কিছু অপ্রিয় ভাবনা-১

১.

ঈমানের সংজ্ঞা কি এবং ঈমানদার কাকে বলে -এ বিষয়ে সঠিক জ্ঞানটি মানব জীবনের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ জ্ঞান। ভাষা, বিজ্ঞান বা গণিতের জ্ঞান না হলেও জান্নাতে পৌঁছা যাবে। কিন্তু ঈমানের অর্থ কি এবং ঈমানদার কীরূপে হওয়া যায় -সে বিষয়ে অ্জ্ঞতা নিয়ে প্রকৃত ঈমানদার হওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব হলো জান্নাতে পৌঁছা। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, এখানে ভূল হওয়ার কারণে অতিশয় বেঈমানও নিজেকে ঈমানদার মনে করে। তখন ভূল হয়, কে ইসলামের শত্রু এবং কে বন্ধু -সেটি চিনতে। অথচ মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে বড় অজ্ঞতাটি হলো এ বিষয়ে।

বান্দার উদ্দেশ্যে ঈমানদারের সংজ্ঞাটি জানিয়ে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। পবিত্র কোরআনে ঘোষিত সে সংজ্ঞাটি হলো: “ঈমানদার একমাত্র তাঁরাই যারা বিশ্বাস করে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে এবং এ নিয়ে আর কোন রূপ দ্বিধা-দ্বন্দ করে না এবং তারা নিজেদের মাল ও জান নিয়ে জিহাদ করে আল্লাহর রাস্তায়। ঈমানের দাবীতে একমাত্র তারাই হলো সত্যবাদী।” -(সুরা হুজরাত, আয়াত ১৫)।

তাই জীবনে জিহাদ ছাড়া নিজেকে ঈমানদার রূপে দাবী করাটি নিরেট ভন্ডামী। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের অর্থ হলো আল্লাহর নিজের রাজ্যে অর্থাৎ দুনিয়ার বুকে একমাত্র তাঁরই সার্বভৌমত্ব ও তাঁরই প্রদত্ত শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠার জিহাদ। তাই যার জীবনে আল্লাহর আইন তথা শরিয়তকে বিজয়ী করার জিহাদ নাই, সে ব্যক্তি নামাযী, রোযাদার বা হাজী হতে পারে; মসজিদের ইমাম, আলেম, মাদ্রাসার শিক্ষক, মোফাছছের বা ইসলামী দলের নেতাও হতে পারে; কিন্তু সে ব্যক্তি কি প্রকৃত ঈমানদার হতে পারে?

জিহাদের পাশাপাশি শরিয়ত পালনের বিষয়টি আল্লাহর দরবারে ঈমানদার রূপে গণ্য হওয়ার জন্য অতি জরুরী। সে বিষয়টি মহান আল্লাহতায়ালা পরিস্কার করেছেন পবিত্র কোর’আনের সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে। উপরুক্ত তিনটি আয়াতে বলা হয়েছে, যারা শরিয়তের আইন অনুযায়ী বিচার করে না তারা কাফের, জালেম ও ফাসেক। মুসলিম রূপে গণ্য হওয়ার জন্য বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, ঔপনিবেশিক কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার আগে সিরাজুদ্দৌলা-শাসিত বাংলা, মোগল-শাসিত ভারতসহ প্রতিটি মুসলিম দেশে শরিয়তের আইন অনুযায়ী বিচার হতো।

২.
রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মচারি প্রতি কাজে সরকারি আইন মেনে চলে। সে আইন অমান্য করলে বা তা্র বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে শুধু চাকুরি থেকেই বহিস্কৃত হয় না, কঠোর শা্স্তিও ভোগ করে। কোর্টমার্শাল হয় বিদ্রোহী সামরিক বাহিনীর সদস্যদের।

তাই জেল-জরিমানা থেকে বাঁচতে হলে দেশের আইন মেনে চলতে হয়। তেমনি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে হলে মানতে হয় শরিয়তের আইন। স্রেফ নামায়-রোযায় মুক্তি মিলে না। ঈমানের প্রকাশ তাই জীবনের প্রতি পদে শরিয়ত মেনে চলায়। নইলে ঈমানের দাবীটি ভূয়া গণ্য হয়। শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হলে শাস্তি শুধু পরকালে নয়, দুনিয়ার বুকেও অনিবার্য হয়ে উঠে। মুসলিমগণ বস্তুতঃ দেশে দেশে সে আযাবের মধ্যেই। বাংলাদেশেও সে ভূয়া ঈমানেরই প্রদর্শণী হচ্ছে দেশের আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না দিয়ে।

৩.
পরকালের ভয় না থাকলে অতি কঠিন পাপও সহজ হয়ে যায়। পরকালের ভয়ই ঈমানদারের জীবনে বিপ্লব আনে। তখন ঈমানদারের জীবনে জিহাদ আসে এবং রাষ্ট্রের বুকে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় শহীদ হওয়ার অদম্য বাসনাও জাগে। পরকালের ভয় থাকাতেই নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের শতকরা৭০ ভাগের বেশী শহীদ হয়ে গেছেন। ফলে মুসলিমগণ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। নামায-রোযা, হজ্ব-উমরাহ মুনাফিকও করতে পারে। কিন্তু তার জীবনে জিহাদ থাকে না, শহীদ হওয়ার আগ্রহও থাকে না। তাদের সকল সামর্থ্য ব্যয় হয় পার্থিব জীবনকে সমৃদ্ধ করতে।

৪.

আলু-পটল,মাছ বা পোষাক রপ্তানি করা যায়। কিন্তু নারীও কি রপ্তানি করা যায়? শরিয়তে নারীদের তো একাকী হজ্বে যাওয়ারও অনুমতি নাই। অজানা বিদেশে এক অপরিচিতের ঘরে একজন পিতা বা মাতা তার মেয়েকে, ভাই তার বোনকে এবং স্বামী তার স্ত্রীকে কীরূপে কাজ  করার অনুমতি দেয়? সে ব্যক্তি যে নারী লোভি দুর্বৃত্ত নয় -সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত হলো কী করে? কত মেয়ে ধর্ষিতা হয়ে দেশে ফিরছে সেটি কি তারা জানে না? সরকারই বা কেন নারীদের বানিজ্যিক পণ্যে পরিণত করে? এ কুফুরির বিরুদ্ধে আলেমদেরই বা প্রতিবাদ কই? অর্থের লোভে মানুষ কি এতটাই বিবেকশূণ্য ও ঈমানশূণ্য হতে পারে? এ বিবেকশূণ্যতার কারণেই সূদী লেনদেন ও বেশ্যাবৃত্তির ন্যায় জঘন্য পাপ কর্মও বৈধ অর্থনৈতিক কর্মে পরিণত হয়েছে।

৫.
যে আরএসএস গান্ধীকে হত্যা করেছিল তাদের হাতেই আজ অধিকৃত ভারতের শাসন ক্ষমতা, পুলিশ ও আদালত। ফলে মসজিদ ভাঙ্গলে এবং মুসলিমদের হত্যা ও ধর্ষণ করলেও ভারতে শাস্তি হয়না। মুসলিম নির্যাতনের যে কাজটি করে থাকে আরএসএস’য়ের গুন্ডারা, সেটিই করছে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পুলিশ। নরেন্দ্র মোদি নিজে আরএসএস’র প্রডাক্ট। অথচ তাকে ঘনিষ্ট বন্ধু রূপে পেয়ে নিজেকে ধণ্য মনে করে শেখ হাসিনা। উপঢৌকন রূপে হাসিনা মোদির জন্য পাঠায় বাংলাদেশী আম ও পাঞ্জাবী –যা বলেছে স্বয়ং মোদি। নরেন্দ্র মোদি যে নির্যাতনটি করছে ভারতীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে, হাসিনাও সেটিই করছে বাংলাদেশী মুসলিমদের বিরুদ্ধে। মোদি প্রখ্যাত ইসলামী মনিষী যাকির নায়েককে ভারতে নিষিদ্ধ করেছে। হাসিনা সেটিই করেছে বাংলাদেশে। যে বীভৎস ও নৃশংস মুসলিম হত্যাকান্ডটি মোদি ঘটিয়েছে গুজরাতে, শেখ হাসিনা সেরূপ নৃশংস হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে হিফাজতে ইসলামের মুসল্লীদের বিরুদ্ধে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে।  




এতো জরুরী কেন একাত্তরের ইতিহাস?

ব্যর্থতা ইতিহাস তুলে ধরায়

ইসলামের শত্রুপক্ষ বিজয়ী হলে বিচার-আচারের মানদন্ডটিও তাদের অনুকুলে পাল্টে দেয়া হয়। তখন সে মানদন্ডে ইসলামের ভয়ানক শত্রু এবং কাফের শক্তির সেবাদাসও বন্ধু ও পিতা রূপে চিত্রিত হয়। সে সাথে ইসলামের পক্ষের শক্তি চিত্রিত হয় ভিলেন রূপে। মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাদের চরিত্রহরণ করা হয় এবং তাদের ফাঁসিতেও চড়ানো হয়। সেটি যেমন নমরুদ-ফিরাউনের আমলে হয়েছে, তেমনি হচ্ছে বাংলাদেশেও। এমন এক বিকৃত মানদন্ড প্রতিষ্ঠা দিয়ে শেখ মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্র হত্যাকারি বাকশালীকে এবং তার দুর্বৃত্ত সাথীদেরকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। সে সাথে বন্ধু দেশ রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে ভারতকে। অপরদিকে যারা ইসলামি ব্যক্তিত্ব তাদের চরিত্র হরণ করা হয়েছে নানা রূপ মিথ্যা অপবাদ দিয়ে।

একাত্তরের ঘটনাবলিকে জনগণের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ইসলামপন্থিদের ব্যর্থতাটি বিশাল। সত্য ইতিহাসকে তুলে ধরাটি মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা সে বিশাল ইতিহাস তুলে ধরেছেন বলেই ফিরাউন, নমরুদ, কারুণের ন্যায় দুর্বৃত্তগণ  ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায়নি। মানব ইতিহাসে তারা হাজার হাজার বছর বেঁচে আছে মানুষের ঘৃণা ও অভিশাপ নিয়ে এবং নিজ নিজ অপরাধ কর্মগুলির শিক্ষ্যণীয় বিবরণ নিয়ে। অপর দিকে মানব জাতির জন্য অনুকরণীয় শ্রেষ্ঠ চরিত্র রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন হযরত ইব্রাহিম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং অন্যান্য নবীগণ। ইসলামের পক্ষের শক্তির পক্ষ থেকে তেমন একটি মূল্যায়ন একাত্তর নিয়েও হওয়া জরুরী ছিল।

এটি সত্য যে, একাত্তরে ইসলামের পক্ষের শক্তি পরাজিত হয়েছে। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় পরাজয়টি হয়েছে একাত্তরের পর। এবং সেটি নৈতিক, আদর্শিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়। তারা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে একাত্তরের সত্য ইতিহাস তুলে ধরতে। কেন তারা অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিল -সে সত্যটি তারা আজও তুলে ধরেনি। একাত্তরে যে দলগুলি পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নিয়েছিল তারা হলো আওয়ামী লীগ, চীনপন্থি ও মস্কোপন্থি ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টি এবং হিন্দুগণ। এদের ভোট সংখ্যা আজ ৩৫% ভাগের বেশী নয়। অপর দিকে যারা অখন্ড পাকিস্তান বাঁচানোর পক্ষ নিয়েছিল তারা হলো মুসলিম লীগের তিনটি উপদল, জনাব নুরুল আমীনের পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টি, নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং সকল আলেম সম্প্রদায় ও পীরগণ। এদের বিশাল গণভিত্তি ছিল। সেটি শেখ মুজিব জানতো বলেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির নামে রেফেরেন্ডামের দাবী কখনোই করেনি। রেফেরেন্ডাম হলে পাকিস্তানপন্থিদের ভোট ৫-৬ দলের মাঝে বিভক্ত হতো না। তখন ভোট ভাগ হতো দুই ভাগে। শেখ মুজিব স্বাধীনতার দাবী তুলেছে ৬ দফার নামে ভোট নেয়ার পর।  ফলে পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধী ছিল এমন বহু লোক তার দলকে ভোট দিয়েছে। এটি ছিল জনগণের সাথে মুজিবের বিশ্বাসঘাতকতা। কারণ জনগণ কখনোই তাকে পাকিস্তান ভাঙ্গার ম্যান্ডেট দেয়নি।

একাত্তরে নেজামে ইসলাম একটি বৃহৎ দল ছিল। পঞ্চাশের দশকের এ দলের নেতা চৌধুরী মহম্মদ আলী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তার নেতৃত্বেই ১৯৫৬ সালে প্রণীত হয় পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান। দলটির আরেক নেতা কক্সবাজারের মৌলভী ফরিদ আহমেদ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন। জামায়াত নেতা জনাব গোলাম আযম লিখেছেন পিস কমিটি বানানোর ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী উদ্যোগী ছিলেন মৌলভী ফরিদ আহমেদ। আজকের হিফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা শফির ওস্তাদ মাওলানা সিদ্দিক আহমেদ সাহেব ছিলেন একাত্তরে নেজামে ইসলাম দলের প্রবীন নেতা। সত্তরের দশকে মাওলানা সিদ্দিক আহমেদ সাহেব ছিলেন হাট হাজারী মাদ্রাসার প্রধান। পাকিস্তানের অখন্ডতা বাঁচানোর কাজে এ দলটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অথচ এ দলের নেতাগণও তাদের সে ভূমিকা নিয়ে আজ নিশ্চুপ। যেন তারা কিছুই জানে না। ফলে চরিত্র হনন হচ্ছে তাদেরও। তাদের নীরবতাটি বরং ইসলামের শত্রুদের জন্য চরিত্র হননের কাজটি আরো সহজ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সত্য বলা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি তাদের অনেকে ইসলামের শত্রুদের সাথে মিতালী গড়ে তাদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও কদর বৃদ্ধিরও চেষ্টা করছেন। এ কাজে তাদেরকে শেখ হাসিনার পাশেও দেখা যায়। তাদের অনেকে হাসিনার ন্যায় এক দুর্বৃত্ত ভোট-ডাকাতকে ‘কওমী জননী’র খেতাবও দিয়েছে। নৈতীক দিক দিয়ে নীচের নামার এটি এক বিরল দৃষ্টান্ত।

ভারতীয় ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একাত্তরে ইসলামের পক্ষের শক্তিগুলির যে গৌরবময় ভূমিকা ছিল -সেটিকে তারা নিজেরাই নিজেদের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত করেছে। এদিক দিয়ে  জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবিরের ভূমিকাটি অতি বিস্ময়কর। ‌বিজয় দিবসের নামে ১৬ ডিসেম্বরে  তারা যেরূপ বিজয় মিছিল বের করে -সেরূপ মিছিল একাত্তরের যারা প্রকৃত বিজয়ী তারাও করে না। অথচ কে না জানে, ‌১৬ ডিসেম্বরে বিজয়টি ইসলামের পক্ষের শক্তির ছিল না। সে বিজয় ছিল ভারত ও তার সেবাদাসদের। এ দিনটি ছিল বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের মাতমের দিন। যাদের মনে সামান্যতম ঈমান আছে তারা কি কোন মুসলিম দেশ ভেঙ্গে যাওয়াতে খুশি হতে পারে? এ দিনে সে বিজয় মিছিলই বা বের করবে কোন আনন্দে? সে দেশটি পাকিস্তান না হয়ে যদি সূদান, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক বা অন্য যে কোন মুসলিম দেশ হতো -তবু্ও তো সেটি মাতমের দিন রূপে গণ্য হতো।

 

জিহাদ চাই বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে

মুসলিমদের ব্যর্থতা শুধু বন্ধুদের চেনায় নয়, শত্রুদের চেনাতেও। এরূপ ব্যর্থতার কারণে মুসলিম উম্মাহর মাঝে একতার চেয়ে বিভক্তিই শ্রেয় গণ্য হয়েছে। এর ফলে শত্রুগণ যেমন নেতা বা পিতা রূপে চিহ্নিত হয়েছে, তেমনি বন্ধুগণ চিহ্নিত হয়েছে শত্রু রূপে। অথচ শত্রু-মিত্র চেনার এ ব্যর্থতাটিই ব্যক্তির সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা। এরূপ অযোগ্যতায় মহান সৃষ্টিকর্তাকে চেনাও অসম্ভব হয়। ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্তগণ তখন জনগণের কাছে ভগবান, নেতা, পিতা বা প্রধানমন্ত্রী রূপে গৃহিত হয়। শাপ-শকুন, গরু-বাছুর, মুর্তি ভগবানের আসনে বসার সুযোগ পেয়েছে তো মানুষের সে বোধহীনতার কারণে। এক্ষেত্রে বাঙালী মুসলিমের ব্যর্থতাটি বিশাল।

একটি জনগোষ্ঠি কতটা জাহান্নামী -সেটি বুঝা যায় কাকে তারা ভগবান বলে মান্যতা দেয় বা পূজা দেয় তা থেকে। তেমনি একটি দেশের মানুষ কতটা অযোগ্য, অশিক্ষিত বা বোধশূণ্য সেটি বুঝা যায় সেদেশে কীরূপ মানুষ জাতির পিতা, নেতা বা শাসক রূপে গৃহীত হয় -তা দেখে। যেদেশে শেখ মুজিবের ন্যায় একজন গণহত্যাকারি বাকশালী ফ্যাসিস্টকে বঙ্গবন্ধু বা জাতির পিতার আসনে বসানো হয় বা শেখ হাসিনার ন্যায় নৈশকালীন ভোট-ডাকাতকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা হয় –সে দেশের মানুষকে কি সুসভ্য, সুশিক্ষিত ও বিবেকবান বলা যায়? গণতন্ত্রের এরূপ শত্রুদেরকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বা জার্মানীর ন্যায় দেশে রাজনীতি করতে দেয়া দূরে থাক, বাঁচার অধিকার দিত? অথচ বাংলাদেশে এ দুর্বৃত্তগণই ছিল একাত্তরের নেতা এবং আজ দেশ তাদের হাতেই অধিকৃত।  

জীবনে বাঁচাটি নিরাপদ করতে হলে শুধু বিষাক্ত শাপ ও হিংস্র পশুকে চিনলে চলে না; মানবরূপী দুর্বৃত্তদেরও চিনতে হয়। সে সামান্য সামর্থ্যটুকু না থাকলে অসম্ভব হয় মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর দ্বীন ও তাঁর প্রিয় রাসূলকে চেনা। অসম্ভব হয় সমাজের সভ্য মানুষদের চেনা। অথচ এটিই মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এমন ব্যর্থতা ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছায়। শাপ যে প্রাণনাশী -সেটি জানা যায় শাপের দংশনে কারো মৃত্যু দেখে। তেমনি দুর্বৃত্ত নেতাদের চেনা যায় তাদের হাতে জনগণের প্রাণনাশ, ক্ষয়-ক্ষতি ও মুসলিম উম্মাহ দুর্বল হওয়া দেখে। তাই যারা ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে মুসলিম উম্মাহর দেহকে খণ্ডিত করে -তাদেরকে কি কখনো বন্ধু বা নেতা বলা যায়? অথচ বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে।

বাংলাদেশে যারা ইসলামের পক্ষের আলেম, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী তাদের জন্য যে কাজটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, জনগণের মনকে কোর’আন-হাদীস ও ইতিহাসের জ্ঞানে আলোকিত করা। নইলে অন্ধকার নিয়ে কে শত্রু এবং কে মিত্র সেটি চেনার কাজ কখনোই সঠিক হয় না। বিশেষ করে সেটি একাত্তর প্রসঙ্গে। এটি এক বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। নইলে রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামের শত্রু ও ভারতেসেবী মীর জাফরদের বিরুদ্ধে যে জিহাদ চলছে তাতে  বিজয়ী হওয়া অসম্ভব হবে। এক্ষেত্রে ইসলামপন্থিদের ব্যর্থটি বিশাল। এটি যে চরম ব্যর্থতা -সে ধারণাও তাদের নাই। এ ব্যর্থতার কারণেই কাফের শক্তির সেবাদাসগণ যেমন নেতা গণ্য হচ্ছে, তেমনি ইসলামপন্থি ব্যক্তিগণ ব্যর্থ হ্চছে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে। অথচ ভারতসেবী মীর জাফরদের মুসলিম স্বার্থ বিরোধী চক্রান্তকে তুলে ধরার জন্য একাত্তরের ঘটনাবলি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একাত্তরের ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে রয়েছে তাদের কৃত অপরাধের রক্তাত্ব স্বাক্ষর।

ইতিহাসের মধ্যে থাকে অমূল্য জ্ঞানের ভান্ডার। অতীতের ইতিহাস থেকে যেমন পাওয়া যায় শয়তানী শক্তির পরিচয়, তেমনি পাওয়া যায় সঠিক পথে সামনে চলার প্রয়োজনীয় জ্ঞান। বিজ্ঞান না জানার কারণে কোন জাতি জাহান্নামী হয় না, জাহান্নামী হয় ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়ার কারণে। তখন জ্ঞানহীন কাপালিকগণ নিজ যুগের ফিরাউনকেও পদসেবা দেয়। শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ন্যায় স্বৈরাচারি, বাকশালী ও মানব-হত্যাকারিদের নেতা হওয়ার পিছনে রয়েছে তো কাপালিক-সুলভ এ অজ্ঞতা। তাদের কারণেই তো দেশে প্লাবন এসেছে গুম, খুন, ধর্ষণ ও পিটিয়ে মানুষ হত্যার রাজনীতির। মহান আল্লাহতায়ালা তাই তাঁর পবিত্র কোর’আনে জীববিদ্যা, পদার্থ বিদ্যা বা গণিতের পাঠ দেননি, কিন্তু বিপুল পাঠ দিয়েছেন ইতিহাস জ্ঞানের। পরিতাপের বিষয় হলো সত্য জ্ঞান তুলে ধরায় মহান আল্লাহতয়ালার সে পবিত্র সূন্নত বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের দ্বারা পালিত হয়নি। অথচ এটিই কাঙ্খিত ছিল যে, একাত্তর নিয়ে সবচেয়ে বেশী লেখা-লেখি ও গবেষণা হবে ইসলামপন্থিদের পক্ষ থেকে। কিন্তু সেটি হয়নি। তারা সে ইতিহাসকে বরং ঢাকার চেষ্টা করেছে। ইতিহাস চর্চার এ অঙ্গনে তাদের অনুপস্থিতি শত্রুপক্ষের জন্য যেটি সহজ করেছে তা হলো ইতিহাস বিকৃতি। একাত্তরকে ভূলে নয়, বরং ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ পর্ব থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং শিক্ষা দান করেই ইসলামের পক্ষের শক্তিকে সামনে এগুতে হবে। ০১/০১/২০২০  

 




একাত্তরের শিক্ষা এবং স্বাধীনতার সুরক্ষা প্রসঙ্গ

যে ভয়ানক নাশকতাটি অনৈক্যের

মুসলিম উম্মাহ আজ যে কারণে শক্তিহীন ও ইজ্জতহীন -সেটি মুসলিম দেশগুলির ভূমি বা জলবায়ুর কারণে নয়। সম্পদের কমতির কারণেও নয়। জনসংখ্যার কমতিতেও নয়। বরং মূল কারণটি হলো, মুসলিমদের অনৈক্য্। সে অনৈক্যের মূল কারণটি হলো, মুসলিম দেশগুলিতে দুর্বৃত্তদের নেতৃত্ব। দেশ চলে নেতাদের নির্দেশে। ফলে নেতাগণ ভ্রষ্ট, অযোগ্য, দুর্বৃত্ত ও বেঈমান হলে দেশও তখন দুর্বৃত্ত কবলিত ও ব্যর্থ হতে বাধ্য। দুর্বৃত্ত নেতাদের সবচেয়ে বড় দুর্বৃত্তিটি হয় ভাষা ও বর্ণের নামে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তির দেয়াল গড়ার মধ্য দিয়ে। মুসলিম সমাজে এরাই শয়তানের দাস। তাদের লক্ষ্য, মুসলিমদের কল্যাণ নয়, পরাজয় ক্ষতিসাধন। সেটি করে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়ে। এজন্য তারা ইসলামের শত্রুশক্তির কাছে এতো প্রিয়। শেখ মুজিব এবং তার কন্যা হাসিনা ভারতের শাসকচক্রের কাছে এজন্যই এতো প্রিয়। একই রূপ গাদ্দারির কারণে ব্রিটিশ সরকার থেকে শুধু রাজনৈতিক প্রশ্রয়ই নয়, অর্থ, অস্ত্র এবং সামরিক বাহিনীর সহায়তা পেয়েছিল মক্বার গর্ভনর শরিফ হোসেনকে। কারণ সে উসমানিয়া খলিফার বিলুপ্তির লক্ষ্যে বিদ্রোহ করেছিল। 

দেশ বিভক্ত হলে দুর্বলতা বাড়ে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন যত বিশালই হোক ক্ষুদ্র ভূগোলের কারণে তা দিয়ে শক্তি বাড়ে না। মাথা পিছু আয়ের দিক দিয়ে কাতার সমগ্র পৃথিবীতে প্রথম। কিন্তু সে আয়ের কারণে দেশটির শক্তি বাড়েনি। মাথা পিছু আয় তা থেকে আরো শতগুণ বাড়লেও তাতে  কাতার কোন শক্তিশালী দেশে পরিণত হবে না। কারণ দেশটি ক্ষুদ্র। রাশিয়ার অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়েও দুর্বল। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটি একটি বিশ্বশক্তি। কারণ, রাশিয়ার রয়েছে বৃহৎ ভূগোল। তাই ভূগোল ক্ষুদ্রতর করা মানে রাষ্ট্রকে শক্তিহীন করা। ইসলামে তাই এটি হারাম। কারণ মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের দুর্বল দেখতে চান না। এতে খুশি হয় শয়তান এবং শয়তানের অনুসারি কাফেরগণ। তাই মুজিবের ন্যায় যারাই মুসলিম দেশের ভূগোল ছোট করেছে তারা ভয়ানক ক্ষতি করেছে মুসলিমদের। এমন ব্যক্তিগণ কখনোই মুসলিমদের বন্ধু হতে পারে না। ইসলামের এরূপ শত্রুদের বিজয়ে কাফেরগণ যেমন পুঁজি বিনিয়োগ করে, তেমনি তাদের বিজয় নিয়ে উৎসবও করে। একাত্তরে ভারত সেটিই করেছে।

অথচ ঈমানদারের চেতনাটি সম্পুর্ণ ভিন্ন। কোন মুসলিম দেশ যদি ভেঁঙ্গে যায় এবং ভেঁঙ্গে যাওয়ার বেদনাটি যদি কেউ হৃদয়ে অনুভব করে তবে বুঝতে হবে তার ঈমানের ভান্ডারটি শূণ্য। এজন্যই একাত্তরে কোন আলেম, কোন ইসলামী দল, ইসলামী চেতনাসমৃদ্ধ কোন বুদ্ধিজীবী এবং কোন পীর পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি। পাকিস্তান ভাঙ্গার প্রকল্পটি ছিল ইসলামের শত্রু পক্ষের। বাংলাদেশ আজ ইসলামের এ শত্রুদের হাতেই অধিকৃত। নামায়-রোযা, হজ্ব-উমরাহ মুনাফিকও পালন করতে পারে। নবীজী (সাঃ)র যুগে মুনাফিকগণ তার পিছনেও নামায পড়েছে। কিন্তু তারা হৃদয়ে ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে না।

যে কোন বৃহৎ দেশ সেদেশে বসবাসকারি মুসলিমদের জন্য বৃহৎ ভূমিকা পালনের সুযোগ সৃষ্টি করে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র্র পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠি হওয়ার কারণে বাঙালী মুসলিমগণ বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে যে ভূমিকা পালনের সুযোগ পেয়েছিল সে সুযোগ হারিয়ে তারা এখন ভারতের পদতলে আত্মসমর্পিত। ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললে পিটুনি খেয়ে লাশ হতে হয়। এটিই হলো একাত্তরের প্রকৃত অর্জন। বাংলাদেশে অসভ্য নাচগানের আসর করতে অনুমতি লাগে না। কিন্তু অনুমতি লাগে কোরআনের তাফসির করতে। কম্যুনিস্ট, নাস্তিক বা অমুসলিমদের দল করতে বাঁধা নাই। কিন্তু বাঁধা আছে ইসলামের নামে দল করতে। সেটির শুরু মুজিবের হাতে।  ক্ষমতা হাতে পাওয়ার সাথে সাথে মুজিব সকল ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করে এবং দলগুলির নেতাকর্মীদের কারাবন্দী করে। অথচ পাকিস্তানে সে বিপদ ছিল না।

 

হারাম বিষয় কখনোই হালাল হয় না

কোর’আন-হাদীস নিয়ে যাদের সামান্য জ্ঞান আছে তাদের মাঝে মুসলিম দেশ ভাঙ্গার কাজটি যে হারাম -তা নিয়ে সামান্যতম সন্দেহ থাকার কথা নয়। অথচ সে হারামকে হালাল বানানোর চেষ্টাটি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মাঝে কম নয়। দেশ ভাঙ্গাকে জায়েজ করতে তাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, পাকিস্তান আমলে অনৈক ইসলামী কাজ ও হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাতে কি একটি দেশ ভাঙ্গার ন্যায় একটি হারাম কাজ জায়েজ হয়? হারাম তো সব সময়ই হারাম। জনপদে সভ্য মানুষের বসবাস যেমন গড়ে উঠে, তেমনি বিষাক্ত সাপও সেখানে বাসা বাঁধার চেষ্টা করে। ঘরে সাপ ঢুকলো সে সাপ মারতে হয়, সে জন্য ঘরে আগুণ দেয়াটি শুধু বুদ্ধিহীনতাই নয়, গুরুতর অপরাধ। তাই শাসক যত দুর্বৃত্তই হোক -সে কারণে দেশ ভাঙ্গা জায়েজ হয় না। জায়েজ হয় না জনগণের মাঝে ভাষা বা বর্ণ ভিত্তিক ঘৃণা, ভিন্নতা বা শোষণের কারণেও। দেশ বাঁচিয়ে রেখেও এসব রোগের চিকিৎসা আছে। তাছাড়া প্রশ্ন হলো, একাত্তরের পূর্বে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ -এ ২২ বছরের পাকিস্তানী আমলে ২২ জন পূর্ব পাকিস্তানীও কি পুলিশ বা সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে? অথচ ২০১৩ সালের ৫’মের এক রাতে শাপলা চত্তরে হিফাজতে ইসলামের শত শত মুসল্লীকে হত্যা করা হয়েছে। এবং মিউনিসিপালিটির ময়লা ফেলার গাড়িতে তুলে তাদের লাশ গায়েব করা হয়েছে। পঞ্চাশের বেশী সেনা অফিসারদের হত্যা করা হয়েছে পিলখানাতে। মুজিবের শাসনামলে রক্ষিবাহিনী হত্যা করেছে তিরিশ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের। যু্দ্ধ আসলে সে সাথে  যুদ্ধাপরাধও আসে। একাত্তরের যুদ্ধে তাই বহু হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে ভয়নাক গণহত্যাগুলি হয়েছে কোনরূপ যুদ্ধ ছাড়াই। ৯ মাসের যুদ্ধকালীন সময়টি ছাড়া পাকিস্তান আমলে কখনোই এরূপ গণহত্যা হয়নি।    

তাছাড়া অনেক খুনখারাবী ও অনৈসলামিক কাজ উমাইয়া ও আব্বাসী খলিফাদের আমলেও হয়েছে। মক্কায় পবিত্র ক্বা’বাতে আগুন দেয়া হয়েছে। হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ইমাম হোসেন (রাঃ)’য়ের ন্যায় মহান ব্যক্তিও সে সরকারি নৃশংসতা থেকে রেহাই পাননি। তারপরও জনগণ মুসলিম রাষ্ট্রকে ভাঙ্গেনি। কারণ ক্বা’বাতে আগুন দেয়া বা হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের হত্যার চেয়েও হাজার গুণ বেশী ক্ষতি হয় যদি মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গা হয়। এজন্যই মহাজ্ঞানী আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি হারাম করেছেন এবং ভাষা ও বর্ণের নামে গড়ে উঠা ভেদাভেদের দেয়াল ভেঙ্গে একতা গড়াকে ইবাদত বলেছেন। একাত্তরে এ জ্ঞানটুকু থাকার কারণেই কোন ইসলামী দল বা ব্যক্তি পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি।

 

যে ব্যর্থতা জনগণের

তবে ব্যর্থতা শুধু নেতাদেরই নয়, সাধারণ জনগণের। জনগণকে শুধু চাষাবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরি-বাকুরি জানলে চলে না। তাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বপালনেও যোগ্যতার পরিচয় দিতে হয়। মুসলিম মাত্র দায়িত্ববান ব্যক্তি। দায়িত্বহীনগণ মুনাফিক হয়, কাফের হয়; কিন্তু তারা মুসলিম হতে পারে না। মুসলিমকে যোগ্যতার পরিচয় দিতে হয় শত্রু-মিত্র চেনাতেও। চোর-ডাকাতদের বন্ধু, নেতা বা পিতা রূপে জড়িয়ে ধরার মধ্যে যা প্রকাশ পায় সেটি বেঈমানী। তাতে যেমন দুনিয়ায় কল্যাণ নাই, তেমনি আখেরাতেও কল্যাণ নেই। এটি অবিকল বিষাক্ত শাপকে জড়িয়ে ধরার মত।

মুসলিমদের বড় বড় ক্ষতিগুলো যারা করেছে তাদের অপরাধগুলো কোন কালেই লুকানো ছিল না। কিন্তু তাদের সে অপরাধগুলি স্বচোখে দেখেও তারা সে অপরাধীদের নেতার আসনে বসিয়েছে। এরচেয়ে বড় অপরাধ কি হতে পারে? বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতার মূল কারণ এখানেই। বাসের সকল যাত্রী মাতাল হলেও সে বাস গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে ব্যর্থ হয় না -যদি চালক সুস্থ্য হয়। কিন্তু যাত্রীগণ দরবেশ হলেও গাড়ী দুর্ঘটনা ঘটাবে বা সঠিক গন্তব্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হবে -যদি চালক মাতাল বা মানসিক ভাবে অসুস্থ্য হয়। এজন্যই সবচেয়ে যোগ্যবান ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটে বসানোর মধ্যেই কল্যাণ। এটিই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। তাই ইসলামের গৌরব যুগে রাষ্ট্র নায়কের সে সিটে বসেছেন খোদ নবীজী (সাঃ)। এবং নবীজী (সাঃ)’র ইন্তেকালের পর সে আসনে বসেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ। অথচ বাংলাদেশ হচ্ছে তার উল্টোটি। রাষ্ট্র হাইজ্যাক হয়েছে ভোট-ডাকাত ফ্যাসিস্টদের হাতে। অথচ বাংলাদেশীদের মাঝে তা নিয়ে কোন প্রতিবাদ নেই। গরুছাগল সামনে কোন অন্যায় হতে দেখেও যেমন নীরবে ঘাস খায়, বাংলাদেশের মুসলিমদে অবস্থা কি তা থেকে ভিন্নতর?

রাষ্ট্রের কল্যাণ কাজের শুরুটি সমাজের নীচের তলা থেকে হয় না। সেটি শুরু করতে উপর থেকে। দেশের জনগণদের সবাইকে ফেরেশতা বানিয়ে তাই রাষ্ট্রে কল্যাণ আনা যায় না। সবাইকে ফেরেশতা বানানোর কাজটি সম্ভবও নয়। কারণ, অধিকাংশ মানুষ যে জাহান্নামে যাবে সেটি তো মহান আল্লাহতায়ালার কথা। সমাজ বিপ্লবের পথে তাই জরুরী হলো শাসন ক্ষমতায় নেক বান্দাদের বসানোর বিপ্লব। নইলে হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও দেশে কোন কল্যাণ আসবে না। বাঙালী মুসলিম দুর্গতির মূল কারণ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ভাল মানুষকে বসানোর ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জনগণের কাছে গুরুত্বই পায়নি। তারা কল্যাণ খুঁজেছে মসহজিদ-মাদ্রাসা গড়ায়। এবং স্রেফ নিজে ভাল হওয়ায়। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর প্রিয় সাহাবাগণ রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের যে মহান সূন্নত রেখে গেছেন -তা থেকে তারা কোন শিক্ষাই নেয়নি।

 

একাত্তরের যুদ্ধের ধারাবাহিকতা

ইসলামের শত্রুপক্ষীয় দুর্বৃত্তদের নীতি হলো, “মানুষকে বিভক্ত করো এবং শাসন করো”। এদের কাজ তাই ভাষা, বর্ণ, ভৌগলিক ভিন্নতা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে জনগণের মাঝে বিভক্তি গড়া। শেখ মুজিবের রাজনীতির মূল পুঁজিই ছিল ঘৃণাভিত্তিক এ বিভক্তির রাজনীতি। পাকিস্তান আমলে তার বিভক্তির রাজনীতির ব্যাকারণ ছিল বাঙালী ও অবাঙালীর বিভক্তি। তেমন একটি ঘৃণাপূর্ণ মগজ নিয়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে নিজ দলকে শক্তিশালী করার কোন চেষ্টাই করেননি। সমগ্র পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে আগ্রহ থাকলে সে গরজটি তার মাঝে দেখা যেত। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর বিভেদ গড়লেন বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষ-বিপক্ষের ভিত্তিতে। এমন ক্ষমতালিপ্সু ক্ষুদ্র মনের মানুষদের কারণেই মুসলিম দেশগুলি খন্ডিত হয়েছে এবং দুর্বল হয়েছে। শয়তান এবং তাবত ইসলাম বিরোধীশক্তিও তো সেটিই চায়। এজন্যই কাফের অধিকৃত দেশগুলিতে তাই এদের বন্ধুর অভাব হয়না। বাংলাদেশের বুকে আত্মবিনাশী সে বিভক্তির রাজনীতিকে বলবান করার কাজে ভারতীয়দের বিনিয়োগ এজন্যই বিশাল। সে রাজনীতিকে বিজয়ী করতে একাত্তরে তারা যুদ্ধও করেছে। এবং তাদের সে নীতি আজও প্রয়োগ করে চলছে। ফলে শেখ হাসিনার পিছনে ভারতীদের রাজনৈতিক ও সামরিক বিনিয়োগটিও একাত্তরের ন্যায় বিশাল। দেহ খন্ডিত হলে যেমন অসম্ভব হয় নিজ পায়ে দাঁড়ানো, তেমনি এক পঙ্গুদশা হয় খন্ডিত দেশেরও। ইসলামে তাই এটি হারাম। অথচ শয়তানী শক্তির স্ট্রাটেজী সম্পূর্ণ বিপরীত।

ফলে ভারতের ন্যায় যারাই ইসলাম ও মুসলিমের ক্ষতিসাধনে উদগ্রীব তাদের স্ট্রাটেজীটি হলো, প্রতিটি মুসলিম দেশে বিচ্ছিন্নতাকামী দুর্বৃত্তদের ময়দানে নামানো। সেটি যেমন বাংলার মাটিতে পাকিস্তান আমলে দেখা গেছে, তেমনটি এখনও দেখা যাচ্ছে্। ভারত শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গা নিয়ে খুশি নয়, মেরুদন্ড ভাঙ্গার বাসনা রাখে প্রতিটি মুসলিম দেশ ও জনপদে। মেরুদন্ড ভাঙ্গার সে কাজ ত্বরান্বিত করতেই কাশ্মীরে ভারত ৭ লাখ সৈন্য মোতায়েন করেছে। অথচ কাশ্মীরের জনসংখ্যা এক কোটিরও কম।  তেমন একটি মেরুদন্ড ভাঙ্গার লক্ষ্য বাংলাদেশেও। সে লক্ষ্যে ভারতের বিপুল বিনিয়োগ বাংলাদেশে। সেটি যেমন ভারতসেবী গুন্ডা উৎপাদনে, তেমনি গ্রামে গ্রামে গুপ্তচর বাহিনী গড়ে তোলায়। ভারতসেবীদের ক্ষমতায় রাখা এজন্যই ভারতীয়দের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ। ভোটে জিতবে না সেটি নিশ্চিত হয়েই ভারত মধ্যরাতে ভোট-ডাকাতির মাধ্যমে হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার চক্রান্ত করে। এবং দমন প্রক্রিয়া চালু রেখেছে, এ ভোট-ডাকাত সরকারের বিরুদ্ধে যে কোন বিদ্রোহকে ব্যর্থ করায়।

ভারতীয়দের একাত্তরের যুদ্ধটি একাত্তরে শেষ হয়নি। একাত্তরে তাদের যুদ্ধটি ছিল পাকিস্তানকে খন্ডিত করার। পাকিস্তানকে খন্ডিত করার প্রয়োজনটি দেখা দিয়েছিল উপমহাদেশে মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করার প্রয়োজনে। একাজে তারা কলাবোরেটর রূপে বেছে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ ও ন্যাপসহ ইসলামী চেতনাশূণ্য সেক্যুলারিস্টদের। তবে পাকিস্তান খন্ডিত হলেও দুর্বল হয়নি, বরং পরিণত হয়েছে পারমানবিক শক্তিশালী দেশে। ফলে একাত্তরে যেরূপ রাশিয়ার সহায়তা নিয়ে বিজয়ী হয়েছিল, সেরূপ বিজয় এখন অসম্ভব। এর ফলে ভারতের সমস্যা বা ভয় কোনটাই কাটেনি। উপরুন্ত ভারতীয়দের মনে ভয় জেগেছে পূর্ব সীমান্তে আরেক শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের উদ্ভব নিয়ে। ভারত-অনুগত দাস শাসনের অবসান হলে তেমন একটি বাংলাদেশের উদ্ভব যে সম্ভব -তা নিয়ে ভারত নিজের বিশ্বাসটিও প্রবল। তখন যুদ্ধ দেখা দিবে ভারতে পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি প্রদেশে। এ কারণেই ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজী হলো বাংলাদেশের বুকে যারা ভারতের গোলামী নিয়ে বাঁচতে চায় তাদের সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা। এবং যারা মুসলিম পরিচিতির ধারক তাদের নির্মূল করা। তেমন একটি লক্ষ্যে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যেতেও রাজি।   

বাংলাদেশের মাটিতে চলমান ভারতীয় যুদ্ধের আলামতগুলি প্রচুর। সেটি চলছে গুম-খুনের রাজনীতির নামে। বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কথা বললে কেউ ক্ষিপ্ত হয়না। লাঠি হাতে কেউ ধেয়েও আসে না। কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললে লাঠি হাতে মারতে তাড়া করে ছাত্রলীগের গুন্ডাগণ। এবং পিটিয়ে হত্যাও করে। ভারতের বিরুদ্ধে ফেস বুকে বক্তব্য দেয়ায় বুয়েটের আবরার ফাহাদ এদের হাতেই নৃশংস ভাবে লাশ হলো। একই কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এরা পিটিয়ে মরণাপন্ন করেছে ভিপি নুরুল হক সহ প্রায় তিরিশজনকে। অনেকে হয়েছে পঙ্গুত্বের শিকার।

 

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ভারতসেবী চেতনা

ভারতীয়দের একাত্তরের যুদ্ধের স্ট্রাটেজীর সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলমান যুদ্ধটির ধারাবাহিকতা যে কতটা গভীর সেটি বুঝা যায়, ভারতবিরোধীদের উপর সরাসরি হামলাগুলি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নামের সংগঠন থেকে। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ক্যাডারদের কাজ হয়েছে যারাই ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলছে তাদের উপর হামলা করা। তাদের কথা, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন কথা বলা যাবে না। কথা হলো, ভারতের বিরুদ্ধে নানা দেশে এবং জাতিসংঘে কথা বলা হচ্ছে, অতএব বাংলাদেশে যাবে না কেন? ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলা দুষণীয় হলে তারা কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কথা বলে? ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদার এ গুন্ডা সংগঠনটি জনবল পাচ্ছে ছাত্রলীগ থেকে। ভারতের ন্যায় ভারতসেবী হাসিনা সরকারের কাজ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের এ দাস-যোদ্ধাদের প্রটেকশন দেয়া। ফলে তাদের হাতে সাধারণ ছাত্রগণ গুরুতর আহত হয়ে ইনটেনসিভ কেয়ারে ঢুকলেও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কেস নেয়না।

একাত্তরে ভারত ও ভারতসেবী আওয়ামী বাকশালীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি ছিল –সেটি বুঝার মোক্ষম সময় মূলতঃ এখন। মুজিব স্বাধীনতাও চায়নি, গণতন্ত্রও চায়নি। স্বাধীনতা চাইলে কি ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষর করতো? গণতন্ত্রও চায়নি। গণতন্ত্র চাইলে কি দেশের সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতো? নিষিদ্ধ করতো কি সকল বিরোধী দলীয় পত্র-পত্রিকা? মুজিবের ছিল একটি মাত্র এজেন্ডা। সেটি হলো যে কোন মূল্যে গদিতে বসা। সে লক্ষ্যে সে যেমন পাকিস্তান ভাঙ্গতে দু’পায়ে খাড়া ছিল, তেমনি প্রস্তুত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিক্রি করাতেও। সে অভিন্ন এজেন্ডাটি নিয়ে কাজ করছে হাসিনাও। আর এরূপ ক্ষমতালোভী দেশ বিক্রেতাদের দাস রূপে পেলে ভারত তাকে দিয়ে ইচ্ছামত কাজ করিয়ে নিবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? তাই মুজিবকে দিয়ে যেমন ২৫ সালা দাসচুক্তি, পদ্মার পানি ও বেরুবাড়ি আদায় করে নিয়েছে, তেমনি হাসিনার মাধ্যেমে নিয়েছে করিডোর, তিস্তা ও ফেনি নদীর পানি, বাংলাদেশের বন্দরে ভারতীয় জাহাজের প্রবেশাধীকার এবং আরো অনেক কিছু। ক্ষমতালিপ্সুদের ক্ষমতায় যাওয়াতে এভাবে দেশের ভয়ানক স্বার্থহানি ঘটে।

ভারত ও ভারতসেবী আওয়ামী বাকশালীদের চেহারাটি একাত্তরেও সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু সেদিন অনেকের চোখই অন্ধ ছিল পাকিস্তানের প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণার কারণে।  আকাশে মেঘ জমলে সূর্যও আড়াল হয়ে যায়; তেমনি মনে বিদ্বেষ ও ঘৃণা জমলে সত্যকে দেখার সামর্থ্যও বিলুপ্ত হয়। একাত্তরে ভারত ও ভারতসেবীদের কুৎসিত চেহারাটি এজন্যই অনেকে দেখতে পায়নি। এখন তো বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তান নাই। ফলে সবাই দেখতে পাচ্ছে ভারত ও ভারতসেবী আওয়ামী বাকশালীদের প্রকৃত চেহারাটি। তাই তাদের প্রতি ঘৃণাটি শুধু একাত্তরের রাজাকারদের বিষয় নয়, সেটি পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় সকল মানুষের নিজস্ব উপলব্ধি।  

ফলে ভারতসেবী বাকশালীদের মিথ্যাচার সরিয়ে একাত্তরের সত্য ঘটনাগুলি জানার এখনই উপযুক্ত সময়।  প্রকৃত বীর, আর কারা ভারতসেবী গাদ্দার -একাত্তরের ইতিহাসের মাঝে রয়েছে তার প্রামাণিক দলিল।  সে দলিল যে বিষয়টি সুস্পষ্ট তা হলো, আগ্রাসী ভারতের হামলা থেকে স্বাধীনতা বাঁচানোর চেতনাটি কখনোই বাকশালী ভোট-ডাকাত ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের গুন্ডাদের চেতনা নয়। বরং সেটি হলো একাত্তরের রাজাকারদের চেতনা -যারা নিজেদের রক্ত দিয়ে ভারতীয় বাহিনী ও ভারতের অর্থে পালিত সেবাদাসদের বিশাল আগ্রাসন রুখতে জিহাদে নেমেছিল।  বহু হাজার রাজাকার সে ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাঁচতে শহীদও হয়েছিল। ০১/০১/২০২০  

 




দেশ ও মানুষ নিয়ে ভাবনা-৮

১.
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কিছু বললে কেউ ক্ষিপ্ত হয় না, পেটাতেও নামে না। কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে কিছু বললে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ধেয়ে আসে কেন? এটি কি এজন্য নয় যে, তারা ভারতের দাস এবং কাজ করছে ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদার রূপে?

২.
ভারতে অতি অসভ্যদের শাসন চলছে। অসভ্যদের শাসনে আইনের শাসন থাকে না; থাকে গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের রাজনীতি। ভারতে তাই মুসলিমদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও নাগরিকত্বহীন করে বহিষ্কারের চেষ্টা হচ্ছে। অসভ্যদের শাসন চলছে বাংলাদেশেও। তাই ভারতে অসভ্য শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সরকার কিছুই বলছে না। যারাই প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামছে তাদের বিরুদ্ধে হামলা হচ্ছে। নিজেদের যারা সভ্য রূপে দাবী করে তাদের এখন আওয়াজ তোলার সময়।

৩.
মশামাছি কখনোই ফুলের উপর বসেনা, আবর্জনা খুঁজে। তেমনি দুর্বৃত্তরা রাজনীতির অঙ্গণে খুঁজে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের দল। বাংলাদেশে দুর্বৃত্তদের সংখ্যাটি বিশাল। তাই শেখ হাসিনার ভোট-ডাকাত সরকারের লোকবলের অভাব হচ্ছে না।

৪.
মিথ্যা বলা ও মিথ্যা নিয়ে বাঁচাটি কবিরা গুনাহ। বাঙালীর জীবনে বড় মিথ্যাটি হলো ১৯৭১’য়ে ৩০ লাখের মৃত্যু। এ গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য চাই সঠিক তালিকা। কিন্তু যাদের রাজনীতি মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত তাদের মূল এজেন্ডা হলো মিথ্যাকে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ মিথ্যা না বাঁচলে তাদের রাজনীতি বাঁচে না। এরাই জনগণকে বাধ্য করে মিথ্যা বলার কবিরা গুনাহতে। এরূপ কবিরা গুনাহর রাজনীতি বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে দেশে রাজাকারের তালিকা ও মুক্তিযুদ্ধাদের তালিকা হলেও একাত্তরে কতজন নিহত হলো -সে তালিকাটি বানানো হচ্ছে না।

শেখ হাসিনার লক্ষ্য হলো, পিতার তিরিশ লাখের মিথ্যাকে যে কোন মূল্যে বাঁচিয়ে রাখা। শেখ হাসিনা জানে, একাত্তরে কতজন মারা গেছে সে তালিকাটি গ্রামে গ্রামে গিয়ে বানানো হলে প্রমাণিত হতো, তার পিতা কত বড় মিথ্যাবাদি ছিল সেটি। তখন শেখ মুজিব ইতিহাসে যুগ যুগ বেঁচে থাকতো বিশাল মাপের মিথ্যাবাদি রূপে। জাতিও জানতে পারতো তাদের তথাকথিত বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গপিতা কতবড় মিথ্যুক ছিল। শেখ হাসিনা এজন্যই তেমন একটি গণনা চায় না।

৫.
সাহাবায়ে কেরামদের জান-মালের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটি ছিল বিশাল মুসলিম রাষ্ট্র্রের প্রতিষ্ঠায়; মসজিদ-মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠায় নয়। অথচ আজকের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটি হচ্ছে মুসলিম রাষ্ট্রকে ক্ষুদ্রতর করার কবিরা গুনাহতে। ১৯৭১’য়ে তেমন একটি কবিরা গুনাহতে বিশাল বিনিয়োগ ছিল বাঙালী মুসলিমদের। এবং সেটি ভারতীয় কাফেরদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে। বাঙালীদের সে বিনিয়োগে উপমহাদেশের মুসলিমগণ যেমন দুর্বল ও নিরাপত্তাহীন হয়েছে, তেমনি শক্তি বেড়েছে ভারতের। একাত্তরে যারা ভারতকে বিজয়ী করতে লড়েছিল এখন তাদেরই অনেকে লড়ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের স্বার্থকে বাঁচিয়ে রাখায়। সেটি করছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নামে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে তেমন একটি কবিরা গুনাহতে মত্ত দেখা গেছে আরবদের। তাতে আরব ভূমি ২২ টুকরোয় বিভক্ত হয়েছে এবং তাতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসরাইল। সে পাপের কারণেই ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, ফিলিস্তিন ইতিমধ্যে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। বিভক্তিতে আযাব যে অনিবার্য -সেটি মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্ট ভাবে শুনিয়েছেন। মুসলিমগণ বিভ্ক্ত হয়ে এখন সেটিই প্রমাণ করছে।  

৬.
রাজাকারদের ইতিহাস হলো তারা কখনোই ভারতের দালালী করেনি। ভারতের দালালী কখনোই তাদের ধাতে সয়না। তাই ভারতের দালালদের রাজাকার বলাটি একাত্তরের ইতিহাস নিয়ে মূর্খতা। তেমন এক মুর্খতা হলো যারা ভারতের বিজয় বাড়াতে একাত্তরে যুদ্ধ করেছে সে ভারতসেবী গোলামদের রাজাকার বলা। অথচ বাংলাদেশে সে মুর্খতাটি প্রকট ভাবে হচ্ছে। এমনকি জামায়াত শিবিরের পক্ষ থেকেও হচ্ছে।

৭.
বাংলাদেশে এখন ভারতের প্রতি অনুগত দাসদের সরকার। তাই ভারতের বিরুদ্ধে কিছু বললে এ দাসেরা মারতে ধেয়ে আসে। এ দাসেরাই আবরারকে হত্যা করেছে এবং ভিপি নূরুল হকসহ অনেককে আহত করেছে।

৮.
পবিত্র কোর’আন জান্নাতের পথ দেখায়। তাই যারা কোর’আনের জ্ঞান থেকে দূরে থাকে তারা দূরে থাকে জান্নাতের পথ থেকে। কোর’আনের জ্ঞানহীনরা চলে জাহান্নামের পথে।

৯.
কে কতটা মুসলিম রূপে বেড়ে উঠলো -মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে সে বিষয়টির বিচার হবে। তার ভিত্তিতে জান্নাত বা জাহান্নাম মিলবে।  কে কতটা বাঙালী হলো সেদিন সেটির কোন গুরুত্বই থাকবে না।

১০.
সেক্যুলার মুসলিমদের মূল আগ্রহটি ভাষা ভিত্তিক পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠায়। তাই সেক্যুলার বাঙালী মুসলিমদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে কোন গর্ব নাই; তাদের গর্বটি বাঙালী রূপে বেড়ে উঠায়। অথচ আল্লাহর দরবারে সে পরিচয়ের কোন মূল্যই নাই। ঈমানের দায়ভার তো মুসলিম রূপে বেড়ে উঠায়।

১১.
বিভক্তি আযাব আনে। এবং একতা বিজয় ও নিয়ামত আনে।  মুসলিমদের সংখ্যা ও সম্পদ যতই বৃদ্ধি পাক না কেন -তা দিয়ে আল্লাহর প্রতিশ্রুত আযাব, অপমান ও পরাজয় থেকে মুক্তি মিলবে না। অথচ যখন একতা ছিল তখন দরিদ্র মুসলিমও কম জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

১২.
“যে ব্যক্তির জীবনে পর পর ২টি দিন আসলো অথচ তার জ্ঞানের ভান্ডারে কোন নতুন জ্ঞান যোগ হলো না তার জন্য বিপর্যয়।”- হাদীস।

১৩.
ডাকাতদের গর্ব তাদের সর্দারকে নিয়ে। কারণ সে ডাকাতির নতুন নতুন পথ দেখায়। আওয়ামী চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের গর্বও শেখ হাসিনাকে নিয়ে। আওয়ামী লীগের সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষণে তো সেটিই ফুটে উঠলো।

১৪.
নেক কাজে সফলতা আসে আল্লাহতায়ালার রহমতের ফলে। তাই সফলতার জন্য ছওয়াব নাই। ছওয়াব জুটে শুধু নেক নিয়েত, মেধা, মেহনত, অর্থ, সময় তথা নিজ সামর্থ্যের বিনিয়োগে।




বাংলাদেশে ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারদের সন্ত্রাস এবং স্বাধীনতার সংকট

ভিয়েতনামে যখন মার্কিন বাহিনীর আগ্রাসন ও গণহত্যা চলে তখন তার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় প্রতিটি বড় বড় শহরে বহু প্রতিবাদ সভা ও মিছিল হয়েছে। অসংখ্য সভা ও মিছিল হয়েছে যখন সোভিয়েত রাশিয়ার হাতে আফগানিস্তান অধিকৃত হয়। ইরাকের উপর যখন মার্কিন হামলা হয় তখনও বাংলাদেশে বহু  প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল হয়েছে। সেরূপ মিছিল-সমাবেশ সমগ্র বিশ্ব ব্যপী হয়েছে। ইরাকের বিরুদ্ধে হামলার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় জনসভাটি হয়েছে লন্ডনে। হাইড পার্কের সে সমাবেশে বিশ লাখের বেশী নরনারী জমায়েত হয়েছিল। সচেতন মানুষেরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে এভাবেই প্রতিবাদ মুখর হয়।

যুদ্ধ-জুলুম-নির্যাতনে বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিবাদ না থাকাটাই মানবতার মৃত্যু। তখন মানব দেহ বেড়ে উঠে নিরেট পশুত্ব নিয়ে। সামনে কাউকে জবাই হতে দেখেও গরু-ছাগল নীরবে ঘাস খায়। এতেই পশুত্বের পরিচয়। কিন্তু হৃদয়ে মানবতা নিয়ে যারা বাঁচে তারা সেটি পারে না। জুলুমের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা সেটি কোন সীমা-সরহাদ মানে না। এ কারণেই কোন গৃহে কেউ খুন বা ধর্ষিতা হলে -সেটি আর সে গৃহের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। সে জুলুম রুখতে বিবেকবান মানুষ মাত্রই আওয়াজ তুলে এবং প্রয়জনে অস্ত্র হাতে ছুটে আসে। প্রশ্ন হলো, ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও শেখ হাসিনার মাঝে সে মানবিক রূপটি কই? তারা তো ভারতের জালেম শাসকের পক্ষ নিয়েছে।

তাছাড়া মানুষ হওয়ার সাথে সাথে যারা মুসলিম পরিচয় নিয়ে বাঁচে তাদের কিছু বাড়তি দায়-দায়িত্বও থাকে। সে দায়িত্ব নিয়ে বাঁচার মধ্যেই প্রকৃত ঈমানদারী। তাই বিশ্বের কোন এক প্রান্তে যদি কোন মুসলিম ধর্ষিতা, আহত, নিহত বা অত্যাচারিত হয় এবং তা নিয়ে যদি কোন ব্যক্তির হৃদয়ে বেদনা না জাগে -তবে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি আদৌ মুসলিম নয়। তার দেহে প্রাণ থাকতে পারে, তবে সে প্রাণে যে বিন্দুমাত্র ঈমান নাই –তা নিয়ে কোন সন্দেহ নাই।  বেদনার সে জায়গাটি হলো ঈমান। এমন বেদনাশূণ্য ব্যক্তিটি বাঙালী হতে পারে, হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টানও হতে পারে, কিন্তু সে কখনোই মুসলিম হতে পারে না। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ তাই বলকান যুদ্ধকালীন সময়ে লিখেছিলেন, “যদি কোন তুর্কী সৈনিকের পা গুলিবিদ্ধ হয় আর সে গুলির আঘাতের বেদনা তুমি যদি হৃদয়ে অনুভব না করো -তবে খোদার কসম তুমি মুসলিম নও।” কারণ, মুসলিম হওয়ার শর্তই হলো অন্য মুসলিম ভাইয়ের বেদনায় পরম ব্যাথীত হওয়া এবং সে বেদনার প্রতিকারে কিছু করার ভাবনা নিয়ে বাঁচা।  অধিকৃত আফগান মুসলিমদের সে বেদনার উপশমে তাই হাজার হাজার মুজাহিদ বিশ্বের নানা কোণ থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আফগানিস্তানে ছুটে এসেছিলেন।

মুসলিম মাত্রই তাই ঢাকার রাস্তায় ভারতে মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাবে সেটিই তো স্বাভাবিক। মুসলিমদের গৌরব কালে এরূপ ঘটনা ঘটলে শুধু প্রতিবাদ নয়, জালেম শক্তির বিরুদ্ধে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধও শুরু হত। মুসলিমের জীবনের মিশন কি স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন এবং মসজিদ-মাদ্রসা নির্মাণ? মুল মিশন তো অন্যায় ও জুলুমের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। ইসলামের যে শান্তির ধর্ম –তা তো এ ভাবে দুর্বৃত্তদের নির্মূলের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়। প্রকৃত ঈমানদারগণ এমন পবিত্র মিশনে নিজেদের জান-মাল তথা সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগ করে। নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের ৭০% ভাগের বেশী এ কাজে শহীদ হয়েছেন। মানব ইতিহাসে অন্য কোন ধর্ম বা জাতির লোকেরা সেটি করেনি। বেঈমানদের বিনিয়োগটি হয় নিছক নিজের গোত্র, ভাষা, বর্ণ, দল বা জাতীয়তার গৌরব বাড়াতে। সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় তাদের কোন গরজ থাকে না। তারা নিজেরাই বরং দুর্বৃত্ত স্বৈর-শাসকে পরিণত হয় –যেমনটি শেখ মুজিবের ক্ষেত্রে হয়েছে। দুর্বৃত্তদের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় প্রকৃত মুসলিমদের সে বিশাল কোরবানীর কারণেই সুরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে সমগ্র মানব সৃষ্টির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ রূপে ভূষিত করেছেন। অথচ শেখ হাসিনা ও তার অবৈধ সরকারের কাজ হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিমদের ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের সে অর্পিত কোর’আনী মিশন থেকে দূরে রাখা। এ মিশন রুখতে শেখ হাসিনা নিজে এবং তার দলের নেতা-কর্মীগণ ভারতের জালেম সরকারের পক্ষে সন্ত্রাসী লাঠিয়ালে পরিণত হয়েছে। সে লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সফলতাটি যে কতটা বিশাল তারই প্রমাণ, ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে বুয়েটে আবরার ফাহাদের হত্যা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিপি নূরের উপর হামলা। তাদের উভয়ের অপরাধ, তারা মুখ খুলেছিল ভারতীয় অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে।      

ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে শুধু যে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন হচ্ছে তা নয়। ষড়যন্ত্র হচ্ছে তাদের নাগরিকত্ব হরণের। চেষ্টা হচ্ছে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিতদেরকে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারি রূপে আখ্যায়ীত করা। এবং বাঙালী অনুপ্রবেশকারির লেবেল লাগিয়ে তাদেরকে ভারত থেকে বাংলাদেশে “পুশ ইন” করা। এ ষড়যন্ত্রের রূপায়নে ইতিমধ্যেই আসামে ১৯ লাখ বাসিন্দাকে নাগরিকত্বহীন করা হয়েছে। যাদেরকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তাদের মধ্যে ৭ লাখ মুসলিম। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে্, তারা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী। এভাবে ভারত সরকার ভারতীয় মুসলিমদের সাথে বাংলাদেশকেও জড়িয়ে ফেলেছে। দিল্লিতে সরকারি ভাবে এ কথা জোরেশোরে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে এবং হিন্দুগণ প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। ভারতের লোক সভায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সেরূপ একটি গুরুতর অভিযোগ এনেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। তাই বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয় কি করে? প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মানুষ এরূপ মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে নীরবই বা থাকে কী করে? অথচ বাংলাদেশের সরকার শুধু নীরবই থাকেনি, অন্যরা ভারতীয় মিথ্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে সরব হোক, সমাবেশ ও মিছিল করুক -সেটিও হাসিনার অবৈধ সরকার অসম্ভব করেছে। সেগুলি বাধা দিতে পেশী শক্তি নিয়ে ময়দানে নেমেছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীগণ। তাদের হাতে  আহত হয়েই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভিপি নূর এবং আরো অনেকে। পুলিশ হামলাকারিদের গ্রেফতার না করে প্রমাণ করলো সরকারেরও সম্মতি হয়েছে এরূপ সন্ত্রাসী হামালায়।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে মিটিং-মিছিল ভারতে সম্ভব হলেও সেটি বাংলাদেশে অসম্ভব করে রেখেছে শেখ হাসিনা ও তার অবৈধ সরকার। এভাবে শেখ হাসিনা এবং তাঁর সাথীগণ প্রমাণ করলো ভারতীয়দের চেয়েও তারা অধীক ভারতীয়। ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মীগণ আবির্ভুত হয়েছে ভারতীয় লাঠিয়াল বাহিনীর ঠ্যাঙ্গারে রূপে। ভিপি নূর ও তাঁর সাথীদের উপর হামলাকারীদের অভিযোগ ভিপি নূর ভারতে অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে রাজনীতি করছে। সে অভিযোগের ভিত্তিতে হুশিয়ারি দিয়েছে, তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকতে দিবে না। এবং ঢুকার চেষ্টা হওয়াতে তাঁর উপর হামলাও হচ্ছে।

শেখ হাসিনার অবৈধ সরকারের ভারতসেবী আচরণের প্রমাণ বহু। বুকার প্রাইজ বিজয়ী ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতি রায় ভারতের নানা শহরে ভারত সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করেন। তিনি ঢাকাতেও এসেছিলেন। তাঁর আগমন উপলক্ষে ডক্টর শহীদুল আলম ঢাকার একটি সেমিনার কক্ষে সুধি সমাবেশর আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু সরকার সেটি করতে দেয়নি। কারণ অরুন্ধতি রায়ের খ্যাতি হলো, ভারত সরকারের জুলুমের বিরুদ্ধে অতি নির্ভয়ে হক কথা বলায়। তিনি কথা বলেন কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর অধিকৃতি ও জুলুমের বিরুদ্ধেও। কিন্তু হাসিনার অবৈধ সরকার চায়নি বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের ভারতীয় নীতির কোনরূপ নিন্দা হোক। এখানে কাজ করেছে শেখ হাসিনার ভারতপ্রীতিই শুধু নয়, ভারতভীতিও। 

গণতন্ত্রবিরোধী এমন নিষ্ঠুর আচরণ একমাত্র অবৈধ সরকারই করতে পারে। কারণ, অবৈধ সরকার মাত্রই জানে, জনগণের ভোট নিয়ে তারা ক্ষমতায় আসেনি। ফলে তাদের আচরণ যত নিষ্ঠুরই হোক, সে জন্য তারা জনগণের কাছে জবাবদেহীতে বাধ্য নয়। তাদের দায়বদ্ধতা ষোল আনা কেবল প্রভুদের প্রতি। হাসিনার ক্ষেত্রে সে প্রভু হলো ভারত সরকার। কারণ, ভারতীয় গোয়েন্দাদের সহযোগিতা নিয়েই শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের রাতে ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় বসেছে। আন্তর্জাতিক মহলে এরূপ একটি অবৈধ সরকারকে গ্রহণযোগ্য করতেও নানা দেশের রাজধানীতে কাজ করছে ভারতীয় কূটনৈতীক মহল। ফলে ভারতের প্রতি দায় পরিশোধ করতেই শেখ হাসিনা মাঠে নামিয়েছে তার লাঠিয়াল বাহিনীকে। ভিপি নূর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের দ্বারা নির্বাচিত হলে কী হবে ক্যাম্পাসে প্রবেশে তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা লাগিয়েছে। একাত্তরে ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল নির্বাচনী বিজয়ের পরও মুজিবের হাতে ক্ষমতা দেয়া হয়নি। অথচ শেখ হাসিনা একই আচরণ করছে ভিপি নূরের বিরুদ্ধে।

যারা ভিপি নূরের মিছিল ও মিটিংয়ে বাধা দিচ্ছে তারা সেটি করছে “মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ”য়ের ব্যানারে। প্রশ্ন হলো, ভারত-বিরোধী আওয়াজ স্তব্ধ করার লক্ষ্যে “মুক্তিযুদ্ধ”য়ের নাম বা চেতনা ব্যবহারের হেতু কী? হেতুটি বিশাল। লক্ষ্য এখানে ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশের জন্মে ভারতের অবদানকে স্মরণ করিয়ে দেয়া। তাদের কথা, বাংলাদেশের মাটিতে বসে ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলার অর্থ ভারতের প্রতি নিমক-হারামী। এটি গাদ্দারি। সেটি হতে দিতে তারা রাজী নয়।  “মুক্তিযুদ্ধ”য়ের চেতনাটি হলো ভারতের ভাত-মাছ, লবন-পানি খেয়ে তাদের অর্থ,অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মুসলিম শক্তিকে খর্ব করা এবং ভারত বিরোধীদের নির্মূলে ভারতকে সাথে নিয়ে যুদ্ধ করা। যুদ্ধ শেষে তাজুদ্দীনের ৭ দফা এবং মুজিবের ২৫ দফার গোলামী চুক্তি মেনে নিয়ে বসবাস করা।

বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিলুপ্তি ঘটেছে। একাত্তরের রাজাকারদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু যা হয়নি তা হলো ভারত-বিরোধী চেতনার বিলুপ্তি। বরং বিপুল ভাবে সেটি বেড়েছে। ভারতকে যারা একাত্তরে চিনতে ভূল করেছে, তারা এখন চিনছে। চিনতে সাহায্য করছে যেমন মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার তেমনি শেখ হাসিনার ভোট ডাকাতি ফ্যাসিবাদ। ভারতের ভয় দ্রুত বাড়ছে বর্ধিষ্ণু ভারত বিরোধীতার কারণে। তাই ভারত চায়, বাংলাদেশীদের মনে ভারতের একাত্তরের অবদানকে স্মরণ করিয়ে দেয়া। সেটি মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নামে। একাত্তরে যাদের ঘাড়ে অস্ত্র রেখে ভারত পাকিস্তান ভেঙ্গেছিল, এখনো তাদের ঘাড়ে অস্ত্র রেখেই ভারত-বিরোধীদের নির্মূল করতে চায়। চায়, একাত্তরেরর ন্যায় আরেকটি যুদ্ধ। সেটি করতেই প্রতিটি ভারত-বিরোধীই চিহ্নিত হচ্ছে রাজাকার রূপে। ফলে বিলুপ্তি ঘটছে না “মুক্তিযুদ্ধ” ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। সে চেতনা ও যুদ্ধ আছে বলেই সে চেতনাধারীদের নির্মম প্রহারে প্রাণ হারালো বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ। এবং গুরুতর ভাবে আহত হলো ভিপি নূর ও তাঁর সাথীরা।

বাংলাদেশীদের সামনে পথ মাত্র দুটি। এক). “মুক্তিযুদ্ধ” ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে শেখ হাসিনা ও তার গুন্ডাগণ ভারতসেবী যে দুর্বৃত্ত গোলামী শাসন প্রতিষ্ঠা দিয়েছে সেটি মাথা নত করে মেনে নেয়া। এটিই হলো শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও সিকিমের লেন্দুপ দর্জির পথ। এ পথটি হলো বাকশালী ফ্যাসিবাদ, গুম-খুন, ভোট ডাকাতি এবং রাস্তায় লাশ হওয়ার পথ। দুই). ভারতের গোলামী মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচার পথ। স্বাধীনতার এ পথে চলতে হলে ভারতসেবীদের কাছে রাজাকার রূপে চিহ্নিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ, একাত্তরের রাজাকারদের চেতনা নিয়ে অনেকের ভূল ধারণা থাকলেও সেরূপ ভূল ভারত ও ভারতসেবীরা করে না। রাজাকারদের চিনতে তারা কখনোই সংশয়ে পড়ে না। তাদের জানা রাজাকারের চেতনার মূল কথাটি হলো, ভারতের গোলামী মুক্ত হয়ে স্বাধীন মুসলিম শক্তি রূপে বাঁচার চেতনা। সে সাথে ভাষা ও ভূগোলের সীমানা ডিঙ্গিয়ে বিশ্ব-মুসলিমদের সাথে প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্বের চেতনা। সে চেতনার কারণেই ১৯৭১’য়ে বহু হাজার সাহসী যুবক পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল এবং ভারতসেবীদের পক্ষে বিশাল প্লাবন দেখেও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। কারণ, তারা বুঝেছিল ক্ষুদ্র ভূগোলে স্বাধীনতা বাঁচে না। সে জন্য বৃহৎ ভূগোল চাই। ১৯৪৭’য়ে তৎকালীন  বাঙালী মুসলিম নেতাগণ সেটি বুঝেছিল বলেই নিজ গরজে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানভূক্ত করেছিল।

ইসলামী ভাতৃত্বের চেতনার ধারকগণ একাত্তরে পরাজিত হলেও সে চেতনাটি মারা যায়নি, বরং প্রবলতর হচ্ছে ক্যাম্পাসে, রাজপথে ও সোসাল মিডিয়াতে। ভারতীয় মুসলিমগণ নির্যাতিত, ধর্ষিতা ও নিহত হলে ঢাকার রাস্তায় তাই আওয়াজ উঠে। ভারত ও ভারতসেবী হাসিনার কাছে ভারতবিরোধী সে আওয়াজটি অসহ্য। এরূপ প্রতিবাদি আওয়াজকে তারা রাজাকারের আওয়াজ মনে করে। এজন্যই আবরার ফাহাদের ন্যায় একজন নিরেট দেশপ্রেমিক মেধাবী ছাত্রকে ভারতসেবী অসভ্য স্বৈরশক্তির হাতে লাশ হতে হলো। এবং আহত হলো ভিপি নূর ও তাঁর সাথীরা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী ভারতসেবীদের শাসনে কি এটিই স্বাভাবিক নয়? ফলে এরূপ বর্বর দমনমূলক শাসন যেমন মুজিব আমলে দেখা গেছে, দেখা যাচ্ছে হাসিনার আমলেও। ২৫/১২/২০১৯ 




দেশ এবং সমাজ নিয়ে ভাবনা-৪

1.
স্বৈরাচারি শাসনামালে অতি নৃশংস অপরাধগুলো শুধু সরকারের অনুগত পুলিশ এবং গুন্ডাদের হাতে হয় না। বরং বড় বড় নৃশংস অপরাধগুলো ঘটে দাস চরিত্রের বিচারকদের হাতে।এবং সেটি বিচারের নামে। নিরপরাধ মানুষদেরও তখন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। স্বৈরাচার শাসকগণ তাই শুধু অনুগত পুলিশ বাহিনীই গড়ে তোলে না, গড়ে তো অনুগত বিচারক বাহিনীও।

2.
বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ যেন আওয়ামী লীগের ক্যাডার। এতকাল জয় বাংলা স্লোগান আওয়ামী  লীগ দলীয় মিটিং ও মিছিলে দেয়া হত। কে আওয়ামী লীগ, আর কে আওয়ামী লীগ নয় -সেটি চেনা যেত এ স্লোগান থেকে। এখন সকল সভায় সবার উপর জয় বাংলা বলাকে আদালত বাধ্যতামূলক করলো। এটি কি আদালতের কাজ?

3.
আদালতের মূল কাজ আইনের শাসন কায়েম করা। আইনের শাসন থাকলে কি মধ্যরাতের ভোট ডাকাতগণ ক্ষমতায় বসতে পারতো? বিচারে তাদের জেলে যেতে হতো।

4.
সুপ্রিম কোর্ট স্বৈরাচারের পক্ষে এবং জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি কোন দলের ছিল না, এটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সকল দলের দাবীর ভিত্তিতে। স্বৈরাচারের পক্ষ থেকে যাতে ভোট ডাকাতি না -সেটি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। জনগণের ভোটের উপর ডাকাতিকে সহজ করতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে আদালত বাতিল করেছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে এ রায়ের মধ্য দিয়ে ।    

5.
যে বিচারকদের ভোট ডাকাতদের আদালতে কাঠগড়ায় খাড়া করে বিচার করার যোগ্যতা নাই তারা এ অধীকার কোত্থেকে পায় যে ভাষণ কি বলে শুরু করতে হবে ও শেষ করতে হবে সে ছবক শোনায়!

6.
আওয়ামী লীগ ভারত সরকারের কাছে অতি প্রিয়। কারণ ভারতের ইচ্ছা তারা সব সময় পূরণ করে।১৯৭১’য়েও ভারতকে বিজয়ী করে খুশির বন্যা দিয়েছিল ও বিশ্বের মুসলিমদের চোখে পানি এনেছিল।

7.
একটি মুসলিম দেশ যদি কাফের শক্তির হামলায় পরাজিত হয় ও ভেঁঙ্গে যায় এবং তা নিয়ে যদি কেউ উৎসব করে -তবে বুঝতে হবে তার ঈমান নাই। টুপি-দাড়ি, নামায-রোযা ও হজ্ব-উমরাহ দিয়ে এ বেঈমানী ঢাকা যায় ন। এরাই ইসলামের শত্রু।

8.
বাংলাদেশের শিক্ষানীতির সবচেয়ে বড় সফলতাটি হলো, এটি অধিকাংশ ছাত্রদের ইসলামশুণ্য করতে পেরেছে এবং চোরডাকাত ও ভোটডাকাতদের গদিতে বসিয়ে সন্মান দিতে  শিখিয়েছে।

9.
একটি ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সফলতাটি বিশাল।চোর-ডাকাতগণ সবার ঘৃনার ভয়ে এতকাল মুখ লুকিয়ে থাকতো। এখন জনগণই ভয়ে হাসিনার ন্যায় এক ভোট ডাকাতকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে

10.
ঈমান ব্যাক্তির মনের দৃষ্টি বাড়ায়। দেহের চোখ মাত্র দুটি, কিন্তু মনের চোখ অসংখ্য। মনের চোখ দিয়ে আল্লাহর নেয়ামত যেমন দেখা যায়, তেমনি দুর্বৃত্তদেরও চেনা যায। মনের এ দৃষ্টিকে পবিত্র কোর’আনের ভাষায় নূর বা বাসিরাত বলা হয়। ঈমানদার তাই ভোট ডাকাতকে কখনোই জননী বা কাওমী জননী বলেনা।

11.
শেখ হাসিনার বড় অহংকার, উন্নতি দিয়ে দেশ ভরে দিয়েছে। সেটি হলে ভোট ডাকাতিতে নামেন কেন? মিছিল-মিটিংয়ের স্বাধীনতাই বা কেড়ে নেন কেন? ভোট ও মাঠে নামার অধীকার দিয়ে জনপ্রিয়তা যাচাই করেন না কেন?

12.
বাংলাদেশে ন্যায্য বিচার থাকলে ভোট ডাকাতির অপরাধে শেখ হাসিনা ও তার সাথীদের কঠোর সাজা হতো। কিন্তু সেটি না হয়ে আদালত পরিনত হয়েছে বিরোধীদের শাস্তি দেয়ার সরকারি হাতিয়ারে।

13.
জনগণের মূল্যবান সম্পদ হলো তার ভোট। অতি ঘৃণ্যতম ডাকাতি হলো সে ভোটের উপর ডাকাতি করা।সে ডাকাতিতে হাতেনাতে ধরা পড়েছে শেখ হাসিনা। অথচ সে ডাকাতের হুকুমই বাংলাদেশের মানুষকে মেনে চলতে হয়। কথা হলো, যারা ডাকাতদের হুকুম মেনে চলে তাদের কি আন্তর্জাতিক অংগনে ইজ্জত থাকে?

14.
শেখ মুজিবকে চিনতে যাদের এখনো বাঁকি, শেখ হাসিনার হাতে সে মুজিবী আদর্শের বাস্তবায়ন দেখে তাকে চেনা উচিত। বুঝতে হবে এরাই ছিল ১৯৭১’য়ের রত্ম যারা সে সময় বহু লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। এবং ডেকে এনেছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।

15.
আদালতে বিচার না করে পুলিশ এবং RAB’য়ের হাতে প্রতিটি হত্যাই হলো খুন। এখানে খুনি হলো দেশের ভোট-ডাকাত সরকার। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী মানুষ খুন হচ্ছে স্বৈরাচারি এ সরকারের হাতে। অথচ সে খুনের কোন বিচার হচ্ছে না।

16.
কোর’আন ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের প্রতিটি সমস্যায় পথ দেখায়। অথচ সমস্যায় পড়লে মুসলিমগণ পথ খোঁজে নিজেদের মুসলিম পরিচয় বাদ দিয়ে এবং কোর’আন-হাদীসের বাইরে থেকে। এটি হলো মহান আল্লাহতায়ালা ও নবীপাকের সাথে চরম বেঈমানী। এ বেঈমানী আযাব ডেকে আনে।

১৭.
কেউ কেউ বলে, জিহাদ হলো নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। সেটি বলে অস্ত্রের যুদ্ধ থেকে মুসলিমদের দূলে রাখার লক্ষ্যে। প্রশ্ন হলো,  নবীজীর দাঁত ভাঙ্গলো এবং শতকরা ৭০ জনের অধীক সাহাবা শহীদ হলেন কি নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে।

 




একাত্তরের বিতর্ক

একাত্তর সম্পর্কে শুরু থেকেই বিপরীত মতামত রয়েছে এবং সেটি ভবিষ্যতেও থাকবে। বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী শক্তি শুধু নিজেদের কথাই বলছে এবং তাদের বিরোধী মতের অনুসারিদের মুখ খুলতে দিচ্ছে না। এটি হলো তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস। অথচ এ নিয়ে খোলাখোলি আলোচনা হওয়া উচিত। যে কোন দেশে নানা বিষয়ে নানা লোকের ভিন্ন ভিন্ন মতামত থাকবে -সেটিই স্বাভাবিক। তবে কোনটি ঠিক এবং কোনটি সঠিক –সে বিচারটি হয় নানারূপ দর্শন ও চেতনার ভিত্তিতে। ফলে বিচারের রায়ও ভিন্ন হয়। যেমন, দুইজনের সম্মতিতে ব্যাভিচার হলে সেটি সেক্যুলার চেতনায় বা সেক্যুলার আইনে কোন অপারধই নয়। বাংলাদেশের সেক্যুলার আইনেও সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হয়না। সেক্যুলার চেতনায় সে ব্যাভিচার বরং প্রেম রূপে গণ্য হয়। বাংলাদেশের সেক্যুলার আইনে মদজুয়ার ন্যায় ব্যাভিচারের দোকান খোলাও কোন অপরাধ নয়।

তেমনি গোত্রবাদী ও জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার চেতনায় কোন মুসলিম দেশ ভাঙ্গার কাজটিও অপরাধ গণ্য হয় না। সেটি বরং দেশপ্রেম গণ্য হয়। অথচ বিচারের মানদন্ডটি কোরআন-হাদীস হলে ব্যাভিচার ও দেশ ভাঙ্গা উভয়ই হত্যাযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হয়। শাসক-শক্তি যদি অত্যাচারি, খুনি বা ধর্ষকও হয় তবুও সে জন্য দেশ ভাঙ্গা জায়েজ হয় না। এটিই শরিয়তের বিধান। কারণ শাসক যত জালেমই হোক সে শত শত বছর বাঁচে না। কিন্তু দেশকে দেশবাসীর জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাজার হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখতে হয়। নইলে বিপদ ঘনিয়ে আসে। দেশের এক গজ ভূগোল বাড়াতেও তো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়। সে দেশকে তাই কি খন্ডিত করা যায়? এমন কাজ তো বেওকুপদের।

খন্ডিত করা মানে তো দেশকে দুর্বল করা। সেটি তো হারাম। ঘরে শাপ ঢুকলে সে শাপ তাড়াতে হয়, সেজন্য ঘরে আগুন দেয়াটি গুরুতর অপরাধ। বিষয়টি প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ জানতো বলেই খোলাফায়ে রাশেদা, উমাইয়া ও আব্বাসী আমলে আরব, ইরানী, তুর্কী, কুর্দ, মুর ইত্যাদী নানা ভাষার মুসলিমগণ একত্রে বসবাস করেছে। ভাষার নামে তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশ গড়েনি। বিভক্তিকে তারা হারাম গণ্য করেছে। তবে আজ যেমন শহরে শহরে পতিতাপল্লী গড়ে দেহব্যবসা করাটি যেমন স্বীকৃতি পেয়েছে, তেমনি বৈধতা পেয়েছে মুসলিম দেশগুলিকে খন্ডিত করা। তাই আরবগণ ২২ টুকরায় বিভক্ত। আর এরূপ হারাম কাজে লিপ্ত হলে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত কঠোর আযাব আসবে -সেটিই তো স্বাভাবিক।

কোর’আন-হাদীস ভিত্তিক এমন একটি চেতনার কারণেই গুটিকয় ব্যতিক্রম ছাড়া একাত্তরের কোন ইসলামী দল, কোন আলেম, কোন পীর, মাদ্রাসার কোন ছা্ত্র ও শিক্ষক এবং ইসলামী কোন চিন্তাবিদ পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি। চেতনার দিক দিয়ে তারা সবাই ছিল রাজাকারের চেতনার অধিকারী। পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নিয়েছিল মূলতঃ ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য আওয়ামী লীগ, চীনপন্থি ও রুশপন্থি ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টি এবং হিন্দুগণ। এমন কি বিশ্বের কোন মুসলিম দেশও পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেনি। বরং পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়াতে মুসলিম বিশ্বের জনগণ সেদিন শোকাহত হয়েছে। পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেছে ভারত, রাশিয়া ও ইসরাইলের ন্যায় মুসলিমবিরোধী রাষ্ট্রগুলি। এবং আনন্দের বন্যা বয়েছে ভারতীয় কাফেরদের মনে। সে আনন্দ দেয়াতে ভারত আওয়ামী লীগকে তাই সব সময় মাথায় তুলে রেখেছে। অপর দিকে একাত্তরের যারা ভারতীয় প্রকল্পের কাছে মাথা নত করেনি তাদের নির্মূলের পথ বেছে নিয়েছে।

যারা কাফেরদের মনে আনন্দ বাড়ায়, মুসলিমদের শক্তিহানী করে এবং মুসলিমদের শোকাহত করে তাদেরকে কি ঈমানদার বলা যায়? নামায-রোযা, হজ্ব-উমরা মুনাফিকগণও পালন করে থাকে। কিন্তু বিশ্বমাঝে মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বশক্তি রূপে দেখার স্বপ্নটি হৃদয়ে নিয়ে বাঁচার সামর্থ্য তাদের থাকে না। বস্তুতঃ এরাই একাত্তরে ভারতের কোলে গিয়ে উঠেছিল।ভারতের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদেরকে বিজয়ী করতে যুদ্ধ করেছিল।এবং আজও বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রটি ভেঙ্গে যাওয়াকে তারা উৎসবের বিষয় রূপে গণ্য করে।

ব্যক্তির ঈমান দাড়ি-টুপিতে ধরা পড়ে না। এমনকি নামায-রোযাতেও নয়। নবীজীর পিছনে কয়েক শত মুনাফিকও নামায পড়েছে। রোযাও রেখেছে। তাদের মুনাফিকী ধরা পড়েছে রণাঙ্গনে এবং রাজনীতিতে। জিহাদের ময়দানে কোন মুনাফিককে নবীজী (সাঃ)র পাশে দেখা যায়নি। বরং তাদের কামনা ছিল, রণাঙ্গণে কাফেরগণ বিজয়ী হোক। বাঙালী কাপালিকদেরও অনেকে মুসলিম রূপে দাবী করে। কিন্তু একাত্তরের যুদ্ধে তাদের দেখা গেছে পৌত্তলিক কাফের শক্তির পাশে। এবং মনেপ্রাণে চেয়েছে কাফেরগণই বিজয়ী হোক। এদের কে কি ঈমানদার বলা যায়?

নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের মধ্য থেকে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। তারা কি মসজিদ-মাদ্রাসা গড়তে বা নামায-রোযা আদায়ে শহীদ হয়েছেন? তারা তো শহীদ হয়েছেন মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়ার প্রয়োজনে। আর শক্তিশালী হতে হলে তো দেশের ভূগোল বাড়াতে হয়। শুধু অর্থনৈতীক উন্নয়ন দিয়ে বিশ্বশক্তি হওয়া যায় না। তেমন একটি প্রয়োজনেই বাঙালী মুসলিমগণ ১৯৪৭ সালে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তান বানিয়েছিল। কিন্তু সেটি ইসলামের দুষমনদের ভাল লাগেনি। সে দেশটি ভাঙ্গতেই তারা দেশের ভীতরে ভারতীয় কাফের বাহিনীকে ডেকে আনে।

রাষ্ট্র শক্তিশালী না হওয়ার বিপদটি তো ভয়ানক। তখন আগ্রাসী শক্তির গোলাম হতে হয়। যেমন আজকের বাংলাদেশ। কিন্তু তা নিয়ে বাঙালী কাপালিকদের কি কোন ক্ষোভ আছে? বরং ভারতের দাস হওয়া নিয়েই তাদের বিপুল আনন্দ। বরং তাদের ক্ষোভ এ নিয়ে, বাঙালী মুসলিম খাজা নাজিমুদ্দীন, মুহাম্মদ আলী (বগুড়ার) ও সহরোওয়ার্দীর কেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলো? সে অপরাধে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকেই তাদের বাদ দিয়েছে। যেন বাঙালী মুসলিমের ইতিহাসের শুরু মুজিব থেকে। ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক বিলুপ্ত হওয়াতে এখন তা নিয়ে সারা বছর বাংলাদেশে উৎসব হয়।

ব্যাঙ ক্ষুদ্র গর্তের সন্ধান করে। মুজিব এবং তার অনুসারিগণও তেমনি ক্ষুদ্র বাংলাদেশের ভূগোল চেয়েছিল। আর ক্ষুদ্রতা যে অন্যের গোলামী আনবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। আর গোলামের জীবনে তো স্বাধীনতা থাকে না। স্বাধীনতা বিলুপ্ত হওয়ার সাথে বাঙালীর ভোটের অধীকারও তাই বিদায় নিয়েছে।

মুজিব জানতো বাংলার ধর্মভীরু সাধারণ মানুষ কখনোই পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করবে না। ফলে ১৯৭০য়ের নির্বাচনে কোনদিনও পাকিস্তান ভাঙ্গার কথা বলেনি। পাকিস্তান ভেঙ্গে পৃথক বাংলাদেশ সৃষ্টি নিয়ে রেফারেন্ডামের দাবীও করেনি। মুজিব ভোট নিয়েছে পাকিস্তানকে অখন্ড রেখে ৬ দফা দাবী আদায়ের কথা বলে। নির্বাচনে ভোট নেয়ার পর মুজিব আওয়াজ তোলে “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। দাবী তুলে, অখন্ড পাকিস্তানের নয়, স্রেফ পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে দিতে হবে। এবং সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে মুজিব তার সঙ্গিদের ভারতে যাওয়ার নসিহত করে।

ভাষা ও অঞ্চলের নামে দেশ স্বাধীন করায় মাঝে কল্যাণ থাকলে ভারত ভেঙ্গে ১২০ কোটি হিন্দুগণ বাংলাদেশের ন্যায় ২০টি স্বাধীন দেশ বানাতে পারতো। তাছাড়া দেশ ভাঙ্গা ইসলামে হারাম হলেও হিন্দু ধর্মে তো হারাম নয়। কিন্তু দেশ ভাঙ্গা যে আত্মঘাতি -সেটি ভারতীয় হিন্দুগণ ভাল করে বুঝে। তাই তারা সে পথে যায়নি। কিন্তু সে হুশ বাঙালী কাপালিকদের নাই। তাই তারা ক্ষুদ্র ভূগোল গড়া নিয়ে উৎসব করে।

তবে একাত্তরের সে জোয়ারের মাঝেও সব বাঙালীই যে বিবেক হারায়নি –সে প্রমাণও অনেক। তাই ১৯৭১য়ে মে মাসের মাঝামাঝিতে দৈনিক ইত্তেফাক পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধীতা করে সম্পাদকীয় লিখেছিল, “দেশ ভাঙ্গাতে বাহাদুরি নাই” এ শিরোনামে। ঢাকা ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক সেদিন পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছিল। সে আমলের পত্রিকাগুলোর দিকে তাকালে তাদের সে বক্তব্যগুলো নজরে পড়বে। তাদের কথার পিছনেও যুক্তি ছিল। অথচ আজ সে সত্য কথাগুলো লুকানো হচ্ছে। এবং সেটি ফ্যাসিবাদী শক্তি প্রয়োগ করে।

একাত্তর নিয়ে বাঙালী কাপালিকগণ যে আকাশ চুম্বি মিথ্যাচার রটিয়েছে সেটি বিলুপ্ত করতে না পারলে কি বাঙালী মুসলিমদের কি উন্নততর মানুষ রূপে বেড়ে উঠার সম্ভাবনা আছে? এবং সেটি করতে হলে তো একাত্তর নিয়ে সত্য কথাগুলো প্রবল ভাবে বলতেই হবে। নইলে গুম-খুন-ধর্ষণ-চুরি-ডাকাতি-সন্ত্রাসের প্লাবনে দেশ আজ যে ভাবে ভাসছে তা যে আরো তীব্রতর হবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

তাছাড়া সবচেয়ে বড় ইবাদত এবং সবচেয়ে বড় জিহাদ তো জালেমের সামনে সত্য কথা বলা। তাছাড়া কারো ভয়ে সত্য লুকানোটি শুধু কবিরা গুনাহই নয়, বরং শিরক। কারণ যে ব্যক্তি ঈমানদার -সে তো ভয় করবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাকে এবং অন্য কাউকে নয়। কিন্তু যে মানুষটি ভয়ে সত্য লুকায়, লুকানোর সে অপরাধটি করে অন্য কোন জালেম ব্যক্তি বা শক্তির ভয়ে। তাই সেটি শিরক। এবং যারা শিরক করে তাদের জন্য নিষিদ্ধ হলো জান্নাত –যা পবিত্র কোরআন ও হাদীসে বার বার বলা হয়েছে। ১০/১২/২০১৯

 




বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মূল রোগটি কোথায়?

মূল রোগটি দর্শনে

শিক্ষাব্যবস্থার মূল্যায়নে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি ছাত্র, শিক্ষক বা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানর সংখ্যা নয়। বছরে কত দিন বা কত ঘন্টা ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়া হয় -সেটিও নয়। পিএইচডি বা সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে কতজন বের হলো সেটিও মাপকাঠি নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতজন জ্ঞানবান ও চরিত্রবান মানুষ সৃষ্টি হলো, জাতির মেরুদন্ড কতটা মজবুত হলো, মানবিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক দিক দিয়ে জাতি কতটা সামনে এগুলো –সে বিষয়গুলি। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা বাড়লে নিছক ছাত্র, শিক্ষক ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি পাওয়াতে দেশের কল্যান বাড়ে না। শিক্ষালয়েই নির্মিত হয় দেশবাসীর চরিত্র এবং জাতির মেরুদন্ড। এখানে থেকেই জাতি পায় বেঁচে থাকার শক্তি। নির্মিত হয় জাতির মন, মনন ও সংস্কৃতি। নিছক ক্ষেতে-খামারে ও কল-কারখানায় উৎপাদন বাড়ালে জাতি বাঁচে না, সে লক্ষ্যে জ্ঞানদানের আয়োজনও বাড়াতে হয়। বিবেক বা আত্মার পুষ্টির জন্য এটি অপরিহার্য। নইলে দেহ নিয়ে বেঁচে থাকাটি সম্ভব হলেও অসম্ভব হয় বিবেক নিয়ে বাঁচাটি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিপুল ভাবে বেড়েছে। গ্রামে গ্রামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু থানা পর্যায়েই নয়, ইউনিয়নেও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বহু জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষাই সরকারি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত। অথচ আজ থেকে শত বছর আগে সমগ্র দেশে একখানি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। অধিকাংশ জেলায় ছিল না কলেজ। আজ বিপুল হারে বেড়েছে ছাত্র-শিক্ষকের সংখ্যাও। কিন্তু বেড়েছে কি সেগুলিও যা শিক্ষা-বিস্তারের সাথে সাথে বেড়ে উঠা উচিত? মজবুত হয়েছে কি জাতির মেরুদন্ড? বেড়েছে কি সততা ও নৈতিকতা? বেড়েছে কি স্বনির্ভরতা ও আবিস্কারের সামর্থ্য? বেড়েছে কি আত্মমর্যাদা? দূর্নীতির বিস্তারে বনজঙ্গলে বসবাসকারি বহু আদিবাসি থেকেও যে বাংলাদেশ যে নীচে নেমেছে -সেটি কি গোপন বিষয়? ৭০ বছর আগেও নির্বাচনে ভোট দেয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, কিন্তু আজ সে ভোট ডাকাতি হয়ে যায় আগের রাতেই। এসব ভোটডাকাত দুর্বৃত্তগণ যে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারি -তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে? অতএব এতো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে লাভ হলো কি?

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা অনেক। তবে বড় সমস্যা শিক্ষাখাতে অর্থাভাব নয়। বিদ্যালয় বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কমতিও নয়। বরং মূল সমস্যা এর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, দর্শন ও শিক্ষা-পদ্ধতিতে। যা শেখানো হয় ও যারা শেখায়, সমস্যা সেখানে। ১৪ শত বছর আগে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সভ্যতাটি যখন নির্মিত হয়েছিল তখন বাংলাদেশে আজ একটি জেলায় যত স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা আছে তার সিকি ভাগও ছিল না। যত বই-পুস্তক ও শিক্ষাসামগ্রী নিয়ে আজ বিদ্যাবিতরণের আয়োজন, সেটিও ছিল না।  অথচ সেদিন দারিদ্র্য ও অপ্রতুল অবকাঠামো নিয়ে মানবতায়-সমৃদ্ধ অতি বিস্ময়কর সভ্যতার নির্মান সম্ভব হলেও বাংলাদেশে আজ কেন তা হচ্ছে না। এটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। চিন্তাশীল মানুষের উচিত তা নিয়ে ভাবা এবং সঠিক উত্তর খুঁজে বের করা। আমাদের জাতীয় জীবনের এটি এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়। এবং এর সাথে জড়িত আমাদের বাঁচামরা। ট্রেনের গতি বা যাত্রীদের প্রতি সেবার মান বড় কথা নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো ট্রেনটি কোন দিকে যাচ্ছে সেটি। বাংলাদেশর শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি অসৎ উদ্দেশ্যে চালু করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকগণ। প্রণীত হয়েছিল, ঔপনিবেশিক শাসনের একনিষ্ঠ সেবাদাস তৈরীর কাজে। এবং সেটি তারা গোপনও রাখেনি। এ শিক্ষায় শিক্ষিতরা রক্তমাংশে ভারতীয় হলেও বৃটিশের বিশ্বস্ত দাস হওয়াকে তারা অতি সন্মানজনক ভাববে -সেটিই ছিল এর মূল লক্ষ্য। ব্রিটিশ শিক্ষামন্ত্রী লর্ড মেকলে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সেটিই সগর্বে ঘোষণা করেছিল। এ লক্ষ্যে তারা সফলও হয়েছিল। এমন গোলাম সৃষ্ঠির কাজে তারা যে শুধু সেক্যুলার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছিল তাই নয়, মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাই কলিকাতায় প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের প্রথম আলিয়া মাদ্রাসাটি আলেমদের প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং সেটি তাদেরই গড়া। ফলে পচনের শিকার হয়েছে উভয় পদ্ধতি।

 

শত্রুর প্রণীত শিক্ষানীতি ও শত্রু উৎপাদন

অথচ শিক্ষিত হওয়া মানেই চরিত্রবান ও বিবেকবান হওয়া। এবং সেটি না হওয়াটাই অশিক্ষা। ডিগ্রি দিয়ে সে অশিক্ষাকে কখনো ঢাকা যায় না। নিজ দেশের স্বাধীনতায় শিক্ষিতরা শ্রম দিবে, অর্থ দিবে, এমনকি প্রাণও দিবে –সেটিই তো কাঙ্খিত। এমন আত্মত্যাগে শিক্ষাব্যবস্থা দেশবাসীর সামর্থ্য জোগাবে এবং সততা ও আত্ম-ত্যাগকে দেশবাসীর আচারে পরিণত হবে – সেটিই তো কাঙ্খিত। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে সেটি হয়নি। কারণ, এ শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে ঔপনিবেশিক শত্রুর হাতে। এবং প্রণীত হয়েছে ইসলাম ও মুসলিমদের শত্রু উৎপাদনে। বহু স্বদেশী মুসলিমকে তারা হত্যাও করেছে। এ শিক্ষাব্যবস্থায় যারা শিক্ষিত হয়েছে তারা নিজেদেরকে ব্রিটিশের ‘মোস্ট-অবিডিয়েন্ট সার্ভেন্ট’ রূপে পরিচিতি দিতে কখনো লজ্জাবোধ করেনি। সাম্রাজ্যবাদী শাসনের পক্ষে তারা যে শুধু কলম ধরেছে বা অফিস আদালতে কাজ করেছে তাই নয়, দেশে-বিদেশে গুপ্তচরবৃত্তি করেছে এবং অস্ত্রও ধরেছে। এমনকি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালে নিরপরাধ মানবহত্যায় ইরাক, ফিলিস্তিন, আফ্রিকা, ইন্দোচীনসহ নানা দেশে গেছে। এবং সে খুনিদের দলে বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ও জাতীয় বীর জেনারেল আতাউল গণি ওসমানিকেও দেখা গেছে। এসবই ইতিহাসের অতি অপ্রিয় সত্য। সাম্রাজ্যবাদীদের দেওয়া মজুরি, পদবী ও উপঢৌকনকে এরা জীবনের  বড় অর্জন ভেবেছে।  ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের দিল্লি আগমনকে অভিনন্দন জানিয়ে কবিতা লিখেছেন এমন কি রবীন্দ্রনাথও। এই হলো ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষিতদের চরিত্র।

১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনমূক্ত হলেও পাকিস্তান বা পরবর্তীতে বাংলাদেশের মানুষ নিজ দেশে ও নিজ ধর্মে অঙ্গিকারহীন এসব বৃটিশ-সেবাদাসদের শাসন থেকে মুক্তি লাভ করেনি। ফলে কিছু রাস্তাঘাট, স্বুল-কলেজ ও শিল্প-করখানা নির্মিত হলেও শিক্ষার মূল লক্ষ্যে পরিবর্তন বা সংস্কার আসেনি। বার বার ভূগোল বা সরকার পরিবর্তন হলেও তাই পরিবর্তন আসেনি বাঁচবার লক্ষ্যে ও রূচীবোধে। বিদেশী স্বার্থের সেবক তৈরীর যে লক্ষ্যে এটি প্রণীত হয়েছিল এখনও সে কাজ অব্যাহত ভাবে চলছে। এদের ভিড়ে দেশপ্রেমের পরিচয় দেয়াটি বরং বিপদ ডেকে আনে। সম্প্রতি বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফুয়াদকে প্রাণ দিতে হলো তো এদের হাতেই। বিদেশী কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অঙ্গিকারে নিজ দেশ, নিজ ধর্ম ও নিজ ঐতিহ্য ছেড়ে এরা বিশ্বের যেকোন দেশে যেতে রাজি। বাংলাদেশে এজন্যই দেশপ্রেমিক নাগরিকের প্রচন্ড অভাব। অথচ এদেশের মাটিতে বিদেশীদের অভাব হয় না তাদের এনজিও বা গুপ্তচর সংস্থায় নিবেদিত-প্রাণ চর পেতে।

 

সামর্থ্য দেয় করুণা লাভে ও জান্নাতের যোগ্য হতে

কথা হলো, শিক্ষার উদ্দেশ্য কি? এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অথচ এর কোন সর্বজন-সম্মত উত্তর নেই। এ জগতে সবাই যেমন একই উদ্দেশ্যে বাঁচে না তেমনি একই উদ্দেশ্যে শিক্ষিতও হয় না। অনেকেই শিক্ষাকে বেশী বেশী জানার মাধ্যম মনে করেন। কেউ ভাবেন, শিক্ষার কাজ যুগোপযোগী নাগরিক গড়া। কেউ বলেন, এর লক্ষ্য ব্যক্তিত্বের বিকাশ। কারো মতে, এটি উপার্জন বৃদ্ধির মাধ্যম। শিক্ষা নিয়ে মানুষের এরূপ ভিন্ন ভিন্ন ভাবনার কারণ ভিন্ন ভিন্ন জীবনদর্শন। তাই শিক্ষা নিয়ে মুসলমানের ভাবনা অমুসলমানদের থেকে ভিন্নতর। কারণ, অমুসলিম যে উদ্দেশ্যে বাঁচে মুসলিম সে উদ্দেশ্যে বাঁচে না। পথ ভিন্ন হলে পাথেয়ও ভিন্ন হয়। ফলে মুসলিমের হালাল-হারামের বাছবিচার শুধু পানাহারের ক্ষেত্রে নয়। একই রূপ বাছবিচার হয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও। দেহের প্রয়োজনের ন্যায় মুসলমানের মনের প্রয়োজনও অমুসলমান থেকে ভিন্ন। মুসলিম জীবনে শিক্ষার মূল লক্ষ্য, বাঁচার মূল লক্ষ্যে সফলতা দেওয়া। এবং শিক্ষা সামর্থ্য সৃষ্টি করবে মহান আল্লাহর করুণা লাভে ও গড়ে তুলবে জান্নাতের যোগ্য রূপে। বস্তুতঃ মুসলিমের বাঁচার লক্ষ্য ও শিক্ষার লক্ষ্যটি বস্তুতঃ একে অপরের পরিপূরক। প্রশ্ন হলো, বাঁচার লক্ষ্য কি? এ প্রশ্নের উত্তর অমুসলমানের কাছে যাই হোক, মুসলমানের কাছে সেটিই যা পবিত্র কোরআনে বর্ণীত হয়েছে। এবং সেটি হলোঃ “আল্লাযী খালাকাল মাউতা ওয়াল হায়াতা লি ইয়াবলুয়াকুম আইয়োকুম আহসানা আমালা” অর্থঃ  তিনি (সেই মহান আল্লাহ) যিনি মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্ঠি করেছেন এজন্য যে তিনি পরীক্ষা করবেন তোমাদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে কে উত্তম”-(সুরা মূলক, আয়াত-২)। অর্থাৎ দুনিয়ার এ জীবন হলো পরীক্ষাকেন্দ্র। এবং পরীক্ষার শেষ ঘন্টাটি যখন তখন বেজে উঠতে পারে।

যেহেতু জীবনের এ পরীক্ষায় পাশের উপর নির্ভর করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতপ্রাপ্তী, ফলে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা মানবজীবনে দ্বিতীয়টি নেই। একই কারণে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ পরীক্ষায় পাশের প্রস্তুতি। কোন পরীক্ষাতেই জ্ঞান ছাড়া পাশ জুটে না। ফলে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ পরীক্ষাতে পাশের জন্য চাই উপযুক্ত শিক্ষা। ইসলামে জ্ঞানচর্চা এজন্যই ফরয। এবং সেটি হয়েছে ৫ ওয়াক্ত নামায এবং মাসব্যাপী রোযা ফরয হওয়ার ১১ বছর পূর্বে। বস্তুতঃ জীবনের মূল পরীক্ষায় পাশের সামর্থ্য বাড়ানো ছাড়া জ্ঞানার্জনের মহত্তর কোন লক্ষ্য নেই। তবে মাথা টানলে কান-নাক যেমন এমনিতেই আসে, তেমনি আখেরাতের পাশের সামর্থ্য বাড়লে, সামর্থ্য বাড়ে বিশ্ব মাঝে বিজয়েরও। সাহাবায়ে কেরাম সেটিই প্রমাণ করে গেছেন। তাই যে জ্ঞানচর্চায় জান্নাতপ্রাপ্তি ঘটে তাতে প্রতিষ্ঠা বাড়ে দুনিয়াতেও। এমন শিক্ষায় সামর্থ্য বাড়ে নেক আমলের। নেক আমলের বর্ণনা দিতে গিয়ে নবীপাক (সাঃ) বলেছেন, পথ থেকে একটি কাঁটা ফেলে দেওয়াও নেক আমল। অর্থাৎ ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ববাসীর জন্য যা কিছু কল্যানকর, এমন প্রতিটি কর্মই হলো নেক আমল। তাই শুধু পথের কাঁটাই নয়, সাহাবায়ে কেরাম অর্থ, শ্রম ও রক্তব্যয় করেছেন সমাজ ও রাষ্ট্রের বুক থেকে দুর্বৃত্ত শাসকের ন্যায় বিপদজনক কাঁটা সরাতে। ফলে অন্যসব কল্যাণকর কাজ-কর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে শুধু নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ও নানারূপ নফল ইবাদতে মগ্ন হওয়াটি নবীজীর সূন্নত নয়।

 

 

সামর্থ্য বাড়ায় নেক আমলের

জ্ঞানার্জন শুধু পথের কাঁটা ফেলাতে শেখায় না, গলার, চোখের বা রাষ্ট্রের বুক থেকে কাঁটা সরানেরা সামর্থ্য দেয়। জ্ঞানের বদৌলে ব্যক্তি পায় বিস্ময়কর সৃষ্টিশীলতা। এবং বিপুল ভাবে বাড়ায় নেক আমলের সামর্থ্য। ইসলামের জ্ঞানচর্চা তাই নিছক কিতাব নির্ভর নয়, বরং নেক-আমল-নির্ভর। কর্মজগতের সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগ ঘটায় জ্ঞানচর্চার। তাছাড়া যথার্থ জ্ঞানলাভ না হলে ধর্মকর্মও সঠিক হয় না। সম্ভব হয় না সিরাতুল মোস্তাকিমে চলাটিও। জ্ঞানের মাধ্যমেই বাড়ে কোটি কোটি মানুষকে অতি অল্প সময়ে আলোকিত করার সামর্থ্য। সামর্থ্য দেয় বিস্ময়কর বিশ্বলোককে দেখার। সেটি যেমন চোখের দৃষ্টিতে, তেমনি মনের দৃষ্টিতে। ইসলামে এটিই হলো মারেফত।ফলে এমন জ্ঞানবান মানুষ দেখতে পায় মহান আল্লাহর অসীম কুদরতকে। মহাশূণ্যে, সাগরের গভীরে, পত্র-পল্লবে তথা সর্বত্র দেখতে পায় মহান আল্লাহর আয়াতকে। ফলে ঈমানের ভূবনে জোয়ার আসে জ্ঞানবান মোমেনের জীবনে।  ঈমান বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিতে ফলন বাড়িয়ে সে জ্ঞানবান মানুষটি লাঘব করে ক্ষুদার্ত মানুষের যাতনা। যুদ্ধাস্ত্র বানিয়ে সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা দেয় ইসলামি রাষ্ট্রের এবং বিনাশ ঘটায় দূর্বৃত্ত শাসনের। এভাবেই জ্ঞানলাভ নানাভাবে বিপুল সমৃদ্ধি আনে নেক আমলে এবং সামর্থ্য দেয় পরীক্ষাপাশে। এরূপ সামর্থ্য লাগাতর বাড়াতে নবীজী (সাঃ) এমনকি সুদূর চীনে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন। নবীজী (সাঃ)র সে নির্দেশ অতি নিষ্ঠার সাথে পালন করেছিলেন সেকালের মুসলমানেরা। এজন্যই বিজ্ঞানচর্চাকে তারা দুনিয়াদার ভাবেননি, বরং উঁচু পর্যায়ের নেক-আমল ভেবে সে কাজে বিপুল অর্থ, শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ করেছিলেন। ফলে কয়েক শত বছরের মধ্যে বিশ্বের নানা ভাষা থেকে বিজ্ঞানের অসংখ্য পুস্তক আরবীতে তর্জমা করেছিলেন এবং গড়ে তুলেছিলেন বিশাল জ্ঞান-ভান্ডার। ফলে স্বল্প সময়ে সম্ভব হয়েছিল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মান এবং বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠালাভ।

তাই বিজ্ঞানচর্চাকে দুনিয়াদারি বলা শুধু মুর্খতাই নয়, আত্মঘাতিও। এমন মুর্খতায় যে শুধু নেক আমলের কমতি দেখা দেয় তাই নয়, মুসলিম উম্মাহ ভয়ানক ভাবে শক্তিহীন হয়। ফলে পরাজিত এবং অপমানিতও হয়। আর এরূপ আত্মঘাতি কর্ম সমাজে ব্যাপ্তি পেলে বহিঃশক্তির প্রয়োজন পড়ে কি? মুসলমানদের আজকের পরাজয়ের মূল কারণ, শিক্ষার গুরুত্ব ও নেক-আমল নিয়ে বিভ্রান্তি। এ বিভ্রান্তির কারণে বিজ্ঞান চর্চাকে দুনিয়াদারি বলে সেটিকে মাদ্রাসার অভ্যন্তরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। দেশে হাজার হাজার মাদ্রাসা ও তার শিক্ষকগণ আজও বেঁচে আছে এ বিশ্বাস নিয়ে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এটি অতিশয় আত্মঘাতি দিক। আধুনিক জ্ঞানের সন্ধানে আলেমগণ সুদূর চীনে যাওয়া দূরে থাক নিজ দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও খোঁজ নেয়নি। তারা উদ্যোগী হয়নি সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঁটা সরাতে। আবর্জনা সরানো হয়নি দেশের রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসন থেকে। এমনকি নানারূপ দূর্নীতির আবর্জনা জমেছে খোদ মাদ্রাসাগুলির অভ্যন্তরে। ফলে দেশ যে আজ দূর্নীতির শিকার সে জন্য আলেমগণও কি কম দায়ী?

পরীক্ষাকেন্দ্রে বসে কোন পরীক্ষার্থী আমোদফুর্তিতে মত্ত হয় না। জানালায় দাঁড়িযে প্রৃকৃতির দৃশ্য দেখে না। বরং নেক কাজে যা কিছু অমনযোগী করে তা থেকে নিজেকে দূরে রাখে। পরীক্ষায় নম্বর বাড়াতে কাজে লাগায় প্রতিটি মুহুর্তকে। আনন্দ-উল্লাস বা শিল্প-সংস্কৃতির নামে মুসলমান তাই নাচগান, উলঙ্গতা, অশ্লিলতাকে প্রশ্রয় দেয় না। এগুলি জীবনের মূল মিশন থেকে বিচ্যুত ও বিভ্রান্ত করে। মহাবিপদ ডেকে আনে ব্যক্তির জীবনে। এগুলি এজন্যই ইসলামে হারাম। মোমেনের জীবনে এ জন্যই সদা ব্যস্ততা নেক আমলে। খলিফা হয়েও ভৃত্তকে উটের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টানা বা রাতে না ঘুমিয়ে আটার বস্তা নিজে কাঁধে গরীবের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার মত ইতিহাস নির্মিত হয়েছে এমন এক বলিষ্ঠ চেতনার কারণেই। নিজে সূদখোর, ঘুষখোর বা দুর্বৃত্ত হওয়া দূরে থাক, রাষ্ট্র ও সমাজকে দুর্বৃত্তমূক্ত করার নিয়তে সে শুধু শ্রম ও অর্থই দেয় না, জীবনও দেয়। এমন সৃষ্টিশীল চেতনা শূন্যে নির্মিত হয় না। এজন্য জ্ঞান চাই এবং জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত কেন্দ্রও চাই। নবীজী (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কেরাম কলেজ-বিশ্ববিদ্ব্যালয় না গড়লেও মসজিদের মেঝেতে জ্ঞানচর্চার এমন কেন্দ্র গড়েছিলেন। মুসলিম সমাজে সৃষ্টিশীল মানুষ ও আত্মত্যাগী মুজাহিদ সৃষ্টি হয় এমন প্রতিষ্ঠানের কল্যাণেই। সাম্রাজ্যবাদের দাস হওয়া দূরে থাক, তাদের আধিপত্য বিলুপ্তির কাজে তারা প্রাণপণে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। তখন দেশের প্রতিরক্ষায় সংশ্লিষ্ট হয় প্রতিটি নাগরিক। এমন দেশের স্বাধীনতা তাই বিপদগ্রস্ত হয় না কতিপয় মীরজাফরের বিশ্বাসাতকতায়। বরং স্বাধীনতা রক্ষায় তখন যুদ্ধ হয় প্রতিটি মুসলিম মহল্লায়।

 

হাতিয়ার রাষ্ট্র বিপ্লবের

আলো যেমন অন্ধকার দূর করে, শিক্ষাও তেমনি রাষ্ট্র থেকে অনাচার ও দূর্নীতি সরায়। বিদ্যালয় এভাবে রাষ্ট্রীয় বিপ্লবে ইঞ্জিনের কাজ করে। শিক্ষাব্যবস্থার সফলতা যাচায়ের সবচেয়ে বড় মাপকাঠিটি হলো, এরূপ আত্মত্যাগী চেতনা নিয়ে কতজন শিক্ষার্থী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলো -সেটি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার বড় প্রমাণ, সে ধরণের আত্মত্যাগী মানুষের চরম স্বল্পতা। বরং ঘটেছে উল্টোটি; বেড়েছে স্বার্থপরতা। সে স্বার্থপরতার কারণে শিক্ষা নিয়ে যারা বের হচ্ছে তাদের বেশীর ভাগই দু’পায়ে খাড়া বিদেশে বা বিদেশীদের সংস্থায় নিজেদের সকল মেধা ও সামর্থ্যের বিনিয়োগে। তীব্র স্বার্থপরতা নিয়ে তারা নামছে সন্ত্রাসে। এবং লুণ্ঠনে হাত দিচ্ছে জাতীয় সম্পদে। ফলে যতই বাড়ছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, ততই বাড়ছে দূর্বৃত্তের সংখ্যা। যেমন আবর্জনা বাড়লে বাড়ে মশা-মাছির সংখ্যা। ফলে দেশ পরাজিত হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতির উপর আধিপত্য বিস্তারে পরিচিত শত্রুদের তাই সীমান্ত-যুদ্ধ করতে হচ্ছে না। আমরা পরাজিত হচ্ছি ঘরের শত্রুদের হাতে। দেশ অধিকৃত চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতদের হাতে। বাংলাদেশ দূর্নীতিতে যেরূপ বিশ্বে ৫ বার প্রথম স্থান অধিকার করলো সেটি কি কোন রোগের মহামারি বা কোন প্রতিকূল জলবায়ু বা জলোচ্ছ্বাসের কারণে? এবং এ পরাজয় ও অপমান অশিক্ষা, রোগব্যাধী বা দারিদ্র্যের কারণে হলে সেটি আজ থেকে ১০০ বছর আগেই হওয়া উচিত। কারণ আজকের তুলনায় এগুলি তখনই অধিক মাত্রায় ছিল।

মানুষ বিশ্বাস, কর্ম ও আচারণে ভিন্ন হয় ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষার কারণে। বস্তুর ব্যক্তির শিক্ষা দৃশ্যমান হয় তার কর্ম ও আচরণের মধ্য দিয়ে। কোরআনে এজন্য বলা হয়েছে, ‘যে জানে ও জানে না -তারা উভয়ে এক নয়।’ বলা হয়েছে, ‘ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহি উলামাহ’ অর্থঃ একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে। অর্থাৎ জ্ঞানীর সংখ্যা কমলে ঈমানদারের সংখ্যাও কমে যায়। আল্লাহভীরু হওয়ার জন্য জ্ঞানার্জন এজন্যই ফরয। তাই এ ফরয শুধু মসজিদের ইমাম বা মাদ্রাসার শিক্ষকের উপর নয়, বরং প্রতি মুসলিমের উপর। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলিম হয়েছেন অথচ জ্ঞানার্জনে লিপ্ত হননি -এমন কোন সাহাবী খুঁজে পাওয়া যাবে না। এবং তাদের জ্ঞানার্জনের পরিধি অংক, বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, অর্থনীতি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে সীমিত ছিল না। ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার তাগিদে গুরুত্ব পেয়েছিল অহির জ্ঞান (কোরআন) এবং হাদীসের জ্ঞানও। এ ফরয আদায় না হলে ঈমান-আমল যেমন বিশুদ্ধ হয় না, তেমনি সহজ হয় না মহান অআল্লাহর পক্ষ থেকে মাগফিরাত লাভ এবং আখেরাতে নাযাত প্রাপ্তি। জ্ঞানার্জনের ফরয এতই গুরুত্বপূর্ণ যে এতে ব্যর্থ হলে ক্বাযা আদায়ের সুযোগ নেই। মুসলিম দেশের সরকারের দায়িত্ব, দেশের মুসলিম নাগরিকদের এ ফরয আদায়ের ব্যবস্থা করা। সরকারের এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কাফের দেশের সরকার থেকে একটি মুসলিম দেশের সরকারের মৌলিক পার্থক্য বস্তুতঃ এখানেই। এ দায়িত্ব পালনে অতীতের মুসলিম সরকারগুলি বড় বড় মাদ্রাসা গড়েছে। মাদ্রাসা খরচ নির্বাহের জন্য বিশাল বিশাল ওয়াক্ফ স্টেটের ব্যবস্থা করেছে।

 

বিপদ বাড়াচ্ছে আখেরাতেও

সাধারণ নাগরিক নিজ উদ্যেগে নিজের খাদ্যবস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে পারে, কিন্ত জ্ঞানার্জনের এ ফরয আদায়ে ঘরে ঘরে মাদ্রাসা খুলবে এবং সিলেবাস প্রণয়ন বা বই রচনা করবে -সেটি কি সম্ভব? নাগরিকগণ সে দায়িত্ব নিজ হাতো নিলে সরকারের কাজটি কি? এমন সরকারকে মুসলিম প্রজারা কেনই বা তারা রাজস্ব দিবে? অথচ বাংলাদেশ ১৭ কোটি মুসলমানের দেশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মুসলিম জীবনে ফরয আদায়ের কোন ব্যবস্থাই রাখা হয়নি। সেক্যুলার শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীনিয়াতের কিছু পৃষ্ঠা বাড়িয়ে ইসলামি জ্ঞানার্জনের ফরয আদায় হয় না; যেমন বিষের সাথে কয়েক চামচ সরবত পানে স্বাস্থ্য বাঁচে না। এমন দুষিত শিক্ষায় পুষ্টি পায় না ঈমান। অথচ বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটিই চালু রয়েছে। ফলে এ শিক্ষায় পূর্ণ-মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাটি নিশ্চিত হচ্ছে না। বরং সেক্যুলার শিক্ষার মাধ্যমে ইসলামের প্রতি অনীহা ও বহু ক্ষেত্রে ঘৃণাও সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে মুসলিম প্রজাদের দেয়া রাজস্বের অর্থ ব্যয় হচ্ছে তাদের সন্তানদের জাহান্নামের দিকে ধাবিত করার কাজে। সরকারের এ ভয়াবহ ব্যর্থতার বিরুদ্ধে কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি চুপ থাকতে পারে? মহল্লা থেকে চোর-ডাকাত বা বাঘ-ভাল্লুক তাড়ানোর চেয়েও অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারহীন এরূপ সরকার তাড়ানো।

বিস্ময়ের বিষয় হলো, চিকিৎসার নামে বিষ পান হলে প্রতিবাদ হয়। অথচ বিদ্যাশিক্ষার নামে ব্যাপক হারে ঈমান নাশ হলেও তা নিয়ে প্রতিবাদ নেই। প্রতিরোধও নেই। ভ্যাকসিন শিশুকে বাঁচায় সংক্রামক রোগের হাতে মৃত্যু থেকে। শিশুকে দেয় রোগভোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা। তেমনি শিক্ষা যথার্থ হলে সেটি ছাত্রকে অনৈসলামিক চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণার আক্রমণ থেকে বাঁচায়। দেয় দূর্নীতির বিরুদ্ধে নৈতীক প্রতিরোধের সামর্থ্য। পাপাচারের স্রোতে না ভেসে শিক্ষিত ব্যক্তিটি তখন আত্মনিয়োগ করে পাপাচারের নির্মূলে। দেশে এমন শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বাড়লে সে দেশ কখনোই দূর্নীতিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে না। জাতি তখন ঈমান নিয়ে শক্ত ভাবে মাথা তুলে দাঁড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। বরং হচ্ছে উল্টোটি। শিক্ষার নামের ছাত্র-ছাত্রীদের চেতনায় ভ্যাকসিন লাগানো হচ্ছে যাতে ইসলামের দর্শন মগজে না ঢুকতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এটিই সবচেয়ে ভয়ানক ব্যর্থতার দিক। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে তাগুতের তথা শয়তানের মোক্ষম হাতিয়ারে। ফলে মুসলিম জীবনে ভয়ানক বিপদ বাড়ছে শুধু পার্থিব জীবনে নয়, অনন্ত অসীম আখেরাতের জীবনেও।

 

 

 




ভারতে মসজিদ ধ্বংস ও মুসলিম নির্মূল প্রকল্প

উৎসব অসভ্য কর্মে

মসজিদ বা অন্য কোন ধর্মের উপাসনালয় ধ্বংস করা কোন কালেই এবং কোন দেশেই সভ্যকর্ম রূপে বিবেচিত হয়নি। সভ্যকর্ম রূপে বিবেচিত হয়নি কোন একটি ধর্মের অনুসারিদের হত্যা করা, তাদের মহিলাদের ধর্ষণ করা এবং শিশুদের আগুণে ফেলে উল্লাস করা। এটিও কোন সভ্য কর্ম নয় যে, কে গরুর মাংস খেলো বা কে শুকর বা শাপ খেলো তার ভিত্তিতে রাস্তায় পিটিয়ে কাউকে হত্যা করা। এরূপ হত্যাকান্ড চিরকালই বিবেচিত হয়েছে অতিশয় বর্বর ও অসভ্য কর্ম রূপে। অথচ এরূপ অসভ্য ও বর্বর কর্মগুলি ভারতে নিয়মিত উৎসবভরে হচ্ছে।  এরূপ অসভ্যতা ভারতে যে কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তারই প্রমাণ হলো, এ বর্বরতা নিছক কোন দলের দুর্বৃত্ত নেতাকর্মীদের মাঝে সীমিত নেই। বরং সেটি ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠির মাঝে। ফলে মসজিদ ভাঙ্গার ন্যায় বর্বর কর্মটি কোথাও শুরু হলে সে অসভ্যতাটিও লাখ লাখ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। সেটি ১৯৯২ সালে সেরূপ একটি উৎসব দেখা গেছে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসকালে। এ বর্বরতাটি এতটাই পবিত্র গণ্য হয়েছে যে, কোন পুলিশ, কোন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা মন্ত্রী ঘটনাস্থলে এসে সেটি থামানোর চেষ্টা করেনি। আরো লক্ষ্যণীয় হলো, মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুদের হত্যা এবং মহিলাদের ধর্ষণের লক্ষ্যে কোন শহরে মুসলিম জনবসতির উপর হামলা শুরু হলে সেখানেও লাখ লাখ হিন্দুর ঢল নামে। যেন সেটিও একটি পবিত্র কর্ম। ১৮৮৩ সালে আসামের নেলীতে, ১৯৯২ সালে মুম্বাইয়ে, ২০০২ সালে গুজরাতে এবং ২০১৩ সালে উত্তর প্রদেশের মুজাফ্ফর নগরে তো সেটিই হয়েছে। সে অসভ্য বর্বরতায় অপরাধীদের পূর্ণ সুযোগ দিতে পুলিশ, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সেনবাহিনীও সচরাচর ঘটনাস্থল থেকে পরিকল্পিত ভাবেই অদৃশ্য থেকেছে। যেন তারা কিছু দেখেনি এবং শুনেনি।

মূল সমস্যাটি তাই শুধু অসভ্য অপরাধ কর্মগুলিতে বিপুল সংখ্যক হিন্দুর অংশ গ্রহণ নয়, বরং সে বর্বর কর্মগুলিকে ঘৃণা না করে সর্বমহলে সেগুলিকে পবিত্র জ্ঞান করা। সে সাথে কাপুরুষের ভূমিকায় নেমেছে দেশের লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। এমন কি ভারতের মুসলিম আলেমগণও।ভারতীয় মুসলিমদের অতিশয় দুশ্চিন্তার কারণ মূলতঃ এখানেই্। দুশ্চিন্তা এতটাই বেড়েছে যে, মায়েরা তাদের সন্তানদের মাথায় টুপি দিয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করে এ ভয়ে যে, বজরং দল, বিজিপি, আর.এস.এস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের গুন্ডারা পথে তাদের পিটিয়ে লাশ বানিয়ে ফেলবে। কিছু দিন আগে কলকাতার মুসলিম মেয়র ফিরহাদ হাকিম এমন একটি পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন তার এক বক্তৃতাতে।  মুসলিম ব্যবসায়ীগণ হাটে গরু বেঁচতে যেতেও ভয় পায়, না জানি গো-রক্ষক ভলেন্টেয়ারেরা পথে তাদের হত্যা করে ফেলে। কারণ, এগুলিই তো অহরহ হচ্ছে। লক্ষণীয় হলো, যে নৃশংস অসভ্যতার শিকার হচ্ছে মুসলিম নর-নারী ও শিশুগণ, তা থেকে এখন বাদ পড়ছে না ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদগুলিও।    

২০১৪ এবং ২০১৯ সালে নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপি)র বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার কারণটি এ নয় যে, দলটি ক্ষমতায় এসে ভারত থেকে দারিদ্র্য দূর করেছে। বরং বাস্তবতা হলো, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব ভারতে দিন দিন বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে দলটির ব্যর্থতা বিশাল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠির বাস এখনো ভারতে। প্রতি বছর বহু হাজার কৃষক আত্মহত্যা করে স্রেফ ঋণের অর্থ পরিশোধ না করতে পেরে। বহুকোটি মানুষ ভিটামাটি হারিয়ে বস্তিতে বসবাস করে। এবং বহুকোটি আদিবাসী বেঁচে আছে বনজঙ্গলের জীব, ফলমূল ও কচু-ঘেচু খেয়ে। বিজিপির জনপ্রিয়তার মূল কারণটি অন্যত্র। সেটি ভারতীয় হিন্দুদের মাঝে চরম মুসলিম বিদ্বেষ সৃষ্টিতে দলটির সফলতা। যে রাজনৈতিক দলটি মুসলিম নির্মূল ও মসজিদ নির্মূলে অধীকতর নৃশংস হওয়ার দৃষ্টান্ত রাখছে -ভারতীয় হিন্দুগণ সে দলকেই বিপুল ভোটে বিজয়ী করছে। সমগ্র ভারত জুড়ে হিন্দুদের মাঝে এরূপ মুসলিম বিদ্বেষের কারণেই গুজরাতের মুসলিম গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদি আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনে বিজিপির পক্ষে জোয়ার সৃষ্টির আরো কারণ, এ দলটিই নেতৃত্ব দিয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর প্রায় ৫ শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদটিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার কাজে। এবং ১৯৯২ সালে ও ২০০২ সালে নেতৃত্ব দিয়েছিল যথাক্রমে মুম্বাই ও গুজরাতে মুসলিম গণহত্যায়।

ভারতীয় মুসলিমদের জন্য ভয়ানক বিপদ এজন্যও যে, মুসলিম নির্মূল এবং মসজিদ নির্মূলের নৃশংস চেতনাটি শুধু বিজিপি,আর.এস.এস, শিব সেনা, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরং দলের গুন্ডাদের মাঝে সীমিত নয়। ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের মাঝেও। এবং সেটিরই সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া যায় সুপ্রিম কোর্টের গত ৯ নভেম্বরের রায়ে। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ আজ থেকে ২৭ বছর আগে যে চেতনার পরিচয় দিয়েছিল তা থেকে তারা অনেক দূর পিছু হটেছে। ২৭ বছর আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের বর্বরতাটিকে তারা একটি জঘন্য ফৌজদারি অপরাধ রূপে গণ্য করেছিল। সে অপরাধে উস্কানি দেয়ার অপরাধে বিজিপির নেতা এবং সাবেক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লাল কৃষ্ণ আদভানিসহ অনেকের বিরুদ্ধেই আদালত থেকে সমন জারি করা হয়েছিল। অথচ সে বিচারকগণই এখন মসজিদ ধ্বংসকারি গুন্ডাদের সাথে সুর মিলিয়ে রায় দিল বাবরি মসজিদের ভিটাতেই মন্দির হবে। ফলে ২৭ বছর আগে যে অপরাধকর্মটি অপরাধ রূপে গণ্য হয়েছিল এখন সেটি আর অপরাধ থাকছে না। বরং গ্রহনযোগ্য ধর্মীয় কর্ম রূপে গণ্য হচ্ছে। এরই ফলে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের অপরাধ নিয়ে যে মামলাগুলি এখনও আদালতে ঝুলছে, সে গুলি সত্ত্বর তুলে নেয়ার জন্য হিন্দু সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে দাবিও উঠছে। সেদিনও দূরে নয় যখন সে মামলাগুলি সত্যই তুলে নেয়া হবে। এবং আসামীগণ চিত্রিত হবে হিরো রূপে।   

 

বিচারের নামে ভূমি বিনিময়ের সালিশ

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের রায়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ ন্যায়বিচারের বদলে নিছক ভূমি লেনদেনের সালিশী পেশ করলো। এবং আদালতের এ রায়ে বিচারকদের আসল মতলবটিও প্রকাশ পেল। এখন এটি সুস্পষ্ট যে, বিচারের মূল লক্ষ্যটি ছিল ফ্যাসিস্ট হিন্দুত্ববাদীদের মনবাসনা পূর্ণ করা। বিচারের রায়ে হিন্দু ফ্যাসিস্টদের বিজয়টি তাই বিশাল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পেয়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদীগণ এতটাই গর্বিত যে, তাদের কাছে অসহ্য হলো সাত শত বছরের মুসলিম শাসনের ইতিহাসকে হজম করা। আরো অসহ্য হলো, চোখের সামনে মুসলিম শাসনের স্মৃতি ধারণকারি প্রতিষ্ঠাগুলিকে বরদাশত করা। বস্তুতঃ এমন একটি ঘৃনার কারণে প্রতিটি মুসলিম এবং প্রতিটি মুসলিম প্রতিষ্ঠানই তাদের কাছে অসহ্য। যে মুসলিমগণ ভারত শাসন করেছিল তাদের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তারা প্রতিশোধ নিতে চায় যারা বেঁচে আছে সে মুসলিমদের থেকে। এমন একটি সহিংস চেতনার কারণে ভারত ভূমি থেকে তারা শুধু মুসলিমদেরই নির্মূল চায় না, নির্মূল করতে চায় ইসলাম ও মুসলিম স্মৃতি নিয়ে বাঁচা প্রতিষ্ঠানগুলিকেও। তেমন একটি উদ্দেশ্য নিয়েই তারা গুন্ডামী করে নির্মূল করে দিল ৫ শত বছরের পুরানো ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদকে। অথচ এরূপ একটি গুরুতর বর্বরতাকে খাটো করতেই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মসজিদ ধ্বংসের ন্যায় গুরুতর এক সন্ত্রাসী অপরাধকে নিছক ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ রূপে বিচার করলো। আদালতের বিচারকদের ধারণা, ৫ একর জমি দিয়ে মুসলিমদের সহজেই তুষ্ট করা যাবে এবং সে সাথে এ বীভৎস অপরাধের কান্ডকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়া যাবে। বিচারকদের রায়ে বাবরি মসজিদের ন্যায় ঐতিহাসিক মসজিদের মূল্য যেন ৫ একর জমি। যেন ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের ৫ একর জমি কেনার সামর্থ্যও নাই। মুসলিমদের প্রতি এরচেয়ে বড় অবমাননা আর কি হতে পারে? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার সাথি হিন্দুত্ববাদী অন্যান্য নেতাকর্মীগণ তাই সুপ্রিম কোর্টের বিচারের রায়ে প্রচন্ড খুশি। কারণ মুসলিমদের যেখানে প্রচন্ড পরাজয় ও অপমান –নরেন্দ্র মোদি ও তার সাথিগণ ততই খুশি হবে -সেটিই তো স্বাভাবিক?

ভারতের প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং আদালতের হিন্দুদের এ বিষয়টি নিশ্চয়ই জানা নেই যে, কোন ভূমিতে যখন মসজিদ নির্মিত হয় তখন সে ভূমির মালিকানা কোন ব্যক্তি, সরকার বা ওয়াক্বফ বোর্ডের থাকে না। প্রতিটি মসজিদই মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের নিজের ঘর। এবং প্রতিটি মসজিদের ইমারত এবং জমির তিনিই একমাত্র মালিক। তাই ভারতীয় হিন্দুগণ মহান আল্লাহতায়ালার মালিকানায় হাত দিয়েছে। তবে আল্লাহতায়ালার ঘরে কেউ হাত দিলে প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হয় তাঁর খলিফা রূপে সে ঘরের পাহারা দেয়া। তাই ৫ একর জমির বিনিময়ে সে ঘরের জমি মন্দির নির্মাণে হিন্দুদের দিয়ে দেয়াটি ঈমানদারি হতে পারে না। এ নিয়ে আপোষ করার কোন এখতিয়ার কোন মুসলিম রাজনৈতিক দল বা ওয়াকফ কমিটিরও থাকে না। হাদীসে বলা হয়েছে, পৃথিবী পৃষ্টে যারা আল্লাহর ঘর গড়েন, আল্লাহতায়ালাও তাদের জন্য জান্নাতে ঘর গড়েন। এবং আল্লাহর সে ঘরের পাহারা দেয়ার কাজটিও তাই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এক্ষেত্রে ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের ব্যর্থতাটি বিশাল। তারা আল্লাহতায়ালার ঘরের নিরাপত্তা দিতে পারিনি। প্রশ্ন হলো, এখন কি তারা আল্লাহর ঘরের ভিটায় মুশরিকদের মন্দির নির্মাণকে মেনে নিবে?   

 

বিচারকদের অবিচার

আদালতের রায়ে বিচারকগণ একথা বলতে বাধ্য হয়েছে যে, এ প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি যে মসজিদের নীচে মন্দির ছিল। অতীতে এমন দাবী এমন কি তুলসী দাস, শিবাজী, বিবেকান্দ, গুরু গোবিন্দ, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী এবং অরবিন্দ ঘোষের ন্যায় যারা ভারতের ইতিহাসে প্রখ্যাত হিন্দু পন্ডিত, নেতা বা বুদ্ধিজীবী -তারাও কখনো করেনি। অথচ ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পিছনে মূল কারণ রূপে দেখানো হয়েছে, মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল মন্দিরের উপর। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার মূল হোতা বিজিপি নেতা লাল কৃষ্ণ আদভানীর দাবি ছিল, মসজিদের ইমাম যে মেম্বরের উপর দাঁড়িয়ে খোতবা দেন, রামের জন্মস্থান ছিল তারই নীচে। মসজিদ ভেঙ্গে সেখান মন্দির নির্মাণ ছাড়া অন্য কোন প্রস্তাবে সে কিছুতেই রাজি ছিল না। তবে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার মধ্য দিয়েই বিজিপি ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলির প্রকল্প শেষ হয়নি। মুসলিম বিরোধী সে ঘৃনাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন আরো অনেক মসিজদের তলায় মন্দিরের তত্ত্ব শোনাচ্ছে। এবং সেটি ঘৃনাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের রাজনীতিকে আরো তীব্রতর করার প্রয়োজনে। তাই বিজিপির এ অপরাজনীতি যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন মসজিদ নির্মূলের রাজনীতিও তীব্রতর হবে। অবিকল সে কথাটিই বলেছেন ভারতীয় হিন্দুদের এক আধ্যাত্মিক গুরু স্বামী অগ্নিবেশ। বলা হচ্ছে মথুরার শাহী মসজিদটি নাকি শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমির উপর। তলায় মন্দিরের কিসসা শোনানো হচ্ছে বারানসির জ্ঞানবাপি মসিজদের বিরুদ্ধেও। কল্পনা করতে তো আর ইতিহাস লাগে না, প্রত্নতাত্তিক প্রমাণ লাগে না। লাগে শুধু কল্পনাবিলাসী মন। এবং গাঁজার কল্কের ন্যায় সেরূপ মনের অধিকারীদের সংখ্যা কি ভারতে কম? এমন কি বলা হচ্ছে, তাজমহলও আগে একটি মন্দির ছিল। সোসাল মিডিয়াতে ইতিমধ্যেই চার শতটি মসজিদের তালিকা পেশ করেছে। বলা হচ্ছে, বাবরি মসজিদের ন্যায় সেগুলিও একের পর এক ধ্বংস করা হবে। তাছাড়া মিথ্যার শক্তি তো বিশাল। একবার রটিয়ে দিলে সে মিথ্যা কোটি কোটি অনুসারি পেয়ে যায়। গরুকে দেবতার আসনে বসানো হয়েছে এবং গো-মুত্রকে পবিত্র পানীয় রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে এরূপ মিথ্যা রটিয়েই। ইবলিসের বিশ্বজোড়া বিশাল অনুসারি তো এ মিথ্যার উপরই।

ভারতের বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ব বিশারদ হলেন দিল্লির জওহারলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ভারমা। তার গবেষণালদ্ধ আবিস্কার হলো, বাবরি মসজিদের নীচে যে পুরোন ইমারতের আলামত পাওয়া গেছে সেটি হলো একটি পুরোন মসজিদের, মন্দিরের নয়। তার যুক্তি, একটি পুরোন ছোট মসজিদের ভিটায় বিশাল মসজিদ নির্মাণ করা হয়। আদালতের বিচারকগণও তাদের রায়ে মিস্টার ভার্মার সে অভিমতটি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, প্রফেসর ভার্মার সে আবিস্কারটি মেনে নিলেও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ সে সত্যের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার প্রদানে নৈতিক বলের প্রমাণ দিতে পারেননি। সেটি সম্ভবতঃ ফ্যাসিবাদী সরকারের ভয়। কারণ বিচারপতিগণও ক্ষুদ্র মানব। দুর্বলতার উর্দ্ধে তারা কোন ফেরেশতা নন। তাদেরও সংসার চালাতে হয় সরকার থেকে পাওয়া বেতন দিয়ে। তাদেরকে যারা নিরাপত্তা দেয় তারা সরকারেরর পুলিশ। তাদের সন্তানদের রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে  হয়, হাটেবাজারে ও স্কুল-কলেজে যেতে হয়। পথে ঘাটে হিন্দু ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে কে তাদের নিরাপত্তা দিবে? একারণেই দুর্বৃত্ত ফ্যাসিস্টদের হাতে দেশ অধিকৃত হলে, যে প্রতিষ্ঠানটির সর্বপ্রথম মৃত্যু ঘটে সেটি হলো দেশের আদালত ও ন্যায় বিচার। আদালত তখন ব্যবহৃত হয় ফ্যাসিবাদী সরকারের খায়েশ পুরণে। এরূপ নতজানু আদালতের রায়কে মান্যতা দেয়াও বস্তুতঃ আরেক নৈতিক অপরাধ। এবং সে অপরাধটি করতে জনগণকে তখন বাধ্য করে ফ্যাসিবাদী সরকার। আদালতের রায় যত ন্যায়বিচার-বিবর্জিত হোক না কেন -সে রায় মেনে নেয়াকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নসিহতও শোনানো হয়। এবং সেরূপ গর্হিত কাজ যেমন ভারতে হচ্ছে তেমনি বাংলাদেশেও হচ্ছে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট এভাবেই ব্যবহৃত হয়েছে দেশের সকল রাজনৈতিক দলের সর্বসম্মতিতে গৃহিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বিলুপ্ত করার ন্যায় এক বিবেক-বিবর্জিত কাজে। কারণ স্বৈরাচারি শেখ হাসিনার ভোট ডাকাতিকে সহজ করার জন্য সেটি জরুরী ছিল। ভারতেও একই ভাবে আদালত ব্যবহৃত হলো বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ন্যায় অতি অসভ্য কাজকে জায়েজ করতে।

অথচ রাজনৈতিক ময়দানে  বিগত ২৭ বছরেও কোন সরকারের পক্ষেই এরূপ গর্হিত কর্মকে জায়েজ করা সম্ভব হয়নি। এমন কি নব্বইয়ের দশকে বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকারও পারেনি। কারণ রাজনীতিতে একটি লজ্জাশরমের ব্যাপার থাকে। সে সাথে নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়ও থাকে। ফলে বিজিপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলি ১৯৯২ বাবরি মসজিদ মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারলেও পরবর্তী কোন সরকার থেকেই সে অপরাধ কর্মের পক্ষে বৈধতা আদায় করতে পারেনি। ফলে মসজিদের ভূমিতে মন্দির নির্মাণের এজেন্ডাও সফল হয়নি। গুজরাতে মুসলিম গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদির বিজয়টি এক্ষেত্রে বিশাল। তার শাসনামলেই নিজের ও তার সঙ্গিদের হাতে সংঘটিত মসজিদ ধ্বংসের ন্যায় এক গুরুতর অপরাধকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের দিয়ে বৈধ করে নেয়া হলো।

অথচ মসজিদ ধ্বংসের বিষয়টি ছিল পুরাপুরি একটি ফৌজদারি অপরাধের বিষয়। দেশে আইনের শাসন থাকলে, কোন ফৌজদারি অপরাধই শাস্তি এড়াতে পারে না। কিন্তু ভারতের আদালতে সে অপরাধের কোন বিচারই হলো না। দেশে আইনের শাসন কতটা অনুপস্থিত এ হলো তারই প্রমাণ। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টিকে অপরাধের বিষয় রূপে না দেখে সেটিকে হিন্দু-মুসলিমদের মাঝে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ রূপে খাড়া করেছে। বিচারও করেছে স্রেফ সে গন্ডির মধ্যে থেকে। সে বিরোধ মিটাতে গিয়ে এক দিকে যেমন মসজিদ ধ্বংসের গুরুতর অপরাধকে লঘু করে সেটিকে জায়েজ বা গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করেছে, তেমনি মুসলিমদের ঘুষ দিয়ে তুষ্ট করার চেষ্টাও হয়েছে। সেটি করতেই মসজিদের পবিত্র ভূমিতে মন্দির করার অনুমিত দিয়ে অন্যত্র ৫ একর ভূমি মুসলিমদের দেয়ার প্রস্তাব রেখেছে। কিন্তু ন্যায় বিচার তো কখনোই এভাবে হয়না। একটি মসজিদকে যে গুড়িয়ে দেয়া হলো সে অপরাধের শাস্তি কোথায় গেল? আদালত যদি মনে করে, বাবরি মসজিদের ভূমিতে শুরুতেই মন্দির ছিল; তবে আবার ৫ একর জমি দেয়ার প্রয়োজন পড়লো কেন? অন্য দিকে আদালত যদি মনে করে মসজিদের নীচে মন্দিরের কোন প্রমাণ নাই এবং মসজিদটি তার নিজস্ব ভূমিতেই ছিল -তবে কেন সেখানে মন্দির নির্মিত হবে?  ৫ একর জমি দেয়ার কারণটি কি তবে মসজিদের জমিটি মন্দিরে জন্য গুন্ডামী করে কেড়ে নেয়ার মূল্য? এটি তো বিচারের নামে দুর্বৃত্তি। মুসলিমগণ সে দুর্বৃত্তিকে বিচারের নামে মেনে নিবে কেন?     

 

ভেসে গেছে সেক্যুলার দলগুলিও

ভারতের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেও বিগত ২৭ বছরে আমূল পরিবর্তন এসেছে। তারাও মসজিদ ধ্বংসের ন্যায় অসভ্য কুকর্মকে ঘৃণা করার সভ্য চেতনাটি হারিয়ে ফেলেছে। ভারতীয় কংগ্রেস, উত্তর প্রদেশের সমাজবাদি দল, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, দলিতদের দল বহুজন সমাজ পার্টি, তামিলদের দল তেলেঙ্গু দেশম পার্টির ন্যায় সংগঠনগুলি যারা এতদিন নিজেদের সেক্যুলার রূপে পরিচয় দিয়েছে তারাও বিজিপি,আর.এস.এস, শিব সেনা, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরং দলের গুন্ডাদের সাথে সুর মিলিয়ে মসজিদের ভিটাতেই মন্দির নির্মাণকে সমর্থণ দিচ্ছে্। অথচ ১৯৯২ সালে যখন বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয় তখন অবস্থা এমনটি ছিল না। তখন সে ঘটনাকে নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস দলীয় প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও। নিন্দার পাশাপাশি তিনি এ ওয়াদাও দিয়েছিলেন, সরকার আবার সেখানে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করবে। সে প্রতিশ্রুতি যে স্রেফ মুসলিমদের শান্ত করার লক্ষ্যে ছিল -তা নিয়ে কি আদৌ সন্দেহ থাকে? ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘটিত এ অপরাধগুলি নিছক বর্বরতা নয়, নৃশংস প্রতারণাও। সে প্রতারণা যেমন ২৭ বছর আগে করা হয়েছিল, তেমনি আজও হচ্ছে।  লক্ষণীয় হলো, যে নাশকতাটি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের কাছে ফৌজদারি অপরাধ রূপে গণ্য হয়েছিল -সে অপরাধ রুখতে ঘটনাস্থলে কোন পুলিশ আসেনি। যে অপরাধকে ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও নিন্দা করলেন, সে অপরাধ দমনে তার কেন্দ্রীয় সরকারও কোন ব্যবস্থাই নেয়নি। সে অপরাধের সাথে যারা জড়িত ছিল তাদেরকে কোন রূপ শাস্তিও দেয়নি। এবং আদালতও বিগত ২৭ বছরে তার চরিত্র হারিয়েছে। যে আদালতে মসজিদ ভাঙ্গার অপরাধটি একটি ফৌজদারি মামলা রূপে গৃহিত হয়েছিল, সে আদালতই সহিংস গুন্ডামীর মাধ্যমে যারা মসজিদ ভাঙ্গলো তাদেরকে ৯ নভেম্বরের রায়ে পুরস্কৃত করলো।

 

অপরাধে সংশ্লিষ্ট হলো আদালতও

ভারতে অহরহ যা কিছু হচ্ছে তা সভ্য রীতি-নীতি থেকে বহু দূরে। কোন ভূমির উপর যদি মসজিদের ন্যায় পবিত্র একটি ইমারত থাকে এবং তা নিয়ে যদি আদালতে মামলা থাকে -তবে সে বিতর্কে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের কি এ অধীকার থাকে যে বিতর্কিত মসজিদটিকে তারা গুন্ডামী করে ভেঙ্গে দিবে? তারপর মসজিদের ভিটায় মন্দির নির্মাণের দাবী তুলবে? এবং মসজিদ ভাঙ্গার কিছু দিন পর দেশের সুপ্রিম কোর্টও সেখানে মন্দির নির্মাণের অনুমতি দিবে? কোন সভ্য সমাজে কি এমনটি ভাবা যায়? এসব তো নিরেট গুন্ডাতন্ত্রের কথা। এরূপ ক্ষেত্রে যে কোন সভ্য দেশেই সরকার ও আদালতের দায়িত্বটি বিশাল। এক্ষেত্রে আদালতের দায়িত্বটি ছিল, বাবরি মসজিদের ভূমিটি কি আদৌ রামের জন্মভূমি তা নিয়ে নিরপেক্ষ ফয়সালা দেয়া। এবং ভারতের সরকার ও তার পুলিশ বাহিনীর  দায়িত্ব ছিল, আদালতের সে ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত বাবরি মসজিদকে নিরাপত্তা দেয়া। যে সভ্য সমাজের সেটিই তো রীতি। কিন্তু বাবরি মসজিদের ক্ষেত্রে সে সভ্য রীতি আদৌ মানা হয়নি। আদালতের ফয়সালা ছাড়াই একটি পক্ষকে আইন নিজ হাতে নিতে দেয়া হয়েছে। পরে আদালত নিজেই অপরাধীদের পদাংক অনুসরণ করেছে। তাই ১৯৯২ সালে মসজিদ ভাঙ্গার গুন্ডামীটি যে গুরুতর অপরাধ ছিল – আদালত সে বিষয়টি সে সময় মেনে নিলেও ৯ ই নভেম্বরের রায়ে সেটিই ঘোষিত হয়েছে যা অপরাধীগণ সব সময় চেয়ে এসেছে। ফলে সুপ্রিম কোর্টের এ রায়ের মধ্য দিয়ে বিচারকদের গুন্ডা-তোষণ নীতিই সুস্পষ্ট হয়েছে। আদালতের বড় ব্যর্থতা হলো, মসজিদ ভাঙ্গার ফৌজদারি অপরাধের মামলাটি বিগত ২৭ বছর যাবত ঝুলে থাকলেও সে অপরাধের জন্য কোন অপরাধীকেই শাস্তি দেয়া হয়নি। প্রশ্ন হলো, তবে কি অপরাধীদের পুরস্কৃত করার জন্যই মামলাটি নিয়ে দীর্ঘকার গড়িমসি করা হচ্ছিল? অবশেষে রায়ে আইনের শাসনের বদলে গুন্ডাদের শাসনকেই বিজয়ী কর হলো। মসজিদর ভাঙ্গার পূর্বে উগ্রহিন্দুদের আস্ফালন ছিল, বাবরি মসজিদের স্থানেই মন্দির হবে। আদালত অবশেষে সে উদ্ধত আস্ফালনকেই পূরণ করলো। এরূপ অবস্থায় মুসলিমগণ কাদের কাছে বিচার চাইবে? তাদের নিজেদের জানমাল এবং মসজিদ-মাদ্রাসারই বা কীরূপে নিরাপত্তা পাবে?      

বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হলো এ যুক্তিতে যে, মসজিদটি গড়া হয়েছিল রামের জন্ম ভূমিতে। প্রশ্ন হলো, কোথায় এবং কোন বছরে রামের জন্ম -সে বিবরণ কি কোথাও কোন কিতাবে লেখা আছে? সেটি কোথাও নাই। অনেকের মতে রামের ধারণাটিই হলো গনেশের নাক বা ঋষিদের রথে চড়ে আকাশে উড়ার মত পৌরাণিক কল্প -কাহিনী মাত্র। বাস্তবে কোন রাম অযোধ্যায় জন্ম নেয়নি। তার নামে কোন মন্দিরও ছিল না। বাবরি মসজিদের জমির পরিমাণ ২.৭ একর। কথা হলো, এত বড় বিশাল জমির উপর রামের জন্ম হলো এবং সেখানে একটি বিশাল মন্দির নির্মিত হলো –এরূপ এক বিশাল কাজ ভারতীয় ইতিহাস থেকে বিলুপ্ত হয় কি করে? তাছাড়া বাবরি মসজিদ তো নির্মিত হয়েছিল ১৫২৮ সালে। ভারতে ইতিহাস লেখার কাজের শুরু তারও বহুশত বছর আগে থেকে। হিন্দুদের দাবী সত্য হলে বাবরি মসজিদ নির্মিত হওয়ার পূ্র্বে এ বিশাল ভূমিতে রামের নামে বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ মন্দির থাকার কথা। সে বিশাল মন্দির ভাঙ্গার কর্মটিও তো ইতিহাসে স্থান পাওয়ার কথা।  কিন্তু আদালতে হিন্দুগণ এরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোন প্রমাণই পেশ করতে পারিনি। তাছাড়া জমির মালিকানা নিয়ে কোন বিরোধ থাকলে সে বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত ছিল মসজিদটি ভাঙ্গার বহু পূর্বেই। সভ্য সমাজে সে নিষ্পত্তি করার জন্য তো আদালত। কিন্তু ভারতে সেটিও হয়নি। লক্ষণীয় হলো, মসজিদ ধ্বংসের লক্ষ্যে প্রতিটি অপরাধ ঘটানো হয়েছে ধাপে ধাপে এবং পরিকল্পনা মাফিক। প্রথমে মসজিদের ভূমিতে রামের জন্মভূমির মিথ্যাচার, এরপর ১৯৪৯ সালে মসজিদে মুর্তি রেখে অপবিত্রকরণ। এরপর ১৯৯২ সালে মসজিদের বিনাশ। এবং ২০১৯ সালে এসে দেশের সুপ্রিম কোর্ট থেকে মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় লাভ। কথা হলো, মসজিদ না ভাঙ্গলে কি ঐ স্থানে মন্দির বানানোর জন্য আদালত অনুমতি দিতে পারতো? এবং রাম জন্মভূমির মিথ্যা না ছড়ালে কি মসজিদ ভাঙ্গার কাজে লাখ লাখ হিন্দুদের জড়ো করা যেত?

বাবরী মসজিদ ধ্বংসের বর্বরতাটি বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। এ বর্বরতার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেল ভারতীয় হিন্দুদের মুসলিম বিরোধী অসভ্য ও সহিংস মনের আসল রূপটি। ভারতে এরূপ ঘটনা যেমন এই প্রথম নয়, শেষও নয়। যারা হাজার হাজার মুসলিম নর-নারী ও শিশুদের উৎসবভরে হত্যা করতে পারে, মুসলিম শিশুদের আগুনে ফেলতে পারে, মুসলিম নারীদের উপর গণধর্ষণ করতে পারে এবং গরুর গোশতো খাওয়ার সন্দেহে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করতে পারে -তাদের কাছে ইট-পাথরের প্রাণহীন মসজিদ গুড়িয়ে দেয়াটি মামূলী ব্যাপার মাত্র। ভারতীয় মুসলিমদের মাথার উপর কীরূপ ভয়াবহ বিপদ -সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাঁকি থাকে?  তাছাড়া বিষয়টি শুধু বিজিপি, আর. এস. এস, বিশ্ব হিন্দুপরিষদ, শিব সেনা বা বজরং দলেরও নয়। সে ভয়ানক মুসলিম বিদ্বেষ ঢুকেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় হি্ন্দুদের চেতনায়। ফলে নির্বাচনে বিজয়ী হচ্ছে মসজিদ ভাঙ্গায় অংশ নেয়া দলগুলি। 

 

ভারত জুড়ে অক্ষত হিন্দু মন্দির ও অহিংস মুসলিম নীতি

ভারতে ইতিহাসের পাঠটি কখনোই নিরেপক্ষ ভাবে দেয়া হয় না। ব্রিটিশ আমল থেকেই ইতিহাস পাঠ হয়েছে মুসলিমদের ভিলেন রূপে দেখানোর জন্য। নিরপেক্ষ বিচার হলে প্রকাশ পেতো  ভারতে মুসলিম শাসন অন্যান্য দেশ ও সভ্যতার তুলনায় কতটা অহিংস ও উন্নত ছিল। মুসলিম বাদশাহগণ নিজেদের মাঝে যতই ঝগড়া-বিবাদ বা লড়াই করুক না কেন ভারতীয় হিন্দুদের নির্মূলে তারা কখনোই হাত দেয়নি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ইতিহাসের দিকে নজর দিলে ভারতে মুসলিম শাসনের এ শ্রেষ্ঠ দিকটা অবশ্যই নজরে পড়ার মতো। অথচ জাতি, বর্ণ ও ধর্মভিত্তিক গণনির্মূল মানব ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। কোটি কোটি মানুষ সে নির্মূল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে। স্পেন এবং পর্তুগালে গেলে মনেই হবে না যে, সেখানে মুসলিমগণ ৭ শত বছর শাসন করেছিল এবং ইউরোপীয়দের সভ্যতর করতে মুসলিমদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এবং ভারতের দিকে তাকালেও মনে হবে না যে এখানে বৌদ্ধদের রাজত্ব ছিল। খৃষ্টান শাসকগণ যেমন ইউরোপ,আমেরিক ও অস্ট্রেলিয়া থেকে অখৃষ্টান আদিবাসীদের নির্মূল করেছে, হিন্দুগণও তেমনি ভারত থেকে বৌদ্ধদের নির্মূল করেছে। কিন্তু মুসলিম শাসন আমলে এরূপ কোন বর্বরতা ঘটেনি। মুসলিম শাসনামলে ভারতে হিন্দু নির্মূলে গণহত্যা হয়েছে –ইতিহাসে সে প্রমাণ নাই। তাদের হাতে নির্মূল হয়েছে এমন কোন হিন্দু প্রতিষ্ঠানের কোন দৃষ্টান্ত নাই। ফলে ভারতের শতকরা ৮০ জনগণই হিন্দু থেকে গেছে; অক্ষত থেকে গেছে তাদের মন্দিরগুলিও। এবং সাত বছর শাসন করেও মুসলিমগণ রয়ে গেছে সংখ্যালঘু। অথচ রোমান সম্রাট কন্সটান্টাইন চতুর্থ শতাব্দীর গোড়ায় খৃষ্টান ধর্ম গ্রহন করে তার সাম্রাজ্যের সবাইকে জোর করে খৃষ্টান বানায়। রাশিয়ার জারও সেটিই করেছে।

তাছাড়া কোন ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি ভাঙ্গা কি কোন সভ্য কর্ম? অমুসলিমদের উপাসনালয় ভাঙ্গা দূরে থাক, তাদের উপাস্যদের গালি দেয়াও ইসলামে নিষিদ্ধ। নবীজী (সাঃ)র হাদীস, অমুসলিমের দেবদেবীকে গালি দিলে তারাও মুসলিমদের মহান আল্লাহকে গালি দিবে। ইসলামে মসজিদ গড়া একটি পবিত্র কর্ম। এবং এ কাজটির মধ্যে থাকে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার পবিত্র প্রেরণা। এমন পবিত্র প্রেরণা নিয়ে কোন মুসলিম কি অন্য ধর্মের উপাসনালয় ধ্বংসের ন্যায় অপরাধে জড়িত হতে পারে? মুসলিমগণ শুধু ভারতই জয় করেনি, এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বহু দেশ জয় করেছে। সে সব দেশে অমুসলিমদের বিশাল বিশাল উপাসনালয় ছিল। তারা যে সেগুলিকে ধ্বংস করেনি বা সেগুলির স্থলে মসজিদ গড়েনি তারই প্রমান হলো, ইস্তাম্বুল, জেরুজালেম, আলেকজান্দ্রিয়ার ন্যায় বহু শহরে বিশাল বিশাল গির্জা এখনো খৃষ্টান ধর্মের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতীয় মুসলিম শাসকগণ ভারত জুড়ে বহু শহরের পত্তন ঘটিয়েছে। সে সময় জনসংখ্যা কম হওয়াতে শহরের ভিতরে ও বাইরে বহু খালি জায়গাও ছিল। ফলে মোগলদের কি প্রয়োজন পড়লো যে, বিস্তর খালি জমি পড়ে থাকতে তারা মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ গড়বে? তাতে কি ছওয়াব পাওয়া যায়?

ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস প্রায় ৭ শত বছরের। দীর্ঘকালীন এ মুসলিম শাসনের পরও ভারতে যত মসজিদ তার চেয়ে বহুগুণ হলো মন্দিরের সংখ্যা। মন্দির ভাঙ্গা লক্ষ্য হলে বহু আধা ভাঙ্গা, আংশিক ভাঙ্গা ও ক্ষতবিক্ষত মন্দিরও দেখা যেত। প্রশ্ন হলো, সারা ভারত জুড়ে যে অসংখ্য বিশাল মাপের পুরোন মন্দির এখনো বিদ্যমান -তার কোন একটিও কি আধা বা আংশিক ভাঙ্গা? কোন একটি মন্দিরের গায়েও দেখা যায় কি মুসলিমদের পক্ষ থেকে নিক্ষিপ্ত গোলা বা কামানের দাগ?

মুসলিমগণ ভারত শাসন করেছে হিন্দুদের সহযোগিতা নিয়ে। মানসিংয়ের ন্যায় মুসলিম শাসকদের দরবারে বহু হিন্দু যেমন জেনারেল হয়েছে, তেমনি মন্ত্রী এবং উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনিক অফিসারও হয়েছে। মুসলিম রাজপুত্রদের সাথে তারা নিজেদের কন্যাদেরও বিয়ে দিয়েছে। তাদের সে সহযোগিতার কারণেই মুসলিম শাসন দীর্ঘকাল স্থায়ী হতে পেরেছে। আরো লক্ষ্যণীয় হলো, ভারতের সম্পদ পূর্ব-পুরুষদের দেশে নিয়ে সেখানে তারা তাজমহল বা প্রাসাদ গড়েনি। যা কিছু করার তারা ভারতেই করেছে। ইংরেজদের ন্যায় ভারতকে তারা ঔপনিবেশিক কলোনী মনে করেনি, বরং নিজের দেশ মনে করেছে। এদেশের প্রতিরক্ষায় তারা প্রাণ দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ করলে কি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগণ কি মুসলিম শাসকদের সাথে সহযোগিতা করতো? অপর দিকে ভারতীয় হিন্দুদের নিজেদের কান্ডটিও চোখে পড়ার মত। হিন্দু রাজা শংকরাচর্যের আমলে ভারতীয় হিন্দুগণ বৌদ্ধ শাসনকেই শুধু নির্মূল করেনি, নির্মূল করেছে যেমন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের, তেমনি বিশাল বিশাল বৌদ্ধ মঠগুলিকে। প্রাণে বাঁচতে তাদেরকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায়, নেপাল, শ্রীলংকা ও বার্মায় পলায়ন করে।  

 

প্রকল্প মুসলিম-নির্মূল

ভারতীয় হিন্দুগণ অতীতে যেমন বৌদ্ধদের নির্মূল করেছে, এখন নির্মূল করতে চায় মুসলিমদের। ফলে তাদের লক্ষ্য শুধু মসজিদ নির্মূল নয়, মুসলিম নারী, পুরুষ এবং শিশু নির্মূলও। আর লক্ষ্য যখন নির্মূল-করণ, তখন তাদের কাছে মসজিদ বা মুসলিমদের বৈধ বা অবৈধ হওয়াটি কোন ব্যাপারই নয়। তাই বাবরি মসজিদ নিয়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায় শোনার মত ধৈর্য্য হিন্দুদের ছিল না। নরেন্দ্র মোদী যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন ৩ হাজারের বেশী মুসলিম নর-নারী ও শিশুদের হত্যা করা হয়। জ্বালিয়ে দেয়া হয় মুসলিমদের শত শত ঘরবাড়ি ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। প্রশ্ন হলো, তারা কি গুজরাতে অবৈধ ছিল?

মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে বিজিপি ও আর.এস.এস ঘরানার লোকেরা চারটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে্। একাজে তাদের অনুকরণীয় আদর্শ হলো ফ্যাসিস্ট হিটলার। হিটলারের ইহুদী নির্মূলের সফলতাটি আর.এস.এস নেতা সাভারকারের খুব ভাল লেগেছিল। সাভারকার ইহুদী বিদ্বেষ নাই। তার তীব্র বিদ্বেষটি স্রেফ মুসলিমদের বিরুদ্ধে। মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে যে প্রকল্পগুলি ভারতে চলছে তা হলোঃ এক). দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলিম নির্মূল, দুই). ন্যাশনাল রেকর্ড অব সিটিজেন (এন, আর.সি) প্রকল্পের নামে মুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া। ইতিমধ্যে আসামে ১৯ লাখ লোককে নাগরিকত্বহীন করা হয়েছে। একই প্রকল্প বাস্তবায়ীত করতে চায় সারা ভারত জুড়ে। পশ্চিম বাংলা বিজিপি’র সভাপতি দিলিপ ঘোষের দাবী, পশ্চিম বাংলার ২ কোটি মানুষ ভারতীয় নাগরিকের তালিকা থেকে বাদ পড়বে। এর অর্থ হলো, তাদের পাঠানো হবে বাংলাদেশে। তিন). মুসলিমদের হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করা। এটিকে তারা বলছে “ঘর ওয়াপসি” -যার অর্থ হলো হিন্দুধর্ম থেকে মুসলিম হওয়া মুসলিমদের আবার হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে নেওয়া। চার). কালচারাল কনভার্শন। এ প্রকল্পের অর্থ হলো হিন্দু ছেলে বা হিন্দু মেয়েদের সাথে বিবাহের মধ্য দিয়ে করে হিন্দু সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়া।      

 

বাংলাদেশীদের দায়ভার

২০ কোটি ভারতীয় মুসলিমদের সামনে আজ তাই মহা দুর্দিন। তবে এ দুর্দিনের মোকাবেলা তাদের নিজেদেরই সচেষ্ট হতে হবে। আর সে জন্য অপরিহার্য হৃদয়ে পবিত্র কোর’আনের শিক্ষা নিয়ে নির্ভেজাল মুসলিম পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠা। মনে রাখতে হবে সেক্যুলারিজমে দীক্ষা নিয়ে মুসলিমদের রক্ষা নাই। একমাত্র মুসলিম হলেই আল্লাহর সাহায্য তখন অনিবার্য হয়। আর আল্লাহর সাহায্য পেলে তখন কি আর অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে? সংকট যতটি তীব্র হোক, মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবের রাজা-বাদশাহদের কাছ থেকে পাওয়ার কিছু নেই। তারা এ বর্বরতার নিন্দাও করবে না। বরং যে নরেন্দ্র মোদির হাতে হাজার হাজার মুসলিমের রক্ত তাকে সৌদি আরব দিয়েছে সে দেশটির সর্বোচ্চ খেতাব। এবং ভারতের অর্থনীতি মজবুত করতে বিনিয়োগ করেছে ২২ বিলিয়ন ডলার। আরব আমিরাতও লাগাতর সমর্থন করছে নরেন্দ্র মোদির কাশ্মিরে গণহত্যার নীতিকে। শুধু প্রতিবেশী রূপে নয়, মুসলিম রূপে বাংলাদেশীদের দায়ভারটি বিশাল। কারণ, ২০ কোটি ভারতীয় মুসলিমদের সংকটটি শুধু ভারতীয় মুসলিমদের নয়, বরং সেটি সমগ্র উপমহাদেশের মুসলিমদের সংকট। তাছাড়া ঠোট উড়ে গেলে দাঁতেও বাতাস লাগে। তাই ভারতের ২০ কোটি মুসলিম নির্মূল হলে বাংলাদেশের মুসলিমগণও নিরাপদে থাকবে না।

তাছাড়া এক মুসলিম তো আরেক মুসলিমের ভাই। তাই ঈমানদারি শুধু নামায-রোয, হজ্ব-যাকাত পালন নয়,  হৃদয়ে অন্য মুসলিমকে নিজের ভাই জ্ঞান করে তার কল্যাণে কিছু করাও। এ প্রসঙ্গে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের একটি বিশেষ উক্তি অতি স্মরণযোগ্য। সেটি ছিল উসমানিয়ায় খেলাফতের বলকান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। তিন তাঁর নিজের সম্পাদিত “আল হেলাল” পত্রিকাতে লিখেছিলেন, “বলকানের রণাঙ্গনে যুদ্ধরত কোন তুর্কি মুসলিম সৈনিকের পা যদি গুলিবিদ্ধ হয়, আর তুমি যদি সে গুলির ব্যথা হৃদয়ে অনুভব না করো, তবে খোদার কসম তুমি মুসলিম নও।” এটিই তো খালেছ বিশ্বজনীন মুসলিম ভাতৃত্বের কথা। তাই প্রশ্ন হলো, মুসলিম ও মসজিদের নির্মূলে ভারতে যে নৃশংসতা চলছে তার ব্যথা যদি কোন বাঙালী মুসলিম হৃদয়ে অনুভব না করে তবে কি সে মুসলিম? মৃত মানুষ যেমন ব্যথা অনুভব করে না, মৃত ঈমানের মানুষও তেমনি অপর মুসলিম ভাইয়ের ব্যথা অনুভব করেনা। তবে এখানে বিষয়টি শুধু ব্যথা পাওয়া নিয়ে নয়, বরং অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ হলো সে বেদনা লাঘবে কিছু কাজ করা। বুঝতে হবে, ভারতীয় মুসলিমগণ শক্তিশালী হলে বাংলাদেশের মুসলিমগণও শক্তিশালী হবে।

তাছাড়া ভারতের তূলনায় বাংলাদেশ ছোট দেশ হলেও সন্ত্রাসী ভারতকে শিক্ষা দেয়ার বিস্তর সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশীদের হাতে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের করিডোর। বাংলাদেশ হলো ভারতের অতি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। বহু লক্ষ ভারতীয় কাজ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। ভারতের পণ্য বিদেশে যায় বাংলাদেশের বন্দর দিয়ে। ফলে বাংলাদেশীরা জেগে উঠলে ধ্বস নামবে ভারতের অর্থনীতিতে। কিন্তু সমস্যা হলো বাংলাদেশীরা নিজেরাই ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের কারাগারে বন্দি। আর বন্দি মানুষ তো চোখের সামনে কাউকে ডুবে বা জ্বলে মরতে দেখলেও তাকে সাহায্যে করতে পারে না।

অথচ ১৭ কোটি স্বাধীন মানুষের সামর্থ্য তো বিশাল। কিন্তু সে সামর্থ্য তো কেড়ে নিয়েছে হাসিনার কারাগার। এবং এটি ভারতীয় স্ট্রাটেজীও। ভারত তার নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হাসিনাকে দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশকে একটি কারাগারে পরিণত করেছে –যাতে বাংলাদেশের মানুষ তাদের প্রতিবেশী ভাইদের বাঁচাতে কিছু করতে না পারে। তাই ভারতের মুসলিম ভাইদের জন্য ঈমানী দায়িত্ব পালন করতে হলে বাঙালী মুসলিমদের প্রথমে নিজ দেশের ফ্যাসিস্ট সরকারের কারগার থেকে মুক্তি পেতে হবে। ২৩/১১/২০১৯ (নিবন্ধটি লেখা হয় লন্ডনে আলেমদের এক সমাবেশে পেশের জন্য।)     

  

 

 




সাম্প্রতিক ভাবনা-৭

১. যে মহাবিপদ সেক্যুলারিজমে

ব্যক্তির ঈমানদারি, বেঈমানি ও মুনাফিকি গোপন থাকার বিষয় নয়। সেগুলি সুস্পষ্ট ধরা পড়ে ব্যক্তির বাঁচার লক্ষ্য, কর্ম ও বিনিয়োগের মাঝে। মহান আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক ব্যক্তিকেই কিছু জ্ঞান, কিছু অর্থ-সম্পদ, চিন্তা-ভাবনার  কিছু সামর্থ্য, কিছু দৈহিক বল এবং বিবেক দিয়েছেন। এসবই মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। এসব সামর্থ্যের তথা এ পবিত্র আমানতের কোথায় ব্যয় হয় তাতেই প্রকাশ পায় ব্যক্তির ঈমানদারি, বেঈমানি ও মুনাফিকি।

ঈমানদারের পক্ষ থেকে আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত এ সামর্থ্যগুলির বিনিয়োগ ঘটে আখেরাতের ভাবনাকে হৃদয়ে রেখে। সে ভাবনার মূল কথা, আল্লাহর জমিনে তাঁর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইন তথা শরিয়তকে বিজয়ী করা। এ লক্ষ্যে সকল বিনিয়োগ গণ্য হয় মহান আল্লাহর পথে জিহাদ রূপে। অপরদিক সেক্যুলারিস্টদের অর্থ, বুদ্ধিবৃত্তি ও জীবনের সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগটি হয় সেক্যুলারিজমকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। তাদের রাজনীতিটি হয় চেতনায় পার্থিব জীবনের আনন্দ বাড়ানোর এজেন্ডাকে ধারণ করে। সে রাজনীতিতে গুরুত্ব পায় শরিয়তকে পরাজিত রাখা। সে লক্ষ্যে সেক্যুলারিস্ট যেমন ভোট দেয়, তেমনি রাজনীতি করে ও যুদ্ধ করে। নামায-রোযা পালন এবং তাবলিগের এজতেমাতেও হাজির হলেও তাতে তাদের সামর্থ্যের বিনিয়োগের উপর কোন প্রভাব পড়ে না।

পরিনামে সেক্যুলারিস্টদের সকল বিনিয়োগ যে শুধু ব্যর্থতাই বাড়ায় -সে ঘোষণাটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সুরা কাহাফের সুরা ১০৩ ও ১০৪ নম্বর আয়াতে। এ দুটি আয়াতে বলা হয়েছে, “বল (হে মুহম্মদ), তোমাদের কি বলে দিব, কারা কাজ-কর্মের দিক দিয়ে সবচেয়ে ক্ষতির মধ্যে? এরা হলো তারা যারা তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যয় করে দুনিয়ার আয়োজন বাড়াতে এবং মনে করে তাদের কর্মগুলি কতই না উত্তম।”  উপরুক্ত দুটি আয়াতের মাঝে রয়েছে সেক্যুলারিষ্টদের জন্য জাহান্নামের খবর। তাদের আমলগুলি এতই বিনষ্ট ও মূল্যহীন হবে যে, রোজ হাশরের বিচার দিনে সেগুলি ওজনের জন্য দাড়িপাল্লা খাড়া করারও প্রয়োজন হবে না। সে ঘোষনাটি এসেছে এ সুরার ১০৫ নম্বর আয়াতে। এবং ১০৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তাদের স্থান হবে জাহান্নামে।   

সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থ ইহজাগিতকতা। অতএব এতে পারলৌকিক ভাবনার কোন স্থান নেই। পারলৌকিক ভাবনাটি গণ্য সাম্প্রদায়িকতা রূপে। সেক্যুলারিষ্টদের মূল কথা হলো, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিচার-আদালতের মাঝে কোনরূপ ইসলামী চেতনা ও পারলৌকিক ভাবনা আনা যাবে না। ফলে সেক্যুলার রাজনীতিতে নির্মিত হয় স্রেফ জাহান্নামের রাস্তা। অপর দিকে ইসলামের শিক্ষা, দুনিয়ায় চলতে হবে প্রতি মুহুর্তে আখেরাতের ভাবনাকে হৃদয়ে নিয়ে। দুনিয়া একটি পরীক্ষা কেন্দ্র মাত্র; আসল ঠিকানাটি আখেরাতে। সেক্যুলারিস্টদের গুরুতর অপরাধ, আখেরাতের জীবনকে সফল করার মহা কল্যাণকর ইসলামী মিশনকে তারা বিফল করে দেয়। সেক্যুলারিস্টদের যুদ্ধটি তাই যেমন ইসলামের বিরুদ্ধে, তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধেও। এ অপরাধটি মানব খুনের চেয়েও গুরুতর। খুনি খুন করলেও তারা সমাজের বুকে জান্নাতের পথে চলাটি রুদ্ধ করে না। কিন্তু সে বিপদটি সেক্যুলারিস্টগণ ঘটায়। এবং সেটি হৃদয়ে আখেরাতের ভাবনা নিয়ে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিচার-আদালত পরিচালনাকে সংবিধান বিরোধী করে।          

২.
সন্তানকে পশু-পাখিও নিয়মিত পানাহার দেয়। কিন্ত মানবকে বাড়তি যেটি জোগাতে হয় সেটি হলো শিক্ষা। সেটি না হলে মানব সমাজও পশু সমাজে পরিণত হয়। ইসলামে তাই জ্ঞান অর্জনকে নামায-রোযা ফরজ হওয়ার ১১ বছর আগে ফরজ করা হয়েছে। এবং শ্রেষ্ঠ জ্ঞান হলো পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান। এ জ্ঞান জীবনের প্রতি পদে পথ দেখা। এ জ্ঞানে অজ্ঞ থাকা তাই কবিরা গুনাহ।

৩.
ঈমানদারের মিশনটি বিশাল। সেটি স্রেফ নামায়-রোযায় শেষ হয়না। তাকের বাঁচতে হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠা ও দুর্বৃত্ত নির্মূলের আমৃত্যু জিহাদ নিয়ে। আগুনে যেমন উত্তাপ দেয়, ঈমানও তেমনি জিহাদ দেয়। যার জীবনে জিহাদ নাই, তার মাঝে ঈমানও নাই।  তাই নবীজী (সাঃ)র এমন কোন সাহাবী ছিলেন না যার জীবনে জিহাদ ছিল না। সাহাবাদের মাঝে ৭০%’য়ের বেশী শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশের ন্যায় ইসলামের এ ইতিহাসকে পড়ানো হয় না।

৪.
গাছের পাশে যেমন আগাছা থাকে, তেমনি মানুষের পাশেও অমানুষ থাকে। আগাছা নির্মূল না করলে ফসল বাঁচে না।  তেমনি অমানুষ নির্মূল করলে শান্তি প্রতিষ্ঠা পায় না। দেশ তখন বাসের অযোগ্য হয়। সুরা ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে মুসলিমদের সমগ্র মানব জাতির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সেটি এজন্য নয় যে তারা বেশী বেশী নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন করে। বরং এজন্য যে তারা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা দেয় এবং দুর্বৃত্তিকে নির্মূল করে।  দুর্বৃত্ত নির্মূলের সে লড়াইটি হলো জিহাদ।এটিই ইসলামে শ্রেষ্ঠ ইবাদত। জিহাদ না থাকলে দেশে গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি ও বিরোধী দল নির্মূলের রাজনীতির জোয়ার আসে। বাংলাদেশ তারই উদাহরণ।

৫.
নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলের যারা স্বপ্ন দেখে তারা বিবেক-বুদ্ধিহীন। দেশের পুলিশ, আদালত, সেনাবাহিনী, সরকারি প্রশাসন পরিণতি হয়েছে ভোট ডাকাতির হাতিয়ারে। এ অবস্থায় কি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়?  দেশ এখন ভোট-ডাকাতদের হাতে অধিকৃত। ঘর থেকে ডাকাত তাড়াতেও যুদ্ধ লাগে। দেশ থেকে ডাকাত নির্মূলের খরচটি আরো বেশী।সভ্য তো তাঁরাই যারা সে খরচ বহন করে।

৬.
আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধান না মানা এবং সে অনুযায়ী রাষ্ট্র চালনা না করা কাফেরদের কাজ। ইসলামের বিজয় এবং শরিয়ত প্রতিষ্ঠার ৩টি উপায়। ১. ভোট, ২. গণ-আন্দোলন ও ৩. জিহাদ। নবীজী তৃতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।

৭.
খাদ্যের অভাবে দেহের মৃত্যু হয়। আর কোর’আনী জ্ঞানের অভাবে ঈমানের মৃত্যু হয়।তাই যে দেশে কোর’আন বুঝার আয়োজন নাই সে দেশে বেঈমানের সংখ্যা বেশী।যে ব্যক্তি ঈমান বাড়াতে চায়, সে কোর’আনের জ্ঞান বাড়াতে মনযোগী  হয়। অর্থ-সম্পদ দুর্বৃত্তরাও পায়, কিন্তু তারা ঈমান ও জ্ঞান পায় না। ঈমান ও জ্ঞান ছাড়া কি জান্নাত পাওয় যায়?

৮.

বেঈমান মানুষের পরিচয়: আল্লাহতায়ালা কোর’আনে কি বললেন সেটি জানায় অনাগ্রহ। ঈমানদারের পরিচয়: কোরআন কি বলে সেটি জানার জন্য পেরেশানী। এ পেরেশানীটিই ঈমানের পরিমাপ দেয়।

৯.
এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই -এটিই আল্লাহতায়ালার দেয়া পরিচয়। এ পরিচয় নিয়ে না বাঁচাতেই মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি। নানা ভাষা ও নানা বর্ণের কাফেরগণ এক দেশে বাস করে এবং বিশ্বশক্তি হয় –যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। সে গুণ মুসলিমদের নাই। অথচ সে পরিচয়টি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের জীবনে। ফলে তারা বিশ্বশক্তিতে পরিণত হতে পেরেছিল।

১০
ত্রাস সৃষ্টির নীতিই সন্ত্রাস। মহল্লায় সন্ত্রাস করে ডাকাতেরা। দেশ জুড়ে সন্ত্রাস করে ভোট-ডাকাত সরকার। ডাকাতদের ক্ষমতায় বসিয়ে কি তাই সন্তাস বিলুপ্ত হয়? সন্ত্রাস হলো বাংলাদেশে সরকারি নীতি। এ ভোট-ডাকাত সরকার বলে, দেশ থেকে তারা দুর্নীতি নির্মূল করবে। সেটি চাইলে সে কাজের শুরু হওয়া উচিত তাদের নির্মূলের মধ্য দিয়ে।  

১১.
কোর’আন না মেনে চলাতেই মুসলিমদের পতন। পথ না চিনলে গন্তব্যস্থলে পৌঁছা যায় না। কোর’আন হলো জান্নাতের রোড ম্যাপ। অতএব কোর’আনের পথে না চললে কীরূপে জান্নাতে পৌঁছা সম্ভব? কোরআন শিক্ষা এজন্যই মুসলিম জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই সেটি নামায-রোযার আগে ফরজ হয়েছে।

১২.
দেশ শয়তানী শক্তির দখলে। আদালতে আল্লাহর আইনের কোন স্থান নেই। বিচার হচ্ছে কুফরি আইনে। এসবের নির্মূলে জিহাদ নাই। অথচ মোল্লা-মৌলভীগণ ব্যস্ত নিজ নিজ ফিরকার মুরিদ বাড়াতে। তারা এমন এক ইসলাম নিয়ে ব্যস্ত যেখানে নবীজী (সাঃ)র ইসলাম নাই। নবীজী (সাঃ)র ইসলামে ইসলামি রাষ্ট্র ছিল, খেলাফত ছিল, শরিয়ত ছিল, জিহাদ ছিল, এবং মুসলিম উম্মাহর একতা ছিল। কিন্তু তাদের ইসলামের এসবের কোন কিছুই নাই।  

১৩.
সমগ্র বাংলাদেশ এখন মুজিব-আদর্শের পাঠশালা। এ পাঠশালায় যতই বাড়ছে মুজিব-আদর্শের পাঠ, ততই বাড়ছে দেশ জুড়ে হত্যা, গুম ও চুরি-ডাকাতির রাজনীতি।মুজিব আট আনা সেরের চাউল ১০ টাকায় খাইয়েছে। আর হাসিনা পেঁয়াজ ২৫০ টাকা সের খাওয়াচ্ছে।

১৪.
গরু-ছাগল নিজের পানাহার ছাড়া দেশ নিয়ে ভাবে না। সে অভিন্ন চরিত্র পশু চরিত্রের মানুষেরও। অথচ মানব মহামানব হয় এবং পরকালে জান্নাত পায় দেশকে সভ্যতর করার কাজে নিজের জান-মালের বিনিয়োগের মাধ্যমে। ইসলামে এটিই পবিত্র জিহাদ।