বিবিধ ভাবনা (৩০)

image_pdfimage_print

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. পশু জীবন ও মানব জীবন

মানব সন্তানদের শুধু পানাহারে বাঁচলে চলে না, বাঁচতে হয় নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে। নইলে সভ্য সমাজ নির্মিত হয় না। সে দায়বদ্ধতা নিয়ে গৃহ থেকে শুধু আবর্জনা সরালে চলে না, রাষ্ট্র থেকে দুর্বৃত্তদেরও সরাতে নয়। নইলে দেশ তখন দুর্বৃত্তদের দখলে যায় এবং বাসের অযোগ্য হয়। দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় স্বৈরচারি জালেম শাসকের বিজয় দেখে তাই নিশ্চিত বলা যায়, সে কাজটি জনগণের দ্বারা যথার্থ ভাবে হয়নি। অর্থাৎ জনগণ পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালনে।

দেশে জালেমের জুলুম চলতে দেখেও যারা নিরব থাকে -তারা হয় স্বভাবে গরুছাগল অথবা নিজেরাই জড়িত জুলুমের সাথে। জুলুম দেখে কোন বিবেকমান মানুষই নিরব থাকতে পারে না। জালেমের হাতে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও সন্ত্রাস দেখে নিরব থাকা গরুছাগলের স্বভাব। কারণ, ঘাস খাওয়া ছাড়া তাদের জীবনে উচ্চতর কোন লক্ষ্য থাকে না। এবং যে দেশে জনগণ গরুছাগলের স্বভাব পায়, সে দেশে শেখ হাসিনার ন্যায় দুর্বৃত্তগণ চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতটি, গুম, খুন ও নৃশংস বর্বরতা চালিয়ে যাওয়ার অবাধ সুযোগ পায়। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে এমন চিন্তাশূণ্য ও দায়িত্বশূণ্য মানুষদের গরু-ছাগল বলেননি, তার চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন।   

২. যুদ্ধের পথ ও গাদ্দারীর পথ

সভ্য ভাবে বাঁচার খরচটি বিশাল। পানাহারের আয়োজন পশুপাখিও করে। কিন্তু সভ্য ভাবে বাঁচতে হলে আমৃত্যু যুদ্ধ করতে হয়। কারণ, জনপদে যেমন হিংস্র পশু থাকে, তেমনি মানবরূপী নৃশংস দুর্বৃত্তও থাকে। শান্তিতে বাঁচার জন্য যুদ্ধ তো উভয়ের বিরুদ্ধেও। সভ্য সমাজ তো তারাই নির্মাণ করে -যাদের জীবনে সে যুদ্ধটি লাগাতর থাকে । মানব জীবনে এর চেয়ে মহান কোন কাজ নাই। ইসলামে এ যুদ্ধকেই পবিত্র জিহাদ বলা হয়।

বাংলাদেশ এখন দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে হাসিনার নেতৃত্বে দুর্বৃত্ত পক্ষ। তাদের হাতেই দেশ আজ অধিকৃত। আরেক দিকে দেশের মজলুম জনগণ। মাঝে কোন তৃতীয় পক্ষ নাই। যারা দেশ থেকে দুর্বৃত্তির নির্মূল চায় চায়, তাদের সামনে যুদ্ধের এখনই সময়। এ যুদ্ধ সভ্য ভাবে বাঁচার। তাই সভ্য মানুষের জীবনে এমন যুদ্ধ অনিবার্য। এ যুদ্ধ থেকে নিজেকে দূরে রাখার অর্থ, দুর্বৃত্তকে তার জুলুম চালিয়ে যেতে  সহায়তা দেয়া। তাতে গাদ্দারী হয় মজলুল জনগণের সাথে।

৩. বাঙালীগণ কি শুধু ফেলই করতে থাকবে?

মহান আল্লাহতায়ালা বাংলাদেশীদের সামনে শেখ হাসিনা ও তার সহচর শয়তানদের চরিত্রকে শতভাগ উম্মোচিত করে দিয়েছেন। বাংলাদেশীদের সামনে এখন তাই ঈমানের বিশাল পরীক্ষা। তারা কি শয়তানদের দলে ভিড়ে নিজেরাও শয়তানে পরিণত হবে, না তাদের নির্মূল করবে? ফিরাউনদের ন্যায় দুর্বৃত্তদের রাজা বানিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা তো এভাবেই ঈমানের পরীক্ষা নেয়। মিশরের লোকজন সে পরীক্ষায় ফেল করেছিল। তারা ফিরাউনের দলেই শুধু ভিড়েনি, তার মত দুর্বৃত্তকে তারা ভগবান বলেছে। শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে সাগরে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ঈমানের পরীক্ষা শুধু রোগ-ভোগ ও বিপদ-আপদ দিয়ে হয় না, জালেম শাসককে দিয়েও হয়। জালেম শাসকের নৃশংস জুলুমের যাঁতাকলে পড়ে ঈমানের পরীক্ষায় পাশ করা খুবই কঠিন। হযরত ইব্রাহীম (আ:) সেটি বুঝতেন। তাই তিনি সেরূপ পরীক্ষা থেকে বাঁচার জন্য দোয়া করেছেন; এবং সে দোয়া লিপিবদ্ধ হয়েছে পবিত্র কোর’আনের সুরা মুমতেহানায়। মহান আল্লাহতায়ালা অতীতে বাংলাদেশীদের থেকে ঈমানের সে পরীক্ষাটি নিয়েছেন শেখ মুজিবের ন্যায় ইসলামবিরোধী, গণতন্ত্র হত্যাকারী, বাকশালী স্বৈরাচারী, মানবহত্যাকারী ও ভারতীয় কাফেরদের একনিষ্ঠ এক দালালের নৃশংস শাসন চাপিয়ে। সে পরীক্ষায় বাংলাদেশীগণ দারুন ভাবে ফেল করেছে। সেটি মুজিবের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে বরং তাকে সন্মানিত করে।

মহান আল্লাহতায়ালাকে একমাত্র উপাস্য বলার জন্য প্রচুর নৈতিক সামর্থ্য লাগে। লাগে সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা রূপে চেনা ও গ্রহণ করার সামর্থ্য। একমাত্র এমন ব্যক্তিগণই পরীক্ষায় পাশ করে। অপর দিকে শূণ্য নম্বর পেয়ে ফেলে করে সে ব্যক্তি যে ব্যক্তি মুর্তি, শাপ-শকুন, গরু-ছাগল ইত্যাদিকে ভগবান বলে এবং দুর্বৃত্তদেরকে জাতির পিতা ও বন্ধু বলে। ঈমানের এরূপ পরীক্ষায় ফেলের শাস্তি ভয়ানক। মুজিবভক্ত বাঙালীরা সে শাস্তি পেয়েছেও প্রচুর। শাস্তি স্বরূপ এসেছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। তখন মারা গেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ, অনাহারে অনেকে বুমি খেয়েছে। নারীরা কাপড়ের অভাবে জাল পড়েছে। ৩০ হাজারের বেশী মানুষ লাশ হয়েছে। বিশ্বের দরবারে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির খেতাব পেয়ে সবার চোখে অপমানিত হয়েছে। এবং দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে। বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসে কোন কালেও কি এরূপ অপমান জুটেছে? বিশ্বের প্রায় ২০০টি রাষ্ট্রের আরো কোন রাষ্ট্র কি এতটা নীচে নেমেছে?

মহান আল্লাহতায়ালা আবার পরিক্ষা নিচ্ছেন ভোটচোর দুর্বৃত্ত হাসিনার শাসন চাপিয়ে। যারা এক দুর্বৃত্ত চোরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও নেত্রী রূপে মাথায় তোলে -তাদেরকে কি মহান আল্লাহতায়ালা কখনো ইজ্জত ও শান্তি দেন? বাঙালীগণ কি এভাবে শুধু ফেলই করবে এবং শাস্তি পেতে থাকবে?

৪.ডাকাতের কদর

এক ডাকাত আরেক ডাকাতকে কদর করে। নইলে ডাকাতী করা যায় না। কারণ, ডাকাতি তো একাকী করার কাজ নয়; সে জন্য দল লাগে। তাই সেনা প্রধান জেনারেল আজিজের কদর শেখ হাসিনা ষোল আনা বুঝে। এটাই ডাকাত দলের সংস্কৃতি -যা এখন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
ডাকাত দলে সেই তো বেশী কদর পায় যে সবচেয়ে বড় ডাকাত।

বাংলাদেশে চোর-ডাকাত কম নেই। কিন্তু জেনারেল আজিজের ন্যায় বড় ডাকাত শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা দুনিয়াতে আছে কি? তার ডাকাতির নমুনা, ভোটডাকাতির মাধ্যমে ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশই ডাকাতি করে সে হাসিনার হাতে তুলে দিয়েছে। সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় ডাকাতি। বিশ্বের বহুদেশই বহু স্বৈরাচারি শাসকদের হাতে অধিকৃত হয়েছে; কিন্তু কোন দেশেই জনগণের ভোটের উপর এরূপ ডাকাতি কখনো হয়নি। আল-জাজিরার ডকুমেন্টারী তাই ডাকাত হাসিনার কাছে আজিজ ডাকাতের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই খবর বেড়িয়েছে, হাসিনাকে তাকে আরো উচ্চ পোষ্টে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

৫. বাঙালী চরিত্রের কদর্যতা ও ব্যর্থতা
মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত হলো, যেমন জাতি তেমন নেতা দেয়া। তাই কাফেরদের নেতা কাফের হয়। এবং মুনাফিকদের নেতা মুনাফিক হয়। ভাল নেতা পেতে হলে তাই জনগণকে নিজেদের চরিত্র বদলাতে হয়। হাসিনা যেভাবে দেশজুড়ে ভোটডাকাতি করলো -সেটি কি কোন সভ্য দেশে ভাবা যায়? সমগ্র দেশ জুড়ে ডাকাতি করতে হলে ঘরে ঘরে প্রতিবাদি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে হয়। তখন প্রয়োজন পড়ে লক্ষ লক্ষ ডাকাত নিয়ে বিশাল ডাকাত বাহিনী। শেখ হাসিনা সফল হয়েছে তেমন একটি বিশাল ডাকাত বাহিনী গড়ে তুলতে।

এরূপ একটি বিশাল ডাকাত বাহিনী কখনোই কোন জঙ্গলে গড়া যায় না। বিশ্বের অন্য কোন দেশেও গড়া যায়না। কিন্তু সেটি সহজেই গড়া যায় বাংলাদেশে। শেখ হাসিনা সেটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এবং সে ডাকাত বাহিনীটি গড়া হয়েছে গ্রামের নিরক্ষর মানুষদের নিয়ে নয়, বরং সেনাবাহিনী, প্রশাসনিক বাহিনী ও আদালত বাহিনীর তথাকথিত শিক্ষিত লোকদের নিয়ে। এভাবেই প্রকাশ পেল বাঙালী চরিত্রের কদর্যতা।

রবীন্দ্রনাথ যখন বলেছিলেন, হে বিধাতা, ৭ কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি, -তখন বাঙালীর চরিত্র এতো খারাপ ছিল না। রবীন্দ্রনাথ এখন বেঁচে থাকলে বাঙালীর মানুষ হওয়ার বর্তমান ব্যর্থতা নিয়ে কি বলতেন -তা রীতিমত ভাবনার বিষয়। এমন চারিত্রিক কদর্যতা ও ব্যর্থতা নিয়ে কি মাথার উপর থেকে ডাকাত নামানো যায়?

৬. যে কর্ম জাহান্নামে নেয়

মানুষ উদ্ভিদ নয়। সবার জীবনেই কর্ম, রাজনীতি ও লড়াই আছে। তবে কর্মের খাতিরে কর্ম, রাজনীতির খাতিরে রাজনীতি এবং লড়াইয়ের খাতিরে লড়াইয়ে কোন কল্যাণ নাই। একমাত্র সে প্রচেষ্ঠাগুলিই মানুষকে কল্যাণ দেয় -যা করা হয় একমাত্র মহান আল্লাহতায়াকে খুশি করতে। এবং বিজয় বাড়ায় ইসলামের। একমাত্র সেগুলিই হলো ইবাদত। এজন্যই প্রতি কর্মের আগে ভাবতে হয়, সে কর্মে মহান আল্লাহতায়ালা আদৌ খুশি হবেন কী? এটিই হলো ঈমানদারের তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি। এমন একটি ভাবনাই মানুষকে পাপ ও দুর্বৃত্তি থেকে দূরে রাখে। এজন্যই নিয়েত শুধু নামায-রোযায় বাঁধলে চলে না, প্রতিটি কর্মেও থাকতে হয়। তেমন একটি ভাবনার কারণেই ব্যক্তির প্রতি মুহুর্তের ভাবনা ও কর্ম নেক আমলে পরিণত হয় -যা তাকে জান্নাতে নেয়। কিন্তু যে কর্ম, রাজনীতি ও লড়াই ইসলামের শত্রুর বিজয় দেয় –তা ব্যক্তিকে জাহান্নামে নেয়। বাংলাদেশে এমন ভাবনাশূণ্য কর্মের সংখ্যা বিশাল। ফলে বিজয়ী হচ্ছে শয়তানী শক্তি এবং পরাজিত হয়েছে ইসলাম।

 

৭. নিজের বিনিয়োগ কতটুকু?
সুন্দর, সভ্য ও শান্তিময় বাংলাদেশ কামনা করে –এমন লোকের সংখ্যা বাংলাদেশে অসংখ্য। কিন্তু এমন একটি বাংলাদেশ তো আকাশ থেকে পড়ার নয়। দেশবাসীকে সেটি নিজ হাতে নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু তেমন একটি সুন্দর বাংলাদেশ নির্মাণে নিজের বিনিয়োগ কতটুকু –তা নিয়ে ক’জন ভাবে? তাই বাংলাদেশের আজ যে নিদারুন ব্যর্থতা -তার জন্য কে অন্যদের দায়ী করা যায়? ব্যর্থতার দায়ভারও যে দেশবাসীর –সে হুশ ক’জনের?

৮. জ্ঞানের উৎপাদন

মানুষ যা খায় -তা দেখা যায় দৈহিক স্বাস্থ্যে। তেমনি যা পাঠ করে –সেটি দেখা যায় তার চরিত্র ও চেতনায়। দেশবাসীর দেহের স্বাস্হ্য বাড়াতে হলে তাই খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে হয়। তেমনি মনের স্বাস্থ্য বাড়াতে হলে বইয়ের তথা জ্ঞানের উৎপাদন বাড়াতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি হচ্ছে না। ফলে মানুষ বাঁচছে মনের প্রচণ্ড অসুস্থ্যতা নিয়ে। দেশে দুবৃত্তির যে প্লাবন -সেটি তো নৈতিক অসুস্থ্যতারই লক্ষণ।

ইংল্যান্ডের জনসংখ্যা সাড়ে ৬ কোটি। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। কিন্তু ইংল্যান্ডে যে পরিমাণ বই প্রকাশিত হয় তা বাংলাদেশে প্রকাশিত সকল বইয়ের বহুশত গুণ বেশী। বহু বছর আগের UNDP য়ের একটি রিপোর্ট বলা হয়: এক কোটি মানুষের দেশ গ্রীসে যে পরিমাণ বই ছাপা হয় -তা তিরিশ কোটি মানুষের ২২টি আরব দেশে ছাপা হয় না। আরবদের চেতনা, চরিত্র ও মানবিক মানদন্ডে পিছিয়ে থাকার কারণ তাদের সম্পদের কমতি নয়, সেটি জ্ঞানের কমতি।

ইসলাম যখন বিশ্বের সুপার পাওয়ার রূপে প্রতিষ্ঠা পায় -তখন তার মূলে সম্পদ বা জনশক্তি ছিল না। সেটি ছিল জ্ঞান। পবিত্র কোর’আনের আগে আরবী ভাষায় কোন বই ছিল না। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা জ্ঞানার্জনকে ফরজ করে। তখন জ্ঞানের উৎপাদনে সৃষ্টি হয় বিস্ময়কর রেকর্ড। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই আরবী ভাষা পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভাষায়। আজও কি মুসলিমদের সামনে ভিন্ন পথ আছে? ২৬/০২/২০২১। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *