গণতন্ত্রের কবর ও সন্ত্রাসে আওয়ামী মনোপলি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

নগ্ন বেশে সরকার

গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনার ভাবনা নাই। গণতন্ত্র আজ কবরস্থ্য। ফলে ভাবনা নাই জনগণের কাছে জবাবদেহীতা নিয়েও। জনগণ কি ভাববে বা আন্তর্জাতিক মহলে দেশ কতটা কলংকিত হবে -সেদিকেও সামান্যতম ভ্রুক্ষেপ নাই। মুজিবের আমলে দেশ তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি রূপে পৃথিবী ব্যাপী প্রচার পেয়েছিল। কিন্তু তাতে মুজিব ও তার অনুসারিদের একটুও লজ্জা হয়নি। বরং সে অপমান নিয়ে আজও  আওয়ামী বাকশালীদের অহংকার। লোকলজ্জা লোক পেলে কোন কুকর্মতেই বিবেকের পক্ষ থেকে বাধা থাকে না। নির্বাচনের নামে প্রহসন, যৌথবাহিনী ও অস্ত্রধারি দলীয় গুন্ডাদের দিয়ে শত শত বিরোধী নেতাকর্মীদের গুম,হত্যা ও নির্যাতনে শেখ হাসিনা ও দলীয় কর্মীদের বিবেকে সামান্যতম দংশনও হয় না। যেন দেশে কিছুই হয়নি। মহান নবীজী (সাঃ) তাই লজ্জাকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, যার লজ্জা নাই তার ঈমানও নাই। আর ঈমান না থাকলে তার জন্য ফাসেক, জালেম বা কাফের হওয়া সহজ হয়ে যায়।

সরকার জনগণকে গাছপালা বা গরু-ছাগলের চেয়ে বেশী কিছু ভাবছে না। একই রোগ সব স্বৈরাচারির। তাদের ধারণা, গরু-ছাগলের জন্মই তো অধিকারহীন ও জবাই হওয়ার জন্য। তাই হিটলার ও স্টালিনের ন্যায় স্বৈরাচারিরা গ্যাস চেম্বার বা ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। ফিরাউন বনি ইসরাইলের প্রতিটি পুরুষ শিশুকে হত্যা করতো। হাসিনাও তেমনি নিরপরাধ মানুষদের ক্রস ফায়ারে দিচ্ছে। একই কাজ করেছে তার পিতা শেখ মুজিব। তারা জানে,গাছপালা ও গরু-ছাগলের সামনে সন্ত্রাস করলে বা ঘরবাড়িতে আগুন দিলে প্রতিবাদ উঠে না। কাপড় খুললেও ধিক্কার দেয় না। দেশ যেন গভীর জঙ্গল। জঙ্গলে লাশ পড়লে বিচার হয়না। তেমনি শত শত লাশ পড়লেও বাংলাদেশে কারো বিচার হয় না,শাস্তিও হয় না। শাপলা চত্বরে এত নিরীহ মুসল্লির প্রাণ গেল, কিন্তু কোন খুনির গায়ে কি কোন আঁচড় লেগেছে? একদিনের জন্যও কি কারো কারাবাস হয়েছে? হাসিনা ও তার বাকশালী সহকর্মীরা শুধু গণতন্ত্রকেই কবর দেয়নি, কবর দিয়েছে নিজেদের বিবেককেও। চোরডাকাত, খুনি ও পতিতারা বিবেক ও লজ্জা-শরম নিয়ে রাস্তায় নামে না। বিবেক ও লজ্জা-শরম নিয়ে রাজনীতিতে নামেনি শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী সহযোগীরা। একই রূপ অবস্থা ছিল হাসিনার পিতা মুজিবের। সামান্যতম বিবেক ও লজ্জা-শরম থাকলে কি মুজিবের হাতে গণতন্ত্র নিহত হত? প্রতিষ্ঠিত হত কি বাকশালী স্বৈরাচার? নিহত হত কি ৩০-৪০ হাজার মানুষ? স্বাক্ষরিত হত কি ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি? দেশ হারাতো কি বেরুবাড়ী? মুজিবের আমলে যারা নিহত হলো –তাদের হত্যার অপরাধে একদিনের জন্যও কারো জেল হয়নি। ইতিহাসের আরেক শিক্ষা, ফিরাউন-নমরুদদের ন্যায় নৃশংস স্বৈরাচারিদের ভগবান বলার মত বিবেকহীন লোকের অভাব কোন কালেই হয়নি। তাই অভাব নেই শেখ মুজিব স্বৈরাচারিদের জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু এবং হাসিনার ন্যায় ভোটচোরকে মানণীয় বলার মত লোকেরও। যেদেশের কোটি কোটি মানুষ শাপশকুন ও গরুবাছুরকে দেবতা বলে পুজা দেয়, সে দেশের বহু কোটি মানুষ এসব স্বৈরাচারিদের নেতা বা পিতা বলবে -তাতেই বা বিস্ময়ের কি?

 

বিবেকধ্বংসী নাশকতা

প্রাণনাশী শুধু রোগজীবাণূই নয়, বরং ভয়ংকর নাশকতা বিবেকহীন রাজনীতিবিদদের। রোগজীবাণূ প্রাণ নাশ ঘটায়, আর বিবেকহীন রাজনীতিবিদেরা বিনাশ ঘটায় বিবেকের। কারণ সেটি তাদের জন্য অপরিহার্য। কারণ বিবেক বিনাশের কাজটি যথার্থ ভাবে না হলে জনগণের কাতার থেকে উপাসনা জুটে না। যুগে যুগে নমরুদ-ফিরাউনরা তাই সুস্থ্য বিবেকবোধ ও সঠিক ধর্মচিন্তা নিয়ে মানুষকে বেড়ে উঠতে দেয়নি। তেমন একটি রাজনৈতিক প্রয়োজনেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে নমরুদ আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। আর ফিরাউন ধাওয়া করেছিল হযরত মূসা (আ:)’র পিছনে। স্বৈরাচারের জেলে যেতে হয়েছে ইমাম আবু হানিফা (রহ:),ইমাম মালেক (রহ:),ইমাম হাম্বলী (রহ:)’র মত মহান ব্যক্তিদের। মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারি শাসকেরা এভাবেই যুগে যুগে চ্যালেঞ্জ খাড়া করেছে। ইসলাম নিয়ে বাঁচতে হলে স্বৈরাচার নির্মূল তাই অনিবার্য হয়ে পড়ে। এজন্যই ইসলামে বড় ইবাদত হলো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জিহাদ। এ জিহাদে প্রাণ গেলে মহান আল্লাহতায়ালা নিহত ব্যক্তিকে মৃত্যুহীন জান্নাত দেন।

বিবেকহীন রাজনীতিবিদদের কারণেই নৈতিক মহামারি লেগেছে বাংলাদেশের প্রশাসন,পুলিশ ও আদালতে। ফলে আজ থেকে ৫০ বছর আগের পাকিস্তান আমলে রাজনীতি,আদালত, প্রশাসন ও পুলিশে যে বিবেকবোধ দেখা যেত সেটি আজ কল্পনাই করা যায় না। ভয়াবহ বিবেকহীনতার কারণে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবী এখন আর মিছিল থামাতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে না। লাঠিচার্জও করে না। বরং সরাসরি গুলি চালায়। লাঠিচার্জ বা গ্রেফতারে নয়,লাশ ফেলাতেই তাদের আনন্দ। আরো আনন্দ পায় বিরোধীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে বা বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিতে। ফলে বেশুমার মানুষ আজ  যত্রতত্র লাশ হচ্ছে। বাংলাদেশের পুলিশ ও র‌্যাব পরিণত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ খুনি বাহিনীতে। একমাত্র মিশর ও সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও পুলিশের সাথেই তাদের তুলনা চলে। পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে পুলিশের হাতে ২৩ জন মানুষও নিহত হয়নি। ১৯৫২ সালের ২১ই ফেব্রেয়ারিতে মাত্র ৩ জন মারা গিয়েছিল। অথচ সেটিই ইতিহাস হয়ে গিয়েছিল।তাতেই সরকার পরিবর্তন হয়েছিল।৩ জনের হত্যাকে নিয়ে পাকিস্তানের বাঙালীরা সেদিন থেকে “আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রেয়ারি,আমি কি ভূলিতে পারি” বলে গান গাওয়া শুরু করেছিল। আজও  সে গান গা্ওয়া শেষ হয়নি।অথচ আজ এক দিনে ৩ জন নয়, ৩ শত খুন হয়। সমগ্র দেশ এখন শাপলা চ্ত্বর। কিন্তু তা নিয়ে আওয়ামী ঘরানার আব্দুল গাফফারদের গলায় আজ  আর বেদনাশিক্ত গান আসে না। বরং আসে আনন্দ-উৎসব। আব্দুল গাফফারদের হাতে রচিত হয় খুনি হাসিনার পক্ষে অসংখ্য প্রশংসাগীত। একটি দেশে বিবেকের মৃত্যূ যে কতটা ভয়ানক হতে পারে এ হলো তার নজির।

১৯৫২ সালের ২১ই ফেব্রেয়ারিতে মাত্র ৩ জন মারা যাওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী জনাব নুরুল আমীন নিহত পরিবারের কাছে মাফ চেয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত গলায় বেতার ভাষণ দিয়েছিলেন।তিনি নিজে যে পুলিশকে গুলিচালনোর হুকুম দেননি এবং সে খুনের সাথে যে তিনি নিজে জড়িত ছিলেন না, সে কৈফিয়তটিও জনগণের সামনে বার বার দিয়েছিলেন। অথচ আজ  পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবীর হাতে শত শত মানুষ খুন হচ্ছে। কিন্তু সে খুন নিয়ে হাসিনার মুখে কোন অনুশোচনা নেই। বরং আছে প্রচন্ড আত্মতৃপ্তি। সে আত্মতৃপ্তি নিয়ে “লাশরা পুলিশের তাড়া খেড়ে উঠে দৌড়িয়েছে” সে কৌতুকও তিনি শোনান। এক খুনের বদলে তিনি ১০ খুনের হুমকি দেন। তেমনি এক অপরাধি চেতনা নিয়ে শাপলা চত্বরের শহীদদের লাশ ময়লার গাড়িতে তোলা হয়ছে। গণতন্ত্রের হায়াত মওত নিয়েও হাসিনার সামান্যতম ভাবনা নেই। সে ভাবনা হাসিনার পিতা শেখ মুজিবেরও ছিল না।মুজিব তাই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিল।এবং সকল বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ ও সকল বেসরকারি পত্রপত্রিকার অফিসে তালা ঝুলিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উৎসব করেছিল।

 

কুফল লজ্জাহীনতার

লজ্জাহীনতার কুফল অতি ভয়ানক। তাতে বিলুপ্ত হয় মানবিক গুণ।  চোর-ডাকাত ও পতিতাদের মূল সমস্যাটি হলো, তাদেরে হায়া-শরম থাকে না। একই সমস্যা গণতন্ত্রের শত্রুদের। লজ্জাশরম থাকলে মানুষ কি এমন অপরাধে নামে? সব যুগে ও সব দেশেই গণতন্ত্রের শত্রুদের একই অবস্থা। গণতন্ত্র হত্যা, পত্রিকার অফিসে তালা লাগানো ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হত্যায় যেমন শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার লজ্জা হয়নি, তেমনি হচ্ছে না মিশরের স্বৈরাচারি শাসকদের। লজ্জাহীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মিশরের সামরিক বাহিনী নিজেই আগামী নির্বাচন লড়তে যাচ্ছে। অন্য কোন বেসামরিক ব্যক্তিকে নয়, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল সিসিকে তারা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী খাড়া করেছে। সমগ্র দেশ এখন সেনা বাহিনীর হাতে অধিকৃত। বিরোধী দলের নেতাকর্মীগণ এখন কারারুদ্ধ। তারা শুধু বেশরমই নয়,কত বড় বেপরওয়া যে, সেনাবাহিনীর প্রধান সিসি ও তার সমর্থকগণ এরূপ সামরিক অধিকৃতিকে বলছে তাহরির স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবেরর ধারাবাহিকতা। ড. মুরসীর আমলে নাকি গণতন্ত্র হাইজ্যাক হয়েছিল,এখন তারা পথে এনেছে। মিথ্যাচার আর কাকে বলে! জেনারেল সিসির পক্ষে প্রচার চালাতে বাধ্য করেছে সে দেশের সকল টিভি চ্যানেল ও পত্রপত্রিকাগুলোকে।সেনাবাহিনীর কাছে যে কোন নিরপেক্ষ প্রচারনাই অসহ্য। প্রচারনা হতে হবে শুধু তাদের পক্ষে। তাই আল -জাজিরার সাংবাদিকদের সন্ত্রাসী বলে জেলে তুলেছে। নিরেট তাঁবেদার ও পাহারাদারে পরিণত করেছে দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বিচারকগণ। সেনাবাহিনী এক রাতে কায়রোর এক ময়দানে হাজারের বেশী নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করেছে। অথচ এরপরও নিজেদেরকে তারা গণতন্ত্রি বলছে।এবং এরূপ নৃশংস হত্যাকান্ডকে বলছে আইনের শাসন। অপর দিকে জেলে তুলেছে ও হত্যা মামলার আসামী বানিয়েছে সেদেশের ইতিহাসের সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসেডেন্ট ড.মুরসীকে। সন্ত্রাসী দল বলে নিষিদ্ধ করেছে মুরসীর দল ইখওয়ানুল মুসলিমুনকে। এরূপ স্বৈরাচারি কুকর্মে জেনারেল সিসির লজ্জা-শরমে একটুও বাধেনি। যেমন বাধছে না শেখ হাসিনারও। ফলে তার কাছে ৫ই জানুয়ারির ভূয়া নির্বাচন গণ্য হচ্ছে গণতন্ত্রের বিজয় রূপে। শতকরা ৫ জন ভোট না দিলে কি হবে,সে নির্বাচনকে বৈধ বলে আরো ৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পক্ষে যুক্তি পেশ করছে।

 

সন্ত্রাসে মনোপলি

সব স্বৈরাচারি শাসকেরাই সন্ত্রাস, লুটতরাজ ও খুন-খারাবীতে নিজেদের নিরংকুশ মনোপলি চায়। এককালে একই রূপ মনোপলি ছিল ব্রিটিশ,স্পানিশ, ডাচ ও পর্তুগীজসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশিক শক্তির। অধিকৃত দেশগুলিতে নিজেদের সে হিংস্র মনোপলিকে বলতো আইনের শাসন। ভারত যখন তাদের হাতে অধিকৃত,এ দেশের নাগরিকদেরকে নিজ বাড়ীতে তীর-ধনুক,তলোয়ার রাখাকেও তারা সন্ত্রাস বলতো। সে অপরাধে তাদেরকে জেলেও তুলতো। আর নিজেরা নির্বিচারে লক্ষ লক্ষ মানুষকে খুন করতো। খুন করে লাশকে বাজারে, নদীর ঘাটে বা লোকালয়ে উঁচু খুঁটিতে লটকিয়ে রাখাটি তাদের কৌশল ছিল। লক্ষ্য, সাধারণ মানুষকে ভীত সন্ত্রস্ত করা। তাদের সন্ত্রাসে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানগণ প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের আদিবাসীগণ। বাংলাদেশের বুকে সন্ত্রাসে একই রূপ মনোপলি হলো আওয়ামী লীগের। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একই ভাবে শুরু হয়েছে রাজনৈতীক শত্রু নির্মূলকরণ। ডাকাত সর্দার যেমন ডাকাতীর স্বার্থে অন্যান্য ছোটখাটো ঢাকাতদের সাথে নেয়, শেখ হাসিনাও তেমনি এরশাদের ন্যায় আরো কিছু স্বৈরাচারিকে সাথে নিয়েছে।

সন্ত্রাসীরা কখনোই নিরস্ত্র মানুষের কাকুতি-মিনতি বা নসিহতে কান দেয় না। এমন কি নবী-রাসূলদের মত মহান ব্যক্তিদের নসিহত্ও তাদের উপর কোন আছড় করেনি। তাদের নজর তো নিরস্ত্র নরনারীর পকেট ও ইজ্জতের দিকে। জনগণকে নিরস্ত্র ও প্রতিরোধহীন দেখাতেই তাদের আনন্দ। তারা বরং নিরস্ত্র মানুষের অসহায় অবস্থাকে উপভোগ করে। তারা তো চায় সারা জীবন তাদের সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম থাকুক। নমরুদ-ফিরাউনের ন্যায় মুজিব যেমন সেটি চেয়েছিল, হাসিনাও সেটি চায়। সেটি শুধু হাজার হাজার নয়,লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তপাতের মধ্য দিয়ে হলেও। কাশ্মীরে লক্ষাধিক মানুষের লাশ পড়লেও ভারতীয় স্বৈরাচার দখলদারি সেখানে ছাড়েনি। ভারত তার অনুগতদের দিয়ে আজ যে অধিকৃতি বাংলাদেশের উপর প্রতিষ্ঠা করেছে সেটি শুধু রাজপথের কিছু মিটিং-মিছিল, কিছু ধর্মঘট ও কিছু অবরোধের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার নয়। সিরিয়ার হাফেজ আল আসাদ বা ক্যাম্বাডিয়ার সাবেক কম্যুনিস্ট শাসক পলপটের চেয়ে হাসিনা কম ক্ষমতা লিপ্সু নয়। পলপট সরকারের হাতে সে দেশের সিকি ভাগ মানুষ নিহত হয়েছিল। নিহতদের সংখ্যা ছিল ২০ লাখের বেশী। অপর দিকে স্বৈরাচারি আসাদের হাতে ইতিমধ্যে নিহত হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার নিরস্ত্র মানুষ।

 

লড়াই জান্নাত ক্রয়ে

স্বৈরাচারিরা কখনোই কোন দেশে একাকী আসে না। শুধু গণতন্ত্র হত্যা ও চুরি-ডাকাতিই তাদের একমাত্র হত্যা নয়। তাদের বড় অপরাধ যেমন মানব হত্যা,তেমনি ধর্ম ও সভ্যতার হত্যা। ফিরাউন, নমরুদের ন্যায় ইসলামের বড়শত্রু চিরকালই ছিল স্বৈরাচারিরা।আজ যেমন সেটি মিশরে, তেমনি সিরিয়া ও বাংলাদেশে। বাংলাদেশে সে হত্যার পর্বটি শুরু হয়েছে মাত্র। তাই হাসিনার স্বৈরাচারি সরকার যতই দীর্ঘায়ু পাবে ততই বাড়বে খরচের বিশাল অংক। একারণেই কোন সভ্য মানুষ এরূপ স্বৈরাচারি সরকারকে মেনে নিতে পারে না। সমগ্র ইতিহাসে মানবের জানমালের সবচেয়ে বড় খরচটি বনের হিংস্র পশু তাড়াতে হয়নি। বরং সেটি হয়েছে মানুষ রূপী এ হিংস্র জীবদের তাড়াতে। মহান আল্লাহতায়ালা দ্বীনের এ শত্রুদের তাই পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। তাদের নির্মূলে নবীজীর আমলে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবাকে শহীদ হতে হয়েছে।

যে কোন নির্মাণ কাজই বিপুল বিনিয়োগ চায়। উচ্চতর সভ্যতা নির্মাণের চেয়ে ব্যয়বহুল নির্মাণ কাজ মানব ইতিহাসে আর কিছু আছে কি? এ কাজ তো মুসলিমদের বিশ্বশক্তি রূপে দাঁড় করানোর। ঈমানদার তো সে বিপুল ব্যয়ের মধ্য দিয়েই জান্নাত ক্রয় করে। মহান আল্লাহতায়ালা এর চেয়ে সহজ কোন রাস্তা মু’মিনের জন্য খোলাও রাখেননি। বাংলাদেশে বর্তমান লড়াই তাই স্রেফ গণতন্ত্র বাঁচানোর নয়, মানুষের জানমাল ও ইসলাম বাঁচানোর। মু’মিনের জীবনে এ লড়াই জান্নাত ক্রয়ের। দেশে দেশে মুসলিমদের মাঝে সে লড়াই আজ তীব্রতর হচ্ছে। বহু গাফেল মুসলিম সেটি না বুঝলেও শয়তানি শক্তি সেটি বুঝতে পেরেছে। হাসিনার পিছনে ভারতসহ সকল কাফের শক্তির বিনিয়োগ তো সে কারণেই এত অধিক। ০৮/০২/২০১৪

 

 




মুসলিম বিশ্বে মার্কিনী সন্ত্রাস: প্রতিরোধ কীরূপে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

তান্ডব মার্কিন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের

নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচার স্বার্থে আশেপাশের হিংস্র জন্তু-জানোয়ারদের চিনতে হয়। জানতে হয় তাদের বিচরনের ক্ষেত্রগুলোকেও। গড়ে তুলতে হয় হিংস্র পশুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সামর্থ্য। নইলে প্রাণ বাঁচে না। তেমনি যে বিশ্বে বসবাস, জানতে হয় সে বিশ্বের হিংস্র দানবদেরও। গড়ে তুলতে হয় সে দানবদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্ট্রাটেজী। এ পৃথিবী পৃষ্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছ মানব ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী দানব রূপে। তার নাশকতার সামর্থ্য তূলনাহীন। দেশটি ইতিমধ্যেই বহু দেশে বহু বীভৎস নাশকতা ঘটিয়েছে। তাছাড়া দেশটির ভান্ডার এখনো রয়েছে নাশকতার বিপুল সামর্থ্য। সে সাথে রয়েছে সে নাশকতার নেশাও। মানব জাতির জন্য তাই এটি বিপদজনক পরিস্থিতি। এ নিবন্ধ লেখার মূল উদ্দেশ্য তেমনি একটি পরিস্থিতির বাস্তবতাকে তুলে ধরা।

ত্রাস বা ভয় সৃষ্টিই যদি সন্ত্রাস হয়, তবে সে সন্ত্রাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তূলনা নাই। সে সন্তাসের শিকার বিশ্বের দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোই শুধু নয়, খোদ জাতিসংঘ এবং তার সবল ও দুর্বল সদস্য রাষ্ট্রগুলোও। নৃশংস মার্কিন সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে আফগানিস্তান ও ইরাক। এ দুটি দেশের বহু লক্ষ মানুষ যেমন নিহত হয়েছে, তেমনি লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ী হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছে। এ বর্বরতার একটি করুণ ইতিহাস আছে। মাকিন সন্ত্রাসীদের চরিত্রকে জানতে হলে সে ইতিহাসকেও জানতে হবে। মানব জাতির জন্য বিশেষ করে মুসলিমদের জন্য তাতে রয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় দিক। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে মোকাবেলায় সেগুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ।

ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের উপর চাপ দিচ্ছিল, তাদের পরিকল্পিত আগ্রাসী যুদ্ধকে বৈধতা দিতে। এজন্য ২৪ ঘন্টা সময়ও বেঁধে দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা, যুদ্ধ তারা করবেই, জাতিসংঘের কাজ সেটিকে জায়েজ ঘোষণা দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী শাসক চক্র বিশ্ববাসীকে যে কতটা বেওকুপ ও দুর্বল ভাবে -এটি হলো তারই প্রমান। ফ্রান্সসহ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্র সে মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি। আর সেটিই মার্কিনীদের কাছে অপরাধ গণ্য হয়েছে। সমর্থণ লাভে ব্যর্থ হয়ে তারা বলেছে নতুন প্রস্তাব পাশের কোন প্রয়োজনই নেই। বহু প্রতিক্ষিত যুদ্ধের প্রস্তুতি স্বরূপ প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০৩ সালের ১৭ই মার্চে সাদ্দামকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে দেশ ছেড়ে পলায়ন অথবা যুদ্ধ -এ দুটির যে কোন একটিকে বেছে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। সাদ্দাম এ হুমকি প্রত্যাখান করেছিল। অতএব হামলা শুরু হয়। হাজার হাজার বোমা, ক্ষেপনাস্ত্র ও ভারী কামানের গোলা ইরাকের নীরস্ত্র মানুষের মাথায় নিক্ষিপ্ত হলো। নিহত ও আহত হলো দেশটির অসংখ্য মানুষ। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ যে ক্রুসেডের হুশিয়ারি বার বার শুনিয়ে আসছিলেন -সেটিই হলো অতি বীভৎস রূপে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় খৃষ্টানদের মধ্যযুগীয় ক্রসেডের গণহত্যা অতি বর্বর ও নৃশংস ছিল। কিন্তু, বুশের আধুনিক ক্রসেডটি সে ক্ষেত্রে আরো বর্বরতর। কারণ মার্কিন যুদ্ধাস্ত্রে এসেছে চরম নাশকতা।

ফিলিস্তিনের ন্যায় ইরাকও অধিকৃত হলো ইসরাইলের মিত্র ও রক্ষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের জন্য, বিশেষ করে মুসলিমদের জন্য এটি যেমন অপমানকর, তেমনি দুঃখজনক। মার্কিনীদের কাছে গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতার সামান্যতম মূল্য থাকলে জাতিসংঘে উত্থাপিত অধিকাংশ দেশের শান্তির প্রস্তাবকে তারা মেনে নিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনই জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে ইরাককে বিভক্ত করে, সেখানে প্রতিষ্ঠা করে নো-ফ্লাই জোন। চাপিয়ে দেয় নির্মম বাণিজ্যিক অবরোধ -যার ফলে বিনাচিকিৎসায় ও অপুষ্টিতে মারা যায় দেশটির ৫ লাখ ইরাকী শিশু। যে তথ্য দিয়েছে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানসেট। সন্ত্রাস করতে গণ-সমর্থণ বা ভোট লাগে না, লাগে অস্ত্রের সামর্থ্য।  আর মার্কিনীদের সামর্থ্য সেক্ষেত্রে বিশাল। ফলে পরওয়া কিসে? বিশ্বজনমত ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অসম্মতি -কোনটাই তাদের এ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে  বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং প্রকাশ পেয়েছে জাতিসংঘের নিজের অসহায় অবস্থা। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ যে কতটা গোঁয়ার ও উদ্ধত এবং বিশ্বজনমতের বিরুদ্ধে কতটা অবজ্ঞাপূর্ণ -সেটিই প্রকাশ পেয়েছে তার বক্তৃতায়। তিনি বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের উপর হামলায় কারো অনুমতির ধার ধারে না। বোঝাতে চেয়েছেন, জাতিসংঘ বা বিশ্বজনমত তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক। এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে কতটা বিপর্যের মুখে আজ বিশ্বশান্তি?

মার্কিন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কারণে অসম্ভব হয়েছে বিশ্বের বহুদেশে গণতন্ত্র চর্চা। মুসলিম দেশগুলোতে গণগন্ত্র চর্চার পথে সবচেয়ে বড় বাঁধাটি হলো মার্কিনীদের স্বৈরাচার প্রতিপালনের নীতি। সৌদি আরব, আমিরাত, জর্দান, বাহরাইন, ইত্যাদি আরব দেশগুলোতে বর্বরতম স্বৈরাচার বেঁচে আছে মার্কিন সাহায্য নিয়ে। সেটিরই আরেক উদাহরণ হলো মিশর। সেখানে সামরিক বাহিনী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মহম্মদ মুরসীকে শক্তির বলে সরিয়ে নিজেরা ক্ষমতা দখল করে। মার্কন যুক্তরাষ্ট্র সে সামরিক স্বৈরাচারকে সমর্থণ দেয়। পঞ্চাশের দশকে একই ভাবে মহম্মদ রেজা শাহর স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল ইরানে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে ঘোষণা, বিশ্বের কোথাও ইসলামী খলিফার নামে রাষ্ট্র গড়া হলে মার্কিন সেনাবাহিনী সেটিকে মাটিকে মিটিয়ে দিবে। মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এটি চরম ঔদ্ধত্য। খেলাফাভিত্তিক রাষ্ট্র হলো মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। খেলাফা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব বিষয়, মার্কিনীদের বিষয় নয়। গণতন্ত্র বিরোধী মার্কিন নীতির আরেক উদাহরণ হলো তুরস্ক। ইরাকের উপর হামলার বিরুদ্ধে তুরস্কের প্রায় শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষ । জনগণ চায় না তুরস্কের এক ইঞ্চি ভুমিও মার্কিনী সৈন্যদের দ্বারা ব্যবহৃত হোক। সে দেশের নব নির্বাচিত পার্লামেন্টেও সে গণরায়ের প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোঁ ধরেছিল, তুরস্কের উপর দিয়ে তার ৬০ হাজার সৈন্যের চলাচলের সুযোগ দিতেই হবে। ইরাকের উত্তরভাগে হামলার জন্য এটিকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিল। কুটনৈতিকভাবে চাপ দিয়েছে, প্রলোভন দিয়েছে অর্থ সাহায্যের, এমনকি চাপ দিয়েছে সে দেশের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের দিয়েও। কথা হলো, এটিই কি গণতন্ত্র চর্চার মার্কিন মডেল? এমন গণতন্ত্রচর্চাই কি তারা চায় ইরাকে ও অন্যান্য দেশে? 

 

নজিরহীন ধোকাবাজি

ইরাকের উপর হামলাকে জায়েজ করতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে বিশ্ব-শান্তির দোহাই দিচ্ছে -সেটি নিছক ধোকাবাজী। নিরেট দস্যুরাও ভাল মানুষ সাজে; সেটি ধোকাবাজির মাধ্যমে। বিশ্ববাসীর কাছে গোপন নয় মার্কিনীদের এ ধোকাবাজী। তার প্রমাণ, একমাত্র  ইসরাইল ছাড়া বিশ্বের দ্বিতীয় কোন রাষ্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই ইরাকের উপর হামলাকে জায়েজ গণ্য করেনি। জনমত জরিপে প্রকাশ পেয়েছে, জার্মান, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালী, স্পেন, গ্রীস, রাশিয়াসহ সকল ইউরোপীয় দেশের আপামর জনগণ ইরাকের উপর এ হামলার প্রচণ্ড বিরোধী। বিরোধীতা প্রকাশ করেছে চীন সরকার। জাতিসংঘের তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারি কফি আনান বলেছেন, জাতিসংঘ সনদ মোতাবেক এ যুদ্ধ অবৈধ। অবৈধ বলেছে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন। এমনকি যে ইরাককে মার্কিন প্রশাসন তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলীরি জন্য বিপদজনক বলছে তারাও এ হামলার বিরোধীতা করছে। আরব লীগের সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনে এ হামলার বিরুদ্ধে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের রাগ গিয়ে পড়েছে তাদের এতো কালের ঘনিষ্ট মিত্র ফ্রান্সের উপরও। যেন  ফ্রান্স তাদের পাকা ধানে মই দিয়েছে। মার্কিনীদের অভিযোগ, ইরাকে হামলার বিরুদ্ধে, ফ্রান্স ভেটোর হুমকি দিয়ে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। অথচ ভুলে গেছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ২০০৩ সাল অবধি ৭২ বার ভেটো প্রয়োগ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজে -যা অন্য যে কোন দেশের চেয়ে অধিক। তাদের ভেটোর দাপটে ইসরাইলের বর্বর নৃশংসতার প্রতিরোধ দূরে থাক তার নিন্দা করাও সম্ভব হয়নি। ফলে সে ইসরাইলী নৃশংশতা থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি হাজার হাজার অসহায় ফিলিস্তিনী নারীপুরুষ ও শিশুকে। মার্কিনীদের সক্রীয় সমর্থনেই ইসরাইল সমগ্র ফিলিস্তিনকে পরিণত করেছে একটি মৃত্যুপুরীতে। অথচ ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন ভেটোর হুমকী দিয়েছিল ইরাকের বিরুদ্ধে একটি প্রকান্ড যুদ্ধ রুখতে। ভেটো দিয়ে যদি এ যুদ্ধটি থামানো যেত তবে সেটিই হতো জাতিসংঘের ইতিহাসে সবচেয়ে কল্যাণকর ভেটো -যা ঘটেনি। কারণ এ যুদ্ধে ইরাকের বহু লক্ষ বেসামরিক নাগরিক নিহত বা চিরকালের জন্য পঙ্গু হবে –সে অভিমতটি ছিল বহু মার্কিনী বিশেষজ্ঞগণেরও। ইরাকের লক্ষ লক্ষ সন্তানহারা পরিবারে যে বহুকাল হাসিই ফুটবে না -সেটি সবারই জানা ছিল। মানবতার কল্যাণ তো এমন একটি ভয়ানক যুদ্ধ শুরুর মধ্যে নয়, বরং সেটি বন্ধের মধ্যে। কিন্তু সে সত্যটি অনুধাবনের সামর্থ্য মার্কিন নেতৃত্ব দেখায়নি।

২০০৩ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধের শুরুটি হয় হাজার হাজার বোমা ফেলে। যুদ্ধ বিমান থেকে সে বোমাগুলো পাহাড় পর্বত বা মরুভূমিতে ফেলা হয়নি, বরং হয়েছে বড় বড় শহরের আবাসিক এলাকায়। তবে বেসামরিক নাগরিক হত্যায় মার্কিনী নৃশংসতা ও বিবেকহীনতা যে নজিরহীন –সে প্রমাণ ইতিহাসে প্রচুর। জাপানের হিরোসীমা ও নাগাসাকীতে তারা পারমানবিক বোমা ফেলেছে। নাপাম বোমায় জীবন্তদের জ্বালিয়ে মেরেছে ভিয়েতনামে। ১৯৯১ সালের যুদ্ধে ইরাকীদের উপর নিক্ষেপ করেছে বহু ডিপ্লিটিড ইউরোনিয়াম বোমা। যার ফলে ইরাকীদের মাঝে বাড়ছে ক্যান্সার। রণাঙ্গণ থেকে পশ্চাতপদ ইরাকী সৈন্যদের উপর বিমান থেকে ভারী বোমা ফেলেছে। এবং মৃত সৈন্যদের বুলডোজার দিয়ে মাটি চাপা দিয়েছে। আবু গারিব জেলে বন্দী ইরাকীদের উলঙ্গ করে তাদের দেহ দিয়ে পিরামিড গড়ে উৎসব করেছে। ইরাক ও সিরিয়ার বহু শহরকে তারা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। এ হলো মার্কিনীদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের রূপ।

 

নীতি প্রতারণার

প্রতিটি আগ্রাসনে বহুল ব্যবহৃত হাতিয়ারটি হলো প্রতারণা। হিংস্র পশু প্রতরণা করে না, সাম্রাজ্যবাদীরা এ কাজে সেয়ানা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতরণামূলক আচরন করেছে বিশ্ববাসীর সাথে। সেটির প্রমাণ, ইরাককের অস্ত্রবিলুপ্তি ও অস্ত্রপরিদর্শক নিয়ে জাতিসংঘে প্রদত্ত তাদের বয়ান। ইরাকের উপর হামলার মার্কিন সিদ্ধান্তটি যে জাতিসংঘে উঠায় বহু পূর্বেই গৃহীত হয়েছির –সেটি বুঝা যায় তা ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি দেখে। যুদ্ধ শুরুর বহু আগেই প্রায় তিন লক্ষ মার্কিন সৈন্যকে উপসাগরীয় এলাকায় মোতায়েন করা হয়। জমা করা হয় বিশাল নৌ-বহর। এ বিশাল রণ-প্রস্তুতি ইরাক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে ছিল না, বরং সেটি ছিল একটি প্রকান্ড য্দ্ধু ও যুদ্ধশেষে জবরদখলের প্রস্তুতি। ইরাকের উপর জাতিসংঘে আলোচনা শুরুর বহু পূর্বেই প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ক্রসেডের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমনকি তারও বহু পূর্বে -যখন তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন না, তিনি ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চিনি এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডোনাল্ড রাম্সফিল্ড ও তাঁর অন্যান্য কর্মকর্তাগণ প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনকে ইরাকের উপর হামলার আহবান জানিয়েছিলেন। ফলে এটি সহজেই বোধগম্য, ইরাক দখলের সিদ্ধান্ত যেহেতু বহু পূর্বেই গৃহীত হয়েছে, কোন আপত্তিকর অস্ত্র নাই সেটি প্রমানিত হলেও ইরাকের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত যুদ্ধটি পরিত্যক্ত হতো না। এবং সে যুদ্ধকে জায়েজ করার স্বার্থেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জেনে বুঝে জাতিসংঘ অস্ত্র পরিদর্শক দলের রিপোর্টকেও মিথ্যা বলছে। এটি নিরেট প্রতারণা।

জাতিসংঘ অস্ত্র পরিদর্শক দলের নেতা হ্যান্স ব্লিক্স সে সময় বলেছিলেন, ইরাকে কোন আপত্তিকর অস্ত্রের সন্ধান তারা পাননি। এবং আরো বলেছেন ইরাক সরকার সকল প্রকার সহযোগিতা করছে এবং অস্ত্র পরিদর্শন কাজে অবস্থার সন্তোষজনক উন্নতি ঘটেছে। যে কাজে বিগত ১২ বছরে হয়নি, গত ১২ সপ্তাহে তার চেয়ে বেশী অগ্রগতি হয়েছে সেটি তিনি বুঝিয়েছেন। ফ্রান্স, জার্মানী, রাশিয়া ও চীনসহ নিরাপত্তাপরিষদের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ এ প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখতে চায়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা মানতে রাজী নয়। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য যদি ইরাকের অস্ত্রবিনাশ হতো, তবে তারাও সে রিপোর্টটি মেনে নিত। তাদের এজেন্ডাই তো ভিন্ন। কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল ইরাক দখল। ফলে অস্ত্র পরিদর্শক দল যতই অব্স্থার সন্তোষজনক অগ্রগতির রিপোর্ট দিয়েছে, ততই মারমুখী হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র গ্রেট বৃটেন। এমন অস্ত্রপরিদর্শনে পরিকল্পিত হামলার মূল টাইম টেবিলে ব্যাঘাত ঘটছে দেখে বাড়ছিল তাদের অস্থিরতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে হামলায় ধৈর্য ধরতে রাজী ছিল না, ফলে শুরু হয় আগ্রাসন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্য শুধু ইরাকের সম্পদ লুন্ঠনই ছিল না। বরং সেটি ছিল মুসলিমদের শক্তি অর্জনের সকল প্রচেষ্ঠার বিনাশ। ইরাকের অপরাধ, দেশটি সামরিক শক্তি বাড়ানো চেষ্টা করছিল। সেটিকে মার্কন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করতে। কোন দস্যুই চায় না যে ঘরে সে হানা দিবে সে ঘরের গৃহস্বামীর প্রতিরক্ষার সামর্থ্য থাকুক। ধনবান গৃহস্বামী নিরস্ত্র, পঙ্গু ও বন্ধুহীন হলেই সে খুশি। কারণ অবাধ লুন্ঠনে তখন আর শক্তি ব্যয় হয় না। একই কৌশল প্রয়োগ করছে তারা ইরাকের বিরুদ্ধে। তাই নিজেদের ভান্ডারে সকল প্রকার বিধ্বংসী অস্ত্র থাকলেও অন্যরা বিশেষ করে মুসলিমগণ সেটির অধিকারি হোক সেটিতে তাদের প্রচণ্ড আপত্তি। তাই ইরাকের স্বল্প রেঞ্জের মিজাইল বা চালকহীন বিমানও তাদের কাছে বিপদজনক মনে হয়েছে। ইরাকে রাসায়নিক  অস্ত্র রয়েছে -এ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বময় তোলপাড় করছে। অথচ তাদের হাতেই এ অস্ত্রটি সবচেয়ে বেশী। দৈনিক গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে ১৯৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা অনুযায়ী তাদের ভান্ডারে ১৫,৬৩৭ টন মাস্টার্ড গ্যাস, ৭,৪৬৪ টন স্যারিন নার্ভ গ্যাস, ৪, ০৩২ টন ভি এক্স নার্ভ গ্যাস ও আরো বহুবিধ রাসায়নিক অস্ত্রের মওজুদ রয়েছে। অতএব ইরাকের অস্তু নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাথা ঘামানোর কোন নৈতিক ভিত্তি থাকে কি?

 

লক্ষ্য লুন্ঠন

ইরাকের উপর আগ্রাসনের লক্ষ্য অর্থনৈতিকও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক আধিপত্য নিয়ে তারা খুশি থাকতে চায় না, ইচ্ছামত শোষনও করতে চাই। কারণ, বিশ্বব্যাপী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজটি অতি ব্যয়বহুল। সে খরচ মার্কিনীদের পক্ষে নায্য উপার্জনের মাধ্যমে অসম্ভব। এ জন্যই লুটপাটের অবাধ ক্ষেত্র তাদের জন্য অপরিহার্য। তাদের লক্ষ্য, ছলে-বলে ও কলে-কৌশলে মধ্যপ্রাচ্যের অঢেল সম্পদকে তাদের দখলে নিতেই হবে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও বাইরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ প্রায় সবদেশগুলী দেশ এখন তাদের দখলে। তবে শোষনের যে সুযোগ এদেশগুলীতে তারা যা পাচ্ছে সেটিতে তারা খুশী নয়। এক গ্রামে ডাকাতী করে দস্যুরা তৃপ্ত হয় না। চায় গ্রামে গ্রামে ডাকাতির সুযোগ। তাদের ক্ষুধা সীমাহীন। আসন্ন হামলায় ইরাক এবং পরবর্তীতে ইরানেও যে মার্কিন দস্যুবৃতি প্রসারিত হবে। এ দস্যুবৃত্তিকে তারা নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য মনে করে।

মার্কিনীগণ নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থটি নিজ সীমান্তের মাঝে দেখে না, দেখে সমগ্র বিশ্বজুড়ে। এটি যেমন আফগানিস্তান ও ইরাক, তেমনি কোরিয়া, ফিলিপাইন, উযবেকিস্তান, সোমালিয়া ও জিবুতিতে। ২০০৩ সালের হিসাব মতে যুক্তরাষ্ট্র ১০.৪ মিলিযন ব্যারেল জ্বালানী তেল আমদানী করে। ২০২০ সাল নাগাদ তাদের আমদানীর পরিমাণ দাঁড়াবে ১৬.৭ মিলিয়ন। ইরাক দখলে সহজ হবে তেল সংগ্রহ। বিজয়ের পর যুদ্ধে সকল খরচও তারা পুষিয়ে নিবে। যেমনটি ১৯৯১ সালের ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সকল খরচ সৌদি আরব আর কুয়েত থেকে আদায় করে নিয়েছে। কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও ওমান জুড়ে মার্কিনীদের আজ যে সামরিক দখলদারিত্ব সেটির প্রতিষ্ঠায় নিজ পকেট থেকে তাদের একটি ডলারও ব্যয় হয়নি। তেমন প্রাণ হানীও হয়নি। কৈয়ের তেল কৈ ভেজেছে তারা। ইরাকেও তেমনটিই হতে যাচ্ছে। ইরাকের প্রতিরোধের সকল সামর্থ্য যুদ্ধ শুরুর আগেই ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিনীদের সামান্যতম প্রাণহানীরও সম্ভাবনা ছিল না। অথচ জয়ের সামর্থ্যটি ছিল বিশাল। ফলে এমন একটি যুদ্ধ থেকে মার্কিনীদের মত সাম্রাজ্যলিপ্সু একটি দেশকে কেউ কি যুদ্ধ থেকে ফেরাতে পারে?

খুনীকে খুনী, দুর্বৃত্তকে দুর্বৃত্ত এবং সন্ত্রাসীকে সন্ত্রাসী বলার জন্য বিশাল মাপের মানবতা বা বিবেকবোধ লাগে না। নিরক্ষরেরও সেটি থাকে। কিন্তু সে সামর্থ্য কি মার্কিনীদের আছে? থাকলে সে প্রমাণ কই?  মার্কিনীরা যে কতটা মানবতাশূর্ণ -সেটি ইসরাইলী নৃশংসতার প্রতি তাদের নিঃশর্ত সমর্থন ও সর্ববিধ সাহায্যই কি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় না? যে মানদন্ডে সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ এককালে ভারতের তাবত সম্পদকে নিজেদের রাজকীয় সম্পদ মনে করতো -সেরূপ একটি মানদন্ডে মার্কিনীরাও ইরাকের, এমনকি মুসলিম বিশ্বের তেল সম্পদকে নিজেদের জাতীয় সম্পদ মনে করে। কারণ, যুগ পাল্টালেও সাম্রাজাবাদ প্রতি যুগে অভিন্ন লুন্ঠন-সুলভ মানসকতারই জন্ম দেয়।

 

কি হবে প্রতিরোধের স্ট্রাটেজী?

প্রশ্ন হলো, মার্কিন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কীরূপ হবে প্রতিরোধের স্ট্রাটেজি? আত্মসমর্পণে যেমন মর্যাদা বাড়ে না, তেমনি নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয় না। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাইরাইন, মিশর, ওমানের ন্যায় দেশগুলো যে ভাবে মার্কন এজেন্ডার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে তাতে তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা কোনটিই বাড়েনি। কোন গৃহে ডাকাত পড়লে যে গ্রামের প্রতিবেশী অন্য বাসিন্দারা যদি নিজ গৃহে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে -সে গ্রামের কারোই ইজ্জত বাঁচে না। ডাকাতেরা একে একে সবারই ঘাড় মটকায়। ইংরেজদের হাতে বাংলা যখন পরাধীন  হলো তখন প্রতিবেশী কেউ এগিয়ে আসেনি। জনগণের কাতার থেকে দেশটিতে স্বাধীনতার যুদ্ধও হয়নি। ফলে স্বাধীনতা শুধু বাংলাই হারায়নি, ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোও একই ভাবে স্বাধীনতা হারিয়েছে। অথচ ভিয়েতনামী যোদ্ধাদের রক্তত্যাগে দেশটি পরাধীনতা থেকে বেঁচেছিল। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে কে নামাজী আর কে বেনামাজী, কে ডানপন্থি আর কে বামপন্থি -সে বিবেচনায় কল্যাণ নাই।

মার্কিন সন্ত্রাসের মুখে আজ শুধু ইরাক নয়, সমগ্র বিশ্ব। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অপ্রতিহত থাকলে স্বাধীন ভাবে বাঁচাটিই অসম্ভব হবে। সবচেয়ে অসম্ভব হবে ঈমান নিয়ে বাঁচাটি। তখন মুসলিম গণহত্যা শুধু ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া বা আফগানিস্তানে সীমিত থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে অন্যান্য মুসলিম দেশেও। কারণ, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটি হলো স্বঘোষিত ধর্মযুদ্ধ তথা ক্রুসেড। এবং ক্রুসেডের একটি ঐতিহাসিক পরিচয় আছে। সে পরিচয়টি খৃষ্টানদের পরিচালিত মুসলিম নির্মূলের বর্বরতম এবং নৃশংসতম যুদ্ধের।

 

যে দায়িত্ব প্রতিটি মুসলিমের

ইরাক আগ্রাসনের নায়ক সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ যেমন তার লক্ষ্য নিয়ে অস্পষ্টতা রাখেননি, তেমনি কোন মুসলিমের অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয় মার্কিন ঘোষিত ক্রুসেডের উদ্দেশ্য নিয়ে। এরূপ হামলার লক্ষ্যই হলো মুসলিমদের মুসলিম রূপে শান্তিতে বাঁচাটি অসম্ভব করে তোলা। আফগান ও ইরাকীগণ মার্কিন হামলার শিকার হওয়ার কারণটি আফগান ও ইরাকী হওয়া নয়, বরং সেটি হলো তাদের মুসলিম পরিচিতি। ফলে তাদের সমস্যা শুধু তাদের নিজেদের সমস্যা নয়, বরং সেটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সমস্যা। মহান আল্লাহতায়ালা ইসলামের এ শত্রুদের সম্মদ্ধেই হুশিয়ারী শুনিয়েছেন এবং বলেছেন, “এবং তোমাদের উপর হামলা থেকে তারা কখনোই বিরত হবে না -যতক্ষণ না তোমরা নিজেদেরকে ইসলাম থেকে সরিয়ে নাও।” -(সূরা বাকারা, আয়াত ২১৭)। কোন একক জাতি বা দেশের পক্ষে এ বিশাল বিশ্বশক্তির রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। সবার ঐক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চাই “ওয়া লা তাফাররাকু” (অর্থ: এবং তোমরা বিভক্ত হয়ো না) -মহান আল্লাহতায়ালার এ কোর’আনী ফরমানের আনুগত্য।

মুসলিম ভূমিতে শত্রুর হামলা শুরু হলে এগিয়ে আসতে হয় প্রতিটি মুসলিমকে। কারণ মুসলিমকে বাঁচতে উম্মাহর ধারণা নিয়ে। উম্মাহ কাজ করে একটি জনগোষ্ঠির একটি অভিন্ন দেহ রূপে। দেহের এক অংশে আঘাত হানলে, অন্য অঙ্গ বেদনা পায় এবং প্রতিরোধ করে। সেটি না হলে বুঝতে হবে সে বেদনাশূণ্য অংশটি দেহ থেকে খন্ডিত হয়েছে। তাছাড়া মুসলিম ভূমিতে মার্কিন সন্ত্রাসের কান্ডটি আদৌ গোপন বিষয় নয়। দেশটিতে সরকার পরিবরর্তন হয়, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী নীতির পরিবর্তন হয় না। তাই হামলা যেমন প্রেসিডেন্ট বুশের আমলে হয়েছে, তেমনি প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলেও হয়েছে। ইসরাইলের আগ্রাসী নীতিই তাদের নীতি। নেকড়ে যেমন চরিত্র পাল্টায় না, তেমনি মার্কিনীরাও পাল্টায় না।

তাই এ মার্কিন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে যার যা সামর্থ্য আছে -তা নিয়েই ময়দানে নামাটি প্রত্যেকের উপর ফরজ। সন্ত্রাসের যেমন ভৌগলিক সীমান্ত নাই, তেমনি নেই প্রতিরোধেরও। সন্ত্রাসবিরোধী সচেনতা গড়তে হবে ঘরে ঘরে। মার্কিন সামর্থ্যে বৃদ্ধি ঘটে -এমন প্রতিটি কর্মই হারাম। হামলার বিরুদ্ধে জিহাদ নিয়ে বাঁচাটাই ইবাদত। কারণ সে জিহাদে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি আনুগত্য। থাকে তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার প্রেরণা। থাকে মুসলিম স্বার্থের প্রতিরক্ষার চেতনা। জিহাদের দায়িত্বটি সবার। মহান আল্লাহতায়ালা দায়িত্ব পালনের সে সামর্থ্য দিয়েছেন প্রতিটি নাগরিককে। দিয়েছেন বিপুল বুদ্ধিবৃত্তিক বল ও প্রতিবাদের ভাষা। ঈমানী দায়ভার হলো, সে সামর্থ্যের বিনিয়োগ। তখন শত্রুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি কোরবানী এবং প্রতিটি প্রয়াসই মহান আল্লাহতায়ার দরবারে মাগফেরাত লাভে সহায়ক হয়। চলমান ক্রুসেডের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে বস্তুত এ ভাবেই। শত্রুকে গালীগালাজ করে পরকালে পরিত্রাণ মিলবে না। নিছক দোয়া পড়েও দায়িত্ব পালন হয়না। সে আগ্রাসী শত্রুর মোকাবিলায় নিজ নিজ প্রচেষ্ঠা বা কোরবানী কি ছিল -সে হিসাব মহান আল্লাহর দরবারে অবশ্যই দিতে হবে। ১ম সংস্করণ ১৮/০৩/২০০৩; ২য় সংস্করণ ১৭/০১/২০২১।




জিহাদ ও সন্ত্রাস

সন্ত্রাসের নাশকতা ও ঈমানী দায়ভার

ঈমানদারকে শুধু হারাম-হালাল ও হিংস্র জন্তু-জানোয়ারদের চিনলে চলে না, চিনতে হয় সমাজের অতি হিংস্র সন্ত্রাসী জীবদেরও। চিনতে হয় কোনটি জিহাদ এবং কোনটি সন্ত্রাস। তাকে সঠিক ভাবে চিনতে হয় কোনটি মহান আল্লাহতায়ালার পথ, এবং কোনটি শয়তানের। কারণ, প্রতি সমাজে এরাই সন্ত্রাসের মূল নায়ক। মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্পূর্ণ ও সবচেয়ে উপকারী হলো এই জ্ঞান। মানব সমাজে সবচেয়ে বড় অভাব এই জ্ঞানের। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি সেরূপ জ্ঞানবানদের সংখ্যা। ফলে বাড়েনি সত্যকে চেনার সামর্থ্য। কোনটি জিহাদ এবং কোনটি সন্ত্রাস – তা নিয়ে গভীর অজ্ঞতার কারণে মানুষ তখন দলে দলে স্বৈরাচারী জালেম, কাফের ও ফাসেকদের পক্ষে ভোট দেয়, অর্থ দেয়, লেখালেখি করে, এমনকি যুদ্ধও করে। সে যুদ্ধে অনেকে প্রাণও দেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশ এভাবে স্বৈরাচারী দুর্বৃত্তদের হাতে অধীকৃত হয়; এতে পরাজিত হয় ইসলাম; এবং বিলুপ্ত হয় শরিয়তী বিধান। তাদের মূল যুদ্ধটি মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। ফলে তাদের বিজয়ে ব্যর্থ হয় মানব জাতিকে জান্নাতে নেয়ার মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব প্রজেক্ট। মানব শিশুগণ তখন বেড়ে উঠে শয়তানের দলের নৃশংস সন্ত্রাসী রূপে। এমন অধিকৃত দেশ তখন দুর্বৃত্তি ও নৃশংস সন্ত্রাসে রেকর্ড গড়ে। শয়তানী শক্তির পক্ষে জানমালের এরূপ বিনিয়োগে সমাজে শান্তি আসে না, বরং যেটি সুনিশ্চিত হয় সেটি জাহান্নামের আযাব। পবিত্র কোর’আনে সে কঠোর হুশিয়ারীও বার বার এসেছে।

কোনটি জিহাদ আর কোনটি সন্ত্রাস -তা নিয়ে অজ্ঞতায় যা অসম্ভব তা হলো প্রকৃত মুসলিম রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠা। কারণ, ঈমানদার ও বেঈমান –উভয়ের জীবনেই লাগাতর যুদ্ধ আছে। বেঈমানের যুদ্ধটি শয়তানের এজেন্ডা পূরণে, সে অভিন্ন অঙ্গণে ঈমানদার যুদ্ধ করে মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাপূরণে। পবিত্র কোর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “যারা ঈমান এনেছে তারা যুদ্ধ করে আল্লাহতায়ালার পথে এবং যারা কাফের তথা আল্লাহর অবাধ্য তারা যুদ্ধ করে শয়তানের পক্ষে; অতঃপর তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল দুর্বল।” –(সুরা নিসা, আয়াত ৭৬)। এজন্যই যুদ্ধরত প্রতিটি সৈনিকের জন্য যা জরুরী তা হলো তার নিজের বাহিনী বা পক্ষটিকে সঠিক  ভাবে চেনা। এখানে ভূল হলে ভূল হয় যুদ্ধে জানমালের বিনিয়োগে। বিভ্রান্ত সে ব্যক্তিটি কাফের বাহিনীকে আপন মনে করে তাদের বিজয়ে যুদ্ধ করবে এবং প্রাণ দিবে -সেটিই স্বাভাবিক। মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করতে এমন বিভ্রান্ত ব্যক্তিগণই অতীতে ইংরেজদের পক্ষে লড়েছে, এবং ১৯৭১’য়ে লড়েছে ভারতীয় কাফেরদের পক্ষে। ভারতীয়দের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে তারা বাংলাদেশের উপর ভারতীয় অধিকৃতিকে সুনিশ্চিত করেছে। এটিই হলো অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াতের সবচেয়ে বড় নাশকতা। প্রশ্ন হলো, এরূপ অজ্ঞতা বা জাহিলিয়াত নিয়ে কি ইসলাম পালন বা সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা সম্ভব? পবিত্র জিহাদ তখন সন্ত্রাস মনে হবে এবং সন্ত্রাসী নেতা-নেত্রীও তখন নির্বাচিত হবে –সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? এমন অজ্ঞতার কারণেই অতীতে বিপুল সংখ্যক মানুষ নমরুদ, ফিরাউন, হিটলার, স্টালীন ও মুজিবের ন্যায় নৃশংস সন্ত্রাসীদের বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদী নির্মূল, গণহত্যা, বিশ্বযুদ্ধ, গ্যাস চেম্বার, ড্রোন হামলা, ক্লাস্টার বোমা, ব্যারেল বোমা ও পারমানবিক বোমার ব্যবহারীগণও বৈধ শাসক রূপে গন্য হয়েছে।

জিহাদ জান্নাতের পথ; এবং সন্ত্রাস জাহান্নামের পথ। মু’মিনের প্রতিটি যুদ্ধই জিহাদ; এবং শয়তানের প্রতিটি যুদ্ধই সন্ত্রাস। বেঈমানের সন্ত্রাসে থাকে আল্লাহর শরিয়তী বিধানকে পরাজিত করার খায়েশ। অপরদিকে জিহাদে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাপূরণের নিয়েত। থাকে, তাঁকে খুশি করার বাসনা। ফলে জিহাদে থাকে, ইসলামকে বিজয়ী করার যুদ্ধে মু’মিনের জান-মাল কোরবানীর পবিত্র আয়োজন। আভিধানিক অর্থে ত্রাস সৃস্টির প্রতিটি প্রয়াসই হলো সন্ত্রাস। ত্রাস সৃষ্টির মূল লক্ষ্যটি এখানে জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা। রাখাল যেমন লাঠির ভয় দেখিয়ে ভেড়ার পালকে নিয়ন্ত্রনে রাখে, তেমনি জনগণের উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠায় সন্ত্রাসী শক্তির মূল হাতিয়ারটি হলো সন্ত্রাস। বিশ্বব্যাপী ত্রাস সৃস্টির লক্ষ্যে সন্ত্রাসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতীতে পারমানবিক বোমাও ব্যবহার করেছে। মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে নৃশংস সন্ত্রাস। হিরোশিমা ও নাগাসাকীর প্রায় দেড় লক্ষ মানবকে তারা নিমিষের মধ্যে হত্যা করেছে। সন্ত্রাসের সে নৃশংস মাত্রা আজও কেউ অতিক্রম করতে পারিনি। বিশ্বশক্তি রূপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও দাপটের মূল কারণ সন্ত্রাস সৃষ্টির সর্বাধিক সে সামর্থ্য।  দেশটি সে অবস্থানটি হারাতে চায় না। ফলে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস সৃষ্টির সে স্ট্রাটেজী এখনো  মার্কিন রাজনীতির মূল নীতি। ফলে দেশে দেশে তারা ব্যবহার করছে হাজার হাজার ক্লাস্টার বোমা, মিজাইল হামলা, বিমান ও ড্রোন হামলা। ত্রাস সৃষ্টির সে অভিন্ন লক্ষ্যে তারা বিশ্বব্যাপী স্থাপন করেছে অসংখ্য সামরিক ঘাঁটি এবং প্রতিষ্ঠা করেছে ন্যাটোর ন্যায় সামরিক জোট। এবং সে লক্ষ্যেই ক্ষুধার্ত কুমিরের ন্যায় তাদের অসংখ্য ডুবো জাহাজ ও বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ নানা দেশের উপকুলে ঘুরে।

রাজনৈতীক এজেন্ডা পূরণে সন্ত্রাস হলো সহিংস সেক্যুলার শক্তির হাতিয়ার। অথচ মু’মিনের মনে কাজ করে জাগতিক স্বার্থের উর্দ্ধে আল্লাহ-সচেতন এক পবিত্র ধর্মীয় চেতনা। সন্ত্রাসীর মনে তেমন কোন উচ্চতর বা পবিত্রতর চেতনা থাকে না। পবিত্রতার বদলে সন্ত্রাসে থাকে পার্থিব স্বার্থ পূরণের সহিংস খায়েশ। অস্ত্রের বলই তাদের একমাত্র বল; এবং নৃশংসতার মাঝেই তাদের উৎসব। সন্ত্রাসীদের মনে তাই নিরস্ত্র জনগণের উপর পারমানবিক বোমা, ক্লাস্টার বোমা, নাপাম বোমা ও ড্রোন হামলার মধ্যেও তীব্র আনন্দবোধ থাকে। কারণ, তাদের সেক্যুলার মনে থাকে না পরকালে জবাবদেহীতার ভয়। মার্কিনীগণ তাই আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় বিজয়ের নামে শহরের পর শহর ধ্বংস করেছে। অথচ জিহাদে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে  পরকালে জবাবদেহীতার ভয়, ফলে থাকে আত্মত্যাগের মাধ্যেম মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার আগ্রহ। জিহাদ এভাবেই পরিণত হয় উচ্চতর ইবাদতে। তাই ঈমানদারদের জিহাদে কোন শহর বা জনপদ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় না।  জিহাদ ও সন্ত্রাসের মাঝে এটিই হলো মূল পার্থক্য। সন্ত্রাসীদের কারণেই ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া ও ইয়েমেনের অসংখ্য শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। এবং একই রূপ সেক্যুলার সন্ত্রাসীদের হাতে রক্তাত্ব হয়েছে ঢাকার শাপলা চত্ত্বর, ইসলামাবাদের হাফসা মাদ্রাসা ও কায়রোর রাবা আল আদাবিয়া অঙ্গণ।

 

পরিণতি ঈমানশূন্যতার

অতীতে অনেকেই নিজেদের মুসলিম পরিচিতি নিয়ে শত্রুপক্ষের সাথে সন্ত্রাসে নেমেছে। সন্ত্রাসের সীমিত, স্থানীয় ও দেশীয় রূপটি হলো ডাকাতী, রাহাজানী ও ফ্যাসীবাদী স্বৈরাচার। আর আন্তর্জাতীক রূপটি হলো দুর্বল দেশের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশীক আগ্রাসন এবং সামরিক অধিকৃতি। বিবেকমান মানুষ মাত্রই যেমন ডাকাতী ও রাহাজানীতে অংশ নেয় না, তেমনি তারা সাম্রাজ্যবাদী সন্ত্রাসীদের দলে সৈনিক রূপেও যোগ দেয় না। শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি কবিরা গুনাহ ও অপরাধ কর্ম। এমন কবিরা গুনাহ ও অপরাধ কর্মে অংশ নেয়া একমাত্র ঈমানশূন্যতাতেই সম্ভব। কিন্তু মুসলিম ইতিহাসে এমন অপরাধীদের সংখ্যা অসংখ্য। তারা সাম্রাজ্যবাদী সন্ত্রাসীদের সেনাদলে যোগ দিয়ে মুসলিম দেশে শুধু ধ্বংস ও গণহত্যাই বাড়ায়নি, মুসলিম ভূমিকে তাদের পদনতও করেছে। উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯১৭ সালে ঔপনিবেশিক কাফের শক্তির হাতে অধিকৃত হয় ইসলামের পবিত্র ভুমি জেরুজালেম। সে ঔপনিবেশিক অধিকৃতিরই ভয়াবহ পরিণতি হলো আজকের ইসরাইল। সে পবিত্র ভূমিতে উসমানিয়া খলিফার সেনাদলকে পরাজিত করতে আগ্রাসী ব্রিটিশ বাহিনীতে যতজন ইংরেজ সৈনিক ছিল তার চেয়ে বেশী ছিল অইংরেজ। তাদের মাঝে বহু হাজার ছিল মুসলিম। বাঙালী মুসলিমের দ্বারা সেরূপ অপরাধ কর্ম যে শুধু ১৯৭১’য়ে হয়েছে তা নয়। তার পূর্বেও হয়েছে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হাতে ১৯১৭ সালে অধীকৃত হয় মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রভুমি ইরাক। ইরাক দখলের লক্ষ্যে হানাদার সে ব্রিটিশ বাহিনীতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ন্যায় বহু বাঙালী মুসলিমও স্বেচ্ছায় অংশ নিয়েছিল। তারা যুদ্ধ করেছিল খলিফার বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং কাফেরদের এজেন্ডা পূরণে। সে ঔপনিবেশিক হানাদার ব্রিটিশ বাহিনীতে মনের আনন্দে অফিসার হয়েছিল আরেক অতি পরিচিত বাঙালী ব্যক্তি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী। আগরতলা ষড়যন্ত্রকে সফল করতে ভারতকে কোন বাঙালী হিন্দুর ঘাড়ে দায়িত্ব দেয়ার প্রয়োজন পড়েনি। মুসলিম দেশের অভ্যন্তরে মুসলিম হত্যায় এবং উম্মাহর বিরুদ্ধে নাশকতায় ইসলামের শত্রুগণ যুগে যুগে এভাবেই মুসলিমদের মধ্য থেকেই কলাবরেটর বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশে সেটি যেমন ইংরেজদের হাতে হয়েছে, তেমনি ১৯৭১’য়ে ভারতীয় হিন্দুদের হাতেও হয়েছে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়াসহ বহু মুসলিম দেশে সে অভিন্ন ধারাই অব্যাহত রেখেছ মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট। শত্রুগণ এভাবেই কই’য়ের তেলে কই ভাজার সুযোগ পেয়েছে।

মুসলিমদের জন্য আরো বিপদের কারণ, এরূপ হারাম অপরাধ-কর্ম নিয়ে দুঃখবোধও নাই। এবং আগ্রহ নাই সে নৈতীক রোগ থেকে আরোগ্য লাভে। বিবেকমান মানুষ মাত্রই দেহে রোগ দেখা দিলে চিন্তিত হয়। এবং সে রোগের চিকিৎসায় যত্নবান হয়। কিন্তু সেরূপ আগ্রহ বিবেকশূন্য মানুষের থাকে না। মুসলিমদের মাঝে সেরূপ বিবেকশূন্যতা ভর করেছে চেতনার রোগ নিয়ে। তাই নিজেদের চেতনার মারাত্মক রোগ নিয়ে তাদের দুঃখবেোধ হয় না। রোগাগ্রস্ত অপরাধীদের মাথায় তুলতে তাদের বিবেকে দংশনও হয়না। বরং ইতিহাসের বইয়ে ঈমানশূণ্য সে অপরাধীদের জাতির গৌরব গণ্য করা হয়। এবং এরই ফলে জনগণের মাঝে আগ্রহ বেড়েছে, এ অপরাধীদের অনুকরণে শত্রুর দলের সৈনিক হওয়ায়। তাই বাংলাদেশের উপর রাজনৈতীক, অর্থনৈতীক ও সাংস্কৃতীক অধিকৃতি বজায় রাখতে ভারতকে তার কাফের সৈন্যদের ব্যবহার করতে হয় না। হাজার হাজার বাঙালী মুসলিম সে কাজটি নিজ খরচে করে দিতে রাজী। এমন মানসিক দাসদের কারণেই বাংলার বুকে ঔপনিবেশিক কাফের শাসন ১৯০ বছর যাবৎ বলবৎ থেকেছে। আর এখন স্থায়ীত্ব পাচ্ছে ভারতের রাজনৈতীক, সাংস্কৃতিক, সামরিক ও অর্থনৈতীক অধিকৃতি। অথচ শরিয়তের বিধান হলোঃ মুসলিম ভূমিতে অমুসলিম সৈন্যের প্রবেশের সাথে সাথে জিহাদ আর ঐচ্ছিক থাকে না, সেটি তখন ফরজে আইনে পরিণত হয়। এরূপ পরিস্থিতিতে আগ্রাসী অমুসলিমদের সাথে সম্পর্ক রাখাটি হারাম; এবং সেটি গোমরাহী তথা পথভ্রষ্টতার দলীল। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশটি হলো, “হে মু’মিনগণ! তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না। … তোমাদের মধ্যে যে এটি করে সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত। তোমাদের কাবু করতে পারলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং (তোমাদের বিরুদ্ধে নাশকতায়) তারা প্রসারিত করবে তাদের হাত ও রসনা। এবং চাইবে, তোমারাও (তাদের মত) কাফের হয়ে যাও।” –(সুরা মুমতেহানা আয়াত ১-২)।

 

হার মানায় পশুকেও

ঈমান না থাকলে মানুষ পশুর চেয়েও হিংস্রতর জীবে তথা সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়। পবিত্র কোরআনে মানব চরিত্রের সে ভয়ানক নৃশংস দিকটি তুলে ধরেছেন মহান আল্লাহতায়ালা। পবিত্র কোর’আনের ভাষায় “উলায়িকা কা’ আল অআনাম, বাল হুম আদাল”। অনুবাদঃ “ওরাই হলো পশু, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট”। তখন পশুর চেয়েও মানুষের সে নিকৃষ্ট রূপটি প্রকাশ পায় সন্ত্রাসে। সমগ্র মানব ইতিহাসে যত নর-নারী ও শিশুর প্রাণনাশ বন্য পশুদের হাতে হয়েছে তার চেয়ে বহু হাজার গুণ বেশী হয়েছে মানব রূপী এসব হিংস্র পশুদের হাতে। তারা মাত্র দুটি বিশ্বযুদ্ধে হত্যা করেছে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে। সর্বকালের সকল পশু মিলেও এর শতভাগের এক ভাগকেও হত্য করতে পারিনি। এরূপ মানব রূপী পশুদের হাতে সন্ত্রাসের মোক্ষম ক্ষেত্র গণ্য হয় দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, যুদ্ধবিগ্রহ ও আইন-আদালত। তখন জনগণের জানমাল, মেধা, শ্রম ও সময়ের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটি হয় সন্ত্রাস তথা ত্রাস সৃষ্টির অবকাঠামো নির্মাণে -তথা পুলিশ, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর শক্তি বাড়াতে। এমন বিনিয়োগের কারণে গণহত্যা বা হলোকাস্ট যে শুধু হিটলারের হাতে হয়েছে -তা নয়। মানব ইতিহাসে –বিশেষ করে পাশ্চাত্য ইতিহাসে এরূপ হিটলারের সংখা অসংখ্য। তাদের ভাণ্ডারে মানুষ পুরিয়ে মারার গ্যাসচেম্বার না থাকলেও মানবতাধ্বংসী অস্ত্রের কোন কমতি ছিল না। তাই জার্মানীর হলোকাস্টে যত ইহুদীর মৃত্যু হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী রেড ইন্ডিয়ানের মৃত্যু হয়েছে ইউরোপীয় খৃষ্টানদের সৃষ্ট আমেরিকার হলোকাস্টে। ইংরেজদের হাতে অধিকৃত হওয়ার সাথে সাথে ভয়ানক হলোকাষ্ট তথা এথনিক ক্লিন্জিং নেমে এসেছিল অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের লক্ষ লক্ষ আদি বাসীর জীবনে। নৃশংস হলোকাস্ট নেমে এসেছিল স্পেনে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ  মুসলিমের জীবনেও। সে নৃশংস হত্যাকান্ডে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ৭ শত বছর ধরে গড়ে উঠা মুসলিম সভ্যতা। খৃষ্টান হওয়াতে তাই ইউরোপীয়দের স্রেফ লেবেল বদলিয়েছে, কিন্তু সভ্য মানুষ রূপে বেড়ে হওয়াতে কোন সহায়তা মেলেনি। বরং মানবতাশূণ্য করেছে। তাই সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, সাম্যবাদ, ঔপনিবেশবাদ, ফ্যাসীবাদ, নাযীবাদ ও বর্ণবাদের ন্যায় হিংস্র মতবাদের উৎপত্তি কোন বনে জঙ্গলে বা ডাকাত পুরীতে হয়নি, হয়েছে ইউরোপের খৃষ্টান ভূমিতে। হলোকাস্ট, বর্ণবাদী নির্মূল, দাস-রপ্তানী, বিশ্বযুদ্ধ ও যুদ্ধে পারমানবিক বোমা, রাসায়নিক বোমা, ক্লাস্টার বোমার ব্যবহারের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংসতম অপরাধগুলো সংগঠিত হয়েছে এই খৃষ্টানদের হাতেই।

 

বেঈমানের যুদ্ধই সন্ত্রাস

বেঈমানের যুদ্ধ মাত্রই সন্ত্রাস তথা ত্রাস সৃষ্টির নৃশংস হাতিয়ার। নিজেদের সে যুদ্ধগুলিকে তারাও কখনো জিহাদ বলে না। সেসব যুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার কোন নিয়েত থাকে না। বরং লক্ষ্য, প্রতিপক্ষের নির্মূল। ফলে তাতে মানবিকতা বা জাগতিক চেতনা-উর্দ্ধ কোন পবিত্রতাও থাকে না। অথচ ঈমানদারের যুদ্ধের ধারণাটাই সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার জানমাল গণ্য হয় মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আমানত রূপে। জানমালের মালিক যেহেতু মহান আল্লাহতায়ালা, তাই সে জানমালের বিনিয়োগটিও হতে হয় একমাত্র তাঁরই এজেন্ডা পূরণে। ফলে মু’মিনের প্রতিটি যুদ্ধই মহান আল্লাহতায়ালার পথে তথা পবিত্র জিহাদ। এরূপ জিহাদে থাকে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার নিয়েত। থাকে জালেম শক্তির নির্মূলের চেতনা; ফলে তাতে গণহত্যা বা হলোকাস্ট নেমে আসে না। তাই মুসলিম ইতিহাসে শত শত জিহাদ হলেও কোথাও হলোকাস্ট বা গণহত্যা নেমে আসেনি। তাই ঐতিহাসিক মক্কা ও জেরুজালেম বিজয়ের দিনে কোন প্রাণহানি হয়নি। অথচ বেঈমানের সন্ত্রাসে গণহত্যা হওয়াটিই রীতি। মার্কিনীদের হাতে অধিকৃত হওয়ায় এ জন্যই বিশাল গণহত্যা নেমে এসেছে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকে। রোমান রাজা কন্সটান্টিনোপলের খৃষ্টান হওয়ার সাথে সাথে তার রাজ্যে কাউকে খৃষ্টান ধর্মের বাইরে থাকার স্বাধীনতা দেয়া হয়নি। তখন প্রজাদের সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা রাখা হয়। হয় খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষা নেয়া, নতুবা মৃত্যুকে বেছে নেয়া। বেঈমানের দেশে এজন্যই রাজা বা শাসকের চেয়ে বড় কোন সন্ত্রাসী থাকে না। অথচ জিহাদে কোন জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে নির্মূলের এজেন্ডা থাকে না, এজেন্ডা স্রেফ জালেমের জুলুম ও মিথ্যা নির্মূল। ফলে ইসলামী সরকার কখনোই সন্ত্রাসের হাতিয়ারে পরিণত হয় না। তাই ৭ শত মুসলিম শাসনের পরও স্পেনের সংখ্যাগরিষ্ট জনগন নিজ নিজ ধর্ম নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার পেয়েছিল; এবং হলোকাস্ট আসেনি সংখ্যাগরিষ্ঠ খৃষ্টানদের জীবনে। অথচ খৃষ্টান রাজা ফার্ডিনান্ড ও রানী ইসাবেলার হাতে স্পেন অধিকৃত হওয়ার সাথে সাথে মুসলিম রূপে বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেয়া হয় স্পেনের বহুলক্ষ মুসলিমের জীবন থেকে। একই রূপ চিত্র দেখা যায় ভারতে। সেখানে ৭ শত বছরের মুসলিম শাসনের পরও সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ হিন্দু রয়ে গেছে। মুসলিম শাসনামলে হিন্দুদের জীবনে হলোকাস্ট এসেছে -সে ইতিহাস নেই্। অথচ ভারতে মুসলিম নির্মূলের লাগাতর দাঙ্গা শুরু হয়েছে মুসলিম শাসন বিলুপ্তির সাথে সাথে। এবং অতীতে হিন্দু শাসনে হলোকাস্ট এসেছে লক্ষ লক্ষ বৌদ্ধদের জীবনে।

 

পরকালীন পুরস্কারের ভাবনা ও জিহাদ

জীবনের সফলতা ও বিফলতা নিয়ে যে যাই ভাবুক, তা নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার রয়েছে নিজস্ব বিচার ও মানদণ্ড। জীবনের চুড়ান্ত সে সফলতাটি হলো, আখেরাতে অনন্ত-অসীম কালের জান্নাতী জীবন। পবিত্র কোরআনে সে বিশাল প্রাপ্তিকে বলা হয়েছে “ফাউজুন আজীম” অর্থঃ বিশাল বিজয়। সে বিজয়ের তূলনায় দুনিয়ার জীবন এতই তুচ্ছ যে, তাঁর নিজের শত্রু  কাফেরদের পার্থিব আরাম-আয়েশ বাড়াতে তাদের ঘরবাড়ী, দালান-কোঠা এবং ঘরের দরজা, সিঁড়ি ও খাট-পালং সোনা-রূপা দিয়ে গড়ে দিতেও মহান আল্লাহতায়ালার কোনরূপ আপত্তি ছিল না। কিন্তু সেগুলি তাদেরকে এজন্য দেননি যে, কাফেরদের সে বিশাল পার্থিব প্রাপ্তি দেখে আশংকা ছিল সকল মানুষের কাফের হয়ে যাওয়ার। সে বর্ণনাটি এসেছে পবিত্র কোর’আনের সুরা জুখরুফের ৩৩, ৩৪ ও ৩৫ নম্বর আয়াতে। মহান নবীজী (সাঃ)র হাদীসঃ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে পার্থিব জীবনের গুরুত্ব যদি মশার একটি ডানার সমানও গণ্য হত তবে তিনি কাফেরদের এ দুনিয়ায় কিছুই দিতেন না। এক ফোটা পানির সাথে সকল সাগর-মহাসাগরের পানির তূলনা হয়। কারণ সকল সাগর-মহাসাগরের সমুদয় পানি যত বিশালই হোক, তা অসীম নয়। ফলে তূলনা চলে দুই সসীমের মাঝে। কিন্তু  আখেরাতের জীবন তো অন্তহীন। ফলে দুনিয়ার অর্জন -তা যত বিশালই হোক, আখেরাতের জান্নাতী অর্জনের সাথে তার কোনরূপ তূলনাই হয় না। তাই পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের বার বার আখেরাতের সফলতায় মনযোগী হতে নির্দেশ দিয়েছেন। সে সাথে এ কথাও বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, আখেরাতে সে বিশাল প্রাপ্তির জন্য ঈমানের পরীক্ষায় পাশ করাটি অপরিহার্য। জীবনের এ চুড়ান্ত পরীক্ষায় কোনরূপ ফাঁকি বা সুপারিশ চলে না। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অপার রহমত ও পুরস্কার জুটে একমাত্র সে পরীক্ষায় পাশের পর, পূর্বে নয়। নবী-রাসূল ও তাঁদের সাথীদেরও সে পরীক্ষায় পাশ করতে হয়েছে। পবিত্র কোর’আনে সে হুশিয়ারিটি ঘোষিত হয়েছে এভাবে, “মানুষ কি মনে করে নিয়েছে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করেই অব্যাহতি দেয়া হবে? আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছিলাম; আল্লাহ  অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা (ঈমানের দাবীতে) সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী।” –(সুরা আনকাবুত, আয়াত ২-৩)।

মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান আনার অর্থ, মু’মিনের জীবনে পরীক্ষা যে অনিবার্য -সেটির উপরও ঈমান আনা। পরীক্ষার সে ক্ষেত্রটি হলো জিহাদ। সাচ্চা ঈমানদারদের বাছাইয়ে জিহাদ ফিল্টারের কাজ করে। বেছে নেয়া হয় জান্নাতের উপযোগী যোগ্যবান বাসিন্দাদের। সে বাছাই থেকে তখন বাদ পড়ে ভীরু-কাপুরুষ ও ঈমানের দাবীতে মিথ্যুক তথা মুনাফিকগণ। মদিনার ৩০০ জন মুনাফিক তাই জায়নামাজে তাদের মুনাফেকী দিনের পর দিন লুকিয়ে রাখতে পারলেও ওহুদের যুদ্ধ কালে সেটি লুকাতে পারিনি। যাচাই-বাছাইয়ের সে কাজে মুসলিম সমাজে জিহাদের প্রেক্ষাপট লাগাতর তৈরী করা হয় মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশরূপে। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার সে পরিকল্পনার কথাটি ঘোষিত হয়েছে এভাবে, “(হে ঈমানদারগণ!) তোমাদের উপর দুর্দিন যদি আঘাত হেনে থাকে (তাতে বিস্ময়ের কি আছে?), সেরূপ আঘাত তো তাদের (কাফেরদের) উপরও এসেছে। আমি মানুষের মাঝে কালের আবর্তন ঘটাই এজন্য যে, যাতে জানতে পারি কারো (প্রকৃত) ঈমানদার।এবং তোমাদের মধ্য থেকে বেছে নেই্ শহীদদের। আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।” -(সুরা আল –ইমরান আয়াত ১৪০)।

 

জিহাদেই বিজয়

ইসলামের বিজয়ে জিহাদের গুরুত্ব অন্য কারণেও। জিহাদের অঙ্গণে যেমন ঈমানের পরীক্ষা হয়, তেমনি সে পবিত্র অঙ্গণেই প্রাপ্তি ঘটে মহান আল্লাহতায়ার গায়েবী মদদ। আসে বিজয়। ফলে জিহাদ বন্ধ হলে মহান আল্লাহতায়ার পক্ষ থেকে সাহায্য লাভও বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, মহান আল্লাহতায়ালা তার নিজের পক্ষ থেকে সাহায্যদানের পূর্বে মু’মিনের নিজের বিনিয়োগটি দেখতে চান। মু’মিনগণ যখন মহান আল্লাহতায়ালার পথে তাঁদের প্রিয় জীবনের কোরবানী পেশে জিহাদের ময়দানে হাজির হন, তখন সে ময়দানে তারা একাকী থাকেন না। তাদের সাহায্যে হাজির হন মহান আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাগণও। ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহিনীও তখন বিশাল বিশাল বাহিনীর উপর বিজয়ী হয়। ইসলামের ইতিহাস তো সেরূপ ঘটনায় ভরপুর। মুসলিমদের পক্ষ থেকে জানমালের সে নিজ বিনিয়োগটি বন্ধ হলে বন্ধ হয়ে যায় মহান আল্লাহর বিনিয়োগও। আর মহান আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কি বিজয় সম্ভব? ফলে শুরু হয় লাগাতর পরাজয়। সে বিষয়টি ইসলামী আক্বীদার এতটাই মৌলিক বিষয় যে, জিহাদ তথা মহান আল্লাহতায়ালার গায়েবী সাহায্য লাভের সে পথটি অতীতে কখনোই বন্ধ করা হয়নি। গায়েবী সাহায্য লাভ ও জান্নাতের সে দ্বারটি খোলা রাখতে খোলাফায়ে রাশেদার আমলেই শুধু নয়, উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া আমলেও সরকারি নীতি ছিল ইসলামের শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবছর জিহাদ সংগঠিত করা। সে সাথে জনগণকে মুসলিমদের মুজাহিদ রূপে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। তাছাড়া যুক্তি হলো, মহান আল্লাহতায়ালার নিজ মালিকানাধীন ভূমিতে কাফের তথা অবাধ্য-বিদ্রোহীদের দখলদারী থাকবে অথচ মু’মিনদের পক্ষ থেকে সে দখলদারী মুক্তির যুদ্ধ থাকবে না সেটিই বা কীরূপে ভাবা যায়?  মুসলিমের জীবনে এটিই তো প্রকৃত মুক্তযুদ্ধ। মুসলিম ভূমি থেকে যখনই লুপ্ত হয়েছে জিহাদ, তখনই শুরু হয়েছে দ্রুত নীচে নামার পালা। পতনের সে ধারা বস্তুত এখনও অব্যাহত রয়েছে।

 

চুক্তি মহান আল্লাহতায়ালার সাথে

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে নবী-রাসূলদেরই পরই ছিদ্দীকীন ও শহীদদের মর্যাদা। হযরত মহম্মদ (সাঃ) এর পর আর কেউ নবীর মর্যাদা পাবেন না। কিন্তু শহীদের মর্যাদা পাবেন অনেকেই। শহীদগণ নিহত হয়েও জীবিতের সন্মান পান। পান বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশের সন্মানিত পুরস্কার। মহান আল্লাহতায়ালা সে মহান শহীদদের বেছে নেয়া হয় জিহাদের ময়দান থেকে; মসজিদ-মাদ্রাসা, জায়নামাজ বা আরাফার মাঠ থেকে নয়। মহান আল্লাহতায়ালার সাথে মু’মিনদের সম্পর্ক যে কত গভীর এবং শহীদ হওয়াটি তাদের জীবনে যে কতটা স্বাভাবিক -সে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট ভাষায় এসেছে পবিত্র কোর’আনে। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের থেকে কিনে নিয়েছেন তাদের জীবন ও সম্পদ; সেটি এ শর্তে যে বিনিময়ে তারা পাবে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায়; তারা নিধন করে (ইসলামের শত্রুদের) এবং নিজরাও নিহত হয়। (আল্লাহর পক্ষ থেকে) এ বিষয়ে দৃঢ় ওয়াদা ব্যক্ত হয়েছে তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোর’আনে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ অপেক্ষা আর কে শ্রেষ্ঠতর? তোমরা (আল্লাহর সাথে) ক্রয়-বিক্রয়ের যে চুক্তি করলে তাতে আনন্দ প্রকাশ করো। এটিই তো মহা সাফল্য। -(সুরা তাওবাহ, আয়াত ১১)।

একটি দেশে কতজন প্রকৃত ঈমানদারের বসবাস -সেটি সেদেশে মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বা নামাজে ও তাবলীগ জামাতের এজতেমায় লোকসমাগম দেখে বুঝা যায় না। সেটি বুঝা যায় জিহাদের ময়দানে লড়াকু মুজাহিদদের সংখ্যা দেখে। বুঝা যায় শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দেখে। ইসলামের শত্রুশক্তি তাই দেশে দেশে বিপুল সংখ্যক মসজিদ-মাদ্রাসা বা তাবলীগ জামাতের এজতেমায় বিশাল লোক-জমায়েত দেখে ভয় পায় না। ভয় পায় জিহাদের ময়দানে হাজিরা দেখে। ফলে প্রচারণা শুরু হয় জিহাদের ন্যায় ইসলামের সনাতন ইন্সটিটিউশনের বিরুদ্ধে। জিহাদকে তখন সন্ত্রাস বলা হয়। তখন জিহাদ রুখতে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন গড়ে উঠে পূর্ব ও পশ্চিমের ৬০’য়ের অধীক দেশ নিয়ে –যেমনটি দাবী করে থাকেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরী। অথচ এতবড় কোয়ালিশন অতীতের দুটি বিশ্বযুদ্ধে কোন বিশ্বশক্তির হামলা রুখতেও গড়ে উঠেনি। জিহাদের মধ্যেই যে ইসলামের শক্তি এবং মুসলিমের বিজয় ও মর্যাদা –সেটি কি এরপরও বুঝতে বাঁকি থাকে? জিহাদের মধ্যে থাকে যে মহান আল্লাহতায়ালার অপ্রতিরোধ্য শক্তি -সেটি তারা রুখবে কেমনে? ২৯/০৮/২০১৬

 




আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসের রাজনীতি

ডাকাতি ফ্যাসীবাদের 

আগুনের উত্তাপ আর কয়লার কালো রং কখনোই আলাদা হয় না। আওয়ামী লীগ থেকেও তেমনি আলাদা করা যায় না তার চরিত্র, ঐতিহ্য ও দলীয় সংস্কৃতি। সেটি যেমন গণতন্ত্র ধ্বংসের, তেমনি অটল ভারত-প্রেম এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাসের। এবং সেটি দলটির জন্ম থেকেই। প্রতিদেশে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই একটি আদর্শ থাকে। মানুষ সে আদর্শ বাস্তবায়নে দলবদ্ধ হয়,সে লক্ষে শ্রম দেয়,মেধা দেয়,অর্থ দেয় এবং প্রয়োজনে প্রাণও দেয়। সে লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রিদের রয়েছে যেমন সমাজতান্ত্রিক দল, তেমনি ইসলামপন্থিদের রয়েছে ইসলামি দল। কিন্তু আওয়ামী লীগের আদর্শ কোনটি? দলের আদর্শ ধরা পড়ে দলের নীতি,কর্ম ও আচরণে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বহুকাল আগে,দলটি কয়েকবার ক্ষমতায়ও গেছে। ফলে গোপন থাকেনি তার নীতি,কর্ম ও আচরণ। আর তাতে প্রকাশ পেয়েছে আদর্শ। মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও আওয়ামী লীগের ইতিহাস,বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠানোর। রহিত করেছিলেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। ক্ষমতায় বসেই শেখ মুজিব দেশবাসীর জন্য আইনসিদ্ধ মতবাদের একটি তালিকা বেঁধে দিয়েছিলের,সেটি ছিল জাতীয়তাবাদ,সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষবাদ। এর বাইরে কোন আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করা বা ভিন্ন দল গড়াকে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ ঘোষিত করেছিলেন। এমনকি আল্লাহর বেঁধে দেয়া একমাত্র আদর্শ ইসলামকে নিয়েও নয়। ফলে তার বাংলাদেশে কোন ইসলামী দল ছিল না।

ডাকাতদের অপরাধ, তারা অন্যের সম্পদ দখলে বা লুণ্ঠনে সন্ত্রাস করে,এবং সে সন্ত্রাসে অস্ত্র ব্যবহার করে। তাদের ডাকাতি ব্যক্তির বিরুদ্ধে। আর ফ্যাসীবাদের ডাকাতি হল দেশ এবং সমগ্র দেশবাসীর বিরুদ্ধে। তারা সন্ত্রাসে নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলে। ডাকাতের সন্ত্রাসে রাজনীতি নাই, ভণ্ডামীও নাই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাদখলের সন্ত্রাসে রাজনীতি হল মূল হাতিয়ার। সন্ত্রাসের সাথে সেখানে রাজনীতি যেমন আছে তেমনি প্রতারণাও আছে।সে কারণেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিব আট আনা সের চাউল খাওয়ানার ওয়াদা করেছিলেন। ১৯৭২-৭৩-এ তলাহীন ঝুড়ি এবং ১৯৭৪-এ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ উপহার দিলে কি হবে,সত্তরের নির্বাচনে তিনি সোনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছিলেন। দেশ ও দেশবাসীর উপর ডাকাতিতে নির্বাচন,রাজপথের জনসভা এবং মিছিলও পরিনত হয় সন্তাসের শিকার। নির্বাচনের আগেই রাজপথের দখল নেওয়ার এটাই ফ্যাসীবাদী সনাতন কৌশল। হিটলার সেটি জার্মানীতে করেছিল। আর আওয়ামী লীগ সে কৌশলের প্রয়োগ করেছে অতীতের প্রতিটি নির্বাচনে। এ নিবন্ধে সে সন্ত্রাসের কিছু উদাহরণ দেয়া হবে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে শেখ মুজিব যেমন একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করেছিল, তেমনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কথা বলে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তির। উন্নয়নের ওয়াদা দিয়ে ডেকে এনেছিলেন দেশীয় শিল্পে ধ্বংস, অর্থনৈতিক দুর্গতি ও ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। ক্ষুদার্ত মানুষ তখন উচ্ছিষ্টের খোঁজে কুকুরের সাথে আস্তাকুঁড়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। মহিলারা তখন লজ্জা নিবারণে মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল। নবাব শায়েস্তা খানের আমলের “ধণে-ধানে পুষ্পেভরা” বাংলা তখন বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত পেয়েছিল তলাহীন ভিক্ষার ঝুড়ি রূপে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই হল মুজিবামল। হাজার বছরের ইতিহাসে আর কোন আমলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দেশটির এত  অপমান জুটেনি।

 

শেখ মুজিবের বক্তৃতা ও রাস্তায় লগিবৈঠা 

শেখ মুজিব তাঁর শাসনামলে সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে একমাত্র দল বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (সংক্ষেপে বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দলীয় পত্র-পত্রিকা। এমন একদলীয় শাসন,এমন সর্বনাশা দুর্ভিক্ষ এবং মতামত প্রকাশের উপর এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানে নাই। নেপাল এবং শ্রীলংকাতেও নাই। অথচ সে স্বৈরাচারি মুজিবই হল আওয়ামী লীগের শ্রেষ্ঠ নেতা ও শ্রেষ্ঠ আদর্শ। যারা ইসলামের প্রতিষ্ঠা চায় তারা কোরআন-হাদীসের চর্চা বাড়ায়। কারণ কোরআন-হাদীসের জ্ঞানে ইসলামের প্রতিষ্ঠায় মানুষ বেশী বেশী একনিষ্ঠ ও আত্মত্যাগী হয়। ডাকাত সর্দারের বার বার দীর্ঘ বক্তৃতা শুনে শিষ্যরা তেমনি বড় ডাকাত হয়। গণতন্ত্র-হত্যাকারি একজন বাকশালী নেতার বক্ততার ক্যাসেট হাজার বার শুনিয়েও কি তাই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা বাড়ে? তখন তো বরং কর্মীরা উৎসাহ পায় লগি বৈঠা নিয়ে রাস্তায় মানুষ হত্যায়। এবং উৎসব বাড়ে অন্য দলের মিছিল-মিটিং পণ্ড করা বা যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ ধরিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যায়। এমন সহিংসতাও তখন শিষ্যদের কাছে গণতান্ত্রিক রাজনীতি মনে হয়ে। শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ হাজারো বার শুনিয়েও তাই দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়েনি। গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা পায়নি। অন্যদের মাঝে দূরে থাক,খোদ আওয়ামী লীগ কর্মীদের জীবনেও তাতে নৈতিক বিপ্লব আসেনি। বরং বেড়েছে নীতিহীনতা এবং বিপর্যয়।

 

অজ্ঞতার বিপদ

বিষকে বিষরূপে জানাটা জীবন বাঁচানোর জন্য জরুরী। নইলে বিষ পানে প্রাণনাশ ঘটে। দেশকে বাঁচাতে হলেও তেমনি দেশের শত্রুদের চিনতে হয়। এক্ষেত্রে অজ্ঞতা হলে দেশের জন্য মহাবিপদ। আর সে অজ্ঞতা দূর করতে হলে রাজনীতিতে যাদের বিচরণ তাদের ইতিহাস জানাটি জরুরী। কারণ তারাই ঘুরেফিরে দেশের ড্রাইভেট সিটে বসে। চারিত্রিক গুণাগুণ, পেশাগত যোগ্যতা ও শারীরীক সুস্থ্যতা না জেনে কাউকে এমনকি বাসের বা ট্রেনের চালক করাতেও মহা বিপদ। নেশাখোর মদ্যপ,দায়িত্বজ্ঞানহীন দুর্বৃত্ত বা অন্ধ মানুষও তখন চালকের সিটে বসার সুযোগ পায়। এতে দুর্ঘটনায় প্রাণনাশ ঘটে যাত্রিদের। তাই অন্যান্য দলের সাথে আওয়ামী লীগের ইতিহাসকেও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার কাজটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আওয়ামী লীগ একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। ক্ষমতায় গিয়েই শুধু নয়, ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলটি দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির সামর্থ রাখে। তাই দেশের কল্যাণে অতি অপরিহার্য হল দলটির প্রকৃত পরিচয় জানা। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ক্ষতিটি হবে বিশাল। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই যথার্থ ভাবে হয়নি। বরং যা হয়েছে তা হল,সুকৌশলে দলটির মূল চরিত্রটিকে গোপন করার। শেখ মুজিবের ১৯৭০-এ বিপুল নির্বাচনী বিজয় এবং ৭ই মার্চের জ্বালাময়ী ভাষনের বাইরেও দলটির বিশাল ইতিহাস আসে। বাংলাদেশী ছাত্রদের কাছে সে ইতিহাসটি জানা ইতিহাস-ভূগোল, ফিজিক্স-কেমিষ্ট্রী বা চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞান-লাভের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ স্রেফ ইতিহাস-ভূগোল, ফিজিক্স-কেমিষ্ট্রী,চিকিৎসা বা কারিগরি জ্ঞান বাড়িয়ে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এমন কি রাস্তাঘাট,কলকারখানা,কৃষি উৎপাদন বা বিদেশে লোক রপ্তানি বাড়িয়েও নয়। দেশ বাঁচাতে হলে দেশের শত্রুদের চেনার বিকল্প নাই। তাছাড়া কারা দেশের শত্রু বা মীরজাফর -সে সত্যটি গোপন করা মহাপাপ। ইসলামে এটি কবিরা গুনাহ। কারণ তাদের না চেনার বিপদটি তো বিশাল। এমন জ্ঞানলাভের ক্ষেত্রে তাই কাযা নেই, কাফ্ফরাও নেই। বরং এ ক্ষেত্রে গাফলতি হলে জাতির জীবনে গোলামী নেমে আসে শত শত বছরের জন্য। এমন মহাপাপের কারণই ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা লুণ্ঠিত হয়েছিল। আগ্রাসী ইংরেজদের হাতে সেদিন যে পরাজয়টি ঘটেছিল সেটি অর্থনিতক পশ্চাদপদতার কারণে নয়। সৈন্য সংখ্যার কমতির কারণেও নয়। এমনকি শিল্পে অনগ্রসরতার কারণেও নয়। বরং সে  সময় তো বিশ্বের বিস্ময়কর মসলিন শিল্প ছিল বাংলায়, যা রপ্তানী হত ইউরোপে। তখন সিরাজুদ্দৌলার সৈন্যসংখ্যা ছিল ইংরেজ সৈন্যের চেয়ে প্রায় দশগুণ বেশী। তাদের হাতে বড় বড় কামানও ছিল। কিন্তু সে বিশাল বাহিনী পরাজয় ঠেকাতে পারিনি। ১৭৫৭ সালের সে শোচনীয় পরাজয়টি ঘটেছিল দেশের মীরজাফরদের না চেনার কারণে। তাতে ফল দাঁড়িয়েছিল,মীর জাফরের ন্যায় জঘন্য বিশ্বাসঘাতককে সেদিন শাস্তি না দিয়ে দেশের সেনাপতি বানানো হয়েছিল।

নবাব সিরাজুদ্দৌলার ন্যায় শাসকদের অজ্ঞতায় মীর জাফরেরা যেমন সেনাপতি হয়,জনগণের অজ্ঞতায় তেমনি শত্রুরাওই তারা নেতা হওয়ার সুযোগ পায়। তাই জনগণকে অজ্ঞ রাখাতেই তাদের বিজয় ও আনন্দ। অজ্ঞতার বড় বিপদটি হল,একই গর্তে পা তখন বার বার পড়ে। তাই বাংলাদেশে ইতিহাস জ্ঞান ইচ্ছা করেই বাড়ানো হয়নি। সেটি যেমন সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ব্রিটিশ আমলে, তেমনি আজ।ও। তাই বাংলাদেশীদের বিপদ ১৭৫৭ সালে পলাশীতে শেষ হয়নি। একাত্তরেও শেষ হয়নি। ২০১১ সালে এসেও শেষ হয়নি। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫-এ সীমাহীন ভারতীয় লুন্ঠন,তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির পরিচয়,১৯৭৪ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ,মুজিবের হাতে গণতন্ত্র-হত্যা, রক্ষিবাহিনীর হাতে ৩০ হাজার বাংলাদেশী হত্যার ন্যায় ভয়াবহ ঘটনাগুলিও তো ঘটেছে একই কারণে। আজও  বাংলাদেশের রাজনীতি,অর্থনীতি,সংস্কৃতি এবং মিডিয়া যেভাবে আগ্রাসী ভারতের হাতে অধিকৃত, ছিনতাই হয়েছে যেভাবে তালপট্টি দ্বীপ,লুণ্ঠিত হচ্ছে যেভাবে পদ্মা,তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি এবং সীমান্তে তারকাঁটায় ঝুলে লাশ হচ্ছে যেভাবে মানুষ -সেগুলির কারণও কি ভিন্নতর?

বিষধর গোখরা শাপ বিছানায় নিয়ে ঘুমালে প্রাণ বাঁচে না। সে বিপদ থেকে বাঁচতে হলে চোখ খোলা রাখতে হয়। তেমনি চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও গণতন্ত্রহত্যাকারি,বিদেশী চর এবং ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তিকে বন্ধু মনে করে নেতা বানালে,এবং তাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসালে দেশও বাঁচে না। তাই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান স্রেফ বিষাক্ত মশামাছি,শাপ-বিচ্ছু,রোগজীবানূর জ্ঞান নয়; অতি গুরুত্বপূর্ণ হল সমাজের বিষধর শাপদের পরিচয়টি যথার্থ জানা। মশামাছি, শাপ-বিচ্ছু ও রোগজীবানূর আক্রমনে বহু হাজার লোক মারা গেলেও তাতে জাতি পরাজিত বা অধিকৃত হয় না। তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিও হয় না। বিশ্বের বহুদেশে এমন মহামারি বহুবার এসেছে। কিন্তু ছদ্দবেশী শত্রুকে নেতা বানালে দেশ অধিকৃত হয়। মুজিব আমলে বাংলাদেশ ২৫ সালা দাসচুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল এবং ভিক্ষার ঝুলি রূপে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছিল তো এমন এক ব্যর্থতার কারণেই। এ বিপদ থেকে বাঁচার জন্য উন্নত স্বাধীন দেশগুলো শুধু কলকারখানা,হাসপাতাল,স্কুল-কলেজ,গবেষণাগার ও রাস্তাঘাট গড়ে না,শত শত কোটি টাকা ব্যায়ে ইতিহাস চর্চা ও নেতাদের আচরনবিধি জানার বিশাল বিশাল প্রতিষ্ঠানও গড়ে। তাদের পলিসির উপর গবেষণা করে। শত শত কোটি টাকা ইতিহাস নিয়ে বইও লেখে এবং জনগণের মাঝে সে জ্ঞানের চর্চাও বাড়ায়। হার্ভার্ড, কেম্ব্রিজ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিখ্যাত শুধু তাদের বিজ্ঞান-বিষয়ক গবেষণাগারের জন্য নয়, বরং ইতিহাস-বিষয়ক বিশাল বিশাল প্রতিষ্ঠানের কারণে। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। ফলে বাংলাদেশে মশামাছি,শাপ-বিচ্ছু,রোগজীবানূর আক্রমণে মানুষ মরা কমলেও বিপদ কমেনি। বরং ধ্বংসের দিকে দেশ দ্রুত ধেয়ে চলেছে আভ্রন্তরীণ শত্রুর কারণে।দেশ আজ  অধিকৃত এসব শত্রুদের হাতে।

 

সন্ত্রাস সংসদে ও রাজপথে

আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে যা ঐতিহাসিক সত্য তা হল,বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই একমাত্র দল যা গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্রকেই দাফন করে এবং প্রতিষ্ঠা করে একদলীয় বাকশালী শাসন। স্বাধীন মতপ্রকাশকে তারা দণ্ডনীয় অপরাধে পরিনত করেছিল। বিরোধীদের দমনের কাজে হাতিয়ারে পরিনত করেছিল দেশের আদালত,বিচারক,পুলিশ ও প্রশাসনকে। সেটি যে শুধু মুজিবামলে তা নয়, যখনই দলটি ক্ষমতায় গেছে তখনই সে কাজটি করেছে। এমনকি অন্যদের উপর সন্ত্রাসে অতি নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে ক্ষমতার বাইরে থাকা কালেও। আওয়ামী লীগ তার সন্ত্রাসের রাজনীতি হঠাৎ শুরু করেনি। দশ-বিশ বছর আগেও নয়। বরং সেটির শুরু দলটির জন্ম থেকেই। এবং সন্ত্রাসের সে রাজনীতি শুধু মাঠকর্মী বা ক্যাডারদের হাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেটির হোতা ছিল মূল নেতারাই। তাছাড়া অন্যদলের জনসভা ও মিছিল পণ্ড করার মধ্যেও সে সন্ত্রাস সীমাবদ্ধ থাকেনি,বরং সন্ত্রাস হয়েছে খোদ সংসদ ভবনে। সে সন্ত্রাস যে শুধু হাতাহাতি বা মারপিঠেও সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়। গড়িয়েছে মানুষ খুণে। লগিবৈঠা নিয়ে কর্মীদের হাতে মানুষ খুনের আগেই নৃশংস নিষ্ঠুরতায় সেদিন পারঙ্গমতা দেখিয়েছিল দলটির সংসদীয় সদস্যরা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের শরীক দল রূপে আওয়ামী লীগ সেদিন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে বিপুল সংখ্যক আসন পায়, কিন্তু তাদের সে বিজয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিজয়ী হয়নি, সংসদেরও গৌরব বাড়েনি। বরং দলটির দলীয় সাংসদদের মারের আঘাতে প্রাণ হারান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ডিপুটি স্পীকার জনাব শাহেদ আলী। সে খবর সেদিন বিশ্ববাসী জেনেছিল। আওয়ামী লীগের নেতাগণ এভাবে সেদিন চুনকালি লেপন করেছিল পাকিস্তানের মুখে এবং পথ করে দিয়েছিল সামরিক শাসনের।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মাওলানা ভাষানী। কিন্তু নিজের প্রতিষ্ঠিত দলে তিনি বেশী দিন থাকতে পারেননি। দ্বন্দ শুরু হয় আরেক নেতা জনাব সোহরাওয়ার্দীর সাথে। ভাষানী আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে নতুন দল গড়েন। ন্যাপ তখন আওয়ামী লীগের প্রবল প্রতিপক্ষ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে আওয়ামী সন্ত্রাসের খড়গ পরে এ দলটির উপর। ১৯৫৭ সালের ২৫শে জুলাই মাওলানা ভাষানীর নেতৃত্বে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমমনা বেশ কিছু নেতা ও কর্মী এক রাজনৈতিক সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন ঢাকার রুপমহল সিনেমা হলে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সে সভায় যোগ দেন খান আব্দুল ওয়ালী খান, মিয়া ইফতারখান উদ্দীনসহ বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তখন আওয়মী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, আর পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান। আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি তখন শেখ মুজিব। সেসাথে তিনি মন্ত্রীও ছিলেন। জনসভা পণ্ড করার মূল দায়িত্ব ছিল তারই উপর। তখন বাসভর্তি গুণ্ডা এনে ন্যাপের সভা পণ্ড করা হয়। সে দিনটিতে পুলিশ বাহিনীর কার্যকলাপ ছিল আরো ন্যাক্কারজনক। হামলাকারি গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে তারাও বরং গুণ্ডাদের সাথে হামলায় যোগ দেয়। পাকিস্তানে ইতিহাসে সেটিই ছিল সরকারি দলের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক সন্ত্রাস। বিরোধীদের পিটাতে সেদিন রক্ষিবাহিনীর প্রয়োজন পড়েনি, পুলিশকেই তারা সে কাজে ব্যবহার করেছিলেন। রুপমহল সিনেমা হলে হামলা সত্ত্বেও সে সভায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)এর জন্ম হয়। পরের দিন ২৬ শে জুলাই ছিল পল্টনে ন্যাপের জনসভা। মাওলানা ভাষানীসহ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত নেতাদের সে জনসভায় ভাষন দেবার কথা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে জনসভা হতে দেয়নি। আওয়ামী লীগের গুণ্ডাবাহিনীর ঝটিকা বেগে সে জনসভার উপর হামলা করে। দক্ষিণে নবাবপুর রেলক্রসিং, উত্তরে পুরনো পল্টন, পশ্চিমে কার্জন হল এবং পশ্চিমে মতিঝিল এ বিস্তীর্ণ এলাকা এক কুরুক্ষেত্র পরিণত হয়। ভন্ডুল হয়ে যায় ভাষানীর জনসভা। সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে এভাবেই গণতন্ত্র চর্চাকে সেদিন অসম্ভব করা হয়েছিল।

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধাণ স্ট্রাটেজী হয়,নির্বাচনের আগেই রাজপথে দলীয় দখলদারি প্রতিষ্ঠা করা। কৌশল হয়,অন্য কাউকে নির্বাচনী প্রচার চালাতে না দেয়া। তাদের এ লক্ষ্য পূরণে জামায়াতে ইসলামীকে তারা প্রধান শত্রু মনে করে। ফলে এ দলটির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস ছিল আরো হিংসাত্মক ও গুরুতর। ১৯৭০ সালের ১৮ই জানুয়ারি পল্টন ময়দানে ছিল জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভা। সে জনসভায় মাওলানা মওদূদীর বক্তৃতা দেয়ার কথা। কিন্তু সে জনসভা আওয়ামী লীগের বিশাল গুণ্ডাবাহিনী হতে দেয়নি। হামলা চালিয়ে তিনজনকে সেদিন শহিদ করে, আহত করে কয়েক হাজার। দলীয় অফিসে বসে শেখ মুজিব নিজে বলেছিলেন, মাওলানা মওদূদী কিভাবে পল্টনে মিটিং করে সেটি দেখে নিব। মুজিবের সে কথা আমি সেদিন নিজ কানে শুনেছি। পরের রবিবার অর্থাৎ ২৫শে জানুয়ারি ছিল মুসলিম লীগের জনসভা। মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরীর বক্তৃতা দেয়ার কথা। আওয়ামী লীগের গুণ্ডারা সে জনসভাও হতে দেয়নি। সেদিনও পল্টন ময়দানে নিজে উপস্থিত থেকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ইটপাথর মারার সে দৃশ্য স্বচোখে দেখেছি। এর পরের রবিবার ছিল পহেলা ফেব্রেয়ারি। সেদিন পল্টন ময়দানে ছিল জনাব নূরূল আমীনের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানে ডিমোক্রাটিক পার্টির জনসভা। সেদিন পল্টন ময়দানের সে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মৌলভি ফরিদ আহম্মদ, জনাব মাহমুদ আলী, আজিজুল হক নান্নাহ মিয়া, ইউসুফ আলী চৌধুরি মোহন মিয়া, এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম খানসহ বহু নেতৃবৃন্দ। দলের নেতা জনাব নূরুল আমীন তখনও মঞ্চে আসেননি। আওয়ামী লীগ নেতারা সে জনসভাও হতে দেয়নি,শুরুতেই হামলা শুরু হয়। কোন কোন নেতার মাথার পাথর পড়ে,এমনকি জনসভা পণ্ড করার পর ফেরতগামী নেতাদের উপরও তারা হামলা হয়।

 

জিহাদ বনাম রাজনীতি

দেশ-সেবা,সমাজ-সেবা,জনসেবা তথা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের কল্যানে কিছু করার মাধ্যম হল রাজনীতি। আত্মত্যাগী মানুষ এখানে মেধা দেয়, শ্রম দেয়, এমনকি প্রাণও দেয়। রাজনীতিকে আরবীতে বলা হয় ‘সিয়াসা’। কোরআন ও হাদীসে ‘সিয়াসা’র কোন উল্লেখ নাই। তবে যা আছে তা হল, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে সর্বাত্মক আত্মনিয়োগের প্রেরণা। আছে ইক্বামতের দ্বীন তথা দ্বীনের প্রতিষ্ঠার কথা। আছে আল্লাহর কোরআনী বিধানের বিজয়ে অর্থদান,শ্রমদান এমনকি প্রাণদানের তাগিদ। ইসলামে এটি পবিত্র ইবাদত। এটি পবিত্র জিহাদ। মুসলমানের এটাই রাজনীতি। রাষ্ট্রে ও সমাজে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব বা খেলাফতের দায়িত্ব পালন নিছক নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালনে হয় না। এ জন্য অপরিহার্য হল জিহাদে তথা আল্লাহর শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালনে ব্যক্তির জীবনে আধ্যাত্মিকতা আসে। আসে তাকওয়া। আর সে তাকওয়াটি হল,আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বাঁচার সার্বক্ষণিক চেতনা। এটি হল তাঁর হুকুম পালনে লাগাতর অঙ্গিকার। এমন তাকওয়া থেকেই মোমেন পায় আল্লাহর দ্বীনের পূর্ণ অনুসরণের প্রেরণা। ঈমানদারের কাজ হল,তাকওয়া-নির্ভর নিজের সে আধ্যাত্মিক পরিবর্তনকে স্রেফ মসজিদ বা নিজ-গৃহের মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও রাষ্ট্রের অঙ্গণে নিয়ে যাওয়া। ঈমানদারের রাজনীতি হল মূলত সে কাজেরই বাহন। পবিত্র কোরআনে ঈমানদারের মূল মিশন রূপে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা হল, “আমারু বিল মারুফ”, “নেহী আনিল মুনকার” এবং লিইউযহিরাহু আলাদ্দীনি কুল্লিহী”। এর অর্থ ‍‍‌‌‍‍‍‍‍“ন্যায়ের আদেশ”‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍, “অন্যায়ের নির্মূল” এবং “সকল মতবাদ,আদর্শ ও ধর্মের উপর ইসলামের বিজয়”। নবীজী(সাঃ)র যুগে আজকের ন্যায় রাজনৈতিক দল ছিল না, রাজনীতিও ছিল না। ছিল জিহাদ। সে জিহাদে অর্ধেকের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছে। তবে সেক্যুলারিষ্টদের কাছে জিহাদ নাই, শাহাদতও নাই। যা আছে তা হল ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে দল গড়া, দলাদলি করা, মিথ্যা ওয়াদা দিয়ে দলভারি করা এবং গদীর স্বার্থে সকল উপায়ে জনগণকে প্রতারণা করা। এটিই হল, মেকিয়াবেলীর “পলিটিক্স” তথা সেক্যুলার রাজনীতি।

 

সবচেয়ে বড় ডাকাতি  

মেহনত, ত্যাগস্বীকার বা লড়াই শুধু ঈমানদারগণই করে না। ডাকাতরাও রাত জাগে, মেহনত করে, এমনকি প্রাণও দেয়। ডাকাতরা হানা দেয় ব্যক্তির ঘরে বা দোকানে। কিন্তু প্রতিদেশে সবচেয়ে বড় ডাকাতি হয় দেশের রাজনীতির ময়দানে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে এখানে ময়দানে নামে দেশের সবচেয়ে দুর্ধষ্য ডাকাতরা। তাদের লক্ষ্য, সমগ্র রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠিত করা। নৃশংসতায় এরা হিংস্র পশুকেও হার মানায়। মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রক্তপাত ঘটেছে তো এসব বড় বড় ডাকাতদের কারণে। বাংলাদেশেও সবচেয়ে বেশী রক্তপাত ঘটিয়েছে তারা। সেটি যেমন একাত্তরে,তেমনি আজও । নিজেদের গদি-দখলের সে প্রজেক্টকে বলেছে জনগণের অধিকার আদায়ের রাজনীতি। অথচ বাস্তবে সেটি ছিল জনগণকে অধিকারহীন করার ষড়যন্ত্র। তাই আওয়ামী লীগের বিজয়ে শেখ মুজিবের গদিলাভ সম্ভব হলেও ডাকাতি হয়েছে জনগণের মৌলিক অধিকারে, যা এমনকি ইয়াহিয়া বা আইয়ুবের আমলেও ঘটেনি। এটাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডাকাতি। এতে লুট হয়েছে মৌলিক মানবিক অধিকার। সে লুটে রাজনীতিতে একচেটিয়া বাকশালী মনোপলি বেড়েছিল আওয়ামী লীগের। নিজেদের সে একচেটিয়া মনোপলি বাড়াতে প্রয়োজনে তারা বিদেশী ডাকাতদেরও ডেকে আনে। একাত্তরে ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে আনার প্রেক্ষাপট নির্মিত হয়েছিল তো এভাবেই। ফলে সেদিন বাংলাদেশের হাজার হাজার কোটি টাকার মালামাল এবং যুদ্ধাস্ত্র ভারতে ডাকাতি হয়ে যায়। ধ্বসিয়ে দেয় সীমান্ত তথা অর্থনীতির তলা। বিণিময়ে উপহার দেয় এক তলাহীন ভিখারী বাংলাদেশের। ডেকে আনে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ,যাতে মৃত্যু ঘটে বহু লক্ষ বাংলাদেশীর। বিগত বহু শত বছরে বাংলাদেশের সকল ডাকাত এবং সকল হিংস্র পশু মিলেও এত মৃত্যু, এত দুঃখ ও এত অপমান উপহার দেয়নি যা ভারতীয় ডাকাত ও তার বাংলাদেশী বাকশালী সহযোগীরা একাত্তর থেকে পঁচাত্তর -এ চার বছরে দিয়েছে।

 

ডাকাতির চেয়েও নৃশংস

ডাকাতদের তবুও কিছু বিধিমালা থাকে। তারা দিবালোকে ডাকাতি করে না। যাত্রীভর্তি বাসেও আগুন দেয় না। বিত্তহীন গরীব মানুষকেও লুণ্ঠনের লক্ষ্য বানায় না। কিন্তু ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক ডাকাতগণ নৃশংসতা ঘটায় দীবালোকে। তাদের নৃশংসতায় সবচেয়ে বেশী মারা পড়ে নিঃস্ব গরীবেরা।এবং ধনি হয় সবচেয়ে ধনিরা। তাছাড়া লোভটা যেখানে বিশাল নৃশংসতাও সেখানে বিকট। বাংলাদেশের আওয়ামী রাজনীতিতে সে নৃশংসতা যে কতটা প্রকট তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। হরতাল বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। বহু দল বহু বছর ধরেই হরতাল করে আসছে। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানে আমলেও হরতাল হয়েছে। কিন্তু বাসে আগুণ দিয়ে যাত্রীদের হত্যা করা বা গায়ে পেট্রোল ঢেলে কাউকে পুড়িয়ে মারা এক ভয়াবহ নতুন নৃশংসতা। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেটি আমদানী করেছিল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীগণ তাদের নিজেদের ডাকা হরতালগুলোতে। আর তা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের মনে কোন অনুশোচনা নাই, আফসোসও নাই। ১৯৯৩ সালে যাত্রাবাড়ীতে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালের দিনে-দুপুরে বাসে আগুণ লাগিয়ে ১৮ জন যাত্রীকে পুড়িয়ে মারা হয়। ২০০৪ সালের ৪ই জুলাই ছিল আরেকটি হরতালের দিন। সেদিন শেরাটনের সামনে একটি দোতালা বাসে আগুণ দিয়ে হত্যা করা হয় ১০ জন নিরীহ বাসযাত্রীকে। ২০০৫ সালের ২১মে হরতালের দিনে আমির হোসেন নামক এক সিএনজি চালককের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুণ দেয়। ২৫শে সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সে মারা যায়। ২০০৫ সালে জানুয়ারি মাসে মিরপুর এক নম্বর সেকশনে হরতালের আগের রাতে হরতালের সমর্থণে একটি বাসকে লক্ষ করে বোমা ছুঁড়া হয়। কিন্তু বোমাটি পড়ে মফিজ নামক একজন রিকশাচালকের উপর। গার্মেন্ট শ্রমিক মফিজ ৮ সন্তানের সংসার চালাতে সে দিনে ফ্যাক্টরীতে কাজের পাশাপাশি রাতে রিকশা চালাতো। ঐ সময় সে বাচ্চাদের জন্য দুধ কিনতে রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী তাঁকে আর দুধ কিনে তার ক্ষুদার্ত সন্তানদের কাছে ফিরতে দেয়নি। সে ফিরেছিলই ঠিকই,তবে লাশ হয়ে। ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর একটি মিছিলের উপর আওয়ামী লীগের কর্মীগণ গলি-বৈঠা নিয়ে হামলা করে। সে হামলায় নিহত হয় ৫ জন জামাতকর্মী, আহত হয় বহু শত। ২০০৫ সালের ৬ই ফেব্রেয়ারির হরতালে আশরাফ সিদ্দিকী নামক একজন পুলিশকে আওয়ামী লীগ কর্মীরা পিটিযে হত্যা করেছিল। ২০০৬ সালের ১৩ই নভেম্বর দৈনিক “প্রথম আলো” খবর ছাপে, “১৪ দলের অবরোধের প্রথম দিনে ১৫-২০টি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্ণিসংযোগ হয়। সাভারে ৮টি গাড়ি ভাঙচুর হয়।” ২০০৪ সালের ৮ই জুন দৈনিক ইত্তেফাক রিপোর্ট ছাপে, “চার দলীয় সরকারের প্রথম তিন বছরে হরতালে ২৫টি বিআরটির বাস পোড়ানো হয়।” ২০০৬ সালের ৭ই ডিসেম্বর দৈনিক যায়যায় দিন প্রতিবেদন ছাপে, ১৩ দিনের অবরোধ ও সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচীতে ৭৭ জন মারা যায়, ২৮০০ আহত হয় এবং ১৮০০ পঙ্গু হয়। দেশের ক্ষতি হয় ৬ হাজার কোটি টাকা।

 

খুনিদের বাঁচাতে শেখ হাসিনা

স্বৈরাচারি দুর্বৃত্ত এরশাদ তখন ক্ষমতায়। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খান। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন বেগবান হওয়ার পথে। শেখ হাসিনাকে সে আন্দোলন থেকে দূরে সরানোর ষড়যন্ত্র আটে এরশাদ। লক্ষ্য,নিজের স্বৈরাচারকে শক্তিশালী ও দীর্ঘায়ীত করা। সে পরিকল্পনায় ধরা দেয় শেখ হাসিনা। বিণিময়ে এরশাদের কাছ আদায় করে নেয় বহু সুযোগ-সুবিধাও। দলীয় খুনিদের বাঁচাতে শেখ হাসিনা যে সুবিধাগুলো আদায় করেছিলেন তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। সে সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিবির কর্মীকে নির্মম ভাবে হত্যা করে আওয়ামী লীগ সমর্থক ছাত্রলীগের কর্মীরা। ইটের উপর তাদের মাথা রেখে ইটদিয়ে মগজ থেথলে দেয়া হয়েছিল। দিনদুপুরে সংঘটিত সে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে আদালত কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মীকে শাস্তি দেয়। এমন দুর্বৃত্ত খুনিদের পক্ষ কি কোন সভ্য মানুষ নেয়। খুণিদের ঘৃণা করা তো মানুষের অতি মৌলিক মানবিক গুণ। কিন্তু সে সন্ত্রাসী খুণীদের পক্ষ নেয় শেখ হাসিনা। জনাব আতাউর রহমান খান তার স্মৃতীচারণ বইতে লিখেছেন, এরশাদের সাথে আলাপ করতে এসে শেখ হাসীনা দাবী তুললেন তিনি কোন আলাপই করবেন না যদি না শাস্তিপ্রাপ্ত উক্ত ছাত্রলীগ কর্মীদের মূক্তি দেয়া হয়। নিজদলীয় সন্ত্রাসী খুনিদের নিয়ন্ত্রনে রাখার সামর্থ শেখ হাসিনার ছিল না। সামর্থ ছিল না তাদের কৃত খুনের ন্যায় জঘন্য অপরাধকে ঘৃণা করার। তেমনি এরশাদের ছিল না শেখ হাসিনার দাবীর কাছে নত না হওয়ার মত নৈতীক মেরুদণ্ড। হাসিনার দাবীর মুখে স্বৈরাচারি এরশাদ সে সাজাপ্রাপ্ত খুণিদের মুক্তি দিয়েছিল। কারণ এরশাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজ গদীর নিরাপত্তা,কে কোথায় খুণ হল বা সন্ত্রাস ঘটলো সেটি দমনে তার কোন আগ্রহ ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সন্ত্রাস যে কতটা প্রবল, শেখ হাসিনার কাছে নিজ দলের খুনিদেরকে খুণের শাস্তি থেকে বাঁচানোটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ -এ হল তার প্রমাণ। নিজের পিতা ও পরিবারে অন্যদের খুনের বিচার নিয়ে তিনি আদালত বসিয়েছেন। কিন্তু বহু হাজার মানুষ যে প্রতি মাসে খুন হচ্ছে তাদের বিচার কই? তাঁর দৃষ্টিতে কি অন্যদের জীবনের কোন মূল্যই নেই। প্রধানমন্ত্রী রূপে তার দায়বদ্ধতা কি শুধু নিজ দল ও পরিবারেরর প্রতি? স্বজনহারা দুঃখী পরিবারের কি ন্যায় বিচার চাওয়ার কোন অধিকারই নাই? ফ্যাসীবাদী রাজনীতিতে অন্যদের বিচার চাওয়া দূরে থাকে বাচার অধিকারই দেয়া হয়না। হিটলারের ফ্যাসীবাদী শাসনে তাই গ্যাস চেম্বারে ৬০ লাখ ইহুদীদের বিনাবিচারে হত্যা করা হয়েছিল। মুজিবামলেও লাশ হয়েছিল ৩০ হাজার বিরোধী দলীয় কর্মী।, তাদের পরিবারগুলো হারিয়েছিল ন্যায় বিচার চাওয়ার অধিকার। শেখ হাসিনা তাঁর পিতার সে ফ্যাসীবাদী আদর্শকেই আজ  অনুসরণ করে চলেছেন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে পুলিশ ও প্রশাসনের প্রধানতম নীতি হয়ে দাঁড়ায় দলীয় নেতা ও দুর্বত্তদের বাঁচানো। সে লক্ষ্য পুরনে শেখ মুজিবের প্রয়োজন পড়েছিল বিশাল রক্ষিবাহিনী গড়ে তোলার। আর আজ  সে অভিন্ন কাজটিই করছে পুলিশ,র‌্যাব,প্রশাসন,আদালত এবং আদালতের সরকারি উকিলগণ। তাদের কাজ হয়েছে জনগণের হাত থেকে সন্ত্রাসীদের প্রটেশকন দেয়া। আওয়ামী লীগ কর্মীগণ রাস্তায় মিছিল নিয়ে নামলে আগে পিছে পুলিশ বাহিনী তাদেরকে পাহারা দেয়। জনমানবহীন গভীর জঙ্গলে মানুষ খুণ বা ব্যাভিচার হলে শাস্তি হয় না। কারণ সেখানে পুলিশ নাই,আইন আদলত না। জঙ্গল তো পশুদের জন্য, লোকালয় ছেড়ে জঙ্গলে বসবাস করার বিপদ তাই ভয়ানক। কিন্তু জঙ্গলের আইনহীনতা নেমে এসেছে বাংলাদেশের জনপদে। ফলে খুন এবং ধর্ষণেও শাস্তি হয় না। খুণ, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসে বনের পশুর ন্যায় দুর্বৃত্তদের এত নির্ভীক হওয়ার হেতু তো সেটাই। শেখ হাসিনা নব্বইয়ের দশকে যখন প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিলেন তথন জাহাঙ্গির বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রলীগ নেতা ধর্ষনে সেঞ্চুরীর উৎসব করেছিল। সে খবর পত্রপত্রিকায় বড় বড় হেডিংয়ে ছাপা হয়েছিল। যে কোন সভ্য দেশেই ধর্ষণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই সে নরপশুকে তিনি আদালতে তুলেননি,একদিনের জন্যও কোন রূপ শাস্তি দেননি। শেখ হাসিনার নীতি-নৈতিকতা ও বিচারের মানদণ্ড যে কতটা ভিন্ন এ হল তার নমুনা।

প্রশ্ন হল,অপরাধীর কৃত অপরাধের বিরুদ্ধে ঘৃনা না থাকলে কি তাকে শাস্তির দেয়ার আগ্রহ জন্মে? ডাকাত দলের সরদারের সেটি থাকে না। বরং ডাকাতদের মধ্যে কে কতটা নৃশংস ভাবে ডাকাতি করলো সেটিই বরং ডাকাত সর্দারের কাছে বেশী গুরুত্ব পায়। শেখ হাসিনার কাছে দলের সন্ত্রাসীদের কদর তো এজন্যই প্রবল। ফলে পুলিশের সামর্থ নাই তাদের আদালতে তোলার। একই অবস্থা ছিল শেখ মুজিবের। তাই মুজিবের আমলে কোটি কোটি টাকার রিলিফের কম্বল ও অন্যান্য মালামাল চুরি হয়েছে, কালোবাজারীদের হাতে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ভারতে পাচার হয়েছে, ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে বহু ছাত্র খুণ হয়েছে। কিন্তু সেসব অপরাধে কাউকে কি একদিনের জন্যও শাস্তি হয়েছে? বরং গাজী গোলাম মোস্তাফাদের মত হাজার হাজার দুর্বৃত্ত ছিল তাঁর নিত্যদের সহচর। তাদের কাউকে কি তিনি দল থেকে এক দিনের জন্যও বহিস্কার করেছেন? তাদের নিয়ে বরং দলীয় দফতর, দলীয় সভা,মন্ত্রীসভা ও প্রশাসন রমরমা করেছেন। এখন বরং ক্ষমতায় যাওয়াতে ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের উপর সন্ত্রাসের দায়ভার কমেছে। সে কাজে নেমেছে পুলিশ ও র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটিলিয়নের বেতনভূক সেপাইরা। এক সময় অন্যদের রাজপথের মিছিল ও জনসভা পণ্ড করতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেরা ময়দানে নামতো,নেতা-কর্মীদের লগিবৈঠা নিয়ে পেটাতে। আর আজ  সে কাজে নামছে সরকারি প্রশাসন, পুলিশ ও র‌্যাব। রাজপথে তারা বিরোধী দলীয় নেতাদের যথেচ্ছাচারে লাঠিপেটা করছে, সংসদের এমপি এবং বিরোধী দলীয় চিপহুইপকে সম্প্রতি গায়ের কাপড় খুলে পিটিয়েছে,বুকের উপর পা তুলে পিষ্ঠ করছে পুলিশ। দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় সে ছবি ছাপাও হচ্ছে।

 

নৃশংস রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস

সম্প্রতি বহু পত্র-পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছে,সরকার জামায়াত নেতাদের পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়িয়েছে। এমন দণ্ডবেড়ি সাধারণত খুণি বা ডাকাতদের পড়ানো হয়। অথচ এ নেতারা কাউকে খুণ করেছেন বা কোথাও ডাকাতি করেছেন সে প্রমাণ নেই। এমনটি করা হয়েছে স্রেফ জনগণের চোখে তাদেরকে হেয় করা বা দৈহিক ও মানসিক ভাবে তাদেরকে নির্যাতিত করার লক্ষ্যে। একই উদ্দেশ্যে বিএনপি,ইসলামী ঐক্যজোট ও হিযবুত তাহরিরের কর্মীদেরও নিষ্ঠুর ভাবে পিটিয়েছে রাজপথে। অন্যদের কষ্ট দেয়ার মধ্যেই হাসিনা ও তার সরকারের আনন্দ। এটি নিছক নৈতিক রোগ নয়, ভয়ানক মানসিক রোগ। চিকিৎসাস্ত্রের ভাষায় এটি স্যাডিইজম। এমন মানসিক রোগের কারণে অন্যদের ঘর থেকে বের করে রাস্তায় টানার মধ্যে তাদের আনন্দ। সে আনন্দটি পাওয়ার লক্ষ্যেই শত শত বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয় এবং গ্রেফতারের পর জেল খানায় জঘন্য অপরাধীদের সাথে রাখা হয়।এবং পুলিশের হাতে সপ্তাহর পর সপ্তাহ রিমাণ্ডে দেয়া হয়। সে আনন্দটি পাওয়ার লক্ষ্যেই ধর্ষণে সেঞ্চুরির পর ছাত্রলীগ কর্মীরা উৎসব করে। শুধু গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীর দণ্ডবেড়ি নয়, এমনকি ধর্ষিতা নারীর সীমাহীন যাতনাও তাদের যে কতটা পুলক দেয় এ হল তার নজির। এমন এক নিষ্ঠুর আনন্দবোধ নিয়েই শেখ মুজিব সিরাজ সিকদার হত্যার পর দেশের সংসদে দাঁড়িয়ে তৃপ্তিভরে বলেছিলেন,“কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” বাংলাদেশের বিপদ, দেশ আজ  এরূপ ভয়ানক অপরাধীদের হাতে অধিকৃত। শুধু পদ্মা, মেঘনা বা তিস্তার পানি নয়, সমগ্র দেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়াতেই তাদের আনন্দ। সন্ত্রাস এখন আর স্রেফ দুর্বৃত্ত সন্ত্রাসীদের মনোপলি নয়,এটি এখন সরকারি প্রশাসনের হাতিয়ার। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এ এক ভয়ংকর রূপ। শাসন ক্ষমতায় এর আগে আইয়ুব খান এসেছেন, ইয়াহিয়া খানও এসেছেন। মুজিবসহ বহু আওয়ামী লীগ নেতারা আগরতলা ষড়যন্ত্রের ন্যায় বহু গুরুতর অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু তাদেরকে কি একদিনের জন্যও রিমাণ্ডে নিয়ে শারীরীক ভাবে অত্যাচার করা হয়েছে? কাউকে কি পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়ানো হয়েছে? শেখ মুজিব তো জেলে প্রথম শ্রেনী পেয়েছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও একাত্তরে দেশোদ্রহী মামলার আসামী হওয়া সত্ত্বেও তার পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়ানো দূরে থাক,পুলিশ কি একটি আঁচড়ও দিয়েছিল? অথচ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মুখাকৃতিকে হিংস্র পশুবৎ করে সে ছবি দেশময় প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু যে অপরাধ শেখ হাসিনা করছে তাঁকে আজ  কি বলা যাবে? সরকারি ভাবে এত খুণ,এত সন্ত্রাস ও এত দানবীয় নির্যাতনের পর শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে মানবীয় বললে ইয়াহিয়া বা আইয়ুব খানকে কি বলা যাবে? ৩/১০/১১