শেখ মুজিবের সাথে কিছুক্ষণের স্মৃতি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ। পরন্ত বিকেলে কয়েক জন বন্ধুর সাথে ঢাকার ইসলামপুর রোডে ফুটপাথে হাঁটছি। দোকানে দোকানে তখন কেনাকাটার ভীড়। এমন সময় পিছন থেকে হঠাৎ আমার নাম ধরে ডাকার আওয়াজ। আমি এসেছি মফস্বলের গ্রাম থেকে। ঢাকায় বন্ধু-বান্ধব তেমন নেই। ফলে রাস্তার ফুটপাথে আমাকে কেউ এভাবে ডাকবেন সেটি ছিল অভাবিত। বিস্ময়ে চোখ ফিরালাম। দেখি আমাদের এলাকার অতি পরিচিত ডাক্তার। তিনি আমাদের পারিবারীক চিকিৎস্যকও। বেশ অমায়ীক মানুষ। তখন এমবিবিএস ও এল এম এফের পাশাপাশী ন্যাশন্যাল পাশ ডাক্তারও গ্রাম এলাকায় দেখা যেত। তিনি ছিলেন শেষাক্ত শ্রেনীর। আমার চাচাজানের তিনি ছিলেন অতি ঘনিষ্ট বন্ধু। ডাক্তারীর পাশাপাশি তিনি রাজনীতি করতেন এবং ছিলেন আওয়ামী লীগের থানা পর্যায়ের একজন নেতা। ভাল ছাত্র হিসাবে কিছুটা পরিচিতি থাকায় এবং সে সাথে পারিবারীক চিকিৎস্যক হওয়ার কারণে আমাকে তিনি স্নেহের চোখে দেখেন। উনার সাথে ছিলেন আমাদের এলাকার আরেকজন ব্যক্তি যিনি পরবর্তীতে আমাদের এলাকার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। আমার ছোটভায়ের সাথে উনার মেয়ের বিয়ে হওয়াতে তিনি আমার আত্মীয়তে পরিণত হয়েছিলেন। দুঃখজনক হল, চেয়্যারম্যান থাকা অবস্থায় তিনি সন্ত্রাসীদের হাতে অল্প বয়সেই নিহত হন। উনারা কুষ্টিয়ার গ্রাম থেকে ঢাকাতে এসেছেন।সামান্য কিছু কুশলাদি বিণিময়ের পর ডাক্তার সাহেব আমাকে বল্লেন,“আমরা বায়তুল মোকাররমে কিছু কেনাকাটা করবো, তুমিও আমাদের সাথে চল।” উনাদের সে প্রস্তাবে আমি সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম।

ঢাকাতে নিজ এলাকার মানুষ মানেই আপন মনে হত। ফলে তাদের সাথে সময় কাটানোর প্রচণ্ড এক আনন্দ ছিল। উনাদের খুশি করতে পারি তেমন একটা বাতিকও ছিল। আমার বন্ধু সাথীদের থেকে বিদায় নিয়ে তাদের সাথে হাঁটা শুরু করলাম। ঢাকা শহরে কেনাকাটার কোন অভিজ্ঞতা আমার আদৌ ছিল না। নতুন নতুন ঢাকায় এসেছি, ফলে ঢাকার দোকান-পাঠ নিয়েও আমার অভিজ্ঞতা ছিল সামান্য। আমার থেকে উনারা কোন সাহায্য ও পরামর্শ পাবেন না, সেটি উনারা জানতেন। কিন্তু তারপরও তারা কেন সাথে নিলেন তা আমি সেদিন বুঝতে পারিনি। তবে এখন তার কারণ কিছু বুঝি। কেন বুঝি সেটির কিছু ব্যাখা দেই। পাকিস্তানের একজন বিখ্যাত আইনবিদ ছিলেন জনাব আল্লাহবখশ খোদাবখশ ব্রোহী। সংক্ষেপে তাঁকে বলা হতো একে ব্রোহী। তিনি পাকিস্তানের আইনমন্ত্রীও হয়েছিলেন। দেখতে কেতাদুরস্ত মিষ্টার মনে হলেও মনেপ্রাণে প্রচণ্ড ধার্মিক ছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি শেখ মুজিবের আইনজীবী ছিলেন। তবে তাঁর আরেকটি বড় পরিচয় ছিল। সেটি হলো, তিনি ছিলেন একজন উঁচুমানের দার্শনিক। সেটি প্রথম টের পাই লাহোরের এক সেমিনারে তাঁর দেয়া এক বক্তৃতা শুনে। সেটি আরো ভাল ভাবে বুঝি তাঁর লেখা বই “এ্যাডভেন্চার ইন সেল্ফ এক্সপ্রেশন” নামক বিখ্যাত বইটি পড়ে। বইটি অতি উচ্চাঙ্গের। বইটি আমার এতই ভাল লেগেছিল যে কিছু কিছু চ্যাপ্টার কয়েকবার পড়েছি। সে বইয়ের কিছু কথা আমার মনে এখনও রেখাপাত করে আছে। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, “every event is destined to promote a serious purpose”। তাঁর এ কথার মর্মার্থ যা বুঝেছি তা হলো, জীবনের কোন ঘটনাই অর্থহীন নয়। লক্ষ্যহীন ভাবে সেগুলি ঘটেও না। গাছের পাতা যেমন মহান আল্লাহর অনুমতি ছাড়া পড়ে না, তেমনি কোন ঘটনাও তার অনুমতি ছাড়া ঘটে না। ব্যক্তির জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার একটি অন্তঃনিহিত উদ্দেশ্যে থাকে। আর সেটি হলো মহৎ একটি লক্ষ্যের দিকে তার জীবনকে ত্বরান্বিত করা। মানুষের দায়িত্ব হল, সেসব ঘটনা –তা ভাল হোক বা মন্দ হোক তা থেকে লাগাতর শিক্ষা নেয়া। যারা এসব ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নেয় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও দার্শনিকে পরিণত হয। কুনফুসিয়াস, সক্রেটিস, প্লেটো, গৌতম বুদ্ধের মত ব্যক্তিরা তাই কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না হয়েও মানব ইতিহাসের বিখ্যাত দার্শনিক। কথাটা যে কতটা সত্য তা আমার জীবনে আমি বহুবার উপলব্ধি করেছি। আমার জীবনে বহু ঘটনা শুরুতে আদৌ কল্যাণকর মনে হয়নি, বরং আসন্ন ক্ষতি বা বিপদের কারণ মনে হয়েছে। কিন্তু পরে দেখিছে সেটিই আামার জীবনে বড় কল্যাণ বেয়ে এনেছে। পরে এক মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স পড়তে গিয়ে অনেক গুরুকে বলতে শুনেছি, যারা জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নিতে জানে তাদের জীবনে ব্যর্থতা বলে কিছু নেই। বরং বড় বড় সে ব্যর্থতাগুলি তাদের জীবনে শিক্ষার অমূল্য সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সেদিন তাদের সাথে ঢাকার রাস্তায় ঘুরাটা আমার কাছে অনর্থক মনে হলেও তা বস্তুত অর্থহীন সময়ক্ষেপণ ছিল না। বরং তা দিয়েছে এমন শিক্ষা যা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরূপে জানবার সুযোগ হয়নি। হয়তো তেমন একটি শিক্ষা দেয়ার জন্যই আল্লাহপাক আমাকে ইসলামপুর রোড থেকে তুলে নিয়ে তাদের সাথে কিছুক্ষণ চলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। অলিগলি, মাঠেঘাটে, ঘরে-বাইরে ও নানা মানুষের মাঝে কোথায় যে শিক্ষার কত অমূল্য রত্ন ছড়িয়ে আছে তা কে জানে?

বায়তুল মার্কেট থেকে উনারা কিছু শাড়ী কিনলেন। তারপর বললেন, “আমরা আওয়ামী লীগ অফিসে যাব। তুমিও চলো আমাদের সাথে।” আমারও কোন ব্যস্ততা ছিল না, তাই রাজী না হওয়ারও কোন কারণ ছিল না। তখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিস পুরোন পল্টনে। বায়তুল মোকাররম ও জিপিওর উত্তর পাশে যে হাউস বিল্ডিং ফাইনান্সের বিল্ডিং তার পূর্ব পাশের রাস্তা দিয়ে কিছুটা উত্তরে গেলেই রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে আওয়ামী লীগের অফিস। সম্ভবত বিল্ডিংটি ছিল তিন তালা। আমরা দুই তালায় উঠলাম। রাস্তায় কাউকে জিজ্ঞেস না করে ডাক্তার সাহেব যেভাবে সরাসরি অফিসে গিয়ে পৌছলেন তাতে মনে হল সে অফিসে তিনি পূর্বেও গেছেন, নইলে মফস্বলের লোকের পক্ষে ঢাকার কোন অফিস এত সহজে চেনা সম্ভব হয় কি করে? দুই তলায় উঠেই ডানপার্শ্বের বড় রুমটাতে সোজা ঢুকে পড়লেন। কেউ কোন বাধা দিল না। ঢুকেই দেখি শেখ মুজিব বসা। তাঁর সামনে একটি মাঝারী আকারের টেবিল। টেবিলের সামনে দুই খানি খালি চেয়ার। পাশে আরেক খানি। আমরা তিন জন একসাথে ঢুকি। ডাক্তার সাহেবকে দেখা মাত্রই শেখ মুজিব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি আমাদের তিন জনের সাথেই একে একে হাত মেলালেন। টেবিলের পাশের তিনটি চেয়ারে আমাদের বসতে বললেন। সাথে সাথে তিন কাপ চায়ের হুকুম দিলেন। ডাক্তার সাহেব বসলেন শেখ মুজিবের বাঁ পাশের চেয়ারে অতি কাছে। আমি বসলাম সরাসরি সামনের চেয়ারে।

আমি তো অবাক। আমাদের ডাক্তার সাহেব এলাকায় খুব একটা বিখ্যাত লোক নন। তার নিজের কোন চেম্বার বা ফার্মেসীও নেই। তিনি রোগী দেখেন অন্যের ফার্মেসীতে বসে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে রোগী দেখেন পুরোন এক সাইকেলে চড়ে। অথচ শেখ মুজিব তখন বিখ্যাত ব্যক্তি। তাকে দেখে শেখ মুজিব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগতম বলবেন সেটি দেখে আমি সেদিন অভিভূত হয়েছিলাম। বুঝতে বাকি থাকলো না, শুধু জেলা পর্যায় নয়, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সাথে শেখ মুজিবের সম্পর্ক কত গভীর। শেখ মুজিবের সেদিনের বডি ল্যাংগুজে আমি এতটাই বিস্মিত হয়েছিলাম যে সে গল্প আমি পরবর্তীতে বহু লোককে বহুবার বলেছি। তবে তার সে বডি ল্যাংগুজের বিবরণ আমি আমার স্ত্রীর কাছেও বহুবার শুনেছি। আমার শ্মশুর সাহেব এক সময় ছিলেন বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার আওয়ামী লীগের নেতা। তিনি আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হয়ে শিক্ষাকতায় যোগ দেন। প্রথমে জগন্নাথ কলেজ, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগে যোগ দেন। কিন্তু  শিক্ষাকতা তাঁর ভাল লাগেনি। পঞ্চাশের দশকের শুরুতেই সে পেশা ছেড়ে দিয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে আইন-ব্যবসায় যোগ দেন। তাতে তিনি যথেষ্ট ভাল করেন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্টাতা সদস্য। আইয়ুব আমলের আগে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়্যারম্যান রূপেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন জেলা পরিষদের চেয়্যারম্যানদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা থাকতো। অবশ্য আইয়ুব খান এসে সে ক্ষমতা জেলাপ্রশাসকদের হাতে তুলে দেন। মাওলানা ভাষানীসহ অনেক বড় বড় আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁর বাসায় এসেছেন। পরে তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে দেন। শেখ মুজিব যখন ৬ দফা পেশ করেন তখন পূর্ব পাকিস্তানের সতেরো জেলার মধ্যে ১৩ জেলার আওয়ামী নেতাই সেটির বিরোধীতা করে বেড়িয়ে যান যান, এবং তিনি ছিলেন তাদের একজন। আলীগড়ে পড়া অবস্থায় তিনি ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। সে পাকিস্তানের ক্ষতি তাঁর কাছে ছিল অসহনীয়। শেখ মুজিবের ৬ দফার মধ্যে তিনি সেটি টের পেয়ে সরে দাঁড়িয়েছেছিলেন। আওয়ামী লীগে থাকলে তিনি সম্ভবত একজন মন্ত্রী হতে পারতেন। শেখ মুজিব ছিলেন আমার শাশুড়ীর আত্মীয়, সম্পর্কে হতেন মামা। আমার শাশুড়ীও ছিলেন গোপালগঞ্জের মেয়ে। সত্তরের নির্বাচনী জলসা করতে যখন তিনি কুষ্টিয়ায় আসেন তখন তিনি এসেছিলেন আমার শ্মশুর সাহেবের বাসায়। সেটিই ছিল তার শেষ আসা। সেদিন জলসা শেষে তারা গলার ফুলের মালা আমার দাদী শাশুড়ীর গলায় পড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমার দাদী শাশুড়ী তখন পক্ষাগ্রস্ত শয্যাশায়ী রোগী। কিন্তু সে মুহুর্তেও তিনি ভোট চাইতে ভূলেননি। আমার শ্মশুর তাঁর দলকে ভোট দিবেন না সেটি জানতেন, কিন্তু ভোট চেয়েছেন আমার শাশুড়ীর কাছে। বলেছিলেন, “জানি, জামাই তো ভোট দিবে না, তুই কিন্তু ভোটটা আমাকেই দিবি।” নির্বাচনী জয় যে শেখ মুজিবের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ হলো তার নমুনা। তার রাজনীতি ছিল অতি ফোকাসড তথা সুস্পষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক। সেটি, যে কোন ভাবে নির্বাচনী জয়। ব্যাবহারের গুণে তিনি সহজেই মানুষের সাথে এভাবে ঘনিষ্ঠ হতে পারতেন।     

শেখ মুজিবকে আমি এর আগে কোনদিন দেখিনি। তবে পরে বিভিন্ন জনসভায় তাঁকে কয়েকবার আরো দেখেছি। আমি ভাবতেও্র পারিনি জীবনে এমন কাছে থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ পাব। আমাদের জন্য চা আসলো। আমাদের গ্রামের বাড়ীতে চা খাওয়ার প্রচলন ছিলনা। ঢাকায় এসে তখনও চা খেতে অভ্যস্থ হযে উঠিনি। ফলে চা খাওয়ার চেয়ে আমার নজর ছিল রুমের অন্যদের দিকে। রুমে তখন অনেক লোক। রুমটিও মোটামুটি বড়। দেখি কোনে কোনে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ চুপি চুপি আলাপ সারছেন। রুমের বাইরেও মানুষের ভিড়। তাদের কথাবার্তাও রুমের মধ্যে ভেসে আসছে। গুঞ্জন চারদিকে। যেন শেয়ার বাজার। শেখ মুজিব বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে একের পর এক আলাপ সারছেন, আলাপের ফাঁকে মুখে পাইপ ঢুকিয়ে মাঝে মাঝে তামাক টানছেন। দেশের প্রেসিডেন্ট তখন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তিনি জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওয়াদা দিয়েছেন। এমন ভাব, সে ওয়াদায় তিনি যে অটল থাকবেন সেটি প্রমাণ করেই ছাড়বেন। এবং সেটি তিনি প্রমাণ করেছিলেনও। তবে অন্য কোন জেনেরেলের এক্ষেত্রে কোন সুনাম ছিল না। দেশজুড়ে তখন নির্বাচনের আমেজ। আওয়ামী লীগের নমিনেশন নিয়ে তখন শুরু হয়েছে জোর লবিং। সেটি সেখানে বসেই বুঝা যাচ্ছিল। আমাদের ডাক্তার সাহেব তার মুখটি শেখ মুজিবের অতি কাছে নিয়ে চুপি চুপি কিছু যেন বললেন। আমার সেটি জানার আগ্রহও ছিল না, তবে কিছু আওয়াজ যা কানে ভেসে আসলো তা থেকে বুঝলাম তিনিও কুষ্টিয়ায় দলের মনোনয়ন নিয়ে কিছু কথা শেখ সাহেবের কাছে রাখলেন।

এমন সময় দুইজন তাগড়া জোয়ান সাথে নিয়ে ঢুকলেন আব্দুর রাজ্জাক। আব্দুর রাজ্জাক তখন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান। ইনিই সেই আব্দুর রাজ্জাক যিনি পরে মন্ত্রী হয়েছেন। শেখ মুজিবের অতি কাছে গিয়ে তিনি দুই যুবককে পরিচয় দিলেন এই বলে, “এরা দুই জন আমাদের ভাল কর্মী। এরা লালবাগের। আপনি তো জানেন, ওখানে জামায়াতের ঘাঁটি।” শেখ মুজিব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যুবক দু’জনের কাঁধ চাপড়িয়ে সাবাস জানালেন। উৎসাহ দিলেন দলের জন্য বেশী বেশী কাজের। তবে আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্য শুনে আমি তো অবাক। কারণ, লালবাগ কখনই জামায়াতের ঘাঁটি ছিল না। লালবাগে তখন বিশাল খারেজী মাদ্রাসা। সে মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন মোহাম্মদউল্লাহ হাফেজজী হুজুরের মত ব্যক্তিবর্গ। তারা ছিলেন ঘোরতর জামায়াত বিরোধী। ফলে আব্দুর রাজ্জাকের রাজনৈতিক জ্ঞান নিয়েই আমার কিছুটা সংশয় দেখা দিল।

যতক্ষন বসে ছিলাম দেখলাম, শেখ মুজিবের অফিস রুমের দরজাটি বরাবরই খোলা। দরজায় কোন প্রহরীর বালায় নেই। ফলে ফ্রি ট্রাফিক। ইচ্ছামত মানুষ তাঁর রুমে ঢুকছেন। যেমন নেতারা ঢুকছে, তেমনি ঢুকছে সাধারণ কর্মীরা। সেখানে দেখলাম আমার চেনাজানা এক পত্রিকার হকার। সে আমাদের কলেজ হোস্টেলে পত্রিকা বিলি করতো। মাথায় টুপি, বিপুল বপুধারী সে হকারটির কাজ ছিল পত্রিকা বিলির পাশাপাশি চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে আওয়ামী লীগের বানী প্রচার করা। সেখানে তাঁকে দেখেও আমি বিস্মিত হলাম। প্রশ্ন জেগেছে, এখানে এ হকারের কি কাজ? এটি তো দলের কেন্দ্রীয় অফিস। আমার প্রত্যাশা ছিল, এখানে তো তারাই আসবে যারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন এবং নীতি নির্ধারণ করবেন। এ অফিসের কাজ হবে তাদের মাঝে সংযোগ ও সলাপরামর্শের কিছু সুযোগ করে দেয়া। কিন্তু তেমন কোন পরিবেশই দেখলাম না। এক বিশৃঙ্খল অবস্থা। দেখলাম মাষ্টার গুল খান এক পশ্চিম পাকিস্তানী ঘুরাফেরা করছেন। তিনি তখন পাঞ্জাব আওয়ামী লীগের নেতা। তার নাম পূর্বে পত্রিকায় পড়েছি, এবার সামনে দেখলাম।

উনিশ শ’ সত্তরের জানুয়ারী মাসটি ছিল নির্বাচনী জনসভার মাস। আওয়ামী লীগ তখন দেশ জুড়ে জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণার উদ্যোগ নিয়েছে। জেলায় জেলায় তখন প্রধান প্রধান সড়গুলিতে বড় বড় নৌকা আর শেখ মুজিবের নামে গেট তৈরীর হিড়িক। কুমিল্লা থেকে আগত আওয়ামী লীগের এক নেতা শেখ মুজিবকে প্রশ্ন করলেন, তাঁর আগমন উপলক্ষ্যে কুমিল্লাতে ক’টি গেট বানানো হবে? প্রশ্নটি আমার কাছে অদ্ভুত লাগলো। নেতার নামে ক’টি গেট বানানো হবে -সেটির জন্য আবার শেখ মুজিবকে জিজ্ঞেস করতে হবে? এটি কিসের নমুনা? এটি তো মেরুদন্ডহীন পদসেবী চরিত্র? সে প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব সেদিন কি বলেছিলেন সেটি সুস্পষ্ট শুনতে পারিনি। গণতন্ত্র সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষমতায়ন ঘটায়, কিন্তু এটি কি ক্ষমতায়নের নমুনা? ক’টি গেট বানাতে হবে সে মামূলী সিদ্ধান্তটিও একজন জেলা পর্যায়ের নেতা নিতে পারছেন না। এসেছেন সরাসরি শেখ মুজিব থেকে জানতে! এটি কি কম তাজ্জবের বিষয়? দেখি ওখানে সবাই শেখ মুজিবকে স্যার বলে ডাকছেন। একজন বল্লেন, “স্যার, আমি আগামী রবিবার আপনার বাসায় দেখা করতে চাই।” উত্তরে শেখ মুজিব পাইপে মুখ লাগিয়ে গম্ভীর ভাবে বল্লেন সেটি অসম্ভব। আরো বল্লেন, “জানো তো, সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর জন্য আমাকে কিছু ভাবতে হয়? অতএব রবিবারে সম্ভব নয়।” তার সে উক্তিতে আমি সেদিন অবাক হয়েছিলাম। দেশবাসীর জন্য একজন নেতার ভাবনা তো সর্বক্ষণের। এটি কি কোন দিনক্ষণ বেঁধে হয়? তাছাড়া দিনক্ষণ বেঁধে হলেও সেটি কি ঘোষণা দেয়ার মত?

তবে সে সন্ধাতে বিস্ময়ের আরো কিছু বাঁকী ছিল। একজন ব্যক্তি মুজিবের বাঁ পাশে দাড়িয়ে কিছু বলা শুরু করলেন। বুঝা যাচ্ছিল তিনি এসেছেন মফস্বল থেকে। তিনি যা বিবরণ শুনাচ্ছিলেন তা হল, জামায়াতে ইসলামের লোকেরা নাকি গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রচার করছে যে তাদের ঢাকায় যেতে হবে। তারা আরো বলছে শেখ মুজিব নাকি তাদের ঢাকায় হাজির হতে বলেছেন। আমার কাছে তার এ বিবরণ মিথ্যা ও হাস্যকর মনে হল। ১৮ই জানুয়ারিতে পল্টন ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর প্রথম নির্বাচনী জনসভা। সে সভায় মাওলনা মওদূদীসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তৃতা দেয়ার কথা। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মাওলানা মওদূদীর সাথে আরো অনেক কেন্দ্রীয় নেতা আসছেন। জামায়াতের নেতা ও কর্মী বাহিনী তখন সে জনসভাকে যতটা সম্ভব বিশাল ও ঐতিহাসিক করার জন্য দেশব্যাপী আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল, সকল জেলা থেকে যত বেশী সম্ভব লোক জড় করা। কিন্তু তারা সেজন্য শেখ মুজিবের নাম ব্যবহার করব সেটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। এটির কোন প্রমাণ নাই। এটি কি চাটুকার এক কর্মীর পক্ষ থেকে নেতার সামনে তার নেতার ইমেজকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা? কিন্তু শেখ মুজিব সে মিথ্যাকে কীরূপে গ্রহণ করলেন সেটি তার মুখ থেকে প্রকাশ পেল না। তিনি জবাবে কিছুই বল্লেন না। কিন্তু নিজে থেকে যা বল্লেন, সেটি ছিল আমার কাছে মনে হল যেমন ভয়ানক তেমনি বিস্ময়কর। মুখের পাইপ থেকে টানা তামাকের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে রাগতঃ স্বরে বল্লেন, “লাহোর-করাচীর ব্যবসায়ীদের পয়সা নিয়ে মওদূদী বাঙ্গালী কিনতে আসছে। দেখে নিবে কি করে মিটিং করে।”

তার কথা শুনে আমি অবাক। তিনি বলছেন, মওদূদী বাঙ্গালী কিনতে আসছেন। তা হলে প্রশ্ন হল, বাঙ্গালী কি বিক্রয়যোগ্য পণ্য? মুজিবের চোখে এটিই কি বাঙালীর মূল্যায়ন? মাওলানা মওদূদী পাকিস্তানের একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। দেশের যে কোন স্থানে জনসভা করার অধিকার তাঁর নাগরিক অধিকার। সে অধিকারকে খর্ব করার কোন অধিকার শেখ মুজিবের ছিল না। সেটি হলে তা হবে এক শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। বাঙ্গালী কেনাই যদি মাওলানা মওদূদীর পরিকল্পনা হয় তবে সেটির মোকাবেলা তাঁকে রাজনৈতিক ভাবে করা উচিত। কিন্তু সে অভিযোগ এনে পল্টন ময়দানে মাওলানা মওদূদীকে মিটিং করতে দেয়া হবে না -এটি কি ধরণের বিচার? এটি তো ফ্যাসীবাদ। এভাবে জনসভা বানচাল করা কি কোন সভ্য দেশে শোভা পায়? অথচ মনে হল, মুজিব দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে তিনি জামায়াতে ইসলামীকে মিটিংই করতে দিবেন না। আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক রূপে জাহির করেন। কিন্তু এটি কি গণতন্ত্রের নমুনা?

মুজিবের সে কথাটি রুমের অনেকেই শুনলেন। কিন্তু দেখলাম কারো মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া নেই। যেন তিনি কোনরূপ অন্যায় বা অশোভন কথা বলেননি। এটিই মনে হলো আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি। সংস্কৃতি থেকেই তো মানুষ সিদ্ধ-অসিদ্ধ, ন্যায়-অন্যায়ের একটি মাপকাঠি পায়। এজন্য কাউকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া লাগে না। সে সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে কথা বললে সেটি তো মামূলীই মনে হবে। সন্ত্রাস বা ফ্যাসীবাদ যখন দলীয় সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায় তখন সে দলের নেতা রুমভর্তি মানুষের সামনে অন্যদলের মিটিং ভাঙ্গার ন্যায় দম্ভোক্তিটি প্রকাশ্যে করতে পারেন। ডাকাত পাড়ারও নিজস্ব একটি সংস্কৃতি থাকে। সেখানে কে কতটা নৃশংস ভাবে ডাকাতি করলো, ধর্ষণ করলো বা খুন করলো সেটিই বাহবা পায়। ভদ্রতা, মানবতা, দয়াবোধ সে পাড়ায় বাজার পায় না। এমন এক অসুস্থ্য সংস্কৃতির কারণেই এক ডাকাত ঘর ভর্তি অন্য ডাকাতদের সামনে নৃশংস ডাকাতির বিবরণ বুক ফুলিয়ে দেয়। সেটি সেখানে বীরত্ব রূপে মনে গণ্য হয়। কিন্তু সভ্য সমাজে সেটি ঘটে না। তেমনি পতিতাপল্লির সংস্কৃতিতে অশ্লিল বা উলঙ্গ থাকাটি কোন অসাধারণ কিছু নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রতিদ্বন্দী ডিমোক্রাটদলীয় প্রার্থীর কোন জনসভা পণ্ড করেননি। শুধু তাদের হেড অফিসে গোপন খবর সংগ্রহের জন্য লুকানো যন্ত্র ফিট করেছিলেন। আর এ অপরাধেই তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়তে হয়েছিল।পিটার ম্যান্ডেলসন ছিলেন ব্রিটিশ লেবার দলের এক প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী। তাকে বলা হত কিং মেকার। তাঁর সমর্থনের বলেই টনি ব্লেয়ার প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি এক ব্যবসায়ীর ভাড়া করা প্যারিসের এক হোটেল রুমে ছিলেন বলে তাঁকে মন্ত্রীত্ব হারাতে হয়েছিল। যদি কোন মন্ত্রী মিথ্যা কথা বলেছেন এটি যদি প্রমাণিত হয় তবে সে অপরাধে ব্রিটেনে এখনও মন্ত্রীত্ব যায়। সততা, সত্যবাদীতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা –এগুলো সভ্য সমাজের জন্য অপরিহার্য। অপরদিকে অন্যদলের রাজনৈতিক মিটিং পন্ড করা ও সে মিটিংয়ে মানুষ খুন করা তো মারাত্মক অপরাধ। অথচ জামায়াতের ১৮ই জানুয়ারীর মিটিংয়ে সেটিই ঘটেছিল। এবং সেটিই আমি স্বচোখে দেখিছি। সে বিবরণও পরে দিব।      

আওয়ামী লীগ অফিস থেকে বিষন্ন মন নিয়ে ফিরলাম। দুশ্চিন্তা বাড়লো দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আকাশে তখন ঘন কালো মেঘ। যখন তখন ঝড় শুরু হতে পারে। তবে তখনও ভাবেনি,পাকিস্তান হয়তো আর বাঁচবে না। কারণ সে বিতর্ক তখনও শুরু হয়নি। বরং শেখ মুজিব নিজেও মাঠে ময়দানে জোরে জোরে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিচ্ছেন। ইয়াহিয়া এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এ্যাডমিরাল আহসানের সাথেও দেখা করছেন। তখন তিনি ব্যস্ত নির্বাচনী বিজয় নিয়ে। তবে মুজিবের মত ব্যক্তির হাতে যে গণতন্ত্র বাঁচবে না সে বিষয়ে আমার সেদিন বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। প্রচণ্ড সে হতাশা নিয়েই সেদিন আমি আওয়ামী লীগ অফিস থেকে ফিরেছিলাম। আমি তখন এক তরুন কলেজ ছাত্র। কিন্তু আমার সেদিনের সে ধারণা বিন্দুমাত্র মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি। ১৯৭৪ সালে একদলীয় বাকশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে সেটি তা প্রমাণ করে ছেড়েছেন।

ঢাকায় বসবাস কালে আমার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল পল্টন ময়দানের প্রতিটি জনসভায় যোগদান করা। ঢাকায় এটিই ছিল জনসভার জন্য সবচেয়ে প্রসিদ্ধ জায়গা। আমার বড় আকর্ষণ ছিল মাওলানা ভাষানীর বক্তৃতা। ঢাকায় অনুষ্ঠিত কয়েকটি জনসভায় আমি তাঁর বক্তৃতা শুনেছি। তার জনসভায় প্রচুর লোকসমাগম হত। তার বক্তৃতার ভঙ্গিটা ছিল অতি চিত্তাকর্ষক। মানুষকে খ্যাপানোর দিক দিয়ে তাঁর জুড়ি ছিল না। । একবার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত ওয়ালীখানপন্থি ন্যাপের নেতাদের বক্তৃতাও শুনলাম। অবশেষে এল ১৯৭০য়ের ১৮ই জানুয়ারি। সেদিনও আমি গিয়ে হাজির। দেখি চারি দিক থেকে প্রচুর লোক আসছে। মনে হচ্ছিল অনেক লোক হবে। বহু লোক এসেছে মফস্বল থেকে। তখনও মাওলানা মাওদূদীসহ কোন কেন্দ্রীয় নেতাই মঞ্চে এসে হাজির হননি। তখন পল্টন ময়দানের দক্ষিণ ও পশ্চিম পার্শ্বে ছিল ইটের দেয়াল। মঞ্চ হতো ময়দানের পূর্ব দিকে। দেখলাম জামায়াতের স্বেচ্ছাসেবীরা মাঠের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা সুদৃঢ় করা ব্যবস্থা করছে। তাদের হাতে বিভিন্ন শ্লোগান বিশিষ্ঠ পোষ্টার। ময়দানের উত্তরের দিকে দেখলাম কিছু পুলিশ। ইতিমধ্যে বক্তৃতা শুরু হয়ে গেছে। জেলা ও প্রাদেশিক পর্যায়ের কিছু নেতা তখন বক্তৃতা দিয়ে মাঠ গরম করেছেন।

লক্ষ করলাম,পশ্চিম দিকের জিন্নাহ এভিনিউতে এখন যা বঙ্গবন্ধু এভিনিউ নামে পরিচিত, সেখানে বেশ কিছু সংখ্যক যুবক দাড়িয়ে জটলা পাকাচেছ। মিটিং তখন আধাঘন্টাও চলেনি। এরপর শুরু হল মিটিং লক্ষ করে বড় বড় পাথর নিক্ষেপ। মাঠে তখন হাজার হাজার মানুষের ভিড়। এমন ভিড়ের মাঝে পাথর ছুড়লে লক্ষভ্রষ্ট হওয়ার উপায় নেই। পাথর গুলো সহজেই তার কাঙ্খিত টার্গেটে গিয়ে আঘাত হানছিল। লাগছিল কারো মাথায়, কারো গায়ে, কারো বা পায়ে। অনেকের মাথা ফেটে রক্ত বেরুচ্ছিল। অনেকে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ এরূপ অবিরাম পাথর বর্ষণের পর শুরু হল উত্তরের পাশ থেকে দলবদ্ধ হামলা। কয়েক শত যুবক লাঠি নিয়ে জনসভার মধ্যে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছিল। তাদের রুখার জন্য সাহসিকতার সাথে প্রাণপণ চেষ্টা করছিল জামায়াতের স্বেচ্ছাসেবকগণ। প্রায় আধাঘন্টা ধরে তারা তাদের রুখে রেখেছিল। এর মধ্যে এল পুলিশ।পুলিশ দেখে জামায়াতের স্বেচ্ছাসেবীরা মনে হয় ভেবেছিল, এবার পুলিশ হামলাকারীদের রুখবে। আর এতেই শুরু হল আরেক বর্বরতা। এবং সেটি ভয়ানক ভাবে। অথচ এতক্ষণ স্বেচ্ছাসেবীরা ভালই রুখছিল। তারা বার বার ধাওয়া করে তাদেরকে জলসা থেকে বহুদুর হটিয়ে রেখে আসছিল। কিন্তু পুলিশ হামলাকারিদের না রুখে বরং তাদের জনসভার মধ্যে ঢুকার সুযোগ করে দিল। ফলে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়লো জনসভার নিরাপত্তা। সহজেই পণ্ড হল জনসভা। এবার নেতাকর্মীদের প্রাণ নিয়ে বাঁচাবার পালা। দেখলাম লম্বা শেরওয়ানী,পাঞ্জাবী,আলখেল্লা পরিহিত ৬০-৭০ বছরের বৃদ্ধকে দক্ষিণের দেয়াল টপকিয়ে প্রাণ বাঁচাবার কি করুণ চিত্র! পালাবার সময়ও তাদের উপর পড়ছে পাথর,কারো পিঠে উপর লাঠির আঘাত।সেখানে সেদিন দুই জন প্রান হারান। আহত হন শত শত। আহতদের অনেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে পুণরায় আহত হন ছাত্র লীগ কর্মীদের হাতে। পল্টন ময়দানের নিকটতম প্রতিবেশী হল গভর্নর হাউস। কিন্তু এতবড় হামলার সে খবর কি সেদিন সেখানে পৌছেছিল? এত বড় হামলার পরও কাউকে সেদিন একদিনের জন্যও গ্রেফতার করা হয়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। প্রশাসন আওয়ামী লীগকে যে কতটা ছাড় দিয়েছিল এ হলো তার প্রমাণ। 

পরদিন দৈনিক পত্রিকাগুলোর খবর দেখে আরেক বিস্ময়। দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ বিশাল ব্যানার হেডিং দিয়ে খবর ছেপেছিল, জনসভায় আগত জনতার উপর জামায়াতকর্মীদের বর্বর হামলা। একটি জাতি যখন অধঃপতনের দিকে যায় তখন সে দেশের দুর্বৃত্তরাই শুধু বিবেকশূন্য হয় না, ভয়ানক অমানুষে পরিণত হয় মানুষরূপীরাও। সেদিনের দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ পড়ে অন্তত সেটিই মনে হয়েছিল। কয়েকটি পত্রিকায় নিহতদের ছবি ছাপা হয়েছিল। নিহতদের দুই জনই এসেছিল মফস্বলের জেলা থেকে। তাদের ছবি দেখে সেদিন এটিই প্রশ্ন জেগেছিল, কি অপরাধে তাদের হত্যা করা হলো? কি জবাব দেয়া হবে তাদের আপনজনদের? আপনজনগন সান্তনাই বা পাবে কীরূপে? কোন সভ্যদেশে কি এটি ভাবা যায়? স্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থ হাছিলে এভাবে নিরপরাধ মানুষ হতে হবে? কোন সভ্যদেশে এমন ঘটনা ঘটেলে সকল দল মিলে তার একটি তদন্ত দাবী করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে দাবীও করেনি।

আওয়ামী লীগ অফিসে বসে সেদিন মুজিবের মুখ থেকে মাওলানা মওদূদীর মিটিং পণ্ড করার যে দৃঢ় অঙ্গিকার শুনেছিলাম, সেটি সেদিন স্বচোখে দেখলাম। তবে এতটা নৃশংসতার মধ্য দিয়ে যে এটি ঘটবে, সেটি সেদিন ভাবতে পারিনি। সেদিন যারা মারা গিয়েছিল বা আহত হয়েছিল তারা ছিল এই বাংলারই নিরীহ-নির্দোষ অতি সহজ-সরল মানুষ। যে কোন সভ্যদেশে এমন প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই প্রচণ্ড বর্বরতা। সে বর্বর ঘটনার আমি একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। দেখেছি তার মূল নায়ককেও। হত্যাকাণ্ড সবার চোখের সামনে ঘটে না। কিন্তু যার সামনে ঘটে তার ঘাড়ে আল্লাহপাক চাপিয়ে দেন এক গুরুতর দায়ভার। সে হলো সে সংঘটিত অপরাধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ইসলামে সে সাক্ষী গোপন করা কবীরা গোনাহ। বাংলাদেশে সে কবীরা গুনাহটি অতি বেশী বেশী হয় বলেই শত শত খুন হলেও তার বিচার হয় না। এর ফলে ভয়ানক খুনিরা মহান নেতাতে পরিণত হয়। ১৮ জানুয়ারীর পর পরবর্তী রোববার ছিল ২৫ জানুয়ারী। ঐদিন ছিল কনভেনশন মুসলিম লীগের মিটিং; প্রধান বক্তা ছিলেন দলের প্রধান ফজলুল কাদের চৌধুরী। ঐদিনও আমি পল্টন ময়দানে হাজির হয়েছিল। সেদিনও দেখলাম গুন্ডাদের হামলা। ইটের বর্ষণে সে মিটিংও পণ্ড করে দেয়া। এ হলো আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রের রূপ।

শেখ মুজিবকে জাতির পিতা বা বঙ্গবন্ধু যাই বলা হোক না কেন, আমি সেদিন তাঁর মধ্যে যে রূপটি দেখেছিলাম সেটি আদৌ কোন মানবতার রূপ নয়। বাঙ্গালীর বন্ধুর রূপতো নয়ই। বরং ভয়ানক এক মানব-শত্রুর। সেটি আরো প্রবল ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর শাসনামলে। বন্দী অবস্থায় সিরাজ শিকদার হত্যার পর তিনি সংসদে দাড়িযে বলেছিলেন, “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” তিনি শুধু তিরিশ হাজারেরও বেশী বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীকেই হত্যা করেননি, হত্যা করেছিলেন গণতন্ত্র ও ন্যূনতম মৌলিক মানবিক অধিকারকেও। প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একদলীয় বাকশাল, বন্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দল ও তাদের পত্র-পত্রিকা। আমার স্মৃতির ভাণ্ডারে দিন দিন আরো বহু স্মৃতিই জমা হয়েছে। সেগুলির কোনটি আনন্দ দেয়, কোনটি প্রচণ্ড পীড়াও দেয়। কিন্তু সেগুলির মাঝে যে স্মৃতিটি এখনও আমাকে দারুন পীড়া দেয় তা হলো মুজিবের হাতে হত্যাকাণ্ডের এ করুণ স্মৃতি। আরো পীড়া দেয় বাঙালীর মানবিক পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠায় ব্যর্থতা নিয়ে।

প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধি বলেছিলেন, একটি জাতির মানবিক গুণে বেড়ে উঠায় ব্যর্থতা বা সফলতা ধরে পড়ে পশুদের সাথে তাদের আচরণ দেখে। কিন্তু এ কথা তিনি বলেননি, নৈতিক ব্যর্থতাটি আরো নিখুঁত ভাবে ধরা পড়ে একই সমাজের নিরপরাধ মানুষের সাথে আরেক মা‌নুষের অসভ্য ও নৃশংস আচরণে। ভারতে সে দারুন অসভ্যতাটি ধরা পড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নামে নিরপরাধ মুসলিমদের হত্যা, ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ী ধ্বংসের মধ্যে। হিটলারের আমলে জার্মানীতে সেটি দেখা গেছে ইহুদীদের বিরুদ্ধে। ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারিদের মাঝে ভিন্ন মতের মানুষের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ থাকে না; বরং থাকে হত্যর নেশা। ফলে তাদের রাজনীতিতে যেটি প্রবলতর হয় সেটি হলো গুম, খুন, সন্ত্রাস ও জেল-জুলুম। তাই স্বৈরাচারি শাসনে অসম্ভব হয় জনগণের সভ্য রূপে বেড়ে উঠে। স্বৈরাচারি শাসনের এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেটিই বার বার ফিরে আসছে। এ পিছনে রয়েছে শেখ মুজিবের লিগ্যাসি। এ কারণেই স্বৈরাচার হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস মানবতা বিরোধী অপরাধ। সভ্য মানুষের রীতি হলো সে অপরাধীদের ঘৃণা করা; সন্মান করা নয়। একটি দেশের জনগণের নৈতিক ব্যর্থতা অতি প্রকট ভাবে ধরা পড়ে যখন সে সব স্বৈরাচারি খুনিদের ঘৃনা না করে জাতির পিতা, বন্ধু, নেতা, নেত্রী ও মাননীয়’র আসনে বসানো হয়। এমনটি ঘটে মানবিক গুণ ও বিবেকের মৃত্যুতে। অথচ বাংলাদেশে সেটিও কি কম হচ্ছে?     ২৩/০৪/২০১১

 




ইরানে প্রথম দিনের স্মৃতি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

ইরানে পৌঁছি ১৯৮০ সালের মে মাসে এবং দেশে ফিরি ১৯৯০ সালের জুনে। পুরো দশটি বছর ইরানে কাটিয়েছি। এর মধ্যে বহুবার আশা যাওয়া করেছি। তখন সারা দুনিয়ার মানুষের নজর ইরানের দিকে। কারণ, দেশটিতে তখন বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে গেছে। প্রতিদেশের পত্র-পত্রিকা, রেডিও-টিভিতে ইরানের খবর তখন লাগাতর শিরোনাম পাচ্ছে। যথন দেশে বেড়াতে আসতাম নানা মানুষ তখন নানা ধরণের প্রশ্ন করতো। ইরান সম্মদ্ধে জানতে তারা যে কতটা উৎস্যুক ছিল সেটি বুঝতাম তাদের জানার আগ্রহ ও প্রশ্নের ধরণ থেকে। ইরানের বিরুদ্ধে তখন পাশ্চাত্য মিডিয়ার মাধ্যমে এতো বেশী মিথ্যা প্রচার হয়েছে যে দেশটি সম্মদ্ধে সঠিক খবর পাওয়াই অসম্ভব ছিল। অনেকেই ইরানকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র ভাবত। তবে দেখতাম, সবাই জানতে চাইতো ইরানের বিপ্লব, ইরানর মানুষ ও সে দেশের নেতা ইমাম খোমেনী সম্মদ্ধে।

দীর্ঘ দশটি বছর ডাক্তার রূপে কাজ করেছি ইরান সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ে। কর্মস্থল ছিল তেহরান থেকে মাত্র ১০৫ কিলোমিটার পূর্বে গরমসার নামক এক জেলা শহরে। এ জেলারও একটি ইতিহাস আছে। এ জেলার মানুষের মাঝে শিক্ষার হার বেশ উঁচু। এ জেলারই সন্তান জনাব আহমেদী নেজাদ ইরানের প্রেসিডেন্ট হন। গরমসার বিখ্যাত উন্নত মানের খরবুজা, ডালিম ও ডুমুরের জন্য। জেলার দক্ষিণে অবস্থিত ইরানের বিশাল মরুভূমি দাশতে কবীর। রাজধানী শহর তেহরান কাছে হওয়ায় ঘন ঘন সেখানে যেতাম। বাসে মাত্র দেড় ঘন্টা লাগতো। তেহরানে আমার কিছু ঘনিষ্ট বন্ধু পরিবার নিয়ে থাকতো, তাদের বাসায় আমিও পরিবার নিয়ে হাজির হতাম। আমার বাসায় তারাও আসতো। তারা ছাড়াও ৩০ কিলো মিটারের মধ্যে ৭/৮ জন বাংলাদেশী ডাক্তার কাজ করতো। ছুটির দিনে আমরা কোন একজন ডাক্তারের বাসায় একত্রিত হতাম। তাতে বিদেশে থাকার ক্লান্তি দূর হতো। প্রায় ৮ বছর কাজ করেছি গরমসার জেলার একমাত্র হাসপাতালে। একই জেলার গ্রামীন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কাজ করেছি প্রায় ২ বছর। ইরান তখন ইসলামী বিপ্লবের দেশ। এ বিপ্লবের শুরু ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে মহম্মদ রেজা শাহের রাজতন্ত্র উৎখাতের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ এ দশটি বছর ইরানে অবস্থান কালে অতি কাছে থেকে ইরান, ইরান বিপ্লব ও ইরানের মানুষদের দেখার সুযোগ পেয়ছি। আমার জীবনের সে এক লম্বা ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

সে সময় ডাক্তার হিসাবে কাজের সুবিধা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও ছিল। কিন্তু মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত যে, তিনি আমাকে ইরানে কাজের সুযোগ দিয়েছিলেন। অন্যদেশে কাজে অধিক অর্থপ্রাপ্তি হলেও তাতে মানব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এ বিপ্লবকে এতো কাছে থেকে দেখার সুযোগটি মিলতো না। ইরানে তখন বিপ্লবের পাঠশালা। শাহকে হঠাতে পারলেও বিপ্লব তখন নিরাপদ তথা মজবুত অবস্থান পায়নি। তখন লাগাতর অভ্যন্তরীন যুদ্ধ চলছিল। শুধু দেশের ইসলাম বিরোধী নানা গ্রুপের বিরুদ্ধেই নয়, যুদ্ধ চলছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানারূপ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও। মহম্মদ রেজা শাহ ছিল সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্টতম মিত্র। যুক্তরাষ্ট্র তার এ ঘনিষ্ট মিত্রের এমন অপমানজনক উৎখাতকে কখনই মেনে নেতে রাজি ছিল না। প্রতিটি বিপ্লবের পরই প্রতি বিপ্লবের সম্ভাবনা থাকে। ইরানে সে সম্ভাবনা আরো প্রবল ছিল। কারণ সেনাবাহিনীসহ সর্বত্র তার ভক্তরা ছিল। প্রশাসনে ও সামরিক বাহিনীতে ছিল শক্তিশালী সেক্যুলারিষ্ট ফোর্স। মার্কিনী উস্কানীতেই তখন ইরানের উপর প্রকান্ড হামলা করে বসে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন। তাকে সর্বাত্মক সমর্থণ দিচ্ছিল কুয়েত, সৌদি আরব, জর্দান, মিশরসহ মধ্যপ্রাচ্যের সকল স্বৈরাচারি শাসকচক্র। মার্কিনীদের পাশাপাশি ইরানের উপর সাদ্দামের সে আগ্রাসনকে তখন সর্বাত্মক সমর্থন করছিল গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ প্রায় সকল বিদেশী শক্তবর্গ। তাদের কাছে সে যুদ্ধটি ছিল প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলিতে ইসলামী বিপ্লবের প্রসার রোধের একটি সুপরিকল্পিত স্ট্রাটেজী। সাদ্দাম হোসেনকে এ কাজে তারা সুকৌশলে ব্যবহার করছিল। পাশ্চাত্যের সে খায়েশ পুরনে ইরান ও ইরাকের প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষের প্রাণনাশ হয়। এবং ৮ বছর ব্যাপী সে যুদ্ধে বিনষ্ট হয় শত শত বিলিয়ন ডলার। ইসলামের শত্রুপক্ষটি সে সময় মুসলিম উম্মাহর বিশাল ক্ষতিতে আনন্দে ডুগডুগি বাজিয়েছে।  

যে কোন দেশে ডাক্তার হিসাবে কাজের বড় সুবিধাটি হলো, সুযোগ মেলে দেশের সর্বপ্রকার মানুষের সাথে নিবীড় মেলামেশার। ডাক্তারী পেশায় এ হলো বড় রকমের এক বাড়তি সুবিধা। অন্য পেশায় এরূপ সুযোগ জুটে না। ডাক্তারদের শুধু রোগীর দেহের খবর জানলে চলে না, রোগ বুঝতে তাকে তার ঘরের খবর, মনের খবর এবং আপনজনদের খবরও জানতে হয়। কারণ ব্যক্তির শারিরীক, মানসিক ও সামাজিক রোগগুলি একে অপরের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। ফলে জানা হয়ে যায় তার প্রাত্যহিক অভ্যাস, রীতিনীতি ও সংস্কৃতিসহ তার নিজ ঘরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবরই। রোগী হিসাবে আমাদের কাছে শুধু আম মানুষই আসতো না, অনেক খাস মানুষও আসতো। দশ বছরের চাকুরি কালে জেলার জামে মসজিদের ইমাম, জেলা প্রশাসক, এমপি, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, পুলিশ প্রধান ও পুলিশ কর্মকর্তা, বিপ্লবী রক্ষিবাহিনী, বাসিজ বা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যসহ নানা ধরণের ক্ষমতাধর মানুষের সাথেও আমার পরিচয় গড়ে উঠে। কাছে থেকে দেখার সুযোগ মেলে তাদের কর্ম ও আচরণ।

বেশীর ভাগ সময় কাজ করেছি হাসপাতালের ইমার্জেন্সী বা জরুরী বিভাগে। কখনও কখনও সেখানে ডিউটি হত ২৪ ঘন্টা ব্যাপী। এ সময়টাতেই মানুষের সাথে সংযোগ ও কথাবার্তার সুযোগটা হতো বেশী। কথা হতো ইরানী নার্স, প্যারামেডিক, ফার্মাসিস্টসহ হাসপাতালের অনেক কর্মচারির সাথেও। দশ বছর একই জেলাতে থাকায় ঐ জেলার মানুষকে এতো মানুষের সাথে এতো জানা-শোনা ও বন্ধুত্ব হয়েছিল যে আমার নিজ থানা বা নিজ জেলাতেও এতো মানুষের সাথে পরিচয় হয়নি। যখন শহরে বাজার করতে বা বেড়াতে বের হতাম তখন রাস্তাঘাটে ও দোকানে প্রচুর পরিচিত মানুষ পেতাম। দোকানদের প্রায় সবাই হয়ে পড়েছিল পরিচিত। ভেড়ার-রাখাল থেকে শুরু করে, সাধারণ কৃষক, ব্যবসায়ী, ইরানী ডাক্তার, স্কুল ও কলেজ শিক্ষক ইত্যাদি নানা পেশার অনেকেই যেমন আমার বাসায় আসতো, তেমনি আমিও সপরিবারে তাদের বাসায় বেড়াতে যেতাম। তারা আমাকে ও আমার পরিবারকে দাওয়াত করতো। বিদেশী হওয়ার ফলে তারা আমাদের সাথে নির্ভয়ে মনের কথা বলতো। বিপ্লবের  বিরোধীরাও তাদের মনের কথাগুলো বলতো। ইরানী সংস্কৃতির সাথে হাসপাতালে রোগী দেখার মধ্য দিয়ে যে পরিচয়টি পেয়েছিলাম তাদের ঘরে আসা যাওয়ার মাধ্যমে সে পরিচয়টি আরো গভিরতর হয়েছিল। আমার আরেকটি বাড়তি সুবিধা ছিল। সেটি হলো, মেডিক্যাল কলেজে পড়াশুনার কারণে দীর্ঘ দিন পাকিস্তানে থাকায় আমি আগে থেকেই উর্দু ভাষা পড়তে ও বলতে জানতাম। আমি ডাক্তারী পাশ করেছিলাম লাহোর থেকে। উর্দু ও ফার্সি এ উভয় ভাষার বহু শব্দই আরবী থেকে নেওয়া। ফল দাঁড়িয়েছিল, ফার্সী ভাষা পড়তে বা বলতে অভ্যস্থ হতে বেশী সময় লাগেনি।        

ইরানে যাওয়ার আগে থেকেই দেশটি আমার কাছে এক ভিন্ন মর্যাদার দেশ রূপে গণ্য হয়েছিল। দুনিয়ায় ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্র। কিন্তু এ দেশগুলোর কোনটিতেই জনগণ এত বিপুল সংখ্যায় ইসলামের পক্ষে রাস্তায় নামেনি। কোন দেশেই ইসলামের নামে এতো মানুষ প্রাণ দেয়নি বা বিপ্লবও করেনি। অন্য কোন দেশে শরিয়তও প্রতিষ্ঠা পায়নি। অথচ মুসলিম দেশে এর আগে আন্দোলন বা বিপ্লব যে হয়নি -তা নয়। কোন কোন মুসলিম দেশে আন্দোলন হয়েছে এবং বিপ্লব হয়েছে জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের নামে। বহুদেশে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়েছে ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য সেক্যুলারিস্টদের হাতে। এবং বহু মুসলিম দেশ ফিরে গেছে মধ্যযুগীয় বর্বর রাজতন্ত্রের দিকে -যেখানে মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার বলে কিছু নেই। বিপ্লবের আগে ইরানে ক্ষমতাসীন ছিল মহম্মদ রেজাশাহ নামে এক স্বৈরাচারী বাদশাহ। তার পিতা রেজা শাহ ছিল তাঁর বংশের প্রথম রাজা। মহম্মদ রেজা শাহ নিজেকে ইরানী রাজতন্ত্রের প্রতিনিধি এবং বিখ্যাত পারস্য সম্রাট সাইরাস ও দারিয়ুসের উত্তারাধিকারি রূপে চিত্রিত করতো। রেজা শাহকে একজন সৈনিকের স্তর থেকে তুলে নিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছিল ইঙ্গো-মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী পক্ষ। মহম্মদ রেজা শাহ ১৯৬৯ সালে ইরানী রাজতন্ত্রের দুই হাজার বছরের উৎসব পালন করে। শিরাজ নগরীর শহরতলীতে অবস্থিত পারসেপলিস নগরীতে অনুষ্ঠিত অতি জাঁকজমকপূর্ণ সে উৎসবে বহু দেশের রাজা-রানী ও প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীদের সমাবেশ ঘটেছিল।

মহম্মদ রেজা শাহের সামরিক শক্তি যেমন মধ্যপ্রাচ্যের যে কোন শাসকের চেয়ে বেশী ছিল, তেমনি সবচেয়ে গভিরতর মিত্রতা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেনসহ সকল নব্য ও পুরোন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে। ১৯৫২ সালে ইরানের জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী শরীফ মোসাদ্দেক রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে মহম্মদ রেজা শাহকে নির্বাসনে পাঠান। তিনি ইরানকে প্রজাতন্ত্র রূপে ঘোষনা দেন এবং তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করেন। ফলে বন্ধ হয়ে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট-ব্রিটেনসহ সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে ইরানী তেলের লুন্ঠন। স্বৈরাচারি রাজতন্ত্রের এমন উৎখাত এবং ইরানের তেল সম্পদের উপর ইরানী জনগণের এমন একচ্ছত্র মালিকানা সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। ফলে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। অতি অল্পদিনের মধ্যেই মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে সামরিক ক্যু করে তাঁকে অপসারিত করে। এবং তারা আবার ক্ষমতায় বসায় মহম্মদ রেজাশাহকে। মোসাদ্দেকের সামরিক ক্যু করে শাহকে পুনরায় ক্ষমতায় বসানোর পর শাহের বিদেশী বন্ধুরা এবার অতি সতর্ক হয়ে যায়। শাহের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে তার চারপাশে পরামর্শদাতার বেশ ধরে মজবুত প্রতিরক্ষা-বেষ্ঠনি গড়ে তোলে। ফলে বিদেশী মদদপ্রাপ্ত এমন এক ক্ষমতাধর স্বৈরাচারি শাসককে উৎখাত করে বিপ্লব ঘটানো সহজ ছিল না। এবং তাও ইসলামের নামে। কারণ ইসলামের নামে কোন বিপ্লবে নামলে অন্য কোন দেশের সামান্যতম সাহায্য পাওয়াও সে সময় অচিন্তনীয় ছিল। এখানেই ইমাম খোমেনীর কৃতিত্ব। মানব ইতিহাসে তিনি এক অসাধারণ বিপ্লবের সফল নেতা। তাই বিশ্ববাসীর কাছে তিনি ছিলেন এ অবাক বিস্ময়। ফলে অতি তাড়াতাড়ি তিনি বিশ্বের কোটি কোটি ইসলামপ্রিয় মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন। সমকালীন বিশ্বে আর কোন মুসলিম নেতাই এ মর্যাদা পাননি।

১৯৭৯ সালের শাহের উৎখাতের পর ইমাম খোমেনী ও তাঁর অনুসারিগণ হুশিয়ার হয়ে যান। বিপ্লব সফল হলেও প্রতিবিপ্লবের ভয় তখন সর্বত্র। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ বিতাড়িত শাহকে আবার যাতে পুণঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ না পায় সে দিক দিয়ে তাঁরা সতর্ক হয়ে যান। এমনই এক অতিসতর্ক পরিবেশে ছাত্ররা হামলা করে বসে তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে। তারা সেটিকে বিপ্লব-বিরোধী ষড়যন্ত্রের সাম্রাজ্যবাদী ঘাঁটি আখ্যায়ীত করে দূতাবাসের অফিসারদের চোখবেঁধে ও হাত পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে জিম্মি বানিয়ে ফেলে অজানা স্থানে নিয়ে যায়। বিশ্বের আর কোন দেশে মার্কিনীদের আর কখনই এত বড় অপমানের মুখোমুখি হতে হয়নি। এসব ঘটনা ঘটেছিল আমার ইরানে পৌঁছার কয়েক মাস আগে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তখন জিমি কার্টার। বন্দীদের উদ্ধারের চেষ্টা তিনি করেছিলেন। কিন্তু সেটি সফল হয়নি। যে মার্কিন বাহিনী হেলিকপ্টার যোগে তাদের উদ্ধারে ইরানের অভ্যন্তরে ঢুকেছিল তাদের সবাই ঝড়ে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ায় মারা পড়ে। তখন টিভির পর্দায় বিশ্বব্যাপী দেখানো হয় মরুভূমিতে পড়ে থাকা মার্কিন সৈনিকদের জ্বলন্ত লাশ। ইরানীদের অনেকেই ভাবে এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট রহমত। আল্লাহতায়ালা যে তাদের পক্ষে সেটি তাদের মনে আরো বদ্ধমূল হয়ে যায়। ফলে আরো বেড়ে যায় তাদের মনবল। অনেকেই এটিকে সুরা ফিলে বর্নিত ক্বাবা ধ্বংসে আগত আবরাহার বিশাল বাহিনীর ধ্বংস হওয়ার সাতে তুলনা করে। মার্কিন বাহিনী বিধ্বস্ত হয় তেহরান থেকে কয়েক শত মাইল দূরের দাশতে কবীরের মরুভূমিতে। এরপর মার্কিনীরা তাদের বন্দীদের উদ্ধারে দ্বিতীয়বার কোন সামরিক চেষ্টা করেনি।     

পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র আরেকটি দেশ শুধু ইসলামের নামে অর্জিত হয়েছিল।মুসলিম ইতিহাসে এ ছিল আরেক গণবিপ্লব। এবং সে দেশটি হল পাকিস্তান। ভারতের বুক চিড়ে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানগণ অনেক কোরবানী দিয়ে এ দেশটি গড়েছিল। বহু লক্ষ মানুষ সেদিন নিজ বাপদাদার পৈতীক ভিটা, চাষাবাদ, চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে ১৯৪৭-৪৮ সালে পাকিস্তানে পাড়ী জমিয়েছিল। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন সফল হয়নি। সারা বছরের বহু শ্রম, বহু কষ্ট, বহু অর্থ ব্যয়ে ফলানো ফসল কি প্রতি বছর ঘরে উঠে? কতবারই তো তা প্লাবনে ভেসে যায়। তেমনি লাখো মুসলিমের বহু রক্ত, বহু শ্রম ও বহু কষ্টের বিপ্লব অনেক সময়ই বাঁচে না। সাতচল্লিশের পাকিস্তানও বাঁচেনি। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ইসলামের শত্রুপক্ষ দেশটির অস্তিত্বের বিরুদ্ধেই বিরোধীতা শুরু করে। পাকিস্তানের সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রীরা দেশটিকে মেনে নিতে পারিনি। মেনে নিতে পারেনি দেশটিতে বসবাসকারীরা সংখ্যালঘুরাও। তাদের সাথে দেশের ঘরের শত্রুতে পরিণত হয় দেশটির সেক্যুলার এবং সে সাথে চরিত্রহীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সেনাবাহিনীর জেনারেল, আদালতের বিচারপতি, মিডিয়া ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ইসলামের নামে একটি দেশ প্রতিষ্ঠা পাবে, সেখানে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পাবে –সেটি ইসলামে অঙ্গিকারহীন দুর্বৃত্তদের কাছে অসহ্য ছিল। তাই দেশটির অস্তিত্বের বিরুদ্ধে জন্ম থেকেই গড়ে উঠে ইসলামের শত্রুপক্ষের বৃহত্তর কোয়ালিশন। তাদের সাথে যোগ হয় ভারত, ইসরাইল ও সোভিয়েত রাশিয়াসহ অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী বিদেশী শক্তিও। অপর দিকে দেশটির দুভাগ্য যে, শত্রুপক্ষের এতবড় কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জুটেনি ইমাম খোমেনীর ন্যায় দূরদর্শী ও কৌশলী নেতা। জুটেনি আত্মত্যাগী কর্মীবাহিনী। বরং নেতৃত্বের আসনে বসেছে আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানের ন্যায় বহু দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি নেতা। ফলে ধ্বসে গেছে উপমহাদেশের মুসলমানদের বহু দিনের স্বপ্ন।

তবে ইসলামের পরাজিত দশা শুধু পাকিস্তান বা বাংলাদেশের ন্যায় উপমহাদেশের মুসলিম দেশেই নয়, অন্যান্য মুসলিম দেশেও। হাজার বছরেরও বেশী কাল ধরে মুসলিম বিশ্বের বুকের উপর জেঁকে বসে আসে নানারূপী স্বৈরাচারি শাসন। তাদের সামনে ইসলামের বিজয়ের স্বপ্ন দেখাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শরিয়তের নামে আওয়াজ তোলাই সন্ত্রাস। এরই মাঝে ইরানীরা ইসলামের নামে আওয়াজ তুললো, বিপ্লব ঘটালো এবং সে বিপ্লবকে বাঁচিয়েও রাখলো -সেটা ছিল অভাবনীয়। আমার মনে প্রচন্ড সাধ ছিল ইসলামের শক্তির উৎস্যটি কোথায় সেটা দেখার। হটাৎ সে সুযোগও এসে গেল। ইরানে চাকুরি জুটিয়ে দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা আমাকে যেন সে সুযোগই করে দিলেন। মানুষ বহু দেশে বহু পেশায় বহু কাজে যায়। কিন্তু আমার কাছে ইরানে যাওয়ার আনন্দটাই ছিল ভিন্ন। নিছক চাকুরি নয়, এটি ছিল অতি স্বপ্নের এক অজানা রহস্যকে নিজ চোখে দেখার আনন্দ। এতদিন যেটি নানা পত্র-পত্রিকা পড়ে জানার চেষ্টা করতাম, এখন সেটিই জনপদে ঘুরে ঘুরে দেখবো, মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলে জানবো –এটি কি কম সৌভাগ্যের? তাই ইরানে কাজের সুযোগ পাওয়ায় আমার জীবনে যেন নতুন শিক্ষা জীবন শুরু হল।       

কিন্তু তেহরান বিমানবন্দর থেকে নেমেই প্রচন্ড আঘাত পেলাম। এটি ছিল স্বপ্নভঙ্গের আঘাত। পাশে নরনারীর পোষাক-পরিচ্ছদের যে চিত্র দেখলাম তাতে তেহরানকে কোন ইসলামী বিপ্লবের দেশের রাজধানী দূরে থাক, কোন মুসলিম দেশর নগর মনে হয়নি। সে তুলনায় ঢাকা, করাচী, লাহোর, ইসলামাবাদ আমার কাছে বেশী ইসলামী মনে হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট তখন ড. বনি সদর। ইরানে যখন বিপ্লব শুরু হয়েছে তখন তিনি প্যারিসে থাকতেন। সেখানেই অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন। বিপ্লবের পর পরই তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং নিজের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠায় লেগে যান। শুরুতে তিনি নিজেকে বিপ্লবের ঘোর সমর্থক হিসাবে জাহির করেন। ইমাম খোমেনীর অনুসারি ও ইসলামি বিপ্লবের সমর্থক রূপেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দীতা করেন এবং বিজয়ী হন। তাঁর আমলে মন্ত্রীদের কম সংখ্যকই ছিলেন পুরাপুরি ইসলামী। তারা অনেকেই ছিলেন ইরানী জাতীয়তাবাদী। কেউবা মধ্যমপন্থি ইসলামী। তারা রাজনীতিতে শাহের স্বৈরাচারের বিরোধী হলেও শাহের আমলে যে সেক্যুলার সংস্কৃতি গড়ে উঠে তার আমূল সংস্কার বা বিলোপ তাদের কাম্য ছিল না। মার্কিনীদের প্রতিও তাদের মনভাব এতটা তীব্র ছিল না।  বিপ্লবের পর পরই প্রধানমন্ত্রী হন মেহেদী বাজারগান ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী হন ড. ইব্রাহীম ইয়াজদী । এরা দু’জনই ছিলেন মধ্যমপন্থি ইসলামিক। ইসলামের অনুশাসনের প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তারা এতটা আপোষহীন ছিলেন না। ফলে তখন শাহ না থাকলেও তাদের সময় শাহের আমলে গড়ে উঠা সংস্কৃতিকে তেমন পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তনের চেষ্টাও হয়নি। তেহরান বিমান বন্দরে নেমেই সেটির নমুনা দেখলাম। এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য, পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গ ও তাদের সেক্যুলার অনুসারিগণ মুসলিম জাহানের যে দুটি দেশে সরকারি পরিচর্যায় অতি দ্রুততার সাথে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল তার একটি হলো ইরান। এবং অপরটি হলো তুরস্ক। শাহের আমলে ইরানে গড়ে উঠা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সে প্রবলতর রূপই তেহরানে নেমেই দেখলাম। শাহ চলে গেলেও শাহ আমলে গড়ে উঠা সংস্কৃতির গায়ে তখনও কোন আঁচড় লাগেনি। দেশে একটি রাজনৈতিক বিপ্লব হলেও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাজ  তখন শুরুই হয়নি।   

বিপ্লবের বয়স তখন এক বছরও হয়নি। বিপ্লবের সময় স্বৈরাচারি শাহের বিরুদ্ধে নানা দলের ও নানা বিশ্বাসের মানুষ একত্রে কাজ করেছিল। ইসলামপন্থিরা যেমন ছিল, তেমনি বামপন্থি, ডানপন্থি, জাতীয়তাবাদীরাও ছিল। শাহ‌ বিতাড়িত হওয়ার পর যুদ্ধ নয়া রুপ নেয়। এবারের যুদ্ধ শুরু হয় তাদের নিজেদের মধ্যে। বামপন্থি মোজাহিদে খালক, তুদেহ পার্ট (ইরানী কম্যুনিষ্টদের সংগঠন) এবং জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের কাছে এটি কখনোই কাম্য ছিল না যে, শাহের রাজতন্ত্র-বিরোধী বিপ্লব একটি সফল ইসলামী বিপ্লবে পরিণত হোক। কিন্তু এ লড়ায়ে তারা লাগতর হারতে শুরু করে ইসলামপন্থিদের হাতে। অতিদ্রুত রাজপথ তাদের হাত ছাড়া হয়ে যায়; দ্রুত দখল জমিয়ে বসে ইসলামপন্থিরা। তখন মোজাহেদীনে খালকের ন্যায় সংগঠনের লক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, ইসলামপন্থি নেতাদের গুপ্তহত্যা করা। বেছে নেয় সন্ত্রাসের পথ। এসব সন্ত্রাসীদের হাতেই নিহত হয় ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম প্রথমসারির বুদ্ধিজীবী আয়াতুল্লাহ মুর্তজা মোতাহারি, আয়াতুল্লাহ তালেগানী ও আয়াতুল্লাহ বেহেশতীসহ আরো অনেকে। নিহত হয়েছেন দেশটির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জনাব রেজায়ী এবং প্রধানমন্ত্রী বাহানূর। সন্ত্রাসীরা এমন কি তেহরানে জুম্মাহর নামাযেও বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে।

তেহরান বিমান বন্দর থেকে ট্যাক্সিতে শহরের কেন্দ্রবিন্দু তোপখানে এলাকাতে গিয়ে পৌঁছলাম। ঢাকা শহরের কেন্দ্রবিন্দু যদি বায়তুল মোকাররাম মসজিদকে ধরা যায় তবে তোপখানা হল তেহরানের সেরূপ কেন্দ্রবিন্দু। এখানে অবস্থিত বহুতল বিশিষ্ঠ বিশাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ বিল্ডিং। পরে এ বিল্ডিং বহুবার বহু প্রয়োজনে আমাকে যেতে হয়েছে। এখানে এসে জমা হয় তেহরানে নানা কোন থেকে আসা শত শত বাস। হোটেল-মুখী যাত্রাপথে ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ফারসীতে আলাপ করছিলাম। ইরানে চাকুরিতে সিলেক্ট হয়েছি এ খবর যখন পেলাম তখন আমি লাহোরে। লাহোরের বিখ্যাত মল রোডে ফিরোজ সন্সের বিশাল বইয়ের দোকান। সেখান থেকে ফার্সী শেখার বই কিনে এনে রীতিমত পড়াশুনা করে দেই। এবং ফার্সী ভাষার সে প্রাথমিক জ্ঞান কাজ দিয়েছিল ইরানে পৌঁছার সাথে সাথেই। হোটেলে ব্যাগ রেখেই আমার শুশুর সাহেবের দেওয়া ঠিকানার খুঁজে বের হলাম। ঠিকানাটি ছিল পরবর্তীতে আমার ঘনিষ্ট বন্ধু এবং অতি অমায়ীক ব্যক্তি জনাব ফরিদুদ্দীন খানের। পরবর্তীতে তিনি পারিবারীক বন্ধুতে পরিণত হন, বহুবার তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে আমার বাসায় এসেছেন এবং আমিও তার বাসায় গেছি। তাঁর দেশের বাড়ী ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার নবী নগরে। শাহের আমলে তিনি ইরানে আসেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম.এ পাশ করেন। নিজ চেষ্টায় তিনি ফার্সি ভাষা ও ফার্সিতে লেখা ইসলামি দর্শনের উপর প্রচুর পড়াশুনা করেন। তেহরান রেডিও’তে তিনি বাংলা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বেশ কিছু বইও লিখেছেন। বিখ্যাত ইরানী দার্শনিক মোল্লা ছদরার দর্শন নিয়ে বহু আলোচনা তার মুখে শুনেছি। দেশে ফিরে গিয়ে তিনি ঢাকার এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকতা করেন। বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লেখেন এবং পলিসি ফোরাম নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন।

তোপখানার বাস স্টেশনে দাঁড়িয়ে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা হল। আমি এক টুকরা কাগজে জনাব ফরিদুদ্দিন খানের ঠিকানাটি ইংরাজীতে লিখে নিয়েছিলাম। বাসস্টপে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়ানো কযেকজন যুবককে আমি জিজ্ঞেস করছিলাম কিভাবে আমি সেখানে যেতে পারি সেটি জানার জন্য। অপূর্ব আগ্রহ দেখলাম তাদের মাঝে। সবাই আমাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারে সে বিষয়ে উদগ্রীব। একজন আমাকে বললো চলুন আমার সাথে। আমি সে যুবকটির সাথে বাসে উঠে পড়লাম। প্রায় বিশ মিনিট পর সে বাস থেকে নেমে হাটা ধরলো। অনেক পথ হাঁটার পর আমার সে ঠিকানায় গিয়ে পৌঁছলাম। কিন্তু দূর্ভাগ্য সে বিল্ডিংয়ের ভিতর থেকে খবর এলো জনাব ফরিদুদ্দীন খান সেখানে থাকেন না। তবে সৌভাগ্য সেখান থেকে খবর পেলাম তাঁর বর্তমান ঠিকানার। জীবনে এই প্রথম দেখলাম বাসার দরজায় লাগানো মাইক্রোফোনের সাহায্যে বাইরে দাঁড়িয়ে ভিতরের কারো সাথে কথা বলা যায়। কাউকে এজন্য গেটে এসে দরজা খুলতে হয় না। এবং সেটি ছিল ১৯৮০ সালের কথা।

এবার আবার যাত্রা শুরু হল, তবে কোন বাসে বা ট্যাক্সিতে নয়। এবার পায়ে হেঁটে। অনেক পথ হাঁটলাম। মনে মনে বড় অপরাধী মনে হল। চিনি না, জানি না এমন এক অজানা যুবককে বিপদে ফেললাম! কিন্তু অবাক হলাম সে যুবকের হাস্যজ্জ্বল চেহারা দেখে। আমাকে সাহায্য করতে পারছে সে জন্যই যেন তার মনভরা আনন্দ। ভেবে অভিভূত হলাম। অনেক হাঁটাহাঁটির পর অবশেষে আমরা সে কাঙ্খিত ঠিকানায় গিয়ে পৌঁছলাম। তখন সন্ধারাত। খবর পেয়ে হাজির হলেন জনাব ফরিদুদ্দীন খান। তার মুখেও তখন আনন্দ ভরা হাঁসি। তাঁকে এর আগে কোন দিনই দেখিনি। প্রথম পরিচয়েই মনে হল তিনি যেন আমার বহু দিনের পরিচিত ঘনিষ্ট বন্ধু। আমার শ্বশুর জনাব এ্যাডভোকেট সা’দ আহম্মদ সাহেব ইরানের বিপ্লবী সরকারের দাওয়াত পেয়ে এর আগে তেহরান এসেছিলেন। তখন ফরিদ ভাইয়ের সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়েছিল। সে সূত্রেই তাঁর ঠিকানা তাঁর কাছে ছিল।

ফরিদ ভাইকে বল্লাম ইরানী যুবকটির সাথে পরিচয়ের কাহিনী এবং সে যে আমার জন্য যে কষ্ট করেছেন এবং মূল্যবান সময় দিয়েছেন -সেসব কথা। ফরিদ ভাই তাঁকে ফার্সীতে অনেক ধন্যবান জানালেন। আমিও যতটা পারলাম তাঁকে বার বার ধন্যবাদ জানালাম। তেহরান এক বিশাল শহর। সে শহরের কোন এক গলি থেকে প্রথম দিনেই কোন একজনকে খুঁজে বের করা নিতান্তই অতি কঠিন কাজ। সে কাজ অতি সহজ করে দিলেন এই ইরানী যুবক। হাঁসিমুখে আমাকে জড়িয়ে ধরে যুবকটি বিদায় নিল। কিন্তু রেখে গেল এমন এক স্মৃতি যা আমার মনের বহু হাজার স্মৃতির ভীড়ে অতিশয় ভাস্বর হয়ে আজও বেঁচে আছে। এমন মহৎ দিলের মানুষেরা গড়ে উঠে দেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি থেকে। সে ঘটনাটির পর নিজেকে বার বার প্রশ্ন করেছি, আমরা কি পেরেছি সেরূপ সমৃদ্ধ সংস্কৃতির জন্ম দিতে? আমি নিশ্চিত, এ স্মৃতি আামার জীবনে আমৃত্যু বেঁচে থাকবে। একটি জাতির সংস্কৃতি, চেতনা ও মূল্যবোধ তো এভাবেই বিদেশীদের চোখে ধরা পড়ে।   

ইরানে দশ বছরে সঞ্চিত এরূপ বহু স্মৃতিই অহরহ মনে পড়ে। আর বার বার মিলিয়ে দেখেছি আমার নিজ দেশের সংস্কৃতির সাথে। সংস্কৃতি মাঠে ঘাটে গড়ে উঠে না। এর জন্য চাই হাজার বছরের নিরলস প্রচেষ্টা। চাই বিদ্যালয়। চাই শত শত দার্শনিক, লেখক, কবি-সাহিত্যিক, শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতা। তারাই তো সংস্কৃতির নির্মাতা। সে সাথে চাই হাজার হাজার উন্নত মানের বই। সেগুলিই চেতনা ও চরিত্রের গঠনে বিপ্লবী ভূমিকা রাখে। মুখের ভাষা সব জাতির মানুষেরই থাকে। পশু পাখিরও থাকে। কিন্তু সব ভাষা সংস্কৃতির ভাষা নয়। এবং সে সত্যটি ফার্সি ভাষার সাথে পরিচিত হওয়ার পর আমার কাছে আরো প্রকটতর হল। মনে হয়েছে ফার্সি ভাষা যথার্থই একটি সংস্কৃতির ভাষা। এ ভাষার সমৃদ্ধিতে কাজ করেছেন শেখ সাদী, হাফিজ সিরাজী, জালালুদ্দীন রুমি, ফরিদুদ্দীন আত্তার, ওমন খাইয়ামের মত শত শত কবি। ভারত বর্ষে ভাষার সংখ্যা বহু শত। কিন্তু শত শত বছর ধরে এ ফার্সিই ভারতবাসীর সংস্কৃতির ভাষা রূপে কাজ করে। ফার্সির চর্চা ছিল এমনকি রাজা রামমোহন, রবীন্দ্রনাথের ন্যায় বিখ্যাত বাঙালী পরিবারেও। আজও বাংলা ভাষায় যে ক’টি চরিত্র গঠনমূলক কবিতা বা গল্প স্কুলে পড়ানো হয় তার বেশীর ভাগ ফার্সি থেকে ধার নেওয়া। যেমন স্কুলের পাঠ্য বইয়ের “জীবন খানা ষোল আনাই মিছে” “কুকুরে কামড় দেওয়া কি মানুষের শোভা পায়” ইত্যাদি কবিতাগুলো।

আরেক উপলদ্ধি হলো, যে ব্যক্তি কোন দিনই তার নিজ দেশের বাইরে যাইনি তার পক্ষে নিজ দেশের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের তূলনামূলক বিচার বা মূল্যায়নের সুযোগ মেলে না। তার অবস্থা অনেকটা  কূয়ার ব্যাঙয়ের মত। এমন কূপমন্ডক ব্যক্তির কাছে তখন নিজ দেশবাসীর অজ্ঞতা ও অপসংস্কৃতিও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি মনে হয়। এমন কি তা নিয়ে অনেক সময় অহংকারও জেগে উঠে। ইরানে দশ বছর থাকা কালে যে অভিজ্ঞতাগুলো হয়েছে সেগুলিকে বার বার মিলিযে দেখিছে আমার নিজ দেশের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সাথে। ভেবেছি, ঢাকার কোন বাসস্টপে কোন বিদেশী যদি এরূপ সাহায্য চাইতো তবে তার জন্য আমি নিজে কতটুকু সময় ব্যয় করতাম? হয়তো মুখে মুখে বা হাতের ঈশারায় পথ বাতলিয়ে দিয়ে তার থেকে দ্রুত বিদায় নিতাম। বড় জোর হয়ত কয়েক কদম তার সাথে হাঁটতাম। কিন্তু কখনই তাকে ঠিকানা চেনাতে নিজ খরচে গুলিস্তান থেকে বাসে উঠে মীরপুরে যেতাম না। এখানেই আমার ও আমাদের দেশের জনগণের চেতনা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সমস্যা।

আমাদের দারিদ্র্যতা যতটা অর্থনৈতিক, তার চেয়েও অনেক বেশী হল সাংস্কৃতিক ও নৈতিক। ইরানী যুবকটি হাত বাড়িয়ে আমাকে সাহায্য করতে এসেছে। সে যেন সে সুযোগটিই অধীর আগ্রহে খুঁজছিল। আচরনে ও কর্মে ইসলামী সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে তো এভাবেই। সুস্থ্য সংস্কৃতির অর্থ নাচ-গান নয়। নাটকে অভিনয় বা গল্প-উপন্যাস লেখাও নয়। বরং সেটি হলো নিজ পায়ে দাঁড়ানো ও অন্যকে সাহায্য করার সামর্থ্য। উচ্চতর সমাজ ও সভ্যতা গড়ে উঠে তো এমন মহৎ গুণের কারণেই। তাই ইসলামী সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ মুসলিমগণ শুধু স্বনির্ভরই হয় না, অপরের সাহায্যেও অগ্রনী হয়। এমন এক সংস্কৃতির বলে অতীতে তৃষ্ণার্থ মুসলিম সৈনিক মূর্মর্ষ অবস্থাতেও নিজে পানি পান না করে পাশের আহত সৈনিককে দিয়েছে। অথচ অপসংস্কৃতিতে বাড়ে পরনির্ভরতা, বাড়ে ভিক্ষাবৃত্তি। বাড়ে স্বার্থপরতা ও দুর্বৃত্তি। এবং বাংলাদেশ ইতিহাস গড়েছে এগুলোতে। আরো ভয়ংকর দিক হল, এ নিয়ে দেশবাসীর মাঝে তেমন দুশ্চিন্তাও নেই। হয়ত বাংলাদেশে অবস্থান করলে আমার মনেও আমাদের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক রোগগুলো এতটা প্রকট ভাবে ধরা পড়তো না। দুশ্চিন্তাও বাড়তো না। কারণ, সব সময় হেঁসেলে যার বসবাস তার কাছে হেঁসেলের গন্ধই স্বাভাবিক মনে হয়। ইরানসহ বিভিন্ন দেশে দীর্ঘকাল থাকার ফলে তূলনামূলক বিচারের যে সুযোগটি মেলেছে আমার কাছে আজও যেন সেটিই অমূল্য।

 




আমার কোভিড অভিজ্ঞতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

মহাদয়াময় মহান আল্লাহতায়ালার অপরিসীম মেহেরবানী যে তিনি আমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। নিজের কোভিড অভীজ্ঞতা নিয়ে আজ যেরূপ অন্যদের সামনে আমার কথাগুলি তুলে ধরছি সে সামর্থ্যটি তো একমাত্র তারই দেয়া। অতি সত্য কথা হলো, করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালা আমাকে একটি নতুন জীবন দান করেছন। আমি দয়াময় রা্ব্বুল আলামীনের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। গত এপ্রিলের ২৫ তারিখে আমাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতাল থেকে বের হই ১৭ই সেপ্টম্বর। মোট ১৪৬ দিন থাকি হাসপাতালে। এর মধ্যে ১২০ দিন থাকি আই.সি.ইউ’তে। এতো দীর্ঘদিন আই.সি.ইউ’তে থাকার ইতিহাস অতি বিরল। আমাকে চিকিৎসা করা হয় কোভিড রোগী হিসাবে। কোভিড রোগ সাধারণতঃ তিন প্রকারের হয়ে থাকে। এক).  ম্রিদু (mild) মাত্রার; দুই). মাঝারি (moderate) মাত্রার; তিন). গুরুতর (severe) কোভিড। আমার ক্ষেত্রে শুরু হয় ম্রিদু মাত্রা নিয়ে। প্রথমে শুকনো কাশি দেখা দেয়। এরপর রাতে জ্বর ও কাঁপুনি। পরে রূপ নেয় গুরুতর কোভিডে। শতকরা ৯০ ভাগ কোভিডের ক্ষেত্রে কোন চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না। রোগীকে হাসপাতালে নিলেও দ্রুত বিদায় দেয়া হয়। কিন্তু বাঁকি শতকরা ১০ ভাগের ক্ষেত্রে রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। রোগীকে অক্সিজেন দেয়া লাগে, অনেককে আই.সি.ইউ (intensive care unit)’তে ভর্তি করা লাগে। এদের মধ্য থেকে অনেকে মারা যায়। আমি ছিলাম শেষাক্ত গ্রুপের একজন।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মাত্র একদিন আগে আমার হাসপাতাল কর্মস্থল থেকে বিকালে লন্ডনের বাসায় ফিরি। সেদিন ব্যস্ত মটরওয়েতে ঘন্টায় ৭০ মাইল বেগে বিরামহীন তিন ঘটা গাড়ি চালিয়েছিলাম। আমি সেখানে মেডিসিনের কনসাল্টেন্ট হিসাবে কাজ করতাম। ফিরার পথে তেমন কোন অসুবিধাই মনে হয়নি। রাতে ভালই ঘুম হলো। পরের দিন সকালেও ভাল ছিলাম। বিকালে দুর্বলতা অনুভব করতে থাকলাম। কাশিও হচ্ছিল। গায়ে জ্বর ছিল না। কোভিড নিয়ে সমস্যা হলো রোগটি নীরবে দেহে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। রোগী জানতে পারে না যে সে মহাবিপদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিকেলে আমার মনে হলো, আমার অক্সিজেন লেবেল দেখা উচিত। কোভিডের প্রধান লক্ষণ হলো, রক্তের অক্সিজেন লেবেল নীচে নামিয়ে আনে। বাসায় অক্সিজেন মাপার কোন যন্ত্র ছিল; আমার ছেলে সেটি দ্রুত বাজার থেকে কিনে আনে। দেখা গেল আমার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৮৬%। স্বাভাবিক মাত্রা হলো ৯৪-৯৮%। বুঝতে পারলাম, দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে এবং অক্সিজেন নিতে হবে। আমার যে কোভিড হয়েছে তা নিয়ে আর কোন সন্দেহই থাকলো না। সাথে সাথে এ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলো।

আমার এক ছেলে এবং ৪ মেয়ে। এক মেয়ে কাছে থাকে। অন্যদের খবর দেয়া হলো। তারা কাছেই থাকতো; তাড়াতাড়ি চলে এলো। ইতিমধ্যে আমার ইমেল লিস্টে যাদের নাম ছিল সবাইকে বার্তা দিলাম যে আমি কোভিডে আক্রান্ত হয়েছি। আমি তাদের কাছে দোয়ার আবেদন করলাম। আমার ইমেল তালিকায় অনেক নেকবান্দাহ আছেন এবং তারা আমাকে ভালবাসেন। আমার বিশ্বাস ছিল, এ খবর পাওয়া মাত্র তারা আমার জন্য রাব্বুল আলামীনের কাছে আন্তরিক ভাবে দোয়া করবেন। এবং দোয়াই ছিল ভরসা।

১০ মিনিটের মধ্যেই এ্যাম্বুলেন্স এসে গেল। প্যারামেডিকগণ আমার অক্সিজেন চেক করে দেখলো অক্সিজেন লেবল অনেক নীচে। সাথে সাথে অক্সিজেন দেয়া শুরু করলো। এবার আমাকে এ্যাম্বুলেন্সে নেয়ার পালা। আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের মুখ তখন অত্যন্ত বিবর্ণ। লন্ডনে শত শত মানুষ তখন কোভিডের কারণে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে। ফলে চারিদিকে কোভিড ভীতি। তাই কোভিডে আক্রান্ত হওয়াটি মামূলী বিষয় নয়। আবার ঘরে ফিরবো কি না তা নিয়ে সন্দেহ জাগাটাই স্বাভাবিক। সবাইকে বিদায় জানালাম; এ্যাম্বুলেন্স দ্রুত রওয়ানা দিল হাসপাতালের দিকে। সাথে কারো হাসপাতালে যাওয়ার অনুমতি নেই, তাই একাকী যেতে হলো।   

আমার বাসা থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী হলো কিং জর্জ হাসপাতাল। সেখানেই আমাকে নেয়া হলো। দেখি কোভিড রোগীদের জন্য আলাদা গেট। আমাকে নেয়া হয় এ্যাকসিডেন্ট ও ইমার্জেন্সী বিভাগের রিসাসিটেশন রুমে। সেখানে আবার অক্সিজেন মাপা হলো। দ্রুত এক্স-রে করা হলো এবং ব্লাড পরীক্ষার জন্য রক্ত নিল। প্রথমে অক্সিজেন দেয়া শুরু হয় সাধারণ মাস্ক দিয়ে। পরে CPAP (continuous positive airway pressure) লাগানো হয়। আমি তখনও সজ্ঞান এবং স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছি। CPAP সহ্য করা সহজ নয়। আমি একসময় লন্ডনের হাসপাতালে রেসপিরেটরী মেডিসিনের রেজিস্টার ছিলাম। বুঝতে পারলাম, কেন অনেক রোগী CPAP লাগানোর চেয়ে মরে যাওয়াই শ্রেয় মনে করতো। আমাকে কতক্ষন CPAP’য়ের উপর রাখা হয়েছিল তা আমার জানা।

প্রথম রাতটি আদৌ ভাল কাটেনি। উপড় হয়ে শুয়ে বহু কষ্ট সয়ে অক্সিজেন নিতে হয়েছে। যতক্ষন হুশ ছিল ভেবেছি, আর কত ঘন্টা এভাবে আমাকে কষ্ট সইতে হবে? এভাবে দিনের পর দিন থাকা তো অসম্ভব। ইতিমধ্য একজন ডাক্তার এসে বললেন, আমাকে ভিন্টিলেটরের উপর রাখাটি জরুরী। তিনি আমার সম্মতি চান। আমি সাথে সাথে সম্মতি জানিয়ে দিলাম। বুঝতে বাঁকি থাকলো না, আমার অবস্থা অতি গুরুতর। ভিন্টিলেটর হলো কোভিড চিকিৎসার সর্বশেষ স্তর। তখন মনে হলো, আমার বেঁচে থাকা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে। এখন যে পৃথিবীটা দেখছি সম্ভবতঃ এটিই শেষ দেখা।  

ভিন্টিলেটরের কথা শুনে মনের ভিতরে হতাশা ও বেদনাটি অতি গভীর হলো। আমার জীবনে একটি স্বপ্ন ছিল। মনে হচ্ছিল, স্বপ্নটি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। অথচ স্কুল জীবন থেকে সে স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়েছি। আমি স্বপ্ন দেখতাম পশ্চাদপদ, পরাজিত ও  অপমানিত মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে কিছু করার। আমি বিশ্বাস ছিল, মুসলিম উম্মাহর অভাব সম্পদে নয়, লোকবলে নয়, ভূগোলেও নয়। সেটি জ্ঞান। জ্ঞানই মানুষকে দেয় শক্তি, বিজয় ও ইজ্জত। আদম (আঃ) জ্ঞানের বলেই ফিরেশতাদের সাথে প্রতিযোগিতায় জিতেছিলেন এবং তাদের সিজদা পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন। আদম (আঃ) সে জ্ঞান পেয়েছিলেন মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। তাই জ্ঞানদান মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। মহান নবীজী (সাঃ)কেও তাই নামায-রোযা দিয়ে তাঁর মিশন শুরু করতে বলেননি। শুরু করেছেন ইকরা তথা পড় ও জ্ঞানবান হও –এদিয়ে। তাই আমার স্বপ্ন ছিল, শেখা ও শেখানোর রাজ্যে কিছু কাজ করা। জ্ঞান বিতরণের কাজে লেখনীকে বেছে নেয়া।

লেখনীর শক্তি যে কত প্রচণ্ড –সেটি আমি ছোট বেলা থেকেই অনুভব করেছি। বহুবই আমার শরীরে তখন শিহরণ তুলেছে। সেসব বই পড়ে আমি চেয়ারে বসে থাকতে পারতাম না। তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হতো আমার মনের ভূবনে। সভ্য সমাজ বা সভ্যতা কখনোই ভাল পানাহারের কারণে সৃষ্টি হয় না; সেটি হয় ভাল বইয়ের কারণে। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম, হায়! আমি যদি তাদের মত লেখক হতে পারতাম। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, ডাক্তারী, ইঞ্জিনীয়ারিং –এরূপ নানা পেশায় লক্ষ লক্ষ মানুষের ভীড়। কিন্তু একটি জাতি কতটা মানবিক গুণাবলী নিয়ে বেড়ে উঠবে -সেটি নির্ভর করে সে জাতির মাঝে কতজন জ্ঞান বিতরণের কাজে তথা লেখালেখিতে নিয়োজিত হলো তার উপর। চিকিৎসা বিজ্ঞানকে আমি বেছে নিয়েছিলাম সন্মানজনক উপার্জন ও মানব খেদমতের হাতিয়ার রূপে। কিন্তু বাঁচার মূল লক্ষ্যটি ছিল মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা। এবং সে লক্ষে লেখালেখির ময়দানে তাঁর একজন একনিষ্ট সৈনিক রূপে যুদ্ধ করা। তাই কলম বেছে নিয়েছিলাম সে যুদ্ধে হাতিয়ার রূপে। লেখালেখির কাজে নিজের সামর্থ্য বাড়ানোর লক্ষ্যে উর্দু, ফার্সি এবং আরবী ভাষা শেখার চেষ্টা করেছি। বিগত তিরিশ বছরের বেশী কাল ধরে সে স্বপ্ন নিয়ে বহুশত প্রবন্ধ লিখেছি। সেগূলির সবই ছাপা হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকা, জার্নাল ও ওয়েব সাইটে। বহুদিন ধরেই ভাবছিলাম এ লেখাগুলিকে দীর্ঘ আয়ু দিতে হলে বই আকারে প্রকাশ করতেই হবে। সেগুলি তখন আমার জন্য সাদকায়ে জারিয়া হবে। ভাবছিলাম, আগামী এক বছরের মধ্যেই কয়েক খানি বই প্রকাশ করবো। তাই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পূর্বে গভীর রাত জেগে জেগে আমার সে প্রবন্ধগুলির এডিটিং করছিলাম। কিন্তু  কোভিড যেন আমার সব স্বপ্ন চুরমার করে দিল। সে বেদনাটি আমাকে খুবই কষ্ট দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এখন মহান আল্লাহতায়ালার কাছে ফিরে যাওয়ার পালা। দুঃখ হচ্ছিল, আমি তো ফিরে যাচ্ছি এক রকম খালি হাতে। আফসোস হচ্ছিল, সাদকায়ে জারিয়ার কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। মহান আল্লাহতায়ালা আমাকে যা দিয়েছেন তা তো ওপারে পাঠাতে পারলাম না। সে এক করুণ বেদনা। ওপারে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম মাত্র, এমন মুহুর্তেই কোভিডের হামলা। পরে ভাবলাম, আমি তো স্রেফ স্বপ্নই দেখতে পারি। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সামর্থ্য তো আমার হাতে নাই। আমাকে নিয়ে তো মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব পরিকল্পনা আছে। আমি যে তাঁর সৈনিক -সেটি মহান আল্লাহতায়ালা ছাড়া আর কে ভাল জানেন? তিনি তো আমার নিয়েত জানেন। অতএব আমার কাজ মহান আল্লাহতায়ালার পরিকল্পনার কাছে আত্মসমর্পণ করা। নিজেকে শান্তনা দিচ্ছিলাম এভাবে। এরূপ ভাবনার মধ্যেই হারিয়ে গেলাম।

কখন আমাকে ভিন্টিলেটরের উপর নেয়া হলো আমার তা জানা নাই। ভিন্টিলেটর কখনোই সজ্ঞান মানুষের উপর লাগানো যায় না। রোগীকে অজ্ঞান করতে হয়। আমাকে কখন অজ্ঞান করা হয় –সেটিও বুঝতে পারিনি। অজ্ঞান অবস্থায় কখন কি হয়েছে তা একটুও টের পায়নি। একবার চোখ খুলে দেখি আমার ছেলে আমার পাশে বসা। তার মুখে হাঁসি। সম্ভবতঃ তখন আমার মুখেও হাঁসি ছিল। কারণ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর এই প্রথম পরিবারের কাউকে দেখছি। কনসাল্টেন্ট তাকে ডেকে এনেছে আমাকে দেখে যাওয়ার জন্য। সে আমাকে প্রশ্ন করলো, কতদিন আমি হাসপাতালে আছি। আমি বল্লাম, এক দিন বা দুই দিন। সে বল্লো তুমি আড়াই মাস বেহুশ ছিলে। আরো বল্লো, আমার অবস্থা নাকি খুবই খারাপ ছিল, ডাক্তার খুবই সমস্যায় পড়েছিল আমার অক্সিজেন লেবেল কাঙ্খিত মাত্রায় আনতে। একসময় ১০০% অক্সিজেনও দিতে হয়েছে। তখনও বুঝতে পারিনি যে, আমি আই.সি.ইউতে।   

পরে আমার স্ত্রী ও ছেলে থেকে জানতে পারি, আই.সি.ইউ’র ডাক্তারগণ আমার ব্যাপারে খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিল। তারা ভেবেছিল, আমি আর বাঁচবো না। গত রামাদ্বানের মাঝামাঝি সময়ে অবস্থা এতোই খারাপ হয়ে যায় যে, ডাক্তার বাসায় ফোন করে আমার স্ত্রীকে তাড়াতাড়ি শেষদেখা দেখার জন্য হাসপাতালে আসতে বলে। তবে করুণাময় মহান আল্লাহর রহমতে সে সময় অবস্থা আর খারাপ হয়নি। কিন্তু তার ২ সপ্তাহ পর ঈদুল ফিতরের দিন অবস্থা আবার খারাপ হয়ে যায়। ডাক্তারদের পক্ষ থেকে আমার পরিবারের প্রতি ডাক আসে শেষ দেখা দেখে আসার জন্য। মহান আল্লাহতায়ালার অপার মেহেরবানী যে, সেবারও রক্ষা পেয়ে যাই্। পরের দিন ডাক্তার ফোনে আমার ছেলেকে জানায়, “সুখবর আছে, তোমার আব্বার শরীর ভালোর দিকে।” এরপর আমি ধীরে ধীরে সুস্থ্য হতে থাকি। উল্লেখ্য হলো, হাসপাতালের কনসাল্টেন্ট ও নার্সগণ আমার পরিবারের সদস্যদের সাথে বেশ ভাল ব্যবহার করেছেন। আই.সি.ইউ’য়ের টিম আমার জন্মদিনও পালন করেছে। এবং তার ছবি NHS (National Health Service) ওয়েব সাইটে দিয়েছে। সে ছবি আমার বন্ধুগণ বিলেত, বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশ থেকে দেখেছে।      

আমার জ্ঞান ফিরে আসার পর আই.সি.ইউ’য়ের কনসাল্টেন্ট ও নার্সগণ আমার অবস্থার বর্ণনা শুনানে শুরু করেন। আমি যেহেতু ডাক্তার তাদের সেসব বলার বেশ আগ্রহও ছিল। তারা সবাই বলতো, এটি অলৌকিক ব্যাপার যে আমি বেঁচে গেছি। সত্য হলো, মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এরূপ অলৌকিক কিছু ঘটানো কোন ব্যাপারই নয়। আমি স্বচোখে আমার ফুসফুসের সিটি স্কান দেখেছি। ফুসফুসের যে অবস্থা দেখেছি তাতে সত্যই বেঁচে যাওয়াটি আমার কাছে অলৌকিকই মনে হয়েছে। আমার দুটি ফুসফুসেই নিউমোনিয়া হয়েছিল। সে সাথে দুই ফুসফুসেই ইম্বোলিজম হয়েছিল; সে সাথে পানিও জমেছিল। আমার কিডনি ফেল করায় ডায়ালাইসিস দিতে হয়েছিল। ফুসফুসে ইম্বোলিজম হওয়াতে হার্টও ফেল করেছিল। সে সাথে লিভারেও দোষ দেখা দিয়েছিল। অথচ কোভিড হওয়ার আগে আমি  সুস্থ্য ছিলাম। আমার ফুসফুস, কিডনি, হার্ট, লিভার –এসব কিছুই পুরাপুরি সুস্থ্য ছিল।  

হুশ ফেরার পরও আমি দুই মাস হাসপাতালে ছিলাম। পরিবারের কাউকে আসতে দিত না। ভিডিও মারফত সাক্ষাৎ করানো হতো। বেহুশ অবস্থায় আমার শরীরের উপর কীরূপ বিপদ গেছে তা বুঝতে পারিনি। কিন্তু যখন হুশ ফিরলো তখন শুরু হলো নতুন সমস্যা। এমন রাতও গেছে যে একটি মিনিটও ঘুমাতে পারিনি। জীবনে কোনদিন ঘুমের বড়ি খেতে হয়নি। কিন্তু তখন ঘুমের বড়ি না খেলে ঘুমই হতো। আবার ঘুম হলে নানা রূপ স্বপ্ন দেখতাম। হ্যালুসিনেশন হতো। আমার বাম হাতে কোন শক্তি ছিল না। খাড়া হওয়া দূরে থাক, বসে থাকতে পারতাম না। পাঁচ মিনিট বসে থাকলেই হাঁপিয়ে উঠতাম। অক্সিজেন দেয়া লাগতো। ফিজিওথেরাপিস্টগণ কাজ শুরু করলো। বাচ্চাকে হাটা শেখানোর ন্যায় আমাকে হাটা শেখানো শুরু করলো। দুই চার কদম হাটতে পারলে ফিজিওথেরাপিস্টরা বাহবা দিত। পাশে হুইল চেয়ার ও অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে তারা প্রস্তুত থাকতো আমাকে বিশ্রাম দেয়ার জন্য। প্রায় দুই মাস এ রকম ফিজিওথেরাপির দেয়ার পর আমি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে সমর্থ হলাম। তখন তারা বল্লো, আমি এখন বাসায় ফিরতে পারবো।     

হাসপাতালের দিনগুলিতে আমি বিচ্ছিন্ন হয়েছিল দুনিয়ার জগত থেকে। সে মুহুর্তে তীব্রতর হয়েছিল আখেরাতের ভাবনা। আমি মৃত্যুকে অনেক কাছে থেকে দেখেছি। নড়বড়ে পায়ে দাঁড়িয়েছিলাম এপার ও ওপারের মাঝে এমন এক খাড়া পর্বত চুড়ার উপর যে সামান্য ধাক্কা দিলেই অনন্ত অসীম পরকালে গিয়ে পড়তাম। সেখান থেকে আর ফিরে আসা যেত না। আমার শরীরের কোভিড যে কোন সময় আরো খারাপ রূপ নিতে পারতো। এ পার্থিব জীবন কতই না ভঙ্গুর! করোনার ন্যায় কত অসংখ্য অদৃশ্য প্রাণনাশী শত্রুর মাঝে আমাদের বসবাস। অথচ এর বিপরীত এক মৃত্যহীন জীবন রয়েছে পরকালে। সেখানে কোন করোনা নাই। জান্নাতে স্থান পেলে সামান্যতম ব্যাথা-বেদনাও নাই। অথচ সে পরকাল নিয়ে ভাবনাই নাই। এর চেয়ে বড় বেওকুফি আর কি হতে পারে? জান্নাতের পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার চেয়ে বুদ্ধিহীনতাই বা কি হতে পারে?

সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, জীবন ও মৃত্যুর ফয়সালাটি কখনোই জমিনের উপর হয় না। সেটি হয় আসমানে। ফয়সালা নেন একমাত্র আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা। সেখানে কারো অংশীদারিত্ব চলে না। পবিত্র কোর’আনে তাই বলা হয়েছে “মা আসাবা মিম মুসিবাতিন ইল্লা বি ইযনিলিল্লাহ” –(সুরা তাগাবুন, আয়াত ১১)। অর্থঃ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন বিপদই তোমাদের স্পর্শ করতে পারে না। তাই কোন প্রাণনাশী ভাইরাস বা জীবাণু মৃত্যু ঘটাতে পারে না -যদি না সে সিদ্ধান্তটি মহান আল্লাহতায়ালার হয়। তবে এক্ষেত্রে দোয়ার শক্তি বিশাল। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দার দোয়া শুনেন এবং জবাবও দেন। সে কথাটি পবিত্র কোর’আনে বার বার বলা হয়েছে। বলা হয়েছে “ফাজকুরুনী, আজকুরুকুম”। অর্থঃ তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো। এবং মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণে যাওয়া তথা তাঁর সাহায্য পাওয়ার উত্তম মাধ্যম হলো দোয়া।  

মহান আল্লাহতায়ালা আমাকে প্রাণে বাঁচিয়ে অনেক কিছু জানার সুযোগ করে দিয়েছেন। মারা গেলে কিছুই জানতে পারতাম না। আমি কোন বিখ্যাত ব্যক্তি নই; অন্যদের সাথে আমার যে সংযোগ -সেটি শুধু লেখনীর মাধ্যমে। কিন্তু অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছি জেনে যে, হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন দেশে আমার জন্য দোয়া করেছেন। লন্ডনের বিভিন্ন মসজিদে আমার জন্য সমবেত ভাবে দোয়া করা হয়েছে। ইন্টারনেটে জুম বৈঠক করে দোয়া করা হয়েছে একাধিক বার। দোয়ার মজলিস বাংলাদেশেও হয়েছে। সূদুর কানাডাতেও দোয়া হয়েছে। কেউ কেউ আমার জন্য সাদাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ চোখের পানি ফেলেছেন। এসবই শুনেছি অন্যদের থেকে। বিশাল মনের অধিকারি এসব ভাইবোনদের বেশীর ভাগকে আমি কোনদিন দেখিনি। তাদের এ বিশাল মনের পরিচয় জেনে আমি অত্যন্ত অভিভূত হয়েছি। এমনটি কোনদিনই ভাবতে পারিনি। ভালবাসা কেনা যায় না। ভালবাসা দেখানোর সামর্থ্যও সবার থাকে না। ফলে যারা সেদিন আমার প্রতি ভালবাসা দেখিয়েছেন তারা নিঃসন্দেহে মহৎ গুণের অধিকারী। আমি তাদের প্রতি গভীর ভাবে কৃতজ্ঞ। মহান আল্লাহতায়ালা নিশ্চয়ই তাদেরকে প্রতিদান দিবেন। ইসলামী ভাতৃত্ববোধ যে মুসলিমদের মাঝে এখনো বেঁচে আছে -এ হলো তারই নমুনা। নানা হতাশার মাঝে এটিই বিশাল আশার পথ দেখায়। গভীর ভাবে আমাকে অনুপ্রেরণাও জোগায়। মুসলিমগণ যখন ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠে তখন হিংসার বদলে এরূপ দোয়ার সংস্কৃতিই প্রবলতর হয়। মানুষ তো এভাবেই একে অপরের প্রতি কল্যাণমুখি হয়। ২৪/১১/২০২০।




ড. হাসান রুহানীর সাথে কিছুক্ষণের স্মৃতি

ড. হাসান রুহানী আজ ইরানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।  নানা কারণে তিনি আজ বিশ্বের বহু আলোচিত ব্যক্তি। ক’দিন আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়ে তিনি আলোচনার শীর্ষবিন্দুতে পৌছে গেছেন। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সাথে টেলিফোন সংলাপের মধ্য দিয়ে ইরান-মার্কিন সম্পর্কে এতকাল যে বিচ্ছেদ ছিল সে ক্ষেত্রে নতুন সংযোগ গড়েছেন। ইরানে অবস্থান কালে আমার বিরল সুযোগ মিলেছিল জনাব রুহানীর সাথে প্রায় ৫-৬ ঘন্টা কাটানোর। সে স্মৃতি ভূলবার নয়। সে স্মৃতির বহুকিছু শুধু বিস্ময়করই নয়, শেখবারও।তাঁর সাথে সাক্ষাতের ফলে সুযোগ মেলে সে সময় যারা বিপ্লবের কান্ডারি ছিল তাদের চিন্তা-চেতনা সাথে কিছু পরিচয় লাভের। তখন উনার বয়স বত্রিশ। সময়টা ছিল ১৯৮০ সালের জুন মাস। আমি সবেমাত্র ইরানে এক সরকারি জেলা হাসপাতালে চিকিৎস্যক রূপে যোগ দিয়েছি,বিপ্লবের বয়স তখন এক বছর চার মাস। মহম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ইরান ছেড়ে পলায়ন করে ১৯৭৯ সালের ১৬ই জানুয়ারিতে।তার পলায়নের পর পরই আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী বহু বছরের নির্বাসন শেষে প্যারিস থেকে তেহরানে ফিরে আসেন। ফেব্রেয়ারি মাসের ১১ তারিখে শাহের সমর্থণপুষ্ট শাহপুর বখতিয়ার সরকারের পতন ঘটে এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ড.মেহেদী বাজারগানের নেতৃত্বে বিপ্লবী সরকার।

আমি ইরানে পৌছি ১৯৮০ সালের মে মাসে। ইরানের আজকের প্রেসিডেন্ট জনাব ড. হাসান রুহানী তখন মজলিশে শুরার সদস্য। ইরানীরা পার্লামেন্টকে বলে মজলিশে শুরা অর্থাৎ পরামর্শ সভা। আমার কর্মস্থল তেহরান থেকে ১০৫ মাইল পূর্বে গরমসার নামক একটি জেলার জেলা হাসপাতালে। গরমসার সেমনান প্রদেশের পূর্বাঞ্চলীয় একটি জেলা শহর। ড.হাসান রুহানী তখন সেমনান জেলার এমপি।৫ বার তিনি সে পদে নির্বাচিত হয়েছেন;১৯৮০ সাল থেকে ২০০০ সাল অবধি ২০ বছর যাবত তিনি মজলিশে শুরার সদস্য ছিলেন।চতুর্থ ও পঞ্চম মেয়াদ কালে তিনি পার্লামেন্টের ডিপুটি স্পীকারও ছিলেন। আমি আমার ইরানে কর্মজীবনের পুরা ১০টি বছর কাটিয়েছি গরমসার জেলাতে। এত দীর্ঘকাল একই জেলাতে ডাক্তার রূপে কাজ করার ফলে জেলার সর্বস্তরের মানুষের সাথে গড়ে উঠে ব্যাপক পরিচিতি। অনেকের সাথে গভীর বন্ধুত্বও গড়ে উঠে। ভেড়ার রাখাল থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষক,শিক্ষক,ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, জুম্মার ইমাম, এমপি, ধর্মীয় ও রাজনৈতীক নেতাকর্মীদের সাথে পরিচিতিও গড়ে উঠে। সুযোগ মেলেছে বহু বামপন্থি, শাহপন্থি, মোজাহিদীনে খালকের ন্যায় প্রচন্ড বিপ্লব বিরোধীদের সাথে কথা বলারও। এরা আমার কাছে এসেছে রোগী হিসাবে। এদের অনেকের বাসায় মেহমান রূপেও বহুবার আমন্ত্রিত হয়েছি।

বিদেশী হওয়ার কারণে এরা আমার সাথে কথা বলতো নির্ভয়ে। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। ডাক্তারি পেশার এটি এক  বাড়তি সুবিধা। এ পেশায় নানা স্তরের মানুষের সাথে মেলামেশায় কোন প্রাচীর থাকে না। বিলেতেও সেটি অনুভব করি। শুধু দেহের কথাই নয়, মনের কথাও তারা নির্ভয়ে বলে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় থেকে চাকুরির প্রস্তাব পাওয়ার সাথে সাথে আমি ফার্সি ভাষা শেখায় তাড়াহুড়া শুরু করে দেই। তখন দুশ্চিন্তা ছিল ফার্সি না জানলে আমি রোগীদের সাথে কথা বলবো কি করে? তাদের রোগই বা জানবো কি করে? ইরানে পৌছার পর ফার্সি ভাষা শেখার সে আগ্রহটা আরো তীব্রতর হয় ফারসী সাহিত্য ও ইরানের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সে দেশের বুদ্ধিজীবীদের লেখালেখির সাথে পরিচিতি লাভের জন্য। কারণ পত্র-পত্রিকা হলো জাতির চিন্তা-চেতনার প্রতিচ্ছবি। সেখানে সন্ধান মেলে একটি দেশের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতীক কর্ণধারগণ দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে নিয়ে কি ভাবছেন তার পরিচয়। তাই কোন দেশের মানুষের মন ও মনন এবং তাদের রাজনৈতীক অভিলাষের খোঁজখবর পেতে হলে সে দেশের পত্র-পত্রিকা পাঠের বিকল্প নেই। তাছাড়া মুসলিম জগতে আরবীর পরই ফার্সি হলো দ্বিতীয় সমৃদ্ধ ভাষা। তাই যতদিন ইরানে ছিলাম ততদিন চেষ্টা করেছি ফার্সি ভাষা শেখার।ফার্সিতে কথা বলায় প্রথম তিন-চার মাস সমস্যা হলেও পরে আর সে সমস্যা থাকেনি। তাছাড়া ফার্সি ভাষাটি অতি সহজ,উর্দু জানা থাকলে সেটি আরো সহজ হয়ে যায়। কারণ এ দুটি ভাষার শব্দভান্ডারে রয়েছে বহু হাজার অভিন্ন শব্দ। ফার্সি বহু শত বছর ভারতের রাষ্ট্র ভাষাও ছিল। বহু ফার্সি শব্দ বাংলা ভাষাতেও রয়েছে। ফারসী জানা থাকলে সহজ হয়ে যায় আরবী ভাষা শিক্ষাও। কারণ ফার্সির প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ শব্দই আরবী ভাষা থেকে নেয়া। ইরানে পৌঁছার কিছু দিনের মধ্যেই  আমি ফার্সি দৈনিক পত্রিকা পড়া শুরু করে দেই। কারণ আধুনিক ভাষা শেখার এটিই সবচেয়ে সফল উপায়। শিক্ষাসূত্রে লাহোরে থাকা কালে আমি উর্দু ভাষা শিখি এ পত্রিকা পড়েই। আর ভাষা হলো মানুষে মানুষে মনের সংযোগের সবচেয়ে সুন্দর বাহন। অন্যভাষীরা খুব খুশি হয় যখন অন্যদের তাদের ভাষায় কথা বলতে দেখে। তখন তারাও মনের দরজা খুলে দেয়। ফলে সহজ হয় তাদের মনের অতি কাছাকাছি পৌঁছার।

 

গরমসার জেলাটি একটি ক্ষুদ্র ও জনবিরল জেলা হলেও এ জেলার মানুষেরা অন্য জেলাবাসীর তুলনায় নিজেদেরকে চালাক-চতুর বা বুদ্ধিমান মনে করে। এবং তা নিয়ে গর্বও করে। সম্ভবত তার কিছু কারণও রয়েছে। শিক্ষাদীক্ষাতে এ জেলাবাসীরা অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক বেশী অগ্রসর। এ জেলার বহু শিক্ষিত মানুষ অন্য জেলায় গিয়ে শিক্ষাকতা করেন। বিশ্ববিদ্যাদয়ের শিক্ষক বা নামকরা ডাক্তার উঠে এসেছে গ্রাম থেকে।ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. আহমেদী নেজাদও এ জেলারই এক ক্ষুদ্র গ্রামের সন্তান। গরমসারের অবস্থান ইরানের সবচেয়ে বড় মরুভূমি “দাশতে কবীর”এর উত্তর ভাগে। ফারসীতে “দাশত” বলতে বুঝায় প্রান্তর,মাঠ বা ক্ষেত্র। “কবীর” অর্থ বড় বা বিশাল। মরুভূমির পাশে অবস্থান হওয়ায় জেলার আবহাওয়া গ্রীষ্মকালে হয়ে পড়ে অত্যন্ত গরম; ইয়ার-কুলার বা ইয়ার-কন্ডিশনার ছাড়া ঘরে বসবাস করাই কঠিন। কিন্তু শীত কালে আবার প্রচন্ড শীত, মাঝে মধ্যে বরফে ঢেকে যায়।গরমসার শহর থেকে প্রায় ১১০ মাইল পূর্ব দিকে হলো প্রাদেশিক শহর সেমনান। গরমসারের অবস্থান সেমনান ও তেহরানের প্রায় মাঝামাঝিতে। সেমনান প্রদেশের পূর্বে প্রসিদ্ধ খোরাসান প্রদেশ এবং উত্তরে বিশাল আল বোরজ পর্বতমালা এবং পর্বতের ওপারেই কাস্পিয়ান সাগর তীরবর্তী নয়নাভিরাম মাজেন্দারান প্রদেশ। আর পশ্চিমে হলো কেন্দ্রীয় প্রদেশ তেহরান। গরমসার জেলাটি বিখ্যাত উন্নত মানের খোরবুজা, ডুমুর,আনার ও তুলা উৎপাদনের জন্য। ১৯৯০ সালে ইরান থেকে চলে আসার জানতে পারি জেলার দক্ষিণ ভাগে বড় ধরণের একটি বিমান ঘাঁটি নির্মিত হয়েছে।

 

ড. রুহানীর সাথে সাক্ষাতের পূর্বে তাঁর সাথে আমার কোন পরিচিতি ছিল না। তার নামও আগে শুনেনি। ড. হাসান রুহানীর সাথে  প্রায় ৫ -৬ ঘন্টা কাটানো কালে আদৌ বুঝতে পারিনি এ ব্যক্তিটি ইরানের প্রেসিডেন্ট হবেন এবং ইতিহাসে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা পাবেন। সেরূপ ধারণা না থাকায় হয়তো ভালই হয়েছে। কারণ, সেরূপ ধারণা থাকলে হয়তো আমাদের কয়েক ঘন্টার আলোচনা এতটা খোলামেলা ও স্বাভাবিক হতো না। আমাদের আলোচনা হয়েছিল একই সমতলে, কে কত বড় তা নিয়ে অন্তত আমার মনে কোন ধারণাই আসেনি। হয়তো তার মনেও নয়। সম্ভবত সে কারণে আমি যেমন উনার সাথে নিঃসংকোচে কথা বলেছি, তেমনি উনিও বলেছেন। সেদিন উনার মাঝেও কোনরূপ কৃত্রিমতা বা অহংকার দেখিনি। ক’দিন আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফার্সিতে দেয়া তাঁর ভাষণটি মনযোগ সহকারে শুনলাম। বহু দেশের বহু প্রেসিডেন্ট এবং বহু প্রধানমন্ত্রীই জাতিসংঘে ভাষন দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামাও দিয়েছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে এবার সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব পেয়েছে ড. রুহানীর ভাষণ। আল জাজিরা তারা পুরা ভাষণটি প্রচার করেছে। শুধু আল জাজিরা নয়, বিবিসিসহ বিশ্বের নানা গুরুত্বপূর্ণ টিভি চ্যানেল তাঁর ভাষণের উপর বিভিন্ন রাজনৈতীক বিশেষজ্ঞদের মন্তব্যও প্রচার করেছে। সবাই এ ব্যাপারে একমত যে প্রেসিডেন্ট রুহানীর বক্তৃতার মাঝে ছিল কুটনীতি-সুলভ প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রনায়ক-সুলভ দুরদৃষ্টি যা সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদী নেজাদের বক্তৃতায় থাকতো না। জনাব আহমেদী নেজাদের আগে আয়াতুল্লাহ রাফজানজানি ও মুহাম্মদ খাতেমী যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন ড. রুহানী ছিলেন তাঁদের ইরানের সেক্যুরিটি বিষয়ক পরামর্শদাতা। ইরানের পারমানবিক অস্ত্র নিয়ে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানী -এ তিন ইউরোপীয় দেশের সাথে তিনিই ইরানের পক্ষ থেকে বৈঠক করতেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল অবধি ১৬ বছর যাবত তিনি ছিলেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিক্যুরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি।

 

ড. রুহানীর সাথে আমার সাক্ষাতের একটি ক্ষুদ্র পঠভূমিকা আছে। ইরানে আমার অবস্থান তখন একমাসও হয়নি। সে সময় কিছু প্রয়োজনীয় কাজে আমাকে সেমনান প্রদেশের হেলথ ডাইরেক্টরের অফিসে যেতে হয়। কাজ সেরে বিকেলে বাস যোগে কর্মস্থলে ফেরার চিন্তা করছি। এমন সময় আমার এক ইরানী বন্ধু বল্লেন, “বারাদার (ভাই), আমাদের শহরের এমপি সাহেব এখনই তেহরানের দিকে রওয়ানা দিচ্ছেন। আপনি বাসে না গিয়ে উনার গাড়ীতে যান। উনার গাড়ীতে জায়গাও আছে।” পরামর্শটি আমার জন্য খুবই ভাল মনে হল। সময় মত বাস পাওয়ার ঝামেলা বড় ঝামেলা। সেমনান থেকে গরমসারের কোন বাস সার্ভিস নাই। বাস নিতে হয় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে দূরপাল্লার চলন্ত বাস থামিয়ে। অনেক সময় ঘন্টা খানেক লেগে যেত এরূপ চলন্ত বাসে জায়গা পেতে। সাধারনত এ বাসগুলো মাশহাদ, নিশাপুর, সবজাভার বা অন্যান্য দূরবর্তী শহর থেকে সেমনান ও গরমসারের পথ ধরে তেহরানমুখী ছুটতো। ফেরার পথে এমপি’র জিপে জায়গা হবে সেটি ছিল আমার জন্য খুবই আনন্দের বিষয়।তবে আমার কাছে আনন্দের মূল কারণটি শুধু বাস পাওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া নয়, বরং একজন এমপি’র সাথে কিছু সময় কাটানোর।

 

আমার ইরানী বন্ধুটিই আমাকে এমপি সাহেবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ইরানে পৌছানোর পর যে কয়েক ইরানীর সাথে আমার পরিচয় ঘটে সে তাদেরই একজন। ড. রুহানী সাহেব তাঁর স্ত্রী ও বাচ্চাদের নিয়ে তেহরান যাচ্ছেন। বাচ্চা নিয়ে তাঁর স্ত্রী বসলেন পিছনের ছিটে। এমপি সাহেব এবং আমি বসেছি মাঝের সারিতে। চেহরাসুরত ও লেবাস দেখে বুঝতে বাঁকি থাকলো না তিনি একজন আলেম। তাঁর চেহারায় তখনও তারুন্য ও মুখে মিষ্টি হাঁসি। মাথায় শিয়া আলেমদের ন্যায় পাগড়ী। তিনি আমার সাথে ইংরাজীতে কথা বলা শুরু করলেন। উচ্চারন আমেরিকান এ্যাকসেন্টের এবং সুন্দর বিশুদ্ধ ইংরাজী। বিস্মিত হলাম,একজন আলেম এরূপ ইংরেজী শিখলেন কোত্থেকে? ভাবলাম,আমাদের দেশের ক’জন আলেম এরূপ ইংরেজীতে কথা বলতে পারেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারিরাই বা ক’জন পারেন? তাদের অনেকে তো শুদ্ধ বাংলাও বলতে পারেন না। যাহোক যাত্রা পথে আমাদের আলোচনায় মাঝে ভাষার আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকলো না। সেমনান থেকে গরমসার প্রায় দুই ঘন্টার যাত্রাপথ। কিন্তু সে দুই ঘন্টায় মাঝে আমাদের আলোচনায় সম্ভবত দুই মিনিটও ছেদ পরিনি। ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি জ্ঞানের অন্যান্য রাজ্যেও যে তার পদচারণা আছে সেটি সেদিন সহজেই বুঝতে পেরেছিলাম।

 

আমাদের আলোচনার কোন নির্দিষ্ট বিষয় ছিলনা। আলাপ হচ্ছিল নানা বিষয়ে। বিশেষ করে বিপ্লব পরবর্তী অবস্থা ও ইরানের সমস্যা নিয়ে। কথা হচ্ছিল বাংলাদেশের সমস্যা নিয়েও। আলাপ হচ্ছিল মুসলিম বিশ্বের অনৈক্য, সাম্রাজ্যবাদের গোলামী ও পশ্চাদপদতা নিয়ে। কথা হচ্ছিল বিপ্লব বিরোধীদের এজেন্ডা নিয়েও। তিনি প্রচন্ড অমায়ীক ও মিষ্টভাষী। মনে হয়েছিল তিনি একজন ভাল মানের বুদ্ধিজীবীও। তিনি সেমনান শহরের এমপি হলেও তার পৈত্রীক নিবাস সেমনান থেকে প্রায় ১৫ মাইল দূরর সোরখে নামক এক ছোট্ট শহরে। এ শহরটি সেমনান থেকে তেহরান যাওয়ার যাত্রা পথেই পরে। সোরখে শহরটি দেখে মনে হয় এটি মরুদ্যান। গাছপালাহীন দীর্ঘ ধূসর মরুভূমি অতিক্রম কালে এ শহরটি তার সবুজ গাছপালা,ক্ষেতখামার আর ঘরবাড়ি নিয়ে পথের মাঝে হটাৎ করে হাজির হয়। তখন মনটাও যেন রুক্ষ ভাব থেকে হটাৎ জেগে উঠে। সবুজের স্পর্ষে মানুষের মন যে কতটা প্রবল আবেগে আন্দোলিত হয় সেটি এরূপ মরুদ্যানগুলো দেখলে বুঝা যায়। সম্ভবত ইরানের এরূপ মরুদ্যানগুলোতেই সেদেশের বিখ্যাত কবিদের জন্ম। বায়ুর মাঝে বসবাসে বায়ুর কদর বুঝা যায় না, তেমনি ছায়া ঢাকা,পাখি ডাকা সবুজ শ্যামল দেশে যাদের বসবাস তারাও প্রকৃতির অপরূপ রূপ দেখে এতটা পুলকিত হয় না। কিন্তু মরুভূমির দেশে প্রতিটি বৃক্ষ,প্রতিটি ফুল ও ফল,প্রতিটি গুল্মলতা এবং প্রতিটি ঝরণা অপরূপ সাজসজ্জা ও অলংকার মনে হয়।পবিত্র কোরআনে জান্নাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহতায়ালাও তাই সেগুলির বর্ণনা বার বার পেশ করেছেন। পবিত্র কোরআনের সে বর্ণনায় মরুবাসী আরবগণ যে দারুন ভাবে আন্দোলিত হতো তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? সেটি আমি নিজ মনে তীব্রভাবে প্রথম অনুভব করেছি যখন গরমসারের রুক্ষ কর্মস্থল ছেড়ে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা কাস্পিয়ান সাগর উপকূলবর্তী গিলান বা মাজেন্দারান প্রদেশে বেড়াতে গেছি। সে এক তীব্র অনুভূতি।

 

ইরানের সর্ববৃহৎ মরুভূমি দাশতে কবীরের বিশাল উত্তর ভাগ জুড়ে সেমনান প্রদেশ। এ প্রদেশের আর দুটি জেলা হলো দমঘান ও শাহরুদ। দমঘান বিখ্যাত পেস্তা উৎপাদনের জন্য। এ দাশতে কবীরের তাবাস’য়েই ১৯৭৯ সালে কয়েকটি মার্কিন হেলিকপ্টার তার আরোহী কমান্ডোদের নিয়ে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এ ঘটনাটি ঘটে আমার ইরানে পৌছার আগেই। পত্রিকায় দেখিছি বিধ্বস্ত হেলিকপ্টার ও তার দগ্ধ আরোহীদের বীভৎস ছবি। জিমি কার্টার তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ইরানী ছাত্রদের হাত থেকে দূতাবাসের জিম্মি মার্কিনীদের উদ্ধারের লক্ষ্যে এটি ছিল মার্কিন প্রশাসনের এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এটি ব্যর্থ হওয়ায় কার্টারের দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনী বিজয়টিও ব্যর্থ হয়ে যায়। তিনি বিপুল ভোটে পরাজিত হন রোনাল্ড রেগানের কাছে।

 

ড. রুহানী বল্লেন, চলার পথে তিনি তাঁর সোরখের পৈত্রিক বাড়ীতে কিছুক্ষণের জন্য থামবেন। আমাকেও অনুরোধ করলেন, আমিও যেন কিছুক্ষণ বসি। তার পিত্রালয়ের গৃহটি কাদামাটির এবং অনেক কালের পুরনো। কোন বিলাসিতা নেই। কোনরূপ চাকচিক্য বা জাঁকজমকও নেই। নেই কোন টেবিল চেয়ার বা সোফাসেট। মেঝেতে দেয়াল থেকে দেয়াল অবধি কার্পেট। এমন কার্পেটই ঘরের চেহারা পাল্টে দেয়। আমি গ্রামের কৃষকের বাড়ীতেও এমন কার্পেট দেখিছি। কোন চেয়ার টেবিল নেই। দেয়ালের সাথে লাগোয়া ঠ্যাস-বালিশ। ফার্সিতে বলে পুশতি। পুশত হলো মানুষের পিঠ। এ বালিশগুলোতে পিঠ ঠ্যাকানো হয় বলেই হয়তো বলা হয় পুশতি। সবাই দেয়াল ঘেষে কার্পেটের উপর বসে। ইরানে যত বাড়ীতে গেছি, দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া সর্বত্র দেখেছি একই চিত্র। মনে হল, এটিই ইরানের রীতি। দেখলাম ড. রুহানী সাহেবের পরিবারের অনেকেই তাঁর আগমনের জন্য অপেক্ষায়। আমরা সবাই বসার একটি ঘরে চারপাশ ঘিরে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলাম। মাঝে বিছানো হলো দস্তরখানা। ফার্সিতে দস্তরখানকে বলা হয় সোরফে। জনাব রুহানীর পিতা ও তার ভাইয়েরাও আসলেন। তাদের সামনে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো। সবাই আমাকে খোশআমদেদ বললেন, কিছু প্রশ্নও করলেন। দোভাষীর কাজ করছিলেন জনান রুহানী। জনাব রুহানীর পিতা হাজি আসাদুল্লাহ ফরীদুন একজন ধর্মভীরু ব্যক্তি,স্থানীয় বাজারে তাঁর মসলাপাতির দোকান। ব্যবসার পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতেও তার গভীর আগ্রহ। শাহ-বিরোধী ও ইসলামপন্থি হওয়ায় শাহের আমলে তাঁকে বহুবার গ্রেফতার করা হয়। তিনি প্রথম গ্রেফতার হন ১৯৬২ সালে।

 

ড. হাসান রুহানী ধর্মীয় শিক্ষার শুরু সেমনানের এক মাদ্রাসায়। এরপর তিনি কোম নগরীতে যান। তৎকালীন বড় বড় আয়াতুল্লাহদের কাছে তিনি শিক্ষা লাভ করেন। ইমাম খোমেনী তখন প্যারিসে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। তখনও তাঁকে ইমাম বলা হতো না। তিনি পরিচিত ছিলেন আর দশ জন আয়াতুল্লাহর ন্যায় একজন আয়াতুল্লাহ রূপে।আয়াতুল্লাহ খোমিনীর জ্যেষ্ঠ পুত্র মোস্তাফা খোমেনী শাহের গুপ্ত ঘাতকদের হাতে শহীদ হোন। তার মৃত্যু বার্ষিকী উদযাপনের আয়োজন হয়েছিল আরক মসজিদে। সে জলসায় এ তরুন যুবক হাসান রুহানীই আয়াতুল্লাহ খোমিনীর নামের সাথে প্রথম ইমাম শব্দটি যুক্ত করে দেন।এরপর থেকে অন্যরাও তাঁকে ইমাম বলা শুরু করে। শিয়াদের কাছে ইমাম খেতাবটি কোন মামূলী বিষয় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদাপূর্ণ খেতাব। কাউকে ইমাম বলার সাথে সাথে তাঁর প্রতি আনুগত্যের বিষয়টিও এসে যায়। তখন থেকেই ইমাম খোমিনী অন্যান্য আয়াতুল্লাহদের থেকে অধিক মর্যাদাবান ধর্মীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। কোনরূপ নির্বাচন বা রেফারেন্ডাম ছাড়াই এভাবে স্বীকৃতি ও বৈধতা পায় তাঁর নেতৃত্ব। এভাবে ইরানের ইতিহাসের সে গুরুত্বপূর্ণ লগ্নটিতে জনাব হাসান রুহানী এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করেন। তখনও শাহের রাজত্ব। তার অতি কুখ্যাত সেক্যুরিটি বাহিনীর নাম ছিল  সাভাক। শুধু ইমাম খোমেনীর পুত্রই নন, ডক্টর আলী শরিয়তির ন্যায় বহু গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী ব্যক্তি সাভাকের খুনিদের হাতে গুম হন। সাভাকের হিটলিস্টে জনাব রুহানীর নাম থাকায় আয়াতুল্লাহ বেহেশতী ও আয়াতুল্লাহ মোতাহারীর ন্যায় নেতাগণ জনাব রুহানীকে ইরান ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর পরামর্শ দেন।

 

জনাব রুহানীর পৈতীক বাড়ীতে আমার অভিজ্ঞতা ভান্ডারে নতুন কিছু যোগ হলো। আমাদের সামনে আনা হোল ফলমূল ও চা। এই প্রথম দেখলাম ফলের ঝুলিতে শসা। শসা ইরানে ফলের মর্যাদা পেয়েছে। বাংলাদেশে জাংলায় ধরা বিশাল শসার তুলনায় এ শসাগুলো সরু ও ছোট। তবে স্বাদ অভিন্ন। বুঝতে বাঁকি থাকলো না, ড. রুহানী অতি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। একই অবস্থা সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. আহমদী নেজাদের। আহমেদী নেজাদের ছোট্ট বাসাতেও কোন খাটপালং বা সোফা-টেবিল নাই। মেঝেতে বিছানা পেড়ে ঘুমোন। গণতন্ত্রের অর্থ তো এরূপ সৎ ও প্রতিভাধর যোগ্য মানুষদের জন্য ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে উঠার জন্য পথ করে দেয়া। কিন্তু সেটি যখন জিম্মি হয়ে পড়ে কোন মৃত নেতার অযোগ্য সন্তান বা স্ত্রীদের হাতে তখন কি তাকে গণতন্ত্র বলা যায়? জনগণও যখনসে জিম্মিদশাকে নিয়ে গর্ব করে এবং সেটিকে গণতন্ত্র বলে চিৎকার করে তখন কি সে জনগণকে গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি বলা যায়? এরূপ পরিবারতন্ত্রের সাথে রাজতন্ত্রের পার্থক্য কোথায়? রাজতন্ত্রেও তো রাজার পাগল বা দুর্বৃত্ব পুত্র বা কন্যা রাজা বা রানী হওয়ার সুযোগ পায়।

 

ড. রুহানীর পিতার বাড়ীতে প্রায় ঘন্টা খানেক অবস্থানের পর আবার আমাদের যাত্রা শুরু হলো। সারা পথ ধরে শুরু হলো আবার বিবিধ বিষয়ে আলোচনা। উনার থেকে জানতে পারলাম, আমার কর্মস্থল গরমসারেও তিনি যাত্রা বিরতি করবেন। বললেন, সেখানকার জামে মসজিদে তাঁর বক্তৃতার পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার হাতে সময় হবে কিনা মসজিদের সে জলসায় থাকার। ঐ রাতে হাসপাতালে আমার কোন ডিউটি ছিল না। অতএব রাজী হয়ে গেলাম। তিনিও খুশি হলেন। মাগরিবের সময় আমরা মসজিদে গিয়ে পৌঁছলাম। মাগরিবের নামাজের পর তাঁর সভা। তিনি ফার্সীতে বক্তৃতা দিলেন। সে বক্তৃতা পুরাপুরি বুঝে উঠার মত ফার্সি তখনও আমি শিখে উঠতে পারিনি। ইরানে রাজনৈতিক জলসাগুলো কোন ময়দানে হয় না, মসজিদেই হয়। মসজিদই ইরানের ধর্ম, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামজিকতার কেন্দ্রবিন্দু। নবীজীর আমলেও সেটিই ছিল রীতি। মসজিদ ভিন্ন তখন রাজনীতি চর্চার অন্য কোন প্রতিষ্ঠানই ছিল না। সাহাবায়ে কেরামদের আমলেও ছিল না। অথচ সেটি হতে দিতে রাজী নয় সেক্যুলারিস্টগণ। মসজিদে রাজনীতি চর্চাকে তারা বলে ইসলাম থেকে বিচ্যুতি। বলে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার। অথচ ইসলামের শিক্ষা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নয়,বরং ইসলামের শরিয়তি বিধানসহ সকল বিধিবিধানকে দেশের রাজনীতি, আদালতে ও প্রশাসনে পূর্ণাঙ্গ ভাবে মেনে চলা। অর্থাৎ রাজনীতির পরিপূর্ণ ইসলামীকরণ।সেটিই তো নবীজী (সাঃ)র শিক্ষা। ইসলামের বিধিবদ্ধ বিধানকে রাজনীতিতে পূর্ণ ভাবে মেনে না চললে কি ইসলাম পালন হয়? আর সেটি করতে হলে রাজনীতির চর্চাও মসজিদ থেকেই শুরু করতে হয়। কারণ মসজিদই হলো আল্লাহর দ্বীনের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, সে সাথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও। কিন্তু সেক্যুলারিস্টদের এজেন্ডা শুধু রাষ্ট্রের উপর তাদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা নয়, বরং মসজিদের উপর দখলদারিও। তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক মসজিদগুলো দখলে নিয়েছিল সেখানে সরকারের বেতনভোগী ইমামদের বসিয়ে। ধর্মপ্রচারে সেসব সরকারি ইমামদের কোন স্বাধীনতা ছিল না, বরং অর্পিত দায়ভারটি ছিল সরকারের পক্ষ থেকে ছাপানো খোতবা জুম্মার নামাজে পড়ে শোনানো। ইসলাম চর্চার ক্ষেত্রে সেক্যুলারিস্টগণ যে কীরূপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় এ হলো তার নমুনা। বিলেতে দেখছি রাজনীতির চর্চা এদেশের চার্চে হয় না। সেটি হয় পাবে -যা আসলে মদ্যশালা। প্রতিগ্রাম ও প্রতিমহল্লায় রয়েছে মদ্যশালা। মানুষ এখানে শুধু মদ খেতেই আসে না, এখানে বসে টিভিতে খেলা দেখে, ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে, রাজনীতি নিয়েও বিতর্ক করে। এমপিগণ এ মদ্যশালায় গিয়ে মানুষের সাথে কথা বলে। এভাবে তারা জনসংযোগ ও নির্বাচনি জলসা করে। এটিই ব্রিটিশ রাজনীতির সেক্যুলারিজম। তাদের রাজনীতিতে চার্চের যেমন স্থান নেই, তেমনি স্থান নেই ধর্মের। কিন্তু সেটি তো ইসলামের শিক্ষা নয়। খৃষ্টান ধর্ম থেকে ইসলাম ভিন্নতর শুধু আক্বিদা-বিশ্বাস ও ইবাদতের ধরণে নয়, বরং রাজনীতিতের ইসলামের প্রয়োগের ক্ষেত্রেও।

 

গরমসারের মসজিদে ঢুকে দেখলাম মসজিদের দেয়ালে অনেক পোস্টার। সেগুলির অধিকাংশই মূলত ইমাম খোমেনীর উক্তি। তেমন বহু উক্তি ক্যালিগ্রাফির ঢংয়ে ইরানের রাস্তাঘাটে শত শত দেখেছি। একই চিত্র দেখেছি ইরানের অন্যান্য মসজিদেও। মসজিদের পুরা মেঝে জুড়ে বিছানো অতি দামী দামী কার্পেট। অবাক হলাম মসজিদের গায়ে লটকানো ফটো দেখে। সেখানে শোভা পাচ্ছে ইমাম খোমিনীর ছবিও।দেখলাম জায়নামাজে বসে অনেকে চা খাচ্ছে। ইরানীরা চা খায় দুধ ছাড়া এবং চিনির টুকরো ভিজিয়ে ভিজিয়ে। চা বানানোর জন্য মসজিদের এক রুমে আলাদা আয়োজনও আছে। চা বানানোর সে বিশাল পাত্রটিকে বলা হয় সামাভার। সে পাত্রে তৈরী চা ভলিন্টিয়ারগণ সমবেত মুসল্লিদের মাঝে ফ্রি বিতরণ করছে। দেখলাম কেউ কেউ আবার ধুমপানও করছে। ইমাম খোমেনী তখন জোরে শোরে শিয়া-সূন্নীর উর্দ্ধে উঠে মুসলিম একতা ও ভাতৃত্বের কথা বলছেন। ইমাম খোমেনীর একতার সে বানী পাশ্চাত্যের কাছে ভাল লাগেনি। ভাল লাগেনি সৌদি বাদশাহদের ন্যায় মুসলিম দেশের স্বৈরাচারি শাসকদের কাছেও। কিন্তু মসজিদে বসে আমার মনে হল, ঢাকা, করাচী, লাহোর ও কাবুলের মুসল্লীরা যদি মসজিদের ভিতরে এরূপ ছবি টানানো ও ধুমপানের খবর জানতে পারে তবে শিয়া-সূন্নীর একতা বিনষ্টের জন্য কি কোন অমুসলিম বা বিদেশী শত্রুর প্রয়োজন পড়বে?

 

ড. রুহানীর বক্তৃতা শেষ হলো। বক্তৃতার পর শহরের গণ্যমান্য লোকদের সাথে কিছুক্ষণ বসলেন। তারপর প্রস্থানের উদ্যোগ নিলেন। আমাকে বল্লেন, রাতে গরমসার শহরেই তাঁর দাওয়াত আছে। আমাকেও তিনি দাওয়াত দিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আমি যেতে রাজী আছি কিনা। আমার পরিবার তখনও ইরানে পৌঁছেনি, হাসপাতালের বাসায় একা একা থাকি। ভাবলাম, বাসায় ফিরে একাকী কি করবো? ড. রুহানীর সাথে থাকায় ইরানী পরিবার,সমাজ ও রাজনীতিকে ভিতর থেকে দেখার যে সুযোগ পেলাম সেটি আমার কাছে অতি মূল্যবান মনে হল। বহু অর্থ বহু সময় ব্যয়েও ক’জন এরূপ দেখার সুযোগ পায়? তাছাড়া বিনা কারণে দাওয়াত অগ্রাহ্য করাও তো সূন্নতের খেলাপ। অতএব রাজী হয়ে গেলাম। অতিশয় অবাক হলাম ড. রুহানীর মেজবানের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে। ড. রুহানীকে অভ্যার্থনা জানানোর জন্য ঘর থেকে তাঁর মেজবানগণ বেরিয়ে এলেন। জনাব রুহানী তাঁর সমবেত আত্মীয়দের মাঝে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে পরিচয় করিয়ে দিলেন এই বলে, ‘ইনি আমার ফার্স্ট কাজিন’। তারপর বল্লেন, “ইনি এ শহরের নাপিত।”  আমি তো অবাক। সে এক বিশাল কালচারাল শক। আমি ভদ্রলোককে চিনতাম। কারণ, আমি গরমসার শহরে আসার পর তাঁর দোকানে চুল কাটাতে গেছি। কিন্তু সে যে তাঁর কাজিন সেটিই আমার বিস্ময়ের কারণ। তাঁর কাজিন যে নাপিত সেটি বলতে ড. রুহানীর সামান্যতম সংকোচও হলো না। ভাবলাম, আমার দেশে হলে ব্যাপারটি কেমন হতো? কেউ কি তার এমন আত্মীয়কে পরিচয় করিয়ে দিত? তাছাড়া প্রশ্ন হলো, কোন মুসলমান সন্তান কি নাপিতের পেশা গ্রহন করতো? বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষে পথে বসে ভিক্ষা করতে লজ্জা করে না, কিন্তু ক’জন পেশা রূপে নাপিতের কাজ করতে রাজী? বাংলাদেশে এ কাজ করে নিম্মশ্রেনীরা হিন্দুরা। মুসলমানদের মধ্যে যারা এ কাজটি করে তারা অবাঙালী বিহারী। ইসলামে শ্রেনীভেদ, জাতিভেদ ও বর্ণভেদ হারাম। হারাম হলো কারো কোন কাজ বা পেশাকে ঘৃনা করা। আর সবচেয়ে ঘৃনার কাজ হল ভিক্ষা করা। অথচ বাঙালী মুসলমানগণ নিজেদের ধর্মভীরু রূপে গর্ব করলেও ধর্মের এ মৌল শিক্ষাটিকে তাদের আচরণে স্থান দেয়নি। তাদের চেতনার মাঝে এখনও রয়ে গেছে হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার। ফলে এখনও রয়ে গেছে হিন্দুদের ন্যায় ডোম, মেথর, নাপিত, মুচীর কাজকে ঘৃনা করার সংস্কৃতি। অথচ ইরানের কোন গ্রামে বা মহল্লায় কোন ডোম-মেথর নাই। সবাইকে নিজ নিজ পায়খানা নিজ হাতে পরিস্কার করতে হয়। অথচ বাংলাদেশের চিত্রটাই ভিন্ন।  পাড়ায় পাড়ায় ভিক্ষা করবে তবুও কোন বাঙালী মুসলমান এসব কাজকে নিজের পেশা রূপে গ্রহন করবে না। যেন একাজ করার জন্যই জন্ম নিয়েছে নিম্ন শ্রেণীর অচ্ছুৎ হিন্দুরা। হিন্দু সংস্কৃতির সাথে বাঙালী মুসলমানের সংস্কৃতি এখানে একাকার হয়ে গেছে। অথচ একটি জনগোষ্ঠির সংস্কৃতি থেকেই পরিচয় মেলে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসটি জনগণের চিন্তা ও চরিত্রে কতটা পরিশুদ্ধি বা সংস্কার এনেছে সেটির।তাই জনগণের ঈমানের পরিমাপটি পাওয়া যায় তাদের সংস্কৃতি থেকে।এমন হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি নিয়ে কেউ ইরানে গেলে ‘কালচারাল শক’এর শিকার না হয়ে উপায় নেই। ইসলামি সংস্কৃতির মধ্যে যাদের বসবাস তারাও বিস্মিত হবে বাংলাদেশে এসে।

 

ড. হাসান রুহানী যে শুধু মাদ্রাসা-শিক্ষিত আলেম -তা নয়। তিনি ১৯৭২ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জুডিশিয়াল ল’র উপর স্মাতক ডিগ্রি নিয়েছেন। এবং কন্সটিটিউশনাল ল’এর পিএইচড করেছেন গ্লাসগোর ক্যালিডোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেটি ১৯৯৯ সালে -যখন তিনি কাজ করছিলেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সেক্যুারিটির সেক্রেটারির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ পদে। সে বছরেই তথা ১৯৯৯সালে তিনি নির্বাচিত হন ইরানের অতি মর্যাদাবান প্রতিষ্টান মজলিসে খুবরাগান বা এক্সপার্ট কাউন্সিলের সদস্য রূপে। এ মজলিসের কাজ হলো পার্লামেন্টে গৃহীত আইনের উপর নজরদারি রাখা। পার্লামেন্টের সদস্যদের আইন প্রণোয়নের অধিকার থাকলেও আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধাচারনের কোন অধিকার নেই। পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র থেকে ইসলামের শুরাভিত্তিক গণতন্ত্রের এখানেই মূল পার্থক্য। জনাব রুহানী পার্লামেন্টের ডিফেন্স ও পরারাষ্ট্র নীতি বিষয়ক কমিটির প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি যে শুধু রাজনৈতীক অঙ্গণের যোদ্ধা তা নয়,ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনেও অস্ত্র ধরেছেন। অংশ নিয়েছেন ইরাকের অধিকৃতি থেকে খুররম শহর নামক নগরটিকে আযাদ করার যুদ্ধে।সে যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তিনি সর্বোচ্চ “নাছর” পদকটি লাভ করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল অবধি ইরাক-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি সশস্ত্র বাহিনীর ডিপুটি কমান্ডারও ছিলেন। লক্ষণীয় হলো, এরূপ নানা ব্যস্ততার মাঝে তিনি লেখাপড়ার কাজও চালিয়ে গেছেন। মনযোগ দিয়েছেন দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধনেও। তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়েরও একজন ট্রাস্টি। অংশ নিয়েছেন গবেষণার কাজেও। ১৯৯২ সাল থেকে কাজ করছেন সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক রিসার্চের প্রধান রূপে। কি শিক্ষা, কি রাজনীতি, কি যুদ্ধ, কি কুটনীতি, কি গবেষণা -সর্বক্ষেত্রে তিনি বিচরণ করেছেন সর্বশক্তি নিয়ে।এরূপ ব্যক্তিগণ যখন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয় তখন সে দেশ যে পৃথিবীর মঞ্চে নিজের জন্য গৌরবময় স্থান করে নিবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? বাংলাদেশের অর্ধেক জনশক্তি নিয়ে এজন্যই ইরান আজ  গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

 

“ইনসানে কামেল” ইসলামে একটি বহুল প্রচলিত প্রতিশব্দ। কামেল শব্দের অর্থ পরিপূর্ণ। শিক্ষা, কর্ম ও ইবাদতের অঙ্গণে জীবনকে শুধু একটি ক্ষেত্রে সীমিত রাখলে সে কামালিয়াত বা পরিপূর্ণতা আসে না। সে জন্য তাকে যেমন নানা বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হয়,তেমনি জীবন যুদ্ধের নানা রণাঙ্গণে অংশও নিতে হয়। এভাবেই ঈমানদারের জীবনে কামালিয়াত বা পূর্ণ আসে। এটিই নবীজীর মহান সূন্নত। নবীজী (সাঃ)শুধু সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ আলেমই ছিলেন না, ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দায়ী বা ধর্মপ্রচারকও। ধর্মের বানী নিয়ে বহু জনপদে ঘুরেছেন। তিনি ছিলেন রণাঙ্গনের জেনারেল। ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ, ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট রাষ্ট্রনায়ক। ছিলেন আদর্শ পিতা, আদর্শ প্রতিবেশী ও আদর্শ ব্যবসায়ী। যারা নবীজী (সাঃ)র আদর্শের অনুসারি হতে চায় তাদের সামনে তাই বহুমুখি কাজে আত্মনিয়োগের বিকল্প নাই। সাহাবাগণের মধ্যে সে কামালিয়াত বা পূর্ণতা অর্জনের বাসনা ছিল প্রবল। ফলে সে সময় মুসলিম সমাজে নানামুখি উন্নয়ন ঘটেছে। তখন দেশে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যাই বাড়েনি,কৃষি, শিল্প,বিজ্ঞান ও সামরিক ক্ষেত্রেও বিপুল বিপ্লব এসেছে।উচ্চতর সভ্যতা তো এভাবেই নির্মিত হয়। ড.হাসান রুহানীর মাঝেও সে বাসনাটি যে অতি প্রবল ছিল সেটি বুঝা যায় তার শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের বহুমুখীতা দেখে। অথচ বাংলাদেশে কত আলেম সারা জীবন শুধু মসজিদের ইমামতি বা মাদ্রাসার শিক্ষাকতা করেই জীবনটি শেষ করছেন। ধর্মের লেবাসধারি অধিকাংশ মানুষ নিজেদের ধর্মকর্মকে সীমিত রেখেছেন শুধু নামাজ-রোযা ও হজ-যাকাতের মাঝে। দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে তারা যেমন মাঠে নামেন না, তেমনি আল্লাহর শরিয়তি বিধান আস্তাকুঁরে গিয়ে পড়লেও তা নিয়ে মাথা ঘামান না। তাদের জীবনে যেমন জিহাদ নেই, তেমনি ইসলামকে বিজয়ী করার কোন রাজনীতিও নাই। কোন জ্ঞানচর্চা বা বুদ্ধিবৃত্তিও নাই। আগ্রহ নাই নিজে শেখা ও অন্যদের শেখানোয়।বহু আলেমের অবস্থা তো এমন যে পয়সা না দিলে তারা মুখই খোলেন না। অথচ কোরআনের জ্ঞান বিতরণ করতে গিয়ে নবীজী (সাঃ)রকোন অর্থপ্রাপ্তি ঘটেনি। তাঁকে বরং কাফেরদের হাতে পাথর খেতে হয়েছে। এরপরও ভাবেন,তারা নবীজী (সাঃ)র সূন্নতের অনুসারি! প্রশ্ন হলো,এমন মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধিতে শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বও যদি ভরে যায় তবুও কি তাতে ইসলামের কোন বিজয় আসবে? কল্যাণ হবে কি মুসলমানের?

 

বিস্ময়ের বিষয় শুধু ড. রুহানীর প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্টৃত হওয়াটি নয়। বরং অধিক বিস্ময়ের বিষয় হলো যারা তাকে নির্বাচিত করেছে সে ভোটাদাতাদের রুচী, দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা। একটি দেশের জনগোষ্ঠির রুচী ও প্রজ্ঞা তো ধরা পড়ে তাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বা এমপিদের চরিত্র দেখে। যে দেশে চোরডাকাত, খুনি,গণতন্ত্র হত্যাকারি বাকশালী,ব্যাভিচারি, স্বৈরাচারি, মিথ্যুক ও দূর্নীতিপরায়নরাও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয় এবং জাতির পিতার আসন পায়,সে দেশের সাধারণ মানুষের অপরাধটিও কি কম? এমন দেশ বার বার দুর্বৃত্তদের দখলে যাবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? ডাকাত পাড়ায় কোন ভাল মানুষ সর্দার হতে পারে না। সে জন্য নিষ্ঠুর ডাকাত হওয়াটি জরুরী। এমন নিষ্ঠুর ডাকাত যখন গ্রামবাসীর ভোটে সর্দার নির্বাচিত হয় তখন কি সন্দেহ থাকে সে গ্রামবাসির চরিত্রের পচন নিয়ে? তাদের চরিত্রের পরিমাপে কি তখন আর কোন গজকাঠির প্রয়োজন হয়? বাংলাদেশ তো তেমনি এক দুর্বৃত্তকবলিত দেশ। এমন একটি দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে বার বার চ্যাম্পিয়ান হবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? গণতন্ত্রের অর্থ শুধু বার বার নির্বাচন নয়, বরং সেটি হলো যোগ্য মানুষদের নির্বাচনে জনগণের সামর্থ। সে সামর্থ ছাড়া গণতন্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য। বাংলাদেশের মানুষের সে সামর্থ কি আদৌ অর্জিত হয়েছে?

 

মানুষকে শুধু হিংস্র পশু,বিষধর শাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়কে চিনলে চলে না, তাকে ইসলামের শত্রু ও সমাজের দুর্বৃত্তদেরও চিনতে হয়। একটি দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয় এরূপ দৃর্বৃত্তদের চিনতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে। হিংস্র পশু,বিষধর শাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়ে ক’জন মারা পড়ে? কিন্তু দুর্বৃত্তগণ ক্ষমতা পেলে বিপদে পড়ে সমগ্র জাতি। মানুষ তখন পথেঘাটে গুম বা খুন হয়। লুন্ঠিত হয় দেশের অর্থভান্ডার।দেশ তখন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হয়। তখন নেমে আসে আল্লাহতায়ালার আযাব। তাই মহান আল্লাহতায়ালা এমন দুর্বৃত্তদের শুধু চেনাটাই ফরজ করেননি, তাদের নির্মূল করাটাকেও ফরজ করেছেন। ইসলামে জিহাদকে ফরজ করা হয়েছে তো সে লক্ষ্যেই। নির্মূলের সে কাজটি করতে গিয়েই তো শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছেন। গণতন্ত্র তো তখনই সফল হয়,যখন জনগণ সে সামর্থ পুরাপুরিটি অর্জন করে। তখন প্রাতিটি নির্বাচন ইসলামের শত্রু নির্মূলের কাজে ধারালো হাতিয়ার রূপে কাজ করে। খলিফায়ে রাশেদার আমলে তো সেরূপ গণতন্ত্রই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ফলে তখন রাজতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্র নির্মূল হয়েছিল এবং নির্বাচিত হয়েছিলেন সমাজের সবচেয়ে যোগ্যবান ব্যক্তিগণ।সেটি না হলে গণতন্ত্রের পথ ধরে হিটলার,মুজিব ও হাসিনার ন্যায় ফ্যাসিবাদী খুনিদের হাতে দেশ অধিকৃত হয়। তখন দেশে গ্যাস চেম্বার বা শাপলা চত্বরের গণগত্যা নেমে আসে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে গণদুষমণগণ বার বার নির্বাচিত হচ্ছে ও রাজপথ বার বার রক্তাত্ব হচ্ছে তো সে ব্যর্থতার কারণেই। ২৯/০৯/১৩