বিবিধ ভাবনা (৩১)

ফিরোজ মাহবুব কামা

১. ব্যর্থতার রেকর্ড

ঘরে আগুণ লাগলে বা ডাকাত পড়লে নিজেদের মধ্যে বিবাদ করা যায় না। দেরী্ও করা যায় না। অন্য সব কাজ ফেলে তখন যার যা সামর্থ্য আছে তা দিয়ে আগুণ থামাতে বা ডাকাত নির্মূলে নামতে হয়। এটিই সভ্য মানুষের গুণ। এভাবেই দায়িত্ববোধের পরীক্ষা হয়। কিন্তু পশুরা সে কাজ করে না। আগুণ দেখে তারা পালায় এবং ডাকাতের কাছে বিনা প্রতিবাদে আত্মসমর্পণ করে। এ পরীক্ষায় ফেল করলে তীব্রতর হয় ডাকাতীর আযাব। তখন আরো নৃশংসতর হয় ডাকাতি। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ সে পরীক্ষায় বহু বছর আগেই ফেল করেছে।

সভ্য মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদটি হলো তার স্বাধীনতা। পানাহার পশুরাও পায়; কিন্তু স্বাধীনতা পায় না। পশুদের তাই গলায় পরাধীনতার রশি নিয়ে বাঁচতে হয়। যে কোন সমাজে অতিশয় অসভ্য কর্ম হলো ভোটের উপর ডাকাতি। সম্পদের উপর ডাকাতি হলে মানুষ স্বাধীনতা হারায় না। কিন্তু ভোটের উপর ডাকাতি হলে মানুষও গরুছাগলের ন্যায় স্বাধীনতাহীন অসহায় জীবে পরিণত হয়। তাদেরকে তখন ডাকাতদের কাছে আত্মসমর্পণ নিয়ে বাঁচতে হয়। ভোটডাকাতগণই হলো সবচেয়ে অসভ্য, নিকৃষ্ট ও নৃশংস জীব। এবং বাংলাদেশে তাদের সংখ্যাটি বিশ্বে যে কোন দেশের চেয়ে বেশী। বাংলাদেশ অতীতে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের সকল দেশকে হারিয়ে ৫ বার প্রথম হয়েছে। নিঃসন্দেহে ডাকাতের সংখ্যাতেও তারা প্রথম হবে। এটি বাংলাদেশীদের ব্যর্থতার আরেক দলিল।

সভ্য মানুষেরা শুধু সম্পদের উপর ডাকাতি্‌ই রুখে না, রুখে দাঁড়ায় ভোটের উপর ডাকাতিও। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ সে ডাকাতি রুখতে ব্যর্থ হয়েছে। গরু-ছাগলের পালে শিকার ধরতে নেকড়কে বেগ পেত হয় না। ভোটডাকাতেরা তেমনি অবাধে ডাকাতি করে প্রতিরোধহীন জনগণের উপর। বাংলাদেশীদের ভোটের উপর প্রথম ডাকাতি হয় ২০১৪ সালের নির্বাচনে। সে নির্বাচনী ডাকাতিতে ১৫৩টি আসনে কোন নির্বাচনই হয়নি। এবং যেসব আসনে নির্বাচন হয়েছিল সেখানেও সুপরিকল্পিত ডাকাতি হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বাঁচায় রুচি থাকলে যে কোন সভ্য দেশের ন্যায় সেখানেও যুদ্ধ শুরু হতো। জনগণ সেদিন যুদ্ধে নামলে ২০১৮ সালের ন্যায় ভোটডাকাতিতে ভোটডাকাতগণ সাহস পেত না।    

২. বিরোধী দলের বিবেকহীনতা

দেশ সবার। ডাকাতদের হাত থেকে দেশ বাঁচানোর দায়িত্বটিও সবার। নীরবে বসে থাকলে ডাকাতের সাহস বাড়ে আরো বেশী ডাকাতি করার। ডাকাতগণ একতাবদ্ধ। তাই জনগণ কি বিভক্ত থাকতে পারে? বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলির মাঝে রয়েছ নানা মত ও পথ নিয়ে বহু মতভেদ। কিন্তু অন্ততঃ একটি বিষয়ে তারা একতাবদ্ধ হতে পারতো। সেটি ভোটডাকাতদের নির্মূলে। কিন্তু তারা একতাবদ্ধ হতে পারিনি। তারা বিভক্ত। ডাকাত তাড়াতে তারা ময়দানে নাই। এটিই তাদের বড় ব্যর্থতা। এটি তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতাও। এ ব্যর্থতা নিয়ে তারা দেশের কি কল্যাণ দিতে পারে? দেশে ডাকাত পড়েছে সেটি দেখেও যদি ডাকাত তাড়াতে না নামে -তবে তাদের যে কান্ডজ্ঞান ও বিবেক আছে সেটি বুঝা যাবে কি করে?

৩. যেদেশে ডাকাতেরা সন্মানিত হয়

প্রতিটি সভ্য দেশেই চোর-ডাকাতদের জেলে পাঠানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তারাই সন্মানিত। অথচ চোরডাকাতদের ঘরের চাকর-বাকারও বানানো যায়না। কিন্তু বাংলাদেশে ডাকাতই শাসক। ডাকাত সর্দারনীকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা হয়। ডাকাতকে সামনে বসিয়ে তার বয়ান শোনা হয়। এটি তো ডাকাতপাড়ার সংস্কৃতি। অথচ সে অসভ্য সংস্কৃতি আজ বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কিছু দালানকোঠা ও রাস্তাঘাট গড়ে কি অসভ্যতাকে ঢাকা যায়? 

ভোটডাকাতগণ সাধারণ চোরডাকাত নয়। তাদের অপরাধ অন্য ডাকাতদের চেয়ে লক্ষগুণ অধিক। সাধারণ ডাকাতেরা অর্থ লুট করে। অথচ ভোটডাকাতগণ ছিনতাই করে সমগ্র দেশ। দেশে চোরডাকাতদের শা্স্তি দেয়ার জন্য বহু শত আদালত রয়েছে। সে সব আদালতে বহুশত বিচারকও রয়েছে। দেশে পুলিশ বাহিনীও রয়েছে। বাংলাদেশে দেশ জুড়ে ভোটডাকাতি হলো। দেশবাসীও সেটি দেখলো। শিশুরাও সেটি জানলো। কিন্তু পুলিশ কাউকে ধরলো না; আদালতেও কোন বিচার হলো না। ফলে সে অপরাধে কারো কোন শাস্তি হলো না। কোন সভ্য দেশে কি এটি ভাবা যায়?

গৃহ যতক্ষণ ডাকাতের দখলে থাকে সে গৃহে শান্তিতে বসবাসের কথা ভাবা যায় না। তেমনি দেশ যখন ডাকাতদের দখলে যায় -শান্তি তখন হাওয়া হয়ে যায়। বাংলাদেশের মূল সংকট এখানেই্। তাই দেশে এখন একটাই যুদ্ধ, সেটি ডাকাত তাড়ানোর। এ যুদ্ধে বিজয়ের উপর নির্ভর করবে দেশের মানুষ সভ্য জীবন ফিরে পাবে কিনা সে বিষয়টি।

৪. ব্যর্থতা মুসলিম হওয়ায়

ছওয়াবের কাজ হলো ক্ষুধার্তের জন্য সামান্য খাবার পেশ করা। তেমনি অতিশয় ছওয়াব কাজ হলো জ্ঞানের ক্ষুধা দূর করতে জ্ঞানের কথা গুলো মানুষের সামনে লাগাতর পেশ করা। কেউ তা গ্রহণ না করলেও যে পেশ করবে সে ছওয়াব পাবে। সমাজ থেকে অজ্ঞতার অন্ধকার তো এভাবেই দূর হয়। মানব জীবনে সবচেয়ে বড় নেক কর্ম তো অন্ধকার সরানো। ইসলামে তাই নামায-রোযার আগে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করা হয়েছে।

মহান নবীজী (সা:)’র হাদীস: ঈমানদারের জীবনে দুই অবস্থা। হয় সে ছাত্র, নতুবা সে শিক্ষক। কোন তৃতীয় অবস্থা নাই। তাই শেখা ও শেখানো নিয়ে আমৃত্যু বাঁচাই হলো মুসলিম সংস্কৃতি। কখনো তাকে নামতে হয় শিক্ষকের ভূমিকায়, কখনো সে ভূমিকাটি হয় ছাত্রের্। যার জীবনে সে রকম ভূমিকা নাই, বুঝতে হবে তার মুসলিম হওয়ায় বিশাল ব্যর্থতা রয়ে গেছে। আজ মুসলিম বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানে যে পশ্চাতপদতা তার মূল কারণ মুসলিমদের মুসলিম হওয়ায় ব্যর্থতা।   

৫.অখাদ্যের বিপদ

যে খাদ্য পুষ্টি দেয় না -তা অখাদ্য। তাতে শরীরের পতন ঘটে। তেমনি যে বই চেতনায় ও চরিত্রে পুষ্টি জোগায় না –সেটিও ক্ষতিকর অখাদ্য। বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের মাঝে ঘুষ, সূদ, দুর্নীতি, ব্যভিচার ও নানারূপ চরিত্রহীনতা দেখে বলা যায় তারা চেতনা পুষ্টি পায়নি। বিদ্যাশিক্ষার নামে যেসব বই পড়ানো হয়েছে তাতে তাদের মগজে অখাদ্য ঢুকানো হয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্য দেখে বলা যায় -সে কি খায়। তেমনি চেতনা ও চরিত্র দেখে নির্ভূল ভাবেই বলা যায় -সে কি পড়ে।

 

৬. বাঁচছে ইসলাম ছাড়াই

বাংলাদেশীদের মূল সমস্যাটি হলো তারা ইসলাম থেকে বহু দূরে সরেছে। ফলে তারা আগ্রহী নয় নবীজী (সা:)’র ইসলামে ফিরে যেতে –যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ, জিহাদ, শুরা, বিশ্বমুসলিম ভাতৃত্ব। বস্তুত তারা বাঁচছে ইসলাম ছাড়াই। বাংলাদেশীদের মাঝে ইসলাম থাকলে ভোটডাকাত সরকারের নির্মূলে জিহাদ শুরু হতো। বিভক্তির বদলে একতা প্রতিষ্ঠা পেত। লাগাতর লড়াই হতো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে।

ইসলামের পথে থাকলে কখনোই ভারতীয় কাফেরদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে ভারতের শত্রু পাকিস্তানকে ভাংঙ্গতো না। এবং মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্র হত্যাকারি, বাকশালী স্বৈরাচারী ও প্রায় ৩০ হাজার মানুষের হত্যাকারি এক ভারতীয় দালালকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলতো না। জনগণের মাঝে ইসলাম বেঁচে থাকলে দেশ দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হতো না।

৭. মহান আল্লাহতায়ালা প্রতি ভালবাসার বিষয়

বাংলাদেশে আল্লাহতায়ালার আশেক এবং রাসূলের আশেক বলে অনেকেই নিজেদের জাহির করে। কিন্তু সেটি প্রচারের বিষয় নয়। কে কতটা মহান আল্লাহতায়ালাকে ভাল বাসে -সেটি তো খালি চোখে দেখা যায়। দেশ থেকে তাঁর সার্বভৌমত্ব বিলুপ্ত করা হলো এব্ং আদালত থেকে তাঁর শরিয়তী বিধানকে বিলুপ্ত করা হলো -অথচ তা নিয়ে মনে কোন ক্ষোভ সৃষ্টি হলো না এবং সে শরিয়তী বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য লড়াইয়ে নামলো না, সে ব্যক্তি নামাযী ও রোযাদার হতে পারে কি্ন্তু তার মনে যে শরিষার দানা পরিমান মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি ভালবাসা নাই –তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে? মহান আল্লাহতায়ালাকে ভালবাসার অর্থ তার বিধানকে ভালবাসা ও সে বিধানের বিজয় নিয়ে বাঁচা। কথা হলো, সে ভালবাসা জনগণের থাকলে কি তাঁর শরিয়ত বিলুপ্ত হতো?

৮. কেন এতো অনৈক্য?

আল্লাহতায়ার দ্বীনকে বিজয়ী করা ও তাঁকে খুশি করা যখন বাঁচার লক্ষ্য হয় তখন সে ব্যক্তি একতা গড়ার জন্য দিবারাত্র পেরেশান হয়। এমন এক পেরেশানীর কারণেই শতাধিক নবী একই সময়ে একই স্থানে প্রেরণ করলেও তাদের মাঝে কোন অনৈক্য হতো না।

কিন্তু রাজনীতির লক্ষ্য যখন নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয়স্বার্থ হাছিল হয়, তখন মুখে ইসলামের কথা বললেও তারা স্বার্থকেন্দ্রীক বিভক্তির পথ ধরে। তখন রাজনীতিতে লক্ষ্য হয় ক্ষমতায় ভাগ বসানো, দ্বীনের বিজয় নয়। ক্ষমতায় ভাগ বসানোর লক্ষ্যে তখন সেক্যুলারিস্টদের ন্যায় ইসলামের শত্রুদের সাথে কোয়ালিশন গড়াও তখন জায়েজ হয়ে যায়। বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের মাঝে অনৈক্যের মূল কারণ হলো এই স্বার্থপরতা।

৯. স্বৈরশাসনের নাশকতা

মানবের শ্রেষ্ঠ সামর্থ্যটি হলো নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য। এর বলেই উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয়। কিন্তু স্বৈরশাসকের বড় নাশকতাটি হলো সে সামর্থ্য নিয়ে জনগণকে স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠতে দেয়া হয়না। তখন চলে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ। দুর্বৃত্ত শাসকগণ দেয় নিজের দলীয দুর্বৃত্তদের স্বাধীনতা। তখন প্রতিষ্ঠা পায় শাসকপূজা। এবং দাপট বাড়ে আনুগত্যজীবীদের। চাটুকারীতা ছাড়া কোন বুদ্ধিবৃ্ত্তিক কর্ম্ ও সাহিত্যকর্ম গড়ে উঠে না।

ফলে ফিরাউনদের মত স্বৈরশাসকদের শাসনে বড় বড় পিরামিড নির্মিত হলেও কোন সভ্য মানুষ ও উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয়নি। স্বৈরশাসক মানেই অসভ্যতার আযাব্। শাসকের অসভ্যতা তখন দেশ জুড়ে অসভ্যতা বাড়ায়। সে অসভ্যতার আযাব চেপে বসেছে এখন বাংলাদেশীদের উপর। তাই স্রেফ কিছু রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা ও স্কুল-কলেজ নির্মাণ করে স্বৈরশাসনের অসভ্যতা থেকে বাঁচা যাবে না। সভ্য সমাজ নির্মাণের কাজও হবে না, সেজন্য অপরিহার্য হলো স্বৈরশাসনের নির্মূল। বাংলাদেশের মানুষ কতটা সভ্য ভাবে বাঁচতে আগ্রহী -তার পরীক্ষা হবে স্বৈরশাসন নির্মূলের এ লড়াইয়ে। ২৮/০২/২০২১।  




বাঙালী মুসলিমের বিরুদ্ধে ভারতের কেন এতো আক্রোশ এবং প্রতিরোধই বা কীরূপে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 দখলদারিটি ভারতের

বাংলাদেশে রাজনীতির খেলা শেখ হাসিনার হাতে নেই। রাজনীতির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনকালেই চাকর-বাকরের হাতে থাকে না; মনিবরা সব সময়ই সেটি নিজ হাতে রাখে। এমনকি একাত্তরেও আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেখ মুজিব বা দলের হাতে ছিল না। সেটিই সব সময়ই ছিল মুজিবের মনিব দিল্লির শাসকচক্রের হাতে। মুজিব রাজনীতির খেলা খেলেছে স্রেফ ভারতের শাসকচক্রের অনুগত সেবাদাস রূপে। সে কাজটি মুজিব বাংলাদেশ সৃষ্টির বহু পূর্ব থেকেই করে আসছিল এবং সেটি চালিয়ে গেছে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টে মৃত্যু অবধি। তবে মনিবরা যেহেতু তাদের খেলাটি খেলে চাকর-বাকরের সাহায্যে, ফলে তাদের কাছে চাকর-বাকরের গুরুত্ব থেকেই যায়। ভারতের কাছে মুজিবের যেমন গুরুত্ব ছিল, তেমনি গুরুত্ব রয়েছে হাছিনারও। এজন্যই চাকর-বাকরকে বাঁচিয়ে রাখাটি তাদের রাজনৈতিক কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ যে শতভাগ সত্য ছিল -সেটি আওয়ামী লীগ নেতা ও সে মামলার অপর আসামী লে.কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) শওকত আলী এবং অন্যন্যরাও স্বীকার করেছেন। ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনের চাপে পাকিস্তান সরকার মুজিবের বিরুদ্ধে আানা মামলা তুলে নিতে বাধ্য হলেও সে ষড়যন্ত্রে মুজিবের নির্দোষ থাকাটি প্রমাণিত হয়নি। তাছাড়া মামলা থেকে ছাড়া পেলেও ভারতের পক্ষ থেকে অর্পিত মিশন থেকে মুজিব এক ইঞ্চিও সরেনি। পাকিস্তানের জেল থেকে ফিরে শেখ মুজিব প্রথম জনসভা করেন রেস কোর্স ময়দানে -যা আজ সোহরোওয়ার্দী ময়দান। সেটি ছিলে ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারীতে। সেদিন তিনি বলেন, “স্বাধীনতার লড়াই ১৯৭১ থেকে নয় ১৯৪৭সালে শুরু করেছিলাম।” আমি নিজ কানে সে কথা শুনেছি। অথচ তার সে লড়াইয়ে কথা তিনি জনগণকে বলেননি। তবে নিশ্চয়ই বলেছিলেন তার মনিব ভারতেকে এবং ভারতের সাথেই গোপনে কাজ করছিলেন -যা ধরা পড়ে আগরতলা ষড়যন্ত্রে। ষড়যন্ত্রের রাজনীতি কখনোই জনগণকে বলা হয়না। তাই মুজিবও বলেনিন। তবে ভারতের ষড়যন্ত্র পাকিস্তান ভাঙ্গা ও মুজিবের মৃত্যুতে শেষ হয়নি। তাই মুজিবের মৃত্যুতে ভারতের কাছে কদর বেড়েছে শেখ হাসিনার।   

আওয়ামী লীগের রাজনীতির ড্রাইভিং সিটে সব সময়ই ছিল দিল্লির শাসকচক্র। তাই মুজিব ১৯৭১’য়ের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানের জেলে গেলেও আওয়ামী লীগের ভারতসেবী রাজনীতির গাড়ি এক দিনের জন্যও থেমে থাকেনি। ভারত যা চেয়েছে -তাই হয়েছে। মুজিবের মুখ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ারও প্রয়োজন পড়েনি। সে গাড়ি ভারতের কাঙ্খিত লক্ষ্যের দিকে চলাটি অবিরাম অব্যাহত রেখেছে। পাকিস্তান সরকার অনেক দেরীতে হলেও সেটি বুঝেছিল। তাই ১৯৭১’য়ের সেপ্টম্বরের দিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার প্রশ্নে রেফারেন্ডামের প্রস্তাব দেন। আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনটি লড়েছে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র তৈরীর দাবী নিয়ে। তাই সে নির্বাচনের আওযামী লীগের বিজয়টি পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে দলিল হতে পারে না। তাই স্বাধীনতার বিষয়ে একটি রিফারেন্ডামের প্রস্তাব দিয়ে ইয়াহিয়া খান দূত পাঠায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির কাছে। কিন্তু ইন্দিরা সে প্রস্তাব অস্বীকার করেন। কারণ, সোভিয়েত রাশির সামরিক ও রাজনৈতিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়ে ভারতের তখন মূল লক্ষ্যটি হয় পাকিস্তান ভাঙ্গা; এবং তা থেকে পিছু হটতে রাজী ছিল না। এবং আরো লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশের মেরুদন্ড ভাঙ্গাও। এভাবে ভারত চায়, দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের শক্তিহীন করতে। তেমন একটি ধ্বংসাত্মক অভিসন্ধির কারণে যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় সৈন্যদের প্রবেশ ও লুটতরাজ অপরিহার্য ছিল। এমন একটি লক্ষ্য নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধের প্রস্তুতি সেপ্টম্বরের মধ্যেই বহুদূর এগিয়ে নিয়েছিল। ফলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের রিফারেন্ডামের প্রস্তাব মেনে নিলে ভারতের সে লক্ষ্যটি কখনোই অর্জিত হতো না।

উপমহাদেশে যুদ্ধটি ভারত ও পাকিস্তানের মাঝের নয়। বরং সেটি হিন্দু ও মুসলিমের মাঝে। যখন পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠা পায়নি, সে লড়াইটি তখনও ছিল। মুসলিম শক্তি গুড়িয়ে দেয়ার প্রথম চেষ্টা করে শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠারা। সে কাজের জন্য শিবাজী রবীন্দ্রনাথের কাছে পূজনীয়; বাংলায় তিনি শিবাজী উৎসব শুরু করেন এবং শিবাজীর সন্মানে কবিতাও লেখেন। একই মিশন ছিল ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতীয় নেতাদের। ভারতের সে মিশন পূরণে সহায়তা দেয় শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ। দক্ষিণ এশিয়ার বুকে মুসলিম শক্তির্ দুটি ডানা: একটি পাকিস্তান , অপরটি বাংলাদেশ। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির লক্ষ্য ছিল, উভয় ডানাকে দুর্বল করা। ফলে তার পরিকল্পনা ছিল: এক). পাকিস্তান খণ্ডিত করা ও দুর্বল করা, দুই). বাংলাদেশের অর্থনীতির বিনাশ এবং রাজনীতিতে ভারতসেবীদের অধিকৃতি। রাজনৈতিক অধিকৃতি অর্জন করে ক্ষমতার আসনে মুজিব ও তার দলকে বসিয়ে। এবং অর্থনীতিতে ধ্বস আনতে শুরু করে সমগ্র সীমান্ত জুড়ে ব্যাপক লুটপাট। সে লুটপাট সহজতর করতে সীমান্ত-বাণিজ্যের নামে বিলুপ্ত করে বাংলাদেশের সীমান্ত। অথচ সীমান্ত বিলুপ্ত হওয়ার অর্থ: অর্থনীতির তলা বিলুপ্ত হওয়া। বাংলাদেশ তাই মুজিবের শাসনামলে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি পায় ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি রূপে। শুধু দেশী সম্পদই নয়, বিদেশীদের দেয়া ত্রাণসামগ্রীও তখন ভারতে চলে যায়। সে পরিকল্পিত লুটপাটের ফলে দেশবাসীর উপর নেমে আসে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ -যাতে মারা যায় বহু লক্ষ বাংলাদেশী। বাংলাদেশীদের জন্য এ ছিল ভারতের বিশেষ উপহার।

 

কেন এতো ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে?

১৯৭১’য়ের যুদ্ধে বড় ক্ষতিটা পাকিস্তানের হয়নি। সেটি হয়েছে বাংলাদেশের। যুদ্ধের কারণে পাকিস্তান তলাহীন ভিক্ষার থলি হয়নি। সে দেশে দুর্ভিক্ষ নেমে আসেনি। লক্ষ লক্ষ মানুষ পাকিস্তানে না খেয়ে মারা যায়নি। পাকিস্তানের কোন বস্তিতে জালপড়া বাসন্তিও সৃষ্টি হয়নি। বরং একাত্তরের যুদ্ধের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলি পাকিস্তানের জন্য সদয় হয়; এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিয়ে তাদের শ্রম বাজার পাকিস্তানীদের উম্মুক্ত করে দেয়। ফলে বহু লক্ষ পাকিস্তানী চাকুরীর সুযোগ পায়। অথচ দুর্ভিক্ষ এসেছে এবং জালপড়া বাসন্তি সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। কারণ, বাংলাদেশের মাটিতে ভারত শুধু যুদ্ধই করেনি, ভয়ানক দস্যুবৃত্তিও করেছে। প্রশ্ন হলো, বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে ভারতের কেন এতো আক্রোশ? এর সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। ইন্দিরার অজানা ছিল না যে, পাকিস্তানের মূল স্রষ্টা বাঙালী মুসলিম। মুসলিমের প্রতিষ্ঠা লাহোর বা করাচীতে হয়নি, হয়েছে ঢাকায়। তাছাড়া ১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল যুদ্ধটি লড়া হয়েছিল অবিভক্ত বাংলার রাজধানি কলকাতায়। বিশেষ করে সেটি ১৯৪৬ সালের ২৩ আগষ্ট মুসলিম লীগের ডাইরেক্ট এ্যাকশন দিবসে। কলকাতার গড়ের মাঠের মিছিল থেকে ফেরার পথে ৫ হাজারের বেশী বাঙালী মুসলিম সেদিন হিন্দু গুন্ডাদের হাতে প্রাণ দিয়েছিল। সে রক্তের বন্যায় ভেসে য়ায় কংগ্রেসের অবিভক্ত ভারত সৃষ্টির স্বপ্ন। ১৯৪৬’য়ের নির্বাচনে শতকরা ৯৬% বাঙালী মুসলিম মুসলিম লীগের পাকিস্তান প্রকল্পের পক্ষে ভোট দেয়। অথচ পাঞ্জাব, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশের মুসলিমগণ পাকিস্তানের পক্ষে এরূপ সমর্থণ দেয়নি। ফলে বাঙালী মুসলিমদের শায়েস্তা করার নেশাটি ভারতীয় হিন্দু নেতাদের মজ্জাগত। এবং সেটিই দেখা যায় একাত্তর-পরবর্তী ভারতীয় সেনাবাহিনীর নৃশংস লুন্ঠনে।

বাঙালী মুসলিমদের মেরুদন্ড চূর্ণ করা ও শাস্তি দেয়ার ভারতীয় প্রকল্পটি ছিল বহুমুখী। সেটি শুধু সীমাহীন লুন্ঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি বানানো নয়। স্রেফ একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ উপহার দেয়াও নয়। শুধু সীমান্ত বিলোপও নয়্। বরং সেটি ছিল, যে ঢাকা শহরে পাকিস্তানের জন্মদাতা মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল সে শহরের বুকে মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে কলংকজনক নাটকটি মঞ্চস্থ করা। সেটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের হাজার হাজার সৈন্যের আত্মসমর্পণের নাটক – যা লজ্জাজনক ছিল শুধু পাকিস্তানের জন্যই নয়, সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের জন্যও। ১৯৭১’য়ে ১৫ আগষ্ট তারিখেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু দিল্লির শাসকচক্র চাচ্ছিল পাকিস্তানের পরাজয় ও বেইজ্জতির মহড়াটি বিশাল আকারে হোক। চাচ্ছিল, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝের সৃষ্ট ঘৃনাটি গভীরতর হোক। তেমন একটি নাটকের জন্যই নির্ধারিত হয় ঢাকার রেসকোর্স ময়দান। সেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয় একজন ইহুদীর কাছে। উল্লেখ্য, তখন ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ ছিলেন মেজর জেনারেল জে. এফ. আর. জেকব। তিনি ছিলেন একজন ইহুদী। এ দিনটিতে বাঙালি সেক্যুলার কাপালিকগণ তাদের হিন্দু কাফের বন্ধুদের সাথে মিলে আনন্দ-উৎসব করলেও বিশ্বের তাবত মুসলিমের হৃদয় সেদিন বেদনাসিক্ত হয়েছিল। দিনটি তাদের জন্য আদৌ আনন্দদায়ক হলে বাংলাদেশকে তারা সাথে সাথে স্বীকৃত দিত। কিন্তু দেয়নি।

ভারতের সে কুৎসিত প্রতিশোধ-পরায়ন মানসিকতার বর্ণনা দিয়েছেনে ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার ঢাকার ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় ‘Beyond the Lines’ শিরোনামায প্রকাশিত তাঁর নিবন্ধে। মিস্টার নায়ার লিখেছেন, একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারতীয় বাহিনীর কাছে অস্ত্রসমর্পণের জন্য প্রস্তুত থাকার পরও এবং সেভাবে প্রক্রিয়া শুরুর পরও বিষয়টি ঘটে ২৪ ঘণ্টা পরে এবং নজিরবিহীনভাবে খোলা মাঠে। কেন এটা ঘটেছিল? এ সম্পর্কে তখনকার ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে. এফ. আর. জেকব সাংবাদিক মি. কুলদিপ নায়ারকে জানান, “New Delhi wanted to humiliate Islamabad by showing that Muslim country had laid down arms before a Jew.”  অর্থ: “নয়া দিল্লি চাচ্ছিল ইসলামাবাদকে অপদস্ত করতে, সেটি এরূপ এক প্রদর্শনীর মাধ্যমে যে একটি মুসলিম দেশ একজন ইহুদীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছে।” ঢাকা শহরটি অন্য কোন কারণে না হোক, অন্তত এই একটি মাত্র কারণে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম ইতিহাসে কিয়ামত অবধি বেঁচে থাকবে। সেটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশের সেনাবাহিনীর বেইজ্জতি করার ভূমি রূপে। অথচ পাকিস্তানের সৃষ্টিতে বাঙালী মুসলিমদের অবদানটাই ছিল সর্বাধিক। বাংলাদেশ তার মানচিত্র পেয়েছে পাকিস্তান থেকেই। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত না হলে বাংলাদেশ হতো আরেক অধিকৃত কাশ্মীরে।

 

যে বেইজ্জতি মুক্তিবাহিনীর

১৯৭১’য়ের ১৬ ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনীর অপমানটিও কি কম ছিল? যুদ্ধ হলো বাংলাদেশের মাটিতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনটি মুক্তিবাহিনীর সদস্যগণ নিজেদের নিজস্ব অর্জন মনে করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো,পাকিস্তানের সেনা বাহিনী কি মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে? ভারতের অর্থে ও ভারতের ক্যাম্পে ভারতের ভাত-পানি খেয়ে গড়ে উঠা মুক্তিবাহিনীকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কোন গুরুত্বই দেয়নি। তাদের কাছে তাই আত্মসমর্পণও করেনি। আত্মসমর্পণ করেছে মুক্তিবাহিনীর মনিবের কাছে। বাংলাদেশ থেকে তাদের যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে নিতেও পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনা করার প্রয়োজনও বোধ করেনি। সেটিও তারা করেছে দিল্লি সরকারর সাথে। ফলে বাংলাদেশ সরকার যে ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের যে অভিযোগ্টি এনেছিল, সে অভিযুক্তদের কেশাগ্র স্পর্শের সুযোগও পায়নি। বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্রশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের চোখের সামনে দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী লুটে নিয়ে যায়। পাকিস্তানের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ পূর্ব পাকিস্তানী হওয়ায় সে অস্ত্র কেনায় অধিকাংশ অর্থ জোগাতে হযেছে বাংলাদেশীদের। অতএব সে অস্ত্র বাংলাদেশে রাখার বৈধ অধিকার ছিল বাংলাদেশর। কিন্তু ভারত সেটি চায়নি। মনিবের সে অস্ত্র লুটের কান্ডটি নীরবে দেখা ছাড়া আওয়ামী বাকশালী পক্ষটি কি কিছু করতে পেরেছিল? তাছাড়া কিছু করার আগ্রহও কি ছিল? ভারতীয় সরকার এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সাথে সামান্যতম আলোচনার প্রয়োজনও বোধ করেনি। মনিবরা কি কখনো চাকর-বাকরের অনুমতি নেয়? বা তাদের সাথে পরামর্শ করে? দিল্লির শাসকদের মনভাব কি আজও ভিন্নতর? দিল্লিস্থ মনিবগণ আজও যা চাচ্ছে বাংলাদেশকে তাই দিতে হচ্ছে। সেটি দেশের অভ্যন্তর দিয়ে করিডোর হোক, তিস্তা বা পদ্মার পানি তুলে নেয়া হোক বা টিপাইমুখে বাধ নির্মাণ হোক।

 

ভারতের ইসলাম ও মুসলিমভীতি

পাকিস্তান ভাঙ্গা ও দেশটির মেরুদন্ড দুর্বল করার পর ভারতের লক্ষ্য এবার বাংলাদেশের মেরুদন্ড ধ্বংসিয়ে দেয়া। তাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশ স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ পেলে দেশটি বহু ভাষা, বহু বর্ণ ও বহু গোত্রে বিভক্ত পাকি্স্তানের চেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র রূপে বেড়ে উঠার সুযোগ পাবে। তাছাড়া এ অঞ্চলে বাংলাদেশ,পশ্চিম বাংলা, আসাম ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠির বসবাস। তাদের মাঝে রয়েছে ভাষাগত ও বর্ণগত সংহতি। নেই শিয়া-সূন্নীর বিভেদ। অতীতে বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের যে উত্থান ঘটেছিল -সেটি সুজলা-সুফলা বিশাল কোন সমৃদ্ধ ভূমি থেকে হয়নি। হয়েছিল জনবিরল এক নিঃস্ব মরুর বুক থেকে। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ কম কিসে? জনবহুল মুসলিম দেশ হওয়াটাই শত্রুর নজরে পড়ার জন্য যথেষ্ঠ ছিল। তাছাড়া আজ ১৭ কোটি মুসলিমের যে বাংলাদেশ -সেটি ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে ১৭ জন মুসলিম মুজাহিদের বিজয়ের দান। এখন ভারতের সীমান্তে দন্ডায়মান ১৭ জন তুর্কি মুসলিম নয়, বরং ১৭ কোটি মুসলিম। বহু কোটি মুসলিমের বাস ভারতের অভ্যন্তরেও। ভারতীয়দের মনে তাই প্রচন্ড মুসলিম-ভীতি। এমন মুসলিম ভীতির কারণে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের আচরন তাই বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার আশা নাই। ব্রিটিশদের হাতে বাংলা অধিকৃত হওয়ার ফলে ব্রিটিশের প্রশ্রয়ে মুসলিম ও হিন্দুদের মাঝের সম্পর্ক পরিণত হয় চাকর ও মনিবের সম্পর্কে। মনিব ছিল হিন্দু জমিদার। চাকর-বাকরকে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়া হলেও তাকে কি কখনো স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ দেয়া হয়? সুযোগ দেয়া হয় কি শিক্ষাদীক্ষার? বাঙালী মুসলিমদের পদানত রাখাই তখন রীতি হয়। বাঙালী মুসলিমদের পাকিস্তানের প্রয়োজনীতা বুঝাতে তাই সেদিন বেশী বক্তৃতার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু বিপদের কারণ হলো, ১৯৭১’য়ের পর বাঙালী মুসলিমদের জীবনে গোলামীর সে দিন আবার ফিরে এসেছে; স্বাধীনতা এসেছে শুধু ভারতের সেবাদাসদের।

ব্রিটিশের প্রতিপালনে বাঙালী হিন্দুর জীবনে রেনেসাঁ এসেছিল। কিন্তু বাঙালী হিন্দুর সে রেনেসাঁ মুসলিমদের জীবনে প্রচন্ড দুঃখ ও নাশকতা বাড়িয়েছিল। তখন বাঙালী মুসলিমের কাঁধে চেপেছিল দুটি জোয়াল। একটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শত্রুদের। অপরটি হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের। বাঙালী মুসলিমদের বেড়ে উঠার সে সুযোগ কেড়ে নিতেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চলছে লাগাতর ষড়যন্ত্র। এবং সেটি ১৯৪৭ সালের পূর্ব থেকেই। ১৯০৫ সালে বাংলার হিন্দুগণ আন্দোলন করেছে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে। কারণ বঙ্গভঙ্গে তারা বাংলার মুসলিমদের কল্যাণ দেখেছিল। এমন কি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও কলকাতায় বড় বড় মিছিল করা হয়েছে। সে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এটি এক বিস্ময়ের বিষয়। মানব ইতিহাসের আর কোথায়ও কি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে? কিন্তু সেটি হয়েছে কলকাতার রাজপথে। এমন একটি কদর্য আন্দোলনের জন্য বিবেকের পচনটা যে কত গভীর হওয়া দরকার -সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন? হিন্দু মনে এমন গভীর ঘৃনা ও বিদ্বেষের কারণেই বাঙালী মুসলিমদের সংখ্যানুপাতে সরকারি চাকুরিতে প্রবেশের যে ন্যায্য দাবিটি দেশবন্ধ চিত্তরঞ্জন দাশ মেনে নিয়েছিলেন -সেটিও কলকাতার হিন্দু বাবুগণ মেনে নেয়নি। এমন এক বৈরী মানসিকতা আজও বেঁচে আছে ভারতের আগ্রাসী হিন্দুদের মনে। ফলে তা অসম্ভব করেছে বাংলাদেশের সাথে ভারতের প্রতিবেশীসুলভ সুসম্পর্ক গড়ে উঠাকে।

কোন ভদ্রলোক কি প্রতিবেশীর ঘরের পাশ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া দেয়? এটি তো প্রতিবেশীকে চোর-ডাকাত ভাবার লক্ষণ। কোন ভদ্র প্রতিবেশী দেশ কি লাশ ঝুলিয়ে রাখে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায়? কেড়ে নেয় কি নদীর পানি? নদীমুখে দেয় কি বাঁধ? ভারত থেকে নদী দিয়ে পাথর গড়িয়ে যাতে বাংলাদেশে না পড়ে -তার জন্য কতো সাবধানতা! ভারতীয়দের মনের কুৎসিত চিত্রটি কি এরপরও গোপন থাকে? বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আজ যা কিছু ঘটছে -সেটি তো পুরনো ষড়যন্ত্রেরই ধারাবাহিকতা। তাছাড়া বিশ্বব্যাপী ইসলামের জোয়ার দেখে ইসলামের শত্রুপক্ষ তো আরো আতংকিত। বাংলাদেশে ইসলাম জোয়ার রুখা তাই ভারতীয়দের কাছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ। তাই বাংলাদেশের নির্বাচনে পুঁজি বিনিয়োগ ও নির্বাচনের ফলাফলটি পক্ষে আনা ভারতীয়দের কাছে আনবিক বোমা বা দূরপল্লার মিজহাইল বানানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজে ভারতীয়গণ বিশ্বস্থ মিত্র রূপে বেছে নিয়েছে আওয়ামী বাকশালীদের। একাত্তরে যাদেরকে সাথে নিয়ে ভারত পাকিস্তান ভেঙ্গেছিল,তাদেরকে সাথে নিয়েই আজ তারা বাংলাদেশের মেরুদন্ড ভাঙ্গায় নেমেছে। লক্ষ্য এখানে ইসলাম নির্মূলও। বাংলাদেশে গণতন্ত্র আজে কবরে শায়ীত; ভোট-ডাকাতেরা আজ ক্ষমতাসীন। এসবই তো ভারতীয় ষড়যন্ত্রের ফসল। চাকর-বাকরেরা কখনোই মনিবের চরিত্র নিয়ে ভাবে না। ব্যাভিচারি দুর্বৃত্ত মনিবও চাকরবাকরদের কাছে প্রনামযোগ্য মহাপ্রভু গণ্য হয়। এমন চাকরবাকরদের কাছে ফিরাউন তো ভগবান রূপে স্বীকৃতি পেয়েছে। ভারতীয়দের আগ্রাসী কদর্য চরিত্রও তাই আওয়ামী বাকশালীদের নজরে পড়েনা। তাই কোন ভারতীয় নেতা বা নেত্রী বাংলাদেশে এলে তখন চাকর-পাড়ায় মহোৎসব শুরু হয়।

 

লড়াই এখন ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে 

বাংলাদেশের মাটিতে আজ যে লড়াই, সেটি নিছক নিরপেক্ষ নির্বাচন ও গণত্ন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই নয়। এটি দেশের স্বাধীনতার বাঁচনোর লড়াই। লড়াই এখানে ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠার। শত্রুর হামলাটি যে স্রেফ গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে হচ্ছে -তা নয়। হামলা হচ্ছে ইসলামের নির্মূল কল্পেও। এ যুদ্ধটি শত্রু-শক্তির চাকর-বাকরদের সাথেও নয়। মুল যুদ্ধটি বরং আওয়ামী বাকশালীদের মনিব ভারতের বিরুদ্ধে। ভারতও সেটি বুঝে। তারাও জানে একাত্তরের ন্যায় এবারের যুদ্ধটিও তাদের নিজেদেরই লড়তে হবে। তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের বিনিয়োগটি বিশাল। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা র’য়ে এজেন্টগণ এখন আর শুধু রাজধানির গোপন ঘাঁটিতে ঘাপটি মেরে বসে নাই। তারা প্রতিটি থানা ও প্রতিটি ইউনিয়নে পৌঁছে গেছে। বসেছে সেনানীবাসগুলোর অফিসে। হিন্দুদের বসিয়েছে পুলিশ বিভাগ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। ভারত এখন শুধু বাকশলী চাকর-বাকরদের উপর ভরসা করছে না। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসিয়েছে নিজেদের অফিসারদের।

তাই শুধু রাজপথের মিছিল বা অবরোধে সহজে বিজয় আসবে না। স্বাধীনভাবে বাঁচার যুদ্ধটি আরো রক্তাত্ব হতে বাধ্য। স্বাধীন ভাবে বাঁচতে হলে যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয়। স্বাধীনতার মূল্য তো এভাবেই দিতে হয়। আর এ যুদ্ধের শুরুটি আজ  থেকে নয়; ১৯৪৭’য়ের পূর্ব থেকেই। বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মিত্র খুঁজতে হয়। সে সত্যটি ১৯৪৭’য়ের পূর্বে শেরে বাংলা ফজলুল হক,খাজা নাযিমউদ্দিন,হোসেন সহরোয়ার্দি, নুরুল আমীন, আকরাম খাঁর মত বাংলার মুসলিম নেতাগণ বুঝেছিলেন। তারা সে যুদ্ধে সহযোদ্ধা পেতে অন্যান্য ভারতীয় মুসলিমদের সাথে মৈত্রী গড়েছিলেন। এবং তাদের সাথে নিয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধ লড়েছিলেন। ইসলামে এমন ঐক্য ফরজ। এটি ছিল সে কালের নেতাদের স্রেফ রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই নয়, ঈমানী দায়ভারও। কিন্তু সে প্রজ্ঞা ও ঈমানীদায়ভার কি তাদের থেকে আশা করা যায় যারা শত্রুশক্তির চাকরবাকর হওয়াকেই জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেয়? কাশ্মিরের শেখ আব্দুল্লাহর মাঝে সে প্রজ্ঞা ও ঈমান ছিল না বলেই কাশ্মির স্থান পেয়েছে ভারতের পেটে। একই কারণে শেখ মুজিব বাংলাদেশকে গোলাম রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এবং আত্মসমর্পণ নিয়েই শেখ মুজিব স্বাক্ষর করেছিল ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি।

 

স্বাধীন ভাবে বাঁচার খরচ ও বাঙালী মুসলিমের দায়ভার

স্বাধীন ভাবে বাঁচার বর্তমান যুদ্ধটি বাঙালী মুসলিমদের এখন একাই লড়তে হবে। এ লড়াই থেকে পিছুহটার সুযোগ নেই। পিছু হটলে কাশ্মির, সিকিম ও হায়দারাবাদের ন্যায় ভারতের পেটে হজম হয়ে যেতে হবে। ভারতের দাসদের শাসন থেকে মুক্তির এ লড়াইটি দীর্ঘ ও রক্তাত্ব হতে বাধ্য। কিছুদিনের হরতাল ও অবরোধে কোন দেশেই স্বাধীনতা আসেনি। বাংলাদেশেও আসবে না। লড়াই কোন দেশবাসীকে দুর্বল করে না, বরং শক্তিশালী করে। জীবতদের চেতনা তো সবল হয় শহীদের রক্তে। তখন শক্তি নিয়ে বেড়ে উঠে ঈমান। তাই যে দেশে শহীদের রক্ত নেই সে দেশে মুসলিম চেতনা মৃত। মুসলিমগণ একমাত্র তখনই বিশ্বশক্তি ছিল যখন তাদের জীবনে লাগাতর জিহাদ ছিল। নবীজী (সা;) ৭০ শতাংশ সাহাবী সে জিহাদে শহীদ হয়েছেন। দুর্বলতা ও পরাজয় আসে তো জিহাদ না থাকার কারণে। বাংলাদেশের জনগণকে ইতিহাসের এ সহজ সত্যকে অবশ্যই বুঝতে হবে।

স্বাধীনতার মূল্য বিশাল। ইসলামের আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠার খরচও বিশাল। চাল-ডাল,আলু-পটল ও মাছ-গোশতো অর্থ দিয়ে কেনা যায়। কিন্তু স্বাধীনতা কিনতে হয় রক্ত দিয়ে। যারা তা দিতে পারে না, স্বাধীনতা তাদের জুটে না। তাদের বাঁচতে হয় গোলামীর ঘানি টেনে টেনে। ইতিহাস সেটি বার বার শিখিয়েছে। স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে ও ইসলামকে বিজয়ী করতে রক্ত দান তাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এ ইবাদত জান্নাতে নেয়। স্বাধীনতার খরচ তাই স্রেফ ভোট দিয়ে পরিশোধ করা যায় না। লাগাতর যুদ্ধ নিয়ে বাঁচতে হয়। কাশ্মিরে এক লাখের বেশী মানুষ প্রাণ দিয়েছে, সিরিয়ায় প্রাণ দিয়েছে বহুলক্ষ মানুষ। ৪০ লাখের বেশী উদ্বাস্তু হয়েছে। কিন্তু এখনও বিজয় জুটিনি। কিন্তু তারা যুদ্ধ ছাড়তে রাজি নয়। তাই আরো রক্ত দিচ্ছে। গাজার মাত্র ১০ লাখ মানুষ যুদ্ধ লড়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সর্ববৃহৎ সামরিক শক্তি ইসরাইলের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন হলো,বাংলাদেশ কি গাজার চেয়েও দুর্বল? ভারত কি ইসরাইলের চেয়েও শক্তিশালী?

 

ব্যর্থতা আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হওয়ায়

শত্রুর বিরুদ্ধে চলমান এ যুদ্ধে জিতলে হলে মহাশক্তিশালী মহান আল্লাহতায়ালাকে অবশ্যই পক্ষে আনতে হবে। এছাড়া বিজয়ের কোন পথ নাই। সম্ভাবনাও নাই। আর মহান আল্লাহতায়ালা পক্ষে থাকলে ভারত কেন,কোন বিশ্বশক্তিও কি তখন হারাতে পারে? ১৭ জন মুজাহিদের পক্ষে অবিভক্ত বাংলার ন্যায় বিশাল দেশ জয় সহজ হয়েছিল তো মহান আল্লাহতায়ালা পক্ষে থাকাতেই। যুদ্ধজয় তো আসে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকেই। কিন্তু আজকের মুসলিমগণ আল্লাহতায়ালাকে পক্ষ আনার বদলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা জাতের কাফের শক্তিকে পক্ষে আনায় ব্যস্ত। সে চেষ্ঠায় নেমেছে এমন কি অনেক ইসলামি দলও। তারা বিজয় ছিনিয়ে আনতে চায় ছল-চাতুরি, প্রচার কৌশল ও বাহুবলে। তাদের আগ্রহ নাই মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা বাস্তবায়নে। আগ্রহ নাই আল্লাহতায়ালার দলের সদস্য হওয়ার। ফলে এসব আালেম-উলামা ও ইসলামি দলের নেতা-কর্মীদের মুখে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কথা যেমন নেই, তেমনি নেই খেলাফত ও জিহাদের কথাও। এরা যে শুধু ভারতের ভয়ে ভীতু তা নয়, বরং আধমরা তাদের চাকর-বাকরদের ভয়েও। বিস্মযের বিষয়,এ ভীরুরা আবার জান্নাত লাভের কামনা রাখে! প্রশ্ন হলো,মহান আল্লাহতায়ালা কি তাঁর পবিত্র জান্নাতে এসব ভীরু ও কাপুরুষদের স্থান দিবেন?

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, “ওয়া মা নাসরু ইল্লা মিন ইনদিল্লাহ,ইন্নাল্লাহা আজিজুন হাকীম।” অর্থ: “বিজয় আসে একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে,নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান।”- (সুরা আনফাল, আয়াত ১০)। অতীতে যত পরাজয় এসেছে তা তো মহান আল্লাহর এজেন্ডার সাথে গাদ্দারীর ফলে। মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে শত ভাগ বিশুদ্ধ জিহাদ গড়ে তুলতে। আর জিহাদ বিশুদ্ধ না হলে কি মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য আসে? মহান আল্লাহতায়ালাকে পক্ষে আনার পথ তো অতি সহজ। সে পথের কথা তো পবিত্র কোরআনে বার বার শোনানো হয়েছে। যারা যুদ্ধ করে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে, তাদের যুদ্ধও তাঁর যুদ্ধ রূপে গণ্য হয়। তাই নির্দেশ দেয়া হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও।” –(সুরা সাফ, আয়াত ১৪)। বলা হয়েছে, “তোমরা আমাকে সাহায্য করো, আমিও তোমাদেরকে সাহায্য করবো।” নির্দেশ এসেছে জিহাদ বের হওয়ার। বলা হয়েছে, “তোমাদের প্রস্তুতি হালকা হোক অথবা ভারী হোক, বেরিযে পড়ো অভিযানে। এবং জিহাদ করো তোমাদের সম্পদ ও জান দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা বুঝতে।” –(সুরা তাওবা, আয়াত ৪১)।

মুসলিমগণ যখন সেক্যুলার রাজনীতির নেতাকর্মী ও সেপাহীতে পরিণত হয়, তখন কি তারা মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য আশা করতে পারে? তখন তো আসে আযাব। ঈমানদারের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তাই স্রেফ নামাযী বা রোযাদার হওয়া নয়। হজ-ওমরা পালনও নয়। এমন ইবাদত তো লক্ষ লক্ষ মুনাফিকও করে। খোদ নবীজী (সা:) আমলে মুনাফিকদের সংখ্যা কি কম ছিল? ওহুদের যুদ্ধের সময় তারা ছিল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ঈমানদারের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বক্ষণিক সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া এবং তাঁর রাস্তায় লাগাতর জিহাদ করা। পরকালে জান্নাত লাভের এটিই তো একমাত্র রাস্তা। কি ভাবে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হতে হয় ও তার রাস্তায় জিহাদ করতে হয় সেটি মহান নবীজী (সাঃ) স্বহস্তে দেখিয়ে গেছেন। দেখিয়ে গেছেন নবীজী(সা:)’র মহান সাহাবাগণও। সে পথটি হলো, সমাজের প্রতি অঙ্গণে মহান আল্লাহতায়ালার নিষ্ঠাবান খলিফা রূপে দায়িত্ব পালন করা এবং তাঁর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় জিহাদরত দলের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা। মহান আল্লাহতায়ালা তো একমাত্র এমন মুজাহিদদের সাহায্য করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যারা তাঁর দ্বীনের বিজয়ে সাহায্য করে, তিনিও তাদের সাহায্য করেন। তাদের সাথে যুদ্ধে সদা প্রস্তুত হলো তাঁর ফেরেশতা বাহিনী। মুজাহিদের বিজয় তো এভাবেই অনিবার্য হয়ে উঠে। মুসলিম জীবনের আজকের ব্যর্থতা তো এখানেই। তারা ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারী হতে। আর এ ব্যর্থতা তাদের পরাজয়ই বাড়িয়ে চলেছে। প্রশ্ন হলো, এ ব্যর্থতা কি পরকালেও কোন সফলতা দিবে? পৌঁছাবে কি জান্নাতে? ১ম সংস্করণ ০৭/০৩/২০১৫; ২য় সংস্করণ ২৮/০২/২০২১।




অপরাধীদের রাজনীতি এবং বাঙালী মুসলিমের বিপদ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বিকল যেখানে ইঞ্জিন                      

জাতীয় জীবনে মূল ইঞ্জিনটি হলো রাজনীতি। এ ইঞ্জিনই জাতিকে সামনে টানে। একটি জাতি কোন দিকে যাবে -সেটি দেশের ক্ষেত-খামার, ব্যবসা-বাণিজ্য, কল-কারখানা ও মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে নির্ধারিত হয় না। সে সিদ্ধান্তটি হয় রাজনীতির ময়দানে। রাজনীতির যিনি কর্ণধার –তিনিই দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনিই দেশের ড্রাইভার; অন্যরা যাত্রী মাত্র। তাই যারা জাতির ভাগ্য পাল্টাতে চায় তারা নিজেদের সমগ্র সামর্থ্য নিয়ে রাজনীতির অঙ্গণে লড়াইয়ে হাজির হয়। একাজ দোয়া দরুদে সম্ভব নয়। তাই মদিনায় হিজরতের প্রথম দিনেই নবীজী (সা:) নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ায় হাত দেন এবং রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসেন। অপর দিকে যারা জাতির পরাজয় ও পতন চায় –সে শত্রুরাও যুদ্ধে নামে রাজনীতির ড্রাইভিং সিটকে দখলে নয়ার লক্ষ্যে। তাই একটি জাতির ব্যর্থতা, বিপর্যয় ও লাগাতর নীচে নামা দেখে নিশ্চিত বলা যায় দেশের রাজনীতি সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিকদের হাতে নাই;  দেশ অধিকৃত হয়েছে শত্রুপক্ষের হাতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলত সেটিই ঘটেছে। ফলে জোয়ার এসেছে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও স্বৈরাচারের রাজনীতির। তাই যারা বাংলাদেশের কল্যাণ চায়, তাদের সামনে শত্রুপক্ষের অধিকৃতি মুক্তির যুদ্ধ ছাড়া ভিন্ন পথ নাই।

দেশের উন্নয়ন বা সুখ-সমৃদ্ধির জন্য জরুরী নয় যে, জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে বিপ্লব আসতে হবে। বরং বিপ্লব আনতে হয় নেতৃত্বে এবং দেশের রাজনীতিতে। রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ পায় পথ-নির্দেশনা। পায় পথ চলায় ভিশন ও মিশন। রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে পায় উপরে উঠার অনুকরণীয় মডেল। রাজা আলেকজান্ডারের আমলে গ্রীস যখন বিশ্বশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে তখন গ্রীসের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন এসেছিল দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বে। তেমনি আরবের মুসলিমগণ যখন বিশ্বের প্রধানতম শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে তখনও আরবের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে কোন বিপ্লব আসেনি। বরং বিপ্লব এসেছিল নেতৃত্বে ও রাজনীতিতে। রাজনীতির ইঞ্জিন তখন বিস্ময়রকর গতিতে সামনে চলেছে।  

রাজনীতি হলো সমাজসেবার সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। কৃষক, শ্রমিক, ডাক্তার, মসিজেদর ইমাম বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসব হয়ে এ বিশাল কাজ করা যায় না। যারা সমাজের কল্যাণে বিশাল ভূমিকা রাখতে চায় এবং চায় নিজ স্বপ্নের বাস্তবায়ন -তাদের সামনে রাজনীতির চেয়ে উত্তম কোন ক্ষেত্র নাই। মুসলিম সমাজে এ কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন খোদ মহান নবী (সা:) এবং তাঁর সাহাবীগণ। রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে দেশের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে বসানো নবীজী (সা:)’র মহান সূন্নত। সে আসনে বসেছেন যেমন খোদ নবীজী (সা:), তেমনি নবীজী (সা:)’র ওফাতের পর বসেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠতম সাহাবাগণ। তাঁরা ছিলেন এমন সাহাবা যারা জীবদ্দশাতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালনের পাশাপাশি যারা মহান আল্লাহতায়ালার রাস্তায় নিজের সমুদয় সামর্থ্য ও জানমাল কোরবানী করতে চায় -এ কাজটি মূলত তাদের। কিন্তু সমাজ সেবার এ সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যমটি যদি ক্ষমতালিপ্সু ও স্বার্থশিকারী দুর্বৃত্তদের হাতে হাইজ্যাক হযে যায় -তখন অনিবার্য হয়ে উঠে সে জাতির পতন ও পরাজয়। সে জাতির জীবনে বিপর্যয় আনার জন্য কি তখন কোন বিদেশী শত্রুর প্রয়োজন পড়ে? ঝাড়ুদারের কাজেও সততা লাগে, নইলে রাস্তা থেকে আবর্জনা দূর হয় না। আর রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব তো রাষ্ট্র থেকে আবর্জনারূপী দুর্বৃত্তদের নির্মূল এবং সে সাথে সুনীতির প্রতিষ্ঠা। কোরআনের ভাষায় “আমারু বিল মারুফ” এবং “নেহী আনিল মুনকার।” সে কাজে গুরুত্ব দিয়ে পবিত্র কোর’আনে নির্দেশ: “তোমাদের মধ্যে অবশ্যই এমন একটি দল থাকতে হবে যারা কল্যাণের পথে মানুষকে ডাকবে এবং ন্যায়ের নির্দেশ দিবে ও অন্যায়ের পথ থেকে রুখবে, এবং তারাই হল সফলকাম।” -(আল-ইমরান, আয়াত ১০৪)।

উপরুক্ত আয়াতের মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিম জীবনের মূল মিশনটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ধর্ম-কর্মকে নিছক নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের মাঝে সীমিত করলে সে মিশন নিয়ে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। সে জন্য যা অপরিহার্য হলো, মানব-সৃষ্ট  সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর সকল সামর্থ্যকে কাজে লাগানো। সেটি সম্ভব হয় একমাত্র রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়েই; নইলে দখলে যায় শত্রুশক্তির হাতে। এজন্যই রাজনীতির এ জিহাদে অর্থদান, শ্রমদান, মেধাদান -এমনকি প্রাণদান সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল। অর্ধেকের বেশী সাহাবী এ পথে শহীদ হয়েছেন। অথচ বাংলাদেশের অবস্থা ভিন্নতর। দেশটির লাখ লাখ মসজিদে নামাযীর অভাব হয় না। এ দেশে বহু কোটি মানুষ রোযা রাখে। বহু হাজার মানুষ প্রতিবছর হজ্ব করে। বহু লক্ষ মানুষ প্রতিদিন কোর’আন তেলাওয়াতও করে। অথচ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলে নিজেদের সামর্থ্যের বিনিয়োগ করছে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তবে রাজনীতিতে নামাযী-রোযাদারগণ যে অংশ নিচ্ছে না -তা নয়। বরং তারাও ভোট দেয়; অর্থ দেয় এবং রাজপথে লড়াইও করে। তবে সেটি ইসলামের শরিয়তী বিধানকে বিজয়ী করতে নয়। বরং তারা বিজয়ী করে সেসব ইসলাম বিরোধী সেক্যুলারিস্টদের –যারা বিজয় চায় না ইসলামের। ফলে তাদের ভূমিকা ইসলামের সাথে গাদ্দারীর।

নবীজী(সা:)’র আমলে আজকের ন্যায় লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রসা ছিল না। কোটি কোটি নামায়ীও ছিল না। সংখ্যায় স্বল্প সংখ্যক হয়েও তাঁরা আরব ভূমি থেকে দূর্নীতি ও দুর্বৃত্তদের নির্মূল করেছিলেন। নির্মূল করেছিলেন আবু লাহাব ও আবু জেহেলদের মত ইসলাম বিরোধী নেতাদের। অথচ বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টেটি। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিমদের ভোটে নির্বাচিত হয় এবং তাদেরই অর্থে প্রতিপালিত হয় ইসলাম-বিরোধী সেক্যুলারিস্টগণ। এবং রাজনীতির ময়দানটি অধিকৃত হয়ে গেছে অতি দুষ্ট ও দুর্বৃত্ত চরিত্রের লোকদের হাতে। অথচ দেশে আইনের শাসন থাকলে এরূপ দুর্বৃ্ত্তদের পক্ষে নেতা হওয়া দূরে থাক, রাস্তার ঝাড়ুদার হওয়াও অসম্ভব হতো। কারণ, দূর্নীতিবাজদের দিয়ে রাস্তার আবর্জনা পরিস্কারের কাজটিও যথার্থভাবে হয় না। কারণ খুঁটে খুঁটে আবর্জনা তোলার কাজেও সৎ, নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল হওয়াটি জরুরী। তাছাড়া জাতীয় জীবনে প্রকৃত আবর্জনা হলো এ দূর্নীতিবাজেরা; প্রতিটি সভ্য দেশেই আবর্জনার ন্যায় তাদেরও স্থান হয় আস্তাকুঁড়ে। দুর্বৃত্ত নির্মূলে ইসলাম অতি কঠোর ও আপোষহীন। তাই যারা চুরি করে, কোর’আনের বিধান হলো তাদের হাত কাটা। তাই যে দেশে চোরডাকাত ও ভোটডাকাতের ন্যায় দুর্বৃত্তগণ নির্মূল না হয়ে শাসন-ক্ষমতায় বসে –তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে দেশের মানুষ ইসলামের অনুসরণ থেকে কতটা দূরে?

 

দায়ী দুষ্ট রাজনীতি

বাংলাদেশের ব্যর্থতা এজন্য নয় যে, দেশটি সম্পদে দরিদ্র। বা দেশের ভূগোল বা জলবায়ু প্রতিকুল। ব্যর্থতার জন্য মূলত দায়ী দেশের দুষ্ট রাজনীতি। গাড়ি না চললে -সে জন্য ইঞ্জিন বা চালক দায়ী, গাড়ির বগি বা যাত্রীগণ নয়। তখন বুঝা যায়, রাজনীতির ইঞ্জিনটি মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ বেয়ে এগুচ্ছে না। প্রদর্শিত সে পথটি হলো সিরাতুল মোস্তাকিম -যা দেখানো হয়েছে পবিত্র কোর’আন ও নবীজী (সা:)’র সূন্নতে। সিরাতুল মোস্তাকিম শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও ইবাদত-বন্দেগীর পথই দেখায় না। দেখায় সঠিক রাজনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির পথও। আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ না করে রাষ্ট্র, সমাজ বা পরিবারে শান্তি আসবে এরূপ বিশ্বাস করাই তো কুফরি তথা ঈমান-বিরুদ্ধ। এটি শিরক। এমন বিশ্বাস নিয়ে কি কেউ মুসলিম থাকতে পারে? আল্লাহর প্রদর্শিত পথ তথা ইসলাম ছাড়াই শান্তি ও সমৃদ্ধি সম্ভব হলে তো ইসলামের প্রয়োজনই ফুরিয়ে যায়। অথচ তেমন একটি ইসলাম বিরোধী চেতনার প্রতিফলন ঘটছে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও আইন-আদালতে। এ ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামের প্রয়োজনই অনুভব করা হচ্ছে না। ইসলাম সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে মসজিদ-মাদ্রাসা ও কিছু পরিবারে। এবং রাষ্ট্রের বাঁকি এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে সূদ, জুয়া, মদ, পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, ঘুষ, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসের ন্যায় নানাবিধ হারাম কাজে।

ইসলামের আগমন শুধু ব্যক্তি জীবনের পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির লক্ষ্যেও। সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধি ছাড়া কি পরিশুদ্ধ মানব গড়া যায়? সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবেশ যদি পাপের জোয়ারে প্লাবিত হয়, তবে কি কোন মানব শিশু সিরাতুল মুস্তাকীম পায়? সে তো তখন সে জোয়ারে ভাসতে থাকে। মহান নবীজী (সা:)’র হাদিস: প্রত্যেক মানব শিশুর জন্ম হয় মুসলিম রূপে। কিন্তু সে ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে হয়ে অমুসলিম হয় (পারিবারীক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়) পরিবেশের প্রভাবে। কোন শিশুই তার পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সামর্থ্য নিয়ে জন্ম নেয় না। যারা নবেল প্রাইজ পায় সে সামর্থ্য এমন কি তাদের প্রবীন বয়সেও সৃষ্টি হয়না। সে সামর্থ্য অর্জিত হয় একটি বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এজন্য চাই, ওহীর তথা কোর’আনের জ্ঞান। তাই কোন শিশুকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচাতে হলে তাকে শুধু পানাহার দিলে চলে না; জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতার অন্ধকার পরিবেশ থেকে মুক্তি দিতে হয়। সমাজ ও রাষ্ট্র অন্ধকারাচ্ছন্ন হলো সিরাতুল মুস্তাকীম পায় না এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরগণও। তাই সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল হলো, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত-মুক্ত করা। রাষ্ট্রের শক্তিশালী অবকাঠামো কোর’আনের জ্ঞানে অজ্ঞ সেক্যুলারিস্টদের হাতে অধিকৃত রেখে কি রাষ্ট্র বা সামাজের পরিবেশকে জাহিলিয়াত-মুক্ত করা যায়? সেটি অসম্ভব বলেই মহান নবীজী (সা) তাঁর কর্মের পরিধি মসজিদ নির্মাণ ও কোর’আনের জ্ঞান বিতরণের মাঝে সীমিত রাখেননি। বরং তিনি ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করেছেন এবং নিজে সে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে দায়িত্ব পালন করেছেন।  

 

দুর্বৃত্তদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়ার বিপদ

মানব জীবনের সবচেয়ে বড় নাশকতাটি মহামারি, ভূমিকম্প বা ঘুর্ণিঝড়ে ঘটে না। সেটি ঘটে অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে। মহামারি, ভূমিকম্প ও ঘুর্ণিঝড়ে দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও রাজনীতি পাল্টে যায় না। অথচ দুর্বৃত্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটে বসলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলি তখন জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার বাহনে পরিণত হয়। একটি বাসের সকল যাত্রী মাতাল হলেও তাদের সঠিক গন্তব্যস্থলে পৌঁছে -যদি চালক সুস্থ্য হয় এবং জ্ঞান রাখে সঠিক পথের। কিন্তু চালক নিজেই যদি মাতাল বা অজ্ঞ হয় তবে সকল যাত্রীর দোয়াদরুদে কোন লাভ হয় না। ভূল পথে চলাটি তখন অনিবার্য হয়ে উঠে। এজন্যই ইসলামে শ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ নয়, বরং সেটি হলো রাষ্ট্রকে অনৈসলামিক শক্তির হাত থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্র নায়কের আসনে ঈমানদার ব্যক্তিকে বসানো। বাংলাদেশীদের জন্য বিপদের বড় কারণ, দেশটি অধিকৃত হয়েছে ভয়ানক অপরাধীদের হাতে। এ অপরাধজীবী দুর্বৃত্তদের নাই পবিত্র কোর’আনের তথা সিরাতুল মুস্তাকীমের জ্ঞান। তাদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়ায় রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে জনগণকে পথভ্রষ্ট করার হাতিয়ারে। ফলে ভ্রষ্ট্তা বাড়ছে শুধু শিশুদের নয়, বয়স্কদেরও। শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সোসল ইঞ্জিনীয়ারিং হচ্ছে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে। মৌলবাদ বলে পরিহার করা হচ্ছে ইসলামের শরিয়তী বিধানকে।

ইসলামের প্রতি ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তদের আচরনকে শুধু ভ্রষ্টতা বললে ভূল হবে, বরং এটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে পূর্ণ বিদ্রোহ। আর সে বিদ্রোহই প্রবল ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। মুষ্টিমেয় কিছু ইসলামি দল ছাড়া দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো আল্লাহর প্রদর্শিত সে সিরাতুল মোস্তাকিমের অনুসরণ দূরে থাক, সেটির প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে না। আল্লাহর বিরুদ্ধে এটি হলো সীমাহীন ঔদ্ধত্য। এমন আচরণের তুলনা চলে সুবিজ্ঞ চিকিৎস্যকের দেওয়া প্রেসক্রিপশনের বিরুদ্ধে মরনাপন্ন রোগীর ঔদ্ধত্যের সাথে। এরাই রাজনীতিকে পরিণত করেছে খুন, গুম, লুট, ধর্ষণ, সন্ত্রাস এবং নানাবিধ অপরাধের হাতিয়ারে। মশা-মাছি যেমন রোগের বিস্তার ঘটায়, দুর্বৃত্তগণও তেমনি দুর্বৃত্তায়ন ঘটায় দেশ জুড়ে। এরই ফলে রাজনৈতিক দলের লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মী, সামরিক বাহিনীর শত শত অফিসার, হাজার হাজার সরকারি আমলা, বহু হাজার ধনি ব্যবসায়ী এবং বিপুল সংখ্যক ধর্মব্যবসায়ী পরিণত হয়েছে সার্বক্ষণিক অপরাধজীবীতে। দেশের সকল ডাকাত দলে বা সন্তাসী বাহিনীতে এতো দুর্বৃত্তের সমাবেশ ঘটেনি যা ঘটেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। দুর্বত্তদের যারা যত বেশী দলে ভেড়াতে পারে -তারাই রাজনীতিতে বেশী প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী। রাজনীতির নামে রাস্তায় লগিবৈঠা দিয়ে পিঠিয়ে মানুষ হত্যা বা যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ দেওয়া – রাজনৈতিক নেতাদের কাছে কোন অপরাধই নয়। বরং ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে সেটিকে তারা অপরিহার্য মনে করে। বাংলাদেশের ইতিহাস এমন বীভৎস অপরাধ কর্মে ভরপুর। খুনোখুনির ঘটনা ঘটেছে এমনকি সংসদেও। গণতন্ত্রের নামে দেশে বার বার নির্বাচন হয়; কিন্ত মিথ্যা ওয়াদা ও ধোকাবাজীর উপর যে দেশে নিয়ন্ত্রণ নেই, সে দেশে দুর্বৃত্তদের কি নির্বাচনে পরাজিত করা যায়? নির্বাচন বরং তাদের সামনে ক্ষমতা দখলে রাস্তা খুলে দেয়।

নির্বাচন পরিণত হয়েছে নাশকতার আরেক সফল হাতিয়ারে। ডাকাতি হয় ব্যালটের উপর। এবং বিজয়ী হয় ভোট-ডাকাতেরা। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ভোটডাকাতেরা দখলে নেয় দেশের প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আইন-আদালত ও মিডিয়াসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে বাংলাদেশে বার বার নির্বাচন হলেও শোষন, লুটপাঠ, দুবৃত্তি ও দূর্নীতি থেকে দেশবাসীর মূক্তি মিলছে না। বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। অপরাধজীবিদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে বিপর্যয় শুরু হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র জুড়ে। জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ইস্যু তাই রাজনীতির ময়দান থেকে পথভ্রষ্টদের নির্মূল। ইসলামে এটিই পবিত্র জিহাদ। নবীজী (সা:)’র আমলে মুসলিমদের সবচেয়ে বেশী কোরবানী পেশ করতে হয়েছে রাজনীতির ময়দানের আবর্জনা সরাতে। সেদিন সে কাজে বড় বাধা রূপে খাড়া হয়েছিল আবু লাহাব, আবু জেহলের মত দুর্বৃত্ত নেতারা। এসব দুর্বৃত্তদের নির্মূলে মুসলিমদের যত রক্তক্ষয় হয়েছে তা নামায-রোয়া, হজ্ব-যাকাত বা অন্য কোন বিধান প্রতিষ্ঠা দিতে হয়নি।

 

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি মানব উন্নয়নে

রাজনীতির মূল লক্ষ্য বা এজেন্ডা কি? সেটি কি শুধু সরকার পরিবর্তন? সেটি কি নিছক নির্বাচন? লক্ষ্য কি শুধু রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত ও কলকারাখানা নির্মাণ? পণ্য বা মানব রপ্তানীতে বৃদ্ধি আনা? বাংলাদেশে এ অবধি নির্বাচন ও সে সাথে সরকার পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। নানা দল নানা এজেন্ডা নিয়ে ক্ষমতায় গেছে। কিন্তু দেশ কতটুকু সামনে এগিয়েছে? জনগণের জীবনে উচ্চতর মানবিক মূল্যবোধই বা কতটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছে? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এ জন্য দরিদ্র নয় যে, সেখানে সম্পদের অভাব। বরং দারিদ্র্যের কারণ, তারা যেমন ব্যর্থ নিজেদের মূল্য বাড়াতে, তেমনি ব্যর্থ খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য বাড়াতে। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় অক্ষমতা। একটি দেশের প্রাচুর্য্য তো বাড়ে সে দেশে মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কতটুকু মূল্য সংযোজন হলো তার উপর। তাই উন্নয়ন বাড়াতে হলে মূল্য বাড়াতে হয়। পাট, তূলা, চা, কফি, তেল, গ্যাস, তামা, কপার, ইউরেনিয়াম, বক্সাইট, টিনের ন্যায় অধিকাংশ কৃষি ও খনিজ সম্পদের উৎস হলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। কিন্তু এ সম্পদের কারণে বেশী লাভবান হচ্ছে পাশ্চাত্যের দেশগুলো। কারণ, এসব কৃষি ও খণিজ সম্পদের উপর সিংহভাগ মূল্য সংযোজন হয় পাশ্চাত্য দেশগুলির কারখানায়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো রয়ে গেছে কাঁচামাল বা খনিজ সম্পদের জোগানদার রূপে। তাই যারা উন্নয়ন চায় -তারা বিদ্যালয় ও কারখানা গড়ে। বিদ্যালয় মূল্য বাড়ায় মানব সন্তানের; এবং কারখানা মূল্য বাড়ায় পণ্যের।

বাংলাদেশে সবচেয়ে ব্যর্থ খাতটি মানব উন্নয়নের খাত। জাতি তখনই সবচেয়ে বেশী লাভবান হয় যখন মূল্য সংযোজন হয় মানুষের উপর। কারণ, মানুষই হলো আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তেলের বা সোনার মূল্য হাজারো গুণ বাড়লেও সেটি কি গুণবান ও সৃষ্টিশীল মানুষের সমান হতে পারে? মানুষের উপর মূল্য সংযোজন হলে সে মানুষটি মহৎ গুণে বেড়ে উঠে। তখন সে মানুষটি মূল্য বাড়ায় প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের উপরও। কম্পুউটির বিজ্ঞানী বিল গেটসের উৎপাদন ক্ষমতা কি কোন তেলের খনির চেয়ে কম? শিক্ষাখাত ব্যর্থ হলে বিল গেটসগণ অনাবিস্কৃত থেকে যায়। এজন্যই শিল্পোন্নত দেশগুলোর শিক্ষাখাতে তথা মানব সম্পদের উন্নয়নে বিনিয়োগটি বিশাল। মানুষের মূল্য বৃদ্ধি বা গুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বা উদ্যোগ নেওয়া এজন্যই ইসলামে এতো গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার সওয়াব এজন্যই এতো বেশী। কারণ, এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজই হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যবৃদ্ধি তথা মহত্তর গুণ নিয়ে বেড়ে উঠায় সহায়তা দেওয়া। তাদের কারণে সমাজ ও রাষ্ট্র তখন বহুগুণে সমৃদ্ধ হয়। এমন রাষ্ট্রের বুকেই নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। মানুষ গড়ার এ মহান কাজটিই এ জন্যই তো মুসলিম রাজনীতির মূল এজেন্ডা। তখন রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়, মানুষকে জান্নাতের যোগ্য করে গড়ে তোলা। এমন মানুষের গুণেই ইসলামী রাষ্ট্রের বুকে আল্লাহর সাহায্য ও শান্তি নেমে আসে।  নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে তো সেটিই হয়েছিল। ইসলামে এমন রাজনীতি তাই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই শুরু থেকেই হয়নি। এজন্যই দেশটি তার ইতিহাসে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি ও সর্বাধিক দূর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র রূপে।

 

মুসলিমের এজেন্ডা ও অমুসলিমের এজেন্ডা

রাজনীতির মূল ইস্যুটি নির্ধারিত হয় জনগণের ধর্ম, জীবনদর্শন, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন থেকে। তাই পূঁজিবাদী ও সমাজবাদী দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা কখনোই এক হয় না। তেমনি এক হয় না মুসলিম ও অমুসলিম দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা। ব্যক্তির মনের গভীরে লালিত আদর্শ বা বিশ্বাস শুধু তার ধর্ম-কর্ম, ইবাদত-বন্দেগী, খাদ্য-পানীয়ের ব্যাপারেই নিয়ম বেঁধে দেয় না, নির্ধারিত করে দেয় জীবনের মূল এজেন্ডাও। তা থেকেই নির্ধারিত হয় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচী। তাই আরবের কাফেরদের এজেন্ডা ও মুসলিমদের এজেন্ডা কখনোই এক ছিল না। মুসলিম যখন বিজয়ী হয় তখন সমাজ থেকে শুধু মূর্তিগুলোই অপসারিত হয়নি। অপসারিত হয়েছিল তাদের প্রচলিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধ। কারণ, একটি মুসলিম সমাজ কখনই অমুসলিম বা সেক্যুলার মূল্যবোধের অধীনে গড়ে উঠতে পারে না। যেমন প্লেনের ইঞ্জিন নিয়ে কোন রেল গাড়ী সামনে এগুতে পারে না। রাজনীতি যেমন জাতির ইঞ্জিন, তেমনি সে ইঞ্জিনের জ্বালানী হলো জনগণের চেতনায় লালিত দর্শন। মুসলিমদের ক্ষেত্রে সেটি হলো পবিত্র কোর’আন।

যে রাজনীতিতে উচ্চতর দর্শন নেই, সে রাজনীতিতে ইচ্ছা ও এজেন্ডা থাকে না উচ্চতর ও মহত্তর লক্ষ্যে চলার। তখন নেমে আসে জগদ্দল পাথরের ন্যায় স্থবিরতা। স্রোতহীন জলাশয়ে যেমন মশামাছি বাড়ে, তেমনি দর্শন-শূণ্য স্থবির রাজনীতিতে বৃদ্ধি ঘটে দর্শনশূণ্য দুর্বৃত্ত কীটদের। সেটিরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো বাংলাদেশ। নবীজী(সা:)’র আমলে আরবের স্থবির ও পাপাচার-পূর্ণ জীবনে মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে যে প্রচন্ড বিপ্লব ও গতি সৃষ্টি হয়েছিল তার কারণ, রাজনীতির ইঞ্জিন তখন আল্লাহপ্রদত্ত দর্শন পেয়েছিল। চালকের পদে বসেছিলেন মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানবগণ। অথচ সে প্রচন্ড শক্তি থেকে দারুন ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশের আজকের রাজনীতি। কারণ, বাংলাদেশের ড্রাইভিং সিটে বসে স্বৈরাচারি চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতগণ। দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে ইসলাম ও আল্লাহর নাম নেওয়া তাদের কাছে সাম্প্রদায়ীকতা। তাদের দাবী, রাজনীতিতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করার। স্বৈরাচারি আওয়ামী-বাকশালী আমলে নিষিদ্ধ হয়েছিল ইসলামের নামে রাজনীতির সে মৌলিক নাগরিক অধিকার। সরকারি মহলে নিষিদ্ধ হয়েছিল বিসমিল্লাহ। অপসারিত হয়েছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রোম থেকে কোর’আনের বানী ও মহান আল্লাহতায়ালার নাম। এভাবেই দর্শনশূণ্য এবং সে সাথে ইসলাশূণ্য হয়েছিল মুজিবামলের রাজনীতি। এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিব-পূজা ও পূজাজীবীরা। ফল দাঁড়িয়েছিল, সবচেযে বড় ও দ্রুত ধ্বংস নেমেছিল নীতি-নৈতিকতা, আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে। সৃষ্টি হয়েছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ -যাতে প্রাণ হারিয়েছিল বহু লক্ষ মানুষ। এবং বিলুপ্ত হয়েছিল দেশের স্বাধীনতা, মানবতা ও ন্যূনতম মানবিক অধিকার। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের পায়ের তলায় পিষ্ট হযেছিল দেশের সার্বভৌমত্ব। এবং গণতন্ত্র ও মানবতার কবরের উপর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিবের এক দলীয় বাকশালী স্বৈরাচার।

 

লক্ষ্য: ইসলামকে পরাজিত রাখা

মুজিবামলের ন্যায় আবার দাবী উঠেছে, রাজনীতিতে ইসলাম নিষিদ্ধ করার। এ দাবী উঠানোর হেতু কি? কারণ একটিই, তা হলো বাংলাদেশকে নীচে নামানোর কাজকে আবার তীব্রতর করা। শয়তান সেটিই চায়। ইসলামী দর্শন, আইন ও মূল্যবোধের পরাজয়ের মধ্যেই তাদের আনন্দ। রাজনীতির ইঞ্জিনকে দর্শনশূণ্য করাই তাদের মূল লক্ষ্য। বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের প্রভু ভারতও সেটিই চায়। সত্তরের দশকেও মুজিব সেটিই করেছিল। দাবীটি আজও এসেছে সেই একই আওয়ামী বাকশালীদের পক্ষ থেকে। কারণ, প্রচন্ড ইসলামী ভীতি। ভয়ের কারণ, বাংলাদেশের ৯১% ভাগ মানুষ মুসলিম। আরো কারণ, দেশটিতে দ্রুত ভাবে বাড়ছে ইসলামী জ্ঞানচর্চা এবং সে সাথে নতুন প্রজন্মের মনে প্রবলতর হচ্ছে ইসলামী চেতনা। বাড়ছে ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক শক্তি।

ইসলামের বিজয় মানেই শরিয়তের প্রতিষ্ঠাসহ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে ইসলামী বিধানের পূর্ণ-প্রয়োগ। এবং সে সাথে সেক্যুলার মূল্যবোধ ও রীতি-নীতির বিলুপ্তি। তখন রাজনৈতিক পরাজয় ঘটে ইসলাম-বিরোধী শক্তির। নিজেদের জন্য এমন একটি পরাজয় বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ মেনে নিতে রাজী নয়। তাই সেরূপ অবস্থা সৃষ্টির আগেই ইসলামপন্থীদের সংগঠিত হওয়াকে তারা নিষিদ্ধ করতে চায়। আর সংগঠিত হতে না পারলে ইসলামপন্থীগণ লড়াই করবেই বা কি করে? একাকী কারো পক্ষেই বড় কিছু করা সম্ভব নয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে তো নয়ই। তখন ইসলামের শত্রুদের পক্ষে সহজেই সম্ভব হবে দেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে নিজেদের বিজয়ী অবস্থানকে ধরে রাখা। এজন্যই তাদের মুখে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে নির্মূলের ধ্বনি। এমন একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে বিগত ১৪ শত বছর ধরেই দেশে দেশ কাজ করছে ইসলামের চিহ্নিত দূষমনগণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ন্যায় শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের দেশে ইসলামের এমন শত্রুগণ বিজয় পায় কি করে? যেখানে ইসলামের পরাজয়, সেখানেই কি পরাজয় নয় বাঙালী মুসলিমের? এমন একটি পরাজয় মেনে নিলে কি মুসলিম থাকা যায়? বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি কি কম আত্মঘাতী? ১ম সংস্করণ ২৫/১০/২০০৮; ২য় সংস্করণ ২৭/০২/২০২১।

 




বিবিধ ভাবনা (৩০)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. পশু জীবন ও মানব জীবন

মানব সন্তানদের শুধু পানাহারে বাঁচলে চলে না, বাঁচতে হয় নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে। নইলে সভ্য সমাজ নির্মিত হয় না। সে দায়বদ্ধতা নিয়ে গৃহ থেকে শুধু আবর্জনা সরালে চলে না, রাষ্ট্র থেকে দুর্বৃত্তদেরও সরাতে নয়। নইলে দেশ তখন দুর্বৃত্তদের দখলে যায় এবং বাসের অযোগ্য হয়। দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় স্বৈরচারি জালেম শাসকের বিজয় দেখে তাই নিশ্চিত বলা যায়, সে কাজটি জনগণের দ্বারা যথার্থ ভাবে হয়নি। অর্থাৎ জনগণ পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালনে।

দেশে জালেমের জুলুম চলতে দেখেও যারা নিরব থাকে -তারা হয় স্বভাবে গরুছাগল অথবা নিজেরাই জড়িত জুলুমের সাথে। জুলুম দেখে কোন বিবেকমান মানুষই নিরব থাকতে পারে না। জালেমের হাতে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও সন্ত্রাস দেখে নিরব থাকা গরুছাগলের স্বভাব। কারণ, ঘাস খাওয়া ছাড়া তাদের জীবনে উচ্চতর কোন লক্ষ্য থাকে না। এবং যে দেশে জনগণ গরুছাগলের স্বভাব পায়, সে দেশে শেখ হাসিনার ন্যায় দুর্বৃত্তগণ চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতটি, গুম, খুন ও নৃশংস বর্বরতা চালিয়ে যাওয়ার অবাধ সুযোগ পায়। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে এমন চিন্তাশূণ্য ও দায়িত্বশূণ্য মানুষদের গরু-ছাগল বলেননি, তার চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন।   

২. যুদ্ধের পথ ও গাদ্দারীর পথ

সভ্য ভাবে বাঁচার খরচটি বিশাল। পানাহারের আয়োজন পশুপাখিও করে। কিন্তু সভ্য ভাবে বাঁচতে হলে আমৃত্যু যুদ্ধ করতে হয়। কারণ, জনপদে যেমন হিংস্র পশু থাকে, তেমনি মানবরূপী নৃশংস দুর্বৃত্তও থাকে। শান্তিতে বাঁচার জন্য যুদ্ধ তো উভয়ের বিরুদ্ধেও। সভ্য সমাজ তো তারাই নির্মাণ করে -যাদের জীবনে সে যুদ্ধটি লাগাতর থাকে । মানব জীবনে এর চেয়ে মহান কোন কাজ নাই। ইসলামে এ যুদ্ধকেই পবিত্র জিহাদ বলা হয়।

বাংলাদেশ এখন দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে হাসিনার নেতৃত্বে দুর্বৃত্ত পক্ষ। তাদের হাতেই দেশ আজ অধিকৃত। আরেক দিকে দেশের মজলুম জনগণ। মাঝে কোন তৃতীয় পক্ষ নাই। যারা দেশ থেকে দুর্বৃত্তির নির্মূল চায় চায়, তাদের সামনে যুদ্ধের এখনই সময়। এ যুদ্ধ সভ্য ভাবে বাঁচার। তাই সভ্য মানুষের জীবনে এমন যুদ্ধ অনিবার্য। এ যুদ্ধ থেকে নিজেকে দূরে রাখার অর্থ, দুর্বৃত্তকে তার জুলুম চালিয়ে যেতে  সহায়তা দেয়া। তাতে গাদ্দারী হয় মজলুল জনগণের সাথে।

৩. বাঙালীগণ কি শুধু ফেলই করতে থাকবে?

মহান আল্লাহতায়ালা বাংলাদেশীদের সামনে শেখ হাসিনা ও তার সহচর শয়তানদের চরিত্রকে শতভাগ উম্মোচিত করে দিয়েছেন। বাংলাদেশীদের সামনে এখন তাই ঈমানের বিশাল পরীক্ষা। তারা কি শয়তানদের দলে ভিড়ে নিজেরাও শয়তানে পরিণত হবে, না তাদের নির্মূল করবে? ফিরাউনদের ন্যায় দুর্বৃত্তদের রাজা বানিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা তো এভাবেই ঈমানের পরীক্ষা নেয়। মিশরের লোকজন সে পরীক্ষায় ফেল করেছিল। তারা ফিরাউনের দলেই শুধু ভিড়েনি, তার মত দুর্বৃত্তকে তারা ভগবান বলেছে। শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে সাগরে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ঈমানের পরীক্ষা শুধু রোগ-ভোগ ও বিপদ-আপদ দিয়ে হয় না, জালেম শাসককে দিয়েও হয়। জালেম শাসকের নৃশংস জুলুমের যাঁতাকলে পড়ে ঈমানের পরীক্ষায় পাশ করা খুবই কঠিন। হযরত ইব্রাহীম (আ:) সেটি বুঝতেন। তাই তিনি সেরূপ পরীক্ষা থেকে বাঁচার জন্য দোয়া করেছেন; এবং সে দোয়া লিপিবদ্ধ হয়েছে পবিত্র কোর’আনের সুরা মুমতেহানায়। মহান আল্লাহতায়ালা অতীতে বাংলাদেশীদের থেকে ঈমানের সে পরীক্ষাটি নিয়েছেন শেখ মুজিবের ন্যায় ইসলামবিরোধী, গণতন্ত্র হত্যাকারী, বাকশালী স্বৈরাচারী, মানবহত্যাকারী ও ভারতীয় কাফেরদের একনিষ্ঠ এক দালালের নৃশংস শাসন চাপিয়ে। সে পরীক্ষায় বাংলাদেশীগণ দারুন ভাবে ফেল করেছে। সেটি মুজিবের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে বরং তাকে সন্মানিত করে।

মহান আল্লাহতায়ালাকে একমাত্র উপাস্য বলার জন্য প্রচুর নৈতিক সামর্থ্য লাগে। লাগে সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা রূপে চেনা ও গ্রহণ করার সামর্থ্য। একমাত্র এমন ব্যক্তিগণই পরীক্ষায় পাশ করে। অপর দিকে শূণ্য নম্বর পেয়ে ফেলে করে সে ব্যক্তি যে ব্যক্তি মুর্তি, শাপ-শকুন, গরু-ছাগল ইত্যাদিকে ভগবান বলে এবং দুর্বৃত্তদেরকে জাতির পিতা ও বন্ধু বলে। ঈমানের এরূপ পরীক্ষায় ফেলের শাস্তি ভয়ানক। মুজিবভক্ত বাঙালীরা সে শাস্তি পেয়েছেও প্রচুর। শাস্তি স্বরূপ এসেছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। তখন মারা গেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ, অনাহারে অনেকে বুমি খেয়েছে। নারীরা কাপড়ের অভাবে জাল পড়েছে। ৩০ হাজারের বেশী মানুষ লাশ হয়েছে। বিশ্বের দরবারে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির খেতাব পেয়ে সবার চোখে অপমানিত হয়েছে। এবং দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে। বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসে কোন কালেও কি এরূপ অপমান জুটেছে? বিশ্বের প্রায় ২০০টি রাষ্ট্রের আরো কোন রাষ্ট্র কি এতটা নীচে নেমেছে?

মহান আল্লাহতায়ালা আবার পরিক্ষা নিচ্ছেন ভোটচোর দুর্বৃত্ত হাসিনার শাসন চাপিয়ে। যারা এক দুর্বৃত্ত চোরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও নেত্রী রূপে মাথায় তোলে -তাদেরকে কি মহান আল্লাহতায়ালা কখনো ইজ্জত ও শান্তি দেন? বাঙালীগণ কি এভাবে শুধু ফেলই করবে এবং শাস্তি পেতে থাকবে?

৪.ডাকাতের কদর

এক ডাকাত আরেক ডাকাতকে কদর করে। নইলে ডাকাতী করা যায় না। কারণ, ডাকাতি তো একাকী করার কাজ নয়; সে জন্য দল লাগে। তাই সেনা প্রধান জেনারেল আজিজের কদর শেখ হাসিনা ষোল আনা বুঝে। এটাই ডাকাত দলের সংস্কৃতি -যা এখন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
ডাকাত দলে সেই তো বেশী কদর পায় যে সবচেয়ে বড় ডাকাত।

বাংলাদেশে চোর-ডাকাত কম নেই। কিন্তু জেনারেল আজিজের ন্যায় বড় ডাকাত শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা দুনিয়াতে আছে কি? তার ডাকাতির নমুনা, ভোটডাকাতির মাধ্যমে ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশই ডাকাতি করে সে হাসিনার হাতে তুলে দিয়েছে। সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় ডাকাতি। বিশ্বের বহুদেশই বহু স্বৈরাচারি শাসকদের হাতে অধিকৃত হয়েছে; কিন্তু কোন দেশেই জনগণের ভোটের উপর এরূপ ডাকাতি কখনো হয়নি। আল-জাজিরার ডকুমেন্টারী তাই ডাকাত হাসিনার কাছে আজিজ ডাকাতের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই খবর বেড়িয়েছে, হাসিনাকে তাকে আরো উচ্চ পোষ্টে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

৫. বাঙালী চরিত্রের কদর্যতা ও ব্যর্থতা
মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত হলো, যেমন জাতি তেমন নেতা দেয়া। তাই কাফেরদের নেতা কাফের হয়। এবং মুনাফিকদের নেতা মুনাফিক হয়। ভাল নেতা পেতে হলে তাই জনগণকে নিজেদের চরিত্র বদলাতে হয়। হাসিনা যেভাবে দেশজুড়ে ভোটডাকাতি করলো -সেটি কি কোন সভ্য দেশে ভাবা যায়? সমগ্র দেশ জুড়ে ডাকাতি করতে হলে ঘরে ঘরে প্রতিবাদি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে হয়। তখন প্রয়োজন পড়ে লক্ষ লক্ষ ডাকাত নিয়ে বিশাল ডাকাত বাহিনী। শেখ হাসিনা সফল হয়েছে তেমন একটি বিশাল ডাকাত বাহিনী গড়ে তুলতে।

এরূপ একটি বিশাল ডাকাত বাহিনী কখনোই কোন জঙ্গলে গড়া যায় না। বিশ্বের অন্য কোন দেশেও গড়া যায়না। কিন্তু সেটি সহজেই গড়া যায় বাংলাদেশে। শেখ হাসিনা সেটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এবং সে ডাকাত বাহিনীটি গড়া হয়েছে গ্রামের নিরক্ষর মানুষদের নিয়ে নয়, বরং সেনাবাহিনী, প্রশাসনিক বাহিনী ও আদালত বাহিনীর তথাকথিত শিক্ষিত লোকদের নিয়ে। এভাবেই প্রকাশ পেল বাঙালী চরিত্রের কদর্যতা।

রবীন্দ্রনাথ যখন বলেছিলেন, হে বিধাতা, ৭ কোটি প্রাণীরে রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করোনি, -তখন বাঙালীর চরিত্র এতো খারাপ ছিল না। রবীন্দ্রনাথ এখন বেঁচে থাকলে বাঙালীর মানুষ হওয়ার বর্তমান ব্যর্থতা নিয়ে কি বলতেন -তা রীতিমত ভাবনার বিষয়। এমন চারিত্রিক কদর্যতা ও ব্যর্থতা নিয়ে কি মাথার উপর থেকে ডাকাত নামানো যায়?

৬. যে কর্ম জাহান্নামে নেয়

মানুষ উদ্ভিদ নয়। সবার জীবনেই কর্ম, রাজনীতি ও লড়াই আছে। তবে কর্মের খাতিরে কর্ম, রাজনীতির খাতিরে রাজনীতি এবং লড়াইয়ের খাতিরে লড়াইয়ে কোন কল্যাণ নাই। একমাত্র সে প্রচেষ্ঠাগুলিই মানুষকে কল্যাণ দেয় -যা করা হয় একমাত্র মহান আল্লাহতায়াকে খুশি করতে। এবং বিজয় বাড়ায় ইসলামের। একমাত্র সেগুলিই হলো ইবাদত। এজন্যই প্রতি কর্মের আগে ভাবতে হয়, সে কর্মে মহান আল্লাহতায়ালা আদৌ খুশি হবেন কী? এটিই হলো ঈমানদারের তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি। এমন একটি ভাবনাই মানুষকে পাপ ও দুর্বৃত্তি থেকে দূরে রাখে। এজন্যই নিয়েত শুধু নামায-রোযায় বাঁধলে চলে না, প্রতিটি কর্মেও থাকতে হয়। তেমন একটি ভাবনার কারণেই ব্যক্তির প্রতি মুহুর্তের ভাবনা ও কর্ম নেক আমলে পরিণত হয় -যা তাকে জান্নাতে নেয়। কিন্তু যে কর্ম, রাজনীতি ও লড়াই ইসলামের শত্রুর বিজয় দেয় –তা ব্যক্তিকে জাহান্নামে নেয়। বাংলাদেশে এমন ভাবনাশূণ্য কর্মের সংখ্যা বিশাল। ফলে বিজয়ী হচ্ছে শয়তানী শক্তি এবং পরাজিত হয়েছে ইসলাম।

 

৭. নিজের বিনিয়োগ কতটুকু?
সুন্দর, সভ্য ও শান্তিময় বাংলাদেশ কামনা করে –এমন লোকের সংখ্যা বাংলাদেশে অসংখ্য। কিন্তু এমন একটি বাংলাদেশ তো আকাশ থেকে পড়ার নয়। দেশবাসীকে সেটি নিজ হাতে নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু তেমন একটি সুন্দর বাংলাদেশ নির্মাণে নিজের বিনিয়োগ কতটুকু –তা নিয়ে ক’জন ভাবে? তাই বাংলাদেশের আজ যে নিদারুন ব্যর্থতা -তার জন্য কে অন্যদের দায়ী করা যায়? ব্যর্থতার দায়ভারও যে দেশবাসীর –সে হুশ ক’জনের?

৮. জ্ঞানের উৎপাদন

মানুষ যা খায় -তা দেখা যায় দৈহিক স্বাস্থ্যে। তেমনি যা পাঠ করে –সেটি দেখা যায় তার চরিত্র ও চেতনায়। দেশবাসীর দেহের স্বাস্হ্য বাড়াতে হলে তাই খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে হয়। তেমনি মনের স্বাস্থ্য বাড়াতে হলে বইয়ের তথা জ্ঞানের উৎপাদন বাড়াতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি হচ্ছে না। ফলে মানুষ বাঁচছে মনের প্রচণ্ড অসুস্থ্যতা নিয়ে। দেশে দুবৃত্তির যে প্লাবন -সেটি তো নৈতিক অসুস্থ্যতারই লক্ষণ।

ইংল্যান্ডের জনসংখ্যা সাড়ে ৬ কোটি। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। কিন্তু ইংল্যান্ডে যে পরিমাণ বই প্রকাশিত হয় তা বাংলাদেশে প্রকাশিত সকল বইয়ের বহুশত গুণ বেশী। বহু বছর আগের UNDP য়ের একটি রিপোর্ট বলা হয়: এক কোটি মানুষের দেশ গ্রীসে যে পরিমাণ বই ছাপা হয় -তা তিরিশ কোটি মানুষের ২২টি আরব দেশে ছাপা হয় না। আরবদের চেতনা, চরিত্র ও মানবিক মানদন্ডে পিছিয়ে থাকার কারণ তাদের সম্পদের কমতি নয়, সেটি জ্ঞানের কমতি।

ইসলাম যখন বিশ্বের সুপার পাওয়ার রূপে প্রতিষ্ঠা পায় -তখন তার মূলে সম্পদ বা জনশক্তি ছিল না। সেটি ছিল জ্ঞান। পবিত্র কোর’আনের আগে আরবী ভাষায় কোন বই ছিল না। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা জ্ঞানার্জনকে ফরজ করে। তখন জ্ঞানের উৎপাদনে সৃষ্টি হয় বিস্ময়কর রেকর্ড। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই আরবী ভাষা পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভাষায়। আজও কি মুসলিমদের সামনে ভিন্ন পথ আছে? ২৬/০২/২০২১। 




বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের একাত্তরের অপরাধ ও বাংলাদেশের আজকের সংকট

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বাঙালী মুসলিম জীবনে একাত্তর                  

পরীক্ষা শুধু ব্যক্তির জীবনে আসে না; জাতীয় জীবনেও আসে। জাতীয় জীবনে পরীক্ষায় পাশের উপর নির্ভর করে জাতি হিসাবে বিশ্ব মাঝে বিজয় ও সন্মান নিয়ে  বাঁচা। প্রতিটি জাতির মাঝেই কিছু ভাল লোক থাকে। কিন্তু জাতীয় পরিচয়টি সে স্বল্প সংখ্যক মানুষদের কারণে অর্জিত হয় না। এখানে বিচার হয় সমগ্র জনগণের। জনগণের পরীক্ষা হয় ঈমান, ঐক্য, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, শত্রু-মিত্রের পরিচয়, শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ভাঙ্গার বদলে গড়ার সামর্থ্য নিয়ে বাঁচার যোগ্যতার। সে পরীক্ষায় ফেল করলে বাড়ে পরাজয়, বিপর্যয় ও অপমান। তেমন একটি পরীক্ষা ১৯৭১’য়ে বাঙালী মুসলিম জীবনেও এসেছিল। বাঙালী মুসলিমগণ সে পরীক্ষায় নিদারুন ভাবেই ফেল করেছে। তারা চিনতে ব্যর্থ হয়েছে শত্রুকে। ফলে আশ্রয় নিয়েছে ভারতের ন্যায় শত্রুর পেটে। অন্যরা গড়া নিয়ে গর্ব করে, বাঙালীরা গর্ব করে ভাঙ্গা নিয়ে। সেটি বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গার। কবরে পাঠিয়েছে গণতন্ত্রকে। এনেছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির খেতাব। বাঙালীর সমগ্র ইতিহাসে এমন বিপর্যয় ও অপমান আর কোন কালেই জুটেনি। বাঙালী মুসলিম ইতিহাসের এ হলো এক কালো অধ্যায়। এবং জনগণের চেতনা ও চরিত্রের গভীর পচনটি ধরা পড়ে শেখ মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারী, গণতন্ত্র হত্যাকারী, তিরিশ হাজারের বেশী মানবহত্যকারী ও ভারতের এজেন্টকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলার মধ্য দিয়ে।

মুসলিম জীবনের পুরস্কারটি বিশাল। সেটি জান্নাত। জান্নাতের এক ইঞ্চি ভূমিও হিমালয়ের সমান স্বর্ণ দিয়ে কেনা যায় না। সে পুরস্কার লাভের জন্য পরীক্ষায় পাশ করতে হয়। এবং সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয় রাজনীতিতে। কারণ মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হবে কি হবে না, সেটি মসজিদ-মাদ্রাসা এবং নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের উপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে মুসলিমগণ রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামকে কতটা বিজয়ী করতে পারলো তার উপর। একমাত্র রাজনীতির অঙ্গণেই পরীক্ষা হয় অন্যায়ের নির্মূলে ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় শ্রম, অর্থ, মেধা ও রক্তের বিনিয়োগের সামর্থ্যের।

অন্যদের কাছে রাজনীতি ক্ষমতাদখলের হাতিয়ার। ফলে সে রাজনীতিতে যেমন মিথ্যাচার ও ভন্ডামী আছে, তেমনি সন্ত্রাস ও ভোটডাকাতিও আছে। আছে শত্রুদেশকে নিজ দেশের অভ্যন্তরে ডেকে আনার ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশে সেরূপ ষড়যন্ত্র যেমন একাত্তরে ঘটেছে, তেমনি আজও হচ্ছে। কিন্তু ঈমানদারের কাছে রাজনীতি হলো ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ইসলামিকরণের ইবাদত। তাই এটি পবিত্র জিহাদ। ইবাদতের রাজনীতির সে পবিত্র সূন্নত প্রতিষ্ঠা করতেই নবীজী (সা:) নিজে আমৃত্যু রাষ্ট্র-প্রধান থেকেছেন। এটিই নবীজী (সা:)’র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। এ পথেই আসে ইসলামের বিজয়। তখন মহান আল্লাহতায়ালার জমিনে প্রতিষ্ঠা পায় তাঁরই সার্বভৌমত্ব।

প্রশ্ন হলো, মহান নবীজী (সা:) যে আসনে বসেছেন সে আসনে কি চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও দুর্বৃত্তদের বসানো যায়? সেটি হলে, ঘটে উল্টোটি। তখন দেশ দুর্বৃত্তিতে রেকর্ড গড়ে –যেমনটি হয়েছে বাংলাদেশে। গলিত আবর্জনার মাঝে সভ্য জীবন অসম্ভব। জীবন দুর্ভিষহ হয় দেশ দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে। তাই সমাজে সর্বশ্রেষ্ঠ কর্মটি দুর্বৃত্ত শাসনের নির্মূল। ইসলাম এ কাজকে জিহাদ তথা শ্রেষ্ঠ ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। এজন্যই দেশের শাসনক্ষমতা দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে, তাদের সরানো প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ হয়ে যায়। এ ফরজ ইবাদতটি পালিত না হলে তখন নবীজী (সা:)’র শিক্ষাও পালিত হয়না। তখন শত্রুর হাতে শুধু পরাজয়ই আসে না, আসে মহান আল্লাহতায়ার পক্ষ থেকে আযাব। দুর্বৃত্ত শাসন তখন আযাবের হাতিয়ারে পরিণত হয়।

প্রতি পেশা, প্রতি কর্ম ও প্রতি আচরনে পথ দেখায় পবিত্র কোর’আন। কিন্তু বেঈমানেরা সে পথে চলতে রাজি নয়। তারা চায়, নিজেদের স্বৈরাচারি স্বার্থসিদ্ধি। এবং সে স্বৈরাচারি স্বার্থসিদ্ধিকে বাধাহীন করার স্বার্থেই তারা দেশের সংবিধান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, আইন-আদালত, প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাদফতরের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশাবলির প্রবেশাধিকার দিতে রাজি নয়। অথচ মু’মিনের ঈমানদারি হলো, ইসলামের প্রতিটি বিধান মেনে চলায় আপোষহীন হওয়া। তাই শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে ফরজ-ওয়াজেব মানলে চলে না, ফরজ-ওয়াজেব এবং নবীজী (সা:) সূন্নতগুলি মানতে হয় রাজনীতিতেও। এ ক্ষেত্রে অবহেলা বা বিদ্রোহ হলে অনিবার্য হয় অনন্ত-অসীম কালের জন্য জাহান্নামের আগুণে পৌঁছা।

মাত্র একটি হুকুম অমান্য করায় অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয়েছে ইবাদতে মশগুল থাকা ইবলিস। একই কারণে, রাজনীতির অঙ্গণে মহান আল্লাহতায়ালার কোন একটি হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটলে নামাযী ব্যক্তিও শয়তানকে পরিণত হয়। ঈমানদার ব্যক্তির জীবনে প্রতিক্ষণের ভাবনা তাই প্রতিপদে পবিত্র কোর’আনে বর্নিত বিধানের পূর্ণ অনুসরণের –সেটি রাজনীতিতে হোক বা শিক্ষা-সংস্কৃতি বা আইন-আদালতে হোক। প্রদর্শিত সে পথটি হলো সিরাতুল মুস্তাকীম। এখানে অবাধ্য বা বিদ্রোহী হলে ঈমান থাকে না। অন্য কোন সফলতাই এমন ব্যক্তিকে জাহান্নামে পৌঁছা থেকে বাঁচাতে পারে না। ঈমানদারের জীবনে প্রতি মুহুর্তে এটিই  হলো পরীক্ষা। জান্নাতপ্রাপ্তি তো ঘটে সে পরীক্ষায় পাশের মধ্য দিয়ে। মহান আল্লাহতায়ালার সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে,“মানুষ কি ভেবে নিয়েছে যে, ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং পরীক্ষা করা হবে না? আমরা তো তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি এবং জেনে নিয়েছি ঈমানের দাবিতে কারা সাচ্চা এবং কারা মিথ্যাবাদি।” –(সুরা আনকাবুত, আয়াত ২-৩)। জীবনের চুড়ান্ত পরীক্ষাটি হয় রাজনীতিতে। এখানে নিরপেক্ষ থাকার উপায় নাই, তাকে একটি পক্ষকে সমর্থণ দিতেই হয়। ফলে ধরা পড়ে সে কোন পক্ষে দাঁড়ালো, ভোট দিল বা অস্ত্র ধরলো। নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে সেরূপ কোন পক্ষ নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না; ফলে সুযোগ থাকে নিজের মুনাফিকি লুকানোর। বাঙালী মুসলমানের জীবনে একাত্তর এসেছিল তেমনি এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পর্ব নিয়ে।

 

একই উৎসবে বাঙালী মুসলিম ও ভারতীয় কাফের!

বাঙালী মুসলিমের একাত্তরের পাকিস্তান ভাঙ্গার যুদ্ধজয়টি দেশ-বিদেশের জাতীয়তাবাদী, সমাজবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, মুর্তিপূজারী, গো-পূজারী, ইহুদী-খৃষ্টান ও নাস্তিকদের কাছে অতি প্রশংসিত। প্রতিবছর সে বিজয় নিয়ে বাংলাদেশে যেমন উৎসব হয়, তেমনি উৎসব হয় ভারতেও। এ উৎসবটি বাঙালী মুসলিমগণ ভারতীয় কাফেরদের সাথে একত্রে করে। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে এমন ঘটনা দ্বিতীয়টি নাই। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার কাছেও কি বাঙালী মুসলমানের একাত্তরের কর্মটি শ্রেষ্ঠ কর্ম রূপে বিবেচিত হবে? একাত্তর নিয়ে বহু বই লেখা হয়েছে, বহু আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু একাত্তরের সে পরীক্ষাপর্বে মহান আল্লাহতায়ালার বিধান কতটুকু মানা হয়েছে -সে বিচার কি কখনো হয়েছে? তা নিয়ে লেখা হয়েছে কি কোন বই? অথচ এটি ঈমানী দায়বদ্ধতা যে প্রতিটি মুসলিম তার প্রতিটি কর্মকে মিলিয়ে দেখবে -কতটা মানা হয়েছে কোর’আনের বিধানকে। প্রচণ্ড অবজ্ঞা হয়েছে এ ক্ষেত্রে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে এ নিয়ে বিচার অবশ্যই বসবে। তখন কি জবাব হবে বাঙালী মুসলিমের? প্রতিটি মুসলিমকে সেদিন শুধু নামায-রোযার হিসাব দিলেই চলবে না, রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহে তার নিজস্ব ভূমিকারও হিসাব দিতে হবে।

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে রাজনীতির গুরুত্বটি অপরিসীম। জীবন ও জগত নিয়ে ব্যক্তির ধ্যান-ধারনাগুলি কীরূপ এবং সে কোন পক্ষের লাঠিয়াল -সেটি জায়নামাজে প্রকাশ পায় না। প্রকাশ পায় রাজনীতিতে। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের প্রতি কে কতটা অনুগত বা বিদ্রোহী -সেটিরও প্রকাশ ঘটে রাজনীতিতে। রাজনীতির বিজয়ী পক্ষই নির্ধারণ করে দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় নীতি, অর্থনীতি, আইন-আদালত কোন দিকে পরিচালিত হবে। রাজনীতিই নিয়ন্ত্রণ আনে ধর্মের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার উপর। মহান রাব্বুল আ’লামীন তাই মানব জাতির এরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীরব থাকেন কীরূপে? তাই তাঁর যুদ্ধটি স্রেফ মুর্তিপূজারি, অগ্নিপূজারি, দেব-দেবী পূজারি বা নাস্তিকদের বিরুদ্ধে নয়, বরং ফিরাউন-নমরুদদের ন্যায় রাজনীতির কর্ণধারদের বিরুদ্ধেও। নিজেদের এবং সে সাথে অন্যদের জীবনকে যারা সিরাতুল মোস্তাকীমে পরিচালিত করতে চায় -রাজনীতির নিয়ন্ত্রনকে স্বহস্তে নেয়া ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প পথ নেই। খোদ নবীজী (সা:) ও তাঁর মহান খলিফাদের এ জন্যই রাষ্ট্রনায়কের আসনে বসতে হয়েছে। রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটে বসা ও নেতৃত্বের দায়ভার স্বহস্তে নেয়া তাই নবীজী (সা:)’র মহান সূন্নত। ইসলামের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় এ সূন্নত পালনের মধ্য দিয়ে। মহান নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের জানমালের বেশীর ভাগ ব্যয় হয়েছে সে সূন্নত পালনে। ইসলামে এটি পবিত্রতম জিহাদ। রাজনীতির ময়দানে ঈমানদার ব্যক্তি তাই নীরব দর্শক নয়,তার অবস্থান বরং প্রথম সারিতে।

 

বিকল্প নাই ঐক্য ও সামরিক বলের

রাজনীতিতে মূল ফরজটি হলো অসত্য ও অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। হারাম হলো যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বিরোধী এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বিরোধী তাদের সমর্থণ করা ও তাদের ভোট দেয়া বা তাদের পক্ষে যুদ্ধ করা। কিন্তু রাজনীতির ফরজ পালন কি এতোই সহজ? বিশ্ব তো অধিকৃত আল্লাহর শত্রুপক্ষের হাতে; এবং পরাজিত মহান আল্লাহতায়ালার কোর’আনি বিধান ও তাঁর সার্বভৌমত্ব। কোন একক ভাষা ও একক দেশের মুসলমানদের পক্ষে কি সম্ভব মহান আল্লাহর দ্বীনের  শত্রুদের পরাজিত করা? নানা ভাষা ও নানা বর্ণের শত্রুগণ তো গড়েছে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন। ইরাক ও আফগানিস্তান দখলে রাখতে এ কোয়ালিশন পাঠিয়েছিল ৪০টি দেশের সেনাবাহিনী। মুসলিমগণ কি তাই ভাষা, ভূগোল, অঞ্চল বা বর্ণের নামে বিভক্ত হতে পারে?

বিভক্তি কোন কালেই বিজয় ও স্বাধীনতা আনে না। আনে পরাধীনতা। ইসলামে ভাষা বা বর্ণভিত্তিক বিভক্তির জাতীয়তাবাদি রাজনীতি এজন্যই কবিরা গুনাহ। অথচ সে কবিরা গুনাহর রাজনীতিই ১৯৭১ সালে বিজয়ী হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। এবং সে বিজয় নিয়ে আজ উৎসবও হয়। ভাষাভিত্তিক রাজনীতি করে বাংলার মুসলিমদের পক্ষে কি একাকী সম্ভব ছিল ১৯৪৭য়ে স্বাধীনতা অর্জন? ভারতের বাঙালী, গুজরাটি, মারাঠী, বিহারী,পাঞ্জাবী, তামিল, কাশ্মিরী ও আসামী হিন্দুগণ ভাষার ভেদাভেদ ভূলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আজও একতাবদ্ধ। তারা একতাবদ্ধ ছিল ১৯৪৭’য়েও। অথচ রাজনীতির ময়দানের এরূপ একতাবদ্ধ হওয়াটি হিন্দুদের উপর ধর্মীয় ভাবে ফরজ নয়। কিন্তু অনিবার্য ফরজ হলো মুসলিমদের উপর। একাকী স্বাধীনতার পথ ধরতে গিয়ে কাশ্মিরের শেখ আব্দুল্লাহ যা অর্জন করেছে তা হলো ভারতের পদতলে অধীনতা। স্বাধীনতা ও সম্মান কি আছে বিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত আরব মুসলিমদের? বাংলার মুসলিমদের ১৯৪৭’য়ের সৌভাগ্যটি হলো, কাশ্মিরী নেতা শেখ আব্দুল্লাহর ন্যায় ভাষা বা প্রদেশের নামে তারা উপমহাদেশের অন্য ভাষাভাষী মুসলিমদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। বরং তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেছে। নইলে বাংলাদেশও পরিণত হতো ভারতের পদতলে পিষ্ট আরেক কাশ্মিরে।

মুসলিম হওয়ার চ্যালেঞ্জটি বিশাল। মু’মিনের জীবনে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধটি তো অনিবার্য। শয়তান ও তার অধিপত্যবাদি কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে লড়াই এখানে প্রতিদিনের। যে মুসলিমের জীবনে সে যুদ্ধটি নাই,বুঝতে হবে তার ঈমান ও মুসলিম হওয়া নিয়েই বিশাল শূণ্যতা আছে। ইসলামের শত্রুপক্ষ কি চায়, নবীজী (সা:)’র ইসলামের ন্যায় যে ইসলামে শরিয়ত আছে, জিহাদ আছে এবং খেলাফত আছে -তা নিয়ে মুসলিমগণ বেড়ে উঠুক? তারা কি চায় বিশ্বের কোন এক ইঞ্চি ভূমিতেও শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পাক? তারা তো বিশ্বকে একটি গ্লোবাল ভিলেজ রূপে দেখে। সে ভিলেজে মদ্যপায়ী, ব্যভিচারি, সমকামী, গো-পূজারি, মুর্তিপূজারি ও নাস্তিকদের জন্য পর্যাপ্ত স্থান ছেড়ে দিতে তারা রাজী। কিন্তু নবীজী (সা:)’র যুগের ইসলাম নিয়ে যারা বাঁচতে চায় তাদের জন্য কি সামান্যতম স্থানও ছেড়ে দেয়? বরং তাদের বিরুদ্ধে তো নির্মূলের ধ্বনি। সেটি শুধু বাংলাদেশে নয়, প্রতি দেশেই। মু’মিনের জীবনে সমগ্র বিশ্বটাই তাই রণাঙ্গন।এ রণাঙ্গণে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার অবস্থানটি তাদের  পক্ষে। যুদ্ধরত মু’মিনদেরকে তিনি গ্রহণ করেছেন নিজ বাহিনী তথা হিযবুল্লাহ রূপে। আর তার নিজ বাহিনীর লোকদের কি তিনি জাহান্নামের আগুণে ফেলতে পারেন? মু’মিনের জীবনে এর চেয়ে বড় অর্জন আর কি হতে পারে?

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অতি প্রিয় হলো, যুদ্ধরত মুজাহিদগণ যুদ্ধ করবে সীসাঢালা প্রাচীরসম একতা নিয়ে। তাঁর নিজবাহিনীর মাঝে অনৈক্য তাঁর অতি অপছন্দের। পবিত্র কোরআনে সেটি ঘোষিত হয়েছে এভাবে: “নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ভালবাসেন যারা তাঁর রাস্তায় যুদ্ধ করে এমন কাতারবদ্ধ ভাবে যেন তারা সীসাঢালা প্রাচীর।” –(সুরা সাফ,আয়াত ৪)। মুসলিম জীবনে একতা তাই অনিবার্য কারণেই এসে যায়। সেটি যেমন সমাজ জীবনে, তেমনি দেশের রাজনীতি ও বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে। যেখানে অনৈক্য, বুঝতে হবে সেখানে ঈমানে শূন্যতা রয়েছে। অনৈক্যের অর্থই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা। অথচ আজ  সে অবাধ্যতাই মুসলিম বিশ্বে জোয়ারের ন্যায় ছেয়ে আছে। মুসলিম জাহান আজ ৫৭ টুকুরোয় বিভক্ত। ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রের কি স্বাধীনতা থাকে? থাকে কি নিজ দেশে শিক্ষা-সংস্কৃতি,অর্থনীতি,আইন-আদালত ও প্রশাসনে আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ মেনে চলার স্বাধীনতা? স্বাধীনতার খরচটি তো বিশাল। সে খরচ জোগানোর জন্য চাই রাষ্ট্রের বিশাল ভূগোল। সে জন্য চাই একতা। এবং হারাম হলো বিভক্তি।

ইসলামের শত্রুপক্ষ তো চায় বিশ্বের প্রায় দেড় শত কোটি মুসলিম বেঁচে থাকুক ইসলামকে বাদ দিয়ে। এক্ষেত্রে তাদের সামনে উত্তম মডেল হলো বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশের ডি-ইসলামাইজড সেক্যুলারিস্টগণ। এ অবাধ্যদের জীবনে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণ নেই। নেই শরিয়তের প্রতি বিশ্বাস। নেই জিহাদ ও ইসলামের প্রতিষ্ঠায় সামান্যতম অঙ্গিকার। যা আছে তা হলো ইসলামের প্রচার ও প্রসার রোধে লাগাতর ষড়যন্ত্র। আছে দুর্বৃত্তি। আছে ইসলামপন্থীদের নির্মূলে সর্বাত্মক যুদ্ধ। কিন্তু এরপরও তাদের দাবী, তারা মুসলিম। আফগানিস্তান দখলের পর জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাবুলে দাঁড়িয়ে বলেন, “শরিয়তি আইনকে আফগানিস্তানে ফিরে আসতে দেয়া হবে না।” মুসলিম ভূমিতে দাঁড়িয়ে এ কথা বলার সাহস কাফেরগণ পায় কোত্থেকে? আফগানিস্তানের আাইন কীরূপ হবে সেটি কি জার্মানী বা অন্য কোন কাফের দেশ থেকে অনুমতি নেয়ার বিষয়? ইসলামের শত্রুগণ কি আব্বাসীয়, উমাইয়া বা উসমানিয়া খেলাফতের আমলে এমন আস্ফালন উচ্চারণ করতে পেরেছিল? অথচ তখনও তো তারা সেটিই চাইতো। প্রশ্ন হলো, শরিয়ত ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়? পবিত্র কোরআনের মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, “আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচার করে না তারাই কাফের,..তারাই জালেম,..তারাই ফাসেক। -(সুরা মায়েদা,আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭)।

 

কেন এ পতন?

রাষ্ট্রের শক্তি ও সামর্থ্য বিশাল। এটিকে নিয়ন্ত্রনে না রাখলে পাগলা হাতির ন্যায় তছনছ করে দিতে পারে ধর্ম ও সভ্য জীবন-যাপনের সকল আয়োজন। আজকের বাংলাদেশে তো তারই উদাহরণ।দেশ অধিকৃত হয়েছে ভয়ংকর চোর-ডাকাতদের হাতে। ফলে বিপন্ন শুধু ইসলামই নয়, মানুষের জানমাল এবং ইজ্জত-আবরুও। আল্লাহর দ্বীন পালন কি শুধু মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়িয়ে চলে? সেটি সম্ভব হলে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবনে কেন এতো যুদ্ধ? কেনই বা তাদেরকে রাষ্ট্রনায়কের আসনে বসতে হলো? নবীজী (সা:)’র জীবনের বড় শিক্ষা: ইসলামের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার জন্য চাই রাষ্ট্রীয় শক্তির পূর্ণ ব্যবহার। চাই রাজনৈতিক ও সামরিক বল। ছোট্ট এক টুকরো ভূমির উপর কি বিশাল দুর্গ গড়া যায়? শ্রেষ্ঠ সভ্যতার নমুনা রূপে বিশ্বমাঝে মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্য তো চাই বিশাল মানচিত্র। চাই নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মানুষের মাঝে গভীর একতা। নবীজী (সা:) তাই দ্রুত ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা বাড়াতে মনোযোগী হয়েছিলেন। ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা বাড়াতে তাঁকে রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে হয়েছে।এবং মৃত্যুর আগে সাহাবাদের নসিহত করেছেন রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানি কন্সটান্টিনোপল দখল করতে। এটি ছিল নবীজী (সা:)’র স্ট্রাটেজিক ভিশন। মুসলমানদের জানমালের সবচেয়ে বড় কোরবানি হয়েছে তো মুসলিম রাষ্ট্রের শক্তি বাড়াতে। পরিপূর্ণ দ্বীন পালন, সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ ও বিশ্বমাঝে সুমহান মর্যাদায় মাথা তুলে দাঁড়ানোর সামর্থ সৃষ্টি হয়েছে তো এভাবেই। আজও  মুসলিমদের সামনে এটিই নবীজী (সা:)’র মহান সূন্নত। তাই যারা মুসলিম দেশের ভূগোলকে খণ্ডিত করে তারা শত্রু মূলত নবীজী (সা:)’র আদর্শ্যের। একাত্তরে সে শত্রুতাটি হয়েছে মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের পক্ষ থেকে। 

মুসলিম বিশ্বের আজ বেহাল অবস্থা। যে আসনে বসেছেন মহান নবীজী (সা:) ও তাঁর খলিফাগণ সে পবিত্র আসনে বসেছে চোরডাকাত, ভোটডাকাত ও কাফের শক্তির সেবাদাসেরা। খেলাফতের আওতাধীন সে বিশাল ভূগোল যেমন নাই, সে সামরিক বলও নাই। বিলুপ্ত হয়েছে মহান আল্লাহর শরিয়ত। আগ্রহ নেই পূর্ণ ইসলাম পালনের। মুসলিমদের পতনের শুরু তখন থেকেই যখন আলেমগণ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও সংস্কারকে বাদ দিয়ে স্রেফ মসজিদ ও মাদ্রাসার চার দেয়ালের মাঝে নিজেদের কর্মকে সীমিত করেছে। পতনের মূল কারণ, সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি রূপে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে মহান নবীজী (সা:) যে সূন্নত রেখে যান -সেটির প্রতি গুরুত্ব না দেয়া। শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জিহাদে অংশ নেয়া দূরে থাক, আলেমগণ তাদের ওয়াজে জিহাদের কথা মুখে আনতে ভয় পান। ভয়ের কারণ, সন্ত্রাসী রূপে চিহ্নিত হওয়ার। আল্লাহতায়ালার ভয়ের চেয়ে অধিক ভীতু বান্দার ভয়ে।

মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা, সংহতি ও ভূগোল বৃদ্ধি ইসলাম ধর্মে অতি পবিত্র ইবাদত। মুসলমান এ কাজে যেমন অর্থ দেয়, তেমনি প্রাণও দেয়। হযরত আবু বকর (রা:) তাঁর ঘরের সমুদয় সম্পদ নবীজী (সা:)’র সামনে এনে পেশ করেছিলেন। অন্যান্য সাহাবাদের অবদানও ছিল বিশাল। মু’মিনের অর্থদান ও আত্মদানে মুসলিম ভূমিতে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যাই বাড়ে না, বিলুপ্ত হয় দুর্বৃত্তদের শাসন এবং প্রতিষ্ঠা পায় মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধান পালনের উপযোগী পরিবেশ। যে দেশে জিহাদ নাই সে দেশে সেরূপ পরিবেশ গড়ে উঠে না। বরং শাসক রূপে তখন ঘাড়ের উপর চেপে বসে চোর-ডাকাতগণ। বাংলাদেশে অবিকল সেটিই হয়েছে। মুসলিমদের গৌরব কালে মুসলিমদের জানমাল, শ্রম ও মেধার বেশীর ভাগ ব্যয় হয়েছে জিহাদে, ফলে নির্মিত হয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। কে মু’মিন আর কে মুনাফিক -সেটিও কোন কালে মসজিদের জায়নামাজে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েছে জিহাদে। ওহুদের যুদ্ধের সময় নবীজী (সাঃ)র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার। কিন্তু তাদের মধ্যে ৩০০ জন তথা শতকরা ৩০ ভাগই ছিল মুনাফিক -যারা নবীজী (সা:)’র জিহাদী কাফেলা থেকে সিটকে পড়ে। তারা যে শুধু নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করতো তা নয়, মহান নবীজী (সা:)’র পিছনে দিনের পর দিন নামাযও পড়েছে। জিহাদ এভাবেই সাচ্চা মু’মিনদের বাছাইয়ে ফিল্টারের কাজ করে। মুখোশ খুলে যাবে এ ভয়ে মুনাফিকগণ তাই ফিল্টারের মধ্য দিয়ে যেতে ভয় পায়। এদের পক্ষ থেকে জিহাদের বিরুদ্ধে এজন্যই এত প্রচারণা। তারা তো চায়, মুসলিম সমাজ দেহে লুকিয়ে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে।

 

সাতচল্লিশের অবদান ও একাত্তরের ষড়যন্ত্র

মুসলিম জনসংখ্যা আজ  বিশাল। কিন্তু কোথায় সে সামরিক ও রাজনৈতিক বল? কোথায় সে ইজ্জত? শক্তি ও ইজ্জত তো বাড়ে অর্থত্যাগ ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে। রাজনৈতিক বল বাড়াতে যেমন চাই আত্মত্যাগী বিশাল জনবল, তেমনি চাই বিশাল ভূগোল। বিশাল ভূগোলের কারণেই ভারতের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি আজ বিশাল। অথচ ভারতে বাস করে বিশ্বের সর্বাধিক দরিদ্র মানুষ। ক্ষুদ্র কাতার, কুয়েত ও দুবাই কি মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে ৫০ গুণ বাড়িয়েও সেরূপ সামরিক ও রাজনৈতিক বল পাবে? বৃহৎ ভূগোলের বিকল্প বৃহৎ ভূগোল, অর্থ নয়। মুসলিম উম্মাহর সামরিক ও রাজনৈতিক বল বাড়াতেই ইখতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির ন্যায় মহান তুর্কি বীর বাংলার বুকে ছুটে এসেছিলেন। তেমনি এক মহান লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে উপমদেশের মুসলমানগণ নানা ভাষা, নানা প্রদেশ ও নানা বর্ণের ভেদাভেদ ভূলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম দেয়। সেটাই ছিল সাতচল্লিশের অবদান। এর মূলে ছিল প্যান-ইসলামিক চেতনা।

হিন্দু, খৃষ্টান, ইহুদী, নাস্তিক, বামপন্থি এরা কেউই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকে শুরু থেকেই মেনে নিতে পারিনি। মেনে নিতে পারেনি ভারত। কারণ ইসলাম ও মুসলিমের শক্তি ও গৌরব বৃদ্ধিতে তারা কেউই খুশি নয়, বরং সেটিকে হুমকি মনে করে। ফল দেশটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয় ১৯৪৭ থেকেই। তাদের একই মঞ্চে দেখা গেছে ১৯৭১ সালে। শত্রুপক্ষের সে ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত হন শেখ মুজিব। তার রাজনীতি ছিল ষড়যন্ত্রের রাজনীতি; এবং লক্ষ্য ছিল ভারতের সাহায্য নিয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গা। পাকিস্তানের জেল থেকে ফেরার পর সহরোওয়ার্দী উদ্দ্যানের সভায় শেখ মুজিব সে ষড়যন্ত্রের কথাটি ব্যক্ত করতে দ্বিধা করেননি। (এ নিবন্ধের লেখক সে বক্তৃতাটি নিজ কানে শুনেছেন)। সেদিন মুজিব বলেছিলেন: “বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু একাত্তর থেকে নয়, উনিশ শ’ সাতচল্লিশ থেকেই”। ১৯৪৭য়ে শুরু করা সে ষড়যন্ত্রটি বিজয়ী হয় ১৯৭১’য়ে। তখন ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসনে মৃত্যু ঘটে তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃবহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের। অথচ পাকিস্তানের সৃষ্টিতে বাংলার মুসলিমদের ভূমিকা ছিল উপমহাদেশের অন্য যে কোন ভাষার মুসলিমদের চেয়ে অধিক। তারাই ছিল দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক। নিজেদের হাতে গড়া শিশু রাষ্ট্রকে তারা নিজেরাই হত্যা করে এবং বিপুল উৎসব বাড়ায় ভারতের ন্যায় কাফের শিবিরে। মহান আল্লাহতায়ালা কি তাতে খুশি হবেন?

যে ব্যক্তি স্বর্ণের বিশাল টুকরো মামূলী পাথর মনে করে – সে স্বর্ণখন্ডটি হারিয়ে যাওয়ায় তারা মনে দুঃখ জাগে না। ফলে জীর্ণ কুঠিরে বাসও সে আহম্মকের জীবনে শেষ হয়না। তেমন এক চেতনাহীনতার কারণে বহু বাঙালীর মনে দুঃখবোধ হয়নি পলাশীর প্রান্তরে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতা অস্ত যাওয়াতে। বরং ইংরেজ বাহিনীর বিজয় উৎসব দেখতে বহু হাজার বাঙালী রাজধানী মুশিদাবাদের সড়কের দু’পাশে ভিড় জমিয়েছল। সে চেতনাহীনতার কারণে বাংলার বুকে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে বড় রকমের কোন জিহাদ হয়নি। বাঙালী মুসলিম জীবনে একই রূপ চেতনাহীনতা পুণরায় দেখা দেয় ১৯৭১’য়ে। ফলে সেদিন কাফেদের বিজয়ও তাদের নিজেদের বিজয়ে পরিণত হয়েছে। ঢাকার রাস্তায় ভারতীয় সেনাদের অনুপ্রবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিন দুপাশে দাঁড়িয়ে প্রচন্ড বিজয়-উল্লাস করেছে।

১৯৭০’য়ে নির্বাচনে শেখ মুজিবের বিশাল সাফল্যের বড় কারণ, ভারতের সাথে ষড়যন্ত্রের সে গোপন বিষয়টি তিনি গোপন রাখতে সমর্থ হয়েছিলের। জনগণ জানলে কি তার মত ভারতীয় চর ও ষড়যন্ত্রকারিকে ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে ভোট দিত? বাংলার মুসলিমদের বড় ব্যর্থতা, একাত্তরে তারা ইসলামের শত্রুদের চিনতে ভয়ানক ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ঘুমের ঘোরে বিষাক্ত গোখরা শাপকে গলায় পেঁচিয়ে নেয়ার বিপদ তো ভয়াবহ। একাত্তরে সেটিই ঘটেছে। সে ভূলের পরিনাম হলো, আজ  শুধু পদ্মা, তিস্তা ও সুরমার পানি নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অস্তিত্বেও আজ  টান পড়েছে। বাংলাদেশে আজ  যে যুদ্ধাবস্থা তা তো একাত্তরের যুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা।

 

নবীজী(সা:)’র লিগ্যাসি ও শয়তানের লিগ্যাসি

মৃত্যুর পরও অনেকের লিগ্যাসি  বহুকাল বেঁচে থাকে। সমগ্র মানব ইতিহাসে ইসলামের সর্বশেষ নবী হযরত মুহম্মদ (সা:)’র লিগ্যাসিটি তূলনাহীন। সেটি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ গড়ার ও সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণের। তিনি ও তাঁর সাহাবাগণ ইতিহাস গড়েন মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম পালনে।  নবীজী (সা:)’র লিগ্যাসি হলো নানা বর্ণ, নানা ভাষা ও নানা ভূ-খন্ডের মানুষের মাঝে গভীর ভাতৃত্ব গড়ার। শুধ ধর্মীয় বলেই নয়, রাজনৈতিক ও সামরিক বলেও তিনি মুসলিমদের শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে দিয়ে যান। তাই স্রেফ মুর্তিপূজা, নাস্তিকতা ও নানারূপ পাপাচার থেকে মুক্তিদানই নবীজী (সা:)’র একমাত্র সাফল্য নয়, মুক্তি দিয়েছেন ভাষাপূজা, বর্ণপূজা, গোত্রপূজা ও জাতিপূজা থেকেও। অথচ সেগুলোই ছিল আরবের বুকে বহু শত বছর যাবৎ রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধের মূল কারণ। নবীজী (সা:) এভাবে তাদেরকে মুক্তি দিয়েছিলেন বিশাল প্রাণহানি ও সম্পদহানি থেকে। ফলে পারস্যের সালমান ফারসী (রা:),আফ্রিকার বেলাল(রা:), রোমের সোহায়েব (রা:)’র সাথে আরবের আবু বকর (রা:), উমর(রা:) বা আলী (রা:)’র কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে কাজে কোনরূপ সমস্যা দেখা দেয়নি। সমগ্র মানব ইতিহাসে একমাত্র সে সময়টিই ছিল সবচেয়ে গৌরবের। একমাত্র তখনই বড় বড় বিজয় এসেছে এবং নির্মিত হয়েছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সভ্যতা। ঈমানের দায়বদ্ধতা এবং সে সাথে সফলতা হলো নবীজী (সা:)’র সে লিগ্যাসি নিয়ে বাঁচায়।

মানব সমাজে শয়তানও বেঁচে আছে তার লিগ্যাসী নিয়ে। সেটি মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার। বাংলাদেশে যারা একাত্তরের চেতানার ধারক তারা বাঁচছে শয়তানের লিগ্যাসী নিয়ে। তাদের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহটি অতি প্রকট। তাদের রাজনীতিতে প্রবল হলো ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে নির্মূলের সুর। শয়তান শুধু মুর্তিপূজায় ডাকে না। ডাকে গোত্রপূজা, বর্ণপূজা, শ্রেণীপূজা, ভাষাপূজা, দলপূজা, দেশপূজা ও জাতিপূজার দিকেও। এরূপ ডাকার কাজে শয়তানের যেমন নিজস্ব পুরোহিত বাহিনী আছে, তেমনি বিপুল সংখ্যক পূজামন্ডপও আছে। আছে বিশাল প্রশাসনিক অবকাঠামোও। তথাকথিত শহীদ মিনারের নামে হাজার হাজার পূজাস্তম্ভ গড়া হয়েছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। মুর্তিপূজার ন্যায় স্তম্ভপূজায় নগ্নপদে হাজির হয় লক্ষ লক্ষ বাঙালী নরনারী।

নবীজী (সা:)’র যুগে আরব কাফেরদের মাঝে শুধু যে মুর্তিপূজা ছিল –তা নয়। ছিল গোত্রপূজা, বর্ণপূজা ও জাতিপূজা। ছিল মুসলিম নির্মূলের যুদ্ধ। জাহেলী যুগে গোত্র বা বর্ণের নামে যুদ্ধ একবার শুরু হলে সেটি আর থামতো না। পূর্বপুরুষদের শুরু করা যুদ্ধগুলিকে তাদের সন্তানেরাও বছরের পর বছর চালিয়ে যেত। বাংলাদেশের ইসলামবিরোধীগণও বেঁচে আছে শয়তানের সে লিগ্যাসি নিয়ে। একারণেই ইসলামপন্থীদের নির্মূলের যে যুদ্ধটি একাত্তরে শুরু হয়েছিল, তাদের রাজনীতিতে এখনো তা বেঁচে আছে। একাত্তরের লিগ্যাসি হলো উম্মাহর বিভক্তি ও কাফেরদের ঘরে বিজয় তুলে দেয়ার। একাত্তরে ভারতের যুদ্ধজয়ে শুধু পাকিস্তান দুর্বল হয়নি; দুর্বল হয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ। দুর্বল হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিমগণও। সে সাথে আশাহত হয়েছে ভারতের মুসলিমগণ। একাত্তরের পর দারুন ভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার কাজটি। এবং বেগবান হয়েছে মুসলিম সন্তানদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজ। একাজে দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে হাতিয়ার রূপে। রাজনীতিতে ইসলামের শত্রুপক্ষ এতটাই প্রবল যে, ইসলামপন্থিদের জন্য সামান্য স্থান ছেড়ে দিতেও তারা রাজি নয়। আগ্রাসনের শিকার হয়েছে বাংলার মুসলিম সংস্কৃতি। এবং মুসলিমগণ বিচ্যুৎ হচ্ছে ইসলামের মূল মিশন থেকে।

ইসলামের শত্রুপক্ষের স্ট্রাটেজী মুসলিম সন্তানদের স্রেফ ইসলাম থেকে দূরে সরানো নয়, বরং মুসলিম রাষ্ট্রগুলিকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করা এবং সে ক্ষুদ্র ও ভগ্ন মানচিত্র গুলোকে যুগ যুগ  বাঁচিয়ে রাখা। মুসলিম উম্মাহকে শক্তিহীন রাখার এটাই শয়তানি স্ট্রাটিজী। সে স্ট্রাটেজীর অংশ রূপেই অখন্ড আরব ভূমিকে বিশেরও বেশী টুকরোয় বিভক্ত করা হয়েছে। তাই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজটি শেখ মুজিবের একার ছিল না। প্রকল্পটি একক ভাবে শুধু ভারতেরও ছিল না। ভাঙ্গার কাজে ভারতকে যে শুধু সোভিয়েত রাশিয়া ও ইসরাইল অস্ত্র জুগিয়েছে তাও নয়। বরং এ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল শয়তানী শক্তিবর্গের আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন; এবং সেটি পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই। পাকিস্তানের মুল অপরাধটি এ ছিল না যে, দেশটিতে স্বৈরাচার বা বৈষম্য ছিল। বরং বর্বরতম স্বৈরাচারের শিকার তো আজকের বাংলাদেশ এবং বেশী আঞ্চলিক বৈষম্য তো ভারতে। শয়তানী শক্তির টার্গেট হওয়ার মূল কারণ, পাকিস্তান ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র এবং ভারতের ন্যায় একটি শত্রুশক্তির প্রতিবেশী।  

 

গৌরব গড়াতে, ভাঙ্গাতে নয়

মুসলিমদের গৌরব গড়াতে, ভাঙ্গাতে নয়। ইসলামে অতি নিন্দনীয় হারাম কাজ হলো কোন কিছু ভাঙ্গা। অকারণে গাছের একটি ডাল ভাঙ্গাও হারাম। তেমনি অতিশয় হারাম কর্ম হলো মুসলিম দেশের ভূগোল ভাঙ্গা। এজন্যই কোন মুসলিম দেশভাঙ্গায় ঈমানদারের হৃদয়ে মাতম উঠে; এবং তাতে উৎসব হয় কাফির শিবিরে। তাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গড়াটি সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে যতটা প্রশংসা কুড়িয়েছে, ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি সেটি পায়নি। ভারত ও ভূটান ছাড়া কোন মুসলিম দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে এগিয়ে আসেনি। পাকিস্তান ভাঙ্গার সে দিনটিতে অনেকেই বরং চোখের পানি ফেলেছে। (লেখক সে বর্ণনা শুনেছেন ভারত ও আফ্রিকার মুসলিমদের থেকে)। মুসলিম দেশ ভাঙ্গার এ কর্মটি বরং আনন্দের প্রচন্ড হিল্লোল তুলেছে ভারতের ন্যায় কাফের দেশগুলোতে। কলকাতার রাস্তায় সেদিন মিষ্টি বিতরণ হয়েছে। আর কাফেরগণ যা নিয়ে উৎসব করে -তাতে কি মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন? তাতে কি মুসলিমদের কোন কল্যাণ হয়?  

মুসলিম দেশের ভাঙ্গন রোধে সীমান্তের এক মুহুর্তের পাহারাদারিকে নবীজী (সাঃ) সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলেছেন। এমন একটি চেতনা কারণে সময়ের তালে মুসলিম দেশের ভূগোল বিশাল আকারে বৃদ্ধি পেলেও সে ভূগোলে শত শত বছরেও ভাঙ্গন আসেনি। অথচ ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে বহু দেশে বিভক্ত হয়েছে ইউরোপ। দেশগুলি বছরের পর বছর রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধেও লিপ্ত থেকেছে। এর বিপরীত, মুসলিমদের ইতিহাস হলো বিভক্তির দেয়াল ভাঙ্গার। দেয়াল ভাঙ্গার মধ্য দিয়েই আরব, ইরানী, তুর্কি, কুর্দি, মুর, বার্বার ও অন্যান্য ভাষার মুসলিমগণ ইউরোপের চেয়ে কয়েকগুণ বৃহৎ ভূখন্ড জুড়ে অভিন্ন উম্মাহ ও বিশাল রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। বিভক্তি তো তখনই শুরু হয়েছে যখন তারা ইসলাম থেকে দূরে সরেছে। বিভক্তি তাই পথভ্রষ্টতার দলিল। শেখ মুজিব ও তার অনুসারি বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ যে পথভ্রষ্টদের দল –তা নিয়ে কি তাই সন্দেহ থাকে?

ভাতৃত্ব, সৌহার্দ-সম্পৃতি ও একতা মুসলিম উম্মাহর জীবনে একাকী আসে না, সাথে আনে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত সাহায্যও। যুদ্ধের ময়দানে তাদের সাহায্যে এমন কি বিপুল সংখ্যয় ফেরেশতাগণও নেমে আসেন। সে সাহায্যের বরকতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হয়েছে বিশাল বিশাল শত্রু বাহিনীর উপর। পরাজিত করছে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের ন্যায় দুই বিশ্বশক্তিকে। অনৈক্যে বিজয় জুটেনা, দেশও বাঁচে না। অনৈক্যে যা জুটে তা হলো অপমানকর পরাজয় ও গোলামী। এবং আনে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কঠিন আযাব। সে আযাবের প্রতিশ্রুতি শোনানো হয়েছে সুরা আল-ইমরানের ৫ নম্বর আয়াতে। আযাবের অংশ রূপেই লক্ষ লক্ষ মুসলিম তখন গণহত্যার শিকার হয়। শহরের পর শহর তখন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়।এবং দেশ অধিকৃত হয় শত্রুবাহিনীর হাতে। একাত্তরে বাংলাদেশে তো সেটিই ঘটেছে।

 

ঈমানদারীর দায়বদ্ধতা

মুসলিমকে শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালনের সামর্থ্য অর্জন করলে চলে না। তাকে নিজ ভাষা, নিজ বর্ণ ও নিজ জন্মভূমির বাইরে অন্য মুসলিমদের সাথেও শান্তিপূর্ণ বসবাসের সামর্থ্য অর্জন করতে হয়। সে সামর্থ্য হিন্দুদের আছে। ভারত তার দৃষ্টান্ত। ইহুদীদেরও আছে। সে দৃষ্টান্তু ইসরাইল। পাশ্চাত্যেরও আছে। সে দৃষ্টান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট। নানা ভাষার ও নানা বর্ণের মানুষ যেমন ভারতে, তেমনি ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একত্রে এক ভূগোলে বসবাস করে। কিন্তু সে সামর্থ নেই মুসলিমদের। তারা বেছে নিয়েছে ভাষা ও বর্ণের নামে ভিন্ন ভিন্ন দেশ গড়ার পথ। অথচ রাজনৈতিক একতা কাফেরদের ধর্মে ফরজ নয়। কিন্তু অন্য দেশ, অন্য ভাষা ও অন্য বর্ণের মুসলিমকে মু’মিন ব্যক্তির ভাই বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। প্রতিটি মু’মিনের উপর ঈমানী দায়বদ্ধতা হলো মহান আল্লাহতায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত সে পবিত্র ভাতৃত্বের সম্পর্কের প্রতি সম্মান দেখানো। নইলে অবমাননা হয় খোদ মহান আল্লাহতায়ালার। সে ফরজটি ১৯৪৭ সালে পালিত হয়েছিল, কিন্তু ১৯৭১’য়ে পালিত হয়নি। বরং প্রচণ্ড অবাধ্যতা হয়েছে। 

ভিন্ ভাষা, ভিন্ বর্ণ ও ভিন্ জাতীয়তার নামে মুসলিম ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ও বিভক্তিটা স্থায়ী করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সীমানার নামে দেয়াল খাড়া করা কি ঈমানদারী? নিজ গৃহে ভাইয়ের প্রবেশ রুখতে কি দেয়াল গড়া যায়? ইসরাইল বা ভারতের ন্যায় শত্রুদেশ এমন দেয়াল গড়তে পারে। কিন্তু সে দেয়াল মুসলিম দেশ গড়ে কি করে? খেলাফতের যুগে সেরূপ দেয়াল ছিল না। ফলে সে বিশাল মুসলিম খেলাফতের যে কোন প্রান্ত থেকে মক্কা-মদিনা বা অন্য কোন শহরে পৌঁছতে ভিসার প্রয়োজন পড়তো না। মুসলিম ভূমিতে আপন রূপে গৃহিত হওয়ার জন্য মুসলমান পরিচিতিটাই সে জন্য যথেষ্ট ছিল।

ভিন্ন ভিন্ন ভাষার নামে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সেগুলীর নামে বিভক্তির সীমান্তরেখাগুলি হলো মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষতিকর বিদ’য়াত। আত্মবিনাশী এ বিদ’য়াতকে বাঁচাতে গড়া হয়েছে শত শত কোটি ডলার ব্যয়ে বিশাল বিশাল সামরিক বাহিনী। শুরু হয়েছে ভিসার প্রচলন। আর আলেমদের অপরাধ হলো, ছোটখাটো বিদ’য়াত নিয়ে উচ্চকন্ঠ হলেও এরূপ বিধ্বংসী বিদ’য়াত নিয়ে তাদের মুখে কোন কথা নেই। ঈমানের রোগ নির্ণয়ে মাপকাঠি অনেক। তবে রোগটি নির্ভূল ভাবে ধরা পড়ে অন্য ভাষা,অন্য দেশ ও অন্য বর্ণের মুসলিমকে নিজ ভাই রূপে আলিঙ্গণের অসামর্থ্যতায়। কারণ, সেজন্য তো চাই ঈমানে পর্যাপ্ত বল। চাই বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের উর্দ্ধে উঠার সামর্থ্য। বাঙালী মুসলিমদের ঈমানের সে অসামর্থ্যতা প্রকট ভাবে ধরা পড়েছে একাত্তরে। স্রেফ ভাষা, বর্ণ ও জন্মস্থান ভিন্ন হওয়ার কারণে একাত্তরে হাজার হাজার বিহারীকে বাংলার বুকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষিতা হয়েছে তাদের নারীরা। জীবিতদেরকে রাস্তায় নামিয়ে তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্যকেও দখলে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে বিহারী বস্তিগুলো সে অপরাধের সাক্ষিরূপে এখনো বেঁচে আছে। এরূপ নৈতিক রোগ নিয়ে ইউরোপীয়রা বিশ্বের নানা দেশে বর্ণ ও জাতিগত নির্মূলে নেমেছে। নির্মূলের পর সেখানে নিজেদের কলোনি গড়েছে। আর বাংলাদেশের বুকে বহু দুর্বৃত্ত বাঙালী নেমেছে বিহারী মহল্লায়। বাংলাদেশের সরকার এসব  দুর্বৃত্তদের পুরস্কৃত করেছে তাদের দখলকৃত ঘরবাড়ি ও দোকানপাঠের উপর মালিকানার সনদ দিয়ে।

লক্ষাধিক নবীরাসূল একত্রে কোন জনপদে প্রেরিত হলেও কি তাদের মাঝে কোন বিরোধ সৃষ্টি হতো? তাদের মাঝে কি ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র ও সেসব রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার নামে সীমানা গড়া হতো? এক্ষেত্রে আজকের মুসলিমদের ব্যর্থতাটি বিশাল। এখানে ধরা পড়ে ঈমান বেড়ে উঠার ব্যর্থতা। শুধু নামায-রোযার মধ্য দিয়ে কি এ ব্যর্থতার আযাব এড়ানো যায়? এরূপ ব্যর্থতা নিয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় বান্দা হওয়া যায়? অনৈক্য ও বিভক্তি যে কতটা সর্বনাশা -সেটি বুঝতে কি ইতিহাস পাঠের প্রয়োজন পড়ে? প্রমাণ তো মুসলিমগণ নিজেরাই। বিশ্বে তাদের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে মুসলিম রাষ্ট্রও। কিন্তু তাতে কি তাদের শক্তি, সামর্থ্য ও প্রতিরক্ষা বেড়েছে? বেড়েছে কি স্বাধীনতা ও মান-ইজ্জত? সংখ্যায় প্রায় দেড় শত কোটি হওয়া সত্ত্বেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বিশ্বের কোন প্রতিষ্ঠানেই কি তারা সাড়ে ৬ কোটি ব্রিটিশ বা সাড়ে ৬ কোটি ফরাসীদের সামনে কি সমান অধিকার নিয়ে দাঁড়াতে পারে?

 

অর্জিত আযাব

এরূপ ব্পির্যয় ও অপমান থেকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহতায়ালা শুধু চুরি-ডাকাতি, মদ-জুয়া, ব্যাভিচার ও মিথ্যাচারকে হারাম করেননি, হারাম করেছেন ভাষা, গায়ের রং, আঞ্চলিকতা নিয়ে মুসলিম ভূগোলকে বিভক্ত করার রাজনীতি।পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার হুশিয়ারি,“সবাই মিলে তোমরা আঁকড়ে ধরো আল্লাহর রশিকে,এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়োনা।” –(সুরা আল ইমরান, অয়াত ১০৩)। এভাবে তিনি কঠোর ভাবে সাবধান করেছেন অনৈক্য থেকে বাঁচতে। আরো হুশিয়ার করেছেন এ বলে,“তোমারা তাদের মত হয়োনা,যারা সুস্পষ্ট নির্দেশ আসার পরও বিভক্ত হয়,এবং ভেদাভেদ গড়ে। এদের জন্যই নির্দিষ্ট রয়েছে বিশাল আযাব।” –(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৫)। উপরুক্ত প্রথম আয়াতটিতে পবিত্র কোরআন চিহ্নিত হয়েছে আল্লাহর রশি রূপে। মুসলিমদের উপর ফরজ হলো, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে আল্লাহর এ রশিকে আঁকড়ে ধরা ও বিভক্তি থেকে বাঁচা। দ্বিতীয় আয়াতটিতে স্পষ্ট হুশিয়ারি হলো, আল্লাহতায়ালার আযাব নামিয়ে আনার জন্য মুর্তিপূজারি বা নাস্তিক হওয়ার প্রয়োজন নেই। সে জন্য মহান আল্লাহতায়ালার রশিকে পরিত্যাগ করা ও নিজেদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টিই যথেষ্টে। বিভক্তির চুড়ান্ত রূপটি হলো বিভক্ত রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রগুলির নামে গড়ে উঠা দেয়াল। বিগত বহু শত বছর যাবত মুসলিম চেতনায় মহান আল্লাহতায়ালার এ হুশিয়ারিটি মুসলিমদের মাঝে এতটাই প্রকট ভাবে বেঁচেছিল যে মুসলিম জনগণ কখনোই মুসলিম ভূখন্ডকে বিভক্ত করার কাজে অংশ নেয়নি। ভাষা,  বর্ণ,অঞ্চলের নামে দেশও গড়া হয়নি। এমন কি ১৯৭১’য়েও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোন ইসলামি দলের নেতাকর্মী, কোন আলেম বা কোন পীর-মাশায়েখ পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থণ করেনি। সে লক্ষে তারা ভারতে যায়নি এবং অস্ত্রও ধরেনি।

বাংলাদেশের মুসলিমগণ আজ  ভয়ানক আযাবের গ্রাসে। দেশে আজ যুদ্ধাবস্থা। তবে এ আযাব তাদের স্বহাতে অর্জিত। যে পাপের কারণে এ আযাব তাদেরকে ঘিরে ধরেছে সেটির শুরু আজ নয়, বরং একাত্তরে। একাত্তরে যাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তাদের কাছে মহান রাব্বুল আলামীনের উপরুক্ত হুশিয়ারিটি আদৌ গুরুত্ব পায়নি। তাদের হাতে আল্লাহর রশিটি যেমন ছিল না, তেমনি ছিল না মুসলিম উম্মাহর একতা, সংহতি ও কল্যাণের ভাবনা। তারা তো ধরেছে ভারতের রশি। ভারতের রশির টানেই তারা দিল্লিতে গিয়ে পৌঁছে। সে রশি দিয়েই শেখ মুজিব ও তার অনুসারিগণ বাংলাদেশকে ভারতের দাসত্বের জালে আবদ্ধ করে। বাঙালী মুসলিমের স্বাধীনতার কথা তাদের কাছে একটু্ও গুরুত্ব পায়নি। গুরুত্ব পায়নি মুসলিম উম্মাহর ইজ্জত-আবরুর কথাও। সেটি গুরুত্ব পেলে কি মুজিব ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষর করতো? বাস্তবতা হলো, ভারতীয় কাফেরদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে মুজিবের অনুসারিরা ভারতের সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যকে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ভারত এজন্যই বাংলাদেশের বুকে তাদের এ বিশ্বস্থ্য দাসদের চিরকাল ক্ষমতায় রাখতে চায়। এবং নির্মূল করতে চায় তাদের যারা ভারতের অধীনতা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে চায়।

তেমন একটি রাজনৈতিক প্রয়োজনে বর্তমান অবৈধ সরকারের ভোট-ডাকাতি যত কদর্য রূপেই হোক, ভারত সেটিকে শতভাগ বৈধতা দেয়। ক্ষমতা থেকে উৎখাত হলে এ দাসগণ যে ইতিহাসের আবর্জণায় যাবে -তা নিয়ে কি ভারতীয়দের মনেও কোন সন্দেহ আছে? আধিপত্যবাদি দেশ তো অন্যদেশের অভ্যন্তরে এমন দাসদেরই খোঁজে। ভারতের কাছে মুজিব ও তার বাকশালী সহরচদের কদর তো এজন্যই এত অধীক। স্বাধীনচেতা মানুষদের তারা বরং শত্রু জ্ঞান করে। ফলে বাংলাদেশে বুকে তাদের নির্মূলের এতো আয়োজন। শুধু ভারতীয় র’য়ের এজেন্ট, র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও দলীয় গুন্ডাবাহিনীই শুধু নয়, আদালতের বিচারকদেরও এ নির্মূল কাজে ময়দানে নামানো হয়েছে। পদসেবী এ দাসদের ক্ষমতায় রাখতে ভারত বরং একাত্তরের ন্যায় আরেকটি যুদ্ধ লড়ে দিতেও রাজী। সাম্রাজ্যবাদীদের সেটিই তো চিরাচরিত রীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের দাসদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সেরূপ যুদ্ধ বিশ্বের নানা দেশে লড়ছে। ভারত সেরূপ যুদ্ধ বাংলাদেশে লড়বে -তাতেই বা বিস্ময়ের কি? এ সহজ বিষয়টুকু বুঝার জন্য কি পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে? ১ম সংস্করণ ০৪/০৪/২০১৫; ২য় সংস্করণ ২৬/০২/২০২১।

 

 




ভারতের আগ্রাসী স্ট্রাটেজী এবং চ্যালেঞ্জের মুখে বাঙালী মুসলিম

ফিরোজ মাহবুব কামাল

লুন্ঠিত স্বাধীনতা

১৯৭১’য়ে ভারতের যুদ্ধজয়টি বিশাল বিজয় দিয়েছে ভারতের। সে সাথে গুম, খুন, চুরিডাকাতি ও ভোটডাকাতির ন্যায় অপরাধের অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছে ভারতীয় মদদপুষ্ট আওয়ামী বাকশালীদের। কিন্তু কতটুকু স্বাধীনতা দিয়েছে বাংলাদেশীদের? স্বাধীনতার অর্থ গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বাঁচার স্বাধীনতা। সে স্বাধীনতার আঁওতায় আসে রাজনৈতিক দল গড়া, কথা বলা, লেখালেখি করা, মিছিল-মিটিং করা ও ইচ্ছামত ভোটদানের স্বাধীনতা। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এর কোনটাই দেয়নি। সে অধিকার না থাকলে তাকে কি স্বাধীনতা বলা যায়? সেটি তো নিরেট পরাধীনতা। সে স্বাধীনতা শেখ মুজিব যেমন দেয়নি, শেখ হাসিনাও দিচ্ছে না। বরং যা দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে -তা হলো ফ্যাসিবাদি বর্বরতা। মুজিব ১৯৭১’য়েই ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। পরে সকল দলের স্বাধীনতাই কেড়ে নেয় এবং একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে। মুজিবের প্রতিষ্ঠিত রক্ষি বাহিনী কেড়ে নেয় প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। মুজিব ও হাসিনা উভয়েই নিজেদের গদি বাঁচাতে বেছে নিয়েছে ভোট ডাকাতির পথ। স্বাধীন ভাবে কথা বললে বা লিখলে গুম-খুন ও রিমান্ডে গিয়ে নৃশংস নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কথা হলো, এরূপ অধিকারহীনতাকে স্বাধীনতা বললে পরাধীনতা কাকে বলে? যে স্বাধীনতা ১৯৪৭’য়ে মিলেছিল, সেটি কি ১৯৭১’য়ে মিলেছে? পরাধীনতার এ নৃশংস জনককে স্বাধীনতার জনক বললে যা প্রতিষ্ঠা পায় তা হলো বিকট মিথ্যা। অথচ ইতিহাস চর্চার নামে বাংলাদেশে সে মিথ্যাচর্চাকে প্রকট করা হয়েছে।   

মুজিবের একদলীয় শাসনের অবসানের পর যখনই স্বাধীন ভাবে বাঁচার চেষ্টা হয়েছে, তখনই ভারত সেটিকে সন্দেহের চোখে দেখেছে এবং তা চিত্রিত হয়েছে ভারত-বিরোধীতা রূপে। ভারতের সাবেক প্রেসেডেন্ট প্রনব মুখার্জির ভাষায় সেরূপ স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচাটি হলো, ভারতের radar’য়ের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। প্রনব মুখার্জি হুংকার দিয়েছেন, বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে সে সুযোগ দেয়া হবে না। প্রশ্ন হলো, তবে কি বাংলাদেশকে বাঁচতে হবে ভারতের radar’য়ের ছত্রছায়ায়? এবং বাঁচতে হবে কি ভারতের সমর্থনপুষ্ট ভোটডাকাতিকে মেনে নিয়ে? এটিই কি একাত্তরের অর্জন? জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় স্বাধীনতা। তখন যা প্রতিষ্ঠা পায় সেটি হলো পরাধীনতা। ভারত তো সেটিই চায়। ভারত নিজের সে ইচ্ছাটি বাস্তবায়ন করেছে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও তাদের দল আওয়ামী লীগের গোলামী-সুলভ সহযোগিতা নিয়ে। হাসিনা নিজের সে ভারতসেবী গোলামীকে চিত্রিত করে ভারতের একাত্তরের ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দায়বদ্ধতা রূপে। যুক্তিটি এমন, ভারত যেহেতু জন্মের সাথে জড়িত, বাংলাদেশকে বাঁচতে হবে ভারতের প্রতি বিরামহীন গোলামী নিয়েই। বস্তুত এটিই মুজিব-তাজুদ্দীনের চেতনা -যা থেকে জন্ম নিয়েছিল মুজিবেব ২৫ দফা ও তাজুদ্দীনের ৭ দফা গোলামী চুক্তি। প্রশ্ন হলো, চেতনায় এরূপ গোলামী নিয়ে কি স্বাধীনতা বাঁচানো যায়?

 

কারণ: ইসলামভীতি

ভারতের এরূপ স্বাধীনতা বিরোধী নীতির মূল কারণ ইসলামভীতি। এখানে ভয়টি হলো, জনগণ স্বাধীনতা পেলে ইসলামের বিজয়ী হবে এবং মুসলিমগণ আবার বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠবে। পরাধীন রাখাটাই জনগণকে শক্তিহীন করার মোক্ষম হাতিয়ার। সিংহকে খাঁচায় রাখলে সেও বিড়ালের ন্যায় শক্তিহীন জীবন পায়। একাত্তরে ভারতের বিজয়ের পর বাংলাদেশ তেমনি এক খাঁচায় পড়েছে। ফলে পাকিস্তান আমলে মিছিল-মিটিং, কথা বলা ও লেখালেখির যে স্বাধীনতা ছিল -তা এখন শুধু কল্পনাই করা যায়। ভারত ও তার সেবাদাসদের লক্ষ্য, বাংলাদেশীদের জন্য সে পরাধীনতাকেই দীর্ঘায়ু দেয়া।

২০১৩ সালের ৮ নভেম্বর তারিখে দৈনিক প্রথম আলো দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটি আলোচনা সভার খবর ছেপেছিল। সে আলোচনাতে যে বিষয়টি প্রকট ভাবে ফুটে উঠেছিল তা হলো ভারতীয় রাজনৈতীক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের প্রচণ্ড ইসলামভীতি। সে সভায় ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম শরণ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত দুই সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ও পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশ এখন যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে মৌলবাদের মোকাবিলাই তাদের রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা ঠিকমতো করতে না পারলে কয়েক বছর ধরে উন্নয়নের যে ধারা অব্যাহত আছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলও অশান্ত হয়ে উঠবে।“দ্য সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজ” আয়োজিত এ গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশ থেকেও কয়েকজন যোগ দেন। বাংলাদেশের ২০১৪ সালের নির্বাচন ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক ও অচলাবস্থা, তাকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং ধর্মীয় মৌলবাদের ক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার বিষয়গুলো এ আলোচনায় প্রাধান্য পায়। দৈনিক প্রথম আলো লিখেছে, বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ও আবুল বারকাত মনে করেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রী, শান্তিপ্রিয় ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের কাছে বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থানই এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বীণা সিক্রি মনে করেন, জামায়াত ও হেফাজত বাংলাদেশে অস্থিরতা আনতে চাইছে, তারা জঙ্গি ইসলামি শাসন কায়েম করতে চায়। সে জন্য তারা মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখতে চায়। তাদের অভিযোগ, বিএনপির শাসনামলেও জামায়াত এ কাজই করেছে। আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের প্রসঙ্গও। পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, আমেরিকা যেভাবে জামায়াতকে নরম মৌলবাদী বলে মনে করে, তা বিপজ্জনক। মৌলবাদ নরম বা কঠোর হয় কি না, সে প্রশ্ন ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে মার্কিন মনোভাব। সে বিষয়ে পিনাকরঞ্জন মনে করেন, বাংলাদেশে জামায়াতের ধারক-বাহক বিএনপি যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মদদ পাচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখনই বেড়েছে ইসলামি জনতার সমাবেশ এবং ধ্বনিত হয়েছে “নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর” তখনই কাঁপন শুরু হয়েছে ভারতীয় শিবিরে। এটিকেই তারা বলছে মৌলবাদের উত্থান। এবং উল্লেখ্য হলো, মৌলবাদী মাত্রই তাদের কাছে সন্ত্রাসী। এখন এটি সুস্পষ্ট, ভারতীয়দের ঘুম হারাম করার জন্য আনবিক বোমার প্রয়োজন নাই, রাজপথে “আল্লাহু আকবর” ধ্বনিই যথেষ্ট। এ ধ্বনির মাঝেই তারা সন্ত্রাসের গন্ধ পায়। বোমার চেয়েও যে এ ধ্বনি শক্তিশালী -সেটিও বার বার প্রমাণিত হয়েছে। ফিরাউন ও তার বিশাল বাহিনীর মনে ভয় ধরাতে তাই বোমা লাগেনি; সেটি শক্তিটি ছিল মুসা (আ:)’র তাওহীদের দাওয়াত। পৌত্তলিক ভারতীয়গণও তাই আতংকিত “আল্লাহু আকবর”য়ের ভয়ে। আওয়ামী লীগের নৌকার তলা যে ধ্বসে গেছে এবং সেটি যে আর ভাসানো সম্ভব নয় -সেটি ভারতীয় নেতারাও বুঝে। ফলে বেড়েছে তাদের দুর্ভাবনাও। ১৯৭৫’য়ের ১৫ই আগষ্টে মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার নিপাতের পর এতবড় দুর্ভাবনায় ভারত এর আগে কখনোই পড়ে নাই। সে দুর্ভাবনা নিয়েই তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিষ্টার মনমোহন সিং বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে। ভারতের ন্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যটি হলো মুসলিম দেশগুলিতে ইসলামের জাগরণ ঠ্যাকানো; গণতন্ত্র বাঁচানা বা মানবাধীকার প্রতিষ্ঠা দেয়া নিয়ে তাদের কোন আগ্রহ নেই। নইলে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত মিশরের প্রথম প্রেসিডেন্ট ডক্টর মহম্মদ মুরসীর বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানকে কেন সমর্থন দিবে? কেনই আলজিরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থিদের বিজয় নস্যাৎ করতে সামরিক বাহিনীর ক্যুদেতা’কে সমর্থন দিবে? 

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণও টের পেয়েছে, নিরপেক্ষ নির্বাচনে তাদের বিজয় অসম্ভব। ক্ষমতায় থাকার জন্য একটিই পথ; সেটি ভোট-ডাকাতির পথ। শেখ হাসিনা এজন্যই বেছে নিয়েছে গুম, খুন, সন্ত্রাস ও ভোট ডাকাতির পথ। ভারতীয়দের ন্যায় মার্কিনীরাও বুঝে ফেলেছে, কোন নিরপেক্ষ নির্বাচনেই হাসিনাকে বিজয়ী করা আর সম্ভব নয়। খুনি হাসিনাকে এমুহুর্তে ক্ষমতায় রাখতে হলে তাদের নিজেদেরকে বা ভারতকে অস্ত্র ধরতে হবে। অথবা হাসিনার ভোট-ডাকাতিকে সমর্থন দিতে হবে। মার্কিনীদের সমস্যা, বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের বিজয় রোধে তাদের নিজেদের যুদ্ধ করার সামর্থ্য নাই। আফগানিস্তান ও ইরাকের দীর্ঘ যুদ্ধ তাদেরকে কাহিল করে ফেলেছে। এতটা কাহিল তারা অতীতের দু’টি বিশ্বযুদ্ধেও হয়নি। বাংলাদেশে সে কাজে যেমন হাসিনাকে চায়, তেমনি তার পাশে ভারতকেও চায়। কিন্তু ভারতের সমস্যাটিও কম নয়। দেশটির সেনাবাহিনী দুইটি বৃহৎ অভ্যন্তরীন যুদ্ধে দীর্ঘকালীন যাবত লিপ্ত। একটি কাশ্মিরে,অপরটি বাংলাদেশের উত্তরপূর্বে অবস্থিত ৭টি রাজ্য জুড়ে। এ দুটি এলাকা পরিণত হয়েছে ভারতের জন্য ভিয়েতনামে। বহু অর্থ ও বহু রক্ত ব্যয়েও ভারত সরকার সে যুদ্ধ শেষ করতে পারিনি। অথচ একাত্তরে পূর্বপাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে সৈন্য-সংখ্যা ছিল তার চেয়ে সাত গুণ অধীক ভারতীয় সৈন্যের অবস্থান কাশ্মীরে। অথচ কাশ্মিরের জনসংখ্যা মাত্র ৯০ লাখ। ফলে ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ভারত সৈন্য নামাবে কোন সাহসে? অথচ “বিডিনিউজ-২৪” এর সুদীব ভৌমিক টাইমস অব ইন্ডিয়া’য় প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভারতীয়দের প্রতি তেমন একটি যুদ্ধেরই দাওয়াত দিয়েছেন। তবে ভারত সরকারের কৌশলটি হলো, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে গণতন্ত্রের নির্মূলে যুদ্ধে নামানো। সে কাজে রাজী করানোর জন্য তাদের সামনে মূলা ঝুলানো হয়েছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষি বাহিনীতে চাকুরির। ২০১৩ সালে শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যায় সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট-ডাকাতিতে সহযোগিতা দিয়ে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রমাণ করেছে তারা বাকশালী স্বৈরাচারকে সুরক্ষা দেয়ার কাজে হাজির।  

 

শত্রুশিবিরে বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ

উপমহাদেশের রাজনীতিতে ভূমিকম্প সৃষ্টির সামর্থ্য বাঙালী মুসলিমদের যে আছে -সেটি বহু বাংলাদেশী না বুঝলেও ভারতীয়রা বুঝেছে। এজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশাল অংকের ভারতীয় বিনিয়োগ। ভারতের বর্তমান কৌশলটি হলো, বাংলাদেশীদের কাঁধে অস্ত্র রেখে নিজের যুদ্ধটি লড়া। এক্ষেত্রে ভারত মিত্র রূপে ব্যবহার করছে দেশের সেক্যুলারিস্টদের। এরাই বাংলাদেশের ঘরের শত্রু। সেক্যুলারিস্টগণই হলো প্রতিটি মুসলিম দেশে ইসলামের সবচেয়ে বড়শত্রু। মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামের বিরুদ্ধে বড় বড় অপরাধগুলো কাফেরদের দ্বারা হচ্ছে না। বরং হচ্ছে মুসলিম নামধারি এসব সেক্যুলারিস্টদের হাতে। এরাই মুসলিম বিশ্বের বিশাল মানচিত্রকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরোয় বিভক্তি করেছে এবং তা নিয়ে বিজয় উৎসব করে। মুসলিমদের উপর যেখানেই আঘাত, সেখানেই তাদের উৎসব। তাই শাপলা চত্ত্বরে হাজার হাজার মানুষকে হতাহত করা হলেও বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের মনে সেদিন কোন দংশন হয়নি। বরং বিপুল আনন্দে তারা উৎসব করেছে। তেমনি বিবেকহীনতা মিশরের সেক্যুলারিস্টদেরও। কায়রোর রাজপথে সামরিক বাহিনী যখন মুসলিম ব্রাদারহুডের সহস্রাধিক কর্মীকে হত্যা করে তখন সে নৃশংস হত্যাকান্ডকে তারা সমর্থণ করেছে। একই চিত্র পাকিস্তানেও। জেনারেল মোশাররফের শাসনামলে ইসলামাবাদের লাল মসজিদের আঙিনায় শত শত ছাত্রীদের উপর সেনাবাহিনী গুলি চালায় ও তাদের হত্যা করে। আর সে নৃশংসতাকেও সমর্থণ দিয়েছে সেদেশের সেক্যুলারিস্টগণ। ইসলামের উত্থান রুখতে এমন কোন হীনকর্ম নাই যা এরা করে না।

ইউরোপ,আমেরিকা বা ভারতে বসবাসকালে এসব সেক্যুলারিস্টদের চেতনায় নিজ নিজ মাতৃভাষা, নিজ সংস্কৃতি, নিজ বর্ণ ও নিজ গোত্রভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার কোন ভাবনা উদয় হয় না। বরং নিজ ভাষা ও নিজ স্বাতন্ত্রতা ভূলে আলো-পটলের ন্যায় সেখানকার সাংস্কৃতিক মেল্টিং পটে হারিয়ে যাওয়াতেই তাদের আনন্দ। অথচ কোন বৃহৎ মুসলিম দেশে বসবাস কালে তাদের কাছে সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় নিজ ভাষা, নিজ বর্ণ ও নিজ গোত্রভিত্তিক রাজনীতি বাঁচানোর এজেন্ডা। অন্যভাষী মুসলিমগণ তাদের কাছে তখন হত্যাযোগ্য শত্রু গণ্য হয়। পাকিস্তান আমলে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের কাছে অসম্ভব গণ্য হয়েছিল অবাঙালী পাকিস্তানীদের সাথে একরাষ্ট্রে বসবাস করা। অথচ তাদের সে সমস্যাটি দেখা দেয় না ভারতে বসবাসকারি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের সাথে বসবাসে। সেটি ইউরোপ-আমেরিকাতেও হয় না। কারণ তাদের দুষমনিটা ভারতের বিরুদ্ধে যেমন নয়, তেমনি পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধেও নয়। তাদের শত্রুতা তো ইসলাম ও মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ক্ষুদ্রতা নিয়ে বেড়ে উঠার উগ্র নেশাগ্রস্ততার কারণেই এসব সেক্যুলারিস্টদের হাতে উসমানিয়া খেলাফত, পাকিস্তান ও আরব ভূমির সুবিশাল ভৌগোলিক মানচিত্র টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় সীমারেখার নামে গড়ে উঠেছে বিভক্তির দুর্ভেদ্য প্রাচীর। আর এতে দারুন ভাবে শক্তিহীন হয়েছে মুসলিম উম্মাহ।

 

গাদ্দারি ইসলামের মৌল বিশ্বাসের সাথে

মুসলিম-রাষ্ট্র-নাশক ভয়ানক জীবদের অবস্থান শুধু যে মুসলিম দেশের সেক্যুলার দলগুলিতে -তা নয়। তাদের উপস্থিতি তথাকথিত বহু ইসলামি দলেও। নইলে সেসব ইসলামী দলেই বা কেন মুসলিম রাষ্ট্রবিনাশের দিবসগুলিতে বর্ণাঢ্য মিছিল ও বিজয়-উৎসব হবে? শুধু তাই, ১৯৭১’য়ে যারা ভারতীয় কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে কাফেরদের বিজয়ী করতে যুদ্ধ করলো তাদের প্রতি প্রশংসায় এসব ইসলামী দলের বহু নেতাকর্মীরাই এখন গদ গদ। মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়া যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো বিভক্তির দিনগুলিতে উৎসব করা। তাতে শক্তিশালী হয় জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম। এমন উৎসবে প্রকাশ পায় বাতিল মতাদর্শের প্রতি তাদের আত্মসমর্পন। প্রশ্ন হলো, সে হুশটি কি এসব ইসলামী দলের নেতাকর্মীদের নেই? তারা কি জানা না, দেশ বাঁচানোর লক্ষ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধটি হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে? কিন্তু সে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে অংশ নেয়ার সামর্থ্য কি এরূপ আত্মসমর্পিতদের থাকে? এমন বিভ্রান্তদের দিয়ে কি দেশের স্বাধীনতা বাঁচানো যায়? নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণ কি স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, তাসবিহ-তাহলিলের শিক্ষা রেখে গেছেন? ভাষা, বর্ণ বা আঞ্চলিকতার নামে মুসলিমদের মাঝে আজকের ন্যায় বিভক্তির দেয়াল কি সাহাবায়ে কেরামের আমলে ছিল? ছিল কি উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে? সূদ,জুয়া, কুফরি আদালত ও পতিতাপল্লির ন্যায় হারাম কাজের পাশাপাশি মুসলিম ভূমিতে এরূপ বিভক্তির সীমারেখাগুলো তো ঔপনিবেশিক কাফের শাসকদের সৃষ্টি। আজ সেগুলি বেঁচে থাকে কি করে? যাদের হৃদয়ে শরিষার দানা পরিমান ঈমান আছে -তাদের অন্তরে তো এরূপ বিভক্তি নিয়ে মাতম হওয়া উচিত, উৎসব নয়। কারণ এরূপ বিভক্তির দেয়াল ইসলামে হারাম। প্রকৃত ঈমানদার তো অংশ নিবে এসব হারাম সীমান্ত ভেঙ্গে উম্মতে ওহেদা গড়ার জিহাদে।

মুসলিম রাজনীতির মূল কথা, ইসলামের প্রতিষ্ঠা বাড়ানো এবং সে সাথে মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধি। তখন রাজনীতি স্রেফ রাজনীতি থাকে না, পবিত্র জিহাদে পরিণত হয়। যুগে যুগে মুসলিম মুজাহিদগণ তো সে কাজেই জিহাদ করেছেন এবং সে জিহাদে শহীদও হয়েছেন। কিছু ব্যক্তির মদ্পানে বা ব্যাভিচারে মুসলিম উম্মাহর এতো বড় ক্ষতি হয় না যা হয় মুসলিম ভুগোল খন্ডিত হলে। এমন বিভক্তি তো শত্রু শিবিরে উৎসব আনে। ১৬ ডিসেম্বর তো এ জন্যই ভারতীয়দের কাছে এতটা উৎসবযোগ্য। অতীতে মুসলিম রাষ্ট্রে ইজিদ বিন মোয়াবিয়া ও হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ন্যায় বহু বর্বর ও জালেম শাসক এসেছে। কিন্তু সে জন্য কি সে যুগের মুসলিমগণ মুসলিম ভূগোলে হাত দিয়েছে? খাবারের প্লেটে পোকামাকড় বসার কারণে প্লেট ভেঙ্গে ফেলাটি শিশু সুলভ পাগলামী। সুস্থ্য বিবেকের প্রকাশ তো সে প্লেট পরিস্কার করায়। তেমনি কোন মুসলিম দেশ বর্বর শাসক দ্বারা অধিকৃত হলে ইসলামের বিধান হলো, সে শাসকের নির্মূলে জিহাদ করা। কিন্তু ভয়ানক অপরাধ হলো, সে শাসকের কারণে মুসলিম দেশকে বিভক্ত করা। অতীতে দেশের বৃহৎ মানচিত্র গড়তে যে বিশাল রক্ত ব্যয় হয়েছে –একজন ঈমানদার সে ইতিহাস ভূলে যায় কি করে? তাছাড়া পবিত্র কোরআনে “পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না” বলে সে হারাম বিভক্তির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশও রয়েছে। এজন্যই ১৯৭১’য়ে কোন একটি ইসলামী দল এবং কোন একজন আলেমও পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেনি। সমর্থন করেনি কোন এক মুসলিম দেশও। সেটি ছিল নিতান্তই ভারত ও তার সেক্যুলারিস্ট দালালদের প্রজেক্ট।

পাপ বেশী বেশী করলে সে পাপ আর পাপ মনে হয়না। সে পাপ তখন দেশের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। অবিকল সে অবস্থাটি হলো মুসলিম দেশের সেক্যুলারিস্টদের। ভাষা ও অঞ্চলের নামে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়ার হারাম কাজটি তারা বেশী বেশী করেছে এবং ভূলিয়ে দিয়েছে বিভক্তি গড়ার বিরুদ্ধে পবিত্র কোর’আনের ফরমান। একই ভাবে সংস্কৃতির অঙ্গ বানিয়ে নিয়েছে সূদী ব্যাংক, মদের দোকান, জুয়ার আসর ও ব্যভিচার পল্লি নির্মাণের ন্যায় পাপকে। এরূপ পাপ নিয়ে বাঁচার সংস্কৃতি প্রবল হওয়াতেই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার পাপকে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের কাছে আদৌ পাপ মনে হয়নি। এবং তাদের কাছে গুনাহ গণ্য হয়নি ভারতের ন্যায় কাফেরদের কোলে আশ্রয় নেয়া ও তাদের অস্ত্র নিয়ে তাদেরকে বিজয়ী করায় যুদ্ধ করা। একাত্তরে তো সেটিই হয়েছে। আর যেসব ব্যক্তি সেসব হারাম কাজে নেতৃত্ব দিয়েছে তাদেরকে জাতির পিতা বলে মাথায়ও তুলেছে। এদের কারণেই মুসলিম উম্মাহ আজ ৫৭টি টুকরায় বিভক্ত। আর সেক্যুলার সেনাবাহিনীর কাজ হয়েছে সে হারাম সীমান্তগুলীকে পাহারা দেয়া। ফলে অসম্ভব হয়ে পড়েছে বিভক্তির প্রাচীর ভেঙ্গে মুসলিম বিশ্বের ভৌগলিক সংহতি প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থান। ভারতের সেক্যুলারিস্ট হিন্দুগণ অন্ততঃ ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে এমন বিভক্তির পথে এগুয়নি। মুসলমান নামধারি ব্যক্তি ইসলামী বিধির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী তথা মুনাফিক হলে সে যে কাফেরদের চেয়েও নীচে নামতে পারে -এ হলো তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। মহান আল্লাহতায়ালা এজন্যই জাহান্নামে তাদের স্থান দিবেন কাফেরদেরও নীচে।–(হাদীস)। এরাই দেশে দেশে ইসলামের আন্তর্জাতিক শত্রুপক্ষের সবচেয়ে বড় মিত্র। ভারত এদের কাঁধে বন্দুক রেখেই বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে চায়।

 

শত্রুর ঘাঁটি দেশের অভ্যন্তরে

কোন মুসলিম দেশে ইসলামের অভ্যুত্থান দেখা দিলে সেক্যুলারিস্টদের কাজ হয় রাজনীতিতে সেনাবাহিনীকে ডেকে আনা। কারণ, মুসলিম দেশগুলোতে সেনাবাহিনীই হলো সবচেয়ে সেক্যুলার ইন্সটিটিউশন। ফলে চিন্তা-চেতনায় সেনাবাহিনীর সদস্যরাই সেক্যুলারিষ্টদের সবচেয়ে বিশ্বস্থ্য মিত্র। সেটি দেখা গেছে মিশরে। দেখা গেছে তুরস্কে। দেখা গেছে আলজেরিয়াতেও। বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণও সম্ভবত সে পথেই এগুবে। আলজেরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থিগণ যখন বিপুল ভাবে বিজয়ী হচ্ছিল তখনই সে বিজয় রুখতে নৃশংস সামরিক জান্তাদের ক্ষমতা দখলে ডেকে আনা হয়। আর সামরিক অভ্যুত্থান একাকী আসে না, সাথে রক্তপাতও আনে। তাই আলজিরিয়ায় লক্ষাধিক মানুষের জীবন নাশ হয়েছে সে অভ্যুত্থানসৃষ্ট গৃহযুদ্ধে। আর সামরিক বাহিনী তো এরূপ ক্ষমতা দখলের কাজে দু’পায়ে খাড়া। মুসলিম দেশগুলিতে তাদের অপরাধের তালিকাটি বিশাল। এরাই গণতন্ত্র ও ইসলামের শত্রু। এজন্যই স্বৈরাচারী শাসনকে বিজয়ী করতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে ভোটডাকাতি অংশ নিতে দেখা যায়।

বস্তুত মুসলিম দেশগুলিতে সেক্যুলারিস্টদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুরক্ষিত ঘাঁটিটি কোন রাজনৈতিক দল নয়। পতিতাপল্লি, মদ্যশালা বা ক্লাব-ক্যাসিনাও নয় বরং সেটি হলো সামরিক বাহনী। ক্যান্টনমেন্টগুলো হলো মুসলিম দেশের মাঝে অনৈসলামিক ধ্যানধারণা ও সংস্কৃতির সুরক্ষিত দ্বীপ। এগুলো প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল ঔপনিবেশিক কাফের শাসকগণ। ইসলাম ও নিজ দেশের মুসলিম সংস্কৃতি নিজেই এখানে বিদেশী। ট্রেনিংয়ের নামে পাশ্চাত্য দেশ থেকে সামরিক অফিসারগণ যতটা পায় সামরিক প্রশিক্ষণ তার চেয়ে বহুগুণ বেশী পায় মগজ ধোলাই। ট্রেনিং শেষে ফিরে আসে তারা কাজ করে শত্রুশক্তির বিশ্বস্থ্য মিত্ররূপে। মুসলিম দেশগুলোতে এরাই হলো বিদেশী শত্রুদের বিশ্বস্থ্য সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বন্ধু। উসমানিয়া খেলাফতের পতন তখন থেকেই শুরু হয় যখন প্রশিক্ষণের জন্য অফিসারদের পশ্চিমা দেশে পাঠানো শুরু হয়। এশিয়া-আফ্রিকার কোথাও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিপদে পড়লে আজও তাদেরই ডাক পড়ে। এদের কারণেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান থেকে ইংরেজগণ বিতাড়িত হলেও পাক-সেনাবাহিনীতে মদ্যপান ও ব্যাভিচার বেঁচেছিল আর বহু দশক। এরাই বার বার দখলে নিয়েছে পাকিস্তানকে এবং দেশটিকে ইসলামী রাষ্ট্র বানানোর প্রজেক্ট বানচাল করে দিয়েছে। কামাল পাশার নেতৃত্বে এরাই খেলাফতের ন্যায় ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করেছে। তুরস্কের নির্বাচিত ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দারেসকে সে দেশের সেনাবাহিনীই ফাঁসীতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল। ইসলামী চেতনার প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীন আরবাকানকে এরা শুধু তাঁর পদ থেকেই হটায়নি, তার জন্য রাজনীতিও নিষিদ্ধ করেছিল। মিশরের ইতিহাসের সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড.মুরসীকে এরাই বন্দী করেছে এবং বিনা চিকিৎসায় কারাগারে হত্যার ব্যবস্থা করেছে। এবং রাজপথে হত্যা করছে তার সমর্থকদের।

আগ্রাসনের ভারতীয় স্ট্রাটেজী

বাংলাদেশের বুকে ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদে জেগে উঠার সুযোগটি প্রতি মুহুর্তের। তা থেকে দূরে থাকার অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ও মিশনের সাথে গাদ্দারি। তাছাড়া দেশের সেক্যুলারিস্টদের ইসলাম বিরোধী কদর্য অপরাধগুলো কি এখন গোপন বিষয়? সাধারণ জনগণও এ অপরাধীদের গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে চায়। তাদেরকে আবর্জনার স্তুপে ফেলার এখনই সময়। কিন্তু ভারত তাদের বন্ধুদের এ অবস্থায় দেখতে রাজি নয়। কারণ, তাতে ভারতের নিজের স্বার্থহানি। তাই ভারতও যুদ্ধ চায়। শুধু আওয়ামী লীগের কাঁধে নয়, সেনাবাহিনীর কাঁধেও অস্ত্র রেখে ভারত তার নিজের যুদ্ধটি লড়তে চায়। ভারতের বিনিয়োগ তাই শুধু তাদের রাজনৈতীক ও সাংস্কৃতিক সেপাইদের পিছনে নয়, সেনাবাহিনীর অফিসারদের পিছনেও। সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল মঈনকে দিল্লিতে ডেকে নিয়ে ভারত সরকার কি শুধু ঘোড়া উপহার দিয়েছিল? আরো কি কি দিয়েছিল সেটি জেনারেল মঈন ও তার সহচরগণই ভাল জানে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছিল তো সে বিনিয়োগের ফলেই।

তাছাড়া বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে ভারতের নতজানু সেবাদাস কি শুধু জেনারেল মঈন ছিল? সেটি হলে তো বুঝতে হবে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত হাজার হাজার ভারতীয় গোয়েন্দাদের দিবারাত্রের কাজ শুধু ঘোড়ার ঘাস কাটা। ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর রুচি ও নৃশংসতা যে কতটা গভীর -সেটি তো ধরা পড়ে শাপলা চত্বরে হাজার হাজার সৈন্যের সমাবেশ ও নিরস্ত্র মুসল্লিদের উপর লক্ষাধিক রাউন্ড গুলি বর্ষণ। তাছাড়া সে নৃশংসতা লাগাতর প্রমাণ করছে র‌্যাবের অফিসার ও সেপাহীরাও। তারাই তো বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে ইসলামি বই বাজেয়াপ্ত করছে। হানা দিচ্ছে হিজাবী ছাত্রীদের পাঠচক্রে। হানা দিচ্ছে বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের অফিসে। তাছাড়া শেখ হাসিনা তার শাসনামলে পুলিশ, RAB ও সেনাবাহিনীকে সাঁজিয়েছে ইসলামপন্থিদের দমনের গ্রান্ড স্ট্রাটেজীকে সামনে রেখে। এবং তার অবৈধ সরকার জনগণকে বাধ্য করছে সে হারাম কাজে রাজস্ব জোগাতে।

ভারতের লক্ষ্য বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়, দেশটির স্বাধীনতা নয়। দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নও নয়। গণতন্ত্রের প্রতি সামান্যতম আগ্রহ থাকলে তবে কেন গণতন্ত্র হত্যাকারি বাকশালী মুজিবের প্রতি এত প্রশংসা? ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতির পরও কেন শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থণ? বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি সামান্য আগ্রহ থাকলে তবে কেন চাপিয়ে দেওয়া হলো তাজুদ্দীনের হাত দিয়ে ৭ দফা ও মুজিবের হাত দিয়ে ২৫ দফা দাসচুক্তি? আর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন? বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় শত্রু হলো ভারত। সেটি প্রমাণিত হয় ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরপরই। পাত্রের তলা ধ্বসে গেলে সে পাত্রে যত কিছুই ঢালা হোক না কেন তা বেরিয়ে যায়। দেশের ক্ষেত্রে সে তলাটি হলো দেশের সীমান্ত। সুরক্ষিত সীমান্তই দেশের সম্পদ নিজ দেশে ধরে রাখে। তাই প্রতিদেশেই রীতি হলো, শুধু যুদ্ধকালে নয়, প্রতি দিনের প্রতিটি মুহুর্ত সীমান্ত পাহারা দেয়া। একাজে বিরতি চলে না। কিন্তু ভারত সে অবিরাম পাহারাদারি বাংলাদেশ সীমান্তে হতে দেয়নি। মুজিবামলে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে পাকিস্তান আমলের সে সুরক্ষিত সীমান্তই বিলুপ্ত করেছিল। আর হাসিনা বিলুপ্ত করেছে বিডিআর। মুজিবের কু-কুর্মের ফলে পাকিস্তান আমলের সোনারূপা, কাঁসাপিতল, কলকারখানার যন্ত্রপাতিই শুধু নয়, বিদেশীদের দেয়া রিলিফের মাল এবং কাঁচা পাটও ভারতের বাজারে গিয়ে উঠে। বাংলাদেশ হারায় পাকিস্তান আমলের অর্জিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাট ও পাটবস্ত্র উৎপাদনকারি দেশের মর্যাদা। সেটি ছিনতাই হয় ভারতের হাতে। বাংলাদেশের ললাটে জুটে বিশ্বের তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি হওয়ার অপমান। সে সময় শুরু হয় শত শত কোটি টাকার জাল নোট ছেপে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিনাশের ষড়যন্ত্র।ফলে আসে অর্থনৈতীক মড়ক ও দুর্ভিক্ষ। তাতে মৃত্যু হয় বহু লক্ষ বাংলাদেশীর। এ সবই হলো ভারত ও তার দাসশাসকদের অপরাধ।

ভারতের এবারের লক্ষ্য শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা খর্ব করা নয়। নিছক অর্থনৈতিক বিনাশও নয়। মূল লক্ষ্যটি হলো, ইসলামের জাগরণ রুখা। কারণ, তারা জানে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ভারতের জন্য কোন চ্যালেঞ্জ নয়। অর্থনৈতিক ময়দানেও বাংলাদেশ ভারতের প্রতিদ্বন্দী নয়। কিন্তু উপমহাদেশের রাজনীতিতে অপ্রতিরোধ্য বিপ্লব আনতে পারে ইসলামী বাংলাদেশ। এবং সে সামর্থ্য রয়েছে বাংলাদেশের। কারণ সে জন্য অর্থবল লাগে না। আনবিক বোমাও লাগে না। লাগে ঈমানের বল। লাগে জিহাদ। আফগানিস্তানের তিন কোটি মানুষের জিহাদ বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র সোভিয়েত রাশিয়ার ভূগোলকে গুড়িয়ে দিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে দেশটির বিশ্বশক্তির মর্যাদা। স্বাধীনতা দিয়েছে ৬টি মুসলিম দেশকে। এবং ২০ বছরের যুদ্ধে ধ্বস নামিয়েছে মার্কিন অর্থনীতিতেও। সে তুলনায় বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ কি কম? ভারত কি সোভিয়েত রাশিয়া বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী?

 

যে চ্যালেঞ্জের মুখে বাঙালী মুসলিম

মুসলিম হওয়ার অর্থ স্রেফ নামাযী বা রোযাদার হওয়া নয়, আল্লাহর দ্বীনের লড়াকু মুজাহিদ হওয়াও। নামায-রোযার পাশে তাঁকে আমৃত্যু জিহাদ নিয়েও বাঁচতে হয়। এটি তো নবীজী (সা:)’র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। সাহাবাদের জীবনে সে সূন্নত ছিল বলেই শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলাম ও মুসলিমদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ইখতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির মাত্র ১৭ জন মুজাহিদ দিয়ে। এখন তো দেশটিতে স্বঘোষিত মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের মাঝে মুজাহিদদের সংখ্যা ক’জন? প্রশ্ন হলো, আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে মুজাহিদ না হলে কি মুসলিম হওয়া যায়? ফলে যে যুদ্ধ সাহাবীদের জীবনে এসেছিল, সে যুদ্ধ অধিকৃত বাংলাদেশের বাঙালি মুসলিমদের জীবনে আসবে না সেটিই বা কীরূপে ভাবা যায়? তাছাড়া ইসলামকে পরাজিত রাখার লক্ষ্যে এ মুসলিম ভূমিতে শত্রুশক্তির লড়াই তো লাগাতর। শত্রুর লাগাতর হামলার মুখে নীরব ও জিহাদ বিমুখ নিষ্কৃয় থাকাটি কি ঈমানদারী?

বাংলাদেশের মাটিতে যারা মুসলিম রূপে বাঁচতে চায় ও ইসলামের বিজয় চায় -তাদের দায়ভারটি বিশাল। স্রেফ লাখ লাখ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ার মধ্য দিয়ে সে দায়ভার পালিত হয়না। ঘরে হাতি ঢুকলে যেমন সব কিছু তছ নছ করে দেয়, তেমনি রাষ্ট্র শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃত হলে লাখ লাখ মসজিদ-মাদ্রাসাকেও অকার্যকর করে দেয়। তখন মাদ্রাসার ছাত্রদেরও পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের শিরকপূর্ণ গান গেতে বাধ্য হতে হয়। নিষিদ্ধ হয় পবিত্র কোরআনের তাফসির। নিয়ন্ত্রিত হয় জুম্মার খোতবা। কেউ শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চাইলে তাকে সন্ত্রাসী বলে হত্যা করা হয়। এজন্যই রাষ্ট্র ও তার বিশাল সামরিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামো শয়তানী শক্তির হাতে থাকতে দেয়াটি হারাম। তখন সে অধিকৃতি থেকে মুক্তি দিতে প্রতিটি মুসলিমের উপর জিহাদ ফরজ হয়ে যায়। সে ফরজ পালনে মহান নবীজী (সা:) নিজে ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছেন এবং সে রাষ্ট্রের প্রধান হয়েছেন। সে রাষ্ট্রের শক্তি ও প্রতিরক্ষা বাড়াতে সাহাবগণ শহীদ হয়েছেন। কুফরি রাষ্ট্রের সে মহাবিপদ থেকে মুক্তি দিতেই ইখতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী হাজার হাজার মাইল দূর থেকে বাংলায় ছুটে এসেছিলেন। বাংলার মানুষের এত বড় কল্যাণ কি আর কেউ করেছে? বাংলার মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তো তিনিই। কিন্তু সে মুসলিম রাষ্ট্র আবার অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে। তারা অসম্ভব করে রেখেছে নবীজী (সা:)’র প্রতিষ্ঠিত ইসলামে -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শুরা, শরিয়ত, হুদুদ, প্যান-ইসলামিক মুসলিম ঐক্য এবং জিহাদ। এ পরাজিত অবস্থায় মুসলিমগণ কি স্রেফ দোয়া-দরুদ পাঠের মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সারবে?

নামাযের বিকল্প যেমন স্রেফ নামায, তেমনি জিহাদের বিকল্প স্রেফ জিহাদ এবং ইসলামী রাষ্ট্রের বিকল্প একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই। মুসলিমদের তাই শুধু নামায-রোযার হাকিকত বুঝলে চলে না, বুঝতে হয় শত্রুর লক্ষ্য ও স্ট্রাটেজীকেও। বাঁচতে হয় সে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে। বাংলাদেশের বুকে সে প্রবল শত্রুটি হলো আধিপত্যবাদী ভারত ও তার দোসরগণ। তাই বাঙালি মুসলিমের লড়াই স্রেফ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতিষ্ঠা নিয়ে নয়। নিছক আওয়ামী বাকশালীদের নির্মূলও নয়। বরং লড়াই এখানে সরাসরি ভারত ও তার পদসেবী সৈনিকদের বিরুদ্ধে। আর ভারতের সে সৈনিকদের অবস্থান শুধু সীমান্তের ওপারে নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও।

 

জিহাদ কেন অনিবার্য?

মুসলিম দেশ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হলে বা সে দেশের উপর হামলা হলে জিহাদ সেখানে ফরজে আইন তথা সবার উপর বাধ্যতামূলক হয়। দেশের প্রতিটি নাগরিকই তখন যোদ্ধা। সমগ্র দেশ তখন ক্যান্টনমেন্ট। সে যুদ্ধে যোগ না দেয়াটি তখন মুনাফিকি। মু’মিনের জীবনে ইসলাম শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত আনে না, লাগাতর জিহাদও আনে। জিহাদ এখানে ইসলামের সনাতন স্ট্রাটেজী। কোর’আনের ছত্রে ছত্রে রয়েছে সে জিহাদের তাগিদ।বলা হয়েছে, “তোমাদের প্রস্তুতি কম হোক বা বেশী হোক অভিযানে বেরিয়ে পড়, জিহাদ করো আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ও প্রাণ দিয়ে। এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা জানতে।”-(সুরা তাওবা, আয়াত ৪১)। এ আয়াতে বিশাল প্রস্তুতির অপেক্ষায় কালক্ষেপনের সুযোগ দেয়া হয়নি। বিশেষ করে তখন যখন মুসলিম ভূমি ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত। মুসলিমদের প্রস্তুতির কমতি মহান আল্লাহতায়ালা তখন ফেরেশতাদের দিয়ে পূরণ করেন। আর এটিই তো সিরাতুল মুস্তাকীম যা মু’মিনকে জান্নাতে নিয়ে পৌঁছায়। যে পথে জিহাদ নেই তাকে কি তাই সিরাতুল মুস্তাকীম বলা যায়? জিহাদহীন সে পথে চলে কি জান্নাতপ্রাপ্তির কল্পনা করা যায়? নবীজী (সা:)’র আমলে তো তেমন এক সিরাতুল মুস্তাকীমের পথেই লাগাতর জিহাদ শুরু হয়েছিল। সে সময় ইসলাম কবুলের অর্থ শুধু নামাযের জামায়াতে হাজির হওয়া ছিল না, জিহাদের ময়দানে হাজির হওয়াও। যার মধ্যে জিহাদ নাই এবং সে জিহাদে জানমালের কোরবানীর কোন নিয়েতও নেই,নবীজী (সা:) তাকে মুনাফিক বলেছেন।

তাই মু’মিনের জীবনে জিহাদের অংশগ্রহণ এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা। কারণ, সে তো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ক্রয়কৃত দাস। পবিত্র কোর’আনে ঈমানদারের সে পরিচিতিটি তুলে ধরা হয়েছে এভাবে,“নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের থেকে তাঁর জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। তাঁরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে এবং (সে পথে তারা শত্রুদের) নিধন করে এবং নিজেরাও নিহত হয়। তাওরাত,ইঞ্জিল ও কোরআনে এ বিষয়ে তাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আর কে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর? তোমরা আল্লাহর সাথে যে সওদা করেছো তার জন্য আনন্দ প্রকাশ করো,কারণ এটিই তো মহাসাফল্য।”-(সুরা তাওবা, আয়াত ১১১)। তাই ঈমানদারির প্রকৃত পরিচয় এবং সে সাথে এ জীবনে সাফল্যের পথ শুধু কালেমায়ে শাহাদত পাঠ নয়।স্রেফ নামায-রোযা আদায়ও নয়। বরং সেটি হলো মহান আল্লাহর রাস্তায় নিজের জান ও মালের কোরবানীতে চুক্তিবদ্ধ হওয়া। এটিই মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ বাণিজ্য।এবং সেটি মহান আল্লাহর সাথে। মানব জীবনে প্রকৃত সফলতা আসে তো এ পথেই। মহান আল্লাহতায়ালার এ ঘোষণাটির উপর যার ঈমান আছে, তার জীবনে জিহাদ এবং সে জিহাদে জানমালের কোরবানীর জজবাটি তাই অনিবার্য কারণেই সৃষ্টি হয়। তাই জিহাদ যেমন মৌলবাদ নয়, তেমনি চরমপন্থি সন্ত্রাসও নয়। বরং মু’মিনের জীবনে এটিই হলো ইসলামের স্বাভাবিক প্রকাশ।

সে জিহাদের ঢেউই বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছিল আজ থেকে ৮ শত বছরেরও বেশী কাল আগে। এবং সে জিহাদের বরকতেই মুক্ত হয়েছিল আজকের চেয়েও বিশাল ও অখন্ড বাংলা। কিন্তু ১৭ জন মুজাহিদের হাতে যে বাংলা সেদিন স্বাধীন হয়েছিল -তা এখন অধিকৃত ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। আর শত্রুপক্ষের অধিকৃতিতে কি ইসলাম নিয়ে বাঁচা সম্ভব? অধিকৃতির কারণেই দেশে শরিয়তি বিধান নাই, বিলুপ্ত হয়েছে সংবিধানে আল্লাহতায়ালার উপর আস্থার বানী, নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তাফসির মাহফিল এবং গুলি চালানো হয়েছে নিরস্ত্র মুসল্লিদের উপর। এবং শহীদ মুসল্লিদের লাশ ফেলা হয়েছে ময়লার গাড়িতে! দেশটিতে সূদ নিষিদ্ধ নয়; নিষিদ্ধ নয় পতিতাপল্লি ও জ্বিনার বানিজ্য। কিন্তু নিষিদ্ধ করা হয়েছে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে রাজনৈতিক সংগঠন করা। সে সাথে শুরু হয়েছে মুর্তি নির্মাণ ও মুর্তিপূজা। এসবই হচ্ছে ১৭ কোটি মুসলিমের দেশে। বাঙালী মুসলিমের জীবনে এর চেয়ে বড় পরাজয় ও এর চেয়ে বড় লজ্জার আর কি হতে পারে? এরূপ অধিকৃত মুসলিম দেশে জিহাদ তথা ইসলামকে বিজয়ী করার লড়াই থাকবে না -তা কি কোন মুসলিম ভাবতে পারে? প্রথম সংস্করণ ১৭/১১/২০১৩, দ্বিতীয় সংস্করণ ২৫/০২/২০২১

 

 




ঈমানবিনাশী জাতীয় সঙ্গিত ও দেশধ্বংসী প্রকল্প

ফিরোজ মাহবুব কামাল

যে পাপ কথা ও গানে

সমাজে বড় বড় অপরাধগুলি শুধু খুন, ব্যভিচার বা চুরিডাকাতি নয়। মানুষ কাফের হয় এবং জাহান্নামের যোগ্য হয় -মুখের কথায় ও গানে। মহান আল্লাহতায়ালাকে যে ব্যক্তি অবিশ্বাস করে বা তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দেয় – জাহান্নামে পৌঁছতে তাকে কি খুন, ধর্ষণ বা চুরি-ডাকাতিতে নামার প্রয়োজন পড়ে? বিদ্রোহের ঘোষণাটি মুখে একবার দেয়াই সে জন্য যথেষ্ঠ। অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হতে ইবলিসকে তাই খুন বা ব্যভিচারে নামতে হয়নি। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া একটি মাত্র হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই তাকে লানতপ্রাপ্ত শয়তানে পরিণত করেছে। সে হুকুমটি ছিল হযরত আদম (আ:)কে সেজদার। তাই বক্তৃতায় কি বলা হয়, সঙ্গিতে কি গাওয়া হয় বা সাহিত্যের নামে কি লেখা হয় –সেগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তা রেকর্ড হয় এবং তা নিয়ে বিচার বসবে রোজ হাশরের বিচার দিনে। মু’মিন ব্যক্তিকে তাই শুধু উপার্জন বা খাদ্য-পানীয়’র ক্ষেত্রে হারাম-হালাম দেখলে চলে না। কথাবার্তা বা লেখালেখির ক্ষেত্রেও অতি সতর্ক হতে হয়।

নবীজী(সা:)’র হাদীস: “অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে জিহ্বা ও যৌনাঙ্গের দ্বারা কৃত অপরাধের কারণে।” তেমনি বহু মানুষ জান্নাতেও যাবে সত্য দ্বীনের পক্ষে জিহ্বাকে কাজে লাগানো তথা সাক্ষি দেয়ার কারণে। ফিরাউনের দরবারে যে কয়েকজন যাদুকর হযরত মূসা (আ:)’র সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে মুসলিম হয়েছিলেন -তারা জীবনে এক দিনও নামায বা রোযা পালন করেননি। “মুসা (আ:) ও হারুনে (আ:)’র রবের উপর ঈমান আনলাম” –তাদের মুখ থেকে উচ্চারিত এই একটি মাত্র বাক্যই তাদেরকে সরাসরি জান্নাতবাসী করেছে। ঈমানের প্রবল প্রকাশ ঘটেছিল তাদের সে উচ্চারণে। ঈমানের সে প্রকাশ ফিরাউনের কাছে সহ্য হয়নি -তাই তাদের হাত-পা কেটে নির্মম হত্যা করা হয়। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সাক্ষদানে তারা এতই অটল ছিলেন যে, সে নির্মম হত্যাকান্ডও তাদের একবিন্দু বিচলিত করতে পারেনি। তাদের এ সাহসী উচ্চারনে মহান আল্লাহতায়ালা এতোটাই খুশি হয়েছিলেন যে, পবিত্র কোর’আনের একাধিক স্থানে তিনি নিজ কালামের পাশে তাদের সে ঘোষণাকেও লিপিবদ্ধ করেছেন। এবং ক্বিয়ামত অবধি মানব জাতির জন্য শিক্ষ্যনীয় করেছেন তাদের ঈমানী প্রত্যয়কে।

ঈমান বন্দুকের গুলি বা মিজাইলে মারা পড়ে না। মারা যায় তখন, যখন গান,সঙ্গিত বা সাহিত্যের নামে চেতনার ভূবনে লাগাতর বিষ ঢালা হয়। শয়তান বিষ পান করানোর সে কাজটাই মহা ধুমধামে করে নানারূপ গীত, গান, স্লোক ও মিথ্যা ধর্মগ্রন্থ পাঠ করানোর মধ্য দিয়ে। সে লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে শয়তানের লক্ষ লক্ষ পুরোহিত, মন্দির ও পূজামন্ডপ এবং হাজারো গান। বাংলার বুকে ইসলামের যখন প্রচন্ড জোয়ার, সে জোয়ার ঠেকাতে শয়তান যে অস্ত্রটি বেছে নিয়েছিল সেটিও কোন আধুনিক মারণাস্ত্র ছিল না। সেটি ছিল ভাববাদী গান। ইসলামের প্রসার রুখতে ভাববাদী গান ও হাতে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তখন মাঠে নেমেছিল চৈতন্য দেব ও তার শিষ্যরা। তার গানের আবেগ এতোটাই প্রবল ছিল যে, বাংলার বুকে হিন্দুদের ইসলাম কবুলের জোয়ার দ্রুত থেমে যায়। ফলে প্রায় অর্ধেক বাঙালী থেকে যায় পৌত্তলিকতা নিয়ে জাহান্নামের পথে। আজও  বাংলাদেশের বুকে শয়তানের স্ট্রাটেজীটি অবিকল অভিন্ন। তবে শয়তানের উদ্দেশ্য, হিন্দুদের মুসলিম হওয়া থেকে রুখা নয়। বরং সেটি মুসলিমদেরকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো তথা ডি-ইসলামাইজেশন। সে কাজে শয়তান তার অবতার রূপে বেছে পেয়েছে আধুনিক মুর্তিপুজারী কবি রবীন্দ্রনাথকে।

 

একাত্তরের আত্মসমর্পণ এবং পৌত্তলিক চেতনা

বাঙালী মুসলিমদের চেতনায় ঈমানবিনাশী বিষ ঢালার কাজ যে পূর্বে হয়নি -তা নয়। সে কাজের শুরু প্রবল  হয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের শাসনামলে। সেটি উগ্র পৌত্তলিক সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম’ গান গাওয়ার মাধ্যমে। বাঙালী হিন্দুগন সে গানকে অবিভক্ত বাংলার সকল স্কুলে জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দেয়। কিন্তু বাঙালী মুসলিমগণ পৌত্তলিকদের সে ঈমানবিনাশী ষড়য্ন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ফলে সে প্রকল্প সেদিন ব্যর্থ হয়। বাঙালী মুসলিমদের সেদিনের সাফল্যের কারণ, মুসলিম রাজনীতির নেতৃত্ব মুজিবের ন্যায় ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাসদের হাতে বন্দী ছিল না। বাঙালী মুসলিমগণ হিন্দু আধিপত্যের কাছে সেদিন আত্মসমর্পিতও ছিল না। বরং তাদের চেতনার ভূমিতে সেদিন ছিল ইসলামের প্রতি গভীর অঙ্গিকার। তাছাড়া সেদিন তারা বন্ধুহীনও ছিল না। তাদের পাশে ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ভাষাভাষি বহু কোটি মুসলিম।

কিন্তু ১৯৭১’য়ে বাংলার রাজনীতির চিত্রই পাল্টে যায়। দেশ অধিকৃত হয় লক্ষাধিক ভারতীয় সৈন্যদের হাতে। এবং বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গণ তখন অধিকৃত হয় ইসলামি চেতনাশূণ্য ও ইসলামচ্যুত জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের হাতে। তখন বাড়ে ভারতের প্রতি আত্মসমর্পণ। ভারতের অর্থে ও স্বার্থে প্রতিপালিত এ সেবাদাসদের অঙ্গিকারটি ভারতের প্রতি এতোই গভীর যে, একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বহু হাজার কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র ভারতের হাতে ডাকাতি হওয়াতেও তাদের মনে সামান্যতম দুঃখ জাগেনি। সে ডাকাতি রোধে তারা কোন চেষ্টাও করেনি। অথচ সে অস্ত্র কেনায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানীদের অর্থ ছিল। ভারতের সেবাদাসগণ রুখেনি দেশের কলকারাখানার যন্ত্রপাতি লুন্ঠনও। বরং লুন্ঠনকে বাধাবিপত্তিহীন করতে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে তারা বিলুপ্ত করে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সীমান্তও। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দেশ দ্রুত পরিণত হয় তলাহীন ভিক্ষার পাত্রে। ১৯৭৪ য়ে নেমে আসে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ; তাতে মৃত্যু হয় বহু লক্ষ মানুষের। আত্মসমর্পণের পর কি আর নিজের ইচ্ছা চলে? তখন তো প্রতি পদে প্রভুর ইচ্ছাই মেনে নিতে হয়। একাত্তরে ভারতের যুদ্ধজয়ের পর তেমনি একটি পরাজিত অবস্থা নেমে আসে বাংলার মুসলিম জীবনে।

দাসদের জীবনে স্বাধীনতা থাকে না। তারা বাঁচে মনিবের পদতলে আমৃত্যু পরাধীনতা নিয়ে। সে পরাধীনতাটি যেমন ভৌগলিক মানচিত্রে, তেমনি চেতনার মানচিত্রে। একাত্তর-পরবর্তী ভারতীয় দখলদারী ও তাদের ডাকাতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ভারতের আশ্রয়ে প্রতিপালীত এহেন বাংলাদেশী দাসদের ছিল না। ফলে ভারত যা চেয়েছে তাই করেছে। স্কুলে কি গাইতে হবে বা পড়তে হবে -সেটিও নির্ধারিত করে দেয় ভারত। শাসতন্ত্রের মূলনীতিগুলিও তারা নির্ধারণ করে দেয়। নিষিদ্ধ করে দেয় ইসলামপন্থীদের রাজনীতি। অথচ ১৯৭০’য়ের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে শেখ মুজিব একটি বারের জন্যও এমন কথা উল্লেখ করেনি। এবং ইসলামপন্থী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে জনগণের রায়ও নেয়নি। পরাধীন ব্রিটিশ আমলে ইসলামের শত্রুগণ “বন্দেমাতরম” গানটি চাপাতে না পারলেও একাত্তরের পর তারা “আমরা সোনার বাংলা”কে চাপিয়েছে। একাত্তরে ইসলামের শত্রুদের এটি হলো বিশাল অর্জন।

প্রশ্ন হলো, ভাব ও ভাবনায় রবীন্দ্রনাথের “আামার  সোনার বাংলা” এবং বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম” গানের মাঝে পার্থক্য কতটুকু? উভয় গানেই দেশ মাতৃতূল্য, সে সাথে পূজনীয় বলে বন্দনা গাওয়া হয়েছে। ফলে উভয় গানের মূলেই রয়েছে অভিন্ন পৌত্তলিকতা। এমন গান কি কোন মুসলিম গাইতে পারে? যারা ঈমানশূন্য, এ গান নিয়ে তাদের আগ্রহটি গভীর। মুসলিমের ঈমান ধ্বংসে যাদের আগ্রহটি প্রবল, একমাত্র তারাই চাইবে এমন পৌত্তলিক গানকে মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিতে। এ গানটি জাতীয় সঙ্গিত রূপে বিবেচিত হওয়ার পিছনে কাজ করেছে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের সেক্যুলার ও হিন্দুয়ানী বিচারবোধ। তাদের সে মানদন্ডে রবীন্দ্রনাথ দেবতুল্য গণ্য হয়েছে। ইসলাম কি বলে -সেটি আদৌ সেদিন বিবেচনায় আনা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেক্যুলার মানদন্ডে যা কিছু হালাল, সেগুলি কি ইসলামি মানদন্ডেও হালাল? জ্বিনা সেক্যুলার মানদন্ডে কোন অপরাধই নয় -যদি সে ব্যাভিচারে সংশ্লিষ্ট নারী ও পুরুষের সম্মতি থাকে। অথচ ইসলামে রয়েছে বিবাহিত ব্যাভিচারীদের প্রস্তরাঘাতে প্রাণনাশের বিধান। আর অবিবাহিতের জন্য রয়েছে লোকসম্মুখে ৮০টি বেত্রাঘাতের শাস্তি। ঈমানদার হওয়ার দায়বদ্ধতা শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন নয়, বরং সেটি মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। সেক্যুলারিস্টদের জীবনে সে আত্মসমর্পণ নাই, বরং প্রকাশ পায় বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহের চেতনাটিই ধরা পড়েছে জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে।

 

আল্লাহতায়ালার সিলেবাস ও শয়তানে সিলেবাস

মহান আল্লাহতায়ালা চান, প্রতিটি মুসলিম বেড়ে উঠুক তাঁর প্রতি অটুট ঈমান নিয়ে। ঈমানে বৃদ্ধি ঘটানোর প্রয়োজনেই মহান আল্লাহ-রাব্বুল আলামীনের রয়েছে নিজস্ব সিলেবাস। সেটি পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানার্জন। এ জন্যই অর্থ বুঝে কোর’আন তেলাওয়াতকে বাধ্যতামূলক করেছেন। সে ফরজটি যেমন ৫ ওয়াক্ত নামাযের প্রতি রাকাতে আদায় করতে হয়, তেমনি নামাযের বাইরেও। ঈমান বৃদ্ধিতে কোর’আনী জ্ঞানের গুরুত্ব যে কত অধীক -সেটি বর্ণীত হয়েছে পবিত্র কোর’আনে। বলা হয়েছে “মুসলিম তো একমাত্র তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহর নাম স্মরণ হওয়া মাত্রই ভয়ে কেঁপে উঠে এবং যখন তাদের কাছে কোর’আনের আয়াত পড়ে শোনানো হয় তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং আল্লাহর উপর তারা নির্ভরশীল।” -(সুরা আনফাল, আয়াত ২)।

মহান আল্লাহতায়ালার প্রকল্পকে বানচাল করার লক্ষ্যে শয়তানেরও রয়েছে নিজস্ব স্ট্রাটেজী। রয়েছে নিজস্ব সিলেবাস। শয়তান চায়, ঈমানের বিনাশ। চায়, মানব মন থেকে আল্লাহর স্মরণকে ভূলিয়ে দিতে। চায়, কোর’আন থেকে দূরে টানতে। তাই শয়তানপন্থীদের হাতে দেশ অধিকৃত হলে নিষিদ্ধ হয় পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানদান। এবং শুরু হয় নাচ, গান, খেলাধুলা ও বহুবিধ উৎসব দিয়ে শয়তানের নিজস্ব সিলেবাস। তখন গুরুত্ব পায় চৈতন্যদেব, বঙ্কীমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের ন্যায় পৌত্তলিকদের রচিত কবিতা, গান ও সাহিত্য। এভাবে শয়তান বাড়ায় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে লাগাতর অবাধ্যতা। বাংলাদেশে কোর’আন পাঠের বদলে রবীন্দ্র-সঙ্গিত পাঠ এজন্যই বাধ্যতামূলক। সেটি শুধু দেশের স্কুলগুলিতেই নয়, এমনকি ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলোতেও। এমন কি জাতীয় সংসদসহ সকল সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও।

 

রবীন্দ্রচেতনার নাশকতা

মানুষ শুধু তার দেহ নিয়ে বাঁচে না। বাঁচতে হয় চেতনা নিয়েও। সে সুস্থ্য চেতনাটির কারণেই মানব শিশু তার মানবিক পরিচয়টি পায়। সে চেতনাটি সাথে নিয়েই মানবের সর্বত্র বিচরণ। সেটি যেমন ধর্ম-কর্ম, রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতি; তেমনি ধরা পড়ে তার গদ্য, পদ্য, কথা ও গানে। মানুষ বেড়ে উঠে, তার আমলের ওজন বাড়ে এবং মূল্যায়ন হয় -সে চেতনার গুণে। ঈমানদারের জীবনে চেতনার সে বিশেষ রূপটি হলো তার ঈমান ও আক্বীদা। বিচার দিন নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের আগে প্রথমে হিসাব হবে ঈমান ও আক্বীদার। এখানে অকৃতকার্য হলে কি সে বিচারে পাশের সম্ভবনা থাকে? মানুষের ধর্ম, কর্ম, সংস্কৃতি ও আচার-আচরনে বিপ্লব আসে তো ঈমান ও আক্বীদের গুণে। চেতনায় রোগ থাকলে কি ব্যক্তির ইবাদতে বা চরিত্রে পরিশুদ্ধি আসে?

মানুষ কি খায় -সেটি দেখা যায় তার দৈহিক স্বাস্থ্যের মাঝে। তেমনি কি শেখে -তা দেখা যায় তার কথা, চেতনা ও চরিত্রে। তাই ব্যক্তির চেতনায় শিরক বা পৌত্তলিকতা দেখে বলা যায় -তার বিদ্যাশিক্ষার কাজটি সঠিক হয়নি। বুঝা যায়, চেতনা দূষিত হয়েছে শিক্ষালয়ে। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে অন্য সব পাপ মাফ হতে পারে, কিন্তু মাফ হয়না শিরকের পাপ। অথচ রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্যে সে শিরকের বীজই ছড়িয়েছেন। বঙ্কিমের ন্যায় তিনিও উপাস্য রূপে হাজির করেছেন দেশের মাটি ও আলো-বাতাসকে। শিরকের সে রূপটি প্রবল ভাবে ছড়িয়ে আছে তার রচিত কবিতা, নাটক, ছোটগল্প ও গানে। বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে এখানেই রবীন্দ্রনাথের গুরুতর অপরাধ। বস্তুত বাঙালী মুসলিম সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি ক্ষেত-খামার বা রণাঙ্গণে হয়নি, সেটি হয়েছে দেশের শিক্ষাঙ্গণে। সেটি রবীন্দ্র সাহিত্যের মাধ্যমে। চৈতন্য দেবের কাজ সীমিত ছিল হিন্দুদের মাঝে, অথচ রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিকতা প্রবেশ করেছে মুসলিম চেতনায়।

বাংলাদেশে আজ গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, চুরিডাকাতি ও ভোটডাকাতির জোয়ার। এসব খুনি ও ধর্ষকগণ আসমান থেকে পড়েনি। ক্ষেত-খামারেও বেড়ে উঠেনি। হিংস্র পশু উৎপাদনের জন্য জঙ্গল চাই। তেমনিট দুর্বৃত্ত উৎপাদনের জন্য চাই ইন্ডাস্ট্রী। বাংলাদেশে বিদ্যাশিক্ষার নামে সে কাজগুলোই করছে দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানেই বেড়ে উঠেছে অপরাধের নায়কগণ। বিশ্বের দরবারে দুর্বৃত্তিতে যারা বার বার প্রথম করলো তারা নিরক্ষর কৃষক বা শ্রমিক নয়। তারা বেড়ে উঠেছে এই শিক্ষা ব্যবস্থায়। শিক্ষার নামে বাড়ানো হয়েছে  নৈতিক ও সাংস্কৃতিক নাশকতা। স্বাস্থ্যের পতন রোধে পরিবর্তন আনতে হয় খাদ্যে, চারিত্রিক পতন রোধে তেমনি পাল্টাতে হয় শিক্ষা। নবীজী (সা:)’র যুগে তো সেটিই করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে সেটিই হচ্ছে না। ফলে অবিরাম ভাবে চলে দুর্বৃত্ত উৎপাদনের কাজ।

পৌত্তলিক চেতনায় বিশ্বের কোথাও উন্নত চরিত্র গড়ে উঠেছে বা উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয়েছে -সে প্রমাণ নাই। কারণ, সেটি তো আদিম জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতার পথ। এমন অজ্ঞতায় মানুষ নিষ্ঠুর হয়, অসভ্য হয় ও অশালীন হয়। এমন জাহিলিয়াতের কারণে ভারতে হিন্দুগণ অতীতে মৃত স্বামীর চিতায় তার স্ত্রীকেও জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে। রবীন্দ্রনাথের জাহেল মনের পরিচয় মেলে সতিদাহের প্রশংসায় লেখা তার কবিতা পাঠ করে। পৌত্তলিক চেতনায় মানব সন্তানকে বিভক্ত করা হয় বিভিন্ন জাত-পাতে। ভারতে কোটি কোটি মানুষকে নিম্ন জাতের আখ্যায়ীত করে তাদেরকে অচ্ছ্যুত গণ্য করা হয়। এটি নিরেট অমানবিকতা। এতে বিলুপ্ত হয় অন্যায়কে ঘৃণা করার সামর্থ্য। একারণেই ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, গণধর্ষণ ও গণনির্যাতন হয়। এবং সরকার ও পুলিশের রুচি নাই সেগুলো রুখার। বাংলাদেশে তেমন এক অসুস্থ্য পৌত্তলিক চেতনাকে প্রতিষ্ঠা দেয়া হচ্ছে যেমন রবীন্দ্রনাথের গানকে জাতীয় সঙ্গিত করে, তেমনি তার রচিত গান, নাটক ও সাহিত্যকে জনগণের রাজস্বের অর্থে বিপুল ভাবে প্রচার করে।

 

যে গান ঈমানধ্বংসী

জাতীয় সঙ্গিতের মূল বিষয়টি ভাব, ভাষা, ছন্দ এবং আবেগের প্রকাশ নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ ঘটাতে হয় সংখ্যাগরিষ্ট দেশবাসীর ঈমান-আক্বিদা, আশা-আকাঙ্খা, দর্শন, ভিশন ও মিশন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন “আমার সোনার বাংলা” গানটি লিখেছিলেন তখন বাংলাদেশ বলে কোন স্বাধীন দেশ ছিল না। সে সময় বাংলা ছিল ভারতের একটি প্রদেশ। সে প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম হলেও তাদের সংখ্যা আজকের ন্যায় শতকরা ৯১ ভাগ ছিল না। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিজেও সে গানটিতে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ, দর্শন, চেতনা বা স্বপ্নের প্রকাশ ঘটাতে লেখেনি। সেটি যেমন তার লক্ষ্য ছিল না, ফলে সে লক্ষ্যে তাঁর প্রস্তুতিও ছিল না। পৌত্তলিকগণ সব সময়ই নতুন উপাস্য চায়। যাদের কাছে গরু-বাছুর ও শাপ-শকুন উপাস্য, তাদের কাছে নবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ তো বিশাল। তাই রবীন্দ্রপূজারি পৌত্তলিকগণ রবীন্দ্রনাথকে পূজনীয় করেছে নিজেদের সে পৌত্তলিক চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে। মনের সে পৌত্তলিক ক্ষুধা নিবারণেই “আমার সোনার বাংলা” গানকে বাংলাদেশে জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ভারতে সে মর্যাদাটি পেয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম” গানটি। প্রশ্ন হলো, সে পৌত্তলিক গান গাইতে ভারতের মুসলিমদের বাধ্য করা হলেও এরূপ পৌত্তলিক গান কেন বাংলাদেশের মুসলিমগণ গাইবে?

পারিবারিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম হলেও কার্যতঃ ছিলেন পৌত্তলিক। এ জগতটাকে একজন মুসলিম  যেভাবে দেখে, কোন পৌত্তলিকই সেভাবে দেখে না। উভয়ের ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন ভিন্ন, তেমনি চেতনার জগতটাও ভিন্ন। আর কবিতা ও গানে তো সে বিশ্বাসেরই প্রকাশ ঘটে। একজন মুসলিমের কাছে এ পৃথিবীর ভূমি, আলো-বাতাস, মাঠ-ঘাট, গাছ-পালা, ফুল-ফল, নদী-সমুদ্র এবং সেগুলির অপরূপ রূপ –সবকিছুই মহান আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন। এসব নিদর্শন দেখে সে মহান আল্লাহর কুদরত যে কত বিশাল সে ছবকটি পায়। ফলে স্রষ্টার এ অপরূপ সৃষ্টিকূল দেখে মু’মিন ব্যক্তি সেগুলিকে ভগবান বা মা বলে বন্দনা করে না, বরং হামদ ও নাত গায় সেগুলির সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহতায়ালার। অথচ রবীন্দ্রনাথের চোখে বাংলার অপরূপ রূপ ধরা পড়লেও মহান আল্লাহতায়ালার সর্বময় অস্তিত্ব ধরা পড়েনি। এখানেই রবীন্দ্রনাথের অজ্ঞতা ও দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর “আমার সোনার বাংলা” গানটিতে লিখেছেন:

“আমার সোনার বাংলা,

আমি তোমায় ভালবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ,

তোমার বাতাস

আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।

ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে

ঘ্রানে পাগল করে–

মরি হায়, হায় রে

ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা খেতে,

আমি কি দেখেছি মধুর হাসি।।

কি শোভা কি ছায়া গো,

কি স্নেহ কি মায়া গো–

কি আঁচল বিছায়েছ

বটের মূলে,

নদীর কূলে কূলে।

মা, তোর মুখের বাণী

আমার কানে লাগে

সুধার মতো–

মরি হায়, হায় রে

মা, তোর বদনখানি মলিন হলে

আমি নয়ন জলে ভাসি।”

রবীন্দ্রনাথের এ গানে প্রচুর ভাব আছে, ভাষা আছে, ছন্দও আছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু আছে যা একজন মুসলিমের ঈমানের সাথে প্রচন্ড সাংঘর্ষিক। এ গানে তিনি বন্দনা গেয়েছেন বাংলার ভূমির, এবং সে ভূমির আলো-বাতাস, নদীর কূল, ধানের ক্ষেত, আমবাগান ও বটমূলের। দেশকে তিনি মা বলেছেন। দেশের বিস্তৃত মাঠঘাট, নদীর পাড় ও বটমূলকে সে মা দেবীর আঁচল রূপে দেখেছেন। দেশকে হাজির করেছেন একজন দেবীর মুর্তিতে। গানটিতে ধ্বনিত হয়েছে সে মা দেবীর প্রতি অশ্রুসিক্ত বন্দনা। কিন্তু যে মহান আল্লাহতায়ালা সেগুলির স্রষ্টা, সমগ্র গানে একটি বারের জন্যও তাঁর বন্দনা দূরে থাক তাঁর নামের উল্লেখ পর্যন্ত নাই। একজন পৌত্তলিকের জন্য এটিই স্বভাবজাত। পৌত্তলিকের এখানেই মূল সমস্যা। এখানে পৌত্তলিকের ভয়ানক অপরাধটি হলো নানা দেবদেবী ও নানা সৃষ্টির নানা রূপ বন্দনার মাঝে মহান আল্লাহতায়ালাকে ভূলে থাকার। মানব জীবনের এটিই সবচেয়ে ঘৃণ্য কর্ম। মহাসত্যময় মহান আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকারের এটিই সবচেয়ে জঘণ্যতম শয়তানি কৌশল। এটিই শিরক। এবং এজন্যই রবীন্দ্রনাথ এজন্যই একজন মুশরিক। মহান আল্লাহর বান্দার বহু বড় বড় গোনাহ মাফ করে দিবেন কিন্তু শিরকের গুনাহ কখনোই মাফ করবেন না। নবীজী (সাঃ) সে হুশিয়ারিটি বহুবার শুনিয়েছেন। তাই একজন মুসলিম এ গান গায় কি করে? সমগ্র মুসলিম ইতিহাসের কোথাও কি একজন পৌত্তলিককে এরূপ সন্মানের আসনে বসানো হয়েছে –যা হয়েছে বাংলাদেশে?

গদ্য,পদ্য, কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মুখ বা জিহবা কথা বলে না, কথা বলে তার চেতনা বা বিশ্বাস। ফলে সে কবিতা ও গানে ব্যক্তির আক্বিদা বা ধর্মীয় বিশ্বাস ধরা পড়ে। তাই “আমার সোনার বাংলা” গানে যে চেতনাটির প্রকাশ ঘটেছে সেটি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের। কোন মুসলিমের নয়। গানে ইসলামী চেতনার প্রকাশের সামর্থ্য থাকলে রবীন্দ্রনাথ মুসলিম হয়ে যেতেন। পৌত্তলিক চেতনা নিয়েই একজন পৌত্তলিক কবি কবিতা ও গান লিখবেন বা সাহিত্যচর্চা করবেন -সেটিই তো স্বাভাবিক। এমন একটি চেতনার কারণেই পৌত্তলিক ব্যক্তি শাপ-শকুন, গরু, বানর-হনুমান, নদ-নদী, বৃক্ষ,পাহাড়-পর্বতকে উপাস্য রূপে মেনে নেয় এবং তার বন্দনাও গায়। “আমার সোনার বাংলা” গানের ছত্রে ছত্রে তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনারই প্রবল প্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে তাঁর নিজ চেতনার সাথে আদৌ গাদ্দারী করেননি। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার সাথে একজন মুসলিমের গাদ্দারী তো তখনই শুরু হয় -যখন পৌত্তলিক চেতনার এ গানকে মনের মাধুরি মিশিয়ে গাওয়া হয়। বাংলাদেশে রবীন্দ্রভক্তদের মূল প্রকল্প হলো বিপুল সংখ্যায় এরূপ গাদ্দার উৎপাদন।এবং সে লক্ষ্যে তারা বিপুল সফলতাও পেয়েছে। মুসলিম নামধারি এরূপ গাদ্দারদের কারণে আল্লাহর শরিয়তি বিধান আজ বাংলাদেশের ন্যায় শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের দেশে পরাজিত।

 

“সোনার বাংলা” গানের প্রেক্ষাপট

“আমার সোনার বাংলা” গানটি রচনার একটি ঐতিহাসিক পেক্ষাপট আছে। গানটি রচিত হয়েছিল ১৯০৫ সালের পর। বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয় ১৯০৫ সালে। পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় অর্থনীতি ও শিক্ষাদীক্ষায় অতি পশ্চাদপদ ছিল পূর্ব বঙ্গ। পূর্ববঙ্গের সম্পদে দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল কলকাতার হিন্দু বাবুদের। সে শহরের শতকরা ৮০ ভাগ বাসিন্দাই ছিল হিন্দু। শুধু প্রশাসনই নয়, বাংলার শিক্ষা ও শিল্প গড়ে উঠছিল স্রেফ কলকাতাকে কেন্দ্র করে। মুসলিমদের দাবী ছিল বাংলাকে বিভক্ত করা হোক এবং পূর্ববঙ্গের রাজধানি করা হোক ঢাকাকে। সে দাবীর ভিত্তিতে ভারতের তৎকালীন ভাইস রয় লর্ড কার্জন পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি আলাদা প্রদেশ গঠন  করেন। এ নতুন প্রদেশের রাজধানী রূপে গৃহীত হয় ঢাকা নগরী। শহরটি রাতারাতি জেলা শহর থেকে রাজধানী শহরে পরিণত হয়। তখন ঢাকায় কার্জন হলসহ বেশ কিছু নতুন প্রশাসনিক ইমারত এবং হাই কোর্ট ভবন নির্মিত হয়। নির্মিত হয় কিছু প্রশস্ত রাজপথ। নতুন এ প্রদেশটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলার এবং সে সাথে আসামের মুসলিমদের মাঝে সৃষ্টি হয় তখন নতুন রাজনৈতিক প্রত্যয়। সে প্রত্যয় নিয়ে ১৯০৬ সালে ঢাকার বুকে গঠিত হয় মুসলিম লীগ যা শুধু বাংলার মুসলিমদের জন্যই নয়, সমগ্র ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে সৃষ্টি করে নতুন আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনা।

মুসলিমদের এ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং কলকাতা ছেড়ে ঢাকার এ মর্যাদা-বৃদ্ধি কলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি। কবি রবীন্দ্রনাথেরও ভাল লাগেনি। অথচ বাঙালী মুসলিমগণ সে বিভক্তিকে নিজেদের জন্য কল্যাণকর মনে করে। তারা এটিকে কলকাতাকেন্দ্রীক হিন্দু আধিপত্য থেকে মুক্তি রূপে দেখে। বাংলা বিভক্তির বিরুদ্ধে বর্ণ হিন্দুদের পক্ষ থেকে শুরু হয় সন্ত্রাসী আন্দোলন। সে সন্ত্রাস ছিল উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক চেতনায় পরিপুষ্ট। সন্ত্রাসীরা মন্দিরে গিয়ে শপথ নিত। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সে সন্ত্রাসী আন্দোলনের সমর্থক। সে সন্ত্রাসের পক্ষে প্রয়োজন ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্রের। সে অস্ত্র জোগাতেই রবীন্দ্রনাথ যুদ্ধে নামেন তার কবিতা, গান ও উপন্যাস নিয়ে। এ প্রেক্ষাপটেই রচিত হয় “আমার সোনার বাংলা” গান।

“আমার সোনার বাংলা” গানে যা প্রকাশ পেয়েছে সেটি রবীন্দ্রনাথের একান্তই সাম্প্রদায়িক হিন্দু চেতনার, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় চেতনা সে গানে স্থান পায়নি। রবীন্দ্রনাথ মুসলিম ছিলেন না। ফলে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিশ্বাস, দর্শন, স্বপ্ন, ভিশন ও মিশনের প্রতিনিধিত্ব করার ইচ্ছা যেমন ছিল না, তেমনি সেগুলির প্রকাশ ঘটানোর সামর্থ্যও তার ছিল না। পূর্ব বাংলা পশ্চাদপদ মুসলিমদের প্রতি অগ্রসর বাঙালী হিন্দুদের কোন দরদ না থাকলেও বাংলার প্রতি তখন তাদের দরদ উপচিয়ে পড়ে। বাংলার মাঠ-ঘাট, আলো-বাতাস, জলবায়ু, বৃক্ষরাজী ও ফলমূলের প্রতি আবেগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন এ গান। এ গানের একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। সেটি স্বাধীনতা ছিল না, বরং ছিল বাংলার বিভক্তির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতার বদলে বাঙালী হিন্দুদের রাজনীতির মূল বিষয়টি হয়ে দাঁড়ায় বঙ্গভঙ্গ রদের দাবী। ব্রিটিশ শাসকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ভারত ভ্রমনে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভারত আগমন উপলক্ষে “জনগণ মনোঅধিনায়ক ভারত ভাগ্যবিধাতা” নামে কবিতা লেখেন। সেটিই আজ ভারতের জাতীয় সঙ্গিত। রবীন্দ্রনাথ ও  বাঙালী হিন্দুদের সে দাবী রাজা পঞ্চম জর্জ মেনে নেন এবং আবার বাংলা একীভূত হয়। প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা নেমে আসে পূর্ব বঙ্গের মুসলিমদের মাঝে। বিক্ষুদ্ধ এ মুসলিমদের শান্ত করতে ভারতের ব্রিটিশ সরকার তখন ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেটিও কলকাতার বাঙালী হিন্দুদের ভাল লাগেনি। তার মধ্যেও তারা কলকাতার শ্রীহানীর কারণ খুঁজে পায়। ফলে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও বাঙালী বাবুগণ তখন বিক্ষোভে রাজপথে নামেন। মিছিলে নেমেছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা রোধে কলকাতার গড়ের মাঠে অনুষ্ঠিত হয় জনসভা। সে জনসভাতেও সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ। এই হলো রবীন্দ্র মানস। সে সাথে বাঙালী হিন্দু-মানস। মুসলিম বিদ্বেষ নিয়ে রচিত রবীন্দ্রনাথের সে গানটিই এখন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত।

আজকের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের আমলের অবিভক্ত বাংলা যেমন নয়, তেমনি দেশটি ভারতভূক্ত কোন প্রদেশও নয়। রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমদের সংখ্যা শতকরা ৫৫ ভাগের বেশী ছিল না। সে আমলের বাংলা ঢাকাকেন্দ্রীকও ছিল না। এখন এটি এক ভিন্ন চরিত্রের বাংলাদেশ -যে দেশে রবীন্দ্রনাথ একদিনের জন্যও বাস করেননি। কোনদিনও তিনি এদেশের নাগরিক ছিলেন না। এদেশের স্বাধীনতার কথা তিনি যেমন শোনেননি,তেমনি এ দেশের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমদের নিয়ে তিনি কোন স্বপ্নও দেখেননি। ফলে বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া,স্বাধীনতা বা স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব? সবচেয়ে বড় কথা,এ সঙ্গিতটি সে উদ্দেশ্যে লেখাও হয়নি। জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের বিষয়টি দোকান থেকে ‘রেডিমেড’ সার্ট কেনার ন্যায় নয়। এটিকে বরং বিশেষ রুচি, বিশেষ আকাঙ্খা, বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে অতি বিশেষ গুণের ‘tailor made’ হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে সে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। বরং এখানে গুরুত্ব পেয়েছে রবীন্দ্রভক্তি ও রবীন্দ্রপূজার মানসিকতা।

 

বাঙালী মুসলিমের আত্মসমর্পণ

আত্মসমর্পণের পর আর এ অধিকার থাকে না, কি খাবে বা কি পান করবে সে সিন্ধান্ত নেয়ার। প্রভু যা খাওয়ায় বা পান করায় -সেটিই খেতে হয় বা পান করতে হয়। এমন কি বিষ পান করানো হলেও সেটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস থাকে না। তখন অধিকার থাকে না জাতীয় সঙ্গিত রূপে কি গাওয়া হবে -সে সিদ্ধান্ত নেয়ার। শেখ মুজিব ও তার অনুসারিদের মূল কাজটি হয় সে আত্মসমর্পণে মাথা নত করা। তাদের কারণেই বাঙালী মুসলিম জীবনে নিদারুন আত্মসমর্পণ নেমে আসে ১৯৭১’য়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে অধিকৃত হওয়ার পর। ১৯৭২’য়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে ভারত তার সেনাবাহিনীকে তুলে নিলেও হাজার হাজার চর ও রাজনৈতিক এজেন্টদের তুলে নেয়নি। বরং দেশ এখন সে এজেন্টদেরই দখলে। ভারত জানে নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভারতপন্থীদের বিজয় অসম্ভব। তাই  গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে কবরে পাঠানো হয়েছে। এবং স্থায়ী রূপ দেয়া হয়েছে ভারতীয় এজেন্টদের জবরদখলকে। ইংরেজগণ তাদের ১৯০ বছরের শাসনের গণদাবীর পরওয়া করেনি। তারা শাসন করেছে খলিফাদের মাধ্যমে; এবং সেটি হাজার হাজার মাইল দূর থেকে। ভারতীয়রাও দিল্লি বসে সেটিই চায়। সে জন্য তারাও ঢাকার শাসন ক্ষমতায় চায় আত্মসমর্পিত খলিফা। সে খলিফার শাসনকে গ্রহণযোগ্য করতেই চায়, পৌত্তলিক চেতনার চাষাবাদ। সেটি বাড়াতেই প্রয়োজন পড়েছে রবীন্দ্র সঙ্গিত ও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের।

ইসলামের শত্রুদের কাছে বাঙালী মুসলিমের আত্মসমর্পণের প্রমাণ শুধু এ নয় যে, দেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসলাম বিরোধী শাসনতন্ত্র, সূদী ব্যাংক,পতিতাপল্লি, জুয়ার আসর, মদের দোকান, অশ্লিল, ছায়াছবি এবং কুফরি আইনের আদালত। বরং আরো প্রমাণ হলো, জাতীয় সঙ্গিত রূপে তারা গেয়ে চলেছে পৌত্তলিক চেতনাপুষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গিতকে। এরূপ আত্মসমর্পণে যা বাড়ে তা হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বেঈমানি। সে বেঈমানী তখন ছড়িয়ে পড়ে জীবনের প্রতিক্ষেত্রে। ইসলামের সাথে গাদ্দারীটা তখন শুধু রাজনীতিতে সীমিত থাকে না। মুসলিম সংহতির বুকে কুড়াল মারা এবং মুসলিম রাষ্ট্র বিনাশের ন্যায় হারাম কাজটিও তখন উৎসবযোগ্য গণ্য হয়।

 

সাইনবোর্ড পৌত্তলিকতার

নবীজীর আমলেও আরব দেশে বিস্তৃত ভূমি, চন্দ্র, সূর্য্য ও আকাশ-বাতাস ছিল। সে ভূমিতেও মাঠ-ঘাট, ফুল-ফল ও বৃক্ষরাজি ছিল। কিন্তু মহান নবীজী (সা:) কি কখনো সে গুলিকে মা বলে সম্বোধন করেছেন? বরং আজীবন হামদ-নাত ও প্রশংসা গীত গেয়েছেন সে সৃষ্টিকুলের মহান স্রষ্টার। আল্লাহর অনুগত বান্দাহ রূপে মুসলিমের বড় দায়িত্ব হলো আল্লাহর নামকে সর্বত্র প্রবলতর করা বা বড় করা। কোন দেশ, ভূমি, ভাষা বা বর্ণকে যেমন নয়, তেমনি কোন ব্যক্তি বা জীবজন্তুকেও নয়। পৌত্তলিকদের থেকে ঈমানদারের এখানেই বড় পার্থক্য। এ জীবনে হেদায়াতপ্রাপ্তির চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালার বড় নেয়ামত নেই। তেমনি পথভ্রষ্ট হওয়ার চেয়ে বড় ব্যর্থতাও নেই। হেদায়াত প্রাপ্তির শুকরিয়া জানাতে ঈমানদার ব্যক্তি তাই আমৃত্যু আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করে। এ জন্য সে আল্লাহু আকবর বলে। এবং সেটির নির্দেশ রয়েছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে,“তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন তোমরা আল্লাহর নামে তাকবির বল (অর্থাৎ আল্লাহ যে মহিমাময় সর্বশ্রেষ্ঠ -সেটি মুখ দিয়ে প্রকাশ করো), যাতে তোমরা এভাবে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৫)। তাই মুসলিম শুধু জায়নামাযেই “আল্লাহু আকবর” বলে না, রাজপথের মিছিলে বা জনসভাতেও বলে। তার মুখে তাই “জয় বাংলা” বা “জয় হিন্দ” ধ্বনিত হয় না।

আব্দুল্লাহ আর ভগবান দাস –এ দুটি শুধু ভিন্ন নাম নয়, বরং দুটি ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক। ব্যক্তির নাম থেকে এভাবেই তার ধর্ম, চেতনা ও বিশ্বাসের পরিচয় মেলে। সে পরিচয়টুকু জানার জন্য তাই বাড়তি প্রশ্নের প্রয়োজন পড়ে না। ব্যক্তির নাম তাই আজীবন তার নিজ ধর্ম বা বিশ্বাসের পক্ষে সাইনবোর্ড রূপে কাজ করে। তেমনি জাতির জীবনে সাইন বোর্ড হলো জাতীয় সঙ্গিত। জাতীয় সঙ্গিত থেকেই পরিচয় মেলে জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও চেতনার। জানা যায় ভিশন ও মিশন। তাই নাস্তিকের ও আস্তিকের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন যেমন এক হয় না, তেমনি এক হয় না জাতীয় সঙ্গিতও। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত থেকে দেশবাসীর যে পরিচয়টি মেলে -সেটি কি কোন তৌহিদী মুসলিমের? সে পরিচয়টি তো রবীন্দ্রনাথের ন্যায় পৌত্তলিকের।

তাছাড়া এ গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে নির্বাচনের একটি ইতিহাস আছে। সেটি গৃহীত হয়েছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর। যারা এ সঙ্গিতটিকে গ্রহণ করেছিল -তারা ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার। তাদের চেতনায় ও রাজনীতিতে ইসলামের কোন প্রভাব ছিল না। বরং তারা পরিচিতি নিজেদের ভারতপ্রীতি, রবীন্দ্রপ্রীতি,এবং ইসলামি চেতনা নির্মূলে আপোষহীনতার কারণে। লগি বৈঠা দিয়ে ইসলামপন্থীদের হত্যা, তাদের বিরুদ্ধে  মিথ্যা মামলা এনে ফাঁসিতে ঝুলানো এবং হত্যার পর তাদের লাশ ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করাই তাদের রাজনীতি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিও শ্রদ্ধা দেখানো তাদের রীতি নয়। সেরূপ শ্রদ্ধাবোধ ছিল না মুজিবেরও। মুজিব যে শুধু রাজনীতিতে স্বৈরাচারি ছিলেন তা নয়, প্রচণ্ড স্বৈরাচারি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির অঙ্গণেও। দেশের উপর তিনি শুধু একদলীয় বাকশালই চাপিয়ে দেননি, চাপিয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে পৌত্তলিক সংস্কৃতির আগ্রাসন। জাতীয় সঙ্গিত রূপে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে চাপানো হয়েছে তেমন এক স্বৈরাচারি মানসিকতা থেকে। এক্ষেত্রে ভারতীয় বর্ণ হিন্দুদের থেকে তার চেতনাটি আদৌ ভিন্নতর ছিল না।

 

আকুতি নিষ্ঠবান পৌত্তলিকের

প্রতিটি দেশের শুধু রাজনৈতিক,ভৌগলিক ও ভাষাগত পরিচয়ই থাকে না, থাকে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ও। জনগণের চেতনায় যেমন সুনির্দ্দিষ্ট দর্শন থাকে, তেমনি সে দর্শনের আলোকে রাজনৈতিক স্বপ্নও থাকে। সে স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠায় জনগণের জীবনে লড়াইও থাকে। সে বিচারে প্রতিটি দেশই অনন্য। সে অনন্য বৈশিষ্ঠের কারণেই পশ্চিম বাংলার ন্যায় বাংলাদেশ ভারতের অংশ নয়। পশ্চিম বাংলার সাথে বাংলাদেশের পার্থক্যটি ভূমি, জলবায়ু বা আলোবাতাসের নয়, বরং সেটি দর্শন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ভিশন ও মিশনের। পার্থক্যটি ভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার। সে ভিন্ন স্বপ্নের কারণেই ১৯৪৭’য়ে পশ্চিম বাংলার হিন্দুগণ যখন ভারতে যোগ দেয় তখন পূর্ব বাংলার মুসলিমগণ সচেতন ভাবেই বাঙালী হিন্দুদের সাথে প্রতিবেশী ভারতে যায়নি। গিয়েছে পাকিস্তানে।

জাতীয় সঙ্গিত রচিত হয় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের যে বিশেষ পরিচয় ও স্বপ্ন -সেগুলো তুলে ধরতে এবং প্রবলতর করতে। এমন সঙ্গিতের প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি উচ্চারণ থেকে প্রতিটি নাগরিক তখন পায় নতুন প্রত্যয় ও নতুন প্রেরণা। পায় স্বপ্নের সে পথটিতে অবিরাম টিকে থাকার মানসিক বল। কিন্তু জাতীয় সঙ্গিতের নির্বাচনে বাংলাদেশের মুসলিমদের সে বিশিষ্ট পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এ সঙ্গিতে যে সুর, যে দর্শন, যে বর্ণনা এবং যে আকুতি ধ্বণিত হয়েছে সেটি কোন মুসলিমের নয়, সেটি নিতান্তই একজন পৌত্তলিকের। এমন সঙ্গিত থেকে কোন মুসলিমই অনুপ্রেরণা পেতে পারে না, বরং পায় পথভ্রষ্টতা। পায় শিরকের ছবক। পায় জাহান্নামের পথ। হিন্দুস্থান চায়, বাংলাদেশীদের মাঝে ১৯৪৭’য়ের পরিচয়টি বিলুপ্ত হোক। চায়, নির্মিত হোক ইসলামচ্যুত নতুন প্রজন্ম নিয়ে এক নতুন বাংলাদেশ।

 

রবীন্দ্রসঙ্গিতের রাজনৈতিক এজেন্ডা

জাতীয় সঙ্গীত কোন সাধারণ গান নয়। তার একটি সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও দর্শনগত এজেন্ডা থাকে। তাতে দেশবাসীর মিশন ও ভিশনের ঘোষণাও থাকে। ১৯০৫ সালে বাঙালী হিন্দুদের এজেন্ডা ছিল বঙ্গভঙ্গ রদ ও অখণ্ড বাংলা। তখন প্রয়োজন দেখা যায় “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভাল বাসি” এ গানটির। কিন্তু হিন্দুদের রাজনৈতিক এজেন্ডাই পাল্টে যায় ১৯৪৭ সালে; তখন সেটি হয় বঙ্গভঙ্গ। তখন প্রয়োজন হারিয়ে ফেলে সে গান। কিন্তু ১৯৭১’য়ের পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার পর তাদের এজেন্ডা আবার পাল্টে যায়। ভারতীয় হিন্দুদের রাজনীতিতে আবার ফিরে এসেছে “অখন্ড বাংলা”র প্রকল্প। তাই আবার প্রয়োজন দেখা দেয় সে গানটির। তারা জানে, এখন অখন্ড বাংলা গড়লে সে বাংলার পক্ষে পাকিস্তানে যোগ দেয়ার সুযোগ নাই। বরং সম্ভাবনা বেড়েছে পশ্চিম বাংলার সাথে যুক্ত হয়ে ভারত ভুক্ত হওয়ার। তাতে ভারত পাবে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের উপর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ। তাতে বাড়বে ভারতের সামরিক ও সামরিক শক্তি। এ সুযোগটি পেতে অতীতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ পৃথিবীর অন্যপ্রান্ত থেকে বাংলার বুকে এসে যুদ্ধ করেছে। তাই এতো কাছে থেকে ভারত সে সুযোগ ছাড়ে কেমনে?‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ তবে সে রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তনের পূর্বে ভারত চায়, বাংলাদেশীদের চেতনার মানচিত্রে পরিবর্তন। চেতনাগত পবিবর্তনের লক্ষ্যেই পুণরায় প্রয়োজন পড়েছে অবিভক্ত বাংলার পক্ষে আবেগ সৃষ্টির। ফলে কদর বেড়েছে রবীন্দ্রনাথের “সোনার বাংলা” গানের।

কোন যুদ্ধই স্রেফ সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রকান্ড যুদ্ধ চলে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানেও। ১৯৭১’য়ের সামরিক যুদ্ধটি শেষ হয়েছে, কিন্তু তীব্র ভাবে এখনো চলছে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ। পাকিস্তান ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে ভারত এক ধাপ এগিয়েছে মাত্র, কিন্তু অখণ্ড ভারত নির্মাণের মূল লক্ষ্যটি এখনো অর্জিত হয়নি। ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের লক্ষ্য,বাঙালী মুসলিমের আদর্শিক ভূবনে পরিবর্তন আনা। কারণ, পূর্ব বাংলার মুসলিমগণ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ভূক্ত হয় পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে ভাষা, বর্ণ বা আঞ্চলিক বন্ধনের কারণে নয়। সেটি সম্ভব হয়েছিল প্যান-ইসলামি মুসলিম ভাতৃত্বের কারণে। ইসলাম এজন্যই ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের মূল টার্গেট। ১৯৭১’য়ে সামরিক বিজয়ের পর ইসলামি চেতনা বিনাশের ভারতীয় প্রজেক্ট বহুদূর এগিয়ে গেছে। ১৯৪৭য়ে শতকরা ৯৬ ভাগ বাঙালী মুসলিম পাকিস্তানে যোগ দেয়ার পক্ষে ছিল। অথচ চিত্রটি এখন ভিন্ন। মনের মাধুরি মিশিয়ে যারা রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গায় তাদের অনেকেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টিকে অনাসৃষ্টি মনে করে। তাদের সামনে ১৯৪৭ এলে তারা পাকিস্তানে যোগ দেয়ার পক্ষে ভোট দিত না। ভারত তাই বিজয়ী হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধেও। নতুন প্রজন্ম ভূলে গেছে ১৯৪৭-পূর্ব বাঙালী মুসলিমদের দুরাবস্থার কথা। তখন বাংলার শহরে ও গ্রামে শতকরা ৯৫ ভাগ দালানকোঠা ও ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিল হিন্দুরা। শহর এলাকার শতকরা ৮৫ ভাগের বেশী জমিজমার মালিক ছিল তারা। সরকারি চাকুরীতে মুসলিমদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও ছিল না। ভারতের মুসলিমগণ এখনো সে একই অবস্থায় রয়ে গেছে।

 

আত্মসমর্পণে কি আখেরাত বাঁচবে?

বাঙালী মুসলিমের চেতনা রাজ্যে ভারতীয় দখলাদারিকে স্থায়ী রূপ দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছে সেক্যুলার বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ। এরা হচ্ছে ভারতের পক্ষে খাঁচার ঘুঘু। এদের কাজ, তাদের ন্যায় অন্যদেরও খাঁচায় বন্দী করা। এরূপ ভারতসেবী সাংস্কৃতিক সৈন্য গড়ে তোলার কাজে ভারতের বিনিয়োগটি ১৯৪৭ থেকেই। ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ভারতের সে খরচটি বিপুল ভাবে কমেছে। ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে এখন ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশী মুসলিমের নিজস্ব রাজস্বের পুঁজি। ভারতের বর্তমান স্ট্রাটেজী হলো, একাত্তরে অর্জিত অধিকৃতিকে যে কোন ভাবেই হোক লাগাতর ধরে রাখা। বাংলাদেশের উপর ভারতের দখলদারিটি শুধু সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক। সে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকৃতিরই প্রতীক হলো জাতীয় সঙ্গিত রূপে চাপিয়ে দেয়া পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের গান।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অখণ্ড হিন্দু ভারতের ধ্বজাধারি। সে অখণ্ড হিন্দু ভারতের চেতনা থেকেই ভারত থেকে মুসলিম নির্মূলের প্রবক্তা মারাঠী শিবাজীকে তিনি জাতীয় বীরের মর্যাদা দিয়েছেন। শিবাজীকে বন্দনা করে তিনি কবিতাও লিখেছেন। এখন সে রবীন্দ্রনাথকে ভারত ব্যবহার করছে বাংলাদেশের উপর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনের যোগসূত্র রূপে। এজন্যই বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা ও রবীন্দ্রঅর্চনা বাড়াতে ভারত সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের এত বিনিয়োগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের রাজস্বের অর্থে বাংলা এ্যাকাডেমীর কাজ হয়েছে প্রতিবছর পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের উপর শত শত বই প্রকাশ করা। অথচ ইসলামের মহান নবীজী(সাঃ)এবং মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষটির উপর কি এর দশ ভাগের এক ভাগ বই ছাপানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

জনগণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে বড় অপরাধটি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়। সেটি ঘটছে চেতনা বা বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে। অপরাধটি এখানে জনগণকে জাহান্নামের আগুণে পৌঁছানোর। অথচ সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা বা হাসপাতাল গড়া নয়, বরং জাহান্নামের আগুণ থেকে নাগরিকদের বাঁচানো। এবং সেটি সম্ভব জান্নাতের পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকীমটি চিনতে এবং সে পথে পথচলায় লাগাতর সহয়তা দেয়ার মধ্য দিয়ে। ইসলামে এটি এক বিশাল ইবাদত এবং প্রতিটি শাসকের উপর এটি এক বিশাল দায়ভার। এ দায়িত্ব পালনের কাজটি সঠিক হলে মহান আল্লাহর দরবারে সে শাসক মহান মর্যাদায় ভূষিত হন। এবং কিভাবে পালন করতে হয় খোদ নবীজী (সা:) দেশ শাসনের সে গুরু দায়ভার নিজ কাঁধে নিয়ে শিখিয়ে গেছেন। শাসকদের জন্য আজও  মহান নবীজী (সা:)’র মহান সূন্নত। দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন খোলাফায়ে রাশেদার ন্যায় মহান সাহাবায়ে কেরামগণ। কিন্তু বাংলাদেশে সে দায়ভার পালিত হয়না। কারণ, শাসকের সে পবিত্র পদটি অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। এরা আবির্ভুত হয়েছে স্বার্থ-শিকারি চোর-ডাকাত রূপে। ক্ষমতালোভী এ সেক্যুলারিস্টদের মূল মিশনটি হলো, কোর’আনে প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীমকেই জনগণের দৃশ্যপট থেকে বিলুপ্ত করা এবং জাহান্নামে পৌঁছাটি সহজতর করা। সে লক্ষেই তাদের রাজনীতি ও শিক্ষানীতি। সে লক্ষ্যেই নৃত্য-গীত, মদ-জুয়া ও পতিতাপল্লির সংস্কৃতি। সে লক্ষ্যেই দেশ জুড়ে গড়া হচ্ছে শত শত নাট্যশালা ও সিনেমা হল। সে অভিন্ন লক্ষ্যেই এক পৌত্তলিকের রচিত সঙ্গিতকে জাতীয় সঙ্গিত রূপে গাইতে বা শুনতে জনগণকে বাধ্য করা হচ্ছে। এভাবে অধিকৃত হয়ে আছে জনগণের মনের ভূবন। জনগণের অধিকৃত সে মন বাধ্য হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে দূরে থাকতে।

অথচ মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে দূরে থাকার বিপদটি তো ভয়াবহ। তখন সে ব্যক্তির উপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তার সঙ্গিরূপে তখন নিয়োগ দেয়া হয় অভিশপ্ত শয়তানের। সে ঘোষণাটি এসেছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে, “যে কেউ রহমানের স্মরণ থেকে দূরে সরবে তার উপর নিয়োগ দেয়া হবে শয়তানের, সে তার সঙ্গি হবে।” –(সুরা জুখরুফ, আয়াত ৩৬)। রবীন্দ্র সঙ্গিত গাওয়ার অর্থ শুধু গান গাওয়া নয়। এর অর্থ, দেশবন্দনার মাঝে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে ভূলে থাকা। ফলে তার পরিণতিটি ভয়াবহ। এখানে মহাবিপদটি সঙ্গি রূপে শয়তানকে নিজ ঘাড়ে বসিয়ে নেয়ার। জনগণের কাঁধে শয়তান বসিয়ে দেয়ার সে ভয়ানক পাপের কাজটিই করছে বাংলাদেশের সরকার। সরকারের নীতির কারণেই দিন দিন শয়তানের অধিকৃতি বাড়ছে দেশবাসীর মনের ভূবনে। আর তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গণই শুধু নয়, জনগণের চেতনার মানচিত্রও অধিকৃত হয়ে যাচ্ছে পৌত্তলিক হিন্দুদের হাতে। এভাবে জাতীয় সঙ্গিত পরিনত হয়েছে জনগণের ঈমান ধ্বংস ও জাহান্নামে পৌছানোর নীরব হাতিয়ারে। ১ম সংস্করণ ১০/০৫/২০১৫; ২য় সংস্করণ ২৫/০২/২০২১।

                                                                                                                                                                                




বিবিধ ভাবনা (২৯)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ডাকাত-সর্দার কেন সেনাপ্রধান?

সেনাবাহিনী যে শেখ হাসিনার ভোটডাকাতির সাথে সরাসরি জড়িত –তা নিয়ে সামান্যতম সন্দেহ নাই। সেনাবাহিনীর কাজ দেশকে প্রতিরক্ষা দেয়া; ভোট ডাকাতি নয়। জেনারেল আজিজ বিজিবীর প্রধান থাকা কালে নেতৃত্ব দিয়েছে হাসিনার পক্ষ্যে ভোট ডাকাতিতে। প্রশ্ন হলো, আজিজের মত একজন অপরাধী ব্যক্তি ডাকাত দলের প্রধান হতে পারে, কিন্তু সেনাবাহিনীর প্রধান হয় কি করে? সেনাবাহিনীর সে কাজটি ছিল সংবিধান বিরোধী এবং জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এছাড়া ২০১৩ সালের ৫’মে শাপলা চত্ত্বরে সেনাবাহিনীর বহু হাজার সদস্যকে দেখা গেছে হিফাজতে ইসলামের নিরস্ত্র মুসল্লীদের উপর গুলি চালাতে। সে খবর বাংলাদেশে পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।

জেনারেল আজিজের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এভাবে পরিণত হয়েছে এক অপরাধী বাহিনীতে। সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ উঠে এসেছে এক অপরাধী খুনি পরিবার থেকে। জেনারেল আজিজের কাজ হয়েছে তার খুনী ভাইদের সাহায্য করা। সে যেমন ভোটডাকাত হাসিনা ও সরকারকে সর্বপ্রকার সাহায্য দিচ্ছে, তেমনি সে নিজেও প্রয়োজনীয় সাহায্য নিচ্ছে ভোটডাকাত হাসিনা থেকে। সেই দেয়া এবং নেয়ার ভিত্তিতেও তার তিন ভাইকে অব্যাহতি দেয়ে হয়েছে খুনের শাস্তি থেকে।

জনগণের ভোটের উপর সফল ডাকাতির কারণেই দেশের শাসন-ক্ষমতা ও সম্পদ এখন শেখ হাসিনার কাছে ডাকাতীতে অর্জিত মাল। ডাকাত সর্দার যেমন ডাকাতি করা মালের উপর ডাকাত দলের অন্যান্য সদস্যদের ভাগ দেয়, তেমনি ভাগ দিচ্ছে সেনা বাহিনীর সদস্যদেরও। লন্ডনের প্রখ্যাত সাপ্তাহিকী “দি ইকোনমিস্ট” বিবরণ ছেপেছে কীরূপ বিপুল সুযোগ-সুবিধা দিয়ে শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীর আনুগত্য কিনেছে। প্রতিদানে জনগণের রাজস্বে প্রতিপালিত সেনা বাহিনীও জনগণের প্রতিরক্ষা না দিয়ে পাহারা দিচ্ছ ভোটডাকাতীর সর্দারনী শেখ হাসিনাকে।

২. প্রসার পাচ্ছে হিন্দু চেতনা ও স্তম্ভপূজা

যারা মুর্তিপূজারী তাদের মুর্তিপূজার নেশাটি গোপন থাকে না। সেটি দেখা যায় মুর্তির সামনে ভক্তি ভরে খাড়া হওয়া ও মুর্তির পদতলে ফুল দেয়া দেখে। সে মুর্তি যেমন দেবী বা পুরুষ লিংগের হতে পারে, তেমনি কোন একটি স্তম্ভেরও হতে পারে। বাংলাদেশে বহু লক্ষ স্তম্ভ গড়া হয়েছে সেগুলো বেদীতে ২১ ফেব্রেয়ারীতি নগ্ন পা’য়ে দাঁড়িয়ে ফুল দেয়ার জন্য। হিন্দুরা যা মন্দিরে গিয়ে যা করে -সেটিই করা হচ্ছে স্তম্ভগুলির বেদীমূলে। এভাবেই হিন্দু চেতনায় বেড়ে উঠছে বাংলাদেশের মুসলিম সন্তানেরা।

স্তম্ভপূজার পথ ধরেই বাড়ছে মুজিবের মুর্তি নির্মাণ ও মুর্তি পূজার হিড়িক। এসবই হলো বাঙালী মুসলিমের ইসলাম থেকে দূরে সরার আলামত। আর সে লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে ক্ষমতাসীন বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ। স্তম্ভপূজার এ জোয়ার চোখে আঙ্গুল দিয়ে ধরিয়ে দেয় ইসলামপন্থীদের ব্যর্থতা। দেশে মাদ্রাস ও মসজিদের সংখ্যা বিপুল ভাবে বেড়েছে। বেড়েছে ইসলামী দল ও সে দলগুলোর নেতা-কর্মীদের সংখ্যাও। কিন্তু  তাদের দ্বারা জনগণের চেতনায় ইসলামের মৌল শিক্ষাকে তুলে ধরার কাজটি যথার্থ ভাবে হয়নি।    

৩. বিচার হবে কবে কী চোর-ডাকাতদের?

সভ্য ও অসভ্য দেশের আলামতগুলো খালি চোখে দেখা যায়। চুরি-ডাকাতি হবে, অথচ বিচার হবে না –সেটি কি কোন সভ্য দেশে ভাবা যায়। সভ্য দেশের জনগণ কি কখনো ডাকাতকে ডাকাতীর মাধ্যমে অর্জিত মালের মালিক হতে দেয়? তাদের বিচার হয়, বিচারে ডাকাতকে জেলে যেতে হয়। এবং ডাকাতীর মাধ্যমে অর্জিত মালকে আসল মালিককে ফেরত দেয়া হয়।

বাংলাদেশে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর যে জনগণের ভোটের উপর যেরূপ ডাকাতি হলো -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? অথচ সভ্য দেশে ডাকাতদের বিরুদ্বে যা হয়ে থাকে -তা বাংলাদেশে হয়নি। দেশে পুলিশ ও আদালত থাকতেও ডাকাতকে ধরা হয়নি এবং শাস্তিও হয়নি। এবং জনগণ ফেরত পায়নি তাদের ডাকাতী হয়ে যায় ভোট। প্রশ্ন হলো ডাকাত হাসিনা থেকে জনগণ তাদের ডাকাতি হয়ে যাওয়া দেশ ফেরত পাবে কবে? তাকে জেলেই বা দিবে কবে?

৪. ডবল স্টান্ডার্ড

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয়ান ইউনিয়নসহ বৃহৎ শক্তিবরর্গের দুই মুখো নীতিটি বড়ই নিন্দনীয়। তারা মায়ানমারের সামরিক অভ্যুর্থাণের নিন্দা করছে। কিন্তু মিশরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসীর বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী যখন অভ্যুর্থাণ করলো -সেটিকে নিন্দা না করে তারা সমর্থণ করেছিল। আলজিরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার জন্য সামরিক বাহিনী যখন অভ্যুর্থাণ করলো –সেটিকেও তারা নিন্দা না করে বরং সমর্থণ করেছিল। মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের বড় শত্রু হলো পাশ্চাত্য এ শক্তিবর্গ।

মায়ানমারে যারা সেনা-স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলছে তাদের দ্বি-মুখী নীতিটিও কম নিন্দনীয়? এখন রেঙ্গুনের রাস্তায় বিপুল সংখ্যক প্রতিবাদী মানুষ। কিন্তু সে রাস্তাগুলো তখন জনশূণ্য ছিল যখন সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিমদের ঘরে ঘরে আগুণ দিচ্ছিল, তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছিল এবং রোহিঙ্গা মহিলাদের উপর ধর্ষণে নেমেছিল। কোন বিবেকমান মানুষকে সে নৃশংস বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। এবং অং সাং সূচিও নিজেও সেনা বাহিনীর বর্বরতার নিন্দা না করে হেগের আদালতে তাদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। এবং অস্বীকার করেছেন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার কথা।  

 

৫. শিক্ষা নিক মায়ানমার থেকে

বাংলাদেশীদের উচিত প্রতিবেশী মায়ানমারের জনগণ থেকে শিক্ষা নেয়া। বাংলাদেশের ন্যায় সেখানেও স্বৈরাচার চেপে বসেছে। দেশটির জনগণ স্বৈরাচারি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গত ১৪ দিনের বেশী হলো তারা রাজপথ লাগাতর দখল করে আছে। সরকারি কর্মচারীগণ কাজে যাচ্ছে না। গুলী চলছে –কিন্তু এরপরও জনগণ রাস্তা ছাড়ছে না। ভোটডাকাত স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সে রুচি বাংলাদেশীদের মাঝে কই?

৬. যে গুনাহ না বুঝে কোর’আন তেলাওয়াতের

মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ: “যাদেরকে কিতাব দিয়েছি এবং সেটি তেলাওয়াত করে তেলাওয়াতের হক আদায়ের সাথে এবং তা বিশ্বাস করে -(তাঁরাই সফল)। এবং যারা অবিশ্বাস করলো তাঁরাই ক্ষতিগ্রস্ত।”-(সুরা বাকারা, আয়াত ১২১)। উপরুক্ত আয়াতে নির্দেশটি হলো তেলাওয়াতের হক আদায়ের। তেলাওয়াতের হক তো তখনই আদায় হয় যখন বিষয়টি বুঝার জন্য চেষ্টা হয়। না বুঝে তেলাওয়াতে সেটি হয়না।

সুরা হাদীদে বলা হয়েছে, “ক্বাদ বাইয়ান্না লাকুমুল আয়াতা লা আল্লাকুম তা’ক্বুলুন।” অর্থ: “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য বয়ান করা হয়েছে আয়াতকে -এজন্য যে যাতে তোমরা সেগুলোর বুঝায় আক্বলকে কাজে লাগাতে পার।” অর্থাৎ কোর’আনের আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে সেগুলো বুঝার জন্য, স্রেফ তেলাওয়াতে জন্য নয়। বিষয়টি স্কুলের শিশুরাও বুঝে। ফলে তারা যে বই বুঝে না, সে বই পড়ে না। পড়ার জন্য পড়া নয়, পড়তে হয় জ্ঞানার্জনের জন্য। মহান আল্লাহতায়ালা জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন; না বুঝে তেলাওয়াত নয়। অথচ বাংলাদেশে তেলাওয়াতের কাজ হচ্ছে, কিন্তু বুঝার কাজটি হচ্ছে না।

মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম মেনে চলা ফরজ এবং অমান্য করাটি কবিরা গুনাহ। কোর’আনের আয়াত না বুঝে পড়লে অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের। ফলে এতে সওয়াব নয়, গুনাহ হয়। অথচ না বুঝে কোর’আন পড়ার মধ্য দিয়ে সে গুনাহ হচ্ছে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। আর সওয়াবের নামে এ গুনাহতে উৎসাহ দিচ্ছে বাংলাদেশের আলেম নামধারী ব্যক্তিবর্গ।

 

৭. বিজয়ী শয়তানের মিশন

গলিত আবর্জনা রোগ-জীবাণুর বৃদ্ধি ঘটায়। তেমনি অপরাধীগণ বৃদ্ধি আনে অপরাধে। তাই সমাজকে বাসের উপযোগী করতে হলো যেমন আবর্জনা সরাতে হয়, তেমনি নির্মূল করতে হয় অপরাধীদের। যারা সে কাজ করতে পারে, একমাত্র তাদের দ্বারাই নির্মিত হয় সভ্য সমাজ। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। অথচ প্রতিটি মুসলিমের বাঁচার মিশন হলো, আ’মিরু বিল মা’রুফ (ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা) এবং নেহী আনিল মুনকার (অন্যায়ের নির্মূল)। এ মিশনটি বেঁধে দেয়া হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। তাই মুসলিমকে শুধু নামায-রোযা পালন করলে চলে না, তাকে অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাতেও নামতে হয়। এটি ফরজ। প্রকৃত মুসলিমগণ এ মিশন নিয়ে বাঁচে বলেই মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা দিয়েছেন।

কিন্তু সমাজে শয়তানের মিশনটি এর বিপরীত। সেটি ন্যায়ের নির্মূল এবং অন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। এটিই হলো জাহান্নামে নেয়ার মিশন। শয়তানের মিশন নিয়ে যারা বাঁচে তারা ক্ষমতায় গেলে দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে প্রথম হয়। বাংলাদেশ সে স্থানে অতীতে ৫ বার পৌঁছেছে। এরা নির্বাচন করলে সেটি নির্বাচন না হয়ে ভোটডাকাতি হয়। এরা জোয়ার আনে গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের। রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা দেয় নৃশংস স্বৈরাচার। এদের শাসনে অসম্ভব হয় ন্যায় বিচার। এবং অপরাধ গণ্য হয় সত্য কথা বলা। শয়তানের সে মিশন নিয়ে বাংলাদেশ শাসন করছে শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশে মসজিদ ও মাদ্রাসার সংখ্যা বিপুল ভাবে বেড়েছে। বেড়েছে নামাযী ও রোযাদারের সংখ্যাও। বেড়েছে আলেম, পীর, মসজিদের ইমাম ও ইসলামী দলগুলোর নেতা ও ক্যডারদের সংখ্যাও।  কিন্তু বাড়েনি ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের মিশন নিয়ে বাঁচার মত ঈমানদার ব্যক্তি। ফলে ইসলাম বিজয়ী না হয়ে বিজয়ী হয়েছে শয়তানের মিশন। হাসিনার মত ভোটডাকাতও তাই প্রধানমন্ত্রী হয়। ২৩/০২/২০২১।

                                                                                   

 




ভাষা-আন্দোলন: বাঙালী সেক্যুলরিস্টদের ষড়যন্ত্র ও নাশকতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

লক্ষ্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক 

১৯৫২’এর ভাষা-আন্দোলনের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলার স্বীকৃতি ছিল না। বরং পাকিস্তান এবং যে প্যান-ইসলামী চেতনার ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তার বিনাশ এবং ইসলামী চেতনাবর্জিত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই যে পাকিস্তান খন্ডিত হয়েছে –সে কথাটি এখন বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ, হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি ও কম্যুনিস্টগণ অতি গর্বের সাথেই বলে। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হলেও ইসলামি চেতনা বিনাশের কাজটি এখনো শেষ হয়নি এবং নির্মূল হয়নি ইসলামের পক্ষের শক্তি। তাই শেষ হয়নি ভাষা আন্দোলনের নামে বাঙালীর চেতনা জগতে সেক্যুলার ধারার সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক বিপ্লবের কাজ। তাই এ আন্দোলনের একটি প্রবল আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক এজেন্ডাও আছে। এ আন্দলোনের লক্ষ্য ছিল বাঙালী মুসলিমের সাংস্কৃতিক কনভার্শন। তেমন একটি আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক এজেন্ডাকে সামনে রেখেই বাংলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা রূপে স্বীকৃতি পেলেও পাকিস্তান আমলেই বেগবান করা হয়েছে বাঙালী মুসলিম সন্তানদের মাঝে স্তম্ভপূজা। হিন্দুগণ মন্দিরে গিয়ে যা করে -সেটিই করা হয় ২১ ফেব্রেয়ারীতে স্তম্ভের পাদদেশে ফুল ও ভক্তি দিয়ে। ভাষা আন্দোলনের নাশকতা তাই শুধু পাকিস্তান ধ্বংসে শেষ হয়নি। এটিকে পরিকল্পিত ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে ইসলামী চেতনার বিনাশের কাজে।

ভাষা আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের দাবী, ভাষা আন্দোলন না হলে বাঙালী জাতীয়তাবাদ কখনই এতটা প্রচণ্ডতা পেত না এবং স্বাধীন বাংলাদেশও সৃষ্টি হতো না। ১৯৪৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের একতা, কল্যাণচিন্তা, ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিরূপে মুসলিমদের আবার উত্থান -এরূপ নানা স্বপ্ন মাথায় নিয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। ভাষা-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সে স্বপ্নেরই মৃত্যু হয়েছে। তাই ইসলাম বিরোধী শক্তির এটি এক বিশাল বিজয়। বিজয় বেড়েছে ভারতের। বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, আইন-আদালত ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে ইসলামপন্থীগণ যেরূপ এক পরাজিত শক্তি এবং বিজয়ী রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তি -তার মূল কারণ তো এ ভাষা-আন্দোলন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন। উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতিতে বহু ঘটনা ঘটেছে, তবে যে ঘটনাটি ভারতের আধিপত্যবাদী হিন্দুদের প্রচুর আনন্দ জুগিয়েছে এবং সে সাথে তাদেরকে প্রচন্ড লাভবানও করেছে -তা হলো এই ভাষা আন্দোলন। এদের অনেকে ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়েও খুশি হয়েছিল। সিরাজদ্দৌলার পরাজয়কে ইংরেজদের সাথে হিন্দুগণও উৎসবযোগ্যরূপে গণ্য করেছে। কারণ, তাতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার উপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। সিরাজুদ্দৌলার চরিত্রে কালীমা লেপন করে বহু হিন্দু কবি-সাহিত্যিক বহু কবিতা, বহু উপন্যাস ও বহু নাটক লিখেছেন। অথচ সে তূলনায় মীর জাফর ও ক্লাইভের কুৎসিত রূপটি তুলে ধরা হয়েছে সামান্যই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাপদাদাগণই যে শুধু ইংরেজদের প্রশংসায় গদগদ ছিলেন তা নয়, রবীন্দ্রনাথ নিজেও ইংরেজ রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত আগমন উপলক্ষ্যে তাকে ভারতের ভাগ্যবিধাতা রূপে কবিতা লিখে প্রশংসা গেয়েছেন। “জয়ো হে, জয়ো হে, ভারত ভ্যাগ্যবিধাতা” – এ স্তুতি গেয়ে জয়োধ্বণিও দিয়েছেন। তিনি ইংরেজদর থেকে নাইট উপাধীও পেয়েছিলেন।

তবে মুসলিমগণ ১৭৫৭ সালের সে পরাজিত দুরাবস্থা থেকে গাঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারই ফল দাঁড়িয়েছিল, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে যখন থেকে ভারতে নির্বাচন দেওয়া শুরু হয়, তখন থেকে বাংলার শাসন ক্ষমতায় কোন হিন্দুকে বসতে দেইনি। অবিভিক্ত বাংলায় তিন জন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের তিন জনই ছিলেন মুসলিম। অথচ তখন মুসলিমদের সংখ্যা হিন্দুদের তুলনায় খুব একটি বেশী ছিল না। জনসংখ্যার ৫৫% হলেও অর্থনীতি, শিক্ষা, চাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মুসলিমদের পশ্চাৎপদতা হিন্দুদের তুলনায় ছিল বিশাল। তারপরও শতকরা ৭৫ ভাগ হিন্দু অধ্যুষিত কলকাতায় বসে ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল অবধি এ ১১ বছর মুসলিম প্রধানমন্ত্রী শাসন করেছে। অবশেষে ১৯৪৭ সালে হিন্দু ও ইংরেজ উভয়ের প্রবল বিরোধীতা সত্ত্বেও লড়াই করে তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল। মুসলিমদের জন্য এ ছিল বিশাল বিজয়। কিন্তু উত্থানমুখী মুসলিমদের কোমর ভেঙ্গে দেয় ভাষা আন্দোলন। মুসলিমদের মধ্যে ভাষা ও অঞ্চল-ভিত্তিক বিভক্তি, ভাতৃঘাতি লড়াই, পাকিস্তানের ধ্বংস এবং ইসলামী চেতনা বিনাশের বীজ বপন করা হয়েছিল এ আন্দোলনে। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই প্রতিষ্ঠা পায় বাংলাদেশ। ফলে যে চেতনার ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ঘটেচে তার মৃত্যু ঘটে পূর্ব পাকিস্তানে। এ জন্যই আজ মহা আনন্দ ভারতীয় আগ্রাসনবাদীদের। কারণ, ১৯৭১’য়ে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তানই শুধু বিভক্ত হয়নি,  বাংলাদেশও পাকাপোক্তভাবে ধরা দিয়েছে ভারতের ফাঁদে। এখন আর বেরুনোর পথ নেই। ভারত এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পেরেছে।

 

উৎসব শত্রু শিবিরে

নিজেদের ক্ষতিটা অনেকেই বুঝতে পারে না। তবে সে ক্ষতিটি সহজে বুঝা যায় শত্রু শিবিরে উৎসব দেখে। তাছাড়া মুসলিমদের কোন কল্যাণ হলো এবং তাতে হিন্দুগণ খুশি হবে তা কি কখনো ভাবা যায়?  আধিপত্যবাদী বর্ণহিন্দুদের কুটিল ও হিংসাত্মক চরিত্রের সাথে যাদের পরিচয়টি গভীর -তাদের অভিজ্ঞতাটি আদৌও সুখের নয়। মুসলিমদেরকে তারা ভৃত্য রূপে গ্রহণ করতে রাজী, বন্ধু হিসাবে নয়। তাদের গৃহে কোন মুসলিম দৈবাৎ প্রবেশ করলে, গোবর দিয়ে না লেপলে তা পবিত্র হয়না। সেটি বুঝা যায় ভারত সরকারের নীতিতে। মুসলিমদের তারা হিন্দুদের সমান নাগরিক অধিকার দিতেও রাজী নয়। লক্ষ লক্ষ মুসলিমদের তারা বাংলাদেশী বলে তাদের বহিস্কারের ফন্দি আঁটছে। ভারতে শতকার ১৫ ভাগ মুসলিম হলে কি হবে, সরকারি চাকুরীতে শতকরা ৫ ভাগও নাই। হিন্দু সংস্কৃতি যা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা হলো, দাঙ্গা বাধিয়ে তাদের হত্যা, ধর্ষণ ও তাদের গৃহে লুটতরাজ। হিন্দুত্ববাদীদের মিছিল-মিটিং যে স্লোগানটি অহরহ ধ্বনিত হয় তা হলো, মুসলিমদের জন্য দুটি ঠিকানা: হয় পাকিস্তকান, না হয় কবরস্থান।

কায়েদে আজম মহম্মদ তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করেন হিন্দু ও মুসলিমের মিলনের দূত রূপে। সে লক্ষ্য নিয়ে যোগ দেন কংগ্রসে।  প্রখ্যাত রাজনীতিবদি সরোজীনী নাইডু তাঁকে হিন্দু-মুসলিম মিলনের দূত বলে অভিহিত করতেন। কিন্তু অচিরেই তাঁর সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। ভগ্ন হৃদয় নিয়ে হিন্দুদের সম্পর্কে বলতেন, তারা “incorrigible” তথা সংশোধনের অযোগ্য। হিন্দুদের নিয়ে কাজ করেছেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী জনাব শেরেবাংলা ফজলুল হক। হিন্দু মহাসভা নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীকে তিনি তার মন্ত্রী সভায় নেন। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতাও প্রীতিকর ছিলনা। তিনি বলতেন, “কলকাতার হিন্দু পত্রিকাগুলো যখন আমার কোন কর্ম বা সিদ্ধান্তের পক্ষে লেখা শুরু করে, তখনই বুঝতে হবে সেটির দ্বারা মুসলিমদের জন্য বড় রকমের ক্ষতি আশংকা রয়েছে।” ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের ভেঙ্গে যাওয়া নিয়ে কোলকাতার পত্রিকাগুলো শুধু পক্ষেই লেখেনি, এখনো বছর ঘুরে প্রতি বছর ২১ ফেব্রেয়ারী এবং ১৬ ডিসেম্বর এলে কলকাতা ও দিল্লীতে উৎসব শুরু হয়। তাই মুসলিমদের ক্ষতির মাত্রা বোঝার জন্য কি কোন গবেষণার প্রয়োজন আছে? সেটি বুঝা যায় তাদের উল্লাসের মাত্রা দেখে। পরিতাপের বিষয় হলো, বাঙালী মুসলিমগণ তাদের নিজেদের কল্যাণের চেয়ে হিন্দুদের বিজয় বৃদ্ধিকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছে। এবং সেটি বাঙালী সেক্যুলারিস্ট জাতীয়তাবাদীদের নেতৃত্বে। বাংলাদেশীদের কল্যাণ নিয়ে তাদের আগ্রহ নিলে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর ভারতীয় সেনা বাহিনীকে লুটাপাটে নামতো?  উপহার দিত কি দুর্ভিক্ষ? সমস্যা হলো, গোলামেরা কখনোই মনিবের দোষগুলো দেখে না, তাদের মনযোগ স্রেফ গোলামী নিয়ে। বাংলাদেশের মাটিতে তার নমুনা হলো বাঙালী সেক্যুলারিস্ট জাতীয়তাবাদীগণ।   

 

ভাষা আন্দোলনে মিথ্যাচার

বাংলাদেশের ইতিহাসে অতি মিথ্যাচার হয়েছে বাংলা ভাষা ও ভাষা-আন্দোলনকে ঘিরে। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি হলো, বাঙালীর মুখের ভাষা নাকি পাকিস্তান সরকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। এ প্রসঙ্গে যে সত্যটিকে তারা বুঝতে রাজী নয় তা হলো, দেশের অনেক গুলো ভাষার মধ্য থেকে একটিকে রাষ্ট্র বানানোর অর্থ অন্য ভাষাগুলোকে কবরে পাঠানো নয়। বাংলা ছাড়াও পাকিস্তানে পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পশতু, বেলুচ ভাষা রয়েছে। উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা বানানোর অন্য সব ভাষার কোনটিরই মৃত্যু হয়নি। বরং সেগুলোও সমৃদ্ধ হয়েছে। সে সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ঢাকার সন্তান খাজা নাযিম উদ্দীন। তখন পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন আরেক বাংলাভাষী জনাব নুরুল আমীন। পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৫৪ সালে। বাংলা ভাষার উন্নয়নে বাংলা এ্যাকাডেমী ও বাংলা-উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশী ভাষার বিপুল সংখ্যক বইয়ের বাংলায় তরজমার কাজ তখনই শুরু করা হয়। বলা যায়, বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার কাজে সরকারি ভাবে পাকিস্তানের ২৩ বছরে যে কাজ করা হয় তা অতীতে হাজার বছরেও হয়নি। বাংলা ভাষার উন্নয়নে ভারতের পশ্চিম বাংলাতেও এত সরকারি বিনিয়োগ হয়নি।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে আরেক মিথ্যাচার হলো, দুনিয়ার আর কোথাও নাকি ভাষার নামে এতো রক্তদান হয়নি যা হয়েছে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রেয়ারীতে। অথচ হিন্দি ভাষাকে যখন দক্ষিণ ভারতের তামিলদের উপর চাপিয়ে দেয়া চেষ্টা হয়, বহু গুণ বেশী মানুষ প্রাণ দেয় সে চেষ্টা রুখতে। একই ঘটনা ঘটে আসামের কাছাড় ও করিম গঞ্জে। বহু মানুষ সেখানেও প্রাণ দেয় যখন বাংলা ভাষার উপর অসমিয় ভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়।

 

সংস্কৃতি স্তম্ভপূজার   

বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিলেও ২১শে ফেব্রুয়ারি উদযাপন বেগবান করা হয়েছে দুটি কারণে। একটি রাজনৈতিক, অপরটি আদর্শিক। রাজনৈতিক প্রয়োজনটি ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘৃনা সৃষ্টির কাজে এ আন্দোলনকে ব্যবহার করা। আদর্শিক প্রয়োজনটি হলো, বাংলার মুসলমানদের মন ও মনন থেকে ইসলামি চেতনার বিনাশ এবং সে সাথে সেকুলারিজম আবাদে সেটিকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বটে, কিন্তু সেকুলারাইজেশনের কাজ শেষ হয়নি। ফলে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে অনুষ্ঠানের প্রয়োজনও শেষ হয়নি। থেমে যায়নি প্রভাতফেরীর নামে হাজার হাজার নারীপুরুষকে একত্রে রাতের আঁধারে রাস্তায় নামানোর আয়োজন। বরং ইসলামী চেতনার দ্রুত বিকাশ এবং ইসলামী রাষ্ট্র বিপ্লবের আন্দোলন দেশে দেশে প্রবলতর হওয়ায় গুরুত্ব বেড়ে গেছে একুশে ফেব্রুয়ারির। এবং সেটি বুঝা যায় একুশে ফেব্রুয়ারি উৎযাপনের বর্তমান মাত্রা দেখে। একুশের বই মেলা পরিণত হয়েছে সেকুলার চেতনা-ভিত্তিক সাহিত্যের প্লাবন সৃষ্টির কাজে। পাকিস্তান আমলে ২১’শে ফেব্রুয়ারি পালিত হতো বছরের মাত্র একটি দিনে, এবং সেটিও মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য। এখন শুরু হয়েছে সারা দেশব্যাপী স্তম্ভপূজা। সে আমলে সেকুলার এবং বামপন্থি ছাত্র-ছাত্রীরাই শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারিতে নগ্নপদে স্মৃতীস্তম্ভে গিয়ে ফুল চড়াতো। এসব ছাত্র-ছাত্রীরা ছিল মূলতঃ আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ও সমর্থক। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা এ থেকে সচেতনতার সাথে দূরে থাকতো। যাদের মধ্যে ইসলামের সামান্য জ্ঞান ছিল এবং ইসলামের অনুশাসন পালনে সামান্য অঙ্গিকার ছিল, স্তম্ভের সামনে দাড়িয়ে তারা এমন সম্মান প্রদর্শনকে নির্ভেজাল শিরক মনে করতো।

শহীদ শব্দের অপব্যবহার ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন

আদর্শের জন্য প্রাণদান ইসলামে নতুন কিছু নয়, নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের অর্ধেকের বেশী শহীদ হয়েছেন। “শহীদ” শব্দটিও এসেছে ইসলাম থেকে। শহীদদের রক্তের বরকতেই আল্লাহর রহমত প্রাপ্তি ঘটেছিল এবং নির্মিত হয়েছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে যা কিছু গর্বের তার বেশীর ভাগের নির্মাতা তারাই। বিশ্বের সকল মুসলিমদের কাছে তাই তারা সর্বকালের পরম সম্মানের পাত্র। কিন্তু ইসলামে সম্মান প্রদর্শনেরও নিজস্ব রীতি আছে। সেটি স্তম্ভ গড়ে নয়। স্তম্ভের গোড়ায় ফুল দিয়ে স্তম্ভপূজাও নয়। রাতে বা প্রভাতে নারী-পুরুষকে রাস্তায় নামিয়েও নয়। শহিদদের স্মৃতিতে স্তম্ভ গড়া সিদ্ধ রীতি হলে শুধু মক্কা-মদীনাতে নয়, মুসলিম বিশ্বের অসংখ্য শহরে হাজার হাজার স্তম্ভ গড়া হতো। সেসব স্তম্ভে বছরের একটি দিনে শুধু নয়, প্রতিদিন ফুল দেওয়া হতো। কিন্তু সেটি হয়নি। কারণ সেটি মুসলিম সংস্কৃতি নয়। ইসলামসিদ্ধও নয়। অথচ বাংলাদেশের নগরে বন্দরের প্রতিটি স্কুল-কলেজে বহু লক্ষ স্তম্ভ গড়ে সেটিকে আজ বাঙালীর সংস্কৃতি রূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এভাবে মুসলিম জীবনে শুরু হয় চরম সাংস্কৃতিক পথভ্রষ্টতা। তাই বাঙালী মুসলিম জীবনে শতভাগ হারাম রীতি চালু করা হয় ভাষা আন্দোলনের নামে। এভাবে খুলে দেয়া হয় জাহান্নামে পথ।

এ সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতা এসেছে আদর্শিক ভ্রষ্টতা থেকে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে দেহব্যবসার মত ব্যাভিচার যেমন আইনগত বৈধতা পেয়েছে, তেমনি বৈধতা পেয়েছে আরেক হারাম কর্ম স্তম্ভপূজা। এমন সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতার পিছনে ভ্রষ্ট দর্শনটি হলো সেকুলারিজম –যার মূলকথা পরকালের ভাবনা বিলুপ্ত করে মানুষকে দুনিয়ামুখি করা। মানুষের ঢল মসজিদমুখি না করে স্তম্ভমুখি করা। বাঙালী মুসলমানদের জীবনে এভাবেই নেমে এসেছে এক ব্যাপক সাংস্কৃতিক কনভার্শন। সংস্কৃতির পথ ধরে এভাবেই চরম দুষণ ঘটেছে বাঙালী মুসলিমদের চেতনালোকে। ইসলামের শত্রুদের আজকের স্ট্রাটেজী মুসলিমদেরকে হিন্দু বানানো নয়। বরং সংস্কৃতির লেবাসে এমন সব বিশ্বাস ও রীতিনীতিতে অভ্যস্থ করা -যা ইসলামের মূল শিক্ষা থেকেই দূরে সরিয়ে নেয়। এভাবেই মুসলিমদের সরানো হচ্ছে ইসলাম থেকে। ফলে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিমের দেশে অনিবার্য পরিণতি হলো ইসলামের লাগাতর পরাজয়। এবং সেটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক অঙ্গণে।

সেক্যুলারিজমের প্রচার ও প্রভাব বাংলাদেশ সৃষ্টির পর এতটাই গভীরতর হয়েছে যে, বহু ইসলামপন্থী নেতাকর্মীও সে স্রোতে ভেসে গেছে। ফলে এখন আর শুধু আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কম্যিউনিষ্ট পার্টির নেতা-কর্মীগণই নগ্ন পদে ফুলের মালা নিয়ে স্তম্ভপূজায় হাজির হচ্ছে না, হাজির হচ্ছে তথাকথিত ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতাকর্মীও। রাজনৈতিক বিজয়ের পাশে বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের জন্য এটি হলো এক আদর্শিক বিজয়। হযরত ঈসা (আ:) ও হযরত মূসা (আ:)’র  অনুসারিদের সমস্যা এ নয় যে, তারা মু্র্তিপূজায় ফিরে গেছে। বরং তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক অঙ্গণে। এবং সে পথভ্রষ্টতার কারণেই তারা বিদ্রোহী হয়েছে আল্লাহর ফরমানের বিরুদ্ধে। ফলে সমগ্র খৃষ্টান ও ইহুদী জগতে আল্লাহর বিধান আজ পরাজিত। পুরাতন টেস্টামেন্ট বা তাওরাতের বিধানগুলো তাই শুধু কেতাবেই রয়ে গেছে। একই ভাবে গভীর ভ্রষ্টতা নেমে এসেছে বাঙালী মুসলিম জীবনে। 

ইন্সটিটিউশন পূজাপালনের

জনগণের মাঝে আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতা সার্বজনীন করার স্বার্থেও ইন্সটিটিউশন চাই। মুর্তিপুজার ন্যায় সনাতন পথভ্রষ্টতা ও মিথ্যাচার বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে মুর্তিগড়া ও এসব মুর্তির পদতলে ফুল দেওয়া হলো হিন্দুদের ধর্মীয় ইন্সটিটিউশন। সে আচার বাঁচিয়ে রাখতে বাংলার হিন্দু সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বারো মাসে তের পার্বন। গড়া হয়েছে লক্ষাধিকর মন্দির ও পূজামন্ডপ। একই আদলে বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টগণও ভাষা আন্দোলনের নামে বাংলাদেশের নগর-বন্দরেই শুধু নয়, গ্রাম-গঞ্জেও স্মৃতিস্তম্ভের নামে বিপুল সংখ্যায় ইন্সটিটিউশন গড়ে তুলেছে। চালু করেছে স্তম্ভপূজা। বস্তুত বাংলার সেকুলারিষ্টদের এটিই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন। একুশের নামে প্রতিবছর যে অনুষ্ঠান হয় সেগুলীর মূল লক্ষ্য ভাষায় সমৃদ্ধি আনা নয়, বরং তা হলো, সেক্যুলার ধারণাকে আরো প্রবলতর করা এবং সে সাথে দীর্ঘজীবী করা। এমনকি ২১ ফেব্রেয়ারীর বদলে ৮ ফাল্গুনও চালু করতে পারিনি। ভাষায় সমৃদ্ধি আনা লক্ষ্য হলে, সে জন্য কি নগ্নপদে মিছিল করা ও স্তম্ভের বেদীমূলে নত শিরে ফুলদানের প্রয়োজন পড়ে? রাষ্ট্রভাষা রূপেও কি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন পড়ে? উর্দু ভাষা ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্র ভাষা ছিল না। কিন্তু সে ভাষার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে সে আমলে। উর্দু ভাষায় পবিত্র কোরআনের বহু অনুবাদ ও বহু তফসির লেখা হয়েছে। বহু তরজমা ও বহু ব্যাখা লেখা হয়েছে হাদীস গ্রন্থগুলিরও। অসংখ্য গ্রন্থ্ লেখা হয়েছে ফিকাহ শাস্ত্র, নবী-জীবনী, সাহাবা-জীবনী, দর্শন ও ইতিহাসের উপর। সমৃদ্ধি এসেছে উর্দু প্রবন্ধ, কবিতা ও গজলে। কিন্তু বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম রাষ্ট্রে রাষ্ট্র-ভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরও বাংলা ভাষায় উন্নয়ন কতটুকু হয়েছে? বাংলা ভাষার যা কিছু উন্নয়ন হয়েছে তা হয়েছে বাঙালী হিন্দুদের দ্বারা। এবং সে উন্নয়ন হয়েছে তখন যখন বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষা ছিল না।

বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের নামে যা কিছু হয়েছে তা মূলত হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। এমন একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এখনও অপূর্ণ থাকায় একুশে ফেব্রুয়ারী পালনে সেকুলারিষ্টদের উদ্যোগে কমতি আসছে না, বরং দিন দিন সেটিকে আরো তীব্রতর করা হচ্ছে। অথচ মনযোগ নাই বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করায়। বাংলাদেশের মানুষের চেতনার উন্নয়ন, নৈতিকতার উন্নয়ন ও বাংলা ভাষার উন্নয়ন নিয়ে পশ্চিম বাংলার একজন হিন্দুর অভিমতটি শোনা যাক। পশ্চিম বঙ্গের দেবেন্দ্র ভট্টাচার্য নামক একজন শিক্ষক ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। দেশে ফিরে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের বাঙালীদের নিয়ে যা লিখেছিলেন তা থেকে কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। লিখেছিলেন, “…আপনাদের আর্ট-কালচার দেখেও আমি হতাশ হয়েছে। ২২ বছরে আপনারা এমন একটি বই প্রকাশ করতে পারেননি যা নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে উপভোগ করা যায়।… আমি হুমায়ুন আহমদের কয়েকটি বই পড়বার চেষ্টা করেছিলাম। রচনার মান অতি নিম্নমানের। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের জীবনের কোন সামগ্রিক চিত্র এর মধ্যে পেলাম না। শুনেছি, তিনি নাকি এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। তার কয়েকটা ছোট গল্প এবং একটা উপন্যাস পাঠ করার পর আমার ধারণা জন্মেছে, পাঠকের পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দেয়ার ক্ষমতা তার আছে। এর অধিক কিছু নেই। এরকম একজন লোক জনপ্রিয় হতে পেরেছেন এ দ্বারা এটাই প্রমানিত হয় যে, এদেশের শিক্ষার মান কত নীচু।” -(সরকার শাহাবুদ্দীন আহম্মদ, আত্মঘাতী রাজনীতির তিন কাল, বুকস ফেয়ার; ২০০৪)।

ভাষার দায়িত্ব

মনের ভাব প্রকাশ করার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর মাধ্যম নেই। কিন্তু শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান মানুষ রূপে বেড়ে উঠার স্বার্থে মনের ভাব প্রকাশ করাটাই একমাত্র কাজ নয়। অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জ্ঞানলাভ করাটাও। নইলে মনের ভাবেরও সভ্যতর প্রকাশ ঘটে না। তাই মাতৃ ভাষাকে শিক্ষার ভাষা, জ্ঞানের ভাষা এবং সংস্কৃতির ভাষাও হতে হয়। এ বিচারে মুসলিমদের ক্ষেত্রে ভাষার দায়িত্বটা আরো বেড়ে যায়। ভাষাকে তখন সিরাতুল মোস্তাকিম তথা জান্নাতের পথ দেখানোর দায়িত্বটা পালন করতে হয়। বান্দাহর উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর মহান রাসূল (সাঃ)’র কথাগুলোও তাই ভাষাকে শেখাতে হয়। একটি ভাষার এটিই হলো সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা -যেমন খাদ্যের সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা হলো পুষ্টি জোগানো। তাই খাদ্যে নিছক মুখরোচক স্বাদ থাকলেই চলে না। নিজ দেশে বা নিজ ঘরে খাদ্য না থাকলে এজন্যই বাঁচার তাগিদে খাদ্যের সন্ধানে নামতে হয়। নইলে অনিবার্য হয় মৃত্যূ। তেমনি চেতনার মৃত্যূ ও ঈমানের মৃত্যু ঠেকাতে মুসলিমকে এমন ভাষা শিখতে হয় যে ভাষায় ঈমানের খাদ্য মেলে। এমন এক দায়বদ্ধতার কারণেই লক্ষ লক্ষ বাংলাভাষী আজও আরবী শেখে। অনেকে উর্দুও শেখে। এভাবে অন্যভাষা শিক্ষার মধ্যে বাংলাভাষার বিরুদ্ধে শত্রুতা কোথায়? ষড়যন্ত্রই বা কোথায়? ইসলামের জ্ঞান না থাকলে মুসলিমানের পক্ষে তখন মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাই অসম্ভব। ইসলামে জ্ঞানার্জন ফরয তো মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার তাগিদেই। মাতৃভাষা ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ না হলে তখন অন্য ভাষার সাহায্য নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বাংলার মুসলিমদের একারণেই শত শত বছর ধরে প্রথমে আরবী ও ফার্সী এবং পরে উর্দু ভাষার দরবারে ছুটতে হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের বেশীর ভাগই হিন্দুদের রচিত। হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের পার্থক্য শুধু খাদ্য-পানীয়তেই নয়। দেহের খাদ্যের ন্যায় বিশাল পার্থক্য রয়েছে উভয়ের মনের খাদ্যতেও। মুসলিম নিছক সাহিত্যরস উপভোগের স্বার্থে সাহিত্য পাঠ করেনা। তাকে সে পাঠের মাধ্যমে ঈমানকেও বাঁচাতে হয়। ফলে বাঙালী হিন্দুদের রচিত বাংলা সাহিত্যে মুসলিমদের জ্ঞানগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজন পুরণ হওয়ার ছিল না। বরং তাতে ভয়ানক ক্ষতিসাধনের ভয় ছিল। কারণ হিন্দুগণ বই লিখেছেন তাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজনে। মুসলিমদের প্রয়োজন তারা পুরণ করবে সেটি কি আশা করা যায়? বিষয়টি এমন কি কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরে পড়ে। তিনি তার এক বন্ধুকে লেখা পত্রে লিখেছিলেন, “আজকের বাঙালা ভাষা যদি বাঙালী মুসলমানদের ভাব সুস্পষ্টভাবে ও সহজ ভাবে প্রকাশ করতে অক্ষম হয়, তবে তারা বাঙালা পরিত্যাগ করে উর্দু গ্রহণ করতে পারেন।” –(প্রবাসী, ১৩৪১: বৈশাখী সংখ্যা)।   

বিশ্বে ভাষার সংখ্যা বহু হাজার। কিন্তু সব ভাষার কি প্রয়োজনীয় সামর্থ্য আছে? বাংলা, পাঞ্জাবী, গুজরাতি, সিন্ধি, কাশ্মিরী, পশতু, অসমীয়, তেলেগুসহ অনেক ভাষা রয়েছে দক্ষিণ এশিয়াতেও। কিন্তু এসব ভাষায় ইসলামী জ্ঞানের বিশাল ভূবন দূরে থাক, মাত্র শত বা দেড় শত বছর আগে কোরআন ও হাদীসের কোন অনুবাদও ছিল না। সমস্যা হলো কোন ভাষায় সেটি রাতারাতি গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। এ কাজে শত শত বছর লাগে। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমগণ পূর্বে সে অভাব পুরণ করতো ফার্সী ও আরবী ভাষা শিখে। ইংরেজরা ফার্সীকে বিলুপ্ত করে দেয়। তখন উপমহাদেশের মুসলমানগণ মনযোগী হয় সম্মিলিত ভাবে উর্দু ভাষা চর্চা ও সেটিকে সমৃদ্ধ করার কাজে। তাই উর্দু ভাষার আজ যে সমৃদ্ধি তার পিছনে ভারতে বিশেষ কোন একটি প্রদেশের বা এলাকার মুসলিমদের অবদান বললে ভূল হবে। এতে অবদান রয়েছে উত্তর ভারতের মুসলিমদের সাথে দক্ষিণ ভারতের মুসলিমদেরও। অবদান রয়েছে পশ্চিম ভারতের মুসলিমদের সাথে পূর্ব ভারতের মুসলিমদেরও। এদিক দিয়ে মুসলিমগণ হিন্দুদের চেয়েও অগ্রসর ছিল। হিন্দুদের তখনও সর্বভারতীয় কোন ভাষা দূরে থাক, বর্ণমালাই ছিল না। হিন্দিতে দেবনাগরীর প্রচলন আসে অনেক পরে। তাদেরকে শব্দভান্ডার গড়ে তুলতে সাহায্য নিতে হয় সংস্কৃত ভাষার ন্যায় একটি মৃত ভাষা থেকে। অথচ মুসলিমগণ উর্দুকে সমৃদ্ধ করে আরবী ও ফার্সীর ন্যায় দুটি জীবন্ত ভাষা থেকে। ফলে উর্দু পরিণত হয় একটি প্রাণবন্ত ভাষায়। পরিণত হয় একটি প্যান-ইসলামিক ও প্যান-ভারতীয় ভাষা।

 উর্দুর সামর্থ্য ও বাংলা ভাষার দৈন্যতা

ভারতীয় উপমহাদেশের বুকে উর্দুই ছিল একমাত্র ভাষা যা বাংলা, আসাম, বিহার, উড়িষ্যা, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, হায়দারাবাদ, পাঞ্জাব, সিন্ধু, কাশ্মির, গুজরাট, মাদ্রাজসহ সর্বভারতের শিক্ষিত মুসলিমদের প্রায় সবাই বুঝতো। কিন্তু সে মর্যাদা বাংলা ভাষার ছিল না। সিন্ধি, পাঞ্জাবী, গুজরাতী বা পশতু ভাষারও ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষার করার দাবী উঠে বস্তুত সে প্রেক্ষাপটেই। তাই এটিকে বাংলার বিরুদ্ধে কি ষড়যন্ত্র বলা যায়? অথচ বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের পক্ষ থেকে সে মিথ্যাটিই লাগাতর বলা হয়ে থাকে। বাংলার পক্ষে পূর্ব পাকিস্তান থেকে যে দাবী উঠে সেটি নিছক পাকিস্তানে বাঙালীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে। কিন্তু পূর্ব বাংলার পাশাপাশি পাকিস্তানে যে আরো ৪টি প্রদেশ আছে সে বিষয়টিকে ভাষা আন্দোলনের নেতারা বিবেচনায় আনেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই তারা দাবী তুলেছে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হলেও বাংলা ছিল নিছক একটি প্রাদেশিক ভাষা, বাংলার বাইরে তার কোন গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। এমন একটি ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করলে কি পাকিস্তান লাভবান হতো? অথচ উর্দু পাকিস্তানের কোন একটি প্রদেশের ভাষা না হলেও সব প্রদেশের শিক্ষিত মানুষেরা সে ভাষাকে বুঝতো। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ হাছিলের লক্ষ্যে ভাষা আন্দোলনের নেতারা সে সত্যটা সেদিন বুঝতে রাজী হয়নি।

পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি ছিলেন গুজরাটি। উর্দু তাঁর মাতৃভাষা ছিল না। কিন্তু তাঁর নিরপেক্ষ বিচারে উর্দুর কোন বিকল্প ছিল না, কারণ উর্দুই ছিল সমগ্র পাকিস্তানের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষা। পাকিস্তানী নেতারা তখন পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতির স্বার্থে একটি মাত্র ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতি ছিলেন। একাধিক ভাষা রাষ্ট্রভাষা হলে তাতে সংহতি না বেড়ে বিভক্তি বাড়বে, সে আশংকা তাদের ছিল। সে বিষয়টি ভাষা আন্দোলনের নেতাগণও বুঝতেন। তাই পাকিস্তান ভাঙ্গা যাদের লক্ষ্য ছিল, ভাষা আন্দোলনের পিছনে তারা একতাবদ্ধ হয় এবং সেটিকে তারা রাজনীতির মূল হাতিয়ারে পরিণত করে। পাকিস্তানের তৎকালীন নেতারা যার আশংকা করেছিলেন ১৯৭১’য়ে সেটিই সত্য প্রমাণতি হয়েছে। সে সময়ের পাকিস্তানী নেতাদের ভূল-ত্রুটি যাই থাক, সে সত্যকে বুঝতে তারা ভূল করেননি।

কুপের ব্যাঙ সমুদ্রে ছেড়ে দিলে সে গর্তের তালাশ করে। বৃহৎ সমুদ্রে বাসে তার রুচি থাকে না। তেমনি বাঙালী জাতীয়তাবাদী নেতারাও নিজেদের বন্দী করে ভারত ঘেরা ক্ষুদ্র বাংলাদেশের চার দেওয়ালের মাঝে। তাই বাংলাদেশের ক্ষুদ্র মানচিত্রে ফিরে আসার সংগ্রামের শুরু একাত্তরে নয়, ১৯৪৭ থেকেই। সে সত্যটিই প্রকাশ পায় যখন শেখ মুজিব পাকিস্তানের জেল থেকে দেশে ফিরে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী সোহরোয়ার্দী উদ্দ্যানের জনসভায় বল্লেন, “স্বাধীনতার সংগ্রামের শুরু একাত্তর থেকে নয়, সাতচল্লিশ থেকেই।” বাঙালীরা নিজেদের দেশও কখনোই নিজেরা শাসন করেনি। পাল বা সেন রাজাও বাঙালী ছিল না। ফলে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের দায়িত্বভার হাতে নেওয়ার যে গণতান্ত্রিক সুযোগটি এসেছিল সে দায়ভার নেয়ার আগেই জোয়ালই ঢেলে দেয়। দেশের সংখ্যগরিষ্ঠ জনগণ কোন সংখ্যালঘিষ্টদের থেকে কখনো পৃথক হয়না। মুসলিমগণ ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে কখনোই ভারত থেকে পৃথক হয়ে পাকিস্তান বানাতো না। পাকিস্তান থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর পৃথক হওয়ার বিষয়টি সমগ্র মানব ইতিহাসে তাই এক বিরল দৃষ্টান্ত। 

 

ভাষা পূজা বনাম ঈমান বাঁচানোর তাগিদ

ইমানদারকে শুধু দেহ বাঁচালে চলে না, ঈমানও বাঁচাতে হয়। নইলে জাহান্নামে যেতে হয়। ঈমান বাঁচাতে যে ভাষায় কোর’আনের জ্ঞান পাওয়া যায় মুসলিমকে সে ভাষা থেকেই জ্ঞানাহরন করতে হয়। এটি ফরজ। ভাষা পূজায় সে কাজ উপেক্ষিত হলে ঈমানের মৃত্যু ঘটে। মিশর, সূদান, আলজেরিয়া, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো, ইরাক, সিরিয়া, লেবাননের ন্যায় বহু দেশের মানুষ সে ফরজ পালনের তাগিদে নিজেদের মাতৃভাষাকে দাফন করে আরবী ভাষাকে নিজেদের ভাষা এবং সে সাথে রাষ্ট্রের ভাষা রূপে গ্রহন করেছিল। কারণ তারা বুঝেছিল, মাতৃভাষা পূজায় জ্ঞানার্জনের ফরয পালন হবে না। তাতে আত্মা পুষ্টি পাবে না, ঈমানও বাঁচবে না। একমাত্র ইসলামী জ্ঞানই সন্ধান দেয় সিরাতুল মোস্তাকিমের। তখন মুক্তি আসে এ দুনিয়ায় ও আখেরাতে। নইলে ব্যর্থ হয় সমগ্র বাঁচাটাই। এ ঈমানী উপলদ্ধিটি বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনে ১৯৪৭’য়ের পূর্বে যেমন ছিল, ১৯৪৭’য়ের পরও ছিল। এমন একটি আত্মীক ক্ষুধা বাংলার ন্যায় পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্তপ্রদেশ ও বেলুচিস্তানের ন্যায় অ-উর্দুভাষী প্রদেশেও ছিল। ঈমানের এমন দাবীতে অনেক বাঙালী মুসলমান আরবী হরফে বাংলা লেখার চিন্তাভাবনাও করেছিলেন। তাদের যুক্তিটি ছিল, হিন্দুদের রচিত বাংলা সাহিত্য মুসলিম মানসে দুষিত চিন্তার জীবাণু ছড়াবে। পাইপ যোগে ঘরে দূষিত পানি পৌঁছতে থাকলে তাতে দেহ বাঁচে না। তেমনি ঈমানও বাঁচে না চেতনায় দূষিত দর্শনের জীবাণু পৌছতে দিলে। বাঙালী হিন্দুগণ মুসলিমদের উপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব করতে না পারলেও আজ সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব করছে তো এভাবেই। ফলে রবীন্দ্রনাথের মত মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু আধিপত্যবাদের কবি পরিণত হয়েছে বাঙালী সেকুলারিষ্টদের আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক গুরুতে। অথচ এই সেই রবীন্দ্রনাথ যিনি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে কোলকাতার রাজপথে প্রতিবাদে নেমেছিলেন। তিনি জানতেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ করার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া। মুসলিম-প্রধান পূর্ববাংলার জন্য এ ছিল ব্রিটিশ সরকারের ওয়াদা। কিন্তু মুসলিমদের সে কল্যাণ সাম্প্রদায়ীক রবীন্দ্রনাথের ভাল লাগেনি। ভাল লাগেনি কোলকাতার হিন্দু পত্রিকাগুলোরও। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তখন মক্কা বিশ্ববিদ্যালয় বলে ব্যাঙ্গ করতো। জমিদার রূপে রবীন্দ্রনাথ নিজে রাজস্ব তুলতেন পূর্ব বাংলা থেকে। অথচ তিনি তাঁর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দু-অধ্যুষিত বোলপুরে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, যে রবীন্দ্রনাথ পূর্ব বাংলার মুসলিমদের শিক্ষিত হওয়াকে পছন্দ করেননি, তার গান পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতে।

হিন্দুদের রচিত মুসলিম বিদ্বেষী বাংলা সাহিত্যের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে যারা বাংলা ভাষার হরফ পাল্টানোর পরামর্শ রেখেছিলেন তাদের যুক্তি ছিল, এতে বাঁচবে বাংলার মুসলিম মানস। এবং সংযোগ বাড়বে আরবী ও উর্দুর সাথে। এতে সমৃদ্ধি আসবে বাংলা ভাষায়। তাদের কথা, হিন্দু সাহিত্য ও মুসলিম সাহিত্য এক নয়। যেমন এক নয় উভয়ের ধর্ম, জীবনবোধ ও দর্শন। উর্দু ও হিন্দির জন্ম মূলত একই ভৌগলিক এলাকায়। কিন্তু দু’টি ভাষার মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল দেওয়াল এবং সেটি শুধু বর্ণমালার নয়, শব্দ, উপমা ও দর্শনের। একই ভূমিতে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও উর্দু ছুটেছে আরবী-ফারসীর দিকে। আর হিন্দি ছুটেছে সংস্কৃত ভাষার দিকে। ঈমান বাঁচানোর সে তাগিদে বাংলার মুসলিমদেরও অনেকে তাই আরবী হরেফে বাংলা লেখার কথা ভাবতেন। কিন্তু সে জন্য কি পাকিস্তানকে দায়ী করা যায়? কিন্তু সেটিই হয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকার উর্দুকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল -তা সত্য নয়। সেটি ছিল ধর্মপ্রাণ ও ইসলামী জ্ঞান-পিপাসু মানুষের মনের দাবী। সে দাবী ছিল ধর্মপ্রাণ বাঙালী মুসলিমদেরও। বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই এ বিষয়টি নানা ভাষাভাষী ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে চিন্তাভাবনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। একই রূপ প্রয়োজনের তাগিদে ফার্সী ভাষা রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা পেয়েছে আফগানিস্তানে। 

তবে জ্ঞানের ক্ষুধা সবার থাকে না। ক্ষুধা তো স্বাস্থ্যের লক্ষণ। স্বাস্থ্য-পতনে যেমন ক্ষুধা লোপ পায়, তেমনি ঈমানের পঁচনে লোপ পায় জ্ঞানের ক্ষুধা। বিশেষ করে ইসলামী জ্ঞানের। তখন ক্ষুধা বাড়ে অখাদ্যে। মুসলিমের ঈমানের সে পঁচনটি ধরা পড়ে জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ ও সেকুলারিজমের ন্যায় বাতিল মতবাদে দীক্ষা ও ইসলামে অঙ্গিকারহীনতার মাধ্যমে। সেটি আরো প্রকট সিম্পটম রূপে ধরা পড়ে দুর্বৃত্তিতে বার বার শিরোপা পাওয়ার মধ্য দিয়ে। ঈমানের এমন প্রকট রোগে যারা আক্রান্ত তাদের মাঝে কোরআন শিক্ষায় আগ্রহ থাকবে -সেটি কি আশা করা যায়? ইসলামী জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে আরবী, উর্দু বা অন্য কোন ভাষা শেখা এজন্যই তাদের কাছে অনর্থক মনে হয়। সেক্যুলার বা বামপন্থি বাঙালীদের কাছে ভাষার গুরুত্ব বিবেচিত হয় সে ভাষায় কথা বলা, গান করা, সাহিত্য রচনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অফিস আদালত চালানোর মধ্যে। একারণেই ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনের আকুতিটি তারা বুঝতেই পারেনি। বরং তারা মনেপ্রাণে ভয় করতো উর্দুকে। কারণ উর্দু নিছক ভাষা ছিল না, ছিল প্যান-ইসলামিক চেতনার প্রতীক। এ ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছিল এমন শত শত প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিক, আলেম ও গ্রন্থকার, যাদের মাতৃভাষা উর্দু ছিল না। উর্দু ভাষায় সবচেয়ে শক্তিশালী কবি এসেছেন পাঞ্জাব থেকে; এবং তিনি আল্লামা মহম্মদ ইকবাল। এবং সবচেয়ে শক্তিশালী গদ্য লেখক এসেছেন বাংলা থেকে; এবং তিনি হলেন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ। অনেক প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক এসেছেন হায়দারাবাদের ন্যায় দক্ষিণ ভারত থেকে। উপমহাদেশের আর কোন ভাষায় এমন নজির নেই। এতে ফল দাঁড়িয়েছিল যেখানেই উর্দু ভাষার চর্চা বেড়েছে সেখানেই জোরদার হয়েছে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব। এমন কি পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে সমগ্র ভারত জুড়ে যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট তৈরী হয় তার পিছনেও উর্দু ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজকের পাকিস্তানে এজন্যই সিন্ধুর জিএম সৈয়দের জাতীয়তাবাদী জিয়ে সিন্ধ আন্দোলন এবং সীমান্ত প্রদেশের খান আব্দুল গাফ্ফার খানের পখতুনিস্তান আন্দোলনও মারা পড়েছে। অথচ পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে প্রথম আন্দোলন শুরু করেছিল তারাই। বাংলার সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের কাছে সে ইতিহাস অজানা ছিল না, তাই তারা শুধু রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি নিয়েই খুশি থাকেনি। পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু ভাষার চর্চাকেও তারা রুদ্ধ করে দেয়। ফলে ভাষা আন্দোলনের নামে বাংলা ভাষার উন্নয়ন যা হয়েছে তার চেয়ে সেটি ব্যবহৃত হয়েছে পাকিস্তানের অবকাঠামোর মধ্যে বাঙালী মুসলমানের একাত্ম হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ রূপে। ফলে প্যান-ইসলামিক চেতনার বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলনের চেতনা পরিণত হয়েছে এক লৌহ দেয়ালে। রাষ্ট্রভাষা রূপে কোন ভাষাকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অর্থ যে সে ভাষাকে মুখ থেকে কেড়ে নেওয়া নয় -সে সত্যটুকুও বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ মেনে নিতে রাজী ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে বাংলাভাষা কোন কালেই রাষ্ট্র ভাষা ছিল না। শত শত বছর ধরে ফার্সী ভাষা বাংলাদেশে রাষ্ট্র ভাষা ছিল, তখন কি বাংলাকে বাঙালীর মুখ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল? রাষ্ট্রভাষা না হওয়াতে পাঞ্জাবী, সিন্ধি,পশতু বা বেলুচ ভাষাও কি পাকিস্তান থেকে বিলুপ্ত হয়েছে? অথচ কত মিথ্যাচার না হয়েছে এবং আজও হচ্ছে এ নিয়ে।

 প্রকল্প অশিক্ষিত করার

আসা যাক ইতিহাসের দিকে। দেখা যাক, বাংলার মুসলিমদের কাছে উর্দু কীভাবে গুরুত্ব পেল সে বিষয়টি। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশের হাতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনতা বিলুপ্ত হওয়ায় মুসলিমদের জীবনে যে শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল তা নয়, প্রচন্ড বিপর্যয় এসেছিল মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রেও। তারা যে বাংলার অর্থনীতি, বিশেষ করে বিশ্ববিখ্যাত মসলিন শিল্পকে বিনষ্ট করার লক্ষ্যে মসলিন শিল্পিদের আঙুল কেটেছিল তাই নয়, তারা প্রকল্প নেয় মুসলিমদের অশিক্ষিত করায়। এভাবে অসম্ভব করে তুলেছিল মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। কারণ, অশিক্ষায় আর যাই হোক মুসলিম হওয়া যায়। নামায-রোযা ফরজ না করে জ্ঞানার্জন ফরজ করা হয় -জ্ঞানের সে গুরুত্বের  কারণেই। ব্রিটিশদের হাতে অধিকৃত হওয়ার আগে বাংলার রাষ্ট্রভাষা এবং সে সাথে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভাষা ছিল ফার্সী। অথচ ইংরেজ শাসকেরা ফার্সীর বদলে ইংরাজীকে চালু করে এবং ফার্সী ভাষায় জ্ঞানলাভ অসম্ভব করে। ইংরেজদের হাতে এটিই ছিল মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। ব্রিটিশ শাসনের আগে বাংলায় ৪০ হাজারেরও বেশী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। বাংলার প্রায় সিকি ভাগ জমি বরাদ্দ ছিল সে মাদ্রাসাগুলো চালানোর খরচ জোগাতে। কিন্তু ইংরেজগণ সে জমি কেড়ে নেয়; ফলে বন্ধ হয়ে যায় মাদ্রাসাগুলো। এভাবেই ইংরেজগণ কার্যকর করে, বাংলার মুসলিমদের দ্রুত মূর্খ এবং সে সাথে দরিদ্র বানানোর প্রকল্প। তারা শুধু মসলিন শ্রমিকদের আঙ্গুলই কাটেনি, তাদের শিক্ষার ভাষাকেও নিষিদ্ধ করে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পে মুসলিমগণ ব্রিটিশদের প্রতিদ্বন্ধি হোক- সেটি তাদের কাম্য ছিল না। তাছাড়া শিক্ষা আত্মসচেনত করে, আগ্রাসনের মুখে প্রতিবাদী ও প্রতিরোধীও করে। সৃষ্টি করে জিহাদের জজবা। তাই ইংরেজদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ইসলামের জ্ঞানচর্চায় বাধা সৃষ্টি করা। জ্ঞানচর্চা থেকে দূরে সরলে, দূরে সরতে হয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতা থেকেও। এভাবেই অশিক্ষার সাথে অর্থনৈতিক দুর্গতিও নেমে আসে বাংলার মুসলিম জীবনে। এমন কি সেটি ধরা পড়েছে ব্রিটিশ শাসনামলের ইংরেজ আমলা ও লেখক ডব্লিও. ডব্লিও. হান্টারের চোখে। তিনি লিখেছেন, “যেসব মুসলমানদের পক্ষে একসময় দরিদ্র হওয়াই অসম্ভব ছিল এখন (ইংরেজ নীতির কারণে) তাদের পক্ষে স্বচ্ছল থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

 

বাংলা ভাষায় হিন্দু সাম্প্রদায়ীকতা

বাংলায় ইংরেজ শাসনের ফলে আনন্দ ও প্রতিপত্তি বেড়েছিল হিন্দুদের। সেটি মুসলিমদের বিস্তর ক্ষতির বিনিময়ে। ইংরেজগণ শুরুতেই বুঝেছিল, মুসলিমগণ কখনই তাদের বন্ধু হবে না। বরং সব সময়ই তাদেরকে হানাদার ভাববে। ফলে ভারত শাসনকে দীর্ঘায়ীত করার লক্ষ্যে তারা পার্টনারশিপ গড়ে তোলে হিন্দুদের সাথে। তখন সবচেয়ে বেশী সুবিধা পায় বাঙালী হিন্দুগণ। মুসলিমদের দাবীয়ে রাখার পাশাপাশি ইংরেজদের পলিসি হয় হিন্দুদের উপরে তোলা। এবং সেটি শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে। ইংরেজগণ তখন মুসলিম শাসনামলের ভূমি আইন পরিবর্তন করে চালু করে চিরস্থায়ী প্রথা যার ফলে সৃষ্টি হয় অর্থশালী হিন্দু জমিদার শ্রেণী। হিন্দুগণ তখন ইংরেজী ভাষা শেখার পাশাপাশি বাংলাভাষা গড়ে তোলাতেও মনযোগী হয়। বাংলাভাষার উন্নতি কল্পে ইংরেজ মিশনারীগণ গড়ে তোলে ছাপাখানা। বাংলাভাষায় সাহিত্য সৃষ্টিতে এগিয়ে আসে বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের ন্যায় বিশাল এক ঝাঁক সাহিত্যিক। তাদের সাহিত্যের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলার হিন্দুদের মাঝে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জাগরণ আনা। এসব হিন্দু সাহিত্যিকদের সাহিত্যে শব্দ, উপমা ও দর্শন সংগৃহীত হত সংস্কৃত ভাষায় রচিত বেদ, রামায়ন, মহাভারত থেকে। বাংলা মুসলিমদের মাতৃ ভাষা হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুদের রচিত এ সাহিত্যে মুসলিমদের মনের খোরাক ছিল না। মিটতো না তাদের শিক্ষা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন। ফলে হিন্দুদের রচিত এ সাহিত্যে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাঙালী হিন্দুদের মাঝে রেনেসাঁ শুরু হলেও মুসলমিমদের উপর তার কোন প্রভাবই পড়েনি।

 

মুসলিম রেণাসাঁ ও উর্দু

অশিক্ষা ও বিপর্যয় থেকে বাঁচবার জন্য মুসলিমদেরও নিজস্ব সাহিত্য চর্চায় হাত দিতে হয়। মুসলিমদের তখন ধাবিত হতে হয় অধিকতর সমৃদ্ধ উর্দু ভাষার দিকে। কারণ, বাংলায় ফার্সী ভাষা নিষিদ্ধ হলেও উর্দু ও ফার্সীর চর্চা জোরে শোরে চলছিল দিল্লীসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে। নিছক চাকুরী ও শিক্ষার প্রয়োজন মেটাতে আজ কোটি কোটি বাঙালী ইংরেজী শিখছে। এবং সে বিদেশী ভাষা শিক্ষায় শত শত ঘন্টা ব্যয়ও করছে। কিন্তু তখন বাংলার মুসলিমদের উর্দু ভাষা শিক্ষার আবশ্যকতা ছিল আরো বেশী। সেটি চাকুরীর প্রয়োজনে ছিল না, ছিল মুসলিম রূপে বাঁচার প্রয়োজনে। অনন্তু-অসীম জীবনের আখেরাত বাঁচাতে। এবং সে প্রয়োজনেই বাংলার বুকে গড়ে তোলা হয় নতুন মডেলের মাদ্রাসা। শুরু হয় উর্দু চর্চা। ১৯৩৭ সালে কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টির কোয়ালিশন সরকার। এরপর জোরদার হয় উর্দু শিক্ষার উদ্যোগ। ১৯৩৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক দ্বিধাহীন ভাবে ঘোষণা দেন, “আমি দৃঢ় ভাবে এ মত পোষন করি, যাদের মাতৃভাষা বাংলা, সেসব মুসলিম ছাত্রদের সবার জন্য উর্দুভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।” -(Star of India, 9 April, 1936).

এর পূর্বে ১৯৩৮ সালের ৩’রা এপ্রিল মুসলিম লীগের আসানসোল সম্মেলনে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক মুসলিমনদের সাংস্কৃতিক সংহতির স্বার্থে উর্দুকে মুসলিম ছাত্রদের জন্য বাধ্যতামূলক করার উপর জোর দেন। -(Star of India, 9 April, 1938. p6)। বাংলার মুসলিমদের সৌভাগ্য হলো, হিন্দুদের মাঝে রেনেসাঁ মুসলিমদের তুলনায় অনেক আগে শুরু হলেও তারা অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক শাসন ক্ষমতা হাতে নিতে পারেনি। শাসন ক্ষমতা যায় মুসলিম প্রধানমন্ত্রীদের হাতে এবং সেটি একযুগের বেশী স্থায়ী হয়। প্রধানমন্ত্রী হন জনাব ফজলুল হক, জনাব সোহরোওয়ার্দী্ ও জনাব নাজিমুদ্দিন। এবং সে সরকারের শিক্ষানীতির ফল হলো, সে সময় বাংলার বুকে শিক্ষিত এমন কোন বাঙালী মুসলিম পাওয়াই কঠিন ছিল যে উর্দু ভাষা জানতো না। অনেকে ফার্সীও জানতো। শুধু ফজলুল হক নন, উর্দুর পক্ষে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেন হোসেন শহীদ সোহরোওয়ার্দী। তিনি বলেছিলেন, “উর্দু এবং উর্দু ও ফার্সীর বর্ণমালা হলো আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষার দুইটি লৌহ দেওয়াল।”-(Star of India, 28th April, 193)। সৈয়দ আমির আলী বলেন, “আরবী এবং উর্দু সমগ্র ইসলামী বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের আবেগ ও অনুভূতির একতা গড়ে তোলে। একতা ছাড়া আর কোথায় অধিক শক্তির সন্ধান পাওয়া যাবে?” -(The Spirit of Islam, London, 1955)।

বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন এমনকি কিছু ইংরেজ পন্ডিত ব্যক্তিও। তখন বাংলার ডি.পি. আই. ছিলেন W.W. Hornwell । তিনি লিখেন, “The question of Urdu is the question of life of death of Mohammadan education in Bengal.” –(The Mussalman, 22 June 1917, p2-3). তার বক্তব্য ছিল, মোঘল শাসনের অবসানের পর ফার্সী চর্চাকে বাংলায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। এবং বাংলার মুসলিমদের বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। অথচ সমস্যা হলো, বাংলা ভাষা হলো হিন্দুদের সাম্প্রদায়ীক ধারণা, ঐতিহ্য এবং দর্শনের ভাষা -যা মুসলিমদের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। তার অভিমত ছিল, বাংলার মুসলিমদের বাংলা শিখতে হবে -কারণ এটি তাদের মাতৃভাষা। তবে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় হলো, সংস্কৃতির ভাষা উর্দু ও ফার্সী। তিনি এ কথাও উল্লেখ করেন, “এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুভব করেই বাংলার উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মুসলিগণ উর্দু ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।” এমন একটি উপলদ্ধি নিয়েই তিনি পরামর্শ রাখেন, বাংলার সকল মুসলিমদের জন্য উর্দু ভাষা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হোক। এছাড়া তিনি উর্দু প্রশিক্ষণ স্কুল এবং উপযোগী উর্দু পাঠ্যবই প্রস্তুতেরও পরামর্শ রাখেন। -(The Mussalman, 22 June 1917, p 2-3)।

বাংলা সাহিত্য নিয়ে হিন্দুদের অভিমত কি ছিল সেটিও দেখা যাক। শনিবারের চিঠিতে লেখক পরিমল গোস্বামী জোরের সাথে লেখেন, “বাংলা সাহিত্য হলো মূলত বাঙালী হিন্দুদের অবদান। সেহেতু বাংলার সাথে হিন্দুর আধ্যাত্মীক সংযোগ। এবং মুসলিমগণ বাংলার উন্নয়নে কোন কাজই করেনি। সুতরাং তাদের এর প্রতি কোন দরদও নেই।”-( শনিবারের চিঠি, ১০ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, কার্তীক ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা ১৩)। এ প্রসঙ্গে জয়া চ্যাটার্জীর লেখা থেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া যাক:  “বাংলার হিন্দু জাগরণের কথা লিখতে গিয়ে যদুনাথ সরকার আধুনিক বাঙলার ইতিহাসে মুসলিমদের অবস্থানকেও অস্বীকার করেন। তার কথা, আধুনিক বাঙলা হলো হিন্দু ভদ্রলোকদের সৃষ্টি। ব্রিটিশদের কাছ থেকে আহৃত দীপ্তির সাহায্যে তারা বাঙলাকে পুনরায় ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। অধিকার বলেই বাংলা তাই তাদেরই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নব জাগরণই হলো শুধু ভদ্রলোকের সংস্কৃতির প্রতীক নয়, সেই সঙ্গে একটি হিন্দু বাঙলার, যেখানে মুসলমানের ঠাই নেই। –(জয়া চ্যাটার্জী, বাঙলা ভাগ হলো; ২০০২)

উর্দু শিক্ষার গুরুত্ব বুঝাতে তখন বাংলায় গড়ে উঠে বহু সংগঠন। অনুষ্ঠিত হয় নানা শহরে সম্মেলন। ১৯১৭ সালে এমনই একটি সম্মেলন হয়ছিল বরিশালে। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বরিশাল কনফারেন্সে যে প্রস্তাবনা গৃহীত হয়েছিল তা হলো:

• আরবী ও ফার্সী ভাষার শিক্ষাদান ৭ম শ্রেণী থেকে নয়, ৫ম শ্রেণী থেকে শুরু করতে হবে

• যাদের মাতৃভাষা উর্দু নয় তাদের জন্য কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পরীক্ষায় উর্দুকে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে স্বীকৃত দিতে হবে।

• কোলকাতা মাদ্রাসা ও অন্যান্য মাদ্রাসার নিম্নশ্রেণীতে বাংলা ও উর্দুকে একে অপরের বিকল্প ভাষা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। -( The Mussalman, 11 May 1917 p3)।

১৯০৮ সালের ১৮ই এপ্রিলে পূর্ণিয়াতে অনুষ্ঠিত হয় মোহমেডান এডুকেশন কনফারেন্স। সে কনফারেন্সে সৈয়দ আব্দুল্লাহ সোহরোওয়ার্দী বাঙলার মুসলিমদের উর্দু শেখার প্রতি আহবান জানান। -(The Mussalman, 24 April 1908 p5.)। ১৯৩৩ সালে ২রা জুলাই কিদিরপুরে অনুষ্ঠিত হয় বেঙ্গল প্রাদেশিক উর্দু কনফারেন্স। সে অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে জনাব এস.ওয়াজেদ আলী মুসলিমদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র ও ঐক্যের উপর জোর দেন। তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা ও জাতি হিসাবে বেঁচে থাকার স্বার্থে উর্দু জরুরী।-(The Mussalman, 4 July 1933 p.9)। 

বাঙালী কেন উর্দু কনফারেন্স করবে? কেনই বা উর্দুর পক্ষে কথা বলবে সেটি আজকের মত সেদিনেও অনেকের মনে উদয় হয়েছিল। তখন তার ব্যাখ্যা দিতে উর্দু সম্মেলনের জনৈক সেক্রেটারি বলেন,“উর্দু সম্মেলন বিশুদ্ধভাবে মুসলিমদের নিজস্ব ব্যাপার। তাই এটি ভিতরের আহ্বান।” -(The Mussalman, 5th July, 1933, p2)। অর্থাৎ উর্দুর প্রতি তাদের এ আগ্রহের পিছনে কোন সরকারের বা গোষ্ঠীর চাপ ছিল না। বরং তারা সেটি করেছেন নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে। পুষ্টিকর খাদ্যের সন্ধানে স্বাস্থ্য-সচেতন ব্যক্তি মাত্রই নিজ গরজে রাস্তায় নামে, কারো চাপের প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাতেও উর্দুর প্রতি এমন এক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল তেমনি এক প্রয়োজনের তাগিদে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বহু বাংলাভাষী নেতা উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবী করেছিল তেমনি এক প্রেরণা থেকে। এমন একটি প্রেরণাকে কি পশ্চিম পাকিস্তানীদের চাপিয়ে দেওয়া ষড়যন্ত্র বলা যায়? উর্দুতো পাকিস্তানের কোন এলাকার ভাষা ছিল না। বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গে সে বিষয়টি আদৌ সততার সাথে বিবেচনা করেনি। 

 উর্দু ও প্যান-ইসলামীজম

ইসলামী জ্ঞানের বিশাল ভান্ডারের পাশাপাশি উর্দু ভাষার মাধ্যমে বাংলার মুসলিমদের আরেকটি রাজনৈতিক সুবিধাও হাছিল হয়। সেটি হলো, আত্মীক সম্পর্ক গড়ে উঠে ভারতের বিভিন্ন কোণের মুসলিমদের সাথে। তখন বাংলার রাজধানী কোলকাতা পরিণত হয় উর্দু ভাষার অন্যতম কেন্দ্রে। তখন ভারতের অন্য যে কোন শহর থেকে অধিক সংখ্যক উর্দু পত্রিকা ও বই ছাপা হতো বাংলার রাজধানী কলকাতা থেকে। এ শহর থেকেই তখন প্রকাশিত হত তৎকালীন ভারতের জাগরণ সৃষ্টিকারি আল-হেলাল ও হামদর্দের ন্যায় বহু উর্দু পত্রিকা। আল-হেলালের সম্পাদক ছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ। তখন তিনি খেলাফত আন্দোলনে পক্ষে জনমত গড়ে তুলছিলেন। হামদর্দের সম্পাদক ছিলেন মাওলানা মহম্মদ আলী জওহর। তিনি ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের নেতা। এসব পত্রিকার কারণেই বাংলার মুসলিমদের মাঝেই শুধু নয়, জাগরণ আসে এবং প্যান-ইসলামী চেতনা গড়ে উঠে সমগ্র ভারত জুড়ে। ফলে মহম্মদ আলী, শওকত আলী, আবুল কালাম আযাদ পরিচালিত খেলাফত আন্দোলনে একাত্ম হতে বাংলার মুসলিমদের কোনে সুবিধা হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল অনুপ্রেরণা তো এসেছিল এই প্যান-ইসলামী চেতনা থেকেই। তাই ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলো তখন রাষ্ট্র ভাষা রূপে উর্দুই প্রাধান্য পাবে -সেটিই কি স্বাভাবিক ছিল না? বরং সে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই। কিন্তু ইর্ষাকাতর বাঙালী সেকুলারিষ্টগণ সেটিকে দেখেছে বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রূপে।

মুসলিম মানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলনের নায়কদের বড় সফলতা হলো, বাঙালী মুসলমানদের হাতে এ আন্দোলনটি একটি প্রায়োরিটির তালিকা ধরিয়ে দিয়েছে। সেটি হলো, তারা প্রথমে বাঙালী। তারপর বাংলাদেশী। এবং তারপর মুসলিম। ভাষা আন্দোলন কতটা গভীরভাবে বাংলাদেশের মুসলিমদের ডি-ইসলামাইজড করেছে এ হলো তার উদাহরণ। এটি হলো সেকুলারাইজেশনের এক চুড়ান্ত বিজয়। অথচ মুসলিমদের কাছে তার মুসলিম পরিচিতিটিই মূল। আল্লাহর কাছে বিচার দিনে একমাত্র তাঁর মুসলিম পরিচিতিটাই গুরুত্ব পাবে, বাঙালী বা বাংলাদেশী পরিচয় নয়। প্রশ্ন উঠবে,তার মুসলিম পরিচিতিটি কতটা স্বার্থক, কতটা সফল ও কতটা আপোষহীন। কে কতটা বাঙালী রূপে বাঁচলো -সে প্রশ্ন সেদিন উঠবেই না। প্রশ্ন হলো, যে পরিচয় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে গুরুত্ব রাখে না -সে পরিচয় মুসলিমের কাছে এতো গুরুত্ব পায় কীরূপে? এটি কি ঈমানের স্খলন নয়? অথচ সেটিই বাঙালী মুসলিম জীবনে প্রকট।

 

 ভেসেছে ইসলামপন্থীরাও

ভাষা আন্দোলনের স্রোতে ভাষা থেকে এমন কি অনেক ইসলামপন্থীরাও রেহাই পাননি। প্রচন্ড স্রোত শুধু কচুরীপানাই ভাসায় না, ভাসিয়ে নেয় অনেক শিকড়ধারীদেরও। সে স্খলন যে কতটা ইসলামপন্থীদের আচ্ছন্ন করেছিল তার উদাহরণ দেওয়া যাক। ভাষা আন্দোলন নিয়ে ইসলামী জাগরণের কবি ফররুখ আহম্মদ লিখলেন, “মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা, খোদার সেরা দান”। তিনি ভূলেই গেলেন, মহান আল্লাহতায়ালার সেরাদান ভাষা নয়, সেটি হলো আল-কোরআন। ভাষা শেখাতে নবী পাঠাতে হয় না। ফেরেশতাদেরও দুনিয়াতে আসতে হয় না। অথচ কোর’আন শেখাতে ফেরেশতা ও নবীজী (সা:) পাঠাতে হয়েছে। তাই ভাষাকে খোদার সেরা দান বললে আল-কোরআনের মর্যাদাহানী হয়। মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা সিরাতুল মোস্তাকিম দেখায় না, পরকালীন মু্ক্তিও দেয় না। সে পথ দেখায় কোরআনী জ্ঞান। সবারই মাতৃভাষা থাকে। নিকোবর দ্বীপ ও পাপুয়া নিউগিনিতে এখনও যারা প্রস্তর যুগের অসভ্যতা নিয়ে জঙ্গলে বাস করছে তাদেরও মাতৃভাষা আছে। তবে যা নেই তা হলো তাদের জীবনে সিরাতুল মোস্তাকিম। তাই মায়ের ভাষাকে খোদার সেরা দান বলা যায় কি করে? মায়ের ভাষাতো পশুপাখীরও থাকে। মায়ের ভাষা অন্ধকারেও টানতে পারে, জাহান্নামেও নিতে পারে -যদি সে ভাষা ঈমানের খাদ্য না জুগায়। মায়ের ভাষা সেরা হলে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, সূদান, আলজিরিয়া, মরক্কো, তিউনিসা, লিবিয়ার মানুষ ইসলামের প্রাথমিক যুগে কেন মাতৃ ভাষাকে কবরে পাঠালো? ফররুখ আহমদের মত ইসলামের জাগরণের কবির এরূপ কবিতা বাংলাদেশে ইসলামের পক্ষের শক্তির অনেকের মনেই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। তার এ কবিতায় বিভ্রান্ত হয়ে ভাষা আন্দোলনের ন্যায় বাংলার মুসলিম ইতিহাসের একটি আত্মঘাতি ঘটনা নিয়েও অনেকে অহংকার করতে শিখেছে।

অপর দিকে তমুদ্দন মজলিসের নেতারা নিজেদেরকে ইসলামী তাহজিব ও তমুদ্দনের সেবক মনে করেন। অথচ তারা ভাষা আন্দোলনের নামে ইসলাম-বিদ্বেষী সেক্যুলারদের দলে ভীড়ে তাদের মাঠকর্মী রূপে খেটেছেন। ডক্টর শহিদুল্লাহও বলে বসলেন, আমি প্রথমে বাঙালী, তারপর মুসলিম। অনেকের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন সূফী রূপে। তিনি ছিলেন ফুরফুরার পীরের খলিফা। কিন্ত খলিফার মুখে একি কথা! তার প্রধানতম গর্ব ছিল বাঙালী হওয়া নিয়ে, মুসলিম হওয়া নিয়ে নয়। কথা হলো, এটা কি ইসলামের শিক্ষা? অথচ মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ দানটি বাঙালী বা অবাঙালী হওয়া নয়, সেটি মুসলিম হওয়া। অথচ ডক্টর শহিদুল্লাহর গর্ব বাঙালী হওয়া নিয়ে! প্রথম সারীর বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের এই হলো চিন্তা-চেতনার মান।

ইসলাম ব্যক্তিকে শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে নিয়ত বাঁধতে বলে না। বাঁচা-মরা ও প্রতিটি চেষ্টা-প্রচেষ্টার মধ্যেও নিয়ত বাঁধতে বলে। যেমনটি হযরত ইবরাহীম (আঃ) বেঁধেছিলেন। আর সেটি হলো, “আমার নামায, আমার কোরবানী, আমার বাঁচা এবং আমার মৃত্যু –সব কিছুই রাব্বুল আলামীন মহান আল্লাহর জন্য।” হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর এমন নিয়তে মহান আল্লাহতায়ালা এতই খুশি হয়েছিলেন যে তাঁর সে কথাগুলোকে চিরকালের জন্য সকল ঈমানদারদের জন্য অনুকরণীয় করে রেখেছেন। মুসলমানের জীবনে প্রকৃত সফলতা মিলবে কে কতটা এ নিয়ত পালনে সফল হলো তার উপর। বস্তুত মুসলিম তাঁর জীবনে ভিশন, মিশন ও প্রায়োরিটি পায় এ আয়াত থেকে। তাঁর মুসলমানিত্ব নির্ভর করে এমন মিশন নিয়ে বাঁচার মধ্যে। মুসলিমের জীবনে রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাজনীতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষা, বন্ধুত্ব ও সম্পৃতির মূল নিয়ন্ত্রক হবে এমন নিয়েত। এখানে ভাষার কোন স্থান নেই। গায়ের রং ও ভূগোলেরও কোন স্থান নেই। রোজ হাশরের বিচার দিনে মহান আল্লাহ কখনই এ প্রশ্ন করবেন না যে তোমার মাতৃভাষা কি ছিল? বরং প্রশ্ন হবে কতটুকু মুসলিম ছিলে -সেটি।

 

ভাষা আন্দোলনের নাশকতা

মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো ভাষা, বর্ণ, অঞ্চলের বিভেদ ভূলে প্যান-ইসলামিক হওয়া। এক্ষেত্রে ব্যর্থতার অর্থ ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠায় ব্যর্থতা। অর্থাৎ মুসলিম হওয়ায় ব্যর্থতা। প্রশ্ন হলো, যে ব্যক্তির জীবনে প্রথম প্রায়োরিটি হয় বাঙালী হওয়া, তার কাছে কি অন্য ভাষার মুসলিমের সাথে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে একাত্ম হওয়া গুরুত্ব পায়? অথচ মুসলিমদের কাজ তো নানা ভাষা ও নানা অঞ্চলের হয়েও এক দেহে লীন এক উম্মতে ওয়াহেদা গড়া। নামায-রোযা আদায়ের ন্যায় এটিও তো ফরয। কিন্তু যখন বাঙালী হওয়াটাই প্রায়োরিটি হয়, তখন ভাষাগত পরিচয়টিই রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ জীবনের বহু কিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে যায়। অভিন্ন বাংলা ভাষার নামে তখন অন্য বাঙালী -তা সে হিন্দু হোক, খৃষ্টান হোক, বৌদ্ধ হোক বা নাস্তিক হোক, তাদের সাথে একাত্ম হওয়াটাই গুরুত্ব পায়। তখন গুরুত্ব হারায় অন্য ভাষী মুসলিম ভাইয়ের সাথে একতা গড়ার বিষয়টি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। নানা ভাষাী মুসলিমদের মাঝে একতা গড়ার ন্যায় ফরজ কাজটি তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে বাঙালীদের মনে গুরুত্ব হারায় পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। বরং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ভারতের পশ্চিম বাংলার সাথে সম্পর্ককে ঘনিষ্টতর করা। ফলে বাঙালী মুসলিম শুধু পাকিস্তান ও উপমহাদেশের মুসলিম থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি, বরং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে মুসলিম জাহান থেকেও। তাই কাশ্মীর,ভারত বা আরাকানের মজলুম মুসলিমদের মুক্তির বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ মাথা ঘামায় না। মনে করে সেগুলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়। নির্যাতিত ফিলিস্তিনীদের জন্যও বাংলাদেশ থেকে তেমন সাহায্য যায় না। বাংলাদেশের সেকুলার রাজনীতিতে বস্তুত এগুলো কোন প্রসঙ্গই নয়।

যখন কোন মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাষা শিখে তখন তার সাথে শুধু মুখের যোগযোগই বাড়ে না, বাড়ে আত্মার সংযোগও। তখন গড়ে উঠে আত্মীক সম্পর্কও। ভাষার মূল কাজ তো এই সংযোগই গড়া। বাংলা ভাষা চর্চার পাশাপাশি উর্দু শেখার কারণে বাংলার মানুষের যে লাভটি হয়েছিল তা হলো, উপমহাদেশের অন্য মুসলিমদের সাথে তাদের মনের সংযোগটি বেড়েছিল। সে সাথে বেড়েছিল জ্ঞানের ঐশ্বর্যও। বেড়েছিল ঔদার্যতাও। এরই ফলে বাঙালী মুসলিমগণ সামর্থ্য পায় উপমহাদশের অন্য মুসলিমদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ফল দাঁড়ালো, অন্য ভাষার অবাঙালী ভাইয়েরা চিত্রিত হলো ছাতুখোর দুষমন রূপে। অথচ এক মুসলিম যে অন্য মুসলিমের ভাই – সে খেতাবটি মহান আল্লাহতায়ালার দেওয়া। তাই মুসলিমগণ একে অপরের ভাই বলবে -সেটি এক অলংঘনীয় ঈমানী দায়বদ্ধতা। নইলে গাদ্দারী হয় মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশের সাথে। অথচ বাঙালী মুসলিমের মাঝে সে গাদ্দারীই প্রবলভাবে বাড়িয়েছে ভাষা আন্দোলন। এভাবে ছিন্ন করা হয় পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মাঝে প্যান-ইসলামী বন্ধন। অথচ এটি শুধু রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক অপরাধই নয়, ইসলামের দৃষ্টিতে হারামও। এমন বিচ্ছিন্নতাই যে কোন মুসলিম জনপদে আল্লাহর আযাব অনিবার্য করার জন্য যথেষ্ট। এরূপ আযাবের জন্য পুতুল পূজার প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কোর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “এবং তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা সুস্পষ্ট ঘোষণা আসার পরও পরস্পরে মতভেদ ও বিভক্তি গড়লো। তারাই হলো সে সব ব্যক্তি যাদের জন্য রয়েছে বিরাট আযাব। -(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৫)।

মহন আল্লাহতায়ালা শুধু একতা গড়াকেই ফরয করেননি, এভাবে হারাম করেছেন বিভক্তি গড়াকেও। তাই ঈমানদার ব্যক্তি শুধু নামায-রোযাতেই মনযোগী হয় না, অতি একনিষ্ঠ হয় মুসলিমদের মাঝে একতা গড়তে এবং অতিশয় সচেষ্ট হয় বিভক্তি এড়াতেও। এমন এক সমৃদ্ধ ইসলামি চেতনার কারণেই ১৯৪৭’য়ে বাংলার মুসলিমগণ অন্যভাষী মুসলিমদের সাথে একত্রিত হয়ে পাকিস্তান গড়েছিল। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের নাশকতায় সেটি বিলুপ্ত হয়েছে। এরই ফল হলো, বাঙালী মুসলিমের মাঝে আজ থেকে শত বছর আগে যে চারিত্রিক, নৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুণ ছিল -তা আজ আর বেঁচে নাই। শত বছর আগে অন্ততঃ অন্য ভাষা, অন্য বর্ণ ও অন্য ভূগোলের মুসলিমদের ভাই বলার ঈমানী সামর্থ্য ছিল; এবং তাদের সাথে একত্রে রাজনীতি করা এবং কাফের শত্রুর বিরুদ্ধে একত্রে যুদ্ধ করারও আগ্রহ ছিল। এখন সেটি বিলুপ্ত। অন্য ভাষার মুসলিমদের সাথে শুধু ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতাই বাড়েনি, বেড়েছে মনের দূরত্বও। দিন দিন সেটি আরো গভীরতর হচ্ছে। অপর দিকে ভারতীয়দের ন্যায় কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব উৎসবে পরিণত হয়েছে। এবং সে সাথে উৎসবে পরিণত হয়েছে অবাঙালী মুসলিমদের সাথে বিচ্ছিন্নতার দিনগুলোও। তাই ১৯৫২’য়ের ভাষা আন্দোলন শুধু বাঙালীর মুসলিমের রাজনৈতিক ভূগোলই পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছে মনের ভূগোলও। এবং তা অসম্ভব করছে প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। ১ম সংস্করণ ২১/১২/২০১৭; ২য় সংস্করণ ২৩/০২/২০২১।




শত্রুশক্তির যুদ্ধ ও ইসলাম বিনাশী নাশকতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

শেষ হয়নি শত্রুর যুদ্ধ

বাংলার বুকে ইসলামের শত্রুশক্তির যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং দিন দিন  তীব্রতর হচ্ছে। যুদ্ধটির শুরু আজ নয়; সূচনা ১৭৫৭ সালে। নবাব সিরাজুদ্দৌলার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী কাফের শক্তির গোলাবারুদের যুদ্ধ পলাশীতে শেষ হলেও শেষ হয়নি ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের মূল যুদ্ধটি। সে যুদ্ধটি বরং লাগাতর চলছে দেশের আদর্শিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গণে। দেশের আইন-আদালত থেকে ঔপনিবেশিক শত্রুশক্তি যেরূপ ইসলামের শরিয়তি বিধানকে বিলুপ্ত করেছিল এবং অসম্ভব করেছিল মুসলিম শক্তির উত্থানকে, আজও সেটিই তাদের মূল এজেন্ডা। তাই ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও আদর্শিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সে যুদ্ধটি এখনো শেষ হয়নি। শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে সেটিই ইসলামের শত্রুপক্ষের মূল যুদ্ধ। এ যুদ্ধে তাদের শত্রুর নিষ্ঠাবান দাস সৈনিক রূপে খাটছে ব্রিটিশ প্রনীত সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়ে উঠা বিশাল কর্মীবাহিনী। রাজনৈতিক শক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থানকে ইংরেজগণ যেরূপ তাদের ১৯০ বছরের শাসনামলে রুখেছিল এবং দূরে রেখেছিল ইসলামের শরিয়তি বিধানকে – ইসলামের সেরূপ একটি পরাজিত অবস্থা বলবৎ রাখাই তাদের উপর শত্রুপক্ষের পক্ষ থেকে অর্পিত মূল দায়ভার। এ কারণেই পাশ্চাত্যের কাফেরদের ন্যায় তারাও সর্বভাবে ইসলামের বিজয়কে রুখতে চায়। দেশের সেনানীবাস, সিভিল প্রশাসন, বিচার বিভাগ, অফিসার্স ক্লাব ও মন্ত্রীপাড়ার ন্যায় গুরুত্বপূ্র্ণ স্থানগুলি আজও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সুরক্ষিত দ্বীপ। সে সাথে প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রও। সেসব অধিকৃত সামরিক ও প্রশাসনিক ঘাঁটিতে বাংলার সাধারণ জনগণের মুসলিম রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি দেখতে পাওয়া যায় না। সে মহলে দেশী বিষয় বিদেশী মনে হয়। কারো কারো জীবনে নামাজ-রোযা থাকলেও সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ নবীর যুগের ইসলামের -যাতে রয়েছে শরিয়ত, খেলাফত, জিহাদ এবং ভাষা ও বর্ণের নামে গড়ে উঠা দেয়াল ভাঙ্গার বিধান। ইংরেজদের প্রস্থানের বহু বছর পরও তাই বাংলার মুসলিম ভূমিতে আজও বহাল তবিয়তে বেচেঁ আছে তাদের প্রতিষ্ঠিত দেহব্যবসা, জুয়া, সূদী ব্যাংকের ন্যায় নানারূপ হারাম কর্ম। রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের নানা ক্ষেত্রে মহান আল্লাহতায়ালা ও আখেরাতের ভয়কে ভূলিয়ে দেয়াই ইসলামবিরোধী এ দখলদার দেশী শক্তির মূল কাজ। ফলে শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের দেশে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত শরিয়তি বিধানকে পরাজিত রাখতে ও ইসলামপন্থিরদের হত্যায় বিদেশী কাফের শক্তিকে ময়দানে নামতে হয় না। সে কাজটি নিষ্ঠুরতার সাথে সমাধা করে পাশ্চত্য-পূজারী বাঙালীগণ। ঢাকার শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যার ন্যায় নিষ্ঠুর গণহত্যাগুলিতেও তাই কোন বিদেশী কাফেরকে  নামতে হয়নি। একাত্তরের গণহত্যাও ছিল দিল্লি, মস্কো, চীন ও পাশ্চাত্যের অনুসারি ইসলামের শত্রুপক্ষের নিজস্ব কাণ্ড –যাদের হাতে মারা গিয়েছিল অগণিত বাঙালী ও অবাঙালী মুসলিম।

কোন মুসলিম ভূমিতে কাফের শক্তির বিজয়ের নাশকতাটি এমনিতেই বিশাল। কিন্তু সে অধিকৃতি যদি ১৯০ বছরের হয় তবে সে নাশকতাটি ভয়ংকর রূপ নেয়। বাঙালী মুসলিমের জীবনে ক্ষতির সে অংকটি তাই বিশাল। এ কারণেই নবীজী (সা:)’র যুগের কোরআনী ইসলাম থেকে বাঙালী মুসলিমদের অবস্থানটি বহু দূরে। নবীজী (সা:)’র ইসলামে কাফের শক্তির অধিকৃতির বিরুদ্ধে জিহাদ ছিল, শরিয়তের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা ছিল এবং নানা বর্ণ ও নানা ভাষার মুসলিমদের মাঝে সীসাঢালা প্রাচীরসম এসকতা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে সে ইসলামের প্রতিষ্ঠা চিহ্নিত হয় সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ রূপে। নবীজী(সা:)’র প্রবর্তিত সে কোরআনী ইসলামের তারা নির্মূল চায়। তাদের ইচ্ছা, মুসলিম বেঁচে থাক নবীজী (সা:)’র ইসলামকে বাদ দিয়ে। এবং গ্রহণ করুক জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, ফেরকাবাদ, স্বৈরাচার ও সেক্যুলারিজমের ন্যায়  নানারূপ পথভ্রষ্টতা। ইসলামের যে বিকৃত রূপকে তারা মেনে নিতে বলছে তাতে রয়েছে শরিয়তের বদলে ব্রিটিশদের প্রণীত কুফরি আইন। তাতে আছে সূদী ব্যাংক, দেহব্যবসা, সূদ–ঘুষ, মদজুয়া, বেপর্দা ও নাচগানের ন্যায় নানারূপ কবিরা গুনাহ ও পাপাচারের আইনগত বৈধতা। প্রকৃত ইসলামের সাথে সম্পর্কচ্যুৎ এমন ভণ্ড মুসলিম গড়ে তোলার লক্ষ্যে অতীতে তারা যেমন মাদ্রাস গড়েছে, তেমনি গড়েছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও। সে সাথে ময়দানে নামিয়েছে মুসলিম নামধারী দালাল শ্রেণীর সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী। মুসলিম ভূমিতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার লক্ষ লক্ষ সৈনিক পেয়েছে বস্তুত ইসলামি চেতনা বিনাশী এরূপ প্রকল্প সফল হওয়ার ফলে। দুর্বৃত্তিতে বাংলাদেশ যেরূপ বার বার বিশ্বরেকর্ড গড়েছে এবং আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা যেরূপ অসম্ভব হয়েছে -তা মূলতঃ তাদের প্রবর্তীত সে বিকৃত ইসলাম ও মানসিক গোলামদের শাসন দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার কারণে।

 

শত্রুর যুদ্ধ কখনোই হয়না

ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে শত্রুর যুদ্ধ কখনোই শেষ হয়না; অস্ত্র ও কৌশল পাল্টায় মাত্র। সময় ও সুযোগ বুঝে তারা গড়ে নতুন কোয়ালিশন; এবং সংগ্রহ করে নতুন সৈনিক। তাই শেষ হয়নি ইসলাম নির্মূলে শয়তান ও তার অনুসারিদের মূল যুদ্ধটিও। বাংলাদেশ তো তাদর হাতেই অধিকৃত। অধিকৃত এ ভূমিতে তাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা, বিভক্তির দেয়াল ভাঙ্গা এবং সে পবিত্র লক্ষ্যে জিহাদে লিপ্ত হওয়াটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেটি যেমন কাফের ব্রিটিশদের আমলে ছিল, তেমনি আজও। এমন অধিকৃত দেশে বাক স্বাধীনতা, লেখালেখীর স্বাধীনতা, ধর্মশিক্ষা ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতার দাবি করাটাই সন্ত্রাস। স্বাধীনতা নাই সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার। সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার পথ তো শরিয়তের প্রতিষ্ঠাসহ ইসলামের পূর্ণ বিজয় ও পূর্ণ ইসলাম পালনের পথ। সেটি তো আল্লাহর জমিনে তাঁর দ্বীনের বিজয়ে অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণদানের পথ। গভীর জঙ্গলে কি মহাসড়ক গড়া যায়? সে জন্য তো জঙ্গল কেটে পথ করতে হয়। সিরাতুল মুস্তাকীম গড়তেও তেমনি অপরিহার্য হলো কুফরি শাসনের নির্মূল। অথচ অন্ধকারের পূজারীগণ সেটি হতে দিতে রাজী নয়। সমাজের নমরুদ-ফিরাউন-আবু জেহলগণ সর্বশক্তি দিয়ে সে কাজে বাধা দেয়। অথচ জাহিলিয়াতের সে অন্ধকার না সরালে কি ইসলাম পালন হয়? সে যুগের জাহিলিয়াতে ছিল পৌত্তলিকতা, অজ্ঞতা, নানারূপ দুবৃত্তি ও ট্রাইবাইলিজম। আর আজকের জাহিলিয়াতটি হলো জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদ ও সেক্যুলারিজমের। ইসলামের নির্মূলে এ নব্য জাহিলিয়াত আদিম জাহিলিয়াতের চেয়ে কম যুদ্ধাংদেহী ও কম নৃশংস নয়। প্রতি যুগেই ইসলাম পালনের পথটি তাই জাহিলিয়াত নির্মূলের পথ; তথা লাগাতর জিহাদের পথ। যার জীবনে সে জিহাদ নাই, বুঝতে হবে সে ব্যক্তির জীবনে কোরআনী ইসলামও নাই। মুসলিম জীবনে এরূপ জিহাদ না থাকলে সে মুসলিমদের রাষ্ট্রে কি ইসলাম বাঁচে? সে রাষ্ট্রে বরং প্রবল প্লাবন আসে জাহিলিয়াতের; এবং সেসাথে নানারূপ দুর্বৃত্তি ও পাপাচারের। বাংলাদেশ হলো তারই নমুনা। বাংলাদেশের একটি থানায় যত মুসলিমের বাস নবীজী (সাঃ)র  প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাষ্ট্রে সে সংখ্যক মুসলিম ছিল না। কিন্তু জাহিলিয়াত ও দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে মহান নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবনে আমৃত্যু জিহাদ এসেছিল। ফলে সমগ্র আরব ভূমি থেকে নির্মূল হয়েছিল দুর্বৃত্তদের আধিপত্য; এবং দেশে দেশে বিজয়ী শক্তিরূপে আাবির্ভুত হয়েছিল ইসলাম। তখন জনগণ পেয়েছিল সিরাতুল মুস্তাকীমে চলার স্বাধীনতা। অথচ নমরুদ, ফিরাউন ও আবু জেহলদের যুগে সে স্বাধীনতা ছিল না। অজ্ঞতার বিরুদ্ধে নবীদের আওয়াজ তোলাটিও তখন হত্যাযোগ্য সন্ত্রাস গণ্য হত। একই অবস্থা বাংলাদেশেও। দেশটির স্বৈরাচারি শাসকদের কাছে নবীদের সে পবিত্র সূন্নত নিয়ে বাঁচাটি গণ্য হয় সন্ত্রাস রূপে।

 

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি প্রসঙ্গে

মানবের উপর অর্পিত মিশনটি স্রেফ নামায-রোযা এবং হজ-যাকাত পালন নয়। স্রেফ তাসবিহও পাঠ নয়। বিশ্বজগতের সকল সৃষ্টিই  মহান আল্লাহতায়ালার নামে তাসবিহ পাঠ করে। “ইউসাব্বিহু লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদি” এবং “সাব্বাহা লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদি” –পবিত্র কোরআনে এরূপ বাক্য বার বার ব্যবহার করে মহান আল্লাহতায়ালা সে সত্যটি বার বার ব্যক্ত করেছেন। তাই স্রেফ তাসবিহ পাঠের মাধ্যমে পাহাড়-পর্বত, জন্তু-জানোয়ার, কীটপতঙ্গ, গাছপালা ও উদ্ভিদ থেকে কোন মানব সন্তানই শ্রেষ্ঠতর হতে পারে না। মানবের জন্য শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সে পথটি ভিন্নতর। সেটি হলো, পৃথিবী জুড়ে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের  প্রতিষ্ঠা। সেটি পৃথিবী জুড়ে ইসলামের বিজয়ে আত্মনিয়োগ। ঈমানদারের জীবনে মূল মিশনটি তাই মহান আল্লাহতায়ালার ভিশনের সাথে একাত্ম হওয়া। পবিত্র কোরআনে বর্নিত মহান আল্লাহতায়ালার সে ভিশনটি হলো, “লি’ইয়ুযহিরাহু আলা দ্দীনে কুল্লিহী” অর্থঃ “সকল দ্বীনের উপর ইসলামের বিজয়”। সে নির্ধারিত মিশন পালনে একজন ব্যক্তি কতটা সফল হলো, তাতেই নির্ধারিত হয় জন্তু-জানোয়ার, কীটপতঙ্গ,গাছপালা ও উদ্ভিদ থেকে তার শ্রেষ্ঠতর মর্যাদা। দায়িত্ব এখানে খেলাফতের।

মানবসৃষ্টির প্রকৃত মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব তাই মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা বা প্রতিনিধি রূপে দায়িত্ব  পালনের মাঝে। সাহাবাগণ মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে পেরছিলেন খেলাফতের সে গুরু দায়িত্বটি সুষ্ঠভাবে পালনের মাধ্যমে। সে কাজে তারা নিজেদের জীবনের শ্রেষ্ঠতর অর্জন ব্যয় করেছেন; শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন। ব্যক্তির প্রতিটি সামর্থ্য তা অর্থনৈতিক, দৈহীক বা বুদ্ধিবৃত্তিক হোক –সবই মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া আমানত। ব্যক্তির প্রকৃত ঈমানদারি হলো, মহামূল্য সে আমানতকে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয়ে বিনিয়োগ করবে। নইলে ভয়ানক খয়ানত হয় যা আযাব ডেকে আনে। সাহাবাদের সে বিনিয়োগটি ছিল বিশাল; তাতে ইসলামের অনুসারিগণ বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছিল। অথচ সেরূপ বিনিয়োগে আজকের মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বেড়েছে ইসলামের পরাজয়। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে আমানতের বিনিয়োগ হয়েছে মূলতঃ জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ, সেক্যুলারিজম ও স্বৈরাচারের ন্যায় নানারূপ  ভ্রষ্টতাকে বিজয়ী করতে। বিনিয়োগ সীমিত রেখেছে স্রেফ নামায-রোযা ও  তাসবিহ পাঠে। অথচ তাসবিহ পাঠ যত লক্ষ বারই হোক -তাতে মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া বিশাল সামর্থ্যের বিনিয়োগ ঘটেনা। ফলে শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশও ঘটে না। গবাদী পশুর মিশন শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নয়,খলিফা হওয়াও নয়। সেটি তো কৃষকের হাল টানা, দুধ দেয়া, পরিধেয় জুতা বা খাবার টেবিলে কোর্মা-কাবাব রূপে হাজির হওয়া। পশুগণ সে মিশন পালনে ব্যর্থ হচ্ছে না। কিন্তু মানুষ ব্যর্থ হচ্ছে তার উপর অর্পিত মিশন পালনে। কাফের ও মুনাফিকগণ এজন্যই পশুরও অধম। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সে সত্যটিও তুলে ধরেছেন। বলা হয়েছে, “বাল হুম আদাল’ অর্থঃ তারা (পশুর) চেয়েও নিকৃষ্ট।  পশু, কীটপতঙ্গ বা গাছপালা তাই জাহান্নামে যাবে না, কিন্তু জাহান্নামের খোরাক হবে অবাধ্য ও বিদ্রোহী মানব।


বিশাল বিজয় শত্রুপক্ষের

শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উগ্রবাদ নয়, সন্ত্রাসও নয়। এটি নামায-রোযার ন্যায় ইসলামের অতি অপরিহার্য বিষয়। নামায-রোযা ছাড়া যেমন মুসলিম হওয়া যায় না, তেমনি ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জান ও মালের বিনিয়োগ ছাড়াও মুসলিম থাকা যায় না। রাষ্ট্রটি মুসলিম না অমুসলিমের সেটি বুঝা যায় সে রাষ্ট্রে শাসকের অঙ্গীকার ও আদালতে আইনের স্বরূপ দেখে। তাই ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতের পরিচয় ছিল ব্রিটিশ ভারত, মুসলিম ভারত রূপে নয় –যদিও সে সময় ব্রিটশদের সংখ্যা প্রতি লাখে একজনও ছিল না। সেটিই স্বাভাবিক ছিল। অপর দিকে বাংলার বুকে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল শরিয়তী আইনের শাসন। অথচ সে সময় দেশটির মুসলিম জনসংখ্যা আজকের ন্যায় শতকরা ৯১ ভাগ ছিল না। এমনকি সিকিভাগও ছিল না। মুসলিম জনসংখ্যা কম হলেও খিলজী আমল, সুলতানী আমল, মোঘল আমল বা নবাবী আমলে ছিল শরিয়তী আইন। ফলে পরিচয় পায় মুসলিম আমল রূপে। ভারত থেকে শরিয়তি আইন বিলুপ্ত হয় ব্রিটিশ কাফেরদের শাসন প্রতিষ্ঠার পর। ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। তখন অসম্ভব হয় ইসলামের মৌল বিধানগুলি মেনে চলা।

ঔপনিবেশিক কাফেরদের শাসন শেষ হয়েছে। কিন্তু শেষ হয়নি তাদের গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইসলামের শত্রুপক্ষের শাসন। ঔপনিবেশিক আমলের সেক্যুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কারণে ইসলামের শত্রু বিপুল ভাবে বেড়েছে নিজ ভূমিতে। অতীতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রোধে মুসলিম জনগণের পক্ষ থেকে কোনরূপ বিরোধীতা হয়নি। মুসলিম কি কখনো নামায-রোযার প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় রাস্তায় নামে? তাতে কি তার ঈমান থাকে? তেমনি শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা কি কোন মুসলিমের নীতি হতে পারে? অথচ সেটিই হচ্ছে বাংলাদেশে! শরিয়তি আইনের নির্মূলে এক কালে যা ছিল সাম্রাজ্যবাদি শাসকদের নীতি, সে অভিন্ন নীতি নিয়ে দেশ শাসন করছে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের স্বৈরাচারি শাসকগণ। নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দিলেও দেশের রাজনীতি, আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে তারা ইসলামের জন্য সামান্যতম স্থানও ছেড়ে দিতে তারা রাজী নয়। বরং কাফেরদের অর্থ, অস্ত্র ও এজেন্ডা নিয়ে দেশে-বিদেশে যুদ্ধ করতে রাজি। বাংলার ন্যায় মুসলিম ভূমি এরূপ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হওয়ায় কঠিন হয়ে পড়ছে জান্নাতের পথে চলা।

বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়টি বিশাল। ইসলামের বিজয় বা উত্থানকে তারা সফল ভাবেই রুখতে পেরেছে। এবং অব্যাহত রাখতে পেরেছে ব্রিটিশদের প্রবর্তিত কুফরি আইনের শাসন। দেশটির জনসংখ্যার শতকরা ৯১ ভাগ নিজেদেরকে মুসলিম রূপে দাবী করলে কি হবে, ধর্মের নামে দেশে যা পালিত হয় তার সাথে নবীজী (সা:)’র ইসলামের মিলের চেয়ে অমিলই প্রচুর। দেশটিতে আজও পৌত্তলিকতা বেঁচে আছে তার আদিম সনাতন পরিচয় নিয়ে। কিন্তু এ মুসলিম ভূমিতে নবীজী (সা:)’র ইসলাম তার পরিচয়টি হারিয়ে ফেলেছে বহু আগেই। এবং বেঁচে নাই কোরআনে বর্নিত জিহাদ, শরিয়ত, হদুদ ও খেলাফতের ধারণা। ফলে পবিত্র কোরআনের সনাতন ইসলাম বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী অপরিচিত। ইসলাম থেকে দূরে সরা জনগণ অতি আনন্দ চিত্তে বরণ করে নিয়েছে বর্ষবরণ, বসন্তবরণ, মঙ্গল প্রদীপসহ নানারূপ পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে। লক্ষ লক্ষ মুসলিম সন্তান হাজির হচ্ছে এমন কি পূজা মন্ডপে।

ইসলামের এ বি‌শাল পরাজয় নিয়ে দেশের লক্ষ লক্ষ আলেমও নিরব, যেন এ পরাজয়কে নিশ্চুপ মেনে নেয়া ছাড়া তাদেরও কিছু করার নাই। মসজিদ ও মাদ্রাসায় চাকুরির মাঝে সীমিত তাদের জীবন। কোর’আনকে তারা তেলাওয়াত করতে পারে -সে সামর্থ্যকেই তারা সামান্য মূল্যে ঘরে ঘরে ও মসজিদে মসজিদে বিক্রি করে বেড়াচ্ছে। শরিয়তী বিধানকে যেভাবে আঁস্তাকুড়ে ফেলা হয়েছে -তা নিয়েও এসব আলেমদের মাঝে সামান্যতম মাতম নাই। শরিয়তের পুণঃপ্রতিষ্ঠা নিয়ে নেই সামান্যতম আগ্রহ। শরিয়ত পালন ছাড়া যে ইসলাম পালন হয়না -সে হুশও কি তাদের মাঝে বেঁচে আছে? ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে দেশ অধিকৃত হলে তখন জিহাদ আর ফরজে কেফায়া থাকে না, ফরজে আইনে পরিণত হয়। প্রতিটি মুসলিমকে তখন লড়াইয়ে নামতে হয়। তাদের মাঝে কতটুকু বেঁচে আছে ইসলামের সে মৌলিক জ্ঞানটুকু? ফলে ইসলামের শত্রুশক্তির অধিকৃতি মোচনের কোন প্রচেষ্ঠাও নেই। ইসলামকে তারা নিজেদের পছন্দ মত বানিয়ে নিয়েছে; এবং নিজেরা যা করছে -সেটিকেই তারা খাঁটি ইসলাম বলছে। ঘরে ঘরে পবিত্র কোর’আনকে রাখা হয় স্রেফ না বুঝে তেলাওয়াতের জন্য; মহান আল্লাহতায়ালা কি বলেছেন সেটি জানা বা অনুসরণের জন্য নয়।

নবীজী (সা:)’র যুগে ইসলাম বলতে যা বুঝাতো তাতে ছিল রাষ্ট্রের উপর একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব; রাজা, জনগণ বা পার্লামেন্টের নয়। শাসকের পরিচয় ছিল নবীজী (সা:)’র খলিফা বা প্রতিনিধি রূপে; অধিকার ছিল না জনগণের উপর নিজের খেয়াল-খুশিকে চাপিয়ে দেয়ার। আইনের উৎস ছিল পবিত্র কোর’আন ও সূন্নাহ; ফলে দেশের আদালত কখনোই দেশের শাসকদের বা নির্বাচিত সদস্যদের প্রণীত আইনের হাতে অধিকৃত হয়নি। সূদ, ঘুষ, মদ, জুয়া সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি ও দেহব্যবসা চিহ্নিত হতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে। ফলে রাষ্ট্রের বুক থেকে সে পাপ ও পাপাচারের পথগুলোও নির্মূল হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশ অধিকৃত ভয়ানক অপরাধীদের হাতে। এদের চরিত্র, এরা শুধু স্বৈরাচারি ও চরম দুর্বৃত্তই নয়; ইসলামের প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধে এরা আপোষহীনও। ফলে সরকার ও দখলদার রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক এজেন্ডাও সুস্পষ্ট। দেশের ক্রমবর্ধমান গুম-খুন, চুরি –ডাকাতি, শেয়ারমার্কেট লুট, ব্যাংক লুট নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। তারা যেহেতু নিজেরাই অপরাধী, অপরাধীদের নির্মূল তাদের লক্ষ্য নয়। তারা চায় নিজেদের রাজনৈতিক শত্রুদের নির্মূল ও গদীর দীর্ঘায়ু। তারা নির্মূল করেত চায় তাদের যারা চায় ইসলামের বিজয়। নির্মূলের সে কাজটি সহজ করতেই তারা দেশের সকল ইসলাম বিরোধী ব্যক্তি, দল ও দুর্বৃত্তদের পক্ষে টেনেছে। এসব দুর্বৃত্তদের কেউ কেউ খুনের অপরাধে আদালতে প্রাণদণ্ড পেলেও দেশের সরকার ও প্রেসিডেন্টের কাজ হয়েছে তাদের প্রাণদণ্ডকে মাফ করে দেয়া।

 

শাসনতন্ত্রে শয়তানের এজেন্ডা

রাজা, জনগণ বা পার্লামেন্টের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি হওয়ার ধারণা পবিত্র কোর’আনে নাই। তাই সেরূপ কোন ধারণার অস্তিত্ব নবীজী (সা:)’র যুগে ছিল না। এরূপ ধারণাই কুফরি। শাসকগণ কাজ করতেন নবীজী(সা:)’র খলিফা রূপে। সার্বভৌমত্ব দাবী করার অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। সে কাজ কাফেরদের। দেশে দেশে সেরূপ যুদ্ধ বস্তুত শয়তানের খলিফাদের। অথচ তেমন একটি যুদ্ধ ঘোষিত হয়েছে বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে। এভাবে শাসনতন্ত্র ব্যাহৃত হচ্ছে শয়তানের এজেন্ডা পূরণে। নবীজী (সা:)’র আমলে ইবাদত বলতে বুঝাতো নামায-রোযা, হজ-যাকাত পালনের সাথে সাথে পবিত্র কোরআনে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং নবীজী (সা:)’র সূন্নতের পূর্ণ অনুসরণ। ফলে মু’মিনের জীবনে অনিবার্য রূপে দেখা দিত ইসলামের বিজয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ। তখন শুরু হতো কোর’আনে নাযিলকৃত মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র বানী আত্মস্থ করার ধ্যানমগ্নতা; ঈমানদারের প্রয়াস তাই স্রেফ তেলাওয়াতে সীমিত ছিল না। সে সাথে ছিল কোরআনের বানীকে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দেয়ার তাড়াহুড়া। ঘরে ঘরে ছিল নিজ জান ও মাল নিয়ে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক জিহাদের প্রস্তুতি। সেসব জিহাদে সাহাবগণ শুধু সঞ্চয়ের সিংহভাগই বিলিয়ে দেননি, শহীদও হয়েছেন। মুসলিমগণ তো সে পথ ধরেই বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সে সনাতন ইসলামকে তার বিশুদ্ধ পরিচয় নিয়ে বাঁচতে দেয়া হয়নি। নবীজী (সা:)’র ইসলামে যেরূপ শরিয়ত, খেলাফত, জিহাদ ও অন্য ভাষা বা অন্য বর্ণের মুসলিমদের সাথে একাত্ম হওয়ার আকুল আগ্রহ ছিল, বাঙালী মুসলিমের ইসলামে তার কোনটাই নাই। সে সনাতন ইসলাম ছেড়েছে দেশের আলেমগণও। এজন্যই রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি অঙ্গণে ইসলামের এ পরাজয় নিয়ে তাদের মাঝে কোন মাতম নেই।

বাংলাদেশে ইসলাম বেঁচে আছে মুষ্টিমেয় লোকের টুপি-দাঁড়ি, দোয়া-দরুদ ও নামায-রোযার মাঝে। সবচেয়ে বড় নেককর্ম রূপে গণ্য হয় কোর’আন পাঠ, দরুদ পাঠ ও মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ। সে তালিকায় ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল যেমন নাই, তেমনি নাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে কোন আগ্রহ। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠতর হওয়ার কারণ, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় ও অন্যায়ের নির্মূলে আত্মনিয়োগ। -(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১১০)। অথচ পবিত্র কোর’আনের সে কথা ভূলে তারা বাঁচছে সম্পূর্ণ বিপরীত মিশন নিয়ে। সেটি মিথ্যা ও অন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং সত্য ও ন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তেমন একটি মিশনের কারণেই বাংলাদেশ দূর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। তাদের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে কোর’আন বুঝা ও নবী-আদর্শের প্রতিষ্ঠা। মহান আল্লাহতায়ালাকে মুখে প্রভু রূপে স্বীকার করা হলেও রাষ্ট্রের উপর তাঁর কোন প্রভুত্ব বা সার্বভৌমত্ব নাই। তাঁর সে সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা নিয়ে কোন আগ্রহ নাই। আইন-আদালতে প্রবেশধাধিকার নাই শরিয়তী আইনের। সাহাবায়ে কেরামের যুগে সেটি কি ভাবা যেত? সময় শয়তানী শক্তি কি মুসলিম ভূমিতে এরূপ বিজয়ের কথা কল্পনা করতে পেরেছে? অথচ আজ আইনগত বৈধতা পেয়েছে পতিতাদের দেহব্যবসা। বৈধতা পেয়েছে সূদের ব্যবসা, মদের ব্যবসা ও জুয়া। নাচগানের অশ্লীল আসর জমানোও অপরাধ নয়। পাপাচারীদের সারাক্ষণ নিরাপত্তা দেয় জনগণের অর্থে প্রতিপালিত পুলিশ। দেশে রাজনীতিতে পূর্ণ আজাদী রয়েছে নাস্তিক, সোসালিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট –তথা সকল প্রকার ইসলামবিরোধীদের। কিন্তু সন্ত্রাস রূপে চিহ্নিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার আইনের প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে ময়দানে নামা। ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হত্যাকাণ্ডকে বলা হয় আইনের শাসন। সেরূপ নির্মূলকরণকে বৈধতা দিতে আরো নতুন আইন প্রণোয়ন করা হচ্ছে। আইন প্রণোয়নের মূল লক্ষ্য, এখানে স্বৈরাচারি সরকারকে নিরাপত্তা দেয়া, সে সাথে ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে প্রতিরোধ করা। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের কোন ভাবনা নাই। ফিরাউন, নমরুদ, হালাকু-চেঙ্গিজ ও হিটলারের আমলেও একই রূপ আইনের শাসন ছিল। সে আইনে সরকার বিরোধীদের গ্রেফতার করা, নির্যাতন করা ও হত্যা করা আইনসিদ্ধ গণ্য হত। অনুরূপ অবস্থা চেপে বসেছে বাংলাদেশের বুকেও। দেশের পুলিশ, আদালত ও প্রশাসনের কাজ হয়েছে সে আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। সরকারি দলের দুর্বৃত্তেদর হাতে লুণ্ঠিত হচ্ছে ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা, ধর্ষিতা হচ্ছে হাজার হাজার মহিলা এবং নিহত হচ্ছে শত শত মানুষ। গুম হচ্ছে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী। কিন্তু এরূপ ভয়ানক অপরাধের নায়কদের কি গ্রেফতার করা হয়েছে? দেয়া হয়েছে কি শাস্তি। অপরাধের নায়ক যেহেতু সরকারি দলের নেতাকর্মী, তাদের গ্রেফতারের ক্ষমতা পুলিশের নাই। কিন্তু  হত্যাযোগ্য অপরাধ হলো ইসলামের পক্ষে রাস্তায় বিক্ষোভে যোগ দেয়া বা সত্য কথা বলা। নিরস্ত্র মানুষের বিক্ষোভ দমনে ২০১৩ সালের ৫ মে’র রাতে শাপলা চত্ত্বরে তাই সেনাবাহিনী নামানো হয়েছিল এবং হেফাজতে ইসলামের শত শত নিরীহ মানুষকে লাশ করে গায়েব করা হয়েছিল।


দখলদারী শয়তানপন্থীদের

ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও অঞ্চলের নামে মানব জাতি শত শত রাষ্ট্র ও গোত্রে বিভক্ত হলেও মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আসল বিভাজনটি মূলতঃ দ্বি-ভাগে। এক). আনসারুল্লাহ অর্থাৎ মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারী দল, দুই). আনসারুশ শায়তান অর্থাৎ শয়তানের সাহায্যকারী দল। মহান আল্লাহতায়ালার বিচারে তৃতীয় কোন দল নাই। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারী হয়ে যাওয়া। লক্ষ্য, ইসলামের বিজয়। মুসলিম নর-নারীর উপর সেটি ফরজ। সে লক্ষ্যে সুস্পষ্ট নির্দেশ এসেছে পবিত্র কোরআনের সুরা সা’ফ’য়ের ১৪ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর আনসার (সাহায্যকারী) হয়ে যাও”। মুসলিম হওয়ার অর্থ তাই মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারী হওয়া। এ হুকুমের অবাধ্যতা হলো সুস্পষ্ট কুফরী। মহান আল্লাহতায়ালা সাহায্যকারী  হওয়ার অর্থ শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত আদায় নয়; বরং তাঁর  ভিশন বা ইচ্ছা পূরণে সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া। নবীজীবনের এটিই তো মূল শিক্ষা। সাহাবায়ে কেরাম তো নবী জীবনের সে শিক্ষাকেই জীবনের মিশন বানিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে বিজয়ী হয়েছিল ইসলাম; এবং  প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল শরিয়ত। যারা মহান আল্লাহতায়ালা সাহায্যকারি  হতে ব্যর্থ, তাদের সামনে শয়তানের সাহায্যকারি হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। তাদের নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে তখন মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হয় না। আর তারই উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশে মসজিদ, মাদ্রাসা ও নামাজীর সংখ্যা বাড়লেও তাতে ইসলামের বিজয় না বেড়ে দাপট বেড়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের। সরকার পরিণত হয়েছে শয়তানের সাহায্যকারীতে। সহযোগিতা বাড়ছে ভারতসহ বিশ্বের তাবত কাফের শক্তির সাথে।

যারা মহান আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাসী তারা আত্মসমর্পণ করে তাঁর প্রতিটি হুকুমের কাছে। এ আত্মসমর্পণ নিয়ে তারা কোন রূপ দ্বিধাদ্বন্দে ভোগে না। আনসারুল্লাহ হওয়ার কোর’আনী হুকুমটি তারা শুধু পাঠই করে  না, নিজ জীবনের মূল মিশনেও পরিণত করে। অপর দিকে যারা মহান আল্লাহতায়ালাতে অবিশ্বাসী, তাদের আগ্রহ থাকে না মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হতে। বরং সে হুকুমের বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহী হয় ও যুদ্ধে নামে। পবিত্র কোর’আনে এরাই চিহ্নিত হয়েছে কাফের রূপে। কাফেরদের এ বিদ্রোহে কোন কপটতা বা প্রতারণা নাই। অথচ সে কপটতা বা প্রতারণা ধরা পড়ে মুনাফিকদের জীবনে। মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়া সত্ত্বেও মুনাফিকদের যুদ্ধটি মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন ও তাঁর শরিয়তের বিরুদ্ধে। পবিত্র কোর’আনে এ বিষয়গুলো নিয়ে বার বার আলোচনা হয়েছে –যাতে মানুষ তার মৃত্যুর পূর্বে কোন দলে অবস্থান সেটি জানতে ভূল না করে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুতায় ও নাশকতায় মুনাফিকদের জুড়ি নাই। ইসলামের বিজয় তাদের কাছে অসহ্য। নবীজীর যুগে এরাই নব্য মুসলিম রাষ্ট্রের নির্মূলে কাফের ও ইহুদীদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছিল। প্রতি মুসলিম দেশে শয়তানের সাহায্যকারিদের সেটিই সনাতন নীতি। সে অভিন্ন নীতি বাংলাদেশেও। তবে পার্থক্য হলো, মদিনার মুনাফিকগণ ছিল পরাজিত। অথচ বাংলাদেশে এরা হলো বিজয়ী। ফলে মদিনার মুনাফিকদের ন্যায় ইসলামের শত্রুপক্ষ তথা কাফেরদের সাথে তারা গোপনে জোট বাঁধে না। তারা সেটি প্রকাশ্যেই করে। নিজেদেরকে আনসারুল্লাহ  বা ইসলামের পক্ষের শক্তি রূপেও তারা দাবী করে না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধ ও ইসলামের পক্ষের শক্তির নির্মূল যে তাদের রাজনীতির প্রধানতম লক্ষ্য -সেটিও তারা খোলাখোলি বলে। তাদের কারণেই দেশটিতে ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে কোন কাফের শক্তিকে ময়দানে নামতে হচ্ছে না। সেটি তারা নিজেরাই করছে। প্রতিটি মুসলিম দেশে এরাই ইসলাম ও মুসলিমের ঘরের শত্রু। নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়ার যে ভণ্ডামী -সে জন্য তাদের জাহান্নামের শাস্তিটা হবে কাফেরদের চেয়েও অধীক। পবিত্র কোরআনে তাই বলা হয়েছে, এরূপ মুনাফিকদের অবস্থান হবে জাহান্নামের সবচেয়ে নীচের স্তরে।

মহান নবীজী (সা:)’র যুগে এরূপ নিকৃষ্ট জীব তথা মুনাফিকদের সংখ্যা নগন্য ছিল না। ওহুদের যুদ্ধের সময় সে সংখ্যা ছিল প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ। সে পরিসংখ্যানটি ধরা পড়ে তখন যখন নবীজী (সা:) মাত্র এক হাজার সৈন্য নিয়ে মদিনা থেকে ওহুদের যুদ্ধে বের হন। তখন মুনাফিকদের ৩০০ জন সে বাহনী থেকে বেরিয়ে যায়। মুনাফিকদের চেনা ও আলাদা করার ব্যাপারে জিহাদ এভাবেই ছাঁকুনীর কাজ করে। এসব মুনাফিকগণ নবীজী (সা:)’র পিছনে নামায পড়তো এবং রোযা, হজ্ব, ওমরাহও পালন করতো। কিন্তু গোপনে গোপনে এরাই ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিনাশে ইহুদী ও কাফেরদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছিল। এমন মুনাফিক আজও বেঁচে আছে প্রতিটি মুসলিম দেশে, এবং বিশাল সংখ্যা নিয়ে।  নবীজী (সা:)’র যুগে সংখ্যায় কম ও পরাজিত হওয়ায় তারা লুকিয়ে লুকিয়ে ষড়যন্ত্র করতো। কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে তারা সংখ্যায় বিশাল, সে সাথে বিপুল ভাবে বিজয়ীও। ইসলামের বিরুদ্ধে এরা এতটাই উগ্র ও উদ্ধত যে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা প্রকাশ্যে যুদ্ধে নামে। বঙ্গীয় এ ভূমিতে তাদেরকে ১৭৫৭’য়ে দেখা গেছে ইংরেজদের সাথে; ১৯৭১’য়ে দেখা গেছে ভারতীয়দের সাথে। আজ দেখা যায় মুসলিম বিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের সাথে। নবীজী (সা:)’র যুগে এরূপ প্রকাশ্যে যুদ্ধ নামার সাহস মুনাফিকগণ পায়নি।

 

সংকটে পরকালীন মুক্তি

ইসলামের যে শত্রুপক্ষের হাতে বাংলাদেশ আজ অধিকৃত, তারা দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, সংবিধান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সেনাবাহিনী ও আইন-আদালতের ন্যায় অঙ্গণে ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের জন্য সামান্যতম স্থান ছেড়ে  দিতে রাজী নয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একমাত্র তাদেরই স্থান দেয়, যারা সমাজে পরিচিত মুর্তিপূজারী কাফের, নাস্তিক, সেক্যুলারিস্ট ও সোসালিস্ট রূপে। তাদের মনের ভূবনের সবটুকু দখল করে আছে ইসলাম প্রসঙ্গে নিজেদের মনগড়া ধারণা। পবিত্র কোর’আনের ব্যাখ্যা হতে হবে তাদের মনপুত, নইলে সেটির প্রচার হতে দিতে তারা রাজী নয়। যে সব বইয়ে জিহাদ বিষয়ক আয়াতের উল্লেখ আছে -সেগুলিকে তারা সন্ত্রাসের বই রূপে চিহ্নিত করে। ঘরে বা দোকানে সে সব বই রাখা বা সেগুলি পাঠ করাকে তারা দণ্ডনীয় অপরাধ গণ্য করে। মসজিদে নামায পাঠ, দরুদ পড়া বা রোযা পালন নিয়ে তাদের আপত্তি নাই; কিন্তু নবীজী (সা:)’র যুগের ন্যায় সমাজ ও রাষ্ট্রের পূর্ণ ইসলামীকরণ হতে দিতে তারা রাজী নয়। ইসলামীকরণের সে স্বপ্ন দেখাটিই তাদের কাছে অপরাধ। যারা সে স্বপ্ন দেখে তাদের বিরুদ্ধে দেয় নির্মূলের হুংকার। ফলে বাংলার মুসলিম ভূমিতে অসম্ভব হয়েছে নবীজী (সা:)’র সে সব গুরুত্বপূর্ণ সূন্নতের অনুসরণ যাতে ছিল তাঁর রাজনীতি, প্রশাসন, জিহাদ ও শরিয়ত পালন। এভাবে অসম্ভব করা হয়েছে পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। বাঙালী মুসলিমের জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে বড় সংকট। এভাবে সংকটে পড়েছে তাদের পরকালীন মুক্তি।

গুরুতর এ সংকটের কারণ, ঈমানদারীর দায়ভারটি স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিল নিয়ে বাঁচা নয়। বরং সে জন্য হলো পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচা। এখানে কোন আপোষ চলে না। কাফের হওয়ার জন্য মহান আল্লাহতায়ালার একটি মাত্র হুকুম অমান্যই যথেষ্ট। প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য অপরিহার্য হলো,  মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুমের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। একটি মাত্র হুকুম অমান্য করায় ইবলিস পাপীষ্ট শয়তানে পরিণত হয়েছে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালার বহু হুকুম অমান্য করায় বাধ্য করছে বাংলাদেশের সরকার। পবিত্র কোর’আনে ঘোষণা, “আমার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচারের কাজ করে না তারা কাফের। ..তারাই জালেম। … তারাই ফাসেক।” –(সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪, ৪৫ ও ৪৬)।  কিন্তু বাংলাদেশে কি মহান আল্লাহতায়ালার এ হুকুম মান্য করা সম্ভব? সে জন্য তো রাষ্ট্রের আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চাই। কোন অনৈসলামিক দেশে বসবাসের বড় বিপদ তো এটিই। সে বিপদ থেকে বাঁচতে ঈমানদার ব্যক্তি নিজ দেশ ছেড়ে ইসলামী দেশে হিজরত করে। অথচ সে বিপদটাই প্রকট রূপে বেড়েছে বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে। বাংলাদেশে ইসলাম বিরোধী শক্তির এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। এটিই তাদের পরিকল্পিত ডি-ইসলামাইজেশন প্রজেক্ট। তাদের লক্ষ্য, মুসলিম জনগণকে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম পালন থেকে জোর পূর্বক দূরে রাখা। নবীজী (সা:)’র ইসলাম থেকে এভাবে দূরে সরিয়ে তাদেরকে ভণ্ড মুসলিমে পরিণত করা। নামায-রোযা, হজ-যাকাতে অংশ নিয়েও মিথ্যা বলা, সূদ-ঘুষ খাওয়া, সেক্যুলার রাজনীতি ও শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা বিরুদ্ধে লাঠি ধরাও তখন এ ভণ্ডদের জন্য সহজ হয়ে যায়। বাংলাদেশে এবং সে সাথে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে, ভয়ানক ক্ষতিটি হয়েছে এরূপ অনৈসলামিক শাসকদের হাতে। বিগত হাজার বছরে খুব কম সংখ্যক মুসলিমই খৃষ্টান, বৌদ্ধ বা হিন্দু ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে। কিন্তু তাদের মাঝে ইসলামের অনুসরণে নিষ্ক্রীয় করার কাজটি হয়েছে বিপুল সংখ্যায়। ইসলাম থেকে দূরে সরা এরূপ মুসলিমগণ ইসলাম নির্মূল করার যুদ্ধে হাত মিলিয়েছে শত্রুপক্ষের সাথে। এরই ফলে বিগত কয়েক শত বছরে মুসলিমদের সংখ্যা বহুগুণ বাড়লেও শক্তি বাড়েনি। সম্মানও বাড়েনি। বরং বেড়েছে উপর্যুপরি পরাজয়। এদের কারণেই মুসলিম উম্মাহ আজ বিভক্ত। এবং আইন-আদালত থেকে নির্বাসিত হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইন। এভাবে নবীজী (সা:)’র ইসলাম অজানা ও অপরিচিত রয়ে গেছে খোদ মুসলিম দেশগুলিতে। মুসলিমের জীবনে সবচেয়ে বড় ইবাদত তাই নামায-রোযা, হজ-যাকাত, তাসবিহ-তাহলিল নয়। এরূপ ইবাদত নবীজী (সা:)’র যুগে মুনাফিকগণও করতো। আজ কোটি কোটি বাঙালী মুসলিমও সেটি করে। বরং সে পবিত্র ইবাদতটি হলো এমন জিহাদ যা রাষ্ট্রের বুক থেকে সেসব  দুর্বৃত্ত শাসকদের নির্মূল করে -যারা মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমগুলোর পূর্ণ পালনকে অসম্ভব করে। যারা সে জিহাদে প্রাণ দেয় তারা পায় বীনা হিসাবে জান্নাত। অন্য কোন ইবাদতে কি সেটি জুটে? করুণাময়ের দরবারে শহীদদের এরূপ বিশাল মর্যাদার কারণ, তাদের কারণেই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হয়; প্রতিষ্ঠা পায় শরিয়ত। এবং বাড়ে বিশ্বজুড়ে মুসলিমের শক্তি ও গৌরব। নবীজী (সা:)’র সাহাবাগণ তো সে পথে অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণদানের মধ্য দিয়েই মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করেছিলেন। কিন্তু যে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের ইতিহাস তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি ও দুর্নীতিতে বিশ্বে শিরোপা লাভে -তাদের কি এ মহান মিশনে আগ্রহ থাকে? বাঙালী মুসলিমের বিপদের মূল কারণ, দেশ জিম্মি এ দুর্বৃত্তদের হাতে। ২১/০২/২০২১