ঈদ কেন মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 উৎসবটি মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত

পৃথিবীর নানা দেশে নানা ধর্মের ও নানা জাতির মানুষের মাঝে শত শত বছর ধরে চলে আসছে বিচিত্র উৎসব। কিন্তু সে সব উৎসব থেকে ঈদ যে অনন্য ও শ্রেষ্ঠতর তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? সামান্যতম সন্দেহ চলে কি মহান আল্লাহতায়ালার হিকমত, প্রজ্ঞা ও তাঁর প্রদত্ত বিধানগুলির কল্যাণধর্মীতা নিয়ে? আল্লাহতায়ালার প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই তাঁর অসীম কুদরতের পরিচয়। ধরা পড়ে মানব কল্যাণে মহান আল্লাহর মহা আয়োজন। ঈদ সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব হওয়ার কারণ,এটি কোন মানুষের আবিস্কৃত উৎসব নয়। এটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে।মানব সভ্যতার সর্বশেষ্ঠ উৎসব হওয়ার জন্য এই একটি মাত্র কারণই যথেষ্ঠ। ঈদের সে সর্বাঙ্গ সুন্দর বিধান,সেটি যে কোন বিবেকবান ও সুস্থ্য চেতনার মানুষের চোখে ধরা পড়তে বাধ্য। আলোচ্য নিবন্ধের সেটিই আলোচ্য বিষয়। কিন্তু তা নিয়ে অবিশ্বাস থাকতে পারে একমাত্র তাদের যাদের অবিশ্বাস আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব, তাঁর প্রজ্ঞা ও তার অপার সৃষ্টি ক্ষমতা নিয়ে। এখানে সমস্যা তাদের অসুস্থ্য বিবেকের,ঈদ উৎসবের নয়।এমন মানসিক অসুস্থ্যতার কারণে তারা যেমন ইসলামের ইবাদতের বিধানের মধ্যে কোন শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে পায়না তেমনি পায়না মুসলমানদের ঈদ উৎসবের মাঝেও।

ঈমানদারের জীবন চলে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সিরাতুল মোস্তাকীম বেয়ে। এ পথে চলায় মুসলমানের জীবনে যেমন প্রচুর ত্যাগ-তিতীক্ষা ও জান-মালের কোরবানী আছে, তেমনি খুশিও আছে। দুঃখ-বেদনার সাথে উৎসবও আছে। তবে সে উৎসবে মোহচ্ছন্নতা নাই, আছে পবিত্রতা। মুসলিম বিশ্বের ঘরে ঘরে ঈদ তাই পবিত্র উৎসব বা খুশি বয়ে আনে। এমন খুশির দিন সারা বছরে মাত্র দু’টি। একটি ঈদুল ফিতর, এবং অপরটি ঈদুল আযহা। এ খুশির দিন দু’টিতে প্রতিটি মুসলিম দেশ নতুন ভাবে সাজে। কিন্তু কেন এ খুশি বা উৎসব? খুশি বা উৎসব তো আসে বিশাল বিজয় বা বড় কিছু অর্জনের পর। কিন্তু কি সে বিজয় বা অর্জন, যার জন্য মুসলমানেরা ঘরে ঘরে ঈদের খুশি করবে? অন্য ধর্ম বা অন্য জাতির উৎসব ইসলামের এ উৎসবের পার্থক্য কোথায়? ঈদের শ্রেষ্ঠত্বই বা কি? কেনই বা দিন দু’টি মানব-সংস্কৃতিতে অনন্য? ইসলাম শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম, কিন্তু এ উৎসবে শান্তি ও কল্যাণই বা কি? খৃষ্টান,বৌদ্ধ ও শিখ ধর্মের অনুসারিরা তাদের ধর্মের প্রচারকদের জন্ম বা মৃত্যু দিবসকে উৎসবের দিনে পরিণত করেছে,কিন্তু ইসলাম সেটি করেনি। অন্যদের উৎসবগুলির দিনক্ষণ ও উপলক্ষ তাদের মনগড়া,কিন্তু ঈদের উৎসব ও তার দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে মহান আল্লাহ থেকে। তিনি যেমন পবিত্র কোরআন দিয়েছেন এবং নামায-রোযা,হজ-যাকাতের বিধান দিয়েছেন,তেমনি এ উৎসবটিও দিয়েছেন। উৎসবের পরিকল্পনায় ও উদযাপনের যে বিধানটি মহান আল্লাহতায়ালা থেকে আসে তাতে কি কোন ত্রুটি থাকতে পারে?

মুসলমানদের এ দুটি উৎসবের পেক্ষাপট যেমন ভিন্ন,তেমনি ভিন্ন তার লক্ষ্যও। এ দুটি উৎসবের কোনটিই কোন বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মদিবস উদযাপনের লক্ষ্যে যেমন নয় তেমনি বছরের সুন্দরতম কোন দিনকে মহামান্বিত করার লক্ষ্যেও নয়। উভয় উৎসবই নির্ধারিত হয়েছে মহান আল্লাহর অনুগত গোলাম রূপে তাঁর বান্দাহ কতটা সফল বা বিজয়ী হলো সে বিষয়টিকে সামনে রেখে। এদিক দিয়ে মানব জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে সফল এবং বিজয়ী ব্যক্তিটি হলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। তিনি বিস্ময়কর প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন কোন বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে নয়,বরং মহা সত্যের আবিস্কারে। এবং সফলতা দেখিয়েছেন সে সত্যের আপোষহীন অনুসরণে। তিনি খুঁজে পেয়েছেন মহান আল্লাহকে। মানব জাতির ইতিহাসে এরচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার আছে কি? বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে ব্যর্থতার কারণে কেউ জাহান্নামে যাবে না, জাহান্নামে যাবে সত্য আবিস্কারে ব্যর্থতার কারণে। কি আল্লাহর উপর অটল বিশ্বাসে,কি ইবাদতে, কি হিজরতে, কি আত্মত্যাগে – আল্লাহর প্রতিটি হুকুমে তিনি নিষ্ঠার সাথে লাব্বায়েক বলেছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সে নিষ্ঠাকে নিয়ে বার বার গর্ব করেছেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি নিজ জন্মস্থান ছেড়ে নানা দেশের পথে পথে ঘুরেছেন। স্ত্রী হাজেরা এবং শিশুপুত্র ঈসমাইলকে যখন জনমানব শূণ্য মক্কার বুকে ছেড়ে আসার নির্দেশ এসেছে তখনও তিনি নিজের ও নিজ-পরিবারের স্বার্থকে গুরুত্ব দেননি। বরং গুরুত্ব দিয়েছেন মহান আল্লাহর ইচ্ছাকে। ফলে আল্লাহতায়ালার সে নির্দেশের জবাবে তিনি ত্বরিৎ লাব্বায়েক বলেছেন। রাব্বুল আলামীনকে খুশি করতে নিজ পুত্র ঈসমাইলকে কোরবানী করতে তাঁর গলায় ছুড়িও চালিয়েছেন। নিজ খেয়াল-খুশি ও নিজ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে মানব জাতির ইতিহাসে এটাই হলো সবচেয়ে বড় বিজয়। আল্লাহপাক তাঁর এ বিজয়ে এতই খুশি হয়েছিলেন যে তাঁর সে বিজয়কে তিনি মানবজাতির উৎসবে পরিণত করেছেন। এবং সেটি ক্বিয়ামত অবধি। মুসলমান হওয়ার অর্থ মূলতঃ মহান আল্লাহর প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক তথা “আমি হাজির বা প্রস্তুত” বলার ধর্ম। দ্বীনে ইব্রাহীমের এটিই মূল শিক্ষা। মুসলিম নামটিও তাঁরই দেয়া। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)র মূল কৃতিত্বটি হলো,খেয়ালখুশি ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে আল্লাহর উপর ঈমানকে তিনি বিজয়ী করেছেন। সে অটল ঈমান কে ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে,“নিশ্চয়ই আমার নামায,আমার কোরবাণী,আমার বেঁচে থাকা এবং আমার মৃত্যুবরণ –সবকিছুই আল্লাহর জন্য।” মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সে প্রদীপ্ত উচ্চারণকে এতটাই পছন্দ করেছেন যে পবিত্র কোরআনে নিজ কথাগুলোর পাশে হযরত ইব্রাহীমের সে কথাগুলোকেও ক্বিয়ামত অবধি মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয় করেছেন। মানব ইতিহাসে এর চেয়ে বড় বিজয় আর কি হতে পাররে? এ বিজয় সামরিক বিজয় নয়,শারিরীক শক্তি বা কুশলতার বিজয়ও নয়,বরং কুফরির উপর ঈমানের।হযরত ইব্রাহীম হলেন মুসলিম উম্মাহর পিতা। ঈদুল আজহার দিনে বিশ্বের মুসলমানগণ বস্তুতঃ পিতার সে বিজয়কে নিয়ে উৎসবই করে না,বরং তার আদর্শের সাথে একাত্মতাও জাহির করে। এর চেয়ে পবিত্র উৎসব আর কি হতে পারে?

 

উৎসব প্রবৃত্তির উপর ঈমানের বিজয় নিয়ে

অপর দিকে ঈদুল ফিতর হাজির হয় বিজয়ের আরেক প্রেক্ষাপটে। সেটি মাসব্যাপী আত্মসংযম, আত্মপরিসুদ্ধি, ও আল্লাহতে আত্মসমর্পণের। উৎসব আসে মাহে রামাদ্বানের মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে। অন্য মাসে পানাহারের ন্যায় বহু কিছুই হালাল, কিন্তু সেগুলির বহু কিছুই রোযা কালীন সময়ে হারাম। ঈমানদার হওয়ার শর্তই হলো হারাম-হালাল নিয়ে আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করা। সেটি জীবনের প্রতি মুহুর্তে। “শুনলাম এবং মেনে নিলাম” –থাকতে হবে এমন এক সদাপ্রস্তুত চেতনা। তেমন একটি চেতনার কারণে মু’মিন ব্যক্তি একান্ত নিভৃতেও কিছু খায় না। তীব্র ক্ষুধা বা প্রচণ্ড তৃষ্ণার মুখেও খাদ্য বা পাণীয় মুখে দেয় না। লোক দেখাতে মানুষ নামায পড়তে পারে,অর্থদান করতে পারে,এমন কি হজও করতে পারে। কিন্তু লোক দেখানোর সে লোভ কি একান্ত গোপনে কিছু খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে? এক্ষেত্রে যেটি কাজ করে তা হলো আল্লাহর ভয় তথা তাকওয়া। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের ন্যায় ইসলামে যত ইবাদত তার লক্ষ্য মাত্র একটিই। তা হলো ঈমানদারের জীবনে তাকওয়া বৃদ্ধি। প্রশ্ন হলো তাকওয়ার অর্থ কি? তাকওয়া হলো, জীবন যাপনের প্রতি পদে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম ও তাঁর প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীম মেনে চলার গভীর তাড়না। সে সাথে সে প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুতির প্রচণ্ড ভয়। যার মধ্যে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম মেনে চলার তাড়না নাই এবং তাঁর প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ভয়ও নেই, তার মধ্যে যে বিন্দুমাত্র তাকওয়াও নাই –তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? মহান আল্লাহতায়ালার কাজে কোরবানীর রক্ত বা গোশতো পৌঁছে না, রুকু-সিজদাও পৌঁছে না। পৌঁছে এই তাকওয়া। ব্যক্তির প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা তো এটাই যে সে তার সকল বুদ্ধিবল ও অর্থবলকে তাকওয়ার বল বাড়াতে ব্যয় করবে। এটিই আখেরাতের মুদ্রা। ব্যক্তির জীবনে তাকওয়া সুস্পষ্ট দেখা যায়, -যেমন দেখা যায় মুর্তিপূজা, ব্যক্তি পূজা, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসীর ন্যায় দুবৃত্তি। যে ব্যক্তি ঘুষ খায়, সূদ খায়, সূদ দেয়, মিথ্যা কথা বলে, রাস্তায় বেপর্দা চলে, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসী করে এবং দেশে শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত ও জিহাদের বিরুদ্ধে  রাজনীতি করে -সে ব্যক্তির মাঝে কি সামান্যতম তাকওয়া আছে? সে তো মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের দুষমন। সে যদি সারা বছর রাজা রাখে, শত শত গরুবাছুর কোরবানী করে বা প্রতি বছর হজ্ব করে -তাতে কি তাকওয়ার প্রমাণ মেলে? তাতে কি পাপ মোচন হয়? বরং সে ব্যক্তিই তো তাকওয়ার অধিকারী বা প্রকৃত মুত্তাকী যে মাসভর রামাদ্বানের রোযা রাখে এবং আল্লাহর প্রতিটি হুকুমকে মেনে চলে । সেই বস্তুতঃ বিজয়ী। এ বিজয় লোভ-লালসা ও প্রবৃত্তির খায়েশাতের উপর তাকওয়ার বিজয়। মুমিনের জীবনে ঈদুল ফিতর আসে সে বিজয়ের উৎসব নিয়ে।

ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব বুঝতে হলে রোযার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝা জরুরী। এবং ঈদুল আযহার গুরুত্ব বুঝতে হলে বুঝতে হয় হযরত ইব্রাহীম (আ:)র জীবনের মিশন। ব্যক্তির সে সমঝ-বুঝই ঈদকে ইবাদতে পরিণত করে; এবং জনগণের জীবনে জন্ম দেয় গভীর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের। নইলে ঈদ অর্থশূণ্য থেকে যায়। নামাযের ন্যায় রোযারও মূল লক্ষ্য হলো, মুসলমানদের মনে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি সৃষ্টি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ রোযা তোমাদের উপর ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেন তোমরা তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পার।”- সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)। আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত,মাগফেরাত এবং আখেরাতে নাজাত প্রাপ্তির জন্য অপরিহার্য হলো এই তাকওয়া। জান্নাতে প্রবেশের এটিই হলো মূল চাবি। তাকওয়া হলো মু’মিনের মনে আল্লাহর কাছে জবাবদেহীর সার্বক্ষণিক এমন এক জাগ্রত চেতনা যা তাকে প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণে আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের আজ্ঞাবহ গোলামে পরিণত করে। ফলে ঈমানদারের প্রতিটি দিন ও প্রতিটি মুহুর্ত কাটে আল্লাহর প্রতি হুকুমের আনুগত্য নিয়ে। সেটি প্রকাশ পায় তার কথা,কর্ম ও আচরণে। আর আল্লাহর যে কোন হুকুমের আনুগত্যই তো ইবাদত। তাই ঈমানদারের ইবাদত শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাতে সীমাবদ্ধ থাকে না,সে তো সর্বক্ষণের আবেদ। এরূপ তাকওয়াকে মু’মিনের জীবনে স্থায়ী তথা সার্বক্ষণিক করাই রামাদ্বানের রোযার মূল লক্ষ্য। মু’মিনের ঈমান তখন দৃশ্যমান হয় তাঁর ধর্ম-কর্ম,আচার-আচারণ,ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি,সংস্কৃতি, যুদ্ধবিগ্রহ তথা জীবনের সর্বাঙ্গ জুড়ে। এভাবে রোযা আল্লাহর গোলামীকে ব্যক্তির জীবনে চির অভ্যাসে পরিনত করে। তখন সে আল্লাহর গোলাম শুধু নামাযে নয়,শুধু রোযা বা হজকালীন সময়ে নয় বরং সর্বক্ষণে এবং সর্বক্ষেত্রে। এটিই হলো মু’মিনের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। সে তখন পরিণত হয় মহান আল্লাহর সেনাদলের সার্বক্ষণিক সৈনিকে। মাহে রামাদ্বান তাই ইসলামের অতিগুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিংয়ের মাস। ট্রেনিং পর্বের শিক্ষাগ্রহণে যারা কৃতকার্য হয় তাদের নিয়ে ট্রেনিং শেষে যেমন সমাপনি উৎসব হয় তেমনটি আছে ইসলামেও। ঈদুল ফিতরের উৎসব তো সেটাই।

রামাদ্বানের এ পবিত্র মাসটিতে তাকওয়া অর্জনে যারা সফল হয়, সেসব মোত্তাকীদের জন্য এ মাসটিতে রয়েছে বিশাল সুখবর। তাদের জন্য মহান আল্লাহতায়ালা খুলে দেন রহমত,মাগফেরাত এবং নাজাতের দ্বার। এ মাসেই রয়েছে লায়লাতুল ক্বদর যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এ পবিত্র মাসে যারা রোযা রাখে, তারাবিহ নামায পড়ে, নানাবিধ নফল ইবাদত করে এবং মিথ্যা-ইর্ষা-কুৎসা-গিবত ও নানাবিধ খারাপ কর্ম থেকে বাঁচে এবং লায়লাতুল ক্বদরের রাতে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে মাগফেরাতের সুযোগ নেয়, এ মাস তাদের জন্য বয়ে আনে জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এ পবিত্র মাসের ইবাদতের বরকতে মাফ হয়ে যায় অতীত জীবনের সকল গুনাহ। এবং বিপুল সমৃদ্ধি আসে ঈমানে। মু’মিনের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে? ব্যবসায়ীক লাভ,পেশাদারি সাফল্য,বিপুল অর্থপ্রাপ্তি বা কর্ম জীবনের অন্য কোন সফলতায় কি এমন অর্জন ঘটে? এমন সফলতা খুশি বয়ে আনবে সেটিই কি যথার্থ নয়? আল্লাহতায়ালাও চান,তাঁর অনুগত বান্দারা জীবনের এ বিশাল অর্জনের পর উৎসব করুক। সেই জন্যই তিনি ঈদুল ফিতরের বিধান দিয়েছেন।

রামাদ্বান হলো প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাস। যুদ্ধজযের পর যোদ্ধারা যেমন মহাধুমধামে উৎসব করে, ঈমানদারেরাও তেমনি প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের পর উৎসব করে। ঈদুল ফিতরে ঘটে সে উৎসবেরই আয়াজন। তবে এ পবিত্র মাসটিতে যারা রোযা রাখেনি এবং তাকওয়া অর্জন করেনি, প্রকৃত অর্থেই তারা ব্যর্থ। এ পবিত্র মাসটিতে নিজেদের বিদ্রোহী প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা অংশই নেয়নি। ফলে তারা বিজয়ী হবে কীরূপে? বরং পরাজিত ক্ষুধা,যৌনতা,অশ্লিলতা তথা অবাধ্য প্রবৃত্তির কাছে। ঈদুল ফিতরের উৎসবের দিনে এমন পরাজিত ব্যক্তিদের জন্য খুশির কিছু নেই। এদিন তো তাদের জন্য মাতমের। তারা তো মহান আল্লাহর অবাধ্য বান্দাহ। এরূপ অবাধ্যতা তো কুফরি। তাদের সে অবাধ্যতা বিমূর্ত হয় শুধু রামাদ্বানে নয়, বরং বছরের অপর ১১টি মাসেও। রামাদ্বানের এ ব্যর্থতা তাদের জীবনে দুঃখময় বিপর্যয় ডেকে আনে। এমন বিপর্যয় নিয়ে তারা উৎসব করে কি করে? নবীজী (সাঃ) তাই তাদের জন্য বলেছেন,“মাহে রামাদ্বানে যারা রোযা রাখেনি তাদের জন্য এ ঈদ খুশির নয়, বরং বড়ই অখুশির।”

আনন্দ যেখানে সার্বজনীন

ইসলামের কল্যাণের ধর্ম। কল্যাণ চায় ব্যক্তির সাথে সমষ্ঠিরও। কল্যাণ চায় সমাজের ধনী-দরিদ্র সর্বশ্রেণীর মানুষের। তাই উৎসবের মাঝেও সে কল্যাণ-চেতনা থেকে ঈমানদারদের বিচ্যুতির অবকাশ নেই। এ দিনে সমাজের সচ্ছল মানুষেরা আনন্দ করবে করবে আর অভাবী মানুষেরা সে আনন্দ নীরবে দেখবে সে বিধান ইসলামে নাই। ঈদের আনন্দ এখানে সার্বজনীন। খুশির এ দিনটিতে কল্যাণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সমাজের অভাবগ্রস্থ দুঃখী মানুষেরও। অনাথ-ইয়াতিম-দুস্থ্য মানুষেরাও যাতে ঈদের খুশিতে সামিল হতে পারে সে জন্য ঈদের জামায়াতে শামিল হওয়ার পূর্বে তাদের হাতে ফিতরার টাকা পৌঁছে দিতে হয় প্রতিটি স্বচ্ছল মুসলমানকে। নবীজী (সাঃ) হাদীস,যে ব্যক্তি ফিতরা না দিয়ে ঈদের নামাযে হাজির হয় তার রোযা আল্লাহর আরশের নীচে শূণ্যে ভাসতে থাকে। তাই রোযা কবুলের শর্ত হলো ঈদের নামাযে হাজির হওয়ার পূর্বে পরিববারে প্রতিটি সদস্যের মাথাপিছু ফিতরা আদায় করা। এটি গরীবের হক,ধনীর দান বা কৃপা নয়। সমাজের অভাবগ্রস্থদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখানে প্রতিটি স্বচ্ছল ব্যক্তির। সম্পদ লাভের সাথে সাথে মু’মিনের ঘাড়ে এ এক বাড়তি দায়িত্ব। গরীবেরা এসে তার দরওয়াজায় ধর্ণা দিবে এবং ফিতরা ভিক্ষা করবে সেটি ইসলামের বিধান নয়। এমন বিধানে গরীবের প্রচ্ণ্ড অসম্মান হয়। এভাবে গরীবের অসম্মান বাড়িয়ে কি ঈদের খুশি হয়? নির্মিত হয় কি সামাজিক সংহতি? প্রতিষ্ঠা পায় কি শান্তি? ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তির সংস্কৃতি গড়ে না, গড়ে দানের সংস্কৃতি। ইসলাম তাই ধনীকে বরং গরীবের দরজায় ছুটতে বলে। খলিফা হযরত উমর (রা:) তাই আটার বস্তা নিজের কাঁধে চাপিয়ে ক্ষুদার্ত মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। সম্পদ-লাভ এভাবেই মু’মিনের জীবনে অহংকার না বাড়িয়ে দায়িত্ববোধ বাড়ায়। অর্থ এভাবেই তাঁকে পরীক্ষার মুখে ফেলে। ইসলাম চায় সমাজের ধনী-দরিদ্র সর্বস্তরের মানুষের মাঝে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত একতা। দানখয়রাত এবং গরীবের কল্যাণ চিন্তা সে একতার নির্মাণে সিমেন্টের কাজ করে। দুস্থ দরিদ্র জনগণ তখন সমাজের হৃদয়বান স্বচ্ছলব্যক্তিদের আপন ভাবতে শেখে। শোষন-নির্ভর পুঁজিবাদী দেশে ধনী-দরিদ্রের যে বিশাল বিভাজন ও বিভেদ সেটি রাজনৈতীক লড়াই ও রক্তক্ষয়ী শ্রেণীযুদ্ধের জন্ম দেয়্, কিন্তু ইসলামী সমাজে সেটি ঘটে না। বরং সমাজের ধনী ব্যক্তিগণ বুঝে,অর্থসম্পদ তাদের উপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত। যেরূপ পবিত্র আমানত হলো তার নিজ জীবন। মু’মিনের দায়িত্ব হলো, অর্পিত এ আমানতকে আল্লাহরই নির্দেশিত পথে ব্যয় করা। নইলে প্রচণ্ড খেয়ানত হয়। আর সে খেয়ানত ইহকালে আযাব এবং পরকালে জাহান্নাম ডেকে আনে। তাই মু’মিন ব্যক্তি সম্পদশালী হলে জীবন যাপনে স্বেচ্ছাচারি হয় না,এবং স্বেচ্ছাচারি হয়না সম্পদের ব্যয়েও। আর এমন একটি আত্মসচেতন ও আত্মসমর্পিত চেতনার কারণেই বাংলাদেশের মত একটি দরিদ্র দেশেও ঈদুল ফিতরের উৎসবে বহু শতকোটি টাকা ধনীর পকেট থেকে গরীবের ঘরে গিয়ে পৌঁছে। ফিতরার অর্থের সাথে যোগ হয় বহু শত কোটি টাকার যাকাতের অর্থ। ফলে আনন্দের ছোয়া লাগে লক্ষ লক্ষ গরীব মানুষের ঘরে। মুসলিম সমাজে এমন অর্থ হস্তান্তরের ফলে ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে বহু কোটি দরিদ্র মানুষের। ফলে রক্ত-সঞ্চালন হয় অর্থনীতিতে। মুসলিম দেশ তো এই ভাবেই সামাজিক কল্যাণ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এগুয়। একই ভাবে ঈদুল আযহার দিনে হাজার হাজার টন কোরবানীর গোশত বিতরণ হয় মুসলমানদের ঘরে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে মক্কা থেকে কোরবানীর গোশত গিয়ে পৌছে বহু হাজার মাইল দূরের শত শত ইয়াতিম খানা,উদ্বাস্তু শিবির ও দুস্থ্য পল্লীতে। অর্থাভাবে বা পুষ্টির অভাবে মুসলিম প্রাণ হারাবে সেটি একারণেই অভাবনীয়। এবং সেটি ঘটলে বুঝতে হবে,সে সমাজ যে শুধু বিবেকশূণ্য তাই নয়, ইসলামশূণ্যও। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যাকাতের অর্থ নেয়ার লোক পাওয়া যেত না মদিনাতে। অর্থের সুষ্ঠ বণ্ঠন হলে প্রতি সমাজেই তেমনটি ঘটে। অভাব, দুর্ভিক্ষ ও অনাহারে মৃত্যু তো সামাজিক অবিচার,অর্থনৈতিক শোষণ,রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বৃত্তির ফল। অতীতে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে তো এগুলির ফলে। একই কারণে,দুনিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু নগরীতে বহু দুস্থ্য মানুষের বাস।

অনন্য উৎসব সমগ্র মানবসংস্কৃতিতে

প্রতি ধর্মে এবং প্রতি জাতির জীবনেই উৎসব আছে। আনন্দ প্রকাশের নানা দিনক্ষণ,পর্ব এবং উপলক্ষও আছে। কিন্তু ইসলামের ঈদে যেরূপ সার্বজনীন কল্যাণ চিন্তা আছে সেটি কি অন্য ধর্মে আছে? ইসলামের ন্যায় অন্য কোন ধর্মে ধনীদের উপর দরিদ্রদের জন্য অর্থদান বাধ্যতামূলক? খৃষ্টান ধর্মে সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ক্রীসমাস। এ উৎসবে বিপুল সাজ-সজ্জার আয়োজন আছে,বিস্তর অর্থব্যয়ও আছে। কিন্তু সে উৎসবে যাকাত-ফিতরার ন্যায় গরীব মানুষের অর্থদানের নির্দেশ নেই। ক্রীসমাসের দিনে যে ভোজের আয়োজনের করা হয় সেগুলি নিতান্তই পারিবারীক। তাতে বিপুল আয়োজন হয় খাদ্য ও পানীয়ের। মদ্যপান হয়, নাচগানও হয়। বিপুল আদান-প্রদান হয় উপহারের। কিন্তু সে উৎসবে দরিদ্র মানুষের কি ভাগ আছে? সেসব পারিবারীক ভোজে এবং উপহারের আদান প্রদানে পরিবারের বাইরের মানুষের কোন অধিকার নেই। তাছাড়া ক্রীসমাসের উৎসবে প্রকৃতির উপর নাশকতাই কি কম? কোটি কোটি গাছ কেটে ঘরে ঘরে ক্রীসমাস ট্রি সাজানো হয়। উৎসবের পর সে সবুজ গাছগুলোকে আবর্জনার স্তুপে ফেলা হয়।একই ভাবে বিপুল তছরুপ হয় পুঁজা উৎসবে। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে ও হাজার হাজার মুর্তি নির্মাতার বহু শ্রমে গড়া হয় হাজার হাজার মুর্তি। কিন্তু এত শ্রম,এত অর্থ,এত কাট-মাটি ও রংয়ে গড়া মুর্তিগুলি অবশেষে পানিতে ফেলা হয়। এতে দূষিত হয় নদী ও জলাশয়ের পানি। ভারতীয় হিন্দুদের বড় উৎসব হলো দেয়ালী। সেখানেও কি নাশকতা কম? শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয় বৈদ্যুতিক বাতিতে শহরগুলি সাজাতে। বিপুল অর্থ ব্যয় হয় আতশ বাজীতে। তাতে যেমন পরিবেশদূষণ ঘটে,তেমনি মাঝে মাঝে ভয়ানক দূর্ঘটনাও ঘটে। অথচ এত অর্থব্যয়ের মাঝে গরীবের অর্থদানের কোন ব্যবস্থা নাই। পুজার মন্ডপে আয়োজিত হয় হিন্দি ফিল্মি গান ও অশ্লিল নাচ। ফলে পবিত্রতা কোথায়? কোন আয়োজন তো তখনই পবিত্রতা পায় যখন সেটি একমাত্র মহানস্রষ্টাকে খুশি করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়। এবং যিকর হয় তাঁর পবিত্র নামের। কিন্তু যেখানে ফিল্মি গান ও নাচের অশ্লিলতা সেখানে কি পবিত্রতা থাকে? ইসলামের ঈদে কি এমন অপচয়, এমন নাচগান ও অশ্লিলতার আয়োজন আছে? বর্ষবরণ,বসন্তবরণ,জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশে যে উৎসব হয় তাতেও কী গরীব মানুষের কোন কল্যাণ চিন্তা থাকে? থাকে কি পবিত্রতা?

অথচ ঈদের উৎসবের শুরু আতশবাজি বা উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে নয়। এতে নাচগান যেমন নেই, তেমন মদ্যপানও নেই। বরং দিনের শুরুটি হয় অজু-গোছলের মধ্য দিয়ে। পরিবারের সবাই পরিধান করে উত্তম পোষাক। পাঠ করা হয় মহান আল্লাহর নামে তাকবীর। এভাবে দিনের শুরু থেকেই প্রাধান্য পায় পবিত্রতা। মহল্লার ঈদগাহে বা মসজিদে সে হাজির হয় আল্লাহর নামে তাকবীর দিতে দিতে। এদিনটিতে বিশাল জামায়াতে নামায হয়, খোতবাহ হয় এবং আল্লাহর দরবারে সমবেত দোয়া হয়। দোয়া শেষে একে অপরের সাথে কোলাকুলি হয়। এরপর শুরু হয় প্রতিবেশীর গৃহে ঈদের শুভেচ্ছা-সাক্ষাতের পালা। ঈদের এ দিনটিতে ঘরের দরওয়াজা সবার জন্য খোলা। কারো গৃহে মেহমান হওয়ার জন্য এ দিনে কোন দাওয়াতের প্রয়োজন পড়ে না। আত্মীয় হওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। মহল্লার যে কেউ যে কোন গৃহে কুশল বিনিময়ে হাজির হতে পারে। এরূপ নির্মল আয়োজন কি অন্য ধর্মে আছে? ইসলাম যেমন জামায়াতবদ্ধ ভাবে নামায আদায়ের উপর গুরুত্ব দেয়,তেমনি জামায়াতবদ্ধতা ও সমাজবদ্ধতার গুরুত্ব দেয় উৎসব পালনেও। ঈদের দিন বেশী বেশী মানুষের সাথে দেখা হবে, কুশল বিনিময় হবে এবং কোলাকোলি হবে –তেমনি একটি লক্ষ সামনে রেখে নবীজী (সা:) সূন্নত হলো ঈদগাহের নামাযে এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং অন্য পথ দিয়ে ফেরার।

 

ঈদ দেয় মিশন নিয়ে বাঁচার নব প্রত্যয়

অনর্থক গাছ কাটা দূরে থাক, গাছের একটি ডাল ভাঙ্গা বা পাতা ছেড়াও ইসলামে হারাম। ফলে কোটি কোটি বৃক্ষ নিধন করে উৎসব পালন কীরূপে ধর্মীয় কর্ম রূপে গণ্য হতে পারে? অপর দিকে মদ্যপান এবং নাচ-গান ব্যক্তির মন থেকে আল্লাহর স্মরণকে বিলুপ্ত করে। বিনষ্ট করে সত্যসন্ধানী মানুষের ধ্যানমগ্নতা,এবং বিচ্যুতি আনে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে। অন্য বহুজাতির উৎসবে যেমন মদ্যপান আছে তেমনি নাচগাণ এবং অশ্লিলতাও আছে। ফলে প্রচণ্ডতা পথভ্রষ্টতাও আছে। শয়তান সরাসরি আল্লাহকে অস্বীকার করতে বলে না, মুর্তিকেও পুজা করতে বলে না। হযরত আদম (আ:)কে ইবলিস কখনই এমন অবাধ্য হতে বলেনি। কিন্তু মিথ্যা প্রলোভনে সে ভূলিয়ে দিয়েছিল মহান আল্লাহর দেয়া নির্দেশকে। ভুলিয়ে দেয় আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্য। মদ্যপান ও নাচ-গান তো সেটিই করে। ফলে মুসলমানের উৎসবে যেমন নাচগান নাই, তেমনি মদ্যপানও নাই। কোনরূপ অশ্লিলতাও নাই। সকল প্রকার ভেদা-ভেদ ভূলে এক জামায়াতে নামায পড়া এবং অন্যকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করা,নিজঘরে প্রতিবেশীকে আপ্যয়ন করা হলো ইসলামের সংস্কৃতি। এমন আলিঙ্গণে ও আপ্যায়নে ধনী-দরিদ্র,আমির-উমরাহ,শাসক-প্রজার মাঝে কোন দুরত্ব রাখার সুযোগ নাই। বরং সবাইকে একই সমতলে খাড়া করে। এবং বিলুপ্ত করে বর্ণভেদ, গোত্রভেদ ও শ্রেণীভেদের বিভক্তি। উচ্চতর সমাজ নির্মাণে অপরিহার্য হলো মানুষে মানুষে এমন ভাতৃত্ব ও সৌহার্দ। সভ্যতর ও সমৃদ্ধতর সমাজ নির্মাণে এমন ভাতৃত্ব হলো সবচেয়ে বড় পুঁজি তথা সোস্যাল ক্যাপিটাল। মুসলমানের জীবনে এটিই তো মহান মিশন। মিশন এখানে বিভক্তির দেওয়াল ভাঙ্গার। প্রকৃত মুসলমান ঈদের উৎসবমুখর দিনেও সে পবিত্র মিশন ভূলে না। বরং সে মিশন নিয়ে বাঁচায় পায় নব প্রত্যয়। সমগ্র মানবসংস্কৃতিতে এমন পবিত্র ও সৃষ্টিশীল উৎসব কি দ্বিতীয়টি আছে? (তৃতীয় সংস্করণ, ২৫/০৭/১৪, দ্বিতীয় সংস্করণ ২/০৮/১৩), প্রথম সংস্করণ ১৭/০৮/১২ (২৯শে রামাদ্বান, ১৪৩৩)।




অর্জিত হচ্ছে কি রমযানের রহমত?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

কোথায় সে রহমত প্রাপ্তি?

?

সেটিই বা কতটা অর্জিত হচ্ছে?

দায়িত্ব ও প্রশিক্ষণ

তাঁরা ব্যর্থ হয়েছে সে ট্রেনিং সমুহ থেকে শিক্ষা নিতে। ফলে তারা দারুন ভাবে ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফার দায়িত্ব পালনে। বরং পরিণত হয়েছে শয়তানের খলিফায়। শয়তান চায়, মানব সন্তানগণ তাদের সামর্থ্যের বিনিয়োগ করুক ব্যক্তি স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্বার্থ ও গোত্রীয় স্বার্থকে বিজয়ী করতে এবং পরিত্যক্ত হোক ইসলামকে বিজয়ী করার এজেন্ডা। শয়তান তার এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে সফল হয়েছে। এবং মুসলিমদের মাঝে বেড়েছে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডার সাথে গাদ্দারী। ফলে ৫৭টি মুসলিম দেশের কোথাও ইসলাম বিজয় পায়নি। নামায, রোযা, হজ্জ, ও যাকাত যে কারণে ফরজ করা হয়েছিল -সেটিও অর্জিত হয়নি।

যে ব্যর্থতা রোযায়

নিছক মোনাজাত ও নফল ইবাদতে সেটি সম্ভব হলে হয়তো ইতিমধ্যেই সেটি জুটতো। কারণ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে সেগুলোই সবচেয়ে বেশী বেশী হচ্ছে।

আনে কাফের, জালেম ও ফাসেক বলা হয়েছে, মুসলিম দেশে সে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাই নাই। ফলে মাহে রমযান থেকে কোথায় সে তাকওয়া অর্জন?   

মুমিন ব্যক্তিকে মহান আল্লাহতায়ালা অবশ্যই ক্ষমা করেন। কিন্তু সে ক্ষমাপ্রাপ্তির জন্য পূর্বশর্ত আছে। সেটি যেমন তাকওয়া অর্জন, তেমনি ইসলামে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। পূর্ণ আত্মসমর্পণ না করে নিছক দয়া ভিক্ষায় যে লাভ হয় না -সেটিই এ আয়াতে সুস্পষ্ঠ করা হয়েছে।

তাকওয়ার সংস্কৃতি ও বিদ্রোহের সংস্কৃতি

আনে এমন বিদ্রোহীকে শাস্তির ঘোষনা শোনানো হয়েছে বার বার। অথচ সেরূপ বিদ্রোহ মুসলিম জীবনে সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বিদ্রোহের এ সংস্কৃতিতে কি শরিয়ত পালিত হয়?

সঞ্চয় ও সম্ভোগও করে। তবে সে উপার্জন ও সম্ভোগের মধ্যে মহান আল্লাহতায়ালা হারাম-হালালের বিধিনিষেধ বেঁধে দিয়েছেন। তাকওয়া হলো সে বিধিনিষেধগুলো মেনে চলা।

এভাবেই মুসলিম জীবনে সৃষ্টি হয় তাকওয়া তথা মহান আল্লাহতায়ালাকে ভয় করে চলার সংস্কৃতি।

সাংস্কৃতিক জীবনেও তাঁর অবাধ্যতা। ফলে রাষ্ট্র মুক্ত হয় তাঁর হুকুমের বিদ্রোহীদের থেকে।

সে রহমত কি শয়তানের বিজয়কে আরো বলবান করতে?

মাস কোরআন নাযিলের

?

নামাযে নিদারুণ ব্যর্থতার বিষয়গুলি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

নামাযের কেন এতো গুরুত্ব?

যে ইবাদতটি অমুসলিম থেকে মুসলিমকে পৃথক করে -তা হলো নামায। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নামায কাফের ও মুসলিমের মাঝে দেয়াল রূপে কাজ করে। নামায না থাকলে মুসলিম আর অমুসলিমের মাঝে কোন পার্থক্যই থাকে না, উভয়ে একাকার হয়ে যায়। ব্যক্তির ঈমান দেখা যায় না। রোযাও দেখা যায় না –যদি সে নিজে থেকে তা প্রকাশ না করে। তেমনই কে যাকাত দেয়, সেটিও বুঝা যায় না –যদি না সে ব্যক্তি অন্যদের জানিয়ে দেয়। আর হজ্জ তো সবার জন্য ফরজ নয়; ফলে হজ্জ না করাতে কেউ অমুসলিম হয় না। কিন্তু নামায দেখা যায়। কারণ নামাযে যে শুধু দৃশ্যমান ক্বিয়াম, রুকু, সিজদা ও বৈঠক আছে –তা নয়। নামায পড়তে হয় লোকালয়ের মসজিদে হাজির হয়ে। ঘরে বা দোকানে নামায পড়লেও তা অন্যদের নজরে পড়ে। তাই কে নামাযী আর কে বেনামাযী -সমাজে সেটি গোপন থা্কে না। অপর দিকে নামাযই ব্যক্তির ঈমানের পরিমাপ দেয়; মুসলিম না অমুসলিম -সেটিও প্রকাশ করে দেয়। প্রতিদিনের প্রশিক্ষণে যদি কোন সৈনিক হাজির না হয় তবে সৈনিকের খাতায় তার নাম থাকে না। কারণ, সৈনিক জীবনে থাকে যুদ্ধের দায়বদ্ধতা। দায়িত্ব পালনের সে সামর্থ্য কখনোই প্রশিক্ষণ ছাড়া সৃষ্টি হয়না। ফলে প্রশিক্ষণে আগ্রহ নাই -এমন ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভর হয় সৈনিক হওয়া। ফলে বহিস্কৃত হয় সেনা বাহিনী থেকে। তেমনি মসজিদের জামায়াতে যে ব্যক্তি হাজির হয় না -তাকেও কি মুসলিম বলা যায়? মুসলিম মাত্রই তো মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক; এবং তাঁর জীবনে আমৃত্যু যুদ্ধটি হলো অন্যায়ের নির্মূলে ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। সে যুদ্ধেও তো সামর্থ্য ও কোরবানী চাই। চাই তাকওয়ার বল। নামায-রোযা এবং হজ্জ-যাকাতের ইবাদত তো সে তাকওয়া, সামর্থ্য ও কোরবানী বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ। এরূপ প্রশিক্ষণে মুনাফিকদের অংশগ্রহণ থাকে না। তারা হাজির হয়না মসজিদে ৫ ওয়াক্ত নামাযে –বিশেষ করে ফজর ও এশার নামাযে। ফলে তাদের দেখা যায়না ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদে। এভাবেই প্রকাশ পায় তাদের মুনাফিকি।  

কোন বেনামাযী যে জান্নাতে যাবে না -তা নিয়ে বিতর্ক নাই। কারণ, জান্নাত তো একমাত্র ঈমানদারদের জন্য। সে পবিত্র স্থানে বেঈমানের কোন স্থান নেই। আর ঈমানদার তো সেই যে নামায পড়ে। আগুন জ্বললে, উত্তাপ দিবেই। তেমনি হৃদয়ে ঈমান প্রবেশ করলে, সে ব্যক্তির জীবনে নামায-রোযা আসবেই। আগুন থেকে যেমন তার উত্তাপকে আলাদা করা যায় না, তেমনি ঈমানদার থেকে পৃথক করা যায় না তার নামাযকে। হাদীসে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম যে ইবাদতের হিসাব নিবেন সেটি হলো নামায। সুরা মুলকে বলা হয়েছে, জাহান্নামবাসীদের জিজ্ঞাসা করা হবে তোমরা কীরূপে এখানে পৌঁছলে? সর্বপ্রথম যে কারণটিকে তারা উল্লেখ করবে তা হলো, তারা নামায পড়তো না। নামাযের মূল্য বেনামাযীগণ ইহকালে না বুঝলেও বুঝবে জাহান্নামে পৌঁছার পর। জাহান্নামবাসীদের সে বেদনাদায়ক উপলব্ধিকে মহান আল্লাহতায়ালা কুর’আনে উল্লেখ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। সেটি হলো, যাদের জীবনে এখনো মৃত্যু আসেনি তাদেরকে সাবধান করতে। জাহন্নামে পৌঁছার আগে তথা দুনিয়ার বুকে থাকতেই তারা যেন বুঝতে পারে নামাযের গুরুত্ব। নইলে জাহান্নামে পৌঁছে শুধু আফসোসই হবে, করার কিছু থাকবে না। কুর’আন মজীদ মানব জীবনের রোডম্যাপ। এ রোডম্যাপ শুধু জান্নাতের পথই দেখায় না, পথ চলায় ভূল হলে -সে ভূলটিও তুলে ধরে। সামনে অপেক্ষামান জাহান্নামের বিপদের কথাও বলে।    

 

কীরূপে ব্যর্থ হয় নামায?                                                                 

আঁখ চিনিকলে নিক্ষিপ্ত হলে চিনিতে পরিণত হয়। সেরূপ না হলে বুঝতে হবে চিনিকলে ত্রুটি রয়েছে? নামাযের মধ্যেও তেমনি একটি প্রক্রিয়া কাজ করে -যা পরিশুদ্ধি আনে ব্যক্তির জীবনে। সে পরিশুদ্ধি না এলে বুঝতে হবে নামাযে ত্রুটি আছে। এবং ত্রুটি কোথায়, সেটি বুঝতে হলে নামাযকে মিলিয়ে দেখতে হয় সাহাবীদের নামাযের সাথে। কারণ, তাঁরাই হলেন নামাযসহ সকল ইবাদত-বন্দেগীর অনুকরণীয় মডেল। নামাযের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ শুধু ক্বিয়াম, রুকু, সিজদা বা বৈঠক নয়। স্রেফ সুরা পাঠ, তাশাহুদ পাঠ, দরুদ ও তাসবিহ পাঠও নয়।  বরং সেটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে নামাযীর মনের সংযোগ। এবং সে সংযোগটি ঘটে তাঁর রহমত, কুদরত, ফজিলত ও আয়াত সমূহের স্মরণের মধ্য দিয়ে। সুরা বাকারা’য় বলা হয়েছে, “ফাযকুরুনি আযকুরুকুম” অর্থ: “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো।” এটি বান্দার প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ঘোষিত পবিত্র ওয়াদা। আর ওয়াদা পালনে তাঁর চেয়ে আর কে শ্রেষ্ঠ হতে পারে? সুরা যুখরুফে বলা হয়েছে, কারো মন থেকে যখন আল্লাহতায়ালার স্মরণ বিলুপ্ত হয় তখন তার উপর শয়তান নিযুক্ত করে দেয়া হয়। এবং সে শয়তান তাকে জাহান্নামে নেয়। সুরা হাশরে বলা হয়েছে যারা মহান আল্লাহতায়ালাকে ভূলে থাকে তাদের জীবন থেকে ভূলিয়ে দেয়া হয় নিজেদের  কল্যাণের বিষয়গুলি। নামাযের মুল কাজ তো ঈমানদারের মনে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণকে জাগ্রত করা। সেটি শুরু হয় নামাযের আযান ও ওযু থেকে। নামাযে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণের মাধ্যমে ঈমানদার নিজেও স্থান করে নেয় মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণে। এটিই তো নামাযের শ্রেষ্ঠ দান।

কিন্তু নামাযীর মন থেকে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ বিলুপ্ত হলে কি সে নামাযের কোন মূল্য থাকে? সেটি তো মনের এক চেতনাহীন বেহাল অবস্থা। সেরূপ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পবিত্র কুর’আনে  বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ, তোমরা মাদকাসক্ত অবস্থায় নামাযের নিকটবর্তী হয়োনা -যতক্ষণ না তোমরা যা পড় তা বুঝতে না পারো…”। –(সুরা নিসা, আয়াত ৪৩)। উপরুক্ত আয়াতে রয়েছে চিন্তা-ভাবনার এক গুরুতর বিষয়। আয়াতটি যখন নাযিল হয়, মদ তখনও হারাম হয়নি। ফলে নবীজী (সা:)’র অনেক সাহাবী মাতাল অবস্থায় মসজিদে হাজির হতেন। মদপানের কুফল হলো, এতে বিলুপ্ত হয় চিন্তা-ভাবনার ক্ষমতা। তখন নামাযীর মন থেকে বিলুপ্ত হয় মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ। এবং বিলুপ্ত হয় মহান মা’বুদের সাথে বান্দার মনের সংযোগ। ফলে নামাযে পবিত্র কুর’আন থেকে যা কিছু তেলাওয়াত হয় -তাতে মনযোগ দেয়া তখন অসম্ভব হয়। তখন অসম্ভব হয় চেতনায় জাগরন বা পরিশুদ্ধি। আর চেতনায় পরিশুদ্ধি না আসলে চরিত্রে পরিশুদ্ধি আসবে কীরূপে? অথচ কুর’আন নিজেই যিকরের কিতাব। সে যিকরের সাথে নিজেকে জড়িত করতে তো যিকির রত মন চাই। সুরা ক্বাফে বলা হয়েছে, “ইন্না ফি যালিকা লা যিকরা লিমান কানা লাহু ক্বালবুন আও আলকাস সাময়া ওয়া হুয়া শাহীদ।” অর্থ: নিশ্চয়ই এ কিতাব (কুর’আন)’র মধ্যে রয়েছে যিকর; (এবং সেটি) তাদের জন্য যাদের রয়েছে ক্বালব এবং যারা কাজে লাগায় শ্রবনশক্তিকে এবং সাক্ষ্য দেয় সত্যের পক্ষে। –(সুরা ক্বাফ, আয়াত ৩৭)। অর্থাৎ কুর’আন থেকে শি্ক্ষা নিতে চাই জাগ্রত ক্বালব, তীক্ষ্ণ শ্রবনশক্তি এবং সত্যকে সত্য রূপে দেখার দৃষ্টিশক্তি। মাদক-সেবন এর সবগুলিই কেড়ে নেয়। ফলে ব্যহত হয় সুস্থ্য বিবেক নিয়ে ও প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। পবিত্র জায়নামাযে নামাযীর এরূপ মাদকাসক্তি ও মনযোগহীনতা মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহাতায়ালার কাছে ভাল লাগেনি। তাই হুকুম দিয়েছেন মাদকাসক্ত চেতনাহীনতা নিয়ে নামাযে না দাঁড়াতে।

শ্রেষ্ঠ যিকর

মু’মিনের উত্তম যিকর হলো তাঁর নামায। এরূপ পবিত্র যিকির পীরের খানকায়, সুফি হালকায় বা বনে-জঙ্গলে সম্ভব নয়। তাই পবিত্র কুর’আনে  সে সব খানকায়, হালকায় ও বনে-জঙ্গলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি। বরং নির্দেশ এসেছে নামাযে ছুটে যাওয়ার। সুরা জুম্মায়াতে বলা হয়েছে, “যখন জুম্মার দিনে নামাযের জন্য ডাকা (আযান দেয়া) হয়, তখন তোমরা আল্লাহর যিকিরে ( অর্থাৎ নামাযে) ছুটে যাও।” নামায ঈমানদারকে প্রতিদিন ৫ বার সে যিকরে হাজির করে। ঈমানদার ব্যক্তি এভাবে শুধু নিজেই মহান আল্লাহতায়ালার যিকর করে না, বরং অন্ততঃ দিনে ৫ বার মহা প্রভুর স্মরণে জায়গা করে নেয়। এভাবেই গড়ে উঠে মা’বুদের সাথে বান্দার গভীর সম্পর্ক।

বস্তুত প্রতিটি ইবাদতই হলো মহান আল্লাহতায়ালার যিকর। রোযার যিকর হয় সমগ্র দিন ব্যাপী; এবং সেটি সমগ্র রমযানের মাস জুড়ে। হজ্জে সে যিকর চলে হজ্জের ইহরাম বাধাকালীন সময়ে। মহান আল্লাহতায়ালার যিকর তখনও হয় যখন বান্দা যাকাত দেয়। এদিক দিয়ে নামায অনন্য; যিকরের আয়োজন হয় কম পক্ষে দিনে ৫ বার এবং চলে আমৃত্যু। যারা তাহাজ্জুদ ও নফল নামায পড়ে -তাদের জীবনে যিকরের মাত্রা আরো অধিক ও দীর্ঘ। অপর দিকে একমাত্র নামাযেই যিকরের কিতাব তথা পবিত্র কুর’আন থেকে পাঠ করাটি বাধ্যতামূলক; রোযা, হজ্জ বা যাকাতের ন্যায় অন্য কোন ইবাদতে সে হয়না।

সর্বকালে ও সর্বজনপদে মানবের মনে যিকর তথা ধ্যানমগ্নতাকে প্রতিষ্ঠা দেয়াই হলো মহান আল্লাহতায়ালার নীতি। কারণ এ যিকরই দেয় জান্নাতের পথে চলার আগ্রহ। দেয় সত্য পথের সন্ধান। এবং মজবুত করে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে বন্ধন। সে যিকর প্রতিষ্ঠায় প্রতি যুগেই নামায গণ্য হয়েছে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম রূপে। তাই হযরত মূসা (সা:)’র সাথে প্রথম বাক্যালাপেই তাঁকে যে নির্দেশটি দেন সেটি হলো নামাযের। হযরত মূসা (সা:)’র সাথে মহান আল্লাহতায়ালার প্রথম বাক্য বিনিময় হয় পবিত্র তুয়া উপত্যাকায়। নিজ পরিবারকে নিয়ে তখন তিনি মিশরে ফিরছিলেন। হযরত মূসা (সা:)কে নির্দেশ দেয়া হয়, “নিশ্চয় আমিই আল্লাহ এবং আমি ছাড়া আর কোন ইলাহা নাই। অতএব আমার ইবাদত করো এবং প্রতিষ্ঠা দাও নামাযকে –যাতে আমার যিকর করতে পার।” –(সুরা ত্বাহা, আয়াত ১৪)।  

নামাযে যিকরের মূল ভূমি হলো কুর’আনে র আয়াত। নামাযীর মনের গভীরে মহান আল্লাহাতায়ালা তাঁর পবিত্র বাণীগুলি গেঁথে দেন পবিত্র কুর’আনের আয়াতগুলির মাধ্যমে। নামাযীর চেতনার সাথে হয় মহাপ্রভুর সংলাপ। তখন ধ্যানমগ্ন হয় নামাযীর মন। কিন্তু ধ্যানের সে সামর্থ্য মাতাল ব্যক্তির অবচেতন মনের থাকে না। তখন ব্যর্থ হয় নামাযের মূল উদ্দেশ্য। সে ব্যর্থতা থেকে বাঁচাতেই মদ পান করে নামাযে আসা হারাম। এবং পরবর্তীতে পুরাপুরি হারাম ঘোষিত হয় মদ্যপান। তবে দুর্ভাবনার আরেকটি গুরুতর কারণ হলো, মানব মনের যিকরের সে সামর্থ্যটি শুধু মদই কেড়ে নেয়, একই ভাবে কেড়ে নেয় কুর’আন বুঝার অক্ষমতাও। তখন নামায ব্যর্থ হয় নামাযীর জীবনে কাঙ্খিত চারিত্রিক বিপ্লব আনতে।

তাই কত কোটি লোক নামায পড়লো সেটিই বড় কথা নয়। কতজন দুর্বৃত্তকে নামায চরিত্রবান করলো, কতজনকে ফিরালো পাপকর্ম থেকে এবং কতজনকে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার মুজাহিদে পরিণত করলো -সেটিই মূল কথা। এক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলির কোটি কোটি নামাযীর ব্যর্থতাটি বিশাল। ব্যর্থতার দলিল হলো: নামায পড়েও কোটি কোটি মানুষ মিথ্যা বলছে, ঘুষ খাচ্ছে, সূদ খাচ্ছে, দুর্নীতি করছে এবং শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে রাজনীতিও করছে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলি রেকর্ড গড়ছে দুর্বৃত্তিতে। এক্ষেত্রে ব্যর্থতাটি নামাযের নয়, বরং যারা নামায পড়ে তাদের। নামাযী ব্যর্থ হচ্ছে নামাযে দাঁড়িয়ে ধ্যানমগ্ন হতে। নামাযী ব্যর্থ হচ্ছে নামাযে দাঁড়িয়ে নিজ জীবনের হিসাব নিতে। এরূপ ব্যর্থতার মূল কারণ, নামাযীদের কুর’আন বুঝার অক্ষমতা। মদের প্রভাব কয়েক ঘন্টায় শেষ হয়। কিন্তু কুর’আন বুঝার ক্ষেত্রে যে অক্ষমতা, সেটি ব্যক্তিকে অক্ষম রাখে আমৃত্যু। এ অক্ষমতা ডেকে আনে মানব জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক ব্যর্থতা।সেটি জাহান্নামে পৌঁছার। ঈমান পুষ্টি পায় পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান থেকে। তাই মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো কুর’আন বুঝার সক্ষমতা অর্জন। এজন্যই নামায-রোযার পূর্বে কুর’আনে র জ্ঞান লাভ ফরজ করে হয়েছে। সে ভয়ানক ব্যর্থতা থেকে বাঁচতেই মিশর, ইরাক, সিরিয়া, সূদান, মরক্কো, আলজিরিয়া, লিবিয়া, মালি, তিউনিসিয়ার ন্যায় বহু দেশের জনগণ মাতৃভাষাকে দাফন করে কুর’আনের ভাষাকে আপন করে নেয়। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, ভাষাপ্রেম তাদের জান্নাতে নিবে না। বরং জান্নাতে নিবে কুর’আনের জ্ঞান।           

মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান হলো পবিত্র কুর’আন। এ কুর’আনই দেখায় জান্নাতের পথ। দেয় সভ্যতর ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের রোডম্যাপ। কুর’আনে র কারণেই নামাযের শ্রেষ্ঠত্ব। প্রতিটি নামাযীকে নামাযের প্রতি রাকাতে কুর’আনে র কিছু অংশ পাঠ করতে হয়। নইলে নামাযই হয় না। নামাযের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো ক্বিয়াম অর্থাৎ জায়নামাযে দাঁড়ানো থাকাকালীন সময়। এ সময়টিতে কুর’আন থেকে কিছু পাঠ করা হয়। কুর’আন পাঠের সে কাজটি রুকু, সিজদা বা বসাকালীন সময়ে হয় না। তাই যে নামাযে দীর্ঘ সময় ক্বিয়ামে কাটানো হয় -সে নামাযের ওজন অধিক। নামাযের সাথে কুর’আনে র গভীর সম্পর্কের বর্ণনাটি এসেছে সুরা আরাফে। বলা হয়ছে, “এবং যারা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলো কুর’আনকে এবং প্রতিষ্ঠা দিল নামাযকে, নিশ্চয়ই আমরা (এরূপ) সৎকর্মশীলদের প্রতিদানকে নষ্ট করিনা।”–(আয়াত ১৭০)। একই রূপ বর্ণনা এসেছে সুরা আনকাবুতে। বলা হয়েছে, “(হে মুহম্মদ), তোমার উপর ওহী রূপে যা নাযিল করেছি তা পাঠ করো কিতাব থেকে (অর্থাৎ কোরআনকে) এবং প্রতিষ্ঠা দাও নামাযকে। নিশ্চয়ই নামায বাঁচায় ফাহেশা (অশ্লিলতা, জ্বিনা, পাপাচার) ও দুর্বৃত্তি থেকে। এবং নিশ্চয়ই আল্লাহর যিকরই সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম। এবং আল্লাহ জানেন যা কিছু তোমরা করো। –(সুরা আনকাবুত, আয়াত ৪৫)। উপরুক্ত দুটি আয়াতে  পবিত্র কুর’আন এবং নামাযে কুর’আন পাঠের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দিনের অন্য সময়ে কুর’আন পাঠের সুযোগ না মিললেও সেটিকে ৫ বার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে নামাযে সুরা তেলাওয়াতের মাধ্যমে। রোগের ভ্যাকসিন নিলে সে রোগ থেকে বাঁচা যায়। তখন শরীরে বাড়ে রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা। কুর’আনের জ্ঞান ব্যক্তির চেতনা রাজ্যে তেমনি এক ভ্যাকসিনের কাজ করে। তখন বাড়ে দুষ্ট মতবাদ, মিথ্যা ও ফাহেশার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা। ফলে যে ব্যক্তি কোর’আন বুঝার সক্ষমতা নিয়ে প্রতিদিনে ৫ ওয়াক্ত নামায আদায় করে সে বাঁচে সকল প্রকার অশ্লিলতা, জ্বিনা, মিথ্যাচার, পাচার ও দুর্বৃত্তি থেকে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়েছে মিরাজের পর অর্থাৎ হিজরাতের মাত্র এক বা দেড় বছর আগে। প্রশ্ন হলো, এর আগে প্রায় ১১ বছর যাবত মক্কায় অবস্থান কালে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ কি করতেন? সে সময় কি ছিল তাঁদের ইবাদতের ধরণ? সে সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি ছিল পবিত্র কুর’আন পাঠ তথা কুর’আনের জ্ঞানার্জন। জ্ঞানই গড়ে চেতনা ও চরিত্র। অজ্ঞ ও জ্ঞানী ব্যক্তির চেতনা-চরিত্র কখনোই একই রূপ হয়না। সাহাবায়ে কেরাম যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব গড়ে উঠতে পরেছিলেন তার মূলে ছিল পবিত্র কুর’আনের গভীর জ্ঞান। নবুয়ত লাভের পর প্রথম যে কয়েকটি সুরা নাযিল হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম হলো সুরা মুজাম্মিল। এ সুরায় নবীজী (সা:)’র উপর নির্দেশ এসেছে যেন তিনি রাতের অর্ধেক অংশ বা তার চেয়ে কিছু বেশী বা কম অংশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পবিত্র কুর’আন থেকে আস্তে আস্তে তেলাওয়াত করেন। সাহাবাগণও সেটিই করতেন। ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজ হওয়ার পূর্বে ১১ বছর ধরে সে কাজ অবিরাম ভাবে চলতে থাকে। এভাবেই সাহাবাদের হৃদয়ে গভীর ভাবে স্থান করে নেয় পবিত্র কুর’আনে র জ্ঞান। সে জ্ঞানের উপর নির্মিত হয় তাদের বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও চারিত্রিক কাঠামো। এভাবে তারা বেড়ে উঠেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে।

যে নামায কল্যাণ আনে

নামায মুসলিম জীবনে কল্যাণ দিবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আজকের মুসলিম জীবনে নামাযের সে কল্যাণ কতটুকু? বাস্তবতা হলো, কোটি কোটি মানুষ নামায পড়লেও সবার নামায একই রূপ হয় না। সকল নামাযীর চেতনায় ও চরিত্রে একই রূপ বিপ্লবও আসে না। বরং অনেক নামাযীর জীবনে আসে মারাত্মক স্খলন। নামাযকে সফল করতে হলে যত্নবান হতে হয় নামাযের প্রতিটি ধাপে। প্রতি ওয়াক্ত নামাযের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট সময়; খেয়াল রাখতে হয় ওয়াক্তের দিকে। যেমন বলা হয়েছে, “নামায নির্দিষ্ট সময়ে আদায়ের জন্য মু’মিনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” –(সুরা নিসা, আয়াত ১০৩)। তবে জরুরি শুধু নির্দিষ্ট সময়ই নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো নামাযের জন্য নির্দিষ্ট স্থান মসজিদে গিয়ে নামায আদায়। এজন্যই জরুরি হলো, নামাযের আযান শুনে মসজিদের দিকে ধাবিত হওয়া। তাই মসজিদে নামায পড়া ও সঠিক ওয়াক্তে নামায পড়ার ক্ষেত্রে যারা গাফেল -তাদের রোগটি ঈমানে।

হাদীসে বলা হয়েছে, “যখন কোন মু’মিন ব্যক্তি নামাযের জন্য মসজিদ অভিমুখে রওয়ানা দেয়, তখন থেকেই সে নামাযে দাখিল হয়ে যায়। এবং প্রতি কদমে বৃদ্ধি করা হয় তার মর্যাদা। এবং মসজিদে গিয়ে নামাযের অপেক্ষায় বসে থেকেও সে নামাযের সওয়াব পায়।” মসজিদে নামায আদায়ের সওয়াব ঘরে নামায আদায়ের চেয়ে ২৭ গুণ অধিক। এমন কি অন্ধ ও পঙ্গুদেরও মসজিদে গিয়ে নামায আদায়ের উৎসাহ দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মকতুম (রা:) ছিলেন অন্ধ। তিনি নবীজী (সা:)কে বল্লেন, “আমি তো চোখে দেখিনা, ফলে মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করা কঠিন। আমি কি অনুমতি পেতে পারি ঘরে নামায পড়ার?” নবীজী (সা:) জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি ঘর থেকে আযান শুনতে পান?” বল্লেন, “হাঁ, আমি আযান শুনতে পাই।” নবীজী (সা:) বল্লেন, “তবে আপনাকে মসজিদে এসেই নামায পড়তে হবে।” –(আবু দাউদ শরীফ)। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণীত হাদীস: নবীজী (সা:)  বলেন, “আমার ইচ্ছা হয়, জ্বালানী কাঠ সংগ্রহের নির্দেশ দেই্। এরপর আযানের পর কাউকে ইমামতির দায়িত্ব দিয়ে ঐসব লোকদের বাড়ীতে যাই যারা মসজিদে নামাযে আসেনি এবং তাদের ঘরগুলি জ্বালিয়ে দেই।”–(বুখারী ও মুসলিম শরীফ)। আবু দাউদ শরীফের হাদীস: “যদি কোন মহল্লায় তিন জন মুসলিমও বাস করে তবে তাদের উচিত জামায়াতবদ্ধ ভাবে নামায আদায় করা।

তাছাড়া মসজিদে নামায আদায়ে মনের যে একাগ্রতা ও ধ্যানমগ্নতা থাকে -তা ঘর, অফিস বা দোকানের নামাযে থাকে না। কারণ, ঘর, অফিস ও দোকানে অন্যদের শোরগোল, কথা-বার্তাসহ দৃষ্টি কেড়ে নেয়ার মত অনেক কিছুই থাকে। ফলে সেখানে থাকে না যিকিরের পরিবশে। কিন্তু মসজিদ সাঁজানো হয় নামাযের জন্য। তাছাড়া মসজিদে বসে অন্যের নামায দেখে শেখারও অনেক কিছু থাকে। নামাযরত পাশের ব্যক্তির একাগ্রতা, ধ্যানমগ্নতা ও দীর্ঘ রুকু-সেজদা দেখে নিজের মনেও ভাল নামায আদায়ের আকাঙ্খা জাগে। তাছাড়া নেকড়ের পাল যেমন বিশাল মহিষকে একাকী পেলে ঘিরে ধরে, তেমনি ঈমানদারকে একাকী পেলে ঘিরে ধরে শয়তানও। তখন বান্দাহর উপর শয়তানের বিজয় সহজ হয়ে যায়।

 

মুসলিমের মিশন ও নামায

ইসলাম শুধু ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি চায় না। পরিশুদ্ধি চায় সমাজ ও রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতেও। চায়, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে চায়, ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। সেরূপ একটি প্রকল্পকে বিজয়ী করতে প্রতিটি ঈমানদারকে তাই অভিন্ন ভিশন ও মিশন নিয়ে বাঁচতে হয়। মুসলিমের মিশন তো তাই যা মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন। পবিত্র কুর’আনে  ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার সে পবিত্র ভিশনটি হলো “লি’ইউযহিরাহু আলাদ্দিনি কুল্লিহি” অর্থাৎ সকল দ্বীনের উপর তাঁর দ্বীন তথা ইসলামের বিজয়। ঈমানদারের দায়বদ্ধতা হলো সে ভিশন নিয়ে বাঁচা। ফলে মুসলিমের বাঁচার মিশনে লড়াই তখন অনিবার্য হয়ে পড়ে। কারণ, ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলে যে ভূমি সেটি তারা বিনা যুদ্ধে ছাড়তে রাজী নয়। ফলে জিহাদ ছাড়া মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন নিয়ে সামনে এগুনোর আর কোন রাস্তা থাকে না। এবং যেখানেই যুদ্ধ,  সেখানে দুর্গ, সৈন্য ও সৈন্যের প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। মসজিদ হলো সেই দুর্গ, প্রতিটি নামাযী হলো সেই সৈনিক এবং ৫ ওয়াক্ত নামায হলো সেই প্রশিক্ষণ।

প্রশিক্ষণের অর্থ শুধু সামরিক কলাকৌশল শেখানো নয়, বরং মূল বিষয়টি হলো ইসলামের বিজয়ে জান, মাল, মেধাসহ সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগে নামাযীকে প্রস্তুত করা। এবং লক্ষ্য, নামাযীদের মাঝে সিসাঢালা দেয়ালসম অটুট ঐক্যের প্রতিষ্ঠা দেয়া। অতীতে মুসলিমগণ যখন একের পর বিজয় এনেছে, তখন মসজিদ ছাড়া তাদের কোন দুর্গ বা ক্যান্টনমেন্ট ছিল না। নামায ছাড়া তেমন নিয়মিত কোন প্রশিক্ষণও ছিল না। মসজিদের জায়নামাযে বসে জিহাদের প্রস্তুতি নেয়া হতো। তখন রাজস্বের সিংহভাগ খরচ করে কোন সেনাবাহিনী পালতে হয়নি। নামাযীগণ তখন নিজ অর্থ, নিজ খাদ্য, নিজ বাহন ও নিজ অস্ত্র নিয়ে রণাঙ্গণে হাজির হতো। তারা সেটিকে জান্নাতে প্রবেশের বাহন মনে করতো। মুসলিমদের মাঝে একতা, শৃঙ্খলা, আত্মনিয়োগ ও কোরবানীর সে সামর্থ্য গড়ে উঠেছিল নামাযের জায়নামাযে। আজ মুসলিম দেশগুলিতে বিপুল অর্থব্যায়ে ক্যান্টনমেন্টের সংখ্যা বেড়েছে, সৈন্য সংখ্যা ও তাদের প্রশিক্ষণের আয়োজনও বেড়েছে। কিন্তু তাতে বিজয় বাড়েনি বরং বেড়েছে পরাজয়। বরং বহু মুসলিম দেশে এ সৈনিকেরা পরিণত হয়েছে দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকচক্রের সেবাদাসে।

অন্য ধর্মের অনুসারিগণ ক্লাবে বা মদ্যশালায় বন্ধুত্ব গড়ে ও জোটবদ্ধ হয়। ইসলাম ভাতৃত্বের বন্ধন গড়ে মসজিদের পবিত্র মেঝেতে। জায়নামাযে ভাষা, গোত্র, বর্ণ ও এলাকাভিত্তিক কোন বিভক্তি থাকে না। সব নামাযীকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাতার বাঁধতে হয়। হাদীসে বলা হয়েছে, কাতারে ফাঁক থাকলে সেখানে শয়তান ঢুকে পড়ে। এবং জামাতবদ্ধ হওয়ার এ রীতি শুধু জায়নামাযে সীমিত রাখলে চলে না, সেরূপ একতাকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গণেও প্রতিষ্ঠা দিতে হয়। প্রতিষ্ঠা দিতে হয় রণাঙ্গণে। জামাতবদ্ধ নামাযের সেটিই তো গুরুত্পূর্ণ  শিক্ষা। মুসলিম মনে এমন একটি প্যান-ইসলামিক চেতনা বলবান হলে মুসলিমদের ভূগোলের আয়োতন বাড়লেও তখন ভূগোল খন্ডিত হয় না।

কিন্তু আজ মুসলিম উম্মাহর মাঝে যে বিভক্তি, তা দেখে নিশ্চিত বলা যায়, নামায থেকে তারা কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেনি।  তাদের নামায ব্যর্থ হয়েছে তাদের মাঝে সীসাঢালা দেয়ালসম একতা গড়তে। ফলে মুসলিম উম্মাহ আজ ৫৭টি রাষ্ট্রে খন্ডিত। অথচ বিভক্তি গড়া যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো বিভক্ত মানচিত্র নিয়ে বাঁচা। এবং পবিত্র ইবাদত হলো বিভক্তির দেয়াল ভেঙ্গে একতা গড়া –সেটি যেমন রাজনৈতিক তেমনি ভৌগলিক। মুসলিম রূপে বাঁচায় শুধু পানাহার হালাল হলে চলে না, হালাল হতে হয় দেশের ভৌগোলিক মানচিত্রও। পরিতাপের বিষয় হলো আজকের মুসলিমগণ বাঁচছে হারাম মানচিত্র নিয়ে। মুসলিম মানচিত্রের ভিত্তি হতে হবে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব; ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতা ভিত্তিক বিভক্তি নয়। নবীজী (সা:) তাঁর সাহাবাদের যুগে কি এরূপ বিভক্ত মানচিত্র গড়ার কথা ভাবা যেত? অথচ তাদের গড়া সে বিশাল ভূগোল ভেঙ্গে ৫০টির বেশী বাংলাদেশ গড়া যেত। কিন্তু তারা সেরূপ হারাম মানচিত্র নির্মাণের পথে পা বাড়াননি। আজকের মুসলিমগণ মুসলিম বিশ্বের ভৌগলিক আয়োতন এক ইঞ্চিও বাড়ায়নি, বরং বাড়িয়েছে রাষ্ট্রের সংখ্যা। বিভক্তির সে হারাম কাজে ঘটেছে গভীর রক্তপাত এবং ডেকে আনা হয়েছে কাফের শত্রুদের -যেমনটি ১৯১৭ সালে আরবভূমিতে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। মুসলিমদের আজকের পরাজয় ও পতনের মূল কারণ তো এই বিভক্তির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা হারাম মানচিত্র। আর হারাম নিয়ে যখন বসবাস তখন কি মহান আল্লাহতায়ালার রহমত পাওয়া যায়? তখন যেটি জুটে সেটি তো আযাব –সে হুশিয়ারিটি শোনানো হয়েছে সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। কিন্তু তা নিয়ে ভ্রুক্ষেপ ক’জনের? বাংলাদেশীদের উপর আযাবের সে দৃশ্যমান হাতিয়ার হলো ভারত; এবং ইসরাইলের হাতে সে আযাব পাচ্ছে আরবগণ।

যে নামায আযাব ডেকে আনে

নামায শুধু ঈমাদারগণই পড়ে না। মুনাফিকগণও পড়ে। মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন মু’মিনদের নামাযে এবং প্রচন্ড অখুশি হন মুনাফিকদের নামাযে। নামায তখন সওয়াবের বদলে আযাব ডেকে আনে। তাই শুধু নামায পড়লেই চলে না, নজর রাখতে হয় নামায যেন মুনাফিকের নামাযে পরিণত না হয়। কি ধরণের নামায মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ধ্বংস ও অভিসম্পাত ডেকে আনে -সে বিষয়টি জানানো হয়েছে সুরা মাউনে। বলা হয়েছে, “ফা ওয়াইলুল্লিল মুছাল্লীন। আল্লাযীনা হুম আন সালাতিহিম সা’হুন। আল্লাযীনা হুম ইউরাউন।” অর্থ: “অতঃপর ধ্বংস ঐসব নামাযীদের জন্য -যারা অমনযোগী বা দেরী করে নামায আদায়ে। তারা নামাযে খাড়া হয় লোক দেখানোর জন্য।”- (সুরা মাউন, আয়াত ৪-৬)।

নামায না পড়লে গর্দান থেকে ইসলামের রশি ছিন্ন হয়ে যায়। নবীজী (সা:)র জামানায় নামায গণ্য হতো মুসলিমের মূল পরিচিতি রূপে। যারা নামায পড়তো না, তারা গণ্য হতো কাফের রূপে। মুসলিম সমাজে কাফের রূপে পরিচিত হওয়ার বিপদ বুঝে মুনাফিকগণও তখন নামাযকে বেছে নিত ঢাল রূপে। তারা শুধু নামাযই পড়তো না, বরং নবীজী (সা:)র পিছনে প্রথম কাতারে হাজির হতো। লোক-দেখানো সে নামাযের মধ্য দিয়ে তারা মুসলিমদের ধোকা দিত। এবং ধোকা দিত মহান আল্লাহতায়ালাকেও। নামায নিয়ে মুনাফিকদের সে ষড়যন্ত্রকে ফাঁস করেছে সুরা নিসা। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই মুনাফিকগণ আল্লাহকে ধোকা দেয়, আসলে তিনিই (আল্লাহ) তাদেরকে ধোকা দেন। এবং যখন তারা নামাযে দাঁড়ায়, দাঁড়ায় আলস্য নিয়ে এবং লোক-দেখানোর উদ্দেশ্য। আল্লাহকে তারা সামান্যই স্মরণ করে।” –(আয়াত ১৪২)।

তাই নামায বা অন্য কোন নেক আমল করলেই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তা গৃহিত হবে -বিষয়টি তেমন সহজ সরল নয়। নেক আমল কবুলের কিছু শর্ত আছে। সে শর্তের কথা শুনানো হয়েছে সুরা তাওবাতে। বলা হয়েছে, “তাদের দান আল্লাহর কাছে গৃহিত হওয়া থেকে কোন কিছুই বাধা দেয় না -একমাত্র এছাড়া যে, তারা অস্বীকার করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে, নামাযে দাঁড়ায় আলস্য নিয়ে এবং দান করে অনিচ্ছা নিয়ে।” –(আয়াত ৫৪)। ইবাদত রূপে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে নামাযীকে তাই জায়নামাযে দাঁড়াতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি গভীর আত্মনিবেদন ও আত্মসমর্পণ নিয়ে। পবিত্র কুর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “নিশ্চয়ই কামিয়াবী মু’মিনদের জন্য। যারা নামাযে আত্মনিবেদিত।”–(সুরা মু’মিনুন, আয়াত ১-২)। এবং সে আত্মনিবেদন ও আত্মসমর্পণ শুধু নামাযে সীমিত রাখলে চলে না, প্রতিষ্ঠা দিতে হয় নামাযের বাইরেও। প্রকাশ ঘটাতে হয় পরিবার, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত ও ব্যবসা-বানিজ্যেসহ সর্বত্র। নইলে গাদ্দারী হয়। নামাযের সাথে সে নগ্ন গাদ্দারীটি ধরা পড়ে যখন রাজনীতিতে সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ ও স্বৈরাচার, অর্থনীতিতে সূদ, সংস্কৃতিতে অশ্লিলতা, অফিসে ঘুষ এবং আদালতে শরিয়তি আইনের বদলে কুফরি আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়।

 

নামায দেয় দোয়ার সুযোগ

দোয়া সর্বাবস্থায় করা যায়। চলতে ফিরতে, কর্মস্থলে, এমন কি বিছানায় শুয়েও মহান আল্লাহর দরবারে আরজী পেশ করা যায়। মু’মিনের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার দরবার সব সময় খোলা। তবে দোয়ার শ্রেষ্ঠতম সময় যেমন নামাযে, তেমনি নামায শেষে জায়নামাযে। নামায গড়ে আল্লাহতায়ালার সাথে সরাসরি সংযোগ। সে জন্য পীর বা দরবেশের মধ্যস্থতা লাগে না। মহান দয়াময়ের স্মরণের জায়গাতে নামায মু’মিনের জন্য স্থান করে দেয়। ফলে সৃষ্টি করে দোয়া কবুলের যথার্থ পরিবেশ। মহান আল্লাহতায়ালা চান, নামাযের মাধ্যমে তাঁর ঈমানদার বান্দাহ তাঁর দরবারে আবেদনটি পেশ করুক। এটিই হলো বান্দার জন্য নামাযের সবচেয়ে বড় দান। নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা ছবর ও নামাযের সাহায্যে সাহায্য চাও। নিশ্চ্য়ই আল্লাহ ধৈয্যশীলদের সাথে।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৩)। মহান আল্লাহতায়ালা থেকে মাগফিরাত লাভের এটিই হলো তাঁর নিজের দেখানো পথ। তাই দয়াময় রাব্বুল আ’লামীনের দরবারে দোয়া পেশের জন্য যেমন ছবর চাই, তেমনি চাই নামায। নামায ছেড়ে যারা পীরের মাজারে বা সুফি হালকায় দোয়া কবুলের জন্য ধর্না দেয়, তাদের জন্য এ আয়াতে রয়েছে চরম হুশিয়ারি।

দোয়ার গুরুত্ব কি, দোয়া কি ভাবে করতে হয় এবং কোন দোয়াটি শ্রেষ্ঠ সেটিও শিখিয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালা। সে শিক্ষাটি দেয়া হয়েছে সুরা ফাতেহা’তে -যা পাঠ করতে হয় নামাযের প্রতি রাকাতে। এ সুরা পাঠ না করলে নামাযই হয় না। তাই জরুরি শুধু সুরা ফাতেহা পাঠ নয়, বরং এ সুরার প্রতিটি বাক্যের অর্থ হৃদয়ে গভীর ভাবে ধারণ করা। সুরা ফাতেহা’র মূল বিষয় তিনটি। এক). প্রথমে বর্ণিত হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার মর্যাদা। বলা হয়েছে,“আল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন”।  অর্থ: সকল প্রশংসা একমাত্র মহান আল্লাহর। তিনিই “রাহমানির রাহীম”, তিনিই “মালিকি ইওয়ামিদ্দিন।” অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা হলেন সবচেয়ে দয়াময় এবং দয়া করাই তার নীতি। এবং তিনি রোজ হাশরের দিনের সর্বসময় কর্তা। দুই). দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এ সুরায় বর্ণিত হয়েছে তা হলো মুসলিম জীবনের মিশন। সে মিশনটি হলো: “ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা না’স্তায়ীন।” অর্থাৎ আমরা ইবাদত করি একমাত্র মহান আল্লাহর এবং একমাত্র আল্লাহ থেকেই আমরা সাহায্য ভিক্ষা করি। তিন). তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো দোয়া। এবং সে দোয়াটি হলো “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম”। অর্থঃ “(হে মহান আল্লাহ), আমাকে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের পথটি দেখান।” এটিই হলো মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া। যে ব্যক্তি সিরাতুল মুস্তাকীম পেল, সেই জান্নাত পেল। এর চেয়ে বড় পাওয়া সমগ্র মানব জীবনে আর কি হতে পারে? ধনসম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও সুঠাম স্বাস্থ্য তো কাফেরও পায়। কিন্তু তা কি জান্নাতে নেয়। যে ব্যক্তি ব্যর্থ হলো সিরাতুল মুস্তাকীম পেতে, সে পৌঁছে জাহান্নামে। এর চেয়ে বড় ক্ষতিই বা কি হতে পারে? নামায তাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি থেকে যেমন বাঁচতে শেখায়, তেমনি দেখায় সবচেয়ে বড় কল্যাণের পথ। নামায এভাবেই কাজ করে জান্নাতে চাবি রূপে। ১০/১২/২০২০।

 




কাঙ্খিত লক্ষ্যে রোযা কতটুকু সফল?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

কতটুকু অর্জিত হচ্ছে তাকওয়া?

রোযার লক্ষ্য কি শুধু এটুকু, মানুষ সকাল থেকে সন্ধা অবধি পানাহার বন্ধ রাখবে? তারাবিহ পড়বে এবং কোর’আন তেলাওয়াত করবে? এবং রমযান শেষে মহা ধুমধামে ঈদ উদযাপন করবে? পথচলায় কত হাজার মাইল পথ চলা হলো -সেটিই কি শুধু গুরুত্বপূর্ণ? সাফল্য যাচায়ে তো গুরুত্বপূর্ণ হলো, কাঙ্খিত লক্ষ্যে আদৌ পৌঁছলো কিনা। রোযার মূল লক্ষ্য, তাকওয়া অর্জন। মহান আল্লাহতায়ালা সে লক্ষ্যটি ব্যক্ত করেছেন এভাবে: ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’’ -(সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)। উপরুক্ত আয়াতে যেটি সুস্পষ্ট তা হলো, তাকওয়াই রোযার মূল লক্ষ্য। প্রশ্ন হলো, তাকওয়া বলতে আমরা কি বুঝি? তাকওয়া অর্থ ভয়। তবে সে ভয় এমন নয়, হঠাৎ বাঘের সামনে পড়া ভীতিগ্রস্থ ব্যক্তির ন্যায় তা বাকশূণ্য করবে। সে ভয় এমনও নয়, হঠাৎ গভীর সমুদ্রে পড়া ব্যক্তির ন্যায় আতংকিত ও বিচলিত করবে। তাকওয়া হলো আল্লাহ-সচেতনতার এমন এক মানসিক অবস্থা যা সর্বদা স্মরণে রাখে জাহান্নামের আযাব, ফেরায় সকল প্রকার ভ্রষ্টতা ও পাপ থেকে এবং প্রেরণা জোগায় নেক-আমলে। তখন জন্ম নেয় আল্লাহকে খুশী করার সার্বক্ষণিক ব্যস্ততা। সৃষ্টি করে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে জবাবদেহীতার চেতনা। এমন চেতনায় জীবনের প্রতিটি দিন ও প্রতিটি মুহুর্ত মনে হয় মহান আল্লাহতায়ালার অমূল্য নেয়ামত রূপে; এবং এ জীবন গণ্য হয় অবিরাম পরীক্ষাপর্ব রূপে। তখন বিরামহীন ব্যস্ততা বাড়ে সে পরীক্ষায় কি করে ভাল ভাবে তকার্য হওয়া যায় তা নিয়ে। যখন কোন ব্যক্তি মটর হাই্ওয়েতে দ্রুত গাড়ি চালায় তখন একটি ভয় তার মনে সব সময়ে কাজ করে। সেটি হলো, সামান্য নিমিষের অসতর্কতা তার গাড়িকে গভীর খাদে নিয়ে ফেলবে এবং ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটাবে। মুহুর্তের মধ্য সে দুর্ঘটনা তার নিজের ও অন্যান্য আরোহীর জীবনে মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। এমন একটি দূর্ঘটনার জন্য দীর্ঘ মেয়াদী কোন ভূলের প্রয়োজন পড়ে না। সামাণ্য ক্ষণের ভূল, অসচেতনতা বা ঘুমই সে জন্য যথেষ্ট। চালককে তাই প্রতি মুহুর্তে চোখ ও মন খোলা রাখতে হয়। মৃত্যূর ভয়ে তাকে সর্বমুহুর্ত সতর্ক থাকতে হয়। চালকের জন্য এটাই হলো তাকওয়া।

আর মু’মিনের জীবনে তাকওয়া হলো সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হওয়ার সার্বক্ষণিক ভয়। যে কোন মুহুর্তে সেও বিচ্যুত হতে পারে মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে; অবাধ্য হতে পারে তাঁর হুকুমের। রোযার মূল কাজ এমন ভয় তথা তাকওয়ার বৃদ্ধি। তাই তাকওয়া নিছক ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও যৌনতাকে দমিয়ে রাখার সামর্থ্য নয়, বরং সর্ব প্রকার জৈবিক,আত্মিক ও আর্থিক কুপ্রবৃত্তি দমনের ঈমানী শক্তি। এমন তাকওয়া থেকেই প্রেরণা আসে আল্লাহপাকের হুকুমগুলি জানার এবং সে সাথে সেগুলি অনুসরণের। কোর’আনের জ্ঞানার্জনকে তাকওয়া-সমৃদ্ধ সে ব্যক্তিটি তখন নিজ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্ম রূপে গ্রহণ করে। কারণ সে বুঝে, অজ্ঞতা নিয়ে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা সম্ভব নয়। কারণ হাজারো পথের মাঝে কোনটি সিরাতুল মুস্তাকীমের পথ আর কোনটি ভ্রষ্টতার পথ -সেটি জানতে বা বুঝতে হলেও তো জ্ঞান চাই। পথচলায় যে সিগনাল বা বিধিনিষেধ থাকে সেগুলোও তো জানতে হয়। নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের মাঝে ইসলামের জ্ঞানে তাই কোন অজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন না। তাদের শতকরা শতভাগই ছিলেন আলেম। অজ্ঞতা নিযে ইবাদতও সঠিক ভাবে হয় না। তাই নামায-রোযার আগে কোর’আনের জ্ঞানার্জনকে ফরজ করা হয়েছে। সাহাবাদের জীবনে এমন একটি সময় ছিল যখন নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত ছিল না। জিহাদও ছিল না। ইবাদত বলতে বুঝাতো রাতের একটি বড় অংশে দাঁড়িয়ে বার বার পবিত্র কোর’আনের আয়াতগুলোকে ধীরে ধীরে নিবিষ্ট মনে আবৃত করা এবং আল্লাহর সে হেদায়েতের বাণীগুলোকে হৃদয়ের গভীরে বসিয়ে দেয়া। সে হুকুম এসেছে নবুয়তের অতি প্রথম দিকে নাযিলকৃত সুরা মুজাম্মিল। বলা হয়েছে, “হে বস্ত্রে আচ্ছাদিত (মুহম্মদ), রাতে খাড়া হয়ে যাও, কিছু অংশ বাদে। রাতের অর্ধেক ভাগ, অথবা তা থেকে কিছুটা কম সময়ের জন্য। অথবা তার চেয়ে কিছু অধিক সময়ের জন্য; এবং তেলাওয়াত করো কোর’আন থেকে ধীরে ধীরে সুরভিত কন্ঠে।” -(সুরা মুজাম্মিল, আয়াত ১-৪)। সে সময় খোদ নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের কাছে সমগ্র কোর’আন ছিল না। ছিল সদ্য নাযিলকৃত কিছু সুরা বা আয়াত। তখন তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বটি ছিল, সেগুলোকে হৃদয়ে গেঁথে নেয়া, সেগুলো পূর্ণ অনুসরণ করা এবং অন্যদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া। সে দায়িত্বপালন গণ্য হতো ইবাদত রূপে। ইসলামের ১৪ শত বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আলেম তো গড়ে উঠেছে কোর’আনেকে বুঝা ও কোর’আন অনুসরণের সে অদম্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এ পর্যায়ে হযরত সুমাইয়া ও হযরত ইয়াসিরের মত কিছু সাহাবা কাফেরদের নির্যাতনে শহীদ হয়ে যান।

 

ভ্রষ্টতা যেখানে ইবাদতে

ঘোড়ার আগে যেমন গাড়ী জোড়া যায় না, তেমনি কোর’আন কোর’আনী জ্ঞানার্জনের আগে ইবাদতও যথার্থ হয়না। অথচ আজ সে জ্ঞানার্জনের দায়ভার চাপানো হয়েছে স্রেফ মসজিদের ইমাম বা মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের উপর। জ্ঞানার্জন যে প্রতিটি মুসলিম নরনারীর উপর ফরজ সেটিও ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে। সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে ভ্রষ্টতার শুরু মূলত এখান থেকেই। ফলে প্রচন্ড ভ্রষ্টতা বেড়েছে ইবাদতে। রোযা রেখে দোকানে বসে যে ব্যক্তিটি দ্রব্যমূল্য বাড়ায় বা পণ্যে ভেজাল মেশায় বা অফিসে বসে ঘুষ খায় এমন ব্যক্তি যে তাকওয়াশূণ্য এবং রোযা থেকে সে যে কোন কিছুই লাভ করেনি -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে? সে তো পথভ্রষ্টতার পথ বেছে নিয়েছে। এখানে কাজ করছে তার অজ্ঞতা ও তাকওয়াশূণ্যতা। রোযা তার কাছে নিছক উপবাস ছাড়া কি অন্য কিছু উপহার দিয়েছে? অথচ তাকওয়া-সম্পন্ন ব্যক্তির অদম্য অনুপ্রেরণা হলো, প্রতি মুহুর্তে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলায়। সর্ব মুহুর্তে তাঁর সতর্কতা থাকে সর্বপ্রকার হারাম কাজ থেকে দূরে থাকায়। যার মনে সে সতর্কতা নাই, বুঝতে হবে তার মনে তাকওয়াও নাই। অনেক গাছই ফল দেয় না। তেমনি অনেকের নামায-রোযা এবং হজ্জ-যাকাতও জীবনে কোন পরিবর্তন আনে না। এরা নামায-রোযা আজীবন করেও বাঁচে পথভ্রষ্টতা নিয়ে। নামে মুসলিম হলেও কর্মজীবনে এরা ফাসেক (অবাধ্য, বিদ্রোহী), জালেম ও মুনাফিক হয়। এদের কারণেই মুসলিম দেশগুলোতে আল্লাহর শরিয়তী বিধান আজ পরাজিত; এবং মুসলিম ভূমি অধিকৃত হয়েছে ইসলামে শত্রুপক্ষের হাতে। অথচ তাকওয়া সম্পন্ন ব্যক্তি গভীর দায়িত্ববোধ পায় আল্লাহর সৈনিক রূপে ইসলামের বিজয়ে পূর্ণ আত্ম-বিনিয়োগে। নবীজীর (সা:) আমলে সে সামর্থ্য পেয়েছিলেন প্রতিটি সাহবা। তাদের জীবনে সর্বক্ষণের প্রচন্ড তাড়াহুড়া ছিল বেশী বেশী নেক আমলের।  

তাকওয়া মানব মনে বা দেহে গোপন থাকার বিষয় নয়। সেটি নানা ভাবে প্রকাশ পায় নেক আমলের মধ্য দিয়ে। ইসলাম কবুলের পর মু’মিন ব্যক্তির জীবনে যেটি অনিবার্য রূপে দেখা দেয় সেটি নেক আমলের প্রতি দুর্বার মোহ ও প্রতিযোগিতা। সে তখন প্রস্তুত হয়ে যায় শুধু মালের কোরবানিতে নয়, জানের কোরবানিতেও। অপর দিকে বদ আমল তা যত ক্ষুদ্রই হোক তার মাঝে ঈমানদার ব্যক্তিটি জাহান্নামের আগুনের পূর্বাভাস দেখতে পায়। ফলে তার সর্বক্ষণের সাধনা হয় তা থেকে বাঁচার। যে ব্যক্তির মাঝে বদ আমল থেকে বাঁচায় ও নেক আমলে তাড়াহুড়া নাই, বুঝতে হবে তার মাঝে তাকওয়াও নাই্।এবং পরকালের উপর ঈমানও নাই। ঈমানের দাবীতে সে যত সোচ্চারই হোক, তার সে ঈমানদারী নিতান্তই মেকী। নেক আমলের প্রেরণায় সাহাবাগণ এতটাই অস্থির থাকতেন যে, মাঝ রাতে না ঘুমিয়ে আটার বস্তা কাঁধে নিয়ে গরীবের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সে কাজ করেছেন এমন কি রাষ্ট্রপ্রধান তথা আমীরুল মো’মিনুনও। নিজেরা অভূক্ত থেকে তারা মেহমানকে খাইয়েছেন। নিজের অসংখ্য ফলবান গাছের বিশাল বাগানকে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিয়েছেন। জিহাদের ময়দানে আহত ও অতি তৃষ্ণার্ত হয়ে পানি নিজে না পান করে পাশের তুষ্ণার্ত মুজাহিদকে দিতে বলেছেন। সর্বোপরি তারা ছটফট করতেন অর্থের পাশাপাশি নিজের জীবনকে আল্লাহর পথে জিহাদে বিলিয়ে দেয়ায়। এরাই হলেন তেমন ব্যক্তি যাদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে বলেছেন, তাদের জানমাল তিনি ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। এমন মানুষদের  আধিক্যের কারণেই তখন নেক আমলের প্লাবন এসেছিল সমগ্র মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। তাকওয়ার সে গুণেই ইসলাম যেমন গড়ে তুলেছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, তেমনি সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।

 

শ্রেষ্ঠ দান ও প্রত্যাশা

মাহে রমযান হলো রহমত ও মাগফেরাতের মাস। এ মাসেই নাযিল হয়েছিল পবিত্র কোর’আন –  অর্থাৎ মর্তের বুকে নেমে এসেছিল মহান আল্লাহর নিজস্ব বাণী। এভাবে মানব জাতি পেয়েছিল মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত – মূক্তি ও সফলতার একমাত্র এবং সর্বশেষ পথ। ইসলামী পরিভাষায় যা হলো সিরাতুল মুস্তাকীম। মানব জাতির কল্যাণে আর কোন ঘটনা কি এতটা গুরুত্বপূর্ণ? মানব জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল এ কোর’আনের বরকতেই। এই একটি মাত্র ঘটনাই রমযানের এই মাসটিকে অন্য যে কোন মাসের তুলনায় অতি সম্মানিত করেছে। এ ঘটনাটির বরকতেই এ মাসটিতে মহান আল্লাহতায়ালার অতি প্রিয় কাজটি হলো তিনি তাঁর বান্দার প্রার্থনাকে কবুল করা। এভাবেই এ মাসটি সম্মানিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে। এবং সে সন্মানেরই প্রতীক হলো, এ মাসেই রয়েছে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রাত লায়তুলু ক্বদর। দোয়া কবুলের এটিই শ্রেষ্ঠ রাত।

তবে দোয়া কবুলটি নিঃশর্ত নয়। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সে শর্তটি হলো, কোর’আনে বর্নীত নির্দেশাবলীর পূর্ণ অনুসরণ। পবিত্র কোর’আনে সে শর্তটি বলা হয়েছে এভাবে, “..(হে মহম্মদ) এবং যখন আমার বান্দারা আমার ব্যাপারে আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, (তাদেরকে আপনি বলে দিন) বস্তুত আমি রয়েছি অতি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা আমি কবুল করি। অতএব তাদেরও অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হলো, আমার হুকুম পালন করা এবং আমার উপর ঈমান আনা।” (-সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)। এ আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, তিনি প্রতিটি বান্দার অতি নিকটে। সুরা ক্বাফে বলা হয়েছে তিনি গর্দানের রক্তের শিরার চেয়েও নিকটবর্তী। তিনি যে শুধু বান্দার প্রতিটি দোয়া শুনেন তাই নয়, সে দোয়া কবুলও করেন। এবং সে ওয়াদাটি অতি সুস্পষ্ট ভাবে ঘোষিত হয়েছে এ আয়াতে। তবে সে সাথে তিনি সুস্পষ্ট শর্তও রেখেছেন। শর্ত হলো, হুকুম পালন করা এবং তাঁর উপর পরিপূর্ণ ঈমান আনা। অর্থাৎ সর্বসামর্থ্য দিয়ে আল্লাহর পক্ষে খাড়া করা। সে জন্য কোন দল বা নেতার অপেক্ষায় বসে থাকারও অনুমতি নাই। তাই পবিত্র কোর’আনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “(হে মহম্মদ) বলে দিন, “তোমাদের জন্য আমার একটি মাত্র ওয়াজ (নসিহত): খাড়া হও আল্লাহর জন্য (আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য) জোড়ায় জোড়ায় অথবা (সেটি সম্ভব না হলে) একাকীই; অতঃপর তোমরা চিন্তাভাবনা করো।”–(সুরা সাবা, আয়াত ৪৬)।

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে বান্দার চাওয়া-পাওয়ার তালিকাটি বিশাল। কিন্তু বান্দার কাছেও তাঁর প্রত্যাশা আছে। সে ন্যূনতম প্রত্যাশাটি হলো, তাঁরা দাঁড়াবে তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার কাজে –যেমনটি দাঁড়িয়েছিলেন নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ। তাঁরা যখন এরূপ দাঁড়ায়, তখন তিনিও তাদের ডাকে সাড়া দেন। সেটিই তাঁর সূন্নত। সাহাবাদের ডাকে তাই তিনি ফিরেশতা পাঠিয়েছিলেন এবং বিশাল বিশাল শত্রুবাহিনীর উপর বিজয় দিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার ডাকে সাড়া দিতে। বরং তারা সাড়া দিয়েছে শয়তানের ডাকে; এবং বিজয়ী করেছে শয়তানের এজেন্ডাকে। এবং যারা শয়তানের পক্ষে দাঁড়ায়, তাদের জীবনে নেমে আসে প্রতিশ্রুত আযাব -সেটি শুধু এ দুনিয়ার জীবনে নয়, অনন্ত-অসীম আখেরাতের জীবনেও। পবিত্র কোর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে বার বার। কথা হলো, আজকের মুসলিমগণ মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে খাড়া হওয়ার বদলে যে শয়তানের পক্ষে খাড়া হয়েছে -সে প্রমাণ কি কম? মুসলিম ভূ-খন্ড আজ বিভক্ত, শরিয়ত বিলুপ্ত, বিজয় জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজমের, প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সূদ, ঘুষ, জুয়া, মদ ও দেহব্যবসা –এগুলো কিসের আলামত? মুসলিম ভূমিতে তারা যে শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করেছে –এগুলো কি তারই প্রমাণ নয়? তবে কি তাদের দোয়া কবুল করে শয়তানের বিজয়কে আরো বাড়িয়ে দিবেন?  

 

রেকর্ড দুর্বৃত্তি ও বিদ্রোহে

নামায-রোযা নিয়মিত আদায় করে এমন মুসলিমদের সংখ্যা আজ পৃথিবীতে কোটি কোটি। কিন্তু সে তুলনায় তাকওয়া অর্জিত হচ্ছে কতটুকু? কতটুকু বেড়েছে নেক আমল? বরং বিপরীতমুখী কর্ম ও চরিত্রই কি প্রবলতর হচ্ছে না? নেক-আমলের বিপরীত হলো, মিথ্যা, সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি, ব্যভিচার , ঘুষ ও ধোকাবাজির ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বা দুর্বৃত্তি। ইসলামী পরিভাষায় এগুলো হলো মুনকার। মুসলিম দেশ হওয়ার বরকতে এটাই  কি কাঙ্খিত ছিল না যে, এদেশগুলি সুনীতি, সত্যবাদীতা ও সৎকর্মে বিশ্বে রেকর্ড গড়বে? সৃষ্টি হবে নেক আমলের প্লাবন। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টোটি। বেড়েছে দূর্নীতি। ফলে রোযা যে তার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হচ্ছে না -তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে?  তবে এ বিফলতা নিয়েই বা ক’জন ভাবছে? আল্লাহতায়ালার নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রতিটি বিদ্রোহই তো শয়তানের অনুসরণ। এমন বিদ্রোহে বিজয়ী হয় শয়তান ও তার অনুসারীরা। অথচ প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে চলছে সে প্রবল বিদ্রোহ। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ  প্রকাশ পাচ্ছে প্রতিটি মিথ্যা, পাপ ও দূর্নীতির মধ্য দিয়ে। এমন বিদ্রোহে মুসলিমরা বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। কাফেরদের হারিয়ে দূর্নীতিতে তারা বিশ্বে প্রথম হয়েছে। বাংলাদেশ প্রথম হয়েছে ৫ বার। প্রতিটি মুসলিম দেশে এমন বিদ্রোহীরাই বার্থ করে দিচেছ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার প্রতিটি উদ্যোগ। শুরুতে মুসলিমদের একাধিক রাষ্ট্র ছিল না, কিন্তু যেটি ছিল সেটি প্রতিষ্ঠিত ছিল শরিয়ত তথা আল্লাহর আইনের উপর। কোর’আনে বর্নীত আল্লাহর হুকুমকে তারা শুধু পাঠই করতো না, সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রয়োগও করতো।  কিন্তু আজ শুধু পাঠই হয়, প্রয়োগ নেই। মুসলিম রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে নানা ভাষা ও নানা জাতীয়তার নামে বহু জাতীয় ঝান্ডা। এবং সে সাথে বেড়েছে আল্লাহর হুকুমের তথা শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডাও। সে ঝান্ডা উড়িয়েছে মুসলিম দেশের ব্যাংকগুলো সূদকে হালাল করে। বিদ্রোহের ঝান্ডা উড়িয়েছে পতিতালয়গুলো। সে বিদ্রোহ মুসলিম দেশের আদালতগুলোতেও। সেটি কোর’আনী আইনের স্থলে কাফেরদের প্রণীত আইন প্রয়োগ করে -যে আইনে ব্যভিচার বা পতিতাবৃত্তিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়।

সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা তুলতে মহিলারাও পিছিয়ে নেই। তারা সে ঝান্ডা তুলেছে পর্দার হুকুম অমান্য করে এবং নারী-পুরুষের মাঝে অবাধ মেলামেশার মধ্য দিয়ে। বেপর্দাগী নিজেই আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা। এবং সে ঝাণ্ডা উড়িয়ে যারা প্রকাশ্যে চলাফেরা করে তাদেরকে এসব নামাযী ও রোযাদার মুসলিমগণ নেত্রী গণ্য করে এবং তাদেরকে ভোটে নির্বাচিতও করে। তাদের পিছনে রাজপথে মিছিলও করে। আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহী তাদের ভোট দিলে বা তাদের রাজনীতিকে সমর্থন করলে কি নামায-রোযা পালনের অর্থ থাকে? বান্দার মনে ইবাদত আনুগত্য বাড়াবে সেটাই কি কাঙ্খিত নয়? কিন্তু কোথায় সে আনুগত্য? কোথায় মহান আল্লাহতায়ালার পথে নিবেদিত প্রাণ সে সৈনিক? বরং অধিকাংশ মুসলিম যেন তাদের কর্ম, চরিত্র, রাজনীতি, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ঘোষণা দিচ্ছে, আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি তাদের কোন পরওয়া না্ই। যা গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো তাদের ব্যক্তিগত, দলগত, জাতিগত ও গোষ্ঠিগত স্বার্থচিন্তা; আল্লাহতায়ালার হুকুম নয়। মহান প্রভুর হুকুমকে তারা সীমাবদ্ধ রেখেছে জায়নামায, বিয়ে-শাদী, মুর্দাদাফন, মসজিদের নামায এবং রোযা-হজ্জ পালনে। এবং তাঁর বিধানের প্রয়োগ নিষিদ্ধ করেছে শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও আইন-আদালতের অঙ্গণে। এমন আচরণ কি মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ নয়? এমন বিদ্রোহী বান্দারা – পোষাক-পরিচ্ছদ ও নামে যতই মুসলিম হোক, যদি সারা মাস রোযা রাখে, সারা রাত নামায পড়ে  এবং সারা রাত কেঁদে কেঁদে মোনাজাত করে, তবে কি সে ইবাদত ও মোনাজাত রাব্বুল আলামিনের কাছে কবুল হয়? কবুল যে হচ্ছে না সে প্রমাণই কি কম? কবুল হওয়ার নমুনা কি এই – মুসলিম দেশে আগ্রাসী বিদেশী শক্তি আধিপত্য পাবে এবং মুসলিম নর-নারি প্রতিদিন নিহত,আহত, ধর্ষিতা ও পদপিষ্ট হবে?

 

দোয়া কবুলের শর্ত

তিরমীযি শরিফের হাদীসে আছে: তিন ব্যক্তির দোয়া কখনোই বৃথা যায় না। সে তিন প্রকার ব্যক্তি হলো: রোযাদার, ন্যায় পরায়ন শাসক এবং যিনি মজলুম। কিন্তু এ হাদীসটির পাশাপাশি এ হাদীসটিও এসেছে যে, দোয়া কবুলের শর্ত হলো তার রিযিক হালাল অবশ্যই হতে হবে। ফলে যে ব্যক্তির সেহরী ও ইফতার যদি হয় ঘুষ, সূদ, মদবিক্রয়, জুয়া, ধোকাবাজি ও  নানা দূনীতির মধ্য দিয়ে উপার্জিত অর্থে হয়; এবং বসবাস যদি হয় সূদী অর্থে কেনা বা জবরদখল ও দূর্নীতির মধ্য দিয়ে অর্জিত গৃহে, তবে তার দোয়া কি কবুল হয়? দোয়া কবুলের জন্য রোযাদার হওয়ার পাশাপাশি ঈমানদার ও নেককার হওয়াও তো শর্ত। পবিত্র কোর’আনে একবার নয়, বহুবার বলা হয়েছে, যারা ফাসেক ও জালেম তাদের দোয়া কবুল দূরে থাক, মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে হিদায়েত দেন না। হিদায়েত  লাভের শর্ত হলো,পাপের পথ তথা দূর্নীতি থেকে প্রথমে ফিরতে হবে। ঔষধের আগে বিষ-পান ত্যাগ যেমন জরুরি, তেমনি হিদায়াত লাভের জন্য জরুরি হলো পুরাপুরি বর্জন করতে হয় পাপের পথকে। মহান আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে বড় দান ধন-দৌলত, সন্তান-সন্ততি বা প্রতিপত্তি নয়, বরং সেটি হিদায়েত। সে হিদায়েত লাভের জন্যই প্রতি নামাযের প্রতি রাকাতে “ইহদিনাস সিরাতুল মুস্তাকীম” বলে দোয়া করতে হয়। এর চেয়ে বড় দোয়া যেমন নেই, তেমনি হিদায়েত প্রাপ্তির চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে শ্রেষ্ঠতর প্রাপ্তিও নাই। এই হিদায়েত প্রাপ্তিই ঈমানদারকে একজন কাফের থেকে আলাদা করে। হিদায়েত লাভের ফলেই সম্ভব হয় সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা। কাফের, জালেম ও ফাসেকের জীবনে হিদায়েত নাই; ফলে তাদের জীবনে যা বাড়ে তা নিছক বিভ্রান্তি। এমন বিভ্রান্তিতে কেবল জাহান্নামে পৌঁছা সম্ভব, জান্নাতে নয়। কারণ, জান্নাতের জন্য তো চাই সিরাতুল মুস্তাকীম। আর ফাসেক ও জালেম তো তারাই যারা সমাজে দুবৃর্ত্ত ও দূর্নীতিবাজ এবং আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। ফলে যে দেশটি দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হয়, সে দেশের মসজিদগুলো মুসল্লিতে যতই পূর্ণ হোক না কেন -তারা কি রহমত পায়? হিদায়েত লাভের জন্য শুধু মুখে কালেমা পড়লেই চলে না। শুধু মূর্তিপুঁজা ছাড়াটাই যথেষ্ট নয়। দূর্নীতি ছেড়ে সুনীতি এবং দুষ্কর্ম ছেড়ে নেক আমলের পথও ধরতে হয়। দোয়া কবুল তো এ পথেই আসে। 

রোযার পরিপূর্ণ ফায়দা নিতে যা জরুরি তা হলে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়া। রোযা পালনের কোর’আনী আহবান তো এসেছে ঈমানদারদের উদ্দেশ্য -জালেম, ফাসেক, কাফের ও মুনাফিকদের উদ্দেশ্যে নয়। মূল লক্ষ্য, ঈমানদারের তাকওয়া বৃদ্ধি। প্রাসাদ গড়তে ভিতটা প্রয়োজন, তাকওয়ার নির্মাণে ঈমান হলো সেই ভিত। তবে ঈমানদারীর অর্থ শুধু আল্লাহকে বিশ্বাস করা নয়। মক্কার কাফেরগণও আল্লাহকে বিশ্বাস করতো। সন্তানদের নাম নবীজীর (সা:) জন্মের পূর্বেও তাদের আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান রাখত। কিন্তু কাফেরদের এ বিশ্বাস  বেশীদূর এগুয়নি। এ বিশ্বাসে তাই তাকওয়া সৃষ্টি হয়নি, ফলে ব্যক্তি ও সমাজ কোনটাই বিশুদ্ধ হয়নি। আল্লাহর উপর ঈমান আনাতে ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি শুরু হয় মাত্র,পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্য মুসলিমকে আরো অনেক দূর এগুতে হয়। তাকে পরিপূর্ণ অংশ নিতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার পরিকল্পিত প্রশিক্ষণে। শুধু একদিন দুদিন নয়, বরং জীবনের সবগুলো দিন ধরে। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, জিহাদ হলো সে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।  

 

রোযার ট্রেনিং কেন অপরিহার্য?

ভালো মানের কৃষক, শ্রমিক, ডাক্তার বা ইঞ্জিনীয়ার গড়ার জন্য লাগাতর ট্রেনিং চাই। তেমনি ট্রেনিং চাই নিষ্ঠাবান মুসলিম গড়ার জন্যও। সে ট্রেনিংয়ের মূল কথা হলো জিহ্বা, পেট ও যৌনতার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। জিহ্ববার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া মিথ্যাচার, গিবত ও কলহ-বিবাদ থেকে নাযাত মেলে না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে অশান্তির মূল কারণ হলো লাগামহীন জিহ্ববা। তেমনি পেটের লালসার উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে পানাহারে অবাধ্যতা হয় শরিয়তী বিধানের। মানুষ তখন উপার্জনে দূর্নীতির আশ্রয় নেয়। তেমনি যৌন লালসার উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে মানুষ ব্যাভিচারে ধাবিত হয়। নবীজী (সা:) বলেছেন, অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে জিহ্ববা ও যৌনাঙ্গের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে। রমযানের মাস ব্যাপী রোযা মূলত সে নিয়ন্ত্রণকেই প্রতিষ্ঠা করে। রমযানের রোযা যদি সে নিয়ন্ত্রণ স্থাপনেই ব্যর্থ হয় তবে বুঝতে হবে রোযাদারের মাসব্যাপী ট্রেনিং সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেছে। রোযা তাকে দিনভর উপবাসের কষ্ট ছাড়া আর কিছু্ই দেয়নি। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের রোযা যে তাদের জীবনে কোনরূপ নিয়ন্ত্রণ আনতে পারিনি তা শুধু রমযানের মাসে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতিতে ধরা পড়ে না, প্রকট ভাবে ধরে বিশ্বব্যাপী দূর্নীতিতে প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়েও।

কোন প্রশিক্ষণই নিছক শারীরিক কসরতের বিষয় নয়। চাই জ্ঞান। রমযানের প্রশিক্ষণের সাথে অপরিহার্য হলো তাই কোর’আনের জ্ঞান। আর রমযান তো কোর’আন নাযিলের মাস। ওহীর এ জ্ঞান আনে ঈমানদারের মনোজগতে রুহানী বা আধ্যাত্মিক বিপ্লব। যেখানেই পরিশুদ্ধি ও পরিমর্জিত জীবন কাম্য, সেখানেই এরূপ কোর’আনী জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। লাগাতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া মানুষের জীবনে উৎকর্ষ অসম্ভব। পশু পশুরূপে জন্ম নেয়, মারাও যায় পশু রূপে। এদের জীবনে জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি কোনরূপ চারিত্রিক উৎকর্ষ নেই। তাই পশুকুলে সমাজ গড়ে উঠে না, সভ্যতাও নির্মিত হয় না। কিন্তু মানুষকে পশু থেকে ভিন্নতর ও উন্নততর হতে হয়। এটিই জীবনের মূল সাধনা। নইলে মানুষরূপে জন্ম নিয়েও সে মারা যেতে পারে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট হয়ে। মানব সমাজে যে সেটি ঘটে সে সাক্ষ্যটি দিচ্ছেন খোদ আল্লাহতায়ালা। তাদের বিষয়েই পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে ‘‘উলায়িকা কা’আল আনয়াম, বাল হুম আদাল।’’ অর্থ: “তারাই পশুর ন্যায় বরং পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট’’। অর্থাৎ এদের জীবনে উপরে উঠার কাজটাই হয়নি। বয়স বাড়ার সাথে তাদের ঈমান ও আমল বাড়েনি, বরং বেড়েছে নীচে নামাটি।

অপর দিকে জ্ঞান-সাধনায় অর্জিত উচ্চতর গুণে মানুষ ফেরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর হতে পারে। এবং সে সামর্থ্য অর্জনের কাজটি ব্যক্তিকে জীবনভর করতে হয়। উচচতর সমাজ ও সভ্যতা নির্মিত হয় তো এমন মানুষের আধিক্যেই। আর এরূপ উচ্চতর মানুষ ও উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণের মধ্য দিয়েই তো যাচাই হয় মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব; সাম্রাজ্য বিস্তার বা পারমানবিক বোমা নির্মাণের সামর্থ্য দিয়ে সেটি হয় না। বস্তুত ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের আমৃত্যু আয়োজনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি পায় নেক আমলের সামর্থ্য। নেক আমল তখন ব্যক্তির জীবন-সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। এমন সংস্কৃতির নির্মাণে রোযার অবদান অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোযায় শেখায় জীবন যাপনে সংযম, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তীতা। আনে আল্লাহ সচেতনতা, এবং সেটি সমগ্র দিন জুড়ে। প্রতি ওয়াক্তের নামায মাত্র কয়েক মিনিটের। এদিক দিয়ে রোযা সবচেয়ে দীর্ঘ ইবাদত। এবং সে ইবাদত ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও সংযমের মধ্য দিয়ে। একান্ত নির্জনেও ক্ষুধাগ্রস্ত ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে মুখে খাদ্য তুলে নেয় না। আল্লাহতায়ালা যে সব কিছু দেখেন -সে চেতনা এভাবেই রোযাদারের মনে আজীবন বদ্ধমূল হয়। সর্বকাজে এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর এমন ভয় এবং এমন আল্লাহ-সচেতনতাই হলো তাকওয়া। এমন তাকওয়া অর্জিত হলেই বুঝতে হবে রোযাদারের রোযা সফল হয়েছে।   

ব্যর্থ হচ্ছে কেন এ প্রশিক্ষণ?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সৈনিকের খাতায় নাম লেখালে বা প্রশিক্ষণ নিলেই কেউ ভাল সৈনিক রূপে গড়ে উঠে না। ভাল সৈনিক হতে হলে সৈনিক জীবনের মূল দর্শন ও মিশনের সাথেও সম্পূর্ণ একাত্ব হতে হয়। দেশের স্বাধীনতা ও সংহতিতে তাকে পূর্ণ বিশ্বাসী হতে হয়। এখানে আপোষ চলে না। সৈনিকের জীবনের মূল মিশন তো দেশের স্বাধীনতা ও সংহতির সংরক্ষণ। কিন্তু এ ক্ষেত্রটিতেই যদি সংশয় থাকে তবে ভাল সৈনিক হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। সৈনিকবেশী এমন ব্যক্তিটির পক্ষে তখন বিদেশী শত্রুর চর হিসাবে কাজ করাও রুচিসিদ্ধ মনে হয়। কোর’আনের কসম খেয়েও এরা গাদ্দারী করে। এরাই কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। মুসলিম দেশকে এরা খন্ডিত করে বা পরাধীন  করে। এবং উল্লাস ভরে মুসলিম হত্যাও  করে। মুসলিম ইতিহাসে এমন বিশ্বাসঘাতক সৈনিকের সংখ্যা কি কম? তেমনি জীবনভর নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাতের প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েও বহু মানুষের জীবনে পরিশুদ্ধি আসে না। পরিশুদ্ধি তো একমাত্র তখনই আসে যখন নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাতের পাশপাশী একাত্ব হয় জীবন ও জগত নিয়ে ইসলামের মূল দর্শনের সাথে। কথা হলো, সে দর্শনটি কি? সেটি হলো, আল্লাহকে একমাত্র প্রভূ, প্রতিপালক, আইনদাতা ও রেযেকদাতারূপে মেনে নেওয়া এবং তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নিজেকে আত্মসমর্পিত সৈনিক রূপে পেশ করা।

মুসলিমের মিশন মূলত আল্লাহর কাছে এক আত্মসমর্পিত গোলামের মিশন। সে দায়িত্ব নিছক নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে পালিত হয় না। সে দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রটি বরং বিশাল। সেটি সমগ্র দেশ, সমগ্র সমাজ, সমগ্র রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি জুড়ে। দায়িত্বপালনের লক্ষ্যে কখনো তাকে দ্বীনের প্রচারক হতে হয়, কখনো রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা হতে হয়, আবার কখনো সৈনিক বা জেনারেলের বেশে যুদ্ধও লড়তে হয়। মুসলিম শব্দটির উদ্ভব তো হয়েছে আত্মসমর্পণ থেকে, যার নমুনা পেশ করেছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আ:)। যিনি আল্লাহর প্রতিটি হুকুমে – সেটি শিশু পুত্রের কোরবানি হোক বা নিজ দেশ ছেড়ে হিজরত হোক – সব সময়ই লাববায়েক (আমি হাজির এবং মেনে নিলাম) বলেছেন। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের মত কোর’আনী প্রশিক্ষণ তো এমন আত্মসমর্পিত মুসলিমদের জন্যই; বেঈমান ও মুনাফিকদের জন্য নয়। যারা জান্নাত চায়, মহান আল্লাহতায়ালার এ প্রশিক্ষণ তো তাদেরকে সে মহাপুরস্কার লাভের জন্য যোগ্য করে গড়ে তোলে। প্রতিটি ঈমানদার যেমন এ প্রশিক্ষণ থেকে ফায়দা পায়, তেমনি এর সাথে একাত্মও হয়।  

 

অবমাননা যেখানে কোর’আনের

প্রশ্ন হলো, কোর’আনের জ্ঞান ছাড়া আল্লাহর নির্দেশিত প্রশিক্ষণ থেকে লাভবান হওয়া কীরূপে সম্ভব? চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান ছাড়া কেউ কি রোগ-চিকিৎসার প্রশিক্ষণে যোগ্য বিবেচিত হয়? প্রচন্ড পরিহাসের বিষয়, মহান আল্লাহতায়ালা কোর’আনী জ্ঞানার্জনের তাগিদ দিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন বার বার, কিন্তু সে দিকে মুসলিমদের ভ্রুক্ষেপ নেই্। অনেক মুসলিমদের ব্যস্ততা দেখা  যায় শুধু তেলাওয়াতে, কিন্তু কোর’আন বুঝায় নয়। তারাবিহ নামাযে কোর’আন খতমের আয়োজন হয় মসজিদে মসজিদে। কিন্তু আয়োজন নেই তেলাওয়াতকৃত আয়াতের অর্থ বুঝায়। কোর’আনের প্রতি এর চেয়ে বড় অবমাননা আর কি হতে পারে? অথচ সারা রমযান জুড়ে মুসলিম দেশগুলিতে পবিত্র কোর’আনের প্রতি সে অবমাননাটাই হচ্ছে। না বুঝে কোন শিশুও কোন বই পাঠ করে না। অথচ না বুঝে কোর’আন পাঠ হচ্ছে ঘরে ঘরে। কোর’আনী জ্ঞানের সে শূণ্যতাটি দেখা যায এমন কোর’আন পাঠকের আমলে, চরিত্রে ও রাজনীতিতে। ফলে এমন কোর’আন পাঠকারি ব্যক্তি মাসভর রোযা রাখলে কি হবে, আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠার পক্ষে সে কথা বলে না, বরং পক্ষ নেয় ইসলামের বিপক্ষ শক্তির বিজয় আনতে।

কথা হলো, যে ব্যক্তিটি চিন্তা-চেতনায় সেক্যুলার, যার সকল কর্মকান্ড ও অঙ্গিকার হলো আল্লাহর বিধানকে আইন-আদালত, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ সকল অঙ্গণে পরাজিত করা -সে ব্যক্তি আজীবন নামায-রোযায় লিপ্ত হয়েও কি কোন পরিশুদ্ধি পায়? সে তো বরং কর্ম জীবনে মিথ্যুক, স্বৈরাচারি, জালেম ও দূর্নীতিবাজ হয়। রাজনীতিতে এরাই শয়তানী শক্তির একনিষ্ঠ সহযোগী হয়। এদের কারণেই শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের দেশ হয়েও বাংলাদেশ দূর্নীতিতে বিশ্বে বার বার প্রথম হয়। দেশে মসজিদ বাড়ছে। মসজিদে নামাযী ও রোযাদারদের সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু তাতে দেশের ইজ্জত বাড়ছে না। যে সমাজ ও রাষ্ট্র চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাত দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত সে সমাজে রোযা যে তার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে -সেটি কি প্রমাণের অপেক্ষা রাখে? এ ব্যর্থতার কারণেই বছর ঘুরে বার বার মাহে রমযান এলেও মুসলিম সমাজে পরিশুদ্ধি আসছে না। এবং সমাজও সভ্যতর হচ্ছে না। বরং দিন দিন দুর্বৃত্তি এবং বিশ্বজুড়া অপমানই প্রকটতর হচ্ছে। ২২/০৭/২০১২




জিহাদ বিলুপ্তির নাশকতা

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

আক্রোশ কেন জিহাদের প্রতি?

দুর্বৃত্ত শাসনের সবচেয়ে বড় নাশকতাটি স্রেফ দুর্বৃত্তির বিস্তার নয়; বরং সেটি হলো জিহাদের ন্যায় মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটির বিলুপ্তি। তখন পন্ড হয় সভ্যতর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব প্রকল্প। তখন বিজয়ী হয় শয়তানী পক্ষ; এবং প্লাবন আসে দুর্বৃত্তির। তখন দুর্বৃত্তি নির্মূলের প্রচেষ্ঠাগুলো গণ্য হয় দন্ডনীয় অপরাধ রূপে। যেমন বাংলাদেশে গুম, খুন, নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার হতে হয় হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতের বিরুদ্ধে রাজপথে অবস্থান  নেয়াতে। যেমন নমরুদ ও ফিরাউনের সামনে মহান আল্লাহকে প্রভু বলাও হত্যাযোগ্য অপরাধ গণ্য হয়েছে। শয়তানপন্থীদের হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই সবচেয়ে বড় বিপদ।

অপর দিকে ইসলামে জিহাদ হলো, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মহান আল্লাহর নির্দেশিত একমাত্র হাতিয়ার। এটিই ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। হাতিয়ার ছাড়া যুদ্ধ লড়া যায় না; তেমনি জিহাদ ছাড়া ইসলামকে বিজয়ী করা যায় না। ইসলাম যে শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম, সেটি জিহাদ ছাড়া কখনোই প্রতিষ্ঠা দেয়া যায়না। এ পবিত্র ইবাদতে বিনিয়োগ ঘটে মু’মিনদের মেধা, অর্থ, শ্রম, সময় ও রক্তের। একমাত্র এ বিনিয়োগের ফলেই রাষ্ট্র দুর্বৃত্তমুক্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠা পায় শরিয়তী বিধান। সভ্যতর সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতা তো এভাবেই নির্মিত হয়। স্রেফ নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলে সেটি হয় না। লক্ষ লক্ষ মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়েও সেটি হয় না। সে সুফলটি পীরদের শত শত আস্তানা বা সুফি খানকা গড়েও জুটে না। আজকের মুসলিম দেশগুলিতে সেগুলি কি কম? কিন্তু কোথায় সে সভ্যতার উৎকর্ষ?

জিহাদ যেহেতু দুর্বৃত্তির নির্মূল ঘটায়; সকল দুর্বৃত্ত শক্তির আক্রোশ তাই জিহাদের বিরুদ্ধে। জিহাদ দেয় আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জজবা এবং দেয় লড়াইয়ের ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তি। তাই তাবত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি জিহাদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ। মজলুমের এ প্রতিরোধ যুদ্ধকে তারা বলে সন্ত্রাস। বলে জঙ্গিবাদ। আগ্রাসী যুদ্ধকে প্রতিরোধহীন করার লক্ষ্যে তারা চায় মুসলিম জীবন থেকে জিহাদের বিলুপ্তি। জিহাদ বিষয়ক কোর’আন-হাদীসের আয়াতগুলিকে বাদ দিতে চায় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার সিলেবাস থেকে। অথচ সেরূপ আক্রোশ নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলের বিরুদ্ধে নাই। সে ক্রোধ তাবলিগ জামায়াত, পীরদের আস্তানা বা সুফি খানকার বিরুদ্ধেও নাই।

বাংলাদেশে জিহাদের বিরুদ্ধে সে আক্রোশটি দেখা যায় ক্ষমতাসীন সেক্যুলারিস্ট শিবিরে। তাদের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে সবচেয়ে বড় দুর্বৃত্তিটি হলো, শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা। জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত গণ্য করে ফৌজদারি অপরাধ রূপে। ঘরে স্রেফ জিহাদ বিষয়ক বই রাখাকে অপরাধ চিহ্নিত করে ছাত্র-ছাত্রীদের জেলে তোলা হচ্ছে। আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় বিদ্রোহ আর কি হতে পারে? বিস্ময়ের বিষয়, এমন ইসলামবিরোধী সরকারও বেঁচে আছে মুসলিম জনগণের রাজস্বের অর্থে! বহুকোটি মানুষ তাদের ভোট দেয়। তাদের সভা-সমাবেশেও বিপুল সংখ্যায় হাজির হয়। ফলে ইসলামের বিরুদ্ধে গাদ্দারীটা শুধু সরকারের নয়, বিপুল সংখ্যক জনগণেরও। কথা হলো, এমন গাদ্দারী কি মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পুরস্কার আনে? আনে কি নিয়ামত? বরং যা আনে -তা হলো পরাজয় ও অপমান।

সমাজ ও রাষ্ট্রের পবিত্রতা বিধানের কাজটি নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও তাসিবহ-তাহলিলে হয় না; এগুলির কাজ ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি আনা। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি, কল্যাণ ও পরিশুদ্ধি আনতে হলে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিকল্প নাই। শরিয়তী বিধান হলো দুর্বৃত্তি বিলুপ্তির হাতিয়ার। তখন পবিত্রতা আসে সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। শরিয়ত ছাড়া তাই ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র তাই পূর্ণাঙ্গ হয় না। এমন শরিয়তী শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল নবীজী(সা:) ও তাঁর সাহাবাদের শাসনামলে। ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনের এটিই হলো মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ মডেল। এটি শুধু কল্যাণধর্মী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারই পথ নয়; জান্নাতে পৌঁছার পথও। শরিয়ত ছাড়া সিরাতুল মুস্তাকীমের কথা ভাবা যায় না। যে রাষ্ট্রে শরিয়ত নাই –বুঝতে হবে সেখানে পথটি জাহান্নামের।

 

ব্যর্থতা সুস্থ সংস্কৃতির নির্মাণে

সংস্কৃতি একটি বিশেষ জীবনবোধ, রুচিবোধ ও দর্শন নিয়ে বাঁচতে অভ্যস্থ কর। লতাপাতা যেমন স্রোতে ভাসে, দেশের অধিকাংশ মানুষ ভাসে আবহমান সাংস্কৃতিক স্রোতে। তাই মুসলিমদের শুধু ঘর ও রাষ্ট্র গড়লে চলে না, সংস্কৃতিও নির্মাণ করতে হয়। আনতে হয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব। বাংলাদেশের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি বস্তুত সুস্থ সংস্কৃতির নির্মাণে। সাংস্কৃতিক ব্যর্থতার কারণে চরম ব্যর্থতা আসে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ায়। মুসলিম সংস্কৃতির উপাদান কোন কালেই গান-বাজনা, নৃত্য, সংঙ্গীত ও ভাস্কর্য ছিল না। এগুলো তো মানুষকে আল্লাহবিমুখ করা ও পরকাল ভূলানোর সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতিতে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা গুরুত্ব পায় না। বরং গুরুত্ব পায় আকন্ঠ জীবন সম্ভোগ। আর এ আকন্ঠ সম্ভোগটাই হলো সেক্যুলারিজমের মূল কথা। সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত করার এটিই শয়তানী প্রকল্প। শরিয়তী বিধান এমন প্রকল্পে বাধা দেয় বলেই সেক্যুলারিস্টগণ শরিয়তের বিরোধী। বাংলাদেশে এমন সেক্যুলার সংস্কৃতির প্রসারে সরকারী ও বেসরকারী বিনিয়োগট বিশাল। শয়তান শুধু রাজনীতির পথই গড়ে না, সংস্কৃতির পথও গড়ে। মানুষকে মন্দিরে নিতে না পারলেও সংস্কৃতির পথে টেনে কোটি কোটি মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে দূরে সরায়। সাংস্কৃতিক অঙ্গণগুলো বস্তুত শয়তানের শিক্ষালয় রূপে কাজ করে। বাংলাদেশে শয়তানে এ প্রজেক্ট বিপুল ভাবে বিজয়ী।

অথচ ইসলামের সংস্কৃতি হলো জিহাদের সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি যেমন দুনিয়ার বুকে জান্নাতের রাস্তা গড়ার সংস্কৃতি; তেমনি উন্নত মানব, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ারও। অথচ বাঙালী মুসলিম সমাজে সে সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। ফলে গড়ে উঠেনি ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র। বরং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে দুর্বৃত্ত-অধিকৃত রাষ্ট্র। জোয়ার বইছে পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদের সংস্কৃতির। আল্লাহপাক এমন পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদেরকে সুরা ফাতেহা’তে দোয়াল্লিন (পথভ্রষ্ট) ও মাগদুব (অভিশপ্ত) বলেছেন। জান্নাত পাওয়ার জন্য সিরাতুল মুস্তাকীম পাওয়াটি যেমন জরুরি; তেমনি জরুরি হলো পথভ্রষ্টদের পথ থেকে বাঁচাটিও। তাই নামাযের প্রতি রাকাতে সিরাতুল মুস্তাকীম পাওয়ার দোয়া পাঠ যেমন বাধ্যতামূলক, তেমনি বাধ্যতামূলক হলো পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদের পথ থেকে বাঁচার দোয়াটিও।

কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের জীবনে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার কাজটি যেমন সঠিক ভাবে হয়নি, তেমনি হয়নি পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদের পথ থেকে বাঁচাটিও। ফলে বাঙালী মুসলিমদের হাতে নির্মিত হয়েছে ১৪ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে কদর্য ইতিহাস। তারা দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়ে রেকর্ড গড়েছে, রেকর্ড গড়েছে ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে ১৯০ বছরের জন্য গোলাম হয়ে। কাফেরদের গোলাম হওয়ার চেয়ে মুসলিম জীবনে বড় আযাব আর কি হতে পারে? তখন শুধু নির্যাতিতই হতে হয় না, ঈমানও হারাতে হয়। অথচ এ আযাব থেকে বাঁচার জন্যই মহান আল্লাহতায়ালা জিহাদকে ফরজ করেছেন। অন্যরা যুদ্ধে মরলে জাহান্নামে যায়। অথচ মুসলিমগণ মরে না; শহীদ হয় এবং জান্নাতে যায়। এটি কি কম পুরস্কার? দেশরক্ষায় সামান্য সময়ের পাহারাদারীকে সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। অথচ সে দেশরক্ষায় বাঙালী মুসলিমের আগ্রহ কই? এবং যারা জিহাদ থেকে দূরে সরে তাদেরকে ঘিরে ধরে প্রতিশ্রুত আযাব। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন শেষ হয়েছে; এখন নতুন আযাব এসেছে ভারত ও তার সেবাদাসদের গোলাম রূপে।

 

হারাম বন্ধুত্ব ও যুদ্ধ

আফগানদের সংখ্যা বাঙালী মুসলিমদের সিকি ভাগও নয়। কিন্তু তারা কি এক দিনের জন্যও কি কোন কাফের শক্তির শাসন মেনে নিয়েছে? অথচ সে দেশে কাফেরদের হামলা যে হয়নি -তা নয়। কিন্তু কাফের আগ্রাসন শুরুর সাথে সাথেই শুরু হযেছে প্রচন্ড প্রতিরোধ। সেটি হয়েছে আম জনতার পক্ষ থেকে। তারা যেমন বীরদর্পে ব্রিটিশ হামলার মোকাবেলা করেছে, তেমনি যুদ্ধ লড়েছে রুশ ও মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও। প্রানদানে তারা পিছুপা হয়নি। অথচ বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে সম্পর্ণ বিপরীত সংস্কৃতি। সেটি হয়েছে নিজ দেশে কাফেরদের সামরিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দখলদারি প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালে সেটিই প্রকট ভাবে হয়েছে একটি মুসলিম দেশে ভেঙ্গে ভারতীয় কাফেরদের বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে। এমনকি কাফেরদের বিজয়কে নিজেদের বিজয় রূপে উৎসব করা হচ্ছে। মদ, জ্বিনা, সূদ যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো মুসলিম দেশ ভাঙ্গা। এটি তো শরিয়তের মৌল বিধান। কোন ঈমানদার কি সে পথে যেতে পারে?

সুরা আল –ইমারানে ঘোষিত “লা তাফাররাকু” অর্থাৎ “বিভক্ত হয়োনা” –এটি মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম। সুরা মুমতাহিনায় রাব্বুল আলামিনে আরেকটি হুশিয়ারি “লা তাত্তিখিজু আদুউ’য়ী ও আদুউ’য়াকুম আউলিয়া।” অর্থ: “তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করোনা।” মূর্তি পূজারীগণ যে আল্লাহর শত্রু তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? ভারতীয় হিন্দুগণ যে বাংলাদেশীদের শত্রু -সেটিও কি তারা এতো দিন প্রমাণ করেনি? যারা ঈমানশূণ্য সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও ন্যাশনালিস্ট –তারা না হয় ভারতকে তাদের বন্ধু করতে পারে, কিন্তু যাদের হৃদয়ে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে -তারা কি মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমকে অমান্য করে কাফেরদের কলাবোরেটর হতে পারে? ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের নামে রাষ্ট্র গড়া জায়েজ হলে উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া খেলাফত শত শত বছর বাঁচতো না। ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও অঞ্চলের পরিচয়ে ১৪ শত পূর্বেই আলাদা আলাদা রাষ্ট্র গড়ে উঠতো। মুসলিম দেশ ভাঙ্গার মিশনটি কাফেরদের; এরাই মধ্যপ্রাচ্যকে ২২ টুকরোয় বিভক্ত করেছে। তাদের কলাবোরেটর হয়েছে কিছু গোত্রপূজারী আরব। মুসলিমদের আজকের যে পরাজয় ও পতিতদশা তার কারণ যে ৫৭ দেশে বিভক্ত ভূগোল তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? মুসলিম বিশ্বে সম্পদ ও জনসংখ্যা যা আছে তা থেকে হাজার গুণ বৃদ্ধি ঘটলেও কি বিভক্ত মানচিত্রের এ দুর্বলতা দূর করা যাবে? সেটি যে অসম্ভব সেটি মহান আল্লাহর চেয়ে আর কে ভাল জানে। তাই তিনি বিভক্তিকে হারাম করেছেন। অথচ মুসলিমগণ সে হারাম পথেই পা বাড়িয়েছে। একই হারাম পথে বাঙালী মুসলিমদের বিরাট অংশ পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে ভারতীয় মুশরিকদের কলাবোরেটর হয়েছে। তারা যে মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় আখেরাতে কাফেরদের কলাবোরেটর হিসাবেই চিহ্নিত হবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

 

সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি

মুসলিম জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতিরক্ষা দেয়া। নবীজী (সা:)’র হাদীস: একাজে সামান্যতম মুহুর্ত ব্যয় সারা রাতের নফল নামাযের চেয়ে উত্তম। এবং সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার আযাবটি অতি করুণ। তখন শত্রুর হাতে শুধু গণহত্যা ও গণধর্ষণের শিকারই হতে হয় না, হারাতে হয় ঈমান-আমলও। সে ব্যর্থতার কারণেই অতীতে বিপদ চেপে বসেছিল স্পেন, রাশিয়া, চীন ও ভারতের বহু কোটি মুসলিমের জীবনে। শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ার দায়িত্বটি শুধু বেতনভোগী সৈনিকদের নয়, বরং প্রতিটি ঈমানদারের। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের মোকাবেলার দায়ভারটি শুধু নবাব সিরাজুদ্দৌলা ও তাঁর সেনাবাহিনীর ছিল না, ছিল প্রতিটি মুসলিমের। মুসলিমগণ যখন রোমান বা পারসিক সাম্রাজ্যের ন্যায় বিশাল বিশাল দেশের সামরিক বাহিনীর মোকাবেলা করেছে তখন মুসলিম বাহিনীতে কোন বেতনভোগী সৈনিকই ছিল না। তাদের সবাই ছিলেন যেমন নামায-রোযা পালনকারী, তেমনি সবাই ছিলেন যোদ্ধা। কিন্তু বাঙলার মুসলিমদের আচরণ ছিল এর বিপরীত। শহিদ তিতুমীরের প্রতিরোধ ও ফকির বিদ্রোহের মত কিছু বিচ্ছিন্ন জিহাদ ছাড়া তারা যে শুধু জিহাদ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে তা নয়, বরং হাজার হাজার মুসলিম যুবক শত্রু সেনাবাহিনীতে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছে। সেটি শুধু বাংলা বা ভারতে ব্রিটিশ দখলদারিকে স্থায়িত্ব দিতে নয়, বরং ইরাক, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনসহ এশিয়া-আফ্রিকার বহু মুসলিম দেশে সাম্রাজ্যবাদী দখলদারি বাড়াতে। অথচ এরূপ আত্মবিক্রীত সেবাদাসদের অনেককে বাঙালী মুসলিমগণ গৌরবের প্রতীক গণ্য করে। নিজ ধর্মের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা কতটা গভীর হলে সেটি হতে পারে – সেটি কি বুঝতে কি থাকে?

 

শেষ হয়নি শত্রুর দখলদারী

মুসলিমদের দায়ভার শুধু ভৌগলিক মানচিত্রের উপর ইসলামের বিজয়কে সুনিশ্চিত করা নয়, বরং সেটি জনগণের চেতনার মানচিত্রেও সুসংহত করা। প্রতিটি বিজয়ী সেনাবাহিনীই সেটি করে। ইংরেজগণ তাই শুধু বাংলার ভৌগলিক মানচিত্রের উপরই দখল জমায়নি, দখল জমিয়েছে বাঙালীর চেতনার মানচিত্রেও। ব্রিটিশের সামরিক দখলদারীটা ১৯৪৭ সালে শেষে হয়েছে। কিন্তু চেতনা রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত  সে দখলদারীটা এখনো প্রবল ভাবে বেঁচে আছে। শত্রুর সে বুদ্ধিবৃত্তিক দখলদারী হটিয়ে রাজনীতি, প্রশাসন, আইন-আদালত, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির কোন একটি অঙ্গণেও ইসলাম বিজয়ী হতে পারিনি। ব্রিটিশের এ অব্যাহত দখলদারী বাঁচিয়ে রেখেছে বাঙালী সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী, বিচারক, আইনবিদ, রাজনীতিবিদ এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাগণ। সে লক্ষ্যে কাজ করছে বহু হাজার এনজিও নেতাকর্মীগণ। বাংলাদেশে ইংরেজগণ তাদের ১৯০ বছরের শাসনেও ঘরে ঘরে সূদ খাওয়া ও সূদ দেয়ার ন্যায় হারাম কাজের আাবাদ বাড়াতে পারিনি। কিন্তু এনজিওগুলোর কারণে সেটি সহজেই সম্ভব হয়েছে। অথচ সূদ খাওয়া ও সূদ দেয়া সামান্য পাপ নয়, নবীজী (সা:) সূদকে মায়ের সাথে জ্বিনার ন্যায় পাপ বলেছেন।–(হাদীস)। তাই কোন মুসলিম যেমন ব্যাভিচারি হতে পারে না, তেমনি সূদখোরও হতে পারে না। এটিই তো মুসলিমের ঈমান। কিন্তু মুসলিমের সে ঈমান এবং ইসলামের সে ভিত্তিমূলটি গুড়িয়ে দিয়েছে দেশের সেক্যুলারিস্টগণ। অপর দিকে বাংলাদেশের আদালতে এখনো পূর্ণ দখলদারী ব্রিটিশদের প্রবর্তিত কুফরি আইন ও তাদের রসম-রেওয়াজের। সে আইনে পতিতাবৃত্তি যেমন হালাল, তেমনি হালাল হলো সূদ, মদ ও জুয়া। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইনের সেখানে কোন দখলদারী চলে না।

শরিয়তী আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালার অধিক অসম্মান আর কি হতে পারে? কোন রাজার রাজ্য যদি তাঁর হুকুমই না চলে তবে সে রাজার কি কোন ইজ্জত থাকে? এ বিশ্ব তো মহান আল্লাহতায়ালার রাজত্ব এবং শরিয়ত তাঁর আইন। ফলে তাঁর মহান ইজ্জতের উপর এর চেয়ে বড় হামলা ও অবমাননা আর কি হতে পারে যদি তার শরিয়তী আইনই মানা না হয়? এটি তো অতি জঘন্য অপরাধ। এরূপ জঘন্য কাজ যারা করে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে তাদেরকে কাফের, জালেম ও ফাসেক এ তিনটি বিশেষ পরিচয়ে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ তারা শুধু কাফেরই নয়, তারা সে সাথে জালেম ও ফাসেকও। অথচ আদালত থেকে শরিয়তী আইন বিলুপ্ত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সে অপরাধটিই লাগাতর করা হচ্ছে। মহান আল্লাহতায়ালার আইনের এরূপ অবমাননা নিয়ে কি মুসলিম থাকা যায়? সাহাবায়ে কেরামের যুগে এমনটি কি কল্পনা করা যেত?

শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখাই যে সেক্যুলারিস্টদের মূল এজেন্ডা -সেটি কোন গোপন বিষয় নয়। সেটি বরং তারা জোরে সোরেই বলে। শাসনতন্ত্রে আল্লাহর আইন দূরে থাক, মহান রাব্বুল আলামীনের নামটিও তাদের কাছে অসহ্য। ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদকে তারা ফাঁসির যোগ্য ফৌজদারি অপরাধ গণ্য করে। অথচ মানবাধিকার রূপে গণ্য হচ্ছে পতিতাবৃত্তি, সমকামিতা, মদ্যপান, জুয়া ও সূদের ন্যায় পাপাচার। আল্লাহর দেয়া আলো-বাতাসে বাস করেও কাফেরগণ যেমন শয়তানের গোলামী করে, এরাও তেমনি মুসলিম ভূমিতে বাস করে গোলামী করে অমুসলিম সংস্কৃতি ও ধ্যান-ধারণার। মিশরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কর্তা ব্যক্তি লর্ড ক্রমার এ শ্রেণীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক গোলামদের নিয়ে বড় আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। ইসলামে অঙ্গিকারহীন এরূপ গোলাম শ্রেণী তৈরী না হওয়া অবধি কোন অধিকৃত মুসলিম ভূমিকে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতা দিবে না -সে ঘোষণাও তিনি দিয়েছিলেন। লর্ড ক্রমারের সে কথাই এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশেরা চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু শাসন ক্ষমতা, শিক্ষাব্যবস্থা ও বিচার ব্যবস্থা দিয়ে গেছে এরূপ মানসিক গোলামদের হাতে। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।  

দেহের স্বাস্থ্য বাঁচাতে হলে শুধু প্রাণনাশী রোগজীবাণুগুলি চিনলে চলে না। সেগুলির নির্মূলে চিকিৎসাও জরুরি। তেমনি মুসলিম উম্মাহর স্বাস্থ্য বাঁচাতে হলে শুধু বিদেশী শত্রুদের চিনলে চলে না; ঘরের শত্রুদেরও চিনতে হয়। নবীজী (সা:)’র আমলে শুধু চেনার কাজই হয়নি; তাদের নির্মূলের কাজও হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিও যথার্থ ভাবে হয়নি। হয়নি বলেই ঈমানবিনাশী ও দেশবিনাশী এসব ভয়ংকর জীবাণুগণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু ভোটই পায় না, হৃদয়েও স্থান পায়। জাতির নেতা, জাতির পিতা ও দেশের বন্ধু রূপেও গৃহিত হয়।    

 

জিহাদ ও জিহাদভীতি  

মুসলিম দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আইন আদালত যখন ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত হয়, জিহাদ তখন নামায-রোযার ন্যায় সবার উপর ফরজ হয়ে যায়। নইলে সে অধিকৃত ভূমিতে পূর্ণ ইসলাম পালন অসম্ভব হয়। রাষ্ট্র তখন শয়তানের বাহনে পরিণত হয়; এবং সে রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটটি তখন সরাসরি শয়তানের দখলে যায়। মুসলিম জীবনে সবচেয়ে সর্বনাশা বিপর্যয় তখনই শুরু হয়। তাই সভ্য নাগরিকের দায়িত্ব শুধু নিজের ঘরকে ডাকাতমুক্ত করা নয়, বরং রাষ্ট্রকে শয়তানের অধিকার মুক্ত করা। মু’মিনের জীবনে এখানেই ঘটে ঈমানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় পাশ করতে শতকরা ৬০ ভাগের বেশী শহীদ হয়ে গেছেন। হযরত আবু বকর (রা:)’র শাসনামলে কিছু লোক রাষ্ট্রীয় ভান্ডারে যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিলেন। আর তাতেই তাদের বিরুদ্ধে তিনি জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন।

বাংলাদেশের মুসলিমদের জিহাদ কোন কাফের দেশ দখল করা নিয়ে নয়। বরং সেটি নিজ দেশকে ইসলামের শত্রুশক্তির দখলদারি থেকে মুক্ত করার। জিহাদ এখানে আল্লাহর পরাজিত বিধানকে পুণঃপ্রতিষ্ঠিত করার।এ জিহাদে যোদ্ধা হওয়া তাই প্রতিটি মুসলিমের উপর নামায-রোযার ন্যায় ফরজ। নামায-রোযায় কাজা আছে কিন্তু এ ফরজে কাজা নাই। অথচ সে পবিত্র ফরজ জিহাদে যোদ্ধা হওয়াকেই অপরাধ ও সন্ত্রাস বলা হচ্ছে। জিহাদ নিয়ে এ ব্যাখাটি নিতান্তই শয়তানি শক্তির নিজস্ব আবিস্কার। ইসলামের শত্রুপক্ষটি এরূপ প্রচার চালাচ্ছে একটি বিশেষ লক্ষ্যকে সামনে রেখে। সেটি শুধু তাদের স্বৈরাচারি শাসনকে দীর্ঘায়ীত করার লক্ষ্যে নয়, বরং বাংলাদেশের বুকে বিদেশী কাফের শক্তির আগামী আগ্রাসনকে প্রতিরোধহীন করার লক্ষ্যে। কারণ, তারা তো সে কাফের শক্তিরই সেবাদাস।

জিহাদই দেয় মুসলিম বাহিনীকে বিপুল লড়াকু জনবল। সাধারণ প্রজারা তখন নিজেদের অর্জিত অর্থ, খাদ্য এবং অস্ত্র সাথে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ছুটে। সেটিকে তারা জান্নাতে প্রবেশের দরওয়াজা গণ্য করে। জিহাদ এভাবে জনগণের ব্যাপক ক্ষমতায়ন ঘটায়। প্রতিটি নাগরিক তখন যোদ্ধায় পরিণত হয় –যেমনটি নবীজী (সা:)’র আমলে হয়েছিল। সে ইতিহাস জানে বলেই ইসলামের শত্রুপক্ষের মনে এতো ইসলামভীতি ও জিহাদভীতি। জিহাদের চেতনা বিলুপ্তিতে এজন্যই তাদের এতো আয়োজন। বিলুপ্ত করতে চায় ওয়াজ ও আলোচনায় জিহাদ শব্দের ব্যবহার। এমন কি আইনগত ভাবে নিষিদ্ধ করতে চায় জিহাদকে। কারণ, জিহাদ নিষিদ্ধ হলে এ পবিত্র ইবাদতটি তখন আদালতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হবে। ভারতে যখন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের শাসন, তারাও নিষিদ্ধ করেছিল জিহাদকে। একই উদ্দেশ্য নিয়ে মার্কিন যক্তরাষ্ট্র মুসলিম দেশের স্কুল ও মাদ্রাসায় সিলেবাস বদলানোতে হাত দিয়েছে। 

বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের চেতনার ভূগোলটি বহু আগেই ভারতীয় কাফেরদের চেতনার সাথে মিশে গেছে। এখন শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূগোল একাকার করার কাজটি বাঁকি। ভারতীয় বা পাশ্চাত্যের কাফেরদের ধ্যানধারণা ও সংস্কৃতির চেয়ে ইসলাম ও ইসলামের সংস্কৃতিই তাদের কাছে বেশী বিদেশী মনে হয়। অথচ আগ্রাসী ভারতীয়দের হাতে বাংলাদেশ একাত্তরের ন্যায় আবার অধিকৃত হলে বাঙালী মুসলিমদের জীবনে যে ভয়ানক আযাব ও অপমান নেমে আসবে তাতেও কি কোন সন্দেহ আছে? একাত্তরে অধিকৃত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী খেতাব জুটেছিল ভিক্ষুকের তলাহীন ঝুলির। এতবড় অপমান কোন কালেই কোন মুসলিম দেশের জুটেনি। সেটিই পরিমাপ দেয় আগ্রাসী ভারতীয়দের দস্যুবৃত্তি একাত্তরে কতটা নির্মম ছিল। কিন্তু পুণঃরায় অধিকৃত হলে আবার নেমে আসবে সে আযাব।

মুসলিম রাষ্ট্রের অতিক্ষুদ্র অঙ্গণকেও কাফেরদের হাতে অধিকৃত থাকতে দেয়ার বিধান ইসলামে নেই। না সামরিক ভাবে, না সাংস্কৃতিক বা আদর্শিক ভাবে। বাংলার নবাব যখন কয়েকটি গ্রামের মালিকানা ইংরেজদের হাতে তুলে দেয় তখন থেকেই শুরু হয় খাল কেটে কুমির আনার কাজ। তখন ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে বাংলার উপর ইংরেজদের দখলদারি। একই ভাবে ধীরে ধীরে সমগ্র ফিলিস্তিন অধিকৃত হয়েছে ইহুদীদের হাতে। ধর্মীয়, আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগলিক ময়দানের কোন একটি ক্ষেত্রও যদি শত্রুশক্তির দখলদারিতে যায় তখন সেটি যে কতবড় ভয়ানক বিপর্যয় ঘটায় -এ হলো তার নমুনা। মুসলিমদেরকে তাই মুসলিম ভূমির প্রতি ইঞ্চিকেই সুরক্ষা দিতে হয়। শুধু দেশের ভূগোল পাল্টালে চলে না, মনের ভূগোলও ইসলামী করতে হয়। নিরংকুশ বিজয় আনতে হয় দেশবাসীর চিন্তা-চেতনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির অঙ্গণেও। অথচ বাংলাদেশে সে বিজয় কোন কালেই অর্জিত হয়নি। বাঙালী মুসলিমের এখানেই বড় ব্যর্থতা। এ ব্যর্থতার কারণে, অনৈসলামিক চেতনা বেঁচে আছে বিপুল সংখ্যক মানুষের মনের মানচিত্রে।

ইসলামের জিহাদ তাই শুধু সামরিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিকও। বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধাদের কাজ হয় কোটি কোটি মুসলিমের চেতনার ভূমিকে প্রতিরক্ষা দেয়া। সে কাজটি যথাযথ না হলে মুসলিমগণও শত্রু বাহিনীর সৈনিকে পরিণত হয়। সব পরাজয়ের শুরু তো চেতনার ভূমি থেকেই। জ্ঞানীর কলমের কালি তাই শহীদের রক্তের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে বাঙালী মুসলিম সৈনিকদের সংখ্যাটি অতি নগন্য। ফলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের সবচেয়ে বড় পরাজয় এবং শত্রুশক্তির সবচেয়ে বড় দখলদারিটি ঘটেছে জনগণের চেতনার ভূবনে। চেতনার মানচিত্রটি এভাবে শত্রুশক্তির দখলে গেলে রাজনৈতিক মানচিত্রের উপরও কি দখলদারি থাকে? তখন পুরা দেশ পরিণত হয় শত্রুশক্তির অধিকৃত ভূমিতে।  রাষ্ট্রের উপর ইসলামের নিরংকুশ বিজয় নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব ঘোষণাটি হলো: “তিনিই সেই সত্ত্বা যিনি হিদায়েত ও সত্যদ্বীনসহ তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন। এবং সেটি এজন্য যে সেটি বিজয়ী হবে সকল দ্বীন তথা ধর্মের উপর।..”।–(সুরা সাফ, আয়াত ৯)। তাই বিজয় শুধু ভৌগলিক হলে চলে না, আদর্শিক ও ধর্মীয়ও হতে হয়। মুসলিম ভূমিতে তাই কোন রাজা, কোন স্বৈরাচারি শাসক বা কোন জনগোষ্ঠির সার্বভৌমত্ব যেমন প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না, তেমনি বৈধতা পেতে পারে না ইসলাম ভিন্ন অন্যকোন ধর্মমত বা মতাদর্শের বিজয়। বিজয়ী হওয়ার বৈধ অধিকার রাখে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন। প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব হলো ইসলামকে বিজয়ী করার লড়াইয়ে সৈনিক হয়ে যাওয়া। মুসলিম জীবনে এর  চেয়ে গুরুত্পূর্ণ কোন কাজ নাই।

 

জিহাদশূণ্যতা ও হারাম রাজনীতি

আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার দায়ভার ফেরেশতাদের নয়, সে দায়ভারটি ঈমানদারদের। কারণ, এ পৃথিবী ফেরেশতাদের পরীক্ষাস্থল নয়; এখানে পরীক্ষা হয় তাদের যারা নিজেদের ঈমানদার রূপে দাবী করে। এবং  পরীক্ষাটি হয় অর্পিত দায়ভার পালনের মধ্য দিয়ে। ফলে ঈমাদারকে শুধু নামাযী ও রোযদার হলে চলে না, মুজাহিদও হতে হয়। মু’মিনের বাঁচার ভিশনটি কি, সে সাথে তাঁর রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির মিশনই বা কি –সেটি সুরা সাফ’য়ের উপরুক্ত আয়াতটিতে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এরূপ একটি মিশনকে মু’মিনের জীবনে ফরজ করার জন্য পবিত্র কোর’আনের উপরুক্ত ঘোষণাটি মাত্র একবার ঘোষিত হওয়াই যথেষ্ট ছিল। অথচ মহান আল্লাহতায়লা সেটি ঘোষণা শুনিয়েছেন তিন বার। ইসলামকে বিজয়ী করার কাজে দেশে দেশে ও যুগে যুগে মু’মিনদের জীবনে যে লাগাতর লড়াই –সেটির ধর্মীয়, নৈতিক ও দার্শনিক যৌক্তিকতা তো মহান আল্লাহতায়ালার এ ঘোষণা।

ইসলাম-অনৈসলামের দ্বন্দে ঈমানদারের জন্য নিরব ও নিষ্ক্রীয় থাকাটি যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো নিরেপক্ষ থাকা। কারণ, তাতে ইসলামের বিজয় আসে না। এজন্য ফরজ হলো লড়াইয়ের প্রতি অঙ্গণে ইসলামের পক্ষ নেয়া। ইসলাম কবুলের সাথে সাথে ঈমানদারের জীবনে তাই নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের সাথে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদও এসে যায়। সে সাথে কিতাল বা সশস্ত্র যুদ্ধও আসে। সেগুলি যেমন নবীজী (সা:)’র জীবনে এসেছিল, তেমনি এসেছিল প্রতিটি সাহাবীর জীবনেও। মুসলিম নামধারী হয়েও যারা রাজনীতিতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করতে চায়, তারা কি একবারও ভেবে দেখেছে, নবীজী (সা:) বেঁচে থাকতে কার হাতে ছিল মুসলিম উম্মাহর রাজনীতি? কে ছিলেন ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান? কে পরিচালনা করতেন জিহাদ? তখন তো নিষিদ্ধ হয়েছিল তাদের রাজনীতি -যাদের লক্ষ্য জনগণকে জাহান্নামে নেয়া। এটি তো ভয়ানক অপরাধের রাজনীতি। তাদের এ অপরাধ তো চোরডাকাতদের অপরাধের চেয়েও ভয়ানক। চোরডাকাতগণ মানুষের অর্থে হাত দিলেও কাউকে জাহান্নামে নেয় না। এ কাজটি তো তাদের -যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করে। নবীজী(সা:) ও সাহাবাযে কেরামের শাসনামলে মুসলিম ভূমিতে তাই এরূপ অপরাধীদের রাজনীতিকে কখনো অনুমতি দেয়া হয়নি। ইসলামের রাজনীতি নিষিদ্ধের নামে বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ যা করতে চায় -তা হলো নবী-আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। শরিয়ত বিরোধীতার এ রাজনীতি শত ভাগ হারাম –যেমন হারাম হলো পতিতাবৃত্তি, মদপান, জুয়া ও সূদ। কোন মুসলিম দেশে এ রাজনীতি বৈধতা পেতে পারে না। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোতে এ হারাম রাজনীতিই বিজয়ী। আর এ হারাম রাজনীতির বিজয়ের মূল কারণ, মুসলিম জীবনে জিহাদশূণ্যতা। এবং একমাত্র জিহাদের মাধ্যমেই বিজয়কে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে।

 

পরাজয় যেরূপে অনিবার্য হয়

রাষ্ট্রের অঙ্গনে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হবে, না অন্য ধর্ম বা বিধান প্রতিষ্ঠা পাবে -সে ফয়সালাটি কখনোই মসজিদ-মাদ্রাসার মেঝেতে হয় না। পীরের খানকাহ, তাবলিগের ইজতেমা বা সুফির আস্তানাতেও হয় না। সেটি নির্ধারিত হয় জিহাদের ময়দানে। তাই ইসলামের বিজয় নিয়ে যাদের সামান্যতম ভাবনা আছে তারা কি কখনো নিজেদের ইবাদত-বন্দেগী মসজিদ-মাদ্রাসা, পীরের খানকাহ, সুফির আস্তানা বা তাবলিগ ইজতেমায় বন্দি রাখতে পারে? তারা তো সকল সামর্থ্য নিয়ে হাজির হয় জিহাদের ময়দানে। নবীজীকেও তাই বদর,ওহুদ¸খন্দক খায়বর ও হুনায়ুনের যুদ্ধের ন্যায় বহু যুদ্ধে নামতে হয়েছে। নামতে হয়েছে লাগাতর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়েও।

ব্যক্তির যুদ্ধ, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি থেকেই ধরা পড়ে সে মূলত কোন পক্ষের। তাছাড়া কোন দল ও কোন মতাদর্শের প্রতিষ্ঠায় সে রায় দেয়, অর্থ দেয় বা শ্রম ও রক্ত দেয় –সেটিও কি গোপন থাকার বিষয়? মু’মিনের ঈমানদারী এবং কাফেরদের বেঈমানী তো এভাবেই প্রকাশ পায়। মদিনার মুনাফিকগণ নবীজী (সা:)’র পিছনে নিয়মিত নামায পড়েছে। কিন্তু তাদের মুনাফিকি ধরা পড়েছে রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধের ময়দানে। ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো, জনগণের জীবন থেকে যখনই জিহাদ বিলুপ্তি হয়, তখনই ইসলাম বিলুপ্ত হয় দেশের রাজনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রশাসন থেকেও। দেশ এভাবেই অধিকৃত হয়ে যায় ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। ইসলাম ও মুসলিমের পরাজয় তো এভাবেই অনিবার্য হয়। এবং আজকের বাংলাদেশ তো তারই উদাহরণ। ১ম সংস্করণ ২২/০৩/২০১৪; ২য় সংস্করণ ০৪/০২/২০২১।




ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা কেন শ্রেষ্ঠ ইবাদত?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্ম

মানব ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণের কাজে হযরত মহম্মদ (সাঃ)’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানটি শুধু ইসলাম প্রচার ছিল না, বরং সেটি ছিল বিশাল ভূ-ভাগ থেকে দুর্বৃত্ত শাসকদের নির্মূল এবং ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এ কাজটি না হলে স্রেফ কোর’আন তেলাওয়াত, নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন এবং মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা বাড়িয়ে ইসলামের বিজয় ও মুসলিমের গৌরব বৃদ্ধি করা যেত না। উচ্চতর সভ্যতাও নির্মাণ করা যেত না। এবং সম্ভব হতো না মানব জাতির কল্যাণে শিক্ষণীয় অবদান রাখাও। কারণ, জনকল্যাণে রাষ্ট্রের যে বিশাল ক্ষমতা -সেটি মসজিদ-মাদ্রাসা বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের থাকে না। এদিকে ইসলাম অন্য ধর্ম থেকে পুরাপুরি ভিন্ন। কারণ, অন্যায়ের নির্মূল (নেহি আনিল মুনকার) ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা (আ’মারু বিল মারুফ)’র বিষয়টি ইসলামের অতি কেন্দ্রীয় বিষয়। এ কাজটিকে মুসলিম জীবনের মিশন রূপে নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি রূপে মুসলিমদের যে আল্লাহতায়ালাপ্রদত্ত মর্যাদা সেটি এ কারণে নয় যে, তারা বেশী নামায-রোযা পালন করে। বরং একারণে যে, তারা বাঁচে অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার মিশন নিয়ে। এবং সে  কাজে নিজের জান ও মালের বিনিয়োগ করে। একারণেই মুসলিম জীবনে অনিবার্য ও অবিরাম হয়ে উঠে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ইসলামের পক্ষে রাষ্ট্রীয় শক্তি না থাকলে দুর্বৃত্ত শক্তির বিরুদ্ধে সে যুদ্ধে বিজয় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মুসলিম জীবনে তখন আসে আত্মসমর্পণ এবং বাঁচতে হয় শত্রু শক্তির কৃপার উপর। এজন্যই মুসলিম জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি মসজিদ-মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা নয়, বরং সেটি ইবাদত ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। মানব সভ্যতার সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় নেক কর্ম। দুর্বৃত্তগণ ইসলামের শক্তির এ পরিচিত উৎস্যটি জানে। এজন্যই সকল শয়তানী শক্তির প্রধান এজেন্ডা হলো পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে প্রতিহত করা। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাই বলেছিল, কোথাও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দেয়া হলে সেটিকে বোমা মেরে ধুলায় মিলিয়ে দেয়া হবে। তেমন একটি লক্ষ্যে শয়তানী শক্তিবর্গের কোয়ালিশনটি দুনিয়াব্যাপী।

ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা না থাকলে কাফের শক্তির সাথে সংঘাতের কোন কারণই সৃষ্টি হতো না। তাবলিগ জামায়াতের কর্মীদের এজন্যই কোন শত্রু নেই; তাদের জীবনে কোন সংঘাতও নাই। অথচ সংঘাত এড়াতে পারেননি নবী-রাসূলগণ। মুসলিম জীবনে এরূপ সংঘাত না থাকার অর্থ ইসলামকে প্রতিষ্ঠা দেয়ায় আগ্রহ না থাকা। হৃদয়ে ঈমান থাকলে সেটি কি সম্ভব? এমন লড়াইহীন জীবন তো ঈমানের শূণ্যতাতেই সম্ভব। মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের সামনে অনুকরণীয় মডেল রূপে খাড়া করেছেন মুসলিম উম্মাহর আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ:)কে। তাঁর কোন লোকবল ছিল না; তিনি ছিলেন একা। কিন্তু নমরুদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত কাফের শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন এ হুংকার দিয়ে: “শুরু হলো তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”। তাঁর সে সাহসী ঘোষণাটি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এতোই ভাল লেগেছিল যে, সেটিকে তিনি রেকর্ড করেছেন পবিত্র কোরআনের সুরা মুমতাহেনার ৪ নম্বর আয়াতে। এবং তাঁকে পেশ করেছেন অনুকরণীয় আদর্শ রূপে। ঈমানদারদের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে ইব্রাহীম (আ:)’য়ের জীবনে।” এ থেকে বুঝা যায়, ইসলামের শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে মুসলিম জীবনে যে লড়াই –সেটি মহান আল্লহাতায়ালার কাছে কতটা প্রিয়।

নবীজী (সা:)’র জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলো, ইসলামের শত্রুশক্তির নির্মূল স্রেফ দোয়ার মাধ্যমে হয়না। অথচ তিনি ছিলেন মহান আল্লাহতায়ালার মহান রাসূল। দুর্বৃত্ত শক্তির নির্মূলে তাকেও দোয়ার সাথে সশরীরে জিহাদে নামতে হয়েছে। এবং সে পথেই প্রতিষ্ঠা করেছেন ইসলামী রাষ্ট্র। এটিই নবীজী (সা:)’র শ্রষ্ঠ সূন্নত। লড়াই না থাকলে বিজয়ের প্রশ্নই উঠে না –সেটি বীজ না বুনে ফসল তোলার ন্যায় কল্প বিলাস। তখন অসম্ভব হয় ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। আর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না পেলে লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও শরিয়ত পালন ও পূর্ণ ইসলাম অসম্ভব হয়। তখন অসম্ভব হয় মুসলিম উম্মাহর শক্তিবৃদ্ধি। বাংলাদেশে ঢাকা’র ন্যায় একটি জেলাতে যত মাদ্রাসা ও মসজিদ আছে তা খলিফা রাশেদার আমলে সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্র জুড়ে ছিল না। কিন্তু তাতে লাভ কি হয়েছে? দেশে কি ইসলামের প্রতিষ্ঠা বেড়েছে? গৌরব বেড়েছে কি বাঙালী মুসলিমের। বরং ইতিহাস তো দুর্নীতিতে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হওয়ার। দূর্নীতি নির্মূলের প্রধান ও শক্তিশালী হাতিয়ারটি হলো রাষ্ট্র। কিন্তু সে রাষ্ট্র যদি দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হয় –তবে দুর্নীতিতে প্লাবন আসবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? নবীজী (সা:)’র ইসলাম –যার অপরিহার্য উপাদান হলো শরিয়ত, হুদুদ, দুর্বৃত্তিমুক্ত সমাজ, খেলাফত, শুরাভিত্তিক শাসন, মুসলিম ঐক্য ও জিহাদ -সে ইসলাম বাংলাদেশে নাই। যেটি আছে সেটি হলো অপূর্ণাঙ্গ ও বিকৃত ইসলাম। পূর্ণাঙ্গ ইসলাম না থাকাতে সমাজ জুড়ে বেড়ে উঠেছে অধর্ম ও ভ্রষ্টতা। এজন্যই দেশ বিশ্বরেকর্ড গড়েছে দুর্বৃত্তিতে। রেকর্ড গড়ছে এমন কি পৌত্তলিক সংস্কৃতির পরিচর্যাতেও। বর্ষবরণ ও বসন্তবরণের নামে দেশে যেরূপ পৌত্তলিক সংস্কৃতির জোয়ার সৃষ্টি হয় -তা এমন কি কলকাতার হিন্দু সংস্কৃতিকেও হার মানায়। ঢাকা শহরে বাংলা ১৪২৫’য়ের নববর্ষ পালন দেখে অভিভুত হয়েছেন কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকার রিপোর্টার। তা নিয়ে উক্ত পত্রিকায় তিনি একটি রিপোর্টও ছেপেছেন।

 

ঈমানদারীর পথ ও গাদ্দারির পথ

ইসলামের মৌল বিশ্বাস ও অনুশাসনের নির্মূলে রাষ্ট্রীয় ভাবে যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইঞ্জিনীয়ারীং চলে, তখন লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসাও যে কতটা ব্যর্থ হয় –বাংলাদেশ মূলত তারই উদাহরণ। অথচ ইসলামের শত্রুশক্তি নির্মূল হলে এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে সমগ্র দেশ পরিণত হয় মসজিদ-মাদ্রসায়। নবীজী (সা:)’র হাদীস: কেউ মসজিদ নির্মাণ করলে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর জন্য জান্নাতে ঘর তৈরী করে দেন। মসজিদ নির্মাণে অর্থ ব্যয় হয়, কিন্তু তাতে রক্তের বিনিয়োগ হয় না। কিন্তু বিপুল অর্থ ও হাজার হাজার মানুষের রক্তের বিশাল বিনিয়োগটি অপরিহার্য হয় ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে। ইসলামী রাষ্ট্র দেয়, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের বিজয়। দেয়, শত্রুর হামলার মুখে মুসলিম উম্মাহর প্রতিরক্ষা। দেয়, বিশ্বশক্তি রূপে উত্থানের সামর্থ্য। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণের পুরস্কার যে কতো বিশাল -সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন? যে সমাজে সে কাজটি বেশী বেশী হয়, সে সমাজ পায় মহান আল্লাহতায়ালার অফুরন্ত নেয়ামত। তাদের সাহায্যে হাজার হাজার ফেরেশতা নেমে আসে। জুটে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়। ফলে এ পৃথিবী পৃষ্ঠে এর চেয়ে সেরা নেক কর্ম এবং শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিশীল কাজ আর কি হতে পারে? সেটি না হলে সে রাষ্ট্রের বুকে যা নেমে আসে তা হলো কঠিন আযাব। ইসলামী রাষ্ট্রটি সবচেয়ে সফল ভাবে হয়েছিল সাহাবায়ে কেরামদের যুগে। নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সে কাজে শহীদ হয়েছেন। তাদের অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগের ফলে অর্জিত হয়েছিল বিশ্বব্যাপী ইজ্জত। এবং তাতে মুসলিম উম্মাহর উত্থান ঘটেছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি রূপে। কিন্তু আজ সে কোরবানি নাই, ফলে মুসলিম উম্মাহর সে শক্তি এবং ইজ্জতও নাই। কারণ, ঈমানদারীর বদলে তারা বেছে নিয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের সাথে গাদ্দারির পথ।

মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের সাথে গাদ্দারির ইতিহাস গড়েছিল বনি ইসরাইলীরা। ফিরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দেয়ার পর হযরত মুসা (সা:) এবং তাঁর অনুসারি বনি ইসরাইলীদের উপর যে হুকুমটি এসেছিল -সেটি উপাসনালয় বা মাদ্রাসা গড়ার নয়। বরং সেটি ছিল ফিলিস্তিন থেকে স্বৈরশাসন নির্মূলের। নির্দেশ ছিল, স্বৈরশাসনের নির্মূল করে সেখানে তাওরাতে ঘোষিত শরিয়ত প্রতিষ্ঠা দেয়ার। কিন্তু ইহুদীগণ সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। তাদের আচরণ এতটাই উদ্ধত ছিল যে তারা হযরত মূসা (আ:)কে বলেছিল, “হে মূসা! তুমি ও তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা অপেক্ষায় আছি।” তাদের গাদ্দারির ফলে স্বৈরাচারের নির্মূল ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কাজ সেদিন সফল হয়নি। ফলে হযরত মূসা (আ:) উপর অবতীর্ণ শরিয়তি বিধান স্রেফ তাওরাতেই রয়ে গেছে, বাস্তবায়ীত হয়নি। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে এরূপ গাদ্দারি কি কখনো রহমত ডেকে আনে? বরং ঘিরে ধরেছিল কঠিন আযাব। ফিলিস্তিনে ঢুকা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়; শত শত বছর তারা নানা দেশের পথে পথে ঘুরেছে উদ্বাস্তুর বেশে। অথচ তাদের যে জনবল ছিল তা মহান নবীজী (সা:) পাননি। নবীজী (সা:) তাঁর মক্কী জীবনের ১৩ বছরে ২০০ জনের বেশী লোক তৈরী করতে পারেননি। অথচ মিশর থেকে হিজরত কালে হযরত মূসা (আ:) সাথে ইহুদীদের সংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। কিন্তু সে বিশাল জনবল তাদের শক্তি ও ইজ্জত না বাড়িয়ে অপমানই বাড়িয়েছে। একই পথ ধরেছে আজকের মুসলিমগণ। বিপুল সংখ্যায় বাড়ছে তাদের জনবল; কিন্তু বাড়েনি মহান আল্লাহতায়ালার পথে তাদের অঙ্গিকার ও কোরবানী। ইহুদীদের ন্যায় তারাও নিষ্ক্রিয় স্বৈরশাসকদের নির্মূলে। এক্ষেত্রে বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতাটি কি কম? দীর্ঘকাল যাবত তাদের ঘাড়ে চেপে বসা স্বৈরশাসন এবং ইসলামের পরাজয় বস্তুত সে ব্যর্থতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম মেনে চলায় সামান্য অঙ্গিকার থাকলে এ জালেম স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গ্রামে গঞ্জে জিহাদ শুরু হতো।

 


বিপদ জিহাদশূণ্যতার

যে কৃষক ফসল ফলাতে জানে, তার ফসল বানের পানিতে বার বার ভেসে গেলেও সে আবার চাষাবাদে নামে। নিষ্ক্রিয় হওয়া, মনের দুঃখে হতোদ্যম হওয়া বা হতাশায় দেশ ছেড়ে যাওয়াটি তাঁর রীতিবিরুদ্ধ। গৃহে বার বার চুরি-ডাকাতি হবে এবং দিনের পর দিন গৃহ চোর-ডাকাতদের হাতে অধিকৃত থাকবে –এটি কি কোন সভ্য মানুষ মেনে নেয়? সেটি মেনে নেয়াটি শুধু অক্ষমতা নয়, বরং অসভ্যতাও। সভ্য মানুষ তাই চোর-ডাকাত তাড়াতে হাতের কাছে যা পায় তাই নিয়ে লড়াইয়ে নামে। ইসলামে সে লড়াইটিই তো জিহাদ। এরূপ জিহাদের কারণেই রাষ্ট্র থেকে নির্মূল হয় শয়তানী শক্তির দখলদারি। শত্রুর নির্মূলে ও মুসলিম উম্মহর প্রতিরক্ষায় একমাত্র জিহাদই হলো মূল হাতিয়ার। ফলে শত্রু শক্তির লাগাতর হামলাটি নামায-রোযা বা হজ্ব-যাকাতের বিরুদ্ধে নয়; বরং সেটির লক্ষ্য মুসলিম জীবন থেকে জিহাদের বিলুপ্তি। এবং জনগণ জিহাদমুক্ত হলে তাদের দখলদারীটি বিপদমুক্ত হয়।

 প্রতিটি মুসলিম সমাজে জিহাদের বিরুদ্ধে শয়তানের কৌশলটিও চোখে পড়ার মত। শয়তান সমাজে শয়তান রূপে নামে না; নামে মোল্লা-মৌলভী, আলেম-উলামা, পীর-দরবেশ, ইমাম, হুজুর ও বুদ্ধিজীবীর ছদ্দবেশে। এরা বলে পবিত্র কোরআনে ইসলামি রাষ্ট্র বলে কিছু নেই। বলে, শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বলে কিছু নাই্। বলে, জিহাদ বলেও কিছু নাই। যেন নবীজী (সাঃ) ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও সে রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে কোরআনের বিরুদ্ধে চলে গেছেন! (নাউযু  বিল্লাহ।) যেন ইসলামে খোলাফায়ে রাশেদা বলে কিছু ছিল না। বদর, ওহুদ, খন্দক ও হুনায়ুনের যুদ্ধ বলেও কিছু ছিল না। তাদের কাছে ইসলাম হলো স্রেফ তাওহীদে বিশ্বাস এবং নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল পালন। নহিসত দেয়, জিহাদে নামার আগে ফেরেশতা হওয়ার। অথচ তারা জানে ফেরেশতা হওয়াটি অসম্ভব ব্যাপার। যে কাজ ফেরেশতাদের, সে কাজ মানুষের নয়। এক্ষেত্রে তাদের নিজেদের ব্যর্থতাটিও কি এ ক্ষেত্রে কম? এরূপ লক্ষ লক্ষ আলেম, ইমাম, হুজুর, পীর, সুফি ও দরবেশ প্রতি বছর দুনিয়া থেকে বিদায় নয় ফেরেশতা না হয়েই। নামায-রোযার ভাণ্ডারে অনেক ইবাদত জমলেও কতটুকু পূর্ণ হয় তাদের ঈমানের ভাণ্ডার? একটি দিনের জন্যও কি তারা জিহাদে হাজির হয়েছে?

জিহাদ থেকে অধিকাংশ মুসলিমের দূরে থাকার কারণে মুসলিম দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও ঘটেনি। অথচ দেশ যেখানে ,অধিকৃত ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে এবং শরিয়ত যেখানে নির্বাসিত, সে দেশে জিহাদের ময়দান তো হাজির হয় প্রতিটি ব্যক্তির দরজার সামনে। এবং জিহাদ প্রসঙ্গে নবীজী (সাঃ)’র প্রসিদ্ধ হাদীস: “যে ব্যক্তিটি জীবনে কোন দিন জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না -সে ব্যক্তি মুনাফিক।”  কারণ জিহাদ তো ঈমানের ফসল। বীজ থেকে যেমন চারা গজায়, ঈমান থেকে তেমনি জিহাদ জন্ম নেয়। তাই ঈমান থাকলে মু’মিনের জীবনে জিহাদ অনিবার্য ভাবেই এসে যায়। তাই নবীজী (সা:)’র অনুসারি এমন কোন সুস্থ্য সাহাবী ছিলেন না যিনি জিহাদের ময়দানে প্রাণ দানে হাজির হননি। অথচ যারা মুনাফিক, তাদের জীবনে নামায-রোযা থাকলেও জিহাদ থাকে না।

 

ঈমানের পরিচয়

ঈমান কাকে বলে এবং কীভাবে তার প্রকাশ ঘটে -পবিত্র কোরআন থেকে একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ফিরাউনের প্রাসাদে মূসা (আ:)’র সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে যাদুকরদের যে দলটি ঈমান এনে শহীদ হয়েছিলেন তাদের কেউই ফেরেশতাদের ন্যায় পুতঃপবিত্র ছিলেন না। তারা সারা কর্মজীবন কাটিয়েছিলেন যাদুর ন্যায় কবিরা গুনাহর রাজ্যে। তাদের নামায-রোযার ভাণ্ডারটি ছিল শূণ্য। হযরত মূসা (আ:)’র সাথে যাদুকরদের প্রতিযোগিতা দেখতে সেখানে হাজির ছিল বহু হাজার মানুষ। হযরত মূসা (আ:)’র একই মোজেজা তারাও দেখেছিল; কিন্তু তাদের কেউই ঈমান আনেনি। অথচ ঈমান আনার সামর্থ্যটুকুই মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সামর্থ্য। মহান আল্লাহতায়ালার বিচারে সে সামর্থ্যটুকুর মূল্য অতি বিশাল। সে সামর্থ্যকে তিনি পুরস্কৃত করেন জান্নাত দিয়ে। জীবনের প্রতি পদে তো সে সামর্থ্যেরই পরীক্ষা হয়।

যাদুকরদের কালেমায়ে শাহাদত মহান আল্লাহতায়ালার কাছে যে শুধু কবুল হয়েছিল তা নয়, বরং মহান রাব্বুল আ’লামিন তাদের মুখে সে কালেমা শুনে এতোই খুশি হয়েছিলেন যে তাদের সে কাহিনী পবিত্র কোর’আনে বার বার বর্ণনা করেছেন। এভাবে সমগ্র মানব জাতির জন্য সেটিকে শিক্ষণীয় করে রেখেছেন। হযরত মূসা (আ:)’র মোজেজা দেখার সাথে সাথে তাদের ঈমানের ভাণ্ডারটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে এবং তাঁরা সেজদায় পড়ে যান। ঈমান আনার অপরাধে ফিরাউন তাদেরকে নির্মম ভাবে হাত-পা কেটে হত্যার হুকুম শুনেয়েছিল। কিন্তু সে নৃশংসতায় তাঁরা আদৌ বিচলিত হননি, তারা অটল বিশ্বাসে শহীদ হয়ে গেছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা। এমন একটি চেতনার কারণে মু’মিনের জীবনে ঈমান কখনোই গোপন থাকে না। সে বলিষ্ঠ ঈমান ব্যক্তিকে যেমন নামাযে নেয়, তেমনি জিহাদেও নেয়। ঈমান বলতে কী বুঝায় এবং কীভাবে তার প্রকাশ ঘটে -সেটি বুঝাতেই যাদুকরদের সে কাহিনীকে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে তাঁর নিজের কালামের পাশে সংকলিত করে ক্বিয়ামত অবধি জিন্দা করে রেখেছেন। প্রশ্ন হলো, সারা জীবন নামায-রোযা পালন করার পরও যদি ঈমানের এরূপ প্রকাশ না ঘটে -তবে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে সে নামায-রোযার মূল্য কতটুকু?

 

শত্রুর মুখে নির্মূলের হুংকার এবং ঈমানদারের জিহাদ

প্রশ্ন হলো, মুসলিম ভূমি ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত দেখেও নীরব থাকাটি কি ঈমানদারী? ঈমানের প্রকাশ তো শত্রুশক্তির অধিকৃতি নির্মূলে জিহাদে নামায়। যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও হিন্দু আধিপত্যবাদ -এ দুই শক্তির বিরুদ্ধে রক্তাত্ব লড়াই করে ১৯৪৭-য়ে বিজয় এনেছিল, তারা কি ভারত ও তার সেবাদাসদের অধিকৃতির মুখে নিষ্ক্রীয় থাকতে পারে? ভারতের ন্যায় আগ্রাসী হিন্দু সাম্প্রদায়ীক শক্তির ভয় এরূপ জিহাদী ঈমানদারদের নিয়ে। তাই ভারতসেবীদের মুখে তাদের বিরুদ্ধে নির্মূলের হুংকার। তাদের ভয়, পূর্ব সীমান্তে নতুন মুসলিম শক্তির উদ্ভবের। ভয় থেকে বাঁচতে মানুষ সাথি খোঁঝে। এবং অন্যদের নিয়ে কোয়ালিশন গড়ে। ভারতীয়দের পক্ষ থেকে কলাবোরেটর রূপে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে বেছে নেয়ার হেতু তো সেটিই। তাই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে লড়াই -তাতে ভারতও যে জড়িয়ে পড়বে -সেটিই তো স্বাভাবিক।

শত্রুদের কাজ শুধু দেশ-ধ্বংস, মানব-হত্যা ও নারী-ধর্ষণ নয়। তারা ধ্বংস করতে চায় দেশবাসীর চেতনা ও গৌরবের ইতিহাসকে। কারণ চেতনা ও ইতিহাস বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রতিষ্ঠার আগ্রহ। তখন মানুষ ভূলে যায় নিজ জীবনের মিশন ও ভিশন। শত্রুগণ জানে, ১৯৪৭’য়ের বিজয়ের পিছনে বাংলার ভূমি বা জলবায়ুর কোন ভূমিকা ছিল না; বরং সেটি ছিল বাঙালী মুসলিমদের ইসলামী চেতনা ও ঈমানী দায়িত্ববোধ। তাই শত্রুগণ সে চেতনার বিরুদ্ধে নাশকতায় নেমেছে। তবে সে নাশকতার কাজে বাঙালী মুসলিমদের শত্রু শুধু বিদেশে নয়, দেশের ভিতরেও। ভিতরের শত্রু হলো ঘাড়ে চেপে বসা ঘাতক স্বৈরশাসক ও তার সাঙ্গপাঙ্গগণ। ইসলামি চেতনা বিনাশে ময়দানে নামিয়েছে ইসলামচ্যুৎ সেক্যুলারিস্ট বাঙালী কাপালিকদের। উঁই পোকার ন্যায় তারা ভিতর থেকে বিনাশ করছে বাঙালী মুসলিমের ঈমান, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মবিশ্বাস। মুসলিম দেশে স্বৈরশাসকের নাশকতাটি তাই ব্যাপক ও সর্বগ্রাসী। ফলে তাদের নাশকতাপূর্ণ সে রাজনীতির নির্মূলের চেয়ে মুসলিম সমাজে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা আর কি হতে পারে? বাঙালী মুসলিমদের স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইটি তাই স্রেফ গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই নয়, ঈমান বাঁচানোরও। এটি নিছক রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং পরিপূর্ণ এক জিহাদ। আর এ জিহাদ বাঙালী মুসলিমদের সামনে পেশ করেছে অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্ত বিনিয়োগের এক পবিত্র অঙ্গণ। এ অঙ্গণে কার কি বিনিয়োগ -সেটিই নির্ধারন করবে অনন্ত অসীম পরকালে কে কোথায় স্থান পাবে সে বিষয়টি। ফলে কোন সুস্থ্য ব্যক্তির জীবনে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কি হতে পারে? ১ম সংস্করণ ০৮/০৯/২০১৮; ২য় সংস্করণ ১৯/০২/২০২১। Tweet:@firozMkamal; facebook.com/firozkamal

 

 




ব্যর্থতা মুসলিম হওয়ায়

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

 যে ব্যর্থতা জনগণের

সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা শুরু করলে সে পথটির শেষ অবধি চলতে হয়। শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলের মাঝে সীমিত থাকলে পথচলার সে কাজটি পুরা হয় না। হাজারো মাইলের যাত্রা পথে যদি এক বা আধা মাইল পথও বাঁকি থাকে তাতে গন্তব্যস্থলে পৌঁছা যায় না। পথের মাঝে যেমন নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক পরিবেশ আসে, তেমনি ধুসর মরুভূমি, দুর্গম পাহাড়, নদ-নদী, অশান্ত সমূদ্রও আসে। গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে হলে বাঁধাবিঘ্নতা যত বিশলই হোক, তা দেখে দমে গেলে চলে না। ধৈর্য ধরে ও কষ্ট সয়ে সবটাই চলতে হয়। সফলতা তো আসে এভাবেই। নইলে ব্যর্থতাই অনিবার্য হয়। একই রূপ অবস্থা আল্লাহর পথে পথ-চলায়। এ পথে শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাতই আসে না, আসে প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে প্রতিরোধও। আসে রক্তাত্ব লড়াই ও জিহাদ। আসে আর্থিক ও দৈহিক ক্ষয়ক্ষতি। আসে মৃত্যু। তবে বাধাবিঘ্নতা ও ক্ষয়ক্ষতি যত বিশালই হোক, সিরাতুল মোস্তাকিমে চলার পথে কোথাও থামার সুযোগ নেই। অনুমতি নেই বিচ্যূত হওয়ারও। বিচ্যুত ও পথভ্রষ্ট হওয়ার অর্থই হলো মহান আল্লাহপাকের কাছে অভিশপ্ত হওয়া। সে বিচ্যুতির পরিনাম জাহান্নামের আগুণ। অপর দিকে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছার আগে নিজ ইচ্ছায় থেমে গেলে ব্যর্থ হয় পূর্বের সকল মেহনত। প্রকৃত মুসলিমের কাছে সেটিও তাই অচিন্তনীয়। মু’মিনের পথ চলা শেষ হয় একমাত্র আল্লাহর পথে শাহাদতে অথবা মৃত্যুতে। সে কখনোই আল্লাহর পথে চলায় থেমে যায় না।

কিন্তু যারা মু’মিনের অকল্যাণ চায়, তারা কখনোই তাকে কল্যাণের পথে তথা সিরাতুল মুস্তাকীমের সবটুকু চলতে দিতে রাজী নয়। তারা চায়, মুসলিমের জীবন সকাল-সন্ধা ঘুরপাক খাক স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও কিছু নফল ইবাদতের মাঝে। পুরা জীবন ইসলামী করতে রাজী নয়। মহান অআল্লাহতায়ালা কি চান -তা নিয়েও তাদের ভ্রুক্ষেপ নাই। তাই মসজিদের জায়নামাজে ও রোযার মাসে অনেকেই মুসলিম, কিন্তু রাজনীতিতে সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী, বিদেশ নীতিতে কাফের রাষ্ট্রের বন্ধু, অর্থনীতিতে সূদখোর, আদালতে কাফরদের আইনের আত্মসমর্পিত, সংস্কৃতিতে হিন্দু, এবং পুলিশ ও প্রশাসক রূপে পতিতাপল্লী, জুয়া, ক্যাসিনো ও মদের ব্যবসার পাহারাদার। মুসলিম রূপে নিজেকে দাবি করলে কি হবে, জীবনের বেশী ভাগ ক্ষেত্রই ইসলামী বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে পরিপূর্ণ।  মহান আল্লাহতায়ালার একটি মাত্র হুকুম অমান্য করায় ইবলিস অভিশপ্ত শয়তানের পরিণত হয়। অথচ মুসলিম সেরূপ অবাধ্যতার একটি নয়, বরং অসংখ্য। তারা নিজেদের দূরে রাখে ইসলামের বিজয় সাধনের ফরজ জিহাদ থেকে। শুধু বাংলাদেশের সরকারেরই নয়,বহু ইসলামি দল বা জামায়াতেরও সেটিই মূল প্রকল্প। তারা মুসলিম জনগণকে জিহাদের অংশটুকু অতিক্রমে অনুমতি বা সমর্থণ দিতে রাজী নয়। ফলে বাঙালী মুসলিমের জীবন ব্যর্থতায় ভরে উঠেছে।

বহু কোটি বাঙালী মুসলিমের মাঝে ক’জন অতিক্রম করেছে জিহাদের ধাপ? ক’জন পুরা পথটা চলেছেন আল্লাহর রাস্তায়? ক’জন নামায-রোযা-হজ-যাকাতের গণ্ডি ডিঙ্গিয়ে সামনে এগিয়েছেন? যে মুসলিম ভূমিতে ইসলাম পরাজিত এবং ইসলামের শরিয়ত গিয়ে পড়েছে আঁস্তাকুড়ে -সে ভূমিতে মু’মিনের জীবেন জিহাদ থাকবে না -সেটি কি ভাবা যায়? কিন্তু ক’জনের জীবনে এসেছে সে জিহাদ? সাহাবাগণ চলেছেন সিরাতুল মুস্তাকীমের পুরাটা পথ। অথচ এক্ষেত্রে বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতাটি বিশাল। সংখ্যায় বিশাল হয়েও মহান আল্লাহর দ্বীনের পরাজয়কে তারা নিরবে সয়ে নিয়েছে। সে পরাজয় নিয়ে তাদের মধ্যে কোন দুঃখবোধ বা মাতমও নেই। বরং আছে বছরের নানা দিনে নানা রূপ উৎসব। মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের সাথে বাঙালী মুসলিমের সংযোগ যে কতটা ছিন্ন -সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাঁকী থাকে? এরূপ বিচ্ছেদের মূল কারণ, ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃতি। দেশ অধিকৃত হলে অধিকৃতি বাড়ে মুসলিমের চেতনার ভূমিতেও। ইসলামের সাথে বিচ্ছেদের সে বিষয়টি তাই শুধু দেশের সেক্যুলারিস্টদের একার নয়।বিচ্ছেদ বেড়েছে তাদেরও যারা নিজেদের ইসলামের পক্ষের শক্তি রূপে দাবী করে তাদের জীবনেও। ফলে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের ময়দানে দেখা না গেলে কি হবে, রাজপথে তারা বিরাট বিরাট বিজয় মিছিল নিয়ে নামে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয় দিবসগুলোতে।

 

ব্যর্থতা শিক্ষাঙ্গণে

বাঙালী মুসলিমদের এরূপ ব্যর্থতার মূল কারণ, ঈমান পুষ্টি পায়নি দেশের প্রচলিত শিক্ষা ও সংস্কৃতি থেকে। বরং বাড়িয়েছে ভয়ানক অপুষ্টি। ঈমান তো পুষ্টি পায় পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান থেকে। অথচ অবহেলা সে জ্ঞানার্জনে। দুষিত পরিবেশে দেহের স্বাস্থ্যহীন ঘটে, তেমন ঈমানের স্বাস্থ্যহানি ঘটে দূষিত শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে। এতে অসম্ভব হয় সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা। তখন বেশী বেশী খরিদদার পায় দেশের পতিতালয়, মদ্যশালা, নৈশক্লাব, সূদী ব্যাংক, সেক্যুলার রাজনৈতীক দল ও ধর্মব্যবসায়ীগণ। একই রূপ কারণে অতীতে সিরাতুলে চলার সামর্থ্য পায়নি জাহিলী যুগের বহু আরব। রাষ্ট্র ইসলামি না হওয়ার কারণে অনুরূপ জাহিলী জামানা ফিরে আসে তথাকথিত মুসলিম ভূমিতেও। দেশবাসী তখন নিজেদেরকে মুসলিম রূপে পরিচয় দেয় নিজ চেতনা, নিজ দেশ ও নিজ সমাজের ইসলামিকরণ না করেই। ব্যক্তির জীবনে ইসলাম গুরুত্ব পেলে জগত ও জীবন নিয়ে সমগ্র ধারণাই পাল্টে যায়। পাল্টে যায় জীবনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। পাল্টে যায় নৈতিক চরিত্র, আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য-পানীয়, কর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি। একজন কাফের থেকে জীবনের এসব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে কতটা পার্থক্য সৃষ্টি হলো -তা থেকেই নির্ণীত হয় তার মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার সঠিক পরিমাপ। নবীজী (সাঃ)র আমলে সে পার্থক্যটি ছিল বিশাল। কাফেরদের থেকে সাহাবাদের পার্থক্য শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের ইবাদতে সীমিত ছিল না। সে পার্থক্যটি স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর নবী-রাসূল, ফেরেশতা, পরকাল, দোযখ-বেহেশত ও হাশর দিনের বিশ্বাস নিয়ে নয়। বরং সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল জীবনের স্বপ্ন, মিশন, ভিশন, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিসহ জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে।

যে ব্যক্তি পূর্ব দিকের দিকের যাত্রী, সে কি কখনো পশ্চিমে যাওয়া ব্যক্তির সাথে কি একই ট্রেনে উঠে? তেমনি মুসলিমও পারে না কাফের বা সেকুলার ব্যক্তির সাথে একই লক্ষ্যে রাজনীতি করতে। পারে না যুদ্ধবিগ্রহেও অংশ নিতে। কারণ জীবনের ভিশন ও মিশনের ন্যায় কখনই এক হতে পারে না উভয়ের রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহ। নবীজী (সাঃ) থেকে বর্নীত হয়েছে, এ দুনিয়ার যাদের সাথে জীবন কাটবে হাশরেরর দিনেও তাদের সাথেই বিচারেরর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এবং তাদের সাথেই হবে পরকালের বাসস্থান।ফলে বংশসূত্রে মুসলিম রূপে পরিচিত হয়েও যারা কাফের, মুশরিক ও নাস্তিকদের সাথে দল বাঁধে এবং তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহ করে পরকালে সে কাফেরদের সাথেই তাদের জাহান্নামে হাজির হতে হবে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি সেটিই বেশী বেশী হয়নি? মুসলিমের রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহ হলো মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন ও শরিয়তকে বিজয়ী করার হাতিয়ার। অপরদিকে কাফেরগণ রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহ করে ইসলামের নির্মূলে এবং মুসলিম রাষ্ট্র দখলে।একাত্তরে তেমন একটি যুদ্ধেই সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ ভারতীয় কাফেরদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের সাথেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে। মুসলিমদের প্রতিটি যুদ্ধই জিহাদ,এবং সে যুদ্ধে যারা প্রাণ দেয় তারা সবাই শহীদ। কিন্তু একাত্তরের বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের যুদ্ধটি কখনোই জিহাদের মর্যাদা পায়নি। জিহাদে পরিণত করা তাদের লক্ষ্যও ছিল না। এটি ছিল বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের পুরাপুরি একটি ডি-ইসলামাইজড যুদ্ধ। ফলে সে যুদ্ধে বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ বিজয়ী হলেও তাতে ইসলাম ও মুসলিমের শক্তি বা গৌরব বাড়েনি। বরং শক্তি ও গৌরবে বেড়েছ ভারতীয় হিন্দুদের; এবং শক্তিহানি হয়েছে উপমহাদেশের মুসলিমদের।

 

ইসলাম থেকে দূরে সরার পরিনাম

সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামীকরণ কতটা হলো সেটি ধরা পড়ে কাফেরদের থেকে মুসলিম নাগরিকের বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আচরণগত পার্থক্য থেকে। ইসলাম থেকে দূরে সরাটি যতই বিশাল হয় ততই বিলুপ্ত হয় সে পার্থক্য।তখন মিল বা অভিন্নতাটি প্রবল হয় কাফেরদের সাথে। উভয়ের বিজয় উৎসবও তখনই একই লগ্নে উপনিত হয়। ভারতীয় পৌত্তলিক ও বাঙালী মুসলিমের উভয়ের বিজয় উৎসব তাই ১৬ই ডিসেম্বর। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে এটি এক অভিনব ঘটনা। মিলগুলি ধরা পড়ে আরো অনেক ক্ষেত্রে।তারই উদাহরণঃ ভিন্নতা নেই ভারতীয় সূদী ব্যাংক, প্রশাসন, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, পতিতাপল্লী, মদ্যশালা, সিনেমা ও নাচগানের আসর থেকে বাংলাদেশী ব্যাংক, প্রশাসন, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তি, সাহিত্য-সংস্কৃতি,পতিতাপল্লী, মদ্যশালা, সিনেমা ও নাচগানের।ভিন্নতা নাই ভারতীয় হিন্দুদের রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকেও। এরূপ অবিকল অভিন্নতার কারণেই বাংলাদেশে ইসলামের উত্থান ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে ভারতীয় কাফেরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে যুদ্ধ লড়তে কোনরূপ আপত্তি নাই বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর। যে ইসলামে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার আছে এবং জিহাদও আছে -সে ইসলামকে উভয়ের দেশের সরকারই গলা মিলিয়ে জঙ্গিবাদ বা জঙ্গি ইসলাম বলে। ইসলামের পরাজয় বাড়লে,এবং পাকিস্তানের ন্যায় কোন মুসলিম দেশ খণ্ডিত হলে বরং উভয়েরই আনন্দ বাড়ে। 

কোন কিছুর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বা ওজন মাপা যেমন সহজ, তেমনি অতি সহজ হলো কুফরি, মুনাফেকী বা অনৈসলামের পরিমাপ। কারণ এগুলো গোপন থাকার বিষয় নয়। সে সহজ বিষয়গুলোকে সনাক্ত করার মধ্যেই মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞা। ইসলামে সে জ্ঞানার্জনটি ফরজ।বাঘ-ভালুকের ন্যায় হিংস্র জানোয়ারদের চিনবার সামর্থ্য না থাকলে সেগুলির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যুক্তি থাকে কি? তেমনি ইসলামের শত্রুদের চেনার সামর্থ্য মানুষকে দেয়া না হলে মুসলিম জীবনে জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতের বৈধতা থাকে কি? তাই ইসলামের শত্রুদের চেনার সে কাজকে সহজ করতেই মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বহু আয়াত নাযিল করেছেন। সে সাথে কাণ্ডজ্ঞানও দিয়েছেন। সেটি না হলে ইসলামের সহিংস শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব করার ন্যায় কবিরা গুনাহ থেকে ঈমানদারগণ রক্ষা পেত কি করে? মুসলিম রাষ্ট্রের শিক্ষা-সংস্কৃতির দায়িত্ব হলো সে সামর্থ্য বাড়ানো। চেনার সে কাজটি অতি সহজ হয় ব্যক্তির রাজনীতি,সংস্কৃতি, অর্থনীতি,আইন-আদালত ও শিক্ষাব্যবস্থা ইসলামের শিক্ষা, দর্শন, বিধিবিধান ও মূল্যবোধ থেকে কতটা বিচ্যুৎ তা দেখে। ব্যক্তির বেঈমানী বা মুনাফিকী শুধু মহান আল্লাহতায়ালাই নন,ব্যক্তিও টের পায়। টের পাওয়াটি অতি সহজ  বলেই হযরত উমর (রাঃ) অতি মহামূল্যবান কথা বলেছেন।তিনি বলেছেন, “মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেয়ার আগে নিজেই নিজের হিসাব নাও।” মানুষের প্রজ্ঞা ও কল্যাণ শুধু তার কাজের মধ্যে নয়; বরং সে কাজ কতটা নির্ভূল ও কল্যাণকর সে হিসাবটি বার বার নেয়ার মধ্যে। ব্যস্ত সড়কে গাড়ির চালকের কি এক নিমিষের জন্যও চোখ বন্ধ করার সুযোগ থাকে? তেমনি চোখ বন্ধ রাখার সুযোগ নাই জীবন চালনাতেই। সেটি হলে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুতিটি অনিবার্য। এবং চোখ খোলে মহান আল্লাহতায়ালার পথে চলাটাই হলো ঈমানদারের তাকওয়া। এখানে থাকে যেমন সে পথ থেকে বিচ্যুতির ভয়,তেমনি থাকে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেয়ার ভয়। প্রকৃত গাফেল বা আহাম্মক তো সে ব্যক্তি,যার মধ্যে সে হিসাব নেয়ায় আগ্রহ নেই। প্রকৃত মু’মিন ব্যক্তি শুধু নিজের হিসাবটিই নেয় না, নিজ পরিবার, নিজ সমাজ,নিজ দেশ, ও নিজ উম্মাহর হিসাবটিও নেয়। এভাবেই তো বাড়ে উম্মাহর সাথে ঈমানদারের সংশ্লিষ্টতা। তখন তার জীবনে আসে জিহাদ এবং সে জিহাদে পরম কোরবানীর প্রেরণা। তাই নিজ পরিবার, নিজ দেশ,নিজ উম্মাহর ব্যাপারে চোখ বুঁজে চলাটি ঈমানদারী নয়। বরং ঈমানশূণ্যতা তথা কুফরির আলামত। তাদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালার হুশিয়ারি, “এ দুনিয়ায় যারা অন্ধ থাকাকে পছন্দ করলো, আখেরাতেও তারা হবে অন্ধ;এবং এরাই হলো চরমপথভ্রষ্ট।”–(সুরা বনি ইসরাইল,আয়াত ৭২)।মু’মিন ব্যক্তির ঈমানদারী তাই নিজ দেশ,নিজ উম্মাহর কল্যাণে অর্থদান, মেধাদান, শ্রমদান ও রক্তদান করায়। এ জন্যই শ্রেষ্ঠ ঈমানদার ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ, শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী, শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও শ্রেষ্ঠ শহীদ হন। ঘরের দরজা বন্ধ করে কখনোই তিনি জীবনটি ধ্যানে কাটিয়ে দেন না। দেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও জিহাদে তারা সব সময়ই সম্মুখ কাতারে থাকেন। নবী-জীবনের এটিই তো অতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এবং সে শিক্ষা অতিশয় গুরুত্ব পেয়েছিল সাহাবাদের জীবনেও। মহান নবীজী (সাঃ) যে ১০ জন সাহাবীকে তাদের মৃত্যুর পূর্বেই জান্নাতের সুখবর শুনিয়েছিলেন তাদের কেউই খানকাবাসী সুফি ছিলেন না, তাদের সবাই  ছিলেন তৎকালীন রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহের সম্মুখভাগের সৈনিক। তাদের অধিকাংশই শহীদ হয়েছেন এবং তাদের মধ্য থেক ৪ জন খোলাফায়ে রাশেদাও হয়েছেন।কিন্তু সে শিক্ষা কতটা গুরুত্ব পেয়েছে বাঙালী মুসলিমের জীবনে?

 

শত্রুর প্রজেক্ট

বাঙালী মুসলিমগণ ইসলাম থেকে এতটাই দূরে সরেছে যে ইসলামের বিজয় বা প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের আগ্রহ সামান্যই। তাদের কারণেই বাংলাদেশ দখলে গেছে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে এবং বিলুপ্ত হয়েছে নবীজী (সাঃ) শিক্ষা। যে আদর্শ, যে দর্শন ও যে বিধিবিধান বাংলাদেশে প্রবল ভাবে বিজয়ী সেটি ইসলামের নয়। বাঙালী সেকুলারিস্টগণ সে চেতনাকে বলছে একাত্তরের চেতনা। তাদের কথা,সে চেতনার প্রতিষ্ঠা একাত্তরে ভারতীয় বাহিনীর যুদ্ধজয় ও পাকিস্তানের পরাজয়ের ফলে। সে চেতনার মূল কথা, ডি-ইসলামাইজেশন তথা “ইসলাম হঠাও”। তাদের কাছে পাকিস্তান চিত্রিত হয়েছিল ইসলামি থিওক্রাটিক দেশ রুপে।দেশটির জন্মের মূলে ছিল প্যান-ইসলামিক চেতনা।তাদের দাবী, ইসলামী চেতনার সাথে সংযোগ ছিন্ন করতেই বাংলাদেশের সৃষ্টি। তাদের কথা, বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পক্ষে কোন রাজনীতি থাকতে পারে না। একাত্তর পরবর্তী ডি-ইসলামাইজেশন প্রজেক্টের এটাই ছিল মূল ভিত্তি। প্রতিটি যুদ্ধের শুধু সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যই থাকে না। থাকে আগ্রাসী আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক লক্ষ্যও। তাই একাত্তেরর যুদ্ধ শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গার মধ্যে সীমিত ছিল না। বিজয়ী ভারত সরকারের আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক লক্ষ্যটি ছিল বাঙালী মুসলিমদের ইসলামশূণ্য করা। বাঙালী জাতিয়তাবাদীদের কাছে সেটিই হলো একাত্তরের চেতনা। এ চেতনায় রাজনীতিতে ইসলামের প্রতি অঙ্গীকার রাখাকে বলা রাজাকারের চেতনা। তাদের দাবী,পাকিস্তানের পরাজয়ের সাথে বাংলাদেশে ইসলামের পরাজয়কেও মেনে নিতে হবে। সে দাবী পূরণের লক্ষ্যে একাত্তরের পর জোরে শোরে শুরু হয় ইসলাম সরানোর কাজ।তাই যেখানেই ইসলাম ও মুসলিম ছিল সেখানেই হাত পড়ে। সে প্রজেক্ট নিয়ে সামনে এগুনোর লক্ষেই দিল্লীর শাসক চক্র তাদের নিজ খেলোয়াড় আওয়ামী বাকশালীদের ক্ষমতায় রাখতে চায়। এমন কি সেটি ভোট শূণ্য নির্বাচনের মাধ্যমে হলেও।

প্রশ্ন হলো,বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম কি ভারতীয় কাফেরদের প্রজেক্টকে বাংলাদেশের মাটিতে মেনে নিবে? বাঙালী সেক্যুলারিস্ট ও তাদের ভারতীয় প্রভুদের কাছে একাত্তরের চেতনা যত প্রাণপ্রিয়ই হোক মুসলিমদের কাছে চেতনা মাত্র একটিই। এবং সেটি হলো ইসলামী চেতনা। সে চেতনায় যেমন মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর মহান রাসূল (সাঃ)’য়ের উপর অটল বিশ্বাস আছে,তেমনি তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন অঙ্গীকারও আছে। মুসলিম মাত্রই একমাত্র মহাপ্রভু মহান আল্লাহতায়ালার উপাসক,তার চেতনার উপর দখলদারি একমাত্র তাঁর। ঈমান-আক্বীদার এ পবিত্র ভূমিতে অন্য কোন ধর্ম, দর্শন বা চেতনার সামান্যতম স্থানও নাই। তাছাড়া একাত্তরের চেতনার উপাদান রূপে পরিচিত সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষবাদ ও সমাজতন্ত্র কোন নতুন বিষয় নয়, এগুলো হলো পুরনো জাহিলিয়াত। মু’মিনের মনের পবিত্র ভূমিতে এ পরিত্যক্ত আবর্জনাগুলো কি সামান্যতম স্থানও পেতে পারে? ঈমানদারের চেতনাই তাকে স্বপ্ন দেখায়;এবং সে স্বপ্ন তাকে সে অনুযায়ী গড়ে উঠায় ও পথ চলায় প্রেরণা ও নির্দেশনা দেয়। জীবনের সফলতা নিয়ে একজন মুসলমানের স্বপ্ন এবং কাফেরের স্বপ্ন এক নয়। এক নয় সফলতা ও বিফলতার মাপকাঠিও। আজকের ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে একজন মুসলিম ও একজন সেকুলারের ভাবনাও তাই এক নয়। সে ভিন্নতার কারণেই একাত্তরের চেতনাধারীরা হিন্দু ভারতের রাজনীতি ও সংস্কৃতির সাথে যতটা একাত্ম হতে পারে,নিজ দেশের মুসলিমদের সাথে তা পারে না। তাদের কাছে স্বদেশী এবং স্বভাষী মুসলিমগণ বিদেশী মনে হয়। অনেকের কাছে এসব স্বদেশী ও স্বভাষী বাংলাদেশীরাও পাকিস্তানী রাজাকার গণ্য হয়।এবং আপন মনে হয় ভারতীয় হিন্দুগণ। আওয়ামী বাকশালীগণ সেটি প্রকাশ্যে বলেও। ভারতীয় সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের এটি এক বিশাল সফলতা। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এটি এক উচ্চমাত্রার বিপদ সংকেত।

 

লক্ষ্য ডি-ইসলামাইজেশ

ডি-ইসলামাইজেশনের নাশকতাটি বিশাল। এক ভাষা, এক বর্ণ ও এক ভূগোলে বসবাস করলেও বাংলাদেশের মানুষের মনের ভূবনটি আজ দারুন ভাবে ভিন্ন। বাংলাদেশের মানুষ প্রচণ্ড মেরুকরণের শিকার। মুসলিমগণ নিজরাই আজ দ্বি-জাতীতে বিভক্ত। একদল ইসলামের পক্ষে আরেক দল বিপক্ষে।বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে মসজিদ ও মাদ্রাসার সংখ্যা বিপুল হারে বাড়লেও দেশে ইসলামিকরণ বাড়েনি, বরং দিন দিন সেটি কমছে। আর সেটি ধরা পড়ছে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভিশন, মিশন ও রাজনীতিতে। ভিশন হল সেই স্বপ্ন যা একজন ব্যক্তি তার নিজের ভবিষ্যৎকে নিয়ে দেখে। অনৈসলামিকরণের ফলে অনিবার্য রূপে যেটি ঘটে সেটি হল, মুসলিম ও অমুসলিমের স্বপ্নের মানচিত্রের যে বিভাজনের সীমারেখা সেটির বিলুপ্তি। ইসলামি শিক্ষার মূল লক্ষ্য হল, চেতনার সে ভিন্ন মানচিত্রকে মজবুত করা। সেটি ধ্বসে গেলে মুসলমানের পৃথক রাজনৈতিক ভূগোলও বাঁচে না। সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থা সে চেতনার পৃথক মানচিত্রকেই ধ্বসিয়ে দেয়। বাংলাদেশে সেটিই ঘটেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশটির হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ও নাস্তিকগণ যে স্বপ্ন দেখে, সেই অভিন্ন স্বপ্ন দেখে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানগণও।

সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক স্রোতের টানটিও অতি প্রবল। সে স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে বাঁচতে হলে যেটি প্রয়োজন তা হল, ঈমানের বল। আর সে বল আসে পবিত্র কোরআন থেকে। এজন্যই কোরআনের জ্ঞানার্জন প্রতিটি নরনারীর উপর ফরয। আর বাংলাদেশে সে কোরআন চর্চাই বাড়েনি। ফলে পালিত হয়নি সে ফরয। কোরআন চর্চার নামে দেশে যে কাজটি হয় সেটি হল কোরআন পাঠ বা তেলাওয়াত, কোরআন বুঝা নয়। অনেক আলেম একথাও বলেন, “কোরআনা বুঝা সাধারণ মানুষের কাজ নয়, একাজ আলেমদের।” ভাবটা এমন, সাধারণ মুসলমানের কাজ তেলাওয়াতের ন্যায় নফল কাজে ব্যস্ত হওয়া, কোরআন বুঝার ন্যায় ফরয কাজে নয়। এভাবে রুদ্ধ করা হয়েছে ইসলামি জ্ঞানের প্রসারের কাজ এবং মুসলিম সমাজে হিন্দুধর্মের অনুকরণে একশ্রেণীর পরগাছা ব্রাক্ষ্মণ শ্রেণী গড়ে তোলা হয়েছে। আর সাধারণ মুসলমানদেরকে খুঁটিনাটি মসলা-মাসায়েলসহ ইসলামি জ্ঞানের সর্বক্ষেত্রে তথাকথিত আলেমদের উপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। আর এভাবে বন্ধ করা হয়েছে সমাজের ইসলামিকরণের কাজ। অথচ আলেম হওয়া প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরজ। কারণ, ঈমানের খাদ্য ও ইসলামিকরণের মূল হাতিয়ার হল এই কোরআনী জ্ঞান। পানাহার ছাড়া যেমন স্বাস্থ্য বাঁচে না তেমনি কোরআনী জ্ঞান ছাড়া ঈমানও বাঁচেনা। দেশের মানুষের শারীরিক সুস্থ্যতা বাড়াতে যেমন প্রতি গ্রামের প্রতি ঘরে খাদ্যের সরবরাহকে সুনিশ্চিত করতে হয় তেমনি মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা নিশ্চিত করতে প্রতি ঘরের প্রতি ব্যক্তির কাছে কোরআনের জ্ঞানকে পৌঁছাতে হয়। মুসলিম রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের এর চেয়ে বড় দায়িত্ব নেই। রাস্তাঘাট, কলকারখানা ও কৃষির উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ, তবে ঈমানদার গড়ার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ নেই। একমাত্র এ পথেই মানুষের সবচেয়ে বড় কল্যাণটি নিশ্চিত হয়। নবীজীর আমলে মুসলমানদের সে সীমিত লোকবল ও অর্থবল থাকা সত্ত্বেও নবী পাক (সাঃ) এমন কি অনিরাপদ স্থানেও তাঁর সাহাবাদের পাঠিয়েছেন এবং বহু সাহাবা শহীদও হয়েছেন। কিন্তু সে জন্য কোরআনের জ্ঞান প্রচারের কাজ বন্ধ করেননি। এভাবে যতই বেড়েছে কোরআনের জ্ঞান, ততই বেড়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের ইসলামিকরণ। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজ গুরুত্ব পায়নি। ফলে বেড়েছে ডি-ইসলামাইজেশন। বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও আইন-আদালত থেকে ইসলাম হঠানোর কাজ এতটা সফলতা পাচ্ছে তো একারণেই। তেমনি ভোটের লড়াইয়ে বিজয়ী হচ্ছে ইসলাম বিরোধী পক্ষ। বিশাল বাজার পাচ্ছে মদের দোকানদার, পতিতা, সূদী ব্যাংকার, অশ্লিল সিনেমা ও নাচগানের নট-নটিরা।

কোরআনী জ্ঞানের অভাবে এমনকি নামায কালাম পড়েও সাধারণ মুসলমানেরাও বেড়ে উঠছে ইসলামের প্রতি চরম দায়িত্বশূণ্যতা নিয়ে। ফলে চোখের সামনে আল্লাহর দ্বীন পরাজিত ও তার বিধান ডাস্টবিনে যেতে দেখেও তাদের মধ্যে কোন শিহরন জাগে না। আল্লাহর এ সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত কোরআনকে কিছু লোকের মাঝে সীমিত রেখে সমগ্র সমাজকে কি ইসলামী করা যায়? তাই একটি সমাজ কতটা ইসলামি হল সেটির সঠিক ধারণা মসজিদ-মাদ্রাসা গণনা করে পাওয়া যায় না। মুসলমানের শতকরা হার গণনা করেও সে পরিচয় মেলে না। দেখতে হয় সে সমাজে কোরআনী জ্ঞানের বিস্তার ও সে জ্ঞানে অনুপ্রাণিত মানুষের সংখ্যা। বাংলাদেশে মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৯০ভাগের বেশী। নবীজী (সাঃ)র আমলে আরবের মানুষ এমন হারে ঈমান আনেনি। বাংলাদেশের একটি জেলায় যত মুসলমানের বাস সে সময় সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্রে এত মুসলমানের বাস ছিল না। কিন্তু সে আমলে মদিনার ন্যায় এক ক্ষুদ্র শহরে যত আলেম গড়ে উঠেছিলেন তা বাংলাদেশের ন্যায় অতি জনবহুল দেশে বিগত হাজার বছরেও গড়ে উঠেনি। মুসলমানদের প্রতিটি ঘর পরিণত হয়েছিল মাদ্রাসায়। ফলে মাত্র কয়েক বছরে ইসলামি জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার গড়ে উঠেছিল। অথচ বাংলাদেশে ইসলামের ইতিহাস ৮ শত বছরেরও বেশী। কিন্তু ১০০ বছর আগেও বাংলাদেশের মুসলমানেরা কোরআনের একখানি তফসিরও লেখেনি। কোরআনী জ্ঞানের এমন দারিদ্রতা নিয়ে কি রাষ্ট্রে ইসলামাইজেশনের স্বপ্ন দেখা যায়? বিজয়ী হয় কি ইসলাম?      

ডি-ইসলামাইজেশনের কাজটি যে শুধু অমুসলিম কাফেরদের দ্বারা হচ্ছে তা নয়, হচ্ছে মুসলমানদের দ্বারাও। সেকুলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, এনজিও, সেকুলার মিডিয়া, সেকুলার সাহিত্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিই ডি-ইসলামাইজেশনের মূল কারণ নয়। এ কাজটি চরম ভাবে হচ্ছে দেশের আলেম ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বনি ঈসরাইলের বিরুদ্ধে যে মূল অভিযোগ এনেছেন সেটি এ নয় যে তারা পৌত্তলিক, নাস্তিক বা কাফের হয়ে গিয়েছিল। এটিও নয় যে, তারা মূসা (আঃ) ও তাঁর উপর নাযিলকৃত তাওরাত কিতাবকে অবিশ্বাস করতো। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি এনেছেন তা হল, আল্লাহর দ্বীনকে তারা পূর্ণভাবে অনুসরণই করেনি। আল্লাহর বাণীতে তারা ইচ্ছামত পরিবর্তন এনেছিল। গাফলতি করেছিল আনুগত্যে। সিরাতুল মোস্তাকিমের পুরা পথটি তারা চলেনি। গন্তব্যস্থলে পৌঁছার বহু আগেই তারা বিচ্যূত হয়েছে। ভেসে গেছে সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক স্রোতে। ভেসে গেছে নিজেদের স্বার্থ চিন্তায়। মূসা (আঃ) মাত্র ৪০ দিনের জন্য আল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন, আর এর মধ্যেই তারা গরু-পুঁজা শুরু করেছিল। মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে সিনা উপত্যাকার ধূসর মরুর বুকে ৪০ বছর মেঘের ছায়া দিয়েছিলেন। আসমান থেকে মান্না সালওয়া নামিয়ে খাইয়েছেন। এরপর তাদেরকে যখন কানান থেকে জালেমদের জবর দখল হটানোর হুকুম দিলেন তখন তারা হযরত মূসা (আঃ)কে বলেছিল, “যাও তুমি ও তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।” ইসলামি চেতনা সমৃদ্ধ কোন জনগোষ্ঠি কি এমন কথা বলতে পারে? এ ভাষা তো বিদ্রোহের। আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে এমন বিদ্রোহ তাদের উপর আল্লাহর আযাবকেই ত্বরান্বিত করেছিল।

ডি-ইসলামাইজেশন একটি উম্মাহকে কিভাবে আল্লাহর প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুত করে সে বিষয়ে জ্ঞানদান করেছেন মহান আল্লাহতায়ালা স্বয়ং নিজে। সে বিষয়ে তিনি উপমা পেশ করেছেন বনি ইসরাইলের ইতিহাস থেকে। মহান আল্লাহতায়ালার অপার নেয়ামত পেয়েছে বনি ইসরাইল। সবচেয়ে বড় নিয়ামত ছিল, আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রদর্শিত সিরাতুল মোস্তাকিম যা অবিরাম দেখাতে তিনি ইহুদীদের জনপদে বহু নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। কিন্তু তারা সে পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। ডি-ইসলামাইজেশনের এ এক করুণ চিত্র। তবে এ বিচ্যুতির কারণ সেকুলার মিডিয়া, সেকুলার এনজিও, পৌত্তলিক কাফের বা বিধর্মী মিশনারী ছিল না। আল্লাহপাক সে জন্য বনি ইসরাইলের আলেমদের দোষী বলেছেন। রাষ্ট্র জুড়ে অজ্ঞতার অন্ধকার দেখে সেটিকে গালী দেওয়া অহেতুক। প্রকৃত দোষী তো সেসব ব্যক্তি যাদের উপর আলো জ্বালানোর দায়িত্ব ছিল কিন্তু তারা সে দায়িত্বই পালন করেনি। বনি ইসরাইলের আলেমগণ সে অপরাধে অপরাধী। আজকের মুসলিম বিশ্বের বিশেষ করে বাংলাদেশের আলেমদের অপরাধ ও ব্যর্থতাও তাদের চেয়ে ভিন্নতর নয়। পবিত্র কোরআনে প্রচন্ড জোর দেয়া হয়েছে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধে। আল্লাহতায়ালা বলেছেন,
“তোমাদের মধ্যে অবশ্যই একটি উম্মাহ থাকতে হবে যারা মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকবে এবং ন্যায়ের হুকুম দিবে এবং অন্যায়কে রুখবে। এবং তারাই হল সফলকাম।” –(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৪)।

সফলতার পথ নিছক নামায-রোযা নয়, হ্জ্ব-যাকাতও নয়, বরং সে লক্ষ্যে ঈমানদারকে আরো সামনে এগুতে হয়। সফলতা আসে কল্যাণের পথে ডাকা এবং ন্যায়ের হুকুম এবং অন্যায়কে রুখার মধ্যে। রাষ্ট্রে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের এটিই হল মূল কৌশল। এটিই হল ইসলামাইজেশন। মুসলমানের জীবনের এটিই হল মূল মিশন এবং এ পথেই আসে পরকালের সফলতা। যে ব্যক্তি পবিত্র কোরআন মনযোগ সহকারে পড়বে সে ব্যক্তির কাছে আল্লাহর সহজ সরল এ নির্দেশটিও সুস্পষ্ট হবে যে, সফলতা লাভের পথ শুধু তাবলীগের পথ নয়। তাকে আরো সামনে যেতে হয়। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরো্ধেও তাকে বহু দূর অগ্রসর হতে হয় এবং সে পথে অগ্রসর হলে সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অনিবার্য। এমন যুদ্ধ এড়াতে পারেননি মহান নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়েই কেরাম। বাংলাদেশের মুসলমানদের সমস্যা, লক্ষ লক্ষ মানুষ দ্বীনের তাবলীগে পথে বেরুলেও এর বেশী তারা এগুতে রাজী নয়। অন্যায়ের প্রতিরোধ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগকে তারা বলছে মৌলবাদ। এমন চেতনাকে বলছে চরমপন্থি ইসলাম। অথচ মুসলমানের ঈমানের মূল পরীক্ষাটি তো হয় এক্ষেত্রটিতেই। কোরআনের মূল জোর ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় ও অন্যায়ের প্রতিরোধে। এ কাজের মধ্যেই ইসলামিকরণের মূল চাবিকাঠি। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম তো এগুলোই করেছেন।           

ধর্মের নামে ডি-ইসলামাইজেশন

সনাতন ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজটি স্রেফ সেকুলারিস্টদের দ্বারা হয়নি, হয়েছে ধর্ম ও ইবাদতের নামেও।বাংলাদেশে মুসলিমদের বড় দূর্ভাগ্য হল, ইসলামের মূল শিক্ষার সাথে তাদের পরিচয় লাভই হয়নি। এদেশটিতে ইসলাম প্রচার লাভ করেছে বিদেশ থেকে আগত সূফীদের দ্বারা। সূফীগন ইসলামের কিছু মজহাবগত বিষয়ের প্রচার করলেও নবীজী (সাঃ) ও তার সাহাবাগণ যে সিরাতুল মোস্তাকিমটি পুরাপুরি অতিক্রম করেছিলেন, তা তারা করেননি। তারা কোরআনের বিধানকে বিজয়ী করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে নেননি। অথচ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের বিষয়টি নবীজীর অতিগুরুত্বপূর্ণ সূন্নত। একাজ ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য ব্যক্তি বা বাদশাহদের হাতে ছেড়ে দিলে সে সমাজে ইসলামের বিজয় আসে না, রাষ্ট্রের ইসলামিকরণও হয় না। অথচ সূফীগণ নবীজী (সাঃ)র সে সূন্নত বা আদর্শকে নিজেরা যেমন পালন করেননি তেমনি বাংলাদেশের মুসলমানেরকেও সেটি পালনে অনুপ্রাণিত করেননি। ইসলামেরর পথে কিছু দূর এগিয়ে তারা আর এগুননি। ফলে শুরু থেকেই বাংলাদেশে ইসলামিকরণের কাজটি পূর্ণাঙ্গতা পায়নি।

কোর’আনের সাথে আলেমদের এমন আচরণ শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। একই পথের পথিক ভারতীয় আলেমগণ। বরং বাংলাদেশের আলেমগণ এক্ষেত্রে ভারতীয় আলেমদের অনুসারি মাত্র। একথা অনস্বীকার্য যে তারা বিপুল সংখ্যক মাদ্রাসা গড়েছেন। আজীবন কোরআন-হাদিসের জ্ঞান বিতরণও করেছেন। কিন্তু সে সব মাদ্রাসায় কোরআনচর্চা কীরূপ হয়েছে তার উপর অভিমত এসেছে উপমহাদেশের দুইজন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন থেকে। তাদের্ একজন হলেন শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান। আরেকজন হলেন মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী। শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসানকে অনেকে সে সময়ের মোজাদ্দেদও মনে করেন। তাঁকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার গ্রেফতার করে মাল্টা দ্বীপে কারাবন্দী করেছিল। মাল্টা জেল থেকে মূক্তি পাওয়ার পর দেওবন্দে তিনি তৎকালীন ভারতের প্রখ্যাত আলেমদের এক বৈঠক ডাকেন। সে জলসায় মাওলানা মূফতি শফি (পরবর্তীকালে পাকিস্তানের গ্রান্ড মূফতি), মাওলানা হোসেন আহমেদ মাদানী, মাওলানা শাব্বির আহম্মদ ওসমানিসহ ভারতের বড় আলেমরা উপস্থিত ছিলেন। সে জলসায় মাওলানা মাহমূদুল হাসান বলেন, আমি মুসলমানদের দুরাবস্থার কারণ নিয়ে যা কিছু চিন্তা ভাবনা করেছি তা থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে মুসলমানদের এ দূর্দশার কারণ মূলতঃ দু’টি।

প্রথম কারণটি হল, কোর’আনের জ্ঞানার্জনে গুরুত্ব না দেওয়া। দ্বিতীয় কারণটি, মুসলমানদের অনৈক্য। এসব আলেমগণ বেশী জোর দিয়েছেন হাদীস ও ফিকাহর উপর। তাদের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাগুলো বহু হাদীস বিশারদ জন্ম দিয়েছে, কিন্তু খুব কমই মোফাস্সিরে কোরআন সৃষ্টি করেছে। মুফতি শফি লিখেছেন, মাওলানা মাহমূদুল হাসান দু’টি কারণের কথা বল্লেও তা মূলতঃ একটি। আর সেটি হল, কোরআনের জ্ঞানে অনিহা। মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী উপমহাদেশের আরেক প্রখ্যাত দেওবন্দি আলেম। তারই এক শিষ্য তাঁকে একদিন অতিশয় বিচলিত ও পেরেশান দেখলেন। তাকে তাঁর পেরেশানির কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, বড় দুশ্চিন্তায় আছি আল্লাহর দরবারে কি করে জবাব দিব। তার শিষ্য জিজ্ঞেস করলেন, “হুজুর, আপনি সারাজীবন হাদিস পড়িয়েছেন, দ্বীনের খেদমত করেছেন। আপনার দুশ্চিন্তার তো কারণ দেখি না। আপনি কেন এত পেরেশান হবেন।” আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী বলেন, “সারাজীবন হানাফী মজহাবের ফিকাহগত ফায়সালাগুলোকে সঠিক প্রমাণিত করার চেষ্টা করেছি। অথচ শাফেয়ী মজহাবের বিষয়গুলোও তো সঠিক হতে হবে।” এ অবস্থা শুধু আনোয়ার শাহ কাশ্মিরীর নয়, অনুরূপ অবস্থা প্রায় অধিকাংশ আলেমদেরও। তারা ফেরকাগত ও মাজহাবগত বিষয়ে এতটা বেশী ডুবে ছিলেন যে কোরআনের জ্ঞান বিতরণের তেমন ফুরসতই পাননি।        

ইসলাম থেকে সরানো হচ্ছে তাবলীগের নামে 

কোন ঈমানদার ব্যক্তি মুসলিম উম্মাহর বিভক্তিতে কখনই খুশি হতে পারেনা, তেমনি সে বিভক্তির কাজে অংশ নিতে পারে না। আর বিভক্তি সৃষ্টি করা যেমন হারাম তেমনি সেটিই টিকিয়ে রাখাও হারাম। সমাজ যখন ইসলামি হয় তখন সে বিভক্তিগুলোও বিলুপ্ত হয়। আর যখন অনৈসলামের পথে যাত্রা শুরু করে তখন সে বিভক্তি আরো গভীরতর হয়। তাই ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশে যেরূপ প্যান-ইসলামী চেতনা ছিল সেটির কথা এখন ভাবাই যায় না। বাংলাদেশে যতই বাড়ছে ডি-ইসলামাইজেশন ততই বাড়ছে বিশ্বের অন্যভাষার মুসলমানদের থেকে দূরত্ব। ভারতের নানা ভাষাভাষী হিন্দুরা আজ একতাবদ্ধ। একতাবদ্ধ ইহুদী ও খৃষ্টানরাও। কিন্তু প্রচন্ডভাবে বিভক্ত মুসলমানেরা। আল্লাহর কাছে এমন বিভক্তি বড্ড অপছন্দের। যার অন্তরে ঈমান আছে, মুসলিম বিশ্বের এমন বিভক্তি তার মনে মাতম সৃষ্টি করবে সেটিই কি কাঙ্খিত নয়? কিন্তু সে মাতম সাধারণ মুসলমান দূরে থাক এমনকি আলেম-উলামা ও ইসলামি সংগঠনের নেতাদের মাঝেও সৃষ্টি হয় না। বরং সে বিভক্তি আজ তাদের কাছেও উৎসবের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎসবের সে আয়োজনে আলেম ও ইসলামী দলের নেতারাও মিলিত হচ্ছে দেশের ইসলামের দুষমন সেকুলারদের সাথে। ডি-ইসলামইজেশন যে কতটা গভীরভাবে দেশের আলেম ও তথাকথিত ইসলামি সংগঠনগুলোকে গ্রাস করেছে এ হল তার নমুনা। সারা জীবন নামায পড়েও লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশী মুসলমান মুসলিম উম্মাহর একতার পক্ষে কিছু করা দূরে থাক তা নিযে বলিষ্ঠ কোন আওয়াজও তুলছে না। ময়দানে নামছে না অন্যায়ের প্রতিরোধে ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। অথচ এমন আচরণ হল আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, প্রশাসন ও আইন-আদালতসহ দেশটির সর্বত্র জুড়ে এ বিদ্রোহীরাও আজ বিজয়ী। ডি-ইসলামাইজেশনের এর চেয়ে বড় নজির আর কি হতে পারে? ১২/০২/২০২১।

 




ইসলামী রাষ্ট্র ও অনৈসলামী রাষ্ট্র এবং ঈমানদারী ও বেঈমানীর বিষয়

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 প্রসঙ্গ: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি

মুসলিম জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমানদার রূপে বাঁচা। এখানে ব্যর্থ হলে অনন্ত কালের জন্য জাহান্নাম অনিবার্য। এ জন্যই ঈমানদার রূপে বাঁচার চেয়ে এ জীবনে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কিছু নাই। এ কারণেই ঈমানদারীর অর্থ কী –এর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কোন প্রশ্নও নাই। কারণ, ঈমানদারী কি -সেটি সঠিক ভাবে না জানলে ঈমানদার রূপে বাঁচবে কীরূপে? তখন সমগ্র বাঁচাটাই ভূল পথে হয় এবং সে বাঁচাটি জাহান্নামে পৌঁছায়। প্রশ্ন হলো, ঈমানদারীর অর্থ কি? মহান আল্লাহতায়ালার কাছে ঈমানদারীর সংজ্ঞাই বা কী? এতবড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পবিত্র কোর’আনে কোন বিবরণ থাকবে না –সেটি কি ভাবা যায়? তাই ঈমানদারীর সংজ্ঞা বুঝতে হলে বুঝতে হবে পবিত্র কোর’আন; না বুঝে তেলাওয়াতে সেটি সম্ভব নয়। সে সাথে দেখতে হবে, মহান নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম কীরূপে বেঁচেছেন –সেটিও। কারণ তাদের বাঁচার মধ্যে মেলে প্রকৃত ঈমানদারীর পরিচয়।

প্রশ্ন হলো, ঈমানদারীর অর্থ কি স্রেফ কালেমা পাঠ, তাসিবহ-তাহলিল, নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত? এবং এগুলো পালন করলেই কি জান্নাত জুটবে? নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের ধর্ম-কর্ম কি শুধু এগুলোর মধ্যে সীমিত ছিল? ঈমানদার রূপে বাঁচতে হলে তো নিজের বাঁচাকে তাঁদের বাঁচার প্রক্রিয়ার সাথে বার বার মিলিয়ে দেখতে হবে। সে হিসাব নেয়া হলে ধরা পড়বে আজকের মুসলিমদের বাঁচাটি নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের বাঁচাটি কতটা ভিন্নতর। আর সে ভিন্নতাটিই হলো সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুতি। প্রশ্ন হলো, সে বিচ্যুতি নিয়ে কি জান্নাতে পৌঁছা যাবে? পবিত্র কোর’আনে ঈমানদারের পরিচয় নিয়ে সামান্যতম অস্পষ্টতা নাই। সেটি অতি স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালার; এবং একবার নয়, অসংখ্যবার। ঈমানদার হওয়ার অর্থ স্রেফ কালেম পাঠ, নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত আদায় নয়।  বরং সেটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে নিজের জান ও মালের ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। এ চুক্তি মোতাবেক ঈমানদার তার জান ও মাল বিক্রয় করে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে। বিনিময়ে পায় জান্নাত। কোর’আনের ভাষায় এটি হলো বাইয়া অর্থাৎ বিক্রয়নামা। সে চুক্তিনামাটি পবিত্র কোর’আনে ঘোষিত হয়েছে এভাবে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিন থেকে তাঁর জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন, তাদের জন্য এর বিনিময়ে রয়েছে জান্নাত। তাঁরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, (শত্রুদের) নিধন করে এবং (নিজেরা) নিহত হয়।” –(সুরা তাওবাহ, আয়াত ১১১)।

ঈমানদারী তাই শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত নিয়ে বাঁচায় সীমিত নয়। বরং সর্বক্ষণ এ চেতনা নিয়ে বাঁচা যে তাঁর নিজের জান ও মালের উপর তাঁর নিজের কোন মালিকানাই নাই। মালিকানাটি মহান আল্লাহতায়ালার। নিজের জান ও মাল বলতে যা বুঝায় -তা হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত মাত্র। এবং দায়িত্ব হলো, সে আমানতের কোনরূপ খেয়ানত না করে একমাত্র তাঁর নির্দেশিত পথে বিনিয়োগ করা। বিনিয়োগের সে খাতটিও উপরুক্ত আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেটি হলো, তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে জিহাদে নেমে শত্রুকে নিধন করা এবং নিজে শহীদ হওয়াও নিয়েত। তাই যার জীবনে জিহাদ নাই, বুঝতে হবে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে তার কোন বিক্রয়নামাও নাই। এবং সে জিহাদশূণ্য প্রমাণ করে, তাঁর মধ্যে সত্যিকারের ঈমানদারীও নাই।      

নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের মাঝে শত্রুর সাথে যুদ্ধ নাই। সেখানে জিহাদ নাই। ফলে সেখানে জানমালের কোরবানী এবং শহীদ হওয়ারও কোন সুযোগ নাই। সেটি ঘটে রাজনীতির অঙ্গণে। রাজনীতিতে কাজ করে দুটি দল: একটি মহান আল্লাহতায়ালার; অপরটি শয়তানের। মহান আল্লাহতায়ালার দলটি তো সেটিই যারা পক্ষ নেয় মহান আল্লাহর ও রাসূলের নিজের নিয়োজিত করে তার এজেন্ডাকে বিজয়ী। আর সে বিজয়ের লক্ষ্যমাত্র হলো শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। আর শয়তানের দলের এজেন্ডা হলো, ইসলামের বিজয়কে প্রতিহত করা। পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিম দেশগুলোতে শয়তানের দলই বিজয়ী, ফলে বিলুপ্ত হয়েছে শরিয়ত।

নবীজী (সা:)’র জীবদ্দশাতে আল্লাহতায়ালার দলের সৈনিকদের সংগ্রহ করেছেন তিনি স্বয়ং। সৈনিক হয়েছেন একমাত্র তারাই যারা মহান আল্লাহতায়ালার সাথে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি সমাধা করেছেন। নবীজী (সা:) তাদের থেকে সে পবিত্র চুক্তির শপথ পাঠ করিয়েছেন। ইসলামী পরিভাষায় এ শপথটি হলো বাইয়াত। বলা হয়ে থাকে, সাহাবাগণ যখন নবীজী (সা:)’র হাত ধরে বাইয়াত করতেন, তখন সেখানে মু’মিনের হাতের সাথে শুধু নবীজী (সা:)’র হাতই থাকতো না। সে দু’টি হাতের উপর আরেকটি হাত থাকতো এবং সেটি মহান আল্লাহতায়ালার। নবীজী (সা:)’র অবর্তমানে বাইয়াতের কাজটি করেন ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান বা খলিফা। লক্ষণীয় হলো, মুসলিম বিশ্বে মহান আল্লাহতায়ালার সে দল বেঁচে নাই্। এবং বেঁচে নাই জিহাদ, ইসলামের বিজয় এবং শরিয়ত। কিন্তু সে বাইয়াত আজও বেঁচে আছে। সে বাইয়াতের রীতি বেঁচে আছে পীর-দরবেশদের মুরিদ রূপে আনুগত্য জাহিরের মাধ্যম রূপে। কিন্তু পীর-দরবেশদের কাছে সে বাইয়েতে বাদ পড়েছে মহান আল্লাহতায়ালার দল গড়া, তাঁর দ্বীনের বিজয়ে জিহাদে নামা এবং সে বিজয়ে জানমালের কোরবানী পেশ। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে মুসলিম রাষ্ট্রে সৈন্য পালতে গ্রীক, রোমান বা পারসিকদের ন্যায় বড় বড় সেনানিবাস গড়তে হয়নি। বড় বড় কেল্লাও নির্মিত হয়নি। বরং প্রতিটি জনপদ ছিল সেনানিবাস, প্রতিটি ঘর ছিল বাংকার। যুদ্ধের প্রয়োজন হলে রাষ্ট্র-প্রধানের পক্ষ থেকে একটি ঘোষণাই যথেষ্ট হতো। আযানের ডাকে ঈমানদার যেমন মসজিদে নামাযে যোগ দেয়, জিহাদের ডাকে তাঁরা সেদিন জিহাদেও যোগ দিতেন। চাষাবাদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ন্যায় যুদ্ধবিদ্ধাও তাঁরা নিজ গরজে শিখতেন। নিজ খরচে অস্ত্র কিনে, নিজ অর্থে যুদ্ধের রশদ সংগ্রহ করে এবং নিজের ঘোড়া বা উঠ নিয়ে শত শত মাইল দূরের রণাঙ্গনে গিয়ে হাজির হতেন। এবং সে যুদ্ধে প্রাণও দিতেন। ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থ এবং মুসলিম ভূমি এভাবেই সে সময় সুরক্ষা পেত।

 

অনৈসলামী রাষ্ট্রের বিপদ

অনৈসলামী রাষ্ট্রের বিপদটি অতি ভয়াবহ। তখন অসম্ভব হয় মহান আল্লাহতায়ালার সাথে কৃত পবিত্র চুক্তির শর্ত পালন। তখন রাষ্ট্রের ভূগোলের উপর শুধু নয়, চেতনার ভূগোলেও প্রতিষ্ঠা পায় শয়তানের অধিকৃতি। শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসন, আদালত, পুলিশ, সেনাবাহিনী –এসবই তখন শয়তানের হাতিয়ারে পরিণত হয়। ফলে অসম্ভব হয় সত্যিকার ঈমানদার রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠা। তখন নিষিদ্ধ হয় জিহাদের ন্যায় ইসলামের সর্বোচ্চ ইবাদত। জিহাদ গণ্য হয় সন্ত্রাস রূপে। এসব রাষ্ট্রের শাসকদের কাছে মুজাহিদগণ গণ্য হয় নিজেদের প্রতিপক্ষ রূপে। ফলে লাগাতর যুদ্ধ শুরু করে ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে। তারা আইন করে বন্ধ করে ইসলামের নামে সংগঠিত হওয়া। এবং দণ্ডনীয় অপরাধ গণ্য হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগ। এভাবেই অনৈসলামী রাষ্ট্রে দুরুহ হয় জান্নাতের পথে পথচলা। তখন সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী ও বিচার-ব্যবস্থাসহ সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান লিপ্ত হয় শয়তানের এজেন্ডা সফল করায়। আরো বিপদ হলো, জনগণ জিহাদশূণ্য হওয়াতে ইসলাম, মুসলিম ভূমি ও মুসলিম জনগণের জানমাল বিপন্ন হলেও এমন রাষ্ট্রে শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু হয়না।

মুসলিমদের আজকের পরাজিত দশা এজন্য নয় যে, মুসলিম দেশগুলোতে কোর’আন-হাদীস বা মসজিদ মাদ্রাসার কমতি রয়েছে। বরং অতীতের তুলনায় এসব শতগুণ বেড়েছে। নবীজী(সাঃ)’র শাসনামলে এমনকি খোলাফায়ে রাশেদার আমলেও কোন সাহাবার ঘরে একখানি পুরা কোর’আন ছিল না। হযরত উসমান (রাঃ) খলিফা থাকা কালে সমগ্র দেশে পূর্ণাঙ্গ কোর’আন পুস্তাকারে ছিল মাত্র ৪ খানি। অথচ আজ ঘরে ঘরে কোর’আন মজিদ ও কোর’আনের তাফসির। আর হাদীস গ্রন্থ? সে সময় কোন হাদীস গ্রন্থই ছিল না। অথচ আজ যে কোন ব্যক্তি বিছানায় শুয়ে শুয়ে হাজার হাজার হাদীস পাঠ করতে পারে। কিন্তু প্রাথমিক কালে হাদীসের সে রূপ শিক্ষা লাভে হাজার হাজার মাইলের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে নানা দেশের নানা স্থানে গিয়ে বিক্ষিপ্ত সাহাবা ও তাবে-তাবেয়ীনদের নিকট থেকে হাদীস শিখতে হতো।

মুসলিমদের আজকের পরাজয়ের মূল কারণটি অন্যত্র। সেটি ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি। কোরআন হাদীস আজ ঘরে ঘরে বেঁচে থাকলেও সমগ্র মুসলিম জাহানে ইসলামী রাষ্ট্র বেঁচে নাই। রাষ্ট্র অধিকৃত হয়ে গেছে ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে। তাতে নানারূপ সেক্যুলার ধ্যানধারণায় প্লাবিত হয়েছে মুসলিমদের চেতনার ভূমি। ফলে বিলুপ্ত হয়েছে কোর’আনী জ্ঞানের ক্ষুধা। ফলে বাড়ছে ঈমানে ভয়ানক অপুষ্টি নিয়ে। আজকের মুসলিমদের এটিই সবচেয়ে বড় বিপদ। চোর-ডাকাতদের হাতে ঘরবাড়ি অধিকৃত হলে এতো বড় ক্ষতি হয় না। কারণ তখনও ঈমান বেঁচে থাকে। কিন্তু দুর্বৃত্ত জাহেলদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে পরিকল্পিত ভাবে ঈমানকে বাঁচতে দেয়া হয় না। নেক আমলের পথও বন্ধ বা সংকুচিত করে দেয়া হয়। ঈমান যে সুস্থ্যতা নিয়ে বেঁচে নাই –সে প্রমাণ কি কম? বেঁচে থাকলে তো মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধানের এমন পরাজয়ে মুসলিম জীবনে জিহাদ কি অনিবার্য হতো না? শয়তানের খলিফাদের দখলদারির বিরুদ্ধে জিহাদ যে শুরু হয়নি -সেটিই প্রমাণ করে ঈমান তার সুস্থ্যতা নিয়ে বেশী মানুষের মাঝে বেঁচে নাই।

 

শত্রুপক্ষের স্ট্রাটেজী

শয়তান ও তার অনুসারিগণ চায় না, রাষ্ট্র ও তার শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানসমূহ ঈমানদারদের হাতিয়ারে পরিণত হোক। কারণ তারা জানে, তাতে বিপন্ন হবে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব। এজন্যই সেগুলোকে ইসলামের শত্রুপক্ষ নিজ হাতে রাখতে চায়। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে মুসলিম ভূমি দীর্ঘকাল অধিকৃত থাকা কালে তারা সেটিকেই সুনিশ্চিত করেছে। মিশরে ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিনিধি লর্ড ক্রমার বলেছিলেন, “মুসলিম দেশগুলিতে সেক্যুলার একটি শ্রেণী গড়ে না উঠা না পর্যন্ত তাদের অধিনত মুসলিম দেশগুলিকে স্বাধীনতা দেয়ার প্রশ্নই উঠেনা।” কাউকে সেক্যুলার করার অর্থই হলো তাকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। আজও সাম্রাজ্যবাদীদের একই স্ট্রাটেজী। সে স্ট্রাটেজী নিয়ে আফিগানিস্তানকে আজও তারা অধিকৃত রেখেছে। সেক্যুলারিজমের মূল কথা ইহজাগতিক স্বার্থচেতনা নিয়ে বাঁচা। পারলৌকিক স্বার্থচেতনা এখানে কুসংস্কার ও পশ্চাদপদতা। লক্ষ্য এখানে চেতনা থেকে মহান আল্লাহর স্মরণকে ভূলিয়ে দেয়া। সেক্যুলার মানুষ গড়তে ইসলামের শত্রুপক্ষ শুধু সিনেমা ঘর, গানের স্কুল, নাট্যশালা ও স্টেডিয়ামই গড়ছে না, সেক্যুলার সেনাবাহিনী, প্রশাসন, আইন-আদালতও গড়ছে। তাই বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে কাফেরদের প্রত্যক্ষ শাসনের অবসান ঘটলেও সেক্যুলারিষ্ট এজেন্ট প্রতিপালনের কাজ শেষ হয়নি।

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামের শত্রু পক্ষের শক্তি বাড়াতে কাফের শক্তির বিনিয়োগটি বিশাল। সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে নাগরিকদের মনযোগ হঠাতেই রাষ্ট্রীয় খরচে বাড়ানো হচেচ্ছ নানা দিবস, নানা উৎসব, নানা রূপ খেলাধুলা ও নাচগানের মহা আয়োজন। অপরদিকে ইসলামচর্চা এবং ইসলামপন্থীদের রাজনীতির উপর লাগানো হচ্ছে নানারূপ নিষেধাজ্ঞা। বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে ইসলামী টিভি চ্যানেল। কোর’আনের তাফসিরকারকদের কারাবন্দী করা হচ্ছে। বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে জিহাদ বিষয়ক বইপত্র। এবং ফাঁসিতে ঝুলানো হচ্ছে ইসলামপন্থী নেতাদের। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয় ইসলামের শরিয়তী বিধানের বিরুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষকদের উত্তেজিত করতে। মুসলিম দেশগুলি ইসলামের শত্রুদের হাতে অধিকৃত হওয়াতে মুসলিম রাষ্ট্র এবং মুসলিম জনসংখ্যা বাড়লেও কোথাও মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের বিজয় সম্ভব হয়নি। ফলে সম্ভব হয়নি মহান আল্লাহর ইচ্ছাপূরণ। মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের সাথে এর চেয়ে বড় বেঈমানী আর কি হতে পারে? এমন বেঈমানী একমাত্র শয়তান ও তার মিত্রদেরই খুশি করতে পারে। কিন্তু তা নিয়ে সচেতনতা ও আত্মসমালোচনাই বা ক’জনের? আজকের মুসলিমদের ব্যর্থতা অনেক। তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের সাথে বেঈমানী। এমন বেঈমানী কি জান্নাতে নিবে?

 

স্বাধীনতার নামে পরাধীনতা

অনৈসলামী রাষ্ট্রগুলো জনজীবনে আযাব ডেকে এনেছে নানা ভাবে। আযাব এনেছে মহান আল্লাহর নির্দেশের সাথে বেঈমানির বাড়িয়ে। স্বাধীনতার নামে এনেছে পরাধীনতা। তাদের কারণেই মুসলিম ভূমি আজ যেমন বিভক্ত, তেমনি পরাজিত। এ বিভক্ত ভূমিতে শুধু ইসরাইল সৃষ্টি হয়নি; লাগাতর যুদ্ধ, রক্তপাত এবং দুর্ভিক্ষও এসেছে। এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। এ বিপদ এসেছে জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের হাতে। প্রশ্ন হলো, যে স্বাধীনতার নামে উসমানিয়া খেলাফতকে তারা ভাঙ্গলো সে স্বাধীনতা কি আদৌ এসেছে? বরং সৃষ্টি হয়েছে কাতার, কুয়েত, জর্দান, লেবানন, বাইরাইন, সৌদি আরব, ওমান, আমিরাতের মত এমন সব রাষ্ট্র যার কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই, ঐতিহ্যও নাই। দেশগুলো নামে মাত্রই স্বাধীন। আসলে শাসিত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অতি অনুগত দাসদের হাতে। অথচ দাসদের শাসন মুসলিম ইতিহাসে অতি পরিচিত। কিন্তু অতীতের সে দাসদের যেমন শক্তি ছিল, তেমনি নিজেরা স্বাধীন ছিল। এবং মুসলিম ভূমির স্বাধীনতা রক্ষায় তাদের প্রবল ইচ্ছা এবং সামর্থ্যও ছিল। আজকের দাসদের ন্যায় তারা সেদিন শক্তিহীন, পরাধীন এবং শত্রুশক্তির দাস ছিলেন না।

শুধু একখন্ড ভূগোল ও একটি পতাকা থাকলেই কি স্বাধীনতা থাকে? স্বাধীনতার সুরক্ষায় লোকবল, অর্থবল ও সামরিক বলও থাকতে হয়। থাকতে হয় স্বাধীনতার সুরক্ষায় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য একটি প্রবল দর্শন। ইসলাম তো সে দর্শনের বলটাই জোগায়। ২২টি আরব রাষ্ট্র এবং ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের মাঝে কোনটিরও কি সে আদর্শিক বল আছে? ইসলামী দর্শন বেঁচে না থাকলে স্বাধীনতা বাঁচানোর আগ্রহও বাঁচে না। মুসলিম দেশগুলোর সামন্ত শাসকেরা বেঁচে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পুরাপুরি জিম্মি রূপে। কাতার, কুয়েত, বাইরান ও ওমানে যেভাবে মার্কিনীরা নৌ, স্থল ও বিমান বাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়েছে তাতে মনে হয় দেশগুলী যেন তাদেরই। বিজয় ও গৌরব ক্ষুদ্রতর হওয়াতে আসে না। রাষ্ট্রের সংখ্যা বৃদ্ধিতেও আসেনা। মুসলিম দেশ ভাঙ্গা তো ইসলামের দুষমনদের কাজ। তেমন একটি খণ্ডিত মানচিত্র সৃষ্টির কাজে তো ইসলামের শত্রুরা নিজ অর্থ, নিজ রক্ত ও নিজ অস্ত্র ব্যয়ে প্রকাণ্ড যুদ্ধ লড়ে দিতেও রাজী। যেমন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ও মার্কিনীরা মধ্যপ্রাচ্যে করেছে এবং ভারত করেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। খণ্ডিত ভূগোল নিয়ে কোন বিশ্ব শক্তি গড়ে উঠেছে -সে নজির মানব-ইতিহাসে নাই। সে জন্য বৃহৎ রাষ্ট্র চাই। সামরিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বলও চাই।

মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো, মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক হওয়া। আর আল্লাহতায়ালা কি তাঁর সৈনিকদের মাঝে অনৈক্য চাইতে পারেন? তেমন অনৈক্যে কি তাঁর দ্বীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা বাড়ে? বরং অনৈক্যে তো মহা বিপর্যয়, সে বিপর্যয় এড়াতেই মহান আল্লাহতায়ালাই তাঁর সৈনিকদের উপর একতাকে ফরজ ঘোষণা করেছেন। তারা বরং কোর’আনে বর্নিত “বুনিয়ানুন মারসুস” তথা সীসাঢালা দেয়ালের মত অটুট হবে -সেটিই মহান আল্লাহতায়ালার কামনা। একতার গুরুত্ব এমনকি কাফেরগণও বুঝে। কারণ তারাও তো বিজয় চায়। তাই বাঙালী-অবাঙালী এবং নানা ভাষা ও নানা বর্ণে বিভক্ত হিন্দু ভারত তাই তার ভৌগলিক অখণ্ডতাকে সযন্তে ধরে রেখেছে। কিন্তু মুসলিমগণ তা পারেনি। মুসলিম দেশে সে বিভক্তি এনেছে জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টগণ। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে এটাই তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ। তারা মুসলিম উম্মাহর জীবনে শুধু বিভক্তিই আনেনি, মুসলিম সভ্যতায় বিপর্যয়ও এনেছে। ফলে অসম্ভব হয়ে পড়েছে বিশ্বশক্তি রূপে পুণরায় মাথা তুলে দাঁড়ানো।

 

সবচেয়ে বড় বিপর্যয়: উদ্ধার কীরূপে?

অনৈসলামী রাষ্ট্রে বসবাসের সবচেয়ে বড় বিপদটি এ নয়, সেখানে মুসলিমগণ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার। বরং সবচেয়ে বড় বিপদটি হলো, অধিকৃত সে ভূমিতে মুসলিমগণ ব্যর্থ হয় মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে দায়িত্বপালনে। অর্থাৎ যে লক্ষ্যে তাদের বাঁচা ও মরা -সেটিই ব্যর্থ হয়। ভূল পথের গাড়ী তা যত বিশাল, যত দামী বা যত উন্নত প্রকৌশলেরই হোক না কেন -তাতে চড়ে বসাতে কি কোন কল্যাণ আসে? সেটি তো বরং ভ্রান্ত পথে নিয়ে যায়। ভারত, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার ন্যায় রাষ্ট্রগুলো বিশ্বশক্তিতে পরিনত হলেও তাতে কি সে রাষ্ট্রে বসবাসকারি মুসলিমদের কল্যাণ বাড়ে? বরং তাদের অর্থ, মেধা, শ্রম তথা সামর্থ্যে বিনিয়োগ হয় অমুসলিম দেশের শক্তি বৃদ্ধিতে। ‌একই ভাবে কোন মুসলিম দেশে কাফের শক্তির হাতে অধিকৃত হলে মুসলিমগণও   তখন দখলদার শক্তির সৈনিকরূপে কাজ করে। এরই উদাহরণ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ২ লাখের বেশী ভারতীয় মুসলিম ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সদস্য রূপে ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়া ইত্যাদি মুসলিম ভূমিতে মুসলিম হত্যাতে নেমেছে।

মুসলিমদের প্রকৃত কল্যাণ নির্ভর করে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাতে -সেটি যেমন এ দুনিয়ায় তেমনি আখেরাতে। কিন্ত্র কোন অমুসলিম দেশে সেটি অতি দুরুহ হয়ে দাঁড়ায়। মুসলিমগণ আজকাল নিছক অর্থনৈতিক কারণে অমুসলিম দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। অথচ মুসলিমদের প্রয়োজনীয়তা নিছক অর্থনৈতিক নয়। সেটি যেমন আধ্যাত্মীক, তেমনি রাজনৈতিক ও শিক্ষা-সাংস্কৃতিক। সে প্রয়োজনটি অমুসলিমদের থেকে ভিন্নতর। মুসলিমদের সে প্রয়োজন মেটানোটি কোন অমুসলিম দেশের এজেন্ডাও নয়। অথচ ইসলামের আধ্যাত্মীক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠতে ব্যর্থ হলে বিপন্ন হয় মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার ন্যায় জীবনের মূল লক্ষ্যটি। তখন জীবনে বাঁচাটাই ব্যর্থ হয়।

মুসলিমদের খাদ্য-পানীয়তে তেমন হালাল-হারামের বিষয় আছে -তেমনি ভিন্নতা আছে তাদের শিক্ষার বিষয়েও। প্রয়োজনীয়তা রয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠারও। কারন শরিয়ত পালন ছাড়া ধর্ম পালনও পুরাপুরি হয় না। একারণেই শুরু থেকে মুসলিমগণ কাফেরদের থেকে শুধু ভিন্নতর ইবাদতগাহই গড়েনি, ভিন্নতর রাষ্ট্রও গড়েছে। ভারত ভেঙ্গে মুসলিমগণ তাই পাকিস্তান গড়াকে অপরিহার্য মনে করেছিল। কিন্তু পাকিস্তান সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের রাষ্ট্রে পরিণত হলেও সেক্যুলারিস্টদের বাধার মুখে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। ফলে হিন্দুদের জুলুম থেকে বাঁচলেও জনগণ ইসলামী রাষ্ট্রের কল্যাণ পায়নি। যে ভিশন নিয়ে আল্লামা মহম্মদ ইকবাল পাকিস্তানের প্রস্তাবনা রেখেছিলেন তা নিয়ে অগ্রসর হওয়ার মত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব পাকিস্তান কোন সময়ই পায়নি। এমনকি আলেমগণও মসজিদ ও মাদ্র্রাসার চার দেয়ালের বাইরে ইসলামের প্রতিষ্ঠা নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি। তারাও দেশটিকে ইসলামী করার কাজে ময়দানে নেমে আসেনি। বরং তাদের নিষ্ক্রীয়তার কারণেই অতি সহজেই দেশটি জাতীয়তাবাদী, সমাজবাদী ও সেক্যুলারিস্ট শত্রুদের হাতে অধিকৃত হয়ে যায়।

অমুসলিম দেশে সংখ্যালঘু রূপে বসবাসকারি মুসলিমদের সংখ্যা আজ অনেক। তাদের পক্ষে সে সব দেশে ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, হিসাবরক্ষক, কৃষিবিদ বা বিজ্ঞানী রূপে বেড়ে উঠার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যালাভ জুটলেও মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাটি ভয়ানক বিপদে পড়ছে। এবং সেটি ইসলামী জ্ঞানলাভ না হওয়ার কারণে। অথচ ইসলামী জ্ঞানলাভের দায়ভারটি মুসলিমদেরকে নিজ হাতে নিতে হয়। এবং মুসলিম রাষ্ট্রে সে দায়িত্বটি সরকারের। বিদ্যাদান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার। মানুষের চরিত্রে মূল পরিবর্তনটি আসে তার চেতনার পরিবর্তন থেকে। তাই চেতনার ভূবনের উপর দখলদারীর গুরুত্ব ভূগোলের উপর দখলদারীর চেয়ে কম গুরুত্পূর্ণ নয়। সে দখলদারী বাড়াতে শত্রুপক্ষ এজন্যই মুসলিম ভূমিতে শত শত মিশনারি বিদ্যালয় খুলে। মুসলিম দেশগুলোতে বিপদ তখন থেকেই বাড়তে শুরু করেছে যখন জ্ঞানার্জনের জন্য সেসব দেশ থেকে নাগরিকদের কাফের দেশে যাওয়া শুরু হয়েছে।

হারাম পানাহারের ন্যায় হারাম শিক্ষালাভও যে ভয়ানক তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো তুরস্কের উসমানিয়া খেলাফত। জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, আঞ্চলিকতা, সেক্যুলারিজম –এসব মূলত পাশ্চাত্যের রোগ। এ রোগের প্রকোপে ইউরোপ বহু টুকরোয় বিভক্ত হয়েছে এবং বিভক্ত টুকরোগুলো শত শত বছর ধরে পরস্পরের বিরুদ্ধে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধও করেছে। অথচ এমন রোগ থেকে মুসলিম ভূমি ১৩ শত বছর মুক্ত থেকেছে। আরব¸ তুর্কী, কু্র্দি, মুর, আলবেনীয়, কোসোভান মুসলিমরা তাই অখণ্ড ভূ-খন্ডে শত শত বছর বসবাস করেছে। এক কাতারে শামিল হয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইও করেছে। কিন্তু তুর্কী ও অতুর্কী নাগরিগদের শিক্ষালাভের জন্য ইউরোপে পাঠানো শুরু হলো তখন তারা শুধু মদ্যপান, সূদ, বেপর্দাগী ও নাচগানের সংস্কৃতি নিয়েই ঘরে ফিরেনি। জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, আঞ্চলিকতা, সেক্যুলারিজমের জীবাণূতেও আক্রান্ত হয়ে ফিরেছে। তখন তারা ইসলামের পতাকা ফেলে দিয়ে তুর্কী, আরব, কুর্দি জাতীয়তার পতাকা নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এমন একটি যুদ্ধে মুসলিমদের রক্তক্ষয় ও শক্তিক্ষয় বাড়াতে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিল শত্রুপক্ষ। মক্কার শরিফ হোসেনদের ন্যায় অনেকেই সে অস্ত্র নিয়ে মুসলিম হত্যায় পাগল হয়ে উঠে। ফলে তুরস্ক উসমানিয়া খেলাফত ভেঙ্গে বিশটির বেশী রাষ্ট্রের জন্ম হয়। আর এ রাষ্ট্রগুলো দ্রুত ইসলামের শত্রু পক্ষের হাতে অধিকৃত হয়; এবং সেগুলো মিত্রতে পরিণত হলো পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির। পাশ্চাত্যের এ মিত্রগণ শরিয়তের প্রতিষ্ঠাই শুধু অসম্ভব করেনি, অসম্ভব করেছে বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থানেরও। একই রূপ জাতীয়তাবাদী ও সমাজবাদী সেক্যুলারিস্টগণ ব্যর্থ করে দিয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের সম্মিলিত পাকিস্তান প্রজেক্ট। তারা কলেজ­-বিশ্ববি্দ্যালয়, প্রশাসন, রাজনীতি, সংস্কৃতি, মিডিয়াকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করেছে আল্লাহ ও তাঁর শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বাড়াতে।

মুসলিম দেশগুলিতে আজ যে ভয়ানক চরিত্রহীনতা ও দুর্নীতি –তার মূল কারণ দেশগুলির সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা। এ শিক্ষাব্যবস্থা কাজ করছে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে পথভ্রষ্ট করার কাজে। এ শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রগণ পরিণত হচ্ছে ভয়ানক শিকারি জীবে। তাদের জ্ঞান, মেধা ও শিক্ষালদ্ধ যোগ্যতার সবটুকুই ব্যয় হয় স্রেফ দুনিয়ার জীবনকে ঐশ্বর্যময় ও আনন্দময় করতে। এরাই হলো সবচেয়ে ব্যর্থ মানব। এবং তাদের সে ব্যর্থতার সার্টিফিকেটটি এসেছে মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। পবিত্র কোর’আনে তিনি বলেছেন, “বল (হে মুহাম্মদ), আমরা কি তোমাদেরকে বলে দিব কর্মের বিচারে কে সবচেয়ে ব্যর্থ? এরা হচ্ছে তারা যাদের জীবনের সকল প্রচেষ্ঠা নষ্ট হয়েছে এ দুনিয়ার জীবনের স্বাচ্ছন্দ বাড়াতে এবং ভাবে যে কর্মে তারা ভাল করছে। এরাই হচ্ছে তারা যারা আল্লাহর নিদর্শনকে অস্বীকার করে এবং অস্বীকার করে পরকালে তাঁর সাথে সাক্ষাতকেও। তাদের কর্মকান্ড ব্যর্থ। এক আখেরাতের বিচার দিনে তাদের কর্মকে ওজনও করা হবে না। -(সুরা কাহাফ, আয়াত ১০৩-১০৫)। উপরুক্ত আয়াতে যা বুঝানো হয়েছে তা হলো, মানব জীবনের মূল লক্ষ্যকে ব্যর্থ করে দেয় সেক্যুলার ধ্যান-ধারণা। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে সেক্যুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সেরূপ ব্যর্থ মানুষদের সংখ্যাই বিপুল ভাবে বাড়িয়ে চলেছে।

শয়তান শুধু মহান আল্লাহতায়ালার দুষমন নয়, মানুষেরও সবচেয়ে বড় দুষমন। মহান আল্লাহতায়ারা পবিত্র কোরআনে সে সত্যটি বার বার শুনিয়েছেন। শয়তান শুধু হযরত আদম (আঃ) ও তাঁর বিবি হযরত হাওয়াকে জান্নাত থেকে বেরই করেনি, বরং দিবারাত্র কাজ করে যাতে তাঁর বংশধরগণ পুণরায় জান্নাতে ঢুকতে না পারে। সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা মূলত নাগরিকদের মহাক্ষতি সাধনের সে শয়তানি প্রকল্প। লক্ষ্য, পরকাল ব্যর্থ করে দেয়া। একাজে শয়তানের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রের সরকার, প্রশাসন ও শিক্ষা-সংস্কৃতি। শয়তান তাই মসজিদ-মাদ্রাসার দখলদারী নিয়ে ততটা ভাবে না, যতটা ভাবে রাষ্ট্রের উপর দখলদারী নিয়ে। শেখ মুজিব রাষ্ট্রের উপর সে দখলদারী নিশ্চিত করতেই রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামপন্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল। হাসিনাও এগুচ্ছে সে পথ ধরে।

সেক্যুলার তথা অনৈসলামী রাষ্ট্রের বিপদটি তাই ভয়ানক। তখন রাষ্ট্র পরিণত হয় জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার বাহনে। অথচ জাহান্নামমুখী সে জাহাজটির নির্মাণে ব্যয় হয় জনগণের নিজেদের অর্থ, শ্রম ও মেধা। শয়তান এভাবেই কইয়ের তেলে কই ভাজে। প্রতি দেশে বেঈমানদের প্রধান এজেন্ডা হলো, এ শয়তানী প্রকল্পকে সফল করা। অপর দিকে ঈমানদারদের উপর ঈমানী দায়ভারটি হলো, এ শয়তানী প্রকল্পের বিরুদ্ধে সর্বভাবে রুখে দাঁড়ানো। নইলে তাদের ঈমান বাঁচে না, পরকালও বাঁচে না। মুসলিমের জীবনে তো সেটাই জিহাদ। মু’মিনের তাকওয়া তো সে সামর্থ্যই বাড়ায়। পবিত্র কোর’আনে তাই বলা হয়েছে, “যারা ঈমানদার তাঁরা জিহাদ করে আল্লাহর রাস্তায়, আর যারা কাফের তারা লড়াই করে শয়তানের রাস্তায়। সুতরাং তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; শয়তানের কৌশল অতিদুর্বল।” -(সুরা নিসা, আয়াত ৭৬)। মুসলিম রাষ্ট্রে শাসকের বড় দায়িত্বটি হলো জিহাদের দায়ভার পালনে মু’মিনদের সংগঠিত করা ও সর্বভাবে সহায়তা দেয়া। এবং শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে জিহাদকে লাগাতর জারি রাখা। এবং যে রাষ্ট্রে যত জিহাদ সংগঠিত হয়, সে রাষ্ট্রের উপর মহান আল্লাহতায়ালার রহমতও তত বেশী নাযিল হয়। সেটি দেখা যায় অতীতের ইতিহাসে।

 

কেন জরুরি ইসলামী রাষ্ট্র

মাছের জন্য যেমন পানি, ঈমানদারের জন্য তেমনি হলো ইসলামী রাষ্ট্র। এ কারণেই অতীতে মুসলিমগণ যেখানেই ঘর গড়েছে, সেখানে ইসলামী রাষ্ট্রও গড়েছে। সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় ও প্রতিরক্ষায় যখনই ডাক পড়েছে তখন সকল মুসলিমগণ ময়দানে নেমে এসেছে। জানমালের বিশাল কোরবানীও দিয়েছে। তাবুক যুদ্ধের সময় মুনাফিকগণ ছাড়া কোন সামর্থ্যবান মুসলিম পুরুষ তাই ঘরে বসে ছিল না। অন্য কোন জাতির জীবনে এমন ইতিহাস একটি বারের জন্যও নির্মিত হয়নি। মুসলিম জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে বড় দায়িত্বশীলতা। কিন্তু অনৈসলামী রাষ্ট্রের প্রধান ষড়যন্ত্র হলো ঈমানদারের জীবন থেকে সে দায়িত্বশীলতাকে নির্মূল করা। মুসলিম জীবনে যে এমন একটি গুরুতর দায়ভার আছে -সেটিকেই ভূলিয়ে দেয়া। তাই যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র নাই সেখানে মসজিদ-মাদ্রাসা, নামায-রোযা বাড়লেও সে দায়িত্বশীলতা বাড়ে না। এবং সে দায়িত্বশীলতা না থাকার কারণেই মুসলিম দেশগুলিতে আজ জাতি, গোত্র, ভাষা, ভূগোল, দল ও নেতার নামে যুদ্ধ ও রক্তপাত বাড়লেও বাড়েনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জিহাদ। সাহাবায়ে কেরামের ধর্মপালন থেকে আজকের মুসলিমের ধর্মপালনে এখানেই বড় পার্থক্য। ফলে মুসলিমদের রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়লেও একখানি ইসলামী রাষ্ট্রও নির্মিত হয়নি। ফলে কোথাও প্রতিষ্ঠা পায়নি মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধান। বরং মুসলিমদের শ্রম, মেধা, অর্থ ও রক্তের কোরবানিতে বিজয়ী হয়েছে জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, সমাজবাদ, পুঁজিবাদ, স্বৈরতন্ত্র, সেক্যুলারিজমের ন্যায় নানা নামের ও নানারূপের জাহিলিয়াত। এবং গৌরব বেড়েছে নানা দল, গোত্র ও নেতার। আল্লাহ ও তাঁর মহান দ্বীনের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় বেঈমানী আর কি হতে পারে? মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সরকারের কাজ হয়েছে সে বেঈমানীকে লাগাতর বাড়ানো। মুসলিম ভূমিতে অনৈসলামী রাষ্ট্রগুলো তো বেঁচে থাকে সে বেঈমানীর উপর। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ছাড়া এমন অকল্যাণ থেকে মুক্তি আছে কি? ১ম সংস্করণ ২২/০৬/২০১২; ২য় সংস্করণ ১০/০২/২০২১।

 

 




অনৈসলামী রাষ্ট্রের অকল্যাণ এবং অনিবার্য কেন ইসলামী রাষ্ট্র?

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

 অকল্যাণ কেন অনৈসলামী রাষ্ট্রে?

রোগব্যাধীর নাশকতা নিয়ে কারোই কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় বড় নাশকতাগুলো রোগব্যাধীর কারণে হয় না। সেটি হয় রাষ্ট্র অসুস্থ্যু ও অকল্যাণকর হলে। তখন লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়। কোটি কোটি মানুষের জীবনে দুর্যোগ ও অশান্তি নেমে আসে। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, গণহত্যা, জাতিগত ও বর্ণগত নির্মূল, স্বৈরাচার, যুদ্ধবিগ্রহ ও বিশ্বযুদ্ধের যে ভয়াবহ নাশকতা –তা তো অসুস্থ্য ও অকল্যাণকর রাষ্ট্রের কারণেই। বস্তুত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক বিপর্যয়গুলো গ্রামগঞ্জে বাস করা চোর-ডাকাতদের হাতে হয়নি। রোগ-ভোগ, মহামারি বা ঝড়-তুফানের হাতেও হয়নি। বরং হয়েছে ঘাতক মতবাদ ও নৃশংস দুর্বৃত্তদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়াতে। বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধে এ দুর্বৃত্ত শ্রেণী সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করেছে। ধ্বংস করেছে শত শত নগর-বন্দর। বিনাশ ঘটিয়েছে বহু ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ।

তাই মানব জাতির সবচেয়ে বড় দুষমন হলো দুর্বৃত্ত-অধিকৃত রাষ্ট্র। রাষ্ট্র তখন অপরাধ কর্মের হাতিয়ার পরিণত হয়। পরিণত হয় দুর্বৃত্তায়নের ইন্ডাস্ট্রীতে। তখন রাষ্ট্রীয় নীতি হয় জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, জাতিগত নির্মূল, সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের ন্যায় মানবতা বিধ্বংসী মতবাদ। রাষ্ট্রের রোগমুক্তি ছাড়া তাই ব্যক্তির বা জনগণে মুক্তি সম্ভব নয়। তাই মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর পবিত্র কোর’আনে শুধু মানবকে পথ দেখাননি, পথ দেখিয়েছেন রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধিরও। এ জন্যই নবীজী (সা:) শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল শেখাননি; শিখিয়েছেন কি ভাবে কল্যাণকর রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হয় –মানব সভ্যতার সবচেয়ে ব্যহবহুল সে প্রকল্পটিও। রাষ্ট্র নির্মাণের সে জটিল ও গুরুত্বপুর্ণ কাজটি হাতে কলমে শেখানোর প্রয়োজনে তিনি নিজে বসেছেন রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে। এটি নবী জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত। মুসলিমগণ তাদের গৌরব কালে যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিল –তার মূলে ছিল এই ইসলামী রাষ্ট্র, স্রেফ মসজিদ মাদ্রাসা নয়। এ রাষ্ট্র যে শুধু দুনিয়াতে কল্যাণ দেয় -তা নয়। কাজ করে জান্নাতে নেয়ার বাহন রূপেও। এবং যে ইসলামী রাষ্ট্রের মডেল নবীজী (সা:) খাড়া করেছিলেন তার বাইরে যত রকমের রাষ্ট্র -তা সবই অনৈসলামী। পৃথিবী পৃষ্ঠের  উপর বিরাজমান সকল বিপর্যের কারণ হলো এ অনৈসলামী রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রগুলো শুধু এ দুনিয়ার জীবনে অশান্তি বাড়ায় না, কাজ করে জাহান্নামে নেয়ার বাহন রূপে। তাই মানবের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর কাজটি কাউকে পানাহার দেয়া বা ঘরবাড়ী গড়ে দেয়া নয়, বরং অনৈসলামী রাষ্ট্রের নির্মূল ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। ইসলাম এ কাজকে পবিত্র জিহাদের মর্যাদা দিয়েছে।

ব্যক্তির ন্যায় রাষ্ট্রও কল্যাণকর বা অকল্যাণকর হয় আদর্শের গুণে। অনৈসলামী রাষ্ট্র তো তাই -যেখানে ইসলামী আদর্শের কোন স্থান নাই্। আর রাষ্ট্রে ইসলামী আদর্শ না থাকলে আদর্শিক শূণ্যতা বিরাজ করে না; সেখানে কাজ করে অনৈসলামী তথা শয়তানী আদর্শ। পবিত্র কোর’আনে আদর্শের বিভাজনটি দ্বিভাগে: হক ও বাতিলের তথা ইসলাম ও অনৈসলামের। তৃতীয় কোন আদর্শিক পক্ষের স্থান ইসলামে নাই। ইসলাম ভিন্ন সকল আদর্শই অনৈসলামী। আর যে ইসলাম নিয়ে বাঁচে তাকে অবশ্যই বাঁচতে হয় সুবৃত্তি নিয়ে। এবং হারাম গণ্য হয় দুর্বৃত্তি নিয়ে বাঁচা। দুর্বৃত্তির পথটি হলো শয়তানের পথ তথা অনৈসলামের পথ। এমন অনৈসলামী পথে শান্তি আসবে -সেটি বিশ্বাস করাই হারাম। এমন বিশ্বাসে গাদ্দারী হয় মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথের সাথে। তাছাড়া অনৈসলামী পথে চলার বিপদটি অতি ভয়ানক। সে পথের অনুসারিগণ হাতে অস্ত্র পেলে অঘটন ঘটায়। তাদের লক্ষ্য শুধু ধনসম্পদ লুন্ঠন নয়; বরং সেটি রাষ্ট্রের উপর একচ্ছত্র প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার। উদ্দেশ্যটি এখানে লুন্ঠনের পরিধিকে রাষ্ট্রময় করা। দেশের পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী, আদালত ও প্রশাসনসহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানগুলি যখন দুর্বৃত্ত কর্মে হাতিয়ারে পরিণত হয়। তখন জনজীবনে নেমে আসে মহা-অকল্যাণ। অবিচার, অত্যাচার, সন্ত্রাস, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যা ও গণহত্যার ন্যায় নানারূপ অপরাধ কর্ম তখন রাষ্ট্রের নীতি বা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায়। ফিরাউন-নমরুদের ন্যায় দুর্বৃত্তগণ যখন রাষ্ট্রের উপর তাদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করেছিল তখন নিজেদেরকে শুধু রাজা রূপে নয়, খোদা রূপেও প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন দুর্বৃত্তকবলিত রাষ্ট্রে সত্য, সুশিক্ষা, সুনীতি ও সুবিচার মারা পড়ে। এমনকি হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)র মত মহামানবগণও সে সমাজে ভাল আচরণ পাননি। বরং তাদেরকেও নির্মম হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যখনই হালাকু-চেঙ্গিজ-হিটলারদের ন্যায় দুর্বৃত্তদের হাতে গেছে তখনই লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে নির্মম নির্যাতন ও মৃত্যু নেমে এসেছে।

মুসলিমগণ আজ বিশ্বশক্তির মর্যাদা হারিয়ে পদে পদে পরাজয়ের যে গ্লানি বইছে -সেটিও রোগ-ভোগ, ভূমিকম্প বা ঝড়-তুফানের কারণে নয়। বরং মুসলিম রাষ্ট্রগুলো দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হওয়ায়। এ ব্যর্থতা রাজনৈতিক। এবং সে বিপর্যয় যে কতটা ভয়ানক হতে পারে তারই আধুনিক উদাহরণ হলো আজকের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ আজ পথে ঘাটে লাশ হচ্ছে, গুম হচ্ছে, ধর্ষিতা হচ্ছে এবং নানা ভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। এ জন্য বাংলাদেশের জলবায়ু বা ভূপ্রকৃতিকে দায়ী করা যায় না। বরং মূল কারণটি হলো, রাষ্ট্র অধিকৃত হয়েছে নৃশংস দুর্বৃত্তদের হাতে। তাদের হাতে দেশের পুলিশ, সেনাবাহিনী, আদালত ও প্রশাসনসহ সমগ্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিণত হয়েছে নির্যাতনের হাতিয়ারে। রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে জঙ্গলে। জঙ্গলে আদালত থাকে না। আইনও থাকে না। ফলে জঙ্গলে মানুষ লাশ হলে বা ছিনতাই হলে বিচার হয় না। তেমনি বিচার হয় না বাংলাদেশেও। ফিরাউন, নমরুদ, হালাকু ও চেঙ্গিজের আমলে মানুষ যেমন জানমালের নিরাপত্তা হারিয়েছিল, একই রূপ অবস্থা এ দেশে। বাংলাদেশের মানুষের বড় দুষমন তাই রোগজীবাণু, ঝড়-তুফান বা চোরডাকাত নয়; শত্রু এখানে খোদ রাষ্ট্র ও তার সরকার।

 

রাষ্ট্রের শক্তি ও গুরুত্ব

ইসলামই একমাত্র ধর্ম -যা রাষ্ট্রের শক্তি-সামর্থ্য ও গুরুত্বকে সঠিক ভাবে সনাক্ত করেছে। এবং মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী এ প্রতিষ্ঠানটির পরিশুদ্ধিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। অন্য ধর্মে রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে দখলে নেয়ার নির্দেশ নেই। কিন্তু ইসলামে সে কাজে অর্থ ও জানের বিনিয়োগে বার বার নির্দেশ এসেছে। ইসলামের নবী তাই শুধু ধর্মপ্রচারকই ছিলেন না, রাষ্ট্রীয় প্রধানও ছিলেন। এরূপ ভিন্নতর নির্দেশের কারণ, মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা থেকে গোপন নয় রাষ্ট্রের প্রবল ক্ষমতাটি। ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেক কর্মটি তাই নফল নামায-রোযা বা দান-খয়রাত নয়। মহল্লার চোর-ডাকাতদের ধরাও নয়। বরং দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রাষ্ট্রকে বাঁচানো। ইসলামে সেটি সর্বোচ্চ ইবাদত। ইসলামে সে প্রচেষ্টাকেই জিহাদ বলা হয়। নবীজী (সাঃ) ও তার সাহাবাদের জীবনে সবচেয়ে বড় কোরবানী দিতে হয়েছে সে জিহাদে। রাষ্ট্রকে নিজেদের দখলে রাখতে নবীজী (সা:)’র শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন।

একটি দেশ কতটা সভ্য রূপে গড়ে উঠবে সে ফয়সালাটি দেশের কলকারখানা, ক্ষেতখামার, রাস্তাঘাট বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা থেকে নির্ধারিত হয় না। বরং সেটি নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রকে ইসলামি করার কাজে কতটা জিহাদ হলো -তা থেকে। জিহাদ হলো ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির লক্ষে এক লাগাতর প্রক্রিয়া। লক্ষ্য, দুর্নীতির নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। তাই যে দেশে সে জিহাদ নাই, সে দেশে আসে দুর্বৃত্তির সয়লাব। সে প্রমাণও দেখা যায় বাংলাদেশ। আবর্জনা এমনিতে সরে না। সেটি সরানোর কাজ না হলে সমগ্র দেশ তখন আবর্জনার স্তুপে পরিণত হয়। সে সরানোর কাজটিই করে জিহাদ। রাষ্ট্র ইসলামী হলে জিহাদ তখন জনজীবনের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায় –যেমনটি হয়েছিল সাহাবাদের জীবনে। বাংলাদেশে বিগত ৫০ বছরে যত কলকারখানা, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল বা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে -তা দেশটির সমগ্র ইতিহাসেও নির্মিত হয়নি। কিন্তু তাতে কি বাংলাদেশের মানুষের সভ্য রূপে বেড়ে উঠাটি নিশ্চিত হয়েছে? নির্মূল হয়েছে কি দুর্নীতি? বরং নির্মিত হয়েছে বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে কদর্যকর ইতিহাস। সেটি হলো দুর্নীতিতে বিশ্বমাঝে ৫ বার প্রথম হওয়ার খেতাব।

 

ব্যর্থ রাষ্ট্রের নাশকতা

ব্যর্থ রাষ্ট্রের নাশকতাটি ভয়াবহ। সে ব্যর্থতাটি প্রকট ভাবে দেখা যায় মানব গড়ার ক্ষেত্রে। যে কোন সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি কলকারখানা, রাস্তাঘাট বা হাসপাতাল  গড়া নয়। বরং সেটি হলো সৎ ও সভ্য মানুষ গড়া। এ খাতে ব্যর্থ হলে অন্যখাতে যত সফলতাই আসুক -তা দিয়ে সত্যিকার কল্যাণ আসে না। অথচ বাংলাদেশে এটিই হলো সবচেয়ে ব্যর্থ খাত। দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উৎপাদন বাড়িয়েছে চোরডাকাত, ব্যাংক-ডাকাত ও ধর্ষকের। এবং বিপুল সংখ্যায় দুর্বৃত্ত জুগিয়েছে শুধু রাজনীতির অঙ্গণেই নয়, বরং পুলিশবাহিনী, সেনাবাহিনী, আদালত এবং প্রশাসনে। এসব দুর্বৃত্তগণ সরকারি লেবাস পড়ে চুরিডাকাতি ও মানুষ খুন করে। ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বর তো এমন সরকার প্রতিপালিত খুনিদের হাতেই রক্তাত্ব হয়েছে। আদালতের বিচারকগণও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে খুন করছে কলমের খোঁচায়।  এমন সহিংস দুর্বৃত্তিতে রেকর্ড গড়েছে মিশরের এক বিচারক। একদিনে সে ৬ শত সরকার বিরোধীদের ফাঁসির নির্দেশ দিয়েছে।

একটি গাছ জন্মাতে হলেও সে গাছের প্রতি নিয়মিত পরিচর্যা চাই। গাছের গোড়ায় পানি ঢালার পাশাপাশি বেড়ে উঠার জন্য নিয়মিত প্রহরাও চাই। নিরাপদ পরিবেশও চাই। নইলে গাছের গোড়ায় দুষ্ট মানুষের হাত পড়ে। সে তুলনায় সমাজে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো মানুষগড়া। পিতামাতার ঘরে শিশু জন্ম নেয় বটে, কিন্তু সে শিশু বেড়ে উঠে শিক্ষা, সংস্কৃতি,সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবেশে। শিশু মানবিক গুণে গড়ে তোলার কাজে পিতামাতার পাশে তাই রাষ্ট্র ও সমাজের লাগাতর সংশ্লিষ্টতাও চাই। নইলে অতি মহৎ ও আলেম ব্যক্তির ঘরেও অতিশয় দুর্বৃত্ত বেড়ে উঠে। রাষ্ট্র সে সৃষ্টিশীল কাজটি করে উপযুক্ত শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে। কিন্তু সেটি অসম্ভব হয় রাষ্ট্র দুর্বৃত্তদের হাতে জিম্মি হলে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ খাতটিও তখন দুর্বৃত্তগড়ার কারখানায় পরিণত হয়। অনৈসলামিক রাষ্ট্রের এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। ফলে ইসলামের ন্যয় যে ধর্মটি মানবের কল্যাণ নিয়ে ভাবে, সেটি রাষ্ট্রের দখলদারি কাদের হাতে থাকবে বা কোন আইন নিয়ে পরিচালিত হবে -সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কখনোই নীরব থাকতে পারে না। কোরআনের ছত্রে ছত্রে তাই সমাজ ও রাষ্ট্রপরিচালনা নিয়ে রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা। রয়েছে শরিয়তী আইন।    

 

কেন ইসলামি রাষ্ট্র?

ইসলামী রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি কোন ইসলামী দলের রাজনৈতিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় নয়। কোন মৌলবাদী মুসলিমের রাজনৈতিক ভাবনাও নয়। বরং সে প্রকল্পটি খোদ মহান আল্লাহতায়ালার। শুধু মাত্র মুসলিম ভূমিতে নয়, সমগ্র বিশ্বব্যাপী। তিনি চান, প্রতিটি মানুষ তাঁর অনুগত বান্দাহ রূপে বেড়ে উঠুক, এবং সমগ্র বিশ্ব তাঁর দ্বীনের আলোকে আলোকিত হোক। মানব জাতির মহাকল্যাণ তো একমাত্র এ পথেই। মহান আল্লাহর সে মহান ইচ্ছাটি ছড়িয়ে আছে পবিত্র কোর’আনে। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সে পবিত্র এজেন্ডার সাথে পুরাপুরি একাত্ম হওয়া। এবং সে লক্ষ্য অর্জনে জানমালের বিনিয়োগ করা। মু’মিন ব্যক্তির ঈমান বৃদ্ধির সাথে সে বিনিয়োগটিও বাড়ে। মহান আল্লাহতায়ালার চান না যে, তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানব জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হোক। জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর কাজকে ত্বরান্বিত করতেই মহান আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে হাজার হাজার নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। এ কাজে এ পৃথিবী পৃষ্ঠে রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী কোন প্রতিষ্ঠান নাই। তিনি চান, জনগণকে আগুন থেকে বাঁচানোর কাজে রাষ্ট্র তার দায়িত্বটি পালন করুক। এবং তাঁর খলিফা রূপে কাজ করুক রাষ্ট্রপ্রধান। খোলাফায়ে রাশেদার আমলে তো –সেটিই হয়েছে।  

জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর এ বিশাল কাজটি কিছু আলেম-উলামার কাজ নয়। কোরআন-হাদীসের কিছু জ্ঞান বিতরণ, অবসর সময়ের তাবলিগ, কিছু ওয়াজ-নসিহত বা কিছু দানখয়রাতের মাধ্যমেও এ বিশাল কাজ সম্ভব নয়। এ কাজটি যেমন অতি গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বিশাল। এ বিশাল কাজটি ইসলামের চর্চা ও ধর্মপালনকে মসজিদ-মাদ্রাসায় সীমিত রেখে সম্ভব নয়। ইবাদতকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখেও সম্ভব নয়। এ কাজটি অসাধ্য এবং অভাবনীয় হয়ে পড়ে যদি রাষ্টের ন্যায় মানব সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি ইসলামের বিপক্ষশক্তি বা ইসলামে অঙ্গিকারহীন ব্যক্তিবর্গের হাতে যায়। নমরুদ, ফিরাউন, আবু লাহাব, আবু জেহলদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত থাকলে ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা দূরে থাক, ইসলামের অনুসারিদের পক্ষে প্রাণে বাঁচাই কঠিন হয়। তাদেরকে ক্ষমতায় রেখে সেটি সম্ভব হলে ইসলামের শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মহম্মদ(সা:) ও তাঁর সাহাবগণ কেন রক্তাত্ব যুদ্ধ-বিগ্রহে বিপুল অর্থদান, শ্রমদান এবং প্রাণদানের পথ বেছে নিলেন? কেন ধর্মকর্ম নিছক কোরআন পাঠ, মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, এবং নামায-রোযা-হজ-যাকাতে সীমিত রাখলেন না?

মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার যেমন রাষ্ট্র, তেমনি সে আগুন থেকে বাঁচানোরও শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো রাষ্ট্র। তাই নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের আমলে মুসলিমদের জানমালের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটি হয়েছে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়। হযরত মুহাম্মদ (সা:)’র আগে লক্ষাধিক নবী-রাসূল এসেছেন। তাদের সবারই ধর্ম ছিল ইসলাম। কিন্তু জাহান্নামের আগুন থেকে যত মানুষকে ইসলামের শেষনবী হযরত মহম্মদ (সা:) রক্ষা করেছেন তা অন্য কোন নবীর পক্ষে সম্ভব হয়নি। অন্য কোন নবীর দ্বারা ইসলামের বিশ্বময় প্রচার এবং ইসলামী সভ্যতার নির্মাণও ঘটেনি। অনেক জ্ঞানি ব্যক্তিই সমতা, নারী স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার এবং শ্রেণীভেদ ও বর্ণবাদবিরোধী বড় বড় নীতি কথা শুনিয়েছেন। কিন্তু কেউ কি তা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন? কিন্তু নবীজী (সা:) পেরেছেন। এজন্য এমনকি বহু অমুসলিমও তাঁকে মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের মর্যদা দেন। মাইকেল হার্ট তাঁর বিখ্যাত বই “দি হানড্রেড”য়ে একশত শ্রেষ্ঠ মানুষের মাঝে হযরত মহম্মদ (সা:)কে প্রথম স্থান দিয়েছেন তো সে বিচারবেোধেই। কিন্তু কীরূপে সম্ভব হলো নবীজী (সা:)’র হাতে সে বিশাল অর্জন? হযরত মুহাম্মদ (সা:)’র এ সফলতার কারণ তাঁর ও তাঁর মহান খলিফাদের হাতে শুধু আল্লাহর দেয়া হেয়ায়েতের গ্রন্থ পবিত্র কোর’আনই ছিল না, বিশাল রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলিও ছিল। কিন্তু আজ ঈমানদারদের হাতে কোরআন আছে, তাদের জীবনে নামায-রোযাও আছে। কিন্তু রাষ্ট্র নেই। তাবলিগের ইজতেমায় শুধু তিরিশ-চল্লিশ লাখ নয়, কোটি কোটি মানুষের সমাবেশ বাড়িয়েও কি সফলতা জুটবে? সেটি তো নবীজীর সূন্নত নয়। ইসলামের প্রতিষ্ঠা তো ইজতেমায় হয় না। নামাযী ও রোযাদারদের সংখ্যাবৃদ্ধিতেও হয় না। এজন্য তো রাষ্ট্রের উপর থেকে দুর্বৃত্তদের হটিয়ে ঈমানদারদের দখলদারিটা চাই।

রাষ্ট্র ইসলামি হলে জাহান্নামের আগুন থেকে মানুষকে বাঁচানোর কাজে কোরআন-হাদীস, মসজিদ-মাদ্রাসা ও আলেম-উলামাদের পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিশাল বিশাল প্রতিষ্ঠানগুলোও দিবারাত্র কাজ করে। তখন দেশ জুড়ে যে বিশাল রাজপথটি দৃশ্যমান হয় সেটি সিরাতুল মুস্তাকীম; আল্লাহর অবাধ্যতার রাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি নয়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তখন বিলুপ্ত করা হয় আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সকল পথ। বাঘ-ভালুককে জনপদে মূক্ত ছেড়ে দিয়ে কি সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া যায়? তেমনি আল্লাহর বিরুদ্ধাচারি লক্ষ লক্ষ সশস্ত্র বিদ্রোহীকে সর্বপ্রকার সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে জান্নাতের পথ রুখার অধিকার দিলে কি সাধারণ মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো যায়? সমগ্র আরব ভূমি, পারস্য, মিশর, মধ্য-এশিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যের পূর্ব ভাগ জুড়ে সাধারণ মানুষের দলে দলে ইসলামের প্রবেশের যে জোয়ার শুরু হয় -সেটি তো আল্লাহর শত্রুদের হাত থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং সামরিক শক্তি ছিনিয়ে নেয়ার পর। তার আগে নয়। তাদের নির্মূলে অপসারিত হয়েছিল জান্নাতের পথে চলার সকল বাধা।

 

রাষ্ট্র: পথভ্রষ্ট করার হাতিয়ার

রাষ্ট্রের দখলদারি যেখানেই কাফেরদের হাতে রয়ে গেছে সেখানেই ইসলামের গাড়ি আর সামনে এগুতে পারেনি। মানব পায়নি সিরাতুল মোস্তাকীম। রাষ্ট্রের বুক থেকে সে বাঁধা সরানো এবং ইসলামি রাষ্ট্রকে নিরাপদ করাটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে মক্কা বিজয়ের পর মহান আল্লাহতায়ালা কাফেরদের জন্য চার মাস সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। এ চার মাসের মধ্যে ইসলাম কবুল না করলে তাদেরকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে হত্যার নির্দেশ দিযেছিলেন।-(সুরা তাওবাহ, আয়াত ২-৩)। কারণ, বিদ্রোহীদের অপতৎপরতা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবাধে চলতে দিলে সে রাষ্ট্র বাঁচে না। ইসলামও তার মজবুত শিকড় নিয়ে সমাজ ও সংস্কৃতি নির্মানের সুযোগ পায় না। তাছাড়া আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে মক্কার কাফেরদের সশস্ত্র বিদ্রোহটি তো গোপন বিষয় নয়। নবীজী (সাঃ)র নবুয়তের প্রথম দিন থেকেই তারা ছিল ইসলাম ও ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সক্রিয় শত্রু। মদিনার সদ্য-প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র ইসলামি রাষ্ট্রকে সূতিকা ঘরে নির্মূল করতে তারা মক্কা থেকে মদিনায় গিয়ে বার বার হামলা করেছে। দেহের অভ্যন্তরে প্রাণনাশক জীবাণূ নিয়ে কোন দেহই সুস্থ্যতা পায় না, বাঁচেও না। তেমনি রাষ্ট্রও বাঁচে না যদি তার অভ্যন্তরে শত্রুরা বেড়ে উঠার সুযোগ পায়। তাই মক্কা বিজয়ের পর শত্রুদের আত্মসমর্পণ বা হত্যা –এ ছিল মহান আল্লাহর পক্ষ ঘোষণা। ‌ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও তার সুরক্ষা যে মহান আল্লাহর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি কি এ কোর’আনী হুকুমের পরও বুঝতে বাঁকি থাকে? সেটি না হলে খোদ মুসলিম ভূমিতেই আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অসম্ভব হয়ে পড়ে ইসলামের বিজয়কে ধরে রাখা। অসম্ভব হয় প্রতিবেশী দেশের নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষ নেয়া বা তাদের সাহায্য করা। বাংলাদেশের মুসলিমগণ সে কারণেই পারছে না আরাকান, ভারত ও কাশ্মিরের নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষ নিতে। কারারুদ্ধ জিন্দানীরা ইচ্ছা করলেই পাশের জিন্দানীর বিপদে সাহায্য করতে পারে না। সে জন্য কারামূক্ত স্বাধীনতা লাগে। তেমনি অবস্থা অধিকৃত দেশের নাগরিকদের। বাংলাদেশ এখান ইসলামপন্থিদের জন্য জেলখানা, এখানে দখলদারিটি ইসলামের শত্রুপক্ষের। সরকারের ভূমিকা এখানে কারাপ্রশাসকের। ফলে তাদের দখলদারিতে বাংলাদেশের মুসলিমগণ আরাকান, কাশ্মির, ফিলিস্তিন বা ভারতের মজলুম মুসলিমদের পক্ষ নিবে -সেটি কি ভাবা যায়? ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসলামের শত্রু পক্ষের কর্তাব্যক্তিগণ কি বাংলাদেশের নাগরিকদের সে অধিকার দিবে?

আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের কাজটি যেমন সর্বসময়ের, তেমনি সে কাজের পরিধিও বিশাল। সেটি রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে জুড়ে। অপরদিকে শয়তান ও তার অনুসারিদের শক্তিও কম নয়। তাদের হাতে অধিকৃত হলো অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র ও সে সব রাষ্ট্রের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। গড়ে উঠেছে হাজার হাজার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অধিকৃত সে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে হামলাও হচ্ছে লাগাতর। সে হামলা থেকে মুসলিমদের প্রতিরক্ষা দায়িত্ব কোন ব্যক্তি বা দল নিতে পারে না। সে লক্ষ্যে মুসলিমদেরও ইসলামি রাষ্ট্র গড়তে হয়। সে রাষ্ট্রের দায়ভারও নিতে হয়।

 

সবচেয়ে বড় নিয়ামত

রাষ্ট্রের দায়িত্বটি শুধু জনস্বার্থে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ, কল-কারখানা ও হাসপাতাল নির্মাণ নয়, বরং সর্ব-প্রকার ভ্রান্ত ধর্ম ও মতবাদের হামলা থেকে মুসলিমদের লাগাতর প্রতিরক্ষা দেয়া। এবং প্রতিরক্ষার সে যুদ্ধটিকে লাগাতর জারি রাখা। নইলে অসম্ভব হয় নাগরিকদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো। খোদ নবীজী (সাঃ) এবং খোলাফায়ে রাশেদার আমলে সে কাজটি লাগাতর করেছে রাষ্ট্র এবং সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। ফলে এমন দেশে জান্নাতের পথ খুঁজে পাওয়াটি তখন সহজ হয়ে যায়। অল্প বিদ্যা-বুদ্ধির মানুষগুলোও তখন জান্নাতে পৌঁছতে পারে। ইসলামি রাষ্ট্রের কারণেই আরবের নিরক্ষর বেদূঈনগণও তখন জন্ম থেকেই ঘরের সামনে ও চোখের সামনে সিরাতুল মুস্তাকীম দেখতে পেয়েছিল। সে পথে চলার ঈমানী সামর্থও পেয়েছিল। সেটি না হলে সাধারণ নাগরিক দূরে থাক, বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকশ প্রফেসর, প্রবীন বুদ্ধিজীবী, পীর-দরবেশ, আলেম-উলামা এবং বড় বড় ডিগ্রিধারিরাও তখন পথভ্রষ্ট হয়। সেটির প্রমাণ আজকের মুসলিম দেশগুলী। পৃথিবীতে মুসলিম রাষ্ট্র ও মুসলিমদের সংখ্যা বাড়লেও এসব মুসলিম দেশে সিরাতুল মোস্তাকীম গড়ে উঠেনি। ইসলামি রাষ্ট্র, ইসলামি সংস্কৃতি এবং আল্লাহর নির্দেশিত শরিয়তি বিধানও প্রতিষ্ঠা পায়নি। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ছাড়া কি সিরাতুল মোস্তাকীমে চলা যায়? শরিয়ত মোতাবেক পথ চলাই তো হলো সিরাতুল মোস্তাকীম। আর সে সিরাতুল মোস্তাকীমে চলাটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে নামাযের প্রতি রাকাতে সে জন্য “ইহদিনাস সিরাতুল মোস্তাকীম” বলে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হয়। মুমিনের জীবনে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া যা শিখিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। এ দোয়া না পড়লে নামাযই হয় না। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে রাষ্ট্রীয় ভাবে যেটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেটি সিরাতুল মোস্তাকীম নয়, বরং সেটি সূদ, ঘুষ, সেক্যুলার রাজনীতি, মিথ্যাচর্চা, জুয়া, বেপর্দাগী, অশ্লিলতা, পতিতাবৃত্তি ও জাতীয়তাবাদের জাহিলিয়াতের ন্যায় পাপাচারকে আচার রূপে মেনে নেয়ার জাহান্নামমুখি এক ভয়ানক পথভ্রষ্টতা।

পরিপূর্ণ এক ইসলামি রাষ্টীয় বিপ্লবের ফলেই সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্র জান্নাতমুখি হয়। তখন রাষ্ট্র পরিণত হয় জান্নাতমুখি এক চলন্ত জাহাজে, এবং নাগরিকগণ হয় সে জাহাজের যাত্রী। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এটিই হলো সবচেয়ে বড় নিয়ামত। রাষ্ট্রের বহু কাজই জনকল্যাণকর। এ জীবনকে আনন্দময় করার জন্য ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট, কৃষি-শিল্প, পানি-বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবা জরুরি হলেও সে গুলো অন্তহীন আখেরাতে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে পারে না। সে জন্য সিরাতুল মোস্তাকীম চাই, চাই সে পথে চলার আধ্যাত্মীক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বল। রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব হলো জনগণের মধ্যে সে সামর্থ্য সৃষ্টি করা। রাষ্ট্র সে কাজটি করে আল্লাহর পথনির্দেশনা বা হেদায়েতের বাণীকে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে। এ হেদায়েত বা পথনির্দেশনাই হলো মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত। সে নেয়ামত বয়ে আনতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে পৃথিবী পৃষ্টে তাঁর মহান ফেরেশতা জিবরাইল (আ:) নেমে এসেছেন। নবীরাসূলগণের মূল কাজটি ছিল সে পথনির্দেশনাকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া। মানব সমাজে এর চেয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়ভারও নাই। ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট, কৃষি-শিল্প, পানি-বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবার কাজ সে তূলনায় নস্যিতূল্য। শাসক বা রাষ্ট্রনায়কদের  সবচেয়ে বড় অবাধ্যতা এবং সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো সে দায়ভার এড়িয়ে যাওয়া। এ দায়ভার পালনে নবীজী (সাঃ) তাই অমুসলিম দেশগুলিকে আল্লাহর শত্রুমূক্ত করতে শুধু মোজাহিদদেরও পাঠাননি, কোর’আনের শত শত শিক্ষকও পাঠিয়েছেন। মুসলিমদের পরাজয় এবং ইসলামের পথ থেকে দূরে সরা তখনই শুরু হয় যথন রাষ্ট্র শুধু রাজস্ব-সংগ্রহ, রাজ্য-বিস্তার ও নিজেদের ক্ষমতাপ্রয়োগে মনযোগী হয়, এবং দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় সিরাতুল মোস্তাকীম গড়া থেকে। তখন গুরুত্ব হারায় জাহান্নামের পথ বন্ধ করে দেয়া এবং সে পথে ডাকা অপরাধীদের শাস্তি দেয়া। গুরুত্বপূর্ণ একাজগুলি কঠিন হয়ে পড়ে রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে সেক্যুলারিস্টদের বিজয়ে। তখন রাষ্ট্রজুড়ে যে পথগুলি দৃশ্যমান হয় ও চোখ ধাঁধিয়ে দেয় তা শয়তানসৃষ্ট জাহান্নামের পথ। এরূপ পথের ভিড়ে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ দূরে থাক, এমনকি নবেল বিজয়ী পন্ডিতগণও সত্যপথ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়।

 

ইসলামী রাষ্ট্র: কেন একমাত্র পথ?

অনৈসলামী রাষ্ট্রের অপরাধ অনেক। বর্বরতাও বহুবিধ। তবে সাধারণ মানুষের নজর থেকে সিরাতুল মুস্তাকীম বিলু্প্ত করা বা অদৃশ্য করাই এসব রাষ্ট্রগুলির সবচেয়ে বড় অপরাধ। সে অপরাধের কারণেই সাধারণ মানুষ জান্নাতের পথ খুঁজে না পেয়ে জাহান্নামমুখী হয়। এখানে রাষ্ট্র ও তার কর্মকর্তাগণ কাজ করে শয়তানের নিষ্ঠাবান খলিফা রূপে। এমন মহাপরাধীদের হাত থেকে জনগণকে বাঁচানোর লড়াই হলো ইসলামের শ্রেষ্ঠ ইবাদত তথা জিহাদ, এ ইবাদতে প্রাণ গেলে বিনা বিচারে জান্নাতপ্রাপ্তি ঘটে। অন্য কোন ইবাদত আজীবন অবিরাম করলেও সে পুরস্কারটি জুটে না। অপরদিকে যে দেশে শয়তানের এ খলিফাদের বিরুদ্ধে জিহাদ নেই সে দেশে প্রকৃত ইসলামও নাই। মানব জাতি বিভক্ত মূলত দুটি পক্ষে। এক). শয়তানের খফিফাদের পক্ষ; দুই). মহান আল্লাহর খফিফাদের পক্ষ। এছাড়া তৃতীয় পক্ষ নাই। মানব জাতির ইতিহাসের সিংহ ভাগ জুড়ে মূলত এ দুই পক্ষের লড়াইয়ের ইতিহাস।

জান্নাতের পথ দেখানো ও জাহান্নামের আগুন থেকে মানুষকে বাঁচানোই ইসলামের মূল মিশন। সে কাজটি করে কোর’আনের জ্ঞান। তবে জ্ঞানদানের সে কাজটি শুধু মসজিদ-মাদ্রাসায় সম্ভব নয়। সে কাজে সমগ্র রাষ্ট্র এবং তার সকল সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠান, আইন-আদালত, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, প্রচারমাধ্যমসহ সকল প্রতিষ্ঠানকে সর্বশক্তি দিয়ে অংশ নিতে হয়। নবীপাক (সা:)’র শাসনামলেই সেটিই ঘটেছিল। নবীজী (সা:)’র  আমলে সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে এমন কোন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ছিল না -যা থেকে তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্টা ও সুরক্ষায় সহয়তা নেননি। তাবুক যুদ্ধের সময় তো প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমদের উপর মদিনা থেকে বহুশত মাইল দূরে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নেয়াকে বাধ্যতামূলক করেছিলেন। নবীজী (সা:)’র সে কাজে যারা সেদিন সহায়তা দেয়নি তাদেরকে আল্লাহতায়ালা ওহী যোগে মুনাফিক বলে চিহ্নিত করেছেন। তারা ঘোষিত হয়েছে ইসলামের শত্রু রূপে। নবীজী (সা:)’র  সে সূন্নতকে অনুসরণ করেছিলেন খোলাফায়ে রাশেদা ও অন্যান্য খফিফাগণ। আজও মুসলিমদের পক্ষ থেকে এরূপ সামগ্রীক সহায়তা ছাড়া কোন দেশে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কি সম্ভব? সম্ভভ কি শয়তানি শক্তির কোয়ালিশনকে পরাজিত করা?

প্রতিটি মুসলিম জীবনেই রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকে। তেমনি একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য অপরিহার্য মুসলিম রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিরও। রাষ্ট্রের এজেন্ডা নিয়ে মুসলিম রাষ্ট্র ও মুসলিম নাগরিকের মাঝে পূর্ণ সমন্বয় তথা compatibility  না থাকলে সে রাষ্ট্র মুসলিমদের জন্য কল্যাণকর হয় না। বরং অকল্যাণ ডেকে আনে। মু’মিনের উপর তাই ফরজ শুধু নিজে মুসলিম হওয়া নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহকে মুসলিম করা। এর অর্থ: পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা পূরণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিয়োজিত করা। একমাত্র তখনই রাষ্ট্র কোর’আনে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার “লিইউযহিরাহু আলা দ্বীনি কুল্লিহি” (সকল ধর্মের উপর ইসলামের বিজয়)’র এ এজেন্ডাটির সাথে একাত্ম হয়। এজন্যই মুসলিমদের রাষ্ট্র কখনোই সেক্যুলার, জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, গ্রোত্রবাদী, সমাজতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী হতে পারে না। এমন রাষ্ট্রের এজেন্ডা হয় শয়তানের এজেন্ডা পূরণ এবং জনগণকে জাহান্নামে নেয়া। ফলে এরূপে রাষ্ট্রে বসবাসের বিপদটি ভয়ানক।

এজন্যই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির উপর ইসলামী বিধানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্রেফ ঈমানদারের রাজনীতি নয়, বস্তুত সেটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা। সে এজেন্ডা নিয়েই নবীজী (সা:) রাষ্ট্রীয় প্রধানের আসনে বসেছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। সে অভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন খোলাফায়ে রাশেদা। প্রশ্ন হলো, নবীজী (সা:) ও খোলাফায়ে রাশেদার অনুসৃত সে পথ থেকে ভিন্ন পথ আছে কি? একমাত্র সে পথটিই তো প্রমাণিত হয়েছে সমগ্র মানব ইতিহাসে সবচেয়ে সফল পথ রূপে। ফলে যারা তেমন একটি ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব না দিয়ে স্রেফ নামায, রোযা, হ্জ্ব ও যাকাতের মধ্যে ধর্মপালনকে সীমিত করে -তাদের সে ধর্মপালনে পূর্ণ ঈমানদারী নাই। নবীজী (সা:)’র সূন্নত পালনেও নেই। এবং আগ্রহ নেই মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাপূরণে। এমন মানুষেরা দৃশ্যতঃ ধার্মিক মনে হলেও আসলে যে বিপথগামী –তা নিয়ে সন্দেহ আছে কী? ১ম সংস্করণ ২২/০৬/২০১২; ২য় সংস্করণ ০৮/০২/২০২১।

 




মুসলিম দেশে ইসলামের পরাজয়

ফিরোজ মাহবুব কামাল

যুদ্ধটি আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে

ইসলামের শত্রুপক্ষের মূল যুদ্ধটি কোন ইসলামি দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। বরং সেটি মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। এ যুদ্ধের মূল লক্ষ্য: মুসলিম ভূমিতে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তার শরিয়তী আইনকে পরাজিত বা বিলুপ্ত রাখা। বিস্ময়ের বিষয় হলো, সে যুদ্ধটি হচ্ছে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশগুলোতে। খোদ মহান আল্লাহতায়ালা মানব দৃষ্টির অগোচরে। কিন্ত তাঁর নাযিলকৃত পবিত্র কোরআন ও শরিয়তী বিধান তো চোখের সামনে। ফলে আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহটি যাদের মধ্যে প্রবল, তাদের মনের আক্রোশটি গিয়ে পড়ছে তাঁর কোরআনী বিধানটির বিরুদ্ধে। এ জন্যই তাদের রাজনীতির স্থায়ী নীতিটি হলো শরিয়তী বিধানের বিরুদ্ধাচরন। ভারত যখন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের হাতে অধিকৃত হয় তখনও দেশটিতে হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসাগুলি ছিল। সেগুলোকে তারা গুড়িয়ে দেয়নি। বরং তারা নিজেরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু নির্মূল করেছে শরিয়তী আদালত। কারণ সে আদালতগুলো ছিল মহান আল্লাহর জমিনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা দেয়ার মুল হাতিয়ার। বাংলাদেশের বুকেও যারা কাফের, ফাসেক, জালেম, মুশরিক, মুনাফিক ও স্বৈরাচারি তারা যে বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে তালা লাগিয়েছে -তা নয়। বরং আল্লাহর শরিয়তী আাইনের প্রয়োগকে তারা নিষিদ্ধ করেছে। আর এভাবেই মুসলিম দেশে পরাজয় এনেছে ইসলামের।

প্রশ্ন হলো, ঔপনিবেশিক বিদেশী শত্রুদের থেকে ইসলামের দেশী শত্রুদের নীতি কি আদৌ ভিন্নতর? উভয়ের নীতি যে অভিন্ন –সেটি বুঝা যায় বাংলাদেশের ন্যায় দেশে ক্ষমতাসীন সেক্যুলারিস্টদের পলিসি থেকে।  আইন-আদালতে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রবর্তিত আইন যে আজও বহাল তবিয়তে চালু রয়েছে -তার কারণ তো ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের উভয়ের অভিন্ন নীতি। আদালতে প্রতিষ্ঠিত কুফরি আইনই যে তাদের কাছে শ্রেষ্ঠ আইন -সে আইনকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে তারা সেটি প্রমাণও করেছে। কোর’আনী আইনের বিরুদ্ধে তাদের প্রধান যুক্তিটি হলো, এটি ১৪ শত বছরের পূরনো। অতএব আধুনিক যুগে তা অচল। মহান আল্লাহতায়ালার আইনের বিরুদ্ধে তাদের দুষমনিটা এতটাই প্রবল যে, শরিয়ত প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগকে তারা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস  বলে। শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকামিদের তারা হত্যা করছে বা জেলে তুলছে। প্রশ্ন হলো, খোদ কোর’আনও তো ১৪ শত বছরের পুরনো। তবে কি পুরনো হওয়ার কারণে কোর’আনকেও বাদ দিতে হবে? তাছাড়া খোদ ইসলাম এসছে তো হযরত আদম (আঃ), হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত ইব্রাহীম (আঃ)’র ন্যায় প্রাচীন নবীদের থেকে। তবে কি বাদ দিতে হবে ইসলামকেও। অপর দিকে সেক্যুলারিস্টদের রীতি-নীতি ও ধ্যান-ধারনাগুলোও কি আধুনিক? সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ ইহজাগতিক স্বার্থ চেতনা। সেক্যুলারিজমের জন্ম তো হযরত আদম (আঃ)’য়ের পুত্র কাবিলের হাতে। ইহজাগতিক সে চেতনা নিয়েই সে তার ভাই হাবিলকে হত্যা করেছিল। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তের এরূপ বিরোধীতা ও অবমাননা কোন মুসলিম দেশে হলে সেদেশের মুসলিম জনগণ নিজেদেরকে নবীজী (সাঃ)’র উম্মত রূপে দাবী করে কি করে? শরিয়তের এরূপ অবমাননা তারা সহ্যই বা করে কি করে?

প্রশ্ন, শরিয়ত বলতে কি বুঝায়? শরিয়ত হলো ন্যায়-অন্যায়, সিদ্ধ-অসিদ্ধ, বৈধ-অবৈধ, আইনী-বেআইনী, হালাল-হারামের বাছবিচারে কোরআনে নাযিলকৃত মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া মানদন্ড। সে মানদন্ড শুধু অপরাধকে অপরাধ বলেই সনাক্ত করে না, সে অপরাধের শাস্তিও নির্ধারণ করে দেয়। মহান আল্লাহতায়ালার হিদায়েত শুধু ইবাদত বা আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেই নয়, সেটি ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও। ইসলাম তো এজন্যই মানব জাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। সেক্যুলারিস্টদের মূল সমস্যাটি হলো তাদের ঈমানশূণ্যতা।  ইসলামের উপর ঈমান না থাকার কারণেই সেক্যুলারিস্টগণ আদালত থেকে শরিয়তের আইনকে বাদ দেয়। কোন সভ্য সমাজ বা রাষ্ট্রই শুধু ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, চাষাবাদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য দিয়ে গড়ে উঠে না। সে জন্য চাই ন্যায় বিচার। চাই, ন্যায় বিচারের জন্য ন্যায্য আইন। একটি জনগোষ্ঠি কতটা সভ্য ও অসভ্য সেটি ধরা পড়ে আইন-আদালতের মান থেকে। জঙ্গল এ কারণেই জঙ্গল যে সেখানে কোন আইন-আদালত থাকে। ইসলাম যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল তার মূলে ছিল শরিয়তের ন্যায় মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ আইন। এ আইনের প্রণেতা খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। এ আইনে নারী তার ন্যায্য অধিকার পেয়েছিল। প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মানবিক অধিকার এবং জানমালের নিরাপত্তা। বিলুপ্ত হয়েছিল দাসপ্রথা, বর্ণবিদ্বেষ ও গোত্রবিদ্বেষ। প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল আইনের শাসন।

মানব সমাজে সবচেয়ে জটিল ও দুরুহ কাজটি হলো সঠিক আইন প্রণোয়ন ও ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠা। মানুষ তার বড় ভূলটি ঘর বাঁধায়, চাষাবাদে বা যন্ত্র আবিস্কারে করে না। বরং সেটি করে ন্যায়-অন্যায়, সিদ্ধ-অসিদ্ধ, বৈধ-অবৈধের তারতম্য নির্ধারণে। এক্ষেত্রটিতেই ধরা পড়ে ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতার মান। একই আলো-বাতাস ও জলবায়ুতে বাস করে তাই নানা মানুষের নানারূপ বিচারবোধ। এরূপ ভিন্নতর বিচারবোধের কারণেই সূদ, ব্যভিচার, পর্ণগ্রাফি, অশ্লিলতা, দাসপ্রথা, সমকামিতা, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ড্রোন-হামলা ও পারমানবিক বোমা হামলাও অনেকের কাছে বৈধ বা আইনসিদ্ধ রূপে গণ্য হয়। এরূপ একটি অপরাধ প্রবনতা নিয়ে বৃহৎ শক্তিবর্গ বিগত দু’টি বিশ্বযুদ্ধে সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে হত্যা করেছে। পাশ্চাত্যবাসী তো এরূপ বহু  কুকর্মের মধ্যেও নিজেদের তথাকথিত আধুনিক ও সভ্য রূপটি দেখে। এমন এক অসুস্থ্য বিচারবোধের কারণেই বর্ণবাদ, দাসপ্রথা, নারিপুরুষে বৈষম্য, উপনিবেশবাদের মত অসভ্যতাও তাদের সমাজে মাত্র কিছুকাল আগেও প্রচণ্ড দাপট নিয়ে বেঁচেছিল। অথচ ইসলাম সেগুলিকে ১৪ শত বছর আগেও অসিদ্ধ ও গর্হিত পাপাচার রূপে চিহ্নিত করেছিল।

কথা হলো, শরিয়তী আইনের বদলে অন্য কোন আইনকে শ্রেষ্ঠ বললে এবং সে অনুসারে আদালতে বিচার কাজ পরিচালনা করলে কি কারো ঈমান থাকে? এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার ষোষণা, “নাযিলকৃত (কোরআনের) বিধান অনুযায়ী যারা বিচারকার্য পরিচলনা করে না তারাই কাফের।– তারাই জালেম। —তারাই ফাসেক।” –(সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪, ৪৫ ও ৪৭)। অথচ বাংলাদেশের আদালতগুলোতে তো সেটিই হচ্ছে। এবং সেটি হচ্ছে কোটি কোটি নামাযী-রোযাদারের ট্যাক্সের অর্থে। কিন্তু সে হুশই বা ক’জনের? প্রশ্ন হলো, ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে অধিকৃত হওয়ার পূর্বে এমন কি কোন মুসলিম রাষ্ট্র ছিল যেখানে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ছিল না? বাংলা ও ভারতে মুসলিমগণ যখন বিজয়ী হয় তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল অমুসলিম। কিন্তু সে জন্য কি শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বিলম্বিত হয়েছিল? অমুসলিম দেশে ঘর বাঁধার কারণে মুসলিম যেমন তাঁর নামায-রোযা পরিহার করতে পারে না, তেমনি কোন অমুসলিম দেশে বিজয় লাভের পর শরিয়তি বিধানও পরিহার করতে পারে না। তাই ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে যখন বাঙলা বিজিত হয় তখন দেশটির আদালতে হিন্দু সেন-আমলের আইন ও বিচার-ব্যবস্থা থাকেনি। প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ইসলামি শরিয়ত। কারণ মুসলিমদের কাছে আইনের এই একটি মাত্র শরিয়তী উৎস ছাড়া আর কোন উৎসের সাথে তাদের পরিচিতিই ছিল না। কিন্তু ইংরেজদের হাতে অধিকৃত হওয়ার পর দেশটির আইন আদালতে আর শরিয়তী আইন থাকেনি। প্রতিষ্ঠা পায় ইংরেজদের কুফরি আইন। কারণ, কাফেরগণও তো তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও আচার নিয়ে বাঁচে এবং তা দিয়ে রাজ্য শাসন করে। ফলে কাফেরদের শাসনে শরিয়ত বেঁচে থাকবে -সেটিও কি আশা করা যায়? ফলে ব্রিটিশের প্রবর্তিত আইনে সূদ, জুয়া ও মদ যেমন বৈধতা পায়, তেমনি ব্যাভিচার এবং পতিতাবৃত্তিও সিদ্ধ কর্ম রূপে স্বীকৃতি পায়। এবং নিষিদ্ধ হয় কোরআন প্রবর্তিত হুদুদের শাস্তি। 

ব্যক্তির ন্যায় রাষ্ট্রেরও নিজস্ব চরিত্র থাকে। সে চরিত্রটি দেশের মাঠঘাট, জলবায়ু বা আলোবাতাস নির্ধারণ করে না। সেটি নির্ধারিত হয় দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আইন-আদালত থেকে। বাংলাদেশের বুক থেকে ইংরেজ শাসনের অবসান হয়েছে। দেশের ভূগোলও পাল্টে গেছে। কিন্তু দেশের চরিত্র এখনো পাল্টে যায়নি। ব্যক্তি-চরিত্রের ন্যায় রাষ্ট্রের চরিত্রেও বিপ্লব আনে কোর’আন। অথচ সে কোর’আনী বিধানকে নিষিদ্ধ বা অকার্যকর করা হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা ও আইন-আদালতে। ফলে রাষ্ট্রের চরিত্রে ইসলামি বিপ্লব আসবে -সেটিও কি কখনো আশা করা যায়? মুসলিম দেশগুলি আজ বিদেশী কাফেরদের সামরিক দখলাদারি থেকে মূক্ত হলেও তাদের পূর্ণ দখলদারি এখনো রয়ে গেছে দেশের আদালতের উপর। ফলে অক্ষত রয়ে গেছে কাফিরদের প্রবর্তিত আইন-কানূন ও বিচার ব্যবস্থা। তাদের হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেক্যুলারিস্টগণ এখনো আদালতের বিচারক। মুসলিম সমাজ ও মুসলিম রাষ্ট্র নির্মাণের পথে মূল বাধাটি আসছে তাদের পক্ষ থেকেই। শরিয়তের দাবি নিয়ে রাস্তায় নামাটি কাফের দেশের আদালতে যেমন অপরাধ রূপে গণ্য হয়, তেমনি অপরাধ রূপে গণ্য হয় বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের আদালতেও। এ অপরাধে ঈমানদারদের ফাঁসীতে ঝুলানো হয়। এরাই রাজনীতিতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করতে চায়। 

 

আলেমদের ব্যর্থতা

মুসলিম সমাজে আলেম হওয়ার দায়ভারটি বিশাল। সাধারণ মানুষ তো তাদের থেকেই নির্দেশনা পায়। অথচ শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজে আলেমদের নিরবতা ও নিষ্ক্রীয়তা কি কম বিস্ময়ের? তাদের অপরাধটিও কি কম? তারা আজীবন কোর’আন-হাদীসের শিক্ষালাভ ও শিক্ষাদান নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু কোর’আন-হাদীসের যে মূল শিক্ষা -তার প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের আগ্রহটি কোথায়? দ্বীন প্রতিষ্ঠার সে লক্ষ্যে আল্লাহর নির্দেশিত যে জিহাদ, সে জিহাদে তাদের কোরবানীই বা কই? আল্লাহর নির্দেশিত শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠায় প্রচন্ড গাফলতি করেছিল বনি-ইসরাইলের আলেমগণ। তারাই ইসলামের ব্যর্থ ছাত্র। পবিত্র কোর’আনে তাদের ব্যর্থতাগুলো বিষদ ভাবে তুলে ধরার কারণ, মুসলিমগণ যেন তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। তাদের ব্যর্থতার মূল কারণ, হযরত মূসা (আ:)’র উপর তাওরাতে যে শরিয়তী আইন নাযিল করা হয়েছিল তার প্রতি তাদের সীমাহীন গাদ্দারী। সে গাদ্দারীর কারণে আল্লাহতায়ালার প্রচন্ড ক্রোধ গিয়ে পড়েছে তাদের উপর। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ভারবাহি গাধার সাথে তুলনা করেছেন। কারণ, গাধার কাজ শুধু ভার বহন করা, পিঠে যা বহন করে সেটি বুঝা ও তার প্রতিষ্ঠায় গাধার কোন আগ্রহ থাকে না। মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ভাষায় তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে: “যাদের উপর তাওরাতের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছিল, (কিন্তু) তারা সে দায়িত্বভারটি বহন করেনি। তাদের উদাহরণ হলো, তারা যেন কিতাব বহনকারি গর্দভ। কত নিকৃষ্ট সে সম্প্রদায়ের দৃষ্টান্ত যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে। আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” –(সুরা জুমুয়া, আয়াত ৫)।

বনি ইসরাইলের আলেমগণ সদাসর্বদা তাওরাত নিয়ে বহন করে চলা ফেরা করতো, তাওরাতের সে বিধানগুলো সুললিত কন্ঠে পাঠও করতো। কিন্তু সেগুলির প্রতিষ্ঠায় তাদের মাঝে কোন আগ্রহ ছিল না। তারা চিত্রিত হয়েছে জালেম রূপে। কারণ, তাদের জুলুমটি ছিল শরিয়তী বিধানের সাথে। প্রশ্ন হলো, আজকের মুসলিম রাষ্ট্রগুলিতে এমন আলেমের সংখ্যা কি কম? এ আলেমদের মাঝে মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের প্রতিষ্ঠা নিয়ে কোথায় সে আগ্রহ? বাংলাদেশে আজ হাজার হাজার মাদ্রাসা। সে সব মাদ্রাসায় লক্ষ লক্ষ ছাত্র ও শিক্ষক। বাংলাদেশে যতজন ডিগ্রিধারি আলেম ও তথাকথিত আল্লামার বসবাস, নবীজী (সাঃ)র আমলে সাহাবাদের সংখ্যা তার ১০ ভাগের এক ভাগও ছিল না। অথচ তারা বিজয়ের পর বিজয় এনেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের আলেমদের হাতে কোথায় সে বিজয়? বাংলাদেশের পথেঘাটে বহু দাবি-দাওয়া নিয়ে মিছিল হয়। কিন্তু শরিয়তের প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে কি আলেমগণ একবারও রাস্তায় নেমেছেন?    

আল্লাহর আইন তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার লড়াইটি জায়নামাযে বা মসজিদে হয়না। সেটি হয় বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও সামরিক রনাঙ্গণে। ফলে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় যার সামান্যতম আগ্রহ আছে সে কখনোই আইনের সে পাঠকে মসজিদ-মাদ্রাসায় বন্দি রাখাতে খুশি হয়না। বরং সে আইনের প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও প্রয়োজনে সামরিক রনাঙ্গণেও হাজির হয়। মুসলিমের জীবনে জিহাদও তো এভাবে অনিবার্য হয়ে উঠে। কিন্তু বাংলাদেশের ক’জন আলেমের জীবনে সে জিহাদ। ক’জনের জীবনে উচ্চতর সে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক লড়াই। যেন মসজিদ মাদ্রাসায় চাকুরি করে কোন রকম বেঁচে থাকাটাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে গেছে। অথচ নবীজী(সাঃ)’র কোন সাহাবী খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি জিহাদে অংশ নেননি এবং প্রাণদানে প্রস্তুত ছিলেন না। মুনাফিকগণ তাই নামাযী, রোযাদার ও হাজী হতে পারে। কিন্তু সে কখনোই আল্লাহর রাস্তায় সৈনিক হতে পারে না। প্রকৃত মু’মিনও হতে পারে না। ফলে তার জন্য অসম্ভব হয় জান্নাত লাভ। ফলে পুরা ব্যর্থ হয়ে যায় পৃথিবীর বুকে সমগ্র বাঁচাটাই। কারণ, মুনাফিকের জিহাদশূণ্য নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও ইবাদতে মহান আল্লাহতায়ালা খুশি নন।

মু’মিন ব্যক্তিকে পরীক্ষায় মধ্যে ফেলাই মহান আল্লাহতায়ালার রীতি। জিহাদ হলো সে উচ্চতর পরীক্ষা। মু’মিনের জীবনে সে পরীক্ষার পর্বটি কতটা কঠোর হতে পারে মহান আল্লাহতায়ালা সে বর্ণনাটি দিয়েছেন এভাবে: “তোমরা কি মনে করে নিয়েছো যে এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের উপর এখনো সেরূপ সময় আসেনি যেমনটি এসেছিল তাোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। অর্থসংকট, দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে এতটাই ঘিরে ধরেছিল এবং তারা এতটাই ভীত ও প্রকম্পিত হয়ছিল যে, এমন কি রাসূল এবং তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারা বলে উঠেছিল, “কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য? জেনে রাখ আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই নিকটে।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ২১৪)। আরো বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো যদিও তোমাদের নিকট তা অপ্রিয়। কিন্তু তোমরা যা অপছন্দ করো, সম্ভবত সেটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। এবং যা তোমরা যা পছন্দ করো সম্ভবত সেটিই তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন আর তোমরা জান না।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ২১৮)। এমন জিহাদই দেয় বিশ্বমাঝে বিজয়ী শক্তি রূপে বেড়ে উঠার সামর্থ্য। এবং প্রতিষ্ঠা দেয় আল্লাহর জমিনে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের। জিহাদ সংগঠিত করার দায়িত্ব তাই ইসলামি রাষ্ট্রের। ইসলামি রাষ্ট্র তো এভাবেই মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য নিশ্চিত জান্নাত লাভের পথ করে দেয়। তাই মুসলিম যেখানে ঘর গড়ে সেখানে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসাই গড়ে না, ইসলামি রাষ্ট্রও গড়ে। সে রাষ্ট্রের মাধ্যমে জিহাদেরও আয়োজন করে। অপর দিকে অনৈসলামিক রাষ্ট্র প্রজার জীবনে বাড়ায় পাপাচার, ফিতনা ও পথভ্রষ্টতা। এভাবে গড়ে জাহান্নামের পথ। অনৈসলামিক রাষ্ট্রের বড় বিপদটি তো এখানেই।

 

মূল কারণটি জাহেলিয়াত

বাঙালী মুসলিমের ব্যর্থতাটি বিশাল। তবে ব্যর্থতার মূল কারণ জাহিলিয়াত তথা জ্ঞানহীনতা। এ জ্ঞানহীন অবস্থাটি এসেছে কোর’আনের জ্ঞান না থাকায়। জ্ঞানহীনতাই মানুষকে চেতনাহীন করে। জ্ঞানহীন এমন মানুষেরা জেগে জেগেও ঘুমায়। ঘুমন্ত মানুষের ন্যায় এরা এতটাই চেতনাহীন হয় যে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই দূরে থাক, শত্রুর উপস্থিতিও তারা টের পায় না। কোন দেশে কোটি কোটি এমন জ্ঞানহীন মানুষ জেগে থাকলেও কি কল্যাণ হয়? ইংরেজ বাহিনীর হাতে যখন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা অধিকৃত হয় তখন কি এ বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের কোটি কো্টি মানুষ ঘুমিয়ে ছিল? তারা তো জেগে জেগেই নিজ দেশের উপর সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হতে দেখেছে। সে দখলদারির বিরুদ্ধে কেউ কি ময়দানে নেমেছে? সে আগ্রাসন রুখতে প্রতিটি মুসলমানের উপর জিহাদে যোগ দেয়া যে ফরজ ছিল -সেটিই বা ক’জন অনুভব করেছে? একটি জনগোষ্ঠি যখন এরূপ চেতনাহীন ও প্রতিরোধহীন হয় তখন সে দেশটি দখলে নিতে ও তাদের উপর শাসনে কি বেশী জনবল ও অস্ত্রবল লাগে? ফলে ভারতের ন্যায় বিশাল ভূ-ভাগের উপর সাম্রাজ্য কায়েম করতে ইংরেজদের বিশাল রাজকীয় বাহিনীর প্রয়োজন পড়েনি। ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর ক্ষুদ্র পেটুয়া বাহিনীর দ্বারাই সে কাজটি অতি সহজে সমাধা হয়েছে। অথচ শত্রুর হামলার বিরুদ্ধে মুসলিমদের জিহাদ শুরু হলে শত্রুর উপর বিজয়টি সহজ হয়ে যায়। কারণ, জিহাদ সম্পৃক্ততা গড়ে মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর ফেরেশতা বাহিনীর সাথে। সে সম্পৃক্তার কারণেই অতীতে আল্লাহর সাহায্য নিয়ে ফেরশতাগণও বার বার রণাঙ্গণে নেমে এসেছেন। মুসলিমদের কাজ তাই প্রতিটি যুদ্ধকেই খালেছ জিহাদে পরিণত করা।

শত্রুর বিরুদ্ধে ঈমানদারদের যুদ্ধটি জিহাদে রূপ নিলে বিজয়টি কি ভাবে আসে তার উদাহরণ হলো আফগানিস্তান। জনবলে দেশটি বাংলাদেশের সিকি ভাগেরও কম। অথচ ইসলামের শত্রুগণ বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে যতটা না ভয় পায়, তার চেয়ে বেশী ভয় করে ৪ কোটি আফগানকে। কারণ বিপুল সংখ্যক আফগান মুসলিমদের মাঝে জিহাদী চেতনা এখনো প্রবল ভাবে বেঁচে আছে। এ জিহাদের বলেই জনবলে ও সম্পদে দুর্বল হয়েও পর পর তিনটি বিশ্বশক্তিকে তারা পরাজিত হয়েছে। সেটি যেমন ব্রিটিশকে, তেমনি সোভিয়েত রাশিয়া ও সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। আফগান মোজাহিদদের উপর্যপরি বিজয়ের কারণ, ইসলামের শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধকে তারা শতভাগ জিহাদের পরিণত করেছে। আর জিহাদ শুরু হলে মুসলিমগণ কি একাকী থাকে না। ক্ষুদ্র কংকরও তখন বোমায় পরিণত হয়। আবরাহার বিশাল বিশাল হাতি মারা পড়েছিল তো সে কংকরের আঘাতে। মশামাছিও তখন মিজাইলে পরিণত হয়। মাছি যেমন নমরুদের ঘায়েল করেছিল। এমনকি সমুদ্রও সে জিহাদে সৈনিক রূপে যোগ দেয়। ফিরাউনের বিশাল সেনাবাহিনীকে তো সাগরের পানিই ডুবিয়ে মেরেছিল।

প্রশ্ন হলো, মুসলিমগণ কি অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিবে না? যে দায়বন্ধতার কারণে তাঁরা মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা -সে দায়ভার কি তারা পালন করবে না? মুসলিম দেশগুলোতে আজ যে যুদ্ধটি মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে চলছে -সেটি তো হওয়া উচিত ছিল শয়তান ও তার সেক্যুলারিস্ট অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এবং বিজয়ী করা উচিত ছিল শরিয়তী বিধানকে। প্রশ্ন হলো, এ বিশাল ব্যর্থতা নিয়ে কে তারা রোজ হাশরের বিচার দিনে মহান আল্লাহতায়ালার সামনে হাজির হতে চায়? ১ম সংস্করণ ২২/০৩/২০১৪; ২য় সংস্করণ ০৪/০২/২০২১।