গণতন্ত্র যেখানে গণহত্যা এবং জবরদখল যেখানে লেবারেশন

ফিরোজ মাহবুব কামাল

আগ্রাসন যেখানে লিবারেশন

ইরাকী জনগণকে স্বৈরাচার থেকে  মুক্তি দিবে এবং গণতন্ত্র উপহার দিবে বলে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেন। কিন্তু তারা স্বৈরাচার থেকে আর কি মুক্তি দিবে, বরং মুক্তি দিচ্ছে অগণিত নারীপুরুষ ও শিশুকে তাদের প্রাণে বেঁচে থাকা থেকেই। গণহত্যা ও ধ্বংসকে তারা রীতিমত স্পোর্টসে পরিণত করেছে। তাদের আরেক যুক্তি ছিল, ইরাকের হাতে weapons of mass destruction তথা ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের কারখানা রয়েছে। যুদ্ধ করে সে অস্ত্র নির্মান বন্ধ করবে। সেটিও যে বিশাল মিথ্যা তাও প্রমাণিত হয়েছে। ইরাকের দক্ষিণ থেকে উত্তর সীমান্ত পর্যন্ত শত শত মাইল তারা দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এ বিশাল ইরাকী ভূমির কোথাও weapons of mass destruction এর কারখানা পায়নি। আর যদি থেকেও থাকে তবে সমগ্র ইরাকজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর এবং খোদ বাগদাদে মার্কিন সেনা প্রবেশের পর ইরাক যে এখনও সেটির প্রয়োগ করেনি -সেটিই কি প্রমাণ করে না যে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও প্রধান মন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের চেয়ে এমন অস্ত্র সাদ্দামের কাছে থাকাই বেশী নিরাপদ?

ইরাকের ভূমিতে মার্কিন ও বৃটিশ সৈনিকের উপর রাসায়নিক বোমা হামলা হলে পারমানবিক বোমা ব্যাবহার করা হবে বলে হুমকি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বুশ ও বৃটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেফরি হুন। অথচ সশস্ত্র হানাদার ঘরে ঢুকলে তার উপর হামলার অধিকার প্রতিটি গৃহকর্তারই থাকে। অবৈধ ও অন্যায় হামলার শিকার হয়েছে ইরাক। ফেলা হয়েছে হাজার হাজার টন বোমা। এমন বোমা ওয়াশিংটন বা লন্ডনে ফেলা হলে তারা কি করতো? পারমানবিক বোমাসহ কোন বিধ্বংসী মারনাস্ত্রই কি তারা গুদামে ফেলে রাখতো? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূ-খন্ডে জাপানীরা বোমা ফেলেনি, ওয়াশিংটন বা নিউয়র্কও আক্রান্ত হয়নি। অথচ জাপানের নাগাসাকি ও হিরোশিমা –এ দু’টি বৃহৎ শহরকে পারমানবিক বোমায় নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। ফলে বিশ্বে কারা সবচেয়ে দায়িত্বহীন এবং কাদের হাতে বিশ্বশান্তি সবচেয়ে বেশী হুমকীর সম্মুখীণ সেটি কি বুঝতে বাঁকি থাকে? অতএব বিশ্বকে অশান্তি ও বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে যে দেশটিকে প্রথমে অস্ত্রমূক্ত করা দরকার সেটি কি ইরাক না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?

ইঙ্গোমার্কিন সামাজ্যবাদ ইরাকের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যাকে যেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বলছে তেমনি এ বিধ্বংসী সামরিক আগ্রাসনকে বলছে লিবারেশন। অপরদিকে ইরাকীদের প্রতিরোধকে বলছে সন্ত্রাস। এভাবে ডিকশোনারিই পাল্টিয়ে দিচ্ছে। অন্যায়কে বলছে ন্যায়, চরম বর্বরতাকে বলছে সভ্যতা। আর এরাই সভ্যতা ও গণতন্ত্র শেখাতে চায় বিশ্ববাসীকে! তাদের প্রত্যাশা, ইরাকী জনগণ অস্ত্র ফেলে কুর্ণিশ করবে। তাদের মাথায় ফুল ও আতর ছিটাবে। দুনিয়ার তাবত দুর্বৃত্ত দস্যুদের একই রুচি। যে কোন দুর্বৃত্তের কাছেই অতি অনাকাঙ্খিত হলো প্রতিরোধ, সে তো চায় আত্মসমর্পণ। ইরাকী জনগণ তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে না সেটিই ইঙ্গোমার্কিন জোটের কাছে বড় অপরাধ।  সে অপরাধের শাস্তি দিতে তারা বিধস্ত করছে বাগদাদ, বসরা, কারবালা, নজফ, কিরকুক, মসোলের ন্যায় শহরগুলোকেই শুধু নয়, সমগ্র ইরাককে। সভ্যতা কি ভাবে জন্মেছিল, কি ভাবে হাঁটি-হাঁটি, পায়ে-পায়ে সামনে এগিয়েছিল – সমগ্র ইরাক হলো তারই নিদর্শন। এজন্যই দেশটিকে বলা হয় ক্রাডল অব সিভিলাইজেশন। ইঙ্গোমার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ভান্ডারের সর্বাধিক বিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে নেমেছে সেটির বিনাশে। হাজার হাজার ঐতিহাসিক নিদর্শন ইতিমধ্যে ট্যাংকের তলায় বা বোমার আঘাতে বিনষ্ট হয়েছে। মানব সভ্যতার জন্মভূমি এভাবেই আজ ধুলিস্যাৎ হচ্ছে। ফলে ইঙ্গোমার্কিনীদের অপরাধ শুধু ইরাকের বিরুদ্ধে নয়, সমগ্র মানব জাতির বিরুদ্ধে। অথচ বিশ্ববাসী সেটিই নীরবে দেখছে। সে নীরব-দর্শনকে টিভি, ইন্টারনেট, পত্র-পত্রিকা আরো সহজতর করে দিয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ও আই সি,  আরব লীগসহ সকল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে আজ একই মৃত্যুবৎ নীরবতা।

 

ষড়যন্ত্র গণতন্ত্র নির্মূলে

আর স্বৈরাচার-মুক্তির কথা? বোমায় কি কখন স্বৈরাচার নির্মূল হয়? ইরানের শাহ, চিলির পিনোশে, ফিলিপাইনের মার্কোস বা ইন্দোনেশিয়ার সোহার্ত কি বোমায় নির্মূল হয়েছে? বোমায় যারা নির্মূল বা পঙ্গু হয় তারা নিরীহ মানুষ, স্বৈরাচার নয়। বরং এতে নয়া স্বৈরাচারের রাস্তা প্রস্তুত করা হয়। আফগানিস্তানে সেটিই হয়েছে। তাছাড়া এ বিশ্বে স্বৈরাচারের সংখ্যা কি কম? মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি দেশেই তো স্বৈরাচার। এবং তাদের নির্মূলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব, কুয়েত, জর্দানসহ সর্বত্র কি তাদের পাহাদারির ব্যবস্থা করতে মার্কিন বা বৃটিশ সৈন্য মোতায়ান করা হয়নি? অপর দিকে স্বৈরাচার নির্মূল ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কারণেই কি ইরানের উপর বিপদ নেমে আসছে না? প্রেসিডেন্ট কার্টারের সময় একবার হামলাও করা হয়েছিল। এ দেশটির প্রতি মার্কিনীদের এখনও আক্রোশ এ কারণে যে কেন মার্কিন যুক্তরাষ্টের  তাঁবেদার মহম্মদ রেজা শাহকে উৎখান করা হলো। একই অপরাধে ১৯৫৬ সালে ইরানে সামরিক অভ্যুর্থাণে উস্কানি দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তখন তারা দেশটির নির্বাচিত প্রধান মন্ত্রী মোসাদ্দেককে হটিয়ে বিতাড়িত শাহকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে শাহ পুণরায় বিতাড়িত হয়ে আশ্রয় পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

মার্কিনীদের আগ্রহ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নয়, বরং গণতন্ত্রের নির্মূলে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মার্কিনীদের এত আগ্রহ থাকলে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওম্মান, জর্দান ও বাইরাইনের ন্যায় দেশগুলীতে তা হচেছ না কেন? এ সব রাষ্ট্রে গণতন্ত্রচর্চা দূরে থাক, রাস্তায় সভা, মিছিল বা মত প্রকাশের অধিকারও নেই। অথচ এসব দেশের সরকার মার্কিনীদের অতি পছন্দের। জনগণ যেহেতু মার্কিন হামলার বিরোধী, ফলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে এ দেশগুলির ঘনিষ্টতা বাড়তো ইরাকের সাথে। মার্কিনীদের ঘাঁটি নির্মান তখন কি সম্ভব হতো? তখন তেলের উপর প্রতিষ্ঠিত হতো জনগণের মালিকানা। অতএব বাধাপ্রাপ্ত হতো তেলের লুন্ঠন। এটিই কি তাদের গণতন্ত্রের সাথে শত্রুতার মূল কারণ নয়?   

মার্কিনীদের এসব ধোকাবাজী জনগণ যে বুঝে না তা নয়। জনগণ কি এতই বোকা যে হীংস্র পশুর নখরে ভাইবোন ও নিজ শিশুদের ছিন্ন ভিন্ন হতে দেখেও সে পশুটিকে আলিঙ্গণ করবে? ভেবেছিল, ইরাকের ধ্বংসে হাজার হাজার টন বোমা ফেললে কি হবে তাদের সৈন্যদেরকে আহলান সাহলান বলা হবে। সম্ভার্ধনা জানাতে প্রতি জনপদে মিছিল হবে। কিন্তু কোথাও সেটি হয়নি। ইরাকে কেন, সমগ্র আরব বিশ্বে হয়নি। যেটি হয়েছে সেটি শাসক মহলে। কারণ তারাই মার্কিনীদের আসল প্রজা। এ আগ্রাসী শক্তিকে তারাই সর্বপ্রকার সহায়তা দিচ্ছে। পবিত্র হজ্ব বা উমরাহ পালনে ভিসা পেতে একজন মুসলিমকে কতো ঝামেলাই না পোহাতে হয়, অথচ মার্কিনীদেরকে অবাধ অনুমতি দিয়েছে এ পবিত্র ভূমিতে অস্ত্র নিয়ে ঢুকার। অধিকার দিয়েছে ঘাঁটি নির্মানের। মার্কিনীরা অবাধ সুযোগ পেলেও জনগণ সুযোগ পাচ্ছে না ইরাকী মুসলমানদের ধ্বংস ও মৃত্যু দেখে প্রতিবাদে রাস্তায় নামার। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশও তারা নিষিদ্ধ করেছে। এ ভয়ে না জানি অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তাদের অভ্যাসে পরিণত না হয়। কারণ, নিজেদের বর্বর শাসনই তখন অসম্ভব হবে। নিজেদের অন্যায় হামলাকে জায়েজ করতে বুশ ও ব্লেয়ার বহু বার বলেছেন, সাদ্দাম হোসেন প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি। ইরাকের প্রতিবেশী ইরান ও সিরিয়া, ফলে তাদের কথা মতো সাদ্দামের পতনে এ দেশ দুটি সর্বাধিক খুশী হবে সেটি ছিল স্বাভাবিক। অথচ মার্কন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রামসফিল্ড ও সেক্রেটারী অব স্টেটস কলিন পাওয়েল ইরান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে হুশিয়ারি দিয়েছে যে তারা ইরাককে সহায়তা দিচ্ছে। অতএব ইরাক প্রতিবেশী দেশগুলির প্রতি হুমকি – এ অভিযোগের সত্যতা কোথায়? ফলে ইরাকের উপর আগ্রাসনের সমগ্র ভিত্তিটাই যে মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত তা নিয়ে সন্দেহ থাকে কি?

 

সংঘাত সভ্যতার

ইরাকে আজ যে বর্বরতা চলছে সেটি কি শুধু জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের? এ যুদ্ধ সমগ্র পুঁজিবাদী সভ্যতার্। এবং এটি ইসলামের বিরুদ্ধে। সামরিক আগ্রাসন, অর্থনৈতিক শোষণ ও গণহত্যা – এগুলি পুঁজিবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার সার্বজনীন সংস্কৃতি। শোষণ-নির্ভর এ সভ্যতার এ গুলোই হলো মূল উপকরণ। এজন্যই আগ্রাসন ও গণহত্যা চালাতে নিজ দেশে সমর্থণ পেতে এদের সামান্যতম বেগ পেতে হয় না। প্রতিটি সফল ডাকাতি ডাকাত পরিবারে আনন্দের হিল্লোল বয়ে আনে। কারণ, এতে রাতারাতি বৃদ্ধি ঘটে বিত্ত-বৈভবে। যে সমৃদ্ধি বাড়াতে অন্যদের যে ভাবে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটতে হয় -তাদের সেটির প্রয়োজন পড়ে না। তাই ইরাকের পতন অত্যাসন্য দেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের প্রায় প্রতি মহলে আনন্দের হিড়িক। এ স্বার্থচেতনা থেকে এদের সবচেয়ে বিবেকবান ব্যক্তিরাও মূক্ত নয়। ফলে ডেইলি গার্ডিয়ান ও মিররের মত পত্রিকাও চায় এ আগ্রাসী য্দ্ধুটি বৃটিশ সৈন্যরা নিরাপদে সমাধা করুক। ব্রিটেনের লেবারেল ডিমোক্রাটিক পার্টির মত দল যারা প্রথমে যুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল তারাও চায় তাদের সৈন্যদের বিজয়। এমন কি মি. রবিন কুক যিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করছেন তিনি ইরাকের ত্বরিৎ পরাজয় চান। একই অবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সাথে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের যত বিরোধই থাক, মার্কিন আগ্রাসন যাতে সফল হয় সেটিই তাদের অভিন্ন এজেন্ডা।

এমন এক অভিন্ন চেতনার কারণেই পরদেশে আগ্রাসন ও গণহত্যায় পুঁজিবিণিয়োগে তাদের পুঁজির অভাব হয় না। বৃটেনে এখন অর্থনৈতিক মন্দা। স্বল্প মজুরীর কারণে কর্মচারিরা বিক্ষুব্ধ, অনেকে ধর্মঘটেও নেমেছে। কিন্তু তাদের বেতন বাড়ানোর পয়সা না থাকলে কি হবে, সরকার তিন বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছে যুদ্ধ খাতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪ কোটিরও বেশী মানুষের স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত, কিন্তু সে দেশের সরকার যুদ্ধ খাতে ৭৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছে। একই কারণে অতীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নিজেদের নিম্ন মানের কাপড়ের বাজার বাড়াতে যখন বাঙলার মসলিন শিল্পীদের হাতের আঙ্গুল কাটছিল তখনও সে জঘন্য কাজে অর্থের জোগানদার পেতে তাদের বেগ পেতে হয়নি। পুঁজি বিনিয়োগে তখনও কমতি পড়েনি যখন নিগ্রোদের গলায় রশি বেঁধে হাটে বাজারে বিক্রি করাকে বাণিজ্যে পরিণত করেছিল বা রেড ইন্ডিয়ানদের নির্মূলকে রাজনীতি ভাবতো। ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এটিই হলো ঐতিহ্য। ইরাকের বিরুদ্ধে একটি অন্যায় যুদ্ধ বিপুল ভোট পার্লামেন্টে কেন গৃহীত হয় -সেটি বুঝতে কি এর পরও কিছু বাঁকি থাকে?

 

উলঙ্গ হলো সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র

অবর্ণনীয় দুঃখের পাশে ইরাকে আগ্রাসন ও গণহত্যা বিশ্ববাসীকে এক অপূর্ব সুযোগও দিয়েছে। সেটি হলো, পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ যে কতটা বর্বর সেটি। এ বিষয়টি কোটি কোটি ঘন্টা বক্তৃতা দিয়ে বা হাজার হাজার বই লিখে বুঝানো সম্ভব হতো না। সাম্রাজ্যবাদ এখন স্বমূর্তিতে হাজির। দূর্বৃত্তের বন্ধু হওয়ার মধ্যে প্রচন্ড অসম্মান আছে। সমাজের দুর্বৃত্তরা এজন্য অর্থশালী হলেও বন্ধুহীন হয়। ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা তেমনি এক অবস্থার মুখোমুখী বিশ্বজুড়ে। ফলে যে ফ্রান্স, জার্মান ও বেলজিয়াম সেদিনও যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের সাথে গলায় গলায় ভাব রেখেছে তাদের কাছে ভিড়তেও আজ তারা ভয় পায়। এ ভয়ে যে, তাদের গায়ের গলিত দূর্গন্ধ না জানি নিজেদের গায়ে জড়িয়ে না যায়। একই ভয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জালেম স্বৈরাচারিরা গোপনে সহযোগীতা করলে প্রকাশ্যে মার্কিনীদের প্রশংসা করা বাদ দিয়েছে।

ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অধিকৃত জনগণের প্রতিরোধকে সাম্রাজ্যবাদী মগল যতই সন্ত্রাস বলে চিত্রিত করুক না কেন -এ যুদ্ধ জিহাদ রুপে গণ্য হচ্ছে সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে। শিয়া-সূন্নী, হানাফী-শাফেয়ী, আরব-অনারব -কারো মধ্যেই এ নিয়ে আজ মতবিরোধ নেই। এটি যে শতভাগ ধর্ম যুদ্ধ সে ফতোয়া আসছে শিয়া ও সূন্নী উভয় পক্ষ থেকেই। মুসলিম বিশ্বকে আর কোন বিষয়ই এতটা একতা বদ্ধ করতে পারিনি -যা এ আগ্রাসন পেরেছে। এটি এক বিরাট অর্জন। প্রতিটি বিবেকমান মানুষের দায়িত্ব, এ বিরল অর্জনকে ধরে রাখা। মানব সভ্যতার স্থায়ী মূল্যবোধ নির্মাণ করতে হবে এ অন্যায় ও অসভ্যতার বিরুদ্ধে ঘৃনাবোধকে চির-জাগ্রত রাখার মধ্য দিয়ে। এ ঘৃনাবোধ বাঁচলে বিবেকবান মানুষ মাত্রই তাদের তাঁবেদার হতে ঘৃণা করবে।

 

ষড়যন্ত্র মানবিক মূল্যবোধ নির্মূলে

সবাই জানে দুর্বৃত্তিতে অর্থপ্রাপ্তি ঘটে। কিন্তু এরপরও বিবেকবান মানুষ মাত্রই সে পথে যে পা বাড়ায় না -সেটি দূষ্ট কর্মের প্রতি তীব্র ঘৃনাবোধ থেকেই। কিন্তু জালিমগণ সেটিই মুছে ফেলতে চায়। দুর্বৃত্ত শাসকের ক্ষমতা লাভে জাতীয় জীবনে যে মহাবিপর্যয়টি ঘটে -সেটি এই মূল্যবোধের ক্ষেত্রে। বিপর্যস্ত এ মূলবোধের কারণে এজিদের ন্যায় দূর্বৃত্তের সৈনিক হওয়ার মধ্যেও পাপবোধ  থাকে না। এ পাপবোধকে নির্মূল করতেই মুসলিম বিশ্বের জালেম শাসকেরা সবসময়ই স্বচেষ্ট হয়েছে যে মানুষের স্মৃতি থেকে এজিদদের কুকর্ম মুছে যাক। ভুলে যাক কারবালার অতি বিয়োগান্ত ঘটনা। ভুলে যাক ইমাম হোসেনের শাহাদতের শিক্ষা। উমাইয়াদের থেকে শুরু করে সর্বযুগের স্বৈরাচারি এজিদদেরা এজন্য বিস্তর অর্থ ব্যয় করেছে আলেমদের পিছনে। আশুরা আসে, আশুরা চলেও যায়। আশুরা নিয়ে বহুবিধ আলোচনাও হয়। লম্বা আলোচনা হয় নফল রোজার ফজিলত নিয়ে। কিন্ত যে ফরজকে সমূন্নত রাখতে মুসলিমদের সার্বজনীন ইমাম ও জান্নাতের যুব-সর্দার ইমাম হোসেন শহিদ হলেন তা নিয়ে অধিকাংশ মসজিদে আজ আর অলোচনাই হয় না। এটিই হলো আজকের আলেমদের বড় বিচ্যুতি। যেন ইমাম হোসেন শিয়া এবং তিনি শিয়াদের! বিভ্রান্ত আলেমদের কারণে এ পৃথিবীতে মহান আল্লাহতায়লার একমাত্র প্রতিষ্ঠান মসজিদগুলো প্রাণহীন হয়েছে। মুসলিম বিশ্বজুড়ে আজ যে এজিদদের সংখ্যাবৃদ্ধি, শরিয়তের অনুপস্থিতি এবং ইমাম হোসেন (রাঃ) অনুসারিদের কমতি -সেটি তো ইমাম হোসেনের (রাঃ) সে শিক্ষাকে ধরে না রাখার কারণেই। এবং সেটি প্রতিরোধহীন করেছে এমন কি কাফের শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও। মুসলিম বিশ্বে আজ যে দুর্গতি তার মূল কারণতো এই বিচ্যুতি।

একই কৌশলে সাম্রাজ্যবাদীরাও চায় তাদের র্বরতার বিরুদ্ধে যে ঘৃনাবোধ সৃষ্টি হয়েছে সেটি মুসলিম মানস থেকে মুছে ফেলতে। এমন ঘৃণাবোধ তখনও সৃষ্টি হয়েছিল যখন তারা লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনীদের ভিটাছাড়া করে ইসরাইল প্রতিষ্টা করেছিল। আগুণ ধরিয়ে দিয়েছিল বাইতুল মোকাদ্দসে। কিন্ত ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রজ্যবাদের বিরুদ্ধে সে ঘৃণাবোধ স্থায়ী হয়নি। দুর্বত্ত মাত্রই জানে, অর্থে শুধু শাক-শবজিই কেনা যায় না, বিস্তর মানুষও কেনা যায়। বিশ্ব জুড়ে সিআইএ ও বৃটিশ গুপ্তচর সংস্থা মানব-ক্রয়ের সে কাজটিই করেছে। যে মিশর ছিল ইসরাইলের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে যুদ্ধাংদেহী সে মিশরকে কিনতে তারা কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এ অর্থব্যয় যে শুধু আনোয়ার সা’দাতের মত সেক্যুলারিষ্টদের উপর হয়েছে তা নয়, এ অর্থ এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে পৌছেছে যেখানে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মোজাহিদ সৃষ্টির সম্ভ্বানা রয়েছে। ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রজ্যবাদ এ লক্ষে কোয়ালিশন গড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারি রাজা-বাদশাহ ও শেখদের সাথে। এ কোয়ালিশন যে কতটা গভীর সেটি কি ইঙ্গো-মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে এসব রাজাবাদশাহ ও শেখদের নীরবতাই কি প্রমাণ করে না?

বনের পাখি ধরতে শিকারী যেমন খাঁচার পাখিকে ব্যবহার করে, তেমনি মুসলিম বিশ্বের বহু নেতা, সংগঠন, লেখক ও  বুদ্ধিজীবী ক্রয়ে সিআইএ এসব জোব্বাধারী রাজাবাদশাহ ও শেখদের ব্যবহার করেছে। ফলে অধিকৃত হয়েছে মুসলিম দেশগুলিই শুধু নয়, বরং হাজার হাজার মসজিদ, মাদ্রাসা, ইসলামী সংগঠন ও আন্দোলন। মুসলিম বিশ্বের বিপদ এখানেই। ফলে পবিত্র মক্কায় শত শত হাজী-হত্যকে মুসলিম বিশ্ব যেভাবে ভুলে গেছে বা ইসরাইলের অস্তিত্বকে যেভাবে নীরবে মেনে নিচ্ছে তেমনি হয়তো ভূলে যাবে ইরাকের উপর ইঙ্গো-মার্কিন বর্বরতাকেও। তখন গণহত্যা স্বীকৃতি পাবে মানবাধিকার রূপে এবং জবরদখলও চিত্রিত হবে ইরাকের লেবারেশন রূপে। কিন্তু কথা হলো, মুসলিম বিশ্বের বিবেকমান মানুষ গুলোও কি এসব মেনে নিবে? তাদের কি এ নিয়ে কিছুই করার নেই?  ০৭/০৪/২০০৩ 




মুসলিম বিশ্বে মার্কিনী সন্ত্রাস: প্রতিরোধ কীরূপে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

তান্ডব মার্কিন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের

নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচার স্বার্থে আশেপাশের হিংস্র জন্তু-জানোয়ারদের চিনতে হয়। জানতে হয় তাদের বিচরনের ক্ষেত্রগুলোকেও। গড়ে তুলতে হয় হিংস্র পশুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সামর্থ্য। নইলে প্রাণ বাঁচে না। তেমনি যে বিশ্বে বসবাস, জানতে হয় সে বিশ্বের হিংস্র দানবদেরও। গড়ে তুলতে হয় সে দানবদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্ট্রাটেজী। এ পৃথিবী পৃষ্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছ মানব ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী দানব রূপে। তার নাশকতার সামর্থ্য তূলনাহীন। দেশটি ইতিমধ্যেই বহু দেশে বহু বীভৎস নাশকতা ঘটিয়েছে। তাছাড়া দেশটির ভান্ডার এখনো রয়েছে নাশকতার বিপুল সামর্থ্য। সে সাথে রয়েছে সে নাশকতার নেশাও। মানব জাতির জন্য তাই এটি বিপদজনক পরিস্থিতি। এ নিবন্ধ লেখার মূল উদ্দেশ্য তেমনি একটি পরিস্থিতির বাস্তবতাকে তুলে ধরা।

ত্রাস বা ভয় সৃষ্টিই যদি সন্ত্রাস হয়, তবে সে সন্ত্রাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তূলনা নাই। সে সন্তাসের শিকার বিশ্বের দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোই শুধু নয়, খোদ জাতিসংঘ এবং তার সবল ও দুর্বল সদস্য রাষ্ট্রগুলোও। নৃশংস মার্কিন সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে আফগানিস্তান ও ইরাক। এ দুটি দেশের বহু লক্ষ মানুষ যেমন নিহত হয়েছে, তেমনি লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ী হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছে। এ বর্বরতার একটি করুণ ইতিহাস আছে। মাকিন সন্ত্রাসীদের চরিত্রকে জানতে হলে সে ইতিহাসকেও জানতে হবে। মানব জাতির জন্য বিশেষ করে মুসলিমদের জন্য তাতে রয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় দিক। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে মোকাবেলায় সেগুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ।

ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের উপর চাপ দিচ্ছিল, তাদের পরিকল্পিত আগ্রাসী যুদ্ধকে বৈধতা দিতে। এজন্য ২৪ ঘন্টা সময়ও বেঁধে দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা, যুদ্ধ তারা করবেই, জাতিসংঘের কাজ সেটিকে জায়েজ ঘোষণা দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী শাসক চক্র বিশ্ববাসীকে যে কতটা বেওকুপ ও দুর্বল ভাবে -এটি হলো তারই প্রমান। ফ্রান্সসহ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্র সে মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি। আর সেটিই মার্কিনীদের কাছে অপরাধ গণ্য হয়েছে। সমর্থণ লাভে ব্যর্থ হয়ে তারা বলেছে নতুন প্রস্তাব পাশের কোন প্রয়োজনই নেই। বহু প্রতিক্ষিত যুদ্ধের প্রস্তুতি স্বরূপ প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০৩ সালের ১৭ই মার্চে সাদ্দামকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে দেশ ছেড়ে পলায়ন অথবা যুদ্ধ -এ দুটির যে কোন একটিকে বেছে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। সাদ্দাম এ হুমকি প্রত্যাখান করেছিল। অতএব হামলা শুরু হয়। হাজার হাজার বোমা, ক্ষেপনাস্ত্র ও ভারী কামানের গোলা ইরাকের নীরস্ত্র মানুষের মাথায় নিক্ষিপ্ত হলো। নিহত ও আহত হলো দেশটির অসংখ্য মানুষ। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ যে ক্রুসেডের হুশিয়ারি বার বার শুনিয়ে আসছিলেন -সেটিই হলো অতি বীভৎস রূপে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় খৃষ্টানদের মধ্যযুগীয় ক্রসেডের গণহত্যা অতি বর্বর ও নৃশংস ছিল। কিন্তু, বুশের আধুনিক ক্রসেডটি সে ক্ষেত্রে আরো বর্বরতর। কারণ মার্কিন যুদ্ধাস্ত্রে এসেছে চরম নাশকতা।

ফিলিস্তিনের ন্যায় ইরাকও অধিকৃত হলো ইসরাইলের মিত্র ও রক্ষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের জন্য, বিশেষ করে মুসলিমদের জন্য এটি যেমন অপমানকর, তেমনি দুঃখজনক। মার্কিনীদের কাছে গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতার সামান্যতম মূল্য থাকলে জাতিসংঘে উত্থাপিত অধিকাংশ দেশের শান্তির প্রস্তাবকে তারা মেনে নিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনই জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে ইরাককে বিভক্ত করে, সেখানে প্রতিষ্ঠা করে নো-ফ্লাই জোন। চাপিয়ে দেয় নির্মম বাণিজ্যিক অবরোধ -যার ফলে বিনাচিকিৎসায় ও অপুষ্টিতে মারা যায় দেশটির ৫ লাখ ইরাকী শিশু। যে তথ্য দিয়েছে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানসেট। সন্ত্রাস করতে গণ-সমর্থণ বা ভোট লাগে না, লাগে অস্ত্রের সামর্থ্য।  আর মার্কিনীদের সামর্থ্য সেক্ষেত্রে বিশাল। ফলে পরওয়া কিসে? বিশ্বজনমত ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অসম্মতি -কোনটাই তাদের এ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে  বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং প্রকাশ পেয়েছে জাতিসংঘের নিজের অসহায় অবস্থা। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ যে কতটা গোঁয়ার ও উদ্ধত এবং বিশ্বজনমতের বিরুদ্ধে কতটা অবজ্ঞাপূর্ণ -সেটিই প্রকাশ পেয়েছে তার বক্তৃতায়। তিনি বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের উপর হামলায় কারো অনুমতির ধার ধারে না। বোঝাতে চেয়েছেন, জাতিসংঘ বা বিশ্বজনমত তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক। এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে কতটা বিপর্যের মুখে আজ বিশ্বশান্তি?

মার্কিন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কারণে অসম্ভব হয়েছে বিশ্বের বহুদেশে গণতন্ত্র চর্চা। মুসলিম দেশগুলোতে গণগন্ত্র চর্চার পথে সবচেয়ে বড় বাঁধাটি হলো মার্কিনীদের স্বৈরাচার প্রতিপালনের নীতি। সৌদি আরব, আমিরাত, জর্দান, বাহরাইন, ইত্যাদি আরব দেশগুলোতে বর্বরতম স্বৈরাচার বেঁচে আছে মার্কিন সাহায্য নিয়ে। সেটিরই আরেক উদাহরণ হলো মিশর। সেখানে সামরিক বাহিনী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মহম্মদ মুরসীকে শক্তির বলে সরিয়ে নিজেরা ক্ষমতা দখল করে। মার্কন যুক্তরাষ্ট্র সে সামরিক স্বৈরাচারকে সমর্থণ দেয়। পঞ্চাশের দশকে একই ভাবে মহম্মদ রেজা শাহর স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল ইরানে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে ঘোষণা, বিশ্বের কোথাও ইসলামী খলিফার নামে রাষ্ট্র গড়া হলে মার্কিন সেনাবাহিনী সেটিকে মাটিকে মিটিয়ে দিবে। মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে এটি চরম ঔদ্ধত্য। খেলাফাভিত্তিক রাষ্ট্র হলো মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। খেলাফা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব বিষয়, মার্কিনীদের বিষয় নয়। গণতন্ত্র বিরোধী মার্কিন নীতির আরেক উদাহরণ হলো তুরস্ক। ইরাকের উপর হামলার বিরুদ্ধে তুরস্কের প্রায় শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষ । জনগণ চায় না তুরস্কের এক ইঞ্চি ভুমিও মার্কিনী সৈন্যদের দ্বারা ব্যবহৃত হোক। সে দেশের নব নির্বাচিত পার্লামেন্টেও সে গণরায়ের প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোঁ ধরেছিল, তুরস্কের উপর দিয়ে তার ৬০ হাজার সৈন্যের চলাচলের সুযোগ দিতেই হবে। ইরাকের উত্তরভাগে হামলার জন্য এটিকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিল। কুটনৈতিকভাবে চাপ দিয়েছে, প্রলোভন দিয়েছে অর্থ সাহায্যের, এমনকি চাপ দিয়েছে সে দেশের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের দিয়েও। কথা হলো, এটিই কি গণতন্ত্র চর্চার মার্কিন মডেল? এমন গণতন্ত্রচর্চাই কি তারা চায় ইরাকে ও অন্যান্য দেশে? 

 

নজিরহীন ধোকাবাজি

ইরাকের উপর হামলাকে জায়েজ করতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে বিশ্ব-শান্তির দোহাই দিচ্ছে -সেটি নিছক ধোকাবাজী। নিরেট দস্যুরাও ভাল মানুষ সাজে; সেটি ধোকাবাজির মাধ্যমে। বিশ্ববাসীর কাছে গোপন নয় মার্কিনীদের এ ধোকাবাজী। তার প্রমাণ, একমাত্র  ইসরাইল ছাড়া বিশ্বের দ্বিতীয় কোন রাষ্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই ইরাকের উপর হামলাকে জায়েজ গণ্য করেনি। জনমত জরিপে প্রকাশ পেয়েছে, জার্মান, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালী, স্পেন, গ্রীস, রাশিয়াসহ সকল ইউরোপীয় দেশের আপামর জনগণ ইরাকের উপর এ হামলার প্রচণ্ড বিরোধী। বিরোধীতা প্রকাশ করেছে চীন সরকার। জাতিসংঘের তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারি কফি আনান বলেছেন, জাতিসংঘ সনদ মোতাবেক এ যুদ্ধ অবৈধ। অবৈধ বলেছে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন। এমনকি যে ইরাককে মার্কিন প্রশাসন তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলীরি জন্য বিপদজনক বলছে তারাও এ হামলার বিরোধীতা করছে। আরব লীগের সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনে এ হামলার বিরুদ্ধে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের রাগ গিয়ে পড়েছে তাদের এতো কালের ঘনিষ্ট মিত্র ফ্রান্সের উপরও। যেন  ফ্রান্স তাদের পাকা ধানে মই দিয়েছে। মার্কিনীদের অভিযোগ, ইরাকে হামলার বিরুদ্ধে, ফ্রান্স ভেটোর হুমকি দিয়ে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। অথচ ভুলে গেছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ২০০৩ সাল অবধি ৭২ বার ভেটো প্রয়োগ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজে -যা অন্য যে কোন দেশের চেয়ে অধিক। তাদের ভেটোর দাপটে ইসরাইলের বর্বর নৃশংসতার প্রতিরোধ দূরে থাক তার নিন্দা করাও সম্ভব হয়নি। ফলে সে ইসরাইলী নৃশংশতা থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি হাজার হাজার অসহায় ফিলিস্তিনী নারীপুরুষ ও শিশুকে। মার্কিনীদের সক্রীয় সমর্থনেই ইসরাইল সমগ্র ফিলিস্তিনকে পরিণত করেছে একটি মৃত্যুপুরীতে। অথচ ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন ভেটোর হুমকী দিয়েছিল ইরাকের বিরুদ্ধে একটি প্রকান্ড যুদ্ধ রুখতে। ভেটো দিয়ে যদি এ যুদ্ধটি থামানো যেত তবে সেটিই হতো জাতিসংঘের ইতিহাসে সবচেয়ে কল্যাণকর ভেটো -যা ঘটেনি। কারণ এ যুদ্ধে ইরাকের বহু লক্ষ বেসামরিক নাগরিক নিহত বা চিরকালের জন্য পঙ্গু হবে –সে অভিমতটি ছিল বহু মার্কিনী বিশেষজ্ঞগণেরও। ইরাকের লক্ষ লক্ষ সন্তানহারা পরিবারে যে বহুকাল হাসিই ফুটবে না -সেটি সবারই জানা ছিল। মানবতার কল্যাণ তো এমন একটি ভয়ানক যুদ্ধ শুরুর মধ্যে নয়, বরং সেটি বন্ধের মধ্যে। কিন্তু সে সত্যটি অনুধাবনের সামর্থ্য মার্কিন নেতৃত্ব দেখায়নি।

২০০৩ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধের শুরুটি হয় হাজার হাজার বোমা ফেলে। যুদ্ধ বিমান থেকে সে বোমাগুলো পাহাড় পর্বত বা মরুভূমিতে ফেলা হয়নি, বরং হয়েছে বড় বড় শহরের আবাসিক এলাকায়। তবে বেসামরিক নাগরিক হত্যায় মার্কিনী নৃশংসতা ও বিবেকহীনতা যে নজিরহীন –সে প্রমাণ ইতিহাসে প্রচুর। জাপানের হিরোসীমা ও নাগাসাকীতে তারা পারমানবিক বোমা ফেলেছে। নাপাম বোমায় জীবন্তদের জ্বালিয়ে মেরেছে ভিয়েতনামে। ১৯৯১ সালের যুদ্ধে ইরাকীদের উপর নিক্ষেপ করেছে বহু ডিপ্লিটিড ইউরোনিয়াম বোমা। যার ফলে ইরাকীদের মাঝে বাড়ছে ক্যান্সার। রণাঙ্গণ থেকে পশ্চাতপদ ইরাকী সৈন্যদের উপর বিমান থেকে ভারী বোমা ফেলেছে। এবং মৃত সৈন্যদের বুলডোজার দিয়ে মাটি চাপা দিয়েছে। আবু গারিব জেলে বন্দী ইরাকীদের উলঙ্গ করে তাদের দেহ দিয়ে পিরামিড গড়ে উৎসব করেছে। ইরাক ও সিরিয়ার বহু শহরকে তারা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। এ হলো মার্কিনীদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের রূপ।

 

নীতি প্রতারণার

প্রতিটি আগ্রাসনে বহুল ব্যবহৃত হাতিয়ারটি হলো প্রতারণা। হিংস্র পশু প্রতরণা করে না, সাম্রাজ্যবাদীরা এ কাজে সেয়ানা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতরণামূলক আচরন করেছে বিশ্ববাসীর সাথে। সেটির প্রমাণ, ইরাককের অস্ত্রবিলুপ্তি ও অস্ত্রপরিদর্শক নিয়ে জাতিসংঘে প্রদত্ত তাদের বয়ান। ইরাকের উপর হামলার মার্কিন সিদ্ধান্তটি যে জাতিসংঘে উঠায় বহু পূর্বেই গৃহীত হয়েছির –সেটি বুঝা যায় তা ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি দেখে। যুদ্ধ শুরুর বহু আগেই প্রায় তিন লক্ষ মার্কিন সৈন্যকে উপসাগরীয় এলাকায় মোতায়েন করা হয়। জমা করা হয় বিশাল নৌ-বহর। এ বিশাল রণ-প্রস্তুতি ইরাক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে ছিল না, বরং সেটি ছিল একটি প্রকান্ড য্দ্ধু ও যুদ্ধশেষে জবরদখলের প্রস্তুতি। ইরাকের উপর জাতিসংঘে আলোচনা শুরুর বহু পূর্বেই প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ক্রসেডের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমনকি তারও বহু পূর্বে -যখন তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন না, তিনি ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চিনি এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডোনাল্ড রাম্সফিল্ড ও তাঁর অন্যান্য কর্মকর্তাগণ প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনকে ইরাকের উপর হামলার আহবান জানিয়েছিলেন। ফলে এটি সহজেই বোধগম্য, ইরাক দখলের সিদ্ধান্ত যেহেতু বহু পূর্বেই গৃহীত হয়েছে, কোন আপত্তিকর অস্ত্র নাই সেটি প্রমানিত হলেও ইরাকের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত যুদ্ধটি পরিত্যক্ত হতো না। এবং সে যুদ্ধকে জায়েজ করার স্বার্থেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জেনে বুঝে জাতিসংঘ অস্ত্র পরিদর্শক দলের রিপোর্টকেও মিথ্যা বলছে। এটি নিরেট প্রতারণা।

জাতিসংঘ অস্ত্র পরিদর্শক দলের নেতা হ্যান্স ব্লিক্স সে সময় বলেছিলেন, ইরাকে কোন আপত্তিকর অস্ত্রের সন্ধান তারা পাননি। এবং আরো বলেছেন ইরাক সরকার সকল প্রকার সহযোগিতা করছে এবং অস্ত্র পরিদর্শন কাজে অবস্থার সন্তোষজনক উন্নতি ঘটেছে। যে কাজে বিগত ১২ বছরে হয়নি, গত ১২ সপ্তাহে তার চেয়ে বেশী অগ্রগতি হয়েছে সেটি তিনি বুঝিয়েছেন। ফ্রান্স, জার্মানী, রাশিয়া ও চীনসহ নিরাপত্তাপরিষদের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ এ প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখতে চায়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা মানতে রাজী নয়। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য যদি ইরাকের অস্ত্রবিনাশ হতো, তবে তারাও সে রিপোর্টটি মেনে নিত। তাদের এজেন্ডাই তো ভিন্ন। কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল ইরাক দখল। ফলে অস্ত্র পরিদর্শক দল যতই অব্স্থার সন্তোষজনক অগ্রগতির রিপোর্ট দিয়েছে, ততই মারমুখী হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র গ্রেট বৃটেন। এমন অস্ত্রপরিদর্শনে পরিকল্পিত হামলার মূল টাইম টেবিলে ব্যাঘাত ঘটছে দেখে বাড়ছিল তাদের অস্থিরতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে হামলায় ধৈর্য ধরতে রাজী ছিল না, ফলে শুরু হয় আগ্রাসন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্য শুধু ইরাকের সম্পদ লুন্ঠনই ছিল না। বরং সেটি ছিল মুসলিমদের শক্তি অর্জনের সকল প্রচেষ্ঠার বিনাশ। ইরাকের অপরাধ, দেশটি সামরিক শক্তি বাড়ানো চেষ্টা করছিল। সেটিকে মার্কন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করতে। কোন দস্যুই চায় না যে ঘরে সে হানা দিবে সে ঘরের গৃহস্বামীর প্রতিরক্ষার সামর্থ্য থাকুক। ধনবান গৃহস্বামী নিরস্ত্র, পঙ্গু ও বন্ধুহীন হলেই সে খুশি। কারণ অবাধ লুন্ঠনে তখন আর শক্তি ব্যয় হয় না। একই কৌশল প্রয়োগ করছে তারা ইরাকের বিরুদ্ধে। তাই নিজেদের ভান্ডারে সকল প্রকার বিধ্বংসী অস্ত্র থাকলেও অন্যরা বিশেষ করে মুসলিমগণ সেটির অধিকারি হোক সেটিতে তাদের প্রচণ্ড আপত্তি। তাই ইরাকের স্বল্প রেঞ্জের মিজাইল বা চালকহীন বিমানও তাদের কাছে বিপদজনক মনে হয়েছে। ইরাকে রাসায়নিক  অস্ত্র রয়েছে -এ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বময় তোলপাড় করছে। অথচ তাদের হাতেই এ অস্ত্রটি সবচেয়ে বেশী। দৈনিক গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে ১৯৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা অনুযায়ী তাদের ভান্ডারে ১৫,৬৩৭ টন মাস্টার্ড গ্যাস, ৭,৪৬৪ টন স্যারিন নার্ভ গ্যাস, ৪, ০৩২ টন ভি এক্স নার্ভ গ্যাস ও আরো বহুবিধ রাসায়নিক অস্ত্রের মওজুদ রয়েছে। অতএব ইরাকের অস্তু নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাথা ঘামানোর কোন নৈতিক ভিত্তি থাকে কি?

 

লক্ষ্য লুন্ঠন

ইরাকের উপর আগ্রাসনের লক্ষ্য অর্থনৈতিকও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক আধিপত্য নিয়ে তারা খুশি থাকতে চায় না, ইচ্ছামত শোষনও করতে চাই। কারণ, বিশ্বব্যাপী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজটি অতি ব্যয়বহুল। সে খরচ মার্কিনীদের পক্ষে নায্য উপার্জনের মাধ্যমে অসম্ভব। এ জন্যই লুটপাটের অবাধ ক্ষেত্র তাদের জন্য অপরিহার্য। তাদের লক্ষ্য, ছলে-বলে ও কলে-কৌশলে মধ্যপ্রাচ্যের অঢেল সম্পদকে তাদের দখলে নিতেই হবে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও বাইরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ প্রায় সবদেশগুলী দেশ এখন তাদের দখলে। তবে শোষনের যে সুযোগ এদেশগুলীতে তারা যা পাচ্ছে সেটিতে তারা খুশী নয়। এক গ্রামে ডাকাতী করে দস্যুরা তৃপ্ত হয় না। চায় গ্রামে গ্রামে ডাকাতির সুযোগ। তাদের ক্ষুধা সীমাহীন। আসন্ন হামলায় ইরাক এবং পরবর্তীতে ইরানেও যে মার্কিন দস্যুবৃতি প্রসারিত হবে। এ দস্যুবৃত্তিকে তারা নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য মনে করে।

মার্কিনীগণ নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থটি নিজ সীমান্তের মাঝে দেখে না, দেখে সমগ্র বিশ্বজুড়ে। এটি যেমন আফগানিস্তান ও ইরাক, তেমনি কোরিয়া, ফিলিপাইন, উযবেকিস্তান, সোমালিয়া ও জিবুতিতে। ২০০৩ সালের হিসাব মতে যুক্তরাষ্ট্র ১০.৪ মিলিযন ব্যারেল জ্বালানী তেল আমদানী করে। ২০২০ সাল নাগাদ তাদের আমদানীর পরিমাণ দাঁড়াবে ১৬.৭ মিলিয়ন। ইরাক দখলে সহজ হবে তেল সংগ্রহ। বিজয়ের পর যুদ্ধে সকল খরচও তারা পুষিয়ে নিবে। যেমনটি ১৯৯১ সালের ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সকল খরচ সৌদি আরব আর কুয়েত থেকে আদায় করে নিয়েছে। কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও ওমান জুড়ে মার্কিনীদের আজ যে সামরিক দখলদারিত্ব সেটির প্রতিষ্ঠায় নিজ পকেট থেকে তাদের একটি ডলারও ব্যয় হয়নি। তেমন প্রাণ হানীও হয়নি। কৈয়ের তেল কৈ ভেজেছে তারা। ইরাকেও তেমনটিই হতে যাচ্ছে। ইরাকের প্রতিরোধের সকল সামর্থ্য যুদ্ধ শুরুর আগেই ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিনীদের সামান্যতম প্রাণহানীরও সম্ভাবনা ছিল না। অথচ জয়ের সামর্থ্যটি ছিল বিশাল। ফলে এমন একটি যুদ্ধ থেকে মার্কিনীদের মত সাম্রাজ্যলিপ্সু একটি দেশকে কেউ কি যুদ্ধ থেকে ফেরাতে পারে?

খুনীকে খুনী, দুর্বৃত্তকে দুর্বৃত্ত এবং সন্ত্রাসীকে সন্ত্রাসী বলার জন্য বিশাল মাপের মানবতা বা বিবেকবোধ লাগে না। নিরক্ষরেরও সেটি থাকে। কিন্তু সে সামর্থ্য কি মার্কিনীদের আছে? থাকলে সে প্রমাণ কই?  মার্কিনীরা যে কতটা মানবতাশূর্ণ -সেটি ইসরাইলী নৃশংসতার প্রতি তাদের নিঃশর্ত সমর্থন ও সর্ববিধ সাহায্যই কি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় না? যে মানদন্ডে সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ এককালে ভারতের তাবত সম্পদকে নিজেদের রাজকীয় সম্পদ মনে করতো -সেরূপ একটি মানদন্ডে মার্কিনীরাও ইরাকের, এমনকি মুসলিম বিশ্বের তেল সম্পদকে নিজেদের জাতীয় সম্পদ মনে করে। কারণ, যুগ পাল্টালেও সাম্রাজাবাদ প্রতি যুগে অভিন্ন লুন্ঠন-সুলভ মানসকতারই জন্ম দেয়।

 

কি হবে প্রতিরোধের স্ট্রাটেজী?

প্রশ্ন হলো, মার্কিন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কীরূপ হবে প্রতিরোধের স্ট্রাটেজি? আত্মসমর্পণে যেমন মর্যাদা বাড়ে না, তেমনি নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয় না। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাইরাইন, মিশর, ওমানের ন্যায় দেশগুলো যে ভাবে মার্কন এজেন্ডার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে তাতে তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা কোনটিই বাড়েনি। কোন গৃহে ডাকাত পড়লে যে গ্রামের প্রতিবেশী অন্য বাসিন্দারা যদি নিজ গৃহে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে -সে গ্রামের কারোই ইজ্জত বাঁচে না। ডাকাতেরা একে একে সবারই ঘাড় মটকায়। ইংরেজদের হাতে বাংলা যখন পরাধীন  হলো তখন প্রতিবেশী কেউ এগিয়ে আসেনি। জনগণের কাতার থেকে দেশটিতে স্বাধীনতার যুদ্ধও হয়নি। ফলে স্বাধীনতা শুধু বাংলাই হারায়নি, ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোও একই ভাবে স্বাধীনতা হারিয়েছে। অথচ ভিয়েতনামী যোদ্ধাদের রক্তত্যাগে দেশটি পরাধীনতা থেকে বেঁচেছিল। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে কে নামাজী আর কে বেনামাজী, কে ডানপন্থি আর কে বামপন্থি -সে বিবেচনায় কল্যাণ নাই।

মার্কিন সন্ত্রাসের মুখে আজ শুধু ইরাক নয়, সমগ্র বিশ্ব। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অপ্রতিহত থাকলে স্বাধীন ভাবে বাঁচাটিই অসম্ভব হবে। সবচেয়ে অসম্ভব হবে ঈমান নিয়ে বাঁচাটি। তখন মুসলিম গণহত্যা শুধু ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া বা আফগানিস্তানে সীমিত থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে অন্যান্য মুসলিম দেশেও। কারণ, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটি হলো স্বঘোষিত ধর্মযুদ্ধ তথা ক্রুসেড। এবং ক্রুসেডের একটি ঐতিহাসিক পরিচয় আছে। সে পরিচয়টি খৃষ্টানদের পরিচালিত মুসলিম নির্মূলের বর্বরতম এবং নৃশংসতম যুদ্ধের।

 

যে দায়িত্ব প্রতিটি মুসলিমের

ইরাক আগ্রাসনের নায়ক সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ যেমন তার লক্ষ্য নিয়ে অস্পষ্টতা রাখেননি, তেমনি কোন মুসলিমের অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয় মার্কিন ঘোষিত ক্রুসেডের উদ্দেশ্য নিয়ে। এরূপ হামলার লক্ষ্যই হলো মুসলিমদের মুসলিম রূপে শান্তিতে বাঁচাটি অসম্ভব করে তোলা। আফগান ও ইরাকীগণ মার্কিন হামলার শিকার হওয়ার কারণটি আফগান ও ইরাকী হওয়া নয়, বরং সেটি হলো তাদের মুসলিম পরিচিতি। ফলে তাদের সমস্যা শুধু তাদের নিজেদের সমস্যা নয়, বরং সেটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সমস্যা। মহান আল্লাহতায়ালা ইসলামের এ শত্রুদের সম্মদ্ধেই হুশিয়ারী শুনিয়েছেন এবং বলেছেন, “এবং তোমাদের উপর হামলা থেকে তারা কখনোই বিরত হবে না -যতক্ষণ না তোমরা নিজেদেরকে ইসলাম থেকে সরিয়ে নাও।” -(সূরা বাকারা, আয়াত ২১৭)। কোন একক জাতি বা দেশের পক্ষে এ বিশাল বিশ্বশক্তির রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। সবার ঐক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চাই “ওয়া লা তাফাররাকু” (অর্থ: এবং তোমরা বিভক্ত হয়ো না) -মহান আল্লাহতায়ালার এ কোর’আনী ফরমানের আনুগত্য।

মুসলিম ভূমিতে শত্রুর হামলা শুরু হলে এগিয়ে আসতে হয় প্রতিটি মুসলিমকে। কারণ মুসলিমকে বাঁচতে উম্মাহর ধারণা নিয়ে। উম্মাহ কাজ করে একটি জনগোষ্ঠির একটি অভিন্ন দেহ রূপে। দেহের এক অংশে আঘাত হানলে, অন্য অঙ্গ বেদনা পায় এবং প্রতিরোধ করে। সেটি না হলে বুঝতে হবে সে বেদনাশূণ্য অংশটি দেহ থেকে খন্ডিত হয়েছে। তাছাড়া মুসলিম ভূমিতে মার্কিন সন্ত্রাসের কান্ডটি আদৌ গোপন বিষয় নয়। দেশটিতে সরকার পরিবরর্তন হয়, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী নীতির পরিবর্তন হয় না। তাই হামলা যেমন প্রেসিডেন্ট বুশের আমলে হয়েছে, তেমনি প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলেও হয়েছে। ইসরাইলের আগ্রাসী নীতিই তাদের নীতি। নেকড়ে যেমন চরিত্র পাল্টায় না, তেমনি মার্কিনীরাও পাল্টায় না।

তাই এ মার্কিন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে যার যা সামর্থ্য আছে -তা নিয়েই ময়দানে নামাটি প্রত্যেকের উপর ফরজ। সন্ত্রাসের যেমন ভৌগলিক সীমান্ত নাই, তেমনি নেই প্রতিরোধেরও। সন্ত্রাসবিরোধী সচেনতা গড়তে হবে ঘরে ঘরে। মার্কিন সামর্থ্যে বৃদ্ধি ঘটে -এমন প্রতিটি কর্মই হারাম। হামলার বিরুদ্ধে জিহাদ নিয়ে বাঁচাটাই ইবাদত। কারণ সে জিহাদে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি আনুগত্য। থাকে তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার প্রেরণা। থাকে মুসলিম স্বার্থের প্রতিরক্ষার চেতনা। জিহাদের দায়িত্বটি সবার। মহান আল্লাহতায়ালা দায়িত্ব পালনের সে সামর্থ্য দিয়েছেন প্রতিটি নাগরিককে। দিয়েছেন বিপুল বুদ্ধিবৃত্তিক বল ও প্রতিবাদের ভাষা। ঈমানী দায়ভার হলো, সে সামর্থ্যের বিনিয়োগ। তখন শত্রুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি কোরবানী এবং প্রতিটি প্রয়াসই মহান আল্লাহতায়ার দরবারে মাগফেরাত লাভে সহায়ক হয়। চলমান ক্রুসেডের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে বস্তুত এ ভাবেই। শত্রুকে গালীগালাজ করে পরকালে পরিত্রাণ মিলবে না। নিছক দোয়া পড়েও দায়িত্ব পালন হয়না। সে আগ্রাসী শত্রুর মোকাবিলায় নিজ নিজ প্রচেষ্ঠা বা কোরবানী কি ছিল -সে হিসাব মহান আল্লাহর দরবারে অবশ্যই দিতে হবে। ১ম সংস্করণ ১৮/০৩/২০০৩; ২য় সংস্করণ ১৭/০১/২০২১।




রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গণহত্যা ও আগ্রাসন যেখানে গণতন্ত্র

ফিরোজ মাহবুব কামাল

নেশা আধিপত্য বিস্তারের

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্ণধারদের বড্ড অহংকার মার্কিন গণতন্ত নিয়ে। অহংকার মার্কিন বিচার ব্যবস্থা ও মার্কিন মূল্যবোধ নিয়েও। যেমন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি হওয়ার অহংকার চেপেছিল হিটলারের মাথায়। সে অহংকারে হিটলার পদানত করতে চেয়েছিল সমগ্র ইউরোপকে। বহু কোটি মানুষের তাতে প্রাণনাশ হয়েছিল। তেমনি অহংকার চেপেছে মার্কিনীদের মাথায়ও। নেশা এখানে আধিপত্য বিস্তারের। হিটলার যেটি ইউরোপময় করতে চেয়েছিল, অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টগণ সেটিই চেয়েছে বিশ্বময় করতে। সে জিদ নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা করে। আরো জিদ, যারাই মার্কিন আধিপত্যের বিরোধীতা করবে তাদের ঘাড়ে পৌঁছে দিবেন মার্কিন বিচার। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বহুবার সে কথা শুনিয়েছেন বিশ্ববাসীকে। তার দাবী, যারা মার্কিনীদের ঘৃনা করে তারা সেটি করে মার্কিন গণতন্ত্র, মার্কিন বিচার ও মূল্যবোধের প্রতি ইর্ষার কারণে।

১১ সেপ্টেম্বরের হামলার তেমনই এক ব্যাখা সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তৎক্ষনাৎ দিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি কি সত্যই তাই? প্রশ্ন হলো কি সেই মার্কিন গণতন্ত্র? কি সেই মার্কিন বিচার ও মূল্যরোধ? তাদের রাজনীতি, তাদের গণতন্ত্র ও মূল্যবোধ আজ আর কোন গোপন বিষয় নয়। যেখানেই তারা গেছে সেখানেই তারা সেটিকে সাথে নিয়ে গেছে। অতীতে জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লেবারনের মানুষ তাদেরকে অতি কাছে থেকে দেখেছে। এখন দেখছে আফগানিস্তান ও ইরাকের মানুষ। সবগুলি দেশেই হত্যা, সন্ত্রাস, দস্যুতা ও জবর দখলকে তারা  নিজেদের জাতিও নীতিতে পরিণত করেছিল। এসব দেশের মানুষ মার্কিনী গণতন্ত বলতে কতটুকু গণতন্ত বুঝে, আর কতটুকু বুঝে এ্যাটম বোমা, নাপাম বোমা, আগুণে বোমা, ক্লাস্টার বোমা আর গুয়ান্তোনামো বে’র কনসেনট্রেশন ক্যাম্প সেটি কি বুঝার জন্য কি বুশের ওয়াজ শুনার প্রয়োজন আছে। বিশ্ববাসী কি এতটাই মুর্খ ও বিবেক শূণ্য যে এসব স্বচক্ষে দেখেও তা বুঝবে না? মানব শিশু রূপে জন্ম নেওয়ার কারণেই যেমন কেউ মানবতা পায় না তেমনি নির্বাচিত হলেই কেউ সভ্যতর হয়না। বুশ যেমন নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছেন, তেমনি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম ব্যক্তি হিটলারও এসেছিল। ফলে গণতন্ত্র নিয়ে বড়াই চলে না। বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে হত্যা, সন্ত্রাস, দস্যুতাকে বিশ্বময় ছড়াচ্ছে তাতে মার্কিন গণতন্ত্র কতটা “ডিমোক্রাসি” আর কতটা “ডিমোনক্রাসি” বা দৈত্যতন্ত্র সেটিই এখন বিবেচনার বিষয়।

তালেবানদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার বড় বাহানা ছিল তারা দেশটিতে মানাধিকার প্রতিষ্ঠা করবে, জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিবে। আফগানিস্তান দখল হলো, সরকারও প্রতিষ্ঠা হলো -কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে কি? জনগণ পেয়েছে কি তাদের মৌলিক অধিকার? এসেছে কি স্থিতিশীলতা? দেশটি আজ বহু টুকরায় বিভক্ত। ক্ষমতায় বসিয়েছে সেসব জঘন্য খুণীদের যারা মানবহত্যাকে দেশের সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে । দেশটিতে খুণোখুণি বন্ধ হোক তা নিয়ে এদের সামান্যতম আগ্রহও নেই। আর তেমনি একটি পরিবেশে মার্কিন বাহিনীও সুযোগ পেয়েছে যত্র তত্র মানুষ খুণ করার। ফলে কে তাদের বিচার করবে? বন্য পশু জঙ্গলে শিকার ধরলে যেমন বিচার হয় না তেমনি বিচার নেই এ খুণীদেরও। বনের পশুহত্যাকে জঙ্গলের গাছ-পাথর ও অন্য পশুরা যেমন নীরবে দেখে তেমনি মার্কিনীদের নৃশংস হত্যাকান্ডকে নীরবে দেখেছে আফগানিস্তানের পুতুল সরকার। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব তোলা হয়েছিল দুনিয়ার কোন আদালতই যেন মার্কিন খুণীদের বিচারের বৈধতা না পায়। এবং সেটি পাশও হয়ে গেছে। যেন বৈধতা পেল সমগ্র বিশ্বটাকেই তারা আফগাস্তান বানানোর। যথেচ্ছাচারে এরা দেশ দখল করবে, শত সহস্র বোমা ফেলে মানুষ খুণ করবে, যারাই বিরোধীতা করবে তাদের ঘর বাড়ী জ্বালিয়ে দিবে, নারী-শিশুকে পঙ্গু করবে – এসব বর্বরতাও জাতিসংঘ  আইনে বৈধতা পেল। তবে সে প্রস্তাবটি পাশ করাতে ব্যর্থ হলেও তাদের অসুবিধা ছিল না। যে আইন তাদের খেয়ালখুশিকে বৈধতা দেয় না সেটিকে তারা বৈধতা দেয় না; বুড়ো আঙ্গুল দেখায়। যেমনটি করেছে ইরাককের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্রে। তারা নিজেরাও জানে তাদের এ নিষ্ঠুরতা ইতিহাসের বর্বরতম অপরাধ।

 

হত্যা মূল্যবোধের

মার্কিন কর্মকর্তাগণ অধিকৃত দেশের নিরীহ মজলুমের প্রতিরোধ যুদ্ধকে বলছে সন্ত্রাস। আর পরদেশে নিজেদের আগ্রাসন এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকর্মকে বলছে স্বাধিনতা ও গণতন্ত্রের লড়াই। এভাবে বিশ্বজুড়ে প্রসার বাড়াচ্ছে এক বিকৃত মূল্যবোধের। ফলে তারা শূধু গণহত্যার নায়কই নয়, মূল্যবোধের হন্তাও। সাধারণ খুণী, দূর্বৃত্ত ও দস্যুদের থেকে তাদের মূল পার্থক্য মূলত এখানেই। কারণ সাধারণ দূর্বৃত্তরা মানুষ খুণ করলেও সে খুণকে ন্যায্য বা যথার্থ বলে দাবী করে না। ফলে তাদের হাতে প্রাণনাশের ঘটনা ঘটলেও তাতে মূল্যবোধের মৃত্যু হয় না। ফলে হত্যাকান্ড যেমন প্রশংসনীয় হয় না, তেমনি হত্যার নায়ক বিচারও এড়াতে পারে না।

কিন্তু মার্কিনী সন্ত্রাসে বিশ্বের মূল্যবোধই বদলে যাচ্ছে। আর তার প্রভাব পড়ছে জাতিসংঘের উপর। এর প্রমাণ, যে যুদ্ধ জাতিসংঘের অনুমোদন পেল না, যার পক্ষে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের সমর্থণ ছিল না এবং যা ছিল জাতিসংঘ সংবিধানের সম্পূর্ণ লংঘন -তেমন এক অবৈধ যুদ্ধে ইরাক অধিকৃত হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে  শাস্তি না দিয়ে বা তিরস্কার না করে বা ইরাক থেকে আগ্রাসী বাহিনীর অপসারণের ব্যবস্থা না করে বরং ইরাকের উপর আগ্রাসী মার্কিন বাহিনীর অধিকার মেনে নিল। এবং অধিকার দিল সেদেশের অর্থ-ভান্ডারে হাত দেওয়ার। আর এ ভাবেই পুরস্কৃত করা হলো এ অপরাধি দেশটিকে। মূল্যবোধ এভাবে বিকৃত হয়েছে বলেই নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজ সৈন্যদের যুদ্ধাপরাধারের বিরুদ্ধে যে কোন বিচারকে নিষিদ্ধ করে যে প্রস্তাব এনেছিল সেটিও পাশ হয়ে গেল।

মূল্যবোধের এ বিকৃতির কারণেই প্রশ্রয় পাচেছ মার্কিনী খুণীচক্র। নিজেদের কু-কর্মকেও তারা হিতকর্ম বলছে। আন্তর্জাতিক দস্যুতাকেও স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য বলছে। ইরাক ও আফগানিস্তানের নিরস্ত্র মানুষকে যেভাবে হত্যা করছে সেটিকেও গণতন্ত্রের পক্ষে প্রয়োজনীয় কর্ম বলে প্রচার করছে। শুধু তাই নয়, বিশ্ববাসীকে এ বর্বর কাজে তাদের পিছে সারিবদ্ধ হতে বলছে। আর এমন চেতনা যে শুধু মাকিন প্রশাসনে ভর করেছে তা নয়, বরং গ্রাস করেছে দেশটির জনগণের বিবেকবোধকেও। ফলে তৃতীয় বিশ্বের কোন নিরক্ষর গ্রাম্য কৃষক ইরাকের উপর মাকিন আগ্রাসনকে যেভাবে অন্যায় বলতে পারলো -তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ দূরে থাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ প্রফেসরও তা পারিনি। পারিনি অধিকাংশ লেখক, কলামিষ্ট, বুদ্ধিজীবী, কংগ্রেস ও সিনেট সদস্যরাও।

মার্কিন মূল্যবোধ ও বিচারবোধ যে কতটা বীভৎস পথে পা বাড়িয়েছে তারই প্রমাণ হলো গুয়ান্তানামো বে’র কারাগার। যারা কোন দিন আমেরিকায় গেল না, সেখানে গিয়ে কোন যুদ্ধও করলো না, কোন মার্কিনীকে হত্যাও করলো না –এরূপ শত শত নিরপরাধ মানুষকে নিয়ে তোলা হয়েছে কিউবার গুয়ান্তানামো দ্বীপের কারাগারে। তারা যে অপরাধ করেছে সে প্রমাণও মার্কিনীদের হাতে নেই। আইনের ভাষায় যথার্থ ভাবেই তারা নিরপরাধ। এমন মানুষদের বন্দী করে রাখা দুনিয়ার যে কোন আইনেই অবৈধ। এমন কাজ করে থাকে দূর্বৃত্ত হাইজাকারগণ। অথচ মার্কিনীরা সেটিই করেছে। গুয়ান্তানামো কারাগারের এসব নিরাপরাধ ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে হাতবাঁধা, চোখবাঁধা, পায়ে লোহার শিকলপড়া অবস্থায়। চিড়িয়াখানায় রাখা বাঘ-ভালুককেও চলাফেরার জন্য জায়গা দেয়া হয়; কিন্তু তাদের তা দেয়া হয়নি। নিষ্ঠুরতায় হিটলার ও তার কনসেনট্রেশণ ক্যাম্পকেও হার মানায়। আর এটিকেই প্রেসিডেন্ট বুশ বড় গর্ব করে বলছে মার্কিন বিচার। গোঁ ধরেছেন এমন বিচার বিশ্বময় প্রতিষ্ঠা করে ছাড়বেন। অর্থাৎ মার্কিন আধিপত্যের বিরোধীদের ধরে ধরে গুয়ান্তানামো দ্বীপে হাজির করবেন। অথবা গুয়ান্তানামো দ্বীপের বর্বরতাকে হাজির করবেন বিশ্বের কোনে কোনে। একবিংশ শতাব্দী এ ভাবেই পরিণত হবে মার্কিন আধিপত্যের শতাব্দী। এটি রুখতে কোন আন্তজাতিক আইন তাদের পায়ে বেড়ি পড়াক -মার্কিনীরা সেটি মানতে রাজী নয়।

 

মৃত জাতিসংঘ

মার্কিনীদের আগ্রাসী অভিপ্রায়ের কারণেই জাতিসংঘকে পরিণত হয়েছে মরা লাশে, এখন শুধু এর দাফনই বাঁকি। ফলে বিবেকমান কোন মানুষের পক্ষে এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করাই এখন দুরুহ। এমন তীক্ততা নিয়ে এমন কি মিস্টার হ্যানস ব্লিক্সের মত মৃদুভাষী কুটনৈতিকও মার্কিন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের প্রকাশ্যে “বাস্টার্ড” বলতে বাধ্য হয়েছেন। তার সে বেদনাভরা অভিব্যক্তির বিস্তারিত বিবরণ ছেপেছে ২০০৩ সালের ১১ জুনের দৈনিক গার্ডিয়ান। হ্যানস ব্লিক্সের দুঃখের কারণ মার্কিন কর্তৃপক্ষ ইরাকের উপর হামলাকে জায়েজ করতে তার রিপোর্টের ভাষাকে মার্কিনীদের জন্য অনুকূল করতে বলেছিল। কিন্তু তিনি তা না করায় পেন্টাগণ তার বিরুদ্ধে জঘন্য প্রচারণায় চালায়। অবশেষে তার কাজকে বন্ধ করতে বাধ্য করে।

লক্ষাধিক সৈন্য, হাজার হাজার স্পাই ও শত শত অস্ত্র বিশেষজ্ঞ মাঠে নামিয়েও মার্কিন কর্তৃপক্ষ যেখানে বিগত দুই মাসে তথাকথিত “উইপন্স অব মাসডিসট্রাকশন” আবিস্কার করতে পারলো না, হ্যানস ব্লিক্সের ক্ষুদ্র অস্ত্রপরিদর্শক দলকে সে কাজ মাত্র দুই সপ্তাহে সমাধা করতে বলেছিল। তাকে একদিনও বাড়তি সময় দিতে রাজী হয়নি। ইরাকে অস্ত্র থাক আর না থাক সেটি বড় কথা নয়, মার্কিনীদের লক্ষ্য ছিল জাতিসংঘ পরিদর্শক দলের রিপোর্ট যেন তাদের হামলার পক্ষে দলিল হিসাবে কাজ করে। এবং সেটি সত্বর। কোন বিবেকমান মানুষের জন্যই এটি মেনে নেওয়া ছিল অপমানজনক। সম্ভব হয়নি হ্যানস ব্লিক্সের পক্ষেও। এক সময় তিনি সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ফলে মার্কিনীদের মতিগতি বুঝার সামর্থ্য বা কুশলতা যে তার ছিল না তা নয়। তাছাড়া তিনি দীর্ঘকাল কাজ করেছেন জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ পদে। ফলে মার্কিন কর্তৃপক্ষের হাঁড়ির খবর তিনি রাখেন। ফলে তিনিই যদি মার্কিন কর্তাব্যক্তিদের বাস্টার্ড বলেন তবে যারা মাকিন ক্লাস্টার বোমা, কামানের গোলা ও নানা বিধ সন্ত্রাসের শিকার তারা তাদেরকে কি বলবে?   

 

ইরাকে গণহত্যা ও লুন্ঠন

ইরাক দখলের দুই মাস অতীত হলো। অথচ আজও তারা কিছুই করতে পারি। চলছে প্রশাসনিক শূণ্যতা। নাই নিরাপত্তা। নাই পানি ও বিদ্যুৎ সাপ্লাই। নাই খাদ্য-রেশন। পানিহীন, বিদ্যুৎহীন, খাদ্যহীন ও নিরাপত্তাহীন অবস্থায় মানুষ অতি অবর্ণনীয় দুরাবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। অথচ যেটি সফল ভাবে চালাতে পারছে সেটি হলো গণহত্যা। গত ২০০৩ সালের ১৩ জুন একদিনেই মার্কিন বাহিনী ৯৭ জনকে হত্যা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের শিক্ষাবিদ ও গবেষকগণের বরাত দিয়ে ১৪ জুনের (২০০৩ সাল) গার্ডিয়ান খবর ছেপেছে এ অবধি ১০ হাজার বেসামরিক ইরাকীকে হত্যা করা হয়েছে। এবং হত্যাকান্ড চলছে অন্যভাবেও। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ঔষধ না থাকায় বহু মানুষ মারা যাচ্ছে বীনাচিকাৎসায়। ভেঙ্গে পড়েছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে কলেরা। মনে হচ্ছে দখলদার মার্কিনীদের এসব দিকে ভ্রক্ষেপও নাই। অথচ ইতিমধ্যে তারা দেশটির তেলের খনিতে হাত দিয়েছে। শুরু করেছে তেলোত্তলন। চালু করেছে রিফাইনারি। তেলের খনিগুলোকে সঁপে দিচ্ছে মার্কিন কোম্পানীগুলোর হাতে। ঘরে ঢুকে দস্যু যেমন সিন্দুকে হাত দেয় এরা তেমন হাত দিয়েছে ইরাকের অর্থভান্ডারে। এবং এটিকেও বলছে মার্কিন বিচার।

 

প্রতারণা ফিলিস্তিনীদের সাথে

অপর দিকে একই রূপ অভিনব মার্কিন বিচার চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে ফিলিস্তিনীদের উপর। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির জন্য প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ প্রশাসন প্রণয়ন করেছে তথাকথিত ’রোড-ম্যাপ’। স¤প্রতি এটি নিয়ে দরবার করতে প্রেসিডেন্ট বুশ মধ্যপ্রাচ্য সফর করলেন। এ রোড-ম্যাপ ফিলিস্তিনীদের শান্তি ও স্বাধীনতা কতটুকু নিশ্চিত করবে সেটি  বলা না হলেও ফিলিস্তিনীদের বলা হচ্ছে ইসরাইলীদের শান্তি ও নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে। বলা হচ্ছে অস্ত্র পরিত্যাগ করতে। অথচ ইসরাইল প্রত্যহ হেলিকপ্টার গানশিপ ও ট্যাংক নিয়ে ফিলিস্তিনের বস্তিতে ঘুরছে ও মানুষ খুণ করছে তা নিয়ে মার্কিনীদের কোন বক্তব্য নেই।   আজ অবধি যতজন ইসরাইলী ফিলিস্তিনীদের হাতে মারা গেছে তার চেয়ে বহু গুণ বেশী ফিলিস্তিনী মারা গেছে ইসরাইলী সামরিক বাহিনীর হাতে। অথচ তাদেরকে সন্ত্রাসী না বলে সন্ত্রাসী বলা হচ্ছে ফিলিস্তিনীদের। ইতিহাসে অন্যের দেশদখল সব সময়ই নিন্দিত হয়েছে এবং প্রশংসিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। মার্কিনীরা ফিলিস্তিনীদের মুক্তিযুদ্ধকে বলছে সন্ত্রাস। অথচ ভূলে যায়, সেটি হলে বড় সন্ত্রাসী বলতে হয় প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনকেও। কারণ তিনিও অস্ত্র হাতে ইংরেজ উপনিবেশিক শক্তির দখলদারির বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। ফলে মার্কিন বিচারবোধ যে কতটা বিকৃত, কতটা অমানবিক ও কান্ডজ্ঞান বর্জিত সেটি এর পরও বুঝতে বাঁকি থাকে? এমনই এক অসুস্থ্য বিবেকবোধের কারনে ইয়াসির আরাফত ফিলিস্তিনীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হলে কি হবে তাকে তারা মানতে রাজি নয়। তার সাথে কথা বলতেও ইচ্ছুক নয়। কথা বলার জন্য মার্কিন চাপে আবু মাজেনকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছে।

অপরদিকে যে ইসরাইল ফিলিস্তিনকে গ্রাস করলো এবং দখলকৃত ভূমি থেকে সৈন্য অপসারণের জাতিসংঘ প্রস্তাবকে বার বার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালো সে ইসরাইলই  হলো মার্কিনীদের পরম মিত্র। ইসরাইল বলেছে ১৯৬৭ সালের আগ্রাসনে অধিকৃত ভূমি থেকে তারা পিছু হঠবে না। রাজি নয় অধিকৃত পশ্চিম তীরে যে হাজার হাজার ইহুদী পল্লী নির্মাণ করেছে সেগুলি উঠিয়ে নিতে। রাজি নয় ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে যাদেরকে তারা নিজ গৃহ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল তাদের ঘরে ফিরতে দিতে। অথচ ফিলিস্তিনীদের সেটি মৌলিক অধিকার। তাদের ঘরে ফেরার সে অধিকার মেনে নিয়ে জাতিসংঘে প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছে। ইসরাইল রাজি নয় ১৯৬৭ সালে দখল করা জেরুজালেম শহরটি ফিরত দিতে। অথচ এটিও জাতিসংঘ প্রস্তাব অনুযায়ী ফিলিস্তিনীদের প্রাপ্য।

অতীতে ফিলিস্তিন নিয়ে বহু কনফারেন্স হয়েছে। ওসলো, মাদ্রিদ, প্যারিস, ক্যাম্প ডেভিড, আকাবা, শারমাল শেখসহ বহুস্থানে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ইসরাইল ভূমি থেকে পূর্ণ ভাবে হাত গুটাতে যেমন রাজি নয়, তেমনি রাজি নয় ফিলিস্তিনী উদ্বাস্তুদের নিজ গৃহে ফিরবার অধিকার দিতে। ইসরাইলী কর্মকর্তাগণ সে কথা অতীতের ন্যায় এবারও স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এরপরও মার্কিনীদের কাছে শান্তির শত্রু ইসরাইল নয়, বরং শত্রু হলো তারা যারা জাতিসংঘ প্রস্তাবের বাস্তাবায়ন চায়। প্রেসিডেন্ট বুশ এর পরও ফিলিস্তিনী নেতাদের নাকে স্বাধীন ফিলিস্তিনের মূলা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। এটি যে প্রচন্ড প্রতারণা সেটি বুঝবার সামর্থ কি ফিলিস্তিনীদের নেই? কথা হলো, যে ব্যক্তি ইরাকে অস্ত্র আছে বলে অবিরাম মিথ্যা বলতে পারে, ইরাকের উপর বেআইনী হামলা ও জবর দখলকে গণতন্ত্র বলতে পারে, হাজার হাজার ইরাকী জনগণের মার্কিন বিরোধী মিছিলের পরও যে ব্যক্তি সেটিকে মার্কিনীদের প্রতি ইরাকীদের “আহলান সাহলান” বলতে পারে -তার পক্ষে স্বাধীন ফিলিস্তিনের মিথ্যা প্রতিশ্র“তি দেওয়া কি এতই কঠিন?

মার্কিনীদের কাজ শুধু আগ্রাসনের নতুন ক্ষেত্র তৈরী করা নয়, বরং আগ্রাসনের পুরনো ক্ষেত্রগুলোকে আরো অশান্ত ও রক্তাত্ব করা। ফলে যে আগ্রাসন ও অশান্তি আজ ফিলিস্তিনে বেঁচে আছে তা যে আফগানিস্তান ও ইরাকেও আরো বহু কাল বেঁচে থাকবে এবং আর বহু দেশে সেরূপ অবস্থা সৃষ্টি হবে তা নিয়ে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? কারণ, দুর্বৃত্ত শক্তি শুধু দুর্বৃত্তিই বাড়াতে পারে; সুনীতি নয়। এবং সেটি যদি বিশ্বশক্তি হয় তখন বিপদ সমগ্র বিশ্ববাসীর –বিশেষ করে যারা শক্তিহীন তাদের। ১ম সংস্করণ ১৫/০৬/২০০৩; ২য় সংস্করণ ১৬/০১/২০২১।