বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের একাত্তরের অপরাধ ও বাংলাদেশের আজকের সংকট

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বাঙালী মুসলিম জীবনে একাত্তর                  

পরীক্ষা শুধু ব্যক্তির জীবনে আসে না; জাতীয় জীবনেও আসে। জাতীয় জীবনে পরীক্ষায় পাশের উপর নির্ভর করে জাতি হিসাবে বিশ্ব মাঝে বিজয় ও সন্মান নিয়ে  বাঁচা। প্রতিটি জাতির মাঝেই কিছু ভাল লোক থাকে। কিন্তু জাতীয় পরিচয়টি সে স্বল্প সংখ্যক মানুষদের কারণে অর্জিত হয় না। এখানে বিচার হয় সমগ্র জনগণের। জনগণের পরীক্ষা হয় ঈমান, ঐক্য, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, শত্রু-মিত্রের পরিচয়, শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ভাঙ্গার বদলে গড়ার সামর্থ্য নিয়ে বাঁচার যোগ্যতার। সে পরীক্ষায় ফেল করলে বাড়ে পরাজয়, বিপর্যয় ও অপমান। তেমন একটি পরীক্ষা ১৯৭১’য়ে বাঙালী মুসলিম জীবনেও এসেছিল। বাঙালী মুসলিমগণ সে পরীক্ষায় নিদারুন ভাবেই ফেল করেছে। তারা চিনতে ব্যর্থ হয়েছে শত্রুকে। ফলে আশ্রয় নিয়েছে ভারতের ন্যায় শত্রুর পেটে। অন্যরা গড়া নিয়ে গর্ব করে, বাঙালীরা গর্ব করে ভাঙ্গা নিয়ে। সেটি বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গার। কবরে পাঠিয়েছে গণতন্ত্রকে। এনেছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির খেতাব। বাঙালীর সমগ্র ইতিহাসে এমন বিপর্যয় ও অপমান আর কোন কালেই জুটেনি। বাঙালী মুসলিম ইতিহাসের এ হলো এক কালো অধ্যায়। এবং জনগণের চেতনা ও চরিত্রের গভীর পচনটি ধরা পড়ে শেখ মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারী, গণতন্ত্র হত্যাকারী, তিরিশ হাজারের বেশী মানবহত্যকারী ও ভারতের এজেন্টকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলার মধ্য দিয়ে।

মুসলিম জীবনের পুরস্কারটি বিশাল। সেটি জান্নাত। জান্নাতের এক ইঞ্চি ভূমিও হিমালয়ের সমান স্বর্ণ দিয়ে কেনা যায় না। সে পুরস্কার লাভের জন্য পরীক্ষায় পাশ করতে হয়। এবং সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয় রাজনীতিতে। কারণ মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হবে কি হবে না, সেটি মসজিদ-মাদ্রাসা এবং নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের উপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে মুসলিমগণ রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামকে কতটা বিজয়ী করতে পারলো তার উপর। একমাত্র রাজনীতির অঙ্গণেই পরীক্ষা হয় অন্যায়ের নির্মূলে ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় শ্রম, অর্থ, মেধা ও রক্তের বিনিয়োগের সামর্থ্যের।

অন্যদের কাছে রাজনীতি ক্ষমতাদখলের হাতিয়ার। ফলে সে রাজনীতিতে যেমন মিথ্যাচার ও ভন্ডামী আছে, তেমনি সন্ত্রাস ও ভোটডাকাতিও আছে। আছে শত্রুদেশকে নিজ দেশের অভ্যন্তরে ডেকে আনার ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশে সেরূপ ষড়যন্ত্র যেমন একাত্তরে ঘটেছে, তেমনি আজও হচ্ছে। কিন্তু ঈমানদারের কাছে রাজনীতি হলো ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ইসলামিকরণের ইবাদত। তাই এটি পবিত্র জিহাদ। ইবাদতের রাজনীতির সে পবিত্র সূন্নত প্রতিষ্ঠা করতেই নবীজী (সা:) নিজে আমৃত্যু রাষ্ট্র-প্রধান থেকেছেন। এটিই নবীজী (সা:)’র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। এ পথেই আসে ইসলামের বিজয়। তখন মহান আল্লাহতায়ালার জমিনে প্রতিষ্ঠা পায় তাঁরই সার্বভৌমত্ব।

প্রশ্ন হলো, মহান নবীজী (সা:) যে আসনে বসেছেন সে আসনে কি চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত ও দুর্বৃত্তদের বসানো যায়? সেটি হলে, ঘটে উল্টোটি। তখন দেশ দুর্বৃত্তিতে রেকর্ড গড়ে –যেমনটি হয়েছে বাংলাদেশে। গলিত আবর্জনার মাঝে সভ্য জীবন অসম্ভব। জীবন দুর্ভিষহ হয় দেশ দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে। তাই সমাজে সর্বশ্রেষ্ঠ কর্মটি দুর্বৃত্ত শাসনের নির্মূল। ইসলাম এ কাজকে জিহাদ তথা শ্রেষ্ঠ ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। এজন্যই দেশের শাসনক্ষমতা দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে, তাদের সরানো প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ হয়ে যায়। এ ফরজ ইবাদতটি পালিত না হলে তখন নবীজী (সা:)’র শিক্ষাও পালিত হয়না। তখন শত্রুর হাতে শুধু পরাজয়ই আসে না, আসে মহান আল্লাহতায়ার পক্ষ থেকে আযাব। দুর্বৃত্ত শাসন তখন আযাবের হাতিয়ারে পরিণত হয়।

প্রতি পেশা, প্রতি কর্ম ও প্রতি আচরনে পথ দেখায় পবিত্র কোর’আন। কিন্তু বেঈমানেরা সে পথে চলতে রাজি নয়। তারা চায়, নিজেদের স্বৈরাচারি স্বার্থসিদ্ধি। এবং সে স্বৈরাচারি স্বার্থসিদ্ধিকে বাধাহীন করার স্বার্থেই তারা দেশের সংবিধান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, আইন-আদালত, প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাদফতরের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশাবলির প্রবেশাধিকার দিতে রাজি নয়। অথচ মু’মিনের ঈমানদারি হলো, ইসলামের প্রতিটি বিধান মেনে চলায় আপোষহীন হওয়া। তাই শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে ফরজ-ওয়াজেব মানলে চলে না, ফরজ-ওয়াজেব এবং নবীজী (সা:) সূন্নতগুলি মানতে হয় রাজনীতিতেও। এ ক্ষেত্রে অবহেলা বা বিদ্রোহ হলে অনিবার্য হয় অনন্ত-অসীম কালের জন্য জাহান্নামের আগুণে পৌঁছা।

মাত্র একটি হুকুম অমান্য করায় অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয়েছে ইবাদতে মশগুল থাকা ইবলিস। একই কারণে, রাজনীতির অঙ্গণে মহান আল্লাহতায়ালার কোন একটি হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটলে নামাযী ব্যক্তিও শয়তানকে পরিণত হয়। ঈমানদার ব্যক্তির জীবনে প্রতিক্ষণের ভাবনা তাই প্রতিপদে পবিত্র কোর’আনে বর্নিত বিধানের পূর্ণ অনুসরণের –সেটি রাজনীতিতে হোক বা শিক্ষা-সংস্কৃতি বা আইন-আদালতে হোক। প্রদর্শিত সে পথটি হলো সিরাতুল মুস্তাকীম। এখানে অবাধ্য বা বিদ্রোহী হলে ঈমান থাকে না। অন্য কোন সফলতাই এমন ব্যক্তিকে জাহান্নামে পৌঁছা থেকে বাঁচাতে পারে না। ঈমানদারের জীবনে প্রতি মুহুর্তে এটিই  হলো পরীক্ষা। জান্নাতপ্রাপ্তি তো ঘটে সে পরীক্ষায় পাশের মধ্য দিয়ে। মহান আল্লাহতায়ালার সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে,“মানুষ কি ভেবে নিয়েছে যে, ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং পরীক্ষা করা হবে না? আমরা তো তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি এবং জেনে নিয়েছি ঈমানের দাবিতে কারা সাচ্চা এবং কারা মিথ্যাবাদি।” –(সুরা আনকাবুত, আয়াত ২-৩)। জীবনের চুড়ান্ত পরীক্ষাটি হয় রাজনীতিতে। এখানে নিরপেক্ষ থাকার উপায় নাই, তাকে একটি পক্ষকে সমর্থণ দিতেই হয়। ফলে ধরা পড়ে সে কোন পক্ষে দাঁড়ালো, ভোট দিল বা অস্ত্র ধরলো। নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে সেরূপ কোন পক্ষ নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না; ফলে সুযোগ থাকে নিজের মুনাফিকি লুকানোর। বাঙালী মুসলমানের জীবনে একাত্তর এসেছিল তেমনি এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পর্ব নিয়ে।

 

একই উৎসবে বাঙালী মুসলিম ও ভারতীয় কাফের!

বাঙালী মুসলিমের একাত্তরের পাকিস্তান ভাঙ্গার যুদ্ধজয়টি দেশ-বিদেশের জাতীয়তাবাদী, সমাজবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, মুর্তিপূজারী, গো-পূজারী, ইহুদী-খৃষ্টান ও নাস্তিকদের কাছে অতি প্রশংসিত। প্রতিবছর সে বিজয় নিয়ে বাংলাদেশে যেমন উৎসব হয়, তেমনি উৎসব হয় ভারতেও। এ উৎসবটি বাঙালী মুসলিমগণ ভারতীয় কাফেরদের সাথে একত্রে করে। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে এমন ঘটনা দ্বিতীয়টি নাই। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার কাছেও কি বাঙালী মুসলমানের একাত্তরের কর্মটি শ্রেষ্ঠ কর্ম রূপে বিবেচিত হবে? একাত্তর নিয়ে বহু বই লেখা হয়েছে, বহু আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু একাত্তরের সে পরীক্ষাপর্বে মহান আল্লাহতায়ালার বিধান কতটুকু মানা হয়েছে -সে বিচার কি কখনো হয়েছে? তা নিয়ে লেখা হয়েছে কি কোন বই? অথচ এটি ঈমানী দায়বদ্ধতা যে প্রতিটি মুসলিম তার প্রতিটি কর্মকে মিলিয়ে দেখবে -কতটা মানা হয়েছে কোর’আনের বিধানকে। প্রচণ্ড অবজ্ঞা হয়েছে এ ক্ষেত্রে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে এ নিয়ে বিচার অবশ্যই বসবে। তখন কি জবাব হবে বাঙালী মুসলিমের? প্রতিটি মুসলিমকে সেদিন শুধু নামায-রোযার হিসাব দিলেই চলবে না, রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহে তার নিজস্ব ভূমিকারও হিসাব দিতে হবে।

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে রাজনীতির গুরুত্বটি অপরিসীম। জীবন ও জগত নিয়ে ব্যক্তির ধ্যান-ধারনাগুলি কীরূপ এবং সে কোন পক্ষের লাঠিয়াল -সেটি জায়নামাজে প্রকাশ পায় না। প্রকাশ পায় রাজনীতিতে। মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের প্রতি কে কতটা অনুগত বা বিদ্রোহী -সেটিরও প্রকাশ ঘটে রাজনীতিতে। রাজনীতির বিজয়ী পক্ষই নির্ধারণ করে দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় নীতি, অর্থনীতি, আইন-আদালত কোন দিকে পরিচালিত হবে। রাজনীতিই নিয়ন্ত্রণ আনে ধর্মের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার উপর। মহান রাব্বুল আ’লামীন তাই মানব জাতির এরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীরব থাকেন কীরূপে? তাই তাঁর যুদ্ধটি স্রেফ মুর্তিপূজারি, অগ্নিপূজারি, দেব-দেবী পূজারি বা নাস্তিকদের বিরুদ্ধে নয়, বরং ফিরাউন-নমরুদদের ন্যায় রাজনীতির কর্ণধারদের বিরুদ্ধেও। নিজেদের এবং সে সাথে অন্যদের জীবনকে যারা সিরাতুল মোস্তাকীমে পরিচালিত করতে চায় -রাজনীতির নিয়ন্ত্রনকে স্বহস্তে নেয়া ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প পথ নেই। খোদ নবীজী (সা:) ও তাঁর মহান খলিফাদের এ জন্যই রাষ্ট্রনায়কের আসনে বসতে হয়েছে। রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটে বসা ও নেতৃত্বের দায়ভার স্বহস্তে নেয়া তাই নবীজী (সা:)’র মহান সূন্নত। ইসলামের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় এ সূন্নত পালনের মধ্য দিয়ে। মহান নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের জানমালের বেশীর ভাগ ব্যয় হয়েছে সে সূন্নত পালনে। ইসলামে এটি পবিত্রতম জিহাদ। রাজনীতির ময়দানে ঈমানদার ব্যক্তি তাই নীরব দর্শক নয়,তার অবস্থান বরং প্রথম সারিতে।

 

বিকল্প নাই ঐক্য ও সামরিক বলের

রাজনীতিতে মূল ফরজটি হলো অসত্য ও অন্যায়ের নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। হারাম হলো যারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা বিরোধী এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বিরোধী তাদের সমর্থণ করা ও তাদের ভোট দেয়া বা তাদের পক্ষে যুদ্ধ করা। কিন্তু রাজনীতির ফরজ পালন কি এতোই সহজ? বিশ্ব তো অধিকৃত আল্লাহর শত্রুপক্ষের হাতে; এবং পরাজিত মহান আল্লাহতায়ালার কোর’আনি বিধান ও তাঁর সার্বভৌমত্ব। কোন একক ভাষা ও একক দেশের মুসলমানদের পক্ষে কি সম্ভব মহান আল্লাহর দ্বীনের  শত্রুদের পরাজিত করা? নানা ভাষা ও নানা বর্ণের শত্রুগণ তো গড়েছে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন। ইরাক ও আফগানিস্তান দখলে রাখতে এ কোয়ালিশন পাঠিয়েছিল ৪০টি দেশের সেনাবাহিনী। মুসলিমগণ কি তাই ভাষা, ভূগোল, অঞ্চল বা বর্ণের নামে বিভক্ত হতে পারে?

বিভক্তি কোন কালেই বিজয় ও স্বাধীনতা আনে না। আনে পরাধীনতা। ইসলামে ভাষা বা বর্ণভিত্তিক বিভক্তির জাতীয়তাবাদি রাজনীতি এজন্যই কবিরা গুনাহ। অথচ সে কবিরা গুনাহর রাজনীতিই ১৯৭১ সালে বিজয়ী হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। এবং সে বিজয় নিয়ে আজ উৎসবও হয়। ভাষাভিত্তিক রাজনীতি করে বাংলার মুসলিমদের পক্ষে কি একাকী সম্ভব ছিল ১৯৪৭য়ে স্বাধীনতা অর্জন? ভারতের বাঙালী, গুজরাটি, মারাঠী, বিহারী,পাঞ্জাবী, তামিল, কাশ্মিরী ও আসামী হিন্দুগণ ভাষার ভেদাভেদ ভূলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আজও একতাবদ্ধ। তারা একতাবদ্ধ ছিল ১৯৪৭’য়েও। অথচ রাজনীতির ময়দানের এরূপ একতাবদ্ধ হওয়াটি হিন্দুদের উপর ধর্মীয় ভাবে ফরজ নয়। কিন্তু অনিবার্য ফরজ হলো মুসলিমদের উপর। একাকী স্বাধীনতার পথ ধরতে গিয়ে কাশ্মিরের শেখ আব্দুল্লাহ যা অর্জন করেছে তা হলো ভারতের পদতলে অধীনতা। স্বাধীনতা ও সম্মান কি আছে বিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত আরব মুসলিমদের? বাংলার মুসলিমদের ১৯৪৭’য়ের সৌভাগ্যটি হলো, কাশ্মিরী নেতা শেখ আব্দুল্লাহর ন্যায় ভাষা বা প্রদেশের নামে তারা উপমহাদেশের অন্য ভাষাভাষী মুসলিমদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। বরং তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেছে। নইলে বাংলাদেশও পরিণত হতো ভারতের পদতলে পিষ্ট আরেক কাশ্মিরে।

মুসলিম হওয়ার চ্যালেঞ্জটি বিশাল। মু’মিনের জীবনে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধটি তো অনিবার্য। শয়তান ও তার অধিপত্যবাদি কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে লড়াই এখানে প্রতিদিনের। যে মুসলিমের জীবনে সে যুদ্ধটি নাই,বুঝতে হবে তার ঈমান ও মুসলিম হওয়া নিয়েই বিশাল শূণ্যতা আছে। ইসলামের শত্রুপক্ষ কি চায়, নবীজী (সা:)’র ইসলামের ন্যায় যে ইসলামে শরিয়ত আছে, জিহাদ আছে এবং খেলাফত আছে -তা নিয়ে মুসলিমগণ বেড়ে উঠুক? তারা কি চায় বিশ্বের কোন এক ইঞ্চি ভূমিতেও শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পাক? তারা তো বিশ্বকে একটি গ্লোবাল ভিলেজ রূপে দেখে। সে ভিলেজে মদ্যপায়ী, ব্যভিচারি, সমকামী, গো-পূজারি, মুর্তিপূজারি ও নাস্তিকদের জন্য পর্যাপ্ত স্থান ছেড়ে দিতে তারা রাজী। কিন্তু নবীজী (সা:)’র যুগের ইসলাম নিয়ে যারা বাঁচতে চায় তাদের জন্য কি সামান্যতম স্থানও ছেড়ে দেয়? বরং তাদের বিরুদ্ধে তো নির্মূলের ধ্বনি। সেটি শুধু বাংলাদেশে নয়, প্রতি দেশেই। মু’মিনের জীবনে সমগ্র বিশ্বটাই তাই রণাঙ্গন।এ রণাঙ্গণে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার অবস্থানটি তাদের  পক্ষে। যুদ্ধরত মু’মিনদেরকে তিনি গ্রহণ করেছেন নিজ বাহিনী তথা হিযবুল্লাহ রূপে। আর তার নিজ বাহিনীর লোকদের কি তিনি জাহান্নামের আগুণে ফেলতে পারেন? মু’মিনের জীবনে এর চেয়ে বড় অর্জন আর কি হতে পারে?

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অতি প্রিয় হলো, যুদ্ধরত মুজাহিদগণ যুদ্ধ করবে সীসাঢালা প্রাচীরসম একতা নিয়ে। তাঁর নিজবাহিনীর মাঝে অনৈক্য তাঁর অতি অপছন্দের। পবিত্র কোরআনে সেটি ঘোষিত হয়েছে এভাবে: “নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ভালবাসেন যারা তাঁর রাস্তায় যুদ্ধ করে এমন কাতারবদ্ধ ভাবে যেন তারা সীসাঢালা প্রাচীর।” –(সুরা সাফ,আয়াত ৪)। মুসলিম জীবনে একতা তাই অনিবার্য কারণেই এসে যায়। সেটি যেমন সমাজ জীবনে, তেমনি দেশের রাজনীতি ও বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে। যেখানে অনৈক্য, বুঝতে হবে সেখানে ঈমানে শূন্যতা রয়েছে। অনৈক্যের অর্থই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে অবাধ্যতা। অথচ আজ  সে অবাধ্যতাই মুসলিম বিশ্বে জোয়ারের ন্যায় ছেয়ে আছে। মুসলিম জাহান আজ ৫৭ টুকুরোয় বিভক্ত। ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রের কি স্বাধীনতা থাকে? থাকে কি নিজ দেশে শিক্ষা-সংস্কৃতি,অর্থনীতি,আইন-আদালত ও প্রশাসনে আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ মেনে চলার স্বাধীনতা? স্বাধীনতার খরচটি তো বিশাল। সে খরচ জোগানোর জন্য চাই রাষ্ট্রের বিশাল ভূগোল। সে জন্য চাই একতা। এবং হারাম হলো বিভক্তি।

ইসলামের শত্রুপক্ষ তো চায় বিশ্বের প্রায় দেড় শত কোটি মুসলিম বেঁচে থাকুক ইসলামকে বাদ দিয়ে। এক্ষেত্রে তাদের সামনে উত্তম মডেল হলো বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশের ডি-ইসলামাইজড সেক্যুলারিস্টগণ। এ অবাধ্যদের জীবনে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণ নেই। নেই শরিয়তের প্রতি বিশ্বাস। নেই জিহাদ ও ইসলামের প্রতিষ্ঠায় সামান্যতম অঙ্গিকার। যা আছে তা হলো ইসলামের প্রচার ও প্রসার রোধে লাগাতর ষড়যন্ত্র। আছে দুর্বৃত্তি। আছে ইসলামপন্থীদের নির্মূলে সর্বাত্মক যুদ্ধ। কিন্তু এরপরও তাদের দাবী, তারা মুসলিম। আফগানিস্তান দখলের পর জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাবুলে দাঁড়িয়ে বলেন, “শরিয়তি আইনকে আফগানিস্তানে ফিরে আসতে দেয়া হবে না।” মুসলিম ভূমিতে দাঁড়িয়ে এ কথা বলার সাহস কাফেরগণ পায় কোত্থেকে? আফগানিস্তানের আাইন কীরূপ হবে সেটি কি জার্মানী বা অন্য কোন কাফের দেশ থেকে অনুমতি নেয়ার বিষয়? ইসলামের শত্রুগণ কি আব্বাসীয়, উমাইয়া বা উসমানিয়া খেলাফতের আমলে এমন আস্ফালন উচ্চারণ করতে পেরেছিল? অথচ তখনও তো তারা সেটিই চাইতো। প্রশ্ন হলো, শরিয়ত ছাড়া কি ইসলাম পালন হয়? পবিত্র কোরআনের মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, “আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী যারা বিচার করে না তারাই কাফের,..তারাই জালেম,..তারাই ফাসেক। -(সুরা মায়েদা,আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭)।

 

কেন এ পতন?

রাষ্ট্রের শক্তি ও সামর্থ্য বিশাল। এটিকে নিয়ন্ত্রনে না রাখলে পাগলা হাতির ন্যায় তছনছ করে দিতে পারে ধর্ম ও সভ্য জীবন-যাপনের সকল আয়োজন। আজকের বাংলাদেশে তো তারই উদাহরণ।দেশ অধিকৃত হয়েছে ভয়ংকর চোর-ডাকাতদের হাতে। ফলে বিপন্ন শুধু ইসলামই নয়, মানুষের জানমাল এবং ইজ্জত-আবরুও। আল্লাহর দ্বীন পালন কি শুধু মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়িয়ে চলে? সেটি সম্ভব হলে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবনে কেন এতো যুদ্ধ? কেনই বা তাদেরকে রাষ্ট্রনায়কের আসনে বসতে হলো? নবীজী (সা:)’র জীবনের বড় শিক্ষা: ইসলামের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার জন্য চাই রাষ্ট্রীয় শক্তির পূর্ণ ব্যবহার। চাই রাজনৈতিক ও সামরিক বল। ছোট্ট এক টুকরো ভূমির উপর কি বিশাল দুর্গ গড়া যায়? শ্রেষ্ঠ সভ্যতার নমুনা রূপে বিশ্বমাঝে মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্য তো চাই বিশাল মানচিত্র। চাই নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মানুষের মাঝে গভীর একতা। নবীজী (সা:) তাই দ্রুত ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা বাড়াতে মনোযোগী হয়েছিলেন। ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা বাড়াতে তাঁকে রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে হয়েছে।এবং মৃত্যুর আগে সাহাবাদের নসিহত করেছেন রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানি কন্সটান্টিনোপল দখল করতে। এটি ছিল নবীজী (সা:)’র স্ট্রাটেজিক ভিশন। মুসলমানদের জানমালের সবচেয়ে বড় কোরবানি হয়েছে তো মুসলিম রাষ্ট্রের শক্তি বাড়াতে। পরিপূর্ণ দ্বীন পালন, সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মাণ ও বিশ্বমাঝে সুমহান মর্যাদায় মাথা তুলে দাঁড়ানোর সামর্থ সৃষ্টি হয়েছে তো এভাবেই। আজও  মুসলিমদের সামনে এটিই নবীজী (সা:)’র মহান সূন্নত। তাই যারা মুসলিম দেশের ভূগোলকে খণ্ডিত করে তারা শত্রু মূলত নবীজী (সা:)’র আদর্শ্যের। একাত্তরে সে শত্রুতাটি হয়েছে মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের পক্ষ থেকে। 

মুসলিম বিশ্বের আজ বেহাল অবস্থা। যে আসনে বসেছেন মহান নবীজী (সা:) ও তাঁর খলিফাগণ সে পবিত্র আসনে বসেছে চোরডাকাত, ভোটডাকাত ও কাফের শক্তির সেবাদাসেরা। খেলাফতের আওতাধীন সে বিশাল ভূগোল যেমন নাই, সে সামরিক বলও নাই। বিলুপ্ত হয়েছে মহান আল্লাহর শরিয়ত। আগ্রহ নেই পূর্ণ ইসলাম পালনের। মুসলিমদের পতনের শুরু তখন থেকেই যখন আলেমগণ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও সংস্কারকে বাদ দিয়ে স্রেফ মসজিদ ও মাদ্রাসার চার দেয়ালের মাঝে নিজেদের কর্মকে সীমিত করেছে। পতনের মূল কারণ, সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি রূপে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে মহান নবীজী (সা:) যে সূন্নত রেখে যান -সেটির প্রতি গুরুত্ব না দেয়া। শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় জিহাদে অংশ নেয়া দূরে থাক, আলেমগণ তাদের ওয়াজে জিহাদের কথা মুখে আনতে ভয় পান। ভয়ের কারণ, সন্ত্রাসী রূপে চিহ্নিত হওয়ার। আল্লাহতায়ালার ভয়ের চেয়ে অধিক ভীতু বান্দার ভয়ে।

মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা, সংহতি ও ভূগোল বৃদ্ধি ইসলাম ধর্মে অতি পবিত্র ইবাদত। মুসলমান এ কাজে যেমন অর্থ দেয়, তেমনি প্রাণও দেয়। হযরত আবু বকর (রা:) তাঁর ঘরের সমুদয় সম্পদ নবীজী (সা:)’র সামনে এনে পেশ করেছিলেন। অন্যান্য সাহাবাদের অবদানও ছিল বিশাল। মু’মিনের অর্থদান ও আত্মদানে মুসলিম ভূমিতে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যাই বাড়ে না, বিলুপ্ত হয় দুর্বৃত্তদের শাসন এবং প্রতিষ্ঠা পায় মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধান পালনের উপযোগী পরিবেশ। যে দেশে জিহাদ নাই সে দেশে সেরূপ পরিবেশ গড়ে উঠে না। বরং শাসক রূপে তখন ঘাড়ের উপর চেপে বসে চোর-ডাকাতগণ। বাংলাদেশে অবিকল সেটিই হয়েছে। মুসলিমদের গৌরব কালে মুসলিমদের জানমাল, শ্রম ও মেধার বেশীর ভাগ ব্যয় হয়েছে জিহাদে, ফলে নির্মিত হয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। কে মু’মিন আর কে মুনাফিক -সেটিও কোন কালে মসজিদের জায়নামাজে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েছে জিহাদে। ওহুদের যুদ্ধের সময় নবীজী (সাঃ)র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার। কিন্তু তাদের মধ্যে ৩০০ জন তথা শতকরা ৩০ ভাগই ছিল মুনাফিক -যারা নবীজী (সা:)’র জিহাদী কাফেলা থেকে সিটকে পড়ে। তারা যে শুধু নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করতো তা নয়, মহান নবীজী (সা:)’র পিছনে দিনের পর দিন নামাযও পড়েছে। জিহাদ এভাবেই সাচ্চা মু’মিনদের বাছাইয়ে ফিল্টারের কাজ করে। মুখোশ খুলে যাবে এ ভয়ে মুনাফিকগণ তাই ফিল্টারের মধ্য দিয়ে যেতে ভয় পায়। এদের পক্ষ থেকে জিহাদের বিরুদ্ধে এজন্যই এত প্রচারণা। তারা তো চায়, মুসলিম সমাজ দেহে লুকিয়ে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে।

 

সাতচল্লিশের অবদান ও একাত্তরের ষড়যন্ত্র

মুসলিম জনসংখ্যা আজ  বিশাল। কিন্তু কোথায় সে সামরিক ও রাজনৈতিক বল? কোথায় সে ইজ্জত? শক্তি ও ইজ্জত তো বাড়ে অর্থত্যাগ ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে। রাজনৈতিক বল বাড়াতে যেমন চাই আত্মত্যাগী বিশাল জনবল, তেমনি চাই বিশাল ভূগোল। বিশাল ভূগোলের কারণেই ভারতের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি আজ বিশাল। অথচ ভারতে বাস করে বিশ্বের সর্বাধিক দরিদ্র মানুষ। ক্ষুদ্র কাতার, কুয়েত ও দুবাই কি মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে ৫০ গুণ বাড়িয়েও সেরূপ সামরিক ও রাজনৈতিক বল পাবে? বৃহৎ ভূগোলের বিকল্প বৃহৎ ভূগোল, অর্থ নয়। মুসলিম উম্মাহর সামরিক ও রাজনৈতিক বল বাড়াতেই ইখতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির ন্যায় মহান তুর্কি বীর বাংলার বুকে ছুটে এসেছিলেন। তেমনি এক মহান লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে উপমদেশের মুসলমানগণ নানা ভাষা, নানা প্রদেশ ও নানা বর্ণের ভেদাভেদ ভূলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম দেয়। সেটাই ছিল সাতচল্লিশের অবদান। এর মূলে ছিল প্যান-ইসলামিক চেতনা।

হিন্দু, খৃষ্টান, ইহুদী, নাস্তিক, বামপন্থি এরা কেউই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকে শুরু থেকেই মেনে নিতে পারিনি। মেনে নিতে পারেনি ভারত। কারণ ইসলাম ও মুসলিমের শক্তি ও গৌরব বৃদ্ধিতে তারা কেউই খুশি নয়, বরং সেটিকে হুমকি মনে করে। ফল দেশটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয় ১৯৪৭ থেকেই। তাদের একই মঞ্চে দেখা গেছে ১৯৭১ সালে। শত্রুপক্ষের সে ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত হন শেখ মুজিব। তার রাজনীতি ছিল ষড়যন্ত্রের রাজনীতি; এবং লক্ষ্য ছিল ভারতের সাহায্য নিয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গা। পাকিস্তানের জেল থেকে ফেরার পর সহরোওয়ার্দী উদ্দ্যানের সভায় শেখ মুজিব সে ষড়যন্ত্রের কথাটি ব্যক্ত করতে দ্বিধা করেননি। (এ নিবন্ধের লেখক সে বক্তৃতাটি নিজ কানে শুনেছেন)। সেদিন মুজিব বলেছিলেন: “বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু একাত্তর থেকে নয়, উনিশ শ’ সাতচল্লিশ থেকেই”। ১৯৪৭য়ে শুরু করা সে ষড়যন্ত্রটি বিজয়ী হয় ১৯৭১’য়ে। তখন ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসনে মৃত্যু ঘটে তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃবহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের। অথচ পাকিস্তানের সৃষ্টিতে বাংলার মুসলিমদের ভূমিকা ছিল উপমহাদেশের অন্য যে কোন ভাষার মুসলিমদের চেয়ে অধিক। তারাই ছিল দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক। নিজেদের হাতে গড়া শিশু রাষ্ট্রকে তারা নিজেরাই হত্যা করে এবং বিপুল উৎসব বাড়ায় ভারতের ন্যায় কাফের শিবিরে। মহান আল্লাহতায়ালা কি তাতে খুশি হবেন?

যে ব্যক্তি স্বর্ণের বিশাল টুকরো মামূলী পাথর মনে করে – সে স্বর্ণখন্ডটি হারিয়ে যাওয়ায় তারা মনে দুঃখ জাগে না। ফলে জীর্ণ কুঠিরে বাসও সে আহম্মকের জীবনে শেষ হয়না। তেমন এক চেতনাহীনতার কারণে বহু বাঙালীর মনে দুঃখবোধ হয়নি পলাশীর প্রান্তরে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতা অস্ত যাওয়াতে। বরং ইংরেজ বাহিনীর বিজয় উৎসব দেখতে বহু হাজার বাঙালী রাজধানী মুশিদাবাদের সড়কের দু’পাশে ভিড় জমিয়েছল। সে চেতনাহীনতার কারণে বাংলার বুকে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে বড় রকমের কোন জিহাদ হয়নি। বাঙালী মুসলিম জীবনে একই রূপ চেতনাহীনতা পুণরায় দেখা দেয় ১৯৭১’য়ে। ফলে সেদিন কাফেদের বিজয়ও তাদের নিজেদের বিজয়ে পরিণত হয়েছে। ঢাকার রাস্তায় ভারতীয় সেনাদের অনুপ্রবেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিন দুপাশে দাঁড়িয়ে প্রচন্ড বিজয়-উল্লাস করেছে।

১৯৭০’য়ে নির্বাচনে শেখ মুজিবের বিশাল সাফল্যের বড় কারণ, ভারতের সাথে ষড়যন্ত্রের সে গোপন বিষয়টি তিনি গোপন রাখতে সমর্থ হয়েছিলের। জনগণ জানলে কি তার মত ভারতীয় চর ও ষড়যন্ত্রকারিকে ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে ভোট দিত? বাংলার মুসলিমদের বড় ব্যর্থতা, একাত্তরে তারা ইসলামের শত্রুদের চিনতে ভয়ানক ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ঘুমের ঘোরে বিষাক্ত গোখরা শাপকে গলায় পেঁচিয়ে নেয়ার বিপদ তো ভয়াবহ। একাত্তরে সেটিই ঘটেছে। সে ভূলের পরিনাম হলো, আজ  শুধু পদ্মা, তিস্তা ও সুরমার পানি নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অস্তিত্বেও আজ  টান পড়েছে। বাংলাদেশে আজ  যে যুদ্ধাবস্থা তা তো একাত্তরের যুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা।

 

নবীজী(সা:)’র লিগ্যাসি ও শয়তানের লিগ্যাসি

মৃত্যুর পরও অনেকের লিগ্যাসি  বহুকাল বেঁচে থাকে। সমগ্র মানব ইতিহাসে ইসলামের সর্বশেষ নবী হযরত মুহম্মদ (সা:)’র লিগ্যাসিটি তূলনাহীন। সেটি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ গড়ার ও সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণের। তিনি ও তাঁর সাহাবাগণ ইতিহাস গড়েন মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম পালনে।  নবীজী (সা:)’র লিগ্যাসি হলো নানা বর্ণ, নানা ভাষা ও নানা ভূ-খন্ডের মানুষের মাঝে গভীর ভাতৃত্ব গড়ার। শুধ ধর্মীয় বলেই নয়, রাজনৈতিক ও সামরিক বলেও তিনি মুসলিমদের শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে দিয়ে যান। তাই স্রেফ মুর্তিপূজা, নাস্তিকতা ও নানারূপ পাপাচার থেকে মুক্তিদানই নবীজী (সা:)’র একমাত্র সাফল্য নয়, মুক্তি দিয়েছেন ভাষাপূজা, বর্ণপূজা, গোত্রপূজা ও জাতিপূজা থেকেও। অথচ সেগুলোই ছিল আরবের বুকে বহু শত বছর যাবৎ রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধের মূল কারণ। নবীজী (সা:) এভাবে তাদেরকে মুক্তি দিয়েছিলেন বিশাল প্রাণহানি ও সম্পদহানি থেকে। ফলে পারস্যের সালমান ফারসী (রা:),আফ্রিকার বেলাল(রা:), রোমের সোহায়েব (রা:)’র সাথে আরবের আবু বকর (রা:), উমর(রা:) বা আলী (রা:)’র কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে কাজে কোনরূপ সমস্যা দেখা দেয়নি। সমগ্র মানব ইতিহাসে একমাত্র সে সময়টিই ছিল সবচেয়ে গৌরবের। একমাত্র তখনই বড় বড় বিজয় এসেছে এবং নির্মিত হয়েছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সভ্যতা। ঈমানের দায়বদ্ধতা এবং সে সাথে সফলতা হলো নবীজী (সা:)’র সে লিগ্যাসি নিয়ে বাঁচায়।

মানব সমাজে শয়তানও বেঁচে আছে তার লিগ্যাসী নিয়ে। সেটি মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার। বাংলাদেশে যারা একাত্তরের চেতানার ধারক তারা বাঁচছে শয়তানের লিগ্যাসী নিয়ে। তাদের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহটি অতি প্রকট। তাদের রাজনীতিতে প্রবল হলো ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে নির্মূলের সুর। শয়তান শুধু মুর্তিপূজায় ডাকে না। ডাকে গোত্রপূজা, বর্ণপূজা, শ্রেণীপূজা, ভাষাপূজা, দলপূজা, দেশপূজা ও জাতিপূজার দিকেও। এরূপ ডাকার কাজে শয়তানের যেমন নিজস্ব পুরোহিত বাহিনী আছে, তেমনি বিপুল সংখ্যক পূজামন্ডপও আছে। আছে বিশাল প্রশাসনিক অবকাঠামোও। তথাকথিত শহীদ মিনারের নামে হাজার হাজার পূজাস্তম্ভ গড়া হয়েছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। মুর্তিপূজার ন্যায় স্তম্ভপূজায় নগ্নপদে হাজির হয় লক্ষ লক্ষ বাঙালী নরনারী।

নবীজী (সা:)’র যুগে আরব কাফেরদের মাঝে শুধু যে মুর্তিপূজা ছিল –তা নয়। ছিল গোত্রপূজা, বর্ণপূজা ও জাতিপূজা। ছিল মুসলিম নির্মূলের যুদ্ধ। জাহেলী যুগে গোত্র বা বর্ণের নামে যুদ্ধ একবার শুরু হলে সেটি আর থামতো না। পূর্বপুরুষদের শুরু করা যুদ্ধগুলিকে তাদের সন্তানেরাও বছরের পর বছর চালিয়ে যেত। বাংলাদেশের ইসলামবিরোধীগণও বেঁচে আছে শয়তানের সে লিগ্যাসি নিয়ে। একারণেই ইসলামপন্থীদের নির্মূলের যে যুদ্ধটি একাত্তরে শুরু হয়েছিল, তাদের রাজনীতিতে এখনো তা বেঁচে আছে। একাত্তরের লিগ্যাসি হলো উম্মাহর বিভক্তি ও কাফেরদের ঘরে বিজয় তুলে দেয়ার। একাত্তরে ভারতের যুদ্ধজয়ে শুধু পাকিস্তান দুর্বল হয়নি; দুর্বল হয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ। দুর্বল হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিমগণও। সে সাথে আশাহত হয়েছে ভারতের মুসলিমগণ। একাত্তরের পর দারুন ভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার কাজটি। এবং বেগবান হয়েছে মুসলিম সন্তানদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজ। একাজে দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে হাতিয়ার রূপে। রাজনীতিতে ইসলামের শত্রুপক্ষ এতটাই প্রবল যে, ইসলামপন্থিদের জন্য সামান্য স্থান ছেড়ে দিতেও তারা রাজি নয়। আগ্রাসনের শিকার হয়েছে বাংলার মুসলিম সংস্কৃতি। এবং মুসলিমগণ বিচ্যুৎ হচ্ছে ইসলামের মূল মিশন থেকে।

ইসলামের শত্রুপক্ষের স্ট্রাটেজী মুসলিম সন্তানদের স্রেফ ইসলাম থেকে দূরে সরানো নয়, বরং মুসলিম রাষ্ট্রগুলিকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করা এবং সে ক্ষুদ্র ও ভগ্ন মানচিত্র গুলোকে যুগ যুগ  বাঁচিয়ে রাখা। মুসলিম উম্মাহকে শক্তিহীন রাখার এটাই শয়তানি স্ট্রাটিজী। সে স্ট্রাটেজীর অংশ রূপেই অখন্ড আরব ভূমিকে বিশেরও বেশী টুকরোয় বিভক্ত করা হয়েছে। তাই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজটি শেখ মুজিবের একার ছিল না। প্রকল্পটি একক ভাবে শুধু ভারতেরও ছিল না। ভাঙ্গার কাজে ভারতকে যে শুধু সোভিয়েত রাশিয়া ও ইসরাইল অস্ত্র জুগিয়েছে তাও নয়। বরং এ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল শয়তানী শক্তিবর্গের আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন; এবং সেটি পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই। পাকিস্তানের মুল অপরাধটি এ ছিল না যে, দেশটিতে স্বৈরাচার বা বৈষম্য ছিল। বরং বর্বরতম স্বৈরাচারের শিকার তো আজকের বাংলাদেশ এবং বেশী আঞ্চলিক বৈষম্য তো ভারতে। শয়তানী শক্তির টার্গেট হওয়ার মূল কারণ, পাকিস্তান ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র এবং ভারতের ন্যায় একটি শত্রুশক্তির প্রতিবেশী।  

 

গৌরব গড়াতে, ভাঙ্গাতে নয়

মুসলিমদের গৌরব গড়াতে, ভাঙ্গাতে নয়। ইসলামে অতি নিন্দনীয় হারাম কাজ হলো কোন কিছু ভাঙ্গা। অকারণে গাছের একটি ডাল ভাঙ্গাও হারাম। তেমনি অতিশয় হারাম কর্ম হলো মুসলিম দেশের ভূগোল ভাঙ্গা। এজন্যই কোন মুসলিম দেশভাঙ্গায় ঈমানদারের হৃদয়ে মাতম উঠে; এবং তাতে উৎসব হয় কাফির শিবিরে। তাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গড়াটি সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে যতটা প্রশংসা কুড়িয়েছে, ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি সেটি পায়নি। ভারত ও ভূটান ছাড়া কোন মুসলিম দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে এগিয়ে আসেনি। পাকিস্তান ভাঙ্গার সে দিনটিতে অনেকেই বরং চোখের পানি ফেলেছে। (লেখক সে বর্ণনা শুনেছেন ভারত ও আফ্রিকার মুসলিমদের থেকে)। মুসলিম দেশ ভাঙ্গার এ কর্মটি বরং আনন্দের প্রচন্ড হিল্লোল তুলেছে ভারতের ন্যায় কাফের দেশগুলোতে। কলকাতার রাস্তায় সেদিন মিষ্টি বিতরণ হয়েছে। আর কাফেরগণ যা নিয়ে উৎসব করে -তাতে কি মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন? তাতে কি মুসলিমদের কোন কল্যাণ হয়?  

মুসলিম দেশের ভাঙ্গন রোধে সীমান্তের এক মুহুর্তের পাহারাদারিকে নবীজী (সাঃ) সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলেছেন। এমন একটি চেতনা কারণে সময়ের তালে মুসলিম দেশের ভূগোল বিশাল আকারে বৃদ্ধি পেলেও সে ভূগোলে শত শত বছরেও ভাঙ্গন আসেনি। অথচ ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে বহু দেশে বিভক্ত হয়েছে ইউরোপ। দেশগুলি বছরের পর বছর রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধেও লিপ্ত থেকেছে। এর বিপরীত, মুসলিমদের ইতিহাস হলো বিভক্তির দেয়াল ভাঙ্গার। দেয়াল ভাঙ্গার মধ্য দিয়েই আরব, ইরানী, তুর্কি, কুর্দি, মুর, বার্বার ও অন্যান্য ভাষার মুসলিমগণ ইউরোপের চেয়ে কয়েকগুণ বৃহৎ ভূখন্ড জুড়ে অভিন্ন উম্মাহ ও বিশাল রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। বিভক্তি তো তখনই শুরু হয়েছে যখন তারা ইসলাম থেকে দূরে সরেছে। বিভক্তি তাই পথভ্রষ্টতার দলিল। শেখ মুজিব ও তার অনুসারি বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ যে পথভ্রষ্টদের দল –তা নিয়ে কি তাই সন্দেহ থাকে?

ভাতৃত্ব, সৌহার্দ-সম্পৃতি ও একতা মুসলিম উম্মাহর জীবনে একাকী আসে না, সাথে আনে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত সাহায্যও। যুদ্ধের ময়দানে তাদের সাহায্যে এমন কি বিপুল সংখ্যয় ফেরেশতাগণও নেমে আসেন। সে সাহায্যের বরকতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হয়েছে বিশাল বিশাল শত্রু বাহিনীর উপর। পরাজিত করছে পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের ন্যায় দুই বিশ্বশক্তিকে। অনৈক্যে বিজয় জুটেনা, দেশও বাঁচে না। অনৈক্যে যা জুটে তা হলো অপমানকর পরাজয় ও গোলামী। এবং আনে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কঠিন আযাব। সে আযাবের প্রতিশ্রুতি শোনানো হয়েছে সুরা আল-ইমরানের ৫ নম্বর আয়াতে। আযাবের অংশ রূপেই লক্ষ লক্ষ মুসলিম তখন গণহত্যার শিকার হয়। শহরের পর শহর তখন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়।এবং দেশ অধিকৃত হয় শত্রুবাহিনীর হাতে। একাত্তরে বাংলাদেশে তো সেটিই ঘটেছে।

 

ঈমানদারীর দায়বদ্ধতা

মুসলিমকে শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালনের সামর্থ্য অর্জন করলে চলে না। তাকে নিজ ভাষা, নিজ বর্ণ ও নিজ জন্মভূমির বাইরে অন্য মুসলিমদের সাথেও শান্তিপূর্ণ বসবাসের সামর্থ্য অর্জন করতে হয়। সে সামর্থ্য হিন্দুদের আছে। ভারত তার দৃষ্টান্ত। ইহুদীদেরও আছে। সে দৃষ্টান্তু ইসরাইল। পাশ্চাত্যেরও আছে। সে দৃষ্টান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট। নানা ভাষার ও নানা বর্ণের মানুষ যেমন ভারতে, তেমনি ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একত্রে এক ভূগোলে বসবাস করে। কিন্তু সে সামর্থ নেই মুসলিমদের। তারা বেছে নিয়েছে ভাষা ও বর্ণের নামে ভিন্ন ভিন্ন দেশ গড়ার পথ। অথচ রাজনৈতিক একতা কাফেরদের ধর্মে ফরজ নয়। কিন্তু অন্য দেশ, অন্য ভাষা ও অন্য বর্ণের মুসলিমকে মু’মিন ব্যক্তির ভাই বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। প্রতিটি মু’মিনের উপর ঈমানী দায়বদ্ধতা হলো মহান আল্লাহতায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত সে পবিত্র ভাতৃত্বের সম্পর্কের প্রতি সম্মান দেখানো। নইলে অবমাননা হয় খোদ মহান আল্লাহতায়ালার। সে ফরজটি ১৯৪৭ সালে পালিত হয়েছিল, কিন্তু ১৯৭১’য়ে পালিত হয়নি। বরং প্রচণ্ড অবাধ্যতা হয়েছে। 

ভিন্ ভাষা, ভিন্ বর্ণ ও ভিন্ জাতীয়তার নামে মুসলিম ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ও বিভক্তিটা স্থায়ী করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সীমানার নামে দেয়াল খাড়া করা কি ঈমানদারী? নিজ গৃহে ভাইয়ের প্রবেশ রুখতে কি দেয়াল গড়া যায়? ইসরাইল বা ভারতের ন্যায় শত্রুদেশ এমন দেয়াল গড়তে পারে। কিন্তু সে দেয়াল মুসলিম দেশ গড়ে কি করে? খেলাফতের যুগে সেরূপ দেয়াল ছিল না। ফলে সে বিশাল মুসলিম খেলাফতের যে কোন প্রান্ত থেকে মক্কা-মদিনা বা অন্য কোন শহরে পৌঁছতে ভিসার প্রয়োজন পড়তো না। মুসলিম ভূমিতে আপন রূপে গৃহিত হওয়ার জন্য মুসলমান পরিচিতিটাই সে জন্য যথেষ্ট ছিল।

ভিন্ন ভিন্ন ভাষার নামে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সেগুলীর নামে বিভক্তির সীমান্তরেখাগুলি হলো মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষতিকর বিদ’য়াত। আত্মবিনাশী এ বিদ’য়াতকে বাঁচাতে গড়া হয়েছে শত শত কোটি ডলার ব্যয়ে বিশাল বিশাল সামরিক বাহিনী। শুরু হয়েছে ভিসার প্রচলন। আর আলেমদের অপরাধ হলো, ছোটখাটো বিদ’য়াত নিয়ে উচ্চকন্ঠ হলেও এরূপ বিধ্বংসী বিদ’য়াত নিয়ে তাদের মুখে কোন কথা নেই। ঈমানের রোগ নির্ণয়ে মাপকাঠি অনেক। তবে রোগটি নির্ভূল ভাবে ধরা পড়ে অন্য ভাষা,অন্য দেশ ও অন্য বর্ণের মুসলিমকে নিজ ভাই রূপে আলিঙ্গণের অসামর্থ্যতায়। কারণ, সেজন্য তো চাই ঈমানে পর্যাপ্ত বল। চাই বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের উর্দ্ধে উঠার সামর্থ্য। বাঙালী মুসলিমদের ঈমানের সে অসামর্থ্যতা প্রকট ভাবে ধরা পড়েছে একাত্তরে। স্রেফ ভাষা, বর্ণ ও জন্মস্থান ভিন্ন হওয়ার কারণে একাত্তরে হাজার হাজার বিহারীকে বাংলার বুকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষিতা হয়েছে তাদের নারীরা। জীবিতদেরকে রাস্তায় নামিয়ে তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্যকেও দখলে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে বিহারী বস্তিগুলো সে অপরাধের সাক্ষিরূপে এখনো বেঁচে আছে। এরূপ নৈতিক রোগ নিয়ে ইউরোপীয়রা বিশ্বের নানা দেশে বর্ণ ও জাতিগত নির্মূলে নেমেছে। নির্মূলের পর সেখানে নিজেদের কলোনি গড়েছে। আর বাংলাদেশের বুকে বহু দুর্বৃত্ত বাঙালী নেমেছে বিহারী মহল্লায়। বাংলাদেশের সরকার এসব  দুর্বৃত্তদের পুরস্কৃত করেছে তাদের দখলকৃত ঘরবাড়ি ও দোকানপাঠের উপর মালিকানার সনদ দিয়ে।

লক্ষাধিক নবীরাসূল একত্রে কোন জনপদে প্রেরিত হলেও কি তাদের মাঝে কোন বিরোধ সৃষ্টি হতো? তাদের মাঝে কি ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র ও সেসব রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার নামে সীমানা গড়া হতো? এক্ষেত্রে আজকের মুসলিমদের ব্যর্থতাটি বিশাল। এখানে ধরা পড়ে ঈমান বেড়ে উঠার ব্যর্থতা। শুধু নামায-রোযার মধ্য দিয়ে কি এ ব্যর্থতার আযাব এড়ানো যায়? এরূপ ব্যর্থতা নিয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় বান্দা হওয়া যায়? অনৈক্য ও বিভক্তি যে কতটা সর্বনাশা -সেটি বুঝতে কি ইতিহাস পাঠের প্রয়োজন পড়ে? প্রমাণ তো মুসলিমগণ নিজেরাই। বিশ্বে তাদের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে মুসলিম রাষ্ট্রও। কিন্তু তাতে কি তাদের শক্তি, সামর্থ্য ও প্রতিরক্ষা বেড়েছে? বেড়েছে কি স্বাধীনতা ও মান-ইজ্জত? সংখ্যায় প্রায় দেড় শত কোটি হওয়া সত্ত্বেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বিশ্বের কোন প্রতিষ্ঠানেই কি তারা সাড়ে ৬ কোটি ব্রিটিশ বা সাড়ে ৬ কোটি ফরাসীদের সামনে কি সমান অধিকার নিয়ে দাঁড়াতে পারে?

 

অর্জিত আযাব

এরূপ ব্পির্যয় ও অপমান থেকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহতায়ালা শুধু চুরি-ডাকাতি, মদ-জুয়া, ব্যাভিচার ও মিথ্যাচারকে হারাম করেননি, হারাম করেছেন ভাষা, গায়ের রং, আঞ্চলিকতা নিয়ে মুসলিম ভূগোলকে বিভক্ত করার রাজনীতি।পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার হুশিয়ারি,“সবাই মিলে তোমরা আঁকড়ে ধরো আল্লাহর রশিকে,এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়োনা।” –(সুরা আল ইমরান, অয়াত ১০৩)। এভাবে তিনি কঠোর ভাবে সাবধান করেছেন অনৈক্য থেকে বাঁচতে। আরো হুশিয়ার করেছেন এ বলে,“তোমারা তাদের মত হয়োনা,যারা সুস্পষ্ট নির্দেশ আসার পরও বিভক্ত হয়,এবং ভেদাভেদ গড়ে। এদের জন্যই নির্দিষ্ট রয়েছে বিশাল আযাব।” –(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৫)। উপরুক্ত প্রথম আয়াতটিতে পবিত্র কোরআন চিহ্নিত হয়েছে আল্লাহর রশি রূপে। মুসলিমদের উপর ফরজ হলো, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে আল্লাহর এ রশিকে আঁকড়ে ধরা ও বিভক্তি থেকে বাঁচা। দ্বিতীয় আয়াতটিতে স্পষ্ট হুশিয়ারি হলো, আল্লাহতায়ালার আযাব নামিয়ে আনার জন্য মুর্তিপূজারি বা নাস্তিক হওয়ার প্রয়োজন নেই। সে জন্য মহান আল্লাহতায়ালার রশিকে পরিত্যাগ করা ও নিজেদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টিই যথেষ্টে। বিভক্তির চুড়ান্ত রূপটি হলো বিভক্ত রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রগুলির নামে গড়ে উঠা দেয়াল। বিগত বহু শত বছর যাবত মুসলিম চেতনায় মহান আল্লাহতায়ালার এ হুশিয়ারিটি মুসলিমদের মাঝে এতটাই প্রকট ভাবে বেঁচেছিল যে মুসলিম জনগণ কখনোই মুসলিম ভূখন্ডকে বিভক্ত করার কাজে অংশ নেয়নি। ভাষা,  বর্ণ,অঞ্চলের নামে দেশও গড়া হয়নি। এমন কি ১৯৭১’য়েও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোন ইসলামি দলের নেতাকর্মী, কোন আলেম বা কোন পীর-মাশায়েখ পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থণ করেনি। সে লক্ষে তারা ভারতে যায়নি এবং অস্ত্রও ধরেনি।

বাংলাদেশের মুসলিমগণ আজ  ভয়ানক আযাবের গ্রাসে। দেশে আজ যুদ্ধাবস্থা। তবে এ আযাব তাদের স্বহাতে অর্জিত। যে পাপের কারণে এ আযাব তাদেরকে ঘিরে ধরেছে সেটির শুরু আজ নয়, বরং একাত্তরে। একাত্তরে যাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তাদের কাছে মহান রাব্বুল আলামীনের উপরুক্ত হুশিয়ারিটি আদৌ গুরুত্ব পায়নি। তাদের হাতে আল্লাহর রশিটি যেমন ছিল না, তেমনি ছিল না মুসলিম উম্মাহর একতা, সংহতি ও কল্যাণের ভাবনা। তারা তো ধরেছে ভারতের রশি। ভারতের রশির টানেই তারা দিল্লিতে গিয়ে পৌঁছে। সে রশি দিয়েই শেখ মুজিব ও তার অনুসারিগণ বাংলাদেশকে ভারতের দাসত্বের জালে আবদ্ধ করে। বাঙালী মুসলিমের স্বাধীনতার কথা তাদের কাছে একটু্ও গুরুত্ব পায়নি। গুরুত্ব পায়নি মুসলিম উম্মাহর ইজ্জত-আবরুর কথাও। সেটি গুরুত্ব পেলে কি মুজিব ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষর করতো? বাস্তবতা হলো, ভারতীয় কাফেরদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে মুজিবের অনুসারিরা ভারতের সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যকে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ভারত এজন্যই বাংলাদেশের বুকে তাদের এ বিশ্বস্থ্য দাসদের চিরকাল ক্ষমতায় রাখতে চায়। এবং নির্মূল করতে চায় তাদের যারা ভারতের অধীনতা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে চায়।

তেমন একটি রাজনৈতিক প্রয়োজনে বর্তমান অবৈধ সরকারের ভোট-ডাকাতি যত কদর্য রূপেই হোক, ভারত সেটিকে শতভাগ বৈধতা দেয়। ক্ষমতা থেকে উৎখাত হলে এ দাসগণ যে ইতিহাসের আবর্জণায় যাবে -তা নিয়ে কি ভারতীয়দের মনেও কোন সন্দেহ আছে? আধিপত্যবাদি দেশ তো অন্যদেশের অভ্যন্তরে এমন দাসদেরই খোঁজে। ভারতের কাছে মুজিব ও তার বাকশালী সহরচদের কদর তো এজন্যই এত অধীক। স্বাধীনচেতা মানুষদের তারা বরং শত্রু জ্ঞান করে। ফলে বাংলাদেশে বুকে তাদের নির্মূলের এতো আয়োজন। শুধু ভারতীয় র’য়ের এজেন্ট, র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও দলীয় গুন্ডাবাহিনীই শুধু নয়, আদালতের বিচারকদেরও এ নির্মূল কাজে ময়দানে নামানো হয়েছে। পদসেবী এ দাসদের ক্ষমতায় রাখতে ভারত বরং একাত্তরের ন্যায় আরেকটি যুদ্ধ লড়ে দিতেও রাজী। সাম্রাজ্যবাদীদের সেটিই তো চিরাচরিত রীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের দাসদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সেরূপ যুদ্ধ বিশ্বের নানা দেশে লড়ছে। ভারত সেরূপ যুদ্ধ বাংলাদেশে লড়বে -তাতেই বা বিস্ময়ের কি? এ সহজ বিষয়টুকু বুঝার জন্য কি পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে? ১ম সংস্করণ ০৪/০৪/২০১৫; ২য় সংস্করণ ২৬/০২/২০২১।

 

 




ভারতের আগ্রাসী স্ট্রাটেজী এবং চ্যালেঞ্জের মুখে বাঙালী মুসলিম

ফিরোজ মাহবুব কামাল

লুন্ঠিত স্বাধীনতা

১৯৭১’য়ে ভারতের যুদ্ধজয়টি বিশাল বিজয় দিয়েছে ভারতের। সে সাথে গুম, খুন, চুরিডাকাতি ও ভোটডাকাতির ন্যায় অপরাধের অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছে ভারতীয় মদদপুষ্ট আওয়ামী বাকশালীদের। কিন্তু কতটুকু স্বাধীনতা দিয়েছে বাংলাদেশীদের? স্বাধীনতার অর্থ গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বাঁচার স্বাধীনতা। সে স্বাধীনতার আঁওতায় আসে রাজনৈতিক দল গড়া, কথা বলা, লেখালেখি করা, মিছিল-মিটিং করা ও ইচ্ছামত ভোটদানের স্বাধীনতা। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এর কোনটাই দেয়নি। সে অধিকার না থাকলে তাকে কি স্বাধীনতা বলা যায়? সেটি তো নিরেট পরাধীনতা। সে স্বাধীনতা শেখ মুজিব যেমন দেয়নি, শেখ হাসিনাও দিচ্ছে না। বরং যা দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে -তা হলো ফ্যাসিবাদি বর্বরতা। মুজিব ১৯৭১’য়েই ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। পরে সকল দলের স্বাধীনতাই কেড়ে নেয় এবং একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে। মুজিবের প্রতিষ্ঠিত রক্ষি বাহিনী কেড়ে নেয় প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। মুজিব ও হাসিনা উভয়েই নিজেদের গদি বাঁচাতে বেছে নিয়েছে ভোট ডাকাতির পথ। স্বাধীন ভাবে কথা বললে বা লিখলে গুম-খুন ও রিমান্ডে গিয়ে নৃশংস নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কথা হলো, এরূপ অধিকারহীনতাকে স্বাধীনতা বললে পরাধীনতা কাকে বলে? যে স্বাধীনতা ১৯৪৭’য়ে মিলেছিল, সেটি কি ১৯৭১’য়ে মিলেছে? পরাধীনতার এ নৃশংস জনককে স্বাধীনতার জনক বললে যা প্রতিষ্ঠা পায় তা হলো বিকট মিথ্যা। অথচ ইতিহাস চর্চার নামে বাংলাদেশে সে মিথ্যাচর্চাকে প্রকট করা হয়েছে।   

মুজিবের একদলীয় শাসনের অবসানের পর যখনই স্বাধীন ভাবে বাঁচার চেষ্টা হয়েছে, তখনই ভারত সেটিকে সন্দেহের চোখে দেখেছে এবং তা চিত্রিত হয়েছে ভারত-বিরোধীতা রূপে। ভারতের সাবেক প্রেসেডেন্ট প্রনব মুখার্জির ভাষায় সেরূপ স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচাটি হলো, ভারতের radar’য়ের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। প্রনব মুখার্জি হুংকার দিয়েছেন, বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে সে সুযোগ দেয়া হবে না। প্রশ্ন হলো, তবে কি বাংলাদেশকে বাঁচতে হবে ভারতের radar’য়ের ছত্রছায়ায়? এবং বাঁচতে হবে কি ভারতের সমর্থনপুষ্ট ভোটডাকাতিকে মেনে নিয়ে? এটিই কি একাত্তরের অর্জন? জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার বিলুপ্ত হলে বিলুপ্ত হয় স্বাধীনতা। তখন যা প্রতিষ্ঠা পায় সেটি হলো পরাধীনতা। ভারত তো সেটিই চায়। ভারত নিজের সে ইচ্ছাটি বাস্তবায়ন করেছে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ও তাদের দল আওয়ামী লীগের গোলামী-সুলভ সহযোগিতা নিয়ে। হাসিনা নিজের সে ভারতসেবী গোলামীকে চিত্রিত করে ভারতের একাত্তরের ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দায়বদ্ধতা রূপে। যুক্তিটি এমন, ভারত যেহেতু জন্মের সাথে জড়িত, বাংলাদেশকে বাঁচতে হবে ভারতের প্রতি বিরামহীন গোলামী নিয়েই। বস্তুত এটিই মুজিব-তাজুদ্দীনের চেতনা -যা থেকে জন্ম নিয়েছিল মুজিবেব ২৫ দফা ও তাজুদ্দীনের ৭ দফা গোলামী চুক্তি। প্রশ্ন হলো, চেতনায় এরূপ গোলামী নিয়ে কি স্বাধীনতা বাঁচানো যায়?

 

কারণ: ইসলামভীতি

ভারতের এরূপ স্বাধীনতা বিরোধী নীতির মূল কারণ ইসলামভীতি। এখানে ভয়টি হলো, জনগণ স্বাধীনতা পেলে ইসলামের বিজয়ী হবে এবং মুসলিমগণ আবার বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠবে। পরাধীন রাখাটাই জনগণকে শক্তিহীন করার মোক্ষম হাতিয়ার। সিংহকে খাঁচায় রাখলে সেও বিড়ালের ন্যায় শক্তিহীন জীবন পায়। একাত্তরে ভারতের বিজয়ের পর বাংলাদেশ তেমনি এক খাঁচায় পড়েছে। ফলে পাকিস্তান আমলে মিছিল-মিটিং, কথা বলা ও লেখালেখির যে স্বাধীনতা ছিল -তা এখন শুধু কল্পনাই করা যায়। ভারত ও তার সেবাদাসদের লক্ষ্য, বাংলাদেশীদের জন্য সে পরাধীনতাকেই দীর্ঘায়ু দেয়া।

২০১৩ সালের ৮ নভেম্বর তারিখে দৈনিক প্রথম আলো দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটি আলোচনা সভার খবর ছেপেছিল। সে আলোচনাতে যে বিষয়টি প্রকট ভাবে ফুটে উঠেছিল তা হলো ভারতীয় রাজনৈতীক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের প্রচণ্ড ইসলামভীতি। সে সভায় ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম শরণ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত দুই সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ও পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশ এখন যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে মৌলবাদের মোকাবিলাই তাদের রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা ঠিকমতো করতে না পারলে কয়েক বছর ধরে উন্নয়নের যে ধারা অব্যাহত আছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলও অশান্ত হয়ে উঠবে।“দ্য সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজ” আয়োজিত এ গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশ থেকেও কয়েকজন যোগ দেন। বাংলাদেশের ২০১৪ সালের নির্বাচন ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক ও অচলাবস্থা, তাকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং ধর্মীয় মৌলবাদের ক্রমে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার বিষয়গুলো এ আলোচনায় প্রাধান্য পায়। দৈনিক প্রথম আলো লিখেছে, বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ও আবুল বারকাত মনে করেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রী, শান্তিপ্রিয় ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের কাছে বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থানই এ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বীণা সিক্রি মনে করেন, জামায়াত ও হেফাজত বাংলাদেশে অস্থিরতা আনতে চাইছে, তারা জঙ্গি ইসলামি শাসন কায়েম করতে চায়। সে জন্য তারা মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখতে চায়। তাদের অভিযোগ, বিএনপির শাসনামলেও জামায়াত এ কাজই করেছে। আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের প্রসঙ্গও। পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, আমেরিকা যেভাবে জামায়াতকে নরম মৌলবাদী বলে মনে করে, তা বিপজ্জনক। মৌলবাদ নরম বা কঠোর হয় কি না, সে প্রশ্ন ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে মার্কিন মনোভাব। সে বিষয়ে পিনাকরঞ্জন মনে করেন, বাংলাদেশে জামায়াতের ধারক-বাহক বিএনপি যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মদদ পাচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখনই বেড়েছে ইসলামি জনতার সমাবেশ এবং ধ্বনিত হয়েছে “নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর” তখনই কাঁপন শুরু হয়েছে ভারতীয় শিবিরে। এটিকেই তারা বলছে মৌলবাদের উত্থান। এবং উল্লেখ্য হলো, মৌলবাদী মাত্রই তাদের কাছে সন্ত্রাসী। এখন এটি সুস্পষ্ট, ভারতীয়দের ঘুম হারাম করার জন্য আনবিক বোমার প্রয়োজন নাই, রাজপথে “আল্লাহু আকবর” ধ্বনিই যথেষ্ট। এ ধ্বনির মাঝেই তারা সন্ত্রাসের গন্ধ পায়। বোমার চেয়েও যে এ ধ্বনি শক্তিশালী -সেটিও বার বার প্রমাণিত হয়েছে। ফিরাউন ও তার বিশাল বাহিনীর মনে ভয় ধরাতে তাই বোমা লাগেনি; সেটি শক্তিটি ছিল মুসা (আ:)’র তাওহীদের দাওয়াত। পৌত্তলিক ভারতীয়গণও তাই আতংকিত “আল্লাহু আকবর”য়ের ভয়ে। আওয়ামী লীগের নৌকার তলা যে ধ্বসে গেছে এবং সেটি যে আর ভাসানো সম্ভব নয় -সেটি ভারতীয় নেতারাও বুঝে। ফলে বেড়েছে তাদের দুর্ভাবনাও। ১৯৭৫’য়ের ১৫ই আগষ্টে মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচার নিপাতের পর এতবড় দুর্ভাবনায় ভারত এর আগে কখনোই পড়ে নাই। সে দুর্ভাবনা নিয়েই তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিষ্টার মনমোহন সিং বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে। ভারতের ন্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যটি হলো মুসলিম দেশগুলিতে ইসলামের জাগরণ ঠ্যাকানো; গণতন্ত্র বাঁচানা বা মানবাধীকার প্রতিষ্ঠা দেয়া নিয়ে তাদের কোন আগ্রহ নেই। নইলে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত মিশরের প্রথম প্রেসিডেন্ট ডক্টর মহম্মদ মুরসীর বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানকে কেন সমর্থন দিবে? কেনই আলজিরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থিদের বিজয় নস্যাৎ করতে সামরিক বাহিনীর ক্যুদেতা’কে সমর্থন দিবে? 

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণও টের পেয়েছে, নিরপেক্ষ নির্বাচনে তাদের বিজয় অসম্ভব। ক্ষমতায় থাকার জন্য একটিই পথ; সেটি ভোট-ডাকাতির পথ। শেখ হাসিনা এজন্যই বেছে নিয়েছে গুম, খুন, সন্ত্রাস ও ভোট ডাকাতির পথ। ভারতীয়দের ন্যায় মার্কিনীরাও বুঝে ফেলেছে, কোন নিরপেক্ষ নির্বাচনেই হাসিনাকে বিজয়ী করা আর সম্ভব নয়। খুনি হাসিনাকে এমুহুর্তে ক্ষমতায় রাখতে হলে তাদের নিজেদেরকে বা ভারতকে অস্ত্র ধরতে হবে। অথবা হাসিনার ভোট-ডাকাতিকে সমর্থন দিতে হবে। মার্কিনীদের সমস্যা, বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের বিজয় রোধে তাদের নিজেদের যুদ্ধ করার সামর্থ্য নাই। আফগানিস্তান ও ইরাকের দীর্ঘ যুদ্ধ তাদেরকে কাহিল করে ফেলেছে। এতটা কাহিল তারা অতীতের দু’টি বিশ্বযুদ্ধেও হয়নি। বাংলাদেশে সে কাজে যেমন হাসিনাকে চায়, তেমনি তার পাশে ভারতকেও চায়। কিন্তু ভারতের সমস্যাটিও কম নয়। দেশটির সেনাবাহিনী দুইটি বৃহৎ অভ্যন্তরীন যুদ্ধে দীর্ঘকালীন যাবত লিপ্ত। একটি কাশ্মিরে,অপরটি বাংলাদেশের উত্তরপূর্বে অবস্থিত ৭টি রাজ্য জুড়ে। এ দুটি এলাকা পরিণত হয়েছে ভারতের জন্য ভিয়েতনামে। বহু অর্থ ও বহু রক্ত ব্যয়েও ভারত সরকার সে যুদ্ধ শেষ করতে পারিনি। অথচ একাত্তরে পূর্বপাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে সৈন্য-সংখ্যা ছিল তার চেয়ে সাত গুণ অধীক ভারতীয় সৈন্যের অবস্থান কাশ্মীরে। অথচ কাশ্মিরের জনসংখ্যা মাত্র ৯০ লাখ। ফলে ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ভারত সৈন্য নামাবে কোন সাহসে? অথচ “বিডিনিউজ-২৪” এর সুদীব ভৌমিক টাইমস অব ইন্ডিয়া’য় প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভারতীয়দের প্রতি তেমন একটি যুদ্ধেরই দাওয়াত দিয়েছেন। তবে ভারত সরকারের কৌশলটি হলো, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে গণতন্ত্রের নির্মূলে যুদ্ধে নামানো। সে কাজে রাজী করানোর জন্য তাদের সামনে মূলা ঝুলানো হয়েছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষি বাহিনীতে চাকুরির। ২০১৩ সালে শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যায় সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট-ডাকাতিতে সহযোগিতা দিয়ে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রমাণ করেছে তারা বাকশালী স্বৈরাচারকে সুরক্ষা দেয়ার কাজে হাজির।  

 

শত্রুশিবিরে বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ

উপমহাদেশের রাজনীতিতে ভূমিকম্প সৃষ্টির সামর্থ্য বাঙালী মুসলিমদের যে আছে -সেটি বহু বাংলাদেশী না বুঝলেও ভারতীয়রা বুঝেছে। এজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশাল অংকের ভারতীয় বিনিয়োগ। ভারতের বর্তমান কৌশলটি হলো, বাংলাদেশীদের কাঁধে অস্ত্র রেখে নিজের যুদ্ধটি লড়া। এক্ষেত্রে ভারত মিত্র রূপে ব্যবহার করছে দেশের সেক্যুলারিস্টদের। এরাই বাংলাদেশের ঘরের শত্রু। সেক্যুলারিস্টগণই হলো প্রতিটি মুসলিম দেশে ইসলামের সবচেয়ে বড়শত্রু। মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামের বিরুদ্ধে বড় বড় অপরাধগুলো কাফেরদের দ্বারা হচ্ছে না। বরং হচ্ছে মুসলিম নামধারি এসব সেক্যুলারিস্টদের হাতে। এরাই মুসলিম বিশ্বের বিশাল মানচিত্রকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরোয় বিভক্তি করেছে এবং তা নিয়ে বিজয় উৎসব করে। মুসলিমদের উপর যেখানেই আঘাত, সেখানেই তাদের উৎসব। তাই শাপলা চত্ত্বরে হাজার হাজার মানুষকে হতাহত করা হলেও বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের মনে সেদিন কোন দংশন হয়নি। বরং বিপুল আনন্দে তারা উৎসব করেছে। তেমনি বিবেকহীনতা মিশরের সেক্যুলারিস্টদেরও। কায়রোর রাজপথে সামরিক বাহিনী যখন মুসলিম ব্রাদারহুডের সহস্রাধিক কর্মীকে হত্যা করে তখন সে নৃশংস হত্যাকান্ডকে তারা সমর্থণ করেছে। একই চিত্র পাকিস্তানেও। জেনারেল মোশাররফের শাসনামলে ইসলামাবাদের লাল মসজিদের আঙিনায় শত শত ছাত্রীদের উপর সেনাবাহিনী গুলি চালায় ও তাদের হত্যা করে। আর সে নৃশংসতাকেও সমর্থণ দিয়েছে সেদেশের সেক্যুলারিস্টগণ। ইসলামের উত্থান রুখতে এমন কোন হীনকর্ম নাই যা এরা করে না।

ইউরোপ,আমেরিকা বা ভারতে বসবাসকালে এসব সেক্যুলারিস্টদের চেতনায় নিজ নিজ মাতৃভাষা, নিজ সংস্কৃতি, নিজ বর্ণ ও নিজ গোত্রভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার কোন ভাবনা উদয় হয় না। বরং নিজ ভাষা ও নিজ স্বাতন্ত্রতা ভূলে আলো-পটলের ন্যায় সেখানকার সাংস্কৃতিক মেল্টিং পটে হারিয়ে যাওয়াতেই তাদের আনন্দ। অথচ কোন বৃহৎ মুসলিম দেশে বসবাস কালে তাদের কাছে সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় নিজ ভাষা, নিজ বর্ণ ও নিজ গোত্রভিত্তিক রাজনীতি বাঁচানোর এজেন্ডা। অন্যভাষী মুসলিমগণ তাদের কাছে তখন হত্যাযোগ্য শত্রু গণ্য হয়। পাকিস্তান আমলে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের কাছে অসম্ভব গণ্য হয়েছিল অবাঙালী পাকিস্তানীদের সাথে একরাষ্ট্রে বসবাস করা। অথচ তাদের সে সমস্যাটি দেখা দেয় না ভারতে বসবাসকারি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের সাথে বসবাসে। সেটি ইউরোপ-আমেরিকাতেও হয় না। কারণ তাদের দুষমনিটা ভারতের বিরুদ্ধে যেমন নয়, তেমনি পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধেও নয়। তাদের শত্রুতা তো ইসলাম ও মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ক্ষুদ্রতা নিয়ে বেড়ে উঠার উগ্র নেশাগ্রস্ততার কারণেই এসব সেক্যুলারিস্টদের হাতে উসমানিয়া খেলাফত, পাকিস্তান ও আরব ভূমির সুবিশাল ভৌগোলিক মানচিত্র টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় সীমারেখার নামে গড়ে উঠেছে বিভক্তির দুর্ভেদ্য প্রাচীর। আর এতে দারুন ভাবে শক্তিহীন হয়েছে মুসলিম উম্মাহ।

 

গাদ্দারি ইসলামের মৌল বিশ্বাসের সাথে

মুসলিম-রাষ্ট্র-নাশক ভয়ানক জীবদের অবস্থান শুধু যে মুসলিম দেশের সেক্যুলার দলগুলিতে -তা নয়। তাদের উপস্থিতি তথাকথিত বহু ইসলামি দলেও। নইলে সেসব ইসলামী দলেই বা কেন মুসলিম রাষ্ট্রবিনাশের দিবসগুলিতে বর্ণাঢ্য মিছিল ও বিজয়-উৎসব হবে? শুধু তাই, ১৯৭১’য়ে যারা ভারতীয় কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে কাফেরদের বিজয়ী করতে যুদ্ধ করলো তাদের প্রতি প্রশংসায় এসব ইসলামী দলের বহু নেতাকর্মীরাই এখন গদ গদ। মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়া যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো বিভক্তির দিনগুলিতে উৎসব করা। তাতে শক্তিশালী হয় জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম। এমন উৎসবে প্রকাশ পায় বাতিল মতাদর্শের প্রতি তাদের আত্মসমর্পন। প্রশ্ন হলো, সে হুশটি কি এসব ইসলামী দলের নেতাকর্মীদের নেই? তারা কি জানা না, দেশ বাঁচানোর লক্ষ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধটি হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে? কিন্তু সে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে অংশ নেয়ার সামর্থ্য কি এরূপ আত্মসমর্পিতদের থাকে? এমন বিভ্রান্তদের দিয়ে কি দেশের স্বাধীনতা বাঁচানো যায়? নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণ কি স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, তাসবিহ-তাহলিলের শিক্ষা রেখে গেছেন? ভাষা, বর্ণ বা আঞ্চলিকতার নামে মুসলিমদের মাঝে আজকের ন্যায় বিভক্তির দেয়াল কি সাহাবায়ে কেরামের আমলে ছিল? ছিল কি উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে? সূদ,জুয়া, কুফরি আদালত ও পতিতাপল্লির ন্যায় হারাম কাজের পাশাপাশি মুসলিম ভূমিতে এরূপ বিভক্তির সীমারেখাগুলো তো ঔপনিবেশিক কাফের শাসকদের সৃষ্টি। আজ সেগুলি বেঁচে থাকে কি করে? যাদের হৃদয়ে শরিষার দানা পরিমান ঈমান আছে -তাদের অন্তরে তো এরূপ বিভক্তি নিয়ে মাতম হওয়া উচিত, উৎসব নয়। কারণ এরূপ বিভক্তির দেয়াল ইসলামে হারাম। প্রকৃত ঈমানদার তো অংশ নিবে এসব হারাম সীমান্ত ভেঙ্গে উম্মতে ওহেদা গড়ার জিহাদে।

মুসলিম রাজনীতির মূল কথা, ইসলামের প্রতিষ্ঠা বাড়ানো এবং সে সাথে মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধি। তখন রাজনীতি স্রেফ রাজনীতি থাকে না, পবিত্র জিহাদে পরিণত হয়। যুগে যুগে মুসলিম মুজাহিদগণ তো সে কাজেই জিহাদ করেছেন এবং সে জিহাদে শহীদও হয়েছেন। কিছু ব্যক্তির মদ্পানে বা ব্যাভিচারে মুসলিম উম্মাহর এতো বড় ক্ষতি হয় না যা হয় মুসলিম ভুগোল খন্ডিত হলে। এমন বিভক্তি তো শত্রু শিবিরে উৎসব আনে। ১৬ ডিসেম্বর তো এ জন্যই ভারতীয়দের কাছে এতটা উৎসবযোগ্য। অতীতে মুসলিম রাষ্ট্রে ইজিদ বিন মোয়াবিয়া ও হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ন্যায় বহু বর্বর ও জালেম শাসক এসেছে। কিন্তু সে জন্য কি সে যুগের মুসলিমগণ মুসলিম ভূগোলে হাত দিয়েছে? খাবারের প্লেটে পোকামাকড় বসার কারণে প্লেট ভেঙ্গে ফেলাটি শিশু সুলভ পাগলামী। সুস্থ্য বিবেকের প্রকাশ তো সে প্লেট পরিস্কার করায়। তেমনি কোন মুসলিম দেশ বর্বর শাসক দ্বারা অধিকৃত হলে ইসলামের বিধান হলো, সে শাসকের নির্মূলে জিহাদ করা। কিন্তু ভয়ানক অপরাধ হলো, সে শাসকের কারণে মুসলিম দেশকে বিভক্ত করা। অতীতে দেশের বৃহৎ মানচিত্র গড়তে যে বিশাল রক্ত ব্যয় হয়েছে –একজন ঈমানদার সে ইতিহাস ভূলে যায় কি করে? তাছাড়া পবিত্র কোরআনে “পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না” বলে সে হারাম বিভক্তির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশও রয়েছে। এজন্যই ১৯৭১’য়ে কোন একটি ইসলামী দল এবং কোন একজন আলেমও পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেনি। সমর্থন করেনি কোন এক মুসলিম দেশও। সেটি ছিল নিতান্তই ভারত ও তার সেক্যুলারিস্ট দালালদের প্রজেক্ট।

পাপ বেশী বেশী করলে সে পাপ আর পাপ মনে হয়না। সে পাপ তখন দেশের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। অবিকল সে অবস্থাটি হলো মুসলিম দেশের সেক্যুলারিস্টদের। ভাষা ও অঞ্চলের নামে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি গড়ার হারাম কাজটি তারা বেশী বেশী করেছে এবং ভূলিয়ে দিয়েছে বিভক্তি গড়ার বিরুদ্ধে পবিত্র কোর’আনের ফরমান। একই ভাবে সংস্কৃতির অঙ্গ বানিয়ে নিয়েছে সূদী ব্যাংক, মদের দোকান, জুয়ার আসর ও ব্যভিচার পল্লি নির্মাণের ন্যায় পাপকে। এরূপ পাপ নিয়ে বাঁচার সংস্কৃতি প্রবল হওয়াতেই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার পাপকে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের কাছে আদৌ পাপ মনে হয়নি। এবং তাদের কাছে গুনাহ গণ্য হয়নি ভারতের ন্যায় কাফেরদের কোলে আশ্রয় নেয়া ও তাদের অস্ত্র নিয়ে তাদেরকে বিজয়ী করায় যুদ্ধ করা। একাত্তরে তো সেটিই হয়েছে। আর যেসব ব্যক্তি সেসব হারাম কাজে নেতৃত্ব দিয়েছে তাদেরকে জাতির পিতা বলে মাথায়ও তুলেছে। এদের কারণেই মুসলিম উম্মাহ আজ ৫৭টি টুকরায় বিভক্ত। আর সেক্যুলার সেনাবাহিনীর কাজ হয়েছে সে হারাম সীমান্তগুলীকে পাহারা দেয়া। ফলে অসম্ভব হয়ে পড়েছে বিভক্তির প্রাচীর ভেঙ্গে মুসলিম বিশ্বের ভৌগলিক সংহতি প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থান। ভারতের সেক্যুলারিস্ট হিন্দুগণ অন্ততঃ ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে এমন বিভক্তির পথে এগুয়নি। মুসলমান নামধারি ব্যক্তি ইসলামী বিধির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী তথা মুনাফিক হলে সে যে কাফেরদের চেয়েও নীচে নামতে পারে -এ হলো তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। মহান আল্লাহতায়ালা এজন্যই জাহান্নামে তাদের স্থান দিবেন কাফেরদেরও নীচে।–(হাদীস)। এরাই দেশে দেশে ইসলামের আন্তর্জাতিক শত্রুপক্ষের সবচেয়ে বড় মিত্র। ভারত এদের কাঁধে বন্দুক রেখেই বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে চায়।

 

শত্রুর ঘাঁটি দেশের অভ্যন্তরে

কোন মুসলিম দেশে ইসলামের অভ্যুত্থান দেখা দিলে সেক্যুলারিস্টদের কাজ হয় রাজনীতিতে সেনাবাহিনীকে ডেকে আনা। কারণ, মুসলিম দেশগুলোতে সেনাবাহিনীই হলো সবচেয়ে সেক্যুলার ইন্সটিটিউশন। ফলে চিন্তা-চেতনায় সেনাবাহিনীর সদস্যরাই সেক্যুলারিষ্টদের সবচেয়ে বিশ্বস্থ্য মিত্র। সেটি দেখা গেছে মিশরে। দেখা গেছে তুরস্কে। দেখা গেছে আলজেরিয়াতেও। বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণও সম্ভবত সে পথেই এগুবে। আলজেরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থিগণ যখন বিপুল ভাবে বিজয়ী হচ্ছিল তখনই সে বিজয় রুখতে নৃশংস সামরিক জান্তাদের ক্ষমতা দখলে ডেকে আনা হয়। আর সামরিক অভ্যুত্থান একাকী আসে না, সাথে রক্তপাতও আনে। তাই আলজিরিয়ায় লক্ষাধিক মানুষের জীবন নাশ হয়েছে সে অভ্যুত্থানসৃষ্ট গৃহযুদ্ধে। আর সামরিক বাহিনী তো এরূপ ক্ষমতা দখলের কাজে দু’পায়ে খাড়া। মুসলিম দেশগুলিতে তাদের অপরাধের তালিকাটি বিশাল। এরাই গণতন্ত্র ও ইসলামের শত্রু। এজন্যই স্বৈরাচারী শাসনকে বিজয়ী করতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে ভোটডাকাতি অংশ নিতে দেখা যায়।

বস্তুত মুসলিম দেশগুলিতে সেক্যুলারিস্টদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুরক্ষিত ঘাঁটিটি কোন রাজনৈতিক দল নয়। পতিতাপল্লি, মদ্যশালা বা ক্লাব-ক্যাসিনাও নয় বরং সেটি হলো সামরিক বাহনী। ক্যান্টনমেন্টগুলো হলো মুসলিম দেশের মাঝে অনৈসলামিক ধ্যানধারণা ও সংস্কৃতির সুরক্ষিত দ্বীপ। এগুলো প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল ঔপনিবেশিক কাফের শাসকগণ। ইসলাম ও নিজ দেশের মুসলিম সংস্কৃতি নিজেই এখানে বিদেশী। ট্রেনিংয়ের নামে পাশ্চাত্য দেশ থেকে সামরিক অফিসারগণ যতটা পায় সামরিক প্রশিক্ষণ তার চেয়ে বহুগুণ বেশী পায় মগজ ধোলাই। ট্রেনিং শেষে ফিরে আসে তারা কাজ করে শত্রুশক্তির বিশ্বস্থ্য মিত্ররূপে। মুসলিম দেশগুলোতে এরাই হলো বিদেশী শত্রুদের বিশ্বস্থ্য সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বন্ধু। উসমানিয়া খেলাফতের পতন তখন থেকেই শুরু হয় যখন প্রশিক্ষণের জন্য অফিসারদের পশ্চিমা দেশে পাঠানো শুরু হয়। এশিয়া-আফ্রিকার কোথাও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিপদে পড়লে আজও তাদেরই ডাক পড়ে। এদের কারণেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান থেকে ইংরেজগণ বিতাড়িত হলেও পাক-সেনাবাহিনীতে মদ্যপান ও ব্যাভিচার বেঁচেছিল আর বহু দশক। এরাই বার বার দখলে নিয়েছে পাকিস্তানকে এবং দেশটিকে ইসলামী রাষ্ট্র বানানোর প্রজেক্ট বানচাল করে দিয়েছে। কামাল পাশার নেতৃত্বে এরাই খেলাফতের ন্যায় ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করেছে। তুরস্কের নির্বাচিত ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দারেসকে সে দেশের সেনাবাহিনীই ফাঁসীতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল। ইসলামী চেতনার প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীন আরবাকানকে এরা শুধু তাঁর পদ থেকেই হটায়নি, তার জন্য রাজনীতিও নিষিদ্ধ করেছিল। মিশরের ইতিহাসের সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড.মুরসীকে এরাই বন্দী করেছে এবং বিনা চিকিৎসায় কারাগারে হত্যার ব্যবস্থা করেছে। এবং রাজপথে হত্যা করছে তার সমর্থকদের।

আগ্রাসনের ভারতীয় স্ট্রাটেজী

বাংলাদেশের বুকে ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদে জেগে উঠার সুযোগটি প্রতি মুহুর্তের। তা থেকে দূরে থাকার অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা ও মিশনের সাথে গাদ্দারি। তাছাড়া দেশের সেক্যুলারিস্টদের ইসলাম বিরোধী কদর্য অপরাধগুলো কি এখন গোপন বিষয়? সাধারণ জনগণও এ অপরাধীদের গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে চায়। তাদেরকে আবর্জনার স্তুপে ফেলার এখনই সময়। কিন্তু ভারত তাদের বন্ধুদের এ অবস্থায় দেখতে রাজি নয়। কারণ, তাতে ভারতের নিজের স্বার্থহানি। তাই ভারতও যুদ্ধ চায়। শুধু আওয়ামী লীগের কাঁধে নয়, সেনাবাহিনীর কাঁধেও অস্ত্র রেখে ভারত তার নিজের যুদ্ধটি লড়তে চায়। ভারতের বিনিয়োগ তাই শুধু তাদের রাজনৈতীক ও সাংস্কৃতিক সেপাইদের পিছনে নয়, সেনাবাহিনীর অফিসারদের পিছনেও। সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল মঈনকে দিল্লিতে ডেকে নিয়ে ভারত সরকার কি শুধু ঘোড়া উপহার দিয়েছিল? আরো কি কি দিয়েছিল সেটি জেনারেল মঈন ও তার সহচরগণই ভাল জানে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছিল তো সে বিনিয়োগের ফলেই।

তাছাড়া বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে ভারতের নতজানু সেবাদাস কি শুধু জেনারেল মঈন ছিল? সেটি হলে তো বুঝতে হবে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত হাজার হাজার ভারতীয় গোয়েন্দাদের দিবারাত্রের কাজ শুধু ঘোড়ার ঘাস কাটা। ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর রুচি ও নৃশংসতা যে কতটা গভীর -সেটি তো ধরা পড়ে শাপলা চত্বরে হাজার হাজার সৈন্যের সমাবেশ ও নিরস্ত্র মুসল্লিদের উপর লক্ষাধিক রাউন্ড গুলি বর্ষণ। তাছাড়া সে নৃশংসতা লাগাতর প্রমাণ করছে র‌্যাবের অফিসার ও সেপাহীরাও। তারাই তো বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে ইসলামি বই বাজেয়াপ্ত করছে। হানা দিচ্ছে হিজাবী ছাত্রীদের পাঠচক্রে। হানা দিচ্ছে বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের অফিসে। তাছাড়া শেখ হাসিনা তার শাসনামলে পুলিশ, RAB ও সেনাবাহিনীকে সাঁজিয়েছে ইসলামপন্থিদের দমনের গ্রান্ড স্ট্রাটেজীকে সামনে রেখে। এবং তার অবৈধ সরকার জনগণকে বাধ্য করছে সে হারাম কাজে রাজস্ব জোগাতে।

ভারতের লক্ষ্য বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়, দেশটির স্বাধীনতা নয়। দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নও নয়। গণতন্ত্রের প্রতি সামান্যতম আগ্রহ থাকলে তবে কেন গণতন্ত্র হত্যাকারি বাকশালী মুজিবের প্রতি এত প্রশংসা? ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতির পরও কেন শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থণ? বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি সামান্য আগ্রহ থাকলে তবে কেন চাপিয়ে দেওয়া হলো তাজুদ্দীনের হাত দিয়ে ৭ দফা ও মুজিবের হাত দিয়ে ২৫ দফা দাসচুক্তি? আর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন? বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় শত্রু হলো ভারত। সেটি প্রমাণিত হয় ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরপরই। পাত্রের তলা ধ্বসে গেলে সে পাত্রে যত কিছুই ঢালা হোক না কেন তা বেরিয়ে যায়। দেশের ক্ষেত্রে সে তলাটি হলো দেশের সীমান্ত। সুরক্ষিত সীমান্তই দেশের সম্পদ নিজ দেশে ধরে রাখে। তাই প্রতিদেশেই রীতি হলো, শুধু যুদ্ধকালে নয়, প্রতি দিনের প্রতিটি মুহুর্ত সীমান্ত পাহারা দেয়া। একাজে বিরতি চলে না। কিন্তু ভারত সে অবিরাম পাহারাদারি বাংলাদেশ সীমান্তে হতে দেয়নি। মুজিবামলে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে পাকিস্তান আমলের সে সুরক্ষিত সীমান্তই বিলুপ্ত করেছিল। আর হাসিনা বিলুপ্ত করেছে বিডিআর। মুজিবের কু-কুর্মের ফলে পাকিস্তান আমলের সোনারূপা, কাঁসাপিতল, কলকারখানার যন্ত্রপাতিই শুধু নয়, বিদেশীদের দেয়া রিলিফের মাল এবং কাঁচা পাটও ভারতের বাজারে গিয়ে উঠে। বাংলাদেশ হারায় পাকিস্তান আমলের অর্জিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাট ও পাটবস্ত্র উৎপাদনকারি দেশের মর্যাদা। সেটি ছিনতাই হয় ভারতের হাতে। বাংলাদেশের ললাটে জুটে বিশ্বের তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি হওয়ার অপমান। সে সময় শুরু হয় শত শত কোটি টাকার জাল নোট ছেপে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিনাশের ষড়যন্ত্র।ফলে আসে অর্থনৈতীক মড়ক ও দুর্ভিক্ষ। তাতে মৃত্যু হয় বহু লক্ষ বাংলাদেশীর। এ সবই হলো ভারত ও তার দাসশাসকদের অপরাধ।

ভারতের এবারের লক্ষ্য শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা খর্ব করা নয়। নিছক অর্থনৈতিক বিনাশও নয়। মূল লক্ষ্যটি হলো, ইসলামের জাগরণ রুখা। কারণ, তারা জানে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ভারতের জন্য কোন চ্যালেঞ্জ নয়। অর্থনৈতিক ময়দানেও বাংলাদেশ ভারতের প্রতিদ্বন্দী নয়। কিন্তু উপমহাদেশের রাজনীতিতে অপ্রতিরোধ্য বিপ্লব আনতে পারে ইসলামী বাংলাদেশ। এবং সে সামর্থ্য রয়েছে বাংলাদেশের। কারণ সে জন্য অর্থবল লাগে না। আনবিক বোমাও লাগে না। লাগে ঈমানের বল। লাগে জিহাদ। আফগানিস্তানের তিন কোটি মানুষের জিহাদ বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র সোভিয়েত রাশিয়ার ভূগোলকে গুড়িয়ে দিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে দেশটির বিশ্বশক্তির মর্যাদা। স্বাধীনতা দিয়েছে ৬টি মুসলিম দেশকে। এবং ২০ বছরের যুদ্ধে ধ্বস নামিয়েছে মার্কিন অর্থনীতিতেও। সে তুলনায় বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ কি কম? ভারত কি সোভিয়েত রাশিয়া বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী?

 

যে চ্যালেঞ্জের মুখে বাঙালী মুসলিম

মুসলিম হওয়ার অর্থ স্রেফ নামাযী বা রোযাদার হওয়া নয়, আল্লাহর দ্বীনের লড়াকু মুজাহিদ হওয়াও। নামায-রোযার পাশে তাঁকে আমৃত্যু জিহাদ নিয়েও বাঁচতে হয়। এটি তো নবীজী (সা:)’র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। সাহাবাদের জীবনে সে সূন্নত ছিল বলেই শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলাম ও মুসলিমদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ইখতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির মাত্র ১৭ জন মুজাহিদ দিয়ে। এখন তো দেশটিতে স্বঘোষিত মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের মাঝে মুজাহিদদের সংখ্যা ক’জন? প্রশ্ন হলো, আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে মুজাহিদ না হলে কি মুসলিম হওয়া যায়? ফলে যে যুদ্ধ সাহাবীদের জীবনে এসেছিল, সে যুদ্ধ অধিকৃত বাংলাদেশের বাঙালি মুসলিমদের জীবনে আসবে না সেটিই বা কীরূপে ভাবা যায়? তাছাড়া ইসলামকে পরাজিত রাখার লক্ষ্যে এ মুসলিম ভূমিতে শত্রুশক্তির লড়াই তো লাগাতর। শত্রুর লাগাতর হামলার মুখে নীরব ও জিহাদ বিমুখ নিষ্কৃয় থাকাটি কি ঈমানদারী?

বাংলাদেশের মাটিতে যারা মুসলিম রূপে বাঁচতে চায় ও ইসলামের বিজয় চায় -তাদের দায়ভারটি বিশাল। স্রেফ লাখ লাখ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ার মধ্য দিয়ে সে দায়ভার পালিত হয়না। ঘরে হাতি ঢুকলে যেমন সব কিছু তছ নছ করে দেয়, তেমনি রাষ্ট্র শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃত হলে লাখ লাখ মসজিদ-মাদ্রাসাকেও অকার্যকর করে দেয়। তখন মাদ্রাসার ছাত্রদেরও পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের শিরকপূর্ণ গান গেতে বাধ্য হতে হয়। নিষিদ্ধ হয় পবিত্র কোরআনের তাফসির। নিয়ন্ত্রিত হয় জুম্মার খোতবা। কেউ শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চাইলে তাকে সন্ত্রাসী বলে হত্যা করা হয়। এজন্যই রাষ্ট্র ও তার বিশাল সামরিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামো শয়তানী শক্তির হাতে থাকতে দেয়াটি হারাম। তখন সে অধিকৃতি থেকে মুক্তি দিতে প্রতিটি মুসলিমের উপর জিহাদ ফরজ হয়ে যায়। সে ফরজ পালনে মহান নবীজী (সা:) নিজে ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছেন এবং সে রাষ্ট্রের প্রধান হয়েছেন। সে রাষ্ট্রের শক্তি ও প্রতিরক্ষা বাড়াতে সাহাবগণ শহীদ হয়েছেন। কুফরি রাষ্ট্রের সে মহাবিপদ থেকে মুক্তি দিতেই ইখতিয়ার মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী হাজার হাজার মাইল দূর থেকে বাংলায় ছুটে এসেছিলেন। বাংলার মানুষের এত বড় কল্যাণ কি আর কেউ করেছে? বাংলার মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তো তিনিই। কিন্তু সে মুসলিম রাষ্ট্র আবার অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে। তারা অসম্ভব করে রেখেছে নবীজী (সা:)’র প্রতিষ্ঠিত ইসলামে -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শুরা, শরিয়ত, হুদুদ, প্যান-ইসলামিক মুসলিম ঐক্য এবং জিহাদ। এ পরাজিত অবস্থায় মুসলিমগণ কি স্রেফ দোয়া-দরুদ পাঠের মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সারবে?

নামাযের বিকল্প যেমন স্রেফ নামায, তেমনি জিহাদের বিকল্প স্রেফ জিহাদ এবং ইসলামী রাষ্ট্রের বিকল্প একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই। মুসলিমদের তাই শুধু নামায-রোযার হাকিকত বুঝলে চলে না, বুঝতে হয় শত্রুর লক্ষ্য ও স্ট্রাটেজীকেও। বাঁচতে হয় সে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে। বাংলাদেশের বুকে সে প্রবল শত্রুটি হলো আধিপত্যবাদী ভারত ও তার দোসরগণ। তাই বাঙালি মুসলিমের লড়াই স্রেফ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতিষ্ঠা নিয়ে নয়। নিছক আওয়ামী বাকশালীদের নির্মূলও নয়। বরং লড়াই এখানে সরাসরি ভারত ও তার পদসেবী সৈনিকদের বিরুদ্ধে। আর ভারতের সে সৈনিকদের অবস্থান শুধু সীমান্তের ওপারে নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও।

 

জিহাদ কেন অনিবার্য?

মুসলিম দেশ ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত হলে বা সে দেশের উপর হামলা হলে জিহাদ সেখানে ফরজে আইন তথা সবার উপর বাধ্যতামূলক হয়। দেশের প্রতিটি নাগরিকই তখন যোদ্ধা। সমগ্র দেশ তখন ক্যান্টনমেন্ট। সে যুদ্ধে যোগ না দেয়াটি তখন মুনাফিকি। মু’মিনের জীবনে ইসলাম শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত আনে না, লাগাতর জিহাদও আনে। জিহাদ এখানে ইসলামের সনাতন স্ট্রাটেজী। কোর’আনের ছত্রে ছত্রে রয়েছে সে জিহাদের তাগিদ।বলা হয়েছে, “তোমাদের প্রস্তুতি কম হোক বা বেশী হোক অভিযানে বেরিয়ে পড়, জিহাদ করো আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ও প্রাণ দিয়ে। এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা জানতে।”-(সুরা তাওবা, আয়াত ৪১)। এ আয়াতে বিশাল প্রস্তুতির অপেক্ষায় কালক্ষেপনের সুযোগ দেয়া হয়নি। বিশেষ করে তখন যখন মুসলিম ভূমি ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে অধিকৃত। মুসলিমদের প্রস্তুতির কমতি মহান আল্লাহতায়ালা তখন ফেরেশতাদের দিয়ে পূরণ করেন। আর এটিই তো সিরাতুল মুস্তাকীম যা মু’মিনকে জান্নাতে নিয়ে পৌঁছায়। যে পথে জিহাদ নেই তাকে কি তাই সিরাতুল মুস্তাকীম বলা যায়? জিহাদহীন সে পথে চলে কি জান্নাতপ্রাপ্তির কল্পনা করা যায়? নবীজী (সা:)’র আমলে তো তেমন এক সিরাতুল মুস্তাকীমের পথেই লাগাতর জিহাদ শুরু হয়েছিল। সে সময় ইসলাম কবুলের অর্থ শুধু নামাযের জামায়াতে হাজির হওয়া ছিল না, জিহাদের ময়দানে হাজির হওয়াও। যার মধ্যে জিহাদ নাই এবং সে জিহাদে জানমালের কোরবানীর কোন নিয়েতও নেই,নবীজী (সা:) তাকে মুনাফিক বলেছেন।

তাই মু’মিনের জীবনে জিহাদের অংশগ্রহণ এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা। কারণ, সে তো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ক্রয়কৃত দাস। পবিত্র কোর’আনে ঈমানদারের সে পরিচিতিটি তুলে ধরা হয়েছে এভাবে,“নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের থেকে তাঁর জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। তাঁরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে এবং (সে পথে তারা শত্রুদের) নিধন করে এবং নিজেরাও নিহত হয়। তাওরাত,ইঞ্জিল ও কোরআনে এ বিষয়ে তাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আর কে আল্লাহ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর? তোমরা আল্লাহর সাথে যে সওদা করেছো তার জন্য আনন্দ প্রকাশ করো,কারণ এটিই তো মহাসাফল্য।”-(সুরা তাওবা, আয়াত ১১১)। তাই ঈমানদারির প্রকৃত পরিচয় এবং সে সাথে এ জীবনে সাফল্যের পথ শুধু কালেমায়ে শাহাদত পাঠ নয়।স্রেফ নামায-রোযা আদায়ও নয়। বরং সেটি হলো মহান আল্লাহর রাস্তায় নিজের জান ও মালের কোরবানীতে চুক্তিবদ্ধ হওয়া। এটিই মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ বাণিজ্য।এবং সেটি মহান আল্লাহর সাথে। মানব জীবনে প্রকৃত সফলতা আসে তো এ পথেই। মহান আল্লাহতায়ালার এ ঘোষণাটির উপর যার ঈমান আছে, তার জীবনে জিহাদ এবং সে জিহাদে জানমালের কোরবানীর জজবাটি তাই অনিবার্য কারণেই সৃষ্টি হয়। তাই জিহাদ যেমন মৌলবাদ নয়, তেমনি চরমপন্থি সন্ত্রাসও নয়। বরং মু’মিনের জীবনে এটিই হলো ইসলামের স্বাভাবিক প্রকাশ।

সে জিহাদের ঢেউই বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছিল আজ থেকে ৮ শত বছরেরও বেশী কাল আগে। এবং সে জিহাদের বরকতেই মুক্ত হয়েছিল আজকের চেয়েও বিশাল ও অখন্ড বাংলা। কিন্তু ১৭ জন মুজাহিদের হাতে যে বাংলা সেদিন স্বাধীন হয়েছিল -তা এখন অধিকৃত ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। আর শত্রুপক্ষের অধিকৃতিতে কি ইসলাম নিয়ে বাঁচা সম্ভব? অধিকৃতির কারণেই দেশে শরিয়তি বিধান নাই, বিলুপ্ত হয়েছে সংবিধানে আল্লাহতায়ালার উপর আস্থার বানী, নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তাফসির মাহফিল এবং গুলি চালানো হয়েছে নিরস্ত্র মুসল্লিদের উপর। এবং শহীদ মুসল্লিদের লাশ ফেলা হয়েছে ময়লার গাড়িতে! দেশটিতে সূদ নিষিদ্ধ নয়; নিষিদ্ধ নয় পতিতাপল্লি ও জ্বিনার বানিজ্য। কিন্তু নিষিদ্ধ করা হয়েছে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে রাজনৈতিক সংগঠন করা। সে সাথে শুরু হয়েছে মুর্তি নির্মাণ ও মুর্তিপূজা। এসবই হচ্ছে ১৭ কোটি মুসলিমের দেশে। বাঙালী মুসলিমের জীবনে এর চেয়ে বড় পরাজয় ও এর চেয়ে বড় লজ্জার আর কি হতে পারে? এরূপ অধিকৃত মুসলিম দেশে জিহাদ তথা ইসলামকে বিজয়ী করার লড়াই থাকবে না -তা কি কোন মুসলিম ভাবতে পারে? প্রথম সংস্করণ ১৭/১১/২০১৩, দ্বিতীয় সংস্করণ ২৫/০২/২০২১

 

 




ভাষা-আন্দোলন: বাঙালী সেক্যুলরিস্টদের ষড়যন্ত্র ও নাশকতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

লক্ষ্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক 

১৯৫২’এর ভাষা-আন্দোলনের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলার স্বীকৃতি ছিল না। বরং পাকিস্তান এবং যে প্যান-ইসলামী চেতনার ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তার বিনাশ এবং ইসলামী চেতনাবর্জিত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই যে পাকিস্তান খন্ডিত হয়েছে –সে কথাটি এখন বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ, হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি ও কম্যুনিস্টগণ অতি গর্বের সাথেই বলে। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হলেও ইসলামি চেতনা বিনাশের কাজটি এখনো শেষ হয়নি এবং নির্মূল হয়নি ইসলামের পক্ষের শক্তি। তাই শেষ হয়নি ভাষা আন্দোলনের নামে বাঙালীর চেতনা জগতে সেক্যুলার ধারার সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক বিপ্লবের কাজ। তাই এ আন্দোলনের একটি প্রবল আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক এজেন্ডাও আছে। এ আন্দলোনের লক্ষ্য ছিল বাঙালী মুসলিমের সাংস্কৃতিক কনভার্শন। তেমন একটি আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক এজেন্ডাকে সামনে রেখেই বাংলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা রূপে স্বীকৃতি পেলেও পাকিস্তান আমলেই বেগবান করা হয়েছে বাঙালী মুসলিম সন্তানদের মাঝে স্তম্ভপূজা। হিন্দুগণ মন্দিরে গিয়ে যা করে -সেটিই করা হয় ২১ ফেব্রেয়ারীতে স্তম্ভের পাদদেশে ফুল ও ভক্তি দিয়ে। ভাষা আন্দোলনের নাশকতা তাই শুধু পাকিস্তান ধ্বংসে শেষ হয়নি। এটিকে পরিকল্পিত ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে ইসলামী চেতনার বিনাশের কাজে।

ভাষা আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের দাবী, ভাষা আন্দোলন না হলে বাঙালী জাতীয়তাবাদ কখনই এতটা প্রচণ্ডতা পেত না এবং স্বাধীন বাংলাদেশও সৃষ্টি হতো না। ১৯৪৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের একতা, কল্যাণচিন্তা, ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিরূপে মুসলিমদের আবার উত্থান -এরূপ নানা স্বপ্ন মাথায় নিয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। ভাষা-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সে স্বপ্নেরই মৃত্যু হয়েছে। তাই ইসলাম বিরোধী শক্তির এটি এক বিশাল বিজয়। বিজয় বেড়েছে ভারতের। বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, আইন-আদালত ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে ইসলামপন্থীগণ যেরূপ এক পরাজিত শক্তি এবং বিজয়ী রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তি -তার মূল কারণ তো এ ভাষা-আন্দোলন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন। উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতিতে বহু ঘটনা ঘটেছে, তবে যে ঘটনাটি ভারতের আধিপত্যবাদী হিন্দুদের প্রচুর আনন্দ জুগিয়েছে এবং সে সাথে তাদেরকে প্রচন্ড লাভবানও করেছে -তা হলো এই ভাষা আন্দোলন। এদের অনেকে ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়েও খুশি হয়েছিল। সিরাজদ্দৌলার পরাজয়কে ইংরেজদের সাথে হিন্দুগণও উৎসবযোগ্যরূপে গণ্য করেছে। কারণ, তাতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার উপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। সিরাজুদ্দৌলার চরিত্রে কালীমা লেপন করে বহু হিন্দু কবি-সাহিত্যিক বহু কবিতা, বহু উপন্যাস ও বহু নাটক লিখেছেন। অথচ সে তূলনায় মীর জাফর ও ক্লাইভের কুৎসিত রূপটি তুলে ধরা হয়েছে সামান্যই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাপদাদাগণই যে শুধু ইংরেজদের প্রশংসায় গদগদ ছিলেন তা নয়, রবীন্দ্রনাথ নিজেও ইংরেজ রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত আগমন উপলক্ষ্যে তাকে ভারতের ভাগ্যবিধাতা রূপে কবিতা লিখে প্রশংসা গেয়েছেন। “জয়ো হে, জয়ো হে, ভারত ভ্যাগ্যবিধাতা” – এ স্তুতি গেয়ে জয়োধ্বণিও দিয়েছেন। তিনি ইংরেজদর থেকে নাইট উপাধীও পেয়েছিলেন।

তবে মুসলিমগণ ১৭৫৭ সালের সে পরাজিত দুরাবস্থা থেকে গাঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারই ফল দাঁড়িয়েছিল, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে যখন থেকে ভারতে নির্বাচন দেওয়া শুরু হয়, তখন থেকে বাংলার শাসন ক্ষমতায় কোন হিন্দুকে বসতে দেইনি। অবিভিক্ত বাংলায় তিন জন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের তিন জনই ছিলেন মুসলিম। অথচ তখন মুসলিমদের সংখ্যা হিন্দুদের তুলনায় খুব একটি বেশী ছিল না। জনসংখ্যার ৫৫% হলেও অর্থনীতি, শিক্ষা, চাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মুসলিমদের পশ্চাৎপদতা হিন্দুদের তুলনায় ছিল বিশাল। তারপরও শতকরা ৭৫ ভাগ হিন্দু অধ্যুষিত কলকাতায় বসে ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল অবধি এ ১১ বছর মুসলিম প্রধানমন্ত্রী শাসন করেছে। অবশেষে ১৯৪৭ সালে হিন্দু ও ইংরেজ উভয়ের প্রবল বিরোধীতা সত্ত্বেও লড়াই করে তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল। মুসলিমদের জন্য এ ছিল বিশাল বিজয়। কিন্তু উত্থানমুখী মুসলিমদের কোমর ভেঙ্গে দেয় ভাষা আন্দোলন। মুসলিমদের মধ্যে ভাষা ও অঞ্চল-ভিত্তিক বিভক্তি, ভাতৃঘাতি লড়াই, পাকিস্তানের ধ্বংস এবং ইসলামী চেতনা বিনাশের বীজ বপন করা হয়েছিল এ আন্দোলনে। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই প্রতিষ্ঠা পায় বাংলাদেশ। ফলে যে চেতনার ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ঘটেচে তার মৃত্যু ঘটে পূর্ব পাকিস্তানে। এ জন্যই আজ মহা আনন্দ ভারতীয় আগ্রাসনবাদীদের। কারণ, ১৯৭১’য়ে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তানই শুধু বিভক্ত হয়নি,  বাংলাদেশও পাকাপোক্তভাবে ধরা দিয়েছে ভারতের ফাঁদে। এখন আর বেরুনোর পথ নেই। ভারত এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পেরেছে।

 

উৎসব শত্রু শিবিরে

নিজেদের ক্ষতিটা অনেকেই বুঝতে পারে না। তবে সে ক্ষতিটি সহজে বুঝা যায় শত্রু শিবিরে উৎসব দেখে। তাছাড়া মুসলিমদের কোন কল্যাণ হলো এবং তাতে হিন্দুগণ খুশি হবে তা কি কখনো ভাবা যায়?  আধিপত্যবাদী বর্ণহিন্দুদের কুটিল ও হিংসাত্মক চরিত্রের সাথে যাদের পরিচয়টি গভীর -তাদের অভিজ্ঞতাটি আদৌও সুখের নয়। মুসলিমদেরকে তারা ভৃত্য রূপে গ্রহণ করতে রাজী, বন্ধু হিসাবে নয়। তাদের গৃহে কোন মুসলিম দৈবাৎ প্রবেশ করলে, গোবর দিয়ে না লেপলে তা পবিত্র হয়না। সেটি বুঝা যায় ভারত সরকারের নীতিতে। মুসলিমদের তারা হিন্দুদের সমান নাগরিক অধিকার দিতেও রাজী নয়। লক্ষ লক্ষ মুসলিমদের তারা বাংলাদেশী বলে তাদের বহিস্কারের ফন্দি আঁটছে। ভারতে শতকার ১৫ ভাগ মুসলিম হলে কি হবে, সরকারি চাকুরীতে শতকরা ৫ ভাগও নাই। হিন্দু সংস্কৃতি যা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা হলো, দাঙ্গা বাধিয়ে তাদের হত্যা, ধর্ষণ ও তাদের গৃহে লুটতরাজ। হিন্দুত্ববাদীদের মিছিল-মিটিং যে স্লোগানটি অহরহ ধ্বনিত হয় তা হলো, মুসলিমদের জন্য দুটি ঠিকানা: হয় পাকিস্তকান, না হয় কবরস্থান।

কায়েদে আজম মহম্মদ তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করেন হিন্দু ও মুসলিমের মিলনের দূত রূপে। সে লক্ষ্য নিয়ে যোগ দেন কংগ্রসে।  প্রখ্যাত রাজনীতিবদি সরোজীনী নাইডু তাঁকে হিন্দু-মুসলিম মিলনের দূত বলে অভিহিত করতেন। কিন্তু অচিরেই তাঁর সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। ভগ্ন হৃদয় নিয়ে হিন্দুদের সম্পর্কে বলতেন, তারা “incorrigible” তথা সংশোধনের অযোগ্য। হিন্দুদের নিয়ে কাজ করেছেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী জনাব শেরেবাংলা ফজলুল হক। হিন্দু মহাসভা নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীকে তিনি তার মন্ত্রী সভায় নেন। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতাও প্রীতিকর ছিলনা। তিনি বলতেন, “কলকাতার হিন্দু পত্রিকাগুলো যখন আমার কোন কর্ম বা সিদ্ধান্তের পক্ষে লেখা শুরু করে, তখনই বুঝতে হবে সেটির দ্বারা মুসলিমদের জন্য বড় রকমের ক্ষতি আশংকা রয়েছে।” ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের ভেঙ্গে যাওয়া নিয়ে কোলকাতার পত্রিকাগুলো শুধু পক্ষেই লেখেনি, এখনো বছর ঘুরে প্রতি বছর ২১ ফেব্রেয়ারী এবং ১৬ ডিসেম্বর এলে কলকাতা ও দিল্লীতে উৎসব শুরু হয়। তাই মুসলিমদের ক্ষতির মাত্রা বোঝার জন্য কি কোন গবেষণার প্রয়োজন আছে? সেটি বুঝা যায় তাদের উল্লাসের মাত্রা দেখে। পরিতাপের বিষয় হলো, বাঙালী মুসলিমগণ তাদের নিজেদের কল্যাণের চেয়ে হিন্দুদের বিজয় বৃদ্ধিকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছে। এবং সেটি বাঙালী সেক্যুলারিস্ট জাতীয়তাবাদীদের নেতৃত্বে। বাংলাদেশীদের কল্যাণ নিয়ে তাদের আগ্রহ নিলে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর ভারতীয় সেনা বাহিনীকে লুটাপাটে নামতো?  উপহার দিত কি দুর্ভিক্ষ? সমস্যা হলো, গোলামেরা কখনোই মনিবের দোষগুলো দেখে না, তাদের মনযোগ স্রেফ গোলামী নিয়ে। বাংলাদেশের মাটিতে তার নমুনা হলো বাঙালী সেক্যুলারিস্ট জাতীয়তাবাদীগণ।   

 

ভাষা আন্দোলনে মিথ্যাচার

বাংলাদেশের ইতিহাসে অতি মিথ্যাচার হয়েছে বাংলা ভাষা ও ভাষা-আন্দোলনকে ঘিরে। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি হলো, বাঙালীর মুখের ভাষা নাকি পাকিস্তান সরকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। এ প্রসঙ্গে যে সত্যটিকে তারা বুঝতে রাজী নয় তা হলো, দেশের অনেক গুলো ভাষার মধ্য থেকে একটিকে রাষ্ট্র বানানোর অর্থ অন্য ভাষাগুলোকে কবরে পাঠানো নয়। বাংলা ছাড়াও পাকিস্তানে পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পশতু, বেলুচ ভাষা রয়েছে। উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা বানানোর অন্য সব ভাষার কোনটিরই মৃত্যু হয়নি। বরং সেগুলোও সমৃদ্ধ হয়েছে। সে সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ঢাকার সন্তান খাজা নাযিম উদ্দীন। তখন পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন আরেক বাংলাভাষী জনাব নুরুল আমীন। পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৫৪ সালে। বাংলা ভাষার উন্নয়নে বাংলা এ্যাকাডেমী ও বাংলা-উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশী ভাষার বিপুল সংখ্যক বইয়ের বাংলায় তরজমার কাজ তখনই শুরু করা হয়। বলা যায়, বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার কাজে সরকারি ভাবে পাকিস্তানের ২৩ বছরে যে কাজ করা হয় তা অতীতে হাজার বছরেও হয়নি। বাংলা ভাষার উন্নয়নে ভারতের পশ্চিম বাংলাতেও এত সরকারি বিনিয়োগ হয়নি।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে আরেক মিথ্যাচার হলো, দুনিয়ার আর কোথাও নাকি ভাষার নামে এতো রক্তদান হয়নি যা হয়েছে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রেয়ারীতে। অথচ হিন্দি ভাষাকে যখন দক্ষিণ ভারতের তামিলদের উপর চাপিয়ে দেয়া চেষ্টা হয়, বহু গুণ বেশী মানুষ প্রাণ দেয় সে চেষ্টা রুখতে। একই ঘটনা ঘটে আসামের কাছাড় ও করিম গঞ্জে। বহু মানুষ সেখানেও প্রাণ দেয় যখন বাংলা ভাষার উপর অসমিয় ভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়।

 

সংস্কৃতি স্তম্ভপূজার   

বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিলেও ২১শে ফেব্রুয়ারি উদযাপন বেগবান করা হয়েছে দুটি কারণে। একটি রাজনৈতিক, অপরটি আদর্শিক। রাজনৈতিক প্রয়োজনটি ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘৃনা সৃষ্টির কাজে এ আন্দোলনকে ব্যবহার করা। আদর্শিক প্রয়োজনটি হলো, বাংলার মুসলমানদের মন ও মনন থেকে ইসলামি চেতনার বিনাশ এবং সে সাথে সেকুলারিজম আবাদে সেটিকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বটে, কিন্তু সেকুলারাইজেশনের কাজ শেষ হয়নি। ফলে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে অনুষ্ঠানের প্রয়োজনও শেষ হয়নি। থেমে যায়নি প্রভাতফেরীর নামে হাজার হাজার নারীপুরুষকে একত্রে রাতের আঁধারে রাস্তায় নামানোর আয়োজন। বরং ইসলামী চেতনার দ্রুত বিকাশ এবং ইসলামী রাষ্ট্র বিপ্লবের আন্দোলন দেশে দেশে প্রবলতর হওয়ায় গুরুত্ব বেড়ে গেছে একুশে ফেব্রুয়ারির। এবং সেটি বুঝা যায় একুশে ফেব্রুয়ারি উৎযাপনের বর্তমান মাত্রা দেখে। একুশের বই মেলা পরিণত হয়েছে সেকুলার চেতনা-ভিত্তিক সাহিত্যের প্লাবন সৃষ্টির কাজে। পাকিস্তান আমলে ২১’শে ফেব্রুয়ারি পালিত হতো বছরের মাত্র একটি দিনে, এবং সেটিও মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য। এখন শুরু হয়েছে সারা দেশব্যাপী স্তম্ভপূজা। সে আমলে সেকুলার এবং বামপন্থি ছাত্র-ছাত্রীরাই শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারিতে নগ্নপদে স্মৃতীস্তম্ভে গিয়ে ফুল চড়াতো। এসব ছাত্র-ছাত্রীরা ছিল মূলতঃ আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ও সমর্থক। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা এ থেকে সচেতনতার সাথে দূরে থাকতো। যাদের মধ্যে ইসলামের সামান্য জ্ঞান ছিল এবং ইসলামের অনুশাসন পালনে সামান্য অঙ্গিকার ছিল, স্তম্ভের সামনে দাড়িয়ে তারা এমন সম্মান প্রদর্শনকে নির্ভেজাল শিরক মনে করতো।

শহীদ শব্দের অপব্যবহার ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন

আদর্শের জন্য প্রাণদান ইসলামে নতুন কিছু নয়, নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের অর্ধেকের বেশী শহীদ হয়েছেন। “শহীদ” শব্দটিও এসেছে ইসলাম থেকে। শহীদদের রক্তের বরকতেই আল্লাহর রহমত প্রাপ্তি ঘটেছিল এবং নির্মিত হয়েছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে যা কিছু গর্বের তার বেশীর ভাগের নির্মাতা তারাই। বিশ্বের সকল মুসলিমদের কাছে তাই তারা সর্বকালের পরম সম্মানের পাত্র। কিন্তু ইসলামে সম্মান প্রদর্শনেরও নিজস্ব রীতি আছে। সেটি স্তম্ভ গড়ে নয়। স্তম্ভের গোড়ায় ফুল দিয়ে স্তম্ভপূজাও নয়। রাতে বা প্রভাতে নারী-পুরুষকে রাস্তায় নামিয়েও নয়। শহিদদের স্মৃতিতে স্তম্ভ গড়া সিদ্ধ রীতি হলে শুধু মক্কা-মদীনাতে নয়, মুসলিম বিশ্বের অসংখ্য শহরে হাজার হাজার স্তম্ভ গড়া হতো। সেসব স্তম্ভে বছরের একটি দিনে শুধু নয়, প্রতিদিন ফুল দেওয়া হতো। কিন্তু সেটি হয়নি। কারণ সেটি মুসলিম সংস্কৃতি নয়। ইসলামসিদ্ধও নয়। অথচ বাংলাদেশের নগরে বন্দরের প্রতিটি স্কুল-কলেজে বহু লক্ষ স্তম্ভ গড়ে সেটিকে আজ বাঙালীর সংস্কৃতি রূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এভাবে মুসলিম জীবনে শুরু হয় চরম সাংস্কৃতিক পথভ্রষ্টতা। তাই বাঙালী মুসলিম জীবনে শতভাগ হারাম রীতি চালু করা হয় ভাষা আন্দোলনের নামে। এভাবে খুলে দেয়া হয় জাহান্নামে পথ।

এ সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতা এসেছে আদর্শিক ভ্রষ্টতা থেকে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে দেহব্যবসার মত ব্যাভিচার যেমন আইনগত বৈধতা পেয়েছে, তেমনি বৈধতা পেয়েছে আরেক হারাম কর্ম স্তম্ভপূজা। এমন সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতার পিছনে ভ্রষ্ট দর্শনটি হলো সেকুলারিজম –যার মূলকথা পরকালের ভাবনা বিলুপ্ত করে মানুষকে দুনিয়ামুখি করা। মানুষের ঢল মসজিদমুখি না করে স্তম্ভমুখি করা। বাঙালী মুসলমানদের জীবনে এভাবেই নেমে এসেছে এক ব্যাপক সাংস্কৃতিক কনভার্শন। সংস্কৃতির পথ ধরে এভাবেই চরম দুষণ ঘটেছে বাঙালী মুসলিমদের চেতনালোকে। ইসলামের শত্রুদের আজকের স্ট্রাটেজী মুসলিমদেরকে হিন্দু বানানো নয়। বরং সংস্কৃতির লেবাসে এমন সব বিশ্বাস ও রীতিনীতিতে অভ্যস্থ করা -যা ইসলামের মূল শিক্ষা থেকেই দূরে সরিয়ে নেয়। এভাবেই মুসলিমদের সরানো হচ্ছে ইসলাম থেকে। ফলে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিমের দেশে অনিবার্য পরিণতি হলো ইসলামের লাগাতর পরাজয়। এবং সেটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক অঙ্গণে।

সেক্যুলারিজমের প্রচার ও প্রভাব বাংলাদেশ সৃষ্টির পর এতটাই গভীরতর হয়েছে যে, বহু ইসলামপন্থী নেতাকর্মীও সে স্রোতে ভেসে গেছে। ফলে এখন আর শুধু আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কম্যিউনিষ্ট পার্টির নেতা-কর্মীগণই নগ্ন পদে ফুলের মালা নিয়ে স্তম্ভপূজায় হাজির হচ্ছে না, হাজির হচ্ছে তথাকথিত ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতাকর্মীও। রাজনৈতিক বিজয়ের পাশে বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের জন্য এটি হলো এক আদর্শিক বিজয়। হযরত ঈসা (আ:) ও হযরত মূসা (আ:)’র  অনুসারিদের সমস্যা এ নয় যে, তারা মু্র্তিপূজায় ফিরে গেছে। বরং তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক অঙ্গণে। এবং সে পথভ্রষ্টতার কারণেই তারা বিদ্রোহী হয়েছে আল্লাহর ফরমানের বিরুদ্ধে। ফলে সমগ্র খৃষ্টান ও ইহুদী জগতে আল্লাহর বিধান আজ পরাজিত। পুরাতন টেস্টামেন্ট বা তাওরাতের বিধানগুলো তাই শুধু কেতাবেই রয়ে গেছে। একই ভাবে গভীর ভ্রষ্টতা নেমে এসেছে বাঙালী মুসলিম জীবনে। 

ইন্সটিটিউশন পূজাপালনের

জনগণের মাঝে আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতা সার্বজনীন করার স্বার্থেও ইন্সটিটিউশন চাই। মুর্তিপুজার ন্যায় সনাতন পথভ্রষ্টতা ও মিথ্যাচার বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে মুর্তিগড়া ও এসব মুর্তির পদতলে ফুল দেওয়া হলো হিন্দুদের ধর্মীয় ইন্সটিটিউশন। সে আচার বাঁচিয়ে রাখতে বাংলার হিন্দু সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বারো মাসে তের পার্বন। গড়া হয়েছে লক্ষাধিকর মন্দির ও পূজামন্ডপ। একই আদলে বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টগণও ভাষা আন্দোলনের নামে বাংলাদেশের নগর-বন্দরেই শুধু নয়, গ্রাম-গঞ্জেও স্মৃতিস্তম্ভের নামে বিপুল সংখ্যায় ইন্সটিটিউশন গড়ে তুলেছে। চালু করেছে স্তম্ভপূজা। বস্তুত বাংলার সেকুলারিষ্টদের এটিই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন। একুশের নামে প্রতিবছর যে অনুষ্ঠান হয় সেগুলীর মূল লক্ষ্য ভাষায় সমৃদ্ধি আনা নয়, বরং তা হলো, সেক্যুলার ধারণাকে আরো প্রবলতর করা এবং সে সাথে দীর্ঘজীবী করা। এমনকি ২১ ফেব্রেয়ারীর বদলে ৮ ফাল্গুনও চালু করতে পারিনি। ভাষায় সমৃদ্ধি আনা লক্ষ্য হলে, সে জন্য কি নগ্নপদে মিছিল করা ও স্তম্ভের বেদীমূলে নত শিরে ফুলদানের প্রয়োজন পড়ে? রাষ্ট্রভাষা রূপেও কি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন পড়ে? উর্দু ভাষা ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্র ভাষা ছিল না। কিন্তু সে ভাষার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে সে আমলে। উর্দু ভাষায় পবিত্র কোরআনের বহু অনুবাদ ও বহু তফসির লেখা হয়েছে। বহু তরজমা ও বহু ব্যাখা লেখা হয়েছে হাদীস গ্রন্থগুলিরও। অসংখ্য গ্রন্থ্ লেখা হয়েছে ফিকাহ শাস্ত্র, নবী-জীবনী, সাহাবা-জীবনী, দর্শন ও ইতিহাসের উপর। সমৃদ্ধি এসেছে উর্দু প্রবন্ধ, কবিতা ও গজলে। কিন্তু বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম রাষ্ট্রে রাষ্ট্র-ভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরও বাংলা ভাষায় উন্নয়ন কতটুকু হয়েছে? বাংলা ভাষার যা কিছু উন্নয়ন হয়েছে তা হয়েছে বাঙালী হিন্দুদের দ্বারা। এবং সে উন্নয়ন হয়েছে তখন যখন বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষা ছিল না।

বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের নামে যা কিছু হয়েছে তা মূলত হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। এমন একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এখনও অপূর্ণ থাকায় একুশে ফেব্রুয়ারী পালনে সেকুলারিষ্টদের উদ্যোগে কমতি আসছে না, বরং দিন দিন সেটিকে আরো তীব্রতর করা হচ্ছে। অথচ মনযোগ নাই বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করায়। বাংলাদেশের মানুষের চেতনার উন্নয়ন, নৈতিকতার উন্নয়ন ও বাংলা ভাষার উন্নয়ন নিয়ে পশ্চিম বাংলার একজন হিন্দুর অভিমতটি শোনা যাক। পশ্চিম বঙ্গের দেবেন্দ্র ভট্টাচার্য নামক একজন শিক্ষক ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। দেশে ফিরে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের বাঙালীদের নিয়ে যা লিখেছিলেন তা থেকে কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। লিখেছিলেন, “…আপনাদের আর্ট-কালচার দেখেও আমি হতাশ হয়েছে। ২২ বছরে আপনারা এমন একটি বই প্রকাশ করতে পারেননি যা নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে উপভোগ করা যায়।… আমি হুমায়ুন আহমদের কয়েকটি বই পড়বার চেষ্টা করেছিলাম। রচনার মান অতি নিম্নমানের। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের জীবনের কোন সামগ্রিক চিত্র এর মধ্যে পেলাম না। শুনেছি, তিনি নাকি এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। তার কয়েকটা ছোট গল্প এবং একটা উপন্যাস পাঠ করার পর আমার ধারণা জন্মেছে, পাঠকের পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দেয়ার ক্ষমতা তার আছে। এর অধিক কিছু নেই। এরকম একজন লোক জনপ্রিয় হতে পেরেছেন এ দ্বারা এটাই প্রমানিত হয় যে, এদেশের শিক্ষার মান কত নীচু।” -(সরকার শাহাবুদ্দীন আহম্মদ, আত্মঘাতী রাজনীতির তিন কাল, বুকস ফেয়ার; ২০০৪)।

ভাষার দায়িত্ব

মনের ভাব প্রকাশ করার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর মাধ্যম নেই। কিন্তু শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান মানুষ রূপে বেড়ে উঠার স্বার্থে মনের ভাব প্রকাশ করাটাই একমাত্র কাজ নয়। অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জ্ঞানলাভ করাটাও। নইলে মনের ভাবেরও সভ্যতর প্রকাশ ঘটে না। তাই মাতৃ ভাষাকে শিক্ষার ভাষা, জ্ঞানের ভাষা এবং সংস্কৃতির ভাষাও হতে হয়। এ বিচারে মুসলিমদের ক্ষেত্রে ভাষার দায়িত্বটা আরো বেড়ে যায়। ভাষাকে তখন সিরাতুল মোস্তাকিম তথা জান্নাতের পথ দেখানোর দায়িত্বটা পালন করতে হয়। বান্দাহর উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর মহান রাসূল (সাঃ)’র কথাগুলোও তাই ভাষাকে শেখাতে হয়। একটি ভাষার এটিই হলো সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা -যেমন খাদ্যের সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা হলো পুষ্টি জোগানো। তাই খাদ্যে নিছক মুখরোচক স্বাদ থাকলেই চলে না। নিজ দেশে বা নিজ ঘরে খাদ্য না থাকলে এজন্যই বাঁচার তাগিদে খাদ্যের সন্ধানে নামতে হয়। নইলে অনিবার্য হয় মৃত্যূ। তেমনি চেতনার মৃত্যূ ও ঈমানের মৃত্যু ঠেকাতে মুসলিমকে এমন ভাষা শিখতে হয় যে ভাষায় ঈমানের খাদ্য মেলে। এমন এক দায়বদ্ধতার কারণেই লক্ষ লক্ষ বাংলাভাষী আজও আরবী শেখে। অনেকে উর্দুও শেখে। এভাবে অন্যভাষা শিক্ষার মধ্যে বাংলাভাষার বিরুদ্ধে শত্রুতা কোথায়? ষড়যন্ত্রই বা কোথায়? ইসলামের জ্ঞান না থাকলে মুসলিমানের পক্ষে তখন মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাই অসম্ভব। ইসলামে জ্ঞানার্জন ফরয তো মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার তাগিদেই। মাতৃভাষা ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ না হলে তখন অন্য ভাষার সাহায্য নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বাংলার মুসলিমদের একারণেই শত শত বছর ধরে প্রথমে আরবী ও ফার্সী এবং পরে উর্দু ভাষার দরবারে ছুটতে হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের বেশীর ভাগই হিন্দুদের রচিত। হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের পার্থক্য শুধু খাদ্য-পানীয়তেই নয়। দেহের খাদ্যের ন্যায় বিশাল পার্থক্য রয়েছে উভয়ের মনের খাদ্যতেও। মুসলিম নিছক সাহিত্যরস উপভোগের স্বার্থে সাহিত্য পাঠ করেনা। তাকে সে পাঠের মাধ্যমে ঈমানকেও বাঁচাতে হয়। ফলে বাঙালী হিন্দুদের রচিত বাংলা সাহিত্যে মুসলিমদের জ্ঞানগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজন পুরণ হওয়ার ছিল না। বরং তাতে ভয়ানক ক্ষতিসাধনের ভয় ছিল। কারণ হিন্দুগণ বই লিখেছেন তাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজনে। মুসলিমদের প্রয়োজন তারা পুরণ করবে সেটি কি আশা করা যায়? বিষয়টি এমন কি কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরে পড়ে। তিনি তার এক বন্ধুকে লেখা পত্রে লিখেছিলেন, “আজকের বাঙালা ভাষা যদি বাঙালী মুসলমানদের ভাব সুস্পষ্টভাবে ও সহজ ভাবে প্রকাশ করতে অক্ষম হয়, তবে তারা বাঙালা পরিত্যাগ করে উর্দু গ্রহণ করতে পারেন।” –(প্রবাসী, ১৩৪১: বৈশাখী সংখ্যা)।   

বিশ্বে ভাষার সংখ্যা বহু হাজার। কিন্তু সব ভাষার কি প্রয়োজনীয় সামর্থ্য আছে? বাংলা, পাঞ্জাবী, গুজরাতি, সিন্ধি, কাশ্মিরী, পশতু, অসমীয়, তেলেগুসহ অনেক ভাষা রয়েছে দক্ষিণ এশিয়াতেও। কিন্তু এসব ভাষায় ইসলামী জ্ঞানের বিশাল ভূবন দূরে থাক, মাত্র শত বা দেড় শত বছর আগে কোরআন ও হাদীসের কোন অনুবাদও ছিল না। সমস্যা হলো কোন ভাষায় সেটি রাতারাতি গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। এ কাজে শত শত বছর লাগে। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমগণ পূর্বে সে অভাব পুরণ করতো ফার্সী ও আরবী ভাষা শিখে। ইংরেজরা ফার্সীকে বিলুপ্ত করে দেয়। তখন উপমহাদেশের মুসলমানগণ মনযোগী হয় সম্মিলিত ভাবে উর্দু ভাষা চর্চা ও সেটিকে সমৃদ্ধ করার কাজে। তাই উর্দু ভাষার আজ যে সমৃদ্ধি তার পিছনে ভারতে বিশেষ কোন একটি প্রদেশের বা এলাকার মুসলিমদের অবদান বললে ভূল হবে। এতে অবদান রয়েছে উত্তর ভারতের মুসলিমদের সাথে দক্ষিণ ভারতের মুসলিমদেরও। অবদান রয়েছে পশ্চিম ভারতের মুসলিমদের সাথে পূর্ব ভারতের মুসলিমদেরও। এদিক দিয়ে মুসলিমগণ হিন্দুদের চেয়েও অগ্রসর ছিল। হিন্দুদের তখনও সর্বভারতীয় কোন ভাষা দূরে থাক, বর্ণমালাই ছিল না। হিন্দিতে দেবনাগরীর প্রচলন আসে অনেক পরে। তাদেরকে শব্দভান্ডার গড়ে তুলতে সাহায্য নিতে হয় সংস্কৃত ভাষার ন্যায় একটি মৃত ভাষা থেকে। অথচ মুসলিমগণ উর্দুকে সমৃদ্ধ করে আরবী ও ফার্সীর ন্যায় দুটি জীবন্ত ভাষা থেকে। ফলে উর্দু পরিণত হয় একটি প্রাণবন্ত ভাষায়। পরিণত হয় একটি প্যান-ইসলামিক ও প্যান-ভারতীয় ভাষা।

 উর্দুর সামর্থ্য ও বাংলা ভাষার দৈন্যতা

ভারতীয় উপমহাদেশের বুকে উর্দুই ছিল একমাত্র ভাষা যা বাংলা, আসাম, বিহার, উড়িষ্যা, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, হায়দারাবাদ, পাঞ্জাব, সিন্ধু, কাশ্মির, গুজরাট, মাদ্রাজসহ সর্বভারতের শিক্ষিত মুসলিমদের প্রায় সবাই বুঝতো। কিন্তু সে মর্যাদা বাংলা ভাষার ছিল না। সিন্ধি, পাঞ্জাবী, গুজরাতী বা পশতু ভাষারও ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষার করার দাবী উঠে বস্তুত সে প্রেক্ষাপটেই। তাই এটিকে বাংলার বিরুদ্ধে কি ষড়যন্ত্র বলা যায়? অথচ বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের পক্ষ থেকে সে মিথ্যাটিই লাগাতর বলা হয়ে থাকে। বাংলার পক্ষে পূর্ব পাকিস্তান থেকে যে দাবী উঠে সেটি নিছক পাকিস্তানে বাঙালীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে। কিন্তু পূর্ব বাংলার পাশাপাশি পাকিস্তানে যে আরো ৪টি প্রদেশ আছে সে বিষয়টিকে ভাষা আন্দোলনের নেতারা বিবেচনায় আনেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই তারা দাবী তুলেছে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হলেও বাংলা ছিল নিছক একটি প্রাদেশিক ভাষা, বাংলার বাইরে তার কোন গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। এমন একটি ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করলে কি পাকিস্তান লাভবান হতো? অথচ উর্দু পাকিস্তানের কোন একটি প্রদেশের ভাষা না হলেও সব প্রদেশের শিক্ষিত মানুষেরা সে ভাষাকে বুঝতো। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ হাছিলের লক্ষ্যে ভাষা আন্দোলনের নেতারা সে সত্যটা সেদিন বুঝতে রাজী হয়নি।

পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি ছিলেন গুজরাটি। উর্দু তাঁর মাতৃভাষা ছিল না। কিন্তু তাঁর নিরপেক্ষ বিচারে উর্দুর কোন বিকল্প ছিল না, কারণ উর্দুই ছিল সমগ্র পাকিস্তানের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষা। পাকিস্তানী নেতারা তখন পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতির স্বার্থে একটি মাত্র ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতি ছিলেন। একাধিক ভাষা রাষ্ট্রভাষা হলে তাতে সংহতি না বেড়ে বিভক্তি বাড়বে, সে আশংকা তাদের ছিল। সে বিষয়টি ভাষা আন্দোলনের নেতাগণও বুঝতেন। তাই পাকিস্তান ভাঙ্গা যাদের লক্ষ্য ছিল, ভাষা আন্দোলনের পিছনে তারা একতাবদ্ধ হয় এবং সেটিকে তারা রাজনীতির মূল হাতিয়ারে পরিণত করে। পাকিস্তানের তৎকালীন নেতারা যার আশংকা করেছিলেন ১৯৭১’য়ে সেটিই সত্য প্রমাণতি হয়েছে। সে সময়ের পাকিস্তানী নেতাদের ভূল-ত্রুটি যাই থাক, সে সত্যকে বুঝতে তারা ভূল করেননি।

কুপের ব্যাঙ সমুদ্রে ছেড়ে দিলে সে গর্তের তালাশ করে। বৃহৎ সমুদ্রে বাসে তার রুচি থাকে না। তেমনি বাঙালী জাতীয়তাবাদী নেতারাও নিজেদের বন্দী করে ভারত ঘেরা ক্ষুদ্র বাংলাদেশের চার দেওয়ালের মাঝে। তাই বাংলাদেশের ক্ষুদ্র মানচিত্রে ফিরে আসার সংগ্রামের শুরু একাত্তরে নয়, ১৯৪৭ থেকেই। সে সত্যটিই প্রকাশ পায় যখন শেখ মুজিব পাকিস্তানের জেল থেকে দেশে ফিরে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী সোহরোয়ার্দী উদ্দ্যানের জনসভায় বল্লেন, “স্বাধীনতার সংগ্রামের শুরু একাত্তর থেকে নয়, সাতচল্লিশ থেকেই।” বাঙালীরা নিজেদের দেশও কখনোই নিজেরা শাসন করেনি। পাল বা সেন রাজাও বাঙালী ছিল না। ফলে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের দায়িত্বভার হাতে নেওয়ার যে গণতান্ত্রিক সুযোগটি এসেছিল সে দায়ভার নেয়ার আগেই জোয়ালই ঢেলে দেয়। দেশের সংখ্যগরিষ্ঠ জনগণ কোন সংখ্যালঘিষ্টদের থেকে কখনো পৃথক হয়না। মুসলিমগণ ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে কখনোই ভারত থেকে পৃথক হয়ে পাকিস্তান বানাতো না। পাকিস্তান থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর পৃথক হওয়ার বিষয়টি সমগ্র মানব ইতিহাসে তাই এক বিরল দৃষ্টান্ত। 

 

ভাষা পূজা বনাম ঈমান বাঁচানোর তাগিদ

ইমানদারকে শুধু দেহ বাঁচালে চলে না, ঈমানও বাঁচাতে হয়। নইলে জাহান্নামে যেতে হয়। ঈমান বাঁচাতে যে ভাষায় কোর’আনের জ্ঞান পাওয়া যায় মুসলিমকে সে ভাষা থেকেই জ্ঞানাহরন করতে হয়। এটি ফরজ। ভাষা পূজায় সে কাজ উপেক্ষিত হলে ঈমানের মৃত্যু ঘটে। মিশর, সূদান, আলজেরিয়া, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো, ইরাক, সিরিয়া, লেবাননের ন্যায় বহু দেশের মানুষ সে ফরজ পালনের তাগিদে নিজেদের মাতৃভাষাকে দাফন করে আরবী ভাষাকে নিজেদের ভাষা এবং সে সাথে রাষ্ট্রের ভাষা রূপে গ্রহন করেছিল। কারণ তারা বুঝেছিল, মাতৃভাষা পূজায় জ্ঞানার্জনের ফরয পালন হবে না। তাতে আত্মা পুষ্টি পাবে না, ঈমানও বাঁচবে না। একমাত্র ইসলামী জ্ঞানই সন্ধান দেয় সিরাতুল মোস্তাকিমের। তখন মুক্তি আসে এ দুনিয়ায় ও আখেরাতে। নইলে ব্যর্থ হয় সমগ্র বাঁচাটাই। এ ঈমানী উপলদ্ধিটি বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনে ১৯৪৭’য়ের পূর্বে যেমন ছিল, ১৯৪৭’য়ের পরও ছিল। এমন একটি আত্মীক ক্ষুধা বাংলার ন্যায় পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্তপ্রদেশ ও বেলুচিস্তানের ন্যায় অ-উর্দুভাষী প্রদেশেও ছিল। ঈমানের এমন দাবীতে অনেক বাঙালী মুসলমান আরবী হরফে বাংলা লেখার চিন্তাভাবনাও করেছিলেন। তাদের যুক্তিটি ছিল, হিন্দুদের রচিত বাংলা সাহিত্য মুসলিম মানসে দুষিত চিন্তার জীবাণু ছড়াবে। পাইপ যোগে ঘরে দূষিত পানি পৌঁছতে থাকলে তাতে দেহ বাঁচে না। তেমনি ঈমানও বাঁচে না চেতনায় দূষিত দর্শনের জীবাণু পৌছতে দিলে। বাঙালী হিন্দুগণ মুসলিমদের উপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব করতে না পারলেও আজ সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব করছে তো এভাবেই। ফলে রবীন্দ্রনাথের মত মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু আধিপত্যবাদের কবি পরিণত হয়েছে বাঙালী সেকুলারিষ্টদের আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক গুরুতে। অথচ এই সেই রবীন্দ্রনাথ যিনি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে কোলকাতার রাজপথে প্রতিবাদে নেমেছিলেন। তিনি জানতেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ করার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া। মুসলিম-প্রধান পূর্ববাংলার জন্য এ ছিল ব্রিটিশ সরকারের ওয়াদা। কিন্তু মুসলিমদের সে কল্যাণ সাম্প্রদায়ীক রবীন্দ্রনাথের ভাল লাগেনি। ভাল লাগেনি কোলকাতার হিন্দু পত্রিকাগুলোরও। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তখন মক্কা বিশ্ববিদ্যালয় বলে ব্যাঙ্গ করতো। জমিদার রূপে রবীন্দ্রনাথ নিজে রাজস্ব তুলতেন পূর্ব বাংলা থেকে। অথচ তিনি তাঁর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দু-অধ্যুষিত বোলপুরে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, যে রবীন্দ্রনাথ পূর্ব বাংলার মুসলিমদের শিক্ষিত হওয়াকে পছন্দ করেননি, তার গান পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতে।

হিন্দুদের রচিত মুসলিম বিদ্বেষী বাংলা সাহিত্যের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে যারা বাংলা ভাষার হরফ পাল্টানোর পরামর্শ রেখেছিলেন তাদের যুক্তি ছিল, এতে বাঁচবে বাংলার মুসলিম মানস। এবং সংযোগ বাড়বে আরবী ও উর্দুর সাথে। এতে সমৃদ্ধি আসবে বাংলা ভাষায়। তাদের কথা, হিন্দু সাহিত্য ও মুসলিম সাহিত্য এক নয়। যেমন এক নয় উভয়ের ধর্ম, জীবনবোধ ও দর্শন। উর্দু ও হিন্দির জন্ম মূলত একই ভৌগলিক এলাকায়। কিন্তু দু’টি ভাষার মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল দেওয়াল এবং সেটি শুধু বর্ণমালার নয়, শব্দ, উপমা ও দর্শনের। একই ভূমিতে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও উর্দু ছুটেছে আরবী-ফারসীর দিকে। আর হিন্দি ছুটেছে সংস্কৃত ভাষার দিকে। ঈমান বাঁচানোর সে তাগিদে বাংলার মুসলিমদেরও অনেকে তাই আরবী হরেফে বাংলা লেখার কথা ভাবতেন। কিন্তু সে জন্য কি পাকিস্তানকে দায়ী করা যায়? কিন্তু সেটিই হয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকার উর্দুকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল -তা সত্য নয়। সেটি ছিল ধর্মপ্রাণ ও ইসলামী জ্ঞান-পিপাসু মানুষের মনের দাবী। সে দাবী ছিল ধর্মপ্রাণ বাঙালী মুসলিমদেরও। বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই এ বিষয়টি নানা ভাষাভাষী ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে চিন্তাভাবনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। একই রূপ প্রয়োজনের তাগিদে ফার্সী ভাষা রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা পেয়েছে আফগানিস্তানে। 

তবে জ্ঞানের ক্ষুধা সবার থাকে না। ক্ষুধা তো স্বাস্থ্যের লক্ষণ। স্বাস্থ্য-পতনে যেমন ক্ষুধা লোপ পায়, তেমনি ঈমানের পঁচনে লোপ পায় জ্ঞানের ক্ষুধা। বিশেষ করে ইসলামী জ্ঞানের। তখন ক্ষুধা বাড়ে অখাদ্যে। মুসলিমের ঈমানের সে পঁচনটি ধরা পড়ে জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ ও সেকুলারিজমের ন্যায় বাতিল মতবাদে দীক্ষা ও ইসলামে অঙ্গিকারহীনতার মাধ্যমে। সেটি আরো প্রকট সিম্পটম রূপে ধরা পড়ে দুর্বৃত্তিতে বার বার শিরোপা পাওয়ার মধ্য দিয়ে। ঈমানের এমন প্রকট রোগে যারা আক্রান্ত তাদের মাঝে কোরআন শিক্ষায় আগ্রহ থাকবে -সেটি কি আশা করা যায়? ইসলামী জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে আরবী, উর্দু বা অন্য কোন ভাষা শেখা এজন্যই তাদের কাছে অনর্থক মনে হয়। সেক্যুলার বা বামপন্থি বাঙালীদের কাছে ভাষার গুরুত্ব বিবেচিত হয় সে ভাষায় কথা বলা, গান করা, সাহিত্য রচনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অফিস আদালত চালানোর মধ্যে। একারণেই ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনের আকুতিটি তারা বুঝতেই পারেনি। বরং তারা মনেপ্রাণে ভয় করতো উর্দুকে। কারণ উর্দু নিছক ভাষা ছিল না, ছিল প্যান-ইসলামিক চেতনার প্রতীক। এ ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছিল এমন শত শত প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিক, আলেম ও গ্রন্থকার, যাদের মাতৃভাষা উর্দু ছিল না। উর্দু ভাষায় সবচেয়ে শক্তিশালী কবি এসেছেন পাঞ্জাব থেকে; এবং তিনি আল্লামা মহম্মদ ইকবাল। এবং সবচেয়ে শক্তিশালী গদ্য লেখক এসেছেন বাংলা থেকে; এবং তিনি হলেন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ। অনেক প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক এসেছেন হায়দারাবাদের ন্যায় দক্ষিণ ভারত থেকে। উপমহাদেশের আর কোন ভাষায় এমন নজির নেই। এতে ফল দাঁড়িয়েছিল যেখানেই উর্দু ভাষার চর্চা বেড়েছে সেখানেই জোরদার হয়েছে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব। এমন কি পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে সমগ্র ভারত জুড়ে যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট তৈরী হয় তার পিছনেও উর্দু ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজকের পাকিস্তানে এজন্যই সিন্ধুর জিএম সৈয়দের জাতীয়তাবাদী জিয়ে সিন্ধ আন্দোলন এবং সীমান্ত প্রদেশের খান আব্দুল গাফ্ফার খানের পখতুনিস্তান আন্দোলনও মারা পড়েছে। অথচ পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে প্রথম আন্দোলন শুরু করেছিল তারাই। বাংলার সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের কাছে সে ইতিহাস অজানা ছিল না, তাই তারা শুধু রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি নিয়েই খুশি থাকেনি। পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু ভাষার চর্চাকেও তারা রুদ্ধ করে দেয়। ফলে ভাষা আন্দোলনের নামে বাংলা ভাষার উন্নয়ন যা হয়েছে তার চেয়ে সেটি ব্যবহৃত হয়েছে পাকিস্তানের অবকাঠামোর মধ্যে বাঙালী মুসলমানের একাত্ম হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ রূপে। ফলে প্যান-ইসলামিক চেতনার বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলনের চেতনা পরিণত হয়েছে এক লৌহ দেয়ালে। রাষ্ট্রভাষা রূপে কোন ভাষাকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অর্থ যে সে ভাষাকে মুখ থেকে কেড়ে নেওয়া নয় -সে সত্যটুকুও বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ মেনে নিতে রাজী ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে বাংলাভাষা কোন কালেই রাষ্ট্র ভাষা ছিল না। শত শত বছর ধরে ফার্সী ভাষা বাংলাদেশে রাষ্ট্র ভাষা ছিল, তখন কি বাংলাকে বাঙালীর মুখ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল? রাষ্ট্রভাষা না হওয়াতে পাঞ্জাবী, সিন্ধি,পশতু বা বেলুচ ভাষাও কি পাকিস্তান থেকে বিলুপ্ত হয়েছে? অথচ কত মিথ্যাচার না হয়েছে এবং আজও হচ্ছে এ নিয়ে।

 প্রকল্প অশিক্ষিত করার

আসা যাক ইতিহাসের দিকে। দেখা যাক, বাংলার মুসলিমদের কাছে উর্দু কীভাবে গুরুত্ব পেল সে বিষয়টি। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশের হাতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনতা বিলুপ্ত হওয়ায় মুসলিমদের জীবনে যে শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল তা নয়, প্রচন্ড বিপর্যয় এসেছিল মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রেও। তারা যে বাংলার অর্থনীতি, বিশেষ করে বিশ্ববিখ্যাত মসলিন শিল্পকে বিনষ্ট করার লক্ষ্যে মসলিন শিল্পিদের আঙুল কেটেছিল তাই নয়, তারা প্রকল্প নেয় মুসলিমদের অশিক্ষিত করায়। এভাবে অসম্ভব করে তুলেছিল মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। কারণ, অশিক্ষায় আর যাই হোক মুসলিম হওয়া যায়। নামায-রোযা ফরজ না করে জ্ঞানার্জন ফরজ করা হয় -জ্ঞানের সে গুরুত্বের  কারণেই। ব্রিটিশদের হাতে অধিকৃত হওয়ার আগে বাংলার রাষ্ট্রভাষা এবং সে সাথে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভাষা ছিল ফার্সী। অথচ ইংরেজ শাসকেরা ফার্সীর বদলে ইংরাজীকে চালু করে এবং ফার্সী ভাষায় জ্ঞানলাভ অসম্ভব করে। ইংরেজদের হাতে এটিই ছিল মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। ব্রিটিশ শাসনের আগে বাংলায় ৪০ হাজারেরও বেশী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। বাংলার প্রায় সিকি ভাগ জমি বরাদ্দ ছিল সে মাদ্রাসাগুলো চালানোর খরচ জোগাতে। কিন্তু ইংরেজগণ সে জমি কেড়ে নেয়; ফলে বন্ধ হয়ে যায় মাদ্রাসাগুলো। এভাবেই ইংরেজগণ কার্যকর করে, বাংলার মুসলিমদের দ্রুত মূর্খ এবং সে সাথে দরিদ্র বানানোর প্রকল্প। তারা শুধু মসলিন শ্রমিকদের আঙ্গুলই কাটেনি, তাদের শিক্ষার ভাষাকেও নিষিদ্ধ করে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পে মুসলিমগণ ব্রিটিশদের প্রতিদ্বন্ধি হোক- সেটি তাদের কাম্য ছিল না। তাছাড়া শিক্ষা আত্মসচেনত করে, আগ্রাসনের মুখে প্রতিবাদী ও প্রতিরোধীও করে। সৃষ্টি করে জিহাদের জজবা। তাই ইংরেজদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ইসলামের জ্ঞানচর্চায় বাধা সৃষ্টি করা। জ্ঞানচর্চা থেকে দূরে সরলে, দূরে সরতে হয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতা থেকেও। এভাবেই অশিক্ষার সাথে অর্থনৈতিক দুর্গতিও নেমে আসে বাংলার মুসলিম জীবনে। এমন কি সেটি ধরা পড়েছে ব্রিটিশ শাসনামলের ইংরেজ আমলা ও লেখক ডব্লিও. ডব্লিও. হান্টারের চোখে। তিনি লিখেছেন, “যেসব মুসলমানদের পক্ষে একসময় দরিদ্র হওয়াই অসম্ভব ছিল এখন (ইংরেজ নীতির কারণে) তাদের পক্ষে স্বচ্ছল থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

 

বাংলা ভাষায় হিন্দু সাম্প্রদায়ীকতা

বাংলায় ইংরেজ শাসনের ফলে আনন্দ ও প্রতিপত্তি বেড়েছিল হিন্দুদের। সেটি মুসলিমদের বিস্তর ক্ষতির বিনিময়ে। ইংরেজগণ শুরুতেই বুঝেছিল, মুসলিমগণ কখনই তাদের বন্ধু হবে না। বরং সব সময়ই তাদেরকে হানাদার ভাববে। ফলে ভারত শাসনকে দীর্ঘায়ীত করার লক্ষ্যে তারা পার্টনারশিপ গড়ে তোলে হিন্দুদের সাথে। তখন সবচেয়ে বেশী সুবিধা পায় বাঙালী হিন্দুগণ। মুসলিমদের দাবীয়ে রাখার পাশাপাশি ইংরেজদের পলিসি হয় হিন্দুদের উপরে তোলা। এবং সেটি শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে। ইংরেজগণ তখন মুসলিম শাসনামলের ভূমি আইন পরিবর্তন করে চালু করে চিরস্থায়ী প্রথা যার ফলে সৃষ্টি হয় অর্থশালী হিন্দু জমিদার শ্রেণী। হিন্দুগণ তখন ইংরেজী ভাষা শেখার পাশাপাশি বাংলাভাষা গড়ে তোলাতেও মনযোগী হয়। বাংলাভাষার উন্নতি কল্পে ইংরেজ মিশনারীগণ গড়ে তোলে ছাপাখানা। বাংলাভাষায় সাহিত্য সৃষ্টিতে এগিয়ে আসে বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের ন্যায় বিশাল এক ঝাঁক সাহিত্যিক। তাদের সাহিত্যের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলার হিন্দুদের মাঝে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জাগরণ আনা। এসব হিন্দু সাহিত্যিকদের সাহিত্যে শব্দ, উপমা ও দর্শন সংগৃহীত হত সংস্কৃত ভাষায় রচিত বেদ, রামায়ন, মহাভারত থেকে। বাংলা মুসলিমদের মাতৃ ভাষা হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুদের রচিত এ সাহিত্যে মুসলিমদের মনের খোরাক ছিল না। মিটতো না তাদের শিক্ষা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন। ফলে হিন্দুদের রচিত এ সাহিত্যে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাঙালী হিন্দুদের মাঝে রেনেসাঁ শুরু হলেও মুসলমিমদের উপর তার কোন প্রভাবই পড়েনি।

 

মুসলিম রেণাসাঁ ও উর্দু

অশিক্ষা ও বিপর্যয় থেকে বাঁচবার জন্য মুসলিমদেরও নিজস্ব সাহিত্য চর্চায় হাত দিতে হয়। মুসলিমদের তখন ধাবিত হতে হয় অধিকতর সমৃদ্ধ উর্দু ভাষার দিকে। কারণ, বাংলায় ফার্সী ভাষা নিষিদ্ধ হলেও উর্দু ও ফার্সীর চর্চা জোরে শোরে চলছিল দিল্লীসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে। নিছক চাকুরী ও শিক্ষার প্রয়োজন মেটাতে আজ কোটি কোটি বাঙালী ইংরেজী শিখছে। এবং সে বিদেশী ভাষা শিক্ষায় শত শত ঘন্টা ব্যয়ও করছে। কিন্তু তখন বাংলার মুসলিমদের উর্দু ভাষা শিক্ষার আবশ্যকতা ছিল আরো বেশী। সেটি চাকুরীর প্রয়োজনে ছিল না, ছিল মুসলিম রূপে বাঁচার প্রয়োজনে। অনন্তু-অসীম জীবনের আখেরাত বাঁচাতে। এবং সে প্রয়োজনেই বাংলার বুকে গড়ে তোলা হয় নতুন মডেলের মাদ্রাসা। শুরু হয় উর্দু চর্চা। ১৯৩৭ সালে কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টির কোয়ালিশন সরকার। এরপর জোরদার হয় উর্দু শিক্ষার উদ্যোগ। ১৯৩৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক দ্বিধাহীন ভাবে ঘোষণা দেন, “আমি দৃঢ় ভাবে এ মত পোষন করি, যাদের মাতৃভাষা বাংলা, সেসব মুসলিম ছাত্রদের সবার জন্য উর্দুভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।” -(Star of India, 9 April, 1936).

এর পূর্বে ১৯৩৮ সালের ৩’রা এপ্রিল মুসলিম লীগের আসানসোল সম্মেলনে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক মুসলিমনদের সাংস্কৃতিক সংহতির স্বার্থে উর্দুকে মুসলিম ছাত্রদের জন্য বাধ্যতামূলক করার উপর জোর দেন। -(Star of India, 9 April, 1938. p6)। বাংলার মুসলিমদের সৌভাগ্য হলো, হিন্দুদের মাঝে রেনেসাঁ মুসলিমদের তুলনায় অনেক আগে শুরু হলেও তারা অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক শাসন ক্ষমতা হাতে নিতে পারেনি। শাসন ক্ষমতা যায় মুসলিম প্রধানমন্ত্রীদের হাতে এবং সেটি একযুগের বেশী স্থায়ী হয়। প্রধানমন্ত্রী হন জনাব ফজলুল হক, জনাব সোহরোওয়ার্দী্ ও জনাব নাজিমুদ্দিন। এবং সে সরকারের শিক্ষানীতির ফল হলো, সে সময় বাংলার বুকে শিক্ষিত এমন কোন বাঙালী মুসলিম পাওয়াই কঠিন ছিল যে উর্দু ভাষা জানতো না। অনেকে ফার্সীও জানতো। শুধু ফজলুল হক নন, উর্দুর পক্ষে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেন হোসেন শহীদ সোহরোওয়ার্দী। তিনি বলেছিলেন, “উর্দু এবং উর্দু ও ফার্সীর বর্ণমালা হলো আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষার দুইটি লৌহ দেওয়াল।”-(Star of India, 28th April, 193)। সৈয়দ আমির আলী বলেন, “আরবী এবং উর্দু সমগ্র ইসলামী বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের আবেগ ও অনুভূতির একতা গড়ে তোলে। একতা ছাড়া আর কোথায় অধিক শক্তির সন্ধান পাওয়া যাবে?” -(The Spirit of Islam, London, 1955)।

বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন এমনকি কিছু ইংরেজ পন্ডিত ব্যক্তিও। তখন বাংলার ডি.পি. আই. ছিলেন W.W. Hornwell । তিনি লিখেন, “The question of Urdu is the question of life of death of Mohammadan education in Bengal.” –(The Mussalman, 22 June 1917, p2-3). তার বক্তব্য ছিল, মোঘল শাসনের অবসানের পর ফার্সী চর্চাকে বাংলায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। এবং বাংলার মুসলিমদের বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। অথচ সমস্যা হলো, বাংলা ভাষা হলো হিন্দুদের সাম্প্রদায়ীক ধারণা, ঐতিহ্য এবং দর্শনের ভাষা -যা মুসলিমদের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। তার অভিমত ছিল, বাংলার মুসলিমদের বাংলা শিখতে হবে -কারণ এটি তাদের মাতৃভাষা। তবে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় হলো, সংস্কৃতির ভাষা উর্দু ও ফার্সী। তিনি এ কথাও উল্লেখ করেন, “এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুভব করেই বাংলার উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মুসলিগণ উর্দু ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।” এমন একটি উপলদ্ধি নিয়েই তিনি পরামর্শ রাখেন, বাংলার সকল মুসলিমদের জন্য উর্দু ভাষা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হোক। এছাড়া তিনি উর্দু প্রশিক্ষণ স্কুল এবং উপযোগী উর্দু পাঠ্যবই প্রস্তুতেরও পরামর্শ রাখেন। -(The Mussalman, 22 June 1917, p 2-3)।

বাংলা সাহিত্য নিয়ে হিন্দুদের অভিমত কি ছিল সেটিও দেখা যাক। শনিবারের চিঠিতে লেখক পরিমল গোস্বামী জোরের সাথে লেখেন, “বাংলা সাহিত্য হলো মূলত বাঙালী হিন্দুদের অবদান। সেহেতু বাংলার সাথে হিন্দুর আধ্যাত্মীক সংযোগ। এবং মুসলিমগণ বাংলার উন্নয়নে কোন কাজই করেনি। সুতরাং তাদের এর প্রতি কোন দরদও নেই।”-( শনিবারের চিঠি, ১০ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, কার্তীক ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা ১৩)। এ প্রসঙ্গে জয়া চ্যাটার্জীর লেখা থেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া যাক:  “বাংলার হিন্দু জাগরণের কথা লিখতে গিয়ে যদুনাথ সরকার আধুনিক বাঙলার ইতিহাসে মুসলিমদের অবস্থানকেও অস্বীকার করেন। তার কথা, আধুনিক বাঙলা হলো হিন্দু ভদ্রলোকদের সৃষ্টি। ব্রিটিশদের কাছ থেকে আহৃত দীপ্তির সাহায্যে তারা বাঙলাকে পুনরায় ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। অধিকার বলেই বাংলা তাই তাদেরই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নব জাগরণই হলো শুধু ভদ্রলোকের সংস্কৃতির প্রতীক নয়, সেই সঙ্গে একটি হিন্দু বাঙলার, যেখানে মুসলমানের ঠাই নেই। –(জয়া চ্যাটার্জী, বাঙলা ভাগ হলো; ২০০২)

উর্দু শিক্ষার গুরুত্ব বুঝাতে তখন বাংলায় গড়ে উঠে বহু সংগঠন। অনুষ্ঠিত হয় নানা শহরে সম্মেলন। ১৯১৭ সালে এমনই একটি সম্মেলন হয়ছিল বরিশালে। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বরিশাল কনফারেন্সে যে প্রস্তাবনা গৃহীত হয়েছিল তা হলো:

• আরবী ও ফার্সী ভাষার শিক্ষাদান ৭ম শ্রেণী থেকে নয়, ৫ম শ্রেণী থেকে শুরু করতে হবে

• যাদের মাতৃভাষা উর্দু নয় তাদের জন্য কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পরীক্ষায় উর্দুকে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে স্বীকৃত দিতে হবে।

• কোলকাতা মাদ্রাসা ও অন্যান্য মাদ্রাসার নিম্নশ্রেণীতে বাংলা ও উর্দুকে একে অপরের বিকল্প ভাষা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। -( The Mussalman, 11 May 1917 p3)।

১৯০৮ সালের ১৮ই এপ্রিলে পূর্ণিয়াতে অনুষ্ঠিত হয় মোহমেডান এডুকেশন কনফারেন্স। সে কনফারেন্সে সৈয়দ আব্দুল্লাহ সোহরোওয়ার্দী বাঙলার মুসলিমদের উর্দু শেখার প্রতি আহবান জানান। -(The Mussalman, 24 April 1908 p5.)। ১৯৩৩ সালে ২রা জুলাই কিদিরপুরে অনুষ্ঠিত হয় বেঙ্গল প্রাদেশিক উর্দু কনফারেন্স। সে অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে জনাব এস.ওয়াজেদ আলী মুসলিমদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র ও ঐক্যের উপর জোর দেন। তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা ও জাতি হিসাবে বেঁচে থাকার স্বার্থে উর্দু জরুরী।-(The Mussalman, 4 July 1933 p.9)। 

বাঙালী কেন উর্দু কনফারেন্স করবে? কেনই বা উর্দুর পক্ষে কথা বলবে সেটি আজকের মত সেদিনেও অনেকের মনে উদয় হয়েছিল। তখন তার ব্যাখ্যা দিতে উর্দু সম্মেলনের জনৈক সেক্রেটারি বলেন,“উর্দু সম্মেলন বিশুদ্ধভাবে মুসলিমদের নিজস্ব ব্যাপার। তাই এটি ভিতরের আহ্বান।” -(The Mussalman, 5th July, 1933, p2)। অর্থাৎ উর্দুর প্রতি তাদের এ আগ্রহের পিছনে কোন সরকারের বা গোষ্ঠীর চাপ ছিল না। বরং তারা সেটি করেছেন নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে। পুষ্টিকর খাদ্যের সন্ধানে স্বাস্থ্য-সচেতন ব্যক্তি মাত্রই নিজ গরজে রাস্তায় নামে, কারো চাপের প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাতেও উর্দুর প্রতি এমন এক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল তেমনি এক প্রয়োজনের তাগিদে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বহু বাংলাভাষী নেতা উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবী করেছিল তেমনি এক প্রেরণা থেকে। এমন একটি প্রেরণাকে কি পশ্চিম পাকিস্তানীদের চাপিয়ে দেওয়া ষড়যন্ত্র বলা যায়? উর্দুতো পাকিস্তানের কোন এলাকার ভাষা ছিল না। বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গে সে বিষয়টি আদৌ সততার সাথে বিবেচনা করেনি। 

 উর্দু ও প্যান-ইসলামীজম

ইসলামী জ্ঞানের বিশাল ভান্ডারের পাশাপাশি উর্দু ভাষার মাধ্যমে বাংলার মুসলিমদের আরেকটি রাজনৈতিক সুবিধাও হাছিল হয়। সেটি হলো, আত্মীক সম্পর্ক গড়ে উঠে ভারতের বিভিন্ন কোণের মুসলিমদের সাথে। তখন বাংলার রাজধানী কোলকাতা পরিণত হয় উর্দু ভাষার অন্যতম কেন্দ্রে। তখন ভারতের অন্য যে কোন শহর থেকে অধিক সংখ্যক উর্দু পত্রিকা ও বই ছাপা হতো বাংলার রাজধানী কলকাতা থেকে। এ শহর থেকেই তখন প্রকাশিত হত তৎকালীন ভারতের জাগরণ সৃষ্টিকারি আল-হেলাল ও হামদর্দের ন্যায় বহু উর্দু পত্রিকা। আল-হেলালের সম্পাদক ছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ। তখন তিনি খেলাফত আন্দোলনে পক্ষে জনমত গড়ে তুলছিলেন। হামদর্দের সম্পাদক ছিলেন মাওলানা মহম্মদ আলী জওহর। তিনি ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের নেতা। এসব পত্রিকার কারণেই বাংলার মুসলিমদের মাঝেই শুধু নয়, জাগরণ আসে এবং প্যান-ইসলামী চেতনা গড়ে উঠে সমগ্র ভারত জুড়ে। ফলে মহম্মদ আলী, শওকত আলী, আবুল কালাম আযাদ পরিচালিত খেলাফত আন্দোলনে একাত্ম হতে বাংলার মুসলিমদের কোনে সুবিধা হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল অনুপ্রেরণা তো এসেছিল এই প্যান-ইসলামী চেতনা থেকেই। তাই ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলো তখন রাষ্ট্র ভাষা রূপে উর্দুই প্রাধান্য পাবে -সেটিই কি স্বাভাবিক ছিল না? বরং সে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই। কিন্তু ইর্ষাকাতর বাঙালী সেকুলারিষ্টগণ সেটিকে দেখেছে বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রূপে।

মুসলিম মানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলনের নায়কদের বড় সফলতা হলো, বাঙালী মুসলমানদের হাতে এ আন্দোলনটি একটি প্রায়োরিটির তালিকা ধরিয়ে দিয়েছে। সেটি হলো, তারা প্রথমে বাঙালী। তারপর বাংলাদেশী। এবং তারপর মুসলিম। ভাষা আন্দোলন কতটা গভীরভাবে বাংলাদেশের মুসলিমদের ডি-ইসলামাইজড করেছে এ হলো তার উদাহরণ। এটি হলো সেকুলারাইজেশনের এক চুড়ান্ত বিজয়। অথচ মুসলিমদের কাছে তার মুসলিম পরিচিতিটিই মূল। আল্লাহর কাছে বিচার দিনে একমাত্র তাঁর মুসলিম পরিচিতিটাই গুরুত্ব পাবে, বাঙালী বা বাংলাদেশী পরিচয় নয়। প্রশ্ন উঠবে,তার মুসলিম পরিচিতিটি কতটা স্বার্থক, কতটা সফল ও কতটা আপোষহীন। কে কতটা বাঙালী রূপে বাঁচলো -সে প্রশ্ন সেদিন উঠবেই না। প্রশ্ন হলো, যে পরিচয় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে গুরুত্ব রাখে না -সে পরিচয় মুসলিমের কাছে এতো গুরুত্ব পায় কীরূপে? এটি কি ঈমানের স্খলন নয়? অথচ সেটিই বাঙালী মুসলিম জীবনে প্রকট।

 

 ভেসেছে ইসলামপন্থীরাও

ভাষা আন্দোলনের স্রোতে ভাষা থেকে এমন কি অনেক ইসলামপন্থীরাও রেহাই পাননি। প্রচন্ড স্রোত শুধু কচুরীপানাই ভাসায় না, ভাসিয়ে নেয় অনেক শিকড়ধারীদেরও। সে স্খলন যে কতটা ইসলামপন্থীদের আচ্ছন্ন করেছিল তার উদাহরণ দেওয়া যাক। ভাষা আন্দোলন নিয়ে ইসলামী জাগরণের কবি ফররুখ আহম্মদ লিখলেন, “মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা, খোদার সেরা দান”। তিনি ভূলেই গেলেন, মহান আল্লাহতায়ালার সেরাদান ভাষা নয়, সেটি হলো আল-কোরআন। ভাষা শেখাতে নবী পাঠাতে হয় না। ফেরেশতাদেরও দুনিয়াতে আসতে হয় না। অথচ কোর’আন শেখাতে ফেরেশতা ও নবীজী (সা:) পাঠাতে হয়েছে। তাই ভাষাকে খোদার সেরা দান বললে আল-কোরআনের মর্যাদাহানী হয়। মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা সিরাতুল মোস্তাকিম দেখায় না, পরকালীন মু্ক্তিও দেয় না। সে পথ দেখায় কোরআনী জ্ঞান। সবারই মাতৃভাষা থাকে। নিকোবর দ্বীপ ও পাপুয়া নিউগিনিতে এখনও যারা প্রস্তর যুগের অসভ্যতা নিয়ে জঙ্গলে বাস করছে তাদেরও মাতৃভাষা আছে। তবে যা নেই তা হলো তাদের জীবনে সিরাতুল মোস্তাকিম। তাই মায়ের ভাষাকে খোদার সেরা দান বলা যায় কি করে? মায়ের ভাষাতো পশুপাখীরও থাকে। মায়ের ভাষা অন্ধকারেও টানতে পারে, জাহান্নামেও নিতে পারে -যদি সে ভাষা ঈমানের খাদ্য না জুগায়। মায়ের ভাষা সেরা হলে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, সূদান, আলজিরিয়া, মরক্কো, তিউনিসা, লিবিয়ার মানুষ ইসলামের প্রাথমিক যুগে কেন মাতৃ ভাষাকে কবরে পাঠালো? ফররুখ আহমদের মত ইসলামের জাগরণের কবির এরূপ কবিতা বাংলাদেশে ইসলামের পক্ষের শক্তির অনেকের মনেই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। তার এ কবিতায় বিভ্রান্ত হয়ে ভাষা আন্দোলনের ন্যায় বাংলার মুসলিম ইতিহাসের একটি আত্মঘাতি ঘটনা নিয়েও অনেকে অহংকার করতে শিখেছে।

অপর দিকে তমুদ্দন মজলিসের নেতারা নিজেদেরকে ইসলামী তাহজিব ও তমুদ্দনের সেবক মনে করেন। অথচ তারা ভাষা আন্দোলনের নামে ইসলাম-বিদ্বেষী সেক্যুলারদের দলে ভীড়ে তাদের মাঠকর্মী রূপে খেটেছেন। ডক্টর শহিদুল্লাহও বলে বসলেন, আমি প্রথমে বাঙালী, তারপর মুসলিম। অনেকের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন সূফী রূপে। তিনি ছিলেন ফুরফুরার পীরের খলিফা। কিন্ত খলিফার মুখে একি কথা! তার প্রধানতম গর্ব ছিল বাঙালী হওয়া নিয়ে, মুসলিম হওয়া নিয়ে নয়। কথা হলো, এটা কি ইসলামের শিক্ষা? অথচ মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ দানটি বাঙালী বা অবাঙালী হওয়া নয়, সেটি মুসলিম হওয়া। অথচ ডক্টর শহিদুল্লাহর গর্ব বাঙালী হওয়া নিয়ে! প্রথম সারীর বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের এই হলো চিন্তা-চেতনার মান।

ইসলাম ব্যক্তিকে শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে নিয়ত বাঁধতে বলে না। বাঁচা-মরা ও প্রতিটি চেষ্টা-প্রচেষ্টার মধ্যেও নিয়ত বাঁধতে বলে। যেমনটি হযরত ইবরাহীম (আঃ) বেঁধেছিলেন। আর সেটি হলো, “আমার নামায, আমার কোরবানী, আমার বাঁচা এবং আমার মৃত্যু –সব কিছুই রাব্বুল আলামীন মহান আল্লাহর জন্য।” হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর এমন নিয়তে মহান আল্লাহতায়ালা এতই খুশি হয়েছিলেন যে তাঁর সে কথাগুলোকে চিরকালের জন্য সকল ঈমানদারদের জন্য অনুকরণীয় করে রেখেছেন। মুসলমানের জীবনে প্রকৃত সফলতা মিলবে কে কতটা এ নিয়ত পালনে সফল হলো তার উপর। বস্তুত মুসলিম তাঁর জীবনে ভিশন, মিশন ও প্রায়োরিটি পায় এ আয়াত থেকে। তাঁর মুসলমানিত্ব নির্ভর করে এমন মিশন নিয়ে বাঁচার মধ্যে। মুসলিমের জীবনে রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাজনীতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষা, বন্ধুত্ব ও সম্পৃতির মূল নিয়ন্ত্রক হবে এমন নিয়েত। এখানে ভাষার কোন স্থান নেই। গায়ের রং ও ভূগোলেরও কোন স্থান নেই। রোজ হাশরের বিচার দিনে মহান আল্লাহ কখনই এ প্রশ্ন করবেন না যে তোমার মাতৃভাষা কি ছিল? বরং প্রশ্ন হবে কতটুকু মুসলিম ছিলে -সেটি।

 

ভাষা আন্দোলনের নাশকতা

মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো ভাষা, বর্ণ, অঞ্চলের বিভেদ ভূলে প্যান-ইসলামিক হওয়া। এক্ষেত্রে ব্যর্থতার অর্থ ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠায় ব্যর্থতা। অর্থাৎ মুসলিম হওয়ায় ব্যর্থতা। প্রশ্ন হলো, যে ব্যক্তির জীবনে প্রথম প্রায়োরিটি হয় বাঙালী হওয়া, তার কাছে কি অন্য ভাষার মুসলিমের সাথে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে একাত্ম হওয়া গুরুত্ব পায়? অথচ মুসলিমদের কাজ তো নানা ভাষা ও নানা অঞ্চলের হয়েও এক দেহে লীন এক উম্মতে ওয়াহেদা গড়া। নামায-রোযা আদায়ের ন্যায় এটিও তো ফরয। কিন্তু যখন বাঙালী হওয়াটাই প্রায়োরিটি হয়, তখন ভাষাগত পরিচয়টিই রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ জীবনের বহু কিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে যায়। অভিন্ন বাংলা ভাষার নামে তখন অন্য বাঙালী -তা সে হিন্দু হোক, খৃষ্টান হোক, বৌদ্ধ হোক বা নাস্তিক হোক, তাদের সাথে একাত্ম হওয়াটাই গুরুত্ব পায়। তখন গুরুত্ব হারায় অন্য ভাষী মুসলিম ভাইয়ের সাথে একতা গড়ার বিষয়টি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। নানা ভাষাী মুসলিমদের মাঝে একতা গড়ার ন্যায় ফরজ কাজটি তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে বাঙালীদের মনে গুরুত্ব হারায় পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। বরং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ভারতের পশ্চিম বাংলার সাথে সম্পর্ককে ঘনিষ্টতর করা। ফলে বাঙালী মুসলিম শুধু পাকিস্তান ও উপমহাদেশের মুসলিম থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি, বরং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে মুসলিম জাহান থেকেও। তাই কাশ্মীর,ভারত বা আরাকানের মজলুম মুসলিমদের মুক্তির বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ মাথা ঘামায় না। মনে করে সেগুলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়। নির্যাতিত ফিলিস্তিনীদের জন্যও বাংলাদেশ থেকে তেমন সাহায্য যায় না। বাংলাদেশের সেকুলার রাজনীতিতে বস্তুত এগুলো কোন প্রসঙ্গই নয়।

যখন কোন মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাষা শিখে তখন তার সাথে শুধু মুখের যোগযোগই বাড়ে না, বাড়ে আত্মার সংযোগও। তখন গড়ে উঠে আত্মীক সম্পর্কও। ভাষার মূল কাজ তো এই সংযোগই গড়া। বাংলা ভাষা চর্চার পাশাপাশি উর্দু শেখার কারণে বাংলার মানুষের যে লাভটি হয়েছিল তা হলো, উপমহাদেশের অন্য মুসলিমদের সাথে তাদের মনের সংযোগটি বেড়েছিল। সে সাথে বেড়েছিল জ্ঞানের ঐশ্বর্যও। বেড়েছিল ঔদার্যতাও। এরই ফলে বাঙালী মুসলিমগণ সামর্থ্য পায় উপমহাদশের অন্য মুসলিমদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ফল দাঁড়ালো, অন্য ভাষার অবাঙালী ভাইয়েরা চিত্রিত হলো ছাতুখোর দুষমন রূপে। অথচ এক মুসলিম যে অন্য মুসলিমের ভাই – সে খেতাবটি মহান আল্লাহতায়ালার দেওয়া। তাই মুসলিমগণ একে অপরের ভাই বলবে -সেটি এক অলংঘনীয় ঈমানী দায়বদ্ধতা। নইলে গাদ্দারী হয় মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশের সাথে। অথচ বাঙালী মুসলিমের মাঝে সে গাদ্দারীই প্রবলভাবে বাড়িয়েছে ভাষা আন্দোলন। এভাবে ছিন্ন করা হয় পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মাঝে প্যান-ইসলামী বন্ধন। অথচ এটি শুধু রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক অপরাধই নয়, ইসলামের দৃষ্টিতে হারামও। এমন বিচ্ছিন্নতাই যে কোন মুসলিম জনপদে আল্লাহর আযাব অনিবার্য করার জন্য যথেষ্ট। এরূপ আযাবের জন্য পুতুল পূজার প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কোর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “এবং তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা সুস্পষ্ট ঘোষণা আসার পরও পরস্পরে মতভেদ ও বিভক্তি গড়লো। তারাই হলো সে সব ব্যক্তি যাদের জন্য রয়েছে বিরাট আযাব। -(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৫)।

মহন আল্লাহতায়ালা শুধু একতা গড়াকেই ফরয করেননি, এভাবে হারাম করেছেন বিভক্তি গড়াকেও। তাই ঈমানদার ব্যক্তি শুধু নামায-রোযাতেই মনযোগী হয় না, অতি একনিষ্ঠ হয় মুসলিমদের মাঝে একতা গড়তে এবং অতিশয় সচেষ্ট হয় বিভক্তি এড়াতেও। এমন এক সমৃদ্ধ ইসলামি চেতনার কারণেই ১৯৪৭’য়ে বাংলার মুসলিমগণ অন্যভাষী মুসলিমদের সাথে একত্রিত হয়ে পাকিস্তান গড়েছিল। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের নাশকতায় সেটি বিলুপ্ত হয়েছে। এরই ফল হলো, বাঙালী মুসলিমের মাঝে আজ থেকে শত বছর আগে যে চারিত্রিক, নৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুণ ছিল -তা আজ আর বেঁচে নাই। শত বছর আগে অন্ততঃ অন্য ভাষা, অন্য বর্ণ ও অন্য ভূগোলের মুসলিমদের ভাই বলার ঈমানী সামর্থ্য ছিল; এবং তাদের সাথে একত্রে রাজনীতি করা এবং কাফের শত্রুর বিরুদ্ধে একত্রে যুদ্ধ করারও আগ্রহ ছিল। এখন সেটি বিলুপ্ত। অন্য ভাষার মুসলিমদের সাথে শুধু ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতাই বাড়েনি, বেড়েছে মনের দূরত্বও। দিন দিন সেটি আরো গভীরতর হচ্ছে। অপর দিকে ভারতীয়দের ন্যায় কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব উৎসবে পরিণত হয়েছে। এবং সে সাথে উৎসবে পরিণত হয়েছে অবাঙালী মুসলিমদের সাথে বিচ্ছিন্নতার দিনগুলোও। তাই ১৯৫২’য়ের ভাষা আন্দোলন শুধু বাঙালীর মুসলিমের রাজনৈতিক ভূগোলই পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছে মনের ভূগোলও। এবং তা অসম্ভব করছে প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। ১ম সংস্করণ ২১/১২/২০১৭; ২য় সংস্করণ ২৩/০২/২০২১।




গণতন্ত্রের কবর ও সন্ত্রাসে আওয়ামী মনোপলি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

নগ্ন বেশে সরকার

গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনার ভাবনা নাই। গণতন্ত্র আজ কবরস্থ্য। ফলে ভাবনা নাই জনগণের কাছে জবাবদেহীতা নিয়েও। জনগণ কি ভাববে বা আন্তর্জাতিক মহলে দেশ কতটা কলংকিত হবে -সেদিকেও সামান্যতম ভ্রুক্ষেপ নাই। মুজিবের আমলে দেশ তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি রূপে পৃথিবী ব্যাপী প্রচার পেয়েছিল। কিন্তু তাতে মুজিব ও তার অনুসারিদের একটুও লজ্জা হয়নি। বরং সে অপমান নিয়ে আজও  আওয়ামী বাকশালীদের অহংকার। লোকলজ্জা লোক পেলে কোন কুকর্মতেই বিবেকের পক্ষ থেকে বাধা থাকে না। নির্বাচনের নামে প্রহসন, যৌথবাহিনী ও অস্ত্রধারি দলীয় গুন্ডাদের দিয়ে শত শত বিরোধী নেতাকর্মীদের গুম,হত্যা ও নির্যাতনে শেখ হাসিনা ও দলীয় কর্মীদের বিবেকে সামান্যতম দংশনও হয় না। যেন দেশে কিছুই হয়নি। মহান নবীজী (সাঃ) তাই লজ্জাকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, যার লজ্জা নাই তার ঈমানও নাই। আর ঈমান না থাকলে তার জন্য ফাসেক, জালেম বা কাফের হওয়া সহজ হয়ে যায়।

সরকার জনগণকে গাছপালা বা গরু-ছাগলের চেয়ে বেশী কিছু ভাবছে না। একই রোগ সব স্বৈরাচারির। তাদের ধারণা, গরু-ছাগলের জন্মই তো অধিকারহীন ও জবাই হওয়ার জন্য। তাই হিটলার ও স্টালিনের ন্যায় স্বৈরাচারিরা গ্যাস চেম্বার বা ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। ফিরাউন বনি ইসরাইলের প্রতিটি পুরুষ শিশুকে হত্যা করতো। হাসিনাও তেমনি নিরপরাধ মানুষদের ক্রস ফায়ারে দিচ্ছে। একই কাজ করেছে তার পিতা শেখ মুজিব। তারা জানে,গাছপালা ও গরু-ছাগলের সামনে সন্ত্রাস করলে বা ঘরবাড়িতে আগুন দিলে প্রতিবাদ উঠে না। কাপড় খুললেও ধিক্কার দেয় না। দেশ যেন গভীর জঙ্গল। জঙ্গলে লাশ পড়লে বিচার হয়না। তেমনি শত শত লাশ পড়লেও বাংলাদেশে কারো বিচার হয় না,শাস্তিও হয় না। শাপলা চত্বরে এত নিরীহ মুসল্লির প্রাণ গেল, কিন্তু কোন খুনির গায়ে কি কোন আঁচড় লেগেছে? একদিনের জন্যও কি কারো কারাবাস হয়েছে? হাসিনা ও তার বাকশালী সহকর্মীরা শুধু গণতন্ত্রকেই কবর দেয়নি, কবর দিয়েছে নিজেদের বিবেককেও। চোরডাকাত, খুনি ও পতিতারা বিবেক ও লজ্জা-শরম নিয়ে রাস্তায় নামে না। বিবেক ও লজ্জা-শরম নিয়ে রাজনীতিতে নামেনি শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী সহযোগীরা। একই রূপ অবস্থা ছিল হাসিনার পিতা মুজিবের। সামান্যতম বিবেক ও লজ্জা-শরম থাকলে কি মুজিবের হাতে গণতন্ত্র নিহত হত? প্রতিষ্ঠিত হত কি বাকশালী স্বৈরাচার? নিহত হত কি ৩০-৪০ হাজার মানুষ? স্বাক্ষরিত হত কি ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি? দেশ হারাতো কি বেরুবাড়ী? মুজিবের আমলে যারা নিহত হলো –তাদের হত্যার অপরাধে একদিনের জন্যও কারো জেল হয়নি। ইতিহাসের আরেক শিক্ষা, ফিরাউন-নমরুদদের ন্যায় নৃশংস স্বৈরাচারিদের ভগবান বলার মত বিবেকহীন লোকের অভাব কোন কালেই হয়নি। তাই অভাব নেই শেখ মুজিব স্বৈরাচারিদের জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু এবং হাসিনার ন্যায় ভোটচোরকে মানণীয় বলার মত লোকেরও। যেদেশের কোটি কোটি মানুষ শাপশকুন ও গরুবাছুরকে দেবতা বলে পুজা দেয়, সে দেশের বহু কোটি মানুষ এসব স্বৈরাচারিদের নেতা বা পিতা বলবে -তাতেই বা বিস্ময়ের কি?

 

বিবেকধ্বংসী নাশকতা

প্রাণনাশী শুধু রোগজীবাণূই নয়, বরং ভয়ংকর নাশকতা বিবেকহীন রাজনীতিবিদদের। রোগজীবাণূ প্রাণ নাশ ঘটায়, আর বিবেকহীন রাজনীতিবিদেরা বিনাশ ঘটায় বিবেকের। কারণ সেটি তাদের জন্য অপরিহার্য। কারণ বিবেক বিনাশের কাজটি যথার্থ ভাবে না হলে জনগণের কাতার থেকে উপাসনা জুটে না। যুগে যুগে নমরুদ-ফিরাউনরা তাই সুস্থ্য বিবেকবোধ ও সঠিক ধর্মচিন্তা নিয়ে মানুষকে বেড়ে উঠতে দেয়নি। তেমন একটি রাজনৈতিক প্রয়োজনেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে নমরুদ আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। আর ফিরাউন ধাওয়া করেছিল হযরত মূসা (আ:)’র পিছনে। স্বৈরাচারের জেলে যেতে হয়েছে ইমাম আবু হানিফা (রহ:),ইমাম মালেক (রহ:),ইমাম হাম্বলী (রহ:)’র মত মহান ব্যক্তিদের। মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারি শাসকেরা এভাবেই যুগে যুগে চ্যালেঞ্জ খাড়া করেছে। ইসলাম নিয়ে বাঁচতে হলে স্বৈরাচার নির্মূল তাই অনিবার্য হয়ে পড়ে। এজন্যই ইসলামে বড় ইবাদত হলো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জিহাদ। এ জিহাদে প্রাণ গেলে মহান আল্লাহতায়ালা নিহত ব্যক্তিকে মৃত্যুহীন জান্নাত দেন।

বিবেকহীন রাজনীতিবিদদের কারণেই নৈতিক মহামারি লেগেছে বাংলাদেশের প্রশাসন,পুলিশ ও আদালতে। ফলে আজ থেকে ৫০ বছর আগের পাকিস্তান আমলে রাজনীতি,আদালত, প্রশাসন ও পুলিশে যে বিবেকবোধ দেখা যেত সেটি আজ কল্পনাই করা যায় না। ভয়াবহ বিবেকহীনতার কারণে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবী এখন আর মিছিল থামাতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে না। লাঠিচার্জও করে না। বরং সরাসরি গুলি চালায়। লাঠিচার্জ বা গ্রেফতারে নয়,লাশ ফেলাতেই তাদের আনন্দ। আরো আনন্দ পায় বিরোধীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে বা বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিতে। ফলে বেশুমার মানুষ আজ  যত্রতত্র লাশ হচ্ছে। বাংলাদেশের পুলিশ ও র‌্যাব পরিণত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ খুনি বাহিনীতে। একমাত্র মিশর ও সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও পুলিশের সাথেই তাদের তুলনা চলে। পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে পুলিশের হাতে ২৩ জন মানুষও নিহত হয়নি। ১৯৫২ সালের ২১ই ফেব্রেয়ারিতে মাত্র ৩ জন মারা গিয়েছিল। অথচ সেটিই ইতিহাস হয়ে গিয়েছিল।তাতেই সরকার পরিবর্তন হয়েছিল।৩ জনের হত্যাকে নিয়ে পাকিস্তানের বাঙালীরা সেদিন থেকে “আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রেয়ারি,আমি কি ভূলিতে পারি” বলে গান গাওয়া শুরু করেছিল। আজও  সে গান গা্ওয়া শেষ হয়নি।অথচ আজ এক দিনে ৩ জন নয়, ৩ শত খুন হয়। সমগ্র দেশ এখন শাপলা চ্ত্বর। কিন্তু তা নিয়ে আওয়ামী ঘরানার আব্দুল গাফফারদের গলায় আজ  আর বেদনাশিক্ত গান আসে না। বরং আসে আনন্দ-উৎসব। আব্দুল গাফফারদের হাতে রচিত হয় খুনি হাসিনার পক্ষে অসংখ্য প্রশংসাগীত। একটি দেশে বিবেকের মৃত্যূ যে কতটা ভয়ানক হতে পারে এ হলো তার নজির।

১৯৫২ সালের ২১ই ফেব্রেয়ারিতে মাত্র ৩ জন মারা যাওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী জনাব নুরুল আমীন নিহত পরিবারের কাছে মাফ চেয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত গলায় বেতার ভাষণ দিয়েছিলেন।তিনি নিজে যে পুলিশকে গুলিচালনোর হুকুম দেননি এবং সে খুনের সাথে যে তিনি নিজে জড়িত ছিলেন না, সে কৈফিয়তটিও জনগণের সামনে বার বার দিয়েছিলেন। অথচ আজ  পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবীর হাতে শত শত মানুষ খুন হচ্ছে। কিন্তু সে খুন নিয়ে হাসিনার মুখে কোন অনুশোচনা নেই। বরং আছে প্রচন্ড আত্মতৃপ্তি। সে আত্মতৃপ্তি নিয়ে “লাশরা পুলিশের তাড়া খেড়ে উঠে দৌড়িয়েছে” সে কৌতুকও তিনি শোনান। এক খুনের বদলে তিনি ১০ খুনের হুমকি দেন। তেমনি এক অপরাধি চেতনা নিয়ে শাপলা চত্বরের শহীদদের লাশ ময়লার গাড়িতে তোলা হয়ছে। গণতন্ত্রের হায়াত মওত নিয়েও হাসিনার সামান্যতম ভাবনা নেই। সে ভাবনা হাসিনার পিতা শেখ মুজিবেরও ছিল না।মুজিব তাই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিল।এবং সকল বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ ও সকল বেসরকারি পত্রপত্রিকার অফিসে তালা ঝুলিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উৎসব করেছিল।

 

কুফল লজ্জাহীনতার

লজ্জাহীনতার কুফল অতি ভয়ানক। তাতে বিলুপ্ত হয় মানবিক গুণ।  চোর-ডাকাত ও পতিতাদের মূল সমস্যাটি হলো, তাদেরে হায়া-শরম থাকে না। একই সমস্যা গণতন্ত্রের শত্রুদের। লজ্জাশরম থাকলে মানুষ কি এমন অপরাধে নামে? সব যুগে ও সব দেশেই গণতন্ত্রের শত্রুদের একই অবস্থা। গণতন্ত্র হত্যা, পত্রিকার অফিসে তালা লাগানো ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হত্যায় যেমন শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার লজ্জা হয়নি, তেমনি হচ্ছে না মিশরের স্বৈরাচারি শাসকদের। লজ্জাহীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মিশরের সামরিক বাহিনী নিজেই আগামী নির্বাচন লড়তে যাচ্ছে। অন্য কোন বেসামরিক ব্যক্তিকে নয়, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল সিসিকে তারা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী খাড়া করেছে। সমগ্র দেশ এখন সেনা বাহিনীর হাতে অধিকৃত। বিরোধী দলের নেতাকর্মীগণ এখন কারারুদ্ধ। তারা শুধু বেশরমই নয়,কত বড় বেপরওয়া যে, সেনাবাহিনীর প্রধান সিসি ও তার সমর্থকগণ এরূপ সামরিক অধিকৃতিকে বলছে তাহরির স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবেরর ধারাবাহিকতা। ড. মুরসীর আমলে নাকি গণতন্ত্র হাইজ্যাক হয়েছিল,এখন তারা পথে এনেছে। মিথ্যাচার আর কাকে বলে! জেনারেল সিসির পক্ষে প্রচার চালাতে বাধ্য করেছে সে দেশের সকল টিভি চ্যানেল ও পত্রপত্রিকাগুলোকে।সেনাবাহিনীর কাছে যে কোন নিরপেক্ষ প্রচারনাই অসহ্য। প্রচারনা হতে হবে শুধু তাদের পক্ষে। তাই আল -জাজিরার সাংবাদিকদের সন্ত্রাসী বলে জেলে তুলেছে। নিরেট তাঁবেদার ও পাহারাদারে পরিণত করেছে দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বিচারকগণ। সেনাবাহিনী এক রাতে কায়রোর এক ময়দানে হাজারের বেশী নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করেছে। অথচ এরপরও নিজেদেরকে তারা গণতন্ত্রি বলছে।এবং এরূপ নৃশংস হত্যাকান্ডকে বলছে আইনের শাসন। অপর দিকে জেলে তুলেছে ও হত্যা মামলার আসামী বানিয়েছে সেদেশের ইতিহাসের সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসেডেন্ট ড.মুরসীকে। সন্ত্রাসী দল বলে নিষিদ্ধ করেছে মুরসীর দল ইখওয়ানুল মুসলিমুনকে। এরূপ স্বৈরাচারি কুকর্মে জেনারেল সিসির লজ্জা-শরমে একটুও বাধেনি। যেমন বাধছে না শেখ হাসিনারও। ফলে তার কাছে ৫ই জানুয়ারির ভূয়া নির্বাচন গণ্য হচ্ছে গণতন্ত্রের বিজয় রূপে। শতকরা ৫ জন ভোট না দিলে কি হবে,সে নির্বাচনকে বৈধ বলে আরো ৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পক্ষে যুক্তি পেশ করছে।

 

সন্ত্রাসে মনোপলি

সব স্বৈরাচারি শাসকেরাই সন্ত্রাস, লুটতরাজ ও খুন-খারাবীতে নিজেদের নিরংকুশ মনোপলি চায়। এককালে একই রূপ মনোপলি ছিল ব্রিটিশ,স্পানিশ, ডাচ ও পর্তুগীজসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশিক শক্তির। অধিকৃত দেশগুলিতে নিজেদের সে হিংস্র মনোপলিকে বলতো আইনের শাসন। ভারত যখন তাদের হাতে অধিকৃত,এ দেশের নাগরিকদেরকে নিজ বাড়ীতে তীর-ধনুক,তলোয়ার রাখাকেও তারা সন্ত্রাস বলতো। সে অপরাধে তাদেরকে জেলেও তুলতো। আর নিজেরা নির্বিচারে লক্ষ লক্ষ মানুষকে খুন করতো। খুন করে লাশকে বাজারে, নদীর ঘাটে বা লোকালয়ে উঁচু খুঁটিতে লটকিয়ে রাখাটি তাদের কৌশল ছিল। লক্ষ্য, সাধারণ মানুষকে ভীত সন্ত্রস্ত করা। তাদের সন্ত্রাসে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানগণ প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের আদিবাসীগণ। বাংলাদেশের বুকে সন্ত্রাসে একই রূপ মনোপলি হলো আওয়ামী লীগের। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একই ভাবে শুরু হয়েছে রাজনৈতীক শত্রু নির্মূলকরণ। ডাকাত সর্দার যেমন ডাকাতীর স্বার্থে অন্যান্য ছোটখাটো ঢাকাতদের সাথে নেয়, শেখ হাসিনাও তেমনি এরশাদের ন্যায় আরো কিছু স্বৈরাচারিকে সাথে নিয়েছে।

সন্ত্রাসীরা কখনোই নিরস্ত্র মানুষের কাকুতি-মিনতি বা নসিহতে কান দেয় না। এমন কি নবী-রাসূলদের মত মহান ব্যক্তিদের নসিহত্ও তাদের উপর কোন আছড় করেনি। তাদের নজর তো নিরস্ত্র নরনারীর পকেট ও ইজ্জতের দিকে। জনগণকে নিরস্ত্র ও প্রতিরোধহীন দেখাতেই তাদের আনন্দ। তারা বরং নিরস্ত্র মানুষের অসহায় অবস্থাকে উপভোগ করে। তারা তো চায় সারা জীবন তাদের সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম থাকুক। নমরুদ-ফিরাউনের ন্যায় মুজিব যেমন সেটি চেয়েছিল, হাসিনাও সেটি চায়। সেটি শুধু হাজার হাজার নয়,লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তপাতের মধ্য দিয়ে হলেও। কাশ্মীরে লক্ষাধিক মানুষের লাশ পড়লেও ভারতীয় স্বৈরাচার দখলদারি সেখানে ছাড়েনি। ভারত তার অনুগতদের দিয়ে আজ যে অধিকৃতি বাংলাদেশের উপর প্রতিষ্ঠা করেছে সেটি শুধু রাজপথের কিছু মিটিং-মিছিল, কিছু ধর্মঘট ও কিছু অবরোধের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার নয়। সিরিয়ার হাফেজ আল আসাদ বা ক্যাম্বাডিয়ার সাবেক কম্যুনিস্ট শাসক পলপটের চেয়ে হাসিনা কম ক্ষমতা লিপ্সু নয়। পলপট সরকারের হাতে সে দেশের সিকি ভাগ মানুষ নিহত হয়েছিল। নিহতদের সংখ্যা ছিল ২০ লাখের বেশী। অপর দিকে স্বৈরাচারি আসাদের হাতে ইতিমধ্যে নিহত হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার নিরস্ত্র মানুষ।

 

লড়াই জান্নাত ক্রয়ে

স্বৈরাচারিরা কখনোই কোন দেশে একাকী আসে না। শুধু গণতন্ত্র হত্যা ও চুরি-ডাকাতিই তাদের একমাত্র হত্যা নয়। তাদের বড় অপরাধ যেমন মানব হত্যা,তেমনি ধর্ম ও সভ্যতার হত্যা। ফিরাউন, নমরুদের ন্যায় ইসলামের বড়শত্রু চিরকালই ছিল স্বৈরাচারিরা।আজ যেমন সেটি মিশরে, তেমনি সিরিয়া ও বাংলাদেশে। বাংলাদেশে সে হত্যার পর্বটি শুরু হয়েছে মাত্র। তাই হাসিনার স্বৈরাচারি সরকার যতই দীর্ঘায়ু পাবে ততই বাড়বে খরচের বিশাল অংক। একারণেই কোন সভ্য মানুষ এরূপ স্বৈরাচারি সরকারকে মেনে নিতে পারে না। সমগ্র ইতিহাসে মানবের জানমালের সবচেয়ে বড় খরচটি বনের হিংস্র পশু তাড়াতে হয়নি। বরং সেটি হয়েছে মানুষ রূপী এ হিংস্র জীবদের তাড়াতে। মহান আল্লাহতায়ালা দ্বীনের এ শত্রুদের তাই পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। তাদের নির্মূলে নবীজীর আমলে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবাকে শহীদ হতে হয়েছে।

যে কোন নির্মাণ কাজই বিপুল বিনিয়োগ চায়। উচ্চতর সভ্যতা নির্মাণের চেয়ে ব্যয়বহুল নির্মাণ কাজ মানব ইতিহাসে আর কিছু আছে কি? এ কাজ তো মুসলিমদের বিশ্বশক্তি রূপে দাঁড় করানোর। ঈমানদার তো সে বিপুল ব্যয়ের মধ্য দিয়েই জান্নাত ক্রয় করে। মহান আল্লাহতায়ালা এর চেয়ে সহজ কোন রাস্তা মু’মিনের জন্য খোলাও রাখেননি। বাংলাদেশে বর্তমান লড়াই তাই স্রেফ গণতন্ত্র বাঁচানোর নয়, মানুষের জানমাল ও ইসলাম বাঁচানোর। মু’মিনের জীবনে এ লড়াই জান্নাত ক্রয়ের। দেশে দেশে মুসলিমদের মাঝে সে লড়াই আজ তীব্রতর হচ্ছে। বহু গাফেল মুসলিম সেটি না বুঝলেও শয়তানি শক্তি সেটি বুঝতে পেরেছে। হাসিনার পিছনে ভারতসহ সকল কাফের শক্তির বিনিয়োগ তো সে কারণেই এত অধিক। ০৮/০২/২০১৪

 

 




বিবিধ ভাবনা (২৮)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ধর্মের নামে ব্যবসা ও দুর্বৃত্ত শক্তির বিজয়

বাংলাদেশে যারা নিজেদেরকে মুসলিম রূপে পরিচয় দেয় তাদের সংখ্যা ১৬ কোটির অধিক। দেশে ইসলামী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও অসংখ্য। তাবলিগ জামায়াতের ইজতেমায় ২০ লাখের বেশী জমায়েত হয়। অথচ দেশটিতে ইসলাম দারুন ভাবে পরাজিত। দেশের আদালতে শরিয়তী আইনের কোন স্থান নাই। শিক্ষাব্যবস্থায় কোর’আন শিক্ষার আয়োজন নাই। সংস্কৃতির উপর প্রভাব হিন্দু সংস্কৃতির এবং সে হিন্দু সংস্কৃতির অনুসরণে শুরু হয়েছে মুর্তি নির্মাণ ও মুর্তি পুজা। দেশে অর্থনীতি চলছে সূদের উপর। অথচ হাদীসে সূদ খাওয়া ও সূদ দেয়া মায়ের সাথে জ্বিনার সমান পাপ বলা হয়েছে। সেটিকে বলা হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে যুদ্ধ রূপে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশে মুসলিমগণ নিজেদের পরিচয় দেয় মুসলিম রূপে, কিন্তু বাঁচছে ইসলাম ছাড়াই। এতে আখেরাতে পরিণাম যে কি হবে -সেটি কি বুঝতে বাঁকি থাকে?

ইসলামের এ নিদারুন পরাজয়ের মাঝেও বাংলাদেশে দারুন ব্যবসা বেড়েছে ধর্মের নামে। সেটি শত শত কোটি টাকার ব্যবসা। রম রমা হয়েছে দেশের মসজিদ বিল্ডিং, মাদ্রাসা ভবন, দলীয় দফতর, পীরের আস্তানা ও মাজার। বেতন বেড়েছে মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক এবং দলীয় “হোল টাইমার”দের। অথচ মুসলিমগণ যখন খেজুর পাতা ও কাদামাটির মসজিদে নামায পড়েছে তখন বিশ্ব শক্তিতে পরিণত হয়েছে। হেতু কী? কারণ, ইসলামকে বিজয়ী করা এসব ধর্মব্যবসায়ীরা আদৌ আগ্রহী নয়। আগ্রহী নয় সূদকে নির্মূল করা, কোর’আন বুঝা ও বুঝানো ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠায়। বরং ভাবে, কি করে সংগঠনের উপার্জন, প্রতিষ্ঠা ও প্রচার বাড়ানো যায়। তেমন একটি লক্ষ্য নিয়ে ইসলামী দলের নেতাকর্মী, দলীয় ক্যাডার, পীরের মুরিদ ও মাজারের খাদেমগণ পরিণত হয়েছে সার্বক্ষণিক চাঁদাবাজে। ফলে তাদের আয় ভাবে বাড়লেও ইসলাম বিজয়ী হচ্ছে না।

যারা ব্যবসায়ে মনযোগী তারা ভালই বুঝে, ইসলামের বিজয়ে নামলে লড়াইয়ে নামতে হয়। তখন দেশে বিপ্লবের প্রসব বেদনা শুরু হয়, অস্থিরতা আসে। তখন জানমালের খরচ বাড়ে এবং কমে যায় অন্যদের থেকে প্রাপ্তির পরিমান। তাতে মন্দা আসে ব্যবসায়। ফলে কমে যায় নেতাকর্মী ও ক্যাডারদের মাসিক বেতন। সে মন্দার ভয়ে দেশে যতই দুর্বৃত্ত শাসন হোক – এ ধর্মব্যবসায়ী লড়াই নামে না। তারা চায় “স্টাটাস কো”। চায়, যা আছে তাই বেঁচে থাক। এটিই হলো ধর্মব্যবসায়ীদের নিরেট দুনিয়াদারী। এতে বিজয়ের পর বিজয় পায় এবং দীর্ঘায়ু পায় শয়তানপন্থীরা। বাংলাদেশ তো তারই দৃষ্টান্ত।

অথচ একটি দেশে সত্যিকার ইসলামী দল থাকলে সেদেশে দুর্বৃত্ত শক্তির শাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ অনিবার্য রূপে দেখা দেয়। কারণ ইসলামপন্থী ও শয়তানপন্থীদের মধ্য শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানটি অভাবনীয়। তখন সে দেশে জান্নাতের পথে যাত্রী শহীদদের সংখ্যা বাড়ে। আর শহীদের রক্তদানের ফলেই তো একটি জনগোষ্ঠীর ঈমান শূণ্যতা দূর হয়। তাই যেদেশে শহীদদের সংখা কম, সেদেশের মানুষের ঈমানশূণ্যতা অতি প্রকট। ঈমানের শ্রেষ্ঠতায় সাহাবাগণ সমগ্র মানব ইতিহাসে তূলনাহীন। কারণ, তাদের শতকরা ৬০ ভাগের বেশী রক্তদান করেছেন শহীদ হয়ে। মুসলিমগণ যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল, তার মূলে ছিল শহীদদের সে রক্ত ও ঈমান। বাংলাদেশে মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে সাহাবাদের সে পথ থেকে দূরে থেকে এবং নীচে নেমে।   

২. ডাকাত সর্দার সেনাপ্রধান!

বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সদস্যদের লজ্জা পাওয়া উচিত এ নিয়ে যে, তারা স্যালুট করে সাজাপ্রাপ্ত খুনিদের ভাই ও তাদের দুর্বৃত্তির সহায়তা দানকারী আরেক দুর্বৃত্তকে। এবং আরো লজ্জা হওয়া উচিত এ জন্য, যাকে তারা স্যালুট করে সে জড়িত ছিল ২০১৮ সালের নৈশকালীন ভোটডাকাতির সাথে। অর্থাৎ সেনাপ্রধান শুধু ভোটডাকাতই নয়, সে ডাকাতদলটির সর্দারও। এমন ডাকাতকে স্যালুট করা তো ডাকাত দলের কালচার, তা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে প্রতিষ্ঠা পায় কি করে?

৩. বইয়ের গুরুত্ব

অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধ হয় না। তেমনি বই ছাড়া কোন বিপ্লব হয় না। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি হলো নবীজী(সা:)র’ নেতৃত্বের ইসলামী বিপ্লব। সে বিপ্লবের মূলে ছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব আল কোর’আন। এ পবিত্র কিতাব ছাড়া সে বিপ্লব অসম্ভব ছিল। ইউরোপের ইতিহাস সবচেয়ে বড় বিপ্লব ছিল ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব। সে বিপ্লবের মূলে ছিল রুশো, ভল্টিয়ার ও অন্যান্য মনিষীদের রচিত বই।

বই আনে জনগণের চেতনার মডেলে পরিবর্তন। সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় সেটিকে বলা হয় প্যারাডাইম শিফ্ট। যা বিপ্লব আনে রাজনৈতিক অঙ্গণে। বাংলাদেশেও বিপ্লব আনতে হলে চাই বই। ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়া যায় না, তাই জ্ঞানের রাজ্যে বিপ্লব ছাড়া রাজনৈতিক ও সমাজ বিপ্লব আনা যায় না। তাই অপরিহার্য হলো, চিন্তার মডেলে তথা জ্ঞানের ভূবনে বিপ্লব। এবং সে কাজে পবিত্র কোর’আনের চেয়ে শ্রষ্ঠ গ্রন্থ্য আর কি হতে পারে?

৪. শয়তানী শক্তির স্ট্রাটেজী

শয়তানী শক্তির সনাতন স্ট্রাটেজী শুধু ইসলামী ব্যক্তিদের নির্মূল নয়, বরং অকার্যকর করা ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও। শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃত হওয়ার এখানেই বিপদ। বাংলাদেশ তারই উদাহরণ। শেখ হাসিনার ন্যায় স্বৈরাচারী ভোটডাকাতের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে সেটি আর মুসলিম রাষ্ট্র থাকে না। সেটি পরিনত হয় শয়তানের দুর্গে। শয়তানের সে দুর্গের পেটের মধ্যে লাখ লাখ মসজিদ গড়েও ইসলামের বিজয় আসে না। তখন ইসলামের প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার থাকলে দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। জিহাদ বিষয়ক বই রাখলে জেলে যেতে হয়।

মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও ইসলামী সংগঠন বাঁচে না। তাই সবচেয়ে বড় নেককর্মটি মসজিদ-মাদ্রাসা ও ইয়াতিম খানা নির্মাণ নয়, বরং সেটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ।

ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত হলে সেটি তখন কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিনত হয়। তখন জনগণকে এতিমখানা ও মাদ্রাসা নির্মাণ করা লাগে না। সে কাজ রাষ্ট্রই করে। নবীজী (সা:) এজন্যই মদিনায় হিজরাতের পর নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছেন। এবং তিনি স্বয়ং সে রাষ্ট্রের শাসকের পদে বসেছেন। কিন্তু নবীজী (সা:)’র সে শিক্ষা কতটুকু বেঁচে আছে বাংলাদেশে?  

৫. উপেক্ষিত শ্রষ্ঠ সূন্নত

নবীজী (সা:)র যে মহান সূন্নতটি পালনে মানব জাতির সবচেয়ে বড় কল্যাণটি হয় -সেটি টুপি, দাড়ি ও মেছওয়াক করার সূন্নত নয়। সেটি তাঁর রাজনীতির সূন্নত। নিজে শাসকের আসনে বসে তিনি সে সূন্নত দেখিয়ে গেছেন। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের হুজুরগণ নবীজী (সা:)’র বহু সূন্নতের বয়ান করলেও তিনি যে দেশের শাসক ছিলেন এবং রাজনীতি  করেছেন -সে সূন্নতের কথা তারা বলেন না। সে সূন্নত পালনও করেন না। বরং সে সূন্নত থেকে দূরে থাকাটি দ্বীনদারী মনে করেন। এবং রাজনীতিতে অংশ নেয়াকে দুনিয়াদারী বলেন। অবশ্য এর কারণ রয়েছে। এ সূন্নতটি যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি বিপদ ডেকে আনে আরাম-আয়াশে। এটি হলো জিহাদ। এ সূন্নত পালনে অর্থদান, শ্রমদান ও রক্তদান লাগে। সে সামর্থ্য ক’জন আলেমের? ফলে তারা বেছে নিয়েছেন টুপি, দাড়ি, পাগড়ি, মেছওয়াক ও মিষ্টি খাওয়ার সহজ সূন্নত।

৬. সন্মানিত হলো ডাকাত

কোন সভ্য দেশে চোরডাকাতদের রাস্তার ঝাড়ুদার বানানোরও রীতি নাই। কারণ, সেখানেও তারা কাজে চুরি করে বা নানারূপ কু্-কর্ম করে। একমাত্র কারাগারে রাখাতেই দেশবাসীর জন্য কল্যাণ। এরূপ অপরাধ থেকে জনগণকে বাঁচাতে ইসলাম তাই চোরদের হাত কাটার নির্দেশ দেয়। জীবাণু না মারলে যেমন দেহ বাঁচে না, তেমনি চোর-ডাকাত নির্মূল না করলে দেশ বাঁচে না। অথচ বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ন্যায় যে ডাকাতটি ভোটডাকাতির ন্যায় জঘন্য অপরাধটি করলো -সে এখন প্রধানমন্ত্রীর আসনে। আরেক অপরাধী জেনারেল আজীজ –যে ২০১৮ সালের ভোটের উপর নৈশ ডাকাতির নেতৃত্ব দিল, সে এখন সেনাবাহিনীর প্রধান। কোন সভ্য দেশে কি এমনটি আশা করা যায়?

৭. ভারতের এজেন্ডা

ভারতের হিন্দুত্ববাদী শাসকদের মূল এজেন্ডা হলো উপমহাদেশের মুসলিম শক্তির বিনাশ। চায়, হিন্দুদের অখণ্ড রাষ্ট্র ভারত। এ লক্ষেই তারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিল। পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠা পায় তখনও দেশটিকে মেনে নেয়নি। এবং ১৯৭১ সালে দেশটিকে ভাঁঙ্গতে সফল হয়। তবে মুসলিম শক্তির বিনাশের কাজটি একাত্তরের পর শেষ হয়নি; এখন দেশটি বাংলাদেশীদেরও কোমর ভাংঙ্গতে চায়। একাজে ভারতকে সাহা্য্য করছে শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ।

শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশকে শক্তি ও সামর্থ্য জোগায় সে দেশের জনগণের সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বল। তাই কোন দেশকে শক্তিহীন করার সবচেয়ে সফল স্ট্রাটেজী হলো, জনগণকে সে সামর্থ্য নিয়ে বেড়ে উঠতে না দেয়া। এবং সে কাজে মোক্ষম উপায় হলো জনগণের মৌলিক মানবিক অধিকার কেড়ে নেয়া। জনগণ তখন প্রতিরোধহীন হয় এবং শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেয়। স্বৈরশাসনের এটিই তো সবচেয়ে বড় নাশকতা। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা তো শত্রুর সে কাজটিই করছে। ভারতের কাছে এজন্যই হাসিনা এত প্রিয়।  

৮. বিচারে ব্যর্থতার পরিণাম

বিচারে ব্যর্থতার পরিণামটি ভয়ানক। রোগের চিকিৎসা না হলে -যা হয়। তাই যে কোন সভ্য দেশ সামান্য কিছু চুরি হলেও তার বিচার হয়। কারণ, চোরকে প্রশ্রয় দিলে চোরগণ দলে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তখন চোরদের হাতে সমগ্র দেশ ডাকাতি হয়ে যায়। শেখ হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতের হাতে বাংলাদেশের ভাগ্যে তো সেটিই ঘটেছে।

বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা হলো, ২০১৮ সালে এতো বড় একটা ভোটডাকাতী হয়ে গেল –সে জন্য কারো কোন শাস্তি হলো না। বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশে রাজনীতিতে এটি যেন কোন এজেন্ডাই নয়। জনগণও তা নিয়ে ভাবে না। বুদ্ধিজীবীগণও তা নিয়ে লেখে না। মৃত্যুশয্যায় শায়ীত মুমূর্ষু ব্যক্তি যেমন নিজের চিকিৎসা আর ভাবে না, তেমনি এক করুণ অবস্থা এখন বাংলাদেশের। নৈতিক পচন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ডাকাত সর্দারনীকে শাসকের আসনে বসিয়ে তাকে মাননীয় নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বলা হয়। সেটি শুধু চোর-ডাকাতগণই বলে না, নিজেদেরকে যারা সুশীল বলে দাবী করে তারাও বলে। কোন সভ্য সমাজে কি এমনটি ভাবা যায়? বাংলাদেশ আর কত নীচে নামবে? ১৯/০২/২০২১।




মুজিবের লিগ্যাসী: দেশধ্বংসী নাশকতা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

ফিরোজ মাহবুব কামাল                                                                                                                                                        নাশকতা ইসলামের বিরুদ্ধে

মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর রাসূল ও ইসলামের উপর বিশ্বাস নয়। বিশ্বাসের সাথে কিছু দায়বদ্ধতাও অনিবার্য করে। প্রতিটি মুসলিমের উপর সে মূল দায়বদ্ধতাটি হলো, ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থে সর্ব মুহুর্তে আপোষহীন হওয়া। কারণ, যেখানে ইসলাম থাকে, সেখানে অনৈসলামও থাকে। এবং ইসলাম ও অনৈসলামের মাঝে অবিরাম লড়াইও থাকে। সে লড়াইয়ে ইসলামের পক্ষে আপোষহীন চেতনা নিয়ে বাঁচাই হলো প্রকৃত ঈমানদারী। নইলে নাশকতা ও বেঈমানী হয় ইসলাম ও মুসলিমের সাথে। রাজনীতির অঙ্গণে যাদের পদচারণা তাদের উপর সে দায়বদ্ধতা আরো অধিক। তখন সে রাজনীতিতে ইসলাম ও মুসলিমের বিজয়ে বিনিয়োগ ঘটাতে হয় নিজের বুদ্ধিবৃত্তি, অর্থ, শ্রম ও রক্তের। রাজনীতি তখন পবিত্র জিহাদে পরিণত হয়। সে জিহাদে নিহত হলে শহীদ হয়। গৌরব কালে মুসলিমদের রাজনীতি বলতে  তো সেটিই বুঝাতো। মুসলিমগণ বিশ্বে সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছে এবং জন্ম দিয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার –তা তো সে জিহাদী রাজনীতির কারণেরই।

শেখ মুজিব নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করতেন। কিন্তু তাঁর রাজনীতিতে ইসলামের বিজয় আসেনি। মুসলিমদের গৌরবও বাড়েনি। বরং বিজয় ও গৌরব বেড়েছে ভারতীয় কাফেরদের। বিজয়ী হয়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরা বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ। এবং শক্তিহানী ঘটেছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের। তাই মুজিবের রাজনীতির মূল চরিত্রটি ছিল ইসলামের সাথে গাদ্দারীর। তবে শেখ মুজিবের গাদ্দারিটা শুধু পাকিস্তানের সাথে ছিল না। সে গাদ্দারিটা ছিল যেমন ইসলামের বিরুদ্ধে, তেমনি বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিল বাংলাভাষী। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জনের লড়াইকে তিনি পাকিস্তান ভাঙ্গার লড়াইয়ে পরিণত করেন। এবং সেটি স্রেফ ভারতীয় অভিলাষ পুরণে। অথচ পাকিস্তান ভাঙ্গার এ কাজটি ভারত নিজ খরচে ১৯৪৭ সাল থেকেই করে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। অতএব এ কাজের জন্য মুজিবের নেতা হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। ভারতের আজ্ঞাবহ দাস হওয়াই যথেষ্ট ছিল। বাস্তবে তিনি সে দাসসুলভ কাজটিই বেশী বেশী করেছেন।

মুজিবের ভারত সেবার রাজনীতিতে চরম লাভবান হয়েছে যেমন ভারত, তেমনি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঙালী মুসলিম। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল তারাই। গণতন্ত্র বাঁচলে শুধু পাকিস্তানের রাজনীতি নয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর রাজনীতিতে, বাঙালী মুসলিমগণ সুযোগ পেত নেতৃত্বদানের। অখন্ড পাকিস্তান বেঁচে থাকলে আজ লোকসংখ্যা হতো ৪০ কোটি। দেশটি হতো পারমানবিক বোমার অধিকারী পৃথিবীব তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক রূপে বাঙালী মুসলিমগণ পেত বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ।  মুজিবের অপরাধ, সে সুযোগ থেকে বাঙালী মুসলিমদের তিনি শুধু বঞ্চিতই করেননি, বরং গোলাম বানিয়েছেন ভারতের। ভারতের ঘরে তিনি বিশাল বিজয় তুলে দিয়েছেন। ১৯৭১’য়ের যুদ্ধের বিজয়ী ভারত তখন লুটে নেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অব্যবহৃত হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র। সে লুন্ঠনের বিরুদ্ধে শেখ মুজিব প্রতিবাদ না করে নীরব থেকেছেন। অথচ পাকিস্তানের সে অস্ত্র কেনায় অর্থ জুগিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকগণও। অতএব এ লুট শুধু পাকিস্তানের উপর ছিল না, ছিল বাংলাদেশের অর্থের উপর। প্রভুর সামনে গোলামদের প্রতিবাদের সাহস থাকে না। সে সাহস সেদিন মুজিবের মধ্যেও দেখা যায়নি। বরং প্রকট ভাবে যা দেখা গেছে সেটি ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এবং সেটি ভারতকে সাথে নিয়ে। এবং ষড়যন্ত্র হয়েছে ইসলাম ও মুসলিমের পরাজয় বাড়াতে। শেখ মুজিবের সে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি আজও বেঁচে আছে হাসিনার রাজনীতিতে।

ইসলামের হারাম হালামের বিধানগুলো শুধু খাদ্য-পানীয়ে নয়, সেটি রয়েছে রাজনীতিতেও। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম রাজনীতিতে আমৃত্যু অংশ নিয়ে দেখিয়ে গেছেন রাজনীতির ফরজ বিষয়গুলো। নবীজী (সা:) সেটি হাতে কলমে শিখিয়ে গেছেন রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে নিজে বসে। তিনি শিখিয়ে গেছেন, ইসলাম কখনোই নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলে সীমিত রাখার বিষয় নয়। ইসলামের বিধানকে পূর্ণ ভাবে প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজে রাষ্ট্রই হলো মূল হাতিয়ার। রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলিকে ইসলামের বাইরে রাখলে ইসলাম পালনের কাজটি হয় না। তখন রাষ্ট্রের উপর প্রতিষ্ঠা পায় না মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়ত বিধান। রাষ্ট্র তখন শয়তানের দুর্গে পরিণত হয়। শয়তানের সে দুর্গের মাঝে হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রসা গড়েও ইসলামের পরাজয় রোধ করা যায় না। এবং তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। এতো মসজিদ ও মাদ্রাসা বিশ্বের আর কোন দেশে নাই। অথচ দেশটির উপর অধিকৃতি শয়তানী শক্তির। ফলে কোর’আনের তাফসিরকারকদের এদেশে জেলে থাকতে হয়। গণহত্যার শিকার হতে মুসল্লীদের। এবং মুর্তিগড়া হয় রাষ্ট্রীয় অর্থে এবং মুর্তিপূজারীর গানকে গাওয়া হয় জাতীয় সঙ্গিত  রূপে।

ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল তাই মসজিদ-মাদ্রাসা গড়া নয়, বরং সেটি হলো শয়তানের দুর্গরূপী রাষ্ট্রকে নির্মূল করে সেটিকে ইসলামের দুর্গে পরিণত করা। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম তো সেটিই করেছেন। মদিনার হিজরতের পর নবীজী (সা:) তাই নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছেন। কিন্তু ইসলামে অ চেতনাশূণ্য শেখ মুজিব ও তার অনুসারীগণ নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে কোন শিক্ষাই নেননি। শিক্ষা নিয়েছেন এবং ষড়যন্ত্র করেছেন ভারতীয় কাফেরদের সাথে একাত্ম হয়ে। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে বিধিবদ্ধ করেছেন জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষবাদ, সমাজতন্ত্রের ন্যায় হারাম মতবাদ। সংকুচিত করেছেন কোর’আন শিক্ষা। এবং নিষিদ্ধ করেছেন ইসলাম প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে রাজনৈতিক দল গড়া। ইসলাম থেকে দূরে না সরলে কাফেরগণ কখনোই বন্ধু রূপে গ্রহণ করে না। শেখ মুজিব ও তার দলের লোকেরা এতোটাই ইসলামচ্যুৎ যে, ইসলামপন্থী ও পাকিস্তানপন্থীদের নির্মূলে ভারত তাদেরকে আজ্ঞাবহ পার্টনার রূপে গ্রহণ করে। ভারতের অস্ত্র ও অর্থ নিয়ে সে কাজে তারা ঝাঁপিয়েও পড়ে। ইসলামের সাথে তাদের দুষমনি শুধু ১৯৭১’য়ের বিষয় নয়; সে অভিন্ন রূপটি ধরা পড়েছে যেমন শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে, তেমনি ২০১৩ সালের ৫মে শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের মুসল্লীদের বিরুদ্ধে গণহত্যায়।

বাংলাদেশের মাটিতে ১৯৭১’য়ে বহু ইসলামী রাজনৈতিক দল ছিল। ইসলামী দলের বহু লক্ষ নেতা-কর্মী এবং সমর্থকও ছিল। কিন্তু তারা ভারতের এজেন্ডা পূরণে হাতে অস্ত্র নেয়নি। ভারতেও যায়নি। একই কারণে কোন আলেম এবং কোন পীর সাহেবও একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গার সে কবিরা গুনাহতে অংশ নেয়নি। তাদের অনেকে রাজাকার হয়েছে, বহু হাজার রাজাকার প্রাণও দিয়েছে।একাত্তরের রাজাকারের চেতনা ছিল এই কবিরা গুনাহ থেকে বাঁচার চেতনা। মুসলিম যুদ্ধ করে মুসলিম দেশের ভূগোল বাড়াতে, সেটিকে ভাঙ্গতে বা খর্ব করতে নয়। মুসলিম দেশে ভাঙ্গার কাজটি তো কাফেরদের কাজ। একাত্তরে সে এজেন্ডা ছিল ভারতের। শেখ মুজিব ও তার দল ভারতের সে এজেন্ডাকে নিজেদের এজেন্ডা বানিয়ে নিয়েছে। মুসলিম দেশ ভাঙ্গতে বা মুসলিম দেশের ভূগোল বিলীন করতে যুগে যুগে বহু যুদ্ধ করেছে কাফেরগণ।  উসমানিয়া খেলাফত ভেঙ্গে বিশের বেশী টুকরোয় বিভক্ত করেছে ব্রিটিশ ও ফরাসী ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। তখন তাদের চর ও দাস হিসাবে খেটেছে আরব জাতিয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টগণ। সে সাথে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, দুবাই, আবুধাবি, ওমানের ট্রাইবাল নেতাগণ। তাদের সে গাদ্দারীতে আরব বিশ্বের উপর দখলদারী বেড়েছে কাফের শক্তির; এবং শক্তিহানী হয়েছে মুসলিমদের। তাদের সে গাদ্দারীর কারণেই আরব ভূখন্ড আজ ২২ টুকরায় বিভক্ত। মুসলিম উম্মাহ শক্তিহানির মূল কারণ তো এই বিভক্তি। আর বাংলাদেশের মাটিতে সে গাদ্দারী এবং বিভক্তির মূল নায়ক ছিলেন শেখ মুজিব। প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন ভারতবন্ধু; কখনোই বঙ্গবন্ধু বা মুসলিমবন্ধু নন। প্রকৃত মুসলিম শুধু মুসলিমের বন্ধুই হয় না, তাঁর প্রতিরক্ষায় সৈনিকে পরিণত হয়। ভারতে বসবাসকারী মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের যে নীতি, মুজিব ও তার অনুসারীগণ সে নীতিই প্রয়োগ করেছে বাংলাদেশে। ফলে একাত্তরে মুজিবের অনুসারীদের হাতে যত পাকিস্তানপন্থী বাঙালী ও অবাঙালী মুসলিম নিহত হয়েছে তার তূলনা একমাত্র ভারতের মুসলিম গণহত্যার সাথেই মেলে।

 

সর্বমুখী নাশকতা

শেখ হাসিনার ঘোষণা, তিনি কাজ করছেন মদিনা সনদ নিয়ে। প্রকৃত সত্যটি এর বিপরীত। শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিব যে সনদ নিয়ে কাজ করেছেন তার মূল বিধিটি হলো ভারতের প্রতি দাসত্বের। সে সনদ অনুসারেই শেখ মুজিব বাংলাদেশের ভূমি বেরুবাড়ি ভারতের হাতে তুলে দেন। তুলে দিয়েছেন পদ্মার পানিও। ভারতে যাচ্ছে ৫৪টি নদীর পানি। অথচ পাকিস্তানী আমলের ২৩ বছরে একদিনের জন্যও বেরুবাড়ির গায়ে ভারত হাত দিতে পারিনি। পদ্মার পানিও তুলে নিতে পারিনি। ভারত শেখ মুজিবকে তার নিজ স্বার্থের সেবাদাস হিসাবে গ্রহণ করলেও বাংলাদেশীদের কখনোই বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে পারিনি। তারই প্রমাণ, দিল্লীর শাসকচক্র মুজিবকে শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজেই ব্যবহার করেনি, ব্যবহার করেছে বাংলাদেশের মেরুদন্ড ভাঙ্গার কাজেও। বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংসে মুজিবের নাশকতা ছিল বহুমুখী। মুজিব বিলুপ্ত করেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমান্ত। সেটি করেন সীমান্ত বাণিজ্যের নামে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় পণ্যের বাজার বসিয়ে। তিনি তার প্রভু দেশের কাছে বাংলাদেশের কারেন্সি নোট ছাপানোর দায়িত্ব দেন। আর ভারত সে সুযোগ পেয়ে কয়েক শত কোটির বেশী অতিরিক্ত নোট ছেপে নিজের হাতে রেখে দেয়। সে অর্থ দিয়ে সীমান্ত ঘিরে বসানো মুক্ত বাজার থেকে বাংলাদেশীদের থেকে বিদেশী মুদ্রা, কাঁসা-পিতল, পাকিস্তান আমলে বিদেশ থেকে ক্রীত যন্ত্রপাতি ও সঞ্চয়কৃত ধাতব পদার্থ কিনে ভারতে নিয়ে যায়। জাতীয়করণের নামে মুজিব ধ্বংস করেন পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানা। এভাবেই পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করা হয় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এবং ১৯৭৪ সালে ডেকে আনা হয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ  -যাতে প্রাণহানি হয় বহু লক্ষ মানুষের। দরিদ্র মানুষ তখন কাপড়ের অভাবে মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়।

নবীজী (সা:)’র আমলে মদিনা সনদের লক্ষ্য ছিল, মুসলিমদের দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি। লক্ষ্য ছিল, সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও ইসলামী সভ্যতার নির্মাণ। হাসিনা নাম নিচ্ছেন মদিনা সনদের, অথচ যাচ্ছেন উল্টো দিকে। শেখ মুজিবের ন্যায় তারও লক্ষ্য, মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো ও তাদের শক্তি হানি। লক্ষ্য, ইসলামের রাষ্ট্র নির্মাণের যে কোন উদ্যোগের প্রতিরোধ। এবং সেটি তিনি বার বার ঘোষণা দিয়েই করছেন। একটি দেশের শক্তির মূল উৎস ৪টি। এক). রাজনৈতিক শক্তি; দু্ই). শিক্ষা ও সংস্কৃতি; তিন). সামরিক শক্তি; চার). অর্থনৈতিক শক্তি। আওয়ামী লীগ এ ৪টি খাতেরই বিনাশে হাত দিয়েছে। ইতিমধ্যে সেগুলিকে তছনছও করা হয়েছে। রাজনীতির মধ্য দিয়েই জনগণ পায় একতা, পায় প্রতিরোধের সাহস। রাজনৈতিক দিক দিয়ে জনগণকে পঙ্গু করার লক্ষ্যেই শেখ মুজিব গণতন্ত্রকে কবরে পাঠায় এবং প্রতিষ্ঠা দেয় একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার। সেনাবাহিনীর শক্তিহানী করতে গড়ে তোলা হয় বিকল্প রক্ষিবাহিনীকে। একই লক্ষ্যে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই সংঘটিত হয় পিলখানা হত্যাকাণ্ড। সেখানে হত্যা করা হয় সেনাবাহিনীর ৫৭ জন অফিসারকে। ১৯৭১’য়ের যুদ্ধেও এতো অফিসারের মৃত্যু হয়নি। সে যুদ্ধে পাকিস্তানও এতো অফিসার হারায়নি। আর্মির পাশাপাশি শক্তি হানি করা হয় বি.ডি.আর’য়ের। শত শত বি.ডি,আর. সদস্যকে কারাবন্দি করা হয়। বন্দী অবস্থায় অনেকের মৃত্যু হয়েছে জেলখানায়। অপর দিকে দেশের শিক্ষাব্যববস্থা ধ্বংসে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করা হয়েছে দলীয় ক্যাডার তৈরীর কারখানায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কসাইখানায় পরিণত করা হয়েছে আবরার ফাহাদদের মত দেশপ্রেমিকদের হত্যা করার লক্ষ্যে। বছরের বেশীর ভাগ সময়ই সেগুলো বন্ধ থাকে রাজনৈতিক ক্যাডারদের মাঝে সংঘাতের কারণে। লেগে থাকে দীর্ঘ সেসন জট। এভাবেই বাড়ানো হয়েছে শিক্ষা খাতে নাশকতা। অপর দিকে অর্থনীতিতে নাশকতা বাড়াতে ব্যাংক থেকে বিদেশে পাচার হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার বিদেশী মূদ্রা। এমনকি চোরদের হাত পড়েছে স্টেট ব্যাংকের ভান্ডারেও। 

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার মাঝে ভারতের স্বার্থটি বিশাল। ভারত চায় ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ টিকে থাকুক স্রেফ ভারতীয় পণ্যের ক্রেতা হিসাবে। অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দি হিসাবে নয়। বাংলাদেশীদের ক্রয়ক্ষমতা ভারতীদের চেয়ে অনেক বেশী। কারণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেমন উৎপাদন বেড়েছে, তেমনি বিদেশী অর্থের উপার্জন বেড়েছে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশীর বিদেশে কর্মসংস্থানের কারণে। ফলে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর পকেটে এখন অনেক পয়সা। এতবড় বাজার ভারতের পশ্চিম বাংলা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, আসাম, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা, মেঘালয়ের মত ছয়-সাতটি প্রদেশ মিলেও নাই। এ বাজার ভারত দখলে দখলে নিতে চায়। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের বিপুল বিনিয়োগ ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাস পালনে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ মুজিব ও তার অনুসারীদের দাপটের মূল কারণ, তাদের পিছনে ভারতের এ অর্থ বিনিয়োগ।

এক সময় পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনে সমগ্র পৃথিবীতে পূর্ব পাকিস্তান প্রথম ছিল। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশী অর্থ উপার্জিত হত এ খাতে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পূর্ব পাকিস্তানের এবং পরে বাংলাদেশের সে প্রতিদ্বন্দি অবস্থান ভারত মেনে নিতে পারেনি। ভারত চেয়েছিল সে মর্যাদা তা নিজের জন্য। সেজন্যই ভারতের প্রয়োজন দেখা দেয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ আদমজী জুটমিলসহ সকল পাট শিল্পের ধ্বংস। ভারতের স্বার্থে সে কাজটি সমাধা করে দেয় তাদেরই পালিত সেবাদাস শেখ মুজিব। মুজিব আমলে একদিকে যেমন পাটকলগুলোকে অচল করা হয় তেমনি পাটের গুদাম গুলোতে আগুণ দেয়া হয়। আর অপরদিকে ভারত তার পুরোন পাটকলের বদলে বাংলাদেশের সীমান্ত ঘিরে গড়ে তোলে বহু পাটকল। তখন বাংলাদেশের সস্তা কাঁচা পাট দেশে মূল্য না পেয়ে ভারতের বাজারে গিয়ে উঠে। ভারত তখন তাড়াতাড়ি পাট শিল্পে বিশ্বে প্রথম হওয়ার হওয়ার মর্যাদা অর্জন করে। আজ বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দী উঠেছে গার্মেন্টস শিল্পে। ভারত সেটিকেও ধ্বংস করতে চায়। আর গার্মেন্টস শিল্পকে আজ ধ্বংস করা হচ্ছে অতি পরিকল্পিত ভাবে। এ শিল্পে নামানো হয়েছে কিছু দুর্বৃত্ত ও ডাকাতদের। যারা নেমেছে দরিদ্র শ্রমিকের রক্তচোষক রূপে। যে শিল্পে রক্তচোষন হয় দরিদ্র শ্রমিকের সে শিল্প কি বেঁচে থাকে? সে শিল্প বরং মহান আল্লাহতায়ালার আযাব ডেকে আনে। তখন তাতে আগুণ লাগে বা ভবন ধ্বসে পড়ে। সাভারে যা ঘটে গেল তা কি তার ই আলামত নয়।

আওয়ামী লীগের ভোটের রাজনীতিতে দেশের দরিদ্র মানুষ পরিণত হয়েছে রাজনীতির কাঁচা মালে। সেটি যেমন মুজিব আমলে, তেমনি হাসিনার আমলে। শেখ মুজিব সোনার বাংলা প্রতিশ্রুতি দিতে ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে ভোট নিয়েছিলেন। ওয়াদা দিয়েছিলেন আট আনা সের চাল খাওয়োনোর। অথচ উপহার দিয়েছিলেন দুর্ভিক্ষ ও লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু। তেমনি ২০০৮ সালে হাসিনা ওয়াদা দিয়েছিলেন ৮ টাকা সের চাল খাওয়ানোর। কিন্তু খাইয়েছেন ৪৫ টাকা সের দরে। ওয়াদা দিয়েছিলে বিনা মূল্যে সারের। ওয়াদা দিয়েছেন ঘরে ঘরে চাকুরির। সবই ছিল প্রকান্ড মিথ্যাচার। ২৪ নভেম্বর ২০১২-তে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের গার্মেন্টস কারখানায় আগুন লেগে ১১১ কর্মী পুড়ে মারা যায়। হাসিনা সরকার ওয়াদা দিয়েছিল ক্ষতিপুরণের। কথা ছিল কারণ খুঁজে শাস্তি দেয়ার। কিন্তু সে সব কিছুই হয়নি। স্বজন হারা পরিবারগুলিকে কোনরূপ ক্ষতিপুরণ দেয়া হয়নি। কারণ, তাজরীনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর দেলোয়ার হোসেন একজন সরকার সমর্থক ব্যক্তি।ফলে কারো পক্ষে তার পকেট থেকে স্বজনহারাদের জন্য ক্ষতিপুরণ আদায় করে দেয়াও সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে কথা বলবে এমন কোন শ্রমিক সংগঠনও গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। কয়েক বছর আমিনুল ইসলাম একজন ব্যক্তি গার্মেন্টস ইন্ডাসট্রিতে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। সে অপরাধে তাকে লাশ হতে হয়। পুলিশ ৪ দিন পর তার লাশ উদ্ধার করলেই দায়িত্ব সেরেছে। আজ অবধি তার খুনের কোন বিচার হয়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। তাজরীোন আগুন লাগার দুই দিন পরে ২৬ নভেম্বর ২০১২-তে চট্টগ্রামে বহদ্দার পুকুর পাড়ে নির্মীয়মান ফ্লাইওভারের গার্ডার ধ্বসে ১৫ জন নিহত হয়। কিন্তু কেন সে নির্মীয়মান ফ্লাইওভারের গার্ডার ধ্বসে পড়লো তার কোন তদন্ত হয়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। কারণ এই ফ্লাইওভার নির্মাণের কার্যাদেশ পেয়েছিল প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু-র মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাকটো পারিসা লিমিটেড এবং মীর আক্তার কনসট্রাকশন দুটি ফার্ম যুগ্মভাবে। ফলে কে তাদের গায়ে আঁচড় দিবে? এভাবেই একের পর দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী দুর্বৃত্তগণ।

অর্থনীতিতে আওয়ামী নাশকতার আরো কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা দেশের চলমান বিদ্যুৎ সঙ্কট মেটানোর লক্ষ্যে স্থায়ী কোন সাশ্রয়ী পদক্ষেপ না নিয়ে চালু করেন ব্যায়বহুল কুইক রেন্টাল সিস্টেম। এর ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা পকেটে গেছে আওয়ামী দুর্বৃত্তদের। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি, বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড)র ক্ষতি ২৫,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রাইভেট কুইক রেন্টাল কম্পানি থেকে বেশি দামে বিদ্যুত কিনে তা কম দামে বিক্রি করে বিপিডিবি। রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট থেকে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুত কেনে ১৪ থেকে ১৭ টাকা। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে সাত থেকে আট টাকার মধ্যে। এখানে অর্ধেকই ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকির যে ৯,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে তার ৮০ শতাংশই দিতে হচ্ছে কুইক রেন্টাল থেকে বেশি দামে বিদ্যুত কেনায়।ভর্তুকির এ অর্থ যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় কর্ণেল ফারুক খান, আজিজ গ্রুপ, গার্মেন্টস রফতানিকারক মোহাম্মদী গ্রুপ, ফার্নিচার বিক্রেতা অটবি গ্রুপ, সালমান রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ ইত্যাদি ন্যায় আওয়ামী রাজনীতির অর্থজোগানদারদের পকেটে। এভাবে শেখ হাসিনা তার পিতার ন্যায় রাজনীতিকে পরিণত করেছেন শুধু দেশ ধ্বংসের হাতিয়ারে নয়, বিপুল অর্থ-উপার্জনের হাতিয়ারেও।

 

নাশকতা শেয়ার বাজারে

যে কোন দেশের শিল্পায়নে অর্থের বিশাল জোগান আসে জনগণের পকেট থেকে। জনগণ তাদের অর্থ ফেলে না রেখে শিল্পকারখানার শেয়ার কিনে বিনিয়োগ করে। পাশ্চাত্যে তো এভাবেই অর্থনৈতিক অগ্রগতি এসেছে। শেয়ার মার্কেটের অর্থ নিয়েই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারত জয় করেছিল। কিন্তু আওয়ামী নাশকতা  ঘটেছে এ ক্ষেত্রটিতেও। শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন তখন নভেম্বর ১৯৯৬’য়ে শেয়ার মার্কেট প্রচন্ড ধ্বস আসে। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসায় আবার ধ্বস আসে অক্টোবর ২০১১’য়ে। শেয়ার বাজারের দ্বিতীয়বারের কেলেঙ্কারিতে দেশের প্রায় ৩৩ লক্ষ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এতে নিঃস্ব হয়ে যান। শেয়ার বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাটের জন্য যারা দায়ী সরকার তাদের একজনকেও গ্রেফতার করেনি এবং শাস্তিও দেয়নি। অথচ দিশাহারা বিনিয়োগকারীরা যখন মতিঝিলে বিক্ষোভ মিছিল করে তখন প্রধানমন্ত্রীর অথনৈতিক উপদেষ্টা ড.মসিউর রহমান বলেন, “ওরা দেশের শত্রু। সমাজের শত্রু। ওদের জন্য মাথা ঘামানোর কোনো কারণ নেই। তাদের কষ্টে আমার মন কাঁদে না। শেয়ারবাজার ধ্বসে সরকারের মাথাব্যথার কিছু নেই। কারণ শেয়ারবাজারে পুঁজি প্রকৃত বিনিয়োগে যায় না… শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখে না।”

অভয়অরণ্য চোর-ডাকাতদের 
প্রতিটি আওয়ামী শাসনামলেই দুর্বৃত্তদের পোয়া বারো হয়। দেশ পরিণত হয় চোর-ডাকাতদের জন্য অভয় অরণ্যে। সেটি যেমন মুজিব আমলে  হয়েছিল, তেমনি হাসিনার আমলেও। ডাকাতদের এখন আর ডাকাত দল গঠনের প্রয়োজন পড়েনা। তারা ডাকাতির জন্য ভূয়া বাণিজ্যিক কোম্পানি গড়ে তোলে। তখন ডাকাতি শুরু করে দেশের অর্থভান্ডারে। সেটি হাজার হাজার কোটি টাকার অংকে। আওয়ামী লীগের আমলে জনগণের অর্থের নির্মম লুটেরা হলো ডেসটিনি নামক একটি কোম্পানি। এ কোম্পানিটি ৩,২৮৫ কোটি টাকা মানি লন্ডারিং ও আত্মসাত করে। ডিসটিনির কর্মকর্তা হলেন জেনারেল হারুন। তদন্তে দুদক জেনারেল হারুনের কাছে জানতে চায় তার ব্যাংক একাউন্টে ২০ কোটি টাকা ঢুকলো কিভাবে? হারুনের জবাব,“মাসিক সম্মানী, ডিভিডেন্ড ফান্ড, এলাউন্স, কমিশন বাবদ এই টাকা আমার একাউন্টে ঢুকেছে। এছাড়া কিছু টাকা বাড়ি ভাড়া থেকেও এসেছে।” -(দৈনিক যুগান্তর, ০৫/১১/২০১২)। জেনারেল হারুন একজন আওয়ামী লীগ নেতা। দুদকের কি সামর্থ্য আছে এ নেতাকে একদিনের জন্যও জেলে নেয়ার? এতবড় দূর্নীতির পরও তাকে জেলে যেতে হয়নি।

ডেসটিনি ছাড়া আরো ত্রিশটির বেশি এম.এল.এম কোম্পানি অবাধে মানুষকে প্রতারণা করার সুযোগ পায় আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনে। এসব কম্পানির মধ্যে রয়েছে ইউনিপে টু ইউ, সাকসেস লিংক, গ্লোবাল নিউওয়ে, প্রভৃতি। দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, কয়েকটি এম.এল.এম প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে ৪,৯৬৩ কোটি টাকার কিছু বেশি এবং এর মধ্যে ব্যক্তিগত একাউন্টে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল প্রায় ৪,৬০১ কোটি টাকা। -(দৈনিক প্রথম আলো ০৯/০৯/২০১২)। টাকা বানানোর এরূপ সুযোগ দেখলে কি দুর্বৃত্তরা কি আর বসে থাকে। মরা লাশের গন্ধ পেলে যেমন শকুন ছুটে আসে তেমনি অর্থলুটের সুযোগ দেখলে দেশবিদেশের ডাকাতেরাও ছুটে আসে। বাংলাদেশের সরকার দুর্বৃত্ত চোর-ডাকাতদের জণ্য তো সে সুযোগই সৃষ্টি করেছে। তাই ২০০৫-এ এগিয়ে আসে চায়না থেকে তিয়ানশি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। -(দৈনিক আমাদের সময়.কম ০৫/১১/২০১২)। এসব চোর ডাকাতদের হাতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কুশ্রী অর্থনৈতিক কেলেংকারির ঘটনা ঘটে সোনালী ব্যাংকের শেরাটন হোটেল ব্রাঞ্চে। সেটিও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের যোগসাজসে। বাংকের ঐ শাখা থেকে ৩,৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ বা প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা লুট হয়ে যায়। হলমার্ক একাই নিয়েছে প্রায় ২,৬৬৮ কোটি টাকা। একটি ব্যাংকের একটি ব্রাঞ্চে একটি কম্পানির এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা আর কোথাও ঘটেনি। এটিই ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। (দৈনিক প্রথম আলো, ০৫/০৯/২০১২)। বাংলাদেশে সকল ডাকাত মিলেও গ্রামগঞ্জ থেকে এত অর্থ বাংলাদেশের বিগত ৫০ বছরে লুটতে পারেনি। অথচ সে লুটের সাথে জড়িত প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ।

 

মূক্তি কীরূপে?

কিন্তু এরূপ সীমাহীন লুটপাঠও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে গুরুতর কিছু মনে হয়নি। এক গোলটেবিল অনুষ্ঠানে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন,“ব্যাংকিং খাতে আমরা ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেই। এর মধ্যে মাত্র তিন বা চার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। এটা কোনো বড় অঙ্কের অর্থ নয়। এ নিয়ে হইচই করারও কিছু নেই। সংবাদ মাধ্যমে এটা নিয়ে অতিরিক্ত প্রচারণা করে দেশের ক্ষতি করছে। এমন ভাব যেন দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ধ্বসে গেছে। এতে আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।” “সোনালী ব্যাংকের এক রূপসী বাংলা শাখায় জালিয়াতি করা অর্থের পরিমাণই তিন হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অন্য কোনো বেসরকারি ব্যাংকে এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটলে ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যেত। যেমন বন্ধ হয়েছিল ওরিয়েন্টাল ব্যাংক।” -(প্রথম আলো ০৫/০৯/২০১২)।

এই অর্থমন্ত্রীই সম্প্রতি দিল্লি সফরে গিয়ে সাভারে ভবন ধ্বসে হাজারের বেশী মানুষের মৃত্যু সম্পর্কে বলেছেন, এটি কোন গুরুতর বিষয় নয়। বলেছেন, এ ভবন ধ্বসে গার্মেন্টস শিল্পের কোন ক্ষতি হবে না। বিকৃত ও অসুস্থ্য বিচারবোধ আর কাকে বলে। চোর-ডাকাত বা ব্যাভিচারিদের ঘৃনা করার সামর্থ্য চোর-ডাকাত ও ব্যাভিচারিদের থাকে না। কিন্তু দেশের নিরক্ষর সাধারণ মানুষদের তা থাকে। এমনকি শিশুদেরও সে সামর্থ্য্য থাকে। কিন্তু সে সামর্থ্য নাই হাসিনা সরকারের এসব মন্ত্রীদের। নাই খোদ শেখ হাসিনার ও তার দলীয় কর্মীদের। বাংলাদেশের মূল বিপদটি এখানেই। দেশ আজ জিম্মি এসব বিবেকহীন অসুস্থ্য ও দুর্বৃত্ত ব্যক্তিদের হাতে। তারা যতদিন ক্ষমতায় থাকবে তাতে শুধু দেশের নয়, ইসলাম এবং দেশবাসীর ঈমানের বিরুদ্ধেও নাশকতা বাড়বে। কতটা দ্রুততর সাথে এ আওয়ামী দখলদারীর সমাপ্তি ঘটবে, তার উপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা ও শান্তি। এবং নির্ভর করছে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও ঈমানের হেফাজত। দেশের স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি, দেশবাসীর ঈমানের হেফাজত  এবং তাদের ইহকাল ও আখেরাতের কল্যাণে এ ছাড়া ভিন্ন পথ আছে কী? ১ম সংস্করণ ১২/০৫/১৩; ২য় সংস্করণ, ১৮/০২/২০২১।

 




বিবিধ ভাবনা (২৭)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. যে কারণে পশু থেকে ভিন্ন

পানাহারে বাঁচা ছাড়া পশুর জীবনে কোনরূপ সামাজিক দায়-দায়িত্ব থাকে না। ফলে শিকার ধরা ছাড়া পশুর জীবনে কোন লড়াই থাকে না। অথচ মানুষকে বাঁচতে হয় বহুবিধ সামাজিক দায়ভার কাঁধে নিয়ে। তাকে সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে হয়। সে লক্ষ্যে দুর্বৃত্তদের নির্মূল এবং ন্যায় ও ইনসাফের প্রতিষ্ঠা দিতে হয়। সে জন্য লাগাতর লড়াই করতে হয়; জান ও মালের কোরবানী পেশ করতে হয। সভ্য সমাজ নির্মাণের সে কাজে ইসলামের সিদ্ধ হাতিয়ারটি হলো জিহাদ। মানব জীবনে এটিই হলো সর্বোচ্চ ইবাদত। এবং সবচেয়ে কল্যাণকর কর্ম।

বস্তুত ঈমানদারের ঈমানের মূল পরীক্ষাটি হয় জিহাদের অঙ্গণে। প্রশ্ন হলো, যার জীবনে জিহাদ নাই -সে কি পশু থেকে আদৌ ভিন্ন? মহান আল্লাহতায়ালা এক শ্রেণীর মানুষকে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট বলেছেন। এরাই হলো তারা। যে সমাজে এরূপ পশু-চরিত্রের মানুষদের সংখ্যা বেশী -সেখানে অসম্ভব হয় সভ্য সমাজের নির্মাণ। সমাজ বা রাষ্ট্র কতটা সভ্য ভাবে বেড়ে উঠবে তা নির্ভর করে সভ্য নির্মাণের কাজ সে রাষ্ট্রে কতটা হলো তার উপর। রাষ্ট্রের বুকে দুর্বৃত্তদের দখলদারী দেখে নিশ্চিত বলা যায়, সে কাজটি হয়নি। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোতে দুর্বৃত্তায়ন তখন থেকে শুরু হয় যখন স্রেফ মসজিদ-মাদ্রসা গুরুত্ব পেয়েছে, এবং গুরুত্ব হারিয়েছে সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ।

২. অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়ার বিপদ

প্রতিটি জনপদে যেমন রোগজীবাণু থাকে, তেমনি ভয়ানক অপরাধী এবং দুর্বৃত্তও থাকে। সে অপরাধীদের থেকে নিরস্ত্র জনগণকে বাঁচানোর দায়িত্বটি প্রতিটি সভ্য দেশেরই সরকার, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আদালতের। জনগণ সেকাজের জন্যই রাজস্ব দিয়ে তাদেরকে আরাম-আয়াশের মাঝে প্রতিপালন করে। কিন্তু রাষ্ট্র যখন অপরাধীদের হাতে অধিকৃত তখন তাদের এজেন্ডাই পাল্টে যায়। তখন জনগণকে বাদ দিয়ে তাদের কাজ হয় অপরাধীদের বাঁচানো।

এরা জনগণকে দেখে শত্রু রূপে। এবং আনন্দ পায় জনগণকে নৃশংস ভাবে রাস্তাঘাটে পিটিয়ে, জেলে তুলে, তাদের পকেট থেকে ঘুষের টাকা নিয়ে। তারা নিজেরাই পরিণত হয় ভয়ানক অপরাধীতে। বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে দেশের সকল চোর-ডাকাত, খুনি ও সন্ত্রাসীগণ যত অপরাধ করে তার চেয়ে বেশী আপরাধ করে এসব সরকারি বাহিনীর লোকেরা। তখন প্লাবন আসে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, খুন ও ধর্ষণে। কোন সভ্য দেশে এমন অসভ্যতার কথা ভাবা যায়না।

জনগণের বিরুদ্ধে নৃশংস অপরাধ কর্মে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশের সরকারি সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর লোকেরা। তাই ২০১৮ সালে জনগণের ভোটের উপর যখন ডাকাতি হলো, দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে সে ভোটডাকাতি ঠ্যাকাতে ময়দানে দেখা যায়নি। বরং তাদের দেখা গেছে দুর্বৃত্তদের সাথে। তারা নিজেরা স্বৈরাচারি সরকারকে বিজয়ী করতে ভোটডাকাতিতে লিপ্ত হয়েছে। একাজে নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বর্তমান প্রধান জেনারেল আজিজ। আর সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাজ হয়েছে এ দুর্বৃত্তকে স্যালুট দেয়া। স্বৈরাচারি সরকারকে বাঁচাতে ২০১৩ সালে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও RABকে দেখা গেছে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের মুসল্লীদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাতে। জনগণের সাথে এরূপ জঘন্য গাদ্দারী আর কি হতে পারে? কুকুরকে পানাহার দিলে কখনোই তারা একাজ করে না।

৩. স্বৈরশাসনের সবচেয়ে বড় নাশকতাটি প্রসঙ্গে

দৈহিক বল পশুরও থাকে। মানবের শ্রেষ্ঠ সামর্থ্যটি দৈহিক বল নয়, সেটি হলো নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বল। এর সামর্থ্যের বলেই উচ্চতর রাষ্ট্র ও সভ্যতা নির্মিত হয়। সভ্য রাষ্ট্রের আলামত হলো, সে রাষ্ট্রের বুকে জনগণ পায় নিজ নিজ সামর্থ্য নিয়ে বেড়ে উঠার পূর্ণ স্বাধীনতা। তখন রাষ্ট্রের কাজ হয়, বেড়ে উঠাকে নিশ্চিত করতে সুষ্ঠ পরিবেশ সৃষ্টি করা। এরূপ সভ্য দেশে গুরুতর অপরাধ গণ্য হয়, এমন কোন আইনই প্রণয়ন করা -যা নিয়ন্ত্রিত করে জনগণের স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠার স্বাধীনতাকে।  

অপরদিকে স্বৈরশাসকের সবচেয়ে বড় নাশকতাটি হলো, কেড়ে নেয় নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য নিয়ে বেড়ে উঠার স্বাধীনতা। জনগণের এমন গুণের মাঝে তারা বিপদ দেখে। ফলে নিয়ন্ত্রিত হয় জনগণের কথা বলা ও লেখালেখির স্বাধানীতা। দুর্বৃত্ত সরকার বরং স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠতে দেয় হয় দুর্বৃত্তদের। কারণ, তাদের মধ্য থেকেই তারা নিজ দলের জন্য লড়াকু দুর্বৃত্ত খুঁজে পায়। এজন্যই স্বৈরাচারি শাসনে সুনামী আসে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসে। বাংলাদেশ তো তারই উদাহরণ। দেশটি অতীতে দুর্নীতিতে যেরূপ বিশ্বে ৫ বার প্রথম হলো -তার মূল কারণ এই স্বৈরশাসন।

৪. সর্বশ্রেষ্ঠ জনকল্যাণ মূলক কাজটি প্রসঙ্গে

মানব যখন মানবিক গুণ বেড়ে উঠে তখন সে পায় দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে এবং ন্যায়ের পক্ষে খাড়া হওয়ার নৈতিক সামর্থ্য। এ সামর্থ্যের বলেই মানুষ পায় জান্নাতের পথে চলার যোগ্যতা। একটি দেশে ভাল মানুষের সংখ্যাটি সে দেশে মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যাটি দেখে মেলে না। সেটি মেলে দুর্বৃত্তি নির্মূলের যুদ্ধে সৈনিকদের সংখ্যা দেখে। সেটি না হলে বুঝতে হবে মসজিদ-মাদ্রাসা কাজ দিচ্ছে না।

অপর দিকে যারা জাহান্নামের যাত্রী, তারা নামে দুর্বৃত্তিতে। তারা যে শুধু একাই সে পথে চলে না –তা নয়; সাথে টানে জনগণকেও। তখন বাজার পায় শয়তানের প্রজেক্ট। দুর্বৃত্ত শাসনের এটিই হলো মূল বিপদ। তাই সমাজে সবচেয়ে বড় কল্যাণকর কাজটি মসজিদ, মাদ্রাসা বা এতিম খানা গড়া নয়, সেটি হলো দেশের বুক থেকে দুর্বৃত্ত শাসনের নির্মূল। তখন রাষ্ট্র পরিণত হয় জান্নাতে নেয়ার বাহনে। রাষ্ট্র পরিণত হয় দুস্থ্য, দরিদ্র, বিধবা ও এতিম -সবার জন্যই এক জনকল্যাণ রাষ্ট্রে।

৫. আল-জাজিরার বিরুদ্ধে হাসিনার প্রতিশোধ

ডাকাত সরদার কখনোই নিজ দলের লোকের খুনের বিচার করেনা। দলের সদস্য জেলে থাকবে বা খুনের অপরাধে ফাঁসিতে ঝুলবে -সেটিকে তারা নিজেদের জন্য পরাজয় ও অসন্মান মনে করে। তারা কি ক্ষমতায় যায় -এরূপ পরাজয় ও অসন্মান মেনে নেয়ার জন্য? জেল এবং ফাঁসি তো বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীর জন্য।

সম্প্রতি (ফেব্রেয়ারি, ২০২১) আল-জাজিরা টিভি চ্যানেল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান এবং শেখ হাসিনার ভোটডাকাত ম্যানেজার জেনারেল আজিজের খুনি ভাইদের পলাতক দেখিয়েছিল। আল-জাজিরা দেখিয়েছিল, পুলিশ বাহিনী এ পলাতক আসামীদের খুঁজলেও ঢাকার এ বিয়ের অনুষ্ঠানে তারা দেশের প্রসিডেন্ট ও সেনাপ্রধানের সাথে উৎসব করছে। আল-জাজিরার এ ডকুমেন্টারী হাসিনাকে যে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করেছে –তা নিয়ে সন্দেহ নাই। হাসিনা আল-জাজিরার বিরুদ্ধে ত্বরিৎ বদলাও নিয়েছে; এবং সেটি খুনীদের খুনের অপরাধ থেকে মাফ করে। এখন আরা তারা পলাতক নয়। পুলিশের খাতায় এখন তারা নির্দোষ। ডাকাতের হাতে রাষ্ট্র যাবে এবং ডাকাত জেলে যাবে –সেটি কি করে হয়?  

 

৬. বাংলাদেশ এখন ডাকাতি করা মাল
সমগ্র বাংলাদেশ এখন শেখ হাসিনার ডাকাতির মাল। সে মালের বন্টন হচ্ছে তার পরিবারের সদস্যদের মাঝে। হাসিনা নিজ পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়কে প্রতি মাসে বিপুল অংকের টাকা দিচ্ছে। সেটি দেয়া হচ্ছে হাসিনার ডিজিটাল বিষয়ে পরামর্শদাতার বেতন রূপে। ডাকাতির মাল বন্টনে প্রাপকের যোগ্যতা দেখা হয় না। দেখা হয়, সে ব্যক্তিটি ডাকাত দলের সদস্য কিনা। জয় তো সে দলেরই সদস্য। একই ভাবে নানা খরচের খাত দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে হাসিনার বোন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের।

 

৭. ঐক্য আসলে বিজয়ও আসে

মহল্লার লোকেরা সংখ্যায় বিশাল হলেও  তাদের ঘরে ডাকাতিতে ডাকাতদের বেগ পেতে হয়না। কারণ, সংখ্যায় কম হলেও ডাকাতদের মধ্যে কাজ করে একতা। একতাই তাদের শক্তি। সে রকম একতা মহল্লাবাসীর মধ্যে থাকে না। তাদের মাঝে ডাকাতদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষাও থাকে না। একই অবস্থা ১৭ কোটি বাংলাদেশীর। তারা নানা দলে বিভক্ত। অনৈক্যই তাদের দুর্বলতা। অপরদিক চোরডাকাত, ভোটডাকাত, খুনি ও সন্ত্রাসী –তা যে কোন জেলার, যে কোন রাজনৈতিক দল বা যে কোন সামরিক বা বেসামরিক প্রতিষ্ঠানেরই হোক না কেন -তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একতাবদ্ধ। সেটি যেমন শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যায় দেখা গেছে, তেমনি দেখা গেছে ২০১৮ সালের ভোটডাকাতি।

দেশের প্রধান আপদ যে স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের অধিকৃতি এবং তাদের নির্মূলে ব্যর্থ হলে যে কারোই কোন শান্তি নাই –এ উপলব্ধিও বিরোধী দলগুলোকে একতাবদ্ধ করতে পারছে না। জনগণের অনৈক্য অসম্ভব করে সভ্য ভাবে বাঁচাকে। অনৈক্য প্রতিশ্রুত আযাব আনে আখেরাতেও। পবিত্র কোর’আনে সে হুশিয়ারী শুনানো হয়েছে সুরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। অনৈক্য গড়া এজন্যই  হারাম এবং কবিরা গুনাহ। এতে শুধু বিপদই বাড়ে।

পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনগণ বাঁচছে অনৈক্যের ন্যায় হারামকে নিয়ে। হারাম নিয়ে বাঁচলে কি মহান আল্লাহতায়ালার রহমত জুটে? বরং বিজয় তুলে দেয় দুর্বৃত্তদের ঘরে। বস্তুত বাংলাদেশের জনগণের উপর দুর্বৃত্ত শাসনের আজ যে আযাব -সেটি তাদের নিজ হাতের কামাই। এ আযাব থেকে বাঁচতে হলে একতার পথে ফিরে আসতেই হবে। একতার বিকল্প একতাই। একতা আসলে বিজয়ও আসে। ১৭/০২/২০২১     

 




অতীতের ব্যর্থতা এবং বাংলাদেশের আজকের বিপর্যয়

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 আজকের বিপর্যয়

বাংলাদেশের আজকের বিপর্যয়টি যেমন গভীর, তেমনি ভয়ানক। দেশটিতে অসম্ভব হয়েছে সভ্য জীবন-যাপন। নৃশংস ফ্যাসিবাদ বলতে যা বুঝায় -প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তারই টেক্সটবুক ভার্শন। ক্ষমতাসীন দলের নাশকতায় মারা পড়েছে সংসদীয় গণতন্ত্র, কেড়ে নেয়া হয়েছে মৌলিক মানবাধিকার, কোমড় ভাঙ্গা হয়েছে বিরোধী দলগুলোর, বিলুপ্ত হয়েছে নিরপেক্ষ নির্বাচন, দলীয়করণের শিকার হয়েছে আদালত এবং প্লাবন এসেছে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের। তারা দখলে নিয়েছে রাজনীতিই শুধু নয়, দেশের বিচার ব্যবস্থা, মিডিয়া, প্রশাসন, পুলিশ -এমনকি সেনাবাহিনী তাদের আজ্ঞাবহ সেবাদাসে পরিণত হয়েছে। সরকারের যা ইচ্ছা তাই করার আজাদী রয়েছে। কিন্তু জনগণের অধিকার নাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে মিটিং, মিছিল ও প্রতিবাদের। দুর্বৃত্তদের হাতে শত শত কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। সেটিও যেন মামূলী বিষয়; প্রতিকার নাই।

রাজনীতির ময়দানে নিরংকুশ বিজয়টি ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের। তাদের কারণে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ভারতীয় এজেন্ডা। বাংলাদেশ থেকে ভারতের চাওয়ার তালিকাটি বিশাল। ভারত চায়, নবীজী (সা:)’র ইসলাম –যাতে আছে ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়তের প্রয়োগ, জিহাদ, বিশ্বমুসলিম ভাতৃ্ত্ব, শুরা ভিত্তিক শাসন এবং একতা, তা পুরাপুরি বাংলাদেশের বিলুপ্ত হোক মুসলিম জনগণের চেতনা থেকে। ভারতের কাছে নবীজী (সা:)’র  ইসলাম হলো মৌলবাদ এবং জিহাদ হলো সন্ত্রাস। ভারতের দাবী, বাংলাদেশের মুসলিমদের সরতে হবে ইসলাম থেকে। ইসলামের পক্ষ নেয়াটাই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশের ভারতেসেবী পক্ষটিও অবিকল সেটিই বলে। ভারত চায়, বাংলাদেশের মানুষ বাঁচুক মুর্তিনির্মাণ ও মুর্তির সামনে ভক্তি জানানোর হিন্দু সংস্কৃতি নিয়ে। ভারতের সে সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা দিতেই রাস্তাঘাট পূর্ণ হচ্ছে মুর্তিতে –৮ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে কখনোই সেটি হয়নি। এমনকি হিন্দু শাসন আমলেও এতো মুর্তি গড়া হয়নি -যা আজ হচচ্ছে।

ভারত চায়, ভারতে মুসলিমগণ খুন, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হলে বা সেদেশে মসজিদ ধ্বংস করা হলে বাংলাদেশ সরকারের কাজ হলো তা নিয়ে নীরব থাকা। এবং জনগণকে রাস্তায় ভারতবিরোধী প্রতিবাদ থেকে প্রতিহত করা। এবং ভারত চায়, বাংলাদেশের বানিজ্যিক বাজার ও শ্রম বাজার সম্পূর্ণ উম্মুক্ত হোক ভারতীয়দের জন্য। লক্ষণীয় হলো, ভারত যা কিছু চায় তা সবই দিয়েছে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকার। ভারতকে অকাতরে দেয়া নিয়ে হাসিনার প্রচুর গর্বও। অতীতে একই ভাবে শেখ মুজিবও দিয়েছিল। কিন্তু ভারত থেকে পাওয়ার অংকটি ফাঁকা। পদ্মার নায্য পানি যেমন মিলছে না, মিলছে না তিস্তার পানিও।

 

অতীতের ব্যর্থতা

অতীতের ব্যর্থতাগুলো পরবর্তীতে ভয়ানক বিপর্যের কারণ হয়। এবং আজকের ব্যর্থতাগুলো বিপর্যয় সৃষ্টি করবে ভবিষ্যতে। প্রশ্ন হলো, কি সে অতীতের ব্যর্থতা? এবং আজকের ব্যর্থতাগুলোই কি? বাংলাদেশের কল্যাণ নিয়ে যারা ভাবে তা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়্ বাংলাদেশে আজ যে বিপর্যয় তার শিকড় রোপন করা হয়েছিল দেশটির জন্মের বহু আগেই। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোথায় সে ব্যর্থতা এবং কারা সে ব্যর্থতার নায়ক সেগুলো  চিহ্নত করা। নইলে আজকের ব্যর্থতার কারণগুলো যেমন জানা  যাবে না, তেমনি ভবিষ্যতের বিপর্যয় থেকেও মুক্তি মিলবে না।

বাংলাদেশের বর্তমান ব্যর্থতাগুলোর শিকড় বপন করা হয়েছে ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে। ঘটেছে ব্রিটিশ শাসনামলেও। সে ব্যর্থতার কারণ যেমন অপরাধী চক্রের রাজনীতি, তেমনি বুদ্ধিজীবী চক্রের ভয়ানক বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তি। সে সাথে যোগ হয়েছে প্রতিবেশী ভারতের আগ্রাসী ষড়যন্ত্র। তারা যৌথ ভাবে ব্যর্থ করে দেয় উপমহাদেশের মুসলিমদের বিশাল রক্ত ব্যয়ে অর্জিত পাকিস্তান প্রজেক্ট। দেশটির ধ্বংসের মধ্যে তারা নিজেদের স্বার্থ পূরণের রাস্তা খুঁজেছে। তবে তাদের ধ্বংস প্রক্রিয়া ১৯৭১’য়ে থেমে যায়নি, বরং সে অভিন্ন অপরাধীদের হাতেই জিম্মি হলো আজকের বাংলাদেশ।

ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর হাতে বঙ্গ বিজয়ের পর বাঙালী মুসলিমদের সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্ব ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। সে সময় পাকিস্তান ছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। এবং সে রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ জনগোষ্টি ছিল বাঙালী মুসলিম। এবং সে পাকিস্তান আজ পারমানবিক অস্ত্রধারী একমাত্র মুসলিম দেশ। ফলে বাঙালী মুসলিমগণ সুযোগ পেয়েছিল শুধু মুসলিম বিশ্বের নয়, সমগ্র বিশ্ব রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার। হতে পারতো দক্ষিণ এশিয়ার বুকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রধান কর্ণধার। কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের সে সুবর্ণ সুযোগ বাঙালী কাপালিকদে ভাল লাগেনি। ফলে সে সুযোগটি বিনষ্ট করতে তারা উঠে পড়ে লাগে।

প্রতিবেশীর গোলাম হওয়ার নেশা যখন চাপে তখন স্বাধীন থাকাটাই অসহ্য হয়ে উঠে। এদের কাছে তাই অসহ্য হয়ে পড়ে পাকিস্তানের বৃহৎ ভূগোল। এবং সে ভূগোল ভাঙ্গার কাছে ভারতের ন্যায় কুচক্রি ও সুযোগ-সন্ধানী পার্টনারও পেয়ে যায়। ভারত পাকিস্তান ভাঙ্গার সে কাজটি নিজ খরচে ১৯৪৭ সালে করে দিতে দুই পাড়ে খাড়া ছিল। তাদের প্রয়োজন ছিল শেখ মুজিবের ন্যায় একজন আজ্ঞাবহ সেবাদাসের। সে সুযোগটি আসে ১৯৭১’য়ে। ফলে মুক্তি বাহিনীকে একটি জেলা বা একটি মহকুমাও স্বাধীন করতে হয়নি। ভারতীয় সেনাবাহিনী সে কাজটি নিজ দায়িত্বে ও নিজ খরচে করে দিয়েছে। একাজের জন্য ভারতের পদসেবা, অর্থসেবা ও ভারতের এজেন্ডার প্রতিষ্ঠা দিয়ে বাঁচাই এখন বাঙালী কাপালিকদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি। ভারতের প্রতি চির কৃতজ্ঞ হয়ে বাঁচাটাই তাদের কাছে গর্বের। 

 

পাকিস্তান আমলের বড় ব্যর্থতাটি

পাকিস্তান আমলের বড় ব্যর্থতাটি অর্থনৈতিক ছিল না। প্রশাসনিকও নয়। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার ছিল ভারতের চেয়েও অধিক। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রশাসকগণ আসতো পাকিস্তান থেকে উন্নয়নের মডেল শিখতে্। সে সময় বহু বিশ্ববিদ্যালয়, বহু মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ, ডিগ্রী কলেজ, ক্যাডেট কলেজ, স্কুল, ক্যান্টনমেন্ট ও কলকারাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্ত ২৩ বছরে একখানি বইও এ নিয়ে লেখা হয়নি যে কেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা হলো। ভারত তো ১৯৪৭ সালের আগে অখণ্ডই ছিল। কিন্তু কেন ভাঙ্গার প্রয়োজন দেখা দিল? পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে এ প্রশ্নটির জবাব দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের ছাত্ররা দেশ-বিদেশের কত জীবজন্তু, লতা-পাতা, কবিতা-পুঁথির উপর গবেষণা করে। পিএইচডি ডিগ্রিও নেয়। কিন্তু অখণ্ড ভারত ভেঙ্গে কেন পাকিস্তান সৃষ্টি হলো -তা নিয়ে কোন গবেষণা করা হয়নি। তেমন কোন বইও লেখা হয়নি। আজ যে অখণ্ড ভারতের কথা বলা হচেছ এবং যেভাবে বাঙালী মুসলিমের মনে বাড়ছে অখণ্ড ভারতের মোহ, সেটি কখনোই এতটা প্রতিষ্ঠা পেত না যদি সে সময় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা নিয়ে ছাত্রদের প্রকৃত ইতিহাস জানানো হত। রাতের অন্ধকারে সুবিধা হয় চোর-ডাকাত-দুর্বিত্তদের, তেমনি অজ্ঞতায় মহা সুবিধা পায় বিদেশী শত্রুরা। তখন জনপ্রিয়তা পায় তাদের ধোকাপূর্ণ বুলি এবং ক্ষতিকর ধ্যান-ধারণা। অখণ্ড ভারতের মোহ তো সে কারেণই বাড়ছে। ইসলামে অজ্ঞ থাকা এজন্য কবীরা গুনাহ।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল ইসলাম ও প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্ব। ইসলামই ছিল পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে একমাত্র যোগসূত্র। এমন একটি আদর্শিক দেশের প্রতি সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রি ও ইসলামবিরোধীদের দরদ থাকার কথা নয়। বরং এমন দেশে তাদের রাজনৈতিক মৃত্যু অনিবার্য। সেটি তারা বুঝতো বলেই দিবারাত্র খেটেছে দেশটির ত্বরিৎ ধ্বংসে। কিন্তু পাকিস্তানের সরকারের যারা কর্ণধার ছিল তারা এ ঘরের শত্রুদের চিনতে পারিনি। চিনলেও তাদের থেকে বাঁচার কোন চেষ্টা করেনি। বরং তাদের অবাধে বাড়তে দিয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধের বহু  আগেই বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গনটি ভারতসেবীরা দখলে চলে যায়। পাকিস্তান ও ইসলামের পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের তেমন কোন লড়াকু সৈনিকই ছিলনা। একই অবস্থা আজও।

সেক্যুলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেদিন যারা বের হয়েছেন তারা পাকিস্তানের বা ইসলামের পক্ষে লাঠি না ধরে নিজেদের শ্রম ও মেধার বিনিয়োগ করেছেন তার বিনাশে। ষাটের দশকে তারা লাঠি ধরেছিলেন সোভিয়েত রাশিয়া বা চীনের পক্ষে। আর এখন খাটছেন ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণে। তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম যে বাঙালীকে পাকিস্তান সরকার বৃত্তি দিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠায় তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক জনাব আব্দুর রাজ্জাক। অথচ এই আব্দুর রাজ্জাকই বিলেত থেকে ফিরে এসে যে কাজটি লাগাতর করেছেন তা হলো পাকিস্তানের শিকড় কাটার কাজ। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিব তাঁর এ রাজনৈতিক গুরুকে জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা দেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আব্দুব রাজ্জাকের ন্যায় এ রকম গাদ্দার ছিলেন প্রচুর। এদেরই অনেকেই এখন খাটছেন ভারতের সেবাদাস রূপে। এদের কারণেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইসলাম-বিরোধীদের দুর্গে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলেও তাদের মিশন শেষ হয়নি। বাংলাদেশের ভুগোলের মধ্যেও তারা পাকিস্তান ও ১৯৪৭’য়ের গন্ধ টের পায়। এবং যা কিছু পাকিস্তানী -তাই তাদের কাছে ঘৃণ্য। এদের অনেকে নাকি পাকিস্তানের নাম উচ্চারন করলে টুথ পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজে। তারা শুধু পাকিস্তানের নয়, শত্রু স্বাধীন বাংলাদেশেরও।

 

নাশকতা চেতনা বিভ্রাটের

বাঙালী মুসলিমের চেতনা বিভ্রাটের আলামতগুলো বিশাল। অনেকেই বলে, “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না হলেই তো ভাল হতো। অখণ্ড ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হতো -এ বিশাল জনসংখ্যা শক্তিশালী মুসলিম শক্তির জন্ম ঘটাতো।” একথা বলার মতলবটি হলো, বাংলাদেশ না হলে ভাল হতো -সে কথাটা পরোক্ষ ভাবে বলা। এরূপ কথা ১৯৪৭’য়ের আগে কংগ্রেসপন্থি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের নেতা-কর্মীগণও বলতো। তারাও চায়নি, বাংলাদেশ অখন্ড ভারতের বাইরে থাক। সিলেটে যখন গণভোট হয় তখন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের আলেমগণ বহু চেষ্টা করেছে যেন সিলেটে ভারতে থাকে। বাংলাদেশ ভারতে মিশে গিলে এখনও তারা খুশি হয়। 

বাংলাদেশে মুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ৯১ ভাগ। কিন্তু তাতে কি রাজনীতি, সংস্কৃতি ও প্রশাসনে হিন্দু বা ভারতীয়দের দাপট কমেছে? কাশ্মীরে শতকরা ৭০ ভাগ মুসলিম। কিন্তু তাতে কি তারা স্বাধীন ভাবে বাঁচার সুযোগ পেয়েছ। অনেকের প্রশ্ন, “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় মুসলিমদের কোন কল্যাণটি হয়েছে?” কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন হলো, ভারতে বসবাসকারি প্রায় ২০ কোটি মুসলিমেরই বা কোন কল্যাণটি হয়েছে? বাংলাদেশে যত মুসলিমের বাস তার চেয়ে বেশী মুসলিমের বাস ভারতে। কিন্তু ভারতীয় মুসলিমদের শক্তি কতটা বেড়েছে? বরং বঞ্চনা সেখানে সর্বত্র। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ভারতের সংখ্যালঘুদের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য একটি তদন্ত কমিশন ঘটনা করেছিলেন। সে তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে যে তথ্যগুলো বেরিয়ে এসেছে তা তো অতি করুণ। শিক্ষা ও চাকুরিতে মুসলিমদের অবস্থা ভারতের অচ্ছুত নমশুদ্রদের চেয়েও খারাপ। ১৯৪৭’য়ে ভারতের মুসলিমদের যে অবস্থা ছিল তা থেকেও তারা অনেক নিচে নেমেছে। অর্থনৈতিক বঞ্চনার পাশাপাশি তারা নিয়মিত নির্মম ভাবে মারা যাচ্ছে এবং লুটপাঠ ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে মুসলিম-নির্মূলের অসংখ্য দাঙ্গায়। ভারতীয় জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ মুসলিম হলেও চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও নয়। কিন্তু ভারতীয় মুসলিমের সে বঞ্চনার ইতিহাস বাঙালী মুসলিমদের সামনে তুলে ধরা হয়নি। পাকিস্তান আমলের এ এক বড় ব্যর্থতা। নেকড়েকে নেকড়ে রূপে পরিচয় না করিয়ে বিপদ তো ভয়াবহ।   

 

পাকিস্তান কি সত্যিই ব্যর্থ?

বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের খাসলত হলো নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে পাকিস্তানের ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরা। নিজেরা যে ৫ বার দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হলো -সে কথা তারা বলে না। তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি বা শাড়ীর বদলে মাছধরা জাল পড়ে বাঙালী মহিলা যে বিশ্বময় ইতিহাস গড়লো -সে কথাও বলে না। অথচ লাহোর বা করাচীতে বোমা ফুটলেই বলে পাকিস্তান একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। পাকিস্তানের ব্যর্থতা অনেক। তবে দেশটির অর্জন কি এতোই তুচ্ছ? পাকিস্তানের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালগুলিতে যত মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করে ভারতে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা তার ২০ ভাগের এক ভাগও নয়। অথচ একটি দেশের মানুষ কতটা সামনে এগুচ্ছে বা কীরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক শক্তিসঞ্চয় করছে -সেটি পরিমাপের একটি নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা। ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে চাকুরিজীবী প্রফেশনালদের সংখ্যাও অনি নগন্য।

পাকিস্তানের একমাত্র করাচী শহরে যত ডাক্তার, শিক্ষক, প্রকৌশলী, আইনবিদ, প্রফেসর, বিজ্ঞানী ও সামরিক অফিসারের বসবাস -সমগ্র ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে তা নেই। তাছাড়া পাকিস্তানে যতজন পারমানবিক বিজ্ঞানী বা পদার্থ বিজ্ঞানীর বসবাস তা ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে দূরে থাক, ৫৭টির মুসলিম দেশের মধ্যে কোন দেশেই নাই। সম্প্রতি ব্রিটিশ পত্রিকায় প্রকাশ, পাকিস্তানের পারমানবিক বোমার সংখ্যা ফ্রান্সের প্রায় সমকক্ষ। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একমাত্র তাদের হাতেই রয়েছে পারমানবিক বোমাধারি দূরপাল্লার মিজাইল যা ভারতীয় প্রযুক্তির চেয়ে অগ্রসর। একাত্তর থেকে পাকিস্তানে তাই অনেক সামনে এগিয়েছে। দেশটি আজও বেঁচে আছে সে সামরিক শক্তির জোরেই। নইলে ভারত ইতিমধ্যে দেশটিকে আরো কয়েক টুকরোয় বিভক্ত করে ফেলতো। একাত্তরের পর ভারতীয় র’ সেটির পরিকল্পনাও এঁটেছিল। ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রায়না তার বই “Inside RAW”য়ে সে বিষয়ে বিস্তর বিবরণ তুলে ধরেছেন।

সামরিক শক্তির বিচারে পাকিস্তানই হল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। আর এ কারণেই দেশটি তার জন্ম থেকেই সকল আন্তর্জাতিক ইসলাম-বিরোধী শক্তির টার্গেট। অখণ্ড ভারতে বসবাস করলে মুসলিমদের কি এরূপ শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ মিলতো? শক্তি সঞ্চয়ের জন্য তো নিজের পায়ের তলায় মাটি চাই, স্বাধীনতাও চাই। ভারতের মুসলিমদের কি সেটি আছে? কারাগারে বন্দীদের সংখ্যা যতই বৃদ্ধি পাক তাতে কি তাদের শক্তি বাড়ে? মুসলিমদের জন্য ভারত কি জেলখানা থেকে ভিন্নতর?

বীজ সব জায়গায় গজায় না,বেড়েও উঠে না। বনেজঙ্গলে পড়লে গজালেও বেড়ে উঠে না। ভারতে মুসলিম প্রতিভা যে নাই -তা নয়। প্রতিটি শিশুরই থাকে বিপুল সম্ভাবনা। কিন্তু ভারতে মুসলিম শিশুকে বেড়ে উঠার অনুকূল পরিবেশ দেয়া হয়না। হিজরত এজন্যই ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মক্কার বন্দী জীবন ছেড়ে হিজরত এজন্যই আল্লাহপাক ফরয করেছিলেন। হিজরতের মাধ্যমেই তাঁরা সেদিন পেয়েছিলেন উর্বর ভূমিতে গিয়ে নিজ প্রতিভা নিয়ে বেড়ে উঠার সামর্থ্য। এর ফলে পেয়েছিলেন শক্তিশালী সভ্যতার নির্মান ও বিশ্বশক্তি রূপে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সামর্থ্য। সাতচল্লিশের পর ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলিম ভারত থেকে হিযরত করে পাকিস্তান গিয়েছিলেন এমন এক চেতনায়। পাকিস্তানের পারমানবিক বোমা আবিস্কারক ড.আব্দুল কাদির হলেন তাদেরই  একজন।

তাছাড়া পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা অনর্থক গণ্য হলে শুধু পাকিস্তান নয়, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রয়োজনীতাও অনর্থক হয়ে দাঁড়ায়। তাই পাকিস্তানের সৃষ্টিকে অনর্থক বা অনাসৃষ্টি বলা বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর চিন্তা। বাংলাদেশ তার সমগ্র মানচিত্রটা পেয়েছে পাকিস্তান থেকে। বাংলাদেশীরা একাত্তরে বা তার পরে এ একইঞ্চি ভূমিও এ মানচিত্রে বাড়ায়নি। তাই বাংলাদেশী মুসলিমদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ১৯৪৭’য়ে অর্জিত স্বাধীনতা। ১৯৭১’য়ে এসে পাকিস্তান থেকে শুধু বিচ্ছিনতাই জুটেছে, স্বাধীনতা নয়। ১৯৭১’য়ের ১৬ই ডিসেম্বরকে স্বাধীনতা দিবস বললে তার পূর্বের পাকিস্তানী ২৩ বছরকে ঔপনিবেশিক বিদেশী শাসন বলে প্রমাণিত করতে হয়। কিন্তু সে পাকিস্তানী আমলকে ঔপনিবেশিক বিদেশী শাসনামল বললে কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর ঢাকার খাজা নাযিম উদ্দিন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হন কি করে? বগুড়ার মহম্মদ আলী এবং আওয়ামী লীগের সোহরোয়ার্দী প্রধানমন্ত্রীই বা হন কি করে? মিথ্যা কথায় হিসাব মিলানো যায় না। তবে মিথ্যা কথা বলার পিছনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা আছে। সেটি নিজেদের কৃত অপরাধগুলোকে গৌরবময় করার স্বার্থে। তাছাড়া তাদের দায়বদ্ধতা হলো ভারতের আগ্রাসী চরিত্রকে আড়াল করার। কিন্তু যারা আওয়ামী লীগের সে অপরাধের সাথে জড়িত নয় এবং লিপ্ত নয় ভারতের লেজুড়বৃত্তিতে, অন্তত তাদের তো সত্য কথাগুলো নির্ভয়ে বলা উচিত।

বরং একাত্তরে যেটি জুটেছে সেটি হলো, ভারতীয় প্রভাব বলয়ে প্রবেশ। ১৯৭১’য়ের পর থেকে ভারত বাংলাদেশকে গণ্য করে তার প্রতিরক্ষা সীমানার অন্তভূক্ত একটি দেশ রূপে। যেমন হায়দারাবাদেরর নিযামের রাজ্য গণ্য হতো ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের কাছে। হায়দারাবাদের নিযাম সে আমলে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন। অথচ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নিজ দেশের প্রতিরক্ষায় দূরপাল্লার একখানি কামানও কিনতে দেয়নি। দেশটির মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নিতে জালের মত রেল লাইন বসিয়েছিল। তাই ১৯৪৮ সালে ভারত-ভূক্ত করতে ভারতকে বেগ পেতে হয়নি। এক দুর্বল আশ্রিত রাষ্ট্রের অবকাঠামো ব্রিটিশেরা পূর্ব থেকেই সেদেশে নির্মাণ করে গিয়েছিল। বাংলাদেশেও তেমনি এক অবকাঠামো নির্মাণ করেছে ভারত ও তার বাংলাদেশী সহযোগীরা। সেটি যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক, তেমনি সাংস্কৃতিক ও সামরিক। তেমন একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখেই একাত্তরের যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান আর্মির অব্যবহৃত সকল অস্ত্র ভারতীয় সেনাবাহিনী নিজ দেশে নিয়ে যায়। একমাত্র অজ্ঞতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মহাবিভ্রাটই এ সত্যকে ভুলিয়ে দিতে পারে। অথচ বাংলাদেশের ভারতপন্থিরা সে বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রাটই বাড়িয়ে চলেছে। আর সে অজ্ঞতা ও বিভ্রাটের কারণেই ভারতের জালে আটকা বন্দীদশা নিয়েও আজ ভারতপন্থি বাঙালী মহলে হচ্ছে মহোৎসব।   

 

সামনে মহা বিপদ

আজকের ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারি শাসক বাংলাদেশে যেভাবে গণতান্ত্রিক আচার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে -তা ভবিষ্যতে মারাত্মক রকমের বিপর্যয়ের জন্ম দিবে। স্বৈরাচার নিজেই দেশ শাসনের এক নৃশংস ও অসভ্য রীতি। এবং সে অসভ্য শাসনই এখন বাংলাদেশের মানুষের ঘাড়ের উপর। গণতান্ত্রিক শাসনের সভ্য রীতি হাওয়ায় জন্ম নেয় না, সে জন্য লাগাতর পরিচর্যা দিতে হয়। লাগাতর পরিচর্যার মাধ্যমে গণতন্ত্র জনগণের সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়। তখন জনগণ ভোটচুরি ও ভোটডাকাতিকে মন থেকে ঘৃণা করতে শেখে। অথচ সে সংস্কৃতি ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারে গড়ে উঠে না।

স্বৈরাচারি শাসনের বড় নাশকতা হলো এটি দেশকে নেতা শূণ্য করে। পাল্টে দেয় মানুষের মূল্যবোধ ও বিচারবোধ। দুর্বৃত্ত স্বৈরশাসন জনগণকে ভোটচোর ও ভোটডাকাতদেরও মাননীয়, মহান নেতা, দেশবন্ধু, দেশনেত্রী বা জাতির পিতা বলতে শেখায়। এভাবে জনগণের চেতনা ও সংস্কৃতি পাল্টায়। এখানেই বাংলাদেশের জন্য মহা বিপদ। ১৯৭১’য়ে দেশের মানচিত্র পাল্টানো হয়েছিল। এখন চলছে চেতনা, চরিত্র ও সংস্কৃতি পাল্টানোর কাজ। কারণ শয়তান শুধু মুসলিমদের ভূগোল বিভক্ত করা নিয়ে খুশি নয়। আরো নিচে নামাতে চায়। জাহান্নামের পূর্ণ উপযোগী করে গড়ে তুলতে চায়। এজন্য জনগণের ঈমান, আমল ও সংস্কৃতির অঙ্গণে নাশকতা ঘটায়। কারণ স্বৈরাচার তো সুস্থ্য চেতনা ও সংস্কৃতিতে বাঁচে না। অসভ্য স্বৈরাচারি শাসকগণ নিজেরা পাল্টায় না; বরং জনগণকে পাল্টায় নিজেদের দুর্বৃত্তির সাথে ম্যাচিং তথা সমন্বয় বাড়াতে। এজন্যই স্বৈরশাসনে দুর্বৃত্ত উৎপাদনে বাম্পার ফলে। বাংলাদেশের জন্য ভয়ংকর বিপদের কারণ এখানেই্। ২৭/০১/২০২১।   

 




বাংলাদেশের অস্তিত্বের সংকট

ফিরোজ মাহবুব কামাল

মডেলটি ব্যর্থতার                                                             

বিশ্বমাঝে বাংলাদেশ এখন এক ব্যর্থতার মডেল। সেটি যেমন ভোট-ডাকাতি ও নৃশংস ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের। তেমনি পর পর পাঁচবার দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হওয়ার। এবং সে সাথে গুম, খুন, চুরি ডাকাতি, ব্যাংক ডাকাতি, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের জোয়ার আনার। তাই যারা নীচে নামতে চায় তারা বাংলাদেশ বহু কিছু শিখতে পারে। সব রোগের পিছনেই কারণ থাকে। তাই কারণ আছে বাংলাদেশের এরূপ নীচে নামারও। পতনের শুরুটি চেতনার বিভ্রাট বা অসুস্থ্যতা থেকে। চেতনাই ব্যক্তিকে কর্ম ও আচরণে পথ দেখায়। ভারতের অনেকে যেরূপ গো-মুত্র সেবন করে, দলিতদের যেরূপ অচ্ছুৎ বলে এবং কিছুকাল আগেও বিধবাদের স্বামীর চিতায় জ্বালিয়ে হত্যা করতো –তা তো অসুস্থ্য চেতনার কারণে। তাই দুর্বৃত্তিতে লিপ্ত দেখে নিশ্চিত বলা যায়, চেতনার ভূমিটি সুস্থ্যতা হারিয়েছে। বাংলাদেশীদের রোগটি এখানেই। পরিতাপের বিষয়ট হলো, ১৯৭১’য়ে দেশটির জন্ম থেকে জনগণকে সুস্থ্য কোন দর্শন বা চেতনার সন্ধানই দেয়া হয়নি। বরং সেটিকে আড়াল করা হয়েছে। অথচ সুস্থ্য ইসলামের ন্যায় সুস্থ্য জীবন-দর্শনের কারণে মুসলিমগন তাদের গৌরব কালে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হতে পেরেছিলেন। 

বিপদের আরো কারণ, বাংলাদেশী মুসলিমদের চেতনার বিভ্রাট যে দিন দিন ভয়ানক রূপ নিচ্ছে -সে প্রমাণ প্রচুর। রোগ নিয়ে জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার তখনই প্রয়োজন হয় যখন সেটি দেহের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশীদের চেতনার রোগটি এখন আর লুকিয়ে নেই, বরং সর্ববিধ সিম্পটম নিয়ে নিজের উপস্থিতি জাহির করছে। জাতীয় জীবনে কোন রোগই -তা সে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা নৈতিক হোক, হঠাৎ আসে না। বাড়ে বহুকাল ধরে। ঝড় শুরু হওয়ার আগে থেকেই আকাশে যেমন কালো মেঘ জমতে শুরু করে তেমনি জাতির জীবনেও কালো মেঘ জমতে থাকে বিপর্যের বহু আগে থেকেই। কালো মেঘ দেখেও ঝড়ের আলামত টের না পাওয়াটি অজ্ঞতা। তেমনি মানব জীবনের ভয়ানক অজ্ঞতাটি হলো, প্রচণ্ড বিচ্যুতি ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে থেকেও তা নিয়ে বোধোদয় না হওয়া। এ অজ্ঞতা নিরক্ষরতার চেয়েও ভয়ানক।

এমন অজ্ঞতা যে শুধু দেশের সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে বিরাজ করছে তা নয়, প্রকট রূপ ধারণ করেছে তাদের মাঝেও যারা নিজেদেরকে ধর্মভীরু মুসলিম ও ইসলামি আন্দোলনের কর্মী বা সমর্থক বলে দাবী করে। বাংলাদেশের অর্জিত ব্যর্থতার জন্য শুধু কোন একক ব্যক্তি বা দল দায়ী নয়, দায়ী সবাই। দুর্বৃত্ত শাসনকে যারা নীরবে মেনে নেয় দায়ী তারাও। কর্পুর যেমন দিন দিন হাওয়ায় হারিয়ে যায়, বাংলাদেশের মানুষের আক্বিদা ও আচরণ থেকে ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধও যেন হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে আজ থেকে ৫০ থেকে বছর আগে বাংলার মানুষ ইসলামের যতটা কাছে ছিল, এখন ততটাই দূরে। তখন বিছমিল্লাহ বা আল্লাহর উপর আস্থা নিয়ে অন্ততঃ মুসলিমদের মাঝে বিরোধ ছিল না। অথচ এখন ঈমানের সে মৌল বিশ্বাসটি দেশের শাসনতন্ত্রে উল্লেখ করাও অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ইসলাম থেকে বাংলাদেশের মানুষ যে কতদূর দূরে সরেছে এ হল তার নমুনা। আর এ অবস্থা সৃষ্টির জন্য যেটি সফল ভাবে কাজ করেছে সেটি দেশের সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা। এ শিক্ষা ব্যবস্থার মূল প্রবর্তক ছিল ব্রিটিশ শাসকেরা। এর মূল কাজটি মুসলিমদের ঈমান বা আল্লাহর উপর আস্থা বাড়ানো ছিল না, ছিল ইসলাম থেকে দ্রুত দূরে সরানো। মহান আল্লাহপাক ও তার রাসূল কি বললেন সেটি ঔপনিবেশিক শাসনামলে যেমন গুরুত্ব পায়নি, এখনও পাচ্ছে না। বরং গুরুত্ব পাচ্ছে ডারউইন, ফ্রয়েড, কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস, ল্যাস্কী বা রাসেলের মত অমুসলিমগণ কি বললো সেটি।

 

সেক্যুলার শিক্ষার নাশকতা

বিষ যেমন দেহের অভ্যন্তুরে ঢুকে দেহের প্রাণশক্তি বিনষ্ঠ করে, সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থাও তেমনি বিনষ্ট করছে ঈমান। মড়ক ধরায় চেতনায়। তাই আল্লাহর উপর আস্থা বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে সেক্যুলারিস্ট ও নাস্তিকদের আর লাঠি ধরতে হচ্ছে না, দেশের শিক্ষ্যাব্যবস্থাই সেটি ত্বরিৎ সমাধা করছে। ফলে দেশে ৯০ ভাগ মুসলিম -এ পরিসংখ্যানটি নিছক বইয়ের পাতায় রয়ে গেছে; দেশবাসীর কাজ-কর্ম, ঈমান-আক্বীদা, নীতি-নৈতীকতায় নয়। বরং বাড়ছে মুর্তি নির্মাণ, মুর্তির সামনে মাতা নত করে খাড়া হওয়া ও মঙ্গল প্রদীপের কদর। এ শিক্ষা ব্যবস্থার ফলেই সফল ভাবে সমাধা হয়েছে কোর্ট-কাছারি, আইন-আদালত, প্রশাসন ও রাজনীতি থেকে ইসলাম সরানোর কাজ। আল্লাহর দ্বীনটির এমন নিষ্ঠুর অবমাননা স্বচক্ষে দেখার পরও রুখে দাঁড়ানোর লোক দেশে শতকরা ৫ জনও নাই। থাকলে ঢাকা শহরে শরিয়তের পক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের মিছিল হত। আর শতকরা ৯০ জন মুসলিমের দেশে ইসলামের এরূপ পরাজয় ডেকে আনার জন্য ভারত, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তাবত ইসলামী বিরোধী শক্তির কাছে কদর বাড়ছে দেশের সেক্যুলার রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও এনজিও কর্মীদের। ভূয়শী প্রশংসা পাচ্ছে ইসলামকে পরাজিত করার এ বাংলাদেশী মডেল। ফলে RAB বা পুলিশের হাতে ভয়ানক ভাবে মানবাধিকার লংঘিত হলেও তা নিয়ে পাশ্চাত্যে শাসকগণ নিন্দা দূরে থাক, মুখ খুলতেই রাজী নয়।  

শূণ্যস্থান বলে এ জগতে কিছু নেই। শূণ্যস্থান থাকে না চেতনা রাজ্যেও। সুশিক্ষার ব্যবস্থা না হলে দেশবাসীর মনের ভূবন কুশিক্ষার দখলে যাবেই। তখন ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়ে অর্থদান, শ্রমদান ও রক্তদানের কাজটি কুশিক্ষাপ্রাপ্ত জনগণই নিজ গরজে সমাধা করে দেয়। কুশিক্ষা তখন ইসলামকে পরাজিত করার কাজে সফল হাতিয়ার রূপে কাজ দেয়। একারণে যারা ইসলামের বিজয় চায় তারাও সর্ব প্রথম যেটিকে গুরুত্ব দেয় সেটি দেশবাসীর সুশিক্ষা। এবং বন্ধ করে দেয় কুশিক্ষার সকল প্রতিষ্ঠানকে। এরূপ কাজটি ছিল নবী-রাসূলদের। মুসলিমদের দায়ভার তো সে কাজকে চালু রাখা। মহান আল্লাহতায়ালাও তাঁর সর্বশেষ নবী (সাঃ)কে সর্বপ্রথম যে পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তা নামায-রোযার নয়, বরং জ্ঞানার্জনের।

সাম্প্রতিক কালে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব এবং সেক্যুলার শিক্ষার নাশকতা যারা সবচেয়ে বেশী বুঝেছেন তারা হলো ইরানী আলেমগণ। মহম্মদ রেজা শাহের প্রতিষ্ঠিত দেশের সকল সেক্যুলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তিন বছরের জন্য তাঁরা বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু ইসলামের নামে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেলেও দেশটির নেতাদের দ্বারা সেটি হয়নি। যারা ইসলামের পক্ষের শক্তি ছিল তারাও বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি, ফলে ইসলামী শিক্ষার প্রবর্তন নিয়ে আন্দোলনও করেননি। এর ফলে বহাল তবিয়তে থেকে যায় ব্রিটিশের প্রবর্তিত সেক্যুলার শিক্ষাব্যাবস্থা। পাশ্চাত্যের যৌন ফিল্ম এবং রাশিয়া ও চীনের সমাজতান্ত্রিক বই ও পত্র-পত্রিকা যাতে অবাধে প্রবেশ করতে পারে -সেজন্য দেশের দরজা পুরাপুরি খুলে দেয়া হয়। যুবকদের চেতনায় মহামারি বাড়াতে এগুলোই পরবর্তীতে ভয়ানক জীবানূর কাজ করে। পাকিস্তান আমলে দেশের রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটগুলোকে সে জীবাণূ-ব্যবসায়ীদের হাতে লিজ দেয়া হয়েছিল। এভাবে দেশের এবং সেসাথে ইসলামের ঘরের শত্রু বাড়ানো হয়েছিল বিপুল হারে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই যারা বিরোধীতা করেছিল এবং দেশটি প্রতিষ্ঠার পর যারা তার বিনাশে সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছিল -তারা হলো সেক্যুলারিস্ট জাতীয়তাবাদী এবং সমাজতন্ত্রিরা। সমাজতন্ত্র মারা গেছে, কিন্তু মারা যাওয়ার আগে মরণ ছোবল মেরে যায় পাকিস্তানের বুকে।

 

বিজয়ী হিন্দু এজেণ্ডা

উপমহাদেশের রাজনীতিতে সবসময়ই দুটি পক্ষ ছিল। দুই পক্ষের দুটি ভিন্ন এজেণ্ডাও ছিল। ফলে ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র নির্মানের দুটি বিপরীত ধারাও ছিল। একটি ছিল অখণ্ড ভারত নির্মানের ধারা। এ ধারার নেতৃত্বে ছিল কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ। অপরটি ছিল প্যান-ইসলামিক মুসলিম ধারা। শেষাক্ত এ ধারাটিই জন্ম দেয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের নির্মাণের মূল ভিত্তি ছিল জিন্নাহর দেয়া দ্বি-জাতি তত্ত্ব। যার মূল কথা হলো: চিন্তা-চেতনা, মন ও মনন, নাম ও নামকরণ, তাহজিব ও তামুদ্দনের বিচারে মুসলিমগণ হলো হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন জাতি। তাদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য, ভিশন ও মিশন তাই এক ও অভিন্ন হতে পারে না। তাই অখণ্ড ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু-ভারতের কাঠামোর মাঝে মুসলিমদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শরিয়ত অনুসরণের এজেন্ডা পূরণ অসম্ভব। পৃথক ও স্বাধীন পাকিস্তান এ এজেন্ডা পূরণে অপরিহার্য। হিন্দু কংগ্রেস ও ব্রিটিশ শাসকদের প্রচণ্ড বিরোধীতা সত্ত্বেও ১৯৪৭’য়ে দ্বি-জাতি তত্ত্বই বিজয়ী হয় এবং প্রতিষ্ঠা পায় পাকিস্তান।

কিন্তু অখণ্ড-ভারত নির্মাণের লক্ষে আত্মনিবেদিত হিন্দু নেতারা ১৯৪৭’য়ের সে পরাজয়কে মেনে নেয়নি। সুযোগ খুঁজতে থাকে মুসলিমদের সে বিজয়কে উল্টিয়ে দেয়ার। সে সুযোগ আসে ১৯৭১’য়ে। ১৯৭১’য়ে তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক বিজয় লাভ করে দেশটির পূর্বাঞ্চলে। ফলে বিজয়ী হয় হিন্দু এজেন্ডা। ভারত ১৯৪৭’য়ের পরাজয়ের বদলা নিয়ে নেয়। নিজেদের সাম্প্রদায়িক প্রকল্পকে মুসলিমদের কাছে আকর্ষণীয় করতে গায়ে সেক্যুলারিজমের লেবাস লাগায়। এটিকে ধর্মনিরপেক্ষতা বলে জাহির করে। সেক্যুলারিজমের মুসলিম-বিরোধী রূপটি নিয়ে বাংলাদেশের মুসলিমদের মনে প্রচণ্ড অজ্ঞতা থাকলেও সে অজ্ঞতা ভারতীয় মুসলিমদের নেই। ভারতের মুসলিম শিশুরাও সেটি বুঝে। তারা সেটি বুঝেছে হিন্দুদের দ্বারা সংঘটিত মুসলিম বিরোধী অসংখ্য দাঙ্গায় সহায়-সম্পদ ও আপনজনদের হারিয়ে; এবং চোখের সামনে মা-বোনদের ধর্ষিতা হতে দেখে। কিন্তু হিন্দু-ভারতের সে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক রূপটিকে পর্দার আড়ালে রাখা হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিমদের থেকে। বরং কুৎসিত রূপে চিত্রিত করা হয়েছে দেশের ইসলামপন্থি এবং একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিদের। এভাবে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর মনে যেমন সৃষ্টি করা হয়েছে পাকিস্তান-বিরোধী প্রচণ্ড ঘৃনা। সে সাথে লালন করা হয়েছে অখণ্ড ভারতের প্রতি মোহ। লাগাতর প্রচারণার ফলে বাংলাদেশী মুসলিমদের মনে এ বিশ্বাসও জন্ম নিয়েছে যে,পাকিস্তানের সৃষ্টিই ভূল ছিল এবং ভূল ছিল জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্ব।

পাকিস্তানকে যারা অনর্থক অনাসৃষ্টি বলে তারা যে শুধু ভারতীয় কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ তা নয়। তাদের সাথে সুর মিলিযে একই কথা বলে বাংলাদেশের কম্যুনিষ্ট, নাস্তিক, জাতীয়তাবাদী এবং মুসলিম নামধারি সেক্যুলারিষ্টগণ। হিন্দু-মুসলিম মিলন ও অখণ্ড ভারতের পক্ষে নানা গুণগানের কথাও তারা বলে। ১৯৭১’য়ে থেকে বাংলাদেশের সকল ছাত্র-ছাত্রী এবং জনগণ শুধু তাদের বাজানো ক্যাসেটটিই লাগাতর শুনে আসছে। অথচ কেন যে বাংলার মুসলিমগণ বিপুল ভোটে পাকিস্তানের পক্ষ নিল -সে কথা তারা বলে না। সে সময় শেখ মুজিব স্বয়ং কেন পাকিস্তানের পক্ষ নিলেন সে কথাও তারা বলে না। বরং বলে, পাকিস্তান সৃষ্টিই ভূল ছিল। তাদের সে নিরচ্ছিন্ন প্রচারণা কাজও দিয়েছে। ফল দাঁড়িয়েছে, এখন সে প্রচরণায় প্লাবনে ভেসে গেছে বহু ইসলামপন্থিরাও। ফলে ১৬ ডিসেম্বর এলে ভারতপন্থিদের সাথে তাঁরাও ভারতীয় বাহিনীর বিজয়ের দিনে উৎসবে নামে। বাংলাদেশে ইসলামি ধারার রাজনীতিতে এটি এক গুরুতর বিচ্যুতি, এবং এক বিশাল চেতনা-বিভ্রাট। তারা এমন সব কথা বলে, একাত্তরের পূর্বে কোন ইসলামপন্থির মুখে তা কখনোই শোনা যায়নি।

 

ইম্যুনিটি ইসলামের বিরুদ্ধে

অমুসলিম পরিবেষ্ঠিত এক ক্ষুদ্র দেশে নিজেদের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে বাঁচতে হলে চিন্তা-চেতনায় বলিষ্ঠ ইম্যুনিটি তথা প্রতিরোধ শক্তি চাই। রোগের বিরুদ্ধে মানব দেহে ভ্যাকসিন বা টিকা সে ইম্যুনিটিই বাড়ায়। তখন কলেরা,যক্ষা বা পলিওর মত ভয়ংকর রোগের মধ্যে থেকেও মানুষ নিরাপদে বাঁচতে পারে। কোর’আনের জ্ঞান ও ইসলামের দর্শন মূলত ঈমানদারের চেতনায় সে ইম্যুনিটিই তীব্রতর করে। তখন উলঙ্গতা, অশ্লিলতা ও নানা রূপ কুফরির মাঝেও মুসলিমগণ ঈমান নিয়ে বাঁচতে পারে। হিজরতের আগে মক্কার মুসলিমগণ তো তেমন এক ইম্যুনিটির কারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠ কাফেরদের মাঝেও বলিষ্ঠ ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন। অথচ মুসলিম অধ্যুষিত সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামিক ইম্যুউনিটি গড়ার সে কাজটি হয়নি। বরং উল্টোটি হয়েছে। ইম্যুনিটি গড়া হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে; এবং সেটি ইসলাম-বর্জিত শিক্ষার মাধ্যমে। ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের মনের গভীরে ইসলামের মৌল ধ্যানধারণা ও শিক্ষাগুলোও প্রবেশ করতে পারছে না।

ইসলামী চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠাকে সাম্প্রদায়িক বা মৌলবাদ আখ্যা দিয়ে সেটি বাংলাদেশের ন্যায় বহু মুসলিম দেশে অসম্ভব করা হয়েছে। সেটি অসম্ভব ছিল মক্কার কাফের সমাজেও। নবীজী (সা:)’কে ইসলামের প্রচারের কাজ তাই লুকিয়ে লুকিয়ে করতে হতো। এমন প্রকাশ্যে নামায পড়াও বিপদজনক ছিল। দ্বীনের এ অপরিহার্য কাজের জন্য যে অনুকূল অবকাঠামো দরকার সেটি যেমন কাফের অধ্যুষিত মক্কায় সম্ভব হয়নি, তেমনি কোন অমুসলিম রাষ্ট্রেও সম্ভব নয়। নবীজী (সা:)’কে তাই মদিনায় গিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রের কাজ নিছক হাসপাতাল, রাস্তাঘাট বা কলকারখানা নির্মাণ নয়। বরং সেটি হলো, ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা। এবং অনৈসলামের বিরুদ্ধে প্রতিটি নাগরিকের মনে ইম্যুনিটি গড়ে তোলা। কোন রাষ্ট্রের এর চেয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। খাদ্য-পানীয় তো বিশ্বের সব দেশেই জুটে। এমন কি পশুও না খেয়ে মরে না। কিন্তু মুসলিম মন ও মানস প্রকৃত নিরাপত্তা পায় এবং ঈমানী পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠে একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্রে। ইসলাম রাষ্ট্র নির্মান তো এজন্যই ফরয। নইলে কুফরির বিশ্বব্যাপী স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। তখন সে শুধু বেঁচে থাকে পারিবারীক মুসলিম নামটি নিয়ে, মুসলিম চরিত্র নিয়ে নয়। সোভিয়েত রাশিয়ার কম্যুনিস্ট কবলিত মুসলিমগণ তো বহুলাংশে হারিয়ে গেছে তো একারণেই। একই কারণে তারা হারিয়ে যাচ্ছে পাশ্চত্যের দেশগুলিতেও।

বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট একটি দেশ হলে কি হবে, ১৯৭১’য়ে যে দর্শনের উপর দেশটি জন্ম নিয়েছিল তাতে মুসলিম রাষ্ট্রের কাঙ্খিত সে মূল কাজটিই গুরুত্ব পায়নি। বরং চেতনার ভূমিতে ঢুকানো হয়েছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজমকে পরিচিত করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষবাদ রূপে। অথচ কোরআন ও সূন্নাহ মতে এ তিনটি মতবাদের যে কোন একটিকে বিশ্বাস করাই কুফরি। মুসলিম হওয়ার অর্থ ধর্ম-নিরপেক্ষ হওয়া নয়, বরং সর্ব-অবস্থায় ইসলামের পক্ষ নেয়া। নিজেকে মুসলিম দাবী করে ইসলামের বিজয়ে পক্ষ না নেয়াটি নিরেট মুনাফিকি। এবং পক্ষ নেয়ার অর্থ, ইসলামের বিজয়ে নিজের অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্ত দেয়া। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী তো সে কাজে শহিদ হয়েছেন। তাই মুসলিম কখনো জাতীয়তাবাদী হয় না। সেক্যুলারিস্ট হয় না। বরং শতভাগ ইসলামী হয়। সে তার পরিচয় ভাষা বা ভূগোল থেকে পায় না। বর্ণ বা গোত্র থেকেও নয়। পায় ঈমান থেকে।

আর সমাজতন্ত্র? সেটি আজ  খোদ সোভিয়েত রাশিয়াতেই আবর্জনার স্তুপে গিয়ে পড়েছে। অথচ শেখ মুজিব সে আবর্জনাও বাংলাদেশের মুসলিমদের মাথায় চাপিয়েছিলেন। এবং সে জন্য জনগণ থেকে কোন রায়ও নেননি। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে এটি কোন ইস্যুও ছিল না। শেখ মুজিব বাঙালী মুসলিমদের মাথার উপর এ কুফরি মতবাদগুলি চাপিয়েছেন নিছক তাঁর প্রভু দেশ ভারত ও রাশিয়াকে খুশি করার জন্য। ইসলামের বিরুদ্ধে মুজিবের গুরুতর অপরাধ, একাত্তরের পর ছাত্র-ছাত্রীদের মনে কুফরি ধ্যান-ধারণা বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন না দিয়ে বরং টিকা লাগিয়েছেন ইসলামের বিরুদ্ধে। আর সে অপরাধ কর্মটি করেছেন জনগণের দেয়া রাজস্বের অর্থে। এ ভাবে কঠিন করা হয়েছে বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের মনে ইসলামের মৌল শিক্ষার প্রবেশ। জিহাদ বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার ন্যায় ইসলামের এ মৌল বিষয়গুলো বাংলাদেশের মানুষের কাছে আজ  গ্রহন-যোগ্যতা পাচ্ছে না –সেটি তো একারণেই। নতুন প্রজন্ম পাচ্ছে না ভ্রষ্ট মতবাদগুলোর মোকাবেলায় ইসলামিক ইম্যুনিটি। ফলে জোয়ারের পানির ন্যায় তাদের চেতনায় ঢুকেছে হিন্দু রাজনীতির এজেন্ডা -যার মূল কথাটি আজও অবিকল তাই যা তারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে বলতো।

যে দেশটি ইসলামী নয় সেদেশে ইম্যুনিটি গড়ার সে ফরয কাজটি করে মসজিদ-মাদ্রাসা, আলেম-মাশায়েখ, ইসলামি সংগঠন, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ। তাঁরা সেটি করেন কোর’আন-হাদিস ও ইসলামী দর্শনের জ্ঞান বাড়িয়ে। নবীজী (সাঃ)র মক্কী জীবন তো সেটিরই সূন্নত পেশ করে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার যেমন সে কাজ করেনি, সঠিক ভাবে সেটি হয়নি আলেমদের দ্বারাও। ইসলামি সংগঠনগুলো ব্যস্ত ক্যাডার-বৃদ্ধি, অর্থ-বৃদ্ধি ও ভোট-বৃদ্ধির কাজে, কোর’আনের জ্ঞান ও ইসলামী দর্শন বাড়াতে নয়। তাদের অর্থের বেশীর ভাগ ব্যয় হয় দলীয় আমলা প্রতিপালনে। সে সাথে দেশের মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোও তাদের হাতে অধিকৃত যাদের চেতনায় ইসলামের বিজয়ের কোন ভাবনা নেই। মসজিদ ও মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটিগুলোতে দখল জমিয়ে আছে সেক্যুলার মোড়ল-মাতবর, রাজনৈতিক ক্যাডার ও আলেমের লেবাস ধারী কিছু রাজনৈতিক বোধশূন্য ব্যক্তি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়লেও ইসলামের বিজয় বাড়ছে না। বরং মুসলিমদের চেতনা রাজ্যে দূষণ বাড়ছে ভয়ানক ভাবে। এমন এক দূষণ প্রক্রিয়াই ফলেই অখণ্ড ভারতের মোহ জেগে উঠছে এমন কি ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মাঝেও।

বাস্তবতা হলো, ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের যে সামরিক বিজয় এসেছিল তাতে শুধু পাকিস্তানের ভূগোলই পাল্টে যায়নি, পাল্টে গেছে বাংলাদেশী মুসলিমদের মনের ভূগোলও। ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়-উৎসবের সাথে ভারত আরেকটি মহা-উৎসব করতে পারে বাঙালী মুসলিমের চেতনা রাজ্যে তাদের এ বিশাল বিজয় নিয়ে। বাঙালী হিন্দুর যখন প্রবল রেনেসাঁ, মুসলিমদের উপর এমন আদর্শিক বিজয় তারা তখনও পায়নি। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের সবচেয়ে বড় অপরাধ হল, হিন্দুদের কোলে তিনি এরূপ একটি সহজ বিজয় তুলে দিয়েছেন।

সামরিক বিজয় পরাজিত দেশে কখনই একাকী আসে না। সাথে আনে আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিজয়ও। বাংলাদেশের ভূমিতে ভারতের বিশাল বিজয় তাই একাত্তরে এসে থেমে যায়নি। বিজয়ের পর বিজয় আসছে সর্বক্ষেত্রে। একাত্তরে তাদের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানের বিনাশ ছিল না, ছিল ইসলামী চেতনার বিনাশও। তাছাড়া তাদের এ যুদ্ধটি নিছক পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও ছিল না, ছিল ইসলাম ও বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধেও। পাকিস্তান-বিরোধী যুদ্ধটি শেষ হয়েছে একাত্তরেই। কিন্তু শেষ হয়নি বাংলাদেশের মাটি থেকে ইসলামপন্থিদের নির্মূলের কাজ। তাই ভারত তার পদলেহীদের দিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ একটা অস্থির অবস্থা বজায় রেখেছে সেই ১৯৭১ থেকেই। তাছাড়া আওয়ামী লীগের আচরণ দেখেও বোঝা যায়, ভারতের পক্ষ থেকে বাঁকি কাজটি সমাধার মূল দায়িত্বটি পেয়েছে তারাই। বেছে বেছে ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধকরণ, ইসলামী নেতাদের বিনা বিচারে গ্রেফতার, মাদ্রাসার পাঠ্যসূচী ও মসজিদে খোতবার উপর নিয়ন্ত্রণ, অফিসে ও ঘরে ঘরে গিয়ে ইসলামী বই বাজেয়াপ্ত করা -ইত্যাদী নানা কর্মসূচী নিয়ে এগুচ্ছে তারা।

 

ভারতের বাংলাদেশ ভীতি এবং এজেণ্ডা

বাংলাদেশের ভূমিতে ভারতীয়দের এত তৎপরতার মূল কারণ, বাংলাদেশে ভীতি। ভয়ের সে মূল কারণটি হলো ইসলাম। ভারতীয়রা বোঝে, ইসলামী দর্শন এবং কোর’আনের জ্ঞানই জোগাতে পারে যে কোন আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি। অতীতে আফগান জনগণ যে শক্তির বলে ব্রিটিশ বাহিনী ও পরে সোভিয়েত বাহিনীকে পরাজিত করেছিল সেটি অস্ত্রবল নয়। অর্থবলও নয়। বরং সেটি ছিল ইসলামী চেতনার বল। সে শক্তির বলে আজও তারা মার্কিনীদের পরাজয় করে চলেছে। ২০ বছরের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও তার ৪০টি মিত্রদেশকে বিজয়ের কাছে ভিড়তে দেয়নি। আর বাংলাদেশীরা আফগানদের থেকে সংখ্যায় ৫ গুণ অধিক। এতবড় বিশাল জনশক্তির মাঝে ইসলামি চেতনার বিস্ফোরণ হলে তাতে কেঁপে উঠবে সমগ্র ভারত। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ ও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির মূলে তো তারাই।

বাংলাদেশের মূল শক্তি তাই তার ভূগোল নয়, সম্পদও নয়। বরং এই মুসলিম জনশক্তি। আর এই জনশক্তির সাথে ইসলামের যোগ হলে জন্ম নিয়ে এক মহাশক্তি। মরুর নিঃস্ব আরবেরা তো বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল এমন এক মিশ্রণ হওয়াতেই। ভারত তাই বাংলাদেশের মানুষকে কোর’আনের জ্ঞান থেকে দূরে সরাতে চায়। আর একাজে ভারতের সুবিধা হল, আওয়ামী লীগকে তারা অতি আগ্রহী কলাবোরেটর রূপে পেয়েছে। বাঙালী হিন্দুদের চেয়েও এ কাজে তারা ভারতের প্রতি বেশী বিশ্বস্থ ও তাঁবেদার। ভারত সে সুযোগটির সদ্ব্যাবহার করতে চায়। একাত্তরের বিজয়কে যুগ যুগ ধরে রাখার স্বার্থে আওয়ামী লীগের কাঁধে লাগাতর বন্দুক রাখাটিকে তারা অপরিহার্যও ভাবে। তবে এলক্ষ্যে তারা যে শধু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের উপরই পুঁজি বিনিয়োগ করছে -তা নয়। তাদের স্ট্রাটেজী, এক ঝুড়িতে সব ডিম না রাখা। তাই বিশাল পুঁজি বিনিয়োগ করেছে দেশের মিডিয়া, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যকর্মী, আলেম-উলামা, ছাত্রশিক্ষক, এমন কি ইসলামী দলগুলোর উপরও। সে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে তারা ভারতে পড়ার সুযোগও করে দেয়েছে। এখন বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করছে দেশের ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার উপর। ভারত জানে, তাদের হাত থেকে আওয়ামী লীগ হারিয়ে যাওয়ার নয়। ক্ষমতায় থাকার সার্থে এ দলটি নিজ গরজেই ভারতে পক্ষ নিবে। কারণ, ভারতের হাতে যেমন রয়েছে বাংলাদেশের হিন্দু ভোট, তেমনি আছে রাষ্ট্রীয় পুঁজি, আছে ভারত-প্রতিপালিত বিশাল মিডিয়া। নির্বাচনী জয়ের জন্য এগুলোই জরুরি।

 

অরক্ষিত বাংলাদেশ

বাঘের পাল দ্বারা ঘেরাও হলে বিশাল হাতিও রেহাই পায় না। তাই যে জঙ্গলে বাঘের বাস সে জঙ্গলের হাতিরাও দল বেঁধে চলে। বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এক দেশ। ঘেরাও হয়ে আছে আগ্রাসী হিন্দুদের দ্বারা। ফলে বাংলাদেশ এক অরক্ষিত দেশ। তাই এদেশটির সীমাবদ্ধতা প্রচুর। যে কোন দেশের প্রতিরক্ষার খরচ বিশাল। আর ভারতের মত একটি বিশাল আগ্রাসী দেশের বিরুদ্ধে সে খরচ তো আরো বিশাল। এ বাস্তবতার দিকে খেয়াল রেখেই বাংলার তৎকালীন নেতা খাজা নাযিমউদ্দিন, সোহরোয়ার্দি, আকরাম খান, নূরুল আমীন, তমিজুদ্দীন খান প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী সভায় লোহোর প্রস্তাবে সংশোধনী এনেছিলেন এবং পাকিস্তানে যোগ দেবার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পূর্ব বাংলা এভাবেই পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিল সেদেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশে রূপে। অথচ এরূপ পাকিস্তানভূক্তিকেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বলছে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন। নিরেট মিথ্যাচার আর কাকে বলে? কোন দেশে ঔপনিবেশিক শাসন গড়তে হলে যুদ্ধ লড়তে হয়। প্রয়োজন পড়ে মীর জাফরদের। প্রয়োজন পড়ে লর্ড ক্লাইভ ও পলাশির। প্রশ্ন হল, ১৯৪৭’য়ে কে ছিল সেই মীর জাফর? কে ছিল ক্লাইভ? সে মীর জাফর কি ছিলেন সোহরোয়ার্দী? খাজা নাজিমুদ্দিন বা আকরাম খাঁ যারা বাংলাকে পাকিস্তান ভূক্ত করেছিলেন? আর ঔপনিবেশিক বাহিনীই বা কোথায়? কোথায় করলো তারা যুদ্ধ? জেনারেল ওসমানী, মেজর জিয়া, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর আব্দুল জলিল, মেজর খালিদ মোশার্রফ কি তবে সে উপনিবেশিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন?

তবে জনগণও নির্দোষ নয়। জনগণের অপরাধ, তারা ১৯৭০ সালে নির্বাচিত করেছে গণতন্ত্র হত্যাকারি এক ফাসিস্টকে। স্বৈরাচারি মুজিবকে যে শুধু ভোট দিয়েছে তা নয়, অর্থ এবং রক্তও দিয়েছে। সে সাথে পরম বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে ভারতীয়দের। ভারতের মোহ শুধু একাত্তরে নয়, আজও বেঁচে আছে বহু বাংলাদেশীদের মনে। সেটি গ্রাস করছে শুধু সেক্যুলারদেরই নয়, বহু ইসলামপন্থিকেও। তাদের চেতনার বিভ্রাটটি এতোই গভীর যে, ভারতের বিজয় এবং বাংলাদেশের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের আধিপত্যকেও নিজেদের বিজয় ও নিজেদের অর্জন বলে উৎসবও করে। বাঙালী মুসলিমের এ এক ভয়ানক আত্মঘাতি রূপ। রোগ না সারলে সেটি প্রতিদিন বাড়ে। তেমনি বাড়ে চেতনার রোগও। তাই যে রোগ এক সময় ভারতপন্থি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মগজে ছিল সেটি এখন অন্যদেরও গ্রাস করছে। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় হুমকি আর কি হতে পারে? ১ম সংস্করণ ০৭/০৬/২০১১; ২য় সংস্করণ ২৬/১১/২০২১।   

 




বাংলাদেশে অপরাধীদের শাসন এবং ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

অপরাধী সরকার ও জনগণের অপরাধ

অপরাধীদের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাই হলো মুসলিম জীবনের মূল মিশন। এ মিশন নিয়ে বাঁচার জন্যই মুসলিম মাত্রই মহান আল্লাহাতায়ালার খলিফা। এবং এ কাজের জন্যই পবিত্র কোর’আনে মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির (খায়রা উম্মাহ) মর্যাদা দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহাতায়ালার পক্ষ থেকে সে ঘোষণাটি এসেছে সুরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে। যারা এ মিশন পালনে ব্যর্থ হয় তারা পরিণত হয় শয়তানের খলিফাতে। আর শয়তানের খলিফাদের শাস্তি দেয়াই মহান আল্লাহাতায়ালার রীতি -সেটি যেমন এ দুনিয়ার বুকে, তেমনি আখেরাত। সে আযাবটি আসে দুর্বৃত্ত শাসনের অসভ্যতার মধ্য দিয়ে। এবং পরকালে জুটে জাহান্নামের শাস্তি।

কোন সমাজেই আযাব শুধু অপরাধী সরকারের কারণে আসে না। জনগণের অপরাধের কারণেও আসে। হিংস্র পশু তাড়ানোর কাজটি দোয়াদরুদে হয় না, অস্ত্র হাতে মাঠে নামতে হয়। নইলে মহল্লায় নিরাপত্তা থাকে না। তেমনি সভ্যভাবে বাঁচার জন্যও মূল্য দিতে হয়। সে মূল্য দিতে হয় জিহাদে নেমে। ইসলামে জিহাদ তাই ফরজ; সভ্যতর রাষ্ট্র নির্মাণের এটিই হলো একমাত্র হাতিয়ার। ঈমানদার এখানে বিনিয়োগ করে তার শক্তি, অর্থ, মেধা ও রক্তের। জনগণ সভ্যতর সমাজে নির্মাণে মূল্য পেশ করে জিহাদের মধ্য দিয়ে। তাই যে সমাজে জিহাদ নাই, সে সমাজে আযাব নেমে আসে দুর্বৃত্ত শাসনের। কারণ, আবর্জনা সরানোর সভ্য কাজটি না হলে, বাঁচতে হয় গলিত আবর্জনার বিষাক্ততা নিয়ে। তখন জোয়ার আসে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের। সভ্য সমাজে গুরুতর অপরাধ হলো মহল্লায় হিংস্র পশুকে বিচরণ করতে দেখেও অস্ত্র হাতে তা মারতে না নামা। তেমনি গুরুতর অপরাধ হলো, দেশে দুর্বৃত্ত শাসন দেখে তার নির্মূলে না নামা। মানব জীবনে এটিই হলো চরম দায়িত্বহীনতা। এবং এরূপ অপরাধ ও দায়িত্বহীনতায় যা অনিবার্য হয় তা হলো আযাব। তখন জোয়ার আসে দুঃসহ দুর্বৃত্তির। অবিকল সেটিই ঘটছে বাঙালী মুসলিমদের জীবনে।

নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের ন্যায় ইবাদতের মূল ভূমিকা হলো, ঈমানদারকে জীবনের সবচেয়ে এ গুরুত্বপূর্ণ মিশনের জন্য প্রস্তুত করা। সে মিশনটি হলো অপরাধীদের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। পবিত্র এ মিশনটি জান, মাল, অর্থ, মেধা ও সময়ের লাগাতর কোরবানী চায়।এটিই হলো মুমিনের জীবনে সবচেয়ে বড় ইবাদত। অন্যান্য ইবাদতের লক্ষ্য হলো, জিহাদের ন্যায় এ বড় ইবাদতটির জন্য মুসলিমদের গড়ে তোলা। যেমন নামাযের ভূমিকা সন্মন্ধে পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে, “ইন্নাস সালাতা তানহা আনিল ফাহশায়ে ওয়াল মুনকার”। অর্থ: নামায অশ্লিলতা ও দুর্বৃত্ত কর্ম থেকে দূরে রাখে। ঔষধের রোগ সারানোর ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে। কিন্তু মুমিনের নামায যে তাকে অশ্লিলতা ও দুর্বৃত্ত কর্ম থেকে দূরে রাখবে না –সেটি কি ভাবা যায়? কারণ নামাযের সে অব্যর্থ কার্যকারিতা নিয়ে রায়টি তো মহান আল্লাহাতায়ালার। নামাযের সে কার্যকারিতা নিয়ে তাই কি সন্দেহ চলে? কিন্তু নামায পড়েও যে নামাযী সূদ খায়, ঘুষ খায়, মিথ্যা বলে ও অশ্লিল হয় -তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে, তার নামায প্রকৃত অর্থে নামাযই নয়?

বাংলাদেশে আজ যেরূপ চোরডাকাত ও ভোটচোরদের শাসন, এবং দুর্বৃত্তি, গুম, খুন, ফাঁসি, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের যে দুর্বিসহ প্লাবন -তার কারণ কি শুধু অপরাধী সরকার? দায়ী তো জনগণও। জনগণের অপরাধ হলো, দুর্বৃ্ত্তির নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার মিশন নিয়ে বাঁচায় তাদের ব্যর্থতা। অপরাধীদের বিচরন শুধু দেশের রাজনীতি. পুলিশ বাহিনী, প্রশাসন, আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বানিজ্য ও বুদ্ধবিত্তিতে নয়, জনগণের মাঝেও। সমগ্র দেশ অধকিৃত হয়ে গেছে অপরাধীদের হাতে। অপরাধীদের সবচেয়ে বড় ভীড়টি দেশের রাজনীতিতে। রাজনীতি এখন আর জনসেবার হাতিয়ার নয়, রাজনীতি ব্যবহৃত হচ্ছে স্বার্থ-শিকারের অস্ত্র রূপ। হিংস্র পশু যেমন শিকিার শেষে বনে গিয়ে নিজ গুহায় আশ্রয় নেয়, তেমনি বহু অপরাধীও নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে বা কৃত অপরাধের শাস্তি এড়াতে যোগ দিচ্ছে রাজনীতিতে। অফিস-আদালত, সেনানিবাস, হাট-বাজার বা লোকালয়ে কোন অপরাধ সংঘটিত হলে সেটির তবুও বিচারের সম্ভাবনা থাকে। কারণ সেখানে রাজনীতি থাকে না। কিন্তু রাজনীতির অঙ্গণে সে সম্ভাবনা নইে। কারণ, আদালত, সচিবালয়, ডাকাতপাড়া বা পথেঘাটে দুর্ষ্কমে লিপ্ত কোন অপরাধীকে পুলিশ ধরলে তার পক্ষে মিছিল হয় না, লগি বৈঠা নিয়ে সে অপরাধীকে বাঁচাতে কেউ যুদ্ধ শুরু করে না। অথচ কোন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে দূর্নীতি বা কোন বিদেশী শত্রুর গুপ্তচর হওয়ার অভিযোগ উঠলেও তার বিচার করা অসম্ভব। বিচারের আগেই অপরাধী নেতাকে নির্দোষ রূপে ঘোষণা দেওয়া হয় রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে। বিচার চিত্রিত হয় ষড়যন্ত্র রূপে। সে অপরাধী নেতার বিচারকে রাজনৈতিক প্রতহিংসা আখ্যা দিয়ে বিচারকদেরই বরং রাজপথে লাঠি দেখানো হয়।

 

স্বৈরশাসনের অসভ্যতা

সভ্য সমাজের আলামত হলো, সেখানে থাকে আইনের শাসন। কিন্তু সেটি অসম্ভব হয় অসভ্য সমাজে। তখন আদালত জিম্মি হয় দুবৃত্তদের হাতে। তখন দেশে অপরাধের প্লাবন আসে, কিন্তু বিচার হয়না। বাংলাদেশে সেরূপ উদাহরণ অনেক। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল ভারতীয় গুপ্তচরদের সাথে মিলে আগরতলা ষড়যন্ত্রের। লক্ষ্য ছিল, পাকিস্তান ভাঙ্গা। সে ষড়যন্ত্রের সত্যতা নিয়ে এখন খোদ আওয়ামী লীগ মহলেও কোন বিতর্ক নাই। বরং তা নিয়ে জড়িতদের সাবাশ দেয়া হয়। অথচ সে সময় সে মামলাকে ষড়যন্ত্র মূলক ও মিথ্যা বলা হয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মুজিবের মুক্তি দাবী করা হয়।

দেশের অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে শত্রু দেশের সাথে মিলে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়া যে কোন সভ্য দেশেই মৃত্যুদন্ড বা যাবৎজীবন কারদন্ডে দন্ডিত হওয়ার ন্যায় গুরুতর অপরাধ। পাকিস্তান সরকাররে কাছে মুজিবের সে অপরাধটি ছিল দেশোদ্রোহ-মূলক জঘন্য অপরাধ। ভারত বা অন্য যে কোন দেশের বিরুদ্ধে সেরূপ ষড়যন্ত্র হলে –সে সব দেশেও এ অপরাধকে ভিন্ন ভাবে দেখা হতো না। কিন্তু পাকিস্তান সরকার মুজিব ও তার সহচরদের অপরাধের বিচার করতে পারনি। পাকিস্তানের আদালত শেখ মুজিবকে কাঠগড়ায় তুলেছিল ঠিকই -কিন্তু বিচারের কাজ শেষ করতে পারিনি। রাজনীতি ঢুকে পড়ে আদালতের অঙ্গণে। শেখ মুজিবকে শাস্তি দেওয়া দূরে থাক, আগরতলা ষড়যন্ত্রের সাথে তার সংশ্লিষ্টতাই তাকে হিরো বানিয়ে দেয়। বাংলাদেশের রাজনী্তিতে অপরাধ কর্মের নায়কগণও যে কতটা বিশাল ভাবে প্রতিষ্ঠা পায় -এ হলো তার নজির। আর এরূপ প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তরাই দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে অপরাধীদরে অভয় অরণ্যে পরণিত করে। এতে দুর্বৃত্তায়ন ঘটে সমগ্র দেশ জুড়ে।

অর্থহরণ, নারীহরণ, দস্যুবৃত্তি ও শত্রুদেশের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি -যে কোন সমাজেই জঘন্য অপরাধ। সে সাথে জঘন্য অপরাধ হলো, জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকারের ন্যায় মৌলিক মানবিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া। এতে লুন্ঠিত হয় মানবের মানবিক পরচিতি ও মর্যাদা। তখন সমাজের মানবিক পরিচয়টি বিলুপ্ত হয়। সমাজে পশুদের কোন অধিকার থাকে না। মানুষও সে অধিকার হারায় যখন সমাজে পশুত্ব বিজয়ী হয়। মানুষ উপার্জন বাড়ায়, উন্নত সমাজ গড়ে এবং সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণ করে তো সে মানবিক মর্যাদা বা অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে। তাই মানবতার মূল শত্রু হলো তারাই যারা মানুষকে স্বাধীন মানুষ রূপে বাঁচার অধিকারকে ছিনিয়ে নেয়। যে কোন সভ্য দেশে সামরকি ক্যু বা ফ্যাসিবাদী নীতিতে জনগণের সে রাজনৈতিক অধকিারহনন এজন্যই অতি গুরুতর অপরাধ। স্বৈরশাসনের এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা।  তখন ব্যহত হয় সভ্য ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ। সমগ্র দেশ তখন কারাগারে পরণিত হয়। জঙ্গলে কেউ খুন হলে সেখানে বিচার হয় না। কারণ সেখানে আদালত থাকে না। সেরূপ বিচারশূণ্য দেখা যায় অসভ্য সমাজেও।

 

শেখ মুজিব: অপরাধের শিকড়

অপরাধ কোথাও হটাৎ করে শুরু হয়না। রোগের যেমন জীবণু থাকে, অপরাধেরও তেমনি শিকড় থাকে। অপরাধী মারা যায়, কিন্তু শিকড় রেখে যায়। বাংলাদেশে আজ যেরূপ অপরাধীদের শাসন -তার শিকড় রোপন করেছিল শেখ মুজিব। আজ সেটিই বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে আজকের ক্ষমতাসীনগণ যে চেতনার ধারক -সেটি মূলত মুজিবের। তাদের হাতে অধিকৃত হওয়ায় অপরাধে ভরে গেছে সমগ্র রাষ্ট্র। ফলে অপরাধ আর অপরাধ গণ্য হচ্ছে না। শেখ মুজিবের অপরাধের তালিকাটি বিশাল। গণতন্ত্র হরণ, সকল বিরোধী দল নিষিদ্ধ করণ, একদলীয় বাকশালী শাসনে প্রতিষ্ঠা, সকল সরকার-বিরোধী পত্রিকার দফতরে তালা ঝুলানো –এসবই হলো তার অপরাধ। ইসলামী দলগুলো নিষিদ্ধ করে নিষিদ্ধ করেছিল ইসলামী চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠাও। এসবই ছিল দেশের শাসনতন্ত্র বিরোধী অপরাধ। এ অপরাধ ছিল জনগণের অধিকারের উপর ছিনতাই। কিন্তু সে অপরাধের বিচার হয়নি। তার আমলে নিহত হয়ছে প্রায় ৩০ হাজারের বেশী বিরেধী দলীয় রাজনৈতিক কর্মী। কোন কোন হত্যার পর প্রচন্ড দম্ভ দেখিয়েছেন স্বয়ং শেখ মুজিব। বন্দী সিরাজ শিকদারকে পুলিশী হিফাজতে হত্যা করার পর সংসদে উল্লাসিত হয়ে হুংকার দিয়েছেন, “কোথায় আজ সিরাজ শিকদার?” কাউকে বিনা বিচারে হত্যার অধিকার কোন সরকারেরই থাকে না। শেখ মুজিবেরও ছিল না। কিন্তু বনের নেকড়ে যেমন কারো অনুমতি নিয়ে শিকার ধরে না, তেমনি স্বৈরাচারি শাসকগণও কারো অনুমতি নিয়ে কাউকে খুন করে না। তখন হিংস্র পশুর আচরণ জনপদে নেমে আসে। স্বৈরশাসনকে এজন্যই জঙ্গলের অসভ্য শাসন বলা হয়।

অপরাধ কর্ম প্রতি সমাজইে ঘটে। তবে সভ্য সমাজের বৈশিষ্ঠ হলো সে সমাজে অপরাধের বিচার হয়। আইনের শাসন প্রতষ্ঠা পায়। অথচ অসভ্য সমাজে সেটি হয় না। অপরাধীদের বিচারে সর্বপ্রথম যা জরুরি,  তা হলো অপরাধকে ঘৃণা করা সামর্থ্য।  এবং চাই অপরাধীকে নিছক অপরাধী রূপে দেখার রুচি। বিচারের আগে কে কোন দলের, কে কোন ভাষা বা বর্ণের অপরাধীর সে পরচিয়টি গুরুত্ব পেলে সুবিচারই অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই সুবিচারের সামর্থ্য সবার থাকে না। সে সামর্থ্য স্বৈরাচারি শাসক, দুর্বৃত্ত বিচারক, আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক লুটেরাদেরও থাকে না। তাদের এজেন্ডা বরং ন্যায় বিচারকেই অসম্ভব করা। কারণ, ন্যায় বিচারকে হত্যা করার মধ্যেই তাদের নিজেদের বাঁচা। তাই এরা শুধু প্রশাসন ও রাজনীতিকেইে দখলে নেয় না, দখলে নেয় দেশের আদালতকেও। তাদের অন্যায় কর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী প্রতিটি ব্যক্তিকেই তারা গণ্য করে রাজনৈতিক শত্রু রূপে; এবং লক্ষ্য হয় তাদের হত্যা করাও। তখন বিরোধীদের জন্য বাড়ে ফাঁসির আয়োজন।

ন্যায় বিচারে আওয়ামী লীগের যে সামান্যতম আগ্রহ নাই –সেটি বুঝা যায় দলটির নীতি থেকে। তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে দলটি নিজ দলের শত শত নেতা-কর্মীদের উপর থেকে দায়েরকৃত সকল মামলা তুলে নেয়। এর মধ্যে ছিল বহু খুণ ও দুর্নীতির মামলা। যে দেশে আদালত কাজ করে সে দেশে কাউকে নির্দোষ বলে খালাস দেওয়ার সামর্থ্য সরকাররে থাকে না। সে অধিকার একমাত্র আদালতের। অথচ স্বৈরাচারি শাসকগণ আদালতের বিচারকদের দলীয় লাঠিয়ালে পরিণত করে। ফলে নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের উপর থেকে মামলা তূলে নিলেও মামলার বন্যা শুরু হয় বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। একই রূপ ঘটনা ঘটেছে সত্তরের দশকে আওয়ামী শাসনামলে। তখন লক্ষাধিক বিহারী, বহু হাজার রাজাকার , শত শত আলেম ও বহু হাজার বামপন্থি নেতাকর্মীকে বিনাবিচারে হত্যা করা হয়ছে। লুন্ঠিত হয়েছে তাদের ঘরবাড়ি ও সহায়সম্পদ। লুন্ঠিত হয়েছে রিলিফির মালামাল। কিন্তু শেখ মুজিবের স্বৈরাচারি সরকার সে অপরাধের নায়কদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নেয়নি।

 

শেখ মুজিবের অপরাধী মানস

বহু হাজার মানুষের সামনে ঢাকা স্টডেয়িামে কাদের সিদ্দিকী ৪ জন হাত-পা বাঁধা রাজাকারকে হত্যা করে। আন্তর্জাতিক আইনে এভাবে বন্দীদের হত্যা যুদ্ধাপরাধ। কিন্তু শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ সে জঘন্য অপরাধকে অপরাধ রূপে গণ্য করেনি। শেখ মুজিব সে অপরাধ কর্মকে প্রথমে অস্বীকার করেন, তারপর নিহতরা যেহেতু রাজাকার সেহেতু সেটিকে জায়জে ঘোষনা দেন। মুজিবের চরিত্র, যুদ্ধাপরাধ ও মিথ্যাচারের প্রামাণ্য দলিল এসেছে প্রখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাসীর রিপোর্ট থেকে। রিপোর্টটি এসেছে মুজিবের সাথে তাঁর সাক্ষাতকারের বিবরণ রূপে। সে বিবরণটি এরূপ: “এরপর ১৮ই ডিসেম্বর হত্যাযজ্ঞ সর্ম্পকে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি রাগে ফেটে পড়েন। নীচের অংশটি আমার (ওরিয়ানা ফালাসীর) টেপ থেকে নেয়া।

শেখ মুজিব: “ম্যাসাকার? হোয়াট ম্যাসাকার?”

ওরিয়ানা ফালাসী: “ঢাকা স্টেডিয়ামে মুক্তিবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত ঘটনাটি?

শেখ মুজিব: “ঢাকা স্টেডিয়ামে কোন ম্যাসাকার হয়নি। তুমি মিথ্যা বলছো।”

ওরিয়ানা ফালাসী: “মি. প্রাইম মিনিস্টার, আমি মিথ্যাবাদী নই। সেখানে আরো সাংবাদিক এবং প্রায় পনেরো হাজার লোকের সাথে আমি সে হত্যাকান্ড প্রত্যক্ষ করেছি। আমি চাইলে আমি আপনাকে তার ছবিও দেখাবো। আমার পত্রিকায় সে ছবি প্রকাশিত হয়েছে।”

শেখ মুজিব: “মিথ্যবাদী, ওরা মুক্তি বাহিনী নয়।”

ওরিয়ানা ফালাসী: “মি. প্রাইম মিনিস্টার, দয়া করে মিথ্যাবাদী শব্দটি আর উচ্চারণ করবেন না। তারা মুক্তি বাহিনীর। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আব্দুল কাদের সিদ্দিকী এবং তারা ইউনিফর্ম পরা ছিল।”

শেখ মুজিব: “তাহলে হয়তো ওরা রাজাকার ছিল যারা প্রতিরোধের বিরোধীতা করেছিল এবং কাদের সিদ্দিকী তাদের নির্মূল করতে বাধ্য হয়েছে।”

ওরিয়ানা ফালাসী: “মি. প্রাইম মিনিস্টার,…কেউই প্রতিরোধের বিরোধীতা করেনি। তারা ভীতসন্ত্রস্ত ছিল। হাত-পা বাঁধা থাকায় তারা নড়াচড়াও করতে পারছিল না।”

শেখ মুজিব: “মিথ্যাবাদী।”

ওরিয়ানা ফালাসী: “শেষবারের মতো বলছি, আমাকে মিথ্যাবাদী বলার অনুমতি আপনাকে দেবো না।” (ইন্টারভউি উইথ হিস্টরী, ওরিয়ানা ফালাসী। – (অনুবাদে:  আনোয়ার হোসনে মঞ্জু)।

এই হলো শেখ মুজিবের মানসিকতা। এই হলো বাংলাদেশীদের জাতির পিতার প্রকৃত পরিচয়। এই হলো আওয়ামী লীগ ঘোষিত সর্বকালের সেরা বাঙালীর মানবতা, নৈতিকতা, ন্যায়-অন্যায়বোধ ও চরিত্রের মান। বাঙালীদের সেরা ব্যক্তির চরিত্রের মান যদি এই হয় -তবে সাধারণ বাঙালীর চরিত্রের মান কোথায় দাঁড়াবে? এক নেকড়ের কাছে অন্য নেকড়ের হিংস্রতা দোষের মনে হয় না। এরই ফল হলো, মুজিবের যে অপরাধী চরিত্রটি ওরিয়ানা ফালাসী তাঁর প্রথম দিনের প্রথম দৃষ্টিতে সঠিক ভাবে সনাক্ত করতে পেরেছিলেন -তা আওয়ামী লীগের নেতা-র্কমীগণ অর্ধশতাব্দী যাবত তাকে কাছে থেকে দেখেও বুঝতে পারিনি। একই কারণে সমগ্র বিশ্বের বিবেকমান মানুষের দৃষ্টিতে একাত্তরের যে অপরাধগুলো জঘন্য যুদ্ধাপরাধ রূপে গণ্য হলো -তা তাদের কাছে আদৌ অপরাধ গণ্য হয়না। বরং সে নৃশংসতা গণ্য হয়েছে বীরত্বর্পূণ র্কম রূপ। এমন মানসকিতা নিয়ে বিনা বিচারে মানুষ হত্যাকে জায়জে মনে করাটিই স্বাভাবিক।

 

বিচারের নামে রাজনৈতিক শত্রু হত্যা

যে কোন অপরাধের ন্যায় যুদ্ধাপরাধের ন্যায্য বিচারেও কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু তেমন একটি বিচারে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের আদৌ কোন আগ্রহ ও যোগ্যতা আছে কি? কারণ, বিচারের কাজ তো খুনিদের দিয়ে হয়না। আওয়ামী লীগ এর আগেও দুইবার ক্ষমতায় এসেছে। আগ্রহ থাকলে সে বিচার সত্তরের দশকই মুজিব আমলে হত। অপরাধরে আলামাত ৪০ বছর পর অক্ষত থাকার কথা নয়। যে কোন যুদ্ধে দুইটি পক্ষ থাক। প্রতি পক্ষেই কিছু অপরাধী থাকে। তারাই অপরাধ ঘটায়। বহু নিরপরাধ লোক তখন মারা যায়। সুবিচারে আগ্রহী হলে উভয় পক্ষের অপরাধীদেরই আদালতের কাঠগড়ায় তুলতে হয়। শুধু একপক্ষের বিচার নিজেই এক বিরাট অবিচার। একাত্তররে সকল অপরাধ শুধু পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বা পাকিস্তানপন্থিরা করেছে -সেটি ঠিক নয়। তা হলে লক্ষাধিক বিহারীদের কারা হত্যা করলো? কারা বিহারীদের ধর্ষণ করলো? কারা তাদের ঘর-বাড়ী, ব্যবসা-বানিজ্য কেড়ে নিয়ে বস্তিতে বসালো? সেটি কি অপরাধ নয়? কারাই বা বহুহাজার বন্দী রাজকার এবং নিরস্ত্র হাজার হাজার পাকস্তানপন্থিকে হত্যা করলো? তারা নিশ্চয়ই বজ্রপাতে বা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা যায়নি। বসনিয়া ও কসভোর যুদ্ধে বহু অপরাধ সংঘটিত হয়ছে। হেগের আন্তর্জাতিক আদালত সার্ব ও মুসলিম উভয় পক্ষের অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারের ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। বিচারের এই কি আন্তর্জাতিক মান?

আন্তর্জাতিক আইনে যে কোন বন্দীকে হত্যা করা যুদ্ধাপরাধ। কিন্তু বিচারের নামে অবিচারের আয়োজন হলে তখন যুদ্ধাপরাধের বিচারের আগ্রহ থাকে না। আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধীদরে বিচারের নামে শুধু সরকার-বিরোধীদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু যেসব যুদ্ধাপরধারীদের অবস্থান আওয়ামী লীগের ভীতরে তাদের বিচারের কোন উদ্যোগ নেই। কারো বিচার করতে হলে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী প্রমাণ আনতে হয়। কথা হলো, যাদেরকে গ্রেফতার করা হলো তাদের বিরুদ্ধে কি ছবিসহ এমন প্রমাণ আছে যে তারা রাইফেলের মাথার বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ি খুঁচিয়ে মানুষ হত্যা করছে? সেটি থাকলে সরকারের সে ছবি প্রকাশ করা উচিতি। কিন্তু কাদের সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে সে ছবি আছে। বিদেশী পত্রিকায় সে ছবি ছাপা হয়ছে। সে ছবি বহু ওয়ব সাইটে আজও প্রামাণ্য দলীল রূপে শোভা পায়। ফলে যুদ্ধাপরাধারীদরে বিচারে আওয়ামী লীগ সরকারের সামান্যতম আগ্রহ থাকলে কাদের সিদ্দিকীকে কাঠগড়ায় খাড়া করা উচিত ছিল।

 

বিচার অপরাধীদের হাতে!

বাংলাদেশে বিচার এখন আর বিচারকদের হাতে নাই। বিচারের আয়োজক এখন অপরাধীগণ। শুধু একাত্তরে নয়, বাংলাদেশের সমগ্র ইতিহাসে সবচেয় বড় অপরাধ কান্ডগুলো ঘটেছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাতে। আজও বাংলাদেশে যত আপরাধ ঘটছে তারও সিংহ ভাগ ঘটছে তাদের হাতে। দেশ জুড়ে দুর্নীতি, চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসীর রাজনীতির যে জোয়ার -তার কারণ তো আওয়ামী শাসন। আন্তর্জাতিক আইনে কাউকে জোরপূর্বক ঘর থেকে রাস্তায় নামিয়ে তার ঘর-বাড়ি ও সহায়-সম্পদ দখলে নেয়া গুরুতর অপরাধ। যুদ্ধকালে ঘটলে সেটি ভয়ানক যুদ্ধাপরাধ। বাংলাদেশে সে অপরাধ যে কতটা বীভৎস ভাবে হয়ছে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো, কয়েক লক্ষ বিহারীর হত্যাই শুধু নয়, তাদের সহায়-সম্বলহীন বস্তির জীবন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর পরাজয়রে পর সেদেশে হিটলারের নাজী পার্টির বহু লক্ষ নেতা-কর্মি জড়িত ছিল। কিন্তু বিজয়ীরা কি তাদের ঘরবাড়ী দখলে নিয়েছে? কেউ খুন বা ডাকাতি করলে তার শাস্তি দেয়া যায়। সে জন্য কি অপরাধীর ঘরবাড়ী ছিনিয়ি নিয়ে তার তার স্ত্রী ও পুত্র-কণ্যাদেরকে রাস্তায় নামানো যায়? বিশ্বের কোন সভ্য দেশে কি এরূপ অপরাধ ঘটে? কিন্তু আওয়ামী লীগের কাছে এ গুরুতর অপরাধ কোন অপরাধই গণ্য হয়নি। বরং মুজিব সরকার সেসব জঘন্য অপরাধীদেরকে অন্যায় ভাবে দখলকৃত বিহারীদের ঘরবাড়ীর মালিকানা লিখে দিয়ে পুরস্কৃত করেছে। কথা হলো এই যাদের ন্যায়বোধ, মূল্যবোধ, বিচারবোধ ও মানবতার মান, তারা যুদ্ধাপরাধ দূরে থাক, কোন বিচারের সামর্থ্য রাখে কী? সে জন্য তো ন্যায়কে ন্যায় এবং অন্যায়কে অন্যায় বলার ন্যূনতম সামর্থ্যটুকু থাকা দরকার।

অপরাধ শুধু যুদ্ধকালে ঘটে না। যুদ্ধ ছাড়াও প্রতি দেশে বহু মানুষ খুন হয়, বহু নারী ধর্ষিত হয়, বহু দোকানপাঠ ও ঘরবাড়ি লুন্ঠিতও হয়। অন্য যে কোন দেশের তুলনায় বাংলাদশে সেটি বরং বেশী বেশী হয়। দেশটি যে অপরাধীদের যে অভয় অরণ্য তার প্রমাণ, অপরাধ কর্মে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০০টির বেশী রাষ্ট্রকে পিছনে ফেলে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়েছে। মুজিব আমলে হাজার হাজার কোটি টাকার ত্রাণসামগ্রী লুন্ঠিত হয়ছে। লুণ্ঠনে লুন্ঠনে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশ্বের দরবারে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির খেতাবও পেয়েছে। যে জমিতে গাছের চেয়ে আগাছার সংখ্যাই বেশী -সে জমি থেকে আগাছা তুলতে বেগ পেতে হয় না। প্রশ্ন হলো, যে দেশে এতো অপরাধী, তাদের মধ্য থেকে ক’জনের বিচার হয়েছে? আওয়ামী লীগ তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর দুর্বৃত্তদের অপরাধ কর্ম প্রতিবারের ন্যায় প্রচন্ড তীব্রতা পেয়েছে। দলীয় অপরাধীদের হাতে বেদখল হয়ে যাচ্ছে সরকারি খাস জমি, নদীর পাড়, রেল সড়কের জমি, বনভূমি ও সমূদ্র সৈকত। ডাকাতির শিকার হচ্ছে দেশের হাটবাজার। লুটপাঠ হয়ে যাচ্ছে রাস্তার পাশের সরকারি গাছ। অপরাধীদের বিচারে সরকারের সামান্যতম ইচ্ছা থাকলে এসব অপরাধ কর্মের নায়কদের গ্রেফতার করা হতো। তাদেরকে আদালতে তোলা হতো। কিন্তু মুজিব যেমন বিচার করেনি, তেমনি হাসিনাও করছে না। তাদের আগ্রহ অন্যত্র। তারা বরং এসব অপরাধীদের নিজ দলে স্থান করে দিচ্ছে। এবং গুম, খুন ও জেলে তুলছে বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের।

 

লক্ষ্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূল

বিচারেরর নামে স্বৈরাচারি সরকারের মূল এজন্ডা হলো, রাজনৈতিক প্রতপক্ষ-নির্মূল। সে নির্মূল প্রক্রিয়াকে জায়েজ করতে তারা প্রতিপক্ষের গায়ে অপরাধীর লেবেল লাগায় এবং গ্রেফতার করে আদালতে তোলে। প্রকৃত অপরাধীদরে দাপটে দেশবাসীর জীবনে নাভিশ্বাস উঠলে কি হবে, পুলিশের নজর সে দিকে নেই। তারা ব্যস্ত সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা তৈরি করার কাজে। পুলিশের এটিই যেন সবচেয়ে বড় কাজ। ফলে মিথ্যা মামলা হচ্ছে হাজারে হাজার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তাদের কাছে কোন প্রসঙ্গই নয়। সেটি হলে একাত্তরে যারা যুদ্ধ করলো -সেই পাক-বাহিনীর অফিসারদের তারা আদালতে তুলতো। অথচ তাদের কথা তারা মুখেও আনে না। কারণ, পাকিস্তানী সেনা অফিসারগণ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়। তারা তো চায়, রাজনীতির ময়দান থেকে শত্রু-নির্মূল।

চোরডাকাত, খুনি ও ধর্ষকগণ জনগণের ও রাষ্ট্রের শত্রু হলেও শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের শত্রু নয়। ফলে তাদের নির্মূল ক্ষমতাসীন দলের এজেন্ডা নয়। সরকার তার নিজের শত্রুদের চেনে। তাই প্রশাসনের হাতে নির্মূল হচ্ছে জামায়াত ও শিবির কর্মী, গুম ও খুন হচ্ছে বিএনপি নেতাকর্মী এবং ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যার শিকার হয়েছে বহুশত হিফাজতে ইসলাম কর্মী। অথচ যে দুর্বৃত্তগণ দেশে অপরাধের জোয়ার এনেছে তাদেরকে ধরে শাস্তি দিয়েছে -সে নজির সামান্যই। বরং তাদেরকে আশ্রয় দিচ্ছে নিজ দলে। কারণ, অপরাধী হলেও দলীয় ক্যাডার রূপে বিরোধী দলীয় কর্মীদের গুম বা খুনে এসব দুর্বৃত্তদের সামর্থ্য প্রচুর। রাজপথে তারা বিরোধীদের লাশ বানাতে পারে। প্রধানমন্ত্রী রূপে শেখ হাসিনার কাজটি হলো, এসব অপরাধীদের নিজ দলে আশ্রয় দেয়া এবং তাদের গায়ে আঁচড়টিও লাগতে না দেওয়া। এবং পুলিশের কাজ হলো, সরকারদলীয়দের অপরাধ কর্মগুলোকে নীরবে দেখা এবং জনগণের হাত থেকে তাদের প্রটেকশন দেয়া।

 

জামায়াতে ইসলামী কেন নির্মূলের টার্গেট?

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে জামায়াতে ইসলামীর নির্মূলে শেখ হাসিনার উদ্যোগী হওয়ার মূল কারণটি সুস্পষ্ট। সেটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। মুসলিম লীগের মত পাকিস্থানপন্থি দলগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় তারা আর এখন আওয়ামী লীগরে প্রতপিক্ষ নয়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর অপরাধ, দলটি এখনও বেঁচে আছে। এবং রাজনৈতিক শক্তিও রাখে। বিএনপির শক্তি যাই হোক, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থণ ছাড়া দলটির পক্ষে ১৯৯১ সালে যেমন ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব ছিল না; ভবিষ্যতেও সম্ভব নয়। দলটি শেখ হাসিনার টার্গেট একারণই। তাই পাকিস্তানপন্থি অনেকের সাথে হাসিনার পারিবারীক আত্মীয়তা জমলওে নির্মূলে নেমেছে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধ।

তবে জামায়াতে ইসলামীর আরেক বিরাট অপরাধ তারা শুধু অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষেই ছিল না, তারা ইসলামপন্থিও। ভারতপন্থি সেক্যুলারিস্টদের কাছে ইসলামপন্থি হওয়াটাই মূল অপরাধ। একাত্তরে জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষ না নিলেও তারা নির্মূলে মুখে পড়তো। কারণ, বাংলাদেশে ইসলামের বিজয় চায় -এমন দলের অস্তিত্ব ভারত এবং যারা ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদার তারা কখনোই মেনে নিতে রাজী নয়। বাংলাদেশে ইসলামী শক্তির উত্থানকে ভারত তার নিজ অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। অপর দিকে ক্ষমতায় থাকতে হলে ভারতীয় এজেন্ডা নিয়ে কাজ করা ছাড়া শেখ হাসিনার সামনে ভিন্ন রাস্তা নাই। শেখ মুজিবেরও ছিল না। তাই ক্ষমতা হাতে পেয়েই মুজিব সকল ইসলামী দলকে নিষিদ্ধি করেছিলেন। তাতে প্রচন্ড খুশি হয়েছিল ভারত। হাসিনা জামায়াতের বহু নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে, ফলে ভারতের কাছে হাসিনার গ্রহণযোগ্যতাও বেড়েছে। তবে আওয়ামী লীগের শত্রুদের তালিকায় জামায়াতে ইসলামী একা নয়। যারাই ইসলামের চেতনাধারি ও ইসলামের বিজয়ী আগ্রহী –টার্গেট তারাও। তাই জেল-জুলুম ও নির্যাতন নেমে এসেছে হিফাজতে ইসলাম, হিজবুত তাহরীর, আহলে হাদীস আন্দোলন ও অন্যান্য ইসলামী দলের নেতা-কর্মীদের উপরও। এমনকি দাড়ী-টুপিধারী সাধারণ মুসল্লীরাও তাদের লগি-বৈঠা থেকে রেহাই পায়না।

 

ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন

তবে বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুপক্ষ একা নয়। তাদের আন্তর্জাতিক মিত্র রয়েছে। ইসলামপন্থিদের দাবিয়ে রাখা বা নির্মূল শুধু আওয়ামী লীগ ও ভারতের স্ট্রাটেজী নয়। এমন এক আগ্রাসী স্ট্রাটজেী নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যুদ্ধ করছে আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, আলজিরিয়া, সোমালিয়া, লিবিয়াসহ বহু মুসলিম দেশে। তাদের কাছে রাষ্ট্রের বুকে ইসলামের প্রতিষ্ঠার পক্ষে আওয়াজ উঠানোই অপরাধ। ইসলামের অবস্থান তারা মসজিদের জায়নামাজে মেনে নিতে রাজী, কিন্তু আদালত, প্রশাসন, শিক্ষা ও অর্থনীতি, আইন-কানূনে নয়। তালেবানদের অপরাধ, ইসলামকে তারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতষ্ঠায় আগ্রহী। সেটি রুখতেই ৪০টি দেশের সৈন্য আফগানিস্তানে হাজির হয়েছে। তারা বোমা ফেলেছে বিয়ের মহফিলে। বোমা ফেলেছে পাকিস্তানে ইসলামপন্থিদের মাথায়। এবং তাদের হাতে নিহত হয়েছে দশ লাখের বেশী নিরপরাধ মানুষ।

বাংলাদেশে সে অভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে আওয়ামী লীগ। ইসলামবরিোধী যুদ্ধে মার্কিনীদের মিত্র যেমন ভারত ও ইসরাইল, তেমনি আওয়ামী লীগও। ভোটডাকাতি করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে, দলটির হাতে গণতান্ত্রিক অধিকার ও আইনের শাসন পদদলিত হয়েছে –কিন্তু তা নিয়ে মার্কিনী প্রশাসন ও তার মিত্রদের মুখে নিন্দা বা প্রতিবাদ নাই। হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে প্রচন্ড খুশি ভারত। দিল্লীর শাসক চক্র চায় কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনী যে যুদ্ধটি করছে, মুসলিমদের দমনে তেমন একটি যুদ্ধ বাংলাদেশেও লাগাতর হোক। বাংলাদেশেও যে কোন সময় ইসলামের পক্ষে জোয়ার শুরু হতে পারে -সে ভয়ে ভারতীয় শাসক মহলে দারুন দুশ্চিন্তা। সে জোয়ার রুখার কাজে ভারত আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করতে চায়। তাই বাংলাদেশের পুলিশের কাজ হয়েছে ঘরে ঘরে হানা দিয়ে শুধু ইসলামপন্থি ছাত্রদের গ্রেফতার করা নয়, বরং জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করাও। অথচ নামায-রোযার ন্যায় জিহাদ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। নামায-রোযা না থাকলে যেমন কাউকে মুসলিম বলা যায় না, তেমনি মুসলিম বলা যায় না জীবেন জিহাদ না থাকলে। জিহাদহীন মুসলিমকে নবীজী (সা:) মুনাফিক বলেছেন। এজন্যই নবীজী (সা:)র আমলে জিহাদ করেননি এমন কোন সাহাবা পাওয়া যায়না। তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে বাংলাদেশে আজ যা কিছু ঘটছে সেটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং মুসিলদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গ্লোবাল যুদ্ধের এটি এক অবিচ্ছে্দ্য ঘটনা।

যুদ্ধাপরাধীদরে বিচার তাই একটি বাহানা মাত্র। মূল লক্ষ্যটি ইসলামপন্থিদের নির্মূল। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের নিজেরও কিছু করার নাই। সে বরং ইসলাম-দুষমন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে ক্রীড়নক মাত্র। বল এখন মার্কিন-নেতুত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী জোটের হাতে। বাংলাদেশে সে জোটের পক্ষ থেকে ইসলামপন্থিদের দমনের ভার পেয়েছে ভারত। একাত্তরেও তেমনই একটি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। আজকের মত তখনও রাজনৈতিক খেলার নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছিল দিল্লির দরবারে। সে সময় শেখ মুজিবেরও ভারতের হুকুম তামিল করা ছাড়া কিছু করার ছিল না। সে আমলে ইসলামী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে এবার নিষিদ্ধ করা না হলেও নির্মূল করা হচ্ছে। মুজিব রক্ষি বাহিনী গড়েছিলেন, শেখ হাসিনা সেনা বাহিনী, RAB এবং পুলিশকে রক্ষি বাহনিী বানিয়ে ফেলেছে।

শান্তিপূর্ণ ভাবে যারা ইসলামের বিজয়ের স্বপ্ন দেখে তাদের এখন স্বপ্নভঙ্গের হওয়ার দিন। শয়তানী শক্তি নবীজী (সা:)’র ন্যায় মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শান্তিবাদী ব্যক্তিকে ইসলামরে প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজটি শান্তিপূর্ণ ভাবে হতে দেয়নি। সে পক্ষটি যে আজও হতে দিবে –সেটি কি আশা করা যায়? ইসলামের বিজয়ের পথটি কোরবানীর পথ।  অর্জন করতে হয় অর্থ, রক্ত, মেধা, শ্রম, ছবরের বিনিময়ে। মহান আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে কোরবানী পেশ ছাড়া বিজয়ের অন্য কোন কোন পথ খোলা রাখা হয়নি। ঈমানদারীর পরীক্ষা হয় তো এ পথইে। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামদেরকে সে অভিন্ন পথে অগ্রসর হতে হয়েছে। ঈমানদারদের জন্য সে পরীক্ষাটইি বাংলাদেশেও শুরু হয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা এ পরীক্ষায় কীভাবে অংশ নেয়। আত্মসর্মপণ এখানে কোন পলসি নয়, ভীরুতা বা নীরবতা কোন স্ট্রাটজেী নয়। আত্মসর্মপণ, ভীরুতা ও নীরবতায় যা অনিবার্য করে সেটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার আযাব –সেটি যেমন এ দুনয়িায়, তেমনি আখেরাতে। কথা হলো, পরীক্ষায় অংশ নেয়া ছাড়া কি প্রমোশন আশা করা যায়? আর ঈমানদারের জীবনে সে প্রমোশনটি তো আসে নিয়ামত ভরা জান্নাত প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। পরিস্থিতির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের তাই বোধোদয় হওয়া উচতি। চলমান এ পরীক্ষায় পাশ-ফেলের উপর নির্ভর করছে তাদের পরকালের পাশ বা ফেল। ১ম সংস্করণ ১৫/০৮/২০১০; ২য় সংস্করণ ২৩/০১/২০২১।