বিবিধ ভাবনা ৫৯

image_pdfimage_print

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১.ব্যর্থ শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিজয় কুশিক্ষার

কোন জাতির উত্থান বা পতনের কাজটির শুরু কখনোই ক্ষেত-খামার বা কলকারখানায় হয়না। সেটি হয় শিক্ষাঙ্গণে। মহান নবীজী (সা:) তাই মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়ার কাজটি কৃষি উন্নয়ন বা শিল্পউন্নয়ন দিয়ে শুরু করেননি। শুরু করেছিলেন শিক্ষা দিয়ে। তিনি আজীবন ছিলেন একজন সার্বক্ষণিক শিক্ষক। শিক্ষাদান ও শিক্ষালাভকে তিনি শ্রেষ্ঠ ইবাদত রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। পবিত্র কুর’আনের প্রথম নির্দেশ বানী তাই নামায-রোযার হুকুম নয়, বরং সেটি “ইকরা” তথা “পড়ো”। পড়ার অর্থ জ্ঞানবান হওয়া। মহান আল্লাহতায়ালা যে ইবাদতটি ঈমানদারদের উপর সর্ব-প্রথম ফরয করেছেন সেটি নামায, রোযা, হজ্জ বা যাকাত নয়, সেটি হলো জ্ঞানার্জন। লক্ষণীয় হলো, বিশ্বের সকল ধর্মের মাঝে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা শিক্ষালাভকে সকল নর-নারীর উপর বাধ্যতামূলক করেছে। অথচ মুসলিমগণই আজ সবচেয়ে অশিক্ষিত।এ হলো তাদের ইসলাম থেকে দূরে সরার নজির।

মানব-উন্নয়নের কাজটি কখনোই পানাহার বাড়িয়ে হয় না, সেটি ঘটে জ্ঞান লাভের মধ্য দিয়ে। জ্ঞানই বিপ্লব আনে চেতনা, চরিত্র ও কর্মে। একমাত্র জ্ঞানের গুণেই একজন জাহিল ব্যক্তি ঈমানদারে পরিণত হয়। এবং অপরাধী ব্যক্তি নেকবান্দায় পরিণত হয়। মানব-উন্নয়নের এ মৌলিক কাজটি বাদ দিয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রে যত উন্নয়নই হোক -তা দিয়ে সভ্য মানুষ যেমন নির্মিত হয় না। তেমনি উন্নত সভ্যতাও গড়ে উঠে না। বাংলাদেশে কি দালান-কোঠা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, ও কলকারখানা কম হয়েছে? কিন্তু দেশ তাতে কতটা সভ্য হয়েছে?

একটি দেশ কতটা অসভ্য –সে বিচারটি কখনোই দেশটিতে বসবাসরত ইতর জীব-জন্তুর সংখ্যা দিয়ে হয় না। বরং সেটি হয়, দেশটিতে আইনের শাসন কতটা প্রতিষ্ঠা পেল এবং চোর-ডাকাত, ভোটডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীদের শাস্তি না দিয়ে কতটা সন্মানের আসনে বসানো হলো -তা থেকে। এরূপ অসভ্যতায় বাংলাদেশ বিশ্বে রেকর্ড গড়েছে। কারণ, একমাত্র এ দেশটিতেই দেশের সবচেয়ে বড় ডাকাতকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে সন্মান দেয়া হয়। বিশ্বের আরো কোন দেশই এতটা নীচে নামেনি। আইনের শাসন আছে এমন কোন সভ্য দেশে কি এমনটি ঘটে? বরং প্রতিটি সভ্য দেশের চোর-ডাকাতদের স্থান হয় জেল খানার বদ্ধ কুঠুরিতে। জঙ্গলে হিংস্র পশুটি যেমন মনের আনন্দে ঘুরে, বাংলাদেশেও তেমন মনের আনন্দে ঘুরে দেশের সবচেয়ে বড় ডাকাতটি। বরং বিস্ময়ের বিষয় হলো, সমগ্র দেশবাসীর মাঝে সে ভোটডাকাতই হলো সবচেয়ে স্বাধীন নাগরিক। এবং তার অবাধ স্বেচ্ছাচারের সে স্বাধীনতাকে পাহারা দেয় দেশের সমগ্র পুলিশ ও সেনাবাহিনী। অথচ স্বাধীন ভাবে কথা বললে অন্যদের গুম ও খুন হতে হয়। অথবা রিমান্ডে গিয়ে নির্যাতিত হতে হয়।     

যখন কোন দেশ স্বৈরাচার, গুম, খুন, ধর্ষণ,ও সন্ত্রাসের ন্যায় অসভ্যতায় ভরে উঠে -তখন বুঝতে হবে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কাজ করছে না। কারণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতেই সমাজের বুক থেকে আবর্জনা সরানো তথা দুর্বৃত্তদের নির্মূলে সৈনিক গড়া হয়। জমিতে গাছ না জন্মালে যেমন আগাছা জন্মে, তেমনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি চরিত্রবান মানুষ না গড়লে সেখানে বিপুল সংখ্যায় দুর্বৃত্ত গড়ে উঠে। বাংলাদেশে সেটিই ঘটেছে। তাই দেশে যারা স্বৈরাচার, গুম, খুন, ও সন্ত্রাসের রাজনীতির জোয়ার এনেছে তারা কোন গভীর জঙ্গলে বেড়ে উঠেনি। তারা বেড়ে উঠেছে দেশের শিক্ষালয়গুলিতে। আবরার ফাহাদদের মত নিরীহ ছাত্রদের তাই ডাকাতপাড়ায় খুন হতে হয়নি, খুন হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। বাংলাদেশে তাই বিপুল সংখ্যায় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে কাজের কাজ তেমন হয়নি।

শিক্ষাদানের কাজটি স্রেফ পড়তে বা লিখতে শেখানো নয়, বরং সেটি সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায় এবং সজ্জন ও দুজ্জনকে চেনার সামর্থ্য সৃষ্টি করা। এবং সে সাথে মিথ্যা ও জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াকু সৈনিক রূপে গড়ে তোলা। কান্টনমেন্টে গড়ে উঠে দেশের সীমান্তে লড়াই করার সৈনিক। আর দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে উঠে রাজনীতির অঙ্গণে শত্রুর বিরুদ্ধে লাগাতর লড়াই করার সৈনিক। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় তাই রাজনৈতিক যুদ্ধের ক্যান্টনমেন্ট। দেশের শিক্ষিত জনগণ জালেমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নির্ভিক সৈনিকে পরিণত হয়তো সঠিক শিক্ষাব্যবস্থার কারণেই। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে সে কাজটি হয়নি। ফলে ১৭ কোটি মানুষের দেশে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল গড়ে উঠেনি। 

সুশিক্ষার বিপরীতে কুশিক্ষার একটি পদ্ধতিও সমাজে সব সময় কাজ করে। সে পদ্ধতি প্রবল ভাবে কাজ করে চোরের গৃহে, ডাকাতপাড়ায় ও সন্ত্রাসী রাজনৈতিক সংগঠনে। সেখানে শেখানে হয় চুরিডাকাতি, খুন ও ধর্ষণে পারদর্শি হতে। ঘৃনা করতে শেখায় ধর্ম, ন্যায়-নীতি, ধর্মকর্ম ও অন্যান্য নেক কর্মগুলিকে। কারণ, ধর্ম, নেককর্ম ও ন্যায়নীতির প্রতি ভালবাসা নিয়ে গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের রাজনীতি করা যায় না। ভোটডাকাতিও করা যায় না। তেমন একটি চেতনা নিয়ে জুতা পায়ে মসজিদে ঢুকে মুসল্লীদেরও পেটানো যায় না। সে জন্য সুনীতির প্রতি প্রচণ্ড ঘৃনা ও দুর্নীতির প্রতি প্রবল আসক্তি সৃষ্টি করতে হয়। সে সামর্থ্য সৃষ্টির জন্যও শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ জরুরি। বনজঙ্গলে সে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নাই ফলে সেখানে চোরডাকাত, ভোটডাকাত ও গুম-খুনের নায়কগণ গড়ে উঠে না। সে জন্যও মহল্লায় মহল্লায় আওয়ামী লীগ, যুব লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্র লীগ চাই। বাংলাদেশে কুশিক্ষার এ প্রতিষ্ঠানগুলি বিপুল ভাবে বিজয়ী। প্রধানমন্ত্রীর ন্যায় দেশের সর্বোচ্চ আসনে একজন ভোটডাকাতকে বসিয়ে তারা প্রমাণ করেছে -তাদের সংখ্যা ও শক্তি কতো বিশাল।

 

২. ব্যর্থ মাদ্রাসা শিক্ষা

একজন ছাত্র বহুবছর ধরে মাদ্রাসায় শিক্ষা নেয় কি শুধু এজন্য, তার কাজ হবে মসজিদে আযান দেয়া, মুর্দা দাফন, কবর জিয়ারত, মিলাদ পড়ানো, বিবাহ পড়ানো বা বড় জোর কোন এক মসজিদে ইমামতি? মাদ্রাসা শিক্ষার এটিই কি মূল উদ্দেশ্য? কোন ভিন্ন উদ্দেশ্য হলে সেটিই বা কি? তাদের সাফল্য রাষ্ট্র ও সমাজের অন্য কোন অঙ্গণে? দেশে প্রশাসন, সেনা বাহিনী, আদালত, মিডিয়া, রাজনীতি ও ব্যবসা-বানিজ্যে কি তাদের কোন স্থান আছে? দেশে প্রতি বছর যতগুলি বই লেখা হয়, তার মধ্যে কতগুলি তাদের লেখা? দেশে যেসব পত্র-পত্রিকা বের হয় তাতেই বা তাদের ক’টি লেখা ছাপা হয়?

ব্যক্তি ও সমাজকে সভ্যতর কাজে শিক্ষার বিকল্প নাই। শিক্ষিত ব্যক্তিটি পায় অন্যায়, মিথ্যা ও জুলুমকে ঘৃণা করার সামর্থ্য। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ডিগ্রি বা পাগড়ি বিতরণ নয়। সেটি হলো মানুষকে জ্ঞানবান, প্রজ্ঞাবান ও চরিত্রবান করা। সভ্যতর সমাজের যোগ্য সদস্য রূপে ছাত্রদের গড়ে তোলা। মুসলিম জীবনে কুর’আনী জ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। মাদ্রাসা শিক্ষার গুরুত্ব এখানেই। পানাহার দেয় দৈহিক বল নিয়ে বেড়ে উঠার সামর্থ্য, এবং কুর’আনের জ্ঞান দেয় ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার সামর্থ্য। তাই এ জ্ঞান ছাড়া মুসলিম হওয়া অসম্ভব। ঈমান থেকেই ব্যক্তি পায় নেক আমলের সামর্থ্য; বস্তুত ঈমান দেখা যায় সে সামর্থ্যের মাঝে। ব্যক্তির বেঈমানী দেখে তাই বুঝা যায়, সে ব্যক্তির জীবনে বিদ্যাশিক্ষা কোন কাজই দেয়নি।

শিক্ষার গুণেই মানুষ পূর্ণ মানুষ তথা ইনসানে কামেল রূপে গড়ে উঠে। চিকিৎস্যক, ইঞ্জিনীয়ার, কৃষিবিদ, বিজ্ঞানী ইত্যাদি পেশার লোকেরা যদি শুধু নিজ নিজ পেশাদারী বিষয়গুলি বুঝে এবং অজ্ঞ থেকে যায় ধর্মীয় জ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, দর্শন ও রাজনীতির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে –তাতে জ্ঞানার্জনে অপূর্ণতা থেকে যায়। তখন দেশে পেশাদারদের সংখ্যা বাড়লেও দারুন অভাব থেকে যায় কামেল তথা পূর্ণাঙ্গ মানুষের। সে অপূর্ণাঙ্গতা যদি মাদ্রাসাগুলিতে ধর্ম শিক্ষার ক্ষেত্রে ঘটে -তবে সেটির নাশকতাটি আরো বিশাল। তখন অতি অশিক্ষিত ব্যক্তিগণও আলেম রূপে সমাজে পরিচিত পায়। “আলেম” শব্দের অর্থ জ্ঞানী। তবে জ্ঞানী হওয়ার অর্থ শুধু কুর’আন-হাদীস পড়তে ও বুঝতে শেখা নয়। ইতিহাস, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, যুদ্ধবিজ্ঞান ও ভূগোল ইত্যাদি বহু বিষয়ে বহু কিছুই শিখতে হয়। কারণ শুধু নামায,রোযা, হজ্জ, যাকাতের মসলা-মাসলা জানলেই সভ্য ও উন্নত সমাজ নির্মাণ করা যায়না। শক্তিশালী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের জ্ঞান যেমন চাই, তেমনি চাই উন্নত যুদ্ধাস্ত্র, কৃষি, শিল্প ও যুদ্ধবিজ্ঞানের জ্ঞান।  নবীজী (সা:) জ্ঞানার্জনে চীনে যেতে বলেছেন। সেটি কুর’আন-হাদীসের জ্ঞান শিখতে নয়। সেটি ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্য শাখার জ্ঞান শেখার প্রয়োজনে। তাই ইসলামের গৌরব কালে মুসলিম জ্ঞানী ব্যক্তিগণ শুধু কুর’আনের তাফসির লিখেননি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় নানা বই লিখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলি সেরূপ জ্ঞানী ব্যক্তি ক’জন তৈরী করেছে? ক’জনের মাঝে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখার জ্ঞান আহরণের সে তীব্র আগ্রহ? এ দিকে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যর্থতাটি অতি বিশাল। যথার্থ জ্ঞানী না হয়েই তারা নিজেদের নামের সাথে আলেম তথা জ্ঞানীর পদবী লাগাচ্ছেন।

“মাওলানা” শব্দের ন্যায় “আলেম” শব্দের আবিস্কারক হলো ভারতীয় উপমহাদেশের মাদ্রাসায় লেখাপড়া করা ব্যক্তিবর্গ –বিশেষ করে দেওবন্দ মাদ্রাসার সাথে যারা জড়িত তারা। অনেকের নামের আগে কুতুবুল ইলম তথা ইলমের তারকাও লেখেন। এটি এক ধরণের তাকাব্বুরি তথা নিজেকে বড় রূপে জাহির করার তাড়না। অথচ ইসলামের গৌরব যুগে যারা জ্ঞানবিজ্ঞানে বিপ্লব এনেছিলেন তারা নিজেদের নামের আগে কখনোই আলেম, আল্লামা বা মাওলানা লেখেননি। আল রাযী, আত তারাবী, ইবনে কাছির এবং আল কুরতুবীর ন্যায় মুসলিম ইতিহাসের বিখ্যাত তাফসিরকারকগণও নিজেদের মাওলানা বা আলেম বা আল্লামা বলে জাহির করেননি। তারা নিজেদের রচিত বইয়ে শুধু নিজের নাম ও পিতার নাম লেখাটিই যথেষ্ট মনে করেছেন। নিজেকে আলেম বা জ্ঞানী রূপে জাহির করার খাসলত এমন কি যারা সেক্যুলার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবীন প্রফেসর তাদেরও নাই। কারণ সেটি তাদের কাছে রুচিশীল গণ্য হয় না।

প্রশ্ন হলো, মাদ্রাসা যে ছাত্রটি ভাষা বিজ্ঞান, রাজনীতি, ইতিহাস, ভূগোল, সমাজ বিজ্ঞান ও দর্শন নিয়ে সমগ্র ছাত্র জীবনে কিছুই পড়ার সুযোগ পেল না -সে নিজেকে আলেম বা জ্ঞানী রূপে জাহির করে কোন যুক্তিতে? বিস্ময়ের বিষয় হলো এরূপ স্বঘোষিত আলেমগণ কিছু কাল পর তাদের নামে সাথে আল্লামা লেখা শুরু করেন বা অন্যদের দিয়ে লেখার ব্যবস্থা করেন। এক কালে সমগ্র ভারত জুড়ে একজন মাত্র ব্যক্তি সমাজের গণ্যমান্যদের পক্ষ থেকে মাত্র আল্লামা খেতাব পেয়েছিলেন। তিনি হলেন আল্লামা মুহম্মদ ইকবাল। আল্লামা শব্দের অর্থ অধিক জ্ঞানী। তিনি  সত্যই ছিলেন একজন আল্লামা। অন্যদের জন্য আল্লামা খেতাব পাওয়াটি তিনি কঠিন করে দেন। তিনি উর্দু, ফারসী, আরবী ও ইংরাজী এ চারটি ভাষা জানতেন। অতি উচ্চাঙ্গের কবিতা লিখেছেন উর্দু ও ফার্সি ভাষায়। উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন ইংল্যান্ড ও জার্মানীতে। জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পি.এইচ.ডি করেছেন। বিলেত থেকে ব্যারিস্টারী পাশ করেছেন। অথচ আজ হাট হাজারী মাদ্রাসার শিক্ষকদের অধিকাংশই হলো আল্লামা। ক’খানা বই লিখেছেন এসব আল্লামাগণ? ক’টি ভাষায় তারা পন্ডিত? প্রশ্ন হলো নামের আগে এরূপ আলেম বা আল্লামা লেখা কি নবীজী (সা:)’র সূন্নত? 

শিক্ষাই মানুষের জীবনে পূর্ণতা দেয়। যে কৃষক, শ্রমিক বা অন্য কোন পেশাজীবী ব্যক্তি নিজের কর্মের বাইরে কোন শিক্ষা বা প্রশিক্ষণই নেয়নি -সে অপূর্ণাঙ্গ। নবীজী (সা:) ছিলেন একজন ইনসানে কামেল তথা পূর্ণাঙ্গ মানুষ। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা, তেমনি ছিলেন আদর্শ রাষ্ট্রীয় নেতা, আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ বিচারক, আদর্শ জেনারেল, আদর্শ ব্যবসায়ী, আদর্শ স্বামী, এবং আদর্শ পিতা। সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক হলেও তাঁর হাতে কোন মাদ্রসা, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। তাঁর শিক্ষাদানের আসরগুলি বসতো কখনো বা মসজিদের মেঝেতে, কখনো কারো গৃহে, কখনো রাস্তার ধারে এবং কখনো বা গাছের নীচে। তার মাদ্রাসার ছাত্রগণই পরবর্তী কালে শ্রেষ্ঠ ফকিহ, শ্রেষ্ঠ গভর্নর, শ্রেষ্ঠ বিচারক, শ্রেষ্ঠ প্রশাসক, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ জেনারেল পরিণত হয়েছেন। দেশে দেশে মুসলিমদের বিজয় ও গৌরব তো বাড়িয়েছেন তারাই।

বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার সে সাফল্যটি কোথায়? অথচ দেশে মাদ্রাসার সংখ্যা বহু শত। কোন কোন মাদ্রাসার আকার অতি বিশাল এবং সেগুলির ছাত্রসংখ্যাও বহু হাজার।  মাদ্রাসার শিক্ষকগণ নবীজী (সা:)’র নানা সূন্নতের কথা বলেন। কিন্তু কোথায় তাদের জীবনে নবীজী (সা;)’র রাজনীতি ও জিহাদের সূন্নত? তারা কি জানেন না, নবীজী (সা:) ১০ বছর রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন? দুর্বৃত্ত শক্তির নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় তার জীবনে জিহাদ ছিল লাগাতর। জিহাদই ছিল তার রাজনীতি। অথচ মাদ্রাসার হুজুরগণ সাংবাদিক সন্মেলন ডেকে বলেন তারা রাজনীতিতে নাই। যেন রাজনীতি সূন্নত বিরোধী কোন হারাম কর্ম! বাংলাদেশ আজ দুর্বৃত্তদের দখলে। প্লাবন এসেছে গুম, খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণের। কিন্তু কোথায় তাদের জীবনে সে দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদ?

দুর্বৃত্তকে ঘৃনা করার সামর্থ্যটি একজন শিক্ষিত মানুষের অতি মৌলিক গুণ। সে কখনোই চোরডাকাত, ভোটডাকাত বা অন্য কোন দুর্বৃত্তকে সন্মান দেখায় না। এটি যেমন রুচি-বিরুদ্ধ, তেমনি ঈমান-বিরুদ্ধ। কুর’আনের ইলম শুধু চুরিডাকাতি, অন্যায়, সন্ত্রাস ও জুলুমকে ঘৃনা করতে শেখায় না, বরং দুর্বৃত্তদের নির্মূলে সৈনিক রূপে গড়ে তোলে।  নবীজী (সা:)’র আমলে তো সেটিই হয়েছে। কিন্তু মাদ্রাসার ছাত্রদের মাঝে সে সামর্থ্যই বা কতটুকু সৃষ্টি হয়েছে? মাদ্রাসার যারা শিক্ষক বা হুজুর তাদেরই বা সে সামর্থ্য কতটুকু? সে সামর্থ্য থাকলে হিফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কি শেখ হাসিনার মত একজন ভোটডাকাত দুর্বৃত্তকে মঞ্চে বসিয়ে মিটিয়ে করতেন বা তার সাথে হাত মেলাতেন? অথচ তারা শুধু হাসিনার সাথে হাতই মেলাননি, তার মত একজন খুনিকে কওমী জননীও বলেছেন। পত্রিকায় সে খবর ছাপা হয়েছে। শাপলা চত্ত্বরে হাসিনার নির্দেশে যে শত শত হিফাজত কর্মী শহীদ হলো –সেটিও তারা ভূল গেলেন? ২০১৩ সালের ৫ মে’র রাতে হিফাজতে ইসলামের কতজন কর্মী শহীদ হলো তাদের নামধাম ও ঠিকানা নেতারা কোনদিন প্রকাশ করলো না। এরূপ সত্য গোপন করা কি জায়েজ? বছর ঘুরে বার বার ৫ মে’র রক্তাত্ব দিনটি ফিরে আসে, কিন্তু সে দিনের শহীদদের স্মৃতি নিয়ে তেমন কোন স্মরণ সভাও করা হয়না। নিজেদের শহীদদের কি মানুষ এভাবে ভূলে? বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলি কি ছাত্রদের এগুলিই শিক্ষা দেয়? ১৮/০৬/২০২১  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *