স্বাধীনতার বসন্ত কীরূপে সম্ভব বাংলাদেশে?  

ফিরোজ মাহবুব কামাল

অধিকৃতি অসভ্য শক্তির

বাংলাদেশের জন-জীবনে চলছে দুর্বৃত্ত শাসনের নৃশংস বর্বরতা। চলছে চুরি-ডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও ফাঁসীর রাজনীতি। চলছে ভারতের প্রতি আত্মসমর্পিত গোলামী। বাঙালী জনগণ এরূপ অসভ্য শাসন কোন কালেই দেখেনি। এমন কি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলেও নয়। হাসিনার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো সে তার নিজের, তার নিজ পিতার ও তাদের প্রভু ভারতের কদর্য চেহারাকে অতি উলঙ্গ রূপে বাংলাদেশের জনগণের সামনে  তুলে ধরেছে। হাসিনা ও তার সঙ্গিরা যে কতটা নৃশংস দুর্বৃত্ত -সেটি বুঝানোর জন্য কোন রাজাকারের বই বা বক্তৃতা দেয়ার প্রয়োজন নাই। হাসিনা নিজেই সেটি তার কর্ম ও আচরণের মধ্য দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে। এতো কুখ্যাতি স্বৈরাচারি আইয়ুব বা এরশাদেরও ছিল না। তাদের রাজনীতিতে এরূপ গুম, খুন, ধর্ষণ ও ফাঁসি ছিল না। মুজিবকে ভারতের চর জেনেও পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ তার গায়ে একটি আঁচড়ও দেয়নি। বরং মাসিক ভাতা দিয়েছে তার পরিবারকে। 

মানুষকে চেনার শ্রেষ্ঠ উপায়টি হলো তার বন্ধুদের চেনা। কারণ বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবাই নিজের চেতনা ও চরিত্রের সাথে সম্ভাব্য বন্ধুর মনের ও চরিত্রের মিলটা দেখে। মদখোর ব্যক্তি তাই মদখোরকে বন্ধু রূপে বেছে নেয়। ডাকাত বন্ধুত্ব করে ডাকাতের সাথে। তেমনি ইসলামের দুশমন বেছে নেয় ইসলামের জঘন্যতম দুশমনকে। মনের ও চরিত্রের সে গভীর মিলটার কারণেই হাসিনার ঘনিষ্ট বন্ধু হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নরেন্দ্র মোদীর ৭১তম জন্ম দিনে ৭১টি গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে হাসিনা সে বন্ধুত্বের প্রমাণ রেখেছে। তাই খুনি নরেন্দ্র মোদির চরিত্র দেখে বুঝা যায় হাসিনার আসল চরিত্র। মনের এ মিলের জন্যই ইসলাম ও মুসলিমদের দমিয়ে রাখার যুদ্ধে নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ট পার্টনার হলো ভোটডাকাত হাসিনা।

নরেন্দ্র মোদীর হাতে হাজার হাজার মুসলিমের রক্ত। মোদী যখন গুজরাতের মুখ্য মন্ত্রী ছিল তখন প্রায় ৩-৫ হাজার মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করা হয়। মোদী সে মুসলিম নিধন বন্ধ করতে পুলিশ পাঠায়নি। মুসলিমদের ঘরে আগুন দিয়ে সে আগুনে জীবন্ত শিশুদের নিক্ষেপ করা হয়। শত শত মুসলিম মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়। ভারতীয় পত্রিকাতেও সে খবর ছাড়া হয়েছে। মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে দাড়ি রাখা বা মাথায় টুপি দেয়ার জন্য পথে ঘাটে মুসলিমদের উপর নির্যাতন করা হয়। বাবরী মসজিদ ধ্বংসের নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং গুন্ডা সংগ্রহ করেছিল মোদী। এখন নাগরিকত্ব রেজিস্ট্রীভূক্ত করার নামে ষড়যন্ত্র করছে লক্ষ লক্ষ মুসলিমদের বাংলাদেশী বহিরাগতের লেবেল লাগিয়ে ভারত থেকে বহিস্কারের।

 

দায়িত্ব দুর্বুত্তদের ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার

সমাজকে সভ্যতর ও নিরাপদ করার স্বার্থে শুধু ভাল মানুষদের চিনলে চলে না, মানবরূপী হিংস্র পশুদেরও চিনতে হয়। চিনিয়ে দেয়ার কাজটি বুদ্ধিজীবীদের। এটি নিশ্চিত করা, মানবরূপী দানবগণ যে কতটা অমানুষ, নৃশংস ও দুর্বৃত্ত হতে পারে ইতিহাসের পাঠকগণ যেন হাসিনার কাহিনী পড়ে যেন জানতে পারে। বর্বরতার এরূপ ইতিহাস তুলে ধরাটি মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। মহান আল্লাহতায়ালা ফিরাউনের নৃশংসতার ইতিহাস পবিত্র কুর’আনে লিপিবদ্ধ করে তা ক্বিয়ামত অবধি বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। এখানে লক্ষ্য, মানুষ যাতে হিংস্র পশুদের চেনার সাথে নৃশংস দুর্বৃত্তদের চিনতেও ভূল না করে। তাই মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র সূন্নত হলো এসব দুর্বৃত্তদের নৃশংসতার বিবরণগুলি ইতিহাস থেকে কখনোই হারিয়ে না যেতে দেয়া।

ইতিহাসে শেখ হাসিনা শত শত বছর বেঁচে থাকবে তার পিতার ন্যায় নৃশংস বর্বরতার কাহিনী নিয়ে। আজ থেকে বহু শত বছর পর বাঙালী প্রজন্ম যখন ইতিহাসের বই পড়বে তখন তারা বিস্মিত হবে ও ধিক্কার দিবে একথা ভেবে, বাংলার মাটি এমন বর্বর, অসভ্য ও নৃশংস অমানুষও জন্ম দিতে পারে! এবং বিব্রত হবে এ দেখে, হাসিনার ন্যায় এ অমানুষগণ গুম, খুন, ধর্ষণ, ফাঁসি ও মিথ্যচারকেও রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়েছিল! এরাই গণ্য হবে দুর্বৃত্ত মানুষদের আইকন রূপে। তাই দায়িত্ব হলো, শেখ হাসিনার বর্বরতার এ কাহিনীগুলোক ইতিহাসে বাঁচিয়ে রাখা।

কাশ্মির ও ভারতের মজলুম মুসলিমদের দুঃখ-বেদনা হাসিনা মনে সামান্যতম সহানুভূতি সৃষ্টি করেনি। বরং সেগুলি অভিন্ন মিশনে ঘনিষ্টতর করেছে খুনি নরেন্দ্র মোদীর সাথে হাসিনার বন্ধুত্বকে। এ কলংক বাংলাদেশীদের জন্যও। হাসিনার কারণেই বাংলাদেশের নাগরিকগণ ভারতীয় নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষে দাঁড়াতে পারছে না। তাদের পক্ষে কথা বলা ও রাস্তায় মিছিল করাও হাসিনা নিষিদ্ধ করেছে। কথা বললে আবরার ফাহাদের ন্যায় তার দলীয় গুন্ডাদের হাতে লাশ হতে হয়। নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফর কালে হাজার হাজার পুলিশ রাস্তায় নামানো হয় মোদী বিরোধী মিছিল বানচাল করতে।

 

মুসলিম ইতিহাস ও বাঙালী মুসলিমের ইতিহাস

মুসলিমদের ইতিহাস তো বড় বড় সাম্রাজ্য ও বিশ্বশক্তি নির্মূলের ইতিহাস। ইতিহাসটি সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণের। রোমান সাম্রাজ্য, পারসিক সাম্রাজ্য, সোভিয়েত সাম্রাজ্য ও মার্কিন সাম্রাজ্য –এরূপ বড় বড় বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করতে পেরেছে একমাত্র মুসলিমগণই। সমগ্র বাংলাকে জয় করেছে মাত্র ১৭ জন মুসলিম সৈনিক। এসবই ইতিহাস। এসব বিজয় এসেছে একমা্ত্র মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যের ফলে। যারাই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় ও মুসলিমদের ইজ্জত বাড়াতে খাড়া হয়, তাদের বিজয় বাড়াতে তিনিও নিজের বাহিনী দিয়ে সাহায্য করতে সদা প্রস্তুত। সে প্রতিশ্রুতির কথা তো পবিত্র কুর’আনে বার বার এসেছে। তাই  ভারত কেন, বিশ্বের ৫০টি দেশের সন্মিলিত বাহিনী পরাজিত করাও তখন সহজ হয়ে যায়। সম্প্রতি তালেবানগণ তো সে ঐতিহাসিক সত্যটিই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। তারা যে শুধু মার্কিনীদের হাতে গড়া ৩ লাখ সৈন্যের আফগান বাহিনীকে পরাজিত করেছে -তা নয়। তারা পরাজিত করেছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৫০টি বেশী দেশের সেনা বাহিনীকেও। ফলে ২০ বছর যুদ্ধ করেও তারা জিততে পারিনি।  

অথচ পরিতাপের বিষয় হলো বাঙালী মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে ভিন্ন পথে। বিগত ১৪ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে বাঙালী মুসলিমগণই একমাত্র মুসলিম জনগোষ্ঠি যারা যুদ্ধ করেছে পৌত্তলিক কাফের শক্তির কমান্ড মেনে নিয়ে তাদের অনুগত তাবেদার রূপে। তাদের অর্থে ও খাদ্যে প্রতিপালিত হয়ে। এবং সেটি একটি কাফের শক্তির এজেন্ডা পূরণে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে খণ্ডিত করে। সেটি করেছে ১৯৭১’য়ে মুজিবের ন্যায় একজন ইসলাম বিরোধী ভারতীয় গোলামের নেতৃত্বে। এবং ভারতীয় সে দাসকে সন্মানিত করেছে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু রূপে। বাঙালী মুসলিমের পৌত্তলিক তোষণের এ জঘন্য পাপ কি মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় লিপিবদ্ধ হয়নি?

অথচ মুসলিম জীবনে শুধু উপার্জন ও পানাহার হালাল হলেই চলে না, হালাল হতে হয় তার রাজনীতি, যুদ্ধবিগ্রহ ও জন্ম। রাজনীতি ও যু্দ্ধবিগ্রহে কোনটি হালাল এবং কোনটি হারাম তা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। এবং সেটি পবিত্র কুর’আনে। কোন পৌত্তলিক কাফেরদের কমান্ড মেনে নেয়া দূরে থাক তাদেরকে বন্ধু রূপে গ্রহন করাকে মহান আল্লাহতায়ালা কঠোর ভাবে হারাম করেছেন সুরা মুমতাহিনার ১ নম্বর আয়াতে এবং সুরা আল ইমরানের ২৮ নম্বর আয়াতে। অথচ সে হারাম কাজের মধ্য দিয়েই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম। সে হারাম জন্ম ও ভারতের বিজয় নিয়ে আজ বাঙালী মুসলিমের প্রতি বছরে বিশাল উৎসব। কাফেরদের বিজয়কে তারা নিজেদের বিজয় রূপে দেখে। ১৪ শত মুসলিম ইতিহাসে কখনো কি এমনটি হয়েছে? মুসলিমের মুখে যারা কালিমা লেপন করে এবং পৌত্তলিক কাফেরদের উৎসব  বাড়ায়, তাদেরকে কি আল্লাহতায়ালা কখনো সুখ বা আনন্দ দেন। তখন তো তাদের পাওনা হয় শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ন্যায় দুর্বৃত্তদের শাসন। তখন জুটে ভারতের ন্যায় কাফের শক্তির গোলামী। জুটে দুর্ভিক্ষ। এবং জুটে আন্তর্জাতিক অঙ্গণের তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির অপমান। বাংলার ইতিহাস এরূপ নৃশংস বর্বর শাসন ও এরূপ বিশ্বজুড়া অপমান কি আর কোন কালে জুটেছে? এসবই তো একাত্তরের অর্জন। এবং তা নিয়েই বাঙালীর অহংকার ও উৎসব।

প্রতিটি হারাম কাজই প্রতিশ্রুত আযাব ডেকে আসে। ভাল ফসলের ন্যায় ভাল নেতাও মহান আল্লাহতায়ালার বিশেষ নেয়ামত। মহান রাব্বুল আলামীন শুধু ভূমিকম্প, ঘুর্ণিঝড়, সুনামী বা মহামারী দিয়ে আযাব দেন না, আযাব দেন জালেম শাসককে ঘাড়ে চাপিয়েও। মহান রাব্বুল আলামীনের অনুমতি ছাড়া গাছের একটি পাতাও পড়েনা। তাই তাঁর অনুমতি ছাড়া এরূপ বিশাল ও ভয়ানক কান্ডগুলি কি কখনো ঘটতে পারে? অবাধ্য ইহুদীদের ঘাড়ে তাই বার বার চাপানো হয়েছে নৃশংস জালেমদের শাসন। সুরা মুমতেহানার ৫ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে হযরত ইব্রাহীম (আ:) জালেম শাসনের সে আযাব থেকে বাঁচতে তিনি কীরূপ দোয়া করেছিলেন। তাই ভারতের গোলামী এবং মুজিব ও হাসিনার নৃশংস শাসন বাঙালী মুসলিমের জীবনে নিয়ামত রূপে আসেনি, এসেছে হারাম রাজনীতির কারণে অর্জিত আযাব রূপে। এরূপ জালেম শাসকগণ নৃশংস শাসন, শোষণ, গণহত্যা, ধর্ষণ, চুরিডাকাতি ও সন্ত্রাস উপহার দিবে -সেটিই কি স্বভাবিক নয়? তাই যতদিন হারাম রাজনীতি বেঁচে থাকবে ততদিন আযাবও আসতে থাকবে। তখন দুর্বৃত্ত মুজিব বা হাসিনার পতন বা মৃত্যু হলে আরেক হাসিনাকে ক্ষমতায় বসানো হবে প্রাপ্য আযাবকে দীর্ঘায়ীত করা প্রয়োজনে।

 

বিপ্লবের মোক্ষম লগ্ন

মহান আল্লাহতায়ালা যেমন অর্জিত আযাবগুলি নিশ্চিত করেন, তেমনি পাপ মোচনেরও পথ করে দিন। সুযোগ করে দেন  তাওবার ও পবিত্র জিহাদের। মুসলিমের রাজনীতিই মানেই পবিত্র জিহাদ। এটি দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সভ্যতর সমাজ নির্মাণের লড়াই। বাংলাদেশীদের সামনে তেমন একটি সুযোগ আবার এসেছে। পোষমানা কিছু কুকুর ছাড়া দুর্বৃত্ত ডাকাতকে কোন ভাল মানুষই পাহারা দেয় না। বরং সবাই চায় তার আসন্ন বিনাশ। তেমনি একটি অবস্থা প্রতিটি দুর্বৃত্ত শাসকের। তাই হাসিনার পাশে একমাত্র কিছু মানবরূপী পোষা পশু ছাড়া কেউ নাই। হাসিনার পিতা শেখ মুজিবকেও কেউ নিরাপত্তা দেয়নি। হাসিনার ভিতটি তাই আজ নড়বড়ে। বাংলাদেশীদের জীবনে সেই দিনটি হবে দারুন খুশির, যখন ক্ষমতা থেকে  হাসিনার পতন হবে। সাথে সাথে তখন জনগণের জীবনে দারুন উৎসব নেমে আসবে -যেমন এসেছিল হাসিনার ফ্যাসিস্ট পিতা শেখ মুজিবের  মৃত্যুতে। তখন জনগণ পাবে ফিরাউনের জেলের দুর্দিন থেকে মুক্তি পাওয়ার বিশাল আনন্দ। ঘরে ঘরে তখন আসবে ঈদের খুশি। দেশবাসী তেমন একটি খুশির দিনের জন্য অপেক্ষা করছে।

বিপদের মুখে পড়েছে হাসিনার প্রভু ভারত। হাসিনার জন্য তাই এখন আরো দুর্বল মুহুর্ত। ভারতীয় নেতাদের মনে এখন প্রচণ্ড তালেবান ভীতি। কাশ্মিরে তালেবান ঢুকবে -সেটি এখন নিশ্চিত। কারণ জালেম কাফেরদের নির্যাতন থেকে কাশ্মিরের মজলুম মুসলিমদের মুক্তি দেয়া তো প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব। মুসলিম কি সে দায় এড়াতে পারে? ঈমানের বলে বলীয়ান তালেবানগণ যে সে কাজে নিশ্চিত এগিয়ে আসবে -ভারত সেটি জানে। ইসলামের গৌরব কালে জিহাদ যেমন আরবে সীমিত থাকেনি, তেমন আজ সীমিত থাকবে না আফগানিস্তানে। এখানেই ভারতের আসন্ন পরাজয়ের ভয়। তাছাড়া ভারত যদি নিজ এজেন্ডা নিয়ে ১৯৭১’য়ে পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আফগানিস্তান ও ইরাকে ঢুকতে পারে তবে তালেবান কেন ভারতে ঢুকতে পারবে না?

ভারতের তালেবান ভীতির কারণ: তালিবানদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ৫০টির বেশী মিত্র দেশ যুদ্ধেশোচনীয় ভাবে হেরে গেছে। ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের চেয়ে শক্তিশালী নয়। এবং ভারত বলতে গেলে একা। হাসিনা ছাড়া তার পাশে আর কেউ নাই। হাসিনার সামর্থ্য নাই যে সে অস্ত্র নিয়ে তার বন্ধু মোদীর পাশে খাড়া হবে। ফলে কাশ্মিরে ভারতের পরাজয় সুনিশ্চিত। কাশ্মিরে মোতায়েনকৃত ৬ লাখ ভারতীয় সৈন্য শুধু তাদের ক্ষয়ক্ষতিই বাড়াবে। পরাজয়ের সাথে ধ্বস নামবে ভারতের অর্থনীতিতে। কারণ যুদ্ধ মানেই রক্তপাত; সেটি যেমন দেহে, তেমনি অর্থনীতিতে।

নিজ দেশের বিপদের কারণে মোদী কি পাবে হাসিনার পাশে দাঁড়ানোর শক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপালিত আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি ও তার সৈনিকগণ যেমন অস্ত্র ছেড়ে পালিয়েছে তেমনি পালাবে হাসিনা ও তার পোষা রক্ষীরা। দুর্দিনে স্বৈর শাসকের কোন বন্ধু থাকে না। তাই হাসিনার পিতাকে বাঁচাতে কেউ এগুয়নি, হাসিনাকে বাঁচাতেও কেউ এগুবে না। এমন কি মুজিবের মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালিক উকিল বলেছিলেন, “ফিরাউনের পতন হয়েছে।” ইতিহাসের সেটিই শিক্ষা। বাংলার দোয়ারে তাই বসন্তের সুবাতাসের যথেষ্ট সম্ভাবনা। কিন্তু বাংলাদেশীগণ কি পারবে এই অনুকুল পরিস্থিতি থেকে ফায়দা নিতে? সে প্রস্তুতিটা কই? 

হাসিনার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ -সেটিই শুধু হাসিনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, সেটি ভারতের মুসলিম হত্যাকারী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধও। তাই এ যুদ্ধ কোন সাধারণ যুদ্ধ নয়, এটি হলো শতভাগ জিহাদ। বাংলাদেশকে হাসিনার পরিণত করেছে আরেক কাশ্মিরে। তাই বাংলাদেশীদের যুদ্ধটি হলো ভারতের দখলদারী থেকে মুক্তির পবিত্র লড়াই। আর কোন লড়াই পবিত্র জিহাদে পরিণত হলে সে যুদ্ধের পরাজয় অসম্ভব হয়। কারণ জিহাদের মালিকানা তখন জনগণের থাকে না, সেটির মালিকানা মহান আল্লাহতায়ালার নিজে নিয়ে নেন। জনগণের দায়িত্ব হলো এ জিহাদের নিজেদের জান ও মালের বিনিয়োগ বাড়ানো। আর বান্দার সে বিনিয়োগ দেখে মহান আল্লাহতায়ালার বাড়ান তাঁর নিজের বিনিয়োগ। তখন বিজয় নিশ্চিত করতে ফিরিশতাগণ রণাঙ্গণে নেমে আসে। অতএব বাঙালী মুসলিমদের সফলতা শতভাগ নির্ভর করছে, তাদের লড়াইকে তারা কতটা নির্ভেজাল জিহাদে পরিণত করতে পারলো -তার উপর।

 

সামনে দুটি পথ

প্রশ্ন হলো, বাঙালী মুসলিমগণ কি হাসিনার ন্যায় ভারতের এক পুতুলকেও সরাতে পারবে না? ৩ কোটি ৮০ লাখ আফগানের তুলনায় ১৬ কোটি মুসলিম কি এতোই শক্তিহীন। অথচ কাজটি অতি সহজ। স্রেফ শর্ত হলো, সে কাজের জন্য বাঙালী মুসলিমদের প্রথমে সত্যিকার মুসলিম হতে হবে। কারণ মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য পাওয়ার জন্য এটিই হলো পূর্বশর্ত। আর মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য ছাড়া কোন বিজয় আসে না। মুজিবের ন্যায় ইসলাম বিরোধী দুর্বৃত্ত ও ভারতের দালালকে যারা জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধুর আসনে বসিয়ে জপ করে তারা কি মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য পাওয়া যোগ্য বিবেচিত হয়? তখন তা জুটে তা তো আযাব। তখন শেখ হাসিনার ন্যায় নৃশংস জালেমকে শাসক রূপে চাপানো হয় প্রতিশ্রুত আযাব প্রদানের হাতিয়ার রূপে।

মুসলিম হতে হলে প্রথমে বিশ্বাস ও কেবলা পাল্টাতে হয়। পূজার পুতুলগুলি সরাতে হয় মনের ভূমি থেকেও। চেতনার ভূমিতে সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ ও লিবারিলাজিমের আবর্জনা বাড়িয়ে কি মুসলিম হওয়া যায়? মুসলিমকে চেতনার ভূমিকে শতভাগ সুরক্ষিত রাখতে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীন ইসলামের জন্য। বাঙালী মুসলিমের এখানেই নিদারুন ব্যর্থতা। সে ব্যর্থতার কারণে যে বিজয় তালেবানগণ অর্জন করলো তা অসাধ্য ও অকল্পনীয় থেকে যাচ্ছে ১৬ কোটি বাঙালী মুসলিমের জীবনে। বাঙালী মুসলিমদের সামনে দুটি পথ। একটি একটি বিজয় ও স্বাধীনতার পথ। অপরটি পরাজয়, গোলামী ও আযাবের পথ। বিজয়ের পথটি হলো সত্যিকার মুসলিম রূপে নিজেদের গড়ে তোলা এবং ঈমানী দায়িত্ব পালনে নিজের জান ও মাল নিয়ে ময়দানে নেমে পড়ার পথ। এ পথটিই পবিত্র জিহাদের। এ পথেই মহান আল্লাহতায়ালার সাহা্য্য জুটে এবং বিজয় জুটে। যারা বিজয়ের পথ পরিহার করে তাদের জন্য যা অনিবার্য হয় তা হলো ভয়ানক আযাবের পথ। সে পথটি ভারত ও হাসিনার ন্যায় ভারতীয় সেবাদাসদের নৃশংস শাসন প্রাপ্তির পথ। কোন পথটি বেছে নিবে -সে চুড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিতে হবে বাংলাদেশীদেরই। ১৯/০৯/২০২১।  

 




উপেক্ষিত জিহাদ ও পরাজিত মুসলিম

ফিরোজ মাহবুব কামাল

ঈমানী বাধ্যবাধকতা

মুসলিম হওয়ার জন্য কারো উপরই কোন বাধ্যবাধকতা নেই। “লা ইকরাহা ফিদ্দীন” কুর’আনের এই বহুল প্রচারিত আয়াতের অর্থ হলো: দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। নবীজী (সা:)’র আমলেও আরবের হাজার হাজার মানুষ অমুসলিম থেকেছে। মিশর, লেবানন, ইরাকসহ আরব দেশগুলির লক্ষ লক্ষ মানুষ আজও যে অমুসলিম –তারা তো তাদেরই বংশধর। কোন মুসলিম সেনাবাহিনী কোন কালেই তাদেরকে মুসলিম হতে বাধ্য করেনি। এরই আরেক প্রমাণ, ভারতের ৬ শত বছরের বেশী কাল মুসলিম শাসন। দীর্ঘ কাল মুসলিম শাসনের পরও রাজধানী দিল্লী ও তার আশেপাশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দুই থাকে যায়। তেমনটি ঘটেছে স্পেনে। সেদেশে মুসলিমগণ ৭ শত শাসন করে। কিন্তু সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণ খৃষ্টানই থেকে যায়। কিন্তু যারা জেনে বুঝে মুসলিম হয় তাদের মাথার উপর অলংঘনীয় দায়িত্বও এসে যায়। অনেকটা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার মত। সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে কাউকে বাধ্য করা হয় না। কিন্তু যোগ দিলে সেনাবাহিনীর বাইরের লোকদের থেকে তার দায়িত্বটা ভিন্নতর হয়। তখন প্রাণ হাতে রণাঙ্গণে যাওয়াটি তার মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে এসে যায়। যুদ্ধে না গেলে বা নির্দেশ পালনে অবাধ্যতা দেখালে তার কোর্ট মার্শাল হয়। বিচারে কঠোর শাস্তি হয়, এমনকি প্রাণদন্ডও হয়।

প্রশ্ন হলো, মুসলিম হওয়ার পর সে অর্পিত বাধ্যবাধকতাটি কি? সেটি হলো, মহাশক্তিমান আল্লাহতায়ালার সাথে এক অলংঘনীয় চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। এবং চুক্তিটি হলো, একমাত্র আল্লাহতায়ালাকে সে মাবুদ বা উপাস্য রূপে মেনে নিবে এবং নিজে তাঁর একান্ত আবেদ বা দাসরূপ প্রতিটি হুকুমকে প্রতিনিয়ত মান্য করে চলবে। সেটি শুধু নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতে নয়, বরং যেখানেই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম তৎক্ষনাৎ তাঁকে সঁপে দিতে হবে সে হুকুম পালনে। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনের দায়িত্ববোধ তাকে সর্বক্ষণ নিবিষ্ট করবে সে হুকুমের অনুসন্ধানে। অনুসন্ধানের সে কাজটি প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ। কারণ, আল্লাহর হুকুমটি যে জানে না, সে ব্যক্তি হুকুমের অনুসরণ করবে কীরূপে? পবিত্র কুর’আনের মধ্যেই রয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দশাবলী। পবিত্র কুর’আনের জ্ঞানার্জন এ জন্যই ফরজ। অজ্ঞতা একারণেই সবচেয়ে ভয়ানক কবীরা গুনাহ। অজ্ঞতা নিয়ে তাই মুসলিম হওয়া যায় না, মুসলিম থাকাও যায় না। পথের অজ্ঞতা নিয়ে সঠিক রাস্তায় পথচলা অসম্ভব। অজ্ঞতায় যা অনিবার্য হয় সেটি পথভ্রষ্টতা। কুর’আনী জ্ঞানের অজ্ঞতা নিয়ে তাই অসম্ভব হলো আল্লাহর প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা।

তাছাড়া মুসলিমের দায়িত্ব শুধু এ নয়, সে শুধু নিজে বা নিজের পরিবারকে নিয়ে সিরাতুল মোস্তাকিমে চলবে। সেটি নবীজী (সা:)’র সূন্নত নয়, সাহাবায়ে কেরামেরও রীতি নয়। তাঁকে পালন করতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার খলিফার দায়ভার। সে কাজে তাকে পথ দেখাতে হয় অন্যদেরও। পথ দেখা ও দেখানো, জাগা ও জাগানোই তাঁর জীবনের মিশন। সে সাথে সরাতে হয় রাষ্ট্রের বুক থেকে সত্যের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি বাধা এবং শয়তানী শক্তির প্রতিটি প্রতিষ্ঠান। নির্মূল করতে হয় দুর্বৃত্ত শক্তির প্রতিটি ষড়যন্ত্র। নবীজী (সা:) তাই শুধু ক্বাবার মধ্য থেকে মূর্তি সরাননি, সরিয়েছেন কাবার বাইরে থেকেও। মদ্যপান, সূদ-ঘুষ, বেশ্যাবৃত্তিসহ পাপের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নির্মূল করেছেন। রোগজীবাণু যেমন দেহের পতন ঘটায়, দুর্বৃ্ত্তগণ তেমনি পচন আনে সমাজ ও রাষ্ট্রে। মুসলিম জীবনের মূল মিশন তাই শুধু দুর্বৃত্ত-নির্মূল নয়, বরং নির্মূণ করতে হয় দুর্বৃত্ত উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে। কারণ দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত ভূমিতে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় অসম্ভব। সে বিজয় আনতে হয় পাপ ও পাপের প্রতিষ্ঠানগুলির বিলুপ্তি ঘটিয়ে। নির্মূলের এ কাজে নামলে মু’মিনের জীবনে জিহাদ তাই অনিবার্য হয়ে পড়ে। তাছাড়া একার পক্ষে জিহাদ গড়ে তোলা অসম্ভব। তখন তাঁকে দল গড়তে হয় এবং একাত্ম হতে হয় অন্য ঈমানদারদের সাথে। একতা গড়া এজন্যই নামায-রোযার ন্যায় ফরজ। জিহাদর শুরুর আগে নবীজী (সা:)কে একাজ মক্কায় ১৩টি বছর অবিরাম করতে হয়েছে। আজও এটিই দ্বীন প্রতিষ্ঠার অনুকরণীয় মডেল।

জিহাদ যে ইসলামে কতটা অনিবার্য সেটির প্রকাশ ঘটেছে কুর’আনের অসংখ্য আয়াতে এবং কুর’আন নাযিলের মূল উদ্দেশ্যটির মধ্যে। আল্লাহতায়ালা সত্য দ্বীনসহ রাসূল পাঠানোর মূল লক্ষ্যটি কখনই অস্পষ্ট রাখেননি। আজকের বহু আলেম সেটি বুঝতে না পারলেও নবীজী (সা:)’র যুগের নিরক্ষর বেদুঈনরাও সেটি বুঝতেন। তারা লাগাতর জিহাদ লড়েছেন এবং জান-মালের বিপুল কুরবানীও পেশ করেছেন। পবিত্র কুর’আনে ঘোষণা: “তিনিই (সেই মহান আল্লাহ যিনি) তাঁর রসুলকে পথনির্দেশ ও সত্যধর্ম দিয়ে প্রেরণ করেছেন যাতে তা সকল ধর্মের উপর বিজয়ী হয়। যদিও কাফেরগণ তা অপছন্দ করে।” – (সূরা সাফ, আয়াত ৬)। অবিকল একই রূপ ঘোষনা এসেছে সুরা তাওবা’র ৩৩ নম্বর আয়াত ও সুরা ফাতহার ২৮ নম্বর আয়াতে। অন্যান্য ধর্ম থেকে ইসলামের এখানেই ভিন্নতা। হুকুম এখানে অন্যান্য ধর্ম, আচার ও মতাদর্শের উপর ইসলামকে বিজয়ী করা। হযরত মূসা (আ:) ও হযরত ঈসা (আ:)’র উপর এমন নির্দেশ একবারও নাযিল হয়নি। অথচ হযরত মহম্মদ (সা:)’র উপর সে নির্দেশ এসেছে তিনবার। নবীজী (সা:)’র পূর্বে যে সব নবী-রাসূল এসেছিলেন তারা ছিলেন নিজ-নিজ গোত্রের জন্য। যেমন হযরত মূসা (আ:) ও তাঁর ভাই হযরত হারুন (আ:) তাদের নবুয়তি জীবনের সবটুকু সামর্থ্য ব্যয় করেছেন বনী ইসরাইলের মানুষদের ফিরাউনের জুলুম থেকে মূক্তি দিতে ও তাদেরকে সত্য দ্বীনের পথে আনতে। হযরত ঈসা (আ:) এসেছিলেন মূলত বনি ইসরাইলীদের মাঝে তাওরাতের বাণীকে পুনর্জাগরিত করতে। অপর দিকে নবীজী (সা:) এসেছেন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য। যেমন বলা হয়েছে, “ওয়া আরসালনাকা লিন্নাসি রাসূলা।” অর্থ: “এবং আপনাকে রাসূল রূপে প্রেরণ করেছিল সমগ্র মানব জাতির জন্য।”

পবিত্র কুর’আনে নবীজী (সা:)কে বলা হয়েছে “রাহমাতুল্লিল আলামীন” তথা সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত। অন্য কোন নবীকে সে বিশেষ উপাধিতে ভূষিত করা হয়নি। অপর দিকে নবীজী (সা:)’র উম্মতকে খাড়া করা হয়েছে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য। নবীজী (সা:)’র উম্মত রূপে মুসলিমদের কর্মের ক্ষেত্রটিও বিশাল। তাদের মিশন বিশ্ববাসীকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয়া ও জান্নাতে নেয়া। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাই সুরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “কুনতুম খায়রা উম্মাতিন উখরিজাত লিন্নাসি তা’মুরুনা বিল মা’রুফি ওয়া তান হাওনা আনিল মুনকারি ওয়া তু’মিনুনা বিল্লাহি।” অর্থ: “তোমরা হচ্ছো সর্বশ্রষ্ঠ জাতি, তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য। তোমরা ন্যায়ের হুকুম দাও এবং নির্মূল করো দুর্বৃত্তিকে এবং তোমরা বিশ্বাস করো আল্লাহকে।” এ বিশাল দায়ভার কোন একক ব্যক্তি, সমাজ বা গোত্র করতে পারে না। সমাজ বিপ্লবের সে বিশাল কাজে জরুরী হলো সহযোগী রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক জনশক্তির পূর্ণ সহযোগিতা। নইলে কোন বিপ্লবই সফল হয়। নবীজী (সা:)কেও তাই নিজ হাতে রাষ্ট্র গড়তে হয়েছে এবং তিনি নিজে সে রাষ্ট্রের প্রধান রূপে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাহাবাগণ নবীজী (সা:)’র সূন্নত অনুসরণ করেছেন। ইসলামের দ্রুত প্রসার এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা রূপে মুসলিম শক্তির উত্থানের মূল কারণ তো সেই ইসলামী রাষ্ট্র। আজকের মুসলিমদের পরাজয়ের মূল কারণ তারা নবীজী (সা:)’র সে সূন্নতের উপর নাই। তারা গড়েছে নিজেদের পথ। তাদের লক্ষ্য, স্রেফ নিজেদের এজেন্ডাকে বিজয়ী করা; মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডার সেখানে কোন স্থান নাই।

দ্বীন নাযিলের অর্থ এ নয় যে, সেটি কুর’আনের পাতায়, মসজিদের জায়নামাযে বা মাদ্রাসার শ্রেনীকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকবে। বরং সেটি প্রতিষ্ঠা ঘটাতে হবে দেশের রাজনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও যুদ্ধ-বিগ্রহসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গনে। দ্বীন তো পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠার জন্য, নিছক পাঠের জন্য নয়। নিছক ব্যক্তিজীবনে পালনের জন্যও নয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা: “তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশে দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মুসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না। -(সুরা আশ-শুরা, আয়াত ১৩)। কুর’আনে যেমন নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাতের আহকাম রয়েছে, তেমনি রয়েছে রাষ্ট্রপরিচালনা ও জিহাদের আহকামও। রয়েছে ফৌজদারি আইন, রয়েছে সম্পদের বন্টন নিয়ে আইন। রয়েছে পোষাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য-পানীয় নিয়ে হারাম-হালালের বিধান। প্রতিবেশীর সাথে আচরণ কীরূপ হবে, কীরূপ আচরণ হবে শিশুদের সাথে, কীরূপ ব্যবহার করতে হবে পিতা-মাতা ও মুরব্বীদের সাথে –আল্লাহতায়ালার নির্দেশ এসেছে এসব বিষয়েও। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ বিধান। এটি আল্লাহর দেওয়া এক পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ। জীবনের প্রতিক্ষেত্রে এটি পথ দেখায়। মুসলিমের কাজ হলো সেটির পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ। কুর’আনে একথাও বলা হয়েছে, “ইন্নাদ্দীনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম”। অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একমাত্র স্বীকৃত দ্বীন বা ধর্ম হলো ইসলাম। এর অর্থ দাঁড়ায়, ইসলামের বাইরে ধর্মের নামে যত ধর্ম বা মতবাদই থাক না কেন -সেগুলি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। সেগুলি অবশ্যই পরিতাজ্য। মানব জাতির বিপর্যয়ের বড় কারণ, বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণনাশ ও সম্পদের সবচেয়ে বেশী ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে বহু পরিতাজ্য ধর্ম ও আদর্শকে বিজয়ী করতে। বহু কোটি মানুষের প্রাণনাশ হয়েছে শুধু কম্যুনিজমের ন্যায় একটি ভ্রান্ত মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দিতে। অথচ ইসলাম জানমালের অতি কম খরচেই মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছে।  

রাষ্ট্রবিপ্লব ও জিহাদের অনিবার্যতা

রাষ্ট্র কোন শূণ্য স্থান নয়। বিশেষ একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সেখানে পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত থাকে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে সে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কর্ণধারেরা। সেটি যেমন হযরত ইব্রাহীম (আ:) ও হযরত মূসা (আ:)’র সময় ছিল, তেমনি ছিল হযরত মুহম্মদ (সা:)’র সময়ও। নমরুদ, ফিরাউন, আবু জেহল ও আবু লাহাবগণ ছিল আল্লাহ-বিরোধী পক্ষের সমকালীন কর্ণধার। ধর্মের নামে তাদের নিজেদের বিশ্বাস ও প্রথা ছিল। সেগুলির বাইরে অন্য বিশ্বাসকে –তা যত সত্যই হোক না তারা তা মানতে রাজী ছিল না। মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিরুদ্ধে তারাই ছিল প্রবল প্রতিপক্ষ। ফলে মুসলিমদের নির্মূলে সংঘাতকে তারা অনিবার্য করে তুলেছিল। অথচ বিশ্বটি মহান আল্লাহতায়ালার। তাঁর নিজের গড়া এ বিশ্বে সে দখল জমানোর অধিকার তাদের ছিল না। ঈমানদারের দায়িত্ব হলো, এ অধিকৃত ভূমিকে শয়­­­­তানী শক্তির দখলদারী থেকে মূক্ত করা। এবং সে সাথে আত্মনিয়োগ করা আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে। এ দায়িত্ব মহান আল্লাহতায়ালার খলিফাদের। একাজের জন্যই মুসলিম উম্মাহকে বলা হয় হিযবুল্লাহ বা আল্লাহর দল। তাই খলিফা, উম্মাহ ও হিযবুল্লাহ –এ বিশেষ শব্দগুলি কোন রাজনীতিকের বা সমাজ বিজ্ঞানীর আবিস্কৃত শব্দমালা নয়, বরং মহান আল্লাহতায়ালার কুর’আনী পরিভাষা।

খলিফা, উম্মাহ, হিযবুল্লাহ, জিহাদ, শরিয়ত –এরূপ প্রতিটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে ইসলামের কুর’আনী দর্শন এবং সে সাথে প্রতিটি ঈমানদারের উপর অর্পিত এক বিশাল দায়ভার। এ দায়িত্ব পালনের মধ্যেই পরিচয় মেলে একজন মুসলিমের প্রকৃত ঈমানদারী। সে দায়িত্বপালনের তাগিদেই প্রতিটি মুসলিম পরিণত হয় মহান আল্লাহর সার্বক্ষণিক সৈনিকে। দায়িত্ব পালনের সে মিশনে মহান আল্লাহর সাথে ঈমানদারের চুক্তিটি ঘোষিত হযেছে এভাবে: “নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মু’মিনদের কাছ থেকে তাদের জান ও মাল, এই মূল্যে যে তাদের জন্য নির্ধারিত থাকবে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায়, অতঃপর (আল্লাহর শত্রুদেরকে) হত্যা করে ও নিজেরাও নিহত হয়। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুর’আনে তিনি এ সত্য প্রতিশ্রুতিতে অবিচল। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিক? সুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেন-দেনের উপর যা তোমরা করছ তাঁর সাথে। আর এ মহান সাফল্য।” –(সুরা তাওবাহ, আয়াত ১১১)।

মুসলিম তাই মহান আল্লাহতায়ালার ক্রয়কৃত সৈনিক বা দাস। তাঁর জান-মালের উপর নিজের কোন মালিকানা নাই, সেটি মহান আল্লাহতায়ালার। মহান আল্লাহতায়ালা জান্নাতের দরে তাদের জানমালকে ক্রয় করে সেটিকে বান্দার কাছেই জিম্মা রেখেছেন। ঈমানদারের দায়িত্ব হলো, মহান আল্লাহর ক্রয়কৃত এ আমানতকে খেয়ানত থেকে বাঁচানো। এ আমানত ব্যয় করতে হবে একমাত্র তাঁরই  নির্দেশিত পথে। এখানেই তার জীবনের মূল পরীক্ষা। নামায-রোযার কাজ হলো সে পরীক্ষায় পাশের সামর্থ্য সৃষ্টি করা। পাঁচবার মসজিদে ডেকে নামায মূলত সে চুক্তির কথাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। সে চুক্তির কথা সর্বক্ষণ চেতনায় নিয়ে বাঁচাই হলো প্রকৃত যিকর। সে চুক্তিটি নামাযের প্রতি রাকাতে ধ্বনিত হয় “ইয়্যাকা’নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা’নাস্তায়ীন”য়ের মধ্য দিয়ে। এর অর্থ: আপনাকেই আমরা ইবাদত করি এবং আপনার কাছেই আমরা সাহায্য চাই। ইবাদতের অর্থ তো মহান আল্লাহতায়ালা প্রতিটি হুকুমের গোলামী। মুসলিমকে প্রতিটি মুহুর্ত বাঁচতে হয় সে গোলামী নিয়ে। তাই মুসলিম জীবনে অন্য কোন ধর্ম, মতবাদ বা ব্যক্তির গোলামীর কোন স্থান নাই।  নামায তো সেই গোলামী নিয়ে বাঁচার যিকর। পবিত্র কুর’আনেও নামাযকে যিকর বলা হয়েছে। যিকর এখানে স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার নাম ও তাঁর মহিমার যিকর নয়, বরং ঈমানদার রূপে দায়িত্ব নিয়ে বাঁচার যিকর। এ যিকরই নামাযীকে মুজাহিদ পরিণত করে। কথা হলো, আল্লাহতায়ালার সাথে কেনাবেচার এ দলিলটি শোনার পর কোন মুসলিম কি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ থেকে দূরে থাকতে পারে? দূরে থাকলে কি সে আর মুসলিম থাকে? মুসলিম হওয়ার অর্থই তো আল্লাহর সাথে সম্পাদিত এ পবিত্র চুক্তিকে মেনে চলা। যারা সে চুক্তি গলা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিল, কেবল তারাই এ চুক্তি অনুযায়ী অর্পিত দায়িত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে পারে। এমন অবাধ্যদের পক্ষ থেকে নিজেদেরকে মুসলিম রূপে দাবী করা নিছক ধোকাবাজী। তবে আল্লাহপাক এমন ধোকাবাজী গোপন রাখার কোন পথ খোলা রাখেননি। তিনি তাদের মুখোশ উম্মোচন করেন তাদের জীবদ্দশাতেই। দাড়ি, টুপি, পোষাক ও মুসলিম নাম দিয়ে অন্যকে ধোকা দেয়া যায়, কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালাকে নয়। মহান আল্লাহতায়ালা সেটি প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেন জিহাদে ডাক দিয়ে। যারা সে জিহাদ থেকে দূরে থাকলো নবীজী (সা:) তাদেরকে মুনাফিক বলেছেন। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত হাদীসটি গুরুত্বপূর্ণ। হাদীসটি হলো: আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মারা গেল অথচ আল্লাহর রাস্তায় কোন যুদ্ধই লড়লো না, এবং এটিও ভাবলো না যে যুদ্ধ লড়াটি তার দায়িত্ব ছিল, এমন ব্যক্তির মৃত্যু হয় মুনাফেকীর মধ্যে।” – আল মুসলিম।

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে জিহাদকে বলেছেন এমন এক ব্যবসা যা ব্যক্তিকে মুক্তি দেয় জাহান্নামের আগুন থেকে। একাজ তাজমহল নির্মাণের কাজ নয়। নিছক ক্ষেতখামার, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ ও কলকারখানা নির্মাণের কাজও নয়। বরং দুনিয়ার বুকে জান্নাত নামিয়ে আনার কাজে। এটি কোটি কোটি মানব সন্তানকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর কাজ। এ কাজের ফলেই মর্তের বুক থেকে সিরাতুল মুস্তাকীম গড়ে উঠে জান্নাতে পৌঁছার। ইসলামে এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। পৃথিবী পৃষ্ঠের সকল কর্মের মাঝে এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ মানব-কল্যাণ মূলক কর্ম। নিছক নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল ব্যক্তিকে বীনা হিসাবে জান্নাতে নেয় না। নিহত হওয়ার পর রেযেকও দেয় না। বিচার দিনে শাফায়াতের অধিকারও দেয় না। কিন্তু জিহাদ দেয়। কারণ একমাত্র জিহাদই মহান আল্লাহতায়ালার ধরিত্রিকে শয়তানী শক্তির দখলমূক্ত করে এবং প্রতিষ্ঠা করে তাঁর সার্বভৌমত্ব। এর ফলেই শয়তানী শক্তির অধিকার মূক্ত হয় তাঁর ভূমি। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এ কাজ কত প্রিয় এবং এ কাজের পুরস্কার কত বিশাল -সে ঘোষণাটি বার বার এসেছে পবিত্র কুর’আনে। আখেরাতে মুক্তি ও পুরস্কারের সে সুখবরটি আল্লাহতায়ালা বাতলিয়েছেন এভাবে: “হে মুমিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দিব যা তোমাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দিবে? আর তা হলো, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবনপণ করে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম -যদি তোমরা বুঝো। -(সুরা সাফ, আয়াত ১০-১১)।

 

বাঁচা কি স্রেফ বাঁচার জন্য?

মু’মিনের বাঁচাটি কখনোই স্রেফ বাঁচার জন্য হয় না। বাঁচার মধ্যেও পবিত্র লক্ষ্য ও এজেন্ডা থাকে। বাঁচার লক্ষ্য ও জীবনের মূল কাজ নিছক রুটি-রুজির তালাশ নয়। সম্পদের আহরণও নয়। সেটি মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা এবং বিনিময়ে জান্নাত লাভ। সে লক্ষ্যটি কি কখনো অবাধ্যতায় অর্জিত হয়? সে জন্য তাকে প্রতিটি কুর’আনী হুকুমের আনুগত্যে নামতে হয়। মু’মিনের জীবনে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ তখন অনিবার্য হয়ে উঠে। এটিই মু’মিনের জীবনে মূল লড়াই। এবং এরূপ লড়াই হলো জিহাদ। এমন জিহাদই নিশ্চিত করে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মাগফিরাত লাভ ও সীমাহীন পুরস্কার লাভ। সে প্রতিশ্রুতি এসেছে এভাবে: “তিনি তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দিবেন এবং এমন জান্নাতে দাখিল করবেন যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং বসবাসের জন্য জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটিই মহাসাফল্য।” -(সুরা সাফ, আয়াত ১২)।

মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এটিও অজানা নয়, তাঁর মু’মিন বান্দা শুধু ওপারের জান্নাতই চায় না, এপারের বিজয়ও চায়। আল্লাহতায়ালা তাঁর ঈমানদার বান্দাদের সে সুসংবাদও দিয়েছেন। সেটি এসেছে সুরা সাফার পরবর্তী আয়াতে। বলা হয়েছে, “এবং আরও একটি অনুগ্রহ যা তোমরা পছন্দ কর, (এবং সেটি হলো) আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য এবং আসন্ন বিজয়। (হে রাসূল!) মুমিনদেরকে এর সুসংবাদ দান করুন। -(সুরা সাফ, আয়াত ১৩)। আরো লক্ষণীয় হলো, মহান আল্লাহতায়ালা যে শুধু জিহাদের পথ বাতলিয়ে দিয়েছেন -তা নয়। বরং নির্দেশ দিয়েছেন সে জিহাদে অবশ্যই শামিল হওয়ার। সে নির্দেশটি হলো: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও। যেমন ঈসা ইবনে মরিয়ম তাঁর শিষ্যদেরকে বলেছিলেন, আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারি হবে? শিষ্যবর্গ বলেছিল, আমরা আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। অতঃপর বনী ইসরাইলীদের একদল বিশ্বাস স্থাপন করলো এবং একদল কাফের হয়ে গেল। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, আমি তাদেরকে শত্রুর মোকাবেলায় সাহায্য করলাম, ফলে তার বিজয়ী হলো। -(সুরা সাফ, আয়াত ১৪)।

আল্লাহতায়ালার এর নির্দেশের পর জিহাদের গুরুত্ব এবং সে জিহাদে অংশগ্রহণের অপরিহার্যতা নিয়ে কি আর কোন অস্পষ্টতা থাকে? এখানে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট তা হলো, মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত আদায় নয়, বরং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া। ফলে কোন ব্যক্তি শুধু আযানের ডাকে মসজিদে ছুটলেই তাকে পূর্ণ ঈমানদার বলা যায় না, তাকে বিপক্ষ শক্তির সাথে লড়াইয়েও নামতে হয়। লড়াইয়ের মাধ্যমেই তাকে অংশ নিতে হয় ইসলামের প্রতিষ্ঠায়। আল্লাহর সাহায্যকারি রূপে তার আসল রূপটি প্রকাশ পায় তো এমন লড়াইয়ের মাধ্যমেই। নামায, রোযা, ও হজ্জ-পালন ও ইসলামী জ্ঞানার্জনের মূল লক্ষ্য তো ব্যক্তির মধ্যে আল্লাহর সাহায্যকারি রূপে গড়ে উঠার প্রয়োজনীয় সামর্থ্য সৃষ্টি করা। কিন্তু মোমেনের জীবনে যদি সে সামর্থ্যই গড়ে না উঠে তবে সেগুলি কি আদৌ ইবাদত? নিছক নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাতের মধ্যে প্রকৃত ঈমানদার নিজের ধর্ম-কর্ম সমাপ্ত করে না, বরং আরো বহুদূর সামনে এগিয়ে যায়। আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের লক্ষ্যে যেখানে যা কিছু অপরিহার্য সেটিই সে করে। এ লক্ষ্যে দ্বীনের প্রচারে যেমন আত্মনিয়োগ করে এবং পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর অতিক্রম করে নানা দেশে যায়, তেমনি মানুষকে সুসংগঠিত করে এবং প্রশিক্ষণ দেয়। সে যেমন রাজনীতিতে অংশ নেয়, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির ময়দানেও অবিরাম লড়াই করে। এরূপ আমৃত্যু জিহাদে থাকাটিই তো ঈমানদারী। এবং তা থেকে দূরে থাকাটিই হলো বেঈমানী ও মুনাফিকি।

 

যে নিয়েত বাঁচা ও মৃত্যুতে

ঈমানদারের নিয়েতটি শুধু নামায-রোযা-হ্জ্জ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতের ক্ষেত্রগুলোতেই থাকলে চলে না, নিয়েত থাকতে হয় বাঁচা এবং মরার ন্যায় মৌলিক ইস্যুতেও। সে নিয়েতই ব্যক্তিকে পথ দেখায়, কী ভাবে বাঁচতে হবে এবং কোথায় প্রাণের কুর’বানী পেশ করতে হবে -সেটি। মহান আল্লাহতায়ালা সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও শিখিয়েছেন পবিত্র কুর’আনে। বলা হয়েছে, “বল (হে মুহম্মদ), নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার বেঁচে থাকা ও মৃত্যু একমাত্র রাব্বুল আলামিনের জন্য।” উপরুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারের জান, মাল ও সামর্থ্যের বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেটি হলো, তাঁকে বাঁচতে হয়, একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্য পূরণে।

প্রতিটি ব্যক্তির হাতে মহান আল্লাহতায়ালার আমানত রূপে তুলে দিয়েছেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি রহস্যকে। এ পৃথিবীর সকল সৃষ্টির মাঝে একমাত্র মানুষের জন্মের শুরুটি পৃথিবীর উর্দ্ধে আসমানে এবং বসবাস ছিল জান্নাতে। সেখান থেকে নামানো হয়েছে এ পৃথিবীর বুকে। অন্য কোন জীবের ক্ষেত্র সেটি ঘটেনি। একারণেই পৃথিবীর সকল সৃষ্টির মাঝে মানব সর্বশ্রেষ্ঠ। প্রতিটি মানব-দেহে রয়েছে বহু হাজার কোটি জীবকোষ। এর একটিতে যে জটিল কম্পিপিউটর লুকিয়ে আছে সেটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় কম্পিউটারেও নেই। জীবকোষের ক্ষুদ্র জিনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে বহু মিলিয়ন ডাটা। বিশ্বের তাবত বিজ্ঞানীদের সামর্থ্য নেই এমন একটি জীব কোষ নির্মাণের। মানব ভাগ্যবান যে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ এ সৃষ্টিকে গচ্ছিত রেখেছেন প্রতিটি ব্যক্তির কাছে। তার উপর অর্পিত দায়িত্ব হলো, আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত বিশাল এ বিস্ময়কর সামর্থ্য ও প্রতিভা নিয়ে একমাত্র মহান আল্লাহর ইবাদত করবে। তাঁর এ শ্রেষ্ঠ সামর্থ্যকে শয়তানের এজেন্ডায় লাগানোর চেয়ে বড় গাদ্দারী বা খেয়ানত আর কি হতে পারে? এবং তার শাস্তিও গুরুতর। এবং সেটি অনন্ত কালের জন্য জাহান্নামের আগুন।

পবিত্র কুর’আনে জীবেন মূল এজেন্ডাটি বেঁধে দেয়া হয়েছে এভাবে, “ওয়া মা খালাকুতুল জিন্না ওয়াল ইনসানা ইল্লা লি ইয়াবুদুন।” অর্থ: আমি মানুষ ও জিনকে এ ভিন্ন আর কোন কারণে সৃষ্টি করেনি যে তারা একমাত্র আমার ইবাদত করবে। কিন্তু সে আমানত যদি নিয়োজিত হয় মূর্তিপূজায় বা ইসলামের বিপক্ষ শক্তির বিজয় বা গৌরব বাড়াতে, তবে তার চেয়ে জঘন্য গাদ্দারী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ আর কি হতে পারে? যে কোন আদালতে হাজার টাকার তছরুফে বা খেয়ানতেও কঠোর শাস্তি হয়। কিন্তু এখানে যে খেয়ানতটি হচ্ছে তা তো বহু লক্ষ বা বহু কোটি টাকার নয়। মানব দেহের একটি ক্ষুদ্র অঙ্গকেও দুনিয়ার তাবত সম্পদ দিয়ে কি কেনা যায়? সমগ্র হিমালয় যদি সোনা হয়ে যায়, তা ব্যয় করে কি একটি হৃৎপিন্ড বা মগজ তৈরী করা যায়? কিন্তু সে আমানত যদি ব্যয় হয় শয়তানী শক্তির গৌরব বাড়াতে, তবে সেটি কি ক্রোধ বাড়াবে না মহান আল্লাহতায়ালার? এটি তো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এমন খেয়ানতের পর সে কি মাফ পেতে পারে মহান আল্লাহর আদালতে? এমন অবাধ্য বান্দা কি জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পেতে পারে? যার অন্তরে সামান্যতম ঈমান আছে -সে কি কখনো এমন অবাধ্যতায় লিপ্ত হতে পারে? ঈমানদার ব্যক্তি তাই রাজা-বাদশাহ-দল-নেতা-ভাষা-ভূগোল বা জাতীয় স্বার্থের বিজয়ে এ গচ্ছিত আমানতকে ব্যয় করেনা। বরং সেটিকে সে সদাসর্বদা নিয়োজিত রাখে একমাত্র আল্লাহর হুকুমের আনুগত্যে ও ইসলামের বিজয়ে।

দুনিয়াদার বা সেক্যুলার ব্যক্তির কাছে গুরুত্ব পায় চাকুরি-বাকুরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘরবাড়ী ও সন্তান-সন্ততির কল্যাণ, কিন্তু গুরুত্ব পায় না ইসলামের বিজয়। ইসলামের বিজয় তার কাছে চিহ্নিত হয় সাম্প্রদায়িক পশ্চাতপদতা রূপে। পার্থিব কল্যাণের আশায় এমন সেক্যুলারিস্টগণ নিজ গৃহ বা প্রতিষ্ঠানে মৌলভী ডেকে দোওয়ার মজলিস বসায়, পীরের মজলিসেও ধর্ণা দেয়। কিন্তু সে দোওয়ার জলসায় গুরুত্ব পায় না জিহাদের সামর্থ্য অর্জন বা সে পথে শহীদ হওয়ার আকাঙ্খা। অথচ সাহাবায়ে কেরাম শুধু নিজে নয়, অন্যকে দিয়ে দোয়া করাতেন যেন শাহাদত নসীব হয়। কারণ এটিকে তারা গণ্য করতেন জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন রূপে। পবিত্র কোরয়ানে বলা হয়েছে, “তোমরা ততক্ষন কোন কল্যাণই অর্জন করবে না যতক্ষণ না তোমাদের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি কুরবানী  না করো।” –(সুরা  আল ইমরান, আয়াত ৯২ )। আর ব্যক্তির কাছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি হলো তার জীবন। লক্ষ লক্ষ মানুষ সে জীবন কুর’বানী করে নিজের দেশ, ভাষা, গোত্র, রাজা, নেতা, দল ও বিভিন্ন মতবাদের নামে। বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধে বহু হাজার মুসলিম জীবন দিয়েছে ব্রিটিশ ও ফরাসী সাম্রাজ্যবাদীদের বিজয়ী করতে। এরূপ প্রাণদান গুরুতর খেয়ানত।

কিন্তু মুসলিমকে জান ও মালের কুরবানী পেশ করতে হয় অন্যায় ও অসত্যের নির্মূলে ও ইসলামকে বিজয়ী করতে। তবে একাজে ঈমানী বল চাই। সে বল আসে কুর’আনের জ্ঞান থেকে। তাই যার মধ্যে সে কুর’আনের চর্চা নেই, তার মধ্যে সে ঈমানী বলও নেই। তাই কোন দেশে কুর’আন-চর্চার কীরূপ বেহাল অবস্থা -সেটি বুঝার জন্য মসজিদ-মাদ্রাসার গণনা করার প্রয়োজন নেই, জিহাদের অনুপস্থিতিই সেটি বলে দেয়। সাহাবায়ে কেরামের আমলে কি এতো মসজিদ-মাদ্রাসা ছিল? কিন্তু সে আমলে কুর’আন-চর্চা যে কতটা গভীর ছিল -সেটি তাদের মাঝে শাহাদতের প্রেরণাই বলে দেয়। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা সেদিন শহীদ হয়েছিলেন। ইসলামের বিজয় তো এসেছিল তাদের কুরবানী র বরকতে। তাদের নিজেদের বিপুল বিনিয়োগের ফলেই সেদিন সম্ভব হযেছিল আল্লাহর সাহায্য-লাভ -যার ওয়াদা মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে বার বার দিয়েছেন। প্রকৃত মুসলিমের জীবনে সবচেয়ে বড় ভাবনাটি হলো, কি করে সে সামর্থ্য অর্জন করা যায় সেটি। নবীজী (সা:)’র আমলে সাহাবাগণ তাই বহু মাইল দূর থেকে মরুর কঠোর আবহাওয়া সহ্য করে নবীজী (সা:)’র কাছে কুর’আন শিক্ষার জন্য ছুটে আসতেন। সে প্রবল প্রেরণায় বহু নিরক্ষর সাহাবী সেদিন কুর’আনের হাফিয হয়েছিলেন।

মোমেনের ঈমানদারী ও তার জীবনের মূল সফলতা তো যাচাই হয় সে কুরবানী র মাপকাটিতেই; ‘আমিও মুসলিম’ -এ দাবীর ভিত্তিতে নয়।। নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাতসহ সকল ইবাদতের মূল লক্ষ্য তো সে সামর্থ্য অর্জনে সহায়তা দেওয়া। যে ব্যক্তি সারা জীবন ইবাদত করলো অথচ সে সামর্থ্য অর্জনে ব্যর্থ হলো -তবে সে ইবাদতের সফলতা কোথায়? মুসলিম বিশ্ব কি আজ এমন বিফল ইবাদতকারীদের দিয়েই পূর্ণ হচ্ছে না? ফলে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় না বেড়ে বাড়ছে পরাজয়। অথচ মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন তাঁর ঈমানদার বান্দার জন্য। সে পুরস্কারের মাধ্যমে তিনি তাঁরই সৃষ্ট মাটির মানুষকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে। তখন স্বল্প আয়ুর মানুষ লাভ করবে এক আনন্দময় অনন্ত জীবন। ব্যক্তির জীবনে এরচেয়ে বড় প্রমোশন আছে কি? এবং এর বিপরীতে সবচেয়ে বড় পদস্খলন, ডিমোশন ও শাস্তি হলো জাহান্নাম-প্রাপ্তি।

প্রশ্ন হলো, পরীক্ষা ছাড়া কি কোন প্রমোশন হয়?  পরীক্ষা আসে তাই ঈমানদারের জীবনেও। বস্তুত দুনিয়ার জীবনটাই হলো সে পরীক্ষাকেন্দ্র। আল্লাহতায়ালা সেটিরই ঘোষণা দিয়েছেন এভাবে: “তিনি মৃত্যু ও জীবন এজন্য সৃষ্টি করেছেন যে, তিনি পরীক্ষা করবেন তোমাদের মধ্যে কে আমলের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠতর।” এ পৃথিবীটা তাই পরীক্ষা কেন্দ্র। এবং এ পার্থিব জীবনের মূল লক্ষ্য হলো, আমলে শ্রেষ্ঠতর হওয়ার পরীক্ষায় সফল হওয়া। এবং সেটি, আল্লাহর রাস্তায় জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি পেশ করার মধ্য দিয়ে। নিরাপদ ঘরে নফল ইবাদত, অবসরে ওয়াজের মহফিলে যোগদান, কিছু কুর’আন তেলাওয়াত, কিছু দানখয়রাত, কিছু ঘরোয়া আলোচনা, আপোষের রাজনীতি – এসবে কি সবচেয়ে প্রিয় বস্তুর কুরবানী  হয়? সাহাবাগণ তাদের প্রিয় জান হাতে নিয়ে প্রবল কাফের বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁরা আহত হয়েছেন, শহীদ হয়েছেন বা বেঁচেছেন জিন্দা শহীদ রূপে। মুসলিমের জীবনে তাই দুই অবস্থা। হয় সে আল্লাহ-প্রদত্ত এ জীবনটি কুরবানী  করবে মহান আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আনতে। সেরূপ নসীব যদি না হয়, তবে বেঁচে থাকবে আল্লাহর দ্বীনের সাক্ষীদাতা মুজাহিদ রূপে। এ দু’টি অবস্থা ছাড়া মুসলিমের জন্য তৃতীয় অবস্থা নেই। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে যেমন আল্লাহর পক্ষে সাক্ষী দেয়, তেমনি প্রতিক্ষণ সাক্ষী দেয় জীবিত অবস্থাতেও। আর এটিই তো ঈমানদার হওয়ার দায়বদ্ধতা। এমন ব্যক্তি বিছানায় মারা গেলেও তার মর্যাদা শহীদের সমান বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এবং সেটির উল্লেখ এসেছে নিম্মূক্ত হাদীসে। হযরত সাহলো বিন হুনাইফ (রা:)থেকে বর্ণিত: আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি শাহাদতের জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিক ভাবে দোওয়া করে আল্লাহ তার মর্যাদাকে বাড়িয়ে শহীদের মর্যাদার সমান করে দেন -এমনকি সে যদি বিছানায়ও মারা যায়।” –(আল মুসলিম))। একই রূপ বর্ণনা এসেছে হযরত আনাস (রা:) থেকে। তিনি বর্ণনা করেছেন: আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আন্তরিক ভাবে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার জন্য প্রার্থনা করে আল্লাহতায়ালা তাঁকে সে মর্যাদা দিবেন -এমনকি সে যদি যুদ্ধক্ষেত্রে মারা না যায় তবুও।” –(মুসলিম শরীফ)। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো আল্লাহর রাস্তায় জানমালের কুরবানী র সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি এবং সুযোগ এলেই স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে অংশগ্রহণ। নিজেকে মুসলিম রূপে নিজেকে পরিচয় দিল অথচ আগ্রহ নেই আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী তে –সেটি কি ঈমানের পরিচয়? নবীজী (সা:)’র আমলে এমন কোন সাহাবা ছিলেন কি যার মধ্যে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী  পেশের আগ্রহ ছিল না? তারা অর্থ, সময় ও শ্রমদানেই শুধু নয়, দু’পায়ে খাড়া ছিলেন এমনকি প্রাণদানেও। আদর্শ মুসলিম সমাজ তাই জিন্দা শহিদদের সমাজ। এজন্যই প্রকৃত মুসলিম সমাজে অতি দ্রুত উন্নত মানুষ ও সে সাথে উন্নত সভ্যতা নির্মিত হয়। কারণ, শহীদ হওয়ার প্রেরণায় বিলুপ্ত হয় ব্যক্তির দুনিয়াবী লোভ-লালসা। কথা হলো, যে ব্যক্তি নিজের সম্পদই শুধু নয়, প্রাণটিও আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতে চায় সে অন্যের সম্পদে কেন হানা দিবে? এমন মানুষ সে সমাজে বৃদ্ধি পায়, সে সমাজকে দূর্নীতিমূক্ত করতে পুলিশের প্রয়োজন হয় না। এখানে প্রতিটি ঈমানদার পরিণত হয় দূর্নীতির বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরীতে। 

মহান আল্লাহতায়ালা মানুষের নিয়ত দেখেন। দেখেন আমল। হিসাব হয়, সে তার নিয়তে কতটা সাচ্চা ও সচেষ্ট। বান্দা তো পুরস্কার পায় তার নিয়ত ও নিয়ত অনুযায়ী প্রচেষ্ঠার প্রতিদান স্বরূপ। সফলতার জন্য নয়। কারণ সফলতা তো আল্লাহর দান। এখানে বান্দার করণীয় কিছু নেই, বাহবা পাওয়ারও কিছু নেই। ফলে সে সফলতার প্রতিদান স্বরূপ পাওয়ারও কিছু নেই। তাই প্রকৃত ঈমানদার সফলতা নিয়ে ভাবে না, ভাবে সাচ্চা নিয়েত ও আল্লাহর পথে নিজের বিনিয়োগটি নিয়ে। এখানে ব্যর্থ হলে তার বাঁচাটাই ব্যর্থ। খালিদ বিন ওয়ালিদের ন্যায় বহু সাহাবী মনেপ্রাণে শহীদ হতে চেয়েছেন। খালেদ বিন ওয়ালিদ সেনাপতি রূপে বহু যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁকে বলা হয় সাইফুল্লাহ তথা মহান আল্লাহতায়ালার তরবারী। কিন্তু শাহাদত তাঁর নসীবে হয়নি। সে নসীব হযরত আবুবকর (রা:)’র ন্যায় আরো অনেক প্রথম সারীর সাহাবীরও হয়নি। অপরদিকে অনেক সাহাবী তাদের জীবনের প্রথম জিহাদেই শহীদ হয়ে গেছেন। এজন্যই শাহাদতের প্রেরণা নিয়ে যারা আমৃর্ত্যু লড়াই করে তাদের সে নিয়ত ও মেহনতকেও মহান আল্লাহতায়ালা বিফল হতে দেন না। তাদেরও শহীদের সমপরিমাণ মর্যাদা দেন। সেটিরই ঘোষণা এসেছে উপরুক্ত হাদীসে।

কিন্তু আজ বাংলাদেশের মত দেশে যারা নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দিচেছ তাদের ক’জন সাক্ষী দিচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের পক্ষে?  ব্যক্তির ঈমানের সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে কাকে সে ভোট দেয়, কার পক্ষে সে লাঠি ধরে এবং কার বিজয়ে সে ফুর্তি করে –তা দেখে। কারো পক্ষে ভোট দেওয়া বা রাজপথে নামার অর্থ কি এ নয়, যার পক্ষে বা যে বিধান ও মেনিফেস্টোর পক্ষে সে ভোট দেয় -তার বিবেচনায় সে ব্যক্তিটি বা সে বিধানটিই শ্রেষ্ঠ? কোন মুসলিম কি ইসলামে অঙ্গিকারহীন কোন সেক্যুলার দল, নেতা বা প্রার্থীর পক্ষে এমন রায় দিতে পারে? তাতে কি তার ঈমান থাকে? অথচ বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশে বহু নামাযী, বহু রোযাদার ও বহু হজ্জ-পালনকারির দ্বারা সেটিই কি হচ্ছে না? এটি তো ইসলামের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট গাদ্দারী। এবং এমন ভোটদানের মধ্য দিয়ে বিদ্রোহের প্রকাশ ঘটছে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে।

অধিকাংশ মুসলিম দেশে আজ আল্লাহর বিধান পরাজিত। সেটি কোন কাফের বাহিনীর দখলদারির কারণে নয়। বরং মুসলিম নামধারী সেক্যুলার শক্তির হাতে অধিকৃত হওয়ায়। এবং সেটি সম্ভব হয়েছে মুসলিম নামধারী জনগণের ভোটে ও রাজস্বদানে। সে সাথে প্রশাসন, অফিস-আদালত, রাজপথসহ রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রতিটি ময়দানে তাদের সক্রিয় সমর্থণদানে। ইসলামের যে শত্রু শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ ছিল –সে শত্রু পক্ষটিই পাচ্ছে তথাকথিত নামাযী-রোযাদারদের বিপুল সমর্থণ। এভাবে ইসলামের শত্রু পক্ষকে বিজয়ী করা কি কম অপরাধ? এক্ষেত্রে একজন মুর্তপূজারী থেকে পার্থক্যটি কোথায়? নিছক তাসবিহ পাঠ ও নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাতে কি অপরাধ থেকে মার্জনা মিলবে? এভাবে কি কখনো প্রতিষ্ঠা পাবে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব? কথা হলো, যারা অর্থ দিয়ে, ভোট দিয়ে এবং বুদ্ধি দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে পরাজিত করে এবং বিজয়ী করে ইসলামের শত্রুপক্ষকে -মহান রাব্বুল আলামীন কি তাদের উপর প্রসন্ন হবেন? স্রেফ নামে মুসলিম হওয়াতে কি তিনি খুশি হবেন? রোজ হাশরের বিচার দিনে মহান আল্লাহতায়ালা কি এরূপ গাদ্দারদের জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করবেন? লন্ডন, ১৫/০৯/২০২১।




নামায কেন ব্যর্থ কাঙ্খিত লক্ষ্যে?

ফিরোজ মহাবুব কামাল

নামাযের কেন এতো গুরুত্ব?

যে ইবাদতটি বিশ্বের সকল অমুসলিম থেকে মুসলিমকে পৃথক করে -তা হলো নামায। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নামায কাফের ও মুসলিমের মাঝে দেয়াল রূপে কাজ করে। নামায না থাকলে মুসলিম আর অমুসলিমের মাঝে কোন পার্থক্যই থাকে না, উভয়ে একাকার হয়ে যায়। ব্যক্তির ঈমান দেখা যায় না। রোযাও দেখা যায় না –যদি সে নিজে থেকে তা প্রকাশ না করে। তেমনই কে যাকাত দেয়, সেটিও বুঝা যায় না –যদি না সে ব্যক্তি অন্যদের জানিয়ে দেয়। আর হজ্জ তো সবার জন্য ফরজ নয়; ফলে হজ্জ না করাতে কেউ অমুসলিম হয় না। কিন্তু নামায দেখা যায়। কারণ নামাযে যে শুধু দৃশ্যমান ক্বিয়াম, রুকু, সিজদা ও বৈঠক আছে –তা নয়। নামায পড়তে হয় লোকালয়ের মসজিদে হাজির হয়ে এবং অন্যদের সাথে কাতার বেঁধে। ঘরে বা দোকানে নামায পড়লেও তা অন্যদের নজরে পড়ে। তাই কে নামাযী আর কে বেনামাযী -সমাজে সেটি গোপন থা্কে না। অপর দিকে নামাযই ব্যক্তির ঈমানের পরিমাপ দেয়; মুসলিম না অমুসলিম -সেটিও প্রকাশ করে দেয়। প্রতিদিনের প্রশিক্ষণে যদি কোন সৈনিক হাজির না হয় তবে সৈনিকের খাতায় তার নাম থাকে না। কারণ, সৈনিক জীবনে থাকে যুদ্ধের দায়বদ্ধতা। দায়িত্ব পালনের সে সামর্থ্য কখনোই প্রশিক্ষণ ছাড়া সৃষ্টি হয়না। ফলে প্রশিক্ষণে আগ্রহ নাই -এমন ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভর হয় সৈনিক হওয়া। এমন ব্যক্তি বহিস্কৃত হয় সেনা বাহিনী থেকে। তেমনি মসজিদের জামায়াতে যে ব্যক্তি হাজির হয় না -তাকেও কি মুসলিম বলা যায়? মুসলিম মাত্রই তো মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক। তাঁর জীবনে আমৃত্যু যুদ্ধটি হলো অসত্য ও অন্যায়ের নির্মূলে এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। সে যুদ্ধেও তো সামর্থ্য ও কুরবানী চাই। প্রশিক্ষণও চাই। চাই তাকওয়ার বল। নামায-রোযা এবং হজ্জ-যাকাতের ন্যায় ফরজ ইবাদতগুলি তো ঈমানদারের মাঝে তাকওয়া বৃদ্ধি এবং সামর্থ্য বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ। এরূপ প্রশিক্ষণে মুনাফিকদের অংশগ্রহণ থাকে না। ফলে তারা নিয়মিত হাজির হয়না মসজিদের ৫ ওয়াক্ত নামাযে –বিশেষ করে ফজর ও এশার নামাযে। তাদের দেখা যায়না ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদে। এভাবেই প্রকাশ পায় তাদের মনের মাঝে লুকানো মুনাফিকি।  

কোন বেনামাযী যে জান্নাতে যাবে না -তা নিয়ে বিতর্ক নাই। কারণ, জান্নাত তো একমাত্র ঈমানদারদের জন্য। সে পবিত্র স্থানে বেঈমানের কোন স্থান নেই। আর ঈমানদার তো সেই যে নামায পড়ে। আগুন জ্বললে, উত্তাপ দিবেই। তেমনি হৃদয়ে ঈমান প্রবেশ করলে, সে ব্যক্তির জীবনে নামায-রোযা আসবেই। আগুন থেকে যেমন তার উত্তাপকে আলাদা করা যায় না, তেমনি ঈমানদার থেকে পৃথক করা যায় না তাঁর নামাযকে। হাদীসে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম যে ইবাদতের হিসাব নিবেন সেটি হলো নামায। সুরা মুলকে বলা হয়েছে, জাহান্নামবাসীদের জিজ্ঞাসা করা হবে তোমরা কীরূপে এখানে পৌঁছলে? সর্বপ্রথম যে কারণটিকে তারা উল্লেখ করবে তা হলো, তারা নামায পড়তো না। নামাযের মূল্য বেনামাযীগণ ইহকালে না বুঝলেও বুঝবে জাহান্নামে পৌঁছার পর। জাহান্নামবাসীদের সে বেদনাদায়ক উপলব্ধিকে মহান আল্লাহতায়ালা কুর’আনে উল্লেখ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। সেটি হলো, যাদের জীবনে এখনো মৃত্যু আসেনি তাদেরকে সাবধান করতে। জাহন্নামে পৌঁছার আগে তথা দুনিয়ার বুকে থাকতেই তারা যেন বুঝতে পারে নামাযের গুরুত্ব। নইলে জাহান্নামে পৌঁছে শুধু আফসোসই হবে, করার কিছু থাকবে না। কুর’আন মজীদ মানব জীবনের রোডম্যাপ। এ রোডম্যাপ শুধু জান্নাতের পথই দেখায় না, পথ চলায় ভূল হলে -সে ভূলটিও তুলে ধরে। তাই সামনে অপেক্ষামান জাহান্নামের বিপদের কথাও বলে।    

 

নামায কীরূপে ব্যর্থ হয়?                                                                 

চিনিকলে আঁখ দিলে তা চিনিতে পরিণত হয়। সেটি না হলে বুঝতে হবে চিনিকলে যান্ত্রিক ত্রুটি রয়েছে? নামাযের মধ্যেও তেমনি একটি প্রক্রিয়া কাজ করে -যা পরিশুদ্ধি আনে ব্যক্তির চিন্তা, চেতনা ও চরিত্র। সেরূপ পরিশুদ্ধি না এলে বুঝতে হবে নামাযে বড় রকমের ত্রুটি আছে। এবং ত্রুটি কোথায়, সেটি বুঝতে হলে নামাযকে মিলিয়ে দেখতে হয় নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবীদের নামাযের সাথে। কারণ, তাঁরাই হলেন নামাযসহ সকল ইবাদত-বন্দেগীর অনুকরণীয় মডেল। নামাযের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ শুধু ক্বিয়াম, রুকু, সিজদা বা বৈঠক নয়। স্রেফ সুরা পাঠ, তাশাহুদ পাঠ, দরুদ ও তাসবিহ পাঠও নয়। বরং সেটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে নামাযীর মনের সংযোগ। এবং সে সংযোগটি ঘটে তাঁর রহমত, কুদরত, ফজিলত ও আয়াত সমূহের স্মরণের মধ্য দিয়ে। সুরা বাকারা’য় বলা হয়েছে, “ফাযকুরুনি আযকুরুকুম” অর্থ: “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো।” এটি বান্দার প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ঘোষিত পবিত্র ওয়াদা। আর ওয়াদা পালনে তাঁর চেয়ে আর কে শ্রেষ্ঠতর হতে পারে?

সুরা যুখরুফে বলা হয়েছে, কারো মন থেকে যখন আল্লাহতায়ালার স্মরণ বিলুপ্ত হয় তখন তার উপর শয়তান নিযুক্ত করে দেয়া হয়। এবং সে শয়তান তাকে জাহান্নামে নেয়। সুরা হাশরে বলা হয়েছে যারা মহান আল্লাহতায়ালাকে ভূলে থাকে তাদের অন্তর থেকে ভূলিয়ে দেয়া হয় নিজেদের  কল্যাণের বিষয়গুলি। নামাযের মুল কাজ তো ঈমানদারের মনে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণকে কম পক্ষে দিনে ৫ বার জাগ্রত করা। সেটি শুরু হয় নামাযের আযান ও ওযু থেকে। নামাযে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণের মাধ্যমে ঈমানদার নিজেও স্থান করে নেয় মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণে। এটিই তো নামাযের সর্বশ্রেষ্ঠ কৃর্তি। ব্যক্তির চেতনা রাজ্যে নামাযের সে গভীর আধ্যাত্মিক আছড় সেটি শুরু হয় আযান থেকে। আযানের মধ্যে ধ্বনিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে উদাত্ত আহবান -যা হৃদয়বান মানুষের হৃদয়ে টান দেয়। সম্প্রতি একটি জরিপ চালানো হয়েছে ইউরোপ-আমেরিকার নও মুসলিমদের উপর। তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তারা কীরূপে ইসলামে আকৃষ্ট হলো? জরিপে বেড়িয়ে আসে, ইসলামের প্রতি তাঁদের আকৃষ্ট হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণটি হলো আযান। তুরস্ক, মরক্কো, মিশর, তিউনিসিয়ার মত মুসলিম দেশে বেড়াতে গিয়ে তাঁরা জীবনে প্রথম মসজিদ থেকে ভেসে আসা আযান শুনে। সে মধুর আযানই নাকি তাদের হৃদয়ের গভীরে নাড়া দিয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের অধিকাংশই পবিত্র কুর’আন পড়ে মুসলিম হয়। অর্থাৎ যেখানেই মহান আল্লাহতায়ালার নিজের বাণী সেখানেই তার বিশাল মোজেজা।     

কিন্তু নামাযীর মন থেকে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ বিলুপ্ত হলে কি সে নামাযের কোন মূল্য থাকে? সেটি তো মনের এক চেতনাহীন বেহাল অবস্থা। সেরূপ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পবিত্র কুর’আনে বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ, তোমরা মাদকাসক্ত অবস্থায় নামাযের নিকটবর্তী হয়োনা -যতক্ষণ না তোমরা যা পড় তা বুঝতে না পারো…”। –(সুরা নিসা, আয়াত ৪৩)। উপরুক্ত আয়াতে রয়েছে চিন্তা-ভাবনার এক গুরুতর বিষয়। আয়াতটি যখন নাযিল হয়, মদ তখনও হারাম হয়নি। ফলে নবীজী (সা:)’র কোন কোন সাহাবী মাতাল অবস্থায় মসজিদে হাজির হতেন। মদপানের কুফল হলো, এতে বিলুপ্ত হয় চিন্তা-ভাবনার ক্ষমতা। তখন নামাযীর মন থেকে বিলুপ্ত হয় মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ। এবং বিলুপ্ত হয় মহান মা’বুদের সাথে বান্দার মনের সংযোগ। ফলে নামাযে পবিত্র কুর’আন থেকে যা কিছু তেলাওয়াত হয় -তাতে মনযোগ দেয়া তখন অসম্ভব হয়। তখন অসম্ভব হয় চেতনায় জাগরন বা পরিশুদ্ধি। আর চেতনায় পরিশুদ্ধি না আসলে চরিত্রে পরিশুদ্ধি আসবে কীরূপে? অথচ কুর’আন নিজেই যিকরের কিতাব। সে যিকরের সাথে নিজেকে জড়িত করতে তো যিকির রত মন চাই। সুরা ক্বাফে বলা হয়েছে, “ইন্না ফি যালিকা লা যিকরা লিমান কানা লাহু ক্বালবুন আও আলকাস সাময়া ওয়া হুয়া শাহীদ।” অর্থ: নিশ্চয়ই এ কিতাব (কুর’আন)’র মধ্যে রয়েছে যিকর; (এবং সেটি) তাদের জন্য যাদের রয়েছে ক্বালব এবং যারা কাজে লাগায় শ্রবনশক্তিকে এবং সাক্ষ্য দেয় সত্যের পক্ষে। –(সুরা ক্বাফ, আয়াত ৩৭)। অর্থাৎ কুর’আন থেকে শি্ক্ষা নিতে চাই জাগ্রত ক্বালব, তীক্ষ্ণ শ্রবনশক্তি এবং সত্যকে সত্য রূপে দেখার দৃষ্টিশক্তি। মাদক-সেবন এর সবগুলিই কেড়ে নেয়। ফলে ব্যহত হয় সুস্থ্য বিবেক নিয়ে এবং সজ্ঞান মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। পবিত্র জায়নামাযে নামাযীর এরূপ মাদকাসক্তি ও মনযোগহীনতা মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহাতায়ালার কাছে ভাল লাগেনি। তাই হুকুম দিয়েছেন মদ-জনিত চেতনাহীনতা নিয়ে নামাযে না দাঁড়াতে। তবে মদ যেরূপ কুর’আনের আয়াত বুঝা ও তা নিয়ে ভাবনার সামর্থ্য কেড়ে নেয়ে, অবিকল সে ক্ষতিকর কাজটিই করে কুর’আন বুঝার অক্ষমতা। বিপদের আরো কারণ, মদের আসক্তি কয়েক ঘন্টায় দূর হয়, কিন্তু মুসলিম মনে সে অক্ষমতার আছড় থাকে আমৃত্যু। তাই মদ পান পরিহার করা যেমন ফরজ, তেমন ফরজ হলো কুর’আনী জ্ঞানের অজ্ঞতা দূর করা। এজন্যই ইসলামের নামায-রোযা ফরজ হওয়ার প্রায় ১১ বছর আগে কুর’আনের জ্ঞানার্জন ফরজ করা হয়েছে। “ইকরা” অর্থাৎ “পড়” হলো পবিত্র কুর’আনে ঘোষিত প্রথম নির্দেশ। কুর’আনের জ্ঞানে মুর্খ থাকা কি তাই কোন ঈমানদারের সাজে? সাহাবাদের সকল সাফল্যের মূলে ছিল জ্ঞানার্জনের ফরজ পালনে সফলতা। কিন্তু আজকের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে এ ফরজ পালনে। এটি যে ফরজ -সে হুশই বা ক’জনের? ক’জন বুঝে পবিত্র কুর’আনের আয়াত? মাদসাক্ত মাতালদের চেয়ে এ ব্যর্থতা কি কম? মুসলিম জীবনে কাঙ্খিত সাফল্য আনতে নামায ব্যর্থ হচ্ছে মূলত কুর’আন বুঝার এ নিদারুন অক্ষমতা থেকেই।   

 

শ্রেষ্ঠ যিকর

মু’মিনের উত্তম যিকর হলো তাঁর নামায। এরূপ পবিত্র যিকির পীরের খানকায়, সুফি হালকায় বা বনে-জঙ্গলে সম্ভব নয়। তাই পবিত্র কুর’আনে  সে সব খানকায়, হালকায় ও বনে-জঙ্গলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি। বরং নির্দেশ এসেছে নামাযে ছুটে যাওয়ার। সুরা জুম্মায়াতে বলা হয়েছে, “যখন জুম্মার দিনে নামাযের জন্য ডাকা (আযান দেয়া) হয়, তখন তোমরা আল্লাহর যিকিরে ( অর্থাৎ নামাযে) ছুটে যাও।” নামায ঈমানদারকে প্রতিদিন ৫ বার সে যিকরে হাজির করে। ঈমানদার ব্যক্তি এভাবে শুধু নিজেই মহান আল্লাহতায়ালার যিকর করে না, বরং অন্ততঃ দিনে ৫ বার মহা প্রভুর স্মরণে জায়গা করে নেয়। এভাবেই গড়ে উঠে মহান মা’বুদের সাথে বান্দার গভীর সম্পর্ক।

বস্তুত প্রতিটি ইবাদতই হলো মহান আল্লাহতায়ালার যিকর। রোযার যিকর হয় সমগ্র দিন ব্যাপী এবং সেটি সমগ্র রমযানের মাস জুড়ে। হজ্জে সে যিকর চলে হজ্জের ইহরাম বাধাকালীন সময়ে। মহান আল্লাহতায়ালার যিকর তখনও হয় যখন বান্দা যাকাত দেয়। এদিক দিয়ে নামায অনন্য; যিকরের আয়োজন হয় কম পক্ষে দিনে ৫ বার এবং চলে আমৃত্যু। যারা তাহাজ্জুদ ও নফল নামায পড়ে -তাদের জীবনে যিকরের মাত্রা আরো অধিক ও দীর্ঘ। অপর দিকে একমাত্র নামাযেই যিকরের কিতাব তথা পবিত্র কুর’আন থেকে পাঠ করাটি বাধ্যতামূলক; রোযা, হজ্জ বা যাকাতের ন্যায় অন্য কোন ইবাদতে সেটি হয়না।

সর্বকালে ও সর্বজনপদে মানবের মনে যিকর তথা ধ্যানমগ্নতাকে প্রতিষ্ঠা দেয়াই হলো মহান আল্লাহতায়ালার নীতি। কারণ, এ যিকরই দেয় ব্যক্তির মনে জান্নাতের পথে নিবিষ্ট হওয়ার আগ্রহ। মজবুত করে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে আত্মীক বন্ধন। মনের গভীরে সর্বদা জাগ্রত রাখে রোজ হাশরের বিচার দিনে জবাবদেহীতার ভাবনা। বলা হয়েছে নামায হলো মু’মিনের মীরাজ। মীরাজ গড়ে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে সরাসরি সংযোগ –যা সাধিত করেছিল নবীজী (সা:)’র জীবনে। মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ ও তাঁর সাথে সংযোগ প্রতিষ্ঠায় প্রতি যুগেই নামায গণ্য হয়েছে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম রূপে। তাই হযরত মূসা (সা:)’র সাথে প্রথম বাক্যালাপেই তাঁকে যে নির্দেশটি দেয়া হয় সেটি হলো নামাযের। হযরত মূসা (সা:)’র সাথে মহান আল্লাহতায়ালার প্রথম বাক্য বিনিময় হয় পবিত্র তুয়া উপত্যাকায়। নিজ পরিবারকে নিয়ে তখন তিনি মিশরে ফিরছিলেন। হযরত মূসা (সা:)কে নির্দেশ দেয়া হয়, “নিশ্চয় আমিই আল্লাহ এবং আমি ছাড়া আর কোন ইলাহা নাই। অতএব আমার ইবাদত করো এবং প্রতিষ্ঠা দাও নামাযকে –যাতে আমার যিকর করতে পার।” –(সুরা ত্বাহা, আয়াত ১৪)। 

নামাযে যিকরের মূল ভূমি হলো কুর’আনের আয়াত। পবিত্র কুর’আনের আয়াতগুলির মাধ্যমে নামাযীর মনের গভীরে মহান আল্লাহাতায়ালা তাঁর পবিত্র বাণীগুলি গেঁথে দেন। তখন আলোকিত তাঁর অন্তর। নামাযের মাধ্যমেই ঘটে মু’মিনের চেতনার সাথে মহাপ্রভুর একান্ত সংলাপ। সেটি পবিত্র কুর’আনের সুরা পাঠের মাধ্যমে। তখন ধ্যানমগ্ন হয় নামাযীর মন। কিন্তু ধ্যানের সে সামর্থ্য মাতাল ব্যক্তির অবচেতন মনের থাকে না। সে সামর্থ্যটি শুধু মদই কেড়ে নেয় না, সেটি বিলুপ্ত হয় কুর’আন বুঝায় অক্ষমতার কারণেও। এমন নামাযীগণ ব্যর্থ হয় তাদের নিজ জীবনে কাঙ্খিত চারিত্রিক, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিপ্লব আনতে।

তাই কত কোটি লোক নামায পড়লো সেটিই বড় কথা নয়। কতজন দুর্বৃত্তকে নামায চরিত্রবান করলো, কতজনকে ফিরালো পাপকর্ম থেকে এবং কতজনকে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার মুজাহিদে পরিণত করলো -সেটিই মূল কথা। এক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলির কোটি কোটি নামাযীর ব্যর্থতাটি বিশাল। ব্যর্থতার দলিল হলো: নামায পড়েও কোটি কোটি মানুষ মিথ্যা বলছে, ঘুষ খাচ্ছে, সূদ খাচ্ছে, দুর্নীতি করছে এবং শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে রাজনীতিও করছে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশ রেকর্ড গড়ছে দুর্বৃত্তিতে। এক্ষেত্রে ব্যর্থতাটি নামাযের নয়, বরং যারা নামায পড়ে তাদের। নামাযী ব্যর্থ হচ্ছে নামাযে দাঁড়িয়ে ধ্যানমগ্ন হতে। নামাযী ব্যর্থ হচ্ছে নামাযে দাঁড়িয়ে নিজ জীবনের হিসাব নিতে। ব্যর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার সংলাপ ও তাঁর এজেন্ডার সাথে একাত্ম হতে। এ ব্যর্থতার মূল কারণ, নামাযীদের কুর’আন বুঝার অক্ষমতা। এ অক্ষমতা ডেকে আনে মানব জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক পরিনতিটি। সেটি জাহান্নামে পৌঁছার।

নামাযীকে নামাযের প্রতি রাকাতে কুর’আনের কিছু অংশ পাঠ করতে হয়। নইলে নামাযই হয় না। নামাযের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো ক্বিয়াম অর্থাৎ জায়নামাযে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন সময়। এ সময়টিতে কুর’আন থেকে কিছু অংশ পাঠ করা হয়। কুর’আন পাঠের সে কাজটি রুকু, সিজদা বা বসাকালীন সময়ে হয় না। তাই যে নামাযে দীর্ঘ সময় ক্বিয়ামে কাটানো হয় -সে নামাযের ওজন অধিক। নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরাম রাতের প্রায় অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে তারতিলের সাথে কুর’আন পাঠে কাটিয়ে দিতেন। নামাযের সাথে কুর’আনের গভীর সম্পর্কের বর্ণনাটি এসেছে সুরা আরাফে। বলা হয়ছে, “এবং যারা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলো কুর’আনকে এবং প্রতিষ্ঠা দিল নামাযকে, নিশ্চয়ই আমরা (এরূপ) সৎকর্মশীলদের প্রতিদানকে নষ্ট করিনা।”–(আয়াত ১৭০)। একই রূপ বর্ণনা এসেছে সুরা আনকাবুতে। বলা হয়েছে, “(হে মুহম্মদ), তোমার উপর ওহী রূপে যা নাযিল করেছি তা পাঠ করো কিতাব থেকে (অর্থাৎ কুর’আনকে) এবং প্রতিষ্ঠা দাও নামাযকে। নিশ্চয়ই নামায বাঁচায় ফাহেশা (অশ্লিলতা, জ্বিনা, পাপাচার) ও দুর্বৃত্তি থেকে। এবং নিশ্চয়ই আল্লাহর যিকরই সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম। এবং আল্লাহ জানেন -যা কিছু তোমরা করো। –(সুরা আনকাবুত, আয়াত ৪৫)। উপরুক্ত দুটি আয়াতে  পবিত্র কুর’আন এবং নামাযে কুর’আন পাঠের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দিনের অন্য সময়ে কুর’আন পাঠের সুযোগ না মিললেও সেটিকে ৫ বার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে নামাযে সুরা তেলাওয়াতের মাধ্যমে। রোগের ভ্যাকসিন নিলে সে রোগ থেকে বাঁচার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তখন শরীরে বৃদ্ধি পায় সে রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা। কুর’আনের জ্ঞান ব্যক্তির চেতনা রাজ্যে তেমনি এক ভ্যাকসিনের কাজ করে। তখন বাড়ে দুষ্ট মতবাদ, মিথ্যা ও ফাহেশার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা। ফলে যে ব্যক্তি কুর’আন বুঝার সক্ষমতা নিয়ে প্রতিদিনে ৫ ওয়াক্ত নামায আদায় করে সে বাঁচে সকল প্রকার অশ্লিলতা, জ্বিনা, মিথ্যাচার, পাচার ও দুর্বৃত্তি থেকে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়েছে মিরাজের পর অর্থাৎ হিজরাতের মাত্র এক বা দেড় বছর আগে। প্রশ্ন হলো, এর আগে প্রায় ১১ বছর যাবত মক্কায় অবস্থান কালে কি ছিল নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণের ইবাদতের ধরণ? সে সময়ের ইবাদত ছিল পবিত্র কুর’আন পাঠ তথা কুর’আনের জ্ঞানার্জন। জ্ঞানই পরিশুদ্ধি আনে চেতনা ও চরিত্র। গড়ে তাকওয়া। তাই অজ্ঞ ও জ্ঞানী ব্যক্তির চেতনা-চরিত্র কখনোই একই রূপ হয়না। সাহাবায়ে কেরাম যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব গড়ে উঠতে পরেছিলেন তার মূলে ছিল পবিত্র কুর’আনের গভীর জ্ঞান। নবুয়ত লাভের পর প্রথম যে কয়েকটি সুরা নাযিল হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম হলো সুরা মুজাম্মিল। এ সুরায় নবীজী (সা:)’র উপর নির্দেশ এসেছে যেন তিনি রাতের অর্ধেক অংশ বা তার চেয়ে কিছু বেশী বা কম অংশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পবিত্র কুর’আন থেকে আস্তে আস্তে তেলাওয়াত করেন। সাহাবাগণও সেটিই করতেন। ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজ হওয়ার পূর্বে ১১ বছর ধরে সে কাজ অবিরাম ভাবে চলতে থাকে। এভাবেই সাহাবাদের হৃদয়ে গভীর ভাবে স্থান করে নেয় পবিত্র কুর’আনে র জ্ঞান। সে জ্ঞানের উপর নির্মিত হয় তাদের বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও চারিত্রিক কাঠামো। এভাবে তারা বেড়ে উঠেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে।

 

যে নামায কল্যাণ আনে

নামায মুসলিম জীবনে কল্যাণ দিবে -সেটিই তো কাঙ্খিত। কিন্তু আজকের মুসলিম জীবনে নামাযের সে কল্যাণ কতটুকু? বাস্তবতা হলো, কোটি কোটি মানুষ নামায পড়লেও সবার নামায একই রূপ হয় না। সকল নামাযীর চেতনায় ও চরিত্রে একই রূপ বিপ্লবও আসে না। বরং অনেক নামাযীর জীবনে আসে মারাত্মক স্খলন। নামাযকে সফল করতে হলে যত্নবান হতে হয় নামাযের প্রতিটি ধাপে। প্রতি ওয়াক্ত নামাযের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট সময়; খেয়াল রাখতে হয় ওয়াক্তের দিকে। যেমন বলা হয়েছে, “নামায নির্দিষ্ট সময়ে আদায়ের জন্য মু’মিনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” –(সুরা নিসা, আয়াত ১০৩)। তবে জরুরি শুধু নির্দিষ্ট সময়ই নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো নামাযের জন্য নির্দিষ্ট স্থান মসজিদে গিয়ে নামায আদায়। এজন্যই জরুরি হলো, নামাযের আযান শুনে মসজিদের দিকে ধাবিত হওয়া। তাই মসজিদে নামায পড়া ও সঠিক ওয়াক্তে নামায পড়ার ক্ষেত্রে যারা গাফেল -তাদের রোগটি ঈমানে।

হাদীসে বলা হয়েছে, “যখন কোন মু’মিন ব্যক্তি নামাযের জন্য মসজিদ অভিমুখে রওয়ানা দেয়, তখন থেকেই সে নামাযের মধ্যে দাখিল হয়ে যায়। প্রতি কদমে বৃদ্ধি করা হয় তাঁর মর্যাদা। মসজিদে গিয়ে নামাযের অপেক্ষায় বসে থেকেও সে নামাযের সওয়াব পায়।” মসজিদে নামায আদায়ের সওয়াব ঘরে নামায আদায়ের চেয়ে ২৭ গুণ অধিক। এমন কি অন্ধ ও পঙ্গুদেরও মসজিদে গিয়ে নামায আদায়ের উৎসাহ দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মকতুম (রা:) ছিলেন অন্ধ। তিনি নবীজী (সা:)কে বল্লেন, “আমি তো চোখে দেখিনা, ফলে মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করা কঠিন। আমি কি অনুমতি পেতে পারি ঘরে নামায পড়ার?” নবীজী (সা:) জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি ঘর থেকে আযান শুনতে পান?” বল্লেন, “হাঁ, আমি আযান শুনতে পাই।” নবীজী (সা:) বল্লেন, “তবে আপনাকে মসজিদে এসেই নামায পড়তে হবে।” –(আবু দাউদ শরীফ)। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণীত হাদীস: নবীজী (সা:)  বলেন, “আমার ইচ্ছা হয়, জ্বালানী কাঠ সংগ্রহের নির্দেশ দেই্। এরপর আযানের পর কাউকে ইমামতির দায়িত্ব দিয়ে ঐসব লোকদের বাড়ীতে যাই যারা মসজিদে নামাযে আসেনি এবং তাদের ঘরগুলি জ্বালিয়ে দেই।”–(বুখারী ও মুসলিম শরীফ)। আবু দাউদ শরীফের হাদীস: “যদি কোন মহল্লায় তিন জন মুসলিমও বাস করে তবে তাদের উচিত জামায়াতবদ্ধ ভাবে নামায আদায় করা।

তাছাড়া মসজিদে নামায আদায়ে মনের যে একাগ্রতা ও ধ্যানমগ্নতা থাকে -তা ঘর, অফিস বা দোকানের নামাযে থাকে না। কারণ, ঘর, অফিস ও দোকানে অন্যদের শোরগোল, কথা-বার্তাসহ দৃষ্টি কেড়ে নেয়ার মত অনেক কিছুই থাকে। ফলে সেখানে থাকে না যিকিরের পরিবশে। কিন্তু মসজিদ সাঁজানো হয় নামাযের জন্য। তাছাড়া মসজিদে বসে অন্যের নামায দেখে শেখারও অনেক কিছু থাকে। নামাযরত পাশের ব্যক্তির একাগ্রতা, ধ্যানমগ্নতা ও দীর্ঘ রুকু-সেজদা দেখে নিজের মনেও ভাল নামায আদায়ের আকাঙ্খা জাগে। তাছাড়া নেকড়ের পাল যেমন বিশাল মহিষকে একাকী পেলে ঘিরে ধরে, তেমনি ঈমানদারকে একাকী পেলে ঘিরে ধরে শয়তানও। তখন বান্দাহর উপর শয়তানের বিজয় সহজ হয়ে যায়।

 

মুসলিমের মিশন ও নামায

ইসলাম শুধু ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি চায় না। পরিশুদ্ধি চায় সমাজ ও রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতেও। চায়, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে চায়, ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। সেরূপ একটি প্রকল্পকে বিজয়ী করতে সকল ঈমানদারদেরকে তাই অভিন্ন ভিশন, মিশন ও একতা নিয়ে বাঁচতে হয়। মুসলিমের মিশন তো তাই যা মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন। পবিত্র কুর’আনে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার সে পবিত্র ভিশনটি হলো “লি’ইউযহিরাহু আলাদ্দিনি কুল্লিহি” অর্থাৎ সকল দ্বীনের উপর তাঁর দ্বীন তথা ইসলামের বিজয়। ঈমানদারের দায়বদ্ধতা হলো সে ভিশন নিয়ে বাঁচা। ফলে মুসলিমের বাঁচার মিশনে লড়াই তখন অনিবার্য হয়ে পড়ে। কারণ, ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলে যে ভূমি সেটি তারা বিনা যুদ্ধে ছাড়তে রাজী নয়। ফলে জিহাদ ছাড়া মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন নিয়ে সামনে এগুনোর আর কোন রাস্তা থাকে না। যুদ্ধ যেখানে অনিবার্য, সেখানেই অপরিহার্য হলো সৈনিকের রিক্রুটমেন্ট, দুর্গ, সৈন্য ও সৈন্যের প্রশিক্ষণ। মসজিদ হলো সেই কাঙ্খিত দুর্গ, প্রতিটি নামাযী হলো সৈনিক এবং ৫ ওয়াক্ত নামায হলো সেই প্রশিক্ষণ। অস্ত্র চালানোর সামর্থ্যই সৈনিকের মূল গুণ নয়, সেটি হলো ব্যক্তির নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও আত্মদানে তাঁর আগ্রহ। নামায এসব গুলোই করে। ব্যক্তির নামাযই বলে দেয়, সৈনিক রূপে সে কতটা সাচ্চা। যে ব্যক্তি মসজিদের ৫ ওয়াক্ত নামাযে হাজির হতে পারে না, সে কি ইসলামের সৈনিক হতে পারে?  

প্রশিক্ষণের অর্থ শুধু সামরিক কলাকৌশল শেখানো নয়, বরং মূল বিষয়টি হলো ইসলামের বিজয়ে জান, মাল, মেধাসহ সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগে নামাযীকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করা। যে কোন যুদ্ধের জন্য এ প্রস্তুতিটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। এবং লক্ষ্য, নামাযীদের মাঝে সিসাঢালা দেয়ালসম অটুট ঐক্যের প্রতিষ্ঠা দেয়া। অতীতে মুসলিমগণ যখন একের পর বিজয় এনেছে, তখন মসজিদ ছাড়া তাদের কোন দুর্গ বা ক্যান্টনমেন্ট ছিল না। নামায ছাড়া তেমন নিয়মিত কোন প্রশিক্ষণও ছিল না। মসজিদের জায়নামাযে বসে জিহাদের প্রস্তুতি নেয়া হতো। রাজস্বের সিংহভাগ খরচ করে তখন কোন সেনাবাহিনী পালতে হয়নি। ক্যান্টনমেন্টও গড়তে হয়নি। নামাযীগণ তখন নিজ অর্থ, নিজ খাদ্য, নিজ বাহন ও নিজ অস্ত্র নিয়ে রণাঙ্গণে হাজির হতো। এ ছিল তাদের মানসিক প্রস্তুতির নমুনা। জিহাদকে তারা জান্নাতে প্রবেশের বাহন মনে করতো। মুসলিমদের মাঝে একতা, শৃঙ্খলা, আত্মনিয়োগ ও কুরবানীর সে বিস্ময়কর সামর্থ্য গড়ে উঠেছিল নামাযের জায়নামাযে। আজ মুসলিম দেশগুলিতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে ক্যান্টনমেন্টের সংখ্যা বেড়েছে। সৈন্য সংখ্যা ও তাদের প্রশিক্ষণের আয়োজনও বেড়েছে। কিন্তু তাতে বিজয় বাড়েনি। বরং বেড়েছে পরাজয়। বেড়েছে সেনাবাহিনীর হাতে দেশের অধিকৃতি ও দেশবাসীর পরাধীনতা। তাদের চেতনায় আত্মত্যাগের সামর্থ্য বাড়েনি। বরং বেড়েছে স্বার্থসিদ্ধির দুর্দম্য নেশা। ফলে বহু মুসলিম দেশে সৈনিকেরা পরিণত হয়েছে দুর্বৃত্ত ফ্যাসিস্ট শাসকচক্রের চাকর-বাকরে। এরই উদাহরণ বাংলাদেশ। নৃশংস ফ্যাসিস্ট শাসকের গদি বাঁচাতে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে ২০১৩ সালে ৫মে তারিখে নিরীহ মুসল্লীদের উপর বাংলাদেশের সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে।  

অন্য ধর্মের অনুসারিগণ ক্লাবে বা মদ্যশালায় বন্ধুত্ব গড়ে ও জোটবদ্ধ হয়। মুসলিমগণ ভাতৃত্বের বন্ধন গড়ে মসজিদের পবিত্র মেঝেতে। জায়নামাযে ভাষা, গোত্র, বর্ণ ও এলাকাভিত্তিক কোন বিভক্তি থাকে না। সব নামাযীকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাতার বাঁধতে হয়। হাদীসে বলা হয়েছে, কাতারে ফাঁক থাকলে সেখানে শয়তানের অনুপ্রবেশ ঘটে। জামাতবদ্ধ হওয়ার এ রীতি মুসলিমগণ তাদের গৌরব কালে শুধু জায়নামাযে সীমিত রাখেননি, প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গণেও। প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন রণাঙ্গণে। জামাতবদ্ধ নামাযের সেটিই তো গুরুত্পূর্ণ  শিক্ষা। মুসলিম মনে এমন একটি প্যান-ইসলামিক চেতনা বলবান হলে মুসলিমদের ভৌগলিক মানচিত্র বিশাল ভাবে বাড়লেও তাতে ভূগোল খন্ডিত হয় না। মুসলিম জীবনে নামায তো এভাবেই সাংস্কৃতিক বিপ্লব এনেছে। সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে একতা ও ভাতৃত্ব নিয়ে বাঁচার।

কিন্তু আজ মুসলিম উম্মাহর মাঝে যে বিভক্তি, তা দেখে নিশ্চিত বলা যায়, নামায থেকে তারা কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেনি। একতার চেতনা তারা মসজিদের বাইরে আনতে পারিনি। তাদের নামায ব্যর্থ হয়েছে তাদের মাঝে সীসাঢালা দেয়ালসম একতা গড়তে। ফলে মুসলিম উম্মাহ আজ ৫৭টি রাষ্ট্রে খন্ডিত। অথচ বিভক্তি গড়া যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো উম্মাহর বিভক্ত মানচিত্র নিয়ে বাঁচা। এবং পবিত্র ইবাদত হলো বিভক্তির দেয়াল ভেঙ্গে একতা গড়া –সেটি যেমন রাজনৈতিক অঙ্গণে, তেমনি ভৌগলিক অঙ্গণে। মুসলিম রূপে বাঁচায় শুধু পানাহার হালাল হলে চলে না, হালাল হতে হয় দেশের রাজনীতি ও ভৌগোলিক মানচিত্রও। নইলে বিপর্যয় অনিবার্য। পরিতাপের বিষয় হলো আজকের মুসলিমগণ নিজ দেশে শুধু সূদি ব্যাংক, পতিতাপল্লী, মদের ব্যবসাকেই প্রতিষ্ঠা দেয়নি, প্রতিষ্ঠা দিয়েছে হারাম রাজনীতি ও হারাম মানচিত্রও। হারাম পরিত্যাগের চেতনাই যেন বিলুপ্ত হয়েছে। মুসলিম মানচিত্রের ভিত্তি হতে হবে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব; ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতা ভিত্তিক বিভক্তি নয়। নবীজী (সা:) তাঁর সাহাবাদের যুগে কি ভাষা, অঞ্চল ও গোত্রের নামে এরূপ বিভক্তির দেয়াল গড়ার কথা ভাবা যেত? অথচ তাদের গড়া সে আমলের বিশাল ভূগোল ভেঙ্গে ৫০টির বেশী বাংলাদেশ গড়া যেত। কিন্তু তারা সেরূপ হারাম মানচিত্র নির্মাণের পথে পা বাড়াননি। তারা বেছে নিয়েছেন একতা ও গৌরবের পথ। এবং এ পথই তো হলো, মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার পথ। এটিই তো নামাযের সংস্কৃতি। অপরদিকে বিভক্তি তো শয়তানকে খুশি করার পথ। আজকের মুসলিমগণ মুসলিম বিশ্বের ভৌগলিক আয়োতন এক ইঞ্চিও বাড়ায়নি, বরং বাড়িয়েছে রাষ্ট্রের সংখ্যা। বিভক্তির সে হারাম পথ বেছে নেয়ায় ঘটেছে ভাতৃঘাতী গভীর রক্তপাত এবং নিজ দেশে ডেকে আনা হয়েছে কাফের শত্রুদের। পরিতাপের বিষয় হলো মুসলিমগণ আজ শয়তানকে খুশি করার পথই বেছে নিয়েছে। এজন্যই ১৯৭১য়ে গড়া বাংলাদেশের মানচিত্রে ভারত উৎসব করে। এবং ২২ টুকরায় বিভক্ত আরবের মানচিত্র  প্রচণ্ড খুশি হয় ইসরাইলসহ তাবত কাফের শক্তি।

             

যে নামায আযাব আনে

নামায শুধু ঈমাদারগণই পড়ে না। মুনাফিকগণও পড়ে। মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন মু’মিনদের নামাযে এবং প্রচণ্ড অখুশি হন মুনাফিকদের নামাযে। এমন নামাযীর উপর মহান আল্লাহতায়ালা তখন অভিসম্পাত দেন।তাই শুধু নামায পড়লেই চলে না, নজর রাখতে হয় নামায যেন মুনাফিকের নামাযে পরিণত না হয়। সওয়াবের বদলে যেন আযাব ডেকে আনে। কি ধরণের নামায মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ধ্বংস ও অভিসম্পাত ডেকে আনে -সে বিষয়টি জানানো হয়েছে সুরা মাউনে। বলা হয়েছে, “ফা ওয়াইলুল্লিল মুছাল্লীন। আল্লাযীনা হুম আন সালাতিহিম সা’হুন। আল্লাযীনা হুম ইউরাউন।” অর্থ: “অতঃপর ধ্বংস ঐসব নামাযীদের জন্য -যারা অমনযোগী বা দেরীতে নামায আদায় করে। তারা নামাযে খাড়া হয় লোক দেখানোর জন্য।”- (সুরা মাউন, আয়াত ৪-৬)।

নামায না পড়লে গর্দান থেকে ইসলামের রশি ছিন্ন হয়ে যায়। নবীজী (সা:)’র জামানায় নামায গণ্য হতো মুসলিমের মূল পরিচিতি রূপে। যারা নামায পড়তো না, তারা গণ্য হতো কাফের রূপে। মুসলিম সমাজে কাফের রূপে পরিচিত হওয়ার বিপদ বুঝে মুনাফিকগণও তখন নামাযকে বেছে নিত ঢাল রূপে। তারা শুধু নামাযই পড়তো না, বরং নবীজী (সা:)’র পিছনে প্রথম কাতারে খাড়া হতো। লোক-দেখানো সে নামাযের মধ্য দিয়ে তারা মুসলিমদের ধোকা দিত। এবং ধোকা দিত মহান আল্লাহতায়ালাকেও। নামায নিয়ে মুনাফিকদের সে ষড়যন্ত্রকে ফাঁস করেছে সুরা নিসা। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই মুনাফিকগণ আল্লাহকে ধোকা দেয়, আসলে তিনিই (আল্লাহ) তাদেরকে ধোকা দেন। এবং যখন তারা নামাযে দাঁড়ায়, দাঁড়ায় আলস্য নিয়ে এবং লোক-দেখানোর উদ্দেশ্য। আল্লাহকে তারা সামান্যই স্মরণ করে।” –(আয়াত ১৪২)।

তাই নামায বা অন্য কোন নেক আমল করলেই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তা গৃহিত হবে -বিষয়টি তেমন সহজ সরল নয়। নেক আমল কবুলের কিছু শর্ত আছে। সে শর্তের কথা শুনানো হয়েছে সুরা তাওবাতে। বলা হয়েছে, “তাদের দান আল্লাহর কাছে গৃহিত হওয়া থেকে কোন কিছুই বাধা দেয় না -একমাত্র এছাড়া যে, তারা অস্বীকার করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে, নামাযে দাঁড়ায় আলস্য নিয়ে এবং দান করে অনিচ্ছা নিয়ে।” –(আয়াত ৫৪)। ইবাদত রূপে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে নামাযীকে তাই জায়নামাযে দাঁড়াতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি গভীর আত্মনিবেদন ও আত্মসমর্পণ নিয়ে। পবিত্র কুর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “নিশ্চয়ই কামিয়াবী মু’মিনদের জন্য। যারা নামাযে আত্মনিবেদিত।”–(সুরা মু’মিনুন, আয়াত ১-২)। এবং সে আত্মনিবেদন ও আত্মসমর্পণ শুধু নামাযে সীমিত রাখলে চলে না, প্রতিষ্ঠা দিতে হয় নামাযের বাইরেও। সে আত্মসমর্পণের প্রকাশ ঘটাতে হয় রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সর্বত্র। নইলে গাদ্দারী হয়। নামাযের সাথে সে নগ্ন গাদ্দারীটি ধরা পড়ে যখন রাজনীতিতে সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ ও স্বৈরাচার, অর্থনীতিতে সূদ, সংস্কৃতিতে অশ্লিলতা, সরকারি অফিসে ঘুষ এবং আদালতে শরিয়তী আইনের বদলে কুফরি আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়।

 

নামায দেয় দোয়ার পরিবেশ

মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া সর্বাবস্থায় করা যায়। চলতে ফিরতে, কর্মস্থলে, এমন কি বিছানায় শুয়েও তাঁর কাছে আরজী পেশ করা যায়। মু’মিনের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার দরবার সব সময়ই খোলা। তবে দোয়ার শ্রেষ্ঠতম সময় যেমন নামায, তেমনি নামায শেষে জায়নামায। মহান আল্লাহতায়ালার সংযোগ গড়তে পীর বা দরবেশের মধ্যস্থতা লাগে না। তিনি সংযোগে সরাসরি লাইন বান্দার হাতে তুলে দিয়েছেন। মহান দয়াময়ের নাম ধরে ডাক দিলেই তিনি তাঁর স্মরণের জায়গাতে মু’মিনের জন্য সাথে সাথে স্থান করে দেয়। এবং সেটিই হলো পবিত্র কুর’আনে বর্ণিত মহান রাব্বুল আলামীনের প্রতিশ্রুতি। নাময তো দোয়া পেশের তেমন একটি পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি করে। মহান আল্লাহতায়ালা চান, নামাযের মাধ্যমে তাঁর ঈমানদার বান্দাহ তাঁর দরবারে আবেদনটি পেশ করুক। এটিই হলো বান্দার জন্য নামাযের সবচেয়ে বড় অবদান। নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা ছবর ও নামাযের সাহায্যে সাহায্য চাও। নিশ্চ্য়ই আল্লাহ ধৈয্যশীলদের সাথে।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৩)। মহান আল্লাহতায়ালা থেকে মাগফিরাত লাভের এটিই হলো তাঁর নিজের দেখানো পথ। তাই দয়াময় রাব্বুল আ’লামীনের দরবারে দোয়া পেশের জন্য যেমন ছবর চাই, তেমনি চাই নামায। নামায ছেড়ে যারা পীরের মাজারে বা সুফি হালকায় দোয়া কবুলের জন্য ধর্না দেয়, তাদের জন্য এ আয়াতে রয়েছে চরম হুশিয়ারি।

দোয়ার গুরুত্ব কি, দোয়া কি ভাবে করতে হয় এবং কোন দোয়াটি শ্রেষ্ঠ সেটিও শিখিয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালা। সে শিক্ষাটি দেয়া হয়েছে সুরা ফাতেহা’তে -যা পাঠ করতে হয় নামাযের প্রতি রাকাতে। এ সুরা পাঠ না করলে নামাযই হয় না। তাই জরুরি শুধু সুরা ফাতেহা পাঠ নয়, বরং এ সুরার প্রতিটি বাক্যের অর্থ হৃদয়ে গভীর ভাবে ধারণ করা। সুরা ফাতেহা’র মূল বিষয় তিনটি। প্রথমে বর্ণিত হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার মর্যাদা। বলা হয়েছে,“আল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন”।  অর্থ: সকল প্রশংসা একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার। তিনিই “রাহমানির রাহীম”, তিনিই “মালিকি ইওয়ামিদ্দিন।” অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা হলেন সবচেয়ে দয়াময় এবং দয়া করাই তার নীতি। এবং তিনিই রোজ হাশরের দিনের সর্বসময় কর্তা। দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এ সুরায় বর্ণিত হয়েছে তা হলো মুসলিম জীবনের মিশন। সে মিশনটি হলো: “ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা না’স্তায়ীন।” অর্থাৎ আমরা ইবাদত করি একমাত্র মহান আল্লাহর এবং একমাত্র আল্লাহ থেকেই আমরা সাহায্য ভিক্ষা করি।

সুরা ফাতেহার তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো দোয়া। এবং সে দোয়াটি হলো “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম”। অর্থ: “(হে মহান আল্লাহ), আমাকে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের পথটি দেখান।” এটিই হলো মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাওয়াটি সম্পদ ও সন্তান চাওয়া নয়, সেটি এই সিরাতুল মুস্তাকীম। যে ব্যক্তি সিরাতুল মুস্তাকীম পেল, সেই তো জান্নাত পেল। এর চেয়ে বড় পাওয়া মানব জীবনে আর কি হতে পারে? ধনসম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও সুঠাম স্বাস্থ্য তো কাফেরও পায়। কিন্তু তা কি জান্নাতে নেয়? যে ব্যক্তি ব্যর্থ হলো সিরাতুল মুস্তাকীম পেতে, সে পৌঁছে জাহান্নামে। এর চেয়ে বড় ক্ষতিই বা কি হতে পারে? মহান আল্লাহতায়ালা অশেষ রহমত হলো, মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া-পাওয়ার বিষয় কি এবং কি ভাবেই বা সেটি রাব্বুল আলামীনের কাছে চাইতে হয় -সেটি তিনি সুরা ফাতেহাতে শিখিয়ে দিয়েছেন। নামায এভাবে জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি থেকে যেমন বাঁচতে শেখায়, তেমনি দেখায় সবচেয়ে বড় কল্যাণের পথ। নামায এভাবেই কাজ করে জান্নাতে চাবি রূপে। লন্ডন, ১০/১২/২০২০।




শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যর্থতা ও বিপর্যয়

ফিরোজ মাহবুব কামাল

কুশিক্ষার বিপদ

চেতনা, চরিত্র, কর্ম ও আচরণে মানুষ মূলত তাই যা সে শিক্ষা থেকে পেয়ে থাকে। তাই শিক্ষা পাল্টে দিলে মানুষের ধর্ম, কর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজনীতি এবং রাষ্ট্রও পাল্টে যায়। তাই মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে মুসলিম করার কাজটি নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত দিয়ে শুরু করেননি। সে কাজে জ্ঞানার্জনকে প্রথম ফরজ করেছেন এবং সেটি ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজ হওয়ার প্রায় ১১ বছর আগে। ইকরা তথা পড়ো ও জ্ঞাবান হও -তাই পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা পক্ষ থেকে মানব জাতির উদ্দেশ্যে প্রথম নির্দেশ। অথচ মুসলিমগণ সে কুর’আনী ইসলাম থেকে এতোটাই দূরে সরেছে যে তারাই বিশ্ববাসীর মাঝে সবচেয়ে অধিক অশিক্ষিত। শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলিমদের ব্যর্থতা ও বিপর্যয়ের এই হলো সবচেয়ে বড় দলিল। যেন অশিক্ষা নিয়েই তারা মুসলিম হতে চায়।

মানুষের সামনে শুধু শ্রেষ্ঠ একটি ভিশন বা মিশন পেশ করলেই চলে না। প্রতিটি ব্যক্তির মাঝে সে ভিশন ও মিশন নিয়ে বাঁচার সামর্থ্যও সৃষ্টি করতে হয়। নইলে সে ভিশন ও মিশন শুধু কিতাবই থেকে যায়। মুসলিম মাত্রই হলো, মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত খলিফা। মানব সৃষ্টির মূল কারণ এটিই। রাজার খলিফাগণ হলো দেশের নানা অঞ্চলে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসকগণ। সে দায়িত্বপালনে তাদেরকে বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত হতে হয়। তাদের অবহেলা ও অযোগ্যতায় রাজার রাজত্ব বাঁচে না। তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার রাজত্বে তাঁর সার্বভৌমত্ব ও আইনের শাসন বাঁচাতে প্রতিটি মুসলিমের দায়ভারটি বিশাল। এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে দায়িত্ব পালনে মুসলিমদের যোগ্যতর রূপে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। সে কাজে নির্ধারিত টেক্সটবুক হলো পবিত্র কুর’আন। কিন্তু বাংলাদেশে ন্যায় মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থায় সে পবিত্র কুর’আনে কোন স্থান নাই। শিক্ষার অঙ্গণে ব্যর্থতার মূল কারণ এখানেই। এবং শিক্ষার অঙ্গণে এ ব্যর্থতার কারণে সীমাহীন ব্যর্থতা ও বিপর্যয় নেমে এসেছে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, প্রশাসন, আইন-আদালত ও সংস্কৃতির অঙ্গণে।

প্রস্তর যুগের আদিম মানুষটির সাথে আধুনিক মানুষের যে পার্থক্য সেটি দৈহিক নয়, বরং শিক্ষাগত। শিক্ষার কারণেই ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে এবং জাতিতে জাতিতে ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। তবে শিক্ষার পাশে প্রতি সমাজে প্রচণ্ড কুশিক্ষাও আছে। কুশিক্ষার কারণেই ধর্মের নামে অধর্ম, নীতির নামে দুর্নীতি এবং আচারের নামে অনাচার বেঁচে আছে। এবং সংস্কৃতির নামে বেঁচে আছে আদিম অপসংস্কৃতি। সুশিক্ষার কারণে মানুষ যেমন সঠিক পথ পায়, তেমনি কুশিক্ষার কারণে পথভ্রষ্ট বা জাহান্নামমুখি হয়। আজকের মুসলিমদের ভয়ানক ব্যর্থতাটি কৃষি, শিল্পে বা বাণিজ্যে নয়, বরং সেটি শিক্ষায়। শিক্ষাক্ষেত্রে এ থেকেই জন্ম নিয়েছে অন্যান্য নানাবিধ ব্যর্থতা। ভূলিয়ে দিয়েছে মানব-সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যটি। বহুলাংশে বিলুপ্ত করেছে আখেরাতে ভয়। ফলে মুসলিম ব্যর্থ হচ্ছে তার উপর অর্পিত খেলাফতের দায়িত্ব পালনে। অনেকেই ফিরে গিছে প্রাক-ইসলামিক যুগের জাহিলিয়াতে। ফলে আল্লাহর সৈনিকের বদলে বিপুল সংখ্যক মানুষ বেড়ে উঠছে শয়তানের সৈনিক রূপে। মুসলিম ভূমিতে মহান আল্লাহর শরিয়তী বিধানের আজ যেরূপ বিলুপ্তি এবং জেঁকে বসেছে যেরূপ কুফরি আইন –তার মূল কারণ তো এই শয়তানের সৈনিকেরা। তাদের কারণেই বিলুপ্ত হয়েছে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব। প্রতিষ্ঠা পেয়েছে গোত্র, বর্ণ, ভাষা ও ভূগোলভিত্তিক বিভক্তির দেয়াল। এবং বেড়েছে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ফলে শত্রুশক্তিকে মুসলিম ভূমিতে আজ কোন যুদ্ধই নিজেদের লড়তে হচ্ছে না। তাদের পক্ষে সে রক্তাত্ব যুদ্ধটি মুসলিম রূপে পরিচয় দানকারীরাই লড়ে দিচ্ছে। ফলে বেঁচে আছে শরিয়তী আইনের বদলে সাবেক কাফের শাসকদের প্রণীত কুফরী আইন। বেঁচে আছে সূদী অর্থনীতি, সেক্যুলার শিক্ষা, পতিতবৃত্তি, জুয়া এবং সংস্কৃতির নামে অশ্লিলতা। এবং ইসলাম বেঁচে আছে প্রাণহীন ও অঙ্গিকারহীন আনুষ্ঠিকতা রূপে। সংজ্ঞাহীন মুমুর্ষ রোগীর দেহে যেমন মাতম থাকে না, তেমনি মাতম নাই পরাজিত ও বিপর্যস্ত এ মুসলিমদেরও। কোন জাতির জীবনে এরচেয়ে ভয়ানক ব্যর্থতা আর কি হতে পারে?    

ঈমান বাঁচাতে সত্যকে জানা ও লাগাতর মেনে চলাটি যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি হলো মিথ্যাকে মিথ্যা রূপে জানা এবং সেটি পরিহার করা। নইলে ঈমান বাঁচে না। পানাহার যেমন প্রতিদিনের কাজ, তেমনি প্রতিদিনের কাজ হলো জ্ঞানার্জন। একমাত্র তখনই লাগাতর সমৃদ্ধি আসে জ্ঞানের ভূবনে। মহান নবীজী (সা:) বলেছেন, “সে ব্যক্তির জন্য বড়ই বিপদ, যার জীবনে দুটি দিন অতিবাহিত হলো অথচ তাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডারে কোন বৃদ্ধিই ঘটলো না।” তবে সে বিশেষ জ্ঞানটি হলো পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান। এ জ্ঞান থেকেই ঈমান পুষ্টি পায় এবং মু’মিনের মনে প্রবলতর হয় মহান আল্লাহতায়ালার ভয় ও আখেরাতের ভয়। কুর’আন পাঠের সাথে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে মু’মিনের সম্পর্ক এভাবেই নতুন প্রাণ পায়। আত্মায় পুষ্টি জোগানোর সে কাজটি নিয়মিত না হলে দৈহিক ভাবে বেঁচে থাকলেও ব্যক্তির াবেআধ্যাত্মিক মৃত্যু ঘটে। নিয়মিত কুর’আন পাঠের সাথে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায, মাসব্যাপী রোযা, হজ্জ, যাকাত, তাসবিহ পাঠ ও দানখয়রাত –এগুলো হলো মানুষকে আধ্যাত্মিক ভাবে বাঁচিয়ে রাখা ও শক্তিশালী করার অপরিহার্য বিধান।

তবে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং মিথ্যা, অধর্ম ও নানারূপ পাপাচারকে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে শয়তানেরও নিজস্ব বিধান ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মদ্যপান, পতিতাবৃত্তি, সূদ, জুয়া, অশ্লিলতা, ব্যাভিচার, পর্ণগ্রাফি, নাচ-গান এগুলো হলো শয়তানের সনাতন বিধান। তবে শয়তানের হাতে সবচেয়ে বৃহৎ ও আধুনিক হাতিয়ার হলো সেক্যুলার রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের পরিচালিত সেক্যুলার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি। এজন্য মুসলিম দেশে যতই বাড়ছে সেক্যুলার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, ততই বাড়ছে ইসলাম থেকে মুসলিমদের দূরে সরা। বাড়ছে ডি-ইসলামাইজেশন। বাড়ছে ইসলামী বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বদৌলতেই মুসলিম দেশে জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, সামন্তবাদ, সেক্যুলারিজম ও পুঁজিবাদের ন্যায় জাহিলিয়াত দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে সরে এসব মানুষ দ্রুত জাহান্নামমুখি হচ্ছে। বাড়ছে সূদ, ঘুষ, অশ্লিলতা, উলঙ্গতা, ব্যাভিচার, হত্যা, গুম ও নানারূপ পাপাচারের সংস্কৃতি।

 

সবচেয়ে বড় বেঈমানি

মুসলিমদের আজকের বিভ্রান্তি এতোটাই প্রকট যে, পৃথিবীতে তারা যে মহান আল্লাহর খলিফা সে ধারণাটিও অধিকাংশের চেতনা থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। পলায়নপর সৈন্য শুধু রণাঙ্গনই ছাড়ে না, সৈনিকের পোষাক এবং নিজ দলের ঝান্ডাও ছেড়ে দেয়। তেমনি আজকের মুসলিমগণ শুধু হাত থেকে ইসলামের ঝান্ডাই ফেলে দেয়নি, বরং তুলে নিয়েছে জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ, রাজতন্ত্র, স্বৈরাচার, পুঁজিবাদ ও সেক্যুলারিজমের ঝান্ডা তুলে নিয়েছে। এভাবে পরিণত হয়েছে শয়তানের সৈনিকে। মুসলিম ভূমিতে আল্লাহর শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠা রুখতে তাই কোন কাফের সৈনিকদের মুসলিম দেশে নামতে হচ্ছে না, সে কাজটি তারা নিজেরাই করে দিচ্ছে। ফলে আল্লাহর কুর’আনী বিধান আজ প্রায় প্রতি মুসলিম দেশে পরাজিত। মহান আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় বেঈমানি, কুর’আনের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় অবমাননা আর কি হতে পারে?

অথচ “মুসলিম” শব্দটি কোন বংশীয় খেতাব নয়। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো ইসলামের বিপ্লবী বিশ্বাস নিয়ে বাঁচা। এবং সে বিশ্বাসে উৎস্য হলো পবিত্র কুর’আন। কিন্তু সমস্যা হলো সেক্যুলারিস্ট-অধিকৃত দেশগুলোতে ইসলামের সে বিপ্লবী চেতনা নিয়ে বাঁচাটাই অসম্ভব করা হয়েছে। কোন কাফেরের সন্তান যেমন মুসলিম হতে পারে, তেমনি মুসলিমের সন্তানও কট্টোর কাফির হতে পারে। সমগ্র মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি এনেছিল ইসলাম। যুগে যুগে বড় বড় নীতি কথা অনেকে মনিষীই বলেছেন, কিন্তু তারা সেগুলি প্রতিষ্ঠা দিতে পারেনি। কারণ তাদের হাতে রাষ্ট্র ছিল না। কিন্তু মুসলিমগণই মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নীতিগুলি প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। কারণ ইসলামের নবী হযরতর মুহাম্মদ (সা:) শুধু কুর’আনী নীতি কথা শিক্ষা দেননি, সেগুলি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা দেন এবং দশ বছর তিনি সে রাষ্ট্রের শাসক ছিলেন। সে রাষ্ট্রই পরবর্তীতে বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়। তিনি প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তা থেকে গড়ে তুলেছন ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ঈমানদার জনশক্তি। ফলে দাসগণ তখন মুক্তি পেয়েছে, সাধারণ মানুষের সাথে নারীগণও অধিকার ও মর্যাদা পেয়েছে। প্রতিষ্ঠা পেয়েছে শরিয়তী আইনের পূণ্য শাসন। সাধারণ জনগণ পেয়েছে জানমাল নিয়ে বাঁচার নিরাপত্তা।

ইসলামের যে চেতনাটি বিপ্লব এনেছিল তার ভিত্তিটি হলো মহান আল্লাহ, তাঁর রাসূল, কুর’আন ও আখেরাতের উপর অটল বিশ্বাস। তবে মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু বিশ্বাসী হওয়া নয়, বরং সে বিশ্বাসকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নিষ্ঠাবান সৈনিক হওয়াও। তাই মুসলিম তাঁর বিশ্বাসকে কখনোই চেতনায় বন্দী রাখে না; বরং কর্ম, আচরণ, রাজনীতি¸ অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহসহ সকল ক্ষেত্রে সে বিশ্বাসের প্রকাশও ঘটায়।  তাঁর বিশ্বাস ও কর্মে থাকে এক সামগ্রীক রাষ্ট্র বিপ্লবের সুর। ১৪ শত বছর পূর্বে নবীজী (সা:) এবং তাঁর অনুসারি প্রতিটি মুসলিম সে বিশ্বাস নিয়ে নিজ নিজ ভূমিকা রেখেছিলেন। নিজেদের বিশ্বাস ও ধর্মকর্মকে তাঁরা নিজ ঘর ও মসজিদে সীমিত রাখেননি, বরং বিপ্লব এনেছিলেন সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। কোন গাছই পাথর খন্ড ও আগাছার জঞ্জালে গজায় না। গজালেও বেড়ে উঠে না। সে জন্য উর্বর ও জঞ্জালমুক্ত জমি চাই। গাছের বেড়ে উঠার জন্য নিয়মিত পরিচর্যাও চাই। রাষ্ট্র তো সে কাজটি করে মানব সন্তানের ঈমান ও নেক আমল নিয়ে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে। মানব শিশুর পরিচর্যার সে কাজটি করে শিক্ষা। নবীজী (সা:) তেমন একটি রাষ্ট্র গড়া এবং সে রাষ্ট্রের বুকে জনগণকে শিক্ষা দেয়ার কাজকে পবিত্র জিহাদে পরিণত করেন। সর্বকালের মুসলিমদের জন্য আজও সেটিই অনুকরণীয় আদর্শ। এবং সে আদর্শের অনুসরণের মধ্যেই দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ। অন্যথায় যেটি ঘটে সেটি মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে অবাধ্যতা। তাতে অনিবার্য হয় জাহান্নামের আযাব।

শিক্ষাদান, শিক্ষালয় ও শিক্ষার মাধ্যম হলো মানব-সভ্যতার শ্রেষ্ঠতম আবিস্কার। মানব-সংস্কৃতির এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ অলংকার। সে সমাজে শিক্ষা নেই সে সমাজে সংস্কৃতিও নাই। শিক্ষার বলেই মানুষ পশু থেকে ভিন্নতর হয়। চেতনা, চরিত্র ও কর্মে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে যে বিপুল তারতম্য দেখা যায় সেটিও শিক্ষা ভেদে। শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ জানতে পারে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব। জানতে পারে এ জীবনে বাঁচার মূল লক্ষ্য এবং সে লক্ষ্যে পৌঁছার সঠিক পথ। জ্ঞানার্জন ছাড়া তাই ইসলাম নিয়ে বাঁচা যায় না। শিক্ষাদান ও শিক্ষালাভের কাজ তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এ ইবাদতের ব্যর্থতায় ব্যক্তির অন্যান্য ইবাদতেও ভয়ানক অপূর্ণতা ও সমস্যা দেখা দেয়। তখন ব্যর্থতায় পূর্ণ হয় সমগ্র জীবন –সেটি যেমন ইহকালে তেমনি আখেরাতে। শিক্ষাদানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাই মানব সমাজে দ্বিতীয়টি নেই। নবীরাসূলদের এটিই শ্রেষ্ঠতম সূন্নত।

মানুষ কতটা মানবিক গুণের মানুষ হবে এবং কতটা বেড়ে উঠবে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে -তা নির্ভর করে জ্ঞানার্জন কতটা সঠিক ভাবে পালিত হলো তার উপর। ইসলামের পরাজিত দশা, মুসলিমদের পথভ্রষ্টতা এবং সমাজে পাপাচারের জয়জয়াকার দেখে এ কথা নিশ্চিত বলা যায় যে, মুসলিম বিশ্বে জ্ঞানার্জনের কাজটি সঠিক ভাবে হয়নি। এটিই হলো মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। অন্যান্য ব্যর্থতা হলো তার শাখা-প্রশাখা মাত্র। মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়লেও ইসলামের মৌলিক শিক্ষাগুলো তুলে ধরার ক্ষেত্রে সেগুলো সফলতা দেখাতে পারিনি। ফল দাঁড়িয়েছে, যে ইসলাম নিয়ে আজকের মুসলিমদের ধর্মকর্ম ও বসবাস -তা নবীজী (সা:)’র আমলের ইসলাম থেকে ভিন্নতর। নবীজী (সা:)’র ইসলামে ইসলামী রাষ্ট্র ছিল, সে রাষ্ট্রে শরিয়তের প্রতিষ্টা ছিল, দ্বীনের প্রচার ছিল, নানা ভাষাভাষী মুসলিমের মাঝে অটুট ভাতৃত্ব ছিল এবং শত্রুর বিরুদ্ধে লাগাতর জিহাদও ছিল। কিন্তু আজ সেগুলো শুধু কিতাবেই রয়ে গেছে। ফলে বিজয় এবং গৌরবের পথ থেকে তারা বহু দূরে সরেছে। বরং দ্রুত ধেয়ে চলেছে অধঃপতনের দিকে। পরাজয়, আযাব এবং অপমান ধেয়ে আসছে তাদের দিকে। সেনানিবাসে দিনের পর দিন প্রশিক্ষণ নিয়ে যে ব্যক্তি সৈনিকের বদলে শত্রুর বন্ধু ও গাদ্দার হয়, তবে বুঝতে প্রশিক্ষণে প্রচণ্ড ব্যর্থতা আছে। তেমনি বছরের পর বছর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় কাটিয়ে কেউ যদি ঈমানদার হওয়ার বদলে মিথ্যাবাদী, ব্যভিচারী, ঘুষখোর, মদখোর, চোরডাকাত, ভোটডাকাত, সন্ত্রাসী, জাতীয়তাবাদী, সেক্যুলারিস্ট ও ইসলামের শত্রু হয় -তবে বুঝতে হবে প্রচণ্ড ব্যর্থতা রয়েছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায়।      

 

সেক্যুলারিজমের বিপদ

সেক্যুলারিজম সর্বার্থেই প্রচণ্ড ইসলাম বিরোধী একটি মতবাদ। সেটি যেমন তত্ত্বে ও বিশ্বাসে, তেমনি রাজনৈতিক এজেন্ডায়। মুসলিম শুধু দুনিয়ার কল্যাণ নিয়ে ভাবে না, বরং বেশী ভাবে আখেরাতের কল্যাণ নিয়ে। কারণ দুনিয়ার জীবনটি অতি ক্ষুদ্র; কিন্তু আখেরাত মৃত্যুহীন তথা অন্তহীন। অথচ সেক্যুলারিস্টদের চেতনায় আখেরাতের গুরুত্ব নাই। ফলে তা নিয়ে ভাবনাও নাই। তাদের প্রায়োরিটি পার্থিব জীবনে সফল হওয়া নিয়ে। আখেরাতের ভাবনা নিয়ে রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, বিচার-আচার, সংস্কৃতি ও যুদ্ধ-বিগ্রহকে তারা পশ্চাদপদতা, কূপমণ্ডূকতা ও সাম্প্রদায়িকতা ভাবে। সেক্যুলারিস্টদের সাথে ঈমানদারদের মূল দ্বন্দটি এখানেই। জান্নাত লাভের চিন্তায় মুসলিমকে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম পালনে একান্ত অনুগত ও নিষ্ঠাবান হতে হয়। কারণ, তাঁর চেতনায় সর্বক্ষণ কাজ করে কোনরূপ অবাধ্যতায় জাহান্নামে পৌঁছার ভয়। এজন্যই ঈমানদারের জীবনে ইসলামী রাষ্ট্র বিপ্লব ও রাষ্ট্রে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কাজে লেগে থাকাটি কোন নেশা বা পেশা নয়; বরং সেটি জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচার একমাত্র অবলম্বন মাত্র। এটি তাঁর নিজের, নিজ সন্তানের ও আপনজনদের জন্য ঈমান ও নেক আমল নিয়ে বাঁচার নিরাপদ পরিবেশ নির্মাণের লড়াই। এ কাজে কোনরূপ আপোষ বা অবহেলার সামান্যতম সুযোগও নাই। কারণ সে কাজের হুকুম এসেছে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। কোন ঈমানদার কি সে হুকুম অমান্য করতে পারে? অমান্য করলে কি ঈমান থাকে? কিন্তু সেক্যুলারিস্টদের জীবনে সে ভয় নাই, সে ভাবনাও নেই। তাই আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনে তাদের মাঝে কোন আগ্রহও নেই। ফলে নামে মুসলিম হলেও সেক্যুলারিস্টদের মনে ইসলামী রাষ্ট্র বিপ্লবের মিশন নেই। বরং তাদের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির লক্ষ্য হলো, সে জান্নাতমুখি মিশনে মুসলিমদেরকে অমনযোগী করা এবং সে সাথে সে পথ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরানো। একাজে তাদের মূল হাতিয়ারটি হলো সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষার মাধ্যমেই তারা মানুষের চেতনার রাজ্যে হামলা করে, ভূলিয়ে দেয় আখেরাতের ভয় এবং ইসলামের মূল মিশন ও ভিশনটি। ইহকালীন সুখ-সমৃদ্ধি বাড়াতে যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ একমাত্র তাতেই তারা আগ্রহ বাড়ায়। মনের ভূবনে এভাবেই তারা দুনিয়ামুখি পরিবর্তন আনে। আর সে দুনিয়ামুখিতাই হলো সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজমের মূল বিপদটি এখানেই। নাস্তিকতা, মুর্তিপূজা ও শাপ-শকুন পূজার চেয়ে এর নাশকতা তাই কোন অংশেই কম নয়। জনগণের ক্ষতি শুধু চোর-ডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও দুর্বৃত্তদের হাতে হয় না, বরং সবচেয়ে ভয়ানক ক্ষতিটি হয় সেক্যুলারিস্টদের হাতে।   

তবে এরূপ দুনিয়ামুখীতা মানব ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। সেক্যুলারিজম কোন আধুনিক মতবাদ নয়। বরং মুর্তিপূজার মত সনাতম জাহিলিয়াতের ন্যায় এটিও অতি সনাতন ব্যাধি। একই রোগ বাসা বেঁধেছিল প্রাক-ইসলামিক আরব পৌত্তলিকদের মনেও। তারা যে আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করতো, তা নয়। তারা বরং নিজ সন্তানের নাম আব্দুল্লাহ, আব্দুর রাহমানও রাখতো। ক্বাবা যে আল্লাহর ঘর সেটিও তারা বিশ্বাস করতো। বরং এ কথাও বিশ্বাস করতো, ক্বাবা ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আ:), এবং তাঁকে সহায়তা দিয়েছিলেন পুত্র ইসমাঈল (আ:)। কিন্তু তারা বিশ্বাস করতো না পরকালে। জান্নাত ও জাহান্নামের কোন ধারণা তাদের মনে ছিল না। মৃত্যুর পর আবার জীবিত হবে -সে ধারণা তাদের ছিল না। ফলে পরকালের জবাবদেহীতার ভাবনাও ছিল না। আখেরাতের ভয় ব্যক্তির জীবনে পাপরোধে লাগামের কাজ করে, কিন্তু সে ভয় না থাকায় তারা পাপাচারে লিপ্ত হতো কোনরূপ ভয়ভীতি ছাড়াই। ফলে তৎকালীন আরবভূমি নিমজ্জিত হয়েছিল পাপাচারে। সেক্যুলারিস্টগণ আজও একই রূপ পাপের প্লাবন আনছে দেশে দেশে। তাদের কুকীর্তির বড় স্বাক্ষর হলো আজকের বাংলাদেশ। বাংলাদেশ যেভাবে এ শতাব্দীর শুরুতে দুনীর্তিতে বিশ্ব ৫ বার পর পর প্রথম হওয়ার রেকর্ড করলো তা কোন মোল্লা-মৌলবীর কাজ ছিল না। গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, তাঁতীর কাজও ছিল না। বরং সেটি অর্জিত হয়েছিল আখেরাতের ভয়শূন্য সেক্যুলারিস্ট দুর্বৃত্তদের হাতে –যাদের হাতে অধিকৃত দেশের শিক্ষা, আইন-আদালত, পুলিশ বিভাগ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও রাজনীতি।

 

বিপ্লব চেতনার মডেলে

আরবদের আর্থসামাজিক পশ্চাদপদতা নিয়ে ইসলামের শেষনবী (সা:) কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা বানাননি। তাদেরকে তিনি অর্থনৈতিক বিপ্লবের প্রতিশ্রুতিও দেননি। নবী (সা:)’র এজেন্ডা ছিল তাদেরকে জান্নাতের উপযোগী রূপে গড়ে তোলা। লক্ষ্য ছিল, উচ্চতর মানবিক গুণে সমৃদ্ধ মানব বানানোর। সে লক্ষ্যে তিনি বিপ্লব এনেছিলেন তাদের চেতনা রাজ্যে। কারণ, চেতনা ও বিশ্বাসই হলো চরিত্র ও কর্মের নিয়ন্ত্রক। নবীজী (সা:)’র সে বিপ্লবটি ছিল ১৮০ ডিগ্রির। চেতনায় আখেরাতে বিশ্বাস ও মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে জবাবদেহীতার ধারণাটি তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। ভাল কাজের প্রতিদান আছে এবং খারাপ কাজের শাস্তি আছে, মৃত্যুর পর জান্নাত ও জাহান্নাম আছে এবং সেখানে মৃত্যুহীন অনন্ত জীবন আছে -সে বিষয়গুলো তিনি তাদের মনে দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। এতেই শুরু হয় ধর্মকর্মের সাথে তাদের চিন্তা-চরিত্র, কর্ম, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতায় আমূল বিপ্লব। মনজগতের এরূপ বিপ্লবকেই বলা হয় প্যারাডাইম শিফ্ট। যে কোন সমাজ বিপ্লবের এ হলো পূর্বশর্ত। নবদীক্ষিত এ মানুষগুলো পরিণত হন নবীজী (সা:)’র একান্ত অনুগত সাহাবায়। তাদের হাতেই শুরু হয় সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে মহাবিপ্লব। দুনিয়ার এ জীবনকে তাঁরা গ্রহণ করেন পরীক্ষা ক্ষেত্র রূপে এবং সে সাথে আখেরাতে পুরস্কার বৃদ্ধির ক্ষেত্র রূপে। তাদের জীবনে বাঁচা-মরা ও লড়াই-সংগ্রামের একমাত্র লক্ষ্য হয় আল্লাহকে খুশি করা। ফলে মিশন হয়, সর্বপ্রকার পাপ থেকে বাঁচা এবং প্রতিটি মুহুর্তকে নেক আমলে ব্যয় করা। শুরু হয় আল্লাহর মাগফেরাত লাগে প্রচণ্ড তাড়াহুড়া –যেমনটি বলা হয়েছে পবিত্র কুর’আনে। সুরা আল-ইমরানের ১৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “এবং তোমরা তাহাহুড়া  তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে মাগফেরাত লাভের জন্য এবং সে জান্নাতের জন্য যার বিস্তার আসমান ও জমিনের ন্যায় যা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকীনদের জন্য।” সুরা হাদীদের ২১ নম্বর আয়াতে মাগফেরাত লাভ এবং জান্নাত লাভের জন্য মু’মিনদের প্রতিযোগিতার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সে প্রতিযোগিতা ও তাড়াহুড়ায় সে যুগের মুসলিমগণ নিজেদের সময়, সম্পদ, শক্তি এমনকি প্রাণের কোরবানী পেশেও কৃপণতা করেনি। ফলে আখেরাতমুখি সে তাড়াহুড়ায় দ্রুত নির্মিত হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র ও সভ্যতা। সমগ্র মানব ইতিহাসে মানবতা নিয়ে অতি দ্রুত উপরে উঠার সেটিই হলো সর্বোচ্চ রেকর্ড।      

মুসলিমের মূল পরিচয়টি হলো, সে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা তথা প্রতিনিধি। ঈমানের প্রকাশ ঘটে মূলত সে পরিচিতি নিয়ে বাঁচাতে। শিক্ষাদান ও শিক্ষালাভের মূল উদ্দেশ্য হলো খলিফার সে দায়িত্বপালনে নিজেকে যোগ্যবান করে গড়ে তোলা। এজন্যই মুসলিম ও অমুসলিমের শিক্ষাগত প্রয়োজনটা কখনোই এক নয়। মুসলিম ও অমুসলিম একই আলো-বাতাসে শারীরিক ভাবে বেড়ে উঠতে পারে, কিন্তু একই শিক্ষা ব্যবস্থায় বেড়ে উঠতে পারে না। কারণ, যে শিক্ষায় বেঈমান তার চেতনায় পুষ্টি পায়, মুসলিম তা পায় না। বরং বেঈমানের শিক্ষার যা সামগ্রী তাতে মৃত্যু ঘটে ঈমানী চেতনার। তাই নিজেদের গৌরব কালে মুসলিমগণ নিজ সন্তানদের শিক্ষাদানের দায়ভার কখনই কাফেরদের হাতে দেয়নি। কাফেরদের থেকে চাল-ডাল ও আলু-পটল কেনা যায়, কিন্তু শিক্ষা নয়। শিক্ষা ধর্মান্তরের বা সাংস্কৃতিক কনভার্শনের অতি শক্তিশালী হাতিয়ার। এখানে কাজ করে শয়তানের ফাঁদ। এজন্যই ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার জন্য মুসলিমদের জন্য আলাদা হয়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়া, সমাজ গড়া ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এতোটা অপরিহার্য। তেমন একটি প্রয়োজনেই ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমগণ পাকিস্তান নামে একটি পৃথক রাষ্ট্রর জন্ম দেয়।

কাফেরগণ মুসলিম দেশে মিশনারি স্কুল-কলেজ চালায় জনসেবার খাতিরে নয়। বরং সেটি মুসলিম শিশুদের ধর্মান্তর করতে। এবং ধর্মান্তর সম্ভব না হলে মনযোগ দেয় মুসলিম সন্তানদের মাঝে সাংস্কৃতিক কনভার্শন তথা ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজটি বাড়াতে। কুশিক্ষার পথ ধরেই ছাত্রদের মগজে কুফরি ঢুকে। শিক্ষাদানের নামে কুশিক্ষাটি তাই শয়তানের প্রধান হাতিয়ার। তাই মুসলিমদের শুধু হারাম পানাহারে সতর্ক হলে চলে না, হারাম শিক্ষা থেকেও অতি সতর্ক হতে হয়। কিন্তু সেক্যুলারিজম সে হারাম শিক্ষাকেই মুসলিম দেশগুলোতে সহজ লভ্য করেছে; এবং অতি কঠিন করেছে পবিত্র কুর’আন থেকে শিক্ষা লাভ। ইংরাজী ভাষা শেখানো গুরুত্ব পেলেও গুরুত্ব পায়নি পবিত্র কুর’আনের ভাষা। বুঝতে হবে বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে  নাস্তিক, সূদখোর, মদখোর, ঘুষখোর, ব্যাভিচারী, ধর্ষক, চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত, স্বৈরাচারী, সন্ত্রাসী ইত্যাদী দুর্বৃত্তগণ বনজঙ্গলে গড়ে উঠেনি, গড়ে উঠেছে দেশের সেক্যুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে।

 

শিক্ষা যেভাবে বিপর্যয় আনে

ইসলামের জয়-পরাজয়ের যুদ্ধটি শুধু রণাঙ্গণে হয় না, সেটি হয় শিক্ষাঙ্গণেও। এটি হলো বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদের জায়গা। মুসলিমদের পরাজয়ের শুরু মূলত তখন থেকেই যখন তারা বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে ইস্তাফা দিয়েছে। এবং শিক্ষার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ কাজটি নিজ দায়িত্বে না রেখে কাফের, ফাসেক ও সেক্যুলারিস্টদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। যখন আলেমদের কাছে গুরুত্ব হারায় শিক্ষাদানের ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণেই ভেঙ্গে গেছে মুসলিমদের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র উসমানিয়া খেলাফত। অথচ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান শুধু মসজিদ বা মাদ্রাসা নয়, সেটি হলো খেলাফার রাজনৈতিক কাঠামো। এটিই হলো ইসলাম ও মুসলিমদের সুরক্ষা দেয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। এটি বিলুপ্ত হলে বিপন্ন হয় মুসলিমদের ইজ্জত, আবরু, ঈমান-আমল, জানমাল ও স্বাধীনতা।

মসজিদ বা মাদ্রাসা গড়তে অর্থ ও শ্রম ব্যয় হলেও তাতে রক্ত ব্যয় হয় না। অথচ রাষ্ট্রের ভূগোল এক মাইল বাড়াতে হলে প্রকাণ্ড যুদ্ধ লড়তে হয়। বহু লক্ষ মুসলিম সৈনিকের রক্ত ব্যয়ে নির্মিত উসমানিয়া খেলাফতের বিশাল রাষ্ট্রটি শত শত বছর ধরে মুসলিমদের জানমাল, ইজ্জত-আবরু ও ধর্মীয় বিশ্বাসের হেফাজত করেছে। বিশাল সে উসমানিয়া খেলাফতে তুর্কী, আরব, কুর্দি, মুর, আলবানিয়ান, কসোভান, বসনিয়ানগণ শত শত বছর একত্রে শান্তিতে বসবাস করেছে। ভাষাগত, বর্ণগত ও আঞ্চলিকতার বিভেদ ইউরোপকে শত বছরের যুদ্ধ ও যুদ্ধ শেষে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্তি উপহার দিলেও উসমানিয়া খেলাফতে তেমন দুর্যোগ দেখা দেয়নি। ভাষাগত, বর্ণগত ও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ হলো মূলত ইউরোপীয় জাহিলিয়াত। সে জাহিলিয়াতের ভাইরাস থেকে মুসলিম ভূমি শত শত বছর মূক্ত ছিল। আলেমদের মাঝে নানা বিষয়ে মতভেদ তাকলেও জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ ও আঞ্চলিকতা যে হারাম -তা নিয়ে কোন কালেই কোন বিরোধ ছিল না। ইসলামে অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অধিকার আছে, কিন্তু ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে যুদ্ধ, বিভক্তি ও দেশভাঙ্গার অনুমতি নেই। রাষ্ট্রের সার্বভৌম মালিকানা একমাত্র মহান আল্লাহর, সে রাষ্ট্রের শাসক মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা তথা  প্রতিনিধি মাত্র। তাই মুসলিম রাষ্ট্রের খণ্ডিত করার যে কোন উদ্যোগই মূলত আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। সে যুদ্ধের শাস্তিও তাই অতি কঠোর। তাই উমাইয়া, আব্বাসী ও উসমানিয়া খেলাফতে শতবার খলিফার বদল হলেও তার ভৌগলিক অখণ্ডতা বেঁচেছিল হাজার বছরের অধিক কাল। সৈন্যরা লড়েছে সীমান্তের ওপারে বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে, কিন্তু দেশের ভিতরে ভূগোলের অখণ্ডতা বাঁচাতে যুদ্ধ করতে হয়েছে সামান্যই। কিন্তু বিদ্যাশিক্ষার নামে তুর্কি, আরব, কুর্দিগণ যখন ইউরোপে পা রাখে তখন থেকেই তারা বিভক্তির ভাইরাস নিয়ে দেশে ফিরাও শুরু করে। তখন অসম্ভব হয়ে উঠে তুর্কি, আরব, কুর্দি এরূপ নানা ভাষাভাষী মুসলিমদের পক্ষে এক রাষ্ট্রে বসবাস করা। শুরু হয় ভাষা ও আঞ্চলিকতার নামে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ফলে মুসলিমদের পরাজিত করতে শত্রুদের যুদ্ধ করতে হয়নি, সে যুদ্ধগুলো এসব জাতীয়তাবাদীরাই লড়ে দিয়েছে। এবং এখনও লড়ছে। এদের কারণেই খেলাফত ভেঙ্গে জন্ম নিয়েছে বিশের বেশী রাষ্ট্র। এবং বিভক্তির পরপরই জন্ম নেয়া নতুন রাষ্ট্রগুলি অধিকৃত হয়েছে ব্রিটিশ, ফরাসী, মার্কিনী ও ইসরাইলীদের হাতে। অথচ খেলাফতভূক্ত থাকার কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমগণ ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে রেহাই পেয়েছিল। অথচ খিলাফত বা বিশাল কোন মুসলিম রাষ্ট্রের বাইরে থাকার কারণে সে সৌভাগ্য বাংলাদেশীদের জুটেনি। ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ইংরেজদের হাতে গোলাম হয় ১৯১৭ সালে। অথচ তার ১৬০ বছর আগেই বাংলা ব্রিটিশের গোলাম হয়েছে। ভূগোলে ক্ষুদ্রতর হওয়ার এটি হলো বিপদ। আরব মুসলিমদের বিপদের শুরু তো উসমানিয়া খেলাফত ভেঙ্গে যাওয়ার পর। পরিতাপের বিষয় হলো, খেলাফতের নেয়ামত তারা খেলাফত বেঁচে থাকতে বুঝেনি এবং রক্ষার চেষ্টাও করেনি।

 

সেক্যুলারিস্টদের অপরাধ

মুসলিমদের সবচেয়ে বড় পরাজয়টি রণাঙ্গণে হয়নি। সেটি হয়েছে শিক্ষার ময়দানে। ইসলাম সর্বপ্রথম তার দখলদারি হারিয়েছে মুসলিমদের চেতনার ভূমিতে, ভূগোলের উপর দখলদারিটি হারিয়েছে অনেক পরে। এবং সেটি ঘটেছে শিক্ষাব্যবস্থার সেক্যুলারাইজেশনের কারণে। সেক্যুলারিজমের মূল লক্ষ্য হলো, শিক্ষা, সমাজ, আইন-আদালত ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রগুলিতে ইসলামের ভূমিকাকে প্রতিহত করা। সেক্যুলারিস্টদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে বন্দীদশা নেমে আসে ঈমানদারদের উপর। অসম্ভব করা হয় পূর্ণ ইসলাম পালন। তখন রাষ্ট্রের সন্ত্রাস ও যুদ্ধটি শুরু হয় ধর্মের বিরুদ্ধে। শরিয়তের প্রতিষ্ঠার ন্যায় ইসলামের অতি মৌলিক ও ফরজ কাজটিও তখন শাস্তি যোগ্য অপরাধ গণ্য হয়। বাংলাদেশের ন্যায় সেরূপ পবিত্র উদ্যোগকে সন্ত্রাস বলা হচ্ছে। ফলে সেক্যুলারিজমকে ধর্মনিরেপক্ষতা বলে জাহির করাটি নিছক প্রতারণা মাত্র। অথচ মুসলিম দেশগুলিতে সে প্রতারণাটিই চলছে লাগামহীন ভাবে। এবং সে প্রতারকদের রুখবার কেউ নাই।

মানব কল্যাণে ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হয় শিক্ষার অঙ্গণে। শিক্ষার মাধ্যমেই ইসলাম মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর পবিত্র মিশনের সাথে মানব সন্তানদের পরিচিতি ঘটায়। এবং সংশ্লিষ্ট করে সে মিশনের সাথে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ঈমানদার তৈরীর কারখানাই বন্ধ হয়ে যায়। তখন পূর্ণ ইসলাম পালন ও রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে ইসলামকে বিজয়ী করার সৈনিক থাকে না। তখন মহান আল্লাহতায়ালার মানব কল্যাণের মূল প্রজেক্টই ব্যর্থ হয়ে যায়। তখন ব্যর্থ হয়ে যায় নবী প্রেরণ ও পবিত্র কুর’আন নাযিলের মূল উদ্দেশ্য। তাই শয়তান ও তার অনুসারীদের মূল হামলাটি মুসলিমদের ক্ষেত-খামারে হয় না, সেটি হয় শিক্ষার অঙ্গণে। সেক্যুলারিস্টদের সবচেয়ে অপরাধটি এখানেই। তাদের অপরাধটি মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে।

জনগণ ও ছাত্র-ছাত্রীদের চেতনায় ইসলামের প্রবেশ রুখতে তাদের মনকে ইম্যুনাইজড করছে ঈমান বিনাশী দুষ্ট ধ্যানধারণার ভ্যাকসিন দিয়ে। সে কাজে তারা ব্যবহার করে মিডিয়ার সাথে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে। সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষাপ্রাপ্ত ছাত্রদের মনে ইসলামী ধ্যানধারণার প্রবেশ এজন্যই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বাংলাদেশের মত দেশে যতই বাড়ছে সেক্যুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মানুষ ততই ইসলাম থেকে দূরে সরছে। ফলে মুসলিমদের রাজস্বের অর্থে বিপুল সংখ্যায় ইসলামের শত্রু উৎপাদিত হচ্ছে। এবং এভাবে বাড়িয়ে চলেছে ইসলামের পরাজয়। জনগণ এভাবে নিজেদের পাপের পাল্লা ভারী করছে। দেশের শিক্ষানীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি তাই দেশবাসীর বিপর্যয় বাড়াচ্ছে শুধু পার্থিব জীবনে নয়, আখেরাতেও। লন্ডন, ১ম সংস্করণ ০৫/০৬/২০১২; দ্বিতীয় সংস্করণ ০৩/০৯/২০২১।




এ কি মোজেজা ঘটলো আফগানিস্তানে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

তালেবানদের বিস্ময়কর বিজয় ও মানবিক গুণ

গতকাল ১৫ আগষ্ট রবিবার তালেবানদের হাতে রাজধানী কাবুলের পতন ঘটেছে। দেশ ছেড়ে পালিয়েছে দেশের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি ও তার সরকারের কিছু উচ্চপদস্থ্ কর্মকর্তা। সমগ্র আফগানিস্তানের উপর এখন তালেবানদের দখল। যে কোন বিচারে এ বিজয় এক বিস্ময়করর মোজেজা। প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণির অধীনে ছিল ৩ লাখ সৈন্যের বিশাল সেনাবাহিনী। তারা ছিল উচ্চ বেতনভোগীও। তারা প্রশিক্ষণ পেয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাদল মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষকদের থেকে। প্রশিক্ষণ দিয়েছে ব্রিটিশ ও জার্মান সেনাবাহিনীর সদ্যরাও। তাদের হাতে ছিল বহু ট্যাংক, দূরপাল্লার বহু কামান, বহু হেলিকপ্টার গানশিপ, এবং যুদ্ধবিমানসহ বিপুল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। আফগান সৈন্যরা বেড়ে উঠেছিল আধুনিক ক্যান্টনমেন্টে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য ছিল মার্কিনীদের তৈরী আর্মি এ্যাকাডেমি। তাদের ছিল আধুনিক সামরিক পোষাক। ব্যবহার করতো বহু দূর অবধি দেখা যায় এমন দূরবীন, রাতে পড়তো উন্নত প্রযুক্তির নৈশকালীন চশমা -যা রাতকেও দিনের মত দেখায়। অপর দিকে তালেবানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৫ হাজার। তারা কোন ক্যান্টনমেন্টে প্রশিক্ষণ পায়নি। তাদের ছিল না সামরিক পোষাক, ছিল না চামড়ার জুতা। অনেকের পায়ে স্যান্ডেল। গায়ে লম্বা কামিজ ও ঢোলা স্যালোয়ার। মাথায় হেলমেটের বদলে পাগড়ি। অস্ত্র বলতে যা বুঝায় তা হলো একে-৪৭ রাইফেল এবং রকেটি চালিত গ্রেনেড। এ নিয়েই একটি বিশাল দেশ জয়। এ অস্ত্র নিয়েই তারা যুদ্ধ করেছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৬০টির বেশী দেশের সৈন্যদের বিরুদ্ধে। ২০ বছরের এ যুদ্ধে তারা শত্রুদের বিজয় রুখেছে এবং অবশেষে নিজেরাই বিজয়ী হয়েছে। এর চেয়ে বড় মোজেজা আর কি হতে পারে?

আরেক মোজেজা হলো, ৫০ লাখ অধ্যুষিত কাবুল দখলকালে একজন মানুষেরও মৃত্যু হয়নি। তালেবানদের হাতে একজন মানুষও মারধরের মুখে পড়েনি। কোন ঘরবাড়ি বিজয়ী সৈনিকদের হাতে দখল হয়নি। কোন নারীও ধর্ষিত হয়নি। আরো বিস্ময়ের বিষয় হলো, যারা বিগত ২০ বছর যাবত তালেবানদের হত্যায় মার্কিন সৈনিকদের সাথে কাজ করেছে তাদের সবার প্রতি সার্বজনীন ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছে তালেবান নেতৃবৃন্দ। এমন কি যারা দোভাষী রূপে মার্কিন সৈনিকদের সাথে কাজ করেছে ও তাদেরকে পথঘাট চিনিয়েছে –তাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করেছে। সমগ্র মানব ইতিহাসে এমন বিজয় বিরল। একমাত্র নবীজী (সা:)’র নেতৃত্বে মক্কা বিজয়ের সময় এমনটি ঘটতে দেখা গেছে। যারা নবীজী (সা:) ও ইসলামকে নির্মূল করতে যুদ্ধ করেছিল তাদেরকেও তিনি মাফ করে দেন। অথচ পাশ্চাত্য জগতে শান্তিপূর্ণ বিজয়ের এ বিশাল মোজেজাটি প্রচার পায়নি। বরং দিবারাত্র তাদের টিভি ও পত্রিকাগুলি মিথ্যা গুজব ছড়াচ্ছে তালেবানদের বিরুদ্ধে।  প্রচার করছে, তালেবানরা বর্বর ও নৃশংস। ক্ষমতায় গিয়ে তারা নারী নির্যাতন করবে, কঠোর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা দিবে, স্কুল-কলেজে মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করবে, স্বাধীনতা কেড়ে নিবে –ইত্যাদি নানা কল্পিত বিষয় নিয়ে তাদের প্রচার। 

 

বাঙালীদের জন্য যা শিক্ষণীয়

খাঁচার সিংহকে ছেড়ে দিলে বুঝে যায় তার হিংস্রতা। তেমনি মানুষের নৃশংস অসভ্যতাটি বুঝা যায় তার হাতে অস্ত্র দিলে। তালেবানদের হাতে অস্ত্র ছিল, ফলে তাদের ছিল নৃশংসতা ঘটানোর সামর্থ্য। কিন্তু সে পথে না গিয়ে তারা নিজেদের মানবিক গুণের শ্রেষ্ঠত্বই প্রকাশ করেছে। অথচ বাংলাদেশে সে নৃশংস অসভ্যতাটি দেখা গেছে ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বরের পর। বহু হাজার নিরস্ত্র মানুষকে স্রেফ তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। জেলা শহর ও থানা শহরগুলিতে স্থানীয় মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নিজামে ইসলামী, ও পিস কমিটির নিরস্ত্র সদস্যদের হত্যার নৃশংস তান্ডব হয়েছে। কে কতটা নৃশংস হতে পারে -তার প্রতিযোগিতা করেছে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা। দেশ পরিণত হয়েছে বধ্যভূমিতে। বিলুপ্ত হয়েছে আইন-কানূন। কাদের সিদ্দিকী ঢাকা স্টেডিয়ামে তিনজন নিরস্ত্র ও হাত-পা বাঁধা রাজাকারকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। নৃশংস অসভ্যতার সে করুণ চিত্রটি বিশ্বব্যাপী সেদিন খবর হয়েছিল। বহু বিবেকমান মানুষকে সে নৃশংসতা ব্যাথিত করেছিল। কাদের সিদ্দিকীর এ যুদ্ধ-অপরাধ নিয় শেখ মুজিবকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন প্রখ্যাত ইটালিয়ান সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাসী। শেখ মুজিব সেদিন কাদের সিদ্দিকীর পক্ষেই সাফাই গেয়েছিল। এ হলো মুজিবে বিবেকবোধ! 

সে সময় সারা বাংলাদেশ জুড়ে হাজার হাজার অবাঙালী নারী, পুরুষ ও শিশুকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ধর্ষণ করা হয়েছিল হাজার হাজার বিহারী মহিলাদের। প্রায় সকল বিহারীর ঘরবাড়ী, দোকানপাট ও কলকারখানা দখল করে তাদেরকে রাস্তায় বসানো হয়েছে। এই হলো একাত্তরে বাঙালীর বিজয়ের চিত্র। বাঙালীরা পাক সেনাবাহিনীর অপরাধ নিয়ে বহু বই, বহু সিনেমা ও বহু নাটক লিখেছে। কিন্তু বাঙালীর একাত্তরের অসভ্য নৃশংসতা নিয়ে আজও বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা যেমন নিশ্চুপ, তেমনি নিশ্চুপ সাধারণ বাঙালীগণ। ডাকাত পাড়ায় যেমন ডাকাতদের নৃশংসতা নিয়ে আলোচনা হয় না, তেমনি হয়েছে বাংলাদেশের অবস্থা। রোগকে গোপন করলে কি তার চিকিৎসা হয়? তখন রোগ আরো গভীরতর হয়। একাত্তরের যুদ্ধ ৫০ বছর আগে শেষ হয়েছে। কিন্তু ভারতসেবীদের আজও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হত্যার কাজ শেষ হয়নি। তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এটি এখন সুস্পষ্ট যে, দেশের রাজনীতিতে যত দিন তাদের প্রতিপক্ষ থাকবে ততদিন প্রতিপক্ষদের হত্যার কাজও চলতে থাকবে। জীবাণু থাকলে রোগও থাকে। ভারতসেবী আওয়ামী লীগ থাকবে অথচ দেশে অসভ্যতা ও নৃশংসতা থাকবে না থাকবে না -তা কি ভাবা যায়?  সভ্য ভাবে বাঁচার দিন যে বাংলাদেশ সহসা আসছে না – এ হলো তারই আলামত। 

 

বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের যা করণীয়

যারা বাঙালীর চারিত্রিক, সামাজিক ও নৈতিক বিপ্লব নিয়ে ভাবে -তাদের উচিত বাঙালী চরিত্রের এ অসভ্য দিকগুলোকে অবশ্যই হাই-লাইট করা। এভাবেই বাঙালীকে বুঝাতে হবে, কতো নীচু অবস্থা থেকে তাদের উপরে উঠতে হবে। পবিত্র কুর’আনে মহাজ্ঞানী মহান আল্লাতায়ালা এক শ্রেণীর মানুষকে গবাদী পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। বাংলাদেশে এমন মানুষদের সংখ্যাটি যে বিশাল -তা কি অস্বীকার করা যায়? যে দেশ বিশ্বের সকল দেশকে পিছনে ফেলে দুর্নীতিতে পর পর ৫ বার প্রথম হয় তাদের মাঝে এমন মানুষ না থাকলে তাদের বসবাস আর কোথায় হবে? মুজিবপন্থী ও ভারতপন্থীদের সাথে সুর মিলিয়ে একাত্তরের নৃশংস অপরাধীদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বললে কি বাঙালীর মনে পরিশুদ্ধি অর্জনের সাধ জাগবে? তখন বরং খুনি, সন্ত্রাসী, চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাত হওয়ারই প্রবল বাসনা জাগবে। এমন দেশে ভোটডাকাতকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা হবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? গুরুতর কান্সার রোগীকে স্বাস্থ্যবান বললে সে কি চিকিৎসা নেয়? রোগীকে রোগী, পশুকে পশু এবং কোদালকে কোদাল বলার অভ্যাস গড়তে হবে। দেখতে চারিত্রিক ও নৈতিক বিপ্লবের পথ। ইসলামে এটিই কবিরা জিহাদ তথা বড় জিহাদ। এবং এ জিহাদে অস্ত্র হলো পবিত্র কুর’আন।

আরো প্রশ্ন হলো, তালেবানগণ সামরিক বিজয়ের সাথে চারিত্রিক বিজয়ের যে মোজেজা দেখালো -সেটি কি বাঙালীগণ পারে না? দেশে দেশে অন্যরা গণতান্ত্রিক বিপ্লবের যে ইতিহাস গড়ছে -সেটিও কি বাংলাদেশীরা পারে না? ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পথে চলে কি এতোই কঠিন? পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। গতকাল পূর্ব আফ্রিকার দেশ জা্ম্বিয়াতে শান্তিপূর্ণ ভাবে একটি নির্বাচন হলো। সে নির্বাচনে দেশের প্রেসিডেন্ট হেরে গিয়ে প্রমাণ করলো নির্বাচন কতটা সুষ্ঠ হয়েছে। সেরূপ নির্বাচন কেন বাংলাদেশে হয়না? বাংলাদেশে আজ চলছে হাসিনার ন্যায় এক নৃশংস ও অসভ্য ভোটডাকাতের সরকার। দেশের উপর ভোটডাকাত ফ্যাসিস্টের দখলদারী মেনে নিলে কি সভ্যতা বাঁচে? সভ্য বিবেকবোধের পরিচয় তো চোর-ডাকাতকে ঘৃণা করার মধ্যে। অথচ কি বিস্ময়ের বিষয়, হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের বিচারপতি, সরকারের সচিব, সংসদ সদস্য, উকিল, এমন কি বহু আলেম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে! কোন সভ্য মানুষ কি কখনো ডাকাতকে মাননীয় বলে? এটি তো নিরেট অসভ্যতা। কি বিস্ময়ের বিষয়, এরূপ অসভ্য মানুষদের সংখ্যাটি বাংলাদেশে কত বিশাল! ডাকাতকে মাননীয় বলার কান্ড কোন সভ্য দেশে হলে সেদেশের বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক কর্মী ও সকল প্রকার বিবেকমান মানুষের মাঝে প্রতিবাদের তুফান উঠতো। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়না।            

 

ইসলামপন্থীদের জন্য যা শিক্ষণীয়

তালেবানদের থেকে ইসলামপন্থীদেরাও বহু কিছু শেখার আছে। তালেবানরা চায়, মহান নবীজী (সা:)’র শেখানো পূর্ণাঙ্গ ইসলাম নিয়ে বাঁচতে। নবীজী (সা:)’র ইসলাম বলতে শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত বুঝায় না। সে ইসলামে রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত ও হুদুদের প্রতিষ্ঠা, জিহাদ, শুরা ভিত্তিক শাসন, ও প্যান ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশে নবীজী (সা:)’র সে ইসলাম পালিত হয় না। এসব দেশের মানুষ বেঁচে আছে নিজেদের মনগড়া এক অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম নিয়ে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম হলো, পরিপূর্ণ ইসলামে প্রবেশের (উদখুলো ফিস সিলমে কা’ফফা)। অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালনে অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহতায়ালার এই হুকুমের।

আরেকটি বিষয় অতি গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষেতখামার ও কারখানায় সেরা পণ্যের উৎপাদন বাড়ালেই চলে না। সে পণ্যের বাজারজাত করণে বিশাল দোকান খুলতে হয়। একমাত্রই তখনই ক্রেতারা সে পণ্যের সাথে পরিচিত হয়। বাজারজাত করণের সে কাজটি না হলে জনগণ ব্যর্থ হয় সে উৎপাদিত পণ্য থেকে ফায়দা নিতে।বিষয়টি অবিকল সত্য ইসলামের বেলাতেও। ইসলামের বিধান সর্বশ্রেষ্ঠ ও কল্যাণকর -সে কথাটি হাজার হাজার ওয়াজে বা কিতাবের মাঝে বয়ান করলে চলেনা। সে শ্রেষ্ঠত্বটিকে রাষ্ট্রের প্রশাসন, সমাজনীতি, বিচার-আচার, শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ প্রতিটি অঙ্গণে প্রতিষ্ঠা দিয়ে প্রমাণ করতে হয়। একেই বলে showcasing। সে কাজে ইসলামী রাষ্ট্র গড়াটি অতি অপরিহার্য। এবং সেটি করলে বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রচারের কাজটি অতি সহজ হয়ে যায়। ইসলামের সুবিচার ও কল্যাণমূলক কর্মই তখন ইসলামের পক্ষে প্রবল ভাবে কথা বলে। তখন মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে তাবলিগ করার প্রয়োজন হয়না। রাষ্ট্র নিজেই তখন ইসলামের প্রচারে বিশাল মনুমেন্টে পরিণত হয়। সেটি দেখে দলে দলে মানুষ তখন ইসলামে প্রবেশ করে। নবীজী(সা:)’র আমলে সেটিই হয়েছিল। তাই সে সময় তাবলিগ জামায়াতের প্রয়োজন পড়েনি। নবীজী (সা:) মদিনায় হিজরতের পর পরই ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দেন। এবং নবীজী (সা:) যা কিছু করেছেন তা করেছেন মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহাতায়ালার নির্দেশেই। তিনি স্বয়ং ১০ বছর যাবত সে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে ইসলামের যেরূপ প্রচার নবীজী (সা:) দিতে পেরেছেন সেরূপ প্রচার হযরত মূসা (আ:) ও হযরত ঈসা (আ:)’র ন্যায় মহান রাসূলগণ দিতে পারেননি।

অতি বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশের মোল্লা-মৌলভীগণ ইসলামের ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলি বলে না। নবীজী (সা:)’র বহু সূন্নতের কথা বল্লেও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ন্যায় বিশাল সূন্নতটির কথাটি তারা মুখে আনে না। সম্ভবত একারণে যে, এ সূন্নত পালনে লাগাতর জিহাদ আছে ও শহীদ হওয়ারও প্রয়োজন থাকে। কিন্তু অন্যান্য সূন্নত পালনে সেটি নাই। অথচ নবীজী (সা:)’র এ মহান সূন্নতটিই মুসলিমদের বিশ্বশক্তির মর্যাদা দিয়েছে। এবং এ সূন্নতের পথ বেয়েই তাঁরা গড়তে পেরেছিলেন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।

পবিত্র কুর’আনে শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়নি। সুরা হাদীদের ২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছ, “লাকাদ আরসালনা রুসুলানা বিল বাই’য়েনাতি ওয়া আনযালনা মায়াহুমুল কিতাবা ওয়াল মিযানা লি ইয়াকুমা নাসু বিল কিসত।” অর্থ: “নিশ্চয়ই আমরা প্রেরণ করেছি সুস্পষ্ট বয়ানসহ আমাদের রাসূলদের, এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও ন্যায় বিচারের মানদন্ড যাতে তারা প্রতিষ্ঠা দিতে পারে ন্যায় বিচার।” অর্থাৎ ইসলামের মূল এজেন্ডা শুধু নামায-রোযার প্রতিষ্ঠা দেয়া নয়, বরং ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠা দেয়াও। আর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার কাজটি ধর্মপালনকে নামায-রোযায় সীমিত রাখলে চলে না। শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়লেও চলে না। শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্রও গড়তে হয়। পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার আরেকটি নির্দেশ হলো, “আমারু বিল মা’রুফ ওয়া নেহী আনীল মুনকার” অর্থাৎ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং দুর্বৃত্তি ও অন্যায়ের নির্মূল। সেকাজটিও রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের মধ্যে পড়ে। তাই মুসলিমের কাজ কোন সেক্যুলার রাষ্ট্র গড়া নয়, সেটি পূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্রগড়া। নবীজী (সা:)কে তাই ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে হয়েছে। আর ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার পথে নামলে জিহাদ অনিবার্য হয়ে উঠে। কারণ ইসলামের শত্রুপক্ষ কখনোই এমন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা চায়না।

 

যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে

তালেবানদের বিজয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে তাদের জন্যও যারা মুসলিম দেশগুলির প্রতিরক্ষা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার বিষয়টি ইসলামের সর্বোচ্চ ইবাদত। এটি পবিত্র জিহাদ। একাজ প্রতিটি ঈমানদারের। মুসলিমদের পরাজয়ের শুরু তখন থেকেই যখন সর্বশ্রেষ্ঠ এ ইবাদতকে কিছু বেতনভোগী স্বার্থপর চাটুকরের প্রফেশনে পরিণত করা হয়েছে। এবং প্রতিরক্ষার পবিত্র জিহাদকে জনগণের স্তরে বিলুপ্ত করে সেটিকে কিছু বেতনভোগীর সেক্যুলারিস্টের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। এসব বেতন ভোগীরাই পরিণত হয় দুর্বৃত্ত শাসকের পদসেবী চাকর-বাকরে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী হলো তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এরা প্রতিপালিত হয় জনগণের অর্থে, কিন্তু পাহারা দেয় তাদেরকে যারা ডাকাতি করে জনগণের ভোট ও সম্পদের উপর। এরা আদৌ রাষ্ট্রের রক্ষক নয়, বরং রক্ষক দুর্বৃত্তদের। অথচ এদের প্রতিপালনে দেশের বাজেটের বিশাল অংশ ব্যয় হয়। এরাই হাসিনার ন্যায় ভোট ডাকাতকে ভক্তি ভরে কুর্ণিশ করে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে। এমন দুশ্চরিত্র চাকর-বাকরদের দিয়ে কি জিহাদের ন্যায় পবিত্র কাজ হয়? বরং এদের কাজ হয়েছে মাঝে মধ্যে সামরিক অভ্যুত্থান করে দেশকে দখলে নেয়া এবং দেশের মূল্যবান জায়গাজমির উপর দখলদারী প্রতিষ্ঠা করা। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, তুরস্ক, মিশর, সূদান, নাইজিরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ার ন্যায় মুসলিম দেশগুলি তো তাদের হাতেই বার বার অধিকৃত ও লুন্ঠিত হয়েছে।

অথচ মুসলিমগণ যখন বিজয়ের পর বিজয় এনেছে এবং রোম সাম্রাজ্য ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় তৎকালীন বিশ্বের দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছে, তাদের কোন ক্যান্টনমেন্টই ছিল না। লড়াকু সৈনিকগণ তখন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ও বেড়ে উঠেছেন নিজ নিজ মহল্লার অলি-গলিতে। সেদিন প্রতিটি মহল্লা পরিণত হয়েছিল ক্যান্টনমেন্টে। এবং প্রতিটি গৃহ পরিণত হয়েছিল যুদ্ধের বাংকার তথা পরিখাতে। খালেদ বিন ওয়ালিদ, সাদ বিন আবি আক্কাস, তারিক বিন জিয়াদের ন্যায় মানব ইতিহাসের সেরা জেনারেলগণ কোন ক্যান্টনমেন্ট বা মিলিট্যারি এ্যাকাডেমীতে গড়ে উঠেননি। তারা গড়ে উঠেছিলেন নিজ নিজ মহল্লা থেকে। অথচ তাদের রণকৌশলগুলো আজ পাশ্চাত্য দেশের মিলিট্যারি এ্যাকাডেমীতে পড়ানো হয়। আজকের আধুনিক যুগেও যারা সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় দু’টি বিশ্ব শক্তিকে শোচনীয় ভাবে পরাজিত করলো তারাও কোন ক্যান্টনমেন্ট বা মিলিট্যারি এ্যাকাডেমীতে গড়ে উঠেননি। তারা বেড়ে উঠেছে মহল্লার অলি-গলিতে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে মিশর, সিরিয়া ও জর্দানের সন্মিলিত সেনাবাহিনী ১৯৬৭ সালে মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে পুরাপুরি পর্যুদস্ত হয়েছিল। মিশর হারিয়েছিল তার বিশাল সাইনাই। সিরিয়া হারিয়েছিল গোলান হাইট। জর্দান হারিয়েছিল জর্দান নদীর পূর্বতীরস্থ ভূমি। অথচ ইসরাইলের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে হামাসের যে মুজাহিদগণ ৫০ দিন বীর দর্পে লড়লো এবং রুখে দিল ইসরাইলকে তারাও কোন ক্যান্টনমেন্ট ও মিলিট্যারি এ্যাকাডেমীতে প্রশিক্ষণ পায়নি। তারাও বেড়ে উঠেছে মহল্লার অলিগলি ও নিজ গৃহে। তাই দেশকে সুরক্ষা দিতে হলে প্রতিরক্ষার পবিত্র জিহাদকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী না রেখে প্রতিটি জনপদে জনগণের স্তরে নামিয়ে আনতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার চেয়ে ভারত শক্তিশালী নয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা আফগানিস্তানের তূলনায় ৪ গুণের বেশী। অতএব ভয় কিসের?      

 

সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ

তালেবানদের সামনে এখন বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিজয় আসলেও যুদ্ধ শেষ হয়নি। ত্বরিৎ পরাজয় দেখে শত্রুগণ আজ দিশেহারা। তারা ষড়যন্ত্র আটছে কি করে তালেবানদের বিজয়কে ছিনিয়ে নেয়া যায়। শত্রুর যুদ্ধ কখনোই শেষ হয়না, তারা শুধু কৌশল পাল্টায়। বুঝতে হবে, মহান আল্লাহছাড়া এ বিশ্বে কোন দেশই তাদের বন্ধু নয়। তবে মহান আল্লাহতায়ালা পক্ষে থাকলে কেউ কি হারাতে পারে? তাই মহান আল্লাহতায়ালার সাথে সম্পর্ককে মজবুত করতে হবে। চিনতে হবে শত্রুদের। আফগানিস্তানে তাদের সংখ্যাটি বিশাল। বুঝতে হবে, ২০ বছর দখলকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্ররা একটি দিনও বসে থাকেনি। প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির অঙ্গণে তারা অনেক পরিবরর্তন এনেছে। পরিবর্তন এনেছে জনগণের ভাবনা ও রুচিতে। সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় পরিবরর্তনের এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় social, educational and political engineering। সে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের সর্বাঙ্গণে বিপুল সংখ্যায় শত্রু উৎপাদিত হয়েছে। কাফের শক্তির হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো বিপদ। ঔপনিবেশিক শাসনের কুফলগুলি নিয়ে এখনো ভুগছে মুসলিম দেশগুলি।

এ যাবত কাল আফগানিস্তানের বাজেটের প্রায় শতকরা ৭৫ ভাগ আসতো বিদেশীদের দেয়া সাহায্য থেকে। এখন সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রগণ যুদ্ধে জিততে না পারলেও অর্থনীতিকে তারা অস্ত্র রূপে ব্যবহার করবে। উত্তর কোরিয়া, ভিনিজুয়েলা ও কিউবার বিরুদ্ধে যে রীতি, সে রীতিই প্রয়োগ করবে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে। বিগত ২০ বছরে তারা অনেক পরজীবী, ভোগবাদী ও পাশ্চাত্যসেবী লক্ষ লক্ষ মানুষ সৃষ্টি করেছে। তাদের চেননার ভূমি পশ্চিমা শক্তির হাতে এখনো অধিকৃত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় এবং তালেবানদের বিজয় নিয়ে এরা শোকাহত। এরাই এখন আফগানিস্তানের ঘরের শত্রু। তারাই ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে লাগাতর সেক্যুরিটি ক্রাইসিস সৃষ্টি করবে।

ফলে তালেবানদের লড়াই এখন নতুন অঙ্গণে প্রবেশ করলো। মু’মিনের জীবনে জিহাদের শেষ নাই। নবীজী (সা:) যখন মৃত্যু শয্যায় তখনও যুদ্ধ চলছিল রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। তালেবানদের এ জিহাদেরও শেষ নাই। ঈমান নিয়ে বাঁচতে হলে জিহাদ নিয়েও বাঁচতে হয়। ইতিমধ্যেই পাশ্চাত্য দুনিয়ার মিডিয়াগুলি তালেবানদের বিরুদ্ধে নেগেটিভ প্রচরণাকে তীব্রতর করেছে। তবে এক্ষেত্রে বিশ্বের নানা ভাষাভাষী মুসলিমদের দায়িত্বটিও বিশাল। এ যুদ্ধটি শুধু তালেবানদের বিরুদ্ধে নয়, বরং বিশ্ব মুসলিমদের বিরুদ্ধে ইসলামের সকল শত্রুদের সম্মিলত যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শত্রু পক্ষের ইসলামকে পরাজিত রাখার যুদ্ধ। এটি হলো দুটি ভিন্ন বিশ্বাস এবং দুইটি সভ্যতার যুদ্ধ। ইসলামের সাথে অনৈসলামের। এ যুদ্ধটি দিন দিন প্রবলতর হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে। কোন মুসলিম কি এ যুদ্ধে নিরপেক্ষ ও দর্শক হতে পারে? ১৬/০৮/২০২১        ৃ

 




বিবিধ ভাবনা ৭২

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ধর্ম নিয়ে বিভ্রান্তি ও অধর্মের জয়

অধিকাংশ মুসলিমের মাঝে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি ও সবচেয়ে বড় অধর্ম ঘটছে ধর্ম নিয়ে। এ বিভ্রান্তি ও অধর্মের কারণ, ধর্ম নিয়ে গণমনে গভীর অজ্ঞতা। অজ্ঞতা নিয়ে কখনোই ধর্ম পালন হয় না। মুসলিমও হওয়া যায় না। মুসলিম হতে হলে তাই প্রথমে অজ্ঞতা সরাতে হয়। সেটি নবীজী (সা:) প্রথম করেছেন। অজ্ঞতার আরবী পরিভাষা হলো জাহিলিয়াত। ইসলামপূর্ব আরবের যুগকে বলা হয় আইয়ামে জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতার যুগ। মহান নবীজী (সা:) ইসলামের আবাদ বাড়িয়েছেন এ অজ্ঞতা দূর করে। এবং কুর’আনী জ্ঞানের আলোও জ্বেলে।

বস্তুত মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো মন থেকে অজ্ঞতা সরানো। এটাই ইসলামে পবিত্রতম ইবাদত। তাই নামায-রোযা ফরজ হওয়ার এক দশকেরও বেশী আগে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করা হয়। পবিত্র কুর’আনের প্রথম শব্দটি তাই নামায-রোযা নিয়ে নয়, বরং সেটি হলো “ইকরা” তথা “পড়” অর্থাৎ জ্ঞানবান হও।  কিন্তু বাংলাদেশে সে জ্ঞানবান করার কাজটি হয়নি। বরং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার নামে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজটি অধিক হয়েছে। ফলে বেড়েছে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি। ফলে বেড়েছে ইসলামচ্যুত জাতীয়তাবাদী, সমাজবাদী, ফ্যাসিবাদী, ও সেক্যুলারিস্টদের সংখ্যা। এ কারণেই বাংলাদেশে ইসলাম পরাজিত এবং বিজয় এসেছে ইসলাম বিরোধী শক্তির।

ধর্মকর্ম বলতে সাধারণতঃ বুঝা হয় নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদের মত কিছু আনুষ্ঠিকতাকে। মুসলিম জীবনে বাধ্যতামূলক এ ধর্মীয় বিধানগুলির অবশ্যই গুরুত্ব আছে। কিন্তু ধর্মের মূল কথা কি স্রেফ নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় গুণটি হলো মিথ্যার ভীড়ের মাঝে সত্যকে চেনার সামর্থ্য। ফিরাউনের ইঞ্জিনীয়ারদের বিস্ময়কর পিরামিড গড়ার সামর্থ্য থাকলেও সত্যকে চেনার সামর্থ্য তাদের ছিল না। ফলে ফিরাউনকে তারা খোদা বলতো। একই অবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারী বহু লক্ষ বাঙালীর। অজ্ঞতার কারণেই তারা জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ, ফ্যাসিবাদ ও সেক্যুলারিজমের ন্যায় ভ্রান্ত মতবাদের অনুসারি হয়েছে। বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ব্যর্থতা হলো তারা ছাত্রদের চেতনা থেকে জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতা সরাতে পারিনি। বরং নব্য জাহিলিয়াতে দীক্ষা দিয়েছে।

অতি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মকর্ম হলো সদা সত্য কথা বলা, হারাম উপার্জন থেকে দূরে থাকা এবং নেক আমলে লেগে থাকা। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে সেটিও গুরুত্ব পায়নি। ফলে সৎ আমলের বদলে দেশে প্লাবন এসেছে দুর্নীতিতে। অপর দিকে শুধু গাছ লাগালেই চলে না, আগাছাও নির্মূল করত হয়। ধার্মীক ব্যক্তিকে তাই শুধু মিথ্যা ও দুর্বৃত্তি থেকে দূরে থাকলেই চলে না, দুর্বৃত্তি নির্মূলেও নামতে হয়। ইসলামে নির্মূলের একাজটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটিকে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত তথা জিহাদের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রে ইসলাম বিজয়ী হয় এই জিহাদের কারণে। স্রেফ নামায-রোযার কারণে নয়। ব্যক্তির প্রকৃত ঈমান তো এ জিহাদের মধ্যেই ধরা পড়ে। সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে জিহাদকে তাই ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ রূপে ঘোষণা করা হয়েছে। যাদের জীবনে জিহাদ আছে একমাত্র তাদেরকেই সত্যিকার ঈমানদার বলা হয়েছে। নবীজী (সা:) ও তাঁর প্রতিটি সাহাবার মাঝে তাই জিহাদ ছিল। নামায-রোযা-হ্জ্জ-উমরাহ এবং দান-খয়রাত বহু ঘুষখোর, চোরডাকাত ও দুর্বৃত্তও করে। কিন্তু তাদের সত্য বলার সামর্থ্য থাকে না; সামর্থ্যও থাকে না দুর্বৃত্তি হারাম উপার্জন থেকে বাঁচার। তারা দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদেও নামে না।

 

২. ইসলামর খুঁটি

ইসলামের খুঁটি ৫টি। ইসলামের বিশাল ঘরটি দাঁড়িয়ে থাকে এই ৫টি খুঁটির উপর। সেগুলি হলো ঈমান, নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিটি হলো ঈমান। ঈমান সঠিক হলেই নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতের ন্যায় ইবাদতগুলি সঠিক হয় এবং মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সেগুলি গ্রহনযোগ্য হয়। ঈমানই আমলের ওজন ও মূল্য বাড়ায়। ঈমানে ভেজাল থাকলে অন্যান্য ইবাদতগুলিতে ভেজাল দেখা দেয়। ঈমানই মু’মিনের জীবনে কম্পাসের কাজ করে। ঈমানের মূল কথাটি হলো, মহান আল্লাহতায়ালার উপর গভীর বিশ্বাস এবং প্রতিটি কর্মে ও আচরণে তাঁকে খুশি করার চেতনা। যে কর্মগুলি মহান আল্লাহতায়ালার অপছন্দের তা থেকে দূরে থাকার সার্বক্ষণিক চেতনা। প্রতি পদে এ বিশ্বাস ও চেতনা নিয়ে বাঁচাই হলো তাকওয়া। এটিই হলো প্রকৃত আল্লাহভীতি।

মু’মিনের ঈমানদারী তথা তাকওয়া শুধু তার নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে চরিত্র, আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে। তাই কথাবার্তায় সে যেমন সত্যবাদী হয়, তেমনি তাঁর রাজনীতিতে থাকে অন্যায়ের নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার তীব্র তাড়না। থাকে, দেশের আদালতে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার তীব্র প্রেরণা। তাঁর রাজনীতি হয় ভাষা, বর্ণ, ভূগোল-ভিত্তিক বাঁধনের উর্দ্ধে উঠে প্যান-ইসলামীক মুসলিম ভাতৃত্বের। তার রাজনীতি তখন সেক্যুলার বা ধর্মহীন না হয়ে পবিত্র জিহাদে পরিণত হয়। অথচ বেঈমানের রাজনীতিতে সেটি থাকে না। তার বেঈমানী নামায-রোযায় ঢাকা পড়লেও সুস্পষ্ট ধরা পড়ে তার রাজনীতিতে। বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ হলে কি হবে দেশটিতে জিহাদের সে রাজনীতি প্রতিষ্ঠা পায়নি, পেয়েছে ইসলাম বিরোধীতার রাজনীতি। এখানেই ধরা পড়ে ঈমানের অঙ্গণে ভেজালটি।

বেঈমানী যেখানে প্রবল হয়, সেখানে রম রমা ব্যবসা জমে উঠে ধর্মের নামে। বাংলাদেশে সেটি বহুশত কোটি টাকার ব্যবসা। কোভিড, ম্যালেরিয়া বা কলেরার ন্যায় দৈহিক রোগগুলি চেনা যেমন সহজ, তেমনি সহজ হলো ঈমানের রোগ চেনা। সহজ হলো ধর্মব্যবসায়ীদের চেনা। ঈমানদারের লক্ষণ: তারা নিজেদের জান-মাল দিয়ে জিহাদ করে ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দিতে। এ জিহাদে তারা তারা কারাবন্দী হয়, নির্যাতিত হয় ও শহীদ হয়। অপর দিকে ধর্ম ব্যবসায়ীদের লক্ষণ: এরা অর্থ দেয় না, বরং অর্থ নেয়। এদের জীবনে শরিয়তের লক্ষে জিহাদ থাকে না, ফলে তারা তেমন নির্যাতিত হয় না, তেমনি কারাবন্দীও হয় না। বরং থাকে ক্ষমতাসীন জালেমে সাথে তাদের সখ্যতা। তাদের জীবনে থাকে নিজ মত, নিজ ফেরকা, নিজ দল ও নিজ নেতাকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার লড়াই। ফলে বাংলাদেশে এসব ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যবসা জমলেও ইসলাম বিজয়ী হচ্ছে না।    

 

৪. মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা ও শয়তানের খলিফা

মুসলিমদের সংখ্যা আজ প্রায় ১৬০ কোটি। ১৬০ কোটি গরু দুধ দিলে সাগর হয়ে যায়। ১৬০ কোটি গাছ ফল দিলে পাহাড় হয়ে যায়। অথচ ১৬০ কোটি মুসলিম আজ কি দিচ্ছে? অথচ মুসলিমদের সংখ্যা যখন ১ কোটিও ছিল না তখন তারা জন্ম দিয়েছে বিশ্বশক্তির। জন্ম দিয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রের। বিশ্ববাসীকে দিয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ও শিক্ষা। কিন্তু আজকের এ ব্যর্থতা নিয়ে মুসলিমদের মাঝে ভাবনা কই? যে পথে চলে বিজয় ও গৌরব জুটলো সে পথে চলার উদ্যোগই বা কই? এ নিয়ে কোথায় সে আত্মসমালোচনা? বাঙালী মুসলিম বুদ্ধিজীবীগণ এ নিয়ে নীরব কেন? বিবেকবান মানুষের বড় পরিচয় হলো, তারা আত্মসমালোচনা নিয়ে বাঁচে। নিজের ব্যর্থতা নিয়ে ভাবে। খোঁজে সাফল্যের পথ। কিন্তু মুসলিম জীবনে আজ কোথায় সে ভাবনা? 

পবিত্র কুর’আনে বর্ণীত মুসলিমদের মূল পরিচয়টি হলো, তারা মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত খলিফা। রোজ হাশরের বিচার দিনে তাদের পুরস্কার মিলবে খলিফা রূপে তারা কতটা দায়িত্ব পালন করেছে তার ভিত্তিতে। দায়বদ্ধতাটি এখানে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে। প্রতি দেশে রাজার খলিফা হলো দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সেনা সদস্য, আদালত-বাহিনী ও থানার পুলিশ। তাদের কাজ রাজার সার্বভৌমত্ব ও আইনের প্রতিষ্ঠা দেয়া। শুধু প্রশিক্ষণ নিলে বা নিয়মিত অফিস করলে সে দায়িত্ব পালিত হয় না। প্রয়োজনে রাজার পক্ষে যুদ্ধও করতে হয়। সে যুদ্ধে প্রাণও দিতে হয়। রাজ্যের ভিতর ও বাহির থেকে বিদ্রোহীদের নির্মূল করতে হয়। তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। অর্থাৎ বিদ্রোহীদের নির্মূল করে তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করা। নবীজী (সা:) ও তাঁর মহান সাহাবাগণ তো সেটাই করেছেন। তাঁরা ধর্মকর্মকে নিছক নামায-রোযা ্ হজ্জ-যাকাতে সীমিত রাখেননি। দ্বীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে সমাজের প্রতি অঙ্গণে যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই করেছেন, তেমনি রণাঙ্গণেও প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, ১৬০ কোটি মুসলিমের মধ্যে ক’জন ইসলামকে বিজয়ী করতে একটি দিন ব্যয় করে? ক’জন প্রান দেয়? ক’জন ইসলামের পক্ষে কলম ধরে বা কথা বলে? ক’জন অর্থ ব্যয় করে? অথচ ভাষার নামে, দলের নামে, দেশীয় বা আঞ্চলিক স্বার্থের নামে হাজার হাজার মুসলিম কথা বলছে, কলম ধরছে এবং প্রান দিচ্ছে। এমন কি অনেকে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে কাফেরদের বাহিনীতে যোগ দিয়ে।

প্রশ্ন হলো, আজকের ১৬০ কোটি মুসলিম কি পৃথিবীর কোথাও কি মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় এনেছে? প্রতিষ্ঠা দিয়েছে কি তাঁর শরিয়তী আইন? বরং তাদের হাতেই সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মানুষের তৈরী কুফরি আইন। এবং বিলুপ্ত হয়েছে শরিয়ত। তাদের রাজনীতির কারণে বিজয়ী হয়েছে জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, সেক্যুলারিজম, স্বৈরাচারের ন্যায় শয়তানী বিধান। তবে কি মুসলিমগণ পরিণত হয়েছে শয়তানের খলিফায়?

 

৫. বিজয়টি দুর্বৃত্তদের

বাংলাদেশে প্রবল বিজয়টি দুর্বৃত্তদের। এবং পরাজয় ইসলামের। এ দুর্বৃত্তদের মূল হাতিয়ারটি হলো মিথ্যাচার। এরা ইসলামের সত্য বিধানগুলিকেও মিথ্যা বলে। এবং শরিয়তের ন্যায় ইসলামের সে বিধানগুলি প্রতিষ্ঠা্র পথে বাধা সৃষ্টি করে। মিথ্যচারী এসব চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত, সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তগণ কথা বলে ফেরেশতাদের মত। অতীতে তারা ওয়াদা দিয়েছে সোনার বাংলার। প্রচার করেছে, তারাই একমাত্র দেশপ্রেমিক। এবং চরিত্রহরন করেছে অন্যদের। সেটি বুঝা যায়, শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে ও শেখ হাসিনার ব্ক্তৃতা শুনলে। এরা বলে, তারা নাকি দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করবে! বলে, জনগণের ভোটের অধিকার দিবে ও ভাগ্য পাল্টাবে!

এদের প্রকৃত চেহারাটি এখন আর গোপন বিষয় নয়। এরাই দেশে চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, গুম, খুন, ভারতের ন্যায় বিদেশের দালালী, সন্ত্রাস ও ফাঁসির রাজনীতির জন্ম দিয়েছে। মুখে এরা গণতন্ত্রের কথা বলে, অথচ এরাই গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠা দিয়েছে নিরেট ফ্যাসিবাদের। এরাই বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা করে, কিন্তু নিশ্চুপ থাকে নিজেদের কুকর্মগুলো নিয়ে। দেশকে অধিনত করেছে ভারতের। এরাই ক্ষমতায় গেলে সত্য কথা বলা এবং ইসলামী বিচার ব্যবস্থা তথা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করে। এরাই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে দুর্বৃত্ত বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।  এভাবে সম্ভব করেছে দুর্বৃত্তি এবং অসম্ভব করেছে ন্যায়-নীতি নিয়ে বাঁচা।

 

৬. বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ ও জিহাদহীন মুসলিম

অস্ত্রের যুদ্ধে বিরতি আছে। কিন্তু এক মুহুর্তের জন্যও বিরতি নাই বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইটি হলো মিথ্যা, অজ্ঞতা, অসত্য ও দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে। এ লড়াই অজ্ঞতা সরিয়ে আলো জ্বালানোর। এ যুদ্ধ হয় কথা, কলম ও বুদ্ধি দিয়ে। ইসলামে এটিও পবিত্র জিহাদ। বুদ্ধিবৃত্তিক এ যুদ্ধটি না হলে কখনোই অস্ত্রের যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি হয় না। সে যুদ্ধে সৈনিক জুটে না, এবং বিজয়ও আসে না। ঘোড়ার আগে যেমন গাড়ি জোড়া যায় না, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের আগে অস্ত্রের যুদ্ধ করায যায় না। নবীজী (সা;)’র জীবনে বুদ্ধিবৃত্তিক এ যুদ্ধটি শুরু হয় নবুয়ত লাভের প্রথম দিন থেকেই। এবং বদরের যুদ্ধ তথা অস্ত্রের যুদ্ধটি আসে নবুয়তের প্রায় ১৫ বছর পর। ইসলামের শত্রু শয়তান ও তার অনুসারিগণ কখনোই তাদের শত্রুদের চিনতে ভূল করে না। তাই বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধাদেরও তারা একই রূপ শত্রু রূপে দেখে, যেমন দেখে রণাঙ্গণের সশস্ত্র যোদ্ধাদের। বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণের মুজাহিদগণও তাই শত্রু শক্তির টার্গেটে পরিণত হয়। এবং তারই প্রমাণ, ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে নিহত হতে শহীদ কুতুবের ন্যায় মিশরের প্রখ্যাত মুফাচ্ছিরে কুর’আনকে তাই অস্ত্র হাতে ময়দানে নামতে হয়নি। তার বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ তথা লেখনির কারণেই তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধাদের মূল কাজটি হলো কোনটি সত্য এবং কোনটি মিথ্যা -সেটিকে জনগণের সামনে সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা। ভ্রান্ত পথের ভিড়ে জনগণকে সিরাতুল মুস্তাকীম দেখানো। জনগণের চেতনায় বাড়াতে হয় শত শত মিথ্যার মাঝে সত্যকে চেনার সামর্থ্য। এবং জনগণকে অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুজাহিদ রূপে গড়ে তোলা। পবিত্র কুর’আন এবং নবীজী (সা:)’র সূন্নত তো সেটিই শেখায়। বুদ্ধিবৃত্তিক এ লড়াইয়ে বিজয় না এলে রণাঙ্গণের যুদ্ধে বিজয় জুটেনা। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মূল লক্ষ্যটি হলো, চেতনার ভূমিকে শত্রুর হামলা থেকে যেমন প্রতিরক্ষা দেয়া, তেমনি শত্রুপক্ষের আরোপিত অস্ত্রের যুদ্ধের মোকাবেলায় লড়াকু সৈনিক গড়ে তোলা।

বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ যে পবিত্র জিহাদ এবং এ জিহাদের মূল হাতিয়ারটি যে পবিত্র কুর’আন –মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সে ঘোষণাটি এসেছে পবিত্র কুর’আনে। বলা হয়েছে, “ফালা তুতিয়ীল কাফিরিনা ওয়া জাহিদ’হুম বিহি জিহাদান কাবিরা।” অর্থ: “অতঃপর কাফিরদের অনুসরণ করো না, এবং তাদের বিরুদ্ধে বড় সে জিহাদটি করো সেটি দিয়ে তথা কুর’আন দিয়ে।”-(সুরা ফুরকান, আয়াত ৫২)। উপরুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা যে “জিহাদান কাবিরা” তথা বড় জিহাদের কথা বলেছেন সেটি অস্ত্রের যুদ্ধ নয়, সেটি বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। এবং সে জিহাদের হাতিয়ার রূপে বলা হয়েছে পবিত্র কুর’আনকে। উপরক্ত আয়াতটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট হুকুম রূপে। তাই এ হুকুম পালন করা প্রতিটি মুসলিমের উপর নামায-রোযার ন্যায় ফরজ। তাই প্রতিটি মুসলিমকে শুধু নামায-রোযা পালন করলে চলে না, তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদের সৈনিকও হতে হয়। এজন্য তার জিহ্ববা, কলম ও জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হয়। কিন্তু ক’জনের রয়েছে সে ফরজ পালন তথা বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে অংশ নেয়ার সামর্থ্য?

অস্ত্রের জিহাদে চাই অস্ত্র চালানোর সামর্থ্য। তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে চাই কুর’আনী জ্ঞান প্রয়োগের সামর্থ্য। কিন্তু পবিত্র কুর’আন যারা না বুঝে তেলাওয়াতে দায়িত্ব সারে তারা কি সে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে কুর’আনের জ্ঞানকে ব্যবহার করতে পারে? তারা কি সেই বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে মুজাহিদ হতে পারে? হাতিয়ারহীন সৈনিকদের ন্যায় এরূপ জ্ঞানশূণ্যরা সে জিহাদের দর্শকে পরিণত হয়। শয়তান তো সেটিই চায়। শয়তান চায় মুসলিমগণ বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে হাতিয়ারহীন হোক এবং জিহাদ থেকে দূরে থাকুক। এবং চায়, বিনা যুদ্ধে বিজয়ী হোক তার দল। সে লক্ষ্য সাধনে শয়তান তার খলিফাদের মাধ্যমে প্রচার করে কুর’আন বুঝার প্রয়োজন নাই, না বুঝে পড়লেই অনেক ছওয়াব। শয়তান এভাবে মানুষদের ছওয়াবে মনযোগী করে, বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে নয়। মুসলিম দেশগুলিতে শয়তানের বিজয় ও ইসলামের পরাজয়ের মূল কারণ তো বুদ্ধিবৃত্তিক এ পবিত্র জিহাদে লড়াকু মুজাহিদের অভাব।      

 

৭. পবিত্র কুর’আনের শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্ব

পবিত্র কুর’আনের আরেক নাম হলো নূর তথা আলো। যেমন সুরা তাগাবুনের ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “ফা আ’মিনু বিল্লাহি ওয়া রাসূলিহি ওয়া নূরিল্লাযী আনজালনা..।” অর্থ: অতঃপর বিশ্বাস করো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর এবং সে নূরের (কুর’আনের) উপর -যা আমি নাযিল করেছি। তাই এ কুর’আনকে বাদ দিলে  মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এবং অসম্পূর্ণ থেকে যায় ইসলামের মিশন। পৃথিবী পৃষ্ঠে পবিত্র কুর’আন কাজ করে মহান আল্লাহতায়ালার মুখপত্র ও হাতিয়ার রূপে। তাই যেখানে পবিত্র কুর’আনী জ্ঞানের প্রতিষ্ঠা ও ব্যপ্তি নাই, সেখানে ইসলা্মও নাই। পবিত্র কুর’আনের আলো ব্যক্তির জীবন থেকে অন্ধকার সরায়। তাই কুর’আনী জ্ঞান না থাকলে, জাহিলিয়াত বা অজ্ঞতা থাকবে সেটিই সুনিশ্চিত। সে অজ্ঞতার অন্ধকারে সঠিক পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকীম চেনা অসম্ভব। যে ব্যক্তি কুর’আনের আলো পায়, একমাত্র সে ব্যক্তিই কুর’আনী আলোয় সে সিরাতুল মুস্তাকীম দেখতে পায়। এমন আলোকিত ব্যক্তিই মিথ্যাসেবী, ধর্ম-ব্যবসায়ী ও ক্ষমতালোভী দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদদের ধোকায় পড়ে না।

কুর’আনের আরেক নাম হিকমাহ। হিকমাহ’র অর্থ প্রজ্ঞা। তাই পবিত্র কুর’আন দেয় গভীর প্রজ্ঞা। ফলে যে ব্যক্তি কুর’আন বুঝলো সে কখনোই বেওকুফের ন্যায় আচরন করে না। সে প্রজ্ঞার বলেই তার চেতনায় থাকে অনন্ত-অসীম আখেরাতের ভাবনা। সে জাহান্নামের আযাবে ভয় তাকে পাপে পথ থেকে দূরে রাখে। এবং মনযোগী করে নেক আমলে। এরূপ ব্যক্তিগণই আখেরাতের ভান্ডারে লাগাতর সঞ্চয় বাড়ায়। এমন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণই ধর্ম, বুদ্ধিবৃত্তি ও রাজনীতির ময়দানে কখনোই কুর’আনী জ্ঞানের জ্ঞানশূণ্য বেওকুফদের অনুসারী হয় না। তাই যে দেশের রাজনীতিতে মিথ্যাচারী দুর্বৃত্তদের বিজয় এবং পরাজয় ইসলামের, বুঝতে হবে সে দেশে মানবদের প্রজ্ঞাবান করে গড়ে তোলার কাজটি হয়নি। তখন বুঝা যায়, সে সমাজে কুর’আনী জ্ঞান বিতরণের কাজটি হয়নি। পানাহার না পেলে যেমন দেহের পতন ঘটে, তেমনি কুর’আনী জ্ঞানের অভাবে মৃত্যু ঘটে প্রজ্ঞার। 

পবিত্র কুর’আনের অপর নাম হলো হুদা অর্থাৎ পথ-প্রদর্শনকারী রোডম্যাপ। যেমন সুরা বাকারার দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, “যালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফি’হি হুদাল লিল মুত্তাকীন।” অর্থ: “এই হলো সেই কিতাব যাতে নাই কোন সন্দেহ এবং মু্ত্তাকীনদের জন্য এই হলো পথ-প্রদর্শনকারী রোডম্যাপ।” অর্থাৎ নানা ভ্রান্তপথের মাঝে একমাত্র এই কুর’আনই আল্লাহভীরু মানবদেরকে সঠিক পথটি দেখায়। তখন প্রাপ্তি ঘটে সিরাতুল মুস্তাকীমের। তাই যারা কুর’আনের জ্ঞান পায়, তারাই জান্নাতের পথ পায়। তাই যে ব্যক্তি কুর’আন বুঝে না -সে ব্যর্থ হয় জীবনের চলার পথে সঠিক পথটি খুঁজে পেতে। এরূপ পথহারাদের পথচলাটি হয় জাহান্নামের পথে। এরূপ পথভ্রষ্টরাই সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, বর্ণবাদী, ও স্বৈরাচারী রাজনীতির নেতাকর্মী হয়।

পবিত্র কুর’আনের আরেক নাম হলো আয-যিকরা তথা স্মরণ। সুরা ক্বাফ’য়ের ৩৭ নম্বর আয়াতে তাই বলা হয়েছে, “ইন্না ফি জালিকা লা যিকরা লি’মান কানা লাহু ক্বালবুন আও আলক্বাস সাময়া ওয়া হুয়া শাহীদ। অর্থ: “নিশ্চয়ই এই কুর’আনের মধ্যে তাঁর জন্য রয়েছে (মহান আল্লাহতায়ালার) যিকর (স্মরণ) যার রয়েছে আলোকিত হৃদয়, রয়েছে শ্রবনের সামর্থ্য এবং রয়েছে পর্যবেক্ষণ ও সাক্ষ্যদানের ক্ষমতা।” পবিত্র কুর’আনের পাঠ তাই ঈমানদারের হৃদয়ে জাগ্রত করে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ। তখন তার স্মৃতিতে জেগে উঠে মহান প্রভুর অপার মহিমা, করুণা ও তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতার কথা। এবং স্মরণে আসে রোজ-হাশরের বিচার দিন, জান্নাত ও জাহান্নামের কথা। তাই সর্বশ্রেষ্ঠ যিকর হলো অর্থ বুঝে পবিত্র কুর’আন তেলাওয়াত।

 কুর’আনের আরেক নাম হলো ফুরকান -যা সামর্থ্য দেয় কোনটি সত্য ও কোনটি মিথ্যা এবং কোনটি ন্যায় ও কোনটি অন্যায় –সেগুলির মাঝে পার্থক্য করার সামর্থ্য। তাই বেঈমানের বেঈমানী, দুর্বৃত্তের দুর্বৃত্তি ও মিথ্যুকের মিথ্যাচার -কুর’আনের জ্ঞানে যারা আলোকিত তাদের কাছে অজানা থাকে না। অথচ যে ব্যক্তি কুর’আন বুঝে না, সে ব্যর্থ হয় সে সামর্থ্য অর্জনে। এরাই রাজনীতিতে মিথ্যাচারী দুর্বৃত্তদের চিনতে ব্যর্থ হয় এবং তাদের পক্ষ নেয়। বাংলাদেশের মত দেশে দুর্বৃত্তদের বিজয়ের বড় কারণ হলো জনগণের মাঝে কুর’আনী জ্ঞানের এই শূণ্যতা। অন্ধকার যেমন চোর-ডাকাতের অপরাধকর্ম সহজ করে দেয়, তেমনি সমাজ থেকে কুর’আনী জ্ঞানের আলো বিলুপ্ত হলে সহজ হয়ে যায় ইসলাম বিরোধী দুর্বৃত্তদের দুর্বৃত্ত । ইসলামের শত্রুপক্ষ এজন্যই পবিত্র কুর’আন শিক্ষার এতো বিরোধী। ১১/০৮/২০২১

 




বিবিধ ভাবনা ৭১

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ঈমানের সংজ্ঞা ও বেঈমানী

ঈমানের সংজ্ঞা কি, ঈমানদার কাকে বলে এবং ঈমানকে শক্তিশালীই বা কীরূপে করা যায় -এগুলি হলো মানব জীবনের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এক্ষেত্রে অজ্ঞতা নিয়ে ঈমানদার হওয়া অসম্ভব। ইসলামে ৫টি খুঁটির মাঝে ঈমানই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি। এ খুঁটিকে মজবুত না করে নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের ন্যায় অন্য খুটিগুলিকে মজবুত করা অসম্ভব। মহান আল্লাহতায়ালা ব্যক্তির আমলের ওজন দেখেন। এবং সে ওজন বৃদ্ধি পায় ঈমানের গভীরতায়। এবং ঈমানের খুঁটি মজবুত করার একমাত্র মাধ্যম হলো ওহীর জ্ঞান। ইসলামে এ জ্ঞানার্জন ফরজ। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত ফরজ করার এক দশকের বেশী আগে এ জ্ঞানার্জনকে তাই ফরজ করা হয়েছে। সে ফরজ আদায়কে সফল করার জন্যই নাযিল করা হয়েছে পবিত্র কুর’আন। পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান ছাড়া ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠা অসম্ভব। মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা: একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে অর্থাৎ সত্যিকার মুসলিম হয়। তবে সে অপরিহার্য জ্ঞানটি ভাষা, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত বা অন্য বিষয়ের জ্ঞান নয়। সেটি পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান। বস্তুত সত্যিকার ঈমানদার হওয়ার পথে কুর’আনের জ্ঞানই হলো মূল দরজা।

মুসলিম বিশ্বে আজ সবচেয়ে বড় অজ্ঞতাটি হলো পবিত্র কুর’আনের জ্ঞানে। কুর’আন তেলাওয়াতের বিপুল আয়োজন হলেও তা বুঝার চেষ্টা হয় না। ফলে আদায় হয়না জ্ঞানার্জনের ফরজ। তাই কুর’আনী জ্ঞানের গভীর অজ্ঞতা নিয়ে বসবাস বাংলাদেশের মত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, শিক্ষক, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক, সাংসদ, সচিব, উকিল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ তথাকথিত শিক্ষিতজনদের। অথচ মুসলিম শিশুর শিক্ষার শুরু হওয়া উচিত ঈমান কাকে বলে এবং কীভাবে সে ঈমানকে আরো শক্তিশালী করা যায় –সে বিষয়গুলি শেখানোর মধ্য দিয়ে। জ্ঞানদান ও জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে এ গভীর ব্যর্থতার কারণে ব্যর্থ হয়েছে সত্যিকার মুসলিম হওয়ার কাজটি।

কুর’আনী জ্ঞানের অজ্ঞতার কারণে অজ্ঞতা বেড়েছে ঈমানের পরিচয় নিয়ে। অধিকাংশ মুসলিম ঈমান বলতে বুঝে মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর নবী-রাসূল, তাঁর নাযিলকৃত গ্রন্থ, রোয হাশরের বিচার দিন, তাকদির, জান্নাত-জাহান্নাম ও ফেরেশতাদের উপর বিশ্বাস। কিন্তু ঈমানের পরিসীমা আরো গভীর। কারা প্রকৃত ঈমানদার -সে বিষয়টি অতি সহজ ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। পবিত্র কোরআনে ঘোষিত ঈমানদারের সে পরিচয়টি হলো: “ঈমানদার একমাত্র তাঁরাই যারা বিশ্বাস করে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে এবং এ নিয়ে আর কোন রূপ দ্বিধা-দ্বন্দ করে না এবং তারা নিজেদের মাল ও জান নিয়ে জিহাদ করে আল্লাহর রাস্তায়। ঈমানের দাবীতে একমাত্র তারাই হলো সত্যবাদী।” -(সুরা হুজরাত, আয়াত ১৫)। উপরক্ত সংজ্ঞা মতে শুধু মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমান আনলেই ঈমানদার হওয়া যায় না। তাকে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয়ে জিহাদে নামতে হয়। জিহাদ হলো ঈমানের প্রকাশ; যেমন উত্তাপের মাঝে আগুণের প্রকাশ। জিহাদ ছাড়া ঈমানের কথা তাই ভাবাই যায় না। তাই নবীজী (সা:)’র প্রতিটি সাহাবার জীবনে জিহাদ ছিল। জিহাদে সংশ্লিষ্ট না হয়ে নিজেকে ঈমানদার রূপে দাবী করাটি তাই ঈমানের সাথে নিরেট ভন্ডামী।

প্রশ্ন হলো জিহাদ কি? জিহাদ হলো মহান আল্লাহতায়ালার রাজ্যে দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াই। সেটি একমাত্র তাঁরই সার্বভৌমত্ব ও তাঁরই প্রদত্ত আইন শরিয়ত প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। তাই যার জীবনে আল্লাহর আইন তথা শরিয়তকে বিজয়ী করার জিহাদ নাই, সে ব্যক্তি নামাযী ও রোযাদার বা হাজী হতে পারে, মসজিদের ইমাম, আলেম, মাদ্রাসার শিক্ষক, মোফাছছের বা ইসলামী দলের নেতাও হতে পারে, কিন্তু সে ব্যক্তি প্রকৃত ঈমানদার নয়।

তাই ঈমানদার হওয়ার জন্য মূল শর্ত হলো, শরিয়তের পালন ও প্রতিষ্ঠা নিয়ে বাঁচা। এবং শরিয়ত নিয়ে বাঁচতে গেলে ঈমানদারের জীবনে জিহাদ অনিবার্য হয়ে উঠে। ঈমান ও জিহাদ তাই ব্যক্তির জীবনে সমান্তরাল ভাবে চলে। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত নিয়ে বাঁচায় এমন কি কাফের দেশেও ইসলামের শত্রুদের আপত্তি নাই। তাদের আপত্তি শরিয়ত নিয়ে। দেশের আইন-আদালত ও বিচার ব্যবস্থাকে তারা নিজেদের দখলে রাখতে চায়। চায়, নিজেদের গড়া আইনের শাসন। শরিয়তকে প্রতিষ্ঠা দিলে তাদের স্বার্থ বাঁচে না। মুসলিম জীবনে ঈমানের মূল পরীক্ষাটি হয় বস্তুত শরিয়ত পালনের এ ক্ষেত্রটিতে। কারণ জিহাদ এখানে অনিবার্য। যাদের জীবনে শরিয়তের পালন নাই, মহান আল্লাহতায়ালার সংজ্ঞা মতে তারাই ঈমানশূণ্য বেঈমান। সে বিষয়টি মহান আল্লাহতায়ালা সুস্পষ্ট করেছেন পবিত্র কোর’আনের সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে। উপরুক্ত তিনটি আয়াতে বলা হয়েছে, যারা শরিয়তের আইন অনুযায়ী বিচার করে না তারা কাফের, জালেম ও ফাসেক। সকল মুসলিম শাসক ও জনগণ ইসলামের এ মৌল বিষয়টি বুঝতো। তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে মহাপ্রভুর কাছে ঈমানদার রূপে গণ্য হওয়াটি। ফলে ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার আগে সিরাজুদ্দৌলা-শাসিত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা, মোগল-শাসিত ভারতসহ প্রতিটি মুসলিম দেশে শরিয়তের আইন অনুযায়ী বিচার হতো। সেটি বিলুপ্ত করে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক কাফের শাসকগণ এবং প্রতিষ্ঠা দেয় নিজেদের মনগড়া আইনের। পরিতাপের বিষয় হলো, বিদেশী কাফেরদের শাসন বিলু্প্ত হলেও শরিয়তী শাসন ফিরে আসেনি। আজও কাফেরদের প্রতিষ্ঠিত কুফরি আইন প্রতিষ্ঠিত রয়েছে তাদের খলিফাদের হাতে –যারা বেড়ে উঠেছে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে।

 

২. মহড়াটি ভূয়া ঈমানের

রাজনীতি ও সংস্কৃতির মাঝে ধরা পড়ে ব্যক্তির প্রকৃত আনুগত্যটির ক্ষেত্রটি কোথায়? এবং অনুকরণীয় সত্ত্বা ও দর্শনটিই বা কী? এখানেই দৃশ্যমান হয় ব্যক্তির ঈমান। কে কতটা নামায-রোযা ও তাসবিহ পাঠ করে -সেটি পথেঘাটে ও কর্মক্ষেত্রে দর্শণীয় হয় না। অথচ রাজনীতি ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তির ঈমান ও বেঈমানী কথা বলে। তাই ঈমানের সাথে বিপ্লব আসে রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির অঙ্গণে কোথায় সে ঈমানের পরিচয়? কোথায় সে কাঙ্খিত ইসলামী বিপ্লব?

রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মচারি প্রতিটি কর্মে সরকারি আইন মেনে চলে। আইন অমান্য করলে বা আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে চাকুরি থেকে শুধু বহিস্কৃতই হয় না, শাস্তিও ভোগ করে। কোর্টমার্শাল হয় বিদ্রোহী সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককেও মানতে হয় রাষ্ট্রের প্রতিটি আইন। তাই জেল-জরিমানা থেকে বাঁচতে হলে সবাইকে আইন মেনে চলতে হয়। তেমনি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে হলে মানতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার আইন শরিয়তকে। স্রেফ নামায়-রোযায় মুক্তি মিলে না। ঈমানের প্রকৃত প্রকাশ তো জীবনের প্রতি পদে শরিয়ত মেনে চলায়। নইলে মহা প্রভুর দরবারে ঈমানের দাবীটি ভূয়া গণ্য হয়। শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হলে শাস্তি শুধু পরকালে নয়, দুনিয়ার বুকেও অনিবার্য হয়ে উঠে। সে অবাধ্যতা আযাব ডেকে আনে। অথচ বাংলাদেশের মত একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নাই। আদালত চলছে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রণীত আইনে। মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে এর চেয়ে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ আর কি হতে পারে? বিস্ময়ের বিষয় হলো, একদিকে চলছে প্রবল বিদ্রোহ, অপর দিকে জোর দেয়া হচ্ছে নামায-রোযা ও তাসবিহ-তাহলিল পালনে।

অথচ মুসলিম হওয়ার অর্থ হলো, মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের পূর্ণ আত্মসমর্পণ। ইসলাম শব্দটির উৎপত্তি হলো আসলামা তথা আত্মসমর্পণ থেকে। সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কাফেরে পরিণত করে। এবং সে হুকুমগুলি শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে সীমিত নয়। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের হুকুমগুলি তো মুষ্টিমেয়। অধিকাংশ কুর’আনী হুকুম তো শরিয়ত বিষয়ক। একমাত্র শরিয়তই দেয় জুলুমের নির্মূল, সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার গ্যারান্টি। নামায-রোযার কাজ সেগুলি নয়। তাই শরিয়ত ছাড়া ইসলাম তাই অপূর্ণ। তখন অসম্ভব হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধি ও ইসলামী সভ্যতার নির্মাণ। শরিয়ত অমান্য করে তাই মুসলিম হওয়া সম্ভব কীরূপে? অথচ বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশে সে ভূয়া ঈমানেরই মহড়া হচ্ছে। এবং সেটি দেশের আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না দিয়ে। এখানে প্রকাশ পাচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। কথা হলো, এ বিদ্রোহ নিয়ে কি জান্নাতের স্বপ্ন দেখা যায়?

 

৩. মশকরা মহান আল্লাহতায়ালার সাথে!

কর্ম, চরিত্র ও আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয় ব্যক্তির চেতনা থেকে। আর ঈমানদারের চেতনার ভূমিতে কাজ করে পরকালের ভয়। পরকালের ভয় না থাকলে অতি কঠিন পাপও সহজ হয়ে যায়। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও তখন মামূলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তখন প্রবৃত্তির লালসাই জীবনের ইঞ্জিনে পরিণত হয়। প্রবৃত্তি যা বলে, বেঈমানের জীবনের গাড়ি সেদিকেই চলে। হালাল-হারামে বাছ-বিচার তখন গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। অপর দিকে ঈমানদারের জীবনে বিপ্লব আনে পরকালের ভয়। ব্যক্তির জীবনে তখন ইবাদত-বন্দেগী আসে এবং নেক আমলে তাড়াহুড়া শুরু হয়। তখন লাগাতর জিহাদ আসে এবং রাষ্ট্রের বুকে অন্যায়ের নির্মূল ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় শহীদ হওয়ার অদম্য বাসনাও জাগে। এভাবেই জনগণের জীবনে নৈতিক ও চারিত্রিক বিপ্লব শুরু হয়। মানুষ তখন ফেরেশতাদের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে। এগুলি কোন ইউটোপিয়ান ভাবনা নয়, মুসলিমদের গৌরব যুগে অবিকল তো তাই ঘটেছিল

পরকালের ভয় থাকাতেই নবীজী (সা:)’র সাহাবীদের শতকরা ৬০ ভাগের বেশী শহীদ হয়ে গেছেন। তাদের সে আত্মত্যাগের ফলেই সমাজ থেকে দুর্বৃত্তি বিলুপ্ত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার বিধান। এবং মুসলিমগণ পরিণত হয়েছে বিশ্বশক্তিতে। অথচ চেতনায় পরকালের ভয় না এলে নামায-রোযা, হজ্জ-উমরাহ পালন করেও মানুষ দুর্বৃত্ত ও মুনাফিক হয়। এমন ব্যক্তিদের জীবনে নৈতিক ও চারিত্রিক বিপ্লব আসে না। মুসলিম সমাজে এমন নামাযী ও রোযাদারের সংখ্যা প্রচুর। এরা নামায পড়েও সূদ খায়, ঘুষ খায় এবং জিহাদকে সন্ত্রাস বলে। এদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মুসলিমদের বিজয় ও গৌরব আসে না।

মুনাফিকদের বড় পরিচয়টি হলো, দেশে নানারূপ দুর্বৃত্তির জোয়ার এলেও তাদের জীবনে অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় জিহাদ থাকে না। শহীদ হওয়ার আগ্রহও থাকে না। তাদের সকল সামর্থ্য ব্যয় হয় নিজেদের পার্থিব জীবনকে সমৃদ্ধ ও আনন্দময় করতে। এবং নামায-রোযার ন্যায় ধর্মের কিছু কিছু বিধানকে তারা খেয়াল-খুশি মত বেছে নেয়। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ হলো, ইসলামের সকল বিধানগুলিতে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। পবিত্র কুর’আনে বলা হয়েছে, “উদখুলো ফিস সিলমে কা’ফফা।” এর অর্থ: প্রবেশ করো ইসলামে পুরাপুরী ভাবে। ইসলামের আংশিক পালন ও পবিত্র কুর’আনে কোন একটি বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কোন অবকাশ নাই। অথচ সে বিদ্রোহই পরিণত হয়েছে বাংলাদেশী মুসলিমদের রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, বিচার আচার ও অর্থনীতিতে। তাই দেশের আদালতে কুফরি আইন, অর্থনীতিতে সূদ, প্রশাসনে ঘুষ, বিদ্যালয়ে কুর’আন বর্জন, শহরে পতিতা পল্লী –এ নিয়েই বাংলাদেশীদের ইসলাম পালন! মহান আল্লাহতায়ালার সাথে এর চেয়ে বড় মশকরা আর কি হতে পারে?  

 

৪. নারী রপ্তানীর হারাম বিষয়টি

আলু-পটল, মাছ বা পোষাক বিদেশে রপ্তানি করা যায়। কিন্তু নারীও কি রপ্তানি করা যায়? অথচ বাংলাদেশে সেটি অবাধে হচ্ছে। নারী পরিণত হয়েছে রপ্তানি পণ্যে। অথচ শরিয়তে নারীদের একাকী হজ্জে যাওয়ার অনুমতিও নাই। এ ফয়সালাটি মহান আল্লাহতায়ালার। অজানা বিদেশে এক অপরিচিতের ঘরে একজন পিতা বা মাতা তার মেয়েকে, ভাই তার বোনকে এবং স্বামী তার স্ত্রীকে কীরূপে কাজ করার অনুমতি দেয়? অজানা সে ব্যক্তিটি যে নারী-লোভী দুর্বৃত্ত নয় -সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত হলো কী করে? কত মেয়ে ধর্ষিতা হয়ে এবং দৈহিক নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে দেশে ফিরছে -সেটি কি তারা জানে না? সরকারই বা কেন নারীদের বানিজ্যিক পণ্যে পরিণত করে? সরকারের দায়িত্ব তো নারীদের প্রতিরক্ষা দেয়া, হারামকে প্রশ্রয় দেয়া নয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে পুরাপুরি দায়িত্বহীন। তারা শুধু বিদেশ থেকে অর্থ লাভকেই গুরুত্ব দেয়। ইসলাম কি বলে -সেটি তাদের কাছে গুরুত্বহীন।

সরকারের এ কুফুরি আচরনের বিরুদ্ধে আলেমদেরই বা প্রতিবাদ কই? সাধারণ মানুষই বা কেন কথা বলে না? অর্থের লোভে মানুষ কি এতটাই বিবেকশূণ্য ও ঈমানশূণ্য হতে পারে? এরূপ ভয়ানক বিবেকশূণ্যতার কারণেই সূদী লেনদেন ও বেশ্যাবৃত্তির ন্যায় জঘন্য পাপ কর্মও বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে বৈধ অর্থনৈতিক কর্মে পরিণত হয়েছে। এসব কি ঈমানদারীর পরিচয়? বাংলাদেশীদের মধ্যে সত্যিকার ঈমান থাকলে এসবের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু হয়ে যেত। স্রেফ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে কি এ বেঈমানী ঢাকা যায়?

 

৫. প্রতিযোগিতা শয়তানকে খুশি করায়

আর.এস.এস (রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ) হলো ভারতীয় হিন্দুদের অতি উগ্র সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। এ সংগঠন থেকেই জন্ম নিয়েছে বিজিপি। এ সংগঠনের কর্মী নাথুরাম গড়সে ভারতের কংগ্রেস নেতা গান্ধীকে হত্যা করেছিল। আজ এ হত্যাপাগল সংগঠনের কর্মীদের হাতেই অধিকৃত হলো ভারতের শাসন ক্ষমতা, পুলিশ ও আদালত। তারা ভারত থেকে মুসলিমদের নির্মূল করতে চায়। তাদের কথা, হিন্দুস্থান শুধু হিন্দুদের জন্য, এবং ভারতে মুসলিমদের স্থান নাই। রাজপথে তারা স্লোগান দেয়, “মুসলিম কো লিয়ে দো স্থান: পাকিস্তান ইয়া কবরস্থান।” অর্থ: “মুসলিমদের জন্য দুটি স্থান: হয় পাকিস্তান, নয় কবরস্থান।”

ফলে মসজিদ ভাঙ্গলে এবং মুসলিমদের হত্যা ও ধর্ষণ করলেও ভারতের আদালতে শাস্তি হয়না। গুজরাত, মুম্বাই ও দিল্লিতে বহু হাজার মুসলিমকে হত্যা করা হলো, কিন্তু কারো কি শাস্তি হয়েছে? দিন-দুপুরে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হলো ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ, সে অপরাধেও কি কারো শাস্তি হয়েছে? অথচ ভারতের আইনেও সেটি ছিল জঘন্য অপরাধ। মুসলিম হত্যা ও নির্যাতনের কাজটি করে থাকে আর,এস.এস’য়ের গুন্ডারা, সে কাজগুলিই আজ সরকারী ভাবে করছে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পুলিশ। নরেন্দ্র মোদি নিজে আর.এস.এস.’র ফসল। অথচ সে মোদীকে ঘনিষ্ট বন্ধু রূপে পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করে শেখ হাসিনা। উপঢৌকন রূপে শেখ হাসিনা মোদির জন্য হাজার কেজি আম পাঠায়। মুসলিমদের জান-মালের প্রতি সামান্য দরদ থাকলে মোদীর ন্যায় মুসলিম হত্যার নায়ক এক জঘন্য অপরাধীকে কেউ কি বন্ধু রূপে গ্রহণ করে? বন্ধুর মধ্যেই ধরা পড়ে একজন ব্যক্তির নিজের পরিচয়। কারণ, বন্ধু নির্বাচনে মানুষ তার মনের কাছের মানুষকে বেছে নেয়। তখন মধ্য ধরা পড়ে তার নিজের পছন্দের ও অপছন্দের বিষয়টি। তাই মোদিকে চিনলেই হাসিনাকে চেনা যায়।

লক্ষণীয় হলো, নরেন্দ্র মোদি যে নির্যাতনটি করছে ভারতীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে, হাসিনাও সেটিই করছে বাংলাদেশী মুসলিমদের বিরুদ্ধে। উভয়েরই অভিন্ন নীতি। নরেন্দ্র মোদি প্রখ্যাত ইসলামী মনিষী যাকির নায়েককে ভারতে নিষিদ্ধ করেছে। হাসিনাও বাংলাদেশে যাকির নায়ককে নিষিদ্ধ করেছে। মোদি নিষিদ্ধ করেছে ইসলামী চ্যানেল পিস টিভি। হাসিনাও নিষিদ্ধ করেছে ইসলামী টিভি চ্যানেল ও ইসলামপন্থীদের দিগন্ত টিভি। হাসিনা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রখ্যাত তাফসির কারক দেলওয়ার হোসেন সাঈদীকে সারা জীবনের জন্য কারাবন্দী করেছে। যে বীভৎস ও নৃশংস মুসলিম হত্যাকান্ডটি মোদি ঘটিয়েছে গুজরাতে, শেখ হাসিনা সেরূপ নৃশংস হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে হিফাজতে ইসলামের মুসল্লীদের বিরুদ্ধে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে। তাই মুসলিম নির্যাতন ও ইসলাম দমনে মোদীর সাথে হাসিনার প্রতিযোগীতা চলছে। তাদের উভয়েরই লক্ষ্য, মুসলিম ও ইসলাম দমন। এ তো নরেন্দ্র মোদীর সাথে হাসিনার শয়তানকে খুশি করার প্রতিযোগিতা। এমন মুসলিম-দুষমন ব্যক্তি কি কোন মুসলিম দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অধিকার রাখে? এমন দুর্বৃত্তকে শাসক রূপে মেনে নিলে কি ঈমান থাকে? অথচ রাষ্ট্র-প্রধানের এ পবিত্র আসনে ১০ বছর যাবত বসেছেন খোদ নবীজী (সা:)। বসেছেন তাঁর মহান সাহাবাগণ। এ পবিত্র আসন হাসিনার ন্যায় একজন ভোটডাকাত দুর্বৃত্তের হাতে হাইজ্যাক হওয়া নিয়ে বাঙালী মুসলিমদের আদৌ কি কোন ক্ষোভ আছে?

 

৬. শিক্ষা খাতের কদর্য ব্যর্থতা

অজ্ঞ বা জ্ঞানশূণ্য ব্যক্তি কখনোই ঈমানদার হতে পারেনা। ঈমানের খাদ্য হলো জ্ঞান। অজ্ঞতায় মারা যায় ঈমান। বাতি জ্বালাতে যেমন তেল লাগে, ঈমানের বাতি জ্বালাতে তেমনি জ্ঞান লাগে। জাহেলিয়াত বা অজ্ঞতায় সেটি হয়না। এজন্যই নামায-রোযা ফরজ করার আগে মহান আল্লাহতায়ালা জ্ঞান অর্জনকে ফরজ করেছেন। প্রতিটি নারী ও পুরুষের উপর নামায-রোযার ন্যায় সেটি আমৃত্যু ফরজ। মুসলিমের জীবনে দুই অবস্থা। হয় সে কিছু শেখার কাজে ব্যস্ত, নতুবা কাউকে কিছু শেখানোর কাজে ব্যস্ত। শেখা ও শেখানো -এ দুটি কাজই অতি পবিত্র ইবাদত। তাই ঈমানদারের বড় পরিচয়টি হলো, সে সব সময় ব্যস্ত থাকে জ্ঞান অর্জনে বা জ্ঞান বিতরণে। তাই যেদেশে প্রকৃত মুসলিমের বসবাস সেদেশে অশিক্ষা ও কুশিক্ষা থাকতে পারে না। মুসলিম সমাজের অর্থই শিক্ষিত ও সভ্য সমাজ। যে মুসলিম সমাজে অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও অসভ্যতা, বুঝতে হবে সে সমাজের মানুষ মুসলিম হতেই ব্যর্থ হয়েছে।

উন্নয়নের ন্যায় দেশের ধ্বংসের শুরুটিও হয় শিক্ষার অঙ্গণ থেকে। শুধু রাজনীতি, আন্দোলন ও বক্তৃতা দিয়ে জাতির ভাগ্য পাল্টানো যায় না। বাংলাদেশে এসব বহু হয়েছে। কিন্তু দেশ ডুবছে। দেশের ভাগ্য পাল্টানোর মূল জায়গাটি হলো শিক্ষালয়। অথচ বাংলাদেশে সে জায়গাকেই ধ্বংস করা হচ্ছে। তাছাড়া শিক্ষাকে শুধু স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় সীমিত রাখলে জাতিকে শিক্ষিত করা যায় না। মসজিদ, পত্র-পত্রিকা, বই, সাহিত্য, রেডিও-টিভি -এসবই জ্ঞানদানের শক্তিশালী মাধ্যম। সরকার অপরাধী হয় যদি দেশের একজন নাগরিকও খাদ্যাভাবে মারা যায়। কারণ খাদ্য জোগানোর মূল দায়িত্বটি সরকারের। তেমনি সরকার অপরাধী হয় যদি কোন একজন ব্যক্তিও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। প্রতিটি নাগরিককে শিক্ষিত করার মূল দায়িত্বটি সরকারের। অশিক্ষা ব্যক্তির বাঁচাটিই ব্যর্থ করে দেয়। জনগণের এ ব্যর্থতার জন্য দায়ী দেশের ব্যর্থ সরকার। দেশে রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কলকারখানা কম হলেও জাতির এতো ক্ষতি হয়না, যতটা ক্ষতি হয় জাতির সবাইকে শিক্ষিত না করলে। রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কলকারখানা গড়া মহান আল্লাহতায়ালা ফরজ করেননি, কিন্তু ফরজ করেছেন শিক্ষাদানকে। তাই শিক্ষাদানই হলো একটি সভ্য সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত।

দেশে কতটা রাস্তাঘাট-ব্রিজ নির্মিত হলো বা অর্থনৈতিক অগ্রগতি হলো -সে প্রশ্নগুলি রোজহাশরের বিচার দিনে উঠবে না। বরং প্রশ্ন উঠবে, জনগণকে জাহান্নাম থেকে ফেরানোর কাজ তথা ঈমানদার রূপে গড়ার কাজ কতটা হয়েছে -তা নিয়ে। আর ঈমানদার রূপে গড়তে হলে তো সুশিক্ষার আয়োজন বাড়াতে হয়। মানুষ পানাহারের অভাবে কাফের ও অসভ্য দুর্বৃত্ত জীবে পরিণত হয় না। সেটি হয় সুশিক্ষার অভাবে। তাই শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন করে লাভ কি যদি মানুষ বেঈমান, অসভ্য ও দুর্বৃত্তে পরিণত হয়? বাংলাদেশের ঘুষখোর, সূদখোর, মদখোর, ধর্ষক, সন্ত্রাসী, চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত ও দুর্নীতিপরায়ন ডাক্তার-ইঞ্জিনীয়ার ও সরকারি কর্মচারীগণ বন-জঙ্গলে বেড়ে উঠেনি। তারা বিপুল সংখ্যায় বেড়ে উঠেছে দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে। বিরাজমান বিপুল সংখ্যক এ অপরাধীরাই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কুকীর্তিগুলি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ­­    

ঔষধে ভেজাল হলে রোগী বাঁচে না। শিক্ষায় ভেজাল হলে চরিত্র বাঁচে না। সভ্য দেশে এ দুইটি ক্ষেত্রেই ভেজাল  অসহ্য। যে দেশে শিক্ষকগণ অসৎ, অলস ও ফাঁকিবাজ এবং পরীক্ষায় যে দেশে নকল হয় ও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় -সে দেশের শিক্ষায় ভেজালটি অতি গভীর। অপর দিকে শিক্ষাকে শুধু স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় সীমিত রাখলে জাতিকে শিক্ষিত করা যায় না। মাদ্রাসায় পরিণত করতে হয় সমগ্র দেশকে। বলা হয়ে থাকে, একটি শিশুকে গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু একটি পরিবারের নয়, সে দায়িত্ব সমগ্র মহল্লাবাসী বা গ্রামবাসীর। একটি গাছও একাকী বেড়ে উঠেনা। সে জন্য চাই সহযোগী পরিবেশ ও আলোবাতাস। তাই প্রতিটি ঘর ও জনপদে চাই শেখা ও শেখানোর পরিবেশ। শিক্ষাদানটি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব পালনের জায়গা। মুসলিমগণ যখন শিক্ষাদীক্ষায় সবচেয়ে বড় বিপ্লব এনেছিল এবং গড়ে উঠেছিল বিশ্বশক্তি রূপে তখন তাদের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল না। তারা প্রতিটি গৃহকে পরিণত করেছিল সার্বক্ষণিক বিদ্যালয়ে এবং প্রতিটি মসজিদকে পরিণত করেছিল কলেজে। মায়েরা পরিণত হয়েছিল সার্বক্ষণিক শিক্ষিকায়। জ্ঞানবান ও চরিত্রবান মানুষ গড়ে উঠেছিল সেসব বিদ্যালয় থেকেই।

মুসলিমদের গৌরব কালে শিক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ পাঠ্য বইটি ছিল পবিত্র কুর’আন। এটিই হলো ভূপৃষ্ঠের বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব। এ কিতাবের রচিয়তা মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা। মহান আল্লাহতায়ালার ভাষায়, পবিত্র কুর’আন হলো নূর তথা আলো। এটি হলো জ্ঞানের আলো। একমাত্র সে আলোই মানুষকে আলোময় জান্নাতের পথ দেখায়। আলোময় এ পথটি সত্য, সুবিচার ও সভ্যতার পথ। অজ্ঞতা হলো অন্ধকার। অজ্ঞতার পথটি হলো মিথ্যা, অবিচার ও অসভ্যতার পথ। তাই যে সমাজে কুর’আনের চর্চা নাই সে সমাজে আলো নাই। সত্য, সুবিচার ও সভ্যতাও নাই। সে সমাজ দুর্বৃত্তময় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সে অন্ধকার নেয় জাহান্নামের পথে। ঈমানদারগণ যখন রাষ্ট্র গড়ে তখন নামায-রোযার ন্যায় জনগণকে আলোর পথ তথা জান্নাতের পথ দেখানোটি সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। এবং সেটি শিক্ষাকে সার্বজনীন করার মাধ্যমে। অথচ বাংলাদেশে মানব শিশুদের হৃদয়ে আলো জ্বালানোর সে কাজটিই হয়নি এবং হচ্ছে না। শিক্ষার নামে স্রেফ সার্টিফিকেট বিতরণ হচ্ছে। সার্টিফিকেট দিয়ে কি দেশ গড়া যায়? মুসলিমগণ যখন সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল তখন তাদের কারোই কোন সার্টিফিকেট ছিল না। তাদের ছিল ঈমান, জ্ঞান ও চরিত্র। অথচ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অভাব হলো এই তিনটি খাতে। কারণ, যে শিক্ষাব্যবস্থায় ঈমান, জ্ঞান ও চরিত্র গড়া হয় সেটিই ধ্বংস করা হয়েছে। ০৪/০৮/২০২১




বিবিধ ভাবনা ৭০

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. হিসাব দেয়ার আগেই হিসাব নেয়া উচিত

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেয়ার আগেই প্রতিটি মুসলিমের নিজের হিসাব নিজে নেয়া উচিত। এর মধ্যেই প্রকৃত প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা। এ নসিহতটি হযরত ওমরের (রা:)। তখন থেকে প্রস্তুতির পর্ব শুরু হয়ে যায়। এতে সহজ হয় রোজ হাশরের বিচার দিনে মহাবিচারক মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে হিসাব দেয়া। অথচ বাঙালী মুসলিমের জীবনে সে হিসাবটি কই? প্রতিটি মুহুর্ত সে বিচার নিয়ে বাঁচার ভাবনাই হলো তাকওয়া। বাঙালী মুসলিম জীবনে সে বিচার থাকলে তো নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে গভীর ভাবনা শুরু হতো। সে ব্যর্থতা শুধরানোরও চেষ্টা হতো। তখন চরিত্র ও কর্মে বিপ্লব আসতো। যার জীবনে হিসাব-নিকাশ নাই তার জীবনে কি কোন বিপ্লব আসে? বাংলাদেশীগণ আফগানদের তুলনায় ৫ গুণ। আফগানগণ সংখ্যায় এতো কম হয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত রাশিয়া ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ন্যায় তিনটি বিশ্বশক্তিকে শোচনীয় ভাবে পরাজিত করেছে। মানব জাতির ইতিহাসে এ কৃতিত্ব একমাত্র তাদের। আফগানদের জীবনে কেন এতো বিজয় এবং বাঙালী মুসলিম জীবনে কেন এতো পরাজয় -তা নিয়েই বা ভাবনা ক’জনের।

বাংলাদেশে এখন ভোটডাকাত শেখ হাসিনার অধিকৃতি। উপরুক্ত বিশ্বশক্তি গুলির তুলনায় হাসিনা ক্ষুদ্র মশা মাত্র। কিন্তু বাঙালী মুসলিমগণ মশাও তাড়াতে পারছে না। মশা মারতে কি কামান দাগা লাগে? খালি হাতেই মারা যায়। ইরানের শাহ, মিশরের হোসনী মোবারক, তিউনিসিয়ার জয়নাল বিন আলী, রোমানীয়ার চচেস্কুর মত বহু স্বৈরশাসক তাড়াতে জনগণকে কামান দাগতে হয়নি। সে সব স্বৈর শাসকদের জনগণ খালী হাতেই তাড়িয়েছে। অথচ সেসব স্বৈরশাসকগণ হাসিনার চেয়ে অধিক শক্তিশালী ছিল। তাদের পিছনে বিশ্বশক্তির সমর্থনও ছিল।

হংকংয়ের জনসংখ্যা মাত্র ৮০ লাখ। সেখানে চীনের স্বৈরনীতির বিরুদ্ধে ২০ লাখ লোক প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। অথচ বাংলাদেশে এক লাখ মানুষও কি কখনো স্বৈরাশাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে? অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। ঢাকা শহরেই বাস করে প্রায় দুই কোটি। যদি ৪০ লাখ ঢাকার রাজপথে অবস্থান ধর্মঘট করতো তবে হাসিনার পুলিশ কি তা রুখতে পারতো? যুদ্ধ দূরে থাক, রাস্তায় নামার সাহসটুকুও যাদের নাই –তারা কি সভ্য জীবনের স্বাদ পায়? তাদের বাঁচতে হয় গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের অসভ্যতা নিয়ে। অথচ হাত-পা, দেহ, মগজ –এসব কি আফগানী বা হংকংবাসীদের তুলনায় বাঙালীদের কম? হাতে তরবারী থাকলেই জয় আসে না, যুদ্ধে জিততে হলে সেটির ব্যবহার করতে হয়। তেমনি সভ্য ভাবে বাঁচতে হলে মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া নেয়ামতের ব্যবহার করতে হয়। পশুর সে সামর্থ্য থাকেনা বলেই সে পশু। মানুষও পশুতে পরিণত হয়, সে সামর্থ্যের ব্যবহার যদি না করে। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে এমন মানুষদের পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। অপর দিকে সেই শ্রেষ্ঠ মানব যে এসব সামর্থ্যের সুষ্ঠ ব্যবহার করে। সভ্য মানুষের দায়ভার তাই দেশকে সভ্যতর কাজে অসভ্যদের নির্মূলে নামতে হয়। এবং সে কাজে নিজের দৈহিক, আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যে ব্যবহার করতে হয়।

দেশের শাসন ক্ষমতায় ভোটডাকাত, আদালতে কাফেরদের রচিত কুফরি আইন, শিক্ষায় ইসলাম বর্জন, ব্যাংকে সুদ, শহরে পতিতা পল্লী বসিয়ে বাঙালী মুসলিমদের কত সুখের বসবাস! কোন ঈমানদার কি তা সহ্য করে? সহ্য করলে কি ঈমান থাকে? নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের সময় কি এমনটি ভাবা যেত? কিন্তু বাঙ্গালীরা এসব পাপকে শুধু সহ্যই করে না, সেগুলি বাঁচাতে ট্যাক্সও দেয়। রাজনীতিক, প্রশাসক ও পুলিশ হয়ে সেগুলিকে তারা পাহারা দেয়। ইসলামের বিরুদ্ধে এ বিশাল বিদ্রোহ নিয়ে তাদের মাঝেও কোন প্রতিবাদ ও ক্ষোভ নাই যারা প্রতিদিন নামায পড়ে। এ কি কম বিস্ময়ের? কথা হলো, এগুলি মেনে নিলে কি কেউ মুসলিম থাকে? দাড়ি লম্বা করে, মাথায় টুপি দিয়ে, হাতে তাসবিহ নিয়ে কি এ পাপ মোচন হয়? এ নিয়ে কি বাঙালী মুসলিমের কোন ভাবনা আছে? মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে কি এ নিয়ে হিসাব অবশ্যই দিতে হবে না? সে হিসাব দেয়ার আগে হিসাবটি নিলে কি কল্যাণ হতো না?

২. সভ্য ও স্বাধীন ভাবে বাঁচার খরচ

পানাহারের বাঁচার খরচটি পশুপাখিও জুটাতে পারে। কিন্তু সভ্য ভাবে বাঁচার খরচটি বিশাল। এখানেই ব্যক্তির ঈমান ও গুণাগুণের বিচার হয়। সভ্য ভাবে বাঁচতে হলে দুর্বৃত্ত নির্মূলের লড়াই নিয়ে বাঁচতে হয়। মুসলিম জীবনে এটি স্রেফ রাজনীতি নয়, এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। এটি পবিত্র জিহাদ। মহান আল্লাহতায়ালা চান তাঁর বান্দারা দুর্বৃত্ত শাসকের গোলাম রূপে নয়, বরং মানবিক অধিকার নিয়ে সভ্য ভাবে বাঁচুক। সেরূপ সভ্য ভাবে বাঁচার প্রচেষ্ঠাকেই তিনি জিহাদের মর্যাদা দিয়েছেন। নামায-রোযায় মারা গেলে কেউ শহীদ হয় না, বিনা হিসাবে জান্নাতও মেলে না। কিন্তু বিনা হিসাবে জান্নাত জুটে দুর্বৃত্ত নির্মূল ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার জিহাদে নিহত হলে। অথচ সে নূন্যতম সভ্য চেতনাটি বাঙালীর নাই, কিন্তু আফগানদের আছে। তাই আফগানদের জীবনে জিহাদ আছে। তাঁরা জিহাদে শহীদ হয়ে বিনা হিসাবে জান্নাত পাওয়ার রাস্তায় খুঁজে। লাখে লাখে তারা শহীদও হয়েছে। নিজ দেশে বিদেশী শত্রুর বিজয় ও ইসলামের পরাজয় কখনোই তাঁরা মেনে নেয়নি। একই কাজে নবীজী (সা:)’র অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। অথচ বাঙালী বেছে নিয়েছে দুর্বৃত্ত শাসকের পদতলে গোলামীর পথ। কারণ, এ পথটি সহজ, এবং এ পথে যুদ্ধ লাগে না। এজন্যই বাঙালীর বড় পরিচয়টি হলো, সমগ্র এশিয়ার বুকে তারাই হলো ইংরেজদের সবচেয়ে সিনিয়র গোলাম। তাদের আগে এশিয়া মহাদেশের আর কেউই ইংরেজ শাসকের গোলাম হয়নি। দিল্লির পতন হয় ১৮৫৭ সালে এবং বাংলার পতন হয় ১০০ বছর আগে ১৭৫৭সালে। বেশী দিন গোলামী করলে গোলামীই জাতির সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। যেমন, দীর্ঘদিন খাঁচায় বন্দী রাখার পর খাঁচার পাখিকে ছেড়ে দিলেও সে আবার খাঁচায় ফিরে আসে। এজন্যই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালীর নেশা ধরে আবার গোলামীতে ফিরে যাওয়ায়। এবং সেটি ভারতের পদতলে। ১৯৭১’য়ে সেটিই ঘটেছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাঙালীর এ বিশাল ব্যর্থতা নিয়ে বাঙালী বুদ্ধিজীবী মহলে কোন গবেষণা নাই। আলোচনাও নাই। বরং নানা ভাবে গর্ব উপচিয়ে পড়ছে। 

আর আজ বাঙালীরা ইতিহাস গড়ছে হাসিনার ন্যায় এক দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতের গোলামী মেনে নিয়ে! সমগ্র দেশবাসীর ভোটডাকাতি হয়ে গেল, অথচ তা নিয়ে কোন প্রতিবাদ হলো না। বরং সে ভোটডাকাতকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের বিচারক, উকিল, সচিব, সেনাবাহিনীর জেনারেলও মনের মাধুরি মিশিয়ে মাননীয় বলে। এটি কি কম লজ্জার? অথচ সে লজ্জা দূরীকরণের কোন উদ্যোগ নাই। একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার বড় কারণটি এখানেই। বাঙালীর ঘাড়ে চেপেছিল ভারতের গোলামী নিয়ে বাঁচার উম্মাদনা। স্বাধীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন নাগরিক রূপে বাঁচার রুচি তারা হারিয়ে ফেলেছিল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের  রাষ্ট্র প্রধান হয়েছেন বাঙালী। তিনি হলেন খাজা নাযিমুদ্দীন। কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর তিনিই তাঁর আসনে বসেন। তিন বার দেশটির প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন বাঙালী। তারা হলেন খাজা নাযিমুদ্দীন, মহম্মদ আলী বোগরা ও হোসেন শহীদ সোহরোওয়ার্দী। সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের নেতা রূপে তারা পেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বিশেষ মর্যাদা। পেয়েছেন বিশ্ব-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ। কিন্তু সে মর্যাদা বাঙালীর ভাল লাগেনি। স্বাধীনতা বাদ দিয়ে বেছে নিয়েছে ভারতের গোলামী। এবং ভারতের পদতলে গোলামীকেই ভেবেছে স্বাধীনতা। এখন সেটিই পুরাদমে চলছে। ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললে তাই আবরার ফাহাদের ন্যায় নৃশংস ভাবে লাশ হতে হয়, অথবা ইলিয়াসের ন্যায় গুম হয়ে যেতে হয়। শুধু হাসিনার নয়, কোটি কোটি বাঙালীর চেতনার ভূমি দখল করে নিয়েছে ভারত।

স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচার খরচটি বিশাল। স্বাধীন রূপে বাঁচতে পাকিস্তানকে তাই বিশাল সামরিক বাহিনী গড়তে হয়েছে। নিজ হাতে নির্মাণ করতে হয়েছে পারমানবিক বোমা, বোমারু বিমান, ট্যাংক, মিজাইল ইত্যাদি। বাংলাদেশীদের কি সে সামর্থ্য আছে? সে সামর্থ্য না থাকলে কি স্বাধীনতা দোয়া-দরুদে বাঁচে? পরাধীনতা তখন অনিবার্য হয়। মেজর আব্দুল জলিলের কথাই বলতে হয় “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা।” সেই পরাধীনতাই হলো একাত্তরের মূল অর্জন। তেমন একটি পরাধীনতা থেকে বাঁচার জন্যই ১৯৪৭ সালে বাঙালী মুসলিম নেতাগণ স্বেচ্ছায় পাকিস্তানভুক্ত হয়। কিন্তু সে সামান্য ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বিষয়টি বুঝার সামর্থ্য ইসলামশূণ্য এবং ইতিহাসের জ্ঞানশূণ্য মুজিব-তাজুদ্দীনের যেমন ছিল না, তেমিন মেজর জিয়াউর রহমানেরও ছিল না। শেখ মুজিব ১৯৪৭’য়ে বাংলার মুসলিমদের পাকিস্তান-প্রেম নিজ চোখে দেখেছে। নিজেও কলকাতার রাস্তায় জনসমুদ্রে মিশে “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” বলেছে। তাই পাকিস্তান ভাঙ্গার কথা প্রকাশ্যে মুখে আনতে ভয় পেয়েছে। এজন্যই পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে ভারতকে সাথে নিয়ে যা কিছু করেছে সেটি গোপনে করেছে। তাই বন্দী হওয়ার পূর্বে সুযোগ ও সময় হাতে থাকা সত্ত্বেও শেখ মুজিব কখনোই স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়নি। কিন্তু সে চেতনা ও সে ইতিহাস জ্ঞান মেজর জিয়ার ছিল না। তাই সে চট্রগ্রামের কালুর ঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এবং স্বেচ্ছায় গিয়ে উঠে ভারতের কোলে। ভারতের কোলে উঠাকেই ভেবেছিল বাঙালীর স্বাধীনতা।

এখন গোপন তথ্যগুলি প্রকাশ পাচ্ছে। পাকিস্তান ভাঙ্গার মূল প্রকল্পটি ছিল সোভিয়েত রাশিয়া, ভারত ও ইসরাইলের। এবং সেটি মুজিবের অজান্তে ১৯৭১ সালের বহু আগে থেকেই। পাকিস্তান বেঁচে থাকুক সেটি ভারত ১৯৪৭ সালে দেশটির জন্ম থেকেই চায়নি। চায়নি সোভিয়েত রাশিয়াও। সোভিয়েত রাশিয়া পাকিস্তানকে গণ্য করতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব-বলয়ের দেশ রূপে। ফলে পাকিস্তানকে দুর্বল করার মাঝে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্টকে দুর্বল করা মনে করতো। অপরদিকে ইসরাইল কখনোই চাইতো না মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান বেঁচে থাক। ইসরাইলের ন্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও চায়নি পাকিস্তান বেঁচে থাক। কারণ, পাকিস্তানের শক্তিবৃদ্ধি মানেই মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধি। তাতে বাধাপ্রাপ্ত হতো বৃহত্তর ইসরাইল নির্মাণের প্রজেক্ট।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইহুদী জেনারেল জ্যাকব ছিল তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের উপর হামলার মূল স্থপতি। এমন কি ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনেরাল মানেক শ’ও পাকিস্তানের উপর হামলায় ইতস্ততঃ করছিল। তার ধারণা ছিল, চীন পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়াবে। জেনারেল জ্যাকবের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক গড়ে। তারই ধারাবাহিকতায় মুজিব কন্যা হাসিনা পাসপোর্টে ইসরাইলে প্রবেশের উপর বাধা-নিষেধ তুলে নিয়েছে এবং গড়ে তুলেছে ইসরাইলের সাথে বানিজ্য চুক্তি। এবং কিনেছে স্পাই সফ্ট ওয়ার। ভারত, রাশিয়া এবং ইসরাইল –এ দেশ তিনটির কারোই স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার ভাবনা ছিল। তাদের মূল এজেন্ডাটি ছিল পাকিস্তানের ন্যায় একটি মুসলিম দেশকে খন্ডিত করা। এবং সে রাশিয়া-ভারত-ইসরাইলী প্রকল্পের সাথে যোগ দিয়েছিল বাঙালী বামপন্থি, রামপন্থি, মুজিবপন্থি ও জিয়াপন্থিগণ। এরা সেদিন ভারতের সাথে একাকার হয়ে বাঙালীর স্বাধীনতা বাড়ায়নি বরং বিজয় বাড়িয়েছে সোভিয়েত রাশিয়া, ভারত ও ইসরাইলের। এরাই একাত্তরে সংগঠিত করে অবাঙালী মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে বিশাল গণহত্যা। বাংলার ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যা। অথচ সে নৃশংস গণহত্যার কথা তারা মুখে আনে না। বাঙালীর ইতিহাসের বইয়েও তার কোন বর্ণনা নাই। যেন একাত্তরে বিহারীদের বিরুদ্ধে কিছুই ঘটেনি। এরা শুধু পাকিস্তানী সেনাদের হাতে বাঙালী হত্যার কথা বলে। এই হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃ্ত্তি। এরাই আজ উৎসব করে হাসিনার হাতে ইসলামপন্থিদের নির্মূল হওয়া নিয়ে।

মেজর জিয়া নিজে হাতে চট্টগ্রামে হত্যা করেছে তার সিনিয়র নিরস্ত্র অবাঙালী পাকিস্তানী অফিসারদের। নিরস্ত্র অফিসারদের এভাবে হত্যা করাটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনে শতভাগ যুদ্ধাপরাধ। যেসব দুর্বৃত্তগণ একাত্তরে বিহারীদের ঘরবাড়ী ও দোকানপাঠ দখল করছিল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের হাতে ঘরবাড়ীর মালিকানার দলিল তুলে দেন। এটি ছিল আরেক মানবতাবিরোধী অপরাধ। জেনারেল জিয়া একাত্তরের সে ভয়ানক অপরাধকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে বৈধতা দেন। বিমান বাহিনীর প্রধান তোয়াবের ন্যায় নরম ইসলামপন্থিও জিয়ার কাছে সহ্য হয়নি। জেনারেল জিয়া তাকে বরখাস্ত করেন। এসবই ইতিহাস। তার বেপর্দা স্ত্রী খালেদা জিয়া তার নগ্ন মাথায় মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে সর্বদা বিদ্রোহের ঝান্ডা নিয়ে ঘুরাফেরা করেন। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থণ না পেলে তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়া অসম্ভব ছিল। কিন্তু প্রতিদানে জামায়াত নেতা প্রফেসর গোলাম আযমকে তিনি জেলবন্দী করেন। বিশ্বাসঘাতকতা আর কাকে বলে? আজ বাংলাদেশে যা কিছু চলছে তার জন্য তো দায়ী মূলত বাপপন্থি, রামপন্থি, মুজিবপন্থি ও জিয়াপন্থিগণ। আজও এরাই বাঙালী মুসলিমদের ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠার মূল শত্রু। ইসলামকে বিজয়ী করতে হলে এদের সাথে লড়াই অনিবার্য।  

 

৩. জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নাশকতা

জাতীয়তাবাদ ইসলামে শতভাগ হারাম –যেমন হারাম শুকরের গোশতো খাওয়া ও জ্বিনা করা। অথচ জাতীয়তাবাদ হলো বাংলাদেশে বাপপন্থি-মুজিবপন্থি-জিয়াপন্থিদের মূল কালেমা। শুকরের গোশতো খেয়ে ও জ্বিনা করে মাত্র কিছু লোক জাহান্নামমুখি হয়। কিন্তু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি জাহান্নামমুখি করে সমগ্র দেশবাসীকে। আধুনিক কালে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় বড় ক্ষতিগুলি ইহুদী, খৃষ্টান ও পৌত্তলিকদের হাতে হয়নি, হয়েছে মুসলিম নামধারী জাতীয়তাবাদীদের হাতে। এরাই মুসলিমদের ঘরের শত্রু। তারাই আরব বিশ্ব ভেঙ্গে ২২ টুকরো করেছে এবং একাত্তরে পাকিস্তানকে ভেঙ্গেছে। নানা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে একত্রে বসবাসকে তারা অসম্ভব করেছে। এভাবে শক্তিহানী করেছে মুসলিমদের এবং বিজয় বাড়িয়েছে ইসলামের শত্রুদের। এদের কারণেই ভারত আজ আঞ্চলিক শক্তি এবং চেপে বসেছে বাংলাদেশের উপর।

কোন মুসলিম দেশের ভাঙ্গার অর্থই তো মুসলিমদের শক্তিহানী করা। এজন্যই বিভক্তি গড়া ইসলামে শতভাগ হারাম। মুসলিমদের বিভক্তিতে খুশি হয় শয়তান। এবং একতায় খুশি হন মহান আল্লাহতায়ালা। মুসলিমদের বিজয় ও গৌবব তো তখনই বেড়েছে যখন তারা দেশ ভাঙ্গার বদলে গড়ায় ও ভূগোল বাড়ানোতে মনযোগী হয়েছে। পরাজয়ের শুরু তো তখন থেকেই যখন গড়ার বদলে ভাঙ্গার কাজ শুরু করেছে। এবং সেটি হয়েছে ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতার নামে। তাই যার মধ্যে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে -এমন ব্যক্তি কি কখনো জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যোগ দিতে পারে? এজন্যই একাত্তরে কোন ইসলামী দল, কোন হাক্কানী আলেম, মাদ্রাসার কোন শিক্ষক ও কোন পীর পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি। শয়তানী শক্তিবর্গকে খুশি করার এ কাজটি ছিল ইসলাম থেকে দূরে সরা বিভ্রান্ত লোকদের। যাদের বড়াই সেক্যুলারিস্ট ও জাতীয়তাবাদী হওয়া নিয়ে।  

 

৪. বাঙালী মুসলিমের বিকৃত ইসলাম

বাঙালী মুসলিমগণ বেঁচে আছে নিজেদের আবিস্কৃত এক বিকৃত ইসলাম নিয়ে। তাতে আছে মিলাদ পড়া, কবর পূজা, পীরের দরবারে অর্থ দেয়া, হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতকে কওমী জননী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা, এবং তাবলিগ জামায়াতের চিল্লা-গাশত নিয়ে বাঁচা। তারা ইসলামের বিজয় নিয়ে ভাবে না। তারা ইসলামের শত্রুদের নির্মূল নিয়েও ভাবে না। কুর’আন-হাদীস কি নির্দেশনা দেয় –সে খোঁজও তারা রাখে না। দেশে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও আদালতে তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা নিয়েও ভাবে না। তারা ভাবে শুধু নিজেদের বাঁচা ও ভোগবিলাস নিয়ে।

কিছু নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত করে, কিছু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে ও কিছু দান-খয়রাত করেই তারা ভাবে অনন্তকালের জন্য জান্নাতে বিশাল প্রাসাদের মূল্যটি পরিশোধ করা হয়ে গেছে। এখন শুধু মৃত্যুর পর বুঝে নেয়ার পালা। কুর’আন পড়লেও জানার চেষ্টা করে না, বান্দাদের থেকে মহান আল্লাহতালার মূল চাওয়ার বিষয়টি কি। কুর’আন বুঝা তাদের রুচিতে সয় না। ফলে তারা না বুঝে কুর’আন পড়ে। মনে করে কুর’আন স্রেফ না বুঝে পড়া, চুমু খাওয়া ও মখমলে জড়িয়ে উপরে তুলে রাখার জন্য নাযিল হয়েছে। ভাবে, তা থেকে কিছু জানা ও মানার কোন প্রয়োজন নাই। মোল্লা-মৌলভীরাও কুর’আন বুঝার উপর গুরুত্ব দেন না। কুর’আন বুঝা নয়, মক্তব-মাদ্রাসায় স্রেফ পড়তে শেখানো হয়। না বুঝে পড়াকেই তারা বিশাল ছওয়াবের কাজ বলে। অথচ ইসলামের গৌরব কালে কুর’আন বুঝার গরজে মুসলিমগণ নিজের মাতৃ ভাষা দাফন করে আরবীকে গ্রহণ করেছে।

যারা জান্নাতে যেতে চায়, মৃত্যুর আগে তাদেরকে জান্নাতের মূল্য পরিশোধ করতে হয়। জান্নাতের মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরামগণ নিজেদের জান ও মাল নিয়ে জিহাদের ময়দানে নেমেছেন। এভাবেই ইসলামকে তারা বিজয়ী করেছেন। এবং ইসলামের শত্রুদের নির্মূল করেছেন। জিহাদ না থাকলে কি নবীজী (সা:) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন? সম্ভব হতো কি সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থান?

জিহাদই দেয় প্রতিরক্ষা। জিহাদই দেয় বিজয়। জিহাদের পথেই ঘটে শত্রুর নির্মূল। যেখানে জিহাদ নাই, সেখানে পরাজয় অনিবার্য। জিহাদই দরিদ্র আফগানদের তিনটি বিশ্বশক্তির বিরুদ্ধে বিজয় দিয়েছে। তাই যারা ইসলামের শত্রু তাদের লক্ষ্য মুসলিমদের নামাযশূণ্য করা নয়, বরং জিহাদশূণ্য করা। হাসিনার ন্যায় ইসলামের শত্রুশক্তি তাই জিহাদ বিষয়ক বই বাজেযাপ্ত করছে। হাসিনা সেটি করছে শয়তানকে খুশি করতে এবং ইসলামের পরজয়কে স্থায়ী করতে।

বাংলাদেশের মুসলিমগণ নবীজী (সা:) এবং তাঁর সাহাবাদের অনুসৃত জিহাদের পথে নাই। তারা বরং ইসলামের পরাজয় বাড়িয়েছে ইসলামের শত্রুদের পক্ষে ভোট দিয়ে, অর্থ দিয়ে ও তাদের পক্ষে লাঠি ধরে। এরপরও দাবী করে তারা নাকি বিশ্বের সবচেয়ে ধর্মভীরু মুসলিম! তাদের গর্ব, তারা দেশ ভরে ফেলেছে মসজিদ-মাদ্রাসা দিয়ে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালা কাছে মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো তার শরিয়তী আইন কতটা প্রতিষ্ঠা পেল এবং কতটা প্রতিষ্ঠা পেল তার সার্বভৌমত্ব। তিনি চান, ইসলামের পূর্ণ বিজয়। কোন সত্যিকার মুসলিম কি তাই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের পরাজয় মেনে নিতে পারে? অথচ বাঙালী মুসলিমগণ ইসলামের পরাজয় শুধু মেনেই নেয়নি, সে পরাজয় নিয়ে চিহ্নিত শত্রুদের সাথে নিয়ে উৎসব করে।

৫. বিশ্বাসঘাতকতা মহান আল্লাহতায়ালার সাথে

রাজার পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যগণ রাজার আইনের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন। আইনভঙ্গকারীকে দেখা মাত্রই তারা আদালতে তোলে। সে কাজের জন্যই তারা রাজার ভান্ডার থেকে বেতন পায়। মুসলিম তো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বক্ষণিক সৈনিক। সৈনিকসুলভ কাজের প্রতিদান স্বরূপ সে পরকালে পাবে অনন্ত কালের জন্য জান্নাত। সে জিহাদে নামে সর্বজাহানের রাজা মহান আল্লাহতায়ালার আইনের প্রতিষ্ঠা দিতে। মুসলিম জীবনে সে জিহাদ না থাকলে কাউকে কি মুসলিম বলা যায়? সে দায়িত্বহীনতা তো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা।

নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামদের আমলে কি ভাবা যেত, আদালতে বিচার হবে কাফেরদের রচিত আইনে? সেরূপ হলে কি তাঁরা বসে থাকতেন? অথচ আজ বাংলাদেশের মুসলিমগণ শুধু বসেই থাকে না, কাফেরদের আইনের কাছে বিচার ভিক্ষা করে! অথচ পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা: যারা তার নাযিলকৃত বিধান (শরিয়ত) অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করেনা তারা কাফের, তারা জালেম এবং তারা ফাসেক। -(সুরা মায়েদা ৪৪, ৪৫, ৪৭)। এরূপ হুশিয়ারী একজন ঈমানদার ভূলে কী করে? এ হুশিয়ারীর কারণে ইউরোপীয় কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার পূর্ব কোন মুসলিম দেশে একদিনের জন্যও শরিয়ত ভিন্ন অন্য কোন আইনে বিচার হয়নি। শরিয়ত বিলুপ্ত করেছে বিদেশী কাফেরগণ। মুসলিমদের বড় অপরাধ হলো, তারা সেটিকে পুণরায় বহাল করেনি। এখন বাঁচছে সে গুরুতর অপরাধ নিয়েই। বিস্ময়ের বিষয় হলো তথাকথিত আলেমদের মাঝেও এ নিয়ে কোন ক্ষোভ ও বিক্ষোভ নাই। শরিয়তের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন আন্দোলন নাই।

বাংলাদেশে ১৬ কোটি মুসলিম। এর মধ্যে এক লাখ মুসলিমের মাঝেও যদি বিনা হিসাবে জান্নাতে যাওয়ার ভাবনা থাকতো তবে দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে লাগাতর জিহাদ শুরু হয়ে যেতো। নিশ্চিত জান্নাত লাভের সেটিই তো একমাত্র পথ। তখন দেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেত। ভারতে বহু হাজার কৃষক নিজেদের দাবী নিয়ে ৮ মাস যাবত দিল্লির রাস্তায় অবস্থান ধর্মঘট করছে। প্রচণ্ড শীত ও গরমে প্রায় ৫০০ জন মারা গেছে। ঢাকার রাস্তায় আল্লাহতায়ালার আইন শরিয়তের দাবী নিয়ে রাস্তায় বসার জন্য কি ১ লাখ ঈমানদার আছে? নামলে কি সরকার তাদের দাবী অগ্রাহ্য করার সাহস দেখাতো? কথা হলো মহান আল্লাহতায়ালার আইনের প্রতিষ্ঠা নিয়ে সে ভাবনা ক’জনের? দেশের পুলিশ, প্রশাসন, আদালত ও সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্য নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। তাদের অনেকে নামায-রোযাও পালন করে। কিন্তু শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের আগ্রহ কই? আগ্রহ না থাকাটি কি ঈমানের পরিচয়? ০২/০৮/২০২১




  বিবিধ ভাবনা ৬৯

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. দুর্নীতি নির্মূলের পথ

কোন চোর বা ডাকাত যদি বলে, সমাজ থেকে সে অপরাধ দুর করবে –তবে তার চেয়ে বড় মশকরা আর কি হতে পারে? বাংলাদেশে সে কৌতুকও হয়। চোর-ডাকাতদের ন্যায় অপরাধীগণ শুধু অপরাধই বাড়াতে জানে, অপরাধের নির্মূল নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে তাই সবচেয়ে বড় কৌতুক হলো, ভোট ডাকাতি করে যে শেখ হাসিনা দেশকে হাইজ্যাক করলো -সে নাকি দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করবে। বরং দেশ জুড়ে দুর্নীতির জোয়ার আজ যেরূপ প্রবলতর হচ্ছে -তার কারণ তো হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতের শাসন।

দেশকে তো তারাই দুর্নীতি মুক্ত করতে পারে যারা নিজেদের প্রথমে দুর্নীতিমুক্ত করে। দুর্নীতিবাজগণ সব সময়ই নিজেদের আশে পাশে বন্ধু বা সহকারি রূপে দুর্নীতিবাজদের বেছে নেয়। তাদের নিজেদের মনে থাকে সুনীতির ধারকদের বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা। কারণ তারা জানে, তাদের বিরুদ্ধে সৎ ও সুনীতির ধারকদের ঘৃণাটিও অতি প্রবল। রাজনীতির ময়দানে তারা তাদের ঘোরতোর শত্রু। সৎ মানুষদের কাছে রাখলে যখন তখন তাদের দুর্নীতির গোপন বিষয় অন্যদের কাছে বলে বিপদ ঘটাতে পারে। এজন্যই সৎ মানুষদের নিজেদের আশে পাশে রাখাকে তারা নিজেদের জন্য বিপদ মনে করে। ফলে চোর-ডাকাত দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে তার অন্যান্য মন্ত্রী ও সচিবগণ চোর-ডাকাত হয়। শাসক খুনি হলে, আশে পাশেও সে খুনিদের রাখে। কথায় বলে ঝাঁকের মাছ ঝাঁকে চলে। সেটি অতি সত্য দুর্নীতি পরায়ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও।

তাই দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করতে হলে সে নির্মূলের কাজটি উপর থেকে শুরু করতে হয়। সরকারের সর্বোচ্চ আসনে সবচেয়ে বড় চোর বা ডাকাতকে বসিয়ে গ্রামের ছিঁছকে চোরকে জেলে পাঠিয়ে দেশ দুর্নীতিমুক্ত হয় না। বিষয়টি গাছের বিশাল কান্ডকে অক্ষত রেখে ছোট ডালা পালা কাটার ন্যায়। চোর-ডাকাতগণও তাদের আশে-পাশের সহচরদের মাঝে কিছু দান খয়রত করে। কিন্তু তাতে দেশের কল্যাণ হয়। সে দানখয়রাতের মাঝে রাজনীতি থাকে। এখানে লক্ষ্য, দুর্নীতিবাজ শাসকের পক্ষে চাটুকর বৃদ্ধি। এ চাটুকরগণ চোরডাকাত ও ভোটডাকাত সরকারের পক্ষে রাজপথে জিন্দাবাদ বলে। এবং চোরডাকাতকে ফেরেশতা বলে প্রচার করে। বাংলাদেশে সেটিই হচ্ছে। 

 

২. সংকট জনগণের স্তরে

সম্প্রতি বিশিষ্ঠ লেখক ও গবেষক ডাক্তার পিনাকী ভট্রাচার্যের একটি কঠোর মন্তব্য যথেষ্ট ভাইরাল হয়েছে। পিনাকী ভট্রাচার্য বলেছেন, “আওয়ামী লীগ দুনিয়ার সব চাইতে স্মার্ট পলিটিক্যাল পার্টি, এরা “গু”কেও হালুয়া বলে ওদের সাপোর্টারদের খাওয়ায়ে দিতে পারে।” এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর গভীর উদ্বেগ ও অতিশয় বেদনার কথা। আসলে বিষয়টি তা নয়। রোগটি আরো গভীরে। সারাতে হলে সেই গভীরে হাত দিতে হবে।

আসলে আওয়ামী লীগ স্মার্ট নয়। বরং বুদ্ধিবিবেচনাহীন আবাল হলো বাংলাদেশের জনগণ। অন্যরা জনগণের সে আবাল-অর্বাচীন অবস্থা থেকে ফায়দা নেয়না, কিন্তু আওয়ামী লীগ পুরাদমে নেয়। এ অপ্রিয় সত্য কথাটি বলতেই হবে। নইলে সত্য লুকানোর গুনাহ হবে। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে এক শ্রেণীর মানুষকে গরুছাগলের চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের কথাটি হলো, “উলাইয়েকা কা’আল আনয়াম, বাল হুম আদাল।” অর্থ হলো: তারাই গবাদী পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। মানুষ যে কতটা নীচে নামতে পারে -তা নিয়ে মহাজ্ঞানী মহান স্রষ্টার এই হলো নিজস্ব বয়ান। তাছাড়া বাঙালীর মানুষ রূপে বেড়ে উঠার ব্যর্থতা নিয়ে দারুন অভিযোগ ছিল রবীন্দ্রনাথেরও। তিনি লিখেছিলেন, হে বিধাতা সাত কোটি প্রানীরে রেখছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি। ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টার ন্যাশনালের জরিপে বাংলাদেশ এ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বের সকল দেশগুলির মাঝে দুর্নীতি পর পর ৫ বার প্রথম হয়েছে। এটি ভয়ানক চারিত্রিক অসুস্থ্যতার কথা। কিন্তু তা নিয়ে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী কথা বলে না। কথা বলে না রাজনীতিকগণও। যেন কিছুই হয়নি। অথচ এটি তো যে কোন সভ্য মানুষের মগজে ঝাঁকুনি দেয়ার কথা। বাঙালীর এ ব্যর্থতা রবীন্দ্রনাথের মগজে ঝাঁকুনি দিয়েছিল বলেই তিনি বিধাতার কাছে উপরুক্ত ফরিয়াদ তুলেছিলেন।   

ক্যান্সারের ন্যায় চারিত্রিক বা চেতনার রোগের সিম্পটমগুলোও গোপন থাকে না। সে সিম্পটমের কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। হংকং’য়ের জনসংখ্যা ৮০ লাখ। চীনের স্বৈরাচারী সরকার সেখানে এতো দিন চলে আসা গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি কেড়ে নিয়েছে। প্রতিবাদে ২০ লাখ নারী-পুরুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। অর্থাৎ প্রতি ৪ জনের একজন রাস্তায় নেমে এসেছে। হাজার হাজার মানুষ কারাবন্দী হয়েছে। এ হলো মানুষের গণতন্ত্রের প্রতি ভালবাসা ও চেতনার মান। ঢাকা শহরের জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। গণতন্ত্র বাংলাদেশেও কেড়ে নেয়া হয়েছে। নির্বাচন না হয়ে ভোট ডাকাতি হয়ে গেছে। কিন্তু ২০ লাখ দূরে থাক, ২০ হাজার মানুষও রাস্তায় নামেনি। মানুষ যখন তার মানবিক চেতনা হারিয়ে ফেলে তখন সে গণতন্ত্র নিয়ে ভাবে না।

বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক জনগণ যে কতটা আবাল – ইতিহাস থেকে তার কিছু প্রমাণ দেয়া যাক। শেখ মুজিব ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ৮ আনা সের চাউল ও সোনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়েছিল। ওয়াদা দিয়েছিল গণতন্ত্রের। কিন্তু খাইয়েছিল ৮ টাকা সের চাউল। গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার উপহার দিয়েছিল। শেখ মুজিব নিজেকে আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট করার ব্যবস্থা করেছিল। এক দেশ, এক নেতার বাকশালী তত্ত্ব বাজারে ছেড়েছিল। তিরিশ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল। ইসলামপন্থীদের জন্য রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। সোনার বাংলার বদলে দুর্ভিক্ষের বাংলায় পরিণত করেছিল। বহু লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল দুর্ভিক্ষ ডেকে এনে। স্বাধীনতার বদলে দিয়েছিল ভারতের গোলামী। শেখ মুজিব ভারতের সাথে মিলে আগরতলা ষড়যন্ত্র করেছিল। এ ষড়যন্ত্রের সত্যতা এখন আওয়ামী লীগের নেতাগণও স্বীকার করে। ভারতীয় পণ্যের বাজার নিশ্চিত করতে দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করেছিল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী জুটমিলকে লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল। মুজিবের ইতিহাসটিই তাই বিশ্বাসঘাতকতা ও জাতি-বিরোধী গুরুতর অপরাধের।  কিন্তু সে শেখ মুজিবকে আবাল বাঙালীগণ জাতির বাপ ও বঙ্গবন্ধু বলে? এমনটি কি কোন সভ্য দেশে ঘটে? সভ্য দেশে এরূপ অপরাধীদের তো ইতিহাসে আস্তাকুঁড়ে ফেলে। কখনোই বাপ বলে না। এরূপ আবাল জনগণকে হালুয়ার নামে বিশুদ্ধ “গু” খাইয়ে দিতে কি স্মার্ট হওয়া লাগে?

হাসিনা ২০১৮ সালে ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতা হাইজ্যাক করলো। এটি কি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল বা শ্রীলংকার ন্যায় অন্য কোন প্রতিবেশী দেশে সম্ভব? সম্ভব নয়। কারণ ঐসব দেশের লোক এতো আবাল নয়। তাই ভোট ডাকাতির কথা সেসব দেশে কোন চোর বা ডাকাত ভাবতেই পারে না। সভ্য মানুষেরা ডাকাত দেখলে দল বেঁধে হাতের কাছে যা পায় তা দিয়ে হামলা করে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটে না। বরং ঘটে উল্টোটি। ডাকাত সর্দারনীর গলায় বিজয়ের মালা পড়িয়ে তাকে সন্মানিত করা হয়। শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণই নয়, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের বিচারক, সংসদের সদস্য, সরকারের সচিব, মিডিয়া কর্মী, বু্দ্বিজীবী ও উকিলগণ যে কতটা আবাল সেটি বুঝা যায় যখন তারা একজন ভোটডাকাতকে সভা-সমিতির বক্তৃতায় বা লেখনীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে। অথচ সভ্য মানুষ তো বাঁচে দুর্বৃত্তদের প্রতি প্রবল ঘৃণা নিয়ে। এটুকু বিলুপ্ত হলে কি সভ্যতা, মানবতা ও নৈতিকতা বাঁচে?      

 

৩. ডাকাতের উপর ভরসা

এক বক্তৃতায় শেখ হাসিনা জনগণকে তার উপর ভরসা করতে বলেছে। অথচ এক্ষেত্রে তার নিজের আচরণটি লক্ষণীয়। হাসিনা নিজে কিন্তু জনগণের ভোটের উপর কখনোই ভরসা করেনি। জনগণের ভোটের উপর ভরসা না করে রাতে ভোট ডাকাতি করে গদিতে বসেছে। কথা হলো, ডাকাতের উপর ভরসা করা কি কোন বু্দ্ধিমানের কাজ হতে পারে? এটি তো আবাল বেওকুপদের কাজ। কোন বুদ্ধিমান সভ্য ও সাহসী মানুষ কি কখনো ডাকাতের উপর ভরসা করে? তারা তো হাতের কাছে যা পায় তা দিয়ে ডাকাত তাড়াতে রাস্তায় নামে। হাসিনা যে ভাবে ক্ষমতায় এলো সেটি কি কোন সভ্য দেশে সম্ভব? হাসিনা বাংলাদেশীদের জন্য যা বাড়িয়েছে তা উন্নয়ন নয়, বরং সীমাহীন দুর্নীতি ও বিশ্বজুড়া অপমান।

 

৪. পরকালের ভয় থেকেই চারিত্রিক বিপ্লব

মিথ্যাচার, চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস, খুন, ধর্ষণ ও ব্যাভিচারের ন্যায় নানারূপ পাপের পথে নামার মূল কারণটি হলো পরকালের ভয় না থাকা। সে রায়টি অন্য কারো নয়, সেটি মহাজ্ঞানী মহাপ্রভু মহান আল্লাহতায়ালার। বিষয়টি তিনি সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন সুরা মুদাছছেরের ৫৩ নম্বর আয়াতে। কোন মানুষের মনে যদি এ ধারণা বাসা বাঁধে, সামান্য কিছু বছরের এ পার্থিব জীবনটি পাপ থেকে পবিত্র রাখলে অনন্ত অসীম কালের জন্য জাহান্নামের আগুনে দগ্ধিভুত হওয়া থেকে বাঁচা যাবে -তবে সে ব্যক্তি কখনোই গুনাহর পথে পা রাখে না।

এক ফোটা পানির সাথে মহা সমুদ্রের বিশাল পানির তুলনা করা যায়। কারণ দু’টোই সসীম। কিন্তু ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বছরেও যে অনন্ত পরকালীন জীবন শেষ হওয়ার নয়, সে জীবনের সাথে কি ৭০ বা ৮০ বছরের জীবনের তুলনা হয়? তাই সামান্য ক্ষণের জন্য পাপে নেমে কেন সীমাহীন কালের জন্য জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে? এটি তো গুরুতর ভাবনার বিষয়। এ ভাবনাটুকুই হলো তাকওয়া। প্রকৃত ঈমানদার প্রতি মুহুর্ত বাঁচে এ ভাবনা নিয়ে। এ ভাবনা ঈমানদারের জীবনে প্রতি  মুহুর্তে পুলিশের কাজ করে। এমন ব্যক্তিগণ তাদের সমগ্র সামর্থ্য বেশী বেশী নেক আমলে ব্যয় করে। এমন ব্যক্তিরাই ফেরেশতায় পরিণত হয়।

কিন্তু যার মনে জাহান্নামের ভয় নাই, পাপের পথে চলায় তার কোন নৈতিক বাধাই থাকে না। পাপের মধ্যে তখন তার জন্য আনন্দ-উৎসবের কারণ হয়। অথচ সামান্য পাপও ঈমানদারকে বেদনা দেয়। সে তাওবা করে সে পাপ থেকে বাঁচার। অথচ সে বোধ বেঈমানের থাকে না। তাই চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও গুম-খুনের রাজনীতির নায়কদের দেখে নিশ্চিত বলা যায় এরা বেঈমান। এদের মনে আখেরাতের কোন ভয় নাই। ভয় থাকলে পাপ তাদের আনন্দ দিত না। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশে চলছে এ বেঈমানদেরই রাজত্ব।

পবিত্র কুরআনের বিশাল ভাগ ব্যয় হয়েছে বস্তুত আখেরাতের ভয়কে তীব্রতর করতে। বিশেষ করে মক্কায় নাযিলকৃত সুরা গুলিতে। তাই যারা নিজের মনে আখেরাতে ভয় সৃষ্টি করতে চায় তারা মনযোগী হয় বেশী বেশী কুর’আন বুঝতে। কিন্তু যারা না বুঝে কুর’আন তেলাওয়াত করে -তাদের মনে সে ভয় জাগে না। অথচ বাংলাদেশে না বুঝে কুর’আনের কাজটিই বেশী বেশী হচ্ছে। ফলে পবিত্র কুর’আন যে চারিত্রিক বিপ্লব আনে সেরূপ বিপ্লব বাংলাদেশে ঘটছে না।

 

৫. জীবনটাই পরীক্ষাময়

মানুষের মাঝে সম্পদ, সন্তান, বিদ্যা-বুদ্ধি ও স্বাস্থ্যের ন্যায় মহান আল্লাহতায়ালার নানা রূপ নিয়ামতের যে ভিন্ন ভিন্ন বন্টন তা নিয়ে যে ক্ষোভ –তা থেকেই জন্ম নেয় হিংসা-বিদ্বেষ। এটি মহান আল্লাহতায়ালার প্রজ্ঞা ও নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তাই এটি বিশাল পাপ। এটি বস্তুত বেঈমানীর লক্ষণ। এ বন্টন নিয়ে রাজী থাকা এবং সন্তুষ্টির যে প্রকাশ –সেটিই হলো শুকরিয়া। সেটিই প্রকৃত ঈমানদারী ও তাকওয়া।

এ পার্থিব জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত জুড়েই হলো পরীক্ষা। জীবনের প্রতিটি নিয়ামত ও বিপদ-আপদ বিনা উদ্দেশ্যে আসে না, আসে পরীক্ষা নিতে। সকল মানুষের ঈমানের ও যোগ্যতার মান যেমন সমান নয়, তেমনি এক নয় পরীক্ষাপত্রও। তাই প্রত্যেকের হাতে ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষাপত্র। কাউকে পরীক্ষা নেন সম্পদ, সন্তান ও স্বাস্থ্য দিয়ে। আবার কারো জীবনে পরীক্ষা আসে সেগুলি সীমিত করে বা না দিয়ে। জান্নাত পেতে হলে এ পরীক্ষায় পাশ করতেই হবে। ঈমানদারী তো এ পরীক্ষায় পাশ করার সার্বক্ষণিক চেতনা নিয়ে বাঁচা। প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো, প্রতি মুহুর্তে সে পরীক্ষায় পাশের সামর্থ্য বাড়ানো। সেটি কুর’আনী জ্ঞান, সঠিক দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে। এ কাজটি দেশের মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই যথার্থ ভাবে হচ্ছে না।      

                                                                                                                         ৬. উন্নয়নের সঠিক ও বেঠিক মাপকাঠি

দেশে কতগুলি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, কলকারখানা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও বিল্ডিং হলো -সেটি উন্নয়নের সঠিক মাপকাঠি নয়। বরং সঠিক মাপকাঠিটি হলো, দেশে কতজন নর-নারী প্রতারক, চোর-ডাকাত, সন্ত্রাসী, খুনি ও ব্যাভিচারী না হয়ে সৎ, চরিত্রবান ও সৃষ্টিশীল মানুষ রূপে বেড়ে উঠলো -সেটি। এ মাপকাঠিতে বাংলাদেশের উন্নয়নের মান বিশ্বের দরবারে অতি নীচে। এ দিক দিয়ে সবচেয়ে দুরাবস্থা দেশের শাসক চক্রের। তারাই নীচের নামার দৌড়ে প্রথম সারীতে।

মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে এ প্রশ্ন কখনোই তোলা হবে না, দেশে কতগুলি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, কলকারখানা, রাস্তাঘাট ও বিল্ডিং গড়া হয়েছিল এবং সে গড়ার কাজে কার কি ভূমিকা ছিল। বরং যে প্রশ্নের জবাব দিতে প্রত্যেককেই কাঠগড়ায় অবশ্যই দাঁড়াতে হবে তা হলো, পাপচার থেকে জীবন কতটা পবিত্র ছিল এবং নেক আমলের ভান্ডার কতটা সমৃদ্ধ ছিল? বিপদের কারণ হলো, মুসলিমের জীবন থেকে আখেরাতের সে মাপকাঠিগুলোই ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ, সেক্যুলারিজমে আখেরাতকে গুরুত্ব দেয়াটি নীতি বিরুদ্ধ।  আখেরাতের ভাবনা গণ্য হয় পশ্চাতপদতা রূপে। উন্নয়নের এমন সব মাপকাঠি খাড়া করা হয়েছে যা উন্নয়ন নিয়ে শুধু বিভ্রান্তিই বাড়িয়েছে। এবং আখেরাতে যা গুরুত্বহীন সেগুলিকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

মহাসড়কে গাড়ি চালনার সময় গন্তব্যস্থলকে সব সময় স্মরণে রাখতে হয়্ সেটি স্মরণে না থাকলে গাড়ি চালনাই ভিন্ন পথে হয়। তেমনি জীবন চালনায় সব সময় স্মরণে রাখতে হয় আখেরাতকে। এবং প্রস্তুত রাখতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে যে প্রশ্নগুলির সম্মুখীন হতে হবে -সেগুলির জবাব নিয়ে। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির কাজ হয়েছে শুধু আখেরাতকেই ভূলিয়ে দেয়া নয়, বরং বিচার দিনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলিকেও ভূলিয়ে দেয়া। যাতে মানুষ সে ভয়ানক দিনটির জন্য নিজেকে প্রস্তুত না করতে পারে। শয়তান তো সেটিই চায়।    

 

৭. বাঁচা ও মরার এজেন্ডা

মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাঁচা-মরার এজেন্ডা। এটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে এখানে ভূল হলে সমগ্র বাঁচাটিই ব্যর্থ হয়। অথচ মানব এই এজেন্ডা নির্ধারণেই সবচেয়ে বেশী ভূল করে। সে ভূল থেকে বাঁচাতে সে এজেন্ডাটি বেঁধে দিয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালা। কুর’আনে সে এজেন্ডার কথাটি বলা হয়েছে এভাবে: “ক্বুল ই্ন্নাস সালাতি ওয়া নুসুকু ওয়া মাহইয়া’আ ওয়া মামাতি লিল্লাহে রাব্বিল আলামীন।” অর্থ: “বলো (হে মুহম্মদ) আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার বাঁচা ও আমার মৃত্যু বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।”। তাই মুসলিম বাঁচে, লড়াই করে ও প্রাণ দেয় কোন নেতা বা দলের স্বপ্ন পূরণে নয় বরং একমাত্র মহান আল্লাহর ইচ্ছা পূরণে। একমাত্র এরূপ বাঁচাতেই প্রকৃত ঈমানদারী। যে বিশ্বাসটি মহান আল্লাহতায়ালার ঈমানদারের চেতনায় সর্ব সময়ের জন্য বদ্ধমূল করতে চান সেটি হলো: “ইন্না লিল্লাহি ও ইন্না ইলাইহি রাজিয়ুন।” অর্থ: “নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহতেই আমাদের ফিরে যাওয়া।” মুমিনের বাঁচা ও মরার পিছনে এটিই তো মূল দর্শন। এই দর্শনই জীবনে সঠিক পথ দেখায়।

বাঁচা ও মরার এ কুর’আনী পথটিকেই বলা হয় সিরাতুল মুস্তাকীম। পথটি অন্য রূপ হলে সেটি জাহান্নামের অন্তহীন আযাবকে অনিবার্য করে। সেটিই হলো শয়তানের পথ। রাষ্ট্র দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে যা অসম্ভব হয় তা হলো, আল্লাহর লক্ষ্যে বাঁচা ও প্রাণ দেয়া। তখন নিষিদ্ধ হয় জীবনে জিহাদ নিয়ে বাঁচা। জিহাদ তো মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত ইসলামী বিধানকে বিজয়ী করার চেতনা নিয়ে বাঁচা ও প্রাণ দেয়া। ইসলামের শত্রুগণ সেরূপ জিহাদ নিয়ে বাঁচাকে সন্ত্রাস বলে। এভাবেই বাঁধা দেয় জান্নাতের পথে চলায়। শয়তানী শক্তির হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। ২৫/০৭/২০২১

 




বিবিধ ভাবনা ৬৮

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. শুধু কিছু ভাল কাজ দিয়ে কি সভ্য দেশ গড়া যায়?

শুধু ভাল কাজ করলেই দেশ সভ্য হয় না। শান্তিও আসে না। ভাল কাজের সাথে দুর্বৃত্ত নির্মূলেরও লাগাতর লড়াই থাকতে হয়। পবিত্র কুর’আন তাই শুধু আমারু বিল মারুফ (ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা)’র কথা বলে না, নেহী আনিল মুনকার (অন্যায়ের নির্মূল)’র কথাও বলে। এ দুটি কাজ একত্রে চালাতে হয়। ইসলামে অন্যায় তথা দুর্বৃত্তদের নির্মূলের কাজটিই হলো পবিত্র জিহাদ। যে দেশে জিহাদ নাই সে দেশ দুর্বৃত্তদের দখলে যায়। যেমন শুধু বিজ ছিটালেই না, আগাছা নির্মূলের কাজটি নিয়মিত না হলে সেখানে গাছ বাঁচে না। তেমনি দেশ দুর্বৃত্তদের দখলে গেলে সুনীতি নিয়ে সভ্য মানুষের বাঁচাটি অসম্ভব হয়। এমন একটি দেশের উদাহরণ হলো বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ পুরাপুরি দখলে নিয়েছে চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত এবং গুম-খুন-সন্ত্রাসের নৃশংস হোতারা। তাদের নির্মূলের কোন আয়োজন নাই। বন-জঙ্গলে যেমন বিনা বাধায় ঝোপ-ঝাড়-আগাছা বেড়ে উঠে, বাংলাদেশে তেমনি বিনা বাধায় দুর্বৃত্তগণ বেড়ে উঠে। যারা ইসলামকে ভাল বাসে তারা ভেবে নিয়েছে, মসজিদ-মাদ্রাসা গড়লে এবং নামায-রোযা আদায় করলেই দেশ শান্তিতে ভরে উঠবে। অথচ সেটি ইসলামের রীতি নয়। মহান নবীজী (সা:)’র সূন্নতও নয়। নবীজী (সা:) যেমন নামায-রোযা করেছেন, মসজিদ গড়েছেন এবং নানাবিধ ভাল কাজ করেছেন, তেমনি দুর্বৃত্তদের নির্মূলে জিহাদে নেমেছেন। অথচ বাংলাদেশের মানুষের মাঝে নবীজী (সা:)’র সে ইসলাম বেঁচে নাই। তারা জিহাদমুক্ত এক বিকৃত ইসলাম আবিস্কার করে নিয়েছে। সে ইসলামে নবীজী (সা:)’র আমলের ইসলামী রাষ্ট্র নাই, শরিয়ত নাই, জিহাদ নাই এবং কুর’আন শিক্ষার রাষ্ট্রীয় আয়োজন নাই। দুর্বৃত্তদের দখলদারী নিয়ে বাঁচাটি তারা অভ্যাসে পরিণত করেছে। ফলে চোখের সামনে ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের নির্মূল হতে থাকলেও তাদের মাঝে কোন প্রতিক্রিয়া নাই।

অপর দিকে দেশের চোরডাকাত ও ভোটডাকাত সরকারের পক্ষ থেকে লাগাতর যুদ্ধ শুরু হয়েছে জিহাদের বিরুদ্ধে। জিহাদকে বলা হচ্ছে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস। জিহাদ বিষয়ক বই রাখাকে দন্ডনীয় অপরাধ গণ্য করছে। পুলিশের কাজ হয়েছে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করা। যেমন জিহাদ বলে কুর’আন-হাদীসে কোন কথাই নাই। এটি নিতান্তই তাদের নিজেদের বাঁচার স্বার্থে। কারণ তারা জানে, জিহাদ হলো মুসলিমের হাতিয়ার। তাদের মত চোরডাকাত ও ভোটডাকাত দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ঈমানদারের যুদ্ধকে বলে জিহাদ। এমন একটি যুদ্ধ তারা চায় না। তাই নিজেদের বাঁচাটি নিরাপদ করতে তারা ইসলামের শিক্ষাকেই বিকৃত করছে। নবীজী (সা)’র ইসলামকে ভূলিয়ে দিতে তারা নামায-রোযা, মিলাদ মহফিল ও দোয়া-দরুদের মাঝে ইসলামকে সীমিত রাখছে। এটি হলো তাদের ইসলামের জিহাদ নির্মূলের যুদ্ধ।  

২. শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় অপরাধটি প্রসঙ্গে

দেশ কতটা সভ্য সেটি দালান-কোঠা, রাস্তা-ঘাট ও কল-কারখানা দেখে বুঝা যায় না। কারণ এগুলি ন্যায়-নীতি, সত্য-মিথ্যা ও সভ্য-অসভ্যতার কথা বলে না। এগুলির নিজস্ব কোন চরিত্র থাকে না। এগুলি কথা বলে না। চরিত্র থাকে এবং সরবে নীতি-নৈতিকতা ও দুর্নীতির বয়ান দেয় দেশের আদালত।  আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে সভ্য-অসভ্যতা, ন্যায় নীতি, দুর্বৃত্তি, ও বিবেক বোধ কথা বলে। একটি সভ্য জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিটি কখনোই প্রাসাদ, রাস্তাঘাট বা কল-কারখানা নয়। সেটি হলো ন্যায় বিচারের আদালত। অসভ্য দেশে সেটি থাকে না। অসভ্য জাতির অসভ্যতা শুধু পতিতাপল্লী, মদ-গাঁজার আসর, ডাকাত পাড়ায় ধরে পড়ে না, সে অসভ্যতা দেখা যায় দেশের আদালতে। বাংলাদেশে সেটি দেখা গেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে। দেখা গেছে হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতকে বিচারের বাইরে রাখাতে।

তাই জাতির সভ্যতা ও অসভ্যতার বিচারে ঘরে ঘরে নেমে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। পুলিশের খাতায় দুর্বৃত্তদের তালিকার খোঁজ নেয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। সেটি দেশের আদালতের দিকে নজর দিলেই সুস্পষ্ট বুঝা যায়। সূর্য দেখে যেমন দিনের পরিচয় মেলে তেমনি আদালতের ন্যায় বিচার দেখে সভ্যতার পরিচয় মেলে। সভ্য মানুষের কাছে দুর্গন্ধময় আবর্জনা যেমন অসহ্য, তেমনি অসহ্য হলো আদালতের বিচারকদের দুর্বৃত্তি ও অবিচার। এটিকেই বলা হয় অবিচারের বিরুদ্ধে সভ্য মানুষের জিরো টলারেন্স। এটিই ঈমানদারের গুণ। কিন্তু দুর্বৃত্ত, অসভ্য ও বেঈমানদের সে রুচি থাকে না। মশামাছি যেমন আবর্জনায় বাচে এরাও তেমনি দুর্বৃত্তি নিয়ে বাঁচে। দুর্বৃত্তির মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতা ধরে রাখাই যেমন তাদের রীতি, তেমনি তাদের বড় দুর্বৃত্তি হলো আদালতে অবিচারের প্রতিষ্ঠা দেয়া।

অথচ সভ্য শাসকদের সর্বশ্রেষ্ঠ গুণটি রাস্তাঘাট ও কলকারখানা গড়া নয়, সেটি হলো দেশে ন্যায় বিচারকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। মহান নবীজী (সা:) দশ বছর রাষ্ট্র-প্রধান ছিলেন। তিনি প্রাসাদ, কলকারখানা ও রাস্তাঘাট গড়েননি, প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন ন্যায় বিচারকে। মহান আল্লাহতায়ালা রোজ হাশরের বিচার দিনে কোন শাসককে প্রাসাদ, কলকারখানা ও রাস্তাঘাট গড়া নিয়ে কাঠগড়ায় তুলবেন না। কিন্তু অবশ্যই কাঠগড়ায় তুলবেন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা নিয়ে। এবং সে ন্যায় বিচারের জন্য তিনি আইনও দিয়েছেন। পবিত্র কুর’আনে ঘোষিত সে আইনকে বলা হয় শরিয়ত। যারা সে শরিয়ত অনুসারে বিচার করে না তাদেরকে কাফের, জালেম ও ফাসেক বলা হয়েছে। তাই শাসকের ঈমানদারী ধরা পড়ে রাষ্ট্রে শরিয়তী আইনের বিচার দেখে। এবং বেঈমানী ধরা পড়ে নিজেদের গড়া কুফরি আইনের অবিচার দেখে। 

বাংলাদেশে সবচেয়ে অসভ্য ও ব্যর্থ খাতটি হলো বিচার ব্যবস্থা। জেনারেল এরশাদ বন্দুকের জোরে পুরা দেশ ডাকাতি করে নিল তার কোন শাস্তি হলো না। শেখ হাসিনাও পুলিশ ও সেনাবাহিনী দিয়ে জনগণের ভোট ডাকাতি করে নিল, তারও কোন শাস্তি হলো না। অথচ ফাঁসি দেয়া হলো বিরোধী দলীয় নেতাদের। কথা হলো যে দেশের আদালতে নিরপরাধদের ফাঁসি দেয়া হয়, দন্ডপ্রাপ্ত খুনিকে জেলখানা থেকে মুক্তি দেয়া হয় এবং ভোটডাকাতকে প্রধানমন্ত্রী রূপে রায় দেয়া হয় -সে দেশকে কি আদৌ সভ্য বলা যায়? শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় অপরাধ এই নয় যে সে জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি করেছে। বরং তার সবচেয়ে বড় অপরাধটি হল, দেশের আদালতে অবিচারকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। এবং আদালতের বিচারকদের মানুষ খুনের লাঠিয়ালে পরিনত করেছে। এভাবে বাংলাদেশকে একটি অসভ্য দেশের পর্যায়ে নামিয়েছে। এভাবে বাংলাদেশীদের জন্য বাড়িয়েছে বিশ্বজুড়া অপমান। এ অপরাধের স্মৃতি নিয়ে শেখ হাসিনা বহু শত বছর ইতিহাসে বেঁচে থাকবে। বাংলাদেশীদের যদি কোন দৃর্বৃত্তকে যুগ যুগ ধরে সর্বাধিক ঘৃনা করতে হয় তবে সে দুর্বৃত্তটি যে নিশ্চয় শেখ হাসিনাই হবে -তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে?  

 

৩. সময়টি কি ঘুমিয়ে থাকার?

কোন পথে জাতির ধ্বংস ও অপমান এবং কোন পথে বিজয় ও গৌরব -সেটি কোন জটিল রকেটি সায়েন্স নয়। ইতিহাসের বইগুলি সেসব কাহিনীতে ভরপুর। যে কোন শিক্ষিত ব্যক্তিই তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। তবে ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়াই মানব জাতির ইতিহাস। রোগের মহামারি অসংখ্য মানবের জীবনের মৃত্যু ডেকে আনে। তবে মহামারিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটলেও তাতে কোন দেশ বা জাতি ধ্বংস হয় না। কিন্তু দেশবাসীর ভাগ্যে ধ্বংস, পরাজয় ও অপমান আনে দুর্বৃত্তদের শাসন। তারা সভ্য ভাবে বাঁচাটাই অসম্ভব করে। তাই দুর্বৃত্ত শাসকগণই হলো জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু। সাধারণ ছিঁছকে চোর-ডাকাত, সন্ত্রাসী ও খুনিদের কারণে দেশের এত বড় ক্ষতি হয় না।

তাই দেশ ও দেশবাসীর কল্যাণে মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের ন্যায় কাজগুলি করাই শুধু ভাল কাজ নয়, বরং সবচেয়ে সেরা ভাল কাজটি হলো দুর্বৃত্ত শাসন নির্মূলের জিহাদ। এটিই ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। দেশের মানুষ পুরাপুরি ইসলাম পালন করতে পারবে কিনা –সে বিষয়টি নির্ভর করে এই জিহাদের উপর। যে দেশে জিহাদ নাই সেদেশে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা থাকেনা এবং আদালতে থাকে নাশরিয়তের বিচার। আর শরিয়ত পালন ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়?

একমাত্র জিহাদের মাধ্যমেই জাতি দুর্বৃত্তমুক্ত হয়। এবং বিজয়ী হয় ইসলাম। একাজ স্রেফ নামায-রোযা ও দোয়াদরুদে হওয়ার নয়। নবীজী (সা:)কে তাই শত শত ভাল কাজের সাথে জিহাদেও নামতে হয়েছে। এ জিহাদে নিহত হলে বিনা হিসাবে জান্নাত মেলে। এতবড় কল্যাণকর কাজ দ্বিতীয়টি নাই। একাজের পুরস্কারও তাই বিশাল। এ কাজে নিহত হলে বিনা হিসাবে মেলে জান্নাত। দুর্বত্ত শাসকগণ শুধু জনগণের শত্রু নয়, শত্রু মহান আল্লাহতায়ালার। যারা জিহাদ করে একমাত্র তারাই মহান আল্লাহতায়ালার শত্রুদের নির্মূল করে। এজন্য রাব্বুল আলামীন তাদের উপর এতো খুশি।

দুর্বৃত্ত শাসকের নির্মূল না করে কোন সভ্য রাষ্ট্র গড়ার কাজটি অসম্ভব। যেমন আগাছার শিকড় না তুলে সেখানে গাছ লাগানো যায় না। দুর্বৃত্তির বিশাল বট গাছটি স্বস্থানে রেখে কি ইসলামের চারা লাগানো যায়? ইসলামবিরোধীদের নির্মূলের পথ ধরতেই হবে। দুর্বৃত্ত শাসনের নির্মূলের মধ্য দিয়েই বিজয়ী হয় ইসলাম। মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার এটিই একমাত্র পথ।  শত শত মসজিদ-মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট ও কল-কারখানা গড়ে দুর্বৃত্ত নির্মূলের কাজটি সমাধা করা যায় না। নির্মূলের কাজে যে জিহাদ তার কোন বিকল্প নাই। তাই যারা প্রকৃত ঈমানদার ও জ্ঞানী তারা দুর্বত্ত নির্মূলের জিহাদে মনযোগী হয়। সে জিহাদে বিনিয়োগ করে নিজেদের অর্থ, মেধা, বুদ্ধিবৃত্তি, ও রক্ত। এটিই নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামদের পথ। একাজে সাহাবাদের অর্ধেকের বেশী শহীদ হয়ে গেছেন। মসজিদ মাদ্রাসার নির্মাণে কোটি কোটি টাকা দিলেও বিনা হিসাবে জান্নাত প্রাপ্তির কোন প্রতিশ্রুতি নাই। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি আছে জিহাদে প্রাণদানে।

বাংলাদেশে যারা শাসন ক্ষমতায়, ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের শত্রুতা কি কোন গোপন বিষয়? দ্বীনের এ শত্রুগণ কুর’আনের তাফসির হতে দিতে রাজী নয়। দেশের সবচেয়ে বড় তাফসিরকারক দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে আজীবন জেলবন্দী করার ব্যবস্থা করেছে। শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিব স্কুলের সিলেবাস থেকে বিলুপ্ত করেছিল ধর্ম শিক্ষা। একই ভাবে হাসিনাও ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। স্কুল-কলেজের পাঠদানে কুর’আন-হাদীস ও নবীজী (সা:)’র চরিত্রের উপর কোন পাঠের ব্যবস্থা নাই। ইসলামপন্থীদের ফাঁসি দিচ্ছে, জেলে নিচ্ছে এবং গুম করছে। ইসলামের বিরুদ্ধে হাসিনার যুদ্ধ দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। এ অবস্থায় ইসলামপন্থীদের কি ঘুমিয়ে থাকার সময়?

 

৪. কেন এ পরাজয় ও আযাব?

নিয়মিত নামায-রোযা করে এবং টুপি-দাড়ি আছে -এমন লোকের সংখ্যা বাংলাদেশে বহু কোটি। কিন্তু আল্লাহর হুকুম ও তাঁর শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠার জিহাদে লোক নাই। ঈমানের ফাঁকিটি এখানেই ধরা পড়ে। এরূপ ফাঁকিবাজীর ফলে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, আদালত ও শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গণে বিজয়টি শয়তানের পক্ষের শক্তির এবং পরাজয় ইসলামের। যার মধ্যে সামান্য ঈমান আছে সে কি শয়তানের এ বিজয় মেনে নিতে পারে? মেনে নিলে কি মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন?

ইসলামের পক্ষের শক্তির এখন বড়ই দুর্দিন। রাস্তায় নামলে এবং ইসলামের পক্ষে কথা বলেই তাদের গুম হতে হয়। অথবা জেল ও পুলিশী নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়। এটি কি কম আযাব? অথচ এ আযাব তাদের নিজ হাতের কামাই। অনৈক্যের পথে এমন আযাব যে অনিবার্য -সে হুশিয়ারী তো মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে বার বার শুনিয়েছেন। কিন্তু সে আযাব থেকে বাঁচায় ইসলামপন্থীদের আগ্রহ কই? অনৈক্যের পথটি  যে নিশ্চিত পরাজয় ও নৃশংস দুর্গতির পথ -সেটি জেনেও বাংলাদেশে ইসলামপন্থীগণ অনৈক্যের পথই বেছে নিয়েছে।   

কিন্তু কেন এতো অনৈক্য? কারণটি সুস্পষ্ট। মানুষ যখন একমাত্র মহান আল্লাহতায়াকে খুশি করার জন্য কাজ করে তখন একতা গড়া তাদের জন্য অতি সহজ হয়। তাই কোথাও লক্ষাধিক নবী-রাসূল একত্রে কাজ করলে তাদের মাঝে সীসাঢালা দেয়ালের ন্যায় একতা দেখা দিত। এবং ইসলামের গৌরবের দিনগুলিতেও দেখা গেছে। কিন্তু একতা অসম্ভব হয় যদি লক্ষ্য হয় দল, নেতা, ফেরকা, পীর, মাজহাবকে বিজয়ী করা। বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। তাদের গরজ যতটা নিজ দল, নিজ ফেরকা ও নিজ পীরগিরি বিজয়ী করা নিয়ে সে গরজ মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করা নিয়ে নাই। ফলে অসম্ভব হয়েছে একতাবদ্ধ হওয়া ।

৫. ঈমানদারী ও বেঈমানী

ঈমান ও বেঈমানী সুস্পষ্ট দেখা যায়। সেটি ব্যক্তির চিন্তাধারা, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, কর্ম ও আচরনের মধ্যে। যার মধ্যে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে সে কি কখনো জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, সেক্যুলারিজম, সমাজবাদের বিশ্বাসী হতে পারে? সে ভ্রান্ত মতবাদগুলি বিজয়ী করার জন্য লড়াই করতে পারে? এগুলিকে বিজয়ী করার অর্থ তো ইসলামকে পরাজিত করা। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামের পরাজয় এবং শয়তানের বিজয় এসেছে তাদের হাতে যারা নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়।

কথা হলো, শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত পালন করলেই কি মুসলিম হওয়া যায়? তাকে তার রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং যুদ্ধ-বিগ্রহকে ইসলামকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে হতে হয়। মুসলিমের জন্য এটি পুরাপুরি হারাম যে, সে বিশ্বাস করবে ইসলামে অথচ যুদ্ধ করবে জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ, সেক্যুলারিজম বা বর্ণবাদকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। এমন কর্মগুলি মূলত ইসলামের সাথে গাদ্দারী।

৬. জিজ্ঞাস্য বিষয়

প্রতিটি বাংলাদেশীর নিজেকে জিজ্ঞাসা করা উচিত, সে কি সত্যিই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় চায়? এবং চাইলে আদালতে শরিয়তের আইন নাই কেন? ব্যক্তি কি চায় এবং কি চায়না –তার মধ্যেই প্রকাশ পায় তার ঈমান বা বেঈমানী। ঈমানদার মাত্রই তাই ইসলামের বিজয় চায়। এবং বেঈমান মাত্রই ইসলামের পরাজয় চায়। কিন্তু শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিমের দেশে সে বিজয়টি কোথায়?

লাখ লাখ সৈনিক পুষে লাভ কি যদি রাজার সার্বভৌমত্ব ও আইনই না চলে? মুসলিম মাত্রই তো মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক। তাদের উপর ঈমানী দায়ভার তো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা দেয়া। সেকাজে ইসলামের গৌরব কালে মুসলিমদের জীবনে লাগাতর যুদ্ধ দেখা গেছে। কিন্তু সে কাজে বাংলাদেশের মুসলিমদের বিনিয়োগ কই? সাফল্যই বা কতটুকু? তারাই কি নিজেদের রাজস্বের অর্থে ও নিজেদের সমর্থনে ইসলামের শত্রুদের বিজয়ী করেনি? মুজিবের ন্যায় ইসলামের শত্রু কি অমুসলিমদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল? ইসলামের বিরুদ্ধে মুজিবের শত্রুতা কি কোন গোপন বিষয়? মুজিবই তো স্কুল-কলেজে ইসলামের পাঠ নিষিদ্ধ করেছিল, কারাবন্দী করেছিল ইসলামী দলগুলির নেতাদের, নিষিদ্ধ করেছিল ইসলামের নামে সংগঠিত হওয়াকে এবং জাতীয় আদর্শ রূপে ঘোষণা দিয়েছিল জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম ও সমাজবাদের ন্যায় হারাম মতবাদগুলিকে। তাজ্জবের বিষয় হলো, ইসলামের সে প্রমাণিত শত্রুকে আজও তারা বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা বলে।

অথচ ব্যক্তির ঈমান তো তার কথা ও বিশ্বাসে ধরা পড়ে। যে হিন্দু পুরোহিতটি মুর্তিপূজা পরিচালনা করে -তার সে হারাম কর্মকে সমর্থন ও প্রশংসা করলে কি কেউ মুসলিম থাকে? তেমনি যে নেতা জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম ও সমাজবাদের ন্যায় হারাম মতবাদকে দেশবাসীর উপর চাপিয়ে দেয় -তাকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বললে কি ঈমান থাকে? এরূপ হারাম কর্মে কি মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা যায়? ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। ধর্মকর্ম, রাজনীতি, আইন-আদালত, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ও যুদ্ধ-বিগ্রহের ন্যায় সর্বক্ষেত্রে রয়েছে ইসলামের দিক-নির্দেশনা। মুসলিমদের ঈমানী দায়বদ্ধতা তো একমাত্র ইসলামকে জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে অনুসরণ করা। মুজিব ও হাসিনার ন্যায় কোন হারাম মতবাদকে অনুসরণ করা নয়। ইসলামকে পুরাপুরি বিশ্বাস করার মধ্যেই তো ঈমানদারী। অথচ বাংলাদেশীদের মাঝে সে ঈমানদারীটি কই? এ নিয়ে আপন মনে প্রশ্নই বা ক’জনের মনে? মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেয়ার আগে এ হিসাব নেয়া কি জরুরি নয়? ২৪/০৭/২০২১