একাত্তরের গণহত্যা (৫)

image_pdfimage_print

 যে কাহিনী শুনতে নেই (০১)

 সংগ্রহে: কায় কাউস

================

০১.

“… সুধীর, জানা আছে, নতুন মানুষজনের সঙ্গে আলাপিত হতে ভালবাসে, ভালবাসে পুরানো মানুষদের সঙ্গ-সাক্ষাৎ। তার কোনো তাড়া নেই। ছোটো রাস্তাকে কী করে প্রলম্বিত করা যায়, সেটাই তার লক্ষ্য। খুলনা শহর খুব ছোটো নয়। রিকশায় যেতে যেতে কত গল্পই না সে করে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালীন প্রতিশােধমূলক গণহত্যার খবর, মুক্তিযোদ্ধা নামধারী অনেক সশস্ত্র মানুষের যুদ্ধ এবং পরবর্তীকালীন কার্যকলাপ, অনেক কিছুর খবরই তার ঝোলায় মজুত। সেসব কথা নিরপেক্ষভাবে কোনো লেখক গবেষকের বই পুস্তকে দুর্লভ।

সুধীর সারা দেশ ঘুরে বেড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের আগেও সে পথে প্রান্তরে এ জেলা সে জেলা করত। এখন সে সেইসব অজানা কাহিনি, কথা বলে যাচ্ছে, অবশ্য অন্য লোকের কান বাঁচিয়ে। খুলনার খালিসপুরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা তার কাছেই সবিস্তারে শুনলাম। আগে আরাে একজন একদিন সে কাহিনির আভাস আমাকে দিয়েছিলেন। তিনি একজন সরকারি আমলা। তাঁর নামটা সঙ্গত কারণেই উল্লেখ করা যায় না, যেহেতু স্বপদে না থাকলেও এখনো তিনি জীবিত এবং এদেশে ওদেশে ব্যাপকভাবে পরিচিত। সুধীরের নামটাও সে কারণে পালটেই রেখেছি।

দুজনেই বলেছিল, মুক্তিযুদ্ধ মিটে যাবার পর দেশ স্বাধীন হলে এরকম হত্যাকাণ্ডের কী কিছু প্রয়োজন ছিল? খালিসপুরে নাকি দশ হাজার অবাঙালি বিহারী মুসলমান, নারী, শিশু, বৃদ্ধ, যুবা নির্বিশেষে গণহত্যার বলি হয়েছিল। সরকারি আমলাটি আমার অত্যন্ত এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বন্ধু ছিলেন। তিনি একটা বিশাল হাড় কঙ্কালের স্থূপ আমাকে দেখিয়ে বলেছিলেন, ভাই, হাড় দেখে কিন্তু বাঙালি অবাঙালি বোঝা যায় না। খান সেনা, রাজাকার, আলবদরেরা জঘন্যতম কাজ করেছিল। তারা পাকিস্তানের সহযােগী হয়ে ধ্বংসকাণ্ড চালিয়েছিল তাতে ভুল নেই। কিন্তু কিছু মুক্তিযাদ্ধা? মুক্তিযোদ্ধা বা স্বাধীনতা সংগ্রামী অর্থ কী? তারাও কী ঘাতক, ধর্ষক অথবা সুযোগ সন্ধানী হবে, খান সেনা অথবা তাদের সহযাগীদের মতো? তাহলে আমরা কাকে ঘৃণা করব অথবা ভালোই বা বাসব কাকে? কথাগুলো আমার অবশ্যই সুমানবিক মনে হয়েছিল। শুধু মানবিক বলছি না এ কারণে যে হত্যা এবং ভালোবাসা উভয়ই তঁ মানবিক কর্ম।

 

সুধীর বলেছিল, যারা দেশকে পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য হাতে অস্ত্র নিয়েছিল তারা মধ্যবিত্ত, সাধারণ গৃহস্থদের কিশোর কিশোরীদের যখন দলভুক্ত করে তখন এবং যুদ্ধ পরবর্তীকালে কিছুমাত্র কম যৌন অপরাধ, খুন এবং লুঠতরাজ করেনি। এদের মধ্যের একটা ব্যাপক সংখ্যক মানুষের পরিচয় খুব গৌরবজনক যে ছিল না, যুদ্ধ পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী এক বছরের মধ্যে তার ব্যাপক প্রমাণ আমি খুব ভালোভাবে জেনেছি। এখনো জানছি। কিন্তু এসব কথা নিয়ে কোনো বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশে বা এদেশে যে তেমন নিরপেক্ষ কোনাে লিখিত তথ্য হাজির করেছেন, এমন খবর আমার কাছে নেই।

এমনকী ১৯৭০-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হবার পর আদমজী জুটমিলে যে ব্যাপক অবাঙালি মুসলমানদের কেটে বুড়িগঙ্গায় ভাসানাে হয়েছিল, সে কথাও ওখানকার অনেকেই জানতেন এবং জানেন। তখন তো মিলিটারি হামলা শুরুই হয়নি। সেইসময় হিলিবর্ডার দিয়ে অজস্র অবাঙালি উদ্বাস্তু যখন ভারত ভূখণ্ডে ঢোকার চেষ্টা করছিল, তখন তাদের এদিকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তারা বিজয়ী রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে তাড়া খেয়ে এদিকে আসছিল আবার এদিক থেকে তাড়া খেয়ে যাচ্ছিল ওদিকে। এরা সব বিহারী মুসলমান, যারা দাঙ্গায় অথবা স্বেচ্ছায় ওদেশে থিতু হয়েছিল বা হতে সচেষ্ট ছিল। একথা সত্য, তাদের একটা বড় অংশই বাঙালি বিদ্বেষী ছিল এবং দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের সিংহ ভাগই পশ্চিম পাকিস্তানিদের মতো তাদের কুক্ষিগত ছিল। কিন্তু এটাই বিরােধের অথবা খুনোখুনির একমাত্র কারণ ছিল না। তবে এসব নিয়ে ব্যাপক বিশ্লেষণের স্থান এ আলেখ্য নয়, নিরাপদও নয়। 

উপমহাদেশের তাবৎ রাজনীতিবিদেরাই এ ব্যাপারে সমানভাবে দোষী। যেদিন এসব কথা নিয়ে নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনা সম্ভব হবে তখন অনেক তথ্য তত্ত্বই পালটে যাবে। আপাতত এ আলোচনা বন্ধ করি শুধু একটি কথা বলে, যে, আবেগের দিক দিয়ে ঘটনাটি যত গাঢ় ছিল, কোনো আদর্শের বিচারে তার মাহাত্ম্য সর্বজনের মধ্যে যে ততটা ছিল, এমন বলা মুশকিল। অধুনাকার পরিবস্থা দেখে তার যাথার্থ বােঝা আদৌ কষ্টকর নয়। তবে এ কথাটিও বলি যে এই আলােচনার দ্বারা আমি মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করতে চাইছি না। এটা মুক্তিযুদ্ধের পেছন দিক॥”

— মিহির সেনগুপ্ত / ধানসিদ্ধির পরণকথা ॥ [ দে’জ পাবলিশিং (কলকাতা) – জানুয়ারি, ২০০৮ । পৃ: ২১-২৩ ]

০২.

“… যতদূর মনে পড়ে, ২৭ মার্চ বেলা দুটা নাগাদ আমাদের গেটের বিহারি দারোয়ানরা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লো। তারা আর ডিউটি করতে পারলো না। তারা প্রথমে কয়েকজন অবাঙালি ম্যানেজারের বাসায় গিয়ে আশ্রয় চেয়েছিলো। অবাঙালি ম্যানেজাররা তাদেরকে আমার বাসায় পাঠিয়ে দেন। আমি তাদের ফেরাতে পারলাম না। তাদেরকে আমার বাসায় আশ্রয় দিলাম। সন্ধ্যা নাগাদ আরও সাত-আটজন বিহারি দারোয়ান আমার বাসায় আশ্রয় নেয়। আমি তাদেরকে স্টোররুম, কিচেন এবং ডাইনিংরুম ছেড়ে দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেই। আমি আধঘন্টা পরপর গিয়ে ওদের খোঁজখবর নিতাম। এরা শুধু পানি খেতে চাইতো। বিসমিল্লাহ নামের এক বিহারি দারোয়ান আমার বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলো। আমার খুব প্রিয় দারোয়ান। আমার অনেক বিপদ-আপদে সে সব সময় আমার পাশে থেকেছে। কখনও আমাকে বিপদের মধ্যে ফেলে চলে যায়নি। আমার স্পষ্ট মনে আছে; ওইদিন সন্ধ্যায় একবার বিসমিল্লাহ দারোয়ান তার দুই হাত দিয়ে আমার মুখটা জড়িয়ে ধরে খুব করুণভাবে জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘স্যার , হাম বাঁচে গা তো?’ রাত দুটা পর্যন্ত এদের খবর নিয়েছিলাম। তারপর আর পারিনি। পরদিন ভোরবেলায় এদের খোঁজ নিতে গিয়ে আর এদেরকে পাইনি। জানি না এদের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো। হয়তো এরা পালিয়ে গিয়েছিলো, নয়তো অজ্ঞাতনামা সেই হত্যাকারীদের হাতে এদেরকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিলো।     

… উনত্রিশ মার্চ ভোরবেলায় যখন আমার ফ্ল্যাটে ঢুকি, তখন বারান্দায় দশ-বারোজন লোককে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখেছিলাম। এরা সবাই বিহারি। লেবার কলোনি থেকে কোনরকমে বেঁচে রাতের অন্ধকারে কীভাবে যেন অফিসার্স কলোনিতে ঢুকে পড়েছে। মনে হয়, এদের মধ্যে দুই জন পুরুষ, দুই জন মহিলা এবং বাকিরা এদের ছেলেমেয়ে। এদের চোখের চাহনি আজও ভুলতে পারিনি। বেঁচে থাকার জন্যে, একটু আশ্রয়ের জন্যে করুণ চাহনি। হত্যাকারীরা রাইফেল নিয়ে তখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাড়াতাড়ি বিহারি লোকগুলোকে নিয়ে আমার বাসার পেছনের কিচেন গার্ডেনে গেলাম। টমেটো গাছের জন্যে মাচা করেছিলাম। সেই মাচার নিচে এদেরকে লুকিয়ে রাখলাম। মনে আছে ঘন্টা দুই পরে গিয়ে এদেরকে আর পাইনি। আজও জানি না এদের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো।

উনত্রিশ মার্চ সকালে খবর নিয়ে জানলাম যে, বাঙালি ম্যানেজাররা ও তাদের পরিবারবর্গ সবাই নিরাপদে আছেন। রাতেরবেলায় তাদের কারও কোন ক্ষতি হয়নি। সকাল নয়টার দিকে জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি লুকিয়ে ছিলেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বাসায়। আমার কথা শুনে বেরিয়ে এলেন। সারা রাত ঘুমাননি। চোখ লাল। বললাম, ‘আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়। লেবার কলোনি জনমানবশুন্য। বিহারি সব শেষ। বাঙালিরা নদী পার হয়ে পালিয়েছে। শুধু অফিসাররাই আছি। যে কোন মুহুর্তে আর্মি এসে যেতে পারে। আর্মি এলে আমাদেরকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করবে। চলুন নদী পার হয়ে গ্রামে চলে যাই।’ জেনারেল ম্যানেজার সাহেব বললেন, ‘গ্রামে গেলে গ্রামের লোকেরা আমাদের (অবাঙালিদেরকে) হত্যা করবে। অতএব গ্রামে যাওয়া সমীচীন নয়। তোমরা সবাই এখানে থাকো, যদি আর্মি আসে তবে তাদের হাত থেকে আমি তোমাদেরকে বাঁচাবো।’ ‘না’ বলতে পারলাম না। কথা দিলাম থাকবো। বাইরে চলে এলাম॥”    

— কাজী আনোয়ারুল ইসলাম / আমার একাত্তর ॥ [ অবসর – ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮ । পৃ: ৫৪-৫৫ ]

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *