসন -সেটি এক দিনের কামাই নয়। এবং সেটি শুধু সরকারের ব্যর্থতাও নয়। বরং সে জন্য দায়ী বহুদিন ধরে চলা জনগণের নিজেদের ব্যর্থতাও।

 ২. রাজনীতিবিমুখ বাঙালী মুসলিম

জনগণের কান্ডজ্ঞান, ধর্মপ্রেম, দেশপ্রেম ও বিবেকবোধ বোঝা যায় রাজনীতিকে তারা কতটা গুরুত্ব দেয় তা থেকে। সত্যের জয়-পরাজয়ের ন্যায় মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধান জিতবে না হারবে –সেটি মসজিদ-মাদ্রাসায় স্থির হয় না, নির্ধারিত হয় রাজনীতির ময়দানে। অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার ন্যায় মুসলিম জীবনের যে মূল মিশন –সে মিশন নিয়ে বাঁচার পূরণে মূল হাতিয়ারটি হলো রাজনীতি। এজন্যই নবীজী (সা:) নিজে ছিলেন রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্রনায়ক। রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন তাঁর সকল সাহাবাগণ। তাই রাজনীতি থেকে দূরে থাকাটি ইসলামের মিশনের সাথে বেঈমানী। সেটি নবীজী(সা)র সূন্নতের সাথে গাদ্দারী। তাতে বিজয়ী হয় শয়তানের পক্ষ।

তাছাড়া ঈমানের মূল পরীক্ষাটি হয় রাজনীতিতে। নামায-রোযা-হজ্জ অনেক ঘুষখোর, সূদখোর ও হাসিনার ন্যায় ভোটচোর জালেমও করে, কিন্তু রাজনীতিতে ধরা পড়ে সে আসলে কোন পক্ষের সৈনিক। রাজনীতির ময়দানে এক সাথে দুই পক্ষে লড়াই করা যায়না, যে কোন এক পক্ষ বেছে নিতে হয়। ঈমানদারকে যোগ দিতে হয় ইসলামকে বিজয়ী করার পক্ষে। এটি পবিত্র জিহাদ। এ জিহাদে ঈমানদারকে শুধু ভোট দিলে চলে না, বিনিয়োগ করতে হয় তাঁর দৈহিক, আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য। এমন কি বিলিয়ে দেয় তার রক্ত ও প্রাণ। অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। ঈমানদারের ঈমানদারী এভাবেই খালি চোখে দেখা যায় তাঁর রাজনীতিতে।

অথচ অধিকাংশ বাঙালী মুসলিমের রাজনীতিতে রুচি নাই। রাজনীতির ময়দানে নাই অধিকাংশ আলেম ও তাবলিগ জামায়াতের লোকেরা, এটিকে তারা দুনিয়াদারী মনে করেন। নবীজী (সা:)’র রাজনৈতিক সূন্নতের ধারে কাছেও তারা নাই। যারা নিজেদের নামাযী ও রোযাদার ভাবেন, তারাও ইসলামকে বিজয়ী করা নিয়ে ভাবেন না। এজন্যই রাজনীতিতে তাদের তেমন বিনিয়োগও নাই। নির্বাচন কালে বড় জোর ভোট দেন। এবং তাদের অধিকাংশই ভোট দেন তাদেরকে যারা সেক্যুলারিস্ট রূপে পরিচিত এবং যাদের এজেন্ডা হলো ইসলাম ও তার শরিয়তী বিধানকে পরাজিত রাখা। বস্তুত তাদের  কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিরংকুশ বিজয়টি ইসলামের শত্রুপক্ষের।  

 

৩. পালিত হয়নি দায়িত্ব

গণতন্ত্রের সুফলটি বিশাল, এটি জনগণের ক্ষমতায়ন করে। দায়িত্ব দেয় সরকার নির্বাচনের। এ দায়িত্বটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে বাড়ে জনগণের নিজ দায়িত্বও। সে দায়িত্বটি সঠিক ভাবে পালন না করাটিও গুরুতর অপরাধ। দায়িত্ব এখানে যোগ্য, সৎ ও ঈমানদার মানুষকে নির্বাচিত করার। সেটি না হলে অপরাধটি হয় ইসলাম, দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে। পাপটি তখন ফিরাউন ও নমরুদের ন্যায় দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকদের পক্ষে দাঁড়ানোর ও ইসলামকে পরাজিত করার। তাই পাপটি এখানে ভয়নাক। এ পাপই জনগণকে জাহান্নামে টানে। সে পাপের কারণেই বাংলাদেশের জনগণের ইসলামী শাসনের সুফল থেকে তারা বঞ্চিত এবং ঘানি টানছে বর্বর স্বৈরশাসনের।

লক্ষণীয় হলো, শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ন্যায় নৃশংস স্বৈরশাসক বন্দুকের জোরে ক্ষমতায়  আসেনি। এসেছে কখনো বা জনগণের ভোটে, কখনো বা ভোটডাকাতি করে। ভোট দিয়ে মুজিব ও হাসিনার ন্যায় অপরাধীদের নির্বাচিত করার অপরাধটি অতি গুরুতর। এটি রুচিহীন অসভ্য কর্ম। অপরাধটি এখানে বাংলাদেশের জনগণের। আদালতে দাঁড়িয়ে খুনি ও চোরডাকাতকে ভাল মানুষ বলে সাক্ষী দিয়ে জেল থেকে তাদেরকে মুক্ত করাটি জঘন্য অপরাধ। তাতে সমাজ জুড়ে অপরাধ ও অশান্তি বাড়ে। তেমনি গুরুতর অপরাধ হলো স্বৈরাচারি ভোট-ডাকাতদের পক্ষে ভোট দিয়ে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসানো।

৪. চেনা হয়নি শত্রুদের

প্রতিটি মানুষকেই কিছু দায়-দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে হয়। দায়-দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে হয় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও আলেম সমাজকেও। তাদের কাজটি হলো দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জনগণের সামর্থ্য বাড়ানো। সে সাথে তাদের আরো দায়িত্ব হলো যেসব দুর্বৃত্তগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসতে চায় তদের আসল রূপকে জনগণের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিও হয়নি। বরং যাদের দায়িত্ব ছিল দুর্বৃত্তদের মুখোশ উম্মোচন করা, তারাই দুর্বৃত্তদের সাফাই গায়। অথচ চুরি করা যেমন অপরাধ, তেমনি অপরাধ হলো চোরকে সাহায্য করা। ফলে তাদের এ ব্যর্থতার কারণে চেনা হয়নি দেশের শত্রুদের। অথচ সভ্য সমাজ নির্মাণের কাজে শুধু হিংস্র পশুদের চিনলেই চলে না, চিনতে হয় মানবরূপী ভয়ানক শত্রুদেরও। সে ক্ষেত্রে ভূল দেশে গণহত্যা ঘটে এবং দেশের উপর স্বৈরাচারি বর্বরতা ও অসভ্যতার প্লাবন নেমে আসে। অথচ জনগণের সে অপরাধের কারণেই হাসিনা যেমন ক্ষমতায় এসেছে, অতীতে মুজিবও এসেছে। হাসিনাকে চিনতে জনগণ যেমন দারুন ভাবে ব্যর্থ হয়েছে তেমনি ব্যর্থ হয়েছে মুজিবকে চিনতেও।

কীরূপ ছিল মুজিব? কীরূপ ছিল তার রাজনীতি? শেখ মুজিবের রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যটি ছিল যে কোন রূপে ক্ষমতা-দখল দেশের স্বাধীনতা, অখন্ডতা, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবিষয়গুলি তার কাছে কোন কালেই গুরুত্ব পায়নি। মুজিব ভারতকে সাথে নিয়ে পাকিস্তান ভেঙ্গেছে বাংলাদেশীদের জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি বা গণতন্ত্র দেয়ার জন্য নয়। বরং সেটি ছিল স্রেফ শাসন ক্ষমতা নিজ হাতে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে। ক্ষমতার লোভে এমন কি শত্রু দেশের সাথে ষড়যন্ত্র করাও তার কাছে গর্হিত মনে হয়নি। ভারতের সাথে মিলে আগরতলা ষড়যন্ত্র্ করেছে ক্ষমতা-লাভকে প্রতিদ্বন্দিতাহীন করতে খুন করা হয়েছে ৩০ হাজারের বেশী মানুষকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সকল বিরোধী দলকে এবং কবরে পাঠানো হয়েছে গণতন্ত্রকে

বাঘ-ভালুকের চেয়ে বহুগুণ অধিক প্রাণনাশী হলো স্বৈরাচারি শাসকেরা। তারাই ইতিহাসে গণহত্যা, গণধর্ষণ, গুম-খুনের নায়ক।  বাংলাদেশেও তাই লাশ পড়ে স্বৈরাচারি শাসকের হাতে, বাঘ-ভালুকের হাতে নয়। প্রতিটি সভ্য দেশে এজন্যই স্বৈরাচারি শাসকদের ঘৃণা করা হয়। এবং ইতর  ও অসভ্য গণ্য করা হয় তাদের যারা তাদের প্রতি  শ্রদ্ধা দেখায়। হিটলারের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো এজন্যই জার্মানীতে অপরাধ। জাহান্নামে যাওয়ার জন্য শয়তানকে ভালবাসাই যথেষ্ট। বস্তুত ব্যক্তির সভ্য ও অসভ্য রূপটি চেনার জন্য কোন গবেষণা লাগে না, সেটি দেখা যায় কাকে সে ভাল বাসে বা ঘৃণা করে -সেটি দেখে। মানুষের চরিত্র তো এভাবেই দর্শনীয় হয়। বাঙালীর সে চরিত্রটি দেখা যায় মুজিবের ন্যায় একজন নৃশংস স্বৈরচারীকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলার মধ্য দিয়ে। তার ন্যায় একজন গুরুতর অপরাধীকে কোন সভ্য মানুষ জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলবে সেটি কি ভাবা যায়? মুজিবের অপরাধ তো শুধু বাকশালী স্বৈরাচার নয়, ৩০ হাজার মানুষের প্রাণনাশ নয় এবং মানবিক অধিকার কেড়ে নেয়াও নয়। বরং তার অপরাধ তো ১৮ কোটি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে তাদেরকে ভারতের ন্যায় শত্রুশক্তির দাস বানানোর। তার কারণেই সমগ্র বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে একটি ভারতীয় জেলখানায়। অপরাধ তো স্বাধীন মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার অধিকার কেড়ে নেয়ার।

 

৫. মিলবে কি গণতন্ত্রের সুফল?

গণতন্ত্রের সুফল পেতে হলে জনগণকে প্রথমে শিক্ষিত ও বিবেকবান হতে হয়। শত্রু ও মিত্র, যোগ্য ও অযোগ্য এবং সত্য ও মিথ্যা –এ গুলি চেনার সামর্থ্য অর্জন করতে হয়। নইলে দুর্বৃত্তগণ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। নির্বাচন তখন ধুর্ত চোরডাকাতদের জন্য ক্ষমতার শীর্ষে উঠার সিঁড়িতে পরিণত হয়। ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়া যায়না। তেমনি জনগণকে সুশিক্ষিত নাগরিক রূপে গড়ে তোলার আগে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা দেয়া যায় না। অথচ বাংলাদেশে জনগণের মাঝে সে সামর্থ্য সৃষ্টির কাজটি হয়নি। বরং আগে যা ছিল সেটি দুষ্ট শিক্ষা ও প্রচারনায় বিনষ্ট করা হয়েছে।

পাশ্চত্যের যেসব দেশে গণতন্ত্র সফল ভাবে কাজ করছে -সেসব দেশে জনগণকে শিক্ষিত করার কাজটি শত বছর আগেই সমাধা করা হয়েছে। সেসব দেশে জনগণের মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে নৈতিকতা ও বিবেক বোধ। ফলে স্বৈরাচারি শাসকদেরকে তারা গভীর ভাবে ঘৃণা করে। ঘৃণা করে দুর্বৃত্তদের। ফলে সেসব দেশে কোন স্বৈরচারী দুর্বৃত্তকে জাতির পিতা, নেতা ও বন্ধু বলা হয়না। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের লোকেরা ভোটডাকাতিতে সাহায্য করবে -সেটিও ভাবা যায় না। আদালতের বিচারপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ভোটডাকাতির নির্বাচনকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলে রায় দিবে -সেটিও সেদেশগুলিতে কল্পনা যায়না। কিন্তু বাংলাদেশে সেটিই সংস্কৃতি।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে কি সেরূপ নৈতিকতা ও বিবেকবোধ নিকট ভবিষ্যতে গড়ে উঠবে? সে সম্ভাবনা তো ক্ষীণ। কারণ, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো জনগণকে শিক্ষিত করায় যাদের দায়িত্ব তাদের নিয়ে। দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিজেদেরই শিক্ষিত হওয়াতে অনেক ব্যর্থতা রয়েছে। তারাই দেশের অন্যতম নীতিহীন ও বিবেকহীন শ্রেণী। তারাই ভোটডাকাতিকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলে এবং ভোটডাকাত হাসিনাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে। ফলে তারাই গণতন্ত্রের বড় শত্রু। রোগী যেমন রোগ ছড়ায়, এরাও তেমন নীতিহীনতা ও বিবেকহীনতা ছড়াবে। এরূপ নীতিহীনতা ও বিবেকহীনতায় কি কোন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়? নির্মিত হয় কি সভ্য সমাজ? দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে এ নিয়ে ভাবা উচিত। ০৩/০৪/২০২১

 




জিহাদ বিলুপ্তির নাশকতা

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

আক্রোশ কেন জিহাদের প্রতি?

দুর্বৃত্ত শাসনের সবচেয়ে বড় নাশকতাটি স্রেফ দুর্বৃত্তির বিস্তার নয়; বরং সেটি হলো জিহাদের ন্যায় মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটির বিলুপ্তি। তখন পন্ড হয় সভ্যতর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব প্রকল্প। তখন বিজয়ী হয় শয়তানী পক্ষ; এবং প্লাবন আসে দুর্বৃত্তির। তখন দুর্বৃত্তি নির্মূলের প্রচেষ্ঠাগুলো গণ্য হয় দন্ডনীয় অপরাধ রূপে। যেমন বাংলাদেশে গুম, খুন, নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার হতে হয় হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতের বিরুদ্ধে রাজপথে অবস্থান  নেয়াতে। যেমন নমরুদ ও ফিরাউনের সামনে মহান আল্লাহকে প্রভু বলাও হত্যাযোগ্য অপরাধ গণ্য হয়েছে। শয়তানপন্থীদের হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই সবচেয়ে বড় বিপদ।

অপর দিকে ইসলামে জিহাদ হলো, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মহান আল্লাহর নির্দেশিত একমাত্র হাতিয়ার। এটিই ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। হাতিয়ার ছাড়া যুদ্ধ লড়া যায় না; তেমনি জিহাদ ছাড়া ইসলামকে বিজয়ী করা যায় না। ইসলাম যে শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম, সেটি জিহাদ ছাড়া কখনোই প্রতিষ্ঠা দেয়া যায়না। এ পবিত্র ইবাদতে বিনিয়োগ ঘটে মু’মিনদের মেধা, অর্থ, শ্রম, সময় ও রক্তের। একমাত্র এ বিনিয়োগের ফলেই রাষ্ট্র দুর্বৃত্তমুক্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠা পায় শরিয়তী বিধান। সভ্যতর সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতা তো এভাবেই নির্মিত হয়। স্রেফ নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলে সেটি হয় না। লক্ষ লক্ষ মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়েও সেটি হয় না। সে সুফলটি পীরদের শত শত আস্তানা বা সুফি খানকা গড়েও জুটে না। আজকের মুসলিম দেশগুলিতে সেগুলি কি কম? কিন্তু কোথায় সে সভ্যতার উৎকর্ষ?

জিহাদ যেহেতু দুর্বৃত্তির নির্মূল ঘটায়; সকল দুর্বৃত্ত শক্তির আক্রোশ তাই জিহাদের বিরুদ্ধে। জিহাদ দেয় আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জজবা এবং দেয় লড়াইয়ের ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তি। তাই তাবত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি জিহাদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ। মজলুমের এ প্রতিরোধ যুদ্ধকে তারা বলে সন্ত্রাস। বলে জঙ্গিবাদ। আগ্রাসী যুদ্ধকে প্রতিরোধহীন করার লক্ষ্যে তারা চায় মুসলিম জীবন থেকে জিহাদের বিলুপ্তি। জিহাদ বিষয়ক কোর’আন-হাদীসের আয়াতগুলিকে বাদ দিতে চায় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার সিলেবাস থেকে। অথচ সেরূপ আক্রোশ নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলের বিরুদ্ধে নাই। সে ক্রোধ তাবলিগ জামায়াত, পীরদের আস্তানা বা সুফি খানকার বিরুদ্ধেও নাই।

বাংলাদেশে জিহাদের বিরুদ্ধে সে আক্রোশটি দেখা যায় ক্ষমতাসীন সেক্যুলারিস্ট শিবিরে। তাদের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে সবচেয়ে বড় দুর্বৃত্তিটি হলো, শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা। জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত গণ্য করে ফৌজদারি অপরাধ রূপে। ঘরে স্রেফ জিহাদ বিষয়ক বই রাখাকে অপরাধ চিহ্নিত করে ছাত্র-ছাত্রীদের জেলে তোলা হচ্ছে। আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় বিদ্রোহ আর কি হতে পারে? বিস্ময়ের বিষয়, এমন ইসলামবিরোধী সরকারও বেঁচে আছে মুসলিম জনগণের রাজস্বের অর্থে! বহুকোটি মানুষ তাদের ভোট দেয়। তাদের সভা-সমাবেশেও বিপুল সংখ্যায় হাজির হয়। ফলে ইসলামের বিরুদ্ধে গাদ্দারীটা শুধু সরকারের নয়, বিপুল সংখ্যক জনগণেরও। কথা হলো, এমন গাদ্দারী কি মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পুরস্কার আনে? আনে কি নিয়ামত? বরং যা আনে -তা হলো পরাজয় ও অপমান।

সমাজ ও রাষ্ট্রের পবিত্রতা বিধানের কাজটি নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও তাসিবহ-তাহলিলে হয় না; এগুলির কাজ ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি আনা। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি, কল্যাণ ও পরিশুদ্ধি আনতে হলে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিকল্প নাই। শরিয়তী বিধান হলো দুর্বৃত্তি বিলুপ্তির হাতিয়ার। তখন পবিত্রতা আসে সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। শরিয়ত ছাড়া তাই ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র তাই পূর্ণাঙ্গ হয় না। এমন শরিয়তী শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল নবীজী(সা:) ও তাঁর সাহাবাদের শাসনামলে। ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনের এটিই হলো মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ মডেল। এটি শুধু কল্যাণধর্মী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারই পথ নয়; জান্নাতে পৌঁছার পথও। শরিয়ত ছাড়া সিরাতুল মুস্তাকীমের কথা ভাবা যায় না। যে রাষ্ট্রে শরিয়ত নাই –বুঝতে হবে সেখানে পথটি জাহান্নামের।

 

ব্যর্থতা সুস্থ সংস্কৃতির নির্মাণে

সংস্কৃতি একটি বিশেষ জীবনবোধ, রুচিবোধ ও দর্শন নিয়ে বাঁচতে অভ্যস্থ কর। লতাপাতা যেমন স্রোতে ভাসে, দেশের অধিকাংশ মানুষ ভাসে আবহমান সাংস্কৃতিক স্রোতে। তাই মুসলিমদের শুধু ঘর ও রাষ্ট্র গড়লে চলে না, সংস্কৃতিও নির্মাণ করতে হয়। আনতে হয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব। বাংলাদেশের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি বস্তুত সুস্থ সংস্কৃতির নির্মাণে। সাংস্কৃতিক ব্যর্থতার কারণে চরম ব্যর্থতা আসে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ায়। মুসলিম সংস্কৃতির উপাদান কোন কালেই গান-বাজনা, নৃত্য, সংঙ্গীত ও ভাস্কর্য ছিল না। এগুলো তো মানুষকে আল্লাহবিমুখ করা ও পরকাল ভূলানোর সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতিতে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা গুরুত্ব পায় না। বরং গুরুত্ব পায় আকন্ঠ জীবন সম্ভোগ। আর এ আকন্ঠ সম্ভোগটাই হলো সেক্যুলারিজমের মূল কথা। সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত করার এটিই শয়তানী প্রকল্প। শরিয়তী বিধান এমন প্রকল্পে বাধা দেয় বলেই সেক্যুলারিস্টগণ শরিয়তের বিরোধী। বাংলাদেশে এমন সেক্যুলার সংস্কৃতির প্রসারে সরকারী ও বেসরকারী বিনিয়োগট বিশাল। শয়তান শুধু রাজনীতির পথই গড়ে না, সংস্কৃতির পথও গড়ে। মানুষকে মন্দিরে নিতে না পারলেও সংস্কৃতির পথে টেনে কোটি কোটি মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে দূরে সরায়। সাংস্কৃতিক অঙ্গণগুলো বস্তুত শয়তানের শিক্ষালয় রূপে কাজ করে। বাংলাদেশে শয়তানে এ প্রজেক্ট বিপুল ভাবে বিজয়ী।

অথচ ইসলামের সংস্কৃতি হলো জিহাদের সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি যেমন দুনিয়ার বুকে জান্নাতের রাস্তা গড়ার সংস্কৃতি; তেমনি উন্নত মানব, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ারও। অথচ বাঙালী মুসলিম সমাজে সে সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। ফলে গড়ে উঠেনি ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র। বরং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে দুর্বৃত্ত-অধিকৃত রাষ্ট্র। জোয়ার বইছে পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদের সংস্কৃতির। আল্লাহপাক এমন পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদেরকে সুরা ফাতেহা’তে দোয়াল্লিন (পথভ্রষ্ট) ও মাগদুব (অভিশপ্ত) বলেছেন। জান্নাত পাওয়ার জন্য সিরাতুল মুস্তাকীম পাওয়াটি যেমন জরুরি; তেমনি জরুরি হলো পথভ্রষ্টদের পথ থেকে বাঁচাটিও। তাই নামাযের প্রতি রাকাতে সিরাতুল মুস্তাকীম পাওয়ার দোয়া পাঠ যেমন বাধ্যতামূলক, তেমনি বাধ্যতামূলক হলো পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদের পথ থেকে বাঁচার দোয়াটিও।

কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের জীবনে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার কাজটি যেমন সঠিক ভাবে হয়নি, তেমনি হয়নি পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদের পথ থেকে বাঁচাটিও। ফলে বাঙালী মুসলিমদের হাতে নির্মিত হয়েছে ১৪ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে কদর্য ইতিহাস। তারা দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়ে রেকর্ড গড়েছে, রেকর্ড গড়েছে ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে ১৯০ বছরের জন্য গোলাম হয়ে। কাফেরদের গোলাম হওয়ার চেয়ে মুসলিম জীবনে বড় আযাব আর কি হতে পারে? তখন শুধু নির্যাতিতই হতে হয় না, ঈমানও হারাতে হয়। অথচ এ আযাব থেকে বাঁচার জন্যই মহান আল্লাহতায়ালা জিহাদকে ফরজ করেছেন। অন্যরা যুদ্ধে মরলে জাহান্নামে যায়। অথচ মুসলিমগণ মরে না; শহীদ হয় এবং জান্নাতে যায়। এটি কি কম পুরস্কার? দেশরক্ষায় সামান্য সময়ের পাহারাদারীকে সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। অথচ সে দেশরক্ষায় বাঙালী মুসলিমের আগ্রহ কই? এবং যারা জিহাদ থেকে দূরে সরে তাদেরকে ঘিরে ধরে প্রতিশ্রুত আযাব। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন শেষ হয়েছে; এখন নতুন আযাব এসেছে ভারত ও তার সেবাদাসদের গোলাম রূপে।

 

হারাম বন্ধুত্ব ও যুদ্ধ

আফগানদের সংখ্যা বাঙালী মুসলিমদের সিকি ভাগও নয়। কিন্তু তারা কি এক দিনের জন্যও কি কোন কাফের শক্তির শাসন মেনে নিয়েছে? অথচ সে দেশে কাফেরদের হামলা যে হয়নি -তা নয়। কিন্তু কাফের আগ্রাসন শুরুর সাথে সাথেই শুরু হযেছে প্রচন্ড প্রতিরোধ। সেটি হয়েছে আম জনতার পক্ষ থেকে। তারা যেমন বীরদর্পে ব্রিটিশ হামলার মোকাবেলা করেছে, তেমনি যুদ্ধ লড়েছে রুশ ও মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও। প্রানদানে তারা পিছুপা হয়নি। অথচ বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে সম্পর্ণ বিপরীত সংস্কৃতি। সেটি হয়েছে নিজ দেশে কাফেরদের সামরিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দখলদারি প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালে সেটিই প্রকট ভাবে হয়েছে একটি মুসলিম দেশে ভেঙ্গে ভারতীয় কাফেরদের বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে। এমনকি কাফেরদের বিজয়কে নিজেদের বিজয় রূপে উৎসব করা হচ্ছে। মদ, জ্বিনা, সূদ যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো মুসলিম দেশ ভাঙ্গা। এটি তো শরিয়তের মৌল বিধান। কোন ঈমানদার কি সে পথে যেতে পারে?

সুরা আল –ইমারানে ঘোষিত “লা তাফাররাকু” অর্থাৎ “বিভক্ত হয়োনা” –এটি মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম। সুরা মুমতাহিনায় রাব্বুল আলামিনে আরেকটি হুশিয়ারি “লা তাত্তিখিজু আদুউ’য়ী ও আদুউ’য়াকুম আউলিয়া।” অর্থ: “তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করোনা।” মূর্তি পূজারীগণ যে আল্লাহর শত্রু তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? ভারতীয় হিন্দুগণ যে বাংলাদেশীদের শত্রু -সেটিও কি তারা এতো দিন প্রমাণ করেনি? যারা ঈমানশূণ্য সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও ন্যাশনালিস্ট –তারা না হয় ভারতকে তাদের বন্ধু করতে পারে, কিন্তু যাদের হৃদয়ে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে -তারা কি মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমকে অমান্য করে কাফেরদের কলাবোরেটর হতে পারে? ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের নামে রাষ্ট্র গড়া জায়েজ হলে উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া খেলাফত শত শত বছর বাঁচতো না। ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও অঞ্চলের পরিচয়ে ১৪ শত পূর্বেই আলাদা আলাদা রাষ্ট্র গড়ে উঠতো। মুসলিম দেশ ভাঙ্গার মিশনটি কাফেরদের; এরাই মধ্যপ্রাচ্যকে ২২ টুকরোয় বিভক্ত করেছে। তাদের কলাবোরেটর হয়েছে কিছু গোত্রপূজারী আরব। মুসলিমদের আজকের যে পরাজয় ও পতিতদশা তার কারণ যে ৫৭ দেশে বিভক্ত ভূগোল তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? মুসলিম বিশ্বে সম্পদ ও জনসংখ্যা যা আছে তা থেকে হাজার গুণ বৃদ্ধি ঘটলেও কি বিভক্ত মানচিত্রের এ দুর্বলতা দূর করা যাবে? সেটি যে অসম্ভব সেটি মহান আল্লাহর চেয়ে আর কে ভাল জানে। তাই তিনি বিভক্তিকে হারাম করেছেন। অথচ মুসলিমগণ সে হারাম পথেই পা বাড়িয়েছে। একই হারাম পথে বাঙালী মুসলিমদের বিরাট অংশ পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে ভারতীয় মুশরিকদের কলাবোরেটর হয়েছে। তারা যে মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় আখেরাতে কাফেরদের কলাবোরেটর হিসাবেই চিহ্নিত হবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

 

সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি

মুসলিম জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতিরক্ষা দেয়া। নবীজী (সা:)’র হাদীস: একাজে সামান্যতম মুহুর্ত ব্যয় সারা রাতের নফল নামাযের চেয়ে উত্তম। এবং সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার আযাবটি অতি করুণ। তখন শত্রুর হাতে শুধু গণহত্যা ও গণধর্ষণের শিকারই হতে হয় না, হারাতে হয় ঈমান-আমলও। সে ব্যর্থতার কারণেই অতীতে বিপদ চেপে বসেছিল স্পেন, রাশিয়া, চীন ও ভারতের বহু কোটি মুসলিমের জীবনে। শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ার দায়িত্বটি শুধু বেতনভোগী সৈনিকদের নয়, বরং প্রতিটি ঈমানদারের। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের মোকাবেলার দায়ভারটি শুধু নবাব সিরাজুদ্দৌলা ও তাঁর সেনাবাহিনীর ছিল না, ছিল প্রতিটি মুসলিমের। মুসলিমগণ যখন রোমান বা পারসিক সাম্রাজ্যের ন্যায় বিশাল বিশাল দেশের সামরিক বাহিনীর মোকাবেলা করেছে তখন মুসলিম বাহিনীতে কোন বেতনভোগী সৈনিকই ছিল না। তাদের সবাই ছিলেন যেমন নামায-রোযা পালনকারী, তেমনি সবাই ছিলেন যোদ্ধা। কিন্তু বাঙলার মুসলিমদের আচরণ ছিল এর বিপরীত। শহিদ তিতুমীরের প্রতিরোধ ও ফকির বিদ্রোহের মত কিছু বিচ্ছিন্ন জিহাদ ছাড়া তারা যে শুধু জিহাদ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে তা নয়, বরং হাজার হাজার মুসলিম যুবক শত্রু সেনাবাহিনীতে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছে। সেটি শুধু বাংলা বা ভারতে ব্রিটিশ দখলদারিকে স্থায়িত্ব দিতে নয়, বরং ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনসহ এশিয়া-আফ্রিকার বহু মুসলিম দেশে সাম্রাজ্যবাদী দখলদারি বাড়াতে। অথচ এরূপ আত্মবিক্রীত সেবাদাসদের অনেককে বাঙালী মুসলিমগণ গৌরবের প্রতীক গণ্য করে। নিজ ধর্মের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা কতটা গভীর হলে সেটি হতে পারে – সেটি কি বুঝতে কি থাকে?

 

শেষ হয়নি শত্রুর দখলদারী

মুসলিমদের দায়ভার শুধু ভৌগলিক মানচিত্রের উপর ইসলামের বিজয়কে সুনিশ্চিত করা নয়, বরং সেটি জনগণের চেতনার মানচিত্রেও সুসংহত করা। প্রতিটি বিজয়ী সেনাবাহিনীই সেটি করে। ইংরেজগণ তাই শুধু বাংলার ভৌগলিক মানচিত্রের উপরই দখল জমায়নি, দখল জমিয়েছে বাঙালীর চেতনার মানচিত্রেও। ব্রিটিশের সামরিক দখলদারীটা ১৯৪৭ সালে শেষে হয়েছে। কিন্তু চেতনা রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত  সে দখলদারীটা এখনো প্রবল ভাবে বেঁচে আছে। শত্রুর সে বুদ্ধিবৃত্তিক দখলদারী হটিয়ে রাজনীতি, প্রশাসন, আইন-আদালত, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির কোন একটি অঙ্গণেও ইসলাম বিজয়ী হতে পারিনি। ব্রিটিশের এ অব্যাহত দখলদারী বাঁচিয়ে রেখেছে বাঙালী সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী, বিচারক, আইনবিদ, রাজনীতিবিদ এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাগণ। সে লক্ষ্যে কাজ করছে বহু হাজার এনজিও নেতাকর্মীগণ। বাংলাদেশে ইংরেজগণ তাদের ১৯০ বছরের শাসনেও ঘরে ঘরে সূদ খাওয়া ও সূদ দেয়ার ন্যায় হারাম কাজের আাবাদ বাড়াতে পারিনি। কিন্তু এনজিওগুলোর কারণে সেটি সহজেই সম্ভব হয়েছে। অথচ সূদ খাওয়া ও সূদ দেয়া সামান্য পাপ নয়, নবীজী (সা:) সূদকে মায়ের সাথে জ্বিনার ন্যায় পাপ বলেছেন।–(হাদীস)। তাই কোন মুসলিম যেমন ব্যাভিচারি হতে পারে না, তেমনি সূদখোরও হতে পারে না। এটিই তো মুসলিমের ঈমান। কিন্তু মুসলিমের সে ঈমান এবং ইসলামের সে ভিত্তিমূলটি গুড়িয়ে দিয়েছে দেশের সেক্যুলারিস্টগণ। অপর দিকে বাংলাদেশের আদালতে এখনো পূর্ণ দখলদারী ব্রিটিশদের প্রবর্তিত কুফরি আইন ও তাদের রসম-রেওয়াজের। সে আইনে পতিতাবৃত্তি যেমন হালাল, তেমনি হালাল হলো সূদ, মদ ও জুয়া। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইনের সেখানে কোন দখলদারী চলে না।

শরিয়তী আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালার অধিক অসম্মান আর কি হতে পারে? কোন রাজার রাজ্য যদি তাঁর হুকুমই না চলে তবে সে রাজার কি কোন ইজ্জত থাকে? এ বিশ্ব তো মহান আল্লাহতায়ালার রাজত্ব এবং শরিয়ত তাঁর আইন। ফলে তাঁর মহান ইজ্জতের উপর এর চেয়ে বড় হামলা ও অবমাননা আর কি হতে পারে যদি তার শরিয়তী আইনই মানা না হয়? এটি তো অতি জঘন্য অপরাধ। এরূপ জঘন্য কাজ যারা করে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে তাদেরকে কাফের, জালেম ও ফাসেক এ তিনটি বিশেষ পরিচয়ে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ তারা শুধু কাফেরই নয়, তারা সে সাথে জালেম ও ফাসেকও। অথচ আদালত থেকে শরিয়তী আইন বিলুপ্ত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সে অপরাধটিই লাগাতর করা হচ্ছে। মহান আল্লাহতায়ালার আইনের এরূপ অবমাননা নিয়ে কি মুসলিম থাকা যায়? সাহাবায়ে কেরামের যুগে এমনটি কি কল্পনা করা যেত?

শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখাই যে সেক্যুলারিস্টদের মূল এজেন্ডা -সেটি কোন গোপন বিষয় নয়। সেটি বরং তারা জোরে সোরেই বলে। শাসনতন্ত্রে আল্লাহর আইন দূরে থাক, মহান রাব্বুল আলামীনের নামটিও তাদের কাছে অসহ্য। ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদকে তারা ফাঁসির যোগ্য ফৌজদারি অপরাধ গণ্য করে। অথচ মানবাধিকার রূপে গণ্য হচ্ছে পতিতাবৃত্তি, সমকামিতা, মদ্যপান, জুয়া ও সূদের ন্যায় পাপাচার। আল্লাহর দেয়া আলো-বাতাসে বাস করেও কাফেরগণ যেমন শয়তানের গোলামী করে, এরাও তেমনি মুসলিম ভূমিতে বাস করে গোলামী করে অমুসলিম সংস্কৃতি ও ধ্যান-ধারণার। মিশরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কর্তা ব্যক্তি লর্ড ক্রমার এ শ্রেণীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক গোলামদের নিয়ে বড় আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। ইসলামে অঙ্গিকারহীন এরূপ গোলাম শ্রেণী তৈরী না হওয়া অবধি কোন অধিকৃত মুসলিম ভূমিকে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতা দিবে না -সে ঘোষণাও তিনি দিয়েছিলেন। লর্ড ক্রমারের সে কথাই এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশেরা চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু শাসন ক্ষমতা, শিক্ষাব্যবস্থা ও বিচার ব্যবস্থা দিয়ে গেছে এরূপ মানসিক গোলামদের হাতে। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।  

দেহের স্বাস্থ্য বাঁচাতে হলে শুধু প্রাণনাশী রোগজীবাণুগুলি চিনলে চলে না। সেগুলির নির্মূলে চিকিৎসাও জরুরি। তেমনি মুসলিম উম্মাহর স্বাস্থ্য বাঁচাতে হলে শুধু বিদেশী শত্রুদের চিনলে চলে না; ঘরের শত্রুদেরও চিনতে হয়। নবীজী (সা:)’র আমলে শুধু চেনার কাজই হয়নি; তাদের নির্মূলের কাজও হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিও যথার্থ ভাবে হয়নি। হয়নি বলেই ঈমানবিনাশী ও দেশবিনাশী এসব ভয়ংকর জীবাণুগণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু ভোটই পায় না, হৃদয়েও স্থান পায়। জাতির নেতা, জাতির পিতা ও দেশের বন্ধু রূপেও গৃহিত হয়।    

 

জিহাদ ও জিহাদভীতি  

মুসলিম দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আইন আদালত যখন ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত হয়, জিহাদ তখন নামায-রোযার ন্যায় সবার উপর ফরজ হয়ে যায়। নইলে সে অধিকৃত ভূমিতে পূর্ণ ইসলাম পালন অসম্ভব হয়। রাষ্ট্র তখন শয়তানের বাহনে পরিণত হয়; এবং সে রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটটি তখন সরাসরি শয়তানের দখলে যায়। মুসলিম জীবনে সবচেয়ে সর্বনাশা বিপর্যয় তখনই শুরু হয়। তাই সভ্য নাগরিকের দায়িত্ব শুধু নিজের ঘরকে ডাকাতমুক্ত করা নয়, বরং রাষ্ট্রকে শয়তানের অধিকার মুক্ত করা। মু’মিনের জীবনে এখানেই ঘটে ঈমানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় পাশ করতে শতকরা ৬০ ভাগের বেশী শহীদ হয়ে গেছেন। হযরত আবু বকর (রা:)’র শাসনামলে কিছু লোক রাষ্ট্রীয় ভান্ডারে যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিলেন। আর তাতেই তাদের বিরুদ্ধে তিনি জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন।

বাংলাদেশের মুসলিমদের জিহাদ কোন কাফের দেশ দখল করা নিয়ে নয়। বরং সেটি নিজ দেশকে ইসলামের শত্রুশক্তির দখলদারি থেকে মুক্ত করার। জিহাদ এখানে আল্লাহর পরাজিত বিধানকে পুণঃপ্রতিষ্ঠিত করার।এ জিহাদে যোদ্ধা হওয়া তাই প্রতিটি মুসলিমের উপর নামায-রোযার ন্যায় ফরজ। নামায-রোযায় কাজা আছে কিন্তু এ ফরজে কাজা নাই। অথচ সে পবিত্র ফরজ জিহাদে যোদ্ধা হওয়াকেই অপরাধ ও সন্ত্রাস বলা হচ্ছে। জিহাদ নিয়ে এ ব্যাখাটি নিতান্তই শয়তানি শক্তির নিজস্ব আবিস্কার। ইসলামের শত্রুপক্ষটি এরূপ প্রচার চালাচ্ছে একটি বিশেষ লক্ষ্যকে সামনে রেখে। সেটি শুধু তাদের স্বৈরাচারি শাসনকে দীর্ঘায়ীত করার লক্ষ্যে নয়, বরং বাংলাদেশের বুকে বিদেশী কাফের শক্তির আগামী আগ্রাসনকে প্রতিরোধহীন করার লক্ষ্যে। কারণ, তারা তো সে কাফের শক্তিরই সেবাদাস।

জিহাদই দেয় মুসলিম বাহিনীকে বিপুল লড়াকু জনবল। সাধারণ প্রজারা তখন নিজেদের অর্জিত অর্থ, খাদ্য এবং অস্ত্র সাথে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ছুটে। সেটিকে তারা জান্নাতে প্রবেশের দরওয়াজা গণ্য করে। জিহাদ এভাবে জনগণের ব্যাপক ক্ষমতায়ন ঘটায়। প্রতিটি নাগরিক তখন যোদ্ধায় পরিণত হয় –যেমনটি নবীজী (সা:)’র আমলে হয়েছিল। সে ইতিহাস জানে বলেই ইসলামের শত্রুপক্ষের মনে এতো ইসলামভীতি ও জিহাদভীতি। জিহাদের চেতনা বিলুপ্তিতে এজন্যই তাদের এতো আয়োজন। বিলুপ্ত করতে চায় ওয়াজ ও আলোচনায় জিহাদ শব্দের ব্যবহার। এমন কি আইনগত ভাবে নিষিদ্ধ করতে চায় জিহাদকে। কারণ, জিহাদ নিষিদ্ধ হলে এ পবিত্র ইবাদতটি তখন আদালতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হবে। ভারতে যখন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের শাসন, তারাও নিষিদ্ধ করেছিল জিহাদকে। একই উদ্দেশ্য নিয়ে মার্কিন যক্তরাষ্ট্র মুসলিম দেশের স্কুল ও মাদ্রাসায় সিলেবাস বদলানোতে হাত দিয়েছে। 

বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের চেতনার ভূগোলটি বহু আগেই ভারতীয় কাফেরদের চেতনার সাথে মিশে গেছে। এখন শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূগোল একাকার করার কাজটি বাঁকি। ভারতীয় বা পাশ্চাত্যের কাফেরদের ধ্যানধারণা ও সংস্কৃতির চেয়ে ইসলাম ও ইসলামের সংস্কৃতিই তাদের কাছে বেশী বিদেশী মনে হয়। অথচ আগ্রাসী ভারতীয়দের হাতে বাংলাদেশ একাত্তরের ন্যায় আবার অধিকৃত হলে বাঙালী মুসলিমদের জীবনে যে ভয়ানক আযাব ও অপমান নেমে আসবে তাতেও কি কোন সন্দেহ আছে? একাত্তরে অধিকৃত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী খেতাব জুটেছিল ভিক্ষুকের তলাহীন ঝুলির। এতবড় অপমান কোন কালেই কোন মুসলিম দেশের জুটেনি। সেটিই পরিমাপ দেয় আগ্রাসী ভারতীয়দের দস্যুবৃত্তি একাত্তরে কতটা নির্মম ছিল। কিন্তু পুণঃরায় অধিকৃত হলে আবার নেমে আসবে সে আযাব।

মুসলিম রাষ্ট্রের অতিক্ষুদ্র অঙ্গণকেও কাফেরদের হাতে অধিকৃত থাকতে দেয়ার বিধান ইসলামে নেই। না সামরিক ভাবে, না সাংস্কৃতিক বা আদর্শিক ভাবে। বাংলার নবাব যখন কয়েকটি গ্রামের মালিকানা ইংরেজদের হাতে তুলে দেয় তখন থেকেই শুরু হয় খাল কেটে কুমির আনার কাজ। তখন ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে বাংলার উপর ইংরেজদের দখলদারি। একই ভাবে ধীরে ধীরে সমগ্র ফিলিস্তিন অধিকৃত হয়েছে ইহুদীদের হাতে। ধর্মীয়, আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগলিক ময়দানের কোন একটি ক্ষেত্রও যদি শত্রুশক্তির দখলদারিতে যায় তখন সেটি যে কতবড় ভয়ানক বিপর্যয় ঘটায় -এ হলো তার নমুনা। মুসলিমদেরকে তাই মুসলিম ভূমির প্রতি ইঞ্চিকেই সুরক্ষা দিতে হয়। শুধু দেশের ভূগোল পাল্টালে চলে না, মনের ভূগোলও ইসলামী করতে হয়। নিরংকুশ বিজয় আনতে হয় দেশবাসীর চিন্তা-চেতনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গণেও। অথচ বাংলাদেশে সে বিজয় কোন কালেই অর্জিত হয়নি। বাঙালী মুসলিমের এখানেই বড় ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার কারণে, অনৈসলামিক চেতনা বেঁচে আছে বিপুল সংখ্যক মানুষের মনের মানচিত্রে।

ইসলামের জিহাদ তাই শুধু সামরিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিকও। বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধাদের কাজ হয় কোটি কোটি মুসলিমের চেতনার ভূমিকে প্রতিরক্ষা দেয়া। সে কাজটি যথাযথ না হলে মুসলিমগণও শত্রু বাহিনীর সৈনিকে পরিণত হয়। সব পরাজয়ের শুরু তো চেতনার ভূমি থেকেই। জ্ঞানীর কলমের কালি তাই শহীদের রক্তের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে বাঙালী মুসলিম সৈনিকদের সংখ্যাটি অতি নগন্য। ফলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের সবচেয়ে বড় পরাজয় এবং শত্রুশক্তির সবচেয়ে বড় দখলদারিটি ঘটেছে জনগণের চেতনার ভূবনে। চেতনার মানচিত্রটি এভাবে শত্রুশক্তির দখলে গেলে রাজনৈতিক মানচিত্রের উপরও কি দখলদারি থাকে? তখন পুরা দেশ পরিণত হয় শত্রুশক্তির অধিকৃত ভূমিতে।  রাষ্ট্রের উপর ইসলামের নিরংকুশ বিজয় নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব ঘোষণাটি হলো: “তিনিই সেই সত্ত্বা যিনি হিদায়েত ও সত্যদ্বীনসহ তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন। এবং সেটি এজন্য যে সেটি বিজয়ী হবে সকল দ্বীন তথা ধর্মের উপর।..”।–(সুরা সাফ, আয়াত ৯)। তাই বিজয় শুধু ভৌগলিক হলে চলে না, আদর্শিক ও ধর্মীয়ও হতে হয়। মুসলিম ভূমিতে তাই কোন রাজা, কোন স্বৈরাচারি শাসক বা কোন জনগোষ্ঠির সার্বভৌমত্ব যেমন প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না, তেমনি বৈধতা পেতে পারে না ইসলাম ভিন্ন অন্যকোন ধর্মমত বা মতাদর্শের বিজয়। বিজয়ী হওয়ার বৈধ অধিকার রাখে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন। প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব হলো ইসলামকে বিজয়ী করার লড়াইয়ে সৈনিক হয়ে যাওয়া। মুসলিম জীবনে এর  চেয়ে গুরুত্পূর্ণ কোন কাজ নাই।

 

জিহাদশূণ্যতা ও হারাম রাজনীতি

আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার দায়ভার ফেরেশতাদের নয়, সে দায়ভারটি ঈমানদারদের। কারণ, এ পৃথিবী ফেরেশতাদের পরীক্ষাস্থল নয়; এখানে পরীক্ষা হয় তাদের যারা নিজেদের ঈমানদার রূপে দাবী করে। এবং  পরীক্ষাটি হয় অর্পিত দায়ভার পালনের মধ্য দিয়ে। ফলে ঈমাদারকে শুধু নামাযী ও রোযদার হলে চলে না, মুজাহিদও হতে হয়। মু’মিনের বাঁচার ভিশনটি কি, সে সাথে তাঁর রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির মিশনই বা কি –সেটি সুরা সাফ’য়ের উপরুক্ত আয়াতটিতে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এরূপ একটি মিশনকে মু’মিনের জীবনে ফরজ করার জন্য পবিত্র কোর’আনের উপরুক্ত ঘোষণাটি মাত্র একবার ঘোষিত হওয়াই যথেষ্ট ছিল। অথচ মহান আল্লাহতায়লা সেটি ঘোষণা শুনিয়েছেন তিন বার। ইসলামকে বিজয়ী করার কাজে দেশে দেশে ও যুগে যুগে মু’মিনদের জীবনে যে লাগাতর লড়াই –সেটির ধর্মীয়, নৈতিক ও দার্শনিক যৌক্তিকতা তো মহান আল্লাহতায়ালার এ ঘোষণা।

ইসলাম-অনৈসলামের দ্বন্দে ঈমানদারের জন্য নিরব ও নিষ্ক্রীয় থাকাটি যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো নিরেপক্ষ থাকা। কারণ, তাতে ইসলামের বিজয় আসে না। এজন্য ফরজ হলো লড়াইয়ের প্রতি অঙ্গণে ইসলামের পক্ষ নেয়া। ইসলাম কবুলের সাথে সাথে ঈমানদারের জীবনে তাই নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের সাথে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদও এসে যায়। সে সাথে কিতাল বা সশস্ত্র যুদ্ধও আসে। সেগুলি যেমন নবীজী (সা:)’র জীবনে এসেছিল, তেমনি এসেছিল প্রতিটি সাহাবীর জীবনেও। মুসলিম নামধারী হয়েও যারা রাজনীতিতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করতে চায়, তারা কি একবারও ভেবে দেখেছে, নবীজী (সা:) বেঁচে থাকতে কার হাতে ছিল মুসলিম উম্মাহর রাজনীতি? কে ছিলেন ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান? কে পরিচালনা করতেন জিহাদ? তখন তো নিষিদ্ধ হয়েছিল তাদের রাজনীতি -যাদের লক্ষ্য জনগণকে জাহান্নামে নেয়া। এটি তো ভয়ানক অপরাধের রাজনীতি। তাদের এ অপরাধ তো চোরডাকাতদের অপরাধের চেয়েও ভয়ানক। চোরডাকাতগণ মানুষের অর্থে হাত দিলেও কাউকে জাহান্নামে নেয় না। এ কাজটি তো তাদের -যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করে। নবীজী(সা:) ও সাহাবাযে কেরামের শাসনামলে মুসলিম ভূমিতে তাই এরূপ অপরাধীদের রাজনীতিকে কখনো অনুমতি দেয়া হয়নি। ইসলামের রাজনীতি নিষিদ্ধের নামে বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ যা করতে চায় -তা হলো নবী-আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। শরিয়ত বিরোধীতার এ রাজনীতি শত ভাগ হারাম –যেমন হারাম হলো পতিতাবৃত্তি, মদপান, জুয়া ও সূদ। কোন মুসলিম দেশে এ রাজনীতি বৈধতা পেতে পারে না। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোতে এ হারাম রাজনীতিই বিজয়ী। আর এ হারাম রাজনীতির বিজয়ের মূল কারণ, মুসলিম জীবনে জিহাদশূণ্যতা। এবং একমাত্র জিহাদের মাধ্যমেই বিজয়কে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে।

 

পরাজয় যেরূপে অনিবার্য হয়

রাষ্ট্রের অঙ্গনে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হবে, না অন্য ধর্ম বা বিধান প্রতিষ্ঠা পাবে -সে ফয়সালাটি কখনোই মসজিদ-মাদ্রাসার মেঝেতে হয় না। পীরের খানকাহ, তাবলিগের ইজতেমা বা সুফির আস্তানাতেও হয় না। সেটি নির্ধারিত হয় জিহাদের ময়দানে। তাই ইসলামের বিজয় নিয়ে যাদের সামান্যতম ভাবনা আছে তারা কি কখনো নিজেদের ইবাদত-বন্দেগী মসজিদ-মাদ্রাসা, পীরের খানকাহ, সুফির আস্তানা বা তাবলিগ ইজতেমায় বন্দি রাখতে পারে? তারা তো সকল সামর্থ্য নিয়ে হাজির হয় জিহাদের ময়দানে। নবীজীকেও তাই বদর,ওহুদ¸খন্দক খায়বর ও হুনায়ুনের যুদ্ধের ন্যায় বহু যুদ্ধে নামতে হয়েছে। নামতে হয়েছে লাগাতর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়েও।

ব্যক্তির যুদ্ধ, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি থেকেই ধরা পড়ে সে মূলত কোন পক্ষের। তাছাড়া কোন দল ও কোন মতাদর্শের প্রতিষ্ঠায় সে রায় দেয়, অর্থ দেয় বা শ্রম ও রক্ত দেয় –সেটিও কি গোপন থাকার বিষয়? মু’মিনের ঈমানদারী এবং কাফেরদের বেঈমানী তো এভাবেই প্রকাশ পায়। মদিনার মুনাফিকগণ নবীজী (সা:)’র পিছনে নিয়মিত নামায পড়েছে। কিন্তু তাদের মুনাফিকি ধরা পড়েছে রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধের ময়দানে। ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো, জনগণের জীবন থেকে যখনই জিহাদ বিলুপ্তি হয়, তখনই ইসলাম বিলুপ্ত হয় দেশের রাজনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রশাসন থেকেও। দেশ এভাবেই অধিকৃত হয়ে যায় ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। ইসলাম ও মুসলিমের পরাজয় তো এভাবেই অনিবার্য হয়। এবং আজকের বাংলাদেশ তো তারই উদাহরণ। ১ম সংস্করণ ২২/০৩/২০১৪; ২য় সংস্করণ ০৪/০২/২০২১।




বিবিধ ভাবনা (৩৯)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ইসলামের বিপক্ষ শক্তির বিজয় উৎসব 

বাংলাদেশে ইসলামের বিপক্ষের শক্তির বিজয়গুলো বিশাল। বাংলাদেশে বহু কোটি মানুষের পেটে দুই বেলা ভাত না জুটলে কি হবে, সে বিজয় নিয়ে বাংলাদেশে এখন শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে উৎসব হচ্ছে। এ উৎসবে প্রধান অতিথি হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও গুজরাতের মুসলিম গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদি। নরেন্দ্র মোদি প্রতিনিধিত্ব করে ভারতের মুসলিম নিধনকারী হিন্দুত্ববাদী আর,এস,এস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজিপি’র সম্মিলিত অক্ষ শক্তির। এরাই আসাম ও পশ্চিম বাংলা থেকে বাঙালী মুসলিমদের বাংলাদেশী বলে বহিস্কারের ষড়যন্ত্র করছে। এরাই বাবরি মসজিদকে ধুলির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের ইসলামের শত্রু শক্তির কাছে ভারতের মুসলিম বিরোধী এ উগ্র শক্তিটি যে কতটা কাছের -তা নরেন্দ্র মোদিকে প্রধান অতিথি করে সেটিই প্রমাণ করলো। ভারতে মুসলিম গণহত্যা হলে বা সীমান্তে বাংলাদেশীকে হত্যা করা হলে -এ জন্যই এরা সেগুলির নিন্দা করেনা।

এদের আরেক বিজয় হলো, বাঙালী মুসলিমদের তারা সফল ভাবে দূরে সরাতে পেরেছে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে। ফলে শরিয়ত ও জিহাদের কথা কেউ মুখে আনে না। যেন শরিয়ত ও জিহাদ -এ দুটি ইসলামের কোন অংশই নয়। দেশের আদালতে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা না দিলে যে মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় কাফের, ফাসেক ও জালেম গণ্য হতে হয় -সে হুশও জনগণের চেতনা থেকে তারা বিলুপ্ত করতে পেরেছে। দাফন দিতে পেরেছে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব। ফলে অবাঙালী মুসলিমগণ তাদের কাছে ঘৃণার বস্তু। একাত্তরে এরাই উৎসব ভরে তাদের হত্যা ও ধর্ষণ করেছে। এবং তাদেরকে ঘরবাড়ী থেকে তাড়িয়ে সেগুলি দখলে নিয়েছে। হিন্দুদের ন্যায় মূর্তি নির্মাণ ও মূর্তির পদতলে ফুল চড়ানো এখন তাদেরও সংস্কৃতি। ইসলামপন্থীদের ফাঁসি, শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যা, নিষিদ্ধ কোর’আনের তাফসির –এ গুলোও কি কম বিজয়?

তাদের সবচেয়ে বড় বিজয়টি আসে ১৯৭১’য়ে। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ইসলামের শত্রু পক্ষের এটিই ছিল সবচেয়ে বড় নাশকতা। সে কাজে তারা সাথে পায় আগ্রাসী ভারতীয় কাফেরদের। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমগণ ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে মুসলিম শক্তি রূপে উত্থানের স্বপ্ন দেখেছিল এবং সে স্বপ্নের বাস্তবায়নে জন্ম দিয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তান। ভারতের কাফেরগণ চায়নি, পাকিস্তান সৃষ্টি হোক এবং বেঁচে থাকুক। চায়নি, বাংলাদেশের ইসলামবিরোধী শক্তিও। ১৯৭১’য় ভারতীয় আগ্রাসী শক্তির সাথে কোয়ালিশন গড়ে তারা সফল হয় উপমহাদেশের মুসলিমদের সে স্বপ্নকে পন্ড করতে। তাতে বিজয়ী হয়েছিল ভারত। ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর বিজয়ে উল্লসিত হয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি পার্লামেন্টে দাঁড়িয় বলেছিল, “হাজার সালকা বদলা লে লিয়া।” ইন্দিরা গান্ধির সে বদলাটি ছিল ভারতের বুকে মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দুদের প্রতিশোধ। প্রশ্ন হলো, হিন্দুদের সে বদলা নেয়ার যুদ্ধে একজন মুসলিম কীরূপে জড়িত হয়? লক্ষণীয় হলো, বাংলাদেশের কোন আলেম বা কোন ইসলামী দল তাতে জড়িত হয়নি। কিন্তু জড়িত হয় এবং সহায়তা দেয় বাংলাদেশের ইসলাম বিরোধী শক্তি। একাত্তরের সে প্রতিশোধের যুদ্ধে তারাই ভারতে ঘরে বিজয় তুলে দেয় এবং সে বিজয় নিয়ে ভারতীয় কাফেরদের সাথে মিলে এখন উৎসব করছে।

প্রশ্ন হলো, যে উৎসবটি কাফেরদের সাথে নিয়ে হয়, তাতে শয়তান খুশি হলেও মহান আল্লাহতায়ালা কি খুশি হন? সে ভাবনাই বা ক’জন বাংলাদেশীর? সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে কখনো কি এমন হয়ছে, মুসলিমগণ কাফেরদের সাথে একত্রে বিজয় উৎসব করেছে? মুসলিম ও কাফেরদের বিজয় ও পরাজয়েরে বিষয়গুলো তো ভিন্ন ভিন্ন। কাফেরদের যাতে বিজয়, তাতে তো মুসলিমদের পরাজয়।   

 

২. ইসলামপন্থীদের পরাজয়

বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের পরাজয়গুলো বিশাল ও ভয়ানক। সে পরাজয়গুলো নিয়ে তাদের মাতম হওয়া উচিত। তারা ব্যর্থ হয়েছে ঐক্যবদ্ধ হতে। ব্যর্থ হয়েছে দেশের আদালতে শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা দিতে। ব্যর্থ হয়েছে অন্যায় ও দুর্বৃত্তির নির্মূলে এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। অথচ অন্যায় ও দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা নিয়ে বাঁচাটাই তো মুসলিম জীবনের মূল মিশন। এ মিশন নিয়ে বাঁচার জন্যই তারা মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় শ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা পায়। একমাত্র এ পথেই নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। সে মিশন নিয়ে বাঁচার কারণেই মুসলিমগণ অতীতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। অথচ আজ বাঙালী মুসলিমগণ জন্ম দিচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের। এবং শাসক রূপে মেনে নিয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় ডাকাতকে।

তাদের বিশাল ব্যর্থতা পবিত্র কোর’আনকে বুঝায় এবং কোর’আনের জ্ঞানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ায়। কোর’আন না বুঝে তারা শুধু তেলাওয়াতে দায় সারছে। পবিত্র কোর’আনের সাথে এর চেয়ে বড় বেয়াদবী আর কি হতে পারে? এরূপ বেয়াদবদের কি মহান আল্লাহতায়ালা কখনো ইজ্জত দেন? আল্লাহতায়ালা কোর’আনের জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন, না বুঝে তেলাওয়াতকে নয়।

ঈমানদারের পরীক্ষা কি শুধু নামায-রোযা পালনে হয়? নামায-রোযা তো নবীজী(সা:)’র যুগে মুনাফিকদের জীবনেও ছিল। সূদখোর, ঘুষখোরও তো নামায পড়ে। তাকে তো বিজয়ী হতে হয় ইসলামের বিজয় আনার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা ব্যর্থ হয়েছে নবীজী(সা:)’র ইসলাম নিয়ে বাঁচায়। তারা যে ইসলাম নিয়ে বাঁচছে সেটি তো নবীজী(সা:)’র ইসলাম নয়; সেটি তো তাদের নিজেদের মনগড়া ইসলাম। নবীজী (সা:)’র ইসলামে ইসলামী রাষ্ট্র ছিল, জিহাদ ছিল, শাহাদত ছিল, শরিয়ত ও হুদুদের পালন ছিল এবং প্যান-ইসলামিক মুসলিম ঐক্য ছিল। বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের মাঝে এর কোনটাই নাই। তাদের মাঝে বেঁচে আছে ফেরকাপরস্তি, পীরপরস্তি, মজহাবপরস্তি, ইত্যাদি। নবীজী (সা:)’র ইসলাম নিয়ে বাঁচতে হলে জান ও মালের বিশাল খরচ পেশ করতে হয়। সাহাবাদের শতকরা ৬০ ভাগের বেশী তাই শহীদ হয়েছেন।

 ৩. কবিরা গুনাহ

মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও দুর্বৃত্তি নির্মূলের হুকুম দিয়েছেন। প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ হলো, সে হুকুমগুলো মেনে চলা। অথচ বাংলাদেশের মানুষ বাঁচছে সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে। উল্লেখ্য হলো, যারা তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী, তাদেরকে পবিত্র কোর’আনে কাফের ও ফাসেক বল হয়েছে। কাফের, ফাসেক ও জালেম বলা হয়েছে তাদেরও যারা শরিয়তের হুকুম মানে না। ইসলামের এগুলো অতি মৌলিক বিষয়।

অথচ বাংলাদেশে মুসলিমদের দ্বারা মহান আল্লাহতায়ালার সে হুকুম মানার কাজটি হয়নি। দুর্বৃত্তদের নির্মূল না করে জনগণ তাদের প্রতিপালনে রাজস্ব দেয় এবং বিপুল সংখ্যায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী প্রতিপালনের খরচ জোগায়। দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কাজ হয়েছে রাস্তায় জনগণকে পেটানো এবং নির্বাচন কালে ভোটডাকাতি করে দুর্বৃত্তদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া। ২০১৩ সালে এদের দেখা গেছে শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যায়। এমন দুর্বৃত্তদের প্রতিপালন করা তো কবিরা গুনাহ।

৪. সবচেয়ে বড় বাঁচা মুনাফিকি থেকে বাঁচা

সবচেয়ে বড় বাঁচাটি হলো মুনাফিকি থেকে বাঁচা। নামায-রোযা করা সহজ। ঘুষখোর, সূদখোর এমনকি দুর্বৃত্ত বেঈমানেরাও নামায পড়ে এবং রোযা রাখে। নবীজী (সা:)’র যুগে অতি দুর্বৃত্ত মুনাফিকগণ নামায পড়তো। তারা নামায পড়তো এমন কি নবীজী (সা:)’র পিছনে জামাতের প্রথম সারীতে। নামায পড়লেও তারা ইসলামের পরাজয় চাইতো। নবীজী (সা:)কে হত্যা ও মুসলিমদের পরাজিত করার লক্ষ্যে তারা কাফের ও ইহুদীদের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করতো। এরা কাফেরদের চেয়ে্ও নিকৃষ্ট। এরাই ঘরের শত্রু। পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে, এদের স্থান হবে জাহান্নামে কাফেরদের চেয়েও নীচে তথা অধিকতর ভয়ানক স্থানে।

এমন মুনাফিকদের সংখ্যা কি বাংলাদেশে কম? বাংলাদেশে যারা ইসলামকে পরাজিত রেখেছে, তাদের সবাই কি মূর্তিপূজারী কাফের? তাদের অনেকেই নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং যাকাত দেয়। অথচ এদের অনেকই ১৯৭১’য়ে দেখা গেছে ভারতীয় কাফেরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে। কাফেরদের এজেন্ডা ও তাদের এজেন্ডা সেদিন একাকার হয়েছিল। এমনটি কোন ঈমাদারের জীবনে এক মুহুর্তের জন্যও ঘটে? তেল ও পানি যেমন একত্রে মেশে না, তেমনি মুসলিমের এজেন্ডা ও কাফেরদের এজেন্ডা কখনোই একত্রে মেশে না। মুসলিম ভূমিতে যুদ্ধ শুরু হলে এভাবেই মুনাফিকদের চরিত্র ধরা পড়ে। তাই এ জীবনে সবচেয়ে কঠিন হলো মুনাফিকি থেকে বাঁচা। নবীজী (সা:)’র যুগে ১ হাজারের মাঝে ৩০০ জন মুনাফিক রূপে ধরা পড়েছিল। এটি এত বিশাল সংখ্যা; এবং সেটি নবীজী (সা:)’র উপস্থিতিতে। এখন সে সংখ্যাটি তা থেকে বহুগুণ বেশী।

জিহাদ মুনাফিকদের আলাদা করতে অব্যর্থ ফিল্টারের ন্যায় কাজ করে। ঈমান থাকলে জিহাদ থাকতেই হবে। যার মধ্যে জিহাদ নাই, বুঝতে তার মধ্যে ঈমানও নাই। বিষয়টিকে মহান আল্লাহতায়ালা সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে অতি সুস্পষ্ট ভাবে ব্যক্ত করেছেন। এ আয়াতে জিহাদকে তিনি ঈমানের অঙ্গ এবং ঈমান যাচা্ইয়ের শর্ত রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। মুনাফিকি তাই দেখা যায়। শত্রুর নির্মূলে ও ইসলামের বিজয় সাধনে যার জীবনে জিহাদ নাই, সে ব্যক্তি যতই নামায-রোযা করুক -সে ব্যক্তি মুনাফিক।

৫. খাড়া হও আল্লাহর রাস্তায়

“(হে নবী, ঈমানদের) বলুন, “তোমাদের জন্যএকটি মাত্র ওয়াজ (নসিহত): খাড়া হও আল্লাহর জন্য জোড়ায়ূ জোড়ায় অথবা একাকীই; অতঃপর চিন্তাভাবনা কর।”-(সুরা সাবা, আয়াত ৪৬)। আল্লাহর জন্য খাড়া হওয়ার অর্থ ইসলামের বিজয়ে তাঁর সৈনিক রূপে খাড়া হওয়া। তাই মুসলিমকে শুধু নামাযে খাড়া হলে চলে না, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধের ময়দানে ইসলামের পক্ষে খাড়া হতে হয়।

তবে খাড়া হওয়ার জন্য শর্ত এ নয়, তাকে বিশাল কোন দলের সদস্য হতে হবে। যার যা সামর্থ্য আছে তা নিয়েই খাড়া হতে হবে। উপরুক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, সাথী না জুটলে, একাকীই খাড়া হতে হবে। যুদ্ধ নানা ভাবে হয়। অস্ত্রের হতে পারে, বুদ্ধিবৃত্তিকও হতে পারে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কোন একটি স্ট্রাটেজী অবশ্যই বেছে নিতে হবে। ইসলামে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকার কোন অবকাশ নাই। ঈমান নিয়ে বাঁচতে হলে জিহাদ নিয়েই বাঁচতে হবে। নিষ্ক্রীয় থাকার পথটি মুনাফিকির পথ।

নমরুদের সামনে খাড়া হয়েছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আ:) নিতান্তই একাকী। তাঁর সাথে কেউ ছিল না। ফিরাউনের সামনে খাড়া হয়েছিলেন হযরত মূসা (আ:) ও হযরত হারুন (আ:) –মাত্র এই দুই ভাই। এরাই তো মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ নক্ষত্র। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তাদের সে সাহসী ভূমিকা অত্যন্ত ভাল লেগেছিল এবং পবিত্র কোর’আনে তাদের সে সাহসিকতাকে তিনি চিরকালের জন্য অক্ষয় করে রেখেছেন। এবং দেখিয়েছেন, ঈমান কাকে বলে?

৬. বাংলাদেশীদের ব্যর্থতা

 গৃহে গলিত আবর্জনার স্তুপ দেখে শতভাগ সঠিক ভাবেই বলা যায়, সে গৃহে কোন সভ্য মানুষ বাস করে না। কোন সভ্য মানুষ কখনোই ঘরে আবর্জনা স্তুপ নিয়ে বসবাস করেনা। আবর্জনা সরানোই তাঁর সংস্কৃতি। তেমনি কোন দেশে ভোটডাকাতদের শাসন দেখেও নিশ্চিত বলা যায়, সে দেশে কোন সভ্য জনগণ বাস করেনা। সভ্য জনগণ বাস করলে সেদেশে ডাকাত তাড়ানোর যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। অথচ তেমন একটি যুদ্ধ বাংলাদেশে নাই। ফলে বাংলাদেশ কেমন দেশ -সেটি কি বিশ্বাবাসীর কাছে কোন গোপন বিষয়? আজ শত শত কোটি টাকা খরচ করে ৫০ বছরের পুর্তি উৎসব হচ্ছে। কিন্তু ভোটডাকাতদের শাসনের যে অসভ্যতা -তা কি তাতে দূর হবে? এটি ঘরে গলিত আবর্জনার স্তুপ রেখে মুখে কসমেটিক লাগানোর মত।

৭. সবচেয়ে বড় নেক কর্ম

কাউকে কিছু পানাহার বা অর্থ দিয়েই অনেকে ভাবেন -কতই না সে উপকার করলো। কিন্তু ঈমানদারের ভাবনাটি বিশাল। সে ভাবে শুধু তার দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেয়া নিয়ে নয়, বরং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো নিয়ে। সে কাজের ছওয়াব এতোই বেশী যে মহান আল্লাহতায়ালা তাকেও জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করেন। সে কল্যাণ কর্মের ভাবনা নিয়েই যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ এসেছিলেন। তাদের মিশনের লক্ষ্য অর্থনৈতিক বিপ্লব ছিল না, বরং সে্টি ছিল জান্নাতের যোগ্য রূপে মানবকে গড়ে তোলা। মাথা টানলে যেমন কান আসে, তেমনি জান্নাতের উপযোগী মানুষ সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রও তখন শান্তি ও সৃষ্টিশীল কর্মে ভরে উঠে।

রাষ্ট্র ইসলামী হলে সে বিশাল কাজটিই অতি সহজ হয়ে যায়। কারণ রাষ্ট্রই হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান; মানবের কল্যাণে ও অকল্যাণে রাষ্ট্রের ক্ষমতাটি বিশাল। ফলে এ রাষ্ট্রকে দুর্বৃত্ত শক্তির কবজায় রাখার বিপদটি ভয়াবহ। রাষ্ট্রকে তখন জাহান্নামে নেয়ার বাহনে পরিণত হয়। ইসলামে তাই সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি মসজিদ বা মাদ্রাসা গড়া নয়, সেটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ। এটিই মানব সভ্যতার সবচেয়ে ব্যয়বহুল কাজ। তখন দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত, প্রশাসন, অর্থনীতি, পুলিশ ও সেনাবাহিনী যেমন মানুষকে শয়তানী শক্তির হাত থেকে রক্ষা দেয় তেমনি প্রস্তুত করে জান্নাতের উপযোগী করে। ২৭/০৩/২০২১




বিবিধ ভাবনা (৩৮)

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. চাকুরীজীবী রাজনীতিবিদদের পঙ্গুত্ব ও দুর্বৃত্তদের স্বর্গরাজ্য

 যেসব সংগঠনে সার্বক্ষনিক নেতাকর্মীর নামে চাকুরীজীবী পালা হয় -সেসব সংগঠনে গড়ে উঠে চাকুরীজীবীদের পাশাপাশী বিপুল সংখ্যক আনুগত্যজীবী। আনুগত্যজীবীদের বলা হয় দলীয় ক্যাডার। আনুগত্যজীবীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় চাকুরীজীবীদের উৎসাহে। কারণ দলে নিজ নিজ পদে নিজেদের চাকুরী স্থায়ী করার জন্য এরূপ আনুগত্যজীবীদের প্রতিপালন দেয়াকে জরুরি মনে করা হয়। এরা দলে নেতাদের অনুগত পাহারাদার রূপে কাজ করে।

এসব সংগঠন দীর্ঘকাল বেঁচে থাকলেও তাদের দ্বারা কোন গণ-আন্দোলন বা বিপ্লব হয়না। কারণ গণ-আন্দোলন বা বিপ্লব ঘটাতে হলে রাজপথে লড়াইয়ে নামতে হয়। তখন দলের দরজা খুলে দিতে হয় নতুনদের জন্য। কিন্তু চাকুরীজীবী সংগঠনে সেটি সম্ভব নয়। চাকুরীজীবীগণ ও তাদের সহচর আনুগত্যজীবীগণ দরজায় পাহারাদার রূপে দাঁড়ায় যাতে অন্যদের বিপুল সংখ্যায় প্রবেশে তাদের চাকুরী বিপদে না পড়ে। এজন্যই এসব চাকুরীজীবীদের সংগঠনে কোন নতুন মুখ বা নেতা দেখা যায় না। পুরোন ক্যাডারদের থেকেই নেতা হয়।

তাছাড়া আন্দোলনে দেশ অস্থির হলে দলের আয়ে ঘাটতি, চাকুরীজীবীদের বেতন হ্রাস ও চাকুরী হারানোর ভয় থাকে। তাই তারা ঝুঁকি নেয় না। এজন্যই দেশে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন যতই তীব্র হোক না কেন এবং নিজেদের নেতাকর্মীগণ যতই ফাঁসিতে ঝুলুক বা নির্যাতিত হোক না কেন -এসব চাকুরীজীবীদের সংগঠন আন্দোলনে যায় না।

নবীজী (সা:)’র সাহাবীগণ কোন সংগঠনের চাকরীজীবী ছিলেন না। তারা নিজেদের জানমাল বেঁচে দিয়েছিলেন মহান আল্লাহতায়ালার কাছে। সমাজ বিপ্লবের কাজে তাঁরা অর্থ দিতেন, নিতেন না। প্রতিদান চাইতেন একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। দুর্বৃত্ত শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইকে তাঁরা পবিত্র জিহাদ মনে করতেন। এমন আত্মত্যাগী মানুষ সৃস্টি না হলে কোন বিপ্লব হয় না, বিজয়ও আসে না। নবীজী (সা:)’র আমলে এরূপ আত্মত্যাগী মানুষের সংখ্যা সমগ্র মানব ইতিহাসে সর্বাধিক ছিল বলেই সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি সেদিন সংঘটিত হয়েছিল। বাংলাদেশে সে রকম মানুষ নাই, ফলে কোন বিপ্লবও নাই। তাই দেশ হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতদের স্বর্গরাজ্য।

২. আন্দোলন হোক অসভ্যতার নির্মূলে

জনপদে নেকড়ে বা ডাকাত ঢুকলে সবাই যুদ্ধে নামে। এটিই সভ্য সমাজের রীতি। স্বৈরচারী দুর্বৃত্ত ও ভোটডাকাত ক্ষমতায় বসলে জনগণ তেমন একটি যুদ্ধ শুরু করবে -সেটিও সভ্য সমাজে অতি কাঙ্খিত। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। এখানেই ধরা পড়ে বাংলাদেশীদের নৈতিক দিক দিয়ে দারুন ভাবে পিছিয়ে পড়াটি।

তবে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতাটি আরো গুরুতর। ব্যর্থতাটি স্রেফ দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নয়; বরং তাদের ঘৃণা করার সামর্থ্যে। লড়াইয়ের জন্য চাই দৈহিক বল, ঘৃণার জন্য চাই নৈতিক বল। চোর-ডাকাতদের ঘৃনা করার জন্য শিক্ষিত হওয়া লাগে না। নিরক্ষরেরও সে সামর্থ্য থাকে। কিন্তু সে সামর্থ্য নাই বাংলাদেশের আদালতের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সেনা অফিসার, প্রশাসনের কর্মচারি ও পুলিশ বিভাগের লোকদের। তারা বরং ভোটচোর হাসিনা ও তার সহচর দুর্বৃত্তদের গুণ গায় এবং প্রটেকশন দেয়। বিষয়টি গুরুতর। বাংলাদেশের সমস্যা শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং ভয়ানক নৈতিক। এটি নিতান্তই বিকট অসভ্যতা। তাই বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় আন্দোলনটি হওয়া উচিত এই অনৈতিকতা ও অসভ্যতার নির্মূলে।

আর অসভ্য মানুষদের সভ্য করার কাজে সবচেয়ে সফল প্রেসক্রিপশনটি হলো কোর’আন। এ হাতিয়ারটি দিয়েছেন মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা। আরবের অসভ্য মানুষদের এ প্রেসক্রিপশন মহামানবে পরিণত করেছিল। তাই বাংলাদেশে অবশ্যই সবচেয়ে বড় আন্দোলনটি হওয়া উচিত কোর’আন বুঝা ও কোর’আন বুঝানো নিয়ে। এ আন্দোলন সফল না হলে স্রেফ মুসলিমদের মুসলিম হওয়া বিফল হবে না, বিফল হবে সভ্য মানুষ রূপে বেড়ে উঠাও। এ কাজটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে সমগ্র মানব ইতিহাসে একমাত্র এ কাজের জন্যই মহান আল্লাহতায়ালা নবী-রাসূল ও জিব্রাইল (আ:)কে এ পৃথিবী পৃষ্ঠে পাঠিয়েছিলেন।

৩. ব্যর্থতা মুসলিম হওয়ায়

ডাক্তারী বই না পড়িয়ে কাউকে ডাক্তার বানানো যায় না। তেমনি কোর’আন না বুঝিয়ে কাউকে মুসলিম করা যায়না। তাই নামায-রোযার আগে কোর’আন বুঝা ফরজ করা হয়েছে। ইকরা (পড়) তাই ওহীর প্রথম শব্দ। নামায ফরজ হয়েছে ইলম ফরজ হ্‌ওয়ার ১১ বছর পর। অথচ মুসলিমগণ কোর’আন না বুঝে পড়ে। ফলে অসম্ভব হয়েছে্ মুসলিম হওয়া। কেউ মুসলিম না হলে শয়তানে পরিণত হবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। এদের কারণেই তো বাংলাদেশে ইসলাম পরাজিত এবং বিজয় ইসলামবিরোধীদের।

মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্দোলনটি হলো মানুষকে ঈমানদার বানানোর আন্দোলন। এ আন্দোলন মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর। ফলে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রেষ্ঠ নেক কর্ম আর কি হতে পারে? এ কাজে অংশ নেয়া সবার উপরে ফরজ। এ কাজ নবী-রাসূলদের। এ কাজে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে রাষ্ট্র। এবং সেটি কোর’আন শিক্ষাকে ব্যাপকতর করার মধ্য দিয়ে।

৪.শত্রুর ষড়যন্ত্র

জিহাদ এবং শাহাদা – এ দুটি ইসলামের অতি মৌলিক বিষয় যার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে পবিত্র কোর’আনে। মুসলিম ইতিহাসে যা কিছু মহৎ কর্ম সাধিত হয়েছে -তা সম্ভব হয়েছে বিপুল সংখ্যক মানুষের জিহাদে অংশ নেয়া ও শহীদ হওয়ার কারণে। এ দুটি বাদ দিলে ইসলাম বাঁচে না। জিহাদই ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। শহীদরাই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানব। তারা জান্নাত পায় বিনা হিসাবে। অথচ জিহাদ এবং শাহাদা’র বিষয়টি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বাদ দিতে চাপ দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল কাফের শক্তি। তারা মুসলিম দেশগুলির স্কুল ও মাদ্রাসার সিলেবাস পাল্টানোয় হাত দিয়েছে।  

৫.চাই রাজনৈতিক শক্তি

ভেড়ার সংখ্যা কোটি কোটি হলেও তাদের ভাগ্যে পরিবর্তন আসে না। আগের মতই ভেড়া ঘাস খায়। ভেড়া জন্মায় জবাই হওয়ার জন্য। তাই শুধু জনসংখ্যায় বাড়লেই হয় না, ভাগ্য পরিবর্তনে রাজনৈতিক শক্তি লাগে। পশু থেকে মানুষ উন্নত এই রাজনৈতিক শক্তির কারণে। এরিস্টোটল তাই মানুষকে রাজনৈতিক পশু বলেছিলেন। ১৭ কোটি বাংলাদেশীর সে রাজনৈতিক শক্তি নাই। তারাও ভেড়াতে পরিণত হয়েছে। তাই ঘাড়ের উপর দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতগণ বসলেও ভেড়ার মত তারাও প্রতিরোধহীন থাকে।

৬.পকেট ভরছে ডাকাতদের এবং দেনা বাড়ছে জনগণের

শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার আগে ৩৮ বছরে বিদেশের কাছে বাংলাদেশের মোট লোন হয়েছিল প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। শেখ হাসিনা তার ১২ বছরের শাসনে লোন নিয়েছে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের এখন মোট লোন ৫৭ বিলিয়ন ডলার। এ লোন হাসিনা নিজে শোধ করবে না, শোধ করবে দেশের জনগণ।

হাসিনা ইতিমধ্যেই দেশের সরকারি ব্যাংক গুলোর ভান্ডার খালি করেছে। কিন্তু তার নিজের এবং দলীয় ডাকাতদের অর্থের লোভ কমেনি। তাই অর্থ সংগ্রহে হাত বাড়িয়েছে বিদেশীদের কাছে। বিদেশীদের লাভ, লোন দিলে তারা মোটা অংকের সূদ পাবে। লোনের টাকায় পকেট ভর্তি হচ্ছে হাসিনার ও তার দলীয় ডাকাতদের এবং দেনা বাড়ছে জনগণের।

৭ যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে

 যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিবর্গ মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র নিয়ে ভাবে না। তারা ভাবে ইসলাম দমন নিয়ে। যারা ইসলামপন্থীদের দমনের কাজটি নিষ্ঠুর ভাবে করবে -তাদেরকে তারা সর্বভাবে সমর্থণ দিবে। তাই হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাত ফ্যাসিবাদীকে বা মিশরের জেনারেল সিসি’র ন্যায় বর্বর শাসককেও এরা সমর্থন দেয়।

এখন এটি পরিস্কার, ইসলামপন্থীগণ কোন দেশে জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসলেও পাশ্চাত্যের কাফের শক্তি তাদের মেনে নিতে রাজী নয়। সেটি দেখা গেছে আলজিরিয়া, ফিলিস্তিন ও মিশরের নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয়কে পন্ড করার ক্ষেত্রে। অপর দিকে স্বৈরাচারি শাসক যত ফ্যাসিস্টই হোক না কেন, তাদের মেনে নিতে কোন আপত্তি নাই -যদি সে সরকার ইসলামপন্থীদের নির্মূলে উদ্যোগী হয়। ফলে তাদের যুদ্ধটা ইসলামের বিরুদ্ধে। মুসলিমদের দায়িত্ব হলো তাদের মূল শত্রুকে চেনা। ২২/০৩/২০২১।