হিযবুল্লাহ ও হিযবুশ শায়তান

image_pdfimage_print

ফিরোজ মাহবুব কামাল

দলীয় পরিচয় থেকেই ব্যক্তির পরিচয়

জন্মসূত্রেই মানব সামাজিক। প্রতিটি মানবকেই তাই বাঁচতে হয় কোন একটি পরিবার, দল, সমাজ বা রাষ্ট্রের সাথে একাত্ম হয়ে। দল বা রাষ্ট্রের এজেন্ডা পূরণে নিজ সামর্থ্যের বিনিয়োগও করতে হয়। কোন মানব-সন্তানের পক্ষেই একাকী জন্ম নেয়া ও বাঁচা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব নয় রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, ধর্ম-কর্ম এবং নিজের দাফন-কাফনও। দলভূক্ত হওয়া ও দলের পক্ষে কাজ করাটি মানব জীবনে শধু অনিবার্যই নয়, বরং তা থেকেই নির্ধারিত হয় কোন লক্ষ্যে ও কোন দিকে জীবন পরিচালিত হবে -সে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও। তখন ব্যক্তির নিজের ইচ্ছা ও এজেন্ডা হারিয়ে যায় সমষ্ঠির মাঝে। হিটলারের দলের সবাই যে তার মত নৃশংস খুনি ও ফ্যাসিষ্ট ছিল তা নয়। কিন্তু তারা চাকর-বাকরের ন্যায় খেটেছিল হিটলারের বর্বর নীতির বাস্তবায়নে। ফলে হিটলারকে নিজ হাতে কাউকে গ্যাস চেম্বারে নিতে হয়নি। কাউকে খুনও করতে হয়নি। আওয়ামী লীগের সবাই যে শেখ মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারি ও ভারতের প্রতি আত্মসমর্পিত ছিল -তা নয়। অনেকেই গণতন্ত্রের ভক্তও ছিল। কিন্তু বাকশালভূক্ত হয়ার কারণে তাদেরকেও মুজিবের ন্যায় স্বৈরাচারির চাকর-বাকরে পরিণত হতে হয়েছে। অপরাধীদের দলে যোগ দিলে অপরাধ কর্ম থেকে নিষ্কৃতি মেলে না। তখন দুর্বৃত্তি থেকে নিজেকে দূরে রাখার সুযোগও থাকে না। ফলে জীবনে সব চেয়ে বড় বাঁচাটি হলো, দুর্বৃত্তদের দলে শামিল হওয়া থেকে বাঁচা। মানুষ বস্তুত তার নিজের পরিচয়টি পায় তার দলীয় পরিচয় থেকে। ডাকাত দলের সদস্যদের তাই ডাকাত বলা হয়। এজন্যই হাদীসে বলা হয়েছে, রোজ হাশরের বিচার দিনে মানুষকে খাড়া করা হবে তাদের সাথে যাদের সাথে সে দুনিয়ার দিনগুলো কাটিয়েছে। এজন্যই মানব জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোন দলে সে যোগ দিল এবং কোথায় সে অর্থ, শ্রেম, মেধা ও প্রাণের বিনিয়োগ করলো -সে বিষয়গুলো।

ঈমানদার ব্যক্তি যেমন একাকী তার ঈমান নিয়ে বাঁচতে ও বেড়ে উঠতে পারেনা, তেমনি শয়তানও একাকী তার এজেন্ডা পূরণ করতে পারে। তাই নবীদেরও যেমন দল গড়তে হয়েছে, তেমনি দল গড়তে হয়েছে শয়তান ও শয়তানের অনুসারিদেরও। দলগড়া এবং দল নিয়ে বাঁচা তাই মানব জাতির অতি প্রাচীনতম সংস্কৃতি। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালা এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট পথ-নির্দেশনা দিতে হয়েছে।  মহান আল্লাহতায়ালার বিচারে পৃথিবী পৃষ্ঠে দল মাত্র দু’টি। একটি তাঁর নিজের -যাকে বলা হয় হিযবুল্লাহ তথা আল্লাহতায়ালার দল। অপরটি হলো শয়তানের। যাকে বলা হয় হিযবুশ শায়তান তথা শয়তানের দল। মানব জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোনটি হিযবুল্লাহ এবং কোনটি হিযবুশ শয়তান –এ বিষয়টি সঠিক ভাবে জানা। এখানে ভূল হলে অনিবার্য হয় পথভ্রষ্ট হওয়া ও জাহান্নামে পৌঁছা। যাত্রাপথে স্রেফ পথ চলাটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়, অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো যাত্রাটি সঠিক পথে ও সঠিক বাহনে হওয়াটি। বিশ্বমাঝে কে কতটা জ্ঞানী, ধর্মপ্রাণ, যোগ্যবান বা ভাল মানুষ -সে বিচারটি কখনোই পেশা, ঘরবাড়ী, খাদ্যপানীয়, অর্থসম্পদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, লেবাস ও ধর্মকর্মের উপর নির্ভর করে না। সেটি নির্ভর করে সে কোন দলে যোগ দিল, কোন নেতার সমর্থন দিল এবং কার বিজয়ে অর্থ, রক্ত ও সামর্থ্যের বিনিয়োগ করলো -তা থেকে। পরকালে কে জান্নাত পাবে এবং কে জাহান্নাম পাবে –সে বিষয়টি পুরাপুরি নির্ভর করে সঠিক দল বেছে নয়া এবং সে দলে জানমালের বিনিয়োগের উপর। নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালনে লাভ কি -যদি সে ব্যক্তি রাজনীতিতে সেক্যুলার ও জাতীয়তাবাদী শক্তির সাথে একাত্ব হয় এবং শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে লেগে যায়? 

ইহলোক ও পরলোকে সাফল্য লাভে অপরিহার্য শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন নয়। বরং অতি অপরিহার্য হলো শয়তানের দলের সদস্য হওয়া থেকে বাঁচা এবং হিযবুল্লাহ’র নিবেদিত-প্রাণ সদস্য হয়ে যাওয়া। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় দেশগুলিতে মুসলিমদের সে ব্যর্থতাটি বিশাল। এ ব্যর্থতার কি শুধু সাধারণ মুসলিমের? এ ব্যর্থতা তো তাদেরও যারা পরিচিত আলেম, আল্লামা, পীর, দরবেশ, মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষক রূপে। তারা সমর্থণ করে, বন্ধুত্ব গড়ে এবং নির্বাচনে কোয়ালিশন গড়ে এমন সব দলের সাথে যাদের ঘোষিত এজেন্ডা হলো ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ, মুসলিম ঐক্য ও খেলাফার প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করা। ইসলামের বিজয়ের তারা ততটাই বিরোধী যতটা বিরোধী কাফেরগণ।

 

হিযবুল্লাহ ও হিযবুশ শায়তান

আরবী “হিযব” শব্দের অর্থ হলো দল। হিযবুল্লাহ’র অর্থ আল্লাহর দল; এবং হিযবুশ শায়তান অর্থ শয়তানের দল। হিযবুল্লাহ ও হিযবুশ শায়তান –এ দুটি শব্দের প্রয়োগ হয়েছে পবিত্র কোর’আন। সমগ্র মানব জাতির বিভাজনটি হলো এই দুটি মাত্র দলে। তৃতীয় কোন দলের উল্লেখ পবিত্র কোর’আনে নাই। এ দুটি দলের বর্ণনাও দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। একটি হলো জান্নাতীদের দল; অপরটি জাহান্নামীদের দল। একটি সফলকামদের দল; অপরটি বিফলদের দল। মানব জাতির স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে এ দুটি দলের কোন একটি বেছে নেয়ার। ব্যক্তির সকল সামর্থ্যে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয় এ দুটি পথের একটিকে বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে। এখানে ভূল হলে যেটি অনিবার্য হয় সেটি হলো জাহান্নাম। এ জন্যই মহান  আল্লাহতায়ালা এ দুটি দলের পরিচিতি তূলে ধরেছেন অতি সুস্পষ্ট ভাবে -যাতে মানুষ দল চেনার ক্ষেত্র কোন রূপ ভূল না করে। এখানে ভূল হলে জীবনে অন্য সকল ক্ষেত্রে সফল হলেও কোন লাভ হয়না।

মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ভাষায় হিযবুশ শায়তানের চরিত্রটি হলো: “তাদের উপর চড়াও হয়েছে শয়তান; অতঃপর ভূলিয়ে দিয়েছে আল্লাহর যিকর। তারাই হলো হিযুবুশ শায়তান। নিশ্চয়ই শায়তানের দলই হলো ক্ষতিগ্রস্ত।”–(সুরা মুজাদেলা, আয়াত ১৯)। অর্থাৎ শয়তানের মূল এজেন্ডা হলো মানব মন থেকে মহান আল্লাহতায়ালাকে ভূলিয়ে দেয়া। ফলে যারা শয়তানের দলভূক্ত তাদের মূল চরিত্র হলো তাদের চেনতায় থাকে না মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ। তাদের রাজনীতি, পেশাদারী ও সংস্কৃতিতে থাকে না মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে নিয়ে বাঁচার প্রেরণা। থাকে না পরকালের বিচার দিনে জবাবদেহীতার ধারণা। থাকে না মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার কোন পেরেশানী। তারা বাঁচে নিজেদের খায়েশাত ও শয়তানের এজেন্ডা নিয়ে। এরাই হলো ক্ষতিগ্রস্ত দল যারা আখরাতে স্থান পাবে জাহান্নামে।   

মহান আল্লাহতায়ালার ভাষায় হিযবুল্লাহর পরিচয়টি হলো: “এবং যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ নিল এবং ঈমান আনলো (তারাই হিযবুল্লাহ’র), নিশ্চয়ই যারা হিযবুল্লা্‌হর তারাই বিজয়ী।” –(সুরা মায়েদা, আয়াত ৫৬)। এর অর্থ দাঁড়ায়, যারা মহান আল্লাহতায়ালার দলে তাঁরা কখনোই ধর্ম নিরেপক্ষ হয় না, তাঁরা দল নিরপেক্ষও হয় না; বরং তারা নেয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ। তারা ঈমান আনে তার কোর’আনী বিধানের উপর এবং সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগ করে সে বিধানকে বিজয়ী করতে। এবং হলো বিজয়ী পক্ষ। হিযবুল্লাহর পরিচিতি তুলে ধরেছেন পবিত্র কোর’আনের সুরা মুজাদেলাতেও। সেখানে সে পরিচয়টি এসেছে এভাবে,“যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা¸ পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠি হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ সুদৃঢ় করে দিয়েছেন ঈমান এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর নিজের পক্ষ থেকে রুহ দিয়ে। তিনি তাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত, সেখানে তাদের স্থায়ী নিবাস হবে,আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট,এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই তো আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম।”-(সুরা মুজাদালা আয়াত ২২)।

সুরা মুজাদেলার উপরুক্ত আয়াতের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট আছে। আছে প্রবল শিক্ষণীয় দিক। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে উক্ত চিত্রটি এজন্য তুলে ধরেছেন যে, আগামীদিনের ঈমানদারগণ যেন তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। তাছাড়া মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর নিজদল কীরূপ গড়ে তুলতে চান সেটি বুঝা যায় উক্ত আয়াতে। উক্ত আয়াতের শানে নযুল রূপে তাফসিরকারকগণ কয়েকটি ঘটনা পেশ করেছেন। বর্ণনা এসেছে আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের পুত্র আব্দুল্লাহ (রাঃ) সম্পর্কে। তাঁর পিতা ছিল মদিনায় মুনাফিক সর্দার। একবার তিনি তাঁর পিতার মুখ থেকে নবীজী (সাঃ)কে অসম্মানজনক গালি দিতে শুনেন। এতে তিনি এতটাই অস্থির হয়ে পড়েন যে তৎক্ষাৎ তিনি নবীজী(সাঃ)র কাছে ছুটে আসেন এবং ঘটনাটি বলেন। নবীজী (সাঃ)র কাছে তিনি অনুমতি ভিক্ষা করেন যেন তাঁর পিতাকে তিনি নিজ হাতে হত্যা করতে পারেন। নবীজী (সাঃ) তাঁকে এমন কাজ করতে নিষেধ করেন। একবার হযরত আবু বকর (রাঃ)র পিতা আবু কুহাফা আল্লাহর নবী (সাঃ)কে অপমানসূচক গালি দেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) পিতার এ কথায় এতটাই অস্থির হযে পড়েন যে তিনি অকস্মাৎ তার পিতাকে আঘাত করেন এবং তাতে তাঁর পিতা জমিনে পড়ে যায়। নবীজী(সাঃ)কে যখন এ ঘটনাটি বলেন, তাঁকে এমনটি করতে নিষেধ করেন।

 

দুই দল ও দুই এজেন্ডা

সুরা নিসাতেও মানব জাতির বিভাজনটি করা হয়েছে ঈমানদার ও কাফের – এই দুই দলে। এখানেও তৃতীয় কোন শ্রেণীর মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়নি। বস্তুত যারা ঈমানদার তারাই হলো হিযবুল্লাহভূক্ত। এবং যারা কাফের তারাই হলো হিযবুশ শায়তানের। স্রেফ দলের জন্য কখনোই কোন দল গড়া হয় না, দল গড়া হয় বিশেষ একটি মিশন নিয়ে বাঁচার জন্য। তেমন একটি মিশন যেমন হিযবুল্লাহ-ভূক্তদের রয়েছে, তেমনি রয়েছে হিযবুশ শায়তান-ভূক্তদেরও। সুরা নিসাতে সে দুটি ভিন্ন মিশনের কথা্ও বলা হয়েছে। সেটি এ ভাবে: “যারা ঈমান এনেছে তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর পথে এবং যারা কাফের তারা যুদ্ধ করে শয়তানের পথে। অতঃপর যুদ্ধ করো শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে। নিশ্চয়ই শয়তানের ষড়যন্ত্র দুর্বল।” -(সুরা নিসা, আয়াত ৭৬। রণাঙ্গণে নিষ্ক্রীয় থাকাটিও অপরাধ। সে নিষ্ক্রীয়তায় লাভ হয় শত্রু পক্ষের। এজন্যই ইসলামে নিরপেক্ষ বা নিষ্ক্রীয় বলে কোন  পক্ষের অস্তিত্ব নাই। নিরপেক্ষ বা নিষ্ক্রীয় থাকার ভান করে তারাও সহায়তা করে শয়তানের পক্ষকে।

ফলে প্রশ্ন হলো, কারা হিযবুশ শায়তান তথা শয়তানের দলের এবং কি তাদের এ্জেন্ডা –সেটি চেনা কি এতোই কঠিন? বরং তাদের চেনা ততোটাই সহজ যতটা সহজ দিনের আলো ও রাতের আঁধারকে চেনা। শয়তানের দলের আলামতটি হলো, তাদের রাজনীতিতে ইসলামের কোন স্থান নাই। মুসলিম উম্মাহর বিজয় বাড়ানোও তাদের কাছে ইস্যু নয়। তাছাড়া তারা নিজেরাও কখনো নিজেদেরকে ইসলামের পক্ষের বলে পরিচয় দেয় না। রাজনীতিতে তাদের লড়াই্টি হলো সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, দলবাদ, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্রের ন্যায় ইসলাম বিরোধী মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়া নিয়ে। এবং তারা আপোষহীন মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধানকে রাষ্ট্রের অঙ্গণ থেকে দূরে রাখায়। এরাই বাংলাদেশের সংবিধানে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর উপর আস্থার কথাটিও লিপিবদ্ধ রাখতে চায় না। ভারত, কাশ্মীর, মায়ানমার বা অন্যকোন দেশে মুসলিমগণ গণহত্যা ও মুসলিম নারীগণ গণধর্ষণের শিকার হলেও তাদের রাজনীতিতে সেটি কোন ইস্যুতে পরিণত হয় না।   

ঈমানের অবস্থান তো আত্মার গভীরে। ঈমানদারের অটল বিশ্বাস যেমন মহান আল্লাহতায়ালার উপর, তেমনি তার শরিয়তী বিধান ও আখেরাতের উপরও। সে ঈমান গোপন থাকার বিষয় নয়। মু’মিনের বিশ্বাসের এ ক্ষেত্রটিতে আপোষ চলে না। সেটি দৃশ্যমান হয় তার কর্ম, চরিত্র ও আচরণে। ঈমান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় তার সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি এবং যুদ্ধবিগ্রহও। কাদেরকে তারা ভালবাসকে এবং কাদের সাথে হবে তার শত্রুতা –সেটিও নির্ধারিত হয় ঈমানের সে ভূমি থেকে। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর নিজ দলের সদস্যদের সে গুণাবলি গুলোই তুলে ধরেছেন পবিত্র কোর’আনের বহু আয়াতে। তাদের চরিত্রের প্রবল দিকটি হলো, মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের যারা বিরুদ্ধাচারি, তাদেরকে তারা বন্ধু রূপে গ্রহণ করে না। এমন কি সে যদি তাঁর নিজের পিতা¸ পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠি  হয় তবুও নয়। 

 

বন্ধনটি ঈমানের

শয়তানের দলের সদস্যদের মাঝে পারস্পারীক সম্পর্কের ভিত্তিটি হলো গোত্রীয়, বংশীয়, পারিবারীক বা দলীয় বন্ধনের। এবং সে সাথে মহান আল্লাহতায়ার সাথে বেঈমানীর। আর মুসলিমদের মাঝে পারস্পারীক প্যান-ইসলামিক ভাতৃসুলভ সম্পর্কের ভিত্তিটি হলো মহান আল্লাহতায়ার উপর বিশ্বাস এবং তাঁকে খুশি করার তীব্র আগ্রহ। ইসলাম কবুলের পর হযরত আবু বকর (রাঃ)’য়ের পুত্র আব্দুর রহমান তাঁর পিতাকে বলেন, “পিতাজান, বদরের যুদ্ধে আমি আপনাকে তরবারীর সামনে পেয়েছিলাম, কিন্তু আপনি পিতা বলে হত্যা করেনি। পুত্রের কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেন, “হে পুত্র, আমি যদি ঐদিন তোমাকে তরবারির সামনে পেতাম তবে হত্যা করতাম।” এখানে হক ও বাতিলের মাঝে লড়াইয়ে পিতা ও পুত্রের রক্তের সম্পর্ক কাজ দেয় না। হযরত উবায়দুল্লাহ বিন যাররাহ(রাঃ) ছিলেন একজন বিখ্যাত সাহাবী। যে দশজন সাহাবীকে নবীজী (সাঃ) মৃত্যুর আগে জান্নাতবাসী হওয়ার সুসংবাদ শুনিয়েছিলেন -তিনি ছিলেন তাঁদেরই একজন। তিনি ছিলেন হযরত উমর(রাঃ)র খেলাফত আমলে সিরিয়ার গভর্নর। সে বিশাল সিরিয়া ভেঙ্গে আজ সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, ইসরাইল ও ফিলিস্তিন -এ ৫টি রাষ্ট্র। তাঁর মৃত্যু হয়েছিল হযরত উমর (রাঃ)’র মৃত্যুর আগেই। তাঁর সম্পর্কে হযরত উমর (রাঃ) মৃত্যুকালে বলেছিলেন,আজ  যদি উবায়দুল্লাহ বিন যাররাহ বেঁচে থাকতেন তবে তাঁকেই খলিফা নিযুক্ত করতাম। বদরের যুদ্ধে তাঁর পিতা যাররাহ কাফেরদের পক্ষে লড়ছিলেন। আবু উবায়দা (রাঃ) সে যুদ্ধে তিন তাঁর পিতাকে হত্যা করেছিলেন। বদরেরই যুদ্ধেই হযরত হামজা (রাঃ) ওতবাকে, হযরত আলী (রাঃ)শায়বাকে এবং হযরত উবাইদাহ (রাঃ) ওলীদকে হত্যা করেন। অথচ তারা সবাই ছিলেন তাদের নিজেদের অতি নিকট আত্মীয় এবং স্বগোত্রের। বিখ্যাত সাহাবী হযরত মুসয়াব ইবনে উমায়ের (রাঃ) তার ভ্রাতাকে হত্যা করেছিলেন। ঐ যুদ্ধে তাঁর আরেক ভাই আব্দুল আজিজ বন্দি হয়। তাঁর ভাইকে একজন আনসার সাহাবী রশি দিয়ে বাঁধছিলেন। হযরত মুসয়াব (রাঃ) তা দেখে সে আনসারীকে বলেন,“তাকে শক্ত করে বাঁধুন। তার মা সম্পদশালী, তার মুক্তির জন্য সে বড় রকমের ফিদিয়া দিবে।” একথা শুনে আব্দুল আজিজ তাঁকে বলে,“নিজের আপন ভাই সম্পর্কে তুমি এমন কথা বললে?” হযরত মুসয়াব (রাঃ) জবাব দেন,“আজ তুমি আমার ভাই নও। বরং আমার ভাই তো হলো ঐ আনসারি যে তোমাকে বাঁধছে।” নবীজী (সাঃ)র জামাইও বদরের যুদ্ধে বন্দী হয়, কিন্তু তার প্রতিও কোনরূপ ভিন্নতর আচরণ করা হয়নি।–( সুত্র: তাফসিরে ইবনে কাসির, মারুফুল কোরআন, তাফহিমূল কোরআন)।

বদরের যুদ্ধে বেশ কিছু কাফের সৈনিক মুসলমানদের হাতে বন্দি হয়। তাদেরকে নিয়ে কি করা যায় তা নিয়ে সাহাবাদের সাথে আলোচনা করেছেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) তাদের থেকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দেন। তার যুক্তি ছিলঃ “দরিদ্র মুসলিমদের তাতে আর্থিক সংকটে কিছুটা উপশম হবে। এবং ভবিষ্যতে হয়তো তারা ইসলামে ফিরে আসবে। তাছাড়া তারা তো আমাদেরই আত্মীয়স্বজন।” হযরত ওমর (রাঃ) বিপরীত মত দেন। তিনি পরামর্শ দেন,“হে আল্লাহর রাসূল! মুসলিমদের মধ্যে যাদের আত্মীয় বন্দী, তাকে তাঁরই হাতে সমর্পণ করুন এবং নির্দেশ দেন তাকে হত্যা করতে। আমরা আল্লাহতায়ালাকে দেখাতে চাই, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের প্রতি কোনই ভালবাসা নেই। আমার হাতে আমার অমুক আত্মীয়কে সমর্পণ করুন। হযরত আলী (রাঃ)’র হাতে তাঁর ভাই আকীলকে সমর্পণ করুণ। অমুক কাফেরকে অমুক সাহাবীর হাতে সঁপে দিন।”–(তাফসির ইবনে কাসীর)।

হিযবুল্লাহর সদস্য রূপে নবীজী (সাঃ)র মহান সাহাবাদের এই হলো দৃষ্টান্ত। তারা দেখিয়ে দেন, মহান আল্লাহতায়ালাকে ভালবাসার ক্ষেত্রে সামান্যতম আপোষ নেই। নেই স্বজনপ্রীতি। নেই রক্তপ্রীতি বা বংশপ্রীতি। ভালবাসা ও শত্রুতার মানদন্ডই এখানে ভিন্ন। কাউকে ঘৃনা করার ক্ষেত্রে যা গুরুত্ব পায় তা হলো মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা। মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের শানে বেয়াদবি ও অসম্মান হলে -নীরবে তা বরদাস্ত করা মু’মিনের গুণ নয়। সেরূপ বেয়াদবি ও অসম্মানজনক আচরণ যদি নিজ পিতা,নিজ ভাই বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনদের পক্ষ থেকে হয় -তার বিরুদ্ধেও সে খড়গহস্ত। এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সে যুদ্ধ করতেও রাজি। সাহাবাদের এমন নিষ্ঠাবান আচরণে মহান আল্লাহতায়ালা এতটাই খুশি হয়েছিলেনে যে পবিত্র কোরআনে নিজের আয়াতের পাশে তাদের গুণাবলির বর্ণনা স্থান দিয়ে কেয়ামত অবধি সমগ্র মানব জাতির জন্য তা শিক্ষণীয় করেছেন। তাদেরকে “তারাই তো আল্লাহর দল” আখ্যায়ীত করে মহান রাব্বুল আলামীন তাদের সে আন্তুরিক নিষ্ঠা ও ঈমানের যেমন প্রশংসা করেছেন, তেমনি স্বীকৃতিও দিয়েছেন। “জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম” ঘোষণা দিয়ে তাদের জান্নাতদানের মহা সুসংবাদও শুনিয়েছেন। কারণ এ জীবনের প্রকৃত সফলতা তো  জান্নাত প্রাপ্তিতে। একজন মু’মিনের জীবনে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন স্বীকৃতি ও এমন সুসংবাদের পর বড় কিছু পাওয়ার থাকে কি?

 

গাদ্দারী মহান আল্লাহতায়ালার সাথে

কিন্তু আজকের মুসলিমদের মাঝে কোথায় সে চেতনা ও কোথায় সে আচরন? মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ)’র প্রতি সে গভীর ভালবাসা কই? মহান আল্লাহতায়ালার ইজ্জতের সাথে অবিরাম বেয়াদবি হচ্ছে খোদ মুসলিম দেশগুলোতে। বিদ্রোহ ও গাদ্দারী হচ্ছে তার হুকুমে সাথে। কিন্তু সে গাদ্দারী ও বেয়াদবির বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে প্রতিবাদ কই? রাষ্ট্রে বা জনপদে মহান রাব্বুল আ’লামীনের ইজ্জতের প্রতি সম্মান স্রেফ তাঁর নামে তাসবিহ পাঠে হয় না। প্রকৃত আনুগত্য ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন তো হয় তাঁর হুকুম প্রতিপালনের মধ্য দিয়ে। যে রাজ্যে রাজার নিজের হুকুমের প্রকাশ্যে অমান্য হয় -সে রাজ্যে কি রাজার ইজ্জত বাঁচে? কোন রাজা কি সেটি মেনে নেয়? রাজ্যের পুলিশ, সৈনিক, গুপ্তচর ও প্রশাসনিক কর্মচারিদের মূল দায়িত্ব তো রাজার হুকুমের এমন অবাধ্যদের ধরে ধরে কঠোর শাস্তির ব্যব্স্থা করা। রাজার সার্বভৌমত্ব ও ইজ্জত তো এভাবেই বাঁচে। একই ভাবে আল্লাহর দলের সৈনিকদের দায়ভার হলো, আল্লাহতায়ালা ও তার রাসূলের ইজ্জতের পাহারাদার হয়ে যাওয়া। এ দায়ভার পালিত হয় আল্লাহতায়লার শরিয়তি হকুমকে প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষা দেয়ার মধ্য দিয়ে। মুসলিমগণ তো যুগে যুগে নিজেদের অর্থ, রক্ত, শ্রম ও মেধার বিনিয়োগ করেছে সে কাজে। অথচ বাংলাদেশের মুসলিমদের দ্বারা সে কাজটি হয়নি। বরং বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে আল্লাহর শরিয়ত আইনকে প্রতিষ্ঠা না করা ও সেটিকে অমান্য করাই হলো সরকারি নীতি। জনগণের কাজ হয়েছে, আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহী তাদের শুধু ভোট দেয়া নয়, তাদের পক্ষে স্রেফ লাঠি ধরাও নয়, বরং রাজস্ব দিয়ে তাদের শাসনকে সুরক্ষা দেয়া। আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা দূরে থাক, আল্লাহর উপর আস্থার ঘোষণাটিও সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করা হয়েছে।

নামায-রোযা পালন করলে কি হবে, অর্থ, ভোট ও শ্রম দিয়ে সংজ্ঞানে সম্পৃক্ত হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার আইন ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সরকার-পরিচালিত বিদ্রোহে। এমন সংশ্লিষ্টতা যে কবিরা গুনাহ, সে হুশই বা ক’জনের? এমন গুনাহ কি শুধু পার্থিব জীবনের আযাবে সীমিত থাকে? এমন বিদ্রোহ তো জাহান্নামেও পৌঁছাবে। নবীজী (সাঃ)র একজন সাহাবী বেঁচে থাকতে কি কোন মুসলিম জনপদে মহান আল্লাহর ইজ্জতের সাথে এমন বেইজ্জতি হয়েছে? আল্লাহর শরিয়ত কি এ ভাবে উপেক্ষিত হয়েছে? এরূপ বিদ্রোহের পরও কি কেউ দাবি করতে পারে যে, সে মুসলিম ও আল্লাহর দলের সদস্য? এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে আজকের মুসলিমদের বড় ব্যর্থতা কোথায়? ব্যর্থতা তো আল্লাহর দলের সৈনিক রূপে বেড়ে না উঠায়।

 

পথটি ব্যর্থতা ও আযাবের

মুসলিমগণ যে পথটি বেছে নিয়েছে সেটি যেমন ব্যর্থতার, তেমনি ভয়নাক আযাবের। সেটি যেমন এ দুনিয়ায়, তেমনি আখেরাতে। তবে ব্যর্থতাটি যে শুধু সাধারণ মুসলিমদের -তা নয়। বরং যারা নিজেদেরকে পীর, দরবেশ, আলেম, মসজিদের ইমাম এবং মাদ্রাসার শিক্ষক রূপে পরিচয় দেয় –ব্যর্থতাটি তাদেরও। আলেমগণ স্রেফ মসজিদ-মাদ্রাসায় চাকুরি-বাকুরি ও রুটিরুজি নিয়ে ব্যস্ত। তাদের ব্যস্ততা মসজিদ-মাদ্রাসার জমি, বিল্ডিং ও নিজেদের বেতন বাড়ানো নিয়ে। রাষ্ট্রে বা সমাজে মহান আল্লাহতায়ালার ইজ্জতের সাথে বেইজ্জতি হলেও তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধান আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হলেও তা নিয়ে এমন কি আলেমদের মাঝেও কোন মাতম নাই। আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করতে নবীজী (সাঃ) পাথরের আঘাতে আহত হয়েছেন; ভেঙ্গে গেছে তাঁর দাঁত। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের আলেমদের মাঝে সে অঙ্গিকার কই? সে  কোরবানীর কই? আল্লাহাতায়ালার দ্বীনের বিজয়ে সামান্যতম অঙ্গিকার থাকলে তাদের মাঝে অবশ্যই জিহাদ থাকতো।

পবিত্র তাওরাতে শরিয়তের যে বিধান দেয়া হয়েছিল তার প্রতিষ্ঠায় জিহাদ না করায় বনি ইসরাইলের আলেমদেরকে মহান আল্লাহতায়ালা সুরা জুম্মাতে ভারবাহি গাধার সাথে তুলনা করেছেন। গাধা কিতাব বইতে পারে, কিন্তু কিতাবের হুকুম পালন করতে পারে না। শরিয়ত পালনে এ ব্যর্থতার জন্য তাদের উপর আযাব পাঠিয়েছেন। বনি ইসরাইলীগণ দেখিয়ে গেছে কীভাবে কী ভাবে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের অবাধ্য হতে হয়। হিযবুল্লাহ’র বদলে তারা পরিণত হয়েছে শয়তানের দলে। অথচ সে অভিন্ন পথই ধরেছে মুসলিম আলেমগণ। এর প্রমাণ, বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে লক্ষ লক্ষ আলেম থাকা সত্ত্বেও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নেই; প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলনও নাই। “আমিরু বিল মা’রূফ ওয়া নেহি আনিল মুনকার” তথা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের উৎখাত নিয়ে কোন জিহাদও নেই। আর সেটি না থাকায় চেপে বসেছে অতি বর্বর ও অসভ্য শাসন। শরীয়তের প্রতিষ্ঠা না থাকায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন ও সন্ত্রাসের রাজনীতি। কথা হলো, নিজ দেশে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের পরাজয় এবং শয়তানের দলের বিজয় বাড়িয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে সম্মান মিলবে? জুটবে কি পরকালের মুক্তি? ২২/০১/২০২১।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *