অর্জিত পরাধীনতা ও স্বাধীনতার যুদ্ধ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

অর্জিত পরাধীনতা

মানুষ শুধু নিজেকে বাঁচানোর জন্যই লড়াই করে না। অনেক সময় আত্মঘাতী হয় এবং নিজের মৃত্যু নিজেই ডেকে আনে। তেমনটি ঘটে এমন কি জাতীয় জীবনেও। অনেক সময় নিজ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ যুদ্ধ করে নিজেদের পরাজয় বাড়াতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে শত্রুর হাতে পরাধীনতা বাড়াতে তেমন আত্মঘাতী যুদ্ধ দেখা গেছে মধ্যপ্রাচের আরব দেশগুলোতে। বহু লাখ আরব সে যুদ্ধে ব্রিটিশ ও ফরাসী সাম্রাজ্যবাদীদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে চিহ্নিত শত্রুদের বিজয় বাড়িয়েছে এবং ২২ টুকরোয় বিভক্ত ও পরাজিত এক আরব মানচিত্রের জন্ম দিয়েছে। তেমন উসমানিয়া খেলাফত জার্মানীর পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিয়ে উসমানিয়া খেলাফতের পরাজয় ও বিলুপ্তি ডেকে এনেছে। অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরব ও তুর্কী মুসলিমদের যুদ্ধ ছিল না। এ যুদ্ধ ছিল ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের নিজেদের যুদ্ধ। তেমনি ১৯৭১’য়ের যুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতে যুদ্ধ। বাঙালীগণ সে যুদ্ধে ভারতের পক্ষ নিয়ে যেমন ভারতের বিজয় বাড়িয়েছে, তেমনি পরাধীনতা বাড়িয়েছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশ আজও তার ঘানি টানছে। এবং বহু শত বছর সে ঘানি টানতে হবে। এ পরাধীনতা বাংলাদেশীদের নিজ হাতের অর্জিত পরাধীনতা।    

পরাধীনতা অধিকৃত দেশের মুসলিমদের উপর গুরুতর দায়ভার চাপায়। সেটি প্রতিরোধ জিহাদের। দেশবাসীর উপর শত্রুর পক্ষ থেকে আরোপিত পরাধীনতা থাকবে অথচ জিহাদ থাকবে না -সেটি ইসলামের রীতি নয়। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো নির্ভয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। মু’মিনের জীবনে সেটিই তো মিশন। সে পরাধীনতার বিলুপ্তিতে ঈমানদারের জীবনে জিহাদ শুরু হবে -সেটিই স্বাভাবিক ও কাঙ্খিত। শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে এরূপ দাঁড়ানোর অর্থই হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে দাঁড়ানো। সেটি শুধু বিদেশী কাফেরদের বিরুদ্ধে নয়, বরং ইসলামের দেশী শত্রুদের বিরুদ্ধেও। ইসলামে এরূপ দাঁড়ানোটি প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ। নইলে গোলামি হয় শয়তানের। আর শয়তানের গোলামী নিয়ে বাঁচা তো হারাম। শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদের হুকুম দেন খলিফা বা আমিরুল মু’মিনুন। কিন্তু  আজকের বিশ্বে না আছে কোন খলিফা, না আছে আমির। দেশে দেশে আছে কেবল ইসলামের শত্রুশক্তির দখলদারি। কিন্তু তাই বলে কি পরাধীনতার বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু হবে না? সেটি না হলে পরাধীনতা বিলুপ্ত হবে কীরূপে? এবং কীরূপে বিজয়ী হবে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন? বিষযটি এতোই গুরত্বপূর্ণ যে, শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর হুকুমটি এসেছে পবিত্র কোর’আনে। সে হুকুমটি এসেছে এভাবে, “বলো (হে মুহাম্মদ)! “(হে ঈমানদারগণ) তোমাদের উদ্দেশ্যে আমার একমাত্র নসিহত: তোমরা আল্লাহর জন্য জোড়ায় জোড়ায় এবং (সাথী না জুটলে) এক এক জন করে খাড়া হয়ে যাও। অতঃপর ভেবে দেখো -কোনরূপ উম্মাদনা নাই তোমাদের সাথীর মাঝে। সে তো আসন্ন আযাব সম্পর্কে কঠিন শাস্তির সতর্ক কারী মাত্র।” –(সুরা সাবা, আয়াত ৪৬)। লক্ষ্যণীয় হলো, উপরুক্ত হুকুমটি যখন এসেছিল তখন নবীজী (সাঃ)’র হাতে বিশাল বাহিনী ছিল না, প্রস্তুতিও ছিল না। বিশাল দল ও প্রস্তুতি এ আয়াতে শর্তও করা হয়নি।

 

ইব্রাহীম (আঃ)’র সূন্নত

জালেম শাসকের সামনে নির্ভয়ে একাকী দাঁড়ানোর ইতিহাস গড়েছেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। সে অপরাধে তাঁকে নির্মম শাস্তি দেয়া হবে সেটি তাঁর অজানা ছিল না। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ পালন, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন ও পরকালের মুক্তিই তাঁর কাছে অধীক গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি কোন আমিরের অনুমতির অপেক্ষায় থাকেননি। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে আগুণে ফেলে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সেটিকে তিনি তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন। সত্যের পক্ষে নির্ভয়ে দাঁড়ানোর এটি এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। নমরুদের সামনে একাকী দাঁড়িয়ে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) সেদিন যা কিছু বলেছিলেন সেটির রেকর্ড অন্য কেউ নন, ধারন করেছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)’র সে সাহসী ঘোষণাটি ছিল এরূপ: “তোমাদের থেকে এবং  আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদেরকে পুঁজা করো তাদের থেকে ছিন্ন করছি সম্পর্ক; তোমাদেরকে আমরা মানিনা; এবং তোমাদের সাথে শুরু হলো আমাদের চিরকালের শত্রুতা ও বিদ্বেষ -যদি না তোমরা এক আল্লাহতে ঈমান না আনো..।” –(সুরা মুমতাহেনা, আয়াত ৪)। মহান আল্লাহতায়ালা চান, সমগ্র মানবজাতি হযরত ইব্রাহীম (আঃ)’র ন্যায় প্রজ্ঞাবান সাহসী ব্যক্তি থেকে শিক্ষা নিক। গড়ে উঠুক মিথ্যা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে খাড়া হওয়ার তথা জিহাদের সংস্কৃতি। সভ্যতর সভ্যতা গড়ে উঠে তো এমন জিহাদী সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করেই। মিথ্যা ও অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণে কখনোই কোন সভ্যতর সমাজ গড়ে উঠে না; বরং তাতে বাড়ে ইতর বর্বরতা। তাতে বিজয় আসে শয়তানের। শয়তানের সে আধিপত্যকে মেনে নেয়া কখনোই মহান আল্লাহতায়ালার খলিফার কাজ হতে পারে না। তাতে গাদ্দারী হয় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। খলিফার দায়িত্ব তো সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং মিথ্যা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। ইব্রাহীম (আ:)’র জীবন থেকে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাই পবিত্র কোর’আনে সর্বযুগের মু’মিনদের সামনে অনুকরণীয় মডেল রূপে খাড়া করা হয়েছে ইব্রাহীম (আ:)।

অথচ নমরুদ, ফিরাউনদের ন্যায় জালেমদের বিরুদ্ধে একাকী দাঁড়ানোটি কোন কালেই সুস্থ্য ব্যক্তির কর্ম রূপে গণ্য করা হয়নি। গণ্য হয়েছে উম্মাদনা রূপে। সেটি যেমন মহান নবীজী(সা:)’র যুগে দেখা গেছে, তেমনি দেখা যায় আধুনিক যুগেও। ইসলাম বিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আজও তাই বহু ইসলামী দলের নেতাকর্মী ও আলেম কান্ডজ্ঞানহীন উম্মাদনা মনে করে। অথচ যারা দাঁড়ায় তারাই যুগে যুগে ইতিহাস গড়ে। হযরত ইব্রাহীম (আ:) তাই একাকী ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন নমরুদের মনে। তিনি একা হলে কি হবে, পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁকে মিল্লাত রূপে চিত্রিত করেছেন। একই ভাবে ফিরাউনের মনে ক্ষমতা হারানোর ভয় ধরেছিল হযরত মূসা (আ:) ও তার ভাই হারুন (আ:)কে দেখে। মুষ্টিমেয় মু’মিনের জিহাদে শয়তানী শক্তির মনে সব সময়ই ত্রাস সৃষ্টি হবে –সেটিই নিয়ম। সে গুরুত্বপূর্ণ নসিহতটি ঈমানদারদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে পবিত্র কোর’আনের উপরুক্ত আয়াতে।

মু’মিনের জীবনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে হয় না, সেটি হয় মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে দাঁড়নোর মধ্য দিয়ে। পরকালে জান্নাত প্রাপ্তি নির্ভর করে এ পরীক্ষায় পাশের উপর। এবং সে পরীক্ষায় পাশ করে একমাত্র সাচ্চা ঈমানদারগণই। জায়নামাজে ঘুষখোর, সূদখোর, মদখোর, লম্পট এবং মুনাফিকগণও খাড়া হয়। কিন্তু জিহাদের ময়দানে দাঁড়ানোর কথা তারা মুখে আনতেও ভয় পায়। এবং জিহাদে যোগদানকে তারা উম্মাদনা বলে। বলে চরমপন্থা। ফলে তাদের রীতি হয়, স্বৈরাচারী, জাতীয়তাবাদী, রাজতন্ত্রী, সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে দাঁড়ানোর। তাদের কারণেই মুসলিম দেশগুলোকে দখলে রাখার কাজে ইসলামের শত্রুপক্ষের লোক বলের কমতি পড়েনা। অথচ প্রকৃত ঈমানদার জিহাদের ময়দানে হাজির হন এবং শহীদও হন। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় এভাবেই তারা কৃতকার্য হন। সমগ্র মানব ইতিহাসে সে পরীক্ষায় পাশের হারটি সর্বাধিক ছিল সাহাবায়ে কেরামের যুগে। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে দাঁড়ানোর দায়িত্ব পালনের কাজে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী শহীদ হয়ে গেছেন। যাদের জীবনে শহীদ হওয়ার নসীব হয়নি তাদের মাঝেও শাহাদতের তামান্না কি কম ছিল? তাছাড়া যেখানেই মু’মিনের জান ও মালের বিশাল বিনিয়োগ, সেখানেই ঘটে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বিশাল সাহায্যপ্রাপ্তি।  ফলে সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরামের যুগে সবচেয়ে বেশী বিজয় এসেছে। তাদের হাতে পতন ঘটেছে রোমান ও পারসিক সাম্রাজ্যের –যারা ছিল সে সময়ের দুটি বিশ্বশক্তি।

 

যুদ্ধ পরাধীনতা বৃদ্ধির!

কিন্তু আজকের মুসলিমগণ বিজয়ের পথে পা দেয়নি। তারা ইতিহাস গড়েছে অন্য ভাবে। যুদ্ধ তারাও করে। তারাও প্রাণ দেয়। শ্রম ও শক্তির বিশাল বিনিয়োগও করে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেটি স্বাধীনতা বাড়াতে নয়, বরং শত্রু শক্তির হাতে পরাধীনতা বাড়াতে। ব্রিটিশ কাফিরদের অস্ত্র নিয়ে সে পরাধীনতার জন্য ১৯১৭ সালে উসমানিয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল আরব মুসলিমগণ। তেমন এক পরাধীনতার জন্য ১৯৭১সালে লড়েছিল বাঙালী মুসলিমগণ। সেটি ভারতীয় কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে। অথচ তারাই ছিল দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক। কাফেরগণ যে কখনোই মুসলিমের স্বাধীনতা বাড়াতে অস্ত্র দেয় না -সে অতি সত্যটিও তারা বুঝতে পারিনি। এমন অজ্ঞতা নিয়ে কেউ কি ইসলাম ও মুসলিমের বিজয় ও কল্যাণ আনতে পারে?  সে অজ্ঞতায় যা আসে তা তো পরাজয় ও অপমান। এমন জাহেলগণ ভাষা, বর্ণ, গোত্র, দেশের নামে প্রাণ দিলেও, তারা ব্যর্থ হয় মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে দাঁড়াতে। তারা ভূলে যায়, মানব জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন যেমন মহান আল্লাহতায়ালার পথে শহীদ হওয়া, তেমনি সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো ইসলাম ভিন্ন অন্য পথে প্রাণদান। সেরূপ প্রাণদানের পথটি যে জাহান্নামের পথ -তা নিয়ে কি সন্দেহ করা চলে? অমুসলিম কাফের শক্তি তো মুসলিমদের দলে নেয়, অস্ত্র দেয় ও রক্ত ঝরায় পরকালের ব্যর্থতা বাড়াতে। বাংলার বুকে শত্রু শক্তির বিপুল বিনিয়োগ যেমন ১৯৭১’য়ে ছিল, তেমন বিনিয়োগ আজও। মুসলিম বিশ্বের নানা কোনে একই রূপ বিনিয়োগ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর নেতৃত্বাধীন জোট। শত্রুশক্তির এমন বিনিয়োগ যে পরাধীনতা আনে–ইতিহাসের গ্রন্থ তো সে কাহিনীতে ভরপুর।

পরীক্ষায় পাশের জন্য প্রস্তুতি চাই। সৈনিকগণ দেশের জন্য খাড়া হবে ও প্রাণ দিবে -সে সামর্থ্য বাড়াতে সেনানীবাসগুলোতে বছরের পর প্রশিক্ষণ হয়। এমন ট্রেনিং ও প্রশিক্ষণের সে বাধ্যবাধকতাটি ইসলামেও। মহান আল্লাহতায়ালা চান, ঈমানদারগণ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় কৃতকার্য হোক। এ পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার উপর নির্ভর করে মানব জীবনের প্রকৃত সফলতা। কৃতকার্য হওয়ার সে সামর্থ্য বাড়াতেই ইসলামে কোর’আনী জ্ঞানার্জনকে ফরজ করা হয়েছে, এবং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে নামাজ-রোযা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় প্রশিক্ষণ। স্কুল-কলেজের ক্লাসে অংশ না নিলে যেমন পরীক্ষায় পাশ জুটে না, তেমনি নামাজ-রোযা, হজ-যাকাতের ন্যায় প্রশিক্ষণে নিয়মিত অংশ না নিলে সফলতা জুটে না জীবনের চুড়ান্ত পরীক্ষায়। তবে স্কুল-কলেজে হাজিরা দিয়েও যেমন অনেকে পরীক্ষায় ফেল করে, তেমনি যারা সারাজীবন নামায-রোযা পালন করেও ঈমানের মূল পরীক্ষায় অনেকেই ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশের মত অধীকাংশ দেশে ব্যর্থতার সে হারটি বিশাল। সে বিশাল ব্যর্থতাটি ধরা পড়ে মহান রাব্বুল আ’লামীনের পক্ষে খাড়া না হওয়ার মধ্য দিয়ে। এরূপ ব্যর্থতা নিয়ে কেউ কি আখেরাতে সফলতা পেতে পারে? কোটি কোটি মুসলিম নামায-রোযা পালন করলেও ক’জনের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে দাঁড়ানোর সামর্থ্য? বরং বিপুল সংখ্যায় জমা হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের শিবিরে। ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলিত পরাজিত হয়েছে মহান আল্লাহর শরয়তি বিধান। সাম্প্রতিক কালে বিশ্বে শরিয়তের বিধান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ৫৭টি মসুলিম দেশের মাঝে একমাত্র আফগানিস্তানে। সেটিই দেশটির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামের শত্রুশক্তির ৪০টির বেশী দেশের সম্মিলিত বাহিনী দেশটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন কাফের বাহিনী যখন দেশটিতে মুসলিম নিধনে লিপ্ত সে বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল হাজার হাজার তুর্কী সৈনিক। এক বছর যাবত সে কোয়ালিশন বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল একজন তুর্কী জেনারেল। মার্কিন বাহিনীর জন্য হামালার পথ করে দেয় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মোশাররাফ। ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে এ কোয়ালিশনের যুদ্ধ এখন বিশ্বজুড়ে। 

 

শত্রুর সন্ত্রাস ও ঈমানদারের জিহাদ

লড়াইয়ের ময়দানে যেমন আগ্রাসী সন্ত্রাসী থাকে, তেমনি সে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জিহাদও থাকে। যারা সন্ত্রাসী তাদের চেষ্টা-প্রচেষ্টার নিয়েতটাই ভিন্ন। মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা তাদের লক্ষ্য নয়। তাদের লক্ষ্য, নিজেদের বিজয় ও আধিপত্যের বিস্তার। আভিধানিক অর্থে ত্রাস সৃষ্টির প্রতি প্রচেষ্টাই হলো সন্ত্রাস। তাই সন্ত্রাস হলো প্রতিটি অনায্য যুদ্ধ। রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের তূলনায় সন্ত্রাসের সে সামর্থ্য তো তাদেরই বেশী যাদের হাতে রয়েছে মারণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী জাহাজ, ড্রোন, পারমানবিক বোমা ও সাবমেরিনের বিশাল ভান্ডার। এসব মারাত্মক অস্ত্রধারীরা সন্ত্রাসকে ভয়ংকর আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছে। পৃথিবী জুড়ে সন্ত্রাসের মনোপলি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভারত, ফ্রান্স, ইসরাইলের ন্যায় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর হাতে। মহল্লার বা রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসীগণ সন্ত্রাসে চাকু, পিস্তল, হাতবোমা বা বন্দুক ব্যবহার করে; ব্যরেল বোমা, ক্লাস্টার বোমা বা ড্রোন হামলার সামর্থ তাদের থাকে না। ফলে তাদের সন্ত্রাসে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয় না; দেশত্যাগেও বাধ্য হয় না। প্রকৃত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ হলো নিরস্ত্র জনগণের উপর যারা সামরিক আগ্রাসন চালানোর নীতি। ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও কাশ্মীরের জনগণ হলো সে সন্ত্রাসের শিকার। সে সন্ত্রাসে একমাত্র আফগানিস্তান ও ইরাকে বিশ লাখের বেশী নরনারী ও শিশুর প্রাণনাশ হয়েছে। 

ইতিহাসের আরেক সত্য বিষয় হলো, সমাজের জঘন্য অপরাধীগণ শুধু অপরাধীই নয়, অতিশয় মিথ্যাবাদীও। তাই অতি নৃশংস গণহত্যার নায়ক হয়েও ফিরাউন বা হিটলারের ন্যায় বর্বরগণ নিজেদেরকে  নিরপরাধ মনে করতো। ফিরাউন তো সমাজে অশান্তির কারণ রূপে চিত্রিত করতো মহান নবী হযরত মুসা (আ:)কে। একই কারণে সেসব অপরাধীগণও নিজেদের নিরপরাধ মনে করে যারা অতীতে দুইবার পারমানবিক বোমা নিক্ষেপের ন্যায় অপরাধ কর্ম করেছে, দুই-দুইটি বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে এবং জন্ম দিয়েছে উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ, ফ্যাসীবাদ এবং এথনিক ক্লিন্জিংয়ের ন্যায় নানারূপ বর্বরতার। এবং এরাই আজ দেশে দেশে নিরস্ত্র মানুষের উপর ব্যারেল বোমা, ক্লাস্টার বোমা ও ড্রোন হামলা করছে। অথচ এ পেশাদার অপরাধীগণই সন্ত্রাসী বলছে তাদের যারা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠা চায়। এবং চায় মুসলিমদের নবীজী (সাঃ)’র যুগের ইসলামের দিকে ফিরিয়ে নিতে।  জিহাদ চিত্রিত হচ্ছে সন্ত্রাস রূপে। ইসলামের শত্রুপক্ষ মুসলিমদের নামায-রোযা, হজ-যাকাত থেকে দূরে সরানো নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা জানে তাদের সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য কখনোই নামাযী, রোযাদার বা হাজীদের সংখ্যাবৃদ্ধিতে বিপদে পড়বে না। তারা বিপদ দেখে জিহাদের ময়দানে মুজাহিদদের দেখে।

অথচ প্রকৃত মু’মিনের জীবনে শুধু নামাজ-রোযা ও হজ-যাকাতাই থাকে না, জিহাদও থাকে। সে প্রমাণ মেলে সাহাবায়ে কেরামদের জীবন থেকে। ঈমানের দাবীতে কে কতটা সাচ্চা -সেটি কখনোই নামাজ-রোযা ও হজ-যাকাত দিয়ে যাচাই হয় না। ঘুষখোর, সূদখোর, মিথ্যাবাদী, চোর-ডাকাত ও মুনাফিকও নামায-রোযা পড়তে পারে। তারা বার বার হজও করতে পারে। খোদ নবীজী (সা:)’র পিছনে নামায পড়েও বহু মানুষ মুনাফেকী করেছে। ব্যক্তির সাচ্চা ঈমানদারী ধরা পড়ে জিহাদের ময়দানে জানমালের কোরবানীতে; সে সামর্থ্য কখনোই মুনাফিকদের থাকে না। জিহাদ তাই প্রকৃত ঈমানদারদের বাছাইয়ে ফিল্টারের কাজ করে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রকৃত মুসলিম রূপে গৃহীত হওয়ার জন্য জিহাদে অংশ নেয়াটি এজন্যই এতো অপরিহার্য।

মানব জাতির বিভাজনটি নানা ভাষা, নানা বর্ণ, নানা গোত্রের হলেও মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সে বিভাজনটি মাত্র দুটি পক্ষে। একটি  মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ এবং অপরটি শয়তানের পক্ষ। তেমনি দুটি পক্ষ থাকে রণাঙ্গনেও। আল্লাহতায়ালার পক্ষের যুদ্ধের লক্ষ্য,  তাদের প্রভূর ইচ্ছাপূরণ ও তাঁর নির্দেশিত বিধি-বিধান ও স্বার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা। তাদের লক্ষ্য, ইসলামের বিজয় ও মুসলিমের শক্তি ও গৌরব বৃদ্ধি। ইসলামেই এটিই জিহাদ। অপর দিকে শয়তানের পক্ষটি খাড়া হয় এর প্রতিপক্ষ রূপে। তাদের লক্ষ্য, ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিরোধ করা। ইসলামের বিরুদ্ধে ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও জাতীয়তার নামে তারা জনগণকে  রণাঙ্গণে নামায়। এমন যুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাপূরণ গুরুত্ব না পাওয়ায় সে যুদ্ধে কোন পবিত্রতা ও মানবিকতা থাকে না। এরা তখন যুদ্ধে ব্যারেল বোমা, ক্লাস্টার বোমা, কেমিক্যাল বোমা এমনকি পারমানবিক বোমাও নিক্ষেপ করে। লক্ষ্য, শক্তির প্রদর্শনী ও ত্রাস সৃষ্টি। মূল লক্ষ্যটি এখানে ত্রাস সৃষ্টি। এরাই মানব জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস সন্ত্রাসী। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব এরূপ দেশী ও বিদেশী সন্ত্রাসীদের হাতে অধিকৃত। কোন কোন অধিকৃত দেশে সংঘাত শুরু হয় জিহাদী মুসলিমদের সাথে সন্ত্রাসীদের।

 

পরাধীনতা নির্মূলের জিহাদ

জিহাদ না থাকলে মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামের বিজয় ও প্রতিষ্ঠা থাকে না। তাতে মুসলিমদের স্বাধীনতা ও গৌরবও বাঁচেনা। খোদ মুসলিম দেশগুলিতে ইসলাম যেরূপ পরাজিত এবং মুসলিমগণ যেরূপ ইজ্জতহীন -সেটি নামাজী ও রোজাদারদের কমতির কারণে নয়। বরং নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে যত নামাজী ও রোযাদার ছিল বর্তমান বিশ্বে সে সংখ্যা হাজারগুণ অধীক। কিন্তু সে বিপুল সংখ্যার কারণে পৃথিবীর কোথাও ইসলামের প্রতিষ্ঠা যেমন বাড়েনি, তেমনি মুসলিমদের বিজয় ও স্বাধীনতাও বাড়েনি। কোন দেশে সৈন্য সংখ্যা লাখ লাখ হলেও তাতে বিজয়  আসে না, বিজয়ে  আনতে হলে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হয়। জান ও মালের কোরবানীও পেশ করতে হয়। নইলে শত্রু শক্তির অধিকৃতি বাড়ে; তখন আদর্শ, ন্যায়নীতি ও শরিয়তি বিধান অপসারিত হয় রাষ্ট্র থেকে। ১৭৫৭ সালে হানাদার ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌলার সৈন্য সংখ্যা প্রায় দশগুণ ছিল। কিন্তু তারা যুদ্ধে নামেনি। ফলে যুদ্ধ ছাড়াই ইংরেজগণ বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার বিশাল ভূ-খন্ডের উপর নিজেদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সফল হয়। ধীরে ধীরে মুষ্টিমেয় ইংরেজগণ সমগ্র ভারত জুড়ে তাদের শাসন বিস্তৃত করতে সফল হয়। অথচ শত্রুর হামলার মুখে মুসলিম জনগণের এরূপ আচরণ  ছিল অভাবনীয়। সকল ইসলামবিরোধী শক্তির সমগ্র বিশ্বজুড়ে এখন প্রচন্ড প্রচারণা জিহাদের বিরুদ্ধে।

জিহাদ সন্ত্রাস নয়, জিহাদ হলো মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে পবিত্র লড়াই। জিহাদ হলো, মুসলিম ভূমিকে শত্রুশক্তির আগ্রাসন থেকে মহান আল্লাহতায়ালার স্বার্বভৌমত্ব বাঁচানোর যুদ্ধ। মহান আল্লাহতায়ালার স্বার্বভৌমত্বের অর্থ, দেশে শরিয়ত, খেলাফত, হুদুদ, জিহাদের প্রতিষ্ঠা। শরিয়ত হলো মহান আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত কোর’আনী আইন। খেলাফত হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় নবীজী (সাঃ)র প্রতিনিধিত্ব -তথা তাঁর অনুসৃত নীতিমালার প্রতিষ্ঠা। দুনিয়ার বুকে  মুসলিম রূপে বাঁচার এ হলো এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা। যে দেশে মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত কোর’আনী আইনের প্রতিষ্ঠা নাই এবং নাই খেলাফত তথা নবীজী (সাঃ)’র প্রতিনিধিত্ব -তাকে কি মুসলিম দেশ বলা যায়? সে ইসলামশূণ্যতার মাঝে যা প্রতিষ্ঠা পায় তা হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামরিক আগ্রাসন। তখন কাফের দেশ থেকে কি সে দেশের কোন পার্থক্য থাকে?

নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত যেমন মুসলিমকে কাফেরদের থেকে তাকে পৃথক করে, তেমনি তাকে ভিন্নতর পরিচয় দেয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার  দায়বদ্ধতার কারণে। সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এমন একটি দিনও কি গেছে যখন শরিয়তের পালন হয়নি? তাদের আমলে কোন মুসলিম মুসলিম ভূমি কি কোন অমুসলিম শক্তির হাতে অধিকৃত হয়েছে? হয়নি। কিন্তু তবুও তাদের জীবনে লাগাতর জিহাদ ছিল। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন। সে জিহাদ এসেছিল কাফের শক্তির অধিকৃতি থেকে মহান আল্লাহতায়ালার বিশাল বিশাল ভূমিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে। যাদের জীবনে সেদিন জিহাদ ছিল না, তারা চিত্রিত হয়েছে মুনাফিক রূপে। অথচ ইসলামের শত্রুপক্ষের কথা, ইসলামে কোন যুদ্ধ নাই। তারা বলে, ধর্মকর্মের অর্থ শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল। যেন ইরান, সিরিয়া, মিশর, আফ্রিকার বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে ইসলামের বিজয় এবং বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উদয় তা সম্ভব হয়েছে স্রেফ দোয়া দরুদের বরকতে। ইসলামের এরূপ একটি পরিচয় তুলে ধরার লক্ষ্য মুসলিমদের নবীজী (সা:)’র ইসলাম থেকে দূরে সরানো। সে সাথে তাদেরকে প্রতিরক্ষাহীন করা। কারণ, রণাঙ্গণ ছেড়ে মসজিদে আশ্রয় নিলে তো প্রতিরক্ষা থাকে না।

নবীজী (সা:)’র ইসলামে নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল যেমন ছিল, তেমনি ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, হুদুদ, শরিয়ত ও জিহাদ। কিন্তু মুসলিমগণ আজ নবীজী (সা:)’র ইসলাম থেকে এতটাই দূরে সরেছে যে, ইসলামী রাষ্ট্র, হুদুদ ও শরিয়তী আইন এবং জিহাদ –এর কোনটাই মুসলিম দেশগুলোতে বেঁচে নাই। মুসলিমগণ বাঁচছে নবীজী (সা:)’র ইসলাম ছাড়াই। নবীজী (সা:)’র যুগে কি কখনো ভাবা যেত, মুসলিম ভূমি অধিকৃত হবে, শরিয়তী আইন আবর্জনার স্তুপে যাবে, কাফেরদের প্রণীত আইন প্রতিষ্ঠা পাবে এবং শত্রুর বিমান হামলা, ট্যাংক হামলা, ড্রোন হামলা হবে এবং মুসলিমগণ তখনও নীরব ও নিষ্ক্রীয় থাকবে? এমন নিষ্ক্রীয়তায় যা প্রতিষ্ঠা পায় তা হলো, মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও আগ্রাসন। এ নিষ্ক্রীয়তায় যা প্রকাশ পায় তা হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে গাদ্দারী। তাতে প্রবলতর হয় পরাধীনতা। মুসলিম উম্মাহ তো আজ তারই শিকার। বেশী বেশী মসজিদ গড়ে বা নামায-রোযা বাড়িয়ে কি এ পরাধীনতা থেকে বাঁচা যাবে? এ লক্ষ্যে জিহাদই হলো মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত একমাত্র পথ। ১২/০২/২০২১।

 

 




ঈমানদারের পরাধীনতা ও বেঈমানের স্বাধীনতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

স্বাধীনতা যখন নাশকতার হাতিয়ার

স্বাধীনতার রূপটি জনে জনে ভিন্নতর। বেঈমানের সে স্বাধীনতাটি আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে নাশকতার হাতিয়ার। বেঈমানের স্বাধীনতার অর্থ মিথ্যাচার, স্বৈরাচার, সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকতি ও গণহত্যাসহ নানাবিধ দুর্বৃত্তি নিয়ে বাঁচার স্বাধীনতা। সেটি নিরস্ত্র মানুষের উপর পারমানবিক বোমা, রাসায়নিক বোমা, ব‌্যারেল বোমা, ক্লাস্টার বোমা, ড্রোন হামলা ও বিমান হামলার অবাধ স্বাধীনতা। সেটি দুর্বল দেশগুলিতে যুদ্ধ ও অধিকৃতির স্বাধীনতা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ দেশে দেশে সে স্বাধীনতার প্রয়োগ করে চলছে বহুকাল যাবত।  বেঈমানের স্বাধীনতার মূল চরিত্রটি হলো তারা ঈমানদারদের স্বাধীনতা দিতে রাজী নয়।  জালেমদের হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ার বিপদটি তাই ভয়াবহ। সমগ্র দেশ তখন দুঃসহ জেলখানায় পরিণত হয়। তখন নৃশংস পরাধীনতা জেঁকে বসে অধিকৃত দেশের জনগণের উপর। জালেমের স্বাধীনতা এভাবেই দুর্বলের জন্য ভয়াবহ পরাধীনতার কারণ হয়। ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতের উপর সেরূপ স্বাধীনতার একচ্ছত্র মালিক ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশগণ। ব্রিটিশ ডাকাতগণ তখন শাসকে পরিণত হয়েছে; এবং ভারতীয়গণ পরিণত হয়েছে নিছক গোলামে। ব্রিটিশদের লুন্ঠনের সে অবাধ স্বাধীনতায় তখন দেশে ছিয়াত্তরের মনন্তর এসেছে; যাতে মৃত্যু হয় বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নাগরিকের।

অধিকাংশ মুসলিম দেশ থেকে ঔপনিবেশিক শাসন শেষ হয়েছে; কিন্তু স্বাধীনতা মেলেনি জনগণের। বরং আরোপিত হয়েছে নতুন পরাধীনতা। স্বাধীনতা নতুন ভাবে লুণ্ঠিত হয়েছে ঔপনিবেশিক শত্রুদের আশ্রয়ে, প্রশ্রয়ে ও পরিচর্যায় বেড়ে উঠা স্বৈরাচারী রাজা-বাদশাহ, সামরিক শাসক ও ফ্যাসিবাদি দুর্বৃত্তদের হাতে। সাম্রাজ্যবাদী বিদেশীদের ন্যায় এসব দেশী শাসকদের মনযোগটিও ছিল মূলত লুন্ঠনে। ঔপনিবেশিক কাফেরদের ন্যায় তাদের বেঈমানীটাও খেলাফত, শরিয়ত, হুদুদ, জিহাদের ন্যায় ইসলামের অতি মৌলিক বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাতের ন্যায় আরব দেশগুলীতে সে স্বাধীনতার একচ্ছত্র মালিক হলো রাজা-বাদশাহগণ। মিশরে সে স্বাধীনতা কুক্ষিগত হয়েছে সামরিক বাহিনীর জেনারেলদের হাতে। এবং সিরিয়া ও বাংলাদেশের ন্যায় দেশগুলিতে স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায় তা হলো স্রেফ স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্টদের স্বাধীনতা। সে স্বাধীনতার অঙ্গণে জনগণের কোন স্থান নাই। ঔপনিবেশিক লুটেরাদের তূলনায় জেঁকে বসা এ দেশী স্বৈরাচারীদের নাশকতাও কি কম নৃশংস? সে লাগামহীন স্বাধীনতা নিয়েই সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ প্রায় তিন লক্ষ সিরিয়াবাসীকে হত্যা করেছে ও ধ্বংস করেছে হাজার হাজার ঘরবাড়ী। তিরিশ লাখের বেশী নরনারী ও শিশুকে বাধ্য করেছে নিজ ঘর-বাড়ী ছেড়ে বিদেশে পাড়ী দিতে।

১৯৭১’য়ে স্বাধীনতার নাম ভাঙ্গিয়ে বাংলাদেশেও একই রূপ নিজ স্বেচ্ছাচার প্রতিষ্ঠার প্রচন্ড স্বাধীনতা পেয়েছিলেন শেখ মুজিব ও তার দলের লোকজন। লাগামহীন সে স্বাধীনতা নিয়ে শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার। বিরোধীদের ও বিহারীদের হাজার হাজার ঘর-বাড়ী ও ব্যবসা-বানিজ্যের উপর দখলে নিয়েছে তার দলের লোকজন। নিজের গদী বাঁচনোর স্বার্থে শেখ মুজিব তিরিশ হাজারেরও বেশী বিরোধী দলীয় রাজনৈতীক নেতা-কর্মীকে বিনাবিচারে হত্যা করেছিলেন; এবং নিষিদ্ধ করেছিলেন ইসলামী চেতনাধারীদের সংগঠিত হওয়াকে। মুজিবের পতন ঘটেছে, কিন্তু তার স্বৈরাচার বিলুপ্ত হয়নি। ইসলামপন্থি নেতাকর্মীদের খুন, গুম ও নির্মূলে একই রূপ লাগামহীন স্বাধীনতা প্রয়োগ করে চলেছেন শেখ হাসিনা । তার নৃশংস নাশকতা শুধু ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে সীমিত থাকেনি, বরং সমগ্র দেশ পরিণত হয়েছে শাপলা চত্ত্বরে।

ইসলামের শত্রুপক্ষ কখনোই ঈমানদারদের পূর্ণ ইসলাম পালন ও প্রকৃত মুসলিম বেড়ে উঠার স্বাধীনতা দিতে রাজী নয়। তারা রাজী নয়, কোন মুসলিম রাষ্ট্রকে দূর্নীতিমূক্ত ইসলামের পূণ্যভূমি রূপে গড়ে উঠতে দিতে। সে অধীকার যেমন শেখ মুজিব দেয়নি, দিচ্ছে না শেখ হাসিনাও। জালেমদের হাতে শাসনভার গেলে মু’মিনদের জন্য জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচা যে কতটা অসম্ভব হয় তার উদাহরণ হলো আজকের বাংলাদেশ। তখন তাদের ঘাড়ে চাপানো হয় নিরেট ও নির্মম পরাধীনতা। স্বৈরাচারী দুর্বৃত্তগণ সব সময়ই ইসলামের রাজনৈতিক শক্তিতে ভয় পায়, ফলে ইসলামের বিরুদ্ধ তারা অতিশয় নৃশংস ও নির্দয় হয়। নিরস্ত্র হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে তাই তারা আগুণে ফেলেছিল। হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছিল হযরত মহম্মদ (সাঃ)র বিরুদ্ধে। তাদের সে সংস্কৃতি আজও বেঁচে আছে আধুনিক স্বৈরাচারীদের মাঝে। নানারূপ মিথ্যাচারের সাথে তাদের আরেক মিথ্যাচার হলো, নিজেদের জুলুমবাজীর লাগামহীন স্বাধীনতাকে তারা জনগণের স্বাধীনতা বলে প্রচার করে। এবং জনগণকে বাধ্য করে বছরের বিশেষ মাসে ও বিশেষ দিনে সে স্বাধীনতার উদযাপনে রাস্তায় নামতে। সেসব উৎসবে নিজেদের নিরেট স্বৈরাচারকে তারা দেশবাসীর স্বাধীনতা রূপে প্রচার করে। বাংলাদেশে সেটি যেমন মুজিব করেছিল, এখন সেটিই করছে হাসিনা।

স্বাধীনতার অর্থ বিয়েশাদী, পরিবার পালন, মৎস্যপালন, পশুপালন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ ও দালান-কোঠা গড়ার স্বাধীনতা নয়। এরূপ স্বাধীনতা কাফের শাসিত দেশেও থাকে। সত্যিকার স্বাধীনতার ক্ষেত্রটি অতি বিশাল। মহান আল্লাহতায়ালার এটি এক বিশাল নেয়ামত। এটি যেমন ধর্মপালন, ধর্মপ্রচার, কোর’আন শিক্ষা ও শরিয়ত পালনের স্বাধীনতা, তেমনি সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো ও আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে মুজাহিদ রূপে বেড়ে উঠার স্বাধীনতা। ঈমানদার ব্যক্তি তো এভাবেই অর্জন করে মহান আল্লাহতায়ালার মাগফেরাত লাভের সামর্থ্য; এবং  পায় জান্নাতের যোগ্য রূপে বেড়ে উঠার স্বাধীনতা। সে স্বাধীনতা নিয়েই ঈমানদার ব্যক্তিগণ রাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গণে ঈমানী দায়িত্বপালন করে এবং প্রয়োজনে জান ও মালের কোরবানী পেশ করে। এমন স্বাধীন ভূমিতে তখন ঘরে ঘরে বেড়ে উঠে আত্মত্যাগী মুজাহিদ –যেমনটি হয়েছিল সাহাবায়ে কেরামদের সময়। মানুষ তখন পার্থিব স্বার্থপরতা ছেড়ে জান্নাতমুখি হয়। গড়ে উঠে জনসেবা, ত্যাগ ও জিহাদের সংস্কৃতি। তখন শিশুরাও বুঝে, আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয়ে শ্রমদান, অর্থদান ও প্রাণ দান তথা শহীদ হওয়াই এ জীবনে সফলতা তথা জান্নাতের পথ।

জিহাদের পথেই আসে মহান আল্লাহতায়ার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত গায়েবী মদদ; তখন বিজয় আসে শক্তিধর কাফের শক্তির বিরুদ্ধেও। সেরূপ গায়েবী মদদ, বিজয় ও পরকালে সফল হওয়ার লক্ষ্যে মু’মিনের প্রতিটি যুদ্ধ ও প্রতিটিকে লড়াইকে তাই শতভাগ বিশুদ্ধ জিহাদে পরিণত করতে হয়। তখন ১৭ জন সৈনিকের পক্ষেও বিশাল দেশজয় সম্ভব হয় –যেমনটি হয়েছিল ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গবিজয়ের ক্ষেত্রে। ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার এমন স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়াটি ইসলামে গুরুতর অপরাধ। একাজ কাফের, মুনাফিক ও জালেমদের। তাদের হাতে অধীনতায় সে স্বাধীনতা ঈমানদারদের জুটে না। ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রয়োগটি ইসলামের পক্ষে হলো সে স্বাধীনতা তখন হত্যাযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হয়। ফিরাউনের দরবারে যে যাদুকরগণ হযরত মূসা (আঃ)’র সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে ঈমান এনেছিলেন, তাদেরকে তাই নির্মম ভাবে করা হত্যা করা হয়েছিল। ফিরাউন তাদেরকে প্রতিযোগিতায় নামালেও ঈমান আনার স্বাধীনতা দেয়নি। ইসলাম গ্রহণ করায়  একই ভাবে হত্যা করা হয়েছিল হযরত সুমাইয়া (রাঃ)ও তাঁর স্বামী হযরত ইয়াসির (রাঃ)কে। একই রীতি আধুনিক কাফেরদেরও। তাদের কাছে দন্ডনীয় অপরাধ রূপে গণ্য হয় ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলে মুসলিম যুবকের জিহাদ ও তাঁর জান-মালের কোরবানী। ঘরে জিহাদ বিষয়ক বই রাখাও হাসিনা সরকারের কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এবং নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামদের প্রতিষ্ঠিত খেলাফত, শরিয়ত ও হুদুদের ধারণা নিয়ে রাষ্ট্র গড়লে মার্কিনী জোটের পক্ষ থেকে বোমা বর্ষণ শুরু হয়।

 

পরাধীনতার নাশকতা

বেঈমানদের হাতে পরাধীনতার সবচেয়ে বড় বিপদটি হলো, তখন অসম্ভব হয় সিরাতুল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের পথে চলা। এমন অধিকৃত দেশে সাহিত্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয় জনগণকে জাহান্নামের উপযোগী করে গড়ে তোলা। সে লক্ষ্য-সাধনে তারা জনগণকে বিদ্রোহী করে আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও  তার শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে। এবং দূরে হটায় জিহাদের পথ থেকে। তাদের কাছে স্বাধীনতার অর্থ স্রেফ জাহান্নামে চলার স্বাধীনতা। অথচ মানব জীবনে অতি কল্যাণকর স্বাধীনতাটি হলো ইসলাম পালন ও জান্নাতের পথে চলার স্বাধীনতা। একমাত্র তখনই জুটে জাহান্নামের পথ থেকে বাঁচার স্বাধীনতা। মানব জীবনে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কি হতে পারে? এরূপ স্বাধীনতার উপরই নির্ভর করে অনন্ত অসীম আখেরাতের সফলতা। এরূপ স্বাধীনতা ছাড়া কি কারো পক্ষে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে পরাধীনতার নাশকতাটি ভয়াবহ; পার্থিব জীবনের দুঃসহ যাতনার সাথে তখন ভয়ানক বিপদে পড়ে অনন্ত অসীম কালের পরকালীন সফলতা তথা সুখশান্তি। সে অধিকৃত ভূমিতে ইসলামের শত্রুপক্ষের রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির মূল এজেন্ডা হয়, জনগণকে পথভ্রষ্ট করা ও জাহান্নামের পথে চলতে বাধ্য করা। শয়তানী শক্তির অধিকৃত সে ভূমিতে দেহব্যবসায়ী, মদ-ব্যবসায়ী, জোয়ারী, নর্তকী ও সূদী ব্যাংকের মালিকদের নিজ নিজ ব্যবসার চালানোর আজাদী দিলেও আজাদী মেলে না ইসলাম নিয়ে বাঁচা ও ইসলামের শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠার। ফিরাউন, নমরুদ, মুজিব-হাসিনার ন্যায় ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলদারীর এটিই হলো মূল নাশকতা।

ইসলামের শত্রুশক্তির মূল এজেন্ডাটি হলো, আল্লাহর স্মরণ ও জীবনের মূল মিশন ভূলিয়ে দেয়া। অথচ আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হওয়ার বিপদটি ভয়াবহ। এর অর্থ, নিজের ঘাড়ে শয়তানকে চাপিয় নেয়া। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “যারাই দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয় তাদের উপর আমি নিযুক্ত করি শয়তান। অতঃপর সে হয় তার সহচর। এসব শয়তানেরা সৎপথ থেকে চলা থেকে তাদেরকে বিরত রাখে। অথচ সে (বিভ্রান্ত) মানুষগুলি মনে করে তারা হিদায়েতপ্রাপ্ত।” –(সুরা যুখরুফ, আয়াত ৩৬-৩৭)। শয়তানী শক্তির অধিকৃত ভূমিতে শয়তানের এজেন্টগণ তখন সমাজ-সংসারের প্রতি মোড়ে খাড়া হয় জনগণকে জান্নাতের পথ থেকে হটিয়ে জাহান্নামের পথে টানতে। কেউবা সেটি করে সেক্যুলার রাজনীতিকের বেশে; কেউবা পথভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবী বা ভন্ড আলেমের বেশে। কেউবা করে নর্তকী, গায়ক-গায়িকা, মিডিয়াকর্মী, নাট্যকর্মী, এনজিও কর্মী বা দেহব্যবসায়ীর বেশে। দেশে দেশে ইসলামের শত্রুশক্তির পক্ষ থেকে পরিচালিত সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং’য়ের এটিই হলো মূল কৌশল। লক্ষ্য, জনগণকে আল্লাহর দ্বীনের শত্রুতে পরিণত করা। কোটি কোটি মানুষ তখন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে, খেলার মাঠে, সিনেমা হলে, টিভির সামনে, নাটক পাড়ায় ও গান-বাজনার আসরে লক্ষ লক্ষ ঘন্টা কাটিয়ে দেয় এক মুহুর্তের জন্য দয়াময় মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ না করেই। বিস্মরণের সে বিশাল সময় জুড়ে তাদের ঘাড়ে আসীন থাকে প্রতিশ্রুত শয়তান। শয়তানের আজ্ঞাবহ দাস রূপে এভাবেই শুরু হয় ইসলাম ও জীবনের মূল মিশন থেকে দ্রুত দূরে সরার পর্ব। রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণকে তারা চিত্রিত করে পশ্চাৎপদতা ও সাম্প্রদায়িকতারূপে।

শয়তানী প্রকল্পের অংশ রূপেই বাংলাদেশের ন্যায় শতকরা ৯১% ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশে একজন মুসলিম ছাত্র বা ছাত্রীকে তার শিক্ষা জীবনের ১৫ বা ১৬টি বছরে বহু বইয়ের বহু হাজার পৃষ্ঠা পড়ানো হলেও পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের অর্থ  বুঝার সামর্থ্য সৃষ্টি করা হয় না। অথচ সে সামর্থ্য সৃষ্টিই প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ তথা বাধ্যতামূলক। কোর’আনের জ্ঞানে অজ্ঞ থাকাটি কবিরা গুনাহ। অন্য গুনাহগুলো জন্ম নেয় এই কবিরা গুনাহ থেকে। তাই নামায-রোযা ফরজ করার বহু বছর আগে মহান আল্লাহতায়ালা তাই জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছিলেন। কোর’আনী জ্ঞানে এমন অজ্ঞতা নিয়ে কি মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা সম্ভব? মুসলিম শিশু তার ঈমানের পুষ্টি ভাত-মাছ-গোশতো থেকে পায় না; সেটি পায় কোর’আনী জ্ঞান থেকেই। সে কোরআনী জ্ঞানের সে পুষ্টি না পেলে ঈমান মারা পড়তে বাধ্য। ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধীনতার বিপদ তাই ভয়াবহ। তাদের অপরাধটি শুধু চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস ও মানব-হত্যা নয়, কোটি কোটি মানুষের ঈমান হত্যারও। মানব হত্যার চেয়ে এটি কি কম গুরুতর? ঈমান হত্যার সে কাজটি করা হয় সিলেবাস থেকে কোর’আন শিক্ষা তথা ঈমানের পুষ্টিকে বিলুপ্ত করে। ফলে বিপদ এখানে কাফের, ফাসেক ও মুনাফিক রূপে বেড়ে উঠার। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ হয় এবং ধর্ষণে সেঞ্চুরীর উৎসবও হয়। যেমনটি শেখ হাসিনার প্রথম বার প্রধানমন্ত্রী হওয়াতে এক ছাত্রলীগের এক কর্মীর দ্বারা ধর্ষণে সেঞ্চুরীর উৎসব জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়েছিল। দুর্বৃত্তদের লক্ষ্য কখনোই দুর্বৃত্তদের নির্মূল নয়। ফলে ধর্ষণে সেঞ্চুরী্ করার অপরাধীকে সেদিন শাস্তি দেয়া হয়নি। দুর্বৃত্ত শক্তির হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ায় ভয়াবহ বিপদ তো এখানেই। তখন জোয়ার আসে দুর্বৃত্তির; নামিয়ে আনে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত আযাব  –যেমন ইহকালে, তেমনি পরকালে।

শয়তানী শক্তির অধিকৃতি থেকে মুক্তির লড়াই হলো প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ। এমন প্রতিটি যুদ্ধই হলো শতভাগ বিশুদ্ধ  জিহাদ। প্রকৃত মু’মিনের জীবনে সর্বক্ষণের প্রস্তুতি তো তেমন একটি জিহাদের। জিহাদের সে সার্বক্ষণিক প্রস্তুতির কথাটি পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে এভাবে, “তাদের (ইসলামের শত্রুশক্তির) মোকাবেলায় প্রস্তুত রাখো তোমাদের যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ব-বাহিনী; এভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুদের; এবং (সন্ত্রস্ত রাখো) অন্যদেরও যাদেরকে তোমরা জান না, অথচ আল্লাহ তাদেরকে জানেন।” –(সুরা আনফাল, আয়াত ৬০)। জিহাদের এরূপ সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি নিয়ে বাঁচাই মু’মিনের বাঁচা। যাদের জীবনে রয়েছে জিহাদের এমন সদা প্রস্তুতি, তাদের সাহায্যে সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকেন মহান আল্লাহতায়ালার বিশাল ফেরশতা বাহিনীও। তাদের সাহায্যে ক্ষুদ্র পাথর টুকরোও মিজাইলে পরিণত হয় –যা বিশাল হাতিকেও গুড়িয়ে দেয়। সাগরও পথ করে দেয়। তখন পুরস্কার রূপে আসে প্রতিশ্রুত বিজয়। অপরদিকে এরূপ প্রস্তুতি না থাকার বিপদটি ভয়াবহ। তাতে ধরা পড়ে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তথা কুফরি। এমন বিদ্রোহ তখন অনিবার্য করে প্রতিশ্রুত আযাব। সে আযাবের আলামত হলো শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃতি, নির্যাতন ও সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে পথভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতা পৌঁছিয়ে দেয় জাহান্নামের আগুনে। বাংলাদেশের মুসলিমদের ব্যর্থতাটি এক্ষেত্রে বিশাল। মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় নিয়ে তাদের ভাবনা নাই, প্রস্তুতিও নেই। তাদের প্রস্তুতি ও কোরবানী তো ইসলামের শত্রুদের বিজয়ে। এরাই ১৯৭১’য়ে অস্ত্র ধরেছিল ভারতীয় কাফেরদের বিজয়ী করতে। তারা ভোট দেয়, অর্থ দেয় ও শ্রম দেয় সেক্যুলারিস্ট, সোসালিস্ট ও ন্যাশনালিস্টদের ন্যায় ইসলামের শত্রুদের বিজয়ী করতে।  

 

যে বিপদ  ইসলামী রাষ্ট্র না গড়ার

ইসলাম নিয়ে বাঁচার স্বাধীনতা মক্কার কাফেরগণ মুসলিমদের দেয়নি। নমরুদ, ফিরাউনও দেয়নি। এরূপ পরাধীনতা থেকে বাঁচতে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)কে যেমন নিজ জন্মভূমি ছেড়ে হিজরত করতে হয়েছে, তেমনি হিজরত করতে হয়েছে মহান নবীজী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) ও তাঁর সাহাবীদেরকে।  ঔপনিবেশিক শাসনামলে মুসলিমদের সে স্বাধীনতা দেয়নি দখলদার কাফের শাসকগণও। কাফের শক্তির হাতে অধিকৃত হওয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর বিপদটি হলো, পরিপূর্ণ ইসলাম ও জিহাদ নিয়ে বেড়ে না উঠার বিপদ। রাষ্টীয় শিক্ষা, প্রচার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি তখন মনের ভূবন থেকে ঈমান নির্মূলের হাতিয়ারে পরিণত হয়। তাদের হাতে অর্থনৈতীক শোষণ ও জেল-জুলুমের বিপদটি সাময়িক, কিন্তু ইসলাম ও জিহাদ নিয়ে বেড়ে না উঠার শাস্তিটি চিরন্তন। কোটি কোটি বছরেও সেটি শেষ হওয়ার নয়। অথচ সে বিপদটি নেমে আসে দেশ ইসলামের দেশী বা বিদেশীদের শত্রুদের হাতে অধীকৃত হওয়ায়। সে বিপদ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ, রাষ্ট্রের ইসলামীকরণ। প্রকৃত ঈমানদারগণ তাই ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার জিহাদ শুরু করে ঈমান আনার প্রথম দিন থেকেই। এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়ভারটি তারা সমাজের সবচেয়ে আল্লাহভীরু লোকদের হাতে তুলে দেয়। মহান নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামদের যুগে তো সেটিই হয়েছিল। সমগ্র মানব জাতির জন্য আজও সেটিই অনুকরণীয় আদর্শ।

মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলো রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সামর্থ্য বিশাল। সেটি শুধু আল্লাহর দ্বীনের সৈনিক গড়া ও ইসলামের বিজয় আনার ক্ষেত্রেই নয়, জাহিলিয়াতের প্রতিষ্ঠা দেয়ার ক্ষেত্রেও। শয়তানী শক্তির হাতে এ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটির অধিকৃত হওয়ার বিপদ এজন্যই ভয়াবহ। ইসলামে সবচেয়ে বড় নেক কর্ম তাই রাষ্ট্রকে শত্রুশক্তির হাত থেকে বাঁচানো। ইসলাম বিরোধী শক্তির হাতে রাষ্ট্র অধীকৃত হলে তখন সে রাষ্ট্র জাহান্নাম-মুখি ট্রেনের কাজ করে। অপরদিকে ইসলামী রাষ্ট্র ট্রেনে পরিণত হয় জনগণকে জান্নাতে নেয়ায়। ইসলামী রাষ্ট্র সে কাজটি করে ইসলামি শিক্ষা, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল, শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, তাকওয়া-সম্পন্ন মানুষের প্রশাসন ও অর্থনৈতীক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তাছাড়া মহাকল্যাণটি করে, জাহান্নামে নেয়ার শয়তানী পথ ও পাথেয়গুলি বিলুপ্ত করে। তাই ইসলামে শ্রেষ্ঠতম জিহাদ শুধু ইসলামী রাষ্ট্র গড়া নয়, বরং শত্রুশক্তির হামলা থেকে সে রাষ্ট্রকে প্রতিমুহুর্তে প্রতিরক্ষা দেয়া। নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ “ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তে দাড়িয়ে এক মুহুর্তের পাহারাদারি সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ট।”  ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দেয়ার প্রতি এরূপ গুরুত্ব থেকেই বুঝা যায়, সেরূপ একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব কত অধীক। তাই অতীতে মুসলিমদের জান ও মালের সবচেয়ে বড় খরচটি হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় ও প্রতিরক্ষায়; মসজিদ বা মাদ্রাসা গড়ায় বা দাওয়াতী কাজে নয়। নবীজী (সাঃ)র ২৩ বছরের নবুয়তী জীবনে তিনি একখানী মাদ্রাসাও গড়েননি। মহল্লায় মহল্লায় মসজিদও গড়েননি।  বরং সে সময় মুসলিম উম্মাহর সমুদয় সামর্থ্য ব্যয় হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায়। কারণ, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলে সমগ্র দেশ তখন আল্লাহর দ্বীনের মাদ্রাসায় পরিণত হয়। তখন প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি মসজিদ, প্রতিটি শ্রেণীকক্ষ ও প্রতিটি অফিস-আদালত পরিণত হয় কোরআনী জ্ঞানের পাঠশালায়। এবং বন্ধ হয় জাহান্নামে নেয়ার সমুদয় পথ। মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিগণ গড়ে উঠেছেন তো সে পাঠশালা থেকেই। অপর দিকে ইসলামী রাষ্ট্র না গড়ার ভয়ানক বিপদটি হলো, তখন প্রতিটি নগর-বন্দর, গ্রামগঞ্জ ও জনপদ থেকে শুরু হয় জাহান্নামের পথে মিছিল। 

আজকের মুসলিমদের ব্যর্থতা অনেক। তবে মূল ব্যর্থতাটি ইবাদতের প্রায়োরিটি চিনতে না পারায়। ফলে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ন্যায় ফরজ জিহাদের বদলে গুরুত্ব পেয়েছ নফল নামায। নফল ইবাদত না করলে গুনাহ হয় না; আযাবও আসে না। কিন্তু ফরজ বাদ দেয়াটি কবিরা গুনাহ; তখন অনিবার্য হয় আযাবপ্রাপ্তি। সেটি যেমন দুনিয়ায়, তেমনি আখেরাতে। এক্ষেত্রে ভারতীয় উপমহাদেশের আলেমদের ব্যর্থতাটি চোখে পড়ার মত। মুসলিমদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ভারতের সাধারণ মুসলিমগণ বুঝলেও অধিকাংশ আলেম বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী বিরোধীতা হয়েছে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের ন্যায় উলামাদের সংগঠন থেকে। অথচ পাকিস্তানের ব্যর্থতা আজ যতই হোক, ভবিষ্যতে দেশটির ইসলামী রাষ্ট্র রূপে বেড়ে উঠার সম্ভাবনা তো বিশাল। কিন্তু  শতকরা ৮০ ভাগ হিন্দু অধ্যুষিত ভারতে কি সে সম্ভাবনা হাজার বছরেও সৃষ্টি হবে? তাছাড়া পাকিস্তান তখন প্রতিষ্ঠা পেল তখন সে নতুন রাষ্ট্রের ইসলামীকরণে তারা তেমন ভূমিকাও রাখেনি। রাজনীতিকে নোংরা মানুষে কাজ বলে তা থেকে দূরে থেকেছে। রাজনীতির ময়দান তখন দখলে গেছে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। অথচ নবীজী (সাঃ) শুধু রাসূলই ছিলেন না তিন শাসক ছিলনে এবং সেনাবাহিনীর প্রধানও ছিলেন। কিন্তু নবীজী (সাঃ)র সে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত থেকে তারা কোন শিক্ষাই নেয়নি। তাদের বড় অপরাধ, ইসলামকে স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত, মসজিদ-মাদ্রাসা ও ওয়াজ-মহফিলের মধ্যে তারা সীমিত রেখেছেন। তারা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছেন ইসলামী রাষ্ট্রের গুরুত্ব বুঝতে। ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন ও মিশনকে বুঝতে। নবী-রাসূলদের পরই শহীদদের মর্যাদা। সাহাবায়ে কেরামদের শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সে স্তরে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু এ যুগের আলেমদের শতকরা এক ভাগ দূরে থাক হাজারে একজনও সে স্তরে পৌছতে পারেনি। সাহাবায়ে কেরাম ও প্রাথমিক যুগের আলেমদের থেকে এ যুগের আলেমদের এখানেই মূল পার্থক্য।

ভারতীয় আলেমগণ বড় বড় মাদ্রাসা গড়লেও বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন কাফের শাসিত দেশে বসবাসের ক্ষতিকর বিষয়টি। সংখ্যাগরিষ্ঠ কাফেরের দেশে বসবাসের কবিরা গুনাহ বা ভয়ানক অপরাধটি হয় মুসলিম হত্যায় ও মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বোমারু বিমান, গোলাবারুদ, ট্যাংক, মিজাইল ও গুলির খরচ জোগানার মধ্য দিয়ে। যেমন কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যা, নির্যাতন ও কাশ্মীরী মহিলাদের ধর্ষণে খরচ জুগিয়ে যাচ্ছে ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম। সেটি শত শত কোটি টাকা রাজস্ব জুগিয়ে। তেমনি ১৯৭১ সালে তারা খরচ জুগিয়েছে বিশ্বের সর্ব মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু লক্ষ মুসলিম একই ভাবে খরচ জুগিয়ে চলেছে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়াসহ নানা দেশে মুসলিম গণহত্যায় এবং সে দেশগুলির নগর-বন্দর ও ঘর-বাড়ী ধ্বংসের কাজে। তাই কাফের দেশে বসবাস করে কারো পক্ষে নির্দোষ বা নিরাপরাধ থাকাটাই অসম্ভব। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কারণে ভারতীয় হিন্দুদের ইসলামবিনাশী প্রজেক্টে অংশ নেয়ার কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচেছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ –এ উভয় দেশের প্রায় ৪০ কোটি মুসলিম। এরূপ ভয়ানক অপরাধ ও গুনাহ থেকে বাঁচাতেই ইসলামে যেমন রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার হুকুম, তেমনি রয়েছে কাফের রাষ্ট্র থেকে হিযরতের নির্দেশ। এবং হারাম হলো স্রেফ উপার্জন বাড়াতে মুসলিম দেশ ছেড়ে কাফর শাসিত দেশে ঘর বাঁধা। এজন্যই নবীজী (সাঃ)র যুগে হারাম ছিল মদিনার ইসলামী রাষ্ট্র ছেড়ে কাফের শাসিত মক্কায় গিয়ে বসবাস করা।  

ইসলামে মানব হত্যার চেয়েও অতি গুরুতর অপরাধ হলো ইসলামী রাষ্ট্রের  ক্ষতিসাধনে বিদ্রোহ বা ফিতনা সৃষ্টি। মহান আল্লাহতায়ালার সেটি ব্যক্ত করেছেন এ ভাষায়ঃ “ফিতনাতু আশাদ্দু মিনাল কাতল”। অর্থঃ মানব হত্যার চেয়েও গুরুতর অপরাধ হলো ফিতনা সৃষ্টি। ইসলামে রাষ্ট্রে কিছু লোকের প্রাননাশ হলেও তাতে রাষ্ট্রের জান্নাতমুখি ট্রেনটি বিলুপ্ত হয় না। কিন্তু সেটি ধ্বংস হয় জনগণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লিপ্ত হলে। ফিতনা বা বিদ্রোহের শাস্তি তাই প্রাণদণ্ড। বিষয়টি ইসলামের এতই মৌলিক বিষয় যে প্রসিদ্ধ ফিকাহর কিতাবগুলিতে এ নিয়ে কোন বিরোধ নেই। এ জন্যই কাফের বা বেঈমান ব্যক্তিকে কামার, কুমার, কৃষক, শ্রমিক বা রাস্তার ঝাড়ুদার বানানো যায়, কিন্তু মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারপতি, সেনাপতি, আইন প্রণেতা বা প্রশাসক করা যায় না। তাতে মারা পড়ে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার মূল এজেন্ডা। ইসলামে তাই এটি হারাম। সে হারাম রুখতেই মু’মিনের জীবনে আজীবনের যুদ্ধ। গাড়ীর সকল যাত্রী মাতাল হলেও সে গাড়ী সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে যদি চালক সুস্থ্য হয়। অথচ মাতাল চালকের হাতে গাড়ি ছিনতাই হলে যাত্রীদের কোর’আন পাঠ ও দোয়া-দরুদে লাভ হয় নয়। বিষয়টি অবিকল সত্য রাষ্ট্রের বেলায়। তাই রাষ্ট্রের শাসক রূপে বসা ও সর্বস্তর থেকে দুর্বৃত্তদের হটানোর কাজটি মহান নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। মু’মিনের জীবনের এটি গুরুত্বপূর্ণ মিশন। তাই ঈমানদারকে শুধু নামায-রোযা হজ-যাকাত পালন করলে চলে না, এবং স্রেফ মসজিদের ইমাম নির্বাচনে যত্নবান হলেই চলে না। রাষ্ট্রপ্রধানের আসনেও নবীজী (সাঃ)র আদর্শের শ্রেষ্ঠ অনুসারিকে বসাতে উদ্যোগী হতে হয়। প্রশ্ন হলো, যে পবিত্র আসনে মহান নবীজী (সাঃ) বসেছেন সে আসনে কি কোন কাফের, মুনাফিক ও ইসলামে অঙ্গীহারহীন সেক্যুলারিস্ট, সোসালিস্ট বা জাতীয়তাবাদীকে বসানো যায়? সেটি তো হারাম। সেটি ইসলামের সাথে গাদ্দারি। মুসলিমদের আজকের বিশাল ব্যর্থতাটি তো এ গুরুতর বিষয়টি না বুঝাতে। ফলে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে সে হারাম কর্মও জনগণের সমর্থন ও বৈধতা পায়। অতি দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারীগণও তখন বিজয়ী হয় জনগণের ভোটে। এমন গুরুতর দায়িত্বহীনতার কারণে মুসলিম দেশগুলিতে শুধু পতিতাবৃত্তি, সূদী ব্যাংক, মদের দোকান, নাচগানের অশ্লিলতাই বৈধতা পায়নি, রাষ্ট্রের বৈধ শাসক রূপে স্বীকৃতি পেয়েছে ইসলামের চিহ্নিত শত্রুগণও। মুসলিম ও ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের নায়ক হলো ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য এসব সেক্যুলার শাসকগণ। অধিকাংশ মুসলিম দেশগুলি আজ এদের হাতেই অধিকৃত। ফলে মুসলিমদের ব্যক্তি জীবনে ও রাষ্ট্রের বুকে মহান আল্লাহতায়ালা যে ধরনের ইসলামের প্রতিষ্ঠা চান তা কোথাও প্রতিষ্ঠা পায়নি।  মুসলিমদের নানা ব্যর্থতার মাঝে এটিই হলো সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

 

অব্যাহত পরাধীনতা

রাষ্ট্রকে ইসলামী করার লাগাতর জিহাদ না থাকলে সে রাষ্ট্র ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হতে বাধ্য। আজকের মুসলিমদের ব্যর্থতা এক্ষেত্রে শতভাগ। ফলে মুসলিম বিশ্ব থেকে ঔপনিবেশিক কাফের শাসন শেষ হলেও কোথাও প্রতিষ্ঠা পায়নি ইসলামী রাষ্ট্র। এমন ব্যর্থতা ভয়ানক আযাব নিয়ে হাজির হবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। সে আযাবটি মূলতঃ কাফের, ফাসেক ও মুনাফিকদের গড়া গোলামীর শিকল গলায় নিয়ে আমৃত্যু বসবাসের। এরূপ অধিকৃতির কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশেও মুসলিম রূপে বেড়ে উঠায় সাহায্য জোগাতে কোনরূপ রাষ্টীয় অবকাঠামো গড়ে উঠেনি। বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসনের অঙ্গন জুড়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কাফেরদের গড়া অবকাঠামো –যার মূল কাজ জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো ও মুসলিমদের শক্তিহীন রাখা। এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসলামে অঙ্গীকারশূণ্য দুর্বৃত্ত সেক্যুলারিস্টদের শাসন। ফলে বিদেশী কাফেরগণ বিতাড়িত হলেও তাদের বিশ্বস্থ্য খলিফাদের হাতে শুরু হয়েছে নতুন পরাধীনতা। সে অব্যাহত পরাধীনতার কারণেই ব্যর্থ হচ্ছে প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার চেষ্টা। ফলে মুসলিমগণ বেড়ে  উঠেছে ইসলাম ছাড়াই। 

মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি মসজিদ-মাদ্রসার নির্মাণ বা কৃষি ও শিল্প খাতে নয়; সেটি ইসলামি রাষ্ট্র নির্মাণে। সে ব্যর্থতাটির নাশকতা বিশাল।  রাষ্ট্রের বিকল্প রাষ্ট্রই; মসজিদ-মাদ্রাসা নয়। তাই লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে বা তাবলিগ জামাতের বিশাল বিশাল এজতেমা করে কি সে ব্যর্থতা দূর করা সম্ভব হচ্ছে না। যে দায়ভারটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সমূহের, সে কাজ কি নামাযী-রোয্দার ও মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়িয়ে সম্ভব? তাই শুধু ব্যক্তির ইসলামীকরণ হলে চলে না, ইসলামীকরণ করতে হয় রাষ্ট্রকেও। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের সে সত্য বিষয়টি সাহাবা কেরাম শতভাগ বুঝেছিলেন; এবং তাঁরা সেটি বুঝেছিলেন মহান নবীজী (সাঃ) থেকে। ফলে নিজেদের জান-মাল ও সর্বপ্রকার সামর্থ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে শয়তানী শক্তির দখলদারি থেকে বাঁচিয়েছিলেন। ফলে তাদের হাতে এসেছে ইসলামের লাগাতর বিজয় ও প্রতিষ্ঠা এবং জুটেছে বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠার গৌরব। তাদের হাতে নির্মিত হয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। আজকের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো ইসলামের সে কোরআনী রূপটি না বুঝার। নিরেট সে অজ্ঞতার কারণেই মুসলিম মনে বিশ্বাস জমেছে, মুসলিমের জীবনে জিহাদ অপ্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় হলো জান-মালের কোরবানী -এমন কি যদি সেটি খেলাফত ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বা কাফের বাহিনীর অধিকৃতি নির্মূলের জন্যও হয়! এমন অজ্ঞতার কারণেই তারা কাফেরদের সাথে গলা মিলিয়ে জিহাদকে সন্ত্রাস বলছে। বলছে, ইসলামের নামে এটি বাড়াবাড়ি। জিহাদ বিরোধী সে কথাগুলো তারা আরো বেশী বেশী বলে মার্কিন যুক্তরাষ্টের নেতৃত্বাধীন ইসলাম বিরোধী জোটের কাছে মডারেট মুসলিম রূপে গ্রহনযোগ্যতা বাড়ানোর স্বার্থে। তাদের মনে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ভাবনা নাই। বরং বহু ইসলামী দলের নেতাকর্মী তো এ বেদনায় কাতর, তাদেরকে কেন মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনে নেয়া হচ্ছে না। তাদের দৃষ্টিতে ইসলামের বিজয়ের পথটি  হলো স্রেফ দোয়া-দরুদ, বেশী বেশী কোর’আন পাঠ, নামায-রোযা, মসজিদ নির্মাণ, ইসলামী দলগুলোর কর্মীবৃদ্ধি ও তাবলিগ জামায়াতের এজতেমায় হাজিরা-বৃদ্ধিতে। তাদের দলীয় গঠণতন্ত্রে বা সিলেবাসে কোথাও খেলাফত, শরিয়ত, হুদুদ ও জিহাদের উল্লেখ নাই। সেগুলো তারা মুখেও আনে না। মহান নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামে জীবনে যা ছিল অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তা বাদ পড়েছে আজকের মুসলিমদের ধর্ম-কর্ম, রাজনীতি ও আইন-আদালত থেকে। এরপরও তাদের দাবী, তারা মহান নবীজী (সাঃ)র অনুসারি!

 

বেঈমানের স্বাধীনতার নাশকতা                                                       

পৃথিবী পৃষ্টে সবচেয়ে ভয়াবহ নাশকতাটি ভূমিকম্প, সুনামী বা মহামারিতে ঘটে না, সেটি হয় দুষ্ট বেঈমানদের স্বাধীনতায়। বেঈমানদের স্বাধীনতার অর্থ দুর্বৃত্তিতে তাদের স্বাধীনতা। দেশ তখন যুদ্ধ-বিগ্রহ, চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস ও নানারূপ অপরাধ কর্মে ভরে যায়। বিগত দু’টি বিশ্বযুদ্ধে তারা সে স্বাধীনতার প্রয়োগ করেছে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করে। এখন সে স্বাধীনতার প্রয়োগ করছে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায় ইচ্ছামত বিমান হামলা, ড্রোন হামলা করে। এরূপ স্বাধীনতা পাওয়াতে বাংলাদেশকে এরা দুর্বৃত্তিতে বিশ্বমাঝে ৫ বার প্রথম স্থানে পৌছে দিয়েছে।  তাদের হাতে ঈমানদারদের প্রাণে বাঁচার স্বাধীনতাই শুধু ভূ-লুন্ঠিত হয় না, বরং ভয়ানক বিপদে পড়ে জান্নাত পাওয়ার বিষয়টিও। কারণ সিরাতুল মোস্তাকীমে চলার পথে তারা বাঁধা সৃষ্টি করে। অসম্ভব করে শরিয়তের পালন নিয়ে বাঁচতে।  মক্কার কাফেরগণ মারা গেলেও তাদের এজেন্ডা মারা পড়েনি। সে অভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে আজও প্রবল ভাবে বেঁচে আছে শয়তানের আধুনিক অনুসারিগণ। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে মুসলিম নামধারী আধুনিক মুনাফিকগণ। প্রতিযুগে ইসলাম ও মুসলিমদের স্বাধীনতার মূল শত্রু এরাই।

মুসলিমের জীবনে ধর্মীয় স্বাধীনতার অর্থ স্রেফ নামাজ-রোযা, হজ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ নিয়ে বাঁচার স্বাধীনতা নয়, বরং সেটি পরিপূর্ণ ইসলাম নিয়ে বাঁচার স্বাধীনতা। ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, খেলাফাহ, হুদুদ ও জিহাদের প্রতিষ্ঠা ছাড়া পূর্ণ ইসলাম পালন কি সম্ভব? নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে ইসলাম বলতে যা বুঝাতো তাতে ছিল এর সবকিছুই। মহান অআল্লাহতায়ালার হুকুম, “উদখুলু ফিস সিলমে কা’ফ্ফা” অর্থঃ “পরিপূর্ণ রূপে প্রবেশ করো ইসলামের মাঝে।” সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে মুসলিমদের জান, মাল, সময় ও সামর্থ্যের সবচেয়ে বেশী খরচ হয়েছে সে পরিপূর্ণ ইসলাম নিয়ে বাঁচার লড়াইয়ে। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী সে সব লড়াইয়ে শহীদ হয়েছেন। প্রকৃত মুসলিম রূপে বাঁচার অর্থ যে ইসলামের মৌল বিষয়গুলো নিয়ে বাঁচা -সেটি বুঝতে ইসলামের শত্রুপক্ষ কখনোই ভূল করেনা। তাই নবীজী (সাঃ)র ইসলাম নিয়ে যারা বাঁচতে চায় তাদেরকে তারা মৌলবাদী বলে। তারা চায়, মুসলিমগণ বাঁচুক ইসলামের মৌল বিষয়গুলো পরিত্যাগ করে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ইসলাম নিয়ে। লক্ষ্যণীয় হলো, তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ইসলামে নেই খেলাফত, শরিয়ত, হুদুদ, জিহাদ ও একতাবদ্ধ মুসলিম উম্মাহর ন্যায় মৌলিক বিষয়ের স্বীকৃতি। এরূপ এক অপূর্ণাঙ্গ ও বিকৃত ইসলামকে তারা বলছে মডারেট ইসলাম। ইসলামের এ শত্রুগণ যখনই কোন মুসলিম দেশ দখলে নেয় সে দেশে তারা অসম্ভব করে ইসলামের মৌল বিষয়গুলো পালন। ব্রিটিশগণ যখন ভারত দখলে নিয়েছিল তখন তারা সেদেশের আদালত থেকে শরিয়তী বিধানকে বিলুপ্ত করেছিল। আফগানিস্তান দখলে নেয়ার সাথে সাথে একই কাজ করেছিল মার্কিনীগণ।

স্বাধীনতার অর্থ স্রেফ একটি মানচিত্র বা পতাকা পাওয়া নয়, বরং সেটি শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত, রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসনসহ জীবনের সর্বস্তরে পরিপূর্ণ ইসলামের অনুসরণ নিয়ে বাঁচা ও বেড়ে উঠার স্বাধীনতা। সে স্বাধীনতা না থাকাটাই মানব জীবনে সবচেয়ে বড় পরাধীনতা। সেটিই জীবনের সবচেয়ে বড় নিঃস্বতা। ভাতে-মাছে সে নিঃস্বতা দূর হয় না। ১৯৭১’য়ে সে স্বাধীনতা মেলেনি। বরং মিলেছে দুঃসহ পরাধীনতা। বাংলাদেশের জনগণের উপর সে পরাধীনতা চাপিয়ে দিয়েছে ভারতীয় কাফের শক্তি। তখন পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছিল ভারতের আশ্রয়ে প্রতিপালিত ভারতসেবী ইসলামের শত্রুপক্ষ। ভারতীয় সাহায্যে স্বৈরাচারী শেখ মুজিব তখন নেমেছিল বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের এজেন্ডা প্রতিপালনে; সেটি ছিল ইসলাম ও ইসলামের পক্ষের শক্তির নির্মূলে। শেখ মুজিব হাজার হাজার ইসলামপন্থিকে নিহত, আহত ও কারাবন্দী করেছিলেন, অথচ মূক্ত ছেড়ে দিয়েছিলেন কাফের, মুনাফিক, সেক্যুলারিস্ট, সোসালিস্ট, কম্যুনিস্ট ও ন্যাশনালিস্ট তথা ইসলামবিরোধী শিবিরের সহিংস নেতাকর্মী ও ক্যাডারদের। মুজিবের কাছে ইসলাম ও মুসলিম -এ দুটি শব্দ সহ্য হয়নি। তাই পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত জাহাঙ্গির নগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল হয়ে যায় সলিমুল্লাহ হল, নজরুল ইসলাম কলেজ হয়ে পড়ে নজরুল কলেজ। সহ্য হয়নি পবিত্র কোর’আনের আয়াতও। শেখ মুজিব তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে পবিত্র কোরআনের আয়াত “ইকরা বিসমে রাব্বিকা” বিলুপ্ত করেছেন। একই পথ ধরেছেন মুজিব-কণ্যা শেখ হাসিনা। তার কাছে সহ্য হয়নি শাসনতন্ত্রে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার উপর আস্থার বিষয়টি। ভারতীয় কাফেরদের উপর আস্থা নিয়ে যাদের উঠাবসা, বেড়েউঠা  ও রাজনীতি, তাদের মনে কি মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান বা আস্থা গড়ে উঠতে পারে। এমন ব্যক্তি তো পূজা মন্ডপে গিয়ে বলবেন, “এবার আমাদের দেবী গজে চড়ে এসেছেন, তাই ফসল এবার ভালো হয়েছে”। (২০১১ সনের ৫ই অক্টোবর রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির ও রামকৃষ্ণ মিশনে দুর্গা পূজা উপলক্ষে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে শেখ হাসিনা এ কথা বলেছিনেন। সূত্রঃ দৈনিক আমার দেশ, ৬ই অক্টোবর, ২০১১)। কথা হলো, এটি কি ঈমানদারের লক্ষণ। একাত্তরে একমাত্র এরাই স্বাধীনতা পেয়েছে, দেশের ঈমানদার জনগণ নয়। এরূপ ঈমানশূণ্যতার কারণেই নিরস্ত্র মুসল্লীদের হত্যায় শাপলা চত্বরে সশস্ত্র সেনাবাহিনী ও ট্যাংক নামাতে শেখ হাসিনার মনে সামান্যতম দ্বিধা হয়নি। অগণিত মুসল্লী হত্যার পর লাশগুলোকে তিনি ময়লার গাড়ীতে তুলে গায়েব করার ব্যবস্থা করেছেন। স্বাধীনতা এভাবেই ইসলামপন্থিদের হত্যা ও দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। তখন ভূলুন্ঠিত হয় জনগণের প্রাণে বাঁচার অধীকার।

 

অপরাধের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো

শত্রুশক্তির হাতে অধীকৃত হওয়ার যন্ত্রনাটি বহুমুখি। নিজেদের স্বাধীনতার অবাধ প্রয়োগে তারা গড়ে তোলে বিশাল রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো। সে প্রকল্পের অংশ রূপেই রাষ্ট্রের মন্ত্রীপরিষদ, পুলিশ, প্রশাসন, শিক্ষাব্যবস্থা, আদালত ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের ভয়ানক অপরাধীতে পরিণত করা হয়। তাদের এরূপ সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং’য়ের মূল লক্ষ্য, মুসলিম ভূমি থেকে ইসলামের মৌল বিশ্বাসগুলি নির্মূল। এবং যারা খেলাফত, শরিয়ত, হুদুদ ও জিহাদের ন্যায় বিধানগুলির প্রতিষ্ঠা চায় তাদের হত্যা।  ঢাকার শাপলা চত্বরের ন্যায় নিষ্ঠুর গণহত্যাও তখন মামূলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। নিরপরাধ মানুষ তখন অহরহ লাশে পরিণত হয় ক্রসফায়্যারে ও ফাঁসীর মঞ্চে। জনগণের গলায় শিকল পড়ানোর লক্ষ্যে শত্রুপক্ষ স্রেফ প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীকেই কাজে লাগায় না, বরং সেটি সহনীয় ও আইনসিদ্ধ করে পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা, অপসংস্কৃতি ও আইন-আদালতের মাধ্যমে। ছাত্রদের ইসলামের মৌল শিক্ষা থেকে দূরে সরানোর লক্ষ্যে লেখা হয় নতুন নতুন বই, পরিবর্তন আনা হয় সিলেবাসে। ইসলামবৈরী এমন এক পরিচর্যার কারণে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীগণও তখন ইসলামপন্থীদের ফাঁসীর দাবী নিয়ে রাজপথে নামে। সন্ত্রাসের মনোপলি সরকার নিজ হাতে নিয়ে নেয়। তখন নিরস্ত্র জনগণের মনে ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যে রাস্তায় ট্যাংক ও কামান নামানো হয়। ত্রাস সৃষ্টির এরূপ প্রতিটি উদ্যোগই তো সন্ত্রাস। অথচ জনগণের ঘরে দা, কুড়াল এবং ছুরিও সন্ত্রাসের হাতিয়ার রূপে প্রচার পায়। একই রূপ নীতি ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটেশের। এবং সে নীতির কারণে তাদের শাসন ১৯০ বছর যাবত স্থায়ীত্ব পেয়েছিল। তারা বিলুপ্ত করেছিল শরিয়ত ও হুদুদের ন্যায় ইসলামের বহু মৌল বিষয় -যা ভারতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এবং আইনসিদ্ধ করেছিল সূদী ব্যাংক, মদ্যপান, জুয়া, পতিতাবৃত্তি, অশ্লিলতা এবং নিজেদের প্রণীত কুফরী আইন। বাংলাদেশে আজও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে।

 

বিশুদ্ধ জিহাদ

বেঈমানদের কাছে স্বাধীনতার অর্থ স্রেফ রাজনৈতীক স্বেচ্ছাচার নয়, বরং সে অধীকারটি মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহেরও। সে গুরুতর যুদ্ধাপরাধ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। তাই পবিত্র কোর’আনে তারা চিত্রিত হয়েছে স্রেফ ঈমানদারদের শত্রু রূপে নয়, বরং মহান আল্লাহতায়ালার শত্রু রূপে। পবিত্র কোরআনে এমন বিদ্রোহীদের মডেল হলো ফিরাউন ও নমরুদ। যুগে যুগে এরাই জনগণের উপর পরাধীনতা চাপিয়ে দিয়েছে এবং অসম্ভব করেছে সত্যের পথে চলা। ইতিহাসে এরাই সন্ত্রাসের আদি নেতা। তাদের হাতে প্রতিষ্ঠা পায়, শয়তানী আইন এবং শুরু হয় সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে দূরে সরা। এরূপ দূরে সরার কারণেই বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে ইসলাম যে পরিচিতি নিয়ে বেঁচে আছে তার সাথে নবীজী (সাঃ)র ইসলামের দূরত্বটি বিশাল। এ ইসলামে শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত ও জিহাদের কোন ধারণা নেই।

ইসলাম থেকে এরূপ দূরত্ব বাড়িয়েছে ইসলামের দেশী শত্রুগণ। তাদের কারণে ঔপনিবেশিক শাসন শেষ হলেও পরাধীনতা শেষ হয়নি। পরাধীনতার সে শিকলটি হলো ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে প্রণীত কুফরি আইনের অধীনতা। এ আইনে ব্যাভিচার, দেহব্যবসা, মদের ব্যবসা, মদ্যপান, জুয়া ও সূদের ন্যায় পাপকর্ম বৈধ হলেও বৈধ নয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে রাস্তায় নামা। সন্ত্রাসে অভিযোগ এনে তখন হত্যা করা হয়। প্রকৃত মুসলিমের জীবনে প্রকৃত লড়াইটি তো এরূপ পরাধীনতা থেকে মূক্তির লড়াই। ভাষা, বর্ণ, শ্রেণী, গোত্র বা আঞ্চলিকতার নামে যুদ্ধে স্রেফ শিকলের বদল ঘটে, কিন্তু পরাধীনতা থেকে মুক্তি মেলে না। স্বাধীনতা তখন পালাক্রমে লুন্ঠিত হয় নানা দলের ও নানা মতের সুযোগ-সন্ধানী দুর্বৃত্তদের হাতে। এরূপ পরাধীনতা থেকে মুক্তি স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত বা দোয়া-দরুদেও আসে না। সে বিপদ থেকে বাঁচাতেই ফরজ করা হয়েছে জিহাদকে। শয়তানী শক্তির অধীনতা থেকে মুক্তির এ লড়াইটি যে শতভাগ বিশুদ্ধ জিহাদ –তা নিয়ে কি তাই সামান্যতম সন্দেহ চলে?  কোন ব্যক্তির জীবনে ঈমান থাকবে অথচ মহান আল্লাহতায়ালার পথে এরূপ জিহাদ থাকবে না সেটিই বা কীরূপে ভাবা যায়? ১৪/০৮/২০১৬

 




নিষিদ্ধ জিহাদ ও সন্ত্রাসের আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 ঈমানদারের মিশন ও জিহাদ

একমাত্র পাগল ছাড়া এ জীবনে সবাই নিজ নিজ লক্ষ্য ও মিশন নিয়ে বাঁচে। সেরূপ লক্ষ্য ও মিশনটি যেমন দুর্বৃত্ত সন্ত্রাসীর থাকে, তেমনি থাকে ঈমানদারেরও। মানুষ মূলত বাঁচে সে মিশন পূরণের লক্ষ্যে; পানাহার সে বাঁচায় সহায়তা দেয় মাত্র।  তবে অলস ভাবে আমোদ-ফুর্তি নিয়ে বাঁচা যেমন মিশন হতে পারে, তেমনি হতে পারে বিশেষ একটি মহত্তর লক্ষ্যে নিজের জান, মাল ও সমুদয় সামর্থ্য বিলিয়ে দেয়া। সে লক্ষ্য ও মিশনটি নিজ খেয়াল-খুশিতে বেছে নেয়ার অধীকার কাফেরদের থাকলেও মু’মিনের নেই। মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ভূলটি হয় বাঁচার সামগ্রী অর্জনে নয়, বরং সেটি জীবনের এজেন্ডা বা লক্ষ্য স্থির করায়। অথচ এখানে ভূল হলে বাঁচার সকল কষ্ট ও প্রচেষ্টাই অনর্থক হয় –অবিকল ভূল পথে দৌড়ানোর মত।

প্রতিটি মানবকে সে মহাক্ষতি বাঁচানো ও তার প্রতিটি প্রচেষ্টাকে অর্থময় করার জন্যই হারাম-হালালের ন্যায় মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূ্র্ণ সে এজেন্ডাটি সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। পবিত্র কোরআনে মানব জীবনের সে মূল এজেন্ডাটি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে এভাবে, “বলো (হে মুহাম্মদ) আমার নামায, আমার কোরবানী, আমার জীবন-ধারন ও আমার মৃত্যু জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশ্যে। -(সুরা আন’আম, আয়াত ১৬২)। এ এজেন্ডা পূরণে মু’মিনের জন্য বেঁধে দেয়া মিশনটি হলো “আ’মারু বিল মারুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার”। অর্থ: ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও  অন্যায়ের নির্মূল। সে মিশনটি আরো সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে এভাবে, “তোমরাই হচ্ছো শ্রেষ্ঠ উম্মত, তোমাদের খাড়া করা হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য। এ জন্য যে, তোমরা প্রতিষ্ঠা করবে ন্যায়ের এবং নির্মূল করবে অন্যায়ের এবং ঈমান আনবে আল্লাহর উপর।” –(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১১০)। বস্তুত এ মিশনটি নিয়ে বাঁচাই হলো প্রকৃত মুসলিম রূপে বাঁচা। এখানে ভূল বা অবাধ্যতা হলে তা জাহান্নামে পৌঁছার কারণ হয়।

মহান আল্লাহতায়ালা মুমিনের জীবনে স্রেফ আইন-কানূন ও মিশনই বেঁধে দেননি। বরং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের কাজে শক্তি ও সামর্থ্য বাড়াতে প্রয়োজনীয় সামগ্রীও দান করেছেন। তিনি যেমন দৈহিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য দিয়েছেন, তেমনি দিয়েছেন নানারূপ সম্পদ ও সামগ্রিক সামর্থ্য। এবং পরীক্ষা হয় কীরূপে সে সামর্থ্যের বিনিয়োগ হয় –তা থেকে। মহান আল্লাহতায়ালা সুরা হাদিদে ধাতব লোহাকে সেরূপ এক কল্যানকর নেয়ামত রূপে উল্লেখ করেছেন। সে আমলে কামান, বন্দুক বা গোলা-বারুদ ছিল না। যুদ্বাস্ত্র বলতে বুঝাতো ঢাল-তলোয়ার, বর্শা-বর্ম ও তীর-ধনুক। সেগুলো নির্মিত হতো লৌহ থেকেই। মু’মিনদের তাগিদ দেয়া হয়েছে কোর’আনী বিধানের প্রয়োগে এ লৌহদন্ডকে ব্যবহার করতে। তাই বলা হয়েছে, “আমি রসূলদের প্রেরণ করেছি সুস্পষ্ট নিদর্শন দিয়ে, তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি -যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আর আমি  নাযিল করেছি লৌহ যাতে রয়েছে প্রচণ্ড রণশক্তি এবং মানুষের জন্য রয়েছে বহুবিধ উপকার। এটি এজন্য যে আল্লাহ জেনে নিবেন কারা তাঁকে ও তাঁর রাসূলদেরকে না দেখে সাহায্য করে। আল্লাহ শক্তিধর ও পরাক্রমশালী।” –(সুরা হাদীদ, আয়াত ২৫)।

ইসলামের মূল মিশনটি বুঝতে হলে অতিশয় জরুরী হলো সুরা হাদীদের এ আয়াতটির মর্মার্থ বুঝা। যাদের ধারণা, ইসলামে জিহাদ বা যুদ্ধ-বিগ্রহ নাই, আছে জিহাদ-বর্জিত সুফিবাদ, আছে দোয়াদরুদ, নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাবলিগ -তাদের সে দাবী এ আয়াত পুরাপুরি রদ করে দেয়। ইসলাম চায় বিশ্বজুড়ে ন্যায়-নীতি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে। ইসলাম যে শা্ন্তির ধর্ম সেটি দোয়া-দরুদ, নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে প্রমাণিত হয়। সেজন্য দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ন্যায়-ইনসাফের প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। এবং সে লক্ষ্যে পৌঁছতে যুদ্ধ অনিবার্য। কারণ, অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা নিয়ে ময়দানে নামলে সশস্ত্র শয়তানী শক্তিও তাদের অস্তিত্ব বাঁচাতে ধেয়ে আসে। কারণ, জুলুম ও অন্যায় নিয়ে যাদের কারবার তারা নিরস্ত্র নয়, এবং বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণে রাজী নয়। তাই তাদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে হলে চাই প্রচণ্ড রণশক্তি, চাই লড়াকু জনশক্তিও। মহান আল্লাহতায়ালা দেখতে চান, কে সে লড়াই’য়ে তাঁর ও তাঁর রাসূলের পক্ষে দাঁড়ায় এবং কে দাঁড়ায় তাঁর বিপক্ষে তথা শয়তানের দলে। ঈমানের এটিই চুড়ান্ত পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় কে ব্যর্থ হয়, আর কে সফল হয় -সেটি দেখতেই মু’মিনদের জীবনে জিহাদকে অনিবার্য করা হয়েছে। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার এ পরিকল্পনাটি অতি স্পষ্ট ভাবে ব্যক্ত হয়েছে। বলা হয়েছে, “তোমরা কি মনে করেছে নিয়েছো এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ জানলেন না তোমাদের মধ্য থেকে কারা জিহাদ করলো এবং ছবর ধারণ করলো।” – (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৪২)।

তাই যারা ঈমান আনে তাদের শুধু নামাযের জায়নামাযে দাঁড়ালে চলে না; ঈমাদারীর প্রমাণ দিতে তাদেরকে জিহাদের ময়দানেও দাঁড়াতে হয়। তাই নবীজী (সাঃ)র শাসনামলে ইসলাম দোয়া-দরুদ, নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতে সীমিত ছিল না; সে ইসলামে বহু রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধও ছিল। সাহাবায়ে কেরামগণ তাই নবীজী (সাঃ)’র পিছনে স্রেফ জায়নামাযে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব সারেননি, বার বার রণাঙ্গণেও হাজির হয়েছেন। জিহাদের ময়দানে দাঁড়ানো যে অতি গুরুত্বপূর্ণ, উপরুক্ত আয়াতে বস্তুত সেটিই বুঝানো হয়েছে।  জিহাদের নামে কেউ গর্হিত কিছু করলে তাকে গালাগালাজ করায় নিজের উপর অর্পিত জিহাদের  দায়ভার শেষ হয় না, বরং বৃদ্ধি পায়। তখন সে ব্যক্তির উপর বাড়তি দায়ভারটি হয়, নিজে ময়দানে নেমে জিহাদের সঠিক নমুনা পেশ করা। কিন্তু মুসলিম বিশ্বজুড়ে সেটি হচ্ছে না। বরং অধিকাংশ মুসলিমগণ কাফেরদের সাথে গলা মিলিয়ে এমনকি সত্যিকার মুজাহিদদেরও বদনাম করছে। ইসলামের শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যারা নিজেদের প্রাণ অকাতরে বিলিয়ে দিচ্ছে তাদেরকেও এরা সন্ত্রাসী বলছে। জিহাদের নামে ইসলামের বদনাম হচ্ছে -এ কথা তাদের মুখে মুখে। কিন্তু তাদের নিজেদের জীবনে কোথায় সে জিহাদ? সাহাবায়ে কেরামের ন্যায় তাদের মাঝে কোথায় সে জান-মাল বিনিয়োগের প্রেরণা? প্রশ্ন হলো, দেশে দেশে ইসলাম ও ইসলামের শরিয়তি বিধান যেভাবে পরাজিত, বিজয়ীর বেশে যেভাবে প্রতিষ্ঠিত স্বৈরাচারীদের দুর্বৃত্ত শাসন –তারপরও মুসলিম জীবনে জিহাদ না থাকলে জিহাদ আর কোথায় থাকবে?

 

ঈমানী দায়ভার

ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বিষয়টি নিছক রাজনীতি নয়, খেয়াল-খুশির বিষয়ও নয়। প্রতিটি মুসলিমের জীবনে এটি গুরুতর ঈমানী দায়ভার। সে ঈমানী দায়ভার পালনে সামর্থ্য সৃষ্টির লক্ষ্যে ইসলামে রয়েছে নামায-রোযা, হজ-যাকাত, যিকর-ফিকরের ন্যায় ইবাদতের ট্রেনিং প্রোগ্রাম। সে সামর্থ্যের বলে মু’মিন ব্যক্তি জীবনের প্রতি পদে এবং রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রতি অঙ্গণে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে দাঁড়ায়; এবং কখনোই মিথ্যা, অন্যায় ও জুলুমের পক্ষ নেয় না। সে সামর্থ্য সৃষ্টি না হলে বুঝতে হবে তার সকল ইবাদত-বন্দেগী কার্যতঃ নিস্ফল হয়েছে। ব্যক্তির ঈমানদারি স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়ে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোয়; এবং বেঈমানী ও মুনাফেকি বেরিয়ে আসে যখন সে ইসলামের শত্রুপক্ষে দাঁড়ায়, ভোট দেয় বা অস্ত্র ধরে। নিস্ফল ইবাদতকারীগণ এভাবেই শয়তানের পক্ষ নেয় এবং মুসলিম দেশে ইসলামকে পরাজিত রাখে।

শরিয়তের বিধানে গুরুতর অপরাধ শুধু নিরস্ত্র মানুষের মাথার উপর বোমাবর্ষন, নাশকতা, গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনই নয়। বরং অতি গুরুতর অপরাধ হলো, মুসলিম রাষ্ট্র ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে হামলার কাজে যুদ্ধবিমান, মিজাইল, ট্যাংক, কামান ও বোমা নির্মাণে বা ক্রয়ে অর্থ জোগানো। কাফের দেশের নাগরিকগণ সে অর্থ জোগায় রাজস্ব দিয়ে। সে গোনাহ থেকে বাঁচতেই ইসলামে হিজরতের বিধান দেয়া হয়েছে। শরিয়তের বিধানে শাস্তিযোগ্য ভয়ানক অপরাধ হলো ইসলামের চিহ্নিত শত্রুদের রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহকে নীরবে বা সরবে সমর্থন দেয়া; বা তাদের সাথে জোটবদ্ধ হওয়া। মহান নবীজী (সাঃ)র শাসনামলে সে  গুরুতর অপরাধের কারণে মদিনার ইহুদী গোত্র বনু কোরাইজার সকল সাবালক পুরুষকে হত্যা ও তাদের নারী-শিশুকে বন্দী করা হয়েছিল। অথচ তারা যে অস্ত্র হাতে মুসলিমদের বিরুদ্ধ যুদ্ধে নেমেছিল –তা নয়। তাদের অপরাধ, খন্দকের যুদ্ধকালে সদ্য বেড়ে উঠা মুসলিম উম্মাহর নির্মূলে তারা হামলাকারী আরবের কাফের কোয়ালিশনের সাথে একাত্ম হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে এরূপ অপরাধীদের সংখ্যা কি কম? যারা কাশ্মীর, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ার ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে গণহত্যায় ব্যস্ত তাদের সাথে একাত্মতা হওয়াটিই হলো এ অপরাধীচক্রের রাজনীতি। একাত্তরের যুদ্ধে এরাই বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় কাফের সেনাবাহিনীকে ডেকে এনেছিল তাদের ঘরে বিজয় তুলে দিয়েছিল।

প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়ভার হলো, জীবনের প্রতিপদে, প্রতি যুদ্ধে এবং রাজনীতির প্রতি লড়াই’য়ে সে ইসলামের পক্ষ নিবে। যে কোন বিষয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোটি কবিরা গুনাহ। মহান আল্লাহতায়ার পক্ষ থেকে নির্দেশিত মিশনটি নিয়ে বাঁচার মধ্যেই শ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়ার মর্যাদা। অন্যথায় পতন, পরাজয় ও অপমান অনিবার্য। তখন নেমে আসে কঠিন আযাব –সেটি যেমন দুনিয়ার জীবনে, তেমনি আখেরাতের জীবনে। এ পবিত্র মিশন পূরণে মু’মিন ব্যক্তি তার সামগ্রিক শারিরীক, আর্থীক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যের বিনিয়োগ করে। এমনকি প্রাণও দান করে। তখন ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলে মু’মিনের জীবনে আমৃত্যু লড়াই শুরু হয়। মুসলিমের জীবনে সেটিই হলো পবিত্র জিহাদ। এ পথে চলার মাঝেই সে মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাপূরণ ও পরকালে জান্নাতপ্রাপ্তির স্বপ্ন দেখে। তাই ঈমানদার ব্যক্তি কখনোই স্বৈরাচারী, সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী, জাতীয়তাবাদী বা ফ্যাসিবাদী দুর্বৃত্তদের দলে শামিল হয় না। তাদের সমর্থক বা সৈনিক হয় না। ইসলামে শাস্তিযোগ্য গুরুতর হারাম কর্ম শুধু মানবহত্যা, মদ্যপান, সূদ-ঘুষ ও ব্যাভিচার নয়, বরং অপরাধ হলো ইসলামের শত্রুপক্ষের সৈনিক বা সমর্থক হওয়া।

ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা যখন গভীর এবং পথভ্রষ্টতা যেখানে বিশাল –একমাত্র তখনই কোন মুসলিম এরূপ হারাম কাজে লিপ্ত হতে পারে। অথচ বাংলাদেশে ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে মানবহত্যা, মদ্যপান, সূদ-ঘুষ ও ব্যাভিচারই শুধু বাড়েনি, বরং বিপুল ভাবে বেড়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়ে জান-মাল বিনিয়োগের ন্যায় অতিশয় নিষিদ্ধ ঘৃণ্য কর্ম। এভাবে বিপুল ভাবে বেড়েছে কবিরা গুনাহ ও মীর জাফরদের সংখ্যা। এসব মীর জাফরদের কারণে মুসলিম দেশে বিদেশী কাফেরগণই শুধু বিজয়ী হয়নি, দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে তাদের অধিকৃতিও। এবং শক্তি ও অধিকৃতি বেড়েছে ইসলামের দেশী শত্রুদেরও। তাতে বিলুপ্ত হয়েছে জিহাদ, খেলাফত, হদুদ ও শরিয়তের ন্যায় ইসলামের অতি মৌল বিধান। এভাবে ইসলাম তার নিজ ভূমিতেই পরাজিত হয়েছে। এবং অপরিচিতি বেড়েছে নবীজী (সাঃ)র ইসলামের।

 

সন্ত্রাসের আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন ও অধিকৃতি

ত্রাস সৃষ্টির প্রতি চেষ্টাই সন্ত্রাস। সত্যের শত্রুগণ নিরস্ত্র নয়। যুদ্ধহীনও নয়। তাদের রয়েছে ত্রাস সৃষ্টির তথা সন্ত্রাসের বিপুল সামর্থ। তাদের মধ্য থেকেই জন্ম নিয়েছে নমরুদ, ফিরাউন, হিটলার, বুশ, ব্লেয়ারের ন্যায় মানবহত্যার নৃশংস নায়কগণ। তারা শুধু ধর্মশূণ্যই নয়, আদর্শশূণ্যও। ধর্ম ও আদর্শের শূণ্যতা পূরণ করেছে মিথ্যাচার ও সহিংসতা দিয়ে।  নিজেদের গড়া মিথ্যাচার দিয়ে গড়েছে নিত্যনতুন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট –যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার গড়েছিল ইরাক যুদ্ধের বেলায়। লক্ষ্য একটিই; সেটি বিশ্বময় শোষণ ও আধিপত্য বিস্তার। সন্ত্রাসের সামর্থ্যই তাদের মূল সামর্থ্য। যুগে যুগে সামরিক দখলদারি, বর্ণবাদী ক্লিন্জিং, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, শত শত যুদ্ধ ও বিশ্বযুদ্ধ জন্ম দিয়েছে তারাই। আধিপত্যবাদ, সন্ত্রাস ও শোষণপ্রক্রিয়া নিয়ে বাঁচাই তাদের সংস্কৃতি। তাদের সন্ত্রাসের ভান্ডারে রয়েছে হাজার হাজার পারমানবিক অস্ত্র, রাসায়নিক অস্ত্র, যুদ্ধ বিমান, বিমানবাহী জাহাজ, সাবমেরীন ও লক্ষ লক্ষ সৈন্য। তাদের কারণে সন্ত্রাস এখন আর কোন বিশেষ দেশ বা মহাদেশে সীমিত নয়, বরং তা পেয়েছে বিশাল এক আন্তর্জাতিক রূপ। বিশ্ব রাজনীতি বস্তুত এরূপ সন্ত্রাসীদেরই কবজায়।

বিশ্বব্যাপী নিজেদের অধিকৃতি বাঁচাতে সাম্রাজ্যবাদী শাসকচক্র গড়েছে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন। গড়েছে জাতিসংঘ। দুর্বল দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অধিকৃতি এবং মুসলিম উম্মাহর উপর চাপিয়ে দেয়া বিভক্তির মানচিত্রের উপর তারা বৈধতার সিল লাগায় জাতিসংঘের হাত দিয়ে। তাদের কারণেই ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আফগানিস্তানসহ কোন দেশের সমস্যার সমাধানই আজ আর সম্ভব নয়। অসম্ভব হয়েছে মুসলিম বিশ্বের বুক থেকে বিভক্তির দেয়াল নির্মূল করা। জাতিসংঘের কাজ হয়েছে যুদ্ধ ও আগ্রাসনের রাজনীতিকে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখা এবং সে সাথে আগ্রাসী শক্তির আগ্রাসন ও অপকর্মের দ্রুত ন্যায্যতা দেয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ও ইরাক দখলের বিষয়টি  তাই নিন্দিত না হয়ে বরং বৈধতা পেয়েছে। বৈধতা পেয়েছে এমনকি আবু গারিব ও গোয়ান্তো নামো বে’র ন্যায় বর্বর নির্যাতন প্রক্রিয়াও। আধিপত্য বাঁচানোর লক্ষ্যে তারা শত শত যুদ্ধ এবং দুটি বিশাল বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে। হাজার হাজার টন বোমার পাশাপাশি পারমানবিক বোমাও নিক্ষেপ করেছে। যুদ্ধ, সন্ত্রাস, হত্যা, ধর্ষণ, অধিকৃতি ও লুণ্ঠন তাদের হাতে বিশ্বময় বিস্তার-লাভ করেছে। প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করেছে দু’টি বিশ্বযুদ্ধে।

 

জিহাদের অনিবার্যতা

সাম্রাজ্যবাদী কোয়ালিশনের কামানের মুখ এখন মুসলিম বিশ্বের দিকে। খৃষ্টান জগতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ স্নায়ু যুদ্ধ শেষ হয়েছে। তাদের সম্মিলিত  যুদ্ধ এখন এখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া –এ উভয় দেশের হাজার হাজার বোমা পড়ছে এখন মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রভূমি সিরিয়ায়। হাজার হাজার বোমা বর্ষিত হচ্ছে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়াসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের নগর, বন্দর ও গ্রামগঞ্জের উপর। বিধ্বস্ত হয়েছে চেচনিয়ার রাজধানী গ্রোজনী। তারা বিশ লাখের বেশী নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে একমাত্র আফগানিস্তান ও ইরাকে। বিদেশী আগ্রাসনের পাশাপাশী অধিকাংশ মুসলিম দেশ এখন অধিকৃত তাদের খলিফা দেশী স্বৈরাচারীদের হাতে। “ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল” যাদের জীবেনর মূল মিশন, তারা কি নিজ দেশে এরূপ নৃশংস দুষ্কর্মের নীরব দর্শক হতে পারে? মু’মিনের জীবনে জিহাদ তখন অনিবার্য হয়ে উঠে। সেটিরই বাস্তব আলামত হলো সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া ও কাশ্মীরের রনাঙ্গণ।  মু’মিনের জীবনে ঈমান যে বেঁচে আছে সেটি বুঝা যায় মূলত এই জিহাদ থেকেই।

ঈমানদারের জীবনে ঈমান ও জিহাদ একত্রে অবস্থান করে। ঈমান থাকলে জিহাদ থাকবেই। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা জিহাদের সে অনিবার্যতা বুঝিয়েছেন এভাবে, “একমাত্র তারাই মু’মিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনে এবং তারপর আর কখনোই সন্দেহ পোষণ করে না; এবং আল্লাহর রাস্তায় নিজের জান ও ধনসম্পদ দিয়ে জিহাদ করে। ঈমানের দাবীতে তারাই সাচ্চা। ” – ( সুরা হুজরাত, আয়াত ১৫ )। জিহাদ যে প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ, মুফাস্সিরগণ সেটির পক্ষে দলিল রূপে পেশ করেন সুরা হুজরাতের এই আয়াত। তবে জিহাদের অনিবার্যতা বুঝাতে এ আয়াতটিই একমাত্র আয়াত নয়। পবিত্র কোর’আনে এরূপ ঘোষণা বার বার এসেছে। সুরা নিসায় বলা হয়েছে, “সুতরাং পরকালের বিনিময়ে আল্লাহর  কাছে যারা দুনিয়ার এ জীবনকে বিক্রয় করেছে তারা যেন অবশ্যই আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে এবং অতঃপর নিহত হয় কিংবা বিজয় অর্জন করে, তাদেরকে নিশ্চয়ই আমি মহা প্রতিদান দান করবো‍। -(সুরা নিসা, আয়াত ৭৪।)  বলা হয়েছে, “যারা ঈমানদার তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায়, আর যারা কাফির তারা যুদ্ধ করে তাগুত তথা শয়তানের পথে। সুতরাং তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, শয়তানের  কৌশল অবশ্যই দুর্বল।  -(সুরা নিসা, আয়াত ৭৬)। উপরুক্ত আয়াতের অর্থঃ যুদ্ধ আসে কাফের বা মুসলিম –সবার জীবনেই। তবে মুসলিমের জীবনে সে যুদ্ধটি স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার পথে। জিহাদ যে প্রতিটি মু’মিনের জীবনে ফরজ, সে ঘোষনাটি যেমন পবিত্র কোর’আনে এসেছে, তেমনি এসেছে হাদীসেও। মুসলিম শরীফের হাদীসঃ নবীজী (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি জীবনে কখনোই জিহাদে অংশ নেয়নি এবং জিহাদের নিয়েতও করেনি সে ব্যক্তি মুনাফিক। তাই কারো জিহাদ ও প্রাণের কোরবানীকে স্রেফ নিন্দা করার মধ্য দিয়ে জিহাদের দায়ভার থেকে মুক্তি মেলে না। অন্যের জিহাদ ভাল না লাগলে দায়িত্ব তো নিজে উত্তম জিহাদের নমুনা পেশ করা।

 

জিম্মি ইসলাম ও অধিকৃতি শত্রুপক্ষের

মুসলিম দেশগুলিতে ইসলাম নিজেই আজ জিম্মি। সে জিম্মিদশাটি মুসলিম নামধারী ইসলামের  শত্রুপক্ষের হাতে। জিম্মি মানুষ যেমন তার নিজের অধীকার হারায়, তেমনি ইসলাম হারিয়েছে তার নিজস্ব বিধান প্রয়োগের  অধীকার। শরিয়তি বিধান তাই স্থান হারিয়েছে মুসলিম দেশের আদালতে। কোন দেশ যখন ইসলামের দেশী বা বিদেশী শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হয় এবং আইন-আদালত থেকে যখন বিলুপ্ত হয় শরিয়তি বিধান –তখন ইসলামের জন্য ঘটে এক বিশাল পরাজয়। এমন দেশে জিহাদ না থাকাটাই অভাবনীয়। সেটি সম্ভব দেশটি মুসলিমশূণ্য এবং মুসলিমগণ ঈমানশূণ্য হলে। একটি দেশ কতটা ইসলামশূন্য এবং মুসলিমগণ কতটা ঈমানশূণ্য -সেটি পরিমাপের জন্য সেদেশের মসজিদ ও মাদ্রাসার সংখ্যা গণনার প্রয়োজন আছে কি? সেদেশে জিহাদ, শরিয়ত, হুদুদ ও খেলাফতের উপস্থিতি কীরুপ -সেটিই চোখে আঙ্গুল দিয়ে তা দেখিয়ে দেয়। বাংলাদেশের মাত্র একটি জেলায় যতগুলি মসিজদ আছে খোলাফায়ে রাশেদার সময় সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তা ছিল না। টঙ্গির তাবলীগ এজতেমাতে যত লোকের জমায়েত হয় তা সে আমলে কোথাও সেটি হয়নি। অথচ সে আমলই ছিল ইসলামের সবচেয়ে গৌরব যুগ। কারণ তখন দেশের আইন-আদালত, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রণাঙ্গণসহ সর্বত্র পবিত্র কোর’আন বিজয়ী বিধান রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।

অথচ বাংলাদেশের ন্যায় দেশে ইসলামশূণ্যতা ও ঈমানশূণ্যতা সর্বত্র। মু’মিনের জীবনে “ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল” মিশন হলে কী হবে, দেশটি দুর্নীতিতে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে ৫ বার। যারা মসজিদ গড়ে বা তাবলীগের এজতেমাতে উপস্থিতি বাড়ায় বা ইসলামের নামে দল গড়ে -এ বিশাল ব্যর্থতা নিয়ে তাদের কোন পেরেশানী নাই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তাদের বিবেক “বোতাম আঁটা জামার নীচে শান্তিতে শয়ান”। তারা এতটাই বিবেকশূণ্য যে দেশের আইন-আদালত থেকে শরিয়তের বিলুপ্তি নিয়ে তাদের মাঝে কোন মাতম বা দুঃখবোধ নাই। দুঃখবোধ নাই, ১০ বা ১৫ বছরের শিক্ষা জীবনে ছাত্র-ছাত্রীদের কোরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা শোনানোর যে ব্যবস্থা নেই -তা নিয়েও। অথচ মুসলিম দেশে শিক্ষাব্যবস্থার মূল দায়িত্ব তো ছাত্রদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাটি নিশ্চিত করা। ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে মুসলিম শিশুদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে। এভাবে জাহান্নামে নেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে অতি পরিকল্পিত ভাবে। অথচ অনেকের গর্ব টঙ্গির এজতেমায় লোকসংখ্যা ও দেশে মসজিদ ও মাদ্রাসার সংখ্যা নিয়ে। আলেমদের মাঝে আগ্রহ নেই শরিয়তে প্রতিষ্ঠা নিয়েও। অথচ পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার সুস্পষ্ট ঘোষণা “যারা আমার নাযিলকৃত বিধান তথা শরিয়ত অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করেনা তারা কাফের। …তারা জালেম। …তারা ফাসেক। -(সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪, ৪৫ ও ৪৭)। বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে ইসলামের নামে যা বেড়েছে সেটি ব্যবসা। ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে জনগণের পকেটে যত সহজে হাত দেয়া যায় সেটি অন্যভাবে সম্ভব নয়। তখন নানারূপ দল, সমিতি বা প্রতিষ্ঠান গড়ে নিজের ও নিজ আপনজনদের আয়-উপার্জন বাড়ানো যায়। মুসলিম দেশগুলোতে দ্বীনের প্রতিষ্ঠা না বাড়লে কি হবে, এরূপ আয় বাড়ানো নিয়ে শুরু হয়েছে দিন-রাত প্রতিযোগীতা। ইসলাম মূলত এদের হাতেই আজ জিম্মি। 

 

মিথ্যচার কেন জিহাদের বিরুদ্ধে?

ঈমানশূন্যতার পথ ধরেই মুসলিমের মাঝে আসে জিহাদশূণ্যতা। ইসলামের শত্রুপক্ষ চায়, বীনা যুদ্ধে বা সামান্য যুদ্ধে মুসলিম ভূমিতে বিজয়লাভ। চায়, নিজেদের প্রতিষ্ঠিত  অধিকৃতিকে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখতে। এজন্যই তাদের লক্ষ্য, মুসলিমদের শক্তিহীন ও প্রতিরোধহীন করা। মুসলিমগণ যেহেতু প্রতিরোধের প্রেরণা পায় ঈমান ও ঈমানের গভীরতা থেকে উত্থিত জিহাদ থেকে, তাদের মূল স্ট্রাটেজী তাই মুসলিমদের ঈমানশূণ্য ও জিহাদশূণ্য করা। ঈমানশূণ্যতা ও জিহাদশূণ্যতা বাড়াতে ইসলামের শত্রুপক্ষ যেমন কোরআন শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রন করে, তেমনি নিষিদ্ধ করে জিহাদকেও

শয়তান ও তার অনুসারীগণ নিজদের শত্রুকে চিনতে ভূল করেনা। ভূল করেনি জিহাদের শক্তি ও গুরুত্বকে বুঝতেও। যেখানেই মহান আল্লাহতায়ালার পথে জিহাদ, সেখানেই তারা নিজ দর্শন, সংস্কৃতি, রাজনীতি, আইন-আদালত  ও ইন্সটিটিউশনের মৃত্যু দেখে। এমন ভয় তারা নামায-রোযা, হজ-যাকাতের মাঝে দেখে না। জিহাদই হলো মহান আল্লাহতায়ালার পথে মু’মিনের জানমাল বিনিময়ের পবিত্র ক্ষেত্র। এখানেই ঈমানের চুড়ান্ত পরীক্ষাটি হয়। ধরা পড়ে কে কতটা মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম পালন ও তাঁর দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় কোরবানী পেশে আগ্রহী। অতীতে দেশে দেশে ইসলামের বিজয় এসেছে জিহাদের ময়দানে বিশাল বিনিয়োগের বিনিময়েই। ইসলামের শত্রুপক্ষ তাই মসজিদে, হজে বা তাবলিগ জামায়াতের এজতেমায় লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েতে ভয় পায় না। তারা প্রচন্ড ভয় পায় জিহাদের ময়দানে মুজাহিদদের হাজিরা দেখে। তাই নামায-রোযা, হজ বা তাবলিগের উপর তারা বিধিনিষেধ আরোপ করে না। কিন্তু জিহাদকে চিত্রিত করে সন্ত্রাস রূপে। সেটি করে জিহাদের পবিত্রতা ও গুরুত্ব বিনষ্টের লক্ষ্যে।

জিহাদ কখনোই সন্ত্রাস নয়। জিহাদ জিহাদই। ঈমানদার মাত্রই মুজাহিদ হয়, কখনোই সে খুনি বা সন্ত্রাসী হয়না। সন্ত্রাসের যেমন নিজস্ব সংজ্ঞা রয়েছে, তেমনি সংজ্ঞা রয়েছে জিহাদেরও। জিহাদের গুরুত্ব ও পবিত্রতা তার নিয়তের মাঝে। জিহাদের লক্ষ্য মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাপূরণ। জিহাদে যারা নিজেদের জানমালের কোরবানী পেশ করে তারা ফেরেশতা নেয়; তাদের জীবনেও ভূল-ভ্রান্তি ঘটে। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা ও তাঁর শরিয়তি বিধানকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নিজেদের প্রাণের কোরবানীই তাদের সকল ভূলত্রুটি ও গোনাহকে পাকসাফ করে দেয়। ফিরাউনের দরবারে যে ক’জন যাদুকর প্রতিযোগীতায় নেমেছিল তারা সত্ত্বর নিজেদের ভ্রষ্টতা বুঝতে পেরেছিল। তাদের চোখে ধরা পড়েছিল হযরত মূসা (আঃ)এর প্রচারিত দ্বীনের সত্যতা। তারা সাথে সাথে মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান এনেছিল। কিন্তু সে সত্যকে চিনতে ব্যর্থ হয়েছিল ফিরাউন ও তার সহচরগণ। ফলে যাদুকরদের শান্তিপূর্ণ ইসলাম কবুলের বিরুদ্ধে ফিরাউন নৃশংস সন্ত্রাসে নেমেছিল। তাদের হাত-পা কেটে ও শূলে চড়িয়ে হত্যায় নেমেছিল। কিন্তু যাদুকরগণ তাতে দমেনি। ফিরাউনের কাছে আত্মসমর্পণের বদলে নির্মম ভাবে নিহত হওয়াকে তারা শ্রেয় মনে করেছিল। কারণ তারা বুঝেছিল, নির্যাতন সয়ে ও নিজের জান দিয়ে যদি জান্নাত জুটে তবে সেটিই হবে শ্রেষ্ঠ পাওয়া। এটিও জেনেছিল, ফিরাউনের কাছে আত্মসমর্পণে তাদের প্রাণ বাঁচালও তা অনন্ত-অসীম কালের জন্য নিশ্চিত করবে জাহান্নামের আগুণকে।

 

সর্বশ্রেষ্ঠ সামর্থ্য ও সেরা পুরস্কার

সত্য আবিস্কার ও সত্যের পক্ষে ত্যাগ ও প্রাণদানের সামর্থ্যই হলো মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সামর্থ্য। সে সামর্থ্য আনে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার। সেটি অনন্ত-অসীম কালের জন্য জান্নাতপ্রাপ্তি। এক্ষেত্রে ব্যর্থতাই জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। সে ব্যর্থতা আনে লক্ষ কোটি বছর তথা অসীম কালের জন্য জাহান্নামের আগুণ। লক্ষ্যণীয়, বহু নামাযী-রোযাদার, এমন কি বহু আলেমের জীবনে এরূপ কোরবানীর সামর্থ্য দেখা যায় না। সত্যের আবিস্কারে ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতার আলামতটিই বিশাল। ফিলে মুসলিম দেশে এরূপ আলেমদের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়লেও ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা একটুও বাড়েনি। সারা জীবন ধর্মকর্ম করার পরও এমন সামর্থ্য বনি ইসরাইলের বহু বৃদ্ধ আলেমের মাঝেও সৃষ্টি হয়নি। তারা বরং ইতিহাস গড়েছে মিথ্যার কাছে আত্মসমর্পণ ও জালেমের পক্ষে প্রাণ কোরবানীর। তাদের হাতে এজন্যই হযরত মূসা (আঃ)এর নাযিলকৃত শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠা পায়নি।  তারা হযরত ঈসা (আঃ)কে জেরুজালেমের কাফের রোমান গর্ভনরের হাতে তুলে দিয়েছিল এ দাবী নিয়ে, যেন তাঁকে হত্যা করা হয়। বনি ইসরাইলের এরূপ আলেমদের মহান আল্লাহতায়ালা ভারবাহী গাধা বলেছেন। একই পথ ধরেছে মুসলিম উম্মাহর বর্তমান আলেমগণ।

অথচ ইসলাম কবুলের পূর্বমুহুর্তেও ফিরাউনের দরবারের যাদুকরগণ যাদুর ন্যায় কবিরা গুনাহতে লিপ্ত ছিল। ইসলাম কবুলের সাথে সাথে তারা মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের পক্ষে সাক্ষ্যদান ও সে পথে প্রাণদানের মাঝেই মহা সাফল্য দেখেছেন। এরাই প্রকৃত শহীদ। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা এমন শহীদদের মৃত বলা হারাম ঘোষণা দিয়েছেন; এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিনা হিসাবে জান্নাতপ্রাপ্তির। সুসংবাদ দিয়েছেন নিহত হওয়ার সাথে সাথে গায়েব থেকে খাদ্যপ্রাপ্তির। সত্য আবিস্কার, সত্যের উপর অটল বিশ্বাস ও সত্যের পক্ষে তাদের কোরবানীর সামর্থ্যে মহান আল্লাহতায়ালা এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে পবিত্র কোরআনে সে ঘটনা তিনি বার বার উল্লেখ করেছেন। এভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তাদেরকে আদর্শ ঈমানদারীর মডেল রূপে খাড়া করেছেন। ঈমানের দাবীতে এরাই সাচ্চা। মহান আল্লাহতায়ালার বাহিনীর এরূপ সাচ্চা সৈনিকগণ প্রতি যুগেই শয়তানী শক্তির কাছে হত্যাযোগ্য শত্রু গণ্য হয়েছে। অথচ সত্যের পক্ষে সাক্ষ্যদান ছাড়া এ নিরস্ত্র ব্যক্তিগণ কোনরূপ অপরাধই করেনি। দুর্বৃত্ত ফিরাউন এরপরও তাদেরকে অতি নৃশংস ভাবে হত্যা করেছিল। তাদেরকে দেশের নিরাপত্তার শত্রু রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। সে অভিন্ন স্ট্রাটেজী ইসলামের আধুনিক শত্রুদেরও। সে স্ট্রাটেজীর অংশ রূপেই মুসলিম দেশে জিহাদ নিষিদ্ধ হয়; এবং অপরাধ রূপে গণ্য হয় শত্রুপক্ষের অধিকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অপরদিকে যারা দেশে দেশে সামরিক আগ্রাসন, শত শত শহর ধ্বংস ও লক্ষ লক্ষ মানব হত্যার সাথে জড়িত -সেসব সন্ত্রাসীদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন। ০৪/০৮/২০১৬  

 

 

 

 




কাশ্মীরের জিহাদ এবং ভারতের অপ্রতিরোধ্য পরাজয়

ফিরোজ মাহবুব কামাল

দিশেহারা ভারত

সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের শক্তি যখন সমগ্র বিশ্বে শীর্ষে -তখন তারা দুই বার পরাজিত হয়েছিল আফগানিস্তানে। সোভিয়েত রাশিয়ার সামরিক শক্তি যখন তুঙ্গে তখনও তারা পরাজিত হয়েছিল আফগানিস্তানে।  শুধু পরাজিত হয়নি, দেশটি ১৫ টুকরোয় বিভক্ত হয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাস্ত্রের ভান্ডারে যখন দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক ধ্বংসাকারি অস্ত্রশস্ত্র এবং আফগানিস্তানে হাজির হয়েছিল আরো ৪০টি মিত্র রাষ্ট্রের সৈন্য নিয়ে -তারাও বিজয় পায়নি আফগানিস্তানে। জিহাদের শক্তিই ভিন্ন। আফগানিস্তানে যে ব্রিটিশ, সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয়েছে ভারত তার চেয়ে শক্তিশালী নয়। কাশ্মীরের জিহাদও দুর্বল নয়। সেটি বুঝা যায় কাশ্মীরে ৬ লাখ ভারতীয় সৈন্যের সমাবেশ নিয়ে।

কাশ্মীর নিয়ে ভারত এখন দারুন দিশেহারা অবস্থায়। তাদের পরাজয় দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হচ্ছে। ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশয়িার যে অবস্থা হয়েছিল – কাশ্মীরে ভারত সেদিকেই এগুচ্ছে। তবে পার্থক্য হলো, মার্কিন ও রুশদের পক্ষে তাদের অধিকৃত দেশে কোমড় বেঁধে লড়বার প্রচুর লোক ছিল। কারণ, আফগানিস্তানে রাশিয়ান কম্যুনিস্টদের পক্ষে লড়বার জন্য হাজার হাজার আফগান কম্যুনিস্ট ছিল। তেমনি ভিয়েতনামে মার্কিনীদের পক্ষে ছিল কম্যুনিজম বিরোধী হাজার ভিয়েতনামী সৈনিক। কিন্তু ভারত কাশ্মীরে কোন রাজনৈতিক মতবাদ নিয়ে হাজির হয়নি, বরং হাজির হয়েছে নিরেট সাম্রাজ্যবাদী সামরিক আগ্রাসন নিয়ে। চাপিয়েছে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের নৃশংসতা। তাছাড়া সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সাথে রয়েছে কাশ্মীরীদের সাথে ভারতের অতীত প্রতারণার ইতহিাস। আছে আসমুদ্র-হিমাচল জুড়ে হিন্দু সাম্রাজ্য নির্মাণের স্বপ্ন। আছে মুসলিম বিরোধী প্রচন্ড সাম্প্রদায়িকতা। ফলে হিন্দু-সাম্রাজ্য নির্মাণে এ যুদ্ধটি ভারতীয় সৈন্যদের একাই লড়তে হচ্ছে। এবং সৈন্যদের প্রায় সবাই হিন্দু। অপর দিকে কাশ্মীরী মুজাহিদদের সাথে সমগ্র বিশ্বের বিশ্বের মুসলিম বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষদের সহমর্মিতা।

কাশ্মীরীদের স্বাধীনতার লড়াইটি দীর্ঘদিনের। শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে, যখন কাশ্মীরের হিন্দুরাজা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম প্রজাদের মতামতের তোয়াক্কা না করে ভারতে যোগ দিয়েছিল। কাশ্মীরী মুসলিমদের এ নায্য লড়াইকে ভারতীয় শাসক মহল সন্ত্রাস বললেও কাশ্মীরা তা বলে না। আগে লড়াইটি ছিল কাশ্মীরী জাতীয়তাবাদী লড়াই। কিন্তু এখন সেটি শতভাগ পবিত্র জিহাদ। এখানেই কাশ্মীরীদের লড়াইয়ের শক্তি। ভারতের জন্য বিপদ হলো, জিহাদ কোথাও একবার শুরু হলে তা আর থামে না। দিন দিন তা বরং শক্তিশালী হয়্। ভারতের কাশ্মীরে সেটিই হচ্ছে। সে জিহাদের মোকাবেলায় কাশ্মীরে ভারত ৬ লাখ সৈন্য মোতায়েন করেছে। শ্রীনগরসহ শহরগুলোর প্রতিটি শহরের প্রতিটি মহল্লায় এবং প্রতি রাস্তায় সারিবদ্ধ ভাবে ২৪ ঘন্টার জন্য অবস্থান নিয়েছে ভারতীয় সৈন্যরা। ভারত এরূপ বিশাল সংখ্যক সৈন্য ১৯৬৫ সালে ও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নিয়োজিত করেনি। অথচ এ বিশাল সৈন্য নিয়োগের পরও বিজয় মিলছে না। কতকাল এ যুদ্ধ চলবে সেটিও কেউ বলতে পারছে না। তাছাড়া যুদ্ধের মেয়াদ যতই বাড়ে, তাতে বাড়ে বিজয়ের বদলে পরাজয়ের সম্ভাবনা।

তাছাড়া প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো কাশ্মীরের পরিস্থিতইতে আরো জটিল করেছে। ভারতের সংবিধানে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ছিল, মোদি সরকার সেটিকে রহিত করেছে। ভারতের অন্য রাষ্ট্রের বাসিন্দাদের জন্য কাশ্মীরে ভূমি ক্রয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। মোদি সরকার সেটিও তুলে দিয়েছে। এ ছাড়া হিন্দু অধ্যুষিত জম্মু, মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর এবং বৌদ্ধ অধ্যুষিত লাদাখ – এ তিন অঞ্চলে কাশ্মীরকে বিভক্ত করেছে্‌। এছাড়া নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে গভর্নর শাসন জারি করেছে। তবে এতে লাভবান হয়েছে স্বাধীনতাকামীগণ।      

কাশ্মীরে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। অর্থাৎ ঢাকা শহরের জনসংখ্যার অর্ধেকের কিছু বেশী। অথচ তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ভারত সরকার ৬ লাখের বেশী সৈন্য মোতায়েন করেছে। ১৯৭১’য়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনা বাহিনী যে সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করেছিল -এ সৈন্যসংখ্যা তার চেয়ে ১৩ গুণের অধিক। জেনারেল নেয়াজীর মতে ১৯৭১’য়ে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানী সৈন্যদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৫ হাজার। (সূত্র: The Betrayal of East Pakistan; General A.K. Niazi)। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ১৯৭১’য়ে ছিল সাড়ে সাত কোটি – কাশ্মীরের আজকের মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ১০ গুণ। ভারতীয় সেনাবাহিনী এ অবধি এক লাখেরও বেশী মানুষকে হত্যা করেছে। তাদের হাতে বহু হাজার নারী ধর্ষিতাও হয়েছে। বহু হাজার মানুষকে তারা কারারুদ্ধ বা পঙ্গু করছে। কিন্তু তারপরও কাশ্মীরীদের স্বাধীনতার লড়াই থামা দূরে থাক -তা বরং দিন দিন প্রচন্ডতর হচ্ছে। জ্বলন্ত আগুণে লাগাতর পেট্রোল ঢাললে যা হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী পেট্রেোল ঢালার সে কাজটি করছে লাগাতর হত্যা, ধর্ষণ, জেল-জুলুম ও গৃহে অগ্নসংযোগের মাধ্যমে।

আগুণে লাগাতর পেট্রোল ঢালার কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। কিছু কাল আগে ভারতীয় সেনাবাহিনী ৯ বছরের এক বালক এবং ১৫ জন তরুণকে অতি নৃশংস ভাবে হত্যা করে। এতে সমগ্র কাশ্মীর জুড়ে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আগুণ। শ্রীনগর, বারামুল্লাহ, শোপর ও অন্যান্য নগরে হাজার হাজার তরুন ফিলিস্তিনী ইন্তেফাদার অনুকরণে ঢিল-পাথর নিয়ে ভারতীয় সৈন্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কাশ্মীরীদের এরূপ ইন্তেফাদা তথা গণজাগরণ ঠেকাতে ভারতীয় বাহিনী কাশ্মীরের প্রতিটি শহর ও গ্রামকে রণাঙ্গণে পরিণত করেছে। দেশ রণাঙ্গণ পরিণিত হলে নিজ বাহিনীর সৈনিক ছাড়া সবাইকে শত্রু মনে হয়। ভারতীয় বাহিনীর কাছে তাই হত্যাযোগ্য শত্রু মনে হচ্ছে রাজপথের নিরস্ত্র কাশ্মীরী  যুবকেরা। ফলে কাশ্মীরে নিরপরাধ মানব হত্যা অতি মামূলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাউকে হত্যা করার জন্য সন্ত্রাসী রূপে অভিযোগ আনাটাই যেন যথেষ্ট। কোনরূপ তদন্ত ভারতীয় সৈন্যদের কাছে অনর্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

জিহাদই একমাত্র পথ

কাশ্মীর সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথটি ভারত নিজেই বন্ধ করে দিয়েছে। কাশ্মীরীদের সামনে এখন যে পথটি খোলা রয়েছে সেটি হলো জিহাদের। শান্তিপুর্ণ সমাধান তো তখনই সম্ভব হয় যখন সামরিক আগ্রাসনের বদলে জনগণের মতামত গুরত্ব পায়। ভারতের কাছে কাশ্মীরী জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার গুরুত্ব নাই। তাদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে একমাত্র অখন্ড ভারত নির্মাণের প্রকল্প। হিন্দুত্ববাদী বিজিপী ক্ষমতায় আসাতে সে অভিলাষ আরো তীব্রতর হয়েছে। শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিল জাতিসংঘ; এবং সেটি ১৯৪৮ সালে। সে সময়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে কাশ্মীরে গণভোটের পক্ষে প্রস্তাব গৃহিত হয়েছিল। তাতে জনগণের অধিকার স্বীকৃতি পেয়েছিল। তারা পাকিস্তানে যোগ দিবে, না ভারতে থাকবে, না স্বাধীন থাকবে –সে সিদ্ধান্ত তারা নিজে নিবে। পাকিস্তান এবং ভারত –উভয়ই সে প্রস্তাব মেনে নেয়। জাতিসংঘের ইতিহাসে এই প্রথমবার সর্বসম্মতিতে গৃহিত জাতিসংয়ের একটি প্রস্তাবকে বিবাদমান দুই পক্ষই মেনে নেয়। মার্কিন এ্যাডমিরাল নিমিটজের উপর দায়িত্ব দেয়া হয় কাশ্মীরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের।

কিন্তু ভারত সরকার সে গণভোটে পরাজয়ের গন্ধ পেয়ে তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু ভেবেছিলেন তাঁর কাশ্মীরী বন্ধু শেখ আব্দুল্লাহ গণভোটে ভারতকে বিজয়ী করতে সহায়তা দিবেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই ভারতীয়দের আসল মতলব নিয়ে কাশ্মীরী নেতা শেখ আব্দুল্লাহর মোহভঙ্গ হয়। ভারত সরকারও তাঁর উপর আস্থা রাখতে পারিনি। গণভোটে পরাজয় নিশ্চিত জেনে জাতিসংঘ প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে ভারত সরকার লাগাতর বলা শুরু করে, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য্ অঙ্গ। এবং বলতে শুরু করে কাশ্মীর নিয়ে আর কোন আলোচনার প্রশ্ন উঠে না। বরং উস্কানীমূলক ভাবে একথাও বলে, আলোচনায় যদি বসতেই হয় তবে সেটি হবে কাশ্মীরের পাকিস্তানভূক্ত অংশকে কীভাবে ভারতের সাথে যুক্ত করা যায় তা নিয়ে। এ হলো কাশ্মীর সমস্যার সমাধান নিয়ে জাতিসংঘ প্রস্তাবনার সাথে ভারতের বিশ্বাসঘাতকতা।

প্রশ্ন হলো, ভারতীয়দের কাছে শান্তিপুর্ণ সমাধানের অর্থ যদি কাশ্মীরের ভারতভুক্তি হয় -তবে শত বছর আলোচনা চালিয়েও কোন লাভ হবে কী? ভারত সরকারের কথা, “আলোচনা চাই তবে কাশ্মীর যে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ -তা নিয়ে আলোচনার কোন সুযোগ নাই।” ভারতে এরূপ মনভাবের কারণে শুধু পাকিস্তান সরকারই নয়, কাশ্মীরীরাও ভারতের সাথে আলোচনায় আগ্রহ হারিয়েছে। আগ্রহ হারিয়েছে মধ্যস্থতাকারি প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘও। এমনই এক পক্ষাপটে জনগণ বুঝতে পেরেছে জিহাদ ছাড়া স্বাধীনতার রাস্তা নাই।

 

অবনতি ভারত-পাকিস্তান সর্ম্পকে

ইতিমধ্যে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সর্ম্পকেও মারাত্মক অবনতি ঘটছে। পাকিস্তানের বালাকটে বিমান হামলা করে ভারত অবস্থাকে আরো উত্তপ্ত করেছে। পঞ্চাশের দশকে  ভারত পানিচুক্তি করেছিল পাকিস্তানের সাথে। সে চুক্তিতে বিপুল ভাবে লাভবান হয়েছিল ভারত। সে সময় পাকিস্তানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সংকট ছিল প্রকট। পাকিস্তানকে চলতে হতো বিশ্বব্যাংকের কৃপার উপর। বিশ্বব্যাংকের চাপেই পাকিস্তান সে সময় অসম পানচুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এরপরও ভারত সে চুক্তি মানছে না। চুক্তি ভঙ্গ করে পানি তুলে নিচ্ছে সেসব নদী থেকে যে নদীগুলোর পানি পাকিস্তানের পাওনা। পাকিস্তানের সবগুলো নদী এসেছে কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে। ভারত শুরু করেছে সে গুলোর উপর বাঁধ-নির্মাণ। ফলে রাজনৈতিক বিবাদ এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বিপদ এখন তুঙ্গে। পাকিস্তান কাশ্মীর নিয়ে ৭০ বছর অপেক্ষা করেছে। কিন্তু এখন যদি পানি বিবাদে ৫ বছরও অপক্ষো করে তবে পাকিস্তানের বিরাট অংশ মরুভূমতি পরিণত হবে। তাই কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ না হলেও পানি নিয়েও যুদ্ধ অনিবার্য হতে চলেছে।

অপর দিকে কাশ্মীরের লড়াই এখন আর কোন সেক্যুলার যুদ্ধ নয়। রূপ নিয়েছে শতভাগ বিশুদ্ধ জিহাদে। রাজনীতি বহুলাংশই হাতছাড়া হয়ে গেছে কাশ্মীরের ও পাকিস্তানের সেক্যুলার নেতাদের হাত থেকে। হাতছাড়া হয়ে গেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাত থেকেও। অতীতে তিনটি যুদ্ধ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যা অর্জন করেছিল, মোজাহিদগণ চলমান জিহাদে তার চেয়ে বেশী অর্জন করেছে। ফলে বিপদ বেড়েছে ভারতের। আলাপ-আলোচনায় বসতে চাইলেও তারা পার্টনার পাচ্ছে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, আলাপ-আলোচনা লাগাতর চললওে তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। শত চুক্তি হলেও তাতে জিহাদ যে থামবে -সে সম্ভবনাও কম।

 

ভারতের অপ্রতিরোধ্য পরাজয়

ভারতের বিপদ দিন দিন বাড়ছে। ভারতের জন্য আসন্ন বিপদের কারণ, আফগানিস্তানে মার্কিনীদের পরাজিত দশা। আফগানিস্তানের যুদ্ধটিই হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘকালীন যুদ্ধ। তবে ২০ বছর যাবত চলা এ যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোন সফলতা পায়নি। মার্কিনী বাহিনী এখন পলায়নের রাস্তা খুঁজছে। পলায়নের পর্বটি নিরাপদ করতে দারুণ ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে পাকিস্তানের উপর। নইলে সৈন্য ও  রশদ-সামগ্রী নিরাপদে ফেরত নেওয়াই কঠিন হবে। কারণ, ঘরে ফেরার পথে লোটাকম্বল সাথে নিয়ে য্দ্ধু লড়া যায় না। তাই এ মুর্হুতে পাকিস্তানের উপর বেশী চাপ প্রয়োগের সুযোগ মার্কিনীদের হাতে নাই। তাই এতো দিন কাশ্মীরে পাকিস্তানীদের পরিচালিত জিহাদ থামাও বল মার্কিনীদের উপর ভারত সরকার যেরূপ চাপ দিত -সে সুযোগ এখন নাই। তাছাড়া আফগানিস্তান যখন সোভিয়েত রাশিয়ার দখলে ছিল তখন আনন্দে ভারত ডুগডুগি বাজিয়েছিল। সে খবর মার্কিনীরাও যেমন জানে, তেমনি তালবানগণও জানে। তালেবানগণ তাই প্রচন্ড ভারত বরিোধী। এবং অচিরেই আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতায় তারাই আসছে। এখানেই ভারতের জন্য বিপদ। ভারত থেকে তারা প্রতিশোধ নিবে -সেটাইি স্বাভাবিক। অপর দিকে কাশ্মীরের মুজাহিদগণ পাবে তাদের ঘনিষ্ট মিত্র। তাছাড়া জিহাদ কখনোই কোন ভৌগলিক সীমান্তে সীমিত থাকে না। ফলে আফগানিস্তানের জিহাদ যে নিজ ভূমিতে সীমিত না থেকে যে কাশ্মীরেও প্রবেশ করবে -সেটিই স্বাভাবিক। ভারতের হৃৎপিন্ডে এজন্য কম্পন শুরু হয়েছে।

অপরদিকে সোভিয়েত দখলদারীর সময় ভারতীয় চরগণ আফগানিস্তানে রুশদের ছত্রছায়ায় বসে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উস্কানী দিয়েছিল। কারণ, ভারতের পাকিস্তান ভাঙ্গার প্রকল্প ১৯৭১’য়ে শেষ হয়নি। ভারত চায়, অবিশিষ্ট পাকিস্তানও খন্ডিত হোক।  কিন্তু তালেবানদের হাতে ক্ষমতা যাওয়ায় তল্পিতল্পা সমেত ভারতীয় চরগণ কাবুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। তালেবানদের পরাজয় এবং মার্কিনীদের দখলদারীর প্রতিষ্ঠার পর ভারত সরকার আবার সেই একই ষড়যন্ত্র শুরু করে। বেলুচিস্তানের বিচ্ছন্নবাদীরা আবার পেতে শুরু করে ভারত থেকে প্রচুর অর্থ ও অস্ত্র। ফলে পাকিস্তাানের নানা শহরে শুরু হয় বোমা বি্স্ফোরণ।

তাই ভারতের সাথে পাকিস্তানের বিরোধ শুধু কাশ্মীর নিয়ে নয়। আরো বহু বিষয় নিয়ে। তবে রাজনীতির হাওয়া এখন ভারতের বিরুদ্ধে। ভারত এখন প্রবলতর এক জিহাদের মুখোমুখী। বিগত ২০ বছরেও যে জিহাদকে ভারতীয় সেনা বাহিনী পরাজিত করতে পারিনি, আগামী ২০ বছরে যে পারবে -সে সম্ভবনা ক্ষীণ। ভারতের জন্য মাওবাদী নকশালদের পরাজিত করা সহজ। কিন্তু অসম্ভব হলো জিহাদকে পরাজিত করা। কারণ, জিহাদে পক্ষ শুধু দুটি নয়, বরং এখানে থাকে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ। ফলে জিহাদের ময়দানে হাজির হন তাঁর ফেরেশতাগণ। তাই জিহাদ শতভাগ বিশুদ্ধ হলে তার পরাজয় নাই। সেক্যুলার সেনাবাহিনীর যুদ্ধ থেকে জিহাদের এখানেই মূল পার্থক্য। অতীতে সোভিয়েত রাশিয়া তাই আফগানিস্তানে জিততে পারিনি। পারছে না মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও তার মিত্রগণ। ফ্রান্স জিততে পারিনি আলজিরিয়াতে। ভারতের রাজনীতিকগণ সেটি টের না পেলেও দেশটির সেনাবাহিনী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

 

বিরামহীন রক্তক্ষরণের মুখে ভারত

তাছাড়া প্রতিটি যুদ্ধের খরচই অতি বিশাল। যুদ্ধে শুধু সৈনিকদেরই রক্তক্ষরণ ঘটায় না, গভীর রক্তক্ষরণ ঘটায় অর্থনীতিতে। তাই যারা উন্নয়ন চায় তারা যুদ্ধকে পরিহার করে। তাছাড়া ভারতের অর্থনীতিতে এখন দারুন মন্দা। অর্থনৈতিক উৎপাদন এখন শূণ্যের কোঠায়। এরপর কোভিড ১৯’য়ের কারণে দারুন মহামারি লেগেছে অর্থনীতিতে। তাছাড়া ভারত হচ্ছে social exclusion’য়ের দেশ। যে দেশ উন্নতি চায় সে দেশটি চায়, দেশের প্রতিটি মানুষ উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় শামিল হোক। তারা নেয় social inclusion’য়ের পলিসি। বাগানের সবগুলো গাছ ফল দিলে্ই তো উৎপাদন বাড়ে। কিন্তু উগ্র মুসলিমবিদ্বেষ ও বর্ণবিদ্বেষের কারণে ভারতে সেরূপ জনকল্যাণমূলক মহৎ নীতির কোন স্থান নাই। ফলে ২০ কোটি মুসলিম এবং ২০ কোটি দলিত –এ ৪০ কোটি মানুষকে উন্নয়নের প্রক্রিয়ার ধারে কাছে আসতে না দেয়াই ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের নীতি। বিজেপির ক্ষমতায় আসাতে সে নীতি আরো তীব্রতর হয়েছে্। একারণেই ভারতের ১৩০ কোটি মানুষের অর্থনীতি ১৩ কোটি মানুষের জাপানের চেয়েও ক্ষুদ্রতর।

একজন সৈনিককে রণাঙ্গণে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি  বছর খরচ হয় এ মিলিয়ন তথা ১০ লাখ ডলার। এটা ঠিক, একজন ভারতীয় সৈন্যকে রণাঙ্গণে রাখতে ১০ লাখ ডলার খরচ হয় না। কারণ, মার্কিন সৈনিক জীবনযাত্রার যে মান, সে মান ভারতীয় সৈনিকদের নাই। কিন্তু সে খরচ কি গড়ে মার্কিনীদের চেয়ে ২০ গুণ কম অর্থাৎ আধা লাখ ডলারও হবে না? এবং বছরে মাথা পিছু খরচ আধা লাখ ডলার হলে তাতে ৬ লাখ সৈন্যকে শুধু রণাঙ্গণে রাখতেই খরচ হবে ৩০ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া আছে অস্ত্রের খরচ। ফলে ২০ বছরে খরচ হবে ৬০০ বিলিয়ন ডলার। ফলে পাকিস্তানের জন্য এটি এক মহা সুযোগ। তাদের চিরশত্রু এখন ফাঁদে পড়েছে। ফলে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে যুদ্ধ শুরু করার কোন প্রয়োজনই নাই। ভারতীয় সেনা বাহিনী রণাঙ্গণে এরূপ বিশ বা তিরিশ বছর ফেঁসে থাকলেই তো তাদের লাভ।

দেহ যত বিশালই হোক, লাগাতর রক্তক্ষরণ হলে হাতিও নির্জিব হয়ে মাটিতে ঢলে পড়ে। ভারত কোন অর্থনৈতিক হাতি নয়, বরং দুনিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠির বসবাস হলো ভারতে। তাছাড়া দেশটিতে চলছে গভীর অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ। কাশ্মীবের যুদ্ধ সে রক্তক্ষরণ তারা তীব্রতর করছে্। অনুরূপ রক্তক্ষরণের কারণেই সোভিয়েত রাশিয়ার ভেঙ্গে ১৫টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। ভারত কি সেদিকেই এগোচ্ছে না? ফলে কাশ্মীরী জনগণ নয়, বরং শিখ, মেজো, নাগা, মনিপুরীসহ আরো বহু মজলুম জনগণই যে ভারতের জিন্দান ভেঙ্গে স্বাধীন হবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? ২৫/০১/২০২১।

 

 




গণতন্ত্র যেখানে গণহত্যা এবং জবরদখল যেখানে লেবারেশন

ফিরোজ মাহবুব কামাল

আগ্রাসন যেখানে লিবারেশন

ইরাকী জনগণকে স্বৈরাচার থেকে  মুক্তি দিবে এবং গণতন্ত্র উপহার দিবে বলে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেন। কিন্তু তারা স্বৈরাচার থেকে আর কি মুক্তি দিবে, বরং মুক্তি দিচ্ছে অগণিত নারীপুরুষ ও শিশুকে তাদের প্রাণে বেঁচে থাকা থেকেই। গণহত্যা ও ধ্বংসকে তারা রীতিমত স্পোর্টসে পরিণত করেছে। তাদের আরেক যুক্তি ছিল, ইরাকের হাতে weapons of mass destruction তথা ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের কারখানা রয়েছে। যুদ্ধ করে সে অস্ত্র নির্মান বন্ধ করবে। সেটিও যে বিশাল মিথ্যা তাও প্রমাণিত হয়েছে। ইরাকের দক্ষিণ থেকে উত্তর সীমান্ত পর্যন্ত শত শত মাইল তারা দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এ বিশাল ইরাকী ভূমির কোথাও weapons of mass destruction এর কারখানা পায়নি। আর যদি থেকেও থাকে তবে সমগ্র ইরাকজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর এবং খোদ বাগদাদে মার্কিন সেনা প্রবেশের পর ইরাক যে এখনও সেটির প্রয়োগ করেনি -সেটিই কি প্রমাণ করে না যে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও প্রধান মন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের চেয়ে এমন অস্ত্র সাদ্দামের কাছে থাকাই বেশী নিরাপদ?

ইরাকের ভূমিতে মার্কিন ও বৃটিশ সৈনিকের উপর রাসায়নিক বোমা হামলা হলে পারমানবিক বোমা ব্যাবহার করা হবে বলে হুমকি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বুশ ও বৃটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেফরি হুন। অথচ সশস্ত্র হানাদার ঘরে ঢুকলে তার উপর হামলার অধিকার প্রতিটি গৃহকর্তারই থাকে। অবৈধ ও অন্যায় হামলার শিকার হয়েছে ইরাক। ফেলা হয়েছে হাজার হাজার টন বোমা। এমন বোমা ওয়াশিংটন বা লন্ডনে ফেলা হলে তারা কি করতো? পারমানবিক বোমাসহ কোন বিধ্বংসী মারনাস্ত্রই কি তারা গুদামে ফেলে রাখতো? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূ-খন্ডে জাপানীরা বোমা ফেলেনি, ওয়াশিংটন বা নিউয়র্কও আক্রান্ত হয়নি। অথচ জাপানের নাগাসাকি ও হিরোশিমা –এ দু’টি বৃহৎ শহরকে পারমানবিক বোমায় নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। ফলে বিশ্বে কারা সবচেয়ে দায়িত্বহীন এবং কাদের হাতে বিশ্বশান্তি সবচেয়ে বেশী হুমকীর সম্মুখীণ সেটি কি বুঝতে বাঁকি থাকে? অতএব বিশ্বকে অশান্তি ও বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে যে দেশটিকে প্রথমে অস্ত্রমূক্ত করা দরকার সেটি কি ইরাক না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?

ইঙ্গোমার্কিন সামাজ্যবাদ ইরাকের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যাকে যেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বলছে তেমনি এ বিধ্বংসী সামরিক আগ্রাসনকে বলছে লিবারেশন। অপরদিকে ইরাকীদের প্রতিরোধকে বলছে সন্ত্রাস। এভাবে ডিকশোনারিই পাল্টিয়ে দিচ্ছে। অন্যায়কে বলছে ন্যায়, চরম বর্বরতাকে বলছে সভ্যতা। আর এরাই সভ্যতা ও গণতন্ত্র শেখাতে চায় বিশ্ববাসীকে! তাদের প্রত্যাশা, ইরাকী জনগণ অস্ত্র ফেলে কুর্ণিশ করবে। তাদের মাথায় ফুল ও আতর ছিটাবে। দুনিয়ার তাবত দুর্বৃত্ত দস্যুদের একই রুচি। যে কোন দুর্বৃত্তের কাছেই অতি অনাকাঙ্খিত হলো প্রতিরোধ, সে তো চায় আত্মসমর্পণ। ইরাকী জনগণ তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে না সেটিই ইঙ্গোমার্কিন জোটের কাছে বড় অপরাধ।  সে অপরাধের শাস্তি দিতে তারা বিধস্ত করছে বাগদাদ, বসরা, কারবালা, নজফ, কিরকুক, মসোলের ন্যায় শহরগুলোকেই শুধু নয়, সমগ্র ইরাককে। সভ্যতা কি ভাবে জন্মেছিল, কি ভাবে হাঁটি-হাঁটি, পায়ে-পায়ে সামনে এগিয়েছিল – সমগ্র ইরাক হলো তারই নিদর্শন। এজন্যই দেশটিকে বলা হয় ক্রাডল অব সিভিলাইজেশন। ইঙ্গোমার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ভান্ডারের সর্বাধিক বিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে নেমেছে সেটির বিনাশে। হাজার হাজার ঐতিহাসিক নিদর্শন ইতিমধ্যে ট্যাংকের তলায় বা বোমার আঘাতে বিনষ্ট হয়েছে। মানব সভ্যতার জন্মভূমি এভাবেই আজ ধুলিস্যাৎ হচ্ছে। ফলে ইঙ্গোমার্কিনীদের অপরাধ শুধু ইরাকের বিরুদ্ধে নয়, সমগ্র মানব জাতির বিরুদ্ধে। অথচ বিশ্ববাসী সেটিই নীরবে দেখছে। সে নীরব-দর্শনকে টিভি, ইন্টারনেট, পত্র-পত্রিকা আরো সহজতর করে দিয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ও আই সি,  আরব লীগসহ সকল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে আজ একই মৃত্যুবৎ নীরবতা।

 

ষড়যন্ত্র গণতন্ত্র নির্মূলে

আর স্বৈরাচার-মুক্তির কথা? বোমায় কি কখন স্বৈরাচার নির্মূল হয়? ইরানের শাহ, চিলির পিনোশে, ফিলিপাইনের মার্কোস বা ইন্দোনেশিয়ার সোহার্ত কি বোমায় নির্মূল হয়েছে? বোমায় যারা নির্মূল বা পঙ্গু হয় তারা নিরীহ মানুষ, স্বৈরাচার নয়। বরং এতে নয়া স্বৈরাচারের রাস্তা প্রস্তুত করা হয়। আফগানিস্তানে সেটিই হয়েছে। তাছাড়া এ বিশ্বে স্বৈরাচারের সংখ্যা কি কম? মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি দেশেই তো স্বৈরাচার। এবং তাদের নির্মূলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব, কুয়েত, জর্দানসহ সর্বত্র কি তাদের পাহাদারির ব্যবস্থা করতে মার্কিন বা বৃটিশ সৈন্য মোতায়ান করা হয়নি? অপর দিকে স্বৈরাচার নির্মূল ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কারণেই কি ইরানের উপর বিপদ নেমে আসছে না? প্রেসিডেন্ট কার্টারের সময় একবার হামলাও করা হয়েছিল। এ দেশটির প্রতি মার্কিনীদের এখনও আক্রোশ এ কারণে যে কেন মার্কিন যুক্তরাষ্টের  তাঁবেদার মহম্মদ রেজা শাহকে উৎখান করা হলো। একই অপরাধে ১৯৫৬ সালে ইরানে সামরিক অভ্যুর্থাণে উস্কানি দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তখন তারা দেশটির নির্বাচিত প্রধান মন্ত্রী মোসাদ্দেককে হটিয়ে বিতাড়িত শাহকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে শাহ পুণরায় বিতাড়িত হয়ে আশ্রয় পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

মার্কিনীদের আগ্রহ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নয়, বরং গণতন্ত্রের নির্মূলে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মার্কিনীদের এত আগ্রহ থাকলে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওম্মান, জর্দান ও বাইরাইনের ন্যায় দেশগুলীতে তা হচেছ না কেন? এ সব রাষ্ট্রে গণতন্ত্রচর্চা দূরে থাক, রাস্তায় সভা, মিছিল বা মত প্রকাশের অধিকারও নেই। অথচ এসব দেশের সরকার মার্কিনীদের অতি পছন্দের। জনগণ যেহেতু মার্কিন হামলার বিরোধী, ফলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে এ দেশগুলির ঘনিষ্টতা বাড়তো ইরাকের সাথে। মার্কিনীদের ঘাঁটি নির্মান তখন কি সম্ভব হতো? তখন তেলের উপর প্রতিষ্ঠিত হতো জনগণের মালিকানা। অতএব বাধাপ্রাপ্ত হতো তেলের লুন্ঠন। এটিই কি তাদের গণতন্ত্রের সাথে শত্রুতার মূল কারণ নয়?   

মার্কিনীদের এসব ধোকাবাজী জনগণ যে বুঝে না তা নয়। জনগণ কি এতই বোকা যে হীংস্র পশুর নখরে ভাইবোন ও নিজ শিশুদের ছিন্ন ভিন্ন হতে দেখেও সে পশুটিকে আলিঙ্গণ করবে? ভেবেছিল, ইরাকের ধ্বংসে হাজার হাজার টন বোমা ফেললে কি হবে তাদের সৈন্যদেরকে আহলান সাহলান বলা হবে। সম্ভার্ধনা জানাতে প্রতি জনপদে মিছিল হবে। কিন্তু কোথাও সেটি হয়নি। ইরাকে কেন, সমগ্র আরব বিশ্বে হয়নি। যেটি হয়েছে সেটি শাসক মহলে। কারণ তারাই মার্কিনীদের আসল প্রজা। এ আগ্রাসী শক্তিকে তারাই সর্বপ্রকার সহায়তা দিচ্ছে। পবিত্র হজ্ব বা উমরাহ পালনে ভিসা পেতে একজন মুসলিমকে কতো ঝামেলাই না পোহাতে হয়, অথচ মার্কিনীদেরকে অবাধ অনুমতি দিয়েছে এ পবিত্র ভূমিতে অস্ত্র নিয়ে ঢুকার। অধিকার দিয়েছে ঘাঁটি নির্মানের। মার্কিনীরা অবাধ সুযোগ পেলেও জনগণ সুযোগ পাচ্ছে না ইরাকী মুসলমানদের ধ্বংস ও মৃত্যু দেখে প্রতিবাদে রাস্তায় নামার। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশও তারা নিষিদ্ধ করেছে। এ ভয়ে না জানি অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তাদের অভ্যাসে পরিণত না হয়। কারণ, নিজেদের বর্বর শাসনই তখন অসম্ভব হবে। নিজেদের অন্যায় হামলাকে জায়েজ করতে বুশ ও ব্লেয়ার বহু বার বলেছেন, সাদ্দাম হোসেন প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি। ইরাকের প্রতিবেশী ইরান ও সিরিয়া, ফলে তাদের কথা মতো সাদ্দামের পতনে এ দেশ দুটি সর্বাধিক খুশী হবে সেটি ছিল স্বাভাবিক। অথচ মার্কন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রামসফিল্ড ও সেক্রেটারী অব স্টেটস কলিন পাওয়েল ইরান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে হুশিয়ারি দিয়েছে যে তারা ইরাককে সহায়তা দিচ্ছে। অতএব ইরাক প্রতিবেশী দেশগুলির প্রতি হুমকি – এ অভিযোগের সত্যতা কোথায়? ফলে ইরাকের উপর আগ্রাসনের সমগ্র ভিত্তিটাই যে মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত তা নিয়ে সন্দেহ থাকে কি?

 

সংঘাত সভ্যতার

ইরাকে আজ যে বর্বরতা চলছে সেটি কি শুধু জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের? এ যুদ্ধ সমগ্র পুঁজিবাদী সভ্যতার্। এবং এটি ইসলামের বিরুদ্ধে। সামরিক আগ্রাসন, অর্থনৈতিক শোষণ ও গণহত্যা – এগুলি পুঁজিবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার সার্বজনীন সংস্কৃতি। শোষণ-নির্ভর এ সভ্যতার এ গুলোই হলো মূল উপকরণ। এজন্যই আগ্রাসন ও গণহত্যা চালাতে নিজ দেশে সমর্থণ পেতে এদের সামান্যতম বেগ পেতে হয় না। প্রতিটি সফল ডাকাতি ডাকাত পরিবারে আনন্দের হিল্লোল বয়ে আনে। কারণ, এতে রাতারাতি বৃদ্ধি ঘটে বিত্ত-বৈভবে। যে সমৃদ্ধি বাড়াতে অন্যদের যে ভাবে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটতে হয় -তাদের সেটির প্রয়োজন পড়ে না। তাই ইরাকের পতন অত্যাসন্য দেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের প্রায় প্রতি মহলে আনন্দের হিড়িক। এ স্বার্থচেতনা থেকে এদের সবচেয়ে বিবেকবান ব্যক্তিরাও মূক্ত নয়। ফলে ডেইলি গার্ডিয়ান ও মিররের মত পত্রিকাও চায় এ আগ্রাসী য্দ্ধুটি বৃটিশ সৈন্যরা নিরাপদে সমাধা করুক। ব্রিটেনের লেবারেল ডিমোক্রাটিক পার্টির মত দল যারা প্রথমে যুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল তারাও চায় তাদের সৈন্যদের বিজয়। এমন কি মি. রবিন কুক যিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করছেন তিনি ইরাকের ত্বরিৎ পরাজয় চান। একই অবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সাথে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের যত বিরোধই থাক, মার্কিন আগ্রাসন যাতে সফল হয় সেটিই তাদের অভিন্ন এজেন্ডা।

এমন এক অভিন্ন চেতনার কারণেই পরদেশে আগ্রাসন ও গণহত্যায় পুঁজিবিণিয়োগে তাদের পুঁজির অভাব হয় না। বৃটেনে এখন অর্থনৈতিক মন্দা। স্বল্প মজুরীর কারণে কর্মচারিরা বিক্ষুব্ধ, অনেকে ধর্মঘটেও নেমেছে। কিন্তু তাদের বেতন বাড়ানোর পয়সা না থাকলে কি হবে, সরকার তিন বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছে যুদ্ধ খাতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪ কোটিরও বেশী মানুষের স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত, কিন্তু সে দেশের সরকার যুদ্ধ খাতে ৭৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছে। একই কারণে অতীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নিজেদের নিম্ন মানের কাপড়ের বাজার বাড়াতে যখন বাঙলার মসলিন শিল্পীদের হাতের আঙ্গুল কাটছিল তখনও সে জঘন্য কাজে অর্থের জোগানদার পেতে তাদের বেগ পেতে হয়নি। পুঁজি বিনিয়োগে তখনও কমতি পড়েনি যখন নিগ্রোদের গলায় রশি বেঁধে হাটে বাজারে বিক্রি করাকে বাণিজ্যে পরিণত করেছিল বা রেড ইন্ডিয়ানদের নির্মূলকে রাজনীতি ভাবতো। ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এটিই হলো ঐতিহ্য। ইরাকের বিরুদ্ধে একটি অন্যায় যুদ্ধ বিপুল ভোট পার্লামেন্টে কেন গৃহীত হয় -সেটি বুঝতে কি এর পরও কিছু বাঁকি থাকে?

 

উলঙ্গ হলো সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র

অবর্ণনীয় দুঃখের পাশে ইরাকে আগ্রাসন ও গণহত্যা বিশ্ববাসীকে এক অপূর্ব সুযোগও দিয়েছে। সেটি হলো, পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ যে কতটা বর্বর সেটি। এ বিষয়টি কোটি কোটি ঘন্টা বক্তৃতা দিয়ে বা হাজার হাজার বই লিখে বুঝানো সম্ভব হতো না। সাম্রাজ্যবাদ এখন স্বমূর্তিতে হাজির। দূর্বৃত্তের বন্ধু হওয়ার মধ্যে প্রচন্ড অসম্মান আছে। সমাজের দুর্বৃত্তরা এজন্য অর্থশালী হলেও বন্ধুহীন হয়। ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা তেমনি এক অবস্থার মুখোমুখী বিশ্বজুড়ে। ফলে যে ফ্রান্স, জার্মান ও বেলজিয়াম সেদিনও যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের সাথে গলায় গলায় ভাব রেখেছে তাদের কাছে ভিড়তেও আজ তারা ভয় পায়। এ ভয়ে যে, তাদের গায়ের গলিত দূর্গন্ধ না জানি নিজেদের গায়ে জড়িয়ে না যায়। একই ভয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জালেম স্বৈরাচারিরা গোপনে সহযোগীতা করলে প্রকাশ্যে মার্কিনীদের প্রশংসা করা বাদ দিয়েছে।

ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অধিকৃত জনগণের প্রতিরোধকে সাম্রাজ্যবাদী মগল যতই সন্ত্রাস বলে চিত্রিত করুক না কেন -এ যুদ্ধ জিহাদ রুপে গণ্য হচ্ছে সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে। শিয়া-সূন্নী, হানাফী-শাফেয়ী, আরব-অনারব -কারো মধ্যেই এ নিয়ে আজ মতবিরোধ নেই। এটি যে শতভাগ ধর্ম যুদ্ধ সে ফতোয়া আসছে শিয়া ও সূন্নী উভয় পক্ষ থেকেই। মুসলিম বিশ্বকে আর কোন বিষয়ই এতটা একতা বদ্ধ করতে পারিনি -যা এ আগ্রাসন পেরেছে। এটি এক বিরাট অর্জন। প্রতিটি বিবেকমান মানুষের দায়িত্ব, এ বিরল অর্জনকে ধরে রাখা। মানব সভ্যতার স্থায়ী মূল্যবোধ নির্মাণ করতে হবে এ অন্যায় ও অসভ্যতার বিরুদ্ধে ঘৃনাবোধকে চির-জাগ্রত রাখার মধ্য দিয়ে। এ ঘৃনাবোধ বাঁচলে বিবেকবান মানুষ মাত্রই তাদের তাঁবেদার হতে ঘৃণা করবে।

 

ষড়যন্ত্র মানবিক মূল্যবোধ নির্মূলে

সবাই জানে দুর্বৃত্তিতে অর্থপ্রাপ্তি ঘটে। কিন্তু এরপরও বিবেকবান মানুষ মাত্রই সে পথে যে পা বাড়ায় না -সেটি দূষ্ট কর্মের প্রতি তীব্র ঘৃনাবোধ থেকেই। কিন্তু জালিমগণ সেটিই মুছে ফেলতে চায়। দুর্বৃত্ত শাসকের ক্ষমতা লাভে জাতীয় জীবনে যে মহাবিপর্যয়টি ঘটে -সেটি এই মূল্যবোধের ক্ষেত্রে। বিপর্যস্ত এ মূলবোধের কারণে এজিদের ন্যায় দূর্বৃত্তের সৈনিক হওয়ার মধ্যেও পাপবোধ  থাকে না। এ পাপবোধকে নির্মূল করতেই মুসলিম বিশ্বের জালেম শাসকেরা সবসময়ই স্বচেষ্ট হয়েছে যে মানুষের স্মৃতি থেকে এজিদদের কুকর্ম মুছে যাক। ভুলে যাক কারবালার অতি বিয়োগান্ত ঘটনা। ভুলে যাক ইমাম হোসেনের শাহাদতের শিক্ষা। উমাইয়াদের থেকে শুরু করে সর্বযুগের স্বৈরাচারি এজিদদেরা এজন্য বিস্তর অর্থ ব্যয় করেছে আলেমদের পিছনে। আশুরা আসে, আশুরা চলেও যায়। আশুরা নিয়ে বহুবিধ আলোচনাও হয়। লম্বা আলোচনা হয় নফল রোজার ফজিলত নিয়ে। কিন্ত যে ফরজকে সমূন্নত রাখতে মুসলিমদের সার্বজনীন ইমাম ও জান্নাতের যুব-সর্দার ইমাম হোসেন শহিদ হলেন তা নিয়ে অধিকাংশ মসজিদে আজ আর অলোচনাই হয় না। এটিই হলো আজকের আলেমদের বড় বিচ্যুতি। যেন ইমাম হোসেন শিয়া এবং তিনি শিয়াদের! বিভ্রান্ত আলেমদের কারণে এ পৃথিবীতে মহান আল্লাহতায়লার একমাত্র প্রতিষ্ঠান মসজিদগুলো প্রাণহীন হয়েছে। মুসলিম বিশ্বজুড়ে আজ যে এজিদদের সংখ্যাবৃদ্ধি, শরিয়তের অনুপস্থিতি এবং ইমাম হোসেন (রাঃ) অনুসারিদের কমতি -সেটি তো ইমাম হোসেনের (রাঃ) সে শিক্ষাকে ধরে না রাখার কারণেই। এবং সেটি প্রতিরোধহীন করেছে এমন কি কাফের শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও। মুসলিম বিশ্বে আজ যে দুর্গতি তার মূল কারণতো এই বিচ্যুতি।

একই কৌশলে সাম্রাজ্যবাদীরাও চায় তাদের র্বরতার বিরুদ্ধে যে ঘৃনাবোধ সৃষ্টি হয়েছে সেটি মুসলিম মানস থেকে মুছে ফেলতে। এমন ঘৃণাবোধ তখনও সৃষ্টি হয়েছিল যখন তারা লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনীদের ভিটাছাড়া করে ইসরাইল প্রতিষ্টা করেছিল। আগুণ ধরিয়ে দিয়েছিল বাইতুল মোকাদ্দসে। কিন্ত ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রজ্যবাদের বিরুদ্ধে সে ঘৃণাবোধ স্থায়ী হয়নি। দুর্বত্ত মাত্রই জানে, অর্থে শুধু শাক-শবজিই কেনা যায় না, বিস্তর মানুষও কেনা যায়। বিশ্ব জুড়ে সিআইএ ও বৃটিশ গুপ্তচর সংস্থা মানব-ক্রয়ের সে কাজটিই করেছে। যে মিশর ছিল ইসরাইলের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে যুদ্ধাংদেহী সে মিশরকে কিনতে তারা কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এ অর্থব্যয় যে শুধু আনোয়ার সা’দাতের মত সেক্যুলারিষ্টদের উপর হয়েছে তা নয়, এ অর্থ এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে পৌছেছে যেখানে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মোজাহিদ সৃষ্টির সম্ভ্বানা রয়েছে। ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রজ্যবাদ এ লক্ষে কোয়ালিশন গড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারি রাজা-বাদশাহ ও শেখদের সাথে। এ কোয়ালিশন যে কতটা গভীর সেটি কি ইঙ্গো-মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে এসব রাজাবাদশাহ ও শেখদের নীরবতাই কি প্রমাণ করে না?

বনের পাখি ধরতে শিকারী যেমন খাঁচার পাখিকে ব্যবহার করে, তেমনি মুসলিম বিশ্বের বহু নেতা, সংগঠন, লেখক ও  বুদ্ধিজীবী ক্রয়ে সিআইএ এসব জোব্বাধারী রাজাবাদশাহ ও শেখদের ব্যবহার করেছে। ফলে অধিকৃত হয়েছে মুসলিম দেশগুলিই শুধু নয়, বরং হাজার হাজার মসজিদ, মাদ্রাসা, ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলন। মুসলিম বিশ্বের বিপদ এখানেই। ফলে পবিত্র মক্কায় শত শত হাজী-হত্যকে মুসলিম বিশ্ব যেভাবে ভুলে গেছে বা ইসরাইলের অস্তিত্বকে যেভাবে নীরবে মেনে নিচ্ছে তেমনি হয়তো ভূলে যাবে ইরাকের উপর ইঙ্গো-মার্কিন বর্বরতাকেও। তখন গণহত্যা স্বীকৃতি পাবে মানবাধিকার রূপে এবং জবরদখলও চিত্রিত হবে ইরাকের লেবারেশন রূপে। কিন্তু কথা হলো, মুসলিম বিশ্বের বিবেকমান মানুষ গুলোও কি এসব মেনে নিবে? তাদের কি এ নিয়ে কিছুই করার নেই?  ০৭/০৪/২০০৩ 




মুসলিম বিশ্বে মার্কিনী সন্ত্রাস: প্রতিরোধ কীরূপে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

তান্ডব মার্কিন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের

নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচার স্বার্থে আশেপাশের হিংস্র জন্তু-জানোয়ারদের চিনতে হয়। জানতে হয় তাদের বিচরনের ক্ষেত্রগুলোকেও। গড়ে তুলতে হয় হিংস্র পশুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সামর্থ্য। নইলে প্রাণ বাঁচে না। তেমনি যে বিশ্বে বসবাস, জানতে হয় সে বিশ্বের হিংস্র দানবদেরও। গড়ে তুলতে হয় সে দানবদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্ট্রাটেজী। এ পৃথিবী পৃষ্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছ মানব ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী দানব রূপে। তার নাশকতার সামর্থ্য তূলনাহীন। দেশটি ইতিমধ্যেই বহু দেশে বহু বীভৎস নাশকতা ঘটিয়েছে। তাছাড়া দেশটির ভান্ডার এখনো রয়েছে নাশকতার বিপুল সামর্থ্য। সে সাথে রয়েছে সে নাশকতার নেশাও। মানব জাতির জন্য তাই এটি বিপদজনক পরিস্থিতি। এ নিবন্ধ লেখার মূল উদ্দেশ্য তেমনি একটি পরিস্থিতির বাস্তবতাকে তুলে ধরা।

ত্রাস বা ভয় সৃষ্টিই যদি সন্ত্রাস হয়, তবে সে সন্ত্রাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তূলনা নাই। সে সন্তাসের শিকার বিশ্বের দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোই শুধু নয়, খোদ জাতিসংঘ এবং তার সবল ও দুর্বল সদস্য রাষ্ট্রগুলোও। নৃশংস মার্কিন সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে আফগানিস্তান ও ইরাক। এ দুটি দেশের বহু লক্ষ মানুষ যেমন নিহত হয়েছে, তেমনি লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ী হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছে। এ বর্বরতার একটি করুণ ইতিহাস আছে। মাকিন সন্ত্রাসীদের চরিত্রকে জানতে হলে সে ইতিহাসকেও জানতে হবে। মানব জাতির জন্য বিশেষ করে মুসলিমদের জন্য তাতে রয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় দিক। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে মোকাবেলায় সেগুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ।

ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের উপর চাপ দিচ্ছিল, তাদের পরিকল্পিত আগ্রাসী যুদ্ধকে বৈধতা দিতে। এজন্য ২৪ ঘন্টা সময়ও বেঁধে দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা, যুদ্ধ তারা করবেই, জাতিসংঘের কাজ সেটিকে জায়েজ ঘোষণা দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী শাসক চক্র বিশ্ববাসীকে যে কতটা বেওকুপ ও দুর্বল ভাবে -এটি হলো তারই প্রমান। ফ্রান্সসহ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্র সে মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি। আর সেটিই মার্কিনীদের কাছে অপরাধ গণ্য হয়েছে। সমর্থণ লাভে ব্যর্থ হয়ে তারা বলেছে নতুন প্রস্তাব পাশের কোন প্রয়োজনই নেই। বহু প্রতিক্ষিত যুদ্ধের প্রস্তুতি স্বরূপ প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০৩ সালের ১৭ই মার্চে সাদ্দামকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে দেশ ছেড়ে পলায়ন অথবা যুদ্ধ -এ দুটির যে কোন একটিকে বেছে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। সাদ্দাম এ হুমকি প্রত্যাখান করেছিল। অতএব হামলা শুরু হয়। হাজার হাজার বোমা, ক্ষেপনাস্ত্র ও ভারী কামানের গোলা ইরাকের নীরস্ত্র মানুষের মাথায় নিক্ষিপ্ত হলো। নিহত ও আহত হলো দেশটির অসংখ্য মানুষ। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ যে ক্রুসেডের হুশিয়ারি বার বার শুনিয়ে আসছিলেন -সেটিই হলো অতি বীভৎস রূপে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় খৃষ্টানদের মধ্যযুগীয় ক্রসেডের গণহত্যা অতি বর্বর ও নৃশংস ছিল। কিন্তু, বুশের আধুনিক ক্রসেডটি সে ক্ষেত্রে আরো বর্বরতর। কারণ মার্কিন যুদ্ধাস্ত্রে এসেছে চরম নাশকতা।

ফিলিস্তিনের ন্যায় ইরাকও অধিকৃত হলো ইসরাইলের মিত্র ও রক্ষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের জন্য, বিশেষ করে মুসলিমদের জন্য এটি যেমন অপমানকর, তেমনি দুঃখজনক। মার্কিনীদের কাছে গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতার সামান্যতম মূল্য থাকলে জাতিসংঘে উত্থাপিত অধিকাংশ দেশের শান্তির প্রস্তাবকে তারা মেনে নিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনই জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে ইরাককে বিভক্ত করে, সেখানে প্রতিষ্ঠা করে নো-ফ্লাই জোন। চাপিয়ে দেয় নির্মম বাণিজ্যিক অবরোধ -যার ফলে বিনাচিকিৎসায় ও অপুষ্টিতে মারা যায় দেশটির ৫ লাখ ইরাকী শিশু। যে তথ্য দিয়েছে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানসেট। সন্ত্রাস করতে গণ-সমর্থণ বা ভোট লাগে না, লাগে অস্ত্রের সামর্থ্য।  আর মার্কিনীদের সামর্থ্য সেক্ষেত্রে বিশাল। ফলে পরওয়া কিসে? বিশ্বজনমত ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অসম্মতি -কোনটাই তাদের এ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে  বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং প্রকাশ পেয়েছে জাতিসংঘের নিজের অসহায় অবস্থা। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ যে কতটা গোঁয়ার ও উদ্ধত এবং বিশ্বজনমতের বিরুদ্ধে কতটা অবজ্ঞাপূর্ণ -সেটিই প্রকাশ পেয়েছে তার বক্তৃতায়। তিনি বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের উপর হামলায় কারো অনুমতির ধার ধারে না। বোঝাতে চেয়েছেন, জাতিসংঘ বা বিশ্বজনমত তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক। এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে কতটা বিপর্যের মুখে আজ বিশ্বশান্তি?

মার্কিন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কারণে অসম্ভব হয়েছে বিশ্বের বহুদেশে গণতন্ত্র চর্চা। মুসলিম দেশগুলোতে গণগন্ত্র চর্চার পথে সবচেয়ে বড় বাঁধাটি হলো মার্কিনীদের স্বৈরাচার প্রতিপালনের নীতি। সৌদি আরব, আমিরাত, জর্দান, বাহরাইন, ইত্যাদি আরব দেশগুলোতে বর্বরতম স্বৈরাচার বেঁচে আছে মার্কিন সাহায্য নিয়ে। সেটিরই আরেক উদাহরণ হলো মিশর। সেখানে সামরিক বাহিনী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মহম্মদ মুরসীকে শক্তির বলে সরিয়ে নিজেরা ক্ষমতা দখল করে। মার্কন যুক্তরাষ্ট্র সে সামরিক স্বৈরাচারকে সমর্থণ দেয়। পঞ্চাশের দশকে একই ভাবে মহম্মদ রেজা শাহর স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল ইরানে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে ঘোষণা, বিশ্বের কোথাও ইসলামী খলিফার নামে রাষ্ট্র গড়া হলে মার্কিন সেনাবাহিনী সেটিকে মাটিকে মিটিয়ে দিবে। মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এটি চরম ঔদ্ধত্য। খেলাফাভিত্তিক রাষ্ট্র হলো মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। খেলাফা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব বিষয়, মার্কিনীদের বিষয় নয়। গণতন্ত্র বিরোধী মার্কিন নীতির আরেক উদাহরণ হলো তুরস্ক। ইরাকের উপর হামলার বিরুদ্ধে তুরস্কের প্রায় শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষ । জনগণ চায় না তুরস্কের এক ইঞ্চি ভুমিও মার্কিনী সৈন্যদের দ্বারা ব্যবহৃত হোক। সে দেশের নব নির্বাচিত পার্লামেন্টেও সে গণরায়ের প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোঁ ধরেছিল, তুরস্কের উপর দিয়ে তার ৬০ হাজার সৈন্যের চলাচলের সুযোগ দিতেই হবে। ইরাকের উত্তরভাগে হামলার জন্য এটিকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিল। কুটনৈতিকভাবে চাপ দিয়েছে, প্রলোভন দিয়েছে অর্থ সাহায্যের, এমনকি চাপ দিয়েছে সে দেশের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের দিয়েও। কথা হলো, এটিই কি গণতন্ত্র চর্চার মার্কিন মডেল? এমন গণতন্ত্রচর্চাই কি তারা চায় ইরাকে ও অন্যান্য দেশে? 

 

নজিরহীন ধোকাবাজি

ইরাকের উপর হামলাকে জায়েজ করতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে বিশ্ব-শান্তির দোহাই দিচ্ছে -সেটি নিছক ধোকাবাজী। নিরেট দস্যুরাও ভাল মানুষ সাজে; সেটি ধোকাবাজির মাধ্যমে। বিশ্ববাসীর কাছে গোপন নয় মার্কিনীদের এ ধোকাবাজী। তার প্রমাণ, একমাত্র  ইসরাইল ছাড়া বিশ্বের দ্বিতীয় কোন রাষ্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই ইরাকের উপর হামলাকে জায়েজ গণ্য করেনি। জনমত জরিপে প্রকাশ পেয়েছে, জার্মান, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালী, স্পেন, গ্রীস, রাশিয়াসহ সকল ইউরোপীয় দেশের আপামর জনগণ ইরাকের উপর এ হামলার প্রচণ্ড বিরোধী। বিরোধীতা প্রকাশ করেছে চীন সরকার। জাতিসংঘের তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারি কফি আনান বলেছেন, জাতিসংঘ সনদ মোতাবেক এ যুদ্ধ অবৈধ। অবৈধ বলেছে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন। এমনকি যে ইরাককে মার্কিন প্রশাসন তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলীরি জন্য বিপদজনক বলছে তারাও এ হামলার বিরোধীতা করছে। আরব লীগের সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনে এ হামলার বিরুদ্ধে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের রাগ গিয়ে পড়েছে তাদের এতো কালের ঘনিষ্ট মিত্র ফ্রান্সের উপরও। যেন  ফ্রান্স তাদের পাকা ধানে মই দিয়েছে। মার্কিনীদের অভিযোগ, ইরাকে হামলার বিরুদ্ধে, ফ্রান্স ভেটোর হুমকি দিয়ে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। অথচ ভুলে গেছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ২০০৩ সাল অবধি ৭২ বার ভেটো প্রয়োগ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজে -যা অন্য যে কোন দেশের চেয়ে অধিক। তাদের ভেটোর দাপটে ইসরাইলের বর্বর নৃশংসতার প্রতিরোধ দূরে থাক তার নিন্দা করাও সম্ভব হয়নি। ফলে সে ইসরাইলী নৃশংশতা থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি হাজার হাজার অসহায় ফিলিস্তিনী নারীপুরুষ ও শিশুকে। মার্কিনীদের সক্রীয় সমর্থনেই ইসরাইল সমগ্র ফিলিস্তিনকে পরিণত করেছে একটি মৃত্যুপুরীতে। অথচ ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন ভেটোর হুমকী দিয়েছিল ইরাকের বিরুদ্ধে একটি প্রকান্ড যুদ্ধ রুখতে। ভেটো দিয়ে যদি এ যুদ্ধটি থামানো যেত তবে সেটিই হতো জাতিসংঘের ইতিহাসে সবচেয়ে কল্যাণকর ভেটো -যা ঘটেনি। কারণ এ যুদ্ধে ইরাকের বহু লক্ষ বেসামরিক নাগরিক নিহত বা চিরকালের জন্য পঙ্গু হবে –সে অভিমতটি ছিল বহু মার্কিনী বিশেষজ্ঞগণেরও। ইরাকের লক্ষ লক্ষ সন্তানহারা পরিবারে যে বহুকাল হাসিই ফুটবে না -সেটি সবারই জানা ছিল। মানবতার কল্যাণ তো এমন একটি ভয়ানক যুদ্ধ শুরুর মধ্যে নয়, বরং সেটি বন্ধের মধ্যে। কিন্তু সে সত্যটি অনুধাবনের সামর্থ্য মার্কিন নেতৃত্ব দেখায়নি।

২০০৩ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধের শুরুটি হয় হাজার হাজার বোমা ফেলে। যুদ্ধ বিমান থেকে সে বোমাগুলো পাহাড় পর্বত বা মরুভূমিতে ফেলা হয়নি, বরং হয়েছে বড় বড় শহরের আবাসিক এলাকায়। তবে বেসামরিক নাগরিক হত্যায় মার্কিনী নৃশংসতা ও বিবেকহীনতা যে নজিরহীন –সে প্রমাণ ইতিহাসে প্রচুর। জাপানের হিরোসীমা ও নাগাসাকীতে তারা পারমানবিক বোমা ফেলেছে। নাপাম বোমায় জীবন্তদের জ্বালিয়ে মেরেছে ভিয়েতনামে। ১৯৯১ সালের যুদ্ধে ইরাকীদের উপর নিক্ষেপ করেছে বহু ডিপ্লিটিড ইউরোনিয়াম বোমা। যার ফলে ইরাকীদের মাঝে বাড়ছে ক্যান্সার। রণাঙ্গণ থেকে পশ্চাতপদ ইরাকী সৈন্যদের উপর বিমান থেকে ভারী বোমা ফেলেছে। এবং মৃত সৈন্যদের বুলডোজার দিয়ে মাটি চাপা দিয়েছে। আবু গারিব জেলে বন্দী ইরাকীদের উলঙ্গ করে তাদের দেহ দিয়ে পিরামিড গড়ে উৎসব করেছে। ইরাক ও সিরিয়ার বহু শহরকে তারা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। এ হলো মার্কিনীদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের রূপ।

 

নীতি প্রতারণার

প্রতিটি আগ্রাসনে বহুল ব্যবহৃত হাতিয়ারটি হলো প্রতারণা। হিংস্র পশু প্রতরণা করে না, সাম্রাজ্যবাদীরা এ কাজে সেয়ানা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতরণামূলক আচরন করেছে বিশ্ববাসীর সাথে। সেটির প্রমাণ, ইরাককের অস্ত্রবিলুপ্তি ও অস্ত্রপরিদর্শক নিয়ে জাতিসংঘে প্রদত্ত তাদের বয়ান। ইরাকের উপর হামলার মার্কিন সিদ্ধান্তটি যে জাতিসংঘে উঠায় বহু পূর্বেই গৃহীত হয়েছির –সেটি বুঝা যায় তা ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি দেখে। যুদ্ধ শুরুর বহু আগেই প্রায় তিন লক্ষ মার্কিন সৈন্যকে উপসাগরীয় এলাকায় মোতায়েন করা হয়। জমা করা হয় বিশাল নৌ-বহর। এ বিশাল রণ-প্রস্তুতি ইরাক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে ছিল না, বরং সেটি ছিল একটি প্রকান্ড য্দ্ধু ও যুদ্ধশেষে জবরদখলের প্রস্তুতি। ইরাকের উপর জাতিসংঘে আলোচনা শুরুর বহু পূর্বেই প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ক্রসেডের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমনকি তারও বহু পূর্বে -যখন তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন না, তিনি ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চিনি এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডোনাল্ড রাম্সফিল্ড ও তাঁর অন্যান্য কর্মকর্তাগণ প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনকে ইরাকের উপর হামলার আহবান জানিয়েছিলেন। ফলে এটি সহজেই বোধগম্য, ইরাক দখলের সিদ্ধান্ত যেহেতু বহু পূর্বেই গৃহীত হয়েছে, কোন আপত্তিকর অস্ত্র নাই সেটি প্রমানিত হলেও ইরাকের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত যুদ্ধটি পরিত্যক্ত হতো না। এবং সে যুদ্ধকে জায়েজ করার স্বার্থেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জেনে বুঝে জাতিসংঘ অস্ত্র পরিদর্শক দলের রিপোর্টকেও মিথ্যা বলছে। এটি নিরেট প্রতারণা।

জাতিসংঘ অস্ত্র পরিদর্শক দলের নেতা হ্যান্স ব্লিক্স সে সময় বলেছিলেন, ইরাকে কোন আপত্তিকর অস্ত্রের সন্ধান তারা পাননি। এবং আরো বলেছেন ইরাক সরকার সকল প্রকার সহযোগিতা করছে এবং অস্ত্র পরিদর্শন কাজে অবস্থার সন্তোষজনক উন্নতি ঘটেছে। যে কাজে বিগত ১২ বছরে হয়নি, গত ১২ সপ্তাহে তার চেয়ে বেশী অগ্রগতি হয়েছে সেটি তিনি বুঝিয়েছেন। ফ্রান্স, জার্মানী, রাশিয়া ও চীনসহ নিরাপত্তাপরিষদের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ এ প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখতে চায়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা মানতে রাজী নয়। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য যদি ইরাকের অস্ত্রবিনাশ হতো, তবে তারাও সে রিপোর্টটি মেনে নিত। তাদের এজেন্ডাই তো ভিন্ন। কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল ইরাক দখল। ফলে অস্ত্র পরিদর্শক দল যতই অব্স্থার সন্তোষজনক অগ্রগতির রিপোর্ট দিয়েছে, ততই মারমুখী হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র গ্রেট বৃটেন। এমন অস্ত্রপরিদর্শনে পরিকল্পিত হামলার মূল টাইম টেবিলে ব্যাঘাত ঘটছে দেখে বাড়ছিল তাদের অস্থিরতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে হামলায় ধৈর্য ধরতে রাজী ছিল না, ফলে শুরু হয় আগ্রাসন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্য শুধু ইরাকের সম্পদ লুন্ঠনই ছিল না। বরং সেটি ছিল মুসলিমদের শক্তি অর্জনের সকল প্রচেষ্ঠার বিনাশ। ইরাকের অপরাধ, দেশটি সামরিক শক্তি বাড়ানো চেষ্টা করছিল। সেটিকে মার্কন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করতে। কোন দস্যুই চায় না যে ঘরে সে হানা দিবে সে ঘরের গৃহস্বামীর প্রতিরক্ষার সামর্থ্য থাকুক। ধনবান গৃহস্বামী নিরস্ত্র, পঙ্গু ও বন্ধুহীন হলেই সে খুশি। কারণ অবাধ লুন্ঠনে তখন আর শক্তি ব্যয় হয় না। একই কৌশল প্রয়োগ করছে তারা ইরাকের বিরুদ্ধে। তাই নিজেদের ভান্ডারে সকল প্রকার বিধ্বংসী অস্ত্র থাকলেও অন্যরা বিশেষ করে মুসলিমগণ সেটির অধিকারি হোক সেটিতে তাদের প্রচণ্ড আপত্তি। তাই ইরাকের স্বল্প রেঞ্জের মিজাইল বা চালকহীন বিমানও তাদের কাছে বিপদজনক মনে হয়েছে। ইরাকে রাসায়নিক  অস্ত্র রয়েছে -এ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বময় তোলপাড় করছে। অথচ তাদের হাতেই এ অস্ত্রটি সবচেয়ে বেশী। দৈনিক গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে ১৯৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা অনুযায়ী তাদের ভান্ডারে ১৫,৬৩৭ টন মাস্টার্ড গ্যাস, ৭,৪৬৪ টন স্যারিন নার্ভ গ্যাস, ৪, ০৩২ টন ভি এক্স নার্ভ গ্যাস ও আরো বহুবিধ রাসায়নিক অস্ত্রের মওজুদ রয়েছে। অতএব ইরাকের অস্তু নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাথা ঘামানোর কোন নৈতিক ভিত্তি থাকে কি?

 

লক্ষ্য লুন্ঠন

ইরাকের উপর আগ্রাসনের লক্ষ্য অর্থনৈতিকও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক আধিপত্য নিয়ে তারা খুশি থাকতে চায় না, ইচ্ছামত শোষনও করতে চাই। কারণ, বিশ্বব্যাপী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজটি অতি ব্যয়বহুল। সে খরচ মার্কিনীদের পক্ষে নায্য উপার্জনের মাধ্যমে অসম্ভব। এ জন্যই লুটপাটের অবাধ ক্ষেত্র তাদের জন্য অপরিহার্য। তাদের লক্ষ্য, ছলে-বলে ও কলে-কৌশলে মধ্যপ্রাচ্যের অঢেল সম্পদকে তাদের দখলে নিতেই হবে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও বাইরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ প্রায় সবদেশগুলী দেশ এখন তাদের দখলে। তবে শোষনের যে সুযোগ এদেশগুলীতে তারা যা পাচ্ছে সেটিতে তারা খুশী নয়। এক গ্রামে ডাকাতী করে দস্যুরা তৃপ্ত হয় না। চায় গ্রামে গ্রামে ডাকাতির সুযোগ। তাদের ক্ষুধা সীমাহীন। আসন্ন হামলায় ইরাক এবং পরবর্তীতে ইরানেও যে মার্কিন দস্যুবৃতি প্রসারিত হবে। এ দস্যুবৃত্তিকে তারা নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য মনে করে।

মার্কিনীগণ নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থটি নিজ সীমান্তের মাঝে দেখে না, দেখে সমগ্র বিশ্বজুড়ে। এটি যেমন আফগানিস্তান ও ইরাক, তেমনি কোরিয়া, ফিলিপাইন, উযবেকিস্তান, সোমালিয়া ও জিবুতিতে। ২০০৩ সালের হিসাব মতে যুক্তরাষ্ট্র ১০.৪ মিলিযন ব্যারেল জ্বালানী তেল আমদানী করে। ২০২০ সাল নাগাদ তাদের আমদানীর পরিমাণ দাঁড়াবে ১৬.৭ মিলিয়ন। ইরাক দখলে সহজ হবে তেল সংগ্রহ। বিজয়ের পর যুদ্ধে সকল খরচও তারা পুষিয়ে নিবে। যেমনটি ১৯৯১ সালের ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সকল খরচ সৌদি আরব আর কুয়েত থেকে আদায় করে নিয়েছে। কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও ওমান জুড়ে মার্কিনীদের আজ যে সামরিক দখলদারিত্ব সেটির প্রতিষ্ঠায় নিজ পকেট থেকে তাদের একটি ডলারও ব্যয় হয়নি। তেমন প্রাণ হানীও হয়নি। কৈয়ের তেল কৈ ভেজেছে তারা। ইরাকেও তেমনটিই হতে যাচ্ছে। ইরাকের প্রতিরোধের সকল সামর্থ্য যুদ্ধ শুরুর আগেই ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিনীদের সামান্যতম প্রাণহানীরও সম্ভাবনা ছিল না। অথচ জয়ের সামর্থ্যটি ছিল বিশাল। ফলে এমন একটি যুদ্ধ থেকে মার্কিনীদের মত সাম্রাজ্যলিপ্সু একটি দেশকে কেউ কি যুদ্ধ থেকে ফেরাতে পারে?

খুনীকে খুনী, দুর্বৃত্তকে দুর্বৃত্ত এবং সন্ত্রাসীকে সন্ত্রাসী বলার জন্য বিশাল মাপের মানবতা বা বিবেকবোধ লাগে না। নিরক্ষরেরও সেটি থাকে। কিন্তু সে সামর্থ্য কি মার্কিনীদের আছে? থাকলে সে প্রমাণ কই?  মার্কিনীরা যে কতটা মানবতাশূর্ণ -সেটি ইসরাইলী নৃশংসতার প্রতি তাদের নিঃশর্ত সমর্থন ও সর্ববিধ সাহায্যই কি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় না? যে মানদন্ডে সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ এককালে ভারতের তাবত সম্পদকে নিজেদের রাজকীয় সম্পদ মনে করতো -সেরূপ একটি মানদন্ডে মার্কিনীরাও ইরাকের, এমনকি মুসলিম বিশ্বের তেল সম্পদকে নিজেদের জাতীয় সম্পদ মনে করে। কারণ, যুগ পাল্টালেও সাম্রাজাবাদ প্রতি যুগে অভিন্ন লুন্ঠন-সুলভ মানসকতারই জন্ম দেয়।

 

কি হবে প্রতিরোধের স্ট্রাটেজী?

প্রশ্ন হলো, মার্কিন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কীরূপ হবে প্রতিরোধের স্ট্রাটেজি? আত্মসমর্পণে যেমন মর্যাদা বাড়ে না, তেমনি নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয় না। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাইরাইন, মিশর, ওমানের ন্যায় দেশগুলো যে ভাবে মার্কন এজেন্ডার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে তাতে তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা কোনটিই বাড়েনি। কোন গৃহে ডাকাত পড়লে যে গ্রামের প্রতিবেশী অন্য বাসিন্দারা যদি নিজ গৃহে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে -সে গ্রামের কারোই ইজ্জত বাঁচে না। ডাকাতেরা একে একে সবারই ঘাড় মটকায়। ইংরেজদের হাতে বাংলা যখন পরাধীন  হলো তখন প্রতিবেশী কেউ এগিয়ে আসেনি। জনগণের কাতার থেকে দেশটিতে স্বাধীনতার যুদ্ধও হয়নি। ফলে স্বাধীনতা শুধু বাংলাই হারায়নি, ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোও একই ভাবে স্বাধীনতা হারিয়েছে। অথচ ভিয়েতনামী যোদ্ধাদের রক্তত্যাগে দেশটি পরাধীনতা থেকে বেঁচেছিল। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে কে নামাজী আর কে বেনামাজী, কে ডানপন্থি আর কে বামপন্থি -সে বিবেচনায় কল্যাণ নাই।

মার্কিন সন্ত্রাসের মুখে আজ শুধু ইরাক নয়, সমগ্র বিশ্ব। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অপ্রতিহত থাকলে স্বাধীন ভাবে বাঁচাটিই অসম্ভব হবে। সবচেয়ে অসম্ভব হবে ঈমান নিয়ে বাঁচাটি। তখন মুসলিম গণহত্যা শুধু ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া বা আফগানিস্তানে সীমিত থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে অন্যান্য মুসলিম দেশেও। কারণ, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটি হলো স্বঘোষিত ধর্মযুদ্ধ তথা ক্রুসেড। এবং ক্রুসেডের একটি ঐতিহাসিক পরিচয় আছে। সে পরিচয়টি খৃষ্টানদের পরিচালিত মুসলিম নির্মূলের বর্বরতম এবং নৃশংসতম যুদ্ধের।

 

যে দায়িত্ব প্রতিটি মুসলিমের

ইরাক আগ্রাসনের নায়ক সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ যেমন তার লক্ষ্য নিয়ে অস্পষ্টতা রাখেননি, তেমনি কোন মুসলিমের অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয় মার্কিন ঘোষিত ক্রুসেডের উদ্দেশ্য নিয়ে। এরূপ হামলার লক্ষ্যই হলো মুসলিমদের মুসলিম রূপে শান্তিতে বাঁচাটি অসম্ভব করে তোলা। আফগান ও ইরাকীগণ মার্কিন হামলার শিকার হওয়ার কারণটি আফগান ও ইরাকী হওয়া নয়, বরং সেটি হলো তাদের মুসলিম পরিচিতি। ফলে তাদের সমস্যা শুধু তাদের নিজেদের সমস্যা নয়, বরং সেটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সমস্যা। মহান আল্লাহতায়ালা ইসলামের এ শত্রুদের সম্মদ্ধেই হুশিয়ারী শুনিয়েছেন এবং বলেছেন, “এবং তোমাদের উপর হামলা থেকে তারা কখনোই বিরত হবে না -যতক্ষণ না তোমরা নিজেদেরকে ইসলাম থেকে সরিয়ে নাও।” -(সূরা বাকারা, আয়াত ২১৭)। কোন একক জাতি বা দেশের পক্ষে এ বিশাল বিশ্বশক্তির রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। সবার ঐক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চাই “ওয়া লা তাফাররাকু” (অর্থ: এবং তোমরা বিভক্ত হয়ো না) -মহান আল্লাহতায়ালার এ কোর’আনী ফরমানের আনুগত্য।

মুসলিম ভূমিতে শত্রুর হামলা শুরু হলে এগিয়ে আসতে হয় প্রতিটি মুসলিমকে। কারণ মুসলিমকে বাঁচতে উম্মাহর ধারণা নিয়ে। উম্মাহ কাজ করে একটি জনগোষ্ঠির একটি অভিন্ন দেহ রূপে। দেহের এক অংশে আঘাত হানলে, অন্য অঙ্গ বেদনা পায় এবং প্রতিরোধ করে। সেটি না হলে বুঝতে হবে সে বেদনাশূণ্য অংশটি দেহ থেকে খন্ডিত হয়েছে। তাছাড়া মুসলিম ভূমিতে মার্কিন সন্ত্রাসের কান্ডটি আদৌ গোপন বিষয় নয়। দেশটিতে সরকার পরিবরর্তন হয়, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী নীতির পরিবর্তন হয় না। তাই হামলা যেমন প্রেসিডেন্ট বুশের আমলে হয়েছে, তেমনি প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলেও হয়েছে। ইসরাইলের আগ্রাসী নীতিই তাদের নীতি। নেকড়ে যেমন চরিত্র পাল্টায় না, তেমনি মার্কিনীরাও পাল্টায় না।

তাই এ মার্কিন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে যার যা সামর্থ্য আছে -তা নিয়েই ময়দানে নামাটি প্রত্যেকের উপর ফরজ। সন্ত্রাসের যেমন ভৌগলিক সীমান্ত নাই, তেমনি নেই প্রতিরোধেরও। সন্ত্রাসবিরোধী সচেনতা গড়তে হবে ঘরে ঘরে। মার্কিন সামর্থ্যে বৃদ্ধি ঘটে -এমন প্রতিটি কর্মই হারাম। হামলার বিরুদ্ধে জিহাদ নিয়ে বাঁচাটাই ইবাদত। কারণ সে জিহাদে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি আনুগত্য। থাকে তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার প্রেরণা। থাকে মুসলিম স্বার্থের প্রতিরক্ষার চেতনা। জিহাদের দায়িত্বটি সবার। মহান আল্লাহতায়ালা দায়িত্ব পালনের সে সামর্থ্য দিয়েছেন প্রতিটি নাগরিককে। দিয়েছেন বিপুল বুদ্ধিবৃত্তিক বল ও প্রতিবাদের ভাষা। ঈমানী দায়ভার হলো, সে সামর্থ্যের বিনিয়োগ। তখন শত্রুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি কোরবানী এবং প্রতিটি প্রয়াসই মহান আল্লাহতায়ার দরবারে মাগফেরাত লাভে সহায়ক হয়। চলমান ক্রুসেডের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে বস্তুত এ ভাবেই। শত্রুকে গালীগালাজ করে পরকালে পরিত্রাণ মিলবে না। নিছক দোয়া পড়েও দায়িত্ব পালন হয়না। সে আগ্রাসী শত্রুর মোকাবিলায় নিজ নিজ প্রচেষ্ঠা বা কোরবানী কি ছিল -সে হিসাব মহান আল্লাহর দরবারে অবশ্যই দিতে হবে। ১ম সংস্করণ ১৮/০৩/২০০৩; ২য় সংস্করণ ১৭/০১/২০২১।




আধিপত্য বিস্তারে আগ্রাসী মার্কিন প্রজেক্ট

ফিরোজ মাহবুব কামাল

যুদ্ধ জায়েজ করতে মিথ্যাচার

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে ইরাক ও আফগানিস্তান যেভাবে অধিকৃত হলো এবং বিধ্বস্ত হলো তাতে কোন বিবেকমান মানুষই শংকিত না হয়ে পারে না। একটি বিবেকহীন, নীতিহীন ও উদ্ধত সামরিক শক্তির হাতে বিশ্বের দূর্বল জাতিসমূহ –বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব যে কতটা জিম্মি, হলো তারই প্রমাণ। যে অভিযোগের উপর ভিত্তি করে ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনী ইরাকের উপর বৃষ্টির ন্যায় বোমা ফেললো, হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করলো এবং ধ্বংস করলো অগণিত ঘরবাড়ী, কলাকারখানা ও অফিস আদালত সেটি যে মিথ্যা এবং সেটি যে বলা হয়েছিল নিছক রাজনৈতিক প্রয়োজনে -তা নিয়ে এখন খোদ মার্কিন মহলেও সন্দেহ নেই। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের আমলের মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মি. রামস্ ফিল্ড স্বীকার করেছিলেন, “ইরাকে তারা সে বহু কথিত ’উয়েপন্স অব ম্যাস ডিসট্রাকশন’ বা ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র পাবে না।” সে আমলের মার্কিন প্রশাসনের আরেক কর্তা ব্যক্তি ঊলফোভিচ বলেছিলেন, “ইরাকের বিরুদ্ধে তারা যে “উইপন্স অব ম্যাস ডিসট্রাকশন”য়ের যে অভিয়োগ এনেছিল সেটি ছিল নিছক সরকারি আমলাদের আবিস্কার। এটির লক্ষ্য ছিল বিশ্ব-জনমতকে পক্ষে রাখা। এদিকে বৃটিশ গুপ্তচর বিভাগের এক পদস্থ অফিসারের বরাত দিয়ে পত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছে, এ যুদ্ধকে জায়েজ করতে তৎকালিন  ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মি. টনি ব্লেয়ারের সরকার তাদের উপর ইরাকে “উয়েপন্স অব ম্যাস ডিসট্রাকশন” আছে এর পক্ষে বানায়োট রিপোর্ট তৈরী করতে চাপ দিয়েছিল।

সময় যতই যাচ্ছে, ততই ইঙ্গো-মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদী চক্রের থলির বেড়াল বেড়িয়ে আসছে। তারা যে কতটা ভন্ড, কতটা মিথ্যাবাজ এবং কতটা ষড়যন্ত্রকারি সেটিই এখন প্রকাশ পাচ্ছে। অথচ তারা বিশ্ববাসীকে বুঝিয়েছিল, সাদ্দাম মিথ্যাবাদী এবং বিশ্ব-নিরাপত্তার জন্য হুমকি। অপর দিকে সাদ্দাম হোসেন বলেছিল, ইরাকে “উয়েপন্স অব ম্যাস ডিসট্রাকশন” নেই। সেটি প্রমাণিত করার জন্য জাতিসংঘ অস্ত্রপরিদর্শকদেরকে যে কোন স্থানে পরিদর্শণের সুযোগও দিয়েছিল। সাদ্দাম যে এ বিষয়ে মিথ্যা বলেনি সেটিই এখন প্রমাণিত হচ্ছে। অথচ ইরাকে অস্ত্র আছে বলে বুশ ও ব্লেয়ার কসম খেয়েছিল। তাদের এ মিথ্যাচার বিশ্ববাসী যে শুরু থেকেই টের পায়নি তা নয়। টের পেয়েছিল বলেই বিশ্বের নানা শহরে লাখো লাখো মানুষ যুদ্ধ-বিরোধী সমাবেশ করেছে। বলেছে, এ যুদ্ধ ইরাকের সম্পদ লুটের যুদ্ধ। বলেছে, এটি একটি দেশকে পরাধীন করার যুদ্ধ। অবশেষে বিশ্ববাসী যা ভেবেছিল তাই হলো। প্রমাণিত হলো, সর্বার্থেই এ যুদ্ধের নায়কেরা মিথ্যাচারি। এটি অতি নাজায়েজ যুদ্ধ। ফলে এ যুদ্ধে ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনী সামরিক ভাবে জিতলেও হেরেছে নৈতিক দিক দিয়ে। নতুন ভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাদের আসল চরিত্র। চক্ষুলজ্জা থাকলে জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ার এ অবস্থায় জনসম্মুখে মুখ দেখাতে শরম পেত। কিন্তু সমস্যা হলো, যে কোন সন্ত্রাসীর ন্যায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এ নায়কদেরও লজ্জাশরম নেই। ফলে অবিরাম মিথ্যা বলছে এখনও। এত বড় জঘন্য রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পরও তারা বলছে, ইরাকের উপর এমন ধ্বংসজ্ঞ নাকি বিশ্বশান্তির জন্য অপরিহার্য ছিল। সে ধ্বংসজ্ঞ তাদের কাছে উৎসবে পরিণত হয়েছে। কথা হলো, এ মিথ্যাচারি অপরাধীদের কি শাস্তি হবে না? এভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে বিশ্বনিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অপরাধে যদি শাস্তি নয় তবে অন্য সন্ত্রাসের নিন্দার বৈধতা থাকে কি?

 

 রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও স্বাধীনতার লড়াই

আফগানিস্তান ও ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিনগণ যা করেছে -সেটি নিরেটে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। সমগ্র মানব ইতিহাসের সকল সন্ত্রাসী মিলে যত হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তার চেয়ে বেশী হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে ইঙ্গো-মার্কিন এ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী চক্র এ দেশ দুটিতে। এ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মোকাবেলায় ইরাকের জনগণ নেমেছে স্বাধীনতার যুদ্ধে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে জায়েজ করতে আগ্রাসী শক্তি লাগাতর মিথ্যাও বললে। বহু মিথ্যার সাথে তাদের আরেক মিথ্যা হলো, ইরাকী জনগণ নাকি “আহসাল সাহলান” বলে তাদের বাহিনীকে অভিনন্দন করছে। এমন ডাহা মিথ্যা বলেছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। তিনি অধিকৃত ইরাকের বসরা নগরী ঘুরে এসে বলেছেন ইরাকের জনগণের বিপুল সমর্থণের কথা। অথচ সত্য হলো, তিনি বিক্ষুব্ধ ইরাকী জনগণের সাথে মিশবার সাহসই পাননি। দেখা করেছেন বসরার বৃটিশ সৈনিকদের সাথে। ফলে যা বলেছেন, সেটি নিতান্তই তাঁর কল্পনা প্রসূত। সেটি বলেছেন সরকার পরিচালিত প্রপাগান্ডার অংশরূপে। এরূপ মিথ্যা প্রচারের কাজটি তিনি যুদ্ধের পূর্ব থেকে অবিরাম ভাবেই করে আসছেন। প্রকৃত সত্য হলো ইরাকী জনগণের আক্রোশের ভয়ে তাদের সৈনিকেরা সেনা ছাউনি, সাঁজায়ো গাড়ি ও ট্যংকের বাইরে আসতেও ভয় পায়।

বনের হিংস্র জন্তুজানোয়ার যেমন হামলার ভয়ে জনপদে ঢুকতে ভয় পায় -তেমনি অবস্থা এ ইঙ্গো-মার্কিনী সৈনিকদেরও। অন্যরা বিশদ না জানলেও তারা সঠিক ভাবে জানে নিজেদের কৃত অপরাধের খবর। তারা যে হামলাকারি, তাদের লক্ষ্য যে ইরাক দখল ও দস্যুবৃত্তি –সেটি তারা নিজেরাও জানে। ইরাকের জনগণের জন্য সেখানে তারা ফুলের তোড়া নিয়ে হাজির হয়নি, হাজির হয়েছে হাজার হাজার টন ডিপ্লিটেড ইউরোনিয়াম বোমা, ক্লাস্টার বোমা, আগুণে বোমা ও শত শত ক্রুজ মিজাইল নিয়ে। সে নৃশংস বর্বর হত্যাযজ্ঞার কথা ইরাকী জনগণ কি ভূলতে পারে? এ জন্যই তাদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড গণরোষ। তাদের বিরুদ্ধে নানা স্থানে হামলাও হচ্ছে। যতই দিন যাচ্ছে, ততই বাড়ছে হামলার সংখ্যা। আগ্রাসী এ যুদ্ধ লড়তে মার্কিনীরা এসেছে অন্য গোলার্ধ থেকে। তাদের এ রক্তাত্ব আগ্রাসনকে ন্যায্য বললে ইরাকীদের প্রতিরোধের যুদ্ধ বলার যুক্তি থাকে না। ফলে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে এবং একটি ন্যায্য প্রতিরোধ যুদ্ধকে সন্ত্রাস বলছে। কথা হলো, এমন একটি প্রতিরোধ যুদ্ধকে সন্তাস বললে স্বাধীনতার লড়াই কাকে বলা যাবে? অতীতে স্বাধীনতাকামী ভিয়েতনামীদেরও তারা সন্ত্রাসী বলেছিল। কিন্তু তাতে মার্কিন দখলদারি  দীর্ঘায়ীত হয়নি। বরং বেড়েছে লাশের সংখ্যা। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে ইরাক দ্রুত তেমন একটি রক্তাত্ব অবস্থার দিকেই ধাবিত হচ্ছে।

 

হিসাবে ভূল

শুরু থেকেই মার্কিনীরা হিসাবে ভূল করেছে। অতিশয় বাতিকগ্রস্ত হলে যা হয়ে থাকে। ভেবেছিল, দু’টি পারমানবিক বোমায় দুই লাখেরও বেশী লোক নিহত হওয়ার পরও জাপানীরা যেভাবে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি মেনে নিয়েছে তেমনটি ইরাকেও হবে। এতো হত্যা, এতো ধ্বংসযজ্ঞের পর ইরাকের মাটিতে আহলান-সাহলান ও মোবারকবাদ পাওয়ার যে স্বপ্ন প্রেসিডেন্ট বুশ ও প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার দেখেছিলেন সেটি ছিল বস্তুত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-কালীন মানসিকতারই ফসল। কিন্তু তারা ভূলে গিয়েছিল ইরাক জাপান নয়। জার্মানও নয়। জাপান ও জার্মান এ দুটি দেশই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহু জঘন্য অপরাধের নায়ক। বিভিন্ন দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষকে বড় নৃশংস ভাবে তারা হত্যা করেছিল। দখল করেছিল বহু দেশ। ফলে তারা ছিল মানব-ইতিহাসের অতি বর্বর যুদ্ধ অপরাধী। আর অপরাধীদের যে শাস্তিই দেয়া হোক না কেন তা মাথা পেতে মেনে নেওয়ার ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এমন অপরাধিরা প্রতিরোধ ছেড়ে আত্মগোপন করে। তখন বিজয়ী শক্তির দেওয়া শাস্তিকে তারা ন্যায্য পাওনা ভাবে। ফলে এমন অপরাধী জাতি পরাজিত হলে তাদের মধ্যে জন্ম নেয় না প্রতিরোধের নৈতিক বল। তাই ভিয়েতনামে বা আফগানিস্তানের ন্যায় দুর্বল দেশে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও জাপানে বা জার্মানীতে তা হয়নি।

অপরদিকে ইরাকী জনগণ যুদ্ধাপরাধি নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা বৃটেনের বিরুদ্ধে এদেশটির জনগণ কোন অপরাধই করেনি। ফলে তারা কেন মার্কিন আধিপত্যকে মেনে নিবে? তাছাড়া সাদ্দাম স্বৈরাচারি হলেও সে অপরাধ নিছক সাদ্দামের। এজন্য জনগণ কেন ইঙ্গো-মাকিনীদের সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে মেনে নিবে? ফলে সাদ্দামের বাহিনী পরাজিত হলেও বিপুল আম-জনতা “মার্কিনীরা ইরাক ছাড়” দাবীতে রাস্তায় নেমেছে। ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনী তাই বুঝতে পেরেছে জনগণ কতটা আক্রোশপূর্ণ। প্রতিবাদপূর্ণ এ আক্রমনই তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তারা ইরাকের বন্ধু নয়, তারা অপরাধী। আর সে অপরাধ-চেতনাই তাদের অবচেতন মনে সদাসর্বদা কাজ করছে। ফলে বোরখা পরিহিত নারী, মিছিলকারি নিরস্ত্র ছাত্র বা টুপি-পরিহিত নিরস্ত্র পথচারিও তাদের কাছে সশস্ত্র শত্রু মনে হয়।

ভীতসন্ত্রস্ত ও হত্যাপাগল মার্কিন চেতনার প্রকাশ ঘটেছে বাগদাদের উত্তরে একটি ছোট্ট শহরে। মার্কিন বাহিনী সেখানে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে শহরের স্কুলটিতে। লেখাপড়া বন্ধ হওয়ায় বিক্ষুব্ধ হয়েছে স্কুলের ছাত্রা। স্কুল জবরদখলের বিরুদ্ধে তারা নিরস্ত্র মিছিল করেছিল। আর তাতেই আতংকিত হয় মার্কিন বাহিনী গুলী চালিয়ে হত্যা করেছে তিরিশ জনেরও বেশী স্কুল ছাত্রকে। একই রূপ ভীতি নিয়ে হত্যা করছে বহু পথচারিকেও। যে দখলদার বাহিনী নিরস্ত্র জনগণকে এভাবে শত্র“জ্ঞান করে তারা কি জনগণের বন্ধু হতে পারে? তারা কি পারে জনগণের সাথে জনগণের কল্যাণে কাজ করতে?  তারা যে পারছে না তার বড় প্রমাণ, ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনী এ অবধি কোন প্রশাসনই গড়ে তুলতে পারিনি। তারা সাধারণ ইরাকীদের কাছে এতটাই কুৎসিত অপরাধিরূপে চিত্রিত হয়েছে যে কোন সম্মানী ব্যক্তি তাদের কাছে ভিড়তেই ঘৃণা করে। এমন কি এতকাল যারা মার্কিনীদের সহায়তা দিয়েছে তারাও এখন সহযোগিতায় শরম পাচ্ছে। ফলে গার্নার নামের যে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলটি প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে প্রেসিডেন্ট বুশ ইরাকে পাঠিয়েছিল তার সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। এখন এসেছে মিস্টার পল ব্রেমার। সেও এগুতে পারছে না। গড়বে কি?  এখনও ভাঙ্গতেই ব্যস্ত। ব্রেমের এসেই ইরাকের ৪ লাখের বিশাল সেনাবাহিনীকে  বিলুপ্ত করেছে। বিলুপ্ত করেছে আদালত, নিরাপত্তা পুলিশ ও তথ্যমন্ত্রালয়। ফলে চাকুরি হারিয়েছে লক্ষ লক্ষ ইরাকী। তারা এখন সমাজের সবচেয়ে বিক্ষুব্ধ মানুষদের কাতারে। বসরা শহরের পৌর প্রশাসনের দায়িত্ব থেকে ইরাকীদের হঠিয়ে ব্রিটিশ সেনা অফিসার নেওয়ায় সেখানে হাজার হাজার মানুষের প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে। কিন্তু দখলদার বাহিনীর সেদিকে ভ্রুক্ষেপও নাই। ফলে বাড়ছে ক্রোধ। অথচ ইঙ্গো-মার্কিনী দখল বাহিনী বলেছিল, তারা ইরাকের জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিবে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। কথা হলো, এটিই কি ইঙ্গো-মার্কিনী গণতন্ত্র গণতন্ত্রের নমুনা?

যতই বাড়ছে ইরাকীদের প্রতিরোধ ততই বাড়ছে ইরাকের প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে মার্কিনীদের আক্রোশ। এ প্রতিরোধকে বলছে প্রতিবেশী সিরিয়ার সৃষ্টি। সিরিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসন ইতিমধ্যে চরম হুশিয়ারিও দিয়েছে। তাদেরকে বলেছে ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে। কথা হলো প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে নসিহত দান কি মার্কিনীদের সাজে? তারা শুধু হস্তক্ষেপ করতে নয় বরং একটি অতিশয় বিধ্বংসী যুদ্ধ চাপাতে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে ছুটে এসেছে। ফলে হস্তক্ষেপের এ কাজ যদি ইঙ্গো-মার্কিনীদের কাছে জায়েজ হয়, তবে তা ইরাকের নিকটতম প্রতিবেশীদের কাছে নাজায়েজ হবে কেন? এটি কি এজন্য যে সামরিক দিক দিয়ে তারা দূর্বল?  আইন মার্কিনীদের জন্য একটি আর অন্যদের জন্য আরেকটি সেটি কি নৈতিকতা? এটি কি বর্ণবাদের কুৎসিত রূপ নয়? দক্ষিণ আফ্রিাকার শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা তো এমন বর্ণবাদী আইনই প্রতিষ্ঠা করেছিল। ইঙ্গো-মার্কিনারা কি সেটিই বিশ্বময় করতে চায়? সেটি যে চায় তার প্রমাণ বহু।

 

ঔপনিবেশিক শাসনের নতুন মডেল

মার্কিনীগণ যে কতটা উদ্ধত ও হত্যাপাগল সেটি বুঝাা যায় কাবুলের মার্কিন দূতাবাসের সামনে ৫ জন আফগানীকে গুলী করে হত্যা। যে কোন দেশের অভ্যন্তরে সে দেশের নাগরিক হত্যার অধিকার কোন বিদেশীর থাকে না। এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। এমন হত্যার অপরাধে তাকে সে দেশের কারাগারে ঊঠতে হয়। কিন্তু মার্কিনীদের আদালতে যেতে হয়নি। বরং এমন হত্যাকান্ড চালানোর মূক্ত অধিকার চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এটি নিরেট ঔপনিবেশিক মানসিকতা। এ মানসিকতা নিয়েই বিদেশী বৃটিশ ভারতে পক্ষি শিকারের স্বদেশী শিকার করেছে। মার্কিনীরা সে অধিকার চায় বিশ্বব্যাপী। তাদের গায়ে গূলী দূরে থাক ঢিলও ছুঁড়েনি -এমন বহু মানুষকে মার্কিন নিজ দেশের জেলে বা গুয়ান্তানামোর কারাগারে নিয়ে গেছে। অথচ তারা নির্বিচারে গণহত্যা চালালেও কোন আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না। মার্কিনীরা এমন বিচারের অধিকার দেয়নি এমনকি আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টকে। এক কালে ভিয়েতনামে যেটি করেছে সেটিই আজ আফগানিস্তান ও ইরাকে করছে। সে বর্ণবাদী মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্টা দিতেই আফগানিস্তানে মেরুদন্ডহীন কারজাইকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। ফলে আফগান নাগরিকদের বাঁচানো নিয়ে এ বিবেকহীন দাসটির সামান্যতম মাথা ব্যাথা নেই। তার সকল মাথা ব্যাথা আফগানিস্তানে মার্কিনীদের কি করে সর্বাধিক নিরাপত্তা দেওয়া যায় তা নিয়ে।

বৃটিশেরা একই রূপ ঔপনিবেশবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিল ভারতে। তবে পার্থক্য হলো, সে কালে বৃটিশ স্বার্থের পাহারিদারি করতে ইংল্যান্ড থেকে বিশ্বাসভাজন লোককে বড়লাট বা গভর্নর জেনারেল করে পাঠানো হতো। কিন্তু এখন বিশ্বস্থ ও পরীক্ষিত গোলামদের বসানো হচ্ছে অধিকৃত দেশগুলী থেকেই। আর এ গোলামদের পাহারাদারির জন্য এসব অধিকৃত দেশে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে মার্কিন বাহিনী। ঔপনিবেশবাদের এটিই হলো নয়া মডেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শক্তিবর্গ আফ্রো-এশিয়ার দেশগুলো থেকে বাহ্যিক ভাবে বিতাড়িত হলেও হাজির হয়েছে এ নতুন মডেল নিয়ে। আর এ নয়া মডেলের পরীক্ষা নিরীক্ষা প্রথমে শুরু হয় তেল সমৃদ্ধ মুসলিম মধ্যপ্রাচ্যে। কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, ওমান, আমিরাত বা জর্দান হলো এমন ঔপনিবেশবাদের শিকার। উসমানিয়া খেফাফত টুকরো টুকরো করে প্রতিষ্ঠিত হয় এ দেশগুলি। শাসন ক্ষমতায় বসানো হয় অতিশয় অনুগত দাসদের। ফলে বৃটিশ ও মার্কিন সেনাবাহিনী এসব দেশগুলোতে যত্রতত্র ততটাই স্বাধীনভাবে যেতে পারে যতটা ইংরেজ বাহিনী পারতো ১৯৪৭-পূর্ব ভারতে। এসব দেশে অন্য কোন মুসলিম দেশের পণ্য মূক্ত প্রবেশাধিকার না পেলে কি হবে বৃটিশ বা মার্কিন পণ্য স্বাধীনভাবে বাজার দখল করছে। যেমন ঔপনিবেশিক আমলে ভারতের বাজার দখল করেছিল বৃটিশ পণ্য। একই ভাবে এসব দেশ থেকে শত শত বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাড়তি পুঁজি গিয়ে উঠছে মার্কিন ও বৃটিশ ব্যাংকগুলোতে। শোষন-শাসনের এ মডেলটি এতটাই সফল হয়েছে যে এখন তারা এর সম্প্রসারণ চায় বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতেও। আর এটিই হলো একবিংশ শতাব্দির বিশ্বকরায়ত্বের মার্কিনী প্রজেক্ট।

আফগানিস্তান অধিকৃত হলো, অধিকৃত হলো ইরাক, এবং পাকিস্তান, উযবেকিস্তান, তাজাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ বহু মুসলিম দেশে মার্কিন ঘাঁটিও নির্মিত হলো – এসবই হলো সে মার্কিন প্রজেক্টের অংশরূপে। ফলে ইরাকের উপর ইঙ্গো-মার্কিন যুদ্ধটি স্রেফ সাদ্দামের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল না “উইপন্স অব ম্যাস ডিসট্রাকশন”য়ের কারণে। সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের ঘোষণায়ও সেটিই প্রমাণিত হয়েছে। এটির লক্ষ্য ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলসমৃদ্ধ দেশে উপনিবেশবাদী মার্কিন শাসনের বিস্তার। অপরদিকে ইরাকের বিরুদ্ধে এ য্দ্ধুটি সাম্রাজ্যবাদীদের পরিচালিত প্রথম যুদ্ধ যেমন নয়, তেমিনি শেষ যুদ্ধও নয়। তাঁদের ক্ষুধা সীমাহীন। এ সীমাহীন ক্ষুধাই অতীতে ক্ষুদ্র বৃটিশ জাতিকে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তারে আগ্রহী করেছিল। মার্কিনীদের সামর্থ্য এক্ষেত্রে বৃটিশের চেয়ে বহু গুণ অধিক। ফলে বিপদ শুধু ইরাক বা আফগানিস্তানের নয়। কোরিয়া, ইরান বা সিরিয়ারও নয়। এ বিপদ বিশ্বের সকল স্বাধীনচেতা জাতি সমুহের। বিশ্বের দুর্বল জাতিসমূহের শংকার মূল কারণ এখানেই। তাই এনিয়ে প্রতিটি বিবেকমান মানুষের যেমন ভাববার আছে, তেমনি কিছু করবারও আছে। নইলের সুনামীর মত ধেয়ে আসবে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। ০১/০৬/২০০৩।

 




মুসলিম জীবনে ব্যর্থতা ও অর্জিত আযাব

ফিরোজ মাহবুব কামাল

দুর্বলতার আযাব

এ পৃথিবীতে দুর্বলতা নিয়ে বাঁচাটিই বড় আযাব। তখন আসে শত্রু শক্তির অধিকৃতি। আসে পরাধীনতা, জুলুম, লুন্ঠন, মৃত্যু, ধর্ষণ ও উদ্বাস্তু জীবনের লাঞ্ছনা। তখন অসম্ভব হয় সভ্য জীবন ও পূর্ণ দ্বীন পালন। সে পরাধীন জীবনে নবীজী (সা:)’র ইসলাম -যাতে রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, জিহাদ, শুরা ও মুসলিম ঐক্য, তা শুধু কোর’আনে থেকে যায়। সেগুলো বিলুপ্ত হয় সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে। আজ মুসলিম উম্মাহকে তেমন একটি আযাবই ঘিরে ধরেছে। তারা যে কতটা দুর্বল ও মেরুদন্ডহীন, কতটা বিবেক ও চেতনাহীন এবং কতটা পঙ্গু ও অসহায় –সেটি কোন গোপন বিষয় নয়। ঘরে সশস্ত্র ডাকাত ডুকলে নিরস্ত্র দুর্বল গৃহকর্তার প্রতিবাদের সাহস থাকে না। সন্তানকে খুন বা স্ত্রী-কণ্যাকে ধর্ষিত হতে দেখেও এমন দুর্বল ব্যক্তির কিছু করার সামর্থ্য থাকে না। নিষ্ঠুর বর্বরতাকেও তখন নীরবে সইতে হয় । যুগে যুগে পশুবৎ দুর্বৃত্তদের হাতে এভাবেই কোটি কোটি মানুষ নিহত হয়েছে। ফিলিস্তিন, কাশ্মির, ভারত, চেচনিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, আরাকানের জনপদে অসংখ্য মানুষ এসব দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত ও ধর্ষিতা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।

এসবই হলো দুর্বল থাকার আযাব। এ আযাব মুসলিমদের নিজ হাতের কামাই। মহান আল্লাহতায়ালা কাছে অতি অপছন্দের হলো দুর্বল থাকা। সে দুর্বলতা নিজ জীবনে ও নিজ দেশে মানবরূপী হিংস্র পশুদের ডেকে আনে। দুর্বল থাকাটি এজন্যই ঈমানদারের গুণ নয়। শত্রুর হাতে পরাজয় এড়াতে বাঁচতে হয় প্রতি মুহুর্তে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে। এভাবে লড়াই করে বাঁচাটাই হলো জিহাদ। জিহাদ দেয় নিরাপত্তা; দেয় ইজ্জত নিয়ে বাঁচার অধিকার। তাই ইসলামে এটি ফরজ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশটি হলো,“ওয়া আয়েদ্দুলাহুম মাস্তাতা’তুম মিন কুওয়া ওয়া মিন রিবাতিল খাইলি তুরহেবুনা বিহি আদুওয়াল্লাহ ওয়া আদুওয়ালাকুম।” অর্থ: “এবং (হে ঈমানদারগণ) যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নাও সমগ্র সামর্থ্য দিয়ে এবং (যুদ্ধের জন্য) শক্ত ভাবে বাঁধো ঘোড়ার লাগামকে এবং এ ভাবে সন্তস্ত্র করো আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদেরকে … ।” –(সুরা আনফাল আয়াত ৬০)। এ কোর’আনী নির্দেশ পালন ততটাই ফরয় যতটা ফরয নামায-রোযা পালন। কারণ এ ফরমানও তো মহান আল্লাহতায়ালার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মুসলিম জীবনে কোথায় সে প্রস্তুতি? শিক্ষা-দীক্ষা, বিজ্ঞান ও সামরিক আয়োজনে পিছনে থেকে কি প্রস্তুতি নেয়া যায়? বরং প্রস্তুতি তো শত্রুর হাতে পরাজয় ও গোলামী মেনে নেয়ায়। নিছক নামাজ রোযা, হজ্ব-যাকাত বা দোয়াদরুদ পালনে কি পূর্ণ ইসলাম পালন হয়? সে পথে কি শক্তি, নিরাপত্তা ও ইজ্জতও বাড়ে? বরং তাতে মহাপাপ হয় অপূর্ণ ইসলাম পালনের। এবং সে মহাপাপ আযাব ডেকে আনে। মুসলিমগণ তো সে আযাবের মধ্যেই।

দুর্বলতা নিয়ে বাঁচাতে যে আযাব -নিছক চোখের পানি ফেলে তা থেকে পরিত্রাণ মেলে না। কারণ, পরিত্রাণের পথ সেটি নয়। পরিত্রাণের পথ তো মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমকে মেনে চলায়। সেরূপ মেনে চলাটি লক্ষ্য হলে মুমিনের জীবনে তখন সর্বশক্তি দিয়ে জিহাদের প্রস্তুতিও আসে। মুসলিম জীবনে মূল সমস্যাটি তো এখানেই। নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের মাঝে একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি শত্রুর বিরুদ্ধে নিজেকে সর্বাত্মক ভাবে প্রস্তুত করেননি বা যুদ্ধে অংশ নেননি? কিন্তু আজ পূর্ণ দ্বীন পালনে সে আগ্রহ কই? সর্বসামর্থ্য নিয়ে বেড়ে উঠার প্রস্তুতিই বা কই? নবী করীম (সা:)’র সাহাবাদের মধ্য থেকে এমন কি বৃদ্ধ, যুবক এবং অতিশয় নিঃস্বরাও একাজে স্বতঃস্ফুর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন। অঙ্গিকারহীন নিষ্ক্রিয়তা চিত্রিত হয়েছে মুনাফিকি রূপে। নবীজী (সা:)’র পিছনে নামায-পাঠও এরূপ মুনাফিকদের মুনাফিকি হওয়া থেকে তাই বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু আজকের মুসলিমদের মাঝে ক’জন আগ্রহী মহান আল্লাহতায়ালার উপরুক্ত হুকুম পালনে? সে আগ্রহ না থাকার প্রমাণ তো যুদ্ধের প্রস্তুতি না থাকা। নবীজীর (সাঃ) নফল ইবাদত, নফল নামায ও বহু নফল আমলকে আমরা সূন্নত গণ্য করি। এ সূন্নত পালন না করলে নিজেকে গোনাহগারও ভাবি। অথচ শত্রুর বিরদ্ধে জিহাদে নিজেকে প্রস্তুত রাখাটি নফল কাজ নয়, এটি ফরজ। কিন্তু সে ফরজ ক’জন পালন করে? সে ফরজ পালনে কতটা বিনিয়োগ হয় নিজের অর্থ, শ্রম, সময় ও মেধার।

উপরুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদেরকে নিজেদের ঘোড়াকে সর্বদা প্রস্তুত রাখার কথা বলেছেন। সে কালে ঘোড়া রণাঙ্গণে ট্যাংকের কাজ দিত। ফলে ঘোড়ার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। দরিদ্র সাহাবীদের সামর্থ্য ছিল না সুন্দর গৃহ নির্মাণের, অনেকের ঘরে এমনকি দুই বেলা খাবারও জুটতো না। কিন্তু জীর্ণ ঘরে বা জ্বরাজীর্ণ বসনে থেকেও তারা উন্নত মানের ঘোড়া কিনতেন। সে ঘোড়াকে সুস্থ্য ও সবল রাখতে অর্থের পাশাপাশি প্রচুর সময়ও ব্যয় করতেন। তাদের বাঁচার মধ্যে ছিল যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার স্ট্রাটেজিক আয়োজন। সে সামরিক প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে যা ব্যয় হতো -তার চেয়ে বেশী ব্যয় হতো সাহাবাদের নিজেদের তহবিল থেকে। এভাবেই তারা নিজেদের সঞ্চয় বাড়াতেন জান্নাতের এ্যাকাউন্টে। সে কালের দরিদ্র মুসলিমগণ এ পথেই এনেছিলেন উপর্যোপরি বিজয়। তাঁরা পরাস্ত করেছিলেন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্ব শক্তিকে। তাদের এ বিজয়ের সবচেয়ে বড় সম্বল ছিল মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য। তাদেরকে বিজয়ী করতে তিনি বার বার ফেরশতা বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। কারণ, সাহাবাগণ পরিণত হয়েছিলনে মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব বাহিনীতে। আর নিজ বাহনীকে সাহায্য করাই তো তাঁর সূন্নত।

 

পথটি নিশ্চিত পরাজয়ের

মুসলিমগণ যে পথটি বেছে নিয়েছে সেটি নিশ্চিত পরাজয়ের। বিজয় বা গৌরব কখনোই এ পথে আসে না। এবং সে পথে অতীতেও কখনো আসেনি। সকল বিজয় আসে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে, “ওয়া মা নাছরু ইল্লা মিন ইন্দিল্লাহি” অর্থ: বিজয় আসে একমাত্র আল্লাহ থেকে।” যেখানে তাঁর সাহায্য নাই, সেখানে বিজয়ও নাই। ফলে তাঁর সাহায্য পাওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট শর্তও আছে। সাহায্য স্রেফ নিছক দোয়ায় জুটে না, অপরিহার্য হলো নিজের জান, মাল, মেধা, শ্রম ও রক্তের বিনিয়োগ। ঈমানদারের নিজের বিনিয়োগ বাড়লে মহান আল্লাহতায়ালাও তাঁর বিনিয়োগে বৃদ্ধি ঘটান। একমাত্র তখনই বিজয় আসে। এটিই হলো তাঁর সনাতন নীতি। পবিত্র কোর’আনে সেরূপ নীতির কথা ও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি বার বার শোনানো হয়েছে।

যে দরিদ্র মুসলিম তাঁর জীবনের সমগ্র সঞ্চয়ই শুধু নয়, প্রিয় প্রাণটিও মহান আল্লাহতায়ালার পথে খরচ করতে দু’পায়ে খাড়া হয় তাঁকে তিনি সাহায্য করবেন না -সেটি কি হয়? কারণ, সে তো তাঁর দল তথা হিযবুল্লাহর সৈনিক। তখন ঈমানদারদের দুর্বলতা তিনি পুরণ করেন নিজের অসীম কুদরত দিয়ে। তবে যে কৃষক জমিতে কোন শ্রমই বিনিয়োগ করেনি, বপন করেনি একটি বীজও – সে কি করে ফসল ফলাতে পারে? রাব্বুল আ’লামীনই বা কি করে তার ঘরে ফসল তুলে দিবেন? সারা রাতের নফল ইবাদতে চোখের পানি ফেলে কি অনাবাদী জমিতে ফসল ফলানো যায়? সেটি সম্ভব হলে নবীজী (সাঃ) যুদ্ধের ময়দানে কেন নিজের রক্ত ফেললেন? প্রায় শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা কেন শহীদ হলেন? বিনিয়োগ ছাড়া যে বিজয় আসে না –এ সত্যটি বুঝে উঠা কি এতোই কঠিন? অথচ মুসলিম জীবনে সে সত্যের উপলব্ধি কোথায়? বিশ্বে আজ প্রায় দেড় শত কোটি মুসলিম। মুসলিম ভূমি একের পর এক অধিকৃত হচ্ছে। মুসলিমগণ দেশে দেশে লাশ হচ্ছে, মহিলারা ধর্ষিতা হচ্ছে। বহু লক্ষ মুসলিম উদ্বাস্তু হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মুসলিমদের নিজেদের বিনিয়োগটি কই?  ক’জন বিনিয়োগ করেছে নিজ অর্থ, রক্ত, শ্রম ও মেধা? নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াতে যারা নিজ সামর্থ্যের বিনিয়োগ করে না, মহান আল্লাহতায়ালা কি তাদের বিজয় দেন?

প্রতিটি পরাজয়েরই ইতিহাস থাকে। মুসলিম জীবনে পরাজয়ের শুরু তখন থেকেই যখন ফরজের বদলে নফল পালন বেশী গুরুত্ব পেয়েছে। নফল আদায় না করলে কেউ পাপী হয় না। অথচ ফরজ পালনে ব্যর্থতা শুধু কবিরা গুনাহই নয়, আযাবও ডেকে আনে। মুসলিম মাত্রই মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক। সৈনিকের দায়িত্বপালন প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ। এটিই তাঁর সার্বক্ষণিক ইবাদত। অতি গুরুতর অপরাধ হলো সে দায়িত্বপালনে অবহেলা দেখানো। মুসলিম মাত্রই যেমন জ্ঞানী হবে, তেমনি সৈনিক, জেনারেল, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী এবং ডাক্তারও হবে। কিন্তু এসবই হবে মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক রূপে উচ্চতর দায়িত্বপালনের তাগিদে। কারণ দ্বীনকে বিজয়ী করার লড়ায়ে মুর্খ সৈনিক আর জ্ঞানবান সৈনিকের অবদান এক নয়। এ লক্ষ্যে সে যেমন সুন্দর গৃহ ও শহর নির্মান করে, তেমনি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সেনানীবাস, অস্ত্রশিল্প, কলকারখানা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানও গড়ে। সভ্যতা নির্মানের লড়াইয়ে এগুলোও অপরিহার্য। কারণ সভ্যতা কখনোই তাঁবুতে বা মুর্খদের দ্বারা  গড়ে উঠে না। সুফিদের বড় অপরাধ, মুসলিমদেরকে জিহাদ ও সভ্যতা নির্মাণের মিশন থেকে উঠিয়ে খানকায় বা বদ্ধ গুহায় তুলেছিল এবং ত্বরান্বিত করেছিল সামরিক পরাজয়।

 

পথটি আত্মবিনাশের

মহান আল্লাহতায়ালার জমিনকে পাপ মুক্ত করা ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাই মুসলিম জীবনের মূল মিশন। নইলে অসম্ভব হয় সভ্য জীবন। তখণ প্লাবন আসে পাপাচারে। পাপ নির্মূলের এ পথে লড়াই অনিবার্য। কারণ পাপীরা বিনা যুদ্ধে পথ ছেড়েছে -সে নজির নেই। লড়াই এজন্যই মুসলিম জীবনে অনিবার্য। নবীজী (সা:)’র যুগে কোন মুসলিমই তা থেকে পরিত্রাণ পাননি। পরিস্থিতি আজও তা থেকে ভিন্নতর নয়। আর এ লড়ায়ে জিততে হলে প্রতিটি মুসলিমের যোগ্যতায় বৃদ্ধি আনাটি জুরুরি। মুর্খ, জ্ঞানহীন ও প্রস্তুতিহীন থাকাটি এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বড় অবাধ্যতা তথা মহাপাপ। এ পাপ আরো বহুপাপের জন্ম দিয়েছে। সত্য যত প্রবলই হোক -তা নিজ গুণে প্রতিষ্ঠা পায় না। প্রতিষ্ঠা পেলেও তা নিজ শক্তিতে টিকে থাকে না। সত্যের প্রতিষ্ঠা ও সেটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য চাই সার্বক্ষণিক সৈনিক। মুসলিম তো সে সৈনিকের কাজই করে। নবীপাক (সা:) এ কাজে আরবের বহু বস্তিতে ঘুরেছেন। গালী খেয়েছেন, রক্তাত্ব হয়েছেন এবং স্বশরীরে বহু যুদ্ধও লড়েছেন। সাহাবাগণ এ মিশন নিয়ে নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, বহু সাগরও অতিক্রম করেছিলেন। কিন্তু নবী জীবনের এ ফরজ ইবাদত আজ ক’জনের জীবনে?

মুসলমিদের মাঝে বিভক্তি গড়া ইসলামে হারাম। অথচ “ওয়া লা তাফাররাকু” (অর্থ: এবং তোমরা বিভক্ত হয়ো না) -মহান আল্লাহতায়ালার এ নির্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে খোদ মুসলিমগণ। হারাম হলো মুসলিম ভূমিতে অমুসলিম  শত্রু বাহিনীকে ঢেকে আনা। সে পাপ কর্মটিও হচ্ছে মুসলিমদের দ্বারা। মুসলিমদেরকে বলা হয়েছে “বুনিয়ানুম মারসুস” তথা সীসাঢালা প্রাচীরসম দেয়াল গড়তে। সেরূপ একতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ। ফলে মুসলিম রাষ্ট্রের আয়তন শতগুণ বাড়লেও রাষ্ট্রের সংখ্যা একটির স্থলে দুটি হয়নি। এক ও অভিন্ন রাষ্ট্রের মাঝে নানা ভাষী, নানা অঞ্চল ও নানা বর্ণের মানুষ একত্রে বসবাস করেছে। সেদিন মুসলিম বাহিনীর মূলে ছিল এই একতা। ফলে সেদিন মুসলিম জনপদে শত্রুবাহিনীর হাতে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাঠ হয়নি। কোন পাত্রে ময়লা জমলে সুস্থ্য মানুষের চেষ্ঠা হয় সেটিকে ময়লামুক্ত করায়। কিন্তু ময়লা জমেছে এ যুক্তিতে সে পাত্রটিকে ভেঙ্গে ফেলা শিশুসুলভ বালখিল্যতাই শুধু নয়, শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ সে জঘন্য অপরাধটি হয়েছে মুসলিম উম্মাহর ভূগোল ভাঙ্গার ক্ষেত্রে।

দেশের জনগণ দশটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে এ যুক্তিতে মুসলিম দেশকে দশ টুকরোয় বিভক্ত করা শুধু বিদয়াতই নয়, সুস্পষ্ট  হারামও। মুসলিম ভুমিতে এজিদদের মত ব্যক্তিদের স্বৈরশাসন একবার নয় বহুবার এসেছে। কিন্তু প্রাথমিক যুগের প্রজ্ঞাবান মুসলিমদের রাগ কখনই সেসব এজিদদের কারণে মুসলিম ভূমির অখন্ড মানচিত্রের  উপর গিয়ে পড়েনি। অপরাধ তো ভূগোলের নয়। ইজ্জত-আবরু, ধর্ম-সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার প্রতিরক্ষায় বৃহৎ ভূগোল শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়, অপরিহার্যও। ভূগোল বাড়াতে মুসলিমগণ যে বিস্তর অর্থ ও রক্ত ব্যয় করেছে -সেটি নিছক খেলাতামাশার জন্য নয়। বরং বিশ্বশক্তির মর্যাদা নিয়ে বেড়ে উঠার প্রয়োজনে। সে ভূগোলের ক্ষুদ্রকরণে একমাত্র শত্রুরাই খুশী হতে পারে। ফলে সে আমলে বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় পঞ্চাশ গুণ বৃহৎ মুসলিম ভূমিকে ভাঙ্গার কল্পনা ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মগজে ঢুকেনি। এ কাজে পৌত্তলিক, ইহুদী ও খৃষ্টানদের সাথে ষড়যন্ত্রও করেনি। অথচ এযুগের জাতিবিধ্বংসী নেতারা সে জঘন্য অপরাধই করেছে। এরাই শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়ে মুসলিম ভূগোলকে চূর্ণবিচূর্ণ করেছে। এভাবে বিনষ্ট করেছে বিশ্বশক্তি রূপে উত্থানের সম্ভাবনাকে। আজ যে মুসলিম উম্মাহর মেরুদন্ডহীন পঙ্গুদশা –সে জন্য তো এসব নেতারাই দায়ী। আর শুধু নেতারাই নয়, সাধারণ মুসলিমদের বিবেকশূণ্যতা ও চেতনাশূণ্যতাও কি কম? তাদের অপরাধ, মুজিবের ন্যায় শত্রুর সেবাদাসকে এরা নেতার আসনে বসিয়েছে। শুধু তাই নয়, অপরাধীদেরকে তারা জাতির পিতা বা জাতির বন্ধুরূপেও প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ফলে পাপ শুধু হেজাজের শরিফ হোসেন, তুরস্কের কামালপাশা, আফগানিস্তানের কারজাই বা বাংলাদেশের মুজিবদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বিস্তার পেয়েছে জনগণের মাঝেও। ফলে সে পাপ আযাব নামিয়ে এনেছে জনগণের উপরও।

 

পথটি গাদ্দারীর

অধুনা বিশ্বে মুসলিমদের সংখ্যা ও সম্পদ দুটিই বেড়েছে। সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সম্পদের কথা বাদই দেয়া যাক, শুধু মক্কা, মদিনা, রিয়াদ বা জেদ্দার ন্যায় নগরীগুলোতে যে সম্পদ জমা হয়েছে খোলাফায়ে রাশেদার আমলে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর হাতে তা ছিল না। সেদিন কাদামাটির জীর্ণঘরে বাস করতেন খলিফাগণও। অথচ মুসলিম ইতিহাসের সিংহভাগ গৌরবের নির্মাতা তারাই। মানুষের সৃষ্টির মধ্যে মহান আল্লাহতায়ালার সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা রয়েছে। মানব মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য পায় ও সফল হয় -সে এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়ার কারণে। সে এজেন্ডাটি হলো, “ওয়া মা খালাকতুল জিন্না ওয়াল ইনসানা ইল্লা লি’ইয়াবুদুন: অর্থ: “ইবাদত ভিন্ন অন্য কোন লক্ষ্যে আমি মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করিনি।”

ফলে যারা মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডার সাথে একাত্ম হতে চায়, ইবাদত ভিন্ন তাদের জীবনে অন্য কোন লক্ষ্য থাকতে পারে না। ইবাদতের অর্থ, আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের আনুগত্য। একাজ ক্ষণিকের নয়, আমৃত্যু। ইবাদত শুধু নামায রোযা বা হজ্ব-যাকাত নয়, বরং যেখানেই আল্লাহর হুকুম, ইবাদত হলো সে হুকুমেরই প্রতি আত্মসমর্পণ। এ ইবাদত যেমন মসজিদে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যে, রাজনীতি, সংস্কৃতি, অফিস-আদালত ও সামরিক বাহিনীতেও। মুসলিমের ঈমান ও ইবাদত তাঁর আমৃত্যু সহচর। ঈমান নিয়ে সে শুধু মসজিদেই যায় না বা হজ্বই করে না বরং রাজনীতি, অফিস আদালত, সামিরক ও বেসামরিক কর্ম ক্ষেত্রেও ঢুকে। প্রতিটি কাজের মধ্যেই তার ঈমান বিমূর্ত হয়।। আল্লাহর বাহিনীতে নাম লিপিবদ্ধ করার এটিই একমাত্র পথ। এবং এ পথেই প্রাপ্তী ঘটে আল্লাহপাকের গায়েবী মদদ। আল্লাহপাক কি কখনো তাঁর নিজ বাহিনীর পরাজয় চাইতে পারেন? প্রশ্ন হলো, মুসলিমগণ মহান আল্লাহতায়ালার সে ঘোষিত এজেন্ডার সাথে কতটা একাত্ম হতে পেরেছে? কতটা বেড়ে উঠতে পেরেছে তাঁর বাহিনী রূপে?

মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র যে পরাজয় –সে পরাজয় মহান আল্লাহপাকের বাহিনীর নয়। এ পরাজয় মূলত ভন্ড মুসলিমদের -যারা শুধু নামেই মুসলিম। তাদের ইসলাম যে নবীজী (সা:)র ইসলাম নয় –তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? নবীজী (সা:)’র ইসলাম হলে তো তাদের জীবনে ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, জিহাদ ও একতা থাকতো।  মুসলিমদের যে পরিচয় নবীজী (সা:)’র আমলে ছিল, সে পরিচয় নিয়ে কি তারা বেড়ে উঠতে পেরেছে? বরং তাদের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, সংস্কৃতি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ তো মহান আল্লাহর এজেন্ডার সাথে গাদ্দারীর আলামত। এমন গাদ্দারী কি আযাবই অনিবার্য করে না। তারা ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার বাহিনীতে নাম লেখাতে। ফলে তাঁর পক্ষ থেকে মদদই বা জুটবে কীরূপে? যারা মিথ্যা বলে, ঘুষ খায়, সূদ খায়, দূর্নীতি করে এবং ইসলামের শত্রুপক্ষকে নির্বাচিত করে –তারা কি করে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য পেতে পারে? যারা নিজেরাই তাঁর সৈনিক রূপে জিহাদে রাজী নয়, তাদের সাহায্য করলে তো বিজয়ী হয় শয়তান।

 

 

ব্যর্থতাটি মুসলিম হওয়ায়

মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি মুসলিম রূপে বেড়ে উঠায়। তাদের সকল ব্যর্থতার কারণ হলো এটি। যে লক্ষ্যে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল –বিচ্যুত হয়েছে সে লক্ষ্য থেকে। মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা বাদ দিয়ে তারা বাঁচছে নিজ স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, জাতীয় স্বার্থ ও গোত্রীয় স্বার্থ চেতনায়। নামায-রোযা-হজ্বের ন্যায় ইবাদত রূপ নিয়েছে নিছক আনুষ্ঠিকতায়। চরিত্র ও কর্মক্ষেত্র পূর্ণ হয়েছে মহান আল্লাহর অবাধ্যতায়। রাজনীতি, সংস্কৃতি, যুদ্ধবিগ্রহ এবং জীবন-সংগ্রামের সর্বক্ষেত্র থেকে বিলুপ্ত হয়েছে আল্লাহতায়ালার অনুগত বান্দাহ হওয়ার আকুতি। দূর্নীতি নির্মূলের এজেন্ডা ছেড়ে তারা জন্ম দিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের। মুসলিমের রাজনীতি হবে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার হাতিয়ারে, অথচ সেটি পরিণত হয়েছে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে। মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার বদলে তাদের রাজনৈতিক মিশন হলো, নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা। এটি যে শিরক –সে উপলব্ধিই বা ক’জনের চেতনায়? প্রশ্ন হলো, ইসলাম থেকে এতো দূরে সরে কি মুসলিম থাকা যায়?

মুসলিমগণ যুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিবে এবং শত্রুকে সন্ত্রস্ত করবে –এটিই ছিল মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ। কিন্তু মুসলিম জীবনে সে নির্দেশ গুরুত্ব পায়নি। বরং তারা ধরেছে উল্টো পথ। সন্ত্রস্ত করার বদলে সকল সামর্থ্য ব্যয় করে শত্রুকে তুষ্ট করতে। পতন এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে, চিহ্নিত শত্রুদের খুশী করতে এরা শুধু মুসলিম ভূমিকেই খন্ডিত করেনা বরং শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী জনগণকে নিরস্ত্র ও শক্তিহীনও করে। শেখ মুজিব ও তার দল তাই ভারতকে তুষ্ট করতে গিয়ে ১৯৭১’য়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে টুকরো করেছিল। এবং বিলুপ্ত করেছিল ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সীমান্তকে। সে সাথে পঙ্গু করেছিল সেনাবাহিনীকে। গণহত্যা চালিয়েছিল রক্ষিবাহিনী দিয়ে এবং চাপিয়ে দিয়ছিল স্বৈরাচারি বাকশালী শাসন। দূর্ভিক্ষ ডেকে এনে বহু লক্ষ মানুষের জীবনে মৃত্যুও ডেকে এনেছিল। ইসলামের উত্থান রুখতে সংকুচিত করেছিল ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামকে বিজয়ী করার রাজনীতি। একমাত্র আল্লাহর শত্রুগণই এমন কাজে খুশি হতে পারে। ইসলামের শত্রুদের খুশি করার এরূপ প্রকল্প নিয়ে কি মহান আল্লাহতায়ার রহমত আশা করা যায়? বরং তা তো আযাব নামিয়ে আনে। বাঙালী মুসলিমের জীবনে তখন আযাব ও অপমান বেড়েছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি হওয়ার মধ্য দিয়ে।

 

আগ্রহ নিয়ে ইজ্জত নিয়ে বাঁচায়

গোলামী নিয়ে বাঁচায় খরচ নাই। অথচ খরচটি বিশাল নিজ ঈমান-আক্বিদা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচায়। তখন বাঁচতে হয় পদে পদে যুদ্ধ করে। ইজ্জত নিয়ে বাঁচাকে নিশ্চিত করতেই মুসলিমদের উপর জিহাদকে ফরজ করা হয়েছে। আর কোন ধর্মে সে বিধান নাই। অথচ আজকের মুসলিমদের সমস্যাটি হলো তাদের মন থেকে সে ইজ্জত-চিন্তাই বিলুপ্ত হয়েছে। তারা বেছে নিয়েছে বৃহৎ শক্তির গোলামীর পথ। শত্রু শক্তি নারাজ হবে এভাবে সামরিক শক্তি বাড়াতেও তারা অনাগ্রহী। ফলে ক্ষুদ্র ও দরিদ্র উত্তর কোরিয়ার যে সামরিক শক্তি রয়েছে তা ধনকুবের সৌদিদের নেই। উত্তর কোরিয়া আনিবক বোমা নির্মান করছে অথচ সৌদিরা বন্দুকও তৈরি করতে পারে না। কারণ, সৌদিদের সে ইজ্জত-চিন্তাই নেই। নইলে ইসরাইলের চেয়ে প্রায় চারগুণ বৃহৎ জনশক্তি নিয়ে নিজ ভূমিতে কেন মার্কিনীদের স্থান দিবে? একই অবস্থা বাংলাদেশসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশের।

ইসলামের শত্রুরা একমাত্র  অস্ত্রের ভাষাই বোঝে। ন্যায়নীতির ওয়াজ তারা বোঝে না। ফলে ভারতের কাছে পাকিস্তানের যে মর্যাদা, বাংলাদেশের তা নেই। পাকিস্তানের সীমানায় তারা পা রাখতে ভয় পায়, অথচ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে গবাদী পশুই শুধু নয় নারী-পুরুষও ধরে নিয়ে যায়। এর কারণ, পাকিস্তানের পারমানবিক অস্ত্র, বিশাল সামরিক বাহিনী ও সদাজাগ্রত যুদ্ধাবস্থা। একই কারণে ক্ষুদ্র উত্তর কোরিয়াকেও সমীহ করে চলছে যুক্তরাষ্ট্র। সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী  ডোনাল্ড রামসফিল্ড ঘোষণা দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ করিয়া থেকে তাদের ৩৭ হাজার সৈন্য সরিয়ে নিবে। কারণ, উত্তর কোরিয়া মিজাইল ও পারমানবিক অস্ত্রের রেঞ্জের মধ্যে তাদের অবস্থান। ফলে ভীতি ঢুকেছে মার্কিনীদের মনে। অথচ বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবত মার্কিন সৈন্যের অপসারণের দাবীতে কত বিক্ষোভ হয়েছে রাজধানী সিয়োলের রাজপথে। কিন্তু এতকাল তাতে কর্ণপাতই করেনি। ১২ বছর যাবত ইরাকে মার্কিন হামলা না হওয়ার কারণ মার্কিনী ন্যায়নীতি নয়। বরং ইরাকের হাতে রাসায়নিক অস্ত্রের ভীতি। সে ভীতি দূর হয় জাতিসংঘ বাহনীর তদন্তের মাধ্যমে। সে ভয় দূর হওয়ার পরই শুরু হয় ইরাকের উপর মার্কিন হামলা।

অস্ত্র ও যুদ্ধের প্রস্তুতি শুধু যুদ্ধজয়ের জন্যই অপরিহার্য নয়, মান-সম্মান ও ইজ্জত-আবরু নিয়ে বাঁচার জন্যও। স্কুল -কলেজ, রাস্তা-ঘাট বা কলকারখানা ও কৃষি বাড়িয়ে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনা যায়, কিন্তু তাতে ইজ্জত-আবরু বাঁচে না। বাড়ে না নিরাপত্তা। কাতারী ও কুয়েতীদের স্বচ্ছলতা কি সাধারণ মার্কিনীদের চেয়ে কম? কিন্তু সে স্বচ্ছলতায় কি ইজ্জত বেড়েছে? কোন সম্মানী ব্যক্তিই অন্দরহমলে চিহ্নিত শত্রু বা অনাত্মীয়কে ঢুকতে দেয়না। কিন্তু এরা দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ প্রকাশ্যে ক্রুসেড ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে তার সেনাবাহিনী মুসলিমদের বন্ধু হয় কি করে? মুসলিম ভূমিতে সে বাহিনী প্রবেশের অনুমতিই বা পায় কি করে? নাদুস-নুদস দেহ নিয়ে পথের অনেক কুকুরও বাঁচে। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালা তো চান তাঁর প্রিয় বান্দাহরা ইজ্জত নিয়ে বাঁচুক। এজন্যই ঘোষণা দিয়েছেন, “ওয়া আয়েদ্দুলাহুম মাস্তাতা’তুম মিন কুওয়া..” অর্থাৎ “প্রস্তুত হও সমগ্র শক্তি দিয়ে।” তাই মহান আল্লাহতায়ালার সদাপ্রস্তুত সৈনিক হিসাবে এ প্রস্তুত হওয়াটিই মহান আল্লাহতায়ালার ইবাদত। এটি ফরজ। কোন মুসলিম কি মহান আল্লাহতায়ালার এ হুকুমের কি অবাধ্য হতে পারে? এমন অবাধ্যতা মহাপাপ। অবাধ্যতার এ পাপ যে আল্লাহতায়ালার আযাবকেই যে অনিবার্য করে তুলে -তা নিয়ে সন্দেহ আছে কি?   ১ম সংস্করণ ১২/০৩/২০০৩; ২য় সংস্করণ ০৫/০১/২০২১।




পতনমুখী উম্মাহর উত্থান কীরূপে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

লেখক পরিচিতি: বিলেতে মেডিসিনের কনসালটেন্ট; গবেষণা নিবন্ধ, পত্রিকার কলাম এবং বইয়ের লেখক; ইন্টার ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব সায়েন্টিফিক স্টাডিস অব পপুলিশেন (আই.ইউ.এস.এস.পি) ১৯৯৭ সালের চীনের বেইজিংয়ে ও ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলে  এবং ২০২০ সালের ফেব্রেয়ারীতে ফ্রান্সে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ও নরম্যান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান গবেষণা পেপার পেশ

শুরু কোত্থেকে?

মুসলিমদের পতন-যাত্রা বহু শত বছর পূর্বে শুরু হলেও এখনও শেষ হয়নি। বরং দিন দিন শত্রুদের হাতে পরাজয়ই বাড়ছে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ার বহু মুসলিম নগরী মাটির সাথে মিশে গেছে। তেমনি দেশে দেশে মুসলিমগণ নিহত, নির্যাতিত, ধর্ষিতা ও উদ্বাস্তু হচ্ছে। নির্যাতিত ফিলিস্তিনী মুসলিমদের সাথে যোগ হয়েছে ভারতের মুসলিম, চীনের উইঘুর মুসলিম, মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম, কাশ্মিরের মুসলিমের নিদারুণ দুর্দশা। পতনমুখী এ জাতির উত্থান নিয়ে যারা চিন্তিত তাদের প্রশ্ন, এ পতন যাত্রা থামানো যায় কীরূপে? উত্থানের কাজই বা শুরু করতে হবে কোত্থেকে? এ নিয়ে নানা জন নানা মতে বিভক্ত। তবে আশার কথা হলো, অন্য নানা বিষযের ন্যায় এ বিষয়েও নির্ভূল নির্দেশনাটি পাওয়া যায় মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষনা ও নবীজী (সাঃ)’র সূন্নত থেকে। ব্যক্তি ও জাতি গঠনের কাজে নির্ভূল রোড ম্যাপ হলো পবিত্র কোর’আন। একই রূপ পতিত দশায় ছিল আরবের জনগণ। সে কোর’আনী রোড ম্যাপ নিয়ে নবীজী (সাঃ) যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন আমাদেরও জাতি গঠনের কাজ সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। আর সে নির্দেশনাটি হলো ’ইকরা’ তথা ’পড়’ অর্থাৎ জ্ঞানার্জন করো।

“ইকরা” একটি প্রতিকী শব্দ। এর অর্থ: পাঠ করো। পবিত্র কোর’আনের প্রথম শব্দটি ঈমান, নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত বা কোন নেক আমল নয়, সেটি “ইকরা”। পড়া বা অধ্যয়ন যেহেতু জ্ঞানার্জনের চাবি, পবিত্র কোরআনের প্রথম শব্দ রূপে এ শব্দটি নির্বাচন করে মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা বুঝি দিয়েছেন মানব জীবনে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব কত অপরিসীম। জ্ঞান দেয় মনের আলো। দেয় নানা পথের ভীড়ে সত্য পথটি চেনার সামর্থ্য। তখন পথহারা মানুষটি পায় হিদায়াত। পায় আলোর পথ। অন্ধকার যেমন আচ্ছন্ন করে রাখে রাতের পৃথিবীকে, অজ্ঞতাও তেমনি আচ্ছন্ন করে মনের ভুবনকে। অজ্ঞতা এভাবেই ব্যক্তির জীবনে আনে সত্যপথ থেকে বিচ্যুতি। এবং অসম্ভব করে জান্নাতের পথে পথচলা। সত্যের তথা ইসলামের বড় শত্রু তাই অজ্ঞতা। অজ্ঞতা না সরিয়ে ইসলামের পথে চলা অসম্ভব। পবিত্র কোর’আনের শুরুটি তাই “ইকরা” তথা পাঠ করো অর্থাৎ জ্ঞানার্জন করো -এ নির্দেশ দিয়ে।

অতি পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিমদের ব্যর্থতা যেমন জ্ঞানের গুরুত্ব বুঝায়, তেমনি ব্যর্থতা অজ্ঞতার নাশকতা বুঝায়। সেটি বুঝলে শতভাগ মুসলিম জ্ঞানী তথা আলেম হতো। জ্ঞান ছাড়া যে মুসলিম হওয়া যায় না –সেটিও তখন বুঝতো। অজ্ঞতার আরবী পরিভাষা হলো জাহিলিয়াত। যে কোন মানব সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামতটি যেমন তার জ্ঞান, তেমনি তার জীবনে সবচেয়ে ভয়ানক নাশকতাটি ঘটে অজ্ঞতার কারণে। জ্ঞানের বরকতে মানুষ ফিরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ হতে পারে। জ্ঞানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই হযরত আদম (আ:) ফিরেশতাদের সেজদা পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন। পানাহারারের অভাবে জীবন ব্যর্থ হয় না, সে জন্য কেউ জাহান্নামের আগুনে যাবে না। কিন্তু জাহান্নামে নেয় অজ্ঞতা। মানব জীবনের সব চেয় বড় পাপ তাই অজ্ঞ থাকা। এ পাপ আরো অনেক পাপের জন্ম দেয় এবং অসম্ভব করে ঈমানদার হওয়া এবং পরকালে জান্নাত পাওয়া। রাতের অন্ধকার যেমন শিকার ধরতে সুযোগ করে দেয়, মনের অন্ধকার তেমনি সুযোগ সৃষ্টি করে শয়তানের শিকার ধরায়। শয়তানের মূল হাতিয়ার হলো অজ্ঞতার অন্ধকার, তাই সে মানবকে আলো থেকে অন্ধকারে নেয়। শয়তান জাহিলিয়াতের ফেরী করে ও ফাঁদ পাতে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, বুদ্ধিবৃত্তির ন্যায় জীবনের প্রতিটির ক্ষেত্র জুড়ে। সেখান থেকে যাত্রী তুলে জাহান্নামে পথে। তাই মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাটি শুধু বিষাক্ত সাপ বা হিংস্র পশু থেকে বাঁচা নয়, বরং অজ্ঞতা দূর করা এবং শয়তানের ফাঁদগুলো থেকে বাঁচা। সে জন্য চাই জ্ঞান। এবং সে জ্ঞানটি হতে হয় পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান। একমাত্র সে জ্ঞানই দেয়  ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য, শিষ্ঠ-অশিষ্ঠ এবং শ্লিল-অশ্লিল চেনার সামর্থ্য। এবং নেয় অন্ধকার থেকে আলোতে।

 

শ্রেষ্ঠদান ও সবচেয়ে বড় নাশকতা

পবিত্র কোর’আনে পাকে বলা হয়েছে,‘‘আল্লাহু ওয়ালী উল্লাযীনা আমানু ইয়ুখরিজুহুম মিনাযযুলুমাতি ইলান্নূর।’’- (সুরা বাকারা)। অর্থ: ‘‘যারা ঈমান আনলো, তাদের বন্ধু হলো আল্লাহ; তিনি তাঁদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে আসেন।’’ পবিত্র কোর’আনের এ আয়াতটি মহান আল্লাহতায়ালা গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘোষণা দিয়েছেন। এবং এ বিশেষ ঘোষণাটি একমাত্র ঈমানদারদের জন্য। এ আয়াতে মহান রাব্বুল আলামীন নিজেকে পরিচয় করিয়েছেন ঈমানদারদের বন্ধু রূপে। প্রশ্ন হলো, ঈমানদারের জন্য এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আর কি হতে পারে? মহান আল্লাহতায়ালাকে নিজের বন্ধু রূপে পাওয়ার চেয়ে বড় পাওয়াই বা কি হতে পারে? এবং প্রতিশ্রুতি পালনে মহান আল্লাহতায়ালার চেয়ে আর কে শ্রেষ্ঠতর হতে পারেন? তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকার জন্য এ বিশাল মেহেরবানীই কি যথেষ্ট নয়? উক্ত আয়াতে দ্বিতীয় ঘোষণাটি হলো, বন্ধু রূপে মহান আল্লাহতায়ালার বড় দানটি এই যে তিনি ঈমানদারদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসেন। অর্থ দাঁড়ায়, অন্ধকার থেকে আলোতে নেয়ার চেয়ে অধিক উপকার অন্য কিছুতে হতে পারে না। যে আলোর পথ পায়, সেই পায় জান্নাত। উক্ত আয়াতে যে আলোর কথা বলা হয়েছে, সেটি সূর্যের আলো নয়। সেটি মনের আলো তথা জ্ঞান। এবং সেটি কোর’আনের জ্ঞান। সূর্যের আলো তিনি গাছপালা, পশুপাখীসহ সবাইকে দেন। কাফেরদেরও দেন। কিন্তু মনের আলো তথা কোর’আনের জ্ঞান পায় একমাত্র ঈমানদারগণ। এবং এ জ্ঞানই দেয় জীবনের পথ চলায় হিদায়াত। যার জীবনে সে জ্ঞান নাই, তার জীবনে হিদায়েতও নাই। বস্তুত মহান আল্লাাহতয়ালার উপর ঈমান আনার এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিদান। মহান আল্লাহতায়ালার সর্বোত্তম পুরস্কারটি তাই ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি বা উত্তম চেহারা-সুরত নয়, সেটি হলো এই কোর’আনী জ্ঞান।

উপরুক্ত আয়াতে আরেকটি সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। সেটি হলো, বেঈমানদের বন্ধু হলো শয়তান। শয়তান তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়। মানব জাতির বিরুদ্ধে এটিই হলো শয়তানের সবচেয়ে বড় নাশকতা। এজন্যই দেখা যায়, যেখানেই বাড়ে শয়তানদের আধিপত্য, সেখানেই বাড়ে অজ্ঞতার গভীরতা। এই অজ্ঞতার কারণেই মুসলিম বিশ্ব জুড়ে প্রবলতর হয়েছে শত্রুশক্তির বিজয় এবং এসেছে শরিয়তের পরাজয়। তাই মহান আল্লাহতায়ালার নিয়ামত প্রাপ্তির বড় আলামতটি হলো জ্ঞানবান হওয়া। অপর দিকে কোর’আনী জ্ঞানে অজ্ঞতা প্রমাণ করে শয়তানের বিজয়। তাই নামে মুসলিম হলেও এমন ব্যক্তির অন্ধকারময় ও দূর্বৃত্তময় জীবন দেখে নিশ্চিত বলা যায়, জ্ঞান, ঈমান ও মহান আল্লাহর বন্ধুত্ব –এরূপ নেয়ামতের কোনটিই তার জীবনে জুটেনি। অথচ এটিই হলো আজকের মুসলিমদের প্রকৃত চিত্র। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া কোর’আনী আলো পেয়ে আরবের নিরক্ষর মুসলিমগণ আজ থেকে ১৪ শত বছর পূর্বে অন্যায়, অসত্য ও অসুন্দরকে সঠিক ভাবে যেমন সনাক্ত করেছিলেন, তেমনি নির্মূলও করেছিলেন। ফলে নিজেদের বাঁচাতে পেরেছিলেন শয়তানের বিছানো ফাঁদ থেকে। সেটিই ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তাতে তাদের মর্যাদা জুটেছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে। অথচ সে সাফল্য মুসলিম নামধারি পন্ডিতদের যেমন জুটছে না, তেমনি জুটছে না পাশ্চাত্যের নবেল প্রাইজ বিজয়ী জ্ঞানীদেরও। ফলে মুসলিমধারি শিক্ষিত বাংলাদেশীরা যেমন দেশকে দূর্নীতিতে বিশ্বের শীর্ষে নিয়ে গেছে, তেমনি পাশ্চাত্যের শিক্ষিতরাও ব্যভিচার, ফ্রি-সেক্স, হোমোসেক্সুয়ালিটি, মদপানের ন্যায় আদিম পাপাচারকে সভ্য আচার রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

অজ্ঞতায় অসম্ভব হয় ইবাদত

জ্ঞানার্জন ছাড়া অন্য ফরজগুলোও যথাযত পালিত হয় না। ইসলাম খৃষ্টান ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের ন্যায় নয় যে গীর্জার যাযক বা মন্দিরের ঠাকুরকে দিয়ে বন্দেগী করিয়ে নেয়া যায়। ইবাদতের দায়িত্ব একান্তই ব্যক্তির নিজের, কাউকে দিয়ে এ দায়িত্ব পালন হওয়ার নয়। তাই ইসলামের খলিফাকেও প্রজার ন্যায় একই ভাবে নামাজ, রোযা, হজ্ব ও অন্য ইবাদত করতে হয়েছে। অজ্ঞতা নিয়ে ইবাদত হয় না, ইবাদতের সামর্থ্য অর্জনে জ্ঞানার্জন অপরিহার্য। অন্য ধর্মে বিদ্যাশিক্ষা ফরজ নয়। অন্য ধর্মগুলি যে কতটা ভ্রান্ত -সেটি বুঝা যায় জ্ঞানার্জনের বিষয়টি গুরুত্ব না দেয়া থেকে। কারণ জ্ঞান না বাড়িয়ে কি  মানুষ গড়া যায়? এক্ষেত্রে ইসলাম য সর্বশ্রেষ্ঠ ও অনন্য -সেটি বুঝা যায় জ্ঞানার্জনকে ফরজ করা থেকে। ইসলাম জ্ঞানার্জনক বাধ্যতামূলক করেছে নামায-রোযার ফরজ হওয়ার প্রায় ১১ বছর আগে। তবে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য শুধু পড়া, লেখা বা হিসাব নিকাশের সামর্থ্য বৃদ্ধি নয়, বরং মনের অন্ধকার দূর করা। ব্যক্তির দেখবার ও ভাববার সামর্থ্যে সমৃদ্ধি আনা।

মনের অন্ধকার নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার কুদরতকে দেখা যায় না। দেখা যায় না তাঁর মহান সৃষ্টিরহস্যকেও। জাহেল ব্যক্তির আচরন তাই অজ্ঞের ন্যায়। আল্লাহর অসীম সৃষ্টি জগতের মাঝে বসেও তাঁর অস্তিত্বকে সে অস্বীকার করে। জাহলে ব্যক্তির ইবাদতে তাই মনের সংযোগ থাকে না। ইসলাম মানব মনের এ অন্ধকার দূর করতে চায়, সদা জাগ্রত রাখতে চায় আল্লাহ-সচেতনতা তথা তাকওয়া। মানব কল্যাণে এটিই হলো শ্রেষ্ঠ নেক কর্ম। মানব রূপে বেড়ে উঠার জন্য এর বিকল্প নেই। জ্ঞানার্জন ইসলামে নিজেই কোন লক্ষ্য নয়, বরং এটি লক্ষ্যে পৌঁছবার মাধ্যম মাত্র। আর লক্ষ্যটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা পালনে নিজেকে লাগাতর যোগ্যতর করা। লক্ষ্য, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। এটিই তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। চালক যেমন গাড়ী চালনায় সর্বপ্রথম গন্তব্যস্থলকে জেনে নেয় এবং রোডম্যাপ মেনে গাড়ি চালায়, একজন মুসলিমকেও তেমনি সঠিক রোডম্যাপকে জানতে চায় এবং সে রোডম্যাপ অনুসরণ করতে হয়। নইলে অসম্ভব হয় জান্নাতে বা মহান আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছা। গাড়ি চালনায় গাড়ির মান ও গতিই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, তার চেয়েও অধিক গুরুত্পূর্ণ হলো পথটি সঠিক কিনা –সেটি। বিজ্ঞানের বৈপ্লবিক অগ্রগতির পরও অসংখ্য মানব যে আজ সীমাহীন বিভ্রান্তির শিকার তার মূল কারণ, সে রোডম্যাপ নিয়ে অজ্ঞতা। জীবন চালনায় বিশুদ্ধ রোড-ম্যাপটি বিদ্যমান একমাত্র পবিত্র কোর’আনে। মানব জাতির জন্য এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান। এ দিক দিয়ে মুসলিমরাই সবচেয়ে ভাগ্যবান। এবং মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো এ রোডম্যাপের জ্ঞানার্জন। বিষয়টি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে এখানে ভূল হলে বা অবহেলা হলে অনিবার্য হয় পরকালে জাহান্নামে পৌঁছা। দুনিয়ার জীবনও তখন ব্যর্থতায় ভরে উঠে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন তো তখনই রোগমুক্তি ঘটায় যখন সেটি মেনে ঔষধ খাওয়া হয়। ফলে না বুঝে তেলাওয়াতে বা মুখস্থ্য করায় কোর’আন থেকে জ্ঞান লাভের কাজটি যেমন হয় না, তেমনি হয়না কোর’আন মেনে জীবন চালানোর কাজটিও। তখন প্রচণ্ড বেঈমানী ঘটে মহান আল্লাহতায়ালার এই শ্রেষ্ঠ নেয়ামতটির সাথে। এবং সে বেঈমানী তখন ভয়ানক আযাব নামিয়ে আনে। মুসলিম বিশ্বকে তো সে আযাবই ঘিরে ধরেছে।

ইসলামে জ্ঞানের অর্থ এ নয়, তাতে শুধু উপার্জনের সামর্থ্য বাড়বে বা কলাকৌশলে দক্ষতা বাড়বে। জ্ঞানের মোদ্দা কথাটি হলো, তাতে সৃষ্টি হতে হবে মহান আল্লাহতায়ালার ভয়। যে জ্ঞান ব্যক্তির মনে মহান আল্লাহতায়ালার ভয় সৃষ্টিতে ব্যর্থ -সে জ্ঞান জ্ঞানই নয়। সেটি জ্ঞানের লেবাসে আরেক অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত। মহান আল্লাহতায়ালা কোরআন মজিদে বলেছেন একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে। এ থেকে বুঝা যায়, মহান আল্লাহপাক জ্ঞান বলতে কি বুঝাতে চান। যার মধ্যে আল্লাহর ভয় নেই, তার মধ্যে ইলমও নেই। কোরআন মজীদের অন্যত্র বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টি ও রাত-দিনের ঘুর্ণায়নের মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” অর্থাৎ বিশ্ব চরাচর হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিশাল গ্রন্থ। এ গ্রন্থ্যের প্রতিটি ছত্রে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য আয়াত বা নিদর্শন। জ্ঞানী তো তারাই যারা সে গ্রন্থ থেকে শিক্ষা লাভের  সামর্থ্য রাখে। এ সামর্থ্য না থাকাটিই মানব মনের সবচেয়ে বড় পঙ্গুত্ব -যা অসম্ভব করে মানবিক গুণে বেড়ে উঠাটি। এ সামর্থ্য না থাকলে সিরাতুল মোস্তাকীমে চলতে আল্লাহতায়ালার আয়াতগুলো নানা প্রান্তর থেকে যে সিগনাল দেয় -তা বুঝতে সে ব্যর্থ হয়। তখন বিজ্ঞানী হয়েও মামূলী বিষয়ে বিশাল ভূল করে।

বিশ্বের কোন জ্ঞানই কোরআনী জ্ঞানের সমকক্ষ হওয়া দুরে থাক, তুলনীয়ও হতে পারে না। কারণ, বিশুদ্ধ জ্ঞানের উৎপাদনে মানুষের সামর্থ্য অতি সামান্য। যত বড় জ্ঞানী বা বিজ্ঞানীই হোক, সে ব্যক্তি নিজেই জানে না আগামী কাল সে বাঁচবে কি বাঁচবে না। দেয়ালের ওপারে কি আছে সেটি জানার সামর্থ্য তার নাই। সে সীমিত জ্ঞান নিয়ে তখন ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যার সংজ্ঞা খুঁজতেই হিমসিম খেতে হয়। ফলে ব্যর্থ হয় ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা দিতে। সম্পদে নারীদের বঞ্চিত করা, কৃষ্ণাঙ্গদের পশুর ন্যায় হাটে তোলা, রেড-ইন্ডিয়ানদের নির্মূল করা, ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার ন্যায় অসভ্যতাগুলি তো হয়েছে তো সে আদিম অজ্ঞতার কারণেই। অথচ ইসলাম ১৪ শত পূর্বেই সে অসভ্যতার দাফন করেছে। ধর্মবিবর্জিত যে শিক্ষার কারণে পাশ্চাত্য-সমাজ আজ বিপর্যয়ের মুখে। অথচ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় মুসলিমগণও আজ সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। ফলে বিপর্যয় তাদেরও ধাওয়া করছে। ফলে উত্থানের বদলে দিন দিন বাড়ছে তাদের পতন-যাত্রায় গতি।

 

বিজয় যে পথে আসে

বিজয়ের পথ খুঁজে পেতে হলে অবশ্যই দেখতে হবে, মুসলিমদের বিস্ময়কর অতীত সফলতার মূলে কি ছিল –সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। ইতিহাসের মূল্য অপরিসীম। বস্তুত জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো ইতিহাস বিজ্ঞান। বিজয়ের ইতিহাস নির্মাণে রক্ত, অর্থ, শ্রম, মেধা ও সময়ের ব্যয়গুলি বিশাল। যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় তারা বাঁচে সে বিশাল খরচ থেকে। বাঁচে একই ভূল বার বার করা থেকে। তাই মুসলিমদের বিজয়ের অতীত ইতিহাসই দিতে পারে বিজয়ের পথ চলার সঠিক নির্দেশনা। কিন্তু সমস্যা হলো, নিজেদের সে ইতিহাস পাঠে মুসলিমদের আগ্রহ সামান্যই। তারা বহু কিছুই শিখছে; মুসলিম দেশগুলো ভরে উঠছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু তারা শিখছে না সে গৌরবোজ্জল ইতিহাস থেকে। ফলে তাদের জানাই হয়নি চলমান পতন-যাত্রা থেকে উদ্ধারের পরিক্ষিত পথটি।

অথচ ইতিহাসের পাঠ কোন জটিল রকেট সায়েন্স নয়। বরং ইতিহাসের পাঠ অতি সহজ। মোটা দাগে ও চোখ আঙ্গুল দিয়ে ইতিহাস তার শিক্ষনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরে। সেগুলো বুঝবার জন্য বিশাল ডিগ্রীধারী, বড় মাপের জ্ঞানী বা আল্লামা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। শুধু চাই সুস্থ্য বিবেক, চিন্তার সামর্থ্য ও শিক্ষা লাভে গভীর আগ্রহ।  তখন সাধারণ মানুষও তা বুঝতে পারে এবং তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। মুসলিমদের অতীত বিজয় ও গর্বের মূলে ছিল মাত্র তিনটি বিষয়। এক). পবিত্র কোর’আনের পূর্ণ অনুসরণ। রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, বিচার-আচারে রোডম্যাপ রূপে গ্রহণ করেছিলেন তারা কোর’আনী বিধানকে। বাস্তবতা হলো, কোর’আন ছাড়া তাদের সামনে সে সময় আর কোন কিতাবই ছিল না। দুই). একতা। ভাষা, বর্ণ, অঞ্চল ও গোত্র-ভিত্তিক চেতনার উর্দ্ধে উঠে তারা গড়েছিলেন প্যান-ইসলামিক একতার সংস্কৃতি। ফলে আরব, ইরানী, কুর্দ, তুর্ক, মুর ইত্যাদি নানা পরিচয়ের মানুষ সেদিন এক কাতারে এবং একই লক্ষ্যে শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তারা বিভ্ক্ত হননি। জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, সেক্যুলারিজমের ন্যায় ভ্রষ্ট মতবাদ তাদের মগজে তখন স্থান পায়নি।  তিন). জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ তথা মহান আল্লাহতায়ালার রাস্তায় জিহাদ। সে সময় জিহাদ ভিন্ন তাদের জীবনে আর কোন যুদ্ধই ছিল না। তারা নিজেদের সমুদয় সামর্থ্যের বিনিয়োগ করেছিলেন মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার লক্ষ্যে। সে পথে শহীদ হওয়াকে তারা জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন মনে করতেন। জনগণের মাঝে সে জিহাদী চেতনার কারণে মুসলিম রাষ্ট্র পেয়েছিল অপ্রতিরোধ্য প্রতিরক্ষা ক্ষমতা। সে পবিত্র চেতনায় প্রতিটি নাগরিক পরিণত হয়েছিল সৈন্যে এবং সমগ্র দেশ পরিণত হয়েছিল সেনানীবাসে।

আজও চলমান পতন-যাত্রা থেকে মুক্তি ও বিজয়ের পথে এগোনের এ ছাড়া ভিন্ন পথ আছে কি? সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে তাদের সে পথই তো একমাত্র পরিক্ষিত পথ। আরো লক্ষনীয় হলো, কোর’আনের জ্ঞানার্জন, সীসা-ঢালা একতা এবং আল্লাহর পথে জিহাদ – এ তিনটি বিষয়ই প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ। পবিত্র কোর’আনের সাথে গাদ্দারী করে কেউ যেমন মুসলিম থাকে না। তেমন মুসলিম থাকে একতা ও জিহাদের সাথে গাদ্দারী করেও। একমাত্র অনৈক্যের কারণেই যে মুসলিমদের উপর ভয়ানক আযাব নেমে আসে -সে সুস্পষ্ট হুশিয়ারিটি এসেছে সুরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। মুসলিমদের আজকের পরাজয়ের মূল কারণ, উপরুক্ত তিনটি ফরজ পালন থেকে তারা দূরে সরেছে। বরং চলছে উল্টো পথে। তারা যেমন দূরে সরেছে পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান থেকে, তেমনি ধাবিত হয়েছে অনৈক্যের পথে। এবং জিহাদ বিলুপ্ত হয়েছে তাদে জীবন থেকে। ঐক্যের বদলে তারা গড়েছে ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল ভিত্তিক অনৈক্য। মুসলিম বিশ্ব আজ ৫৭ টুকরায় বিভক্ত। অথচ গৌরবকালে তাদের ছিল এক অখন্ড ভূগোল। তারা আজ রক্ত দেয়, অর্থ দেয় ও মেধা দেয় নিজেদের ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা অঞ্চলের নাম বড় করতে, আল্লাহতায়ালার নাম বড় করতে বা তাঁর দ্বীনের বিজয় আনতে নয়। ফলে তারা যে পথ ধরেছে -তা তো বহু পরিক্ষিত পরাজয়ের পথ। এ পথ জাহান্নামের পথও। ইসলামের বিজয় নিয়ে যাদের সামান্যতম ভাবনা আছে এবং যারা বাঁচে মহান আল্লাহকে খুশি করার ভাবনা নিয়ে এবং চায় জান্নাত -তারা কি কখনো এ পথ বেছে নিতে পারে? ১ম সংস্করন ২৭/০৫/২০০৭; ২য় সংস্করন ০১/০১/২০২১   

 




পাশ্চাত্য দেশে যে মহাসংকট মুসলিমদের

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বিপদ স্রোতে ভেসে যাওয়ার

অনৈসলামিক দেশে বসবাস যে কতটা বিপদজনক -তা পাশ্চাত্য দেশগুলোতে ইতিমধ্যেই ফলতে শুরু করেছে। বানের জলে ভাসার চেয়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্লাবনে ভাসার বিপদ যে কম নয় -সে বিষয়টি এখন সুস্পষ্ট। বানের জলে ক্ষেতের ফসল ও গরুছাগল ভেসে যায়, কিন্তু এখানে ভেসে যাচ্ছে তাদের নিজের ও নিজ সন্তানদের ঈমান-আখলাক, রুচিবোধ ও সংস্কৃতি। ফলে ভেসে যাচ্ছে পরকাল। পরকাল হারানোর চেয়ে বড় বিপদ মানব জীবনে আর কি হতে পারে? অথচ সে মহাবিপদই মুসলিমদের ঘিরে ধরেছে। পরকাল বাঁচাতে মুসলিমগণ নিজেদের ঈমান-আখলাক, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ বাঁচায় এবং সেগুলো বাঁচাতে আলাদা রাষ্ট্র গড়বে, ভিন্ন কম্যুনিটি ও প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিবে এবং এ কাজে অর্থদান ও শ্রমদানের পাশাপাশি লড়াই করবে -সেটিই ছিল কাঙ্খিত। যুগে যুগে মুসলিমগণ তাই করেছে। অথচ পাশ্চাত্য দেশগুলিতে সেগুলোর কিছুই হচ্ছে না। বরং ঈমান-আখলাক ও সংস্কৃতি বাঁচাতে নয়, নিছক পানাহারে বাঁচার প্রয়োজনে মুসলিমগণ পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে ঈমান বিসর্জন দিচ্ছে। ভুলে যাচ্ছে নিজেদের ধর্ম, রুচিবোধ ও সংস্কৃতি। এটি কি কম আতংকের?

শংকার আরো কারণ, অধিকাংশ মুসলিমের মনে এ ভাবে স্রোতে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে কোন দুশ্চিন্তাও নেই। বিপদ বোঝার মত বোধশক্তিও নেই। তাদের দুশ্চিন্তা বরং পাউন্ত-ডলারের কামাই কি করে আরো বাড়ানো যায় -তা নিয়ে। উপার্জন বাড়াতে অনেকে মদবিক্রয়, রেস্তোঁরায় মদ সরবরাহের ন্যায় হারাম পথও ধরেছেন। অনেকে নানারূপ দুর্নীতিতেও নেমেছে। মুসলিমদের পচন যে কত গভীরে পৌঁছেছে -এসব হলো তারই প্রমাণ। উদ্ভিদও বেড়ে উঠার জন্য অনুকূল পরিবেশ চায়। বীজ যত উত্তমই হোক তা পাথরের উপর বা মরুভূমিতে গজায় না। ঝোপঝাড়েও বেড়ে উঠে না। একই কারণে অনুকূল পরিবেশ অপরিহার্য মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্যও। তেমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতেই নবীজী (সা:) মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। এবং মদিনার বুকে সর্বপ্রথম যে কাজটি করেছিলেন -সেটি হলো ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্টা। এবং নিজে রাষ্ট্রপ্রধানের  আসনে বসে সেটিকে এক শ্রেষ্ঠ সূন্নত রূপে প্রতিষ্টা দিয়েছিলেন। তাঁর সাহাবাদের জান ও মালের সবচেয়ে বেশী কোরবানী পেশ করতে হয়েছে সে রাষ্ট্রের শক্তি বাড়াতে ও প্রতিরক্ষা দিতে। মুসলিমগণ তাদের গৌরব কালে যে ভাবে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন -তার মূলে ছিল এ ইসলামী রাষ্ট্র। রাষ্ট্র না গড়ে শুধু মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়ে কি সেটি সম্ভব  হতো? অথচ ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও আদর্শের তীব্র স্রোতে বীজ ছিটিয়ে মুসলিমগণ ভাবছে তাদের নতুন প্রজন্ম সুন্দর ভবিষ্যৎ পাবে!

 

স্রোতে ভাসা কি মুসলিমের সাজে?

অন্যদের বাঁচা আর মুসলিমদের বাঁচা এক নয়। মুসলিম উদ্ভিদ নয়, অন্য জীবজন্তু বা পশুপাখিও নয় যে শুধু জন্মালো, কিছু খেলো, কিছুকাল বাঁচলো এবং মরে গেল। মুসলিম নিছক বাঁচার জন্য বাঁচে না। মরার জন্যও মরে না। মুসলিমের বাঁচা ও মরা –উভয়ের মধ্যেই সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকে। তাঁকে বাঁচতে হয়, প্রতি পদে ইবাদত নিয়ে। বাঁচতে হয় সিরাতুল মুস্তাকীম বেয়ে। মরতে হয় মহান আল্লাহ-প্রদত্ত মিশনকে নিয়ে। তাই কোন একটি দেশে বাঁচলেই চলে না, ইসলামের মিশনটি নিয়ে সেদেশে বাঁচাটি কতটা নিশ্চিত -ঈমানদারকে সে বিষয়কেও গভীর ভাবে খতিয়ে দেখতে হয়। নিছক বাঁচার স্বার্থে সাইবেরিয়ার পাখিরা শীত কালে হাজার হাজার মাইল উড়ে অন্য দেশে পাড়ি দেয়। পাখির বাঁচাতে রাজনীতি, আদর্শ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি লাগে না। কিন্তু সেরূপ বাঁচাটি কি ঈমানদারের লক্ষ্য হতে পারে? মুসলিমদের পরিচয়টি সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির। সে বিশেষ মর্যাদাটি স্রেফ পানাহারে বাঁচার কারণে নয়, বরং মিশন নিয়ে বাঁচার কারণে। সেটি হলো, “আ’মিরু বিল মারুফ” তথা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং “নেহী আনিল মুনকার” তথা অন্যায়ের নির্মূল। লক্ষ্য, উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণ। এরূপ একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বাঁচা ও মরার কারণেই মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের “খায়রুল উম্মাহ” তথা সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ রূপে অভিহিত করেছেন। তবে এ কাজের জন্য তাঁরা মহান আল্লাহতায়ালার কারিগর মাত্র, আর্কিটেক্ট বা ডিজাইনারও নন। কিভাবে সে সভ্যতা নির্মিত হবে সেটির ডিজাইন ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। কোরআন পাক তো সে নির্দেশনারই কিতাব।

রাসূলে পাক (সা:) নিজ হাতে দেখিয়ে গেছেন, পবিত্র কোর’আনে বর্ণীত সে নির্দেশনাগুলো কি করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে কার্যকর করতে হয়। মুসলিমের প্রতি মুহুর্তের ব্যস্ততা হলো, এ মিশনকে বিজয়ী করা। সে বাঁচে, এবং বাঁচার জন্য কিছু উপার্জন করে শুধু এ মিশন চালিয়ে যাওয়ার জন্য। সে জ্ঞানার্জন করে, ঘর গড়ে, কখনো ঘর ছেড়ে হিজরত করে -নিছক সভ্যতর সমাজ নির্মাণের স্বার্থে। এটিই ঈমানদারের জিহাদ। তাই মুমিনের জীবনে শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত থাকে না, লাগাতর জিহাদও থাকে। এ জিহাদ নিজের ও অন্যদের ঈমান ও আমল বাঁচানোর। এরূপ অবিরাম জিহাদ থাকার কারণেই মুসলিমগণ তাই অনৈসলামিক সমাজে হারিয়ে যায় না, বরং অন্যরা হারিয়ে যায় তাদের সৃষ্ট সমাজে।

পানি ছাড়া যেমন মাছ বাঁচে না, মুসলিমও তেমনি বাঁচে না ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি ছাড়া। তাই একজন হিন্দু, চৈনীক বা খৃষ্টান যত সহজে ভিন্ দেশে খাপ খাইয়ে নেয়, কোন মুসলিম তা পারে না। শক, হুন, বৈদ্ধ, জৈন প্রভৃতি ধর্মের লোকেরা ভারতের হিন্দু সমাজে হারিয়ে গেলেও মুসলিমগণ যে হারিয়ে যায়নি -তার কারন তো এটিই। মুসলিমগণ যেখানেই গেছে সেখানেই তাঁরা মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথ ধরে কোর’আনের জ্ঞান-নির্ভর ইসলামী ধারার জন্ম দিয়েছে। এরূপ একটি ভিন্ন ধারা জন্ম দেয়ার মধ্যেই নিশ্চিত হয় মুসলিমের ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকাটি। নইলে হারিয়ে যেতে হয়। বহু অমুসলিম দেশে মুসলিমগণ বিপুল সংখ্যায় হারিয়ে যাচ্ছে বস্তুত একটি ইসলামী ধারা জন্ম দেয়ায় ব্যর্থ হওয়াতে।

 

যাত্রী জাহান্নামমুখি জাহাজের

ইসলামের শত্রুপক্ষ চায়, মুসলিমগণ নিজেদের ভিন্নধারাটি বিলুপ্ত করুক এবং হারিয়ে যাক সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিমদের “মেল্টিং পট”য়ে। এরূপ হারিয়ে যাওয়াকে তারা বলে সামাজিক ইন্ট্রিগ্রেশন। মুসলিমদের উদ্দেশ্যে পাশ্চত্যের দেশগুলোর এটিই হলো সরকারি নীতি। এরূপ নীতির বাস্তবায়নের মাঝে তারা নিজ সমাজের প্রগতি ভাবে। এ নীতির বাস্তবায়নে সরকারি স্কুল-কলেজের পাশাপাশী কাজ করছে শত শত এনজিও। এ লক্ষ্যে বাঁধা রূপে মনে করা হয় মসজিদ-মাদ্রাসার ন্যায় ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ফলে বন্ধ করা হয় মসজিদ-মাদ্রাসার ন্যায় ইসলামী প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল মাক্রন সেদেশের ৭০টির বেশী মসজিদে তালা লাগিয়েছে। তবে এ নীতি শুধু পাশ্চাত্য দেশগুলোর নয়; একই নীতি আন্যান্য অনেক অমুসলিম দেশেরও। কম্যুনিস্ট শাসনামালে বহু হাজার মসজিদে  তালা লাগিয়েছে সোভিয়েত রাশিয়া ও চীন। ইসলাম ও মুসলিম সংস্কৃতির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার লক্ষ্যেই চীন সরকার লক্ষ লক্ষ মুসলিম সন্তানদের তাদের পিতামাতা থেকে ছিনিয়ে নির্বাসন কেন্দ্রে তুলেছে। মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস বা দুর্বল করা হচ্ছে ভারতে। লক্ষ্য একটাই, মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকে বাধাগ্রস্ত করা। অমুসলিম দেশে বসবাসের এটিই হলো সবেচেয়ে ভয়াবহ বিপদ। এটি এমন এক জাহাজে চড়ে বসার ন্যায় -যার লক্ষ্য জাহান্নামের দিকে।    

উনুনের পাশে রাখলে পাথরের ন্যায় শক্ত বরফও গলে যায়। সেটি হয় উত্তপ্ত পরিবেশের কারণে। তেমনি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার পরিবেশও ব্যক্তিকে পাল্টে দেয়। হাদীসপাকে বলা হয়েছে, সকল শিশুর জন্ম হয় মুসলিম রূপে, কিন্তু পরিবেশের প্রভাবে তারা বেড়ে উঠে ইহুদী, নাসারা, মুর্তিপূজারী বা অন্যধর্মের অনুসারী রূপে। তাই অনৈসলামিক দেশের কুফরি পরিবেশে মুসলিম সন্তানেরা মুসলিম হিসাবে বেড়ে উঠবে -সেটি কি এতই সহজ? বিষয়টি স্রোতের উজানে লাগাতর সাঁতার কাটার মত। সাঁতারে ঢিল দিলে ভেসে যেতে হয়। সেরূপ ভেসে যাওয়া থেকে বাঁচতেই নিজের অনুকূলে স্রোত সৃষ্টি করতে হয়। সেজন্য ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে হয়। পানাহারের অভাবে কেউ জাহান্নামে যাবে না, কিন্তু সেটি অনিবার্য হয় অনৈসলামের স্রোতে ভাসাতে। এবং সেটি আরো সহজ হয় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র না থাকাতে।

 

হিযরত কেন ফরজ?

মুসলিম অভিভাবককে তাই শুধু পানাহারে হালাল-হারাম নিয়ে ভাবলে চলে না। ভাবতে হয় নিজের ও নিজ সন্তানের জন্য শিক্ষা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিয়েও। এজন্যই মুসলিমগণ অতীতে সবদেশে বসতি গড়েনি। যেখানে বসত গড়েছে সেখানকার শিক্ষা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকে নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা করেছে। ভারত ও স্পেনের মত দেশে সংখ্যা লঘিষ্ট হয়েও তারা রাজনীতিকে নিজ হাতে নিয়েছে। এমন কি পশু-পাখি, জীবজন্তুও উপযোগী পরিবেশ ছাড়া বাসা বাঁধে না।

অন্য জীবের কাছে গুরুত্ব পায় স্রেফ দৈহিক ভাবে বাঁচা। কিন্তু ঈমানদারকে শুধু দৈহিকভাবে বাঁচলে চলে না, তাঁকে বাঁচতে হয় ঈমান নিয়ে। এবং সেরূপ বাঁচায় ব্যক্তির নিজস্ব সামর্থ্যই যথেষ্ট নয়, সে জন্য জরুরি হলো দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আদর্শিক ও শিক্ষার পরিবেশ থেকে লাগাতর পুষ্টি। সে পুষ্টি যোগ হয় ঈমানের ভূমিতে। অনৈসলামিক রাষ্ট্রে সেটি অসম্ভব। তেমন একটি সহায়ক পরিবেশ পেতে ইসলামী রাষ্ট গড়া মুসলিম জীবনে এজন্যই এতো গুরুত্বপূর্ণ। জিহাদ এ জন্যই অনিবার্য হয়ে উঠে। এ জিহাদ মূলত ঈমান নিয়ে বাঁচা ও নিজেদের আখেরাত বাঁচানোর লড়াই। ইসলামি রাষ্ট্র গড়া অসম্ভব মনে হলে মুসলমান সেখানে বসতি না গড়ে বরং সে দেশ থেকে হিজরত করে। নামাজ রোজা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় হিজরতও তখন ফরজ ইবাদতে পরিণত হয়।

অনৈসলামিক দেশে আবাদী গড়ার যে ধারণা -সেটি সাম্প্রতিক। অমুসলিমের রাইফেল কাঁধে নিয়ে যুদ্ধে নামা বা তাদের কামানে গোলা ভরা বা কারখানায় শ্রমিক হওয়া বা জাহাজে কয়লা ঢালার যে ঐতিহ্য -সেটিও এযুগের। একাজে তারাই নেমেছে যাদের কাছে দৈহিক ভাবে বাঁচাটাই অধিক গুরুত্ব পেয়েছে, ঈমান নিয়ে বাঁচাটি নয়। এতে শক্তি বেড়েছে ইসলামের শত্রু পক্ষের, মুসলিমদের নয়। এখনও অমুসলিম শক্তিবর্গ সে লক্ষ্যেই মুসলিমদের ব্যবহার করতে চায়। অন্যদের স্বর্ণখনি বা তেলের খনির লুন্ঠনের ন্যায় এরা এখন মুসলিম দেশের মেধার খনিকেও কাজে লাগাতে চায়। দ্বীনের কাজে মুসলিমদের দেশত্যাগ অহরহ হলেও অতীতে সেটি কখনোই অমুসলিম দেশে রুজীরোজগারের জন্য হয়নি। অথচ রুটি রুজীর জন্য আজকের মুসলিমগণ এমন ভাবে নিজ ঘরাড়ী ছাড়ছে -যা শুধু আগুন লেগেছে এমন ঘর বা জাহাজ থেকে ঝাপিয়ে পড়া মানুষের সাথেই তুলনা চলে। মুসলিমদের আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যোগাযোগহীন সে যুগে জন্মভূমি ইরাক ছেড়ে সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর ও হেজাজের পথে পথে ঘুরেছেন। হাজার হাজার মাইল তিনি এভাবে ভ্রমন করেছেন। সে দেশত্যাগে রুজী-রোজগার গুরুত্ব পেলে স্ত্রী ও শিশু পুত্রকে নিয়ে তিনি কখনই মক্কার বিজন মরুভূমিতে হাজির হতেন না। অর্থের লোভে কুফুরি পরিবেশে নিজেকে সঁপে দেয়া নবীরাসুলের সুন্নত নয়। রেযেকের জন্য মুসলিমদের তাওয়াক্কুল সব সময়ই মহান আল্লাহতায়ালার উপর। মুসলিমের বাঁচবার লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রুপে দায়িত্বপালন। সে দায়িত্বপালন কি বৈরী পরিবেশে আত্মসমর্পণে বা বসবাসে হয়? বেঁচে থাকার জন্য অবশ্যই রোজগার করতে হয়। তবে রোজগারের জন্যই বাঁচতে হবে এবং সে লক্ষ্যে সকল সামর্থ্য নিয়োগ করতে হবে -সেটি কি ঈমানদারি? সেটি তো নিছক দুনিয়াদারি। এবং কোনটি ঈমানদারি আর কোনটি দুনিয়াদারি -অন্ততঃ এ দুটি বিষয়ে মুসলিমদের সম্যক উপলব্ধি প্রয়োজন। এ মৌলিক বিষয়ে অজ্ঞতা নিয়ে কে জান্নাতের পথে চলা যায়?

 

কুশিক্ষা ও অপসংস্কৃতির নাশকতা

শিক্ষা-সংস্কৃতির সৃষ্টিশীলতা যেমন বিশাল, তেমনি অতি ভয়ংকর হলো কুশিক্ষা ও অপসংস্কৃতির নাশকতা। নির্ভর করে কি উদ্দেশ্য নিয়ে শিক্ষানীতি প্রণীত হলো -তার উপর। যারা আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানদের নির্মূল করলো, হিটলারের গ্যাসচেম্বারে ইহুদীদের পুড়িয়ে মারলো, জাপানে পারমানবিক বোমা ফেললো এবং আফগানিস্তান ও ইরাকে দুই লাখের বেশী মানুষকে হত্যা করলো -তারা বনে জঙ্গলে বেড়ে উঠেনি। নিরক্ষরও ছিল না। তারা বেড়ে উঠেছিল একটি বিশেষ শিক্ষানীতি ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মানুষকে পশুর চেয়েও কত অধিক হিংস্র করতে পারে –এ হলো তারই উদাহরণ। পাশ্চাত্য দেশসমুহে মুসলিমদের বিপদের সবচেয়ে বড় কারণ হলো, কুশিক্ষা ও অপসংস্কৃতি। এ শিক্ষাই জন্ম দিয়েছে বর্ণবাদ, ঔপনিবেশবাদ, জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদের ন্যায় নৃশংস মতবাদ। তাই বিপদ শুধু ঈমান বিলুপ্তির নয়, জাতিগত বিলুপ্তিরও। শত শত মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়েও স্পেনে ৭ শত বছরের মুসলিম শাসন বাঁচেনি। বরং সম্পূর্ণ নির্মূল হতে হয়েছে। বাঁচতে হলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির জগতে বাঁচার স্ট্রাটেজী নিয়ে বাঁচতে হয়। থাকতে প্রবল প্রতিরক্ষার স্ট্রাটেজী। থাকতে হয় জিহাদের স্পিরিট। ইতিহাসের শিক্ষা তো সেটিই। কিন্তু পাশ্চাত্য দেশে বসবাসকারী মুসলিমদের মাঝে সে সবের বালাই নাই। ডলার-পাউন্ড কামাই ছাড়া তাদের তেমন কোন উচ্চতর ভাবনা নাই। যেন হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই তাদের তৃপ্তি।

চেতনা, চরিত্র ও সমাজ পরিবর্তনে শিক্ষা ও সংস্কৃতি হলো শক্তিশালী হাতিয়ার। পাশ্চাত্যে দেশে এ হাতিয়ার দুটি ইসলামের বিরুদ্ধে যেমন আগ্রাসী, তেমনি ঈমান- বিনাশীও। শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপাদানগুলি এতোই শক্তিশালী যে সংখ্যালঘুরা তাতে নিজ পরিচয় হারিয়ে বিলীন হতে বাধ্য। পাশ্চাত্য দেশের কর্ণধারগণ এজন্যই মুসলিমদের ধর্মান্তর নিয়ে ভাবে না, তারা চায় কালচারাল কনভার্শন। একাজে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো শক্তিশালী হাতিয়ার। উপনিবেশিক শাসনামলে ভারতবর্ষে এমন শিক্ষাব্যবস্থা শুরু করতে গিয়ে ব্রিটিশ শিক্ষামন্ত্রী লর্ড মেকলে বলেছিলেন, “এ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা শিক্ষিত হয়ে বেরুবে তারা শুধু রক্ত-মাংসেই ভারতীয় হবে, মন-মানসিকতায় হবে বৃটিশ।” লর্ড মেকলে আসলে এখানে অসত্য বলেছেন। লক্ষ্য আদৌ চিন্তা-চেতনা ও মন-মানসিকতায় ইংরেজ বানানো ছিল না। সেটি ছিল ব্রিটিশের গোলাম ও তাদের ঔপনিবেশিক স্বার্থের সেবাদাস বানানো। তারই ফল হলো, এমন কি কংগ্রেস নেতা করম চাঁন্দ গান্ধি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলা কালে ব্রিটিশ বাহনীকে বিজয়ী করতে ভারতীয় মাঝে সৈন্য সংগ্রহে নেমেছিলেন।

মানুষ তার সময়, শ্রম, মেধা তথা জীবনের শ্রেষ্ঠ সামর্থ্য কোথায় বিনিয়োগ করবে এবং সে বিনিয়োগের কাজে কোন দেশে বা কোন ফ্রন্টিয়ারে যাবে -সে নির্দেশটি পায় তার চেতনা ও মন-মানসিকতা থেকে। মন-মানসিকতায় বৃটিশের গোলাম হওয়ার অর্থ, বৃটিশের পক্ষে যুদ্ধ লড়া বা বৃটিশ সমাজে বিলুপ্ত হওয়াকেই তারা যথার্থ ভাববে। সে চেতনায় নিজ ধর্ম ও নিজ দেশের চেয়ে বৃটিশ স্বার্থের প্রতি অঙ্গিকার হয় অধিক। যে সব মুসলমান ১৯১৭ সালে বৃটিশ বাহিনীতে শামিল হয়ে উসমানিয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে ক্রসেড লড়েছিল -তারা ছিল এ শিক্ষানীতিরই ফসল। উল্লেখ্য যে, দুই লাখের অধিক ভারতীয় মুসলিম প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করেছিল। তাদের মাঝে বাংলার কাজী নজরুল ইসলামও ছিলেন। বায়তুল আকসা, ইরাক, সিরিয়া দখল করে বৃটিশের হাতে তুলে দেয়াকে এরা গর্বের কাজ মনে করেছিল। আজও মার্কিন নেতুত্বে যে ক্রুসেড শুরু হয়েছে সে ক্রসেডে বহু মুসলিম দেশ যে তাদের পক্ষ নিচ্ছে তার কারণ তো এ ইসলামশূণ্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি। মানুষকে বিবেক শূণ্য, ধর্মশূণ্য ও দেশপ্রেমশূণ্য করার কাজে শিক্ষানীতি যে কতটা সর্বনাশা ভূমিকা পালন করতে পারে -এ হলো তার নজির।

 

বিপদ “মেল্টিং পট”য়ের

শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজ রূপান্তরের যে শক্তিশালী প্রক্রিয়া পশ্চিমা সমাজে ক্রিয়াশীল -সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় “মেল্টিং পট ফেনোমেনা”। উনুনের উচ্চতাপে কড়াইয়ের আলু, পটল, মরিচ, বেগুন যেমন একাকার হয়ে যায়, পাশ্চাত্য সমাজের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ায় তেমনি একাকার হয়ে যাচেছ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগণ। শিক্ষাই জীবনে পথ দেখায়। পাপ-পুণ্য ও শিষ্ঠ-অশিষ্ঠের সংজ্ঞা দেয় এবং সেসাথে ব্যক্তিকে দেয় বিশিষ্ঠ পরিচয়। হাওয়ায় যেমন প্রাসাদ গড়া যায় না, শিক্ষাছাড়া তেমনি ঈমানও গড়ে উঠে না। পবিত্র কোর’আনের সর্বপ্রথম ওহীটি হলো, “ইকরা” অর্থাৎ পড় তথা জ্ঞানবান হও। মহান আল্লাহতায়ালা নিজে শপথবাণী উচ্চারণ করেছেন কলম ও কলম দিয়ে যা লেখা হয় তার নামে -(সুরা কলম)। বিদ্যালাভ ও শিক্ষার গুরুত্ব যে কত অধিক মহান আল্লাহতায়ালার এ ঘোষনা থেকে সেটিই সুস্পষ্ট।

অপরদিকে সংস্কৃতি হলো ব্যক্তির কর্মে, চরিত্রে, চৈতন্যে ও রুচিবোধে সংস্কারের প্রক্রিয়া। কিন্তু পাশ্চাত্যের দেশসমুহে শিক্ষা ও সংস্কৃতি -এ দুটির কোনটিই ইসলামের পক্ষে নয়, বরং শিকড় কাটছে ঈমানের। ফলে মুসলিম সন্তানদের পক্ষ্যে ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠাই দিন দিন দুরুহ হচ্ছে। সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্ম অভ্যস্থ করছে অশ্লিলতা ও বিবাহ-বহির্ভুত যৌনতায়। বাড়ছে মাদকাসক্তি, বাড়ছে নানারূপ পাপাচার। ফলে এসব দেশে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে মুসলিমদের দর্শন ও জীবনবোধে। তাওহীদ, রেসালাত, আখেরাত, ইবাদত ও খেলাফতের যে মৌলিক কোর’আনী  ধারণা -সেগুলি এ শিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু অজানাই থাকছে না বরং চেতনা থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে। নিছক কোরআনের তেলাওয়াত শিখিয়ে বা কিছু ওয়াজ শুনিয়ে কি চেতনার এ বিচ্যুতি দুর করা যায়? যাচ্ছেনা। ফলে সময়ের তালে বরফ যেমন হাওয়ায় হারিয়ে যায়, লক্ষ লক্ষ মুসলিম যুবকও তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে অমুসলিম সমাজে। মাঝে মধ্যে দুয়েকজন অমুসলিমের মুসলিম হওয়ার যে আনন্দ -তা কি লাখ লাখ মুসলিম সন্তানের হারিয়ে যাওয়ার বেদনাকে লাঘব করতে পারে?

চেতনায় আরেক গভীর বিচ্যুতি হলো শিক্ষার গুরুত্ব ও তার উদ্দেশ্য নিয়ে অজ্ঞতা। শিক্ষার উদ্দেশ্য নিছক উপার্জনের কৌশল শেখানো নয়। সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, শিষ্ঠ-অশিষ্ঠ চিনতে যে শিক্ষা সাহায্য করে না -তা কি আদৌ শিক্ষা? এমন শিক্ষায় কি ঈমান গড়ে উঠে? আসে কি নেক আমলে প্রেরণা? শিক্ষা হবে প্রতি পদে সত্য-মিথ্যা চেনা ও হেদায়াত লাভের হাতিয়ার, নিছক উপার্জনের নয়। উপার্জনের কৌশলাদী আবু লাহাব বা আবু জেহেলের কম জানা ছিল না। কিন্তু তাদেরকে শিক্ষিত বলা হয়নি। আবু জেহেলকে বরং মুর্খের পিতা বলা হয়েছে। কারণ তার বিদ্যা সত্যাপোব্ধির সামর্থ্য বাড়ায়নি। পাশ্চাত্যের শিক্ষায় শিক্ষিতদের উপার্জন বাড়ছে বটে, তবে তাতে তাদের ঈমানও কি বাড়ছে?  বাড়ছে না, বরং উল্টোটি হচ্ছে। পাশ্চাত্যে মুসলিম শিশুরা ধর্মান্তরিত হচ্ছে না বটে, তবে লাখে লাখে যে নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে –সেটি তো এ কারণেই। এটিই হলো কালচারাল কনভার্শন। এরই ফলে মুসলিম সন্তানদের চরিত্র ও চাল চলনে ইসলামের নামগন্ধ থাকছে না।

এরূপ বিপর্যের মূল কারণ, শিক্ষাদানের ন্যায় ফরজ কাজটিই পাশ্চাত্যের মুসলিমদে মাঝে যথার্থ ভাবে হচ্ছে না। অথচ শিশুদের শিক্ষাকে সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিটি মুসলিমের। ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট, যানবাহন বা কলকারখানাগুলো অমুসলিমদের দিয়ে তৈরী করিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু সন্তানদের মুসলিম রূপে গড়ে তোলার কাজটি একান্তই তাদের নিজেদের। অমুসলিদের দিয়ে এটি করাতে গেলে বিপদটি ভয়াবহ। এতে বিদ্যা-হাসিলের ফরজ বিধানটি আদায় হয় না। তুরস্ক, পাকিস্তান ইত্যাদি মুসলিম দেশগুলি সামরিক ও বেসামরিক অফিসারদের প্রশিক্ষণের দায়ভার যেদিন থেকে পাশ্চাত্য দেশগুলিতে গেল, তাদের ধ্বংসের গতিও তখন থেকে বেড়ে গেল। বিদ্ধস্ত হলো উসমানিয়া খেলাফত, খন্ডিত ও বিপর্যস্ত হলো বড় বড় মুসলিম দেশগুলি। কারণ চেতনায় দূষিত চেতনার প্রবেশ ঘটাতে শিক্ষাব্যবস্থা পাইপ লাইনের কাজ করে। অন্যকে প্রভাবিত করার এটিই শক্তিশালী মাধ্যম। আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের পিতা-মাতা ও নেতা-নেত্রী। তারা সুশিক্ষা না পেলে তাদের সন্তানেরাও পাবে না। পিতা-মাতার দায়িত্ব শুধু সন্তানের দেহের খাদ্য জোগানো নয়, বরং মনের খাদ্যকেও সুনিশ্চিত করা। এটির উপরই নির্ভর করে তার ঈমান পুষ্টি পাবে কি পাবে না, সে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠবে কি উঠবে না – এসব গুরুত্বপুর্ণ বিষয়গুলো। কিন্তু পশ্চিমা দেশে সে সুযোগ সামান্যই। ফ্রান্সে মেয়েদের মাথায় স্কার্ফ পড়াকে যেভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাতে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার বিষয়টি তাদের কাছে কতটা অপছন্দের -সেটি কি গোপন থাকে?

তবে মুসলিম রূপে টিকে থাকা বা বেড়ে উঠার স্বার্থে বিক্ষিপ্ত ভাবে চেষ্টা যে হচ্ছে না -তা নয়। কিন্তু এর সুফল কতটুকু? বিষাক্ত পানির প্লাবনে যে ব্যক্তি ডুবতে বসেছে তাকে দুয়েক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করিয়ে কি বাঁচানো যায়? ঔষধ সারা জীবন খাওয়ার বস্তু নয়, এতে স্বাস্থ্য বাঁচে না। বরং এর জন্য দূষিত পানি থেকে পরিত্রাণ চাই; এবং নিয়মিত বিশুদ্ধ খাদ্য-পানীয় চাই। তেমনি মুসলিমদের ঈমানী স্বাস্থ্যের জন্য সুশিক্ষার ও সু-সংস্কৃতির পবিত্র পরিবেশ চাই। এজন্যই ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ চাই। কিন্তু সেটি কি পাশ্চাত্যে সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই এখানে মুসলিমদের জীবন নিরাপদ নয়। এ কঠিন বাস্তবতা অবশ্যই বুঝতে হবে।

                                  

উদ্ধার কীরূপে?

পাশ্চাত্য দেশে মুসলিমদের উদ্ধারের পথ খুব একটা বেশী নেই। বরং শংকার কারণ হলো, মুসলিমগণ উদ্ধার পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে পাশ্চাত্য দেশে আসেনি। ফলে উদ্ধার পাওয়া নিয়ে তাদের  ভাবনাও তেমন একটা নাই। প্রচেষ্টাও তেমন নাই। উদ্ধারের পথ নয় বরং যে পথটি নিশ্চিত নিমজ্জনের -সেটিই বহু মুসলিম বেছে নিয়েছে। এ পথের পথিকেরা পাশ্চাত্য সমাজে ইন্টিগ্রেটেড তথা একাত্ব হওয়া নিয়ে ব্যস্ত। তারা তাই খরচের খাতায়। মুক্তির পথ মাত্র দুইটি। প্রথমটি, কবি আল্লামা ইকবাল(পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা), মুহাম্মদ আসাদ (জার্মান নওমুসলিম, প্রখ্যাত সাংবাদিক, তাফসির লেখক ও বুদ্ধিজীবি যিনি পাকিস্তানে হিজরত করেছিলেন এবং জাতিসংঘে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদুত ছিলেন) ও পারমানবিক বিজ্ঞানী ড. আব্দুল কাদের খানের (যিনি পাকিস্তানকে পারমানবিক শক্তিতে পরিণত করেছেন) পথ। তাদের পথ হলো, পশ্চিমা দেশ থেকে যা কিছু শেখার তা দ্রুত শিখে একটি মুসলিম দেশে তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে সে দেশের উন্নয়নে লেগে যাওয়া। দ্বিতীয় পথটি হলো, মিশনারীর পথ। অমুসলিম দেশে অবস্থান একমাত্র এ পথেই জায়েজ হয়। যুগে যুগে মুসলিমগণ এ পথেই বাংলা, ভারত, বার্মা, মালয়, ও আফ্রিকার নানা দেশে অনৈসলামিক সমাজে না হারিয়ে ঈমান-আমল নিয়ে বেঁচে থাকতে পেরেছিলেন। মিশনারি কাজ চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে তাদের প্রয়োজন হবে উপার্জনের। উপার্জনের প্রয়োজনে হালাল ব্যবসা বা চাকুরি মাধ্যম হতে পারে। তবে  নিছক উপার্জনের স্বার্থে এদেশে থাকা শুধু অর্থহীনই নয়, অতি বিপদজনকও।

সাংস্কৃতিক বা আদর্শিক স্রোতে হয় উজাতে হয়, নইলে ভেসে যেতে হয়। সব সময় একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। মিশনারি স্পিরিটই মুসলিমদেরকে দিতে পারে পাশ্চাত্যের প্রচন্ড স্রোতে উজানে ছুটার শক্তি। কারণ এরূপ মিশনারীরাই চিন্তা-চেতনা ও কর্মে ভিশনারী হয়। তাদের দৃষ্টিতে সদা জাগ্রত থাকে মহান আল্লাহতায়ালার সান্যিধ্যে সফলকাম হয়ে পৌঁছার প্রচন্ড বাসনা। মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করাই তখন তাদের একমাত্র সাধনা হয়। এ বাসনা ও সাধনাতেই তাদের জীবন অবিশ্বাস্য শক্তি ও অদম্য গতি পায় –  যেমনটি ছিল রাসুলে পাকের (সা) সাহাবীদের মাঝে। সে অদম্য গতিতে তারা নানা দেশে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ছুটেছেন। পাহাড়-পর্বত, বনজঙ্গল, মরুভুমি কোন কিছুই তাদের অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারেনি। সমাজের প্রতিকূল স্রোত বা অনৈসলামিক সংস্কৃতি তাদের ভাসিয়ে নিতে পারেনি। বরং তারাই অন্যদের ভাসিয়ে নিয়েছেন নিজেদের স্রোতে। পাশ্চাত্যের স্রোত থেকে বাঁচবার তাগিদে ইউরোপের অর্থডক্স ইহুদীরা মধ্যযুগে যেভাবে শহরের অভ্যন্তরে নিজেদের জন্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ঘেটো জীবনের জন্ম দিয়েছিল -আজকের আধুনিক যুগে সেটি অচল। এমনকি ইহুদীরাও তা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। কারণ টিভি, পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট ও রাষ্ট্র পরিচালিত শিক্ষা ব্যবস্থার বদৌলতে সংস্কৃতির জোয়ার এখন বেডরুমেও ঢুকেছে। ফলে ঘেটো জীবন মুসলিমদের জন্যও মুক্তির পথ নয়।

নবী পাকের (সাঃ) যুগে মুসলিমদের যে সংখ্যা ছিল, একমাত্র লন্ডন শহরে নিয়মিত নামাযীদের সংখ্যাই তার চেয়ে কয়েকগুণ। দাওয়াতী কাজে এ বিশাল সংখ্যাকে শক্তিতে পরিণত করতে পারলে অলৌকিক কিছু আশা করাও অসম্ভব নয়। এদেশের ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব এখন মুসলিমদের। সমগ্র ইউরোপের যে আয়তন তার চেয়ে বৃহত্তর ভুখন্ডে প্রাথমিক যুগের মুষ্টিমেয় মুসলিমগণ ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। এ কাজো তাঁরা বহু দুর্গম পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা ও বিজন মরুভূমি অতিক্রম করেছেন পায়ে হেঁটে। অথচ এখানে পাশ্চাত্য সভ্যতার অভ্যন্তরে বসে সেরূপ কষ্টস্বীকারের প্রয়োজন নেই। তবে এ কাজে জরুরি হলো, অন্যদের শিক্ষিত করার আগে নিজেদেরকে শিক্ষিত করা। জরুরি, কোর’আনের জ্ঞানে নিজেদের আলোকিত করা এবং চেতনায় বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব আনা।

মহান আল্লাহতায়ালা তো সত্যিকার মুসলিমদের সাহায্য করতে সদাপ্রস্তুত। তাঁরা যদি মহান আল্লাহতায়ালার পথে এগোয়, তবে তিনিও তাঁদের দিকে ছুটে আসেন। কোর’আন পাকে সে প্রতিশ্রুতির কথা উচ্চারিতও হয়েছে বহুবার। তবে শর্ত হলো সে সাহায্য গ্রহণের সামর্থ্য থাকা দরকার। সাহায্য না আসার কারণ, সাহায্যপ্রাপ্তির জন্য তারা নিজেদেরকে তৈরীই করেনি। পাশ্চত্য দেশসমুহে মুসলিমদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বস্তুত তাদের নিজেদের প্রস্তুতির উপর। নইলে এ মহাপ্লাবনের মধ্যখানে নিজেদের ঈমান-আমল নিয়ে বেঁচে থাকাই অসম্ভব। নিজেদের ছেলেমেয়ে ও আপনজনদের অনেকেই যে সে প্লাবনে ভেসে যাবে –তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? কারণ, প্লাবনের কাজই তো গ্রাস করা। প্লাবনের পানিতে মানুষ সাগরে বা নদীতে ভেসে যায়। কিন্তু কুফরির এ প্লাবন যে জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছাবে –সে হুশ ক’জনের? ১ম সংস্করণ ২৬/০৭/২০০৩; ২য় সংস্করণ ১০/১২/২০২০।