ঈদ কেন মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 উৎসবটি মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত

পৃথিবীর নানা দেশে নানা ধর্মের ও নানা জাতির মানুষের মাঝে শত শত বছর ধরে চলে আসছে বিচিত্র উৎসব। কিন্তু সে সব উৎসব থেকে ঈদ যে অনন্য ও শ্রেষ্ঠতর তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? সামান্যতম সন্দেহ চলে কি মহান আল্লাহতায়ালার হিকমত, প্রজ্ঞা ও তাঁর প্রদত্ত বিধানগুলির কল্যাণধর্মীতা নিয়ে? আল্লাহতায়ালার প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই তাঁর অসীম কুদরতের পরিচয়। ধরা পড়ে মানব কল্যাণে মহান আল্লাহর মহা আয়োজন। ঈদ সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব হওয়ার কারণ,এটি কোন মানুষের আবিস্কৃত উৎসব নয়। এটি এসেছে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে।মানব সভ্যতার সর্বশেষ্ঠ উৎসব হওয়ার জন্য এই একটি মাত্র কারণই যথেষ্ঠ। ঈদের সে সর্বাঙ্গ সুন্দর বিধান,সেটি যে কোন বিবেকবান ও সুস্থ্য চেতনার মানুষের চোখে ধরা পড়তে বাধ্য। আলোচ্য নিবন্ধের সেটিই আলোচ্য বিষয়। কিন্তু তা নিয়ে অবিশ্বাস থাকতে পারে একমাত্র তাদের যাদের অবিশ্বাস আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব, তাঁর প্রজ্ঞা ও তার অপার সৃষ্টি ক্ষমতা নিয়ে। এখানে সমস্যা তাদের অসুস্থ্য বিবেকের,ঈদ উৎসবের নয়।এমন মানসিক অসুস্থ্যতার কারণে তারা যেমন ইসলামের ইবাদতের বিধানের মধ্যে কোন শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে পায়না তেমনি পায়না মুসলমানদের ঈদ উৎসবের মাঝেও।

ঈমানদারের জীবন চলে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সিরাতুল মোস্তাকীম বেয়ে। এ পথে চলায় মুসলমানের জীবনে যেমন প্রচুর ত্যাগ-তিতীক্ষা ও জান-মালের কোরবানী আছে, তেমনি খুশিও আছে। দুঃখ-বেদনার সাথে উৎসবও আছে। তবে সে উৎসবে মোহচ্ছন্নতা নাই, আছে পবিত্রতা। মুসলিম বিশ্বের ঘরে ঘরে ঈদ তাই পবিত্র উৎসব বা খুশি বয়ে আনে। এমন খুশির দিন সারা বছরে মাত্র দু’টি। একটি ঈদুল ফিতর, এবং অপরটি ঈদুল আযহা। এ খুশির দিন দু’টিতে প্রতিটি মুসলিম দেশ নতুন ভাবে সাজে। কিন্তু কেন এ খুশি বা উৎসব? খুশি বা উৎসব তো আসে বিশাল বিজয় বা বড় কিছু অর্জনের পর। কিন্তু কি সে বিজয় বা অর্জন, যার জন্য মুসলমানেরা ঘরে ঘরে ঈদের খুশি করবে? অন্য ধর্ম বা অন্য জাতির উৎসব ইসলামের এ উৎসবের পার্থক্য কোথায়? ঈদের শ্রেষ্ঠত্বই বা কি? কেনই বা দিন দু’টি মানব-সংস্কৃতিতে অনন্য? ইসলাম শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম, কিন্তু এ উৎসবে শান্তি ও কল্যাণই বা কি? খৃষ্টান,বৌদ্ধ ও শিখ ধর্মের অনুসারিরা তাদের ধর্মের প্রচারকদের জন্ম বা মৃত্যু দিবসকে উৎসবের দিনে পরিণত করেছে,কিন্তু ইসলাম সেটি করেনি। অন্যদের উৎসবগুলির দিনক্ষণ ও উপলক্ষ তাদের মনগড়া,কিন্তু ঈদের উৎসব ও তার দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে মহান আল্লাহ থেকে। তিনি যেমন পবিত্র কোরআন দিয়েছেন এবং নামায-রোযা,হজ-যাকাতের বিধান দিয়েছেন,তেমনি এ উৎসবটিও দিয়েছেন। উৎসবের পরিকল্পনায় ও উদযাপনের যে বিধানটি মহান আল্লাহতায়ালা থেকে আসে তাতে কি কোন ত্রুটি থাকতে পারে?

মুসলমানদের এ দুটি উৎসবের পেক্ষাপট যেমন ভিন্ন,তেমনি ভিন্ন তার লক্ষ্যও। এ দুটি উৎসবের কোনটিই কোন বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মদিবস উদযাপনের লক্ষ্যে যেমন নয় তেমনি বছরের সুন্দরতম কোন দিনকে মহামান্বিত করার লক্ষ্যেও নয়। উভয় উৎসবই নির্ধারিত হয়েছে মহান আল্লাহর অনুগত গোলাম রূপে তাঁর বান্দাহ কতটা সফল বা বিজয়ী হলো সে বিষয়টিকে সামনে রেখে। এদিক দিয়ে মানব জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে সফল এবং বিজয়ী ব্যক্তিটি হলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। তিনি বিস্ময়কর প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন কোন বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে নয়,বরং মহা সত্যের আবিস্কারে। এবং সফলতা দেখিয়েছেন সে সত্যের আপোষহীন অনুসরণে। তিনি খুঁজে পেয়েছেন মহান আল্লাহকে। মানব জাতির ইতিহাসে এরচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার আছে কি? বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে ব্যর্থতার কারণে কেউ জাহান্নামে যাবে না, জাহান্নামে যাবে সত্য আবিস্কারে ব্যর্থতার কারণে। কি আল্লাহর উপর অটল বিশ্বাসে,কি ইবাদতে, কি হিজরতে, কি আত্মত্যাগে – আল্লাহর প্রতিটি হুকুমে তিনি নিষ্ঠার সাথে লাব্বায়েক বলেছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সে নিষ্ঠাকে নিয়ে বার বার গর্ব করেছেন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি নিজ জন্মস্থান ছেড়ে নানা দেশের পথে পথে ঘুরেছেন। স্ত্রী হাজেরা এবং শিশুপুত্র ঈসমাইলকে যখন জনমানব শূণ্য মক্কার বুকে ছেড়ে আসার নির্দেশ এসেছে তখনও তিনি নিজের ও নিজ-পরিবারের স্বার্থকে গুরুত্ব দেননি। বরং গুরুত্ব দিয়েছেন মহান আল্লাহর ইচ্ছাকে। ফলে আল্লাহতায়ালার সে নির্দেশের জবাবে তিনি ত্বরিৎ লাব্বায়েক বলেছেন। রাব্বুল আলামীনকে খুশি করতে নিজ পুত্র ঈসমাইলকে কোরবানী করতে তাঁর গলায় ছুড়িও চালিয়েছেন। নিজ খেয়াল-খুশি ও নিজ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে মানব জাতির ইতিহাসে এটাই হলো সবচেয়ে বড় বিজয়। আল্লাহপাক তাঁর এ বিজয়ে এতই খুশি হয়েছিলেন যে তাঁর সে বিজয়কে তিনি মানবজাতির উৎসবে পরিণত করেছেন। এবং সেটি ক্বিয়ামত অবধি। মুসলমান হওয়ার অর্থ মূলতঃ মহান আল্লাহর প্রতি হুকুমে লাব্বায়েক তথা “আমি হাজির বা প্রস্তুত” বলার ধর্ম। দ্বীনে ইব্রাহীমের এটিই মূল শিক্ষা। মুসলিম নামটিও তাঁরই দেয়া। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)র মূল কৃতিত্বটি হলো,খেয়ালখুশি ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে আল্লাহর উপর ঈমানকে তিনি বিজয়ী করেছেন। সে অটল ঈমান কে ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে,“নিশ্চয়ই আমার নামায,আমার কোরবাণী,আমার বেঁচে থাকা এবং আমার মৃত্যুবরণ –সবকিছুই আল্লাহর জন্য।” মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সে প্রদীপ্ত উচ্চারণকে এতটাই পছন্দ করেছেন যে পবিত্র কোরআনে নিজ কথাগুলোর পাশে হযরত ইব্রাহীমের সে কথাগুলোকেও ক্বিয়ামত অবধি মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয় করেছেন। মানব ইতিহাসে এর চেয়ে বড় বিজয় আর কি হতে পাররে? এ বিজয় সামরিক বিজয় নয়,শারিরীক শক্তি বা কুশলতার বিজয়ও নয়,বরং কুফরির উপর ঈমানের।হযরত ইব্রাহীম হলেন মুসলিম উম্মাহর পিতা। ঈদুল আজহার দিনে বিশ্বের মুসলমানগণ বস্তুতঃ পিতার সে বিজয়কে নিয়ে উৎসবই করে না,বরং তার আদর্শের সাথে একাত্মতাও জাহির করে। এর চেয়ে পবিত্র উৎসব আর কি হতে পারে?

 

উৎসব প্রবৃত্তির উপর ঈমানের বিজয় নিয়ে

অপর দিকে ঈদুল ফিতর হাজির হয় বিজয়ের আরেক প্রেক্ষাপটে। সেটি মাসব্যাপী আত্মসংযম, আত্মপরিসুদ্ধি, ও আল্লাহতে আত্মসমর্পণের। উৎসব আসে মাহে রামাদ্বানের মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে। অন্য মাসে পানাহারের ন্যায় বহু কিছুই হালাল, কিন্তু সেগুলির বহু কিছুই রোযা কালীন সময়ে হারাম। ঈমানদার হওয়ার শর্তই হলো হারাম-হালাল নিয়ে আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করা। সেটি জীবনের প্রতি মুহুর্তে। “শুনলাম এবং মেনে নিলাম” –থাকতে হবে এমন এক সদাপ্রস্তুত চেতনা। তেমন একটি চেতনার কারণে মু’মিন ব্যক্তি একান্ত নিভৃতেও কিছু খায় না। তীব্র ক্ষুধা বা প্রচণ্ড তৃষ্ণার মুখেও খাদ্য বা পাণীয় মুখে দেয় না। লোক দেখাতে মানুষ নামায পড়তে পারে,অর্থদান করতে পারে,এমন কি হজও করতে পারে। কিন্তু লোক দেখানোর সে লোভ কি একান্ত গোপনে কিছু খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে? এক্ষেত্রে যেটি কাজ করে তা হলো আল্লাহর ভয় তথা তাকওয়া। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের ন্যায় ইসলামে যত ইবাদত তার লক্ষ্য মাত্র একটিই। তা হলো ঈমানদারের জীবনে তাকওয়া বৃদ্ধি। প্রশ্ন হলো তাকওয়ার অর্থ কি? তাকওয়া হলো, জীবন যাপনের প্রতি পদে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিটি হুকুম ও তাঁর প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীম মেনে চলার গভীর তাড়না। সে সাথে সে প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুতির প্রচণ্ড ভয়। যার মধ্যে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম মেনে চলার তাড়না নাই এবং তাঁর প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ভয়ও নেই, তার মধ্যে যে বিন্দুমাত্র তাকওয়াও নাই –তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে? মহান আল্লাহতায়ালার কাজে কোরবানীর রক্ত বা গোশতো পৌঁছে না, রুকু-সিজদাও পৌঁছে না। পৌঁছে এই তাকওয়া। ব্যক্তির প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা তো এটাই যে সে তার সকল বুদ্ধিবল ও অর্থবলকে তাকওয়ার বল বাড়াতে ব্যয় করবে। এটিই আখেরাতের মুদ্রা। ব্যক্তির জীবনে তাকওয়া সুস্পষ্ট দেখা যায়, -যেমন দেখা যায় মুর্তিপূজা, ব্যক্তি পূজা, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসীর ন্যায় দুবৃত্তি। যে ব্যক্তি ঘুষ খায়, সূদ খায়, সূদ দেয়, মিথ্যা কথা বলে, রাস্তায় বেপর্দা চলে, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসী করে এবং দেশে শরিয়ত, হুদুদ, খেলাফত ও জিহাদের বিরুদ্ধে  রাজনীতি করে -সে ব্যক্তির মাঝে কি সামান্যতম তাকওয়া আছে? সে তো মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের দুষমন। সে যদি সারা বছর রাজা রাখে, শত শত গরুবাছুর কোরবানী করে বা প্রতি বছর হজ্ব করে -তাতে কি তাকওয়ার প্রমাণ মেলে? তাতে কি পাপ মোচন হয়? বরং সে ব্যক্তিই তো তাকওয়ার অধিকারী বা প্রকৃত মুত্তাকী যে মাসভর রামাদ্বানের রোযা রাখে এবং আল্লাহর প্রতিটি হুকুমকে মেনে চলে । সেই বস্তুতঃ বিজয়ী। এ বিজয় লোভ-লালসা ও প্রবৃত্তির খায়েশাতের উপর তাকওয়ার বিজয়। মুমিনের জীবনে ঈদুল ফিতর আসে সে বিজয়ের উৎসব নিয়ে।

ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব বুঝতে হলে রোযার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝা জরুরী। এবং ঈদুল আযহার গুরুত্ব বুঝতে হলে বুঝতে হয় হযরত ইব্রাহীম (আ:)র জীবনের মিশন। ব্যক্তির সে সমঝ-বুঝই ঈদকে ইবাদতে পরিণত করে; এবং জনগণের জীবনে জন্ম দেয় গভীর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের। নইলে ঈদ অর্থশূণ্য থেকে যায়। নামাযের ন্যায় রোযারও মূল লক্ষ্য হলো, মুসলমানদের মনে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি সৃষ্টি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ রোযা তোমাদের উপর ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেন তোমরা তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পার।”- সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)। আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত,মাগফেরাত এবং আখেরাতে নাজাত প্রাপ্তির জন্য অপরিহার্য হলো এই তাকওয়া। জান্নাতে প্রবেশের এটিই হলো মূল চাবি। তাকওয়া হলো মু’মিনের মনে আল্লাহর কাছে জবাবদেহীর সার্বক্ষণিক এমন এক জাগ্রত চেতনা যা তাকে প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণে আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের আজ্ঞাবহ গোলামে পরিণত করে। ফলে ঈমানদারের প্রতিটি দিন ও প্রতিটি মুহুর্ত কাটে আল্লাহর প্রতি হুকুমের আনুগত্য নিয়ে। সেটি প্রকাশ পায় তার কথা,কর্ম ও আচরণে। আর আল্লাহর যে কোন হুকুমের আনুগত্যই তো ইবাদত। তাই ঈমানদারের ইবাদত শুধু নামায-রোযা,হজ-যাকাতে সীমাবদ্ধ থাকে না,সে তো সর্বক্ষণের আবেদ। এরূপ তাকওয়াকে মু’মিনের জীবনে স্থায়ী তথা সার্বক্ষণিক করাই রামাদ্বানের রোযার মূল লক্ষ্য। মু’মিনের ঈমান তখন দৃশ্যমান হয় তাঁর ধর্ম-কর্ম,আচার-আচারণ,ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি,সংস্কৃতি, যুদ্ধবিগ্রহ তথা জীবনের সর্বাঙ্গ জুড়ে। এভাবে রোযা আল্লাহর গোলামীকে ব্যক্তির জীবনে চির অভ্যাসে পরিনত করে। তখন সে আল্লাহর গোলাম শুধু নামাযে নয়,শুধু রোযা বা হজকালীন সময়ে নয় বরং সর্বক্ষণে এবং সর্বক্ষেত্রে। এটিই হলো মু’মিনের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। সে তখন পরিণত হয় মহান আল্লাহর সেনাদলের সার্বক্ষণিক সৈনিকে। মাহে রামাদ্বান তাই ইসলামের অতিগুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিংয়ের মাস। ট্রেনিং পর্বের শিক্ষাগ্রহণে যারা কৃতকার্য হয় তাদের নিয়ে ট্রেনিং শেষে যেমন সমাপনি উৎসব হয় তেমনটি আছে ইসলামেও। ঈদুল ফিতরের উৎসব তো সেটাই।

রামাদ্বানের এ পবিত্র মাসটিতে তাকওয়া অর্জনে যারা সফল হয়, সেসব মোত্তাকীদের জন্য এ মাসটিতে রয়েছে বিশাল সুখবর। তাদের জন্য মহান আল্লাহতায়ালা খুলে দেন রহমত,মাগফেরাত এবং নাজাতের দ্বার। এ মাসেই রয়েছে লায়লাতুল ক্বদর যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এ পবিত্র মাসে যারা রোযা রাখে, তারাবিহ নামায পড়ে, নানাবিধ নফল ইবাদত করে এবং মিথ্যা-ইর্ষা-কুৎসা-গিবত ও নানাবিধ খারাপ কর্ম থেকে বাঁচে এবং লায়লাতুল ক্বদরের রাতে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে মাগফেরাতের সুযোগ নেয়, এ মাস তাদের জন্য বয়ে আনে জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এ পবিত্র মাসের ইবাদতের বরকতে মাফ হয়ে যায় অতীত জীবনের সকল গুনাহ। এবং বিপুল সমৃদ্ধি আসে ঈমানে। মু’মিনের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে? ব্যবসায়ীক লাভ,পেশাদারি সাফল্য,বিপুল অর্থপ্রাপ্তি বা কর্ম জীবনের অন্য কোন সফলতায় কি এমন অর্জন ঘটে? এমন সফলতা খুশি বয়ে আনবে সেটিই কি যথার্থ নয়? আল্লাহতায়ালাও চান,তাঁর অনুগত বান্দারা জীবনের এ বিশাল অর্জনের পর উৎসব করুক। সেই জন্যই তিনি ঈদুল ফিতরের বিধান দিয়েছেন।

রামাদ্বান হলো প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাস। যুদ্ধজযের পর যোদ্ধারা যেমন মহাধুমধামে উৎসব করে, ঈমানদারেরাও তেমনি প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের পর উৎসব করে। ঈদুল ফিতরে ঘটে সে উৎসবেরই আয়াজন। তবে এ পবিত্র মাসটিতে যারা রোযা রাখেনি এবং তাকওয়া অর্জন করেনি, প্রকৃত অর্থেই তারা ব্যর্থ। এ পবিত্র মাসটিতে নিজেদের বিদ্রোহী প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা অংশই নেয়নি। ফলে তারা বিজয়ী হবে কীরূপে? বরং পরাজিত ক্ষুধা,যৌনতা,অশ্লিলতা তথা অবাধ্য প্রবৃত্তির কাছে। ঈদুল ফিতরের উৎসবের দিনে এমন পরাজিত ব্যক্তিদের জন্য খুশির কিছু নেই। এদিন তো তাদের জন্য মাতমের। তারা তো মহান আল্লাহর অবাধ্য বান্দাহ। এরূপ অবাধ্যতা তো কুফরি। তাদের সে অবাধ্যতা বিমূর্ত হয় শুধু রামাদ্বানে নয়, বরং বছরের অপর ১১টি মাসেও। রামাদ্বানের এ ব্যর্থতা তাদের জীবনে দুঃখময় বিপর্যয় ডেকে আনে। এমন বিপর্যয় নিয়ে তারা উৎসব করে কি করে? নবীজী (সাঃ) তাই তাদের জন্য বলেছেন,“মাহে রামাদ্বানে যারা রোযা রাখেনি তাদের জন্য এ ঈদ খুশির নয়, বরং বড়ই অখুশির।”

আনন্দ যেখানে সার্বজনীন

ইসলামের কল্যাণের ধর্ম। কল্যাণ চায় ব্যক্তির সাথে সমষ্ঠিরও। কল্যাণ চায় সমাজের ধনী-দরিদ্র সর্বশ্রেণীর মানুষের। তাই উৎসবের মাঝেও সে কল্যাণ-চেতনা থেকে ঈমানদারদের বিচ্যুতির অবকাশ নেই। এ দিনে সমাজের সচ্ছল মানুষেরা আনন্দ করবে করবে আর অভাবী মানুষেরা সে আনন্দ নীরবে দেখবে সে বিধান ইসলামে নাই। ঈদের আনন্দ এখানে সার্বজনীন। খুশির এ দিনটিতে কল্যাণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সমাজের অভাবগ্রস্থ দুঃখী মানুষেরও। অনাথ-ইয়াতিম-দুস্থ্য মানুষেরাও যাতে ঈদের খুশিতে সামিল হতে পারে সে জন্য ঈদের জামায়াতে শামিল হওয়ার পূর্বে তাদের হাতে ফিতরার টাকা পৌঁছে দিতে হয় প্রতিটি স্বচ্ছল মুসলমানকে। নবীজী (সাঃ) হাদীস,যে ব্যক্তি ফিতরা না দিয়ে ঈদের নামাযে হাজির হয় তার রোযা আল্লাহর আরশের নীচে শূণ্যে ভাসতে থাকে। তাই রোযা কবুলের শর্ত হলো ঈদের নামাযে হাজির হওয়ার পূর্বে পরিববারে প্রতিটি সদস্যের মাথাপিছু ফিতরা আদায় করা। এটি গরীবের হক,ধনীর দান বা কৃপা নয়। সমাজের অভাবগ্রস্থদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখানে প্রতিটি স্বচ্ছল ব্যক্তির। সম্পদ লাভের সাথে সাথে মু’মিনের ঘাড়ে এ এক বাড়তি দায়িত্ব। গরীবেরা এসে তার দরওয়াজায় ধর্ণা দিবে এবং ফিতরা ভিক্ষা করবে সেটি ইসলামের বিধান নয়। এমন বিধানে গরীবের প্রচ্ণ্ড অসম্মান হয়। এভাবে গরীবের অসম্মান বাড়িয়ে কি ঈদের খুশি হয়? নির্মিত হয় কি সামাজিক সংহতি? প্রতিষ্ঠা পায় কি শান্তি? ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তির সংস্কৃতি গড়ে না, গড়ে দানের সংস্কৃতি। ইসলাম তাই ধনীকে বরং গরীবের দরজায় ছুটতে বলে। খলিফা হযরত উমর (রা:) তাই আটার বস্তা নিজের কাঁধে চাপিয়ে ক্ষুদার্ত মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। সম্পদ-লাভ এভাবেই মু’মিনের জীবনে অহংকার না বাড়িয়ে দায়িত্ববোধ বাড়ায়। অর্থ এভাবেই তাঁকে পরীক্ষার মুখে ফেলে। ইসলাম চায় সমাজের ধনী-দরিদ্র সর্বস্তরের মানুষের মাঝে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় মজবুত একতা। দানখয়রাত এবং গরীবের কল্যাণ চিন্তা সে একতার নির্মাণে সিমেন্টের কাজ করে। দুস্থ দরিদ্র জনগণ তখন সমাজের হৃদয়বান স্বচ্ছলব্যক্তিদের আপন ভাবতে শেখে। শোষন-নির্ভর পুঁজিবাদী দেশে ধনী-দরিদ্রের যে বিশাল বিভাজন ও বিভেদ সেটি রাজনৈতীক লড়াই ও রক্তক্ষয়ী শ্রেণীযুদ্ধের জন্ম দেয়্, কিন্তু ইসলামী সমাজে সেটি ঘটে না। বরং সমাজের ধনী ব্যক্তিগণ বুঝে,অর্থসম্পদ তাদের উপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত। যেরূপ পবিত্র আমানত হলো তার নিজ জীবন। মু’মিনের দায়িত্ব হলো, অর্পিত এ আমানতকে আল্লাহরই নির্দেশিত পথে ব্যয় করা। নইলে প্রচণ্ড খেয়ানত হয়। আর সে খেয়ানত ইহকালে আযাব এবং পরকালে জাহান্নাম ডেকে আনে। তাই মু’মিন ব্যক্তি সম্পদশালী হলে জীবন যাপনে স্বেচ্ছাচারি হয় না,এবং স্বেচ্ছাচারি হয়না সম্পদের ব্যয়েও। আর এমন একটি আত্মসচেতন ও আত্মসমর্পিত চেতনার কারণেই বাংলাদেশের মত একটি দরিদ্র দেশেও ঈদুল ফিতরের উৎসবে বহু শতকোটি টাকা ধনীর পকেট থেকে গরীবের ঘরে গিয়ে পৌঁছে। ফিতরার অর্থের সাথে যোগ হয় বহু শত কোটি টাকার যাকাতের অর্থ। ফলে আনন্দের ছোয়া লাগে লক্ষ লক্ষ গরীব মানুষের ঘরে। মুসলিম সমাজে এমন অর্থ হস্তান্তরের ফলে ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে বহু কোটি দরিদ্র মানুষের। ফলে রক্ত-সঞ্চালন হয় অর্থনীতিতে। মুসলিম দেশ তো এই ভাবেই সামাজিক কল্যাণ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এগুয়। একই ভাবে ঈদুল আযহার দিনে হাজার হাজার টন কোরবানীর গোশত বিতরণ হয় মুসলমানদের ঘরে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে মক্কা থেকে কোরবানীর গোশত গিয়ে পৌছে বহু হাজার মাইল দূরের শত শত ইয়াতিম খানা,উদ্বাস্তু শিবির ও দুস্থ্য পল্লীতে। অর্থাভাবে বা পুষ্টির অভাবে মুসলিম প্রাণ হারাবে সেটি একারণেই অভাবনীয়। এবং সেটি ঘটলে বুঝতে হবে,সে সমাজ যে শুধু বিবেকশূণ্য তাই নয়, ইসলামশূণ্যও। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যাকাতের অর্থ নেয়ার লোক পাওয়া যেত না মদিনাতে। অর্থের সুষ্ঠ বণ্ঠন হলে প্রতি সমাজেই তেমনটি ঘটে। অভাব, দুর্ভিক্ষ ও অনাহারে মৃত্যু তো সামাজিক অবিচার,অর্থনৈতিক শোষণ,রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বৃত্তির ফল। অতীতে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে তো এগুলির ফলে। একই কারণে,দুনিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু নগরীতে বহু দুস্থ্য মানুষের বাস।

অনন্য উৎসব সমগ্র মানবসংস্কৃতিতে

প্রতি ধর্মে এবং প্রতি জাতির জীবনেই উৎসব আছে। আনন্দ প্রকাশের নানা দিনক্ষণ,পর্ব এবং উপলক্ষও আছে। কিন্তু ইসলামের ঈদে যেরূপ সার্বজনীন কল্যাণ চিন্তা আছে সেটি কি অন্য ধর্মে আছে? ইসলামের ন্যায় অন্য কোন ধর্মে ধনীদের উপর দরিদ্রদের জন্য অর্থদান বাধ্যতামূলক? খৃষ্টান ধর্মে সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ক্রীসমাস। এ উৎসবে বিপুল সাজ-সজ্জার আয়োজন আছে,বিস্তর অর্থব্যয়ও আছে। কিন্তু সে উৎসবে যাকাত-ফিতরার ন্যায় গরীব মানুষের অর্থদানের নির্দেশ নেই। ক্রীসমাসের দিনে যে ভোজের আয়োজনের করা হয় সেগুলি নিতান্তই পারিবারীক। তাতে বিপুল আয়োজন হয় খাদ্য ও পানীয়ের। মদ্যপান হয়, নাচগানও হয়। বিপুল আদান-প্রদান হয় উপহারের। কিন্তু সে উৎসবে দরিদ্র মানুষের কি ভাগ আছে? সেসব পারিবারীক ভোজে এবং উপহারের আদান প্রদানে পরিবারের বাইরের মানুষের কোন অধিকার নেই। তাছাড়া ক্রীসমাসের উৎসবে প্রকৃতির উপর নাশকতাই কি কম? কোটি কোটি গাছ কেটে ঘরে ঘরে ক্রীসমাস ট্রি সাজানো হয়। উৎসবের পর সে সবুজ গাছগুলোকে আবর্জনার স্তুপে ফেলা হয়।একই ভাবে বিপুল তছরুপ হয় পুঁজা উৎসবে। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে ও হাজার হাজার মুর্তি নির্মাতার বহু শ্রমে গড়া হয় হাজার হাজার মুর্তি। কিন্তু এত শ্রম,এত অর্থ,এত কাট-মাটি ও রংয়ে গড়া মুর্তিগুলি অবশেষে পানিতে ফেলা হয়। এতে দূষিত হয় নদী ও জলাশয়ের পানি। ভারতীয় হিন্দুদের বড় উৎসব হলো দেয়ালী। সেখানেও কি নাশকতা কম? শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয় বৈদ্যুতিক বাতিতে শহরগুলি সাজাতে। বিপুল অর্থ ব্যয় হয় আতশ বাজীতে। তাতে যেমন পরিবেশদূষণ ঘটে,তেমনি মাঝে মাঝে ভয়ানক দূর্ঘটনাও ঘটে। অথচ এত অর্থব্যয়ের মাঝে গরীবের অর্থদানের কোন ব্যবস্থা নাই। পুজার মন্ডপে আয়োজিত হয় হিন্দি ফিল্মি গান ও অশ্লিল নাচ। ফলে পবিত্রতা কোথায়? কোন আয়োজন তো তখনই পবিত্রতা পায় যখন সেটি একমাত্র মহানস্রষ্টাকে খুশি করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়। এবং যিকর হয় তাঁর পবিত্র নামের। কিন্তু যেখানে ফিল্মি গান ও নাচের অশ্লিলতা সেখানে কি পবিত্রতা থাকে? ইসলামের ঈদে কি এমন অপচয়, এমন নাচগান ও অশ্লিলতার আয়োজন আছে? বর্ষবরণ,বসন্তবরণ,জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেশে যে উৎসব হয় তাতেও কী গরীব মানুষের কোন কল্যাণ চিন্তা থাকে? থাকে কি পবিত্রতা?

অথচ ঈদের উৎসবের শুরু আতশবাজি বা উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে নয়। এতে নাচগান যেমন নেই, তেমন মদ্যপানও নেই। বরং দিনের শুরুটি হয় অজু-গোছলের মধ্য দিয়ে। পরিবারের সবাই পরিধান করে উত্তম পোষাক। পাঠ করা হয় মহান আল্লাহর নামে তাকবীর। এভাবে দিনের শুরু থেকেই প্রাধান্য পায় পবিত্রতা। মহল্লার ঈদগাহে বা মসজিদে সে হাজির হয় আল্লাহর নামে তাকবীর দিতে দিতে। এদিনটিতে বিশাল জামায়াতে নামায হয়, খোতবাহ হয় এবং আল্লাহর দরবারে সমবেত দোয়া হয়। দোয়া শেষে একে অপরের সাথে কোলাকুলি হয়। এরপর শুরু হয় প্রতিবেশীর গৃহে ঈদের শুভেচ্ছা-সাক্ষাতের পালা। ঈদের এ দিনটিতে ঘরের দরওয়াজা সবার জন্য খোলা। কারো গৃহে মেহমান হওয়ার জন্য এ দিনে কোন দাওয়াতের প্রয়োজন পড়ে না। আত্মীয় হওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। মহল্লার যে কেউ যে কোন গৃহে কুশল বিনিময়ে হাজির হতে পারে। এরূপ নির্মল আয়োজন কি অন্য ধর্মে আছে? ইসলাম যেমন জামায়াতবদ্ধ ভাবে নামায আদায়ের উপর গুরুত্ব দেয়,তেমনি জামায়াতবদ্ধতা ও সমাজবদ্ধতার গুরুত্ব দেয় উৎসব পালনেও। ঈদের দিন বেশী বেশী মানুষের সাথে দেখা হবে, কুশল বিনিময় হবে এবং কোলাকোলি হবে –তেমনি একটি লক্ষ সামনে রেখে নবীজী (সা:) সূন্নত হলো ঈদগাহের নামাযে এক পথ দিয়ে যাওয়া এবং অন্য পথ দিয়ে ফেরার।

 

ঈদ দেয় মিশন নিয়ে বাঁচার নব প্রত্যয়

অনর্থক গাছ কাটা দূরে থাক, গাছের একটি ডাল ভাঙ্গা বা পাতা ছেড়াও ইসলামে হারাম। ফলে কোটি কোটি বৃক্ষ নিধন করে উৎসব পালন কীরূপে ধর্মীয় কর্ম রূপে গণ্য হতে পারে? অপর দিকে মদ্যপান এবং নাচ-গান ব্যক্তির মন থেকে আল্লাহর স্মরণকে বিলুপ্ত করে। বিনষ্ট করে সত্যসন্ধানী মানুষের ধ্যানমগ্নতা,এবং বিচ্যুতি আনে সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে। অন্য বহুজাতির উৎসবে যেমন মদ্যপান আছে তেমনি নাচগাণ এবং অশ্লিলতাও আছে। ফলে প্রচণ্ডতা পথভ্রষ্টতাও আছে। শয়তান সরাসরি আল্লাহকে অস্বীকার করতে বলে না, মুর্তিকেও পুজা করতে বলে না। হযরত আদম (আ:)কে ইবলিস কখনই এমন অবাধ্য হতে বলেনি। কিন্তু মিথ্যা প্রলোভনে সে ভূলিয়ে দিয়েছিল মহান আল্লাহর দেয়া নির্দেশকে। ভুলিয়ে দেয় আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্য। মদ্যপান ও নাচ-গান তো সেটিই করে। ফলে মুসলমানের উৎসবে যেমন নাচগান নাই, তেমনি মদ্যপানও নাই। কোনরূপ অশ্লিলতাও নাই। সকল প্রকার ভেদা-ভেদ ভূলে এক জামায়াতে নামায পড়া এবং অন্যকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করা,নিজঘরে প্রতিবেশীকে আপ্যয়ন করা হলো ইসলামের সংস্কৃতি। এমন আলিঙ্গণে ও আপ্যায়নে ধনী-দরিদ্র,আমির-উমরাহ,শাসক-প্রজার মাঝে কোন দুরত্ব রাখার সুযোগ নাই। বরং সবাইকে একই সমতলে খাড়া করে। এবং বিলুপ্ত করে বর্ণভেদ, গোত্রভেদ ও শ্রেণীভেদের বিভক্তি। উচ্চতর সমাজ নির্মাণে অপরিহার্য হলো মানুষে মানুষে এমন ভাতৃত্ব ও সৌহার্দ। সভ্যতর ও সমৃদ্ধতর সমাজ নির্মাণে এমন ভাতৃত্ব হলো সবচেয়ে বড় পুঁজি তথা সোস্যাল ক্যাপিটাল। মুসলমানের জীবনে এটিই তো মহান মিশন। মিশন এখানে বিভক্তির দেওয়াল ভাঙ্গার। প্রকৃত মুসলমান ঈদের উৎসবমুখর দিনেও সে পবিত্র মিশন ভূলে না। বরং সে মিশন নিয়ে বাঁচায় পায় নব প্রত্যয়। সমগ্র মানবসংস্কৃতিতে এমন পবিত্র ও সৃষ্টিশীল উৎসব কি দ্বিতীয়টি আছে? (তৃতীয় সংস্করণ, ২৫/০৭/১৪, দ্বিতীয় সংস্করণ ২/০৮/১৩), প্রথম সংস্করণ ১৭/০৮/১২ (২৯শে রামাদ্বান, ১৪৩৩)।




বিবিধ ভাবনা (৪৬)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 ১. অবহেলা সর্বশ্রেষ্ঠ নেককর্মে

মানুষকে শুধু রোগভোগ ও দারিদ্র্য থেকে বাঁচানোই বড় বাঁচানো নয়। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাট নির্মাণই শ্রেষ্ঠ সমাজকর্ম নয়। বরং সবচেয়ে বড় বাঁচানো এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজকর্মটি হলো শয়তানী শক্তির অনুসারি হওয়া থেকে বাঁচানো। রোগভোগ ও আর্থিক দূরাবস্থা কাউকে জাহান্নামে নেয় না, কিন্তু শয়তান ও তার অনুসারীগণ নেয়। আর জাহান্নামের আগুনে পৌঁছার চেয়ে ভয়ানক বিপদ আর কি হতে পারে? যে ব্যক্তি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচলো -সেই অনন্ত কালের জন্য জান্নাত পেল। নবী-রাসূলগণ তাই মানুষের দৈহিক ব্যাধি ও দারিদ্র্য থেকে বাঁচাতে প্রেরীত হননি। তাঁরা এসেছেন সবচেয়ে বড় কল্যাণটি করতে। এটিই মানব সমাজে সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ। এ কাজের জন্যই নবী-রাসূলগণ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার পাবেন। এবং যারা নবী-রাসূলদের সে সূন্নতকে অনুসরণ করেন তারাই পরকালে শ্রেষ্ঠ মানব রূপে সন্মানিত হবেন।

মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার কাজে শয়তানের বাহিনী কাজ করে ধর্ম, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের অঙ্গণে। এসব অঙ্গণে শিকার ধরার কাজে শয়তান বিছায় তার নিজের ষড়যন্ত্রের জাল। এবং ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবকাঠামো। জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার শয়তানী কৌশলগুলি রুখার কাজটি তাই মসজিদ-মাদ্রাসায় বসে হয় না। স্রেফ দোয়া-দরুদের মাধ্যমেও হয় না। ঈমানদারকে সশরীরে এসব অঙ্গণে নামতে হয় এবং অর্থ, শ্রম, বুদ্ধি ও রক্তের বিনিয়োগ করতে হয়। কুর’আনের জ্ঞান হলো এ কাজে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তা্ই সে কাজে সামর্থ্য বাড়াতে যারা নিজেকে কুর’আনের জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে তারাই প্রকৃত জ্ঞানী।

জনগণকে জান্নাতে নেয়ার কাজে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি হলো রাষ্ট্র। রাষ্ট্র ইসলামী হলে তার শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নীতিমালা জনগণকে জান্নাতে নেয়ার বাহনে পরিণত হয়। অপরদিকে শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃত হলে রাষ্ট্র পরিণত হয় জাহান্নামে নেয়ার বাহনে। তাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো রাষ্ট্রকে শয়তানী শক্তির হাত থেকে মুক্ত করা ও সেটিকে ইসলামী করার জিহাদ। কোটি কোটি মানুষ তাতে লাভবান হয়। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা এ জিহাদে শহীদ হয়ে গেছেন। তাই যারা প্রকৃত ঈমানদার তারা কখনোই রাজনীতি থেকে দূরে থাকে না। সে কাজটি সুচারু ভাবে করার জন্যই নবীজী (সা:) ১০ বছর রাষ্ট্র প্রধান ছিলেন। আজকের মুসলিমদের বিপদে কারণ, নবীজী (সা:)’র সে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নতটি মুসলিমদের মাঝে বেঁচে নাই্। এমনকি যারা নিজেদের আলেম রূপে পরিচয় দেন তারাও নিজেদের অরাজনৈতিক বলে ঘোষণা দেন। কিছু দান-খয়রাত করা তাদের কাছে গুরুত্ব পায়, কিন্তু জনগণকে শয়তানী শক্তির খপ্পর থেকে বাঁচানোর ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ কাজটি নয়।   

২. ভালবাসা ও ঘৃণার সামর্থ্য এবং বিমূর্ত বেঈমানী

 কাউকে ভালবাসা ও ঘৃণা করার সামর্থ্য মহান আল্লাহতায়ালা সবাইকে দিয়েছেন। কারো চেতনা বা বিবেকের ভূমিতেই জালেমের লাঠির আঘাত পড়ে না। ফলে প্রতিটি ব্যক্তি এক্ষেত্রে স্বাধীন। তাই ফিরাউনের প্রাসাদে বসেও হযরত আসিয়া ফিরাউনকে গভীর ভাবে ঘৃণা করতেন। বস্তুত ব্যক্তির ঈমানদারী ও বেঈমানী ধরা পড়ে ভালবাসা ও ঘৃণার সামর্থ্যের প্রয়োগের মাঝে। নীরব থাকাটি কোন দেশেই দন্ডনীয় অপরাধ নয়। ঘৃণার স্বাধীনতা প্রকাশ্যে প্রয়োগে ভয় থাকলে নীরব থাকায় বাধা কোথায়? তাই যে ব্যক্তি খুনি, গণতন্ত্রের হত্যাকারী, ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী ও ইসলামের শত্রুকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতির পিতা, দেশের বন্ধু বলতে সোচ্চার -সে ব্যক্তি  নামাযী বা রোযাদার হলেও তাকে কি ঈমানদার বলা যায়? তারা বেঈমানী ধরা পড়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চোর ও ভোটডাকাতদের পক্ষ নেয়ায়। ঈমান থাকলে সেটি প্রকাশ পেত দুর্বৃত্তকে ঘৃণা করার মধ্যে।

৩. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটিই সবচেয়ে অবহেলিত

 কুর’আনের জ্ঞানই আল্লাহতায়ালার ভয় তথা তাকওয়া বাড়ায়। জাহেল তথা অজ্ঞ ব্যক্তির অজ্ঞতাটি তার স্রষ্টাকে নিয়ে। ফলে তার পক্ষে তাকওয়া অর্জন যে অসম্ভব -সে ভাষ্যটি মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার। কুর’আনের জ্ঞানই নেক আমলের ওজন বাড়ায়। জ্ঞানই মহান রবের দরবারে ঈমানদারের মর্যাদা বাড়ায়। পানাহার ছাড়া যেমন দেহ বাঁচে না, তেমনি কুর’আনের জ্ঞান ছাড়া ঈমান বাঁচে না। এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কুর’আনের জ্ঞানলাভ। তাই নামাযের আগে ইলম অর্জন ফরজ করা হয়েছে।

অথচ সে জ্ঞানের উৎস্য পবিত্র কুর’আন ক’জন মুসলিম বুঝে? মুসলিম রাষ্ট্রগুলিতে সে জ্ঞান বিতরণের আয়োজনই বা কোথায়? অথচ এটিই হলো মুসলিম জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। দেশে রাস্তাঘাট ও কল-কারখানা কম হওয়াতে কেউ জাহান্নামে যাবে না। অথচ অজ্ঞতা টানে জাহান্নামের দিকে। কারণ, তাতে অসম্ভব হয় মুসলিম হওয়া। অথচ মুসলিমগণ বাঁচছে কুর’আনী জ্ঞানের গভীর অজ্ঞতা নিয়ে। আর সে অজ্ঞতাই মুসলিমদেরকে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করেছে। মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার মূল বাধা তো এখানেই। আর এজন্যই মুসলিম ভূমিতে ইসলাম পরাজিত।  

৪. অবহেলা বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে

 শয়তানের সৈনিকদের নিরস্ত্র করার কাজটি যুদ্ধের ময়দানে হয় না। যুদ্ধের ময়দানে মূল কাজটি হয় শত্রুর নির্মূলের। শত্রুর সৈনিকদের নিরস্ত্র করা ও যুদ্ধ থেকে তাদেরকে দূরে রাখার কাজটি করতে হয় বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে। ফলে যে দেশে ইসলামের পক্ষে বুদ্ধিবুত্তিক জিহাদ নাই -সে দেশে মুসলিমগণ বিপুল সংখ্যায় শয়তানের দলে যোগ দেয়। তখন সে দলের লোকেরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বেশে রণাঙ্গণে হাজির হয়।

মুসলিমদের মাঝে সে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজটি না হওয়ায় ঔপনিবেশিক কাফেরগণ মুসলিম দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ সৈনিক পেয়েছে মুসলিমদের হত্যা করা ও মুসলিম দেশ দখল করার কাজে। যেমন ভারতের ২ লাখের বেশী মুসলিম ব্রিটশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছে ইরাক ও ফিলিস্তিন দখলের কাজে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন বাংলার কবি কাজী নজরুল ইসলামও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীও। বহু লাখ মুসলিম যোগ দিয়েছে হেজাজ, মিশর ও মরক্কো থেকে। এবং ১৯৭১’য়ে বাঙালী মুসলিমদের দেখা গেছে ভারতীয় কাফেরদের পাশে তাদেরকে বিজয়ীর করার যুদ্ধ করতে।

মুসলিম ইতিহাসের এগুলো অতি কলংকিত অধ্যায়। এবং এর কারণ, বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা। বুদ্ধিবৃত্তিক এ ব্যর্থতার কারণেই কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে মুসলিমদের হত্যা করা ও মুসলিম দেশকে কাফেরদের হাতে তুলে দেয়ার ন্যায় অতি ঘৃণ্য কর্মটিও মুসলিম সমাজে অপরাধ রূপে গণ্য হয়নি। একই রূপ বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার কারণে হাসিনার নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ বাঙালী ভারতের পদসেবা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে আবরার ফাহাদদের লাশ করতে কোন ভারতীয়কে নামতে হয়নি। সে নৃশংস কর্মটি বাঙালী মুসলিম সন্তানেরাই দল বেঁধে নিজ উদ্যোগে করে দিয়েছে। 

৫. পতনের শুরু ও কারণ

 মুসলিমগণ তাদের পতনমুখী যাত্রায় যে জায়গায় আজ পৌঁছেছে সেখানে একদিনে পৌঁছেনি। পতনের শুরুটি বহু বছর আগে থেকে। পতনের শুরুটি পবিত্র কুর’আন থেকে দূরে সরা ও বিভক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে।এটি শুধু পতনের পথ নয়, জাহান্নামের পথও।

এ পতনযাত্রা থেকে উদ্ধারের একটিই পথ। সেটি কুর’আনের পথে ফিরে যাওয়া। এবং কুর’আনের পথে ফিরার অর্থ একতার পথে ফিরা। একমাত্র তখনই অনিবার্য হবে বিজয়।

৬. বিচারহীনতার অসভ্যতা

বিশ্বের সকল দেশেই চোরডাকাতদের ঘৃনা করা হয়। তাদের শাস্তিও হয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো বাংলাদেশ। এদেশে সরকারী দলের চোর-ডাকাতদের বিচার হয় না। বরং সরকারি উদ্যোগে চুরিডাকাতি হয়। এবং গুম, খুন ও সন্ত্রাস হয়। হাসিনা যেরূপ নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট চুরি করে বিজয়ী হলো -সেটি কি বিশ্বের অন্য কোন দেশে কখনো হয়েছে? জনগণের ভোট চুরি হয়ে গেলো -কিন্তু সে অপরাধে কারো শাস্তি হলো না। বিচারে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের খুনি ভা্‌ইয়ের শাস্তি হয়েছিল। কিন্তু তাকে হাসিনা সরকার জেল থেকে বের করে এনেছে। কোন সভ্য দেশে কি এটি ভাবা যায়?  

৭. মাতমের দিন

 ঈমানদারের উৎসবের দিন নাই। হৃদয়ে এতো গভীর বেদনা নিয়ে কি উৎসব হয়? কারণ দেশে দেশে মুসলিমদের বেঈমানী, ব্যর্থতা, কদর্যতা ও ভোগান্তিগুলি তো সীমাহীন। কোন ঈমানদার কি মুসলিমদের এমন বিপর্যয় দেখে খুশি হতে পারে? নামতে পারে কি উৎসবে?

উৎসবের জন্য তো বিজয় চাই। সে জন্য মনে প্রচুর আনন্দ চাই। কোথায় সে বিজয়? কোথায় সে আনন্দ? মুসলিম দেশগুলি অধিকৃত ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে। পরাজয় এখানে ইসলাম ও মুসলিমের। অসম্ভব করা হয়েছে পূর্ণ ইসলাম পালন করা। ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে প্রতিবাদ জানানোর মৌলিক মানবিক অধিকার। সে অধিকার নিয়ে বাঁচতে গেলে লাশ হতে হয়। গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশে ২২ জনকে লাশ করা হলো খুনি নরেন্দ্র মোদী আগমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর অপরাধে। কোন সভ্য দেশে কি এরূপ ঘটে? এ তো হৃদয়বিদারক ঘটনা। হৃদয়ে এরূপ গভীর বেদনা নিয়ে কেউ কি উৎসব করতে পারে? যে দেশে মানবাধিকার বিলুপ্ত -সে দেশে প্রতিটি দিন তো মাতমের। ০২/০৫/২০২১




বিবিধ ভাবনা (৪৫)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. এতো ব্যর্থতা কেন?

ইসলামের এজেন্ডা শুধু পরিশুদ্ধ চরিত্রের মানব সৃষ্টি নয়, বরং সেটি পরিশুদ্ধ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মাণও। সেটি বুঝা যায় ইসলামের নীতিমালা ও ফরজ বিধানের দিকে নজর দিলে। ব্যক্তির কর্ম, চরিত্র ও চেতনায় পরিশুদ্ধির জন্য ইসলামের প্রেসক্রিপশন হলো কুর’আন শিক্ষা, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত এবং তাসবিহ-তাহলিলের বিধান। সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির জন্য প্রেসক্রিপশন হলো ইসলামের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, জিহাদ, শরিয়ত ও হুদুদ পালন, প্যান-ইসলামিক ঐক্য এবং শুরাভিত্তিক শাসন। এ প্রেসক্রিপশনের প্রয়োগ মুসলিমদের উপর বাধ্যতামূলক তথা ফরজ। পাখির দুটি ডানার একটি ভেঙ্গে গেলে পাখি উড়তে পারে না। তেমন পরিশুদ্ধ সভ্যতার নির্মাণে শুধু ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি আনলে চলে না, পরিশুদ্ধি আনতে হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের অঙ্গণেও।

তা্ই শুধু ব্যক্তির ইসলামীকরণ হলে চলে না, রাষ্ট্রেরও ইসলামীকরণ করতে হয়। এটিই নবীজী (সা:)’র সূন্নত। রাষ্ট্রের ইসলামীকরণের লক্ষ্যে নবীজী (সা:) নিজে ১০ বছর রাষ্ট্র প্রধানের আসনে বসেছেন। মুসলিমদের গৌরব কালে তাদের সফলতার মূল কারণটি হলো, সে আমলে মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত প্রেসক্রিপশনের পূর্ণ প্রয়োগ হয়েছিল উভয় ক্ষেত্রেই। মুসলিমদের আজকের ব্যর্থতার কারণ, তাদের নিদারুন ব্যর্থতা উভয় ক্ষেত্রেই। ইসলামীকরণ যেমন হয়নি ব্যক্তি-জীবনে, তেমনি হয়নি রাষ্ট্রীয় জীবনেও। দেশে মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়লেও ইসলামী করণের কাজ হয়নি শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, আইন-আদালত ও প্রশাসনে। বরং দ্রুত গতিতে হয়েছে দুর্বৃত্তিতে জোয়ার আনার কাজ। দুর্বৃত্তিতে এতটাই বৃদ্ধি আনা হয়েছে যে একটি মুসলিম দেশ হয়েও বাংলাদেশ এ শতাব্দীর শুরুতে পর পর ৫বার দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছে। এটি কি কম লজ্জার?

রাষ্ট্র পরিশুদ্ধ করণের মূল হাতিয়ারটি হলো জিহাদ। এটিই ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। এ ইবাদতে বিনিয়োগ হয় ব্যক্তির অর্থ, মেধা, শ্রম ও রক্তের্। জিহাদের এ ফরজ বিধান প্রতিটি ঈমানদারকে দুর্বৃত্ত শক্তির নির্মূলে আমৃত্যু লড়াকু সৈনিকে পরিণত করে। এ জিহাদে প্রাণ গেলে সরাসরি জান্নাত জুটে। নবীজী (সা:)’র সাহাবীদের শতকরা ৬০ ভাগের বেশী শহীদ হয়েছেন। যে দেশে জিহাদ নাই সে দেশ অবশ্যই দুর্বৃত্তদের দখলে যায়। রাষ্ট্র তখন দেশবাসীকে জাহান্নামে নেয়ার বাহনে পরিনত হয়। দুর্বৃত্তকবলিত সে দুষ্ট রাষ্ট্রটি জাহান্নামে নেয়ার ভয়ানক কাজটি করে ইসলামবর্জিত শিক্ষা ব্যবস্থা, অশ্লিল সংস্কৃতি, ইসলাম বিরোধী মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তির দুর্বৃত্তি এবং চুরি-গুম-খুন-সন্ত্রাসের রাজনীতির মাধ্যমে। পরিশুদ্ধির বদলে এদের হাতে দুষ্টকরণের কাজটিই তখন বেশী বেশী হয়। বাংলাদেশ তারই উদাহরণ। ফলে শাসকের যে স্থানে বসেছেন খোদ নবীজী (সা:), বাংলাদেশে সে আসনে বসেছে একজন দুর্বৃত্ত ভোটচোর। এটিই হলো বাংলাদেশে ১৬ কোটি মুসলিমের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কিন্তু সে ব্যর্থতা অনুশোচনা ক’জনের? এ দুষ্ট প্রক্রিয়া থেকে বেড়িয়ে আসার ভাবনাই বা ক’জনের।  

২. বেঈমানীর পরিচয়

মহান আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকার করাই শুধু বেঈমানী নয়। বরং সুস্পষ্ট বেঈমানী হলো, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিচার, অর্থনীতি এবং প্রশাসনে ইসলামের বিধ্যানগুলিকে মেনে না চলা। আদালতে কুফরী আইন, রাজীনীতিতে সেক্যুলারিজম, অর্থনীতিতে সূদ, অফিসে ঘুষ, সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানী এবং পোষাকে বেপর্দাগী –এগুলি কি ঈমানদারীর পরিচয়? সুস্পষ্ট বেঈমানী হলো ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী শিক্ষা ও শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করা। যেখানে ইসলাম সেখানেই এ বেঈমানদের শত্রুতা। এবং সে বেঈমানী নিয়েই বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি।

৩. সভ্যতা ও অসভ্যতার পরিচয়

জঙ্গল যতই গভীর হয় ততই সেটি হিংস্র পশুদের আস্তানা হয়। তাই জঙ্গলের পরিচয় মেলে সেখানে হিংস্র জীবজন্তুর পদচারণা দেখে। তেমনি দেশ যতই অসভ্য হয়, ততই সে দেশ দুর্নীতিপরায়নদের আস্তানা হয়। তাই দেশ কতটা অসভ্য –সেটির পরিচয় মেলে গুম, খুন ও সন্ত্রাসের অসভ্য নায়কদের শাসন দেখে। তখন মিছিল করলে লাশ হতে হয়, সরকারকে নিন্দা করলে জেলে যেতে হয়, নারীরা ধর্ষিতা হয় এবং নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হয়।

অসভ্য সমাজের ন্যায় সভ্য সমাজকেও খালি চোখে দেখা যায়। সভ্য জনপদে কখনো হিংস্র পশুদের বসবাস থাকে না। হিংস্র পশু ঢুকলে সেটিকে হত্যা করা হয়। সভ্য সমাজে থাকে না অসভ্য ও দুর্নীতিপরায়ন ব্যক্তির শাসন। হিংস্র পশুকে যেমন তাড়ানো হয়, তেমনি তাড়ানো দুর্বৃত্তদেরও। তাই সে সভ্য সমাজে কখনোই খুনি, ভোটচোর এবং স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তকে দেশের বন্ধু, পিতা, নেতা ও প্রধানমন্ত্রী করার ন্যায় অসভ্য কর্ম কখনোই ঘটেনা। কিন্তু বাংলাদেশে হয়। বাংলাদেশ যে কতটা অসভ্য দেশে পরিণত হয়েছে -এ হলো তারই প্রমাণ।

৪. শিক্ষায় অনীহা

যারা বোধশূণ্য এবং সে সাথে ঈমানশূণ্য -তারা ভাবে তাদের দায়িত্ব শুধু পানাহারে বাঁচা। পশুও এর চেয়ে বেশী কিছু ভাবে না। বোধশূণ্যতার আরো পরিচয়: তারা ভাবে, জ্ঞান লাভ বা বই পড়ার দায় তাদের নাই। ফলে তারা বই কেনে না, এবং বই পড়েও না। তারা ভাবে তাদের কানে জ্ঞানের কথা পৌঁছে দেয়ার দায় অন্যদের। একটি দেশের জনগণ কতটা নীচে নামছে -সেটি বুঝার জন্য তাই কোন গবেষণার পড়ে না। সেটি বুঝা যায় বইয়ের দোকানগুলির দিকে তাকালে। কতগুলি বই এবং কীরূপ বই বিক্রয় হয় বা পড়া হয় -তা দেখেই সেটি সঠিক ভাবে বলা যায়।

দেহ বাঁচাতে যেমন খাদ্য চাই, তেমনি ঈমান বাঁচাতে চাই কুরআনী জ্ঞান। ইসলামে জ্ঞানার্জন তাই ফরজ। তাই একজন মুসলিম বেনামাযী থাকবে সেটি যেমন ভাবা যায়না, তেমনি ভাবা যায় না সে নিরক্ষর বা অজ্ঞ থাকবে। ব্যক্তির অজ্ঞতা্‌ই সঠিক পরিমাপ দেয় তার ঈমানহীনতার। একজন ব্যক্তি ঈমান নিয়ে কতটা বেড়ে উঠতে চায় -সেটি বুঝা যায় কুর’আনের জ্ঞানলাভে তার আগ্রহ দেখে। এজন্যই ঈমানদার ব্যক্তি শুধু চাল,ডাল, মাছ, মাংস কেনে না, বই কেনাও জরুরি মনে করে। নিজের খাবার যেমন নিজে খায়, তেমনি নিজের জ্ঞান লাভের কাজটিও নিজে করে।

৫. কী বলে ভোটচোর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?

সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা: কেউ আইনের উর্দ্ধে নয়, সবার বিচার করা হবে। এটি কি বিচারের নামে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি হুমকির বাণী? তার কথায় সামান্যতম সত্যতা থাকলে ভোটচুরির অপরাধে হাসিনাকে কেন রিমান্ডে নেয়া হয়না? সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের খুনী ভাইকে কেন জেলে থেকে মুক্তি দেয়া হয়? এরা কি আইনের উর্দ্ধে? এই কি বিচারের নমুনা?

বাংলাদেশের পুলিশ পরিণত হয়েছে সরকারী দলের গুন্ডা বাহিনীতে। তাদের কাজ হয়েছে সরকার বিরোধীদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া। কখনো বা ক্রসফায়ারে দিয়ে হত্যা করা। জনগণের কাজ হয়েছে রাজস্ব দিয়ে এ সরকারী গুন্ডাদের প্রতিপালন করা।

৬. যে বিপদ অপরাধীদের শাসনে

স্রেফ ক্ষমতা লাভের জন্য যে ব্যক্তি ভোট চুরি করতে পারে, সে ব্যক্তি ঠান্ডা মাথায় মানুষও খুন করতে পারে। হাসিনার সে খুনি চরিত্রটি ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যায় দেখা গেছে। এবং সে চরিত্রটিই ২৬ মার্চ দেখা গেল ২১ জনকে হত্যা করাতে। ক্ষমতালোভী অপরাধীর হাতে দেশ যখন অধিকৃত হয় তখন দেশ জুড়ে এরূপ অপরাধই ঘটতে থাকে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিশালী পদটি প্রধানমন্ত্রীর। যার শক্তি বেশী, তার দায়িত্বও সবচেয়ে বেশী। কিন্তু সে শক্তিশালী ব্যক্তিটি যদি চোর বা ডাকাত হয়, তখন সে শক্তির বিনিয়োগ হয় চুরি-ডাকাতিতে। এখানেই বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদ। শেখ হাসিনা গৃহবধু বা অফিসের কর্মচারী হলে এতো বিপদ হতো না। বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিধর ব্যক্তি যে একজন চোর -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? ভোটচুরি করে নিজের চরিত্র হাসিনা দেখিয়ে দিয়েছে। ফলে সরকার প্রধান রূপে তার বিশাল সামর্থ্য ব্যয় হচ্ছে চুরি-ডাকাতি বাড়াতে। এতে হাজার হাজার কোটি টাকা প্রতি বছর চুরি হয়ে যাচ্ছে দেশের ভান্ডার থেকে।

৭. অসভ্য রীতি

প্রতিটি সভ্য দেশেই চোরকে চোর এবং ডাকাতকে ডাকাত বলা হয়। একই ভাবে স্বৈরাচারিকে স্বৈরাচারি বলা হয় এবং ক্ষমতা থেকে তাকে নামিয়ে দেয়া হয়। তাদেরকে ঘৃণা করাই সভ্য রীতি। এবং অসভ্যতা ধরা পড়ে এ দুর্বৃত্তদের সন্মান করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যা হলো, এ দেশে দুর্বৃত্তদের ঘৃণা করার সভ্য রীতি চলে না। ফলে এদেশে হাসিনার ন্যায় জঘন্য ভোটচোরকে মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী বলা হয়। এবং গণতন্ত্র হত্যাকারী বাকশালী মুজিবকে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা বলা হয়। কথা হলো, যে দেশে এমন অসভ্য আচরণ হয় সে দেশকে কি সভ্য দেশ বলা যায়? ২৯/০৪/২০১৮




অর্জিত হচ্ছে কি রমযানের রহমত?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

কোথায় সে রহমত প্রাপ্তি?

?

সেটিই বা কতটা অর্জিত হচ্ছে?

দায়িত্ব ও প্রশিক্ষণ

তাঁরা ব্যর্থ হয়েছে সে ট্রেনিং সমুহ থেকে শিক্ষা নিতে। ফলে তারা দারুন ভাবে ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার খলিফার দায়িত্ব পালনে। বরং পরিণত হয়েছে শয়তানের খলিফায়। শয়তান চায়, মানব সন্তানগণ তাদের সামর্থ্যের বিনিয়োগ করুক ব্যক্তি স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্বার্থ ও গোত্রীয় স্বার্থকে বিজয়ী করতে এবং পরিত্যক্ত হোক ইসলামকে বিজয়ী করার এজেন্ডা। শয়তান তার এজেন্ডাকে বিজয়ী করতে সফল হয়েছে। এবং মুসলিমদের মাঝে বেড়েছে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডার সাথে গাদ্দারী। ফলে ৫৭টি মুসলিম দেশের কোথাও ইসলাম বিজয় পায়নি। নামায, রোযা, হজ্জ, ও যাকাত যে কারণে ফরজ করা হয়েছিল -সেটিও অর্জিত হয়নি।

যে ব্যর্থতা রোযায়

নিছক মোনাজাত ও নফল ইবাদতে সেটি সম্ভব হলে হয়তো ইতিমধ্যেই সেটি জুটতো। কারণ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে সেগুলোই সবচেয়ে বেশী বেশী হচ্ছে।

আনে কাফের, জালেম ও ফাসেক বলা হয়েছে, মুসলিম দেশে সে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাই নাই। ফলে মাহে রমযান থেকে কোথায় সে তাকওয়া অর্জন?   

মুমিন ব্যক্তিকে মহান আল্লাহতায়ালা অবশ্যই ক্ষমা করেন। কিন্তু সে ক্ষমাপ্রাপ্তির জন্য পূর্বশর্ত আছে। সেটি যেমন তাকওয়া অর্জন, তেমনি ইসলামে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। পূর্ণ আত্মসমর্পণ না করে নিছক দয়া ভিক্ষায় যে লাভ হয় না -সেটিই এ আয়াতে সুস্পষ্ঠ করা হয়েছে।

তাকওয়ার সংস্কৃতি ও বিদ্রোহের সংস্কৃতি

আনে এমন বিদ্রোহীকে শাস্তির ঘোষনা শোনানো হয়েছে বার বার। অথচ সেরূপ বিদ্রোহ মুসলিম জীবনে সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বিদ্রোহের এ সংস্কৃতিতে কি শরিয়ত পালিত হয়?

সঞ্চয় ও সম্ভোগও করে। তবে সে উপার্জন ও সম্ভোগের মধ্যে মহান আল্লাহতায়ালা হারাম-হালালের বিধিনিষেধ বেঁধে দিয়েছেন। তাকওয়া হলো সে বিধিনিষেধগুলো মেনে চলা।

এভাবেই মুসলিম জীবনে সৃষ্টি হয় তাকওয়া তথা মহান আল্লাহতায়ালাকে ভয় করে চলার সংস্কৃতি।

সাংস্কৃতিক জীবনেও তাঁর অবাধ্যতা। ফলে রাষ্ট্র মুক্ত হয় তাঁর হুকুমের বিদ্রোহীদের থেকে।

সে রহমত কি শয়তানের বিজয়কে আরো বলবান করতে?

মাস কোরআন নাযিলের

?

নামাযে নিদারুণ ব্যর্থতার বিষয়গুলি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

নামাযের কেন এতো গুরুত্ব?

যে ইবাদতটি অমুসলিম থেকে মুসলিমকে পৃথক করে -তা হলো নামায। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নামায কাফের ও মুসলিমের মাঝে দেয়াল রূপে কাজ করে। নামায না থাকলে মুসলিম আর অমুসলিমের মাঝে কোন পার্থক্যই থাকে না, উভয়ে একাকার হয়ে যায়। ব্যক্তির ঈমান দেখা যায় না। রোযাও দেখা যায় না –যদি সে নিজে থেকে তা প্রকাশ না করে। তেমনই কে যাকাত দেয়, সেটিও বুঝা যায় না –যদি না সে ব্যক্তি অন্যদের জানিয়ে দেয়। আর হজ্জ তো সবার জন্য ফরজ নয়; ফলে হজ্জ না করাতে কেউ অমুসলিম হয় না। কিন্তু নামায দেখা যায়। কারণ নামাযে যে শুধু দৃশ্যমান ক্বিয়াম, রুকু, সিজদা ও বৈঠক আছে –তা নয়। নামায পড়তে হয় লোকালয়ের মসজিদে হাজির হয়ে। ঘরে বা দোকানে নামায পড়লেও তা অন্যদের নজরে পড়ে। তাই কে নামাযী আর কে বেনামাযী -সমাজে সেটি গোপন থা্কে না। অপর দিকে নামাযই ব্যক্তির ঈমানের পরিমাপ দেয়; মুসলিম না অমুসলিম -সেটিও প্রকাশ করে দেয়। প্রতিদিনের প্রশিক্ষণে যদি কোন সৈনিক হাজির না হয় তবে সৈনিকের খাতায় তার নাম থাকে না। কারণ, সৈনিক জীবনে থাকে যুদ্ধের দায়বদ্ধতা। দায়িত্ব পালনের সে সামর্থ্য কখনোই প্রশিক্ষণ ছাড়া সৃষ্টি হয়না। ফলে প্রশিক্ষণে আগ্রহ নাই -এমন ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভর হয় সৈনিক হওয়া। ফলে বহিস্কৃত হয় সেনা বাহিনী থেকে। তেমনি মসজিদের জামায়াতে যে ব্যক্তি হাজির হয় না -তাকেও কি মুসলিম বলা যায়? মুসলিম মাত্রই তো মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক; এবং তাঁর জীবনে আমৃত্যু যুদ্ধটি হলো অন্যায়ের নির্মূলে ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। সে যুদ্ধেও তো সামর্থ্য ও কোরবানী চাই। চাই তাকওয়ার বল। নামায-রোযা এবং হজ্জ-যাকাতের ইবাদত তো সে তাকওয়া, সামর্থ্য ও কোরবানী বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ। এরূপ প্রশিক্ষণে মুনাফিকদের অংশগ্রহণ থাকে না। তারা হাজির হয়না মসজিদে ৫ ওয়াক্ত নামাযে –বিশেষ করে ফজর ও এশার নামাযে। ফলে তাদের দেখা যায়না ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদে। এভাবেই প্রকাশ পায় তাদের মুনাফিকি।  

কোন বেনামাযী যে জান্নাতে যাবে না -তা নিয়ে বিতর্ক নাই। কারণ, জান্নাত তো একমাত্র ঈমানদারদের জন্য। সে পবিত্র স্থানে বেঈমানের কোন স্থান নেই। আর ঈমানদার তো সেই যে নামায পড়ে। আগুন জ্বললে, উত্তাপ দিবেই। তেমনি হৃদয়ে ঈমান প্রবেশ করলে, সে ব্যক্তির জীবনে নামায-রোযা আসবেই। আগুন থেকে যেমন তার উত্তাপকে আলাদা করা যায় না, তেমনি ঈমানদার থেকে পৃথক করা যায় না তার নামাযকে। হাদীসে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম যে ইবাদতের হিসাব নিবেন সেটি হলো নামায। সুরা মুলকে বলা হয়েছে, জাহান্নামবাসীদের জিজ্ঞাসা করা হবে তোমরা কীরূপে এখানে পৌঁছলে? সর্বপ্রথম যে কারণটিকে তারা উল্লেখ করবে তা হলো, তারা নামায পড়তো না। নামাযের মূল্য বেনামাযীগণ ইহকালে না বুঝলেও বুঝবে জাহান্নামে পৌঁছার পর। জাহান্নামবাসীদের সে বেদনাদায়ক উপলব্ধিকে মহান আল্লাহতায়ালা কুর’আনে উল্লেখ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। সেটি হলো, যাদের জীবনে এখনো মৃত্যু আসেনি তাদেরকে সাবধান করতে। জাহন্নামে পৌঁছার আগে তথা দুনিয়ার বুকে থাকতেই তারা যেন বুঝতে পারে নামাযের গুরুত্ব। নইলে জাহান্নামে পৌঁছে শুধু আফসোসই হবে, করার কিছু থাকবে না। কুর’আন মজীদ মানব জীবনের রোডম্যাপ। এ রোডম্যাপ শুধু জান্নাতের পথই দেখায় না, পথ চলায় ভূল হলে -সে ভূলটিও তুলে ধরে। সামনে অপেক্ষামান জাহান্নামের বিপদের কথাও বলে।    

 

কীরূপে ব্যর্থ হয় নামায?                                                                 

আঁখ চিনিকলে নিক্ষিপ্ত হলে চিনিতে পরিণত হয়। সেরূপ না হলে বুঝতে হবে চিনিকলে ত্রুটি রয়েছে? নামাযের মধ্যেও তেমনি একটি প্রক্রিয়া কাজ করে -যা পরিশুদ্ধি আনে ব্যক্তির জীবনে। সে পরিশুদ্ধি না এলে বুঝতে হবে নামাযে ত্রুটি আছে। এবং ত্রুটি কোথায়, সেটি বুঝতে হলে নামাযকে মিলিয়ে দেখতে হয় সাহাবীদের নামাযের সাথে। কারণ, তাঁরাই হলেন নামাযসহ সকল ইবাদত-বন্দেগীর অনুকরণীয় মডেল। নামাযের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ শুধু ক্বিয়াম, রুকু, সিজদা বা বৈঠক নয়। স্রেফ সুরা পাঠ, তাশাহুদ পাঠ, দরুদ ও তাসবিহ পাঠও নয়।  বরং সেটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে নামাযীর মনের সংযোগ। এবং সে সংযোগটি ঘটে তাঁর রহমত, কুদরত, ফজিলত ও আয়াত সমূহের স্মরণের মধ্য দিয়ে। সুরা বাকারা’য় বলা হয়েছে, “ফাযকুরুনি আযকুরুকুম” অর্থ: “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো।” এটি বান্দার প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ঘোষিত পবিত্র ওয়াদা। আর ওয়াদা পালনে তাঁর চেয়ে আর কে শ্রেষ্ঠ হতে পারে? সুরা যুখরুফে বলা হয়েছে, কারো মন থেকে যখন আল্লাহতায়ালার স্মরণ বিলুপ্ত হয় তখন তার উপর শয়তান নিযুক্ত করে দেয়া হয়। এবং সে শয়তান তাকে জাহান্নামে নেয়। সুরা হাশরে বলা হয়েছে যারা মহান আল্লাহতায়ালাকে ভূলে থাকে তাদের জীবন থেকে ভূলিয়ে দেয়া হয় নিজেদের  কল্যাণের বিষয়গুলি। নামাযের মুল কাজ তো ঈমানদারের মনে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণকে জাগ্রত করা। সেটি শুরু হয় নামাযের আযান ও ওযু থেকে। নামাযে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণের মাধ্যমে ঈমানদার নিজেও স্থান করে নেয় মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণে। এটিই তো নামাযের শ্রেষ্ঠ দান।

কিন্তু নামাযীর মন থেকে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ বিলুপ্ত হলে কি সে নামাযের কোন মূল্য থাকে? সেটি তো মনের এক চেতনাহীন বেহাল অবস্থা। সেরূপ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পবিত্র কুর’আনে  বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ, তোমরা মাদকাসক্ত অবস্থায় নামাযের নিকটবর্তী হয়োনা -যতক্ষণ না তোমরা যা পড় তা বুঝতে না পারো…”। –(সুরা নিসা, আয়াত ৪৩)। উপরুক্ত আয়াতে রয়েছে চিন্তা-ভাবনার এক গুরুতর বিষয়। আয়াতটি যখন নাযিল হয়, মদ তখনও হারাম হয়নি। ফলে নবীজী (সা:)’র অনেক সাহাবী মাতাল অবস্থায় মসজিদে হাজির হতেন। মদপানের কুফল হলো, এতে বিলুপ্ত হয় চিন্তা-ভাবনার ক্ষমতা। তখন নামাযীর মন থেকে বিলুপ্ত হয় মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ। এবং বিলুপ্ত হয় মহান মা’বুদের সাথে বান্দার মনের সংযোগ। ফলে নামাযে পবিত্র কুর’আন থেকে যা কিছু তেলাওয়াত হয় -তাতে মনযোগ দেয়া তখন অসম্ভব হয়। তখন অসম্ভব হয় চেতনায় জাগরন বা পরিশুদ্ধি। আর চেতনায় পরিশুদ্ধি না আসলে চরিত্রে পরিশুদ্ধি আসবে কীরূপে? অথচ কুর’আন নিজেই যিকরের কিতাব। সে যিকরের সাথে নিজেকে জড়িত করতে তো যিকির রত মন চাই। সুরা ক্বাফে বলা হয়েছে, “ইন্না ফি যালিকা লা যিকরা লিমান কানা লাহু ক্বালবুন আও আলকাস সাময়া ওয়া হুয়া শাহীদ।” অর্থ: নিশ্চয়ই এ কিতাব (কুর’আন)’র মধ্যে রয়েছে যিকর; (এবং সেটি) তাদের জন্য যাদের রয়েছে ক্বালব এবং যারা কাজে লাগায় শ্রবনশক্তিকে এবং সাক্ষ্য দেয় সত্যের পক্ষে। –(সুরা ক্বাফ, আয়াত ৩৭)। অর্থাৎ কুর’আন থেকে শি্ক্ষা নিতে চাই জাগ্রত ক্বালব, তীক্ষ্ণ শ্রবনশক্তি এবং সত্যকে সত্য রূপে দেখার দৃষ্টিশক্তি। মাদক-সেবন এর সবগুলিই কেড়ে নেয়। ফলে ব্যহত হয় সুস্থ্য বিবেক নিয়ে ও প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। পবিত্র জায়নামাযে নামাযীর এরূপ মাদকাসক্তি ও মনযোগহীনতা মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহাতায়ালার কাছে ভাল লাগেনি। তাই হুকুম দিয়েছেন মাদকাসক্ত চেতনাহীনতা নিয়ে নামাযে না দাঁড়াতে।

শ্রেষ্ঠ যিকর

মু’মিনের উত্তম যিকর হলো তাঁর নামায। এরূপ পবিত্র যিকির পীরের খানকায়, সুফি হালকায় বা বনে-জঙ্গলে সম্ভব নয়। তাই পবিত্র কুর’আনে  সে সব খানকায়, হালকায় ও বনে-জঙ্গলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি। বরং নির্দেশ এসেছে নামাযে ছুটে যাওয়ার। সুরা জুম্মায়াতে বলা হয়েছে, “যখন জুম্মার দিনে নামাযের জন্য ডাকা (আযান দেয়া) হয়, তখন তোমরা আল্লাহর যিকিরে ( অর্থাৎ নামাযে) ছুটে যাও।” নামায ঈমানদারকে প্রতিদিন ৫ বার সে যিকরে হাজির করে। ঈমানদার ব্যক্তি এভাবে শুধু নিজেই মহান আল্লাহতায়ালার যিকর করে না, বরং অন্ততঃ দিনে ৫ বার মহা প্রভুর স্মরণে জায়গা করে নেয়। এভাবেই গড়ে উঠে মা’বুদের সাথে বান্দার গভীর সম্পর্ক।

বস্তুত প্রতিটি ইবাদতই হলো মহান আল্লাহতায়ালার যিকর। রোযার যিকর হয় সমগ্র দিন ব্যাপী; এবং সেটি সমগ্র রমযানের মাস জুড়ে। হজ্জে সে যিকর চলে হজ্জের ইহরাম বাধাকালীন সময়ে। মহান আল্লাহতায়ালার যিকর তখনও হয় যখন বান্দা যাকাত দেয়। এদিক দিয়ে নামায অনন্য; যিকরের আয়োজন হয় কম পক্ষে দিনে ৫ বার এবং চলে আমৃত্যু। যারা তাহাজ্জুদ ও নফল নামায পড়ে -তাদের জীবনে যিকরের মাত্রা আরো অধিক ও দীর্ঘ। অপর দিকে একমাত্র নামাযেই যিকরের কিতাব তথা পবিত্র কুর’আন থেকে পাঠ করাটি বাধ্যতামূলক; রোযা, হজ্জ বা যাকাতের ন্যায় অন্য কোন ইবাদতে সে হয়না।

সর্বকালে ও সর্বজনপদে মানবের মনে যিকর তথা ধ্যানমগ্নতাকে প্রতিষ্ঠা দেয়াই হলো মহান আল্লাহতায়ালার নীতি। কারণ এ যিকরই দেয় জান্নাতের পথে চলার আগ্রহ। দেয় সত্য পথের সন্ধান। এবং মজবুত করে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে বন্ধন। সে যিকর প্রতিষ্ঠায় প্রতি যুগেই নামায গণ্য হয়েছে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম রূপে। তাই হযরত মূসা (সা:)’র সাথে প্রথম বাক্যালাপেই তাঁকে যে নির্দেশটি দেন সেটি হলো নামাযের। হযরত মূসা (সা:)’র সাথে মহান আল্লাহতায়ালার প্রথম বাক্য বিনিময় হয় পবিত্র তুয়া উপত্যাকায়। নিজ পরিবারকে নিয়ে তখন তিনি মিশরে ফিরছিলেন। হযরত মূসা (সা:)কে নির্দেশ দেয়া হয়, “নিশ্চয় আমিই আল্লাহ এবং আমি ছাড়া আর কোন ইলাহা নাই। অতএব আমার ইবাদত করো এবং প্রতিষ্ঠা দাও নামাযকে –যাতে আমার যিকর করতে পার।” –(সুরা ত্বাহা, আয়াত ১৪)।  

নামাযে যিকরের মূল ভূমি হলো কুর’আনে র আয়াত। নামাযীর মনের গভীরে মহান আল্লাহাতায়ালা তাঁর পবিত্র বাণীগুলি গেঁথে দেন পবিত্র কুর’আনের আয়াতগুলির মাধ্যমে। নামাযীর চেতনার সাথে হয় মহাপ্রভুর সংলাপ। তখন ধ্যানমগ্ন হয় নামাযীর মন। কিন্তু ধ্যানের সে সামর্থ্য মাতাল ব্যক্তির অবচেতন মনের থাকে না। তখন ব্যর্থ হয় নামাযের মূল উদ্দেশ্য। সে ব্যর্থতা থেকে বাঁচাতেই মদ পান করে নামাযে আসা হারাম। এবং পরবর্তীতে পুরাপুরি হারাম ঘোষিত হয় মদ্যপান। তবে দুর্ভাবনার আরেকটি গুরুতর কারণ হলো, মানব মনের যিকরের সে সামর্থ্যটি শুধু মদই কেড়ে নেয়, একই ভাবে কেড়ে নেয় কুর’আন বুঝার অক্ষমতাও। তখন নামায ব্যর্থ হয় নামাযীর জীবনে কাঙ্খিত চারিত্রিক বিপ্লব আনতে।

তাই কত কোটি লোক নামায পড়লো সেটিই বড় কথা নয়। কতজন দুর্বৃত্তকে নামায চরিত্রবান করলো, কতজনকে ফিরালো পাপকর্ম থেকে এবং কতজনকে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার মুজাহিদে পরিণত করলো -সেটিই মূল কথা। এক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলির কোটি কোটি নামাযীর ব্যর্থতাটি বিশাল। ব্যর্থতার দলিল হলো: নামায পড়েও কোটি কোটি মানুষ মিথ্যা বলছে, ঘুষ খাচ্ছে, সূদ খাচ্ছে, দুর্নীতি করছে এবং শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে রাজনীতিও করছে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলি রেকর্ড গড়ছে দুর্বৃত্তিতে। এক্ষেত্রে ব্যর্থতাটি নামাযের নয়, বরং যারা নামায পড়ে তাদের। নামাযী ব্যর্থ হচ্ছে নামাযে দাঁড়িয়ে ধ্যানমগ্ন হতে। নামাযী ব্যর্থ হচ্ছে নামাযে দাঁড়িয়ে নিজ জীবনের হিসাব নিতে। এরূপ ব্যর্থতার মূল কারণ, নামাযীদের কুর’আন বুঝার অক্ষমতা। মদের প্রভাব কয়েক ঘন্টায় শেষ হয়। কিন্তু কুর’আন বুঝার ক্ষেত্রে যে অক্ষমতা, সেটি ব্যক্তিকে অক্ষম রাখে আমৃত্যু। এ অক্ষমতা ডেকে আনে মানব জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক ব্যর্থতা।সেটি জাহান্নামে পৌঁছার। ঈমান পুষ্টি পায় পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান থেকে। তাই মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো কুর’আন বুঝার সক্ষমতা অর্জন। এজন্যই নামায-রোযার পূর্বে কুর’আনে র জ্ঞান লাভ ফরজ করে হয়েছে। সে ভয়ানক ব্যর্থতা থেকে বাঁচতেই মিশর, ইরাক, সিরিয়া, সূদান, মরক্কো, আলজিরিয়া, লিবিয়া, মালি, তিউনিসিয়ার ন্যায় বহু দেশের জনগণ মাতৃভাষাকে দাফন করে কুর’আনের ভাষাকে আপন করে নেয়। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, ভাষাপ্রেম তাদের জান্নাতে নিবে না। বরং জান্নাতে নিবে কুর’আনের জ্ঞান।           

মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান হলো পবিত্র কুর’আন। এ কুর’আনই দেখায় জান্নাতের পথ। দেয় সভ্যতর ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের রোডম্যাপ। কুর’আনে র কারণেই নামাযের শ্রেষ্ঠত্ব। প্রতিটি নামাযীকে নামাযের প্রতি রাকাতে কুর’আনে র কিছু অংশ পাঠ করতে হয়। নইলে নামাযই হয় না। নামাযের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো ক্বিয়াম অর্থাৎ জায়নামাযে দাঁড়ানো থাকাকালীন সময়। এ সময়টিতে কুর’আন থেকে কিছু পাঠ করা হয়। কুর’আন পাঠের সে কাজটি রুকু, সিজদা বা বসাকালীন সময়ে হয় না। তাই যে নামাযে দীর্ঘ সময় ক্বিয়ামে কাটানো হয় -সে নামাযের ওজন অধিক। নামাযের সাথে কুর’আনে র গভীর সম্পর্কের বর্ণনাটি এসেছে সুরা আরাফে। বলা হয়ছে, “এবং যারা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলো কুর’আনকে এবং প্রতিষ্ঠা দিল নামাযকে, নিশ্চয়ই আমরা (এরূপ) সৎকর্মশীলদের প্রতিদানকে নষ্ট করিনা।”–(আয়াত ১৭০)। একই রূপ বর্ণনা এসেছে সুরা আনকাবুতে। বলা হয়েছে, “(হে মুহম্মদ), তোমার উপর ওহী রূপে যা নাযিল করেছি তা পাঠ করো কিতাব থেকে (অর্থাৎ কোরআনকে) এবং প্রতিষ্ঠা দাও নামাযকে। নিশ্চয়ই নামায বাঁচায় ফাহেশা (অশ্লিলতা, জ্বিনা, পাপাচার) ও দুর্বৃত্তি থেকে। এবং নিশ্চয়ই আল্লাহর যিকরই সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম। এবং আল্লাহ জানেন যা কিছু তোমরা করো। –(সুরা আনকাবুত, আয়াত ৪৫)। উপরুক্ত দুটি আয়াতে  পবিত্র কুর’আন এবং নামাযে কুর’আন পাঠের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দিনের অন্য সময়ে কুর’আন পাঠের সুযোগ না মিললেও সেটিকে ৫ বার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে নামাযে সুরা তেলাওয়াতের মাধ্যমে। রোগের ভ্যাকসিন নিলে সে রোগ থেকে বাঁচা যায়। তখন শরীরে বাড়ে রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা। কুর’আনের জ্ঞান ব্যক্তির চেতনা রাজ্যে তেমনি এক ভ্যাকসিনের কাজ করে। তখন বাড়ে দুষ্ট মতবাদ, মিথ্যা ও ফাহেশার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা। ফলে যে ব্যক্তি কোর’আন বুঝার সক্ষমতা নিয়ে প্রতিদিনে ৫ ওয়াক্ত নামায আদায় করে সে বাঁচে সকল প্রকার অশ্লিলতা, জ্বিনা, মিথ্যাচার, পাচার ও দুর্বৃত্তি থেকে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়েছে মিরাজের পর অর্থাৎ হিজরাতের মাত্র এক বা দেড় বছর আগে। প্রশ্ন হলো, এর আগে প্রায় ১১ বছর যাবত মক্কায় অবস্থান কালে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ কি করতেন? সে সময় কি ছিল তাঁদের ইবাদতের ধরণ? সে সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি ছিল পবিত্র কুর’আন পাঠ তথা কুর’আনের জ্ঞানার্জন। জ্ঞানই গড়ে চেতনা ও চরিত্র। অজ্ঞ ও জ্ঞানী ব্যক্তির চেতনা-চরিত্র কখনোই একই রূপ হয়না। সাহাবায়ে কেরাম যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব গড়ে উঠতে পরেছিলেন তার মূলে ছিল পবিত্র কুর’আনের গভীর জ্ঞান। নবুয়ত লাভের পর প্রথম যে কয়েকটি সুরা নাযিল হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম হলো সুরা মুজাম্মিল। এ সুরায় নবীজী (সা:)’র উপর নির্দেশ এসেছে যেন তিনি রাতের অর্ধেক অংশ বা তার চেয়ে কিছু বেশী বা কম অংশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পবিত্র কুর’আন থেকে আস্তে আস্তে তেলাওয়াত করেন। সাহাবাগণও সেটিই করতেন। ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজ হওয়ার পূর্বে ১১ বছর ধরে সে কাজ অবিরাম ভাবে চলতে থাকে। এভাবেই সাহাবাদের হৃদয়ে গভীর ভাবে স্থান করে নেয় পবিত্র কুর’আনে র জ্ঞান। সে জ্ঞানের উপর নির্মিত হয় তাদের বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও চারিত্রিক কাঠামো। এভাবে তারা বেড়ে উঠেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে।

যে নামায কল্যাণ আনে

নামায মুসলিম জীবনে কল্যাণ দিবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আজকের মুসলিম জীবনে নামাযের সে কল্যাণ কতটুকু? বাস্তবতা হলো, কোটি কোটি মানুষ নামায পড়লেও সবার নামায একই রূপ হয় না। সকল নামাযীর চেতনায় ও চরিত্রে একই রূপ বিপ্লবও আসে না। বরং অনেক নামাযীর জীবনে আসে মারাত্মক স্খলন। নামাযকে সফল করতে হলে যত্নবান হতে হয় নামাযের প্রতিটি ধাপে। প্রতি ওয়াক্ত নামাযের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট সময়; খেয়াল রাখতে হয় ওয়াক্তের দিকে। যেমন বলা হয়েছে, “নামায নির্দিষ্ট সময়ে আদায়ের জন্য মু’মিনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” –(সুরা নিসা, আয়াত ১০৩)। তবে জরুরি শুধু নির্দিষ্ট সময়ই নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো নামাযের জন্য নির্দিষ্ট স্থান মসজিদে গিয়ে নামায আদায়। এজন্যই জরুরি হলো, নামাযের আযান শুনে মসজিদের দিকে ধাবিত হওয়া। তাই মসজিদে নামায পড়া ও সঠিক ওয়াক্তে নামায পড়ার ক্ষেত্রে যারা গাফেল -তাদের রোগটি ঈমানে।

হাদীসে বলা হয়েছে, “যখন কোন মু’মিন ব্যক্তি নামাযের জন্য মসজিদ অভিমুখে রওয়ানা দেয়, তখন থেকেই সে নামাযে দাখিল হয়ে যায়। এবং প্রতি কদমে বৃদ্ধি করা হয় তার মর্যাদা। এবং মসজিদে গিয়ে নামাযের অপেক্ষায় বসে থেকেও সে নামাযের সওয়াব পায়।” মসজিদে নামায আদায়ের সওয়াব ঘরে নামায আদায়ের চেয়ে ২৭ গুণ অধিক। এমন কি অন্ধ ও পঙ্গুদেরও মসজিদে গিয়ে নামায আদায়ের উৎসাহ দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মকতুম (রা:) ছিলেন অন্ধ। তিনি নবীজী (সা:)কে বল্লেন, “আমি তো চোখে দেখিনা, ফলে মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করা কঠিন। আমি কি অনুমতি পেতে পারি ঘরে নামায পড়ার?” নবীজী (সা:) জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি ঘর থেকে আযান শুনতে পান?” বল্লেন, “হাঁ, আমি আযান শুনতে পাই।” নবীজী (সা:) বল্লেন, “তবে আপনাকে মসজিদে এসেই নামায পড়তে হবে।” –(আবু দাউদ শরীফ)। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণীত হাদীস: নবীজী (সা:)  বলেন, “আমার ইচ্ছা হয়, জ্বালানী কাঠ সংগ্রহের নির্দেশ দেই্। এরপর আযানের পর কাউকে ইমামতির দায়িত্ব দিয়ে ঐসব লোকদের বাড়ীতে যাই যারা মসজিদে নামাযে আসেনি এবং তাদের ঘরগুলি জ্বালিয়ে দেই।”–(বুখারী ও মুসলিম শরীফ)। আবু দাউদ শরীফের হাদীস: “যদি কোন মহল্লায় তিন জন মুসলিমও বাস করে তবে তাদের উচিত জামায়াতবদ্ধ ভাবে নামায আদায় করা।

তাছাড়া মসজিদে নামায আদায়ে মনের যে একাগ্রতা ও ধ্যানমগ্নতা থাকে -তা ঘর, অফিস বা দোকানের নামাযে থাকে না। কারণ, ঘর, অফিস ও দোকানে অন্যদের শোরগোল, কথা-বার্তাসহ দৃষ্টি কেড়ে নেয়ার মত অনেক কিছুই থাকে। ফলে সেখানে থাকে না যিকিরের পরিবশে। কিন্তু মসজিদ সাঁজানো হয় নামাযের জন্য। তাছাড়া মসজিদে বসে অন্যের নামায দেখে শেখারও অনেক কিছু থাকে। নামাযরত পাশের ব্যক্তির একাগ্রতা, ধ্যানমগ্নতা ও দীর্ঘ রুকু-সেজদা দেখে নিজের মনেও ভাল নামায আদায়ের আকাঙ্খা জাগে। তাছাড়া নেকড়ের পাল যেমন বিশাল মহিষকে একাকী পেলে ঘিরে ধরে, তেমনি ঈমানদারকে একাকী পেলে ঘিরে ধরে শয়তানও। তখন বান্দাহর উপর শয়তানের বিজয় সহজ হয়ে যায়।

 

মুসলিমের মিশন ও নামায

ইসলাম শুধু ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি চায় না। পরিশুদ্ধি চায় সমাজ ও রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতেও। চায়, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে চায়, ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। সেরূপ একটি প্রকল্পকে বিজয়ী করতে প্রতিটি ঈমানদারকে তাই অভিন্ন ভিশন ও মিশন নিয়ে বাঁচতে হয়। মুসলিমের মিশন তো তাই যা মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন। পবিত্র কুর’আনে  ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার সে পবিত্র ভিশনটি হলো “লি’ইউযহিরাহু আলাদ্দিনি কুল্লিহি” অর্থাৎ সকল দ্বীনের উপর তাঁর দ্বীন তথা ইসলামের বিজয়। ঈমানদারের দায়বদ্ধতা হলো সে ভিশন নিয়ে বাঁচা। ফলে মুসলিমের বাঁচার মিশনে লড়াই তখন অনিবার্য হয়ে পড়ে। কারণ, ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলে যে ভূমি সেটি তারা বিনা যুদ্ধে ছাড়তে রাজী নয়। ফলে জিহাদ ছাড়া মহান আল্লাহতায়ালার ভিশন নিয়ে সামনে এগুনোর আর কোন রাস্তা থাকে না। এবং যেখানেই যুদ্ধ,  সেখানে দুর্গ, সৈন্য ও সৈন্যের প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। মসজিদ হলো সেই দুর্গ, প্রতিটি নামাযী হলো সেই সৈনিক এবং ৫ ওয়াক্ত নামায হলো সেই প্রশিক্ষণ।

প্রশিক্ষণের অর্থ শুধু সামরিক কলাকৌশল শেখানো নয়, বরং মূল বিষয়টি হলো ইসলামের বিজয়ে জান, মাল, মেধাসহ সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগে নামাযীকে প্রস্তুত করা। এবং লক্ষ্য, নামাযীদের মাঝে সিসাঢালা দেয়ালসম অটুট ঐক্যের প্রতিষ্ঠা দেয়া। অতীতে মুসলিমগণ যখন একের পর বিজয় এনেছে, তখন মসজিদ ছাড়া তাদের কোন দুর্গ বা ক্যান্টনমেন্ট ছিল না। নামায ছাড়া তেমন নিয়মিত কোন প্রশিক্ষণও ছিল না। মসজিদের জায়নামাযে বসে জিহাদের প্রস্তুতি নেয়া হতো। তখন রাজস্বের সিংহভাগ খরচ করে কোন সেনাবাহিনী পালতে হয়নি। নামাযীগণ তখন নিজ অর্থ, নিজ খাদ্য, নিজ বাহন ও নিজ অস্ত্র নিয়ে রণাঙ্গণে হাজির হতো। তারা সেটিকে জান্নাতে প্রবেশের বাহন মনে করতো। মুসলিমদের মাঝে একতা, শৃঙ্খলা, আত্মনিয়োগ ও কোরবানীর সে সামর্থ্য গড়ে উঠেছিল নামাযের জায়নামাযে। আজ মুসলিম দেশগুলিতে বিপুল অর্থব্যায়ে ক্যান্টনমেন্টের সংখ্যা বেড়েছে, সৈন্য সংখ্যা ও তাদের প্রশিক্ষণের আয়োজনও বেড়েছে। কিন্তু তাতে বিজয় বাড়েনি বরং বেড়েছে পরাজয়। বরং বহু মুসলিম দেশে এ সৈনিকেরা পরিণত হয়েছে দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকচক্রের সেবাদাসে।

অন্য ধর্মের অনুসারিগণ ক্লাবে বা মদ্যশালায় বন্ধুত্ব গড়ে ও জোটবদ্ধ হয়। ইসলাম ভাতৃত্বের বন্ধন গড়ে মসজিদের পবিত্র মেঝেতে। জায়নামাযে ভাষা, গোত্র, বর্ণ ও এলাকাভিত্তিক কোন বিভক্তি থাকে না। সব নামাযীকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাতার বাঁধতে হয়। হাদীসে বলা হয়েছে, কাতারে ফাঁক থাকলে সেখানে শয়তান ঢুকে পড়ে। এবং জামাতবদ্ধ হওয়ার এ রীতি শুধু জায়নামাযে সীমিত রাখলে চলে না, সেরূপ একতাকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গণেও প্রতিষ্ঠা দিতে হয়। প্রতিষ্ঠা দিতে হয় রণাঙ্গণে। জামাতবদ্ধ নামাযের সেটিই তো গুরুত্পূর্ণ  শিক্ষা। মুসলিম মনে এমন একটি প্যান-ইসলামিক চেতনা বলবান হলে মুসলিমদের ভূগোলের আয়োতন বাড়লেও তখন ভূগোল খন্ডিত হয় না।

কিন্তু আজ মুসলিম উম্মাহর মাঝে যে বিভক্তি, তা দেখে নিশ্চিত বলা যায়, নামায থেকে তারা কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেনি।  তাদের নামায ব্যর্থ হয়েছে তাদের মাঝে সীসাঢালা দেয়ালসম একতা গড়তে। ফলে মুসলিম উম্মাহ আজ ৫৭টি রাষ্ট্রে খন্ডিত। অথচ বিভক্তি গড়া যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো বিভক্ত মানচিত্র নিয়ে বাঁচা। এবং পবিত্র ইবাদত হলো বিভক্তির দেয়াল ভেঙ্গে একতা গড়া –সেটি যেমন রাজনৈতিক তেমনি ভৌগলিক। মুসলিম রূপে বাঁচায় শুধু পানাহার হালাল হলে চলে না, হালাল হতে হয় দেশের ভৌগোলিক মানচিত্রও। পরিতাপের বিষয় হলো আজকের মুসলিমগণ বাঁচছে হারাম মানচিত্র নিয়ে। মুসলিম মানচিত্রের ভিত্তি হতে হবে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব; ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতা ভিত্তিক বিভক্তি নয়। নবীজী (সা:) তাঁর সাহাবাদের যুগে কি এরূপ বিভক্ত মানচিত্র গড়ার কথা ভাবা যেত? অথচ তাদের গড়া সে বিশাল ভূগোল ভেঙ্গে ৫০টির বেশী বাংলাদেশ গড়া যেত। কিন্তু তারা সেরূপ হারাম মানচিত্র নির্মাণের পথে পা বাড়াননি। আজকের মুসলিমগণ মুসলিম বিশ্বের ভৌগলিক আয়োতন এক ইঞ্চিও বাড়ায়নি, বরং বাড়িয়েছে রাষ্ট্রের সংখ্যা। বিভক্তির সে হারাম কাজে ঘটেছে গভীর রক্তপাত এবং ডেকে আনা হয়েছে কাফের শত্রুদের -যেমনটি ১৯১৭ সালে আরবভূমিতে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। মুসলিমদের আজকের পরাজয় ও পতনের মূল কারণ তো এই বিভক্তির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা হারাম মানচিত্র। আর হারাম নিয়ে যখন বসবাস তখন কি মহান আল্লাহতায়ালার রহমত পাওয়া যায়? তখন যেটি জুটে সেটি তো আযাব –সে হুশিয়ারিটি শোনানো হয়েছে সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। কিন্তু তা নিয়ে ভ্রুক্ষেপ ক’জনের? বাংলাদেশীদের উপর আযাবের সে দৃশ্যমান হাতিয়ার হলো ভারত; এবং ইসরাইলের হাতে সে আযাব পাচ্ছে আরবগণ।

যে নামায আযাব ডেকে আনে

নামায শুধু ঈমাদারগণই পড়ে না। মুনাফিকগণও পড়ে। মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন মু’মিনদের নামাযে এবং প্রচন্ড অখুশি হন মুনাফিকদের নামাযে। নামায তখন সওয়াবের বদলে আযাব ডেকে আনে। তাই শুধু নামায পড়লেই চলে না, নজর রাখতে হয় নামায যেন মুনাফিকের নামাযে পরিণত না হয়। কি ধরণের নামায মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ধ্বংস ও অভিসম্পাত ডেকে আনে -সে বিষয়টি জানানো হয়েছে সুরা মাউনে। বলা হয়েছে, “ফা ওয়াইলুল্লিল মুছাল্লীন। আল্লাযীনা হুম আন সালাতিহিম সা’হুন। আল্লাযীনা হুম ইউরাউন।” অর্থ: “অতঃপর ধ্বংস ঐসব নামাযীদের জন্য -যারা অমনযোগী বা দেরী করে নামায আদায়ে। তারা নামাযে খাড়া হয় লোক দেখানোর জন্য।”- (সুরা মাউন, আয়াত ৪-৬)।

নামায না পড়লে গর্দান থেকে ইসলামের রশি ছিন্ন হয়ে যায়। নবীজী (সা:)র জামানায় নামায গণ্য হতো মুসলিমের মূল পরিচিতি রূপে। যারা নামায পড়তো না, তারা গণ্য হতো কাফের রূপে। মুসলিম সমাজে কাফের রূপে পরিচিত হওয়ার বিপদ বুঝে মুনাফিকগণও তখন নামাযকে বেছে নিত ঢাল রূপে। তারা শুধু নামাযই পড়তো না, বরং নবীজী (সা:)র পিছনে প্রথম কাতারে হাজির হতো। লোক-দেখানো সে নামাযের মধ্য দিয়ে তারা মুসলিমদের ধোকা দিত। এবং ধোকা দিত মহান আল্লাহতায়ালাকেও। নামায নিয়ে মুনাফিকদের সে ষড়যন্ত্রকে ফাঁস করেছে সুরা নিসা। বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই মুনাফিকগণ আল্লাহকে ধোকা দেয়, আসলে তিনিই (আল্লাহ) তাদেরকে ধোকা দেন। এবং যখন তারা নামাযে দাঁড়ায়, দাঁড়ায় আলস্য নিয়ে এবং লোক-দেখানোর উদ্দেশ্য। আল্লাহকে তারা সামান্যই স্মরণ করে।” –(আয়াত ১৪২)।

তাই নামায বা অন্য কোন নেক আমল করলেই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তা গৃহিত হবে -বিষয়টি তেমন সহজ সরল নয়। নেক আমল কবুলের কিছু শর্ত আছে। সে শর্তের কথা শুনানো হয়েছে সুরা তাওবাতে। বলা হয়েছে, “তাদের দান আল্লাহর কাছে গৃহিত হওয়া থেকে কোন কিছুই বাধা দেয় না -একমাত্র এছাড়া যে, তারা অস্বীকার করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে, নামাযে দাঁড়ায় আলস্য নিয়ে এবং দান করে অনিচ্ছা নিয়ে।” –(আয়াত ৫৪)। ইবাদত রূপে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে নামাযীকে তাই জায়নামাযে দাঁড়াতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি গভীর আত্মনিবেদন ও আত্মসমর্পণ নিয়ে। পবিত্র কুর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “নিশ্চয়ই কামিয়াবী মু’মিনদের জন্য। যারা নামাযে আত্মনিবেদিত।”–(সুরা মু’মিনুন, আয়াত ১-২)। এবং সে আত্মনিবেদন ও আত্মসমর্পণ শুধু নামাযে সীমিত রাখলে চলে না, প্রতিষ্ঠা দিতে হয় নামাযের বাইরেও। প্রকাশ ঘটাতে হয় পরিবার, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত ও ব্যবসা-বানিজ্যেসহ সর্বত্র। নইলে গাদ্দারী হয়। নামাযের সাথে সে নগ্ন গাদ্দারীটি ধরা পড়ে যখন রাজনীতিতে সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ ও স্বৈরাচার, অর্থনীতিতে সূদ, সংস্কৃতিতে অশ্লিলতা, অফিসে ঘুষ এবং আদালতে শরিয়তি আইনের বদলে কুফরি আইনকে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়।

 

নামায দেয় দোয়ার সুযোগ

দোয়া সর্বাবস্থায় করা যায়। চলতে ফিরতে, কর্মস্থলে, এমন কি বিছানায় শুয়েও মহান আল্লাহর দরবারে আরজী পেশ করা যায়। মু’মিনের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার দরবার সব সময় খোলা। তবে দোয়ার শ্রেষ্ঠতম সময় যেমন নামাযে, তেমনি নামায শেষে জায়নামাযে। নামায গড়ে আল্লাহতায়ালার সাথে সরাসরি সংযোগ। সে জন্য পীর বা দরবেশের মধ্যস্থতা লাগে না। মহান দয়াময়ের স্মরণের জায়গাতে নামায মু’মিনের জন্য স্থান করে দেয়। ফলে সৃষ্টি করে দোয়া কবুলের যথার্থ পরিবেশ। মহান আল্লাহতায়ালা চান, নামাযের মাধ্যমে তাঁর ঈমানদার বান্দাহ তাঁর দরবারে আবেদনটি পেশ করুক। এটিই হলো বান্দার জন্য নামাযের সবচেয়ে বড় দান। নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা ছবর ও নামাযের সাহায্যে সাহায্য চাও। নিশ্চ্য়ই আল্লাহ ধৈয্যশীলদের সাথে।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৩)। মহান আল্লাহতায়ালা থেকে মাগফিরাত লাভের এটিই হলো তাঁর নিজের দেখানো পথ। তাই দয়াময় রাব্বুল আ’লামীনের দরবারে দোয়া পেশের জন্য যেমন ছবর চাই, তেমনি চাই নামায। নামায ছেড়ে যারা পীরের মাজারে বা সুফি হালকায় দোয়া কবুলের জন্য ধর্না দেয়, তাদের জন্য এ আয়াতে রয়েছে চরম হুশিয়ারি।

দোয়ার গুরুত্ব কি, দোয়া কি ভাবে করতে হয় এবং কোন দোয়াটি শ্রেষ্ঠ সেটিও শিখিয়েছেন মহান আল্লাহতায়ালা। সে শিক্ষাটি দেয়া হয়েছে সুরা ফাতেহা’তে -যা পাঠ করতে হয় নামাযের প্রতি রাকাতে। এ সুরা পাঠ না করলে নামাযই হয় না। তাই জরুরি শুধু সুরা ফাতেহা পাঠ নয়, বরং এ সুরার প্রতিটি বাক্যের অর্থ হৃদয়ে গভীর ভাবে ধারণ করা। সুরা ফাতেহা’র মূল বিষয় তিনটি। এক). প্রথমে বর্ণিত হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার মর্যাদা। বলা হয়েছে,“আল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন”।  অর্থ: সকল প্রশংসা একমাত্র মহান আল্লাহর। তিনিই “রাহমানির রাহীম”, তিনিই “মালিকি ইওয়ামিদ্দিন।” অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা হলেন সবচেয়ে দয়াময় এবং দয়া করাই তার নীতি। এবং তিনি রোজ হাশরের দিনের সর্বসময় কর্তা। দুই). দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এ সুরায় বর্ণিত হয়েছে তা হলো মুসলিম জীবনের মিশন। সে মিশনটি হলো: “ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা না’স্তায়ীন।” অর্থাৎ আমরা ইবাদত করি একমাত্র মহান আল্লাহর এবং একমাত্র আল্লাহ থেকেই আমরা সাহায্য ভিক্ষা করি। তিন). তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো দোয়া। এবং সে দোয়াটি হলো “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম”। অর্থঃ “(হে মহান আল্লাহ), আমাকে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের পথটি দেখান।” এটিই হলো মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া। যে ব্যক্তি সিরাতুল মুস্তাকীম পেল, সেই জান্নাত পেল। এর চেয়ে বড় পাওয়া সমগ্র মানব জীবনে আর কি হতে পারে? ধনসম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও সুঠাম স্বাস্থ্য তো কাফেরও পায়। কিন্তু তা কি জান্নাতে নেয়। যে ব্যক্তি ব্যর্থ হলো সিরাতুল মুস্তাকীম পেতে, সে পৌঁছে জাহান্নামে। এর চেয়ে বড় ক্ষতিই বা কি হতে পারে? নামায তাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি থেকে যেমন বাঁচতে শেখায়, তেমনি দেখায় সবচেয়ে বড় কল্যাণের পথ। নামায এভাবেই কাজ করে জান্নাতে চাবি রূপে। ১০/১২/২০২০।

 




বিবিধ ভাবনা (৪৪)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. বাংলাদেশে দুর্বৃত্ত শাসন ও অসভ্য রীতি

 যে কোন সভ্য দেশে চোরডাকাত-ভোটডাকাতদের ন্যায় দৃর্বৃত্ত ও অপরাধীদের জেলে বন্দী করা হয়। দেশকে অসভ্য ও অপরাধীদের হাত থেকে বিপদমুক্ত রাখা্র এটিই হলো সভ্য রীতি। কিন্তু বাংলাদেশে যা ঘটছে তা হলো সম্পূর্ণ উল্টো। এদেশে চোরডাকাত-ভোটডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীদের শাস্তি হয়না। তাদের জেলে নেয়া হয় না। ছাত্রলীগের জসিমুদ্দীন মানিক তাই জাহাঙ্গির নগর বিশ্বিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরি করেও কোন শাস্তি পায়নি। জেনারেল আজিজের ভাই খুনের অপরাধে জেলে গিয়েও বেকসুর মুক্তি পেয়েছে। বরং জেল হয়, হত্যা বা গুম করা হয় এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয় তাদের যারা চোরডাকাত-ভোটডাকাত দৃর্বৃত্তদের নিন্দা করে এবং রাজপথে তাদের নির্মূলের দাবী তুলে। আবরার ফাহাদ লাশ ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্টাটাস দেয়ায়। দেশ দখলে গেছে অপরাধীচক্রের সিন্ডিকেটের হাতে। তারা চায়, বাংলাদেশকে বিশ্বমাঝে সবচেয়ে অসভ্য দেশ বানাতে। এবং সে কাজে তারা সাফল্য যে বিশাল–সে প্রমাণও কি কম?

যে কোন সভ্য মানুষের স্বভাব হলো, অসভ্য ও দুর্বৃত্তদের নির্মূলে তাঁর আপোষহীন। অথচ অসভ্য সমাজে তাদের নির্মূল না করে প্রতিপালন দেয়া হয়। শেখ হাসিনার অপরাধ এক্ষেত্রে অতি ভয়ানক। সে শুধু গণতন্ত্রকেই কবরে পাঠায়নি, ভদ্র রীতি-নীতিকেও কবরে পাঠিয়েছে। দেশ পরিণত হয়েছে গহীন জঙ্গলে। জঙ্গলে যেমন হিংস্র পশুগণ নিরাপত্তা পায় ও প্রাণ হারাম নিরস্ত্র মানুষ, বাংলাদেশেও তেমনি নিরাপত্তা পায় হিংস্র দুর্বৃত্তগণ ও লাশ হয় আবরার ফাহাদগণ। আল জাজিরা ডক্যুমেন্টারী চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ ও তার ভাইদের খুনখারাবী ও দুর্বৃত্তির কাহিনী। কিন্তু সরকার কাউকেই শাস্তি দেয়নি। সে কাজে হাসিনা সরকারের সামান্যতম আগ্রহও নাই। জেনারেল আজিজ তার পদে এখনো আসীন। শাস্তি থেকে মুক্ত তার খুনি ভাইগণও। কোন সভ্য দেশে কি এরূপ অসভ্য রীতি আশা করা যায়?   

আওয়ামী বাকশালীদের সবচেয়ে জঘন্য নাশকতাটি এই নয়, তারা চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম-খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের ন্যায় দুর্বৃত্তিকেই প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। বরং সবচেয়ে বড় দুর্বৃ্ত্তি ও নাশকতাটি হলো, মানব সমাজে হাজার হাজার বছর ধরে যে অপরাধগুলি ঘৃণিত হয়ে আসছে -সে গুলিকে ঘৃণা করাও দন্ডনীয় অপরাধে পরিণত করেছে। ধ্বংস করেছে মানুষের বিবেকবোধকে। হিংস্র পশুরা প্রাণ সংহার করলেও এরূপ বিবেক হত্যা করে না। বাংলাদেশীদের সামনে মূল ইস্যু তাই স্রেফ গণতন্ত্র বাঁচানো নয়, বরং সেটি অসভ্যদের নির্মূলের।

২. জিহাদ কী? 

জিহাদ হলো অন্যায়ের নির্মূল (নেহী আনিল মুনকার) ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা (আ’মিরু বিল মারুফ) –পবিত্র কোর’আনে নির্দেশিত এ মিশন নিয়ে বাঁচার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। এটি হলো সকল অনৈসলামিক বিধান নির্মূল করে আল্লাহর শরিয়তি বিধানকে বিজয়ী করার আমৃত্যু লড়াই। এটি বস্তুত একটি রাষ্ট্রকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার যুদ্ধ। এরূপ জিহাদে ঈমানদারগণ বিনিয়োগ করে তাদের অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্তের। এটিই হলো নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের অনুসৃত ইসলাম। ব্যক্তির পরিশুদ্ধির জন্য ইসলামের প্রেসক্রিপশন হলো নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত। আর সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির জন্য প্রেসক্রিপশন হলো জিহাদ। তাই যে দেশে জিহাদ না্‌ই সে দেশে নামাযী, রোযাদার, হাজী, তাবলিগী ও মসজিদ-মাদ্রাসা বিপুল সংখ্যায় হলেও সে দেশ দুর্বৃত্তিতে ভরে যায়। বাংলাদেশে হলো তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

অনেকে যে কোন উত্তম কর্মে প্রচেষ্টা করাকে জিহাদ বলে। সেটি ঠিক নয়। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই অনেক কাফের, ফাসেক ও মুশরিকগণও করে। কিন্তু সেগুলি জিহাদ হয়না। জিহাদী হতে হলে প্রথমে ঈমানদার হতে হয়। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে জিহাদকে “জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর পথে জিহাদ বলে উল্লেখ করেছেন। কোন কিছু মহান আল্লাহতায়ালার পথে হওয়ার অর্থ, সে কর্মের মধ্যে থাকতে হবে তাঁর এজেন্ডাকে বিজয়ী করার নিয়েত। পবিত্র কোর’আনে এরূপ জিহাদের কথা বার বার বলা হয়েছে। জিহাদ ইসলামের কোন পৃথক স্তম্ভ নয়; বরং মিশে থাকে ঈমানের মাঝে। জিহাদ ঈমানের এতটাই অবিচ্ছদ্দ্য অঙ্গ যে, সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ঈমানের দাবীতে একমাত্র তারাই সাচ্চা যাদের মাঝে রয়েছে জান ও মালের জিহাদ।

তাই শুধু ঈমানের দাবী করলেই কেউ ঈমানদার হয়না, সাথে জিহাদও থাকতে হয়। এ নিয়ে সম্পূরক হাদীস রয়েছে নবীজী (সা:)’র। নবীজী (সা:)বলেছেন, যে ব্যক্তি জিহাদ করলো না, এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না, সে ব্যক্তি মুনাফিক। -(মুসলিম শরীফ)। তাই নবীজী (সা:)’র প্রত্যেক সাহাবার জীবনে জিহাদ ছিল এবং শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। সমাজে পরিশুদ্ধি এসেছিল জিহাদের বিনিময়ে। পবিত্র কোর’আনে এ ঘোষণাও বার বার দেয়া হয়েছে, “ঈমান এনেছি এ কথা বললেই কি ছেড়ে দেয়া হবে এবং পরীক্ষা নেয়া হবে না?” ঈমানের সে পরীক্ষাটি হয় জিহাদের ময়দানে। যারা জিহাদে শহীদ হয় তাদেরকে জীবিত বলা হয়েছে এবং বিনা হিসাবে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। তাই যে ইসলামে জিহাদ নাই সেটি নবীজী (সা:)’র ইসলাম নয়। সেটি ভন্ডদের বানাওয়াট ইসলাম।

৩. কোর’আনের মর্যাদা

মহান আল্লাহতায়ালা সন্তান-সন্ততি, পানাহার ও বিপুল সম্পদ কাফেরদেরও দেন। তবে মানব জাতির জন্য তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ দানটি হলো পবিত্র কোর’আন। এবং এ কোর’আন থেকে ফায়দা নেয়ার যোগ্যতা রাখে কেবল ঈমানদারগণ। কোন কিছুই জান্নাতে নিবে না, নিবে একমাত্র পবিত্র কোর’আন। পবিত্র কোর’আন হলো মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ভাষায় “হাবলিল্লাহ” তথা আল্লাহর রশি। যারা এ রশিকে আঁকড়ে ধরবে তাঁরাই পাবে জান্নাতের পথ। নইলে অনিবার্য হয় জাহান্নাম। তাই ঈমানদারদের উদ্দেশ্যে সুরা আল ইমরানে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “সবাই মিলে আঁকড়ে ধরো আল্লাহর রশিকে এবং পরস্পরে বিচ্ছন্ন হয়ো না।” কোর’আন আঁকড়ে ধরার অর্থ হলো কোর’আনের অনুসরণ।

এ বিশ্ব চরাচরে মহান আল্লাহতায়ালার অসংখ্য বিস্ময়কর সৃষ্টি। সেগুলি নিরবে সাক্ষ্য দেয় তাঁর অস্তিত্বের পক্ষে। এবং মহান আল্লাহতায়ালা নিজে কথা বলেন পবিত্র কোর’আনের মাধ্যমে। তাই যারা মহান আল্লাহতায়ালার প্রকৃত আশেক তারা কোর’আন থেকে তাঁর সে কথাগুলি বুঝার জন্য পাগল। কে জান্নাতে পথ পাবে এবং কে জাহান্নামে যাবে -তা নির্ভর করে কোর’আন বুঝা ও তা অনুসরণের উপর। মানব জীবনে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই ওহী নাযিল শুরু হওয়ার পর মুসলিমদের উপর কোর’আন বুঝাকে সর্বপ্রথম ফরজ করা হয়েছিল। নামায-রোযা ফরজ হয়েছিল তার ১১ বছর পর। তাই ইবাদত শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত নয়, সেটি কোর’আন বুঝাও। এবং বুঝতে হবে, মহান আল্লাহতায়ালা কি বলেন -তা না বুঝে তেলাওয়াতে জানা যায় না। ফলে তাতে জ্ঞানার্জনের ফরজও আদায় হয়না।

৪. তামাশা ইসলাম নিয়ে

 ইসলাম নিয়ে প্রচুর তামাশা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ওমুক দোয়া পাঠ করলে জান্নাতের ৮টি দরজা খুলে দেয়া হবে। স্রেফ দোয়া পাঠের মধ্যে জান্নাতপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি শোনানো হচ্ছে। রমযান মাসে সে কথাগুলো আরো বেশী বেশী শোনানো হয়। এটি এক বিশাল ব্যাপার। সেটি সত্য হলে সে বিশাল ঘোষণাটি আসা উচিত ছিল মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কোর’আনে। কিন্তু সে বিষয় নিয়ে পবিত্র কোর’আনে কোন ঘোষণাই নাই। অথচ দোয়া কবুলের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারায় বলা হয়েছে, মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দার দোয়া অবশ্যই শোনেন। তবে দোয়া করলেই তা কবুল হয় না এবং জান্নাতের দরজাও খুলে দেয়া হয়না। দোয়া কবুলের শর্ত হলো, দোয়াকারী বান্দা মান্য করবে তাঁর কোর’আনে ঘোষিত কথাগুলো। মহান আল্লাহতায়ালার কথা মান্য করার অর্থ, তাঁর বিধানকে নিজ জীবনে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা দেয়ায় আত্মনিয়োগ করা।

পবিত্র কোর’আনে তাই বার বার বলা হয়েছে, জান্নাত পেতে হলে জিহাদের ময়দানে জান ও মালের পরীক্ষায় অবশ্যই পাশ করতে হবে। প্রশ্ন হলো, স্রেফ দোয়া পাঠে কি জান ও মালের সে কাঙ্খিত পরীক্ষাটি হয়? তাছাড়া দোয়া কবুলের আগে দেখা হয়, কতটা মানা হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার কথাগুলো রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী, আদর্শে সেক্যুলারিস্ট, সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানী, অর্থনীতিতে সূদ-ঘুষ, আদালতে কুফরি আইন, ব্যবসার নামে বেশ্যাবৃত্তি এবং শিক্ষা-দীক্ষায় কোর’আন-বর্জন –এগুলি তো বিদ্রোহের আলামত। এরূপ বিদ্রোহীদের দোয়া কি মহান আল্লাহতায়ালা কখনো কবুল করেন? বিদ্রোহীদের জন্য যা বরাদ্দ তা তো আযাব ও অপমান।

তাছাড়া মুসলিম বিশ্ব জুড়ে দোয়া কি কম হচ্ছে? চোখের পানিও কি কম ফেলা হচ্ছে? প্রতি নামাযে দোয়া। রোযা কালীন দোয়া। হজ্জে গিয়ে দোয়া। প্রতি বছর ২০ লাখের বেশী মুসলিম চোখের পানি ফেলছে দোয়া কবুলের স্থান আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে। কিন্তু দোয়া কবুলের আলামত কই? দোয়া কবুল হলে কি মুসলিম ভূমি শত্রুদের হাতে অধিকৃত হতো? বিধ্বস্ত হতো কি মুসলিম নগর-বন্দর ও গ্রাম? নিহত, ধর্ষিতা ও নিজ ঘর থেকে বহিস্কৃত হতো কি মুসলিম নর-নারী?

৫. গাদ্দারী নিয়ামতের সাথে

 প্রতিটি মানুষকে মহান আল্লাহতায়ালা নানাবিধ সামর্থ্য দেন -যা দিয়ে সে নিজেকে জান্নাতের যোগ্য রূপে গড়ে তুলতে পারে। প্রকৃত বুদ্ধিমান তো তারাই যারা সে সামর্থ্যকে কাজে লাগায় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য। এবং সবচেয়ে বড় আহাম্মক হলো তারা্ যারা সে সামর্থ্যকে কাজে লাগায় অর্থপূজা, নেতাপুজা, দলপূজায়, পেশাপূজা ও দেশপূজায়। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া নিয়ামতের সাথে এর চেয়ে বড় গাদ্দারী আর কি হতে পারে? বস্তুত এরূপ গাদ্দারীই ব্যক্তিকে জাহান্নামের উপযোগী করে।

৬. ছোট লোকের ছোট ভাবনা

কে কতটা মহান ও ক্ষুদ্রতর –সেটি দেখা যায় তার বাঁচার এজেন্ডার দিকে নজর দিলে। ঈমানদার বাঁচে ইসলামকে বিজয়ী করার প্রবল বাসনা নিয়ে। সে কাজে সে তাঁর সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগ করে। কিন্তু যাদের জীবনে এরূপ মহান কিছু করার সামর্থ্য ও ইচ্ছা থাকেনা তাঁরাই বাঁচে অর্থপূজা, ব্যক্তিপূজা, ফেরকাপূজা ও দলপূজা নিয়ে। তারাই প্রচন্ড স্বার্থপর ও চিন্তা-চেতনায় ছোটলোক হয়। বাংলাদেশে এদের সংখ্যা বেশী। ফলে দেশটিতে ইসলামকে বিজয়ী করার কাজে জনবলের দারুন অভাব। এবং লোকবলের বড্ড অভাব স্বৈরাচারমুক্ত সভ্যতর সমাজ গড়ার কাজেও। এদের কারণে বিপুল হারে ভোটডাকাত, চোরডাকাত, গুন্ডা, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীর ভীড় দেখা দেয় হাসিনার ন্যায় স্বৈরাচারীর শিবিরে।  

৭. ঝান্ডা বিদ্রোহের

ঈমান ও মহান আল্লাহতায়ালার ভয় সুস্পষ্ট দেখা যায়। কোন মহিলার হৃদয়ে শরিষার দানা পরিমান আল্লাহর ভয় থাকলে -সে কি কখনো বেপর্দা হতে পারে? সে কি পারে দেহের নিষিদ্ধ স্থানগুলো জনসম্মুখে দেখাতে? বেহিজাবী তথা পর্দাহীনতা তো মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা। এরূপ বিদ্রোহীদের নামায-রোযার কি আদৌ মূল্য আছে? বিদ্রোহীদের স্থান তো জাহান্নামে।

ঈমানদারের লক্ষণ, সে গুরুত্ব দেয় নিজের খেয়াল-খুশির বদলে মহান আল্লাহতায়ালার বিধান মেনে চলাকে। এজন্যই ঈমানদার নারীগণ পর্দানশীন হয়। অথচ বেঈমানের কাছে গুরুত্ব পায় নিজের ইচ্ছার গোলামী। এরাই বেছে নেয় বেপর্দা হওয়ার পথ এবং তুলে নেয় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা। দেহ জুড়ে বিদ্রোহের এ প্রকাণ্ড ঝান্ডা দেখেও কি তাদের বেঈমানী নিয়ে কোন গবেষণার প্রয়োজন পড়ে? অথচ প্রতিটি মহিলাই হলো গৃহশিক্ষক। শিশুরা গড়ে উঠে তাদের হাতে। কিন্তু এদের কারণে মুসলিম দেশের কোটি কোটি ঘর পরিণত হয়েছে বিদ্রোহীদের ঘাঁটিতে। ফলে পরাজিত হচ্ছে ইসলাম এবং বিনা যুদ্ধে বিজয় বাড়ছে শয়তানের। ১৮/০৪/২০২১

 

 




বিবিধ ভাবনা (৪৩)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. অভাব সভ্য রুচির

বাঘ এক বারে মাত্র একটা শিকার ধরে। সেটি হজম করার পর আরেকটি ধরে। সে রীতি স্বৈরাচারি শাসকদেরও। তারাও একটা একটা করে রাজনৈতিক শত্রুদের ঘাড় মটকায়। ফ্যাসিবাদী হাসিনা তার শিকার ধরার কাজটি কর্নেল ফারুক ও তাঁর সাথীদের দিয়ে শুরু করেছিল। জামায়াত, বিএনপি ও হেফাজতের নেতাকর্মীগণ তখন হাসিনার রাজনৈতিক শত্রু নির্মূলের সে নিষ্ঠুর তান্ডবটি নীরবে দেখছিল। এরপর আসে জামায়াত নেতাদের ফাঁসীতে চড়ানোর পালা। তখন বিএনপি ও হেফাজতে নেতাকর্মীগণ সেটিকেও নীরবে দেখেছে। হয়তো তারা ভেবেছিল জামায়াত তো তাদের লোক নয়। অতএব তাদের নির্মূলে ক্ষতি কি? তাছাড়া বিএনপি নেতৃত্বে রয়েছে ভাষানীপন্থী বামদের প্রভাব। এ বামেরা কোনকালেই জামায়াতের বন্ধু ছিল না। এরপর এলো বিএনপি এবং হিফাজতের নেতা-কর্মীদের গুম ও খুন করার পালা। দেশের জনগণ সেটিকে নীরবে দেখেছে; স্বৈরাচার তাড়াতে তারা কখনোই রাস্তায় নামেনি। এখন হামলা হচ্ছে জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের উপর। ডাকাতি হয়ে গেল জনগণের ভোট এবং কবরে গেল গণতন্ত্র। প্লাবন এসেছে গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের। দেশ এখন দুর্বৃত্তদের জন্য আপদমুক্ত। তারা যা চায়, এখন বিনা বাধায় তা করতে পারে।

নেকড়ে যেমন কারো বন্ধু নয়, তেমনি স্বৈরাচারি দুর্বৃত্ত শাসকগণও কারো বন্ধু নয়। তারা সবার শত্রু। তাই মহল্লায় নেকড়ে ঢুকলে বিভক্ত হলে চলে না। তখন ঐক্যবদ্ধ ভাবে নেকড়ে বধ করতে হয়। স্বৈরাচারি শাসকগণ হিংস্র পশুর চেয়েও বেশী হিংস্র। পশু গণহত্য বা গণধর্ষণ করে না। কিন্তু মানবরূপী পশুগণ করে। তাই স্বৈরাচারি শাসক তাড়াতে সভ্য জনগণকে একতাবদ্ধ হতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতাটি বিশাল। ঘরবাড়ী থেকে আবর্জনা সরানোর জন্য সভ্য রুচি লাগে। তেমনি রুচি লাগে দুর্বৃত্তের শাসন থেকে মুক্ত হয়ে সভ্য দেশ গড়তে। বাংলাদেশীদের ব্যর্থতা এখানেই। সভ্য রুচি থাকলে তারা কি কখনো গণতন্ত্রের শত্রু বাকশালী মুজিবকে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা বলতো?  

২. তান্ডব গুন্ডা রাজত্বের

আল জাজিরা ডক্যুমেন্টারীতে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের ভাই খুনি হারিসকে বলতে শুনা গেল, “পুলিশই তো বড় গুন্ডা। পুলিশ থাকতে কি গুন্ডা লাগে?” ২৬ মার্চে মোদীর ঢাকায় আগমনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ মিছিল হয়। ব্রাহ্মনবাড়িয়া ও হাটহাজারীতে মিছিলের উপর বাংলাদেশের পুলিশ গুলী করে ২১ জনকে হত্যা করে। এভাবে প্রমান করে, খুনি হারিস পুলিশের চরিত্র নিয়ে যা বলেছে তা কতটা বাস্তব। বরং পুলিশ যে গুন্ডাদের চেয়েও বেশী গুন্ডা –সেটিও তারা প্রমাণ করেছে। তাদের কারণেই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নিরেট গুন্ডারাজত্ব। এবং গুন্ডারাজত্বে যা অসম্ভব হয় -তা হলো সভ্য ভাবে জীবন-যাপন। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনগণ রাজস্ব দেয় পুলিশবেশী নৃশংস গুন্ডা প্রতিপালনে।

৩. নিকৃষ্টতর পশুর চেয়েও

গরু-ছাগলের পানাহার হলেই চলে। পানাহার পেলে গলায় দড়ি নিয়ে বাঁচতে তাদের অসুবিধা হয়না। তখন দড়ি ছিঁড়তে্ তারা চেষ্টাও করেনা। অথচ সভ্য মানুষের পরিচয় তো এটাই, তারা শুধু পানাহার নিয়ে ভাবে না, ভোটের অধিকার ও স্বাধীন ভাবে কথা বলা ও লেখালেখির অধিকারও চায়। তবে মানুষ যখন গরুছাগলের পর্যায়ে পৌঁছে, তারাও তখন স্রেফ পানাহার নিয়ে ভাবে। গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকার নিয়ে তারা ভাবে না। এরূপ মানুষেরা গণতন্ত্র উদ্ধারে কখনো রাস্তায় নামে না। গরুছাগলের সংখ্যাবৃদ্ধিতে যেমন স্বৈরচারি শাসক বিপদে পড়ে না, তেমনি বিপদে পড়ে না এরূপ পশুচরিত্রের মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধিতে। বাংলাদেশে তাই জনসংখ্যা বাড়লে কি হবে, দুর্বৃত্তদের শাসন তাতে নির্মূল হয়নি। এবং বাড়েনি মানবিক অধিকার ও গণতন্ত্রচর্চা।

মানুষ গরুছাগলের স্তরে পৌঁ‌ছে চেতনাশূণ্যতার কারণে। স্বৈরাচারি শাসকদের মূল কাজ তাই জনগণের চেতনার আগ্রাসন করা। চেতনার ভূমি বিধ্বস্ত হলে জনগণ পরিনত হয় গরুছাগল বা তার চেয়েও নিকৃষ্ট জীবে। বাংলাদেশে চেতনা বিনাশের সে কাজটি এতই সফল ভাবে হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষক, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বহু বিচারপতি, সেনাবাহিনীর বহু জেনারেল এবং বহু বুদ্ধিজীবী ২০১৮ সালের ভোটডাকাতির নির্বাচনকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলে। গরুছাগলও কখনো এভাবে দুর্বৃত্তদের পক্ষ নেয় না। পবিত্র কোর’আনে এ ধরণের মানুষদেরকে গরুছাগলের চেয়েও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে। তাদের চরিত্র নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ভাষ্যটি হলো: “উলায়িকা কা’আল আনয়াম, বালহুম আদাল।” অর্থ: “তারাই হলো গবাদী পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট।” মহান আল্লাহতায়ালার এ কোর’আনী বানী যে কতটা নির্ভূল –তারই নিখুঁত প্রদর্শনী হচ্ছে বাংলাদেশে। মানুষরূপী এ পশুগুলো বনজঙ্গলে বাস করে না। বরং বাস করে জনপদে। তাদের অবস্থান শুধু সংসদে নয়, বরং দেশের আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তি ও প্রশাসনে। বাংলাদেশ তো এদের হাতেই অধিকৃত। পশুগণ কখনোই গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকার কেড়ে নেয় না, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানবরূপী এ পশুগণ।  

৪. সবচেয়ে বড় অপরাধী হলো সরকার

সভ্য দেশে আইন বানানো হয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য। সভ্য সরকারের কাজ শুধ জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের সুরক্ষা দেয়া নয়, বরং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতিরক্ষা দেয়াও। আর অসভ্য দেশে আইন বানানো হয় সে অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য। অথচ কেড়ে নেয়ার সে কাজই বেশী বেশী হচ্ছে বাংলাদেশে। তাই জনগণের অধিকার নাই স্বাধীন ভাবে কথা বলা, লেখালেখি ও মিটিং-মিছিলের। সে অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য ডিজিটাল আইন বানানো হয়েছে।

অথচ অপরাধ শুধু মানুষের প্রাণ ও অর্থ কেড়ে নেয়া নয়, অপরাধ হলো স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়াও। এদিক দিয়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে অপরাধী চক্রটি চোর-ডাকাতদের দলগুলি নয়; বরং সেটি হলো দেশের সরকার। হাসিনা সরকার এ কাজে মাঠে নামিয়েছে তার দলীয় গুন্ডা বাহিনীকে। এদের হাতেই নৃশংস ভাবে লাশ হতে হলো আবরার ফাহাদকে। কোন সভ্য দেশে কি এমনটি ঘটে? স্বৈর শাসকগণ একটি দেশে যে কীরূপ অসভ্য শাসন প্রতিষ্ঠা দিতে পারে –বাংলাদেশ হলো তারই নজির।

৫. সংকট অপূর্ণাঙ্গ মুসলিম হওয়ায়

মুসলিম জীবনে ইবাদতের পরিধিটি বিশাল। তাকে শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত পালন করলে চলে না। এরূপ ইবাদতের লক্ষ্য হলো, ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি আনা। কিন্তু মুসলিমকে বাঁচতে হয় এর চেয়ে বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রেখে। সেটি হলো সমাজ ও রাষ্ট্র্রের বুকে পরিশুদ্ধি আনা। সভ্যতর সমাজ ও সভ্যতার নির্মাণের কাজ তো একমাত্র তখনই সম্ভব হয়। এবং ইসলাম একমাত্র তখনই বিজয়ী হয়। সে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মুসলিম জীবনে অনিবায় হয় জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। তখন ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ, অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, শরিয়তের প্রয়োগ ও ঐক্যগড়া ইত্যাদি বহু ফরজ কাজ তার জীবনের মিশনে পরিণত হয়। এরূপ কাজে না নামলে পূর্ণ মুসলিম হওয়া যায় না। দেশে পূর্ণ মুসলিম না বাড়লে বিজয়ী হয় শয়তান।

মুসলিমদের আজকের বড় সমস্যাটি হলো তাদের ধর্মকর্ম ও ইবাদত স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে সীমিত হয়ে গেছে। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র দখলে গেছে শয়তানী শক্তির হাতে। অথচ রাষ্ট্র ও সমাজ শয়তানী শক্তির দখলে গেলে ব্যক্তিও নিরাপদ থাকে না। রাষ্ট্র যে স্রোতে ভাসে ব্যক্তিকেও তখন সে স্রোতে ব্যক্তিকেও ভাসতে হয়।

৬. বাঙালীর বেওকুপি

শিকার ধরাই বাঘের স্বভাব। বাঘকে কখনোই পোষ মানানো যায় না, তার সাথে দোস্তিও চলে না। তেমনি স্বভাব হলো ভারতের ন্যায় আগ্রাসী দেশগুলোর। তাই শুধু বাঘ-ভালুকের ন্যায় হিংস্র পশুগুলিকে চিনলে চলে না, দানবের ন্যায় দেশগুলোকেও চিনতে হয়। বাঘকে ভেড়া মনে করে যারা গলা জড়িয়ে ধরে -তারাই বাঘের পেটে যায়। এরূপ বেওকুপের সংখ্যা বাংলাদেশে

অতি বিশাল। এদের হাতেই বাংলাদেশে রাজনীতি্ ও বুদ্ধিবৃত্তি। এরাই ১৯৭১’য়ে ভারতের গলা জড়িয়ে ধরেছিল। ভারতী সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে এনেছিল এবং ভারতীয় বাহিনীকে বিজয়ী করেছিল। ভারতের পেটে ঢুকার পর এরাই এখন ভারতকে গালি দেয়। ১৪/০৪/২০২১




কাঙ্খিত লক্ষ্যে রোযা কতটুকু সফল?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

কতটুকু অর্জিত হচ্ছে তাকওয়া?

রোযার লক্ষ্য কি শুধু এটুকু, মানুষ সকাল থেকে সন্ধা অবধি পানাহার বন্ধ রাখবে? তারাবিহ পড়বে এবং কোর’আন তেলাওয়াত করবে? এবং রমযান শেষে মহা ধুমধামে ঈদ উদযাপন করবে? পথচলায় কত হাজার মাইল পথ চলা হলো -সেটিই কি শুধু গুরুত্বপূর্ণ? সাফল্য যাচায়ে তো গুরুত্বপূর্ণ হলো, কাঙ্খিত লক্ষ্যে আদৌ পৌঁছলো কিনা। রোযার মূল লক্ষ্য, তাকওয়া অর্জন। মহান আল্লাহতায়ালা সে লক্ষ্যটি ব্যক্ত করেছেন এভাবে: ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’’ -(সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)। উপরুক্ত আয়াতে যেটি সুস্পষ্ট তা হলো, তাকওয়াই রোযার মূল লক্ষ্য। প্রশ্ন হলো, তাকওয়া বলতে আমরা কি বুঝি? তাকওয়া অর্থ ভয়। তবে সে ভয় এমন নয়, হঠাৎ বাঘের সামনে পড়া ভীতিগ্রস্থ ব্যক্তির ন্যায় তা বাকশূণ্য করবে। সে ভয় এমনও নয়, হঠাৎ গভীর সমুদ্রে পড়া ব্যক্তির ন্যায় আতংকিত ও বিচলিত করবে। তাকওয়া হলো আল্লাহ-সচেতনতার এমন এক মানসিক অবস্থা যা সর্বদা স্মরণে রাখে জাহান্নামের আযাব, ফেরায় সকল প্রকার ভ্রষ্টতা ও পাপ থেকে এবং প্রেরণা জোগায় নেক-আমলে। তখন জন্ম নেয় আল্লাহকে খুশী করার সার্বক্ষণিক ব্যস্ততা। সৃষ্টি করে মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে জবাবদেহীতার চেতনা। এমন চেতনায় জীবনের প্রতিটি দিন ও প্রতিটি মুহুর্ত মনে হয় মহান আল্লাহতায়ালার অমূল্য নেয়ামত রূপে; এবং এ জীবন গণ্য হয় অবিরাম পরীক্ষাপর্ব রূপে। তখন বিরামহীন ব্যস্ততা বাড়ে সে পরীক্ষায় কি করে ভাল ভাবে তকার্য হওয়া যায় তা নিয়ে। যখন কোন ব্যক্তি মটর হাই্ওয়েতে দ্রুত গাড়ি চালায় তখন একটি ভয় তার মনে সব সময়ে কাজ করে। সেটি হলো, সামান্য নিমিষের অসতর্কতা তার গাড়িকে গভীর খাদে নিয়ে ফেলবে এবং ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটাবে। মুহুর্তের মধ্য সে দুর্ঘটনা তার নিজের ও অন্যান্য আরোহীর জীবনে মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। এমন একটি দূর্ঘটনার জন্য দীর্ঘ মেয়াদী কোন ভূলের প্রয়োজন পড়ে না। সামাণ্য ক্ষণের ভূল, অসচেতনতা বা ঘুমই সে জন্য যথেষ্ট। চালককে তাই প্রতি মুহুর্তে চোখ ও মন খোলা রাখতে হয়। মৃত্যূর ভয়ে তাকে সর্বমুহুর্ত সতর্ক থাকতে হয়। চালকের জন্য এটাই হলো তাকওয়া।

আর মু’মিনের জীবনে তাকওয়া হলো সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হওয়ার সার্বক্ষণিক ভয়। যে কোন মুহুর্তে সেও বিচ্যুত হতে পারে মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে; অবাধ্য হতে পারে তাঁর হুকুমের। রোযার মূল কাজ এমন ভয় তথা তাকওয়ার বৃদ্ধি। তাই তাকওয়া নিছক ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও যৌনতাকে দমিয়ে রাখার সামর্থ্য নয়, বরং সর্ব প্রকার জৈবিক,আত্মিক ও আর্থিক কুপ্রবৃত্তি দমনের ঈমানী শক্তি। এমন তাকওয়া থেকেই প্রেরণা আসে আল্লাহপাকের হুকুমগুলি জানার এবং সে সাথে সেগুলি অনুসরণের। কোর’আনের জ্ঞানার্জনকে তাকওয়া-সমৃদ্ধ সে ব্যক্তিটি তখন নিজ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্ম রূপে গ্রহণ করে। কারণ সে বুঝে, অজ্ঞতা নিয়ে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা সম্ভব নয়। কারণ হাজারো পথের মাঝে কোনটি সিরাতুল মুস্তাকীমের পথ আর কোনটি ভ্রষ্টতার পথ -সেটি জানতে বা বুঝতে হলেও তো জ্ঞান চাই। পথচলায় যে সিগনাল বা বিধিনিষেধ থাকে সেগুলোও তো জানতে হয়। নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের মাঝে ইসলামের জ্ঞানে তাই কোন অজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন না। তাদের শতকরা শতভাগই ছিলেন আলেম। অজ্ঞতা নিযে ইবাদতও সঠিক ভাবে হয় না। তাই নামায-রোযার আগে কোর’আনের জ্ঞানার্জনকে ফরজ করা হয়েছে। সাহাবাদের জীবনে এমন একটি সময় ছিল যখন নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত ছিল না। জিহাদও ছিল না। ইবাদত বলতে বুঝাতো রাতের একটি বড় অংশে দাঁড়িয়ে বার বার পবিত্র কোর’আনের আয়াতগুলোকে ধীরে ধীরে নিবিষ্ট মনে আবৃত করা এবং আল্লাহর সে হেদায়েতের বাণীগুলোকে হৃদয়ের গভীরে বসিয়ে দেয়া। সে হুকুম এসেছে নবুয়তের অতি প্রথম দিকে নাযিলকৃত সুরা মুজাম্মিল। বলা হয়েছে, “হে বস্ত্রে আচ্ছাদিত (মুহম্মদ), রাতে খাড়া হয়ে যাও, কিছু অংশ বাদে। রাতের অর্ধেক ভাগ, অথবা তা থেকে কিছুটা কম সময়ের জন্য। অথবা তার চেয়ে কিছু অধিক সময়ের জন্য; এবং তেলাওয়াত করো কোর’আন থেকে ধীরে ধীরে সুরভিত কন্ঠে।” -(সুরা মুজাম্মিল, আয়াত ১-৪)। সে সময় খোদ নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের কাছে সমগ্র কোর’আন ছিল না। ছিল সদ্য নাযিলকৃত কিছু সুরা বা আয়াত। তখন তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বটি ছিল, সেগুলোকে হৃদয়ে গেঁথে নেয়া, সেগুলো পূর্ণ অনুসরণ করা এবং অন্যদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া। সে দায়িত্বপালন গণ্য হতো ইবাদত রূপে। ইসলামের ১৪ শত বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আলেম তো গড়ে উঠেছে কোর’আনেকে বুঝা ও কোর’আন অনুসরণের সে অদম্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এ পর্যায়ে হযরত সুমাইয়া ও হযরত ইয়াসিরের মত কিছু সাহাবা কাফেরদের নির্যাতনে শহীদ হয়ে যান।

 

ভ্রষ্টতা যেখানে ইবাদতে

ঘোড়ার আগে যেমন গাড়ী জোড়া যায় না, তেমনি কোর’আন কোর’আনী জ্ঞানার্জনের আগে ইবাদতও যথার্থ হয়না। অথচ আজ সে জ্ঞানার্জনের দায়ভার চাপানো হয়েছে স্রেফ মসজিদের ইমাম বা মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের উপর। জ্ঞানার্জন যে প্রতিটি মুসলিম নরনারীর উপর ফরজ সেটিও ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে। সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে ভ্রষ্টতার শুরু মূলত এখান থেকেই। ফলে প্রচন্ড ভ্রষ্টতা বেড়েছে ইবাদতে। রোযা রেখে দোকানে বসে যে ব্যক্তিটি দ্রব্যমূল্য বাড়ায় বা পণ্যে ভেজাল মেশায় বা অফিসে বসে ঘুষ খায় এমন ব্যক্তি যে তাকওয়াশূণ্য এবং রোযা থেকে সে যে কোন কিছুই লাভ করেনি -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে? সে তো পথভ্রষ্টতার পথ বেছে নিয়েছে। এখানে কাজ করছে তার অজ্ঞতা ও তাকওয়াশূণ্যতা। রোযা তার কাছে নিছক উপবাস ছাড়া কি অন্য কিছু উপহার দিয়েছে? অথচ তাকওয়া-সম্পন্ন ব্যক্তির অদম্য অনুপ্রেরণা হলো, প্রতি মুহুর্তে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলায়। সর্ব মুহুর্তে তাঁর সতর্কতা থাকে সর্বপ্রকার হারাম কাজ থেকে দূরে থাকায়। যার মনে সে সতর্কতা নাই, বুঝতে হবে তার মনে তাকওয়াও নাই। অনেক গাছই ফল দেয় না। তেমনি অনেকের নামায-রোযা এবং হজ্জ-যাকাতও জীবনে কোন পরিবর্তন আনে না। এরা নামায-রোযা আজীবন করেও বাঁচে পথভ্রষ্টতা নিয়ে। নামে মুসলিম হলেও কর্মজীবনে এরা ফাসেক (অবাধ্য, বিদ্রোহী), জালেম ও মুনাফিক হয়। এদের কারণেই মুসলিম দেশগুলোতে আল্লাহর শরিয়তী বিধান আজ পরাজিত; এবং মুসলিম ভূমি অধিকৃত হয়েছে ইসলামে শত্রুপক্ষের হাতে। অথচ তাকওয়া সম্পন্ন ব্যক্তি গভীর দায়িত্ববোধ পায় আল্লাহর সৈনিক রূপে ইসলামের বিজয়ে পূর্ণ আত্ম-বিনিয়োগে। নবীজীর (সা:) আমলে সে সামর্থ্য পেয়েছিলেন প্রতিটি সাহবা। তাদের জীবনে সর্বক্ষণের প্রচন্ড তাড়াহুড়া ছিল বেশী বেশী নেক আমলের।  

তাকওয়া মানব মনে বা দেহে গোপন থাকার বিষয় নয়। সেটি নানা ভাবে প্রকাশ পায় নেক আমলের মধ্য দিয়ে। ইসলাম কবুলের পর মু’মিন ব্যক্তির জীবনে যেটি অনিবার্য রূপে দেখা দেয় সেটি নেক আমলের প্রতি দুর্বার মোহ ও প্রতিযোগিতা। সে তখন প্রস্তুত হয়ে যায় শুধু মালের কোরবানিতে নয়, জানের কোরবানিতেও। অপর দিকে বদ আমল তা যত ক্ষুদ্রই হোক তার মাঝে ঈমানদার ব্যক্তিটি জাহান্নামের আগুনের পূর্বাভাস দেখতে পায়। ফলে তার সর্বক্ষণের সাধনা হয় তা থেকে বাঁচার। যে ব্যক্তির মাঝে বদ আমল থেকে বাঁচায় ও নেক আমলে তাড়াহুড়া নাই, বুঝতে হবে তার মাঝে তাকওয়াও নাই্।এবং পরকালের উপর ঈমানও নাই। ঈমানের দাবীতে সে যত সোচ্চারই হোক, তার সে ঈমানদারী নিতান্তই মেকী। নেক আমলের প্রেরণায় সাহাবাগণ এতটাই অস্থির থাকতেন যে, মাঝ রাতে না ঘুমিয়ে আটার বস্তা কাঁধে নিয়ে গরীবের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। সে কাজ করেছেন এমন কি রাষ্ট্রপ্রধান তথা আমীরুল মো’মিনুনও। নিজেরা অভূক্ত থেকে তারা মেহমানকে খাইয়েছেন। নিজের অসংখ্য ফলবান গাছের বিশাল বাগানকে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিয়েছেন। জিহাদের ময়দানে আহত ও অতি তৃষ্ণার্ত হয়ে পানি নিজে না পান করে পাশের তুষ্ণার্ত মুজাহিদকে দিতে বলেছেন। সর্বোপরি তারা ছটফট করতেন অর্থের পাশাপাশি নিজের জীবনকে আল্লাহর পথে জিহাদে বিলিয়ে দেয়ায়। এরাই হলেন তেমন ব্যক্তি যাদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে বলেছেন, তাদের জানমাল তিনি ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। এমন মানুষদের  আধিক্যের কারণেই তখন নেক আমলের প্লাবন এসেছিল সমগ্র মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে। তাকওয়ার সে গুণেই ইসলাম যেমন গড়ে তুলেছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, তেমনি সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা।

 

শ্রেষ্ঠ দান ও প্রত্যাশা

মাহে রমযান হলো রহমত ও মাগফেরাতের মাস। এ মাসেই নাযিল হয়েছিল পবিত্র কোর’আন –  অর্থাৎ মর্তের বুকে নেমে এসেছিল মহান আল্লাহর নিজস্ব বাণী। এভাবে মানব জাতি পেয়েছিল মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত – মূক্তি ও সফলতার একমাত্র এবং সর্বশেষ পথ। ইসলামী পরিভাষায় যা হলো সিরাতুল মুস্তাকীম। মানব জাতির কল্যাণে আর কোন ঘটনা কি এতটা গুরুত্বপূর্ণ? মানব জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল এ কোর’আনের বরকতেই। এই একটি মাত্র ঘটনাই রমযানের এই মাসটিকে অন্য যে কোন মাসের তুলনায় অতি সম্মানিত করেছে। এ ঘটনাটির বরকতেই এ মাসটিতে মহান আল্লাহতায়ালার অতি প্রিয় কাজটি হলো তিনি তাঁর বান্দার প্রার্থনাকে কবুল করা। এভাবেই এ মাসটি সম্মানিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে। এবং সে সন্মানেরই প্রতীক হলো, এ মাসেই রয়েছে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রাত লায়তুলু ক্বদর। দোয়া কবুলের এটিই শ্রেষ্ঠ রাত।

তবে দোয়া কবুলটি নিঃশর্ত নয়। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সে শর্তটি হলো, কোর’আনে বর্নীত নির্দেশাবলীর পূর্ণ অনুসরণ। পবিত্র কোর’আনে সে শর্তটি বলা হয়েছে এভাবে, “..(হে মহম্মদ) এবং যখন আমার বান্দারা আমার ব্যাপারে আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, (তাদেরকে আপনি বলে দিন) বস্তুত আমি রয়েছি অতি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা আমি কবুল করি। অতএব তাদেরও অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হলো, আমার হুকুম পালন করা এবং আমার উপর ঈমান আনা।” (-সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)। এ আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, তিনি প্রতিটি বান্দার অতি নিকটে। সুরা ক্বাফে বলা হয়েছে তিনি গর্দানের রক্তের শিরার চেয়েও নিকটবর্তী। তিনি যে শুধু বান্দার প্রতিটি দোয়া শুনেন তাই নয়, সে দোয়া কবুলও করেন। এবং সে ওয়াদাটি অতি সুস্পষ্ট ভাবে ঘোষিত হয়েছে এ আয়াতে। তবে সে সাথে তিনি সুস্পষ্ট শর্তও রেখেছেন। শর্ত হলো, হুকুম পালন করা এবং তাঁর উপর পরিপূর্ণ ঈমান আনা। অর্থাৎ সর্বসামর্থ্য দিয়ে আল্লাহর পক্ষে খাড়া করা। সে জন্য কোন দল বা নেতার অপেক্ষায় বসে থাকারও অনুমতি নাই। তাই পবিত্র কোর’আনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “(হে মহম্মদ) বলে দিন, “তোমাদের জন্য আমার একটি মাত্র ওয়াজ (নসিহত): খাড়া হও আল্লাহর জন্য (আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য) জোড়ায় জোড়ায় অথবা (সেটি সম্ভব না হলে) একাকীই; অতঃপর তোমরা চিন্তাভাবনা করো।”–(সুরা সাবা, আয়াত ৪৬)।

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে বান্দার চাওয়া-পাওয়ার তালিকাটি বিশাল। কিন্তু বান্দার কাছেও তাঁর প্রত্যাশা আছে। সে ন্যূনতম প্রত্যাশাটি হলো, তাঁরা দাঁড়াবে তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার কাজে –যেমনটি দাঁড়িয়েছিলেন নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ। তাঁরা যখন এরূপ দাঁড়ায়, তখন তিনিও তাদের ডাকে সাড়া দেন। সেটিই তাঁর সূন্নত। সাহাবাদের ডাকে তাই তিনি ফিরেশতা পাঠিয়েছিলেন এবং বিশাল বিশাল শত্রুবাহিনীর উপর বিজয় দিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার ডাকে সাড়া দিতে। বরং তারা সাড়া দিয়েছে শয়তানের ডাকে; এবং বিজয়ী করেছে শয়তানের এজেন্ডাকে। এবং যারা শয়তানের পক্ষে দাঁড়ায়, তাদের জীবনে নেমে আসে প্রতিশ্রুত আযাব -সেটি শুধু এ দুনিয়ার জীবনে নয়, অনন্ত-অসীম আখেরাতের জীবনেও। পবিত্র কোর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে বার বার। কথা হলো, আজকের মুসলিমগণ মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে খাড়া হওয়ার বদলে যে শয়তানের পক্ষে খাড়া হয়েছে -সে প্রমাণ কি কম? মুসলিম ভূ-খন্ড আজ বিভক্ত, শরিয়ত বিলুপ্ত, বিজয় জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজমের, প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সূদ, ঘুষ, জুয়া, মদ ও দেহব্যবসা –এগুলো কিসের আলামত? মুসলিম ভূমিতে তারা যে শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করেছে –এগুলো কি তারই প্রমাণ নয়? তবে কি তাদের দোয়া কবুল করে শয়তানের বিজয়কে আরো বাড়িয়ে দিবেন?  

 

রেকর্ড দুর্বৃত্তি ও বিদ্রোহে

নামায-রোযা নিয়মিত আদায় করে এমন মুসলিমদের সংখ্যা আজ পৃথিবীতে কোটি কোটি। কিন্তু সে তুলনায় তাকওয়া অর্জিত হচ্ছে কতটুকু? কতটুকু বেড়েছে নেক আমল? বরং বিপরীতমুখী কর্ম ও চরিত্রই কি প্রবলতর হচ্ছে না? নেক-আমলের বিপরীত হলো, মিথ্যা, সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি, ব্যভিচার , ঘুষ ও ধোকাবাজির ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বা দুর্বৃত্তি। ইসলামী পরিভাষায় এগুলো হলো মুনকার। মুসলিম দেশ হওয়ার বরকতে এটাই  কি কাঙ্খিত ছিল না যে, এদেশগুলি সুনীতি, সত্যবাদীতা ও সৎকর্মে বিশ্বে রেকর্ড গড়বে? সৃষ্টি হবে নেক আমলের প্লাবন। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টোটি। বেড়েছে দূর্নীতি। ফলে রোযা যে তার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে সফল হচ্ছে না -তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে?  তবে এ বিফলতা নিয়েই বা ক’জন ভাবছে? আল্লাহতায়ালার নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রতিটি বিদ্রোহই তো শয়তানের অনুসরণ। এমন বিদ্রোহে বিজয়ী হয় শয়তান ও তার অনুসারীরা। অথচ প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে চলছে সে প্রবল বিদ্রোহ। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ  প্রকাশ পাচ্ছে প্রতিটি মিথ্যা, পাপ ও দূর্নীতির মধ্য দিয়ে। এমন বিদ্রোহে মুসলিমরা বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। কাফেরদের হারিয়ে দূর্নীতিতে তারা বিশ্বে প্রথম হয়েছে। বাংলাদেশ প্রথম হয়েছে ৫ বার। প্রতিটি মুসলিম দেশে এমন বিদ্রোহীরাই বার্থ করে দিচেছ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম তথা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার প্রতিটি উদ্যোগ। শুরুতে মুসলিমদের একাধিক রাষ্ট্র ছিল না, কিন্তু যেটি ছিল সেটি প্রতিষ্ঠিত ছিল শরিয়ত তথা আল্লাহর আইনের উপর। কোর’আনে বর্নীত আল্লাহর হুকুমকে তারা শুধু পাঠই করতো না, সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রয়োগও করতো।  কিন্তু আজ শুধু পাঠই হয়, প্রয়োগ নেই। মুসলিম রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে নানা ভাষা ও নানা জাতীয়তার নামে বহু জাতীয় ঝান্ডা। এবং সে সাথে বেড়েছে আল্লাহর হুকুমের তথা শরিয়তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডাও। সে ঝান্ডা উড়িয়েছে মুসলিম দেশের ব্যাংকগুলো সূদকে হালাল করে। বিদ্রোহের ঝান্ডা উড়িয়েছে পতিতালয়গুলো। সে বিদ্রোহ মুসলিম দেশের আদালতগুলোতেও। সেটি কোর’আনী আইনের স্থলে কাফেরদের প্রণীত আইন প্রয়োগ করে -যে আইনে ব্যভিচার বা পতিতাবৃত্তিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়।

সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা তুলতে মহিলারাও পিছিয়ে নেই। তারা সে ঝান্ডা তুলেছে পর্দার হুকুম অমান্য করে এবং নারী-পুরুষের মাঝে অবাধ মেলামেশার মধ্য দিয়ে। বেপর্দাগী নিজেই আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা। এবং সে ঝাণ্ডা উড়িয়ে যারা প্রকাশ্যে চলাফেরা করে তাদেরকে এসব নামাযী ও রোযাদার মুসলিমগণ নেত্রী গণ্য করে এবং তাদেরকে ভোটে নির্বাচিতও করে। তাদের পিছনে রাজপথে মিছিলও করে। আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহী তাদের ভোট দিলে বা তাদের রাজনীতিকে সমর্থন করলে কি নামায-রোযা পালনের অর্থ থাকে? বান্দার মনে ইবাদত আনুগত্য বাড়াবে সেটাই কি কাঙ্খিত নয়? কিন্তু কোথায় সে আনুগত্য? কোথায় মহান আল্লাহতায়ালার পথে নিবেদিত প্রাণ সে সৈনিক? বরং অধিকাংশ মুসলিম যেন তাদের কর্ম, চরিত্র, রাজনীতি, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ঘোষণা দিচ্ছে, আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি তাদের কোন পরওয়া না্ই। যা গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো তাদের ব্যক্তিগত, দলগত, জাতিগত ও গোষ্ঠিগত স্বার্থচিন্তা; আল্লাহতায়ালার হুকুম নয়। মহান প্রভুর হুকুমকে তারা সীমাবদ্ধ রেখেছে জায়নামায, বিয়ে-শাদী, মুর্দাদাফন, মসজিদের নামায এবং রোযা-হজ্জ পালনে। এবং তাঁর বিধানের প্রয়োগ নিষিদ্ধ করেছে শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও আইন-আদালতের অঙ্গণে। এমন আচরণ কি মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ নয়? এমন বিদ্রোহী বান্দারা – পোষাক-পরিচ্ছদ ও নামে যতই মুসলিম হোক, যদি সারা মাস রোযা রাখে, সারা রাত নামায পড়ে  এবং সারা রাত কেঁদে কেঁদে মোনাজাত করে, তবে কি সে ইবাদত ও মোনাজাত রাব্বুল আলামিনের কাছে কবুল হয়? কবুল যে হচ্ছে না সে প্রমাণই কি কম? কবুল হওয়ার নমুনা কি এই – মুসলিম দেশে আগ্রাসী বিদেশী শক্তি আধিপত্য পাবে এবং মুসলিম নর-নারি প্রতিদিন নিহত,আহত, ধর্ষিতা ও পদপিষ্ট হবে?

 

দোয়া কবুলের শর্ত

তিরমীযি শরিফের হাদীসে আছে: তিন ব্যক্তির দোয়া কখনোই বৃথা যায় না। সে তিন প্রকার ব্যক্তি হলো: রোযাদার, ন্যায় পরায়ন শাসক এবং যিনি মজলুম। কিন্তু এ হাদীসটির পাশাপাশি এ হাদীসটিও এসেছে যে, দোয়া কবুলের শর্ত হলো তার রিযিক হালাল অবশ্যই হতে হবে। ফলে যে ব্যক্তির সেহরী ও ইফতার যদি হয় ঘুষ, সূদ, মদবিক্রয়, জুয়া, ধোকাবাজি ও  নানা দূনীতির মধ্য দিয়ে উপার্জিত অর্থে হয়; এবং বসবাস যদি হয় সূদী অর্থে কেনা বা জবরদখল ও দূর্নীতির মধ্য দিয়ে অর্জিত গৃহে, তবে তার দোয়া কি কবুল হয়? দোয়া কবুলের জন্য রোযাদার হওয়ার পাশাপাশি ঈমানদার ও নেককার হওয়াও তো শর্ত। পবিত্র কোর’আনে একবার নয়, বহুবার বলা হয়েছে, যারা ফাসেক ও জালেম তাদের দোয়া কবুল দূরে থাক, মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে হিদায়েত দেন না। হিদায়েত  লাভের শর্ত হলো,পাপের পথ তথা দূর্নীতি থেকে প্রথমে ফিরতে হবে। ঔষধের আগে বিষ-পান ত্যাগ যেমন জরুরি, তেমনি হিদায়াত লাভের জন্য জরুরি হলো পুরাপুরি বর্জন করতে হয় পাপের পথকে। মহান আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে বড় দান ধন-দৌলত, সন্তান-সন্ততি বা প্রতিপত্তি নয়, বরং সেটি হিদায়েত। সে হিদায়েত লাভের জন্যই প্রতি নামাযের প্রতি রাকাতে “ইহদিনাস সিরাতুল মুস্তাকীম” বলে দোয়া করতে হয়। এর চেয়ে বড় দোয়া যেমন নেই, তেমনি হিদায়েত প্রাপ্তির চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে শ্রেষ্ঠতর প্রাপ্তিও নাই। এই হিদায়েত প্রাপ্তিই ঈমানদারকে একজন কাফের থেকে আলাদা করে। হিদায়েত লাভের ফলেই সম্ভব হয় সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা। কাফের, জালেম ও ফাসেকের জীবনে হিদায়েত নাই; ফলে তাদের জীবনে যা বাড়ে তা নিছক বিভ্রান্তি। এমন বিভ্রান্তিতে কেবল জাহান্নামে পৌঁছা সম্ভব, জান্নাতে নয়। কারণ, জান্নাতের জন্য তো চাই সিরাতুল মুস্তাকীম। আর ফাসেক ও জালেম তো তারাই যারা সমাজে দুবৃর্ত্ত ও দূর্নীতিবাজ এবং আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। ফলে যে দেশটি দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হয়, সে দেশের মসজিদগুলো মুসল্লিতে যতই পূর্ণ হোক না কেন -তারা কি রহমত পায়? হিদায়েত লাভের জন্য শুধু মুখে কালেমা পড়লেই চলে না। শুধু মূর্তিপুঁজা ছাড়াটাই যথেষ্ট নয়। দূর্নীতি ছেড়ে সুনীতি এবং দুষ্কর্ম ছেড়ে নেক আমলের পথও ধরতে হয়। দোয়া কবুল তো এ পথেই আসে। 

রোযার পরিপূর্ণ ফায়দা নিতে যা জরুরি তা হলে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়া। রোযা পালনের কোর’আনী আহবান তো এসেছে ঈমানদারদের উদ্দেশ্য -জালেম, ফাসেক, কাফের ও মুনাফিকদের উদ্দেশ্যে নয়। মূল লক্ষ্য, ঈমানদারের তাকওয়া বৃদ্ধি। প্রাসাদ গড়তে ভিতটা প্রয়োজন, তাকওয়ার নির্মাণে ঈমান হলো সেই ভিত। তবে ঈমানদারীর অর্থ শুধু আল্লাহকে বিশ্বাস করা নয়। মক্কার কাফেরগণও আল্লাহকে বিশ্বাস করতো। সন্তানদের নাম নবীজীর (সা:) জন্মের পূর্বেও তাদের আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান রাখত। কিন্তু কাফেরদের এ বিশ্বাস  বেশীদূর এগুয়নি। এ বিশ্বাসে তাই তাকওয়া সৃষ্টি হয়নি, ফলে ব্যক্তি ও সমাজ কোনটাই বিশুদ্ধ হয়নি। আল্লাহর উপর ঈমান আনাতে ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি শুরু হয় মাত্র,পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্য মুসলিমকে আরো অনেক দূর এগুতে হয়। তাকে পরিপূর্ণ অংশ নিতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার পরিকল্পিত প্রশিক্ষণে। শুধু একদিন দুদিন নয়, বরং জীবনের সবগুলো দিন ধরে। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, জিহাদ হলো সে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।  

 

রোযার ট্রেনিং কেন অপরিহার্য?

ভালো মানের কৃষক, শ্রমিক, ডাক্তার বা ইঞ্জিনীয়ার গড়ার জন্য লাগাতর ট্রেনিং চাই। তেমনি ট্রেনিং চাই নিষ্ঠাবান মুসলিম গড়ার জন্যও। সে ট্রেনিংয়ের মূল কথা হলো জিহ্বা, পেট ও যৌনতার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। জিহ্ববার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া মিথ্যাচার, গিবত ও কলহ-বিবাদ থেকে নাযাত মেলে না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে অশান্তির মূল কারণ হলো লাগামহীন জিহ্ববা। তেমনি পেটের লালসার উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে পানাহারে অবাধ্যতা হয় শরিয়তী বিধানের। মানুষ তখন উপার্জনে দূর্নীতির আশ্রয় নেয়। তেমনি যৌন লালসার উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে মানুষ ব্যাভিচারে ধাবিত হয়। নবীজী (সা:) বলেছেন, অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে জিহ্ববা ও যৌনাঙ্গের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে। রমযানের মাস ব্যাপী রোযা মূলত সে নিয়ন্ত্রণকেই প্রতিষ্ঠা করে। রমযানের রোযা যদি সে নিয়ন্ত্রণ স্থাপনেই ব্যর্থ হয় তবে বুঝতে হবে রোযাদারের মাসব্যাপী ট্রেনিং সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেছে। রোযা তাকে দিনভর উপবাসের কষ্ট ছাড়া আর কিছু্ই দেয়নি। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের রোযা যে তাদের জীবনে কোনরূপ নিয়ন্ত্রণ আনতে পারিনি তা শুধু রমযানের মাসে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতিতে ধরা পড়ে না, প্রকট ভাবে ধরে বিশ্বব্যাপী দূর্নীতিতে প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়েও।

কোন প্রশিক্ষণই নিছক শারীরিক কসরতের বিষয় নয়। চাই জ্ঞান। রমযানের প্রশিক্ষণের সাথে অপরিহার্য হলো তাই কোর’আনের জ্ঞান। আর রমযান তো কোর’আন নাযিলের মাস। ওহীর এ জ্ঞান আনে ঈমানদারের মনোজগতে রুহানী বা আধ্যাত্মিক বিপ্লব। যেখানেই পরিশুদ্ধি ও পরিমর্জিত জীবন কাম্য, সেখানেই এরূপ কোর’আনী জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। লাগাতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া মানুষের জীবনে উৎকর্ষ অসম্ভব। পশু পশুরূপে জন্ম নেয়, মারাও যায় পশু রূপে। এদের জীবনে জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি কোনরূপ চারিত্রিক উৎকর্ষ নেই। তাই পশুকুলে সমাজ গড়ে উঠে না, সভ্যতাও নির্মিত হয় না। কিন্তু মানুষকে পশু থেকে ভিন্নতর ও উন্নততর হতে হয়। এটিই জীবনের মূল সাধনা। নইলে মানুষরূপে জন্ম নিয়েও সে মারা যেতে পারে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট হয়ে। মানব সমাজে যে সেটি ঘটে সে সাক্ষ্যটি দিচ্ছেন খোদ আল্লাহতায়ালা। তাদের বিষয়েই পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে ‘‘উলায়িকা কা’আল আনয়াম, বাল হুম আদাল।’’ অর্থ: “তারাই পশুর ন্যায় বরং পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট’’। অর্থাৎ এদের জীবনে উপরে উঠার কাজটাই হয়নি। বয়স বাড়ার সাথে তাদের ঈমান ও আমল বাড়েনি, বরং বেড়েছে নীচে নামাটি।

অপর দিকে জ্ঞান-সাধনায় অর্জিত উচ্চতর গুণে মানুষ ফেরেশতাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর হতে পারে। এবং সে সামর্থ্য অর্জনের কাজটি ব্যক্তিকে জীবনভর করতে হয়। উচচতর সমাজ ও সভ্যতা নির্মিত হয় তো এমন মানুষের আধিক্যেই। আর এরূপ উচ্চতর মানুষ ও উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণের মধ্য দিয়েই তো যাচাই হয় মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব; সাম্রাজ্য বিস্তার বা পারমানবিক বোমা নির্মাণের সামর্থ্য দিয়ে সেটি হয় না। বস্তুত ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের আমৃত্যু আয়োজনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি পায় নেক আমলের সামর্থ্য। নেক আমল তখন ব্যক্তির জীবন-সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। এমন সংস্কৃতির নির্মাণে রোযার অবদান অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোযায় শেখায় জীবন যাপনে সংযম, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তীতা। আনে আল্লাহ সচেতনতা, এবং সেটি সমগ্র দিন জুড়ে। প্রতি ওয়াক্তের নামায মাত্র কয়েক মিনিটের। এদিক দিয়ে রোযা সবচেয়ে দীর্ঘ ইবাদত। এবং সে ইবাদত ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও সংযমের মধ্য দিয়ে। একান্ত নির্জনেও ক্ষুধাগ্রস্ত ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে মুখে খাদ্য তুলে নেয় না। আল্লাহতায়ালা যে সব কিছু দেখেন -সে চেতনা এভাবেই রোযাদারের মনে আজীবন বদ্ধমূল হয়। সর্বকাজে এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর এমন ভয় এবং এমন আল্লাহ-সচেতনতাই হলো তাকওয়া। এমন তাকওয়া অর্জিত হলেই বুঝতে হবে রোযাদারের রোযা সফল হয়েছে।   

ব্যর্থ হচ্ছে কেন এ প্রশিক্ষণ?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সৈনিকের খাতায় নাম লেখালে বা প্রশিক্ষণ নিলেই কেউ ভাল সৈনিক রূপে গড়ে উঠে না। ভাল সৈনিক হতে হলে সৈনিক জীবনের মূল দর্শন ও মিশনের সাথেও সম্পূর্ণ একাত্ব হতে হয়। দেশের স্বাধীনতা ও সংহতিতে তাকে পূর্ণ বিশ্বাসী হতে হয়। এখানে আপোষ চলে না। সৈনিকের জীবনের মূল মিশন তো দেশের স্বাধীনতা ও সংহতির সংরক্ষণ। কিন্তু এ ক্ষেত্রটিতেই যদি সংশয় থাকে তবে ভাল সৈনিক হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। সৈনিকবেশী এমন ব্যক্তিটির পক্ষে তখন বিদেশী শত্রুর চর হিসাবে কাজ করাও রুচিসিদ্ধ মনে হয়। কোর’আনের কসম খেয়েও এরা গাদ্দারী করে। এরাই কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। মুসলিম দেশকে এরা খন্ডিত করে বা পরাধীন  করে। এবং উল্লাস ভরে মুসলিম হত্যাও  করে। মুসলিম ইতিহাসে এমন বিশ্বাসঘাতক সৈনিকের সংখ্যা কি কম? তেমনি জীবনভর নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাতের প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েও বহু মানুষের জীবনে পরিশুদ্ধি আসে না। পরিশুদ্ধি তো একমাত্র তখনই আসে যখন নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাতের পাশপাশী একাত্ব হয় জীবন ও জগত নিয়ে ইসলামের মূল দর্শনের সাথে। কথা হলো, সে দর্শনটি কি? সেটি হলো, আল্লাহকে একমাত্র প্রভূ, প্রতিপালক, আইনদাতা ও রেযেকদাতারূপে মেনে নেওয়া এবং তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নিজেকে আত্মসমর্পিত সৈনিক রূপে পেশ করা।

মুসলিমের মিশন মূলত আল্লাহর কাছে এক আত্মসমর্পিত গোলামের মিশন। সে দায়িত্ব নিছক নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে পালিত হয় না। সে দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রটি বরং বিশাল। সেটি সমগ্র দেশ, সমগ্র সমাজ, সমগ্র রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি জুড়ে। দায়িত্বপালনের লক্ষ্যে কখনো তাকে দ্বীনের প্রচারক হতে হয়, কখনো রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা হতে হয়, আবার কখনো সৈনিক বা জেনারেলের বেশে যুদ্ধও লড়তে হয়। মুসলিম শব্দটির উদ্ভব তো হয়েছে আত্মসমর্পণ থেকে, যার নমুনা পেশ করেছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আ:)। যিনি আল্লাহর প্রতিটি হুকুমে – সেটি শিশু পুত্রের কোরবানি হোক বা নিজ দেশ ছেড়ে হিজরত হোক – সব সময়ই লাববায়েক (আমি হাজির এবং মেনে নিলাম) বলেছেন। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের মত কোর’আনী প্রশিক্ষণ তো এমন আত্মসমর্পিত মুসলিমদের জন্যই; বেঈমান ও মুনাফিকদের জন্য নয়। যারা জান্নাত চায়, মহান আল্লাহতায়ালার এ প্রশিক্ষণ তো তাদেরকে সে মহাপুরস্কার লাভের জন্য যোগ্য করে গড়ে তোলে। প্রতিটি ঈমানদার যেমন এ প্রশিক্ষণ থেকে ফায়দা পায়, তেমনি এর সাথে একাত্মও হয়।  

 

অবমাননা যেখানে কোর’আনের

প্রশ্ন হলো, কোর’আনের জ্ঞান ছাড়া আল্লাহর নির্দেশিত প্রশিক্ষণ থেকে লাভবান হওয়া কীরূপে সম্ভব? চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান ছাড়া কেউ কি রোগ-চিকিৎসার প্রশিক্ষণে যোগ্য বিবেচিত হয়? প্রচন্ড পরিহাসের বিষয়, মহান আল্লাহতায়ালা কোর’আনী জ্ঞানার্জনের তাগিদ দিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন বার বার, কিন্তু সে দিকে মুসলিমদের ভ্রুক্ষেপ নেই্। অনেক মুসলিমদের ব্যস্ততা দেখা  যায় শুধু তেলাওয়াতে, কিন্তু কোর’আন বুঝায় নয়। তারাবিহ নামাযে কোর’আন খতমের আয়োজন হয় মসজিদে মসজিদে। কিন্তু আয়োজন নেই তেলাওয়াতকৃত আয়াতের অর্থ বুঝায়। কোর’আনের প্রতি এর চেয়ে বড় অবমাননা আর কি হতে পারে? অথচ সারা রমযান জুড়ে মুসলিম দেশগুলিতে পবিত্র কোর’আনের প্রতি সে অবমাননাটাই হচ্ছে। না বুঝে কোন শিশুও কোন বই পাঠ করে না। অথচ না বুঝে কোর’আন পাঠ হচ্ছে ঘরে ঘরে। কোর’আনী জ্ঞানের সে শূণ্যতাটি দেখা যায এমন কোর’আন পাঠকের আমলে, চরিত্রে ও রাজনীতিতে। ফলে এমন কোর’আন পাঠকারি ব্যক্তি মাসভর রোযা রাখলে কি হবে, আল্লাহর শরিয়ত প্রতিষ্ঠার পক্ষে সে কথা বলে না, বরং পক্ষ নেয় ইসলামের বিপক্ষ শক্তির বিজয় আনতে।

কথা হলো, যে ব্যক্তিটি চিন্তা-চেতনায় সেক্যুলার, যার সকল কর্মকান্ড ও অঙ্গিকার হলো আল্লাহর বিধানকে আইন-আদালত, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ সকল অঙ্গণে পরাজিত করা -সে ব্যক্তি আজীবন নামায-রোযায় লিপ্ত হয়েও কি কোন পরিশুদ্ধি পায়? সে তো বরং কর্ম জীবনে মিথ্যুক, স্বৈরাচারি, জালেম ও দূর্নীতিবাজ হয়। রাজনীতিতে এরাই শয়তানী শক্তির একনিষ্ঠ সহযোগী হয়। এদের কারণেই শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের দেশ হয়েও বাংলাদেশ দূর্নীতিতে বিশ্বে বার বার প্রথম হয়। দেশে মসজিদ বাড়ছে। মসজিদে নামাযী ও রোযাদারদের সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু তাতে দেশের ইজ্জত বাড়ছে না। যে সমাজ ও রাষ্ট্র চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাত দুর্বৃত্তদের দ্বারা অধিকৃত সে সমাজে রোযা যে তার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে -সেটি কি প্রমাণের অপেক্ষা রাখে? এ ব্যর্থতার কারণেই বছর ঘুরে বার বার মাহে রমযান এলেও মুসলিম সমাজে পরিশুদ্ধি আসছে না। এবং সমাজও সভ্যতর হচ্ছে না। বরং দিন দিন দুর্বৃত্তি এবং বিশ্বজুড়া অপমানই প্রকটতর হচ্ছে। ২২/০৭/২০১২




বিবিধ ভাবনা (৪২)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. আসক্তি হারাম রাজনীতিতে

মহান আল্লাহতায়ালা শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের হুকুমই দেন না। একতাবদ্ধ হওয়ার হুকুমও দেন। ঈমানদারের উপর তাঁর মহান প্রভুর প্রতিটি হুকুম মানাই বাধ্যতামূলক। সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়া হারাম -যা অনিবার্য করে আযাব। বিদ্রোহের এ পথ শয়তানের। রাস্তায় গাড়ি চালনায় কোন একটি ট্রাফিক সিগনাল অমান্য করলে দুর্ঘটনা ঘটে। বিষয়টি তেমন জীবন চালনার ক্ষেত্রেও। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধি আসে ব্যক্তি জীবনে। কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার নির্মাণের কাজটি একাকী হয় না। দুর্বৃত্তদের নির্মূল ও সমষ্ঠির মাঝে পরিশুদ্ধি আনার সে কাজে অপরিহার্য হলো বহু মানুষের ঐক্য। ঐক্যের সে পরিসর যতটা বাড়ে অর্থাৎ যত বেশী মানুষ একতাবদ্ধ হয় ততই বাড়ে সৃষ্টিশীল কর্মের সামর্থ্য। এজন্যই ফরজ হলো ঐক্যবদ্ধ হওয়া।   

অপর দিকে শয়তান চায় কাফেরদের ঐক্য। ভারতের ১১০ কোটি হিন্দু তাই বর্ণ, ভাষা ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে একতাবদ্ধ। অথচ ভারত ভেঙ্গে ১০টির বেশী বাংলাদেশ হতে পারতো। শয়তান চায়, মুসলিমদের বিভক্তি। মুসলিমগণ মেনেছে শয়তানের হুকুমকে। মহান আল্লাহতায়ালার একতার হুকুমের সাথে গাদ্দারী করে তারা টুকরো টুকরো করেছে মুসলিম ভূগোলকে। আরব ভূখন্ডকে বিভক্ত করছে বিশের বেশী টুকরোয়। বিভক্তি একাকী আসে না, সাথে আনে পরাজয় এবং গোলামীও। আরবদের বিভক্তির কারণেই তাদের ঘাড়ের উপর আজ ইসরাইল। এ গোলামী তাদের নিজ হাতের কামাই। বাঙালী মুসলিমগণ তেমনি কাফেরদের এজেন্ডা পূরণে ও তাদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে পাকিস্তান ভেঙ্গেছে। এ কাজটি ছিল শতভাগ হারাম। এ হারাম কাজে খুশি হয়েছে শয়তান ও ভারতীয় কাফেরগণ। এবং ক্ষতি হয়েছে মুসলিম উম্মাহর। এর পিছনে ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ -যা হলো শতভাগ হারাম। হারাম পানাহারে যেমন অকল্যাণ, তেমনি অকল্যাণ আনে হারাম মতবাদও।

ইসলাম মানুষকে ভাষা, ভূগোল, গোত্রীয় পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে প্যান-ইসলামীক মুসলিম হতে শেখায়। এটিই মুসলিমদের গৌরব যুগের লিগ্যাসী। আরব, ইরানী, কুর্দি, তুর্কি ইত্যাদি নানাভাষী মানুষ বিভক্তি না হয়ে একত্রে কাজ করেছে। জাতীয়তাবাদ ইসলামে অঙ্গিকারহীন, বিদ্রোহী ও বিভক্ত হতে শেখায়। সে বিদ্রোহ নিয়ে ভারতের ন্যায় কাফেরদের সাথে একাত্ম হতেও আপত্তি থাকেনা। বাঙালী মুসলিম জীবনে সেটাই দেখা গেছে একাত্তরে। সে হারাম পথে চলার ফল হলো, বাংলাদেশ আজ ভারতের অধীনত এক গোলাম রাষ্ট্র। বাঙালী মুসলিমদের ঘাড়ের উপর এখন ভারতের নওকরদের শাসন। এ থেকে কি সহজে মুক্তি আছে? এটি হলো, বাঙালী মুসলিমদের নিজ হাতের অর্জিত আযাব। অবাক করার বিষয় হলো, সে গোলামী নিয়েও মার্চ ও ডিসেম্বর এলেই উৎসব হয়। মানুষ বিভ্রান্ত হলে নিজের ভাল-মন্দ বোঝার সামর্থ্য থাকেনা। তখন গোলামীও স্বাধীনতা মনে হয়। খুনিরাও বন্ধু মনে হয়। নরেন্দ্র মোদীর  ন্যায় খুনিরাও তখন সন্মানিত হয়।

মুসলিমদের বিভক্তিতে খুশি হয় কাফের শক্তি। তাই একাত্তরে বাঙালী মুসলিমরা বিজয়ের বিপুল সামগ্রী জুগিয়েছে দিল্লির শাসক মহলে। বিভক্তি মানেই দুর্বলতা ও পরাধীনতা । নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ আদায় করে বিভক্তির আযাব থেকে বাঁচা যায় না। তখন বাঁচতে হয় ঘাড়ে গোলামীর জোয়াল নিয়ে। বাঙালী মুসলিমগণ সজ্ঞানে গোলামীর সে পথই বেছে নিয়েছে। তবে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার জন্য বড় আযাবটি আখেরাতে।

২. বিজয় হারাম রাজনীতির ও ভাবনাশূণ্যতার

পানাহারের ন্যায় রাজনীতিতেও হালাল-হারাম আছে। হারাম হলো জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম ও মুসলিম দেশ ভাঙ্গার রাজনীতি। কোর’আন-হাদীস খুঁজে এ হারাম রাজনীতির পক্ষে একটি দলিলও পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে একাত্তরে হারাম রাজনীতিই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে। সে হারাম রাজনীতিরই ফসল হলো ভোটচোর স্বৈরাচারি হাসিনা।

মশামাছি মলমূত্রে বসে ও রোগজীবাণু ছড়ায়। এতে রোগব্যাধীর মহামারি শুরু হয়। বেঈমানেরা তেমনি মিথ্যায় বিশ্বাসী হয় এবং মিথ্যা ছড়ায়। তাতে বাড়ে নৈতিক রোগের মহামারি। একটি দেশে বেঈমানদের সংখ্যা ও তাদের বিপুল বিজয়টি বুঝা যায় মিথ্যার বাজার দেখে। বাংলাদেশে মিথ্যার বাজারটি যেমন বিশাল; তেমন বিশাল হলো মিথ্যায় বিশ্বাসীর সংখ্যা। দেশবাসী মিথ্যাকে যে কতটা বিশ্বাস করে -সেটি বুঝা যায় একাত্তরে ৩০ লাখের মৃত্যুর ন্যায় মিথ্যার বিশাল বাজার দেখে। মিথ্যার বড় নাশকতা হলো, সেটি মানুষকে চিন্তা শূণ্য করে। চিন্তাশূণ্যতার ফল হলো, গরু, সাপ, মুর্তি, ইত্যাদিও ভগবান গণ্য হয়। ফিরাউনের না্য় মানুষও তখন ভগবানে পরিণত হয়। অথচ তারা বুদ্ধিশূণ্য ছিল না; বিস্ময়কর পিরামিড তো তারাই নির্মাণ করেছিল। বিদ্যাবুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও মানুষ যেমন মিথ্যাবাদী হয়, তেমনি চিন্তাশূণ্যও হয়।

সেরূপ চিন্তাশূণ্যতার কারণেই বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, প্রশাসনের সচিব এবং সেনাবাহিনীর জেনারেলগণও মনে করে একাত্তরে তিরিশ লাখ বাঙালী মারা গেছে। তারা ভাবতে ব্যর্থ হয়, ৯ মাসে ৩০ লাখ মারা গেলে প্রতি দিন ১১ হাজার নিহত হতে হয়। একথাও তারা ভাবে না, সাড়ে সাত কোটির (৭৫ মিলিয়ন) মাঝে ৩০ লাখ (৩ মিলিয়ন) মারা গেলে প্রতি ২৫ জনে একজনকে মারা যেতে হয়। বাঙালীল ইতিহাসে আরেক বড় মিথ্যা হলো, মুক্তিবাহিনী নাকি বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। অথচ মুক্তিবাহিনী একটি জেলা দূরে থাক একটি থানাও কি স্বাধীন করতে পেরেছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পৃথক করে বাংলাদেশ বানিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। বিপুল সংখ্যক বাঙালী যে কতটা মিথ্যসেবী ও চিন্তাশূণ্য সেটি বুঝার জন্য কি কোন গবেষণার প্রয়োজন আছে? এমন মিথ্যসেবী ও চিন্তাশূণ্য চরিত্র নিয়ে কি কোন জনগোষ্ঠি সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে পারে? বাঙালীর কল্যাণ যারা চায় তাদের প্রচেষ্ঠা হওয়া উচিত এ রোগমুক্তির জন্য জিহাদে নামা। জিহাদের এটি এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। 

৩. রাজাকার প্রসঙ্গ ও কিছু বেঈমানের কান্ড

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতি স্বাভাবিক ব্যাপার হলো, রাজাকারদের গালী দেয়া। যারা ভারতের দালালী  করেএমন কি তাদেরও ভারতের রাজাকার বলে গালি দেয়া হয়। যেন রাজাকার শব্দটি একটি গালির শব্দ। বিষয়টি কি যথার্থ? যারা চিন্তাশীল ও দেশপ্রেমিক – এনিয়ে তাদের চিন্তা করা উচিত। একাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয়ের পর রাজকারদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে এবং তাদেরকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হলেও রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হয়নি। সে কাজটি তারাই বেশী বেশী করে যারা একাত্তরে ভারতে গিয়েছিল, ভারতের হাতে প্রতিপালিত হয়েছিল এবং ভারতের এজেন্ডা পূরণে তাদের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছিল। অপরদিকে রাজাকারগণ অস্ত্র ধরেছিল ভারত ও তার দালালদের বিরুদ্ধে। ভারত যে মুসলিমদের শত্রু এবং কখনোই বন্ধু হতে পারে না –সে সত্যটি সেদিন রাজাকারগণ যথার্থ ভাবে বুঝতে পেরেছিল। অথচ সে সত্যটি বুঝতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বাঙালী প্রফেসর,বহু রাজনীতিবিদ ও বহু প্রবীন বাঙালী বুদ্ধিজীবী।

বাংলাদেশের বুকে ভারতের আজ যে দখলদারী এবং বাঙালী মুসলিম জীবনে আজ যে গোলামী -সেটি রাজকারগণ একাত্তরেই বুঝতে পেরেছিল। অখন্ড পাকিস্তানের মধ্যে তারা বাঙালীর কল্যাণ দেখেছিল। কোন একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গা যে হারাম ও সে কাজে জড়িত হওয়া যে সুস্পষ্ট বেঈমানী -সেটি রাজাকারগণ মনে প্রাণে বিশ্বাস করতো। মুসলিমদের আজকের দুর্গতির মূল কারণ তো বিভক্তির এ হারাম পথ। রাজাগণ সেটি বুঝতো বলেই তারা একাত্তরে ভারতে যায়নি। মুসলিম দেশ ভাংগার হারাম রাজনীতিও করেনি। তারা পরাজিত হতে পারে কিন্তু তাদের বিশ্বাসকে তো মিথ্যা বলা যায় না। এজন্য কি রাজাকারকে কি গালী দেয়া যায়? সেটি তো ইসলামের মূল বিশ্বাসের সাথে বেঈমানী। ভারতীয় কাফেরদের সেবাদাসগণ রাজাকারকে গালী দিবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি কি কোন ঈমানদারের কাজ হতে পারে?

৪. ঈমান ও বেঈমানীর রূপ

ব্যক্তির ঈমানদারী ও বেঈমানী খালি চোখে দেখা যায়। ঈমান দেখা যায় ব্যক্তির চরিত্র, কর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতির মধ্যে। সেটি দেখা যায়, দুর্বৃত্ত শাসকের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃনা ও লাগাতর জিহাদে। দেখা যায়, দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদে অর্থদান, শ্রমদান, রক্তদান ও বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যে। অপর দিকে বেঈমানী দেখা যায় দুর্বৃত্ত শাসকের পক্ষে ভোট দেয়া, তাদের পক্ষে লড়া্‌ই করা ও তাদের রাজনীতিকে সমর্থন দেয়ার মধ্যে।

চুরিডাকাতি করাই শুধু অপরাধ নয়, অপরাধ হলো চুরিডাকাতিকে সমর্থন করাও। সামান্যতম ঈমান থাকলে কেউ কি সেটি করে? তেমনি চরম বেঈমানী ও অপরাধ হলো স্বৈরাচারকে সমর্থন করা। এরূপ বেঈমানেরা নামায-রোযা করলেও তারা বেঈমান। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিজয়ী হলো বেঈমানেরা এবং পরাজিত হয়েছে ঈমানদারেরা।

৫. বিজয় হারাম রাজনীতির

পানাহারের ন্যায় রাজনীতিতেও হালাল-হারাম আছে। হারাম হলো জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম, স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও মুসলিম দেশ ভাঙ্গার রাজনীতি। একাত্তরে হারাম রাজনীতি প্রবল ভাবে বিজয়ী হয়েছে। হারাম রাজনীতির ফসল হলো ভোটচোর হাসিনা ও তার দুর্বৃত্তির শাসন। এবং তাতে মারা পড়েছ গণতন্ত্র ও মৌলিক মানবিক অধদিকার। বাংলাদেশ চলছে সেক্যুলারজিমের রাজনীতি। দেশটির জন্মও সেক্যুলারিজমে। সেক্যুলারিজমে ব্যভিচার যেমন প্রেম, তেমনি মুসলিম দেশ ভাঙ্গার হারাম রাজনীতিও সিদ্ধ। তাই দেশটিতে কাফেরদের সাথে জোট বেঁধে পাকিস্তান ভাংঙ্গা ও ভারতের গোলামী করাও গণ্য হয় স্বাধীনতা রূপে।

৬. অভাব ঈমানদার মানুষের

বাংলাদেশে ঈমানদার মানুষের বড্ড অভাব। ঘরে আবর্জনা দেখে বলা যায়, সে ঘরে কোন সভ্য মানুষ বাস করে না। কারণ, সভ্য মানুষ কখনো আবর্জনার মাঝে বাস করে না। তেমনি দেশে দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতের শাসন দেখে বলা যায় দেশে ঈমানদার নাই। কারণ, ঈমানদার থাকলে অবশ্যই বেঈমান তাড়াতো।

৭. অপরাধীর কান্ড

চুরি-ডাকাতি করে যে চোর বা ডাকাত মসজিদ বানায় -তাতে কি চুরি-ডাকাতির অপরাধ মাফ হয়? হাসিনা ভোটডাকাতি করেছে। ভোটডাকাতির মাধ্যমে পুরা দেশ ডাকাতি করেছে। এখন পদ্মা ব্রিজ নিয়ে নিজের কৃতিত্ব জাহির করছে। কথা হলো, পদ্মা ব্রিজ কি তার নিজের বা পিতা শেখ মুজিবের টাকার? ডাকাতির অপরাধ কি তাতে মাফ হয়? বরং হাসিনার সহচরদের দুর্বৃত্তির কারণে বিশ্ব ব্যাংক দূরে সরেছে এবং তাতে পদ্মা ব্রিজ নির্মাণের কাজ এক যুগ পিছিয়ে গেছে। সে সাথে বহুগুণ বেড়েছে নির্মাণ-খরচ। বিশ্ব ব্যাংক না হঠলে পদ্মা ব্রিজের উপর দিয়ে বহু আগে থেকেই গাড়ি চলতো।

৮. বাঙালীর ব্যর্থতা ও অর্জিত আযাব

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ থামাতে ২০ লাখ মানুষ লন্ডনে মিছিল করেছিল। অনেকে বলে, সেটি ছিল তিরিশ লাখ মানুষের মিছিল। বাংলাদেশের মানুষের উপর চলছে হাসিনার নৃশংস যুদ্ধ। ২০ লাখ মানুষ ঢাকার রাজপথে নামলে কি হাসিনা থাকতো? তখন বিনা রক্তপাতে হাসিনার পতন ঘটতো। ঢাকার লোকসংখ্যা তো লন্ডনের দ্বিগুণ। গণতন্ত্র নিয়ে সভ্য ভাবে বাঁচার একটি খরচ আছে। সে খরচ দিতে মায়ানমারের লোকেরা প্রতিদিন রক্ত দিচ্ছে। বাঙালী গণতন্ত্র চায়, কিন্তু তার মূল্য দিতে তারা রাজী নয়। এখানেই বাঙালীর ব্যর্থতা।

জঙ্গলে বাঘ-ভালুকের বিরুদ্ধে মিছিল হয়না। দেশ যখন জঙ্গলে পরিণত হয় তখন ডাকাতদের বিরুদ্ধেও লড়াই হয় না। কারণ সেরূপ লড়াই নিয়ে বাঁচাটি তো সভ্য মানুষদের কাজ। যে দেশ দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়, যে দেশে ভোটডাকাতি, শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যা ও গুম-খুনের রাজনীত হলেও প্রতিবাদ হয়না –সে দেশে কি সভ্য সমাজ নির্মিত হয়? বরং সত্য হলো, এরূপ দেশে দুর্বৃত্তি ও স্বৈরাচার নিয়ে বাঁচাটাই সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। 

দেশকে ডাকাত মুক্ত করার দায়ভার কোন দলের নয়, এ দায়ভার প্রতিটি নাগরিকের। কিন্তু নাগরিকগণ যখন সে দায়ভার পালন করে না -তখন অসভ্য সমাজের আযাব তাদেরকে ঘিরে ধরে। তখন শুধু বিরোধী নেতারাই গুম-খুন হয় না, জনগণও তখন গুম, খুন, নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়। এসবই হলো অর্জিত আযাব।

৯. ভারতের চাওয়া ও পাওয়া

বাংলাদেশে ভারত শুধু তার সেবাদাস আওয়ামী-বাকশালীদের স্বাধীনতা দেখতে চায়। জনগণ ভোটের আজাদী পেলে ভারতের দালালগণ যে নির্বাচনে পরাজিত হবে -সেটি ভারত জানে। ভারতীয়দের মনে এজন্য  গণতন্ত্রভীতি। তাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু হলো ভারত ও তার সেবাদাস আওংয়ামী-বাকশালী গোষ্ঠি।

নিরপেক্ষ নির্বাচন কোন জটিল রকেট সায়েন্স নয়। নেপালেও সেটি সম্ভব। সেরূপ একটি নির্বাচন হচ্ছে পাশ্ববর্তী পশ্চিম বাংলাতেও। অথচ ভারত সেরূপ নির্বাচন বাংলাদেশে হতে দিতে রাজী নয়। বরং বাংলাদেশে যা চায় তা হলো ভোট ডাকাতির নির্বাচন। চায়, নির্বাচনের নামে ব্যালেট ডাকাতি করে আওয়ামী বাকশালীদের বিপুল বিজয়। তেমন একটি নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে। সে ভোটডাকাতিকে জায়েজ করতে ভারতীয় দূতাবাসগুলি ও মিডিয় বিশ্বজুড়ে প্রচারে নেমেছিল। ভারত চায়, বাংলাদেশ বেঁচে থাকুক একটি জেলখানা রূপে। জেলখানার লোকদের ভোটের অধিকার থাকে না। তেমনি ভোটাধিকার নাই বাংলাদেশীদেরও। ১২/০৪/২০২১ 




বিবিধ ভাবনা (৪১)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 ১.  ঈমানদার ও বেঈমানের  রাজনীতি

ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা ও আশা-আকাঙ্খা কখনোই গোপন থাকে না; সেগুলির সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে রাজনীতিতে। ঈমানদারের রাজনীতিতে ঘটে ঈমানের প্রকাশ।  তাতে প্রকাশ ঘটে মহান আল্লাহতায়ালা কি চান –সেটির। মহান আল্লাহতায়ালা চান তাঁর দ্বীনের বিজয়, চান আদালতে তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। চান, মুসলিমদের ঐক্য। তাই ঈমানদারের রাজনীতি থাকে মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধির প্রচন্ড ভাবনা। তাই তাঁর রাজনীতিতে কখনোই মুসলিম দেশের ভূগোল ভাঙ্গার ভাবনা থাকে না, বরং থাকে ভূগোল বৃদ্ধির ভাবনা। থাকে সর্ব শক্তি দিয়ে শত্রুশক্তির ভূগোল ভাঙ্গার রাজনীতির বিরোধীতা। একাত্তরে সে ভাবনা থেকেই প্রতিটি ইসলামী দল, প্রতিটি হকপন্থী আলেম ও ঈমানদার ব্যক্তি পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধীতা করেছে এবং বহু হাজার ব্যক্তি রাজাকার হয়েছে। অতীতে সে ভাবনা থেকেই মুসলিমগণ সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তির জন্ম দিয়েছে।

মুসলিমদের শুধু ঈমানদারদের চিনলে চলে না; চিনতে হয় বেঈমানদেরও। নইলে শত্রু ও মিত্র চেনার কাজটি হয় না। বেঈমানদের চেনার কাজটি সহজ হয় তাদের রাজনীতি দেখে। এদের রাজনীতিতে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা পূরণের কোন ভাবনা থাকে না। বরং থাকে ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতি করার ভাবনা। থাকে, যে কোন ভাবে ক্ষমতা দখলের এজেন্ডা। এবং সেটি কাফেরদের সাহায্য নিয়ে মুসলিম দেশকে খন্ডিত করার মধ্য দিয়ে হলেও। মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বেঈমানগণ সে কাজটিই করেছে একাত্তরে। তারা সেটি করেছে ভারতের ন্যায় কাফের দেশের মুসলিম বিরোধী এজেন্ডা পূরণের মধ্য দিয়ে। ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তান ভাঙ্গতে চেয়েছে; তারা অপেক্ষায় ছিল একজন মুজিবের। ১৯৭১’য়ে ভারতের অস্ত্র নিয়ে ভারতের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুজিবপন্থীগণ সেদিন যুদ্ধ করেছে। সামান্য ঈমান থাকলে কেউ কি এরূপ কাজ করতে পারে? ইসলামের প্রতি নিজেদের বেঈমানীটিট জানিয়েছে ইসলামের পক্ষ ছেড়ে এবং জাতীয়তাবাদের ন্যায় কুফরি মতবাদে দীক্ষা নিয়ে।  

প্রশ্ন হলো যারা কাফেরদের বিজয়ী করতে ও তাদের এজেন্ডা পূরণে তাদের দেয়া অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করে তাদেরকে কি ঈমানদার বলা যায়? বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরাই হলো ভারতের পদলেহী তাঁবেদার পক্ষ। ইসলাম ও মুসলিমের পরাজয় নিয়ে এরা ভারতীয় কাফেরদের সাথে মিলে উৎসব করে। প্রতিবছর সেটি দেখা যায় ১৬ই ডিসেম্বর এলে। দক্ষিণ এশিয়ার বুকে ভারত আজ বৃহৎ শক্তি –সেটি তো তাদের ভারতসেবী রাজনীতির কারণে। এরা শুধু পাকিস্তানের শত্রু নয়, বরং ভয়ানক শত্রু হলো ইসলাম ও বাঙালী মুসলিমদের। সে সাথে শত্রু গণতন্ত্রের।  বাঙালী মুসলিমদের মুসলিম রূপে বাঁচতে হলে এ শত্রুদের নির্মূল করতেই হবে। প্রতিটি মুসলিম জীবনে জিহাদ থাকে। বাঙালী মুসলিম জীবনে সে জিহাদটি হলো এ বেঈমানদের বিরুদ্ধে। লক্ষ্য এখানে পুণরায় পাকিস্তান বানানো নয়, বরং বাঙালী মুসলিমদের মাথা তুলে দাঁড়ানো। দায়িত্ব এখানে প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলা, আসাম, বিহার ও আরাকানে বসবাসকারী ২২ কোটি মুসলিমের নেতৃত্ব দেয়া।

২. যে পাপ বাঙালী মুসলিমের

বাংলাদেশে নিজ দল, নিজ জামায়াত, নিজ ফিরকা, নিজ মাযহাব, নিজ পীর ও নিজ নেতাকে বিজয়ী করতে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ করছে। দেশের পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী, বিজিবি, প্রশাসন, বিচারক বাহিনী তাদের সর্বশক্তি বিনিয়োগ করছে ভোটচোর অবৈধ হাসিনার প্রতিটি হুকুমকে প্রতিষ্ঠিত দিতে। কিন্তু দেশে লোক নাই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমকে বিজয়ী করার । ফলে বাংলাদেশের বুকে বিজয়টি ইসলামের শত্রুদের। বাঙালী মুসলিমগণ এভাবেই পরাজয় বাড়িয়েছে ইসলামের। এবং অসম্মান বাড়িয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার। এ পাপ তো বিশাল। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত দিয়ে কি এ পাপ মোচন হয়?

৩. গোলামীর পথে বাঙালী মুসলিম

ঈমান থাকলে জিহাদও আসে। কারণ জিহাদ ঈমানের অংশ। তাই নবীজী (সা:) ও তাঁর প্রতিটি সাহাবার জীবনে জিহাদ ছিল। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। জিহাদ মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য আনে। ফলে বিজয় আসে। তখন বিজয়ী হয় মুসলিম এবং প্রতিষ্ঠা পায় ইসলাম। এবং জিহাদ না থাকলে আসে পরাজয়। বাঙালী মুসলিম জীবনে জিহাদ নাই, ফলে বাঙালী মুসলিম জীবনে বিজয়ও নাই। তাদের বাঁচতে হয় শয়তানী শক্তির গোলামী নিয়ে। বাঙালীরা মুসলিমগণ ১৯৭১ থেকে ভারতের গোলামীর পথটাই বেছে নিয়েছে। তাই নির্যাতন, জেল ও মৃত্যু নেমে এসেছে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের জীবনে।  

৪. খুনিদের উৎসব

হাসিনা ঢাকার খুনি। সে শত শত মুসলিমের লাশ ফেলছে। আর নরেন্দ্র মোদি হচ্ছে গুজরাতের খুনি। সে যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন ৫ হাজার মুসলিমের লাশ ফেলেছে। বাবরী ধ্বংসের কাজেও সে অংশ নেয়। দুই খুনি এখন ঢাকায় উৎসব করছে। জনগণকে রাস্তায় নামতে নিষেধ করেছে।

বন্ধুত্ব গড়তে সবাই মনের মিলটা দেখে। এজন্যই দুর্বৃত্তরা সব সময় দুর্বৃত্তদের ভালবাসে। কারণ,তারাই তাদের মনের অতি কাছের মানুষ। মাছি যেমন মলমুত্র খোঁজে, দুর্বৃত্তও তেমনি দুর্বৃত্ত খোঁজে। তেমনি খুনি খোঁজে আরেক খুনিকে। এজন্যই খুনি হাসিনা তার পিতার জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে কোন ভাল মানুষকে নয়, গুজরাতের কুখ্যাত খুনি নরেন্দ্র মোদিকে অতিথি করেছে। হাসিনা জানে, নরেন্দ মোদি তাকে যেমন ভালবাসে, দুনিয়ার কোন সভ্য মানুষই সেরূপ ভালবাসে না।বরং নিজের অসভ্য ও বর্বর কর্মের জন্য প্রতিটি সভ্য মানুষের কাছেই সে ঘৃণার পাত্র।

৫.অবমাননা মহান আল্লাহতায়ালার এবং বিজয় শয়তানের

বাংলাদেশে আইন অমান্য করলে বা কোন দুর্বৃত্ত বিচারপতির হুকুমের অবমাননা করলে শাস্তি হয়। দেশের পুলিশ বাহিনী ও আদালত সে অবমাননাকারীকে জেলে তুলতে তৎপর। অথচ দেশটিতে  দিনরাত বিদ্রোহ ও অবমাননা হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম ও তাঁর শরিয়তি আইনের। অথচ তার কোন বিচার নাই; কারো কোন শাস্তিও নাই। কোন প্রকৃত ঈমানদার কি তাঁর মহান প্রভুর এরূপ অবমাননা কখনো সইতে পারে? সইলে কি ঈমান থাকে?

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মু’মিনের পরিচয় হলো, সে তাঁর পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফা ও সৈনিকের। সৈনিকের কাজ তো রাজার আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের ধরে ধরে শাস্তি দেয়া। নইলে ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটি শুধু কিতাবেই থেকে যায়।  নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের যুগে  কেউ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম ও তাঁর শরিয়তি আইনের বিরুদ্ধে এরূপ অবমাননা ও বিদ্রোহ করলে কি তার ঘাড়ে মাথাটি থাকতো? অথচ বাংলাদেশে আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে বাঁচাটিই সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এরপরও তারা গর্ব করে বলে, তারা ঈমানদার? নবীজী (সা:)’র যুগে প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ ছিল মুনাফিক -যারা নবীজী (সা:)’র পিছনে মসজিদে নববীতে নামায পড়তো। বাংলাদেশে এ মুনাফিকদের সংখ্যা যে বিপুল -তা কি নিয়ে সন্দেহ আছে?  দেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও আইন-আদালতে তো এরাই বিজয়ী শক্তি। তাই বাংলাদেশে উৎসবটি শয়তান ও তার অনুসারীদের।

৬. জিহাদ বাছাই কাজ করে ঈমানদারদের

নামাযে অর্থ ও রক্তের খরচ নাই, তাই সেখানে সুদখোর, ঘুষখোর ও মিথ্যুক দুর্বৃত্তদের দেখা যায়। মুনাফিকদেরও দেখা যায়। তাদের থেকে প্রকৃত ঈমানদারদের আলাদা করার ক্ষেত্রটি হলো জিহাদ। জিহাদে তারাই যোগ দেয় -যারা প্রকৃত ঈমানদার। তাঁরা বাঁচে ও প্রাণ দেয় মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে এবং তাঁর বিধানকে বিজয়ী করতে। জিহাদে তো তারাই যোগ দেয় যারা বিনা বিচারে জান্নাতে যেতে চায়। বেঈমান কখনোই আল্লাহকে খুশি করার লক্ষ্যে বাঁচে না। তারা বাঁচে নিজেকে এবং নিজের পরিবার, দল ও নেতাকে খুশি করতে।

৭. ঈমানদারের জিহাদ ও বেঈমানের যুদ্ধ

সবার জীবনেই যুদ্ধ থাকে। অনেকের যুদ্ধ স্রেফ বাঁচার যুদ্ধ। বেঈমানের যুদ্ধটি তাকে জাহান্নামে নেয়। বেঈমানের সে যুদ্ধটি হয় ভাষা, গোত্র, অঞ্চল, দল ও নেতার নামে। ঈমানদারের যুদ্ধ তাঁকে জান্নাতে নেয়। ঈমানদারের প্রতিটি যুদ্ধই জিহাদ। জিহাদের লক্ষ্য ইসলামের প্রতিষ্ঠা, মুসলিম দেশের প্রতিরক্ষা ও জান-মালকে সুরক্ষা দেয়া। জিহাদই ইসলামে শ্রেষ্ঠ ইবাদত। ইবাদত এখানে শয়তানী পক্ষকে পরাজিত করার। জিহাদে যারা প্রাণ দেয় তারা শহীদ হয় এবং বিনা হিসাবে জান্নাত পায়।

১৯৭১’য়ে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধটি জিহাদ ছিল না। সে যুদ্ধটি ছিল সেক্যুলারিজম ও বাঙালী জাতীয়তাবাদের নামে। সে যুদ্ধে ইসলাম কোন বিষয়ই ছিল না। মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধিও এ যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল না। যুদ্ধের অস্ত্রদাতা, অর্থদাতা ও মূল পৃষ্ঠপোষক ছিল ভারতীয় কাফেরগণ এবং পরিচিত শত্রুদেশ রাশিয়া। তাদের যুদ্ধে লাভবান হয়েছে ভারত। এ যুদ্ধে তাদের ও মুক্তিবাহিনীর যারা মারা গেছে ভারতীয় কাফেরগণ তাদের শহীদ বলে।  অথচ শহীদ একটি কোর’আনী পরিভাষা, হিন্দুদের ধর্মীয় বইয়ে শহীদ বলে কোন শব্দ নাই। তাই যারা প্রকৃত শহীদ হতে চায় তারা একাত্তরে ভারতের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করা থেকে সযত্নে দূরে থেকেছে। কারণ মুসলিমের প্রতিটি খাবার যেমন হালাল হতে হয়, তেমনি প্রতিটি যুদ্ধকে শতভাগ হালাল হতে হয়। এবং যুদ্ধতো তখনই হালাল হয় যখন সেটি বিশুদ্ধ জিহাদ হয়। তাছাড়া মুসলিম দেশ বাঁচানোর যুদ্ধ জিহাদ হয়, ভাঙ্গার যুদ্ধ কখনোই জিহাদ হয় না। সে হুশ থাকার কারণেই কোন আলেম এবং ইসলামপন্থী কোন দল ও ব্যক্তিকে মুক্তিবাহিনীতে দেখা যায়নি।

৮. জিহাদ বিরামহীন

ঈমানদারের জীবনে জিহাদ অবিরাম। কখনো সেটি বুদ্ধিবৃত্তিক, কখনো অস্ত্রের। কখনো সেটি নফসের বিরুদ্ধে, কখনো সেটি সশস্ত্র শত্রুর বিরুদ্ধে। নামায দিনে ৫ বার। রোযা  বছরে ১ মাস। এবং হজ্জ জীবনে একবার। কিন্তু জিহাদ প্রতি দিন ও প্রতিক্ষণ। জিহাদে ক্বাজা নাই। জিহাদ না থাকার অর্থ, শত্রুর হাতে পরাজয় ও আত্মসমর্পণ। দেশ যখন ইসলামের শত্রু শক্তির দখলে তখন জিহাদ থেকে দূরে থাকা বেঈমানী। তখন বিজয়ী হয় শয়তান। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে।

নামায-রোযা করেও বহু মানুষ মুনাফিক হয়। নবীজী (সা:)র পিছনে নামায আদায় করেও অনেকে মুনাফিক হয়েছে। এরা কাফিরদের চেয়েও নিকৃষ্ট। ন্যায়ের পক্ষে থাকা এবং জিহাদে যোগ দেয়ার সামর্থ্য এদের থাকে না। এরা অপরাধী; এরা যুদ্ধ করে চোরডাকাত, ভোটডাকাত ও দুর্বৃত্তদের বিজয়ী করার লক্ষ্যে।

৯. ফরজে অবহেলা এবং আসক্তি হারামে

ইসলামে ফরজ হলো একতা গড়া। এবং হারাম হলো অনৈক্য গড়া। বাঙালী মুসলিম জীবনে অনৈক্য দেখে বুঝা যায় অনৈক্য গড়ার ন্যায় হারাম কাজে তাদের কত আগ্রহ। দেশ ডাকাতদের দখলে গেছে, ডাকাত তাড়াতে তবুও রাজী নয় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো! একতায় রাজী নয় দেশের আলেম সমাজ। অনৈক্যের হারাম নিয়ে বাঁচাই যেন তাদের নীতি।অনৈক্যে এরূপ ডুবে কি আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা যায়? মিলবে কি জান্নাত?

১০. উৎসব কি পরাধীনতা নিয়ে?

বাংলাদেশে কোথায় স্বাধীনতা? মিছিল করতে গেলে লাশ হতে হয়। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে গুম হতে হয়। এবং ভোট ডাকাতি হয়ে যায়। কথা হলো, এসব কি স্বাধীনতার লক্ষণ? এমন দেশে আবার কিসের উৎসব? দেশবাসীকে পরাধীন করে হাসিনা তার প্রভু নরেন্দ্র মোদিকে পদসেবা দিচ্ছে নিরীহ মানুষকে বলি দিয়ে। নরেন্দ্র মোদির আগমন কালে ২১জন নিরীহ মানুষকে হাসিনা করেছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে অপরাধী ব্যক্তি হচ্ছে হাসিনা। এ ভয়ানক অপরাধীকে দেশবাসী কি শাস্তি দিবে না? ০৯/০৪/২০২১