সেক্যুলারিস্ট বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রাট ও নাশকতা

image_pdfimage_print

ফিরোজ মাহবুব কামাল

পথভ্রষ্টতা যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক অলংকার

কোন জাতির ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে হলে নজর দিতে হয় সে জাতির বুদ্ধিজীবীদের। কারণ, তারাই বসে দেশবাসীর চেতনার ড্রাইভিং সিটে। জাতি ভ্রষ্টতার শিকার হয় তাদের কারণে। কোন জাতি কখনোই দেশের কৃষক-শ্রমিক তথা সাধারণ জনগণের নিরক্ষরতার কারণে বিপর্যস্ত হয় না। কৃষি, শিল্প, রাস্তাঘাট ও ব্যবসা-বানিজ্যে পিছিয়ে থাকার কারণেও নয়। বিপর্যয়, বিভ্রান্তি ও ধ্বংস ডেকে আনে মূলত বুদ্ধিজীবী, জ্ঞানী বা আলেম রূপে যারা পরিচিতি পায় তাদের ভ্রষ্টতা। জাতিকে পথ দেখানোর নাম করে তারাই জাতিকে পথভ্রষ্ট ও বিপর্যস্ত করে। এরাই ঘৃণা, বিভক্তি, সংঘাত ও যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করে। বনি ইসরাইলের আলেমদের কারণেই ইহুদীগণ অভিশপ্ত ও বিপর্যস্ত জাতিতে পরিনত হয়েছে। পবিত্র কোর’অআনে এ বিষয়টি বার বার তুলে ধরা হয়েছে। মানুষকে পথ দেখানোর কাজটি মূলত পয়গম্বরদের। তাদের অবর্তমানে সে কাজটি করে দেশের আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তিরা। এটিই হলো একটি জাতির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে তাদের মর্যাদা তাই সর্বোচ্চে। কিন্তু সে জন্য শর্ত হল, জ্ঞানীদেরকে সত্য পথের পথিক হতে হয়।

মানব জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনটি নাম-ডাক, ধনসম্পদ বা সন্তান-সন্ততি নয়, বরং সেটি হলো সঠিক-পথ প্রাপ্তি। আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এটিই সবচেয়ে বড় নিয়ামত। সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি জান্নাতে নেয় না; নেয় সত্যপথ প্রাপ্তি। মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ এ নিয়ামতটি পাওয়ার জন্য তাই ঈমানদারকে নামাযের প্রতি রাকাতে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে “ইহদিনাস সিরাতুয়াল মোস্তাকিম” বলে দোয়া করতে হয়। নইলে নামাযই হয় না। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কোরআনে শেখানো এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া। তবে সে দোয়ার কবুলের শর্ত হলো, “ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তায়ীন” অর্থাৎ “একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং একমাত্র আপনার থেকেই সাহায্য চাই” বলে মহান আল্লাহতায়ালার সকল হুকুমের প্রতি পরিপূর্ণ  দাসত্বে নিজেকে নিবেদিত করতে হয়। এবং সে দাসত্ব কি ভাবে করতে হয় সেটিরই আল্লাহপ্রদত্ত গাইড বুক হলো পবিত্র কোর’আন।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নাশকতা দেশটির জলবায়ু, রোগজীবাণু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘটেনি। সেটি ঘটেছে সেক্যুলারিষ্ট বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের হাতে। তাদের মূল চরিত্রটি হলো পবিত্র কোর’আনে বর্ণিত সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে পরম ভ্রষ্টতার। এ ভ্রষ্টতাকে পেশ করে নিজেদের চরিত্রের অলংকার রূপে। এটিকে বলে প্রগতিশীলতা। এবং সিরাতুল মুস্তাকীমে চলাটি গণ্য হয় সাম্প্রদায়িকতা ও পশ্চাদপদতা রূপে। বাংলাদেশে ভ্রষ্ট পথে চলা মানুষের সংখ্যাটি বিশাল। দেশে মিথ্যাচার, চুরি-ডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণের যে জোয়ার –তার মূল কারণ ভ্রষ্ট পথে চলা এ দুর্বৃত্তরা। এবং জাতিকে এ স্থানে টেনে এনেছে ভ্রষ্ট চরিত্রের বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা।  পথভ্রষ্টগণ শুধু নিজেরাই ভ্রষ্ট পথে চলে না; অন্যদেরও তারা সে পথ পথটিতে। সমগ্র মানব ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ কর্ম। এ কাজটি পাপিষ্ট শয়তানের। এ কাজ জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার। এমন কি দুনিয়াকেও এরা জাহান্নামে পরিণত করে। বিশ্বজোড়া পথভ্রষ্টতা, অনাচার ও পাপাচার তথা জাহান্নামের পথে মানুষের যে ভিড় -তা তো মানবরূপী এসব শয়তানদের কারণেই। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “যারা ঈমান এনেছে তাদের বন্ধু আল্লাহ, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যায়। আর যারা কাফের, তাদের বন্ধু হল শয়তান। সে তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়।” সেক্যুলারিষ্ট বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ তো সে কাজই করছে। সেক্যুলার বা ধর্মে অঙ্গিকার শূণ্য কোন বুদ্ধিজীবী বা ডিগ্রিধারি ব্যক্তিগণ যে আলোর পথ তথা সঠিক পথ দেখাতে পারে বা তাদের সে যোগ্যতা আছে -সেটি বিশ্বাস করাই তো শিরক। ইসলামে এরূপ বিশ্বাস কবিরা গুনাহ। সত্যপথ দেখানোর কাজ একমাত্র মহান আল্লাহর যেমন পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “ইন্না আলায়নাল হুদা”। অর্থঃ পথ দেখানোর কাজটি নিশ্চয়ই আমার। এবং সে দেখানোর পথের সন্ধান মেলে পবিত্র কোর’আনে।

 

ভারতসেবী দাসচরিত্র ও মিথ্যাচর্চা

বাংলাদেশীদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদটি হলো, দেশবাসীকে ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য, কল্যান-অকল্যানের ছবক দিচ্ছে ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য সেক্যুলার বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা। দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, আইন-আদালতসহ সর্বক্ষেত্রে তারাই জনগণকে পথ দেখায়। ফলে যা হবার সেটিই অতি ভয়ানক ভাবে হচ্ছে। বাড়ছে সত্য পথ থেকে বিচ্যুতি। এদের কারণেই দেশজুড়ে বাড়ছে মিথ্যার প্রসার; সেটি যেমন ধর্ম নিয়ে, তেমনি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি নিয়ে। সেক্যুলার বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের মাঝে ভারতসেবী দাসচরিত্র ও মিথ্যাচর্চা যে কতটা গভীর তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। সে উদাহরণটি দেয়া যাক সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের মাঝে যিনি প্রথম সারির কলামিস্ট তার লেখা থেকে। সেটি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ২০১১’য়ের ১২ সেপ্টম্বর তারিখে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত তার একটি নিবন্ধ থেকে।  নিবন্ধটি লিখেছিলেন কায়েদে আজম মহম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু দিবস উপলক্ষ্যে “আজ ‘কায়েদে আজম’ বেঁচে থাকলে কী ভাবতেন কী করতেন” শিরোনামে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর সাথে জড়িত আছে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের ইতিহাস এবং সেসাথে তাদের শত্রুদের ইতিহাসও।

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছিলেন, “খবরটি ঢাকার একটি কাগজে বের হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে ভারত তার দেশের মুসলমানদের সংখ্যা কম করে দেখাচ্ছে। ২০০১ সালে ভারতের আদমশুমারিতে দেখানো হয়েছে মুসলমানদের সংখ্যা ১৩ কোটি ৮০ লাখ। কিন্তু আমেরিকার হিসাব মতে এই সংখ্যা অনেক বেশি। নয়াদিল্লির মার্কিন দূতাবাসের হিসাবে এই সংখ্যা ১৬ থেকে ১৮ কোটি। গতকাল (রোববার) যখন আমার হাতে আসা ঢাকার কাগজে এই খবরটি পড়ছি, তখন চকিতে মনে পড়ল, আজ ১১ সেপ্টেম্বর। ১৯৪৮ সালের এই দিনে পাকিস্তানি মুসলমানদের দ্বারা সম্বোধিত ‘কায়েদে আজম’ ইন্তেকাল করেন। তিনি অবিভক্ত ভারতের তৎকালীন ১০ কোটি মুসলমানকে একটি আলাদা জাতি বলে দাবি করে দেশটিকে ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ছুরিতে ভাগ করেছিলেন। মৃত্যুর ৬৩ বছর পর আজ যদি তিনি কবর থেকে হঠাৎ জেগে উঠতেন এবং জানতেন খণ্ডিত ভারতেই এখন মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি অথবা মার্কিন হিসাব অনুযায়ী ১৬ থেকে ১৮ কোটি, তাহলে তিনি কী করতেন? কী ভাবতেন? আরেকটি পাকিস্তান দাবি করতেন কি?”

তিনি আরো লিখেছেন, “ধর্মের ভিত্তিতে জাতিত্ব নির্ধারণ এবং দেশ ভাগ করার মতো সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক বুদ্ধি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো একজন আধুনিকমনা, পাশ্চাত্য শিক্ষিত নেতাকে কেমন করে পেয়ে বসেছিল তা ভাবলে এখন বিস্মিত হতে হয়। … তিনি অবিভক্ত ভারতের ১০ কোটি মুসলমানের মধ্যে ৪ কোটিকে ভারতে রেখে ৬ কোটিকে নিয়ে পাকিস্তান গঠন করেছিলেন। ..তার বুদ্ধিতে কি এই কথা ধরা পড়েনি যে, এই চার কোটি মুসলমান ভারতে বাস করেই কালক্রমে ১৪ কোটি হয়ে দাঁড়াতে পারে! তখন তারা ভারতীয় হতে চাইলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের কাছে সমান মর্যাদার ভারতীয় বলে গৃহীত হতে নাও পারেন। তখন তাদের স্বার্থ, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা ক্রমাগত ক্ষুণ্ণ হতে থাকবে বই বাড়বে না। ভারতে এখন মুসলমানদের ভাগ্যে তাই ঘটছে। ওয়েবসাইট উইকিলিকস সম্প্রতি নয়াদিল্লির মার্কিন দূতাবাসের এক তারবার্তা প্রকাশ করে ভারতীয় মুসলমানদের বর্তমান পশ্চাৎপদ ও অনুন্নত অবস্থার কথা ফাঁস করে দিয়েছে। উইকিলিকসের ফাঁস করা খবরে বলা হয়েছে, ‘গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ইউএস ভিউজ অন ইন্ডিয়ান ইসলাম অ্যান্ড ইটস ইন্টারপ্রেটেশন’ শিরোনামে দিল্লির মার্কিন দূতাবাস ওয়াশিংটনে একটি তারবার্তা পাঠায়। ভারতের বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তারবার্তায় বলা হয়, ২০০১ সালের সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতে মুসলমানের সংখ্যা ১৩ কোটি ৮০ লাখ। কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি- ১৬ থেকে ১৮ কোটি। তারবার্তায় ভারতের মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়, ‘ভারতে আজিম প্রেমজির মতো কোটিপতি থাকলেও বেশিরভাগ মুসলমানের অবস্থা খুবই খারাপ। মুসলমানরা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। ভারতের পার্লামেন্ট এবং অন্যান্য নির্বাচনী বডিতে মুসলমানদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। ভারতের দলিত শ্রেণীর চেয়ে মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি তুলনামূলকভাবে বেশি। কিছু সংখ্যক মুসলমানের অবস্থার উন্নতি হলেও তাদের চিত্র ভারতের মুসলমানদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সামগ্রিক চিত্র নয়।’

তিনি আরো লিখেছেন, “এই হচ্ছে নয়াদিল্লির মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো রিপোর্টে বর্ণিত ভারতের ১৪ কোটি অথবা ১৮ কোটি মুসলমানের বর্তমান অবস্থা। চল্লিশের দশকে ধর্মের ছুরিতে শুধু অবিভক্ত ভারতকে কর্তন করা নয়, ভারতের মুসলমানদেরও বিভক্ত করে তৎকালীন ছ’কোটি মুসলমানের জন্য ‘হোমল্যান্ড’ তৈরি করতে গিয়ে জিন্নাহ কি ভাবতে পেরেছিলেন, অবশিষ্ট চার কোটি এবং তাদের কোটি কোটি ভবিষ্যৎ বংশধরের জন্য তিনি যুগ যুগ ধরে ‘নিজভূমে পরবাসী’ হওয়ার ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন? তাদের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হবে? কাশ্মীর সমস্যা জন্ম নেবে?

 কেন এতো জিন্নাহ বিরোধীতা?

লক্ষণীয় হলো উক্ত নিবন্ধে দিল্লির মার্কিন দূতাবাস ভারতের মুসলমানদের পশ্চাদপদতা নিয়ে যে তথ্য তুলে ধরেছে সে পশ্চাদপদতার জন্য আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী ভারত সরকারকে দায়ী করতে রাজী নন। দায়ী করেছেন কায়েদে আজমকে। দায়ী করেছেন তার নেতৃত্বে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকে। তাই লিখেছেন, “তিনি ভারতের মুসলমানদের উপকার করার বদলে তাদের যে অপকার করে গেছেন, তার প্রমাণ আজকের ব্যর্থ এবং বিধ্বস্ত রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং ভারতের মুসলমানদের বর্তমান দুর্দশা ও দুরবস্থা।” উক্ত নিবন্ধে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী নিজেকে পেশ করেছেন ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয় রূপে। তিনি বিরোধীতা করেছেন জনাব জিন্নাহ’র দ্বি-জাতি তত্ত্বকে। অথচ দ্বি-জাতি তত্ত্বকে অস্বীকার করলে মেনে নিতে হয় হিন্দু কংগ্রেসী নেতাদের এক ভারতীয় জাতির তত্ত্ব। সেটি হলে বাঙালীদের আলাদা জাতি রূপে পরিচিতি এবং সে পরিচিতি নিয়ে পৃথক বাংলাদেশ নির্মাণের অধিকার থাকে কি?  দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরোধীতার মধ্য দিয়ে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী কি তবে অখন্ড ভারত নির্মাণের পক্ষে উকালতি করছেন?

ভারতীয় হিন্দুগণ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা চায়নি। ভারত  আজ যেভাবে ২০ কোটি মুসলিমকে সে দেশের দলিত বা নমশুদ্রদের চেয়ে নীচে রাখতে পেরেছে, একই ভাবে গোলাম করে রাখতে  চেয়েছিল পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ৪০ কোটি মুসলিমদেরও। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কারণেই সেটি সম্ভব হয়নি। এ ব্যর্থতার কারণে দিল্লীর শাসকচক্রের প্রচণ্ড ক্ষোভ; তাই তারা পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধী। একই কারণে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীও পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধী।  আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর দুঃখ তো পাকিস্তানের বেঁচে থাকা নিয়ে। তিনি প্রচণ্ড খুশি হতেন যদি ভারত খন্ডিত হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত না হতো। গান্ধি বা নেহেরু না হলেও ভারত স্বাধীন হতো। কিন্তু জিন্নাহ না হলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হতো না। কারণ ভারতের নানা ভাষা ও নানা মজহাবে বিভক্ত মুসলমানদের একতাবদ্ধ করার দুরুহ কাজটি অন্য কোন মুসলিম নেতার পক্ষে সে সময় সম্ভব ছিল না। আর এজন্যই জিন্নাহর প্রতি ভারতীয় হিন্দুদের এত ক্ষোভ, এত আক্রোশ। একই কারণে আক্রোশ আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীরও। তার আক্রোশ শুধু কায়েদে আজমের উপর নয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও। পাকিস্তান কেন আজও বেঁচে আছে সেটিই তার কাছে অসহ্য।      

প্রশ্ন হল, ভারতকে তার মুসলিম নাগরিকদের প্রতি মানবিক হতে কি কায়েদে আজম নিষেধ করেছিলেন? সে জন্য পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাই বা দায়ী হয় কি করে? বরং লক্ষ্যনীয় হল, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্টদের অধীনে ভারতীয় মুসলিমদের জানমাল, ইজ্জত, আবরু কতটা বিপদাপন্ন সেটি আজ থেকে ৬৫ বছর আগে কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ সুস্পষ্ট ভাবে দেখতে পেরেছিলেন। কিন্তু সেভাবে দেখার সামর্থ্য আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর মত লোকগুলির কি আছে? সে দেশে নিয়মিত দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুদের উৎসব ভরে হত্যা করা হয়। পুলিশের চোখের সামনে দিনদুপুরে মসজিদ ধ্বংস করা হয় – যেমন ১৯৯২ সালে লাখ লাখ হিন্দু অযোধ্যায় ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদকে ধ্বংস করে। সেদেশে ধর্ষিত হয় মুসলিম নারী; ধর্ষনের পর তাদেরকে আগুণে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু সে অপরাধের জন্য কাউকে গ্রেফতার করা হয় না, আদালতেও তোলা হয় না। অরুন্ধুতি রায়ের মত বহু বিবেকমান ভারতীয় বুদ্ধিজীবী মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও গৃহে অগ্নিসংযোগের ন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার।  কিন্তু সেরূপ প্রতিবাদের ভাষা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর মুখে নাই, নাই তাদের নেত্রী শেখ হাসিনারও মুখেও। অথচ তারা পাকিস্তানের সৃষ্টিকেই অনর্থক মনে করে। এবং পাকিস্তানকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে।

 

 

হামলা বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে

প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কি সত্যই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র? তিনি কি দেখেন না, ৫৭ টি মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো পাকিস্তান। আজকের পাকিস্তান আজ আর একাত্তরের পাকিস্তান নয়। দেশটির হাতে রয়েছে পারমানবিক বোমা। রয়েছে দূরপাল্লার মিজাইল। যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, কামান, ইত্যাদি যুদ্ধাস্ত্র তারা নিজেরাই তৈরী করে। তাছাড়া পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার ফলে মুসলিমদের যে উপকার হয়েছে সেটি কি এতটাই তুচ্ছ? বাংলাদেশ যে মানচিত্র পেয়েছে সেটি তো পাকিস্তান থেকেই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত না হলে কি বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো? এটুকু বুঝার সামর্থ্য কি তার নাই? এই হলো বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের চেতনার মান! পাকিস্তানের সৃষ্টিকে অনর্থক বলে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করছে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে। 

ভারতে মুসলিমদের সংখ্যা পাকিস্তানের মুসলিমদের চেয়ে অধিক। কিন্তু পাকিস্তানের করাচী বা লাহোরের ন্যায় একটি মাত্র শহরে যতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আর্মি অফিসার, বিচারপতি, আইনবিদ, প্রশাসনিক আমলা আছে এবং তাদের হাতে যে পরিমান ধন-সম্পদ সঞ্চিত হয়েছে -তা কি ভারতের সমুদয় মুসলিমদের আছে? পাকিস্তানের অন্যান্য শহরগুলির কথা তো বাদই রইলো। সম্পদ ও শিক্ষার বাইরে উন্নয়নের বড় মাফকাঠি হলো, জানমালের নিরাপত্তা ও ইজ্জত। এক্ষেত্রেও পাকিস্তানের মুসলিমদের অর্জন কি কম? পাকিস্তানী একজন মুসলিম যতটা স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বসবাস করে -তা কি কোন ভারতীয় মুসলিম ভাবতে পারে?

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তানীরা কায়েদে আজম তথা শ্রেষ্ঠ নেতা বলে সম্মান দেখায় সেটি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ভাল লাগেনি। তিনি বরং তাকে হাফ এডুকেটেড ব্যারিস্টার বলে হেয় করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বরং শ্রেষ্ঠ বলার চেষ্টা করেছেন শেখ মুজিবকে। শেখ মুজিব যে শ্রেষ্ঠ সেটি প্রমানের জন্য এক পাকিস্তানী সাংবাদিক বন্ধুর মন্তব্যকে পেশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “লন্ডনে এক পাকিস্তানি সাংবাদিক-বন্ধু আমাকে বলেছেন, ‘তোমরা বড় ভাগ্যবান তাই শেখ মুজিবের মতো নেতা পেয়েছিলে। তিনি সময় মতো বাংলাদেশকে পাকিস্তানের জংলি ফৌজি শাসন থেকে মুক্ত করে আলাদা স্বাধীন দেশ না করলে এখন পাকিস্তানের পূর্বাংশ হিসেবে তোমরাও একদিকে তালেবানি সন্ত্রাসে জর্জরিত এবং অন্যদিকে মার্কিনি ড্রোন হামলার শিকার হতে। তোমরা এখন এই গ্রেট লিডারের সামান্য ভুলত্রুটির যতই সমালোচনা কর, একথা ভুললে চলবে না, তিনি তোমাদের স্বাধীন জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং একটি স্বাধীন নেশন স্টেট উপহার দিয়ে গেছেন। পাকিস্তানের সঙ্গে সহমরণে তোমাদের যেতে হয়নি।’

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর যে বন্ধুটি শেখ মুজিবকে গ্রেট লিডার বলেছেন সে ব্যক্তিটি শেখ মুজিব যে বাংলাদেশকে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি রূপে বিশ্ব মাঝে পরিচিত করলো এবং গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে বাকশাল প্রতিষ্ঠা দিল -সে বিষয়গুলি কি জানেন? তাছাড়া মুজিব বা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ন্যায় পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অসংখ্য শত্রুর বসবাস দেশটির জন্ম থেকেই। ফলে পাকিস্তান ভাঙ্গলে তাদের ভাল লাগবে সেটিই তো স্বাভাবিক। মুজিবের ইমেজকে বড় করতে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী তেমন একজনকেই খাড়া করেছেন।  জিন্নাহর পাকিস্তান আর যাই হোক তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি হয়নি। পাকিস্তানে একদলীয় বাকশালও প্রতিষ্ঠা পায়নি। দেশবাসীকে রক্ষিবাহিনীর নির্মম অত্যাচারও সইতে হয়নি। এবং দেশটি পরিনত হয়নি ভারতের গোলাম রাষ্ট্রে। বরং বাংলাদেশের আজ যে পৃথক অস্তিত্ব সেটিও তো সম্ভব হয়েছে জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায়।   

 

বাঙালী মুসলিম চেতনায় কায়েদে আজম

কায়েদে আজম বাঙালী ছিলেন না। কিন্তু তারপরও তাঁর প্রশংসায় বাঙালী কবি-সাহিত্যিকেরা যত কবিতা লিখেছেন তা কি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির গ্রেট লিডার মুজিবকে নিয়ে লেখা হয়েছে? ভয়ভীতি দেখিয়ে কাউকে দিয়ে কবিতা লেখানো যায় না। কবিতা লেখার সে প্রেরণাটি আসে মনের গভীর থেকে। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী তার লেখায় বুঝাতে চেয়েছেন, পাকিস্তানী আমলে নিছক ঘটা করেই কায়েদে আজমের জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন করা হতো, তার সাথে বাঙালীর মনের যোগ ছিল না। তার মন্তব্যটি যে কতটা অসত্য সেটি প্রমানের জন্য বাংলা সাহিত্যে কায়েদে আজমকে নিয়ে রচিত অসংখ্য বাংলা কবিতা ও প্রবন্ধই কি যথেষ্ট নয়? বাংলা কবিতা থেকে তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।

অন্য কেউ নন, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরিদের স্বপক্ষীয় কবি খোদ বেগম সুফিয়া কামাল কায়েদে আজমকে নিয়ে লিখেছেন,

“তসলীম লহ, হে অমর প্রাণ! কায়েদে আজম, জাতির পিতা!

মুকুট বিহীন সম্রাট ওগো! সকল মানব-মনের মিতা।

অমা-নিশীথের দুর্গম পথে আলোকের দূত! অগ্রনায়ক!

সিপাহসালার! বন্দী জাতিরে আবার দেখালে মুক্তি-আলোক।”

                 – (মাহে নও। ডিসেম্বর ১৯৫৯)।

অন্য এক কবিতায় তিনি লিখেছেন,

“জাতির পতাকা-তলে একত্রিত সকলে তোমারে

স্মরণ করিছে বারে বারে,

তোমার আসন আজও সকলের হৃদয়ের মাঝে

তোমারে লইয়া ভরে আছে।

যুগে যুগে তুমি তব দানের প্রভায়

চিরঞ্জীব হয়ে র’বে আপনারী দিব্যি মহিমায়।

কায়েদে আজম। তবদান

মহাকাল-বক্ষ ভরি রহিবে অম্লান।”

                -(মাহে নও। ডিসেম্বর ১৯৫৫)

সুফিয়া কামাল আরেক কবিতায় লিখেছেন,

“হে সিপাহসালার! তব দৃপ্ত মনোরথে

ছুটাইয়া টুটাইয়া জিন্দানের দ্বার

আনিলে প্রদীপ্ত দীপ্তি ঘুচায়ে শতাব্দী অন্ধকার

মৃত্যু নাহি যে প্রাণের ক্ষয় নাহি তার দেয়া দানে

লভি আজাদীর স্বাদ, এজাতি-জীবন তাহা জানে

তোমার জনম দিনে, তোমার স্মরণ দিনে

কায়েদে আজম! তব নাম

কোটি কন্ঠে ধ্বনি ওঠে, কহে, লহ মোদের সালাম।”

                         –(পাক-সমাচার। ডিসেম্বর: ১৯৬৩)। 

কায়েদে আজম স্মরণে সিকান্দার আবু জাফর লিখেছেন,

“ডোবেনি যে রবি, নেভেনি যে আলো

মুছিবে না কোন কালে,

এই কালে পৃথিবীর ভালে

জ্যোতি-প্রদীপ্ত উজ্বল সেই

সূর্য্যের প্রতিভাস

সে রচিয়া গেছে মৃত্যুবিহীন

আপনার ইতিহাস।

সে ছড়ায়ে গেছে মৃত্যুঞ্জয়ী

মহাজীবনের বীজ,

সে ফোটায়ে গেছে লক্ষ বুকের

তিমির সরসী নীরে

চির প্রভাতের আনন্দ সরসিজ।

মৃত্যু ‘অতীত জীবন তাহার

মৃত্যু সাগর তীরে

দিগন্তহীন সীমা বিস্তৃত জীবনের মহাদেশে

যুগ-যুগান্ত সে আসিবে ফিরি ফিরে।

বহু মৃত্যুর দিগন্ত হতে সে এনেছে কেড়ে

জীবনের সম্মান;

ক্ষয় নাহি তার নাহি তার অবসান।

অযুত মৌন কন্ঠ ভরিয়া নব জীবনের গান

ফোটা যে বারে বারে

মৃত্যু কি তারে স্তব্ধ করিতে পারে? 

           -(শাহেদ আলী সংকলিত, ১৯৮৯)

আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী, আওয়ামী লীগ আমলের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং বাংলা এ্যাকাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক ডঃ মাযহারুল ইসলাম লিখেছেন,

“সহসা আলোর পরশ লাগালো

প্রাণে প্রাণে এক চেতনা জাগলো

আধার দুয়ার খুলে গেল সম্মুখে

কে তুমি হে নব-পথ-সন্ধানী আলোকদ্রষ্টা?

কে তুমি নতুন মাটির স্রষ্টা?

যে এনেছে বুক জুড়ে আশ্বাস

যে দিয়েছে সত্তা নিয়ে বাঁচবার বিশ্বাস

অগণন মানুষের হৃদয়-মঞ্জিলে

-সে আমার কাযেদে আজম

আমার তন্ত্রীতে যার ঈমানের একতার

শৃঙ্খলার উঠিছে ঝংকার

সুন্দর মধুর মনোরম।” -(শাহেদ আলী সংকলিত, ১৯৮৯)

 

ড. মাজহারুল ইসলাম অন্য এক কবিতায় কায়েদে আজম সম্পর্কে লিখেছেন,

“আঁধারের গ্লানিভরা জাতির জীবন

কোথাও ছিল না যেন প্রাণ স্পন্দন

মৃত্যু­-তুহীন দিন গুণে গুণে এখানে ওখানে

শুধু যেন বারবার চলিষ্ণু পখের প্রান্তে ছেদ টেনে আনে

ম্লান পথ হয়ে ওঠে আরো ঘন ম্লান

আঁধারে বিলীন হলো মুক্তি-সন্ধান।

তারপর মৃত্যু-জয়ী সে এক সৈনিক

সৃষ্টির আনন্দ নিয়ে নেমে এলো আঁধারের পথে

চোখে মুখে অপূর্ব স্বপন

হাতে আঁকা অপরূপ নতুন দেশের রূপায়ন

এ মাটিতে সে এক বিস্ময়,

মৃত বুকে প্রাণ এলো

মুক্তির চেতনা এলো।

প্রাণ যাক তবু সেই স্বপ্ন হোক জয়

নির্বিকার ত্যাগের আহবান!

পথে পথে রক্তের আহবান।

  -মাটির ফসল, -(শাহেদ আলী সংকলিত,১৯৮৯)

বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক এবং ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জনাব আবু হেনা মোস্তাফা কামাল কায়েদে আজমের সম্মানে লিখেছেন,

“প্রদীপ্ত চোখে আবার আকাশকে দেখলাম

পড়লাম এক উজ্বল ইতিহাসঃ

সে ইতিহাসের পাতায় পাতায় একটি সোনালী নাম…

আবার আমরা আমরা চোখ তুলে তাই দেখলাম এ আকাশ।

তোমাকে জেনেছি আকাশের চেয়ে বড়—

সাগরের চেয়ে অনেক মহত্তর—

কেননা ক্লান্ত চোখের পাতায় নতুন আলোর ঝড়

তুমি এনে দিলে । নতুন জোয়ার ছুঁয়ে গেল বন্দর।

        -(মাহে নওঃ ডিসেম্বর ১৯৫৩)     

কায়েদে আজমের মৃত্যুতে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন,

“অনুর্বর প্রহরে আমার-প্রাণ দিলে সুর দিলে তুমি,

আমার মৃত্তিকালদ্ধ ফসলের ভিত্তিভূমি তুমি।

প্রতিকূল প্রহরের প্রবঞ্চনা ফিরে গেল অসীম কুন্ঠায়,

আসলাম দীপ্ত পথে খরতর সূর্যের আশায়।

তুমি সে সূর্যের দিন,তুমি তার আরম্ভের প্রভা,

সবুজের সমারোহ জীবনের দগ্ধ দিন

প্রাণের বহ্নিব মোহে জেগে উঠে নতুন সঙ্গীতে-

অপূর্ণ জীবন আজ পরিপূর্ণ হলো বন্ধু তোমার ইঙ্গিতে।

মানব কন্ঠে যে সুর জাগালে তুমি,

সে সুরে এবার তুলে কল্লোল আমার জন্মভূমি।

  • নয়া সড়ক (বার্ষিকী), (সংকলনে শাহেদ আলী, ১৯৮৯)।

 

বিপদ জ্ঞানের দৈন্যতায়

মানুষ যে দেশে বা যে পরিবেশে বসবাস করে সেখানে বসবাসকারি শত্রুমিত্র, উপকারি-অনুপকারিকে জানতে হয়। জানতে হয় কোনটি বিষাক্ত শাপ, কোনটি ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ, কোথায় বাঘের বাস, কে দুর্বৃত্ত, এবং কোথায় চোর-ডাকাতদের পাড়া -সেগুলোও। সেগুলিকে চিনতে মহল্লায় আলোও জ্বালাতে হয়। তেমনি জানতে হয় জাতীয় জীবনে কে প্রকৃত শত্রু ও কে প্রকৃত মিত্র। বাংলার মানুষ এক কালের মশার কামড়ে লাখে লাখে প্রাণ হারিয়েছে। তারা জানতোই না যে সে মশার রক্তে বসবাস করে ম্যালেরিয়ার ঘাতক জীবানু। তেমনি প্রতি দেশে ও মহাদেশে বহু আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী ব্যক্তিবর্গ যেমন আছে, তেমন আছে নিষ্ঠুর লুটেরাও। তেমনি আছে বিদেশী শত্রুর অর্থে প্রতিপালিত হাজার হাজার দেশীশত্রুও। নমরুদ ও ফিরাউনের মত স্বৈরাচারি শাসকদের উপস্থিতি তো প্রতি যুগেই। মীর জাফর শুধু ১৯৫৭ সালেই আসেনি। তাই মুসলিম হওয়ার দায়বদ্ধতা শুধু মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর মহান রাসূলকে চেনা নয়। তাঁকে যুগের নমরুদ, ফিরাউন ও মীর জাফরদেরও চিনতে হয়। তাই শধু ১৯৭১ এর ইতিহাস জানলে হয় না, ১২০২, ১৭৫৭, ১৮৫৭, ১৯৪৭’য়ের ইতিহাসও জানতে হয়।

তাই শুধু পাঠ্য বইয়ের ইতিহাস পড়লেও চলে না। পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও খুঁজতে হয় ইতিহাসের জ্ঞান। কারণ পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাসটি লেখে বিজয়ী পক্ষ। ফলে পরাজিতগণ যত ভাল মানুষই হোক না কেন, তাদের প্রতি সে ইতিহাসে প্রচণ্ড অবিচার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আরোপিত হয় বহু মিথ্যা অভিযোগ। সে অভিযোগের বিরুদ্ধে জবাব দেয়ার সুযোগও দেয়া হয়না। তাই পাঠ্য পুস্তকের ইতিহাসে ১৭৫৭ সালের বিজয়ী পক্ষ ইংরেজরা প্রশংসিত। তাদের প্রশংসায় যে শুধু ইংরেজ ঐতিহাসিকেরা লিখেছে তা নয়, বিস্তর লেখেছে ইংরেজ স্বার্থের সেবাদাস বহু বাঙালীও। এমনকি রবীন্দ্রনাথ নাথও ইংরেজ সম্রাটের প্রশংসায় কবিতা লিখেছেন। সে সাথে চরিত্র হনন করা হয়েছে সিরাজুদ্দৌলার। তাঁকে মদ্যপ ও জ্বিনাকারি বানানো হয়েছে। অন্ধকার কূপের হতাকারিও বানানো হয়েছে। তেমন চরিত্রহনন হয়েছে ১৮৫৭ সালের মোজাহিদদের। একই ভাবে চরিত্র হনন করা হয়েছে একাত্তরের ইতিহাসেও। সে ইতিহাসে ভিলেন রূপে খাড়া করা হয়ছে তাদেরকে -যারা খাড়া হয়েছিল ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।   

পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা ও কারিগরি জ্ঞানে অনগ্রসরতার কারণে কোন দেশই ধ্বংস হয় না। ধ্বংস হয় দর্শন ও ইতিহাস-জ্ঞানে অনগ্রসরতার কারণে। কারণ, অনগ্রসরতার কারণে লোপ পায় সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করার বুদ্ধিবৃত্তিক বল। তখন দুর্বৃত্তরা দেশের পিতা, নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পায়। মুসলিমগণ যখন মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সভ্যতার জন্ম দিল তখন পদার্থ, রাসায়নিক বা কারিগরি ক্ষেত্রে যে বিশাল বিপ্লব এসেছিল -তা নয়। রাস্তাঘাট, কলকারখানা যে বিপুল ভাবে গড়ে উঠিছিল তাও নয়। সেটি সম্ভব হয়েছিল ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের জ্ঞানে গভীরতার কারণে। তখন বিপ্লব এসেছিল কোর’আন বুঝায় এবং সে অনুযায়ী আমল করায়। বিপ্লব এসেছিল জীবন ও জগত নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্রে। বিপ্লব এসেছিল মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধে। বিপ্লব এসেছিল মানুষের বাঁচার লক্ষ্য এবং পদ্ধতিতে। সে বিপ্লবের ফলে বিপ্লব এসেছিল উন্নত মানব রূপে বেড়ে উঠায়। ফলে মানুষ তখন মহামানব রূপে বেড়ে উঠেছিল। আর যে রাষ্ট্রে মহামানবের সংখ্যা বাড়ে সে রাষ্ট্র যে মহান-সভ্যতার জন্ম দেয় -সেটিই তো স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের আজকের বিপর্যয় ও ব্যর্থতার কারণ, দেশে রাস্তা ঘাট, কলকারখানা ও ক্ষেতখামারের কমতি ততটা নয় যতটা দৈনত্য জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে জ্ঞানের সর্বশ্রষ্ঠ উৎস কোর’আন চর্চার ক্ষেত্রে। এবং তার কারণ, দেশটির বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণ দখলে গেছে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ন্যায় মিথ্যাসেবী ও ভারতসেবী বুদ্ধিজীবীদের হাতে। আর এতে দেশ ছিনতাই তবে দুর্বৃত্তদের হাতে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? ১ম সংস্করণ, সেপ্টম্বর ২০১১; ২য় সংস্করণ, ০৩/১২/২০২০।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *