বিবিধ ভাবনা (৩৭)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 ১. পরাধীনতা নিয়ে উৎসব

বাংলাদেশের সরকার বিরাট ধুমধামে স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকী উৎসব করতে যাচ্ছে। খবরে প্রকাশ ১২ কোটি টাকা ব্যয় করবে দুবাইয়ের বিশ্ববিখ্যাত টাউয়ার বুর্জে খলিফায় আলোক সজ্জা দিতে। কিন্তু এ উৎসব কার স্বাধীনতা নিয়ে? কোন একটি দেশ স্বাধীনতা পেলে স্বাধীনতা পায় সে দেশের জনগণ। কিন্তু বাংলাদেশে কোথায় সে স্বাধীনতা? দেশের জনগণ স্বাধীন ভাবে কথা বলতে পারে না, লিখতে পারে না এবং মিছিল-মিটিং করতে পারে না। দেশ জুড়ে ভোট ডাকাতি করলে সামান্যতম শাস্তিও হয়না। কিন্তু স্বাধীন ভাবে কথা বললে গুম হতে হয়, জেলে যেতে হয়, নির্যাতিত হতে হয় এবং নির্মম ভাবে লাশ হতে হয়। লাশ হয়েছে বুয়েটের ছা্ত্র আবরার ফাহাদ। সম্প্রতি লাশ হলো মুশতাক আহম্মদ। ভোটের অধিকার ছিনতাই হয়েছ বহু আগেই। এতো নিরেট পরাধীনতা! জনগণ কেন এ পরাধীনতা উদযাপনে রাজস্ব দিয়ে অর্থ জোগাবে?

যারা স্বাধীনতা পেয়েছে তারা বাংলাদেশের জনগণ নয়, তারা হলো চোরডাকাত, ভোটডাকাত  ও গুম-খুন-সন্ত্রাসের নায়কগণ। পূর্ণ স্বাধীনতা ডাকাত সর্দারনী হাসিনা। জনগণ এ ডাকাত সর্দারনীর হাতে জিম্মি। ডাকাতদের সাথে অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছে ভারত। ভারত স্বাধীনতা পেয়েছে বাংলাদেশের পদ্মা ও তিস্তাসহ ৫৪টি নদীর পানি তুলে নিতে। তারা স্বাধীনতা পেয়েছে বাংলাদেশে মধ্য দিয়ে  বাস ও ট্রাক নিয়ে এপার-ওপার করিডোরের সুবিধা ভোগের। স্বাধীনতা পেয়েছে বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দগুলি ব্যবহারের।

৩. কেন পতনের পথে মুসলিমগণ?

মুসলিম উম্মাহর অবস্থা এমন এক বিশাল বাগানের ন্যায় যেখানে রয়েছে ১৫০ কোটি গাছ। কিন্তু সে বাগানের সব গাছ ফল দেয় না; ফল দেয় গুটি কয়েক মাত্র। কিন্তু বাগানের মালিক মহান আল্লাহতায়ালা চান ফল দিবে বাগানের প্রতিটি গাছ, কারণ পানাহার ও আলোবাতাস নিচ্ছে তো সব গাছগুলোই।

নিছক পানাহারে বাঁচার মধ্যে কোন কল্যাণ নাই। সংখ্যায় বৃদ্ধিতেও কোন মর্যদা নাই। মর্যাদা তো কর্মের কারণে। কোর’আনে তাই বলা হয়েছে, “ওয়া লি কুল্লি দারাজাতিন মিম্মা আমিলু।” অর্থ: সকল মর্যাদা আমলের মধ্যে। সে মর্যাদা যেমন জুটে এ দুনিয়ায়, তেমনি আখেরাতে। আর নবীজী (সা:)’র হাদীস: সবচেয়ে মর্যাদাকর আমল হলো জ্ঞানার্জন করা ও জ্ঞানদান করা। তাই যারা জ্ঞানের রাজ্যে্ এগোয় তারাই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মর্যাদা পায়। সে জ্ঞানীরা মর্যাদা পায় বিশ্বমাঝেও। অপর দিকে জ্ঞানহীনতা নেয় পতনের পথে। মুসলিমদের আজকের পতন, পরাজয় ও মর্যদাহীনতার মূল কারণ, জ্ঞানের রাজ্যে পশ্চাদপদতা। প্রশ্ন হলো, এ জ্ঞানহীনেরা কি আখেরাতে কোন মর্যাদা পাবে?  

৩. বাংলাদেশের রেকর্ড

পশু তাড়ানোর লোক না থাকলে জনপদ জুড়ে পশুরা রাজত্ব পায়। তেমনি দেশে চোরডাকাত তাড়ানো ও তাদের শাস্তি দেয়ার লোক না থাকলে রাজত্ব পায় চোরডাকাতেরা। তারই পারফেক্ট উদাহরণ হলো আজকের বাংলাদেশ। দেশের পুলিশ, আদালত ও সেনাবাহিনীর কাজ হয়েছে ডাকাতদের সুরক্ষা দেয়া। ফলে বাংলাদেশে জনগণের ভোট নির্বাচনের আগের রাতে ডাকাতি হয়ে গেলেও কেউ গ্রেফতার হয়না। সে অপরাধে কারো কোন শাস্তিও হলো না। জনগণের কাজ হয়েছে এ চোরডাকাতকে না তাড়িয়ে ডাকাত সরদারনীকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা। কোন সভ্য ব্যক্তি কি এমনটি করে? এটি তো ডাকাতপাড়ার সংস্কৃতি। অথচ এ অসভ্য সংস্কৃতিই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।    

৪. ডাকাত দলের রীতি

ডাকাত দলের সরদার কখনোই তার ডাকাত দলে ভাল লোককে নেয় না। কারণ, তাতে ডাকাতিতে সাহায্য মেলে না। তাই সে খোঁজে জঘন্য চরিত্রের অতিশয় ঝানু ডাকাতকে। তখন কদর পায় ডাকাতগণ। এবং অসম্ভব করা হয় ভাল মানুষের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচা। তখন ভাল লোকের পক্ষে রাজনীতি ও সরকারে থাকা অসম্ভব হয়। দেশ তখন একটি জঙ্গলে পরিণত হয়। চোরডাকাত ও ভোটডাকাতদের হাতে দেশ অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। এজন্যই হাসিনার কাছে জেনারেল আজিজের এতো কদর। কারণ, আজিজ উঠে এসেছে ডাকাত পরিবার থেকে; তার ৪ ভাই খুনি। এবং সে সাথে সে তার ডাকাতি কাজে বিপুল সামর্থ্য দেখিয়েছে ২০১৮ সালে ভোট ডাকাতিতে।

৫. জান্নাতের পথ ও জাহান্নামের পথ

জান্নাতে নানা বর্ণ, নানা অঞ্চল ও নানা ভাষার মানুষ পরস্পরে ভাইয়ের মত সৌহার্দ ও সম্পৃতি নিয়ে বসবাস করবে। সেখানে কোন বিবাদ ও বিভক্তি থাকবে না। ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের উর্দ্ধে উঠে তাদের একটিই পরিচয় হবে যে তারা মুসলিম। ঈমানদারদের জন্য এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া একমাত্র পরিচয়। তাই যারা জান্নাতের যোগ্য হতে চায় তাদেরকে দুনিয়ার বুকে্ও সে ভাবে ভাতৃসুলভ মুসলিম পরিচয় নিয়ে বাঁচার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।

সাহাবাগণ সে কাঙ্খিত সামর্থ্যটি অর্জন করেছিলেন। তারা বর্ণ, ভাষা, গোত্র ও আঞ্চলিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠতে পেরেছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া সে পরিচয় আজকের মুসলিমদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। তারা বেছে নিয়েছে বর্ণ, ভাষা, গোত্র ও আঞ্চলিক পরিচয়ে বিভক্তির দেয়াল গড়ার পথ। মুসলিম উম্মাহ তাই ৫৭টি জাতীয় ও গোত্রী রাষ্ট্রে বিভক্ত। বাঙালী, আরব, কুর্দি, ইরানী, মালয়ী ইত্যাদি পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠাটাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিভক্তির পথ মাত্রই আযাবের পথ –সে কথা পবিত্র কোর’আনে সুস্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে। যারা পরকালে জান্নাত পেতে চায় তারা কি সে পথ বেছে নিতে পারে?

৬. বিশ্বের সবচেয়ে বড় জেলখানা

যখন কোন ভূমির চারপাশে দেয়াল বা কাঁটা তারের বেড়া দেয়া হয় তখন সে জায়গাটা গরুছাগলের খোয়ার অথবা জেলখানায় পরিণত হয়। জেলের চার পাশে উঁচু দেয়াল বা কাঁটাতারের বেড়া থাকে। বাংলাদেশের চারপাশে সে বেড়া দিয়েছে ভারত। পাকিস্তানী আমলে ভারত এরূপ বেড়া দেয়নি। এ দেয়াল একাত্তরের অর্জন। ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জেলখানায়।

জেলখানার বাসিন্দাদের কথাবলা, লেখালেখি ও মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা থাকে না। নির্বাচনে অংশ নেয়া ও ভোটদানের স্বাধীনতা থাকে না। বাংলাদেশীদেরও সে স্বাধীনতা নাই। এদেশে স্বাধীন ভাবে কথা বললে, লেখালেখি করলে বা মিটিং-মিছিল করলে নির্যাতিত হতে হয় এবং লাশ হতে হয়। এ হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার অবস্থা –যা নিয়ে আবার উৎসবও হচ্ছে!

৭. দশের ও দেশের ভাবনা নিয়ে বাঁচা

নিজের স্বার্থে ও নিজ পরিবারের স্বার্থে সবাই কিছু না কিছু করে। সেরূপ কাজটি পশু-পাখীও করে। কিন্তু দেশের কল্যাণে কে কতটুকু করে -সে হিসাব বা সে ভাবনা ক’জনে? সে ভাবনা নাই বলেই বাংলাদেশ আজ চোরডাকাতদের দখলে। অথচ কে কতটা কাজ দশের জন্য ও দেশের জন্য করলো -পরকালে সে হিসাবই গুরুত্ব পাবে। সে কাজের ভিত্তিতে জান্নাত জুটবে।

৮. পরাজয়ের পথ

মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের একতা পছন্দ করেন। এবং তিনি ঘৃনা করেন তাদের অনৈক্যকে। যারা একতাবদ্ধ হয়, তাদেরকে তিনি বিজয় দেন। যারা বিভক্ত হয় তাদের পরাজয় দেন। মুসলিমগণ বিভক্তির পথ ধরেছে। ফলে তারা সর্বত্র পরাজিত। ১৯/০৩/২০২১।




পতনের পথ ও বিজয়ের পথ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

কীভাবে শুরু হলো পতনযাত্রা?

মুসলিমদের পতনের পথে যাত্রা বহুশত বছর পূর্বে শুরু হলেও এখনো শেষ হয়নি। পতনমুখী এ জাতির উত্থান নিয়ে যারা চিন্তিত তাদের প্রশ্ন, উত্থানের কাজ কোথা থেকে শুরু করতে হবে? এ নিয়েও নানা জন নানা মতে বিভক্ত। অন্য নানা বিষযের ন্যায় এ বিষয়েও নির্ভূল নির্দেশনা মেলে মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত ও নবীজীর (সা:) সূন্নত থেকে। সে সূন্নতের অনুসরণ শিল্প, কৃষি বা বিজ্ঞানের উন্নতি দিয়ে নয়; সেটি অজ্ঞতার দূরীকরণ ও জ্ঞানের উন্নয়ন দিয়ে। এবং সে জ্ঞানটি হলো কোর’আনের জ্ঞান। ব্যক্তি ও জাতির উন্নয়নে নির্ভূল ও অতীতে সফল-প্রমাণিত রোড ম্যাপ হলো পবিত্র কোর’আন। সে রোড ম্যাপের যে স্থান থেকে মহান নবীজী (সা:) তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন আমাদেরও জাতি গঠনের কাজ সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। আর সে নির্দেশনা হলো ’ইকরা’ তথা ’পড়’। “ইকরা” একটি প্রতিকী শব্দ। পড়া বা অধ্যয়ন যেহেতু জ্ঞানার্জনের চাবি, পবিত্র কোর’আনের প্রথম শব্দ রূপে এ শব্দটি তাই বুঝিয়েছে জ্ঞানার্জনের অপরিসীম গুরুত্বের কথা। জ্ঞান দেয় মনের আলো। মনের সে আলো দেয় নানা পথের ভিড়ে সত্য পথটি চিনে নেয়ার সামর্থ্য। মানুষ তখন পায় হিদায়াত। অন্ধকার আচ্ছন্ন করে রাতের পৃথিবীকে, অজ্ঞতাও তেমনি আচ্ছন্ন করে মনের ভুবনকে। অজ্ঞতা তখন অসম্ভব করে সত্য পথটি চেনা এবং সে পথে পথচলা। তখন জীবনে আসে ভয়ানক বিচ্যুতি। অন্ধকার শিকারের সুযোগ করে দেয় হিংস্র পশুদের, মনের অন্ধকার তেমনি সুযোগ করে দেয় মনুষ্যরূপী শয়তানদের।

শিকারী পশুর ন্যায় শয়তানেরাও এমন একটি অন্ধকার অবস্থার অপেক্ষায় থাকে। সেরূপ একটি অবস্থা সৃষ্টির জন্যই তারা কোর’আনী জ্ঞানের পরমতম শত্রু। শিকার ধরার কাজে তারা ওঁত পেতে থাকে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ন্যায় জীবনের প্রতিটির ক্ষেত্র জুড়ে। শয়তানের ফাঁদগুলো চিনে জীবন বাঁচানোর জন্য চাই জ্ঞান; এবং কোর’আনী জ্ঞান চাই ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য, শিষ্ঠ-অশিষ্ঠের পার্থক্য বুঝবার জন্যও। পবিত্র কোর’আনের অপর নাম ফুরকান; ফুরকান হলো সেই মানদন্ড যা দেয় ন্যায় ও অন্যায় এবং সত্য ও অসত্যের মাঝে বাছবিচারের সামর্থ্য। ফলে যার মধ্যে পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান নাই, তার কাছে অন্যায়ও ন্যায় এবং অসত্যও সত্য মনে হয়। জাহান্নামের পথও তখন সঠিক মনে হয়। মনের অন্ধকার নিয় বাঁচার এটিই তো ভয়াবহতা। মহান আল্লাহতয়ালা ঈমানদারদের রক্ষা করেন সে বিপদ থেকে; তিনি দেখান আলোর পথ। পবিত্র কোর’আনে পাকে সুরা বাকারায় বলা হয়েছে, ‘‘আল্লাহু ওয়ালী উল্লাযীনা আ’মানু ইয়ুখরিজুহুম মিনায যুলুমাতি ইলান্নূর।’’ অর্থ: ‘‘আল্লাহপাক ঈমানদারের বন্ধু। তিনি তাকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে আসেন।’’ যে আলোর কথা এখানে বলা হয়েছে সেটি সেই মনের আলো‌ তথা জ্ঞান। এ জ্ঞান থেকেই জুটে হেদায়াত বা সত্য পথপ্রাপ্তী। মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান আনার প্রতিদানে এটিই হলো বান্দাহর প্রতি মহান আল্লাহর সর্বোত্তম পুরস্কার। ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি বা চেহারা-সুরত নয়। অপরদিকে ঈমানশূণ্যদের বন্ধু হলো শয়তান। শয়তান তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়। সে পথে সে জাহান্নামে নেয়। ফলে অজ্ঞতা তাই শয়তানের বড় হাতিয়ার। ফলে যেখানে জাহিলিয়াত বা অজ্ঞতা বেড়েছে সেখানেই বেড়েছে ইসলামবিরোধী শয়তানদের আধিপত্য। এই অজ্ঞতার পথ ধরেই মুসলিম বিশ্ব জুড়ে এসেছে আল্লাহর দ্বীনের পরাজয়; এসেছে শরিয়তের বিলুপ্তি। এসেছে শত্রু শক্তির বিজয়।

পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানে জ্ঞানবান হওয়াই হলো মহান আল্লাহতায়ালার নিয়ামত প্রাপ্তির সবচেয়ে বড় আলামত। এবং অজ্ঞতা হলো অভিশপ্ত জীবনের আলামত। নামে মুসলিম হলেও দূর্বৃত্তময় জীবন দেখে তাই নিশ্চিত বলা যায়, সত্যিকার ঈমান ও আল্লাহর নেয়ামতের কোনটিই এমন ব্যক্তির জুটেনি। আজকের মুসলিমদের সেটিই প্রকৃত চিত্র। অথচ আল্লাহর সে নিয়ামতের কারণেই অন্যায়, অসত্য ও অসুন্দরকে মরুর নিরক্ষর মুসলিমরা আজ থেকে ১৪ শত বছর পূর্বে সনাক্ত করতে পেরেছিলেন। ফলে শয়তানের বিছানো ফাঁদ থেকে নিজেদের বাঁচাতে পেরেছিলেন। সে দুর্বৃত্তি থেকে বাঁচাটিই ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা। অথচ আজ সে সফলতা মুসলিম নামধারি পন্ডিতজনদের জুটছে না। জুটছে না পাশ্চাত্যের এমনকি নবেল-বিজয়ী জ্ঞানীদেরও। ফলে মুসলিম নামধারী শিক্ষিতরা বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশকে দূর্নীতিতে যেমন বিশ্বের শীর্ষে নিয়ে গেছে, তেমনি পাশ্চাত্যের শিক্ষিতরাও ব্যভিচার, ফ্রি-সেক্স, হোমোসেক্সুয়ালিটি, জুয়া ও মদপানের মত আদিম পাপাচারকেও সভ্য আচার রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কোর’আনের জ্ঞানার্জন এতোই জরুরি যে, এ ছাড়া ব্যক্তির জীবনে অন্য ফরজগুলোও যথাযত পালিত হয় না। ইসলাম খৃষ্টান ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের ন্যায় নয় যে গীর্জার যাযক বা মন্দিরের ঠাকুরকে দিয়ে ইবাদত-বন্দেগী করিয়ে নেওয়া যাবে। ইবাদতের দায়িত্ব ব্যক্তির নিজের, কাউকে দিয়ে এ দায়িত্ব পালন হওয়ার নয়। তাই ইসলামের খলিফাকেও প্রজার ন্যায় একইভাবে নামায, রোযা ও অন্য ইবাদত করতে হয়েছে। আর অজ্ঞতা নিয়ে ইবাদত হয় না, ইবাদতের সামর্থ্য অর্জনে জ্ঞানার্জন তাই অপরিহার্য। জ্ঞানার্জন এজন্যই ইসলামে বাধ্যতামূলক। জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য শুধু পড়া, লেখা বা হিসাব নিকাশের সামর্থ্য বৃদ্ধি নয়; বরং সেটি হলো মনের অন্ধকার দূর করা। ব্যক্তির দেখবার ও ভাববার সামর্থ্যে সমৃদ্ধি আনা। মনের অন্ধকার নিয়ে মহান আল্লাহতায়ার বিশাল বিশাল কুদরতকে দেখা যায় না, দেখা যায় না তাঁর মহান সৃষ্টি-রহস্যকেও। জাহেল ব্যক্তি এজন্যই আল্লাহতায়ালার অসীম সৃষ্টি জগতের মাঝে বসেও তাঁর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে ইসলাম মানুষের মনের এ অন্ধকার দূর করতে চায়। তাই জ্ঞানার্জন ইসলামে নিজেই কোন লক্ষ্য নয়, বরং এটি লক্ষ্যে পৌঁছবার মাধ্যম মাত্র। আর সে লক্ষ্যটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন। আর যে ব্যক্তি তাঁকে সন্তুষ্ট করে, সেই তো জান্নাত পায়। এজন্য এটি মু’মিনের জীবন লক্ষ্য। চালক যেমন তার গাড়ীকে চালনার পূর্বে গন্তব্যের লক্ষ্য ও সে লক্ষ্যে পৌঁছবার রোড-ম্যাপকে জেনে নেয়, তেমনি একজন মুসলিমকেও জান্নাতে পৌঁছবার সঠিক রোড-ম্যাপকে জানতে চায়। আর সে রোড-ম্যাপের সঠিক জ্ঞানলাভই মুসলিমের জ্ঞানার্জনের মূল উদ্দেশ্য। রোড-ম্যাপের এ প্রাথমিক জ্ঞানলাভটুকু সঠিক না হলে জীবনে বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি আসবে এবং পরকালে জাহান্নামে নিবে -সেটিই স্বাভাবিক। বিজ্ঞানের বৈপ্লবিক অগ্রগতির পরও অসংখ্য মানব যে আজ সীমাহীন বিভ্রান্তির শিকার তার মূল কারণ তো কোর’আনী রোডম্যাপ নিয়ে অজ্ঞতা।

 

জ্ঞানের ইসলামী সংজ্ঞা

ইসলামে জ্ঞানের নিজস্ব সংজ্ঞা রয়েছে। জ্ঞানের অর্থ এই নয়, তাতে শুধু উপার্জনের সামর্থ্য বাড়বে বা কলাকৌশলে দক্ষতা দিবে। জ্ঞানের মোদ্দা কথা হলো, তাতে ভয় সৃষ্টি হয় আল্লাহতায়ালার। সাহায্য করে সত্য ও মিথ্যাকে চিনতে। এবং চেনায় জান্নাতের ও জাহান্নামের পথ। যে জ্ঞান ব্যক্তির মনে আল্লাহর ভয় সৃষ্টিতে ব্যর্থ -সে জ্ঞান জ্ঞানই নয়। এটি কোন কারিগরী দক্ষতা বা ট্রেড স্কিল হতে পারে তবে -সেটি যথার্থ জ্ঞান বা ইলম নয়। অনেক পশুপাখি বা জীবজন্তুরও বহু দক্ষতা থাকে যা মানুষেরও নেই। কুকুর যেভাবে লুকানো মাদক দ্রব্য বা অপরাধীকে সনাক্ত করে তা মানুষ বা মানুষের তৈরী আধুনিক যন্ত্রের নেই। কিন্তু এর জন্য কুকুরকে জ্ঞানী বলা হয় না। আল্লাহতায়ালা কোর’আন মজিদে বলেছেন, একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে। এ থেকে এটিই বুঝা যায় আল্লাহপাক জ্ঞান বলতে কি বুঝাতে চান। যার মধ্যে আল্লাহতায়ালার ভয় নেই তার মধ্যে ইলমও নেই। আল্লাহপাক কোরআন মজীদে আরো বলেছেন, “নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টি ও রাত-দিনের ঘুর্ণায়নের মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে আয়াত তথা নিদর্শন।” অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার বিশাল গ্রন্থ হলো এ বিশ্ব চরাচর; এ গ্রন্থের প্রতিটি ছত্রে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য আয়াত বা নিদর্শন। এবং জ্ঞানী একমাত্র তারাই যারা স্রষ্টার সে গ্রন্থ পাঠের সামর্থ্য রাখে। নানা ভাষার গ্রন্থ পাঠের যাদের সামর্থ্য রয়েছে অথচ আল্লাহতায়ালার এ বিশাল গ্রন্থ পাঠের যোগত্য নেই -তাদেরকে আর যাই হোক জ্ঞানী বলা যায় না। ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞানী তিনিই যার রয়েছে বিশ্ব-চরাচরে ছড়ানো ছিটানো আল্লাহর নিদর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়ার সামর্থ্য। এ জ্ঞানটুকু না থাকলে সিরাতুল মোস্তাকীমে চলতে মহান আল্লাহতায়ালার আয়াতগুলো বিশ্বচরাচরের নানা প্রান্ত থেকে যে সিগনাল দেয় -তা বুঝতে সে ব্যর্থ হয়। নবীজীর (সা:) আমলে মুসলিমদের মাঝে স্বাক্ষরতার হার তেমন ছিল না। তবে আল্লাহতায়ালার জ্ঞান-সমৃদ্ধ গ্রন্থ থেকে পাঠ লাভের সামর্থ্যটি আজকের শিক্ষিতদের চেয়ে বেশী ছিল। ফলে সেদিন যেরূপ বিপুল সংখ্যক উঁচু মাপের জ্ঞানীর সৃষ্টি হয়েছিল -তা মানব ইতিহাসের কোন কালেই হয়নি।

আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “জ্ঞানী আর অজ্ঞ ব্যক্তি কখনই এক নয়।” -(সুরা যুমার, আয়াত ৯)। অন্যত্র বলেছেন, “আল্লাহতায়ালা যে ব্যক্তির কল্যান চান তার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দেন।” -(সুরা মুযাদিলা, আয়াত ১১)। অর্থাৎ মানুষের জন্য জ্ঞানের চেয়ে কল্যানকর কিছু নেই। তাই নিছক সম্পদের অন্বেষণে জীবনের সামর্থ্য বিনিয়োগে মানবতা নেই, এটি পশু থেকেও নীচুতে পৌছে দেয়। পশুর পেট পূর্ণ হলে সে আর খাদ্য তালাশ করে না। কিন্তু মানুষ সম্পদের পাহাড়ে বসেও আরো চায়। জ্ঞানার্জন এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে, মহান আল্লাহতায়ালা তার অনুগত বান্দাদেরকে তাঁর কাছে দোওয়া চাওয়ার ভাষাও শিখিয়ে দিয়েছেন। যেমন: “হে রব, আমার জ্ঞানে বৃদ্ধি করে দাও।” -(সুরা ত্বা হা, আয়াত ১১৪)। আল্লাহতায়ালার শেখানো দোয়ার ভাষা থেকে এটিও সুস্পষ্ঠ যে, জ্ঞান থাকাটাই বড় কথা নয়, উত্তরোত্তর সে জ্ঞানের বৃদ্ধি হওয়া চাই। একটি জাতিকে বিজয়ী জাতি হিসাবে টিকে থাকার জন্য এমন অবিরাম শিক্ষা শুধু জরুরি নয়, অপরিহার্যও। জ্ঞানের বৃদ্ধি যে দিন থেমে যায়, ব্যক্তির মন ও মননের পচনও সেদিন থেকে শুরু হয়। এটি অনেকটা দেহের খাদ্য গ্রহণের মত। খাদ্য গ্রহণ বন্ধ হলে ব্যক্তির জীবনে যেটি অনিবার্যরূপে আবির্ভূত হয় সেটি মৃত্যু। নবীপাক (সা:) এই জন্যই বলেছেন, আফসোস সে ব্যক্তির জন্য যার জীবনে একটি দিন অতিবাহিত হলো অথচ তার ইলমে বৃদ্ধিই ঘটলো না। বলেছেন, ”উতলুবুল ইলম মিনাল মাহদে ইলাল লাহাদ।” অর্থ: “কবর থেকে দোলনা পর্যন্ত জ্ঞান লাভ কর।” অর্থাৎ জ্ঞানার্জন  শিশুর জন্য যেরূপ জরুরি তেমন জরুরি হলো বৃদ্ধের জন্যও। অর্থাৎ দেহে যতদিন প্রাণ আছে, খাদ্য-পানীয় সংগ্রহের যতদিন সামর্থ আছে, জ্ঞানার্জনও ততদিন চালিয়ে যেতে হবে। এ হাদীসটি নিছিক নসিহত নয়; এসেছে নির্দেশের ভাষায়। কথা হলো, নবীজীর (সা:) উম্মতরূপে পরিচয় দিতে যে মুসলিমগণ এতো উচ্চকন্ঠ তাদের মধ্যে এ নির্দেশ পালনে আগ্রহ কতটুকু? আর থাকলে জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চাৎপদতার রেকর্ড গড়ে কি করে? হযরত আলী (রা:) বলেছেন, “সম্পদ মানুষকে পাহারাদার বানায় কিন্তু জ্ঞান মানুষকে পাহারা দেয়।” ফলে বিচ্যুতি, বিপদ তথা জাহান্নামের রাস্তা থেকে বাঁচানোর কাজে জ্ঞানহীদের জীবনে কোন পাহারাদার থাকে না। ফলে শয়তানের ছোবলে পড়ে এবং বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি তাদের জীবনে নিত্য সহচর হয়। প্রকৃত মুসলিমের শিক্ষা তাই স্বল্পকালীন নয়, বরং আমৃত্যু। যতদিন পানাহার চলে, ততদিন জ্ঞানার্জনও চলে।

হযরত আলী (রা:) আরো বলেছেন, সম্পদ  চুরি হয়, কিন্তু জ্ঞান চুরি হয় না। কোন ডাকাত সেটি ছিনিয়ে নিতে পারে না। জ্ঞান কাউকে দিলে কমে না, বরং বৃদ্ধি পায়। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা আজ থেকে ১৪শত বছর পূর্বে বিদ্যাশিক্ষাকে সার্বজনীন ও ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক করেছিল। ফলে মাত্র কয়েক শতাব্দিতে তারা জ্ঞানবিজ্ঞানে অভূতপূর্ব বিপ্লব আনে। যে আরবী ভাষায় কোর’আনের পূর্বে কোন গ্রন্থ ছিল না সে আরবী ভাষায় জ্ঞানের এক এক বিশাল ভান্ডার গড়ে তোলে।। রাসূলে পাক (সা:) বলেছেন, “একমাত্র দুই ব্যক্তিকে নিয়ে হিংসা করা যায়: এর মধ্যে এক ব্যক্তি হলেন তিনি যাকে আল্লাহতায়ালা জ্ঞানদান করেছেন এবং তিনি জ্ঞানের আলোকে জীবন পরিচালনা করেন এবং তা অন্যদের শেখান।” -(সহিহ বুখারী ও মুসলীম)। হাদীস পাাকে আরো বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে পথে বের হন, আল্লাহতায়ালা তাঁর জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” -(সহীহ মুসলিম)।  তিরমিযী শরিফে বলা হয়েছে, নবীপাক (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনে ঘর থেকে বের হয় সে ব্যক্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অবস্থান করে। আরো বলা হয়েছে, “জ্ঞানীর ঘুম একজন অজ্ঞ এবাদতকারীর নফল নামাযের চেয়ে উত্তম। যিনি ইলম শিক্ষা দেন তার জন্য আল্লাহতায়ালা রহমত নাযিল করেন। ফেরেশতাকুল, জমিন ও আসমানের বাসিন্দা, এমনকি পিপিলিকা এবং মাছও তাদের জন্য দোয়া করতে থাকে।” -(তিরমিযী শরিফ)। কোন নফল ইবাদতকারীর জন্য সেটি ঘটে না।

 

বিজয়ের একমাত্র পথ

ইসলামের গৌরবকালে মুসলিমদের বিস্ময়কর সফলতার মূল কারণ, এই কোরআনী জ্ঞান। বিশ্বের কোন জ্ঞানই তার সমকক্ষ হওয়া দুরে থাক, তুলনীয়ও হতে পারে না। মানুষের সামর্থ্য অতি সামান্য। যতবড় জ্ঞানী বা বিজ্ঞানীই হোক না কেন সে নিজেই জানে না আগামী কাল বাঁচবে কি বাঁচবে না। তার দৃষ্টি পাতলা কাগজের দেয়ালও ভেদ করতে পারে না। অপর দিকে কোর’আন এসেছে সেই মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা থেকে যার কাছে আসমান জমিনের দৃশ্য অদৃশ্য কোন কিছুই অজানা নয়। সেই মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালা মানুষের বোধশক্তির উপযোগী করে পাঠিয়েছেন পবিত্র আল-কোর’আন। এটি মানুষের সামর্থ্য বাড়াতে পারে বিস্ময়কর ভাবে। মগজকে যদি হার্ডডিস্ক বলা যায় তবে কোর’আনকে হলো সেটির জন্য সর্বোত্তম সফটওয়ার। কম্পিউটার শক্তিশালী হলেও সফটওয়ার ছাড়া কিছু করার সাধ্য নেই। অথচ সফটওয়ারের কারণে যাদুকেও হার মানায়। অবশ্য এজন্য সফটওয়ারকেও হার্ডডিস্কের উপযোগী হতে হয়। এজন্যই সফটওয়ারের আবিস্কারককে হার্ডডিস্কে বিশেষজ্ঞ হতে হয়। আর মহান স্রষ্টা আাল্লাহতায়ালার চেয়ে মানুষের মগজের সে খবর আর কে বেশী রাখেন? ফলে মগজকে সৃষ্টিশীল করার কাজে পবিত্র কোর’আনের চেয়ে নির্ভূল সফটওয়ার আর কি হতে পারে? মুসলিমগণ অতি অল্প সময়ে উন্নয়নের যে রেকর্ড গড়েছিল সেটিতো এ সফটওয়ার সঠিক প্রয়োগের কারণেই। অথচ নিজ ক্ষুদ্রতা নিয়ে মানুষ যখনই কিছু করতে ­­চেষ্টা করেছে তখন শুধূ ব্যর্থতাই বাড়িয়েছে। এমন কি সত্য-অসত্য, ন্যায়-অন্যায় ও শ্লিল-অশ্লিলের তারতম্যও নির্ণয় করতে পারেনি। বুঝতে পারেনি উলঙ্গতা, ফ্রিসেক্স, পর্ণোগ্রাফি, হোমোসেক্সৃয়ালিটি, মদ্যপান মানব জাতির জন্য কত বীভৎস ও ক্ষতিকর। এরূপ অজ্ঞতার প্রমাণ মানবসৃষ্ট নানা মতবাদের মাঝে। কম্যুনিজম, জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ ও ফ্যাসীবাদের মত ভ্রান্ত মতবাদের পিছে প্রাণনাশ হয়েছে কোটি কোটি মানুষের। মানব জাতির এ এক করুণ ব্যর্থতা। খরচের অংক তারা বিস্ময়কর ভাবে বাড়িয়েছে। একমাত্র দুটি বিশ্বযুদ্ধেই সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করেছে।

ফলে বিজ্ঞানের বিশাল অগ্রগতিতেও বিপদমুক্তি ঘটেনি মানুষের। বরং এককালে যে হিংস্রতা নিয়ে বনের হিংস্র পশুগুলো হামলা করতো তার চেয়েও অধিক হিংস্রতা নিয়ে হামলা করছে মনুষ্যরূপী পশুরা। ফিলিস্তিন, বসনিয়া, চেচনিয়া, কসভো, কাশ্মির, আফগানিস্তান, ইরাক, মায়ানমার, চীন এবং সিরিয়ায় মানুষরূপী যে দানবেরা হিংস্রতা দেখাচ্ছে বা দেখিয়েছে তা কি পশুর চেয়ে কম হিংস্র? আর এ ব্যর্থতার মূল কারণ, শান্তির লক্ষ্যে মানুষের মগজের উপযোগী যে সফটওয়ার আল্লাহতায়ালা দিয়েছিলেন মানুষ সেটিকে কাজে লাগায়নি। ফলে বেড়েছে নানারূপ বিপর্যয় ও অশান্তি। অথচ আরবের মরুবাসী জনগণ এটির প্রয়োগ করে শান্তি, সমৃদ্ধি ও মানবতার উৎকর্ষে বিস্ময়কর রেকর্ড স্থাপন করেছিলেন। বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে শিক্ষার নামে যা হয়েছে তাতে কুশিক্ষাই বেড়েছে। ফলে দেশে স্কুল বেড়েছে, বিপুল সংখ্যায় বেড়েছে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ও, কিন্তু আলোকিত মানুষ বাড়েনি। বরং বেড়েছে দুর্বৃত্তদের সংখ্যা; এবং দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্ব রেকর্ড করেছে। অথচ ইসলাম জ্ঞানদান পদ্ধতিকে পরিপূর্ণ মানুষ তৈরীর হাতিয়ার বানায়। ইসলামী পরিভাষায় এরূপ পরিপূর্ণ মানুষই হলো ইনসানে কামেল। সে ইনসানে কামেল যেমন খানকার দরবেশ নন, তেমনি পীর সাহেবও নন।

 

 ফিরতে হবে কোর’আনের প্রেসক্রিপশনে

একজন বিজ্ঞানীর জ্ঞান একটি বিশেষ বিষয়ে বিস্ময়কর হলেও ধর্ম বিষয়ে তার অজ্ঞতা হাজার বছর পূর্বের আদিম মানুষের চেয়ে আদৌ কম নয়। অপরদিকে মাদ্রাসার ছাত্র বেড়ে উঠছে বিজ্ঞানের বহু মৌল বিষয়ের উপর সীমাহীন অজ্ঞতা নিয়ে। জ্ঞানার্জনের এ পদ্ধতি মানুষকে অতি অপূর্ণাঙ্গ করে গড়ে তুলছে। কিন্তু ইসলাম মানুষকে চায় পূর্ণাঙ্গ তথা কামেল করতে। আজকের আলেমদের ন্যায় পূর্বকালের আলেমগণ এতটা অপূর্ণাঙ্গ ছিলেন না। তারা যেমন শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন, তেমনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, জেনারেল এবং রাজনীতিবিদ। তাদের জীবনে সমন্বয় ঘটেছিল বহুমুখী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার। মসজিদের নামাযে যেমন আওয়াল-ওয়াক্তে হাজির হতেন, যুদ্ধের ময়দানেও তেমনি ফ্রন্ট লাইনে থাকতেন। অথচ আজকের আলেমদের ক’জন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আছেন, এবং তাদের বিরুদ্ধে একটি ঢিল ছুঁড়েছেন?  বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে ইসলামকে বিজয়ী করতে ক’জন ভূমিকা রাখছেন? তাদের এ ব্যর্থতার কারণ ইলমের ক্ষেত্রে তাদের অপূর্ণাঙ্গতা। তাদের ইলম তাদের জীবনে ইঞ্জিনের কাজ করেনি ইসলামী পরিভাষায় এমন অপূর্ণাঙ্গ মানুষদের বলা হয় “ইনসানে নাকেছ”। অথচ এ অপূর্ণাঙ্গতা দূরীকরণে নবীজী (সা:) কোরআন-হাদিসের বাইরেও জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত করেছেন। এমনকি নিজেও শিখেছেন অন্যদের থেকে। খন্দকের যুদ্ধে পরীখা নির্মাণের কৌশল শিখেছিলেন ইরানী সাহাবা সালমান ফারসী থেকে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা সেকালে গ্রীক ভাষা শিখে এরিস্টোটল, প্লেটোসহ বহু গ্রীক বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের গ্রন্থকে তাঁরা আরবী ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। অনেকে ভারতের ভাষা শিখে হিন্দু পন্ডিতদের বহু বই-পুস্তক তরজমা করেছিলেন। অথচ আজ তেমনটি হচ্ছে না। কারণ, যে জ্ঞান জাতিকে সামনে টেনে নেয় সেটির চর্চাই লোপ পেয়েছে। ক’জন আলেম আজ সেরূপ জ্ঞানার্জনে সচেষ্ট?

জ্ঞানার্জনের একটি মাত্র মাধ্যম হলো বই পড়ে শেখা। এছাড়া আরো বহু মাধ্যম রয়েছে। যেমন দেখে শেখা, শুনে শেখা এবং নিজ হাতে কাজ করতে করতে শেখা। তবে জ্ঞানার্জনের অতি কার্যকর মাধ্যম হলো ছাত্রদের ভাবতে বা চিন্তায় অভ্যস্থ করা। চিন্তার সামর্থ্য জ্ঞানের বৃদ্ধিতে জেনারেটরের কাজ করে। পাঠ্যপুস্তক বা শ্রেণীকক্ষের যে বক্তৃতা ছাত্রকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে না -তা কি জ্ঞানার্জনে সহায়ক? এতে সার্টিফিকেট লাভ হলেও তাতে জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়ে না। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজই হলো ছাত্রের মনে জ্ঞানের নেশা সহজতর ধরিয়ে দেওয়া যা তাকে আজীবন জ্ঞানপিপাসু করবে। কিন্তু মুসলিম দেশের আজকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা পারিনি। ফলে বাড়েনি জ্ঞানের প্রতি সত্যিকার আগ্রহ। এমন জ্ঞানবিমুখী চেতনাই জাতির পতন ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট।

উড়তে হলে পাখীর দুটো ডানাই যেমন সবল ও সুস্থ থাকা অপরিহার্য, তেমনি সুস্থ ও উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণে অপরিহার্য হলো কোর’আন ও বিজ্ঞান -এ দুটো শাখাতেই ভারসাম্যমূলক অগ্রগতি। কিন্তু মুসলিম দেশগুলোতে তা হয়নি। ধর্মবিবর্জিত যে শিক্ষার কারণে পাশ্চাত্য-সমাজ আজ বিপর্যয়ের মুখে, সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় মুসলিমগণও সেদিকেই ধাবিত হচ্ছি। ফলে বিপর্যয় মুসলিমদেরও ধাওয়া করছে। ফলে বাড়ছে পতনের পথে গতি। ধ্বংসমুখী এই মুসলিম উম্মাহর উদ্ধারে ও উত্থানে সামনে একটিই মাত্র পথ। আর সেটি হলো, ফিরে যেতে হবে ১৪ শত বছর পূর্বের সেই কোর’আনী প্রেসক্রিপশনে। এটা জরুরি শুধু মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্যই নয়, ধ্বংসমুখী পতন-যাত্রা থেকে বাঁচতেও। বিজয়ের পথে এটিই একমাত্র পরীক্ষিত পথ। ১ম সংস্করণ ২৭/০৫/২০০৭; ২য় সংস্করণ ১৭/০৩/২০২১।




বিবিধ ভাবনা (৩৬)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. বাঙালীর চরিত্র

নিজের সুস্বাস্থ্যের কথা বাইরে প্রচার করায় স্বাস্থ্য বাড়ে না। বরং ভাবতে হয়, অন্যকে বলতে হয় এবং ত্বরিৎ ডাক্তারের কাছে যেতে হয় -যদি রোগ দেখা দেয়। রোগকে অবহেলা করলে বা গোপন রাখলে ভয়ানক ক্ষতি হয়। তাতে যেমন চিকিৎসা হয় না, তেমনি রোগ বাড়ে ও মৃত্যু ঘটায়। অনেক সময় রোগ গোপন করার পিছনে থাকে নিজেকে সুস্থ্য রূপে জাহির করে গর্ব করার বাতিক। দেহকে সুস্থ্য রাখার জন্য জরুরি হলো শরীরের দিকে নিয়মিত নজর রাখা। অনিয়ম দেখা দিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। 

বিষয়টি তেমনি একটি জাতির ক্ষেত্রেও। মানব দেহের ন্যায় জাতির দেহেও অনেক রোগ-ব্যাধী দেখা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে রোগ-ব্যাধী নিয়ে তল্লাশীর কাজটিই হয়নি। বরং জাতীয় জীবনের রোগগুলিকে গোপন রাখার কাজটিই বেশী বেশী হয়েছে। দেশটিতে এমন লোকের অভাব নাই -যারা মনে করে বাঙালীরাই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। অন্যরা ভাষার জন্য প্রাণ দেয়না, বাঙালীরা দেয় –তা নিয়ে কত গর্ব! অনেকে বলে একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা শ্রেষ্ঠ বাঙালী। এবং অনেকে আবার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলে শেখ মুজিবকে। কিন্তু তাদের অপরাধগুলো কি কখনো খুঁতিয়ে দেখা হয়েছে? তাদের হাতে কত নিরপরাধ মানুষ খুন হয়েছে, কত মিথ্যাচার হয়েছে এবং কত দুর্নীতিত হয়েছে -সে হিসাব কি কেউ নিয়েছে? ইতিহাসের বইয়ে ফুলিয়ে ফাঁফিয়ে শুধু বিজয় গাঁথা লিখলে চলে না, ভূলভ্রান্তি ও ভয়ানক অপরাধের কথাগুলোও লিখতে হয়। নইলে ইতিহাস থেকে শেখার তেমন কিছু থাকে না। ফলে জাতীয় জীবনে পরিশুদ্ধিও আসে না।

বাংলাদেশীদের জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে ১৯৭১’য়ে। দেশে যখন পুলিশ, আদালত ও প্রশাসন কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়, তখন জনগণের আসল রূপটি দেখা যায়। বাঘও খাঁচার মধ্যে শান্ত দেখায়, কিন্তু তার হিংস্র রূপটি দেখা যায় খাঁচা থেকে বের করলে। বাঙালীর আসল চরিত্রটি দেখা গিয়েছিল একাত্তরে –যখন তাদের অপরাধ কর্মে বাধা দেয়ার কেউ ছিল না। তাই যারা বাঙালীর আসল চরিত্র জানতে চায় -তাদের জন্য একাত্তরের ইতিহাস অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে সে ইতিহাস নিয়ে কোন গবেষণা হয়নি। সে কাজে কারো আগ্রহ আছে -সেটিও নজরে পড়ে না। বিষয়টি অবিকল ঘরের আবর্জনাকে কার্পেটের নীচে চাপা দেয়ার মত। বরং একাত্তরের সকল দোষ চাপানো হয়েছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও অবাঙালীদের উপর।

১৯৭১’য়ে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশে অপরাধ রুখার ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষার কেউ ছিল না। পুলিশ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা তখন ভেঙ্গে পড়ে। তারা তখন দেশ জুড়ে অসহযোগে। দেশ তখন অপরাধীদের জন্য স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। সে সুযোগ থেকে ফায়দা নিতে দেখতে যারা শিক্ষিত ও ভদ্র দেখায় তারাও চোরডাকাত, খুনি ও ধর্ষকে পরিণত হয়। সে সময় সবচেয়ে অসহায় ও প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়ে বিহারীরা। কেউ তাদের হত্যা করলে, ঘরবাড়ী ও দোকান লুটপাঠ করলে এবং তাদের মহিলাদের ধর্ষণ করলে –কেউ ছিল না রক্ষা দেয়ার। একাত্তরে বহু বাঙালী নিহত হয়েছে, অনেক বাঙালীর ঘরবাড়ী জ্বালানো হয়েছে এবং অনেক বাঙালী মহিলা ধর্ষিতাও হয়েছে। কিন্তু বিহারীগণ যেরূপ খুন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে তার তূলনা হয়না। একাত্তরে সবচেয়ে জঘন্য গণহত্যার শিকার হয়েছে তারাই। অথচ এখানে কি মিথ্যাচার কম হয়েছে? একাত্তরের ইতিহাস লেখা হয়েছে সে বীভৎসতার বিবরণ না দিয়েই।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ক্ষমতায় এসেছেন শেখ মুজিব। কিন্তু বিহারীদের ঘরবাড়ী ও দোকান-পাটের উপর যে ডাকাতী হলো -তার কোন বিচার তিনি করেননি। ডাকাতদের শাস্তি না দিয়ে ডাকাতী করা ঘরবাড়ীর মালিকানা দেয়া হয়েছে ডাকাতদের। মুজিবের পর ক্ষমতায় এসেছেন জেনারেল জিয়া। তিনিও অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে বরং ডাকাতদের হাতে বিহারীদের ঘরবাড়ীর মালিকানা দলিল তুলে দিয়েছেন। কোন সভ্য দেশে কি চোরডাকাতদের এভাবে পুরস্কৃত করা হয়? যার মধ্যে সামা্ন্য ঈমান আছে সে কি এমন কাজ করতে পারে? অথচ বাংলাদেশে সেটিই পরিণত হয়েছে সংস্কৃতিতে। ফলে জনগণ নিজেই আজ গুম, খুন ও ডাকাতির শিকার।    

ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতার বিবরণ দেয়া যাক। ১৯৭১’য়ের মার্চের প্রথম তারিখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের (পার্লামেন্টের) আসন্ন অধিবেশন মুলতবীর করার ঘোষণা দেন। ঐদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে হচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের সাথে পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচ। আমি তখন স্টেডিয়ামের পশ্চিম দিকের গ্যালারীতে বসে খেলা দেখছিলাম। বিকেল তিনটার দিকে স্টেডিয়ামের পূর্বপাশের প্যান্ডেল কিছু যুবক আগুণ ধরিয়ে দেয়। খেলাওয়ারগণ দৌড়ে মাঠ ছাড়ে; আমরা দ্রুত বেড়িয়ে গেলাম। তখন জিন্নাহ এভেনিউ (আজকের মুজিব এভেনিউ)তে গ্যানীস নামে অবাঙালীদের একটি বড় দোকান ছিল। দেখলাম, বিপুল সংখ্যক মানুষ লুটপাটে লেগে গেছে। এদের কাউকে দেখে বস্তির লোক মনে হচ্ছিল না, প্যান্টসার্ট বড়া কেতুদুরস্তই দেখাচ্ছিল। শহরের নানা স্থানে সেদিন অবাঙালীদের দোকানগুলো বেছে বেছে লুট করে হয়েছে। তখন ঢাকার নবাবপুর ও ইসালামপুর রোডে বড় বড় দোকান ছিল অবাঙালীদের। সেগুলোও লুট হয়েছে। রাস্তায় স্লোগান দেয়া হচ্ছে “একটা একটা মাওরা (বিহারী/অবাঙালী) ধরো, সকাল বিকাল নাশতা করো।” সে এক সহিংস অবস্থা। সে সময়ে অনেকে ঢাকা ছেড়ে বিমানে পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ী দেয়ার চেষ্টা করেছে, এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে তাদের পকেট হাতড়িয়ে লুট করা হয়েছে।

এতো গেলে রাজপথের কথা। দেশে যখন এরকম অবস্থা হয় তখন নেতাদের কিছু দায়দায়িত্ব থাকে। তখনো প্রধান দুই নেতা শেখ মুজিব ও ভাষানীসহ দেশের সকল রাজনৈতিক নেতাগণ মুক্ত। তখনও দৈনিক পত্র-পত্রিকা গুলো নিয়মিত ছাপা হচ্ছে। দেশে বহু বুদ্ধিজীবীও ছিল। তাদের চোখের সামনেই চলছে অবাঙালীদের উপর হিংস্র অপরাধ কর্ম। অথচ লক্ষণীয় বিষয় হলো, সে অপরাধ থামাতে না মুজিব কোন বিবৃতি দিয়েছেন, না ভাষানী। কেউ অসহায় বিহারীদের পাশে দাঁড়ায়নি। যেন তারা কিছুই দেখেননি। এ হলো নেতাদের বিবেকের মান। রাজনীতি যে কত বিবেকহীন মানুষের হাতে জিম্মি ছিল -এ হলো তার নমুনা। এ অপরাধ থামাতে পত্রিকাগুলোও কোন প্রতিবেদন ছাপেনি; কোন উপসম্পাদকীয় লেখেনি। অবাঙালী হওয়াটাই বিহারীদের জন্য যেন অপরাধ; তাদের উপর সকল প্রকার নৃশংসতাই যেন জায়েজ। অথচ তখনও পাকিস্তান আর্মি কোন অপারেশনে যায়নি। বিহারীরা কোথাও বাঙালীদের উপর অত্যাচারে নেমেছে -সেরূপ ঘটনাও তখন ঘটেনি। ২৫মার্চ পর্যন্ত বিহারীদের উপর সব নৃশংসতাই সংঘটিত হয়েছে বিনা উস্কানীতে। 

তূলনামুলক একটি বিবরণ দেয়া যাক। কারণ, তুলনা ছাড়া মানবতায় নীচে নামাটি বুঝা যায় না। চিকিৎসক রূপে ১০ বছর ইরানে থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার। ১৯৮০ সালে যখন ইরান পৌঁছি, দেশটিতে ১৯৭৯ সালে ঘটে যায় বিরাট বিপ্লব। ইরানের বাদশাহ মহম্মদ রেজা শাহ দেশ থেকে পালিয়ে গেলেও তারা হাজার হাজার সমর্থক, তাঁর সমর্থক রাস্তাখিজ পার্টির বহু নেতাকর্মী্‌ তখনোও ইরানে ছিল্। শাহপন্থীদের বহু দোকান-পাট ও বিলাসবহুল ঘরবাড়ীও ছিল। ছিল গোয়েন্দা বাহিনী সাভাক ও সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সদস্য। কিন্তু তাদের কারো বাড়ী লুটপাট হয়েছে, তাতে আগুণ দেয়া হয়েছে বা তাদের ঘরবাড়ী জবর দখল করা হয়েছে –এমনটি ঘটেনি। অথচ তাদের প্রতিরক্ষা দেয়ার জন্য থানায় কোন পুলিশ ছিল না, রাস্তায় সেনাবাহিনীও ছিল না। পুলিশ থানা ছেড়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু জনগণ এরপরও রাস্তায় চুরিডাকাতি ও ঘরবাড়ী দখলে নামেনি। রাস্তায় প্রতিটি দোকানপাট অক্ষত থেকেছে –একমাত্র মদের দোকানগুলি ছাড়া। অথচ একাত্তরে অবাঙালী পরিবারের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও শিশুদের রাস্তায় বসিয়ে তাদের ঘরবাড়ী দখলে নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান ও পরকালের ভয় আছে -সে কি কখনো এমন ডাকাতিতে নামতে পারে?

আজ দেশ আছে। এ দেশে অবাঙালী তেমন নাই। যারা আছে তারা আজ সহায়সম্পদহীন বস্তির বাসিন্দা। কিন্তু দুর্বৃত্তরা বেড়েছে বিপুল হারে। এসব দুর্বৃত্তদের চোখে বাঙালীর অর্থ ও বাঙালী নারী কি অবাঙালীর অর্থ ও অবাঙালী নারীর চেয়ে চেয়ে কম লোভনীয়? যে ডাকাতেরা ডাকাতি করেছে অবাঙালীদের উপর এবং ধর্ষণ করেছে অবাঙালী নারীদের -তারাই এখন ডাকাতী ও ধর্ষণে নেমেছে বাঙালীদের উপর। কারণ দুর্বৃত্তরা তো দুর্বৃ্ত্তির নেশা ছাড়তে পারে না। তাছাড়া দেশ তে তাদের হাতে অধিকৃত; ফলে তাদের সামর্থ্য বেড়েছে বিপুল ভাবে। পুলিশের কাজ হয়েছে তাদের প্রতিরক্ষা দেয়া। রোগ না সারালে তো রোগ বাড়বেই। তাই দ্রুত বেড়ে চলেছে ডাকাতের সংখ্যা ও ডাকাতদের নৃশংসতার মাত্রা। দেশ জুড়ে আজ গুম, খুন ও ধর্ষণের প্লাবন, ডাকাতি হয়েছে জনগণের ভোট এবং ডাকাতি হয়ে গেছে পুরা দেশ -এসবই হয়েছে বাঙালী ডাকাতদের হাতে। যে কোন সভ্য দেশে এরূপ ভয়ানক অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে সচেতন মানুষেরা ময়দানে নেমে আসে; কিন্তু বাংলাদেশে সে সবের কোন বালাই নাই। একাত্তরের ইতিহাস থেকে জাতি যদি শিক্ষা নিত, তবে দেশ আজ যেখানে পৌঁছেছে সেখানে কি পৌঁছতো? অন্য যে কোন বিজ্ঞানের চেয়ে ইতিহাস বিজ্ঞানের গুরুত্ব তাই অধিক। ইতিহাসের কাজ তো অতীতের ভূলগুলো তুলে ধরা এবং ভবিষ্যতের পথ চলায় সঠিক সিগনাল দেয়া। যারা সে শিক্ষা নেয় না, তাদের পা একই গর্তে বার বার পড়ে। বাকশালী অসভ্যতা থেকে তাই মুক্তি মিলছে না।    

২.ছোট লোক ও বড় লোক

মানুষ কতটা ছোট বা বড় মাপের -সেটি দৈহিক মাপে বুঝা যায় না। সেটি বুঝা যায় তাদের চেতনার মানচিত্র দেখে। ছোট লোকেরা পশুর ন্যায় পেট নিয়ে ভাবে, দেশ নিয়ে ভাবে না। দেশ ডাকাতদের দখলে গেলেও এরা ডাকাত তাড়াতে রাস্তায় নামে না। এরা বরং ডাকাতদের চাটুকরে পরিণত হয়। ডাকাত যতই বড় মাপের হয়, এ চাটুকরগণ ততই বেশী পদলেহন দেয়। এবং সে চিত্রটা দেখা যায় বাংলাদেশে। তাই হাসিনার ন্যায় দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতও দেশের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সেনা অফিসার, পুলিস অফিসার ও মিডিয়া কর্মীদের কাছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রূপে গণ্য হয়।

কোন ভদ্র লোকই চোরডাকাতকে কেউ ভাল মানুষ বলে না। তাদের পক্ষে কোন ভাল মানুষ কখনো সাক্ষীও দেয় না। চোরডাকাতদের পক্ষে সাক্ষী দেয় একমাত্র চোরডাকাতগণ। কিন্ত বাংলাদেশ যারা ভোটডাকাতির মাধ্যমে সমগ্র দেশ ডাকাতী করে নিল -তাদের পক্ষে সাক্ষী দিয়েছে এবং ভোটডাকাতিকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলেছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা, আদালতের বিচারপতি ও সেনাপ্রধান। এ হলো তাদের বিবেকে মান। এমন দেশে সততা ও দেশপ্রেম বাঁচে না। এবং অসম্ভব হয় বিবেকবোধ, গণতন্ত্র এবং মানবিক অধিকার নিয়ে বাঁচা।

৩. ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব

জালেমে বিরুদ্ধে হক কথা বলা উত্তম জিহাদ। -(হাদীস)। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা দেশবাসী, বিশ্ববাসী তথা মানবতার কল্যাণে অর্থদান, শ্রমদান, মেধাদান ও রক্তদানকে ফরজ করেছে। যারা একাজে নিহত হয় তাদেরকে শহীদ বলে। অপরদিকে হারাম করেছে দুর্বৃত্তের সমর্থক ও সাহায্যকারী হওয়াকে। মানব কল্যাণে নিজ সামর্থ্যের এমন বিনিয়োগ হলো পবিত্র জিহাদ। ইসলাম যে শান্তি ও মানব কল্যাণের ধর্ম -সেটি তো এভাবেই প্রমাণিত হয়।  জিহাদ হলো দুর্বৃত্ত শক্তির দখলদারী মুক্ত করে সত্য ও  ন্যায় প্রতিষ্ঠার খোদায়ী প্রজেক্ট। তাই যে দেশে জিহাদ নাই -সেদেশে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা নাই। সেদেশে  চেপে বসে দুর্বৃত্তদের শাসন।

দুর্বৃত্তগণ ইসলামের মিশনকে শুধু নামায,রোযা, হজ্জ ও যাকাতের মধ্যে সীমিত রাখতে চায়। এরা জিহাদকে বলে সন্ত্রাস। অথচ জিহাদ নিষিদ্ধ করার অর্থ হলো, অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় ইসলামের যে পবিত্র এজেন্ডা -সেটিকে পন্ড করে দেয়া। লক্ষ্য এখানে শয়তানী প্রজেক্টকে বিজয়ী করা। 

৪. সন্ত্রাসী সরকার ও জাতিসংঘের দায়ভার   

খবরে প্রকাশ: বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের কাছ সন্ত্রাস দমনে উন্নত প্রযুক্তি সাহায্য চেয়েছে। অথচ দেশে সরকার নিজেই হলো সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী। তাদের সন্ত্রাসের শিকার দেশের জনগণ। মানুষ গুম, খুন, ধর্ষিতা এবং নির্যাতিত হচ্ছে সরকারী সন্ত্রাসীদের হাতে। সে সন্ত্রাসে হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশের পুলিশ, সেনাবাহিনী, আদালত বাহিনী ও সরকারী দলের ক্যাডার বাহিনী। নতুন প্রযুক্তি হাতে পেলে সন্ত্রাসে সরকারের সামর্থ্য বাড়বে; এবং সেটি ব্যবহৃত হবে বিরোধী দল দমনে। জাতিসংঘের উচিত জনগণের পাশে দাঁড়ানো। সামর্থ্য থাকলে তাদের উচিত জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি থেকে প্রটেকশন দেয়া এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। দেশ একমাত্র তখনই সন্ত্রাস মুক্ত হবে।

৫. অনৈক্যের নাশকতা

আল্লাহ মুসলিমদের একতা চান। শয়তান চায় অনৈক্য। মুসলিমগণ শয়তানের অনুসরণ করছে, তাই তারা ৫৭টি দেশে বিভক্ত। শয়তান কাফেরদের একতা চায়। তাই ভারতের ১২০ কোটি হিন্দু একতাবদ্ধ। স্পেনে মুসলিমদের ৭ শত বছরের শাসন বাঁচেনি। কারণ, তারা ছিল নানা দলে বিভক্ত। পুত্র পিতার বিরুদ্ধে এবং ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। অপরদিকে খৃষ্টানগণ ছিল একতবদ্ধ। ফলে মুসলিমদের বিপুল সম্পদ ও অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও নির্মূল হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা ঐক্যকে ফরজ করেছেন এবং বিভক্তিকে হারাম করেছেন।

কিন্তু মুসলিমগণ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতি ভ্রক্ষেপ করিনি; বরং তারা বেছে নিয়েছে হারাম পথকে। তারা বেছে নিয়েছে পরাজয় ও নির্মূলের পথ। নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ কি নির্মূল হওয়া থেকে মুক্তি দেয়? অতীতে মুক্তি দেয়নি; ভবিষ্যতেও দিবে না। কারণ, এগুলো তো ঐক্যের বিকল্প নয়। অনৈক্য যে আযাব আনে -সেটি তো পবিত্র কোর’আনের কথা। এবং সে আযাব আসে শত্রুশক্তির হাতে পরাজয় রূপে। অতীতে সেটি বার বার হয়েছে। কিন্তু সে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ায় আগ্রহ কই?  

৬. ঈমানদারীর ও বেঈমানীর লক্ষণ

ঈমানদারী ও বেঈমানী সুস্পষ্ট দেখা যায়। ঈমানদারীর লক্ষণ: চেতনায় থাকে জাহান্নামে আগুণ থেকে বাঁচার ভাবনা। থাকে মৃত্যুর জন্য সদা প্রস্তুতি। কারণ, মৃত্য যখন তখন বিনা নোটিশে হাজির হয়। ফলে ঈমানদারের জীবনে থাকে নেক আমলের সার্বক্ষণিক তাড়াহুড়া। বেঈমানীর লক্ষণ: ভাবনাশূণ্যতা মৃত্যু নিয়ে। তার সকল তাড়াহুড়া পেশাদারী সাফল্য, সন্তানদের প্রতিষ্ঠা ও সম্পদের বৃদ্ধি নিয়ে।

ঈমানদারীর প্রকাশ ইবাদত, ঐক্য, ইসলামী রাষ্ট্র, জিহাদ ও শরিয়ত পালন নিয়ে বাঁচায়। এবং বেঈমানীর প্রকাশ সেক্যুলার রাজনীতি, বিভক্ত ভূগোল, কুফরী আইন, পতিতালয়, সূদী ব্যাংক, মদ,জুয়া ইত্যাদি হারাম কাজ নিয়ে বাঁচায়। এ পথ জাহান্নামের। কিন্তু এরূপ বেঈমানী থেকে বাঁচার ভাবনা ক’জনের?

৭. নবীজী (সা:)’র রাজনৈতিক সূন্নত

নবীজী (সা:) নিজে রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাই তাঁর পক্ষে রাজনীতিতে নিষ্ক্রীয় বা নিরপেক্ষ থাকার প্রশ্নই উঠেনা। তিনি ছিলেন মুসলিম সেনাবাহিনীর সেনাপতি। দূত পাঠিয়েছেন নানা দেশে। প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন শরিয়ত। যারা নিজেদের নবীজী (সা:)’র উম্মত মনে করে তাদের জীবনে নবীজী (সা:)’র সে রাজনীতি কই? যেসব আলেমগণ নবীজী (সা:)’র সূন্নত নিয়ে বড় বড় ওয়াজ করেন তাদের জীবনে নবীজী (সা:)’র সে গুরুত্পূর্ণ সে সূন্নত কই? অথচ ইসলামকে বিজয়ী করার একমাত্র পথ হলো নবীজী (সা:)’র এ সূন্নত। যাদের জীবনে এ সূন্নত নাই তারা পরাজয় বাড়ায় ইসলামের এবং বিজয়ী করে শয়তানী পক্ষকে। ১৪/০৩/২০২১।




বিবিধ ভাবনা (৩৫)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. পাকিস্তান কেন ভেঙ্গে গেল?

পাকিস্তান ভেঁঙ্গে যাওয়ার কারণ যতটা অর্থনৈতিক বৈষম্য, তার চেয়ে অনেক বেশী নৈতিক ও চেতনার বৈষম্য। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে moral and intellectual disparity ছিল বিশাল। মানুষ পানাহার ও পোষাক-পরিচ্ছদের ভিন্নতা নিয়েও একই ভূমিতে একত্রে বসবাস করতে পারে; কিন্তু সেটি অসম্ভব হয় নৈতিক ও চেতনার ভিন্নতায়। একত্রে বসবাসের জন্য শুধু রাজনৈতিক ভূগোলটি এক হলে হয় না, চেতনার ভূগোলটিও এক হতে হয়। বাঙালী মুসলিমদের সমস্যা হলো অন্য ভাষার মুসলিমদের সাথে বসবাসের নৈতিক সামর্থ্য তাদের নাই। এর কারণ, বাংলার বুকে অন্য ভাষী মানুষের বসবাস না থাকাতে সে সামর্থ্য ও অভ্যাস তাদের গড়েই উঠেনি। তারা বাস করছে অন্য মুসলিমদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই; তাদের আপন করে নিতে পারেনি। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে পাঞ্জাবী, সিন্ধু, পাঠান ও বেলুচদের পাশাপাশি বসবাস শত শত বছর ধরে। ফলে চেতনায় তারা অনেক কসমোপলিটান ও প্যান-ইসলামিক। সে তূলনায় বাঙালীরা অতি আঞ্চলিক ও সংকীর্ণ মনের।

নিজ অভিজ্ঞতা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের সে কসমোপলিটান চেতনার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। লাহোরের কিং এডওয়ার্ড মেডিক্যাল কলেজ হলো পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে পুরাতন মেডিক্যাল কলেজ। সে্টি এখন বিশ্ববিদ্যালয়। কলেজের ৯০% য়ের বেশী ছাত্র-ছাত্রীই পাঞ্জাবী। আমি যখন সে কলেজের ছাত্র, তখন সে প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বৃহৎ ছাত্র সংগঠনের প্রধান ছিলেন একজন বাঙালী। সংসদ নির্বাচনে সে ছাত্র সংগঠটিই বিজয়ী হতো। আরো বিস্ময়, লাহোরের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় হলো সমগ্র পাকিস্তানের সবচেয়ে পুরোন ও বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তারিকুর রহমান নামে বাংলাদেশের নলিতাবাড়ির এক ছাত্র। আরেক বিস্ময়: করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মহিউদ্দীন নামে নোয়াখালীর এক ছাত্র। এ বিষয়গুলো সামান্য নয়, এগুলি একটি জনগোষ্ঠির চেতনার পরিচয় দেয়। বাংলাদেশে কি এটা ভাবা যায়, কোন বিহারী বা অন্য কোন অবাঙালী ছাত্র বাংলাদেশের কোন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংসদে ছাত্রদের ভোটে নির্বাচিত হবে? কিন্তু পাকিস্তানে সেটি সম্ভব। অথচ এ বাঙালীরা সত্তরের দশকে স্লোগান দিত তারা নাকি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি! কিন্তু সেটি কিসের বলে? শ্রেষ্ঠ হতে হলে তো মনটাও বড় হতে হয়। পাকিস্তানে এখন ১০ লাখের বেশী বাঙালীর বসবাস। অনেকের মতে ১৫ লাখ। এরা গেছে ১৯৭১’য়ের পর। একাত্তরে প্রায় ৪ লাখ বাঙালী ছিল; তারা ১৯৭৪’য়ের মধ্যেই বাংলাদেশে ফিরে গেছে। তাদের কারো হত্যা করা হয়েছে, ধর্ষণ করা হয়েছে বা তাদের ঘরবাড়ী কেড়ে রাস্তায় বসানো হয়েছে তার প্রমাণ নাই। অথচ সেটি বাংলাদেশে হয়েছে বিহারীদের সাথে।  

পাকিস্তানের জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৬০ জন পাঞ্জাবী। অথচ দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একজন পাঠান। পাকিস্তানে পাঠানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ। অথচ তাঁর দল পাঞ্জাবী নওয়াজ শরীফকে হারিয়ে শুধু পাকিস্তানে নয়, পাঞ্জাব প্রদেশেও ক্ষমতাসীন। সিন্ধিদের সংখ্যা শতকরা ১৬ ভাগ। জুলফিকার আলি ভূট্টো ও তাঁর মেয়ে বেনজির ভূট্টো সিন্ধি হয়েও তারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু। অথচ দেশটির শতকরা ১০ ভাগ মানুষের মাতৃ ভাষা্ও উর্দু নয়। যে পাঞ্জাবীরা শতকরা ৬০ জন, তারা কখনোই এ দাবী তুলেনি যে পাঞ্জাবীকে দেশের রাষ্ট্র ভাষা করতে হবে। বাঙালীরা কি কোনদিন সেটি মেনে নিত? পাঞ্জাবী দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছে, ক্ষুদ্র আঞ্চলিক স্বার্থকে নয়।

Moral and intellectual disparity ’র বড় কারণ, বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ বিশ্বটাকে দেখে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে। ফলে পৌত্তলিক ভারতের প্রতি রবীন্দ্রনাথের মত তাদেরও আনুগত্য আছে। আছে ভারত বন্দনাও। রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক গান তাই বাংলাদেশীদের জাতীয় সঙ্গীত। অনেক বাঙালীরাই ভারতকে দেখে বাংলাদেশের জন্মদাতা রূপে। ভারত্ও তাই মনে করেন। এরই প্রমাণ, ভারতের The Time of India একাত্তরে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল ম্যানেক শ’কে নিয়ে একটি বিশাল নিবন্ধ প্রকাশ। তাতে তাকে father of a nation বলে আখ্যায়ীত করেছিল। বাংলাদেশ সরকার তার প্রতিবাদ করেনি্। তবে প্রতিবাদ না করার কারণও রয়েছে। মুক্তিবাহিনী একটি জেলা দূরে থাক, ভারতীয় আর্মীর অনুপ্রবেশের আগে একটি থানাও মুক্ত করতে পারিনি্। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছে ভারতী সেনাবাহিনী। অথচ আফগানিস্তানে যখন ১ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন সৈন্যের অবস্থান, তখনও তালেবানরা শতকরা ৬০ ভাগ ভূ-খন্ডের উপর নিজেদের দখল বজায় রেখেছে। এজন্যই বাকশালীগণ বলে, ক্বিয়ামত অবধি ভারতের ঋণ শোধ দেয়া যাবে না। কথা হলো, পিতার ঋণ কি কখনো শোধ দেয়া যায়? যে পিতা, সে তো সব সময়ের জন্যই পিতা। এজন্যই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ বাংলাদেশের পাশে কোন শত্রু দেখে না। কারণ, পিতাকে তো শত্রু ভাবা যায় না। অপর দিকে পশ্চিম পাকিস্তানীরা বিশ্বটাকে দেখে আল্লামা ইকবালের দৃষ্টিতে। ফলে তাদের আছে মাথা তুলে দাঁড়ানোর জজবা। তারা ভারতকে দেখে প্রতিদ্বন্দী শত্রু রূপে। ফলে ভারত যখন পারমানবিক বোমা বানায় তখন পাকিস্তান্ও বানায় ফলে দেশটি পরিণত হয়েছে ৫৭টি মুসলিম দেশের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে। অথচ বাংলাদেশ একটি রাইফেলও নিজে বানানোর প্রয়োজনীতা বোধ করে না। দেশটির নীচে নামার কি শেষ আছে? দক্ষিণ এশিয়ার ৩টি দেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশের অন্তর্ভূক্ত্ করা হয়েছে। সে দেশটি হলো নেপাল, ভূটান ও বাংলাদেশ।সে তালিকায় পাকিস্তান নাই। অথচ আওয়ামী নেতাদের দাবী, তারা পাকিস্তানের চেয়ে বেশী উন্নতি করছে।       

২. মিথ্যার নাশকতা ও মিথ্যার স্রোতে ভাসা মানুষ

অধিকাংশ মানুষই চলমান স্রোতের টানে ভাসে। সে স্রোতটি সুস্পষ্ট মিথ্যার হলেও -তা নিয়ে তারা চিন্তাভাবনা করতে রাজী নয়। সে মিথ্যাকেই তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। হিন্দুরা মুর্তিপূজা করে, গরুকে ভগবান মনে করে, গো-মুত্র সেবন করে এবং গোবর দিয়ে ঘর পবিত্র করে –এর কারণ এই চলমান স্রোতে-ভাসা স্বভাব। ভারতের স্কুল-কলেজে এখন পড়ানো হয়, বহু হাজার বছর আগে থেকেই ভারতের মুনি-ঋষিরা আকাশে উড়তো। তারা বিমান আবিস্কার করতে জানতো। মানুষ যদি চিন্তাভাবনায় অভ্যস্থ না হয় তবে এরূপ মিথ্যার স্রোতে ভাষা থেকে সে রক্ষা পায় না; বরং সে মিথ্যার প্রচারকে পরিণত হয়। এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রিও তাকে মিথ্যাসেবী হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে না। ভারতে যারা গরুকে ভগবান বলে ও গো-মুত্র সেবন করে -তাদের সবাই যে নিরক্ষর,তা নয়। তাদের অনেকেই পিএইচডিধারী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

একই রূপ মিথ্যার স্রোতে ভাসছে কোটি কোটি বাংলাদেশী। তারা মনে করে ১৯৭১ তিরিশ লাখ বাঙালী পাক সেনাবাহিনীর হাতে মারা গিয়েছিল। একথা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যেমন বলে, তেমনি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও বলে। বলে দেশটির বুদ্ধিজীবীরাও। মিথ্যার সে স্রোতটি সৃষ্টি করেছিল মুজিব; মুজিব-ভক্তদের কাজ হয়েছে সে মিথ্যাকে বাঁচিয়ে রাখা। গরু যেমন ভগবান রূপে হিন্দুদের মাঝে বেঁচে আছে, তেমনি ৩০ লাখের মিথ্যাও বাঙালীর মাঝে বেঁচে আছে। এ মিথ্যাসেবীরা ভাবতে রাজী নয়, ৩০ লাখ মরতে হলে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের দেশে প্রতি ২৫ জনে একজন মারা যেতে হয়। এবং ৯ মাস যুদ্ধের প্রতিদিন ১১ হাজারের বেশী মানুষকে মরতে হয়। মিথ্যা থেকে তে তারাই বাঁচে যারা চিন্তা-ভাবনা ও হিসাব-নিকাশ করতে আগ্রহী। কিন্তু মিথ্যাসেবীদের সে আগ্রহ থাকে না।  

৩. জাহান্নামে নেয় চেতনার অসুস্থ্যতা

 রোজহাশরের বিচার দিনে দৈহিক স্বাস্হ্যের বিচার হবে না। বিচার হবে চেতনার স্বাস্হ্যের। ইসলামী পরিভাষায় সেটিই হলো ঈমান ও আক্বিদা। নামায-রোযা আসে পরে, ঈমান-আক্বিদা আসে আগে। চেতনা তথা ধ্যান-ধারণার অসুস্থতার কারণে মানুষে জাহান্নামের আগুণে যাবে। মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি তাই, চেতনাকে সুস্থ্য রাখা। এবং সবচেয়ে ঘৃন্য ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো চেতনাকে অসুস্থ্য করা। অসুস্থ্য করার কাজে মিথ্যা হলো মূল হাতিয়ার; সত্যের পথ তথা জান্নাতের পথ এটি বন্ধ করে দেয়। মিথ্যাকে এজন্যই সকল পাপের মা বলা হয়। মিথ্যুকেরাই হলো সবচেয়ে বড়পাপী। গরু, সাপ, মুর্তি, ইত্যাদি ভগবান রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মিথ্যার কারণে। কোন এক মিথ্যুক আদি কালে সে মিথ্যাকে চালু করেছিল, অন্য মিথ্যুকেরা সেটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই জাহান্নামে যাওয়ার জন্য মানব-হত্যা ও নারী ধর্ষণের প্রয়োজন পড়ে না, মিথ্যুক হওয়াই সে জন্য যথেষ্ট্। শেখ মুজিবের অপরাধ শুধু এ নয়, সে গণতন্ত্র হত্যা ও ভারতের দালালী করেছে। বরং সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো, সে ৩০ লাখের মিথ্যার জন্ম দিয়েছে; এবং কোটি কোটি বাঙালীকে মিথ্যুকে পরিণত করেছে।

মহান আল্লাহতায়ালা লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। সেটি মানুষকে বিজ্ঞান শেখাতে নয়; বরং সত্যসেবী করতে এবং জনগণের চেতনায় সুস্থ্যতা দিতে। চেতনা পুষ্টি পায় ওহীর জ্ঞান থেকে। জ্ঞানের বলে জ্ঞানীরা তখন স্রোতের উজানে সাঁতরায়। সে জ্ঞানদান নিশ্চিত করতেই মহান আল্লাহতায়ালা আসমানী কিতাব পাঠিয়েছেন। পবিত্র কোর’আন হলো সে লক্ষ্যে সর্বশেষ কিতাব। যারা সে কোর’আনের জ্ঞান পায়, তারাই সত্যের সন্ধান পায় এবং তাদের চেতনা পায় সুস্থ্যতা। বাঙালী ফ্যাসিস্টদের অপরাধ হলো, সে কোর’আনী জ্ঞানের প্রতিষ্ঠা দিতে তারা রাজী নয়।

৪. ঈমানদারের পরিচয়

ঈমানদারের ব্যস্ততার দুটি প্রধান খাত: এক). কোর’আনী জ্ঞানের বৃদ্ধি। কারণ, জ্ঞানই চেতনায় পুষ্টি ও সুস্থ্যতা দেয় এবং আমলের ওজন বাড়ায়। এবং পথ দেখায় জান্নাতের। দুই). নেক আমল। নেক আমলে তাড়াহুড়া আসে মহান আল্লাহকে খুশি করা ও আখেরাতে সঞ্চয় বৃদ্ধির প্রেরণা থেকে। অপর দিকে বেঈমানের পরিচয় হলো: সে আগ্রহহীন কোর’আন বুঝায়। তার সর্বক্ষণের চিন্তা ও ব্যস্ততা সম্পদের বৃদ্ধিতে। সে নিজে পরিণত হয় সম্পদের পাহারাদারে।

৫. চোরডাকাতদের সমর্থণে!

 কোন সভ্য মানুষই চোরডাকাতদের চুরিডাকাতিকে সমর্থণ করে না।এরূপ কাজ চোরডাকাতদের। সভ্য ও ভদ্র লোকদের এ চারিত্রিক বলটি থাকতেই হয়। অথচ সে সামর্থ্য বিলুপ্ত হয়েছে তাদের মধ্য থেকে যারা নিজেদের শিক্ষিত বলে পরিচয় দেয়। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের বিপুল সংখ্যক শিক্ষক বিবৃতি দিয়েছে ২০১৮ সালের নির্বাচর সুষ্ঠ হয়েছে। এবং সমর্থণ দিচ্ছে ভোট ডাকাত হাসিনাকে। সমর্থণ দিচ্ছে নির্বাচনি কমিশনার, আদালতের বিচারকগণ, বুদ্ধিজীবী এবং সেনাপ্রধান! ডাকাত পাড়ার সংস্কৃতি কীরূপে ছেয়ে গেছে -এ হলো তার নমুনা।  

৬. বিশ্বমিথ্যুক ও বিশ্বভীরু

 মিথ্যার জন্য বিশ্বমিথ্যুক রূপ খেতাব পাওয়া উচিত ভোটডাকাত হাসিনার। অপর দিকে বিশ্বভীরু রূপে আখ্যায়ীত হওয়া উচিত বাংলাদেশের জনগণের। কি বিস্ময়! দেশের ১৬ কোটি মানুষ রুখতে পারলো না ভোটডাকাতদের! শুধু তাই নয়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলছে ভোটচোরকে!

৭. চরিত্র দেখা যায়

 চরিত্র দেখা যায় দুর্বলের সাথে আচরণ দেখে। সবলের সামনে অতি অসভ্য দুর্বৃত্ত ব্যক্তিও ভদ্র আচরণ করে। অথচ পা ভাংঙ্গা হাঁসকে শিশুও লাথি মারে। বাঙালীর সে চরিত্রটি অতি নগ্ন ভাবে দেখা গেছে প্রতিরক্ষাহীন বিহারী নারী-পুরুষ ও শিশুদের উপর হত্যা, ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ী ও ব্যবাসা-বাণিজ্য দখল করার মধ্য দিয়ে। একই কারণে দুর্বল নারীকে অতি ভীরু এবং কাপুরুষও পিটাতে পারে। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় প্রকাশ, নারী নির্যাতন ও নারী হত্যায় ভারত বিশ্বে প্রথম। ফলে দেশটি সংকটের মুখে পড়েছে অসহায় মুসলিম ও দলিত শ্রেণী। কাপুরুষেরা দুর্বলদের পেলে অতিশয় নৃশংস হয়। তেমন এক নৃশংস হিংস্রতা নিয়ে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজিপি ও আর.এস.এস স্লোগান দেয়: মুসলমান কি লিয়ে দো স্থান- কবরস্থান ইয়া পাকিস্তান। অর্থ: মুসলমানদের জন্য দুই জায়গা: হয় পাকিস্তান, অথবা কবরস্থান। অথচ সে ভারতের বন্ধু হলো শেখ হাসিনা।

৮. উপেক্ষিত মুসলিম অবদান

 ভারতীয় মুসলিমদের জন্য বড়ই দুর্দিন। তাদেরকে বহিরাগত ও দেশের শত্রু ভাবা হয়। অথচ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বেশী অবাদান মুসলিমদের। দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে ৯২,৩৫৩ জনের নাম লেখা আছে যারা প্রাণ দিয়েছে ভারতের স্বাধীনতার জন্য। তাদের মধ্যে ৬২,৯৪৫ জন মুসলিম। অথচ নরেন্দ্র মোদির বিজিপি মুসলিমদের সে অবদানের কথা বলে না। এমন কি বলেনা ভারতীয় মিডিয়া।  ১১/০৩/২০২১।

 

 




বিবিধ ভাবনা (৩৪)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. নবীজী (সা:)’র ইসলাম ও আজকের ইসলাম

সৈনিককে শুধু প্রশিক্ষণ নিলে চলে না, দেশরক্ষায় যুদ্ধেও নামতে হয়। সেটি না হলে দেশের সাথে গাদ্দারী হয়। সেরূপ গাদ্দার সৈনিকদের সংখ্যাবৃদ্ধিতে দেশের স্বাধীনতা বাঁচে না। তেমনি মুসলিম জীবনে শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত থাকলে চলে না। অসত্যের নির্মূল, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও আদালতে শরিয়ত পালন করতে জিহাদেও নামতে হয়। এটিই নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামের ইসলাম। মুসলিমগণ বিশ্বশক্তি রূপে খাড়া হয়েছিল তো এ ইসলাম নিয়ে বাঁচার কারণে।

আজকের মুসলিমগণ যে ইসলাম নিয়ে বেঁচে আছে -সেটি নবীজী (সা:)’র ইসলাম নয়। আজকের ইসলামে নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত আছে, কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, ঐক্য ও জিহাদ নাই। মুসলিমগণ বাঁচছে নবীজী (সা:)’র ইসলামের সাথে গাদ্দারী নিয়ে। ফলে তাদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সে শক্তি ও ইজ্জত নাই। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় কি তারা মুসলিম রূপে গণ্য হবে? স্থান পাবে কি জান্নাতে? জান্নাতে যেতে হলে তো নবীজী (সা:)’র ইসলামের অনুসারি হতে হয়।

 

২. বিজয় ডাকাতদের

বাংলাদেশে গণতন্ত্র কবরে গেছে; চলছে ডাকাততন্ত্র। এবং বিজয়ী ডাকাতাগণ। ডাকাততন্ত্রে ভোট লাগে না, লাগে ডাকাতির সামর্থ্য। সে সামর্থ্য রয়েছে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার। পুলিশ এবং সেনাবাহিনীও এখন হাসিনার ডাকাত বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ডাকাতপাড়ায় দালানকোঠা দেখে বলা যায় না যে উন্নতি হয়েছে। উন্নয়নের পরিমাপে জরুরি হলো গণতন্ত্র্ কতটা প্রতিষ্ঠা পেল এবং জনগণ কতটা মানবিক অধিকার পেল সেটি। ডাকাতের গ্রামকে সভ্য গ্রাম বলা হয় না। তেমনি ডাকাত অধিকৃত দেশকেও সভ্য দেশ বলা যায় না। দেশে তখন প্রতিষ্ঠা পায় ডাকাত পাড়ার সংস্কৃতি। সে সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠা ও সন্মান পায় ডাকাতগণ। ডাকাত বিরোধীদের তখন গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। 

 ৩. ছোট ডাকাত ও বড় ডাকাত

ছোট ডাকাতেরা মানুষের অর্থ ডাকাতি করে। বড় ডাকাতেরা জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি করে। তখন সমগ্র দেশ ও দেশের সম্পদ ডাকাতদের হাতে চলে যায়। আমলা বাহিনী, আদালত বাহিনী, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীও তখন ডাকাতদের বাহিনীতে পরিণত হয়। জনগণকে তখন সে ডাকাত প্রতিপালনে রাজস্ব জোগাতে হয়।

বাংলাদেশে ডাকাতদের জৌলুস বাড়ছে এবং গরীব মানুষ আরো দরিদ্র হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশ, অভাবের তাড়নায় মানুষ সন্তান বিক্রি করছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন মেজর মটর সাইকেল  চালায়, আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজরকে দেয়া হয় ৫০ লাখ টাকার জিপ ও সে সাথে জোগানো হয় তেলের খরচ। মুজিব আমলেও সেটিই হয়েছিল। ক্ষুধায় মানুষ বুমি খেয়েছে, আর মুজিব সোনার মুকুট পড়িয়ে ছেলের বিয়ে দিয়েছে। দেশ ডাকাতদের দখলে যাবে এবং তাদের জৌলুস বাড়বে না –সেটি কি হয়? তাই কিছু রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়িয়ে বাংলাদেশে শান্তি আনা যাবে না, সে জন্য ডাকাত তাড়াতে হবে।

৪. উৎসব ভাংঙ্গা নিয়ে

মুসলিমকে শুধু নামায-রোযা নিয়ে ভাবলে চলে না। তাকে ভাবতে হয় মুসলিম উম্মাহর ইজ্জত ও নিরাপত্তা নিয়েও। ন্ইলে শত্রুশক্তির গোলাম হতে হয়। সভ্য মানুষেরা তাই যেমন মজবুত ঘর গড়ে তেমনি শক্তশালী রাষ্ট্রও গড়ে। অতীতে তাই মুসলিমগণ তাদের জানমালের বিশাল ভাগ বিনিয়োগ করেছিলেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। বৃহৎ ভূগোলের যে শক্তি সে শক্তি শত কোটি বিচ্ছিন্ন মানুষের থাকে না। সে শক্তি হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসারও থাকে না। একেই বলে power of geopolitics। ভূগোল বাড়লেই শক্তি বাড়ে। অতীতের মুসলিমগণ সেটি বুঝতেন; তাই ভূগোল বাড়াতে তারা বিপুল অর্থ ও রক্ত ব্যয় করেছেন। সে সুস্থ্য বিবেক বোধ দেখা গিয়েছিল ১৯৪৭ সালে বাঙালী মুসলিম লীগ নেতাদের মাঝে। আর আজকের মুসলিমগণ রক্ত ব্যয় করে ভূগোল ভাংঙ্গতে। তাদের উৎসব দেশ ভাংঙ্গা নিয়ে, গড়া নিয়ে নয়। ১৯৭১’য়ের পর সে উৎসবটি ব্যাপক ভাবে দেখা যায় বাংলাদেশের বাঙালী মুসলিমদের মাঝে।

মহান আল্লাহতায়ালা শুধু ব্যক্তির নামায-রোযার হিসাবই নেন না, হিসাব নেন কিসে তার আনন্দ-উৎসব সেটিরও। কারণ, আনন্দ-উৎসবের মধ্যে ধরা পড়ে তার প্রকৃত ঈমান ও চেতনা। মুসলিম দেশ ভাংঙ্গলে সাহস ও শক্তি বৃদ্ধি পায় কাফেরদের। তাতে পরাজয় ও গোলামী বাড়ে মুসলিম উম্মাহর। তাই যারা মুসলিম দেশ ভাংঙ্গাকে সমর্থন করে ও তা নিয়ে উৎসব করে -তারা বাঙালী, আরব, কুর্দি, হিন্দু, খৃষ্টান ও বৌদ্ধ হতে পারে কিন্তু প্রকৃত মুসলিম হতে পারে না। তারা মিত্র কাফের শক্তির। যেমনটি দেখা গেছে মুজিব ও তার অনুসারিদের ক্ষেত্রে। একখানি প্লেট ভাংঙ্গলেও একজন সুস্থ্য মানুষের মনে কষ্ট হয়। একটি মুসলিম দেশ ভেংঙ্গে গেল অথচ মনে কষ্ট পেল না, সেটি কি করে সম্ভব? সেটি সম্ভব একমাত্র ঈমান না থাকাতে। 

একাত্তরে তাই কোন ইসলামী দল ও আলেম পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেনি। এটি ছিল ভারতপন্থী ও রুশপন্থী আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কম্যুনিস্ট পার্টির কাজ। বিশ্বের কোন মুসলিম দেশও দেশভাংঙ্গার এ কাজকে সমর্থন করেনি; সমর্থন করেছে ভারত, সোভিয়েত রাশিয়া ও ভূটানের ন্যায় কাফের রাষ্ট্র।   

৫. আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুতি ও মুসলিমদের গাদ্দারী

সুরা বাকারায় মহান আল্লাহতায়ালার ওয়াদা: “ফাজকুরুনি, আজকুরুকুম”। অর্থ: তোমরা আমার স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো। এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর স্মরণে থাকার জন্য কোন পীরদরবেশের মধ্যস্থতার দরকার নেই। আল্লাহতায়ালার স্মরণ নিয়ে বাঁচার অর্থ শুধু তাঁর নাম ও কুদরতের স্মরণ নিয়ে বাঁচা নয়। বরং সেটি হলো, তাঁর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়বদ্ধতাটি সর্বদা স্মৃতিতে নিয়ে বাঁচা। সে দায়িত্ব থেকে গাফেল হয়ে যাওয়ার ভয়টিই হলো তাকওয়া।

প্রতিটি ঈমানদারের উপর সে অর্পিত দায়ভারটি হলো, নিজ নিজ জনপদে তাঁর খলিফা তথা প্রতিনিধি রূপে দায়িত্ব পালন। সে দায়িত্বপালনে মুমিন ব্যক্তি পরিণত হয় আমৃত্যু তাঁর সৈনিকে। সে তখন বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়তী আইনকে বিজয়ী করার স্মরণ নিয়ে। আর যে ব্যক্তি প্রতি মুহুর্ত বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা নিয়ে, বস্তুত তাঁর প্রতি হলো তাঁর এ বিশেষ ওয়াদা। যারা তাঁর আইনকে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে বিজয়ী করতে আত্মনিয়োগ করে, নিশ্চয়ই তিনি তাদেরকে বিজয়ী করবেন আখেরাতে।

অথচ মুসলিম জীবনে এক্ষেত্রে গাদ্দারীটি বিশাল। তারা বাঁচছে স্মৃতিতে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি দায়বদ্ধতার কথা ধারণ না করেই। তারা যে তাঁর খলিফা -সে ধারণাটিও বিলুপ্ত হয়েছে। তারা রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী ও সেক্যলারিস্ট, অর্থনীতিতে সূদখোর, প্রশাসনে ঘুষখোর, সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানী এবং আদালতে কাফেরদের আইনের অনুসরারি। সর্বত্রই বিদ্রোহ। স্মৃতিতে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থাকলে কি এমনটি হতো? 

৬. রাষ্ট্রের গুরুত্ব ও মুসলিমের ব্যর্থতা

মানুষের সবচেয়ে বড় উপকারটি অর্থদানে হয়না। সেটি হয় জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর মধ্য দিয়ে। সেটি সম্ভব হয় কোরআনের জ্ঞান দিয়ে। সে কাজটি একজন ব্যক্তি যেমন করতে পারে, তেমনি একটি সংগঠনও করতে পারে। কিন্তু পৃথিবী পৃষ্টে জান্নাতে নেয়ার সর্ববৃহৎ ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকল্পটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র। সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তখন কাজ হয়, অসত্যের নির্মূল ও সত্যের প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা, মিডিয়া তখন মানুষকে জান্নাতের পথে নেয়ার বাহনে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রই হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানকে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে রেখে ইসলামী বিধানকে প্রতিষ্ঠা দেয়া অসম্ভব। বিষয়টি নবীজী (সা:) বুঝতেন এবং আল্লাহতায়ালাও চাইতেন বলেই মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর প্রথম কাজ হয় নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দেয়া। মুসলিমগণ যে তৎকালে সুপার পাওয়ারে পরিণত হয় তার কারণ হলো এই ইসলামী রাষ্ট্র। লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে কি সেটি সম্ভব হতো? বিজয় ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে হলে শুধু নামায-রোযা বুঝলে চলে না, বুঝতে হয় রাষ্ট্রের গুরুত্ব এবং power of geopolitics। মুসলিমদের আজকের ব্যর্থতা এখানেই। তারা ব্যর্থ হয়েছে নবীজী(সা:)’র আদর্শে ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে্। রাষ্ট্র অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে তথা জাহান্নামে নেয়ার কাজে। ফলে রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে মানবের সবচয়ে বড় শত্রুতে। কোন হিংস্র পশুর হাতে এতো বড় ক্ষতি হচ্ছে না।  

৭. ঈমানদারী ও বেঈমানীর পরিচয়

ঈমানদারের পরিচয় হলো ইসলামকে বিজয়ী করার কাজে সে সবার সামনে থাকে। তাকে দেখা যায় অন্যায়ের নির্মূলে ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। দেখা যায় মুসলিমদের মাঝে ঐক্য গড়তে। সে চেতনায় প্যান-ইসলামীক হয়। তার নৈতিক সামর্থ্যটি দেখা যায় ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে অন্যদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ায়। বেঈমানের পরিচয় হলো, সে প্রচণ্ড স্বার্থপর। নিজের স্বার্থ হাছিলে তাকে সবার আগে আগে দেখা যায়। এবং ইসলামকে বিজয়ী করার বদলে তারা প্রচেষ্টা হয় ইসলাম ও মুসলিমকে পরাজিত করায়। তার রাজনীতিতে থাকে ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার নামে মুসলিম উম্মাহর দেহে বিভক্তির দেয়াল গড়ার এজেন্ডা। মুসলিম দেশগুলোতে এরাই বিজয়ী। মুসলিম উম্মাহর এরাই ঘরের শত্রু।  ০৯/০৩/২০২১।

 




বিবিধ ভাবনা (৩৩)

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ভোটডাকাতের ভাবমূর্তির ভাবনা

বাংলাদেশের ভোটডাকাত সরকার সম্প্রতি বলেছে: সোসাল মিডিয়া দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। প্রশ্ন হলো, দেশের  ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে সোসাল মিডিয়া না ভোটডাকাত সরকার? দিনের ভোট যদি রাতে সরকারি দলের হাতে ডাকাতী হয়ে যায় -তবে কি দেশের ভাবমূর্তি থাকে? সরকারের দায়িত্ব তো ডাকাতি ঠেকানো; কিন্তু সরকার নিজেই যদি ডাকাতে পরিণত হয় -তবে কি দেশের ইজ্জত থাকে? যদি প্রতিবাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয় এবং গুম, খুন ও ধর্ষণের প্লাবন শুরু হয় -জনগণের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না হলে তো বিশ্ববাসী বুঝবে দেশের মানুষ কতটা মৃত। তাছাড়া ভোটডাকাতের আবার ভাবমূর্তির ভাবনা কিসের? সে ভাবনা থাকলে কি তারা চুরিডাকাতিতে নামতো? দুনিয়ার সামনে দেশের ভাবমূর্তি ডুবিয়েছে তো শেখ হাসিনা, সেনাপ্রধান আজিজ ও তাদের খুনি সহচরগণ -যা আল জাজিরা প্রকাশ করেছে।

দেশের পত্র-পত্রিকা ও টিভি সরকারের নিয়ন্ত্রনে। সেগুলি সরকারী দলের দুর্বৃত্তির কথা তুলে ধরেনা। সে দুর্বৃত্তির কথা সোসাল মিডিয়াতে তুলে ধরা হলে –সরকার বলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। যারা ডাকাতি, গুম, খুন ও ধর্ষণের সাথে জড়িত -তারা দুর্বৃত্তির স্বাধীনতা চায়। কিন্তু সে দুর্বৃত্তির কথা অন্যরা জানুক –সেটি চায়না। নিজেদের ভাবমূর্তি নিয়ে এতো ভাবনা থাকলে -তাদের উচিত ছিল সে অপরাধের পথে পা না বাড়ানো। সোসাল মিডিয়া নিশ্চুপ হলে তো দেশের ভাবমূর্তি আরো নষ্ট হবে। তখন বিশ্ববাসী জানবে, দেশে বিবেকবান মানুষ বলে কেউ নাই। অপরাধ করা যেমন অপরাধ, তেমনি সে অপরাধ সয়ে যাওয়াও তো অপরাধ। এটি কি করে সম্ভব যে জনগণ অপরাধ নিরবে সয়ে যাবে?

২. অবৈধ হাসিনা বলে কী?  

সম্প্রতি শেখ হাসিনার উক্তি: যারা অবৈধ ভাবে ক্ষমতায় আসে তারাই দেশকে অস্থিতিকর করে। ভাবটা এমন, সে নিজে যেন বৈধ ভাবে ক্ষমতায় এসেছে। শেখ হাসিনা দুইবার অবৈধ ভাবে ক্ষমতায় এসেছে: প্রথমবার ২০১৪ সাল এবং দ্বিতীয়বার ২০১৮ সালে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩ সিটে কোন নির্বাচনী বুথই খোলা হয়নি। এবং ২০১৮ সালে নির্বাচনে আগের রাতেই জনগণের ভোট ডাকাতী করে নেয়।

নির্লজ্জ হলে মানুষ জনসম্মুখে উলঙ্গ হতে পারে। তেমন নির্লজ্জরাই সবার সামনে ডাকাতির ন্যায় ভয়ংকর অপরাধে নামতে পারে। সে রকম নির্লজ্জতার পরিচয় দিয়েছে শেখ হাসিনা। কথা হলো, দুর্নীতি ও ভোটডাকাতী করে ক্ষমতায় আসা কি অবৈধ নয়? তাতে কি দেশ অস্থিতিকর হয় না? ভোটডাকাতি বৈধ হলে অবৈধ পথ কোনটি?

৩. যে পাপ দুর্বৃত্তি সয়ে যাওয়ার

কে কত নামায পড়লো ও রোযা রাখলো -মহান আল্লাহতায়ালা শুধু সে হিসাবই নিবেন না। দুর্বৃত্তের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় কার কি ভূমিকা -সে হিসাবও দিতে হবে। কারণ সে কাজটিও মুসলিম জীবনের মিশন। শুধু পানাহার নিয়ে বাঁচলে জীবন সুখের হয়না, ঘর থেকে নিয়মিত আবর্জনাও সরাতে হয়। তেমনি দুর্বৃত্তের শাসন মেনে নেয়া আদৌ ঈমানদারী নয়। তাতে সমাজ সভ্য ও শান্তিময় হয়না। শুধু নামায-রোযায় সে কাজ হয় না। এজন্যই ইসলামে ফরজ শুধু নামায-রোযা নয়, ফরজ হলো দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদ। যে দেশে জিহাদ নাই সেদেশ দুর্বৃত্তদের দখলে যায়। বাংলাদেশ দুর্বৃত্তদের দখলে যাওয়ার কারণ তো জনগণের জীবনে জিহাদশূণ্যতা। পাপ এখানে দুর্বৃত্তির নির্মূল না করে সয়ে যাওয়ার।

৪.সরকারের অপরাধ

পানাহারের ন্যায় কথা বলা, লেখালেখি করা ও মিছিল-মিটিং করা জনগণের মৌলিক অধিকার। পানাহারে সরকারের অনুমতি লাগে না। মিছিল-মিটিং করতেই বা জনগণের অনুমতি লাগবে কেন? বরং অপরাধ তো সে সরকারী নেতাদের যারা সে অধিকার কেড়ে নেয়া। যে আইন সে অধিকার কেড়ে নেয়, সে আইনই বেআইনী। সে আইন অসভ্য ও সংবিধান বিরোধী। সে অপরাধের জন্য সরকারের বিচার হওয়া এবং বিচারে কঠোর শাস্তি হওয়া জরুরি।

৫. মানবতার পরিচয় যুদ্ধ নিয়ে বাঁচায়

গরু-ছাগলের ভোটাধিকার ও মতামতের প্রকাশ নিয়ে আগ্রহ থাকে না। ফলে ভোটদান ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিলেও তারা রাস্তায় নামে না। গরু-ছাগলেরা চায় স্রেফ ঘাস। জনগণের মানবতা বুঝা যায়, তাদের মাঝে নাগরিক অধিকার নিয়ে বাঁচার যুদ্ধ দেখে। তাই ভোটাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা হারিয়ে যাওয়ার পরও যারা নিরব থাকে -বুঝতে হবে তারা গরু-ছাগল থেকে সামান্যই উন্নত। তারা পানাহার ছাড়া বেশী কিছু চায় না। এমন জনগণের উপর ভোটডাকাতদের শাসন চেপে বসে। তাই বাংলাদেশে উপর যে স্বৈরাচারি শাসন চেপে বসেছে -তা কি বিশ্বের কোন সভ্য দেশে ভাবা যায়?

 ৬. ডাকাত তাড়াতে আগ্রহ কই?

যাকাতের শাড়ী পেতে বাংলাদেশে মানুষের ঢল নামে। বহু মানুষ ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে মারা যায়। ঢাকায় কোটি লোকের বেশী মানুষের বসবাস। দশ জনের মধ্যে একজনও যদি ভোটডাকাত তাড়াতে রাস্তায় নামতো তবে ১০ লাখের বেশী মানুষ রাস্তায় হতো। তখন ভোটডাকাত সরকার কি তখন ক্ষমতায় থাকতে পারতো? কিন্তু সে ডাকাত তাড়াতে আগ্রহ কই?

৭.চেনার কাজটি হয়নি

 সভ্যদেশে গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ হয়। অসভ্য দেশ ভোটডাকাতদের সরকারও বিনা প্রতিরোধে দীর্ঘায়ু পায়। ডাকাত না তাড়িয়ে যারা ঘুমায় তারা ডাকাতের বন্ধু এবং দেশের শত্রু। এবং যারা ডাকাত তাড়াতে ময়দানে নামে তাঁরাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক। বাংলাদেশে সে দেশপ্রেমিকদের সংখ্যাটি কম। ফলে ডাকাতও শাসকের আসনে বসে। অথচ এ আসনে বসেছেন নবীজী (সা:) এবং তার মহান সাহাবীগণ।   

প্রাণ বাঁচাতে যেমন হিংস্র পশুদের চিনতে হয়, তেমনি মানবিক অধিকার নিয়ে বাঁচতে হলে গণতন্ত্রের শত্রু ভোট-ডাকাতদেরও চিনতে হয়। এবং কিন্তু বাংলাদেশে সে চেনার কাজটি হয়নি। ফলে শেখ মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্র হত্যাকারি ফ্যাসিস্টকে যেমন জাতির পিতা বলা হয়, তেমনি হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা হয়। এরূপ অজ্ঞতা নিয়ে কি ভোটডাকাত দুর্বৃত্তদের শাসন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়? ০৫/০৩/২০২১।

 




বিবিধ ভাবনা (৩২)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. রাজনীতির গুরুত্ব ও অবহেলা

রাজনীতি হচ্ছে দেশের শাসক, আইন ও নীতি পরিবর্তনের ময়দান। এ ময়দানেই অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র জিহাদ। শত্রুগণ পরাজিত হয়, ইসলাম বিজয়ী হয় এবং সুশাসন ও শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠা পায় একমাত্র রাজনীতির এ ময়দানে বিজয়ী হলে। মহান আল্লাহতায়ালা বিনা বিচারে যাদেরকে জান্নাতে নিতে চান -তাদেরকে শহীদের মর্যাদা দিয়ে তুলে নেন রাজনীতির এ ময়দান থেকে। সে কাজটি মসজিদের জায়নামাজ থেকে হয়না। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সে ঘোষণাটি এসেছে সুরা আল-ইমরানের ১৪০ আয়াতে। বলা হয়েছে: “বিপদ তোমাদের উপর যেমন আঘাত হেনেছে, অনুরূপ আঘাত হেনেছে তাদের (তোমাদের শত্রুদের) উপরও; আমরা মানবের মাঝে এরূপ কালের বিবর্তন ঘটাই -যাতে আল্লাহ জানতে পারেন কারা ঈমান এনেছে এবং যাতে তোমাদের মধ্য থেকে তিনি বাছাই করতে পারেন শহীদদেরকে। আল্লাহ জালেমদের ভালবাসেন না।”

তাজ্জবের বিষয় হলো, বাংলাদেশের আলেমদের বিশাল অংশ এবং বিপুল সংখ্যক নামাযী ব্যক্তি রাজনীতিতে অংশ নেন না। দেশ ও দেশের রাজনীতি চোরডাকাত ও দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলেও তা নিয়ে তারা মাথা ঘামান না। রাজনীতিতে অংশ নেয়াকে দুনিয়াদারি ও অসাধু লোকদের কাজ মনে করেন। হিফাজতে ইসলামের নেতাগণ সাংবাদিক সন্মেলন করে জানিয়ে দিয়েছেন তারা রাজনীতিতে নাই। তারা নবীজী(সা:)’র বহু সূন্নতের উপর তাগিদ দেন। কিন্তু ভূলে যান নবীজী (সা:) নিজে ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি নিজে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করেছেন এবং বহু যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। সমাজের শ্রেষ্ঠ মানুষগণ যখন রাজনীতিতে অংশ তখনই দেশ অধিক লাভবান হয়। রাজনীতির এ গুরুত্বপূর্ণ ময়দান শূণ্য রাখলে তা শূণ্য থাকে না, দুর্বৃ্ত্তরা দখল করে নেয়।  

তবে যারা রাজনীতিতে নেই বলে নিজেদের জাহির করেন সে দে্‌ওবন্দীদের মঞ্চে দেখা যায় হাসিনার ন্যায় দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতকে। হাসিনাকে তারা কওমী জননী বলেও সন্মানীত করেছে। ভারতে তাদেরকে  দেখা যায় কংগ্রেসের লেজুড়বৃত্তি করতে। আশির দশকে দেওবন্দ মাদ্রসায় তাদেরকে দেখা গেছে ইন্দিরা গান্ধিকে আমন্ত্রিত করতে।

 

২.ভন্ডামী আল্লাহতায়ালার প্রতি ভালবাসা নিয়ে

বাংলাদেশ বহু লক্ষ আলেম ও মসজিদের ইমাম। দেশে বহু কোটি নামাযী ও রোযা পালনকারী। তাদের সবারই দাবী, তারা নাকি মহান আল্লাহতায়ালাকে ভালবাসেন। অনেকে “আশেকে আল্লাহ’র পরচিয় দিয়ে পীরগীরির রম রমা বাণিজ্য করেন। কিন্তু কোথায় সে ভালবাসার প্রমাণ?

মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইন অপসারিত হয়েছে আদালত থেকে। সেখানে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কাফের ব্রিটিশদের আইন। একাজ ইসলামে হারাম। এতো মহান আল্লাহতায়ালার বিরাট অপমান! পরাজয় তাঁর ইসলামী বিধানের। কিন্তু তা নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা এসব তথাকথিত আশেকদের মনে বেদনা কই? বেদনা থাকলে তা নিয়ে প্রতিবাদ কই? বেদনা থাকলে শুরু হতো শরিয়তের প্রতিষ্ঠার জিহাদ। ভন্ডামী কি কখনো গোপন থাকে?

৩. ১০টি প্রশ্ন ও গুরুতর ভাবনার বিষয়:

১). পৃথিবীর বুকে সে দেশ কোনটি যে দেশে ভোটডাকাতীর অপরাধীকে জেল না দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা হয়?

২). বিশ্বের বুকে এমন কোন দেশ আছে কি যে দেশে বিদেশের এজেন্ট, প্রায় ৩০ হাজার মানুষের খুনি ও একদলীয় ফ্যাসিবাদী স্বৈরচারীর পিতাকে জাতির পিতা ও দেশের বন্ধু বলা হয়?

৩). মানব ইতিহাসে কোন দেশ দুর্বৃত্তিতি বিশ্বে পর পর ৫ বার প্রথম হয়েছে?

৪). সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে কোন দেশের মুসলিমগণ নিজ দেশের রাজধানীতে পৌত্তলিক কাফের সেনাবাহিনীর সামনে মুসলিম সৈনিকদের আত্মসমর্পণ নিয়ে উৎসব করে?

৫) কোন দেশের মুসলিমগণ কাফেরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছে এবং কাফের বাহিনীকে বিজয়ী করেছে? এবং কাফেরদের বিজয়কে নিজেদের বিজয় বলে উৎসব করে?

৬) পৃথিবীর কোন দেশের নাগরিকগণ প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত রক্ষির গুলিতে নিহত হয়ে কাঁটাতারে ঝুলে এবং তা নিয়ে কোন প্রতিবাদ হয় না? এবং নিজ দেশের ৫০টির বেশী নদীর পানি তুলে নিলে্ও সরকার প্রতিবাদ করে না? এবং সে খুনি ও আগ্রাসী প্রতিবেশী দেশকে সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু মনে করা হয়?

৭) বিশ্বের ইতিহাসে কোন দেশে ৫৭ জন সেনা অফিসার নিজ দেশের সেনানীবাসে নিজ সিপাইদের হাতে নিহত হয়েছে এবং সে হত্যাকান্ডের কোন সুষ্ঠ বিচার হয়নি?

৮). পৃথিবীর কোন দেশে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পেপার ডাকাতী হয়ে যায়? এবং ডাকাতীর নির্বাচনকে নির্বাচন কমিশন বৈধ নির্বাচন বলে সার্টিফিকেট দেয়া হয়?

৯). পৃথিবীর কোন দেশে খুনের আসামীকে মুক্তি দেয়া হয়, এবং সাংবাদিক ও লেখকদের স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য কারাগারে নির্যাতিত ও নিহত হতে হয়?

১০). পৃথিবীর কোন দেশের সেনাপ্রধানের ৪ ভাই খুনি এবং সে খুনিদের মুক্তি দেয়া হয়? এবং কোন দেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশ জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি করে?

উপরের ১০টি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে সবগুলো বিষয়েই সমগ্র বিশ্বে রেকর্ডটি একমাত্র বাংলাদেশের। একটি দেশের পতিতদশা বুঝবার জন্য ও বিবেকমান মানুষের চেতনায় বড় রকম ধাক্কা দেয়ার জন্য কদর্যতার এ রেকর্ডই যথেষ্ট্। সভ্য সমাজ নির্মাণে আগ্রহ থাকলে বিরামহীন লড়াই শুরু হওয়া জরুরি ছিল ১৯৭১ সাল থেকেই। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বে  নতুন রেকর্ড গড়েছে চোরডাকাত-দুর্বৃত্তদের জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা্য়। বিশ্বের আর কোন দেশে চোরডাকাত-দুর্বৃত্তগণ কি কোন কালে এভাবে সন্মানিত হয়েছে?

 

৪. সভ্য ও অসভ্যের পরিচয়

সভ্য ও অসভ্যদের খালি চোখে দেখা যায়। সে জন্য গবেষণা লাগে না। অসভ্য মানুষদের চেনা যায় ঘরের মাঝে পোকা-মাকড় ও গলিত আবর্জনা দেখে। তেমনি অসভ্য জাতিকে চেনা যায় তাদের উপর চোরডাকাত-দুর্বৃত্তদের শাসন দেখে। সভ্য মানুষেরা শুধু ভাত-মাছ খায় না, চোর-ডাকাতও তাড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি। বাংলাদেশে ভাত-মাছের আয়োজন বেড়েছে, কিন্তু চোর-ডাকাত তাড়ানোর কাজটি আদৌ হয়নি।

৫. দুর্বৃত্ত নির্মূলের গুরুত্ব

দুর্বৃত্ত নির্মূলের কাজটি ইসলামের প্রধানতম মিশন। এ মিশন নিয়ে বাঁচার জন্যই মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা -যা বলা হয়েছে সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৫’য়ে। পবিত্র কোর’আনে আরো বলা হয়েছে: “তোমাদের মধ্যে অবশ্যই একটি দল থাকবে যারা কল্যাণের দিকে মানুষকে ডাকবে, ন্যায়ের নির্দেশ দিবে এবং দুর্বৃত্তির নির্মূল করবে –এরাই সফলকাম।” -( সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৪)। এ আয়াতটিতে মহান আল্লাহতায়ালা সফলতার সংজ্ঞা বেঁধে নিয়েছেন। সেটি নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন নয়; বরং রাষ্ট্র থেকে দুর্বৃত্তদের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। তাই যারা মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ করে এবং নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন করে অথচ দুর্বৃত্তদের নির্মূলে ময়দানে নামে না –তারা ঈমানদার হিসাবে বিফল। নিষ্ক্রীয় থেকে তারা বরং বিজয় তুলে দেয় শয়তানের হাতে। তাই তারা শয়তানের সাহায্যকারী।

বাংলাদেশে দলের সংখ্যা অনেক। বহু দল ইসলামের নামেও। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উপরুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা যে ধরণের দল দেখতে চান, সে ধরনের দল বাংলাদেশে আদৌ আছে কি? থাকলে তাদের মাঝে দুর্বৃত্ত নির্মূলের লড়াই কই?

৬. চোর-ডাকাতদের দখলে দেশ

গ্রামে ডাকাত পড়লে গ্রামের সবাই সকল সামর্থ্য নিয়ে ডাকাত তাড়াতে নামে। দেশের কোটি কোটি মানুষের ভোটগুলো ডাকাতি হয়ে গেল, এবং সে ডাকাতির ফলে ডাকাতি হয়ে গেল সমগ্র দেশ। কিন্তু ক’জন সে ডাকাতদের ধরতে ও শাস্তি দিতে রাস্তায় নামলো? এমন দেশের উপর ডাকাতদের দখলদারী দীর্ঘায়ু পাবে -সেটাই কি স্বাভাবিক নয়?

বাংলাদেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কাজ হয়েছে হাসিনার পক্ষে ভোটডাকাতি করা। নির্বাচন কমিশনের কাজ হয়েছে ভোটডাকাতিকে জায়েজ করা। আদালতের বিচারকদের কাজ হয়েছে ভোটডাকাতদের বিচার না করা। এবং জনগণের কাজ হয়েছে সবকিছু বিনা প্রতিবাদে নীরবে দেখা। এটি কি কোন সভ্য দেশের রীতি হতে পারে? এরূপ অসভ্য রীতির কারণেই দেশ পুরাপুরি অধিকৃত হয়েছে অপরাধী চক্রের হাতে।

৭. অপরাধী হাসিনা

শেখ হাসিনা শুধু অবৈধই নয়, গুরুতর অপরাধীও। তার অপরাধ জনগণের ভোটের উপর ডাকাতি। জনগণের দায়ভার হলো এ অপরাধীকে সাজা দেয়া। সেটিই যে কোন সভ্য সমাজের রীতি। এটি জনগণের বৈধ অধিকারও। অপরাধীদের যে দেশে সাজা দেয়া হয়না, সে দেশ অপরাধীদের দখলে যায়। তখন প্লাবন আসে অপরাধ কর্মে্। তখন দুর্নীতিই নীতিতে পরিণত হয়। এবং তারই উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। ০২/০৩/২০২১।




বিবিধ ভাবনা (৩১)

ফিরোজ মাহবুব কামা

১. ব্যর্থতার রেকর্ড

ঘরে আগুণ লাগলে বা ডাকাত পড়লে নিজেদের মধ্যে বিবাদ করা যায় না। দেরী্ও করা যায় না। অন্য সব কাজ ফেলে তখন যার যা সামর্থ্য আছে তা দিয়ে আগুণ থামাতে বা ডাকাত নির্মূলে নামতে হয়। এটিই সভ্য মানুষের গুণ। এভাবেই দায়িত্ববোধের পরীক্ষা হয়। কিন্তু পশুরা সে কাজ করে না। আগুণ দেখে তারা পালায় এবং ডাকাতের কাছে বিনা প্রতিবাদে আত্মসমর্পণ করে। এ পরীক্ষায় ফেল করলে তীব্রতর হয় ডাকাতীর আযাব। তখন আরো নৃশংসতর হয় ডাকাতি। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ সে পরীক্ষায় বহু বছর আগেই ফেল করেছে।

সভ্য মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদটি হলো তার স্বাধীনতা। পানাহার পশুরাও পায়; কিন্তু স্বাধীনতা পায় না। পশুদের তাই গলায় পরাধীনতার রশি নিয়ে বাঁচতে হয়। যে কোন সমাজে অতিশয় অসভ্য কর্ম হলো ভোটের উপর ডাকাতি। সম্পদের উপর ডাকাতি হলে মানুষ স্বাধীনতা হারায় না। কিন্তু ভোটের উপর ডাকাতি হলে মানুষও গরুছাগলের ন্যায় স্বাধীনতাহীন অসহায় জীবে পরিণত হয়। তাদেরকে তখন ডাকাতদের কাছে আত্মসমর্পণ নিয়ে বাঁচতে হয়। ভোটডাকাতগণই হলো সবচেয়ে অসভ্য, নিকৃষ্ট ও নৃশংস জীব। এবং বাংলাদেশে তাদের সংখ্যাটি বিশ্বে যে কোন দেশের চেয়ে বেশী। বাংলাদেশ অতীতে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের সকল দেশকে হারিয়ে ৫ বার প্রথম হয়েছে। নিঃসন্দেহে ডাকাতের সংখ্যাতেও তারা প্রথম হবে। এটি বাংলাদেশীদের ব্যর্থতার আরেক দলিল।

সভ্য মানুষেরা শুধু সম্পদের উপর ডাকাতি্‌ই রুখে না, রুখে দাঁড়ায় ভোটের উপর ডাকাতিও। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ সে ডাকাতি রুখতে ব্যর্থ হয়েছে। গরু-ছাগলের পালে শিকার ধরতে নেকড়কে বেগ পেত হয় না। ভোটডাকাতেরা তেমনি অবাধে ডাকাতি করে প্রতিরোধহীন জনগণের উপর। বাংলাদেশীদের ভোটের উপর প্রথম ডাকাতি হয় ২০১৪ সালের নির্বাচনে। সে নির্বাচনী ডাকাতিতে ১৫৩টি আসনে কোন নির্বাচনই হয়নি। এবং যেসব আসনে নির্বাচন হয়েছিল সেখানেও সুপরিকল্পিত ডাকাতি হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বাঁচায় রুচি থাকলে যে কোন সভ্য দেশের ন্যায় সেখানেও যুদ্ধ শুরু হতো। জনগণ সেদিন যুদ্ধে নামলে ২০১৮ সালের ন্যায় ভোটডাকাতিতে ভোটডাকাতগণ সাহস পেত না।    

২. বিরোধী দলের বিবেকহীনতা

দেশ সবার। ডাকাতদের হাত থেকে দেশ বাঁচানোর দায়িত্বটিও সবার। নীরবে বসে থাকলে ডাকাতের সাহস বাড়ে আরো বেশী ডাকাতি করার। ডাকাতগণ একতাবদ্ধ। তাই জনগণ কি বিভক্ত থাকতে পারে? বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলির মাঝে রয়েছ নানা মত ও পথ নিয়ে বহু মতভেদ। কিন্তু অন্ততঃ একটি বিষয়ে তারা একতাবদ্ধ হতে পারতো। সেটি ভোটডাকাতদের নির্মূলে। কিন্তু তারা একতাবদ্ধ হতে পারিনি। তারা বিভক্ত। ডাকাত তাড়াতে তারা ময়দানে নাই। এটিই তাদের বড় ব্যর্থতা। এটি তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতাও। এ ব্যর্থতা নিয়ে তারা দেশের কি কল্যাণ দিতে পারে? দেশে ডাকাত পড়েছে সেটি দেখেও যদি ডাকাত তাড়াতে না নামে -তবে তাদের যে কান্ডজ্ঞান ও বিবেক আছে সেটি বুঝা যাবে কি করে?

৩. যেদেশে ডাকাতেরা সন্মানিত হয়

প্রতিটি সভ্য দেশেই চোর-ডাকাতদের জেলে পাঠানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তারাই সন্মানিত। অথচ চোরডাকাতদের ঘরের চাকর-বাকারও বানানো যায়না। কিন্তু বাংলাদেশে ডাকাতই শাসক। ডাকাত সর্দারনীকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা হয়। ডাকাতকে সামনে বসিয়ে তার বয়ান শোনা হয়। এটি তো ডাকাতপাড়ার সংস্কৃতি। অথচ সে অসভ্য সংস্কৃতি আজ বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কিছু দালানকোঠা ও রাস্তাঘাট গড়ে কি অসভ্যতাকে ঢাকা যায়? 

ভোটডাকাতগণ সাধারণ চোরডাকাত নয়। তাদের অপরাধ অন্য ডাকাতদের চেয়ে লক্ষগুণ অধিক। সাধারণ ডাকাতেরা অর্থ লুট করে। অথচ ভোটডাকাতগণ ছিনতাই করে সমগ্র দেশ। দেশে চোরডাকাতদের শা্স্তি দেয়ার জন্য বহু শত আদালত রয়েছে। সে সব আদালতে বহুশত বিচারকও রয়েছে। দেশে পুলিশ বাহিনীও রয়েছে। বাংলাদেশে দেশ জুড়ে ভোটডাকাতি হলো। দেশবাসীও সেটি দেখলো। শিশুরাও সেটি জানলো। কিন্তু পুলিশ কাউকে ধরলো না; আদালতেও কোন বিচার হলো না। ফলে সে অপরাধে কারো কোন শাস্তি হলো না। কোন সভ্য দেশে কি এটি ভাবা যায়?

গৃহ যতক্ষণ ডাকাতের দখলে থাকে সে গৃহে শান্তিতে বসবাসের কথা ভাবা যায় না। তেমনি দেশ যখন ডাকাতদের দখলে যায় -শান্তি তখন হাওয়া হয়ে যায়। বাংলাদেশের মূল সংকট এখানেই্। তাই দেশে এখন একটাই যুদ্ধ, সেটি ডাকাত তাড়ানোর। এ যুদ্ধে বিজয়ের উপর নির্ভর করবে দেশের মানুষ সভ্য জীবন ফিরে পাবে কিনা সে বিষয়টি।

৪. ব্যর্থতা মুসলিম হওয়ায়

ছওয়াবের কাজ হলো ক্ষুধার্তের জন্য সামান্য খাবার পেশ করা। তেমনি অতিশয় ছওয়াব কাজ হলো জ্ঞানের ক্ষুধা দূর করতে জ্ঞানের কথা গুলো মানুষের সামনে লাগাতর পেশ করা। কেউ তা গ্রহণ না করলেও যে পেশ করবে সে ছওয়াব পাবে। সমাজ থেকে অজ্ঞতার অন্ধকার তো এভাবেই দূর হয়। মানব জীবনে সবচেয়ে বড় নেক কর্ম তো অন্ধকার সরানো। ইসলামে তাই নামায-রোযার আগে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করা হয়েছে।

মহান নবীজী (সা:)’র হাদীস: ঈমানদারের জীবনে দুই অবস্থা। হয় সে ছাত্র, নতুবা সে শিক্ষক। কোন তৃতীয় অবস্থা নাই। তাই শেখা ও শেখানো নিয়ে আমৃত্যু বাঁচাই হলো মুসলিম সংস্কৃতি। কখনো তাকে নামতে হয় শিক্ষকের ভূমিকায়, কখনো সে ভূমিকাটি হয় ছাত্রের্। যার জীবনে সে রকম ভূমিকা নাই, বুঝতে হবে তার মুসলিম হওয়ায় বিশাল ব্যর্থতা রয়ে গেছে। আজ মুসলিম বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানে যে পশ্চাতপদতা তার মূল কারণ মুসলিমদের মুসলিম হওয়ায় ব্যর্থতা।   

৫.অখাদ্যের বিপদ

যে খাদ্য পুষ্টি দেয় না -তা অখাদ্য। তাতে শরীরের পতন ঘটে। তেমনি যে বই চেতনায় ও চরিত্রে পুষ্টি জোগায় না –সেটিও ক্ষতিকর অখাদ্য। বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের মাঝে ঘুষ, সূদ, দুর্নীতি, ব্যভিচার ও নানারূপ চরিত্রহীনতা দেখে বলা যায় তারা চেতনা পুষ্টি পায়নি। বিদ্যাশিক্ষার নামে যেসব বই পড়ানো হয়েছে তাতে তাদের মগজে অখাদ্য ঢুকানো হয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্য দেখে বলা যায় -সে কি খায়। তেমনি চেতনা ও চরিত্র দেখে নির্ভূল ভাবেই বলা যায় -সে কি পড়ে।

 

৬. বাঁচছে ইসলাম ছাড়াই

বাংলাদেশীদের মূল সমস্যাটি হলো তারা ইসলাম থেকে বহু দূরে সরেছে। ফলে তারা আগ্রহী নয় নবীজী (সা:)’র ইসলামে ফিরে যেতে –যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ, জিহাদ, শুরা, বিশ্বমুসলিম ভাতৃত্ব। বস্তুত তারা বাঁচছে ইসলাম ছাড়াই। বাংলাদেশীদের মাঝে ইসলাম থাকলে ভোটডাকাত সরকারের নির্মূলে জিহাদ শুরু হতো। বিভক্তির বদলে একতা প্রতিষ্ঠা পেত। লাগাতর লড়াই হতো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে।

ইসলামের পথে থাকলে কখনোই ভারতীয় কাফেরদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে ভারতের শত্রু পাকিস্তানকে ভাংঙ্গতো না। এবং মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্র হত্যাকারি, বাকশালী স্বৈরাচারী ও প্রায় ৩০ হাজার মানুষের হত্যাকারি এক ভারতীয় দালালকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলতো না। জনগণের মাঝে ইসলাম বেঁচে থাকলে দেশ দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হতো না।

৭. মহান আল্লাহতায়ালা প্রতি ভালবাসার বিষয়

বাংলাদেশে আল্লাহতায়ালার আশেক এবং রাসূলের আশেক বলে অনেকেই নিজেদের জাহির করে। কিন্তু সেটি প্রচারের বিষয় নয়। কে কতটা মহান আল্লাহতায়ালাকে ভাল বাসে -সেটি তো খালি চোখে দেখা যায়। দেশ থেকে তাঁর সার্বভৌমত্ব বিলুপ্ত করা হলো এব্ং আদালত থেকে তাঁর শরিয়তী বিধানকে বিলুপ্ত করা হলো -অথচ তা নিয়ে মনে কোন ক্ষোভ সৃষ্টি হলো না এবং সে শরিয়তী বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য লড়াইয়ে নামলো না, সে ব্যক্তি নামাযী ও রোযাদার হতে পারে কি্ন্তু তার মনে যে শরিষার দানা পরিমান মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি ভালবাসা নাই –তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ থাকে? মহান আল্লাহতায়ালাকে ভালবাসার অর্থ তার বিধানকে ভালবাসা ও সে বিধানের বিজয় নিয়ে বাঁচা। কথা হলো, সে ভালবাসা জনগণের থাকলে কি তাঁর শরিয়ত বিলুপ্ত হতো?

৮. কেন এতো অনৈক্য?

আল্লাহতায়ার দ্বীনকে বিজয়ী করা ও তাঁকে খুশি করা যখন বাঁচার লক্ষ্য হয় তখন সে ব্যক্তি একতা গড়ার জন্য দিবারাত্র পেরেশান হয়। এমন এক পেরেশানীর কারণেই শতাধিক নবী একই সময়ে একই স্থানে প্রেরণ করলেও তাদের মাঝে কোন অনৈক্য হতো না।

কিন্তু রাজনীতির লক্ষ্য যখন নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয়স্বার্থ হাছিল হয়, তখন মুখে ইসলামের কথা বললেও তারা স্বার্থকেন্দ্রীক বিভক্তির পথ ধরে। তখন রাজনীতিতে লক্ষ্য হয় ক্ষমতায় ভাগ বসানো, দ্বীনের বিজয় নয়। ক্ষমতায় ভাগ বসানোর লক্ষ্যে তখন সেক্যুলারিস্টদের ন্যায় ইসলামের শত্রুদের সাথে কোয়ালিশন গড়াও তখন জায়েজ হয়ে যায়। বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের মাঝে অনৈক্যের মূল কারণ হলো এই স্বার্থপরতা।

৯. স্বৈরশাসনের নাশকতা

মানবের শ্রেষ্ঠ সামর্থ্যটি হলো নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য। এর বলেই উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয়। কিন্তু স্বৈরশাসকের বড় নাশকতাটি হলো সে সামর্থ্য নিয়ে জনগণকে স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠতে দেয়া হয়না। তখন চলে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ। দুর্বৃত্ত শাসকগণ দেয় নিজের দলীয দুর্বৃত্তদের স্বাধীনতা। তখন প্রতিষ্ঠা পায় শাসকপূজা। এবং দাপট বাড়ে আনুগত্যজীবীদের। চাটুকারীতা ছাড়া কোন বুদ্ধিবৃ্ত্তিক কর্ম্ ও সাহিত্যকর্ম গড়ে উঠে না।

ফলে ফিরাউনদের মত স্বৈরশাসকদের শাসনে বড় বড় পিরামিড নির্মিত হলেও কোন সভ্য মানুষ ও উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয়নি। স্বৈরশাসক মানেই অসভ্যতার আযাব্। শাসকের অসভ্যতা তখন দেশ জুড়ে অসভ্যতা বাড়ায়। সে অসভ্যতার আযাব চেপে বসেছে এখন বাংলাদেশীদের উপর। তাই স্রেফ কিছু রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা ও স্কুল-কলেজ নির্মাণ করে স্বৈরশাসনের অসভ্যতা থেকে বাঁচা যাবে না। সভ্য সমাজ নির্মাণের কাজও হবে না, সেজন্য অপরিহার্য হলো স্বৈরশাসনের নির্মূল। বাংলাদেশের মানুষ কতটা সভ্য ভাবে বাঁচতে আগ্রহী -তার পরীক্ষা হবে স্বৈরশাসন নির্মূলের এ লড়াইয়ে। ২৮/০২/২০২১।  




বাঙালী মুসলিমের বিরুদ্ধে ভারতের কেন এতো আক্রোশ এবং প্রতিরোধই বা কীরূপে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 দখলদারিটি ভারতের

বাংলাদেশে রাজনীতির খেলা শেখ হাসিনার হাতে নেই। রাজনীতির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনকালেই চাকর-বাকরের হাতে থাকে না; মনিবরা সব সময়ই সেটি নিজ হাতে রাখে। এমনকি একাত্তরেও আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেখ মুজিব বা দলের হাতে ছিল না। সেটিই সব সময়ই ছিল মুজিবের মনিব দিল্লির শাসকচক্রের হাতে। মুজিব রাজনীতির খেলা খেলেছে স্রেফ ভারতের শাসকচক্রের অনুগত সেবাদাস রূপে। সে কাজটি মুজিব বাংলাদেশ সৃষ্টির বহু পূর্ব থেকেই করে আসছিল এবং সেটি চালিয়ে গেছে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টে মৃত্যু অবধি। তবে মনিবরা যেহেতু তাদের খেলাটি খেলে চাকর-বাকরের সাহায্যে, ফলে তাদের কাছে চাকর-বাকরের গুরুত্ব থেকেই যায়। ভারতের কাছে মুজিবের যেমন গুরুত্ব ছিল, তেমনি গুরুত্ব রয়েছে হাছিনারও। এজন্যই চাকর-বাকরকে বাঁচিয়ে রাখাটি তাদের রাজনৈতিক কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ যে শতভাগ সত্য ছিল -সেটি আওয়ামী লীগ নেতা ও সে মামলার অপর আসামী লে.কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) শওকত আলী এবং অন্যন্যরাও স্বীকার করেছেন। ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনের চাপে পাকিস্তান সরকার মুজিবের বিরুদ্ধে আানা মামলা তুলে নিতে বাধ্য হলেও সে ষড়যন্ত্রে মুজিবের নির্দোষ থাকাটি প্রমাণিত হয়নি। তাছাড়া মামলা থেকে ছাড়া পেলেও ভারতের পক্ষ থেকে অর্পিত মিশন থেকে মুজিব এক ইঞ্চিও সরেনি। পাকিস্তানের জেল থেকে ফিরে শেখ মুজিব প্রথম জনসভা করেন রেস কোর্স ময়দানে -যা আজ সোহরোওয়ার্দী ময়দান। সেটি ছিলে ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারীতে। সেদিন তিনি বলেন, “স্বাধীনতার লড়াই ১৯৭১ থেকে নয় ১৯৪৭সালে শুরু করেছিলাম।” আমি নিজ কানে সে কথা শুনেছি। অথচ তার সে লড়াইয়ে কথা তিনি জনগণকে বলেননি। তবে নিশ্চয়ই বলেছিলেন তার মনিব ভারতেকে এবং ভারতের সাথেই গোপনে কাজ করছিলেন -যা ধরা পড়ে আগরতলা ষড়যন্ত্রে। ষড়যন্ত্রের রাজনীতি কখনোই জনগণকে বলা হয়না। তাই মুজিবও বলেনিন। তবে ভারতের ষড়যন্ত্র পাকিস্তান ভাঙ্গা ও মুজিবের মৃত্যুতে শেষ হয়নি। তাই মুজিবের মৃত্যুতে ভারতের কাছে কদর বেড়েছে শেখ হাসিনার।   

আওয়ামী লীগের রাজনীতির ড্রাইভিং সিটে সব সময়ই ছিল দিল্লির শাসকচক্র। তাই মুজিব ১৯৭১’য়ের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানের জেলে গেলেও আওয়ামী লীগের ভারতসেবী রাজনীতির গাড়ি এক দিনের জন্যও থেমে থাকেনি। ভারত যা চেয়েছে -তাই হয়েছে। মুজিবের মুখ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ারও প্রয়োজন পড়েনি। সে গাড়ি ভারতের কাঙ্খিত লক্ষ্যের দিকে চলাটি অবিরাম অব্যাহত রেখেছে। পাকিস্তান সরকার অনেক দেরীতে হলেও সেটি বুঝেছিল। তাই ১৯৭১’য়ের সেপ্টম্বরের দিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার প্রশ্নে রেফারেন্ডামের প্রস্তাব দেন। আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনটি লড়েছে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র তৈরীর দাবী নিয়ে। তাই সে নির্বাচনের আওযামী লীগের বিজয়টি পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে দলিল হতে পারে না। তাই স্বাধীনতার বিষয়ে একটি রিফারেন্ডামের প্রস্তাব দিয়ে ইয়াহিয়া খান দূত পাঠায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির কাছে। কিন্তু ইন্দিরা সে প্রস্তাব অস্বীকার করেন। কারণ, সোভিয়েত রাশির সামরিক ও রাজনৈতিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়ে ভারতের তখন মূল লক্ষ্যটি হয় পাকিস্তান ভাঙ্গা; এবং তা থেকে পিছু হটতে রাজী ছিল না। এবং আরো লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশের মেরুদন্ড ভাঙ্গাও। এভাবে ভারত চায়, দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের শক্তিহীন করতে। তেমন একটি ধ্বংসাত্মক অভিসন্ধির কারণে যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় সৈন্যদের প্রবেশ ও লুটতরাজ অপরিহার্য ছিল। এমন একটি লক্ষ্য নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধের প্রস্তুতি সেপ্টম্বরের মধ্যেই বহুদূর এগিয়ে নিয়েছিল। ফলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের রিফারেন্ডামের প্রস্তাব মেনে নিলে ভারতের সে লক্ষ্যটি কখনোই অর্জিত হতো না।

উপমহাদেশে যুদ্ধটি ভারত ও পাকিস্তানের মাঝের নয়। বরং সেটি হিন্দু ও মুসলিমের মাঝে। যখন পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠা পায়নি, সে লড়াইটি তখনও ছিল। মুসলিম শক্তি গুড়িয়ে দেয়ার প্রথম চেষ্টা করে শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠারা। সে কাজের জন্য শিবাজী রবীন্দ্রনাথের কাছে পূজনীয়; বাংলায় তিনি শিবাজী উৎসব শুরু করেন এবং শিবাজীর সন্মানে কবিতাও লেখেন। একই মিশন ছিল ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতীয় নেতাদের। ভারতের সে মিশন পূরণে সহায়তা দেয় শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ। দক্ষিণ এশিয়ার বুকে মুসলিম শক্তির্ দুটি ডানা: একটি পাকিস্তান , অপরটি বাংলাদেশ। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির লক্ষ্য ছিল, উভয় ডানাকে দুর্বল করা। ফলে তার পরিকল্পনা ছিল: এক). পাকিস্তান খণ্ডিত করা ও দুর্বল করা, দুই). বাংলাদেশের অর্থনীতির বিনাশ এবং রাজনীতিতে ভারতসেবীদের অধিকৃতি। রাজনৈতিক অধিকৃতি অর্জন করে ক্ষমতার আসনে মুজিব ও তার দলকে বসিয়ে। এবং অর্থনীতিতে ধ্বস আনতে শুরু করে সমগ্র সীমান্ত জুড়ে ব্যাপক লুটপাট। সে লুটপাট সহজতর করতে সীমান্ত-বাণিজ্যের নামে বিলুপ্ত করে বাংলাদেশের সীমান্ত। অথচ সীমান্ত বিলুপ্ত হওয়ার অর্থ: অর্থনীতির তলা বিলুপ্ত হওয়া। বাংলাদেশ তাই মুজিবের শাসনামলে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি পায় ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি রূপে। শুধু দেশী সম্পদই নয়, বিদেশীদের দেয়া ত্রাণসামগ্রীও তখন ভারতে চলে যায়। সে পরিকল্পিত লুটপাটের ফলে দেশবাসীর উপর নেমে আসে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ -যাতে মারা যায় বহু লক্ষ বাংলাদেশী। বাংলাদেশীদের জন্য এ ছিল ভারতের বিশেষ উপহার।

 

কেন এতো ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে?

১৯৭১’য়ের যুদ্ধে বড় ক্ষতিটা পাকিস্তানের হয়নি। সেটি হয়েছে বাংলাদেশের। যুদ্ধের কারণে পাকিস্তান তলাহীন ভিক্ষার থলি হয়নি। সে দেশে দুর্ভিক্ষ নেমে আসেনি। লক্ষ লক্ষ মানুষ পাকিস্তানে না খেয়ে মারা যায়নি। পাকিস্তানের কোন বস্তিতে জালপড়া বাসন্তিও সৃষ্টি হয়নি। বরং একাত্তরের যুদ্ধের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলি পাকিস্তানের জন্য সদয় হয়; এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিয়ে তাদের শ্রম বাজার পাকিস্তানীদের উম্মুক্ত করে দেয়। ফলে বহু লক্ষ পাকিস্তানী চাকুরীর সুযোগ পায়। অথচ দুর্ভিক্ষ এসেছে এবং জালপড়া বাসন্তি সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। কারণ, বাংলাদেশের মাটিতে ভারত শুধু যুদ্ধই করেনি, ভয়ানক দস্যুবৃত্তিও করেছে। প্রশ্ন হলো, বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে ভারতের কেন এতো আক্রোশ? এর সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। ইন্দিরার অজানা ছিল না যে, পাকিস্তানের মূল স্রষ্টা বাঙালী মুসলিম। মুসলিমের প্রতিষ্ঠা লাহোর বা করাচীতে হয়নি, হয়েছে ঢাকায়। তাছাড়া ১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল যুদ্ধটি লড়া হয়েছিল অবিভক্ত বাংলার রাজধানি কলকাতায়। বিশেষ করে সেটি ১৯৪৬ সালের ২৩ আগষ্ট মুসলিম লীগের ডাইরেক্ট এ্যাকশন দিবসে। কলকাতার গড়ের মাঠের মিছিল থেকে ফেরার পথে ৫ হাজারের বেশী বাঙালী মুসলিম সেদিন হিন্দু গুন্ডাদের হাতে প্রাণ দিয়েছিল। সে রক্তের বন্যায় ভেসে য়ায় কংগ্রেসের অবিভক্ত ভারত সৃষ্টির স্বপ্ন। ১৯৪৬’য়ের নির্বাচনে শতকরা ৯৬% বাঙালী মুসলিম মুসলিম লীগের পাকিস্তান প্রকল্পের পক্ষে ভোট দেয়। অথচ পাঞ্জাব, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশের মুসলিমগণ পাকিস্তানের পক্ষে এরূপ সমর্থণ দেয়নি। ফলে বাঙালী মুসলিমদের শায়েস্তা করার নেশাটি ভারতীয় হিন্দু নেতাদের মজ্জাগত। এবং সেটিই দেখা যায় একাত্তর-পরবর্তী ভারতীয় সেনাবাহিনীর নৃশংস লুন্ঠনে।

বাঙালী মুসলিমদের মেরুদন্ড চূর্ণ করা ও শাস্তি দেয়ার ভারতীয় প্রকল্পটি ছিল বহুমুখী। সেটি শুধু সীমাহীন লুন্ঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি বানানো নয়। স্রেফ একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ উপহার দেয়াও নয়। শুধু সীমান্ত বিলোপও নয়্। বরং সেটি ছিল, যে ঢাকা শহরে পাকিস্তানের জন্মদাতা মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল সে শহরের বুকে মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে কলংকজনক নাটকটি মঞ্চস্থ করা। সেটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের হাজার হাজার সৈন্যের আত্মসমর্পণের নাটক – যা লজ্জাজনক ছিল শুধু পাকিস্তানের জন্যই নয়, সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের জন্যও। ১৯৭১’য়ে ১৫ আগষ্ট তারিখেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু দিল্লির শাসকচক্র চাচ্ছিল পাকিস্তানের পরাজয় ও বেইজ্জতির মহড়াটি বিশাল আকারে হোক। চাচ্ছিল, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝের সৃষ্ট ঘৃনাটি গভীরতর হোক। তেমন একটি নাটকের জন্যই নির্ধারিত হয় ঢাকার রেসকোর্স ময়দান। সেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয় একজন ইহুদীর কাছে। উল্লেখ্য, তখন ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ ছিলেন মেজর জেনারেল জে. এফ. আর. জেকব। তিনি ছিলেন একজন ইহুদী। এ দিনটিতে বাঙালি সেক্যুলার কাপালিকগণ তাদের হিন্দু কাফের বন্ধুদের সাথে মিলে আনন্দ-উৎসব করলেও বিশ্বের তাবত মুসলিমের হৃদয় সেদিন বেদনাসিক্ত হয়েছিল। দিনটি তাদের জন্য আদৌ আনন্দদায়ক হলে বাংলাদেশকে তারা সাথে সাথে স্বীকৃত দিত। কিন্তু দেয়নি।

ভারতের সে কুৎসিত প্রতিশোধ-পরায়ন মানসিকতার বর্ণনা দিয়েছেনে ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার ঢাকার ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় ‘Beyond the Lines’ শিরোনামায প্রকাশিত তাঁর নিবন্ধে। মিস্টার নায়ার লিখেছেন, একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারতীয় বাহিনীর কাছে অস্ত্রসমর্পণের জন্য প্রস্তুত থাকার পরও এবং সেভাবে প্রক্রিয়া শুরুর পরও বিষয়টি ঘটে ২৪ ঘণ্টা পরে এবং নজিরবিহীনভাবে খোলা মাঠে। কেন এটা ঘটেছিল? এ সম্পর্কে তখনকার ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে. এফ. আর. জেকব সাংবাদিক মি. কুলদিপ নায়ারকে জানান, “New Delhi wanted to humiliate Islamabad by showing that Muslim country had laid down arms before a Jew.”  অর্থ: “নয়া দিল্লি চাচ্ছিল ইসলামাবাদকে অপদস্ত করতে, সেটি এরূপ এক প্রদর্শনীর মাধ্যমে যে একটি মুসলিম দেশ একজন ইহুদীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছে।” ঢাকা শহরটি অন্য কোন কারণে না হোক, অন্তত এই একটি মাত্র কারণে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম ইতিহাসে কিয়ামত অবধি বেঁচে থাকবে। সেটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশের সেনাবাহিনীর বেইজ্জতি করার ভূমি রূপে। অথচ পাকিস্তানের সৃষ্টিতে বাঙালী মুসলিমদের অবদানটাই ছিল সর্বাধিক। বাংলাদেশ তার মানচিত্র পেয়েছে পাকিস্তান থেকেই। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত না হলে বাংলাদেশ হতো আরেক অধিকৃত কাশ্মীরে।

 

যে বেইজ্জতি মুক্তিবাহিনীর

১৯৭১’য়ের ১৬ ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনীর অপমানটিও কি কম ছিল? যুদ্ধ হলো বাংলাদেশের মাটিতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনটি মুক্তিবাহিনীর সদস্যগণ নিজেদের নিজস্ব অর্জন মনে করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো,পাকিস্তানের সেনা বাহিনী কি মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে? ভারতের অর্থে ও ভারতের ক্যাম্পে ভারতের ভাত-পানি খেয়ে গড়ে উঠা মুক্তিবাহিনীকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কোন গুরুত্বই দেয়নি। তাদের কাছে তাই আত্মসমর্পণও করেনি। আত্মসমর্পণ করেছে মুক্তিবাহিনীর মনিবের কাছে। বাংলাদেশ থেকে তাদের যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে নিতেও পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনা করার প্রয়োজনও বোধ করেনি। সেটিও তারা করেছে দিল্লি সরকারর সাথে। ফলে বাংলাদেশ সরকার যে ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের যে অভিযোগ্টি এনেছিল, সে অভিযুক্তদের কেশাগ্র স্পর্শের সুযোগও পায়নি। বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্রশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের চোখের সামনে দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী লুটে নিয়ে যায়। পাকিস্তানের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ পূর্ব পাকিস্তানী হওয়ায় সে অস্ত্র কেনায় অধিকাংশ অর্থ জোগাতে হযেছে বাংলাদেশীদের। অতএব সে অস্ত্র বাংলাদেশে রাখার বৈধ অধিকার ছিল বাংলাদেশর। কিন্তু ভারত সেটি চায়নি। মনিবের সে অস্ত্র লুটের কান্ডটি নীরবে দেখা ছাড়া আওয়ামী বাকশালী পক্ষটি কি কিছু করতে পেরেছিল? তাছাড়া কিছু করার আগ্রহও কি ছিল? ভারতীয় সরকার এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সাথে সামান্যতম আলোচনার প্রয়োজনও বোধ করেনি। মনিবরা কি কখনো চাকর-বাকরের অনুমতি নেয়? বা তাদের সাথে পরামর্শ করে? দিল্লির শাসকদের মনভাব কি আজও ভিন্নতর? দিল্লিস্থ মনিবগণ আজও যা চাচ্ছে বাংলাদেশকে তাই দিতে হচ্ছে। সেটি দেশের অভ্যন্তর দিয়ে করিডোর হোক, তিস্তা বা পদ্মার পানি তুলে নেয়া হোক বা টিপাইমুখে বাধ নির্মাণ হোক।

 

ভারতের ইসলাম ও মুসলিমভীতি

পাকিস্তান ভাঙ্গা ও দেশটির মেরুদন্ড দুর্বল করার পর ভারতের লক্ষ্য এবার বাংলাদেশের মেরুদন্ড ধ্বংসিয়ে দেয়া। তাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশ স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ পেলে দেশটি বহু ভাষা, বহু বর্ণ ও বহু গোত্রে বিভক্ত পাকি্স্তানের চেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র রূপে বেড়ে উঠার সুযোগ পাবে। তাছাড়া এ অঞ্চলে বাংলাদেশ,পশ্চিম বাংলা, আসাম ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠির বসবাস। তাদের মাঝে রয়েছে ভাষাগত ও বর্ণগত সংহতি। নেই শিয়া-সূন্নীর বিভেদ। অতীতে বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের যে উত্থান ঘটেছিল -সেটি সুজলা-সুফলা বিশাল কোন সমৃদ্ধ ভূমি থেকে হয়নি। হয়েছিল জনবিরল এক নিঃস্ব মরুর বুক থেকে। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ কম কিসে? জনবহুল মুসলিম দেশ হওয়াটাই শত্রুর নজরে পড়ার জন্য যথেষ্ঠ ছিল। তাছাড়া আজ ১৭ কোটি মুসলিমের যে বাংলাদেশ -সেটি ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে ১৭ জন মুসলিম মুজাহিদের বিজয়ের দান। এখন ভারতের সীমান্তে দন্ডায়মান ১৭ জন তুর্কি মুসলিম নয়, বরং ১৭ কোটি মুসলিম। বহু কোটি মুসলিমের বাস ভারতের অভ্যন্তরেও। ভারতীয়দের মনে তাই প্রচন্ড মুসলিম-ভীতি। এমন মুসলিম ভীতির কারণে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের আচরন তাই বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার আশা নাই। ব্রিটিশদের হাতে বাংলা অধিকৃত হওয়ার ফলে ব্রিটিশের প্রশ্রয়ে মুসলিম ও হিন্দুদের মাঝের সম্পর্ক পরিণত হয় চাকর ও মনিবের সম্পর্কে। মনিব ছিল হিন্দু জমিদার। চাকর-বাকরকে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়া হলেও তাকে কি কখনো স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ দেয়া হয়? সুযোগ দেয়া হয় কি শিক্ষাদীক্ষার? বাঙালী মুসলিমদের পদানত রাখাই তখন রীতি হয়। বাঙালী মুসলিমদের পাকিস্তানের প্রয়োজনীতা বুঝাতে তাই সেদিন বেশী বক্তৃতার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু বিপদের কারণ হলো, ১৯৭১’য়ের পর বাঙালী মুসলিমদের জীবনে গোলামীর সে দিন আবার ফিরে এসেছে; স্বাধীনতা এসেছে শুধু ভারতের সেবাদাসদের।

ব্রিটিশের প্রতিপালনে বাঙালী হিন্দুর জীবনে রেনেসাঁ এসেছিল। কিন্তু বাঙালী হিন্দুর সে রেনেসাঁ মুসলিমদের জীবনে প্রচন্ড দুঃখ ও নাশকতা বাড়িয়েছিল। তখন বাঙালী মুসলিমের কাঁধে চেপেছিল দুটি জোয়াল। একটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শত্রুদের। অপরটি হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের। বাঙালী মুসলিমদের বেড়ে উঠার সে সুযোগ কেড়ে নিতেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চলছে লাগাতর ষড়যন্ত্র। এবং সেটি ১৯৪৭ সালের পূর্ব থেকেই। ১৯০৫ সালে বাংলার হিন্দুগণ আন্দোলন করেছে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে। কারণ বঙ্গভঙ্গে তারা বাংলার মুসলিমদের কল্যাণ দেখেছিল। এমন কি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও কলকাতায় বড় বড় মিছিল করা হয়েছে। সে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এটি এক বিস্ময়ের বিষয়। মানব ইতিহাসের আর কোথায়ও কি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে? কিন্তু সেটি হয়েছে কলকাতার রাজপথে। এমন একটি কদর্য আন্দোলনের জন্য বিবেকের পচনটা যে কত গভীর হওয়া দরকার -সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন? হিন্দু মনে এমন গভীর ঘৃনা ও বিদ্বেষের কারণেই বাঙালী মুসলিমদের সংখ্যানুপাতে সরকারি চাকুরিতে প্রবেশের যে ন্যায্য দাবিটি দেশবন্ধ চিত্তরঞ্জন দাশ মেনে নিয়েছিলেন -সেটিও কলকাতার হিন্দু বাবুগণ মেনে নেয়নি। এমন এক বৈরী মানসিকতা আজও বেঁচে আছে ভারতের আগ্রাসী হিন্দুদের মনে। ফলে তা অসম্ভব করেছে বাংলাদেশের সাথে ভারতের প্রতিবেশীসুলভ সুসম্পর্ক গড়ে উঠাকে।

কোন ভদ্রলোক কি প্রতিবেশীর ঘরের পাশ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া দেয়? এটি তো প্রতিবেশীকে চোর-ডাকাত ভাবার লক্ষণ। কোন ভদ্র প্রতিবেশী দেশ কি লাশ ঝুলিয়ে রাখে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায়? কেড়ে নেয় কি নদীর পানি? নদীমুখে দেয় কি বাঁধ? ভারত থেকে নদী দিয়ে পাথর গড়িয়ে যাতে বাংলাদেশে না পড়ে -তার জন্য কতো সাবধানতা! ভারতীয়দের মনের কুৎসিত চিত্রটি কি এরপরও গোপন থাকে? বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আজ যা কিছু ঘটছে -সেটি তো পুরনো ষড়যন্ত্রেরই ধারাবাহিকতা। তাছাড়া বিশ্বব্যাপী ইসলামের জোয়ার দেখে ইসলামের শত্রুপক্ষ তো আরো আতংকিত। বাংলাদেশে ইসলাম জোয়ার রুখা তাই ভারতীয়দের কাছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ। তাই বাংলাদেশের নির্বাচনে পুঁজি বিনিয়োগ ও নির্বাচনের ফলাফলটি পক্ষে আনা ভারতীয়দের কাছে আনবিক বোমা বা দূরপল্লার মিজহাইল বানানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজে ভারতীয়গণ বিশ্বস্থ মিত্র রূপে বেছে নিয়েছে আওয়ামী বাকশালীদের। একাত্তরে যাদেরকে সাথে নিয়ে ভারত পাকিস্তান ভেঙ্গেছিল,তাদেরকে সাথে নিয়েই আজ তারা বাংলাদেশের মেরুদন্ড ভাঙ্গায় নেমেছে। লক্ষ্য এখানে ইসলাম নির্মূলও। বাংলাদেশে গণতন্ত্র আজে কবরে শায়ীত; ভোট-ডাকাতেরা আজ ক্ষমতাসীন। এসবই তো ভারতীয় ষড়যন্ত্রের ফসল। চাকর-বাকরেরা কখনোই মনিবের চরিত্র নিয়ে ভাবে না। ব্যাভিচারি দুর্বৃত্ত মনিবও চাকরবাকরদের কাছে প্রনামযোগ্য মহাপ্রভু গণ্য হয়। এমন চাকরবাকরদের কাছে ফিরাউন তো ভগবান রূপে স্বীকৃতি পেয়েছে। ভারতীয়দের আগ্রাসী কদর্য চরিত্রও তাই আওয়ামী বাকশালীদের নজরে পড়েনা। তাই কোন ভারতীয় নেতা বা নেত্রী বাংলাদেশে এলে তখন চাকর-পাড়ায় মহোৎসব শুরু হয়।

 

লড়াই এখন ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে 

বাংলাদেশের মাটিতে আজ যে লড়াই, সেটি নিছক নিরপেক্ষ নির্বাচন ও গণত্ন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই নয়। এটি দেশের স্বাধীনতার বাঁচনোর লড়াই। লড়াই এখানে ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠার। শত্রুর হামলাটি যে স্রেফ গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে হচ্ছে -তা নয়। হামলা হচ্ছে ইসলামের নির্মূল কল্পেও। এ যুদ্ধটি শত্রু-শক্তির চাকর-বাকরদের সাথেও নয়। মুল যুদ্ধটি বরং আওয়ামী বাকশালীদের মনিব ভারতের বিরুদ্ধে। ভারতও সেটি বুঝে। তারাও জানে একাত্তরের ন্যায় এবারের যুদ্ধটিও তাদের নিজেদেরই লড়তে হবে। তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের বিনিয়োগটি বিশাল। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা র’য়ে এজেন্টগণ এখন আর শুধু রাজধানির গোপন ঘাঁটিতে ঘাপটি মেরে বসে নাই। তারা প্রতিটি থানা ও প্রতিটি ইউনিয়নে পৌঁছে গেছে। বসেছে সেনানীবাসগুলোর অফিসে। হিন্দুদের বসিয়েছে পুলিশ বিভাগ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। ভারত এখন শুধু বাকশলী চাকর-বাকরদের উপর ভরসা করছে না। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসিয়েছে নিজেদের অফিসারদের।

তাই শুধু রাজপথের মিছিল বা অবরোধে সহজে বিজয় আসবে না। স্বাধীনভাবে বাঁচার যুদ্ধটি আরো রক্তাত্ব হতে বাধ্য। স্বাধীন ভাবে বাঁচতে হলে যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয়। স্বাধীনতার মূল্য তো এভাবেই দিতে হয়। আর এ যুদ্ধের শুরুটি আজ  থেকে নয়; ১৯৪৭’য়ের পূর্ব থেকেই। বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মিত্র খুঁজতে হয়। সে সত্যটি ১৯৪৭’য়ের পূর্বে শেরে বাংলা ফজলুল হক,খাজা নাযিমউদ্দিন,হোসেন সহরোয়ার্দি, নুরুল আমীন, আকরাম খাঁর মত বাংলার মুসলিম নেতাগণ বুঝেছিলেন। তারা সে যুদ্ধে সহযোদ্ধা পেতে অন্যান্য ভারতীয় মুসলিমদের সাথে মৈত্রী গড়েছিলেন। এবং তাদের সাথে নিয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধ লড়েছিলেন। ইসলামে এমন ঐক্য ফরজ। এটি ছিল সে কালের নেতাদের স্রেফ রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই নয়, ঈমানী দায়ভারও। কিন্তু সে প্রজ্ঞা ও ঈমানীদায়ভার কি তাদের থেকে আশা করা যায় যারা শত্রুশক্তির চাকরবাকর হওয়াকেই জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়ে নেয়? কাশ্মিরের শেখ আব্দুল্লাহর মাঝে সে প্রজ্ঞা ও ঈমান ছিল না বলেই কাশ্মির স্থান পেয়েছে ভারতের পেটে। একই কারণে শেখ মুজিব বাংলাদেশকে গোলাম রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এবং আত্মসমর্পণ নিয়েই শেখ মুজিব স্বাক্ষর করেছিল ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসচুক্তি।

 

স্বাধীন ভাবে বাঁচার খরচ ও বাঙালী মুসলিমের দায়ভার

স্বাধীন ভাবে বাঁচার বর্তমান যুদ্ধটি বাঙালী মুসলিমদের এখন একাই লড়তে হবে। এ লড়াই থেকে পিছুহটার সুযোগ নেই। পিছু হটলে কাশ্মির, সিকিম ও হায়দারাবাদের ন্যায় ভারতের পেটে হজম হয়ে যেতে হবে। ভারতের দাসদের শাসন থেকে মুক্তির এ লড়াইটি দীর্ঘ ও রক্তাত্ব হতে বাধ্য। কিছুদিনের হরতাল ও অবরোধে কোন দেশেই স্বাধীনতা আসেনি। বাংলাদেশেও আসবে না। লড়াই কোন দেশবাসীকে দুর্বল করে না, বরং শক্তিশালী করে। জীবতদের চেতনা তো সবল হয় শহীদের রক্তে। তখন শক্তি নিয়ে বেড়ে উঠে ঈমান। তাই যে দেশে শহীদের রক্ত নেই সে দেশে মুসলিম চেতনা মৃত। মুসলিমগণ একমাত্র তখনই বিশ্বশক্তি ছিল যখন তাদের জীবনে লাগাতর জিহাদ ছিল। নবীজী (সা;) ৭০ শতাংশ সাহাবী সে জিহাদে শহীদ হয়েছেন। দুর্বলতা ও পরাজয় আসে তো জিহাদ না থাকার কারণে। বাংলাদেশের জনগণকে ইতিহাসের এ সহজ সত্যকে অবশ্যই বুঝতে হবে।

স্বাধীনতার মূল্য বিশাল। ইসলামের আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠার খরচও বিশাল। চাল-ডাল,আলু-পটল ও মাছ-গোশতো অর্থ দিয়ে কেনা যায়। কিন্তু স্বাধীনতা কিনতে হয় রক্ত দিয়ে। যারা তা দিতে পারে না, স্বাধীনতা তাদের জুটে না। তাদের বাঁচতে হয় গোলামীর ঘানি টেনে টেনে। ইতিহাস সেটি বার বার শিখিয়েছে। স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে ও ইসলামকে বিজয়ী করতে রক্ত দান তাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এ ইবাদত জান্নাতে নেয়। স্বাধীনতার খরচ তাই স্রেফ ভোট দিয়ে পরিশোধ করা যায় না। লাগাতর যুদ্ধ নিয়ে বাঁচতে হয়। কাশ্মিরে এক লাখের বেশী মানুষ প্রাণ দিয়েছে, সিরিয়ায় প্রাণ দিয়েছে বহুলক্ষ মানুষ। ৪০ লাখের বেশী উদ্বাস্তু হয়েছে। কিন্তু এখনও বিজয় জুটিনি। কিন্তু তারা যুদ্ধ ছাড়তে রাজি নয়। তাই আরো রক্ত দিচ্ছে। গাজার মাত্র ১০ লাখ মানুষ যুদ্ধ লড়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সর্ববৃহৎ সামরিক শক্তি ইসরাইলের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন হলো,বাংলাদেশ কি গাজার চেয়েও দুর্বল? ভারত কি ইসরাইলের চেয়েও শক্তিশালী?

 

ব্যর্থতা আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হওয়ায়

শত্রুর বিরুদ্ধে চলমান এ যুদ্ধে জিতলে হলে মহাশক্তিশালী মহান আল্লাহতায়ালাকে অবশ্যই পক্ষে আনতে হবে। এছাড়া বিজয়ের কোন পথ নাই। সম্ভাবনাও নাই। আর মহান আল্লাহতায়ালা পক্ষে থাকলে ভারত কেন,কোন বিশ্বশক্তিও কি তখন হারাতে পারে? ১৭ জন মুজাহিদের পক্ষে অবিভক্ত বাংলার ন্যায় বিশাল দেশ জয় সহজ হয়েছিল তো মহান আল্লাহতায়ালা পক্ষে থাকাতেই। যুদ্ধজয় তো আসে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকেই। কিন্তু আজকের মুসলিমগণ আল্লাহতায়ালাকে পক্ষ আনার বদলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা জাতের কাফের শক্তিকে পক্ষে আনায় ব্যস্ত। সে চেষ্ঠায় নেমেছে এমন কি অনেক ইসলামি দলও। তারা বিজয় ছিনিয়ে আনতে চায় ছল-চাতুরি, প্রচার কৌশল ও বাহুবলে। তাদের আগ্রহ নাই মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা বাস্তবায়নে। আগ্রহ নাই আল্লাহতায়ালার দলের সদস্য হওয়ার। ফলে এসব আালেম-উলামা ও ইসলামি দলের নেতা-কর্মীদের মুখে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কথা যেমন নেই, তেমনি নেই খেলাফত ও জিহাদের কথাও। এরা যে শুধু ভারতের ভয়ে ভীতু তা নয়, বরং আধমরা তাদের চাকর-বাকরদের ভয়েও। বিস্মযের বিষয়,এ ভীরুরা আবার জান্নাত লাভের কামনা রাখে! প্রশ্ন হলো,মহান আল্লাহতায়ালা কি তাঁর পবিত্র জান্নাতে এসব ভীরু ও কাপুরুষদের স্থান দিবেন?

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, “ওয়া মা নাসরু ইল্লা মিন ইনদিল্লাহ,ইন্নাল্লাহা আজিজুন হাকীম।” অর্থ: “বিজয় আসে একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে,নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাবান।”- (সুরা আনফাল, আয়াত ১০)। অতীতে যত পরাজয় এসেছে তা তো মহান আল্লাহর এজেন্ডার সাথে গাদ্দারীর ফলে। মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে শত ভাগ বিশুদ্ধ জিহাদ গড়ে তুলতে। আর জিহাদ বিশুদ্ধ না হলে কি মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য আসে? মহান আল্লাহতায়ালাকে পক্ষে আনার পথ তো অতি সহজ। সে পথের কথা তো পবিত্র কোরআনে বার বার শোনানো হয়েছে। যারা যুদ্ধ করে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে, তাদের যুদ্ধও তাঁর যুদ্ধ রূপে গণ্য হয়। তাই নির্দেশ দেয়া হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারি হয়ে যাও।” –(সুরা সাফ, আয়াত ১৪)। বলা হয়েছে, “তোমরা আমাকে সাহায্য করো, আমিও তোমাদেরকে সাহায্য করবো।” নির্দেশ এসেছে জিহাদ বের হওয়ার। বলা হয়েছে, “তোমাদের প্রস্তুতি হালকা হোক অথবা ভারী হোক, বেরিযে পড়ো অভিযানে। এবং জিহাদ করো তোমাদের সম্পদ ও জান দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা বুঝতে।” –(সুরা তাওবা, আয়াত ৪১)।

মুসলিমগণ যখন সেক্যুলার রাজনীতির নেতাকর্মী ও সেপাহীতে পরিণত হয়, তখন কি তারা মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য আশা করতে পারে? তখন তো আসে আযাব। ঈমানদারের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তাই স্রেফ নামাযী বা রোযাদার হওয়া নয়। হজ-ওমরা পালনও নয়। এমন ইবাদত তো লক্ষ লক্ষ মুনাফিকও করে। খোদ নবীজী (সা:) আমলে মুনাফিকদের সংখ্যা কি কম ছিল? ওহুদের যুদ্ধের সময় তারা ছিল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ঈমানদারের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বক্ষণিক সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া এবং তাঁর রাস্তায় লাগাতর জিহাদ করা। পরকালে জান্নাত লাভের এটিই তো একমাত্র রাস্তা। কি ভাবে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারি হতে হয় ও তার রাস্তায় জিহাদ করতে হয় সেটি মহান নবীজী (সাঃ) স্বহস্তে দেখিয়ে গেছেন। দেখিয়ে গেছেন নবীজী(সা:)’র মহান সাহাবাগণও। সে পথটি হলো, সমাজের প্রতি অঙ্গণে মহান আল্লাহতায়ালার নিষ্ঠাবান খলিফা রূপে দায়িত্ব পালন করা এবং তাঁর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় জিহাদরত দলের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা। মহান আল্লাহতায়ালা তো একমাত্র এমন মুজাহিদদের সাহায্য করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যারা তাঁর দ্বীনের বিজয়ে সাহায্য করে, তিনিও তাদের সাহায্য করেন। তাদের সাথে যুদ্ধে সদা প্রস্তুত হলো তাঁর ফেরেশতা বাহিনী। মুজাহিদের বিজয় তো এভাবেই অনিবার্য হয়ে উঠে। মুসলিম জীবনের আজকের ব্যর্থতা তো এখানেই। তারা ব্যর্থ হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যকারী হতে। আর এ ব্যর্থতা তাদের পরাজয়ই বাড়িয়ে চলেছে। প্রশ্ন হলো, এ ব্যর্থতা কি পরকালেও কোন সফলতা দিবে? পৌঁছাবে কি জান্নাতে? ১ম সংস্করণ ০৭/০৩/২০১৫; ২য় সংস্করণ ২৮/০২/২০২১।




অপরাধীদের রাজনীতি এবং বাঙালী মুসলিমের বিপদ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বিকল যেখানে ইঞ্জিন                      

জাতীয় জীবনে মূল ইঞ্জিনটি হলো রাজনীতি। এ ইঞ্জিনই জাতিকে সামনে টানে। একটি জাতি কোন দিকে যাবে -সেটি দেশের ক্ষেত-খামার, ব্যবসা-বাণিজ্য, কল-কারখানা ও মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে নির্ধারিত হয় না। সে সিদ্ধান্তটি হয় রাজনীতির ময়দানে। রাজনীতির যিনি কর্ণধার –তিনিই দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনিই দেশের ড্রাইভার; অন্যরা যাত্রী মাত্র। তাই যারা জাতির ভাগ্য পাল্টাতে চায় তারা নিজেদের সমগ্র সামর্থ্য নিয়ে রাজনীতির অঙ্গণে লড়াইয়ে হাজির হয়। একাজ দোয়া দরুদে সম্ভব নয়। তাই মদিনায় হিজরতের প্রথম দিনেই নবীজী (সা:) নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ায় হাত দেন এবং রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসেন। অপর দিকে যারা জাতির পরাজয় ও পতন চায় –সে শত্রুরাও যুদ্ধে নামে রাজনীতির ড্রাইভিং সিটকে দখলে নয়ার লক্ষ্যে। তাই একটি জাতির ব্যর্থতা, বিপর্যয় ও লাগাতর নীচে নামা দেখে নিশ্চিত বলা যায় দেশের রাজনীতি সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিকদের হাতে নাই;  দেশ অধিকৃত হয়েছে শত্রুপক্ষের হাতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলত সেটিই ঘটেছে। ফলে জোয়ার এসেছে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও স্বৈরাচারের রাজনীতির। তাই যারা বাংলাদেশের কল্যাণ চায়, তাদের সামনে শত্রুপক্ষের অধিকৃতি মুক্তির যুদ্ধ ছাড়া ভিন্ন পথ নাই।

দেশের উন্নয়ন বা সুখ-সমৃদ্ধির জন্য জরুরী নয় যে, জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে বিপ্লব আসতে হবে। বরং বিপ্লব আনতে হয় নেতৃত্বে এবং দেশের রাজনীতিতে। রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ পায় পথ-নির্দেশনা। পায় পথ চলায় ভিশন ও মিশন। রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে পায় উপরে উঠার অনুকরণীয় মডেল। রাজা আলেকজান্ডারের আমলে গ্রীস যখন বিশ্বশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে তখন গ্রীসের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন এসেছিল দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বে। তেমনি আরবের মুসলিমগণ যখন বিশ্বের প্রধানতম শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে তখনও আরবের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে কোন বিপ্লব আসেনি। বরং বিপ্লব এসেছিল নেতৃত্বে ও রাজনীতিতে। রাজনীতির ইঞ্জিন তখন বিস্ময়রকর গতিতে সামনে চলেছে।  

রাজনীতি হলো সমাজসেবার সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। কৃষক, শ্রমিক, ডাক্তার, মসিজেদর ইমাম বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসব হয়ে এ বিশাল কাজ করা যায় না। যারা সমাজের কল্যাণে বিশাল ভূমিকা রাখতে চায় এবং চায় নিজ স্বপ্নের বাস্তবায়ন -তাদের সামনে রাজনীতির চেয়ে উত্তম কোন ক্ষেত্র নাই। মুসলিম সমাজে এ কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন খোদ মহান নবী (সা:) এবং তাঁর সাহাবীগণ। রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে দেশের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে বসানো নবীজী (সা:)’র মহান সূন্নত। সে আসনে বসেছেন যেমন খোদ নবীজী (সা:), তেমনি নবীজী (সা:)’র ওফাতের পর বসেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠতম সাহাবাগণ। তাঁরা ছিলেন এমন সাহাবা যারা জীবদ্দশাতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালনের পাশাপাশি যারা মহান আল্লাহতায়ালার রাস্তায় নিজের সমুদয় সামর্থ্য ও জানমাল কোরবানী করতে চায় -এ কাজটি মূলত তাদের। কিন্তু সমাজ সেবার এ সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যমটি যদি ক্ষমতালিপ্সু ও স্বার্থশিকারী দুর্বৃত্তদের হাতে হাইজ্যাক হযে যায় -তখন অনিবার্য হয়ে উঠে সে জাতির পতন ও পরাজয়। সে জাতির জীবনে বিপর্যয় আনার জন্য কি তখন কোন বিদেশী শত্রুর প্রয়োজন পড়ে? ঝাড়ুদারের কাজেও সততা লাগে, নইলে রাস্তা থেকে আবর্জনা দূর হয় না। আর রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব তো রাষ্ট্র থেকে আবর্জনারূপী দুর্বৃত্তদের নির্মূল এবং সে সাথে সুনীতির প্রতিষ্ঠা। কোরআনের ভাষায় “আমারু বিল মারুফ” এবং “নেহী আনিল মুনকার।” সে কাজে গুরুত্ব দিয়ে পবিত্র কোর’আনে নির্দেশ: “তোমাদের মধ্যে অবশ্যই এমন একটি দল থাকতে হবে যারা কল্যাণের পথে মানুষকে ডাকবে এবং ন্যায়ের নির্দেশ দিবে ও অন্যায়ের পথ থেকে রুখবে, এবং তারাই হল সফলকাম।” -(আল-ইমরান, আয়াত ১০৪)।

উপরুক্ত আয়াতের মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিম জীবনের মূল মিশনটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ধর্ম-কর্মকে নিছক নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের মাঝে সীমিত করলে সে মিশন নিয়ে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। সে জন্য যা অপরিহার্য হলো, মানব-সৃষ্ট  সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর সকল সামর্থ্যকে কাজে লাগানো। সেটি সম্ভব হয় একমাত্র রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়েই; নইলে দখলে যায় শত্রুশক্তির হাতে। এজন্যই রাজনীতির এ জিহাদে অর্থদান, শ্রমদান, মেধাদান -এমনকি প্রাণদান সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল। অর্ধেকের বেশী সাহাবী এ পথে শহীদ হয়েছেন। অথচ বাংলাদেশের অবস্থা ভিন্নতর। দেশটির লাখ লাখ মসজিদে নামাযীর অভাব হয় না। এ দেশে বহু কোটি মানুষ রোযা রাখে। বহু হাজার মানুষ প্রতিবছর হজ্ব করে। বহু লক্ষ মানুষ প্রতিদিন কোর’আন তেলাওয়াতও করে। অথচ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলে নিজেদের সামর্থ্যের বিনিয়োগ করছে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তবে রাজনীতিতে নামাযী-রোযাদারগণ যে অংশ নিচ্ছে না -তা নয়। বরং তারাও ভোট দেয়; অর্থ দেয় এবং রাজপথে লড়াইও করে। তবে সেটি ইসলামের শরিয়তী বিধানকে বিজয়ী করতে নয়। বরং তারা বিজয়ী করে সেসব ইসলাম বিরোধী সেক্যুলারিস্টদের –যারা বিজয় চায় না ইসলামের। ফলে তাদের ভূমিকা ইসলামের সাথে গাদ্দারীর।

নবীজী(সা:)’র আমলে আজকের ন্যায় লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রসা ছিল না। কোটি কোটি নামায়ীও ছিল না। সংখ্যায় স্বল্প সংখ্যক হয়েও তাঁরা আরব ভূমি থেকে দূর্নীতি ও দুর্বৃত্তদের নির্মূল করেছিলেন। নির্মূল করেছিলেন আবু লাহাব ও আবু জেহেলদের মত ইসলাম বিরোধী নেতাদের। অথচ বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টেটি। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিমদের ভোটে নির্বাচিত হয় এবং তাদেরই অর্থে প্রতিপালিত হয় ইসলাম-বিরোধী সেক্যুলারিস্টগণ। এবং রাজনীতির ময়দানটি অধিকৃত হয়ে গেছে অতি দুষ্ট ও দুর্বৃত্ত চরিত্রের লোকদের হাতে। অথচ দেশে আইনের শাসন থাকলে এরূপ দুর্বৃ্ত্তদের পক্ষে নেতা হওয়া দূরে থাক, রাস্তার ঝাড়ুদার হওয়াও অসম্ভব হতো। কারণ, দূর্নীতিবাজদের দিয়ে রাস্তার আবর্জনা পরিস্কারের কাজটিও যথার্থভাবে হয় না। কারণ খুঁটে খুঁটে আবর্জনা তোলার কাজেও সৎ, নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল হওয়াটি জরুরী। তাছাড়া জাতীয় জীবনে প্রকৃত আবর্জনা হলো এ দূর্নীতিবাজেরা; প্রতিটি সভ্য দেশেই আবর্জনার ন্যায় তাদেরও স্থান হয় আস্তাকুঁড়ে। দুর্বৃত্ত নির্মূলে ইসলাম অতি কঠোর ও আপোষহীন। তাই যারা চুরি করে, কোর’আনের বিধান হলো তাদের হাত কাটা। তাই যে দেশে চোরডাকাত ও ভোটডাকাতের ন্যায় দুর্বৃত্তগণ নির্মূল না হয়ে শাসন-ক্ষমতায় বসে –তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে দেশের মানুষ ইসলামের অনুসরণ থেকে কতটা দূরে?

 

দায়ী দুষ্ট রাজনীতি

বাংলাদেশের ব্যর্থতা এজন্য নয় যে, দেশটি সম্পদে দরিদ্র। বা দেশের ভূগোল বা জলবায়ু প্রতিকুল। ব্যর্থতার জন্য মূলত দায়ী দেশের দুষ্ট রাজনীতি। গাড়ি না চললে -সে জন্য ইঞ্জিন বা চালক দায়ী, গাড়ির বগি বা যাত্রীগণ নয়। তখন বুঝা যায়, রাজনীতির ইঞ্জিনটি মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ বেয়ে এগুচ্ছে না। প্রদর্শিত সে পথটি হলো সিরাতুল মোস্তাকিম -যা দেখানো হয়েছে পবিত্র কোর’আন ও নবীজী (সা:)’র সূন্নতে। সিরাতুল মোস্তাকিম শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও ইবাদত-বন্দেগীর পথই দেখায় না। দেখায় সঠিক রাজনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির পথও। আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ না করে রাষ্ট্র, সমাজ বা পরিবারে শান্তি আসবে এরূপ বিশ্বাস করাই তো কুফরি তথা ঈমান-বিরুদ্ধ। এটি শিরক। এমন বিশ্বাস নিয়ে কি কেউ মুসলিম থাকতে পারে? আল্লাহর প্রদর্শিত পথ তথা ইসলাম ছাড়াই শান্তি ও সমৃদ্ধি সম্ভব হলে তো ইসলামের প্রয়োজনই ফুরিয়ে যায়। অথচ তেমন একটি ইসলাম বিরোধী চেতনার প্রতিফলন ঘটছে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও আইন-আদালতে। এ ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামের প্রয়োজনই অনুভব করা হচ্ছে না। ইসলাম সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে মসজিদ-মাদ্রাসা ও কিছু পরিবারে। এবং রাষ্ট্রের বাঁকি এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে সূদ, জুয়া, মদ, পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, ঘুষ, চুরি-ডাকাতি ও সন্ত্রাসের ন্যায় নানাবিধ হারাম কাজে।

ইসলামের আগমন শুধু ব্যক্তি জীবনের পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির লক্ষ্যেও। সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধি ছাড়া কি পরিশুদ্ধ মানব গড়া যায়? সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবেশ যদি পাপের জোয়ারে প্লাবিত হয়, তবে কি কোন মানব শিশু সিরাতুল মুস্তাকীম পায়? সে তো তখন সে জোয়ারে ভাসতে থাকে। মহান নবীজী (সা:)’র হাদিস: প্রত্যেক মানব শিশুর জন্ম হয় মুসলিম রূপে। কিন্তু সে ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে হয়ে অমুসলিম হয় (পারিবারীক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়) পরিবেশের প্রভাবে। কোন শিশুই তার পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সামর্থ্য নিয়ে জন্ম নেয় না। যারা নবেল প্রাইজ পায় সে সামর্থ্য এমন কি তাদের প্রবীন বয়সেও সৃষ্টি হয়না। সে সামর্থ্য অর্জিত হয় একটি বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এজন্য চাই, ওহীর তথা কোর’আনের জ্ঞান। তাই কোন শিশুকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচাতে হলে তাকে শুধু পানাহার দিলে চলে না; জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতার অন্ধকার পরিবেশ থেকে মুক্তি দিতে হয়। সমাজ ও রাষ্ট্র অন্ধকারাচ্ছন্ন হলো সিরাতুল মুস্তাকীম পায় না এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরগণও। তাই সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল হলো, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত-মুক্ত করা। রাষ্ট্রের শক্তিশালী অবকাঠামো কোর’আনের জ্ঞানে অজ্ঞ সেক্যুলারিস্টদের হাতে অধিকৃত রেখে কি রাষ্ট্র বা সামাজের পরিবেশকে জাহিলিয়াত-মুক্ত করা যায়? সেটি অসম্ভব বলেই মহান নবীজী (সা) তাঁর কর্মের পরিধি মসজিদ নির্মাণ ও কোর’আনের জ্ঞান বিতরণের মাঝে সীমিত রাখেননি। বরং তিনি ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করেছেন এবং নিজে সে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে দায়িত্ব পালন করেছেন।  

 

দুর্বৃত্তদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়ার বিপদ

মানব জীবনের সবচেয়ে বড় নাশকতাটি মহামারি, ভূমিকম্প বা ঘুর্ণিঝড়ে ঘটে না। সেটি ঘটে অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে। মহামারি, ভূমিকম্প ও ঘুর্ণিঝড়ে দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও রাজনীতি পাল্টে যায় না। অথচ দুর্বৃত্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটে বসলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলি তখন জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার বাহনে পরিণত হয়। একটি বাসের সকল যাত্রী মাতাল হলেও তাদের সঠিক গন্তব্যস্থলে পৌঁছে -যদি চালক সুস্থ্য হয় এবং জ্ঞান রাখে সঠিক পথের। কিন্তু চালক নিজেই যদি মাতাল বা অজ্ঞ হয় তবে সকল যাত্রীর দোয়াদরুদে কোন লাভ হয় না। ভূল পথে চলাটি তখন অনিবার্য হয়ে উঠে। এজন্যই ইসলামে শ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ নয়, বরং সেটি হলো রাষ্ট্রকে অনৈসলামিক শক্তির হাত থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্র নায়কের আসনে ঈমানদার ব্যক্তিকে বসানো। বাংলাদেশীদের জন্য বিপদের বড় কারণ, দেশটি অধিকৃত হয়েছে ভয়ানক অপরাধীদের হাতে। এ অপরাধজীবী দুর্বৃত্তদের নাই পবিত্র কোর’আনের তথা সিরাতুল মুস্তাকীমের জ্ঞান। তাদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়ায় রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে জনগণকে পথভ্রষ্ট করার হাতিয়ারে। ফলে ভ্রষ্ট্তা বাড়ছে শুধু শিশুদের নয়, বয়স্কদেরও। শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সোসল ইঞ্জিনীয়ারিং হচ্ছে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে। মৌলবাদ বলে পরিহার করা হচ্ছে ইসলামের শরিয়তী বিধানকে।

ইসলামের প্রতি ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তদের আচরনকে শুধু ভ্রষ্টতা বললে ভূল হবে, বরং এটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে পূর্ণ বিদ্রোহ। আর সে বিদ্রোহই প্রবল ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। মুষ্টিমেয় কিছু ইসলামি দল ছাড়া দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো আল্লাহর প্রদর্শিত সে সিরাতুল মোস্তাকিমের অনুসরণ দূরে থাক, সেটির প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে না। আল্লাহর বিরুদ্ধে এটি হলো সীমাহীন ঔদ্ধত্য। এমন আচরণের তুলনা চলে সুবিজ্ঞ চিকিৎস্যকের দেওয়া প্রেসক্রিপশনের বিরুদ্ধে মরনাপন্ন রোগীর ঔদ্ধত্যের সাথে। এরাই রাজনীতিকে পরিণত করেছে খুন, গুম, লুট, ধর্ষণ, সন্ত্রাস এবং নানাবিধ অপরাধের হাতিয়ারে। মশা-মাছি যেমন রোগের বিস্তার ঘটায়, দুর্বৃত্তগণও তেমনি দুর্বৃত্তায়ন ঘটায় দেশ জুড়ে। এরই ফলে রাজনৈতিক দলের লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মী, সামরিক বাহিনীর শত শত অফিসার, হাজার হাজার সরকারি আমলা, বহু হাজার ধনি ব্যবসায়ী এবং বিপুল সংখ্যক ধর্মব্যবসায়ী পরিণত হয়েছে সার্বক্ষণিক অপরাধজীবীতে। দেশের সকল ডাকাত দলে বা সন্তাসী বাহিনীতে এতো দুর্বৃত্তের সমাবেশ ঘটেনি যা ঘটেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। দুর্বত্তদের যারা যত বেশী দলে ভেড়াতে পারে -তারাই রাজনীতিতে বেশী প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী। রাজনীতির নামে রাস্তায় লগিবৈঠা দিয়ে পিঠিয়ে মানুষ হত্যা বা যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ দেওয়া – রাজনৈতিক নেতাদের কাছে কোন অপরাধই নয়। বরং ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে সেটিকে তারা অপরিহার্য মনে করে। বাংলাদেশের ইতিহাস এমন বীভৎস অপরাধ কর্মে ভরপুর। খুনোখুনির ঘটনা ঘটেছে এমনকি সংসদেও। গণতন্ত্রের নামে দেশে বার বার নির্বাচন হয়; কিন্ত মিথ্যা ওয়াদা ও ধোকাবাজীর উপর যে দেশে নিয়ন্ত্রণ নেই, সে দেশে দুর্বৃত্তদের কি নির্বাচনে পরাজিত করা যায়? নির্বাচন বরং তাদের সামনে ক্ষমতা দখলে রাস্তা খুলে দেয়।

নির্বাচন পরিণত হয়েছে নাশকতার আরেক সফল হাতিয়ারে। ডাকাতি হয় ব্যালটের উপর। এবং বিজয়ী হয় ভোট-ডাকাতেরা। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ভোটডাকাতেরা দখলে নেয় দেশের প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আইন-আদালত ও মিডিয়াসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে বাংলাদেশে বার বার নির্বাচন হলেও শোষন, লুটপাঠ, দুবৃত্তি ও দূর্নীতি থেকে দেশবাসীর মূক্তি মিলছে না। বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। অপরাধজীবিদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে বিপর্যয় শুরু হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র জুড়ে। জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ইস্যু তাই রাজনীতির ময়দান থেকে পথভ্রষ্টদের নির্মূল। ইসলামে এটিই পবিত্র জিহাদ। নবীজী (সা:)’র আমলে মুসলিমদের সবচেয়ে বেশী কোরবানী পেশ করতে হয়েছে রাজনীতির ময়দানের আবর্জনা সরাতে। সেদিন সে কাজে বড় বাধা রূপে খাড়া হয়েছিল আবু লাহাব, আবু জেহলের মত দুর্বৃত্ত নেতারা। এসব দুর্বৃত্তদের নির্মূলে মুসলিমদের যত রক্তক্ষয় হয়েছে তা নামায-রোয়া, হজ্ব-যাকাত বা অন্য কোন বিধান প্রতিষ্ঠা দিতে হয়নি।

 

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি মানব উন্নয়নে

রাজনীতির মূল লক্ষ্য বা এজেন্ডা কি? সেটি কি শুধু সরকার পরিবর্তন? সেটি কি নিছক নির্বাচন? লক্ষ্য কি শুধু রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত ও কলকারাখানা নির্মাণ? পণ্য বা মানব রপ্তানীতে বৃদ্ধি আনা? বাংলাদেশে এ অবধি নির্বাচন ও সে সাথে সরকার পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। নানা দল নানা এজেন্ডা নিয়ে ক্ষমতায় গেছে। কিন্তু দেশ কতটুকু সামনে এগিয়েছে? জনগণের জীবনে উচ্চতর মানবিক মূল্যবোধই বা কতটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছে? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এ জন্য দরিদ্র নয় যে, সেখানে সম্পদের অভাব। বরং দারিদ্র্যের কারণ, তারা যেমন ব্যর্থ নিজেদের মূল্য বাড়াতে, তেমনি ব্যর্থ খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য বাড়াতে। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় অক্ষমতা। একটি দেশের প্রাচুর্য্য তো বাড়ে সে দেশে মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কতটুকু মূল্য সংযোজন হলো তার উপর। তাই উন্নয়ন বাড়াতে হলে মূল্য বাড়াতে হয়। পাট, তূলা, চা, কফি, তেল, গ্যাস, তামা, কপার, ইউরেনিয়াম, বক্সাইট, টিনের ন্যায় অধিকাংশ কৃষি ও খনিজ সম্পদের উৎস হলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। কিন্তু এ সম্পদের কারণে বেশী লাভবান হচ্ছে পাশ্চাত্যের দেশগুলো। কারণ, এসব কৃষি ও খণিজ সম্পদের উপর সিংহভাগ মূল্য সংযোজন হয় পাশ্চাত্য দেশগুলির কারখানায়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো রয়ে গেছে কাঁচামাল বা খনিজ সম্পদের জোগানদার রূপে। তাই যারা উন্নয়ন চায় -তারা বিদ্যালয় ও কারখানা গড়ে। বিদ্যালয় মূল্য বাড়ায় মানব সন্তানের; এবং কারখানা মূল্য বাড়ায় পণ্যের।

বাংলাদেশে সবচেয়ে ব্যর্থ খাতটি মানব উন্নয়নের খাত। জাতি তখনই সবচেয়ে বেশী লাভবান হয় যখন মূল্য সংযোজন হয় মানুষের উপর। কারণ, মানুষই হলো আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তেলের বা সোনার মূল্য হাজারো গুণ বাড়লেও সেটি কি গুণবান ও সৃষ্টিশীল মানুষের সমান হতে পারে? মানুষের উপর মূল্য সংযোজন হলে সে মানুষটি মহৎ গুণে বেড়ে উঠে। তখন সে মানুষটি মূল্য বাড়ায় প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের উপরও। কম্পুউটির বিজ্ঞানী বিল গেটসের উৎপাদন ক্ষমতা কি কোন তেলের খনির চেয়ে কম? শিক্ষাখাত ব্যর্থ হলে বিল গেটসগণ অনাবিস্কৃত থেকে যায়। এজন্যই শিল্পোন্নত দেশগুলোর শিক্ষাখাতে তথা মানব সম্পদের উন্নয়নে বিনিয়োগটি বিশাল। মানুষের মূল্য বৃদ্ধি বা গুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বা উদ্যোগ নেওয়া এজন্যই ইসলামে এতো গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার সওয়াব এজন্যই এতো বেশী। কারণ, এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজই হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যবৃদ্ধি তথা মহত্তর গুণ নিয়ে বেড়ে উঠায় সহায়তা দেওয়া। তাদের কারণে সমাজ ও রাষ্ট্র তখন বহুগুণে সমৃদ্ধ হয়। এমন রাষ্ট্রের বুকেই নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। মানুষ গড়ার এ মহান কাজটিই এ জন্যই তো মুসলিম রাজনীতির মূল এজেন্ডা। তখন রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়, মানুষকে জান্নাতের যোগ্য করে গড়ে তোলা। এমন মানুষের গুণেই ইসলামী রাষ্ট্রের বুকে আল্লাহর সাহায্য ও শান্তি নেমে আসে।  নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে তো সেটিই হয়েছিল। ইসলামে এমন রাজনীতি তাই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই শুরু থেকেই হয়নি। এজন্যই দেশটি তার ইতিহাসে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি ও সর্বাধিক দূর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র রূপে।

 

মুসলিমের এজেন্ডা ও অমুসলিমের এজেন্ডা

রাজনীতির মূল ইস্যুটি নির্ধারিত হয় জনগণের ধর্ম, জীবনদর্শন, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন থেকে। তাই পূঁজিবাদী ও সমাজবাদী দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা কখনোই এক হয় না। তেমনি এক হয় না মুসলিম ও অমুসলিম দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা। ব্যক্তির মনের গভীরে লালিত আদর্শ বা বিশ্বাস শুধু তার ধর্ম-কর্ম, ইবাদত-বন্দেগী, খাদ্য-পানীয়ের ব্যাপারেই নিয়ম বেঁধে দেয় না, নির্ধারিত করে দেয় জীবনের মূল এজেন্ডাও। তা থেকেই নির্ধারিত হয় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচী। তাই আরবের কাফেরদের এজেন্ডা ও মুসলিমদের এজেন্ডা কখনোই এক ছিল না। মুসলিম যখন বিজয়ী হয় তখন সমাজ থেকে শুধু মূর্তিগুলোই অপসারিত হয়নি। অপসারিত হয়েছিল তাদের প্রচলিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধ। কারণ, একটি মুসলিম সমাজ কখনই অমুসলিম বা সেক্যুলার মূল্যবোধের অধীনে গড়ে উঠতে পারে না। যেমন প্লেনের ইঞ্জিন নিয়ে কোন রেল গাড়ী সামনে এগুতে পারে না। রাজনীতি যেমন জাতির ইঞ্জিন, তেমনি সে ইঞ্জিনের জ্বালানী হলো জনগণের চেতনায় লালিত দর্শন। মুসলিমদের ক্ষেত্রে সেটি হলো পবিত্র কোর’আন।

যে রাজনীতিতে উচ্চতর দর্শন নেই, সে রাজনীতিতে ইচ্ছা ও এজেন্ডা থাকে না উচ্চতর ও মহত্তর লক্ষ্যে চলার। তখন নেমে আসে জগদ্দল পাথরের ন্যায় স্থবিরতা। স্রোতহীন জলাশয়ে যেমন মশামাছি বাড়ে, তেমনি দর্শন-শূণ্য স্থবির রাজনীতিতে বৃদ্ধি ঘটে দর্শনশূণ্য দুর্বৃত্ত কীটদের। সেটিরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো বাংলাদেশ। নবীজী(সা:)’র আমলে আরবের স্থবির ও পাপাচার-পূর্ণ জীবনে মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে যে প্রচন্ড বিপ্লব ও গতি সৃষ্টি হয়েছিল তার কারণ, রাজনীতির ইঞ্জিন তখন আল্লাহপ্রদত্ত দর্শন পেয়েছিল। চালকের পদে বসেছিলেন মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানবগণ। অথচ সে প্রচন্ড শক্তি থেকে দারুন ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশের আজকের রাজনীতি। কারণ, বাংলাদেশের ড্রাইভিং সিটে বসে স্বৈরাচারি চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতগণ। দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে ইসলাম ও আল্লাহর নাম নেওয়া তাদের কাছে সাম্প্রদায়ীকতা। তাদের দাবী, রাজনীতিতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করার। স্বৈরাচারি আওয়ামী-বাকশালী আমলে নিষিদ্ধ হয়েছিল ইসলামের নামে রাজনীতির সে মৌলিক নাগরিক অধিকার। সরকারি মহলে নিষিদ্ধ হয়েছিল বিসমিল্লাহ। অপসারিত হয়েছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রোম থেকে কোর’আনের বানী ও মহান আল্লাহতায়ালার নাম। এভাবেই দর্শনশূণ্য এবং সে সাথে ইসলাশূণ্য হয়েছিল মুজিবামলের রাজনীতি। এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিব-পূজা ও পূজাজীবীরা। ফল দাঁড়িয়েছিল, সবচেযে বড় ও দ্রুত ধ্বংস নেমেছিল নীতি-নৈতিকতা, আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে। সৃষ্টি হয়েছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ -যাতে প্রাণ হারিয়েছিল বহু লক্ষ মানুষ। এবং বিলুপ্ত হয়েছিল দেশের স্বাধীনতা, মানবতা ও ন্যূনতম মানবিক অধিকার। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের পায়ের তলায় পিষ্ট হযেছিল দেশের সার্বভৌমত্ব। এবং গণতন্ত্র ও মানবতার কবরের উপর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিবের এক দলীয় বাকশালী স্বৈরাচার।

 

লক্ষ্য: ইসলামকে পরাজিত রাখা

মুজিবামলের ন্যায় আবার দাবী উঠেছে, রাজনীতিতে ইসলাম নিষিদ্ধ করার। এ দাবী উঠানোর হেতু কি? কারণ একটিই, তা হলো বাংলাদেশকে নীচে নামানোর কাজকে আবার তীব্রতর করা। শয়তান সেটিই চায়। ইসলামী দর্শন, আইন ও মূল্যবোধের পরাজয়ের মধ্যেই তাদের আনন্দ। রাজনীতির ইঞ্জিনকে দর্শনশূণ্য করাই তাদের মূল লক্ষ্য। বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের প্রভু ভারতও সেটিই চায়। সত্তরের দশকেও মুজিব সেটিই করেছিল। দাবীটি আজও এসেছে সেই একই আওয়ামী বাকশালীদের পক্ষ থেকে। কারণ, প্রচন্ড ইসলামী ভীতি। ভয়ের কারণ, বাংলাদেশের ৯১% ভাগ মানুষ মুসলিম। আরো কারণ, দেশটিতে দ্রুত ভাবে বাড়ছে ইসলামী জ্ঞানচর্চা এবং সে সাথে নতুন প্রজন্মের মনে প্রবলতর হচ্ছে ইসলামী চেতনা। বাড়ছে ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক শক্তি।

ইসলামের বিজয় মানেই শরিয়তের প্রতিষ্ঠাসহ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে ইসলামী বিধানের পূর্ণ-প্রয়োগ। এবং সে সাথে সেক্যুলার মূল্যবোধ ও রীতি-নীতির বিলুপ্তি। তখন রাজনৈতিক পরাজয় ঘটে ইসলাম-বিরোধী শক্তির। নিজেদের জন্য এমন একটি পরাজয় বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ মেনে নিতে রাজী নয়। তাই সেরূপ অবস্থা সৃষ্টির আগেই ইসলামপন্থীদের সংগঠিত হওয়াকে তারা নিষিদ্ধ করতে চায়। আর সংগঠিত হতে না পারলে ইসলামপন্থীগণ লড়াই করবেই বা কি করে? একাকী কারো পক্ষেই বড় কিছু করা সম্ভব নয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে তো নয়ই। তখন ইসলামের শত্রুদের পক্ষে সহজেই সম্ভব হবে দেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে নিজেদের বিজয়ী অবস্থানকে ধরে রাখা। এজন্যই তাদের মুখে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে নির্মূলের ধ্বনি। এমন একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে বিগত ১৪ শত বছর ধরেই দেশে দেশ কাজ করছে ইসলামের চিহ্নিত দূষমনগণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ন্যায় শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের দেশে ইসলামের এমন শত্রুগণ বিজয় পায় কি করে? যেখানে ইসলামের পরাজয়, সেখানেই কি পরাজয় নয় বাঙালী মুসলিমের? এমন একটি পরাজয় মেনে নিলে কি মুসলিম থাকা যায়? বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি কি কম আত্মঘাতী? ১ম সংস্করণ ২৫/১০/২০০৮; ২য় সংস্করণ ২৭/০২/২০২১।