গণতন্ত্রের কবর ও সন্ত্রাসে আওয়ামী মনোপলি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

নগ্ন বেশে সরকার

গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনার ভাবনা নাই। গণতন্ত্র আজ কবরস্থ্য। ফলে ভাবনা নাই জনগণের কাছে জবাবদেহীতা নিয়েও। জনগণ কি ভাববে বা আন্তর্জাতিক মহলে দেশ কতটা কলংকিত হবে -সেদিকেও সামান্যতম ভ্রুক্ষেপ নাই। মুজিবের আমলে দেশ তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি রূপে পৃথিবী ব্যাপী প্রচার পেয়েছিল। কিন্তু তাতে মুজিব ও তার অনুসারিদের একটুও লজ্জা হয়নি। বরং সে অপমান নিয়ে আজও  আওয়ামী বাকশালীদের অহংকার। লোকলজ্জা লোক পেলে কোন কুকর্মতেই বিবেকের পক্ষ থেকে বাধা থাকে না। নির্বাচনের নামে প্রহসন, যৌথবাহিনী ও অস্ত্রধারি দলীয় গুন্ডাদের দিয়ে শত শত বিরোধী নেতাকর্মীদের গুম,হত্যা ও নির্যাতনে শেখ হাসিনা ও দলীয় কর্মীদের বিবেকে সামান্যতম দংশনও হয় না। যেন দেশে কিছুই হয়নি। মহান নবীজী (সাঃ) তাই লজ্জাকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, যার লজ্জা নাই তার ঈমানও নাই। আর ঈমান না থাকলে তার জন্য ফাসেক, জালেম বা কাফের হওয়া সহজ হয়ে যায়।

সরকার জনগণকে গাছপালা বা গরু-ছাগলের চেয়ে বেশী কিছু ভাবছে না। একই রোগ সব স্বৈরাচারির। তাদের ধারণা, গরু-ছাগলের জন্মই তো অধিকারহীন ও জবাই হওয়ার জন্য। তাই হিটলার ও স্টালিনের ন্যায় স্বৈরাচারিরা গ্যাস চেম্বার বা ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। ফিরাউন বনি ইসরাইলের প্রতিটি পুরুষ শিশুকে হত্যা করতো। হাসিনাও তেমনি নিরপরাধ মানুষদের ক্রস ফায়ারে দিচ্ছে। একই কাজ করেছে তার পিতা শেখ মুজিব। তারা জানে,গাছপালা ও গরু-ছাগলের সামনে সন্ত্রাস করলে বা ঘরবাড়িতে আগুন দিলে প্রতিবাদ উঠে না। কাপড় খুললেও ধিক্কার দেয় না। দেশ যেন গভীর জঙ্গল। জঙ্গলে লাশ পড়লে বিচার হয়না। তেমনি শত শত লাশ পড়লেও বাংলাদেশে কারো বিচার হয় না,শাস্তিও হয় না। শাপলা চত্বরে এত নিরীহ মুসল্লির প্রাণ গেল, কিন্তু কোন খুনির গায়ে কি কোন আঁচড় লেগেছে? একদিনের জন্যও কি কারো কারাবাস হয়েছে? হাসিনা ও তার বাকশালী সহকর্মীরা শুধু গণতন্ত্রকেই কবর দেয়নি, কবর দিয়েছে নিজেদের বিবেককেও। চোরডাকাত, খুনি ও পতিতারা বিবেক ও লজ্জা-শরম নিয়ে রাস্তায় নামে না। বিবেক ও লজ্জা-শরম নিয়ে রাজনীতিতে নামেনি শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী সহযোগীরা। একই রূপ অবস্থা ছিল হাসিনার পিতা মুজিবের। সামান্যতম বিবেক ও লজ্জা-শরম থাকলে কি মুজিবের হাতে গণতন্ত্র নিহত হত? প্রতিষ্ঠিত হত কি বাকশালী স্বৈরাচার? নিহত হত কি ৩০-৪০ হাজার মানুষ? স্বাক্ষরিত হত কি ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি? দেশ হারাতো কি বেরুবাড়ী? মুজিবের আমলে যারা নিহত হলো –তাদের হত্যার অপরাধে একদিনের জন্যও কারো জেল হয়নি। ইতিহাসের আরেক শিক্ষা, ফিরাউন-নমরুদদের ন্যায় নৃশংস স্বৈরাচারিদের ভগবান বলার মত বিবেকহীন লোকের অভাব কোন কালেই হয়নি। তাই অভাব নেই শেখ মুজিব স্বৈরাচারিদের জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু এবং হাসিনার ন্যায় ভোটচোরকে মানণীয় বলার মত লোকেরও। যেদেশের কোটি কোটি মানুষ শাপশকুন ও গরুবাছুরকে দেবতা বলে পুজা দেয়, সে দেশের বহু কোটি মানুষ এসব স্বৈরাচারিদের নেতা বা পিতা বলবে -তাতেই বা বিস্ময়ের কি?

 

বিবেকধ্বংসী নাশকতা

প্রাণনাশী শুধু রোগজীবাণূই নয়, বরং ভয়ংকর নাশকতা বিবেকহীন রাজনীতিবিদদের। রোগজীবাণূ প্রাণ নাশ ঘটায়, আর বিবেকহীন রাজনীতিবিদেরা বিনাশ ঘটায় বিবেকের। কারণ সেটি তাদের জন্য অপরিহার্য। কারণ বিবেক বিনাশের কাজটি যথার্থ ভাবে না হলে জনগণের কাতার থেকে উপাসনা জুটে না। যুগে যুগে নমরুদ-ফিরাউনরা তাই সুস্থ্য বিবেকবোধ ও সঠিক ধর্মচিন্তা নিয়ে মানুষকে বেড়ে উঠতে দেয়নি। তেমন একটি রাজনৈতিক প্রয়োজনেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে নমরুদ আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। আর ফিরাউন ধাওয়া করেছিল হযরত মূসা (আ:)’র পিছনে। স্বৈরাচারের জেলে যেতে হয়েছে ইমাম আবু হানিফা (রহ:),ইমাম মালেক (রহ:),ইমাম হাম্বলী (রহ:)’র মত মহান ব্যক্তিদের। মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারি শাসকেরা এভাবেই যুগে যুগে চ্যালেঞ্জ খাড়া করেছে। ইসলাম নিয়ে বাঁচতে হলে স্বৈরাচার নির্মূল তাই অনিবার্য হয়ে পড়ে। এজন্যই ইসলামে বড় ইবাদত হলো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জিহাদ। এ জিহাদে প্রাণ গেলে মহান আল্লাহতায়ালা নিহত ব্যক্তিকে মৃত্যুহীন জান্নাত দেন।

বিবেকহীন রাজনীতিবিদদের কারণেই নৈতিক মহামারি লেগেছে বাংলাদেশের প্রশাসন,পুলিশ ও আদালতে। ফলে আজ থেকে ৫০ বছর আগের পাকিস্তান আমলে রাজনীতি,আদালত, প্রশাসন ও পুলিশে যে বিবেকবোধ দেখা যেত সেটি আজ কল্পনাই করা যায় না। ভয়াবহ বিবেকহীনতার কারণে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবী এখন আর মিছিল থামাতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে না। লাঠিচার্জও করে না। বরং সরাসরি গুলি চালায়। লাঠিচার্জ বা গ্রেফতারে নয়,লাশ ফেলাতেই তাদের আনন্দ। আরো আনন্দ পায় বিরোধীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে বা বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিতে। ফলে বেশুমার মানুষ আজ  যত্রতত্র লাশ হচ্ছে। বাংলাদেশের পুলিশ ও র‌্যাব পরিণত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ খুনি বাহিনীতে। একমাত্র মিশর ও সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও পুলিশের সাথেই তাদের তুলনা চলে। পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে পুলিশের হাতে ২৩ জন মানুষও নিহত হয়নি। ১৯৫২ সালের ২১ই ফেব্রেয়ারিতে মাত্র ৩ জন মারা গিয়েছিল। অথচ সেটিই ইতিহাস হয়ে গিয়েছিল।তাতেই সরকার পরিবর্তন হয়েছিল।৩ জনের হত্যাকে নিয়ে পাকিস্তানের বাঙালীরা সেদিন থেকে “আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রেয়ারি,আমি কি ভূলিতে পারি” বলে গান গাওয়া শুরু করেছিল। আজও  সে গান গা্ওয়া শেষ হয়নি।অথচ আজ এক দিনে ৩ জন নয়, ৩ শত খুন হয়। সমগ্র দেশ এখন শাপলা চ্ত্বর। কিন্তু তা নিয়ে আওয়ামী ঘরানার আব্দুল গাফফারদের গলায় আজ  আর বেদনাশিক্ত গান আসে না। বরং আসে আনন্দ-উৎসব। আব্দুল গাফফারদের হাতে রচিত হয় খুনি হাসিনার পক্ষে অসংখ্য প্রশংসাগীত। একটি দেশে বিবেকের মৃত্যূ যে কতটা ভয়ানক হতে পারে এ হলো তার নজির।

১৯৫২ সালের ২১ই ফেব্রেয়ারিতে মাত্র ৩ জন মারা যাওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী জনাব নুরুল আমীন নিহত পরিবারের কাছে মাফ চেয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত গলায় বেতার ভাষণ দিয়েছিলেন।তিনি নিজে যে পুলিশকে গুলিচালনোর হুকুম দেননি এবং সে খুনের সাথে যে তিনি নিজে জড়িত ছিলেন না, সে কৈফিয়তটিও জনগণের সামনে বার বার দিয়েছিলেন। অথচ আজ  পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবীর হাতে শত শত মানুষ খুন হচ্ছে। কিন্তু সে খুন নিয়ে হাসিনার মুখে কোন অনুশোচনা নেই। বরং আছে প্রচন্ড আত্মতৃপ্তি। সে আত্মতৃপ্তি নিয়ে “লাশরা পুলিশের তাড়া খেড়ে উঠে দৌড়িয়েছে” সে কৌতুকও তিনি শোনান। এক খুনের বদলে তিনি ১০ খুনের হুমকি দেন। তেমনি এক অপরাধি চেতনা নিয়ে শাপলা চত্বরের শহীদদের লাশ ময়লার গাড়িতে তোলা হয়ছে। গণতন্ত্রের হায়াত মওত নিয়েও হাসিনার সামান্যতম ভাবনা নেই। সে ভাবনা হাসিনার পিতা শেখ মুজিবেরও ছিল না।মুজিব তাই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিল।এবং সকল বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ ও সকল বেসরকারি পত্রপত্রিকার অফিসে তালা ঝুলিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উৎসব করেছিল।

 

কুফল লজ্জাহীনতার

লজ্জাহীনতার কুফল অতি ভয়ানক। তাতে বিলুপ্ত হয় মানবিক গুণ।  চোর-ডাকাত ও পতিতাদের মূল সমস্যাটি হলো, তাদেরে হায়া-শরম থাকে না। একই সমস্যা গণতন্ত্রের শত্রুদের। লজ্জাশরম থাকলে মানুষ কি এমন অপরাধে নামে? সব যুগে ও সব দেশেই গণতন্ত্রের শত্রুদের একই অবস্থা। গণতন্ত্র হত্যা, পত্রিকার অফিসে তালা লাগানো ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের হত্যায় যেমন শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার লজ্জা হয়নি, তেমনি হচ্ছে না মিশরের স্বৈরাচারি শাসকদের। লজ্জাহীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মিশরের সামরিক বাহিনী নিজেই আগামী নির্বাচন লড়তে যাচ্ছে। অন্য কোন বেসামরিক ব্যক্তিকে নয়, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল সিসিকে তারা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী খাড়া করেছে। সমগ্র দেশ এখন সেনা বাহিনীর হাতে অধিকৃত। বিরোধী দলের নেতাকর্মীগণ এখন কারারুদ্ধ। তারা শুধু বেশরমই নয়,কত বড় বেপরওয়া যে, সেনাবাহিনীর প্রধান সিসি ও তার সমর্থকগণ এরূপ সামরিক অধিকৃতিকে বলছে তাহরির স্কোয়ার থেকে শুরু হওয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবেরর ধারাবাহিকতা। ড. মুরসীর আমলে নাকি গণতন্ত্র হাইজ্যাক হয়েছিল,এখন তারা পথে এনেছে। মিথ্যাচার আর কাকে বলে! জেনারেল সিসির পক্ষে প্রচার চালাতে বাধ্য করেছে সে দেশের সকল টিভি চ্যানেল ও পত্রপত্রিকাগুলোকে।সেনাবাহিনীর কাছে যে কোন নিরপেক্ষ প্রচারনাই অসহ্য। প্রচারনা হতে হবে শুধু তাদের পক্ষে। তাই আল -জাজিরার সাংবাদিকদের সন্ত্রাসী বলে জেলে তুলেছে। নিরেট তাঁবেদার ও পাহারাদারে পরিণত করেছে দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বিচারকগণ। সেনাবাহিনী এক রাতে কায়রোর এক ময়দানে হাজারের বেশী নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করেছে। অথচ এরপরও নিজেদেরকে তারা গণতন্ত্রি বলছে।এবং এরূপ নৃশংস হত্যাকান্ডকে বলছে আইনের শাসন। অপর দিকে জেলে তুলেছে ও হত্যা মামলার আসামী বানিয়েছে সেদেশের ইতিহাসের সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসেডেন্ট ড.মুরসীকে। সন্ত্রাসী দল বলে নিষিদ্ধ করেছে মুরসীর দল ইখওয়ানুল মুসলিমুনকে। এরূপ স্বৈরাচারি কুকর্মে জেনারেল সিসির লজ্জা-শরমে একটুও বাধেনি। যেমন বাধছে না শেখ হাসিনারও। ফলে তার কাছে ৫ই জানুয়ারির ভূয়া নির্বাচন গণ্য হচ্ছে গণতন্ত্রের বিজয় রূপে। শতকরা ৫ জন ভোট না দিলে কি হবে,সে নির্বাচনকে বৈধ বলে আরো ৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পক্ষে যুক্তি পেশ করছে।

 

সন্ত্রাসে মনোপলি

সব স্বৈরাচারি শাসকেরাই সন্ত্রাস, লুটতরাজ ও খুন-খারাবীতে নিজেদের নিরংকুশ মনোপলি চায়। এককালে একই রূপ মনোপলি ছিল ব্রিটিশ,স্পানিশ, ডাচ ও পর্তুগীজসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশিক শক্তির। অধিকৃত দেশগুলিতে নিজেদের সে হিংস্র মনোপলিকে বলতো আইনের শাসন। ভারত যখন তাদের হাতে অধিকৃত,এ দেশের নাগরিকদেরকে নিজ বাড়ীতে তীর-ধনুক,তলোয়ার রাখাকেও তারা সন্ত্রাস বলতো। সে অপরাধে তাদেরকে জেলেও তুলতো। আর নিজেরা নির্বিচারে লক্ষ লক্ষ মানুষকে খুন করতো। খুন করে লাশকে বাজারে, নদীর ঘাটে বা লোকালয়ে উঁচু খুঁটিতে লটকিয়ে রাখাটি তাদের কৌশল ছিল। লক্ষ্য, সাধারণ মানুষকে ভীত সন্ত্রস্ত করা। তাদের সন্ত্রাসে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানগণ প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের আদিবাসীগণ। বাংলাদেশের বুকে সন্ত্রাসে একই রূপ মনোপলি হলো আওয়ামী লীগের। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একই ভাবে শুরু হয়েছে রাজনৈতীক শত্রু নির্মূলকরণ। ডাকাত সর্দার যেমন ডাকাতীর স্বার্থে অন্যান্য ছোটখাটো ঢাকাতদের সাথে নেয়, শেখ হাসিনাও তেমনি এরশাদের ন্যায় আরো কিছু স্বৈরাচারিকে সাথে নিয়েছে।

সন্ত্রাসীরা কখনোই নিরস্ত্র মানুষের কাকুতি-মিনতি বা নসিহতে কান দেয় না। এমন কি নবী-রাসূলদের মত মহান ব্যক্তিদের নসিহত্ও তাদের উপর কোন আছড় করেনি। তাদের নজর তো নিরস্ত্র নরনারীর পকেট ও ইজ্জতের দিকে। জনগণকে নিরস্ত্র ও প্রতিরোধহীন দেখাতেই তাদের আনন্দ। তারা বরং নিরস্ত্র মানুষের অসহায় অবস্থাকে উপভোগ করে। তারা তো চায় সারা জীবন তাদের সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম থাকুক। নমরুদ-ফিরাউনের ন্যায় মুজিব যেমন সেটি চেয়েছিল, হাসিনাও সেটি চায়। সেটি শুধু হাজার হাজার নয়,লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তপাতের মধ্য দিয়ে হলেও। কাশ্মীরে লক্ষাধিক মানুষের লাশ পড়লেও ভারতীয় স্বৈরাচার দখলদারি সেখানে ছাড়েনি। ভারত তার অনুগতদের দিয়ে আজ যে অধিকৃতি বাংলাদেশের উপর প্রতিষ্ঠা করেছে সেটি শুধু রাজপথের কিছু মিটিং-মিছিল, কিছু ধর্মঘট ও কিছু অবরোধের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার নয়। সিরিয়ার হাফেজ আল আসাদ বা ক্যাম্বাডিয়ার সাবেক কম্যুনিস্ট শাসক পলপটের চেয়ে হাসিনা কম ক্ষমতা লিপ্সু নয়। পলপট সরকারের হাতে সে দেশের সিকি ভাগ মানুষ নিহত হয়েছিল। নিহতদের সংখ্যা ছিল ২০ লাখের বেশী। অপর দিকে স্বৈরাচারি আসাদের হাতে ইতিমধ্যে নিহত হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার নিরস্ত্র মানুষ।

 

লড়াই জান্নাত ক্রয়ে

স্বৈরাচারিরা কখনোই কোন দেশে একাকী আসে না। শুধু গণতন্ত্র হত্যা ও চুরি-ডাকাতিই তাদের একমাত্র হত্যা নয়। তাদের বড় অপরাধ যেমন মানব হত্যা,তেমনি ধর্ম ও সভ্যতার হত্যা। ফিরাউন, নমরুদের ন্যায় ইসলামের বড়শত্রু চিরকালই ছিল স্বৈরাচারিরা।আজ যেমন সেটি মিশরে, তেমনি সিরিয়া ও বাংলাদেশে। বাংলাদেশে সে হত্যার পর্বটি শুরু হয়েছে মাত্র। তাই হাসিনার স্বৈরাচারি সরকার যতই দীর্ঘায়ু পাবে ততই বাড়বে খরচের বিশাল অংক। একারণেই কোন সভ্য মানুষ এরূপ স্বৈরাচারি সরকারকে মেনে নিতে পারে না। সমগ্র ইতিহাসে মানবের জানমালের সবচেয়ে বড় খরচটি বনের হিংস্র পশু তাড়াতে হয়নি। বরং সেটি হয়েছে মানুষ রূপী এ হিংস্র জীবদের তাড়াতে। মহান আল্লাহতায়ালা দ্বীনের এ শত্রুদের তাই পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। তাদের নির্মূলে নবীজীর আমলে শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবাকে শহীদ হতে হয়েছে।

যে কোন নির্মাণ কাজই বিপুল বিনিয়োগ চায়। উচ্চতর সভ্যতা নির্মাণের চেয়ে ব্যয়বহুল নির্মাণ কাজ মানব ইতিহাসে আর কিছু আছে কি? এ কাজ তো মুসলিমদের বিশ্বশক্তি রূপে দাঁড় করানোর। ঈমানদার তো সে বিপুল ব্যয়ের মধ্য দিয়েই জান্নাত ক্রয় করে। মহান আল্লাহতায়ালা এর চেয়ে সহজ কোন রাস্তা মু’মিনের জন্য খোলাও রাখেননি। বাংলাদেশে বর্তমান লড়াই তাই স্রেফ গণতন্ত্র বাঁচানোর নয়, মানুষের জানমাল ও ইসলাম বাঁচানোর। মু’মিনের জীবনে এ লড়াই জান্নাত ক্রয়ের। দেশে দেশে মুসলিমদের মাঝে সে লড়াই আজ তীব্রতর হচ্ছে। বহু গাফেল মুসলিম সেটি না বুঝলেও শয়তানি শক্তি সেটি বুঝতে পেরেছে। হাসিনার পিছনে ভারতসহ সকল কাফের শক্তির বিনিয়োগ তো সে কারণেই এত অধিক। ০৮/০২/২০১৪

 

 




মুজিবের লিগ্যাসী: দেশধ্বংসী নাশকতা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

ফিরোজ মাহবুব কামাল                                                                                                                                                        নাশকতা ইসলামের বিরুদ্ধে

মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর রাসূল ও ইসলামের উপর বিশ্বাস নয়। বিশ্বাসের সাথে কিছু দায়বদ্ধতাও অনিবার্য করে। প্রতিটি মুসলিমের উপর সে মূল দায়বদ্ধতাটি হলো, ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থে সর্ব মুহুর্তে আপোষহীন হওয়া। কারণ, যেখানে ইসলাম থাকে, সেখানে অনৈসলামও থাকে। এবং ইসলাম ও অনৈসলামের মাঝে অবিরাম লড়াইও থাকে। সে লড়াইয়ে ইসলামের পক্ষে আপোষহীন চেতনা নিয়ে বাঁচাই হলো প্রকৃত ঈমানদারী। নইলে নাশকতা ও বেঈমানী হয় ইসলাম ও মুসলিমের সাথে। রাজনীতির অঙ্গণে যাদের পদচারণা তাদের উপর সে দায়বদ্ধতা আরো অধিক। তখন সে রাজনীতিতে ইসলাম ও মুসলিমের বিজয়ে বিনিয়োগ ঘটাতে হয় নিজের বুদ্ধিবৃত্তি, অর্থ, শ্রম ও রক্তের। রাজনীতি তখন পবিত্র জিহাদে পরিণত হয়। সে জিহাদে নিহত হলে শহীদ হয়। গৌরব কালে মুসলিমদের রাজনীতি বলতে  তো সেটিই বুঝাতো। মুসলিমগণ বিশ্বে সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছে এবং জন্ম দিয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার –তা তো সে জিহাদী রাজনীতির কারণেরই।

শেখ মুজিব নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করতেন। কিন্তু তাঁর রাজনীতিতে ইসলামের বিজয় আসেনি। মুসলিমদের গৌরবও বাড়েনি। বরং বিজয় ও গৌরব বেড়েছে ভারতীয় কাফেরদের। বিজয়ী হয়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরা বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ। এবং শক্তিহানী ঘটেছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের। তাই মুজিবের রাজনীতির মূল চরিত্রটি ছিল ইসলামের সাথে গাদ্দারীর। তবে শেখ মুজিবের গাদ্দারিটা শুধু পাকিস্তানের সাথে ছিল না। সে গাদ্দারিটা ছিল যেমন ইসলামের বিরুদ্ধে, তেমনি বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিল বাংলাভাষী। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জনের লড়াইকে তিনি পাকিস্তান ভাঙ্গার লড়াইয়ে পরিণত করেন। এবং সেটি স্রেফ ভারতীয় অভিলাষ পুরণে। অথচ পাকিস্তান ভাঙ্গার এ কাজটি ভারত নিজ খরচে ১৯৪৭ সাল থেকেই করে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। অতএব এ কাজের জন্য মুজিবের নেতা হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। ভারতের আজ্ঞাবহ দাস হওয়াই যথেষ্ট ছিল। বাস্তবে তিনি সে দাসসুলভ কাজটিই বেশী বেশী করেছেন।

মুজিবের ভারত সেবার রাজনীতিতে চরম লাভবান হয়েছে যেমন ভারত, তেমনি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঙালী মুসলিম। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল তারাই। গণতন্ত্র বাঁচলে শুধু পাকিস্তানের রাজনীতি নয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর রাজনীতিতে, বাঙালী মুসলিমগণ সুযোগ পেত নেতৃত্বদানের। অখন্ড পাকিস্তান বেঁচে থাকলে আজ লোকসংখ্যা হতো ৪০ কোটি। দেশটি হতো পারমানবিক বোমার অধিকারী পৃথিবীব তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক রূপে বাঙালী মুসলিমগণ পেত বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ।  মুজিবের অপরাধ, সে সুযোগ থেকে বাঙালী মুসলিমদের তিনি শুধু বঞ্চিতই করেননি, বরং গোলাম বানিয়েছেন ভারতের। ভারতের ঘরে তিনি বিশাল বিজয় তুলে দিয়েছেন। ১৯৭১’য়ের যুদ্ধের বিজয়ী ভারত তখন লুটে নেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অব্যবহৃত হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র। সে লুন্ঠনের বিরুদ্ধে শেখ মুজিব প্রতিবাদ না করে নীরব থেকেছেন। অথচ পাকিস্তানের সে অস্ত্র কেনায় অর্থ জুগিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকগণও। অতএব এ লুট শুধু পাকিস্তানের উপর ছিল না, ছিল বাংলাদেশের অর্থের উপর। প্রভুর সামনে গোলামদের প্রতিবাদের সাহস থাকে না। সে সাহস সেদিন মুজিবের মধ্যেও দেখা যায়নি। বরং প্রকট ভাবে যা দেখা গেছে সেটি ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এবং সেটি ভারতকে সাথে নিয়ে। এবং ষড়যন্ত্র হয়েছে ইসলাম ও মুসলিমের পরাজয় বাড়াতে। শেখ মুজিবের সে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি আজও বেঁচে আছে হাসিনার রাজনীতিতে।

ইসলামের হারাম হালামের বিধানগুলো শুধু খাদ্য-পানীয়ে নয়, সেটি রয়েছে রাজনীতিতেও। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম রাজনীতিতে আমৃত্যু অংশ নিয়ে দেখিয়ে গেছেন রাজনীতির ফরজ বিষয়গুলো। নবীজী (সা:) সেটি হাতে কলমে শিখিয়ে গেছেন রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে নিজে বসে। তিনি শিখিয়ে গেছেন, ইসলাম কখনোই নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলে সীমিত রাখার বিষয় নয়। ইসলামের বিধানকে পূর্ণ ভাবে প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজে রাষ্ট্রই হলো মূল হাতিয়ার। রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলিকে ইসলামের বাইরে রাখলে ইসলাম পালনের কাজটি হয় না। তখন রাষ্ট্রের উপর প্রতিষ্ঠা পায় না মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়ত বিধান। রাষ্ট্র তখন শয়তানের দুর্গে পরিণত হয়। শয়তানের সে দুর্গের মাঝে হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রসা গড়েও ইসলামের পরাজয় রোধ করা যায় না। এবং তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। এতো মসজিদ ও মাদ্রাসা বিশ্বের আর কোন দেশে নাই। অথচ দেশটির উপর অধিকৃতি শয়তানী শক্তির। ফলে কোর’আনের তাফসিরকারকদের এদেশে জেলে থাকতে হয়। গণহত্যার শিকার হতে মুসল্লীদের। এবং মুর্তিগড়া হয় রাষ্ট্রীয় অর্থে এবং মুর্তিপূজারীর গানকে গাওয়া হয় জাতীয় সঙ্গিত  রূপে।

ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল তাই মসজিদ-মাদ্রাসা গড়া নয়, বরং সেটি হলো শয়তানের দুর্গরূপী রাষ্ট্রকে নির্মূল করে সেটিকে ইসলামের দুর্গে পরিণত করা। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম তো সেটিই করেছেন। মদিনার হিজরতের পর নবীজী (সা:) তাই নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছেন। কিন্তু ইসলামে অ চেতনাশূণ্য শেখ মুজিব ও তার অনুসারীগণ নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে কোন শিক্ষাই নেননি। শিক্ষা নিয়েছেন এবং ষড়যন্ত্র করেছেন ভারতীয় কাফেরদের সাথে একাত্ম হয়ে। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে বিধিবদ্ধ করেছেন জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষবাদ, সমাজতন্ত্রের ন্যায় হারাম মতবাদ। সংকুচিত করেছেন কোর’আন শিক্ষা। এবং নিষিদ্ধ করেছেন ইসলাম প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে রাজনৈতিক দল গড়া। ইসলাম থেকে দূরে না সরলে কাফেরগণ কখনোই বন্ধু রূপে গ্রহণ করে না। শেখ মুজিব ও তার দলের লোকেরা এতোটাই ইসলামচ্যুৎ যে, ইসলামপন্থী ও পাকিস্তানপন্থীদের নির্মূলে ভারত তাদেরকে আজ্ঞাবহ পার্টনার রূপে গ্রহণ করে। ভারতের অস্ত্র ও অর্থ নিয়ে সে কাজে তারা ঝাঁপিয়েও পড়ে। ইসলামের সাথে তাদের দুষমনি শুধু ১৯৭১’য়ের বিষয় নয়; সে অভিন্ন রূপটি ধরা পড়েছে যেমন শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে, তেমনি ২০১৩ সালের ৫মে শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের মুসল্লীদের বিরুদ্ধে গণহত্যায়।

বাংলাদেশের মাটিতে ১৯৭১’য়ে বহু ইসলামী রাজনৈতিক দল ছিল। ইসলামী দলের বহু লক্ষ নেতা-কর্মী এবং সমর্থকও ছিল। কিন্তু তারা ভারতের এজেন্ডা পূরণে হাতে অস্ত্র নেয়নি। ভারতেও যায়নি। একই কারণে কোন আলেম এবং কোন পীর সাহেবও একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গার সে কবিরা গুনাহতে অংশ নেয়নি। তাদের অনেকে রাজাকার হয়েছে, বহু হাজার রাজাকার প্রাণও দিয়েছে।একাত্তরের রাজাকারের চেতনা ছিল এই কবিরা গুনাহ থেকে বাঁচার চেতনা। মুসলিম যুদ্ধ করে মুসলিম দেশের ভূগোল বাড়াতে, সেটিকে ভাঙ্গতে বা খর্ব করতে নয়। মুসলিম দেশে ভাঙ্গার কাজটি তো কাফেরদের কাজ। একাত্তরে সে এজেন্ডা ছিল ভারতের। শেখ মুজিব ও তার দল ভারতের সে এজেন্ডাকে নিজেদের এজেন্ডা বানিয়ে নিয়েছে। মুসলিম দেশ ভাঙ্গতে বা মুসলিম দেশের ভূগোল বিলীন করতে যুগে যুগে বহু যুদ্ধ করেছে কাফেরগণ।  উসমানিয়া খেলাফত ভেঙ্গে বিশের বেশী টুকরোয় বিভক্ত করেছে ব্রিটিশ ও ফরাসী ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। তখন তাদের চর ও দাস হিসাবে খেটেছে আরব জাতিয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টগণ। সে সাথে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, দুবাই, আবুধাবি, ওমানের ট্রাইবাল নেতাগণ। তাদের সে গাদ্দারীতে আরব বিশ্বের উপর দখলদারী বেড়েছে কাফের শক্তির; এবং শক্তিহানী হয়েছে মুসলিমদের। তাদের সে গাদ্দারীর কারণেই আরব ভূখন্ড আজ ২২ টুকরায় বিভক্ত। মুসলিম উম্মাহ শক্তিহানির মূল কারণ তো এই বিভক্তি। আর বাংলাদেশের মাটিতে সে গাদ্দারী এবং বিভক্তির মূল নায়ক ছিলেন শেখ মুজিব। প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন ভারতবন্ধু; কখনোই বঙ্গবন্ধু বা মুসলিমবন্ধু নন। প্রকৃত মুসলিম শুধু মুসলিমের বন্ধুই হয় না, তাঁর প্রতিরক্ষায় সৈনিকে পরিণত হয়। ভারতে বসবাসকারী মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের যে নীতি, মুজিব ও তার অনুসারীগণ সে নীতিই প্রয়োগ করেছে বাংলাদেশে। ফলে একাত্তরে মুজিবের অনুসারীদের হাতে যত পাকিস্তানপন্থী বাঙালী ও অবাঙালী মুসলিম নিহত হয়েছে তার তূলনা একমাত্র ভারতের মুসলিম গণহত্যার সাথেই মেলে।

 

সর্বমুখী নাশকতা

শেখ হাসিনার ঘোষণা, তিনি কাজ করছেন মদিনা সনদ নিয়ে। প্রকৃত সত্যটি এর বিপরীত। শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিব যে সনদ নিয়ে কাজ করেছেন তার মূল বিধিটি হলো ভারতের প্রতি দাসত্বের। সে সনদ অনুসারেই শেখ মুজিব বাংলাদেশের ভূমি বেরুবাড়ি ভারতের হাতে তুলে দেন। তুলে দিয়েছেন পদ্মার পানিও। ভারতে যাচ্ছে ৫৪টি নদীর পানি। অথচ পাকিস্তানী আমলের ২৩ বছরে একদিনের জন্যও বেরুবাড়ির গায়ে ভারত হাত দিতে পারিনি। পদ্মার পানিও তুলে নিতে পারিনি। ভারত শেখ মুজিবকে তার নিজ স্বার্থের সেবাদাস হিসাবে গ্রহণ করলেও বাংলাদেশীদের কখনোই বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে পারিনি। তারই প্রমাণ, দিল্লীর শাসকচক্র মুজিবকে শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজেই ব্যবহার করেনি, ব্যবহার করেছে বাংলাদেশের মেরুদন্ড ভাঙ্গার কাজেও। বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংসে মুজিবের নাশকতা ছিল বহুমুখী। মুজিব বিলুপ্ত করেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমান্ত। সেটি করেন সীমান্ত বাণিজ্যের নামে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় পণ্যের বাজার বসিয়ে। তিনি তার প্রভু দেশের কাছে বাংলাদেশের কারেন্সি নোট ছাপানোর দায়িত্ব দেন। আর ভারত সে সুযোগ পেয়ে কয়েক শত কোটির বেশী অতিরিক্ত নোট ছেপে নিজের হাতে রেখে দেয়। সে অর্থ দিয়ে সীমান্ত ঘিরে বসানো মুক্ত বাজার থেকে বাংলাদেশীদের থেকে বিদেশী মুদ্রা, কাঁসা-পিতল, পাকিস্তান আমলে বিদেশ থেকে ক্রীত যন্ত্রপাতি ও সঞ্চয়কৃত ধাতব পদার্থ কিনে ভারতে নিয়ে যায়। জাতীয়করণের নামে মুজিব ধ্বংস করেন পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানা। এভাবেই পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করা হয় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এবং ১৯৭৪ সালে ডেকে আনা হয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ  -যাতে প্রাণহানি হয় বহু লক্ষ মানুষের। দরিদ্র মানুষ তখন কাপড়ের অভাবে মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়।

নবীজী (সা:)’র আমলে মদিনা সনদের লক্ষ্য ছিল, মুসলিমদের দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি। লক্ষ্য ছিল, সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও ইসলামী সভ্যতার নির্মাণ। হাসিনা নাম নিচ্ছেন মদিনা সনদের, অথচ যাচ্ছেন উল্টো দিকে। শেখ মুজিবের ন্যায় তারও লক্ষ্য, মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো ও তাদের শক্তি হানি। লক্ষ্য, ইসলামের রাষ্ট্র নির্মাণের যে কোন উদ্যোগের প্রতিরোধ। এবং সেটি তিনি বার বার ঘোষণা দিয়েই করছেন। একটি দেশের শক্তির মূল উৎস ৪টি। এক). রাজনৈতিক শক্তি; দু্ই). শিক্ষা ও সংস্কৃতি; তিন). সামরিক শক্তি; চার). অর্থনৈতিক শক্তি। আওয়ামী লীগ এ ৪টি খাতেরই বিনাশে হাত দিয়েছে। ইতিমধ্যে সেগুলিকে তছনছও করা হয়েছে। রাজনীতির মধ্য দিয়েই জনগণ পায় একতা, পায় প্রতিরোধের সাহস। রাজনৈতিক দিক দিয়ে জনগণকে পঙ্গু করার লক্ষ্যেই শেখ মুজিব গণতন্ত্রকে কবরে পাঠায় এবং প্রতিষ্ঠা দেয় একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার। সেনাবাহিনীর শক্তিহানী করতে গড়ে তোলা হয় বিকল্প রক্ষিবাহিনীকে। একই লক্ষ্যে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই সংঘটিত হয় পিলখানা হত্যাকাণ্ড। সেখানে হত্যা করা হয় সেনাবাহিনীর ৫৭ জন অফিসারকে। ১৯৭১’য়ের যুদ্ধেও এতো অফিসারের মৃত্যু হয়নি। সে যুদ্ধে পাকিস্তানও এতো অফিসার হারায়নি। আর্মির পাশাপাশি শক্তি হানি করা হয় বি.ডি.আর’য়ের। শত শত বি.ডি,আর. সদস্যকে কারাবন্দি করা হয়। বন্দী অবস্থায় অনেকের মৃত্যু হয়েছে জেলখানায়। অপর দিকে দেশের শিক্ষাব্যববস্থা ধ্বংসে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করা হয়েছে দলীয় ক্যাডার তৈরীর কারখানায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কসাইখানায় পরিণত করা হয়েছে আবরার ফাহাদদের মত দেশপ্রেমিকদের হত্যা করার লক্ষ্যে। বছরের বেশীর ভাগ সময়ই সেগুলো বন্ধ থাকে রাজনৈতিক ক্যাডারদের মাঝে সংঘাতের কারণে। লেগে থাকে দীর্ঘ সেসন জট। এভাবেই বাড়ানো হয়েছে শিক্ষা খাতে নাশকতা। অপর দিকে অর্থনীতিতে নাশকতা বাড়াতে ব্যাংক থেকে বিদেশে পাচার হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার বিদেশী মূদ্রা। এমনকি চোরদের হাত পড়েছে স্টেট ব্যাংকের ভান্ডারেও। 

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার মাঝে ভারতের স্বার্থটি বিশাল। ভারত চায় ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ টিকে থাকুক স্রেফ ভারতীয় পণ্যের ক্রেতা হিসাবে। অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দি হিসাবে নয়। বাংলাদেশীদের ক্রয়ক্ষমতা ভারতীদের চেয়ে অনেক বেশী। কারণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেমন উৎপাদন বেড়েছে, তেমনি বিদেশী অর্থের উপার্জন বেড়েছে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশীর বিদেশে কর্মসংস্থানের কারণে। ফলে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর পকেটে এখন অনেক পয়সা। এতবড় বাজার ভারতের পশ্চিম বাংলা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, আসাম, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা, মেঘালয়ের মত ছয়-সাতটি প্রদেশ মিলেও নাই। এ বাজার ভারত দখলে দখলে নিতে চায়। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের বিপুল বিনিয়োগ ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাস পালনে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ মুজিব ও তার অনুসারীদের দাপটের মূল কারণ, তাদের পিছনে ভারতের এ অর্থ বিনিয়োগ।

এক সময় পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনে সমগ্র পৃথিবীতে পূর্ব পাকিস্তান প্রথম ছিল। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশী অর্থ উপার্জিত হত এ খাতে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পূর্ব পাকিস্তানের এবং পরে বাংলাদেশের সে প্রতিদ্বন্দি অবস্থান ভারত মেনে নিতে পারেনি। ভারত চেয়েছিল সে মর্যাদা তা নিজের জন্য। সেজন্যই ভারতের প্রয়োজন দেখা দেয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ আদমজী জুটমিলসহ সকল পাট শিল্পের ধ্বংস। ভারতের স্বার্থে সে কাজটি সমাধা করে দেয় তাদেরই পালিত সেবাদাস শেখ মুজিব। মুজিব আমলে একদিকে যেমন পাটকলগুলোকে অচল করা হয় তেমনি পাটের গুদাম গুলোতে আগুণ দেয়া হয়। আর অপরদিকে ভারত তার পুরোন পাটকলের বদলে বাংলাদেশের সীমান্ত ঘিরে গড়ে তোলে বহু পাটকল। তখন বাংলাদেশের সস্তা কাঁচা পাট দেশে মূল্য না পেয়ে ভারতের বাজারে গিয়ে উঠে। ভারত তখন তাড়াতাড়ি পাট শিল্পে বিশ্বে প্রথম হওয়ার হওয়ার মর্যাদা অর্জন করে। আজ বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দী উঠেছে গার্মেন্টস শিল্পে। ভারত সেটিকেও ধ্বংস করতে চায়। আর গার্মেন্টস শিল্পকে আজ ধ্বংস করা হচ্ছে অতি পরিকল্পিত ভাবে। এ শিল্পে নামানো হয়েছে কিছু দুর্বৃত্ত ও ডাকাতদের। যারা নেমেছে দরিদ্র শ্রমিকের রক্তচোষক রূপে। যে শিল্পে রক্তচোষন হয় দরিদ্র শ্রমিকের সে শিল্প কি বেঁচে থাকে? সে শিল্প বরং মহান আল্লাহতায়ালার আযাব ডেকে আনে। তখন তাতে আগুণ লাগে বা ভবন ধ্বসে পড়ে। সাভারে যা ঘটে গেল তা কি তার ই আলামত নয়।

আওয়ামী লীগের ভোটের রাজনীতিতে দেশের দরিদ্র মানুষ পরিণত হয়েছে রাজনীতির কাঁচা মালে। সেটি যেমন মুজিব আমলে, তেমনি হাসিনার আমলে। শেখ মুজিব সোনার বাংলা প্রতিশ্রুতি দিতে ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে ভোট নিয়েছিলেন। ওয়াদা দিয়েছিলেন আট আনা সের চাল খাওয়োনোর। অথচ উপহার দিয়েছিলেন দুর্ভিক্ষ ও লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু। তেমনি ২০০৮ সালে হাসিনা ওয়াদা দিয়েছিলেন ৮ টাকা সের চাল খাওয়ানোর। কিন্তু খাইয়েছেন ৪৫ টাকা সের দরে। ওয়াদা দিয়েছিলে বিনা মূল্যে সারের। ওয়াদা দিয়েছেন ঘরে ঘরে চাকুরির। সবই ছিল প্রকান্ড মিথ্যাচার। ২৪ নভেম্বর ২০১২-তে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের গার্মেন্টস কারখানায় আগুন লেগে ১১১ কর্মী পুড়ে মারা যায়। হাসিনা সরকার ওয়াদা দিয়েছিল ক্ষতিপুরণের। কথা ছিল কারণ খুঁজে শাস্তি দেয়ার। কিন্তু সে সব কিছুই হয়নি। স্বজন হারা পরিবারগুলিকে কোনরূপ ক্ষতিপুরণ দেয়া হয়নি। কারণ, তাজরীনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর দেলোয়ার হোসেন একজন সরকার সমর্থক ব্যক্তি।ফলে কারো পক্ষে তার পকেট থেকে স্বজনহারাদের জন্য ক্ষতিপুরণ আদায় করে দেয়াও সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে কথা বলবে এমন কোন শ্রমিক সংগঠনও গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। কয়েক বছর আমিনুল ইসলাম একজন ব্যক্তি গার্মেন্টস ইন্ডাসট্রিতে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। সে অপরাধে তাকে লাশ হতে হয়। পুলিশ ৪ দিন পর তার লাশ উদ্ধার করলেই দায়িত্ব সেরেছে। আজ অবধি তার খুনের কোন বিচার হয়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। তাজরীোন আগুন লাগার দুই দিন পরে ২৬ নভেম্বর ২০১২-তে চট্টগ্রামে বহদ্দার পুকুর পাড়ে নির্মীয়মান ফ্লাইওভারের গার্ডার ধ্বসে ১৫ জন নিহত হয়। কিন্তু কেন সে নির্মীয়মান ফ্লাইওভারের গার্ডার ধ্বসে পড়লো তার কোন তদন্ত হয়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। কারণ এই ফ্লাইওভার নির্মাণের কার্যাদেশ পেয়েছিল প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু-র মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাকটো পারিসা লিমিটেড এবং মীর আক্তার কনসট্রাকশন দুটি ফার্ম যুগ্মভাবে। ফলে কে তাদের গায়ে আঁচড় দিবে? এভাবেই একের পর দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী দুর্বৃত্তগণ।

অর্থনীতিতে আওয়ামী নাশকতার আরো কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা দেশের চলমান বিদ্যুৎ সঙ্কট মেটানোর লক্ষ্যে স্থায়ী কোন সাশ্রয়ী পদক্ষেপ না নিয়ে চালু করেন ব্যায়বহুল কুইক রেন্টাল সিস্টেম। এর ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা পকেটে গেছে আওয়ামী দুর্বৃত্তদের। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি, বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড)র ক্ষতি ২৫,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রাইভেট কুইক রেন্টাল কম্পানি থেকে বেশি দামে বিদ্যুত কিনে তা কম দামে বিক্রি করে বিপিডিবি। রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট থেকে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুত কেনে ১৪ থেকে ১৭ টাকা। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে সাত থেকে আট টাকার মধ্যে। এখানে অর্ধেকই ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকির যে ৯,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে তার ৮০ শতাংশই দিতে হচ্ছে কুইক রেন্টাল থেকে বেশি দামে বিদ্যুত কেনায়।ভর্তুকির এ অর্থ যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় কর্ণেল ফারুক খান, আজিজ গ্রুপ, গার্মেন্টস রফতানিকারক মোহাম্মদী গ্রুপ, ফার্নিচার বিক্রেতা অটবি গ্রুপ, সালমান রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ ইত্যাদি ন্যায় আওয়ামী রাজনীতির অর্থজোগানদারদের পকেটে। এভাবে শেখ হাসিনা তার পিতার ন্যায় রাজনীতিকে পরিণত করেছেন শুধু দেশ ধ্বংসের হাতিয়ারে নয়, বিপুল অর্থ-উপার্জনের হাতিয়ারেও।

 

নাশকতা শেয়ার বাজারে

যে কোন দেশের শিল্পায়নে অর্থের বিশাল জোগান আসে জনগণের পকেট থেকে। জনগণ তাদের অর্থ ফেলে না রেখে শিল্পকারখানার শেয়ার কিনে বিনিয়োগ করে। পাশ্চাত্যে তো এভাবেই অর্থনৈতিক অগ্রগতি এসেছে। শেয়ার মার্কেটের অর্থ নিয়েই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারত জয় করেছিল। কিন্তু আওয়ামী নাশকতা  ঘটেছে এ ক্ষেত্রটিতেও। শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন তখন নভেম্বর ১৯৯৬’য়ে শেয়ার মার্কেট প্রচন্ড ধ্বস আসে। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসায় আবার ধ্বস আসে অক্টোবর ২০১১’য়ে। শেয়ার বাজারের দ্বিতীয়বারের কেলেঙ্কারিতে দেশের প্রায় ৩৩ লক্ষ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এতে নিঃস্ব হয়ে যান। শেয়ার বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাটের জন্য যারা দায়ী সরকার তাদের একজনকেও গ্রেফতার করেনি এবং শাস্তিও দেয়নি। অথচ দিশাহারা বিনিয়োগকারীরা যখন মতিঝিলে বিক্ষোভ মিছিল করে তখন প্রধানমন্ত্রীর অথনৈতিক উপদেষ্টা ড.মসিউর রহমান বলেন, “ওরা দেশের শত্রু। সমাজের শত্রু। ওদের জন্য মাথা ঘামানোর কোনো কারণ নেই। তাদের কষ্টে আমার মন কাঁদে না। শেয়ারবাজার ধ্বসে সরকারের মাথাব্যথার কিছু নেই। কারণ শেয়ারবাজারে পুঁজি প্রকৃত বিনিয়োগে যায় না… শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখে না।”

অভয়অরণ্য চোর-ডাকাতদের 
প্রতিটি আওয়ামী শাসনামলেই দুর্বৃত্তদের পোয়া বারো হয়। দেশ পরিণত হয় চোর-ডাকাতদের জন্য অভয় অরণ্যে। সেটি যেমন মুজিব আমলে  হয়েছিল, তেমনি হাসিনার আমলেও। ডাকাতদের এখন আর ডাকাত দল গঠনের প্রয়োজন পড়েনা। তারা ডাকাতির জন্য ভূয়া বাণিজ্যিক কোম্পানি গড়ে তোলে। তখন ডাকাতি শুরু করে দেশের অর্থভান্ডারে। সেটি হাজার হাজার কোটি টাকার অংকে। আওয়ামী লীগের আমলে জনগণের অর্থের নির্মম লুটেরা হলো ডেসটিনি নামক একটি কোম্পানি। এ কোম্পানিটি ৩,২৮৫ কোটি টাকা মানি লন্ডারিং ও আত্মসাত করে। ডিসটিনির কর্মকর্তা হলেন জেনারেল হারুন। তদন্তে দুদক জেনারেল হারুনের কাছে জানতে চায় তার ব্যাংক একাউন্টে ২০ কোটি টাকা ঢুকলো কিভাবে? হারুনের জবাব,“মাসিক সম্মানী, ডিভিডেন্ড ফান্ড, এলাউন্স, কমিশন বাবদ এই টাকা আমার একাউন্টে ঢুকেছে। এছাড়া কিছু টাকা বাড়ি ভাড়া থেকেও এসেছে।” -(দৈনিক যুগান্তর, ০৫/১১/২০১২)। জেনারেল হারুন একজন আওয়ামী লীগ নেতা। দুদকের কি সামর্থ্য আছে এ নেতাকে একদিনের জন্যও জেলে নেয়ার? এতবড় দূর্নীতির পরও তাকে জেলে যেতে হয়নি।

ডেসটিনি ছাড়া আরো ত্রিশটির বেশি এম.এল.এম কোম্পানি অবাধে মানুষকে প্রতারণা করার সুযোগ পায় আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনে। এসব কম্পানির মধ্যে রয়েছে ইউনিপে টু ইউ, সাকসেস লিংক, গ্লোবাল নিউওয়ে, প্রভৃতি। দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, কয়েকটি এম.এল.এম প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে ৪,৯৬৩ কোটি টাকার কিছু বেশি এবং এর মধ্যে ব্যক্তিগত একাউন্টে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল প্রায় ৪,৬০১ কোটি টাকা। -(দৈনিক প্রথম আলো ০৯/০৯/২০১২)। টাকা বানানোর এরূপ সুযোগ দেখলে কি দুর্বৃত্তরা কি আর বসে থাকে। মরা লাশের গন্ধ পেলে যেমন শকুন ছুটে আসে তেমনি অর্থলুটের সুযোগ দেখলে দেশবিদেশের ডাকাতেরাও ছুটে আসে। বাংলাদেশের সরকার দুর্বৃত্ত চোর-ডাকাতদের জণ্য তো সে সুযোগই সৃষ্টি করেছে। তাই ২০০৫-এ এগিয়ে আসে চায়না থেকে তিয়ানশি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। -(দৈনিক আমাদের সময়.কম ০৫/১১/২০১২)। এসব চোর ডাকাতদের হাতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কুশ্রী অর্থনৈতিক কেলেংকারির ঘটনা ঘটে সোনালী ব্যাংকের শেরাটন হোটেল ব্রাঞ্চে। সেটিও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের যোগসাজসে। বাংকের ঐ শাখা থেকে ৩,৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ বা প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা লুট হয়ে যায়। হলমার্ক একাই নিয়েছে প্রায় ২,৬৬৮ কোটি টাকা। একটি ব্যাংকের একটি ব্রাঞ্চে একটি কম্পানির এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা আর কোথাও ঘটেনি। এটিই ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। (দৈনিক প্রথম আলো, ০৫/০৯/২০১২)। বাংলাদেশে সকল ডাকাত মিলেও গ্রামগঞ্জ থেকে এত অর্থ বাংলাদেশের বিগত ৫০ বছরে লুটতে পারেনি। অথচ সে লুটের সাথে জড়িত প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ।

 

মূক্তি কীরূপে?

কিন্তু এরূপ সীমাহীন লুটপাঠও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে গুরুতর কিছু মনে হয়নি। এক গোলটেবিল অনুষ্ঠানে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন,“ব্যাংকিং খাতে আমরা ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেই। এর মধ্যে মাত্র তিন বা চার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। এটা কোনো বড় অঙ্কের অর্থ নয়। এ নিয়ে হইচই করারও কিছু নেই। সংবাদ মাধ্যমে এটা নিয়ে অতিরিক্ত প্রচারণা করে দেশের ক্ষতি করছে। এমন ভাব যেন দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ধ্বসে গেছে। এতে আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।” “সোনালী ব্যাংকের এক রূপসী বাংলা শাখায় জালিয়াতি করা অর্থের পরিমাণই তিন হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অন্য কোনো বেসরকারি ব্যাংকে এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটলে ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যেত। যেমন বন্ধ হয়েছিল ওরিয়েন্টাল ব্যাংক।” -(প্রথম আলো ০৫/০৯/২০১২)।

এই অর্থমন্ত্রীই সম্প্রতি দিল্লি সফরে গিয়ে সাভারে ভবন ধ্বসে হাজারের বেশী মানুষের মৃত্যু সম্পর্কে বলেছেন, এটি কোন গুরুতর বিষয় নয়। বলেছেন, এ ভবন ধ্বসে গার্মেন্টস শিল্পের কোন ক্ষতি হবে না। বিকৃত ও অসুস্থ্য বিচারবোধ আর কাকে বলে। চোর-ডাকাত বা ব্যাভিচারিদের ঘৃনা করার সামর্থ্য চোর-ডাকাত ও ব্যাভিচারিদের থাকে না। কিন্তু দেশের নিরক্ষর সাধারণ মানুষদের তা থাকে। এমনকি শিশুদেরও সে সামর্থ্য্য থাকে। কিন্তু সে সামর্থ্য নাই হাসিনা সরকারের এসব মন্ত্রীদের। নাই খোদ শেখ হাসিনার ও তার দলীয় কর্মীদের। বাংলাদেশের মূল বিপদটি এখানেই। দেশ আজ জিম্মি এসব বিবেকহীন অসুস্থ্য ও দুর্বৃত্ত ব্যক্তিদের হাতে। তারা যতদিন ক্ষমতায় থাকবে তাতে শুধু দেশের নয়, ইসলাম এবং দেশবাসীর ঈমানের বিরুদ্ধেও নাশকতা বাড়বে। কতটা দ্রুততর সাথে এ আওয়ামী দখলদারীর সমাপ্তি ঘটবে, তার উপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা ও শান্তি। এবং নির্ভর করছে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও ঈমানের হেফাজত। দেশের স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি, দেশবাসীর ঈমানের হেফাজত  এবং তাদের ইহকাল ও আখেরাতের কল্যাণে এ ছাড়া ভিন্ন পথ আছে কী? ১ম সংস্করণ ১২/০৫/১৩; ২য় সংস্করণ, ১৮/০২/২০২১।

 




আওয়ামী শাসন এবং বিপর্যয়ের মুখে বাংলাদেশ

বিপর্যয়টি মুসলমান থাকা নিয়ে

বাংলাদেশ আজ ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে। সেটি শুধু রাজনৈতিক নয়। নয় নিছক সামরিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতি, অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে। বরং সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটছে মুসলমানদের মুসলমান থাকা নিয়ে। আওয়ামী লীগ শুধু দেশের সরকার, পার্লামেন্ট, প্রশাসন বা রাজনীতির ময়দান দখল নিয়ে খুশি নয়, তারা প্রবল ভাবে দখলে নিচ্ছে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানও। দখলদারি প্রতিষ্ঠা করছে মুসলমানদের ঈমানের ভূবনেও। আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং আবির্ভুত হয়েছে রাজনৈতিক, সামাজিক ও আদর্শিক শক্তি রূপে। তারা এখন ইসলামেরও ব্যাখা দেওয়া শুরু করেছে। কোনটি জিহাদ আর কোনটি জিহাদ নয়, কোনটি ইসলাম-সম্মত আর কোনটি অনৈসালিক সে ব্যাখাও দেওয়া শুরু করেছে। তারা সে ব্যাখা দিচ্ছে ভারত ও মার্কিনীদের সাথে অভিন্নতা রেখে।

বাংলাদেশে এখন প্রচন্ড ভাবে অধিকৃত নিজদেশের ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে। তারা সে অধিকার পেয়েছে নির্বাচনের মাধমে। তাদের সে বিপুল বিজয়ে শুধু যে দেশের আভ্যন্তরীন ইসলামের বিপক্ষ শক্তিই খুশি হয়েছে তা নয়, খুশি হয়েছে ইসলাম-বিরোধী চিহ্নিত বিদেশী শক্তিও। প্রতিবেশী ভারত সরকার ও তার মিডিয়া সে খুশি গোপন রাখেনি। সরকারি ভাবে ভারত যে কতটা খুশি হয়েছে সেটি বুঝা যায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রনব মুখার্জির বক্তব্য থেকে। প্রণব মুখার্জি বলেছেন, ভারত সরকার শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে কোন হুমকি আসলে ভারত নিশ্চুপ বসে থাকবে না। লক্ষ্যণীয় হলো, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাসের অতি কঠিন বিপদের মুখোমুখি হয়েছিল। ক্ষুদার্ত মানুষ তখন প্রাণ বাঁচাতে আস্তাকুড়ে উচ্ছিষ্ট খুঁজেছে, কুকুর বিড়ালের সাথে লড়াই করেছে, রাস্তায় বুমিও খেয়েছে। লজ্জা ঢাকতে তখন মহিলারা মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু ভারত বাংলাদেশের সে বিপদের দিনে এগিয়ে আসেনি। কোন আর্থিক সাহায্যও পেশ করিনি। বরং দেশটির সীমান্ত ফুটো করে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত খয়রাতী মাল টেনে নিয়েছে নিজ দেশে। মুজিব তখন কয়েক কোটি ছাপার কাজ দিয়েছিল ভারতের ছাপাখানায়। ভারত তখন তার চেয়ে বহুগুণ বেশী গুণ বেশী নোট ছেপে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে রশাতলে ডুবিয়ে দেয়। এভাবে বাড়িয়েছে বাংলাদেশের মানুষের যাতনা ও মৃত্যু। বাংলাদেশ পরিণত হয় আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি। বিশ বছরের যুদ্ধেও দরিদ্র আফগানিস্তানের ভাগ্যে এমন খেতাব জুটেনি। জুটেনি ভিয়েতনামের ভাগ্যেও। একটি দেশকে ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হতে যে শুধু যুদ্ধ লাগে না, বরং লাগে অবিরাম শোষণও -সেটিই সেদিন বাংলাদেশে সত্য রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ভারত যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বন্ধু নয়, বরং রক্ষক হলো একটি বিশেষ পক্ষের, প্রনব মুখার্জি সেটিই প্রকাশ করেছে। তার সে বক্তব্যে এটিই প্রমাণ হয়েছে, বাংলাদেশে ভারতের নিজস্ব এজেন্ডা রয়েছে। এবং সে এজেন্ডারে বাস্তবায়নে ভারতের কাছে আওয়ামী লীগ যে অপরিহার্য প্রনব মুখার্জি সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

নিজেদের রাজনৈতিক দখলদারিটা স্থায়ী করতে আওয়ামী লীগ এখন বাংলাদেশের মানুষের মনের ভূবনে আমূল পরিবর্তন আনছে। ইসলামী সভ্যতার নির্মানে শুরুতে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ বিশাল ভূ-খন্ডটি এক সময় মুসলিম উম্মাহর একটি শক্তিশালী অংশ ছিল। খোলাফায়ে রাশেদার পর আরবগণ যথন ভাতৃঘাতি সংঘাতে লিপ্ত হয় তখন কোরআনের বড় বড় মোফাচ্ছের, বিজ্ঞানী, চিকিৎস্যক, কবি-সাহিত্যিক ও দার্শনিক জন্ম নেয় ইরানে। ইমাম আবু হানিফা, আব্দুল কাদের জিলানী, আল ফারাবী, আল রাজি, ইবনে সিনা, ইমাম আল গাজ্জালী, শেখ সাদী, মাওলানা রুমী সহ বহু প্রতিভার জন্ম ইরানে। তারা শুধু মুসলিম উম্মাহর গৌরব ছিল সমগ্র মুসলিম উম্মাহর। প্রখ্যাত সমাজ-বিজ্ঞানী ইবনে খুলদুনের অভিমত, ইসলামের উদ্ভব আরবে হলেও ইসলামি সভ্যতার নির্মান ঘটে ইরানে। আব্বাসী খলিফার দুর্বল সময়ে সে ইরানই বিচিছন্ন হয়ে মুসলিম উম্মাহ থেকে। আর সে বিচ্ছিন্নতাকে স্থায়ী রূপ দিতেই ইরানের জাতিয়তাবাদী শাসকেরা পাল্টে দেয় দেশটির ধর্মীয় চেতনা। জন্ম দেয় শিয়া মতবাদ। সাফাভী শাসকদের সে বলপূর্বক ধর্মীয় পরিবর্তনে লক্ষ লক্ষ সূন্নী মুসলমানকে হত্যা করা হয়। ফলে নিছক এক রাজনৈতিক প্রয়োজনে এককালের সূন্নী ইরান পরিণত হয় শিয়া রাষ্ট্রে। প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্র থেকে এভাবেই গড়া হয় ইরান ঘিরে বিভক্তির বিশাল প্রাচীর। ইরানীরা মুখে যাই বলুক আজও তারা সমগ্র মুসলিম উম্মাহ থেকে বস্তুতঃ পৃথক সে ঐতিহাসিক পৃক্ষাপটে। এদেশটির শিয়া শাসকেরা ইউরোপীয় শাসকদের সামরিক সহয়তা নিয়ে বার বার হামলা চালিয়েঠেছ উসমানিয়া খেলাফতের পূর্ব সীমান্তে। মুসলিম সেনাবাহিনী যখন সমগ্র বলকান, গ্রীস, ক্রিমিয়াসহ বিশাল পূর্ব ইউরোপ দখল করে অস্ট্রিয়ার রাজধানী অবরুদ্ধ করে ফেলে সেসময় ইরান বিশাল চাকু ঢুকিয়ে দেয় উসমানিয়া খেলাফতের পিঠে। পূর্ব সীমান্তে শুরু হয় শিয়া হামলা। মুসলিম সেনাদল তখন ভিয়েনা থেকে অবরোধ তুলে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ইরানের সে হামলা না হয়ে ইউরোপের ইতিহাস হয়তো ভিন্ন ভাবে লিখিত হতো। সে সময় থেকেই ইরানের প্রতিভা ও সামর্থ নানা ভাবে ব্যয় হয়ে আসছে মুসলমানদের রক্ত ঝরাতে। সম্প্রতি আফগানিস্তান ও ইরাকে যে মার্কিন হামলা হলো তাতে সাহায্য ও সর্বাত্মক সমার্থণ দিয়েছে ইরান। এখন তারা সাহায্য দিচ্ছে ভারত ও পাশ্চাত্যের পাকিস্তান বিরোধী আগ্রাসনে। বাংলাদেশও একই ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে উপমহাদেশে মুসলিম শক্তির উত্থান রুখবার কাজে। অথচ ১৯৪৭য়ে বাংলাদেশের মুসলমানদের কারণেই জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের সর্ব বৃহৎ ও সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। এ রাষ্ট্রটি গড়ায় যে সংগঠনটি কাজ করেছিল সেটি হলো মুসলিম লীগ। এবং সে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল ঢাকায়। পাকিস্তান প্রস্তাবটিও উত্থাপন করেছিল বাংলার ফজলুল হক। কিন্তু পরবর্তিতে আওয়ামী লীগ আবির্ভুত হয় কাফের শক্তিবর্গের অতি বিশ্বস্ত মিত্ররূপে। তাদের কাছে ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধতা চিত্রিত হয় সাম্প্রদায়িকতা রূপে।এজন্যই তাদের বিজয়টি ভারতসহ সকল মুসলিম বিরোধী শক্তির কাছে এতটা উৎসব পরিণত হয়। এমন একটি ইসলাম বিরোধী চেতনার কারণে প্রতিবেশী দেশে হাজার হাজার মুসলিমকে পুড়িয়ে হত্যা বা সেদেশের মুসজিদ ধ্বংস করা হলেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মুখে কোন প্রতিবাদের ধ্বনি উঠে না, প্রতিবাদে রাজপথেও নামে না। পত্রিকায় কোন বিবৃতিও দেয় না।

 

লক্ষ্য ইসলামি চেতনাবিনাশ 

ইসলামি চেতনা থেকে ভিন্নতর এক চেতনা-রাজ্য নির্মানেরই স্বার্থেই আওয়ামী লীগ সরকার তার সকল সামর্থ বিণিয়োগ করছে ইসলামি চেতনার বিনাশে। ইরানের স্বৈরাচারি শাসকেরা যেখানে রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচর্যা দিয়েছিল শিয়া ধর্মমতের, এরা শেখানে দিচ্ছে সেকুলার চেতনার। এজন্যই মুসলিম জনগণের দেওয়া রাজস্বের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে নাচগাণ শেখানোর কাজে। অথচ ইসলামে নাচগান হারাম। কারণ মানুষের এ পার্থিব জীবন একটি পরীক্ষা কেন্দ্র। নারীপূরুষ এখানে ব্যস্ত তাদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দিতে। এ পরীক্ষায় ফেল করলে তারা কোন চাকুরি হারাবে বা ডিগ্রি পেতে ব্যর্থ হবে তা নয়। বরং পরিণতিটি হবে অতি ভয়ংকর। নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামের দাউদাউ করে জ্বলা বিশাল আগুণে। পরীক্ষার কোন হলে কি নাচগানের আয়োজন চলে? তাই প্রকৃত মুসলমানদের হাতে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মিত হলেও নাচগান পরিচর্যা পায়নি। যখন পেয়েছে তখন মুসলমান আর প্রকৃত মুসলমান থাকেনি। তারা পরিনত হয়েছে শয়তানের সেবকে। ইসলামের সত্যপথ থেকে মুসলমান তরুন-তরুনীদের বিভ্রান্ত করার কাজে নাচগান সব সময়ই একটি সফল হাতিয়ার। শয়তানী শক্তিবর্গ অতীতের ন্যায় আজও সেটি সর্বত্র প্রয়োগ করছে। বাংলাদেশে যতই বাড়ছে কাফেরদের পুজি বিণিয়োগ ততই বাড়ছে এ শয়তান হাতিয়ারটির ব্যাপক প্রয়োগ। কাফেরদের অর্থে এনজিওগুলি এখন নাচগানের চর্চাকে মাঠপর্যায়ে নিয়ে গেছে। পাপচর্চার এ ক্ষেত্রগুলো এখন প্রতিষ্ঠান বা ইনস্টিটিউশন রূপে গড়ে উঠেছে। ফলে এনজিওগুলোর প্রতিষ্ঠিত স্কুলের হাজার হাজার মেয়েরা এখন আর নেচেগেয়ে আনন্দ প্রকাশে কোনরূপ সংকোচ বোধ করে না। আর যেখানে নাচগাণ বাড়ে সেখানে বাড়ে মদ্যপান ও ব্যাভিচার। আর বাংলাদেশে সেগুলিও বাড়ছে সমান তালে। বেশ্যাবৃত্তি তাই এখন আর পতিতাপল্লিতে সীমাবদ্ধ নয়, সেটি উপচিয়ে আবাসিক মহল্লায় নেমে এসেছে। ফল দাড়িয়েছে এই ব্যভিচার এখানে সংক্রামিত করছে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষকে। প্রায় দশ বছর আগের এক জরীপে প্রকাশ, বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশী যুবক বিবাহের আগেই যৌন কর্মে লিপ্ত হয়। বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশের জন্য এটি এক ভয়াবহ খবর।

ইসলামি চেতনার বিনাশ যে কতটা মহামারি রূপ পেয়েছে এ হলো তার নজির। পাশ্চাত্য-করণের এটিই হলো স্বাভাবিক রূপ। পাশ্চাত্য দেশে এটি আর কোন হারাম কর্ম নয়, বরং স্বীকৃতি পেয়েছে বৈধ-কর্ম রূপে। তাদেরকে বলা হয় সেক্স-ওয়ার্কার। সে অভিন্ন পাশ্চাত্য মূল্যবোধই বিশ্বের কাফের শক্তিবর্গ এখন বাংলাদেশেও প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সে লক্ষ্যেই শুরু করেছে সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং। একাজে লিপ্ত এমন কি জাতিসংঘও। ইঞ্জিনীয়ারগন এতকাল রাস্তাঘাট-ব্রিজ নির্মান করতো, আর এখন সোসাল ইঞ্জিনীয়ারীংয়ের নামে তারা তাদের অর্থ, মেধা ও প্রযুক্তির বিণিয়োগ করছে সেকুলার ধাঁচের সমাজ-সংস্কৃতি, চেতনা ও রাষ্ট্র নির্মানের। আর একাজে প্রথম প্রয়োজন হলো, জনগণের চেতনা রাজ্য থেকে ইসলামের অপসারণ। যাকে বলা হয় ডি-ইসলামাইজেশন। বাংলাদেশের বহু টিভি নেট-ওয়ার্ক, অসংখ্য পত্র-পত্রিকা, শত শত এনজিও কাজ করছে সে সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং প্রজেক্টের আঁওয়াতায়। ইসলামের নবজাগরণ প্রতিরোধের এটিই হলো তাদের মূল স্ট্রাটেজি। একাজে কাফের দেশ থেকে আসছে হাজার হাজার কোটি টাকার পুঁজি। আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রসার রূখতে এটিই এখন কাফের শক্তিবর্গের সম্মিলিত গ্লোবাল স্ট্রাটেজী। এলক্ষ্যে তারা মুসলিম দেশের ইসলামে অঙ্গিকার-শূন্য দলগুলোর সাথে গড়ে তুলেছে কোয়ালিশন। বাংলাদেশের সরকার ও তার সহযোগী সেকুলার এনজিওগুলো হলো সে কোয়ালিশনেরই অংশ।

 

নারী রপ্তানীর অর্থনীতি

সরকারের ইসলামি চেতনা বিনাশের কাজ দ্রুত ফল দিচ্ছে। বাংলাদেশে ইসলামি চেতনাধারীদের নানা ভাবে হেয় করা বা নির্যাতন করা এখন তাই উৎসবকর্ম। রাজপথে তাদের লগি বৈঠা নিয়ে দাড়ি-টুপিধারিদের হত্যা করলেও পত্রিকার পাতায় সেটি নিন্দনীয় না হয়ে বরং প্রশংসনীয় হয়। এরই আরেক সফলতা হলো, বাংলাদেশ এখন বাজার ধরেছে নারী রপ্তানিতেও। দেশেটি এখন থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনের ন্যায় দেশেল পথ ধরেছে। বিদেশী দুর্বৃত্তদের গৃহেই শুধু নয়, বাঙ্গালী পতিতাদের ভিড় বেড়ে চলেছে কোলকাতা, বোম্বাই ও করাচীর পতিতাপল্লিতেও। অর্থের পিছে দৌঁড়াতে থাকলেও সেটি যে কত দ্রুত জাহান্নামের পথে নিয়ে যায এ হলো তার নমুনা। অথচ বাংলাদেশের সেকুলারদের মূল এজেন্ডা হলো নরনারীদের অর্থের পিছে দৌড়াতে শেখানো, সত্যদ্বীন বা ইসলামের পিছে নয়। ইসলামের পিছে দৌড়ানোকে বরং তার মৌলবাদ বলে শুধু নিন্দনীয় নয়, নির্মূলযোগ্যও ঘোষণা করছে। জনগণের মন থেকে ইসলামি চেতনা বিলুপ্তির লক্ষ্যেই এখন ২১শে ফেব্রেয়ারি, ২৫ শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর, পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্র জয়ন্তির ন্যায় দিবসগুলি আর ঐ বিশেষ দিনে পালিত হয় না, পালিত হচ্ছে মাসাধিক কাল ব্যাপী। তখন ইসলামি চেতনা বিনাশের পাঠদানে পাঠশালা পরিণত হয় সারাদেশ। অথচ ইসলামের পরিচিতি বাড়াতে আওয়ামী লীগ একটি আলোচনা সভা বা সেমিনারের আয়োজন করেছে তার নজির নেই। অথচ এরাই বলে “আমরাও মুসলমান”। ইসলামি চেতনা বিনাশের কাজে রাষ্ট্রীয় পুঁজি বিণিয়োগের বিপুল পুঁজি বিণিয়োগ হচ্ছে বিশ্বের কাফের দেশগুলোর। সে পুঁজিতে দেশের নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে বিপুল ভাবে ফুলে ফেঁপে উঠছে বাংলাদেশের হাজার হাজার এনজিও। কাফের রাষ্ট্রগুলোর ইসলাম-বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নে এরাই হলো তাদের ঘনিষ্ট মিত্রপক্ষ। সে অভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে গড়ে তুলেছে এক নিরেট পার্টনারশিপ।

 

সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে রাজনৈতিক আধিপত্য

আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পথ ধরেই আসে রাজনৈতিক আধিপত্য। তখন সে রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনে শত্রু পক্ষের আর যুদ্ধ লড়তে হয়নি। শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজী ছিল অন্যদের অভ্যন্তরে নিজেদের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক দ্বীপ গড়া। তুরস্ক, মিশর, পাকিস্তানসহ অধিকাংশ মুসলিম সে দ্বীপগুলো হলো ক্যান্টনমেন্ট, অফিসপাড়া, আদালত, পতিতালয় ও ব্যাংকিং সেক্টর। এগুলোর সীমান্ত পাশ্চাত্য চেতনা ও মূল্যবোধের সাথে একাকার। ইসলামের হারাম-হালালের বিধান এসব জাগায় অচল। তারাই এখন পাশ্চাত্যের কাফের শক্তির একনিষ্ঠ মিত্র। পাকিস্তানে তারাই হাজার হাজার মুসলমানদের হত্যা করছে অতিশয় আনন্দ চিত্তে। তুরস্কে তার স্কুলের মেয়েদের মাথায় রুমাল বাধতে দিতেও রাজী নয়। মিশরে এরা ইসলামপন্থিদের রাজনীতির ময়দানে আসতে দিতেও রাজী নয়। এখন তারা সেরূপ অভিন্ন দ্বীপ গড়ছে রাজনীতির অঙ্গনেও। আর বাংলাদেশের রাজনীতির আওয়ামী লীগ হলো তাদের সে দ্বীপ। একজন পশ্চিমা দুর্বৃত্ত বাংলাদেশের পতিতালয়ে যে সমাদার সেটি চেতনাগণ অভিন্নতার কারণেই। তেমনি এক অভিন্নতার কারণেই ভারতীয় নেতারাও অতি আপনজন রূপে গৃহীত হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের আসরে। এ সম্পর্ক অতি গভীরতা পেয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের আমলেই। ভারতীয় স্বার্থের সেবক রূপে দায়িত্ব-পালনের অঙ্গিকার নিয়ে ষাটের দশকেই তিনি আগড়তলা গিয়েছিলেন। ভারতীয় গুপ্তচর চিত্তরঞ্জন সুতোর বা কালিপদ বৈদ্যরা ছিলেন সে আমল থেকেই ছিলেন তারা ঘনিষ্ঠ সহচর। তিনিই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের “তিন বিঘা” ভূমি । সীমান্ত বাণিজ্যের নামে তিনিই দেশের সীমান্ত তুলে দিয়েছিলেন, এবং এভাবে সুযোগ করে দিয়েছিলেন অবাধ লুণ্ঠনের। যার ফলে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল বাংলাদেশীদের জীবনে। তিনিই অনুমতি দিয়েছিল ফারাক্কা বাঁধ চালুর। এখন ভারত পরিকল্পনা নিচ্ছে ব্রম্মপুত্র নদীর উজানে “টিপাই বাধ” দেওয়ার। দখলে নিচ্ছে বঙ্গপোসাগরে জেগে উঠা তালপাট্টি দ্বীপ। ভারত বাংলাদেশের জন্য নেপালে যাওয়ার জন্য ২০-৩০ মাইলের করিডোর দিতে রাজি হচ্ছে না, অথচ বাংলাদেশের মাঝখান দিয়ে ৫০০ মাইলের করিডোর চায়। ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভূটানে যাওয়ার করিডোর বাংলাদেশের যতটা অপরিহার্য অবস্থা সেরূপ নয় ভারতের জন্য। ভারত তার পূর্বাঞ্চলে যেতে পারে তার নিজ ভূমির মধ্য দিয়ে। অথচ এরপর চাপ দি্চ্ছে সে করিডোর আদায়ে এবং আওয়ামী লীগ তা নিয়ে বিবেচনাও করছে।

 

আওয়ামী লীগের বিজয় ও বিপর্যয়ের কবলে বাংলাদেশ

আওয়ামী লীগের বিজয়ে বাংলাদেশের উপর বিপর্যয় আসছে নানা ভাবে। যখনই এ দলটি ক্ষমতায় গেছে তখনই বিপর্যয় এসেছে দেশের সেনাবাহিনীর উপর। মুজিব আমলে সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশী গুরুত্ব পেয়েছিল রক্ষিবাহিনী। আওয়ামী লীগের এবারের বিজয়ে দেশের রাজধানীতে নিহত হলো ৫৭ জন সেনা অফিসার। রক্তাত্ব শত্রুতা সৃষ্টি হলো সেনাবাহিনী ও বিডিআরের মাঝে। পিলখানার রক্ত শুকালেও মনের মাঝে যে বিভক্তি ও ঘৃনা সৃষ্টি হলো সেটি কি দূর হবার? এখন কথা উঠছে বিডিআরের বিলুপ্তির। সরকার ভাবছে, বিডিআরের নাম ও লেবাস পাল্টিয়ে আরেকটি বাহিনী গড়ার। সরকারের ধারণা, সমস্যা শুধু বিডিআর নামটি নিয়ে। ভাবটা যেন, ফাইলপত্র ও অফিস আদালতের গা থেকে ‘বিডিআর’ নামটি বা তাদের লেবাসটি উঠে গিয়ে সেনা-অফিসারদের বুকে গুলি চালালিয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ ‘বিডিআর’ নামটি ও তার লেবাসটি বিলূপ্ত করতে চায়। কিন্তু যারা গুলি চালালো, যারা সে হত্যাযজ্ঞে নেতৃত্ব দিল তাদের বিচারে অগ্রগতি কোথায়?

দুর্যোগ নেমেছে দেশের শিক্ষাঙ্গনে। চরদখলের ন্যায় সেখানে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আওয়ামী ক্যাডার বাহিনীর। শুধু ভিসি বা প্রিন্সিলের অফিসেই নয়, দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আবাসিক হলগুলোর সিটগুলোর উপরও। আওয়ামী ক্যাডার বাহিনীর অনুমতি ছাড়া সেখানে কেউ থাকতে পারবে না। একই রূপ হাত পড়েছে দেশের কৃষি ও শিল্পাঙ্গনেও। সরকারের বাণিজ্যনীতির কারণে ভারত থেকে অবাধে ঢুকছে ভারতীয় নিম্মমানের সস্তাপন্য। ফলে বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য। বাংলাদেশের কৃষকগণ তাই বাজার না পেয়ে রাস্তায় উপর তাদের দুধ ঢেলেছে। বন্ধ হয়েছে দেশের নিজস্ব সূতা তৈরীর কারখানা। হাত পড়েছে দেশের তাঁতীদের গায়েও। মুজিবামলেও এমনটিই ঘটেছিল। তখন দেশী কারখানায় তালা লাগানো শুরু হয়েছিল। আগুনে ভস্মিভূত হয়েছিল বহু পাটের গুদাম। ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া দেশের জন্য তখন আর রাস্তাই খোলা রাখা হয়নি।

 

আক্রোশ ইসলামের বিরুদ্ধে

তবে আওয়ামী সরকারের মূল আক্রোশ শুধু শিক্ষা, শিল্প, কৃষি বা সেনাবাহিনীর উপর নয়, বরং  সেটি ইসলাম ও তার মৌল-বিশ্বাসের প্রতি। এটিকেই তারা তাদের রাজনীতির মূল শত্রু ভাবে। ইসলামের সে বিশ্বাসকে মৌলবাদ বলে সেটির নির্মূলে তারা কোঁমড় বেধেছে। সম্প্রতি তারা উদ্যোগ নিয়েছে, দেশের শাসনতন্ত্র থেকে “সর্বশক্তি মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস” কথাটি উচ্ছেদ করবে। এ উচ্ছেদ কাজে তারা দেশের সেকুলার আদালতকে হাতিয়ার রূপে বেছে নিচ্ছে। অতীতে দেশের সেকুলার আদালত থেকে এ রায় হাসিল করেছিল যে “সর্বশক্তি মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস” কথাটি দেশের শাসতনন্ত্র বিরোধী। বিএনপি সরকার ঢাকা হাইকোর্টের সে রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করিছিল। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে সে রায়টি এতটাই মনঃপুত হয়েছে যে সে রায়ের বিরুদ্ধে তারা আর আপিল করবে না। “সর্বশক্তি মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস” কথাটি এমনিতেই বাতিল হয়ে যাবে। এভাবেই বাতিল হবে ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস। সরকার এখন উদ্যোগ নিয়েছে দেশের সেকুলার আদালতের সাহায্যেই তারা সংবিধান থেকে উচ্ছেদ করবে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”। বাংলাদেশের আদালতে ব্যভিচার কোন হারাম কর্ম নয় যদি সেটি দুইপক্ষের সম্মতিতে হয়। হারাম নয় সূদও। কিন্তু সে আদালতেই নিষিদ্ধ হলো “সর্বশক্তি মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস”। এমন আদালত থেকে মুসলমান আর কি আশা করতে পারে? এজন্য তো কোরআনে শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাদের তাগিদ দেওয়া হয়নি। তাগিদ দেওয়া হয়েছে শরিয়ত ভিত্তিক আদালতের প্রতিষ্ঠায়। ইসলামে এটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জমিনের উপর কাফেরদের দখলদারীর বিলুপ্তি ও আল্লারহর সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ তো এ শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজ। একাজে যার উদ্যোগ নাই মহান আল্লাহতায়ালা তাকে কাফের, জালেম ও ফাসেক এ তিনটি বিশেষণে আখ্যায়ীত করেছেন। সুত্রঃ সুরা মায়েদার পর পর তিনটি আয়াত (৪২,৪৩ ও ৪৪)। চোর-ডাকাত, ব্যাভিচারী, সূদখোর বা খুনীকেও কোরআনের কোথাও তিনি এভাবে আখ্যায়ীত করেননি। এ দায়িত্ব তাই শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সাধিত হতে পারে না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা এখানে অপরিহার্য। শয়তানের মূল শত্রুতাটিও মূলতঃ এখানে, নামায-রোযা-হজ-যাকাত নিয়ে নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের তাবত কাফের দেশ মুসলমানদের মসজিদ স্থাপনে বাধা দেয় না। বরং জমি ও অর্থ দিয়ে সাহায্যও করে। ব্রিটিশ সরকার এককালে ভারতে আলিয়া মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেছে। হোটাইস হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইফতারির দাওয়াতও দেয়, ঈদের পূর্ণঃমিলনী করে। কিন্তু বিশ্বের কোথাও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার সামান্য প্রমান পেলে তারা সেখানে তৎক্ষনাৎ যুদ্ধ শুরু করে। আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার মূল কারণ তো এটিই। একই লক্ষে তারা এখান মিজাই মারছে পাকিস্তানের অভ্যন্তুরে। এবং কোয়াশিন গড়ছে পাকিস্তানের সেকুলার সরকার ও আর্মির সাথে।

সব গরুই যেমন ঘাস খায়, তেমনি সবদেশের সেকুলারদের আচরণ একই রূপ ইসলাম বিরোধী। তুরস্কের আদালতে কতজন ব্যাভিচারী বা সূদখোর দন্ডিত হয়েছে সে খবর নেই। কিন্তু সেদেশের একজন শিশুও আদালত থেকে মাথায় রুমাল বাধার অনুমতি পায়নি। রুমাল বাধা সেখানে অপরাধ। অথচ মহিলাদের মাথা না-ঢাকা বা বিপর্দা হওয়া হলো আল্লাহর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। এমন বিদ্রোহীর নামায-রোযা কি কবুল হয়? কবুল হয় কি কোন দোয়া। সম্ভব হয় কি তার পক্ষে মুসলমান হওয়া? কারণ, মুসলমান হওয়ার অর্থই আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য। আর বিদ্রোহীকে বলা হয় কাফের। আল্লাহর বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহের সে ধ্বনিই এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সরকারের এ্যাটর্নি জেনারেল সম্প্রতি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” সংবিধানের কোন অংশই নয়। তার াভাষায় তাই সেটির সংবিধানে থাকার কোন অধিকারই নাই। যেখানে ইসলাম ও আল্লাহর নাম, তাদের কাছে সেটিই সাম্প্রদায়ীকতা। আল্লাহর উপর আস্থা তাদের কাছে যেমন সাম্প্রদায়িক কুসংস্কার, তেমনি প্রগতি-বিরোধীও। তাদের সাফ জবাব, এমন কুসংস্কার (?) ও প্রগতি-বিরোধী (?) বিশ্বাসকে তারা শাসনতন্ত্রে স্থান দিতে রাজি নয়। শুধু তাই নয়, তারা বাদ দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় ধর্ম রূপে ইসলামকেও। কথা হলো, এমন কাজ কি কোন ঈমানদারের হতে পারে? মুসলমানের কাজ তো শুধু শাসনতন্ত্রে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম রূপে ঘোষনা দেওয়া নয়, বরং দায়িত্ব হল আল্লাহর বিধানের পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠা করা। সে শুধু মুখেই আল্লাহু আকবর বলবে না, কর্মের মধ্য দিয়েও সে সাক্ষী দিবে। সেটি শুধু মসজিদে নয়, শাসতন্ত্রেও ধ্বণিত হবে। মার্কিনীরা ডলারের নোটের উপর বড় বড় হরফে লিখে “WE TRUST IN GOD” অর্থ আমরা আল্লাহর উপর আস্থা রাখি। আল্লাহর নির্দেশকে তারা কতটুকু মানে এখানে সেটি বড় কথা নয়, আল্লাহর প্রতি এটি তাদের ণ্যূনতম ভদ্রতা বা শালীনতা। কিন্তু মহান আল্লাহর সাথে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা সে শালীন আচরণটুকুও করতে রাজী নয়। আল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অশালীন ও অভদ্র আচরণের মাত্রা এতটাই তীব্র যে, আল্লাহর আইন তথা শরিয়তকে তারা বাংলাদেশের আদালত-গৃহে ঢুকতে রাজী নয়। এমন কি বরদাশত করতে রাজি নয় শাসনতন্ত্রে আল্লাহর নামকেও। আল্লাহর সাথে এর চেয়ে বড় অশালীন ও উদ্ধত আচরন আর কি হতে পারে? আরও লক্ষণীয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নামের সাথে এমন অশালীন আচরনের পরও তা নিয়ে রাজপথে কোন প্রতিবাদ নেই, কোন আন্দোলন নাই। এরপরও কি একটি দেশের জনগণ আল্লাহর নেয়ামত পেতে পারে? এটি তো আযাবপ্রাপ্তির পথ। কোরআনে বর্নিত আদ-সামুদ গোত্র, বনি ইসরাইল ও মাদাইনের অধিবাসীদের অবাধ্যতা বা আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কি এর চেয়েও গুরুতর ছিল। তাদের কাছে আল্লাহর সুস্পষ্ট কোরআন ছিল না যা বাংলাদেশীদের কাছে আছে। কিন্তু সে কোরআনী বিধানের প্রয়োগটি কোথায়?

 

মুসলিম হওয়ার দায়বদ্ধতা

মুসলিম হওয়ার সবচেয়ে দায়বদ্ধতা হলো, সে হবে আল্লাহর অতি অনুগত খলিফা বা প্রতিনিধি। রাষ্ট্রের প্রতিনিধির কাজ হলো রাষ্ট্রের আইনের সর্বত্র অনুসরণ ও প্রয়োগ। সে দায়িত্ব “আমিও মুসলমান” -শুধু এ কথা বলার মধ্য দিয়ে পালিত হয় না। আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হওয়ার চেতনা মুসলিম মনে প্রচন্ড এক বিপ্লবী চেতনার জন্ম দেয়। সরকারের ডিসি, এসপি বা কমিশনার হওয়ার চেয়েও এ চেতনার শক্তি এবং দায়িত্ববোধ অনেক বেশী। কারণ সরকারের ডিসি, এসপি বা কমিশনার হওয়ায় কিছু বেতন বা বাড়ী-গাড়ী জুটে, বেহেশত পাওয়ার প্রতিশ্রুতি তো মেলে না। এমন এক চেতনা নিয়ে ঈমানদার যখন জায়নামাযে দাঁড়াবে তখন সে আনুগত্যে সেজদায় লুটিয়ে পড়বে। আর যখন সে রাজনীতিতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইন তথা শরিয়তকে প্রতিষ্ঠার কাজে নিজের জানমাল বিলিয়ে দিবে। নবীজীর শতকরা ৬০ ভাগ সাহাবা সে কাজে শুধু অর্থ ও শ্রম-দানই করেননি, প্রাণও দিয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীগণের বিপুল ভাগ নিজেদের মুসলমান রূপে দাবী করলেও সে বিণিয়োগটি কই? দায়িত্ব-পালন দূরে থাক, তারা এখন কোমড় বেঁধেছে সে দায়িত্বপালনের চেতনাকে বিলুপ্ত করায়। খেলাফতের দায়িত্বপালনের চেতনাকে তারা বলছে মৌলবাদ। বলছে রাজাকারের চেতনা। আর সে ইসলামি চেতনার বিলুপ্তি সাধনের চেতনাকে বলছে একাত্তরের চেতনা। মহান আল্লাহতায়ালার  সাথে এমন অশালীন ও অবাধ্য আচরণ কি ব্যক্তি ও জাতির জন্য কোন কল্যাণ ডেকে আনে? আল্লাহর বিরুদ্ধে মুজিবের অবাধ্য আচরণ সত্তরের দশকে বাংলাদেশের বুকে আযাব ডেকে এনেছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ তখন না খেয়ে বা প্রলয়ংকরি জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়ে মরেছে। আদ-সামুদ গোত্র, মাদানের অধিবাসী, নমরুদ বা ফিরাউনের বাহিনীরও এত লোকক্ষয় হয়নি যতটা বাংলাদেশের বুকে ঘটে যাওয়া সেসব প্রলয়ংকরি আযাবে। প্রচন্ড তান্ডব নেমে এসেছিল মুজিবের পরিবারের উপরও। এমন ঘটনা গাছের ঝরা-পাতা পড়ার ন্যায় মামূলী ব্যাপার ছিলনা। অথচ ঝরে পড়া পাতাটিও মাটিতে পড়ে আল্লাহর অনুমতি নিয়ে। আল্লাহর অনুমিত ছাড়া কোন সামুদ্রীক ঝড়ের কি সামর্থ আছে মানুষ হত্যা দূরে থাক গাছের একটি মরা পাতা ফেলার? মানুষ তো বাচে মরে তো আল্লাহর অনুমতি নিয়েই। প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগ নেতাদের কি সে বিশ্বাস আছে? আল্লাহর নিয়ামতকে নিয়ামত আর আযাবকে আযাব বলার সামর্থ সবার থাকে না। সে সামর্থ আসে একমাত্র ঈমানের বলে। সেটিই হলো ইসলামি চেতনা। সেকুলার চেতনায় সে সামর্থ নির্মিত হয় না। এজন্যই আল্লাহর আযাবকে তারা আযাব বলতে চায় না। বলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আর এভাবে আযাবকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে আল্লাহর কুদরতকেই তারা আড়াল করতে চায়। আড়াল করতে চায় আল্লাহর সাথে তাদের কৃত কদর্য আচরণকেও। অথচ ঈমানদার হওয়ার জন্য চেতনার এ সামর্থটুকু অতি ণ্যূনতম প্রয়োজন। এটুকু না থাকলে কি তাকে মুসলমান বলা যায়? আর তেমন একটি বিশ্বাস থাকলে কোন ব্যক্তি কি “সর্বশক্তি মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস” এর ন্যায় কথাটি শাসতন্ত্র থেকে বিলুপ্তি করতে পারে? আওয়ামী ক্ষমতায় এসেছিল নতুন প্রতিশ্রুতিতে। কিন্তু কার্যতঃ তারা অনুসরণ করছে শেখ মুজিবের সেই পুরনো নীতিকেই। ফলে মুজিবী আমলের ন্যায় আজও চলছে আল্লাহর আযাবকে অতি দ্রুত নীচে নামিয়ে আনার কাজে। সে লক্ষ্যেই আজ তীব্রতা পাচ্ছে আল্লাহর প্রকাশ্য অবাধ্যতায়। ষড়যন্ত্র হচ্ছে ইসলাম ও ইসলামের অনুসারিদের বিরুদ্ধে। ইসলামপন্থিদের নির্মূলে আঁতাত গড়া হচ্ছে ইসলাম-বিরোধী কাফেরদের সাথে। ফলে বিপর্যয় যে অনিবার্য তা নিকে সামান্যতম সন্দেহ আছে? তবে কথা এহলো এ অবস্থায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কোন পথটি বেছে নিবে? আল্লাহর বিরুদ্ধে এমন বিদ্রোহের মুখে জনগণের নীরবতা কি আদৌ ঈমানদারীর লক্ষণ? আল্লাহর খফিফার দায়িত্ব কি এ বিদ্রোহের নীরব দর্শক হওয়া। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোন বিদ্রোহ হতে দেখলে কোন রাজকর্মচারি কি সেটি নীরবে দেখে? তাতে কি তার চাকরি থাকে? অথচ মুসলমানদের অপরাধ আজ এরচেয়েও গুরুতর। আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানগণ আল্লাহর বিরুদ্ধে পরিচালিত এ বিদ্রোহের মুখে নীরব বা নিরপেক্ষ থাকছে তা নয়, বরং ভোট দিচ্ছে, অর্থ দিচ্ছে, মেধা ও শ্রম দিচ্ছে সে বিদ্রোহী শক্তিটির পক্ষে। ফলে আযাব শুধু সরকারকে নয়, জনগণকেও যে ঘিরে ধরবে তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে। তখন শান্তি, সুখ, নিরাপত্তা বিদায় নেয় প্রতিটি ঘর থেকে। নিরাপত্তার খোজে মানুষ তখন ঘর ছেড়ে বনে জঙ্গলেও আশ্রয় নেয়। বাধ্য হয় দেশ ছাড়তেও। মুজিব আমলে তো সেটিই ঘটেছিল। আজও কি বাংলাদেশ অতি দ্রুততার সাথে সেদিকেও ধেয়ে চলছে না?

 




আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসের রাজনীতি

ডাকাতি ফ্যাসীবাদের 

আগুনের উত্তাপ আর কয়লার কালো রং কখনোই আলাদা হয় না। আওয়ামী লীগ থেকেও তেমনি আলাদা করা যায় না তার চরিত্র, ঐতিহ্য ও দলীয় সংস্কৃতি। সেটি যেমন গণতন্ত্র ধ্বংসের, তেমনি অটল ভারত-প্রেম এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাসের। এবং সেটি দলটির জন্ম থেকেই। প্রতিদেশে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই একটি আদর্শ থাকে। মানুষ সে আদর্শ বাস্তবায়নে দলবদ্ধ হয়,সে লক্ষে শ্রম দেয়,মেধা দেয়,অর্থ দেয় এবং প্রয়োজনে প্রাণও দেয়। সে লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রিদের রয়েছে যেমন সমাজতান্ত্রিক দল, তেমনি ইসলামপন্থিদের রয়েছে ইসলামি দল। কিন্তু আওয়ামী লীগের আদর্শ কোনটি? দলের আদর্শ ধরা পড়ে দলের নীতি,কর্ম ও আচরণে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বহুকাল আগে,দলটি কয়েকবার ক্ষমতায়ও গেছে। ফলে গোপন থাকেনি তার নীতি,কর্ম ও আচরণ। আর তাতে প্রকাশ পেয়েছে আদর্শ। মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও আওয়ামী লীগের ইতিহাস,বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠানোর। রহিত করেছিলেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। ক্ষমতায় বসেই শেখ মুজিব দেশবাসীর জন্য আইনসিদ্ধ মতবাদের একটি তালিকা বেঁধে দিয়েছিলের,সেটি ছিল জাতীয়তাবাদ,সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষবাদ। এর বাইরে কোন আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করা বা ভিন্ন দল গড়াকে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ ঘোষিত করেছিলেন। এমনকি আল্লাহর বেঁধে দেয়া একমাত্র আদর্শ ইসলামকে নিয়েও নয়। ফলে তার বাংলাদেশে কোন ইসলামী দল ছিল না।

ডাকাতদের অপরাধ, তারা অন্যের সম্পদ দখলে বা লুণ্ঠনে সন্ত্রাস করে,এবং সে সন্ত্রাসে অস্ত্র ব্যবহার করে। তাদের ডাকাতি ব্যক্তির বিরুদ্ধে। আর ফ্যাসীবাদের ডাকাতি হল দেশ এবং সমগ্র দেশবাসীর বিরুদ্ধে। তারা সন্ত্রাসে নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলে। ডাকাতের সন্ত্রাসে রাজনীতি নাই, ভণ্ডামীও নাই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাদখলের সন্ত্রাসে রাজনীতি হল মূল হাতিয়ার। সন্ত্রাসের সাথে সেখানে রাজনীতি যেমন আছে তেমনি প্রতারণাও আছে।সে কারণেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিব আট আনা সের চাউল খাওয়ানার ওয়াদা করেছিলেন। ১৯৭২-৭৩-এ তলাহীন ঝুড়ি এবং ১৯৭৪-এ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ উপহার দিলে কি হবে,সত্তরের নির্বাচনে তিনি সোনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছিলেন। দেশ ও দেশবাসীর উপর ডাকাতিতে নির্বাচন,রাজপথের জনসভা এবং মিছিলও পরিনত হয় সন্তাসের শিকার। নির্বাচনের আগেই রাজপথের দখল নেওয়ার এটাই ফ্যাসীবাদী সনাতন কৌশল। হিটলার সেটি জার্মানীতে করেছিল। আর আওয়ামী লীগ সে কৌশলের প্রয়োগ করেছে অতীতের প্রতিটি নির্বাচনে। এ নিবন্ধে সে সন্ত্রাসের কিছু উদাহরণ দেয়া হবে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে শেখ মুজিব যেমন একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করেছিল, তেমনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কথা বলে তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তির। উন্নয়নের ওয়াদা দিয়ে ডেকে এনেছিলেন দেশীয় শিল্পে ধ্বংস, অর্থনৈতিক দুর্গতি ও ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। ক্ষুদার্ত মানুষ তখন উচ্ছিষ্টের খোঁজে কুকুরের সাথে আস্তাকুঁড়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। মহিলারা তখন লজ্জা নিবারণে মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল। নবাব শায়েস্তা খানের আমলের “ধণে-ধানে পুষ্পেভরা” বাংলা তখন বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত পেয়েছিল তলাহীন ভিক্ষার ঝুড়ি রূপে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই হল মুজিবামল। হাজার বছরের ইতিহাসে আর কোন আমলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দেশটির এত  অপমান জুটেনি।

 

শেখ মুজিবের বক্তৃতা ও রাস্তায় লগিবৈঠা 

শেখ মুজিব তাঁর শাসনামলে সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে একমাত্র দল বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ (সংক্ষেপে বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দলীয় পত্র-পত্রিকা। এমন একদলীয় শাসন,এমন সর্বনাশা দুর্ভিক্ষ এবং মতামত প্রকাশের উপর এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানে নাই। নেপাল এবং শ্রীলংকাতেও নাই। অথচ সে স্বৈরাচারি মুজিবই হল আওয়ামী লীগের শ্রেষ্ঠ নেতা ও শ্রেষ্ঠ আদর্শ। যারা ইসলামের প্রতিষ্ঠা চায় তারা কোরআন-হাদীসের চর্চা বাড়ায়। কারণ কোরআন-হাদীসের জ্ঞানে ইসলামের প্রতিষ্ঠায় মানুষ বেশী বেশী একনিষ্ঠ ও আত্মত্যাগী হয়। ডাকাত সর্দারের বার বার দীর্ঘ বক্তৃতা শুনে শিষ্যরা তেমনি বড় ডাকাত হয়। গণতন্ত্র-হত্যাকারি একজন বাকশালী নেতার বক্ততার ক্যাসেট হাজার বার শুনিয়েও কি তাই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা বাড়ে? তখন তো বরং কর্মীরা উৎসাহ পায় লগি বৈঠা নিয়ে রাস্তায় মানুষ হত্যায়। এবং উৎসব বাড়ে অন্য দলের মিছিল-মিটিং পণ্ড করা বা যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ ধরিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যায়। এমন সহিংসতাও তখন শিষ্যদের কাছে গণতান্ত্রিক রাজনীতি মনে হয়ে। শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ হাজারো বার শুনিয়েও তাই দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়েনি। গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা পায়নি। অন্যদের মাঝে দূরে থাক,খোদ আওয়ামী লীগ কর্মীদের জীবনেও তাতে নৈতিক বিপ্লব আসেনি। বরং বেড়েছে নীতিহীনতা এবং বিপর্যয়।

 

অজ্ঞতার বিপদ

বিষকে বিষরূপে জানাটা জীবন বাঁচানোর জন্য জরুরী। নইলে বিষ পানে প্রাণনাশ ঘটে। দেশকে বাঁচাতে হলেও তেমনি দেশের শত্রুদের চিনতে হয়। এক্ষেত্রে অজ্ঞতা হলে দেশের জন্য মহাবিপদ। আর সে অজ্ঞতা দূর করতে হলে রাজনীতিতে যাদের বিচরণ তাদের ইতিহাস জানাটি জরুরী। কারণ তারাই ঘুরেফিরে দেশের ড্রাইভেট সিটে বসে। চারিত্রিক গুণাগুণ, পেশাগত যোগ্যতা ও শারীরীক সুস্থ্যতা না জেনে কাউকে এমনকি বাসের বা ট্রেনের চালক করাতেও মহা বিপদ। নেশাখোর মদ্যপ,দায়িত্বজ্ঞানহীন দুর্বৃত্ত বা অন্ধ মানুষও তখন চালকের সিটে বসার সুযোগ পায়। এতে দুর্ঘটনায় প্রাণনাশ ঘটে যাত্রিদের। তাই অন্যান্য দলের সাথে আওয়ামী লীগের ইতিহাসকেও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার কাজটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আওয়ামী লীগ একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। ক্ষমতায় গিয়েই শুধু নয়, ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলটি দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির সামর্থ রাখে। তাই দেশের কল্যাণে অতি অপরিহার্য হল দলটির প্রকৃত পরিচয় জানা। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ক্ষতিটি হবে বিশাল। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই যথার্থ ভাবে হয়নি। বরং যা হয়েছে তা হল,সুকৌশলে দলটির মূল চরিত্রটিকে গোপন করার। শেখ মুজিবের ১৯৭০-এ বিপুল নির্বাচনী বিজয় এবং ৭ই মার্চের জ্বালাময়ী ভাষনের বাইরেও দলটির বিশাল ইতিহাস আসে। বাংলাদেশী ছাত্রদের কাছে সে ইতিহাসটি জানা ইতিহাস-ভূগোল, ফিজিক্স-কেমিষ্ট্রী বা চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞান-লাভের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ স্রেফ ইতিহাস-ভূগোল, ফিজিক্স-কেমিষ্ট্রী,চিকিৎসা বা কারিগরি জ্ঞান বাড়িয়ে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এমন কি রাস্তাঘাট,কলকারখানা,কৃষি উৎপাদন বা বিদেশে লোক রপ্তানি বাড়িয়েও নয়। দেশ বাঁচাতে হলে দেশের শত্রুদের চেনার বিকল্প নাই। তাছাড়া কারা দেশের শত্রু বা মীরজাফর -সে সত্যটি গোপন করা মহাপাপ। ইসলামে এটি কবিরা গুনাহ। কারণ তাদের না চেনার বিপদটি তো বিশাল। এমন জ্ঞানলাভের ক্ষেত্রে তাই কাযা নেই, কাফ্ফরাও নেই। বরং এ ক্ষেত্রে গাফলতি হলে জাতির জীবনে গোলামী নেমে আসে শত শত বছরের জন্য। এমন মহাপাপের কারণই ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা লুণ্ঠিত হয়েছিল। আগ্রাসী ইংরেজদের হাতে সেদিন যে পরাজয়টি ঘটেছিল সেটি অর্থনিতক পশ্চাদপদতার কারণে নয়। সৈন্য সংখ্যার কমতির কারণেও নয়। এমনকি শিল্পে অনগ্রসরতার কারণেও নয়। বরং সে  সময় তো বিশ্বের বিস্ময়কর মসলিন শিল্প ছিল বাংলায়, যা রপ্তানী হত ইউরোপে। তখন সিরাজুদ্দৌলার সৈন্যসংখ্যা ছিল ইংরেজ সৈন্যের চেয়ে প্রায় দশগুণ বেশী। তাদের হাতে বড় বড় কামানও ছিল। কিন্তু সে বিশাল বাহিনী পরাজয় ঠেকাতে পারিনি। ১৭৫৭ সালের সে শোচনীয় পরাজয়টি ঘটেছিল দেশের মীরজাফরদের না চেনার কারণে। তাতে ফল দাঁড়িয়েছিল,মীর জাফরের ন্যায় জঘন্য বিশ্বাসঘাতককে সেদিন শাস্তি না দিয়ে দেশের সেনাপতি বানানো হয়েছিল।

নবাব সিরাজুদ্দৌলার ন্যায় শাসকদের অজ্ঞতায় মীর জাফরেরা যেমন সেনাপতি হয়,জনগণের অজ্ঞতায় তেমনি শত্রুরাওই তারা নেতা হওয়ার সুযোগ পায়। তাই জনগণকে অজ্ঞ রাখাতেই তাদের বিজয় ও আনন্দ। অজ্ঞতার বড় বিপদটি হল,একই গর্তে পা তখন বার বার পড়ে। তাই বাংলাদেশে ইতিহাস জ্ঞান ইচ্ছা করেই বাড়ানো হয়নি। সেটি যেমন সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ব্রিটিশ আমলে, তেমনি আজ।ও। তাই বাংলাদেশীদের বিপদ ১৭৫৭ সালে পলাশীতে শেষ হয়নি। একাত্তরেও শেষ হয়নি। ২০১১ সালে এসেও শেষ হয়নি। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫-এ সীমাহীন ভারতীয় লুন্ঠন,তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির পরিচয়,১৯৭৪ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ,মুজিবের হাতে গণতন্ত্র-হত্যা, রক্ষিবাহিনীর হাতে ৩০ হাজার বাংলাদেশী হত্যার ন্যায় ভয়াবহ ঘটনাগুলিও তো ঘটেছে একই কারণে। আজও  বাংলাদেশের রাজনীতি,অর্থনীতি,সংস্কৃতি এবং মিডিয়া যেভাবে আগ্রাসী ভারতের হাতে অধিকৃত, ছিনতাই হয়েছে যেভাবে তালপট্টি দ্বীপ,লুণ্ঠিত হচ্ছে যেভাবে পদ্মা,তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি এবং সীমান্তে তারকাঁটায় ঝুলে লাশ হচ্ছে যেভাবে মানুষ -সেগুলির কারণও কি ভিন্নতর?

বিষধর গোখরা শাপ বিছানায় নিয়ে ঘুমালে প্রাণ বাঁচে না। সে বিপদ থেকে বাঁচতে হলে চোখ খোলা রাখতে হয়। তেমনি চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও গণতন্ত্রহত্যাকারি,বিদেশী চর এবং ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তিকে বন্ধু মনে করে নেতা বানালে,এবং তাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসালে দেশও বাঁচে না। তাই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান স্রেফ বিষাক্ত মশামাছি,শাপ-বিচ্ছু,রোগজীবানূর জ্ঞান নয়; অতি গুরুত্বপূর্ণ হল সমাজের বিষধর শাপদের পরিচয়টি যথার্থ জানা। মশামাছি, শাপ-বিচ্ছু ও রোগজীবানূর আক্রমনে বহু হাজার লোক মারা গেলেও তাতে জাতি পরাজিত বা অধিকৃত হয় না। তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিও হয় না। বিশ্বের বহুদেশে এমন মহামারি বহুবার এসেছে। কিন্তু ছদ্দবেশী শত্রুকে নেতা বানালে দেশ অধিকৃত হয়। মুজিব আমলে বাংলাদেশ ২৫ সালা দাসচুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল এবং ভিক্ষার ঝুলি রূপে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছিল তো এমন এক ব্যর্থতার কারণেই। এ বিপদ থেকে বাঁচার জন্য উন্নত স্বাধীন দেশগুলো শুধু কলকারখানা,হাসপাতাল,স্কুল-কলেজ,গবেষণাগার ও রাস্তাঘাট গড়ে না,শত শত কোটি টাকা ব্যায়ে ইতিহাস চর্চা ও নেতাদের আচরনবিধি জানার বিশাল বিশাল প্রতিষ্ঠানও গড়ে। তাদের পলিসির উপর গবেষণা করে। শত শত কোটি টাকা ইতিহাস নিয়ে বইও লেখে এবং জনগণের মাঝে সে জ্ঞানের চর্চাও বাড়ায়। হার্ভার্ড, কেম্ব্রিজ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিখ্যাত শুধু তাদের বিজ্ঞান-বিষয়ক গবেষণাগারের জন্য নয়, বরং ইতিহাস-বিষয়ক বিশাল বিশাল প্রতিষ্ঠানের কারণে। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি হয়নি। ফলে বাংলাদেশে মশামাছি,শাপ-বিচ্ছু,রোগজীবানূর আক্রমণে মানুষ মরা কমলেও বিপদ কমেনি। বরং ধ্বংসের দিকে দেশ দ্রুত ধেয়ে চলেছে আভ্রন্তরীণ শত্রুর কারণে।দেশ আজ  অধিকৃত এসব শত্রুদের হাতে।

 

সন্ত্রাস সংসদে ও রাজপথে

আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে যা ঐতিহাসিক সত্য তা হল,বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই একমাত্র দল যা গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্রকেই দাফন করে এবং প্রতিষ্ঠা করে একদলীয় বাকশালী শাসন। স্বাধীন মতপ্রকাশকে তারা দণ্ডনীয় অপরাধে পরিনত করেছিল। বিরোধীদের দমনের কাজে হাতিয়ারে পরিনত করেছিল দেশের আদালত,বিচারক,পুলিশ ও প্রশাসনকে। সেটি যে শুধু মুজিবামলে তা নয়, যখনই দলটি ক্ষমতায় গেছে তখনই সে কাজটি করেছে। এমনকি অন্যদের উপর সন্ত্রাসে অতি নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে ক্ষমতার বাইরে থাকা কালেও। আওয়ামী লীগ তার সন্ত্রাসের রাজনীতি হঠাৎ শুরু করেনি। দশ-বিশ বছর আগেও নয়। বরং সেটির শুরু দলটির জন্ম থেকেই। এবং সন্ত্রাসের সে রাজনীতি শুধু মাঠকর্মী বা ক্যাডারদের হাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেটির হোতা ছিল মূল নেতারাই। তাছাড়া অন্যদলের জনসভা ও মিছিল পণ্ড করার মধ্যেও সে সন্ত্রাস সীমাবদ্ধ থাকেনি,বরং সন্ত্রাস হয়েছে খোদ সংসদ ভবনে। সে সন্ত্রাস যে শুধু হাতাহাতি বা মারপিঠেও সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়। গড়িয়েছে মানুষ খুণে। লগিবৈঠা নিয়ে কর্মীদের হাতে মানুষ খুনের আগেই নৃশংস নিষ্ঠুরতায় সেদিন পারঙ্গমতা দেখিয়েছিল দলটির সংসদীয় সদস্যরা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের শরীক দল রূপে আওয়ামী লীগ সেদিন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে বিপুল সংখ্যক আসন পায়, কিন্তু তাদের সে বিজয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিজয়ী হয়নি, সংসদেরও গৌরব বাড়েনি। বরং দলটির দলীয় সাংসদদের মারের আঘাতে প্রাণ হারান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ডিপুটি স্পীকার জনাব শাহেদ আলী। সে খবর সেদিন বিশ্ববাসী জেনেছিল। আওয়ামী লীগের নেতাগণ এভাবে সেদিন চুনকালি লেপন করেছিল পাকিস্তানের মুখে এবং পথ করে দিয়েছিল সামরিক শাসনের।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মাওলানা ভাষানী। কিন্তু নিজের প্রতিষ্ঠিত দলে তিনি বেশী দিন থাকতে পারেননি। দ্বন্দ শুরু হয় আরেক নেতা জনাব সোহরাওয়ার্দীর সাথে। ভাষানী আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে নতুন দল গড়েন। ন্যাপ তখন আওয়ামী লীগের প্রবল প্রতিপক্ষ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে আওয়ামী সন্ত্রাসের খড়গ পরে এ দলটির উপর। ১৯৫৭ সালের ২৫শে জুলাই মাওলানা ভাষানীর নেতৃত্বে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমমনা বেশ কিছু নেতা ও কর্মী এক রাজনৈতিক সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন ঢাকার রুপমহল সিনেমা হলে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সে সভায় যোগ দেন খান আব্দুল ওয়ালী খান, মিয়া ইফতারখান উদ্দীনসহ বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তখন আওয়মী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, আর পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান। আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি তখন শেখ মুজিব। সেসাথে তিনি মন্ত্রীও ছিলেন। জনসভা পণ্ড করার মূল দায়িত্ব ছিল তারই উপর। তখন বাসভর্তি গুণ্ডা এনে ন্যাপের সভা পণ্ড করা হয়। সে দিনটিতে পুলিশ বাহিনীর কার্যকলাপ ছিল আরো ন্যাক্কারজনক। হামলাকারি গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে তারাও বরং গুণ্ডাদের সাথে হামলায় যোগ দেয়। পাকিস্তানে ইতিহাসে সেটিই ছিল সরকারি দলের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক সন্ত্রাস। বিরোধীদের পিটাতে সেদিন রক্ষিবাহিনীর প্রয়োজন পড়েনি, পুলিশকেই তারা সে কাজে ব্যবহার করেছিলেন। রুপমহল সিনেমা হলে হামলা সত্ত্বেও সে সভায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)এর জন্ম হয়। পরের দিন ২৬ শে জুলাই ছিল পল্টনে ন্যাপের জনসভা। মাওলানা ভাষানীসহ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত নেতাদের সে জনসভায় ভাষন দেবার কথা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে জনসভা হতে দেয়নি। আওয়ামী লীগের গুণ্ডাবাহিনীর ঝটিকা বেগে সে জনসভার উপর হামলা করে। দক্ষিণে নবাবপুর রেলক্রসিং, উত্তরে পুরনো পল্টন, পশ্চিমে কার্জন হল এবং পশ্চিমে মতিঝিল এ বিস্তীর্ণ এলাকা এক কুরুক্ষেত্র পরিণত হয়। ভন্ডুল হয়ে যায় ভাষানীর জনসভা। সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে এভাবেই গণতন্ত্র চর্চাকে সেদিন অসম্ভব করা হয়েছিল।

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধাণ স্ট্রাটেজী হয়,নির্বাচনের আগেই রাজপথে দলীয় দখলদারি প্রতিষ্ঠা করা। কৌশল হয়,অন্য কাউকে নির্বাচনী প্রচার চালাতে না দেয়া। তাদের এ লক্ষ্য পূরণে জামায়াতে ইসলামীকে তারা প্রধান শত্রু মনে করে। ফলে এ দলটির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস ছিল আরো হিংসাত্মক ও গুরুতর। ১৯৭০ সালের ১৮ই জানুয়ারি পল্টন ময়দানে ছিল জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভা। সে জনসভায় মাওলানা মওদূদীর বক্তৃতা দেয়ার কথা। কিন্তু সে জনসভা আওয়ামী লীগের বিশাল গুণ্ডাবাহিনী হতে দেয়নি। হামলা চালিয়ে তিনজনকে সেদিন শহিদ করে, আহত করে কয়েক হাজার। দলীয় অফিসে বসে শেখ মুজিব নিজে বলেছিলেন, মাওলানা মওদূদী কিভাবে পল্টনে মিটিং করে সেটি দেখে নিব। মুজিবের সে কথা আমি সেদিন নিজ কানে শুনেছি। পরের রবিবার অর্থাৎ ২৫শে জানুয়ারি ছিল মুসলিম লীগের জনসভা। মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরীর বক্তৃতা দেয়ার কথা। আওয়ামী লীগের গুণ্ডারা সে জনসভাও হতে দেয়নি। সেদিনও পল্টন ময়দানে নিজে উপস্থিত থেকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ইটপাথর মারার সে দৃশ্য স্বচোখে দেখেছি। এর পরের রবিবার ছিল পহেলা ফেব্রেয়ারি। সেদিন পল্টন ময়দানে ছিল জনাব নূরূল আমীনের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানে ডিমোক্রাটিক পার্টির জনসভা। সেদিন পল্টন ময়দানের সে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মৌলভি ফরিদ আহম্মদ, জনাব মাহমুদ আলী, আজিজুল হক নান্নাহ মিয়া, ইউসুফ আলী চৌধুরি মোহন মিয়া, এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম খানসহ বহু নেতৃবৃন্দ। দলের নেতা জনাব নূরুল আমীন তখনও মঞ্চে আসেননি। আওয়ামী লীগ নেতারা সে জনসভাও হতে দেয়নি,শুরুতেই হামলা শুরু হয়। কোন কোন নেতার মাথার পাথর পড়ে,এমনকি জনসভা পণ্ড করার পর ফেরতগামী নেতাদের উপরও তারা হামলা হয়।

 

জিহাদ বনাম রাজনীতি

দেশ-সেবা,সমাজ-সেবা,জনসেবা তথা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের কল্যানে কিছু করার মাধ্যম হল রাজনীতি। আত্মত্যাগী মানুষ এখানে মেধা দেয়, শ্রম দেয়, এমনকি প্রাণও দেয়। রাজনীতিকে আরবীতে বলা হয় ‘সিয়াসা’। কোরআন ও হাদীসে ‘সিয়াসা’র কোন উল্লেখ নাই। তবে যা আছে তা হল, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে সর্বাত্মক আত্মনিয়োগের প্রেরণা। আছে ইক্বামতের দ্বীন তথা দ্বীনের প্রতিষ্ঠার কথা। আছে আল্লাহর কোরআনী বিধানের বিজয়ে অর্থদান,শ্রমদান এমনকি প্রাণদানের তাগিদ। ইসলামে এটি পবিত্র ইবাদত। এটি পবিত্র জিহাদ। মুসলমানের এটাই রাজনীতি। রাষ্ট্রে ও সমাজে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব বা খেলাফতের দায়িত্ব পালন নিছক নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালনে হয় না। এ জন্য অপরিহার্য হল জিহাদে তথা আল্লাহর শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালনে ব্যক্তির জীবনে আধ্যাত্মিকতা আসে। আসে তাকওয়া। আর সে তাকওয়াটি হল,আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বাঁচার সার্বক্ষণিক চেতনা। এটি হল তাঁর হুকুম পালনে লাগাতর অঙ্গিকার। এমন তাকওয়া থেকেই মোমেন পায় আল্লাহর দ্বীনের পূর্ণ অনুসরণের প্রেরণা। ঈমানদারের কাজ হল,তাকওয়া-নির্ভর নিজের সে আধ্যাত্মিক পরিবর্তনকে স্রেফ মসজিদ বা নিজ-গৃহের মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও রাষ্ট্রের অঙ্গণে নিয়ে যাওয়া। ঈমানদারের রাজনীতি হল মূলত সে কাজেরই বাহন। পবিত্র কোরআনে ঈমানদারের মূল মিশন রূপে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা হল, “আমারু বিল মারুফ”, “নেহী আনিল মুনকার” এবং লিইউযহিরাহু আলাদ্দীনি কুল্লিহী”। এর অর্থ ‍‍‌‌‍‍‍‍‍“ন্যায়ের আদেশ”‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍, “অন্যায়ের নির্মূল” এবং “সকল মতবাদ,আদর্শ ও ধর্মের উপর ইসলামের বিজয়”। নবীজী(সাঃ)র যুগে আজকের ন্যায় রাজনৈতিক দল ছিল না, রাজনীতিও ছিল না। ছিল জিহাদ। সে জিহাদে অর্ধেকের বেশী সাহাবী শহীদ হয়ে গেছে। তবে সেক্যুলারিষ্টদের কাছে জিহাদ নাই, শাহাদতও নাই। যা আছে তা হল ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে দল গড়া, দলাদলি করা, মিথ্যা ওয়াদা দিয়ে দলভারি করা এবং গদীর স্বার্থে সকল উপায়ে জনগণকে প্রতারণা করা। এটিই হল, মেকিয়াবেলীর “পলিটিক্স” তথা সেক্যুলার রাজনীতি।

 

সবচেয়ে বড় ডাকাতি  

মেহনত, ত্যাগস্বীকার বা লড়াই শুধু ঈমানদারগণই করে না। ডাকাতরাও রাত জাগে, মেহনত করে, এমনকি প্রাণও দেয়। ডাকাতরা হানা দেয় ব্যক্তির ঘরে বা দোকানে। কিন্তু প্রতিদেশে সবচেয়ে বড় ডাকাতি হয় দেশের রাজনীতির ময়দানে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে এখানে ময়দানে নামে দেশের সবচেয়ে দুর্ধষ্য ডাকাতরা। তাদের লক্ষ্য, সমগ্র রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠিত করা। নৃশংসতায় এরা হিংস্র পশুকেও হার মানায়। মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রক্তপাত ঘটেছে তো এসব বড় বড় ডাকাতদের কারণে। বাংলাদেশেও সবচেয়ে বেশী রক্তপাত ঘটিয়েছে তারা। সেটি যেমন একাত্তরে,তেমনি আজও । নিজেদের গদি-দখলের সে প্রজেক্টকে বলেছে জনগণের অধিকার আদায়ের রাজনীতি। অথচ বাস্তবে সেটি ছিল জনগণকে অধিকারহীন করার ষড়যন্ত্র। তাই আওয়ামী লীগের বিজয়ে শেখ মুজিবের গদিলাভ সম্ভব হলেও ডাকাতি হয়েছে জনগণের মৌলিক অধিকারে, যা এমনকি ইয়াহিয়া বা আইয়ুবের আমলেও ঘটেনি। এটাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডাকাতি। এতে লুট হয়েছে মৌলিক মানবিক অধিকার। সে লুটে রাজনীতিতে একচেটিয়া বাকশালী মনোপলি বেড়েছিল আওয়ামী লীগের। নিজেদের সে একচেটিয়া মনোপলি বাড়াতে প্রয়োজনে তারা বিদেশী ডাকাতদেরও ডেকে আনে। একাত্তরে ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে আনার প্রেক্ষাপট নির্মিত হয়েছিল তো এভাবেই। ফলে সেদিন বাংলাদেশের হাজার হাজার কোটি টাকার মালামাল এবং যুদ্ধাস্ত্র ভারতে ডাকাতি হয়ে যায়। ধ্বসিয়ে দেয় সীমান্ত তথা অর্থনীতির তলা। বিণিময়ে উপহার দেয় এক তলাহীন ভিখারী বাংলাদেশের। ডেকে আনে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ,যাতে মৃত্যু ঘটে বহু লক্ষ বাংলাদেশীর। বিগত বহু শত বছরে বাংলাদেশের সকল ডাকাত এবং সকল হিংস্র পশু মিলেও এত মৃত্যু, এত দুঃখ ও এত অপমান উপহার দেয়নি যা ভারতীয় ডাকাত ও তার বাংলাদেশী বাকশালী সহযোগীরা একাত্তর থেকে পঁচাত্তর -এ চার বছরে দিয়েছে।

 

ডাকাতির চেয়েও নৃশংস

ডাকাতদের তবুও কিছু বিধিমালা থাকে। তারা দিবালোকে ডাকাতি করে না। যাত্রীভর্তি বাসেও আগুন দেয় না। বিত্তহীন গরীব মানুষকেও লুণ্ঠনের লক্ষ্য বানায় না। কিন্তু ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক ডাকাতগণ নৃশংসতা ঘটায় দীবালোকে। তাদের নৃশংসতায় সবচেয়ে বেশী মারা পড়ে নিঃস্ব গরীবেরা।এবং ধনি হয় সবচেয়ে ধনিরা। তাছাড়া লোভটা যেখানে বিশাল নৃশংসতাও সেখানে বিকট। বাংলাদেশের আওয়ামী রাজনীতিতে সে নৃশংসতা যে কতটা প্রকট তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। হরতাল বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। বহু দল বহু বছর ধরেই হরতাল করে আসছে। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানে আমলেও হরতাল হয়েছে। কিন্তু বাসে আগুণ দিয়ে যাত্রীদের হত্যা করা বা গায়ে পেট্রোল ঢেলে কাউকে পুড়িয়ে মারা এক ভয়াবহ নতুন নৃশংসতা। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেটি আমদানী করেছিল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীগণ তাদের নিজেদের ডাকা হরতালগুলোতে। আর তা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের মনে কোন অনুশোচনা নাই, আফসোসও নাই। ১৯৯৩ সালে যাত্রাবাড়ীতে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালের দিনে-দুপুরে বাসে আগুণ লাগিয়ে ১৮ জন যাত্রীকে পুড়িয়ে মারা হয়। ২০০৪ সালের ৪ই জুলাই ছিল আরেকটি হরতালের দিন। সেদিন শেরাটনের সামনে একটি দোতালা বাসে আগুণ দিয়ে হত্যা করা হয় ১০ জন নিরীহ বাসযাত্রীকে। ২০০৫ সালের ২১মে হরতালের দিনে আমির হোসেন নামক এক সিএনজি চালককের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুণ দেয়। ২৫শে সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সে মারা যায়। ২০০৫ সালে জানুয়ারি মাসে মিরপুর এক নম্বর সেকশনে হরতালের আগের রাতে হরতালের সমর্থণে একটি বাসকে লক্ষ করে বোমা ছুঁড়া হয়। কিন্তু বোমাটি পড়ে মফিজ নামক একজন রিকশাচালকের উপর। গার্মেন্ট শ্রমিক মফিজ ৮ সন্তানের সংসার চালাতে সে দিনে ফ্যাক্টরীতে কাজের পাশাপাশি রাতে রিকশা চালাতো। ঐ সময় সে বাচ্চাদের জন্য দুধ কিনতে রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী তাঁকে আর দুধ কিনে তার ক্ষুদার্ত সন্তানদের কাছে ফিরতে দেয়নি। সে ফিরেছিলই ঠিকই,তবে লাশ হয়ে। ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর একটি মিছিলের উপর আওয়ামী লীগের কর্মীগণ গলি-বৈঠা নিয়ে হামলা করে। সে হামলায় নিহত হয় ৫ জন জামাতকর্মী, আহত হয় বহু শত। ২০০৫ সালের ৬ই ফেব্রেয়ারির হরতালে আশরাফ সিদ্দিকী নামক একজন পুলিশকে আওয়ামী লীগ কর্মীরা পিটিযে হত্যা করেছিল। ২০০৬ সালের ১৩ই নভেম্বর দৈনিক “প্রথম আলো” খবর ছাপে, “১৪ দলের অবরোধের প্রথম দিনে ১৫-২০টি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্ণিসংযোগ হয়। সাভারে ৮টি গাড়ি ভাঙচুর হয়।” ২০০৪ সালের ৮ই জুন দৈনিক ইত্তেফাক রিপোর্ট ছাপে, “চার দলীয় সরকারের প্রথম তিন বছরে হরতালে ২৫টি বিআরটির বাস পোড়ানো হয়।” ২০০৬ সালের ৭ই ডিসেম্বর দৈনিক যায়যায় দিন প্রতিবেদন ছাপে, ১৩ দিনের অবরোধ ও সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচীতে ৭৭ জন মারা যায়, ২৮০০ আহত হয় এবং ১৮০০ পঙ্গু হয়। দেশের ক্ষতি হয় ৬ হাজার কোটি টাকা।

 

খুনিদের বাঁচাতে শেখ হাসিনা

স্বৈরাচারি দুর্বৃত্ত এরশাদ তখন ক্ষমতায়। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খান। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন বেগবান হওয়ার পথে। শেখ হাসিনাকে সে আন্দোলন থেকে দূরে সরানোর ষড়যন্ত্র আটে এরশাদ। লক্ষ্য,নিজের স্বৈরাচারকে শক্তিশালী ও দীর্ঘায়ীত করা। সে পরিকল্পনায় ধরা দেয় শেখ হাসিনা। বিণিময়ে এরশাদের কাছ আদায় করে নেয় বহু সুযোগ-সুবিধাও। দলীয় খুনিদের বাঁচাতে শেখ হাসিনা যে সুবিধাগুলো আদায় করেছিলেন তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। সে সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিবির কর্মীকে নির্মম ভাবে হত্যা করে আওয়ামী লীগ সমর্থক ছাত্রলীগের কর্মীরা। ইটের উপর তাদের মাথা রেখে ইটদিয়ে মগজ থেথলে দেয়া হয়েছিল। দিনদুপুরে সংঘটিত সে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে আদালত কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মীকে শাস্তি দেয়। এমন দুর্বৃত্ত খুনিদের পক্ষ কি কোন সভ্য মানুষ নেয়। খুণিদের ঘৃণা করা তো মানুষের অতি মৌলিক মানবিক গুণ। কিন্তু সে সন্ত্রাসী খুণীদের পক্ষ নেয় শেখ হাসিনা। জনাব আতাউর রহমান খান তার স্মৃতীচারণ বইতে লিখেছেন, এরশাদের সাথে আলাপ করতে এসে শেখ হাসীনা দাবী তুললেন তিনি কোন আলাপই করবেন না যদি না শাস্তিপ্রাপ্ত উক্ত ছাত্রলীগ কর্মীদের মূক্তি দেয়া হয়। নিজদলীয় সন্ত্রাসী খুনিদের নিয়ন্ত্রনে রাখার সামর্থ শেখ হাসিনার ছিল না। সামর্থ ছিল না তাদের কৃত খুনের ন্যায় জঘন্য অপরাধকে ঘৃণা করার। তেমনি এরশাদের ছিল না শেখ হাসিনার দাবীর কাছে নত না হওয়ার মত নৈতীক মেরুদণ্ড। হাসিনার দাবীর মুখে স্বৈরাচারি এরশাদ সে সাজাপ্রাপ্ত খুণিদের মুক্তি দিয়েছিল। কারণ এরশাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজ গদীর নিরাপত্তা,কে কোথায় খুণ হল বা সন্ত্রাস ঘটলো সেটি দমনে তার কোন আগ্রহ ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সন্ত্রাস যে কতটা প্রবল, শেখ হাসিনার কাছে নিজ দলের খুনিদেরকে খুণের শাস্তি থেকে বাঁচানোটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ -এ হল তার প্রমাণ। নিজের পিতা ও পরিবারে অন্যদের খুনের বিচার নিয়ে তিনি আদালত বসিয়েছেন। কিন্তু বহু হাজার মানুষ যে প্রতি মাসে খুন হচ্ছে তাদের বিচার কই? তাঁর দৃষ্টিতে কি অন্যদের জীবনের কোন মূল্যই নেই। প্রধানমন্ত্রী রূপে তার দায়বদ্ধতা কি শুধু নিজ দল ও পরিবারেরর প্রতি? স্বজনহারা দুঃখী পরিবারের কি ন্যায় বিচার চাওয়ার কোন অধিকারই নাই? ফ্যাসীবাদী রাজনীতিতে অন্যদের বিচার চাওয়া দূরে থাকে বাচার অধিকারই দেয়া হয়না। হিটলারের ফ্যাসীবাদী শাসনে তাই গ্যাস চেম্বারে ৬০ লাখ ইহুদীদের বিনাবিচারে হত্যা করা হয়েছিল। মুজিবামলেও লাশ হয়েছিল ৩০ হাজার বিরোধী দলীয় কর্মী।, তাদের পরিবারগুলো হারিয়েছিল ন্যায় বিচার চাওয়ার অধিকার। শেখ হাসিনা তাঁর পিতার সে ফ্যাসীবাদী আদর্শকেই আজ  অনুসরণ করে চলেছেন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে পুলিশ ও প্রশাসনের প্রধানতম নীতি হয়ে দাঁড়ায় দলীয় নেতা ও দুর্বত্তদের বাঁচানো। সে লক্ষ্য পুরনে শেখ মুজিবের প্রয়োজন পড়েছিল বিশাল রক্ষিবাহিনী গড়ে তোলার। আর আজ  সে অভিন্ন কাজটিই করছে পুলিশ,র‌্যাব,প্রশাসন,আদালত এবং আদালতের সরকারি উকিলগণ। তাদের কাজ হয়েছে জনগণের হাত থেকে সন্ত্রাসীদের প্রটেশকন দেয়া। আওয়ামী লীগ কর্মীগণ রাস্তায় মিছিল নিয়ে নামলে আগে পিছে পুলিশ বাহিনী তাদেরকে পাহারা দেয়। জনমানবহীন গভীর জঙ্গলে মানুষ খুণ বা ব্যাভিচার হলে শাস্তি হয় না। কারণ সেখানে পুলিশ নাই,আইন আদলত না। জঙ্গল তো পশুদের জন্য, লোকালয় ছেড়ে জঙ্গলে বসবাস করার বিপদ তাই ভয়ানক। কিন্তু জঙ্গলের আইনহীনতা নেমে এসেছে বাংলাদেশের জনপদে। ফলে খুন এবং ধর্ষণেও শাস্তি হয় না। খুণ, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসে বনের পশুর ন্যায় দুর্বৃত্তদের এত নির্ভীক হওয়ার হেতু তো সেটাই। শেখ হাসিনা নব্বইয়ের দশকে যখন প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিলেন তথন জাহাঙ্গির বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রলীগ নেতা ধর্ষনে সেঞ্চুরীর উৎসব করেছিল। সে খবর পত্রপত্রিকায় বড় বড় হেডিংয়ে ছাপা হয়েছিল। যে কোন সভ্য দেশেই ধর্ষণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই সে নরপশুকে তিনি আদালতে তুলেননি,একদিনের জন্যও কোন রূপ শাস্তি দেননি। শেখ হাসিনার নীতি-নৈতিকতা ও বিচারের মানদণ্ড যে কতটা ভিন্ন এ হল তার নমুনা।

প্রশ্ন হল,অপরাধীর কৃত অপরাধের বিরুদ্ধে ঘৃনা না থাকলে কি তাকে শাস্তির দেয়ার আগ্রহ জন্মে? ডাকাত দলের সরদারের সেটি থাকে না। বরং ডাকাতদের মধ্যে কে কতটা নৃশংস ভাবে ডাকাতি করলো সেটিই বরং ডাকাত সর্দারের কাছে বেশী গুরুত্ব পায়। শেখ হাসিনার কাছে দলের সন্ত্রাসীদের কদর তো এজন্যই প্রবল। ফলে পুলিশের সামর্থ নাই তাদের আদালতে তোলার। একই অবস্থা ছিল শেখ মুজিবের। তাই মুজিবের আমলে কোটি কোটি টাকার রিলিফের কম্বল ও অন্যান্য মালামাল চুরি হয়েছে, কালোবাজারীদের হাতে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ভারতে পাচার হয়েছে, ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে বহু ছাত্র খুণ হয়েছে। কিন্তু সেসব অপরাধে কাউকে কি একদিনের জন্যও শাস্তি হয়েছে? বরং গাজী গোলাম মোস্তাফাদের মত হাজার হাজার দুর্বৃত্ত ছিল তাঁর নিত্যদের সহচর। তাদের কাউকে কি তিনি দল থেকে এক দিনের জন্যও বহিস্কার করেছেন? তাদের নিয়ে বরং দলীয় দফতর, দলীয় সভা,মন্ত্রীসভা ও প্রশাসন রমরমা করেছেন। এখন বরং ক্ষমতায় যাওয়াতে ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের উপর সন্ত্রাসের দায়ভার কমেছে। সে কাজে নেমেছে পুলিশ ও র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটিলিয়নের বেতনভূক সেপাইরা। এক সময় অন্যদের রাজপথের মিছিল ও জনসভা পণ্ড করতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেরা ময়দানে নামতো,নেতা-কর্মীদের লগিবৈঠা নিয়ে পেটাতে। আর আজ  সে কাজে নামছে সরকারি প্রশাসন, পুলিশ ও র‌্যাব। রাজপথে তারা বিরোধী দলীয় নেতাদের যথেচ্ছাচারে লাঠিপেটা করছে, সংসদের এমপি এবং বিরোধী দলীয় চিপহুইপকে সম্প্রতি গায়ের কাপড় খুলে পিটিয়েছে,বুকের উপর পা তুলে পিষ্ঠ করছে পুলিশ। দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় সে ছবি ছাপাও হচ্ছে।

 

নৃশংস রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস

সম্প্রতি বহু পত্র-পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছে,সরকার জামায়াত নেতাদের পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়িয়েছে। এমন দণ্ডবেড়ি সাধারণত খুণি বা ডাকাতদের পড়ানো হয়। অথচ এ নেতারা কাউকে খুণ করেছেন বা কোথাও ডাকাতি করেছেন সে প্রমাণ নেই। এমনটি করা হয়েছে স্রেফ জনগণের চোখে তাদেরকে হেয় করা বা দৈহিক ও মানসিক ভাবে তাদেরকে নির্যাতিত করার লক্ষ্যে। একই উদ্দেশ্যে বিএনপি,ইসলামী ঐক্যজোট ও হিযবুত তাহরিরের কর্মীদেরও নিষ্ঠুর ভাবে পিটিয়েছে রাজপথে। অন্যদের কষ্ট দেয়ার মধ্যেই হাসিনা ও তার সরকারের আনন্দ। এটি নিছক নৈতিক রোগ নয়, ভয়ানক মানসিক রোগ। চিকিৎসাস্ত্রের ভাষায় এটি স্যাডিইজম। এমন মানসিক রোগের কারণে অন্যদের ঘর থেকে বের করে রাস্তায় টানার মধ্যে তাদের আনন্দ। সে আনন্দটি পাওয়ার লক্ষ্যেই শত শত বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয় এবং গ্রেফতারের পর জেল খানায় জঘন্য অপরাধীদের সাথে রাখা হয়।এবং পুলিশের হাতে সপ্তাহর পর সপ্তাহ রিমাণ্ডে দেয়া হয়। সে আনন্দটি পাওয়ার লক্ষ্যেই ধর্ষণে সেঞ্চুরির পর ছাত্রলীগ কর্মীরা উৎসব করে। শুধু গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীর দণ্ডবেড়ি নয়, এমনকি ধর্ষিতা নারীর সীমাহীন যাতনাও তাদের যে কতটা পুলক দেয় এ হল তার নজির। এমন এক নিষ্ঠুর আনন্দবোধ নিয়েই শেখ মুজিব সিরাজ সিকদার হত্যার পর দেশের সংসদে দাঁড়িয়ে তৃপ্তিভরে বলেছিলেন,“কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” বাংলাদেশের বিপদ, দেশ আজ  এরূপ ভয়ানক অপরাধীদের হাতে অধিকৃত। শুধু পদ্মা, মেঘনা বা তিস্তার পানি নয়, সমগ্র দেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়াতেই তাদের আনন্দ। সন্ত্রাস এখন আর স্রেফ দুর্বৃত্ত সন্ত্রাসীদের মনোপলি নয়,এটি এখন সরকারি প্রশাসনের হাতিয়ার। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এ এক ভয়ংকর রূপ। শাসন ক্ষমতায় এর আগে আইয়ুব খান এসেছেন, ইয়াহিয়া খানও এসেছেন। মুজিবসহ বহু আওয়ামী লীগ নেতারা আগরতলা ষড়যন্ত্রের ন্যায় বহু গুরুতর অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু তাদেরকে কি একদিনের জন্যও রিমাণ্ডে নিয়ে শারীরীক ভাবে অত্যাচার করা হয়েছে? কাউকে কি পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়ানো হয়েছে? শেখ মুজিব তো জেলে প্রথম শ্রেনী পেয়েছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও একাত্তরে দেশোদ্রহী মামলার আসামী হওয়া সত্ত্বেও তার পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়ানো দূরে থাক,পুলিশ কি একটি আঁচড়ও দিয়েছিল? অথচ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মুখাকৃতিকে হিংস্র পশুবৎ করে সে ছবি দেশময় প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু যে অপরাধ শেখ হাসিনা করছে তাঁকে আজ  কি বলা যাবে? সরকারি ভাবে এত খুণ,এত সন্ত্রাস ও এত দানবীয় নির্যাতনের পর শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে মানবীয় বললে ইয়াহিয়া বা আইয়ুব খানকে কি বলা যাবে? ৩/১০/১১

 




আওয়ামী লীগের ঘৃণার রাজনীতি এবং সংঘাতের পথে বাংলাদেশ

নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের মূল লক্ষ্য ছিল, যেভাবেই হোক নির্বাচনী জয়। এজন্য তারা মিত্রতা গড়েছে সামরিক-বেসামরিক নানা পক্ষের সাথে। বিজয়ের পর এবার তাদের এজেন্ডা নিজেদের রাজনৈতিক দখলদারির স্থায়ী রূপ দেওয়া। সে লক্ষ্যে এখন তারা দখলদারি জমাতে চায় দেশবাসীর মনের ভূবনে। কারণ, একমাত্র চেতনার মানচিত্রের সাথেই স্থায়ী যোগসূত্র হলো রাজনৈতিক মানচিত্রের। এটি পাল্টে গেলে তাই পাল্টে যায় রাজনৈতিক মানচিত্রও। এজন্যই রাজনৈতিক বিজয়ের পর পরই প্রতিটি কৌশলি রাজনৈতিক পক্ষ্যই সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক বিজয়ে মনযোগী হয়। ইরানের জাতিয়তাবাদীরা ছিল এক্ষেত্রে অতি ধুরন্ধর। তারাই রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পর আদর্শিক ও ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতাকে পাকাপোক্ত করে। ইতিহাস থেকে তার একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ইসলামী সভ্যতার নির্মাণে শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ইরান।

এ বিশাল ভূ-খন্ডটি এক সময় মুসলিম উম্মাহর একটি শক্তিশালী অংশ ছিল। খোলাফায়ে রাশেদার পর আরবগণ যথন ভাতৃঘাতি সংঘাতে লিপ্ত হয় তখন কোরআনের বড় বড় মোফাচ্ছের, বিজ্ঞানী, চিকিৎস্যক, কবি-সাহিত্যিক ও দার্শনিক জন্ম নেয় ইরানে। ইমাম আবু হানিফা, আব্দুল কাদের জিলানী, আল ফারাবী, আল রাজি, ইবনে সিনা, ইমাম আল গাজ্জালী, শেখ সাদী, মাওলানা রুমীসহ বহু প্রতিভার জন্ম ইরানে। তারা শুধু ইরানের গৌরব ছিলেন না, গৌরব ছিলেন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর। প্রখ্যাত সমাজ-বিজ্ঞানী ইবনে খুলদুনের মতে ইসলামের উদ্ভব আরবে হলেও ইসলামি সভ্যতার নির্মান ঘটে ইরানে। আব্বাসী খলিফার দূর্বল সময়ে সে ইরানই বিচ্ছিন্ন হয় মুসলিম উম্মাহ থেকে। বলা যায় মুসলিম ইতিহাসে ইরানই হলো জাতিয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতার গুরু। ইরানী শাসকেরা সে বিচ্ছিন্নতাকে স্থায়ী রূপ দিতেই পাল্টে দিতে হাত দেয় সেদেশের মানুষের ধর্মীয় চেতনায়। জন্ম দেয় শিয়া মতবাদ। সাফাভী শাসকদের সে বলপূর্বক ধর্মীয় পরিবর্তনে লক্ষ লক্ষ সূন্নী মুসলমানকে হত্যা করা হয়। ফলে নিছক এক রাজনৈতিক প্রয়োজনে এককালের সূন্নী ইরান পরিণত হয় শিয়া রাষ্ট্রে। প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্র থেকে এভাবেই গড়া হয় ইরান ঘিরে বিভক্তির বিশাল প্রাচীর। মুসলিম উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ থেকে বিভক্তি গড়ে তোলার স্বার্থেই জন্ম দেয়া হয় এবং সে সাথে পরিচর্যা পায় তীব্র ঘৃণাবোধ। শিয়াদের সে ঘৃণা থেকে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমর (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আয়েশা (রাঃ)র ন্যায় নবীজীর অতি প্রিয় ব্যক্তিরাও রেহাই পাননি। ইরানীরা মুখে যাই বলুক আজও তারা সমগ্র মুসলিম উম্মাহ থেকে বিচ্ছিন্ন সে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই। এভাবে সুযোগ হারিয়েছে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বদানে। কারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনায় আর যাই হোক কোন কালেই কোন বৃহৎ জনগোষ্ঠির নেতা হওয়া সম্ভব নয়। তখন থেকেই ইরানে লোপ পায় প্যান-ইসলামিক চেতনা, এবং বেড়ে উঠে বর্ণবাদী চেতনা। সেসাথে বেড়ে উঠে মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি সাধনের চেতনা। ক্ষতিসাধনের সে চেতনাতেই এদেশটির শিয়া শাসকেরা ইউরোপীয় শাসকদের সামরিক সহয়তা নিয়ে বার বার হামলা চালিয়ছে উসমানিয়া খেলাফতের পূর্ব সীমান্তে। মুসলিম সেনাবাহিনী যখন সমগ্র বলকান, গ্রীস, দক্ষিণ রাশিয়া, ক্রিমিয়াসহ বিশাল পূর্ব ইউরোপ দখল করে অস্ট্রিয়ার রাজধানী অবরুদ্ধ করে ফেলে সে সময় ইরান চাকু ঢুকিয়ে দেয় উসমানিয়া খেলাফতের পিঠে। ইতিহাসের সে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পূর্ব সীমান্তে শুরু হয় শিয়া হামলা। মুসলিম সেনাদল তখন ভিয়েনা থেকে অবরোধ তুলে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ইরানের সে হামলা না হলে ইউরোপের ইতিহাসই হয়তো ভিন্নভাবে রচিত হতো। সে সময় থেকেই ইরানের প্রতিভা ও সামর্থ্য নানা ভাবে ব্যয় হয়ে আসছে মুসলমানদের রক্ত ঝরাতে। সম্প্রতি আফগানিস্তান ও ইরাকে যে মার্কিন হামলা হলো তাতে সাহায্য ও সর্বাত্মক সমার্থণ দিয়েছে ইরান। এখন তারা সাহায্য দিচ্ছে ভারত ও পাশ্চাত্যের পাকিস্তান বিরোধী আগ্রাসনে। বাংলাদেশের বাঙ্গালী বর্ণবাদীরা আজ একই ভাবে সে মধ্যযুগীয় ইরানী বর্ণবাদীদের পথ ধরেছে। তারা নিজেরা বিচ্ছিন্ন হয়েছে উপমহাদশের অন্য মুসলমানদের থেকে। এবং সর্বোভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে উপমহাদেশে মুসলিম শক্তির উত্থান রুখবার কাজে। ইসলামি উম্মাহ থেকে তারা যে কতটা বিচ্ছিন্ন এবং ঘৃণা যে তাদের কতটা মজ্জাগত তারই প্রমাণ হলো, আজও পাকিস্তানের খন্ডিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখলে শুধু ভারতীয় কাফের বা ইসরাইলের ইহুদীরাই খুশি হয় না, আনন্দের বন্যা বইতে থাকে আওয়ামী মহলেও। অবাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সে ঘৃণা থেকে আল্লামা ইকবালের ন্যায় মহান কবিও রেহাই পাননি। অথচ আল্লামা ইকবাল ছিলেন মুসলিম উম্মাহর কবি। তিনি ছিলেন প্যান-ইসলামের কবি। মাতৃভাষা পাঞ্জাবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কবিতা লিখেছেন উর্দু ও ফার্সী ভাষায়। তার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তার নাম সেখান থেকে মুছে দেয়। অথচ তিনি বাঙ্গালী মুসলমানদের কোন ক্ষতিই করেননি। জাতিয়তাবাদী চেতনা মানুষকে যে কতটা বিদ্বেষপূর্ণ ও বিবেকশূণ্য করে এ হলো তার নমুনা। এমন বিবেক শূণ্যতার কারণেই একজন ভিন্ন ভাষার বা ভিন্ন এলাকার নিরপরাধ মানুষও হত্যা করা বা তাকে তার বসত বাড়ী থেকে বের করে বা তার সম্পদের উপর দখল জমানো জাতিয়তাবাদীদের জন্য আদৌ অপরাধ মনে হয় না।

অথচ প্যান-ইসলামি চেতনা একটি জনগোষ্ঠিকে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে যে কতটা সৃষ্টিমুখি করে তারও প্রমাণ বাংলার মুসলমান। ১৯৪৭এ বাংলাদেশের মুসলমানদের কারণেই জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের সর্ব বৃহৎ ও সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। মুসলমানদের হাতে দিল্লী বিজয়ের পর এটিই ছিল ভারতের মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ রাষ্ট্রটি গড়ায় যে সংগঠনটি কাজ করেছিল সেটি হলো মুসলিম লীগ। এবং সে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল ঢাকায়। পাকিস্তান প্রস্তাবটিও উত্থাপন করেছিল বাংলার ফজলুল হক। কিন্তু পরবর্তিতে আওয়ামী লীগ আবির্ভুত হয় কাফের শক্তিবর্গের অতিবিশ্বস্ত মিত্ররূপে। তাদের কাছে ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধতা চিত্রিত হয় সাম্প্রদায়িকতা রূপে। এজন্যই তাদের প্রতিবারের নির্বাচনী বিজয় ভারতসহ সকল কাফের শক্তির কাছে এতটা উৎসবে পরিণত হয়। এমন একটি ইসলাম বিরোধী চেতনার কারণে প্রতিবেশী দেশে হাজার হাজার মুসলমানকে পুড়িয়ে হত্যা বা সেদেশের মুসজিদ ধ্বংস করা হলেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মুখে কোন প্রতিবাদের ধ্বনি উঠে না, প্রতিবাদে রাজপথেও নামে না। পত্রিকায় বিবৃতিও দেয় না। প্যান-ইসলামি চেতনা থেকে এটি সম্পূর্ণ এক ভিন্নতর চেতনা। এমন চেতনার নির্মান হতে পারে একমাত্র প্যান-ইসলামি চেতনার বিনাশের পথ ধরেই। আওয়ামী লীগ সরকার তার সকল সামর্থ বিণিয়োগ করছে সে ইসলামি চেতনার বিনাশে। তারা এটিকে বলে রাজাকারের চেতনা। ইরানের স্বৈরাচারি শাসকেরা প্যান-ইসলামি চেতনার বিনাশে রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচর্যা দিয়েছিল ইরানী বর্ণবাদ ও শিয়া ধর্মমতের। আর আওয়ামী লীগ শেখাচ্ছে বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদ ও ইসলাম-মূক্ত সেকুলার চেতনার। এলক্ষ্যে মুসলিম জনগণের দেওয়া রাজস্বের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে নাচগান শেখানোর কাজে। অথচ ইসলামে নাচগান হারাম। কারণ, মানুষের এ পার্থিব জীবনকে পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক অভিহিত করেছেন একটি পরীক্ষাকেন্দ্র রূপে। নারীপুরুষ এখানে ব্যস্ত তাদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দিতে। এ পরীক্ষায় ফেল করলে তারা কোন চাকুরি হারাবে বা ডিগ্রি পেতে ব্যর্থ হবে তা নয়। বরং পরিণতিটি হবে ভয়ংকর। নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামের আগুনে। পরীক্ষার হলে কি নাচগানের আয়োজন চলে? এমন একটি চেতনার কারণেই মুসলমানদের হাতে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মিত হলেও নাচগান পরিচর্যা পায়নি। যখন পেয়েছে তখন মুসলমান আর প্রকৃত মুসলমান থাকেনি। পরিণত হয়েছে শয়তানের একনিষ্ঠ সেবকে। ইসলামের সত্যপথ থেকে মুসলমান তরুন-তরুনীদের বিভ্রান্ত করার কাজে নাচগান সব সময়ই একটি সফল হাতিয়ার। শয়তানী শক্তিবর্গ অতীতের ন্যায় আজও সেটি সর্বত্র প্রয়োগ করছে। এবং বাংলাদেশে আজ সেটি হচ্ছে অতি ব্যাপক ভাবে। কাফেরদের অর্থে এনজিওগুলি এখন নাচগানের চর্চাকে মাঠপর্যায়ে নিয়ে গেছে। অথচ ব্রিটিশদের শাসনামলেও এমনটি হয়নি। পাপচর্চার এ ক্ষেত্রগুলো এখন ইনস্টিটিউশন রূপে গড়ে উঠেছে। এনজিওদের প্রতিষ্ঠিত স্কুলের হাজার হাজার ছেলেমেয়েরা নেচেগেয়ে আনন্দ প্রকাশে এখন আর কোনরূপ সংকোচ বোধ করে না। যে লজ্জাকে ঈমানের অর্ধেক বলা হয়েছে সেটিকেই তারা বিদায় দিয়েছে ছোটদের শিশুমন থেকে। আর যেখানে নাচগান বাড়ে সেখানে মদ্যপান ও ব্যাভিচার বাড়বে সেটিই তো স্বাভাবিক। অনেকটা কান টানলে মাথা আসার মত। আর বাংলাদেশে সেগুলি তাই বাড়ছে অতি সমান তালে। বেশ্যাবৃত্তি তাই এখন আর পতিতাপল্লিতে সীমাবদ্ধ নয়, সেটি উপচিয়ে আবাসিক মহল্লায় ঢুকেছে। ফলে ব্যভিচারে সংক্রামিত হচ্ছে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষকে। প্রায় দশ বছর আগের এক জরীপে প্রকাশ, বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশী যুবক বিবাহের আগেই যৌন কর্মে লিপ্ত হয়। বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশের জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ খবর আর কি হতে পারে? অথচ ইসলামের দুষমনদের জন্য এটি এক মহা-উৎসবের বিষয়। ডি-ইসলামাইজেশন যে কতটা সফল ভাবে হচ্ছে এ হলো তার বড় প্রমাণ।

পাশ্চাত্য দেশে কোন কুকর্মই এখন আর হারাম নয়। সেটি ব্যাভিচার হোক, সমকামিতা হোক বা মদ্যপান হোক। জায়েজ বলছে পুরুষের সাথে পুরুষের বিবাহকেও। পতিতাদের বলা হয় সেক্স-ওয়ার্কার। সে অভিন্ন পাশ্চাত্য মূল্যবোধই বিশ্বের কাফের শক্তিবর্গ এখন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। পাশ্চাত্যের ভোগবাদী পাপাচারের কাছে খৃষ্টানধর্মের ধর্মীয় নেতা ও অনুসারিগণ যেমন আত্মসমর্পণ করেছে, তারা চায় ইসলামের অনুসারিগণ সেরূপ আত্মসমর্পণ করুক। এবং আত্মসমর্পণ না করাটাকে বলছে মৌলবাদ। সে মৌলবাদ নির্মূলের লক্ষ্যে তারা একদিকে যেমন শুরু করেছে সোশাল ইঞ্জিনীয়ারিং তেমনি অপরদিকে শুরু করেছে প্রকান্ড যুদ্ধ। ইঞ্জিনীয়াররা এতকাল রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কলকারখানা নির্মাণ করতো, আর এখন সোশাল ইঞ্জিনীয়ারীংয়ের নামে নিজেদের অর্থ, মেধা ও প্রযুক্তির বিণিয়োগ করছে সেকুলার ধাঁচের সমাজ-সংস্কৃতি, চেতনা ও রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে। আর তাদের সে লক্ষ্যপুরণে অপরিহার্য গণ্য হচ্ছে, জনগণের চেতনা থেকে ইসলামের অপসারণ। যাকে বলা হয় ডি-ইসলামাইজেশন। বাংলাদেশের বহু টিভি নেটওয়ার্ক, অসংখ্য পত্র-পত্রিকা, শত শত এনজিও কাজ করছে সে সোশাল ইঞ্জিনীয়ারিং প্রজেক্টের আঁওতায়। ইসলামের নবজাগরণ প্রতিরোধের এটিই হলো তাদের মূল স্ট্রাটেজি। একাজে কাফের দেশ থেকে আসছে হাজার হাজার কোটি টাকার পুঁজি। আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা রূখতে এটিই এখন কাফের শক্তিবর্গের সম্মিলিত গ্লোবাল স্ট্রাটেজী। এলক্ষ্যে তারা মুসলিম দেশের ইসলামে অঙ্গিকার-শূন্য দলগুলোর সাথে গড়ে তুলেছে নিবিড় কোয়ালিশন। বাংলাদেশের সরকার ও তার সহযোগী সেকুলার এনজিওগুলো হলো সে কোয়ালিশনেরই অংশ। ইসলামি চেতনা বিনাশের কাজ ফলও দিচ্ছে। জনগণের সহযোগিতাও পাচ্ছে। বাংলাদেশে ইসলামি চেতনাধারীদের নানা ভাবে হেয় করা বা নির্যাতন করা এখন তাই গণ্য হচ্ছে উৎসবকর্ম রূপে। রাজপথে লগি-বৈঠা নিয়ে দাড়ি-টুপিধারিদের হত্যা করলেও পত্রিকার পাতায় তাই সেটি নিন্দনীয় না হয়ে বরং প্রশংসনীয় হয়। এরই আরেক সফলতা হলো, বাংলাদেশ এখন বাজার ধরেছে নারী রপ্তানিতেও। দেশেটি এখন থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনের ন্যায় দেশের পথ ধরেছে। বিদেশী দুর্বৃত্তদের গৃহেই শুধু নয়, বাঙ্গালী পতিতাদের ভিড় বেড়ে চলেছে কোলকাতা, বোম্বাই ও করাচীর পতিতাপল্লিতেও। একাজ প্রথম শুরু করেছিল শেখ মুজিব। তিনি গৃহপরিচারিকার কাজ দিয়ে তেহরানে বহু শত মহিলাকে পাঠিয়েছিলেন। কথা হলো, বৃদ্ধ মহিলাকেও যেখানে ইসলামে একাকী হজ্বে যাওয়ার অনুমতি দেয়না সেখানে একজন যুবতি মহিলা অপরিচিত ব্যক্তির ঘরে গৃহপরিচারিকার কাজ নিয়ে বিদেশে যায় কি করে? অর্থের পিছে দৌঁড়াতে থাকলেও সেটি যে কত দ্রুত জাহান্নামের পথে নিয়ে যায এ হলো তার নমুনা। বাংলাদেশের সেকুলারদের মূল এজেন্ডা হলো নর-নারীদের অর্থের পিছে দৌড়াতে শেখানো, সত্যদ্বীন বা ইসলামের পিছে নয়। ইসলামের পিছে দৌড়ানোকে বরং মৌলবাদ বলে সেটিকে নির্মূলযোগ্যও বলছে। মাইক্রোক্রেডিটের ব্যবসায়ী এনজিওগুলো সূদকে ঘরে ঘরে প্রচলিত করেছে। এতবড় জঘন্য হারাম কাজ এমনকি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কাফেরদের শাসনামলেও এতটা ব্যপ্তি পায়নি। জনগণের মন থেকে ইসলামি চেতনা বিলুপ্তির লক্ষ্যেই এখন ২১শে ফেব্রেয়ারি, ২৫ শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর, পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্র জয়ন্তির ন্যায় দিবসগুলি এখন আর শুধু ঐ বিশেষ দিনে পালিত হয় না, পালিত হচ্ছে মাসাধিক কালব্যাপী।

ইসলামি চেতনা বিনাশের পাঠদানে এ মাসগুলোতে পাঠশালায় পরিণত হয় সারাদেশ। অথচ ইসলামের পরিচিতি বাড়াতে আওয়ামী লীগ একটি আলোচনা সভা বা একটি সেমিনারের আয়োজন করেছে সে নজির নেই। অথচ এরাই জোর গলায় বলে “আমরাও মুসলমান”। বাংলাদেশে ইসলামি চেতনা বিনাশের এ কাজে রাষ্ট্রীয় পুঁজির পাশাপাশি বিপুল পুঁজি বিণিয়োগ হচ্ছে কাফের দেশগুলোরও। সে পুঁজিতে দেশের নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ জুড়ে ফুলে-ফেঁপে উঠছে বহু হাজার এনজিও। ইসলাম-বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারা দেশী-বিদেশীদের সাথে গড়ে তুলেছে এক নিরেট পার্টনারশিপ।

আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পথ ধরেই আসে রাজনৈতিক আধিপত্য। একবার আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনৈতিক আধিপত্য-স্থাপনে শত্রুপক্ষের কাছে যুদ্ধ-লড়াটা তখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজী ছিল অন্যদেশের অভ্যন্তরে নিজেদের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক দ্বীপ গড়া। তুরস্ক, মিশর, পাকিস্তানসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশে সে দ্বীপগুলো হলো ক্যান্টনমেন্ট, অফিসপাড়া, আদালত, পতিতালয় ও ব্যাংকিং সেক্টর। এগুলোর সীমান্ত পাশ্চাত্য চেতনা ও মূল্যবোধের সাথে একাকার। ইসলামের হারাম-হালালের বিধান এসব জাগায় অচল। তারাই এখন পাশ্চাত্যের কাফের শক্তির একনিষ্ঠ মিত্র। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তাই আজ নিজ দেশে হাজার হাজার মুসলমান হত্যা করছে অতিশয় আনন্দ-চিত্তে। তুরস্কে দেশের সৈনিকরা স্কুলের মেয়েদের মাথায় রুমাল বাধতে দিতেও রাজী নয়। মিশরে এরা রাজী নয় ইসলামপন্থিদের রাজনীতির ময়দানে আসতে দিতে। এখন পাশ্চাত্যের সেকুলারিস্টগণ সেরূপ অভিন্ন দ্বীপ গড়ছে রাজনীতির অঙ্গনেও। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ হলো তাদের সে অভয় দ্বীপ। একজন পশ্চিমা দুর্বৃত্ত ব্যভিচারি বাংলাদেশের পতিতালয়ে বা মদের আসরে যে সমাদারটি পায় সেটি তো চেতনাগত অভিন্নতার কারণেই। তেমনি এক অভিন্নতার কারণেই ভারতীয় নেতারাও অতি আপনজন রূপে গৃহীত হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের আসরে। আর ভারতের সাথে আওয়ামী লীগের সে গভীর সম্পর্কটি নতুন বিষয় নয়। সেটি গভীরতা পেয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের আমলেই। ভারতীয় স্বার্থের সেবক রূপে দায়িত্ব-পালনের অঙ্গিকার নিয়ে তিনিই আগড়তলা গিয়েছিলেন। এবং সেটি ষাটের দশকে। ভারতীয় গুপ্তচর চিত্তরঞ্জন সুতোর বা কালিপদ বৈদ্যরা ছিলেন সে আমল থেকেই তার ঘনিষ্ঠ মিত্র। তিনিই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের “তিন বিঘা” ভূমি । সীমান্ত বাণিজ্যের নামে তিনিই দেশের সীমান্ত তুলে দিয়েছিলেন, এবং এভাবে সুযোগ করে দিয়েছিলেন অবাধ লুণ্ঠনের। যার ফলে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল বাংলাদেশীদের জীবনে। তিনিই অনুমতি দিয়েছিল ফারাক্কা বাঁধ চালুর। এখন ভারত পরিকল্পনা নিচ্ছে ব্রম্মপুত্র নদীর উজানে “টিপাই বাধ” দেওয়ার। ফারাক্কার কারণে মরুভূমি হতে চলেছে উত্তর বঙ্গের বিশাল ভূ-ভাগ। এখন একই প্রক্রিয়ার শিকার হতে যাচ্ছে সিলেট বিভাগ। দখলে নিচ্ছে বঙ্গপোসাগরে জেগে উঠা তালপট্টি দ্বীপ। ভারত বাংলাদেশের জন্য নেপালে যাওয়ার জন্য ২০-৩০ মাইলের করিডোর দিতে রাজি হচ্ছে না, অথচ বাংলাদেশের মাঝখান দিয়ে ৫০০ মাইলের করিডোর চায়। ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভূটানে যাওয়ার করিডোর বাংলাদেশের যতটা অপরিহার্য সেরূপ অবস্থা ভারতের জন্য নয়। ভারত তার পূর্বাঞ্চলে যেতে পারে তার নিজ ভূমির মধ্য দিয়ে। অথচ এরপরও ভারত চাপ দিচ্ছে সে করিডোর আদায়ে এবং আওয়ামী লীগ সেটি বিবেচনাও করছে।

আওয়ামী লীগের বিজয়ে প্রতিবারেই বিপর্যয় এসেছে নানা ভাবে। প্রচন্ড বিপর্যয় এসেছে সেনাবাহিনীর উপরও। মুজিব আমলে সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশী গুরুত্ব পেয়েছিল রক্ষিবাহিনী। আওয়ামী লীগের এবারের বিজয়ে দেশের রাজধানীতে নিহত হলো ৫৭ জন সেনা অফিসার। শত্রুতা সৃষ্টি হলো এবং অবিশ্বাস বাড়লো সেনাবাহিনী ও বিডিআরের মাঝে। পিলখানার রক্ত শুকালেও মনের মাঝে যে বিভক্তি ও ঘৃনা সৃষ্টি হলো সেটি কি দূর হবার? এতে কি দেশের প্রতিরক্ষা দৃঢ়তা পায়? এখন কথা উঠছে বিডিআরের বিলুপ্তির। সরকার ভাবছে, বিডিআরের নাম ও লেবাস পাল্টিয়ে আরেকটি বাহিনী গড়ার। সরকারের ধারণা, সমস্যা শুধু বিডিআর নামটি ও পোষাকটি নিয়ে। ভাবটা যেন, ফাইলপত্র ও অফিস আদালতের গা থেকে ‘বিডিআর’ নামটি বা তাদের লেবাসটি উঠে গিয়ে সেনা-অফিসারদের বুকে গুলি চালিয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ সমাধান খুঁজছে ‘বিডিআর’ নামটি ও তার লেবাসটি বিলূপ্তির মাঝে। কিন্তু যারা গুলি চালালো, যারা সে হত্যাযজ্ঞে নেতৃত্ব দিল তাদের বিচারে অগ্রগতি কোথায়?

দুর্যোগ নেমেছে দেশের শিক্ষাঙ্গনেও। চরদখলের ন্যায় সেখানে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আওয়ামী ক্যাডার বাহিনীর। শুধু ভিসি বা প্রিন্সিপালের অফিসেই নয়, দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আবাসিক হলগুলোর সিটগুলোর উপরও। আওয়ামী ক্যাডার বাহিনীর অনুমতি ছাড়া সেখানে কেউ থাকতে পারবে না। দলীয় নিয়ন্ত্রণ আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রেও। লাশ হচ্ছে ছাত্ররা। ব্যাপক অবনতি ঘটেছে আইনশৃঙ্খলার। বাড়ছে চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী ও খুনখারাবী। একই রূপে হাত পড়েছে দেশের কৃষি ও শিল্পাঙ্গনেও। সরকারের বাণিজ্যনীতির কারণে ভারত থেকে অবাধে ঢুকছে ভারতীয় নিম্মমানের সস্তা পন্য। ফলে বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য। কিছুদিন আগে তাই বাংলাদেশের কৃষকরা বাজার না পেয়ে রাস্তার উপর তাদের দুধ ঢেলেছে। সে ছবি টিভিতে দেখানো হয়েছে। দেশে বন্ধ হচ্ছে নিজস্ব সূতা তৈরীর কারখানা। হাত পড়েছে দেশের তাঁতীদের গায়েও। মুজিবামলেও এমনটিই ঘটেছিল। তখনও দেশী কারখানায় তালা লাগানো শুরু হয়েছিল। আগুনে ভস্মিভূত হয়েছিল বহু পাটের গুদাম। বাজারে প্লাবন এসেছিল তখন ভারতীয় পণ্যের। শিল্প-কৃষি-বাণিজ্য এভাবে একের পর এক বিধস্ত বা বেদখল হলে কি সে দেশের জনগণের কাছে ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া আর কোন রাস্তা খোলা থাকে? কথা হলো এভাবে কি একটি দেশের প্রতিষ্ঠা বাড়ে? বাড়ে কি সম্মান?

দেশের বিপর্যয় বাড়াতে আওয়ামী লীগ আরেকটি আত্মঘাতি পথও বেছে নিয়েছে। আর সেটি হলো রাজনৈতিক বিভক্তি ও ঘৃনার রাজনীতির। ইতিহাস থেকে খুঁজে খুঁজে তারা বিভক্তির সূত্র গুলো রাজনৈতিক ময়দানে নিয়ে আসছে। যুদ্ধ-অপরাধের মত ৩৮ বছরেরও পুরনো বিষয়কে তারা রাজনীতিতে টেনে আনছে। যারা ক’দিন আগে দিনদুপুরে নিহত ৫৭ জন সেনা-অফিসার হত্যার একটি সুষ্ঠ বিচার করতে হিমসিম খাচ্ছে, এবং এখন কোন আশার আলো দেখাতে পারছে না তারা আবার ৩৮ বছর পুরোন অপরাধের বিচার করবে। কান্ডজ্ঞান আছে এমন কোন ব্যক্তি কি সেটি বিশ্বাস করতে পারে? শেখ মুজিবের ২০ টাকা মণ দরে চাল খাওয়ানো বা শেখ হাসিনার প্রতি পরিবারে একজনের চাকুরিদানের ন্যায় নির্বাচনী ওয়াদার মতই এটি এক প্রকান্ড মিথ্যাচার। বিচার শুধু গলাবাজীতে হয় না, চাক্ষুষ প্রমাণ ও সাক্ষী-সাবুদও হাজির করতে হয়। অপরাধী কে অপরাধীরূপে প্রমাণের দায়িত্ব সরকারের। এবং বিচারকে গ্রহণযোগ্য করতে না পারলে নিজেদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও যে আস্তাকুড়ে পড়বে সে খেয়াল কি তাদের আছে? ঘৃণার রাজনীতির শিকার হয়েছেন শেখ মুজিব নিজে ও তার পরিবার। সিরাজ সিকদারের হত্যার পর সংসদে তিনি ঘৃনা ও দম্ভভরে বলেছিলেন, “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” কিন্তু সে কথা বলার পর তিনিও বেশী দিন বাঁচেননি। সিরাজ সিকদারের ন্যায় তিনিও লাশ হয়েছেন। কিন্তু মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ অতীতের ইতিহাসে থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি। তারা রাজনীতিতে জোয়ার দেখেছে ভাটাও দেখেছে। ভাটার সময় মুজিবের লাশ সিড়িতে পড়ে থাকলেও সে লাশ কেউ তুলতে এগুয়নি। ঘৃণা পেট্রোলের চেয়েও বিস্ফোরক। একবার সেটি ছড়িয়ে পড়লে সহজে সেটি থামে না। লক্ষ লক্ষ মানুষকে সেটি সাথে নিয়ে যায়। ইউরোপ এক সময় এ ঘৃণার কারণে দারুন ভাবে বিধ্বস্ত ও জনশুন্য হয়েছিল। তাই তারা নানা জাতিতে বিভক্ত ইউরোপকে এখন এক করতে ব্যস্ত। আরেকটি ধ্বংসযজ্ঞ তারা এড়াতে চায়। ইতিহাস থেকে যারা শিক্ষা নেয় তাদের আচরণটি এমনই হয়। আজকের ইরাক হলো আরেক দৃষ্টান্ত। অতিশয় ঘৃণার কারণে মানুষ সেখানে নিজেই পরিণত হচ্ছে বোমায়। ফেটে পড়ছে রাজপথে, মসজিদে ও বাজারে। পাঁচ লাখেরও বেশী মানুষের সেখানে মৃত্যু ঘটেছে। আরেক উদাহরন আলজেরিয়া।

রাজনীতি হলো একতা ও সম্পৃতি গড়ার নীতি। একমাত্র সে পথেই রাষ্ট্র সামনে এগোয়। দেশবাসীও নিজেদের মধ্যে সংহতি খুঁজে পায়। তাই যেদেশে রাজনীতি পরিপক্কতা পায় সেদেশের রাজনীতিতে একতা ও সম্পৃতি গুরুত্ব পায়। এবং লোপ পায় সংঘাত। হ্রাস পায় দল-উপদলের সংখ্যা। অন্য ভাষা, অন্য এলাকা ও অন্য নগরের মানুষকে রাজনৈতিক কর্মীরা তখন আপন করতে শেখে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা সে পথে চলতে রাজী নয়। শুরু থেকে ঘৃণা ও বিচ্ছিন্নতাই তাদের রাজনীতির মূল পুঁজি। মশামাছি যেমন নর্দমার নোংরা পানিতে বেঁচে থাকে, তেমনি এরাও বাঁচে ঘৃণার স্তুপে শিকড় ঢুকিয়ে। ফলে একতা, সৌহার্দ ও সম্পৃতির চর্চা তাদের হাতে বাড়বেই বা কেমন করে? পাকিস্তান আমলে অবাঙ্গালীদের ঘৃণা করাই ছিল তাদের রাজনীতির মূল পুঁজি, যোগ্যতা নয়। তাদের যোগ্যতা তো আজও ইতিহাস। মানুষ সেটি মুজিব আমলে যেমন স্বচোক্ষে দেখেছে তেমনি আজও দেখছে। তাদের এখনকার ঘৃণা দেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে। তাছাড়া সাম্প্রতিক নির্বাচনী বিজয় প্রচন্ডভাবে তাদেরকে দাম্ভিকও করেছে। এতে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। পেট্রোল ছিটানোর ন্যায় তারা শুধু ঘৃণাই ছড়িয়ে যাচ্ছে। লগিবৈঠা নিয়ে রাজপথে মুসল্লি হত্যা, যাত্রীভরা বাসে পেট্রোল বোমা মারা বা ইসলামপন্থিদের নির্মূলের হুমকি দেওয়া-সে ঘৃণার রাজনীতিরই ফসল। কিন্তু ভূলে যাচ্ছে, ঘৃণার যে বীজগুলি তারা অবিরাম ছিটাচ্ছে একসময় তা ফলবান বিশাল বৃক্ষে পরিণত হবে। এবং সে বিষবৃক্ষে শান্তি নয়, একমাত্র ঘৃণার বোমাই ফলবে। আর ঘৃণার সে বোমাগুলি একবার ফাটা শুরু করলে তাদের রাজনীতিই শুধু অসম্ভব হবে না, হাত পড়বে তাদের অস্তিত্বেও। সংঘাতটি আরো রক্তাত্ব হওয়ার নিশ্চিত কারণ হলো, এক পক্ষের কাছে সেটি পবিত্র জিহাদে পরিণত হবে। দেশ তখন আরেক ইরাক, আরেক আফগানিস্তান বা আলজেরিয়ায় পরিণত হবে। আওয়ামী লীগ কি জেনেবুঝে দেশকে সে দিকেই ধাবিত করছে?

 




আওয়ামী দুঃশাসনের দুই পর্বঃ  মুজিব-আমল ও হাসিনা-আমল

আওয়ামী দুঃশাসন ও হাসিনা বড়াই –

মানব চরিত্রে পরিবর্তন আসে তার দৈহীক গুণের কারণে নয়। জলবায়ু, ভূগোল বা সম্পদের গুণেও নয়। বরং ধ্যান­-ধারনা ও বিশ্বাসের কারণে। ধ্যান­-ধারনা ও বিশ্বাস পাল্টে গেলে তাই চরিত্রও পাল্টে যায়। নবী-রাসূলগণ তাই মানব চরিত্র পাল্টাতে তাদের বিশ্বাসে হাত দিয়েছেন। নবীজী (সাঃ)র  আমলে সাহবাদের চরিত্রে যে মহান বিপ্লব এসেছিল এবং যেভাবে নির্মিত হয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা -সেটি জীবন ও জগত নিয়ে তাদের বিশ্বাসে আমূল বিপ্লব আসার কারণে। সে বিশ্বাস পাল্টাতে কাজ করেছেন মহান আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর জ্ঞান নিয়ে। সে রূপ কোন ধ্যান-ধারণা ও জ্ঞানের বিপ্লব আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জীবনে বিগত সত্তর বছরেও আসেনি। বরং তাদের সর্বাত্মক প্রয়াস পুরনো ও ব্যর্থ বিশ্বাসগুলোকে ধরে রাখায়। ফলে আওয়ামী লীগের বয়স বাড়লেও দলটির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনে কোনরূপ চারিত্রিক পরিবর্তন আসেনি। বরং বয়সের ভারে চোরডাকাতের জীবনে যেমন চুরিডাকাতিতে নৃশংস অভিজ্ঞতা আসে তেমনি নৃশৃংসতা এসেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জীবনেও। ফলে রাজনৈতীক সমাবেশ করা, মিছিল করা,পত্রিকা প্রকাশ করার ন্যায় জনগণের মৌলিক অধিকার হননে মুজিব যেরূপ বাকশালী একদলীয় শাসন চালু করেছিল, হাসিনা সেটি করছে বাকশাল চালু না করেই।

মুজিব দেশে লাল বাহিনী, রক্ষিবাহিনী, দলীয় স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী নামিয়ে তিরিশ-চল্লিশ হাজার মানুষ খুন করেছিল, কিন্তু ঢাকার রাজপথে একরাতে ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন সেনা ও পুলিশ নামিয়ে শত শত মানুষ হত্যার ন্যায় নৃশংসতা দেখাতে ভয় পেয়েছিল। ফলে তার হাতে শাপলা চত্ত্বরের ন্যায় গণহত্যা হয়নি।কিন্তু শেখ হাসিনা সে গণহত্যাটি ঘটিয়েছে কোনরূপ দ্বিধাদ্বন্দ না করেই, এবং তেমন একটি ভয়ানক নৃশংসতার পরও হাসিনা বলছে সে রাতে কিছুই হয়নি। দূর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে,অথচ তারপরও হাসিনার বড়াই,দেশ তার আমলেই সবচেয়ে বেশী উন্নতি করেছে। দেশ যে কতটা দ্রুত দূর্নীতিতে ডুবে যাচ্ছে সেটির কিছুটা বিবরণ পাওয়া যায় সম্প্রতি শেখ হাসিনার প্রতি লেখা জনৈক লায়েকুজ্জামানের লেখা একটি খোলা চিঠিতে। সে চিঠি থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি দেয়া যাকঃ “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একটু খোঁজ-খবর নিয়ে দেখুন মন্ত্রী-এমপিরা কি করেছেন এলাকায়। .. তারা আচার-আচরণে, চলনে-বলনে কেবল আপনাকেই তুষ্ট রাখে বাক্যবাণে, কারণ আপনি হচ্ছেন তাদের কামাই-জামাই করার তাবিজ। ..বড় হচ্ছে মালপানি। বৃহত্তর ফরিদপুর থেকে নির্বাচিত একজন এমপি আগে ভাঙাচুরা একটা গাড়ি ব্যবহার করতেন, এখন তার দামি গাড়ি তিনটি। আগে থাকতেন ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে, এখন ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক। ওই এমপির নির্বাচনী এলাকার দলীয় কর্মীদের অভিযোগ, যারা টাকা নিয়ে আসেন তারা এমপির বাসার দোতলায় যেতে পারেন, যারা টাকা আনেন না তাদের ঠিকানা নিচে, তারা ওপরের তলায় পৌঁছতে পারেন না। ..চট্টগ্রামে বনকর্মীদের ত্রাহি অবস্থা, চেটেপুটে যারা খাচ্ছে তাদের কিছু বলার ক্ষমতা নেই বনকর্মীদের। এক ক্ষমতাধর মন্ত্রীর নিকট আত্মীয় তারা। হয়তো আপনার কাছে রিপোর্ট আছে অথবা নেই- কম করে হলেও ১০০ এমপিকে এলাকায় যেতে হয় হয়তো পুলিশ না হয় প্রাইভেট বাহিনী নিয়ে। ..কয়েক মাস আগে রাজশাহীর এক এমপিকে নিজের নির্বাচনী এলাকা থেকে ফিরতে হয়েছে দু’হাতে পিস্তলের গুলি ছুড়তে ছুড়তে। বিক্ষুব্ধ কর্মীদের রোষানল থেকে জীবন বাঁচাতে গুলি ছুড়ে পালাতে হয়েছে এমপিকে। এক কমিউনিস্ট মন্ত্রীর ভাগ্নে কিভাবে লুটে খাচ্ছে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুই দপ্তরের টেন্ডার- চোখ মেললেই তা দেখা যাবে। ওই কমিউনিস্ট মন্ত্রী ঢাকার প্লট বরাদ্দ দিচ্ছেন তার নির্বাচনী এলাকার নিকট আত্মীয়দের নামে। সরাসরি কোটার ওই প্লট পেতে অন্যরা গেলে তিনি বলে দেন প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ লাগবে। বৃহত্তর ফরিদপুরের আরেক জাঁদরেল মন্ত্রীর সোনার ভাই তো এলাকায় মন্ত্রীর জনপ্রিয়তা তলানিতে এনে ঠেকিয়েছেন। জেলার সব কাজে মন্ত্রীর ভাইয়ের পার্সেন্টেজ লাগবে, কাজের আগে বাড়িতে তার ভাগের টাকা পৌঁছে দিতে হয়। মন্ত্রী আবার জনসভাতে ভাইয়ের প্রশংসা করে বলেন, এমন ভাই পাওয়া যায় কপাল ফেরে। নিশ্চুপ হয়ে যান কর্মীরা, ধমকের ভয়ে কেউ সত্য কথাটা বলেন না মন্ত্রীকে। দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার এক জেলা সদরের হায়ার করা একদা বাম নেতা এমপি তো বহাল তবিয়তে লুটে যাচ্ছেন তার দুই পুত্রধন আর এক মদের ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতাকে সঙ্গে নিয়ে। ওই জেলার পাশে সীমান্ত এলাকার আরেক এমপি পুরো নির্বাচনী এলাকার টাকা রোজগারের সেক্টরগুলো তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ রেখেছেন নিজের হাতে, অন্য দুই সেক্টরের একটি দিয়েছেন ছেলেকে, আরেকটি বউকে। উত্তরবঙ্গের এক মন্ত্রী মাঠে ছেড়ে দিয়েছেন তার ছেলেকে। টয়লেট নির্মাণের টেন্ডার হলেও তার ছেলে হাজির হয় সেখানে। দু’চারজন মন্ত্রী-এমপি বাদে বেশির ভাগেরই একই অবস্থা। এতো গেল কামাই রোজগারের দিক। এতো গেল এমপি-মন্ত্রীদের কথা। আপনার আশপাশ দিয়ে যারা আছেন তাদের খবর কি? নিজের এলাকায় তারা কত বিঘা জমি কিনেছেন, ক’টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান করেছেন একটু খবর নিলেই জানতে পারবেন ওই সব ফুটন্ত গোলাপের কথা, সর্বশেষ তারা বিসিএস নিয়োগে ডাক তুলেছেন ১০ লাখ করে। ওই সব হচ্ছে আপনার নাগের ডগায় বসে। আপনার আশপাশেই তারা টাকা বানানোর মেশিন বসিয়েছে”।

আওয়ামী যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখন যে শুধু দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি সংকটে পড়ে তা নয়।প্রচন্ড ধস নেমে আসে দেশের প্রবাহমান ন্যায়নীতি, আচার-ব্যাবহার ও মূল্যবোধেও। ভয়ানক দুর্বৃ্ত্তিতে নামে তখন সমগ্র প্রশাসন। চোরডাকাতগণ তখন যেন প্রবল বল পায়। তাদের কারণে তখন ধস নামে দেশের শেয়ার বাজারে। সীমাহীন ডাকাতি শুরু হয় দেশের অর্থ ভান্ডারে। সন্ত্রাসীরা তখন দল বেঁধে প্রকাশ্য রাজপথে নেমে আসে। পুলিশ, র‌্যাব, বিজীবী তখন খুনিতে পরিণত হয়। হলমার্ক, ডিস্টিনী, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ন্যায় কোম্পানীগুলো যেভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ডাকাতি করলো সেটি কি আর কোন আমলে হয়েছে? সরকারি চোর-ডাকাতদের কারণেই পদ্মাসেতুর বরাদ্দকৃতত ঋণ বাতিল হয়ে গেল। ফলে পিছিয়ে গেল পদ্মা সেতুর ন্যায় দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। এতে শুধু পদ্মা সেতু পিছিয়ে গেল না, বহু বছরের জন্য পিছিয়ে গেল সমগ্র দেশ। আমরা এমনিতেই বিশ্বের বহু দেশ থেকে নানা ভাবে পিছিয়ে আছি। এখন আর পিছিয়ে থাকার সময় আছে? এখন তো অতি দ্রুত সামনে এগুনোর সময়।কিন্তু বর্তমান সরকার সে এগিয়ে যাওয়াই অসম্ভব করে রেখেছে। দূর্নীতির দায়ে পদ্মা সেতু ভেস্তে গেলে কী হবে, সে দূর্নীতির দায়ে কারো কি কোন শাস্তি হয়েছে? বিশ্বব্যাংক এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী হৈ চৈ করলেও হাসিনা সরকারের কি তাতে ঘুম ভেঙ্গেছে? বাংলাদেশ মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বরে যেভাবে শত শত মানুষকে হত্যা করা হলো এবং গুম করা হলো অসংখ্য লাশ হলো সেটিই বা আর কোন কালে হয়েছে? আজ যেভাবে ইসলামপন্থিদের ধরে ধরে নির্যাতন করা হচ্ছে সেটি কি আবু জেহল ও আবু লাহাবের আমলের বর্বরতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় না? শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে এটিই কি ইসলামপন্থিদের প্রাপ্য? বায়তুল মোকাররম মসজিদের গেটে পুলিশ তালা পর্যন্ত ঝুলিয়েছে, এভাবে মুসল্লিদের মসজিদের ঢুকতেও বাধা দেয়া হচ্ছে। কোন মুসলিম দেশে কি সেটি ভাবা যায়? সরকার পরিকল্পিত ভাবে দেশকে একটি সংঘাতের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

মিথ্যার সয়লাব ও বেইজ্জতি দেশবাসীর

আবহমান কাল থেকেই মানব জাতির মাঝে দুটি পক্ষ। একটি সত্যের, অপরটি মিথ্যার। নির্ভেজাল সত্যটি আসে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। সে সত্য থেকেই মানুষ পায় কোনটি ন্যায় এবং কোনটি অন্যায় তার একটি নির্ভূল ধারণা। সে ধারণাটি দৈহীক বলেও আসে না, কলকারখানায়ও আবিস্কৃত হয় না। মানব জাতিকে সত্যের সন্ধানটি দিতেই করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালা এ পৃথিবীকে লক্ষাধিক নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। সে মহাসত্য বিধানটি হলো ইসলাম। মানব জীবনে সবচেয়ে বড় কর্মটি হলো সে সত্যের অনুসরণ। এর চেয়ে বড় মহৎ কর্ম এ সংসারে দ্বিতীয়টি নাই। সে সত্য অনুসরণের ফলেই মু’মিন ব্যক্তি মৃত্যুর পর জান্নাত পায়। এবং এ পৃথিবীও নেক আমলে ভরে উঠে। এটিই ইসলামী মিশন। অপরদিকে শয়তান ও তার অনুসারিদের লক্ষ্য হলো ইসলামের সে কোরআনী সত্যকে সর্বভাবে প্রতিরোধ করা। সে কাজে তাদের মূল অস্ত্রটি হলো অসত্য তথা মিথ্যা। যারাই কোরআনী সত্যের অনুসারি নয়, তারাই মূলত শয়তানের অনুসারি। তাদের রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস –সবকিছুই তখন হয়ে পড়ে মিথ্যা নির্ভর। সত্যের অনুসারিদের পরাজিত করতে তারা তখন মিথ্যাকে সর্বভাবে বলবান করে। নর্দমার কীট যেমন আবর্জনায় বেচে থাকে এরাও তেমনি মিথ্যার উপর বেঁচে থাকে। আল্লাহ প্রদত্ত সত্যের আলোকে নিভিয়ে দিতে শয়তানি পক্ষটি এজন্যই যুগে যুগে মিথ্যার জাল বিস্তার করেছে। আর মিথ্যার বিজয় এলে মিথ্যুক দুর্বৃত্তরাও তখন মর্যাদা পায়। সে মিথ্যার প্রবল জোয়ারের কারণেই নমরুদ ফিরাউন বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে খোদা রূপে স্বীকৃত পেয়েছে। উপাস্য রূপে  স্বীকৃতি পেয়েছে কোটি কোটি গরুবাছুর, শাপশকুন, নদীনালা, পাহাড়-পর্বত ও প্রাণহীন মুর্তি। একই ভাবে মিথ্যার উপাস্যদের কাছে অতি নৃশংস খুনি ও স্বৈরাচারি শাসকেরা্ও রাষ্ট্রের নেতা, দেশের বন্ধু, জাতির পিতা এরূপ নানা খেতাবে ভুষিত হয়েছে। দেশে শয়তানের এ পক্ষটি ক্ষমতায় আসলে তাই সে দেশে মিথ্যার জোয়ার শুরু হওয়াটাই নিয়ম। বাংলাদেশ আজ সে জোয়ারেই প্লাবিত। কারণ, বাংলাদেশে আজ যারা ক্ষমতাসীন তারা ইসলামের পক্ষের শক্তি নয়। তাদের অবস্থান যে ইসলামের বিপক্ষে -সেটি তারা গোপনও রাখেনি। ইসলামের শরিয়তি বিধানের পরাজয় এবং ইসলামপন্থিদের হত্যা ও নির্যাতনের মাঝেই যে তাদের উৎসব -সেটিও তারা জাহির করছে বার বার। এদের কারণেই বাংলাদেশে আজ মিথ্যার প্রচন্ড সয়লাব। সে মিথ্যার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।

আওয়ামী সরকারের আবিস্কৃত মিথ্যার সংখ্যা অসংখ্য। সেটি যেমন মুজিব আমলে, তেমনি হাসিনার আমলে। মুজিবামলেই রচিত হয়েছিল একাত্তরে  তিরিশ লাখ নিহতের গাঁজাখোরি মিথ্যাটি। বলা হয়েছিল, বাংলা ভাষা ও বাঙালীর নির্মূলই হলো পাকিস্তান সরকারের মূল লক্ষ্য। মিথ্যাচারিরা স্বভাবতঃই বিবেকশূণ্য হয়। প্রকট মিথ্যাকে সত্য থেকে পার্থক্য করার জন্য যে কান্ডজ্ঞান লাগে সে কান্ডজ্ঞানের মৃত্যুটা এখানে জরুরী, নইলে গরুছাগলকে যেমন দেবতা বলা যায় না,তেমনি ফিরাউন-নমরুদকে ভগবান এবং মুজিবের ন্যায় বাকশালী গণশত্রুদের নেতা, পিতা বা বন্ধু বলার রূচি সৃষ্টি হয় না। বাংলাদেশের বুকে আওয়ামী শাসন মূলত সে মিথ্যার আবাদই বিপুল ভাবে বাড়িয়েছে। তাই নয় মাসে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করতে হলে যে প্রতিদিন ১১ হাজার মানূষ হত্যা করতে হয় সে হিসাব করার মত বিবেকটুকুও আওয়ামী বাকশালীদের ছিল না।

সম্প্রতি তারা আরেক মিথ্যা আবিস্কার করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। সেটি রানা প্লাজা ধসে যাওয়ার ১৭ দিন পর সে ধ্বংসস্তুপ থেকে রেশমাকে উদ্ধারের মধ্য দিয়ে। সত্য ঘটনা থেকে মানুষের নজর কাড়ার ক্ষেত্রে অলীক মিথ্যার সে সামর্থটি বিশাল। হাসিনা ও তার দলবল সেটি বুঝে,তাই তাদের দ্বারা ঘটে রেশমা কাহিনীর আবিস্কার। বিশ্ববাসীকে সে মিথ্যাটি তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। শুধু দেশবাসীর নয়, বিশ্ববাসীর নজরও সে ঘটনাটি কেড়ে নিয়েছিল। এভাবে সরকার প্রমাণ করতে চেয়েছিল তার সরকারের পরিচালিত উদ্ধার কাজটি কতই না চমৎকার ও সফল। সরকার তেমন একটি অহংকার নিয়েই তো উদ্ধারকাজে বিদেশীদের সহায়তা দানের প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মিথ্যা দিয়ে অপরাধীদের যেমন কলংকমোচন হয় না,তেমনি সে পথে তাদের ইজ্জতও বাড়ে না। কারণ মিথ্যাকে বেশী দিন গোপন রাখা যায় না। রেশমা উদ্ধারের কাহিনীটি যে অলীক মিথ্যা ছিল -সেটি আজ আবিস্কৃত হয়েছে। আবিস্কৃত সে সত্যটি আজ বিশ্বব্যাপী বিপুল প্রচারও পাচ্ছে। লন্ডনের বহুল প্রচারিত ডেইলী মিরর তা নিয়ে এক নিবন্ধ ছেপেছে। সেরূপ খবর ছাপা হচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও। আর এতে কালিমা লেপন হচ্ছে শুধু শেখ হাসিনার মুখে নয়, বাংলাদেশীদের মুখেও। দেশে মশা মাছি ও গলিত আবর্জনার বাড়লে ম্যালেরিয়া,কলেরা ও টাইফয়েডের ন্যায় রোগভোগও বাড়ে। তাতে মানুষের মৃত্যুও বাড়ে। দুষিত পরিবেশে বসবাসের এটিই বিপদ। তেমনি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেল অথচ বাকশালী স্বৈরাচার নেমে আসলো না,দেশের সম্পদ লুন্ঠিত হলো না বা পথে ঘাটে মানুষ লাশ হলো না –সেটি কি ভাবা যায়? গোখরা শাপ যেমন বিষ নিয়ে চলাফেরা করে,আওয়ামী লীগও তেমনি বেঁচে থাকে গণতন্ত্রধ্বংসী, অর্থনীতি ধ্বংসী তথা দেশধ্বংসী এক নাশকতামূলক চরিত্র নিয়ে। হাসিনার দুঃশাসন কি সেটিই প্রমাণ করছে না?

 

মুজিবী দুঃশাসনের দিনগুলি

মুজিবী দুঃশাসনের সে দিনগুলি বাংলাদেশের মানুষ আজ প্রায় ভূলতে বসেছে। অথচ আওয়ামী লীগ ও আজকের হাসিনা আমলের এ দুঃশাসন বুঝতে হলে মুজিবী দুঃশাসন বুঝাটি অতি জরুরী। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয় বলেই বোকাদের পা একই গর্তে বার বার পড়ে। অথচ নবীজী (সাঃ) বলেছেন, ঈমানদের পা কখনোই একই গর্তে বার বার পড়ে না। কারণ অতীত ইতিহাস থেকে তারা শিক্ষা নেয়। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানদের ক্ষেত্রে সে জ্ঞানলাভটি ঘটেনি। ফলে একই গর্তে তাদের পা বার বার পড়ছে। ফলে তাদের জীবনে আওয়ামী দুঃশাসন বার বার নেমে আসছে। আওয়ামী নেতাকর্মীদের কাছে স্বর্ণযুগ হলো মুজিবামল। নবাব শায়েস্তা খাঁর আমল তাদের কাছে কিছুই না। মুজিবই হলো তাদের কাছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী। কিন্তু কীরূপ ছিল সে মুজিবামল? মুজিবকে চিনতে হলে ইতিহাসের সে পাঠটি নেয়া অতি জরুরী। তবে সমস্যা হলো সে আমলের প্রকৃত চিত্রটি বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় মেলে না। সুপরিকল্পিত ভাবে সে বিবরণগুলি গায়েব করা হয়েছে। স্থান পেয়েছে শুধু মুজিব বন্দনা। কিন্তু সে ইতিহাসটি বেঁচে আছে বিদেশী পত্র-পত্রিকায়। এ নিবন্ধে সে আমলের বিদেশী পত্রিকা থেকেই কিছু উদাহরণ পেশ করা হবে। বাংলাদেশ সে সময় কোন ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সাহিত্য,জ্ঞান-বিজ্ঞান বা খেলাধুলায় চমক সৃষ্টি করতে না পারলেও বিশ্বব্যাপী খবরের শিরোনাম হয়েছিল দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি, হত্যা, সন্ত্রাস, ব্যর্থ প্রশাসন ও স্বৈরাচারের দেশ হিসাবে।

১৯৭৪ সালের ৩০ শে মার্চ গার্ডিয়ান পত্রিকা লিখেছিল,“আলীমুদ্দিন ক্ষুধার্ত। সে ছেঁড়া ছাতা মেরামত করে। বলল, যেদিন বেশী কাজ মেলে,সেদিন এক বেলা ভাত খাই। যেদিন তেমন কাজ পাই না সেদিন ভাতের বদলে চাপাতি খাই। আর এমন অনেক দিন যায় যেদিন কিছুই খেতে পাই না।” তার দিকে এক নজর তাকালে বুঝা যায় সে সত্য কথাই বলছে। সবুজ লুঙ্গির নীচে তার পা দু’টিতে মাংস আছে বলে মনে হয় না। ঢাকার ৪০ মাইল উত্তরে মহকুমা শহর মানিকগঞ্জ। ১৫ হাজার লোকের বসতি। তাদের মধ্যে আলীমুদ্দিনের মত আরো অনেকে আছে। কোথাও একজন মোটা মানুষ চোখে পড়ে না। কালু বিশ্বাস বলল,“আমাদের মেয়েরা লজ্জায় বের হয় না-তারা নগ্ন।” আলীমুদ্দিনের কাহিনী গোটা মানিকগঞ্জের কাহিনী। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাহিনী,শত শত শহর বন্দরের কাহিনী। এ পর্যন্ত বিদেশ থেকে ৫০ লাখ টনেরও বেশী খাদ্যশস্য বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যাদের জন্য পাঠানো হয়েছে তারা পায়নি।”

 

আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি

১৯৭৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখে লন্ডনের নিউ স্টেট্সম্যান লিখেছিল,“বাংলাদেশ আজ বিপদজনক ভাবে অরাজকতার মুখোমুখি। লাখ লাখ লোক ক্ষুধার্ত। অনেকে না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে। .. ক্ষুধার্ত মানুষের ভীড়ে ঢাকায় দম বন্ধ হয়ে আসে।.. বাংলাদেশ আজ দেউলিয়া। গত আঠার মাসে চালের দাম চারগুণ বেড়েছে। সরকারি কর্মচারিদের মাইনের সবটুকু চলে যায় খাদ্য-সামগ্রী কিনতে। আর গরীবরা থাকে অনাহারে। কিন্তু বিপদ যতই ঘনিয়ে আসছে শেখ মুজিব ততই মনগড়া জগতে আশ্রয় নিচ্ছেন। ভাবছেন, দেশের লোক এখনও তাঁকে ভালবাসে;সমস্ত মুসিবতের জন্য পাকিস্তানই দায়ী। আরো ভাবছেন,বাইরের দুনিয়া তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসবে এবং বাংলাদেশ উদ্ধার পাবে। নিছক দিবাস্বপ্ন.. দেশ যখন বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে,তখনও তিনি দিনের অর্ধেক ভাগ আওয়ামী লীগের চাইদের সাথে ঘরোয়া আলাপে কাটাচ্ছেন। .. তিনি আজ আত্মম্ভরিতার মধ্যে কয়েদী হয়ে চাটুকার ও পরগাছা পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন।…সদ্য ফুলে-ফেঁপে ওঠা তরুণ বাঙালীরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের শরাবখানায় ভীড় জমায়। তারা বেশ ভালই আছে। এরাই ছিল মুক্তিযোদ্ধা- বাংলাদেশের বীর বাহিনী। .. এরাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের বাছাই করা পোষ্য। আওয়ামী লীগের ওপর তলায় যারা আছেন তারা আরো জঘন্য। .. শুনতে রূঢ় হলেও কিসিঞ্জার ঠিকই বলেছেনঃ “বাংলাদেশ একটা আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি।”

১৯৭৪ সালে ২রা অক্টোবর,লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় জেকুইস লেসলী লিখেছিলেন,“একজন মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে,আর অসহায় দৃষ্টিতে তার মরণ-যন্ত্রণাকাতর চর্মসার শিশুটির দিকে তাকিয়ে আছে। বিশ্বাস হতে চায় না, তাই কথাটি বোঝাবার জন্য জোর দিয়ে মাথা নেড়ে একজন ইউরোপীয়ান বললেন, সকালে তিনি অফিসে যাচ্ছিলেন,এমন সময় এক ভিখারি এসে হাজির। কোলে তার মৃত শিশু। ..বহু বিদেশী পর্যবেক্ষক মনে করেন বর্তমান দুর্ভিক্ষের জন্য বর্তমান সরকারই দায়ী। “দুর্ভিক্ষ বন্যার ফল ততটা নয়,যতটা মজুতদারী চোরাচালানের ফল”-বললেন স্থানীয় একজন অর্থনীতিবিদ।.. প্রতি বছর যে চাউল চোরাচালন হয়ে (ভারতে) যায় তার পরিমাণ ১০ লাখ টন।”  ১৯৭৪ সালের ২৫ অক্টোবর হংকং থেকে প্রকাশিত ফার ইস্টার্ণ ইকোনমিক রিভিয়্যূ পত্রিকায় লরেন্স লিফসুলজ লিখেছিলেন,“সেপ্টেম্বর তৃতীয় সপ্তাহে হঠাৎ করে চাউলের দাম মণ প্রতি ৪০০ টাকায় উঠে গেল। অর্থাৎ তিন বছরে আগে -স্বাধীনতার পূর্বে যে দাম ছিল – এই দাম তার দশ গুণ। এই মূল্যবৃদ্ধিকে এভাবে তুলনা করা যায় যে,এক মার্কিন পরিবার তিন বছর আগে যে রুটি ৪০ সেন্ট দিয়ে কিনেছে,তা আজ কিনছে ৪ পাউন্ড দিয়ে। কালোবাজারী অর্থনীতির কারসাজিতেই এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।..২৩শে সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে শেখ মুজিব ঘোষণা করলেন,“প্রতি ইউনিয়নে একটি করে মোট ৪,৩০০ লঙ্গরখানা খোলা হবে।” প্রতি ইউনিয়নের জন্য রোজ বরাদ্দ হলো মাত্র দুমন ময়দা। যা এক হাজার লোকের প্রতিদিনের জন্য মাথাপিছু একটি রুটির জন্যও যথেষ্ট নয়।”

নিউয়র্ক টাইমস পত্রিকা ১৯৭৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর তারিখে লিখেছিল,“জনৈক কেবিনেট মন্ত্রীর কথা বলতে গিয়ে একজন বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ বললেন, “যুদ্ধের পর তাঁকে (ঐ মন্ত্রীকে) মাত্র দুই বাক্স বিদেশী সিগারেট দিলেই কাজ হাসিল হয়ে যেত,এখন দিতে হয় অন্ততঃ এক লাখ টাকা।” ব্যবসার পারমিট ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য আওয়ামী লীগারদের ঘুষ দিতে হয়। সম্প্রতি জনৈক অবাঙালী শিল্পপতী ভারত থেকে ফিরে আসেন এবং শেখ মুজিবের কাছ থেকে তার পরিত্যক্ত ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানাটি পুনরায় চাল করার অনুমোদন লাভ করেন। শেখ মুজিবের ভাগিনা শেখ মনি -যিনি ঐ কারখানাটি দখল করে আছেন-হুকুম জারি করলেন যে তাকে ৩০ হাজার ডলার দিতে হবে। শেখ মুজিবকে ভাল করে জানেন এমন একজন বাংলাদেশী আমাকে বললেন,“লোকজন তাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করুক,এটা তিনি পছন্দ করেন। তাঁর আনুগত্য নিজের পরিবার ও আওয়ামী লীগের প্রতি। তিনি বিশ্বাসই করেন না যে, তারা দুর্নীতিবাজ হতে পারে কিংবা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে।”

 

পথেঘাটে লাশ ও জালপড়া বাসন্তি

দেখা যাক,প্রখ্যাত তথ্য-অনুসন্ধানী সাংবাদিক জন পিলজার ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সম্পর্কে কি বলেছিলেন। তিনি ১৯৭৪ সালের ১৭ই ডিসেম্বর লন্ডনের ডেইলী মিরর পত্রিকায় লিখেছেন,“একটি তিন বছরের শিশু -এত শুকনো যে মনে হলো যেন মায়ের পেটে থাকাকালীন অবস্থায় ফিরে গেছে। আমি তার হাতটা ধরলাম। মনে হলো তার চামড়া আমার আঙ্গুলে মোমের মত লেগে গেছে। এই দুর্ভিক্ষের আর একটি ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান এই যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ৫০ লাখ মহিলা আজ নগ্ন দেহ। পরিধেয় বস্ত্র বিক্রি করে তারা চাল কিনে খেয়েছে।” পিলজারের সে বক্তব্য এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সে অভিমতের প্রমাণ মেলে ইত্তেফাকের একটি রিপোর্টে। উত্তর বংগের এক জেলেপাড়ার বস্ত্রহীন বাসন্তি জাল পড়ে লজ্জা ঢেকেছিল। সে ছবি ইত্তেফাক ছেপেছিল। পিলজার আরো লিখেছেন,“সন্ধা ঘনিয়ে আসছে এবং গাড়ী আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম-এর লরীর পিছনে পিছনে চলেছে। এই সমিতি ঢাকার রাস্তা থেকে দুর্ভিক্ষের শেষ শিকারটিকে কুড়িয়ে তুলে নেয়। সমিতির ডাইরেক্টর ডাঃ আব্দুল ওয়াহিদ জানালেন,“স্বাভাবিক সময়ে আমরা হয়ত কয়েক জন ভিখারীর মৃতদেহ কুড়িয়ে থাকি। কিন্তু এখন মাসে অন্ততঃ ৬০০ লাশ কুড়াচ্ছি- সবই অনাহার জনিত মৃত্যু।”

লন্ডনের “ডেইলী টেলিগ্রাফ” ১৯৭৫ সালের ৬ই জানুয়ারি ছেপেছিল,“গ্রাম বাংলায় প্রচুর ফসল হওয়া সত্ত্বেও একটি ইসলামিক কল্যাণ সমিতি (আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম) গত মাসে ঢাকার রাস্তা,রেল স্টেশন ও হাসাপাতালগুলোর মর্গ থেকে মোট ৮৭৯টি মৃতদেহ কুড়িয়ে দাফন করেছে। এরা সবাই অনাহারে মরেছে। সমিতিটি ১৯৭৪ সালের শেষার্ধে ২৫৪৩টি লাশ কুড়িয়েছে- সবগুলি বেওয়ারিশ। এগুলোর মধ্যে দেড় হাজারেরও বেশী রাস্তা থেকে কুড়ানো। ডিসেম্বরের মৃতের সংখ্যা জুলাইয়ের সংখ্যার সাতগুণ।.. শেখ মুজিবকে আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বোঝা বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ছোট-খাটো স্বজন প্রীতির ব্যাপারে তিনি ভারী আসক্তি দেখান। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া বাঁকী পড়ে থাকে।.. অধিকাংশ পর্যবেক্ষকদের বিশ্বাস,আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকট রোধ করার কোন সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম এ সরকারের নেই। রাজনৈতিক মহলো মনে করেন, মুজিব খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বুনিয়াদ আরো নষ্ট করে দেবেন। তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছেন। ডেইলী টেলিগ্রাফের আশংকা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। জরুরী অবস্থা জারি করেছেন, আরো বেশী ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন। অবশেষে তাতেও খুশি হননি, সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে তিনি একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। আওয়ামী লীগ যাকে নিয়ে গর্ব করে, এ হলো তার অবদান।

১৯৭৫ সালের ২১শে মার্চ বিলেতের ব্রাডফোর্ডশায়র লিখেছিল,“বাংলাদেশ যেন বিরাট ভুল। একে যদি ভেঙ্গে-চুরে আবার ঠিক করা যেত। জাতিসংঘের তালিকায় বাংলাদেশ অতি গরীব দেশ। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে যখন বন্যা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে দেশের দক্ষিণ অঞ্চল ডুবে যায় তখন দুনিয়ার দৃষ্টি এ দেশের দিকে – অর্থাৎ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের দিকে নিবদ্ধ হয়। রিলিফের বিরাট কাজ সবে শুরু হয়েছিল। এমনি সময়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুণ জ্বলে উঠল। –কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ যখন শুরু হলো,তখন জয়ের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। একমাত্র ভারতের সাগ্রহ সামরিক হস্তক্ষেপের ফলেই স্বল্পস্থায়ী-কিন্তু ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী- যুদ্ধের পর পাকিস্তানের পরাজয় ঘটে এবং বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়।” পত্রিকাটি লিখেছে, “উড়োজাহাজ থেকে মনে হয়,যে কোন প্রধান শহরের ন্যায় রাজধানী ঢাকাতেও বহু আধুনিক অট্রালিকা আছে। কিন্তু বিমান বন্দরে অবতরণ করা মাত্রই সে ধারণা চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যায়। টার্মিনাল বিল্ডিং-এর রেলিং ঘেঁষে শত শত লোক সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, কেননা তাদের অন্য কিছু করার নাই। আর যেহেতু বিমান বন্দর ভিক্ষা করবার জন্য বরাবরই উত্তম জায়গা।”

পত্রিকাটি আরো লিখেছে,”আমাকে বলা হয়েছে,অমুক গ্রামে কেউ গান গায়না। কেননা তারা কি গাইবে? আমি দেখেছি,একটি শিশু তার চোখে আগ্রহ নেই,গায়ে মাংস নেই। মাথায় চুল নাই। পায়ে জোর নাই। অতীতে তার আনন্দ ছিল না, বর্তমান সম্পর্কে তার সচেতনতা নাই এবং ভবিষ্যতে মৃত্যু ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না সে।” দেশে তখন প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ চলছিল। হাজার হাজার মানুষ তখন খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছিল। মেক্সিকোর “একসেলসিয়র” পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবকে যখন প্রশ্ন করা হলো, খাদ্যশস্যের অভাবের ফলে দেশে মৃত্যুর হার ভয়াবহ হতে পারে কিনা,শেখ মুজিব জবাব দিলেন,“এমন কোন আশংকা নেই।” প্রশ্ন করা হলো,“মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,পার্লামেন্টে বিরোধীদল বলেন যে,ইতিমধ্যেই ১৫ হাজার মানুষ মারা গেছে।” তিনি জবাব দিলেন,“তারা মিথ্যা বলেন।” তাঁকে বলা হলো,”ঢাকার বিদেশী মহলো মৃত্যু সংখ্যা আরও বেশী বলে উল্লেখ করেন।” শেখ মুজিব জবাব দিলেন,“তারা মিথ্যা বলেন।” প্রশ্ন করা হলো,দুর্নীতির কথা কি সত্য নয়? ভুখাদের জন্য প্রেরিত খাদ্য কি কালোবাজারে বিক্রী হয় না..? শেখ বললেন, “না। এর কোনটাই সত্য নয়।”(এন্টার প্রাইজ,রিভার সাইড,ক্যালিফোর্নিয়া, ২৯/০১/৭৫)।

বাংলাদেশ যে কতবড় মিথ্যাবাদী ও নিষ্ঠুর ব্যক্তির কবলে পড়েছিল এ হলো তার নমুনা। দেশে দুর্ভিক্ষ চলছে,সে দুর্ভিক্ষে হাজার মানুষ মরছে সেটি তিনি মানতে রাজী নন। দেশে কালোবাজারী চলছে,বিদেশ থেকে পাওয়া রিলিফের মাল সীমান্ত পথে ভারতে পাড়ী জমাচ্ছে এবং সীমাহীন দুর্নীতি চলছে সেটি বিশ্ববাসী মানলেও তিনি মানতে চাননি। অবশেষে পত্রিকাটি লিখেছে,“যে সব সমস্যা তার দেশকে বিপর্যস্ত করত সে সবের কোন জবাব না থাকায় শেখের একমাত্র জবাব হচ্ছে তাঁর নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা বৃদ্ধি। জনসাধারণের জন্য খাদ্য না হোক,তার অহমিকার খোরাক চাই।” (এন্টার প্রাইজ,রিভার সাইড, ক্যালিফোর্নিয়া,২৯/০১/৭৫)।

 

কবরে গেল গণতন্ত্র

শেখ মুজিব যখন বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন তখন লন্ডনের ডেইলী টেলিগ্রাফে পিটার গিল লিখেছিলেন,“বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দেশ থেকে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটুকু লাথি মেরে ফেলে দিয়েছেন। গত শনিবার ঢাকার পার্লামেন্টের (মাত্র) এক ঘণ্টা স্থায়ী অধিবেশনে ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে শেখ মুজিবকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছে এবং একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকে ক্ষমতা অর্পণ করেছে। অনেকটা নিঃশব্দে গণতন্ত্রের কবর দেয়া হয়েছে। বিরোধীদল দাবী করেছিল,এ ধরণের ব্যাপক শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের ব্যাপারে আলোচনার জন্য তিন দিন সময় দেয়া উচিত। জবাবে সরকার এক প্রস্তাব পাশ করলেন যে,এ ব্যাপারের কোন বিতর্ক চলবে না। .. শেখ মুজিব এম.পি.দের বললেন, পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র ছিল “ঔপনিবেশিক শাসনের অবদান”। তিনি দেশের স্বাধীন আদালতকে “ঔপনিবেশিক ও দ্রুত বিচার ব্যাহতকারী” বলে অভিযুক্ত করলেন।” অথচ পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিব ও তাঁর আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী পদ্ধতির গণতন্ত্রের জন্য কতই না চিৎকার করেছেন। তখন পাকিস্তানে আইউবের প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির গণতন্ত্রই তো ছিল। গণতন্ত্রের নামে আওয়ামী লীগের পতাকা তলে যে কতটা মেরুদণ্ডহীন ও নীতিহীন মানুষের ভীড় জমেছিল সেটিও সেদিন প্রমাণিত হয়েছিল। এতদিন যারা গণতন্ত্রের জন্য মাঠঘাট প্রকম্পিত করত তারা সেদিন একদলীয় স্বৈরাচারি শাসন প্রবর্তনের কোন রূপ বিরোধীতাই করল না। বরং বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এতবড় গুরুতর বিষয়ে যখন সামান্য তিন দিনের আলোচনার দাবী উঠল তখন সেটিরও তারা বিরোধীতা করল। সামান্য এক ঘণ্টার মধ্যে এতবড় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিল। অথচ গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে এক টাকা ট্যাক্স বৃদ্ধি হলে সে প্রসঙ্গেও বহু ঘণ্টা আলোচনা হয়। ভেড়ার পালের সব ভেড়া যেমন দল বেঁধে এবং কোন রুপ বিচার বিবেচনা না করে প্রথম ভেড়াটির অনুসরণ করে তারাও সেদিন তাই করেছিল। আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রের দাবী যে কতটা মেকী,সেটির প্রমাণ তারা এভাবেই সেদিন দিয়েছিল। দলটির নেতাকর্মীরা সেদিন দলে দলে বাকশালে যোগ দিয়েছিল,এরকম একদলীয় স্বৈরচারি শাসন প্রতিষ্ঠায় তাদের বিবেকে সামান্যতম দংশনও হয়নি।

১৯৭৪ সালে ১৮ অক্টোবর বোষ্টনের ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরে ডানিয়েল সাদারল্যান্ড লিখেছিলেন,“গত দুই মাসে যে ক্ষুধার্ত জনতা স্রোতের মত ঢাকায় প্রবেশ করেছে,তাদের মধ্যে সরকারের সমর্থক একজনও নেই। বন্যা আর খাদ্যাভাবের জন্য গ্রামাঞ্চল ছেড়ে এরা ক্রমেই রাজধানী ঢাকার রাস্তায় ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু মনে হচ্ছে সরকার এদেরকে রাজপথের ত্রিসীমানার মধ্যে ঢুকতে না দিতে বদ্ধপরিকর। এরই মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যককে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে সারাদিন দুই এক টুকরা রুটি খেতে পাওয়া যায, মাঝে মাঝে দুই-একটা পিঁয়াজ ও একটু-আধটু দুধ মেলে। ক্যাম্পে ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না। “যে দেশে মানুষকে এমন খাঁচাবদ্ধ করে রাখা হয় সেটা কি ধরনের স্বাধীন দেশ”- ক্রোধের সাথে বলল ক্যাম্পবাসীদেরই একজন। ক্যাম্পের ব্লাকবোর্ডে খড়িমাটি দিয়ে জনৈক কর্মকর্তা আমার সুবিধার্থে প্রত্যেকের রুটি খাওয়ার সময়সূচির তালিকা লিখে রেখেছেন। “তালিকায় বিশ্বাস করবেন না”-ক্যাম্পের অনেকেই বলল। তারা অভিযোগ করল যে, রোজ তারা এক বেলা খেতে পায়- এক কি দুই টুকরা রুটি। কোন এক ক্যাম্পের জনৈক স্বেচ্ছাসেবক রিলিফকর্মী জানাল যে, “সরকারী কর্মচারীরা জনসাধারণের কোন তোয়াক্কা করে না। তারা বাইরের জগতে সরকারের মান বজায় রাখতে ব্যস্ত। এ কারণেই তারা লোকদেরকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাচেছ। বিদেশীরা ভুখা-জনতাকে রাস্তায় দেখুক এটা তারা চায় না।”

১৯৭৪ সালে ৩০ অক্টোবর লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় পিটার প্রেসটন লিখেছিলেন,“এই সেদিনের একটি ছবি বাংলাদেশের দৃশ্যপট তুলে ধরেছে। এক যুবতি মা -তার স্তন শুকিয়ে হাঁড়ে গিয়ে লেগেছে,ক্ষুধায় চোখ জ্বলছে – অনড় হয়ে পড়ে আছে ঢাকার কোন একটি শেডের নীচে,কচি মেয়েটি তার দেহের উপর বসে আছে গভীর নৈরাশ্যে। দু’জনাই মৃত্যুর পথযাত্রী। ছবিটি নতুন,কিন্তু চিরন্তন। স্বাধীনতার পর থেকে ঢাকা দুনিয়ার সবচেয়ে -কলিকাতার চেয়েও -বীভৎস শহরে পরিণত হয়েছে। সমস্ত বীভৎসতা সত্ত্বেও কোলকাতায় ভীড় করা মানুষের যেন প্রাণ আছে,ঢাকায় তার কিছুই নাই। ঢাকা নগরী যেন একটি বিরাট শরণার্থী-ক্যাম্প। একটি প্রাদেশিক শহর ঢাকা লাখ লাখ জীর্ণ কুটীর,নির্জীব মানুষ আর লঙ্গরখানায় মানুষের সারিতে ছেয়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলে যখন খাদ্যাভাব দেখা দেয়,ভুখা মানুষ ঢাকার দিকে ছুটে আসে। ঢাকায় তাদের জন্য খাদ্য নেই। তারা খাদ্যের জন্য হাতড়ে বেড়ায়,অবশেষে মিলিয়ে যায়। গেল সপ্তাহে একটি মহলের মতে শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই মাসে ৫০০ লোক অনাহারে মারা যাচ্ছে। এর বেশীও হতে পারে,কমও হতে পারে। নিশ্চিত করে বলার মত প্রশাসনিক যন্ত্র নাই।.. জন্মের পর পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সাহায্যের এক অভূতপূর্ব ফসল কুড়িয়েছিলঃ ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড। আজ সবই ফুরিয়ে গেছে। কোন চিহ্ন পর্যন্ত নেই। রাজনীতিবিদ, পর্যবেক্ষক, দাতব্য প্রতিষ্ঠান -সবাই একই যুক্তি পেশ করছে যা অপরাধকে নিরাপদ করছে, দায়িত্বকে করছে অকেজো। তাদের মোদ্দা যুক্তি হলো এই যে, বাংলাদেশের ঝুলিতে মারাত্মক ফুটো আছে। যত সাহায্য দেয়া হোক না কেন, দুর্নীতি, আলসেমী ও সরকারী আমলাদের আত্মঅহমিকার ফলে অপচয়ে ফুরিয়ে যাবে। বেশী দেয়া মানেই বেশী লোকসান।”

 

অরক্ষিত সীমান্ত

পাত্রের তলায় ফুটো থাকলে পাত্রের মালামাল বেড়িয়ে যায়,তবে তা বেশী দূর যায় না। আশে পাশের জায়গায় গিয়ে পড়ে। তেমনি বাংলাদেশের তলা দিয়ে বেড়িয়ে যাওয়া সম্পদ হাজার মাইল দূরের কোন দেশে গিয়ে উঠেনি,উঠেছিল প্রতিবেশী ভারতে। আর এ ফুটোগুলো গড়ায় ভারতীয় পরিকল্পনার কথা কি অস্বীকার করা যায়? পাকিস্তান আমলে ২৩ বছরে পাকিস্তান সরকারের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল,সীমান্ত দিয়ে চোরাকারবারী বন্ধ করা। এ কাজে প্রয়োজনে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের বসানো হত। অথচ শেখ মুজিব সীমান্ত দিয়ে চোরাকারবারি বন্ধ না করে ভারতের সাথে চুক্তি করে সীমান্ত জুড়ে বাণিজ্য শুরু করেন। এভাবে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে দেশের তলায় শুধু ফুটো নয়,সে তলাটিই ধসিয়ে দিলেন। তলা দিয়ে হারিয়ে যাওয়া সম্পদ তখন ভারতে গিয়ে উঠল। ভারত বস্তুত তেমন একটি লক্ষ্য হাছিলের কথা ভেবেই সীমান্ত বাণিজ্যের প্রস্তাব করেছিল। অথচ পাকিস্তান আমলে ভারত এ সুবিধার কথা ভাবতেই পারেনি। অথচ মুজিব সেটাই বিনা দ্বিধায় ভারতের হাতে তুলে দিলেন। বাংলাদেশের বাজারে তখন আর রাতের আঁধারে চোরাচালানকারী পাঠানোর প্রয়োজন পড়েনি। দিন দুপুরে ট্রাক-ভর্তি করে বাংলাদেশের বাজার থেকে সম্পদ তুলে নিয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা তখন পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানার যন্ত্রাংশ খুলে নামে মাত্র মূল্যে ভারতীয়দের হাতে তুলে দেয়। তলাহীন পাত্র থেকে পানি বেরুতে সময় লাগে না,তেমনি দেশের তলা ধসে গেলে সময় লাগে না সে দেশকে সম্পদহীন হতে। ভারতের সাথে সীমান্ত বাণিজ্যের দাড়িয়েছিল,ত্বরিৎ বেগে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল বাংলাদেশে। (নতুন সংস্করণ, ৩০/০৬/১৩)