গণতন্ত্র যেখানে গণহত্যা এবং জবরদখল যেখানে লেবারেশন

ফিরোজ মাহবুব কামাল

আগ্রাসন যেখানে লিবারেশন

ইরাকী জনগণকে স্বৈরাচার থেকে  মুক্তি দিবে এবং গণতন্ত্র উপহার দিবে বলে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেন। কিন্তু তারা স্বৈরাচার থেকে আর কি মুক্তি দিবে, বরং মুক্তি দিচ্ছে অগণিত নারীপুরুষ ও শিশুকে তাদের প্রাণে বেঁচে থাকা থেকেই। গণহত্যা ও ধ্বংসকে তারা রীতিমত স্পোর্টসে পরিণত করেছে। তাদের আরেক যুক্তি ছিল, ইরাকের হাতে weapons of mass destruction তথা ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের কারখানা রয়েছে। যুদ্ধ করে সে অস্ত্র নির্মান বন্ধ করবে। সেটিও যে বিশাল মিথ্যা তাও প্রমাণিত হয়েছে। ইরাকের দক্ষিণ থেকে উত্তর সীমান্ত পর্যন্ত শত শত মাইল তারা দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এ বিশাল ইরাকী ভূমির কোথাও weapons of mass destruction এর কারখানা পায়নি। আর যদি থেকেও থাকে তবে সমগ্র ইরাকজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর এবং খোদ বাগদাদে মার্কিন সেনা প্রবেশের পর ইরাক যে এখনও সেটির প্রয়োগ করেনি -সেটিই কি প্রমাণ করে না যে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও প্রধান মন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের চেয়ে এমন অস্ত্র সাদ্দামের কাছে থাকাই বেশী নিরাপদ?

ইরাকের ভূমিতে মার্কিন ও বৃটিশ সৈনিকের উপর রাসায়নিক বোমা হামলা হলে পারমানবিক বোমা ব্যাবহার করা হবে বলে হুমকি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বুশ ও বৃটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেফরি হুন। অথচ সশস্ত্র হানাদার ঘরে ঢুকলে তার উপর হামলার অধিকার প্রতিটি গৃহকর্তারই থাকে। অবৈধ ও অন্যায় হামলার শিকার হয়েছে ইরাক। ফেলা হয়েছে হাজার হাজার টন বোমা। এমন বোমা ওয়াশিংটন বা লন্ডনে ফেলা হলে তারা কি করতো? পারমানবিক বোমাসহ কোন বিধ্বংসী মারনাস্ত্রই কি তারা গুদামে ফেলে রাখতো? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূ-খন্ডে জাপানীরা বোমা ফেলেনি, ওয়াশিংটন বা নিউয়র্কও আক্রান্ত হয়নি। অথচ জাপানের নাগাসাকি ও হিরোশিমা –এ দু’টি বৃহৎ শহরকে পারমানবিক বোমায় নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। ফলে বিশ্বে কারা সবচেয়ে দায়িত্বহীন এবং কাদের হাতে বিশ্বশান্তি সবচেয়ে বেশী হুমকীর সম্মুখীণ সেটি কি বুঝতে বাঁকি থাকে? অতএব বিশ্বকে অশান্তি ও বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে যে দেশটিকে প্রথমে অস্ত্রমূক্ত করা দরকার সেটি কি ইরাক না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?

ইঙ্গোমার্কিন সামাজ্যবাদ ইরাকের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যাকে যেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বলছে তেমনি এ বিধ্বংসী সামরিক আগ্রাসনকে বলছে লিবারেশন। অপরদিকে ইরাকীদের প্রতিরোধকে বলছে সন্ত্রাস। এভাবে ডিকশোনারিই পাল্টিয়ে দিচ্ছে। অন্যায়কে বলছে ন্যায়, চরম বর্বরতাকে বলছে সভ্যতা। আর এরাই সভ্যতা ও গণতন্ত্র শেখাতে চায় বিশ্ববাসীকে! তাদের প্রত্যাশা, ইরাকী জনগণ অস্ত্র ফেলে কুর্ণিশ করবে। তাদের মাথায় ফুল ও আতর ছিটাবে। দুনিয়ার তাবত দুর্বৃত্ত দস্যুদের একই রুচি। যে কোন দুর্বৃত্তের কাছেই অতি অনাকাঙ্খিত হলো প্রতিরোধ, সে তো চায় আত্মসমর্পণ। ইরাকী জনগণ তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে না সেটিই ইঙ্গোমার্কিন জোটের কাছে বড় অপরাধ।  সে অপরাধের শাস্তি দিতে তারা বিধস্ত করছে বাগদাদ, বসরা, কারবালা, নজফ, কিরকুক, মসোলের ন্যায় শহরগুলোকেই শুধু নয়, সমগ্র ইরাককে। সভ্যতা কি ভাবে জন্মেছিল, কি ভাবে হাঁটি-হাঁটি, পায়ে-পায়ে সামনে এগিয়েছিল – সমগ্র ইরাক হলো তারই নিদর্শন। এজন্যই দেশটিকে বলা হয় ক্রাডল অব সিভিলাইজেশন। ইঙ্গোমার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ভান্ডারের সর্বাধিক বিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে নেমেছে সেটির বিনাশে। হাজার হাজার ঐতিহাসিক নিদর্শন ইতিমধ্যে ট্যাংকের তলায় বা বোমার আঘাতে বিনষ্ট হয়েছে। মানব সভ্যতার জন্মভূমি এভাবেই আজ ধুলিস্যাৎ হচ্ছে। ফলে ইঙ্গোমার্কিনীদের অপরাধ শুধু ইরাকের বিরুদ্ধে নয়, সমগ্র মানব জাতির বিরুদ্ধে। অথচ বিশ্ববাসী সেটিই নীরবে দেখছে। সে নীরব-দর্শনকে টিভি, ইন্টারনেট, পত্র-পত্রিকা আরো সহজতর করে দিয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ও আই সি,  আরব লীগসহ সকল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে আজ একই মৃত্যুবৎ নীরবতা।

 

ষড়যন্ত্র গণতন্ত্র নির্মূলে

আর স্বৈরাচার-মুক্তির কথা? বোমায় কি কখন স্বৈরাচার নির্মূল হয়? ইরানের শাহ, চিলির পিনোশে, ফিলিপাইনের মার্কোস বা ইন্দোনেশিয়ার সোহার্ত কি বোমায় নির্মূল হয়েছে? বোমায় যারা নির্মূল বা পঙ্গু হয় তারা নিরীহ মানুষ, স্বৈরাচার নয়। বরং এতে নয়া স্বৈরাচারের রাস্তা প্রস্তুত করা হয়। আফগানিস্তানে সেটিই হয়েছে। তাছাড়া এ বিশ্বে স্বৈরাচারের সংখ্যা কি কম? মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি দেশেই তো স্বৈরাচার। এবং তাদের নির্মূলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব, কুয়েত, জর্দানসহ সর্বত্র কি তাদের পাহাদারির ব্যবস্থা করতে মার্কিন বা বৃটিশ সৈন্য মোতায়ান করা হয়নি? অপর দিকে স্বৈরাচার নির্মূল ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কারণেই কি ইরানের উপর বিপদ নেমে আসছে না? প্রেসিডেন্ট কার্টারের সময় একবার হামলাও করা হয়েছিল। এ দেশটির প্রতি মার্কিনীদের এখনও আক্রোশ এ কারণে যে কেন মার্কিন যুক্তরাষ্টের  তাঁবেদার মহম্মদ রেজা শাহকে উৎখান করা হলো। একই অপরাধে ১৯৫৬ সালে ইরানে সামরিক অভ্যুর্থাণে উস্কানি দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তখন তারা দেশটির নির্বাচিত প্রধান মন্ত্রী মোসাদ্দেককে হটিয়ে বিতাড়িত শাহকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে শাহ পুণরায় বিতাড়িত হয়ে আশ্রয় পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

মার্কিনীদের আগ্রহ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নয়, বরং গণতন্ত্রের নির্মূলে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মার্কিনীদের এত আগ্রহ থাকলে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওম্মান, জর্দান ও বাইরাইনের ন্যায় দেশগুলীতে তা হচেছ না কেন? এ সব রাষ্ট্রে গণতন্ত্রচর্চা দূরে থাক, রাস্তায় সভা, মিছিল বা মত প্রকাশের অধিকারও নেই। অথচ এসব দেশের সরকার মার্কিনীদের অতি পছন্দের। জনগণ যেহেতু মার্কিন হামলার বিরোধী, ফলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে এ দেশগুলির ঘনিষ্টতা বাড়তো ইরাকের সাথে। মার্কিনীদের ঘাঁটি নির্মান তখন কি সম্ভব হতো? তখন তেলের উপর প্রতিষ্ঠিত হতো জনগণের মালিকানা। অতএব বাধাপ্রাপ্ত হতো তেলের লুন্ঠন। এটিই কি তাদের গণতন্ত্রের সাথে শত্রুতার মূল কারণ নয়?   

মার্কিনীদের এসব ধোকাবাজী জনগণ যে বুঝে না তা নয়। জনগণ কি এতই বোকা যে হীংস্র পশুর নখরে ভাইবোন ও নিজ শিশুদের ছিন্ন ভিন্ন হতে দেখেও সে পশুটিকে আলিঙ্গণ করবে? ভেবেছিল, ইরাকের ধ্বংসে হাজার হাজার টন বোমা ফেললে কি হবে তাদের সৈন্যদেরকে আহলান সাহলান বলা হবে। সম্ভার্ধনা জানাতে প্রতি জনপদে মিছিল হবে। কিন্তু কোথাও সেটি হয়নি। ইরাকে কেন, সমগ্র আরব বিশ্বে হয়নি। যেটি হয়েছে সেটি শাসক মহলে। কারণ তারাই মার্কিনীদের আসল প্রজা। এ আগ্রাসী শক্তিকে তারাই সর্বপ্রকার সহায়তা দিচ্ছে। পবিত্র হজ্ব বা উমরাহ পালনে ভিসা পেতে একজন মুসলিমকে কতো ঝামেলাই না পোহাতে হয়, অথচ মার্কিনীদেরকে অবাধ অনুমতি দিয়েছে এ পবিত্র ভূমিতে অস্ত্র নিয়ে ঢুকার। অধিকার দিয়েছে ঘাঁটি নির্মানের। মার্কিনীরা অবাধ সুযোগ পেলেও জনগণ সুযোগ পাচ্ছে না ইরাকী মুসলমানদের ধ্বংস ও মৃত্যু দেখে প্রতিবাদে রাস্তায় নামার। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশও তারা নিষিদ্ধ করেছে। এ ভয়ে না জানি অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তাদের অভ্যাসে পরিণত না হয়। কারণ, নিজেদের বর্বর শাসনই তখন অসম্ভব হবে। নিজেদের অন্যায় হামলাকে জায়েজ করতে বুশ ও ব্লেয়ার বহু বার বলেছেন, সাদ্দাম হোসেন প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি। ইরাকের প্রতিবেশী ইরান ও সিরিয়া, ফলে তাদের কথা মতো সাদ্দামের পতনে এ দেশ দুটি সর্বাধিক খুশী হবে সেটি ছিল স্বাভাবিক। অথচ মার্কন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রামসফিল্ড ও সেক্রেটারী অব স্টেটস কলিন পাওয়েল ইরান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে হুশিয়ারি দিয়েছে যে তারা ইরাককে সহায়তা দিচ্ছে। অতএব ইরাক প্রতিবেশী দেশগুলির প্রতি হুমকি – এ অভিযোগের সত্যতা কোথায়? ফলে ইরাকের উপর আগ্রাসনের সমগ্র ভিত্তিটাই যে মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত তা নিয়ে সন্দেহ থাকে কি?

 

সংঘাত সভ্যতার

ইরাকে আজ যে বর্বরতা চলছে সেটি কি শুধু জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের? এ যুদ্ধ সমগ্র পুঁজিবাদী সভ্যতার্। এবং এটি ইসলামের বিরুদ্ধে। সামরিক আগ্রাসন, অর্থনৈতিক শোষণ ও গণহত্যা – এগুলি পুঁজিবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার সার্বজনীন সংস্কৃতি। শোষণ-নির্ভর এ সভ্যতার এ গুলোই হলো মূল উপকরণ। এজন্যই আগ্রাসন ও গণহত্যা চালাতে নিজ দেশে সমর্থণ পেতে এদের সামান্যতম বেগ পেতে হয় না। প্রতিটি সফল ডাকাতি ডাকাত পরিবারে আনন্দের হিল্লোল বয়ে আনে। কারণ, এতে রাতারাতি বৃদ্ধি ঘটে বিত্ত-বৈভবে। যে সমৃদ্ধি বাড়াতে অন্যদের যে ভাবে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটতে হয় -তাদের সেটির প্রয়োজন পড়ে না। তাই ইরাকের পতন অত্যাসন্য দেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের প্রায় প্রতি মহলে আনন্দের হিড়িক। এ স্বার্থচেতনা থেকে এদের সবচেয়ে বিবেকবান ব্যক্তিরাও মূক্ত নয়। ফলে ডেইলি গার্ডিয়ান ও মিররের মত পত্রিকাও চায় এ আগ্রাসী য্দ্ধুটি বৃটিশ সৈন্যরা নিরাপদে সমাধা করুক। ব্রিটেনের লেবারেল ডিমোক্রাটিক পার্টির মত দল যারা প্রথমে যুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল তারাও চায় তাদের সৈন্যদের বিজয়। এমন কি মি. রবিন কুক যিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করছেন তিনি ইরাকের ত্বরিৎ পরাজয় চান। একই অবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সাথে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের যত বিরোধই থাক, মার্কিন আগ্রাসন যাতে সফল হয় সেটিই তাদের অভিন্ন এজেন্ডা।

এমন এক অভিন্ন চেতনার কারণেই পরদেশে আগ্রাসন ও গণহত্যায় পুঁজিবিণিয়োগে তাদের পুঁজির অভাব হয় না। বৃটেনে এখন অর্থনৈতিক মন্দা। স্বল্প মজুরীর কারণে কর্মচারিরা বিক্ষুব্ধ, অনেকে ধর্মঘটেও নেমেছে। কিন্তু তাদের বেতন বাড়ানোর পয়সা না থাকলে কি হবে, সরকার তিন বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছে যুদ্ধ খাতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪ কোটিরও বেশী মানুষের স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত, কিন্তু সে দেশের সরকার যুদ্ধ খাতে ৭৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছে। একই কারণে অতীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নিজেদের নিম্ন মানের কাপড়ের বাজার বাড়াতে যখন বাঙলার মসলিন শিল্পীদের হাতের আঙ্গুল কাটছিল তখনও সে জঘন্য কাজে অর্থের জোগানদার পেতে তাদের বেগ পেতে হয়নি। পুঁজি বিনিয়োগে তখনও কমতি পড়েনি যখন নিগ্রোদের গলায় রশি বেঁধে হাটে বাজারে বিক্রি করাকে বাণিজ্যে পরিণত করেছিল বা রেড ইন্ডিয়ানদের নির্মূলকে রাজনীতি ভাবতো। ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এটিই হলো ঐতিহ্য। ইরাকের বিরুদ্ধে একটি অন্যায় যুদ্ধ বিপুল ভোট পার্লামেন্টে কেন গৃহীত হয় -সেটি বুঝতে কি এর পরও কিছু বাঁকি থাকে?

 

উলঙ্গ হলো সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র

অবর্ণনীয় দুঃখের পাশে ইরাকে আগ্রাসন ও গণহত্যা বিশ্ববাসীকে এক অপূর্ব সুযোগও দিয়েছে। সেটি হলো, পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ যে কতটা বর্বর সেটি। এ বিষয়টি কোটি কোটি ঘন্টা বক্তৃতা দিয়ে বা হাজার হাজার বই লিখে বুঝানো সম্ভব হতো না। সাম্রাজ্যবাদ এখন স্বমূর্তিতে হাজির। দূর্বৃত্তের বন্ধু হওয়ার মধ্যে প্রচন্ড অসম্মান আছে। সমাজের দুর্বৃত্তরা এজন্য অর্থশালী হলেও বন্ধুহীন হয়। ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা তেমনি এক অবস্থার মুখোমুখী বিশ্বজুড়ে। ফলে যে ফ্রান্স, জার্মান ও বেলজিয়াম সেদিনও যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের সাথে গলায় গলায় ভাব রেখেছে তাদের কাছে ভিড়তেও আজ তারা ভয় পায়। এ ভয়ে যে, তাদের গায়ের গলিত দূর্গন্ধ না জানি নিজেদের গায়ে জড়িয়ে না যায়। একই ভয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জালেম স্বৈরাচারিরা গোপনে সহযোগীতা করলে প্রকাশ্যে মার্কিনীদের প্রশংসা করা বাদ দিয়েছে।

ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অধিকৃত জনগণের প্রতিরোধকে সাম্রাজ্যবাদী মগল যতই সন্ত্রাস বলে চিত্রিত করুক না কেন -এ যুদ্ধ জিহাদ রুপে গণ্য হচ্ছে সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে। শিয়া-সূন্নী, হানাফী-শাফেয়ী, আরব-অনারব -কারো মধ্যেই এ নিয়ে আজ মতবিরোধ নেই। এটি যে শতভাগ ধর্ম যুদ্ধ সে ফতোয়া আসছে শিয়া ও সূন্নী উভয় পক্ষ থেকেই। মুসলিম বিশ্বকে আর কোন বিষয়ই এতটা একতা বদ্ধ করতে পারিনি -যা এ আগ্রাসন পেরেছে। এটি এক বিরাট অর্জন। প্রতিটি বিবেকমান মানুষের দায়িত্ব, এ বিরল অর্জনকে ধরে রাখা। মানব সভ্যতার স্থায়ী মূল্যবোধ নির্মাণ করতে হবে এ অন্যায় ও অসভ্যতার বিরুদ্ধে ঘৃনাবোধকে চির-জাগ্রত রাখার মধ্য দিয়ে। এ ঘৃনাবোধ বাঁচলে বিবেকবান মানুষ মাত্রই তাদের তাঁবেদার হতে ঘৃণা করবে।

 

ষড়যন্ত্র মানবিক মূল্যবোধ নির্মূলে

সবাই জানে দুর্বৃত্তিতে অর্থপ্রাপ্তি ঘটে। কিন্তু এরপরও বিবেকবান মানুষ মাত্রই সে পথে যে পা বাড়ায় না -সেটি দূষ্ট কর্মের প্রতি তীব্র ঘৃনাবোধ থেকেই। কিন্তু জালিমগণ সেটিই মুছে ফেলতে চায়। দুর্বৃত্ত শাসকের ক্ষমতা লাভে জাতীয় জীবনে যে মহাবিপর্যয়টি ঘটে -সেটি এই মূল্যবোধের ক্ষেত্রে। বিপর্যস্ত এ মূলবোধের কারণে এজিদের ন্যায় দূর্বৃত্তের সৈনিক হওয়ার মধ্যেও পাপবোধ  থাকে না। এ পাপবোধকে নির্মূল করতেই মুসলিম বিশ্বের জালেম শাসকেরা সবসময়ই স্বচেষ্ট হয়েছে যে মানুষের স্মৃতি থেকে এজিদদের কুকর্ম মুছে যাক। ভুলে যাক কারবালার অতি বিয়োগান্ত ঘটনা। ভুলে যাক ইমাম হোসেনের শাহাদতের শিক্ষা। উমাইয়াদের থেকে শুরু করে সর্বযুগের স্বৈরাচারি এজিদদেরা এজন্য বিস্তর অর্থ ব্যয় করেছে আলেমদের পিছনে। আশুরা আসে, আশুরা চলেও যায়। আশুরা নিয়ে বহুবিধ আলোচনাও হয়। লম্বা আলোচনা হয় নফল রোজার ফজিলত নিয়ে। কিন্ত যে ফরজকে সমূন্নত রাখতে মুসলিমদের সার্বজনীন ইমাম ও জান্নাতের যুব-সর্দার ইমাম হোসেন শহিদ হলেন তা নিয়ে অধিকাংশ মসজিদে আজ আর অলোচনাই হয় না। এটিই হলো আজকের আলেমদের বড় বিচ্যুতি। যেন ইমাম হোসেন শিয়া এবং তিনি শিয়াদের! বিভ্রান্ত আলেমদের কারণে এ পৃথিবীতে মহান আল্লাহতায়লার একমাত্র প্রতিষ্ঠান মসজিদগুলো প্রাণহীন হয়েছে। মুসলিম বিশ্বজুড়ে আজ যে এজিদদের সংখ্যাবৃদ্ধি, শরিয়তের অনুপস্থিতি এবং ইমাম হোসেন (রাঃ) অনুসারিদের কমতি -সেটি তো ইমাম হোসেনের (রাঃ) সে শিক্ষাকে ধরে না রাখার কারণেই। এবং সেটি প্রতিরোধহীন করেছে এমন কি কাফের শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও। মুসলিম বিশ্বে আজ যে দুর্গতি তার মূল কারণতো এই বিচ্যুতি।

একই কৌশলে সাম্রাজ্যবাদীরাও চায় তাদের র্বরতার বিরুদ্ধে যে ঘৃনাবোধ সৃষ্টি হয়েছে সেটি মুসলিম মানস থেকে মুছে ফেলতে। এমন ঘৃণাবোধ তখনও সৃষ্টি হয়েছিল যখন তারা লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনীদের ভিটাছাড়া করে ইসরাইল প্রতিষ্টা করেছিল। আগুণ ধরিয়ে দিয়েছিল বাইতুল মোকাদ্দসে। কিন্ত ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রজ্যবাদের বিরুদ্ধে সে ঘৃণাবোধ স্থায়ী হয়নি। দুর্বত্ত মাত্রই জানে, অর্থে শুধু শাক-শবজিই কেনা যায় না, বিস্তর মানুষও কেনা যায়। বিশ্ব জুড়ে সিআইএ ও বৃটিশ গুপ্তচর সংস্থা মানব-ক্রয়ের সে কাজটিই করেছে। যে মিশর ছিল ইসরাইলের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে যুদ্ধাংদেহী সে মিশরকে কিনতে তারা কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এ অর্থব্যয় যে শুধু আনোয়ার সা’দাতের মত সেক্যুলারিষ্টদের উপর হয়েছে তা নয়, এ অর্থ এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে পৌছেছে যেখানে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মোজাহিদ সৃষ্টির সম্ভ্বানা রয়েছে। ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রজ্যবাদ এ লক্ষে কোয়ালিশন গড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারি রাজা-বাদশাহ ও শেখদের সাথে। এ কোয়ালিশন যে কতটা গভীর সেটি কি ইঙ্গো-মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে এসব রাজাবাদশাহ ও শেখদের নীরবতাই কি প্রমাণ করে না?

বনের পাখি ধরতে শিকারী যেমন খাঁচার পাখিকে ব্যবহার করে, তেমনি মুসলিম বিশ্বের বহু নেতা, সংগঠন, লেখক ও  বুদ্ধিজীবী ক্রয়ে সিআইএ এসব জোব্বাধারী রাজাবাদশাহ ও শেখদের ব্যবহার করেছে। ফলে অধিকৃত হয়েছে মুসলিম দেশগুলিই শুধু নয়, বরং হাজার হাজার মসজিদ, মাদ্রাসা, ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলন। মুসলিম বিশ্বের বিপদ এখানেই। ফলে পবিত্র মক্কায় শত শত হাজী-হত্যকে মুসলিম বিশ্ব যেভাবে ভুলে গেছে বা ইসরাইলের অস্তিত্বকে যেভাবে নীরবে মেনে নিচ্ছে তেমনি হয়তো ভূলে যাবে ইরাকের উপর ইঙ্গো-মার্কিন বর্বরতাকেও। তখন গণহত্যা স্বীকৃতি পাবে মানবাধিকার রূপে এবং জবরদখলও চিত্রিত হবে ইরাকের লেবারেশন রূপে। কিন্তু কথা হলো, মুসলিম বিশ্বের বিবেকমান মানুষ গুলোও কি এসব মেনে নিবে? তাদের কি এ নিয়ে কিছুই করার নেই?  ০৭/০৪/২০০৩ 




বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদী তান্ডব এবং বিপন্ন মুসলিম-বিশ্ব

ফিরোজ মাহবুব কামাল

সাম্রাজ্যাবাদের কেন বহুজাতিক রূপ?

পুঁজিবাদী অর্থনীতি যেমন তার বিশ্বব্যাপী দাপট ও শোষন প্রক্রিয়া চালু রাখতে বহুজাতিক কোম্পানীর রূপ নিয়েছে, তেমন বহুজাতিক কৌশল নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদের বিশ্ব রাজনীতিও। আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ এখন পুঁজিবাদী বিশ্বের বহুজাতিক প্রজেক্ট। সে বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদই হাজির হয়েছে ইরাক ও আফগানিস্তানে। ইরাক ও আফগানিস্তান দখলের চেষ্টা এই প্রথম নয়, অতীতেও হয়েছে। হামলা করেছিল এক সময়ের প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ব্রিটেন। আফগানিস্তানে দুই দুই বার হামলা করে ভয়ানক ভাবে পরাস্ত হয়েছিল তারা। হামলা করেছিল সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বশক্তি সোভিয়েত রাশিয়াও। আফগানিস্তানে প্রায় দশ বছর চেষ্টা করেও রাশিয়া ব্যর্থ হয়েছে। যে কোন যুদ্ধই বিপুল অর্থক্ষয় ও রক্তক্ষয় হয়। সে অর্থক্ষয় ও রক্তক্ষয়ের কারণে সোভিয়েত রাশিয়া নিজেই টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। প্রায় এক শত বছর আগে ব্রিটিশ বাহিনী ইরাক দখল করেছিল। কিন্তু ধরে রাখার সামর্থ্য না থাকায় হটে আসতে বাধ্য হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নতুন উপলব্ধি হলো, কোন দেশের একার পক্ষে অন্য দেশ দখল করা ও সেখানে অধিকার জমিয়ে রাখা -এখন অসম্ভব।

বিশ্বশক্তি রূপে টিকে থাকার খরচটি বিশাল। সে খরচ পোষাতে না পেরেই সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে গেছে। একই কারণে অতীতে ব্রিটিশ ও ফরাসী উপনিবেশিক শাসনেরও সমাপ্তি ঘটেছিল। তাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতসহ এশিয়া-আফ্রিকা থেকে যে ভাবে ভেগে আসতে বাধ্য হয়েছিল -সেটি কোন মানবিক মূল্যবোধের কারণে নয়। তবে বাস্তবতা হলো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হলেও, ইংরেজদের মন থেকে সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা বিলুপ্ত হয়নি। অন্য দেশের উপর আগ্রাসী হামলা ও গণহত্যা পরিচালনায় ব্রিটিশ সরকারকে তাই জন-সমর্থণ পেতে অসুবিধা হয়না। হামলা ও গণহত্যার মধ্য দিয়ে অন্যদেশের উপর অর্জিত আধিপত্য নিয়ে ব্রিটিশ মিডিয়াতে প্রচন্ড উল্লাসও হয়। যে বিপুল উল্লাসটি ইরাক ও আফগানিস্তানে হামলার সময় বিবিসিসহ সকল ব্রিটিশ মিডিয়াতে দেখা গেছে। যুদ্ধের পর সংসদীয় নির্বাচনে টনি ব্লেয়ারের ন্যায় গণহত্যার নায়কগণ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয় তো -সে কারণেই। তাই নৈতিক দিক দিয়ে লর্ড ক্লাইভের আমলের ব্রিটেন ও আজকের ব্রিটেনের মাঝে পার্থক্য অতি সামান্যই। সে সময় আধিপত্য বিস্তারে তারা ঘুষ দিত মীর জাফরের ন্যায় দুর্বৃত্ত গাদ্দারদের। এখন ঘুষ দিচ্ছে মধ্য প্রাচ্যের স্বৈরাচারি রাজা-বাদশাহদের। সৌদি আরবের সাথে বাহাত্তর বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তিতে যে বিপুল ঘুষ দেওয়া হয়েছিল সে দেশের রাজপরিবারের সদস্যদের -সে তথ্য ফাঁস করেছে ব্রিটিশ মিডিয়া। যে কোন সভ্য দেশে এটি এক গুরুতর অপরাধ। অথচ সে  অপরাধের তদন্তে যে নৈতিক দায়িত্ববোধটুকু থাকার দরকার -ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রি টনি ব্লেয়ার সেটিও দেখাতে পারেননি। এটিই হলো ব্রিটিশ শাসকচক্রের নৈতিকতার প্রকৃত মান।

 

খরচ বেড়েছে সাম্রাজ্যবাদের

সাম্রাজ্যবাদী দেশের একক সামরিক শক্তির দূর্বলতা নিয়ে সম্প্রতি সত্য কথাটি বলছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুটিন। জার্মানীতে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘‘বিশ্বশক্তি রূপে টিকে থাকাটি অতি ব্যয়বহুল। কোন একক দেশের সে সামর্থ্য নাই।’’ সে সত্যটি উপলদ্বি করেছে এমন কি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্রপক্ষও। এজন্যই মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ তার স্ট্রাটেজীই পাল্টে ফেলেছে। একই কারণে ফকল্যান্ড হামলার পর ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কোন দেশেই একাকী যায়নি। গেছে বহু জাতিক বাহিনীর সদস্য রূপে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের বিরুদ্ধে একাকী হামলা চালাতে ভয় পেয়েছে। এজন্যই বহুজাতিক হামলার পথ বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকের উপর হামলায় মার্কিন বাহিনী এজন্যই সাথে নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া, ইটালি, স্পেন, ক্যানাডা, কোরিয়া, পোলান্ড, বুলগেরিয়া, চেক রিপাবলিকসহ বহুদেশের সেনাবাহিনীকে। সহযোগিতা নিয়েছিল বা ভূমি ব্যবহার করেছিল সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ প্রায় সকল দেশের। অপর দিকে আফগানিস্তানে যুদ্ধ করছে ন্যাটোর সম্মিলিত বাহিনী। ন্যাটো যে বহুজতিক সাম্রাজ্যবাদের সামরিক ফ্রন্ট এখন আর সেটি গোপন বিষয় নয়। বহুজাতিক কোম্পানী যেমন নিজেদের বাজার ও মুনাফা বাড়াতে বাজারে শেয়ার ছাড়ে, তেমনি শেয়ার ছেড়েছে বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদী জোটও। এবং সেটি মুসলিম দেশগুলিতেও। ১৯৯১ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে হামলায় সে জোটের শেয়ার হোল্ডার রূপে তাই ডাক পড়েছিল বহু মুসলিম দেশের সমারিক বাহিনীর।

হিংস্র পশুর আসল চেহারা টের পাওয়া যায় তখন যখন সে ক্ষুদার্ত হয়। বিষয়টি অভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক্ষেত্রেও। গণতন্ত্র, বিশ্বশান্তি ও মানবিক অধিকারের বড় বড় বুলি নিয়ে ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্ররা বড্ড মুখর। কিন্তু এরূপ অতি মানবিক বিষয় নিয়ে তাদের আগ্রহ যে সামান্যই সেটি পূর্বের ন্যায় আজও প্রমাণিত হচ্ছে ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, লেবাননসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি কোনে। তাদের আসল চেহারা নিয়ে তাই কোন দিব্যমান ব্যক্তির দ্বিধা-দ্বন্দের থাকার অবকাশ নাই। ইরাকে হামলার সময় তারা বলেছিল, তাদের যুদ্ধ নিছক সাদ্দামের বিরুদ্ধে, ইরাকের জনগণের বিরুদ্ধে নয়। সাদ্দামকে তারা মারাত্মক যুদ্ধাপরাধি রূপে চিত্রিত করেছিল। এ অভিযোগে তাকে হত্যাও করেছে। কিন্তু সাদ্দাম হোসেনের শাসনের শেষ হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শেষ হয়নি। এখন লিপ্ত ইরাকের জনগণ হত্যায়। তাদের যু্দ্ধের কারণে প্রায় এক লক্ষ মানুষ ইতিমধ্যে নিহত হয়েছে। দিন দিন সে হত্যাকান্ড আরো তীব্রতর হচ্ছে। কিন্ত তা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী মহলে কোন দুঃখ বা ক্ষোভ নেই। তাদের আসল লক্ষ্য সাদ্দাম বা তার সরকার ছিল না। লক্ষ্য ছিল ইরাকের তেল এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা। এ লক্ষ্যে তারা দেশটির উপর পূর্ণ আধিপত্য চায়। সাদ্দাম ছাড়া অন্য কেউ থাকলেও তারা দেশটিকে দখলে নিত। তার ইরাকের উপর হামলা যে নিছক একটি বহু জাতিক সাম্রাজ্যবাদী প্রজেক্ট তা নিয়ে আর কি কোন সন্দেহ থাকে?

 

বিভক্ত মুসলিমবিশ্ব ও দেশীশত্রুর অধিকৃতি

মুসলিম দেশগুলির সমস্যা শুধু বিদেশী শক্তির অধিকৃতি নয়, বরং সেটি দেশী শত্রুদের অধিকৃতিও। প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে জেঁকে বসে আছে নৃশংস স্বৈরশক্তি। নিজেদের গদি বাঁচাতে তারা ভয়ানক গণহত্যাতেও রাজী। বাংলাদেশে হাসিনার হাতে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যা, মিশরের জেনারেল সিসির কায়রাতে রাবা আল-আদাবিয়ার গণহত্যা এবং পাকিস্তানের ইসলামাবাদে জেনারেল মোশাররাফের লাল মসজিদের গণহত্যা তো -সে নৃশংস অধিকৃতিরই প্রমাণ। তাদের কারণে বিদেশী হামলার বিরুদ্ধে লন্ডন, ওয়াশিংটন, রোম, প্যারিসের ন্যায় সাম্রাজ্যবাদী দেশের রাজধানিতে বড় বড় মিছিল হলেও অধিকাংশ মুসলিম দেশে তা হয়নি।

মুসলিম বিশ্বের বড় সমস্যা হলো অনৈক্য। অন্য দেশে হামলা, গণহত্যা, দস্যুবৃত্তি ও আধিপত্য বিস্তারে বহু জাতিক সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে যে অটুট ঐক্য -সে রূপ ঐক্য মুসলিমদের মাঝে নেই। অথচ মুসলিমদের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কাজটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আরোপিত ফরজ বিধান। অনৈক্য ইসলামে শতভাগ হারাম। হারাম হলো, হামলাকারি কাফের বাহিনীর সাথে সহযোগিতা করা। অথচ সূদ-ঘুষ ও পতিতাবৃত্তির ন্যায় সে হারাম চর্চা বেড়েছে প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে। তাই ইরাকের উপর হামলা ও সেদেশে মুসলিম হত্যার লক্ষ্যে যখন মার্কিন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষ থেকে ডাক পড়লো -তখন তাঁবেদার ভৃত্যের ন্যায় সে ডাকে সাড়া দিল বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশরসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশ।

 

যে আগ্রাসন অনিবার্য

মুসলিম বিশ্বের, বিশেষ করে আরব বিশ্বের, সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যেমন তেল, তেমনি সকল সমস্যার মূল কারণও হলো এই তেল। তেল সম্পদ আরব ভূমিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হামলার লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করেছে। আরবদের মর্যাদা না বাড়িয়ে সে সম্পদ দাসত্বের জিঞ্জির পড়িয়েছে। বিশাল তেল সম্পদের কারণেই এ মুসলিম ভূমিতে সাম্যাজ্যবাদীরা পৃথিবীর অপর গোলার্ধ থেকে ছুটে আসছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয়ের পর মুসোল ও কিরকুকের বিশাল তেল খনি দেশটিতে ডেকে এনেছিল বৃটিশের সাম্রাজ্যবাদী শাসন। ইরাক এখনও বিশ্বের দ্বিতীয় তেল উৎপাদনকারি দেশ। ফলে বিপদ থেকেই গেছে। নিরীহ মেষ শাবক দেখে ছুটে আসে যেমন ক্ষুদার্ত নেকডে, ইরাকের তেল সম্পদ দেখে তেমনি ধেয়ে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, দেশটির প্রতিদিন প্রয়োজন পড়ে ২০ মিলিয়ন ( দুই কোটি) ব্যারেল। খাদ্য ছাড়া প্রাণ অচল, তেমনি তেল ছাড়া মার্কিনীদের অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রাও অচল। তেল ভিন্ন তাই বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের সামর্থ্য আসবে কী করে? ফলে এ তেল ক্ষেত্র দখলে রাখার প্রয়োজনটি বিশাল। ইরাকের তেলের উপর একক দখলদারি থাকার কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর উপর ইঙ্গোমার্কিনীদের বিজয় সহজতর হয়। বাস্তবতা হলো, মার্কিনীদের প্রতিদিন দুইকোটি ব্যারেল তেলের জোগানদানের সামর্থ্য সৌদি আরবের নেই। এমন তেল ভান্ডার তাদের নিজ ভূমিতেও নেই। তাছাড়া সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিনীরা এমনিতে উদ্বিগ্ন। তারা চিন্তিত, এ দেশ থেকে তাদের তেলের জোগান কতটা বহাল থাকবে -তা নিয়ে।

দস্যুকে বাঁচতে হয় লাগাতর দস্যুবৃত্তি নিয়ে। নইলে তার ঠাটবাট ও সংসার চলে না। ফলে দস্যুর জীবনে ডাকাতি তাই সংস্কৃতি ও নেশায় পরিণত হয়। তেমনি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে তার দম্ভ নিয়ে বাঁচতে নানা দেশে আগ্রাসনে নামতে হয়। ম্যালেরিয়ার জীবাণূ শরীরে ঢুকলে জ্বরের কাঁপুনি অনিবার্য; তেমনি চেতনায় সাম্রাাজ্যবাদ বাসা বাঁধলে শুরু করে অন্যের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন। নতুন ক্ষেত্র সে খুঁজবেই। জর্জ বুশ, টনি ব্লেয়ার বা ভ্লাদিমির পুটিনের মধ্যে এ ক্ষেত্রে তাই সামান্যতম পার্থক্যও নেই। বনের সব বাঘই একই চরিত্রের। তেমনি অবস্থা সকল সাম্রাজ্যবাদীরও। তাই মুসলিম ভূমিতে যতদিন সম্পদের ভান্ডার থাকবে, ততদিন থাকবে সাম্রাজ্যবাদী হামলার বিপদও। তাই ইরাক বা আফগানিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রথম হামলা যেমন নয়, তেমনি শেষ হামলাও নয়।

ডাকাত পল্লীতে সম্পদশালী থাকাটাই বিপদ। একই রূপ বিপদ, সাম্রাজ্যবাদ কবলিত এ বিশ্বে সম্পদশালী থাকাটিও। মুসলিম উম্ম্হার বড় বিপদ একারণেই। এজন্যই অতি প্রয়োজন হল প্রতিরক্ষার সদাপ্রস্তুতি ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্য। সেরূপ একটি সদা-প্রস্তুতির হুকুম এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে, ‘‘ওয়াদ্দালাহুম মাস্তাতাতুম বিল কুউয়া।’’ অর্থ: ‘‘তাদের বিরুদ্ধে সদা প্রস্তুতি নাও সর্বশক্তি দিয়ে।’’ –(সুরা আনফাল আয়াত ৬০)। শুধু প্রস্তুতিই ফরয নয়, সে সাথে অপরিহার্য হলো একতা। ইসলামে পরস্পরে একতাবদ্ধ হওয়াটি নামায-রোযার ন্যায় ফরজ। ঐক্য বুঝাতে বলা হয়েছে, ‘‘কা আন্নাহুম বুনইয়ানুম মারসুস’’ অর্থাৎ সীসা ঢালা দেওয়ালের ন্যায় অটুট। এবং আরো বলা হয়েছে, মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তারা প্রিয় যারা যুদ্ধ করে তার রাস্তায় সীসী ঢালা প্রাচীরের ন্যায়। তাই মহান আল্লাহতায়ালার বড় অবাধ্যতা শুধু নামায-পরিত্যাগ করা নয়, সেটি হলো শত্রুর বিরুদ্ধে নিজেকে প্রস্তুত না রাখা। এবং সে সাথে বিভক্ত থাকাটিও। এরূপ অবাধ্যতা মহাপাপ। এমন পাপ কাফের শত্রুর অধিকৃতির ন্যায় ভয়ানক আযাব ডেকে আনে। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব আজ মূলত সে আযাবেরই শিকার। 

 

লক্ষ্য: জনগণকে শক্তিহীন ও অধিকারহীন রাখা

মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতির অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: এক). মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের উপর অব্যাহত আধিপত্য। দুই). সম্পদের উপর তাদের খলিফা স্বৈরাচারি শাসক গোষ্ঠির পাহারাদারি এবং রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা থেকে জনগণকে দূরে রাখা। সে লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে মধ্যপ্রাচ্যে -বিশেষ  করে তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোতে অসম্ভব করে রাখা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জোটভূক্ত দেশগুলো এ লক্ষ্যে আপোষহীন। আরব জগতে স্বৈরাচার-বিরোধী যে গণ-আন্দোলন হয়েছিল -সেটি একারণেই তাদের ভাল লাগেনি। সে গণ-বিস্ফোরণ থেকে স্বৈরাচার বাঁচাতে পরিকল্পিত ভাবেই সে জোয়ার আর বেশী দূর এগোতে দেয়নি। মিশরবাসীর জন্য যে অভূতপূর্ব অধিকার অর্জিত হয়েছিল সেটি তারা দ্রুত নস্যাৎ করে দেয়। সামরিক ক্যু’র মাধ্যমে সে দেশের ইতিহাসে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট ড. মহম্মদ মুরসীকে অপসারণ করা হয় এবং জেলে নিয়ে তাঁকে হত্যাও করা হয়।

লক্ষ্যণীয় হলো, মিশরীয় সামরিক বাহিনীর গণতন্ত্র-বিরোধী সে সন্ত্রাসকে কোন পাশ্চাত্য শক্তিই নিন্দা করেনি। নিন্দা করেনি প্রেসিডেন্ট ড. মুরসীর হত্যাকেও। অতএব এ হলো তাদের গণতন্ত্রপ্রেম। অপর দিকে তারা রাজি নয় ইরাক থেকে তাদের সামরিক বাহিনীকে সম্পূর্ণ রূপে তুলে নেওয়ায়। রাজি নয় জাতিসংঘ নীতিমালাকে মানতেও। বরং নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে লাগাতর ব্যবহার করছে জাতিসংঘকে। সত্য তো এটাই, জাতিসংঘের কাজ দাঁড়িয়েছে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সকল কুকর্মকে নিন্দা না করে বরং স্বীকৃতি দেওয়া। তাই ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনী যখন ইরাক ও আফগানিস্তান দখল করলো এবং দেশ দুটির লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করলো – সে রক্তাত্ব আগ্রাসনকে নিন্দা না করে জাতিসংঘ সেটিকে বৈধতা দিয়েছে। সে বৈধতার সূত্র ধরেই মার্কিন বাহিনী দাবী করে, ইরাকে তাদের অবস্থান অবৈধ নয়। তারা সেখানে আছে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে।

আরো লক্ষণীয় হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতই সাম্রাজ্যবাদী হানাদার চরিত্র নিয়ে হাজির হচ্ছে ততই প্রকাশ পাচ্ছে বিশ্বের মেরুদন্ডহীন মুসলিম নেতৃত্ব। এরা শুধু অযোগ্য, শক্তিহীন এবং বিভক্তই নয়, বিবেকহীনও। ইরাকের উপর হামলা যে একটি অতি অন্যায় ও অপরাধমূলক কাজ -সেটি বুঝতেও কি বড় রকমের কান্ডজ্ঞান লাগে? অথচ সে কান্ডজ্ঞানের প্রমাণ এ স্বৈরশাসকগণ রাখতে পারেনি। তাই কোন মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের মুখ থেকে এ হামলার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ শোনা যায়নি। ব্যর্থতা শুধু মুসলিম দেশগুলির সরকারেরই নয়, জনগনেরও। কোন মুসলিম রাজধানিতে এমন হামলার বিরুদ্ধে বড় রকমের কোন বিক্ষোভও আয়োজিত হয়নি। যেগুলি হয়েছে তার কোনটিই বিশাল আকারের নয়। বরং যতগুলো বৃহৎ বিক্ষোভ আয়োজিত হয়েছে তার সবগুলোই হয়েছে অমুসলিম দেশে। এবং সেগুলীর আয়োজকও ছিলেন অমুসলিমেরা।

ইরাকে হামলার বিরুদ্ধে ২০ লাখ মানুষের মিছিল হয়েছে লন্ডনে। ৩০ লাখ মানুষের মিছিল হয়েছে ইটালীর রাজধানী রোমে। সে তুলনায় করাচী, ঢাকা, কায়রো, জাকার্তা ও ইস্তাম্বুলের মত নগরীতে দশ ভাগের এক ভাগ সমাবেশও হয়নি। অথচ এ নগরগুলোর  লোকসংখ্যা লন্ডন ও রোমের চেয়ে অধিক। প্রতিটি নগরে প্রায় কোটি লোকের বাস। একটি মুসলিম দেশের উপর অন্যায় হামলা হতে যাচ্ছে – সেটি জেনে তার বিরুদ্ধে এসব নগরগুলোর প্রতিটিতে যদি দশ লক্ষ মানুষের সমাবেশ হতো -তবে মুসলিম উম্মাহ এরূপ হামলাকে কতটা ঘৃনা করে সেটির প্রমাণ মিলতো। কিন্তু সে ঘৃণা প্রকাশ পায়নি। বরং উল্টোটি হয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্র-প্রধান ও নেতারা মার্কিন প্রশাসনের কাছে বিশ্বাসভাজন হওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অথচ মার্কিন জোটের হামলায় নিহত ও আহত হয়েছে লক্ষাধিক ইরাকী ও আফগান নাগরিক, ভস্মিভূত হয়েছে হাজার হাজার কোটি ডলারের সম্পদ এবং শৃঙ্খলিত হ মুসলিম উম্মাহর একটি বিরাট অংশ। এমন  হামলায় সামান্যতম সহযোগিতাও হারাম। অবকাশ নেই নিরপেক্ষ থাকার। কিন্তু এ নিয়ে কি মুসলিম নেতৃবৃন্দের কোন ভাবনা আছে কী? আর থাকলে তার প্রকাশ কই? পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, মুসলিম মাত্রই পরস্পরের ভাই। এক ভাইয়ের ব্যাথা অপর ভাই অনুভব করবে -সেটিই তো কাঙ্খিত। অথচ সে অনুভবই যার নেই -তাকে কি ভাই বলা যায়? ভাতৃত্ববোধ না থাকলে তাকে মুসলিমই বা বলা যায় কি করে? ইরাক ও আফগানিস্তানের মুসলমিদের সে দুঃসহ ব্যাথা অনুভব দূরে থাক, কিভাবে তা বাড়ানো যায় -তা নিয়ে হামলাকারি মার্কিন বাহিনীর সাথে জর্দান, কুয়েত, সৌদিআরব, বাহরাইন, তুরস্ক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, ওমান, কাতারের সরকারগুলো বরং সহযোগীতা করতে উদগ্রীব। নিজ ভূমিতে তারা ঘাঁটি নির্মাণের অধিকার দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। প্রতিবশীর ঘরে হামলায় দস্যুকে সহায়তা দানের ন্যায় এরাও সহায়তা দিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের। নিজ নাগরিকদের ধরে ধরে কাফেরদের হাতে তুলে দিচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ এভাবে নির্মম নির্যাতনের শিকার হচেছ গোয়ান্তোনামো বে’র ন্যায় কারাগারে।

গোলামী মানসিকতায় আচ্ছন্ন মানুষের কাছে স্বাধীনতার মূল্য সামান্যই। দূর্বৃত্ত সর্দারের পার্শ্বচর হওয়ার ন্যায় এরাও সাম্যাজ্যবাদী শক্তির কাছে বিশ্বস্থ থাকাকে জীবনের বড় অর্জন মনে করে। এক কালে ভারতে কিছু মুসলিম নামধারি ব্যক্তির বৃটিশ স্বার্থের প্রতি বিশ্বস্থ্যতা এতই প্রগাঢ় ছিল যে, বৃটিশেরাও তাতে মোহিত  হতো। এমনকি তাদেরকে স্যার বলতো বা নানা উপাধিতে ডাকতো। একই ভাবে মার্কিনীদের কাছে বিশ্বস্থ হওয়ার প্রগাঢ় আগ্রহ বেড়েছে মুসলিম রাষ্ট্র প্রধান, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে। এমন বিশ্বস্থ হওয়াকে তারা জাতীয় মান-সম্মান নির্ণয়ের মানদন্ডে পরিণত করেছে। সম্প্রতি এমন গোলামী মানসিকতার উলঙ্গ প্রকাশ ঘটেছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন বিভাগ যে কয়টি দেশের নাগরিকের উপর কড়া নজর রাখার ঘোষণা দিয়েছে তাদের মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নামও রয়েছে। রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরবসহ আরো প্রায় বিশটি দেশের নাম। এসব দেশের নাগরিকের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকালে টিপসই দিতে হবে, নিয়মিত পুলিশ দফতরে হাজিরা দিতে হবে এবং ঠিকানা পরিবর্তন করলে তা অতিসত্বর সরকারকে জানাতে হবে। তা নিয়েই পাকিস্তান ও বাংলাদেশে প্রচন্ড আলোড়ন। “ইজ্জত গেল, ইজ্জত গেল” – আওয়াজ উঠেছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা সে সময় খালেদা জিয়া সরকারের পদত্যাগেরও দাবী তুলেছিলেন।

 

জর্জ বুশের ক্রসেড

মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ যে ক্রুসেডের ঘোষণা দিয়েছেন -সেটি কোন গোপন বিষয় নয়। তিনি সে কথাটি অতি প্রকাশ্যে বলেছেন। মিডিয়াতেও সেটি এসেছে। ইতিহাসে ক্রুসেডের একটি নিজস্ব পরিচিতি আছে। সেটি হলো, মুসলিম ভূমিতে ভয়ানক যুদ্ধ, মুসলিম বিরোধী গণহত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ এবং শত বছরের  আধিপত্য। তিনি একথাও বলেছেন, “এ যুদ্ধে অন্যদের অবস্থান হয় আমাদের পক্ষে, না হয় আমাদের বিপক্ষে।” এ মুসলিম বিরোধী ক্রুসেডে তিনি মুসলিমদেরকে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ দেননি। অতএব যারা তার স্বঘোষিত ক্রুসেডে মার্কিনীদের পক্ষে অস্ত্র ধরবে না -তাদেরকে শত্রু পক্ষ ভাবা এবং তাদের উপর কড়া নজর রাখাই হবে মার্কিন নীতি। এ নিয়ে একজন ঈমানদারের করণীয় কি থাকতে পারে?  তাছাড়া সে ক্রুসেডের একটি পর্ব চলছে আফগানিস্তানে, দ্বিতীয় পর্ব ইরাকে ও তৃতীয় পর্ব শুরু হয়েছে সিরিয়ায়। হয়তো এর পর হবে অন্য কোন মুসলিম দেশে।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ন্যায় মুসলিম দেশের সেক্যুলারিষ্টগণ না জানলেও মার্কিনীরা ঠিকই জানে, কোন ঈমানদারই তাদের মুসলিম বিরোধী এ ক্রুসেডে সহযোগী হবে না। ইসলামে এটি শতভাগ হারাম। মুসলিমের ঈমান তাঁকে আল্লাহ ও মুসলিম স্বার্থে বিশ্বস্থ ও অঙ্গিকারবদ্ধ করে; মার্কিন স্বার্থের প্রতি নয়। ফলে যার হৃদয়ে ঈমানের স্পন্দন আছে, মার্কিনীরা তাকে অবিশ্বাস করবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? আর সে জাগ্রত চেতনা এখন মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিমের মনে। বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে মার্কিনীদের এ সন্দেহজনক নীতি এটিই প্রমাণ করে, বাংলাদেশ যে একটি মুসলিম অধ্যুাষিত দেশ -সেটি তাদের কাছে স্বীকৃত। দেশটি ইসরাইল নয়, হিন্দুস্থানও নয়। অথচ তেমন এক প্রেক্ষাপটে মুসলিম স্বার্থে অঙ্গিকারহীন সেক্যুলারিষ্টগণ মার্কিন স্বার্থের প্রতি তাদের অঙ্গিকার প্রমাণ করতে উদগ্রিব। ইসলামে অঙ্গিকারহীন অথচ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে নিবেদিত এমন নেতৃত্ব বস্তুত এখন প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে। নিজেদের রাজনৈতিক অভিলাষ পুরণে অমুসলিম কাফের শক্তির নিজ দেশে আগ্রাসনে আহবান করা ও তাদের অস্ত্র নিয়ে মুসলিম হত্যার ইতিহাস গড়ার ঐতিহ্য এদের অনেকেরই। এমন গাদ্দারেরাই মার্কিন বাহিনীকে দাওয়াত দিয়েছিল আফগানিস্তান ও ইরাক দখলে। মুসলিম বিশ্বে হামলা ও আধিপত্যের দিন, ক্ষণ ও প্রেক্ষাপট এজন্যই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গের কাছে এতটা উপযোগী। তাই বিপদ শুধু বিদেশী শত্রুর কারণে বাড়ছে না, বাড়ছে ঘরের শত্রুর কারণেই। তাই আগ্রাসনের শিকার শুধু আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, কাশ্মির বা লেবানন নয়, তেমন একটি আগ্রাসনের মুখে সমগ্র মুসলিম উম্মাহও।  লন্ডন: ১ম সংস্করণ ০৫/০৫/২০০৭; ২য় সংস্করণ ২৯/১২/২০২০।

 




খেলাফত প্রতিষ্ঠার জিহাদ ও সাম্রাজ্যবাদি শক্তির কোয়ালিশন

নতুন সম্ভাবনার পথে

ইসলামের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) শুধু পবিত্র কোরআনের প্রচারই করেননি বরং কোরআনী বিধানগুলির প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মজবুত অবকাঠামোও প্রতিষ্ঠা করে যান। সে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোটিই পরবর্তীতে তাঁর মহান সাহাবীদের হাতে খেলাফত নামে পৃথিবীর বিশাল ভূখন্ড জুড়ে প্রতিষ্ঠা পায়।খোলাফায়ে রাশেদার শাসকগণ ছিলেন মূলত নবীজী (সাঃ)র প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পরিচালনায় নবীজী (সাঃ)র রাজনৈতীক ও আধ্যাত্মীক প্রতিনিধি তথা খলিফা।খেলাফতী রাষ্ট্রীয় পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছে তাই নবীজীর প্রতিনিধিত্বের দায়বদ্ধতা থেকে। মুসলমান যেমন নামাযের সময় হলে নবীজী (সাঃ)র অনুকরণে নামায পড়ে, মাহে রামাদ্বান এলে নবীজী (সাঃ)র ন্যায় রোযা রাখে, তেমনি কোন দেশ বা রাষ্ট্রের উপর দখল জমাতে পারলে সেখানে খেলাফতের আদর্শে রাষ্ট্রও গড়ে। নবীজী (সাঃ)র এ সুন্নত পালন মুসলমানদের জীবনে এক ধর্মীয় দায়ব্ধতা।নবীজী (সাঃ) নিজে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না করলে মুসলমানদের সামনে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুন্নতই থাকতো না। শরিয়ত, জিহাদ, জিজিয়া, আ’মিরু বিল মারূফ ওয়া নেহীয়ানুল মুনকার তথা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের ন্যায় মহান আল্লাহতায়ালার বহু কোরআনী হুকুমই সমাজে পালিত হতো না। ফলে প্রতিষ্ঠা পেত না মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন। তাছাড়া নবীজী (সাঃ)র এ সুন্নতের আনুগত্য ছাড়া কি আল্লাহর হুকুম পালিত হয়? তাতে কি মুসলমান হওয়া যায়? সাহাবাগণ নিজেদের অর্থ,শ্রম,মেধা ও প্রাণ দিয়েছেন তো সে খিলাফত প্রতিষ্ঠা ও সেটিকে প্রতিরক্ষা দেয়ার কাজে। খিলাফত প্রতিষ্ঠা না পেলে খৃষ্টানদের ন্যায় মুসলমানদের সংখ্যা বাড়লেও ইসলাম পরিচিতি পেত এক অপূর্ণাঙ্গ দ্বীন রূপে।ফলে মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথে কোথাও শান্তি প্রতিষ্ঠা পেত না। ইসলামি ন্যায়নীতির উপর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতাও নির্মিত হতো না।

ইসলামের ইতিহাস অনন্য। পৃথিবীপৃষ্ঠে বহু হাজার নবী-রাসূল এসেছেন, মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে একাধীক আসমানি কিতাবও নাযিল হয়েছে। কিন্তু সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি হলো মহান নবীজী (সাঃ)র নেতৃত্বে এই ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভের ফলে সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে এই প্রথমবার মহান আল্লাহতায়ালার মু’মিন বান্দারা সবচেয়ে শক্তিমান বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা লাভের সুযোগ পান। একমাত্র তখনই মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর মহান দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় ও সে দ্বীনের প্রতিরক্ষায় সর্বশ্রেষ্ঠ একটি বিশ্বশক্তি তার সর্বসামর্থ নিয়ে পাশে দাঁড়ায়। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধান তখন আর পবিত্র কোরআনের পাতায় বন্দি থাকেনি। বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা লাভের গৌরব অর্জন করে। লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কর্ম রূপে গুরুত্ব পায় খেলাফত ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও সে খেলাফতের সুরক্ষায় জানমালের কোরবানি পেশ। একমাত্র তখনই একটি বিশাল রাষ্ট্র তার সমগ্র সামরিক, প্রশাসনিক, বিচারবিভাগীয় ও শিক্ষা বিষয়ক অবকাঠামো নিয়ে ইসলামের প্রতিষ্ঠায় অংশ নেয়। আজও এটিই সর্বকালের ও  সর্বদেশের মুসলমানদের জন্য অনুকরণীয় নবী আদর্শ।

তাই যারা নবীজী (সাঃ)র উম্মত রূপে পরিচয় দিতে চায় তাদের সামনে খেলাফতের প্রতিষ্ঠা ও তার প্রতিরক্ষা ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত দ্বীনকে মসজিদ মাদ্রাসায় সীমিত করা কোন কোলেই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত নয়। সেটি তারা সাহাবাগণও করেননি। নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও পবিত্র কোরআনে পাঠের মধ্যে নিজেদের ধর্মকর্মকে তারা সীমিত রাখেননি। বরং কোরআনী বিধানের প্রতিষ্ঠায় তারা যেমন শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, তেমনি সে রাষ্ট্রের উপর ইসলামের পক্ষের শক্তির পূর্ণ দখলদারিও প্রতিষ্ঠা করেছেন। মুসলমানগণ দেরীতে হলেও ইরাক ও সিরিয়ায় সে প্রচেষ্ঠা আজ শুরু করেছে। সে খিলাফতের হাতে আজ গ্রেটব্রিটেনের চেয়েও বৃহত্তর ভূমি। মুসলমানদের সামনে তাই নতুন সম্ভাবনা।

আজকের ন্যায় নবীজী (সাঃ)র যুগেও ইসলামের শত্রুর অভাব ছিল না। শত্রুপক্ষে যেমন আরবের স্থানীয় কাফের ও ইহুদী গোত্রগুলো ছিল, তেমনি ছিল দুই বিশ্বশক্তি -বিশাল পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য। তারা ইসলামের প্রচার যেমন চায়নি, তেমনি চায়নি খেলাফত ও আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠাও। ইসলাম ও মুসলমানদের নির্মূলে তারা শুরু থেকেই যুদ্ধ শুরু করে। তাদের লাগাতর হামলার মুখে ইসলামের অনুসারিদের প্রতিপদে যুদ্ধ এবং সে যুদ্ধে জানমালের বিপুল কোরবানি দিয়ে সামনে এগুতে হয়েছে। শত্রুর হাত থেকে খেলাফত এবং ইসলামের প্রতিষ্ঠা বাঁচাতে নবীজী (সাঃ)র প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ সাহাবীকে শহীদ হতে হয়েছে। সে আমলের দুর্বৃত্ত শয়তানগণ ইসলামের সে মহান সৈনিকদের হাতে নির্মূল হয়েছিল, কিন্তু নির্মূল হয়নি তাদের সে শয়তানি মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্র। আজও তা ইসলামের বিরুদ্ধে একই রূপ হিংস্রতা নিয়ে প্রবল ভাবে বেঁচে আছে। ইসলামের এ শত্রুপক্ষগুলি প্রবল বল পায় যখন মুসলিম দেশগুলি সাম্রাজ্যবাদি কাফের শক্তির উপনিবেশে পরিণত হয়। রাষ্ট্রের সমগ্র শক্তি ও অবকাঠামো তখন ইসলামের শিকড় কাটার কাজে ব্যবহৃত হয়।

ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদি শক্তিবর্গ মুসলিম দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ ও তার ষড়যন্ত্র বিলুপ্ত হয়নি। বিলুপ্ত হয়নি তাদের প্রতিপত্তিও। সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্থ খলিফাদের হাতে মুসলিম দেশগুলি আজও অধিকৃত। এরা হলো তাদের হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও তাদেরই আদর্শে দীক্ষাপ্রাপ্ত সেক্যুলারিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, ট্রাইবালিস্ট, সোসালিস্ট, সেক্যুলার সামরিক বাহিনী ও স্বৈরাচারি রাজাবাদশাহগণ। এরাই ইসলামের দেশী শত্রুপক্ষ। মুসলিম নামধারি হলেও ইসলামের প্রতিষ্ঠা রোধে তাদের শত্রুতা কোন কাফের শক্তির চেয়ে কম নয়। তাদের একাত্মতা বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেটব্রিটেন, ফ্রান্স, হিন্দুস্থানসহ সকল কাফের শক্তির সাথে। ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে যারা নিরপরাধ মুসল্লি করলো বা ইসলামবাদের লালমসজিদ ধ্বংস করলো এবং মসজিদ সংলগ্ন হাফসা মাদ্রাসার শতাধিক ছাত্রীদের হত্যা করলো তারা তো এরাই। মুসলিম দেশগুলি আজ তাদের হাতেই অধিকৃত। শয়তানি শক্তির এ নতুন প্রজন্ম আজ থেলাফত, শরিয়ত, জিহাদ, জিজিয়া ও প্যানইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্বের ন্যায় ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সর্বসামর্থ নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

 

 

অপরিহার্য কেন খিলাফত?

মৌলিক মানবিক অধিকার, উচ্চতর মূল্যবোধ, নীতি ও নৈতীকতা, সুবিচার ও সাম্য –এসব নিয়ে বড় বড় কথা বলা খুবই সহজ। লক্ষ লক্ষ পন্ডিতজন শত শত বছর ধরে এমন কথা বলে আসছেন। ভবিষ্যতেও বলবেন। তাদের সেসব কথা হাজার হাজার বছর ধরে বইয়ের পাতায় বেঁচেও থাকবে। কিন্তু তাদের কথায় বিশ্বের কোথাও নির্যাতীতা নারীদের মুক্তি মিলেনি। দাসপ্রথাও বিলুপ্ত হয়নি। বর্ণবাদী, গোত্রবাদী ও জাতিয়তাবাদী বৈষম্য ও শোষণও বিলুপ্ত হয়নি। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলে অতিশয় অপরিহার্য হলো সহায়ক রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো। আর তেমন রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর প্রতিষ্ঠা এজন্যই ইসলামে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। সে ইবাদতের ছওয়াব কখনোই স্রেফ নামায-রোযা বা হজ-যাকাত পালনে অর্জিত হয় না। এমন রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় একমুহুর্ত ব্যয়কে নবীজী (সাঃ) সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। তাছাড়া মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য নিয়ে হাজার হাজার ফেরেশতার বাহিনী কখনোই কোন বান্দাহর ঘরে হাজির হন না। কোন কামেল ব্যক্তির ঘর, সুফি খানকা বা মসজিদ-মাদ্রাসাও নয়। কারণ, সেগুলি তাদের অবতরণের ক্ষেত্র নয়। সে ক্ষেত্রটি সেটি হলো জিহাদের অঙ্গণ। তাদের উপস্থিতি তাই বদর, ওহুদ, হুনায়ুনের ন্যায় জিহাদের অঙ্গণে বার বার দেখা গেছে। মুসলমানের কাজ হলো তাই লাগাতর অবতরণের ক্ষেত্র নির্মাণ। সেজন্য চাই খেলাফা। চাই লাগাতর জিহাদ। চাই মু’মিনদের নিজেদের জানমালের কোরবানি। চাই শরিয়তের প্রতিষ্ঠার লাগাতর প্রচেষ্টা। এমন জিহাদ ও এমন কোরবানীর মাধ্যমে ঈমানদারগণ তখন খোদ মহান আল্লাহতায়ালার বাহিনীতে পরিণত হয়। আর মহান আল্লাহতায়ালার ফেরেশতা বাহিনী তো ভূপৃষ্ঠে নেমে আসেন স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার বাহিনীকে বিজয়ী করতে। যেদেশে মহান আল্লাহতায়ালার বাহিনী হওয়ার ব্যর্থতা সেদেশে রহমতের ফিরেশতাগণ নয়, নেমে আসেন আযাবের ফিরেশতাগণ। তাঁরা নামেন বন্যা, খড়া, অতিবৃষ্টি, ঘুর্ণিঝড়, ভূমিকম্প ও সুনামী নিয়ে। বাড়ে ফিতনা-ফ্যাসাদ। তেমন আযাব যে অতীতে বহু জনপদে বহুবার এসেছে সে সাক্ষ্যটি তো মহান আল্লাহতায়ালার -যা তিনি পবিত্র কোরঅনে বহুবার উল্লেখ করেছেন। তা নিয়ে কি কোন ঈমানদারের সামান্যতম সন্দেহ থাকতে পারে? সন্দেহ হলে কি সে আর মুসলমান থাকে? তাই খেলাফত আমলে সমাজে বিপর্যয় বা ফিতনা দেখা দিলে খলিফার দায়িত্ব ছিল ইসলামের শত্রুদেশের বিরুদ্ধে দ্রুত জিহাদ সংগঠিত করা। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে গুনাহমাফ ও রহমত লাভের জন্য এটিই হতো সে আমলে বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া।

বান্দার উপর মহান আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে বড় নিয়ামত সন্তান-সন্ততি বা ধনসম্পদ নয়, সেটি হলো হিদায়েত ও শরিয়ত। হিদায়েত ও শরিয়তের সে মহান গ্রন্থটি হলো পবিত্র কোরআন। আর বান্দাহর উপর ফরজ হলোঃ প্রতিটি কথা, প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি চিন্তা ও প্রতিটি আচরনে হিদায়েতের পথে চলা। নির্দেশ হলোঃ বিচার-আচারে শরিয়তের পরিপূর্ণ অনুসরণ। এখানে অবাধ্যতা বা বিদ্রোহ হলে আসে বিপর্যয়, মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আসে আযাবও। সেটি যেমন দুনিয়ায়, তেমনি আখেরাতে। মহান আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতের বড় খেয়ানত ও সে সাথে কবিরা গুনাহ হলো তাঁর নাযিলকৃত হিদায়েতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তেমন বিদ্রোহে অতীতে ইতিহাস গড়েছিল ইহুদীদগণ, আর আজ সে পথ ধরেছে মুসলমানগণ। হযরত মূসা (আঃ) এর উপর মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র গ্রন্থ তাওরাত নাযিল করেছিলেন। তাওরাতে শরিয়তের বিধান ছিল। সে শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে হযরত ইয়াকুব (আঃ) জন্মভূমি কানানে গিয়ে খেলাফত প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়েছিলেন। সেখানে তখন শাসন চলছিল এক দুর্বৃত্ত জালেম গোষ্ঠির। খিলাফতের প্রতিষ্ঠায় তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল জান ও মালের কোরবানীর। কিন্তু ইহুদীদের তাতে আগ্রহ ছিল না। তাদের আগ্রহ ছিল স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালা থেকে শুধু পাওয়ায়, তার পথে দেয়ায় নয়। তাই প্রচন্ড অবাধ্যতার সুরে তারা হযরত মূসা (আঃ)কে বলেছিল, “হে মুসা! তুমি ও তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।” তাদের সে অবাধ্যতার কথা মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন। এমন অবাধ্যতা কি কোন জনগোষ্ঠির উপর আল্লাহ রহমত আনে? বরং যা আনে তা হলো কঠিন আযাব। সে আযাবেরই আলামত হলো, ইসরাইলীদের ভাগ্যে কোথায়ও কোন ইজ্জত মিলেনি। ভবঘুরের ন্যায় নানা দেশের পথেপ্রান্তরে হাজার হাজার বছর ধরে ঘুরে বেড়ানোই তাদের নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। অবশেষে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশেরা অধিকৃত মুসলিম ভূমিতে অবৈধ ভাবে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা দেয়। কিন্তু তাতেও তাদের ইজ্জত বাড়েনি। নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়নি। বরং বিশ্বব্যাপী ধিক্কার কুড়াচ্ছে এক অতি বর্বর ও নৃশংস জাতি রূপে। তাওরাতের শরিয়তি বিধানকে প্রতিষ্ঠার মিশন দিয়ে হযরত ইসা (আঃ)কে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় কোন আগ্রহই দেখায়নি, বরং খৃষ্টানগণ হযরত ঈসা (আঃ)কে খোদা বানিয়ে পুজা শুরু করে। খৃষ্টান ধর্মে তারা হারাম-হালালে কোন পার্থক্যই রাখেনি। তারা বেঁচে আছে মদ্যপান, জুয়া, অশ্লিলতা ও ব্যাভিচারের ন্যায় আদিম পাপাচার নিয়ে। সমকামিতার ন্যায় পাপাচারকে তারা আইনগত বৈধতা দিয়েছে, তেমনি আইনসিদ্ধ করেছে পুরুষের সাথে পুরুষের এবং নারীর সাথে নারীর বিবাহের ন্যায় অপরাধকেও।একই ভাবে মুসলমানগণ আজ শরিয়তকে বিদায় দিয়েছে দেশের বিচারকার্য থেকে।

 

 

অনিবার্য কেন জিহাদ?

রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে ধর্ম তখন বিশুদ্ধতা নিয়ে বাঁচে না। নানা রূপ দূষন শুরু হয় ধর্মীয় আক্বিদা-বিশ্বাস ও ধর্মপালনের ক্ষেত্রে। সরকারি সহযোগিতায় তথন রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গণে দুর্বৃত্তির প্লাবন সৃষ্টি করা হয়। পতিতাপল্লি, সূদী ব্যাংক, মদের দোকান, নাচগানের আসর বাড়াতে তখন সরকারও তার প্রশাসন নিয়ে এগিয়ে আসে। সে নমুনা স্রেফ খৃষ্টান বা ইহুদী দেশে নয়, মুসলিম দেশগুলোতেও। বাংলাদেশের মুসলমানগণ দূর্নীতিতে ৫ বার বিশ্বরেকর্ডও স্থাপন করেছে সে প্লাবনের কারণেই। এজন্যই ইসলামে পবিত্র জিহাদ শুধু মুসলিম রাষ্ট্রের উপর কাফের শক্তির হামলা প্রতিরোধ করা নয়, অতি পবিত্র জিহাদ হলো রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের বুক থেকে পাপাচারের প্লাবন থামানো। ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূল। এবং সে লক্ষ্যসাধনে জরুরী হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উপর থেকে ইসলাম বিরোধী শক্তির দখলদারি নির্মূল। খিলাফত বা ইসলামি রাষ্ট্র তো এ পথেই প্রতিষ্ঠিত হয়। মু’মিনের জীবনে এটিই জিহাদ। এপথে প্রাণ গেলে জান্নাতপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত। সে প্রতিশ্রুতি মহান আল্লাহতায়ালার। সে জিহাদ যার মধ্যে নাই মহান নবীজী (সাঃ) তাকে মুনাফিক বলেছেন। নবীজী (সাঃ)র প্রখ্যাত হাদীসঃ “যে ব্যক্তি জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না সে ব্যক্তি মুনাফিক।”

মুসলমানদের তাই শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের বিধান শিখলে চলে না। যুদ্ধও শিখতে হয়। নামাযী ও রোযাদার হওয়ার পাশাপাশি আজীবন মুজাহিদের দায়িত্বও পালন করতে হয়। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে এমন কোন সাহাবীকে কি পাওয়া যাবে যিনি নামায-রোযা শিখেছেন অথচ যুদ্ধাবিদ্যা জানতেন না বা জিহাদে যোগ দেননি? হযরত আম্মার (রাঃ)র ন্যায় বহু সাহাবী ৮০ বছর বয়সে জিহাদের ময়দানে গেছেন এবং শহীদও হয়েছেন। তাই ইসলামি রাষ্টের প্রতিটি নাগরিক যেমন সৈনিক,তেমনি পুরা রাষ্ট্র হলো ক্যান্টনমেন্ট।এবং লাগাতর শিক্ষালাভ ও সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ হলো মুসলিম সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্দ্য অঙ্গ। ইসলামি সরকারের দায়িত্ব হলো সে সংস্কৃতির লালন। কিন্তু মুসলিম দেশ যখনই শয়তানি শক্তির হাতে আধিকৃত হয় তখন নির্মূল করা হয় সে সংস্কৃতি। প্রতিষ্ঠা দেয়া হয় নাচগান, খেলাধুলা, মদজুয়া, অশ্লিলতা ও ব্যাভিচারের সংস্কৃতি। এ হলো পরকালের ভাবনা ও আল্লাহর কাছে জবাবদেহীতা ভূলানোর সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতিতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয় ইসলামে অঙ্গিকার শূণ্য সেক্যুলারিস্টদের হাতে।এবং অস্ত্রহীন করা হয় আল্লাহর দ্বীনের মোজাহিদদের।ভারতের বুকে ব্রিটিশগণ সে রীতি ও সংস্কৃতি সরকারি ভাবে প্রতিষ্ঠা করে গেছে।আর আজ বাংলাদেশ,পাকিস্তান,তুরস্ক,মিশরের মত দেশগুলোতে সে সংস্কৃতির পরিচর্যা দিচ্ছে স্বদেশী সেক্যুলারিস্টগণ।

মুসলিম সমাজে যুদ্ধ কিছু বেতনভোগী সৈনিকদের পেশাদারিত্ব নয়।বরং নামায-রোযার ন্যায় প্রতিটি মুসলমানের জীবনে সেটি ফরজ ইবাদত। তাই ইসলামি রাষ্ট্রে বিশাল বেতন, বাড়ি-গাড়ি ও হাজার হাজার সরকারি প্লট দিয়ে বিশাল সেনাবাহিনী প্রতিপালনের প্রয়োজন পড়ে না। মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিটি ঘরই সৈনিকের ঘর। এ সৈনিকেরা ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় শুধু শ্রম, মেধা ও মালের কোরবানিই দেয় না, জানের কোরবানিও দেয়। খালিদ বিন ওলিদ, সাদ বিন আবি ওক্কাস, আমর ইবনুল আস, আবু ওবাইদা, তারিক বিন যিয়াদের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে খ্যাতিনামা জেনারেলগণ কি কোন সামরিক কলেজ বা ক্যান্টনমেন্টের সৃষ্টি? তারা তো গড়ে উঠেছে মাটির ঘর থেকে। পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বড় বড় যুদ্ধ জয় তো তারাই করেছে। তাদের রণকৌশলগুলো এখন বিভিন্ন দেশের সামরিক কলেজে পড়ানো হয়।

তাছাড়া বিজয় তো আসে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। কোন যুদ্ধই মুসলমানগণ নিজ শক্তিবলে অর্জন করেনি। প্রতিটি বিজয় এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার রহমতের বরকতে| তাদের বিজয়ী করতে হাজার হাজার ফিরেশতা মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিত। তাই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাঃ “কোন বিজয় নেই একমাত্র আল্লাহর সাহায্য ছাড়া; নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান ও প্রজ্ঞাময়।” সুরা আনফাল আয়াত ১০। তাই আল্লাহর সাহায্য নামিয়ে আনার মূল সামর্থটাই সৈনিকের মূল সামর্থ। আর সে সামর্থ কি শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সামরিক কলেজ বা সেনানীবাসে তৈরী হয়? সে জন্য তো প্রয়োজন আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার সামর্থ। সে সামর্থ তো আসে মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান, কোরআনী জ্ঞান ও গভীর তাকওয়া থেকে। সে সামর্থ সৃষ্টিতে কি সেনানীবাস লাগে? তা তো গ্রাম-গঞ্জে এবং মাটির ঘরেও নির্মিত হতে পারে। সে সামর্থ সৃষ্টির মূল উপকরণ তো কোরআনী জ্ঞান ও সে জ্ঞানলদ্ধ আল্লাহর উপর গভীর বিশ্বাস। সে সামর্থের বদৌলতে বিশ্বের যে কোন দেশে ও যে কোন সময় আসতে পারে। সে সাহায্য তো আজও আসছে। তাই আজও আসছে বিস্ময়কর বিজয়। সেটিই সম্প্রতি দেখা গেল ইরাকের রণাঙ্গনে। ইরাকে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মোসল করে নিল মাত্র আট শত মোজাহিদ। অথচ সেখানে তাদের যুদ্ধটি ছিল আধুনিক সেনানীবাস ও সামরিক কলেজে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তিরিশ হাজর ইরাকী সৈন্যদের বিরুদ্ধে। তারা প্রশিক্ষণ পেয়েছিল বিশ্বের সেরা মার্কিনী যুদ্ধবিশেষজ্ঞদের হাতে। অথচ সে বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় লাভে মোজাহিদদের একদিনও লাগেনি।

আবার তাই প্রমাণিত হলো, মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য পাওয়ার জন্য নবীজী (সাঃ) সাহাবা হওয়া ও তাঁর পিছনে নামায পড়ার প্রয়োজন পড়েনা। বরং অপরিহার্য হলো গভীর ঈমান, তাকওয়া ও নবীজী (সাঃ)র প্রদর্শিত পথে জানমাল কোরবানীর পূর্ণ প্রস্তুতি। সে প্রস্তুতির বরকতে নবীজীর ইন্তেকালের বহুহাজার বছর পরও পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য যেমন আসে, তেমনি বিজয়ও আসে। মহান নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ যেরূপ লাগাতর বিজয় আনতে পেরেছিলেন তা তো এমন মর্দেমুমিন মোজাহিদদের কারণেই। তখন খলিফার অধীনে কোন পেশাদার সেনাবাহিনীই ছিল না। অথচ তাঁরা নবীজী (সাঃ) ইন্তেকালের মাত্র ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বিশ্বশক্তির জন্ম দেন। নির্মাণ করেন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। সে সভ্যতায় বুকে বড় বড় প্রাসাদ, দুর্গ, দেয়াল বা পিরামিড নির্মিত হয়নি। বরং নির্মিত হয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ও মূল্যবোধ, সর্বশ্রেষ্ঠ আইন ও বিচার ব্যবস্থা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সামাজিক ও রাষ্ঠ্রীয় নীতি। সে মূল্যবোধে খলিফা তথা বিশ্বশক্তির রাষ্ট্রপ্রধান চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। অথচ মুসলমানগণ আজ আল্লাহতায়ালার  সাহায্যপ্রাপ্তির সে বহু পরিক্ষিত পথটি ছেড়ে বনি ইসরাইলীদের অনুসৃত ও পরিক্ষিত অভিশপ্তের পথটি ধরেছে। তাদের অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ খোদ আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। হিদায়েত ও শরিয়তকে তারা নিজেদের জীবন থেকে বিসর্জন দিয়েছে। খেলাফতের দায়ভার বহনের বদলে তারা নিজেরাই সার্বভৌম রাজা-বাদশাহ ও শাসকে পরিণত হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালার আনুগত্যের বদলে আনুগত্য শুরু করেছে নিজের স্বৈরাচারি নফসের।

 

 

দায়িত্ব রাজনৈতীক প্রতিনিধিত্বের

মুসলমান হওয়ার অর্থ শুধু মহান আল্লাহর উপর অটল বিশ্বাস নয়, স্রেফ নামায-রোযা পালনও নয়। বরং সেটি ধর্মীয়, রাজনৈতীক, প্রশাসনিক ও সামরিক অঙ্গণে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিনিধিত্বের। নিজ জীবনের প্রতিকর্ম, প্রতিসিদ্ধান্ত ও প্রতিটি আচরণেই সে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা। প্রতিনিধিত্ব এখানে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠার। ঈমানদারের জানমালের বিনিয়োগ তো হয় এ দায়িত্বপালনে। অথচ আজ মুসলিম রাষ্ট্রগুলিতে শুধু যে খেলাফত বিলুপ্ত হয়েছে তা নয়, শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত হয়েছে মুসলিম রাষ্ট্রসমুহ ও তার প্রতিষ্ঠানগুলি। কার্যতঃ মুসলমানগণ পরিণত হয়েছে শয়তানের খলিফায়। ইসলামি দল, ইসলামি জামাত বা ইসলামি আন্দোলনের নামে এমন কিছু ব্যক্তিবর্গের উদ্ভব ঘটেছে যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের বদলে মন্ত্রি, এমপি ও নেতা হওয়াকে গুরুত্ব দেয়। দেশের শাসনতন্ত্র ও আইন-আদালতে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইনের অনুপস্থিতি নিয়ে তাদের হৃদয়ে কোন মাতম উঠে না। মাতম উঠে তখন যখন তাদের নেতাকর্মীদের জেলে ঢুকানো নয় বা তাদের অফিসে তালা ঝুলানো হয়। তাদের রাজনীতির এজেন্ডা দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও নয়। দেশে শাসনতন্ত্র ও আইন-আদালতে মহান আল্লাহতায়ালার আইন স্থান পায়নি। স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রনীত আইন। মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্বের বদলে স্থান পেয়েছে মানুষের সার্বভৌমত্ব। মহান আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় বিদ্রোহ আর কি হতে পারে? অথচ সে শাসনতন্ত্র ও আইন বাঁচানো নিয়েই তথাকথিত ইসলামি দলগুলির রাজনীতি। তাদের বক্তৃতা, লেখনি ও ওকালতি স্রেফ নিজের দল, নিজের নেতা ও নিজেদের ধর্মীয় ফিরকাকে বড় রূপে দেখানো নিয়ে। তাদের আন্দোলন স্রেফ নিজ দল, দলীয় স্বার্থ ও দলীয় নেতাদের বাঁচানো নিয়ে।সে লক্ষ্যে তারা দেশের বা বিদেশের কোন দল বা ব্যক্তিদের সাথে আঁতাত করতেও রাজী। শরিয়ত, খেলাফত ও জিহাদের পক্ষে তাদের মুখে কোন কথা নেই। আন্দোলনও নাই।

অথচ প্রকৃত ঈমানদারের প্রতিমুহুর্তের বাঁচাতো আল্লাহর দ্বীনের প্রতিটি বিধান ও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ওকালতি ও জিহাদ নিয়ে বাঁচা। সে সত্যের পক্ষে আমৃত্যু সাক্ষ্যদাতা ও উকিল। শরিয়ত, খেলাফত ও জিহাদের পক্ষে সে হবে নির্ভীক। মু’মীনের জীবনে মূল সামর্থ তো সত্যকে চেনা, সত্যের পক্ষ নেয়া ও সত্যের পক্ষে জানমাল কোরবানীর সামর্থ। ব্যক্তির ঈমানদারি তো সে সামর্থের মধ্যে ধরা পড়ে। নবীজীর (সাঃ) শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবা সে কাজে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশের মুলমানদের মাঝে শতকরা একজনও সে কাজে হাজির? মহান আল্লাহ যাদের দিয়ে জাহান্নাম ভরবেন তারা যে সবাই চোর-ডাকাত, খুনি বা ব্যাভিচারি -তা নয়। অধিকাংশ মুশরিক এবং কাফের খুনি নয়। তারা চোর-ডাকাত বা ব্যাভিচারিও নয়। কিন্তু তারা জাহান্নামে যাবে সত্যকে চিনতে না পারা ও সত্যের পক্ষ না নেয়ার কারণে। বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের চেয়ে সত্যকে চেনার গুরুত্ব অপরিসীম। সে সামর্থের গুণেই ব্যক্তি জান্নাত পাবে। বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে নয়।

রাসূলে পাক (সাঃ)এর সময়ও এমন ইহুদী ও খৃষ্টানদের সংখ্যা কি কম ছিল যারা উপোস, উপাসনা ও তাওরাত বা বাইবেল পাঠে শরীর পতন ঘটাতো? অথচ মহান আল্লাহপাক তাদেরকে কাফের বলেছেন। এবং মুসলমানদেরকে অতি সুস্পষ্ট ভাবে হুশিয়ার করে দিয়েছেন যেন তাদের অনুসরণ না করা হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার সে হুশিয়ারিটি এসেছে এভাবেঃ “হে ঈমানদারগণ! যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের মাঝের কোন দলকে যদি তোমরা অনুসরণ করো তবে তারা তোমাদেরকে ঈমান আনার পরও আবার কাফেরে পরিণত করবে।” –(সুরা আল ইমরান আয়াত ১০০)। ইহুদী ও খৃষ্টান আহলে কিতাবীদের কাফের বলার কারণ তারা মহান আল্লাহতায়ালার শেষ রাসূল ও শেষ আসমানি কিতাবকে চিনতে ব্যর্থ হয়েছিল। তারা ব্যর্থ হয়েছিল নবীজী (সাঃ)র মিশনের সাথে একাত্ম হতে। ধার্মিকের লেবাসে তাদের কাজ ছিল মানুষকে কাফেরে পরিণত করা। প্রশ্ন হলো, আজকের মুসলিম আলেম, আল্লামা ও মুফতিদের কি সে ব্যর্থতা কম? তারাদেরই বা ক’জন নবীজী (সাঃ)র মিশনকে চিনতে পেরেছে। নবীজী (সাঃ)এর রেখে যাওয়া খিলাফত, শরিয়ত ও জিহাদের সাথে তাদের ক’জন আজ সংশ্লিষ্ট? নবীজী (সাঃ)র অধীকাংশ সাহাবাগণ যে পথে শহীদ হয়েছেন এসব আলেমদের ক’জন সে পথে? যে যুবকগণ হাজার হাজার মাইল দূর থেকে স্রেফ খেলাফত, শরিয়ত ও জিহাদের লক্ষ্যে আরাম-আয়াশের ঘরবাড়ি ছেড়ে শহীদ হচ্ছে তাদেরকে এরা খারেজী ও কাফের বলছে! মোশাদ, সিআইয়ের এজেন্ট বলছে। নারী লোভীও বলছে! এবং খেলাফত প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে তারা হটকারিতা বলছে। তারা কি মনে করে এসব যুবকদের বদলে আসমান থেকে ফেরেশতারা এসে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করবেন? অথচ উমাইয়া, আব্বাসী ও ওসমানিয়া খেলাফতের প্রতিষ্ঠারা কি ফেরেশতারা ছিলেন? তাদের ক’জন জিহাদের ময়দানে সশরীরে প্রাণ কোরবানীতে হাজির হয়েছেন? তারা ছিলেন দোষেগুণের মানুষ। তাদেরই শাসনামলে হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ)ও তাঁর ৭২ জন নিরপরাধ সঙ্গিকে কারবালায় নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। অথচ তারপরও তাদেরকে খলিফা রূপে স্বীকৃতি ও তাদের নামে জুম্মার খোতবা দেয়া হয়েছে। বিগত ৯০ বছর মুসলিম বিশ্বে কোন খলিফা নাই। ফেরেশতাতূল্য মহামানবদের অপেক্ষায় কি আরো অপেক্ষা করতে হবে?

 

 

বিষাক্ত প্রচারণা

আল্লাহর দ্বীনের প্রতি মুসলিম দেশের অধিকাংশ ইসলামি দলের নেতাকর্মী ও আলেমদের অঙ্গিকার যে কতটা ফাঁকা সেটি খেলাফত, শরিয়ত এবং জিহাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানই সুস্পষ্ট করে দেয়। বনি ইসরাইলের আলেমগণ আজও মাথা-ঘাড় দুলিয়ে দুলিয়ে তাওরাতে নাযিলকৃত শরিয়তের বিধানগুলো মুখস্থ করে। কিন্তু তার প্রয়োগ নিয়ে তারা ময়দানে নেই। তাদের থেকে মুসলিম আলেমদের অবস্থা কতটুকু ভিন্নতর? তাদের বিভ্রান্তিকর ভূমিকার কারণেই মুসলিম দেশে জনবল বেড়েছে জাতিয়তাবাদী, রাজতন্ত্রি, স্বৈরাচারি ও সাম্রাজ্যবাদি শিবিবে। তাদের কারণেই পরাজয় বেড়েছে ইসলামের। এবং মুসলিম দেশগুলি অধিকৃত হয়ে গেছে ইসলামি শত্রুশক্তির হাতে। এবং বিলুপ্ত রয়ে গেছে খিলাফত। এসব ইসলামি দলের বর্তমান প্রচারনার সুর কোন কাফের শক্তির বিরুদ্ধে নয় বরং সেটি খেলাফত, শরিয়ত ও জিহাদের বিরুদ্ধে। সৌদি আরবের গ্রাণ্ড মুফতি ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করার নিন্দা করেছেন। অথচ যুদ্ধ করতে বলছেন ইরাকের জিহাদীদের বিরুদ্ধে। সৌদি আরবের গ্রাণ্ড মুফতি সৌদি আরবে মার্কিন কাফের সৈনিকদের অবস্থানের বিরুদ্ধে কথা বলেন না। অথচ হযরত ওমর (রাঃ) সমগ্র জাজিরাতুল আরব থেকে সকল অমুসলিমদের বিতাড়িত করেছিলেন। একই ভূমিকায় নেমেছেন শেখ ইউসুফ কারযাভী। তাঁর অবস্থান কাতারে। অথচ কাতার হলো সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। তিনি সে মার্কিন অবস্থানের বিরুদ্ধেও মুখ খুলেন না। আল্লাহকে খুশি করার বদলে এরা গুরুত্ব দেন ইসলাম, মুসলমান ও আল্লাহর শত্রুদের সাথে সুসম্পর্ক রাখাকে। গুজরাতের মুসলিম নারী-শিশুর রক্তে রঞ্জিত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদীর হাত। অথচ বাংলাদেশের প্রধান ইসলামি দলের নেতা তার নির্বাচনি বিজয়কে অভিনন্দন করেছেন। সেটি স্রেফ দলীয় স্বার্থে। এটিই সেক্যুলারিজম। ইসলামি চেতনায় এটি অসম্ভব।এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার হুশিয়ারি হলোঃ “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করোনা। তোমরা তাদের প্রতি সৌহার্দপূর্ণ আচরণও করবে না, তারা তো অস্বীকার করেছে সে সত্যকে যা তোমাদের কাছে এসেছে?..) –সুরা মুমতেহানা আয়াত ১)। আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে শত্রুতাই নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। তাদের বিজয়ে অভিনন্দন জানানো নয়। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ সে সতর্কবানী একবার নয়, বহুবার এসেছে পবিত্র কোরআনে। অথচ সে হুশিয়ারির বিরুদ্ধে এসব নেতাদের ভ্রক্ষেপ নাই।

ব্যক্তির ঈমান শুধু নামায-রোযায় ধরা পড়ে না, নির্ভূল ভাবে ধরা পড়ে রাজনীতিতে। নামায-রোযা মুনাফিকও পড়তে পারে। কিন্তু শরিয়ত ও খেলাফতের প্রতিষ্ঠার জিহাদে অংশ নেয়া ও সে জিহাদে প্রাণ দেয়ার সামর্থ মুনাফিকের থাকে না। ঈমানের আরেক পরিচয় হলো প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্বের চেতনা। সে চেতনা দেয় ভাষা, ভূগোল ও বর্ণের পরিচয় অতিক্রম করার সামর্থ। সে চেতনায় মুসলিম বিশ্বে জাতীয় রাষ্ট্রের নামে গড়া বিভক্তির মানচিত্র ও দেয়ালগুলি বৈধতা পায় না। ভাষা, ভূগোল ও বর্ণের পরিচয়ে বিভক্তি গড়া এবং বিভক্তিকে বৈধতা দেয়া ইসলামে হারাম। এটি মহান আল্লাহর ফরমান “লা তাফাররাকু” অর্থাৎ “বিভক্ত হয়োনা”র বিরূদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। অথচ ইসলামের নামে যারা দল বা জামায়াত গড়ে তারাও এ বিভক্তিকে বৈধতা দেয় এবং ভক্তি করে মুসলিম বিশ্বের বিভক্ত মানচিত্রকে। এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের জন্ম দিবস নিয়ে জাতিয়তাবাদীদের ন্যায় বিজয়-উৎসব করে। যেমনটি বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর দ্বারা হচ্ছে। বিভক্ত এ মানচিত্র ভেঙ্গে বিশাল এক খেলাফতি রাষ্ট্র গড়ার জিহাদ শুরু হলে সে পবিত্র কর্মকে তারা যে শুধু ঘৃনা করে তা নয়, কাফেরদের সাথে নিয়ে তা প্রতিরোধেরও চেষ্টা করে। এমন জিহাদকে তারা আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী বলে অভিহিত করে। খিলাফত প্রতিষ্ঠার জিহাদে যারা আজ কাফেরশক্তির বিমান হামলায় ইরাক ও সিরিয়ার বুকে শহীদ হচ্ছেন তাদেরকে বলে সিআইএ ও মোশাদের এজেন্ট। কি বিস্ময়! জিহাদীদের চরিত্র ধ্বংসে এরা প্রচার করে, মোসলের রাস্তায় তারা নাকি মহল্লাবাসীদের কাছে নারী সাপ্লাইয়ের দাবী জানিয়ে পোষ্টার লাগায়!সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার কত জঘন্য অপপ্রচার! এতো ব্যাভিচারের অপরাধ। অথচ কাউকে ব্যাভিচারির অপবাদ দেয়ার শরিয়তের শাস্তি হলো, তার পিঠে ৮০ চাবুকের ঘা। ব্যাভিচারিদের হাতে অস্ত্র থাকলে তারা কি পোষ্টার লাগিয়ে নারী খোঁজে? তারা বলে, এ জিহাদীরা নাকি খারেজী। অথচ ভূলে যায়, খারেজীদের যুদ্ধ ছিল খেলাফতের বিরুদ্ধে। তাদের যুদ্ধ খেলাফতের প্রতিষ্ঠা বা সুরক্ষা নিয়ে ছিল না। খারেজীরা যুদ্ধ করেছে ইসলামের মহান খলিফা হযরত আলী (রাঃ)র বিরুদ্ধে। অথচ আজ যাদেরকে খারেজী বলা হচ্ছে তাদের জিহাদ তো খেলাফতের প্রতিষ্ঠায়। তারা প্রাণ দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। তাদের যুদ্ধ তো ইসলাম বিরোধী কুর্দি ও আরব জাতিয়তাবাদী, রাজতন্ত্রি, স্বৈরাচারি ও সেক্যুলারিস্টদের বিরুদ্ধে।

 

 

ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীদের অপরাধ

ঔপনিবেশিক শত্রুদের অপরাধ শুধু দেশদখল এবং অধিকৃত দেশে গণহত্যা, অর্থনৈতীক শোষণ ও নির্যাতন নয়। তাদের দ্বারা সবচেয়ে বড় অপরাধটি ঘটেছে মুসলিম দেশের শিক্ষাঙ্গণে। শিক্ষাঙ্গণকে তারা ব্যবহার করেছে মগজ ধোলাইয়ের কারখানা রূপে। ফলে বাংলার ন্যায় মুসলিম ভূমিতে মুসলমানদের খৃষ্টান বানাতে না পারলেও ইসলাম থেকে দূরে সরাতে পেরেছে। এতে মড়ক লেগেছে মুসলমানদের ঈমানে। ঈমানের সে মড়কটি সবচেয়ে বেশী ঘটেছে তাদের জীবনে যারা শিক্ষা অর্জনের নামে মগজ ধোলাইয়ের সে কারখানায় প্রবেশ করেছে। ফলে বাংলার নিরক্ষর মুসলমানগণ যতটা ঈমান নিয়ে বেঁচেছে তথাকথিত বাঙালী শিক্ষিতরা তা পারেনি। বরং বহুদূর ছিটকে পড়েছে পবিত্র কোরআনে বর্নিত সিরাতুল মোস্তাকীম থেকে। আর যারা মূল রাস্তা থেকে ছিটকে গভীর খাদে গিয়ে জ্ঞান হারায় তাদের পক্ষে কি সেখান থেকে উঠে আসা সহজ? হিন্দু, খৃষ্টান বা ইহুদী থেকে ইসলাম থেকে দূরে সরা এসব মুসলিম নামধারিদের পার্থক্যই বা কতটুকু? বরং মিলতো বিশাল। হিন্দু, খৃষ্টান বা ইহুদীদের ন্যায় তাদের অবস্থানও সিরাতুল মোস্তাকীমে নয়। তারাও কাফেরদের ন্যায় শরিয়ত, খেলাফত ও জিহাদের বিরোধীতায় একই রূপ যুদ্ধাংদেহী। রাজনীতি, সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহের অঙ্গণে মুসলমান নামধারি এসব ব্যক্তিগণও তাই অমুসলমানের সাথে একত্রে নামে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ বাহিনী যখন ইরাক ও ফিলিস্তিন দখলে হামলা চালায় তখন হানাদার সে সামরিক বাহিনীতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ন্যায় হাজার হাজার মুসলিম নামধারি যুবকও মুসলিম হত্যায় শামিল হয়েছিল। অন্তরে ঈমান থাকলে কেউ কি এভাবে কাফের বাহিনীতে যোগ দিতে পারে? এমন কাজ তো হারাম। কিন্তু সে হারামকেও বহু মুসলিম নামধারি সেদিন হালাল রূপে গ্রহণ করেছিল। লক্ষ লক্ষ আধুনিক শিক্ষিতরা আজও সে ধারাকে অব্যাহত রেখেছে। মুখে মুসলমান হওয়ার গগনবিদারি দাবী, অথচ তাদের সশস্ত্র অবস্থান শত্রু শিবিরে।একাত্তরে তাদেরকেই ভারতীয় কাফেরদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে মুসলিম নিধনে দেখা গেছে। শিক্ষাদানের নামে ইংরেজগণ এভাবেই সেদিন বহু মুসলিম সন্তানকে ইসলাম থেকে দূরে সরাতে পেরছিল। এদের কারণেই ভারতের বুকে ১৯০ বছরে ঔপনিবেশিক শাসনে ব্রিটিশদের কলাবোরেটর পেতে কোনরূপ অসুবিধা হয়নি। ইসলাম থেকে দূরে সরা এ্মন মানুষদের কারণে খেলাফতের বিরুদ্ধে যোদ্ধা পেতে সাম্রাজ্যবাদি কাফেরশক্তির আজও কোন অসুবিধা হচেছ না।

মুসলিম দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটেছে। কিন্ত তাদের প্রতিষ্ঠিত ঈমানহীন করার কারখানাগুলো এখনো বন্ধ হয়নি। বরং অভিন্ন প্রকল্প নিয়ে বিপুল ভাবে বেড়েছে সেগুলির সংখ্যা ও সামর্থ। ফলে বিপুল ভাবে বেড়েছে ইসলামের শত্রু উৎপাদনও। তাতে দ্রুত বাড়ছে দিন দিন ইসলাম থেকে দূরে সরার কাজ। ফলে বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে শরিয়ত, খেলাফত ও জিহাদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড বিরোধীতাটি কাফেরদের পক্ষ থেকে আসছে না, আসছে তথাকথিত মুসলমানদের পক্ষ থেকে। এমন কি আসছে তথাকথিত আলেমদের পক্ষ থেকেও। আজ থেকে শত বছর আগেও বাংলার বা ভারতীয় মুসলমানদের অবস্থা এতটা শোচনীয় ছিল না। খেলাফতের পক্ষে সেদিন গড়ে উঠেছিল তুমুল গণআন্দোলন। ভারতীয় ইতিহাসে সেটি খিলাফত আন্দোলন নামে পরিচিত। ভারতের ইতিহাসে সেটিই ছিল সর্বপ্রথম গণআন্দোলন। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে সেদিন খলিফার সাহায্যে মুষ্টির চালের হাড়ি বসানো হয়েছিল। বহু ভারতীয় মোজাহিদ সেদিন ছুটে গিয়েছিলেন খলিফার বাহিনীতে যোগ দিতে। অথচ তেমন আত্মত্যাগকে আজ বলা হচ্ছে সন্ত্রাস। জাতিয়তাবাদের ভূগোল ডিঙানো প্যান-ইসলামীক মুসিলিম ভাতৃত্বকে বলা হচ্ছে মৌলবাদ।

 

 

খিলাফত কেন অপরিহার্য?

ঈমানদারের জন্য ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাটি শুধু রাজনৈতীক ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন নয়। বরং এমন একটি রাষ্ট্র অতি অপরিহার্য হলো মু’মিন রূপে বাঁচা ও ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার স্বার্থে। আলোবাতাস ও পানাহারে দেহ নিয়ে বাঁচা সম্ভব। কিন্তু তাতে ঈমান নিয়ে বাঁচাটি সম্ভব হয় না। ঈমান বাঁচাতে যা অপরিহার্য তা হলো ইসলামি শিক্ষা। ঈমানে পুষ্টি জোগানোর স্বার্থে পানাহারের ন্যায় ইসলামি শিক্ষার প্রয়োজনটিও প্রতিদিনের। সে প্রয়োজনটি কয়েক বছরের ছাত্রাবস্থায় মেটে না। ঈমানদারের সে ছাত্রাবস্থাটি আজীবনের।ফলে মুসলিম দেশের সব নাগরিকই কার্যত ছাত্র। তেমন একটি প্রয়োজন মেটাতে সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্র তখন পরিণত হয় মাদ্রাসায়। শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়াই মহান নবীজী (সাঃ)র সূন্নত। শত্রুর বিরুদ্ধে কোরআনই ইসলামের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ইসলামের যাত্রা তাই নামায-রোযা ও হজ-যাকাত দিয়ে হয়নি; হয়েছে ইকরা বা পড়া দিয়ে। সেটি নবুয়তের প্রথম দিন থেকেই। সেটির শুরু লাগাতর কোরআনী জ্ঞান-বিতরনের মধ্য দিয়ে।

নারী-পুরুষ ও সকল বয়সের ছাত্রদের ইসলামি জ্ঞানদান সুনিশ্চিত করার মূল দায়ভারটি রাষ্ট্রের। মূলতঃ রাষ্ট্রের ঘাড়ে এটিই হলো সবচেয়ে বড় দায়ভার। কোরআন-হাদীসের জ্ঞান হলো সে পুষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ ভান্ডার। অথচ রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা কি ধরণের জ্ঞান জোগাবে সেটির পূর্ণ-নিয়ন্ত্রন থাকে সরকারের হাতে। তাই রাষ্ট্র্র ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলে গেলে অসম্ভব হয় ইসলামি জ্ঞান লাভ। তাতে অসম্ভব হয় মুসলমানদের মুসলমান রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠা। কাফেরশক্তির হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ার এখানেই মূল বিপদ।সে বিপদ যেমন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের শাসনামলে বেড়েছে। তেমনি বেড়েছে জাতিয়তাবাদি সেক্যলারিস্টদের দখলদারিতেও। ফলে মুসলিম চেতনায় প্রবল ভাবে বেড়েছে কোরআনী জ্ঞানের অপুষ্টি। তাতে মুসলিম সন্তানের মনে ঈমান যে মারা যাবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে সেটিই ঘটছে। ফলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ হয়, ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসবও হয়।এবং দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ডও গড়ে।

জীবননাশী জীবাণুর চেয়ে ধ্যান-ধারণাও কম বিষাক্ত বা কম বিনাশী নয়। বিষাক্ত জীবাণু প্রাণনাশ ঘটায়। আর ঈমাননাশ ঘটায় দূষিত ধ্যান-ধারণা। বিষাক্ত ধ্যান-ধারণার সে নাশকতায় এমন কি দেশের ভূগোলেরও বিনাশ ঘটে। সে দৃষ্টান্ত হলো পাকিস্তান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে। নানা ভাষার ভারতীয় মুসলমানদের বিশাল রক্তের কোরবানীতে দেশটি সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু অধিকৃত হয়ে যায় সামরিক ও বেসামরিক সেক্যুলারিষ্টদের হাতে। ইসলামের এ শত্রুরা নিজেদের নানামুখি নাশকতার পাশাপাশি বিশ্বের নানা কাফের দেশ থেকে ঈমাননাশী জীবাণূ আমদানি শুরু করে। সে জীবাণু মার্কসবাদের নামে আনে সোভিয়েত রাশিয়া এবং চীন থেকে।সস্তায় মার্কসবাদের সে বিষাক্ত বই ও পত্রিকা পৌছিয়ে দেয়া হতো কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে। ফল দাঁড়ায়, মার্কসবাদের বিষপান করা ও মার্কসবাদী হওয়া তখন ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ফ্যাশনে পরিণত হয়। সে সাথে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিষাক্ত বিষ আমদানি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সে বিষ আসে হলিউডের উলঙ্গ ছায়াছবির মাধ্যমে। সে বিষ দিবারাত্র পান করানো হতো সিনেমা হল গুলোতে। ফলে আমদানিকৃত সে বিষে মারা যায় প্যান-ইসলামিক চেতনা -যা ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির মূল ভিত্তি। এবং প্রতিষ্ঠা পায় জাতিয়তাবাদ, সমাজবাদ ও সেক্যুলারিজমের ন্যায় ইসলাম-বিনাশী বিষাক্ত মতবাদ। ফলে ধ্বসে যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ।এখন সে বিষাক্ত বিষ পচিয়ে দিচ্ছে বাঙালী মুসলমানের চরিত্রও। দেশে ভাত-মাছের আয়োজন বাড়িয়েও তাই শান্তি বাড়ছে না। বরং বাড়ছে আযাব। আযাব আসছে ভয়ানক এক দুর্বৃত্ত শাসনের বেশ ধরে|

মুসলিম রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ভয়ানক রোগভোগ, পোকা-মাকড় ও পানাহার রোধই নয়, বিষাক্ত ধ্যান-ধারণার প্রতিরোধও। আর সে কাজটি কোন ব্যক্তির দ্বারা সম্ভব নয়।সে দায়িত্বটিও রাষ্ট্রের।ইসলামি রাষ্ট্র ঈমাননাশী ধারণার বিরুদ্ধে প্রতিরোধক ভ্যাকসিন দেয় কোরআনী-হাদীসের গভীর জ্ঞান দিয়ে। এতে ইম্যুনিটি বাড়ে কুফরি ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রে জন্ম নেয়া শিশুর পক্ষে ঈমান নিয়ে বাঁচা ও বেড়ে উঠাটি সহজ হয়। অপরদিকে অনৈসলামি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা ছাত্রের চেতনায় ভ্যাকসিন দেয় ইসলামের বিরুদ্ধে। ফলে সে দেশে দুরূহ হয় ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠা। কাফের অধ্যুষিত দেশে বা কাফেরদের প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থায় বেড়ে উঠা মানুষের মাঝে আল্লাহর আইন, খিলাফত, জিহাদ ও জিজিয়ার বিরুদ্ধে ঘৃণাবোধ এজন্যই অতি প্রচন্ড। কাফের অধ্যুষিত দেশে বসবাস ও কাফেরদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভের এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ। কাফেরদের কাছ থেকে আলুপটল বা হাসমুরগী কেনা চলে, তাদের থেকে প্রযুক্তি বা চিকিৎসা জ্ঞানও নেয়া যায়। কিন্তু তাদের থেকে রাজনীতি, সমাজনীতি, দর্শন, ধর্মজ্ঞান, নীতিজ্ঞান, ইতিহাস ও জীবন জিজ্ঞাসার অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা লাভের বিপদ ভয়ানক। এজন্যই নবীজী (সাঃ)র যুগে মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর কাফের দেশে বসবাস করা হারাম ঘোষিত হয় এবং ফরজ ঘোষিত হয় হিজরত।

 

খেলাফত বিলুপ্তির আযাব

খেলাফতের প্রতিষ্ঠা কোন কালেই ফেরেশতাদের হাতে ঘটেনি। দোষত্রুটি নিয়ে যে মানুষ তারাই খেলাফত প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। কিন্তু সে ত্রুটির দোহাই দিয়ে খেলাফত বিলুপ্তিকে কোন কালে কি জায়েজ বলা হয়েছে? অথচ আজ খেলাফতের বিলুপ্তির লক্ষ্যে জিহাদীদের মাথার উপর বোমা ফেলার জন্য কাফের মার্কিন বাহিনীকে ডাকা হচ্ছে। দোষত্রুটি সম্পন্ন মানুষদের মধ্য থেকেই কাউকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিতে হবে। খলিফা হওয়ার শর্ত ফেরশতা হওয়া নয়। বরং সে শর্তটি হলো গোত্র, বর্ণ, ভাষাগত পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, মুসলমানদের একতা ও লাগাতর জিহাদ সংগঠিত করায় আন্তরিক হওয়া। শর্ত হলো, বিশ্বের তাবত ভাষাভাষি মুসলমানদের জন্য ইসলামি রাষ্ট্রের দরওয়াজা সবসময়ের জন্য খুলে দেয়া। শর্ত হলো মুসলিম জাহান জুড়ে পৃথক পৃথক জাতীয় রাষ্ট্রের নামে যে বিভক্তির দেয়াল গড়া হয়েছে সেগুলো বিলুপ্ত করায় সচেষ্ট হওয়া।

মাত্র শত বছর আগেও যে কোন মুসলিম খলিফা শাসনভূক্ত যে কোন প্রদেশে, শহরে ও গ্রামে বসতি স্থাপন করতে পারতো। দোকান-পাঠ বসিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করতে পারতো। তাতে কোন বাধা ছিল না। কে আরব, কে তুর্কি, কে কুর্দি, হিন্দি, আফগানি বা বাঙালী -সে পরিচয় নেয়া হতো না। এমন কি আজ ই্সরাইলেও নেয়া হয়। ইসরাইলের নাগরিক হওয়ার জন্য ইহুদী হওয়াটিই যথেষ্ট। আমরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর নাগরিক হওয়ার জন্য সে সব দেশে ৫ বছরের বেশী বৈধ বসবাসই যথেষ্ট। অথচ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলি মুসলিম দেশে ২০ বা ৩০ বছর বৈধভাবে বসবাস ও খেদমতের পরও অনারব মুসলমানের নাগরিকত্ব জুটে না। এটি কি মানবতা? এটি কি ইসলাম? এতো আদিম জাহিলিয়াত যুগের বর্বরতা। অথচ এরূপ বর্বরদের হাতে মুসলিম ভূমিগুলি আজ অধিকৃত। এ হলো খেলাফত বিলুপ্তির আযাব।

আরব দেশগুলির উন্নয়নে যারা নিজেদের রক্ত পানি করছে সে দেশে তাদের নাগরিকত্ব লাভের অধিকার কি সেদেশের আদি জনগণের চেয়ে কম? কোন সভ্য দেশ কি সে অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করতে পারে? খেলাফত প্রতিষ্ঠিত খাকলে কি এরূপ বর্বরতা স্থান পেত? খলিফা তো বিশ্বের সমগ্র মুসলমানদের অভিভাবক। তার কাছে আরব-অনারব, সাদা-কালো সবাই সমান। তাই এমন বিভাজন উমাইয়া, আব্বাসীয় ও ওসমানীয়া খেলাফত আমলেও ছিল না। মহান আল্লাহতায়ালা প্রতিটি মু’মিনকে অপর মু’মিনের ভাই বলেছেন। প্রকৃত ঈমানদারের দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে দেয়া ভাতৃত্বের পরিচয়ের প্রতি সম্মান দেখানো। নিজ ভাইয়ের প্রবেশ রুখতে কি দেয়াল গড়া যায়? অথচ আরব দেশগুলো সেটাই করেছে এবং এরপরও তারা নিজেদের মুসলমান রূপে দাবী করে! খেলাফত প্রতিষ্ঠা পেলে বিভক্তির দেয়াল লোপ পাবে। তখন বিলুপ্ত হবে আরব-অনারব, শ্বেতাঙ্গ-কষ্ণাঙ্গ, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য মুসলমানের পার্থক্য।এবং প্রতিষ্ঠা পাবে প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্ব। খলিফা বাগদাদীর পক্ষে থেকে তো সেটিরই ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ইরাক এবং সিরিয়ার মাঝের সীমান্ত রেখাকে তাই ইতিমধ্যেই গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আরব-অনারব, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ, এশিয়ান-ইউরোপীয়ানগ সেখানে একই রণাঙ্গণে। বিশ্বের নানা ভাষা-ভাষী মুসলমানগণ আজ মিলেমিশে এক বিশাল বিশ্বশক্তি রূপে মাথা তুলে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু সেটি যেমন বিদেশী কাফেরগণ চায় না, তেমনি বর্ণবাদী, গোত্রবাদী, রাজতন্ত্রি ও স্বৈরাচারি জাতিয়তাবাদিগণও চায় না। আরব শাসকগণ ফিরে গিছে ইসলামপূর্ব আরব জাহিলিয়াতের দিকে। নবীজী (সাঃ) বিরুদ্ধে সে আমলের আবর গোত্রগুলি যেরূপ কোয়ালিশন গড়েছিল, আজকের স্বৈরাচারি আরব শাসকগণও সে পথ ধরেছে। খেলাফতের বিরুদ্ধে তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে গভীর একতা। গাজায় ইসরাইলী গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তারা একটি দিন বা একটি ঘন্টার জন্য একত্রে বৈঠক করতে পারিনি। এখন খিলাফতের বিরুদ্ধে তাদের বৈঠকের শেষ নাই। এসব আরব শাসকবর্গ অনারব মুসলমানদের চেয়ে পাশ্চাত্যের কাফেরদেরকেই বেশী আপন ভাবছে। নিজেদের অবৈধ শাসনের প্রতিরক্ষায় তারা ইসলামের পবিত্র ভূমিতে কাফেরবাহিনীকে ডাকছে। খেলাফতের নির্মূলে গড়ে তুলেছে বৃহত্তর কোয়ালিশন। স্বৈরাচারি এসব আরব শাসকগণ ও তাদের গৃহপালিত আলেমগণ ইসলাম থেকে যে কতটা দূরে সরেছে সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাঁকি থাকে?  ২২/০৯/১৪