বিবিধ ভাবনা (৪৮)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 ১. ধর্মের নামে ভয়ানক অধর্মের বিষয়টি

ইসলাম যে একমাত্র সত্য ধর্ম -সেটি অন্য ধর্মগুলির সাথে তূলনা করলে সুস্পষ্ট বুঝা যায়। একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাই নির্ভূল। ফলে তাঁর নির্দেশিত ধর্ম ও ধর্মীয় বিধানগুলিও নির্ভূল। এবং সেটি সুস্পষ্ট বুঝা যায় অন্য ধর্মগুলির সাথে তুলনা করলে। ধর্মের দিক দিয়ে অতি মিথ্যা, অকল্যাণ ও অধর্মে ভরা হলো হিন্দু ধর্ম। যে কোন বিবেকবান মানুষের কাছেই সেটি ধরা পড়তে বাধ্য। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায়, এ ধর্মের নির্মাণে সামান্য বিবেকবোধও কাজ করেনি। এক সময় এ ধর্মে স্ত্রীকে তার মৃত স্বামীর সাথে একই সাথে চিতায় জ্বলে মরতে হতো। নানা জাতপাতে মানবকে বিভক্ত করাই হলো এ ধর্মের রীতি। এবং রীতি হলো নানা জাতপাতের ভিত্তিতে মানুষকে অচ্ছুৎ গণ্য করা ও ঘৃণা করা। অতিশয় বিস্ময়ের বিষয় হলো, আজকের এই আধুনিক যুগে ভারতের শত কোটির বেশী মানুষ কি করে এমন একটি অজ্ঞতা ও বর্বরতাপ্রসূত ধর্মের অনুসারী হলো। এ ধর্মের বীভৎস রূপটি কোভিড রোগের কারণে আরো বীভৎস রূপে প্রকাশ পাচ্ছে। নীচে তারই কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।

ইসলামের বিধান হলো, মৃতদেহের দাফন করা। হিন্দু ধর্মের বিধানটি মৃতদেহ পুড়িয়ে দেয়ায়। সরকারী হিসাব মতে কোভিডের কারণ ভারতে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। সরকারী হিসাবে এ অবধি প্রায় ৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে বহু বিশেষজ্ঞের মতে মৃতের সংখ্যা সরকারের দেয়া সংখ্যা থেকে ৫ থেকে ১০গুণ বেশী। কোভিডে সমগ্র বিশ্বে যত মানুষ মারা যাচ্ছে এক ভারতে মারা যাচ্ছে তার অর্ধেকের বেশী। এতে বিপর্যস্ত হচ্ছে ভারতের পরিবেশ। শ্মশানগুলোতে শত শত লাশ পুরানো হচ্ছে। শ্মশানে জায়গা না হওয়ায় কার পার্ক, রাস্তা ও খোলা মাঠের উপর গড়ে উঠছে শ্মশান। হাজার হাজার লাশ পুড়ার গন্ধ ও ধুঁয়ায় বিষাক্ত হচ্ছে্ শহরের পরিবেশ।

একটি মানব দেহকে পুড়িয়ে পুরা ছাই করতে প্রচুর কাঠ লাগে। যে দরিদ্র মানুষের ঘরে চুলা জ্বালানোর জন্য খড়ির অভাব, সে কাঠ জোগাড় করবে কোত্থেকে? তাছাড়া হটাৎ চাহিদা বাড়ায় দিল্লি, মোম্বাই ও অন্যান্য বড় বড় শহরগুলিতে শুরু হয়েছে কাঠের সংকট্। কাঠের দাম প্রতি মন ৫ শত রুপীতে পৌঁছেছে। সংকট এড়াতে ভারতের বন বিভাগ রাস্তার গাছ কাটার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু তাতে সমস্যা দূর হয়নি। কাঠের অভাবে লাশ না পুড়িয়ে বা আধা পুড়িয়ে শত শত লাশ ফেলা হচ্ছে নদীতে। হিন্দু ধর্মে সেটিও নাকি সিদ্ধ। গঙ্গা ও যমুনার ন্যায় নদীতে ফেলা অসংখ্য লাশ ফুলে ফেঁপে ভেসে উঠছে। লাশ থেকে রোগ ছড়িয়ে পড়বে এ ভয়ে আতংকিত নদীর তীরে বসবাসকারী মানুষগুলো। অপর দিকে গলিত লাশগুলো ছড়াচ্ছে বিকট দুর্গন্ধ। অনেক লাশ কুকুর, শৃগাল ও শকুনের খাদ্য হচ্ছে। এ এক বীভৎস চিত্র। ভারতীয় টিভিতে এগুলোই হলো খবরের শিরোনাম।

মানুষ কতটা সভ্য ও বিবেকবান -সেটি ধরা পড়ে শুধু জীবিতদের প্রতি সন্মান দেখানোতে নয়। বরং ধরা পড়ে মৃতদের প্রতি কতটা সন্মান দেখানো হয় তা দেখে। প্রশ্ন হলো, হিন্দু ধর্মের যারা জন্ম দিয়েছিল তাদের মগজে মানব সমাজের অতি গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে কি তারা আদৌ ভাবেনি? ভারতীয় চ্যানেলগুলোয় লোমহর্ষক চিত্রগুলো যখন দেখি তখন মনে ভেসে উঠে নিজ চোখে দেখা ইরানের রাজধানী তেহরানের বেহেশতে জাহরার চিত্র। বেহেশতে জাহরা হলো তেহরানের সবচেয়ে বড় কবরস্থান। এটির আয়োতন ঢাকার সহরোওয়ার্দী উদ্যানের চেয়েও অনেক বড়। ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরানের দশ লাখের বেশী মানুষ নিহত হয়। সে যুদ্ধে তেহরানবাসীদের মধ্য থেকে যারা নিহত হয়েছিল তাদের কবরগুলি এখানে। অথচ মনে হয়, এটিই যেন তেহরানের সর্ববৃহৎ পার্ক। মনেই হয়না এটি কোন কবরস্থান। কবরস্থানের মধ্য দিয়ে অসংখ্য পরিচ্ছন্ন পাকা রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ দৃষ্টিনন্দন গাছ। কবরগুলো ঘিরে নানা রংয়ের ফুলের গাছ। যেন সে ফুলগাছগুলি পাহারা দিচ্ছে কবরগুলিকে। কবরের চার পাশ দিয়ে মার্বেল পাথরের আচ্ছাদন। প্রতিটি কবরে রয়েছে ফলক, তাতে রয়েছে নিহতের বাঁধানো ছবি। লেখা আছে জন্ম তারিখ, কবে এবং কোন রণাঙ্গণে নিহত হয়েছিল তার বিবরণ। এসব দেখে মনে হয়, ইরানীরা নিহতদের সন্মান দিতে জানে। কবরস্থানকে তারা জীবিত রেখেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার পরিবার আসে কবরবাসীদের জিয়ারত করতে। ছুটির দিনগুলোতে  কবরস্থান লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। তেহরানের বুকে এটিই হলো তেহরানবাসীর বেড়ানোর সবচেয়ে জনবহুল জায়গা। কবরের পাশে কার্পেট বিছিয়ে তার উপর ঘন্টার পর ঘন্টা অবস্থান করে। সমগ্র কবরস্থান জুড়ে এরূপ জমে উঠে বিপুল সংখ্যক মানুষের জটলা। নিহত ব্যক্তি হয়তো কারো সন্তান, কারা ভাই, কারো স্বামী বা কারো পিতা। তাকে ঘিরে তারা স্মৃতিচারণ করে। কেউ বা দোয়াদরুদ পাঠ করে। সেখানে বসেই তারা পানাহার করে।

জীবিতগণ তাদের জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ পাঠটি পায় মৃতদের থেকে। মৃতগণ নিজে মরে গিয়ে অনেক কিছুই শিখিয়ে যায়। জীবিতদের তারা মৃত্য-সচেতন করে। জিয়ারতকারী কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের আগামী বাসস্থানটি স্বচোখে দেখে ঘরে ফিরে। কবরে যারা শুয়ে আছে তারাও একদিন জীবিত ছিল- সেটিই তো পরম সত্য। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিপ্লবের জন্য এরূপ মৃত্যু-সচেতনতাটিই তো মুল্। জীবনের এ পাঠটি কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া যায় না। এজন্যই নবীজী (সা:) কবরস্থান জিয়ারতের নসিহত করেছেন্। মৃতদেহ জ্বালিয়ে দিলে শিক্ষালাভের সে অমূল্য বিদ্যাপীঠটি আর অবশিষ্ঠ থাকে কী? হিন্দু ধর্মে সেটি নেই।

 

২.  বিরাট ভূল হয়ে গেছে: এবার ভোগের পালা

বিশাল গাছ দেখেই বলা যায়, অনেক আগে সেখানে একটি চারা লাগানো হয়েছিল। তেমনি দেশে দুর্বৃত্তদের অতি নৃশংস স্বৈরশাসন দেখে নিশ্চিত বলা যায়, অতীতে স্বৈরশাসনের বীজ রোপন করা হয়েছিল। গাছ যেমন একদিনেই বড় হয়না, স্বৈরাচারি শাসনের দুর্বৃত্তিও তেমনি একদিনে দেশ জুড়ে জোয়ার আনে না। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বীজ রোপনের কাজটি হয়েছিল ১৯৭০ সালে। এবং সেটি জনগণের নিজ হাতে। ভয়ানক সে ক্ষতির কাজটি হয়েছিল বাকশালী স্বৈরাচারি, খুনি এবং ভারতের সেবাদাস মুজিবকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে। বাঙালী মুসলিমের সমগ্র ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে বড় ভূল। সে ভূলের পর থেকেই বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে ভারতের একটি গোলাম রাষ্ট্রে।

ভূল করলে তার ফলও ভুগতে হয়। মুজিবের ন্যায় একজন ভারতীয় দালাল, খুনি ও বাকশালী স্বৈরাচারিকে ভোট দিলে গণতন্ত্র আসে না। বরং ডাকাতি আসে। হিংস্র নেকড়ে চেনার সামর্থ্য না থাকলে বড় বড় ডিগ্রি নিয়ে লাভ কী? তখন নেকড়ের পেটে যেতে হয়। তেমনি  স্বৈরচারি দুর্বৃত্তকে কে না চিনলে কি গণতন্ত্র আসে? তবে কথা হলো, শেখ মুজিব ক্ষমতায় বসার পর স্বৈরাচারী, খুনি, দুর্বৃত্ত ও ভারতের সেবাদাস হয়নি। ক্ষমতায় যাওয়ার আগেও তো সে তাই ছিল। ভারতের সাথে ২৫ সালা চুক্তির আগেই সে আগরতলা ষড়যন্ত্র করেছিল।  কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ জেনে বুঝে তাকে মাথায় তুলেছে। ফলে আজ যা কিছু হচ্ছে তা জনগণের নিজ হাতের কামাই।

মুজিবের দুর্বৃত্তি, স্বৈরাচার ও ভারতসেবী চরিত্র পুরাপুরি বেঁচে আছে হাসিনার মাঝে। মুজিবের হাতে গণতন্ত্রের উপর ডাকাতি হয়েছিল। এবং জনগণের উপর চাপানো হয়েছিল একদলীয় বাকশালী ফ্যাসিবাদ। তেমনি হাসিনার হাতেও ডাকাতি হয়ে গেছে স্বাধীনতা। ডাকাতি হয়ে গেছে ভোটদানের অধিকার। ফলে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান আমলে জনগণের মিটিং-মিছিল, লেখালেখী ও ভোটদানের যে স্বাধীনতা ছিল -সে স্বাধীনতার কথা এখন ভাবাও যায় না। জনগণ সেদিন যেভাবে স্বাধীন ভাবে ভোট দিতে পেরেছিল, সেটি আজ কল্পনাও করা যায় না। লক্ষণীয় হলো, মুজিবের ন্যায় হাসিনা্ও গণতন্ত্রের সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছে। মুজিব তার একদলীয় বাকশালী শাসনকে গণতন্ত্র বলতো। তেমনি হাসিনাও স্বৈরাচারকে গণতন্ত্র বলছে। এবং ভোটডাকাতীকে বলছে সুষ্ঠ নির্বাচন।

 

৩. জনকল্যাণের ভাবনা চোরডাকাতদের থাকে না

চোরডাকাতদের জনকল্যাণের মহৎ ভাবনা থাকে না। সে ভাবনা থাকলে কি তারা চুরিডাকাতির ন্যায় কাউকে ক্ষতি করার কাজে নামতো। কল্যাণের সে ভাবনা ভোটডাকাত শেখ হাসিনারও নাই। দেশে কোভিড রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ভারতে সেটি অতি চরম আকার ধারণ করেছে। ভারত সরকারের স্বাস্থ্য খাত এখন পুরাপুরি বিপর্যস্ত। শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে আক্সিজেনের অভাবে। কোভিডের সে প্লাবন যখন তখন বাংলাদেশে্ও ধেয়ে আসতে পারে। অথচ বাংলাদেশ সরকারের জরুরি ভিত্তিতে যা করণীয় ছিল -সেটিই করছে না। দেশে নাই ভ্যাকসিন। ভারতকে ভ্যাকসিনের আগাম মূল্য দিয়েছিল, কিন্তু ভারত ভ্যাকসিন দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। জেলা হাসপাতালগুলোয় নাই আই.সি.ইউ বেড। নাই ভেনটিলেটর। নাই পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা। নাই প্রয়োজনীয় সংখ্যক হাসপাতাল বেড। নাই পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাক্তার ও নার্স।  থানা পর্যায়ের হাসপাতালগুলির অবস্থা তো আরো শোচনীয়। জনগণের জীবন বাঁচানো নিয়ে সরকারের আগ্রহ কত সামান্য -সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাকি থাকে? অথচ হাসিনার এজেন্ডা স্রেফ তার গদি বাঁচানো এবং সে সাথে তার মৃত পিতার স্মৃতি বাঁচানো। শেখ মুজিবের স্মৃতি বাঁচানোর সে কাজে দেশের রাজস্ব ভান্ডার থেকে সম্প্রতি শত শত কোটি টাকা খরচ করলো।

৪. দানের প্রচার
রমযান মাসে মানুষের মাঝে দানে আগ্রহ বাড়ে। আনেকেই এ মাসে প্রচুর দান-খয়রাত করেন। অনেকে আবার দান-খয়রাতের ছবি ছেপে প্রচারও করছেন। অথচ দান যখন গোপনে করা হয় -বুঝতে হবে সে দানে মহান আল্লাহতায়ালার ভয় আছে। যখন দানের ছবি তুলে অন্যদের দেখানো হয় -তখন বুঝতে হবে এর মধ্যে রাজনীতি ও রিয়াকারী তথা লোকদেখানোর ভাব আছে, যা দানের ছওয়াব কমিয়ে দেয়। দানের লক্ষ্য, পরকালের এ্যাকাউন্টে নিজের সঞ্চয় বাড়ানো। সেটি তখন বাড়ে যখন সে দানে মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হয়। কোন বান্দাহকে খুশি করা যেমন লক্ষ্য নয়, তেমনি কারো থেকে বাহবা পাওয়াও লক্ষ্য নয়। ফলে প্রচারের কেন প্রয়োজন হবে?   

৫. শ্রেষ্ঠদান
সবচেয়ে বড় দানটি অর্থ, বস্ত্র, গৃহ বা ভূমিদান নয়। সেটি পবিত্র কুর’আনের জ্ঞানদান। একমাত্র এ দানই জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচায়। কোটি টাকা দানেও সে কল্যাণটি হয়না। নবীরাসূলগণ অর্থশালী ছিলেন না। তারা দান করেছেন ওহীর জ্ঞান। কিন্তু বাংলাদেশে জ্ঞানদানের সে কাজটি হচ্ছে না। মকতব খুলে ছাত্র-ছাত্রীদের স্রেফ তেলাওয়াত শেখানো হচ্ছে। কিন্তু জ্ঞানদানের কাজ হচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশে কুর’আন শেখানোর নামে সেটিই বেশী বেশী হচ্ছে।

৬. শ্রেষ্ঠ ইবাদত

যে ইবাদতে অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্তের বিনিয়োগ ঘটে সেটি হলো জিহাদ। অন্য কোন ইবাদতে জান, মাল ও সামর্থ্যের এরূপ বিশাল বিনিয়োগ হয়না। জিহাদ এজন্যই সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। একমাত্র জিহাদই শয়তানী শক্তিকে পরাজিত করে এবং ইসলামকে বিজয়ী করে। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতে সেটি হয় না। জিহাদীরাই মুসলিম উম্মহর ভাগ্য পাল্টা এবং জমিনের উপর মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের গৌরব বাড়ায়। এবং প্রতিষ্ঠা দেয় তাঁর সার্বভৌমত্বের।

জিহাদে প্রাণ গেলে শহীদ হয় এবং বিনা হিসাবে জান্নাত পায়। আন্য কোন ইবাদতের ক্ষেত্রে সে প্রতিশ্রুতি নাই। জিহাদের মধ্যে সত্যিকার ঈমান দেখা যায়। মুনাফিকও নামায পড়তে পারে, হজ্জ করতে পারে এবং যাকাতও দিতে পারে। কিন্তু মুনাফিক কখনোই জিহাদে হাজির হয়না। তাই বলা হয়, যার মধ্যে জিহাদ নাই তার  মধ্যে সত্যিকার ঈমানও নাই। এমন ব্যক্তি ঈমানের দাবী করলেও সে আসলে মুনাফিক।

৭. বই ও বই পড়ার গুরুত্ব

ঘরে শুধু চাল-ডালের- মওজুদ বাড়ালে চলে না, বইয়ের মওজুদও বাড়াতে হয়। চাল-ডাল দেহ বাঁচায়, আর মনে পুষ্টি জোগায় সুন্দর সুন্দর বই। তাই মানবিক গুণে মানুষ রূপে বেড়ে উঠার জন্য বই পড়া জরুরি। মুসলিমদের গৌরবকালে ঘরে ঘরে লাইব্রেরি ছিল। তারা শুধু দৈহিক স্বাস্থ্যেরই অধিকারী ছিল না, তাদের মনের স্বাস্থ্যও বলিষ্ঠ ছিল। সে সময় ছাপাখানা আবিস্কৃত না হলেও হাতে লিখে হাজার হাজার বই প্রকাশ করা হতো। একটি ভাল বই নকল করে সুন্দর হস্তাক্ষরে শত শত বই লেখা হতো। সে গুলি ছড়িয়ে পড়তো সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে। যারা নকল করতো তাদের কাতেব বলা হতো। হাজার হাজার পরিবার বই নকল করার পেশায় জীবিকা নির্বাহ করতো।

বইপড়া কমতে শুরু হলে নীচে নামাও শুরু হয়। মুসলিম দেশগুলোতে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হলেও বই লেখা ও বইপড়া বাড়েনি। একটি জাতি চেতনা-চরিত্র ও মানবিক গুণে কতটা সমৃদ্ধ সেটি বুঝার জন্য ঘর-বাড়ী, চাল-ডাল ও অর্থ ভান্ডারের খবর নেয়ার প্রয়োজন নাই। দেশের বইয়ের দোকানগুলিতে কতগুলি বই বিক্রয় হয় সে খোঁজ নিলেই সেটি সঠিক বুঝা যায়। সাড়ে ৬ কোটি মানুষের দেশ হলো বিলেত তথা যুক্তরাজ্য। অথচ এদেশে যত বই ছাপা হয় এবং যত বই পড়া হয় তা ১৫০ কোটি মুসলিমের দেশগুলিতে ছাপা হয়না। পড়াও হয়না। অথচ মুসলিম দেশগুলির সম্পদ কি কম? মুসলিমগণ কেন পিছিয়ে আছে সেটি বুঝতে কি এরপরও কি্ছু বাকি থাকে? বই পড়ার দিক দিয়ে এগিয়ে আছে অথচ উন্নয়নে পিছিয়ে আছে -এমন একটি দেশ কি দুনিয়াতে খুঁজে পাওয়া যাবে? তেমনি বই পড়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে কিন্তু উন্নয়নে এগিয়ে আছে -এমন কোন দেশও কি কোথাও আছে?   

৮. বাঙালী মুসলিমের সবচেয়ে বড় অপরাধটি প্রসঙ্গে

মানুষের কর্ম ও চরিত্র নিয়ন্ত্রিত হয় তার ঈমান বা বেঈমানী থেকে। ঈমানদারীর প্রকাশ ঘটে মিথ্যা ও দুর্বৃত্তদের ঘৃনা এবং সত্য ও ভালবাসার মধ্যে। অপর দিকে বেঈমানীর প্রকাশ ঘটে খুনি ও স্বৈরাচারী দুর্বৃত্তদের পক্ষ নেয়ার মধ্য দিয়ে। ফিরাউনের ন্যায় স্বৈরাচারী দুর্বৃত্তগণ যে দেশে পিতা, নেতা ও বন্ধু রূপে স্বীকৃতি পায় সেদেশের মানুষকে কি বলা যাবে? এটি কি ঈমানদারীর প্রকাশ?

ভয়ানক অপরাধ শুধু খুন, ব্যাভিচারীও চুরিডাকাতি নয়। ঈমান ও বিবেকের পরীক্ষা হয় দুর্বৃত্ত ও তার মিথ্যাবৃত্তি ও দুর্বৃত্তিকে ঘৃণা করার সামর্থ্য দেখে। যারা জাহান্নামে যাবে তারা যে সবাই খুনি, ব্যাভিচারী ও চোর-ডাকাত তা নয়। যারা মুর্তি পূজারী কাফের তারা যে সবাই দুর্বৃত্ত বা খুনি তাও নয়। তাদের অপরাধ সত্যকে চিনতে ব্যর্থ হওয়ায়। বাঙালী মুসলিমের সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে বড অপকর্ম এবং সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো, শেখ মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারী ও ইসলাম বিরোধী দুর্বৃত্তকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করায় এবং তাকে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা রূপে মেনে নেয়ায়। তার মিথ্যাচারী, স্বৈরাচারী ও ভারতসেবী চরিত্র চিনতে বাঙালী মুসলিমগণ নিদারুন ব্যর্থ হয়েছে। এরূপ ব্যর্থতার কারণেই মিশরবাসীগণ ফিরাউনকে ভগবান বলতো ও হযরত মূসা (আ:)’র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তথচ তারা বুদ্ধিহীন ছিল না; তারাই বিস্ময়কর পিরামিড নির্মাণ করেছে। কিন্তু সে বুদ্ধিকে তারা সত্যকে সনাক্ত করার কাজে লাগায়নি। একই রূপ ব্যর্থতা নিয়েই হিন্দুগণ সাপ, মুর্তি ও গরুকে ভগবান বলে। এরূপ অক্ষমতা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে গণ্য হয় গুরুতর অপরাধ রূপে। ১১/০৫/২০২১

 




বিবিধ ভাবনা (৪৭)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. বাংলাদেশ একটি জেলখানা

কারো সভ্যতা, ভদ্রতা ও বিবেকের বিচার কখনোই দালান-কোঠা, গাড়ি ও পোষাক-পরিচ্ছদ দেখে হয়না। বড় বাড়ি, দামী গাড়ি ও জমকালো পোষাক চোর-ডাকাতদের ন্যায় দুর্বৃত্তদেরও থাকতে পারে। তেমনি একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত সে বিচার রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা ও জিডিপি’র বৃদ্ধি দেখে হয়না। বিচারে গুরুত্ব পায় সে দেশের মানুষ কতটা স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করে -সে বিষয়গুলি। দেশ যদি জেল খানায় পরিণত হয় -তবে রাস্তাঘাট, গাড়ি-বাড়ি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে লাভ কি? জেলখানার বিল্ডিংটি প্রাসাদসম হলে জেলবাসীদের কি লাভ? জেলখানার কয়েদীদের স্বাধীনতা ও মর্যাদা থাকে না। থাকে বিরামহীন গোলামী। জেলে আটক থাকাটাই বড় শাস্তি। এজন্যই জেলখানায় কেউ আটক থাকতে চায় না।

একটি রাষ্ট্রও তেমন এক জেলখানায় পরিণত হতে পারে। তেমন এক জেলখানার উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। জেলের মতই দেশটি একটি আযাবের জায়গা। জেলখানায় মিটিং-মিছিল ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না। নির্যাতন হলেও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অধিকার থাকে না। থাকে না সংগঠিত হওয়ার অধিকার। সে অধিকার নাই বাংলাদেশের জনগণেরও। এখান স্বাধীন ভাবে বাঁচতে গেলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তবে পার্থক্য হলো, সাধারণ জেলখানায় অপরাধীদের রাখা হয়, কিন্তু বাংলাদেশ নামক বিশাল জেলখানায় বন্দী হয়ে আছে দেশটির নিরপরাধ জনগণ। 

২. কবরে গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের ব্যর্থ জনগণ

শাসনতান্ত্রিক ভাবে বাংলাদেশকে বলা হয় একটি গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু কোথায সে গণতন্ত্র? গণতন্ত্র দেশের মানুষকে আর কি গণতন্ত্র দিবে? গণতন্ত্র নিজেই এখন কবরবাসী। মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ নির্বাচন, স্বাধীন পত্রিকা ও নিরপেক্ষ বিচার ছাড়া কি গণতন্ত্রের কথা ভাবা যায়? ভোটচোর হাসিনা এর সবগুলোই ধ্বংস করেছে। সেগুলি ধ্বংস না করলে চোরগণ কি ক্ষমতায় থাকতে পারে?

পার্শ্ববর্তী পশ্চিম বাংলায় একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়ে গেল। অথচ সেরূপ একটি নির্বাচন বাংলাদেশে হয়না। এটি কি কম লজ্জার? আত্মসন্মান আছে এমন কোন বাংলাদেশী কি এ অপমান সইতে পারে? ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে এদেশে ভোটডাকাতি হয়েছে। যে কোন সভ্য দেশে চোর-ডাকাতদের শাস্তি হয়, কিন্তু বাংলাদেশে ভোটচোর হাসিনাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা। চোরকে এরূপ সন্মানিত করার নীতি কি কোন সভ্য দেশে আছে? কোন সভ্য জনগণ কি চোর-ডাকাতের শাসন মেনে নেয়? বাংলাদেশী জনগণ এ ক্ষেত্রে ইতিহাস গড়েছে। সেটি হাসিনার ন্যায় ভোটচোরের শাসন মেনে নিয়ে।

ছাগল-ভেড়ার খামার দেখলে সেখানে নেকড়ে হানা দেয়। তেমনি জনগণ ভীরু-কাপুরুষ হলে সে দেশে ডাকাতেরা হানা দেয়। ছাগল-ভেড়া জন্মায় জবাই হওয়ার জন্য; তেমনি কাপুরুষগণ বেড়ে উঠে চোর-ডাকাতদের শিকার হওয়ার জন্য। এবং বাংলাদেশে এ চোর-ডাকাতগণ এখন শাসক হয়ে বসেছে। হাসিনার মত চোর কোন সভ্যদেশে কি রাস্তার ঝাড়ুদার হওয়ার চাকুরিও পেত? কেউ কি কোন চোরকে তার বাড়ীর দাসীও বানায়? চোরদের স্থান তো জেলে। যে চোর জনগণের ভোট চুরি করতে পারে, সে রাজস্বের ভান্ডারও চুরি করতে পারে।

চোরদের হাতে রাষ্ট্রের দায়ভার দূরে থাক, ঝাড়ুদার বানানোও নিরাপদ নয়। এরা দেশও বিক্রি করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে চোরদের পক্ষে সম্ভব হলো দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়াও! মুজিবে ন্যায় আত্মস্বীকৃত খুনি, বাকশালী স্বৈরাচারী এবং ভারতের ন্যায় শত্রুশক্তির চর দেশটির জনগণের কাছে বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা ও মহান নেতার সন্মানও পায়! কি আশ্চর্য? পাকিস্তানীদের বড়ই সৌভাগ্য যে তারা বেঁচে গেছে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ন্যায় দুর্বৃত্তদের ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে। কিন্তু হতভাগা বাঙালী বাঁচেনি।   

৩. অসভ্য শাসনের শিকার বাংলাদেশ

বাঘ-ভালুকের ন্যায় হিংস্র পশুগণ জনপদে বাস করে না। নিজেদের জান বাঁচাতে তারা গভীর জঙ্গল খোঁজে। তেমনি চোর-ডাকাতেরাও সভ্য সমাজে বাস করে না, তারাও নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরে অসভ্য সমাজ খোঁজে। প্রয়োজনে সেরূপ একটি অসভ্য সমাজ তারা তৈরী করে নেয়। এবং তারই প্রমাণ হলো আজকের বাংলাদেশ। অসভ্য সমাজের নির্মাণের খাতিরে গণতন্ত্র, নিরপেক্ষ আদালত ও স্বাধীন মিডিয়ার ন্যায় সভ্য সমাজের প্রয়োজনীয় স্তম্ভগুলিকে তারা কবরে পাঠায়। জঙ্গলে যেমন বিচার-আচার থাকে না, তেমনি থাকে না অসভ্য সমাজেও। বাংলাদেশে তো সেটইই হয়েছে। তাই একটি দেশে সভ্য রীতি-নীতি কতটা মারা পড়েছে এবং অসভ্য শাসন কতটা প্রবলতর হয়েছে -সেটি বুঝা যায় শাসন ক্ষমতায় চোর-ডাকাতদের দেখে।

৪. সাচ্চা ঈমানের পরিচয়

সেই প্রকৃত ঈমানদার যে বাঁচে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার নিয়তে। তখন আমূল বিপ্লব আসে তাঁর চরিত্র, কর্ম ও আচরণে। তখন তাঁর প্রতিটি দিন কাটে নেক আমলে। সেটি যেমন কর্মে, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিতে। কারণ সে জানে, দুনিয়া ছেড়ে যখন তখন তাঁকে বিনা নোটিশে চলে যেতে হবে। সে জানে, অনন্ত-অসীম আখেরাতে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার কাজটি দুনিয়াতে থাকা অবস্থাতেই করতে হবে। ফলে সে তাঁর সমগ্র সামর্থ্যের বিনিয়োগ করে নেক আমালে। তখন আখেরাতের সঞ্চয় বাড়াতে শুরু হয় প্রচণ্ড তাড়াহুড়া। এদের জীবনে জিহাদও আসে। কারণ, মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সবচেয়ে বড় নেক আমল হলো জিহাদ। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত ব্যক্তির জীবনে পরিবর্তন আনে। কিন্তু জিহাদ দেশ জুড়ে বিজয় আনে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের। তখন বিপ্লব আসে কোটি কোটি মানুষের জীবনে। মহান আল্লাহতায়ালার নিজ বয়ানে ঈমানের দাবীতে এই জিহাদীরাই হলো প্রকৃত সাচ্চা –যা তিনি বলেছেন সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে।

৫. জিহাদ কেন অনিবার্য হয়?

যে জনপদে বাঘ-ভালুকের বাস, সেখানে বাঘ-ভালুক তাড়ানোর সদা প্রস্তুতি থাকতে হয়। নইলে পশুর পেটে যেতে হয়। তেমনি যে সমাজে দুর্বৃত্তদের দাপট তাদের নির্মূলেও লাগাতর যুদ্ধ থাকতে হয়। নইলে সমাজে শান্তি আসে না। তখন দেশ অধিকৃত হয় দুর্বৃত্তদের হাতে। দুর্বৃ্ত্ত নির্মূলের সে যুদ্ধটিই হলো মুসলিম জীবনের জিহাদ। নবীজী (সা:)’র হাদীস: মুসলিমের জীবনে দুই অবস্থা। হয় সে জিহাদে থাকবে অথবা জিহাদের প্রস্তুতি নিতে থাকবে। অপরদিকে শয়তানের এজেন্ডা হলো: মুসলিম জীবন থেকে জিহাদ বিলুপ্ত করা। এ জন্যই যে দেশের রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে শয়তানী শক্তির বিজয়, সে দেশে জিহাদ থাকে না। বরং জিহাদ গণ্য হয় সন্ত্রাস রূপে।

অথচ জিহাদের প্রস্তুতি নিয়ে বাঁচাটি ইসলামে ফরজ। কারণ, সে নির্দেশটি এসেছে সুরা আনফালের ৬০ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, “তাদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে প্রস্তুত হও; শক্ত করে ধরো ঘোড়ার লাগামকে, এবং তা দিয়ে সন্তস্ত্র করো তোমাদের শত্রু ও আল্লাহর শত্রুদের…”। অতএব জিহাদের সে প্রস্তুতি না থাকাটিই চুড়ান্ত বেঈমানী্। এজন্যই নবীজী (সা:)’র প্রসিদ্ধ হাদীস: যে কোনদিন জিহাদ করেনি এবং জিহাদের নিয়েতও করে না -সে মুনাফিক।

 

৬. বাংলাদেশের চোরের সন্মান

চোর কখনোই চুরি করা মালের মালিক হয়না। ভোট চুরি করে তেমনি কেউ দেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী হতে পারে না। যে কোন দেশের আইনে এরূপ চুরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই প্রতিটি সভ্য দেশেই চোরকে শাস্তি দেয়া হয়। কিন্তু বিশ্বমাঝে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এদেশে চোরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে সন্মানিত করা হয়। জনগণ ভূলে যায় যে, ভোটচোরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলার অর্থ চোরকে সন্মানিত করা। ইসলামে এটি গুরুতর পাপ। কারণ ঈমানদার বাঁচতে হয়ে চোর-ডাকাতসহ সকল দুর্বৃত্তদের নির্মূলের প্রতিজ্ঞা নিয়ে। কারণ, নেহী আনিল মুনকার (দুর্বৃত্তির নির্মূল) এবং আ’মারু বিল মারুফ (ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা) হলো পবিত্র কুর’আনে বর্ণীত মুসলিম জীবনের মিশন।

 

৭. উম্মাহর অনৈক্য ও হারাম ভূগোল

মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে কি বলেছেন সেটি গুরুত্ব পেলে সমাজে বিভেদ হয়না। বিভেদ তো তখন শুরু হয় যখন ঘটনার বিচারে নিজের স্বার্থ, নিজ নেতা ও দলের স্বার্থ, গোত্রের স্বার্থ ও শ্রেণীস্বার্থ গুরুত্ব পায়। অনৈক্যের বড় কারণ হলো, এসব নৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে পবিত্র কুর’আনী রোড ম্যাপ থেকে দূরে সরা। ঘটনার বিশ্লেষণে ও সমস্যার সমাধান খুঁজতে যারা কোর’আনের পথকে বাদ দিয়ে নিজেদের বুদ্ধিকে কাজে লাগায় তারাই পথভ্রষ্ট হয়। তাদের ভ্রষ্টতার কারণেই এক সিরাতুল মুস্তাকীমের বদলে অসংখ্য পথ গড়ে উঠে। তারা শুধু জনগণকে পথভ্রষ্টই করে না, রাষ্ট্রকে সংঘাতপূর্ণও করে। তাই মানবসৃষ্ট মতবাদগুলি মানব জাতিকে কোন কল্যাণ দেয়নি। এ পথভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবীদের কারণে বাংলাদেশেও অকল্যাণ কম হয়নি। এদের কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘাত বেড়েছে এবং বিজয়ী হয়েছে শয়তানের পক্ষের শক্তি।

মুসলিমগণ আজ যে পতনদশায় পৌঁছেছে সেটি দশ-বিশ বছরে  ঘটেনি, পতনের শুরুটি  বহু আগে থেকেই। সেটি কুর’আনী রোডম্যাপ থেকে দূরে সরা ও বিভক্তির মধ্য দিয়ে। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ যে রোডম্যাপ বেয়ে চলেছেন সে রোডম্যাপ চলা তারা বহুশত বছর আগেই ছেড়ে দিয়েছে। ফলে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের আমলের ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়তী আদালত, শুরা ভিত্তিক শাসন, ঐক্য ও জিহাদ কোথাও বেঁচেনি। বিভক্তি হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আলামত। অথচ আরবগণ ২২ রাষ্ট্রে বিভক্ত। মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত ৫৭টি রাষ্ট্রে। এরূপ বিভক্ত মানচিত্র গড়া কি ইসলামে বৈধ। বিভক্তি গড়ার প্রতিটি প্রচেষ্টাই তো হারাম। মুসলিমদের গৌরব কালে কি এরূপ বিভক্ত ভূগোল ছিল? অথচ সে ভূগোল ভেঙ্গে ৫০টি বাংলাদেশ বানানো যেত। আজকের মুসলিমগণ তো বাঁচছে নিজ নিজ দেশের হারাম মানচিত্র নিয়ে। এ হারামের বিরুদ্ধে কথা বলাও অপরাধ। অথচ শুধু পানাহার হালাল হলে চলে না। রাজনীতি ও রাষ্ট্রের ভূগোলও হালাল হতে হয়। মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করার ন্যায় হারাম প্রজেক্ট নিয়ে যে মানচিত্র -তা হালাল হয় কি করে?

 

৮. জয়-পরাজয়, স্বাধীনতা-পরাধীনতা ও ঈমানদারীর বিষয়

মানুষের স্বভাব হলো বিজয় নিয়ে গর্ব করা। অনেক সময় বিজয় দিয়ে নির্ধারণ করা হয় কে সঠিক পথে এবং কে বেঠিক পথে –সে বিষয়টি। বিজয়ীদের কুকর্মগুলো তখন বিচার বসেনা। জাপানে দুটি পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ করেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাই অপরাধীর কাটগড়ায় উঠতে হয়নি। অথচ মানব জীবনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বিজয়ী বা পরাজিত হওয়া নয়, সেটি হলো ন্যায়ের পথে অটল থাকা। মুসলিমের ঈমানী দায়ভার হলো, উম্মাহর কিসে কল্যাণ এবং কিসে অকল্যাণ –সে বিষয়ে মনযোগী হওয়া। বুঝতে হয়, পরাজিত হওয়াতে কেউ জাহান্নামে যাবে না। অথচ বিজয়ী হয়েও অনেকে জাহান্নামে যাবে। এবং সেটি ন্যায়ের পথ থেকে পথভ্রষ্ট হওয়াতে। ইতিহাসে বহু সাম্রাজ্যবাদী জালেম বিজয়ী হয়েছে। এবং বহু নিরাপরাধ জনগণ পরাজিত হয়েছে এবং গণহত্যার শিকার হয়েছে। পরাজিত হয়েছেন এমন কি বহু নবী-রাসূলও।

বাঙালীগণ একই ভূল করে একাত্তরের মূল্যায়নে। একাত্তরে বাঙালী মুসলিমদের মাঝে দুটি পক্ষ ছিল। একটি ছিল অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ। তারা ছিল প্যান-ইসলামীক চেতনায় উদ্বুদ্ধ। তারা তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের মাঝে থাকায় কল্যাণ দেখতো। দেখতো আগ্রাসী ভারতের হামলার মুখে বাঙালী মুসলিমদের প্রতিরক্ষার বিষয়টিও। সেটি ক্ষুদ্র বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা ভাবতো পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক রূপে সুযোগ মিলবে বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার। এমন একটি চেতনার কারণেই ১৯৪৭ সালে বাংলার মুসলিম লীগের নেতাগণ পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান ভূক্ত করে। তাছাড়া শরিয়তের দৃষ্টিতে কোন মুসলিম দেশকে ভাঙ্গা হারাম। এ জন্যই কোন বাঙালী আলেম পাকিস্তান ভাঙ্গাকে সমর্থন করেনি। ভারতের কোলে গিয়েও উঠেনি এবং মুক্তি বাহিনীতেও যোগ দেয়নি। পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসাকে তারা মনে করতো গলায় ভারতের গোলামীর শিকল বেঁধে নেয়া। তারা ভাবতো বাঙালী মুসলিমের মঙ্গলটি পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা দেয়ায়, পাকিস্তান ভাঙ্গায় নয়।

অপর পক্ষে ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টগণ। তাদের এজেন্ডায় মুসলিম ও ইসলামের কল্যাণের কোন ভাবনা ছিল না। তাছাড়া জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম কোন হালাল রাজনৈতিক দর্শন নয়। এ পক্ষের নেতা ছিল শেখ মুজিবের ন্যায় একজন ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য, খুনি, ভারতসেবী ও ক্ষমতালোভী ফ্যাসিস্ট। শেখ মুজিবের দুশ্চরিত্রের কোন কিছুই পরবর্তীতে আর গোপন থাকেনি। মুজিবের সে চরিত্রের প্রকাশ ঘটছে শেখ হাসিনার মধ্যে। তার মত একজন অপরাধী কি দেশবাসীর অকল্যাণ ছাড়া কোন রূপ কল্যাণ দিতে পারে? দিতে যে পারে না -তা গণতন্ত্র হত্যা, ৩০ হাজার মানব হত্যা, বাকশালী স্বৈরাচার ও দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছে। শেখ মুজিব ও তার সহচরদের সহায়তা দিয়েছে আগ্রাসী ভারতীয় কাফেরগণ ও সোভিয়েত রাশিয়া। একাত্তরে দুর্বল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইসলাম বিরোধী এ আন্তর্জাতিক পক্ষটিই বিজয়ী হয়েছে। তবে মূল বিজয়টি ছিল ভারতের। সে বিজয়ের পর ভারত আন্তর্জাতিক অঙ্গণে আঞ্চলিক শক্তির মর্যাদা পায়। ভারতকে এ পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ। বাংলাদেশ যা পেয়েছে সেটি আদৌ স্বাধীনতা নয় বরং ভারতের অধিনত এক গোলাম রাষ্ট্রের পরিচিতি। বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ হয় এখন দিল্লি থেকে। হাসিনাকে তাই জনগণের সমর্থন না পেলেও চলে। দিল্লির সমর্থনই তার জন্য যথেষ্ট। ভারেতর প্রতি এ গোলামীই হলো একাত্তরের প্রকৃত অর্জন -যা নিয়ে বাঙালী মুসলিমদের বাঁচতে হবে আগামী বহুশত বছর। কিন্তু বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ এ তিক্ত সত্যকে গিলতে রাজী নয়। জনগণ ভোটের অধিকার না পেল কি হবে, এ গোলামীকেই তারা স্বাধীনতা মনে করে। ০৬/০৫/২০২১

 

 




বিবিধ ভাবনা (৪৬)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 ১. অবহেলা সর্বশ্রেষ্ঠ নেককর্মে

মানুষকে শুধু রোগভোগ ও দারিদ্র্য থেকে বাঁচানোই বড় বাঁচানো নয়। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাট নির্মাণই শ্রেষ্ঠ সমাজকর্ম নয়। বরং সবচেয়ে বড় বাঁচানো এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজকর্মটি হলো শয়তানী শক্তির অনুসারি হওয়া থেকে বাঁচানো। রোগভোগ ও আর্থিক দূরাবস্থা কাউকে জাহান্নামে নেয় না, কিন্তু শয়তান ও তার অনুসারীগণ নেয়। আর জাহান্নামের আগুনে পৌঁছার চেয়ে ভয়ানক বিপদ আর কি হতে পারে? যে ব্যক্তি জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচলো -সেই অনন্ত কালের জন্য জান্নাত পেল। নবী-রাসূলগণ তাই মানুষের দৈহিক ব্যাধি ও দারিদ্র্য থেকে বাঁচাতে প্রেরীত হননি। তাঁরা এসেছেন সবচেয়ে বড় কল্যাণটি করতে। এটিই মানব সমাজে সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ। এ কাজের জন্যই নবী-রাসূলগণ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার পাবেন। এবং যারা নবী-রাসূলদের সে সূন্নতকে অনুসরণ করেন তারাই পরকালে শ্রেষ্ঠ মানব রূপে সন্মানিত হবেন।

মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার কাজে শয়তানের বাহিনী কাজ করে ধর্ম, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের অঙ্গণে। এসব অঙ্গণে শিকার ধরার কাজে শয়তান বিছায় তার নিজের ষড়যন্ত্রের জাল। এবং ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবকাঠামো। জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার শয়তানী কৌশলগুলি রুখার কাজটি তাই মসজিদ-মাদ্রাসায় বসে হয় না। স্রেফ দোয়া-দরুদের মাধ্যমেও হয় না। ঈমানদারকে সশরীরে এসব অঙ্গণে নামতে হয় এবং অর্থ, শ্রম, বুদ্ধি ও রক্তের বিনিয়োগ করতে হয়। কুর’আনের জ্ঞান হলো এ কাজে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তা্ই সে কাজে সামর্থ্য বাড়াতে যারা নিজেকে কুর’আনের জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে তারাই প্রকৃত জ্ঞানী।

জনগণকে জান্নাতে নেয়ার কাজে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি হলো রাষ্ট্র। রাষ্ট্র ইসলামী হলে তার শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নীতিমালা জনগণকে জান্নাতে নেয়ার বাহনে পরিণত হয়। অপরদিকে শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃত হলে রাষ্ট্র পরিণত হয় জাহান্নামে নেয়ার বাহনে। তাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো রাষ্ট্রকে শয়তানী শক্তির হাত থেকে মুক্ত করা ও সেটিকে ইসলামী করার জিহাদ। কোটি কোটি মানুষ তাতে লাভবান হয়। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা এ জিহাদে শহীদ হয়ে গেছেন। তাই যারা প্রকৃত ঈমানদার তারা কখনোই রাজনীতি থেকে দূরে থাকে না। সে কাজটি সুচারু ভাবে করার জন্যই নবীজী (সা:) ১০ বছর রাষ্ট্র প্রধান ছিলেন। আজকের মুসলিমদের বিপদে কারণ, নবীজী (সা:)’র সে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নতটি মুসলিমদের মাঝে বেঁচে নাই্। এমনকি যারা নিজেদের আলেম রূপে পরিচয় দেন তারাও নিজেদের অরাজনৈতিক বলে ঘোষণা দেন। কিছু দান-খয়রাত করা তাদের কাছে গুরুত্ব পায়, কিন্তু জনগণকে শয়তানী শক্তির খপ্পর থেকে বাঁচানোর ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ কাজটি নয়।   

২. ভালবাসা ও ঘৃণার সামর্থ্য এবং বিমূর্ত বেঈমানী

 কাউকে ভালবাসা ও ঘৃণা করার সামর্থ্য মহান আল্লাহতায়ালা সবাইকে দিয়েছেন। কারো চেতনা বা বিবেকের ভূমিতেই জালেমের লাঠির আঘাত পড়ে না। ফলে প্রতিটি ব্যক্তি এক্ষেত্রে স্বাধীন। তাই ফিরাউনের প্রাসাদে বসেও হযরত আসিয়া ফিরাউনকে গভীর ভাবে ঘৃণা করতেন। বস্তুত ব্যক্তির ঈমানদারী ও বেঈমানী ধরা পড়ে ভালবাসা ও ঘৃণার সামর্থ্যের প্রয়োগের মাঝে। নীরব থাকাটি কোন দেশেই দন্ডনীয় অপরাধ নয়। ঘৃণার স্বাধীনতা প্রকাশ্যে প্রয়োগে ভয় থাকলে নীরব থাকায় বাধা কোথায়? তাই যে ব্যক্তি খুনি, গণতন্ত্রের হত্যাকারী, ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী ও ইসলামের শত্রুকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতির পিতা, দেশের বন্ধু বলতে সোচ্চার -সে ব্যক্তি  নামাযী বা রোযাদার হলেও তাকে কি ঈমানদার বলা যায়? তারা বেঈমানী ধরা পড়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চোর ও ভোটডাকাতদের পক্ষ নেয়ায়। ঈমান থাকলে সেটি প্রকাশ পেত দুর্বৃত্তকে ঘৃণা করার মধ্যে।

৩. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটিই সবচেয়ে অবহেলিত

 কুর’আনের জ্ঞানই আল্লাহতায়ালার ভয় তথা তাকওয়া বাড়ায়। জাহেল তথা অজ্ঞ ব্যক্তির অজ্ঞতাটি তার স্রষ্টাকে নিয়ে। ফলে তার পক্ষে তাকওয়া অর্জন যে অসম্ভব -সে ভাষ্যটি মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহতায়ালার। কুর’আনের জ্ঞানই নেক আমলের ওজন বাড়ায়। জ্ঞানই মহান রবের দরবারে ঈমানদারের মর্যাদা বাড়ায়। পানাহার ছাড়া যেমন দেহ বাঁচে না, তেমনি কুর’আনের জ্ঞান ছাড়া ঈমান বাঁচে না। এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কুর’আনের জ্ঞানলাভ। তাই নামাযের আগে ইলম অর্জন ফরজ করা হয়েছে।

অথচ সে জ্ঞানের উৎস্য পবিত্র কুর’আন ক’জন মুসলিম বুঝে? মুসলিম রাষ্ট্রগুলিতে সে জ্ঞান বিতরণের আয়োজনই বা কোথায়? অথচ এটিই হলো মুসলিম জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। দেশে রাস্তাঘাট ও কল-কারখানা কম হওয়াতে কেউ জাহান্নামে যাবে না। অথচ অজ্ঞতা টানে জাহান্নামের দিকে। কারণ, তাতে অসম্ভব হয় মুসলিম হওয়া। অথচ মুসলিমগণ বাঁচছে কুর’আনী জ্ঞানের গভীর অজ্ঞতা নিয়ে। আর সে অজ্ঞতাই মুসলিমদেরকে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করেছে। মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার মূল বাধা তো এখানেই। আর এজন্যই মুসলিম ভূমিতে ইসলাম পরাজিত।  

৪. অবহেলা বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে

 শয়তানের সৈনিকদের নিরস্ত্র করার কাজটি যুদ্ধের ময়দানে হয় না। যুদ্ধের ময়দানে মূল কাজটি হয় শত্রুর নির্মূলের। শত্রুর সৈনিকদের নিরস্ত্র করা ও যুদ্ধ থেকে তাদেরকে দূরে রাখার কাজটি করতে হয় বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে। ফলে যে দেশে ইসলামের পক্ষে বুদ্ধিবুত্তিক জিহাদ নাই -সে দেশে মুসলিমগণ বিপুল সংখ্যায় শয়তানের দলে যোগ দেয়। তখন সে দলের লোকেরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বেশে রণাঙ্গণে হাজির হয়।

মুসলিমদের মাঝে সে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজটি না হওয়ায় ঔপনিবেশিক কাফেরগণ মুসলিম দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ সৈনিক পেয়েছে মুসলিমদের হত্যা করা ও মুসলিম দেশ দখল করার কাজে। যেমন ভারতের ২ লাখের বেশী মুসলিম ব্রিটশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছে ইরাক ও ফিলিস্তিন দখলের কাজে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন বাংলার কবি কাজী নজরুল ইসলামও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীও। বহু লাখ মুসলিম যোগ দিয়েছে হেজাজ, মিশর ও মরক্কো থেকে। এবং ১৯৭১’য়ে বাঙালী মুসলিমদের দেখা গেছে ভারতীয় কাফেরদের পাশে তাদেরকে বিজয়ীর করার যুদ্ধ করতে।

মুসলিম ইতিহাসের এগুলো অতি কলংকিত অধ্যায়। এবং এর কারণ, বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা। বুদ্ধিবৃত্তিক এ ব্যর্থতার কারণেই কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে মুসলিমদের হত্যা করা ও মুসলিম দেশকে কাফেরদের হাতে তুলে দেয়ার ন্যায় অতি ঘৃণ্য কর্মটিও মুসলিম সমাজে অপরাধ রূপে গণ্য হয়নি। একই রূপ বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার কারণে হাসিনার নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ বাঙালী ভারতের পদসেবা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে আবরার ফাহাদদের লাশ করতে কোন ভারতীয়কে নামতে হয়নি। সে নৃশংস কর্মটি বাঙালী মুসলিম সন্তানেরাই দল বেঁধে নিজ উদ্যোগে করে দিয়েছে। 

৫. পতনের শুরু ও কারণ

 মুসলিমগণ তাদের পতনমুখী যাত্রায় যে জায়গায় আজ পৌঁছেছে সেখানে একদিনে পৌঁছেনি। পতনের শুরুটি বহু বছর আগে থেকে। পতনের শুরুটি পবিত্র কুর’আন থেকে দূরে সরা ও বিভক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে।এটি শুধু পতনের পথ নয়, জাহান্নামের পথও।

এ পতনযাত্রা থেকে উদ্ধারের একটিই পথ। সেটি কুর’আনের পথে ফিরে যাওয়া। এবং কুর’আনের পথে ফিরার অর্থ একতার পথে ফিরা। একমাত্র তখনই অনিবার্য হবে বিজয়।

৬. বিচারহীনতার অসভ্যতা

বিশ্বের সকল দেশেই চোরডাকাতদের ঘৃনা করা হয়। তাদের শাস্তিও হয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো বাংলাদেশ। এদেশে সরকারী দলের চোর-ডাকাতদের বিচার হয় না। বরং সরকারি উদ্যোগে চুরিডাকাতি হয়। এবং গুম, খুন ও সন্ত্রাস হয়। হাসিনা যেরূপ নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট চুরি করে বিজয়ী হলো -সেটি কি বিশ্বের অন্য কোন দেশে কখনো হয়েছে? জনগণের ভোট চুরি হয়ে গেলো -কিন্তু সে অপরাধে কারো শাস্তি হলো না। বিচারে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের খুনি ভা্‌ইয়ের শাস্তি হয়েছিল। কিন্তু তাকে হাসিনা সরকার জেল থেকে বের করে এনেছে। কোন সভ্য দেশে কি এটি ভাবা যায়?  

৭. মাতমের দিন

 ঈমানদারের উৎসবের দিন নাই। হৃদয়ে এতো গভীর বেদনা নিয়ে কি উৎসব হয়? কারণ দেশে দেশে মুসলিমদের বেঈমানী, ব্যর্থতা, কদর্যতা ও ভোগান্তিগুলি তো সীমাহীন। কোন ঈমানদার কি মুসলিমদের এমন বিপর্যয় দেখে খুশি হতে পারে? নামতে পারে কি উৎসবে?

উৎসবের জন্য তো বিজয় চাই। সে জন্য মনে প্রচুর আনন্দ চাই। কোথায় সে বিজয়? কোথায় সে আনন্দ? মুসলিম দেশগুলি অধিকৃত ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে। পরাজয় এখানে ইসলাম ও মুসলিমের। অসম্ভব করা হয়েছে পূর্ণ ইসলাম পালন করা। ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে প্রতিবাদ জানানোর মৌলিক মানবিক অধিকার। সে অধিকার নিয়ে বাঁচতে গেলে লাশ হতে হয়। গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশে ২২ জনকে লাশ করা হলো খুনি নরেন্দ্র মোদী আগমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর অপরাধে। কোন সভ্য দেশে কি এরূপ ঘটে? এ তো হৃদয়বিদারক ঘটনা। হৃদয়ে এরূপ গভীর বেদনা নিয়ে কেউ কি উৎসব করতে পারে? যে দেশে মানবাধিকার বিলুপ্ত -সে দেশে প্রতিটি দিন তো মাতমের। ০২/০৫/২০২১




বিবিধ ভাবনা (৪৫)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. এতো ব্যর্থতা কেন?

ইসলামের এজেন্ডা শুধু পরিশুদ্ধ চরিত্রের মানব সৃষ্টি নয়, বরং সেটি পরিশুদ্ধ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মাণও। সেটি বুঝা যায় ইসলামের নীতিমালা ও ফরজ বিধানের দিকে নজর দিলে। ব্যক্তির কর্ম, চরিত্র ও চেতনায় পরিশুদ্ধির জন্য ইসলামের প্রেসক্রিপশন হলো কুর’আন শিক্ষা, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত এবং তাসবিহ-তাহলিলের বিধান। সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির জন্য প্রেসক্রিপশন হলো ইসলামের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, জিহাদ, শরিয়ত ও হুদুদ পালন, প্যান-ইসলামিক ঐক্য এবং শুরাভিত্তিক শাসন। এ প্রেসক্রিপশনের প্রয়োগ মুসলিমদের উপর বাধ্যতামূলক তথা ফরজ। পাখির দুটি ডানার একটি ভেঙ্গে গেলে পাখি উড়তে পারে না। তেমন পরিশুদ্ধ সভ্যতার নির্মাণে শুধু ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি আনলে চলে না, পরিশুদ্ধি আনতে হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের অঙ্গণেও।

তা্ই শুধু ব্যক্তির ইসলামীকরণ হলে চলে না, রাষ্ট্রেরও ইসলামীকরণ করতে হয়। এটিই নবীজী (সা:)’র সূন্নত। রাষ্ট্রের ইসলামীকরণের লক্ষ্যে নবীজী (সা:) নিজে ১০ বছর রাষ্ট্র প্রধানের আসনে বসেছেন। মুসলিমদের গৌরব কালে তাদের সফলতার মূল কারণটি হলো, সে আমলে মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত প্রেসক্রিপশনের পূর্ণ প্রয়োগ হয়েছিল উভয় ক্ষেত্রেই। মুসলিমদের আজকের ব্যর্থতার কারণ, তাদের নিদারুন ব্যর্থতা উভয় ক্ষেত্রেই। ইসলামীকরণ যেমন হয়নি ব্যক্তি-জীবনে, তেমনি হয়নি রাষ্ট্রীয় জীবনেও। দেশে মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়লেও ইসলামী করণের কাজ হয়নি শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, আইন-আদালত ও প্রশাসনে। বরং দ্রুত গতিতে হয়েছে দুর্বৃত্তিতে জোয়ার আনার কাজ। দুর্বৃত্তিতে এতটাই বৃদ্ধি আনা হয়েছে যে একটি মুসলিম দেশ হয়েও বাংলাদেশ এ শতাব্দীর শুরুতে পর পর ৫বার দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছে। এটি কি কম লজ্জার?

রাষ্ট্র পরিশুদ্ধ করণের মূল হাতিয়ারটি হলো জিহাদ। এটিই ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। এ ইবাদতে বিনিয়োগ হয় ব্যক্তির অর্থ, মেধা, শ্রম ও রক্তের্। জিহাদের এ ফরজ বিধান প্রতিটি ঈমানদারকে দুর্বৃত্ত শক্তির নির্মূলে আমৃত্যু লড়াকু সৈনিকে পরিণত করে। এ জিহাদে প্রাণ গেলে সরাসরি জান্নাত জুটে। নবীজী (সা:)’র সাহাবীদের শতকরা ৬০ ভাগের বেশী শহীদ হয়েছেন। যে দেশে জিহাদ নাই সে দেশ অবশ্যই দুর্বৃত্তদের দখলে যায়। রাষ্ট্র তখন দেশবাসীকে জাহান্নামে নেয়ার বাহনে পরিনত হয়। দুর্বৃত্তকবলিত সে দুষ্ট রাষ্ট্রটি জাহান্নামে নেয়ার ভয়ানক কাজটি করে ইসলামবর্জিত শিক্ষা ব্যবস্থা, অশ্লিল সংস্কৃতি, ইসলাম বিরোধী মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তির দুর্বৃত্তি এবং চুরি-গুম-খুন-সন্ত্রাসের রাজনীতির মাধ্যমে। পরিশুদ্ধির বদলে এদের হাতে দুষ্টকরণের কাজটিই তখন বেশী বেশী হয়। বাংলাদেশ তারই উদাহরণ। ফলে শাসকের যে স্থানে বসেছেন খোদ নবীজী (সা:), বাংলাদেশে সে আসনে বসেছে একজন দুর্বৃত্ত ভোটচোর। এটিই হলো বাংলাদেশে ১৬ কোটি মুসলিমের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কিন্তু সে ব্যর্থতা অনুশোচনা ক’জনের? এ দুষ্ট প্রক্রিয়া থেকে বেড়িয়ে আসার ভাবনাই বা ক’জনের।  

২. বেঈমানীর পরিচয়

মহান আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকার করাই শুধু বেঈমানী নয়। বরং সুস্পষ্ট বেঈমানী হলো, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিচার, অর্থনীতি এবং প্রশাসনে ইসলামের বিধ্যানগুলিকে মেনে না চলা। আদালতে কুফরী আইন, রাজীনীতিতে সেক্যুলারিজম, অর্থনীতিতে সূদ, অফিসে ঘুষ, সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানী এবং পোষাকে বেপর্দাগী –এগুলি কি ঈমানদারীর পরিচয়? সুস্পষ্ট বেঈমানী হলো ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী শিক্ষা ও শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করা। যেখানে ইসলাম সেখানেই এ বেঈমানদের শত্রুতা। এবং সে বেঈমানী নিয়েই বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তি।

৩. সভ্যতা ও অসভ্যতার পরিচয়

জঙ্গল যতই গভীর হয় ততই সেটি হিংস্র পশুদের আস্তানা হয়। তাই জঙ্গলের পরিচয় মেলে সেখানে হিংস্র জীবজন্তুর পদচারণা দেখে। তেমনি দেশ যতই অসভ্য হয়, ততই সে দেশ দুর্নীতিপরায়নদের আস্তানা হয়। তাই দেশ কতটা অসভ্য –সেটির পরিচয় মেলে গুম, খুন ও সন্ত্রাসের অসভ্য নায়কদের শাসন দেখে। তখন মিছিল করলে লাশ হতে হয়, সরকারকে নিন্দা করলে জেলে যেতে হয়, নারীরা ধর্ষিতা হয় এবং নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হয়।

অসভ্য সমাজের ন্যায় সভ্য সমাজকেও খালি চোখে দেখা যায়। সভ্য জনপদে কখনো হিংস্র পশুদের বসবাস থাকে না। হিংস্র পশু ঢুকলে সেটিকে হত্যা করা হয়। সভ্য সমাজে থাকে না অসভ্য ও দুর্নীতিপরায়ন ব্যক্তির শাসন। হিংস্র পশুকে যেমন তাড়ানো হয়, তেমনি তাড়ানো দুর্বৃত্তদেরও। তাই সে সভ্য সমাজে কখনোই খুনি, ভোটচোর এবং স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তকে দেশের বন্ধু, পিতা, নেতা ও প্রধানমন্ত্রী করার ন্যায় অসভ্য কর্ম কখনোই ঘটেনা। কিন্তু বাংলাদেশে হয়। বাংলাদেশ যে কতটা অসভ্য দেশে পরিণত হয়েছে -এ হলো তারই প্রমাণ।

৪. শিক্ষায় অনীহা

যারা বোধশূণ্য এবং সে সাথে ঈমানশূণ্য -তারা ভাবে তাদের দায়িত্ব শুধু পানাহারে বাঁচা। পশুও এর চেয়ে বেশী কিছু ভাবে না। বোধশূণ্যতার আরো পরিচয়: তারা ভাবে, জ্ঞান লাভ বা বই পড়ার দায় তাদের নাই। ফলে তারা বই কেনে না, এবং বই পড়েও না। তারা ভাবে তাদের কানে জ্ঞানের কথা পৌঁছে দেয়ার দায় অন্যদের। একটি দেশের জনগণ কতটা নীচে নামছে -সেটি বুঝার জন্য তাই কোন গবেষণার পড়ে না। সেটি বুঝা যায় বইয়ের দোকানগুলির দিকে তাকালে। কতগুলি বই এবং কীরূপ বই বিক্রয় হয় বা পড়া হয় -তা দেখেই সেটি সঠিক ভাবে বলা যায়।

দেহ বাঁচাতে যেমন খাদ্য চাই, তেমনি ঈমান বাঁচাতে চাই কুরআনী জ্ঞান। ইসলামে জ্ঞানার্জন তাই ফরজ। তাই একজন মুসলিম বেনামাযী থাকবে সেটি যেমন ভাবা যায়না, তেমনি ভাবা যায় না সে নিরক্ষর বা অজ্ঞ থাকবে। ব্যক্তির অজ্ঞতা্‌ই সঠিক পরিমাপ দেয় তার ঈমানহীনতার। একজন ব্যক্তি ঈমান নিয়ে কতটা বেড়ে উঠতে চায় -সেটি বুঝা যায় কুর’আনের জ্ঞানলাভে তার আগ্রহ দেখে। এজন্যই ঈমানদার ব্যক্তি শুধু চাল,ডাল, মাছ, মাংস কেনে না, বই কেনাও জরুরি মনে করে। নিজের খাবার যেমন নিজে খায়, তেমনি নিজের জ্ঞান লাভের কাজটিও নিজে করে।

৫. কী বলে ভোটচোর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?

সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা: কেউ আইনের উর্দ্ধে নয়, সবার বিচার করা হবে। এটি কি বিচারের নামে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি হুমকির বাণী? তার কথায় সামান্যতম সত্যতা থাকলে ভোটচুরির অপরাধে হাসিনাকে কেন রিমান্ডে নেয়া হয়না? সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের খুনী ভাইকে কেন জেলে থেকে মুক্তি দেয়া হয়? এরা কি আইনের উর্দ্ধে? এই কি বিচারের নমুনা?

বাংলাদেশের পুলিশ পরিণত হয়েছে সরকারী দলের গুন্ডা বাহিনীতে। তাদের কাজ হয়েছে সরকার বিরোধীদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া। কখনো বা ক্রসফায়ারে দিয়ে হত্যা করা। জনগণের কাজ হয়েছে রাজস্ব দিয়ে এ সরকারী গুন্ডাদের প্রতিপালন করা।

৬. যে বিপদ অপরাধীদের শাসনে

স্রেফ ক্ষমতা লাভের জন্য যে ব্যক্তি ভোট চুরি করতে পারে, সে ব্যক্তি ঠান্ডা মাথায় মানুষও খুন করতে পারে। হাসিনার সে খুনি চরিত্রটি ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যায় দেখা গেছে। এবং সে চরিত্রটিই ২৬ মার্চ দেখা গেল ২১ জনকে হত্যা করাতে। ক্ষমতালোভী অপরাধীর হাতে দেশ যখন অধিকৃত হয় তখন দেশ জুড়ে এরূপ অপরাধই ঘটতে থাকে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিশালী পদটি প্রধানমন্ত্রীর। যার শক্তি বেশী, তার দায়িত্বও সবচেয়ে বেশী। কিন্তু সে শক্তিশালী ব্যক্তিটি যদি চোর বা ডাকাত হয়, তখন সে শক্তির বিনিয়োগ হয় চুরি-ডাকাতিতে। এখানেই বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদ। শেখ হাসিনা গৃহবধু বা অফিসের কর্মচারী হলে এতো বিপদ হতো না। বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিধর ব্যক্তি যে একজন চোর -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? ভোটচুরি করে নিজের চরিত্র হাসিনা দেখিয়ে দিয়েছে। ফলে সরকার প্রধান রূপে তার বিশাল সামর্থ্য ব্যয় হচ্ছে চুরি-ডাকাতি বাড়াতে। এতে হাজার হাজার কোটি টাকা প্রতি বছর চুরি হয়ে যাচ্ছে দেশের ভান্ডার থেকে।

৭. অসভ্য রীতি

প্রতিটি সভ্য দেশেই চোরকে চোর এবং ডাকাতকে ডাকাত বলা হয়। একই ভাবে স্বৈরাচারিকে স্বৈরাচারি বলা হয় এবং ক্ষমতা থেকে তাকে নামিয়ে দেয়া হয়। তাদেরকে ঘৃণা করাই সভ্য রীতি। এবং অসভ্যতা ধরা পড়ে এ দুর্বৃত্তদের সন্মান করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যা হলো, এ দেশে দুর্বৃত্তদের ঘৃণা করার সভ্য রীতি চলে না। ফলে এদেশে হাসিনার ন্যায় জঘন্য ভোটচোরকে মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী বলা হয়। এবং গণতন্ত্র হত্যাকারী বাকশালী মুজিবকে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা বলা হয়। কথা হলো, যে দেশে এমন অসভ্য আচরণ হয় সে দেশকে কি সভ্য দেশ বলা যায়? ২৯/০৪/২০১৮




বিবিধ ভাবনা (৪৪)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. বাংলাদেশে দুর্বৃত্ত শাসন ও অসভ্য রীতি

 যে কোন সভ্য দেশে চোরডাকাত-ভোটডাকাতদের ন্যায় দৃর্বৃত্ত ও অপরাধীদের জেলে বন্দী করা হয়। দেশকে অসভ্য ও অপরাধীদের হাত থেকে বিপদমুক্ত রাখা্র এটিই হলো সভ্য রীতি। কিন্তু বাংলাদেশে যা ঘটছে তা হলো সম্পূর্ণ উল্টো। এদেশে চোরডাকাত-ভোটডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীদের শাস্তি হয়না। তাদের জেলে নেয়া হয় না। ছাত্রলীগের জসিমুদ্দীন মানিক তাই জাহাঙ্গির নগর বিশ্বিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরি করেও কোন শাস্তি পায়নি। জেনারেল আজিজের ভাই খুনের অপরাধে জেলে গিয়েও বেকসুর মুক্তি পেয়েছে। বরং জেল হয়, হত্যা বা গুম করা হয় এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয় তাদের যারা চোরডাকাত-ভোটডাকাত দৃর্বৃত্তদের নিন্দা করে এবং রাজপথে তাদের নির্মূলের দাবী তুলে। আবরার ফাহাদ লাশ ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্টাটাস দেয়ায়। দেশ দখলে গেছে অপরাধীচক্রের সিন্ডিকেটের হাতে। তারা চায়, বাংলাদেশকে বিশ্বমাঝে সবচেয়ে অসভ্য দেশ বানাতে। এবং সে কাজে তারা সাফল্য যে বিশাল–সে প্রমাণও কি কম?

যে কোন সভ্য মানুষের স্বভাব হলো, অসভ্য ও দুর্বৃত্তদের নির্মূলে তাঁর আপোষহীন। অথচ অসভ্য সমাজে তাদের নির্মূল না করে প্রতিপালন দেয়া হয়। শেখ হাসিনার অপরাধ এক্ষেত্রে অতি ভয়ানক। সে শুধু গণতন্ত্রকেই কবরে পাঠায়নি, ভদ্র রীতি-নীতিকেও কবরে পাঠিয়েছে। দেশ পরিণত হয়েছে গহীন জঙ্গলে। জঙ্গলে যেমন হিংস্র পশুগণ নিরাপত্তা পায় ও প্রাণ হারাম নিরস্ত্র মানুষ, বাংলাদেশেও তেমনি নিরাপত্তা পায় হিংস্র দুর্বৃত্তগণ ও লাশ হয় আবরার ফাহাদগণ। আল জাজিরা ডক্যুমেন্টারী চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ ও তার ভাইদের খুনখারাবী ও দুর্বৃত্তির কাহিনী। কিন্তু সরকার কাউকেই শাস্তি দেয়নি। সে কাজে হাসিনা সরকারের সামান্যতম আগ্রহও নাই। জেনারেল আজিজ তার পদে এখনো আসীন। শাস্তি থেকে মুক্ত তার খুনি ভাইগণও। কোন সভ্য দেশে কি এরূপ অসভ্য রীতি আশা করা যায়?   

আওয়ামী বাকশালীদের সবচেয়ে জঘন্য নাশকতাটি এই নয়, তারা চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম-খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের ন্যায় দুর্বৃত্তিকেই প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। বরং সবচেয়ে বড় দুর্বৃ্ত্তি ও নাশকতাটি হলো, মানব সমাজে হাজার হাজার বছর ধরে যে অপরাধগুলি ঘৃণিত হয়ে আসছে -সে গুলিকে ঘৃণা করাও দন্ডনীয় অপরাধে পরিণত করেছে। ধ্বংস করেছে মানুষের বিবেকবোধকে। হিংস্র পশুরা প্রাণ সংহার করলেও এরূপ বিবেক হত্যা করে না। বাংলাদেশীদের সামনে মূল ইস্যু তাই স্রেফ গণতন্ত্র বাঁচানো নয়, বরং সেটি অসভ্যদের নির্মূলের।

২. জিহাদ কী? 

জিহাদ হলো অন্যায়ের নির্মূল (নেহী আনিল মুনকার) ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা (আ’মিরু বিল মারুফ) –পবিত্র কোর’আনে নির্দেশিত এ মিশন নিয়ে বাঁচার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। এটি হলো সকল অনৈসলামিক বিধান নির্মূল করে আল্লাহর শরিয়তি বিধানকে বিজয়ী করার আমৃত্যু লড়াই। এটি বস্তুত একটি রাষ্ট্রকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার যুদ্ধ। এরূপ জিহাদে ঈমানদারগণ বিনিয়োগ করে তাদের অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্তের। এটিই হলো নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের অনুসৃত ইসলাম। ব্যক্তির পরিশুদ্ধির জন্য ইসলামের প্রেসক্রিপশন হলো নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত। আর সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির জন্য প্রেসক্রিপশন হলো জিহাদ। তাই যে দেশে জিহাদ না্‌ই সে দেশে নামাযী, রোযাদার, হাজী, তাবলিগী ও মসজিদ-মাদ্রাসা বিপুল সংখ্যায় হলেও সে দেশ দুর্বৃত্তিতে ভরে যায়। বাংলাদেশে হলো তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

অনেকে যে কোন উত্তম কর্মে প্রচেষ্টা করাকে জিহাদ বলে। সেটি ঠিক নয়। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই অনেক কাফের, ফাসেক ও মুশরিকগণও করে। কিন্তু সেগুলি জিহাদ হয়না। জিহাদী হতে হলে প্রথমে ঈমানদার হতে হয়। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে জিহাদকে “জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর পথে জিহাদ বলে উল্লেখ করেছেন। কোন কিছু মহান আল্লাহতায়ালার পথে হওয়ার অর্থ, সে কর্মের মধ্যে থাকতে হবে তাঁর এজেন্ডাকে বিজয়ী করার নিয়েত। পবিত্র কোর’আনে এরূপ জিহাদের কথা বার বার বলা হয়েছে। জিহাদ ইসলামের কোন পৃথক স্তম্ভ নয়; বরং মিশে থাকে ঈমানের মাঝে। জিহাদ ঈমানের এতটাই অবিচ্ছদ্দ্য অঙ্গ যে, সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ঈমানের দাবীতে একমাত্র তারাই সাচ্চা যাদের মাঝে রয়েছে জান ও মালের জিহাদ।

তাই শুধু ঈমানের দাবী করলেই কেউ ঈমানদার হয়না, সাথে জিহাদও থাকতে হয়। এ নিয়ে সম্পূরক হাদীস রয়েছে নবীজী (সা:)’র। নবীজী (সা:)বলেছেন, যে ব্যক্তি জিহাদ করলো না, এবং জিহাদের নিয়েতও করলো না, সে ব্যক্তি মুনাফিক। -(মুসলিম শরীফ)। তাই নবীজী (সা:)’র প্রত্যেক সাহাবার জীবনে জিহাদ ছিল এবং শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। সমাজে পরিশুদ্ধি এসেছিল জিহাদের বিনিময়ে। পবিত্র কোর’আনে এ ঘোষণাও বার বার দেয়া হয়েছে, “ঈমান এনেছি এ কথা বললেই কি ছেড়ে দেয়া হবে এবং পরীক্ষা নেয়া হবে না?” ঈমানের সে পরীক্ষাটি হয় জিহাদের ময়দানে। যারা জিহাদে শহীদ হয় তাদেরকে জীবিত বলা হয়েছে এবং বিনা হিসাবে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। তাই যে ইসলামে জিহাদ নাই সেটি নবীজী (সা:)’র ইসলাম নয়। সেটি ভন্ডদের বানাওয়াট ইসলাম।

৩. কোর’আনের মর্যাদা

মহান আল্লাহতায়ালা সন্তান-সন্ততি, পানাহার ও বিপুল সম্পদ কাফেরদেরও দেন। তবে মানব জাতির জন্য তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ দানটি হলো পবিত্র কোর’আন। এবং এ কোর’আন থেকে ফায়দা নেয়ার যোগ্যতা রাখে কেবল ঈমানদারগণ। কোন কিছুই জান্নাতে নিবে না, নিবে একমাত্র পবিত্র কোর’আন। পবিত্র কোর’আন হলো মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ভাষায় “হাবলিল্লাহ” তথা আল্লাহর রশি। যারা এ রশিকে আঁকড়ে ধরবে তাঁরাই পাবে জান্নাতের পথ। নইলে অনিবার্য হয় জাহান্নাম। তাই ঈমানদারদের উদ্দেশ্যে সুরা আল ইমরানে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “সবাই মিলে আঁকড়ে ধরো আল্লাহর রশিকে এবং পরস্পরে বিচ্ছন্ন হয়ো না।” কোর’আন আঁকড়ে ধরার অর্থ হলো কোর’আনের অনুসরণ।

এ বিশ্ব চরাচরে মহান আল্লাহতায়ালার অসংখ্য বিস্ময়কর সৃষ্টি। সেগুলি নিরবে সাক্ষ্য দেয় তাঁর অস্তিত্বের পক্ষে। এবং মহান আল্লাহতায়ালা নিজে কথা বলেন পবিত্র কোর’আনের মাধ্যমে। তাই যারা মহান আল্লাহতায়ালার প্রকৃত আশেক তারা কোর’আন থেকে তাঁর সে কথাগুলি বুঝার জন্য পাগল। কে জান্নাতে পথ পাবে এবং কে জাহান্নামে যাবে -তা নির্ভর করে কোর’আন বুঝা ও তা অনুসরণের উপর। মানব জীবনে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই ওহী নাযিল শুরু হওয়ার পর মুসলিমদের উপর কোর’আন বুঝাকে সর্বপ্রথম ফরজ করা হয়েছিল। নামায-রোযা ফরজ হয়েছিল তার ১১ বছর পর। তাই ইবাদত শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত নয়, সেটি কোর’আন বুঝাও। এবং বুঝতে হবে, মহান আল্লাহতায়ালা কি বলেন -তা না বুঝে তেলাওয়াতে জানা যায় না। ফলে তাতে জ্ঞানার্জনের ফরজও আদায় হয়না।

৪. তামাশা ইসলাম নিয়ে

 ইসলাম নিয়ে প্রচুর তামাশা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ওমুক দোয়া পাঠ করলে জান্নাতের ৮টি দরজা খুলে দেয়া হবে। স্রেফ দোয়া পাঠের মধ্যে জান্নাতপ্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি শোনানো হচ্ছে। রমযান মাসে সে কথাগুলো আরো বেশী বেশী শোনানো হয়। এটি এক বিশাল ব্যাপার। সেটি সত্য হলে সে বিশাল ঘোষণাটি আসা উচিত ছিল মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কোর’আনে। কিন্তু সে বিষয় নিয়ে পবিত্র কোর’আনে কোন ঘোষণাই নাই। অথচ দোয়া কবুলের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারায় বলা হয়েছে, মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দার দোয়া অবশ্যই শোনেন। তবে দোয়া করলেই তা কবুল হয় না এবং জান্নাতের দরজাও খুলে দেয়া হয়না। দোয়া কবুলের শর্ত হলো, দোয়াকারী বান্দা মান্য করবে তাঁর কোর’আনে ঘোষিত কথাগুলো। মহান আল্লাহতায়ালার কথা মান্য করার অর্থ, তাঁর বিধানকে নিজ জীবনে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা দেয়ায় আত্মনিয়োগ করা।

পবিত্র কোর’আনে তাই বার বার বলা হয়েছে, জান্নাত পেতে হলে জিহাদের ময়দানে জান ও মালের পরীক্ষায় অবশ্যই পাশ করতে হবে। প্রশ্ন হলো, স্রেফ দোয়া পাঠে কি জান ও মালের সে কাঙ্খিত পরীক্ষাটি হয়? তাছাড়া দোয়া কবুলের আগে দেখা হয়, কতটা মানা হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার কথাগুলো রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী, আদর্শে সেক্যুলারিস্ট, সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানী, অর্থনীতিতে সূদ-ঘুষ, আদালতে কুফরি আইন, ব্যবসার নামে বেশ্যাবৃত্তি এবং শিক্ষা-দীক্ষায় কোর’আন-বর্জন –এগুলি তো বিদ্রোহের আলামত। এরূপ বিদ্রোহীদের দোয়া কি মহান আল্লাহতায়ালা কখনো কবুল করেন? বিদ্রোহীদের জন্য যা বরাদ্দ তা তো আযাব ও অপমান।

তাছাড়া মুসলিম বিশ্ব জুড়ে দোয়া কি কম হচ্ছে? চোখের পানিও কি কম ফেলা হচ্ছে? প্রতি নামাযে দোয়া। রোযা কালীন দোয়া। হজ্জে গিয়ে দোয়া। প্রতি বছর ২০ লাখের বেশী মুসলিম চোখের পানি ফেলছে দোয়া কবুলের স্থান আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে। কিন্তু দোয়া কবুলের আলামত কই? দোয়া কবুল হলে কি মুসলিম ভূমি শত্রুদের হাতে অধিকৃত হতো? বিধ্বস্ত হতো কি মুসলিম নগর-বন্দর ও গ্রাম? নিহত, ধর্ষিতা ও নিজ ঘর থেকে বহিস্কৃত হতো কি মুসলিম নর-নারী?

৫. গাদ্দারী নিয়ামতের সাথে

 প্রতিটি মানুষকে মহান আল্লাহতায়ালা নানাবিধ সামর্থ্য দেন -যা দিয়ে সে নিজেকে জান্নাতের যোগ্য রূপে গড়ে তুলতে পারে। প্রকৃত বুদ্ধিমান তো তারাই যারা সে সামর্থ্যকে কাজে লাগায় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য। এবং সবচেয়ে বড় আহাম্মক হলো তারা্ যারা সে সামর্থ্যকে কাজে লাগায় অর্থপূজা, নেতাপুজা, দলপূজায়, পেশাপূজা ও দেশপূজায়। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া নিয়ামতের সাথে এর চেয়ে বড় গাদ্দারী আর কি হতে পারে? বস্তুত এরূপ গাদ্দারীই ব্যক্তিকে জাহান্নামের উপযোগী করে।

৬. ছোট লোকের ছোট ভাবনা

কে কতটা মহান ও ক্ষুদ্রতর –সেটি দেখা যায় তার বাঁচার এজেন্ডার দিকে নজর দিলে। ঈমানদার বাঁচে ইসলামকে বিজয়ী করার প্রবল বাসনা নিয়ে। সে কাজে সে তাঁর সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগ করে। কিন্তু যাদের জীবনে এরূপ মহান কিছু করার সামর্থ্য ও ইচ্ছা থাকেনা তাঁরাই বাঁচে অর্থপূজা, ব্যক্তিপূজা, ফেরকাপূজা ও দলপূজা নিয়ে। তারাই প্রচন্ড স্বার্থপর ও চিন্তা-চেতনায় ছোটলোক হয়। বাংলাদেশে এদের সংখ্যা বেশী। ফলে দেশটিতে ইসলামকে বিজয়ী করার কাজে জনবলের দারুন অভাব। এবং লোকবলের বড্ড অভাব স্বৈরাচারমুক্ত সভ্যতর সমাজ গড়ার কাজেও। এদের কারণে বিপুল হারে ভোটডাকাত, চোরডাকাত, গুন্ডা, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীর ভীড় দেখা দেয় হাসিনার ন্যায় স্বৈরাচারীর শিবিরে।  

৭. ঝান্ডা বিদ্রোহের

ঈমান ও মহান আল্লাহতায়ালার ভয় সুস্পষ্ট দেখা যায়। কোন মহিলার হৃদয়ে শরিষার দানা পরিমান আল্লাহর ভয় থাকলে -সে কি কখনো বেপর্দা হতে পারে? সে কি পারে দেহের নিষিদ্ধ স্থানগুলো জনসম্মুখে দেখাতে? বেহিজাবী তথা পর্দাহীনতা তো মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা। এরূপ বিদ্রোহীদের নামায-রোযার কি আদৌ মূল্য আছে? বিদ্রোহীদের স্থান তো জাহান্নামে।

ঈমানদারের লক্ষণ, সে গুরুত্ব দেয় নিজের খেয়াল-খুশির বদলে মহান আল্লাহতায়ালার বিধান মেনে চলাকে। এজন্যই ঈমানদার নারীগণ পর্দানশীন হয়। অথচ বেঈমানের কাছে গুরুত্ব পায় নিজের ইচ্ছার গোলামী। এরাই বেছে নেয় বেপর্দা হওয়ার পথ এবং তুলে নেয় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা। দেহ জুড়ে বিদ্রোহের এ প্রকাণ্ড ঝান্ডা দেখেও কি তাদের বেঈমানী নিয়ে কোন গবেষণার প্রয়োজন পড়ে? অথচ প্রতিটি মহিলাই হলো গৃহশিক্ষক। শিশুরা গড়ে উঠে তাদের হাতে। কিন্তু এদের কারণে মুসলিম দেশের কোটি কোটি ঘর পরিণত হয়েছে বিদ্রোহীদের ঘাঁটিতে। ফলে পরাজিত হচ্ছে ইসলাম এবং বিনা যুদ্ধে বিজয় বাড়ছে শয়তানের। ১৮/০৪/২০২১

 

 




বিবিধ ভাবনা (৪৩)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. অভাব সভ্য রুচির

বাঘ এক বারে মাত্র একটা শিকার ধরে। সেটি হজম করার পর আরেকটি ধরে। সে রীতি স্বৈরাচারি শাসকদেরও। তারাও একটা একটা করে রাজনৈতিক শত্রুদের ঘাড় মটকায়। ফ্যাসিবাদী হাসিনা তার শিকার ধরার কাজটি কর্নেল ফারুক ও তাঁর সাথীদের দিয়ে শুরু করেছিল। জামায়াত, বিএনপি ও হেফাজতের নেতাকর্মীগণ তখন হাসিনার রাজনৈতিক শত্রু নির্মূলের সে নিষ্ঠুর তান্ডবটি নীরবে দেখছিল। এরপর আসে জামায়াত নেতাদের ফাঁসীতে চড়ানোর পালা। তখন বিএনপি ও হেফাজতে নেতাকর্মীগণ সেটিকেও নীরবে দেখেছে। হয়তো তারা ভেবেছিল জামায়াত তো তাদের লোক নয়। অতএব তাদের নির্মূলে ক্ষতি কি? তাছাড়া বিএনপি নেতৃত্বে রয়েছে ভাষানীপন্থী বামদের প্রভাব। এ বামেরা কোনকালেই জামায়াতের বন্ধু ছিল না। এরপর এলো বিএনপি এবং হিফাজতের নেতা-কর্মীদের গুম ও খুন করার পালা। দেশের জনগণ সেটিকে নীরবে দেখেছে; স্বৈরাচার তাড়াতে তারা কখনোই রাস্তায় নামেনি। এখন হামলা হচ্ছে জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের উপর। ডাকাতি হয়ে গেল জনগণের ভোট এবং কবরে গেল গণতন্ত্র। প্লাবন এসেছে গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের। দেশ এখন দুর্বৃত্তদের জন্য আপদমুক্ত। তারা যা চায়, এখন বিনা বাধায় তা করতে পারে।

নেকড়ে যেমন কারো বন্ধু নয়, তেমনি স্বৈরাচারি দুর্বৃত্ত শাসকগণও কারো বন্ধু নয়। তারা সবার শত্রু। তাই মহল্লায় নেকড়ে ঢুকলে বিভক্ত হলে চলে না। তখন ঐক্যবদ্ধ ভাবে নেকড়ে বধ করতে হয়। স্বৈরাচারি শাসকগণ হিংস্র পশুর চেয়েও বেশী হিংস্র। পশু গণহত্য বা গণধর্ষণ করে না। কিন্তু মানবরূপী পশুগণ করে। তাই স্বৈরাচারি শাসক তাড়াতে সভ্য জনগণকে একতাবদ্ধ হতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতাটি বিশাল। ঘরবাড়ী থেকে আবর্জনা সরানোর জন্য সভ্য রুচি লাগে। তেমনি রুচি লাগে দুর্বৃত্তের শাসন থেকে মুক্ত হয়ে সভ্য দেশ গড়তে। বাংলাদেশীদের ব্যর্থতা এখানেই। সভ্য রুচি থাকলে তারা কি কখনো গণতন্ত্রের শত্রু বাকশালী মুজিবকে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা বলতো?  

২. তান্ডব গুন্ডা রাজত্বের

আল জাজিরা ডক্যুমেন্টারীতে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের ভাই খুনি হারিসকে বলতে শুনা গেল, “পুলিশই তো বড় গুন্ডা। পুলিশ থাকতে কি গুন্ডা লাগে?” ২৬ মার্চে মোদীর ঢাকায় আগমনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ মিছিল হয়। ব্রাহ্মনবাড়িয়া ও হাটহাজারীতে মিছিলের উপর বাংলাদেশের পুলিশ গুলী করে ২১ জনকে হত্যা করে। এভাবে প্রমান করে, খুনি হারিস পুলিশের চরিত্র নিয়ে যা বলেছে তা কতটা বাস্তব। বরং পুলিশ যে গুন্ডাদের চেয়েও বেশী গুন্ডা –সেটিও তারা প্রমাণ করেছে। তাদের কারণেই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নিরেট গুন্ডারাজত্ব। এবং গুন্ডারাজত্বে যা অসম্ভব হয় -তা হলো সভ্য ভাবে জীবন-যাপন। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনগণ রাজস্ব দেয় পুলিশবেশী নৃশংস গুন্ডা প্রতিপালনে।

৩. নিকৃষ্টতর পশুর চেয়েও

গরু-ছাগলের পানাহার হলেই চলে। পানাহার পেলে গলায় দড়ি নিয়ে বাঁচতে তাদের অসুবিধা হয়না। তখন দড়ি ছিঁড়তে্ তারা চেষ্টাও করেনা। অথচ সভ্য মানুষের পরিচয় তো এটাই, তারা শুধু পানাহার নিয়ে ভাবে না, ভোটের অধিকার ও স্বাধীন ভাবে কথা বলা ও লেখালেখির অধিকারও চায়। তবে মানুষ যখন গরুছাগলের পর্যায়ে পৌঁছে, তারাও তখন স্রেফ পানাহার নিয়ে ভাবে। গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকার নিয়ে তারা ভাবে না। এরূপ মানুষেরা গণতন্ত্র উদ্ধারে কখনো রাস্তায় নামে না। গরুছাগলের সংখ্যাবৃদ্ধিতে যেমন স্বৈরচারি শাসক বিপদে পড়ে না, তেমনি বিপদে পড়ে না এরূপ পশুচরিত্রের মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধিতে। বাংলাদেশে তাই জনসংখ্যা বাড়লে কি হবে, দুর্বৃত্তদের শাসন তাতে নির্মূল হয়নি। এবং বাড়েনি মানবিক অধিকার ও গণতন্ত্রচর্চা।

মানুষ গরুছাগলের স্তরে পৌঁ‌ছে চেতনাশূণ্যতার কারণে। স্বৈরাচারি শাসকদের মূল কাজ তাই জনগণের চেতনার আগ্রাসন করা। চেতনার ভূমি বিধ্বস্ত হলে জনগণ পরিনত হয় গরুছাগল বা তার চেয়েও নিকৃষ্ট জীবে। বাংলাদেশে চেতনা বিনাশের সে কাজটি এতই সফল ভাবে হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষক, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বহু বিচারপতি, সেনাবাহিনীর বহু জেনারেল এবং বহু বুদ্ধিজীবী ২০১৮ সালের ভোটডাকাতির নির্বাচনকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলে। গরুছাগলও কখনো এভাবে দুর্বৃত্তদের পক্ষ নেয় না। পবিত্র কোর’আনে এ ধরণের মানুষদেরকে গরুছাগলের চেয়েও নিকৃষ্ট বলা হয়েছে। তাদের চরিত্র নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের ভাষ্যটি হলো: “উলায়িকা কা’আল আনয়াম, বালহুম আদাল।” অর্থ: “তারাই হলো গবাদী পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট।” মহান আল্লাহতায়ালার এ কোর’আনী বানী যে কতটা নির্ভূল –তারই নিখুঁত প্রদর্শনী হচ্ছে বাংলাদেশে। মানুষরূপী এ পশুগুলো বনজঙ্গলে বাস করে না। বরং বাস করে জনপদে। তাদের অবস্থান শুধু সংসদে নয়, বরং দেশের আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তি ও প্রশাসনে। বাংলাদেশ তো এদের হাতেই অধিকৃত। পশুগণ কখনোই গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকার কেড়ে নেয় না, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানবরূপী এ পশুগণ।  

৪. সবচেয়ে বড় অপরাধী হলো সরকার

সভ্য দেশে আইন বানানো হয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য। সভ্য সরকারের কাজ শুধ জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের সুরক্ষা দেয়া নয়, বরং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতিরক্ষা দেয়াও। আর অসভ্য দেশে আইন বানানো হয় সে অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য। অথচ কেড়ে নেয়ার সে কাজই বেশী বেশী হচ্ছে বাংলাদেশে। তাই জনগণের অধিকার নাই স্বাধীন ভাবে কথা বলা, লেখালেখি ও মিটিং-মিছিলের। সে অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য ডিজিটাল আইন বানানো হয়েছে।

অথচ অপরাধ শুধু মানুষের প্রাণ ও অর্থ কেড়ে নেয়া নয়, অপরাধ হলো স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়াও। এদিক দিয়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে অপরাধী চক্রটি চোর-ডাকাতদের দলগুলি নয়; বরং সেটি হলো দেশের সরকার। হাসিনা সরকার এ কাজে মাঠে নামিয়েছে তার দলীয় গুন্ডা বাহিনীকে। এদের হাতেই নৃশংস ভাবে লাশ হতে হলো আবরার ফাহাদকে। কোন সভ্য দেশে কি এমনটি ঘটে? স্বৈর শাসকগণ একটি দেশে যে কীরূপ অসভ্য শাসন প্রতিষ্ঠা দিতে পারে –বাংলাদেশ হলো তারই নজির।

৫. সংকট অপূর্ণাঙ্গ মুসলিম হওয়ায়

মুসলিম জীবনে ইবাদতের পরিধিটি বিশাল। তাকে শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত পালন করলে চলে না। এরূপ ইবাদতের লক্ষ্য হলো, ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি আনা। কিন্তু মুসলিমকে বাঁচতে হয় এর চেয়ে বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রেখে। সেটি হলো সমাজ ও রাষ্ট্র্রের বুকে পরিশুদ্ধি আনা। সভ্যতর সমাজ ও সভ্যতার নির্মাণের কাজ তো একমাত্র তখনই সম্ভব হয়। এবং ইসলাম একমাত্র তখনই বিজয়ী হয়। সে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মুসলিম জীবনে অনিবায় হয় জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। তখন ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ, অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, শরিয়তের প্রয়োগ ও ঐক্যগড়া ইত্যাদি বহু ফরজ কাজ তার জীবনের মিশনে পরিণত হয়। এরূপ কাজে না নামলে পূর্ণ মুসলিম হওয়া যায় না। দেশে পূর্ণ মুসলিম না বাড়লে বিজয়ী হয় শয়তান।

মুসলিমদের আজকের বড় সমস্যাটি হলো তাদের ধর্মকর্ম ও ইবাদত স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতে সীমিত হয়ে গেছে। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র দখলে গেছে শয়তানী শক্তির হাতে। অথচ রাষ্ট্র ও সমাজ শয়তানী শক্তির দখলে গেলে ব্যক্তিও নিরাপদ থাকে না। রাষ্ট্র যে স্রোতে ভাসে ব্যক্তিকেও তখন সে স্রোতে ব্যক্তিকেও ভাসতে হয়।

৬. বাঙালীর বেওকুপি

শিকার ধরাই বাঘের স্বভাব। বাঘকে কখনোই পোষ মানানো যায় না, তার সাথে দোস্তিও চলে না। তেমনি স্বভাব হলো ভারতের ন্যায় আগ্রাসী দেশগুলোর। তাই শুধু বাঘ-ভালুকের ন্যায় হিংস্র পশুগুলিকে চিনলে চলে না, দানবের ন্যায় দেশগুলোকেও চিনতে হয়। বাঘকে ভেড়া মনে করে যারা গলা জড়িয়ে ধরে -তারাই বাঘের পেটে যায়। এরূপ বেওকুপের সংখ্যা বাংলাদেশে

অতি বিশাল। এদের হাতেই বাংলাদেশে রাজনীতি্ ও বুদ্ধিবৃত্তি। এরাই ১৯৭১’য়ে ভারতের গলা জড়িয়ে ধরেছিল। ভারতী সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে এনেছিল এবং ভারতীয় বাহিনীকে বিজয়ী করেছিল। ভারতের পেটে ঢুকার পর এরাই এখন ভারতকে গালি দেয়। ১৪/০৪/২০২১




বিবিধ ভাবনা (৪২)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. আসক্তি হারাম রাজনীতিতে

মহান আল্লাহতায়ালা শুধু নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের হুকুমই দেন না। একতাবদ্ধ হওয়ার হুকুমও দেন। ঈমানদারের উপর তাঁর মহান প্রভুর প্রতিটি হুকুম মানাই বাধ্যতামূলক। সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়া হারাম -যা অনিবার্য করে আযাব। বিদ্রোহের এ পথ শয়তানের। রাস্তায় গাড়ি চালনায় কোন একটি ট্রাফিক সিগনাল অমান্য করলে দুর্ঘটনা ঘটে। বিষয়টি তেমন জীবন চালনার ক্ষেত্রেও। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাতের মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধি আসে ব্যক্তি জীবনে। কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার নির্মাণের কাজটি একাকী হয় না। দুর্বৃত্তদের নির্মূল ও সমষ্ঠির মাঝে পরিশুদ্ধি আনার সে কাজে অপরিহার্য হলো বহু মানুষের ঐক্য। ঐক্যের সে পরিসর যতটা বাড়ে অর্থাৎ যত বেশী মানুষ একতাবদ্ধ হয় ততই বাড়ে সৃষ্টিশীল কর্মের সামর্থ্য। এজন্যই ফরজ হলো ঐক্যবদ্ধ হওয়া।   

অপর দিকে শয়তান চায় কাফেরদের ঐক্য। ভারতের ১১০ কোটি হিন্দু তাই বর্ণ, ভাষা ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে একতাবদ্ধ। অথচ ভারত ভেঙ্গে ১০টির বেশী বাংলাদেশ হতে পারতো। শয়তান চায়, মুসলিমদের বিভক্তি। মুসলিমগণ মেনেছে শয়তানের হুকুমকে। মহান আল্লাহতায়ালার একতার হুকুমের সাথে গাদ্দারী করে তারা টুকরো টুকরো করেছে মুসলিম ভূগোলকে। আরব ভূখন্ডকে বিভক্ত করছে বিশের বেশী টুকরোয়। বিভক্তি একাকী আসে না, সাথে আনে পরাজয় এবং গোলামীও। আরবদের বিভক্তির কারণেই তাদের ঘাড়ের উপর আজ ইসরাইল। এ গোলামী তাদের নিজ হাতের কামাই। বাঙালী মুসলিমগণ তেমনি কাফেরদের এজেন্ডা পূরণে ও তাদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে পাকিস্তান ভেঙ্গেছে। এ কাজটি ছিল শতভাগ হারাম। এ হারাম কাজে খুশি হয়েছে শয়তান ও ভারতীয় কাফেরগণ। এবং ক্ষতি হয়েছে মুসলিম উম্মাহর। এর পিছনে ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ -যা হলো শতভাগ হারাম। হারাম পানাহারে যেমন অকল্যাণ, তেমনি অকল্যাণ আনে হারাম মতবাদও।

ইসলাম মানুষকে ভাষা, ভূগোল, গোত্রীয় পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে প্যান-ইসলামীক মুসলিম হতে শেখায়। এটিই মুসলিমদের গৌরব যুগের লিগ্যাসী। আরব, ইরানী, কুর্দি, তুর্কি ইত্যাদি নানাভাষী মানুষ বিভক্তি না হয়ে একত্রে কাজ করেছে। জাতীয়তাবাদ ইসলামে অঙ্গিকারহীন, বিদ্রোহী ও বিভক্ত হতে শেখায়। সে বিদ্রোহ নিয়ে ভারতের ন্যায় কাফেরদের সাথে একাত্ম হতেও আপত্তি থাকেনা। বাঙালী মুসলিম জীবনে সেটাই দেখা গেছে একাত্তরে। সে হারাম পথে চলার ফল হলো, বাংলাদেশ আজ ভারতের অধীনত এক গোলাম রাষ্ট্র। বাঙালী মুসলিমদের ঘাড়ের উপর এখন ভারতের নওকরদের শাসন। এ থেকে কি সহজে মুক্তি আছে? এটি হলো, বাঙালী মুসলিমদের নিজ হাতের অর্জিত আযাব। অবাক করার বিষয় হলো, সে গোলামী নিয়েও মার্চ ও ডিসেম্বর এলেই উৎসব হয়। মানুষ বিভ্রান্ত হলে নিজের ভাল-মন্দ বোঝার সামর্থ্য থাকেনা। তখন গোলামীও স্বাধীনতা মনে হয়। খুনিরাও বন্ধু মনে হয়। নরেন্দ্র মোদীর  ন্যায় খুনিরাও তখন সন্মানিত হয়।

মুসলিমদের বিভক্তিতে খুশি হয় কাফের শক্তি। তাই একাত্তরে বাঙালী মুসলিমরা বিজয়ের বিপুল সামগ্রী জুগিয়েছে দিল্লির শাসক মহলে। বিভক্তি মানেই দুর্বলতা ও পরাধীনতা । নামায-রোযা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ আদায় করে বিভক্তির আযাব থেকে বাঁচা যায় না। তখন বাঁচতে হয় ঘাড়ে গোলামীর জোয়াল নিয়ে। বাঙালী মুসলিমগণ সজ্ঞানে গোলামীর সে পথই বেছে নিয়েছে। তবে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার জন্য বড় আযাবটি আখেরাতে।

২. বিজয় হারাম রাজনীতির ও ভাবনাশূণ্যতার

পানাহারের ন্যায় রাজনীতিতেও হালাল-হারাম আছে। হারাম হলো জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম ও মুসলিম দেশ ভাঙ্গার রাজনীতি। কোর’আন-হাদীস খুঁজে এ হারাম রাজনীতির পক্ষে একটি দলিলও পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে একাত্তরে হারাম রাজনীতিই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে। সে হারাম রাজনীতিরই ফসল হলো ভোটচোর স্বৈরাচারি হাসিনা।

মশামাছি মলমূত্রে বসে ও রোগজীবাণু ছড়ায়। এতে রোগব্যাধীর মহামারি শুরু হয়। বেঈমানেরা তেমনি মিথ্যায় বিশ্বাসী হয় এবং মিথ্যা ছড়ায়। তাতে বাড়ে নৈতিক রোগের মহামারি। একটি দেশে বেঈমানদের সংখ্যা ও তাদের বিপুল বিজয়টি বুঝা যায় মিথ্যার বাজার দেখে। বাংলাদেশে মিথ্যার বাজারটি যেমন বিশাল; তেমন বিশাল হলো মিথ্যায় বিশ্বাসীর সংখ্যা। দেশবাসী মিথ্যাকে যে কতটা বিশ্বাস করে -সেটি বুঝা যায় একাত্তরে ৩০ লাখের মৃত্যুর ন্যায় মিথ্যার বিশাল বাজার দেখে। মিথ্যার বড় নাশকতা হলো, সেটি মানুষকে চিন্তা শূণ্য করে। চিন্তাশূণ্যতার ফল হলো, গরু, সাপ, মুর্তি, ইত্যাদিও ভগবান গণ্য হয়। ফিরাউনের না্য় মানুষও তখন ভগবানে পরিণত হয়। অথচ তারা বুদ্ধিশূণ্য ছিল না; বিস্ময়কর পিরামিড তো তারাই নির্মাণ করেছিল। বিদ্যাবুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও মানুষ যেমন মিথ্যাবাদী হয়, তেমনি চিন্তাশূণ্যও হয়।

সেরূপ চিন্তাশূণ্যতার কারণেই বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, প্রশাসনের সচিব এবং সেনাবাহিনীর জেনারেলগণও মনে করে একাত্তরে তিরিশ লাখ বাঙালী মারা গেছে। তারা ভাবতে ব্যর্থ হয়, ৯ মাসে ৩০ লাখ মারা গেলে প্রতি দিন ১১ হাজার নিহত হতে হয়। একথাও তারা ভাবে না, সাড়ে সাত কোটির (৭৫ মিলিয়ন) মাঝে ৩০ লাখ (৩ মিলিয়ন) মারা গেলে প্রতি ২৫ জনে একজনকে মারা যেতে হয়। বাঙালীল ইতিহাসে আরেক বড় মিথ্যা হলো, মুক্তিবাহিনী নাকি বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। অথচ মুক্তিবাহিনী একটি জেলা দূরে থাক একটি থানাও কি স্বাধীন করতে পেরেছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পৃথক করে বাংলাদেশ বানিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। বিপুল সংখ্যক বাঙালী যে কতটা মিথ্যসেবী ও চিন্তাশূণ্য সেটি বুঝার জন্য কি কোন গবেষণার প্রয়োজন আছে? এমন মিথ্যসেবী ও চিন্তাশূণ্য চরিত্র নিয়ে কি কোন জনগোষ্ঠি সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে পারে? বাঙালীর কল্যাণ যারা চায় তাদের প্রচেষ্ঠা হওয়া উচিত এ রোগমুক্তির জন্য জিহাদে নামা। জিহাদের এটি এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। 

৩. রাজাকার প্রসঙ্গ ও কিছু বেঈমানের কান্ড

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতি স্বাভাবিক ব্যাপার হলো, রাজাকারদের গালী দেয়া। যারা ভারতের দালালী  করেএমন কি তাদেরও ভারতের রাজাকার বলে গালি দেয়া হয়। যেন রাজাকার শব্দটি একটি গালির শব্দ। বিষয়টি কি যথার্থ? যারা চিন্তাশীল ও দেশপ্রেমিক – এনিয়ে তাদের চিন্তা করা উচিত। একাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয়ের পর রাজকারদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে এবং তাদেরকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হলেও রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হয়নি। সে কাজটি তারাই বেশী বেশী করে যারা একাত্তরে ভারতে গিয়েছিল, ভারতের হাতে প্রতিপালিত হয়েছিল এবং ভারতের এজেন্ডা পূরণে তাদের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছিল। অপরদিকে রাজাকারগণ অস্ত্র ধরেছিল ভারত ও তার দালালদের বিরুদ্ধে। ভারত যে মুসলিমদের শত্রু এবং কখনোই বন্ধু হতে পারে না –সে সত্যটি সেদিন রাজাকারগণ যথার্থ ভাবে বুঝতে পেরেছিল। অথচ সে সত্যটি বুঝতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বাঙালী প্রফেসর,বহু রাজনীতিবিদ ও বহু প্রবীন বাঙালী বুদ্ধিজীবী।

বাংলাদেশের বুকে ভারতের আজ যে দখলদারী এবং বাঙালী মুসলিম জীবনে আজ যে গোলামী -সেটি রাজকারগণ একাত্তরেই বুঝতে পেরেছিল। অখন্ড পাকিস্তানের মধ্যে তারা বাঙালীর কল্যাণ দেখেছিল। কোন একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গা যে হারাম ও সে কাজে জড়িত হওয়া যে সুস্পষ্ট বেঈমানী -সেটি রাজাকারগণ মনে প্রাণে বিশ্বাস করতো। মুসলিমদের আজকের দুর্গতির মূল কারণ তো বিভক্তির এ হারাম পথ। রাজাগণ সেটি বুঝতো বলেই তারা একাত্তরে ভারতে যায়নি। মুসলিম দেশ ভাংগার হারাম রাজনীতিও করেনি। তারা পরাজিত হতে পারে কিন্তু তাদের বিশ্বাসকে তো মিথ্যা বলা যায় না। এজন্য কি রাজাকারকে কি গালী দেয়া যায়? সেটি তো ইসলামের মূল বিশ্বাসের সাথে বেঈমানী। ভারতীয় কাফেরদের সেবাদাসগণ রাজাকারকে গালী দিবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি কি কোন ঈমানদারের কাজ হতে পারে?

৪. ঈমান ও বেঈমানীর রূপ

ব্যক্তির ঈমানদারী ও বেঈমানী খালি চোখে দেখা যায়। ঈমান দেখা যায় ব্যক্তির চরিত্র, কর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতির মধ্যে। সেটি দেখা যায়, দুর্বৃত্ত শাসকের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃনা ও লাগাতর জিহাদে। দেখা যায়, দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদে অর্থদান, শ্রমদান, রক্তদান ও বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যে। অপর দিকে বেঈমানী দেখা যায় দুর্বৃত্ত শাসকের পক্ষে ভোট দেয়া, তাদের পক্ষে লড়া্‌ই করা ও তাদের রাজনীতিকে সমর্থন দেয়ার মধ্যে।

চুরিডাকাতি করাই শুধু অপরাধ নয়, অপরাধ হলো চুরিডাকাতিকে সমর্থন করাও। সামান্যতম ঈমান থাকলে কেউ কি সেটি করে? তেমনি চরম বেঈমানী ও অপরাধ হলো স্বৈরাচারকে সমর্থন করা। এরূপ বেঈমানেরা নামায-রোযা করলেও তারা বেঈমান। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিজয়ী হলো বেঈমানেরা এবং পরাজিত হয়েছে ঈমানদারেরা।

৫. বিজয় হারাম রাজনীতির

পানাহারের ন্যায় রাজনীতিতেও হালাল-হারাম আছে। হারাম হলো জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম, স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও মুসলিম দেশ ভাঙ্গার রাজনীতি। একাত্তরে হারাম রাজনীতি প্রবল ভাবে বিজয়ী হয়েছে। হারাম রাজনীতির ফসল হলো ভোটচোর হাসিনা ও তার দুর্বৃত্তির শাসন। এবং তাতে মারা পড়েছ গণতন্ত্র ও মৌলিক মানবিক অধদিকার। বাংলাদেশ চলছে সেক্যুলারজিমের রাজনীতি। দেশটির জন্মও সেক্যুলারিজমে। সেক্যুলারিজমে ব্যভিচার যেমন প্রেম, তেমনি মুসলিম দেশ ভাঙ্গার হারাম রাজনীতিও সিদ্ধ। তাই দেশটিতে কাফেরদের সাথে জোট বেঁধে পাকিস্তান ভাংঙ্গা ও ভারতের গোলামী করাও গণ্য হয় স্বাধীনতা রূপে।

৬. অভাব ঈমানদার মানুষের

বাংলাদেশে ঈমানদার মানুষের বড্ড অভাব। ঘরে আবর্জনা দেখে বলা যায়, সে ঘরে কোন সভ্য মানুষ বাস করে না। কারণ, সভ্য মানুষ কখনো আবর্জনার মাঝে বাস করে না। তেমনি দেশে দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতের শাসন দেখে বলা যায় দেশে ঈমানদার নাই। কারণ, ঈমানদার থাকলে অবশ্যই বেঈমান তাড়াতো।

৭. অপরাধীর কান্ড

চুরি-ডাকাতি করে যে চোর বা ডাকাত মসজিদ বানায় -তাতে কি চুরি-ডাকাতির অপরাধ মাফ হয়? হাসিনা ভোটডাকাতি করেছে। ভোটডাকাতির মাধ্যমে পুরা দেশ ডাকাতি করেছে। এখন পদ্মা ব্রিজ নিয়ে নিজের কৃতিত্ব জাহির করছে। কথা হলো, পদ্মা ব্রিজ কি তার নিজের বা পিতা শেখ মুজিবের টাকার? ডাকাতির অপরাধ কি তাতে মাফ হয়? বরং হাসিনার সহচরদের দুর্বৃত্তির কারণে বিশ্ব ব্যাংক দূরে সরেছে এবং তাতে পদ্মা ব্রিজ নির্মাণের কাজ এক যুগ পিছিয়ে গেছে। সে সাথে বহুগুণ বেড়েছে নির্মাণ-খরচ। বিশ্ব ব্যাংক না হঠলে পদ্মা ব্রিজের উপর দিয়ে বহু আগে থেকেই গাড়ি চলতো।

৮. বাঙালীর ব্যর্থতা ও অর্জিত আযাব

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ থামাতে ২০ লাখ মানুষ লন্ডনে মিছিল করেছিল। অনেকে বলে, সেটি ছিল তিরিশ লাখ মানুষের মিছিল। বাংলাদেশের মানুষের উপর চলছে হাসিনার নৃশংস যুদ্ধ। ২০ লাখ মানুষ ঢাকার রাজপথে নামলে কি হাসিনা থাকতো? তখন বিনা রক্তপাতে হাসিনার পতন ঘটতো। ঢাকার লোকসংখ্যা তো লন্ডনের দ্বিগুণ। গণতন্ত্র নিয়ে সভ্য ভাবে বাঁচার একটি খরচ আছে। সে খরচ দিতে মায়ানমারের লোকেরা প্রতিদিন রক্ত দিচ্ছে। বাঙালী গণতন্ত্র চায়, কিন্তু তার মূল্য দিতে তারা রাজী নয়। এখানেই বাঙালীর ব্যর্থতা।

জঙ্গলে বাঘ-ভালুকের বিরুদ্ধে মিছিল হয়না। দেশ যখন জঙ্গলে পরিণত হয় তখন ডাকাতদের বিরুদ্ধেও লড়াই হয় না। কারণ সেরূপ লড়াই নিয়ে বাঁচাটি তো সভ্য মানুষদের কাজ। যে দেশ দুর্বৃত্তিতে ৫ বার বিশ্বে প্রথম হয়, যে দেশে ভোটডাকাতি, শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যা ও গুম-খুনের রাজনীত হলেও প্রতিবাদ হয়না –সে দেশে কি সভ্য সমাজ নির্মিত হয়? বরং সত্য হলো, এরূপ দেশে দুর্বৃত্তি ও স্বৈরাচার নিয়ে বাঁচাটাই সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। 

দেশকে ডাকাত মুক্ত করার দায়ভার কোন দলের নয়, এ দায়ভার প্রতিটি নাগরিকের। কিন্তু নাগরিকগণ যখন সে দায়ভার পালন করে না -তখন অসভ্য সমাজের আযাব তাদেরকে ঘিরে ধরে। তখন শুধু বিরোধী নেতারাই গুম-খুন হয় না, জনগণও তখন গুম, খুন, নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়। এসবই হলো অর্জিত আযাব।

৯. ভারতের চাওয়া ও পাওয়া

বাংলাদেশে ভারত শুধু তার সেবাদাস আওয়ামী-বাকশালীদের স্বাধীনতা দেখতে চায়। জনগণ ভোটের আজাদী পেলে ভারতের দালালগণ যে নির্বাচনে পরাজিত হবে -সেটি ভারত জানে। ভারতীয়দের মনে এজন্য  গণতন্ত্রভীতি। তাই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু হলো ভারত ও তার সেবাদাস আওংয়ামী-বাকশালী গোষ্ঠি।

নিরপেক্ষ নির্বাচন কোন জটিল রকেট সায়েন্স নয়। নেপালেও সেটি সম্ভব। সেরূপ একটি নির্বাচন হচ্ছে পাশ্ববর্তী পশ্চিম বাংলাতেও। অথচ ভারত সেরূপ নির্বাচন বাংলাদেশে হতে দিতে রাজী নয়। বরং বাংলাদেশে যা চায় তা হলো ভোট ডাকাতির নির্বাচন। চায়, নির্বাচনের নামে ব্যালেট ডাকাতি করে আওয়ামী বাকশালীদের বিপুল বিজয়। তেমন একটি নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে। সে ভোটডাকাতিকে জায়েজ করতে ভারতীয় দূতাবাসগুলি ও মিডিয় বিশ্বজুড়ে প্রচারে নেমেছিল। ভারত চায়, বাংলাদেশ বেঁচে থাকুক একটি জেলখানা রূপে। জেলখানার লোকদের ভোটের অধিকার থাকে না। তেমনি ভোটাধিকার নাই বাংলাদেশীদেরও। ১২/০৪/২০২১ 




বিবিধ ভাবনা (৪১)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 ১.  ঈমানদার ও বেঈমানের  রাজনীতি

ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা ও আশা-আকাঙ্খা কখনোই গোপন থাকে না; সেগুলির সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে রাজনীতিতে। ঈমানদারের রাজনীতিতে ঘটে ঈমানের প্রকাশ।  তাতে প্রকাশ ঘটে মহান আল্লাহতায়ালা কি চান –সেটির। মহান আল্লাহতায়ালা চান তাঁর দ্বীনের বিজয়, চান আদালতে তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। চান, মুসলিমদের ঐক্য। তাই ঈমানদারের রাজনীতি থাকে মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধির প্রচন্ড ভাবনা। তাই তাঁর রাজনীতিতে কখনোই মুসলিম দেশের ভূগোল ভাঙ্গার ভাবনা থাকে না, বরং থাকে ভূগোল বৃদ্ধির ভাবনা। থাকে সর্ব শক্তি দিয়ে শত্রুশক্তির ভূগোল ভাঙ্গার রাজনীতির বিরোধীতা। একাত্তরে সে ভাবনা থেকেই প্রতিটি ইসলামী দল, প্রতিটি হকপন্থী আলেম ও ঈমানদার ব্যক্তি পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরোধীতা করেছে এবং বহু হাজার ব্যক্তি রাজাকার হয়েছে। অতীতে সে ভাবনা থেকেই মুসলিমগণ সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তির জন্ম দিয়েছে।

মুসলিমদের শুধু ঈমানদারদের চিনলে চলে না; চিনতে হয় বেঈমানদেরও। নইলে শত্রু ও মিত্র চেনার কাজটি হয় না। বেঈমানদের চেনার কাজটি সহজ হয় তাদের রাজনীতি দেখে। এদের রাজনীতিতে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা পূরণের কোন ভাবনা থাকে না। বরং থাকে ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতি করার ভাবনা। থাকে, যে কোন ভাবে ক্ষমতা দখলের এজেন্ডা। এবং সেটি কাফেরদের সাহায্য নিয়ে মুসলিম দেশকে খন্ডিত করার মধ্য দিয়ে হলেও। মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বেঈমানগণ সে কাজটিই করেছে একাত্তরে। তারা সেটি করেছে ভারতের ন্যায় কাফের দেশের মুসলিম বিরোধী এজেন্ডা পূরণের মধ্য দিয়ে। ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তান ভাঙ্গতে চেয়েছে; তারা অপেক্ষায় ছিল একজন মুজিবের। ১৯৭১’য়ে ভারতের অস্ত্র নিয়ে ভারতের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুজিবপন্থীগণ সেদিন যুদ্ধ করেছে। সামান্য ঈমান থাকলে কেউ কি এরূপ কাজ করতে পারে? ইসলামের প্রতি নিজেদের বেঈমানীটিট জানিয়েছে ইসলামের পক্ষ ছেড়ে এবং জাতীয়তাবাদের ন্যায় কুফরি মতবাদে দীক্ষা নিয়ে।  

প্রশ্ন হলো যারা কাফেরদের বিজয়ী করতে ও তাদের এজেন্ডা পূরণে তাদের দেয়া অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করে তাদেরকে কি ঈমানদার বলা যায়? বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরাই হলো ভারতের পদলেহী তাঁবেদার পক্ষ। ইসলাম ও মুসলিমের পরাজয় নিয়ে এরা ভারতীয় কাফেরদের সাথে মিলে উৎসব করে। প্রতিবছর সেটি দেখা যায় ১৬ই ডিসেম্বর এলে। দক্ষিণ এশিয়ার বুকে ভারত আজ বৃহৎ শক্তি –সেটি তো তাদের ভারতসেবী রাজনীতির কারণে। এরা শুধু পাকিস্তানের শত্রু নয়, বরং ভয়ানক শত্রু হলো ইসলাম ও বাঙালী মুসলিমদের। সে সাথে শত্রু গণতন্ত্রের।  বাঙালী মুসলিমদের মুসলিম রূপে বাঁচতে হলে এ শত্রুদের নির্মূল করতেই হবে। প্রতিটি মুসলিম জীবনে জিহাদ থাকে। বাঙালী মুসলিম জীবনে সে জিহাদটি হলো এ বেঈমানদের বিরুদ্ধে। লক্ষ্য এখানে পুণরায় পাকিস্তান বানানো নয়, বরং বাঙালী মুসলিমদের মাথা তুলে দাঁড়ানো। দায়িত্ব এখানে প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলা, আসাম, বিহার ও আরাকানে বসবাসকারী ২২ কোটি মুসলিমের নেতৃত্ব দেয়া।

২. যে পাপ বাঙালী মুসলিমের

বাংলাদেশে নিজ দল, নিজ জামায়াত, নিজ ফিরকা, নিজ মাযহাব, নিজ পীর ও নিজ নেতাকে বিজয়ী করতে লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ করছে। দেশের পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী, বিজিবি, প্রশাসন, বিচারক বাহিনী তাদের সর্বশক্তি বিনিয়োগ করছে ভোটচোর অবৈধ হাসিনার প্রতিটি হুকুমকে প্রতিষ্ঠিত দিতে। কিন্তু দেশে লোক নাই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমকে বিজয়ী করার । ফলে বাংলাদেশের বুকে বিজয়টি ইসলামের শত্রুদের। বাঙালী মুসলিমগণ এভাবেই পরাজয় বাড়িয়েছে ইসলামের। এবং অসম্মান বাড়িয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার। এ পাপ তো বিশাল। নামায-রোযা ও হজ্জ-যাকাত দিয়ে কি এ পাপ মোচন হয়?

৩. গোলামীর পথে বাঙালী মুসলিম

ঈমান থাকলে জিহাদও আসে। কারণ জিহাদ ঈমানের অংশ। তাই নবীজী (সা:) ও তাঁর প্রতিটি সাহাবার জীবনে জিহাদ ছিল। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। জিহাদ মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য আনে। ফলে বিজয় আসে। তখন বিজয়ী হয় মুসলিম এবং প্রতিষ্ঠা পায় ইসলাম। এবং জিহাদ না থাকলে আসে পরাজয়। বাঙালী মুসলিম জীবনে জিহাদ নাই, ফলে বাঙালী মুসলিম জীবনে বিজয়ও নাই। তাদের বাঁচতে হয় শয়তানী শক্তির গোলামী নিয়ে। বাঙালীরা মুসলিমগণ ১৯৭১ থেকে ভারতের গোলামীর পথটাই বেছে নিয়েছে। তাই নির্যাতন, জেল ও মৃত্যু নেমে এসেছে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের জীবনে।  

৪. খুনিদের উৎসব

হাসিনা ঢাকার খুনি। সে শত শত মুসলিমের লাশ ফেলছে। আর নরেন্দ্র মোদি হচ্ছে গুজরাতের খুনি। সে যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন ৫ হাজার মুসলিমের লাশ ফেলেছে। বাবরী ধ্বংসের কাজেও সে অংশ নেয়। দুই খুনি এখন ঢাকায় উৎসব করছে। জনগণকে রাস্তায় নামতে নিষেধ করেছে।

বন্ধুত্ব গড়তে সবাই মনের মিলটা দেখে। এজন্যই দুর্বৃত্তরা সব সময় দুর্বৃত্তদের ভালবাসে। কারণ,তারাই তাদের মনের অতি কাছের মানুষ। মাছি যেমন মলমুত্র খোঁজে, দুর্বৃত্তও তেমনি দুর্বৃত্ত খোঁজে। তেমনি খুনি খোঁজে আরেক খুনিকে। এজন্যই খুনি হাসিনা তার পিতার জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে কোন ভাল মানুষকে নয়, গুজরাতের কুখ্যাত খুনি নরেন্দ্র মোদিকে অতিথি করেছে। হাসিনা জানে, নরেন্দ মোদি তাকে যেমন ভালবাসে, দুনিয়ার কোন সভ্য মানুষই সেরূপ ভালবাসে না।বরং নিজের অসভ্য ও বর্বর কর্মের জন্য প্রতিটি সভ্য মানুষের কাছেই সে ঘৃণার পাত্র।

৫.অবমাননা মহান আল্লাহতায়ালার এবং বিজয় শয়তানের

বাংলাদেশে আইন অমান্য করলে বা কোন দুর্বৃত্ত বিচারপতির হুকুমের অবমাননা করলে শাস্তি হয়। দেশের পুলিশ বাহিনী ও আদালত সে অবমাননাকারীকে জেলে তুলতে তৎপর। অথচ দেশটিতে  দিনরাত বিদ্রোহ ও অবমাননা হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম ও তাঁর শরিয়তি আইনের। অথচ তার কোন বিচার নাই; কারো কোন শাস্তিও নাই। কোন প্রকৃত ঈমানদার কি তাঁর মহান প্রভুর এরূপ অবমাননা কখনো সইতে পারে? সইলে কি ঈমান থাকে?

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মু’মিনের পরিচয় হলো, সে তাঁর পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফা ও সৈনিকের। সৈনিকের কাজ তো রাজার আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের ধরে ধরে শাস্তি দেয়া। নইলে ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটি শুধু কিতাবেই থেকে যায়।  নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের যুগে  কেউ মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম ও তাঁর শরিয়তি আইনের বিরুদ্ধে এরূপ অবমাননা ও বিদ্রোহ করলে কি তার ঘাড়ে মাথাটি থাকতো? অথচ বাংলাদেশে আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে বাঁচাটিই সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এরপরও তারা গর্ব করে বলে, তারা ঈমানদার? নবীজী (সা:)’র যুগে প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ ছিল মুনাফিক -যারা নবীজী (সা:)’র পিছনে মসজিদে নববীতে নামায পড়তো। বাংলাদেশে এ মুনাফিকদের সংখ্যা যে বিপুল -তা কি নিয়ে সন্দেহ আছে?  দেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও আইন-আদালতে তো এরাই বিজয়ী শক্তি। তাই বাংলাদেশে উৎসবটি শয়তান ও তার অনুসারীদের।

৬. জিহাদ বাছাই কাজ করে ঈমানদারদের

নামাযে অর্থ ও রক্তের খরচ নাই, তাই সেখানে সুদখোর, ঘুষখোর ও মিথ্যুক দুর্বৃত্তদের দেখা যায়। মুনাফিকদেরও দেখা যায়। তাদের থেকে প্রকৃত ঈমানদারদের আলাদা করার ক্ষেত্রটি হলো জিহাদ। জিহাদে তারাই যোগ দেয় -যারা প্রকৃত ঈমানদার। তাঁরা বাঁচে ও প্রাণ দেয় মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করতে এবং তাঁর বিধানকে বিজয়ী করতে। জিহাদে তো তারাই যোগ দেয় যারা বিনা বিচারে জান্নাতে যেতে চায়। বেঈমান কখনোই আল্লাহকে খুশি করার লক্ষ্যে বাঁচে না। তারা বাঁচে নিজেকে এবং নিজের পরিবার, দল ও নেতাকে খুশি করতে।

৭. ঈমানদারের জিহাদ ও বেঈমানের যুদ্ধ

সবার জীবনেই যুদ্ধ থাকে। অনেকের যুদ্ধ স্রেফ বাঁচার যুদ্ধ। বেঈমানের যুদ্ধটি তাকে জাহান্নামে নেয়। বেঈমানের সে যুদ্ধটি হয় ভাষা, গোত্র, অঞ্চল, দল ও নেতার নামে। ঈমানদারের যুদ্ধ তাঁকে জান্নাতে নেয়। ঈমানদারের প্রতিটি যুদ্ধই জিহাদ। জিহাদের লক্ষ্য ইসলামের প্রতিষ্ঠা, মুসলিম দেশের প্রতিরক্ষা ও জান-মালকে সুরক্ষা দেয়া। জিহাদই ইসলামে শ্রেষ্ঠ ইবাদত। ইবাদত এখানে শয়তানী পক্ষকে পরাজিত করার। জিহাদে যারা প্রাণ দেয় তারা শহীদ হয় এবং বিনা হিসাবে জান্নাত পায়।

১৯৭১’য়ে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধটি জিহাদ ছিল না। সে যুদ্ধটি ছিল সেক্যুলারিজম ও বাঙালী জাতীয়তাবাদের নামে। সে যুদ্ধে ইসলাম কোন বিষয়ই ছিল না। মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধিও এ যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল না। যুদ্ধের অস্ত্রদাতা, অর্থদাতা ও মূল পৃষ্ঠপোষক ছিল ভারতীয় কাফেরগণ এবং পরিচিত শত্রুদেশ রাশিয়া। তাদের যুদ্ধে লাভবান হয়েছে ভারত। এ যুদ্ধে তাদের ও মুক্তিবাহিনীর যারা মারা গেছে ভারতীয় কাফেরগণ তাদের শহীদ বলে।  অথচ শহীদ একটি কোর’আনী পরিভাষা, হিন্দুদের ধর্মীয় বইয়ে শহীদ বলে কোন শব্দ নাই। তাই যারা প্রকৃত শহীদ হতে চায় তারা একাত্তরে ভারতের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করা থেকে সযত্নে দূরে থেকেছে। কারণ মুসলিমের প্রতিটি খাবার যেমন হালাল হতে হয়, তেমনি প্রতিটি যুদ্ধকে শতভাগ হালাল হতে হয়। এবং যুদ্ধতো তখনই হালাল হয় যখন সেটি বিশুদ্ধ জিহাদ হয়। তাছাড়া মুসলিম দেশ বাঁচানোর যুদ্ধ জিহাদ হয়, ভাঙ্গার যুদ্ধ কখনোই জিহাদ হয় না। সে হুশ থাকার কারণেই কোন আলেম এবং ইসলামপন্থী কোন দল ও ব্যক্তিকে মুক্তিবাহিনীতে দেখা যায়নি।

৮. জিহাদ বিরামহীন

ঈমানদারের জীবনে জিহাদ অবিরাম। কখনো সেটি বুদ্ধিবৃত্তিক, কখনো অস্ত্রের। কখনো সেটি নফসের বিরুদ্ধে, কখনো সেটি সশস্ত্র শত্রুর বিরুদ্ধে। নামায দিনে ৫ বার। রোযা  বছরে ১ মাস। এবং হজ্জ জীবনে একবার। কিন্তু জিহাদ প্রতি দিন ও প্রতিক্ষণ। জিহাদে ক্বাজা নাই। জিহাদ না থাকার অর্থ, শত্রুর হাতে পরাজয় ও আত্মসমর্পণ। দেশ যখন ইসলামের শত্রু শক্তির দখলে তখন জিহাদ থেকে দূরে থাকা বেঈমানী। তখন বিজয়ী হয় শয়তান। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে।

নামায-রোযা করেও বহু মানুষ মুনাফিক হয়। নবীজী (সা:)র পিছনে নামায আদায় করেও অনেকে মুনাফিক হয়েছে। এরা কাফিরদের চেয়েও নিকৃষ্ট। ন্যায়ের পক্ষে থাকা এবং জিহাদে যোগ দেয়ার সামর্থ্য এদের থাকে না। এরা অপরাধী; এরা যুদ্ধ করে চোরডাকাত, ভোটডাকাত ও দুর্বৃত্তদের বিজয়ী করার লক্ষ্যে।

৯. ফরজে অবহেলা এবং আসক্তি হারামে

ইসলামে ফরজ হলো একতা গড়া। এবং হারাম হলো অনৈক্য গড়া। বাঙালী মুসলিম জীবনে অনৈক্য দেখে বুঝা যায় অনৈক্য গড়ার ন্যায় হারাম কাজে তাদের কত আগ্রহ। দেশ ডাকাতদের দখলে গেছে, ডাকাত তাড়াতে তবুও রাজী নয় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো! একতায় রাজী নয় দেশের আলেম সমাজ। অনৈক্যের হারাম নিয়ে বাঁচাই যেন তাদের নীতি।অনৈক্যে এরূপ ডুবে কি আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা যায়? মিলবে কি জান্নাত?

১০. উৎসব কি পরাধীনতা নিয়ে?

বাংলাদেশে কোথায় স্বাধীনতা? মিছিল করতে গেলে লাশ হতে হয়। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে গুম হতে হয়। এবং ভোট ডাকাতি হয়ে যায়। কথা হলো, এসব কি স্বাধীনতার লক্ষণ? এমন দেশে আবার কিসের উৎসব? দেশবাসীকে পরাধীন করে হাসিনা তার প্রভু নরেন্দ্র মোদিকে পদসেবা দিচ্ছে নিরীহ মানুষকে বলি দিয়ে। নরেন্দ্র মোদির আগমন কালে ২১জন নিরীহ মানুষকে হাসিনা করেছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে অপরাধী ব্যক্তি হচ্ছে হাসিনা। এ ভয়ানক অপরাধীকে দেশবাসী কি শাস্তি দিবে না? ০৯/০৪/২০২১

 




বিবিধ ভাবনা (৪০)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. অপরাধীদের দখলদারী ও জনগণের ব্যর্থতা

মানব সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গণটি হলো রাজনীতি। জাতি কোন দিকে যাবে -তা ক্ষেত-খামার, হাট-বাজার, কলকারখানা বা স্কুল-কলেজ থেকে নির্ধারিত হয় না। সেটি নির্ধারিত হয় রাজনীতি থেকে।  তাই যারা দেশ ও দেশবাসীর ভাগ্য পাল্টাতে চায় তারা রাজনীতিতে যোগ দেয়। সমাজ বিপ্লবের এটিই হাতিয়ার। ইসলাম যেহেতু মানুষের জীবনধারাই পাল্টাতে চায়, রাজনীতিকে তাই জিহাদের মর্যাদা দিয়েছে। রাষ্ট্রের অঙ্গণে ইসলাম বিজয়ী হবে না পরাজিত হবে –সেটিই নির্ধারিত হয় রাজনীতি বা জিহাদের ময়দান থেকে। যাত্রীবাহী বাসে চালকের যে ভূমিকা, দেশের ক্ষেত্রে সে ভূমিকাটি হলো রাজনৈতিক নেতা বা সরকার-প্রধানের। বাসের চালক যদি সুস্থ্য থাকে তবে সকল যাত্রী মদ খেয়ে বেহুশ হয়ে পড়লেও তাতে গাড়ি খাদে পড়ে না। দুর্ঘটনাও ঘটে না। সুস্থ্য চালকের কারণে বাস তখন সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে। কিন্তু বাসের চালক যদি মদ খেয়ে ঢলে পড়ে তবে দুর্ঘটনা ঘটবেই। তাতে প্রাণনাশও হতে পারে। তখন যাত্রীদের ক্রন্দন বা দোয়া-দরুদে লাভ হয় না।

একই কারণে ভয়ানক বিপদ ঘটে দুর্বৃত্তকে ক্ষমতায় বসালে। তখন সমগ্র দেশ ডাকাতি হয়ে যায়। সে বিপদ থেকে বাঁচতেই সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে  রাষ্ট্রনায়কের সিটে বসাতে হয়। এটিই হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ। দেশবাসীর প্রজ্ঞার প্রকাশ তো এভাবেই ঘটে। এবং সেটিই হলো নবীজী (সা:)’র সর্বশ্রেষ্ঠ সূন্নত। মুসলিমগণ অতীতে যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিল সেটি মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ার কারণে নয়। সেটি হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আসন থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূল ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দেয়ার কারণে।

নবীজী(সা:) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন ততদিন তিনিই ছিল ছিলেন মুসলিমদের রাজনৈতিক নেতা এবং সে সাথে রাষ্ট্রপ্রধান। নবীজী (সা:)’র ইন্তেকালের পর সে আসনে বসেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ। কিন্তু বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে নবীজী (সা:)’র বহু সূন্নত বেঁচে থাকলেও অতি গুরুত্বপূর্ণ সে সূন্নতটি বেঁচে নাই। চোর-ডাকাত-দুর্বৃত্তদের সন্মানিত করা ও তাদেরকে শাসন ক্ষমতায় বসানো তো দুর্বৃত্তদের সংস্কৃতি। অথচ বাংলাদেশে সেটিই এখন বিজয়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ফলে নবীজী (সা:)’র সে পবিত্র শাসনটি হাইজ্যাক হয়েছে ভোটডাকাত দুর্বৃত্তদের হাতে। জনগণের মাঝে তা নিয়ে কোন বিদ্রোহ নাই। মুসলিম দেশগুলিতে ইসলামের পরাজয়ের মূল কারণ তো এই দুর্বৃত্তদের অধিকৃতি ও জনগণের আত্মসমর্পণ।  

পুরা একটি দেশকে হাইজ্যাক করার লক্ষ্যে শাসন ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনটি দখলে নিলেই চলে। সারা দেশ তখন দখলে এসে যায়। হাসিনার নেতৃত্বে ভোটডাকাতগণ সে ভাবেই বাংলাদেশকে হাইজ্যাক করেছে। ফলে দেশ এখন তাদেরই দখলে। তাই জনগণকে শুধু দেশের সীমান্ত পাহারা দিলে চলে না, পাহারা দিতে হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনটিকেও। প্রয়োজনে সে জন্য যুদ্ধ করতে হয়। সভ্য দেশের নাগরিকদের এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অথচ বাংলাদেশের জনগণ সে দায়িত্ব পালনে পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে আছে একজন ভোটডাকাত।

তাছাড়া যে পবিত্র আসনে খোদ নবীজী (সা:) বসেছেন, সে আসনে কি কোন চোর-ডাকাত-দুর্বৃত্তকে বসানো যায়? তাতে যেমন নবীজী (সা:)’র সূন্নতের অবমাননা হয়, তেমনি অবমাননা হয় সে পবিত্র আসনের। সেরূপ অবমাননা আযাব ডেকে আনে। তাছাড়া চুরি করা যেমন অপরাধ, তেমনি অপরাধ হলো সে চুরিকে বৈধতা দেয়া। রাষ্ট্রের উপর চোরডাকাতদের সে অবৈধ অধিকৃতির বৈধতা দেয়ার অপরাধটি ঘটে তখন, যখন সে অপরাধীদের না হটিয়ে তাদের শাসন বাঁচাতে রাজস্ব দেয়া হয়। অথচ ডাকাতদের ভোট দেয়া যেমন অপরাধ, তেমন অপরাধ হলো তাদেরকে রাজস্ব দিয়ে প্রতিপালন দেয়া। সে অপরাধের জন্য শাস্তি পেয়েছিল ফিরাউনের প্রজারা। বাংলাদেশের জনগণ একই গুরুতর অপরাধ করছে হাসিনার ন্যায় এক ভোটডাকাত দুর্বৃত্তকে রাজস্ব দিয়ে প্রতিপালন করে। তবে বাংলাদেশে জনগণের আরো অপরাধ হলো, তারা নিজেরাও অনেক সময় দুর্বৃত্তদের সক্রিয় সহযোগী হয়ে পড়ে। ডাকাতেরা একাকী ডাকাতি করতে পারে না; ডাকাতিতে তাদেরও লোক বল চাই। হাসিনার ডাকাতিতে লোকবল জুগিয়েছে বাংলাদেশের সেনবাহিনী, পুলিশ, প্রশাসন ও আদালতের লোকজন। অপর দিকে শেখ মুজিবের ন্যায় বাকশালী স্বৈরাচারি, খুনি, গণহত্যাকারী এবং ভারতীয় দালালও একাকী রাষ্ট্রক্ষমতা হাইজ্যাক করেনি। সে কাজে সহায়তা দিয়েছে দেশের জনগণ।

জনগণের দয়-দায়িত্বটি বিশাল। ব্যক্তির মর্যাদা তো সে দায়িত্ব নিয়ে বাঁচায়। মহান আল্লাহতায়ালা শুধু ঈমানই দেখেন না, আমলও দেখেন। জান্নাতে তো তারাই যাবেন যারা ঈমান ও আমল – এ উভয় ক্ষেত্রেই উন্নত। আমলের মধ্যেই ধরা পড়ে ব্যক্তির বিবেক, চরিত্র ও ঈমানের মান। এবং নেক আমল শুধু দান-খয়রাত নয়, সবচেয়ে বড় নেক আমল হলো দেশের শাসন ক্ষমতা থেকে শয়তান নির্মূল করা। দেশ সভ্যতর হয় তো এ আমলের গুণে। প্রাসাদসম মসজিদ গড়ে দেশ পাল্টানো যায় না, বিপ্লব আনতে হয় দেশের রাজনীতিতে। বাসের চালক দুর্ঘটনা ঘটালে কিছু যাত্রী মারা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের চালক দুর্ঘটনা ঘটালে লাখ লাখ লোকের মৃত্যু হয়। দেশ তখন আযাবের যন্ত্রে পরিণত হয়। তাই সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হলো, কোন দুর্বৃত্তকে সরকার-প্রধানের আসনে বসানো। এবং এ কারণেই সবচেয়ে বড় নেক আমলটি পথের কাঁটা সরানো বা বাঘ তাড়ানো নয়, সেটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আসন থেকে অপরাধী ব্যক্তিদের নির্মূল করা। ইসলামের একাজে পবিত্র জিহাদের মর্যাদা রয়েছে। শয়তানকে তো এভাবেই পরাজিত করা যায়। বাজারে সামান্য মাছ কিনতে গেলেও কোনটি পচা এবং কোনটি ভাল –সেটি যাচাই-বাছাই করে কিনতে হয়।  নইলে পচা মাছে স্বাস্থ্যহানী ঘটে। সে নিখুঁত যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি করতে হয় রাজনীতির ময়দানে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কাকে বসানো হয় –সেটি খুঁতিয়ে দেখার মধ্যেই দেশের মহা কল্যাণ। এখানে ব্যর্থ হলে ভয়ানক শত্রু এবং দুর্বৃত্তও শাসকে পরিনত হয়। সে কাজে বাংলাদেশীদের ব্যর্থতাটি বিশাল। বাংলাদেশে আজ যে ভয়ানক দুঃশাসন -সেটি এক দিনের কামাই নয়। এবং সেটি শুধু সরকারের ব্যর্থতাও নয়। বরং সে জন্য দায়ী বহুদিন ধরে চলা জনগণের নিজেদের ব্যর্থতাও।

 ২. রাজনীতিবিমুখ বাঙালী মুসলিম

জনগণের কান্ডজ্ঞান, ধর্মপ্রেম, দেশপ্রেম ও বিবেকবোধ বোঝা যায় রাজনীতিকে তারা কতটা গুরুত্ব দেয় তা থেকে। সত্যের জয়-পরাজয়ের ন্যায় মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধান জিতবে না হারবে –সেটি মসজিদ-মাদ্রাসায় স্থির হয় না, নির্ধারিত হয় রাজনীতির ময়দানে। অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার ন্যায় মুসলিম জীবনের যে মূল মিশন –সে মিশন নিয়ে বাঁচার পূরণে মূল হাতিয়ারটি হলো রাজনীতি। এজন্যই নবীজী (সা:) নিজে ছিলেন রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্রনায়ক। রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন তাঁর সকল সাহাবাগণ। তাই রাজনীতি থেকে দূরে থাকাটি ইসলামের মিশনের সাথে বেঈমানী। সেটি নবীজী(সা)র সূন্নতের সাথে গাদ্দারী। তাতে বিজয়ী হয় শয়তানের পক্ষ।

তাছাড়া ঈমানের মূল পরীক্ষাটি হয় রাজনীতিতে। নামায-রোযা-হজ্জ অনেক ঘুষখোর, সূদখোর ও হাসিনার ন্যায় ভোটচোর জালেমও করে, কিন্তু রাজনীতিতে ধরা পড়ে সে আসলে কোন পক্ষের সৈনিক। রাজনীতির ময়দানে এক সাথে দুই পক্ষে লড়াই করা যায়না, যে কোন এক পক্ষ বেছে নিতে হয়। ঈমানদারকে যোগ দিতে হয় ইসলামকে বিজয়ী করার পক্ষে। এটি পবিত্র জিহাদ। এ জিহাদে ঈমানদারকে শুধু ভোট দিলে চলে না, বিনিয়োগ করতে হয় তাঁর দৈহিক, আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য। এমন কি বিলিয়ে দেয় তার রক্ত ও প্রাণ। অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। ঈমানদারের ঈমানদারী এভাবেই খালি চোখে দেখা যায় তাঁর রাজনীতিতে।

অথচ অধিকাংশ বাঙালী মুসলিমের রাজনীতিতে রুচি নাই। রাজনীতির ময়দানে নাই অধিকাংশ আলেম ও তাবলিগ জামায়াতের লোকেরা, এটিকে তারা দুনিয়াদারী মনে করেন। নবীজী (সা:)’র রাজনৈতিক সূন্নতের ধারে কাছেও তারা নাই। যারা নিজেদের নামাযী ও রোযাদার ভাবেন, তারাও ইসলামকে বিজয়ী করা নিয়ে ভাবেন না। এজন্যই রাজনীতিতে তাদের তেমন বিনিয়োগও নাই। নির্বাচন কালে বড় জোর ভোট দেন। এবং তাদের অধিকাংশই ভোট দেন তাদেরকে যারা সেক্যুলারিস্ট রূপে পরিচিত এবং যাদের এজেন্ডা হলো ইসলাম ও তার শরিয়তী বিধানকে পরাজিত রাখা। বস্তুত তাদের  কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিরংকুশ বিজয়টি ইসলামের শত্রুপক্ষের।  

 

৩. পালিত হয়নি দায়িত্ব

গণতন্ত্রের সুফলটি বিশাল, এটি জনগণের ক্ষমতায়ন করে। দায়িত্ব দেয় সরকার নির্বাচনের। এ দায়িত্বটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে বাড়ে জনগণের নিজ দায়িত্বও। সে দায়িত্বটি সঠিক ভাবে পালন না করাটিও গুরুতর অপরাধ। দায়িত্ব এখানে যোগ্য, সৎ ও ঈমানদার মানুষকে নির্বাচিত করার। সেটি না হলে অপরাধটি হয় ইসলাম, দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে। পাপটি তখন ফিরাউন ও নমরুদের ন্যায় দুর্বৃত্ত স্বৈরাচারি শাসকদের পক্ষে দাঁড়ানোর ও ইসলামকে পরাজিত করার। তাই পাপটি এখানে ভয়নাক। এ পাপই জনগণকে জাহান্নামে টানে। সে পাপের কারণেই বাংলাদেশের জনগণের ইসলামী শাসনের সুফল থেকে তারা বঞ্চিত এবং ঘানি টানছে বর্বর স্বৈরশাসনের।

লক্ষণীয় হলো, শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ন্যায় নৃশংস স্বৈরশাসক বন্দুকের জোরে ক্ষমতায়  আসেনি। এসেছে কখনো বা জনগণের ভোটে, কখনো বা ভোটডাকাতি করে। ভোট দিয়ে মুজিব ও হাসিনার ন্যায় অপরাধীদের নির্বাচিত করার অপরাধটি অতি গুরুতর। এটি রুচিহীন অসভ্য কর্ম। অপরাধটি এখানে বাংলাদেশের জনগণের। আদালতে দাঁড়িয়ে খুনি ও চোরডাকাতকে ভাল মানুষ বলে সাক্ষী দিয়ে জেল থেকে তাদেরকে মুক্ত করাটি জঘন্য অপরাধ। তাতে সমাজ জুড়ে অপরাধ ও অশান্তি বাড়ে। তেমনি গুরুতর অপরাধ হলো স্বৈরাচারি ভোট-ডাকাতদের পক্ষে ভোট দিয়ে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসানো।

৪. চেনা হয়নি শত্রুদের

প্রতিটি মানুষকেই কিছু দায়-দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে হয়। দায়-দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে হয় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও আলেম সমাজকেও। তাদের কাজটি হলো দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জনগণের সামর্থ্য বাড়ানো। সে সাথে তাদের আরো দায়িত্ব হলো যেসব দুর্বৃত্তগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসতে চায় তদের আসল রূপকে জনগণের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিও হয়নি। বরং যাদের দায়িত্ব ছিল দুর্বৃত্তদের মুখোশ উম্মোচন করা, তারাই দুর্বৃত্তদের সাফাই গায়। অথচ চুরি করা যেমন অপরাধ, তেমনি অপরাধ হলো চোরকে সাহায্য করা। ফলে তাদের এ ব্যর্থতার কারণে চেনা হয়নি দেশের শত্রুদের। অথচ সভ্য সমাজ নির্মাণের কাজে শুধু হিংস্র পশুদের চিনলেই চলে না, চিনতে হয় মানবরূপী ভয়ানক শত্রুদেরও। সে ক্ষেত্রে ভূল দেশে গণহত্যা ঘটে এবং দেশের উপর স্বৈরাচারি বর্বরতা ও অসভ্যতার প্লাবন নেমে আসে। অথচ জনগণের সে অপরাধের কারণেই হাসিনা যেমন ক্ষমতায় এসেছে, অতীতে মুজিবও এসেছে। হাসিনাকে চিনতে জনগণ যেমন দারুন ভাবে ব্যর্থ হয়েছে তেমনি ব্যর্থ হয়েছে মুজিবকে চিনতেও।

কীরূপ ছিল মুজিব? কীরূপ ছিল তার রাজনীতি? শেখ মুজিবের রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যটি ছিল যে কোন রূপে ক্ষমতা-দখল দেশের স্বাধীনতা, অখন্ডতা, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবিষয়গুলি তার কাছে কোন কালেই গুরুত্ব পায়নি। মুজিব ভারতকে সাথে নিয়ে পাকিস্তান ভেঙ্গেছে বাংলাদেশীদের জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি বা গণতন্ত্র দেয়ার জন্য নয়। বরং সেটি ছিল স্রেফ শাসন ক্ষমতা নিজ হাতে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে। ক্ষমতার লোভে এমন কি শত্রু দেশের সাথে ষড়যন্ত্র করাও তার কাছে গর্হিত মনে হয়নি। ভারতের সাথে মিলে আগরতলা ষড়যন্ত্র্ করেছে ক্ষমতা-লাভকে প্রতিদ্বন্দিতাহীন করতে খুন করা হয়েছে ৩০ হাজারের বেশী মানুষকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সকল বিরোধী দলকে এবং কবরে পাঠানো হয়েছে গণতন্ত্রকে

বাঘ-ভালুকের চেয়ে বহুগুণ অধিক প্রাণনাশী হলো স্বৈরাচারি শাসকেরা। তারাই ইতিহাসে গণহত্যা, গণধর্ষণ, গুম-খুনের নায়ক।  বাংলাদেশেও তাই লাশ পড়ে স্বৈরাচারি শাসকের হাতে, বাঘ-ভালুকের হাতে নয়। প্রতিটি সভ্য দেশে এজন্যই স্বৈরাচারি শাসকদের ঘৃণা করা হয়। এবং ইতর  ও অসভ্য গণ্য করা হয় তাদের যারা তাদের প্রতি  শ্রদ্ধা দেখায়। হিটলারের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো এজন্যই জার্মানীতে অপরাধ। জাহান্নামে যাওয়ার জন্য শয়তানকে ভালবাসাই যথেষ্ট। বস্তুত ব্যক্তির সভ্য ও অসভ্য রূপটি চেনার জন্য কোন গবেষণা লাগে না, সেটি দেখা যায় কাকে সে ভাল বাসে বা ঘৃণা করে -সেটি দেখে। মানুষের চরিত্র তো এভাবেই দর্শনীয় হয়। বাঙালীর সে চরিত্রটি দেখা যায় মুজিবের ন্যায় একজন নৃশংস স্বৈরচারীকে জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলার মধ্য দিয়ে। তার ন্যায় একজন গুরুতর অপরাধীকে কোন সভ্য মানুষ জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলবে সেটি কি ভাবা যায়? মুজিবের অপরাধ তো শুধু বাকশালী স্বৈরাচার নয়, ৩০ হাজার মানুষের প্রাণনাশ নয় এবং মানবিক অধিকার কেড়ে নেয়াও নয়। বরং তার অপরাধ তো ১৮ কোটি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে তাদেরকে ভারতের ন্যায় শত্রুশক্তির দাস বানানোর। তার কারণেই সমগ্র বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে একটি ভারতীয় জেলখানায়। অপরাধ তো স্বাধীন মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার অধিকার কেড়ে নেয়ার।

 

৫. মিলবে কি গণতন্ত্রের সুফল?

গণতন্ত্রের সুফল পেতে হলে জনগণকে প্রথমে শিক্ষিত ও বিবেকবান হতে হয়। শত্রু ও মিত্র, যোগ্য ও অযোগ্য এবং সত্য ও মিথ্যা –এ গুলি চেনার সামর্থ্য অর্জন করতে হয়। নইলে দুর্বৃত্তগণ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। নির্বাচন তখন ধুর্ত চোরডাকাতদের জন্য ক্ষমতার শীর্ষে উঠার সিঁড়িতে পরিণত হয়। ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়া যায়না। তেমনি জনগণকে সুশিক্ষিত নাগরিক রূপে গড়ে তোলার আগে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা দেয়া যায় না। অথচ বাংলাদেশে জনগণের মাঝে সে সামর্থ্য সৃষ্টির কাজটি হয়নি। বরং আগে যা ছিল সেটি দুষ্ট শিক্ষা ও প্রচারনায় বিনষ্ট করা হয়েছে।

পাশ্চত্যের যেসব দেশে গণতন্ত্র সফল ভাবে কাজ করছে -সেসব দেশে জনগণকে শিক্ষিত করার কাজটি শত বছর আগেই সমাধা করা হয়েছে। সেসব দেশে জনগণের মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে নৈতিকতা ও বিবেক বোধ। ফলে স্বৈরাচারি শাসকদেরকে তারা গভীর ভাবে ঘৃণা করে। ঘৃণা করে দুর্বৃত্তদের। ফলে সেসব দেশে কোন স্বৈরচারী দুর্বৃত্তকে জাতির পিতা, নেতা ও বন্ধু বলা হয়না। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের লোকেরা ভোটডাকাতিতে সাহায্য করবে -সেটিও ভাবা যায় না। আদালতের বিচারপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ভোটডাকাতির নির্বাচনকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলে রায় দিবে -সেটিও সেদেশগুলিতে কল্পনা যায়না। কিন্তু বাংলাদেশে সেটিই সংস্কৃতি।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে কি সেরূপ নৈতিকতা ও বিবেকবোধ নিকট ভবিষ্যতে গড়ে উঠবে? সে সম্ভাবনা তো ক্ষীণ। কারণ, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো জনগণকে শিক্ষিত করায় যাদের দায়িত্ব তাদের নিয়ে। দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিজেদেরই শিক্ষিত হওয়াতে অনেক ব্যর্থতা রয়েছে। তারাই দেশের অন্যতম নীতিহীন ও বিবেকহীন শ্রেণী। তারাই ভোটডাকাতিকে সুষ্ঠ নির্বাচন বলে এবং ভোটডাকাত হাসিনাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে। ফলে তারাই গণতন্ত্রের বড় শত্রু। রোগী যেমন রোগ ছড়ায়, এরাও তেমন নীতিহীনতা ও বিবেকহীনতা ছড়াবে। এরূপ নীতিহীনতা ও বিবেকহীনতায় কি কোন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়? নির্মিত হয় কি সভ্য সমাজ? দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে এ নিয়ে ভাবা উচিত। ০৩/০৪/২০২১

 




বিবিধ ভাবনা (৩৯)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ইসলামের বিপক্ষ শক্তির বিজয় উৎসব 

বাংলাদেশে ইসলামের বিপক্ষের শক্তির বিজয়গুলো বিশাল। বাংলাদেশে বহু কোটি মানুষের পেটে দুই বেলা ভাত না জুটলে কি হবে, সে বিজয় নিয়ে বাংলাদেশে এখন শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে উৎসব হচ্ছে। এ উৎসবে প্রধান অতিথি হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও গুজরাতের মুসলিম গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদি। নরেন্দ্র মোদি প্রতিনিধিত্ব করে ভারতের মুসলিম নিধনকারী হিন্দুত্ববাদী আর,এস,এস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজিপি’র সম্মিলিত অক্ষ শক্তির। এরাই আসাম ও পশ্চিম বাংলা থেকে বাঙালী মুসলিমদের বাংলাদেশী বলে বহিস্কারের ষড়যন্ত্র করছে। এরাই বাবরি মসজিদকে ধুলির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের ইসলামের শত্রু শক্তির কাছে ভারতের মুসলিম বিরোধী এ উগ্র শক্তিটি যে কতটা কাছের -তা নরেন্দ্র মোদিকে প্রধান অতিথি করে সেটিই প্রমাণ করলো। ভারতে মুসলিম গণহত্যা হলে বা সীমান্তে বাংলাদেশীকে হত্যা করা হলে -এ জন্যই এরা সেগুলির নিন্দা করেনা।

এদের আরেক বিজয় হলো, বাঙালী মুসলিমদের তারা সফল ভাবে দূরে সরাতে পেরেছে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে। ফলে শরিয়ত ও জিহাদের কথা কেউ মুখে আনে না। যেন শরিয়ত ও জিহাদ -এ দুটি ইসলামের কোন অংশই নয়। দেশের আদালতে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা না দিলে যে মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় কাফের, ফাসেক ও জালেম গণ্য হতে হয় -সে হুশও জনগণের চেতনা থেকে তারা বিলুপ্ত করতে পেরেছে। দাফন দিতে পেরেছে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব। ফলে অবাঙালী মুসলিমগণ তাদের কাছে ঘৃণার বস্তু। একাত্তরে এরাই উৎসব ভরে তাদের হত্যা ও ধর্ষণ করেছে। এবং তাদেরকে ঘরবাড়ী থেকে তাড়িয়ে সেগুলি দখলে নিয়েছে। হিন্দুদের ন্যায় মূর্তি নির্মাণ ও মূর্তির পদতলে ফুল চড়ানো এখন তাদেরও সংস্কৃতি। ইসলামপন্থীদের ফাঁসি, শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যা, নিষিদ্ধ কোর’আনের তাফসির –এ গুলোও কি কম বিজয়?

তাদের সবচেয়ে বড় বিজয়টি আসে ১৯৭১’য়ে। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ইসলামের শত্রু পক্ষের এটিই ছিল সবচেয়ে বড় নাশকতা। সে কাজে তারা সাথে পায় আগ্রাসী ভারতীয় কাফেরদের। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমগণ ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে মুসলিম শক্তি রূপে উত্থানের স্বপ্ন দেখেছিল এবং সে স্বপ্নের বাস্তবায়নে জন্ম দিয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তান। ভারতের কাফেরগণ চায়নি, পাকিস্তান সৃষ্টি হোক এবং বেঁচে থাকুক। চায়নি, বাংলাদেশের ইসলামবিরোধী শক্তিও। ১৯৭১’য় ভারতীয় আগ্রাসী শক্তির সাথে কোয়ালিশন গড়ে তারা সফল হয় উপমহাদেশের মুসলিমদের সে স্বপ্নকে পন্ড করতে। তাতে বিজয়ী হয়েছিল ভারত। ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর বিজয়ে উল্লসিত হয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি পার্লামেন্টে দাঁড়িয় বলেছিল, “হাজার সালকা বদলা লে লিয়া।” ইন্দিরা গান্ধির সে বদলাটি ছিল ভারতের বুকে মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দুদের প্রতিশোধ। প্রশ্ন হলো, হিন্দুদের সে বদলা নেয়ার যুদ্ধে একজন মুসলিম কীরূপে জড়িত হয়? লক্ষণীয় হলো, বাংলাদেশের কোন আলেম বা কোন ইসলামী দল তাতে জড়িত হয়নি। কিন্তু জড়িত হয় এবং সহায়তা দেয় বাংলাদেশের ইসলাম বিরোধী শক্তি। একাত্তরের সে প্রতিশোধের যুদ্ধে তারাই ভারতে ঘরে বিজয় তুলে দেয় এবং সে বিজয় নিয়ে ভারতীয় কাফেরদের সাথে মিলে এখন উৎসব করছে।

প্রশ্ন হলো, যে উৎসবটি কাফেরদের সাথে নিয়ে হয়, তাতে শয়তান খুশি হলেও মহান আল্লাহতায়ালা কি খুশি হন? সে ভাবনাই বা ক’জন বাংলাদেশীর? সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে কখনো কি এমন হয়ছে, মুসলিমগণ কাফেরদের সাথে একত্রে বিজয় উৎসব করেছে? মুসলিম ও কাফেরদের বিজয় ও পরাজয়েরে বিষয়গুলো তো ভিন্ন ভিন্ন। কাফেরদের যাতে বিজয়, তাতে তো মুসলিমদের পরাজয়।   

 

২. ইসলামপন্থীদের পরাজয়

বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের পরাজয়গুলো বিশাল ও ভয়ানক। সে পরাজয়গুলো নিয়ে তাদের মাতম হওয়া উচিত। তারা ব্যর্থ হয়েছে ঐক্যবদ্ধ হতে। ব্যর্থ হয়েছে দেশের আদালতে শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা দিতে। ব্যর্থ হয়েছে অন্যায় ও দুর্বৃত্তির নির্মূলে এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। অথচ অন্যায় ও দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা নিয়ে বাঁচাটাই তো মুসলিম জীবনের মূল মিশন। এ মিশন নিয়ে বাঁচার জন্যই তারা মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় শ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদা পায়। একমাত্র এ পথেই নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। সে মিশন নিয়ে বাঁচার কারণেই মুসলিমগণ অতীতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। অথচ আজ বাঙালী মুসলিমগণ জন্ম দিচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের। এবং শাসক রূপে মেনে নিয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় ডাকাতকে।

তাদের বিশাল ব্যর্থতা পবিত্র কোর’আনকে বুঝায় এবং কোর’আনের জ্ঞানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ায়। কোর’আন না বুঝে তারা শুধু তেলাওয়াতে দায় সারছে। পবিত্র কোর’আনের সাথে এর চেয়ে বড় বেয়াদবী আর কি হতে পারে? এরূপ বেয়াদবদের কি মহান আল্লাহতায়ালা কখনো ইজ্জত দেন? আল্লাহতায়ালা কোর’আনের জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন, না বুঝে তেলাওয়াতকে নয়।

ঈমানদারের পরীক্ষা কি শুধু নামায-রোযা পালনে হয়? নামায-রোযা তো নবীজী(সা:)’র যুগে মুনাফিকদের জীবনেও ছিল। সূদখোর, ঘুষখোরও তো নামায পড়ে। তাকে তো বিজয়ী হতে হয় ইসলামের বিজয় আনার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা ব্যর্থ হয়েছে নবীজী(সা:)’র ইসলাম নিয়ে বাঁচায়। তারা যে ইসলাম নিয়ে বাঁচছে সেটি তো নবীজী(সা:)’র ইসলাম নয়; সেটি তো তাদের নিজেদের মনগড়া ইসলাম। নবীজী (সা:)’র ইসলামে ইসলামী রাষ্ট্র ছিল, জিহাদ ছিল, শাহাদত ছিল, শরিয়ত ও হুদুদের পালন ছিল এবং প্যান-ইসলামিক মুসলিম ঐক্য ছিল। বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের মাঝে এর কোনটাই নাই। তাদের মাঝে বেঁচে আছে ফেরকাপরস্তি, পীরপরস্তি, মজহাবপরস্তি, ইত্যাদি। নবীজী (সা:)’র ইসলাম নিয়ে বাঁচতে হলে জান ও মালের বিশাল খরচ পেশ করতে হয়। সাহাবাদের শতকরা ৬০ ভাগের বেশী তাই শহীদ হয়েছেন।

 ৩. কবিরা গুনাহ

মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও দুর্বৃত্তি নির্মূলের হুকুম দিয়েছেন। প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ হলো, সে হুকুমগুলো মেনে চলা। অথচ বাংলাদেশের মানুষ বাঁচছে সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে। উল্লেখ্য হলো, যারা তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী, তাদেরকে পবিত্র কোর’আনে কাফের ও ফাসেক বল হয়েছে। কাফের, ফাসেক ও জালেম বলা হয়েছে তাদেরও যারা শরিয়তের হুকুম মানে না। ইসলামের এগুলো অতি মৌলিক বিষয়।

অথচ বাংলাদেশে মুসলিমদের দ্বারা মহান আল্লাহতায়ালার সে হুকুম মানার কাজটি হয়নি। দুর্বৃত্তদের নির্মূল না করে জনগণ তাদের প্রতিপালনে রাজস্ব দেয় এবং বিপুল সংখ্যায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী প্রতিপালনের খরচ জোগায়। দেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কাজ হয়েছে রাস্তায় জনগণকে পেটানো এবং নির্বাচন কালে ভোটডাকাতি করে দুর্বৃত্তদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া। ২০১৩ সালে এদের দেখা গেছে শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যায়। এমন দুর্বৃত্তদের প্রতিপালন করা তো কবিরা গুনাহ।

৪. সবচেয়ে বড় বাঁচা মুনাফিকি থেকে বাঁচা

সবচেয়ে বড় বাঁচাটি হলো মুনাফিকি থেকে বাঁচা। নামায-রোযা করা সহজ। ঘুষখোর, সূদখোর এমনকি দুর্বৃত্ত বেঈমানেরাও নামায পড়ে এবং রোযা রাখে। নবীজী (সা:)’র যুগে অতি দুর্বৃত্ত মুনাফিকগণ নামায পড়তো। তারা নামায পড়তো এমন কি নবীজী (সা:)’র পিছনে জামাতের প্রথম সারীতে। নামায পড়লেও তারা ইসলামের পরাজয় চাইতো। নবীজী (সা:)কে হত্যা ও মুসলিমদের পরাজিত করার লক্ষ্যে তারা কাফের ও ইহুদীদের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করতো। এরা কাফেরদের চেয়ে্ও নিকৃষ্ট। এরাই ঘরের শত্রু। পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে, এদের স্থান হবে জাহান্নামে কাফেরদের চেয়েও নীচে তথা অধিকতর ভয়ানক স্থানে।

এমন মুনাফিকদের সংখ্যা কি বাংলাদেশে কম? বাংলাদেশে যারা ইসলামকে পরাজিত রেখেছে, তাদের সবাই কি মূর্তিপূজারী কাফের? তাদের অনেকেই নামায পড়ে, রোযা রাখে এবং যাকাত দেয়। অথচ এদের অনেকই ১৯৭১’য়ে দেখা গেছে ভারতীয় কাফেরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে। কাফেরদের এজেন্ডা ও তাদের এজেন্ডা সেদিন একাকার হয়েছিল। এমনটি কোন ঈমাদারের জীবনে এক মুহুর্তের জন্যও ঘটে? তেল ও পানি যেমন একত্রে মেশে না, তেমনি মুসলিমের এজেন্ডা ও কাফেরদের এজেন্ডা কখনোই একত্রে মেশে না। মুসলিম ভূমিতে যুদ্ধ শুরু হলে এভাবেই মুনাফিকদের চরিত্র ধরা পড়ে। তাই এ জীবনে সবচেয়ে কঠিন হলো মুনাফিকি থেকে বাঁচা। নবীজী (সা:)’র যুগে ১ হাজারের মাঝে ৩০০ জন মুনাফিক রূপে ধরা পড়েছিল। এটি এত বিশাল সংখ্যা; এবং সেটি নবীজী (সা:)’র উপস্থিতিতে। এখন সে সংখ্যাটি তা থেকে বহুগুণ বেশী।

জিহাদ মুনাফিকদের আলাদা করতে অব্যর্থ ফিল্টারের ন্যায় কাজ করে। ঈমান থাকলে জিহাদ থাকতেই হবে। যার মধ্যে জিহাদ নাই, বুঝতে তার মধ্যে ঈমানও নাই। বিষয়টিকে মহান আল্লাহতায়ালা সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে অতি সুস্পষ্ট ভাবে ব্যক্ত করেছেন। এ আয়াতে জিহাদকে তিনি ঈমানের অঙ্গ এবং ঈমান যাচা্ইয়ের শর্ত রূপে ঘোষণা দিয়েছেন। মুনাফিকি তাই দেখা যায়। শত্রুর নির্মূলে ও ইসলামের বিজয় সাধনে যার জীবনে জিহাদ নাই, সে ব্যক্তি যতই নামায-রোযা করুক -সে ব্যক্তি মুনাফিক।

৫. খাড়া হও আল্লাহর রাস্তায়

“(হে নবী, ঈমানদের) বলুন, “তোমাদের জন্যএকটি মাত্র ওয়াজ (নসিহত): খাড়া হও আল্লাহর জন্য জোড়ায়ূ জোড়ায় অথবা একাকীই; অতঃপর চিন্তাভাবনা কর।”-(সুরা সাবা, আয়াত ৪৬)। আল্লাহর জন্য খাড়া হওয়ার অর্থ ইসলামের বিজয়ে তাঁর সৈনিক রূপে খাড়া হওয়া। তাই মুসলিমকে শুধু নামাযে খাড়া হলে চলে না, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধের ময়দানে ইসলামের পক্ষে খাড়া হতে হয়।

তবে খাড়া হওয়ার জন্য শর্ত এ নয়, তাকে বিশাল কোন দলের সদস্য হতে হবে। যার যা সামর্থ্য আছে তা নিয়েই খাড়া হতে হবে। উপরুক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, সাথী না জুটলে, একাকীই খাড়া হতে হবে। যুদ্ধ নানা ভাবে হয়। অস্ত্রের হতে পারে, বুদ্ধিবৃত্তিকও হতে পারে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কোন একটি স্ট্রাটেজী অবশ্যই বেছে নিতে হবে। ইসলামে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকার কোন অবকাশ নাই। ঈমান নিয়ে বাঁচতে হলে জিহাদ নিয়েই বাঁচতে হবে। নিষ্ক্রীয় থাকার পথটি মুনাফিকির পথ।

নমরুদের সামনে খাড়া হয়েছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আ:) নিতান্তই একাকী। তাঁর সাথে কেউ ছিল না। ফিরাউনের সামনে খাড়া হয়েছিলেন হযরত মূসা (আ:) ও হযরত হারুন (আ:) –মাত্র এই দুই ভাই। এরাই তো মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ নক্ষত্র। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তাদের সে সাহসী ভূমিকা অত্যন্ত ভাল লেগেছিল এবং পবিত্র কোর’আনে তাদের সে সাহসিকতাকে তিনি চিরকালের জন্য অক্ষয় করে রেখেছেন। এবং দেখিয়েছেন, ঈমান কাকে বলে?

৬. বাংলাদেশীদের ব্যর্থতা

 গৃহে গলিত আবর্জনার স্তুপ দেখে শতভাগ সঠিক ভাবেই বলা যায়, সে গৃহে কোন সভ্য মানুষ বাস করে না। কোন সভ্য মানুষ কখনোই ঘরে আবর্জনা স্তুপ নিয়ে বসবাস করেনা। আবর্জনা সরানোই তাঁর সংস্কৃতি। তেমনি কোন দেশে ভোটডাকাতদের শাসন দেখেও নিশ্চিত বলা যায়, সে দেশে কোন সভ্য জনগণ বাস করেনা। সভ্য জনগণ বাস করলে সেদেশে ডাকাত তাড়ানোর যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। অথচ তেমন একটি যুদ্ধ বাংলাদেশে নাই। ফলে বাংলাদেশ কেমন দেশ -সেটি কি বিশ্বাবাসীর কাছে কোন গোপন বিষয়? আজ শত শত কোটি টাকা খরচ করে ৫০ বছরের পুর্তি উৎসব হচ্ছে। কিন্তু ভোটডাকাতদের শাসনের যে অসভ্যতা -তা কি তাতে দূর হবে? এটি ঘরে গলিত আবর্জনার স্তুপ রেখে মুখে কসমেটিক লাগানোর মত।

৭. সবচেয়ে বড় নেক কর্ম

কাউকে কিছু পানাহার বা অর্থ দিয়েই অনেকে ভাবেন -কতই না সে উপকার করলো। কিন্তু ঈমানদারের ভাবনাটি বিশাল। সে ভাবে শুধু তার দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেয়া নিয়ে নয়, বরং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো নিয়ে। সে কাজের ছওয়াব এতোই বেশী যে মহান আল্লাহতায়ালা তাকেও জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করেন। সে কল্যাণ কর্মের ভাবনা নিয়েই যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ এসেছিলেন। তাদের মিশনের লক্ষ্য অর্থনৈতিক বিপ্লব ছিল না, বরং সে্টি ছিল জান্নাতের যোগ্য রূপে মানবকে গড়ে তোলা। মাথা টানলে যেমন কান আসে, তেমনি জান্নাতের উপযোগী মানুষ সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রও তখন শান্তি ও সৃষ্টিশীল কর্মে ভরে উঠে।

রাষ্ট্র ইসলামী হলে সে বিশাল কাজটিই অতি সহজ হয়ে যায়। কারণ রাষ্ট্রই হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান; মানবের কল্যাণে ও অকল্যাণে রাষ্ট্রের ক্ষমতাটি বিশাল। ফলে এ রাষ্ট্রকে দুর্বৃত্ত শক্তির কবজায় রাখার বিপদটি ভয়াবহ। রাষ্ট্রকে তখন জাহান্নামে নেয়ার বাহনে পরিণত হয়। ইসলামে তাই সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি মসজিদ বা মাদ্রাসা গড়া নয়, সেটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ। এটিই মানব সভ্যতার সবচেয়ে ব্যয়বহুল কাজ। তখন দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালত, প্রশাসন, অর্থনীতি, পুলিশ ও সেনাবাহিনী যেমন মানুষকে শয়তানী শক্তির হাত থেকে রক্ষা দেয় তেমনি প্রস্তুত করে জান্নাতের উপযোগী করে। ২৭/০৩/২০২১