বিবিধ ভাবনা (৪৩)

image_pdfimage_print

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. অভাব সভ্য রুচির

বাঘ এক বারে মাত্র একটা শিকার ধরে। সেটি হজম করার পর আরেকটি ধরে। সে রীতি স্বৈরাচারি শাসকদেরও। তারাও একটা একটা করে রাজনৈতিক শত্রুদের ঘাড় মটকায়। ফ্যাসিবাদী হাসিনা তার শিকার ধরার কাজটি কর্নেল ফারুক ও তাঁর সাথীদের দিয়ে শুরু করেছিল। জামায়াত, বিএনপি ও হেফাজতের নেতাকর্মীগণ তখন হাসিনার রাজনৈতিক শত্রু নির্মূলের সে নিষ্ঠুর তান্ডবটি নীরবে দেখছিল। এরপর আসে জামায়াত নেতাদের ফাঁসীতে চড়ানোর পালা। তখন বিএনপি ও হেফাজতে নেতাকর্মীগণ সেটিকেও নীরবে দেখেছে। হয়তো তারা ভেবেছিল জামায়াত তো তাদের লোক নয়। অতএব তাদের নির্মূলে ক্ষতি কি? তাছাড়া বিএনপি নেতৃত্বে রয়েছে ভাষানীপন্থী বামদের প্রভাব। এ বামেরা কোনকালেই জামায়াতের বন্ধু ছিল না। এরপর এলো বিএনপি এবং হিফাজতের নেতা-কর্মীদের গুম ও খুন করার পালা। দেশের জনগণ সেটিকে নীরবে দেখেছে; স্বৈরাচার তাড়াতে তারা কখনোই রাস্তায় নামেনি। এখন হামলা হচ্ছে জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের উপর। ডাকাতি হয়ে গেল জনগণের ভোট এবং কবরে গেল গণতন্ত্র। প্লাবন এসেছে গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের। দেশ এখন দুর্বৃত্তদের জন্য আপদমুক্ত। তারা যা চায়, এখন বিনা বাধায় তা করতে পারে।

নেকড়ে যেমন কারো বন্ধু নয়, তেমনি স্বৈরাচারি দুর্বৃত্ত শাসকগণও কারো বন্ধু নয়। তারা সবার শত্রু। তাই মহল্লায় নেকড়ে ঢুকলে বিভক্ত হলে চলে না। তখন ঐক্যবদ্ধ ভাবে নেকড়ে বধ করতে হয়। স্বৈরাচারি শাসকগণ হিংস্র পশুর চেয়েও বেশী হিংস্র। পশু গণহত্য বা গণধর্ষণ করে না। কিন্তু মানবরূপী পশুগণ করে। তাই স্বৈরাচারি শাসক তাড়াতে সভ্য জনগণকে একতাবদ্ধ হতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতাটি বিশাল। ঘরবাড়ী থেকে আবর্জনা সরানোর জন্য সভ্য রুচি লাগে। তেমনি রুচি লাগে দুর্বৃত্তের শাসন থেকে মুক্ত হয়ে সভ্য দেশ গড়তে। বাংলাদেশীদের ব্যর্থতা এখানেই। সভ্য রুচি থাকলে তারা কি কখনো গণতন্ত্রের শত্রু বাকশালী মুজিবকে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা বলতো?  

২. তান্ডব গুন্ডা রাজত্বের

আল জাজিরা ডক্যুমেন্টারীতে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের ভাই খুনি হারিসকে বলতে শুনা গেল, “পুলিশই তো বড় গুন্ডা। পুলিশ থাকতে কি গুন্ডা লাগে?” ২৬ মার্চে মোদীর ঢাকায় আগমনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ মিছিল হয়। ব্রাহ্মনবাড়িয়া ও হাটহাজারীতে মিছিলের উপর বাংলাদেশের পুলিশ গুলী করে ২১ জনকে হত্যা করে। এভাবে প্রমান করে, খুনি হারিস পুলিশের চরিত্র নিয়ে যা বলেছে তা কতটা বাস্তব। বরং পুলিশ যে গুন্ডাদের চেয়েও বেশী গুন্ডা –সেটিও তারা প্রমাণ করেছে। তাদের কারণেই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নিরেট গুন্ডারাজত্ব। এবং গুন্ডারাজত্বে যা অসম্ভব হয় -তা হলো সভ্য ভাবে জীবন-যাপন। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনগণ রাজস্ব দেয় পুলিশবেশী নৃশংস গুন্ডা প্রতিপালনে।

৩. নিকৃষ্টতর পশুর চেয়েও

গরু-ছাগলের পানাহার হলেই চলে। পানাহার পেলে গলায় দড়ি নিয়ে বাঁচতে তাদের অসুবিধা হয়না। তখন দড়ি ছিঁড়তে্ তারা চেষ্টাও করেনা। অথচ সভ্য মানুষের পরিচয় তো এটাই, তারা শুধু পানাহার নিয়ে ভাবে না, ভোটের অধিকার ও স্বাধীন ভাবে কথা বলা ও লেখালেখির অধিকারও চায়। তবে মানুষ যখন গরুছাগলের পর্যায়ে পৌঁছে, তারাও তখন স্রেফ পানাহার নিয়ে ভাবে। গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকার নিয়ে তারা ভাবে না। এরূপ মানুষেরা গণতন্ত্র উদ্ধারে কখনো রাস্তায় নামে না। গরুছাগলের সংখ্যাবৃদ্ধিতে যেমন স্বৈরচারি শাসক বিপদে পড়ে না, তেমনি বিপদে পড়ে না এরূপ পশুচরিত্রের মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধিতে। বাংলাদেশে তাই জনসংখ্যা বাড়লে কি হবে, দুর্বৃত্তদের শাসন তাতে নির্মূল হয়নি। এবং বাড়েনি মানবিক অধিকার ও গণতন্ত্রচর্চা।

মানুষ গরুছাগলের স্তরে পৌঁ‌ছে চেতনাশূণ্যতার কারণে। স্বৈরাচারি শাসকদের মূল কাজ তাই জনগণের চেতনার আগ্রাসন করা। চেতনার ভূমি বিধ্বস্ত হলে জনগণ পরিনত হয় গরুছাগল বা তার চেয়েও নিকৃষ্ট জীবে। বাংলাদেশে চেতনা বিনাশের সে কাজটি এতই সফল ভাবে হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষক, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বহু বিচারপতি, সেনাবাহিনীর বহু জেনারেল এবং বহু বুদ্ধিজীবী ২০১৮ সালের ভোটডাকাতির নির্বাচনকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলে। গরুছাগলও কখনো এভাবে দুর্বৃত্তদের পক্ষ নেয় না। পবিত্র কোর’আনে এ ধরণের মানুষদেরকে গরুছাগলের চেয়েও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে। তাদের চরিত্র নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ভাষ্যটি হলো: “উলায়িকা কা’আল আনয়াম, বালহুম আদাল।” অর্থ: “তারাই হলো গবাদী পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট।” মহান আল্লাহতায়ালার এ কোর’আনী বানী যে কতটা নির্ভূল –তারই নিখুঁত প্রদর্শনী হচ্ছে বাংলাদেশে। মানুষরূপী এ পশুগুলো বনজঙ্গলে বাস করে না। বরং বাস করে জনপদে। তাদের অবস্থান শুধু সংসদে নয়, বরং দেশের আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তি ও প্রশাসনে। বাংলাদেশ তো এদের হাতেই অধিকৃত। পশুগণ কখনোই গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকার কেড়ে নেয় না, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানবরূপী এ পশুগণ।  

৪. সবচেয়ে বড় অপরাধী হলো সরকার

সভ্য দেশে আইন বানানো হয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য। সভ্য সরকারের কাজ শুধ জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের সুরক্ষা দেয়া নয়, বরং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতিরক্ষা দেয়াও। আর অসভ্য দেশে আইন বানানো হয় সে অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য। অথচ কেড়ে নেয়ার সে কাজই বেশী বেশী হচ্ছে বাংলাদেশে। তাই জনগণের অধিকার নাই স্বাধীন ভাবে কথা বলা, লেখালেখি ও মিটিং-মিছিলের। সে অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য ডিজিটাল আইন বানানো হয়েছে।

অথচ অপরাধ শুধু মানুষের প্রাণ ও অর্থ কেড়ে নেয়া নয়, অপরাধ হলো স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়াও। এদিক দিয়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে অপরাধী চক্রটি চোর-ডাকাতদের দলগুলি নয়; বরং সেটি হলো দেশের সরকার। হাসিনা সরকার এ কাজে মাঠে নামিয়েছে তার দলীয় গুন্ডা বাহিনীকে। এদের হাতেই নৃশংস ভাবে লাশ হতে হলো আবরার ফাহাদকে। কোন সভ্য দেশে কি এমনটি ঘটে? স্বৈর শাসকগণ একটি দেশে যে কীরূপ অসভ্য শাসন প্রতিষ্ঠা দিতে পারে –বাংলাদেশ হলো তারই নজির।

৫. সংকট অপূর্ণাঙ্গ মুসলিম হওয়ায়

মুসলিম জীবনে ইবাদতের পরিধিটি বিশাল। তাকে শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত পালন করলে চলে না। এরূপ ইবাদতের লক্ষ্য হলো, ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি আনা। কিন্তু মুসলিমকে বাঁচতে হয় এর চেয়ে বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রেখে। সেটি হলো সমাজ ও রাষ্ট্র্রের বুকে পরিশুদ্ধি আনা। সভ্যতর সমাজ ও সভ্যতার নির্মাণের কাজ তো একমাত্র তখনই সম্ভব হয়। এবং ইসলাম একমাত্র তখনই বিজয়ী হয়। সে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মুসলিম জীবনে অনিবায় হয় জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। তখন ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ, অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, শরিয়তের প্রয়োগ ও ঐক্যগড়া ইত্যাদি বহু ফরজ কাজ তার জীবনের মিশনে পরিণত হয়। এরূপ কাজে না নামলে পূর্ণ মুসলিম হওয়া যায় না। দেশে পূর্ণ মুসলিম না বাড়লে বিজয়ী হয় শয়তান।

মুসলিমদের আজকের বড় সমস্যাটি হলো তাদের ধর্মকর্ম ও ইবাদত স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে সীমিত হয়ে গেছে। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র দখলে গেছে শয়তানী শক্তির হাতে। অথচ রাষ্ট্র ও সমাজ শয়তানী শক্তির দখলে গেলে ব্যক্তিও নিরাপদ থাকে না। রাষ্ট্র যে স্রোতে ভাসে ব্যক্তিকেও তখন সে স্রোতে ব্যক্তিকেও ভাসতে হয়।

৬. বাঙালীর বেওকুপি

শিকার ধরাই বাঘের স্বভাব। বাঘকে কখনোই পোষ মানানো যায় না, তার সাথে দোস্তিও চলে না। তেমনি স্বভাব হলো ভারতের ন্যায় আগ্রাসী দেশগুলোর। তাই শুধু বাঘ-ভালুকের ন্যায় হিংস্র পশুগুলিকে চিনলে চলে না, দানবের ন্যায় দেশগুলোকেও চিনতে হয়। বাঘকে ভেড়া মনে করে যারা গলা জড়িয়ে ধরে -তারাই বাঘের পেটে যায়। এরূপ বেওকুপের সংখ্যা বাংলাদেশে

অতি বিশাল। এদের হাতেই বাংলাদেশে রাজনীতি্ ও বুদ্ধিবৃত্তি। এরাই ১৯৭১’য়ে ভারতের গলা জড়িয়ে ধরেছিল। ভারতী সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে এনেছিল এবং ভারতীয় বাহিনীকে বিজয়ী করেছিল। ভারতের পেটে ঢুকার পর এরাই এখন ভারতকে গালি দেয়। ১৪/০৪/২০২১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *