বাংলাদেশে হিন্দু সংস্কৃতির জোয়ারঃ বাঙালী মুসলিম কি ভেসেই যাবে?

বর্ষবরণের নামে পূজা

পূজা মন্ডপ এখন আর মন্দিরে নয়, ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছে। নানা রংয়ের নানা জীব-জন্তুর মুর্তি মাথায় নিয়ে যারা মিছিলে নেমেছে তারাও কোন মন্দিরের হিন্দু পুরোহিত  বা হিন্দু পূজারি নয়। তারা নিজেদের পরিচয় দেয় মুসলিম রূপে। এ চিত্রটি এখন আর শুধু ঢাকা শহরের নয়, সরকারি খরচে সেটিই সারা বাংলাদেশ জুড়ে হচ্ছে। কথা হলো, এতে কি কোন মুসলিম খুশি হতে পারে? যার মনে সামান্যতম ঈমান অবশিষ্ঠ আছে তার অন্তরে তো এ নিয়ে বেদনাসিক্ত ক্রন্দন উঠতে বাধ্য। কারণ, এ তো কোন সুস্থ্য সংস্কৃতি নয়। নির্দোষ কোন উৎসবও নয়। এটি তো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উৎসব। এটি তো সিরাতুল মুস্তাকীম ছেড়ে জাহান্নামের পথে চলা অসংখ্য মানুষের ঢল। এটি তো পৌত্তলিকদের পূজা মন্ডপ রাজপথে নামানোর মহা-উৎসব। এ উৎসব তো শয়তানের বিজয়ের। এবং সেটি মুসলিমদের রাজস্বের অর্থে। আরো পরিতাপের বিষয়, ইসলামের সংস্কৃতি ও অনুশাসনের বিরুদ্বে এ উদ্ধত শয়তানী বিদ্রোহের পাহারাদারে পরিণত হয়েছে দেশের পুলিশ ও প্রশাসন।

প্রশ্ন হলো, যে দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলিম সে দেশে কি কখনো এরূপ পূজামন্ডপ মাথায় নিয়ে মিছিল হয়? বিশ্বের কোন মুসলিম দেশে কি সেটি হয়?  এবং আয়োজিত হয় কি মুসলিমদের দ্বারা? এ কাজ তো মুরতাদদের। এতে আনন্দ বাড়ে একমাত্র পৌত্তলিক কাফেরদের। জাহান্নামের পথে ছুটে চলা এরূপ অসংখ্য মিছিলে লক্ষ লক্ষ সতীর্থ দেখে পৌত্তলিকদের মনে আনন্দের প্রচণ্ড হিল্লোল উঠবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। সে আনন্দেরই প্রকাশ ঘটেছে ১৫ই এপ্রিল কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকায়। এটি যে হিন্দুর পূজা মন্ডপ নিয়ে মিছিল -তা নিয়ে কোন পৌত্তলিকের সন্দেহ হওয়ার কথা নয়। সন্দেহ হয়নি আনন্দবাজার পত্রিকারও। তাই পত্রিকাটির রিপোর্টঃ “কার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে! কখনও মনে হচ্ছিল কলকাতার কলেজ স্কোয়ার বা একডালিয়ার পুজো মণ্ডপ। কখনও বা শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবের চেহারা। তা সে রমনার বটমূলের বৃন্দগানই হোক কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাজপথে মঙ্গল শোভাযাত্রা। পুজো, বসন্ত উৎসবের মিলমিশে একাকার ঢাকার নববর্ষের সকাল।”

আনন্দ বাজার পত্রিকা রাজপথের একজন অতি উৎসাহীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে,‘‘এটাই এখন আমাদের জাতীয় উৎসব। যেখানেই থাকি ঠিক চলে আসি।’’ প্রশ্ন হলো, এমন পূজার মন্ডপ নিয়ে মিছিল বাঙালী মুসলিমের জাতীয় উৎসব হয় কি করে? কোনটি জাতীয় উৎসব এবং কোনটি নয় -সেটি কে নির্ধারণ করবে? সে ফয়সালা দিবে কি ইসলামবিরোধী এ বিদ্রোহীগণ?  এর পিছনে সরকারের বিনিয়োগ কতখানি সে বর্ণনাও দিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা। লিখেছে, “হেলিকপ্টার থেকে ফুল ছড়িয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা দড়ির ব্যারিকেড দিয়েও উৎসাহী জনতাকে ঠেকাতে পারছেন না। অষ্টমীর রাতে কলকাতায় যেমন হয়। শোভাযাত্রায় মন্ত্রী-সান্ত্রি সবাই ছিলেন। শোভাযাত্রা ঘিরে থিকথিক করছিল পুলিশ। শুক্রবার রাতে দেখছিলাম রাস্তায় ছেলেমেয়েরা ভিড় করে আলপনা দিচ্ছেন। গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেমনটা এখন পুজোর সময়ে কোনও কোনও রাস্তায় হয়।”

পুরা আয়োজন যে ছিল পূজার সেটি অনেক বাঙালী মুসলিমের নজরে না পড়লেও আনন্দবাজারের হিন্দু সাংবাদিকের নজরে ঠিকই ধরা পড়েছে। তাই তিনি লিখেছেন,“শুধু পুজো নয়, কলকাতার সরস্বতী পুজো, ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র মেজাজও যেন ধরা পড়ল বাংলাদেশের এই নববর্ষে! জাতি-ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে এ যেন সর্বজনীন উৎসব।’’ প্রশ্ন হলো, হিন্দুর পূজা কি কখনো ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে ইসলামের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করতে পারে? হিন্দুর পূজা কি মুসলিম সন্তানের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়? অথচ সে চেষ্টাই হচ্ছে জনগণের রাজস্বের অর্থে। সরকারের এজেন্ডা, হিন্দুর সে পূজাকেই বাংলাদেশে সার্বজনীন করা। বাংলাদেশের সরকার যে সে এজেন্ডা নিয়ে বহু কিছু করেছে এবং বহু দূর অগ্রসর হয়েছে, তাতেই আনন্দবাজারের মহা-আনন্দ। সে আনন্দটি মূলতঃ ভারত সরকারেরও। বাংলাদেশে তারা তো তেমন একটি সরকারকেই যুগ যুগ ক্ষমতায় রাখতে চায়।

 

স্ট্রাটেজী: ইসলাম প্রতিরোধের

আনন্দবাজার একই দিনে আরেকটি রিপোর্টে ছেপেছে, সেটি “মৌলবাদকে পথে নেমে মোকাবিলা বাংলাদেশে” শিরোনামে। তাতে শেখ হাসিনার প্রশংসায় পত্রিকাটি অতি গদগদ। মৌলবাদ চিত্রিত হয়েছে ইসলাম নিয়ে বাঁচার সংস্কৃতি ও তা নিয়ে রাজনীতি। যারা ইসলামের প্রতি সে অঙ্গিকার নিয়ে বাঁচতে চায় তারা চিত্রিত হচ্ছে “অন্ধকার অপশক্তি” রূপে।  তাই তাদের কাছে প্রতিটি ইসলামি দলই হলো অপশক্তি –সেটি যেমন জামায়াতে ইসলামী, তেমনি হেফাজতে ইসলাম। এমন কি বিএনপি’ও। ইসলামি শক্তির মোকাবেলায় নববর্ষের মতো একটি অনুষ্ঠানকেই হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়ায় পত্রিকাটি প্রচণ্ড খুশি। লক্ষ্য এখানে বাঙালী মুসলিমদের হিন্দু বানানো নয়, বরং তাদেরকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। তাই নেমেছে সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামের ব্যানারে। ইসলামের বিশ্বব্যাপী জাগরণের প্রতিরোধে এটি মূলতঃ আন্তর্জাতিক সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের অংশ। ইসলাম বিরোধী এ আন্তর্জাতীক কোয়ালিশন শুধু যে স্ট্রাটেজীক পরিকল্পনা দিচ্ছে তা নয়, সে স্ট্রাটেজীর বাস্তবায়নে বিশ্বের তাবদ কাফের শক্তি শত শত কোটি টাকার অর্থও দিচ্ছে। সরকারি অর্থের পাশাপাশি এ বিদেশী অর্থে বিপুল ভাবে বেড়েছে মিছিলের সংখ্যা ও জৌলুস। মিছিলে মিছিলে ছেয়ে গেছে সমগ্র দেশ। আল্লাহর স্মরণ ভূলিয়ে দেয়ার এর চেয়ে সফল হাতিয়ার আর কি হতে পারে? আল্লাহর স্মরণ থেকে এরূপ বিস্মৃত  হওয়ার ভয়ানক শাস্তিটি হলো তখন শয়তানকে সঙ্গি রূপে বসানো হয় অবাধ্য ব্যক্তির ঘাড়ে। যার প্রতিশ্রুতি্ এসেছে সুরা যুখরুফের ৩৬ নম্বর আয়াতে। ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে নেমেছে যেমন জাতিসংঘ, তেমনি ইউনেস্কো। তাই ইউনেস্কো ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’-এর পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে নববর্ষের ঢাকার মঙ্গল শোভাযাত্রাকে। ইসলাম-দমন প্রকল্পের অংশ রূপেই সিলেবাস থেকে বাদ দেয়া হয়েছে কোরআন-হাদীসের পাঠ, নিষিদ্ধ হয়েছে পিস টিভি ও ইসলামী টিভি চ্যানেল এবং জেলে ঢুকানো হয়েছে বিখ্যাত মোফাচ্ছেরদের। সে সাথে  বন্ধ করা হয়েছে তাফসির মাহফিল এবং ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন। শত শত কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে দেশী-বিদেশী এনজিওদের ডুগি, তবলা ও হারমনিয়াম দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের নাচগান শেখাতে।

ইসলামে শত্রুপক্ষের মতলব গোপন নয়। ঘোষণা দিয়েই তারা মাঠে নেমেছে। তারা আঘাত হানতে চায় ইসলামের তাওহীদের মূলে। তাদের স্পর্ধা এতটাই বেড়েছে যে, উপাস্য রূপে খাড়া করেছে মহাপ্রভূ আল্লাহতায়ালার বদলে মানুষকে। ১৫ই এপ্রিলে অঞ্জন রায় নামক ব্যক্তি দৈনিক আনন্দ বাজারে রিপোর্ট করেছেঃ “সেই কবে এই জনপদের কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার গ্রামের আখড়ায় ফকির লালন সাঁইজি উচ্চরণ করেছিলেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। সেই উচ্চারণকে ধারণ করেই সত্যিকারের মানুষ হওয়ার বিষয়ে এ বারের শপথ ছিল ঢাকায়, বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। মানুষের ভিড়ে এ বারের শোভাযাত্রার মিছিল হয়ে উঠেছিল মহামিছিল। সেই পুরনো পোশাকের ঢাকিরা সার বেধে বোল তুলেছেন ঢাকে। তালে তালে নাচছে শিশু থেকে বৃদ্ধ। জানান দিচ্ছে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সব মানুষের উৎসব পয়লা বৈশাখের অমিত শক্তির কথা।”

পত্রিকাটি সোনার মানুষ হওয়ার পথও বাতলিয়ে দিয়েছে। সেটি মহান আল্লাহতায়ালার ইবাদতের পথ নয়, সেটি মানুষের উপাসনা। এটি  একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে কতবড় সাংঘাতিক কথা? নবী-রাসূল নয়, পথ-প্রদর্শক রূপে পেশ করা হয়েছে লালন শাহকে। লালন শাহ মুসলিম ছিল, এক আল্লাহর উপাসক ছিল বা তার জীবনে নামায-রোযা ছিল -তার কোন প্রমাণ নাই। তার মত এক পথভ্রষ্টকে পেশ করা হয়েছে বাঙালীর পথের সন্ধানদাতা রূপে। এরূপ পথভ্রষ্টতাকে প্রতিষ্ঠা দিতে সরকারের বিনিয়োগও কি কম? অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির নামে নানা ভাবে এই পথভ্রষ্ট লালনকেই  সরকারি ভাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হচ্ছে্।

 

ইসলামের পক্ষের শক্তি কি অপশক্তি?

আনন্দ বাজার বড় আনন্দভরে উল্লেখ করেছে, “অন্ধকার অপশক্তির সঙ্গে লড়াইয়ে সবচেয়ে শক্তিমান বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। সেই ধারণাকে ধারণ করেই আয়োজিত হয়ে চলেছে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার। প্রায় প্রত্যেকের হাতে বিশাল আকারের মুখোশ, শোলার সেই প্রাচীন রূপকথার পাখি, টেপা পুতুল, বিভিন্ন মঙ্গল প্রতীক।” কিন্তু কারা সে অপশক্তি সেটি আনন্দ বাজার প্রকাশ না করলেও গোপন থাকেনি। বাংলাদেশে চলছে বর্বর স্বৈরাচারি শাসন। চলছে লাগামহীন সরকারি ও বেসরকারি সন্ত্রাস। চলছে ব্যাংক লুট, ট্রেজারি লুট। ঘটছে শত শত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। অন্য কোন দেশের চেয়ে বেশী খরচে রাস্তা গড়লেও অর্থলুটের কারণে সে রাস্তা বেশী দিন টিকে না। খারাপ রাস্তার জন্য বাংলাদেশ এখন রেকর্ড গড়ছে। দূর্নীতিতে বাংলাদেশ ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, আইন-আদালত ভয়ানক অপশক্তির দখলে। নির্বাচন ছিনতাইয়ের মাধ্যমে এক বর্বর ফ্যাসিবাদী শক্তি এখন ক্ষমতায়। তাদের কারণে সম্ভব নয় একটি নিরপক্ষ নির্বাচন। তারা অসম্ভব করে রেখেছে বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ ও মিছিল। কিন্তু আনন্দবাজার পত্রিকায় যারা অপশক্তি রূপে চিত্রিত হয়েছে তারা কিন্তু এসব দানবীয় অপশক্তিগুলি নয়। বরং দখলদার স্বৈরাচারি অপশক্তি প্রশংসা কুড়িয়েছে আনন্দ বাজার পত্রিকার। তাদের কাছে অপশক্তি হলো তারা যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে ইসলামি চেতনার প্রচার ও প্রতিষ্ঠা চায়। রাজনীতির এ অঙ্গণে ভারতের পৌত্তলিক কাফের ও বাংলাদেশের ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের এজেন্ডা একাকার হয়ে গেছে।

আনন্দ বাজারের আরো পত্রিকার রিপোর্ট, “শোভাযাত্রায় একটাই শপথ -মানুষের মধ্যে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার যে আকাঙ্ক্ষা, প্রতিপাদ্যে সেই বার্তাই ছড়িয়ে দিতে চায় মঙ্গল শোভাযাত্রা,’’-এমনটাই বললেন শোভাযাত্রা আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। ‘‘এই উপস্থিতিই আশাবাদ,’’ এমনই বললেন বাংলাদেশের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক গোলাম কুদ্দুস। তিনি বললেন, ‘‘বাংলাদেশের মানুষ কখনওই কোনও অপশক্তির কাছে মাথা নোয়ায়নি। আর ভয়কে জয় করে চলার যে পথ, সেটিই বাঙালির পথ। এ বারের শোভাযাত্রায় যে মানুষের ঢল, সেটাই প্রমাণ করে বাংলাদেশ পথ হারায়নি, অন্ধকার কখনও শেষ কথা নয়।’’ সেটাই জানান দিল আজকের মানুষের মিলিত ঢল।

কি মিথ্যা অহংকার নিয়ে উচ্চারণ যে ‘‘বাংলাদেশের মানুষ কখনোই কোন অপশক্তির কাছে মাথা নোয়ায়নি”। প্রশ্ন হলো, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের অধীনে ১৯০ বছরের গোলামীর জীবনও কি অপশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ের ইতিহাস? এতই যখন শক্তির বড়াই তবে ১৯৭১ য়ে বাংলার মাটিতে ভারতীয়দের ডেকে আনা হলো কেন? ভারতের সেনাবাহিনীর সাহায্য ছাড়া পুরা দেশ দূরে থাক একটি জেলাও কেন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী থেকে স্বাধীন করতে পারলো না? আজ যে ফ্যাসীবাদী শক্তির অধিকৃতি, সেটিও কি গর্বের?  “বাংলাদেশ পথ হারায়নি” বলেই বা আয়োজকগণ কি বুঝাতে চান? সেটি কি পূজামন্ডপ নিয়ে মাঠে নামার পথ?

 

এটিই কি সেই একাত্তরের চেতনা?

‘কি সেই একাত্তরের চেতনা’ –শেখ মুজিব কখনো সেটি বলেননি। তবে না বললেও চেতনার বিষয়টি কখনোই গোপন থাকে না। চেতনা তো সেটিই যা ধর্ম-কর্ম, আচার-আচরণ, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রকাশ পায়। বলা হয়, পবিত্র কোরআনের তাফসির হলো নবীজী (সাঃ)র নবুয়ত-পরবর্তী জীবন। তাই তাঁকে বাদ দিলে ইসলামি চেতনার পরিচয় মেলে না। বিশুদ্ধ ইসলামি চেতনাটি তো প্রকাশ পেয়েছে নবীজী (সাঃ)র ইবাদত-বন্দেগী, আচার-আচারণ, কর্ম, রাজনীতি, বিচার-ব্যবস্থা ও জিহাদের মধ্য দিয়ে। প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ ও তাঁর জীবন-ইতিহাস সামনে থাকার কারণে কোন কালেই ইসলামের চেতনা বুঝতে মুসলিমদের অসুবিধা হয়নি। চেতনা নিয়ে সে স্বচ্ছতার কারণেই দেশে দেশে যারাই ইসলাম কবুল করেছে তারাই নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে যেমন আত্মনিয়োগ করেছে, তেমনি আত্মসমর্পণ করেছে শরিয়ত, হুদুদ, কেসাস, খেলাফা, মুসলিম একতা ও জিহাদের বিধানগুলির কাছে। যার মধ্যে এসবে আগ্রহ নাই, বুঝতে হবে তার মধ্যে যেমন ঈমান নাই, তেমনি ইসলামি চেতনাও না্ই।

তেমনি একাত্তরের চেতনা বুঝতে হলে সে চেতনার যারা ধারক তাদের ধর্ম-কর্ম, আচার- আচরণ, রাজনীতি ও চরিত্রকে বুঝতে হয়। নিঃসন্দেহে শেখ মুজিব হলো একাত্তরের চেতনার মূল নায়ক। তাকে বাদ দিলে একাত্তরের চেতনা বাঁচে না। লেলিনকে বাদ দিয়ে যেমন লেলিনিজম বুঝা যায় না, তেমনি মুজিবকে বাদ দিয়ে একাত্তরের চেতনারও পরিচয় মেলে না। আজও যারা বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় তাদের কেউই রাজাকার নন। তাদের প্রচণ্ড অহংকার একাত্তরের চেতনা নিয়ে। তাই সে চেতনার সন্ধান মিলে বর্তমানে যারা বাংলাদেশের শাসন-ক্ষমতায় তাদের ধর্ম-কর্ম, চরিত্র ও রাজনীতি থেকে। তারাই মূলতঃ একাত্তরের বিজয়ী রাজনীতির মূলধারার প্রতিনিধি। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মাটিতে একাত্তরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শত শত জীবন্ত তারাকা থাকার পরও কি সে চেতনা নিয়ে অজ্ঞতা চলে?

বাংলার রাজনীতিতে আজ সে স্বৈরাচার এবং যে বাকশালী স্বৈরাচার শেখ মুজিব নিজে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন -সেটি কি কোন রাজাকারের সংস্কৃতি? পাকিস্তান আমলে কোন সময়ই  এক দলীয় বাকশালী স্বৈরাচার ছিল না। এটি নিরেট একাত্তর পরবর্তী ঘটনা। এবং এর প্রবর্তক খোদ শেখ মুজিব। ফলে এ স্বৈরাচারকে একাত্তরের চেতনা থেকে আলাদা করার উপায় নাই। আজও যে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চেপে বসেছে সেটিও বাকশালী স্বৈরাচারের ধারাবাহিকতা মাত্র। একাত্তরের চেতনার আরেকটি অবিচ্ছেদ্দ উপাদান হলো ভারত-নির্ভরতা ও ভারত-সেবী রাজনীতি। সে চেতনাটিও আজ বেঁচে আছে শেখ হাসিনার রাজনীতি। তাই একাত্তরে যেমন ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে আনা হয়, আজও তেমনি ভারতকে অবাধে ট্রানজিট দেয়া হচ্ছে। দেশের রাজপথে পূজার সংস্কৃতির জয়জয়াকার সেটিও কোন রাজাকারের সংস্কৃতি নয়। এটিও একাত্তরের চেতনাধারীদের সংস্কৃতি। এ চেতনা ভারতকে দিয়েছে বাংলাদেশের উপর তার সাংস্কৃতিক আধিপত্য।

 

একমাত্র মুক্তির পথ 

একাত্তরের চেতনাধারীগণ বাংলাদেশকে কোন দিকে নিতে চায় সেটি আজ আর গোপন বিষয় নয়। বাঙালী মুসলিমদের সামনে এখন পথ মাত্র দু’টি। এক). বিদেশী প্রভূদের সাথে মিলে একাত্তরের চেতনাধারীগণ বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতিত যে প্রবল স্রোত সৃষ্টি করেছে তাতে ভেসে যাওয়া। বহু মানুষ ভেসে যাওয়ার সে পথকেই যে বেছে নিয়েছে সেটি পহেলা বৈশাখের বিশাল মিছিলই বলে দেয়। দুই). স্রোতে না ভেসে প্রবল বিক্রমে প্রতিরোধে নামা। এটিই মূলতঃ ঈমানদারীর পথ। গাছের মরা পাতার ন্যায় স্রোতে ভাসাটি কোন মুসলিমের সংস্কৃতি নয়। মুসলিম তো সে ব্যক্তি, যার মধ্যে থাকে স্রোতের বিপরীতে সামনে চলার ঈমানী বল। সে ঈমানী বলে সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে তারা সৃষ্টি করে নতুন স্রোত। মু’মিনের জীবনে সেটিই তো জিহাদ। সে ঈমানের বলের জন্যই ঈমানদার ব্যক্তি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে পুরস্কার পায়। প্রশ্ন হলো, ঈমান, স্বাধীনতা ও জান্নাতের আশা নিয়ে বাঁচতে হলে এ ছাড়া কি বিকল্প পথ আছে?  ২রা বৈশাখ, ১৪২৫ (১৬/০৪/১৮)

 




বাংলাদেশে স্বৈরাচারের নাশকতা এবং যে ব্যর্থতা বাঙালী মুসলিমের

স্বৈরাচারঃ দুশমন মানব সভ্যতার

স্বৈরশাসকদের নৃশংস অপরাধ শুধু এ নয়, বিপুল সংখ্যায় তারা মানুষ খুন করে, গুম করে ও নির্যাতন করে। বরং তাদের হাতে সবচেয়ে বড় অপরাধটি ঘটে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সনাতন সত্যদ্বীনের নির্মূলে। ভয়ানক অপরাধ করে মানুষের বিবেক নিধনের ক্ষেত্রেও। স্বৈরশাসকের নাশকতাটি তাই হিংস্র পশু ও প্রাণ-নাশক জীব-জীবাণুর চেয়েও ভয়াবহ। কারণ, ঘাতক পশু ও জীব-জীবাণু ইসলাম ও ঈমানের শত্রু নয়। পশুর কাজ স্রেফ দৈহিক হত্যা; বিবেক হত্যা বা ঈমান হত্যা নয়। তাই হিংস্র পশু ও জীব-জীবাণুর নাশকতা বৃদ্ধিতে মানুষ জাহান্নামে যায় না; জাহান্নামে যাওয়ার কারণ তো ঈমানের মৃত্যু এবং সৎ আমলের শূণ্য ভাণ্ডার। সেটি ঘটে স্বৈরশাসকদের হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ায়। অসত্য অন্যায়ের প্রতিষ্ঠাকে প্রবলতর করে তারা অসম্ভব করে সুস্থ্য ঈমানআক্বীদা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ন্যায়নীতি ও নেক আমল নিয়ে বেড়ে উঠা। এভাবে অসম্ভব করে মুসলিম রূপে বাঁচা তথা ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠা।

দেশে দেশে স্বৈরশাসকগণ কাজ করে শয়তানের খলিফা রূপে। মহান আল্লাহতায়ালার খেলাফতের বদলে তারা প্রতিষ্ঠা করে শয়তানের খেলাফত। শয়তানের খলিফাগণ নবী-রাসূল ও তাদের প্রচারিত ধর্মের জন্য কোন দিনই সামান্যতম স্থানও ছেড়ে দিতে রাজী হয়নি। অতীতের ন্যায় আজও সেটিই তাদের রীতি। বাংলাদেশের ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশগুলোতে শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত, জিহাদের ন্যায় ইসলামের মৌল বিধানগুলোর বিরুদ্ধে স্বৈর-শাসকদের যেরূপ উগ্র অবস্থান -সেটি তাই কোন নতুন নীতি নয়। এটিই তাদের সনাতন ও স্বাভাবিক নীতি। শুধু রাষ্ট্রের অঙ্গণে নয়, এমনকি জনগণের মনের ভূবনেও চায় ইসলামী চেতনার নির্মূল। চায়, বর্ণবাদ, জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজমের ন্যায় নানারূপ ইসলাম বিরোধী মতবাদ বা ধ্যান-ধারনার অধিকৃতি। ইসলামের প্রতিষ্ঠাকামীদের বিরুদ্ধে স্বৈর-শাসকদের যুদ্ধ ও সন্ত্রাস এজন্যই এতটা লাগাতর এবং নৃশংস। গণতন্ত্রে যেহেতু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মভীরু মুসলিম জনগণের ইসলামী আক্বীদার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব ও বৈধতা পায়, শয়তানী শক্তিবর্গ এজন্যই গণতন্ত্রের ঘোরতর শত্রু। আলজিরিয়া, ফিলিস্তিন ও মিশরে ইসলামপন্থিদের বিজয়কে ছিনিয়ে নিয়ে স্বৈর শাসনকে চাপিয়ে দেয়ার মূল কারণ তো এটিই।

মদিনার বুকে ইসলামের দ্রুত বেড়ে উঠার বড় কারণ, সেখান ফিরাউন, নমরুদের ন্যায় শক্তিশালী দুর্বৃত্তদের স্বৈরশাসন ছিল না। এলাকাটি কোন কালেই স্বৈরশাসন কবলিত তৎকালীন রোমান পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি দুর্বৃত্ত বিশ্বশক্তির কবজায় ছিল না। এতে মানুষের বিবেক বেঁচেছিল স্বৈরশাসকে হাতে নিহত হওয়া থেকে। ফলে মদিনার মানুষ নৈতীক যোগ্যতা পেয়েছিল মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন কবুল ও তাঁর মহান নবীজীকে নিজ শহরে দাওয়াত দেয়ার। মানব ইতিহাসে এমন ঘটনা পূর্বে আর কখনোই ঘটেনি। সেখানে ইসলাম পেয়েছিল দ্রুত বেড়ে উঠার সহায়ক পরিবেশ। অথচ স্বৈরশাসকদের হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ার নাশকতাটি এতটাই প্রকট যে, অতি কঠিন হয়ে পড়ে সেখানে সুস্থ্য ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠা। যেমন কঠিন হয়েছিল নমরুদ ও ফিরাউনের শাসনামলে ইরাক ও মিশরে। এবং আজ হচ্ছে বাংলাদেশে।

শয়তানের এজেন্ডা পূরণে বিশ্বস্ত সহকারি রূপে কাজ করাই স্বৈর-শাসকদের নীতি। রাষ্ট্রকে তারা শয়তানের ইন্সটিউশনে পরিণত করে। শয়তানের অনুগত সৈনিক রূপে মানুষকে জাহান্নামে নেয়াই তাদের মূল মিশন। ফলে তারা প্রতিপক্ষ রূপে খাড়া হয় ইসলামের বিজয়ের বিরুদ্ধে। এজন্যই মানব সমাজের সবচেয়ে বড় নেক কাজটি হিংস্র পশু, মশামাছি বা ঘাতক রোগজীবাণু নির্মূল নয়, বরং সেটি হলো স্বৈরাচার নির্মূল। তাই ইসলামে সবচেয়ে বড় ইবাদতটি হলো স্বৈর শাসন নির্মূলের জিহাদ। এ কাজটি না হলে সে রাষ্ট্রে ঈমান নিয়ে বাঁচা এবং মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্বৈর শাসন নির্মূলের জিহাদে নবীজী (সাঃ)র শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছেন। স্বৈর শাসক এজিদের বিরুদ্ধে জিহাদে শহীদ হয়েছেন ইমাম হোসেন (রাঃ) ও তাঁর ৭২ জন সহচর। স্বৈরাচারি শাসকদের হাতে জনগণের বিবেক হত্যার অপরাধটি মহামারি আকারে হওয়ার কারণেই অতি দুর্বৃত্ত শাসকগণও জাতির নেতা, পিতা, বন্ধু এমন কি ভগবান রূপে স্বীকৃতি পায়। একারণেই নমরুদ ও ফিরাউনের ন্যায় স্বৈরশাসকগণ মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিপক্ষ রূপে গৃহীত হয়েছিল। এবং নিন্দিত, নির্যাতিত, নিহত বা দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন এমন কি নবীরাসূলগণ। যে দেশে চোর-ডাকাত, খুনি ও স্বৈরাচারিগণ শাসকরূপে স্বীকৃতি পায় ও সন্মানিত হয়, বুঝতে হবে সেখানে বিবেকের মৃত্যুটি একমাত্র চোর ডাকাত ও স্বৈরাচারি শাসকদের নিজস্ব বিষয় নয়, সেরূপ বিবেকের মৃত্যু ঘটে সাধারণ মানুষের জীবনেও। মিশরের বুকে ফিরাউন শুধু একা অপরাধী ছিল না, অপরাধী ছিল সেদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণও। তাই আযাব তাদের সবাইকে ঘিরে ধরেছিল।

স্বৈরাচারঃ শয়তানের বিশ্বস্ত হাতিয়ার

ন্যায়ের নির্মূলে ও অন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় শক্তির ক্ষমতাটি বিশাল। কোনটি ন্যায় আর কোনটি অন্যায়, কোনটি সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পাবে এবং কোনটি বর্জন করা হবে -সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নির্ধারণ করে রাষ্ট্র। সেখানে মহান আল্লাহতায়ালার বিধান কাজ করে না। ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে থাকলে ধর্মীয় ও বর্ণগত নির্মূলকে যেমন বৈধ বলা যায়, তেমনি সুস্পষ্ট অন্যায়কেও ন্যায় বলা যায়। যেমনটি স্পেন থেকে মুসলিম নির্মূল এবং আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে আদিবাসীদের নির্মূলের ক্ষেত্রে হয়েছে। গ্যাস চেম্বারে লাখ লাখ মানুষ পুরিয়ে মারাকেও তখন আইনসিদ্ধ বলা যায়। যেমনটি হিটলার বলেছে। তখন বৈধতা দেয়া যায় মা-বাপদের কোল থেকে সন্তান ছিনিয়ে নেয়া, অন্যদের দেশ দখল করা, পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ বা গোয়ান্তানামো বেএর ন্যায় জেলে বছরের পর বিনাবিচারে বন্দি রাখার ন্যায় নানারূপ অসভ্য কর্মকেও। যেমনটি করছে মার্কিনীরা। ক্ষমতার দাপটে একই ভাবে বহু হারাম কর্মকে মুসলিম দেশগুলিতে উৎসবযোগ্য করা হয়েছে। যেমন পৃথক ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও ভূগোলের নামে মুসলিম দেশগুলিকে টুকরো টুকরো করে দুর্বল করা। এমন কি আইন সিদ্ধ করা বলা হয়েছে ভোটা-ডাকাতির নির্বাচনকেও। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তো সেটিই করেছে। সে লুন্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ের দোহাই দিয়ে দাপটের সাথে দেশ-শাসনের অবৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

স্বৈর-শাসন ও তার রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগুলো কাজ করে মূলতঃ শয়তানের একনিষ্ঠ হাতিয়ার রূপে। নামে মুসলিম হলেও তারা লড়ে শয়তানের ইসলাম বিরোধী এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষে। তাই স্বৈরাচার শুধু সুস্থ্য রাজনীতি, নিরপেক্ষ নির্বাচন ও ন্যায়পরায়ণ প্রশাসনেরই শত্রু নয়; ভয়ানক শত্রু বিবেক-বুদ্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তিরও। তাদের কারণে বিপুল প্রতিপত্তি পায় দুর্বৃত্ত মানুষ ও দুর্বৃত্ত বুদ্ধিজীবীগণ। অপরাধী স্বৈর-সরকার কখনোই নিজেদের ব্যর্থতার দায়ভার নিজেরা গ্রহণ করেনা। সর্ব-অবস্থায় নিজেদের দোষমুক্ত জাহির করাই তাদের নীতি। এমনকি ১৯৭৩-৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ যেরূপ প্রাণ হারালো -সেজন্য আওয়ামী লীগ আজও দোষ স্বীকার করেনি। দোষ চাপিয়েছে বিদেশীদের উপর। বিদেশীদের দোষ, তারা কেন যথা সময়ে পর্যাপ্ত ভিক্ষা দিল না? অথচ এ আত্মজিজ্ঞাসা কখনোই আওয়ামী শাসক মহলে উঠেনি, হাজার হাজার কোটি টাকার ভিক্ষালব্ধ সম্পদ যে দেশের অরক্ষিত সীমানা দিয়ে ভারতে পাচার হয়ে গেল সেজন্যও কি বিদেশীরা দায়ী? নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো যে কোন সভ্য আইনেই গুরুতর অপরাধ। অথচ সেটাই হলো সকল স্বৈরাচারি শাসকদের স্বভাবজাত অভ্যাস। তাদের বিচারে নিজেদের ব্যর্থতা মেনে নেয়ার অর্থ, নিজেদের পরাজয় মেনে নেয়া। তাদের ভয়, তাতে গণরোষে আবর্জনার স্তুপে পড়ার। সে ভয় থেকেই স্বৈরশাসকগণ সকল ব্যর্থতার দায়ভার বিরোধী পক্ষের উপর চাপায়। একই কারণে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতির কথাও তারা দেশবাসিকে ভূলিয়ে দিতে যায়। ভূলিয়ে দিতে চায়, ২০১৩ সালে ৫ই মের শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার কথাও।

 

 

যে অপরাধ বাঙালী সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের

দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে ভয়ানক নাশকতাটি শুধু স্বৈরশাসকদের হাতে ঘটে না, ঘটে স্বৈরশাসক প্রতিপালিত বুদ্ধিজীবীদের হাতেও। মন্দিরের ঠাকুর বা পুরোহিত ছাড়া পুতুল পূজা, শাপপূজা, লিঙ্গপূজার ন্যায় বর্বর জাহিলিয়াত বাঁচে না। তেমনি মিথ্যসেবী বুদ্ধিজীবী ছাড়া অসভ্য স্বৈরশাসনও বাঁচে না। ফিরাউন কখনো নিজে ঘরে ঘরে গিয়ে জনগণের কাছে নিজেকে ভগবান রূপে পেশ করেনি। সে কাজটি করেছিল তার উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধিজীবী ও ধর্মজীবীরা। পবিত্র কোরআনে এ শ্রেণীর দুর্বৃত্ত মানুষদের মহান আল্লাহতায়ালা মালাউন বলে অভিহত করেছেন। প্রতি যুগে এবং প্রতি দেশে এসব বুদ্ধিজীবী ও ধর্মজীবীদের অবস্থান ইসলামের ঘোরতর বিপক্ষে। ইসলামের লড়াকু সৈনিকদের বিরুদ্ধে এরাই স্বৈর-শাসকের ভাণ্ডারে বুদ্ধিবৃত্তিক গোলাবারুদ সরবরাহ  করে। তাদের কারণেই শরিয়ত, হুদুদ, জিহাদ, খেলাফতের ন্যায় ইসলামের মৌল বিধানগুলি স্রেফ মুসলিম দেশ থেকে নয়, মুসলিম চেতনা থেকেও বিলুপ্ত হয়েছে। এরূপ বুদ্ধিজীবীদের কারণেই দীর্ঘ আয়ু পায় দুর্বৃত্ত স্বৈর শাসকগণও। বাংলাদেশে বাকশালী স্বৈরাচার যে এখনো বেঁচে আছে সেটিও তো তাদের কারণে। তাদের কাজ, মিথ্যা ও অন্যায়কে স্রেফ বৈধ ও সঙ্গত রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া নয়, বরং প্রকৃত অপরাধীদের অপরাধকে মানুষের চোখ থেকে আড়াল করা। দেশের সকল ব্যর্থতার জন্য স্বৈরাচারকে দায়ী না করে তারা দায়ী করে জনগণকে। স্বৈরাচারের অদক্ষতা ও দূর্নীতিকে লুকাতে গিয়ে দায়ী করে দেশের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে। এমনকি দায়ী করে দেশের ভূমি, ভূগোল ও জলবায়ুক। দায়ী করে এমন কি ক্ষমতার মসনদ থেকে বহু দুরে থাকা বিরোধী দলকে। যেমন ফিরাউন দায়ী করতো হযরত মূসা (আঃ) ও তার ভাই হযরত হারুন (আঃ)কে।

সেবকশ্রেণীর এ বুদ্ধিজীবী ও ধর্মজীবীদের মূল কাজ স্রেফ স্বৈরশাসকদের গুণগান গাওয়া নয়, বরং তাদের কৃত জঘন্য অপরাধগুলি লুকানো। এদের সংখ্যাটি বাংলাদেশে বিশাল। সামান্য একটি উদাহরণ দেয়া যাক। গত ২৬শে জুন, ২০১৮ আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রথম আলোতে কলাম লিখেছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে যা কিছু হয়েছে তার জন্য স্রেফ আওয়ামী লীগকে দোষ দেয়া যাবে না। তাঁর কথা, দোষ অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও। তবে লক্ষ্যণীয় হলো, ২০১৪ সালে নির্বাচনের নামে যে ভয়ানক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে -সেটি তিনিও অস্বীকার করতে পারছেন না। তবে সৈয়দ আবুল মকসুদের নিজের অপরাধটি অন্যত্র। সেটি হলো, ভয়ানাক অপরাধীকে অপরাধী গণ্য না করার। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর ২০১৪ সালে যে নির্লজ্জ ডাকাতি হলো এবং সে ডাকাতির মূল নায়ক যে আওয়ামী লীগকে সে সত্যটি তিনি তার প্রবন্ধে গোপন করেছেন। এবং ডাকাতদের সামান্যতম নিন্দাও করেননি। অথচ সে ভয়ানাক অপরাধটি ছিল সমগ্র দেশবাসীর বিরুদ্ধে। আজকের রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণও সেটি। এতবড় অপরাধের জন্য যারা দায়ী -তাদের শাস্তি না দেয়া তো আরেক অপরাধ। বুদ্ধিজীবীদের এ  অপরাধের কারণে সাহস বাড়ে প্রকৃত অপরাধীদের। অথচ সৈয়দ মকসুদ আহমেদ সে অপরাধ ও অপরাধীর বিরুদ্ধে শাস্তির কথা মুখে আনেননি। বরং আওয়ামী লীগের অপরাধ লঘু করতে তিনি দোষ চাপিয়েছেন অন্যান্য দলের উপরও। আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত ভোট ডাকাতির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিরোধী দলগুলি।  ভাবটা এমন, ঘরে ডাকাতি হলে দোষ শুধু ডাকাতদের নয়, গৃহস্বামীরও। গৃহস্বামীর অপরাধ, ডাকাতদের জন্য দরজা খুলে না দেয়ার। এবং ডাকাতিতে সহযোগিতা না করার। ডাকাত পাড়ায় বিচার বসলে বিচারের রায় তো এরূপই হয়। ২০১৪ সালের ভোট ডাকাতি নিয়ে সেরূপ অভিন্ন রায়টি তাই স্বৈরসেবক প্রতিটি বুদ্ধিজীবীর।

অথচ ২০১৪ সালের নির্বাচনে জনগণকে ভোটকেন্দ্রে আনায় আওয়ামী লীগের সামান্যতম আগ্রহ থাকলে নিরপেক্ষ কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন তারা মেনে নিত। বিরোধী দলের এ দাবী আদৌ অনায্য ছিল না। এ দাবী নিয়ে এক সময় শেখ হাসিনাও প্রচণ্ড আন্দোলন করেছেন। ফলে সে দাবী আজ অনায্য হয় কি করে? বিরোধী দল তো কখনো এ দাবী করেনি, তাদের পছন্দের লোকের হাতে ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচন করাতে হবে। তারা তো চেয়েছে স্রেফ নির্দলীয় সরকারের হাতে নির্বাচন। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যে সামান্যতম ইচ্ছা নেই -সেটির প্রমাণ শেখ হাসিনা বার বার দিয়ে যাচ্ছেন। জনগণ ইচ্ছামত তাদের ভোট প্রয়োগ করুক সেটি তিনি চান না। বরং চান, যে কোন ভাবে নির্বাচনি বিজয়। জনগণের ভোট তাঁর কাছে সামান্যতম গুরুত্ব পেলে যে নির্বাচনে ১৫৩টি সিটে কোন ভোটকেন্দ্রই খোলা হলো না এবং শতকরা ৫ ভাগ ভোটারও ভোট দিল না -সে নির্বাচনের ফলাফল আওয়ামী লীগের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় কি করে? অন্যরাই বা এ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয় কি করে? কেয়ারটেকার সরকারের বিধান যে বিচারক বিলুপ্ত করেছেন তার কথা এটি সংবিধান বিরোধী। কথা হলো, সংবিধান বিরোধী হলে সেটিকে সহজেই সংশোধন করা যেত। তেমনি একটি সাংবিধানিক সংশোধনীতে কি দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি হতো? বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে তো সেটি না করায়। অপর দিকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে যে ভয়ানক ডাকাতি ঘটলো সেটি তো ২০১৪ য়ের ডাকাতির চেয়েও অভিনব। ২০১৪ সালে বিরোধী দলের উপর দোষ চাপানো হলো নির্বাচনে তারা অংশ না নিলে তাদের কি করার আছে? ২০১৮ সালে বিরোধী দল অংশ নিল। কিন্তু এবার ভোটের আগের রাতে সরকারি ভাণ্ডার থেকে ব্যালেট পেপার ছিনিয়ে সিল মেরে ব্যালট বক্স পূর্ণ করা হলো। নির্বাচনে জনগণকে ভোটদানের অধিকারই দেয়া হলো না।   

 

সমস্যাটি লজ্জা-শরম বিলুপ্তির

সভ্য মানুষের কাছে লজ্জা-শরমেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তাকে ঈমান ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে হয়। লজ্জা-শরমের কারণে সাধারণ মানুষ তাই অপরাধে নামে না। নবীজী (সাঃ) লজ্জা-শরমকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। ফলে লজ্জা-শরম যার নেই, ঈমানের ভাণ্ডারেও তার থাকে প্রচণ্ড শূণ্যতা। শরমের ভয় থাকাতে এমন কি চোর-ডাকাতগণও রাতের আঁধারে লুকিয়ে চুরি-ডাকাতি করে। শরমের কারণে পতিতাও রাজপথে দেহ ব্যবসায়ে নামে না, গোপন আস্তানা খোঁঝে। কিন্তু স্বৈর-শাসকদের সে লজ্জা-শরম থাকে না। ফলে ডাকাতির পণ্য ভোটের উপর ডাকাতিতে তারা নামে দিন-দুপুরে এবং জনসম্মুখে। ফলে সমাজে এরাই হলো সবচেয়ে জঘন্য অপরাধী। এবং সবচেয়ে বড় বেঈমানও। অন্য অপরাধীরা কিছু লোকের সম্পদ ও ইজ্জত লুটে, কিন্তু স্বৈর-শাসক দখলে নেয় সমগ্র দেশ। স্বৈর-শাসক এরশাদ তাঁর সে লজ্জাহীনতা বার বার প্রমাণ করেছেন। সেজন্য যথার্থই তিনি আখ্যায়ীত হয়েছেন বেহায়া ও বেঈমান রূপে। ঝাঁকের কই ঝাঁকে  চলে। বেহায়া এরশাদও তাই স্বৈরাচার বাঁচাতে হাসিনার সাথে জোট বেঁধেছে।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোট-ডাকাতির নির্বাচনে প্রমাণিত হলো  স্বৈরাচারি এরশাদের  ন্যায় শেখ হাসিনারও লজ্জা-শরমের বালাই নেই। যা আছে তা হলো ক্ষমতার নেশা। নেশাগ্রস্ততার কারণেই তিনি জনগণের ভোটের অধিকারের উপর ডাকাতি করেছেন দিনের আলোয় হাজার হাজার মানুষের চোখের সামনে। তাই লজ্জাহীন হওয়াটি শুধু ড্রাগ-এ্যাডিক্টদের রোগ নয়; একই রোগ পাওয়ার-এ্যাডিক্টদেরও। সেটিই শেখ হাসিনা বার বার প্রমাণ করে চলেছেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ডাকাতিটি কোন ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল সমগ্র জনগণের ভোটের উপর। জনগণের কাছে এ ভোটের গুরুত্বটি অপরিসীম। কে সংসদে বসবে বা মন্ত্রী -হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধীকারটি শেখ হাসিনার নয়, সেটির হক একমাত্র জনগণের। জনগণ নিজেদের সে অধীকারটি প্রয়োগ করে রাজস্ব বা শ্রম দিয়ে নয়, বরং ভোট দিয়ে। অথচ শেখ হাসিনারও পছন্দ হয়নি জনগণ সে অধীকারের মালিক হোক। তাই ডাকাতির মাধ্যমে জনগণের সে অধীকারকে তিনি ছিনিয়ে নিয়েছেন। জনগণ পরিনত হয়েছে তাঁর স্বৈরাচারি আচরণের শক্তিহীন নীরব দর্শকে। জনগণের বদলে সংসদের সদস্য নির্বাচন করেছেন তিনি নিজে, সেটি দলীয় মনোনয়ন দিয়ে। রাজা-বাদশাহদের জনগণের ভোটের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয়নি হাসিনার দলের সংসদ সদস্যদেরও। ২০১৪ সালের ভোট ডাকাতির বদৌলতে তারা ৫ বছর সংসদে বসেছেন। ২০১৮ সালে সে মেয়াদেরই নবায়ন করে নিল আরেক ডাকাতি করে।

 

মহামারিটি বিবেকের অঙ্গণে

আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধজীবীদের ব্যর্থতাটিও কি কম? জনগণের অধিকারের প্রতি যাদের সামান্যতম দরদ ও শ্রদ্ধাবোধ আছে -তারা কি গুরুতর ভোট-ডাকাতিকে সমর্থন করতে পারে? কিন্তু সে দরদ ও বিবেকের প্রকাশ নেই আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের মাঝে। এখানে মহামারিটি তাদের বিবেকের অঙ্গণে। দেহের মৃত্যুর ন্যায় বিবেকের মৃত্যুও কখনো গোপন থাকে না। বিবেকের সে মৃত্যুটি বাংলাদেশে কতটা ব্যাপক সেটি বুঝা যায় দেশের পত্র-পত্রিকার পৃষ্ঠা, টিভি অনুষ্ঠান ও সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের দিকে নজর দিলে। পত্রিকায় যারা লিখেন, সেমিনারে যারা বক্তৃতা দেন বা টিভি অনুষ্ঠানে যারা হাজির হন -তাদের কজনের মাঝে রয়েছে মিথ্যাকে মিথ্যা, অন্যায়কে অন্যায়, স্বৈরাচারকে স্বৈরাচার এবং ভোট-ডাকাতকে ভোট-ডাকাত বলার সামর্থ্য? বরং অধীকাংশই ভোট-ডাকাতদের পক্ষ নেন এবং তাদের অপরাধকে গোপন করেন। সৈয়দ আবুল মকসুদের মত বুদ্ধিজীবীদের লেখা তো তারই দৃষ্টান্ত।

সৈয়দ আবুল মকসুদের ন্যায় বুদ্ধিজীবীগণ কলম ধরার লক্ষ্য, জনগণের আহত স্মৃতির উপর মলম লাগানো। এবং ভোট ডাকাতের ইমেজ থেকে আওয়ামী লীগকে মুক্তি দেয়া। সেটি করতে গিয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ ২০১৪ সালের নির্বাচনে যা কিছু হয়েছে তার জন্য দোষ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির উপরও চাপিয়েছেন। তবে একাজে সৈয়দ আবুল মকসুদ একা নন। তাঁর ন্যায় বুদ্ধিজীবীদের বিবেকশূণ্যতা এক্ষেত্রে অতি প্রকট। এ বিষয়টি তাদের বিবেচনায় আসে না, ২০১৪ সালে দেশে যে রাজনৈতিক দলগুলি ময়দানে ছিল সেগুলি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও ছিল। তাদের কারণে সে নির্বাচনগুলোতে কি কোন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল? গাড়ি খাদে পড়ে তো নেশাগ্রস্ত চালকের কারণে, যাত্রীদের কারণে নয়। বিষয়টি অনুরূপ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বেলায়ও। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে ভোট ডাকাতি না হওয়ার কারণ, সে নির্বাচনগুলি শেখ হাসিনার ন্যায় কোন পাওয়ার-এ্যাডিক্ট স্বৈর-শাসকের হাতে হয়নি। হয়েছে কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে।

নির্বাচনের নামে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে যা কিছু হয়েছে তার জন্য অন্য কোন পক্ষ জড়িত ছিল না। জড়িত ছিল একমাত্র শেখ হাসিনার স্বৈরাচারি সরকার। নির্বাচনটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হোক সেটি কখনোই শেখ হাসিনার উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তাঁর পরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল, প্রশাসনকে ব্যবহার করে তাঁর নিজের দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করা। সে পরিকল্পনার অংশ রূপেই নির্বাচনের কিছুকাল আগে খায়রুল হকের ন্যায় একজন আজ্ঞাবাহক বিচারককে দিয়ে তিনি কেয়ারটেকার সরকারের বিধিকে বিলুপ্ত করেন। কিছুকাল পরে সে বিচারককে নিজের রিলিফ ভাণ্ডার থেকে ১০ লাখ টাকার অর্থদানও করেছেন যা পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। ফলে শুরু থেকেই নির্বাচন পরিচালনার জন্য নিরপেক্ষ নির্বাচনি কমিশন ও প্রশাসন গড়ে তোলাটি তাঁর এজেন্ডায় স্থান পায়নি। তাছাড়া কথা হলো, একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচারের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিব যাদের কাছে বাঙালী ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও অনুকরণীয় আদর্শ তাদের কাছে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন থাকবে সেটিই বা কি রূপে ভাবা যায়? তারা বরং সুযোগ পেলে মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার ফিরিয়ে আনবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। সে বাকশালী স্বৈরাচারের কারণেই দেশ বহু রাজনৈতিক দল থাকলে রাজনীতির অঙ্গণে দখলদারি মাত্র একটি দলেরই। সে বিষয়টি বাংলাদেশের নিরক্ষর কৃষক-শ্রমিকও বুঝে। কিন্তু আওয়ামী ঘরানার আবুল মকসুদগণ সেটি ইচ্ছা করেই বুঝতে রাজী নন। এর কারণ, তাদের চেতনার ভূমিতে যে চেতনাটি দখল জমিয়েছে সেটি কোন গণতান্ত্রিক চেতনার নয়; বরং সেটি মুজিবের একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচারি আদর্শের।

 

 যে ব্যর্থতা বাঙালী মুসলিমের

ডাকাতদের নেতৃত্ব ও আধিপত্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশ ঘটে একটি জনপদের অসভ্যতা। রাস্তা-ঘাট বা দালান-কোঠা দিয়ে সে অসভ্যতা ঢাকা যায় না। মিশরেরর ফিরাউনগণ অসংখ্য এবং বিস্ময়কর পিরামিড গড়েও সে অসভ্যতা ঢাকতে পারিনি। সভ্য মানুষেরা তাই সে বসতি থেকে হয় ডাকাত নির্মূল করে, নতুবা নিজেরাই অন্যত্র চলে যায়। আলো ও আঁধার যেমন একত্রে থাকে না, তেমন সভ্য ও অসভ্য মানুষেরাও কখনোই একত্রে বসবাস করে না। তাই হযরত মুসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গিসাথীগণ নিজেদের ঘরবাড়ী ও সহায়-সম্পদ জালেমদের হাতে ফেলে মিশর ছেড়েছিলেন। হযরত মহম্মদ (সাঃ) ও তাঁর সঙ্গিগণ ছেড়েছিলেন মক্কা। ইসলামে এটিই হলো পবিত্র হিজরত। স্রেফ উলঙ্গতা, ব্যাভিচার, চুরিডাকাতি, সন্ত্রাস, গরুপূজা, মু্র্তিপূজা বা লিঙ্গপূজাই কোন জাতির অসভ্যতার মূল মাপকাঠি নয়। অসভ্যতার অতি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভূল মাপকাঠি হলো দেশের উপর স্বৈরাচারি শাসন। কারণ, স্বৈরাচারি শাসন হলো মানুষকে বিবেকহীন, শক্তিহীন ও অসভ্য করার শয়তানের ইন্সটিটিউশন। স্বৈরশাসকদের হাতে অধিকৃত হলে সমগ্র দেশ তখন অসভ্য ডাকাত পাড়ায় পরিণত হয়। অতীতে ডাকাতদের সে অসভ্য সংস্কৃতিই জন্ম দিয়েছে উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ। আজও সে সংস্কৃতি বিলুপ্তি হয়নি।

ঈমান-আমল ও মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণের পরিমাপটি স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও দান-খয়রাত দিয়ে হয় না। সে সামর্থ্য বহু পাপী ও বহু মুনাফিকেরও থাকে। সে বিচারটি নির্ভূল ভাবে হয় রাষ্ট্রের বুক থেকে স্বৈরশাসনের অসভ্যতা নির্মূলে ব্যক্তির জান ও মালের বিনিয়োগ থেকে। নিজের স্বার্থ-উদ্ধারের লক্ষ্যে মানুষ এ ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় আপোষটি করে এবং অসভ্য স্বৈরাচারের সমর্থকে পরিণত হয়। এমন কি ধর্মের লেবাসধারিরাও। এজন্যই এজিদেরা তাদের দুর্বৃত্তিতে কখনো একাকী ছিল না। অথচ দুর্বৃত্তদের নির্মূলে কে কতটা অংশ নিল -সেটিই হলো ঈমান যাচায়ে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ঘোষিত লিটমাস টেস্ট। সেটির ঘোষণা এসেছে পবিত্র কোরআনের সুরা আল ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, তোমাদের (মুসলিমদের) উত্থান ঘটানো হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মডেল রূপে। তোমরা প্রতিষ্ঠা করো ন্যায়ের এবং নির্মূল করো অন্যায়ের। এবং তোমরা ঈমান রাখো আল্লাহর উপর। অতএব মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা এজন্য নয় যে, তারা বেশী বেশী নামায পড়ে, রোযা রাখে বা পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ গড়ে। বরং এজন্য যে, তারা অন্যায়কে নির্মূল করে এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করে। এবং মহান আল্লাহতায়ালার উপর অটল বিশ্বাস রাখে। বাংলাদেশ যখন দুর্নীতিতে বার বার বিশ্বে প্রথম হয়, তখন ঘটে উল্টোটি। তখন প্রকাশ পায়, বাঙালী মুসলিমের গভীর ব্যর্থতা।

 

সর্বশ্রেষ্ঠ নেককর্ম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব

সুরা আল ইমরানের উপরুক্ত ১১০ নম্বর আয়াত থেকে অপর যে বিষয়টি সুস্পষ্ট বুঝা যায় সেটি হলো, মানব জীবনে সবচেয়ে বড় নেক কর্ম এবং রাষ্ট্রের বুকে সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি কোটি কোটি টাকার দান খয়রাতে হয় না। বহুকোটি টাকার দান-খয়রাত বহু কাফেরও করে। বরং সর্বশ্রেষ্ঠ নেককর্মের শুরুটি হয় ব্যক্তির বিবেক ও জিহবা থেকে। বিবেকের দ্বারা সে নেক কাজটি হয় অন্যায়কে অন্যায় এবং সত্যকে সত্য রূপে চেনার মধ্য দিয়ে। বিবেকের ভূমিতে সে বিশাল বিপ্লবের কাজটি করে পবিত্র কোরআনের জ্ঞান। পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জন এজন্যই প্রতিটি নর-নারীর উপর ফরজ। এ ফরজ পালন ছাড়া কোন ব্যক্তির পক্ষে সভ্যতর মানব রূপে গড়ে উঠা অসম্ভব। সভ্যতর সমাজ বা রাষ্ট্র গড়ার মহাবিপ্লবের শুরু তো এখান থেকেই। বাঙালী মুসলিমের ব্যর্থতার কারণও মূলতঃ এখানে।

সত্যকে সত্য রূপে এবং মিথ্যাকে মিথ্যা রূপে চেনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সামর্থ্যের। ব্যক্তির বিবেকে সে সামর্থ্য না থাকলে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সত্য দ্বীন এবং মানব জীবনের মূল মিশনটিও অজানা থেকে যায়। তখন শয়তানের মিশনকে তারা নিজ জীবনের মিশন বানিয়ে নেয়। এর ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে প্রতিষ্ঠা পায় ধর্ম ও মতবাদের নামে নানারূপ মিথ্যাচার ও অসভ্যতা। দেশে দেশে রাজনৈতিক মতবাদের নামে জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং ধর্মের নামে শাপপূজা, লিঙ্গপূজা, গরুপূজা ও মুর্তিপূজার ন্যায় নানারূপ সনাতন মিথ্যা ও আদিম অসভ্যতা তো বেঁচে আছে বিবেকের সে অসামর্থ্যের কারণেই। অপর দিকে নেক আমলে এবং সমাজ বিপ্লবে জিহবার সামর্থটিও বিশাল। ব্যক্তির জিহবা শক্তিশালী হাতিয়ার রূপে কাজ করে সত্যের পক্ষে ও মিথ্যার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে। বিবেক ও জিহবার সে সামর্থ্যের বলেই একজন ঈমানদার যেমন জনসম্মুখে কালেমায় শাহাদত পাঠ করে, তেমনি দুর্বৃত্ত স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধেও আমৃত্য সৈনিক রূপে খাড়া হয়। প্রবল বিক্রমে সে প্রতি অঙ্গণে সাক্ষ্য দেয়, মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের পক্ষে। এরাই স্বৈরশাসকের নির্মূলে এবং সত্যদ্বীনের প্রতিষ্ঠায় নিজের জান ও মাল নিয়ে জিহাদে নামে।

নবী-রাসূলদের মূল কাজ তো ব্যক্তির বিবেক ও জিহবার সামর্থ্য বৃদ্ধি। এ কাজে মূল হাতিয়ারটি হলো পবিত্র ওহীর জ্ঞান। জ্ঞানের সে সমৃদ্ধিতেই ঘটে মানব জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব। তখন ব্যক্তি খুঁজে পায় সিরাতুল মুস্তাকীম। জ্ঞান-সমৃদ্ধ বিবেকের সামর্থ্যেই ব্যক্তি পায়, সত্যকে চেনা ও জান্নাতের পথে চলার সামর্থ্য। নইলে মানুষ যেমন বিবেকহীন হয়, তেমনি মিথ্যাবাদী এবং দুর্বৃত্তও হয়। এমন বিবেকহীন মানুষই স্বৈরশাসকের সেবাদাসে পরিণত হয়। নবী-রাসূলগণ অর্থশালী ছিলেন না, তারা বড় বড় নেক কাজ করেছেন তাদের জ্ঞানসমৃদ্ধ বিবেক দিয়ে ও সাহসী জিহবা দিয়ে। তাঁরা জিহবাকে কাজে লাগিয়েছেন নির্ভয়ে জ্ঞানদানে ও সত্যের পক্ষে সাক্ষদানে। তাদের জ্ঞান-সমৃদ্ধ সে বিবেক ও জিহবা নিয়োজিত হয়েছিল অন্যায়, অসত্য ও স্বৈরাচার নির্মূলে। তাঁরা বীরদর্পে দাঁড়িয়েছেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। সে কাজ করতে গিয়ে হাজার হাজার নবী-রাসূল শহীদ হয়েছেন। সাহাবাগণ তাদের পথ বেয়েই সামনে এগিয়েছেন। এবং তাদের প্রচেষ্ঠাতেই নির্মিত হয়েছে মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।

আখেরাতে যারা জাহান্নামের বাসিন্দা হবে তাদের অধিকাংশ যে মানুষ খুন বা ব্যাভিচারের জন্য সেখানে যাবে -তা নয়। তারা সেখানে পৌঁছবে মিথ্যার পক্ষে সাক্ষী দেয়া এবং মিথ্যা-সেবী অপরাধীদের দলে শামিল হওয়ার কারণে। এরূপ মিথ্যা-সেবীদের খাসলত, তারা নিজেদের জিহবাকে ব্যবহার করে জালেম  সরকারের পক্ষে জিন্দাবাদ বলায়। বিবেককে ব্যবহার করে জাতিয়তাবাদী ও ফ্যাসিবাদী সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়া, মিছিল করা ও ভোট দেয়ার কাজে। বাংলাদেশে রাজনীতির নামে এমন অপরাধই তো বেশী বেশী হচ্ছে। এখানেই বাঙালী মুসলিমের বিশাল ব্যর্থতা। সে ব্যর্থতার কারণে অপরাধী স্বৈরশাসকগণ যেমন সমর্থণ পায়, ভোট পায় এবং অর্থ পায়, তেমনি ভ্রষ্ট মতবাদ, দূষিত শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং শরিয়ত বিরোধী আইনও প্রতিষ্ঠা পায়। বস্তুতঃ এরূপ বিবেকহীনদের বিপুল সংখ্যার কারণেই বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের লোকবলের অভাব হচ্ছে না। এতে পরাজয় বাড়ছে যেমন ইসলামের, তেমনি পাপ বাড়ছে মুসলিমদের। কথা হলো, স্রেফ নামায-রোযা পালন বা মসজিদ-মাদ্রসা গড়ে কি পরকালে এ পাপের শাস্তি থেকে মুক্তি মিলবে?

বাংলাদেশের মুসলিমগণ বিশেষ করে আলেমগণ বেশী বেশী নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের কথা বলে। প্রশ্ন হলো, নবীজী (সাঃ)র সূন্নত কি স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত, দান-খয়রাত, লম্বা জোব্বা বা দাড়ি টুপি?  সেটি কি স্রেফ মসজিদ-মাদ্রসার প্রতিষ্ঠা? সেটি তো জিহাদ। সেটি তো মহান আল্লাহতায়ালার কোরআনী বিধানের প্রতিষ্ঠায় জানমালের কোরবানী। সেটি দুর্বৃত্ত শাসকের নির্মূল ও শরিয়তি শাসনের প্রতিষ্ঠা। একমাত্র এভাবেই তো আসে ইসলামের  বিজয়। নবীজী (সাঃ)র সাহাবায়ে কেরামের যুগকে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ বলা হয়। কিন্তু কেন সেটি সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ? সে আমলে আজকের ন্যায় এতবড় বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা ও এত মসজিদ-মাদ্রাসা ছিল না। তাদের গৌরবের  মূল কারণ, একমাত্র তাদের আমলেই পূর্ণাঙ্গ ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ইসলামের শরিয়তি বিধান, হুদুদ,জিহাদ, খেলাফত ও শুরাভিত্তিক শাসনএবং নির্মূল হয়েছিল স্বৈরাচারি অসভ্যতা। এটিই ছিল মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লব। সে বিপ্লব সফল করতে শতকরা ৭০ ভাগ সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। নবীজী (সাঃ) জিহাদের ময়দানে নেমেছেন এবং তিনি নিজে আহত হয়েছেন। বাংলাদেশের ওলামাগণ নবীজী (সাঃ)র প্রতি মহব্বত ও তাঁর সূন্নত পালনের কথা বললেও তাদের জীবনে সে সূন্নত নেই। পবিত্র কোরআনের জ্ঞান, ৫ ওয়াক্ত নামায, মাসব্যাপী রোযা, হজ-যাকাত, দান-খয়রাত ও নানারূপ ইবাদতের উদ্দেশ্য তো তেমন একটি নৈতীক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের জন্য ঈমানদারকে প্রস্তুত করা। বাঙালী মুসলিমেদর দ্বারা সে কাজটি হয়নি। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের শত্রুপক্ষের প্রতিপত্তি ও বিজয়ই বলে দেয়, ১৬ কোটি বাঙালী মুসলিমের ব্যর্থতাটি কত বিশাল। তাদের সে ব্যর্থতা আনন্দ বাড়িয়েছে ইসলামের শত্রুদের। আর শত্রুর বিজয় মুসলিম জীবনে দুঃসহ আযাব আনবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। ৮/৭/২০১৮; নতুন সংস্করণ ১৯/০৩/২০১৯   Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal

 




বাংলাদেশে স্বৈরাচারি অসভ্যতা ও মৃত গণতন্ত্র

মৃত গণতন্ত্র ও অসভ্যতা

বাঁচার অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার এবং দেশের ভাগ্য নির্ধারণে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে কবরে পাঠিয়ে যে বাঁচা -তাতে সভ্য ভাবে বাঁচার কাজটি হয় না। সেটি নিরেট বর্বর যুগের অসভ্যতা। সে অসভ্যতা তাদের হাতেই প্রচণ্ড রূপ লাভ করে যাদের যুদ্ধের মূল লক্ষ্য জনগণের অধিকার হনন। বাংলাদেশের মাটিতে জনগণের অধিকার নির্মূলের যুদ্ধটি প্রথম শুরু করেন শেখ মুজিব। সে যুদ্ধে তিনি বিজয় লাভ করেন একদলীয় বাকশালের প্রতিষ্ঠা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠানোর মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্র বলতে আওয়ামী লীগ যা বুঝে তা হলো ১৯৭৩, ২০১৪ এবং ২০১৮’য়ের ভোট ডাকাতির নির্বাচন। এসব নির্বাচনে জনগণের স্বাধীন রায় দেয়ার অধিকার যেমন দেয়া হয়নি, তেমনি বিরোধীদের জন্য সংসদে কোন স্থানও রাখা হয়নি। শেখ মুজিবের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যুদ্ধ থামেনি। বরং সে যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় বাকশালী চেতনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ শুধু জীবিতই নয়, এক বিজয়ী আদর্শে পরিণত হয়েছে। চলমান এ যুদ্ধে তাদের প্রতিপক্ষ হলো জনগণ। তাদের লক্ষ্য স্রেফ দেশকে অধিকৃত রাখা নয়, জনগণকে পরাজিত এবং নিরস্ত্র রাখাও। আরো লক্ষ্য হলো, তাদের বিদেশী  প্রভু ভারতকে খুশি রাখা। স্বৈরশাসকগণ জানে, জনগণের মোক্ষম  অস্ত্রটি ঢাল-তলোয়ার বা গোলাবারুদ নয়, সেটি হলো ভোট। সে ভোট দিয়েই জনগণ তাদের ইচ্ছামত কাউকে ক্ষমতায় বসায়, কাউকে নামায় এবং কাউকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে। গণতন্ত্রে জনগণের শক্তি তাই বিশাল। এ শক্তিবলে বড় বড় স্বৈরশাসককে জনগণ অতীতে আস্তাকুঁড়ে ফেলেছে। এজন্যই প্রতিটি স্বৈরশাসক গণতন্ত্রকে ভয় পায়। তারা জনগণের ভোটে ক্ষমতাচ্যুৎ হওয়া থেকে বাঁচতে চায়। তাদের লক্ষ্য তাই জনগণের হাত থেকে ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া। ফলে  স্বৈরশাসক মাত্রই গণতন্ত্রের চিরশত্রু। স্বৈরতন্ত্র ও গণতন্ত্র –এ দুটি কখনোই একই ভূমিতে একত্রে বাঁচে না; একটির বাঁচা মানেই অপরটির মৃত্যু। জনগণের ভোটের অধিকার, মিছিল-মিটিং করার অধিকার ও মৌলিক মানবিক অধীকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও নৃশংস সহিংসতা ছাড়া স্বৈরশাসনের মৃত্যু তাই অনিবার্য়। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়ামী বাকশালীদের লাগাতর ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধের মূল কারণ তো এটিই।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে তিনবার কবরে পাঠিয়েছে। প্রথমে কবরে পাঠানোর কাজটি করেন শেখ মুজিব নিজে; সেটি সকল বিরোধী দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। লক্ষ্যণীয় হলো, মুজিবের হাতে গণতন্ত্র হত্যার সে গণবিরোধী গর্হিত কর্মটি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে কোনদিনই নিন্দনীয় গণ্য হয়নি। বরং তাদের কাছে গণতন্ত্র হত্যার সে স্বৈরাচারি নায়ক গণ্য হয় শ্রেষ্ঠ আদর্শ রূপে, এমনকি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী রূপে! ফলে এতে প্রমান মেলে,গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থানটি স্রেফ মুজিবের একার ছিল না, সেটিই ছিল আওয়ামী লীগের দলগণ অবস্থান। দলটি দ্বিতীয়বার গণতন্ত্র হত্যার কাজটি করে ১৯৮২ সালে; সেটি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে জেনারেল এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থণের মধ্য দিয়ে। লক্ষ্যণীয় হলো, সামরিক অভ্যুত্থানকে নিন্দা করাই বিশ্বের তাবত গণতান্ত্রিক শক্তির রীতি। কারণ, সামরিক অভ্যুত্থানে কোন দেশেই গণতন্ত্র বাঁচেনি, বরং সামরিক অভ্যুত্থানই হলো দেশে দেশে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার মূল হাতিয়ার। ফলে সামরিক জান্তাদের হাতে গণতন্ত্র হত্যার সে বর্বর কাজটিকে নিন্দার সামর্থ্য না থাকলে তাকে গণতন্ত্রী বলাটি মূলতঃ গণতন্ত্রের সাথে দুশমনি। গণতান্ত্রিক চেতনার মূল্যায়নে এটি হলো লিটমাস টেস্ট। কিন্তু সে টেস্টে আওয়ামী লীগ ফেল করেছে। কারণ, স্বৈরাচারি এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানকে আওয়ামী লীগ নিন্দা না করে বরং সমর্থন করেছে। এবং আজও গণতন্ত্র-হত্যাকারি স্বৈরাচারি এরশাদই হলো শেখ হাসিনার ঘনিষ্ট রাজনৈতিক মিত্র। এ হলো আওয়ামী লীগের স্বৈরাচার প্রীতির নমুনা। গণতন্ত্রকে তৃতীয়বার এবং সবচেয়ে বেশী কালের জন্য কবরে পাঠিয়েছেন দলটির বর্তমান নেত্রী শেখ হাসিনা। সেটি ২০১৪ সালে ভোট-ডাকাতি ও ভোটাবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে। জনগণের ভোটের ভাণ্ডারে শেখ হাসিনা পুণরায় ডাকাতি করে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে। ডাকাতগণ কখনোই নিজেদের নৃশংস ডাকাতি নিয়ে লজ্জাবোধ করে না। বরং প্রচণ্ড গর্ববোধ করে সফল ডাকাতির। এজন্যই হাসিনার মুখে সব সময়ই খুশি খুশি তৃপ্তির হাঁসি। রায় দানের অধিকার ছিনতাইয়ের পর জনগণের কাজ এখন হাসিনার ফেরেশতা সুলভ কথা এবং হাসির মহড়া দেখা। এটিই তো স্বৈরাচারের রীতি। বাংলাদেশে নবী-রাসূলকে নিন্দা করলে শাস্তি হয় না। কিন্তু হাসিনার নিন্দা করলে জেলে যেতে হয়।

সামরিক অভ্যুত্থানে যেমন গণতন্ত্র বাঁচে না, তেমনি ভোট-ডাকাতিতেও গণতন্ত্র বাঁচে না। ফলে কেয়ার টেকার গভর্নমেন্টের হাত ধরে যে গণতন্ত্র কবর থেকে ফিরে এসেছিল -সেটি আবার হাসিনার হাতে নিহত ও কবরে শায়ীত। তবে ভোট ডাকাতি ও গণতন্ত্র হত্যাই শেখ হাসিনার একমাত্র অপরাধ নয়। তিনি তাঁর পিতার বাকশালকে প্রতিষ্ঠা করেছেন এক নতুন আঙ্গিকে। শেখ মুজিব সকল বিরোধী দলকে বিলুপ্ত করেছিলেন এবং নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দলীয় পত্রপত্রিকা। শেখ হাসিনা বিরোধী দলগুলিকে বিলুপ্ত না করে বিলুপ্ত করেছেন বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মৌলিক মানবিক অধিকার। কেড়ে নিয়েছেন সভাসমিতি, মিছিল, জনসংযোগের অধিকার। নিষিদ্ধ করেছেন আমার দেশ, দিগন্ত টিভি, ইসলাম টিভি। ফলে বিরোধীদলগুলো নামে বাঁচলেও বিলুপ্ত হয়েছে সংসদ, রাজপথ ও মিডিয়া থেকে। গণতন্ত্র নির্মূলে শেখ হাসিনা তাঁর পিতা থেকেও বহু ধাপ এগিয়ে গেছেন। বিরোধী দলের মিটিংয়ে গুলি চালাতে ও বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যায় শেখ মুজিব কখনো সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেননি। সে কাজে তাঁর ছিল একটি মাত্র বাহিনী, সেটির নাম ছিল রক্ষিবাহিনী। কিন্তু শেখ হাসিনা রক্ষি বাহিনী না গড়ে সেনাবাহিনী, বিজিবী, পুলিশ ও RAB (রাপিড আকশন ব্যাটিলন)কে রক্ষিবাহিনীতে পরিণত করেছেন। ২০১৩ সালের ৫ই শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে গণহত্যায় গোলাবারুদ ও ভারী মেশিন গান নিয়ে সাত হাজারের বেশী সশস্ত্র সেপাই যোগ দিয়েছিল। তারা এসেছিল উপরুক্ত চারটি বাহিনী থেকে।

জনগণের ভোটাধীকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার ঘৃণা কতটা তীব্র সেটি বুঝা যায় ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে সংসদের ১৫৩টি সিটে তিনি ভোটকেন্দ্র খোলার প্রয়োজন বোধ করেননি। অপর দিকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র খোলা হলেও ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের কাজটি পূর্বের রাতেই সমাধা করা হয়। ফলে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট না দিয়েই ভোটারদের ফিরে আসতে। মানব ইতিহাসে গণতন্ত্র হত্যার এ এক নয়া রেকর্ড। ঘৃনা সব সময়ই ঘৃনার জন্ম দেয়। গণতন্ত্রের প্রতি শেখ হাসিনার মনে যে ঘৃণা তা জনগণের মনে প্রচণ্ড ভাবে জন্ম দিয়েছে তাঁর স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা। সে ঘৃণার তীব্র প্রকাশ ঘটেছিল তার আয়োজিত ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করার মধ্য দিয়ে। ফলে ২০১৪ সালের নির্বাচনে শতকরা ৫ ভাগ ভোটারও ভোট দেয়নি।

নির্বাচনের লক্ষ্য তো জনগণের রায় নেয়া। সেটি অর্জিত না হলে কি তাকে নির্বাচন বলা যায়? বিশ্বের আর কোন দেশে কোন কালেই কি এরূপ ভোটারহীন নির্বাচন এবং ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের নির্বাচন হয়েছে? অথচ শেখ হাসিনা তো তাতেই খুশি। শেখ হাসিনার লক্ষ্য ছিল তাঁর দলের বিজয়, নির্বাচন কতটা সুষ্ঠ বা নিরপেক্ষ হলো এবং জনগণ তাতে কতটা অংশ নিল –তা নিয়ে তাঁর সামান্যতম আগ্রহ ছিল না। এ হলো তাঁর গণতন্ত্রের নমুনা। গণতন্ত্র হত্যায় আওয়ামী লীগ এভাবে স্বৈরাচারি এরশাদের চেয়েও বহুধাপ নিচে নেমেছে। ভোটারগণ তো তখনই ভোটকেন্দ্রে আসে যখন নির্বাচনে বিরোধীদল অংশ নেয়, নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হয় এবং তারা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর বিজয়ে সম্ভাবনা দেখে। কিন্তু যে নির্বাচনের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য হলো, স্রেফ সরকারি দলকে যে কোন রূপে বিজয়ী করা –সে নির্বাচনে জনগণ ভোটকেন্দ্রে আসবে কেন? এজন্যই স্বৈরশাসকের আয়োজিত নির্বাচনগুলি নিতান্তই প্রহসন ও গণতন্ত্রের সাথে মশকরা ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

 

স্বৈরাচারঃ অসভ্যতার প্রতীক

সভ্যতার ন্যায় অসভ্যতার নিজস্ব আলামত আছে। সেটি শুধু জন্তু-জানোয়ারের ন্যায় বনেজঙ্গলে বা গুহায় বসবাস নয়। বরং সে নিরেট অসভ্যতার প্রকাশটি বাড়ি-গাড়ি, রাস্তাঘাট ও অফিস-আদালতে পরিপূর্ণ আধুনিক শহরেও হতে পারে। বন-জঙ্গলের ন্যায় এসব শহরেও তখন বিলুপ্ত হয় ন্যায়-নীতি, আইন-আদালত ও ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধ। অসভ্যতার সে আয়োজনে কাজ করে সন্ত্রাসের শক্তি। যার শক্তি আছে সে যাকে ইচ্ছা তাকে ধরতে পারে, গুম করতে পারে, খুন করতে এবং ধর্ষণও করতে পারে। রিমান্ডে নিয়ে দিনের পর দিন নির্যাতনও করতে পারে। সে অসভ্যতায় এমন কি ৭-৮ বছরের বালিকাকে ধর্ষিতা হতে পারে। এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গণে ধুমধামে শত নারী ধর্ষণের উৎসবও করতে পারে –যেমনটি শেখ হাসিনার প্রথমবার ক্ষমতায় আসাতে জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা করেছে। পত্রিকায় সে খবর ফলাও করে প্রকাশও পেয়েছে। এ অসভ্যতার আরো আলামত হলো, জঙ্গলে কেউ গুম, খুন বা ধর্ষিতা হলে যেমন বিচার বসে না, তেমনি আধুনিক অসভ্যতাতেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোন বিচার বসে না। তাই বাংলাদেশের রেকর্ড শুধু দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বচাম্পিয়ান হওয়ায় নয়, বরং দুর্বৃত্তদের বিচার না করারও।  জঙ্গলের অসভ্যতায় ভাল-ভালুকের সামনে ছাগল-ভেড়ার জীবনে নিরাপত্তা থাকে না। তেমনি স্বৈরাচারের অসভ্যতায় নিরাপত্তা থাকে না নিরীহ সাধারণ মানুষের -বিশেষ করে সরকারবিরোধীদের। আদিম অসভ্যতার ন্যায় এখানেও হুকুম চলে একমাত্র দলীয় প্রধান বা স্বৈরশাসকের। অন্যরা পরিণত হয় চাকর-বাকরে। রাষ্ট্রের অর্থ, অস্ত্র এবং সকল সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তি পরিণত হয় স্রেফ স্বৈরশাসকের ত্রাস সৃষ্টির হাতিয়ারে।

তবে বন-জঙ্গলের অসভ্যতা ও স্বৈরাচারের অসভ্যতার মাঝে মৌলিক কিছু পার্থক্যও আছে। হিংস্র জন্তুর সহিংসতায় থাকে নিছক প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ। পেট পূর্ণ হলে তারা শিকার ধরে না। শিকার হত্যায় পশুদের মাঝে একটি নিয়ন্ত্রন দেখা যায়। ফলে বনে জঙ্গলে কখনো লাশ পড়ে থাকে না। ফলে গণনির্মূলের ন্যায় জঙ্গলে কখনো পশুনির্মূল হয় না। তাই পশুদের নৃশংসতায় স্ব-আরোপিত নিয়ন্ত্রণ থাকে। অথচ সেরূপ নিয়ন্ত্রণ থাকে না স্বৈরাচারের অসভ্যতায়। এজন্যই কোন দেশের বনজঙ্গলে বিপুল সংখ্যক হিংস্র পশুর বসবাস হলেও তাতে দেশ অসভ্যতায় ইতিহাস গড়ে না। কিন্তু সেটি হয় দেশের লোকালয়ে স্বৈরাচারি নেতাকর্মীদের সংখ্যা বাড়লে। স্বৈরাচারি নেতাকর্মীগণ নৃশংসতায় নামে স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে নয়, বরং নিজেদের জুলুমবাজীর সংস্কৃতি বাঁচাতেও। কারণ জুলুমবাজী না বাঁচলে তাদের স্বৈর শাসন বাঁচে না। ফলে গুম, খুন, গণগ্রেফতার, গণহত্যা, গণনির্মূল –এসবই স্বৈরাচারি অসভ্যতার সহজাত সংস্কৃতি।  এবং থাকে সে নৃশংস অসভ্যতাকে একটি সভ্য রূপ দেওয়ার আয়োজন। সে অসভ্যতা বাঁচাতে যেমন নিত্য নতুন আইন তৈরী করা হয়, তেমনি আদালত বসিয়ে বিচারের নামে প্রহসনও হয়। এসব কিছুই হয় বিরোধীদের নির্মূলের কাজকে বৈধতা দিতে। যেমন রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নৃশংস গণহত্যা ও উচ্ছেদের ন্যায় নিরেট অসভ্যতাকে আইনসিদ্ধ করতে মায়ানমারে আইন তৈরী করা হয়েছে। অনুরূপ রাষ্ট্রীয় অসভ্যতার কারণেই জার্মানীতে বহু লাখ ইহুদীকে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করাকেও আইনের শাসন বলা হয়েছে। তেমনি বাংলাদেশেও আইনের শাসন রূপে গণ্য হয়েছে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের শত শত কর্মীকে নিহত ও আহত এবং হত্যা শেষে তাদের লাশ গুম করার ন্যায় অসভ্যতা। একই রূপ আইনের শাসনের নাম করে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে। আইনের শাসনের দোহাই দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা-নেত্রীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা খাড়া করা হচ্ছে। এভাবে আইন-আদালত ও প্রশাসন পরিণত হয়েছে স্বৈরাচারি অসভ্যতাকে দীর্ঘজীবী করার হাতিয়ারে।

 

কোয়ালিশন স্বৈরাচারি শক্তির

গণতন্ত্রের প্রাণ হলো, কে দেশের শাসক হবে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নেয়া। সেটি না হলে মৃত্যু ঘটে গণতন্ত্রের। অথচ ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জনগণ সে রায় দেয়নি। এমন নির্বাচন বার বার হলেও তাতে গণতন্ত্র বাঁচে না। ফলে যারা ক্ষমতায় বসেছে তারা গণতন্ত্রের নিজস্ব সংজ্ঞায় পুরাপুরি অবৈধ। জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে এবং সামান্যতম আত্মসম্মান থাকলে এমন প্রহসনের নির্বাচনকে ভিত্তি করে কেউ কি ক্ষমতায় বসতে পারে? আত্মসম্মান ও জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকাতেই ডাকাতগণ অন্যের গৃহে ঢুকে এবং তাদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়। একই রোগ তো স্বৈর শাসকের। একই রোগ সামরিক জান্তাদেরও। তারাও জনগণের অনুমতি না নিয়েই রাষ্ট্রের ঘরে ঢুকে। জনগণের শাসক রূপে নিজেদের ঘোষনা দেয়। ফলে যাদের মধ্যে সততা, মানবতা ও সামান্যতম বিবেকবোধ আছে এবং জনগণের মৌলিক অধিকারকে যারা সমর্থন করে -তারা কখনোই স্বৈরাচারের পক্ষ নেয় না। পক্ষ নেয় না সামরিক স্বৈরশাসকেরও। অথচ বাংলাদেশ গণতন্ত্র মারা পড়েছে যেমন স্বৈরশাসকের অধীনে অনুষ্ঠিত ভূয়া নির্বাচনে, তেমনি সামরিক অভ্যুর্থানে। আরো লক্ষ্যণীয় হলো, বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যার সবগুলি অপরাধের সাথেই আওয়ামী লীগ জড়িত। এমন কি পাকিস্তানী আমলেও দলটির ভূমিকা আদৌ কম কদর্যপূর্ণ ছিল না। আওয়ামী লীগের নেতারা ঢাকার প্রাদেশিক আইন পরিষদের ডেপুটি স্পীকার জনাব শাহেদ আলিকে সহিংস ভাবে হত্যা করেছিল। এবং সে হত্যাকাণ্ডের তারা বিচার করেনি। লক্ষণীয় হলো, পাকিস্তানের অন্য কোন প্রদেশের আইন পরিষদের অভ্যন্তরে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড কখনোই ঘটেনি; কারণ সেসব প্রদেশের সংসদে আওয়ামী লীগ ছিল না।

আওয়ামী বাকশালীদের বর্তমান যুদ্ধটি মূলতঃ সে সব বিরোধী দলের বিরুদ্ধে যারা গণতন্ত্রকে কবর থেকে আবার ফিরিয়ে আনতে চায়। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ চালিয়ে নিতে শেখ হাসিনা কোয়ালিশন গড়েছেন এরশাদের ন্যায় এক সাবেক স্বৈরশাসকের সাথে। সাথে নিয়েছেন গণতন্ত্র বিরোধী ও গণবিচ্ছিন্ন বামপন্থিদের। আওয়ামী বাকশালীদের এরূপ গণবিরোধী ভূমিকার কারণে গণতন্ত্র চর্চায় তুরস্কো, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, তিউনিসিয়া, লেবানন, নাইজিরিয়ার মত মুসলিম দেশগুলি বহুদূর এগিয়ে গেছে। এগিয়ে গেছে শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটানের ন্যায় দেশগুলিও। অথচ বাংলাদেশ রয়ে গেছে ৪৬ বছর পূর্বের মুজিব-প্রবর্তিত স্বৈরাচারি বাকশালী জামানায়। বাংলাদেশীদের আজকের পিছিয়ে পড়া নিয়ে বহুশত বছর পরও নতুন প্রজন্মের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন উঠবে এবং সে সাথে ধিক্কারও উঠবে, “আমাদের পূর্বপুরুষগণ কি এতই অসাধু ছিল যে, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ন্যায় সভ্য কাজের সামান্য সামর্থ্যও তাদের ছিল না? অভিযোগ উঠবে, জনগণ কি এতই অযোগ্য ছিল যে, ব্যর্থ হয়েছে গণতন্ত্রের শত্রু নির্মূলে?”

প্রশ্ন হলো, আগামী প্রজন্মের দরবারে সে ইজ্জতের ভাবনা কি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আছে? সে ভাবনা যে নাই –সেটিই প্রকাশ পাচ্ছে নানা ভাবে। সে ভাবনা থাকলে তো আজকের বিশ্ববাসীর সামনেও তারা নিজেদের ইজ্জত নিয়ে ভাবতো। আত্মসম্মানের সে ভাবনায় অসম্ভব হতো দূর্নীতিতে বাংলাদেশের ৫ বার বিশ্বে প্রথম হওয়া। অসম্ভব হতো ভোটডাকাতি করা। তবে তেমন একটি সুস্থ্য ভাবনা না থাকার যথেষ্ঠ কারণও আছে। সেটি হলো, সভ্যতা, সম্মান  ও অগ্রগতি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অদ্ভুত বিপরীতমুখী ভাবনা ও মূল্যবোধ। সে ভ্রষ্ট ভাবনার কারণে বাকশালী স্বৈরাচারকে তারা যেমন গণতন্ত্র বলে, তেমনি ১৫৩ সিটে নির্বাচন না করাকেও সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলে। এবং দেশের পিছিয়ে পড়াকেও অগ্রগতি বলে। গলা উঁচিয়ে আরো বলে, দেশ দ্রুত উন্নত দেশগুলির কাতারে শামিল হচ্ছে। এমন মানসিক বিকলাঙ্গগণ কি মানবতা বা গণতন্ত্রের বন্ধু হতে পারে? অথচ বাংলাদেশে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে যারা নিরেপক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেছিল – তারা বিদেশী ছিল না। তারা এদেশেরই সন্তান ছিল। কিন্তু সেরূপ নির্বাচন এজন্যই সম্ভব হয়েছিল যে সেগুলি আওয়ামী বাকশালীদের দখলদারিতে অনুষ্ঠিত হয়নি, হয়েছিল নির্দলীয় কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে। তেমন একটি সভ্য নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ না থাকাতে এটিই প্রমাণিত হয়, দেশ আজ কতটা অশুভ ও অসভ্য শক্তির হাতে অধিকৃত।

 

চেতনায় রাজতন্ত্র

অসভ্যতার যেমন সুস্পষ্ট প্রকাশ আছে, তেমনি আছে সভ্যতারও। স্বৈরাচার যেমন অসভ্যতার প্রতীক, তেমনি সভ্যতার প্রতীক হলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মৌলিক মানবিক অধিকার নিয়ে বাঁচা। দেশ কতটা উন্নত বা পশ্চাদপদ, সভ্য বা অসভ্য –সে বিচারটি নির্ভূল ভাবে হয় মতপ্রকাশ, ধর্মপালন, রাজনীতি ও ভোট দানের স্বাধীনতা থেকে। চলাফেরা, ঘর বাঁধা, খাওয়া-পড়া, চাষাবাদের স্বাধীনতা এমন কি ঔপনিবেশিক বিদেশী শত্রুশক্তিও অতীতে কেড়ে নেয়নি। এরূপ স্বাধীনতা যেমন দেশের পশুপাখি পায়, তেমনি পায় জনগণও। কিন্তু দখলদার শত্রুশক্তি কেড়ে নেয় স্বাধীন মতপ্রকাশ, সভাসমিতি ও রাজনীতির ন্যায় সভ্য মানুষ রূপে বাঁচার মৌলিক অধিকার। তাই স্বৈরশাসকদের  আমলে ঘরবাড়ী, দোকানপাঠ, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা ও স্কুল-কলেজ নির্মিত হলেও তাতে নাগরিক অধিকার নিয়ে বাঁচাটি নিশ্চিত হয় না। তেমনি স্বৈরশাসকদের আমলে বার বার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হলেই তাকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয় না; সেজন্য জরুরী হলো মত প্রকাশ, দল গঠন ও নির্বাচনে  অংশ নেয়ার অবাধ স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচার অধিকার। সেটি আসে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়। একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই প্রতিষ্ঠা পায় এক দল, এক মত ও এক নেতার বদলে নানা নেতা, নানা মত ও নানা দলের মূক্ত রাজনীতি। কিন্তু সে স্বাধীনতা আওয়ামী বাকশালীগণ মুজিব আমলে যেমন দেয়নি, হাসিনার আমলেও দিচ্ছে না।

গণতন্ত্রের মূল কথা, রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণে সবারই সমান অধিকার। কারো কোন বাড়তি অধিকার থাকে না। যে সম-অধিকার যেমন একজন ধনীর, তেমনি একজন গরীবেরও। ফলে নির্বাচনে কেউ যেমন দু’টি ভোটের অধিকারী নয়; তেমনি কেউ স্পেশালও নয়। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এখানেই শেখ হাসিনার প্রচণ্ড ক্ষোভ। কারণ, গণতান্ত্রিক চেনতায় বিলুপ্ত হয় তাঁর নিজের বিশেষ অধিকার। তিনি তো সাধারণ মানুষ নন। তাঁর পিতা তো জাতির পিতা। সেরূপ এক পিতার সন্তান রূপে তাঁর অধিকার তো সবার উপরে। দেশ-শাসনের অধিকার তো একমাত্র তাঁরই। রাজার সন্তানেরাই তো রাজা হয় –চেতনায় রাজতন্ত্র থাকায় শেখ হাসিনা নিজের ও নিজ পরিবারের সদস্যদের জন্য রাষ্ট্রের তহবিল থেকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার খরচ ও প্রহরার ব্যবস্থা আদায় করেছেন। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেরূপ বাড়তি অধিকার কারো থাকে না, নিরাপত্তার অধিকারটি এখানে সবার সমান। অথচ বাংলাদেশে জনগণের জীবনে সে নিপরাপত্তার অধিকার আজ সমাহিত। ফলে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবার নিরাপত্তা পেলেও হাজার হাজার বাংলাদেশী লাশ হচ্ছে, গুম  হচ্ছে, ধর্ষিতা হচ্ছে এবং পুলিশের হাতে  নির্যাতিত হচ্ছে। জনগণকে সমান ভোটাধিকার দিলে তো হরণ হয় শেখ মুজিবে কণ্যা সূত্রে তাঁর নিজের অগ্রাধিকার। তাই রাজা-বাদশাহদের ন্যায় শেখ হাসিনাও জনগণকে ভোটাধিকার দিতে রাজী নন। তাঁর ভয়, জনগণকে সে অধিকার দিলে অতীতের ন্যায় সে অস্ত্র আবারো ব্যবহৃত হবে তাঁর অপসারণের কাজে। এমন একটি ভীতি নিয়েই তিনি জনগণের হাত থেকে ভোটের অস্ত্রটি ছিনিয়ে নিয়েছেন। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এরূপ নাশকতায় তিনি স্রেফ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকেই ধ্বংস করেননি, জনগণের মৌলিক নাগরিক অধিকারগুলিকেও আবর্জনার স্তুপে ফেলেছেন। তেমন একটি গণবিরোধী ধারণার কারণেই ২০১৪ সালে ১৫৩ আসনে নির্বাচন না করাটি তার কাছে আদৌ অপরাধ গণ্য হয়নি। অপরাধ গণ্য হয়নি ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতি।

 

যে মহাবিপদ স্বৈরশাসনের

শাসক মাত্রই তার গদি বাঁচাতে শুধু প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে পরিবর্তন আনে না, পরিবর্তন আনে দেশবাসীর বিশ্বাস ও সংস্কৃতিতে। পরিবর্তন আনে কোনটি ঘৃণীত হবে এবং কোনটি গৃহিত হবে -সে বাছ-বিচারের মানদণ্ড। সংস্কৃতির নির্মাণে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবটি বিশাল। চোর-ডাকাতগণ সমাজে ঘৃণিত হয় এ কারণে যে, তাদের হাতে রাজনৈতিক দল থাকে না, থাকে না পুলিশ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী,পত্র-পত্রিতা এবং আদালত। ফলে তাদের পক্ষে কথা বলা ও তাদের বাঁচাতে লাঠি ধরার কেউ থাকে না। কিন্তু ভোট-ডাকাতদের থাকে। তাদের হাতে থাকে জনগণের মতামত ও চেতনাকে প্রভাবিত করার বিপুল ক্ষমতা। ফলে তাদের হাতে কলুষিত হয় জনগণের বিশ্বাস, রুচি এবং সংস্কৃতি। তখন ফিরাউনের ন্যায় নৃশংস স্বৈরাচারি শাসকও জনগণের কাছে খোদা রূপে স্বীকৃতি পায়। একই কারণ ভোট-ডাকাতগণও জনগণের কাছে শাসক রূপে গৃহিত হয়। স্বৈরশাসনের এটিই সবচেয়ে বড় বিপদ। বিলেতে কোন এমপি বা মন্ত্রী মিথ্যা বলেছে বা চুরি করেছে -সেটি প্রমাণিত হলে তাকে নিজ পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়। অথচ বাংলাদেশে ভোট-ডাকাতি করেও এমপি, মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায়। এর কারণ, বিলেত থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতির ভিন্নতা। বিলেতের বুকে ভিন্নতর রীতি ও সংস্কৃতির কারণ, সেখানে কোন স্বৈরাচারি শাসন নেই। তাই কোন মিথ্যুক বা চোর-ডাকাত এমপি বা মন্ত্রী হবে -সেটি জনগণ ভাবতেও পারে না।

দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে শুধু প্রশাসনকে নয়, দেশবাসীর চেতনা ও সংস্কৃতিকে কলুষিত করার পূর্ণ সুযোগ পেয়েছে আওয়ামী লীগ। সমগ্র সরকারি প্রশাসনকে তারা পরিণত  করেছে সরকারি দলের চাকর-বাকরে। সরকারি প্রশাসনের প্রতিটি বিভাগ পরিণত হয়েছে স্বৈরশাসকের ডাকাত বাহিনীতে। ফলে ভোট-ডাকাতির কাজটি এখন আর দলীয় নেতাকর্মীদের নিজ হাতে করতে হয় না, সেটি পুলিশ ও প্রশাসনের লোকেরা নিজ হাতে করে দেয়। সরকারি ডাকাত বাহিনীর অতি নৃশংসতাটি নগ্ন ভাবে দেখা গেছে ২০১৩ সালের ৫ই মে শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের কয়েক শত কর্মীকে হত্যা ও হত্যার পর লাশ গুমের কাজে। এখনো দেখা যায়, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের উপর জুলুমবাজীর ক্ষেত্রে। এরূপ ডাকাতবাহিনীর হাতে নির্বাচন যে নিছক প্রহসনে পরিণত হবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসককে উৎখাত করা এজন্যই অসম্ভব। স্বৈরাচারি এরশাদকেও তাই ভোটের মাধ্যমে উৎখাত করা যায়নি। অপসারণ করা যায়নি মিশরে হোসনী মোবারক ও তিউনিসার বিন আলীকেও। কারণ, নির্বাচনি কমিশন, প্রেজাইডিং অফিসার, ভোট কেন্দ্রের পাহারাদার –এদের সবাই নিজেদেরকে স্বৈর-সরকারের বেতনভোগী চাকর-বাকর ছাড়া বড় কিছু ভাবেনা। তারা জানে, ভোটকেন্দ্রে তাদের মূল দায়িত্বটি হলো, সরকারি দলের প্রার্থীকে যে কোন ভাবে বিজয়ী করা। তারা এটাও জানে, সরকারি  দলকে বিজয়ী করার মধ্যেই তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার।

স্বৈরশাসনের আরেক বড় অসভ্যতা হলো, এতে বিলুপ্ত হয় ন্যায় বিচার। এবং যখন বিচারে শাস্তির ভয় থাকে না তখন দেশ পরিণত হয় অপরাধীদের অভয় অরণ্যে। তখন অপরাধীগণ অপরাধ ঘটায় অতি নৃশংস ভাবে। এবং সেটি দিন-দুপুরে অন্যদের চোখের সামনে। এমন কি তখন অপরাধের আলামত গোপন করাও অপরাধীদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। বরং নিজেদের কৃত অপরাধকে বেশী বেশী জনসম্মুখে প্রকাশ করে এবং তা নিয়ে বাহাদুরি জাহির করে। তখন জনসম্মুখে রাস্তায় মানুষ খুন করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্র হাতে ছাত্রদের লাশ করা ও ধর্ষণ নিয়ে উৎসব করা, ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরে দলবল নিয়ে স্বদর্পে আড্ডা দেয়া এবং প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল মারাও অতি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে অপরাধীদের জন্য এক অভয় অরণ্যে। কোন সভ্য দেশে কি ভাবা যায়, দিনদুপুরে ডাকাতি হবে এবং ডাকাতদের শাস্তি হবে না? এটি তো অসভ্যতার আলামত। অথচ বাংলাদেশে এরূপ অসভ্যতাকে প্রবলতর করাই হলো শেখ হাসিনা এবং তার দলের প্রধানতম অবদান। চোর-ডাকাতগণ স্বভাবতঃই চুরি-ডাকাতি করে। খুনিরাও মানুষ খুন করে। সেটি সব যুগেই হয়। কিন্তু স্বৈরাচারি সরকার যেরূপ রাষ্টের বুকে অসভ্যতার জন্ম দেয়, সেরূপ অপরাধ মহল্লার চোর-ডাকাতগণ করে না।

শেখ হাসিনাও এক দিন মারা যাবেন, কিন্তু তার সৃষ্ট অসভ্যতার ইতিহাস শত শত বছর বেঁচে থাকবে। তখন কবরে শুয়ে তার লাগাতর অর্জনটি হবে কোটি কোটি মানুষের ঘৃণা ও অভিশাপ। এবং সেটি শত শত বছর ধরে। তবে স্বৈরাচারিদের স্বভাব হলো, তারা জনগণের ঘৃণা বা অভিশাপ নিয়ে ভাবে না। সে ভাবনা থাকলে তো তারা ভোট-ডাকাতি, খুন ও গুমের রাজনীতিতে নামতো না।  তারা ভাবে নিজেদের শাসনকে কী করে আরো দীর্ঘায়ীত করা যায় -তা নিয়ে। ফলে ভাবে বেশী বেশী গুম, খুন ও ভোট-ডাকাতির পরিকল্পনা নিয়ে। এটি হলো পাপের প্রতি তারা অসভ্য নেশাগ্রস্ততা। এমন নেশাগ্রস্ততা নিয়ে শেখ মুজিব গণতান্ত্রিক অধিকার হনন করে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। সেরূপ নেশাগ্রস্ততা নিয়ে ফিরাউনও হযরত মূসা (আঃ)র ন্যায় মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। প্রতিটি স্বৈর-শাসকদের এটিই হলো স্বভাব। শেখ হাসিনা হাতে বাংলাদেশে সে অসভ্যতাই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তবে পার্থক্য হলো, ফিরাউন তার ফিরামিড নিয়ে গর্ব করতো। এবং হাসিনার গর্ব হলো মানব রপ্তানি, পোষাক রপ্তানি ও চিংড়ি রপ্তানি নিয়ে। ১৮/০৩/২০১৯




স্বৈরশাসনের নিপাত কেন জরুরী?

বিপদ বিরামহীন যুদ্ধের

যে কোন মুসলিম দেশেই স্বৈরশাসনের আপদটি ভয়াবহ। ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠা দূরে থাক, তখন অসম্ভব হয় সভ্য মানুষ রূপে বেড়ে উঠা। ঘুর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, মহামারি বা প্লাবনে এতবড় বিপদ ঘটে না। ফিরাউন-নমরুদের ন্যায় তারাও মহান আল্লাহতায়ালার আযাবকে অনিবার্য করে তোলে। কারণ, এরা শুধু জনগণের শত্রু নয়, শত্রু মহান আল্লাহতায়ালারও। তাদের এজেন্ডা স্রেফ নিজেদের খেয়ালখুশির প্রতিষ্ঠা। নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা বাঁচাতে এরা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় মহান আল্লাহতায়ালার কর্তৃত্ব ও তাঁর সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে। আইন তৈরীর অধিকার তারা নিজ হাতে নিয়ে নেয়। ফলে তাদের যুদ্ধ মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়ত, হুদুদ ও কেসাসের বিধানের বিরুদ্ধে। পবিত্র কোরআন এদেরকে চিত্রিত করা হয়েছে মুস্তাকবিরীন রূপে। আরবী ভাষায় মুস্তাকবিরীন বলতে তাদের বুঝায় যারা নিজেদেরকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা বড় মনে করে। অথচ নিজেকে শ্রেষ্ঠ বা বড় মনে করার অধিকারটি একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার। মুস্তাকবিরীনদের কলাবোরেটর রূপে থাকে এমন এক দালাল শ্রেণীর দুর্বৃত্ত নেতা, কর্মী ও বুদ্ধিজীবী -যাদের কাজ স্বৈরশাসকের সকল দুষ্কর্মের সমর্থণ করা। তাদের আরো কাজ, স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে যখনই সত্য ও ন্যায়ের বানি নিয়ে ময়দানে নামে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা। হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারিদের নির্মূলে ফিরাউনের পাশে এদের অবস্থানটি ছিল তার মন্ত্রি, পরামর্শদাতা, সভাসদ, গোত্রপতি, সেনাপতি ও লাঠিয়াল রূপে। মানব ইতিহাসে এরাই হলো অতি নিকৃষ্ট শ্রেণীর দুর্বৃত্ত। এদের অপরাধ সাধারণ চোর-ডাকাতদের চেয়েও জঘন্য। সাধারণ চোর-ডাকাতগণ স্বৈরশাসকদের বাঁচাতে গণহত্যায় নামে না, কিন্তু এরা নামে। যুগে যুগে ফিরাউনগণ দীর্ঘায়ু পেয়েছে বস্তুতঃ এদের কারণেই।

পবিত্র কোরআনে ফিরাউনের ন্যায় স্বৈরশাসকদের সহযোগীদের মালাউন বলে অভিহিত করা হয়েছে। মালাউন শব্দটি মহান আল্লাহতায়ালার নিজের বাছাইকৃত বিশেষ এক বর্ণনাত্মক পরিভাষা তথা ন্যারেটিভ। এর কোন বিকল্প নেই। এর কোন অনুবাদও হয় না। মালাউন শব্দটির মধ্য দিয়ে মানব ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে মহান আল্লাহতায়ালা এমন এক শ্রেণীর দুর্বৃত্তদেরকে হাজির করেছেন -যাদের অপরাধের তুলনা একমাত্র তাদের নিজেদের সাথেই চলে। তাদের মূল অপরাধটি হলো, আল্লাহতায়ালা, তাঁর নবী-রাসূল ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। ফলে মহান আল্লাহতায়ালার ক্রোধ শুধু ফিরাউনদের উপর নয়, এসব মালাউনদের বিরুদ্ধেও। তাই মহান আল্লাহতায়ালা তাই শুধু ফিরাউনকে নয়, মালাউনদেরও ডুবিয়ে হত্যা করেছেন। পরকালে তাদের জন্য বরাদ্দ রেখেছেন জাহান্নামের অনন্ত কালের আযাব। স্বৈরাচারকে বস্তুতঃ বাঁচিয়ে এ মালাউন শ্রেণী। ফলে যে দেশেই স্বৈরাচার আছে, সে দেশেই মালাউন আছে। এসব মালাউনদের কারণেই গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে লক্ষ লক্ষ মানব হত্যার কাজটি হিটলারকে নিজ হাতে করতে হয়নি। শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যায় বা ফাঁসি ঝুলিয়ে জামায়াত নেতাদের হত্যার কাজটিও শেখ হাসিনাকে নিজে হাতে করতে হয়নি। বাংলাদেশ আজ অধিকৃত বস্তুতঃ এরূপ মালাউন শ্রেণী ও তাদের প্রভু স্বৈরশাসকের হাতে। ফলে জুলুম নেমে এসেছে সেসব নিরীহ মানুষের উপর -যারা গণতান্ত্রিক অধিকার চায় এবং ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায়।

স্বৈরশাসনের আরেকটি ভয়ানক কুফল হলো, দেশ বিভক্ত হয় দ্বি-জাতিতে। সে বিভক্তির পিছনে কাজ করে দু’টি ভিন্ন লক্ষ্য, দুটি ভিন্ন মূল্যবোধ এবং দু’টি ভিন্ন দর্শন। সে বিপরীতমুখি লক্ষ্য, মুল্যবোধ ও দর্শনকে ঘিরে শুরু হয় রাজনীতির তীব্র মেরুকরণ। এক মেরুতে অবস্থান নেয় স্বৈরশাসক ও তার অনুসারিরা; এবং অন্য মেরুতে অবস্থান নেয় স্বৈরাচারবিরোধী সকল দল ও সেসব দলের নেতাকর্মীগণ। সে মেরুকরণের রাজনীতিতে স্বৈরশাসকের পক্ষ থেকে ধ্বনিত হয় বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্মূলের চিৎকার। যেমন ফিরাউন ও তার সঙ্গি মালাউনগণ ধ্বনি তুলেছিল হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারিদের নির্মূলে এবং আবু জেহল-আবু লাহাব নির্মূলে নেমেছিল হযরত মহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারিদের। নির্মূলের লক্ষ্যে সৃষ্টিহয় যুদ্ধাবস্থা।

স্বৈরশাসক মাত্রই বিজয় খুঁজে নিরস্ত্র বিরোধীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র  যুদ্ধে। ভোটে নয়, বন্দুকের জোরে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা শুরু হয়। স্বৈর-শাসকের সে লক্ষ্য পূরণে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর লোক-লশ্করেরা পরিণত হয় চাকর-বাকরে। ফলে দেশের সেনাবাহিনী দেশ বা জনগণকে কি প্রতিরক্ষা দিবে, তারা ব্যর্থ হয় এমন কি নিজেদের অফিসারদের জীবন বাঁচাতে। তাদের সে অক্ষমতার প্রমাণ, ২০০৯ সালে ঢাকার পিলখানায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫৩ জন সেনা-অফিসারের নৃশংস মৃত্যু। পাকিস্তান ১৯৬৫ সালে ও ১৯৭১ সালে দুটি প্রকাণ্ড যুদ্ধ লড়েছে। কিন্তু কোন যুদ্ধেই দেশটির ৫৩ জন অফিসারের মৃত্যু হয়নি, কিন্তু বাংলাদেশে এতো বড় হত্যাকাণ্ড কোন রণাঙ্গণে হয়নি, বরং রাজধানীর সেনা ছাউনিতে। অন্যদের প্রাণ বাঁচানো নিয়ে স্বৈরশাসকদের গরজ থাকে না; তাদের গরজ স্রেফ নিজের গদি বাঁচানো। সে কাজে তারা ব্যবহার করে পুলিশের সাথে দেশের সেনাবাহিনীকেও। নিরস্ত্র নাগরিক হত্যায় তখন ব্যারাক থেকে হাজার হাজার সৈন্য, মেশিন গান, ভারী কামান -এমন কি টাংক নামিয়ে আনে রাজপথে। জন্ম দেয় গৃহযুদ্ধের। বাংলাদেশের দরিদ্র জনগণ সেনা বাহিনী, বিজিবি, RAB এবং মুজিব আমলের রক্ষি বাহিনী পালনে হাজার হাজার কোটি ব্যয় করেছে। বিগত ৪৬ বছরে দেশের সীমান্তে তারা কোন যুদ্ধ লড়েনি। বরং যুদ্ধ লড়েছে সে সব নিরস্ত্র নাগরিক হত্যায় -যারা তাদেরকে রাজস্ব দিয়ে পালে এবং অভিজাত এলাকায় প্লট দিয়ে রাজার হালে বাঁচার সুবিধা করে দেয়।

গণতন্ত্রে স্বৈরশাসক বাঁচে না। এজন্যই নিজেদের শাসন বাঁচাতে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারের যুদ্ধটি অবিরাম। অথচ গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অর্থ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। শেখ মুজিবের স্বৈরশাসনকে সুরক্ষা দিতে জনগণের বিরুদ্ধে সে রক্তাত্ব যুদ্ধটি লড়েছিল রক্ষি বাহিনী। তিরিশ হাজারেরও বেশী নাগরিককে তারা হত্যা করেছিল। একই কারণে শেখ হাসিনার স্বৈর শাসন বাঁচাতে  সেনা বাহিনী, বিজিবি, RAB, এবং পুলিশের সেপাহীদের এতটা নৃশংস হতে দেখা যায়। ২০১৩ সালে ৫ই মে শাপলা চত্ত্বরে এসব বাহিনীর সেপাহীগণ সম্মিলিত ভাবে গোলাবারুদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র মুছল্লীদের উপর। সে গণহত্যায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হয়েছিল। নিহতদের সংখ্যাটি গোপন করতে সরকারের আয়োজনটি ছিল চোখে পড়ার মত। হত্যাযজ্ঞ চলা কালে সেখানে কোন নিরপেক্ষ সাংবাদিককে থাকতে দেয়নি। নিভিয়ে দেয়া হয়েছিল রাস্তার আলো। খামোশ করে দেয়া হয়েছিল টিভি ক্যামেরা। ঐ রাতেই বন্ধ করে দেয় ইসলাম টিভি চ্যানেল। পেশাদার খুনি যেমন রাতের আঁধারে খুন করে পালিয়ে যেতে চায়, তেমন স্ট্রাটেজী ছিল শাপলা চত্ত্বরের খুনিদেরও। গণহত্যার কাজে সরকারি খুনিদের সুবিধাগুলি এমনিতেই বিশাল। তখন অপরাধ ঘটে এবং অপরাধের আলামত গায়েবের চেষ্টা হয় পুলিশী প্রহরায়। শাপলা চত্ত্বর থেকে লাশ গায়েব ও রক্তের দাগশূণ্য না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। গণহত্যার আলামত গায়েব করতে মিউনিসিপালিটির ময়লা বহনের গাড়িতে করে নিহতদের লাশ রাতারাতি সরানো হয়েছে। রক্ত দাগ মুছে ফেলা হয়েছে পানি ঢেলে। পরের দিন বুঝার উপায় ছিল না, সেখান কামান দাগা হয়েছে, হাজার হাজার রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে এবং শত শত মানুষকে সেখান নিহত ও আহত করা হয়েছে।

মানব ইতিহাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলি কোন কালেই হিংস্র পশুকুলের হাতে হয়নি। এমন কি ডাকাতদল বা সন্ত্রাসী দলের হাতেও নয়। এমন গণহত্যা একমাত্র জালেম স্বৈরশাসকের পক্ষেই সম্ভব। কয়েক হাজার নয়, কয়েক লক্ষ মানুষ হত্যা করলেও আদালতে তাকে আসামী রূপে দাঁড়াতে হয় না। সে হত্যাকাণ্ড নিয়ে যেমন তদন্ত হয় না, তেমনি বিচারও বসে না। ফলে কারো শাস্তিও হয় না। কারণ, স্বৈরশাসকগণ শুধু খুন, গুম, ধর্ষণের ন্যায় অপরাধকেই বেগবান করে না, অচল করে বিচার ব্যবস্থাকেও। বরং বিচারকদের উপর ফরমায়েশ দেয়া হয় বিরোধীদের ফাঁসিতে ঝুলানোর তাগিদ দিয়ে –যেরূপ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েশাস্তিযোগ্য অপরাধ স্বাইপীর কথোপকথনে ধরা পড়েছে। স্বৈরাচারি শাসনের আযাবে তাই হাজার হাজার মানুষকে লাশ হয়ে হারিয়ে যেতে হয়। কিন্তু কেন তারা লাশ হলো, কীরূপে লাশ হলো এবং কারা লাশ করলো -সে বিষয়টি কখনোই জনগণের জানতে দেয়া হয় না। সেসব নৃশংস অপরাধের ঘটনাগুলিকে বলা হয় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার গোপন বিষয়। অপরাধ গণ্য হয় সেগুলি জনগণকে জানানো। সে গোপন বিষয় যারা সাহস করে প্রকাশ করে, স্বৈর সরকার তাদেরকে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার শত্রুরূপে অভিযুক্ত করে। রিমান্ডে নিয়ে তাদের উপর নির্যাতন করে এবং দীর্ঘকালীন জেলশাস্তি দেয়।

 

অপরাধ হক কথা বলাও

স্বৈর-সরকারের ক্ষমতার কোন কোন সীমা-সরহাদ থাকে না। ইচ্ছামত তারা গ্রেফতার করে, গুম ও খুন করে, এবং সেনাবাহিনীকে দিয়ে গণহত্যা চালায়। শুধু তাই নয়, নিজ দলের ক্যাডাদের দিয়ে ধর্ষণ করায় এবং দলের নেতা-কর্মিগণ ব্যাংক, ট্রেজারি ও শেয়ার মার্কেট লুণ্ঠনে নামে। ভাবটা এমন, এসবই যেন শাসক দলের শাসনতান্ত্রিক অধিকার। তাদের কথা, ক্ষমতায় থাকতে হলে এগুলি করতেই হয়। তারা অনুসরণ করে ফিরাউন-নমরুদ-হিটলারের সুন্নত। তারা যেহেতু করে গেছে, অতএব এগুলি অপরাধ হবে কেন? তাদের বিচারই বা হবে কেন? বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ তো ঘটে যাওয়া নৃশংসা ঘটনাগুলির চিত্র বাইরে প্রকাশ করা –বিশেষ করে বিদেশীদের কানে তুলে দেয়া। তাদের কথা, এসব গোপন বিষয় অন্যরা জানলে দেশের সম্মানের ক্ষতি হয় এবং দেশের শান্তি বিনষ্ট হয়। অতএব যারাই সরকারের গোপন বিষয় প্রকাশ করে তাদের শাস্তি দেয়াই বাংলাদেশের স্বৈর-সরকারের নীতি। একই নীতি মায়ানমার সরকারেরও। এবং বিচারের রায়ে তো সেটিই কার্যকর হয় -যা সরকার চায়। সম্প্রতি মায়ানমারের সরকার “রয়টার” সংবাদ সংস্থার দুইজন বার্মিজ সাংবাদিককে এরূপ অপরাধে গ্রেফতার করেছে এবং বিচার করেছে। এবং বিচারে ৭ বছরের জেল দেয়া হয়েছে। তাদের অপরাধ, রোহিঙ্গাদের গ্রামে গিয়ে আর্মির গণহত্যা ও গণকবরের কিছু চিত্র তাঁরা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছে। একই রূপ অপরাধে বাংলাদেশের সরকার চিত্রশিল্পী শহীদুল আলমকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছে। শহীদুল আলমের অপরাধ, নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামা কিশোর বিদ্রোহীদের উপর পুলিশ ও সরকার দলীয় ক্যাডারদের নৃশংসতার কিছু বিবরণ তিনি আল-জাজিরা’কে জানিয়েছেন।

স্বৈরশাসকের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যে এক নয় –সে আইনগত ও নৈতিক বিষয়টি স্বৈরশাসগণ নিজ স্বার্থে ইচ্ছা করেই বুঝতে রাজি নয়। বুঝতে রাজী নয়, তাদের অনুগত আদালতের বিচারকগণও। ফলে প্রকাশ পায়, জনকল্যাণ নিয়ে তাদের যেমন আগ্রহ নাই, তেমনি আগ্রহ নেই অপরাধের নির্মূল নিয়েও। ফলে গরজ নেই, যেসব ভয়ংকর অপরাধীদের হাতে দেশ জিম্মি -তাদের বিচার নিয়েও। কারণ, অপরাধীগণ জনগণের শত্রু হলেও সরকারের শত্রু নয়। প্রতিবছর বাংলাদেশে একমাত্র বাস ড্রাইভারদের হাতেই প্রায় ৮ হাজার মানুষ নিহত হচ্ছে। কিন্তু তাতে স্বৈর-সরকারের ক্ষতি কি? মানুষ মারা পড়লেও স্বৈর-সরকারের কর্তাব্যক্তিদের গায়ে যে আঁচড় লাগছে না –তাতেই সরকার খুশি। অতএব, অপরাধীদের গ্রেফতার করা বা তাদের বিচার করা –সরকারের কাছে গুরুত্ব পাবে কেন? তাদের এজেন্ডা তো সরকার-বিরোধীদের নির্মূল করা। হিফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে এজন্যই শাপলা চত্ত্বরে ভারী কামান ও গোলাবারুদ দিয়ে সেনাবাহিনী নামানো হয়েছিল।

হত্যা, গুম ও নির্যাতনে স্বৈরশাসকের এতোটা নির্ভয় ও নৃশংস হওয়ার কারণ, ক্ষমতায় থাকার জন্য তাকে নিহত, আহত ও নির্যাতিতদের পরিবারের কাছে গিয়ে ভোট চাইতে হয় না। স্বৈরশাসক জানে, নির্বাচনে জিতবার জন্য জনগণের ভোটের দরকার নেই। সে কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি চাকর-বাকরগণই যথেষ্ঠ। প্রয়োজনীয় ভোট তারা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভোটের বাক্সে ঢালতে পারে। অতএব পরওয়া কিসের? ফলে গদি বাঁচাতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা, অসংখ্য নগর ধ্বংস এবং নিজ দেশে বিদেশী শত্রুদের ডেকে আনতেও তারা পিছুপা হয় না। নিজের গদি ছাড়া কোন কিছুর উপরই স্বৈরশাসকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদ তো তারই দৃষ্টান্ত। একই নীতি যে শেখ হাসিনারও। সেটি বুঝার জন্য শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার পর আর কোন প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে কি? শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যাটি কীরূপ নৃশংস এবং কতোটা বিশাল ছিল সেটি জানার জন্য google’য়ে শাপলা চত্ত্বর লিখে টোকা মারাই যথেষ্ট। তখন দেখা যায়, সে বীভৎসতার অসংখ্য ছবি।

 

যুদ্ধ ঈমান ও অধিকার বিনাশে

স্বৈর-শাসকগণ কখনোই তাদের নিজেদের শত্রুদের চিনতে ভুল করে না। কারণ, এখানে ভূল হলে তাদের শাসন বাঁচে না। তাদের সে মূল্যায়নে শত্রু রূপে গণ্য হয় যেমন সাধারণ জনগণ, তেমনি তাদের উদ্দীপ্ত ঈমান। স্বৈরশাসকগণ সব সময়ই জনগণকে দুর্বল দেখতে চায়। কারণ, একমাত্র তাতেই বাড়ে তাদের গদির নিরাপত্তা। নির্বাচন যেহেতু জনগণের শক্তি প্রয়োগের হাতিয়ার, ফলে স্বৈরাচারি শাসক মাত্রই চায় সে হাতিয়ারটি বিকল করতে বা কেড়ে নিতে। স্বৈরশাসকদের দুষমনি তাই বিশেষ কোন রাজনৈতিক দল বা কোন নেতা বা নেত্রীর বিরুদ্ধে নয়, বরং সেটি খোদ জনগণের বিরুদ্ধে। চোর-ডাকাতের অপরাধ, তারা হাত দেয় জনগণের অর্থসম্পদে। কিন্তু স্বৈরশাসকদের অপরাধ তার চেয়েও নৃশংস। তাদের হানাটি শুধু অর্থসম্পদের উপর নয়, জনগণের নাগরিক অধিকারের উপরও। ফলে স্বৈর-শাসনামলে জনগণের রাষ্ট্রীয় অর্থভাণ্ডারের উপর চুরি-ডাকাতিটা মামূলী বিষয়ে পরিণত হয়; ছিনতাই হয় জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। এবং প্রহসনে পরিণত হয় নির্বাচন।

গণতান্ত্রিক অধিকার বিনাশের পাশাপাশি নরনারীর ঈমান ধ্বংসেও স্বৈরাচারি সরকারের যুদ্ধটি লাগাতর। কারণ তারা জানে, ঈমানদার মাত্রই স্বৈরাচার নির্মূলের মিশন নিয়ে বাঁচে। স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত নিয়ে নয়, তারা বাঁচে একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়েও। সেটি হলো, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের নির্মূল। আল-কোরআনের ভাষায় “আমিরু বিল মারুফ, নেহী আনিল মুনকার।” ফলে তারা জানে, ঈমানদার ব্যক্তি কখনোই স্বৈরশাসকের মিত্র হয় না। মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সে মিশনটির কারণেই নবী-রাসুলগণ যুগে যুগে দুর্বৃত্ত শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। অপরদিকে স্বৈরশাসকগণ নেমেছে তাদের নির্মূলে। স্বৈরশাসকের এজেন্ডা তাই স্রেফ জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া বা নির্বাচন প্রক্রিয়া বিকল করা নয়, বরং জনগণের ঈমান বিলুপ্ত করাও। কারণ, স্বৈরশাসকদের সমস্যা ঈমানদারের দেহ, ভাষা বা বর্ণ নিয়ে নয়, বরং তাদের ঈমান নিয়ে। ঈমান বিলুপ্ত হলেই তাদের মিত্র হতে আর কোন বাধা থাকে না।

এজন্যই জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে রাখা এবং তাদের ঈমান, আমল ও নৈতিকতা বিনষ্ট করার কাজে স্বৈরচারি শাসকচক্রের রাজনৈতিক ও সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংটি বাংলাদেশেও চোখে পড়ার মত।  ফিরাউন, নমরুদ ও আবু জেহলগণ যুগে যুগে ইসলাম ও নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে ক্ষেপিয়েছে। মহান নবীজী (সাঃ)র গায়ে পাথর মারতে কিশোরদের উস্কে দিয়েছিল তায়েফের সর্দারগণ। অবিকল সেরূপ একটি পরিকল্পণার অংশ রূপেই বাংলাদেশের স্বৈর-সরকারও স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের রাস্তায় নামিয়েছে ইসলামপন্থি নেতাদের ফাঁসির দাবী তুলতে। ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে শহরে শহরে নির্মূল কমিটিরও জন্ম দিয়েছে। তাদের কাছে সন্ত্রাস এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো জিহাদ, শরিয়ত, হুদুদ ও খেলাফতের পক্ষ নেয়াটি।

 

সবচেয়ে বড় নাশকতাটি স্বৈর-শাসকের

মানবজীবনে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি সম্পদের ক্ষতি নয়; বরং সেটি ঘটে ঈমানের বিরুদ্ধে নাশকতায়। অথচ জনগণের বিরুদ্ধে সে ভয়ানক নাশকতাটি ঘটায় দেশের স্বৈর সরকার। সেটি শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, মিডিয়া, সাহিত্য তথা নানা রূপ সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিংয়ের মাধ্যমে। প্রশ্ন হলো, জনগণের এত বড় ক্ষতি কি কোন হিংস্র জন্তু-জানোয়ার, বিষাক্ত কীটপতঙ্গ বা রোগজীবাণূর হাতে ঘটে? সমাজের চোর-ডাকাতগণও কি মানব জীবনে এতবড় নাশকতা ঘটায়? জনগণের আর্থিক ক্ষতি করলেও তাদেরকে তারা জাহান্নামে নেয় না। ভয়নাক সে নাশকতাটি ঘটে স্বৈরাচারি সরকারের হাতে। তাই মহান আল্লাহতায়ালার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি কোটি কোটি টাকার দান-খয়রাত নয়, শত শত স্কুল- কলেজ-মাদ্রসা বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাও নয়। জঙ্গলের হিংস্র পশু বা বিষাক্ত কীট হত্যাও নয়, বরং সেটি হলো স্বৈরাচারি শাসক নির্মূল। পৃথিবীপৃষ্টে এরাই হলো শয়তানের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি। অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাদের নির্মূল ছাড়া কি ভিন্ন পথ আছে? এরূপ শাসকদের বিরুদ্ধে হক কথা বলাটিও উত্তম জিহাদ; আর তাদের নির্মূলের যুদ্ধে প্রাণ গেলে জুটে শহীদের মর্যাদা।

কোন মুসলিম দেশে স্বৈরশাসন দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার বিপদটি অতি ভয়াবহ। তারা বাঁচলে জনগণের জীবনে বাড়ে ইসলাম থেকে দুরে সরাটি। আর ইসলাম থেকে দুরে সরার অর্থ তো জাহান্নামের পথে ধাবিত হওয়া। এবং বাংলাদেশে দুরে সরানোর সে কাজটি চলছে জনগণের রাজস্বের অর্থে এবং ধর্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতি, মিডিয়া ও সাহিত্য-সংঙ্গিতের নামে। বস্তুতঃ এটি হলো জনগণকে ঈমানশূণ্য করার সরকারি পরিকল্পনা। ঈমানশূণ্য করার সে পরিকল্পনা কতটা সফল হচ্ছে সেটি বুঝা যায়, দেশে চুরি-ডাকাতি, গুম,খুন, ধর্ষণ, ব্যাভিচারি, সন্ত্রাস কতটা বাড়লো -তা দিয়ে। আরো বুঝা যায়, দুর্বৃত্তগণ দেশের রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসন ও আইন-আদালতে কতটা অধিকার জমালো এবং ফিরাউনের ন্যায় শাসকগণ কতটা আয়ু পেল -তা থেকে। এরূপ দুর্বৃত্তকরণ প্রক্রিয়া বলবান হলে ফিরাউনগণ শুধু শাসকের পদে থাকে না, তারা ভগবানেও পরিণত হয়। তখন রাষ্ট্রের নীতি এবং সে সাথে উৎসবের বিষয় রূপে গণ্য হয় আল্লাহভীরু মানুষদের হত্যা করাটি। অপরাধীদের হাতে অধিকৃত এরূপ রাষ্ট্র পরিণত হয় পৃথিবীর পৃষ্ঠে সবচেয়ে বিপদজনক প্রতিষ্ঠানে। সমাজের বুকে সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি চোর-ডাকাত নির্মূল নয়। বাঘ-ভালুক তাড়ানোও নয়। বরং এরূপ বিপদজনক রাষ্ট্রের হাতে থেকে পরিত্রানের ব্যবস্থা করা। এটিই তো নবীজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূন্নত। নির্মূলের সে কাজে নবীজী (সাঃ) ও তারঁ সাহাবাদের লাগাতর জিহাদ করতে হয়েছে। সে সূন্নতের বরকতেই আরবভূমিসহ বিশ্বের বিশাল ভূভাগ থেকে অপরাধীদের শাসন বিলুপ্ত হয়েছিল। অথচ আজকের মুসলিমগণ নবীজী (সাঃ)র সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নতটি বাদ দিয়েই তাঁর অনুসারি হতে চায়।  ১৮.০৩.২০১৯

 

 




ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা কেন শ্রেষ্ঠ ইবাদত

সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্ম

মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণে হযরত মহম্মদ (সাঃ)’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানটি শুধু ইসলাম প্রচার ছিল না, বরং সেটি ছিল বিশাল ভূ-ভাগ থেকে দুর্বৃত্ত শাসকদের নির্মূল এবং ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এ কাজটি না হলে স্রেফ কোর’আন তেলাওয়াত, নামায-রোযা ও হজ্বযাকাত পালন এবং মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা বাড়িয়ে ইসলামের বিজয় ও মুসলিমের গৌরব বৃদ্ধি করা যেত না। এবং সম্ভব হতো না মানব জাতির কল্যাণে শিক্ষণীয় অবদান রাখাও। কারণ, জনকল্যাণে রাষ্ট্রের যে বিশাল ক্ষমতা -সেটি মসজিদ-মাদ্রাসা বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের থাকে না। এদিকে ইসলাম অন্য ধর্ম থেকে পুরাপুরি ভিন্ন। কারণ, অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ইসলামের কেন্দ্রীয় বিষয়। এটি মুসলিম জীবনের মিশন রূপে নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। মুসলিমগণ সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি তার কারণ তাদের জীবনে থাকে অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার মিশন। আর অন্যায়ের নির্মূলে ময়দানে নামলে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে যুদ্ধটি অনিবার্য ও অবিরাম হয়ে উঠে। ইসলামের শত্রুদের নির্মূলের সে শক্তিটি তো আসে রাষ্ট্রীয় শক্তি থেকে। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এজন্যই মুসলিম জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় নেক কর্ম। দুর্বৃত্তগণ ইসলামের শক্তির এ পরিচিত উৎস্যটি জানে। এজন্যই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে এতো বিরোধীতা। এ লক্ষ্যে শয়তানী শক্তিবর্গের কোয়ালিশনটি তাই দুনিয়াব্যাপী।

ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা না থাকলে কাফের শক্তির সাথে সংঘাতের কোন কারণই সৃষ্টি হতো না। তাবলিগ জামায়াতের কর্মীদের এজন্যই কোন শত্রু নেই; তাদের জীবনে কোন সংঘাতও নাই। অথচ সংঘাত এড়াতে পারেননি নবী-রাসূলগণ। মুসলিম জীবনে এরূপ সংঘাত না থাকার অর্থ বস্তুতঃ প্রকৃত ঈমান না থাকা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের সামনে অনুকরণীয় মডেল রূপে খাড়া করেছেন মুসলিম উম্মাহর আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে। তাঁর কোন লোকবল ছিল না; তিনি ছিলেন একা। কিন্তু নমরুদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত কাফের শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন এ হুংকার দিয়েঃ “শুরু হলো তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তাঁর সে সাহসী ঘোষণাটি এতোই ভাল লেগেছিল যে, সেটিকে তিনি রেকর্ড করেছেন পবিত্র কোরআনের সুরা মুমতাহেনার ৪ নম্বর আয়াতে। তাঁকে অনুকরণ করার নির্দেশ দিয়ে ঈমানদারদের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে ইব্রাহীম (আঃ)’য়ে জীবনে।” এ থেকে বুঝা যায় মুসলিম জীবনে শত্রুশক্তির সাথে সংঘাতের অনিবার্যতা ও তার নির্মূলে জিহাদটি কতো গুরুত্বপূর্ণ।

নবীজী (সাঃ)র জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলোঃ জিহাদের মাধ্যমেই নির্মূল করেছেন স্বৈর শাসন। এবং প্রতিষ্ঠা করেছেন ইসলামী রাষ্ট্র। লড়াই না থাকলে বিজয়ের প্রশ্নই উঠে না –সেটি বীজ না বুনে ফসল ঘরে তোলার ন্যায় কল্প বিলাস। জিহাদ না থাকলে তাই অসম্ভব হয় ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। আর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না পেলে লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও মুসলিম উম্মাহর শক্তিতে বৃদ্ধি আনা যায় না। বাংলাদেশে ঢাকা’র ন্যায় একটি জেলাতে যত মাদ্রাসা ও মসজিদ আছে তা খলিফা রাশেদার আমলে সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্র জুড়ে ছিল না। কিন্তু তাতে লাভ কি হয়েছে? দেশে কি ইসলামের প্রতিষ্ঠা বেড়েছে? গৌরব বেড়েছে কি বাঙালী মুসলিমের। বরং তারা তো ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে দুর্নীতিতে। নবীজী (সাঃ)র ইসলাম –যার অপরিহার্য উপাদান হলো শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত, শুরা, মুসলিম ঐক্য, সে ইসলাম বাংলাদেশে নাই। যেটি আছে সেটি হলো অপূর্ণাঙ্গ ও বিকৃত ইসলাম। পূর্ণাঙ্গ ইসলাম না থাকাতে সমাজ জুড়ে বেড়ে উঠেছে অধর্ম ও পথভ্রষ্টতা। এজন্যই দেশ বিশ্বরেকর্ড গড়েছে দুর্বৃত্তিতে। রেকর্ড গড়ছে এমন কি পৌত্তলিক সংস্কৃতির পরিচর্যাতেও। বর্ষবরণ ও বসন্তবরণের নামে দেশে যেরূপ পৌত্তলিক সংস্কৃতির জোয়ার সৃষ্টি হয় -তা এমন কি কলকাতার হিন্দু সংস্কৃতিকেও হার মানায়। ঢাকা শহরে বাংলা ১৪২৫’য়ের নববর্ষ পালন নিয়ে তেমন একটি রিপোর্ট ছেপেছে কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকা।

 

রাষ্ট্রই সবচেয়ে শক্তশালী ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান

ইসলামের মৌল বিশ্বাস ও অনুশাসনের নির্মূলে রাষ্ট্রীয় ভাবে যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইঞ্জিনীয়ারীং চলে, তখন লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসাও যে কতটা ব্যর্থ হয় –বাংলাদেশ মূলতঃ তারই নমুনা। অথচ ইসলামের শত্রুশক্তির নির্মূল হলে এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে সমগ্র দেশ পরিণত হয় মসজিদ-মাদ্রসায়। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ কেউ মসজিদ নির্মাণ করলে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর জন্য জান্নাতে ঘর তৈরী করে দেন। মসজিদ নির্মাণে অর্থ ব্যয় হয়, কিন্তু তাতে রক্তের বিনিয়োগ হয় না। কিন্তু বিপুল অর্থ ও হাজার হাজার মানুষের রক্তের বিশাল বিনিয়োগটি অপরিহার্য হয় ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে। ইসলামী রাষ্ট্র দেয়, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের বিজয়। দেয়, শত্রুর হামলার মুখে মুসলিম উম্মাহর প্রতিরক্ষা। দেয়, বিশ্বশক্তি রূপে উত্থানের সামর্থ্য। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণের পুরস্কার যে কতো বিশাল -সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন? যে সমাজে সে কাজটি বেশী বেশী হয়, সে সমাজ পায় মহান আল্লাহতায়ালার অফুরন্ত নেয়ামত। তাদের সাহায্যে হাজার হাজার ফেরেশতা নেমে আসে। জুটে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়। ফলে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে এর চেয়ে সেরা নেক কর্ম এবং শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিশীল কাজ আর কি হতে পারে? সেটি না হলে যা আসে তা হলো কঠিন আযাব। সে কাজটি সবচেয়ে বেশী হয়েছিল সাহাবায়ে কেরামদের যুগে। নবীজী (সাঃ)র শতকরা৭০ ভাগের বেশী সাহাবা সে কাজে শহীদ হয়েছেন। তাদের অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগের ফলে জুটেছে গায়েবী মদদ ও বিশ্বব্যাপী ইজ্জত। এবং তাতে মুসলিম উম্মাহর উত্থান ঘটেছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি রূপে। কিন্তু আজ সে কোরবানি নাই, ফলে মুসলিম উম্মাহর সে শক্তি এবং ইজ্জতও নাই।

ফিরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দেয়ার পর হযরত মুসা (সাঃ) এবং তাঁর অনুসারি বনি ইসরাইলীদের উপর যে হুকুমটি এসেছিল সেটি উপাসনালয় বা মাদ্রাসা গড়ার নয়; বরং সেটি ছিল ফিলিস্তিন থেকে স্বৈরশাসন নির্মূলের। নির্দেশ ছিল, স্বৈরশাসনের নির্মূল করে সেখানে তাওরাতে  ঘোষিত শরিয়ত প্রতিষ্ঠা দেয়ার। কিন্তু ইহুদীগণ সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। তাদের আচরণ এতটাই উদ্ধত ছিল যে তারা হযরত মূসা (আঃ)কে বলেছিল, “হে মূসা! তুমি ও তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা অপেক্ষায় আছি।” তাদের গাদ্দারির ফলে স্বৈরাচারের নির্মূল ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কাজ সেদিন সফল হয়নি। ফলে হযরত মূসা (আঃ) উপর অবতীর্ণ শরিয়তি বিধান তাওরাতেই রয়ে গেছে, বাস্তবায়ীত হয়নি। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে এরূপ গাদ্দারি কি কখনো রহমত ডেকে আনে? বরং ঘিরে ধরেছিল কঠিন আযাব। ফিলিস্তিনে ঢুকা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়; শত শত বছর তারা নানা দেশের পথে পথে ঘুরেছে উদ্বাস্তুর বেশে। অথচ তাদের যে জনবল ছিল তা মহান নবীজী (সাঃ) পাননি। নবীজী (সাঃ) তাঁর মক্কী জীবনের ১৩ বছরে ২০০ জনের বেশী লোক তৈরী করতে পারেননি। অথচ মিশর থেকে হিজরত কালে হযরত মূসা (আঃ) সাথে ইহুদীদের সংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। কিন্তু সে বিশাল জনবল তাদের শক্তি ও ইজ্জত না বাড়িয়ে অপমানই বাড়িয়েছে। একই পথ ধরেছে আজকের মুসলিমগণ। বিপুল সংখ্যায় বাড়ছে তাদের জনবল; কিন্তু বাড়েনি মহান আল্লাহতায়ালার পথে তাদের অঙ্গিকার ও কোরবানী। ইহুদীদের ন্যায় তারাও নিষ্ক্রিয় স্বৈরশাসকদের নির্মূলে। এক্ষেত্রে বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতাটি কি কম? দীর্ঘকাল যাবত তাদের ঘাড়ে চেপে বসা স্বৈরশাসক এবং ইসলামের পরাজয় বস্তুতঃ সে ব্যর্থতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম মেনে চলায় সামান্য অঙ্গিকার থাকলে এ জালেম স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গ্রামে গঞ্জে জিহাদ শুরু হতো।


অপরাধীদের অধিকৃতি ও প্রহসনের নির্বাচন

কোনটি গণতন্ত্র আর কোনটি স্বৈরাচার -সেটি বুঝা উঠে কি এতই কঠিন? গণতন্ত্রের মূল কথা, কারা দেশের শাসক হবে সেটি নির্ধারিত হবে একমাত্র জনগণের ভোটে। প্রশ্ন হলো, নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে জনগণ তাদের সে রায়টি জানাবে কেমনে? সে জন্য যে কোন দায়িত্বশীল সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি হলো, নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুষ্ঠ পরিবেশ সৃষ্টি করা। অথচ স্বৈরাচারি সরকারের বড় অপরাধটি হয় এ ক্ষেত্রে। নির্বাচন পরিণত হয় ভোটডাকাতির মাধ্যমে। ফলে এমন ভোটডাকাতির নির্বাচন বার বার হলেও তাতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না। তাতে জনগণের রায়েরও প্রতিফলন হয় না। বস্তুতঃ নির্বাচন কতটা বৈধ হলো সে বিচারটি হয়, নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহন কীরূপ এবং কতটা নিরপেক্ষ -তা দিয়ে। সেটি না হলে নির্বাচন অর্থহীন। এমন গণতন্ত্রহীন নির্বাচন স্বৈরশাসকদের শক্তি বাড়ায়। এবং শক্তিহীন ও নিছক দর্শকে পরিণত করে জনগণকে। এজন্যই স্বৈরশাসকগণ জনগণে শত্রু।

গণতন্ত্র বাঁচাতে হলে গণজীবনে বাঁচাতে হয় জনগণের কথা বলার স্বাধীনতা, মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা। নইলে গণতন্ত্র বাঁচে না। কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনটাই বাঁচেনি। ফলে বেঁচে নাই গণতন্ত্রও। মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দল গড়ে সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা শুধু পাকিস্তান আমলেই ছিল না, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলেও ছিল। কিন্তু এখন নাই। রাস্তায় নিরস্ত্র মানুষের  মিছিল শুরু হলে শুধু সশস্ত্র পুলিশ নয়, সরকার দলের ক্যাডারগণও অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাসিনার স্বৈর সরকার রাজপথে স্কুলের নিরীহ কিশোর-কিশোরীদের মিছিলও সহ্য করেনি। তাদের উপরও সশস্ত্র পুলিশ ও গুণ্ডাদের লেলিয়ে দিয়েছে। তাদের হাতে ছাত্র-ছাত্রীগণ শুধু আহতই হয়নি, যৌন ভাবে লাঞ্ছিতও হয়েছে। আল জাজিরা’ টিভি চ্যানেলের সামনে সে সত্য বিবরণ তুলে ধরাতে গৃহে হামলা দিয়ে ডিবি’র পুলিশ ফটোশিল্পী শহীদুল আলমকে উঠিয়ে নিয়ে নির্যাতন করেছে। নির্যাতনের ফলে আদালতে তাঁকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাজির হতে হয়েছে।

স্বৈর-সরকারের হাতে নির্বাচন হাইজ্যাকের কাজটি শুধু নির্বাচন কালে হয় না। সেটি শুরু হয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বহু পূর্ব থেকেই। বস্তুতঃ সেটি চলে সমগ্র স্বৈর-শাসনামল জুড়ে। নির্বাচন হাইজ্যাকের কাজে ব্যবহৃত হয় দেশের আইন ও আদালত। আইন ও আদালতকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভাবে চলতে না দিয়ে ব্যবহার করা হয় সরকারের শত্রু নির্মূলের কাজে। সেটি বুঝা যায় সরকারি দলের নেতাদের মিথ্যা মামলায় জেল ও ফাঁসি দেয়ার আয়োজন দেখে। কেড়ে নেয়া হয় রাজপথে প্রতিবাদের স্বাধীনতা। এরূপ অগণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচন হলে সে নির্বাচন কি কোন ভদ্র ও সুবোধ মানুষের স্বীকৃতি পায়? শেখ হাসিনার সরকার যে একটি অবৈধ, অসভ্য এবং অগণতান্ত্রিক সরকার –তা নিয়ে এজন্যই ভদ্র সমাজে কোন বিতর্ক নেই। ২০১৪ সালের নির্বাচনে সংসদের ৩০০ সিটের মাঝে ১৫৩ সিটে কোন ভোটাভুটি হয়নি। দেশব্যাপী শতকরা ৫ ভাগ ভোটার ভোট দেয়নি। কোন গণতান্ত্রিক দেশে কোন কালেও কি এমন নির্বাচন হয়েছে? এমন ভোটারহীন নির্বাচনকে নির্বাচন বললে ভোট ডাকাতির নির্বাচনকে কি বলা যাবে? প্রতিটি সভ্য সমাজেই সভ্য ও অসভ্য এবং ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকে, সে পার্থক্য বিলুপ্ত করাটিই অসভ্য সমাজের রীতি। বাংলাদেশে সে পার্থক্য বিলুপ্ত হয়েছে শেখ হাসিনার ন্যায় স্বৈর-শাসকদের হাতে। ফলে সরকারের নীতিতে সত্য-মিথ্যা এবং ন্যায়-অন্যায় একাকার হয়েছে। ফলে ভোট ডাকাতির নির্বাচনও ঘোষিত হয় সুষ্ঠ নির্বাচন রূপে। যেসব ভয়নাক চোর-ডাকাতদের স্থান হওয়া উচিত ছিল কারাগারে, তারাই আবির্ভুত হয়েছে দেশের হর্তাকর্তা রূপে।

ডাকাত ও ভোট-ডাকাতঃ পার্থক্যটি কোথায়?

ডাকাত ও ভোট-ডাকাত –উভয়ই অপরাধী। তবে উভয় প্রকার ডাকাতের মাঝে পার্থক্যটি সৃষ্টি হয় বিবেকের বিরুদ্ধে নাশকতা ভেদে। চুরি-ডাকাতিকে অপরাধ গণ্য করার মত বিবেক চোর-ডাকাতদের মাঝে কিছুটা হলেও বেঁচে থাকে। শরমবোধ থাকে চোর-ডাকাত রূপে সমাজে পরিচিতি হওয়াতে। ডাকাতির অর্থকে এজন্যই তারা লুকিয়ে রাখে। এজন্যই দিনে নয়, রাতের আঁধারে তারা চুরি-ডাকাতিতে নামে। কিন্তু সে সামান্য বিবেকবোধ এবং চোর-ডাকাত রূপে পরিচিতি হওয়া নিয়ে সামান্য শরমবোধের মৃত্যু ঘটে ভোট-ডাকাতদের মাঝে। ফলে দর্পের সাথে তারা ভোট-ডাকাতি করে দিনদুপুরে। এমন বিবেকহীনতা ও শরমহীনতার কারণে দেশবাসীর সামনে এবং সে সাথে বিশ্ববাসীর সামনে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রূপে জাহির করতে শেখ হাসিনার কোন শরম হয়নি। শরম পায়নি ক্ষমতায় থাকা কালে ভোট ডাকাত এরশাদও। এরশাদ তাই খেতাব কুড়িয়েছিল বিশ্ববেহায়া রূপে। এদের হাতে পৃথিবীজুড়া অপমান বাড়ছে বাংলাদেশীদের। যে সব বিদেশীগণ বাংলাদেশে রাজনীতির খবর রাখে, তারা কি জানে না কীরূপে ক্ষমতায় এসেছে শেখ হাসিনা? তাঁর সাথে সাক্ষাত কালে বিদেশীদের স্মৃতিতেও নিশ্চিত জেগে উঠে তাঁর অপরাধের নৃশংসতা। সে স্মৃতিটি এক অপরাধি স্বৈরশাসকের। যার অপরাধ, ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ক্ষমতা ছিনতাইয়ের।


বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের ইতিহাসে হুসেন মহম্মদ এরশাদ এক অতি অসভ্য চরিত্র। এখন সে অসভ্য ব্যক্তিটি শেখ হাসিনার শুধু রাজনৈতিক মিত্রই নয়, বরং উভয়েই একত্রে অবস্থান গণতন্ত্রের নির্মূলে। চোর-ডাকাতদের নাশকতায় মানুষের আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতি হলেও তাতে কারো ঈমান বিনষ্ট হয়না। কারণ, অর্থে হাত দিলেও তারা মানুষের ঈমান বা বিবেক হত্যায় হাত দেয় না। অথচ সে কাজটি করছে ভোট- ডাকাত স্বৈরশাসকগণ। ফলে তাদের শাসনে দেশে ব্যাপক ভাবে বাড়ে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। বাড়ে গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাস। দেহের মধ্যে জীবাণু রেখে সুস্থ্য দেহ আশা করা যায় না, তেমনি বিবেকধ্বংসী স্বৈরাচারিদের ক্ষমতায় রেখে দেশগড়ার কাজও হয়না। নবীজী (সাঃ)র গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত তাই স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও মসজিদের প্রতিষ্ঠা ছিল না, ছিল রাষ্ট্রের অঙ্গণ থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূলও।


অপরাধীদের মনে সব সময়ই থাকে নিজ অপরাধ গোপন করার নেশা। শেখ হাসিনা তাই ২০১৪ সালের নির্বাচন জনগণ কর্তৃক বর্জনের জন্য দায়ী করেন বিরোধী দলকে। অথচ ইচ্ছা করেই এ সত্য বুঝতে তারা রাজী নয়, তাবলিগ, রিলিফ বিতরণ বা সৃষ্টিহীন হৈচৈ’য়ের জন্য কেউ রাজনৈতিক দল গড়ে না। রাজনৈতিক দল গড়ার মূল উদ্দেশ্যটি হলো, নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া। নির্বাচনে অংশ নেয়াকে প্রতিটি রাজনৈতিক দল এজন্যই অপরিহার্য ভাবে। ব্যবসা করতে হলে দোকান খুলতে হয়, তেমনি রাজনীতি করতে হলে নির্বাচনে অংশ নিতে হয়। শাসন ক্ষমতায় যাওয়ার এটিই একমাত্র বৈধ পথ। কিন্তু সরকারি দলের উদ্যোগে নিরপেক্ষ নির্বাচনকে যখন অসম্ভব করা হয়, তখন লাখ লাখ টাকা খরচ করে নির্বাচনে নামা ও রাতদিন প্রচার চালনাটি অর্থহীন। এমন সাঁজানো নির্বাচনে অংশ নিলে বৈধতা পায় স্বৈরাচারি শাসকের সিলেকশন প্রক্রিয়া। তাতে গাদ্দারি হয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাথে। ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল তেমনি একটি প্রহসন মূলক নির্বাচন। দেশের নিরক্ষর নাগরিকগণও সেটি বুঝতো। এজন্যই স্বৈরাচার বিরোধী দলগুলির কোনটিই ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এরূপ নির্বাচনে অংশ নিলে এসব দলের নেতা-নেত্রীগণ ইতিহাসে তারা গণতন্ত্রের শত্রুরূপে ধিকৃত হতো। এজন্য শত শত বছর পরও নতুন প্রজন্ম থেকে ধিক্কার কুড়াতো। কিন্তু স্বৈরশাসকদের সে লজ্জাশরমের ভাবনা থাকে না। কে কি বলবে -তা নিয়ে তারা ভাবে না। তাদের ভাবনা, কি ভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা যায় -তা নিয়ে। তাই সে প্রহসনের নির্বাচনে শেখ হাসিনার সাথে অংশ নিতে দেখা গেছে গণতন্ত্রের আরেক ঘৃণীত দুষমন এরশাদকে।

দায়ভারটি জিহাদের

অতীতের গৌরবময় ইতিহাস জনগণকে দেয় নতুন ইতিহাস গড়ায় আত্মবিশ্বাস। মুসলিমদের সে ইতিহাস তো অতি সমৃদ্ধ। যে কৃষক ফসল ফলাতে জানে, তার ফসল বানের পানিতে বার বার ভেসে গেলেও সে আবার চাষাবাদে নামে। নিষ্ক্রিয় হওয়া, মনের দুঃখে হতোদ্যম হওয়া বা হতাশায় দেশ ছেড়ে যাওয়াটি তাঁর রীতিবিরুদ্ধ। গৃহে বার বার চুরি-ডাকাতি হবে এবং দিনের পর দিন গৃহ চোর-ডাকাতদের হাতে অধিকৃত থাকবে –এটি কি কোন সভ্য মানুষ মেনে নেয়? সেটি মেনে নেয়াটি শুধু অক্ষমতা নয়, বরং অসভ্যতাও। সভ্য মানুষ তাই চোর-ডাকাত তাড়াতে হাতের কাছে যা পায় তাই নিয়ে লড়াইয়ে নামে। ইসলামে সেটিই তো জিহাদ। এরূপ জিহাদের কারণেই রাষ্ট্র থেকে নির্মূল হয় শয়তানী শক্তির দখলদারি। শত্রুর নির্মূলে ও মুসলিম উম্মহর প্রতিরক্ষায় জিহাদই হলো বস্তুতঃ মূল হাতিয়ার। ফলে শত্রু শক্তির লাগাতর হামলাটি নামায-রোযা বা হজ্ব-যাকাতের বিরুদ্ধে নয়; বরং সেটির লক্ষ্য মুসলিম জীবন থেকে জিহাদের বিলুপ্তি।

প্রতিটি মুসলিম সমাজে জিহাদের বিরুদ্ধে শয়তানের কৌশলটিও চোখে পড়ার মত। শয়তান সমাজে নামে মোল্লা-মৌলভী, আলেম-উলামা, পীর-দরবেশ, ইমাম, হুজুরদের ছদ্দবেশে। এরা বলে পবিত্র কোরআনে ইসলামি রাষ্ট্র বলে কিছু নেই। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বলেও কিছু নাই্। যেন নবীজী (সাঃ) ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও সে রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে কোরআনের বিরুদ্ধে চলে গেছেন! (নাউযু  বিল্লাহ।) যেন ইসলামে খোলাফায়ে রাশেদা বলে কিছু ছিল না।  তাদের কাছে ইসলাম হলো স্রেফ তাওহীদে বিশ্বাস এবং নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল পালন। তারা মানুষকে নহিসত দেয় জিহাদে নামার আগে নিজেকে ফেরেশতা বানাতে। অথচ তারা জানে ফেরেশতা হওয়াটি অসম্ভব ব্যাপার। সে কাজ ফেরেশতাদের, মানুষের নয়। এক্ষেত্রে তাদের নিজেদের ব্যর্থতাটিও কি এ ক্ষেত্রে কম? এরূপ লক্ষ লক্ষ আলেম, ইমাম, হুজুর, পীর, সুফি ও দরবেশ প্রতি বছর দুনিয়া থেকে বিদায় নয় ফেরেশতা না হয়েই। তাদের নামায-রোযার ভাণ্ডারে অনেক ইবাদত জমলেও ঈমানের ভাণ্ডারটি থাকে শুণ্য। ফলে একটি দিনের জন্য তারা কোন জিহাদের ময়দানে হাজির হয় না। জিহাদ থেকে অধিকাংশ মুসলিমের দূরে থাকার কারণে মুসলিম দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও ঘটেনি। অথচ দেশ যেখানে ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে অধিকৃত এবং শরিয়ত যেখানে নির্বাসিত, জিহাদের ময়দান তো সে দেশে হাজির হয় প্রতিটি ব্যক্তির এবং প্রতিটি ঘরের দরজার সামনে। এবং জিহাদ প্রসঙ্গে নবীজী (সাঃ)র প্রসিদ্ধ সহীহ হাদীস, “যে ব্যক্তি জীবনে কোন দিন জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না সে ব্যক্তি মুনাফিক।”  কারণ জিহাদ তো ঈমানের ফসল। বীজ থেকে যেমন চারা গজায় তেমনি ঈমান থেকে জিহাদ জন্ম নেয়। ঈমান থাকলে মু’মিনের জীবনে জিহাদ অনিবার্য ভাবেই এসে যায়। তাই নবীজী (সাঃ)’র অনুসারি এমন কোন সুস্থ্য সাহাবী ছিলেন না যিনি জিহাদের ময়দানে প্রাণ দানে হাজির হননি। অথচ যারা মুনাফিক, তাদের জীবনে নামায-রোযা থাকলেও জিহাদ থাকে না।

ঈমান কাকে বলে এবং কীভাবে তার প্রকাশ ঘটে পবিত্র কোরআন থেকে তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক।  ফিরাউনের প্রাসাদে মূসা (আঃ)এর সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে যাদুকরদের যে দলটি ঈমান এনে শহীদ হয়েছিলেন তাদের কেউই ফেরেশতা ছিলেন না। সারা জীবন তারা কাটিয়েছিলেন যাদুর ন্যায় কবিরা গুনাহর রাজ্যে। তাদের নামায-রোযার ভাণ্ডারটি ছিল শূণ্য। হযরত মূসা (আঃ)’র সাথে প্রতিযোগিতা দেখতে সেখানে হাজির ছিল আরো বহু হাজার মানুষ। একই মোজেজা তারাও দেখেছিল; কিন্তু তাদের কেউই ঈমান আনেনি। মহান আল্লাহতায়ালার বিচারে একজন ব্যক্তির এ সামর্থ্যটুকুর মূল্য তো বিশাল। এ দুনিয়ায় পদে পদে তো সে সামর্থ্যেরই পরীক্ষা হয়। যাদুকরদের কালেমায়ে শাহাদত মহান আল্লাহতায়ালার কাছে যে শুধু কবুল হয়েছিল তা নয়, বরং মহান রাব্বুল আ’লামিন তাতে এতোই খুশি হয়েছিলেন যে তাদের সে কাহিনী পবিত্র কোরআনে বার বার বর্ণনা করেছেন। হযরত মূসা (আঃ) মোজেজা দেখার সাথে সাথে তাদের ঈমানের ভাণ্ডারটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে এবং তাঁরা সেজদায় পড়ে যান। ঈমান আনার অপরাধে ফিরাউন তাদেরকে নির্মম ভাবে হাত-পা কেটে হত্যার হুকুম শুনেয়েছিল। কিন্তু সে নৃশংসতায় তাঁরা আদৌ বিচলিত হননি, শহীদ হয়ে গেছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা। এমন একটি চেতনার কারণে মু’মিনের জীবনে ঈমান কখনো গোপন থাকে না। সেটি যেমন নামাযে নেয়, তেমনি জিহাদে নেয়। কীভাবে ঈমানের প্রকাশ ঘটে -সেটি বুঝাতেই যাদুকরদের সে কাহিনী মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে তাঁর নিজের কালামের পাশে সংকলিত করে ক্বিয়ামত অবধি জিন্দা করে রেখেছেন। প্রশ্ন হলো, সারা জীবন নামায-রোযা পালন করার পরও যদি ঈমানের এরূপ প্রকাশ না ঘটে -তবে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে সে নামায-রোযার মূল্য কতটুকু?

 

 

নীরবতা ঈমানদারি নয়

মুসলিম ভূমি ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত দেখেও নীরব থাকাটি তাই ঈমানদারি নয়। দেশ থেকে শত্রুশক্তির অধিকৃতি নির্মূলে মুসলিম মাত্রই জিহাদে নামবে তাতেই তো ঈমানের প্রকাশ। যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও হিন্দু আধিপত্যবাদ -এ দুই শক্তির বিরুদ্ধে রক্তাত্ব লড়াই করে ১৯৪৭-য়ে বিজয় এনেছিল, তারা কি এ নতুন অধিকৃতির মুখে আজ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকতে পারে? এখানেই ভারতের ন্যায় আগ্রাসী হিন্দু সাম্প্রদায়ীক শক্তির ভয়। তাদের ভয়, পূর্ব সীমান্তে নতুন মুসলিম শক্তির উদ্ভবের। ভয় থেকে বাঁচতেই মানুষ সাথি খোঁঝে। ভারতীয়দের পক্ষ থেকে কলাবোরেটর রূপে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে বেছে নেয়ার হেতু তো সেটিই। তাই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে লড়াই তাতে ভারতও জড়িয়ে পড়েত  বাধ্য।

শত্রুদের কাজ শুধু দেশ-ধ্বংস, মানব-হত্যা ও নারী-ধর্ষণ নয়, তারা ধ্বংস করতে চায় দেশবাসীর চেতনা ও গৌরবের ইতিহাসকে। কারণ চেতনা ও ইতিহাস বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় আত্মবিশ্বাসও। তখন মানুষ ভূলে যায় নিজ জীবনের মিশন ও ভিশন। শত্রুগণ জানে, ১৯৪৭’য়ের বিজয়ের পিছনে বাংলার ভূমি বা জলবায়ুর কোন ভূমিকা ছিল না; বরং সেটি ছিল বাঙালী মুসলিমদের ইসলামী চেতনা ও ঈমানী দায়িত্ববোধ। তাই শত্রুগণ সে চেতনার বিরুদ্ধে নাশকতায় নেমেছে। তবে সে নাশকতার কাজে বাঙালী মুসলিমদের শত্রু শুধু বিদেশে নয়, ভিতরেও। ভিতরের শত্রু হলো ঘাড়ে চেপে বসা ঘাতক স্বৈরশাসক ও তার সাঙ্গপাঙ্গগণ। ইসলামি চেতনা বিনাশে ময়দানে নামিয়েছে ইসলামচ্যুৎ সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীবেশী বাঙালী কাপালিকদের। উঁই পোকার ন্যায় তারা ভিতর থেকে বিনাশ করছে বাঙালী মুসলিমের ঈমান, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মবিশ্বাস। মুসলিম দেশে স্বৈরশাসকের নাশকতাটি তাই ব্যাপক ও সর্বগ্রাসী। ফলে তাদের নাশকতাপূর্ণ সে রাজনীতির নির্মূলের চেয়ে মুসলিম সমাজে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা আর কি হতে পারে? বাঙালী মুসলিমদের স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইটি তাই স্রেফ গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই নয়, ঈমান বাঁচানোরও। এটি নিছক রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং পরিপূর্ণ এক জিহাদ। আর এ জিহাদ বাঙালী মুসলিমদের সামনে পেশ করেছে অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্ত বিনিয়োগের এক পবিত্র অঙ্গণ। এ অঙ্গণে কার কি বিনিয়োগ সেটিই নির্ধারন করবে অনন্ত অসীম পরকালে কোথায় সে স্থান পাবে এবিষয়টি। ফলে কোন সুস্থ্য ব্যক্তির জীবনে এরচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কি হতে পারে? ৮/০৯/২০১৮ Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal

 

 




বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ

অধিকৃত দেশ

যুদ্ধ শুধু আগ্নেয়াস্ত্রে হয় না। স্রেফ রণাঙ্গনেও হয় না।বরং সবচেয়ে বড় ও বিরামহীন যুদ্ধটি হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ময়দানে। এ যুদ্ধে হেরে গেলে রাজনৈতিক পরাজয়টি তখন নীরবে ঘটে। রণাঙ্গণের যুদ্ধ তখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে গেল এবং পোলান্ড, পূর্ব জার্মান, চেকোস্লাভিয়া, ক্রয়েশিয়া, সার্বিয়া, আলবানিয়া, বুলগারিয়ার ন্যায় বহু সমাজতান্ত্রিক দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত হলো এবং সে সাথে ন্যাটোতে যোগ দিল –সেটি কি কোন সামরিক পরাজয়ের কারণে? বরং সে পরাজয়টি এসেছে সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। এমন একটি  যুদ্ধকেই বলা হয় স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ার।  এ যুদ্ধে পরাজিত হলে বিলুপ্ত হয় পরাজিত জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। বাংলাদেশে তেমনি একটি আরোপিত যুদ্ধ চলছে। এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজ, ফরাসী, জার্মান, ডাচ, আইরিশ, স্পেনিশ, আফ্রিকান –এরূপ নানাভাষী মানুষের বসতি ছিল। কিন্তু এখন সব মিলে মিশে মার্কিনী হয়ে গেছে। এখানে সংস্কৃতির সে মূল ধারাটি হলো গ্রীকো-রোমান সভ্যতার। ভারতে সেটি পৌত্তলিক হিন্দুত্বের।  হিন্দুত্বের সে রূপটি নিছক ধর্মীয় নয়,বরং তাতে রয়েছে সাংস্কৃতিক শক্তিও। সে শক্তির বলেই অতীতে শক, হুন, জৈন –এরূপ বহুজাতি হিন্দুত্বের সাথে মিশে গেছে। ধর্মীয় ভাবে হিন্দু না হলেও সাংস্কৃতিক ভাবে তারা হিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদেশেই এভাবে বিজয়ী শক্তির হাতে নীরবে সাংস্কৃতিক কনভার্শন ঘটে। বাংলাদেশে এমন সাংস্কৃতিক কনভার্টদের সংখ্যা আজ  লক্ষ লক্ষ।

সাংস্কৃতিক শক্তি প্রবল বল পায় রাজনৈতিক বিজয়ের ফলে। রাজনৈতিক,প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক শক্তি তখন সাংস্কৃতিক শক্তির বিকাশে দুয়ার খুলে দেয়। তখন শুরু হয় বিজয়ী শক্তির সাংস্কৃতিক বিপ্লব। বস্তুত এক সফল সাংস্কৃতিক বিপ্লবের লক্ষ্যেই প্রয়োজন পড়ে বিপুল রাজনৈতিক বিপ্লবের। মুসলিম শাসনামলে ভারতীয় হিন্দুগণ সে শক্তি পায়নি। তাদের সে শক্তিটি বিলুপ্ত হয়েছিল মুসলমানদের রাজনৈতিক বিজয়ে। ইসলাম তখন শুধু রাজনৈতিক শক্তি রূপে নয়, প্রবল সাংস্কৃতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে শক-হুন-জৈনগণ যে ভাবে হিন্দু সংস্কৃতিতে হারিয়ে গেছে, মুসলমানগণ সে ভাবে হারিয়ে যায়নি। কিন্তু হাজার বছর পর হিন্দুগণ ভারতে এখন সে রাজনৈতিক শক্তিটি ফিরে পেয়েছে। ফলে হিন্দুদের মাঝে জেগেছে হিন্দু আচারে সাম্রাজ্য নির্মাণের প্রেরণা। ফলে তাদের রাজনীতিতে এসেছে প্রচণ্ড সাম্রাজ্য লিপ্সা। ১৯৪৭য়ে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৪৮য়ে কাশ্মীর ও হায়দারাবাদ দখল, ১৯৭১য়ে পূর্ব-পাকিস্তানে দখল এবং ১৯৭৪ সালে সিকিম দখলের ন্যায় ঘটনা ঘটেছে একই ধারাবাহিকতায়। ১৯৭১ সালে সামরিক বিজয়ের পর তাদের সে প্রভাব-বলয়ের অধীনে এসে গেছে বাংলাদেশ। ১৯৭২য়ে ভারতের সামরিক অধিকৃতি শেষ হলেও সাংস্কৃতি অধিকৃতি শেষ হয়নি। বরং সেটি আরো তীব্রতর হয়েছে।

ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর হিন্দুদের হাতে অখন্ড ভারতের শাসনক্ষমতা গেলে মুসলমানদের জন্য যে ভয়ানক বিপদ নেমে আসবে সেটি বহু আলেম,মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ টের না পেলেও সেটি টের পেয়েছিলেন দার্শনিক আল্লামা ইকবাল। সে বিপদটি যে শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হবে না, বরং ভয়ানক রূপে নিবে সংস্কৃতির ময়দানে –তা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র সংন্দেহ ছিল না। সে বিপদ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল হিন্দুদের রাজনৈতিক আধিপত্যের বাইরে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের সৃষ্টি। তাঁর সে দুর্ভাবনার সে চিত্রটি ফুটে উঠে ১৯৩৭ সালের ২০ শে মার্চ কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহকে লেখা তাঁর এক চিঠিতে। তিনি লিখেছিলেন, “ভারতীয় মুসলমানদের মূল সমস্যাটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং বড় সমস্যাটি হলো সাংস্কৃতিক। মুসলমানদের সাংস্কৃতিক সমস্যার সমাধান অখণ্ড ভারতের কাঠামোয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শাসনাধীনে থেকে সম্ভব নয়।” (সূত্রঃ জিন্নাহর প্রতি আল্লামা ইকবালের পত্রাবলী)।এ ভাবনা নিয়েই ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তানে গড়ার প্রস্তাব দেন। একজন মুসলমান তার অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান ইউরোপ, আমেরিকা বা অন্যকোন সমৃদ্ধ দেশে চাকুরি নিয়ে গিয়ে মেটাতে পারে। কিন্তু তাতে তার সাংস্কৃতিক প্রয়োজন মেটে না। সাংস্কৃতিক সমস্যার সমাধানে ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে হয়। কারণ সংস্কৃতি খাদ্য-পানীয়,আলো-বাতাস, ভূমি বা জলবায়ুর উপর ভিত্তি করে উঠে না। সেটি সম্ভব হলে একই ভূখন্ডে বসবাসকারি হিন্দু-মুসলমান-খৃষ্টান-বৌদ্ধদের সংস্কৃতি এক হতো। এখানে কাজ করে একটি দর্শন। আর সে দর্শনের পিছনে কাজ করে ধর্মীয় শিক্ষা ও চেতনা। সে ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র শুধু জরুরী নয়, অপরিহার্য। শত বাধা অতিক্রম করে ও বহু রক্ত ব্যয় করে এমন একটি রাষ্ট্র নবীজী (সাঃ) নিজে নির্মান করে সেটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

 

সংস্কৃতির শক্তি

প্রশ্ন হলো,সংস্কৃতি কি? সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিপদই বা কি? মানুষ যেভাবে বাঁচে সেটাই তার সংস্কৃতি। বাঁচবার মধ্যে সভ্য মানুষের জীবনে আসে লাগাতর সংস্কার,এবং সে সংস্কার থেকেই তার সংস্কৃতি। পশুর জীবনে সেরূপ সংস্কার নাই, তাই সংস্কৃতিও নাই। সেটি না থাকার কারণে হাজার বছর আগের পশুটি যে ভাবে বাঁচতো আজকের পশুটিও সে ভাবেই বাঁচে। সংস্কারের সে প্রক্রিয়াকে ইসলাম তীব্রতর করে, এখানেই ইসলামের শক্তি। সে শক্তির বলে মরুর অসভ্য মানুষগুলো ফেরেশতাতূল্য হতে পেরেছিল।  সমগ্র মানব ইতিহাসে আর কোন কালেই এরূপ শক্তিশালী সাংস্কৃতিক শক্তির জন্ম হয়নি। ইসলামের হাতে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক সভ্যতা গড়ে উঠার কারণ তো এটাই। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ গড়ে উঠে তো সংস্কৃতির গুণে। বিশ্বাসী মুসলমান এবং মুর্তিপুজারি হিন্দু একই লক্ষ্যে এবং একই সংস্কার নিয়ে বাঁচে না, তাই তাদের সংস্কৃতিও এক নয়। বাঙালীর হিন্দু ও বাঙালী মুসলমান একই গ্রামে বা একই মহল্লায় বাস করলেও উভয়ের সংস্কৃতি এজন্যই এক নয়। উলঙ্গ ও অশ্লিল মানুষটির মাঝে সংস্কার নেই, সে বাঁচে আদিম প্রস্তর যুগের আচার নিয়ে। ফলে তার সংস্কৃতিও নেই।

সংস্কৃতি হলো মানুষের বাঁচাকে সভ্যতর করার এক লাগাতর প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়াকেই আরবী ভাষায় তাহজিব বলা হয়। এটি হলো ব্যক্তির কর্ম,রুচী,আচার-আচারণ, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সার্বিক জীবন যাপনের প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধিকরণ। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ রিফাইনড হয় তথা সুন্দরতম হয়। দিন দিন সুন্দরতম হয় তার রুচীবোধ,আচার-আচরণ, কাজকর্ম ও চরিত্র। মুসলমানের ইবাদত ও সংস্কৃতি -এ দুটোর মূলে হলো তার ঈমান। ঈমানের বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে তার ইবাদত ও সংস্কৃতিতে। যেখানে ঈমান নেই,সেখানে ইবাদত যেমন নাই তেমনি সংস্কৃতিও নাই্। অপরদিকে যখন ঈমানে জোয়ার আসে তখন শুধু আল্লাহ তায়ালার ইবাদতই বাড়ে না,সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ হয়। ঈমান শুধু তার আত্মীক পরিশুদ্ধি দেয় না,পরিশুদ্ধি আনে তার রুচি,আচার-ব্যবহার,পানাহার,পোষাক-পরিচ্ছদ এবং চেতনা ও চৈতন্যে। পরিশুদ্ধি আসে তার অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও। এভাবেই মুসলমানের পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে শুরু হয় সংস্কৃতির নির্মাণ।

রাষ্ট্রের কাজ স্রেফ রাস্তাঘাট,স্কুল-কলেজ ও কলকারাখানা গড়া নয়।দেশ-শাসন ও বিচারকার্য পরিচালনাও নয়। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো,জনগণের ঈমান-বৃদ্ধি ও সংস্কৃতির নির্মাণ। সে কাজে কোরআনী জ্ঞানের প্রসার যেমন জরুরী তেমনি জরুরী হলো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও পাপাচারের নির্মূল। পাপাচার বাঁচিয়ে যেমন সমাজে সংস্কার আনা যায় না,তেমনি ব্যক্তির জীবনেও তাতে পরিশুদ্ধি আসে না। তাই মুসলমানগণ যেখানে রাষ্ট্র গড়েছে সেখানে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসাই গড়েনি,সংস্কৃতিকেও সমৃদ্ধ করেছে।এবং দূর করেছে অপসংস্কৃতিকে। এভাবে সভ্যতার নির্মাণে লাগাতর ভূমিকা রাখতে হয়েছে। নবীজী(সাঃ)র এটাই বড় সূন্নত। সাহাবাদের জানমালের সবচেয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে একাজে। ভভএমন এক মহৎ লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের নির্মাণ উপমহাদেশের মুসলমানদের কাছে অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু সেটি অনাসৃষ্টি গণ্য হয় ইসলামের শত্রুপক্ষের কাছে। আল্লাহর অবাধ্যদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে কোরআনের জ্ঞান ও আল্লাহর শরিয়তই যে শুধু অবহেলিত হয় তা নয়,বরং উলঙ্গতা,অশ্লিলতা এবং নাচগানের ন্যায় পাপাচারও তখন শিল্পকলা রূপে গণ্য হয়। মানুষকে মানবতা-বর্জিত করার লক্ষ্যে এটাই হলো শয়তানি শক্তির মিশন। আল্লাহর অবাধ্য এ শক্তিটি মুসলমানদের হাত থেকে যে কোরআন কেড়ে নেয় -তা নয়।বরং কেড়ে নেয় সত্যিকার মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার পদ্ধতি। আর মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার সে প্রক্রিয়াটিই হলো সংস্কৃতি। সাহাবায়ে কেরাম,তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনগণ যেভাবে নিষ্ঠাবান মুসলমান রূপে বেড়ে উঠেছে -সেটি কি কোন মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কারণে? বরং সেটি মুসলিম রাষ্ট্রে বিদ্যমান ইসলামী সংস্কৃতির কারণে। ইসলামি রাষ্ট্র বিলুপ্ত হলে বা ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলো বিলুপ্ত হয় সে সংস্কৃতি। সংস্কৃতির ময়দানে তখন শুরু হয় উল্টো স্রোত। ইসলামের শত্রুশক্তি এজন্যই ইসলাম থেকে মুসলমানদের ফেরাতে মুসলিম দেশের রাজনীতির উপর দখলদারি চায়।বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলির রাজনীতিতে কাফের শক্তির বিনিয়োগটি এজন্যই অধিক। আজকের বাংলাদেশ মূলত তাদের হাতেই অধিকৃত। যারা এ দেশটির শাসক তারা স্বাধীন নয়,বরং বিজয়ী বিদেশীদের পদসেবী এজেন্ট বা প্রতিনিধি মাত্র। বাংলাদেশের উপর ভারত সে মহাবিজয়টি পেয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ১৯৭২য়ে তারা সৈন্য সরিয়ে নিলেও গুপ্তচর ও এজেন্টদের অপসারণ করেনি। বরং  এজেন্ট প্রতিপালনে প্রতি বছর যেমন শত শত কোটি টাকা ব্যয় করছে,তেমনি বহুশত কোটি টাকা ব্যয় করে প্রতিটি নির্বাচনে তাদেরকে বিজয়ী করতে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভারত তার আওয়ামী বাকশালী এজেন্টদের বিজয়ে যে বিপুল অর্থব্যয় করেছিল সে খতিয়ানটি দিয়েছে লন্ডনের বিখ্যাত পত্রিকা “দি ইকোনমিসস্ট”।

 

শত্রুর এজেন্ডা ও রিনিয়োগ

মুসলিম দেশে অমুসলিমদের যেমন এজেন্ডা থাকে তেমনি প্রচুর বিনিয়োগও থাকে। তবে সেটি অর্থনীতির ময়দানে নয়। সেটি বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির ময়দানে। সে বিনিয়োগের অর্থে ফুলে ফেঁপে উঠেছে বহু হাজার এনজিও। উঁই পোকার মত এরা ভিতর থেকে শিকড় কাটে। বাংলাদেশের মুসলমানদের উপর ভারতের সে বিনিয়োগটির শুরু একাত্তর থেকে নয়, বরং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরের দিন থেকে। সে বিনিয়োগটিই প্রকাণ্ড ফল দেয় ১৯৭১ সালে এসে। বাংলাদেশের ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের কাছে ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার হলো সাম্প্রদায়িকতা। সে যুক্তিটি দেখিয়ে ভারতীয় হিন্দুরা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা রুখতে চেয়েছে। এখন সে কথাটিই বাংলাদেশী সেক্যুলারিস্টরা ভারতীয়দের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলে। এসব সেক্যুলারিস্টদের কাছে ভারতীয়দের হিন্দু হওয়াটি সাম্প্রদায়িকতা নয়, কিন্তু মুসলিমদের ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠাটিই সাম্প্রদায়িক। আরো লক্ষণীয় হলো, তাদের কাছে প্যান-হিন্দুবাদ নিয়ে নানা প্রদেশের নানাভাষী হিন্দুদের মাঝে ঐক্য এবং সে একতা নিয়ে অখণ্ড ভারত নির্মাণও সাম্প্রদায়িকতা নয়। কিন্তু মুসলিমদের  প্যান-ইসলামী চেতনা নিয়ে রাষ্ট্র নির্মাণ তাদের কাছে শুধু সাম্প্রদায়িকতাই নয়, সেটি চিহ্নিত হয় সন্ত্রাস রূপে। তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় ইসলামী শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও। কারণ, প্যান-ইসলামী চেতনা ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা পেলে তাদের রাজনীতি থাকে না। প্যান-ইসলামী চেতনা গুরুত্ব পেলে অবাঙালী মুসলিমগণও তখন বাঙালী মুসলিমদের কাছে ভাই রূপে গৃহীত হয়। তখন মৃত্যু ঘটে বাঙালী জাতিয়তাবাদী জাহেলিয়াতের। আর শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেলে তো তাদের মত অপরাধীদের স্থান হয় কারাগারে অথবা কবরস্থানে। কারন তাদের অপরাধ তো আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের।

তাই একাত্তরের চেতনাধারিদের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানের ধ্বংস ছিল না, মূল লক্ষ্যটি ছিল ইসলামি চেতনার বিনাশ। সেটি যেমন জনগণের চেতনা থেকে, তেমনি রাষ্ট্রের অঙ্গণ থেকেও। রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনিক শক্তিকে তারা পরিনত করেছে ইসলামি চেতনা নির্মূলের হাতিয়ারে। একাত্তরের চেতনাধারিরা তাদের এ মিশনে সবচেয়ে বড় সাহায্য্যটি যে শুধু ভারত থেকে পাচ্ছে তা নয়, বরং সেটি আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট, ইউরেোপসহ বিশ্বের তাবত ইসলামবিরোধী শক্তি থেকে। তাদের কাছে ইসলামের প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগই হলো মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস। তারা যে কোন স্বৈরাচারকে মেনে নিতে রাজী আছে,কিন্তু ইসলামের শরিয়ত প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে নয়। কারণ ইসলাম প্রতিষ্ঠার মধ্যে তারা একটি প্রতিপক্ষ সভ্যতার নির্মাণ দেখতে পায়। সভ্যতার সংঘাতের লড়াইয়ে এমন একটি শক্তিতে তারা নিজেদের প্রতিপক্ষ গণ্য করে। সভ্যতার এ লড়াইয়ে যারাই ইসলামের বিপক্ষ তারাই তাদের মিত্র। আওয়ামী বাকশালীরা তো এজন্য ভারতীয় শাসকচক্রের এত কাছের। ইসলামকে রুখতে তারা পাপাচারের জোয়ার সৃষ্টি করে। সেটিকে তারা বলে আধুনিকতা। সেক্যুলার এ সরকারগুলির কাজ তাই সুনীতির প্রতিষ্ঠা যেমন নয়,তেমনি পাপাচারের নির্মূলও নয়। নর্দমার কীট যেমন আবর্জনায় পরিপুষ্টি পায়, এরাই তেমনি পরিপুষ্টি পায় দুর্নীতিতে। ফলে এদের মুল কাজটি হলো,পাপাচারে ও দুর্নীতি দেশটিকে দ্রুত নীচে নামানো। সে মিশনে এরা যে কতটা সফল সেটির প্রমাণ মেলে পৃথিবীর দুইশতটি দেশটির মাঝে দুর্নীতিতে ৫ বার প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে।

শুধু কালেমা পাঠে সংস্কৃতবান মানুষ সৃষ্টি হয় না। সেজন্য তাকে সংস্কারের একটি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। বহু বীজ যেমন গজিয়ে শেষ হয়ে যায়, তেমনি বহু মানুষের জীবনে কালেমা পাঠ থাকলেও পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার কাজটি হয়না। বাংলাদেশে বহু মুসলিম মুখে কালেমা পাঠ করলেও বেড়ে উঠেছে হিন্দু সংস্কৃতি নিয়ে। সংস্কারের চাষাবাদটি হয় চেতনারাজ্য, মুসলিম নরনারীর জীবনে সেখানে কাজ করে কোরআনী দর্শন। কোরআনের জ্ঞানার্জন এজন্যই ইসলামে ফরয। যেখানে সে জ্ঞান নাই, সেখানে সে সংস্কারও নাই। সে জ্ঞানহীনতার ইসলামী পরিভাষা হলো জাহিলিয়াত। জাহিলিয়াত নিয়ে মুসলমান হওয়াটি অসম্ভব। অথচ যার জীবন কোর’আনী জ্ঞানে সমৃদ্ধ তাঁর জীবনে সংস্কারটি আসে বিশাল আকারে। সে সংস্কারের চুড়ান্ত পর্ব হলো আল্লাহর রাস্তায় আত্মদান। তাই যে সমাজে কোরআনের চর্চা যত অধিক সে সমাজে ততই বাড়ে আল্লাহর পথে মোজাহিদ এবং শহীদের সংখ্যা। এবং সে জ্ঞানের শূন্যতায় বিপুল সংখ্যায় বেড়ে উঠে দুর্বৃত্তরা। ইসলামের শত্রু পক্ষ সেজন্যই কোর’আনী জ্ঞান নিয়ে বেড়ে উঠাটি রুখতে চায়। এজন্য তারা চায়, মুসলিম চেতনায় অশিক্ষা ও অজ্ঞতার তথা জাহিলিয়াতের আবাদ। সাবেক সোভিয়েত রাশিয়াতে এজন্যই কোরআনের জ্ঞানচর্চা বন্ধ করা হয়েছিল। তালা ঝুলিয়েছিল মসজিদ­-মাদ্রাসায়। অপরদিকে একই রূপ উদ্দেশ্য নিয়ে আজ মার্কিনীগণ মুসলিম দেশে সিলেবাস নিয়ন্ত্রণে নেমেছে।  বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ তেমনি একটি উদ্দেশ্য নিয়েই পীর-ফকির ও  আউল-বাউলদের খুঁজছে। আজ থেকে কয়েক শত বছর আগে ইসলামের বিজয় রুখার সে তাগিদে চৈতন্যদেবকে হাজির করা হয়েছিল।

অথচ ইসলামি সংস্কৃতি মু’মিনকে ইসলামি সভ্যতার নির্মানে নিরলস সৈনিকে পরিণত করে। তখন তার মূল্যবোধ, রুচীবোধ, পানাহার,রাজনীতি, পোষাকপরিচ্ছদ ও তার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সংস্কারপ্রাপ্ত এক মহান চেতনা ও জীবনবোধ। প্রকাশ পায় তার আল্লাহভীরুতা। এখানে কাজ করে আল্লাহর কাছে প্রিয়তর হওয়ার চেতনা। এ হলো তার বাঁচবার সংস্কৃতি। ঈমানদারের চিন্তুা ও কর্মে এভাবেই আসে পবিত্রতা -যা একজন কাফের বা মোনাফিকের জীবনে কল্পনাও করা যায় না। মুসলিম সমাজে এভাবেই আসে শান্তি,শৃঙ্খলা ও শ্লিলতা। অথচ সেক্যুলারের জীবনে সেটি আসে না। বরং সেক্যুলার সমাজে যেটি প্রবলতর হয় সেটি পার্থিব স্বার্থ হাসিলের প্রেরণা। জীবন-উপভোগে মানুষ এখানে প্রচণ্ড স্বেচ্ছাচারি হয়। সে স্বেচ্ছাচারকে ব্যক্তি-স্বাধীনতার লেবাস পড়িয়ে জায়েজ করে নিতে চায়। সেক্যুলার সমাজে পতিতাবৃত্তি,ব্যভিচার,সমকামিতা,অশ্লিলতা,মদ্যপানের ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বৈধ্যতা পায় জীবন উপভোগের এমন স্বেচ্ছাচারি প্রেরণা থেকেই। সেক্যুলারিজম প্রবলতর হলে পাপাচারে এজন্যই প্লাবন আসে। বাংলাদেশ আজ তেমনি এক প্লাবনে নিমজ্জমান। দুর্নীতির দ্রুত বৃদ্ধির কারণ তো এটাই।

 

চাই শত্রুমূক্ত স্বাধীনতা

আজকের বাংলাদেশে ভৌগলিক ভাবে অধিকৃত নয়। এখানে অধিকৃতিটি সাংস্কৃতির। এরূপ সাংস্কৃতিক অধিকৃতিই অসম্ভব করেছে সত্যিকার মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। আর সে অধিকৃতিটি ভারতসহ ইসলামের শত্রুপক্ষের। মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্য এ অধিকৃতিমূক্তিটি অপরিহার্য। মুসলিম রূপে বেঁচে থাকার জন্য ঘরবাঁধা,চাষাবাদ করা বা কলকারখানা গড়াই সবকিছু নয়। শুধু পনাহারে জীবন বাঁচে বটে, তাতে ঈমান বাঁচে না। এমন বাঁচার মধ্য দিয়ে সিরাতুল মোস্তাকিম নাই। বরং জুটে পথভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতায় বিপন্ন হয় আখেরাতের জীবন। ইহকাল ও পরকাল বাঁচাতে এজন্যই একজন চিন্তাশীল মানুষকে বেড়ে উঠতে হয় জীবন-বিধান, মূল্যবোধ, জীবন ও জগত নিয়ে একটি সঠিক ধারণা নিয়ে। নিত্য দিনের বাঁচবার সে কোরআনভিত্তিক প্রক্রিয়াটি হলো ইসলামী সংস্কৃতি। মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাকে সহজ করার লক্ষ্যেই শত্রুমূক্ত স্বাধীনতা চাই।

১৯৪৭য়ের আগে মুসলমানদের প্রতিপক্ষ শুধু ব্রিটিশগণ ছিল না, প্রবল প্রতিপক্ষ ছিল হিন্দুরা্রা। আল্লামা ইকবাল চেয়েছিলেন শুধু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের থেকে মুক্তি নয়, হিন্দুদের থেকে মুক্তিও। উভয়ের থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন হতে পরামর্শ দেন। এজন্যই আল্লামা ইকবালকে বলা হয় পাকিস্তানের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা। ইকবালের ধারণা যে কত নির্ভূল ছিল তার প্রমাণ আজকের ভারতীয় মুসলমানগণ। সংখ্যায় তারা পাকিস্তানের সমূদয় জনসংখ্যার চেয়ে অধিক, ইন্দোনেশিয়ার পরই তাদের অবস্থান। কিন্তু এতবড় বিশাল জনসংখ্যার সফলতা কোথায়? কিছু অভিনেতা, কিছু গায়ক-গায়ীকা, কিছু খেলোয়াড় সৃষ্টি করতে পারলেও তারা কি ইসলামী চেতনাসমৃদ্ধ মোজাহিদ, দার্শনিক ও আলেমের সৃষ্টি করতে পেরেছে? শুধু করাচীতে বা লাহোরে যে সংখ্যক আলেম, লেখক,বুদ্ধিজীবী,বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, আইনবিদ, প্রফেসর, ব্যবসায়ী ও শিল্পোক্তদাতা সৃষ্টি হয়েছে তা কি ভারতের সমগ্র মুসলমানগণ সৃষ্টি করতে পেরেছে। হাজার হাজার পাকিস্তানীরা প্রাণ দিয়েছে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত রাশিয়াকে হঠাতে, জিহাদের সে ময়দানে মোজাহিদ এসেছে সূদুর আফ্রিকা থেকে। কিন্তু ক’জন ভারতীয় মুসলমান সেখানে গেছে? অথচ মুসলমানের জীবনে জিহাদ তো অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতি। চেতনার সংস্কার যেখানে চুড়ান্ত,জিহাদ সে জীবনে অনিবার্য। কোন ভৌগলিক সীমান্ত দিয়ে কি সে জিহাদ সীমিত থাকে?

ভারত যে স্ট্রাটেজী নিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের শক্তিহীন করেছে সে অভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধেও। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলমান এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে ভারত একা নয়। কাজ করছে এক বিশাল কোয়ালিশন। এ কোয়ালিশনে ভারতের সাথে রয়েছে সমগ্র পাশ্চাত্য বিশ্ব এবং ইসরাইল। শত্রুপক্ষের এ কোয়ালিশনটি একই যুদ্ধ লড়ছে আফগানিস্তান,ইরাক ও ফিলিস্তিনে। বাংলাদেশের রণাঙ্গনে তারা অতি-উৎসাহী সহযোদ্ধা রূপে পেয়েছে দেশটির বিপুল সংখ্যক সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক ক্যাডার, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী, লেখক-সাংবাদিক, আইনজীবী, বিচারপতিসহ বহু সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা। বিশ্ব-রাজনীতির অঙ্গণ থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার বিদায়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল তাদের পথের কাঁটা এবার দূর হলো। আধিপত্য বিস্তৃত হবে এবার বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সেটি হয়নি। একমাত্র আফগানিস্তান দখলে রাখতেই তাদের হিমশিম খেতে হচেছ। পরাজিত হয়েছে ইরাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শেষ হতে ৫ বছর লেগেছিল। কিন্তু বিগত ১৭ বছর যুদ্ধ লড়েও মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৫০টিরও বেশী দেশের কোয়ালিশ বাহিনী আফগানিস্তানে বিজয় আনতে পারিনি। বরং দ্রুত এগিয়ে চলেছে পরাজয়ের দিকে। এখন তারা জান বাঁচিয়ে পালাবার রাস্তা খুঁজছে।

 

লক্ষ্য ইসলামী চেতনা নির্মূল

পাশ্চাত্যের কাছে এখন এটি সুস্পষ্ট, আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, লেবানন, সোমালিয়ার মত ক্ষুদ্র দেশগুলো দখল করা এবং সেগুলোকে কন্ট্রোলে রাখার সামার্থ্য তাদের নেই। যে প্রতিরোধের মুখে তারা হারতে বসেছে সেটির মূল হাতিয়ার যুদ্ধাস্ত্র নয়। জনবল বা অর্থবলও নয়। বরং সেটি কোরআনী দর্শন ও ইসলামের সনাতন জিহাদী সংস্কৃতি। এ দর্শন ও সংস্কৃতিই মুসলমানের জন্য আত্মসমর্পণকে অসম্ভব ও অচিন্তনীয় করে তুলেছে। বরং অতি কাম্য গণ্য হচ্ছে আগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই ও শাহাদত। এমন চেতনা এবং এমন সংস্কৃতির বলেই অতীতে মুসলমানেরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছিল। এ যুগেও তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ও বিশ্বশক্তি  রাশিয়াকে পরাজিত করেছে। এবং এখন গলা চেপে ধরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। আফগান মোজাহিদদের জিহাদ তাই পাল্টে দিচ্ছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ। কামান, বোমা ও যুদ্ধবিমানের বলে গণহত্যা চালানো যায়। নগর-বন্দরও ধ্বংস করা যায়। কিন্তু সে কামানে বা গোলায় কি দর্শন ও সংস্কৃতির বিনাশও সম্ভব? বরং তাদের আগ্রাসন ও গণহত্যায় প্রতিরোধের সে দর্শন ও সংস্কৃতিই দিন দিন আরো বলবান হচ্ছে। কোন মার্কিনীকে রণাঙ্গণে রাখতে মাথাপিছু প্রায় ১০ লাখ ডলার খরচ হয়। অথচ মুসলমানরা হাজির হচ্ছে নিজ খরচে। তারা শুধু স্বেচ্ছাই অর্থই দিচ্ছে না, প্রাণও দিচ্ছে।

অবস্থা বেগতিক দেখে পাশ্চাত্য এখন ভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়েছে। সেটি শুধু দেশদখল ও গণহত্যা নয়। নিছক নগর-বন্দর, ঘরবাড়ী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনাশও নয়। বরং সেটি ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি ধ্বংসের। কোরআনে বিশুদ্ধ ইসলাম ও সে ইসলামের অনুসারিদেরকে তারা শত্রু মনে করে। তারা চায়, মুসলমান বেঁচে থাকুক এমন এক ইসলাম নিয়ে যে ইসলামে জিহাদ নেই, শরিয়তের বিধান নাই এবং সূদ-ঘুষ-মদ্যপান ও ব্যভিচারের ন্যায় পাপাচারগুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধও নাই। এবং যুদ্ধ নাই সাম্রাজ্যবাদী দখলদারির বিরুদ্ধেও। আত্মসমর্পণের এমন বিকৃত ইসলামকে তারা বলছে প্রকৃত ইসলাম। বলছে মডারেট ইসলাম। সে লক্ষ্যে পৌছার জন্য শুরু করেছে প্রকান্ড আকারের এক সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। নতুন এ স্ট্রাটেজীর আলোকে শুধু নিরপরাধ মানুষ হত্যাই করছে না, ঈমান হত্যাতেও তৎপর হয়েছে। এবং সেটি শুধু আফগানিস্তান ও ইরাকে সীমিত নয়। বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশই এখন একই রূপ সাংস্কৃতিক যুদ্ধের শিকার। তবে বাংলাদেশ তাদের অন্যতম টার্গেট হওয়ার কারণ, দেশটিতে ১৬ কোটি মুসলমানের বাস। তেল, গ্যাস বা অন্য কোন খনিজ সম্পদের চেয়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার ফ্যাক্টরটিই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেল, গ্যাস বোমায় পরিণত হয়না, কিন্তু মানুষ হয়। মাত্র ১৭ জন মুসলিম সৈনিক আজ থেকে হাজার বছর আগে বাংলাসহ সমগ্র পূর্ব ভারতের রাজনৈতীক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রই পাল্টে দিয়েছিল। যে চেতনা নিয়ে ১৭ জন মুসলিম সৈনিক বাংলা জয় করেছিল সে চেতনায় ১৬ কোটি মুসলমান জেগে উঠলে সমগ্র ভারতের মানচিত্রই যে পাল্টে যাবে। ভারতও সেটি বুঝে। তাই বাংলাদেশীরা যুদ্ধ না চাইলেও ভারতের পক্ষ থেকে অর্পিত যুদ্ধের টার্গেট হওযা থেকে বাঁচার উপার নাই। বাঁচতে হলে লড়াই করেই বাঁচতে হবে।

ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের লড়াইটি সব সময়ই লাগাতর। শত্রুর পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেয়া এমন যুদ্ধ থেকে খোদ নবীজীও বাঁচতে পারেননি। মাত্র ১০ বছরে তাকে ৫০ টির বেশী যুদ্ধ করতে হয়। এমন যুদ্ধে শত্রুর লক্ষ্য, শুধু দৈহীক নির্মূল নয়, মুসলমানদের ঈমানকে হত্যা করা। চলমান এ যুদ্ধে পরাজিত হলে অতি কঠিন হবে বাংলাদেশের মুসলমানদের ঈমান নিয়ে বাঁচা। ফলে সংকটে পড়বে আখেরাতের জীবনও। তবে শত্রুর কাছে যারা আত্মসমর্পিত, তাদের জীবনে যুদ্ধ আসে না, বরং আসে লাগাতর গোলামী। পোষা কুকুরে ন্যায় তাদের গলায় তখন শোভা পায় পরাধীনতার শিকল। তাজুদ্দীনের আমলে সে শিকলটি ছিল ভারতের সাথে ৭ দফা চুক্তির, আর মুজিবামলে সেটি ছিল ২৫ সালা চুক্তির। তবে গৃহপালীত বা আত্মবিক্রীত হলে আর চুক্তি লাগে না। এমন গোলামদের কাছে দাসত্ব তখন জীবন-সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। শেখ হাসিনার অআমলে তাই আর চুক্তি লাগছে না। ভারতের গোলামীটাই এখন রাজনীতির সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

 

যে যুদ্ধের শেষ নেই

বাইবেলের বা বেদ-উপনিষদের জ্ঞান দিয়ে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করা অসম্ভব। সেটি অসম্ভব মুসলিম জনপদে পাদ্রী বা পুরোহিতদের নামিয়ে। ব্রিটিশ শাসকেরা সেটি জানতো। জানে আজকের ভারতীয় হিন্দুশাসকগণও। ফলে ইসলামের বিরুদ্ধে তারা সৈন্য নামিয়েছে ইসলামী শিক্ষার ছ্দ্দবেশে। যুগে যুগে ইসলামের শত্রুপক্ষের এটাই কৌশল। মুসলমানেদের মাঝে কাউকে নামিয়েছে আলেমের বেশে, কাউকে বা রাজনীতিবিদ বা বুদ্ধিজীবীর বেশে। তেমন এক স্ট্রাটেজী নিয়ে ব্রিটিশগণ ভারতে আলিয়া মাদ্রাসা খুলেছিল। উপমহাদেশের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে এসব মুসলিম নামধারিদের হাতে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে সূদী লেনদেন, ঘুষ, বেপর্দা ও অশ্লিলতা,সেক্যুলার রাজনীতি, পতিতাপল্লি, মদ্যপান ও ব্যভিচারের ন্যায় নানা দুর্বৃত্তি বিনা প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তো তাদের কারণেই। এরা মুসলমানদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করেছে জিহাদের ন্যায় ইসলামের মূল শিক্ষাকে। ফলে নিরাপদ হয়েছিল তাদের ১৯০ বছেরের শাসন। ইসলামে বিরুদ্ধে সে সফল স্ট্রাটেজী নিয়ে তারা আবার ময়দানে নেমেছে বাংলাদেশে। এখন সে কাজে বাংলাদেশে ব্যবহার করতে চায় জনগণের নিজ অর্থে প্রতিষ্ঠিত হাজার হাজার স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সেক্যুলারিষ্টদের সহায়তায় ইতিমধ্যই এখন এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের হাতে অধিকৃত। অধিকৃত দেশের অধিকাংশ মিডিয়াও। শুরু হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রপাগান্ডা। তাদের কথা, ইসলাম এ যুগে অচল। ইসলামের নামে মুসলমানদের চৌদ্দশত বছর নেয়া যাবে না। যেন ইসলাম শুধু নবীজী (সাঃ)র জামানার লোকদের জন্যই নাযিল হয়েছিল। তারা শরিয়তকে বলছে মানবতাবিরোধী। সে প্রপাগান্ডাকে ব্যাপকতর করছে বাংলাদেশের বহু টিভি চ্যানেল,পত্র-পত্রিকা ও বই-পুস্তক। সেগুলির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছে হাজার হাজার এনজিও। এদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা হলো, নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলামকে জনগণের মন থেকে ভূলিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর কোরআনী হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করা।

বাংলাদেশে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশী-বিদেশী ইসলামী বিরোধী শক্তির সম্মিলিত স্ট্রাটেজী হলো,মুসলমানদের জীবন থেকে জিহাদের সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা। এবং ভূলিয়ে দেয়া ইসলামের এ মৌল শিক্ষাটিকে। অথচ ইসলাম থেকে নামায-রোযাকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি আলাদা করা যায় না জিহাদকেও। পবিত্র কোরআনে জিহাদে যোগ দেয়ার নির্দেশ এসেছে বার বার। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন জিহাদে। নবীজী (সাঃ) নিজে যুদ্ধ লড়েছেন বহুবার; ওহুদের যুদ্ধে শহীদও হয়েছেন। ইসলামের বহু শত্রুকে হত্যা এবং বনু কুরাইজা ও বনু নাযির ন্যায় ইহুদী বস্তিকে নির্মূল করা হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। অথচ নবীজী (সাঃ)র সে আপোষহীন নীতি ও ইসলামের সে সংগ্রামী ইতিহাসকে তারা সুপরিকল্পিত ভাবে আড়াল করতে চায়। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বাইরেও শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও আইন-আদলতের সংস্কারে ঈমানদারের যে গুরুতর দায়ভার রয়েছে সেটিকেও ভূলিয়ে দিতে চায়।

সৈনিকদের হাত থেকে হাতিয়ার কেড়ে নিলে তারা শক্তিহীন ও প্রতিরক্ষাহীন হয়, তেমনি ঈমানদারগণ জিহাদশূণ্য হলে ইসলামের পক্ষে দাঁড়াবার কেউ থাকে। শত্রুপক্ষ তখন বিনা বাধায় আল্লাহর শরিয়তী বিধানকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে। তখন আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয় সর্বত্র জুড়ে।বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলমানের সামনে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হচ্ছে,এবং তাঁর শরিয়তী বিধান অপমানিত হচ্ছে তো এ কারণেই। সাহাবায়ে কেরামের যুগে মুসলমানদের সংখ্যা এর হাজার ভাগের এক ভাগও ছিল না। কিন্তু তাদের সামনে আল্লাহর শরিয়তী বিধান এভাবে পরাজিত ও অপমানিত হয়নি। কারণ তাদের ঈমানের সাথে জিহাদও ছিল। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের এ এক শোচনীয় পরাজয়। বিপুল বিজয়ীর বেশে এখানে ইসলামের শত্রুপক্ষ। মহান আল্লাহর বদলে রাষ্ট্রের মালিক-মোখতার হয়ে পড়েছে দুর্বৃত্তরা। অথচ এ বিজয় আনতে শত্রুপক্ষকে একটি তীরও ছুড়তে হয়নি। কারণ সে যুদ্ধটি হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির ময়দানে,এবং যুদ্ধ লড়েছে সাংস্কৃতিক কর্মীরা। নিজেদের রক্তক্ষয় ও অর্থব্যয় এড়াতে বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম ভূমিতে এমন একটি যুৎসই সাংস্কৃতিক যুদ্ধকেই তারা লাগাতর চালিয়ে যেতে চায়। ফলে এ যুদ্ধের শেষ নাই। দেশটির সাংস্কৃতিক রণাঙ্গনে তাদের বিপুল সৈন্যসমাবেশ ও আয়োজন দেখে তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে?  ১৪/০৪/২০১২ দ্বিতীয় সংস্করণ ১৭/০৩/২০১৯

 




আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সংস্কৃতি ও রাজনীতি

 বিদ্রোহের সংস্কৃতি ও রাজনীতি

ব্যক্তির জীবনে প্রতিটি পাপ, প্রতিটি দুর্বৃত্তি, আল্লাহর হুকুমের প্রতিটি অবাধ্যতাই হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা প্রকাশ পায় বেপর্দা, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা, নাচগান, মদ্যপান, মাদকাশক্তি,সন্ত্রাস, দূর্নীতি ইত্যাদীর ব্যাপক বৃদ্ধিতে। জাতীয় জীবনে সেটি প্রকাশ পায় দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, সূদমূক্ত ব্যাংক ও অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশ আল্লাহর বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহে সমগ্র বিশ্বমাঝে একবার নয়, ৫ বার শিরোপে পেয়েছে। তাদের সে মহাবিদ্রোহটি ঘটেছে আল্লাহর নির্দেশিত সুনীতি প্রতিষ্ঠার হুকুমের অবাধ্যতা এবং সর্বস্তরে দূর্নীতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এরূপ শিরোপা লাভই কি বলে দেয় না দেশটির মানুষের জীবনযাত্রার প্রক্রিয়া তথা সংস্কৃতি কতটা অসুস্থ্য ও বিদ্রোহাত্মক? এবং সাংস্কৃতিক যুদ্ধে ইসলামের পক্ষের শক্তি কতটা পরাজিত? প্রবল রূপ পেয়েছে বিদ্রোহের সংস্কৃতি।

ব্যক্তির সংস্কৃতির পরিচয় মেলে পোষাক-পরিচ্ছদ বা পানাহার থেকে নয়। বরং কীরূপ দর্শন বা চেতনা নিয়ে সে বাঁচলো তা থেকে। সংস্কৃতির মূল উপাদান হলো এই দর্শন। বস্তুত দর্শনই মানুষকে পশু থেকে পৃথক করে। নাচগান তো পশুপাখিও করে। কিন্তু তাতে কোন দর্শন থাকে না। তাই পশুপাখির নাচে-গানে কোন সমাজই সভ্যতর হয় না,সেখানে সভ্যতাও নির্মিত হয় না। তাই যে সমাজের সংস্কৃতি যতটা দর্শন-শূন্য সমাজ ততটাই মানবতা বর্জিত। সে সমাজ তখন ধাবিত হয় পশুত্বের দিকে। দর্শনই নির্ধারণ করে দেয় কে কীভাবে বাঁচবে, কীভাবে পানাহার করবে, কীভাবে জীবন যাপন করবে বা উৎসব করবে সেটি। চেতনার এ ভিন্নতার কারণেই একজন পতিতা, ঘুষখোর, সন্ত্রাসী এবং দুর্বৃত্তের বাঁচার ধরণ,পোষাক-পরিচ্ছদ, পানাহার ও উৎসবের ধরণ ঈমানদারের মত হয় না। মুসলমানের সংস্কৃতি এজন্যই অবিশ্বাসী বা কাফেরের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি বিশেষ বিশ্বাস বা দর্শন জন্ম দেয় একটি বিশেষ রুচী ও সে রুচীভিত্তিক অভ্যাস। সে অভ্যাসের কারণেই ব্যক্তি বেড়ে উঠে সে সংস্কৃতির মানুষ রূপে। সংস্কৃতি এভাবেই সমাজে নীরবে কাজ করে। মুসলিম সমাজ থেকে সৎ নামাযী ও রোযাদারের পাশাপাশী আপোষহীন মোজাহিদ বের হয়ে আসে তা তো সংস্কৃতির সে ইন্সটিটিউশন সক্রিয় থাকার কারণেই। যেখানে সেটি নেই, বুঝতে হবে সেখানে সে পূণ্যময় সংস্কৃতিও নাই।

মুসলমানদের শক্তির মূল উৎস তেল-গ্যাস নয়, জনশক্তিও নয়। সে শক্তি হলো কোরআন ভিত্তিক দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতি। এজন্যই শত্রুপক্ষের আগ্রাসনের শিকার শুধু মুসলিম দেশের ভূগোল নয়, বরং মূল টার্গেট হলো ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি। তাই পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ বাংলাদেশের মত দেশে বোমা বা যুদ্ধ বিমান নিয়ে হাজির হয়নি। হাজির হয়েছে সাংস্কৃতিক প্রকল্প নিয়ে। বাংলাদেশের হাজার হাজার এনজিওর উপর দায়িত্ব পড়েছে সে প্রকল্পকে কার্যকর করা। দেশের সংস্কৃতিকে তারা এভাবে ইসলামের শিক্ষা ও দর্শন থেকে মূ্ক্ত করতে চাচ্ছে। রাস্তায় মাটি কাটা ও তূত গাছ পাহাড়া দেওয়াকে মহিলার ক্ষমতায়ন বলে এসব এনজিওগুলো তাদেরকে বেপর্দা হতে বাধ্য করছে। অপর দিকে মাইক্রোক্রেডিটের নামে সাধারণ মানুষকে সূদ দিতে ও সূদ খেতেও অভ্যস্থ করছে। অথচ সূদ খাওয়া বা সূদ দেওয়া –উভয়ই হলো আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। ডক্টর ইউনুসকে পাশ্চাত্য মহল নোবেল প্রাইজ দিয়েছে। সেটি এজন্য নয় যে, বাংলাদেশ থেকে তিনি দারিদ্র্য নির্মূল করেছেন। বরং দেশে যতই বাড়ছে গ্রামীন ব্যাংক, ব্রাক বা সূদ ভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট এনজিওর শাখা ততই বাড়ছে দারিদ্র্য। ডক্টর ইউনুস নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন এজন্য যে, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে বিদ্রোহ করতে তিনি অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছেন। এত বড় সাফল্য ইংরেজগণ তাদের ১৯০ বছরের শাসনেও অর্জন করতে পারিনি। ফলে শুধু নোবেল পুরস্কার নয়, এর চেয়ে কোন বড় পুরস্কার থাকলেও তারা তাকে দিত।

 

লক্ষ্য: মুসলিম সংস্কৃতির বিনাশ

ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের মূল এজেন্ডাটি কি সেটি বুঝা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আফগানিস্তান দখল ও সেখানে চলমান কার্যক্রম থেকে। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সেখানে মুসলিম সংস্কৃতির বিনাশে হাত দিয়েছে। আফগানিস্তানের অপরাধ, অতীতে দেশটির জনগণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছে। এবং সেটি কোন জনশক্তি, সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক শক্তির বলে নয়, বরং ইসলামি দর্শন ও সে দর্শন-নির্ভর আপোষহীন জিহাদী সংস্কৃতির কারণে। সে অভিন্ন দর্শন ও দর্শনভিত্তিক সংস্কৃতির বলেই তারা আজ  মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্রদের পরাজিত করতে চলেছে। ফলে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ সে দর্শন ও সে দর্শন-ভিত্তিক সংস্কৃতির নির্মূলে করতে চায়। এবং সে বিনাশী কর্মের পাশাপাশি বিপুল বিণিয়োগ করছে সেদেশে সেক্যুলার দর্শন ও সেক্যুলার সংস্কৃতির নির্মানে। এটিকে তারা বলছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামোর নির্মান। পরিকল্পিত ভাবে গড়ে তুলছে অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আফগানিস্তানের শিশুরা এখনও নানা রোগভোগে লাখে লাখে মারা যাচ্ছে। কিন্তু তা থেকে বাঁচানোয় আগ্রহ তাদের নেই, অথচ শত শত মিলিয়ন ডলার খরচ করছে তাদের নাচগান শেখাতে। বিবাহের বয়স বাড়িয়ে সহজতর করা হচ্ছে ব্যাভিচারকে।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশরের মত দেশে অতীতে একই রূপ স্ট্রাটেজী নিয়ে কাজ করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। এদেশগুলির উপর তাদের দীর্ঘ শাসনমামলে তেমন কোন শিল্প কলকারখানা বা প্রযুক্তি গড়ে না উঠলেও তারা সে সব দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেক্যুলার করেছিল। সে আমলে প্রতিটি শহরে গড়া হয়েছে ব্যাভিচার পল্লি। গড়া হয়েছ সুদী ব্যাংক। ফলে এনেছে সাংস্কৃতিক জীবনে প্রচন্ড বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি। সেক্যুলারলিজমের অভিধানিক অর্থ হলো ইহজাগতিকতা। সেক্যুলারিজমের অর্থ, ব্যক্তি তার কাজ-কর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে প্রেরণা পাবে ইহজাগতিক আনন্দ-উপভোগের তাগিদ থেকে, ধর্ম থেকে নয়। উপভোগ বাড়াতে সে নাচবে, গাইবে, বেপর্দা হবে, অশ্লিল নাটক ও ছায়াছবি দেখবে। মদ্যপান করবে এবং ব্যাভিচারিতেও লিপ্ত হবে। উপার্জন বাড়াতে সে সূদ খাবে এবং ঘুষও খাবে। এগুলো ছাড়া তাদের এ পার্থিব জীবন আনন্দময় হয় কি করে? অপর দিকে ধর্মপালনকে বলেছে মৌলবাদী পশ্চাদ-পদতা ও গোঁড়ামী। তাই দেশে সেক্যুলারিজম বাড়লে অসভ্যতা এবং দূর্নীতিও বাড়ে। এ কারণেই বাংলাদেশ বিশ্বের দুইশত দেশের মাঝে দূর্নীতিতে লাগাতর ৫ বার প্রথম স্থান অধিকার করেছে।

কোন মুসলিম দেশে এমন সেক্যুলার চেতনা ও সংস্কৃতির প্রোকোপ বাড়লে জনগণের মন থেকে আল্লাহতায়ালার ভয়ই বিলুপ্ত হয়। মুসলমানগণ তখন ভূলে যায় নিজেদের ঈমানী দায়বদ্ধতা। বরং বাড়ে মহান আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রবনতা। ফলে বাংলাদেশ, মিশর, পাকিস্তান বা তুরস্কের মত দেশে আল্লাহর আইন তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন কাফেরকে অস্ত্র ধরতে হয়নি। সেকাজের জন্য বরং মুসলিম নামধারি সেক্যুলারগণই যথেষ্ঠ করিৎকর্মা প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামের জাগরণ ও মুসলিম শক্তির উত্থান রুখার লক্ষ্যে আজও দেশে দেশে পাশ্চত্যের অনুগত দাস গড়ে তোলার এটিই সফল মডেল। মার্কিন দখলদার বাহিনী সেটিরই বাস্তবায়ন করছে আফগানিস্তানে। এ স্ট্রাটেজীক কৌশলটির পারঙ্গমতা নিয়ে ব্রিটিশ শাসকচক্রের মনে কোন রূপ সন্দেহ ছিল না। যেখানে অধিকার জমিয়েছে সেখানেই এরূপ সেক্যুলারদেরকেই সযত্নে গড়ে তুলেছে। তাদের সংখ্যা পর্যাপ্ত সংখ্যায় বাড়াতে যেখানে দেরী হয়েছে সেদেশের স্বাধীনতা দিতেও তারা বিলম্ব করেছে। সে ব্রিটিশ পলিসির পরিচয়টি মেলে মিশরে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিনিধি লর্ড ক্রোমারের লেখা থেকে। তিনি লিখেছেন, “কোন ব্রিটিশ উপনিবেশকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা যতক্ষণ না সে দেশে এমন এক সেক্যুলার শ্রেণী গড়ে না উঠে যারা চিন্তা-চেতনায় হবে ব্রিটিশের অনুরূপ।”

ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে ব্রিটিশ পলিসি যে কতটা ফলপ্রসু হয়েছে তার প্রমাণ মিলে বাংলাদেশের মত সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর প্রশাসন, রাজনীতি, সেনাবাহিনী ও বিচার ব্যবস্থায় সেক্যুলার ব্যক্তিদের প্রবল আধিপত্য দেখে। আজও আইন-আদালতে ব্রিটেশের প্রবর্তিত পেনাল কোড। বাংলাদেশের সেক্যুলার সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ মুসলিম দেশের জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিপালিত হলে কি হবে, দেশে যারা শরিয়ত বা আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা চায় ব্রিটিশদের ন্যায় তারাও তাদেরকে শত্রু মনে করে। আর বিশ্বস্থ্য আপনজন মনে করে ভিন্ দেশী কাফেরদের। এদের কারণেই মুসলিম দেশে হামিদ কারজাইয়ের মত দাস পেতে ইসলারেম শত্রুপক্ষের কোন বেগ পেতে হয় না। ইসলামি দর্শন থেকে দূরে সরানো এবং মগজে সেক্যুলার চেতনার পরিচর্যাকে তীব্রতর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের মত দেশে সেক্যুলার দিনক্ষণকে ইতিহাস থেকে খুঁজে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিচ্ছে। এরই উদাহরণ, বাংলাদেশের মত দেশে বসন্তবরণ বা নববর্ষের দিন উদযাপন। নবীজীর হাদীস, মুসলমানের জীবনে বছরে মাত্র দুটি উৎসব। একটি ঈদুল ফিতর, এবং অপরটি ঈদুল আদহা বা কোরবানীর ঈদ। বাংলার মুসলমানগণ এ দুটো দিনই এতদিন ধুমধামে উদযাপন করে আসছে। বাংলার মুসলমানদের জীবনে নববর্ষের উৎসব কোন কালেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

 

 

শয়তানী শক্তির লক্ষ্য: মূল পরীক্ষায় বিফল করা

এ জীবনে কে কতটা সফল বা বিফল -সে মূল্যায়নটি আসে মহান আল্লাহতায়লার মূল্যায়ন থেকে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহর নিজস্ব ঘোষণাটি হলো, “তিনিই (মহান আল্লাহতায়ালা) জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন যেন পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।” –(সুরা মুলুক, আয়াত ২)। অর্থাৎ মানুষের জন্য এ পার্থিব জীবন পরীক্ষা-কেন্দ্র মাত্র। শয়তানের লক্ষ্য: জীবনের এ চুড়ান্ত পরীক্ষায় বিফল করা। সে লক্ষ্য পূরণে শয়তানের স্ট্রাটেজী বহুবিধ। হাজির হয় সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্মের নামে। আয়োজন বাড়ে খেলাধুলা ও নাচগানের। তখন শুরু হয় জাহান্নামের পথে চলা। প্রশ্ন হলো, পরীক্ষা দিতে বসে কেউ কি নাচগান করে? নাচগান, খেলাধুলা বা উৎসবের আয়োজন তো পরীক্ষায় মনযোগী হওয়াই অসম্ভব করে তোলে। নবীজীর হাদীস,“পানি যেমন শস্য উৎপাদন করে,গানও তেমনি মুনাফেকি উৎপন্ন করে।” মুনাফেকী তো ইসলামে অঙ্গিকার শূন্যতা,ঈমানের সাথে তার আমলের গড়মিল। তাই প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের হাতে মুসলমানদের শক্তি ও মর্যাদা বাড়লেও নাচগান বাড়েনি। সংস্কৃতির নামে এগুলো শুরু হলে যেটি বাড়ে তা হলো পথভ্রষ্টতা। তখন সিরাতুল মোস্তাকিমে পথচলাই অসম্ভব হয়ে উঠে। তাই এগুলো শয়তানের স্ট্রাটেজী, মুসলমানের নয়।

নতুন বছর, নতুন মাস, নতুন দিন নবীজী(সাঃ)র আমলেও ছিল। কিন্তু তা নিয়ে তিনি নিজে যেমন কোনদিন উৎসব করেননি, সাহাবাগণও করেননি। অথচ তারাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ও সংস্কৃতি গড়েছিলেন। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাগান এ ব্যাপারে অতিশয় মনযোগী ছিলেন যেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সমাজ বা রাষ্ট্রে এমন কিছুর চর্চা না হয় যাতে সিরাতুল মোস্তাকিমে চলাই অসম্ভব হয়। এবং মনযোগে ছেদ পড়ে ধর্মের পথে পথচলায়। ড্রাইভিং সিটে বসে নাচগানে মত্ত হলে কি সঠিক ভাবে গাড়ী চালানো যায়? এতে বিচ্যুতি ও বিপদ তো অনিবার্য। অবিকল সেটি ঘটে জীবন চালোনার ক্ষেত্রেও। নবীজী(সাঃ)র আমলে সংস্কৃতির নামে আনন্দ উপভোগের প্রতি এত আকর্ষণ ছিল না বলেই সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা তাদের জন্য সহজতর হয়েছিল। বরং তারা জন্ম দিয়েছিলেন মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতির। সে সংস্কৃতির প্রভাবে একজন ভৃত্যও খলিফার সাথে পালাক্রমে উঠের পিঠে চড়েছেন। এবং খলিফা ভৃত্যকে উঠের পিঠে বসিয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এর কোন তুলনা  নেই। অথচ বাংলাদেশে আজ সংস্কৃতির নামে কি হচ্ছে? ২০১০ সালে এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা নববর্ষের কনসার্টে কী ঘটেছিল? যৌন ক্ষুধায় অতি উদভ্রান্ত অসংখ্য হায়েনা কি সেদিন নারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়িনি? অসংখ্য নারী কি সেদিন  লাঞ্ছিত হয়নি? কিছু কাল আগে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ব্যান্ড সঙ্গীতের আসরে কী ঘটলো? শত শত নারী কি সেদিন ধর্ষিতা হয়েছিল শত শত নারী। এটিই কি বাঙালী সংস্কৃতি? দেশের সেক্যুলার পক্ষ এমন সংস্কৃতির উৎকর্ষতা চায়?

 

লক্ষ্য: ইসলাম থেকে দূরে সরানো

নববর্ষ উদযাপনের নামে নারী-পুরুষদের মুখে উলকি কেটে বা নানান সাজে একত্রে রাস্তায় নামানোর রীতি কোন মুসলিম সংস্কৃতি নয়। বাঙালীর সংস্কৃতিও নয়। এমনকি বাঙালী হিন্দুদেরও নয়। নববর্ষে নামে বাংলায় বড়জোর কিছু হালখাতার অনুষ্ঠান হতো। কিন্তু কোন কালেই এদিনে কনসার্ট গানের আয়োজন বসেনি। জন্তু-জানোয়ারের প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিলও হয়নি। পাশ্চাত্যেও নববর্ষের দিনে এমন উৎসব দিনভর হয় না। বাংলাদেশে এগুলীর এত আগমন ঘটেছে নিছক রাজনৈতিক প্রয়োজনে। যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যে অনেক সময় নতুন প্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্র সৈনিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অনেক সময় তাতে বিজয়ও আসে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে সংস্কৃতির নামে এসব অভিনব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ত্বড়িৎ বিজয়ের লক্ষ্যে। তাদের লক্ষ্য নাচ-গান, কনসার্টের নামে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়ে  নতুন ঢংযের এসব আয়োজন বাড়ানো হয়েছে তেমনি এক ষড়যন্ত্রমূলক প্রয়োজনে। পাশ্চাত্যের যুবক-যুবতীদের ধর্ম থেকে দূরে টানার প্রয়োজন নেই। জন্ম থেকেই তারা ধর্ম থেকে দূরে। নাচগান, মদ, অশ্লিলতা, উলঙ্গতা ও ব্যভিচারের মধ্য দিয়েই তাদের বেড়ে উঠা। তাই নববর্ষের নামে তাদের মাঝে এ সবে অভ্যস্থ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেটির প্রয়োজন রয়েছে বাংলাদেশে। সেটি ধর্ম থেকে ও নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরানোর লক্ষ্যে। এসবের চর্চা বাড়াতে কাজ করছে প্রচুর দেশী-বিদেশী এনজিও। এমন অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয়ও হচ্ছে। এবং সে অর্থ আসছে বিদেশীদের ভান্ডার থেকে। এভাবে নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার পাশপাশি অশ্লিলতারও সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এবং লুপ্ত করা হচেছ ব্যভিচার ও অশ্লিলতাকে ঘৃণা করার অভ্যাস, -যা পাশ্চাত্য থেকে বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে।

শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য মুসলিম দেশেও এরূপ নববর্ষ পালনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ পাশ্চাত্য দেশ বিপুল অংকের অর্থ সাহায্য দিচ্ছে। ইরানী-আফগানী-কিরগিজী-কুর্দীদের নওরোজ উৎসবের দিনে প্রেসিডেন্ট ওবামা বিশেষ বানীও দিয়েছে। তবে নববর্ষের নামে বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিণিয়োগের মাত্রাটি আরো বিচিত্র ও ব্যাপক। এখানে বানী নয়, আসছে বিপুল বিণিয়োগ। কারণ, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। আফগানিস্তানের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ। জনসংখ্যার ৯০% ভাগ মুসলমান, যাদের আপনজনেররা ছড়িয়ে আছে ব্শ্বিজুড়ে। ফলে এদেশে ইসলামের দর্শন প্রচার পেলে তা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। এ বিশাল জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে সেক্যুলার সংস্কৃতিতে বশ করানো তাদের কাছে তাই অতিগুরুত্বপূর্ণ। তারা চায় এ পৃথিবীটা একটি মেল্টিং পটে পরিণত হোক। আলু-পটল, পেঁয়াজ-মরিচ যেমন চুলার তাপে কড়াইয়ে একাকার হয়ে যায়, তেমনি বিশ্বের সব সংস্কৃতির মানুষ একক সংস্কৃতির মানুষের পরিণত হোক। এভাবে নির্মিত হোক গ্লোবাল ভিলেজ। আর সে গ্লোবাল ভিলেজের সংস্কৃতি হবে পাশ্চাত্যের সেক্যুলার সংস্কৃতি। এজন্যই বাংলাদেশে নারী-পুরুষকে ভ্যালেন্টাইন ডে, বর্ষপালন,মদ্যপান, অশ্লিল নাচ, পাশ্চাত্য ধাঁচের কনসার্টে অভ্যস্থ করায় এসব এনজিওদের এত আগ্রহ। তারা চায় তাদের সাংস্কৃতিক সীমানা বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের প্রতি বসতঘরের মধ্যেও বিস্তৃত হোক। তাই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সীমানা আজ বিলুপ্ত।

 

মহাবিপর্যের পথে

বিপদের আরো কারণ, এতবড় গুরুতর বিষয় নিয়েও কারো কোন  দুশ্চিন্তা নেই। কোন পরিবারে কেউ মৃত্যুশয্যায় পড়লে সে পরিবারে দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না, দৌড়াদৌড়ি শুরু হয় কিভাবে তাকে বাঁচানো যায় তা নিয়ে। অথচ আজ সততা, নৈতীকতা ও ঈমান-আমলের দিক দিয়ে শয্যাশায়ী সমগ্র বাংলাদেশ। সমগ্র দেশবাসী ছুটে চলেছে মহা বিপদের দিকে। সামনে অনন্ত অসীম কালের জাহান্নাম। অথচ তা নিয়ে ক’জন আলেম, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও লেখক উদ্বিগ্ন? ক’জন মুখ খুলেছেন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন? ১৭৫৭ সালের চেতনা থেকে বাংলার মুসলমান কি সামান্যতমও সামনে এগিয়েছে? তখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্রিটিশের দখলদারি। অস্তমিত হয়েছিল বাংলার মুসলমানদের স্বাধীনতা। সে পরাধীনতা বিরুদ্ধে কোন জনপদে ও গ্রাম-গঞ্জে সাথে সাথে কোনরূপ প্রতিরোধ বা বিদ্রোহের ধ্বনি উঠেছিল -সে প্রমাণ নেই। বরং যে যার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ততা থেকেছে। দেশের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু ভাবা বা কিছু করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ শত্রুর হামলার মুখে প্রতিরোধের এ দায়ভার প্রতিটি মুসলমানের। এ কাজ শুধু বেতনভোগী সৈনিকের নয়। প্রতিটি নাগরিকের। ইসলামে এটি জিহাদ। মুসলমানদের গৌরব কালে এজন্য কোন সেনানীবাস ছিল না। প্রতিটি গৃহই ছিল সেনানীবাস। প্রতিটি নাগরিক ছিল সৈনিক। প্রতিটি যুদ্ধে ঈমানদারগণ তখন স্বেচ্ছায় নিজ নিজ ঘর থেকে নিজ খরচে যুদ্ধে গিয়ে হাজির হয়েছেন। সে জিহাদের সমুদয় খরচ তারা নিজেরা পেশ করেছেন। অথচ আজ সেনানীবাসের পর সেনানীবাস বেড়েছে, রাজস্বের সিংহভাগ সৈন্যপালেন খরচ হচ্ছে অথচ শত্রুর হামলার মুখে কোন প্রতিরোধ নেই। দেশের পর দেশ তাই অধিকৃত। এবং অধিকৃত মুসলিম দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতিও। এতে দূরত্ব বেড়েছে নবীজী (সা:) আমলের ইসলাম থেকে।

সাংস্কৃতিক সীমানা রক্ষার লড়ায়ে পরাজিত হলে পরাজয় অনিবার্য হয় ঈমান-আক্বীদা রক্ষার লড়ায়েও। কারণ, মুসলমানে ঈমান-আক্বীদা কখনো অনৈসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠে না। মাছের জন্য যেমন পানি চাই, ঈমান নিয়ে বাঁচার জন্যও তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি সংস্কৃতি চাই। মুসলমান তাই শুধু কোরআন পাঠ ও নামায-রোযা আদায় করেনি, ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়ত ও ইসলামি সংস্কৃতিরও প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলমানদের অর্থ, রক্ত, সময় ও সামর্থ্যের সবচেয়ে বেশী ভাগ ব্যয় হয়েছে তো ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির নির্মাণে। নামায-রোযার পালন তো কাফের দেশেও সম্ভব। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যা তথা ইসলামী বিধানের পূর্ণ পালন কি অমুসলিম দেশে সম্ভব? অতীতের ন্যায় আজকের মুসলমানদের উপরও একই দায়ভার। সেটি শুধু কলম-সৈনিকের নয়, প্রতিটি আলেম, প্রতিটি শিক্ষক, প্রতিটি ছাত্র ও প্রতিটি নাগরিকের উপরও। এ লড়ায়ে তাদেরকেও ময়দানে নেমে আসতে হয়। এ লড়াইটি হয় কোরআনী জ্ঞানের তরবারী দ্বারা। নবীজী (সাঃ)র যুগে সেটিই হয়েছে। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামায-রোযার আগে ফরয করা হয়েছে। কিন্তু সে ফরয পালনের আয়োজনই বা কোথায়?

অনেকেই জ্ঞানার্জন করছেন নিছক রুটিরুজির তালাশে। ফরয আদায়ের লক্ষে নয়। ফলে প্রচণ্ড শূণ্যতা ও বিচ্যুতি রয়েছে জ্ঞানার্জনের নিয়তেই। ফলে সে জ্ঞানচর্চায় তাদের রুটি-রুজী জুটছে ঠিকই, কিন্তু তাতে জ্ঞানার্জনের ফরয আদায় হচ্ছে না। বাড়ছে না জিহাদের ময়দানে লোকবল। এবং বাড়ছে না ইসলামের প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য এটি এক বিপদজনক দিক। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে অরক্ষিত শুধু দেশটির রাজনৈতিক সীমান্তুই নয়, বরং প্রচণ্ড ভাবে অরক্ষিত দেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও। দেশ তাই দ্রুত ধেয়ে চলেছে সর্বমুখি পরাজয় ও প্রচণ্ড বিপর্যের দিকে। ইসলামের নামে যা বেঁচে আছে সেটি নবীজী(সাঃ)র আমলের কোরআনী ইসলাম নয়। যে সনাতন ইসলামে শরিয়ত, খেলাফত, হুদুদ, শুরা, প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব ও জিহাদ ছিল, দেশটিতে সে ইসলামে মৃত্যু ঘটেছে বহু আগেই।  শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা ও নামায-রোযার সংখ্যা বাড়িয়ে কি এ বিপদ থেকে মুক্তি মিলবে? দ্বিতীয় সংস্করণ, ০৩/০৮/২০১৭

 

 




বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ এবং নাশকতা ইসলামের বিরুদ্ধে

নৃশংস নাশকতার রা্জনীতি

ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধটি নিছক সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতীক নয়। সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে সে যুদ্ধটি অতি প্রবল ভাবে হচ্ছে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ময়দানে। সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক যুদ্ধের তেমনি একটি অতি রক্তাত্ব রণাঙ্গণ হলো বাংলাদেশ। ইসলামবিরোধী পাশ্চাত্যের সে কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে আরেক আগ্রাসী দেশ ও মুসলিমদের অতি পরিচিত শত্রু ভারত। শত্রুপক্ষের আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া বা ফিলিস্তিনের মুসলিমদের বিরুদ্ধে আজ যা কিছু করছে, ভারতে অবিকল সেটিই ঘটে আসছে বিগত ৬০ বছরের বেশী কাল ধরে। সেটি যেমন অধিকৃত কাশ্মিরে, তেমনি কাশ্মিরের বাইরে ভারতীয় জিম্মি মুসলিমদের বিরুদ্ধে। একাত্তরের পর সে যুদ্ধই প্রবল ভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে বাংলাদেশে। কাশ্মিরে রক্ত ঝরছে মুসলিমদের এবং কেড়ে নেয়া হয়েছে তাদের স্বাধীনতা, বাংলাদেশেও রক্ত ঝরছে তাদের যারা ইসলামের পক্ষে কথা বলে। এবং কেড়ে নেয়া হয়েছে তাদের স্বাধীনতাও।

ভারতীয় বর্ণহিন্দুদের থেকে গরু-বাছুর, সাপ-শকুনেরাও পূজা পায়। নিরাপত্তাও পায়। কিন্তু তাদের কাছে ঘৃণ্য ও হত্যাযোগ্য গণ্য হয় মুসলিম নরনারী ও শিশু। সে অভিন্ন ঘৃণা নিয়ে মুসলিমদের ঘরে আগুণও দেয়া হয়। তাই থলিতে বা ঘরে স্রেফ গরুর গোশত রাখার সন্দেহে সে দেশে দিবালোকে পুলিশের সামনে অতি নৃশংস ভাবে মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে একই রূপ ধুমধাম করে অযোধ্যার বাবরী মসজিদও গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। সে অপরাধ রুখতে যেমন পুলিশ কোনরূপ ব্যবস্থা নেয়নি। তেমনি মসজিদ গুড়িয়ে কাউকে শাস্তিও দেয়নি। ভারতীয় সরকার ও তার পুলিশের কাছে অপরাধের সংজ্ঞা যে ভিন্ন, সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে? কোন মুসলিম খুন হলে, মুসলিমের কোন ঘর জ্বালিয়ে দিলে বা কোন মসজিদ গুঁড়িয়ে দিলে ভারেত যে সেটি অপরাধ গণ্য হয় না -সেটি মুসলিম বিরোধী এত দাঙ্গা ও মুসলিমের এতো ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার পর গোপন থাকার কথা নয়। গরু বাঁচানোর লক্ষ্যে হাজার হাজার হিন্দু রাস্তায় নামলেও সে গরজ মুসলিমদের জান বাঁচাবার বেলায় নাই। বরং উল্টো, যারা গরু বাঁচাতে নেমেছ তারাই হত্যা করছে নিরীহ মুসলিমদের। এক্ষেত্রে সরকার ও সরকারি দলের প্রশ্রয়ও কি কম?

চোর-ডাকাত ও খুনিদের সাথে গলাগলি করে নিজ ঘরের বাসিন্দাদের চরিত্রে সাধুতা আনা যায় না। সভ্য হতে হলে তাই অসভ্যদের থেকে দূরে থাকতে হয়। এটিই ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু বাংলাদেশী সরকারে পরম বন্ধু ও অভিভাবক হলো দিল্লির নরেন্দ্র মোদীর সরকার। অথচ নরেন্দ্র মোদীর হাত গুজরাতের মুসলিম রক্তে রঞ্জিত। এ অপরধের কারণে প্রেসিডেন্ট ওবামা যুক্তরাষ্ট্রে তারা প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন ২ হাজারের বেশী মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। শত শত মুসলিম নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। ধর্ষণ শেষে অনেক মহিলাকে আগুনে ফেলা হয়েছিল। সে  জঘন্য অপরাধ কর্ম দমনে মোদী যেমন উদ্যোগ নেননি, তেমনি অপরাধীদের শাস্তিও দেননি। সে অপরাধী মোদীই এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ফলে তার ন্যায় কোটি কোটি মোদী এখন ভারত জুড়ে ছেয়ে গেছে। এতে মুসলিম বিনাশী নৃশংসতা বেড়েছে সমগ্র ভারত জুড়ে। কাশ্মির পরিণত হয়েছে বধ্যভূমিতে। এরূপ ভয়ানক চেতনা নিয়ে মানবরূপী এসব দানবগণ শুধু ভারত বা কাশ্মিরে নয়, খোদ বাংলাদেশের রাজনীতিতেও জেঁকে বসেছে। তবে বাংলাদেশের রণাঙ্গনে তাদের বাড়তি সুবিধাটি হলো তারা দেশটিতে একা নয়; বরং সাথে পেয়েছে অভিন্ন চেতনার বিপুল সংখ্যক সহযোদ্ধা। ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এসব ভারতসেবী বাংলাদেশীগণ ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয়; এবং হিন্দুদের চেয়েও অধিক পূজারী হলো হিন্দু সংস্কৃতির। তাই মঙ্গল প্রদীপের পূজা যতটা ঢাকায় হয় এবং সেখানে লক্ষ লক্ষ বেদীমূলে যত ফুল দেয়া হয় তা কলকাতা বা দিল্লিতে হয় না। ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদার রূপে বাংলাদেশের মাটিতে তাদের অবস্থান হলো রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক ক্যাডার, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবী, বিচারপতি, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা রূপে। তাদের উপর অর্পিত মূল দায়িত্ব হলো, বাংলার মাটিতে শরিয়ত, হুদুদ ও  কোরআনী নীতির বাস্তবায়নের ন্যায় ইসলামের মৌল বিষয়গুলিকে পরাজিত রাখা। লক্ষ্য: বাংলাদেশী মুসলিমদের পূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে না দেয়া। সে সাথে বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির উপর ভারতীয় দখলদারীকে বহাল রাখা।

ভারতীয়দের সাহায্যে ও প্রশ্রয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতসেবীদের সফলতাটি বিশাল। সেটি যেমন একাত্তরে, তেমনি আজও। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই তারা বাংলার সমগ্র মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। একাত্তরে লক্ষাধিক বিহারী মুসলিমদের এরা বিনা বিচারে হত্যা করেছে। এখন সে অভিন্ন হত্যাকাণ্ড চলছে খোদ বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে। তাই ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে নিরস্ত্র মুসল্লীদের জমায়েতের উপর কামান দেগে শত শত নিরীহ মানুষ নিমিষের মধ্যে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর বিগত ৭০ বছরে ভারতের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত সকল মুসলিম বিরোধী দাঙ্গাতে যত মুসলিম নরনারীকে হত্যা করা হয়েছে ভারতসেবী বাঙালীগণ একমাত্র একাত্তরেই তার চেয়ে বেশী মুসলিমকে বাংলাদেশে হত্যা করেছে। শুধু অবাঙালীদের নয়, ভারতবিরোধী হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ বাঙালী মুসলিমদেরও তারা হত্যা করা হয়েছে। বিগত ৭০  বছরে অধিকৃত কাশ্মীরে যুদ্ধরত ৬ লাখ ভারতীয় সৈন্যও এত মুসলিম হত্যা করতে পারিনি যা ভারতসেবী বাঙালীগণ মাত্র  এক বছরে হত্যা করেছে। এজন্যই তাদের প্রতি ভারত এত প্রসন্ন এবং তাদের ক্ষমতায় রাখার জন্য দেশটির এত বিনিয়োগ।

একাত্তরে বিহারী মুসলিমগণ অপরাধী গণ্য হয়েছে এ কারণে যে, নিজেদের ঘর-বাড়ি ভারতে ফেলে ১৯৪৭য়ে তারা পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল এবং একাত্তরে দেশটির ভাঙ্গার কাজে তারা ভারতের অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি। বরং পাকিস্তানকে নিজেদের দেশ ভেবে দেশটির সংহতি ও দীর্ঘায়ু কামনা করেছে। বিহারীদের সবচেয়ে বড় অপরাধ, ভারতসেবী বাঙালীদের ন্যায় তারা ভারতীয় আধিপত্যের সেবাদাস হতে পারেনি। তবে সেরূপ না করার পিছনে প্রচুর কারণও ছিল। ভারতে জন্ম নেয়ার কারণে বিষপূর্ণ হিন্দু মানসিকতার সাথে তাদের পরিচিতিটি ছিল যে কোন বাংলাদেশীদের চেয়ে অতি গভীর। তাছাড়া এ অপরাধটি কি শুধু বিহারীদের? লক্ষ লক্ষ বাঙালী মুসলিমও তো সেদিন অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। তাদের অনেকে ভারতীয় বাহিনী ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছিল। একাত্তরে কোন একজন শিক্ষিত আলেম পাকিস্তান ভাঙাকে সমর্থণ করেছে -সে প্রমাণ কি আছে? প্রতিটি আলেম ও ইসলামপন্থি এজন্যই ভারতসেবীদের কাছে আজও রাজাকার। অথচ সে কারণে বিহারীদের বাঁচতে দেয়া হয়নি।

একাত্তর নিয়ে ভারতীয়দের সবচেয়ে বড় উল্লাসের কারণ শুধু এ নয় যে, তারা পাকিস্তান ভাঙ্গতে পেরেছে। বরং এজন্য যে, খোদ মুসলিম ভূমিতে লক্ষাধিক মুসলিমকে হত্যা করতে পেরেছে। ভারতীয় ভূমিতে এত মুসলিম হিন্দুদের হাতে নিহত হলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ উঠতো, যেমনিট মায়ানমারের বিরুদ্ধে হচ্ছে। খুনিরা এজন্যই খুনখারাবীর জন্য নিজের বসত ভিটার বাইরে বধ্যভূমি বেছে নেয়। মার্কিনীদের কাছে তেমন বধ্যভূমি হলো আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেন। ভারতীয়গণ বাংলাদেশকে তেমনি একটি বধ্যভূমি রূপে বেছে নিয়েছিল একাত্তরে। বাংলাদেশের মাটিতে সে সুযোগটি ভারত ধরে রাখতে চায়। নইলে পাকিস্তানের ন্যায় পূর্ব সীমান্তেও আরেক পাকিস্তান খাড়া হবে সে ভীতি তাদের মনে অতি প্রবল। সে জন্যই বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ভারতীয়দের শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ। রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মায়ানমারের বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের আচরণটি অতিশয় নৃশংস ও ভয়াবহ। হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের ঘরে তারা আগুণ দিয়েছে। বহু হাজারকে তারা হত্যা করেছে। শত শথ রোহিঙ্গা মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু একাত্তরে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী নৃশংস বর্বরতা হয়েছে বিহারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে। একই রূপ হত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠন ও গৃহ আগুনের প্রকোপে পড়েছে বিহারীগণ। এবং সেটি ভারতসেবী বাঙালীদের হাতে। দখলদার ভারতীয় সেনাবাহিনী সে বর্বরতা থামাতে কোন উদ্যোগ নেয়নি। মায়ানমারে মুসলমানের ঘরবাড়ী জ্বালানো হলেও এ বিধান কখনোই প্রয়োগ করা হয়নি যে, মায়ানমারে  কোন রোহিঙ্গা মুসলিমের ঘরবাড়ী ও দোকানপাঠের মালিক হওয়ার অধিকার নাই। ফলে কোন বৌদ্ধই রোহিঙ্গা মুসলিমের ঘরবাড়ি ও দোকান পাটের মালিকানা দাবি করেনি। অথচ সে নীতির প্রয়োগ করা হয়েছে বিহারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে। তাদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তাদের বসতবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য। বিহারীদের তাদের নিজ ঘরবাড়ী থেকে উচ্ছেদ করে বস্তিতে পাঠানো হয়েছে। এবং তাদের ঘরবাড়ীর মালিক হয়েছে ভারতের সেবাদাসগণ। বাংলার সমগ্র ইতিহাসে কখনোই কি কোন জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে এমন অপরাধ হয়েছে? ১৯৪৭ সালে কি কোন হিন্দু পরিবারকে কি বস্তিতে বসানো হয়েছে? অথচ তারাতো পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাণপণে বিরোধীতা করেছিল?

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার বিরুদ্ধে বহু বার্মিজ বুদ্ধিজীবী যে সোচ্চার –সে প্রমাণ অনেক। তারা বিদেশী টিভি চ্যানেলে এমন কি সেদেশের নেত্রী অঙ সাং সূচীর বিরুদ্ধেও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কিন্ত বিহারী মুসলিমদের বিরুদ্ধে একাত্তরে যে বর্বর নৃশংসতা হলো তার বিরুদ্ধে কি কোন বাঙালী বুদ্ধিজীবী বা রাজনীতিবিদ প্রতিবাদী হয়ে রাস্তায় নেমেছে বা পত্রিকায় কোন বিবৃতি দিয়েছে? সে নৃশংসতা নিয়ে বিদেশের পত্র-পত্রিকায় বহু নিবন্ধ ছাপা হলেও ঢাকার কোন পত্রিকায় কি একটি নিবন্ধও ছাপা হয়েছে? ডাকাত পাড়ায় যেমন নৃশংস ডাকাতীর নিন্দা না হয়ে বরং তা নিয়ে প্রচণ্ড উল্লাস হয়, সেরূপ একটি অবস্থা ছিল বাংলাদেশের ভারতসেবীদের মহলে। বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের চেতনার ভূবন যে ভারতসেবীদের হাতে কতটা অধিকৃত ও মৃত -এ হলো তার নজির। একাত্তরে বিহারী মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা বাঙালী নয়। এখন বাঙালী মুসলিমদের বেছে বেছে হত্যা করা হচ্ছে এ কারণে যে, তারা ভারতসেবী রাজনীতির সেবাদাস নয়। সে অপরাধে এমনকি ৫৭ জন বাঙালী সেনা অফিসারকে নিহত হতে হয়েছে। ভারতসেবী রাজনীতিকে বলা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এবং সে চেতনার বিরুদ্ধে কথা বলা চিত্রিত হচ্ছে যুদ্ধাপরাধ বলে।

পাশের নেকড়ের হাতে কোন মানুষকে নিহত হতে দেখে পাশের নেকড়ে তাকে বাঁচাতে আগ্রহ দেখায় না। পারলে সে নেকড়েটিও সে নৃশংসতায় অংশ নেয়। সেরূপ আচরন মানবতাশূণ্য মনুষ্যরূপী দানবদেরও। তাই রোহিঙ্গাদের উপর প্রচণ্ড নৃশংসতা দেখে সুদূর তুরস্ক থেকে সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রাণসামগ্রী নিয়ে মায়ানমারে ছুটে এসেছেন। মায়ানমারের সরকারের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও। তিনিন জাহাজ-ভর্তি রিলিফও পাঠিয়েছেন। ছুটে এসেছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। কিন্তু নিশ্চুপ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিশ্চুপ কাশ্মীরের হাজার হাজার মুসলিশ নরনারী ও শিশুকে নিহত ও আহত হতে  দেখেও। অথচ প্রতিবেশী দেশে মুসলিমদের বাঁচাতে মহান আল্লাহতায়ালা জিহাদ ফরজ করেছেন। বলেছেন, “তোমাদের কি হলো যে, তোমরা যুদ্ধ করবে না আল্লাহর পথে এবং অসহায় নরনারী ও শিশুদের বাঁচাতে যারা বলছে, “হে আমাদের রব! যালিমদের অধিকৃত এই জনপদ থেকে আমাদের মুক্ত করুন, আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য অভিভাবক নিযুক্ত করুন এবং কাউকে আমাদের জন্য সাহায্যকারি রূপে প্রেরণ করুন।” –(সুরা নিসা, আয়াত ৭৫)। এটি এমন এক অর্পিত দায়িত্ববোধ যা এড়িয়ে যাওয়ার অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা –যা ভয়ানাক কবিরা গুনাহ। তেমন দায়িত্ববোধে অত্যাচারি রাজা দাহিরেরর হাত থেকে অসহায় হিন্দু নরনারী ও শিশুদের বাঁচাতে সুদূর ইরাক থেকে মহম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে ছুটে এসেছিলেন। এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লড়েছিলেন। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের উলামা সম্প্রদায়, ইসলামী দলসমুহের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মুসল্লীদের মাঝেই বা কতটুকু বেঁচে আছে সে ঈমান? কোথায় সে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনের আগ্রহ?

 

স্ট্রাটেজী ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে

বিশ্ব-রাজনীতির অঙ্গণ থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার বিদায়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল, তাদের পথের কাঁটা এবার বুঝি দূর হলো। ভেবেছিল, আধিপত্য বিস্তৃত হবে এবার বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে মুসলিমগণ। আফগানিস্তান ও ইরাকের মত দুইটি  দেশ দখলে রাখতেই তাদের হিমশিম খেতে হচেছ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শেষ হতে ৫ বছর লেগেছিল। কিন্তু বিগত ১৭ বছর যুদ্ধ লড়েও মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৪০টিরও বেশী দেশের কোয়ালিশ বাহিনী আফগানিস্তানে বিজয় আনতে পারিনি। বরং দ্রুত এগিয়ে চলেছে পরাজয়ের দিকে। পাশ্চাত্যের কাছে এখন এটি সুস্পষ্ট, আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, লেবানন, সোমালিয়ার মত ক্ষুদ্র দেশগুলো দখল করা এবং সেগুলোকে কন্ট্রোলে রাখার সামার্থ্য তাদের নেই। যে প্রতিরোধের মুখে তারা হারতে বসেছে সেটির মূল হাতিয়ার অত্যাধিক যুদ্ধাস্ত্র নয়, জনবল বা অর্থবলও নয়। বরং সেটি কোরআনী দর্শন ও ইসলামের সনাতন জিহাদী সংস্কৃতি। এ দর্শন ও সংস্কৃতিই মুসলমানের জন্য আত্মসমর্পণকে অসম্ভব ও অচিন্তনীয় করে তুলেছে। বরং হাজার হাজার যুবকেদর কাছে অতিশয়  কাম্য গণ্য হচ্ছে আগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই ও শাহাদত। এমন চেতনা এবং এমন সংস্কৃতির বলেই এক কালের মুসলমানেরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছিল। এ যুগেও তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ও বিশ্বশক্তি  রাশিয়াকে পরাজিত করেছে। এবং এখন গলা চেপে ধরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। আফগান মোজাহিদদের জিহাদ তাই পাল্টে দিচ্ছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ। কামান, বোমা ও যুদ্ধবিমানের বলে গণহত্যা চালানো যায়। নগর-বন্দরও ধ্বংস করা যায়। কিন্তু সে কামানে বা গোলায় কি দর্শন ও সংস্কৃতির বিনাশও সম্ভব? বরং তাদের আগ্রাসন ও গণহত্যায় প্রতিরোধের সে দর্শন ও সংস্কৃতিই দিন দিন আরো বলবান হচ্ছে। কোন মার্কিনীকে রণাঙ্গণে রাখতে মাথাপিছু প্রায় এক মিলিয়ন তথা ১০ লাখ ডলার খরচ হয়। অথচ মুসলমানরা হাজির হচ্ছে নিজ খরচে। তারা শুধু স্বেচ্ছাই অর্থই দিচ্ছে না, প্রাণও দিচ্ছে।

অবস্থা বেগতিক দেখে পাশ্চাত্য এখন ভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়েছে। সেটি শুধু গণহত্যা নয়। নিছক নগর-বন্দর, ঘরবাড়ী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনাশও  নয়। বরং সেটি হলো ইসলামের কোরআনী  দর্শন ও সংস্কৃতির ধ্বংস। তাই শুরু করেছে প্রকাণ্ড আকারের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। নতুন এ স্ট্রাটেজীর আলোকে ইরাক ও আফগানিস্তানে তারা শুধু মানুষ হত্যাই করছে না, ঈমান হত্যাতে তৎপর হয়েছে। এবং সেটি শুধু আফগানিস্তান ও ইরাকে সীমিত নয়। বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশই এখন একই রূপ সাংস্কৃতিক যুদ্ধের শিকার। তবে বাংলাদেশ তাদের অন্যতম টার্গেট হওয়ার কারণ, দেশটিতে ১৬ কোটি মুসলমানের ব্সবাস। তেল, গ্যাস বা অন্য কোন খনিজ সম্পদের চেয়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার ফ্যাক্টরটিই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেল, গ্যাস যোদ্ধা বা বোমায় পরিণত হয়না, কিন্তু মানুষ হয়। তাই বাংলাদেশীগণ না চাইলেও সাম্রাজ্যবাদীদের এ আগ্রাসনের টার্গেট হওযা থেকে বাঁচার উপার নাই। শত্রুর লক্ষ্য এখন মুসলমানদের ঈমানকে হত্যা করা। ফলে মহাসংকটে এবার শুধু দুনিয়ার জীবন নয়, আখেরাতের জীবনও। কারণ এ যুদ্ধে তারা বিজয়ী হলে অসম্ভব হবে ঈমান নিয়ে বাঁচা।

 

লক্ষ্য: কোরআন থেকে দূরে সরানো

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্ট্রাটেজী তাই  মুসলমানদের জীবন থেকে জিহাদের সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা। এবং ভূলিয়ে দেওয়া শরিয়ত, হদুদ, শুরা, খেফাফত, জিহাদ, মুসলিম ঐক্যের ন্যায় ইসলামি মৌল বিষয়গুলোকে। তেমন এক স্ট্রাটেজী নিয়ে ব্রিটিশগণ ভারতে স্কুল-কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসা খুলেছিল। ধর্ম-শিক্ষার ছ্দ্দবেশে মুসলমানদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করেছিল জিহাদের ন্যায় ইসলামের মূল হাতিয়ারকে। ফলে নিরাপদ হয়েছিল তাদের ১৯০ বছেরের শাসন। ইসলামে বিরুদ্ধে সে সফল স্ট্রাটেজীর প্রয়োগ কল্পে তারা আবার ময়দানে নেমেছে খোদ বাংলাদেশে। সে কাজে এখন ব্যবহার করছে জনগণের রাজস্বের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হাজার হাজার স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনসহ এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূলত তাদের হাতেই অধিকৃত। অধিকৃত দেশের অধিকাংশ মিডিয়াও। ইসলামের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে ব্যাপক মিথ্যা-প্রপাগান্ডা। বলতে চায়, ইসলাম এ যুগে অচল। যেন ইসলাম শুধু নবীজী (সাঃ)র জামানার লোকদের জন্যই নাযিল হয়েছিল। তারা শরিয়তকে বলছে মানবতা বিরোধী। সে প্রপাগান্ডাকে ব্যাপকতর করতে বহু টিভি চ্যানেল, অসংখ্য পত্র-পত্রিকার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছে হাজার হাজার এনজিও।

ইসলামের এ শত্রুপক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা হলো, নবীজী (সাঃ)র আমলের ইসলাম –যাতে রয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার রাজনীতি ও  ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ, তা জনগণের মন থেকে ভূলিয়ে দেওয়া। অথচ ইসলাম থেকে নামায-রোযাকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি আলাদা করা যায় না শরিয়তের প্রতিষ্ঠার রাজনীতি ও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদকেও। পবিত্র কোরআনে জিহাদে অংশ নেওয়ার নির্দেশ এসেছে বার বার। সে সব জিহাদে অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। নবীজী (সাঃ) নিজে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ লড়েছেন বহুবার। ইসলামের বহুশত্রুকে হত্যা এবং বনু কুরাইজা ও বনু নাযির ন্যায় ইহুদী বস্তিকে নির্মূল করা হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। অথচ নবীজী (সাঃ)র সে আপোষহীন নীতি ও ইসলামের সে সংগ্রামী ইতিহাসকে তারা সুপরিকল্পিত ভাবে আড়াল করতে চায়। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বাইরেও শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও আইন-আদলতের সংস্কারে ঈমানদারের যে গুরুতর দায়ভার রয়েছে সেটিকেও ভূলিয়ে দিতে চায়। এ কারণেই ইসলামের আক্বিদা-বিশ্বাস ও জিহাদী সংস্কৃতি আজ দেশে দেশে শত্রুপক্ষের লাগাতর হামলার শিকার। তাদের লক্ষ্য, মহান আল্লাহর কোরআনী নির্দেশের বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকে বিদ্রোহী করা।

 

চেতনার অরক্ষিত ভূমি

বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য বিপদের কারণ হলো, এরূপ হামলার মুখে দেশটির ভৌগলিক সীমান্তের ন্যায় সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্ত আজ অরক্ষিত। অথচ মুসলমানদের দায়িত্ব শুধু দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়। বরং অতিগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, চেতনার রাজ্য পাহারা দেওয়া। সেটি সুস্থ্য ঈমান-আক্বিদা ও ইসলামি সংস্কৃতি গড়ে তোলার স্বার্থে। সীমান্ত পাহারায় অবহেলা হলে অনিবার্য হয় সামগ্রিক পরাজয় ও গোলামী। তখন বিপন্ন হয় জানমাল ও ইজ্জত-আবরু। যেমনটি ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে হয়েছিল। সে পরাজয়ের ফলেই মুসলমানদের জীবনে নেমে এসেছিল ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের দাসত্ব। আর সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয় একাকী আসে না। আসে অর্থনৈতিক দুর্গতি,আসে দুর্ভিক্ষ। তাই পলাশীর পরাজয়ের পর এসেছিল ছিয়াত্তরের মনত্ত্বর। সে দুর্ভিক্ষে বাংলার বহু লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল, এবং মৃতদের অধিকাংশই ছিল মুসলিম। একই ভাবে নেমে এসিছিল ১৯৭৪য়ের দুর্ভিক্ষ। একই রূপ ভয়ানক পরিণতি নেমে আসে সাংস্কৃতিক যুদ্ধে পরাজিত হলে। তখন মারা পড়ে ঈমান-আক্বিদা। আর মুসলমানের কাছে দৈহীক ভাবে বাঁচার চেয়ে ঈমান ও আক্বিদা নিয়ে বাঁচার গুরুত্ব কি কম? ঈমান নিয়ে বাঁচা অসম্ভব হলে পণ্ড হয় জীবনের মূল বাঁচাটাই। তখন অনিবার্য হয় জাহান্নামের অন্তহীন আযাব।

ভৌগলিক সীমান্তকে সুরক্ষিত করার চেয়েও তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো ঈমান-আক্বিদার এ সীমান্তকে সুরক্ষিত করা। কারণ শয়তানী শক্তির সবচেয়ে বিনাশী হামলা হয় চেতনার এ মানচিত্রে। এটি অধিকৃত হলে দেশ দখল অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। প্রতিটি ঈমানদারকে তাই সে হামলার বিরুদ্ধে লাগাতর জিহাদ করতে হয়। সশস্ত্র যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে অন্ধ-বধির বা পঙ্গু ব্যক্তির নিষ্কৃতি আছে। কিন্তু চেতনার মানচিত্রে শয়তানী শক্তির আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক হামলার বিরুদ্ধে যে লাগাতর জিহাদ তা থেকে সামান্য ক্ষণের নিষ্কৃতি নেই। এ জিহাদকেই ইসলামে ‌জিহাদে আকবর বা শ্রেষ্ঠ জিহাদ বলা হয়েছে। রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষেত্রের লড়াইটি আসে তার পড়ে। বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের আগে তেরটি বছর ধরে এ জিহাদ লাগাতর চলেছে মক্কায়। মুসলমানের চেতনার সীমান্তকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই অপরিহার্য হলো মুসলিম ভূমির ভৌগলিক মানিচিত্রকে সুরক্ষিত করা।

তাই ঘরবাঁধা, চাষাবাদ করা বা কলকারখানা গড়াই একটি জনগোষ্টির বেঁচে থাকার জন্য সবকিছু নয়। শুধু পনাহারে জীবন বাঁচে বটে, তাতে ঈমান বাঁচে না। এমন বাঁচার মধ্য দিয়ে সিরাতুল মোস্তাকিমও জোটে না। তখন যা জুটে তা হলো পথভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতায় বিপদাপন্ন হয় আখেরাতের জীবন। ইহকাল ও পরকাল বাঁচাতে এজন্যই একজন চিন্তাশীল মানুষকে বেড়ে উঠতে হয় জীবন-বিধান, মূল্যবোধ, জীবন ও জগত নিয়ে একটি সঠিক ধারণা নিয়ে। মুসলমানের কাছে সে জীবন-বিধান হলো ইসলাম। আর নিত্য দিনের বাঁচবার সে প্রক্রিয়া হলো ইসলামী সংস্কৃতি। নামায-রোযা, হজ-যাকাত এবং জিহাদ হলো একজন ঈমানদারের ইবাদতের প্রক্রিয়া। আর সংস্কৃতি হলো এ জগতে বাঁচবার বা জীবনধারনের প্রক্রিয়া। ইসলামি পরিভাষায় এ প্রক্রিয়া হলো তাহজিব। আরবী ভাষায় তাহজিবের অর্থ হলো,ব্যক্তির কর্ম,রুচী, আচার-আচারণ, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সার্বিক জীবন যাপনের প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধি করণের প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ রিফাইনড তথা পরিচ্ছন্ন বা সুন্দরতম হয়। দিন দিন সুন্দরতম হয় তার রুচীবোধ, আচার-আচরণ, কাজকর্ম ও চরিত্র।

তাই মুসলমানের ইবাদত ও সংস্কৃতি -এ দুটোকে পৃথক করা যায় না। উভয়ের মধ্যেই প্রকাশ পায় আল্লাহতায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া গভীর প্রেরণা ও প্রচেষ্টা। পাখি যেমন তার দুটো ডানার একটিকে হারালে উড়তে পারে না, ঈমানদারও তেমনি আল্লাহর ইবাদত ও ইসলামী সংস্কৃতিও একটি হারালে মুসলমান রূপে বেড়ে উঠতে পারে না। তাই মুসলমানগণ যেখানে রাষ্ট্র গড়েছে সেখানে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসাই গড়েনি, ইসলামি সংস্কৃতিও গড়েছে। একটির পরিশুদ্ধি ও পরিপুষ্টি আসে অপরটি থেকে। মোমেনের মূল্যবোধ, রুচী্বোধ, পানাহার, পোষাকপরিচ্ছদ, অপরের প্রতি ভালবাসার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তার আল্লাহভীরুতা। তখন সে অন্যের কল্যাণে সচেষ্ট হয় আল্লাহর কাছে প্রিয়তর হওয়ার চেতনায়। এ হলো তার সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতি থেকে সে পায় ইবাদতের স্পিরিট। ঈমানদারে চিন্তুা ও কর্মে এভাবেই আসে পবিত্রতা -যা একজন কাফের বা মোনাফিকের জীবনে কল্পনাও করা যায় না। মুসলিম সমাজে এভাবেই আসে শান্তি, শৃঙ্খলা ও শ্লিলতা। অথচ সেক্যুলার সমাজে সেটি আসে না। সেক্যুলার সমাজে যেটি প্রবলতর হয় সেটি পার্থিব স্বার্থ হাসিলের প্রেরণা। এমন চেতনায় মানুষ শুধু রাজনীতিতেই স্বেচ্ছাচারি হয় না; জীবনের উপভোগেও স্বেচ্ছাচারি হয়। সে স্বেচ্ছাচারিতাকে তারা ব্যক্তি-স্বাধীনতার লেবাস পড়িয়ে জায়েজ করে নিতে চায়। সেক্যুলার সমাজে পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, সমকামিতা, অশ্লিলতা, মদ্যপাণের ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বৈধ্যতা পায় তো জীবন উপভোগের এমন স্বেচ্ছাচারি প্রেরণা থেকেই। ফলে সেক্যিউলারিজম যেখানে প্রবলতর হয় সেখানে পাপাচারেও প্লাবন আসে।

 

মূল ব্যর্থতা যে ক্ষেত্রটিতে

মুসলমান ইবাদতে প্রেরণাও পায় তার সংস্কৃতি থেকে। ফলে স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসায় না গিয়েও মুসলিম সমাজে বসবাসকারি যুবক তাই মসজিদে যায়,নামায পড়ে,রোযা রাখে এবং মানুষের কল্যাণ সাধ্যমত চেষ্টাও করে। সীমান্তের প্রতিরক্ষায় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ময়দানেও হাজির হয়। একাজে শুধু শ্রম-সময়-মেধা নয়, জানমালের কোরবানীও দেয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসার ডিগ্রিধারি না হয়েও নিজেকে বাঁচায় বেপর্দা, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা,চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস-কর্ম ও নানা বিধ পাপাচার থেকে। প্রাথমিক কালের মুসলমানগণ যে মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন সেটি এজন্য নয় যে সেদিন বড় বড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্রাসা ছিল। বরং তখন প্রতিটি ঘর পরিণত হয়েছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান। সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে গড়ে উঠেছিল চেতনা ও চরিত্রের বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। সে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেদিনের মুসলমানেরা উন্নত মানব রূপে বেড়ে উঠতে পেরেছিলেন।

বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের আজকের বড় সমস্যা শুধু এ নয় যে, দেশগুলি ইসলামের শত্রুপক্ষ বা ইসলামে অঙ্গিকারশূন্যদের হাতে অধিকৃত। বরং সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা এবং সে সাথে ভয়ানক বিপদের কারণ হলো,দেশগুলির সাংস্কৃতিক অঙ্গণ থেকে ইসলাম বিলুপ্ত হয়েছে এবং তা অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা। দেশের সীমান্ত বিলুপ্ত না হলেও মুসলিম দেশগুলির সংস্কৃতির ময়দান পুরাপুরি শত্রু পক্ষের দখলে গেছে। ফলে এদেশগুলিতেও তাই হচ্ছে যা কাফের কবলিত একটি দেশে হয়ে থাকে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিও পরিনত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য রূপে গড়া তোলার ইন্সটিটিউশনে। এর ফলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম সন্তান মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ন্যায় মঙলপ্রদীপ হাতে নিয়ে শোভাযাত্রা করছে। কপালে তীলক পড়ছে,থার্টি ফাষ্ট নাইটে অশ্লিল নাচগানও করছে। এরাই শয়তানের পক্ষে লড়াকু সৈনিক। এবং তাদের  যুদ্ধাংদেহী রূপটি শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে। দেশের সরকার তার চাকর-বাকরদের বেতন বৃদ্ধিতে আগ্রহী, কিন্তু তাদের ঈমান বৃদ্ধি নিয়ে নয়। কারণ, সরকার জানে চাকর-বাকরদের ঈমান বাড়লে তাদের দিয়ে চুরি-ডাকাতি ও ভোট-ডাকাতি করা যায় না। এরাই প্রতিটি মুসলিম ভূমিতে ইসলাম ও মুসলিমদের ঘরের শত্রু। এদের কারণেই বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে ইসলামের বিজয় এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন হিন্দু, খৃষ্টান বা অন্য কোন অমুসলিমদের নামতে হচ্ছে না, সে কাজটি করছে তারাই যারা বড় গলায় নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। ২০১৩ সালের ৫ই মে’এর রাতে শাপলা চত্ত্বরে যারা শত শত মুসল্লিদের হত্যা করলো এবং ময়লার গাড়িতে তুলে তাদের লাশ গায়েব করলো -তারা কি কাফের ছিল? তারা কি খুনি নরেন্দ্র মোদীর হাতে গড়া খুনি? তারা কি কোন মন্দির বা গীর্জায় গিয়ে মুসলিম হত্যার শপথ নিয়েছিল? বরং তারা তো তারাই যারা বেড়ে উঠেছে মুসলিমদের নিজ ঘরে।

তাই অতি শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো, মুসলিমদের শুধু দেশ বা ঘর থাকলে চলে না, সে দেশে ও ঘরে ইসলামের শিক্ষা-সংস্কৃতিও থাকতে হয়। কিনন্তু বাঙালী মুসলিমদের তেমন একটি দেশ যেমন নাই, তেমনি সে শিক্ষা-সংস্কৃতিও নাই। বাঙালী মুসলিমদের জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে বড় শূন্যতা। মুসলিম জীবন থেকে সেরূপ শূন্যতা দূর করতেই মহান নবীজী (সাঃ) মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের প্রথম দিনে নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। মসজিদ গড়ে প্রতিটি মুসলিম নর ও নারীর জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। সে শিক্ষালয়ে তিনি ছিলেন সার্বক্ষণিক শিক্ষক। দেশের বুকে গড়ে তুলে ছিলেন নরনারী চরিত্রে উচ্চতর সংস্কার আনার সংস্কৃতি। সে ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষা দিতে নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণ লাগাতর জিহাদ করেছেন। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা সে জিহাদে শহীদ হয়েছেন। অথচ বাঙালী মুসলিমগণ পুরাপুরি ব্যর্থ এক্ষেত্রে। তারা না পেরেছে কোন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিতে, না পেরেছে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা দিতে। এটিই হলো নবীজী (সাঃ)র ইসলাম থেকে বাঙালীর ইসলামের মূল পার্থক্য। বস্তুতঃ এ হলো এক বিশাল ব্যর্থতা ও বিচ্যুতি। প্রশ্ন হলো, এরূপ বিশাল ব্যর্থতা ও বিচ্যুতি নিয়ে শুধু পার্থিব জীবনে নয়, পরকালেও কি বিন্দুমাত্র সফলতা মিলবে? ১৭/০৩/২০১৯




অপরাধীদের শাসন এবং যুদ্ধ আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে

হাইজ্যাক হয়েছে নবীজীর আসন

ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় এবং অন্যায়ের নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে আদালতের বিচারকগণ। ইসলামে বিচারপতির মর্যাদা এই জন্যই বিশাল। ভূমি থেকে আাগাছা নির্মূল ও সে ভূমিতে ফসল ফলানোর দায়িত্ব যেমন কৃষকের,তেমনি দেশ থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার বড় দায়িত্বটি হলো আদালতের বিচারকদের।এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ইন্সটিটিউশন হলো আদালত। আদালতের বিচারকগণ যোগ্যবান হলে সেদেশ দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত হয় না। বিচারকগণ তখন দুর্বৃত্ত পেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীকেও আদালতের কাঠগড়ায় তোলে। একটি দেশ কতটা ব্যর্থ সেটি পরিমাপের জন্য তাই চোর-ডাকাতদের সংখ্যা গণনার প্রয়োজন পড়ে না। দেশের আদালত কতটা কীরূপ বিচারকদের দ্বারা অধিকৃত –তা থেকেই সে হিসাবটি পাওয়া যায়। এ দিক দিয়ে বাংলাদেশের ব্যর্থতা কি কম? অতীতে বিচারপতির আসনে বসেছেন খোদ নবীরাসূলগণ। তাদের অবর্তমানে বসেছেন তাদেরই বিশ্বস্থ্য সাহাবাগণ। ইসলামের যখন গৌরবযুগ তখন সে আসনে বসেছেন সবচেয়ে জ্ঞানী, ফকীহ ও চরিত্রবান ব্যক্তিগণ। ইসলামে এটি অতি উচ্চপর্যায়ের ইবাদত। রাষ্ট্র জুড়ে এ পবিত্র ইবাদতটি প্রতিষ্ঠা না পেলে কোটি কোটি মানুষের নামায-রোযা ও হ্জ-যাকাত,অর্থনৈতিক উন্নয়নে বা শত শত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় দুর্বৃত্তি ও অবিচার নির্মূল হয় না। প্রতিষ্ঠা পায় না সৎকর্ম ও ন্যায়-নীতি। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটিও তখন প্রমাণিত হয় না। দুর্বৃত্ত-অধিকৃত সে দেশটিতে তখন আস্তাকুঁরে গিয়ে পড়ে সুবিচার। তাই শ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের উপর যে প্রধান শর্তটি আরোপ করেছেন তা হলো ঈমানের পাশাপাশি ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল। যে দেশে যোগ্যতর বিচারপতি ও সুবিচারের অভাব,সেদেশে অসম্ভব হলো সভ্যতর সমাজের নির্মাণ।দেশ তখন ইতিহাস গড়ে অবিচার ও দুর্বৃত্তিতে।বাংলাদেশে তো সেটিই ঘটেছে।

কোনটি ন্যায়,আর কোনটি অন্যায় -সে জ্ঞান নিরক্ষর ব্যক্তিদেরও থাকে। কিন্তু সত্যের পক্ষে দাঁড়াবার নৈতীক বলটি সবার থাকে না।এমনকি বহু উচ্চ শিক্ষিতদেরও থাকে না।অতি দুর্বৃত্তরাও জানে কোনটি ন্যায়,আর কোনটি অন্যায়।জেনে বুঝে অন্যায়ের পক্ষ নেয় বলেই তারা দুর্বৃত্ত। আাদালতের বিচারকদের দায়িত্ব হলো,শুধু ন্যায়ের পক্ষ নেয়া নয়,অন্যায়কারিকে শাস্তি দেয়াও। এটি এক গুরু দায়িত্ব। তাই বিচারের কাজ ভীরু,কাপুরুষ ও স্বৈরাচারের কাছে আত্মসমর্পিত ব্যক্তির দিয়ে হয় না। কিন্তু সে সামর্থ বাংলাদেশের আদালতে ক’জন বিচারকের? সে নৈতীক বল কি আইন শাস্ত্রের উপর ডিগ্রি নিলে সৃষ্টি হয়? আইনের জ্ঞান,চিকিৎসাবিজ্ঞান,হিসাবজ্ঞান বা প্রকৌশলের জ্ঞান –এরূপ নানারূপ সেক্যুলার জ্ঞানে পেশাগত জানাশোনা বাড়ে। উপার্জনের সামর্থও বাড়ে। কিন্তু তা দিয়ে কি ন্যায়পরায়নতা,সততা বা নৈতীক বল বাড়ে? সে জন্য তো চাই ঈমানের বল। ঈমানের বলবৃদ্ধির জন্য চাই চেতনায় ঝাঁকুনি দেয়ার মত দর্শনের বল। চাই আধ্যাত্মীক বল। সে সামর্থ লাভে অপরিহার্য হলো মহান আল্লাহর কাছে জবাবদেহীতার ভয়। সে জন্য পেশাদারি জ্ঞানের বাইরেও প্রয়োজন পড়ে গভীর জ্ঞানার্জনের।

গরুর গাড়ির চাকা কি রেলগাড়িতে লাগানো যায়? যে পবিত্র আসনে মহান নবী-রাসূলগণ বসেছেন সে আসনে কোরআনী জ্ঞানে অজ্ঞ ও ইসলামে অঙ্গিকারহীন ব্যক্তিদের কি বসানো যায়? এমন কর্ম যে হারাম এবং মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ -সে বিষয়টি একজন মুসলমান ভূলে যায় কি করে? বিচারকের আসনে কি গুরুছাগলকে বসানো যায়?  যারা কাফের, যারা নাস্তিক,ইসলামের শরিয়তি বিধানে যারা আস্থাহীন এবং ইসলামের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠার যারা বিরোধী –তারা যত ডিগ্রিধারিই হোক,পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তো তাদেরকে গরুছাগলের চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন।তাদেরকে বিচারকের আসনে বসানো কি আদালতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অবমাননা নয়? মুসলিম দেশে এমন হারাম কর্ম আদালতের অঙ্গণে চলতে থাকলে ঈমান নিয়ে ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ নিয়ে বাঁচাটিও যে সে আদালতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে চিহ্নিত হবে সেটি কি স্বাভাবিক নয়? ফিরাউনের আদালতে তো তাই হয়েছিল। বাংলাদেশেও তো আজ সেটিই হচ্ছে।

 

গণতন্ত্র হত্যায় আদালতের ব্যবহার

বাংলাদেশে বার বার আগ্রাসন ও নাশকতা ঘটেছে জনগণের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে। সেগুলো ঘটেছে ঔপনিবেশিক বিদেশী শক্তি এবং দেশী সামরিক বাহিনী ও ফ্যাসিবাদি রাজনৈতিক শক্তির হাতে। কিন্তু দেশের মানুষের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে সর্বশেষ নাশকতাটি ঘটিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের হাতে। সেটি বিচারের নামে। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সে অসম্ভব সে উপলব্ধিটি ছিল সকল রাজনৈতিক দলের। সেটি যেমন অতীতে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে, তেমনি প্রমাণিত হয়েছে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে। দীর্ঘ দিনের সে অভিজ্ঞতা নিয়েই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি তাই গৃহিত হয়েছিল সর্বদলীয় সিন্ধান্তের ভিত্তিতে। অথচ কি আশ্চর্যের বিষয়! দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার যে মৌল বিষয়টি দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীগণ বুঝতে পারলেও সেটিই বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকগণ। ফলে যে সম্মিলিত উপলব্ধির ভিত্তিতে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান চালু হলো -সেটিকেই অবৈধ ঘোষণা দিল দেশের আদালত। আর এতে স্বৈরাচারি শেখ হাসিনা পেল,ইচ্ছামত ভোট ডাকাতির সুযোগ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছে দেশের প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক। খায়রুল হক যে কতটা নীতিহীন ও মেরুদন্ডহীন সেটির প্রমাণ তিনি নিজেই দিয়েছেন। হাসিনা সরকারের পক্ষে রায় দেয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ লক্ষ টাকা ত্রাণ নিয়েছেন। -(সূত্র- দৈনিক আমার দেশ,৩০/৫/১১)। প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক উদ্বাস্তু নন, গৃহহীন বা অর্থহীনও নন। তিনি উচ্চ বেতনের চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ত্রাণ নেয়ার প্রয়োজনটি তার দেখা দেয় কি করে? খায়রুল হকের দেয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিলুপ্তির রায়টি সুযোগ করে দেয় ২০১৪ সালের নির্বাচনী ডাকাতির। ডাকাতির অর্থ কামাইয়ে কোনরূপ চাকুরি-বাকুরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজন পড়ে না। তেমনি ভোট ডাকাতির নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দীতায় নামার প্রয়োজন পড়ে না। তাই সরকারি দলের ১৫১ জন প্রার্থী নির্বাচন জিতেছে কোনরূপ প্রতিদ্বন্দিতা না করেই। যেসব সিটে নির্বাচন হয়েছে,সেসব আসনেও শতকরা ৫% জন ভোটারও ভোট দিতে যায়নি। খেলার মাঠে প্রতিদ্বন্দি দুই দল খেলতে না নামলে কি সে খেলা দেখতে দর্শক হাজির হয়? এমন খেলা তো অবশ্যই পরিত্যক্ত হয়। অথচ দেশের সংসদ নির্বাচন খেলাধুলার ন্যায় মামূলী বিষয় নয়। এখানে নির্ধারিত হয় জাতির ভবিষ্যৎ। তাই গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনি কমিশনের দায়িত্ব হলো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাতে সরকারি ও বিরোধী দল –এ উভয় পক্ষের অংশগ্রহণই সুনিশ্চিত হয়। নইলে সে নির্বাচন পরিত্যক্ত হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এমন প্রতিদ্বন্দীতাহীন নির্বাচন বাংলাদেশে স্থগিত হয়নি!

 

আলেমদের অপরাধ

বাংলাদেশের নগরবন্দরে যেমন বেশ্যাবৃত্তি,সুদ,ঘুষ,মদ্যপান,সন্ত্রাস ও চুরিডাকাতির ন্যায় অসংখ্য হারাম কর্ম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে,তেমনি আদালতের পবিত্র অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ব্রিটিশ কাফেরদের রচিত হারাম আইন ও হারাম বিচার রীতি। অথচ এ হারাম নিয়ে বাংলাদেশের আলেম-উলামা,পীর-মাশায়েখ ও ইসলামি দলের নেতাকর্মিগণও নীরব। এমন নীরবতা কি কম অপরাধ? মুসলিম ভূমির আইন-আদালত কাফেরদের হাতে অধিকৃত হলে কোন ঈমানদার কি নীরব থাকতে পারে? সে নীরবতায় কি তা ঈমান বাঁচে? নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এরূপ হলে কি জিহাদ শুরু হতো না? পবিত্র কোরআনের ও হাদীসের জ্ঞান ছাড়া কোন ব্যক্তি সুবিচারের সামর্থ পাবে ও নৈতীক মেরুদন্ড পাবে -সেটি বিশ্বাস করাই তো পবিত্র কোরআন ও নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের প্রতি অবমাননা। এমন অবমাননাকারি কি পরকালে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে কল্যাণ পেতে পারে? মুসলমানদের থেকেই বা তারা সম্মান পায় কি করে? অথচ বাংলাদেশের আদালতে আল্লাহর দ্বীনের এমন অবাধ্য বিচারকদেরও মহামান্য বলতে হয়। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তের প্রতিষ্ঠার যারা বিরোধী তাদের প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন কি খোদ আল্লাহতায়ালার সাথে মশকরা নয়? তা নিয়েই বা ভাবনা ক’জনের?

 

নবীজী (রাঃ)র আদালত ও বাংলাদেশের আদালত

ঈমানদারির দায়ভার শুধু নবীজী (সাঃ)র অনুকরণে নামায-রোযা,হজ-যাকাত আদায় করা নয়, তাঁর অনুকরণে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করাও।ইসলামে এটি ফরজ। কিন্তু সে ফরজ ইবাদতটি অসম্ভব হয় দুর্বৃত্তদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে। ন্যায় বিচারে মুসলমানগণ যখন ইতিহাস গড়েছিল তখন বিচার কাজের জন্য কোন প্রাসাদ ছিল না। বিচার বসতো মসজিদের মেঝে বা মাটির ঘরে জীর্ণ খেজুর পাতার উপর। সুবিচারের জন্য যা জরুরী তা হলো সুযোগ্য বিচারক। সুযোগ্য বিচারক গড়তে যা অপরিহার্য তা হলো ইসলামের গভীর জ্ঞান। সে জ্ঞানের মাধ্যমেই চেতনার ভূবনে বিপ্লব আসে,নির্মিত হয় বিচারকের অটুট মেরুদন্ড।সে জ্ঞানের বরকতেই ভেড়ার রাখালগণ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বিচারকে পরিণত হয়েছিলেন। মহান আল্লাহতায়ালা এমন উন্নত মানুষ গড়ার মিশন শুরু করেছিলেন কোরআনী জ্ঞানের আলো জ্বালানোর মধ্য দিয়ে। পবিত্র কোরআনের প্রথম আয়াতটি তাই “ইকরা” তথা “পড়”। প্রতিটি নরনারীর উপর ফরজ হলো পবিত্র কোরআনের জ্ঞানার্জন। এ জ্ঞান ছাড়া মুসলিম রাষ্ট্রের আদালতে কেউ বিচারকের আসনে বসবেন সেটি কি ভাবা যায়? সে জ্ঞান ছাড়া প্রকৃত ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠাই কঠিন।

মানুষের চেতনা ও চরিত্রে মূল বিপ্লবটি আসে শিক্ষা ও দর্শনের গুণে। শিক্ষা ও দর্শনের গুণেই মানুষ পায় মজবুত মেরুদন্ড। পায় ন্যায়নীতিপূর্ণ মূল্যবোধ। চোর-ডাকাতদের থেকে ঈমানদারের মূল পার্থক্যটি পানাহারে বা পোষাক-পরিচ্ছদে নয়,দৈহীক গুণেও নয়। সেটি এই শিক্ষা ও জীবন-দর্শনের কারণে। মহান নবীজী (সাঃ)র আগমনে আরবের মানুষের মাঝে খাদ্য-পানীয়,বংশ-মর্যাদা ও আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসেনি। বরং পাল্টে গিয়েছিল আরব জনগণের আক্বিদা-বিশ্বাস তথা জীবন-দর্শন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সে দর্শনটি তারা পেয়েছিলেন মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। তাদের কাছে সেটি পৌঁছেছিল পবিত্র কোরআন মারফত। জ্ঞানচর্চার সে পবিত্র কাজটি শুধু স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত রাখলে চলে না। স্রেফ স্বল্পকালীন ছাত্রজীবনের গন্ডিতে সীমিত রাখলেও চলে না। মুসলমান আমৃত্যু ছাত্র। জীবনের প্রতিদিন ও প্রতিরাত জুড়ে চলে তার জ্ঞানার্জন। জ্ঞানচর্চার সে কাজকে ব্যাপকতর ও গভীরতর করার স্বার্থে প্রতিটি ঘর ও প্রতিটি জনপদকে তখন পাঠশালায় পরিণত করতে হয়। ইসলামের প্রথম ১৩ বছরে কোন মসজিদ,মাদ্রাসা,কলেজ বা বিশ্ববিদালয় গড়া হয়নি। অথচ শুধু মুসলিম ইতিহাসে নয়,সমগ্র মানব ইতিহাসের সবচেয়ে চরিত্রবান,জ্ঞানী ও শক্ত মেরুদন্ডের মানুষগুলো সৃষ্টি হয়েছে সেই ১৩ বছরে। সেটি সম্ভব হয়েছে মু’মিনের মনে লাগাতর কোরআনের জ্ঞানকে বদ্ধমূল করার মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব স্ট্রাটেজীর ফলে। কিন্তু রাষ্ট্রে সে অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি অসম্ভব হয় দুর্বৃত্তদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে।

 

ইন্ডাস্ট্রি ঈমানধ্বংসের

সাম্রাজ্যবাদি শাসনের যুগে ব্রিটিশগণ ভারতে যেসব শিক্ষা নীতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়েছিল তার পিছনেও জঘন্য কু’মতলব ছিল। সেটি ছিল ব্রিটিশ স্বার্থের পাহারাদার ও ইংরেজ রাজকর্মচারিদের জন্য দোভাষী সৃষ্টি।লক্ষ ছিল মুসলমানদের ঈমান ধ্বংস। সে লক্ষ্যেই জোর দেয়া হয় ইংরাজী ভাষা শিক্ষার উপর। সে সময় মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক পুষ্টির ভাষা ছিল ফার্সি। ঈমান পুষ্টি পেত সে ভাষা হতে। ফার্সি ছিল ভারতের রাষ্ট্র ভাষাও। অথচ সেটিকে বাদ দেয়া হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক পুষ্টির ভাষাচর্চা নিষিদ্ধ হলে ঈমান যে মারা পড়বে সেটিই কি সুনিশ্চিত নয়? মুসলিম দেশে কাফের ব্রিটিশদের শাসনে মুসলমানদের শিল্প ধ্বংস হয়েছে সেটি সবচেয়ে বড় ক্ষতি নয়। বরং সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে। এতে মারা পড়েছে বা অসুস্থ্য হয়েছে মুসলমানদের ঈমান।

ব্যক্তির আত্মায় বা চেতনায় জীবাণু পৌঁছাতে ভাষা পাইপ-লাইনের কাজ করে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজী ভাষায় ইসলাম বিষয়ে জ্ঞানলাভের কোন বইপুস্তক ছিল না। বরং ছিল মুসলিম চেতনায় দূষণ সৃষ্টি ও ইসলাম থেকে দূরে সরানোর বিপুল সামগ্রী। ফলে সে সাহিত্যের ফলে মুসলিম মনে বেড়েছে ডি-ইসলামাইজেশন। এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি পরিণত হয়েছে ঈমানধ্বংসের বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে। সে ইন্ডাস্ট্রি আজও একই মিশন নিয়ে মুসলিম দেশগুলির প্রতি অঙ্গণে কাজ করছে। মুসলমানগণ বিপুল হারে খৃষ্টান না হলেও,ইংরেজ-প্রবর্তিত সে শিক্ষানীতির ফলে তারা ইসলাম থেকে প্রচন্ড ভাবে দূরে সরেছে। সে শিক্ষাব্যবস্থায় ডাক্তার,ইঞ্জিনীয়ার, কৃষিবিদ,হিসাববিদ বা নানারূপ পেশাদার রূপে অনেকে বেড়ে উঠলেও সে শিক্ষা থেকে তারা ঈমানে পুষ্টি পায়নি। ঈমানে সে অপুষ্টি ও দূষণের কারণেই কাফেরদের ন্যায় তারাও শরিয়ত, জিহাদ, খেলাফতের বিরোধী। এরূপ ইসলাম বিরোধীদের হাতেই বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের আইন-আদালত,শিক্ষা-সংস্কৃতি, পুলিশ,সেনাবাহিনী ও প্রশাসন জিম্মি।

দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ও হাসপাতালগুলো বিফল হলে সমগ্র দেশ অসুস্থ্য মানুষে ভরে উঠে। আর বিচার ব্যবস্থা কাজ না করলে দেশে দুর্বৃত্তদের প্লাবন আসে। তখন দেশ পূর্ণ হয় ভয়ানক অপরাধীদের দিয়ে। বাংলাদেশে তো সেটিই ঘটেছে। তাই ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ মিশন হলো শরিয়তের বিধানের উপর আদালতের প্রতিষ্ঠা। আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণেই সমগ্র দেশ আজ দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত। চলছে ঘুষখোর ও নানারূপ অপরাধীদের রাজত্ব। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ব্যর্থ খাতটি তাই দেশের কৃষি,শিল্প,বাণিজ্য বা চিকিৎসা খাত নয়। বরং সেটি হলো দেশের আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থা। সে ব্যর্থতার কারণেই সুবিচার ও ন্যায়নীতি আজ  কবরে শায়ীত।

 

যুদ্ধ মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডার বিরুদ্ধে

মানব জাতির সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি খাদ্যাভাবে,বস্ত্রাভাবে,অর্থাভাবে বা চিকিৎসার অভাবে ঘটে না। বরং সেটি ঘটে সুবিচারের অভাবে। অবিচার এবং আল্লাহর আইনের অবাধ্যতা বরং আল্লাহর আযাবকে অনিবার্য করে তোলে। সুবিচারের প্রতিষ্ঠা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটিকে সুনিশ্চিত করতেই মহাজ্ঞানী রাব্বুল আলামীন শরিয়তি বিধান দিয়েছেন,এবং সে সাথে সে বিধানের প্রতিষ্ঠাকে নামায-রোযা,হজ-যাকাতের ন্যায় ফরয তথা বাধ্যতামূলক করেছেন। তিনি খাদ্য,বস্ত্র,রাস্তাঘাট বা শিল্প বাড়াতে এরূপ ওহী নাযিল করেনি। অথচ ওহী পাঠিয়েছেন সুবিচারের পথ দেখাতে। পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ভাবে হুশিয়ার করে দেয়া হয়েছে এ বলে,“যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার করে না তারাই কাফির, তারাই যালিম ও তারাই ফাসিক।” -(সূত্রঃ সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭)।তাই কাফের হওয়ার জন্য পুতুল পুজারি বা নাস্তিক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহ বা বিরোধীতাই সে জন্য যথেষ্ঠ। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে কোন রূপ অস্পষ্টতা রাখা হয়নি।

মানব জাতির বড় প্রয়োজনটি স্রেফ সুযোগ্য কৃষক,শ্রমিক,শিক্ষক,চিকিৎসক,প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানী নয়,বরং সবচেয়ে বড় প্রয়োজনটি হলো শরিয়তি বিচার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা। সে কাজে প্রয়োজন হলো শরিয়তি আইনের উপর বিশেষজ্ঞ বিচারকদের। এবং পবিত্র কর্ম হলো শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জিহাদ।পবিত্র কোরআনের পরিভাষায় এটি হলো জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়িয়ে,হাফিজ বা ক্বারির সংখ্যা বাড়িয়ে কি জিহাদের দায়ভার থেকে মুক্তি মেলে? খাদ্যপণ্য, শিল্পপণ্য বা বৈজ্ঞানিক সামগ্রিক বিদেশ থেকে কেনা যায়। কিন্তু শরিয়তি আদালতের ন্যায়-বিচারকদের বিদেশ থেকে আমদানি করা যায় না। তাদের গড়তে হয় নিজেদের মধ্য থেকে। নইলে সে ভূমিতে সুবিচার প্রতিষ্ঠা পায় না,সভ্য সমাজও নির্মিত হয় না। বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা তো এখানেই। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনে একটি দিনও শরিয়তি বিধান ছাড়া অতিবাহিত হয়নি। এমনকি উমাইয়া,আব্বাসীয়,উসমানিয়া ও মোগল আমলেও নয়।বাংলার সুলতানি আমল বা সিরাজুদ্দৌলার আমলেও নয়। মুসলিম দেশগুলিতে শরিয়ত আইনকে বিলুপ্ত করেছে সাম্রাজ্যবাদি কাফের ব্রিটিশগণ। আর তাদের প্রতিষ্ঠিত সে কুফরি বিচার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে তাদেরই মানসিক গোলাম ও কলাবোরেটরগণ। আজকের মুসলিম দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদি শাসনের এটিই হলো সবচেয়ে ক্ষতিকর লিগ্যাসি যা মুসলমানদেরকে মহান আল্লাহতায়ালার শত্রু রূপে খাড়া করছে। মুসলমানদের ভয়ংকর অপরাধ হলো তারা বাঁচিয়ে রেখেছে কাফেরদের সে ঈমানধ্বংসী লিগ্যাসী। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের ইসলামি দলের নেতাকর্মী ও আলেমদের ব্যর্থতাও এ ক্ষেত্রে বিশাল। দেশের আলেম ও পীরমাশায়েখগণ দাফন-কাফন,হায়েজ-নেফাস, ঢিলাকুলুপ ও মেছাওয়াকের মসলা নিয়ে বিস্তর জ্ঞানদান করলেও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার ফরজ বিষয়টি নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেন না। ইসলামি দলের নেতাকর্মীগণ সরকারের পতন,নেতাদের মুক্তি বা নির্বাচনের দাবীতে রাস্তায় বিপুল সংখ্যায় নামলেও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে একটি আওয়াজও তোলেন না। আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় এরূপ অবহেলা নিয়ে ইহকাল বা পরকালের কোথাও কি মহান আল্লাহতায়ালার করুণা জুটবে?

 

নিয়ন্ত্রণ ইসলাম চর্চায়

ভারতে ব্রিটিশের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মূলতঃ কাজ করেছে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে একপাল অনুগত সেবক সৃষ্টির ইন্ডাস্ট্রি রূপে। সে শিক্ষানীতির প্রবক্তা লর্ড ম্যাকলে নিজেই তেমন এক উদ্দেশ্যের কথা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন। সে শিক্ষানীতি ব্রিটিশের দালাল সৃষ্টিতে অপূর্ব সফলতা দেখিয়েছে। এ দালাল  সৃষ্টির কারণেই একমাত্র প্রথম বিশ্বেযুদ্ধেই ব্রিটিশের সাম্রাজ্য রক্ষায় ১০ লাখ ভারতীয় যুদ্ধ করেছে এবং ৭৪ হাজার ১৮৭ জন ভারতীয় প্রাণ দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সে সংখ্যা ছিল আরো অধীক। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রক্ষায় ১৯৩৯ সালে প্রায় ২৫ লাখ ভারতীয় ব্রিটিশ বাহিনীতে সৈনিক রূপে নাম রিজিস্ট্রিভূক্ত করে। তারা যুদ্ধ করেছে এশিয়া ও আফ্রিকার নানা রণাঙ্গণে। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো একটি বিদেশী শক্তির পক্ষে কোন একটি দেশ থেকে সবচেয়ে বৃহৎ দালাল বাহিনী। অথচ সে ভারতের বুকেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে সুভাষ বোস ২০-৩০ হাজার সৈন্য খুঁজে পেতেই্ প্রচন্ড হিমশীম খাচ্ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সামরিক ও রাজনৈতিক অধীনতা থেকে মুক্তি মেলেছে এবং উপমহাদেশের ভূগোলও পাল্টে গেছে। কিন্তু ইংরেজদের প্রবর্তিত সেক্যেুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যারা ডিগ্রিপ্রাপ্তদের মনের ভুবন থেকে গোলামী এখনো দূর হয়নি। সে অভিন্ন ধারা আজও  অব্যাহত রয়েছে আজকের বাংলাদেশে।ফলে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রবর্তিত কুফরি আইন ও বিচারব্যবস্থা এখনও বেঁচে আছে ১৫ কোটি মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশে। সাহাবায়ে কেরামের যুগে কি এটি ভাবা যেত? অথচ এরপরও আমরা নিজেদের তে ইসলামের অনুসারি মনে করি!

চোর-ডাকাতদের মহল্লায় কি ন্যায়নীতি প্রচার পায়? কদর পায় কি ন্যায়পরায়নতা? বিচার বসে কি ডাকাত দমনে? সেখানে তো প্রশংসা পায় চুরি-ডাকাতি,হত্যা ও হত্যায় নৃশংসতা। একই রূপ কদর্যতা বাড়ে দুর্বৃত্ত-কবলিত দেশে। তখন অপরাধ বাড়াতে ভূলিয়ে দেয়া হয় ধর্মের বাণী এবং ধর্মকর্মকে। রাজনীতিতে তখন গুরত্ব পায় এক খুনের বদলে ১০ খুনের রাজনীতি। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। তাছাড়া দুর্নীতিতে যে দেশ ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয় সে দেশে কি ভিন্নতর কিছু আশা করা যায়? ন্যায়বিচার ও ইসলামের শরিয়ত ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা কদর পাবে বা প্রতিষ্ঠা পাবে সেটিও কি আশা করা যায়? বাংলাদেশে মার্কসবাদ,লেলিনবাদ বা মাওবাদের প্রচার নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ নয় বাইবেল প্রচার। নিষিদ্ধ নয় রামায়ান,বেদ বা ত্রিপঠক পাঠ। নিষিদ্ধ নয় বেশ্যাবৃত্তি, জুয়া, ঘুষ ও মদ্যপানের ন্যায় হারাম কর্মও। বরং পাপাচারের নিরাপত্তা বাড়াতে দেশের পতিতা পল্লিগুলিতে দিবারাত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়। অথচ মসজিদে মসজিদে সরকারের নজরদারি বেড়েছে নবীজী (সাঃ)র প্রচারিত সনাতন ইসলামের প্রচার রুখতে।

নবীজী (সাঃ)র ইসলামে জিহাদ ছিল,শরিয়তি ছিল,খেলাফত ছিল,শুরা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে ইসলামের এ সনাতন রীতিগুলি চিহ্নিত হচ্ছে সন্ত্রাস রূপে। শরিয়তের দাবী নিয়ে রাস্তায় নামলে বা ঘরে জিহাদ বিষয়ক বই রাখলে জেলে তোলা হয়। আদালতে ঈমানদারদের স্থান নাই। সেখানে বরং বেছে বেছে বসানো হয় দলীয় ক্যাডারদের।মহান আল্লাহর শরিয়তি বিধানের পরাজয় দেখতেই এসব বিচারকদের আনন্দ। রাজনৈতিক শত্রু নির্মূলে দলীয় ক্যাডারগণ যেমন রাজপথে লাঠি ধরে,একই লক্ষ্যে তারা আদালতের উপরও অধিকার জমিয়েছে। বিচারকের আসনে বসে নিজ দলের পক্ষে ও ইসলামের বিরুদ্ধে এরাই কলম ধরছে। এরূপ পক্ষপাত-দুষ্ট ও দেশবাসীর স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গিকারশূণ্য বিচারকদের দিয়েই ঔপনিবেশিক শাসকেরা অধিকৃত দেশগুলিতে মুক্তি আন্দোলনের অসংখ্য নেতাকর্মীকে ফাঁসিত ঝুলিয়ে হত্যা করেছে।আর বাংলাদেশ ও মিশরের ন্যায় দেশগুলিতে এখন তারা ব্যবহৃত হচ্ছে গণতন্ত্র হত্যার কাজে। এবং আদালতে চলছে সরকার বিরোধীদের ফাঁসিতে ঝুলানোর তুমুল তান্ডব।

 

যে অপরাধ জনগণের

প্রতিটি ঈমানদারকে শুধু পানাহারে বাঁচলে চলে না,ঈমানী দায়ভার নিয়ে বাঁচতে হয়। সে দায়ভার পালনে প্রয়োজনে যুদ্ধেও নামতে হয়। সে দায়ভার পালনে নবীজী (সাঃ)র শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছেন। দায়িত্বপালনে গাদ্দারির কারণে ইহুদী জাতির লাগাতর আযাব ও অপমান নেমে এসেছে।তাদেরকেও স্বৈরাচারি ও সন্ত্রাসী শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুকুম দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অবাধ্য ইহুদীগণ সে হুকুমের জবাবে হযরত মূসা (আঃ)কে বলেছিল, “যাও, তুমি ও তামার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।” জনপদে বাঘ-ভালুক নামলে সেটি তাড়ানোর দায়িত্ব ফেরেশতাদের নয়। সে দায়ভারটি মহল্লাবাসীদের নিতে হয়। তেমনি রাষ্ট্র জালেম শক্তির হাতে অধিকৃত হলে তাদের নির্মূলের দায়ভারটিও জনগণের। অন্যায় কে মেনে নেয়ার মধ্যে কোন সাধুতা বা ভদ্রতা নেই। বরং সেটি হলো কাপুরুষতা ও অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ। ইসলামে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধরণের অপরাধ পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কঠিন আযাব নামিয়ে নামে। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে এটি এক প্রচন্ড বিদ্রোহও। মহিমাময় মহান আল্লাহতায়ালা শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাত পালনের নির্দেশই দেননি। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন “নেহী আনিল মুনকার” তথা রাষ্ট্র থেকে দুর্বৃত্তদের নির্মূলেও। সামর্থবান মানুষের মহল্লায় যেমন নেকড়া বাঘ বাঁচে না,মুসলিম সমাজে তেমনি আবু লাহাব ও আবু জেহেলদের ন্যায় ইসলামের শত্রুগণও বাঁচে না।তাদের বিরুদ্ধে ঈমানদারদের লাগাতর জিহাদ শুরু হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এক্ষেত্রে অনেক নীচে নেমেছে। আজ থেকে ৬০ বছর আগেও বাংলার সমাজ ও রাজনীতি বর্বর সন্ত্রাসীদের হাতে এতটা অধিকৃত হয়নি। মানুষ গুম ও খুনে পূর্বের কোন সরকারই এতটা সাহস পায়নি।কিন্তু এখন পায়।কারণ,কোটি কোটি মানুষ এমন অপরাধী খুনিদের শুধু ভোটই দেয় না,তাদের পক্ষে অনেকে লাঠিও ধরে।অনেকে কলমও ধরে।

শরীরে ক্যান্সারের আলামতগুলি স্বচোখে দেখার পরও সেটির চিকিৎসা না করাটি অপরাধ। রোগীকে সে অপরাধের শাস্তি পোহাতে হয় অকাল মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। একই রূপ অপরাধ বাংলাদেশীদেরও। দেশে রাজনীতি,প্রশাসন ও আইন-আদালতের নামে প্রাণনাশী ক্যান্সার বেড়ে উঠছে বহুকাল যাবত। সেটি এখন ফুলে ফেঁপে উঠেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে বিশ্বব্যাপী। সে দুর্গন্ধ টের পাচ্ছে হাজার হাজার মাইল দূরের বিশ্ববাসীও। ফলে বাংলাদেশের প্রশাসন ও আইন-আদালতের অপরাধ নি্য়ে বিশ্বের নানা প্রান্তর থেকে প্রবল প্রতিবাদ উঠেছে। বিচারকগণ স্বৈরাচারি সরকারের এজেন্ডা পূরণে রাজনেতিক বিরোধীদের হত্যায় নেমেছে -সে গুরুতর অভিযোগটিও উঠেছে। হ্ত্যার সে সরকারি অভিলাষটি প্রকাশ পেয়েছে একজন সাবেক বিচারপতির স্কাইপী সংলাপ থেকে। কিন্তু যে দেশবাসী সে রোগে আক্রান্ত তাদের মাঝে এ নিয়ে আন্দোলন কই? এটি কি কম বিস্ময়ের? অথচ এরূপ সন্ত্রাসী দুর্বৃত্তদের হাতে কোন কোন সভ্য দেশ অধিকৃত হলে সে অধিকৃতির বিরুদ্ধে তৎক্ষনাৎ যুদ্ধ শুরু হতো। কিন্তু বাংলাদেশে বেড়েছে নীরব আত্মসমর্পণ। মুসলমান তো প্রতিমুহুর্তে বাঁচে মহান আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ নিয়ে। প্রশ্ন হলো,মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আত্মসমর্পণের পাশাপাশি এরূপ দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারের কাছে আত্মসমর্পণও কি একত্রে চলতে পারে? তাতে কি ঈমান বাঁচে? পরকালে কি তাতে জান্নাত জুটবে? ১৫/১২/১৪; নতুন সংস্করণ ১৬/৩/২০১৯

 

 




সন্ত্রাসী স্বৈরাচারিদের অপরাধনামা

একা নয় ঘাতকেরা

সন্ত্রাসী ঘাতকেরা কোন সমাজেই একা নয়। একার পক্ষে রাষ্ট্রের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা দূরে থাক,কোন গৃহে একাকী ডাকাতি করাও অসম্ভব। বিপুল জনগণের সহযোগিতা না পেলে ফিরাউন,নমরুদ,হালাকু,চেঙ্গিজ,হিটলার,স্টালীন ও পলপটদের মত ভয়ানক নরঘাতকগণ কি কখনোই রাষ্ট্রের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা করতে পারতো? বুশ-ব্লেয়ারও কি পারতো একাকী আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসন চালাতে এবং দেশ দু’টির লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করতে? প্রতি সমাজেই এমন লোকের সংখ্যা প্রচুর যারা এ ধরণের মনুষ্য রূপধারী নৃশংস বর্বর জীবদেরকেই শুধু নয়,ইতর গরু-ছাগলকেও ভগবান বলতে রাজী। দক্ষিণ এশিয়ার বুকে এদের সংখ্যা তো আল্লাহতায়ালার উপাসনাকারিদের চেয়েও অধীক। নির্বাচনে এরা শুধু নৃশংস নরঘাতকদের ভোট দিয়ে বিজয়ীই করে না,তাদেরকে মাথায় তুলে উৎসবও করে। তাই হিটলার বা নরেন্দ্র মোদীর ন্যায় নরঘাতকগণ যেমন বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছে,তেমনি গণন্ত্রের ঘাতক ও ৩০-৪০ হাজার মানুষের প্রাণসংহারি বাকশালী মুজিবও নির্বাচিত হয়েছে। এসব বর্বরদের কোন যুদ্ধই একাকী লড়তে হয়নি। তাদের পক্ষ অস্ত্র ধরেছে লক্ষ লক্ষ মনুষ্য রূপধারী জীব।

যে গ্রামে অপরাধী চরিত্রের মানুষদের সংখ্যা অধিক,সে গ্রামে সহজেই বিশাল ডাকাত দল গড়ে উঠে।কোন রাষ্ট্রে এমন মানুষদের সংখ্যা বাড়লে সেখানে সন্ত্রাসী স্বৈরাচারিদের দুঃশাসন শুরু হয়।  হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষদের তখন লাশ হতে হয়। দুর্বৃত্ত-অধিকৃত এমন সমাজে নবীদের ন্যায় পুতঃপবিত্র চরিত্রের মহামানুষেরাও অত্যাচারিত হয়েছেন। স্বৈরাচারি সরকারের বড় অপরাধ হলো, সমগ্র রাষ্ট্রকে তারা দুর্বৃত্ত উৎপাদনের ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত করে। জনগণকে তারা নিজেদের দুর্বৃত্তির সহযোগী করে গড়ে তোলে। তারই দৃষ্টান্ত হলো আজকের বাংলাদেশ। বাংলাদেশে আজ  যেরূপ সন্ত্রাসী স্বৈরাচার চেপে বসেছে তা কি দুনিয়ার কোন সভ্য দেশে আশা করা যায়? এমন কি বাংলার বুকেও কি আজ থেকে শত বছর আগে কল্পনা করা যেত? যারা বলে,“জনগণ কখনোই ভূল করে না” -তারা মিথ্যা বলে। বরং প্রকৃত সত্য হলোঃ জনগণ শুধু ভূলই করে না,স্বেচ্ছায় তারা ভয়ানক অপরাধের সাথে নিজেদের সম্পৃক্তও করে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে গুরুতর অপরাধ শুধু ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা নয়। অপরাধ হলো, ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের আরোপিত যুদ্ধের মুখে নীরব থাকাও। এমন নীরবতা দেশে আযাব ডেকে আনে। একারণে,অতীতে আযাবগুলো স্রেফ ফিরাউনের ন্যায় দুর্বৃত্ত শাসকদের উপরই আসেনি, জনগণের উপরও এসেছে। বাংলাদেশে আজ যে সন্ত্রাসী স্বৈরাচারের বিজয় -তার জন্য কি জনগণ কম অপরাধী? জঙ্গলের গভিরতা বুঝে বাঘ-ভালুকেরা বাসা বাঁধে। তেমনি উপযোগী পরিবেশ খোঁজে সন্ত্রাসী স্বৈরাচারেরা। আজ থেকে ৬০ বছর আগে বাংলাদেশ সন্ত্রাসী স্বৈরাচারিদের জন্য এতটা উপযোগী ছিল না। ফলে তখন বাকশালী গণতন্ত্র, পিলখানায় ৫২ জন সেনা-অফিসার হত্যা, ২০১৩ সালের শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যা, ২০১৪ সালের ভোটবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের ভোট-ডাকাতির নায়কদের ন্যয় অপরাধীগণ জনগণের মাঝে নামতে সাহস পায়নি। রক্ষিবাহিনী ও র‌্যাব-এর ন্যায় ঘাতক বাহিনীও তখন অস্তিত্ব পায়নি। তখন নিরীহ মুসল্লিদের হত্যা করে তাদের লাশ ময়লার গাড়িতে তুলে লাশ গায়েবের সাহস কোন সরকারই দেখায়নি।

ফলে আজ  থেকে ৬০ বছর আগে ১৯৫৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন সম্ভব হয়েছিল,তেমন একটি নির্বচনের কথা আজ ভাবাই যায় না। বিগত ৬০ বছরে বাংলাদেশের আলোবাতাসে পরিবর্তন না এলেও দারুন ভাবে পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশের মানুষের চেতনা,চরিত্র ও রুচি। ৬০ বছর আগে কোন পরিবার থেকে ঘরবাড়ি কেড়ে নিয়ে সে পরিবারের সদস্যদের রাস্তায় মুক্ত আকাশের নীচে বসানো হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের বুকে বহুলক্ষ বিহারী নারী-পুরুষ-শিশু আজ নর্দমার পাশে বস্তিবাসী। ডাকাতপাড়ায় যেমন ডাকাতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠে না তেমনি বাংলাদেশেও এমন বর্বরতার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ উঠেনি। বরং খোদ সরকার এগিয়ে এসেছে জবর দখলকারি ডাকাতদের সহায়তায়। ডাকাতদের নামে সরকার দখলকৃত বাড়ির দলীল করে দিয়েছে। যে দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের ৫ বার প্রথম হয়,এমন নিষ্ঠুর ডাকাতিতে কি অন্য কোন দেশ সেদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে? ভয়ানক অপরাধ প্রবনতা গণমুখিতা পেয়েছে। কোন জাতির লোকেদের মাঝে পরিবর্তন না এলে মহান আল্লাহতায়ালাও সে জাতির ভাগ্যে পরিবর্তন আনেন না। সে ঘোষণাটি তিনি পবিত্র কোরআনে দিয়েছেন। বলা হয়েছে,“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা নিজেরাই নিজেদের পরিবর্তন না করে।” –(সুরা রা’দ আয়াত ১১)। অথচ নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যা ঘটেছে সেটি চেতনা ও চরিত্র নির্মাণে উপরে উঠা নয়,বরং নীচে নামা।এমন জাতির কল্যাণে কি মহান আল্লাহতায়ালা এগিয়ে আসেন?

 

নৃশংস ও বীভৎ সন্ত্রাস

সন্ত্রাসের আভিধানিক অর্থঃ স্বার্থ সিদ্ধির লক্ষ্যে অস্ত্রের ব্যবহার। ডাকাতেরা গ্রামগঞ্জ ও রাস্তাঘাটে সেটি করে অস্ত্র দেখিয়ে। বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাস সৃষ্টির সে ভয়ানক অপরাধটিই সংঘটিত হচ্ছে সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে।সেটি রাস্তায় দলীয় ক্যাডার,পুলিশ,গোয়েন্দা পুলিশ,র‌্যাব,বিজিবী ও  সেনাবাহিনী নামিয়ে। রাস্তার অস্ত্রধারি ডাকাতদের তুলনায় সরকারের এ সন্ত্রাসী কর্মগুলো আরো বর্বর ও ধ্বংসাত্মক। এরূপ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের লক্ষ্য,সমগ্র দেশের উপর তাদের রাজনৈতিক দখলদারি এবং দেশজুড়ে লুন্ঠন। রাস্তার ডাকাতগণ মানুষের অর্থলুন্ঠন করে। কিন্তু ত্রাস সৃষ্টিতে ডাকাতদের সামর্থ সীমিত। দেশের রাজনীতি,আদালত,পুলিশ,প্রশাসন,সংস্কৃতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর তাদের দখলদারি থাকে না। পুলিশ অফিসার,সেনাবাহিনীর সদস্য এবং আদালতের বিচারকদের লাঠিয়ালে পরিণত করার সামর্থও চোর-চোডাকাতদের থাকে না। কিন্তু সন্ত্রাসী সরকারের থাকে। ফলে ডাকাতের লুন্ঠনে কোন দেশেই দুর্ভিক্ষ নেমে আসে না। কিন্তু সেটি আসে সরকারি ডাকাতদলের লুন্ঠনে। সরকারের এরূপ দস্যুবৃত্তির কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনবার ভয়ানক দুর্ভিক্ষ এসেছে। দুইবার এসেছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দস্যুদের লুন্ঠনে। তৃতীয় বার এসেছে শেখ মুজিবের শাসনামলে ১৯৭৪ সালে। ব্রিটিশ দস্যুদের লুন্ঠনে প্রথম বার দুর্ভিক্ষ এসেছিল ১৭৭০ সালে (বাংলা সন ১১৭৬),এটিকে বলা হয় ছিয়াত্তরের মনন্তর। সে ছিল ভয়াবহ মহা দূর্ভিক্ষ। তাতে  বাংলার প্রায় একতৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়। কোন কোন হিসাব মতে অধিকৃত বাংলা ও বিহার জুড়ে প্রায় দেড় কোটির মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী সরকারের লুন্ঠনে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষেও মারা যায় বহু লক্ষ মানুষ।

অপরদিকে স্বৈরাচারের আভিধানিক অর্থঃ দেশ পরিচালনায় শাসকের বা শাসক দলের স্বেচ্ছাচারিতা তথা খেয়ালখুশির প্রাধান্য। স্বৈর-শাসকদের হাতে দেশ অধিকৃত হলে কবরে শায়ীত হয় বহুদলীয় গণতন্ত্র। নির্বাচন তখন তামাশায় পরিণত হয়। তখন নিষিদ্ধ হয় সরকার বিরোধী সকল পত্র-পত্রিকা,বই-পুস্তক ও টিভি চ্যানেল। লুপ্ত করা হয় কথাবলা ও লেখালেখীর স্বাধীনতা। কোন দেশেই এরূপ স্বৈরাচার স্রেফ স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে হাজির হয় না। হাজির হয় ভয়ানক সন্ত্রাস নিয়েও। কারণ স্বৈরাচার তো বাঁচে সন্ত্রাসের মাধ্যমে। জনগণের মাঝে গ্রহনযোগ্যতা বা নির্বাচনি বিজয় নিয়ে তারা ভাবে না। বরং ভাবে সন্ত্রাসের হাতিয়ারগুলোকে আরো শানিত করা নিয়ে। শেখ মুজিব তাই শুধু একদলীয় বাকশালী শাসন,বিরোধী দলগুলির নিষিদ্ধকরণ ও সকল পত্রপত্রিকার অফিসে তালা ঝুলিয়েই খুশি হননি। পাশাপাশি দেশ জুড়ে ত্রাস সৃষ্টিতে রক্ষিবাহিনীও নামিয়েছেন। মুজিবের সে সন্ত্রাসে মৃত্যু ঘটে ৩০-৪০ হাজারের বেশী বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক কর্মীর। শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ একই রূপ সন্ত্রাস,চুরিডাকাতি ও স্বৈরাচার নিয়ে হাজির।

 

আদালত যেখানে ঘাতকের হাতিয়ার

স্বৈরাচারি ও সন্ত্রাসী শাসকগণ শুধু রাজনীতি,পুলিশ,প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর উপরই কবজা করে না। কবজায় নেয় দেশের আইন-আদালত ও বিচার ব্যবস্থাকেও। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ন্যায় বিচারকগণও তখন পরিণত হয় সন্ত্রাসী সরকারের ঘাতক লাঠিয়ালে। তখন নির্বাসনে যায় ন্যায় বিচার। এমন সরকারের আমলে আদালতে উঠার অর্থই হলো কারাগারে বা রিমান্ডে গিয়ে অপমানিত,অত্যাচারিত ও শাস্তির মুখোমুখি হওয়া। আদালত পরিণত হয় অত্যাচারের নির্মম হাতিয়ারে। এমন সন্ত্রাসী সরকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ধর্মচর্চার উপরও। ফিরাউন-নমরুদ কখনোই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত মুসা (আঃ)র ন্যায় মহান ব্যক্তিদেরকে দ্বীন প্রচারের সুযোগ দেয়নি। প্রতিযুগে একই রীতি শয়তানি শক্তির। ফলে স্বৈরাচারি শাসনামলে অসম্ভব হয় স্বাধীন ও নির্ভেজাল ধর্মপালন। অধিকৃত হয় মসজিদও। তখন মসজিদের ইমামের মুখ থেকে তখন তাই ধ্বনিত হয় যা দেশের স্বৈরাচারি সরকার চায়। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার পবিত্র জিহাদকে তখন মসজিদের মেম্বর থেকে সন্ত্রাস বলে চিহ্নিত করা হয়। মসজিদের মেম্বর থেকেই ৮০ বছরের বেশী কাল ধরে হযরত আলী (রাঃ)ন্যায় ব্যক্তির বিরুদ্ধে গালিগালাজ করা হয়েছে। কারণ, সেটিই ছিল উমাইয়া শাসকদের নীতি। অধিকৃত আদালত তখন সে রায়ই শোনায় যা স্বৈরাচারি সরকার চায়। এরূপ আদালতের অত্যাচার থেকে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ),ইমাম শাফেয়ী (রহঃ),ইমাম মালেক (রহঃ)এবং হযরত ইমাম হাম্বলী (রহঃ)র ন্যায় বিখ্যাত ইমামগণও তাই রক্ষা পাননি। তারা অসম্ভব করেছে সুশাসন ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা। দেশে স্বৈরশাসনের এটিই সবচেয়ে গুরুতর বিপদ।

ঔপনিবেশিক লুন্ঠনকারি বা মোঙ্গল বর্বরেরা যখনই দেশ দখল ও লুন্ঠনে বের হতো তখন সাথে শুধু নৃশংস সৈনিকই থাকতো না,থাকতো একপাল ঘাতক বিচারকও। এসব ঘাতক বিচারকগণই ভারতসহ বহু অধিকৃত দেশের স্বাধীনতাকামী মহান সৈনিকদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। এরূপ সন্ত্রাসী স্বৈরাচারিদের শাসনামলে সুবিচার আশা করাটি বৃথা। তখন বিচারের লক্ষ্য হয়,স্রেফ স্বৈরাচারকে নিরাপত্তা দেয়া। বিচারকগণ এরূপ পেশা বেছে নেয় স্রেফ নিজেদের রুটিরুজি নিশ্চিত করতে,আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে নয়। এরা পেটের গোলাম। এমন বিচারকদের কারণেই ফিরাউনের আদালতে দুর্বৃত্ত ফিরাউন ও তার সহচরদের কখনোই বিচার হয়নি। বরং বিচার বসেছে মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান হযরত মূসা (আঃ) ও তাঁর নিরপরাধ সহচরদের বিরুদ্ধে। এরূপ বিচারের লক্ষ্য,নিরপরাধ মানুষ হত্যাকে জায়েজ করা। এরূপ সন্ত্রাসী শাসকগণ আল্লাহর শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠা হতে দিতে রাজি নয়। কারণ সেটি হলে,আইন তখন দুর্বৃত্ত শাসক ও তাদের সহচরদেরও আদালতে তোলে। যে আাইন চোর-ডাকাত, ঘুষখোর ও দুর্বৃত্তদের হাত কাটে বা পিঠে চাবুক মারে সে আইন কি কখনোই চোর-ডাকাত ও দুর্বৃত্তরা চাইবে? বাংলাদেশের মত দুর্বৃত্ত-অধিকৃত দেশে এজন্যই শরিয়তের প্রতিষ্ঠার এতো বিরোধীতা।

 

অধিকৃত আদালত

বাংলাদেশের ইতিহাসে অতিশয় ঘৃণ্য অপরাধ ঘটেছে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির এবং ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে। নানারূপ জঘন্য অপরাধ যে কোন দেশেই ঘটতে পারে। কিন্তু আদালতের ব্যর্থতা স্পষ্টতর হয় সে অপরাধের বিচার না হওয়ার মধ্য দিয়ে। নির্বাচনের নামে কোন দেশে ভোট ডাকাতি হলে আদালতের দায়িত্ব হয় সে নির্বাচনকে বৈধতা না দিয়ে নির্বাচনের আয়োজকদেরকেই আসামীর কাঠগড়ায় খাড়া করা। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। ডাকাতপাড়াতেও ডাকাতদের নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে। সে সংস্কৃতিতে গুরুত্ব পায় নৃশংস ডাকাতদের সম্মান দেখানো। ডাকাতি কর্মে যে যত দুর্বৃত্ত ও নৃশংস,সেই তত বেশী সম্মান পায়। সবচেয়ে নৃশংস ডাকাতকে সর্দারের আসনে বসানো হয়। ফিরাউন-নমরুদের মত দুর্বৃত্ত রাজাদের শাসনে সবচেয়ে বেশী মর্যাদা পেয়েছে তো তারাই। এমনকি তাদেরকে ভগবানের মর্যাদাও দেয়া হয়েছে। স্বৈরাচার-প্রবর্তিত সে সংস্কৃতিতে শুধু রাজাকে নয়,রাজার পোষা কুকুর-বিড়ালকে সম্মান দেখানোই রীতি। দুর্বৃত্ত শাসকের ঘাতক বিচারকগণও তখন “মাই লর্ড” বা “মহামান্য” বলে অভিহিত হয়। ভারতবাসীর স্বাধীনতার চরম শত্রু ও সাম্রাজ্যবাদি ব্রিটিশের পদলেহী বিচারকগণ তো সে উপাধিতেই ব্রিটিশ ভারতের আদালতগুলিতে সম্মানিত হয়ে এসেছে। যুগে যুগে বর্বর স্বৈর-শাসকগণ স্রেফ অস্ত্রের জোরে বাঁচেনি, তারা যুগ যুগ বেঁচেছে এবং সম্মান পেয়েছে -এমনকি ভগবান রূপে আখ্যায়ীত হয়েছে জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া জাহিলিয়াত এবং অপসংস্কৃতির কারণে। তেমন এক জাহিলিয়াত এবং অপসংস্কৃতির জন্ম ও প্রচন্ড পরিচর্যা দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের স্বৈরাচারি সরকারের পক্ষ থেকেও। এমন অপসংস্কৃতির কারণেই দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পরম শত্রু এবং বিদেশী শক্তির গোলামও জাতির পিতা, জাতির নেতা বা জননেত্রীর খেতাব পায়।

ডাকাতপাড়ায় ডাকাতদের বিচার হয় না। বাংলাদেশের তেমনি ভোট ডাকাতদেরও বিচার হয় না। অবৈধ নির্বাচনও তখন বৈধ নির্বাচন রূপে স্বীকৃতি পায়। প্রধানমন্ত্রী,মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য রূপে সন্মান পায় ভোট ডাকাতগণ। কথা হলো জন্ম সূত্রেই যে সরকার অপরাধী,তেমন সরকার থেকে কি ভাল কিছু আশা করা যায়? জীবাণু মাত্রই রোগ ছড়ায়। তেমনি অপরাধীগণও দেশজুড়ে অপরাধ ছড়াবে সেটিই স্বাভাবিক? নেকড়ে বাঘ সব জঙ্গলে একই রূপ হিংস্র। তেমনি অভিন্ন হলো সব দেশের ও সব সময়ের স্বৈরাচারি শাসকগণ। তাই নমরুদ-ফিরাউন মারা গেলেও আজকের নমরুদ-ফিরাউন বেঁচে আছে সে অভিন্ন স্বৈরাচার নিয়ে। সেটি যেমন মিশরে,তেমনি বাংলাদেশসহ বহুদেশে। মিশরের স্বৈরাচারি সরকারের সেনাবাহিনী ২০১৩ সালের ১৪ই আগষ্টের রাতে কায়রোর রাবা আল -আদাবিয়ার ময়দানে এক হাজারের বেশী নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে। নিহতদের অপরাধ,সে দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জনাব মুরসীর বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুর্ত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তারা রাস্তায় ধর্ণা দিয়ে বসেছিল। কিন্তু সে হত্যাকান্ডের অপরাধে কাউকে আদালতে তোলা হয়নি। কারো শাস্তিও হয়নি। লক্ষণীয় হলো,এরূপ গুরুতর অপরাধও বিচারকদের কাছে কোন অপরাধ রূপে গণ্য হয়নি! সম্প্রতি মিশরের সর্বোচ্চ আদালত সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসনী মোবারককে তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল খুনের মামলা থেকে বেকসুর খালাস করে দিল। নির্দোষ রূপে ঘোষণা দিল হুসনী মোবারকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সকল অভিযুক্ত ব্যক্তিদের। তাদের বিরুদ্ধে বিচারকগণ কোন অপরাধ খুঁজে পায়নি। বরং সে বিচারকগণ অপরাধ খুঁজে পেয়েছে ২০১১ সালে সংঘটিত গণবিপ্লবের বিরুদ্ধে -যা স্বৈরশাসক হুসনী মোবারককে ক্ষমতা থেকে হঠিয়েছিল। ফলে সে বিপ্লবে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল তারা এখন জেলে। অথচ ২০১১ সালের সে বিপ্লবে হুসনী মোবারাকের স্বৈরাচারি সরকার ৮ শতের বেশী নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষকে রাজপথে হত্যা করেছিল। সে হত্যাকর্মকে দ্রুততর ও নৃশংস করার স্বার্থে রাজপথে ট্যাংক,কামান ও মেশিনগান নামানো হয়েছিল। মানুষ খুন হয়েছিল দিনের আলোতে এবং রাজপথে। অথচ মিশরের আদালত কোন খুনিকে খুঁজে পায়নি। সে অপরাধে কারো শাস্তিও হয়নি। স্বৈরাচারিদের হাতে দেশ অধিকৃত হয়ে ন্যায় বিচার যে কতটা অসম্ভব হয় এ হলো তার নজির। জঙ্গলে মানুষ খুন হলে কারো শাস্তি হয় না।তেমনি ৮ শতের বেশী মানুষ হত্যাতেও মিশরে কারো শাস্তি হলো না।স্বৈরাচার এভাবেই জনপদে বন্যতা নামিয়ে আনে।

 

মিশরে স্বৈরাচারি সরকার গণবিক্ষোভ থেকে বাঁচতে তড়িঘড়ি করে শত শত প্রতিবাদি মানুষের বিরুদ্ধে ফাঁসির হুকুম দিচ্ছে। বিচারকগণ সে ফাঁসির হুকুম দিচ্ছে শত শত মানুষের বিরুদ্ধে একসাথে। আসামী পক্ষের আইনজীবীগণ যুক্তি পেশেরও সুযোগ পাচ্ছে না। এমন কি রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিলে নামার অপরাধে কয়েকশত স্কুলছাত্রীকে ৪ বছরের জেল দিয়েছে। একই অবস্থা বাংলাদেশে। বাংলাদেশের বিচারকগণও স্বৈরাচারি সরকারের অতি নিষ্ঠুরগুলোকেও অপরাধ রূপে দেখতে রাজি নয়। তাদেরকে আদালতে তুলতেও রাজী নয়। ২০১৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশের শাপলা চত্বরে হিফাজতে ইসলামের নিরস্ত্র সমাবেশ রুখতে সেনাবাহিনী,র‌্যাব,বিজিবি ও পুলিশ নামানো হলো। অসংখ্য মানুষ নিহত হলো,এবং আহত হলো সহস্রাধিক। কিন্তু দেশের আদালতে সে হত্যাকান্ড নিয়ে কোনরূপ তদন্ত হলো না,কারো বিরুদ্ধে কোন বিচারও বসলো না। কারো কোন শাস্তিও হলো না। স্বৈরাচারি সন্ত্রাসীদের হাতে দেশ অধিকৃত হলে দেশের সমগ্র বিচার ব্যব্স্থা, প্রসিকিউশন ও আদালত যে কতটা ঘাতকদের হাতে অধিকৃত হয় -এ হলো তার নজির। তখন জঙ্গলে পরিনত হয় সমগ্র দেশ। তখন মানুষ শুধু পথেঘাটেই মারা যায় না,মারা পড়ে আদালতেও।

 

আস্তাকুরে ন্যায়বিচার

জাতি কতটা সভ্য ও উন্নত -সে বিচার জনসংখ্যা,অর্থনীতি বা সামরিক শক্তি দিয়ে হয় না। বড় বড় প্রাসাদ দিয়েও হয়না। সাম্রাজ্যবাদী দস্যুগণও উন্নয়নে বিস্ময়কর ইতিহাস গড়ে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী আগ্রাসন,দস্যুবৃত্তি ও গণহত্যা তো বেড়েছে তাদের দ্বারাই। তাদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে দুটি ভয়ানক বিশ্বযুদ্ধ। দু’টি বিশ্বযুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে তারা হত্যা করেছে। আনবিক বোমা ফেলেছে জাপানের দুটি জনবহুল নগরীর উপর। বিশ্বযুদ্ধ থামলেও ধ্বংস ও গণহত্যা। ভয়ানক ধ্বংস ও গণহত্যা উপহার দিয়েছে ভিয়েতনাম,আফগানিস্তান ও ইরাকসহ নানা দেশে। সে সব অধিকৃত দেশে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ নারী-শিশুকে তারা হত্যা করেছে। যুদ্ধ তো নিজেই দুর্বলের বিরুদ্ধে অপরাধ। অপরাধটি অগণিত মানুষ হত্যার ও দেশ ধ্বংসের। ইতিহাসের কাঠগড়ায় তারা গণহত্যার আসামী। এখন সে অপরাধীরাই ড্রোন নিয়ে বিশ্বময় যুদ্ধে নেমেছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। এরূপ খুনিগণকে কি সভ্য রূপে চিত্রিত করা যায়? মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে প্রতিটি জাতির মূল্যায়ন হয় সুবিচারের প্রতিষ্ঠায় সে জাতির সফলতা দিয়ে।

মুসলমানদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাঃ “তোমরা্‌ই হচ্ছো শ্রেষ্ঠ উম্মত;সমগ্র মানব জাতির জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে;তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করো,অসৎ কাজে নিষেধ করো এবং আল্লাহতে বিশ্বাস করো।” –(সুরা আল -ইমরান আয়াত ১১০)। বলা হয়েছে,“নিশ্চয়ই আমি রাসূলদের প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ;এবং অবতীর্ণ করেছি তাদের সাথে কিতাব ও মিযান (ন্যায়দনন্ড) যাতে মানুষ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” -(সুরা হাদীদ আয়াত ২৫)। তাই নবীরাসূল প্রেরণের লক্ষ্য স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান ও তাঁর ইবাদতের দিকে মানুষকে ডাকা নয়,বরং গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সৎকাজের প্রতিষ্ঠা ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠা। সৎকাজের প্রতিষ্ঠা ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠায় কতটা সফল হলো তা দিয়েই নির্ণীত হয় জাতির মর্যাদা।তাই স্বৈরাচারি সন্ত্রাসীদের ক্ষমতায় বসিয়ে কি সভ্য জাতি রূপে বেড়ে উঠা সম্ভব? ইসলামে অজ্ঞ ও অঙ্গিকারহীনদের বিচারকের আসনে বসিয়ে কি ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠা সম্ভব? বাংলাদেশের ব্যর্থতা কি এ ক্ষেত্রে কম? বিশ্বের দরবারে ৫ বার যারা সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত দেশের খেতাব পায় সে দেশের মানুষ মহান আল্লাহতায়ালার দরবারেই বা কি মর্যাদা আশা করতে পারে? দেশে মসজিদ-মাদ্রাসা,চাল-ডাল,গরু-ছাগল,পোষাক-শিল্প বাড়িয়ে বা বিদেশে মনুষ্যজীব রপ্তানী করে কি মর্যাদা বাড়ানো যায়?