সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন

ফিরোজ মাহবুব কামাল

সভ্যতার সংঘাত ও সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং

ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি এতকাল ব্যবহৃত হয়েছে প্রকৌশল বিজ্ঞান বুঝাতে। গৃহউন্নয়ন,কলকারখানা¸ রাস্তাঘাট, ব্রিজ, অস্ত্র, যন্ত্র, যানবাহন, কম্পিউটার, স্পেসসায়েন্স ইত্যাদীর উন্নয়নের ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার অবদান অপরিসীম। যান্ত্রিক সভ্যতার বিস্ময়কর উন্নয়নের মূলে বস্তুত এই ইঞ্জিনিয়ারিং। এক্ষেত্রে অগ্রগতির ফলে বিগত একশত বছরে বিজ্ঞান যতটা সামনে এগিয়েছে তা মানব ইতিহাসের বিগত বহু হাজার বছরেও এগুয়নি। সবচেয়ে দ্রুত এগিয়েছে বিগত ৫০ বছরে। বলা যায়,পৃথিবীতে যত বিজ্ঞানী আজ  জীবিত আছে, ইতিহাসের সমগ্র বাঁকি সময়ে হয়তো তার সিকি ভাগও জন্ম নেয়নি। তবে যান্ত্রিক উন্নয়ন বিস্ময়কর গতিতে ঘটলেও চেতনা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও বাঁচবার রুচিবোধে মানুষ সামান্যই সামনে এগিয়েছে। অর্থাৎ মানবিক ও সামাজিক উন্নয়ন সে হারে হয়নি। বরং সামরিক আগ্রাসন, গণহত্যা, বর্ণগত নির্মূল, শোষণ, উলঙ্গতা,অশ্লিলতা, সন্ত্রাস, জাতিভেদ ও বর্ণভেদের ন্যায় বহু অসভ্যতা বেঁচে আছে তার আদিম কদর্যতা নিয়ে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের সীমা-সরহাদ নেই। আলো-বাতাসের ন্যায় এটিও উদার। ফলে যে দেশে ও যে নগরে বিজ্ঞানের আগমন ঘটে সেখানে একই রূপ সুফল বয়ে আনে। পৃথিবী জুড়ে যান্ত্রিক উন্নয়নে এভাবেই মিল সৃষ্টি হয়। ফলে সব দেশের মটরগাড়ি, রেলগাড়ি, উড়ো জাহাজ ও ডুবো জাহাজ একই ভাবে নির্মিত হয় এবং চিকিৎসা পদ্ধতি,গৃহনির্মাণ ও সড়ক নির্মাণ পদ্ধতিও একই ধারায় চলে। কিন্তু সে মিলটি মানুষের ধর্ম, দর্শন, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হয়নি। বরং চিন্তা-চেতনা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানচিত্রটি নানা জনে ও নানা জনপদে ভিন্ন ভিন্ন। পাশ্চাত্যের একজন বিজ্ঞানী যেরূপ মদ্যশালায় গিয়ে মদ পান করে বা হিন্দু বিজ্ঞানী যেরূপ শাপশকুন ও মুর্তিকে পুজা দেয়, কোন মুসলিম বিজ্ঞানী সেটি করেনা। ধর্ম, রুচিবোধ ও সংস্কৃতি নিয়ে তাদের ধারণাগুলিও ভিন্ন। আর সে ভিন্নতা থেকেই জন্ম নেয় পরস্পরে ঘৃনা এবং ঘৃনা থেকে শুরু হয় সংঘাত। সে ঘৃনা থেকেই মসজিদ, মসজিদের আযান বা মুসলিম রমনীর হিজাবের ন্যায় মুসলিম সংস্কৃতির বহু কিছুই পাশ্চাত্যের বহু দেশে অসহনীয় হয়ে পড়েছে। সে অসহনীয় চেতনার কারণেই পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে মসজিদের আযান মসজিদের বাইরে আসতে দেয়া হয়না এবং দণ্ডনীয় অপরাধ রূপে ঘোষিত হয় মুসলিম মহিলার হিজাব। ফ্রান্সের ন্যায় পাশ্চাত্য সভ্যতার কেন্দ্রভূমিতে তো সেটিই হয়েছে। একটি দেশের জনগণ কি ধরণের আইন-আদালতকে গ্রহন করবে -সেটি তাদের নিজস্ব ব্যাপার। এখানেই দেশটির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। নামায-রোযা,হজ-যাকাতের ন্যায় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রতিটি মুসলিম দায়বদ্ধ মহান আল্লাহর কাছে। এখানে কোন বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা চলে না। অথচ সে অধিকার মুসলিম নাগরিকদের দেয়া হচ্ছে না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে আফগানিস্তানের ন্যায় মুসলিম দেশ অধিকৃত হচ্ছে, মুসলিম ভূমিতে লাগাতর ড্রোন হামলাও হচ্ছে। হামলাটি কোন একটি দেশে সীমিত নয়, বরং হামলা হচ্ছে বহু দেশের বহু জনপদে। বলা যায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে নতুন কৌশল নিয়ে। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ৫ বছরের বেশী স্থায়ী হয়নি। কিন্তু মুসলিমদের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধটির বয়স ২০ বছরের বেশী হলেও শেষ হওয়ার নাম নিচ্ছে না। মার্কিন প্রফেসর হান্টিংটন এটিকে বলেছেন “ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন” তথা সভ্যতার লড়াই। তবে সে সংঘাতে প্রফেসর হান্টিংটন দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দি পক্ষকে সনাক্ত করেছেন, একটি পাশ্চাত্য সভ্যতা এবং অপরটি ইসলাম। পাশ্চাত্য চায়, এ সংঘাতে তাদের নিজেদের বিজয়। সভ্যতার সে লড়াইটি যে শুধু সামরিক -তা নয়। বরং লাগাতর লড়াইটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক ময়দানে। মুসলিম উম্মাহর ঈমান ও কোমর ভাঙ্গার এ যুদ্ধটি চলছে কোনরূপ গোলাবারুদের শব্দ ছাড়াই। এ যুদ্ধের হাতিয়ার হলো সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং, এবং লক্ষ্য কালচারাল কনভার্শন।

প্রত্যেকেই কোন না কোন ভাবে বেঁচে থাকে ও জীবন কাটায়; বেঁচে থাকার সে প্রক্রিয়াটি হলো তার সংস্কৃতি। সবাই একই ভাবে বাঁচে না,জীবনও কাটায় না। ফলে সবার সংস্কৃতিও এক নয়। সমাজ পাল্টাতে হলে সে সংস্কৃতিও পাল্টাতে হয়। এখানে পরিবর্তনটি শুরু হয় চেতনা থেকে।  ধর্ম,দর্শন ও নীতিবাক্য এখানে ইঞ্জিনের কাজ করে। সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে দর্শন ও ধর্মের ভূমিকা তাই চুড়ান্ত। প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষ যেরূপ জীবজন্তুর সাথে উলঙ্গ ভাবে বনে বাসে করে তার কারণ সেখানে কোন ধর্ম বা দর্শন কাজ করেনি। তাই ধর্ম ও দর্শন বই-পুস্তক,মসজিদ-মাদ্রাসা ও ক্লাসরুমে সীমিত থাকলে উচ্চতর সমাজ বা সভ্যতা নির্মিত হয় না। সেগুলির প্রকাশ ঘটাতে হয় মানুষের চেতনা-চরিত্র,মূল্যবোধ,পোষাক-পরিচ্ছদ,সামাজিকতা,রুচি,আচরণ ও কর্মের মধ্যে। তখন ঘটে সাংস্কৃতিক কনভার্শন এবং সেটিকে বেগমান করতেই প্রয়োজন পড়ে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তথা প্রকৌশলি পরিকল্পনার।

 

ইসলামি সভ্যতার নির্মাণ ও সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং

ইসলাম মানবিক উন্নয়ন চায়,সে উন্নয়নের মধ্য দিয়ে বিশ্বজনীন সভ্যতার নির্মাণ চায়। এটিই ইসলামের ভিশন। ফলে নামায-রোযা,হজ-যাকাতের বাইরেও ইসলাম নিজ সংস্কৃতির প্রসার ও প্রতিষ্ঠা চায়। সংস্কৃতির দুটি ধারা,একটি আল্লাহর আনুগত্যের,অপরটি বিদ্রোহের। সন্ত্রাসী,মদ্যপায়ী ব্যাভিচারি ও পতিতার সংস্কৃতিতে যেটি প্রকাশ পায় সেটি আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেতনা। অথচ মুসলিম সংস্কৃতির মূলে কাজ করে ইবাদতের স্পিরিট। ইবাদতের বিধানটি কাজ করে আল্লাহর অনুগত সুশৃঙ্খল মানুষ গড়ার হাতিয়ার রূপে। ফলে এ সংস্কৃতি আসে পবিত্রতা। ইসলামের লক্ষ্য তাই শুধু ধর্মান্তর নয়, সাংস্কৃতিক কনভার্শনও। যে কোন সভ্যতার নির্মানে অপরিহার্য হলো এই সাংস্কৃতিক কনভার্শন। সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়টি তাই শুধু পাশ্চাত্যে বিষয় নয়, ইসলামেরও। বরং পরিকল্পিত সমাজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রস্তুতি,ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো হলো ইসলামের। ইসলামের ইবাদত তাই শুধু ব্যক্তি-জীবনে সীমিত নয়, বরং ইবাদতকে সর্বব্যাপী করার লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে সামাজিক,রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অবকাঠামো। আল্লাহর খলিফা রূপে প্রতিটি মুসলমানের নিয়োগপ্রাপ্তি, মহল্লায় মহল্লায় মসজিদ নির্মাণ, ইসলামি রাষ্ট্র-নির্মাণ ও হজ-ওমরাহর বিধান তো সে অবকাঠামো। ব্রিজ, রাস্তাঘাট ও সামরিক স্থাপনার ন্যায় সাংস্কৃতিক অবকাঠামোও প্রতিরক্ষা চায়,সে সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই জিহাদ আল্লাহর নির্দেশিত পবিত্র ইন্সটিউশন।তাই যে সমাজে জিহাদ নেই সে সমাজে ইসলামি শরিয়ত যেমন বাঁচে না,তেমনি ইসলামি সংস্কৃতিও বাঁচে না।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাজে নেতৃত্বের দায়িত্ব যেমন আল্লাহর ঘর মসজিদের,তেমনি ইসলামি রাষ্ট্রের। নামায সংঘটিত করাই মসজিদের মূল কাজ নয়,লক্ষ্য এখানে নামাযীদের সাস্কৃতিক কনভার্শনও। তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলের কাজও শুধু রাস্তাঘাট গড়া বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়। বরং সেটি পরিপূর্ণ ইসলামি সভ্যতার নির্মাণ। আল্লাহর মিশন এখানে সরকারের মিশন হয়ে যায়। সে মিশনটি হলো কোরআনে বর্ণিত “লি ইউযহিরাহু আলা দ্বীনে কুল্লিহি” অর্থাৎ পৃথিবীর সকল ধর্ম ও মতাদর্শের উপর ইসলামের বিজয়ের। ইসলামে এজন্যই সার্বভৌম শাসকের কোন ধারণা নেই,বরং সে ধারণাটি খেলাফতের তথা মহান আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের। ব্যক্তি,মসজিদ ও রাষ্ট্র সবই এখানে মহান আল্লাহর মিশন নিয়ে একাকার হয়ে কাজ করে। গ্রামের দরিদ্র ঈমানদার ব্যক্তিটির মিশন আর রাষ্ট্রের শক্তিধর শাসকের মিশনে কোন পার্থক্য নাই। সবাই এখানে একই রণাঙ্গনে এক ও অভিন্ন মিশন নিয়ে জিহাদ লড়ে। সে রণাঙ্গনে সমগ্র উম্মাহ নেমে আসে।

মুসলমান হওয়ার অর্থ হলো সভ্যতা নির্মাণের সে দায়ভার কাঁধে নেয়া। সে মিশনে জড়িত হওয়াটিই মু’মিনের সংস্কৃতি। এমন এক সর্বাত্মক অংশগ্রহণের কারণেই উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণে সমগ্র মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী সফলতা দেখিয়েছে ইসলাম। মানবতার কথা,নারীপুরুষের সমতার কথা,শোষনমুক্তির কথা,ইনসাফের কথা,দাসমূক্তির কথা এবং ধনীদরিদ্রের পার্থক্য দূরীকরণের কথা –এ সব বড় বড় কথা অতীতে বহু ব্যক্তি, বহু ধর্ম ও বহু মতবাদ নানা ভাবে বলেছে। কিন্তু একমাত্র ইসলামই সেগুলি বাস্তবে পরিণত করেছে। ইসলাম দাসমূক্তিকে শ্রেষ্ঠ ধর্মকর্মে পরিণত হয়েছে। সমতার বিধান? রাষ্ট্রের খলিফা আটার বস্তা নিজের কাঁধে তুলে অন্নহীনের ঘরে পৌছে দিয়েছেন এবং চাকরকে উঠের পিঠে চড়িয়ে নিজে উঠের রশি ধরে টেনেছেন। ইসলামের এ বিস্ময়কর সফলতার কারণ,ইসলাম শুধু ধর্মে পরিবর্তন আনে না, সাংস্কৃতিক কনভার্শনও আনে। আমূল বিপ্লব আনে বাঁচার সংস্কৃতিতে। ইসলামি রাষ্ট্র ও সভ্যতার মূল শক্তি তো এখানেই। কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় যেসব দেশে ইসলামি রাষ্ট্র ও সভ্যতা নির্মিত হয়নি সেখানে দোষটি ইসলামের নয়। বরং এখানে প্রচণ্ড অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে সাংস্কৃতিক কনভার্শনে। ইসলামকে মানুষ নিছক নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বিধানকে কবুল করলেও তার সংস্কৃতিকে কবুল করেনি। বরং মানুষ বেড়ে উঠেছে জাহেলী যুগের দুর্বৃত্তি,সন্ত্রাস,ব্যভিচার ও মিথ্যাচার নিয়ে।দুর্বৃত্তিতে তার বিশ্বের দুই শতটির বেশী রাষ্ট্রকে ৫ বার হারিয়েও দিয়েছে। এটি কি কম বীভৎসতা! জাহিলী যুগের আরবগণ কি এর চেয়েও নীচে ছিল? বাংলাদেশের মুসলিমদের এখানেই বড় ব্যর্থতা। আর সে ব্যর্থতা থেকে আজ হাজারো ব্যর্থতা অসংখ্য ডালপালা নিয়ে গজিয়েছে।

ইসলাম-কবুলের অর্থ ব্যক্তির মনে কোর’আনী সত্যের বীজ-রোপন। আর সংস্কৃতি হলো সে বীজ থেকে পত্র-পল্লব, ফুল ও ফলে সুশোভিত বিশাল বৃক্ষ। বিশাল বৃক্ষের বেড়ে উঠাকে নিশ্চিত করতে যেমন লাগাতর পরিচর্যা চাই, তেমনি সাংস্কৃতিক কনভার্শনের জন্যও চাই লাগাতর সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। মুসলিম রাষ্ট্র ও মসজিদ-মাদ্রাসার বড় দায়িত্ব হলো সে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংকে নিশ্চিত করা। পাশ্চাত্য দেশবাসী একটি নির্দিষ্ট মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি নিয়ে বাঁচে। সে মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে বহু লক্ষ মদ্যশালা, নৃত্যশালা, ক্লাব,ক্যাসিনো, পতিতাপল্লি সেখানে বছরের প্রতিদিন কাজ করছে। সেগুলির পাশে কাজ হাজার হাজার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, অসংখ্য পত্র-পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল। সে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকেই তারা বিশ্বময় করতে  চায়। কারণ তাদের বাঁচাটি এখন আর শুধু নিজ দেশে সীমিত নয়। তাদের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমরনীতির কোন সীমান-সরহাদ নাই। সেটি বিশ্বব্যাপী। সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে অন্যদেশে তাদের বছরের পর বছর কাটাতে হয়। আফগানিস্তান ও ইরাকে লক্ষাধিক মার্কিনী ও ইউরোপীয়রা অবস্থান নিয়ে আছে দশ বছরেরও বেশী কাল ধরে। মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না, মানুষ তো তেমন নিজ সংস্কৃতি ছাড়া বাঁচে না। তারা যেখানে যায় সেখানে শুধু পানাহার চায় না, মদ, জুয়া, ব্যাভিচার, সমকামিতার ন্যায় আরো বহু কিছু চায়। তাই মুসলিম দেশে তাদের বাঁচাটি দুরুহ হয়ে পড়েছে। ফলে নিজ সংস্কৃতির প্রসারে তারা সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং নেমেছে। মুসলিমদের ধর্মান্তর না ঘটাতে পারলেও তারা চায় তাদের কালচারাল কনভার্শন। সে কাজে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করছে জাতিসংঘকে। জাতিসংঘ ব্যক্তি-স্বাধীনতা, নারী-স্বাধীনতা, পেশার স্বাধীনতার নামে একটি বিধিমালা তৈরী করেছে। সে বিধামালা অনুসারে সমকামিতার ন্যায় ভয়ানক পাপকর্ম যেমন অন্যায় ও অবৈধ নয়, তেমনি অবৈধ নয় ব্যভিচারও। পতিতাদেরকে বলছে সেক্স ওয়ার্কার। মদ্যপান, জুয়াও তাদের কাছে কোন অপরাধ-কর্ম নয়। মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির এই যে পাশ্চাত্যের সংজ্ঞা, সেটিকে তারা অন্যদেশের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। না মানলে সে অবাধ্য রাষ্ট্রটির উপর অপরোধ আরোপ করছে, কোথাও কোথাও ড্রোন হামলাও হচ্ছে। সে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অংশ রূপে বাংলাদেশের মহিলাদের যেমন রাস্তায় মাটি কাটা বা গাছ পাহারায় নিয়োজিত করছে,তেমনি আফগানিস্তানের পর্দানশিন মহিলাদের বেপর্দা করে তাদের নাচ-গান শেখাচ্ছে ও হাতে হারমনিয়াম তুলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে ইসলামের অগ্রগতি শুরুতে শুধু ধর্মান্তরে সীমিত রয়ে গেছে। সাংস্কৃতিক কনভার্শনের কাজ সফল ভাবে হয়নি। ফলে ইসলামের সভ্যতার নির্মাণে অংশ নেয়াটি জনগণের জীবন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়নি। বরং অপরিচিত রয়ে গেছে নবীজী(সাঃ)র ইসলাম। নবীজী (সাঃ)র ইসলাম তাদের অনেকের কাছে জঙ্গি ইসলাম মনে হয়। ফলে আরব, ইরান, তুরস্ক ও আফগানিস্তানের জনগণের ইসলাম কবুলের সাথে সাথে সেসব দেশে ইসলাম যেভাবে বিশ্বশক্তি ও সভ্যতা রূপে আবির্ভুত হয়েছিল সেটি বাংলাদেশে হয়নি। এদেশে অন্যদের ইসলাম-কবুল যেমন থেমে গেছে, তেমনি থেমে গেছে ইসলামের সাংস্কৃতিক কনভার্শনও। থেমে গেছে মুসলিমদের পুর্ণ মুসলিম হওয়া। বরং স্রোত উল্টো দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। মুসলিম দীক্ষা নিচ্ছে অনৈসলামিক ধ্যান-ধারণা ও সংস্কৃতিতে। সোসাল ইঞ্জিনীয়ারীং হচ্ছে ইসলাম থেকে লোকদের দূরে সরানোর কাছে। ফলে দেশে মুর্তি নির্মিত হচ্ছে, মুর্তির সামনে শ্রদ্ধানিবেদন হচ্ছে, মঙ্গলপ্রদীপ ও জীবযন্তুর মুর্তি নিয়ে মিছিল হচ্ছে, মুসলিম মহিলারা সিঁধুর লাগাচ্ছে এবং সে সাথে প্রবলতর হচ্ছে অশ্লিলতা এবং বাড়ছে ব্যভিচার ও ধর্ষণ। হিন্দু সংস্কৃতি থেকে মুসলিমদের যে ভিন্নতা ছিল সেটি দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে।

 

নতুন স্ট্রাটেজী

মুসলিমদের খৃষ্টান, ইহুদী বা হিন্দু বানানো এখন আর অমুসিমদের ইস্যু নয়, ইস্যু হলো সাংস্কৃতিক কনভার্শন। তারা এখন স্ট্রাটেজী নিয়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরাতে। মুসলিম দেশগুলিতে আজকের প্রচারকগণ গীর্জার পাদ্রী নন,সবাই খৃষ্টানও নন। এসব প্রচারকদের অনেকে যেমন স্বদেশী,তেমনি মুসলমান-নামধারীও। ধর্মের প্রচারকও না হলেও তারা একটি মতের প্রচারক। সে মতবাদটি সেক্যুলারিজম। তারা আল্লাহ-রাসূল বা মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাসে সরাসরি হামলা করে না। তাদের লড়াইটি সংস্কৃতির ময়দানে। সংস্কৃতি শুধু গান-বাজনা,পোষাক-পরিচ্ছদ বা সাহিত্য নয়,বরং মানুষ যে ভাবে বাঁচে এবং যে রুচি ও মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠে সেটি। জীবন-ধারণের সে প্রক্রিয়ায় তথা সংস্কৃতিতে এতকাল যা প্রভাব রেখেছে তা হলো ধর্ম। তাই ধর্ম পাল্টে গেলে সংস্কৃতিও পাল্টে যায়। আরবের মানুষ যখন ইসলাম কবুল করে তখন তাদের গায়ের রং,দেহের গড়ন বা ভাষা পাল্টে যায়নি। পাল্টে যায় তাদের সংস্কৃতি। ইসলামের পূর্বে মদ্যপান, উলঙ্গ নাচগান ও ব্যাভিচার না হলে তাদের উৎসব হতো না। সে সংস্কৃতিতে পথিককে লুন্ঠন করা,কণ্যাসন্তানকে দাফন করা,মানুষকে ক্রীতদাস বানানো এবং পশুর ন্যায় মানুষকে হাটে তোলা গর্হিত কর্ম গণ্য হত না। বরং এসব ছিল আবহমান আরব সংস্কৃতি।

ঈমান ব্যক্তির অন্তরের বিষয়,সেটি চোখে দেখা যায় না। তবে ঈমান ধরা পড়ে তার বাইরের রূপে। ধরা পড়ে তার কর্ম ও সংস্কৃতিতে। জ্ঞানবান হওয়ার মধ্য দিয়ে যেমন সেটির শুরু,তেমনি লাগাতর ইবাদতের মধ্য দিয়ে সে সংস্কৃতির পরিশুদ্ধি। তাই যার জীবনে ঈমান ও ইবাদত নাই,তার জীবনে উচ্চতর সংস্কৃতিও নাই্।সমাজ ও সংস্কৃতিতে এভাবেই ইসলাম আনে পরিশুদ্ধি। ইসলামের এটাই হলো সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। পরিকল্পিত ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া কোন সুন্দর গৃহ বা শহর গড়ে উঠে না। আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বদৌলতেই দুর্গন্ধময় বস্তি থেকে সুশ্রী নগর নির্মিত হয়। তেমনি সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া সুন্দর ও সভ্যতর সমাজ গড়ে উঠে না। ইসলামে কালচারাল কনভার্শন এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ধর্মান্তরের মধ্যে ইসলামের প্রচার সীমিত থাকলে তাতে ইসলামী সমাজ,রাষ্ট্র ও সভ্যতার নির্মাণ ঘটে না। ইসলামের প্রচার বহুদেশে হয়েছে, কোটি কোটি মানুষ ইসলাম কবুলও করেছে। কিন্তু সবদেশে সবার সাংস্কৃতিক কনভার্শনটি ঠিক মত হয়নি। ইসলাম কবুলের পরও যদি বেপর্দা ভাবে চলে,যদি মাথা নুইয়ে সালাম করে বা ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য ব্যক্তিকে ভোট দেয়,তবে বুঝতে হবে ইসলাম কবুল করলেও তার সাংস্কৃতিক কনভার্শনটি হয়নি। সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে সে ব্যক্তি হিন্দু বা অমুসলিমই রয়ে গেছে। বাংলাদেশসহ বহু মুসলিম দেশে সে সমস্যাটি প্রকট। বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার হয়েছে প্রধানতঃ সুফিদের দ্বারা। নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম যে ইসলাম পেশ করেছিলেন এসব সুফিগণ সে ইসলাম দেখেননি। সে ইসলামের জ্ঞানলাভ যেমন ঘটেনি, তেমনি সে ইসলামের পূর্ণ প্রকাশও তাদের জীবন ঘটেনি। তারা বেড়ে উঠেছেন পীরের খানকায়, কোন ইসলামি রাষ্ট্রে নয়। ফলে অপূর্ণাঙ্গতা রয়ে গেছে তাদের বেড়ে উঠায়। তাদের জীবনে ইসলামের জিহাদ এবং রাজনীতি যেমন ছিল না,তেমনি ইসলামের সংস্কৃতিও পুরাপুরি ছিল না। ফলে তাদের হাতে যেসব হিন্দু ইসলাম কবুল করেন তারা ইসলামের সংস্কৃতির পূর্ণ পরিচয় পায়নি।অথচ ইসলাম কবুলের অর্থ পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ। কোরআনে নির্দেশ এসেছে,“উদখুলু ফি সিলমে কা’ফ্ফা” অর্থঃ “তোমরা ইসলামে পুরিপুরি প্রবেশ করো”। অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগী,অর্থনীতি,সংস্কৃতি,রাজনীতির কোন অংশকেই ইসলামের বাইরে রাখা যাবে না।

 

পাশ্চাত্য বেঁচে আছে সেক্যুলার সংস্কৃতি নিয়ে

পাশ্চাত্য সভ্যতা আজ  খৃষ্টান ধর্ম বা অন্য কোন ধর্ম নিয়ে বেঁচে নাই,বেঁচে আছে একটি সংস্কৃতি নিয়ে। খৃষ্টান ধর্ম পাশ্চাত্য দেশগুলিতে প্রভাব হারিয়েছে অনেক আগেই। এখানে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে নানা উপাদান নিয়ে। তাতে যেমন প্রাগ-খৃষ্টান যুগের ইউরোপীয় প্যাগানিজম রয়েছে,তেমনি গ্রীক ও রোমান সভ্যতার সংস্কৃতি আছে, তেমনি খৃষ্টানধর্মের কিছু প্রভাবও আছে। তবে এখানে মূল সুরটি সেক্যুলারিজমের তথা ইহজাগতিক সুখসম্ভোগের। ইংরাজীতে যাকে বলা হয় হেডোনিজম। সে সুখ সম্ভোগের তাগিদে পাশ্চাত্য শুধু মদ্যপান,অশ্লিলতা ও উলঙ্গতাকে হালাল করে নেয়নি জায়েজ করে নিয়েছে সমকামিতার ন্যায় আদিম অসভ্যতাকেও। হিন্দু ধর্মের কোন শরিয়ত বা আইনী বিধান নেয়,ফলে এ ধর্মটিও বেঁচে আছে আবহমান এক সনাতন সংস্কৃতি নিয়ে। সাংস্কৃতিক সে আচার এবং ধর্মীয় আচার এখানে একাকার হয়ে গেছে,উভয়ে মিলে হিন্দু সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। তেমনি খৃষ্টান ধর্মেও হালাল-হারামের কোন বিধান নেই। এটিও পরিনত হয়েছে এক সাংস্কৃতিক শক্তিতে। পাশ্চাত্য চায় সে সংস্কৃতির পৃথিবীব্যাপী প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে তারা দেশে দেশে সাংস্কৃতিক কনভার্শনে মনযোগ দিয়েছে। এবং চালাচ্ছে সোসাল ইঞ্জিনীয়ারীং। পাশ্চাত্যের অর্থে প্রতিপালীত হাজার হাজার এনজিও কাজ করছে বস্তুত সে লক্ষ্যে।

শুরুতে মুসলিম দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক খৃষ্টানদের লক্ষ্য শুধু লুণ্ঠন ছিল না। রাজনৈতিক প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার সাথে খৃষ্টান ধর্মের প্রচারও ছিল। তখন হাজার হাজার খৃষ্টান-পাদ্রী ধর্মের প্রচার নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরেছে।তাদের সে প্রচেষ্ঠা ফিলিপাইন,পাপুয়া নিউগিনি,ফিজি,পূর্ব-তিমুর,নাগাল্যান্ড,মিজোরামের অমুসলিমদের মাঝে সফলতা মিললেও বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে ১৯০ বছরের শাসনেও সে সফলতা মিলেনি।মুসলমানদের তারা ইসলাম থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ধর্মচ্যুৎ করতে পারেনি।তাদের হাতে বহু মুসলিম দেশ অধিকৃত হয়েছে,অজ্ঞতা ও অশিক্ষাও বেড়েছে,কিন্তু তাদের অবস্থা এতটা পচেনি যে খৃষ্টান ধর্ম,বৌদ্ধ ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের ন্যায় অন্য কোন ধর্ম তারা কবুল করবে। কয়লা থেকে স্বর্ণ, মলমুত্র থেকে মধুকে পৃথক করতে বিদ্যাবুদ্ধি লাগে না।অজ্ঞতা,ভ্রষ্টতা ও মিথ্যাচারপূর্ণ ধর্মগুলি থেকে ইসলামের শ্রেষ্ঠতা বুঝতেও বেশী বুদ্ধি লাগেনি। গ্রামের মুর্খ মুসলমানেরাও সেটি বুঝে। ফলে হিন্দু ধর্মের গরু-ছাগল,শাপ-শকুন,পাহাড়-পর্বত ও পুলিঙ্গ পুজনীয় হওয়ার ন্যায় প্রকাণ্ড মিথ্যাটি যেমন তাদের কাছে মিথ্যা রূপে ধরা পড়েছে তেমনি ধরা পড়েছে খৃষ্টান ধর্মের হযরত ঈসার ঈশ্বর হওয়া এবং সে ঈশ্বরের শুলে চড়ে মারা যাওয়ার মিথ্যাটিও। ধর্মের নামে এরূপ মিথ্যাচার তাই তারা মেনে নেয়নি।

 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সমস্যা

বাংলাদেশের মূল সমস্যাটি নিছক অর্থনৈতিক নয়,বরং সেটি সাংস্কৃতিক। সে সাংস্কৃতিক সমস্যার কারণেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে সুস্থ্য ও সভ্যমানুষ রূপে বেড়ে উঠায়। সে অসুস্থতা ধরা পড়ছে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক দূর্নীতিতে। ধরা পড়ছে দ্রুত বর্ধিষ্ণু অশ্লিতা ও পাপাচারে। ইসলাম শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস বাড়ায়না। মানুষকে শুধু মসজিদমুখিই করেনা। বরং মানবতা,শ্লিলতা,পবিত্রতা যোগ করে তাদের বাঁচাতে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি। এখানেই বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা।

সংস্কৃতির নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হলো জ্ঞান। এই জ্ঞানের কারণেই মুর্খ বাউল,শ্মশানবাসী কাপালিক,জটাধর সাধু এবং জ্ঞানবান ঈমানদারের সংস্কৃতি এক হয় না। ইসলামে জ্ঞানার্জন এজন্যই ফরয। এবং অজ্ঞ থাকাই সবচেয়ে বড় পাপ। জ্ঞানার্জন ছাড়া ব্যক্তির জীবনে সত্যপথ প্রাপ্তি যেমন অসম্ভব,তেমনি সংস্কৃতির নির্মাণ ও অসম্ভব। তবে সে জ্ঞানার্জনে বিশ্ববিদ্যালয় সহায়ক হলেও,ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে অধিক সংখ্যক বিজ্ঞ ব্যক্তি তৈরী হয়েছেন সে সময়ে যখন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল না। অপরদিকে বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতিহাস গড়েছে বিভ্রান্ত,পথভ্রষ্ট ও দুর্বৃত্ত সৃষ্টিতে। বাংলাদেশকে যারা ৫ বার পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে পরিণত করলো তারা গ্রামের মূর্খ রাখাল নয়,বরং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারি ব্যক্তিবর্গ।তারা দেশের কদর্যতা বাড়িয়েছে দেশবাসীকে পথভ্রষ্ট করার মধ্য দিয়ে।

একমাত্র কোরআনী জ্ঞান থেকেই ব্যক্তি পায় পায় শ্লিল ও অশ্লিল,পবিত্রতা ও অপবিত্রতা চেনার সামর্থ। পায় সিরাতুল মোস্তাকীম। অন্যথায় জীবন মিথ্যাচারে পূর্ণ হয়ে উঠে। কোরআনকে এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালা হুদা বা ফোরকান রূপে চিত্রিত করেছেন। হুদা’র অর্থ পথ প্রদর্শক আর ফোরকান হলো সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সৃষ্টিকারি। মুসলিমের সংস্কৃতি এজন্যই খৃষ্টান, হিন্দু, শিখ বা প্রকৃতি পুজারির সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন। তবে কতটা ভিন্ন তার উদাহরণ দেয়া যাক। ইসলামে পবিত্র-অপবিত্রতার যে সুস্পষ্ট বিধান তাতে মলমূত্রের ন্যায় গরুর গোবরও অপবিত্র। তাই কাপড়ে গোবর লাগলে তার পবিত্রতা থাকে না। কিন্তু হিন্দুধর্মে সেটি ভিন্ন। গরুর গোবর লাগানোটাই এ ধর্মে পবিত্রতা। অপবিত্র আসে বরং হিন্দুর ঘরে কোন মুসলিম আসন নিলে। গোবর দিয়ে লেপে তখন তাতে পবিত্রতা আনা হয়। গান-বাজনা ও নৃত্য ছাড়া হিন্দুদের পুজা হয় না। অথচ ইসলামে সেটিও ভ্রষ্টতা। সিরাতুল মোস্তাকিমে চলায় গান-বাজনা ও নৃত্য যেমন অমনোযোগী করে,তেমনি ভ্রষ্টতাও বাড়ায়।

 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অধিকৃতি

বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের আজকের বড় সমস্যা এ নয় যে,দেশগুলি শত্রুর হাতে সামরিক ভাবে অধিকৃত হয়েছে। বরং বড় সমস্যা এবং সে সাথে ভয়ানক বিপদের কারণ,দেশগুলির সাংস্কৃতিক সীমান্ত বিলুপ্ত হয়েছে এবং তা অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের দ্বারা। দেশের রাজনৈতিক সীমান্ত বিলুপ্ত না হলেও মুসলিম দেশগুলির সংস্কৃতির মানচিত্র শত্রুপক্ষের দখলে গেছে। ফলে এদেশগুলিতেও সেগুলিই অহরহ হচ্ছে যা কাফের কবলিত একটি দেশে হয়ে থাকে। মুসলিম দেশের সংস্কৃতিও পরিনত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর অবাধ্য রূপে গড়া তোলার ইন্সটিটিউশনে। পতিতাপল্লি, নাচের আসর, সিনেমা হল,মদ্যশালাই তাদের একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়,বরং গড়া হচ্ছে এবং নতুন ভাবে আবিস্কার করা হচ্ছে আরো বহু সাংস্কৃতিক আচারকে। মুর্তিপুজাকে বাঁচিয়ে রাখতে যেমন হাজারো মন্দির,তেমনি পাচাচার ও ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বাঁচিয়ে রাখতেও গড়া হয়েছে নানা আচার। এসব হলো শয়তানের সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং। লক্ষ্য, শয়তানের আচারে কালচারাল কনভার্শন। এলক্ষ্যেই পহেলা বৈশাখ,ভালবাসা দিবস, থার্টি ফাষ্ট নাইট ইত্যাদি নানা দিবসকে বাঙালীর মুসলিমদের জীবনে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম সন্তান মসজিদে না গিয়ে হিন্দুদের ন্যায় গেরুয়া পোষাক পড়ছে, মঙ্গলপ্রদীপ হাতে নিয়ে শোভাযাত্রা করছে, কপালে তীলক পড়ছে, অশ্লিল নাচগানও করছে। এসব হলো মানুষকে পথভ্রষ্ট ও পাপাচারি বানানোর কৌশল। এরাই বাংলাদেশের ন্যায় প্রতি দেশে শয়তানের পক্ষে লড়াকু সৈনিক,এবং তাদের  যুদ্ধাংদেহী রূপ শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে।

অনৈসলামিক দেশে বসবাসের বড় বিপদটি খাদ্যাভাব নয়,রোগভোগ বা স্বাস্থ্যহানীও নয়। বরং সেটি সিরাতুল মোস্তাকিম সহজে খুঁজে না পাওয়ার। কারণ রাষ্ট্র,সমাজ ও পরিবার জুড়ে তখন যা প্রবলতর হয় তা সত্যচ্যুতির তথা পথভ্রষ্টতার। ইসলামী রাষ্ট্রের মূল দায়িত্বটি আল্লাহর রাস্তায় চলার সিরাতুল মোস্তাকীমটি জনসম্মুখে তুলে ধরা। কাফের রাষ্টনায়কগণ করে তার উল্টোটি। জনগণের দৃষ্টি থেকে তারা সমাজে সিরাতুল মুস্তাকীমকে লুকায়।কুফর শব্দের আভিধানিক অর্থও লুকানো। তারা বরং পথভ্রষ্টতার পথ গড়ে, এবং সে পথগুলি জাহান্নামের দিকে টানে।বিভ্রান্তির সে ভিড়ে হারিয়ে যায় সিরাতুল মোস্তাকীম। সে সমাজে দর্শন,বিজ্ঞান,ধর্ম,সাহিত্য ও সংস্কৃতির নামে জাহান্নামের ব্যবসায়ীগণ মোড়ে মোড়ে দোকান সাজিয়ে বসে,এবং অন্যদেরও সে পথে ডাকে। বাংলাদেশে শত শত পতিতাপল্লি,শত শত সূদিব্যাংক, হাজার হাজার এনজিও,বহু হাজার সাংস্কৃতিক সংস্থা,হাজার হাজার সিনেমা হল,মদের দোকান তো সে কাজটাই করছে। এমন একটি সমাজে প্রতি পদে পা ফেলতে হয় অতি সতর্কতার সাথে। নইলে পা জাহান্নামের গর্তে গিয়ে পড়ে।

মদ-জুয়া,নাচের আসর,পতিতাপল্লি,সূদীব্যাংক,সেক্যুলার শিক্ষা ও রাষ্ট্র ছাড়া যেমন প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতি বাঁচে না,তেমনি নবীজী(সাঃ)র শিক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র,সমাজ,মসজিদ-মাদ্রাসা ও আইন-আদালত কাজ না করলে ইসলামি সংস্কৃতিও বাঁচেনা। অথচ বাংলাদেশে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলি অধিকৃত হয়েছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে। যারা এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তারা নামে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ইসলামের বিজয় নিয়ে তাদের কোন অঙ্গিকার নাই। ভাবনাও নাই। বরং তেমন একটি আগ্রহ থাকাটাই তাদের কাছে ফৌজদারি অপরাধ। এমন আগ্রহী ব্যক্তিকে তারা চিহ্নিত করে মৌলবাদী সন্ত্রাসী রূপে। তাদের নির্মূলে বরং তারা চিহ্নিত কাফেরদের সাথে কোয়ালিশন গড়ে।

 

অনৈসলামিক রাষ্ট্রের বিপদ ও ঈমানী দায়ভার

ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় নেয়ামতটি হলো,সেখানে স্পষ্টতর হয় সিরাতুল মোস্তাকীম। এবং বন্ধ করা হয় জাহান্নামের পথ। এমন রাষ্ট্রের বরকতে কোটি কোটি মানুষ বাঁচে জাহান্নামের আগুণ থেকে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ এজন্যই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নেককর্ম। একাজে সামান্য সময় ব্যয়ও সারারাত তাহাজ্জুদ নামায পড়ার চেয়েও শ্রেষ্ঠ। -(হাদীস)। মহান আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা “আনসারুল্লাহ”র তথা আল্লাহর সাহায্যকারির। একাজে তার শত্রুর হাতে তার মৃত্যু হলে সে পাবে শহীদের মর্যাদা। পাবে বিনা বিচারে জান্নাত। মু’মিনের এ মেহনত ও কোরবানীর বরকতেই বিজয়ী হয় আল্লাহর দ্বীন এবং গড়ে উঠে শ্রেষ্ঠতর সভ্যতা। একারণেই শয়তানী শক্তির সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করা। সে শয়তানী প্রজেক্ট নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমেছে বহু রাজনৈতিক দল,বিদেশীদের অর্থে কাজ করছে বহু হাজার এনজিও। দেশটির জন্মকালে ইসলামের প্রতিষ্ঠা যেমন লক্ষ্য ছিল না। তেমনি আজও  নয়। ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারকে রাষ্ট্রীয় ভাবে নিন্দিত হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা রূপে। সাংস্কৃতিক কনভার্শনের কাজে বিনিয়োগ হয়েছে ভারতসহ বহু কাফের দেশের শত শত কোটি টাকা। সে বিনিয়োগ ফলও দিয়েছে। সে বিনিয়োগের কারণে,পাকিস্তানের ২৩ বছরে যত দুর্বৃত্ত এবং ইসলামের যত শত্রু তৈরী হয়েছিল বাংলাদেশে গত ৪০ বছরে হয়েছে তার চেয়ে শতগুণ বেশী। ফলে কঠিন হয়ে পড়েছে আল্লাহর শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া। দেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে পর পর ৫বার প্রথম হওয়ার মূল কারণ তো শয়তানী শক্তির এ বিশাল বিনিয়োগ। শয়তানী শক্তির সে বিনিয়োগ আজ যে শুধু অব্যাহত রয়েছে তা নয়,বরং বহুগুণ বৃদ্ধিও পেয়েছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের ভয়ানক বিপদ বস্তুত এখানেই।

ইসলামি চরিত্রের নির্মাণ যেমন জঙ্গলে সম্ভব নয়, তেমনি পীরের খানকায়, মসজিদে বা নিজগৃহে নিছক কোরআন-হাদীস পাঠের মধ্য দিয়েও সম্ভব নয়। মুসলমানের ঈমান-আক্বীদা কখনই অনৈসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠে না। সে জন্য ইসলামি রাষ্ট্র ও জিহাদী সংস্কৃতি চাই। সাহাবায়ে কেরাম,তাবে ও তাবে-তাবেয়ীগণ মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষ রূপে গড়ে উঠেছিলেন তো ইসলামি রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রে জিহাদী সংস্কৃতির কারণেই। মুসলমানদের অর্থ,রক্ত,সময় ও সামর্থের সবচেয়ে বেশী ভাগ ব্যয় হয়েছে তো ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির নির্মানে। নামায রোযার পালন তো কাফের দেশেও সম্ভব। কিন্তু ইসলামী শরিয়ত ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও পরিচর্যাও কি অমুসলিম দেশে সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই মুসলমানদের জীবনে হিযরত আসে। সে সাথে জিহাদও আসে। অতীতের ন্যায় আজকের মুসলমানদের উপরও একই দায়ভার। মহান আল্লাহর খলিফা রূপে এটাই একজন ঈমানদারের উপর সবচেয়ে বড় দায়ভার। এ লড়ায়ে সবাইকে ময়দানে নেমে আসতে হয়। এবং লড়াইয়ের শুরুটি কোরআনী জ্ঞানের তরবারী দিয়ে। জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামায-রোযার আগে ফরয করা হয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে সে ফরয পালনের আয়োজন কোথায়? অনেকেই জ্ঞানার্জন করছে নিছক রুটিরুজির তালাশে, ফরয আদায় এখানে লক্ষ্য নয়। বিচ্যুতিটি এখানে জ্ঞানার্জনের নিয়তে। ফলে লোভি,শঠ,ধুর্ত ও মিথ্যাচারি ব্যক্তি এ শিক্ষার বদলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘুষখোর,ডাকাত বা সন্ত্রাসীতে পরিনত হচ্ছে। এমন জ্ঞানচর্চায় রুটি-রুজী জুটছে ঠিকই, কিন্তু জ্ঞানার্জনের ফরয আদায় হচ্ছে না। ফলে দেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বাড়লেও জিহাদের ময়দানে লোকবল বাড়ছে না। ফলে বিপ্লব আসছে না সমাজ ও রাষ্ট্রে। বাংলাদেশের মুসলিমদের জন্য এটি এক বিপদজনক দিক। আগ্রাসী শত্রুর হামলার মুখে অরক্ষিত শুধু দেশটির রাজনৈতিক সীমান্তুই নয়,বরং প্রচন্ড ভাবে অরক্ষিত দেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক সীমান্তও। ফলে ইসলামের মুল শিক্ষা ও সংস্কৃতিই দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে অপরিচিত থেকে যাচ্ছে। অজ্ঞতার বসে শত্রুর সংস্কৃতিকেই শুধু আপন করে নিচ্ছে না, আপন করে নিচ্ছে তাদের ইসলামবিনাশী রাজনৈতিক এজেণ্ডাও।এবং মুসলিম হত্যায় হাতে তুলে নিচ্ছে শত্রুর হাতিয়ার। দেশ তাই দ্রুত অধিকৃত হচ্ছে শত্রুদের হাতে। সেটি যেমন সামরিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে, তেমনি সাংস্কৃতিক ভাবেও। শত্রুর সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন এভাবেই বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম দেশে তাদের বিজয়কে সহজসাধ্য ও কম ব্যয়বহুল করে তুলেছে। সে সাথে ভয়ানক ভাবে বাড়িয়ে তুলেছে দেশবাসীর আখেরাতের বিপদও। তাই আজকের লড়াইটি নিছক রাজনৈতিক নয়। স্রেফ অর্থনৈতিকও নয়।  সেটি যেমন শত্রুর হাত থেকে দখলদারি মুক্তির, তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি নির্মাণের। ২৮/০৪/২০১২

 




রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক চেতনা এবং বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত

ফিরোজ মাহবুব কামাল

সংক্রামক রবীন্দ্র-চেতনা

মানুষ শুধু তার দেহ নিয়ে বাঁচে না। বাঁচে তার চেতনা নিয়েও। সে চেতনাটি নিয়ে এ জীবন ও জগতের সর্বত্র তার বিচরণ। সেটি যেমন ধর্ম-কর্ম, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও পোষাক-পরিচ্ছদে, তেমনি তার গদ্য, পদ্য, কথা ও গানে। কোন ব্যক্তিকে তার রুহ থেকে যেমন আলাদা করা যায় না,তেমনি আলাদা করা যায় না তার চেতনা থেকেও। মানুষ বেড়ে উঠে এবং তার মূল্যায়ন হয় সে চেতনার গুণে। ইসলামের পরিভাষায় সেটিই হলো তার ঈমান ও আক্বীদা। নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের আগে রোজ হাশরে আল্লাহর কাছে প্রথমে হিসাব হবে ঈমান ও আক্বীদার। এখানে অকৃতকার্য হলে পাশের আর কোন সম্ভবনাই নাই। শত বছরের ইবাদত দিয়েও সেটি পূরণ হওয়ার নয়। মানুষের ধর্ম, কর্ম, সংস্কৃতি ও আচরনে বিপ্লব আসে তো ঈমান ও আক্বীদের গুণে। এখানে ভেজাল থাকলে ব্যক্তির ইবাদতে বা চরিত্রেও পরিশুদ্ধি আসে না। শিরক তো সে মহাবিপদই ঘটায়। রবীন্দ্রনাথের একটি বিশ্বাস ও চেতনা ছিল। এবং সেটি পৌত্তলিকতার।সে চেতনাটি প্রবল ভাবে ছড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে। তাঁর রচিত নাটক,ছোটগল্প ও গানে। আলোচ্য নিবন্ধে তাঁর “আমার সোনার বাংলা গান” থেকেই তার কিছু উদাহরণ দেয়া হবে।

যক্ষা,কলেরা ও এ্যাইডসের ন্যায় শারীরীক রোগই শুধু সংক্রামক নয়, বরং অতি সংক্রামক হলো চেতনার রোগ। বাংলাদেশের ভয়ানক বিপদটি মূলতঃ এখানেই। বাংলাদেশ ৫ বার বিশ্বের সবচেয়ে দূর্বৃত্ত কবলিত দেশের যে শিরোপা পেল বা সম্প্রতি বিশ্ববাংক থেকে দূর্নীতির যে অপমানকর সার্টিফিকেট পেল এবং সেসাথে পদ্মা সেতু ঋণ থেকে বঞ্চিত হলো -সেটি যক্ষা, কলেরা ও এ্যাইডসের ন্যায় দৈহীক ব্যাধির কারণে নয়। বরং ব্যাধিগ্রস্ত চেতনা ও চরিত্রের কারণে। চেতনা রোগাগ্রস্ত হয় ভ্রান্ত ধর্ম ও দর্শনে। মানব জীবনে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোন বিষয় নাই। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে একজন মুসলমানকে প্রতি নামাজের প্রতি রাকাতে সে ভ্রান্ত ধর্ম ও দর্শন থেকে বাঁচার জন্য দোয়া পাঠ করতে হয়। মহান আল্লাহর কাছে চাইতে হয় সিরাতুল মোস্তাকীম। সেটি সুরা ফাতেহা পাঠের মধ্য দিয়ে। অথচ এর বিপরীতে ছাত্র-শিক্ষক, নারী-পুরুষ সবার মধ্য রোগ ছড়ানো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় খরচে। পৌত্তলিক চেতনায় বিশ্বের কোথাও উন্নত চরিত্র গড়ে উঠেছে বা উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয় তার প্রমাণ নাই। সেটি তো আদিম জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার পথ। ১৪০০ শত বছর আগেই নবীজী ও তার সাহাবাগণ আরবের বুকে এমন একটি চেতনার কবর রচনা করেছিলেন। অথচ তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনাকে বাংলাদেশের বাঙালী জাতীয় সঙ্গিত রূপে মাথায় তুলেছে। রবীন্দ্রনাথের সংক্রামক পৌত্তলিক চেতনাটি ছড়ানো হচ্ছে তাঁর গানকে যেমন জাতীয় সঙ্গিত করে,তেমনি তাঁর রচিত গান,নাটক ও সাহিত্যকে জনগণের রাজস্বের অর্থে বিপুল ভাবে প্রচার করে। কোটি কোটি কণ্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গিত গেয়ে এবং স্কুল-কলেজে তাঁর সাহিত্য পড়িয়ে যে কোন চারিত্রিক বা নৈতিক বিপ্লব আসে না এবং বাংলাদেশে যে বিগত ৪০ বছরেও আসেনি সেটি কি এখনও প্রমাণিত হয়নি?

মুসলমান হওয়ার প্রকৃত অর্থটি হলো প্রবল এক ঈমানী দায়বদ্ধতা নিয়ে বাঁচা। সে দায়বদ্ধতাটি প্রতি মুহুর্তের। বেঈমান থেকে ঈমানদারের মূল পার্থক্যটি এখানেই। বেঈমান ব্যক্তি মনের খুশিতে যা ইচ্ছা যেমন খেতে বা পান করতে পারে,তেমনি গাইতে, বলতে বা লিখতেও পারে। তার জীবনে কোন নিয়ন্ত্রন নাই।মহান আল্লাহর কাছে তার কোন দায়বদ্ধতার চেতনাও নাই। অথচ মু’মিনের জীবনে নিয়ন্ত্রন সর্বক্ষেত্রে। ঈমানের প্রথম আলামতটি শুরু হয় জিহ্ববার উপর নিয়ন্ত্রন থেকে। সে নিয়ন্ত্রনটি শুধু কালেমায়ে শাহাদত পাঠে সীমিত নয়। বরং সেটি তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি বাক্যের উপর। তাই কোন ব্যক্তির কাফের হওয়ার জন্য মন্দিরে গিয়ে মুর্তিকে পুজা দেয়া প্রয়োজন পড়ে না। জ্বিনা,উলঙ্গতা,মদ্যপান বা সূদ-ঘুষে লিপ্ত হওয়ারও প্রয়োজন পড়ে না,বরং জিহ্ববা দিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কিছু বলা বা পৌত্তলিক চেতনাপূর্ণ কিছু উচ্চারণ করাই সে জন্য যথেষ্ট। তাই মু’মিন ব্যক্তিকে শুধু পানাহার,পোষাকপরিচ্ছদে বা ইবাদতে সতর্ক হলে চলে না,নিজের রচিত প্রতিটি গানে,কবিতায়,কথা বলায় বা লেখনিতেও লাগাতর সর্বদা সতর্ক থাকতে হয়। কাফের ব্যক্তি নোবেল প্রাইজ পেলেও তার জীবনে সে ঈমানী নিয়ন্ত্রন থাকে না। কারণ বড় কবি হওয়া বা নোবেল প্রাইজ পাওয়ার জন্য সেটি কোন শর্তও নয়। ইমরুল কায়েসে মত এক কাফেরও আরবের অতি বিখ্যাত কবি ছিল। কিন্তু সে ইমরুল কায়েস মুসলমানদের কাছে গুরুর মর্যাদা পায়নি। তাই কাফের বক্তি যত প্রতিভাবানই হোক তাঁর গানকে মুসলিম দেশের জাতীয় সঙ্গিত বানানো যায় না। কারণ তাতে সংক্রামিত হয় তার কুফরি চেতনা। অথচ বাংলাদেশে তো সে বিপদটি প্রকট ভাবে ঘটেছে।

জাতীয় সঙ্গিতের অর্থ শুধু ভাব,ভাষা, ছন্দ এবং আবেগের প্রকাশ নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় জাতির সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের আক্বিদা-বিশ্বাস,আশা-আকাঙ্খা,দর্শন,ভিশন ও মিশন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন “আমার সোনার বাংলা” গানটি লিখেছিলেন তখন বাংলাদেশ বলে কোন স্বাধীন দেশ ছিল না,বরং বাংলা ছিল ভারতের একটি প্রদেশ। সে প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলমান হলেও তাদের সংখ্যা আজকের ন্যায় শতকরা ৯০ ভাগ ছিল না। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিজেও সে গানটিতে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ,দর্শন,চেতনা বা স্বপ্নের প্রকাশ ঘটাতে লেখেনি। সেটি যেমন তার লক্ষ্য ছিল না,সে লক্ষ্যে তাঁর প্রস্তুতিও ছিল না। বরং লিখেছেন একান্ত তাঁর নিজের ভাব ও আবেগের প্রকাশ ঘটাতে। ফলে সে গানে যা প্রকাশ পেয়েছে সেটি রবীন্দ্রনাথের একান্ত নিজের।বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নয়।রবীন্দ্রনাথ মুসলমান ছিলেন না। ফলে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিশ্বাস,দর্শন,স্বপ্ন,ভিশন ও মিশনের প্রতিনিধিত্ব করা বা সেগুলির প্রকাশ ঘটানোর সামর্থও তার ছিল না।

 

পৌত্তলিক রবীন্দ্র-চেতনা

পারিবারিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম হলেও কার্যতঃ ছিলেন পৌত্তলিক মুশরিক। আর এ জগতটাকে একজন মুসলমান যেভাবে দেখে, একজন পৌত্তলিক সেভাবে দেখে না। উভয়ের বিশ্বাস যেমন ভিন্ন, তেমনি চেতনার জগতটাও ভিন্ন। আর কবিতা ও গানে তো সে বিশ্বাসেরই প্রকাশ ঘটে।একজন মুসলমানের কাছে এ পৃথিবীর ভূমি,আলোবাতাস,মাঠঘাট,গাছপালা,ফুল-ফল,নদী-সমুদ্র এবং সেগুলির অপরূপ রূপ –এ সবকিছুই মহান আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন। এসব নিদর্শন দেখে সে মহান আল্লাহর কুদরত যে কত বিশাল সে ছবকটি পায়। ফলে স্রষ্টার এ অপরূপ সৃষ্টিকূল দেখে মু’মিন ব্যক্তি সেগুলিকে ভগবান বা মা বলে বন্দনা করে না,বরং হামদ ও নাত গায় সেগুলির সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর “আমার সোনার বাংলা” গানটিতে লিখেছেন:

আমার সোনার বাংলা,

আমি তোমায় ভালবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ,

তোমার বাতাস

আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।

ও মা,

ফাগুনে তোর আমের বনে

ঘ্রানে পাগল করে–

মরি হায়, হায় রে

ও মা,

অঘ্রানে তোর ভরা খেতে,

আমি কি দেখেছি মধুর হাসি।।

কি শোভা কি ছায়া গো,

কি স্নেহ কি মায়া গো–

কি আঁচল বিছায়েছ

বটের মূলে,

নদীর কূলে কূলে।

মা, তোর মুখের বাণী

আমার কানে লাগে

সুধার মতো–

মরি হায়, হায় রে

মা, তোর বদনখানি মলিন হলে

আমি নয়ন জলে ভাসি।।

রবীন্দ্রনাথের এ গানে ভাব আছে, ভাষা আছে, ছন্দও আছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু আছে যা একজন মুসলমানের ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক। এ গানে তিনি বন্দনা গেয়েছেন বাংলার ভূমির,এবং সে ভূমির আলো-বাতাস,নদীর কূল,ধানের ক্ষেত,আমবাগান ও বটমূলের। কিন্তু যে মহান আল্লাহতায়ালা সেগুলির স্রষ্টা,সমগ্র গানে একটি বারের জন্যও তাঁর বন্দনা দূরে থাক তাঁর নামের উল্লেখ পর্যন্ত নাই।একজন পৌত্তলিকের জন্য এটিই স্বভাবজাত। পৌত্তলিকের এখানেই মূল সমস্যা। এখানে পৌত্তলিকের ভয়ানক অপরাধটি হলো নানা দেবদেবী ও নানা সৃষ্টির নানা রূপ বন্দনার মাঝে মহান আল্লাহকে ভূলিয়ে দেয়ার। এটিই তার শিরক। এবং এজন্যই সে মুশরিক। মহান আল্লাহর বান্দার বহু বড় বড় গোনাহ মাফ করে দিবেন কিন্তু শিরকের গুনাহ কখনই মাফ করবেন না। নবীজী (সাঃ) সে হুশিয়ারিটি বহুবার শুনিয়েছেন। পৌত্তলিক ব্যক্তিটি তার মনের গহীন অন্ধকারের কারণে এ পৃথিবীপৃষ্ঠে অসংখ্য সৃষ্টি দেখতে পেলেও সে সৃষ্টিকূলের মহান স্রষ্টাকে খুঁজে পায় না। রবীন্দ্রনাথও সে সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে উঠতে পারেননি। তাছাড়া গদ্য,পদ্য কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মুখ বা জিহবা কথা বলে না বরং কথা বলে তার চেতনা বা বিশ্বাস। ফলে সে কবিতা ও গানে ব্যক্তির আক্বিদা বা ধর্মীয় বিশ্বাস ধরা পড়ে। তাই “আমার সোনার বাংলা” গানে যে চেতনাটির প্রকাশ ঘটেছে সেটি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের। কোন মুসলমানের নয়। গানে ইসলামী চেতনার প্রকাশের সামর্থ থাকলে তো রবীন্দ্রনাথ মুসলমান হয়ে যেতেন। পৌত্তলিক চেতনা নিয়েই একজন পৌত্তলিক কবি কবিতা ও গান লিখবেন বা সাহিত্যচর্চা করবেন সেটিই তো স্বাভাবিক। এমন একটি চেতনার কারণেই পৌত্তলিক ব্যক্তি শাপ-শকুন,গরু, বানর-হনুমান,নদ-নদী,বৃক্ষ,পাহাড়-পর্বতকে উপাস্য রূপে মেনে নেয় এবং তার বন্দনাও গায়।এ গানের ছত্রে ছত্রে তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনারই প্রবল প্রকাশ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের কলমে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে তাঁর নিজ চেতনার সাথে আদৌ গাদ্দারি করেননি। কিন্তু ইসলামি চেতনার সাথে একজন মুসলমানের গাদ্দারি তখনই শুরু হয় যখন পৌত্তলিক চেতনার এ গানকে মনের মাধুরি মিশিয়ে সে গাওয়া শুরু করে।

 

“আমার সোনার বাংলা” গানের প্রেক্ষাপট

“আমার সোনার বাংলা” গানটি রচনার একটি ঐতিহাসিক পেক্ষাপট আছে। গানটি রচিত হয়েছিল ১৯০৫ সালের পর। বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয় ১৯০৫ সালে। পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় অর্থনীতি ও শিক্ষাদীক্ষায় অতি পশ্চাদপদ ছিল পূর্ব বঙ্গ। পূর্ববঙ্গের সম্পদে দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি ঘটছিল কোলকাতার। শুধু প্রশাসনই নয়,শিক্ষা ও শিল্প গড়ে উঠছিল শুধু কোলকাতাকে কেন্দ্র করে। মুসলমানদের দাবী ছিল বাংলাকে বিভক্ত করা হোক এবং পূর্ববঙ্গের রাজধানি করা হোক ঢাকাকে। সে দাবীর ভিত্তিতে ভারতের তৎকালীন ভাইস রয় লর্ড কার্জন পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিযে একটি আলাদা প্রদেশ গঠিত করেন। এ নতুন প্রদেশের রাজধানী রূপে গৃহীত হয় ঢাকা নগরী। শহরটি রাতারাতি জেলা শহর থেকে রাজধানী শহরে পরিণত হয়। তখন ঢাকায় কার্জন হলসহ বেশ কিছু নতুন প্রশাসনিক ইমারত এবং হাই কোর্ট ভবন নির্মিত হয়। নির্মিত হয় কিছু প্রশস্ত রাজপথ। প্রদেশটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলার এবং সে সাথে আসামের মুসলমানদের মাঝে আসে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যয়। ১৯০৬ সালে গঠিত হয় মুসলিম লীগ যা শুধু বাংলার মুসলমানদের জন্যই নয়, সমগ্র ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে সৃষ্টি করে নতুন আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনা। মুসলমানদের এ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং কোলকাতাকে ছেড়ে ঢাকার এ মর্যাদা-বৃদ্ধি কোলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি।কবি রবীন্দ্রনাথেরও ভাল লাগেনি। পূর্ব বাংলা পশ্চাদপদ মুসলমানদের প্রতি অগ্রসর বাঙালী হিন্দুদের কোন দরদ না থাকলেও খণ্ডিত বাংলার প্রতি তখন তাদের দরদ উপচিয়ে পড়ে। বাংলার মাঠঘাট,আলোবাতাস,জলবায়ু,বৃক্ষরাজী ও ফলমূলের প্রতি আবেগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন এ গান। তাই এ গানের একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। সেটি বাংলার বিভক্তির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। বাঙালী হিন্দুরা তখন অখণ্ড বঙ্গের দাবী নিয়ে রাজপথে নামে। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ভারত ভ্রমনে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভারত উপলক্ষে “জনগণ মনোঅধিনায়ক ভারত ভাগ্যবিধাতা” নামে কবিতা লেখেন। ভারতের সেটিই আজ জাতীয় সঙ্গিত।

রবীন্দ্রনাথ ও  বাঙালী হিন্দুদের সে দাবী রাজা পঞ্চম জর্জ মেনে নেন এবং আবার বাংলা একীভূত হয়। প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা নেমে আসে পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের মাঝে। বিক্ষুদ্ধ এ মুসলমানদের শান্ত করতে ভারতের ব্রিটিশ সরকার তখন ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়।কিন্তু সেটিও কোলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি। তার মধ্যেও তারা কোলকাতার শ্রীহানীর কারণ খুঁজে পায়। ফলে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও বাঙালী বাবুগণ তখন রাজপথে নামেন। খোদ রবীন্দ্রনাথে মিছিলে নেমেছিলেন কোলকাতার সড়কে। এই হলো রবীন্দ্র মানস। সে সাথে বাঙালী হিন্দুর মানস। আর সে মানসকে নিয়ে রচিত সঙ্গিত এখন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত।

আজকের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের আমলের অবিভক্ত বাংলা যেমন নয়,তেমনি দেশটি ভারতভূক্তও নয়। রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৫৫ ভাগের বেশী ছিল না। সে আমলের বাংলা ঢাকাকেন্দ্রীকও ছিল না। এখন এটি এক ভিন্ন চরিত্রের বাংলাদেশ -যে দেশে রবীন্দ্রনাথ একদিনের জন্যও বাস করেননি। কোনদিনও তিনি এদেশের নাগরিক ছিলেন না। এদেশের স্বাধীনতার কথা তিনি যেমন শোনেননি,তেমনি এ দেশের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলমানদের নিয়ে তিনি কোন স্বপ্নও দেখেননি। ফলে বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া,স্বাধীনতা বা স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব? তাছাড়া এ সঙ্গিতটি সে উদ্দেশ্যে লেখাও হয়নি। জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের বিষয়টি দোকান থেকে ‘রেডিমেড’ সার্ট কেনার ন্যায় নয়। এটিকে বরং বিশেষ রুচী,বিশেষ আকাঙ্খা,বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে অতি বিশেষ গুণের ‘tailor made’ হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে সে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। বরং এখানে গুরুত্ব পেয়েছে রবীন্দ্রভক্তি ও রবীন্দ্রপুঁজার মানসিকতা।

 

বড় ব্যর্থতা ও বড় বিদ্রোহ

বাংলাদেশের মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা এবং সে সাথে মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহটি শুধু এ নয় যে,তারা রাষ্ট্রের বুকে সূদী ব্যাংক,পতিতাপল্লি,মদের দোকান,অশ্লিল ছায়াছবি এবং দেশের আদালতে কুফরি আইনকে আইনগত বৈধতা দিয়েছে এবং মেনে নিয়েছে। আরেক বড় ব্যর্থতা এবং মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে আরেক বড় বিদ্রোহ হলো জাতীয় সঙ্গিত রূপে গেয়ে চলেছে রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক চেতনাপুষ্ট এ গানটিকে। যারা বেঈমান ও বিদ্রোহী হয় তাদের সে বেঈমানী ও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রেই। সেটি যেমন দেশের আইন-আদালতে কুফরি আইন অনুসরণে এবং রাষ্ট্রে পতিতাপল্লি ও সূদী ব্যংক বহাল রাখার মধ্যে,তেমনি মনের আবেগ ও মাধুারি মিশিয়ে জাতীয় সঙ্গিত রূপে পৌত্তলিক চেতনা সমৃদ্ধ গান গাওয়াতেও। মহান আল্লাহর সাথে তাদের সে বেঈমান-সুলভ গাদ্দারিটা তখন শুধু রাজনীতিতে সীমিত থাকে না,বরং সর্বক্ষেত্রেই সেটি ধরা পড়ে। মুসলিম সংহতির বুকে কুড়াল মারা এবং মুসলিম রাষ্ট্রের বিনাশের ন্যায় হারাম কাজটিও তখন এমন বিদ্রোহীদের কাছে উৎসবে পরিণত হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে এ গানটিকে যে শেখ মুজিব ও তাঁর দলবল নির্বাচন করেছিলেন ইসলামে সাথে তাদের গাদ্দারি কি কম পরিচিত? বাংলাদেশে ইসলামের নামে দলবদ্ধ হওয়া এবং ইসলামের শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে মুজিব সাংবিধানিক ভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলি তাঁর কাছে বরদাশত হয় হয়নি। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে যেমন কোরআনের আয়াতকে সরিয়েছেন,তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে ইসলাম ও মুসলিম শব্দগুলিও সরিয়েছেন। তাই তাঁর হাতে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল হয়ে যায় সলিমুল্লাহ হল। জাহিঙ্গরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় জাহ্ঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং নজরুল ইসলাম কলেজ হয় নজরুল কলেজ। মুজিবের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ পেয়েছিল ভারতকে খুশি করা,আল্লাহকে খুশি করা নয়।

ইসলামের বিরুদ্ধে মুজিবের শুরু করা সে যুদ্ধটি এখন চালিয়ে যাচ্ছে তার কন্যা শেখ হাসিনা ও দলীয় কর্মীরা। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ বা ভারতের হিন্দু কাফেরদের থেকেও তারা বেশী ইসলাম বিদ্বেষী। ব্রিটিশ ও হিন্দু ভারতে মুসলমানদের উপর ইসলামের নামে দল গড়ায় নিষেদ্ধাজ্ঞা কোন কালেই ছিল না এবং আজও  নাই। মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, জামায়াতে ইসলামীসহ বহু মুসলিম প্রতিষ্ঠান ভারতে আজও বেঁচে আছে মুসলিম নাম নিয়ে।অথচ মুজিব বেঁচে থাকতে সে অধিকার বাংলাদেশের মুসলমানদের তিনি দেননি। মুজিব ও তাঁর অনুসারিদের চেতনা যে সিক্ত ছিল রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিক চেতনায় -সেটি কি এ গানের নির্বাচন থেকেই সুস্পষ্ট নয়?

 

গুরুত্ব পায়নি মহান আল্লাহর নির্দেশ ও নবীজী (সাঃ)র সূন্নত

নবীজীর আমলেও আরব দেশে বিস্তৃত ভূমি,চন্দ্র-সূর্য্য ও আকাশ-বাতাস ছিল। সে ভূমিতেও মাঠ-ঘাট,ফুল-ফল ও বৃক্ষরাজিও ছিল। কিন্তু মহান নবীজী (সাঃ) কোন সময়ও কি সেগুলিকে মা বলে সম্বোধন করেছেন? বরং আজীবন হামদ-নাত ও প্রশংসা গীত গেয়েছেন সে সৃষ্টিকূলের মহান স্রষ্টার। আল্লাহর অনুগত বান্দাহ রূপে মুসলমানের বড় দায়িত্ব হলো আল্লাহর নামকে সর্বত্র প্রবল ভাবে প্রকাশ করা বা বড় করা। হেদায়াতপ্রাপ্তির চেয়ে ব্যক্তির জীবনে মহান আল্লাহর বড় নেয়ামত নেই। পথভ্রষ্ট হওয়ার চেয়ে এ জীবনে বড় ব্যর্থতাও নেই। হেদায়াত প্রাপ্তির শুকরিয়া জানাতে ঈমানদার ব্যক্তি আমৃত্যু তাই আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করে। এ জন্য সর্বত্র আল্লাহু আকবর বলে। পবিত্র কোরআনে সেটির নির্দেশও রয়েছে। বলা হয়েছে,“তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন তোমরা আল্লাহর নামে তাকবির বল (অর্থাৎ আল্লাহ যে মহিমাময় সর্বশ্রেষ্ঠ সেটি মুখ দিয়ে প্রকাশ কর), যাতে তোমরা এভাবে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার।” –সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৫। তাই মুসলমান “আল্লাহু আকবর” বলে শুধু জায়নামাজে তাকবির ধ্বণি দেয় না,রাজপথের মিছিলে বা জনসভাতেও দেয়। রাজনীতি,অর্থনীতি সংস্কৃতি,শিক্ষাদীক্ষা,কবিতা ও গানেও বলে। এটি শুধু তাঁর রাজনৈতিক শ্লোগান নয়, বরং ইবাদত। মুসলমান তাই কোথাও সমবেত হলে “জয় বাংলা” বা “জয় হিন্দ” বলে না বরং সর্বশক্তিতে গগন কাঁপিয়ে “নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার” বলে। একজন মুসলমান তো এভাবেই একজন কাফের বা মুনাফিক থেকে ভিন্ন পরিচয় নিয়ে ধর্মকর্ম,রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চা করে।কিন্তু বাংলাদেশের সেক্যুলার পক্ষের বড় সাফল্য হলো ইসলামের সে বিশুদ্ধ চেতনাকে বহুলাংশে তারা বিলুপ্ত করতে সমর্থ হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি,শিক্ষা-সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত যে জয়ধ্বণিটি ঘোষিত হয় সেটি মহান আল্লাহর নয়,বরং শয়তানি বিধানের।

ব্যক্তির নাম থেকেই তার ধর্ম, চেতনা ও বিশ্বাসের পরিচয় জানা যায়। এ পরিচয়টুকু জানার জন্য তখন আর বাড়তি প্রশ্নের প্রয়োজন পড়ে না। সে নামটি আজীবন তার ধর্ম বা বিশ্বাসের পক্ষে সাইনবোর্ড রূপে কাজ করে। তেমনি জাতির জীবনে হলো জাতীয় সঙ্গিত। জাতীয় সঙ্গিত থেকেই পরিচয় মেলে জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও চেতনার। তাই নাস্তিকের ও আস্তিকের ধর্মীয়,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন যেমন এক হয় না,তেমনি এক হয় না জাতীয় সঙ্গিতও। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিতটি নির্বাচনের একটি ইতিহাস আছে। সেটি গৃহীত হয়েছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর। যারা এ সঙ্গিতটিকে গ্রহণ করেছিল তারা ছিল বাঙালী জাতিয়তাবাদী সেক্যুলার। তাদের চেতনায় ও রাজনীতিতে ইসলামের কোন প্রভাব ছিল না। বরং তারা ইতিহাসে পরিচিতি পেয়েছে ভারতপ্রীতি,রবীন্দ্রপ্রীতি,এবং ইসলামি চেতনার নির্মূলে আপোষহীনতার কারণে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিও শেখ মুজিবের কোন শ্রদ্ধাবোধ ছিল না।তিনি যে শুধু রাজনীতিতে স্বৈরাচারি ছিলেন তা নয়।বরং প্রচণ্ড স্বৈরাচারি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও। তাই দেশের উপর তিনি শুধু একদলীয় বাকশালই চাপিয়ে দেননি,বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে চাপিয়ে দিয়েছেন পৌত্তলিক সংস্কৃতির আগ্রাসনও। রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে জাতীয় সঙ্গিত রূপে চাপানো হয়েছে তেমন এক স্বৈরাচারি মানসিকতা থেকে।

 

গুরুত্ব পায়নি বাঙালী মুসলমানের স্বপ্ন

প্রতিটি দেশের শুধু একটি রাজনৈতিক,ভৌগলিক ও ভাষাগত পরিচয়ই থাকে না,সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ও থাকে।জনগণের চেতনায় যেমন সুনির্দ্দিষ্ট দর্শন থাকে,তেমনি সে দর্শনের আলোকে রাজনৈতিক স্বপ্নও থাকে।সভ্যতা নির্মানের সে দেশের জনগণের একটি গুরুতর দায়বদ্ধতাও থাকে। সে বিচারে প্রতিটি দেশই অনন্য।সে অনন্য বৈশিষ্ঠের কারণেই আজকের বাংলাদেশ পশ্চিম বাংলা থেকে ভিন্ন। এবং সে ভিন্নতার ফলেই পশ্চিম বাংলার ন্যায় বাংলাদেশ ভারতের অংশ নয়।পশ্চিম বাংলার সাথে বাংলাদেশের পার্থক্যটি এখানে ভূমি,জলবায়ু বা আলোবাতাসের নয়,বরং দর্শন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ভিশন ও মিশনের। পার্থক্যটি ভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার। সে ভিন্ন স্বপ্নের কারণেই ১৯৪৭য়ে পশ্চিম বাংলার হিন্দুগণ যখন ভারতে যোগ দেয় তখন পূর্ব বাংলার মুসলমানগণ অতি সচেতন ভাবেই বাঙালী হিন্দুদের সাথে প্রতিবেশী ভারতে যায়নি। গিয়েছে পাকিস্তানে। সাতচল্লিশের সে ভাবনার সাথে দেশের ৯০% ভাগ মুসলমানের সমর্থণ ছিল। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক শেখ মুজিবও সেদিন সে ভাবনার সাথে একাত্ম হয়েছিলেন। প্রতিবেশী বাঙালী হিন্দুদের সাথে না গিয়ে তারা তখন ১২০০ মাইল দূরের অবাঙালী পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে গেছে।সেটি এক অনস্বীকার্য ইতিহাস।

বাঙালী মুসলমানদের যে প্রতিবেশী হিন্দুদের থেকে যে ভিন্নতর পরিচয় ও স্বপ্ন ছিল সেটি তাই ইতিহাসের গোপন বিষয় নয়। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রচিত হতে হবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সে বিশিষ্ঠ পরিচয় ও স্বপ্নগুলো তুলে ধরতে এবং প্রবলতর করতে। এমন সঙ্গিতের প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি উচ্চারণ থেকে প্রতিটি নাগরিক তখন পাবে নতুন প্রত্যয় ও নতুন প্রেরণা। পাবে স্বপ্নের সে পথটিতে অবিরাম টিকে থাকার মানসিক বল। কিন্তু জাতীয় সঙ্গিতের নির্বাচনে বাংলাদেশের মুসলমানদের সে ভিন্নতর পরিচয়কে মেনে নেয়া হয়নি। এ সঙ্গিতে যে সুর,যে দর্শন,যে বর্ণনা এবং যে আকুতি ধ্বণিত হয়েছে সেটি কোন মুসলমানের নয়,সেটি নিতান্তই একজন পৌত্তলিকের। এমন সঙ্গিত থেকে মুসলমান অনুপ্রেরণা না পেয়ে পায় চরম পথভ্রষ্টতা। পায় শিরকের ছবক। যে ভ্রষ্টতার কারণে পৌত্তলিক মানুষটি বিষধর সাপকে দেবতা রূপে গ্রহণ করার অনুপ্রেরণা পায়,তেমনি এ সঙ্গিত পাঠকারি বাংলাদেশীও উৎসাহ পায় ভারতের ন্যায় একটি শত্রুদেশকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করায়।

 

ভারতীয় স্ট্রাটেজী ও অধিকৃতি

ভারত থেকে আলাদা মানচিত্র নিয়ে বাংলাদেশ বেড়ে উঠুক ভারত সেটি ১৯৪৭য়ে যেমন চায়নি,আজও  চায় না। ভারতের এ আগ্রাসী নীতি শুধু অধিকৃত কাশ্মির, হায়দারাবাদ,গোয়া,মানভাদড় বা সিকিমের ক্ষেত্রে নয়,বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। কাশ্মিরে ভারত যে ৭ লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী মোতায়েন করেছে সেটি সেখানে গণতন্ত্র বা অর্থনীতি বাড়াতে নয়। বরং ভারতের অধিকৃতি নিশ্চিত করতে। ভারত একাত্তরে যে বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়োজিত করেছিল এবং যেরূপ আজ মোতায়েন করে রেখেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে লক্ষ লক্ষ অনুগত এজেন্ট সেটিও বাংলাদেশে স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র বাড়াতে নয়। কাশ্মিরে ভারতের বিপদটি হলো সেখানে তারা কাশ্মিরীদের মধ্য থেকে এতটা সেবাদাস এজেন্ট পায়নি যতটা পেয়েছে বাংলাদেশে। ফলে এক কোটি মানুষের কাশ্মির দখলে রাখতে হাজার হাজার কোটি রুপি ব্যয়ে পাঞ্জাব,রাজস্থান,বিহার,গুজরাত,মহারাষ্ট্র,উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশসহ ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে ৭ লাখ সৈন্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। সে সাত লাখ সৈন্যের পানাহার, চলাচল ও লজিস্টিকের পিছনে প্রতি বছর বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে বহু হাজার কোটি রুপি। অথচ সাড়ে সাত কোটি মানুষের পূর্ব পাকিস্তানে একাত্তরে এক লাখ পাকিস্তানী সৈন্যও ছিল না। কাশ্মিরে এক লাখ ভারতীয় সৈন্য পালতে যত অর্থ ব্যয় হয় তা দিয়ে বাংলাদেশে অন্ততঃ দশ লাখ দালাল পালা সম্ভব। এজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি,মিডিয়া,প্রশাসন,সেনাবাহিনী,পুলিশ বাহিনী,শিক্ষাঙ্গণ,সংস্কৃতি ও আদালত প্রাঙ্গণে এত ভারতীয় দালালের ছড়াছড়ি।বাংলাদেশের মাটি এক্ষেত্রে অতি উর্বর। সে উর্বরতা বাড়িয়েছে বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেকুলারিস্টগণ। বাংলাদেশে আওয়ামী-বাকশালী দাসদের কারণে ভারত অতি অল্প খরচে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশকে অধিকৃত রাখতে পেরেছে। ফলে বাংলাদেশের বুক চিরে করিডোর নিতে বা দেশের সমূদ্রবন্দর ও নদীবন্দরের উপর দখল নিতে ভারতকে একটি তীরও ছুড়তে হয়নি।

 

জাতীয় সঙ্গিতের রাজনৈতীক এজেন্ডা


গলিত আবর্জনার স্তুপে যেমন অসংখ্য মশামাছি রাতারাতি বেড়ে উঠে তেমনি সেক্যুলারিজমের মাঝে বিপুল ভাবে বেড়ে উঠে ইসলামের দুষমনেরা। তখন সর্বত্র জুড়ে কিলবিল করে ভারতসেবী, মার্কিনসেবী, ইসরাইলসেবী দাস চরিত্রের ঘৃণীত জীব। তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাড়ে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে রাজনৈতিক মিত্রতা। তাই ১৯৭১য়ে আওয়ামী বাকশালীরা মুসলিম দেশে কোন বন্ধু খুঁজে না পেলে কি হবে,মুসলিম নিধনকারি ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ায় তারা প্রচুর মিত্র খুঁজে পেয়েছে।অথচ দালালের আবাদ বাড়াতে কাশ্মিরে ভারত সে উর্বরতা পায়নি। কারণ, সেখানে রয়েছে প্রবল ইসলামী চেতনা। গড়ে উঠেছে  ভারত বিরোধী প্রচণ্ড বিদ্রোহ। ফলে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারত যত সহজে নিরাপদ করিডোর এবং সমুদ্রবন্দর ও নৌবন্দর ব্যবহারের সুযোগ নিয়েছে,কাশ্মিরে ৭ লাখ সৈন্য মোতায়েন করেও যানবাহন চলাচলে সে নিরাপত্তা পায়নি। সে নিরাপত্তা পাচ্ছে না কোন শহরে বা গ্রামে। অথচ বাংলাদেশে তারা বাংলাদেশীদের চেয়েও পাচ্ছে অধিক নিরাপত্তা। ভারতীয় সীমান্তরক্ষির হাতে বাংলাদেশীরা অহরহ লাশ হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয়দের সে বিপদ নাই। বিপুল সংখ্যক সেক্যুলারিস্টদের চেতনা-রাজ্য ইতিমধ্যেই ভারতের হাতে অধিকৃত। অখন্ড ভারতের বাইরে বাংলাদেশের আলাদা মানচিত্রকে যে গান্ধি, নেহেরু বা রবীন্দ্রনাথ শুরু থেকেই বিরোধীতা করেছিল তারা বরং এ ভারতভক্তদের কাছে পুঁজনীয়।

রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে বাংলার বিভক্তিকে মেনে নেননি। মেনে নেননি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকেও। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় তিনি রাজপথে নেমেছেন। কারণে তাতে মুসলমানদের কল্যাণের সম্ভাবনা ছিল।বাংলার অখণ্ড ভূগোল ১৯০৫ সালে তাঁর কাছে তখন পুঁজনীয় ছিল। “আমার সোনার বাংলা” গানটি লেখা হয়েছে তেমনি এক চেতনা নিয়ে। কিন্তু সে অখণ্ড ভূগোলকে রবীন্দ্রভক্ত বাঙালী হিন্দুগণই ১৯৪৭য়ে বিভক্ত করে। ১৯০৫য়ে বাংলাকে অখণ্ড রাখা এবং ১৯৪৭য়ে আবার খণ্ডিত করার মধ্যে তাদের রাজনীতি ছিল। সে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো বাংলার এ ভূখণ্ডে বাঙালী হিন্দুর স্বার্থ সংরক্ষণ।তেমনি একটি আগ্রাসী রাজনীতি আছে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটির পৌত্তলিক চেতনাকে বাংলাদেশের মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়ায়।সে রাজনৈতিক লক্ষটি হলো,যে অখণ্ড বাংলার চেতনা নিয়ে ১৯০৫ সালে গানটি লেখা হয়েছিল সে দিকে ফিরিয়ে নেয়ার।

 

পৌত্তলিকতার আগ্রাসন ও সংকট

বাঙালী মুসলমানের চেতনা রাজ্যে ভারতের পক্ষে প্রবল অধিকৃতি জমানোর কাজটি করেছে সেক্যুলার বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা। ইমারত একবার নির্মিত হলে সেটিকে খাড়া রাখার খরচ অনেক কমে যায়। এমন চেতনা নির্মাণের কাজে ভারতের বিনিয়োগ ১৯৪৭ থেকেই। সেক্যুলার বাংলাদেশ নির্মাণের পর এখন ভারতের সে খরচ বিপুল ভাবে কমেছে। এখন সে কাজে ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলমানদের নিজেদের রাজস্বের পুঁজি। ভারতের লক্ষ্য,নিজেদের সে প্রতিষ্ঠিত অধিকৃতিকে লাগাতর বজায় রাখা। বাংলাদেশের উপর ভারতের দখলদারিটি শুধু সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনতিক নয়,বরং সাংস্কৃতিক।সে অধিকৃতিরই প্রতীক হলো জাতীয় সঙ্গিত রূপে চাপিয়ে দেয়া পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের গান। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অখণ্ড ভারতের ধ্বজাধারি। সে অখণ্ড ভারতের চেতনা থেকেই ভারত থেকে মুসলিম নির্মূলের প্রবক্তা মারাঠী শিবাজীকে তিনি জাতীয় বীরের মর্যাদা দিয়েছেন। শিবাজীকে বন্দনা করে তিনি কবিতাও লিখেছেন। গান্ধীকে পরামর্শ দিয়েছেন হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্র ভাষা করতে। এখন সে রবীন্দ্রনাথকে ভারত ব্যবহার করছে বাংলাদেশের উপর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনের যোগসূত্র রূপে। এজন্যই বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা ও রবীন্দ্রঅর্চনা বাড়াতে ভারত সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের এত বিনিয়োগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের রাজস্বের অর্থে বাংলা এ্যাকাডেমীর কাজ হয়েছে প্রতিবছর পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের উপর শত শত বই প্রকাশ করা। অথচ ইসলামের মহান নবীজী(সাঃ)এবং মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষটির উপর কি এর দশ ভাগের এক ভাগ বই ছাপানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

বাংলাদেশের শিশু-সন্তান ও নাগরিকের বিরুদ্ধে বড় জুলুমটি নিছক রাজনৈতিক,প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক নয়। বরং সেটি আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক। সে জুলুমের অংশ রূপেই একজন পৌত্তলিকের রচিত সঙ্গিতকে বাংলাদেশের মুসলমান নারীপুরুষ ও শিশুদের দিনের পর দিন জাতীয় সঙ্গিত রূপে গাইতে হচেছ,এবং ফলে তারা ব্যর্থ হচ্ছে জীবনের সে স্মরণীয় মুহুর্তগুলোতে মহান আল্লাহকে স্মরণ করতে। শয়তান তো এভাবেই মানুষের মনের ভূবনে অধিকৃতি জমায়। এবং পথভ্রষ্টতা বাড়ায় মহান আল্লাহর প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে। জাতীয় সঙ্গিত পাঠের নামে এভাবেই পরিকল্পিত ভাবে ইসলামের মূল আক্বিদা ও শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে ছাত্র-ছাত্রী,শিক্ষক-সেনা এবং সাধারণ মানুষকে দূরে হটানো হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিই শুধু নয়,সাধারণ মানুষের চেতনার মানচিত্রও যে অভিন্ন ভাষা ও অভিন্ন সাহিত্যের নামে পৌত্তলিক হিন্দুদের হাতে অধিকৃত এ হল তার নমুনা। বাঙালী মুসলমানের চেতনায় ইসলাম তার সনাতন রূপ নিয়ে বেঁচে থাকলে পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের এ গান কি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে গ্রহণযোগ্যতা পেত?

বস্তুত সাহিত্য এবং সে সাথে জাতীয় সঙ্গিত পরিনত হয়েছে ঈমান ধ্বংসের এক নীরব হাতিয়ারে। ফলে পথভ্রষ্টতা বাড়ছে শুধু ধর্মপালনে নয়,বরং দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, আইন-আদালত ও প্রশাসনে।বাঙালী মুসলমানের জীবনে এভাবেই বাড়ছে মহাসংকট। দিন দিন বাড়ছে নবীজী (সাঃ)র আমলের সনাতন ইসলামের সাথে সাধারণ মানুষের দুরুত্ব। সে সাথে প্রবলতর হচ্ছে রাজনীতি,সংস্কৃতি ও প্রশাসনসহ দেশের সর্বত্র ইসলামের শত্রু পক্ষের অধিকৃতি।ফলে দেশ গড়ছে দূর্নীতিতে বিশ্ব রেকর্ড।বাড়ছে দুনিয়াব্যাপী দুর্নাম ও অপমান। ইসলামি রাষ্ট্র,আল্লাহর সার্বভৌমত্ব,শরিয়তি আইন, মুসলিম উম্মাহর একতা,প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভ্রাতৃত্ব এবং জিহাদ –ইসলামের এসব মৌলিক বিষয়গুলো চিত্রিত হচ্ছে সন্ত্রাসী চেতনা রূপে। প্রতিবেশী রোহিঙ্গা মুসলমানেরা হত্যা,ধর্ষণ,নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে এসেও বাংলাদেশে আশ্রয় পাচ্ছে না। একটি মুসলিম দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠির এর চেয়ে বড় অধঃপতন ও বিপর্যয় আর কি  হতে পারে? মহান আল্লাহর দরবারে মূক্তিই বা মিলবে কীরূপে? ১৫/০৭/২০১২




বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ ও মুসলিমদের ঈমানী সংকট

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 অধিকৃত দেশ

যুদ্ধ শুধু আগ্নেয়াস্ত্রে হয় না। স্রেফ রণাঙ্গনেও হয় না। বরং সবচেয়ে বড় ও বিরামহীন যুদ্ধটি হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ময়দানে। এ যুদ্ধে হেরে গেলে পরাজয়টি তখন নীরবে ঘটে। তখন বিলুপ্ত হয় সাংস্কৃতিক পরিচয়। রণাঙ্গণের যুদ্ধ তখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে গেছে এবং পোলান্ড, পূর্বজার্মান, চেকেস্লাভিয়া,ক্রয়েশিয়া, সার্বিয়া, আলবানিয়া, বুলগারিয়ার ন্যায় বহু জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত হয়েছে এবং সে সাথে ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে কোন সামরিক পরাজয়ের কারণে নয়। বরং সোভিয়েত রাশিয়ার সে পরাজয়টি এসেছে সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। এমন একটি  যুদ্ধকেই বলা হয় স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ার।  এ যুদ্ধে পরাজিত হলে বিলুপ্ত হয় পরাজিত জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। বাংলাদেশে তেমনি একটি আরোপিত যুদ্ধ চলছে। এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজ, ফরাসী, জার্মান, ডাচ, আইরিশ, স্পেনিশ, আফ্রিকান –এরূপ নানাভাষী মানুষের বসতি ছিল। কিন্তু এখন সব মিলে মিশে মার্কিনী হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়ে গেছে কালচারাল মেল্টিং পট। এখানে সংস্কৃতির সে মূল ধারাটি হলো গ্রীকো-রোমান সভ্যতার। ভারতে সেটি পৌত্তলিক হিন্দুত্বের।  হিন্দুত্বের সে রূপটি নিছক ধর্মীয় নয়,বরং তাতে রয়েছে সাংস্কৃতিক শক্তিও। সে শক্তির বলেই অতীতে শক, হুন, জৈন –এরূপ বহুজাতি হিন্দুত্বের সাথে মিশে গেছে। ধর্মীয় ভাবে হিন্দু না হলেও সাংস্কৃতিক ভাবে তারা হিন্দুতে পরিণত হয়। প্রতিদেশেই এভাবে বিজয়ী শক্তির হাতে নীরবে সাংস্কৃতিক কনভার্শন ঘটে। বাংলাদেশে হিন্দু ধারায় এমন সাংস্কৃতিক কনভার্টদের সংখ্যা আজ লক্ষ লক্ষ।

সাংস্কৃতিক শক্তি প্রবল বল পায় রাজনৈতিক বিজয়ের ফলে। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক শক্তি তখন সাংস্কৃতিক শক্তির বিকাশে দুয়ার খুলে দেয়। তখন শুরু হয় বিজয়ী শক্তির সাংস্কৃতিক বিপ্লব। বস্তুত এক সফল সাংস্কৃতিক বিপ্লবের লক্ষ্যেই প্রয়োজন পড়ে রাজনৈতিক বিপ্লবের। মুসলিম শাসনামলে ভারতীয় হিন্দুগণ সে শক্তি পায়নি। তাদের সে শক্তিটি বিলুপ্ত হয়েছিল মুসলিমদের রাজনৈতিক বিজয়ে। ইসলাম তখন শুধু রাজনৈতিক শক্তি রূপে নয়, প্রবল সাংস্কৃতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে শক-হুন-জৈনগণ যেভাবে হিন্দু সংস্কৃতিতে হারিয়ে গেছে, মুসলিমগণ সেভাবে হারিয়ে যায়নি। কিন্তু হাজার বছর পর হিন্দুগণ ভারতে এখন সে রাজনৈতিক শক্তিটি ফিরে পেয়েছে। ফলে হিন্দুদের মাঝে জেগে উঠেছে হিন্দু আচারে সাম্রাজ্য নির্মাণের প্রেরণা। ফলে তাদের রাজনীতিতে এসেছে প্রচণ্ড সাম্রাজ্য লিপ্সা। ১৯৪৭’য়ে স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৪৮য়ে কাশ্মীর ও হায়দারাবাদ দখল, ১৯৭১’য়ে পূর্ব-পাকিস্তানে দখল এবং ১৯৭৪ সালে সিকিম দখলের ন্যায় ঘটনা ঘটেছে একই ধারাবাহিকতায়। ১৯৭১ সালে সামরিক বিজয়ের পর তাদের সে প্রভাব-বলয়ের অধীনে এসে গেছে বাংলাদেশও। ১৯৭২’য়ে ভারতের সামরিক অধিকৃতি শেষ হলেও সাংস্কৃতিক অধিকৃতি শেষ হয়নি। বরং সেটি আরো তীব্রতর হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য মহা বিপদের কারণ. ভারতের এ সাংস্কৃতিক অধিকৃতি।

ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর হিন্দুদের হাতে অখন্ড ভারতের শাসনক্ষমতা গেলে মুসলিমদের জন্য যে ভয়ানক বিপদ নেমে আসবে সেটি বহু আলেম, মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ টের না পেলেও সেটি টের পেয়েছিলেন দার্শনিক আল্লামা মহম্মদ ইকবাল। সে বিপদটি যে শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হবে না, বরং ভয়ানক রূপে নিবে সংস্কৃতির ময়দানে –তা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র সংন্দেহ ছিল না। সে বিপদ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল হিন্দুদের রাজনৈতিক আধিপত্যের বাইরে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের সৃষ্টি। তাঁর সে দুর্ভাবনার সে চিত্রটি ফুটে উঠে ১৯৩৭ সালের ২০ শে মার্চ কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহকে লেখা তাঁর এক চিঠিতে। তিনি লিখেছিলেন, “ভারতীয় মুসলিমদের মূল সমস্যাটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং বড় সমস্যাটি হলো সাংস্কৃতিক। মুসলিমদের সাংস্কৃতিক সমস্যার সমাধান অখণ্ড ভারতের কাঠামোয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শাসনাধীনে থেকে সম্ভব নয়।” (সূত্র: জিন্নাহর প্রতি আল্লামা ইকবালের পত্রাবলী)। এ ভাবনা নিয়েই ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তানে গড়ার প্রস্তাব দেন। একজন মুসলিম তার অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান ইউরোপ, আমেরিকা বা অন্যকোন সমৃদ্ধ দেশে চাকুরি নিয়ে মেটাতে পারে। কিন্তু তাতে তার সাংস্কৃতিক প্রয়োজন মেটে না। সাংস্কৃতিক সমস্যার সমাধানে ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে হয়। কারণ সংস্কৃতি খাদ্য-পানীয়, আলো-বাতাস, ভূমি বা জলবায়ুর উপর ভিত্তি করে উঠে না। সেটি সম্ভব হলে একই ভূখন্ডে বসবাসকারি হিন্দু, মুসলিম, খৃষ্টান ও বৌদ্ধদের সংস্কৃতি এক হতো। এখানে কাজ করে একটি দর্শন। আর সে দর্শনের পিছনে কাজ করে ধর্মীয় শিক্ষা ও চেতনা। সে ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র শুধু জরুরি নয়, অপরিহার্য। শত বাধা অতিক্রম করে ও বহু রক্ত ব্যয় করে এমন একটি রাষ্ট্র নবীজী (সাঃ) নিজে নির্মাণ করে সেটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

 

সংস্কৃতির শক্তি

প্রশ্ন হলো, সংস্কৃতি কি? সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিপদই বা কি? মানুষ যেভাবে বাঁচে সেটাই তার সংস্কৃতি। বাঁচবার মধ্যে সভ্য মানুষের জীবনে আসে লাগাতর সংস্কার, এবং সে সংস্কার থেকেই তার সংস্কৃতি। পশুর জীবনে সেরূপ সংস্কার নাই, তাই সংস্কৃতিও নাই। সেটি না থাকার কারণে হাজার বছর আগের পশুটি যে ভাবে বাঁচতো আজকের পশুটিও সে ভাবেই বাঁচে। সংস্কারের সে প্রক্রিয়াকে ইসলাম তীব্রতর করে, এখানেই ইসলামের শক্তি। সে শক্তির বলে মরুর অসভ্য মানুষগুলো ফেরেশতাতূল্য হতে পেরেছিলেন।  সমগ্র মানব ইতিহাসে আর কোন কালেই এরূপ শক্তিশালী সাংস্কৃতিক শক্তির জন্ম হয়নি। ইসলামের হাতে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক সভ্যতা গড়ে উঠার কারণ তো এটাই। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ গড়ে উঠে তো সংস্কৃতির গুণে। বিশ্বাসী মুসলিম এবং মুর্তিপুজারি হিন্দু একই লক্ষ্যে এবং একই সংস্কার নিয়ে বাঁচে না, তাই তাদের সংস্কৃতিও এক নয়। বাঙালীর হিন্দু ও বাঙালী মুসলিম একই গ্রামে বা একই মহল্লায় বাস করলেও উভয়ের সংস্কৃতি এজন্যই এক নয়। উলঙ্গ ও অশ্লিল মানুষটির মাঝে সংস্কার নেই, সে বাঁচে আদিম প্রস্তর যুগের আচার নিয়ে। ফলে তার সংস্কৃতিও নেই।

সংস্কৃতি হলো মানুষের বাঁচাকে সভ্যতর করার এক লাগাতর প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়াকেই আরবী ভাষায় তাহজিব বলা হয়। এটি হলো ব্যক্তির কর্ম,রুচী,আচার-আচারণ, পোষাক-পরিচ্ছদ ও সার্বিক জীবন যাপনের প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধিকরণ। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ রিফাইনড হয় তথা পরিশুদ্ধি পায়। দিন দিন সুন্দরতম হয় তার রুচিবোধ, আচার-আচরণ, কাজকর্ম ও চরিত্র। মুসলিমের ইবাদত ও সংস্কৃতি -এ দুটোর মূলে হলো তার ঈমান। ঈমানের বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে তার ইবাদত ও সংস্কৃতিতে। যেখানে ঈমান নেই, সেখানে ইবাদত যেমন নাই তেমনি সংস্কৃতিও নাই্। অপরদিকে যখন ঈমানে জোয়ার আসে তখন শুধু আল্লাহ তায়ালার ইবাদতই বাড়ে না, সংস্কৃতিও সমৃদ্ধতর হয়। ঈমান শুধু তার আত্মীক পরিশুদ্ধি দেয় না,বরং পরিশুদ্ধি আনে তার রুচি, আচার-ব্যবহার, পানাহার, পোষাক-পরিচ্ছদ এবং চেতনা ও চৈতন্যে। পরিশুদ্ধি আসে তার অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও। এভাবেই মুসলিমের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে শুরু হয় উচ্চতর সংস্কৃতির নির্মাণ।

রাষ্ট্রের কাজ স্রেফ রাস্তাঘাট,স্কুল-কলেজ ও কলকারাখানা গড়া নয়। দেশ-শাসন ও বিচারকার্য পরিচালনাও নয়। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো, জনগণকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানো ও তাদেরকে জান্নাতে নেয়া। হাজার কোটি টাকা দানেও এতো বড় উপকার হয়না। এবং সে লক্ষ্যে জরুরি হলো, জনগণের ঈমান-বৃদ্ধি ও ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির নির্মাণ। সে কাজে কোর’আনী জ্ঞানের প্রসার যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি হলো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও পাপাচারের নির্মূল। সমাজে পাপাচার বাঁচিয়ে যেমন সমাজে সংস্কার আনা যায় না, তেমনি ব্যক্তির জীবনেও তাতে পরিশুদ্ধি আসে না। তাই মুসলিমগণ যেখানে রাষ্ট্র গড়েছে সেখানে শুধু মসজিদ-মাদ্রাসাই গড়েনি, সংস্কৃতিকেও সমৃদ্ধ করেছে।এবং দূর করেছে অপসংস্কৃতিকে। এভাবে সভ্যতার নির্মাণে লাগাতর ভূমিকা রাখতে হয়েছে। নবীজী(সাঃ)র এটাই বড় সূন্নত। সাহাবাদের জানমালের সবচেয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে একাজে। এমন এক মহৎ লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের নির্মাণ উপমহাদেশের মুসলিমদের কাছে অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু সেটি অনাসৃষ্টি গণ্য হয় ইসলামের শত্রুপক্ষের কাছে।

মহান আল্লাহতায়ালার অবাধ্যদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে কোর’আনের জ্ঞান ও আল্লাহর শরিয়তী বিধানই যে শুধু অবহেলিত হয় -তা নয়; বরং উলঙ্গতা,অশ্লিলতা এবং নাচগানের ন্যায় পাপাচারও তখন শিল্পকলা রূপে গণ্য হয়। জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার জন্য গড়া হয় শত শত পথ।  শয়তানের মিশন তখন ষোল কলায় পূর্ণ হয়। মহান আল্লাহতায়ালার অবাধ্য শক্তিটি মুসলিমদের হাত থেকে যে শুধু কোর’আন কেড়ে নেয় -তা নয়। বরং কেড়ে নেয় সত্যিকার মুসলম রূপে বেড়ে উঠার সকল পদ্ধতি। মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার সে সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়াটিই হলো সংস্কৃতি। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনগণ যেভাবে নিষ্ঠাবান মুসলিম রূপে বেড়ে উঠেছে -সেটি কি কোন মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কারণে? বরং সেটি মুসলিম রাষ্ট্রে বিদ্যমান ইসলামী সংস্কৃতির কারণে। ইসলামি রাষ্ট্র বিলুপ্ত হলে বা ইসলামের বিপক্ষ শক্তির হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলো বিলুপ্ত হয় সে সংস্কৃতি। সংস্কৃতির ময়দানে তখন শুরু হয় উল্টো স্রোত। ইসলামের শত্রুশক্তি এজন্যই ইসলাম থেকে মুসলিমদের ফেরাতে মুসলিম দেশের রাজনীতির উপর দখলদারি চায়। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলির রাজনীতিতে কাফের শক্তির বিনিয়োগটি এজন্যই অধিক। আজকের বাংলাদেশ মূলত তাদের হাতেই অধিকৃত। যারা এ দেশটির শাসক তারা স্বাধীন নয়, বরং বিজয়ী বিদেশীদের পদসেবী এজেন্ট বা প্রতিনিধি মাত্র। বাংলাদেশের উপর ভারত সে বিজয়টি পেয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ১৯৭২’য়ে তারা সৈন্য সরিয়ে নিলেও তাদের এজেন্টদের অপসারণ করেনি। বরং এজেন্ট প্রতিপালনে প্রতি বছর যেমন শত শত কোটি টাকা ব্যয় করছে, তেমনি বহুশত কোটি টাকা ব্যয় করে প্রতিটি নির্বাচনে তাদেরকে বিজয়ী করতে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভারত তার আওয়ামী বাকশালী এজেন্টদের বিজয়ে যে বিপুল অর্থব্যয় করেছিল সে খতিয়ানটি দিয়েছে লন্ডনের বিখ্যাত পত্রিকা “দি ইকোনমিসস্ট”। আর এখন সে দখলদারীটি স্থায়ী করতে জনগণের ভোটের অধিকারও কেড়ে নিয়েছে।

 

শত্রু শক্তির বিনিয়োগ ও ইসলাম-বিনাশী নাশকতা

মুসলিম দেশেও অমুসলিমদের বিনিয়োগ প্রচুর। তবে সেটি অর্থনীতির ময়দানে নয়। সেটি বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির ময়দানে। সে বিনিয়োগের অর্থে বাংলাদেশের মত দেশে ফুলে ফেঁপে উঠেছে বহু হাজার এনজিও। উঁই পোকার মত এরা ভিতর থেকে শিকড় কাটে। বাংলাদেশের মুসলিমদের উপর ভারতের সে বিনিয়োগটির শুরু একাত্তর থেকে নয়, বরং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরের দিন থেকে। সে বিনিয়োগটিই প্রকাণ্ড ফল দেয় ১৯৭১ সালে এসে। বাংলাদেশের ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের কাছে ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার হলো সাম্প্রদায়িকতা। সে যুক্তিটি দেখিয়ে ভারতীয় হিন্দুরা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা রুখতে চেয়েছে। এখনো সে কথাটিই বাংলাদেশী সেক্যুলারিস্টগণ ভারতীয়দের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলে। অথচ ভারতে উগ্র হিন্দুদের হাতে হাজার হাজার মুসলিম যে গণহত্যা ও গণধর্ষণের শিকার হচ্ছে এবং বিধ্বস্ত হচ্ছে মসজিদ -তার বিরুদ্ধে তারা কথা বলে না।

তাদের কাছে রাষ্ট্র নির্মাণে প্যান-ইসলামী চেতনা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি গ্রহণযোগ্য নয় ইসলামী শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও। প্যান-ইসলামী চেতনা গুরুত্ব পেলে অবাঙালী মুসলিমগণও তো তখন বাঙালী মুসলিমের কাছে ভাই রূপে গৃহীত হয়। তখন মৃত্যু ঘটে বাঙালী জাতীয়তাবাদের হারাম রাজনীতির। আর দেশের আদালতে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেলে তো তাদের ন্যায় হারাম রাজনীতির অপরাধীদের স্থান হতো কারাগারে অথবা কবরস্থানে। কারণ, তাদের অপরাধ তো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে যুদ্ধের। গুরুতর অপরাধ এখানে মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার। শরিয়তী আইনে এটি হত্যাযোগ্য অপরাধ। একাত্তরের চেতনাধারিদের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানের ধ্বংস ছিল না। মূল লক্ষ্যটি ছিল ইসলামী চেতনার বিনাশ। লক্ষ্য ছিল যেমন জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো; তেমনি রাষ্ট্রকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো। ক্ষমতা হাতে পাওয়ায় তারা রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনিক শক্তিকে পরিণত করেছে ইসলামি চেতনা নির্মূলের হাতিয়ারে। একাত্তরের চেতনাধারিরা তাদের এ মিশনে সবচেয়ে বড় সাহায্য্যটি যে শুধু ভারত থেকে পায় তা নয়, বরং পায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট, ইউরোপীয়ান ইউনিয়নসহ বিশ্বের তাবত ইসলামবিরোধী শক্তি থেকে। তাদের কাছে ইসলামের প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগই হলো মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস। তারা ইসলামের বিজয় রোধে যে কোন নৃশংস স্বৈরাচারকে মেনে নিতে রাজী আছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্বর শাসকগণ তো বেঁচে আছে তাদের সর্বপ্রকার সাহায্য নিয়েই। সেরূপ স্বৈরাচারপ্রীতির কারণেই মিশরের সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রসিডেন্ট ড. মহম্মদ মুরসীকে যখন সামরিক ক্যুর মাধ্যমে সরিয়ে দেয়া হলো -পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গ সেটিকে সমর্থণ করতে দেরী করেনি।

যে বিশেষ এজেন্ডার উপর বিশ্বের তাবত ইসলামবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে অটুট একতা সেটি হলো, মুসলিম দেশের আদালতে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা। কারণ, শরিয়ত প্রতিষ্ঠার মধ্যে তারা একটি প্রতিপক্ষ সভ্যতার নির্মাণ দেখতে পায়। সভ্যতার সংঘাতের লড়াইয়ে এমন একটি শক্তিতে তারা নিজেদের প্রতিপক্ষ গণ্য করে। সভ্যতার এ লড়াইয়ে যারাই ইসলামের বিপক্ষে তারাই তাদের মিত্র। আওয়ামী বাকশালীরা তো এজন্য ভারতীয় শাসকচক্রের এত কাছের। ইসলামের বিজয় রুখতে তারা জনগণকে তাদের সৃষ্ট পাপাচারের জোয়ার ভাসিয়ে নিতে চায়। সেটিকে তারা বলে আধুনিকতা। এজন্যই সেক্যুলার সরকারগুলোর এজেন্ডা সুনীতির প্রতিষ্ঠা যেমন নয়, তেমনি পাপাচারের নির্মূলও নয়। নর্দমার কীট যেমন আবর্জনায় পরিপুষ্টি পায়, এরাও তেমনি পরিপুষ্টি পায় দুর্নীতিতে। ফলে বাংলাদেশে এদের মুল কাজটি হলো, পাপাচারে ও দুর্নীতি দেশটিকে দ্রুত নীচে নামানো। সে মিশনে এরা যে কতটা সফল -সেটি তারা প্রমাণ করেছে পৃথিবীর দুইশতটি দেশটির মাঝে দুর্নীতিতে ৫ বার প্রথম হওয়ার মধ্য দিয়ে।

 

সাংস্কৃতিক সংকট

শুধু কালেমা পাঠে সংস্কৃতবান মানুষ সৃষ্টি হয় না। সেজন্য তাকে সংস্কারের একটি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। বহু বীজ যেমন গজিয়ে শেষ হয়ে যায়, তেমনি বহু মানুষের জীবনে কালেমা পাঠ থাকলেও পরিপূর্ণ মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাটি হয়না। বাংলাদেশে বহু মুসলিম তো মুখে কালেমা পাঠ করলেও বেড়ে উঠেছে হিন্দু সংস্কৃতি নিয়ে। সংস্কারের চাষাবাদটি হয় চেতনারাজ্য, মুসলিমদের  জীবনে সেখানে কাজ করে কোর’আনী দর্শন। কোর’আনের জ্ঞানার্জন এজন্যই ইসলামে ফরয। যেখানে সে জ্ঞান নাই, সেখানে সে সংস্কারও নাই। তখন অসম্ভব হয় মুসলিম হওয়া। অথচ সে কোর’আনী জ্ঞানে যার জীবন সমৃদ্ধ তাঁর জীবনে সংস্কারটি আসে বিশাল আকারে। ঈমানদারের জীবনে সে সংস্কারের চুড়ান্ত পর্বটি হলো আল্লাহর রাস্তায় অর্থদান, শ্রমদান, মেধাদান ও প্রাণদান। তাই যে সমাজে কোর’আনের চর্চা যত অধিক -সে সমাজে ততই বেড়ে উঠে আল্লাহর পথে মোজাহিদ এবং শহীদের সংখ্যা। সে জ্ঞানে শূন্যতা দেখা দিলে বিপুল সংখ্যায় বেড়ে উঠে দুর্বৃত্তরা। ইসলামের শত্রু পক্ষ সেজন্যই ইসলামের পথে বেড়ে উঠার পদ্ধতিটি রুখতে চায়। তাদের আগ্রহ তাই মুসলিম চেতনায় অশিক্ষা ও অজ্ঞতার আবাদে। শিক্ষার নামে তারা ভ্রষ্টতা বাড়ায়। এমন একটি বিধ্বংসী শিক্ষা ব্যবস্থার কারণেই বাংলাদেশের মত দেশে সবচেয়ে চরিত্রহীন হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারীগণ। বাংলাদেশকে এরাই দুর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম করেছে। ঈমান ধ্বংসের এমন একটি প্রকল্পকে সামনে রেখেই সাবেক সোভিয়েত রাশিয়া মুসলিমদের জন্য কোর’আনের জ্ঞানদান বন্ধ করেছিল। তালা ঝুলিয়েছিল মসজিদ­-মাদ্রাসায়। চীন সে কাজটি করছে উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে। অপরদিকে একই রূপ উদ্দেশ্য নিয়ে আজ মার্কিনীগণ মুসলিম দেশে সিলেবাস নিয়ন্ত্রণে নেমেছে।  বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ তেমনি একটি উদ্দেশ্য নিয়েই পীর-ফকির ও  আউল-বাউলদের খুঁজছে। আজ থেকে কয়েক শত বছর আগে ইসলামের বিজয় রুখার সে তাগিদে তারা চৈতন্যদেবকে হাজির করেছিল।

সংস্কৃতি বস্তুত চেতনা ও চরিত্র গড়ার বিশাল ইন্ডাস্ট্রী। এটি পরিবার, সমাজ, পথ-ঘাট, স্কুল-কলেজ তথা দেশের সর্বত্র জুড়ে মানব মনে নীরবে কাজ করে। সংস্কৃতির অঙ্গণে জ্ঞান, ধর্মীয় আচার, সাহিত্য, ঐতিহ্য, ইতিহাস, মূল্যবোধ ও বিবেকবোধ একত্রে কাজ করে। ইসলামী সংস্কৃতিই মূলত মু’মিনকে ইসলামি সভ্যতার নির্মাণে নিরলস সৈনিকে পরিণত করে। তখন তার কর্ম, মূল্যবোধ, রুচিবোধ, পানাহার,রাজনীতি, পোষাক-পরিচ্ছদ ও তার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সংস্কারপ্রাপ্ত এক চেতনা ও জীবনবোধ। প্রকাশ পায় তার আল্লাহভীরুতা। এখানে কাজ করে আল্লাহর কাছে প্রিয়তর হওয়ার প্রবল আগ্রহ। প্রিয়তর হওয়ার সে প্রবল আগ্রহ থেকেই ঈমানদার ব্যক্তি তাঁর জান, মাল ও সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগে জিহাদের ময়দান খুঁজে। জিহাদ এভাবেই মু’মিনের সংস্কৃতির অবিচ্ছদ্য অঙ্গে পরিণত হয়। ঈমানদারের চিন্তুা ও কর্মে এভাবেই আসে পবিত্রতা -যা একজন কাফের বা মুনাফিকের জীবনে কল্পনাও করা যায় না। মুসলিম সমাজে এভাবেই আসে শান্তি, শৃঙ্খলা ও শ্লিলতা। অথচ সেক্যুলারদের জীবনে সেটি আসে না। বরং সেক্যুলার সমাজে যেটি প্রবলতর হয় সেটি পার্থিব স্বার্থ হাসিলের প্রেরণা। জীবন-উপভোগে মানুষ এখানে প্রচণ্ড স্বেচ্ছাচারি হয়। সে স্বেচ্ছাচারকে ব্যক্তি-স্বাধীনতার লেবাস পড়িয়ে জায়েজ করে নিতে চায়। সেক্যুলার সমাজে পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, পর্ণছবি, সমকামিতা, অশ্লিলতা, মদ্যপানের ন্যায় নানাবিধ পাপাচার বৈধ্যতা পায় জীবন উপভোগের এমন স্বেচ্ছাচারি প্রেরণা থেকেই। সেক্যুলারিজম প্রবলতর হলে পাপাচারে এজন্যই প্লাবন আসে। বাংলাদেশ আজ তেমনি এক প্লাবনে নিমজ্জমান। দুর্নীতির দ্রুত বৃদ্ধির কারণ তো এটাই।

 

লড়াই শত্রুমূক্ত স্বাধীনতার

আজকের বাংলাদেশে ভৌগলিক ভাবে অধিকৃত নয়। তবে এ মুসলিম ভূমিতে অধিকৃতিটি সাংস্কৃতির। এরূপ সাংস্কৃতিক অধিকৃতিই অসম্ভব করেছে সত্যিকার মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। আর সে অধিকৃতিটি ইসলামের শত্রুপক্ষের। মুসলিম রূপে বেঁচে থাকা ও বেড়ে উঠার জন্য ঘরবাঁধা, চাষাবাদ করা, রাস্তা নির্মাণ বা কলকারখানা গড়াই সবকিছু নয়। পানাহারে জীবন বাঁচে বটে, তাতে ঈমান বাঁচে না। স্রেফ দেহ নিয়ে বাঁচার মধ্য দিয়ে সিরাতুল মোস্তাকিম নাই; সেরূপ বাঁচাতে বাড়ে পথভ্রষ্টতা। সে পথভ্রষ্টতায় বিপন্ন হয় আখেরাতের জীবন। ইহকাল ও পরকাল বাঁচাতে এজন্যই একজন চিন্তাশীল মানুষকে বেড়ে উঠতে হয় জীবন-বিধান, মূল্যবোধ, জীবন ও জগত নিয়ে একটি সঠিক ধারণা নিয়ে। নিত্যদিন বাঁচবার সে কোর’আন ভিত্তিক প্রক্রিয়াটি হলো ইসলামী সংস্কৃতি। তবে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্য যা অপরিহার্য -তা হলো শত্রুমূক্ত স্বাধীনতা।

১৯৪৭’য়ের আগে ভারতীয় মুসলিমদের প্রতিপক্ষ শুধু সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশগণ ছিল না, প্রবল প্রতিপক্ষ ছিল হিন্দুরাও। আল্লামা ইকবাল চেয়েছিলেন শুধু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের থেকে মুক্তি নয়, হিন্দুদের থেকেও মুক্তি। উভয়ের থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন হতে পরামর্শ দেন। এজন্যই আল্লামা ইকবালকে বলা হয় পাকিস্তানের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা। ইকবালের ধারণা যে কত নির্ভূল ছিল তার প্রমাণ আজকের ভারতীয় মুসলিমগণ। সংখ্যায় তারা পাকিস্তানের সমূদয় জনসংখ্যার চেয়ে অধিক, ইন্দোনেশিয়ার পরই তাদের অবস্থান। কিন্তু এতবড় বিশাল জনসংখ্যার সফলতা কোথায়? কিছু অভিনেতা, কিছু গায়ক-গায়ীকা, কিছু খেলোয়াড় সৃষ্টি করতে পারলেও তারা কি ইসলামী চেতনাসমৃদ্ধ মোজাহিদ, দার্শনিক ও আলেমের সৃষ্টি করতে পেরেছে? শুধু করাচীর ন্যায় পাকিস্তানের একটি মাত্র শহরে যে সংখ্যক আলেম, লেখক, বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, আইনবিদ, প্রফেসর, ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোগী ব্যক্তি সৃষ্টি হয়েছে -তা কি ভারতের সমগ্র মুসলিমগণ সৃষ্টি করতে পেরেছে। হাজার হাজার পাকিস্তানীরা প্রাণ দিয়েছে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত রাশিয়াকে হঠাতে। জিহাদের সে পবিত্র ময়দানে মোজাহিদ এসেছে সূদুর আফ্রিকা থেকে। কিন্তু ক’জন ভারতীয় মুসলিম সে জিহাদে যোগ দিয়েছে? অথচ মুসলিমের জীবনে জিহাদ তো অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতি; তাতে ব্যক্তির ঈমান দেখা যায়। ঈমান যে জীবনে বলিষ্ঠ এবং চেতনার সংস্কার যেখানে চুড়ান্ত, জিহাদ তখন অনিবার্য। কোন ভৌগলিক সীমান্ত দিয়ে কি সে জিহাদ সীমিত রাখা যায়? অথচ সে ইসলামও ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি।

ভারত যে স্ট্রাটেজী নিয়ে ভারতীয় মুসলিমদের শক্তিহীন করেছে -সে স্ট্রাটেজী নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলিমদের বিরুদ্ধেও। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলমান এ সাংস্কৃতিক যুদ্ধে ভারত একা নয়। কাজ করছে এক বিশাল কোয়ালিশন। এ কোয়ালিশনে ভারতের সাথে সমগ্র পাশ্চাত্য বিশ্ব এবং ইসরাইল। শত্রুপক্ষের সে অভিন্ন কোয়ালিশনটি একই যুদ্ধ লড়ছে আফগানিস্তান, ইরাক ও ফিলিস্তিনে। বাংলাদেশের রণাঙ্গনে তারা অতি-উৎসাহী সহযোদ্ধা রূপে পেয়েছে দেশটির বিপুল সংখ্যক সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক ক্যাডার, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী, লেখক-সাংবাদিক, আইনজীবী, বিচারপতিসহ বহু সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে। বিশ্ব-রাজনীতির অঙ্গণ থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার বিদায়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল তাদের পথের কাঁটা এবার দূর হলো। তাদের আধিপত্য বিস্তৃত হবে এবার বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সেটি হয়নি। একমাত্র আফগানিস্তান দখলে রাখতেই তাদের হিমশিম খেতে হচেছ। পরাজিত হয়েছে ইরাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ন্যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শেষ হতে ৫ বছর লেগেছিল। কিন্তু বিগত ২০ বছর যুদ্ধ লড়েও মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৪০টিরও বেশী দেশের কোয়ালিশ বাহিনী আফগানিস্তানে বিজয় আনতে পারিনি। বরং দ্রুত এগিয়ে চলেছে পরাজয়ের দিকে। এখন তারা জান বাঁচিয়ে পালাবার রাস্তা খুঁজছে।

 

স্ট্রাটেজী ইসলাম বিকৃতির ও অপসংস্কৃতির

পাশ্চাত্যের কাছে সুস্পষ্ট, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, লিবিয়া, লেবানন, সোমালিয়ার মত ক্ষুদ্র দেশগুলো দখল করা এবং সেগুলোকে কন্ট্রোলে রাখার সামার্থ্যও এখন তাদের নাই। অধিকৃত দেশগুলোতে যে প্রতিরোধের মুখে তারা হারতে বসেছে –সে যুদ্ধের মূল হাতিয়ারটি যুদ্ধাস্ত্র নয়। সেটি জনবল বা অর্থবলও নয়। বরং সেটি কোর’আনী দর্শন ও ইসলামের সনাতন জিহাদী সংস্কৃতি। এ দর্শন ও সংস্কৃতিই যুগে যুগে মুসলিমদের জন্য আত্মসমর্পণকে অসম্ভব ও অচিন্তনীয় করে। এবং মুসলিম চেতনায় অতি কাম্য গণ্য করে আগ্রাসী শত্রুর বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই ও শাহাদত। এমন চেতনা এবং সংস্কৃতির বলেই অতীতে মুসলিমগণ রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছিল। এ যুগেও তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ও বিশ্বশক্তি  রাশিয়াকে পরাজিত করেছে। এবং এখন গলা চেপে ধরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। আফগান মোজাহিদদের জিহাদ তাই পাল্টে দিয়েছে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ। কামান, বোমা ও যুদ্ধবিমানের বলে গণহত্যা চালানো যায়। নগর-বন্দরও ধ্বংস করা যায়। কিন্তু সে কামানে বা গোলায় কি দর্শন ও সংস্কৃতির বিনাশ সম্ভব? বরং তাদের আগ্রাসন ও গণহত্যার ফলে প্রতিরোধের সে দর্শন ও সংস্কৃতিই দিন দিন আরো বলবান হচ্ছে। কোন একজন মার্কিনী সৈনিককে রণাঙ্গণে রাখতে মাথাপিছু প্রায় ১০ লাখ ডলার খরচ হয়। অথচ মুসলিমগণ জিহাদের ময়দানে হাজির হচ্ছে নিজ খরচে। স্বেচ্ছায় তারা শুধু অর্থই দিচ্ছে না, প্রাণও দিচ্ছে।

অবস্থা বেগতিক দেখে পাশ্চাত্য এখন ভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়েছে। সেটি শুধু দেশদখল ও গণহত্যা নয়। নিছক নগর-বন্দর, ঘরবাড়ী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনাশও নয়। বরং সেটি ইসলামি দর্শন ও সংস্কৃতি ধ্বংসের। কোর’আনে ঘোষিত বিশুদ্ধ ইসলাম ও সে ইসলামের অনুসারিদেরকে তারা শত্রু মনে করে। তাদেরকে চিত্রিত করছে সন্ত্রাসী রূপে। তারা চায়, মুসলিম বেঁচে থাকুক এমন এক ইসলাম নিয়ে যে ইসলামে জিহাদ নেই, শরিয়তের বিধান নাই এবং সূদ-ঘুষ-মদ্যপান ও ব্যভিচারের ন্যায় পাপাচারগুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধও নাই। এবং যুদ্ধ নাই সাম্রাজ্যবাদী দখলদারির বিরুদ্ধে। তেমন একটি ইসলামের প্রচার বাড়াতে তাদের স্ট্রাটিজীটি হলো ইসলাম বিকৃতিকরণের। এমন বিকৃত ইসলামকে তারা বলছে প্রকৃত ইসলাম। সেটিকে বলছে মডারেট ইসলাম। সে ইসলামকে জনমনে প্রতিষ্ঠা দিতে শুরু করেছে প্রকান্ড এক সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। কাঙ্খিত সে সংস্কৃতিটি মূলত পাপাচারের সংস্কৃতি। এটি মূলত নিরপরাধ মানুষ হত্যার পাশাপাশি ঈমান হত্যার স্ট্রাটেজী।

বাংলাদেশের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশই এখন ইসলামের শত্রুশক্তির পক্ষ থেকে এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক যুদ্ধের শিকার। তবে বাংলাদেশ তাদের অন্যতম টার্গেট হওয়ার কারণ, দেশটিতে ১৬ কোটি মুসলিমের বাস। তেল, গ্যাস বা অন্য কোন খনিজ সম্পদের চেয়ে ১৬ কোটি মুসলিম জনসংখ্যার ফ্যাক্টরটিই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেল, গ্যাস বোমায় পরিণত হয়না, কিন্তু মানুষ হয়। মাত্র ১৭ জন মুসলিম সৈনিক আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে বাংলাসহ সমগ্র পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রই পাল্টে দিয়েছিল। যে চেতনা নিয়ে ১৭ জন মুসলিম সৈনিক বাংলা জয় করেছিল সে চেতনায় ১৬ কোটি মুসলিম জেগে উঠলে সমগ্র ভারতের মানচিত্র পাল্টে যাবে -সেটি ইতিহাসের যে কোন পাঠকই বুঝতে পারে। ভারতও সেটি বুঝে। তাই না চাইলেও ভারতের এ আগ্রাসনের টার্গেট হওযা থেকে বাঁচার উপার নাই। স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে হলে তাই লড়াই করেই বাঁচতে হবে।

ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের লড়াইটি সব সময়ই লাগাতর। শত্রুর পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেয়া এমন যুদ্ধ থেকে খোদ নবীজী (সা:)ও বাঁচতে পারেননি। মাত্র ১০ বছরে তাকে ছোট-বড় ৩০টির বেশী যুদ্ধ করতে হয়েছে। এমন যুদ্ধে শত্রুর লক্ষ্য, শুধু দৈহিক নির্মূল নয়, ঈমান হত্যাও। তাই চলমান এ যুদ্ধে পরাজিত হলে অতি কঠিন হবে বাংলাদেশী মুসলিমদের ঈমান নিয়ে বাঁচা। তাতে সংকটে পড়বে তাদের আখেরাতের জীবনও। তবে শত্রুর কাছে যারা আত্মসমর্পিত তাদের জীবনে যুদ্ধ আসে না। যা আসে তা হলো লাগাতর গোলামী। পোষা কুকুরে ন্যায় তাদের গলায় তখন শোভা পায় পরাধীনতার শিকল। তাজুদ্দীনের আমলে সে শিকলটি ছিল ভারতের সাথে ৭ দফা চুক্তির, আর মুজিবামলে সেটি ছিল ২৫ সালা চুক্তির। তবে গৃহপালিত বা আত্মবিক্রীত হলে আর চুক্তি লাগে না। এমন গোলামদের কাছে দাসত্ব তখন জীবন-সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশের আওয়ামী বাকশালীদের জীবনে তো সেটাই ঘটেছে।

 

যে যুদ্ধের শেষ নেই

বাইবেল, তাওরাত বা বেদ-উপনিষদের জ্ঞান দিয়ে মুসলিমদের বিভ্রান্ত করা অসম্ভব। অসম্ভব মুসলিম জনপদে পাদ্রী বা পুরোহিতদের নামিয়ে। ব্রিটিশ শাসকেরা সেটি জানতো। জানে আজকের ভারতীয় হিন্দু শাসকগণও। ফলে ইসলামের বিরুদ্ধে তারা সৈন্য নামিয়েছে ধার্মিক মুসলিম বা ইসলামী শিক্ষার ছ্দ্দবেশে। যুগে যুগে ইসলামের শত্রুপক্ষের এটাই কৌশল। মুসলিমদের মাঝে কাউকে নামিয়েছে মুসলিম নামধারী আলেমের বেশে, কাউকে বা রাজনীতিবিদ বা বুদ্ধিজীবীর বেশে। তেমন এক স্ট্রাটেজী নিয়ে ব্রিটিশগণ ভারতে আলিয়া মাদ্রাসা খুলেছিল। দেশে দেশে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে এসব মুসলিম নামধারিদের হাতে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে সূদী লেনদেন, ঘুষ, বেপর্দা ও অশ্লিলতা,সেক্যুলার রাজনীতি, পতিতাপল্লি, মদ্যপান ও ব্যভিচারের ন্যায় নানা দুর্বৃত্তি বিনা প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তো তাদের কারণেই। এরাই অতীতে মুসলিমদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করেছিল জিহাদের ন্যায় ইসলামের মূল শিক্ষাকে। ফলে নিরাপদ হয়েছিল ব্রিটিশদের ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন।

ইসলামে বিরুদ্ধে অতীতের সফল স্ট্রাটেজী নিয়ে শত্রুগণ আবার ময়দানে নেমেছে বাংলাদেশে। এখন সে স্ট্রাটেজীর বাস্তবায়নে তারা ব্যবহার করতে চায় জনগণের নিজ অর্থে প্রতিষ্ঠিত হাজার হাজার স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সেক্যুলারিষ্টদের সহায়তায় ইতিমধ্যই এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন তাদের হাতে অধিকৃত। অধিকৃত দেশের অধিকাংশ মিডিয়াও। শুরু হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রপাগান্ডা। তাদের কথা, ইসলাম এ যুগে অচল। ইসলামের নামে মুসলিমদের চৌদ্দশত বছর পিছনে নেয়া যাবে না। যেন কোর’আন নাযিল হয়েছিল শুধু নবীজী (সাঃ)’র উপর জামানার লোকদের জন্য। তারা শরিয়তকে বলছে মানবতাবিরোধী। ইসলামের বিরুদ্ধে সে প্রচারকে ব্যাপকতর করছে বাংলাদেশের বহু টিভি চ্যানেল,পত্র-পত্রিকা ও বই-পুস্তক। সেগুলির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছে হাজার হাজার এনজিও। এদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা হলো, নবীজী (সাঃ)’র আমলের ইসলামকে জনগণের মন থেকে ভূলিয়ে দেওয়া এবং মহান আল্লাহতায়ালার কোর’আনী হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করা।

 

লক্ষ্য জিহাদ বিলুপ্তি

বাংলাদেশের ভূমিতে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ই্‌উরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য দেশী-বিদেশী ইসলাম বিরোধী শক্তির সম্মিলিত স্ট্রাটেজী হলো, মুসলিমদের জীবন থেকে জিহাদের সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা। এবং ভূলিয়ে দেয়া ইসলামের মৌল শিক্ষাগুলোকে। অথচ ইসলাম থেকে নামায-রোযাকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি আলাদা করা যায় না জিহাদকেও। পবিত্র কোরআনে জিহাদে যোগ দেয়ার নির্দেশ এসেছে বার বার। অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। নবীজী (সাঃ) নিজে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ লড়েছেন বহুবার; এবং তিনি নিজে আহত হয়েছেন। ইসলামের বহুশত্রুকে হত্যা এবং বনু কুরাইজা ও বনু নাযির ন্যায় ইহুদী বস্তিকে নির্মূল করা হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। অথচ নবীজী (সাঃ)র সে আপোষহীন নীতি ও ইসলামের সে সংগ্রামী ইতিহাসকে তারা সুপরিকল্পিত ভাবে আড়াল করতে চায়। নামায-রোযা, হজ-যাকাতের বাইরেও শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও আইন-আদলতের সংস্কারে ঈমানদারের যে গুরুতর দায়ভার রয়েছে সেটিকেও তারা ভূলিয়ে দিতে চায়।

জিহাদই দেয় ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতিরক্ষা। সৈনিকদের হাত থেকে হাতিয়ার কেড়ে নিলে তারা শক্তিহীন ও প্রতিরক্ষাহীন হয়, তেমনি ঈমানদারগণ জিহাদশূণ্য হলে ইসলামের পক্ষে দাঁড়াবার কেউ থাকে। শত্রুপক্ষ তখন বিনা বাধায় নবীজী (সা:)’র ইসলাম ও মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধানকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয় তখন সর্বত্র জুড়ে। বাংলাদেশ তো তারই উদাহরণ। দেশটি ১৬ কোটি মুসলিমের সামনে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে যেরূপ বিদ্রোহ হচ্ছে এবং তাঁর শরিয়তী বিধান যেরূপ উপেক্ষিত হচ্ছে –তার মূল কারণ তো মুসলিম জীবনে জিহাদশূণ্যতা। সাহাবায়ে কেরামের যুগে মুসলিমদের সংখ্যা ছিল অতি নগন্য। কিন্তু তাদের সামনে আল্লাহর শরিয়তী বিধান এভাবে পরাজিত ও অপমানিত হয়নি। কারণ, নামায-রোযার সাথে তাদের জীবনে লাগাতর জিহাদও ছিল। অথচ বাংলাদেশে বিপুল বিজয়ীর বেশে ইসলামের শত্রুপক্ষ। মহান আল্লাহর বদলে রাষ্ট্রের মালিক-মোখতার হয়ে পড়েছে ইসলাম বিরোধী দুর্বৃত্তরা। অথচ এ বিশাল বিজয় আনতে শত্রুপক্ষকে একটি তীরও ছুঁড়তে হয়নি। কারণ, যুদ্ধটি হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির ময়দানে। এবং যুদ্ধটি লড়েছে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। নিজেদের রক্তক্ষয় ও অর্থব্যয় এড়াতে বাংলাদেশের ন্যায় একটি মুসলিম ভূমিতে এমন একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধকেই তারা লাগাতর চালিয়ে যেতে চায়। ফলে এ যুদ্ধের শেষ নাই। দেশটির সাংস্কৃতিক রণাঙ্গনে তাদের বিপুল সৈন্য সমাবেশ দেখে তা নিয়ে কি সন্দেহ করা চলে?  ১ম সংস্করণ ১৪/০৪/২০১২; ২য় সংস্করণ ০৫/০২/২০২১।

 




পত্রিকা কেন পড়ি এবং পত্রিকায় কেন লিখি?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

পত্রিকায় প্রকাশ পায় জাতীয় পরিচয়

পত্রিকায় লেখা এবং পত্রিকার পাঠকদের দেখে একটি জাতির চেতনা, চরিত্র ও সভ্যতার মান নিয়ে একটি নির্ভুল ধারণা পাওয়া যায়। এরূপ বিচারে জটিল হিসাব নিকাশের প্রয়োজন পড়েনা। যেমন ব্যক্তির স্বাস্থ্যের পরিচয় মেলে সে কি খায় বা পান করে -তা দেখে। ভেজাল খাদ্যে ও খাদ্যের আকালে আর যাই হোক সুস্বাস্থ্য আশা করা যায় না। অখাদ্য, কুখাদ্য ও দুঃর্ভিক্ষ কখনোই স্বাস্থ্য আনে না, বরং আনে রোগব্যাধি ও মহামারি। আর একটি দেশের মানুষ কি খায়, কি পান করে, কিসে তাদের রুচি -সে পরিচয় মেলে দোকানে পণ্যের আয়োজন দেখে। বিষয়টি তেমন পত্রিকার বেলায়ও। মানব মনের পুষ্টি বা অপুষ্টির সন্ধান দেয় পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলো। যারা দেশ চালায় এবং দেশবাসীর চিন্তা-চেতনা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত করে তারা তো হাজির হয় পত্রিকার পাতায়। চেতনার সমৃদ্ধিতে পত্রিকা যেমন জ্ঞানের বাণী ছড়াতে পারে, তেমনি চেতনাকে বিষাক্ত করার কাজে ছড়াতে পারে দুষিত চিন্তার ভয়ানক বিষও।

পত্রিকার মাধ্যমেই জনগণের চেতনা ও চরিত্র কথা বলে। বস্তুত জাতির চেতনা, চরিত্র ও কর্মের প্রতিচ্ছবি নিয়েই হলো পত্র-পত্রিকা। ফলে যে জাতি চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ, হাইজ্যাক, মাস্তানি, দুর্নীতি এবং আন্তর্জাতিক ভিক্ষাবৃত্তির মধ্য দিয়ে সংবাদ গড়ে -সে জাতির পরিচয় পেতে বিশ্বের অন্য গোলার্ধে বসেও অসুবিধা হয় না। পত্রিকার পৃষ্টায় শুধু সরকারের নয়, জনগণের প্রায়োরিটিও ধরা পড়ে। খবরের পাশা-পাশি খবরের প্রেক্ষাপট ও তার নায়কদেরও জানা যায়। শুধু র্কম নয়, কর্মের পিছনে যে ভাবনা কাজ করে -পত্রিকা সেটিকেও প্রকাশ করে। পত্রিকার পৃষ্টাগুলো হলো চিন্তা-ভাবনার জায়গা। এক সময় এ কাজ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে সীমিত ছিল, পত্রিকার বদৌলতে তা এখন জনসম্মুখে। ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞান এখন আর শুধু এ্যাকাডেমিক বিষয় নয়, সেটি এখন জনগণের বিষয়। পত্রিকার পৃষ্টাতে দেশের চিন্তাশীল মানুষেরা কথা বলে। তারা তুলে ধরে কিসে দেশের কল্যাণ ও অকল্যাণ -সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। বিচার-বিশ্লেষণ পেশ করে সরকারি ও বেসরকারী কর্মসুচীর। সাবধান করে চলতি ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে এবং সামনে কি ধরনের বিপদ ঘটতে পারে -সেগুলি নিয়ে। কিসে মঙ্গল এবং কিসে অমঙ্গল –সে কথাগুলোও তুলে ধরে। জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে কাদের কি ভাবনা, কাদের কি কর্মসুচি -সেটির সাথে এভাবেই পরিচয় ঘটে। সভ্য ও চিন্তাশীল মানুষের জন্য পত্রিকা পাঠ এজন্যই গুরুত্বপুর্ণ। শেখা ও শেখোনার কাজে স্কুল-কলেজের যে ভূমিকা, পত্রিকার ভূমিকা তা থেকে কম নয়। পত্রিকায় যারা লেখে তারা যেমন আমৃত্যু শিক্ষক, তেমনি যারা পত্রিকা পড়ে তারা হলো আমৃত্যু ছাত্র। 

 

পত্রিকার নাশকতা

পত্রিকার কল্যাণ যেমন বিশাল, তেমনি নাশকতার ক্ষমতাও কম নয়। সমাজের কল্যাণ নিয়ে সবাই ভাবে না, সবার কাছে সেটি প্রায়োরিটিও নয়। অনেকেই ভাবে শুধু তার নিজের স্বার্থ নিয়ে। হেরোইন ব্যবসায়ীর ন্যায় নেশাগ্রস্ত করার লোকও সমাজে প্রচুর। মানুষ বেশী বেশী নেশাগ্রস্ত হলে তাদের লাভ; তাতে তাদের খরিদদার বাড়ে। সুযোগ সন্ধানীরা জাতিকে যেমন বিভ্রান্ত করে, তেমনি সুযোগ পেলে যুদ্ধের দিকেও ধাবিত করে। কারণ যুদ্ধ বাড়লে তাদের  ব্যবসাও বাড়ে। বিপদের কারণ হলো, পত্রিকাগুলো এরূপ দুর্বৃত্তদের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। তখন বিপদটি আরো ভয়ানক। পানির পাইপ লাইনের ন্যায় কুচিন্তার বিষা্ক্ত ভাইরাসগুলোকে পত্র-পত্রিকা তখন জনগণের মগজে পৌঁছে দেয়। পত্রিকা তখন দুর্বৃত্তায়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়ে যায়। ফ্যাসিবাদ, বর্ণবাদ, ধর্মবিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষের ন্যায় বিষাক্ত বিশ্বাসগুলো তো এভাবেই বাজারে খরিদার পায়। তাছাড়া কোন দেশেই এমন দুর্বৃত্ত  মানুষের অভাব নাই যাদের আগ্রহ যুদ্ধ, রক্তাত্ব সংঘাত, চুরি-ডাকাতি, ধর্ষণ ও লুটপাট নিয়ে। কারণ সেগুলো তাদের সম্ভোগ ও উল্লাস বাড়ায়। বাংলাদেশে নৃশংস দুর্বৃত্তদের তেমন একটি উল্লাস দেখা গেছে ১৯৭১’য়ে। একাত্তরের যুদ্ধে এসব দুর্বৃত্তগণ পেয়েছিল বহু লক্ষ অবাঙালীর ঘরবাড়ী ও ব্যবসা-বানিজ্যের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠার সুযোগ। তারা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। তারা সুযোগ পেয়েছিল অবাঙালী মহিলাদের উপর অবাধ ধর্ষণের। এদের কারণে ঢাকার মহম্মদপুর, মীরপুরের ন্যায় দেশে সকল বিহারী বসতিগুলো পরিণত হয়েছে দুর্বৃত্তদের অভয়পুরিতে। বাংলাদেশের বুকে এগুলি ভয়ংকর পাপীদের বসতি।

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় প্রাণনাশের ঘটনাগুলো হিংস্র জীবজন্তু বা জীবাণূর কারণে হয়নি। সেগুলো হয়েছে বিষাক্ত চিন্তা-চেতনার নাশকতায়। বলা হয় দুটি বিশ্বযুদ্ধে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের প্রাণনাশ হয়। বহু লক্ষ ঘরবাড়ী এবং বহু হাজার নগরবন্দর মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। সে নাশকতার কারণ, ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশবাদের ভয়ানক ধারণাগুলো। এবং সে প্রাণনাশী ধারণাগুলোকে প্রচার দিয়েছিল পত্র-পত্রিকা। পত্রিকার কারণেই সে নৃশংস নাশকতার সাথে জনগণের সংশ্লিষ্টতা বেড়েছিল। পত্রিকাগুলো যথার্থ ভূমিকা নিলে এমন একটি বিশাল গণহত্যা থেকে বিশ্ববাসীকে বাঁচানো যেত।

রোগের মহামারি থেকে জনগণকে বাঁচাতে হলে জনগণের মনে সে রোগ সন্মদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হয়। তেমনি প্রাণনাশী ধ্যানধারণার বিরুদ্ধেও সচেতন সৃষ্টি করতে হয়। পবিত্র কোর’আনে তাই দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে শয়তানের পরিচয়টি তুলে ধরতে। দুর্বৃত্ত শক্তির লক্ষ্য, অভিসন্ধি ও কর্মসুচীর বিচার-বিশ্লেষণ এবং সেগুলো মানুষের তূলে ধরা তাই মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। সে সূন্নত পালিত না হলে বিপন্ন হয় মানবতা। নেমে আসে গণহত্য। এবং সে বিশ্লেষণ হতে হয় এসব দুর্বৃত্ত শক্তির পক্ষ থেকে যুদ্ধে শুরু হওয়ার পুর্বেই। সে কাজটি যথার্থ ভাবে করতে পারে পত্রিকা। কম্যুনিজম যে ব্যর্থ মতবাদ, সেটি আজ প্রমাণিত। অথচ এ সিদ্ধান্তে পৌঁছবার পুর্বেই মানবজাতির অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেছে। রাশিয়া ও চীনসহ বিশ্বের বহু দেশে বহু লক্ষ মানুষের তাতে প্রাণনাশ হয়েছে। একমাত্র কম্বোডিয়াতেই সে দেশের সিকি ভাগ মানুষ কম্যুনিস্টদের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এদের হাতে আফগানিস্তানে নিহতদের সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ। রাশিয়ার কম্যুনিষ্ট বিপ্লবে যত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বহুদেশের জনসংখ্যাও তত নয়। এ বিশাল ক্ষয়ক্ষতির কারণ, যথার্থ পর্যালোচনার পুর্বেই মতবাদটির পক্ষে যুদ্ধ করা হয়েছে।

 

পত্রিকার সামর্থ্য

ঔষধ বিষের চেয়েও মারাত্মক হতে পারে। তাই মানব দেহে প্রয়োগের পুর্বে অন্য জীবের দেহে ঔষধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল ছাপা হয় জার্নাল ও পত্র-পত্রিকায়। যে কোন দেশে এটিই সভ্য রীতি। সেরূপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয় উন্নয়নের বিভিন্ন মডেল ও মতবাদের ক্ষেত্রেও। অথচ কার্ল মার্কস মানবজাতির রোগ নিরাময়ে যে কম্যুনিজম আবিস্কার করলেন -তা সরাসরি প্রয়োগ করা হলো রাশিয়া ও চীনের বহু কোটি মানুষের উপর। সংশ্লিষ্ট দেশের পত্র-পত্রিকা এনিয়ে জনগণকে পর্যাপ্ত জ্ঞান দান করেনি। বিপদ কি হতে পারে –সেটিও বলেনি। বরং উস্কানী দিয়েছে দলীয় লিফলেটের ন্যায়। অথচ সবচেয়ে পুঁজিবাদী ও সর্বাধিক শ্রমিক-অধ্যুষিত দেশ হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটেন কম্যুনিজমের সে প্লাবন থেকে রক্ষা পেয়েছিল। ফলে প্রাণে বেঁচে যায় ব্রিটেনের লক্ষ লক্ষ মানুষ। এবং সেটি সম্ভব হয়েছিল দেশটির  দায়িত্বশীল পত্র-পত্রিকার কারণে। পত্রিকা সেদিন সংযোগ গড়েছিল জনগণের সাথে দেশটির প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের। জনগণের সামনে কম্যুনিজমের বিপদকে সেদিন পত্রিকার কলামিস্টগণ সফল ভাবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। ফলে জনগণ পেয়েছিল গভীর চিন্তাভাবনা ও বিচার বিশ্লেষণের সুযোগ। এতে জনগণ নিতে পেরেছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। 

পত্রিকার কাজ শুধু খবর ছাপা নয়, বরং খবরের কারণগুলোও অনুসন্ধান করা। নানা পথ ও মতের কথাও সঠিক ভাবে তুলে ধরা। মানবতাধ্বংসী মতবাদগুলোর নাশকতাও জনসম্মুখে প্রকাশ করা। প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশে সবচেয়ে বড় আদালতটি হলো জনগণের। এ আদালতে রায় দেয় খোদ জনগণ। সে আদালতের এজলাসে উঠে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক, সামরিক, প্রশাসনিক ইত্যাদি নানা বিষয়ে নানা সমস্যা ও সঙ্কটের কথা। সে সাথে উঠে নানারূপ সমাধানের কথাও। আলোচিত হয় উন্নয়নের নানারূপ মডেল ও মতবাদ। এ আদালতে উকিল হলো পত্রিকার কলামিস্টগণ। দেশের কল্যাণ তো তখনই হয় যখন এ আদালত সঠিক ভাবে কাজ করে। সেজন্য জরুরি হলো, পত্রিকার পৃষ্ঠায় সমস্যা ও সঙ্কটের কথাগুলো যেমন অতি বিষদ ভাবে তূলে ধরা হবে, তেমনি তুলে ধরা হবে নানারূপ সমাধানের কথাও। এখানে জালিয়াতি বা ফাঁকি হলে জনগণ ব্যর্থ হয় সঠিক রায় দিতে। পত্রিকার কলামিস্টদেরকে তাই কোর্ট-কাচারির উকিলদের চেয়ে অধিক যোগ্যবান, অধিক জ্ঞানী ও অধিক নিরপেক্ষ হতে হায়। কারণ, এ আদালতে দায়িত্বপালনে তারা ব্যর্থ হলে সমগ্র জাতি ব্যর্থ হয়। তখন বিজয়ী হয় অপরাধীরা। বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে সবচেয়ে ব্যর্থ খাতটি হলো জনগণের এ আদালত। কারণ, এ আদালতের উকিলগণ তাদের বক্তব্য পেশ করে নিজ নিজ দলের আজ্ঞাবহ ক্যাডার রূপে, নিরপেক্ষ ও সৎ উকিল হিসাবে নয়। পত্রিকার পাতায় জ্ঞানদানের সে কাজটি হয় না। বরং বেশী বেশী হয় জনগণকে বিভ্রান্ত করার কাজ।  ফলে জনগণ দারুন ভাবে ব্যর্থ হয় সঠিক রায় দিতে। ফলে দুর্বৃত্তগণ যেমন ভোট পায়, তেমনি গণতন্ত্র হত্যাকারি ফ্যাসিস্ট দুর্বৃত্তও দেশের বন্ধু ও জাতির পিতার খেতাব পায়। এবং ভোটচোরও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা পায়।

পত্র-পত্রিকা যেমন দুষ্ট চিন্তার বিপদ থেকে বাঁচায়, তেমনি বাঁচায় দুর্বৃত্তদের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও দূর্নীতি থেকেও। এর জন্যই দেশে খাদ্য সংকট শুরু হওয়ার সাথে সাথে দায়িত্বশীল পত্র-পত্রিকায় খাদ্য সংকটের কারণগুলোও প্রকাশিত হয়। তখন সে দুর্ভিক্ষের প্রতিরোধে সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়াও শুরু হয়। তেমনি পত্রিকার কারণে দূর্নীতির নায়কদের দুর্বৃত্তিও জনগণের সামনে গোপন থাকে না। দেশের পুলিশ বিভাগ যেসব দুর্নীতির গোপন বিষয়গুরো জনগণের সামনে তুলে ধরতে  ব্যর্থ হয়, সেগুলো প্রকাশ করে পত্রিকা। পত্র-পত্রিকা এভাবে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই দেশে যতই বাড়ে পত্রিকার মান, ততই কমে দুর্ভিক্ষ ও দুর্নীতির তান্ডব। কিন্তু যে দেশের পত্র-পত্রিকার মালিকানা দুর্বৃত্তদের হাতে, সেদেশে পত্র-পত্রিকা দুর্বৃত্তির অংশীদারে পরিণত হয়।   

 

জ্ঞানদানে পত্রিকা

জ্ঞানদান, চিন্তার লেনদেন ও সমাজ উন্নয়নে পত্র-পত্রিকা হলো অতি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। স্বাধীন পত্রিকা ছাড়া গণতন্ত্র চলে না। জনগণকে শিক্ষিত করার কাজটিও তখন যথার্থ ভাবে হয় না। পত্রিকা শুধু জনগণকেই নয়, নেতাদেরও আলোকিত করে। গণতান্ত্রিক দেশে নেতারা পত্রিকা থেকে যেমন এজেন্ডা খুঁজে পায়, তেমনি নির্দেশনাও পায়। জ্ঞানের এ বাহন বিজ্ঞান, দর্শন ও প্রজ্ঞার বাণীকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। স্কুল-কলেজের জ্ঞানলাভ সার্টিফিকেট লাভে শেষ হয়, কিন্তু পত্রিকার জ্ঞানদান চলে আমৃত্যু। পত্রিকায় থাকে জ্ঞানের বহুমুখীতা। জ্ঞানদানকে বিশেষ একটি শাখায় কেন্দ্রীভূত না করে পাঠককে হাজির করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সে সবের প্রত্যন্ত গভীরে। স্কুল-কলেজে না গিয়ে শুধু পত্রিকা পড়ে একজন ব্যক্তি সুশিক্ষিত হতে পারে। পত্রিকা ছাড়া সামরিক বিজয় সম্ভব; হালাকু, চেঙ্গিজের বিজয় পত্রিকা ছাড়াই হয়েছে। কিন্তু তাতে যা গড়ে উঠেনি তা হলো চেতনা সমৃদ্ধ একটি সভ্য জাতি। বাড়েনি সুস্থ্য চেতনা, বাড়েনি রাষ্ট্রের পরিচালনায় জনগণের সংশ্লিষ্টতা। প্রতিষ্ঠা পায়নি সরকারের স্বচ্ছতা বা জবাবদিহীতা। এগুলো হলো শক্তিশালী মিডিয়ার দান। পত্রিকা ছাড়া শিক্ষিত ও সচেতন জাতি গড়া অসম্ভব। স্বাক্ষরতা বাড়লেও বহু দেশে সভ্য ও সুশীল সমাজ গড়ে উঠেনি স্বাধীন পত্রিকার অভাবে। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন রেকর্ড গড়েছে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে গণতান্ত্রিক সমাজের জন্ম দিতে। জনগণের আয় বাড়ালেও কেড়ে নিয়েছে স্বাধীনতা। জনগণকে বাঁচতে হয় মৌলিক অধিকার ছাড়াই। চিড়িয়াখানায় হিংস্র পশুকে যেমন খাঁচায় রাখা হয়, সেরূপ চীন পরিণত হয়েছে বন্দী মানুষের বিশাল চিড়িয়াখানায়। দেশটিতে গুরুত্ব পেয়েছে জনগণের উপর শাসকশক্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। নিয়ন্ত্রণকে তীব্রতর করতে ১০ লাখ উইঘুর মুসলিমদের নিজ ঘর থেকে উঠিয়ে কনস্রেটশন ক্যাম্পে তুলেছে। পত্র-পত্রিকা যেহেতু স্বাধীন চেতনার পরিচর্যা দেয়, সে গুলোকে চীনে গড়েই উঠতে দেয়া হয়নি। পত্রিকার নামে যা গড়ে উঠেছে তা হলো দলীয় প্রচারপত্র তথা লিফলেট। এগুলোর কাজ হয়েছে, প্রোপান্ডায় আড়ষ্ট করে বিবেকের মৃত্যু ঘটানো। ধনি হলেও চীনারা তাই সভ্য হতে পারিনি।  

 

 

সূন্নত নবীজী(সা:)র

বাংলাতে যেটি পত্রিকা, আরবীতে তাকেই বলা হয় রেসালাহ। রেসালাহ, রাসুল ও মুরাসালাহ একই শব্দ থেকে উদ্ভুদ। রাসুলগণ বাণী প্রচার করতেন মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। লক্ষ্য ছিল ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধি। নবীকরীমের (সা:) সুন্নতকে অনুসরণ করে সে অভিন্ন চেতনাতে বের হয় রেসালাহ। এটি হলো সত্যকে ঘরে ঘরে পৌঁছানোর আধুনিকতম কৌশল। শুধু ইসলামেই নয়, সব দেশে, সব ধর্মে ও সব মতাদর্শের প্রচারকগণই আদর্শ প্রচারে পত্রিকাকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। তাছাড়া মানুষের সত্ত্বাটি শুধু দৈহিক নয়, আত্মিকও। দৈহিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত পানাহার অপরিহার্য। কিন্তু দেহের সুস্থ্যতা সার্বিক সুস্থ্যতা দেয় না। নৈতিক দিক দিয়ে সে ব্যক্তি চরম অসুস্থ্যও হতে পারে। এমন কি হিংস্র পশুর চেয়েও হিংস্রতর হতে পারে। পশু গণহত্যা করে না, ধর্ষণও করে না। জনবসতিকে নিশ্চিহ্নও করে না। কিন্তু মানুষ এসবই করে। এবং করে দৈহিক অসুস্থ্যতার কারণে নয়, বরং নৈতিক অসুস্থ্যতার কারণে। বাংলাদেশে শিশুরা ধর্ষিতা হচ্ছে, পুলিশ নারীদের বস্ত্রহরণ ও ধর্ষণ করছে, সন্ত্রাসীরা মানুষ খুন করছে এবং অফিস-আদালতে ঘুষের নামে মানুষের পকেট লুন্ঠন হচ্ছে। ভোটডাকাতি নেমেছ সরকারি দলের নেতাকর্মীরা। এসব তারাই করছে যারা শারীরিক ভাবে সুস্থ্য। কিন্তু দারুন ভাবে রুগ্ন আত্মার পুষ্টিতে।

দেহের অপুষ্টিতে কোন দেশ বিপর্যয়ে পড়ে না। এ জন্য কেউ জাহান্নামেও যাবে না। অথচ আত্মার অপুষ্টিতে দেশে চুরুডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের প্লাবন আসে। তখন মানুষ চলে পাপের পথে তথা জাহান্নামের পথে। আত্মার পুষ্টি জোগায় শিক্ষা। আর শিক্ষার সবচেয়ে বিশাল ও শক্তিশালী মাধ্যম হলো মিডিয়া। তাই যে দেশে মিডিয়া শক্তিশালী ও দায়িত্ববান -সে দেশের মানুষ পায় জ্ঞানসমৃদ্ধ সুস্থ্য বিবেক। আর বিবেক পুষ্টি পেলে তখন বৃদ্ধি পায় দুর্বৃত্তকে ঘৃণা সামর্থ্য। কিন্তু যে দেশে স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তগণ মাননীয় বলে আখ্যায়ীত হয় এবং গণতন্ত্রহত্যাকারি পায় জাতির পিতার সন্মান, বুঝতে হবে সে দেশে বিবেকে পুষ্টি বৃদ্ধির কাজটি আদৌ হয়নি। বরং ব্যাপক ভাবে হয়েছে বিবেক হত্যার কাজ। এমন দেশে অসংখ্য পত্র-পত্রিকা থাকলেও সেগুলোর কাজ হয় দুর্বৃত্তি ও মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। আজকের বাংলাদেশ তো তারই উদাহরণ।

 

পত্রিকাপাঠ কেন অপরিহার্য?

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা সীমিত, সেখানে থাকে না সকল বয়সের নারী-পুরুষের প্রবেশাধিকার। কিন্তু পত্র-পত্রিকার পাঠক তথা ছাত্র সকল দেশবাসী। ফলে যারা দেশবাসীকে শিক্ষিত করতে চায় তার পত্রিকাকে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করে। জনগণের ক্ষমতায়নের মাধ্যম তো জ্ঞান। এবং ক্ষমতাশূণ্য রাখার হাতিয়ার হলো অজ্ঞতা। তাই যারা জনগণকে অজ্ঞ, বিভ্রান্ত ও ক্ষমতাহীন রাখতে চায়, তারা পত্রিকাকে নিছক প্রচারের হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করে। কেড়ে নেয়ে স্বাধীনতা এবং গোলামে পরিণত করে পত্রিকার কলামিস্টদের। মানসিক পুষ্টি বৃদ্ধি কল্পে বাংলাদেশের মত দুর্নীতি কবলিত দেশে তেমন কিছুই হয়নি। দেশে ধর্মবাণী যা কিছু শোনানো হয় -তা মসজিদের চার দেয়াল ডিঙ্গিয়ে সামান্যই বাইরে বের হয়। নদীতে প্লাবন আসলে সে পানিতে খালবিলেও সয়লাব আসে। তেমনি জ্ঞানচর্চায় মসজিদ-মাদ্রাসাতে প্লাবন আসলে চারদিকেও তার প্রভাব পড়তো। দেশজুড়ে অজ্ঞতার জোয়ার দেখে বোঝা যায়, জ্ঞানের প্লাবন মসজিদ-মাদ্রাসাতেও আসেনি।

অনাহারে দেহ বাঁচে না। তেমনি সুচিন্তার অভাবে বাঁচে না বিবেক। বাংলাদেশে বিবেকশূণ্যতার কারণ, সুচিন্তার অভাব। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, সেরূপ বিবেকশূণ্যতা থেকে বাঁচাতে পবিত্র কোর’আনে “আফালাতাফাক্কারুন” (অর্থ: তোমরা কেন চিন্তা করোনা), “আফালা’ত্বা’কিলুন” (অর্থ: তোমরা কেন বুদ্ধিকে কাজে লাগাওনা), “আফালাতাদাব্বারুন” (তোমরা কেন গভীর ভাবনায় মনোনিবেশ করোনা) বার বার বলে বস্তুত চিন্তাতেই অভ্যস্ত হতে বলা হয়েছে। মানুষ তখনই চিন্তা করে যখন সে কিছু শুনে, পড়ে বা দেখে। প্রতিদিন পাঠকের সামনে চিন্তার নানারূপ উপকরণ নিয়ে হাজির হয় পত্রিকা। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবতে পত্রিকা এভাবেই বিবেককে নাড়া দেয়। তাই যে ব্যক্তি যত পত্রিকা পড়ে সে তত চিন্তাশীল ও দায়িত্বশীল হয়। এজন্যই চিন্তাশীল ও দায়িত্বশীল লোকের পত্রিকা ছাড়া চলে না। জনগণের উন্মুক্ত পার্লামেন্ট হলো পত্রিকা। পত্রিকা পাঠ না করার অর্থ সে পার্লামেন্ট থেকেই দূরে থাকা। ফলে যারা দেশ ও জাতিকে নিয়ে ভাবে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে কিছু করতে আগ্রহী –তারা কি পত্রিকা পাঠ থেকে দূরে থাকতে পারে?

 

যে ব্যর্থতা ইসলামপন্থিদের

পায়ে হেঁটে ঘরে ঘরে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে যাওয়া ছাড়া এক কালে সত্যপ্রচারের অন্য কোন মাধ্যমই ছিল না। সে যুগে রাসুলগণ নিজেরা সে কাজ করেছেন অতিশয় কষ্ট সয়ে সয়ে। অথচ যান্ত্রিক অগ্রগতির বদৌলতে সত্য প্রচারে পত্রিকা আজ অতি শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, শয়তানী শক্তি এ মাধ্যমটিকে যতটা নিখুঁতভাবে ব্যবহার করছে ইসলামের পক্ষের শক্তি তা পারেনি। প্রচারের জোরে আজ অতিশয় অসত্য ও ব্যর্থ মতবাদগুলোও কোটি কোটি মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভূল ও সবচেয়ে সফল জীবন-বিধান হয়েও ইসলাম আজ সর্বত্র পরাজিত। এমনকি ক্রমান্বয়ে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে মুসলিমদের আপন সন্তানেরা।

কিন্তু এমনটি কেন হচ্ছে? দেশে খাদ্যের মওজুদ থাকলেই সবার বাঁচাটা নিশ্চিত হয় না। প্রত্যেকের মুখে প্রত্যহ খাদ্য পৌঁছানোর একটি সুনিশ্চিত ব্যবস্থা থাকাটি জরুরী। খাদ্য বন্টনে সুষ্ঠ নিয়মনীতি না থাকলে দুর্ভিক্ষই অনিবার্য হয়। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বাংলার বহু লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। তবে সেটি খাদ্যের ঘাটতির কমতির কারণে ততটা নয়, যতটা বিলিবন্টনে চরম অব্যবস্থার কারণে। একই কারণে একই সুষ্ঠ ব্যবস্থা অতি অপরিহার্য মনের খাদ্য বন্টনেও। মনের খাদ্যের দুর্ভিক্ষে যে সর্বনাশটি ঘটে সেটি ভয়ানক। এতে ঘটে চেতনার মড়ক। মানুষ তখন বেঁচে থাকে শুধু দেহ নিয়ে, সুস্থ্য বিবেক নিয়ে নয়। ফলে পরিণত হয় বিবেকহীন পশুতে। ইসলামী চেতনা নিয়ে মুসলিমদের বেড়ে না উঠার কারণ মূলত এই মৃত বিবেক।

পবিত্র কোর’আন হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব। পবিত্র এ কিতাবের প্রতিটি বাণী মহান আল্লাহতায়ালার। পৃথিবী পৃষ্ঠে জ্ঞানের এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ ভান্ডার। কিন্তু এ বিশাল জ্ঞানভান্ডার থেকে জ্ঞানের সে কথাগুলো বিশ্ববাসীর কাছে দূরে থাক -এমন কি মুসলিমদের কাছেও আমরা পৌঁছাতে পারিনি। শুধু ব্যবসায়ীক স্বার্থকে সামনে রেখে কোকাকোলার মত পণ্যকে উৎপাদকেরা হিমালয়ের গিরিশৃঙ্গে, প্রশান্তমহাসাগরের দ্বীপে বা সাহারার মরুপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু প্রায় ১৫০ কোটি মুসলিম ইসলামের বাণীকে সেভাবে পৌঁছাতে পারিনি। অথচ এটি ছিল তাদের উপর দ্বীনি দায়িত্ব। খাদ্য না পেলে মানুষ অখাদ্য খাবে -সেটিই স্বাভাবিক। ইসলামের বদলে এজন্যই কোটি কোটি মানুষ রসনা মিটাচ্ছে কম্যুনিজম, সমাজতন্ত্র, নাস্তিক্যবাদ ও অশ্লিল সাহিত্য দিয়ে। রোগাগ্রস্ততায় সুস্বাদু খাদ্যেও রুচি লোপ পায়। তেমনি চেতনার রোগে লোপ পায় জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ। এ রোগের প্রকোপ এখন এতোই তীব্র যে, বিবেককে সুস্থ্যতা দেবে এমন বস্তুতে হাত লাগাতেই এরা ভয় পায়। ফলে জ্ঞানসমৃদ্ধ পত্রিকা বা পুস্তক পাঠের বদলে চটুল সাহিত্য বা হালকা কিছু পড়াই এদের আচারে পরিণত হয়েছে। রোগভোগ ও মৃত্যুর উচ্চহার দেখেই যেমন বোঝা যায়, দেশে চিকিৎসার সুব্যবস্থা নেই। তেমনি ব্যাপক বিবেকহীনতা দেখে বোঝা যায় সচেতনতা সৃষ্টিরও কোন সুব্যবস্থা নেই। শত্রুপক্ষ তাদের চলার গতি রকেট যোগে বাড়ালেও দেশে দেশে ইসলামি পক্ষ চলছে পদব্রজে। বস্তুতঃ পত্রিকার মত আধুনিকতম ও অতি শক্তিশালী মাধ্যমকে তারা সুচারু ভাবে ব্যবহারই করতেই শেখিনি।

পত্রিকার গুরুত্ব আরেকটি কারণে। পত্রিকার মাধ্যমেই দর্শন কথা বলে। এখানে চলে বুদ্ধিবৃত্তির লড়াই। সংলাপ হয় তত্ত্ব ও তথ্যের। এখানে সরব থাকে নানা পক্ষ ও নানা মত। বুদ্ধিবৃত্তির এটি উম্মুক্ত আদালত। প্রতিটি পাঠক এখানে বিচারক। গণতান্ত্রিক দেশে তাদের রায়েই চলে দেশ।  বুদ্ধিবৃত্তির এ আদালতে যাদের পত্রিকা নেই তারা বোবা। ফলে এ আদালতে বোবাদের পরাজয় অনিবার্য। এটি বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। এ লড়াইয়ে ইসলামের পক্ষের শক্তি কি কখনোই নীরব দর্শক হতে পারে? সত্যের পক্ষ নিয়ে ময়দানে নামাই তো ঈমানদারী। এ লড়ায়ে অংশ নেওয়া নিছক ইবাদত নয়, পবিত্রতম জিহাদ। এ কাজে ব্যয়ীত কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়ে মর্যাদায় কম নয়। শহীদের রক্ত বিজয় আনে রণাঙ্গণে। আর কলমের কালি ইসলামকে বিজয়ী করে লক্ষ লক্ষ মানুষের চেতনার ভূমিতে। পত্রিকা পাঠ এবং পত্রিকায় লেখালেখী এজন্যই এতো গুরুত্বপূর্ণ। যারা মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে ভালবাসে এবং চায় তাঁর দ্বীনকে বিশ্বমাঝে বিজয়ী করতে -তাদের কাছে এ কাজ এজন্যই এতো প্রিয়। ১ম সংস্করণ ০৭/০৯/২০০৩; ২য় সংস্করণ ০৬/০১/২০২১।




সংস্কৃতির সংকট ও সুস্থ্য সংস্কৃতির নির্মাণ প্রসঙ্গ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

সংস্কৃতির পরিচয়

সংস্কৃতি বলতে আমরা কি বুঝি? সংস্কৃতির সুস্থ্যতা বা কদর্যতাই বা কি? সুস্থ্য সমাজ, রাষ্ট ও ব্যক্তি গঠনে সংস্কৃতির গুরুত্বই বা কতটুকু? সুস্থ্য সংস্কৃতিই বা কি ভাবে নির্মিত হয়? সভ্যতার নির্মানে সংস্কৃতির গুরুত্বই বা কি? সাংস্কৃতিক সুস্থ্যতা নিয়ে যারা বেড়ে উঠতে চায় এবং নির্মান করতে চায় সভ্যতর সমাজ ও রাষ্ট্র, এমন প্রতিটি ব্যক্তির কাছে এ প্রশ্নগুলো অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। রোগ কিসে হয়, স্বাস্থ্যই্ বা কি করে বৃদ্ধি পায় – এটুকু না জানলে নিজ দেহের উপর পদে পদে অবিচার হয়। স্বাস্থ্যজ্ঞান এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো সংস্কৃতির জ্ঞানও। সে জ্ঞান সুস্থ্যতা আনে রুচিবোধে। রুচির প্রকাশ ঘটে তখন পোষাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, আনন্দ-উল্লাস তথা বাঁচার প্রতিটি আয়োজনে। তাই জ্ঞানার্জনের লক্ষ্য নিছক তথ্যদান হলে চলে না, সুস্থ্য-সংস্কৃতির নির্মাণ ও পরিচর্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হয়। জ্ঞানবান ব্যক্তির সংস্কৃতিবান হওয়ার সম্ভাবনতা তো এভাবেই বাড়ে।

সংস্কৃতির সংজ্ঞা নিয়ে নানা মনিষীর নানা মত। এ ভিন্নতা এসেছে জীবনে বাঁচার লক্ষ্য নিয়ে ধারণাগত ভিন্নতা থেকে। আমাদের বসবাসের পৃথিবীটা এক হলেও বাঁচবার লক্ষ্য সবার এক নয়। এক নয় চেতনার মানচিত্র। ফলে ভিন্ন হয় জীবনের স্বপ্নগুলোও। সে সাথে এজেন্ডাগুলোও। এ থেকেই ভিন্নতা সৃষ্টি হয় বাঁচার পথ ও পাথেয়তে। তখন পার্থক্য সৃষ্টি হয় সংস্কৃতি ও রাজনীতিতেও। মুসলিম থেকে একজন অমুসলিমের পার্থক্য এজন্যই বিশাল। সে পার্থক্য নিছক খাদ্য-পানীয়’তে নয়, বরং জীবনের সর্বত্র জুড়ে। জীবন ও জগতকে যেমন আমরা সবাই একভাবে দেখি না, তেমনি দেখি না সংস্কৃতির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও। সংস্কৃতি এজন্যই সংজ্ঞায়ীত হয়েছে নানা ভাবে।

বাঁচার মধ্যে উচ্চতর বিবর্তন বা জীবনকে নিরন্তর রুচিশীল করার যে লাগাতর প্রক্রিয়া -সেটিই হলো সংস্কৃতি। সংস্কৃতি থেকে ব্যক্তি পায় কিভাবে সমাজে বাঁচতে হবে সে আদব বা শিক্ষা। একটি দেশের জলবায়ু, আবোহাওয়া ও ভৌগলিক প্রকৃতি নির্ধারণ করে সেখানে কি ধরণের উদ্ভিদ ও প্রাণীকুল বাঁচবে। তেমনি একটি দেশের সংস্কৃতিও নির্ধারণ করে সেখানে কি ধরণের মানুষ বেড়ে উঠবে। প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন নির্ধারণ করে জীবকুলের জৈবিক ভাবে বেড়ে উঠাটি, তেমনি সংস্কৃতিও নির্ধারণ করে নৈতিক বা মানসিক ভাবে বেড়ে উঠাটি। তাই এক অভিন্ন ভৌগোলিক পরিমন্ডল একই ধরণের গাছপালা ও পশুপাশির জীবনধারনের নিশ্চয়তা দিলেও তা একই ধরণের মানুষ গড়ে উঠার নিশ্চয়তা দেয়না। বাংলাদেশ তার উংকৃষ্ট উদাহরণ। জলবায়ু বা আবোহাওয়ার দিক দিয়ে পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য নেই। কিন্তু মানুষের জীবনবোধ, রুচিবোধ ও বাঁচবার উদ্দেশ্যে এতই পার্থক্য যে এক অখন্ড ভূখন্ডে বসবাসও তাদের জন্য অসম্ভব হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক ভাবে তাদেরকে পৃথক হতে হয়েছে।

মাছ যেমন পানিতে বেড়ে উঠে, মানুষও তেমনি বেড়ে উঠে নিজ নিজ সংস্কৃতির মাঝে। পানাহার কি হবে, কীরূপ হবে পোষাক-পরিচ্ছদ, কি ভাবে পরিচালিত হবে বিবাহ-শাদী ও ঘরসংসার, উপাস্য কে এবং কি ভাবে হবে তাঁর ইবাদত, প্রতিবেশীর  সাথে আচরণই বা কীরূপ হবে, কি ভাবে একজনকে স্বাগত বা বিদায় জানাবে -এরূপ অসংখ্য বিষয় একজন শিশু বিদ্যালয় থেকে শেখে না। শেখে আবহমান সংস্কৃতি থেকে। এজন্যই শিক্ষিত-অশিক্ষিত, গ্রামীন-শহুরে সবার জন্যই ভাল-মন্দ একটি সংস্কৃতি থাকে। তাই সহজ ভাষায় বলা যায়, মানুষ যেভাবে বাঁচে বা আচরণ করে -সেটাই তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতির প্রসংঙ্গ এজন্যই মানব ইতিহাসে এতো গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই যারা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ চায় তারা শুধু রাজনৈতিক বিপ্লব নিয়ে ভাবে না, ভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়েও। চায় নতুন সংস্কৃতির নির্মাণ। পুরোন পথ ছেড়ে মানুষ নতুন পথে অগ্রসর হোক সেটিও চায়। দেশের ধর্ম ও আদর্শ পাল্টে গেলে এজন্য সংস্কৃতিও পাল্টে যায়। এমন একটি প্রয়োজনেই হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে আবু লাহাব ও আবু জেহেলদের ন্যায় দুর্বৃত্ত নেতাদেরই শুধু নির্মূল করতে হয়নি, নির্মূল  করতে হয়েছিল তাদের অসুস্থ্য সংস্কৃতিকেও। শুরু করতে হয়েছিল সংস্কৃতির নতুন ধারা। তবে প্রতিটি সংস্কৃতিই নির্মিত হয় জীবন ও জগত নিয়ে জনগণের নিজস্ব ধারণা থেকে। তাই এক ভাষা ও একই ভূগোলে বাস করলেও ভিন্ন বিশ্বাসের কারণে মানুষ বিভিন্ন বিপরীতমুখী সংস্কৃতির অনুসারি হয়। মুসলিমগণ সংস্কৃতির সে ধারণাটি পেয়েছে ইসলাম থেকে। শুধু ইহকালের নয়, পরকালের কল্যান-চিন্তার প্রভাব এ সংস্কৃতির নির্মাণে প্রবল। অপর দিকে পাশ্চাত্যে যেটি কাজ করেছে সেটি হলো নিছক ইহজাগতিকতা -যা সংজ্ঞায়ীত হয়েছে সেক্যুলারিজম রূপে। পরকালের ভাবনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। বরং প্রাধান্য পেয়েছে প্রবল বস্তুবাদী চেতনা। ফলে স্বেচ্ছাচারী-প্রবণতার প্রবল প্রভাব পড়েছে তাদের জীবন-উপভোগের পথ ও পাথেয়গুলোর উপর। বিলুপ্ত হয়েছে হারাম-হালাল এবং শ্লিল-অশ্লিলের সীমারেখা। ফলে সংস্কৃতি পূর্ণ হয়েছে ব্যাপক পাপাচারে। বাঁচার লক্ষ্য হয় বেশী বেশী আনন্দ ও উল্লাসের খোঁজে। আনন্দ খোঁজে নিজ ঘর ও দেশ ছেড়ে দেশে দেশে। এদের প্রয়োজন মেটাতেই বিশ্বব্যাপী গড়ে উঠেছে সেক্সটুরিজম। ব্যাপকতর হয়েছে মদ, ড্রাগ, জুয়া, অবাধ সেক্স, উলঙ্গতার ন্যায় সকল আদিম পাপচার। এসব ভোগবাদীরা পানাহারের ন্যায় এ পাপাচার গুলোকেও অপরিহার্য ভাবে। চিত্রিত হয় তাদের নাগরিক অধিকার রূপে। এদের আনন্দের খোরাক জোগাতে এমন কি মুসলিম বিশ্বের কোণে কোণে গড়ে উঠেছে মদের দোকান, ক্লাব-ক্যাসিনো ও পতিতাপল্লী। যা কিছু আনন্দ দেয় তাদের কাছে তাই সিদ্ধ বা জায়েজ। শিষ্ট-অশিষ্ট, শ্লিল-অশ্লিল, জায়েজ-নাজায়েজ এসবের ধার তারা ধারে না। নিছক জৈবিক তাড়না মিটাতে পর্ণোগ্রাফি, চাইল্ড সেক্স ও হোমসেক্সুয়ালিটির জন্ম দিয়েছে এরাই। জগত জুড়ে এভাবেই বেড়েছে নৈতিক অসুস্থ্যতা। অথচ এদের কাছে এগুলিও সংস্কৃতি।

 

কেন সুস্থ্য সংস্কৃতি?

সভ্য মানুষ রূপে বাঁচা এবং উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণে সুস্থ্য সংস্কৃতির বিকল্প নেই। পানাহারে দেহ বাঁচে। এবং সংস্কৃতি শেখায় সভ্য হতে। তাই শুধু পানাহার ও ঘরাবাড়ীতে জৌলুস বাড়ালে চলে না, সভ্য ভাবে বাঁচতে সুস্থ্য সংস্কৃতিও নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু কীরূপে সে সুস্থ্য সংস্কৃতি? কি সে সংস্কৃতি নির্মাণের নীতিমালা? ক্ষুধা মেটাতে সবাই সব কিছু খায় না। খাদ্যের বেলায় কোনটি সিদ্ধ আর কোনটি অসিদ্ধ -তা নির্ধারীত হয় ধর্মীয় অনুশাসন থেকে। তেমনি নৈতিক দিক দিয়েও সব কিছু সিদ্ধ নয়। তবে কোনটি নৈতিক আর কোনটি অনৈতিক -সেটির নির্ধারনেও নির্ভূল মানদন্ড চাই। বিপুল ভোগ-সামগ্রীতেও জীবন যে সুখের হয় না -তার বড় প্রমাণ আজকের পাশ্চাত্য। এজন্যই মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হল সঠিক হিদায়েত বা দিকনির্দেশনা। খাদ্য-পানীয় তো পশুও পায়। তবে পশু যেটি পায় না সেটি হলো উত্তরোত্তর পরিশুদ্ধির বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য। পায় না সিরাতুল মুস্তাকীমের হিদায়েত। তাই পশুর দ্বারা সভ্যতর সমাজ নির্মিত হয়না।

তবে মানুষও যে পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট হতে পারে ইতিহাসে সে প্রমানও প্রচুর। এবং সেটি হিদায়াত থেকে বঞ্চিত থাকা বা দূরে থাকার কারণে। যার জীবনে হেদায়াত নাই সে ব্যক্তি সম্পদশালীই হলেও দুর্ভাগা। অভাব সেখানে ন্যায়-অন্যায় বোধের ও সঠিক জীবন-নির্দেশনার। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে কিতাব অবতীর্ন হয়েছে এবং নবী-রাসূলগণ এসেছেন তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সে প্রয়োজনটি মেটাতে। ইসলাম তাই শুধু বিশুদ্ধ ধর্মই নয়, এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। ব্যক্তির পরিশুদ্ধি ও উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণে ইসলামই হলো একমাত্র রোডম্যাপ। যারা সে রোডম্যাপ পায়, তারাই পায় সভ্য রূপে বেড়ে উঠার সঠিক নির্দেশনা। তারা তখন নিজেদেরকে যোগ্যতর রূপে গড়ে তোলে জান্নাতের জন্য। এক্ষেত্রে ইসলামের অবদানের তূলনা হয় না। ইসলামের কারণেই নির্মিত হয়েছিল সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। মুসলিমগণ পেয়েছিল সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে বেড়ে উঠার সংস্কৃতি। মানুষ তখন ফেরেশতাদের চেয়েও উপরে উঠেছিল। মুসলিমগণ আজ যে কারণে নিচে নামছে তার কারণ তাদের সংখ্যা বা সম্পদের কমতি নয়, বরং সেটি হয়েছে পূর্ণ ভাবে ইসলাম অনুসরণ না করার কারণে। তারা পরিণত হয়েছে পথহারা পথিকে। অপর দিকে পাশ্চাত্যবাসী আল্লাহতায়ালার সে নিয়ামতকেই অস্বীকার করেছে। ফলে অঢেল সম্পদও বাঁচাতে পারিনি বিভ্রান্তি থেকে। বাড়াতে পারিনি মনের শান্তি। বরং শান্তির খোঁজে আসক্ত হয়েছে মদ, হিরোইন, কোকেন বা গাঁজার ন্যায় মাদক দ্রব্যে। কোটি কোটি মানুষ ভূগছে মানসিক রোগে। আনন্দ খুঁজতে সমকামীয়তা, মদ্যপান এবং ব্যাভিচারের ন্যায় আদিম পাপাচারগুলিকেও বৈধতা দিয়েছে। গাধা যে দিকে যায়, গাধার পিঠের অন্ধ-আরোহীও সেদিকেই যায়। গাধাকে পথ দেখানোর সামর্থ্য অন্ধব্যক্তির থাকে না। একই অবস্থা নৈতীক-কম্পাসহীন পাশ্চাত্যের। তাদেরকে চালিত করছে জৈবিক তাড়না। যুগে যুগে এভাবেই নির্মিত হয়েছে অসুস্থ্য সংস্কৃতি। সংস্কৃতি পরিণত হয়েছে জনগণকে পথভ্রষ্ট, নীতিভ্রষ্ট ও দুর্বৃত্ত করার হাতিয়ারে। অভাব এখানে হিদায়েতের।  

 

 

দুষ্ট সংস্কৃতির তান্ডব

কোভিড, কলেরা, যক্ষা ও এইডস’য়ের ন্যায় সংস্কৃতিও প্রচন্ড ভাবে আগ্রাসী ও সংক্রামক। রাজনৈতিক শক্তির ন্যায় সংস্কৃতিও গ্রাস করে অপর দেশের সংস্কৃতি। রাজনৈতিক আগ্রাসনে লুন্ঠিত হয় পরাজিত জাতির সম্পদ। কিন্তু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে লুন্ঠিত হয় নৈতিক ও মানবিক সম্পদ। নষ্ট হয় চরিত্র। বিনষ্ট হয় আদর্শিক পরিমন্ডল বা আবোহাওয়া। তখন পরাজিত মানুষের পক্ষে নিজের মত করে বেড়ে উঠাটিও অসম্ভব হয়। অথচ নৈতিক সম্পদ একটি জাতির অমূল্য সম্পদ। এ সম্পদ কলকারখানা বা ক্ষেতখামারে গড়ে উঠে না। বরং গড়ে উঠে জাতির চেতনালোকে। সে সংস্কৃতির নির্মাণে কাজ করে ধর্ম বা আদর্শ এবং কাজ করে সে ধর্ম বা আদর্শের পতাকাবাহি অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী। যে কোন জীবন্ত ও সুস্থ্য জাতির জীবনে এ প্রচেষ্টা ক্রীয়াশীল থাকা শুধু কাঙ্খিতই নয়, অপরিহার্য। এবং সে প্রক্রিয়া কতটা সফল এবং কতটা কার্যকর -সংস্কৃতি সেটারই পরিমাপ দেয়। খনির অপরিশোধিত স্বর্ণখন্ড আর অলংকারের স্বর্ণ এক নয়, উভয়ের মাঝে যে পার্থক্য তার পশ্চাতে থাকে দীর্ঘ পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া। তেমনি সভ্য মানুষ আর অসভ্য মানুষও এক নয়। এক নয় উভয়ের মাঝে আচার-আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ এবং বাঁচবার রুচিবোধও। এ পার্থকের মূলে থাকে একটি বিশুদ্ধ করণ প্রক্রিয়া। সংস্কারের এ ক্রীয়াশীল দীর্ঘ প্রক্রিয়াই হলো সংস্কৃতি। একটি জাতির সভ্যতর হওয়ার পিছনে এটিই হলো মূল।

কলকারখানার কাজ পণ্যসামগ্রীতে মূল্য সংযোজন ঘটানো। ফলে বাজারে তার কদর বাড়ে, মূল্যও বাড়ে। কিন্ত এ কলকারখানায় ব্যক্তির মূল্য বাড়ে না। বরং ব্যাক্তির জীবনে মূল্য সংযোজন ঘটায় একটি নির্ভূল ধর্ম বা আদর্শ এবং সে ধর্ম ও আদর্শের শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ। তাই জাতিকে সভ্যতার করার কাজে বিশুদ্ধ আদর্শ ও সে আদর্শের বুদ্ধিজীবীদের গুরুত্ব অনেক বেশী। মহান আল্লাহতায়ালাও তাই বিজ্ঞান শেখাতে নবীরাসূল পাঠাননি। পাঠিয়েছেন মানুষের জীবন মূল্যমান বাড়ানোর একটি সঠিক প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে। যাতে মানুষ তাঁর সকল সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি রূপে বেড়ে উঠতে পারে। জীবনের সে মূল্যমানই ব্যক্তির আমলের ওজন বাড়ায়।

আরবীতে সংস্কৃতিকে বলা হয় তাহযীব। এ শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি গভীর দর্শন। সংস্কৃতির এটি এক দর্শনগত সংজ্ঞা দেয়। তাহযীবের অর্থ পরিশুদ্ধি করণ। অর্থাৎ সংস্কৃতি হলো চির-ক্রিয়াশীল এক পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া। পরিশুদ্ধির মাধ্যমে মানব জীবনে নিত্য মূল্য সংযোজনই এর মূল কাজ। বিভিন্ন সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাসকারি মানুষের মাঝে যে গুণগত বিশাল তারতম্য সৃষ্টি হয় সেটি এ প্রক্রিয়ার সফলতা ও বিফলতার কারণে। মুসলিমদের দায়িত্ব হলো, এমন প্রক্রিয়ার নির্মাণে আত্মনিয়োগ করা। নইলে অসম্ভব হয় তার নিজের এবং সে সাথে আগামী প্রজন্মের পক্ষে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের থেকে আজকের মুসলিমদের যে বিশাল পার্থক্য তার মূল কারণ, ইসলামের সে সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়াটি মুসলিম দেশগুলিতে আজ আর সঠিক ভাবে কাজ করছে না। বরং শিকার এক সাংস্কৃতিক দুষ্ট প্রক্রিয়ার।  

 

সুস্থ্য সংস্কৃতির নির্মাণ প্রসঙ্গ

প্রশ্ন হলো কি সে সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া? কি সে উপাদান যার ভিত্তিতে একটি জাতি অন্য একটি জাতি থেকে ভিন্নতর সংস্কৃতির জন্ম দেয় বা জীবনবোধে ভিন্নতর হয়? বলা হয়, মুসলিমগণ সংস্কৃতিতে অমুসলিমদের থেকে ভিন্নতর। কিন্তু কি সে ভিন্নতা? কেন সে ভিন্নতা? বিষয়টি বুঝতে হলে বুঝতে হবে, সংস্কৃতি হাওয়ায় নির্মিত হয় না। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে সংস্কারের মূল প্রেরণা আসে ধর্ম বা আদর্শ থেকে। মুসলিম জীবনে সে ধর্ম বা আদর্শ হলো ইসলাম। ভাল-মন্দ, ন্যয়-অন্যায় নির্ণয়ে ইসলামই হলো মানদন্ড। সে মানদন্ডের ভিত্তিতেই একজন মুসলিম তাঁর বাঁচতে উচ্চতর রুচিবোধ পায়। তাঁর কর্মে ও বাঁচবার প্রক্রিয়ায় আসে গভীর পরিশুদ্ধি। ভমি, ভাষা, জলবায়ু বা গাত্রবর্ণ এমন একটি রুচিবোধ, চেতনাবোধ ও মানদন্ড দিতে পারে না। মানুষ উদ্ভিদ নয় যে ভূমি বা জলবায়ু থেকে তার বাঁচবার উপকরণ সংগ্রহ করবে। ব্যক্তির জৈবিক সত্ত্বার চেয়ে নৈতিক সত্ত্বাই মূল। এজন্যই মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ্র সৃষ্টি। তার নৈতিক শিকড় পুষ্টিপায় আদর্শ থেকে, ভূমি বা জলবায়ু থেকে নয়। ফলে ভাষা, জলবায়ু, ভুগোল ও বর্ণ এক হওয়া সত্বেও বিভিন্ন ধর্ম ও আদর্শের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম হয়। অভিন্ন আরব ভূমিতে একারণেই বিভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। বহুবিধ অনৈসলামিক সংস্কৃতির পাশে সেখানে জন্ম হয়েছে ইসলামি সংস্কৃতির।

সংস্কৃতির নির্মাণে ইসলাম বিপ্লব আনে ব্যক্তির বিশ্বাস, কর্ম, আচরণ ও রুচিবোধে। সে কাজে রাষ্ট্রের প্রতি প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা ও সামাজিক সংগঠন পরিণত হয় সাংস্কৃতিক ইন্ডাস্ট্রীতে। চেতনা রাজ্যে বিপ্লব আনে কোর’আনী জ্ঞান। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্র জুড়ে প্রতিষ্টিত হয় আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত পথে ব্যক্তি ও সমাজ সংস্কারের প্রক্রিয়া। বিলুপ্ত করা হয় চেতনায় অপসংস্কৃতির দূষিতকরণ প্রক্রিয়া। একই ভাবে ভাবা, একই পথে চলা, একই উদ্দেশ্য বাঁচার প্রেরণা তখন মানুষে মাঝে গড়ে তোলে। সংস্কৃতি তখন সাধারণ মানুষের মাঝে সিমেন্টের কাজ করে। ভেদাভেদ ভূলে জনগণ তখন ঐক্যবদ্ধ উম্মাহতে পরিণত হয়। এরূপ এক সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার কারণেই হানাহানীর পরিবর্তে সেকালে মুসলিম সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সৌহার্দ-সম্পৃতি ও ইষ্পাত-দৃঢ় ভাতৃত্ব। ইর্ষা, ঘৃণা ও হানাহানীর স্থলে সংস্কৃতি রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল পরস্পরে সালাম তথা দোয়ার রীতি। এভাবেই সেদিন জন্ম নিয়েছিল শ্রেষ্ঠতম মানব সৃষ্টির সংস্কৃতি।

ইসলামকে বাদ দিয়ে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠে সেটি আর যাই হোক মুসলিম সংস্কৃতি নয়। মুসলিম থেকে যেমন ইসলামকে পুথক করা যায় না, তেমনি তাকে পৃথক করা যায় না ইসলামি সংস্কৃতি থেকেও। সংস্কৃতি হলো ব্যক্তির ঈমান, দর্শন ও চেতনার প্রকাশ। ঈমান, দর্শন ও চেতনা দেখা যায় না, সেগুলো দৃশ্যময় হয় সংস্কৃতির মাধ্যমে। রোগের যেমন লক্ষণ থাকে, স্বাস্থ্যেরও তেমনি বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকে। মহান আল্লাহতে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী -উভয়েরই সনাক্তকরণের কিছু লক্ষণও থাকে। আল্লাহতায়ালাতে যে অবিশ্বাসী তার জীবনের লাগাম থাকে জৈবিক প্রবৃত্তির হাতে। ফলে তার পোষাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলন ও আমোদ-ফুর্তির মাঝে অশ্লিলতার প্রকাশ তাই স্বাভাবিক। কারো গায়ে অমুসলিম লেখা না থাকলেও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে সেটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠে।

মুসলিমের প্রতিটি কর্ম ও চাওয়া-পাওয়ার উপর থাকে আল্লাহভীতির লাগাম। কি আনন্দ-উল্লাস, কি দুঃখ-বিষাদ –মুমিনের সব কিছুর উপর থাকে মহান আল্লাহতায়ালার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। মুসলিমের শোকপ্রকাশ ও উৎসবের প্রক্রিয়া এজন্যই অমুসলিম থেকে ভিন্নতর। শোকে-দুঃখে সে বলে ‘‘ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হি রা’জীযুন।’’ অর্থ: নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহতেই আমরা ফিরে যাবো। এটি পরিণত হয় তাঁর বাঁচবার মূল দর্শনে। কিন্তু অমুসলিমের মধ্যে সেটি থাকে না। বাংলাদেশে মুসলিম এবং অমুসলিম হাজার বছর পাশাপাশী বসবাস করলেও এজন্যই তাদের উভয়ের আনন্দ-উল্লাস বা উৎসব কখনই একই মোহনাতে মিলিত হয়নি। পানি ও তেলের ন্যায় আলাদাই রয়ে গেছে। বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে কারো স্মরণে দাড়িয়ে নীরবতা, বেদীমূলে বা ছবিতে মাল্যদানের যে সংস্কৃতি -সেটি অমুসলিমদের। সে সংস্কৃতি কোন কালেই মুসলিমদের ছিল না। মুসলিমগণ বরং মৃত ব্যক্তির মাগফেরাতে কল্পে দোয়া-দরুদের মজলিস বসিয়েছে। কবর জেয়ারত করেছে বা  গরীব মিসকিনদের মাঝে দান খয়রাত করেছে। এটিই হলো ইসলামি সংস্কৃতি। মৃতদের স্মরণে মুর্তি বা স্তম্ভ নির্মাণ, মুর্তি বা ছবিতে মাল্যদান এবং দাঁড়িয়ে নীরবতা পালনের যে সংস্কৃতি –তার প্রবক্তা ইসলামে অঙ্গিকারহীন সেকুলারিস্টগণ। কোন ঈমানদার নন। মুসলিমদের কাছে সংস্কৃতি যেমন বিনোদন নয়, তেমন আনন্দ-উল্লাসও নয়, এটি ঈমান নিয়ে বাঁচার প্রচেষ্টা। এটি তাই এবাদত।

 

নাশকতা অপসংস্কৃতির

পাশ্চাত্য বিপুল ভ্যালুএ্যাড তথা মূল্য-সংযোজন ঘটিয়েছে বিভিন্ন ধাতু বা পণ্য সামগ্রীতে। কিন্তু মূল্য-সংযোজনে ব্যর্থ হয়েছে মানব জীবনে। বরং ভয়ানক অবমূল্যায়নই ঘটিয়েছে। ফলে পাশ্চাত্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ বেড়ে উঠছে চরিত্রহীন লম্পট ও নৃশংস খুনী রূপে। ফলে নিত্য নতুন গাড়ীর মডেলের ন্যায় যোগ হচ্ছে গণহত্যার নতুন নতুন মডেল। লাম্পট্যও শিল্প রূপে উঠেছে। পশু তার শিকার ধরার আদিম কৌশলে কোন বিপ্লব আনেনি। বহু হাজার বছর আগে হিংস্র পশুরা যেভাবে শিকার ধরতো এখনো সে ভাবেই ধরে। অথচ মানুষ তার নৃশংসতাকে শিল্প রূপে গড়ে তুলেছে এবং সেটিকে বীভৎসতর করেছে। সে নৃশংসতায় যোগ হয়েছে পারমানবিক বোমা, ক্লাস্টার বোমা, মিজাইল, ড্রোন ইত্যাদি ভয়ংকর মারণাস্ত্র। পররাজ্য দখল, শোষণ প্রক্রিয়া, গণহত্যা, বর্ণগত নির্মূলে যোগ হয়েছে নতুন আধুনিকতা।

বস্তুত লাগাতর নীচে নামার পথটিই হলো অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতিতে মৃত্যু ঘটে বিবেকের। মানুষ তখন পশুর চেয়েও হিংস্র জীবে পরিণত হয়। পশু শিকার ধরে নিছক প্রাণ বাঁচাতে, এবং তা নিয়ে উৎসব করে না। কিন্তু মানবরূপী পশুগুলো অপরের ব্যাথা-বেদনা নিয়ে উৎসব করে। পরদেশ দখল, গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, নগর-বন্দর ধুলিস্যাৎ করণও তখন অহংকারে পরিণত হয়। ঔপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং দাসব্যবসা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেয়েছে তো এরূপ অপসংস্কৃতির জোয়ার আসাতে। বিগত দুটি বিশ্ব যুদ্ধে তারা প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল তো তেমনি এক উৎসব ভরে। অপসংস্কৃতির জোয়ারের বড় ক্ষতিটি হলো তাতে  মারা পড়ে নৃশংস জালেম ও তার জুলুমবাজীকে ঘৃনা করার সামর্থ্য। ফলে বসনিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, কাশ্মির, আরাকানে গণহত্যা হলেও সে বর্বরতার নিন্দা জাতিসংঘে হয় না, থামানোরও চেষ্টা হয়না। বরং জাতিসংঘ যাদের হাতে জিম্মি তাদের ইতিহাস তো নিরীহ নারী-পুরুষের মাথায় আনবিক বোমা, ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়াম এবং ক্লাস্টার বোমা নিক্ষেপের।

 

যে রায় ইতিহাসের

মানুষ গড়ার শিল্পে বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র যে ভয়ানক ভাবে ব্যর্থ হয়েছে –ইতিহাসের রায় তো সেটাই। কোন প্রকান্ড মহামারিতেও মানব জাতির এতটা ক্ষতি হয়নি যা হয়েছে মানবের নিজ হাতে। বিপদের আরো কারণ, মাহামারির ন্যায় মানবতা-বিধ্বংসী এ অপসংস্কৃতির প্রসার ঘটছে সমগ্র বিশ্বজুড়ে। ফলে মানব জাতির আজকের সংকট শুধু বৃহৎ শক্তিবর্গের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য নিয়ে নয়, বরং সেটি অপসংস্কৃতির আগ্রাসন নিয়ে। এতে ব্যাপক ভাবে মারা পড়ছে বিশ্বে জুড়ে মানবতা, নীতি-নৈতিকতা ও বিবেক। বাড়ছে নৃশংসতা, নগ্নতা, অশ্লিলতা, লাম্পট্য ও এইডস। কোটি কোটি মানুষ এতে মানবতা শূণ্য হচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি তাই নিছক রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক। সংকট এখানে মানব রূপে বেড়ে উঠায়। ব্যর্থ হয়েছে চেতনা ও চরিত্রের পরিশুদ্ধ করণের প্রক্রিয়া। ফলে পৃথিবীর কোনে কোনে বাড়ছে ধ্বংসের আয়োজন। বাড়ছে দানবীয় পশু শক্তির প্রয়োগ। সমস্যাটি শুধু একটি দেশের নয়, বরং আন্তর্জাতিক। বরং এ সংকটটি সমগ্র মানব সভ্যতার। এ সংকটের সমাধান স্রেফ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তির উন্নয়নে নয়, বরং সুস্থ্য সংস্কৃতির নির্মাণে। এবং মানবকে মানব রূপে বেড়ে উঠার সুযোগ করে দেয়ায়। তবে এ সংস্কৃতির নির্মাণে জরুরি হলো মানব জাতির ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া। কারণ, সে ইতিহাসে যেমন আছে ব্যর্থতার করুণ ইতিহাস তেমনি রয়েছে সফলতার ইতিহাসও। এবং সে সফতার ইতিহাস যে একমাত্র ইসলামে –ইতিহাসের এ রায় নিয়েও কি সন্দেহ আছে? ১ম সংস্করণ ০৮/০৪/২০০৭; ২য় সংস্করণ ০৪/০১/২০২১।




বাঙালী মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

রোগ ভাবনাশূণ্যতার‌                                                                                      

তোমরা কেন ভাবোনা (আ’ফালাতাফাক্কারুন), কেন আক্বলকে কাজে লাগাও না (আ’ফালা তাক্বীলুন), কেন মনকে গভীর ভাবে নিবিষ্ট করোনা (আ’ফালা তাদাব্বারুন)-পবিত্র কোর’আনে এ সিরিয়াস প্রশ্নগুলো খোদ মহান আল্লাহতায়ালার। মহান স্রষ্টার এ প্রশ্নগুলো তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব জাতিকে উদ্দেশ্য করে। মহাজ্ঞানীর সে প্রশ্নগুলো কি মুসলিম মনেও নাড়া দিচ্ছে? পবিত্র কোর’আনে এ প্রশ্নগুলো আমরা বার বার পড়ি। পড়ার পর বেহুশের মত আবার ঘুমিয়ে পড়ি। পশুপাখি ও গাছপালাকে উদ্দেশ্য করে এ প্রশ্নগুলো করা হলে আছড় হতো না। কারণ চিন্তা-ভাবনার সামর্থ্য পশুপাখি ও গাছপালাকে দেয়া হয়নি্। কিন্তু মুসলিমদের বিশেষ করে বাঙালী মুসলিমদের অবস্থা কি তা থেকে ভিন্নতর? অথচ ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করাই ছিল এ প্রশ্নগুলোর মূল উদ্দেশ্য। মহান আল্লাহতায়ালার এ প্রশ্নাবলীকে মুসলিমগণ যতটা মুখস্থ করেছে -তা নিয়ে ততটা চিন্তা করেনি। সেগুলোকে আমলেও নেয়নি। আমলে নিলে বাঙালী মুসলিমদের মনে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব আসতো। কিন্তু সেরূপ বিপ্লব দূরে থাক, তার ধারে-কাছেও নাই। ফলে বাংলাদেশের মত ১৭ কোটি মুসলিমের দেশে বহু লক্ষ হাফেজ ও ক্বারী সৃষ্টি হলেও ফকিহ, মোজতাহিদ বা চিন্তাবিদ তেমন গড়ে উঠেনি। ১৭ কোটির মুসলিমের মধ্য থেকে ক’জন ক’খানা তাফসির বা ইসলামের উপর মৌলিক বই লিখেছেন? জনবহুল এ মুসলিম দেশটিতে দ্বীনী মাদ্রাসায় যে তাফসির গ্রন্থগুলো পড়া হয় তার প্রায় অধিকাংশই অন্যান্য ভাষা থেকে অনুদিত। দর্শন, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস বা জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্য শাখাতেই বা ক’জন ক’খানা গ্রন্থ রচনা করেছেন? বাঙালী মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার বড় দলিল হলো এগুলো।

তবে বাঙালী মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক এ পশ্চাৎপদতা আজকের নয়, বহু শত বছরের। বাংলাদেশে ইসলামের প্রবেশ বঙ্গবিজয়েরও বহু পূর্বে। মুসলিমদের হাতে বঙ্গবিজয় হয়েছে প্রায় আটশত বছর আগে। এ দীর্ঘ সময়ে জাতির চিন্তা-চেতনায় বিপ্লব আসতে পারতো। সৃষ্টি হতে পারতো বহু লক্ষ বইয়ের বিশাল ভূবন। যেমন হয়েছে আরবী, ফার্সী ও উর্দুতে। ইসলামের আগমনের মাত্র একশত বছরের মধ্যেই আরবে ও ইরানে বিস্ময়কর বিপ্লব এসেছিল বুদ্ধিবৃত্তিতে। অথচ সে আমলে তাদের সমুদয় লোকসংখ্যা আজকের ঢাকা শহরের চেয়ে বেশী ছিল না। এমনকি আফগানরাও ছিল সংখ্যায় অতি নগন্য। অথচ একমাত্র সুলতান মাহমুদের সাম্রাজ্যে যতজন বিজ্ঞানীর বসবাস ঘটেছিল, আমরা বিগত এক হাজার বছরেও ততজন বিজ্ঞানী গড়তে পারিনি। উল্লেখ্য, ইবনে সীনা, ইবনে ফারাবী, আল বেরুনীসহ সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী তাঁর সাম্রাজ্যে বসবাস করতো।

ইসলাম আক্বল তথা বুদ্ধিবৃত্তির ধর্ম। কোরআনের প্রতিটি আয়াত ব্যক্তিকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। একমাত্র চিন্তা-ভাবনাই মানুষকে পশুর স্তর থেকে ফেরেশতার পর্যায়ে উঠায়। অন্যসব ধর্ম থেকে ইসলামের পার্থক্যটি এক্ষেত্রে বিশাল। একমাত্র ইসলামই চিন্তা-ভাবনাকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। নবীজী (সা:)’র হাদীস: ‘‘আফযালুল ইবাদাহ তাফাক্কু’’। অর্থ: উত্তম ইবাদত হল চিন্তা ভাবনা করা। এক মহুর্তের চিন্তা-ভাবনাকে নবীজী (সা:) সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। চিন্তা-ভাবনাই সংযোগ গড়ে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে; তাতে ওজন বাড়ে আমলের। অন্যথায় নামায-রোযার ন্যায় ইবাদত নিছক আনুষ্ঠিকতায় পরিণত হয়। যার মধ্যে চিন্তাভাবনা নাই, তার মধ্যে আল্লাহভীতিও নেই। কারণ, মহান আল্লাহতায়ালার ভয় তো আসে পরকালের ভয় থেকে। আর ভয় তো মনের বিষয়, এবং সেটি আসে নিজ পরিণতি নিয়ে গভীর ভাবনা থেকে। ভাবনাশূণ্যতা তাই পরকালের ভয়শূণ্যতার কারণ। চিন্তাশূণ্য ব্যক্তি পশু তূল্য। পশুর জীবনে যেমন ভাবনা থাকে না, তেমনি পরকালের ভয়ও থাকে না। পশুর ন্যায় এমন চিন্তাশূণ্য ব্যক্তির পক্ষে অন্য কিছু হওয়া সম্ভব হলেও কঠিন হয় মুসলিম হওয়া। এমন ভয়শূণ্যদের সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, এদের চোখ আছে – কিন্তু তা দিয়ে এরা দেখে না, কান আছে -কিন্তু তা দিয়ে এরা শুনে না, ক্বালব আছে – কিন্তু তা দিয়ে এরা ভাবে না। অথচ ভাবনার প্রক্রিয়া চালু রাখতে হলে চোখ, কান ও ক্বালবের দরজাকে সব সময় খোলা রাখতে হয়। মানব মনে সে ভাবনা প্রক্রিয়াকেই তীব্রতর করে পবিত্র কোর’আন। বিশ্বচরাচরে মহান আল্লাহতায়ালার যে নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে -সেগুলো যেমন দেখতে বলে তেমনি তা নিয়ে ভাবতেও বল। ইসলামের গৌরব কালে বুদ্ধিবৃত্তিকে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ যেমন এবাদত ভাবতো, তেমনি শাসকেরাও একাজে সহায়তা দানকে দায়িত্ব মনে করতো। ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সে সাথে রাজনৈতিক বিজয়ও এসছিল অতি দ্রুত। সমগ্র মানব ইতিহাসে সেটি তূলনাহীন।

 

অজ্ঞতা অসম্ভব করে মুসলিম হওয়া

বুদ্ধিবৃত্তির গুরুত্ব যে কত গুরুত্বপূর্ণ -সেটি বুঝা যায় পবিত্র কোর’আন পাকে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার একটি বয়ান থেকে। সে ঘোষণাটি হলো, ‘‘ইন্না মা ইয়াখশাল্লাহ মিন ইবাদিহিল উলামা।’’ অর্থ: সমগ্র সৃষ্টিকূলের মধ্যে একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে। উপরুক্ত আয়াতে যে সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে তা হলো, হৃদয়ে মহান আল্লাহর ভয় নিয়ে বাঁচা ও প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য যা অপরিহার্য -তা হলো পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান। এর বিকল্প নেই। শূণ্যে প্রাসাদ গড়া যায় না। তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার ভয় ও ঈমানের সৌধ কখনোই অজ্ঞতার উপর নির্মিত হয় না। নামাজ পড়েও অনেকে ঘুষ খায়, সূদ খায় এবং মিথ্যা কথা বলে। বেপর্দাও হয়। এর কারণ অজ্ঞতা। যে ব্যক্তি জ্ঞানচক্ষুতে পরকাল চোখের সামনে দেখতে পায়, সেটিকে পাপাচারে নষ্ট করতে ভয় পায়। শিশু আগুনে হাত দেয় আগুনের দাহ্য ক্ষমতা না জানার কারণে। নামাজীও তেমনি ঘুষ খায় বা মিথ্যা কথা বলে পরকালের জ্ঞান না থাকার কারণে। অজ্ঞতা নিয়েও নামাযী হওয়া যায়, রোযা বা হজ্বও কারা যায়। কিন্তু পরিপক্ক ঈমানদার ও আল্লাহভীরু যে হওয়া যায় না –সে সাক্ষ্যটি অন্য কারো নয় বরং মহাজ্ঞানী ও মহাপ্রভু মহান আল্লাহতায়ালার।

অজ্ঞতার ইসলামী পরিভাষা হলো জাহিলিয়াত, যার মধ্যে এটি বিদ্যমান তাকে বলা হয় জাহেল। আর এর বিপরীত শব্দ হলো মা’রেফাত। যিনি এর অধিকারী তিনিই আরেফ। মৃত্যুর এপারে বসে ওপারে কি হবে তা উপলব্ধি করার সামর্থ্যই হলো মা’রেফাত। এ সামর্থ্যটি চোখের নয়, এটি অন্তরের। এবং সেটি একমাত্র কোর’আন-লব্ধ জ্ঞানেই সৃষ্ঠি হয়। এমন জ্ঞানই মানুষকে পাপাচারের থেকে দূরে রাখে। অপর দিকে জাহেল শুধু নাস্তিকেরা নয়, বহু আস্তিকও। যুগে যুগে ইসলামের সর্বনাশ হয়েছে মুসলিম বেশধারী এসব জাহিল আস্তিকদের কারণে। ইবাদতের নামে এসব অজ্ঞরা স্বাস্থ্যপতন ঘটালেও তাদের মনে মহান আল্লাহতায়ালার ভয়ের চেয়ে এজিদদের ন্যায় দুর্বৃত্তদের ভয়ই অধিক ছিল। সে যুগে এজিদের বাহিনীতে যারা যুদ্ধে খেটেছে তারা কাফের ছিল না। অথচ এদের হাতে ইমাম হোসেন (রা) শুধু নিহতই হননি, তাঁর লাশকে তারা ঘোড়ার পায়ের নীচে দলিত-মথিতও করেছে। এটিও সম্ভব হয়েছিল তাদের অজ্ঞতার কারণে। একজন জ্ঞানবান ব্যক্তির কাছে এমন জঘন্য কাজ অচিন্তনীয়। অজ্ঞতার কারণেই তারা ব্যর্থ হয়েছিল ইমাম হোসেন ও তাঁর ইসলামকে চিনতে। আজও এরূপ অজ্ঞ জাহেলদের কারণে ৯০% মুসলমানের দেশে ইসলামের প্রয়োগ সম্ভব হচ্ছে না। এদের কারণে আদালত থেকে শরিয়তী আইন বিলুপ্ত। এককালে ইমাম হোসেনকে যারা হত্যা করেছিল তারাই একালে ভোট দিয়ে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে রুখছে। তুরস্কে শতকরা ৯৮ভাগ মুসলমান। অথচ বেশী দিন আগের কথা নয়, মুসলিমদের ভোটেই সেদেশে জনগণকে বাধ্য করা হয়েছিল হারাম কাজে। এমনকি বাধা দেয়া হয়েছে বিদ্যালয়ে, অফিস-আদালতে ও পার্লামেন্টে মহিলাদের হিজাব পরিধানে। তাদের অজ্ঞতা শুধু নিজেকে নিয়ে নয়, বরং আল্লাহতায়ালা, আখেরাত, রোজহাশর তথা সমগ্র ইসলামকে নিয়ে।

আরো মুশকিল হলো, এরূপ অজ্ঞ বা জাহেল থাকাকে মুসলিমগণ আজ আর পাপ ভাবে না। অজ্ঞ থাকাটাই যে ইসলামে সবচেয়ে বড় পাপ –সে হুশও তাদের নাই। অথচ সব পাপের জন্ম তো এখান থেকেই। এ পাপাচার রুখতেই ইসলাম সকল নরনারীর উপর জ্ঞানার্জনকে সর্বপ্রথম ফরজ করা হয়েছে। কোর’আনের প্রথম ওহি “ইকারা” বা “পড়” হওয়ার তাৎপর্য তো এটিই। “ইকরা” বা “পাঠ করা” হলো জ্ঞানার্জনের চাবী। এ চাবী ছাড়া  জ্ঞানার্জনে সামনে এগোনো অসম্ভব। কোর’আন-হাদীসের জ্ঞান নয়, নিছক অক্ষরজ্ঞানের বিনিময়ে মহান নবীজী (সা:) বদর যুদ্ধের হত্যাযোগ্য যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দিয়েছিলেন। বিদ্যার্জন ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ -এটি হলো তারই উদাহরন। জ্ঞানার্জনকে অত্যাধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই সেকালে মুসলিমগণ স্বল্পসময়ে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছিলেন। অথচ আজকের মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে অজ্ঞতায়। অন্য ধর্মের লোকেরা যেখানে অন্ধ, বধির ও বোবাদের জন্যও জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা করেছে -সেখানে বাংলাদেশের ন্যায় বহু মুসলিম দেশের অর্ধেকেরও বেশী সুস্থ্য নর-নারী আজ নিরক্ষর।

সত্য-অসত্য, ন্যায়-অন্যায়ের উপলব্ধিতে অতিশয় জরুরী হলো ব্যক্তির চিন্তার সামর্থ্য। বিবেকমান হওয়ার পথে এটিই সেরা অবলম্বন। চিন্তার সামর্থ্য একমাত্র চিন্তাতেই বৃদ্ধি পায়। চিন্তার অনভ্যাসে সুস্থ্য মানুষও আহম্মকে পরিণত হয়। তখন পঙ্গুত্ব আসে বুদ্ধিবৃত্তিতে। যেমন দীর্ঘকাল ব্যবহার না করায় রোগীর সুস্থ্য হাত-পা-গুলোও শক্তিহীন হয়। অথচ ব্যবহারে শুধু সুস্থ্যই থাকে না, সবলও হয়। নবীজী (সা:)’র আগমনে যে আরবভূমি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়কদের জন্ম দিল -তা কয়েক বছর পূর্বেও দুর্বৃত্তদের লালনভূমি রূপে পরিচিত ছিল। কারণ, সে আমলে আরব জনগণ সুচিন্তা থেকে নিবৃত ছিল। তাতে মৃত্যু ঘটেছিল তাদের বিবেকের। ফলে ব্যাভিচার, দস্যুবৃত্তি, উলঙ্গতা বা নিজ কণ্যার জীবন্ত দাফনেও সে বিবেকে দংশন হতো না। এমন বিবেকহীনদেরকে সুচিন্তায় অভ্যস্থ করে কোর’আন বস্তুত তাদের মৃত বিবেককেই জীবিত করেছিল। অভ্যস্থ করেছিল এ আমৃত্যু ভাবনায় ও প্রচেষ্ঠায় যে কি করে আরো সভ্যতর হওয়া যায়। এভাবেই শুরু হয়েছিল তাদের অবিরাম উপরে উঠার প্রক্রিয়া। এর ফলেই তাঁরা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়তে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু যখনই চিন্তা-ভাবনায় ইস্তাফা দিয়েছে -তখনই শুরু হয়েছে তাদের পতনযাত্র।

 

বিকল বুদ্ধিবৃত্তির ইঞ্জিন

মগজই দেহের ইঞ্জিন। এটি রুগ্ন হলে দেহ বেহুশ হয়। শক্তি হারায় হাত-পা ও দেহ। তেমনি জাতির মগজ হলো আলেম বা বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। জাতির পতনের শুরু তাদের পচন বা অসুস্থ্যতা থেকে। এজন্যই পতনশীল একটি জাতিকে দেখে অন্ততঃ এটুকু সঠিকভাবেই বলা যায়, সে জাতির আলেমরা যথাযথ দায়িত্বপালন করেনি। বনি ইসরাইলের পতনের বড় কারণ ছিল তাদের আলেমগণ। মহান আল্লাহতায়ালা সুরা জুম্মা’তে তাদেরকে ভারবাহী গাধার সাথে তুলনা করেছেন। গাধা বই বহন করতে পারে কিন্তু সে বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে ভাবতে পারেনা। সে ইহুদী আলেমদের অনুসারি কি মুসলিমদের মাঝে কম?

বুদ্ধিবৃত্তি বা ইলমচর্চা মানুষকে ব্যক্তিস্বার্থের উর্দ্ধে উঠে সমাজ, রাষ্ট্র ও সমগ্র বিশ্বকে নিয়ে ভাবতে ও ত্যাগে উৎসাহিত করে। এগুণটি ছাড়া সমাজে উচ্চতর ও সভ্যতর বিবর্তন অসম্ভব। তখন জাতির কাঁধে ভর করে ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা ও হানাহানি। সৃষ্টিশীলতার মাঝে যে অনাবিল আনন্দ -সেটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ব্যক্তিকে ক্ষুদ্র স্বার্থ থেকে দূরে রাখতে। তখন জাগে আরো মহত্তর হওয়ার প্রেরণা। ইবনে সীনা বা ফারাবীদের ন্যায় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠশীল মানবগণ এজন্যই কখনই কোন দুর্বৃত্ত শাসকের গোলামে পরিণত হয়নি। অথচ যে সমাজে সৃষ্টিশীল মানুষের অভাব- সে সমাজে মিরজাফরদের সংখ্যাও অধিক। এ কারণেই অতীতে উপনবেশিক বৃটিশের পক্ষে শাতিল আরবে বা অন্যান্য মুসলিম ভুমিতে মুসলিম নিধনে যুদ্ধ করা বা তাদের জাহাজে কয়লা ঢালার জন্য বাংলাদেশ থেকে ভাড়াটিয়া সৈন্য পেতে বেগ পেতে হয়নি। এমন কি গোলামের সে খাতায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি ও জাতীয় বীরও নাম লেখিয়েছে। আজও সেবাদাস পেতে অসুবিধা হচ্ছে না বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদীদের।

জনগণের ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্ঞান। পানাহারে দেহের বল বাড়লেও তাতে মনের বল বাড়ে না। অথচ অন্যের গোলাম না হয়ে স্বাধীন ভাবে বাঁচার জন্য মনের বলই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বরং দেহের বল নিয়ে অনেকেই বাজার খোঁঝে অন্যের গোলাম হওয়ার জন্য। বিশ্বে রাজনৈতিক বিপ্লব কম হয়নি, কিন্তু তাতে মানব জাতির সভ্যতর উত্তরণ ততটা হয়নি। রাজা বদল সহস্রবার হলেও এতে দাস ও ভাগ্যাহতদের ভাগ্য বদলায়নি। অথচ মানব জাতির ইতিহাসের মোড় পাল্টে দেয় ইসলাম। কারণ জ্ঞানচর্চাকে ইসলাম জনগণের স্তরে নামিয়ে আনে। পেশাদারীর স্থলে এটিকে ইবাদতে পরিনত করে। এতে বুদ্ধিবৃত্তি পরিণত হয় ব্যক্তির সার্বক্ষণিক অভ্যাসে। ফলে সুচিন্তায় তথা বুদ্ধিবৃত্তিতে অভ্যস্থ্য হয় কৃষক, শ্রমিক, তাঁতী, ব্যবসায়ীসহ সর্ব-শ্রেনীর মানুষ। পাঠশালায় পরিণত হয় সমগ্র দেশ, সকল জনপদ ও প্রতিটি ঘর। ফলে এতে গর্জে উঠে ব্যক্তির মাঝে ঘুমিয়ে থাকা শক্তিশালী ইঞ্জিন। ফলে গতি পায় সমগ্র জাতি। এভাবে ইসলাম শুধু একটি জাতির ধর্মই পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছে তার রুচিবোধ, মূল্যবোধ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি। কৃষক পরিনত হয় বিচারক বা প্রশাসকে। ক্রীতদাস পরিনত হয়েছে জেনারেলে। সেদিন কয়েক লক্ষ আরবদের মাঝে সেদিন যে মাপের ও যে সংখ্যায় চিন্তানায়কের জন্ম হয়েছিল তা আজকের মুসলিম বিশ্বের প্রায় দেড় শত কোটি মুসলিমও পারছে না। এ ব্যর্থতা মূলত তাদের শিক্ষাব্যবস্থার। কারণ এটি ব্যর্থ হচ্ছে জীবনের মূল পাঠটি শেখাতে। ব্যর্থ হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিকে ইবাদতে পরিণত করতে। ফলে ব্যর্থ হচেছ ব্যক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিন তথা বিবেককে চালিত করতে। বাংলাদেশ যেভাবে দূর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে সেটি মূর্খতার কারণে নয়, বরং সেটি কুশিক্ষা দানকারী শিক্ষানীতির কারণে। 

 

বিজয়ী শত্রুপক্ষ

মুসলিমগণ বুদ্ধিবৃত্তিকে পরিহার করেছে দীর্ঘকাল আগেই। আক্বলের প্রয়োগ ছেড়ে নকলকে তারা ইলমচর্চা মনে করেছে। ফলে গুরুত্ব হারিয়েছে সৃষ্টিশীল জ্ঞানচর্চা। বাংলাদেশের বিগত আটশত বছরের মুসলিম ইতিহাসে ইসলামের উপর যে কয়খানী বই লেখা হয়েছে তার শতকরা নিরানব্বই ভাগ সম্ভবতঃ লেখা হয়েছে বিগত ৫০ বছরে। প্রশ্ন হলো বাঁকি সাড়ে সাতশত বছর আমরা কি করেছি? এখনও যা হচ্ছে সেটিও কি আশাব্যঞ্জক? বুদ্ধিচর্চার ময়দানে সেক্যুলার পক্ষ তথা ইসলামের শত্রুপক্ষ এখনও  বিজয়ী। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের প্রায় শতকরা ৯০ ভাগের লিখক সম্ভবতঃ তারাই। ইসলামপন্থিরা এদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েই দায়িত্ব সেরেছে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং এভাবে নিজেদের ভাবমূর্তিকে তারা বিনষ্ট করেছে। নিজেরা যে বুদ্ধিবিমুখ সেটিই জনসম্মুখে প্রমানিত করেছে। ইসলামপন্থিদের দায়িত্ব ছিল, বিপক্ষের যুক্তিকে খন্ডন করে অন্ততঃ বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে ইসলামকে বিজয়ী করা। এজন্য প্রয়োজন ছিল দুয়েক জন নয়, বহুহাজার উঁচু মাপের জ্ঞানী বা বুদ্ধিজীবী তৈরী করা। শত্রুপক্ষের জবাবে ইসলাম যা বলতে চায় তা সুন্দরভাবে গুছিয়ে বলা। কিন্তু সে কাজ হয়নি। ফলে চেতনার রাজ্যে সুচিন্তার চাষাবাদ বাড়েনি, কোর’আন যা বলতে চায় বা যুক্তি দেখায় সে গুলোকেও মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছানো হয়নি। ফলে কোরআন সবচেয়ে অধিক পঠিত কিতাব হওয়া সত্ত্বেও তাতে সমাজের অন্ধকার দুর হয়নি। অথচ ইসলামের আলো বিতরণের কাজে প্রতিটি মুসলিমই দায়বদ্ধ।

আল্লাহতায়ার নাযিলকৃত সর্বশ্রেষ্ট এ গ্রন্থটির সাথে যে জুলুম হয়েছে সম্ভবতঃ কোন কেচ্ছাকাহিনীর বইয়ের সাথেও তা হয়নি। কারণ, কেচ্ছাকাহিনীর বই যাতে শিশুরা বুঝতে সে চেষ্টা  করা হয়। ভিন্ন ভাষায় হলে সেটির অনুবাদ করা হয়। অথচ বাংলাদেশে সাতশত বছর ধরে কোর’আন পঠিত হয়েছে অনুবাদ ছাড়াই। জ্ঞানের সর্বোচ্চ উৎস্যের সাথে এমন কান্ডজ্ঞানহীন আচরন একমাত্র বিবেকের পঙ্গুত্বেই সম্ভব, সুস্থ্যতায় নয়। বুদ্ধিবৃত্তি এ যাবতকাল এদেশটিতে কতটা গুরুত্বহীন ছিল -সেটি এ থেকেই বুঝা যায়। অনেকে বলেন, কোরআন বুঝা নিছক আলেমদের কাজ। কথাটি অসত্য। সমগ্র কোর’আন ও হাদিসে এর স্বপক্ষে একটি প্রমাণও নেই। একজনের খাদ্যগ্রহণে আরেকজন বাঁচেনা। খেতে হয় সবাইকেই। তেমনি কোর’আন থেকে এক জনের জ্ঞানার্জনে অন্যের ঈমান পুষ্টি পায় না। ফলে তার জন্য মুসলমান থাকাই তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে। রোজহাশরের বিচার দিনে কোন আলেম কারো পক্ষে দাঁড়াবে না। অজ্ঞ থাকায় যে মহাপাপ –সে পাপের জন্য সবাইকে নিজের হিসাব নিজে দিতে হবে। আহারের ন্যায় জ্ঞানার্জনের দায়িত্বও সবার। নবীজীর (সা) আমলে কোর’আনকে বুঝার চেষ্টা করেছেন ক্ষেত-খামারের সাধারণ মানুষ। নামায-রোযার পাশাপাশি জ্ঞানার্জের ইবাদতেও তাদের সমান ভাবে দেখা গেছে। জ্ঞানচর্চা সেদিন তাই প্রচন্ড গণমুখীতা পেয়েছিল। এ কারণেই ঘরে ঘরে সেদিন আলেম ও শহিদ সুষ্টি হয়েছিল। ফলে মদিনার ক্ষুদ জনপদটিতে সেদিন যত মুজাহিদ ও মুজতাহিদ ফকিহর জন্ম হয়েছিল -বাংলাদেশে বিগত হাজার বছরে তার শত ভাগের এক ভাগও হয়নি। অথচ সে আমলে মদিনার জনসংখ্যা বাংলাদেশের আজকের একটি থানার সমানও ছিল না।

 

বিভ্রান্তি ইলমচর্চা ও আমল নিয়ে

অনেকে বলেন, মুসলিমদের সমস্যা ইলমে নয়, সেটি তাদের আমলে। তাদের ধারণা ইলমচর্চা যথেষ্ট হয়েছে এখন আমল প্রয়োজন। অথচ তারা ভূলে যান, আমল ইলমেরই ফসল। ব্যক্তির কদর্য আমল দেখেই বুঝা যায় সে ব্যক্তির ইলমচর্চা হয়নি। গাছ ছাড়া যেমন ফল আশা করা যায় না, তেমনি ইলম ছাড়া আমলও আশা করা যায় না। ইলমের আগে আমলে পরিশুদ্ধি চাওয়া অনেকটা ঘোড়ার আগে আগে গাড়ি জোড়ার মত। আমলে সমস্যা সৃষ্টি হয় ইলমে সমস্যা থাকার কারণে। ইলম অর্থ সার্টিফিকেট লাভ নয়, এটি হলো ব্যক্তির আত্ম-উপলব্ধি, আত্ম-আবিস্কার ও আত্ম-পরিশুদ্ধির সামর্থ্য। এ সামর্থ্য অর্জনের পরই পরিবর্তন আসে আমলে, পূর্বে নয়। ইলমই চিন্তা-ভাবনা তথা বুদ্ধিবৃত্তিকে সক্রিয় করে। চিন্তাশীল বিবেক তখন সৎকাজে উৎসাহ এবং অসৎকাজে নিষেধ করে। এজন্য ইসলামে ইলম লাভকে প্রথম ফরজ করা হয়েছিল, অন্যান্য ইবাদত এসেছে অনেক পরে।

 

ঔষধের নামে বিষপান সমাজে কম হয় না। তেমনি কম হয় না শিক্ষার নামে কুশিক্ষা এবং জ্ঞানের নামে অজ্ঞতার বিতরন। এজন্যই মাদ্রাসাতে নকল হয়, বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্ষণে উৎসব হয়। হাজা, মজা, চড়াজাগা নদীতে যে সামান্য পানি থাকে -তাতে নৌকা চলে না, প্লাবনও আসে না, এমন কি তা দিয়ে কৃষিকাজও হয় না। তেমনি জ্ঞানের ক্ষেত্রেও। জীবনের মোড় পাল্টাতে হলে গভীরতর জ্ঞানের প্রয়োজন। গভীর জ্ঞানেরই ফলেই আসে ব্যক্তির ঈমান, আমল ও চিন্তার মডেলে পরিবর্তন। যে কোন সমাজ বিপ্লবের জন্য এরূপ জ্ঞানের বিপ্লব শুধু জরুরী নয়, অপরিহার্যও। শুধু তেলাওয়াতে সেটি সম্ভব না। সম্ভব হলে মুসলিমরাই হতো জ্ঞান-বিজ্ঞানে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, কারণ জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাবের এতো তেলোয়াত আর কোন দেশে কোন কালেই হয়নি –যা বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোতে হয়।

 

সমস্যা হলো, অজ্ঞতাই যে আমাদের সকল দুরাবস্থার কারণ -সেটির উপলব্ধি নিয়েও রয়েছে ব্যর্থতা। সঠিক পথের সন্ধান লাভের পর কোন সুস্থ্যব্যক্তি ভ্রান্ত পথে দৌঁড়ায় না। তেমন একটি পথে শত শত বছর চলার পরও যদি সাফল্য না আসে তবে বুঝতে হবে পথটি সঠিক নয়। আমাদের ব্যর্থতাই প্রমান করে, সঠিক পথটি আমাদের চেনাই হয়নি। জাহান্নামের আযাব এতই কঠিন যে সে আযাবের সামান্য উপলব্ধিও ব্যক্তির জীবনে মহত্তর বিপ্লব আনতে বাধ্য। সে বিপ্লব না আসলে বুঝতে হবে, সে আযাবের জ্ঞানলাভই ঘটেনি। নিজের অজ্ঞতা তখন সুস্পষ্ট রূপে ধরা পড়ে। নবীজী (সা) তাঁর ১৩ বছরের মক্কীজীবনে মুসলিমদের মাঝে পরকালের ভীতি তথা আখেরাতের জ্ঞানকেই মজবুত করেছিলেন। তার পিছনে ছিল কোর’আনের জ্ঞান। মক্কায় নাযিলকৃত সুরাগুলির আলোচ্য বিষয় ছিল এগুলো। সে সময়ে মুসলিমদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন হয়েছে। কিন্তু সে নির্যাতন বরং তাদের কোর’আন-লব্ধ জ্ঞান ও চেতনাকে আরো শানিত করেছিল। ধারালো করেছিল তাদের ঈমান ও উপলব্ধিকে।

 

মৃত্যুর মুখোমুখী দাঁড়িয়ে সত্যের সম্যক উপলব্ধির যে সামর্থ্য আসে -তা বক্তৃতায় বা ওয়াজে সৃষ্টি হয় না। ফলে মক্কায় যে কোর’আনী জ্ঞানের ভান্ডার গড়ে উঠেছিল সেটি আজও অতুলনীয়। মদিনার বুকে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল মক্কীজ্ঞানের সে শক্ত বুনিয়াদের উপর ভিত্তি করেই। জ্ঞানের গভীরতম স্তরে পৌঁছার এ মারেফাত পীরের খানকাতে সৃষ্টি হয় না। ওয়াজের মাহফিলেও নয়। বাংলাদেশে যেরূপ লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে ওয়াজ বা ইজতেমা হয় নবীজীর (সা) আমলে সেটি হয়নি। কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বক্তৃতায় নবীজী (সা) যেভাবে মানুষকে চিন্তায় আগ্রহী ও অভ্যস্থ করেছেন সেটিই বরং আত্ম-উপলব্ধির সামর্থ্য বাড়িয়েছে। এটিই হলে প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তি তথা বুদ্ধির প্রয়োগ। ইসলামি পরিভাষায় এটিই হলো তাদাব্বুর, তাওয়াক্কুল ও তাফাক্কুর। অথচ বাংলাদেশে এটিরই মহা সংকট। দেশে মাদ্রাসা বাড়ছে, মসজিদও বাড়ছে। বাড়ছে নামাযীর সংখ্যাও। কিন্তু যা বাড়েনি বা বাড়ছে না -তা হলো বুদ্ধিবৃত্তি তথা বিবেককে কাজে লাগানোর সামর্থ্য। দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, ধর্ম-কর্ম বা ব্যবসাবাণিজ্য জুড়ে আজ যে বিবেকহীনতা -সেটিই প্রমান করে সমাজকে সভ্যতর করার কাজে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। চেতনার রাজ্যে যেভাবে আগাছা বাড়ছে তাতেই প্রমানিত হয়, জ্ঞানের বীজ সেখানে যথার্থভাবে ছিটানোই হয়নি। অথচ একাজের দায়িত্বটি বিশেষ কোন নেতা বা দলের নয়, প্রতিটি মুসলিমের। কারণ, আল্লাহতায়ালার কাছে তারাই এজন্য দায়বদ্ধ। ব্যর্থতার জবাব সবাইকে আলাদা ভাবে দিতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে এভাবে পিছিয়ে থাকলে সভ্যতর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ যে অসম্ভব -সে হুশই বা ক’জনের? বরং তাতে ব্যর্থতাই দিন দিন নতুন গভীরতা পাবে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে তো সে ইতিহাসই নির্মিত হচ্ছে।  ১ম সংস্কণ ২৩/০২/২০০৭; ২য় সংস্করণ ২৮/১২/২০২০।

 




মিডিয়ার শক্তি ও গুরুত্ব

ফিরোজ মাহবুব কামাল

মিডিয়ার শক্তি

মানব জাতির ইতিহাসে বিস্ময়কর বিপ্লব এসেছে জ্ঞানের ভূবনে। বিগত মাত্র এক শত বছরে বিশ্বে যত বিজ্ঞানী জন্ম নিয়েছেন -তা মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসেও জন্মেনি। শুরু থেকে এ অবধি জন্ম নেয়া সকল বিজ্ঞানীদের অর্ধেকেরও বেশী সম্ভবতঃ এখনো জীবিত। হাভার্ড, ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড, লন্ডন, শিকাগো প্রভৃতি নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটিতে যতজন বিজ্ঞানী আজ কাজ করেন বা শিক্ষকতা করেন মানব ইতিহাসের বহুশতাব্দী কেটে গেছে ততজন বিজ্ঞানীর জন্ম না দিয়েই। তবে এ শতাব্দীর সর্বশেষ বিপ্লব হলো মিডিয়া বিপ্লব। মানব জাতির ইতিহাসে এটি এক অতি বিস্ময়কর বিপ্লব। জ্ঞানচর্চার সামর্থ্যের বলেই মানুষ মহান স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্টি। মিডিয়া বিপ্লব সে জ্ঞানচর্চাকে শুধু বেগবানই করেনি, জ্ঞানের ভুবনকে বাড়িয়েছে অবিশ্বাস্যভাবে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের বদৌলতে বিশ্বের যে কোন প্রান্তে বসে যে কেউ অতি নগন্য মূল্যে নানা দেশের নানা ভাষার হাজার হাজার পত্রিকা পড়ার সুযোগ পাচেছ। বিশ্বের যে কোন প্রান্তর থেকে একজন ছাত্র সহজে ঢুকে পড়তে পারে আমেরিকান কংগ্রেস লাইব্রেরীতে। তন্ন তন্ন করে খুঁজতে পারে সেখানে রাখা তার পছন্দের বই বা জার্নালের পৃষ্টা।

ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবনে পরিবর্তনে জ্ঞান ইঞ্জিনের কাজ করে। জ্ঞানই মানব জীবনে মূল্য ও মর্যাদা বাড়ায়। দেয় শক্তি। অথচ অতীতে জ্ঞান কখনই এতটা সহজলভ্য ছিল না। জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে মানুষকে একসময় পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র-মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে হয়েছে। অথচ এখন জ্ঞানের সে অবিশ্বাস্য বিশাল ভুবন কম্পিউটারের কি বোর্ডে। যাদুকেও এটি হার মানায়। এ শক্তির বদৌলতে মিডিয়া পাল্টে দিচ্ছে জ্ঞানের ভূবন, চেতনার জগত, পাল্টে দিচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা, রুচিবোধ ও মূল্যবোধ। কারণ, সকল পরিবর্তনের শুরু হয় চেতনা থেকে। ব্যক্তি তার জীবনের যাত্রা পথে নির্দেশনা পায় এখান থেকেই। আর সে চেতনা রাজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য অজ আর কোন রাজার নয়, কোন প্রেসিডেন্ট বা প্রধান-মন্ত্রীরও নয়। বরং মিডিয়ার। ফলে মিডিয়া পাল্টে দিচ্ছে বিশ্বকে। মিডিয়ার শক্তি তাই অপরিসীম।

মিডিয়া হলো জাতীয় জীবনের আয়না। মানবের চেতনা অদৃশ্য; কিন্তু দৃশ্যময় হয় কথা, কর্ম, চিন্তা ও লেখনীর মাধ্যমে। মিডিয়া সেগুলোকেই জনসম্মুখে হাজির করে। মিডিয়ার কৃতিত্ব এখানেই। পত্রিকার পাতায়, রেডিওর আওয়াজে ও টিভির শব্দ ও ছবিতে ধরা পড়ে জীবন ও জগত নিয়ে একটি জাতির উপলব্ধি, ধ্যান-ধারনা ও রুচিবোধ। জাতির নীরব উপলব্ধিগুলো মিডিয়ার মধ্য দিয়ে সরব হয়। এখানে পরিচয় মেলে  ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কারে কার কি ভাবনা। ফলে ধরা পড়ে চিন্তার সুস্থ্যতার সাথে অসুস্থ্যতাও। অপর দিকে এটি জ্ঞান বিতরণের শক্তিশালী মাধ্যম। নবীজীর (সা) নির্দেশ হলো, দোলনা থেকে কবর পর্যন্তু জ্ঞান-লাভ করো। কিন্তু কোন বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ই জ্ঞান-বিজ্ঞান আজীবন শেখায় না। কিন্তু মিডিয়া সে সুযোগ দেয় জীবনের শেষ দিন অবধি। এ গুলো হলো পত্র-পত্রিকা, রেডিও, টিভি ও জার্নাল। পত্র-পত্রিকা ও জার্নালে লেখেন এবং রেডিও-টিভিতে কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু জাঁদরেল অধ্যাপকেরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত লেকচারের চেয়ে তাদের সে লেখনি ও বক্তব্য অধিক সমৃদ্ধ। ফলে ছাত্র না হয়েও তাদের সে জ্ঞানদান প্রক্রিয়া থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ করে দেয় মিডিয়া। উন্নত দেশগুলি আজীবন শিক্ষার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম তাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সেটি হলো মিডিয়া।

বাণিজ্যিক পণ্যের লেনদেন বা বেচাবিক্রি হয় যেমন হাটবাজারে, জ্ঞানের ফেরি হয় তেমনি মিডিয়ায়। হাটবাজার ছাড়া অর্থনীতি চলে না, তেমনি মিডিয়া ছাড়া একটি আধুনিক জাতির বুদ্ধিবৃত্তিও চলে না। তাই কোন জাতি কতটা চিন্তাশীল ও বিবেকবান -সে পরিচয় মেলে তাদের মিডিয়ার অঙ্গণ দেখে। মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, এমনকি বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত অবধি এটি সংযোগ বাড়ায়। এ সংযোগ যেমন খবরা-খবর ও ব্যক্তির জানাজানিতে, তেমনি চেতনার লেনদেনেও। আত্মীয়তার প্রতিষ্ঠায় পরস্পরে জানাজানিটা হলো প্রধানতম শর্ত। পরস্পরের মাঝে সম্পর্ক গড়ায় এটি সিমেন্টের কাজ করে। ভিন দেশের নেতা, আলেম বা আবিস্কারক প্রাচীন কালে অপর দেশে অপরিচিতই থেকে যেত। কিন্তু আজ মিডিয়ার বদৌলতে অন্য গোলার্ধেও কোটি কোটি মানুষের কাছে আত্মার আত্মীয়তে পরিণত হয়েছে। জাতীয় জীবনে উন্নয়ন, সংহতি ও সম্পৃতির সৃষ্টিতে এর চেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম নেই। মুসলিম বিশ্ব জুড়ে আজ যে বিভেদ ও বিচ্ছেদ -তার কারণ অনেক। তবে অন্যতম কারণ হলো দুর্বল মিডিয়া। দুর্বল মিডিয়ার কারণে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাঝে সিমেন্ট লাগানোর কাজটিই যথার্থভাবে হয়নি। সৃষ্টি হয়নি চিন্তার সংযোগ, সমতা ও একতা। এবং বাড়ছে না সৌহার্দ ও সংহতি। ফলে যে প্যান-ইসলামিক চেতনা ইসলামের অতি মৌলিক বিষয় -সেটিই গড়ে উঠেনি। 

 

কেন মিডিয়া

পশুর জীবনে খাদ্য ও পানীয়ের সংগ্রহ ছাড়া বাঁচবার মহত্তর লক্ষ নেই। পশুরা সমাজ গড়ে না, সভ্যতাও গড়ে না। তাদের মাঝে সিমেন্ট লাগানোর প্রয়োজন পড়ে না। তারা বাঁচে অন্য পশুর বা মানুষের পেট পূর্ণ করার প্রয়োজনে। ফলে পশুর জীবনে প্রচার বা মিডিয়ার প্রয়োজন নাই। অথচ মানুষ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে। শুধু নিজেকে নিয়ে নয়, অপরকে নিয়েও ভাবে। এবং যেটি ভাবে, সেটির প্রচার ও প্রতিষ্ঠাও চায়। মিডিয়ার জন্ম এ প্রেরনা থেকেই। বিভিন্ন প্রজাতির হয়েও পশুরা একই জগতের বাসিন্দা। কিন্তু মানুষের জগত ভিন্ন ভিন্ন। এ ভিন্নতা গড়ে উঠে ভিন্ন ভিন্ন চেতনা, রুচিবোধ, সংস্কৃতি ও বাঁচবার বিবিধ প্রেরণার ভিত্তিতে। তাই ভূগোলের পৃথিবী সবার এক হলেও মনের পৃথিবী সবার এক নয়। তবে সবাই চায় অন্যকে আপন চেতনা-রাজ্যের অধিবাসী করতে। আর এ থেকেই বাড়ে প্রচার। কারণ প্রচার ছাড়া কোন কিছুর প্রসার বাড়ে না। ফলে ভৌগলিক সীমানা বাড়াতে আজ যতটা যুদ্ধের উত্তাপ, তার চেয়ে অধিক উত্তাপ নিয়ে প্রচন্ডতর যুদ্ধ চলছে প্রচার জগতে। কারণ, সবাই চায় অন্যদেরকে নিজ নিজ চেতনা, দর্শন ও সাংস্কৃতিক রাজ্যের প্রজা বানাতে। ফলে শুরু হয়েছে আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। আজ বিশ্ব জুড়ে এ যুদ্ধেরই প্রচন্ড আয়োজন। এ যুদ্ধে পরাজিতদের চেতনার রাজ্যই শুধু বিধ্বস্ত হচ্ছে না, ধ্বসে পড়ছে তাদের রাজনৈতিক ভূগোলও। চেতনার রাজ্যে এ পরাজয়ের কারণেই সোভিয়েত রাশিয়ার রাজনৈতিক ভূগোলকে খন্ডিত করতে শত্রুদেরকে একটি তীরও ছুঁড়তে হয়নি।

রাষ্ট্রের ভুগোলে ফাটল ধরে বস্তুত চেতনার ভূগোলে ফাটল ধরার কারণে। এজন্যই অতীতে বহু সাম্রাজ্য টিকেনি। অথচ মনের রাজ্যে অটুট ঐক্য সৃষ্টি হলে খন্ডিত ভুগোলও তখন একতাবদ্ধ হয়। উত্তর অ্যামিরকায় যে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে উঠেছে সেটি যতটা সামরিক শক্তিবলে, তার চেয়ে অধিক অভিন্ন মনজগতের কারণে। অভিন্ন মন ও মননের কারণেই সেখানে ইংরেজ, ফরাসী, স্পানীশ, ডাচ, জার্মান সবাই একই সংস্কৃতিতে একাকার হয়ে গেছে। এজন্যই দেশটিকে বলা হয় “মেল্টিং পট”। একই লক্ষপথে এগুচ্ছে ইউরোপ। তারা যে একতাবদ্ধ ইউরোপ তথা ইউনাইটেড স্টেটস অব ইউরোপের জন্ম দিবে সে সম্ভাবনা অনেক। একাজে মিডিয়ার ভূমিকা বিশাল। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলিমগণ এমনই একই “মেল্টিং পট”এর জন্ম দিয়েছিল। মিশরীয়. সিরীয়, লেবাননী, ইরাকী, বারবার, সূদানী, মুর, তুর্কী, কুর্দি ও অন্যান্য বহু জনগোষ্ঠী ভিন্ ষাভাভাষী ও ভিন্ সংস্কৃতির হওয়া সত্ত্বেও সবাই একাকার হয়ে এক উম্মতে ওয়াহেদার জন্ম দিয়েছিল। সেটি সম্ভব হয়েছিল পবিত্র কোর’আনের প্যান-ইসলামী দর্শনের  কারণে। সে লক্ষ্যে কাজ দিয়েছিল অভিন্ন ধর্মরাষ্ট্র ও ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা। মানুষ তখন কোর’আনী দর্শন ও শিক্ষা নিয়ে একই চেতনা, একই রুচি, একই মূল্যবোধ ও একই জীবনবোধ নিয়ে গড়ে উঠতো। ফলে গড়ে ঊঠতো রাজনৈতিক একতাও। শক্তিশালী মিডিয়ার কারণে সেরূপ একতা গড়ার কাজটিই এখন অভাবনীয় শক্তি পেয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি শিক্ষাকে ঘরে ঘরে নেয় না, অথচ সেটি নেয় প্রচার মাধ্যম। পৌঁছে দেয় শয়নকক্ষে। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু শিক্ষিত-অশিক্ষিত -সবার সাথে গড়ে তোলে সরাসরি সংযোগ।

তবে সৃষ্টিশীল কাজের ন্যায় অনাসৃষ্টি ও ধ্বংসাত্মক কাজেও মিডিয়ার সামর্থ্য বিশাল। মানুষকে যারা বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করতে চায় তাদের হাতেও মিডিয়া যাদুকরী শক্তি তুলে দিয়েছে। অতীতে মিডিয়া হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হয়েছে জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী, স্বৈরাচারি ও বর্ণবাদী শক্তির হাতেও। এটি এতই শক্তিশালী যে এমন কি রাষ্ট্রীয় শক্তিকেও পরাজিত করতে পারে। শুধু  একটি দেশকে নয়, সমগ্র বিশ্বকে মিডিয়া “মেল্টিং পট”য়ে পরিণত করার সামর্থ্য রাখে। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ এ শক্তির বলেই সমগ্র বিশ্বকে একটি গ্লোবাল ভিলেজ এবং নিজেদের কালচারকে গ্লোবাল কালচারে পরিণত করার স্বপ্ন দেখছে।

 

মিডিয়ার সামর্থ্য ও মুসলিমদের ব্যর্থতা

মিডিয়া এখন আর শুধু জ্ঞান-বিতরণের মাধ্যম নয়, যুদ্ধের  হাতিয়ারও। এবং সেটি স্নায়ু যুদ্ধের। নিজেদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক এজেন্ডা পূরণে পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গের হাতে এটি এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তারা বহু দেশের সরকার ও মানচিত্র পরিবর্তন করছে মিডিয়ার সাহায্যে। তাই শুধু অস্ত্রের জোরে দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক প্রতিরক্ষা দেয়া সম্ভব নয়, সে কাজে অপরিহার্য হলো শক্তিশালী মিডিয়া। এক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলির অবস্থা অতি বেহাল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মুসলিমদের নিজে ঘরের খবর, এমন কি যুদ্ধের খবর শুনতে হয় প্রতিপক্ষের মুখ থেকে। অথচ মুসলিমগণ মিডিয়া থেকে বিস্তর লাভবান হতে পারতো। বিশেষ করে ইসলামের প্রসারে। ইসলামের লক্ষ্য, সত্যের আলোয় বিশ্বকে আলোকিত করা। ইসলামকে কবুল করা বা না করার দায়ভার অমুসলিমদের। কিন্তু বিশ্বের কোনে কোনে পবিত্র কোর’আনের বাণী পৌঁছানোর দায়িত্ব তো প্রতিটি মুসলিমের। অন্যদের কাছে কোর’আনের বাণীকে পৌঁছে দেয়া ভিন্ন অধিক দায়িত্ব এমনকি নবীদেরও দেয়া হয়নি। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সবচেয়ে উত্তম কাজ হলো তাঁর বাণীকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং মানুষকে তাঁর দিকে ডাকা। সে পবিত্র বয়নাটি এসেছে সুরা ফুস্সিলাতের ৩৩ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, “তাঁর চেয়ে কথায় আর কে উত্তম যে মানুষকে ডাকে আল্লাহর দিকে ও নেক আমল করে এবং বলে নিশ্চয়ই আমি মুসলিম।”  নবীজী (সা:) বলেছেন, “সম্ভব হলে আমার একটি বাণীকে অন্যদের কাছে দাও।” নবীজী (সা:)’র উপর যার সামান্যতম ভালবাসা আছে সে কি তাঁর নির্দেশ অমান্য করতে পারে?

মুসলিম হওয়ার অর্থ তাই একটি মিশন নিয়ে বাঁচা, সেটি কোর’আনী জ্ঞান ও নবীজী (সা:)’র শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেয়ার মিশন। এক কালে মুসলিমগণ সে মিশন পূরণে পাহাড়-পর্বত ও বিজন মরুভূমি পাড়ি দিয়েছেন। মিডিয়া সে পবিত্র কাজটিকে সহজ করে দিয়েছে; সে মিশন নিয়ে বাঁচায় ঈমানদারের কাছে শক্তিশালী হাতিয়ার তুলে দিয়েছে। বয়সের ভারে বা শারীরিক অসুস্থ্যতার কারণে অনেকেই সসস্ত্র জিহাদে অংশ নিতে পারেন না। অথচ ইসলামকে বিজয়ী করার বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদটি চলতে পারে কবরে যাওয়ার পূর্বপর্যন্ত। এবং সেটি মিডিয়াকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে। তখন মুসলিম পরিণত হয় আমৃত্যু মুজাহিদে এবং মৃত্যু ঘটে মুজাহিদ রূপে।

 

পয়গম্বরদের কাজ

প্রতিটি মুসলিমই মহান আল্লাহপাকের খলিফা বা প্রতিনিধি। খেলাফতের দায়িত্ব হলো ইসলামকে সকল ধর্ম ও মতবাদের উপর বিজয়ী করা। কিন্তু প্রচার না দিয়ে কি প্রতিষ্ঠা সম্ভব? প্রচারের লক্ষ্যেই মহান আল্লাহতায়ালা ১ লাখ ২৪ হাজার মতান্তরে ২ লাখ ২৪ হাজার রাসূল পাঠিয়েছেন। রাসূল শব্দের অর্থ হলো প্রচারক। সে যুগে পত্র-পত্রিকা ছিল না। অন্য কোন প্রচার মাধ্যমও ছিল না। রাসূলগণ নিজেরাই ছিলেন বার্তাবাহী। লোকালয়ে ঘুরে ঘুরে একাজ নিজেরা করেছেন। হযরত ইব্রাহীম (আ:) সত্যের বাণী নিয়ে তাঁর জন্মস্থান ইরাক থেকে ফিলিস্তিন গেছেন, সেখান থেকে মিশর গেছেন। গেছেন মক্কায়; সেখান থেকে আবার ফিরে গেছেন ফিলিস্তিন। এভাবে সত্যের বাণী ফেরী করতে নানা জনপদে ঘুরেছেন। যারা জান্নাতের বিনিময়ে নিজেদের জানমাল বিক্রয় করে তাঁরা তাঁর এ মহান সূন্নত নিয়ে বাঁচবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? সে মহান সূন্নত নিয়ে কিছু মুজাহিদ বাংলায় এসেছিলেন বলেই তো বাংলার মানুষ মুসলিম হওয়ার সুযোগ পেয়েছ। নইলে মুর্তিপূজারী হয়ে নিশ্চিত জাহান্নামে পৌঁছতে হতে।

আরবী ভাষায় পত্রিকাকে বলা হয় রেসালাহ। রেসালাহর সে কাজই করতেন রাসূলগণ। তাই মেডিয়া কর্মীর কাজটি পয়গম্বরদের কাজ। সে কাজটি কোর’আনের সত্য বাণীকে মানুষের ঘরে সুন্দর ভাবে পৌঁছে দেয়ার। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমের সে কাজের পরিচয় দিয়েছেন এ ভাবে, “ইউছাদ্দেকু বিল হুসনা” অর্থ: তারা সত্যের পক্ষে সুন্দর রূপে সাক্ষ্য দেয়। মুসলিমদের কাজ তাই শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত আদায় নয়, বরং সত্যের বীজকে সর্বত্র ছিটিয়ে দেয়াটিও। পাথর, ঝোপঝাড় ও মরুভূমিতে বীজ পড়লে তা গজায় না। গজালেও বেড়ে উঠে না। তবে এটিও সত্য, বিশাল এ পৃথিবীর সবটুকু পাথর, ঝোপঝাড় বা মরুভূমি নয়। বহু উর্বর ভূমিও রয়েছে। নবীপাক (সা) মক্কা, মদিনা ও তায়েফসহ বহুস্থানে দ্বীনের বীজ ছিটিয়েছিলেন। সে বীজ সব চেয়ে বেশী ফলেছে মদিনাতে। তবে মক্কাতেও সে বীজ বৃথা যায়নি। বরং হযরত আবু বকর (রা), হযরত হামযা (রা), হযরত ওমর (রা), হযরত উসমান ও হযরত আলী(রা)’র ন্যায় নবীজী (সা:)’র মহান সাহবাগণ বেড়ে উঠেছিলেন তো মক্কাতেই।

বিশ্বে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটি। বিশ্বে আজ যত আলেম, হাফেজ. মোফাচ্ছেরে কোরআন আছেন -তাদের সংখ্যাই নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের সংখ্যার চেয়ে হাজার গুণ অধিক। অথচ তারাই বা দ্বীনের বীজ অমুসলিমদের মাঝে কতটা রোপন করেছেন? কোর’আনের জ্ঞানকে ছড়িয়ে কাজে কত জন মিডিয়াকে ব্যবহার করছে? বরং তাদের সকল ব্যস্ততা নিঃশেষ হচ্ছে মসজিদ-মাদ্রসার চার দেয়ালের মাঝে। তাদের চিন্তা-ভাবনায় গুরুত্ব পাচ্ছে শুধু মুসলিমদের মাঝে ইসলাম চর্চা নিয়ে। যেন অমুসলিমদের কাছে কোর’আনের বার্তা পৌঁছাটি তাদের কোন দায়িত্বই নয়। অথচ এটি নবীজী (সা:)’র সূন্নত বিরোধী। রোম, ইথিওপিয়া, পারস্যসহ বহু অমুসলিম দেশের রাজাদের কাছে নবীকরীম (সাঃ) যখন ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন তখন আরবের অধিকাংশ জনগণই ছিল অমুসলিম। এমন কি অমুসলিম ছিল তাঁর নিজ পরিবারের অনেকেই। কিন্তু নিজ জন্মভূমিতে তিনি যে বাঁধা পেয়েছেন -তা তাঁকে অন্যদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

 

অধিকৃত মিডিয়া: হাতিয়ার অসভ্যতার

ইসলামের  পক্ষের শক্তিবর্গ আজ যেমন রাষ্ট্র পরিচালনার মূল আসন থেকে অপসারিত, তেমনি দূরে সরেছে আছে মিডিয়া থেকেও। শক্তিশালী এ মাধ্যমটি আজ বস্তুবাদী, ভোগবাদী, পুঁজিবাদী ও যৌনবাদীদের হাতে অধিকৃত। ফলে বিভ্যান্তি, ব্যর্থতা ও দুর্বৃত্তায়ন বেড়েছে শুধু রাজনৈতিক ময়দানেই নয়, বরং বুদ্ধবৃত্তিক ময়দানেও। মিডিয়া পরিণত হয়েছে অসভ্যতার হাতিয়ারে। ইসলামের বিপক্ষ শক্তি ইসলামের সত্য ও সুন্দর রূপটিকে অসুন্দর, মিথ্যা ও সেকেলে বলে। ইসলামপন্থিদের গায়ে মৌলবাদ ও সন্ত্রাসের লেবেলে লাগিয়ে শুধু গালিগালাজই করে করে না, তাদের নির্মুলেও লাগে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা এদের সম্মন্ধেই বলেছেন, ”ইউকাজ্জেবু বিল হুসনা।” অর্থ: “সুন্দরকে এরা মিথ্যা বলে।” অথচ এরাই আকর্ষণীয় করে পেশ করে অসত্য, অসুন্দর ও অসভ্যতাকে। ফলে যে নগ্নতা ও অশ্লিলতা এক সময় নিষিদ্ধপল্লীর সামগ্রী ছিল, মিডিয়ার বদলে সেগুলো আজ ঘরে ঘরে ফেরী হচ্ছে। শয়তানের যে মুখগুলো নোংরা গলিতে দাঁড়িয়ে অসুন্দর ও পাপাচারে হাতছানি দিত তা এখন টিভির পর্দায় সাধারণ মানুষের শয়ন কক্ষেও সোচ্চার। মহান আল্লাহতায়ালার প্রেরিত পয়গম্বরদের বিরুদ্ধে আবু জেহেল-আবু লাহাবেরা বা ফেরাউন-নমরুদেরা যে কথা গুলো বলতো, আজকের পত্র-পত্রিকা বা রেডিও-টিভিতে সে কথা গুলোই প্রচার রংচং লাগিয়ে প্রচার করছে। সেকালের আদিম অসত্য ও অসভ্য কথাগুলো তাদের হাতে আধুনিকতা পেয়েছে। নগ্নতা ও যৌনতার ন্যায় অশ্লিল বিষয়গুলোও শিল্পরূপে প্রশংসিত হচ্ছে।

মিডিয়া জগতে আজ যেরূপ মিথ্যার একচ্ছত্র আধিপত্য তার জন্য ইসলামের পক্ষের শক্তিও কম দায়ী নয়। তারা শক্তিশালী এ মাধ্যমটির গুরুত্বই অনুধাবন করেনি। এর গুরত্বটি তো তারাই বুঝবে -যারা অন্যকে কিছু শোনাতে বা বোঝাতে চান। ভাবটা এমন, যে পথে চলার ইচ্ছাই যার নাই -সে পথের খোঁজ নেয়া কেন? মুসলিমদের কাছে দাওয়াতের মত ফরজ কাজটি গুরুত্ব না পাওয়াতেই গুরুত্ব হারিয়েছে মিডিয়াও। দ্বীনের প্রচার গুরত্ব পেলে মিডিয়াও গুরুত্ব পেত। কারণ, মিডিয়াতো প্রচারেরই হাতিয়ার। ইতিহাসে বহু জাতির ভাষা পাল্টে গেছে, ছাপাখানা আবিস্কৃত হয়েছে, নানারূপ প্রচারযন্ত্র গড়ে উঠেছে এবং কোটি কোটি বই ছাপা হয়েছে খৃষ্টান ধর্ম-প্রচারকদের উদ্যোগে। অথচ মুসলিমগণ সে কাজে তেমন নামেনি। মিডিয়া ক্ষেত্রে এরূপ ব্যর্থতার কারণেই মুসলিমগণ অন্যদের কাছে দূরে থাক, নিজ সন্তানদের কাছেও ইসলামের সত্য ও সুন্দর কথাগুলো পৌঁছাতে পারছে না। এ ব্যর্থতার কারণেই তারা ভাসছে অন্যদের সৃষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক প্লাবনে।

অথচ বহু লক্ষ মানুষের পক্ষে বহু বছরে যা সম্ভব নয়, তার চেয়েও অধিক প্রচার সম্ভব অতি অল্প সময়ে মিডিয়ার বদৌলতে। ছাত্র-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, আদালতের বিচারক, সেনাবাহিনীর অফিসার, সরকারি আমলাসহ সকল প্রকারের মানুষের কাছে তখন পৌঁছে যেত দ্বীনের দাওয়াত। এভাবে পৌঁছে যেত  রাষ্ট্রের উন্নয়নে ইসলামি চেতনাসমৃদ্ধ গঠনমূলক চিন্তাগুলিও। মিডিয়ার সৃষ্টিশীল ও শক্তিশালী ভূমিকা তো এ কারণেই। মানুষের কানে কানে ও চেতনা রাজ্যে মিডিয়া যত সহজে কোন দর্শন বা ধ্যান-ধারনাকে পৌঁছাতে পারে তা অন্যভাবে সম্ভব নয়। নবীজীর (সা) যুগে মিডিয়া না থাকাতে নবীপাক তার বাণীকে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে প্রচার করতে পারেননি। তিনি ও তাঁর মহান সাহাবাগণ মিডিয়ার অভাব পালন করেছেন পায়ে হেঁটে হেঁটে।

মহান আল্লাহতায়ালার বাণীকে অন্যদের কাছে ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজটিকে সেকালে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হত যে  সাহাবায়ে কেরাম সেগুলোকে যেমন মুখস্থ্য করতেন, তেমনি কাষ্টফলক, হাড্ডি খন্ড, পাথরের ফালি ইত্যাদির উপর লিখেও রাখতেন। পরিতাপের বিষয়, সে সাথে বিস্ময়ের বিষয় হলো, নবীজী (সা:) তাঁর নবুয়তের জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি প্রচারের যে কাজটি নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে করে গেলেন -মুসলিমদের কাছে সেটি আজ গুরুত্ব পাচ্ছে না। মসজিদের মাঝে তাসবিহ-তাহলিল নফল ইবাদত যতটা গুরত্ব পেয়েছে, দাওয়াতের ন্যায় ফরজ কাজ ততটা পায়নি। ফলে গুরুত্ব পাায়নি নিজেদের এবং সে সাথে অন্যদের ইসলামের আলোকে আলোকিত করার কাজও। অথচ পবিত্র  কোর’আনের বাণীকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানোর কাজে একমাত্র তারাই হলো মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা ও আনসার। সে দায়িত্বটি প্রতিটি মুসলিমের। বিচার দিনে এ কাজের জবাবদেহীতা প্রতিটি মুসলিমকে আলাদা ভাবে দিতে হবে। কিন্তু তাঁরা যদি সে দায়িত্ব পালন না করে -তবে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের বিপথগামী হওয়ার দায়ভাব কারা বইবে?

 

 সামনে মহাসুযোগ

বিজ্ঞানের অগ্রগতি মুসলিমদের সামনে বিশাল এক সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে। অন্যান্য ধর্ম ও মতবাদগুলোর ব্যর্থতা আজ আর গোপন কিছু নয়। তাদের ব্যর্থতার পাশাপাশি বিরাজ করছে ইসলাম প্রচারের স্বাধীনতা। নবীজী (সা:) তাঁর জীবদ্দশাতে এতো সুয়োগ পাননি। দ্বীনের ঝান্ডা নিয়ে তাঁকে প্রতি কদম যুদ্ধ করে সামনে এগোতে হয়েছে। অন্ততঃ প্রচার ক্ষেত্রে এখন সে বাধা এখন নেই। ইসলামের শক্তির উৎস হলো পবিত্র কোর’আন। মুসলিমগণ আজ নানা কদর্যতায় আছন্ন হলেও মহান আল্লাহতায়ালার এ পবিত্র গ্রন্থ্যটি এখনও অবিকৃত। মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য তাদের বিশাল তেল বা গ্যাস ভান্ডার বা জনশক্তি নয়, সেটি এই কোর’আন। সমগ্র মানব জাতির জন্যও এটিই সবচেয়ে বড় নেয়ামত। কিন্তু বিশ্ববাসীর বড়ই দুর্ভাগ্য, মহান আল্লাহতায়ালার এ পবিত্র গ্রন্থ্যটির সাথেই তাদের পরিচয় ঘটেনি। শুধু তাই নয়, এমন কি যথার্থ ভাবে পরিচয় ঘটেনি অধিকাংশ মুসলিমের সাথেও। পরিচয় করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব যাদের ছিল তারা নিজেরাই আজ অজ্ঞতার শিকার।

বিজ্ঞানের বদৌলতে বিশ্ববাসীর সামনে সুযোগ এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার এ পবিত্র গ্রন্থ্যটি নিয়ে গভীর অধ্যয়ণ ও গবেষনার। তবে মুসলিমদের দায়িত্ব শুধু কোর’অআন থেকে শিক্ষা নেয়া নয়, বরং সবার জন্য কোর’আনকে সহজলভ্য করা। এবং সে সাথে বিশ্ব-অবলোকন ও ঘটনার বিশ্লেষণে ইসলামের নিজস্ব মানদন্ড ও মূল্যবোধকে খাড়া করা। শয়তানি শক্তির মিথ্যাচার ও মূল্যবোধ একমাত্র এভাবেই দূর হতে পারে। আর এ কাজটি অতি সহজে ও কম মেহনতে সম্ভব পত্র-পত্রিকা, টিভি-রেডিও ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তখন বিশ্ববাসীর সংযোগ বাড়বে মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত কোরআনী জ্ঞানের সাথে। আর অজ্ঞতার আঁধার অপসারণে কোরআনী জ্ঞানের ক্ষমতা তো বিস্ময়কর। সূর্যের আলো যেমন মুহুর্তের মধ্যে আঁধারমূক্ত করে, কোরআনের আলোও তেমনি আঁধার সরাতে পারে কোটি কোটি মানুষের জীবন থেকে। আলোকিত সে ব্যক্তির জীবনে তখন পরিবর্তন আসে তাঁর চেতনায়, চরিত্রে ও কর্মে। তখন নির্মিত হয় উচ্চতর মূল্যবোধের সংস্কৃতি ও সভ্যতা। ইসলামের প্রচার, প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে এভাবেই এক অভাবনীয় বিপ্লব আসতে পারে। আজও পাশ্চাত্যে প্রতিদিন যারা মুসলিম হচ্ছে তারা হচ্ছে ইসলামের সে অবিকৃত সত্য রূপকে দেখে। মুসলিমদের দায়িত্ব, সত্যের সে আলোকে আরো ব্যাপকতর ও বলিষ্ঠতর করা। মিডিয়া এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ বাহন হতে পারে। ফলে অন্যদের কাছে মিডিয়ার গুরুত্ব যেখানে রাজনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক, মুসলমানের কাছে সেটি পবিত্র ইবাদত। ২৮/১২/২০২০।

 




বাংলাদেশের শিক্ষা-সংকট: সমাধান কীরূপে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 কতটুকু সফল হচ্ছে শিক্ষা?

শিক্ষাব্যবস্থার মূল্যায়নে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি ছাত্র, শিক্ষক বা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানর সংখ্যা ও ইমারত নয়। কত বছর বা বছরে কত ঘন্টা ছাত্রকে শিক্ষা দেওয়া হয় -সেটিও নয়। স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, পিএইচডি বা সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে কতজন বের হলো -সেটিও মাপকাঠি নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতজন ছাত্র অন্ধকার থেকে আলোর পথ পেলো, কতজন দুর্বৃত্ত চরিত্রবান হলো, জাতির মেরুদন্ড কতটা মজবুত হলো এবং মানবিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক দিক দিয়ে জাতি কতটা সামনে এগোলো সেগুলি। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা বাড়লে নিছক ছাত্র, শিক্ষক ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি পাওয়াতে দেশের কল্যাণ বাড়ে না। শিক্ষালয়েই নির্মিত হয় জাতির মেরুদন্ড। এখানে থেকেই জাতি পায় বেঁচে থাকা ও বেড়ে উঠার শক্তি। নির্মিত হয় জাতির মন, মনন ও সংস্কৃতি। তাই নিছক ক্ষেতে-খামারে ও কল-কারখানায় উৎপাদন বাড়ালে জাতি বাঁচে না। এজন্য বিদ্যাচর্চাও বাড়াতে হয়। বিবেক বা আত্মার পুষ্টির জন্য এটি অপরিহার্য। নইলে দেহ নিয়ে বেঁচে থাকাটি সম্ভব হলেও অসম্ভব হয় মানবিক গুণ নিয়ে বাঁচাটি।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বহু বেড়েছে। গ্রামে গ্রামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু থানা পর্যায়েই নয়, ইউনিয়নেও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বহু জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষাই সরকারি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত। অথচ আজ থেকে শত বছর আগে সমগ্র দেশে একখানি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। অধিকাংশ জেলায় ছিল না কলেজ। আজ বিপুল হারে বেড়েছে ছাত্র-শিক্ষকের সংখ্যাও। কিন্তু বেড়েছে কি সেগুলিও যা শিক্ষা-বিস্তারের সাথে সাথে বেড়ে উঠা উচিত? নির্মিত হয়েছে কি চরিত্র? মজবুত হয়েছে কি জাতির মেরুদন্ড? বেড়েছে কি সততা, স্বনির্ভরতা, নৈতিকতা ও আবিস্কারের সামর্থ্য? বেড়েছে কি আত্মমর্যাদা? দূর্নীতির বিস্তারে বনজঙ্গলে বসবাসকারি বহু আদিবাসি থেকেও যে বাংলাদেশের জনগণ নীচে নেমেছে -সেটি কি গোপন বিষয়? বরং চরিত্র ও নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রে ব্যর্থতাগুলি বেড়েছে ভয়ানক ভাবে। শিক্ষা খাতে ব্যর্থতার দলিল তো এই, দুর্নীতিতে বাংলাদেশ বিশ্বের সব দেশকে অতিক্রম করে ৫ বার প্রথম হয়েছে। এসব দুর্বৃত্তগণ যে ক্ষেতখামার ও কলকারখানা থেকে আসেনি, বরং তাদের অধিকাংশই যে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রিধারি -তা নিয়েও কি সন্দেহ আছে? এদুর্বৃত্তরা চাকুরির নামে সরকারি অফিসে বসে ঘুষ খাওয়া ও নানারূপ দুর্নীতি করাকে নিজেদের অধিকার মনে করে।

 

মূল সমস্যা কোথায়?

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা অনেক। তবে বড় সমস্যা অর্থাভাব নয়। বিদ্যালয় বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কমতিও নয়। বরং মূল সমস্যাগুলো শিক্ষাদানের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, দর্শন ও শিক্ষা-পদ্ধতিতে। যা শেখানো হয় এবং যারা শেখায়, সমস্যা ঠিক সেই জায়গাতে। ১৪ শত বছর আগে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সভ্যতাটি যখন নির্মিত হয়েছিল তখন বাংলাদেশে আজ একটি জেলায় যত স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা আছে তার সিকি ভাগও ছিল না। যত বই-পুস্তক ও শিক্ষাসামগ্রী নিয়ে আজ বিদ্যাবিতরণের আয়োজন, সেটিও ছিল না।  অথচ সেদিন দারিদ্র্য ও অপ্রতুল অবকাঠামো নিয়ে মানবতা-সমৃদ্ধ অতি বিস্ময়কর সভ্যতার নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশে আজ কেন সেটি হচ্ছে না -সেটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। চিন্তাশীল মানুষের উচিত তা নিয়ে ভাবা এবং সঠিক উত্তর খুঁজে বের করা। এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর সাথে জড়িত আমাদের বাঁচামরা।

ট্রেনের গতি বা সেবার মান বড় কথা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি কোন দিকে যাচ্ছে -সেটি। বাংলাদেশর শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি অসৎ উদ্দেশ্যে চালু করেছিল ঔপনিবেশিক বৃটিশ শক্তি। প্রণীত হয়েছিল, ঔপনিবেশিক শাসনের একনিষ্ঠ সেবাদাস তৈরীর কাজে। এবং সে জন্য জরুরি ছিল, মুসলিমদের যেমন ইসলাম থেকে দূরে সরানো, তেমনি তাদেরকে চরিত্রহীন করা। কারণ তারা জানতো, মুসলিমদের চেতনায় ইসলাম থাকলে এবং তারা চরিত্রবান হলে –তারা কখনোই ঔপনিবেশিক শত্রু শক্তির সেবাদাস হবে না। তারা চেয়েছিল শিক্ষার নামে এমন এক শ্রেণীর মানুষ সৃষ্টি যারা রক্তমাংশে ভারতীয় হলেও বৃটিশের বিশ্বস্ত দাস হওয়াকে সন্মানজনক ভাববে। বৃটিশ শিক্ষামন্ত্রী লর্ড মেকলে বৃটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সেটিই সগর্বে ঘোষণা করেছিল। এ লক্ষ্যে তারা সফলও হয়েছিল।

গোলাম সৃষ্ঠির কাজে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ যে শুধু সেক্যুলার স্কুল-কলেজ খুলেছিল -তাই নয়। মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৭৮০ সালে কলিকাতায় উপমহাদেশের প্রথম আলিয়া মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল তৎকালীন বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিং। মাদ্রাসাটির মূল কাজ হয়, মুসলিমদের ইসলামের মৌল শিক্ষা থেকে দূরে সরানো। ছাত্রদের সামনে মহান আল্লাহতায়ালকে পরিচিত করানো হয় স্রেফ উপাস্য রূপে। তিনি যে রাষ্ট্রের উপর সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, সে রাষ্ট্রের আইনদাতা যে একমাত্র তিনিই এবং সে আইনের প্রতিষ্ঠায় জিহাদ করা ও সেগুলি মেনে চলা যে ফরজ –ইসলামের সে মৌলিক শিক্ষাগুলি পরিকল্পিত ভাবে পাঠ্যসূচী থেকে দূরে সরানো হয়েছিল। ফলে সে শিক্ষায় লাভের চেয়ে ক্ষতিই হয়েছে অধিক।

শিক্ষিতরা নিজ দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় এবং নিজ দেশের স্বাধীনতায় শ্রম দিবে, অর্থ দিবে, এমনকি প্রাণও দিবে – সেটিই তো কাঙ্খিত। এমন আত্মত্যাগে শিক্ষাব্যবস্থা দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করবে এবং সততা ও আত্ম-ত্যাগকে দেশের আচারে পরিণত হবে –সেটিই তো শিক্ষানীতির কাজ। কিন্তু বৃটিশের গড়া শিক্ষাব্যবস্থায় সেটি হয়নি। বরং সে শিক্ষাব্যবস্থায় তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ নিজেদেরকে বৃটিশের ‘মোস্ট-অবিডিয়েন্ট সার্ভেন্ট’ রূপে পরিচিতি দিতে লজ্জাবোধ করেনি। সাম্রাজ্যবাদী শাসনের পক্ষে তারা যে শুধু কলম ধরেছে বা অফিস আদালতে কাজ করেছে -তাই নয়। দেশে-বিদেশে ঔপনিবেশিক শাসন বাঁচাতে গুপ্তচরবৃত্তি করেছে এবং অস্ত্রও ধরেছে। বহু স্বদেশীকে হত্যাও করেছে। এমনকি নিরপরাধ মানবহত্যায় ইরাক, ফিলিস্তিন, আফ্রিকা, ইন্দোচীনসহ নানা দেশে গেছে। সাম্রাজ্যবাদীদের দেওয়া মজুরি, পদবী ও উপঢৌকনকে এরা জীবনের  বড় অর্জন ভেবেছে।  ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনমূক্ত হলেও পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের মানুষ নিজ দেশে ও নিজ ধর্মে অঙ্গিকারহীন এসব বৃটিশ-সেবাদাসদের শাসন থেকে মুক্তি লাভ করেনি। ফলে কিছু রাস্তা-ঘাট, স্বুল-কলেজ ও শিল্প-করখানা নির্মিত হলেও শিক্ষার মূল লক্ষ্যে পরিবর্তন বা সংস্কার আসেনি। বার বার ভূগোল বা সরকার পরিবর্তন হলেও তাই পরিবর্তন আসেনি বাঁচবার লক্ষ্যে ও রূচীবোধে। বিদেশী স্বার্থের সেবক তৈরীর যে লক্ষ্যে এটি প্রণীত হয়েছিল এখনও সে কাজ অব্যাহত ভাবে চলছে। বিদেশী কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অঙ্গিকারে নিজ-দেশ ও নিজ-ঐতিহ্য ছেড়ে এরা বিশ্বের যে কোন দেশে সেবাদাসের দায়িত্ব পালনে রাজি। বাংলাদেশে এজন্যই দেশপ্রেমিক নাগরিকের প্রচন্ড অভাব। অথচ অভাব হয় না বিদেশী এনজিও বা সংস্থার এজেন্ট পেতে।

 

কেন শিক্ষা?

কথা হলো, কেন শিক্ষা? কেনই বা মানুষ শিক্ষিত হবে? শিক্ষার উদ্দেশ্যই বা কি? মানব জীবনের এগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অথচ এর কোন সর্বজন-সম্মত উত্তর নেই। এ জগতে সবাই যেমন একই উদ্দেশ্যে বাঁচে না তেমনি একই উদ্দেশ্যে শিক্ষিতও হয় না। অনেকেই শিক্ষাকে বেশী বেশী জানার মাধ্যম মনে করেন। কেউ ভাবেন, শিক্ষার কাজ যুগোপযোগী নাগরিক গড়া। কেউ বলেন, এর লক্ষ্য ব্যক্তিত্বের বিকাশ। কারো মতে, এটি অর্থ-উপার্জনের মাধ্যম। শিক্ষা নিয়ে মানুষের এরূপ ভিন্ন ভিন্ন ভাবনার কারণগুলো হলো মগজে বাসাবাঁধা ভিন্ন ভিন্ন জীবন-দর্শন। তাই শিক্ষা নিয়ে মুসলিমের ভাবনা অমুসলিমদের ভাবনা থেকে ভিন্নতর। কারণ, অমুসলিম যে উদ্দেশ্যে বাঁচে, মুসলিম সে উদ্দেশ্যে বাঁচে না। লক্ষ্য ও পথ ভিন্ন হলে, বাহন ও পাথেয় ভিন্ন ভিন্ন হয়। ফলে মুসলিমের হালাল-হারামের বাছ-বিচার শুধু পানাহারের ক্ষেত্রে নয়। একই রূপ বাছবিচার হয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও। দেহের প্রয়োজনের ন্যায় মুসলিমের মনের প্রয়োজনও অমুসলিম থেকে ভিন্ন।

মুসলিমের শিক্ষার মূল লক্ষ্যের কাজ বাঁচার মূল লক্ষ্যে সফলতা দেওয়া। বাঁচার লক্ষ্য ও শিক্ষার লক্ষ্যকে পরস্পরে পরিপূরক হতে হয়। প্রশ্ন হলো, বাঁচার লক্ষ্য কি? এ প্রশ্নের উত্তর অমুসলিমের কাছে যাই হোক, মুসলিমের কাছে সেটিই যা পবিত্র কোর’আনে বর্ণীত হয়েছে। এবং সেটি হলো: “আল্লাযী খালাকাল মাউতা ও হায়াতা লি ইয়াবলুয়াকুম আইয়োকুম আহসানা আমালা” অর্থ: তিনি (সেই মহান আল্লাহ) যিনি মৃত্যু ও জীবনকে সৃষ্টি করেছেন এজন্য যে, তিনি পরীক্ষা করবেন তোমাদের মধ্যে আমলের দিক দিয়ে কে উত্তম।”-(সুরা মূলক, আয়াত-১)। অর্থাৎ দুনিয়ার এ জীবন হলো পরীক্ষাকেন্দ্র। এবং বাঁচার লক্ষ্যটি হলো সে পরীক্ষায় পাশ করা। প্রতি মুহুর্তে এ ভয় নিয়ে বাঁচতে হয়, পরীক্ষার শেষ ঘন্টাটি যখন তখন বেজে উঠতে পারে। যেহেতু এ পরীক্ষায় পাশের উপর নির্ভর করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাতপ্রাপ্তী, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা মানবজীবনে নেই। একই কারণে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ পরীক্ষায় পাশের প্রস্তুতি। এবং এ প্রস্তুতির জন্য চাই উপযুক্ত শিক্ষা। ইসলামে জ্ঞানচর্চা এজন্যই ফরয। এবং সেটি ফরয করা হয়েছে নামায ফরয করার ১১ বছর পূর্বে। পানাহার জোগারের সামর্থ্য পশুরও থাকে। মুসলিম জীবনে জ্ঞানার্জনের প্রধান লক্ষ্য, জীবনের মূল পরীক্ষায় পাশের সামর্থ্য বাড়ানো এবং মহান আল্লাহতায়ালার মাগফিরাত লাভের যোগ্য করা। তবে মাথা টানলে কান-নাক এমনিতেই আসে, তেমনি আখেরাতের পাশের সামর্থ্য বাড়লে, সামর্থ্য বাড়ে বিশ্ব মাঝে বিজয়েরও। যে জ্ঞানচর্চায় জান্নাতপ্রাপ্তি ঘটে তাতে প্রতিষ্ঠা বাড়ে দুনিয়াতেও। এমন শিক্ষায় সামর্থ্য বাড়ে নেক আমলের। সাহাবায়ে কেরাম সেটিই প্রমাণ করে গেছেন। নেক আমলের বর্ণনা দিতে গিয়ে নবীপাক (সাঃ) বলেছেন, পথ থেকে একটি কাঁটা ফেলে দেওয়াও নেক আমল। অর্থাৎ ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ববাসীর জন্য যা কিছু কল্যানকর, এমন প্রতিটি কর্মই হলো নেক আমল। তাই শুধু পথের কাঁটাই নয়, সাহাবায়ে কেরাম অর্থ, শ্রম ও রক্তব্যয় করেছেন সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঁটা সরাতে। অন্য সব কাজকর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে শুধু নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ও নানারূপ নফল ইবাদতে মগ্ন হওয়া তাই নবীজীর সূন্নত নয়।

জ্ঞানার্জন শুধু পথের কাঁটা ফেলাতে শেখায় না, গলার, নাড়ীর ও রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে কাঁটা সরানেরা সামর্থ্যও দেয়। জ্ঞানের বদৌলে ব্যক্তি পায় বিস্ময়কর সৃষ্টিশীলতা। ইসলামে জ্ঞানচর্চা তাই নিছক কিতাব নির্ভর নয়, বরং আমল-নির্ভর। কর্মজগতের সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগ ঘটায় জ্ঞানচর্চার। তাছাড়া যথার্থ জ্ঞানলাভ না হলে ধর্মকর্মও সঠিক হয় না। সম্ভব হয় না সিরাতুল মোস্তাকিমে চলাটিও। জ্ঞানের মাধ্যমেই বাড়ে কোটি কোটি মানুষকে অল্প সময়ে আলোকিত করার সামর্থ্য। সামর্থ্য দেয় বিস্ময়কর বিশ্বলোককে দেখার এবং তা নিয়ে ভাবার। ফলে শিক্ষিত মানুষটি দেখতে পায় মহান আল্লাহর কুদরতকে। জ্ঞানের বদৌলতেই সে দেখে মহাশূণ্যে, মহাসাগরের গভীরে, পত্র-পল্লবে সর্বত্র মহান আল্লাহতায়ালার আয়াতকে। ফলে বৃদ্ধি পায় তাঁর ঈমান। তখন মন মগ্ন হয় যিকিরে। এদের সন্মন্ধেই পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে, “যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়ানো, বসা ও শয়ন অবস্থায় এবং চিন্তাভাবনা করে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে এবং বলে হে আমাদের রব, আপনি এসব অহেতুক সৃষ্টি করেননি। আপনারই সকল পবিত্রতা, আমাদের রক্ষা করুণ জাহান্নামের আগুন থেকে।” –(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১৯১ )।

 

যে আত্মঘাত শিক্ষাঙ্গণে

শিক্ষিত ব্যক্তির ঈমান বাড়লে বিপুল ভাবে বাড়ে তাঁর মানব-কল্যাণের সামর্থ্যটি। তখন মানব-কল্যাণ তাঁর জীবনের মিশন হয়ে যায়। সে যেমন কৃষি ফলন বাড়িয়ে লাঘব করে ক্ষুদার্ত মানুষের যাতনা, তেমনি যুদ্ধাস্ত্র বানিয়ে সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা দেয় ইসলামি রাষ্ট্রের এবং বিনাশ ঘটায় দূর্বৃত্ত শক্তির। জ্ঞানলাভ এভাবেই সমৃদ্ধি আনে নেক আমলে এবং সামর্থ্য দেয় পরীক্ষাপাশে। এ সামর্থ্য বাড়াতেই নবীজী (সাঃ) এমনকি সুদূর চীনে যেতে বলেছেন। নবীজী (সাঃ)’র সে নির্দেশ নিষ্ঠার সাথে পালন করেছিলেন সেকালের মুসলিমগণ। বিজ্ঞানচর্চাকে তারা কখনোই দুনিয়াদারী ভাবেননি, বরং উঁচু পর্যায়ের নেক-আমল ভেবে তাতে বিপুল অর্থ, শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ করেছিলেন। ফলে কয়েক শত বছরের মধ্যে বিশ্বের নানা ভাষা থেকে বিজ্ঞানের অসংখ্য পুস্তক আরবীতে তর্জমা করেছিলেন এবং গড়ে তুলেছিলেন বিশাল জ্ঞান-ভান্ডার। ফলে স্বল্প সময়ে সম্ভব হয়েছিল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মান এবং বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠালাভ।

বিজ্ঞানচর্চাকে দুনিয়াদারি বলা শুধু মুর্খতাই নয়, আত্মঘাতীও। এমন মুর্খতায় যে শুধু নেক আমলের কমতি দেখা দেয় -তা নয়। মুসলিম উম্মাহ তাতে পরাজিত এবং অপমানিত হয়। আর এরূপ আত্মঘাতী কর্ম সমাজে ব্যাপ্তি পেলে বহিঃশক্তির প্রয়োজন পড়ে কি? মুসলিমদের আজকের পরাজয়ের মূল কারণ, শিক্ষার গুরুত্ব ও নেক-আমল নিয়ে বিভ্রান্তি। মানব জীবনে বড় পাপ হলো জাহেল বা অজ্ঞ থাকা। এ পাপ ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠাকে অসম্ভব করে এবং টানে জাহান্নামের পতে। এ পাপ অনিবার্য করে পরাজয় ও অধঃপতন। অথচ এ পাপে রেকর্ড গড়েছে মুসলিমগণ। ফলে পরাজয় ও অধঃপতন তাদের ঘিরে ধরেছে। শিক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে বিজ্ঞানচর্চাকে দুনিয়াদারি বলে সেটিকে মাদ্রাসার অভ্যন্তরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। ইতিহাস বিজ্ঞান, ভূগোল, সমাজবিজ্ঞান, দর্শনের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়নি। গৌরবযুগে আলেমগণ আসমানের তারকারাজী নিয়েও গবেষণা করতেন। অথচ মাদ্রাসা শিক্ষায় গুরুত্ব পায় না নিজ দেশের সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস ও ভূগোল। দেশের হাজার হাজার মাদ্রাসা ও তার শিক্ষকগণ আজও বেঁচে আছে জ্ঞানবৈরী অদ্ভুদ বিশ্বাস নিয়ে। বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার এটি অতিশয় আত্মঘাতী দিক। আধুনিক জ্ঞানের সন্ধানে আলেমগণ সুদূর চীনে যাওয়া দূরে থাক নিজ দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও খোঁজ নেয়নি। তারা উদ্যোগী হয়নি সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঁটা সরাতে। আবর্জনা সরানো হয়নি দেশের রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসন থেকে। এমনকি নানারূপ দূর্নীতির আবর্জনা জমেছে খোদ মাদ্রাসাগুলির অভ্যন্তরে। ফলে দেশ যে আজ দূর্নীতির শিকার সে জন্য আলেমগণও কি কম দায়ী?

পরীক্ষাকেন্দ্রে বসে কোন পরীক্ষার্থী আমোদফুর্তিতে মত্ত হয় না। জানালায় দাঁড়িযে প্রৃকৃতির দৃশ্য দেখে না। বরং নেক কাজে যা কিছু অমনযোগী করে -তা থেকে নিজেকে দূরে রাখে। আখেরাতে সঞ্চয় বাড়াতে কাজে লাগায় প্রতিটি মুহুর্তকে। আনন্দ-উল্লাস বা শিল্প-সংস্কৃতির নামে মুসলিম তাই নাচগান, উলঙ্গতা, অশ্লিলতাকে প্রশ্রয় দেয় না। এগুলি জীবনের মূল মিশন থেকে বিচ্যুত ও বিভ্রান্ত করে। মহাবিপদ ডেকে আনে ব্যক্তির জীবনে। এগুলি এজন্যই ইসলামে হারাম। বরং মোমেন সদাসর্বদা ব্যস্ত থাকে নেক আমলে। খলিফা হয়েও ভৃত্তকে উটের পিঠে চড়িয়ে নিজে রশি ধরে টানা বা রাতে না ঘুমিয়ে আটার বস্তা নিজে কাঁধে গরীবের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার মত ইতিহাস নির্মিত হয়েছে এমন এক বলিষ্ঠ চেতনার কারণেই। নিজে সূদখোর, ঘুষখোর বা দুর্বৃত্ত হওয়া দূরে থাক, রাষ্ট্র ও সমাজকে দুর্বৃত্তমূক্ত করার নিয়তে সে শুধু শ্রম ও অর্থই দেয় না, জীবনও দেয়। এমন সৃষ্টিশীল চেতনা শূন্যে নির্মিত হয় না। এজন্য জ্ঞান চাই এবং জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত কেন্দ্রও চাই। নবীজী (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কেরাম কলেজ-বিশ্ববিদ্ব্যালয় না গড়লেও মসজিদের মেঝেতে জ্ঞানচর্চার এমন কেন্দ্র গড়েছিলেন। মুসলিম সমাজে সৃষ্টিশীল মানুষ ও আত্মত্যাগী মুজাহিদ সৃষ্টি হয় এমন প্রতিষ্ঠানের কল্যাণেই। সাম্রাজ্যবাদের দাস হওয়া দূরে থাক, তাদের আধিপত্য বিলুপ্তির কাজে এমন মুজাহিদগণ প্রাণপণে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। যে সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা অধিক সে দেশের স্বাধীনতা মীরজাফরের বিশ্বাসাতকতায় বিপদগ্রস্ত হয় না। স্বাধীনতার সুরক্ষায় তখন যুদ্ধ হয় প্রতি মহল্লায়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়ার মত বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করেছে তো এরাই।

আলো যেমন অন্ধকার দূর করে, শিক্ষাও তেমনি সমাজ থেকে অনাচার ও দূর্নীতি সরায়। বিদ্যালয় এভাবে সমাজ বিপ্লবে ইঞ্জিনের কাজ করে। শিক্ষাব্যবস্থার সফলতার বিচার হয় কতজন ছাত্র দেশ গড়ার কাছে নিজের শ্রম, মেধা, অর্থ ও রক্তের বিনিয়োগ করে -তা দিয়ে। অথচ এক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষানীতির ব্যর্থতাটি বিশাল। এর বড় প্রমাণ, দেশগড়ার ময়দানে আত্মত্যাগী মানুষের স্বল্পতা। বরং ব্যাপক ভাবে বেড়েছে স্বার্থপরতা। উচ্চশিক্ষা নিয়ে যারা বের হচ্ছে তাদের বিপুল ভাগই দু’পায়ে খাড়া বিদেশে বা বিদেশীদের সংস্থায় মেধা বিনিয়োগে। স্বার্থপরতা নিয়ে নামছে সন্ত্রাসে। এবং লুণ্ঠনে হাত দিচ্ছে জাতীয় সম্পদে। ফলে যতই বাড়ছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ততই বাড়ছে দূর্বৃত্তদের সংখ্যা; যেমন আবর্জনা বাড়লে বাড়ে মশা-মাছির সংখ্যা। ফলে দেশ পরাজিত হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতির উপর আধিপত্য বিস্তারে শত্রুকে তাই সীমান্ত-যুদ্ধ করতে হচ্ছে না। আমরা পরাজিত হচ্ছি ঘরের শত্রুদের হাতে। বাংলাদেশ আজ দূর্নীতিতে যেরূপ রেকর্ড গড়ছে -সেটি কি মহামারি, জলবায়ু বা প্লাবনের কারণে? অশিক্ষা, রোগব্যাধী বা দারিদ্র্যের কারণে হলে, সেটি আজ থেকে ১০০ বছর আগেই হওয়া উচিত। কারণ আজকের তুলনায় এগুলি তখনই অধিক ছিল।

মানুষ বিশ্বাস, কর্ম ও আচারণে ভিন্ন হয় ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষার কারণে। বস্তুর ব্যক্তির শিক্ষা দৃশ্যমান হয় তার কর্ম ও আচরণের মধ্য দিয়ে। কোর’আনে এজন্য বলা হয়েছে, “যে জানে ও জানে না তারা উভয়ে এক নয়।” জ্ঞানার্জন ফরয শুধু মসজিদের ইমাম বা মাদ্রাসার শিক্ষকের উপর নয়, প্রতিটি মুসলিমের উপরও। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলিম হয়েছেন অথচ জ্ঞানার্জনে সময় দেননি -এমন কোন সাহাবী খুঁজে পাওয়া যাবে না। এবং শুধু অংক, বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, অর্থনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানার্জন হলে চলে না। ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার জন্য ওহীর জ্ঞান (কোর’আন) এবং হাদীসের জ্ঞানও শিখতে হয়। এ ফরয আদায় না হলে যেমন ঈমান-আমল বিশুদ্ধ হয় না, তেমনি আখেরাতে নাযাত প্রাপ্তির কাজটিও সহজ হয় না। এ ফরযে তাই ক্বাযা নেই। মুসলিম দেশের সরকারের দায়িত্ব, দেশের মুসলিম নাগরিকদের এ ফরয আদায়ের ব্যবস্থা করা। সরকারের এটি মৌলিক ও অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কাফের দেশের সরকার থেকে মুসলিম দেশের মূল পার্থক্য এখানেই। এ দায়িত্ব পালনে অতীতে মুসলিম সরকারগুলি বড় বড় মাদ্রাসা গড়েছে। মাদ্রাসার খরচ নির্বাহের জন্য বিশাল বিশাল ওয়াক্ফ স্টেটের ব্যবস্থা করেছে।

 

 

যে ব্যর্থতা সরকারের

সাধারণ নাগরিক নিজ উদ্যোগে খাদ্য-বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে পারে, কিন্ত জ্ঞানার্জনের এ ফরয আদায়ে ঘরে ঘরে মাদ্রাসা খুলবে, সিলেবাস প্রণয়ন বা বই রচনা করবে -সেটি কি সম্ভব? আর নাগরিকগণ সে দায়িত্ব নিলে সরকারের কাজটি কি? তাহলে সরকারকে কেনই বা তারা রাজস্ব দিবে? অথচ বাংলাদেশ ১৭ কোটি মুসলিমের দেশ হওয়ার সত্ত্বেও দেশের সরকার শিক্ষানীতিতে মুসলিমের সে ফরয আদায়ে সহায়তা দিতে কোন ব্যবস্থাই নেয়নি। সেকুলার শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীনিয়াতের কিছু পৃষ্ঠা বাড়িয়ে ইসলামি জ্ঞানার্জনের ফরয আদায় হয় না। যেমন বিষের সাথে কয়েক চামচ সরবত পানে স্বাস্থ্য বাঁচে না। এমন দুষিত শিক্ষায় পুষ্টি পায় না ঈমান। অথচ বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটিই চালু রয়েছে। ফলে এ শিক্ষায় পূর্ণ-মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাটি নিশ্চিত হচ্ছে না। বরং সেক্যুলার শিক্ষার মাধ্যমে ইসলামের প্রতি অনীহা ও বহু ক্ষেত্রে ঘৃণাও সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে মুসলিমের রাজস্ব ব্যয় হয়েছে তার নিজ সন্তানকে জাহান্নামের দিকে ধাবিত করার কাজে। সরকারের এ ব্যর্থতার বিরুদ্ধে কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি চুপ থাকতে পারে? চিকিৎসার নামে বিষ পান হলে প্রতিবাদ হয়। অথচ বিদ্যাশিক্ষার নামে ব্যাপক হারে ঈমান নাশ হলেও তা নিয়ে প্রতিবাদ নেই। প্রতিরোধও নেই। অথচ শিক্ষাদান যথার্থ হলে সেটি ছাত্রকে অনৈসলামিক চিন্তা ও ধ্যানধারণা থেকে বাঁচতে পারতো, দিতে পারতো দূর্নীতির বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ ক্ষমতা। দূর্নীতিতে রেকর্ড না গড়ে ঈমান নিয়ে তখন শক্ত ভাবে ছাত্রগণ দাঁড়াতে পারতো। ভ্যাকসিন শিশুকে রোগভোগের বিরুদ্ধে ইম্যুনিটি দেয়, শিক্ষা তেমনি ইম্যুনিটি দেয় নৈতিক রোগের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতাটি ভয়ানক। দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে ইম্যুনিটি দূরে থাক, এ শিক্ষাব্যবস্থা বিপন্ন করছে সন্তানদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকে। শিক্ষানীতি পরিণত হয়েছে তাগুতের তথা শয়তানী শক্তির মোক্ষম হাতিয়ারে।

 

 

যে ব্যর্থতাটি বিশাল

শিক্ষার মূল লক্ষ্য কি নিছক তথ্য ও তত্ত্ব নিয়ে জ্ঞানদান? শুধু কি বিজ্ঞান বা কারগরি কৌশলে দক্ষ করা? বরং সেটি হলো, ব্যক্তির ঘুমন্ত বিবেক ও সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করা। এবং মানবকে তার মানবিক গুণে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। সুপ্ত শক্তির আবিস্কারে এ বিশ্বাসটি জরুরি, প্রতিটি ব্যক্তির গভীরে যে সম্পদ লুকিয়ে আছে তা সোনার খনির বা তেলের খনির চেয়েও মূল্যবান। সমাজে শান্তি আসে এবং উন্নততর সভ্যতা নির্মিত হয় বস্তুত সে মানবিক সম্পদের বিস্ফোরণের ফলে। উচ্চতর মানব সভ্যতার নির্মান কাজে প্রাকৃতিক সম্পদ সহায়ক শক্তি বটে, কিন্তু মূল শক্তি নয়। তাই উন্নত জাতিসমূহ শুধু মাটি বা সাগরের তলাতেই অনুসন্ধান করে না, বরং আবিস্কারে হাত দেয় মানুষের মনের গভীরে। মানুষের নিজ শক্তি আবিস্কৃত না হলে প্রাকৃতিক শক্তিতে তেমন কল্যাণ আসে না। তাই আফ্রিকার সোনার খনি বা আরবদের তেলের খনি সে এলাকার মানুষের জন্য ডেকে এনেছে বিশ্বের নানা কোণ থেকে সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের। প্রতিষ্ঠা দিয়েছে ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস স্বৈরাচারকে। জন্ম দিয়েছে রক্তাত্ব যুদ্ধের। অথচ মানুষকে সভ্যতর কাজে ও সভ্যতার নির্মানে নবীজী (সাঃ) হাত দিয়েছিলেন, ব্যক্তির সুপ্ত শক্তির আবিস্কারে। ফলে সমগ্র মানব-ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরাম পরিণত হয়েছিলেন সবচেয়ে সৃষ্টিশীল ও চরিত্রবান মানুষে। ফেরেশতাদের চেয়েও তারা উঁচুতে উঠতে পেরেছিলেন। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষানীতির ব্যর্থতাগুলো এ ক্ষেত্রে বিশাল।

 

 

বিবেকের বধ্যশালা

বীজ থেকে অঙ্কুরোদগমের জন্য চাই উপযুক্ত মাটি, পানি ও জলবায়ু। নইলে তা থেকে চারা গজায় না, এবং গজালেও বেড়ে উঠে না। তেমনি ব্যক্তির সুপ্ত শক্তি ও সামর্থ্যের বেড়ে উঠার জন্যও চাই উপযুক্ত পরিবেশ। সেরূপ একটি পরিবেশ দিয়ে সাহায্য করাই বিদ্যালয়ের মূল কাজ। তখন জেগে উঠে ব্যক্তির ঘুমন্ত বিবেক। বেড়ে উঠে সৃষ্টিশীলতা।  উৎকর্ষ পায় তার ব্যক্তিত্ব। বিদ্যালয়ে এ কাজ না হলে তখন দেহ হত্যা না হলেও নিহত হয় শিশুর সুপ্ত সৃষ্টিশীল সামর্থ্য। তখন বিদ্যালয় পরিণত হয় বিবেকের বধ্যশালায়। তখন মানুষ পরিণত হয় নিজেই নিজের বিবেক ও প্রতিভার কবরস্থানে। বাংলাদেশের বিদ্যালয়ে এভাবেই খুণ হচেছ বহু খালেদ, তারেক, ইবনে সিনা, ফারাবী, তারাবীর ন্যায় প্রতিভা। তবে ভয়ানক বিপদটি শুধু প্রতিভার হত্যাকান্ডতেই সীমিত নয়। জমিতে ফসল না ফলালে যেমন বাড়ে আগাছার তান্ডব, তেমনি সৃষ্টিশীল মানুষের আবাদ না হলে বেড়ে উঠে দুর্বৃত্তরা। বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে অতি ব্যাপক ভাবে। ফলে লাশ পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে গড়ে উঠা ছাত্রদের হাতে। বাংলাদেশে বিপদের মূল হেতু এখানেই। দুর্বৃত্তগণ যে শুধু পতিতাপল্লী, জোয়ার আসর ও ড্রাগের বাবসা দখলে নিয়েছে -তাই নয়। রাজনীতি, অফিস আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিও তারা দখলে নিয়েছ। বাংলাদেশ দূর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে। সেটি নিছক ছিঁচকে চোর বা রাস্তার সন্ত্রাসীদের কারণে নয়, বরং দুর্বৃত্তদের দখলদারি দেশের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে।

পশু থেকে মানুষ যে কারণ পৃথক সেটি হলো তার চেতনা। এ চেতনা দেয় চিন্তা-ভাবনার সামর্থ্য। এবং এ চিন্তা-ভাবনা থেকেই ব্যক্তি পায় সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় এবং ধর্ম-অধর্ম বেছে চলার যোগ্যতা। ধর্ম নিয়ে বা মানবিক ভাবে বেড়ে উঠার জন্য এটি এতই গুরুত্বপুর্ণ যে পবিত্র কোরআনে বার বার বলা হয়েছে, ‘আফালাতা’কীলুন’, ‘আফালাতাদাব্বারূন’ ‘আফালাতাফাক্কারুন’ বলে। অর্থঃ ‘তোমরা কেন চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগাও না?’ ‘তোমরা কেন ধ্যানমগ্ন হও না?’, ‘তোমরা কেন ভাবনা?’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ তাই দৈহিক বল নয়, বরং সেটি চিন্তাভাবনার সামর্থ্য। চিন্তার সামর্থ্য অর্জিত হলে নিজেকে শিক্ষিত করার কাজে সে শুধু সুশীল ছাত্র রূপেই বেড়ে উঠে না, নিজেই নিজের শিক্ষকে পরিণত হয়। এমন ব্যক্তির জীবনে শেখা এবং শেখানো -এ দুটোই তখন সমানে এগোয়। ঈমানদার তাই সর্বাবস্থায় ছাত্র, তেমনি সর্বাবস্থায় শিক্ষকও। ফুলে ফুলে ঘুরে মধুসংগ্রহ যেমন মৌমাছির ফিতরাত, তেমনি সর্বমুহুর্তে ও সর্বস্থলে জ্ঞানার্জন ফিতরাত হলো প্রকৃত জ্ঞানীর। তখন জ্ঞানের সন্ধানে সাগর, মরুভুমি, পাহাড়-পর্বত অতিক্রমেও সে পিছপা হয়না। বিদ্যালয়ের কাজ তো সে ফিতরাতকে জাগ্রত করা। শিক্ষকের দায়িত্ব, বিবেকের সে জাগরণকে বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি কোনে পৌঁছে দেয়া। তখন সমগ্র দেশ পরিণত হয় পাঠশালায়। নবীজী (সাঃ)’র আমলে সেটিই হয়েছিল। ফলে সে সময় কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলেও যে হারে ও যে মাপে জ্ঞানী ব্যক্তি সৃষ্টি হয়েছিলেন -মুসলিম বিশ্বের শত শত বিশ্ববিদ্যালয় আজ তা পারছে না।

আজকের সমস্যা হলো, সে আমলে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব একজন গৃহবধু যতটুকু বুঝতেন এ আমলের প্রফেসরও তা বুঝেন না। এবং সে প্রমাণ ইতিহাসে প্রচুর। শিশু আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)এর মা তাঁর জীবনের সকল সঞ্চয় শিশুপুত্রের জামার আস্তিনে বেঁধে ইরানের গিলান প্রদেশ ছেড়ে হাজার মাইল দূরের বাগদাদে পাঠিছিলেন। অথচ সে সময় আধুনিক যানবাহন ছিল না। পথে ছিল ডাকাতের ভয়, যার কবলে তিনি পড়েছিলেনও। মুসলমানগণ তাদের গৌরব কালে জ্ঞানার্জনকে কতটা গুরুত্ব দিতেন -এটি হলো তারই নমুনা। অথচ আজ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জ্ঞানদানের কাজে ফাঁকি দিয়ে বিদেশী সংস্থায় কাজ করেন। মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ভবিষ্যৎ ডাক্তার তৈরীর কাজে ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে বসে অর্থ কামাই  করেন। তারা নিজ সন্তানের ধর্মজ্ঞান দানে এতই উদাসীন যে, সে লক্ষ্যে হাজার মাইল দূরে পাঠানো দূরে থাক, পাশের মাদ্রাসাতে পাঠাতে রাজি নয়। লক্ষ্য এখানে সন্তানকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা নয়, বরং অর্থ কামাইয়ের হাতিয়ারে পরিণত করা।   

                        

পাল্টায়নি চেতনার মডেল

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আরেক ব্যর্থতা: শিক্ষককে যেমন প্রকৃত শিক্ষক রূপে গড়ে তুলতে পারেনি, তেমনি ছাত্রকে গড়ে তুলতে পারিনি প্রকৃত ছাত্র রূপে। নিছক পড়ন, লিখন বা হিসাব-নিকাশ শিখিয়ে সে আগ্রহ সৃষ্টি করা যায় না। এজন্য ব্যক্তির বিশ্বাস ও দর্শনে হাত দিতে হয়। বিপ্লব আনতে হয় ব্যক্তির চিন্তার মডেল। পবিত্র কোর’আনে সে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সুরা বনি ইসরাইলে। বলা হয়েছে, “ক্বোল, কুল্লুই ইয়ামালু শাকেলাতিহি” অর্থ: “বল হে মহম্মদ, প্রতিটি ব্যক্তিই কাজ করে তার (চিন্তাভারনা বা দর্শন)’র মডেল অনুযায়ী।  এ আয়াতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে চিন্তাভারনা বা দর্শনের মডেল পরিবর্তনে। নবীজীর (সাঃ) আগমনে আরবের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন আসেনি তাদের দৈহিক বল বা খনিজ সম্পদে। বরং ইনকিলাব এসেছিল তাদের জীবন-দর্শনের মডেলে। সে দর্শন পাল্টে দিয়েছিল বাঁচবার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও রূচীবোধ। আরবগণ ভাবতো, মৃত্যুর পর তারা মাটিতে হারিয়ে যাবে। রোজ-হাশর নাই, জবাবদেহীতাও নাই। অপর দিকে ইসলাম প্রতিষ্ঠা দেয়, এ জীবনে কোন মৃত্যু নাই। আছে শুধু  পরকালে স্থানান্তর। আছে পরকালে জবাবদেহীতা। দিয়েছিল, জান্নাত ও জাহান্নামের ধারণা। ফলে জান্নাতে পৌঁছাটি বাঁচা-মরার টার্গেটে পরিণত হয়। এবং সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগ  করে জান্নাত পেতে। উন্নত চরিত্র ও নেক আমল নিয়ে বেড়ে উঠাটি তখন জীবনের মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়। উচ্চতর সভ্যতা তো এভাবেই নির্মিত হয়। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় লিখন, পড়ন বা হিসাব-নিকাশ গুরুত্ব পেলেও গুরুত্ব পায়নি দর্শনের মডেল পাল্টানোর বিষয়টি। ফলে জীবন পাচেছ না সঠিক দিক-নির্দেশনা ও প্রেরণা। পুষ্টি পাচ্ছে না শিক্ষার্থীর বিবেক ও চেতনা। গড়ে উঠছে না সুষ্ঠ চিন্তার ও নেক আমলের সামর্থ্য। জাতি আদর্শ নেতা, সৎ বুদ্ধিজীবী ও সংস্কারকের সরবরাহ পায় দর্শনসমৃদ্ধ সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের থেকে; পেশাজীবী, কর্মজীবী বা টেকনোক্রাটদের থেকে নয়।

দর্শনের প্রতি অবহেলায় মানুষ নিছক নকল-নবীশে পরণিত হয়। বাংলাদেশে উন্নত বিবেকবোধ, মূল্যবোধ ও  সংস্কৃতি বেড়ে না উঠার অন্যতম কারণ হলো এটি। তাছাড়া জ্ঞান শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে আছে আসমান-জমিনের সর্বক্ষেত্র জুড়ে। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রই শুধু নয়, গাছপালা, জীবজন্তু, নদীনালা, অনুপরমানু তথা দৃশ্য-অদৃশ্য প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে আছে জ্ঞানের উপকরণ। কোর’আনের ভাষায় এগুলি হলো মহান আল্লাহতায়ালার আয়াত -যা পড়তে হয় শুধু চোখের আলাতে নয়, মনের আলোতেও। ইসলাম তাই আলোকিত মনের মানুষ গড়তে চায়। তখন সমগ্র বিশ্বটাই পাঠশালা মনে হয়। এ পাঠশালারই শিক্ষক ছিলেন নবীপাক (সাঃ)। জ্ঞান বিতরণে ও মানুষকে চিন্তাশীল করার কাজে মহান আল্লাহতায়ালার এ আয়াতগুলিকে তিনি কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছেন। সেখান থেকেই গড়ে উঠেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানসাধকগণ। জীবনের মূল পরীক্ষায় তথা মহান আল্লাহকে খুশী করার কাজে তাঁরাই মানব-ইতিহাসে সর্বাধিক সফল হয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে তাঁদের নিয়ে তিনি গর্বও করেছেন।

জ্ঞানবিতরণে জ্ঞানকেন্দ্রের চেয়ে শিক্ষকই যে মূল সেটিই নবীজী (সা:) প্রমাণ করে গেছেন। অথচ আমরা বিদ্যালয় গড়ে চলেছি যোগ্য শিক্ষক না গড়েই। সেটি ডাক্তার না গড়ে হাসপাতাল চালানোর মত। সে ব্যর্থতা ঢাকতে বাংলাদেশে সকল ব্যর্থতার কারণ খোঁজা হচ্ছে অন্যত্র। শিক্ষার বিস্তারে শিক্ষককে প্রথমে শিক্ষিত করতে হয়। শুধু জ্ঞানদাতা হলেই চলে না, প্রতিটি শিক্ষককে ছাত্রদের সামনে অনুকরণীয় মডেলও হতে হয়। এটি কোন বাড়তি দায়িত্ব নয়, বরং এটিই শিক্ষকের মৌলিক দায়িত্ব। ফলে যে চরিত্র নিয়ে প্রশাসনের কর্মচারি, বিচারক বা ব্যবসায়ী হওয়া যায়, শিক্ষককে তার চেয়েও উত্তম চরিত্রের অধিকারি হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি যথার্থ ভাবে হয়নি। দেশে নিদারুন কমতি হলো উপযুক্ত শিক্ষকের। শিক্ষকের যে স্থানটিতে বসেছিলেন নবীপাক (সাঃ) স্বয়ং নিজে, সেখানে প্রবেশ করেছে বহু নাস্তিক, পাপাচারি ও চরিত্রহীনেরা। ফলে ছাত্ররা শুধু জ্ঞানের স্বল্পতা নিয়েই বেরুচ্ছে না, বেরুচ্ছে দুর্বল চরিত্র নিয়েও।

 

 

ব্যর্থতা পূর্ণ মানব রূপে গড়ে তোলায়

স্পেশালাইজেশনের নামে ব্যক্তিকে কেঁচোর ন্যায় গর্তের গভীরে ঢুকিয়ে দেয়াতে কল্যাণ নেই। এতে অসম্ভব হয়ে পড়ে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়াটা। ইসলাম চায় মানুষকে পূর্ণতা দিতে, যেন সে সমস্ত প্রতিভা ও সামর্থ্যকে কাজে লাগাতে পারে। মানুষ ভূমি নয় যে তার সুপ্ত সম্পদ অনাবিস্কৃত থাকলে পরবর্তী বংশধরেরা উত্তোলন করবে। বরং মৃত্যুর সাথে সাথে কবরস্থ্য হয় সকল সামর্থ্য। ফলে বুদ্ধিমত্ততা এটাই, মৃত্যুর আগেই নিজের সমুদয় প্রতিভা ও শক্তি আবিস্কার করা এবং আখেরাতের সঞ্চয় বাড়াতে সেগুলি কাজে লাগানো। তখন প্লাবন সৃষ্টি হয় কল্যাণকর্মে। রাষ্ট্রপ্রধানও তখন রাতদুপুরে আটার বস্তা পিঠে নিয়ে দরিদ্র মানুষ খোঁজেন। বিদ্যালয়ের কাজ শুধু এ চেতনাকে ছাত্রের মনে বদ্ধমূল করাই নয়, এ কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়াও। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কারিগরি জীবের আদলে না গড়ে, ছাত্রকে গড়ে তুলবে পূর্ণ মানব রূপে। গড়ে তুলবে ভারসাম্যপূণ্য ব্যক্তি রূপে। ফলে বিজ্ঞানী হয়ে মুসলিম তখন নাস্তিক হয় না, ধর্মের নামে গবাদি পশু বা শাপশকুনকেও পুজা করে না। বিজ্ঞানের ধ্বংসাত্মক অপপ্রয়োগও করে না। নবী করীমের (সাঃ) সাহাবাগণ শুধু ইবাদতে আধ্যাত্মীক ছিলেন না, বরং আধ্যাত্মীকতা নিয়ে এসেছিলেন রাজনীতি, প্রশাসন, ব্যবসাবাণিজ্য ও যুদ্ধবিগ্রহেও। আদর্শ মানুষ রূপে তাদের বিচরণ ছিল জীবনের প্রতিক্ষেত্রে। ইসলামে মানুষকে এভাবে জীবন ও জগতকে নিয়ে বৃহৎ ভাবে ভাবতে অভ্যস্থ করে।

প্রতিটি পদার্থ, অণু-পরমাণু ও পত্র-পল্লবে মহান আল্লাহতায়ালার যে প্রকাশমান কুদরত সেটিই ধ্বণিত হয় ঈমানদারদের হৃদয়ের গভীরে। মুসলমানের শিক্ষা এ ভাবেই ব্যক্তিকে তাঁর স্রষ্টার সাথে সম্পৃক্ত করে। আল্লামা ইকবাল সেটি তুলে ধরেছেন এভাবেঃ “কাফের কি ইয়ে পেহচান কেহ আফাক মে গুম হ্যায়, মোমেন কি ইয়ে পেহচান কেহ গুম উস মে হ্যায় আফাক। অর্থঃ কাফেরের পরিচিতি হলো সে বিশ্বমাঝে হারিয়ে যায়, আর মোমেনের পরিচিতি হলো তার মধ্যে হারিয়ে যায় বিশ্বপ্রকিৃতি।” এভাবে মহান আল্লাহতায়ালার একাত্ববাদ ও কুদরতের প্রকাশ ঘটে মোমেনের সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে।

কোর’আনের জ্ঞান ব্যক্তিকে দেয় মহান আল্লাহতায়ালার আনুগত্যে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার প্রেরণা। ব্যক্তি নিজেই তখন মহান আল্লাহতায়ালার কুদরত ও মহিমার দৃশ্যমান অভিব্যক্তি হয়ে দাঁড়ায়। আল্লামা ইকবাল সেটির প্রকাশ করেছেন তার এক দর্শনসমৃদ্ধ বিখ্যাত কবিতায়: “খুদী কা সার নেহা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, খুদি হ্যায় তেগ ফেশা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ইয়ে নাগমা ফসলে গুল ও লালেহ কা নেহি পাবন্দ, বাহার হো কেহ খেজাহ  লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” অর্থ: ব্যক্তির (খুদীর) আত্মপ্রকাশ হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। খুদী তো তলোয়ার, সেটি শানিত করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এ গান কোন মৌসূম বা ফুলের কারণে নয়; বসন্ত হোক অথবা হোক হেমন্ত, একই আওয়াজ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” এটিই হলো মোমেনের আত্ম-উপলদ্ধি ও আত্মপ্রকাশ।

ব্যক্তির আত্ম-উপলদ্ধি ও আত্মপ্রকাশের সামর্থ্য আসে তাঁর শিক্ষা থেকে। শিক্ষা আত্মার ময়লা ধোয়ার কাজ করে। আর পরিশুদ্ধ আত্মা তখন রূপ দেয় স্বচ্ছ আয়নাতে -যার মধ্যে প্রতিবিম্বিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার কুদরাত ও নিদর্শন। মোমেনের বিশ্বাস এভাবেই প্রকাশ পায় তার রাজনীতি, অর্থনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, যুদ্ধবিগ্রহ ও আচার-আচারণে। ঈমানদার এভাবেই পরিণত হয় ইনসানে কামেলে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যর্থতাটি আকাশচুম্বি। এবং এ ব্যর্থতাই বাংলাদেশের সকল ব্যর্থতার জনক। প্রশ্ন হলো, এ ব্যর্থতা কি পরকালে সফলতা দিবে? শিক্ষার ব্যর্থতা বস্তুত ইহকাল ও পরকালের ব্যর্থতাকে একাকার করে ফেলে।  ১ম সংস্করণ ১০/১২/০৪; ২য় সংস্করণ ২৪/১২/২০২০ 

 




সংস্কৃতির গুরুত্ব ও অপসংস্কৃতির বিপদ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

পরিচয় সংস্কৃতিতে

জাতি কতটা সভ্য বা উন্নত -সেটির পরিমাপ দেয় সংস্কৃতি। সংস্কৃতিতে পরিচয় মেলে একটি জনগোষ্টির চিন্তা-চেতনা, চরিত্র, রূচীবোধ, চালচলন বা জীবনবোধের। পশু বা উদ্ভিদের জীবনে সময়ের তালে বাঁচার প্রক্রিয়ায় উন্নতি আসে না। তাই তাদের পরিচয় সব সময় একই থাকে। কিন্তু মানুষ তার সমাজকে নিয়ে সামনে এগোয়, পূর্বের চেয়ে উন্নততর ও সভ্যতর হয়। হাজার বছর পূর্বে পশুরা যা খেতো আজকের জন্তু-জানোয়ারের খাদ্য, পানীয় বা বাসস্থান অবিকল একই। কিন্তু মানুষ সামনে এগিয়েছে। আর সামনে এগোনোর এই যে প্রক্রিয়া সেটিই হলো সংস্কৃতি। এটি হলো সংস্কারের তথা পরিশুদ্ধির পদ্ধতি। যে কোন জীবন্ত ও সুস্থ্য জাতির জীবনে এ প্রচেষ্টা ক্রীয়াশীল থাকাটি শুধু কাঙ্খিতই নয়, অপরিহার্যও। সমাজে সে প্রক্রিয়া কতটা সফল এবং কার্যকর -সংস্কৃতি সেটারই পরিমাপ দেয়। খনির স্বর্ণ আর অলংকারের স্বর্ণ এক নয়, উভয়ের মাঝে যে পার্থক্য তার পশ্চাতে থাকে দীর্ঘ পরিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া। তেমনি সভ্য মানুষ আর অসভ্য মানুষও এক নয়। এক নয় উভয়ের আচার-আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ এবং বাঁচবার রূচীবোধও। এ পার্থক্যের মূলে থাকে একটি বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। সংস্কারের এ ক্রীয়াশীল প্রক্রিয়াকেই বলা হয় সংস্কৃতি। কোন জাতির সভ্যতর রূপে বেড়ে উঠার পিছনে এ প্রক্রিয়াটাই মূল।

প্রশ্ন হলো, কি সেই সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া? কি সে উপাদান যার ভিত্তিতে একটি জাতি অন্য একটি জাতি থেকে ভিন্নতর সংস্কৃতির জন্ম দেয়? কি করে ভিন্নতর হয় নানা জনগোষ্ঠির জীবনবোধ ও চরিত্র? সচারচরই বলা হয়, মুসলিমগণ সংস্কৃতিতে অমুসলিমদের থেকে ভিন্ন। কিন্তু কি সে ভিন্নতা? কেন সে ভিন্নতা? এবং কি ভাবে গড়ে উঠে সে ভিন্নতা? সংস্কৃতি বুঝতে হলে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। জীবনমাত্রই গতিময়, এ গতি যেমন উর্ধ্বমুখী হতে পারে, তেমনি অধোমুখীও হতে পারে। কোন জাতি যেমন বিশ্বশক্তি হতে পারে, তেমনি কিছুকাল পর আন্যজাতির গোলামও হতে পারে। ব্যক্তি বা জাতীয় জীবনেও স্থিতিবস্থা বলে কিছু নেই। এগুতে না পারলে পিছিয়ে যেতে হয়। মানবজাতির ইতিহাস এ উত্থান-পতনের ইতিহাসে ভরপুর। এককালের বহু সভ্য জাতি কালের গতিতে পিছিয়ে গেছে। মুসলিমগণ নিজেরাই এর প্রকৃষ্ট উদাহরন। আজকের তুলনায় চৌদ্দশত বছর পূর্বেও তারা বহুগগুণ উন্নত ছিল। এরূপ এগিয়ে ও পিছিয়ে যাওয়ার পিছনে কাজ করে জাতীয় জীবনে একটি সফল সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া সক্রীয় থাকা না থাকার বিষয়টি।

ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে সংস্কারের প্রেরণা আসে ধর্মীয় বিশ্বাস বা দর্শন থেকে। মুসলিম জীবনে সে ধর্ম বিশ্বাস বা দর্শনটি হলো ইসলাম। সভ্য-অসভ্য, ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় নির্ণয়ে ইসলামই হলো মানদন্ড। সে মানদন্ডের ভিত্তিতে বাঁচবার মধ্যে আসে রূচীবোধ। আসে চিন্তা-চেতনা, চরিত্র, কর্ম ও বাঁচবার প্রক্রিয়াতে পরিশুদ্ধি। ভূমি,ভাষা, জলবায়ু বা গাত্রবর্ণ এমন একটি রূচীবোধ বা মানদন্ড দিতে পারে না। ফলে ভাষা, জলবায়ু ও বর্ণ অভিন্ন হওয়া সত্বেও একই ভূমিতে বিভিন্ন ধর্ম ও আদর্শের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম হয়। মানুষ উদ্ভিদ নয় যে ভূমি বা জলবায়ু থেকে তার বাঁচবার উপকরণ সংগ্রহ করবে। ব্যক্তির দৈহিক ও জৈবিক সত্ত্বার চেয়ে নৈতিক সত্ত্বাটিই মূল। এ নৈতিক সত্ত্বা জন্যই মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ্র সৃষ্টি। এবং তার নৈতিক শিকড় পুষ্টি পায় আদর্শ থেকে, ভূমি থেকে নয়। অভিন্ন আরব ভূমিতে একারণেই বিভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। বহুবিধ অনৈসলামিক সংস্কৃতির পাশে জন্ম হয়েছে ইসলামি সংস্কৃতির। ইসলামী বিশ্বাসের কারণেই বিপ্লব আসে মুসলিমদের বিশ্বাস, কর্ম, আচরণ ও রূচীবোধে। সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্টিত হয় আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথে ব্যক্তি ও সমাজ সংস্কারের প্রক্রিয়া। ফলে আরবের প্রাক-ইসলামিক যুগের হানাহানীর পরিবর্তে স্থান পায় ইস্পাতদৃঢ় মুসলিম ভাতৃত্ব। যুদ্ব-বিগ্রহ ও অশান্তির স্থলে প্রতিষ্টা পায় পারস্পরীক সৌহার্দ্য ও সম্পৃতি। যারা এক কালে ইর্ষা, ঘৃণা ও হানাহানী নিয়ে বাঁচতো, তাদের মুখ থেকে উৎচারিত হতে থাকে একে-অপরের প্রতি প্রাণঢালা সালাম তথা শান্তির দোয়া। এভাবেই মানব ইতিহাসে জন্ম নেয় শ্রেষ্ঠতম মানব বা শান্তিময় বিশ্ব সৃষ্টির সংস্কৃতি।

 

ইসলামি সংস্কৃতি ও অনৈসলামি সংস্কৃতি

ইসলামকে বাদ দিয়ে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠে সেটি আর যাই হোক মুসলিমের সংস্কৃতি নয়। মুসলিম থেকে যেমন ইসলামকে পৃথক করা যায় না, তেমনি তাকে পৃথক করা যায় না ইসলামি সংস্কৃতি থেকেও। সংস্কৃতি হলো ব্যক্তির বিশ্বাস ও চেতনার প্রতীক। বিশ্বাস বা চেতনা দৃশ্যময় নয়, কিন্তু সেটি দৃশ্যময় হয় সংস্কৃতির মাধ্যমে। রোগের যেমন লক্ষণ থাকে, স্বাস্থ্যেরও তেমনি বৈশিষ্ঠ্য থাকে। তেমনি মহান আল্লাহতায়ালাতে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী উভয়েরই সনাক্তকরণের কিছু লক্ষণ থাকে। আল্লাহতায়ালাতে অবিশ্বাসীর জীবনে শ্লিলতার বদলে অশ্লিলতার প্রকাশটিই স্বাভাবিক। কারণ, তার জীবনের লাগামটি থাকে খেয়ালখুশী বা জৈবিক প্রবৃত্তির হাতে। এমন প্রবৃত্তিপরায়ন ব্যক্তির পোষাক-পরিচ্ছদ, আমোদ-আহ্লাদ ও জীবন-যাপনে কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না, ফলে থাকে অশ্লিলতা। থাকে অপরাধপ্রবনতা।

কিন্তু মুসলিমের প্রতিটি কর্ম ও আচরন আল্লাহর ভয়ে বিমূর্ত। আল্লাহর ভয় তার চাওয়া-পাওয়ার উপর শক্ত লাগাম পড়িয়ে দেয়। ফলে তার জীবন হয় নিয়ন্ত্রিত। কি আনন্দ-উল্লাস, কি দুঃখ-বিষাদ -সব কিছুতেই থাকে আল্লাহর উপর অটল নির্ভরতা। মুসলিমের শোকপ্রকাশ ও উৎসবের প্রক্রিয়া এজন্যই অমুসলিমদের থেকে ভিন্নতর। শোকে-দঃখে সে বলে “ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হি রা’জীয়ুন”। অর্থ: নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্যই এবং আল্লাহতেই ফিরে যাবো। ফলে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে ফিরে যাওয়া ও তাঁর কাছে জবাবদেহীতার গভীর ভাবনা। এমন ভাবনা থেকেই পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় মুসলিমের জীবন। কিন্তু অমুসলিমের জীবনে সে জবাবদেহীতা থাকে না। ফলে তার রূচীবোধ, জীবনবোধ ও সংস্কৃতি মুসলিম থেকে ভিন্নতর। এজন্যই বাংলাদেশে মুসলিম এবং অমুসলিম প্রায় হাজার বছর পাশাপাশী বসবাস করলেও তাদের উভয়ের আনন্দ-উল্লাস বা  উৎসব কখনোই একই মোহনাতে মিলিত হয়নি। পানি ও তেলের ন্যয় আলাদাই রয়ে গেছে। বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে কারো স্মরণে দাড়িয়ে নীরবতা, বেদীমূলে বা ফটোতে মাল্যদানের যে সংস্কৃতি -সেটি অমুসলিমদের; সেটি কোন মুসলিমের হতে পারিনি। মুসলমানেরা বরং বিদেহী আত্মার মাগফেরাতে দোওয়া-দরুদের মজলিস বসায়, কবর জেয়ারত করে, গরীব মিসকিনকে দান খয়রাত করে। এটিই হলো ইসলামি সংস্কৃতি। শহীদ মিনারের নামে স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা, তাতে মাল্যদান এবং নগ্ন-পায়ে দাড়িয়ে নীরবতা পালনের যে সংস্কৃতিকে আপামর বাঙ্গালী সংস্কৃতি বলা হয় -সেটি সত্য নয়। ইসলামে অঙ্গিকারহীন সেক্যুলারগণ এ সংস্কৃতির জনক, কোন নিষ্ঠাবান মুসলিম নন। কখনোই এটি ধর্মপ্রাণ মুসলিমের সংস্কৃতি হতে পারেনি। তাছাড়া সাংস্কৃতিক কর্ম মুসলিমের কাছে নিজেই কোন লক্ষ্য নয়, লক্ষ্যে পৌঁছবার মাধ্যম মাত্র। মানুষের মাঝে গুণের উংকর্ষ ঘটিয়ে ইসলাম তাঁকে ফেরেশতার পর্যায়ে পৌঁছাতে চায়, এবং ইসলামি সংস্কৃতি হলো সে প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। মানব শিশু মুসলিম রূপে জন্মালেও সে প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে এ সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। নইলে অসম্ভব হয় মুসলিম হওয়া। তাই সে সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ায় বেড়ে উঠাটি মুসলিমের কাছে কোন বিনোদন নয়, আনন্দ-উল্লাসও নয়, এটি গুরুত্বপূর্ণ এবাদত। এ কাজে  মেধাদান, শ্রমদান ও অর্থদান জ্বেহাদের সমতূল্য। এবং এমন কাজে ব্যবহৃত কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে পবিত্র।

আল্লাহতে বিশ্বাসী ও অনুগত হলে জীবন শ্লিল ও রূচীশীল হয়, আসে পবিত্রতা। ইসলাম পবিত্রতার প্রতিষ্টা চায় শুধু মসজিদে নয়, বরং সমগ্র সমাজে ও রাষ্ট্রজুড়ে। এমনকি আনন্দ-উৎসব ও শোক-দুঃখের আসর গুলোতেও। সমাজের কোন ক্ষুদ্রতর অংশ আনন্দ-উংসব বা সাংস্কৃতিক ক্রীয়াকর্মের নামে অশ্লিলতা ও নোংরামীতে আক্রান্ত হোক -ইসলাম তা চায় না। কারণ এগুলো রোগ। আর রোগমাত্রই সংক্রামক। এগুলির শুরু ক্ষুদ্রতর স্থান থেকে হলেও আস্তে আস্তে সমগ্র রাষ্ট্রকে গ্রাস করে। তাই যে অশ্লিলতার শুরু নাটকের মঞ্চ, সিনেমা হল, যাত্রা দল বা নিষিদ্ধ পল্লীতে, সেগুলি সেখানে সীমাবদ্ধ থকে না। আগুনের ন্যায় ঘর থেকে ঘর, গ্রাম থেকে গ্রামকে গ্রাস করে। এজন্যই ব্যক্তি ও জাতির পরিশুদ্ধির প্রয়োজনে ইসলাম সমাজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঙ্গণ থেকেও অশ্লিলতার নির্মূল চায়। সাংস্কৃতি পরিশুদ্ধির এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সমাজ পরিশুদ্ধির প্রয়োজনে ইসলাম শুধু ব্যক্তির মৌখিক কালেমা পাঠের মধ্যেই দায়িত্ব সাড়ে না, বরং তাকে একটি বিশেষ মডেলে গড়ে তুলতে চায়। আর সে মডেল হলো, রাসূলে পাকের (সা) মডেল। কালেমা উচ্চারণের মধ্য দিয়ে সেটি শুরু হয় বটে, তবে শেষ হয় না। এজন্য তাকে চিন্তা-চেতনা, আমল-আখলাক বিশুদ্ধকরণের বিশেষ এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। ইসলামি সংস্কৃতি হলো সে বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। আরবীতে এটিকে বলা হয় তাহযীব। তাহযীব হলো আরবী ব্যকারণের বাবে তাফয়ীলে হাযযাবা শব্দের ক্রিয়া বিশেষ্য। এ বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া কাজ না করলে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম করার প্রক্রিয়াই বন্ধ হয়ে যায়। কারণ মানুষ বইপত্র বা স্কুল-কলেজ থেকে যা শেখে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী শেখে সংস্কৃতি থেকে। জীবনের মূলপাঠটি সে সেখান থেকেই লাভ করে। তাকে কেন সৎ হতে হবে, কিভাবে সৎ হতে হবে, কেন ধর্মে একনিষ্ট হতে হবে, কেন অপরের দুঃখে দুখী এবং সুখে সুখী হতে হবে, কিভাবে বড়দের সন্মান ও ছোটদের সন্মান করতে হবে, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন বা মেহমানকেই বা কিভাবে আপ্যায়ীত করবে এবং জীবনের মূল ফিলোসফি কি -সে গুলো সে শেখে সংস্কৃতি থেকে। ফলে স্কুলে না গিয়েও সে জ্ঞানবান হয়।

 

অজ্ঞতাই সবচেয়ে বড় শত্রু

ইসলাম শুধু কালেমা, নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত শেখায় না। ইসলামী রাষ্ট্র, শিক্ষাকেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও গড়তে বলে। শুধু কালেমা, নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে পরিশুদ্ধি সম্ভব হলে আজকের মুসলিমগণও প্রাথমিক যুগের ন্যায় মহামানব রূপে বেড়ে উঠতো। অথচ আজকের দেড়শত কোটির অধিক মুসলিম সাহাবাদের তূলনায় হাজার ভাগের এক ভাগও কি অর্জন করতে পেরেছে? পারেনি। সে আমলে কোন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। তাঁরা প্রতি কর্মে নির্দেশনা নিতেন পবিত্র কোর’আন ও হাদীস থেকে। আজকের মুসলিমদের ব্যর্থতার মূল কারণ, তাদের মাঝে বিলুপ্ত হয়েছে কোর’আন-হাদীসের জ্ঞান। এবং বিনষ্ট বা বিলুপ্ত হয়েছে ইসলামী সংস্কৃতির সে বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া। একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য কি এর চেয়ে বেশী কিছু লাগে?

অজ্ঞতায় কোন সভ্যতা গড়ে উঠেনা। কোন সংস্কৃতিও নির্মিত হয় না। কোন সভ্যতর মানুষও তাতে সৃষ্টি হয়না। অজ্ঞতাই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। এজন্যই ইসলামের প্রথম জিহাদটি অজ্ঞতার বিরুদ্ধে। প্রতিটি নর-নারীর উপর প্রথম ফরজ বিধানটিও তাই জ্ঞানার্জন, নামায-রোযা নয়। এবং মহান আল্লাহতায়ালার প্রথম ওহীর নির্দেশটি ছিল “ইকরা” অর্থাৎ পড়ো। এভাবেই মহান আল্লাহতায়ালা সুস্পষ্ট করেছেন প্রতিটি ব্যক্তিকে কি ভাবে তাঁর পছন্দের মানব রূপে বেড়ে  উঠতে হবে। কিন্তু আজকের মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে অজ্ঞতায়। জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ ভান্ডার যে পবিত্র কোর’আন -তা থেকে তারা জ্ঞান নেয়া ছেড়ে দিয়েছে বহু আগেই। তারা দায়িত্ব সারছে না বুঝে তেলাওয়াতে। ভাবটি এমন, তারা শুধু সওয়াব চায়, হিদায়েত চায় না। হিদায়েত পেতে হলে তো কোর’আন বুঝতে হয়। বুঝার চেষ্টা করতে তারা রাজী নয়। না বুঝে তেলাওয়াতে যে অজ্ঞতা দূর হয় না, জ্ঞানার্জনের ফরজও যে তাতে আদায় হয় না এবং মহান আল্লাহতায়ালাও যে এরূপ অজ্ঞ থাকাতে খুশি হন না -সে হুশই বা ক’জনের? অমুসলিমের উপর মুসলিমের শ্রেষ্ঠত্ব তো কোর’আন-লব্ধ জ্ঞান ও দর্শনে। কিন্তু অজ্ঞতায় ও দর্শনহীনতায় কি শ্রেষ্ঠত্ব বাঁচে?

ইসলামের শত্রপক্ষের স্ট্রাটেজী মসজিদ-মাদ্রাসাগুলি ধ্বংস করা নয়। সেটি হলো মুসলিমদের কোর’আন-হাদীসের জ্ঞান থেকে দূরে সরানো। ইসলামের সংস্কৃতিক প্রক্রিয়াকে বিনষ্ট করার এটিই হলো সফল স্ট্রাটেজী। বীজকে গজাতে দেওযার পর তাকে  বেড়ে উঠার সুযোগ না দিলে সেটি নিস্ফল আয়ু পায় মাত্র, ফল দেয় না। মুসলিম সন্তানের জন্মরোধ করতে না পারলেও মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকে তারা বন্ধ করতে চায়। এক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছে। এবং সেটি ঔপনিবেশিক কাফের শক্তির হাতে অধিকৃত হওয়ার পর থেকেই। এরই ফল হলো, আজকের প্রায় দেড়শত শতকোটি মুসলিম ইসলামের বিজয় বা গৌরব বাড়াতে কোন অবদানই রাখতে পারছে না। এহেন নিস্ফল জীবনের সবচেয়ে জাজ্বল্যমান ও নিকৃষ্টতর উদাহরণ হলো বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলিম। দেশটিতে পবিত্র কোর’আন অক্ষত থাকলেও পশ্চাদপদতায় রেকর্ড গড়েছে। পরিশুদ্ধির বদলে বাড়িয়েছে কদর্যতা এবং দূর্নীতি বিশ্বে বার বার প্রথম হওয়ার রেকর্ড গড়েছে। দূর্নীতি, মিথ্যাচার, গুম-খুনের রাজনীতি, সন্ত্রাস ও ভিক্ষাবৃত্তি দেশটিতে একটি শিল্পে রূপ নিয়েছে। পতিতাবৃত্তি ও উলঙ্গতার ন্যায় পাপাচারকে না রুখে বরং সেগুলিকে আরো ব্যাপকতর করা হচ্ছে। বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার বদলে যে দূষিতকরণ প্রক্রিয়া উপনিবেশিক শত্রুরা চালু করেছিল -তাকে উৎখাত না করে বরং আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও অন্য মুসলমানদের কল্যানে কিছু করা দুরে থাক, নিজেদের কল্যানেও কিছু করতে পারছে না।

 

বিধ্বস্ত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান

 সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অসংখ্য। বহু প্রতিষ্ঠান অপসংস্কৃতির তথা দূষিতকরণ প্রক্রিয়ারও। ইসলামী সংস্কৃতির মূলকেন্দ্র হলো মসজিদ। এটিই হলো মর্তের বুকে মহান আল্লাহতায়ালারএকমাত্র নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই দ্বীনের আলো মহল্লার অন্ধকার সরায়। এ জন্যই শয়তানের মূল টার্গেট হলো মসজিদ। কিন্তু ইসলাম বিরোধী শক্তি ইসলামী সংস্কৃতির এ প্রাণকেন্দ্রকে বহুলাংশেই প্রাণহীন ও অকার্যকর করে রেখেছে। মহান আল্লাহতায়ালার এ পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহৃত হচ্ছে নিছক নামাজ আদায়ের স্থানরূপে। নামাজের সময় ব্যতীত লক্ষ লক্ষ মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনগুলি অধিকাংশ সময়ই অব্যবহৃত থাকে। দ্বীনশিক্ষা, মানুষের মাঝে ভাতৃত্ব গড়া, সমাজসেবা, জুলুমের বিরুদ্ধে জ্বিহাদ সংগঠিত করা এবং জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার যে কাজ একদিন মসজিদের জায়নামাজে হতো -তা আজ বিস্মৃতপ্রায়। অথচ এসব কাজের জন্য সে সময় মসজিদ ভিন্ন মুসলিমদের অন্য কোন প্রতিষ্ঠানই ছিল না। ক্লাব, যাত্রাদল, সিনেমা ও নাট্যমঞ্চ এগুলি জন্ম ও পরিচর্যা পেয়েছে অমুসলিমদের হাতে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে যে সংস্কৃতি চর্চা হয় সেটিও মুসলিমের নয়। ইসলামের আলোকে এগুলি আদৌ সংস্কৃতি নয়, বরং অপসংস্কৃতি। এবং এ অপসংস্কৃতির নাশকতাটি ভয়ংকর।

পবিত্রতা শুধু নামাযে থাকলে চলে না। পবিত্রতা থাকতে হয় প্রতিটি কর্মে। কারণ, নামাযের পাশাপাশি প্রতিটি কর্মের জন্যও মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সে দায়বদ্ধ। মসজিদের জায়নামাযের যে পবিত্রতা সেটি অন্যত্র সম্ভব নয়। তাই সমাজীকরণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনে অন্যরা ক্লাব গড়লেও পবিত্রতার স্বার্থে মুসলিমগণ শুধু মসজিদই গড়েছে। তবে নিছক কয়েক মিনিটের জন্য জায়নামাযে আসাতে ব্যাক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি আসে না। নবীজী (সা) তাঁর সাহাবাদের নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আল্লাহতায়ালার এ পবিত্র ঘরে নবীজী (সাঃ)’র সাহচর্য্যে কাটিয়েছেন এবং দ্বীনের আলোকে নিজেদের আলোকিত করেছেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে এটিই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ ক্লাসরুম। শিক্ষক ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক মহান নবীজী (সাঃ)। মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব সৃষ্টি হয়েছেন এ ক্লাসরুম থেকে। কিন্তু আজকের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুসলিম বিশ্বে আজ লক্ষ লক্ষ মসজিদ। কিন্তু মসজিদের জায়নামাজে নবীজী (সাঃ)’র সে পবিত্র সূন্নত বিলুপ্ত করা হয়েছে বহু আগেই।   

পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানই মানুষকে মুসলিম বানায়। মুসলিম সমাজের গাঢ় অন্ধকার দেখেই বলা যায়, দ্বীনের আলো এখানে পূর্ণভাবে জ্বালানো হয়নি। সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অন্ধকার সরাতে আল্লাহর এ প্রতিষ্টান মসজিদ আদৌ কোন সফলতা দিতে পারেনি। ফলে নির্মিত হয়নি সুস্থ্য সংস্কৃতি। এবং নির্মিত হয়নি ইসলামি রাষ্ট্র। ফলে মুসলিমদের মুসলিম হওয়াতেই বেজায় ফাঁকি রয়ে গেছে। মুসলিমদের সকল ব্যর্থতার মূল কারণ এই ফাঁকিবাজি। ইসলামের বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়াকে রুখতে শত্রুশক্তি মসজিদকে যেমন নিষ্ক্রিয় করেছে, তেমনি প্রতিষ্ঠা দিয়েছে নাচগান, যাত্রা, নাটক, সিনেমা, মদ্যপান, বেশ্যাবৃত্তির ন্যায় নানান অশ্লিলতার। এগুলোর ফলে মুসলিমদের চেতনা যেমন অসুস্থ্য হয়েছে, তেমনি দিন দিন কদর্যতা বাড়ছে তাদের রুচীবোধ ও আচার-আচরনে।

 

সাংস্কৃতিক নাশকতা

সাহিত্য সংস্কৃতির অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জ্ঞানের বিস্তারে সাহিত্য পাইপলাইনের কাজ করে। কিন্তু অশ্লিল সাহিত্য এ পাইপলাইনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে চেতনার ভুবনে রোগের বিস্তার ঘটায়। দূষিত পানিতে দেহ রোগাগ্রস্থ হয়, দুষিত সাহিত্যে রোগাগ্রস্থ হয় সমগ্র চেতনা। চেতনার এ রোগাগ্রস্থ্যতার কারণেই মানুষ চুরি-ডাকাতি, খুন-ধর্ষন ও রাহাজানিতে লিপ্ত হয়।  বাংলাদেশে আজ সেটিই হচ্ছে। সংস্কৃতি হলো মানুষকে সভ্যতর করার শিল্প। মানুষ সভ্যতর হয়, সমাজ সামনে এগোয়, এবং রাষ্ট্র সমৃদ্ধতর হয় -এ শিল্পের গুণেই। বাংলাদেশে আজ যে অবাধ ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, হত্যার সয়লাব, সেটিই প্রমাণ করে এ সৃষ্টিশীল শিল্প এদেশে গড়ে উঠেনি। বরং বেড়েছে মানুষকে অসভ্যতর করার শিল্প অর্থাৎ অপসংস্কৃতি। এটির টানে আমরা যেন আঁধারের দিকে ছুটছি। আর এরূপ আঁধারের দিকে নেওয়াই তো শয়তানের কাজ, এবং সে বেঈমানদের সুহৃদ। সুরা বাকারা’তে তো সেটিই বলা হয়েছে।

সংস্কৃতির লেবাসে যুগে যুগে মানুষকে মহান আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে ধাবিত করাই শয়তানের সনাতন ধর্ম। শয়তানের এ ধর্ম কিতাব নির্ভর নয়, বরং সংস্কৃতি নির্ভর। সংস্কৃতির ছদ্দবেশে সে ব্যক্তির পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়াকে চিরতরে রুখতে চায়। বাংলাদেশে ইসলামের উপর জঘন্যতম হামলা আসছে এই সাংস্কৃতিক কর্মীদের পক্ষ থেকেই। মৌলবাদ নির্মূল করার নামে এরাই ইসলামকে নির্মূল করতে চায়। এদের কারণে জাতিকে সভ্যতর করার মাধ্যমগুলো আজ বিপর্যস্ত। কবিতার নামে, যাত্রা-নাটক ও সিনেমার নামে এরা মানুষের চিন্তা-চেতনাকে দিন দিন আরো অসুস্থ্যতর করছে। বাড়ছে উলঙ্গতা, বাড়ছে অশ্লিললতা, বাড়ছে নেশাগ্রস্থতা। তাতে পাড়ার বখাটে ছেলেরা ধর্ষণে উৎসাহ পাচ্ছে। ফলে পাড়ায় পাড়ায় যতই বাড়ছে নাট্যদল, ক্লাব, ভিডিও, সিনেমা হল ততই বেড়ে চলেছে সমাজে অসুস্থ্য মানুষের ভিড়। এদের কারণে ৫০ বছর পূর্বে জাতি নীতি-নৈতিকতা ও মুল্যবোধের মানদন্ডে যে পর্যায়ে ছিল তার চেয়ে অনেক নীচে নেমেছে। সংস্কৃতি চর্চার নামে এ পতন-প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে ইসলামের নির্মূলে শত্রুশক্তির একটি তীরও ছোড়ার প্রয়োজন পড়বে না।

সাংস্কৃতিক ভিন্নতাই রাজনৈতিক ভিন্নতার জন্ম দেয়। সে ভিন্নতার কারণেই দেশবাসী ভিন্ন মানচিত্র পায়। সেটি বিলুপ্ত হলে বাংলাদেশের পৃথক থাকার যুক্তি বা ভিত্তিই বিলুপ্ত হবে। তখন বিপর্যস্ত হবে দেশটির স্বাধীনতা ও অস্তিত্ব। বাংলাদেশের ভারতপন্থি সাংস্কৃতিক কর্মীরা বস্তুত সে কাজেই  দ্র্রুত অগ্রসর হচ্ছে। একারণেই এদের প্রতিপালনে ভারতের বিপুল বিনিয়োগ। বাংলাদেশে এ অবধি কোন শিল্পে তেমন বিনিয়োগ না করলেও কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্মে ও মিডিয়াতে। দিন রাত মগজ ধোলাইয়ের কাজ করছে ভারতীয় টিভিও।সে সাথে দলে দলে আসছে ভারতীয় নাট্যকর্মী, গায়ক-গায়িকা ও সিনেমাকর্মী। একাজে যেসব বাংলাদেশী ভারতের একনিষ্ট সেবক -তাদেরকে তারা পুরস্কৃতও করছে।

জাতিকে বাঁচাতে হলে চেতনার দূষিতকরণ প্রক্রিয়াকে অবশ্যই বিলুপ্ত করতে হয়। এবং যে পাইপ লাইনগুলি ঘরে ঘরে সংস্কৃতির নামে জাতি ধ্বংসের জীবাণু পৌঁছে দিচ্ছে -বিচ্ছিন্ন করতে হয় সেগুলির সংযোগও। নিজ ধর্ম ও নিজ সংস্কৃতি নিয়ে বাঁচার স্বার্থে জাতিকে শুধু ভৌগলিক সীমানা পাহারা দিলে চলে না, সাংস্কৃতিক সীমানাও পাহারা দিতে হয়। অথচ বাংলাদেশে সে কাজটিই হচ্ছে না। ফলে প্লাবনের পানির ন্যায় ধেয়ে আসছে শত্রু শক্তির সাংস্কৃতিক স্রোত। তাই এ মুহুর্তে জরুরি শুধু সংস্কৃতির সংস্কারই নয়, বরং সাংস্কৃতিক প্রতিরক্ষাও। নইলে ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকাই যে কঠিন হবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? ১ম সংস্করণ ০৩/০৮/২০০৩; ২য় সংস্করণ ১৮/১২/২০২০।

 




বাংলাদেশে যে শিক্ষা শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে

ফিরোজ মাহবুব কামাল

লেখক পরিচিতি: বিলেতে মেডিসিনের কনসালটেন্ট; গবেষণা নিবন্ধ, পত্রিকার কলাম এবং বইয়ের লেখক; ইন্টার ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব সায়েন্টিফিক স্টাডিস অব পপুলিশেন (আই.ইউ.এস.এস.পি) ১৯৯৭ সালের চীনের বেইজিংয়ে ও ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলে  এবং ২০২0 সালের ফেব্রেয়ারীতে ফ্রান্সে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ও নরম্যান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান গবেষণা পেপার পেশ

উপেক্ষিত শিক্ষার মূল লক্ষ্য                                                    

শিক্ষার মূল লক্ষ্যটি স্রেফ স্বাক্ষর-জ্ঞান, গণিতের জ্ঞান বা পড়ালেখার সামর্থ্য বৃদ্ধি নয়। স্রেফ উপার্জনের কৌশল শেখানো নয়। নিছক তথ্য ও তত্ত্ব জানানোও নয়। এমন কি বিজ্ঞান বা কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ করাও নয়। বরং সে মূল উদ্দেশ্যটি হলো ব্যক্তির বিবেককে জাগ্রত করা। জ্ঞানের সন্ধান ও জ্ঞানার্জনের পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়া। মিথ্যা থেকে সত্য, অন্যায় থেকে ন্যায়কে চেনার কান্ডজ্ঞান দেয়া। ছাত্রকে পরিশুদ্ধ চেতনা ও মানবিক গুণে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। তখন শুধু ব্যক্তির বিশ্বাস, দর্শন ও রুচীবোধই পাল্টে যায় না, পাল্টে যায় তার কর্মকান্ড, আচার-আচরণ ও চিরায়ত অভ্যাস। অসভ্য ও অসুন্দর মানুষ থেকে শিক্ষিত মানুষ তখন ভিন্নতর মানুষে পরিণত হয়। শিক্ষার মাধ্যমে জাতি এ ভাবেই পায় পরিশীলিত, সভ্য ও সুন্দর চরিত্রের মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশ তা পায়নি। বাংলাদেশের এ বিশাল ব্যর্থতাটি মিথ্যাপূর্ণ গলাবাজি করে ঢাকা যায় না। সে ব্যর্থতার প্রমাণ তো হলো, দেশজুড়ে সন্ত্রাস, খুন, গুম, ধর্ষণ, দুর্নীতি, অরাজকতা, স্বৈরাচারিদের দখলদারি ও দূর্নীতিতে বিশ্বে বার বার প্রথম স্থান অর্জন। এসব ব্যর্থতার কারণ অনেক। তবে মূল ব্যর্থতাটি শিক্ষাব্যবস্থার। গরু-ছাগল বেড়ে উঠে গোয়ালে এবং মানব শিশু মানবিক গুণে বেড়ে উঠে বিদ্যালেয়। বাংলাদেশের ব্যর্থতাগুলি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা জাতিকে শিক্ষিত করতে এবং ছাত্রদের প্রকৃত মানব রূপে গড়ে তুলতে চরম ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। এ শিক্ষা শুধু দূর্নীতি, সন্ত্রাস, স্বৈরাচারই বাড়ায়নি, বাড়িয়েছে পরনির্ভরতাও। মেরুদণ্ড গড়ার বদলে সেটিকে বরং চুর্ণ বা পঙ্গু করছে। এ শিক্ষাব্যবস্থা ব্যক্তির নিজেকে, তার বাঁচবার মূল লক্ষ্যকে ও তার প্রভুকে জানতেও তেমন সাহায্য করছে না।

শিক্ষার মূল লক্ষ্য, কোনটি সত্য ও কোনটি মিথ্যা এবং কোনটি জান্নাতের পথ আর কোনটি জাহান্নামের পথ -সেটি জানায় ছাত্রের সামর্থ্য বাড়ানো। সেটি না হলে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি শয়তানের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়। তখন ছাত্রগণ কর্মজীবনে ডাক্তার, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, প্রকৌশলী, প্রশাসক বা বিচারক হয়েও মিথ্যার জোয়ারে ভাসতে থাকে ও শয়তানের সেপাহীতে পরিণত হয়। এমন দেশে ভিনদেশী শত্রুগণও তাদের পক্ষে বিপুল সংখ্যক ভাড়াটে সৈনিক পায়। বিশ্ববিদ্যালের সেরা ডিগ্রি নিয়েও এমন ব্যক্তি নিরেট জাহেল, ইসলামের শত্রু ও জাহান্নামের যাত্রীতে পরিণত হয়। ইসলামের বিজয় রুখতে তারা বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদি শক্তির সাথেও কোয়ালিশন গড়ে। ইসলামে জাহেল থাকাটিই এজন্যই কবিরা গুনাহ। সকল গুনাহর এটিই হলো জননী। অজ্ঞতা ও কুশিক্ষা নিয়ে অসম্ভব হয় সত্যিকার মুসলিম হওয়া। তাই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী কোন ব্যক্তি যখন সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী বা সমাজবাদী রাজনীতির ক্যাডার বা সমর্থক হয় -তখন কি বুঝতে বাঁকি যে ব্যর্থতাটি মূলত শিক্ষালাভে? 

সমাজে পেশা বা কাজের সংখ্যা অসংখ্য। তবে জীবনে সফল হতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ কোনটি -সে হুশটি ষোল আনা থাকতে হয়। একই বলে sense of prioratisation. সে বোধ থাকলে গাড়ীর গায়ে রঙ লাগানোর চেয়ে ইঞ্জিন ঠিক করাটি অধীক গুরুত্বপূর্ণ গণ্য হয়। নইলে সে গাড়ী চলে না। ইসলামের সে ইঞ্জিনটি হলো ঈমান। সে ঈমান পানাহারে বেড়ে উঠে না। ঈমান বাড়ে এবং পুষ্টি পায় পবিত্র কোরআন-হাদীসের জ্ঞানে। তাই নবীজী (সাঃ)র উপর নাযিলকৃত প্রথম ওহীটি নামায-রোযা বা হজ-যাকাত ফরজ করতে নাযিল হয়নি। সেটি ছিল জ্ঞানার্জন ফরজ করতে। “ইকরা” তাই পবিত্র কোর’আনের প্রথম শব্দ। গাড়ির শক্তিশালী ইঞ্জিনের সাথে যেটি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ –সেটি হলো সঠিক পথের  তথা সিরাতুল মুস্তাকীমের রোডম্যাপ। পবিত্র কোরআন হলো সে রোড ম্যাপ। পবিত্র কোরআনের জ্ঞান ছাড়া কোন ব্যক্তির নিজের বুদ্ধিতে –তা সে যতবড় বুদ্ধিমানই হোক না কেন, জান্নাতের পথ পাওয়া সম্ভব। সেটি এমনকি নবীজী (সা:)র পক্ষে সম্ভব ছিল না। “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযী খালাক” -অর্থ: “পড় যিনি সৃষ্টি করেছেন সে মহান প্রভুর নামে”, পবিত্র কোরআনে ঘোষিত মহান আল্লাহর এ প্রথম আয়াতটি এবং প্রথম এ হুকুমটি মূলত সে অপরিহার্য বিষয়টিই সুস্পষ্ট করে। এবং সে নির্দেশটি স্রেফ নবীজী (সা:)র প্রতি নয়, বরং প্রতিটি মানুষের উপর। যার মাঝে সে জ্ঞানার্জনের হুকুম পালনে আগ্রহ নাই সে ব্যক্তি নামাযী, রোযাদার বা হাজী হতে পারে, কিন্তু যেরূপ জ্ঞানবান মুসলিম মহান আল্লাহতায়ালার কাছে পছন্দীয় সে পর্যায় পৌঁছা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। 

পবিত্র কোরআনের জ্ঞান থেকে যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিল, সে মূলত জাহেল। এমন জাহেলগণ মুসলিম হওয়ার পরিবর্তে কাফের, মুনাফিক, ও জালেম হয়। এরাই অন্তহীন কালের জন্য জাহান্নামের বাসিন্দা হয়। জ্ঞান ছাড়া ঈমান-আক্বিদা যেমন ঠিক হয় না, অন্য ইবাদতও সঠিক হয় না। কোর’আনী ইলমে জ্ঞানবান ব্যক্তিকে আলেম বলা হয়, সে জন্য মাদ্রাসার ডিগ্রি জরুরি নয়। সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে আজ  অবধি মুসলিম ইতিহাসে যারা শ্রেষ্ঠ আলেম রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তাদের কোন ডিগ্রি ছিল না। গভীর জ্ঞান ও জ্ঞানলব্ধ উন্নত আমলই ছিল তাদের সার্টিফিকেট বা সনদ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা, “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহ মিন ইবাদিহিল উলামা”। অর্থ: সমগ্র মানবসৃষ্টির মাঝে একমাত্র আলেমগণই আল্লাহকে ভয় করে। এর অর্থ দাঁড়ায়, অন্তরে আল্লাহতায়ালার ভয় সৃষ্টি করতে হলে তাকে আলেম হতে হয়। আল্লাহতায়ালার ভয় ছাড়া কি মুসলিম হওয়া যায়? মুসলিম হতে হলে তাই আলেমও হতে হয়। জ্ঞানার্জন এ জন্যই অপরিহার্য। এবং সে জ্ঞানের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও সর্বশ্রেষ্ঠ ভাণ্ডারটি হলো পবিত্র কোর’আন। এটিই মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান; তেল, গ্যাস, হিরক বা সোনা-রূপা নয়। কোর’আনের জ্ঞান ছাড়া তাই প্রকৃত জ্ঞানী হওয়া চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। অথচ বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে জ্ঞানী হওয়ার কাজটি হচ্ছে কোর’আনের জ্ঞান ছাড়াই। ফলে দেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা বিপুল সংখ্যায় বাড়লেও, প্রকৃত জ্ঞানীর সংখ্যা বাড়েনি। বরং ভয়ানক ভাবে যা বেড়েছে ডিগ্রিধারীদের মাঝে খুনি, ধর্ষক, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের সংখ্যা। মানুষকে লাশ বানানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গণে।

 

পালিত হচ্ছে না জ্ঞানার্জনের ফরজ

খাওয়ার অর্থ কোন কিছু শুধু মুখে পুরা নয়। বরং সেটিকে চর্বন করা, গলধঃকরণ করা এবং হজম করা। নইলে খাওয়ার কাজটি যথার্থ হয়না। তাতে দেহের পুষ্টিও বাড়ে না। তেমনি পড়ার অর্থ শুধু তেলাওয়াত নয়, বরং যা পড়া হয় তার অর্থ পুরাপুরি বুঝা তথা আত্মস্থ করা। অথচ বাংলাদেশে কোরআন পড়ার নামে স্রেফ তেলাওয়াত  হয়, কোরআন বুঝা হয় না। কোরআনী জ্ঞানার্জনের ফরযও তাতে আদায় হয় না। অথচ পবিত্র কোর’আনে “আ’ফালা ইয়াতাদাব্বারুন” (অর্থ: তোমার কোন গভীর ভাবে মননিবেশ করো না?) এবং “আ’ফালা তা’ক্বুলুনর” (অর্থ: তোমার কেন নিজের বিবেক বু্দ্ধিকে কাজে লাগানো না?) এরূপ প্রশ্ন রেখে মহান আল্লাহতায়ালা মূলত পবিত্র কোর’আন বুঝার উপর অপরিসীম গুরুত্ব দিয়েছেন। নবীর যুগে সাহাবাগণ সেটি বুঝেছিলেন। তাই সে সময় যারা নিরক্ষর ছিলেন বা ভেড়া চড়াতেন তারাও দ্রুততার সাথে অতি উচ্চমানের জ্ঞানী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। অথচ বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশের আলেমগণ অর্থ না বুঝে তেলাওয়াত করাকে নিন্দা করেন না। বরং সেটিকে সওয়াবের কাজ বলে প্রশংসা করেন। মহান আল্লাহতায়ালা তাদাব্বারুন, তায়াক্কুল ও তাফাহহুমের যে গুরুত্ব দিয়েছেন, সেটি বাংলাদেশী আলেমদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। ফরজ পালনের বদলে সওয়াব হাছিলই তাদের কাছে বেশী গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে কোরআন তেলাওয়াত ও কোর’আনের হাফেজ হওয়ার আয়োজন বাড়লেও কোরআন বুঝার আয়োজন বাড়েনি।

অথচ না বুঝে তেলাওয়াতের যে সওয়াব –সেটি হাসিল না করলে গুনাহ হয় না। মাথা টানলে কান এমনিতেই চলে আসে। ফলে বুঝে কোর’আন পাঠ করলে তেলাওয়াতের সওয়াব তো সে সাথে জুটবেই। কিন্তু কোর’আন না বুঝলে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের যে চরম অবাধ্যতা হয় এবং তাতে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলা যে সম্ভব হয় না -সে হুশ কি আছে? কোর’আন হিদায়েত তথা পথনির্দেশনা দেয়ার কিতাব। হিদায়েত নিতে হলে তো কিতাব বুঝতে হয়; না বুঝায় সেটি সম্ভব কি করে?

মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতিটি অবাধ্যতাই কুফরি। পবিত্র কোরআনের অর্থ বুঝা যে কতটা জরুরী সেটি বুঝা যায় মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র ঘোষণা থেকে: “ইয়া আইয়োহাল্লীযীনা আমানু লা তাকরাবুস সালাতা  ও আনতুম সুকারা ও হাত্তা তা’লামু তা কূলুনু।” –(সুরা নিসা, আয়াত ৪৩)। আয়াতটির অর্থঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমার নামাযের নিকটবর্তী হয়ো না যদি মদ্যপ অবস্থায় থাকো; এবং ততক্ষণ পর্যন্ত নয় যতক্ষণ না তোমরা যা বলো তা বুঝতে না পারো।” আয়াতটি যখন নাযিল হয়েছিল তখনও মদ্যপান হারাম ঘোষিত হয়নি। ফলে মাদকাসক্ত অবস্থায় অনেকে নামাযে দাঁড়াতো। ফলে যে আয়াতগুলো নামাযে তেলাওয়াত করা হতো -তাঁর অর্থ তাঁরা বুঝতো না। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সেটি অতি অপছন্দনীয় ছিল। তিনি চান, পবিত্র কোরআন কেউ পাঠ করলে তার অর্থও তাকে বুঝতে হবে। অথচ সেটি মদ্যপ অবস্থাতে অসম্ভব। তবে আরেকটি কারণেও মহান আল্লাহতায়ালার অপছন্দনীয় সে কাজটি ঘটে, সেটি হলো না বুঝে কোরআন তেলাওয়াতে।

তাই ইসলামে মদ্যপান যেমন হারাম ঘোষিত হয়েছে, তেমন ফরজ করা হয়েছে পবিত্র কোরআন বুঝাকে। কোরআন বুঝার সে গুরুত্বটি বুঝার কারণেই মিশর, সিরিয়া, ইরাক, সূদান, লিবিয়া,মরক্কো, মালি, আলজিরিয়ার ন্যায় দেশের অনারব মুসলিমগন নিজেদের মাতৃভাষা পরিহার করে আরবী ভাষাকে গ্রহণ করেছিলেন। অর্থ উদ্ধারে ব্যর্থ হওয়াতে পবিত্র কোরআনের বার বার খতম তেলাওয়াতেও বাঙালী মুসলিমদের জ্ঞানের ভূবনে বৃদ্ধি ঘটছে না। ফলে আল্লাহ-ভীরু মুসলিম সৃষ্টি হচ্ছে না। লক্ষ লক্ষ ঘন্টা এভাবে ব্যয় হলেও প্রকৃত জ্ঞানী বা আলেম সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশে প্রচলিত তাফসির গ্রন্থগুলির প্রায় সবগুলিই উর্দু বা আরবী ভাষা থেকে অনুদিত। প্রকৃত আলেম সৃষ্টি হলে তো মুজাহিদও সৃষ্টি হতো। তখন আল্লাহর নির্দেশিত শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠাও ঘটতো। শিক্ষার ময়দানে বাঙালী মুসলিমদের এটিই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। সে ব্যর্থতার কারণে দ্রুত বাড়ছে জাহেলদের সংখ্যা। ফলে বাড়ছে ১৬ কোটি মুসলিমের দেশে ইসলামের পরাজয়। এবং বলবান হচ্ছে ইসলামের শত্রুপক্ষের অধিকৃতি।

 

শিক্ষাই জীবনের মূল্য বাড়ায়

ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনে ভ্যালু এ্যাড বা মূল্য সংযোজন হয় শিক্ষার মাধ্যমে। মানব জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো এরূপ লাগতর মূল্য সংযোজন। রাষ্ট্রের এবং মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো এটি। ভূমি, কৃষিপণ্য, খনিজ সম্পদের গায়ে মূল্য সংযোজনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির গায়ে মূল্য সংযোজন। এবং সবচেয়ে বড় মূল্য-সংযোজনটি হয় হিদায়েত বা সিরাতুল মুস্তাকীম-প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। তখন সে জান্নাতের যোগ্য রূপে বিবেচিত হয়। সেটি না হলে ব্যক্তি ও সমষ্টির সকল খাত ব্যর্থ হতে বাধ্য। সেটি যেমন আখেরাতে, তেমনি এ দুনিয়াতে। তখন ব্যর্থ হয় প্রশাসন, রাজনীতি, প্রতিরক্ষা, আইন-আদালত, শিল্প, কৃষি, বিজ্ঞানসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য খাত। মূল্য সংযোজনের অর্থ, ব্যক্তির জীবনে লাগাতর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ঈমান, চারিত্রিক পরিশুদ্ধি ও কর্ম-কুশলতা বৃদ্ধি। এখাতে ব্যর্থ হলে জিডিপি বা মাথাপিছু আয় বাড়িয়েও জাতি দুর্বৃত্তিতে রেকর্ড গড়ে।

শিক্ষাকালটি কখনোই স্কুল-কলেজের শিক্ষা শেষে শেষ হওয়ার নয়। বরং আজীবন সে ছাত্র। এবং তার জ্ঞানার্জন চলে কবরে যাওয়ার পূর্ব-মুহুর্ত পর্যন্ত। নবীজী (সা:) বলেছেন, তার জন্য ধ্বংস যার জীবনে পর পর দু’টি দিন অতিবাহিত হলো, অথচ জ্ঞানে বৃদ্ধি ঘটলো না। ঈমানদার ব্যক্তিকে তাই দিন শেষে ভাবতে হয়, তার জ্ঞানের ভূবনে সে দিনটিতে কতটুকু অর্জিত হলো -তা নিয়ে। পাটের আঁশে মূল্য সংযোজন না হলে সেটি স্রেফ আঁশই থেকে যায়। মূল্য সংযোজন হলে সে পাটই মূল্যবান কার্পেটে পরিণত হয়। মূল্য সংযোজনের ফলে খনির স্বর্ণ বা হীরক খন্ড অতি মূল্যবান গহনাতে পরিণত হয়। মানব জীবনে মূল্য সংযোজনের সে ইন্ডাস্ট্রিগুলো হলো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মসজিদ-মাদ্রাসা। কিন্তু বাংলাদেশে সবচেয়ে ব্যর্থ খাত হল এগুলি। এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে হচ্ছে এর উল্টোটি। গ্রামের সুবোধ বালকটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে খুনি, সন্তুাসী ও ধর্ষকে পরিনত হচ্ছে। অসংখ্য ছাত্রী ধর্ষিতা হচ্ছে, আবরার ফাহাদগণ লাশ হচ্ছে তো তাদের হাতেই।হলের রুমগুলো পরিণত হচ্ছে ধর্ষণপুরি ও টর্চার সেলে।

 

শিক্ষাঙ্গণ যেখানে ক্রাইম ইন্ডাস্ট্রি

বাংলাদেশকে যারা সন্ত্রাসী, স্বৈরাচারি, ধর্ষক ও  দূর্নীতিবাজদের দেশে পরিণত করেছে -তারা ডাকাত পাড়ায় বেড়ে উঠেনি। তারা শিক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। নবীজী (সা:)’র বিখ্যাত হাদীস, “প্রতিটি শিশুর জন্ম হয় মুসলিম রূপে।” মুসলিম দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত কাজ হলো, প্রতিটি শিশুর জীবনে কোর’আনীর জ্ঞানের মূল্য সংযোজন ঘটিয়ে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। এভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি ছাত্র-ছাত্রীদের জান্নাতে পৌঁছতে সাহায্য করবে –সেটিই তো কাঙ্খিত। কিন্তু কাফের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এজেন্ডাটি হয় এর উল্টো। সেগুলি ব্যবহৃত হয় ছাত্রদের ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে ইসলামের শত্রু রূপে গড়ে তোলার কাজে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালের ডিগ্রিধারী ছাত্রগণ যখন সন্ত্রাসী, খুনি, ঘুষখোর, ধর্ষক, মাদকাসক্ত হয় এবং জাতীয়তাবাদী, সমাজবাদী ও সেক্যুলারিস্ট রাজনীতির ক্যাডার রূপে খাড়া হয় -তখন কি বুঝতে বাঁকি থাকে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কিসের ইন্ডাস্ট্রি? এগুলোর কারণে মুসলিম শিশু ডিগ্রি পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এসব ডিগ্রীধারিগণই বাংলাদেশকে পৌঁছে দিচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ রূপে।

প্রতিটি ব্যক্তির গভীরে যে সম্পদ লুকিয়ে আছে তা সোনার খনি বা তেলের খনির চেয়েও বহুগুণ সমৃদ্ধ। শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় এবং উন্নততর সভ্যতার নির্মাণে বস্তুতঃ এ মানবিক সম্পদই মূল। অন্যসব সম্পদের প্রাচুর্য আসে এ সম্পদের ভিত্তিতেই। তাই উন্নত জাতিসমূহ শুধু মাটি বা সাগরের তলাতেই অনুসন্ধান করে না, বরং মানুষের গভীরেও আবিস্কারে হাত দেয়। মানুষের নিজ শক্তি আবিস্কৃত না হলে প্রাকৃতিক শক্তিতে তেমন কল্যাণ আসে না। তাই আফ্রিকার সোনার খনি বা আরবদের তেলের খনি সে এলাকার মানুষকে উপহার দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শোষন ও মানবেতর স্বৈরাচার। অথচ নবী পাক (সাঃ) মানুষকে সভ্যতর কাজে ও সভ্যতার নির্মানে ব্যক্তির সুপ্ত শক্তির আবিস্কারে হাত দিয়েছিলেন। ফলে মানব-ইতিহাসের বিস্ময়কর মানুষে পরিণত হয়েছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। ফেরেশতাদের চেয়েও তারা উঁচুতে উঠতে পেরেছিলেন। তবে বীজ থেকে অঙ্কুরোদগমের জন্য চাই উপযুক্ত মাটি, পানি ও জলবায়ু। নইলে তা থেকে চারা গজায় না, বৃক্ষও বেড়ে উঠে না। তেমনি ব্যক্তির সুপ্ত শক্তি ও সামর্থ্যের বেড়ে উঠার জন্যও চাই উপযুক্ত পরিবেশ। সেরূপ একটি পরিবেশ দিয়ে সাহায্য করাই বিদ্যালয়ের মূল কাজ। তখন জেগে উঠে ব্যক্তির ঘুমন্ত বিবেক। বেড়ে উঠে তার ব্যক্তিত্ব। বিদ্যালয়ে এ কাজ না হলে তখন দেহ হত্যা না হলেও নিহত হয় শিশুর সৃষ্টিশীল সুপ্ত সামর্থ্য। তখন বিদ্যালয় পরিণত হয় বিবেকের বধ্যশালায়। তখন মানুষ পরিণত হয় নিজেই নিজ বিবেক ও প্রতিভার কবরস্থানে।

বাংলাদেশের বিদ্যালয়ে এভাবেই খুন হচেছ বহু খালেদ, তারেক, ইবনে সিনা, ফারাবী, তারাবীর ন্যায় প্রতিভা। তবে বিপদ শুধু প্রতিভার হত্যাকান্ডতেই সীমাবদ্ধ নয়। জমিতে ফসল না ফলালে যেমন বিপদ বাড়ে আগাছার তান্ডবে, তেমনি সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের আবাদ না বাড়ালে সেখানে বেড়ে উঠে দুর্বৃত্তরা। বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে অতি ব্যাপক ভাবে। দেশেটির আজকের বিপদের মূল হেতু এখানেই। এরা যে শুধু পতিতা পল্লি, জোয়ার আসর ও ড্রাগের বাবসা দখলে নিয়েছে তাই নয়, রাজনীতি, অফিস আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির উপরও আধিপত্য জমিয়েছে। নিছক রাস্তার চোর-ডাকাত বা সন্ত্রাসীদের কারণে বাংলাদেশ দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হয়নি। বরং সে উপাধিটি জুটেছে দেশের সর্বস্তরে দুর্বৃত্তদের দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে। 

পশু থেকে মানুষ পৃথক তার চেতনার কারণে। এ চেতনা দেয় চিন্তা-ভাবনার সামর্থ্য। এবং এ চিন্তা-ভাবনা থেকেই ব্যক্তি পায় সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় এবং ধর্ম-অধর্ম বেছে চলার যোগ্যতা। মহৎ মানুষ রূপে বেড়ে উঠার জন্য এটি এতোই গুরুত্বপুর্ণ যে পবিত্র কোরআনে বার বার বলা হয়েছে, ‘আফালাতা’কীলুন’, ‘আফালাতাদাব্বারূন’ ‘আফালাতাফাক্কারুন’ বলে। অর্থঃ ‘তোমরা কেন চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগাও না?’ ‘তোমরা কেন ধ্যানমগ্ন হও না?’, ‘তোমরা কেন ভাবনা?’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ দৈহিক বল নয় বরং তার চিন্তাভাবনার সামর্থ্য। চিন্তাভাবনাই জ্ঞানের জন্মদাতা। চিন্তার সামর্থ্য অর্জিত হলে নিজেকে শিক্ষিত করার কাজে সে শুধু সুশীল ছাত্র রূপেই বেড়ে উঠে না, নিজেই নিজের শিক্ষকে পরিণত হয়। এমন ব্যক্তির জীবনে শেখা এবং শেখানো -এ দুটোই তখন দ্রুত সমানে সামনে এগুয়। ঈমানদার তাই সর্বাবস্থাতেই যেমন ছাত্র, তেমনি শিক্ষকও। ফুলে ফুলে ঘুরে মধুসংগ্রহ যেমন মৌমাছির ফিতরাত, তেমনি সর্বমুহুর্তে ও সর্বস্থলে জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান-দানের ফিতরাত হলো প্রকৃত জ্ঞানীর। তখন জ্ঞানের সন্ধানে সাগর, মরুভুমি, পাহাড়-পর্বত অতিক্রমেও সে পিছপা হয়না। বিদ্যালয়ের কাজ তো সে ফিতরাতকে জাগ্রত করা। একমাত্র তখনই নর-নারীগণ জ্ঞানার্জনের মেশিনে পরিণত হয়। তখন দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রবল জোয়ার আসে।

শিক্ষকের দায়িত্ব জ্ঞানার্জনের সে ধারাকে শুধু বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি কোনে পৌঁছে দেয়া। তখন সমগ্র দেশ পরিণত হয় পাঠশালায়। নবীজীর আমলে সেটিই হয়েছিল। ফলে সে সময় কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলেও যে হারে ও যে মাপে জ্ঞানী ব্যক্তি সৃষ্টি হয়েছিলেন -মুসলিম বিশ্বের শত শত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় আজ তা পারছে না। সে আমলে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব একজন গৃহবধু যতটুকু বুঝতেন এ আমলের প্রফেসরও তা বুঝেন না। এবং সে প্রমাণ তো ইতিহাসে প্রচুর। শিশু আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)এর মাতা জীবনের সকল সঞ্চয় শিশুপুত্রের জামার আস্তিনে বেঁধে ইরানের গিলান প্রদেশ ছেড়ে হাজার মাইল দূরের বাগদাদে পাঠিয়েছিলেন। অথচ সে সময় আধুনিক যানবাহন ছিল না। পথে ছিল ডাকাতের ভয়, যার কবলে তিনি পড়েছিলেনও। মুসলমানগণ তাদের গৌরব কালে জ্ঞানার্জনকে কতটা গুরুত্ব দিতেন -এটি হলো তারই নমুনা। অথচ আজ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জ্ঞানদানের কাজে ফাঁকি দিয়ে বিদেশী সংস্থায় কাজ করেন। মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ভবিষ্যৎ ডাক্তার তৈরীর কাজে ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে বসে অর্থ কামাই  করেন। তারা নিজ সন্তানের ধর্মজ্ঞান দানে এতই উদাসীন যে, সে লক্ষ্যে হাজার মাইল দূরে দূরে থাক, পাশের অবৈতনিক মাদ্রাসাতেও পাঠাতে রাজি নন।

 

যা সকল ব্যর্থতার মূল কারণ

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই দেশের প্রতিটি মানুষ জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানবৃদ্ধির বিরামহীন মেশিনে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে ইসলামের অর্জনটি সমগ্র মানব ইতিহাসে অভূতপূর্ব। পবিত্র কোরআনের পূর্বে আরবী ভাষায় কোন গ্রন্থ ছিল না। ছিল শুধু কিছু কবিতা ও কাসিদা। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা জ্ঞানার্জনকে ফরজে আইন তথা প্রত্যেকর উপর বাধ্যতা মূলক ঘোষণা করে। ফলে সে ফরজ পালনের তুমুল আগ্রহে অতি অল্প সময়ের মধ্যে জ্ঞানের ভূবনে মুসলিম বিশ্বে বিশাল সমৃদ্ধি আসে। ঘরে ঘরে তখন লাইব্রেরি গড়ে উঠে। যারা সেদিন ইসলাম কবুল করেছিলেন তাদের অনেকের মাতৃভাষা আরবী ছিল না। কিন্তু জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাণ্ডার কোর’আনের সাথে সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজনে নিজেদের মাতৃ ভাষা দাফন করে আরবী ভাষাকে নিজেদের ভাষা রূপে গ্রহণ করেছেন। ফলে  সমর্থ হন জ্ঞানের বিস্তারে ও ইসলামী সভ্যতার নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতাটি বিশাল। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা যেমন জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাণ্ডার পবিত্র কোরআনের সাথে সম্পর্ক গড়তে ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি শিক্ষকগণ ব্যর্থ হয়েছেন আদর্শ শিক্ষক রূপ বেড়ে উঠতে। ছাত্রদেরও গড়ে তুলতে পারেনি প্রকৃত ছাত্র রূপে। তারা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়ছেন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝাতে। বস্তুত শিক্ষাঙ্গণই হলো বাংলাদেশের সকল ব্যর্থতার জন্মভূমি। নিছক পড়ন, লিখন বা হিসাব-নিকাশ শিখিয়ে সেরূপ গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়? এজন্য তো জরুরী হলো, ব্যক্তির বিশ্বাস ও দর্শনে হাত দেয়া। নবীজীর (সাঃ) আগমনে আরবের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন আসেনি তাদের দৈহিক বল বা খনিজ সম্পদে। বরং বিপ্লব এসেছিল তাদের জীবন-দর্শনে। সে দর্শন পাল্টে দিয়েছিল বাঁচবার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও রূচীবোধ। ফলে বিপ্লব এসেছিল শিক্ষা খাতে।  

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় লিখন, পড়ন বা হিসাব-নিকাশ গুরুত্ব পেলেও গুরুত্ব পায়নি দর্শন। ফলে জীবন পাচেছ না সঠিক দিক-নির্দেশনা। পুষ্টি পাচ্ছে না শিক্ষার্থীর বিবেক ও চেতনা। ফলে ছাত্র পাচ্ছে না সুষ্ঠ চিন্তার সামর্থ্য। অথচ জাতি আদর্শ নেতা, বুদ্ধিজীবী, সংস্কারকের সরবরাহ পায় দর্শনসমৃদ্ধ সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের থেকে; পেশাজীবী, কর্মজীবী বা টেকনোক্রাটদের থেকে নয়। দর্শনের প্রতি অবহেলায় মানুষ নিছক নকল-নবীশে পরণিত হয়। বাংলাদেশে উন্নত বিবেকবোধ, মূল্যবোধ ও  সংস্কৃতি বেড়ে না উঠার অন্যতম কারণ হলো এটি। তাছাড়া জ্ঞান শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে আছে আসমান-জমিনের ছত্রে ছত্রে। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহনক্ষত্রই শুধু নয়, গাছপালা, জীবজন্তু, নদীনালা, অনু-পরমানু তথা দৃশ্য-অদৃশ্য প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে আছে জ্ঞানের উপকরণ। কোরআনেরর ভাষায় এগুলি হলো আল্লাহর আয়াত। যা পড়তে হয় শুধু চোখের আলাতে নয়, মনের আলোতেও। ইসলাম তাই আলোকিত মনের মানুষ গড়তে চায়। তখন সমগ্র বিশ্বটাই পাঠশালা মনে হয়। এ পাঠশালারই শিক্ষক ছিলেন মহান নবীপাক (সাঃ)। জ্ঞান বিতরণে ও মানুষকে চিন্তাশীল করার কাজে আল্লাহর এ আয়াতগুলিকে তিনি কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছেন। সেখান থেকেই গড়ে উঠেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানসাধকগণ। জীবনের মূল পরীক্ষায় তথা মহান আল্লাহকে খুশী করার কাজে তাঁরাই মানব-ইতিহাসে সর্বাধিক সফল হয়েছিলেন। পবিত্র কোর’আনে তাঁদের নিয়ে তিনি গর্বও করেছেন।

এমন কি সক্রেটিস যে পাঠশালার শিক্ষক ছিলেন সেটিও আজকের মত কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। সেটিও ছিল এথেন্সের উম্মূক্ত অলিগলি ও মাঠঘাট। অথচ জ্ঞানচর্চায় তিনিও অবিস্মরণীয় ইতিহাস গড়েছেন। জ্ঞানবিতরণে জ্ঞানকেন্দ্রের চেয়ে শিক্ষকই যে মূল সেটি তিনিও প্রমাণ করে গেছেন। অথচ আমরা বিদ্যালয় গড়ে চলেছি যোগ্য শিক্ষক না গড়েই। সেটি ডাক্তার না গড়ে হাসপাতাল চালানোর মত। সমাজের অযোগ্য মানুষগুলোর ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করতে গিয়ে এরিস্টটল বলতেন, “এটি ঐখানে তথা বিদ্যালয়ে, যেখানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।” অথচ বাংলাদেশে সকল ব্যর্থতার কারণ খোঁজা হচ্ছে অন্যত্র। শিক্ষার বিস্তারে শিক্ষককে প্রথমে শিক্ষিত হতে হয়। শুধু জ্ঞানদাতা হলেই চলে না, প্রতিটি শিক্ষককে ছাত্রদের সামনে অনুকরণীয় মডেলও হতে হয়। এটি নিছক বাড়তি দায়িত্ব নয়, এটিই শিক্ষকের মৌলিক দায়িত্ব। ফলে যে চরিত্র নিয়ে প্রশাসনের কর্মচারি, বিচারক বা ব্যবসায়ী হওয়া যায়, শিক্ষককে তার চেয়েও উত্তম চরিত্রের অধিকারি হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি যথার্থ ভাবে হয়নি। দেশে নিদারুন কমতি হলো উপযুক্ত শিক্ষকের। শিক্ষকের যে স্থানটিতে বসেছিলেন নবীপাক (সাঃ) স্বয়ং নিজে, সেখানে প্রবেশ করেছে বহু নাস্তিক, পাপাচারি ও চরিত্রহীনেরা। ফলে ছাত্ররা শুধু জ্ঞানের স্বল্পতা নিয়েই বেরুচ্ছে না, বেরুচ্ছে দুর্বল চরিত্র নিয়েও।

 

 ব্যর্থতা ব্যক্তিত্বের মডেল খাড়া করায়

ইতিহাস ঘেঁটে ছাত্রের সামনে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বা ‘ফিগার অব হাইনেস’ তুলে ধরা শিক্ষানীতি ও শিক্ষকের অন্যতম বিশাল দায়িত্ব। মডেলকে সামনে রেখে শিল্পি যেমন ছবি আঁকে, ছাত্রও তেমনি তার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে স্বচেষ্ট হয় নিজেকে গড়ায়। এরূপ মডেল নির্বাচনে প্রতি দেশেই নিজ নিজ ধর্মীয় চেতনা ও জাতীয় ধ্যানধারণা গুরুত্ব পায়। গরুকে দেখে যেমন ভেড়ার ছবি আঁকা যায় না, তেমনি অমুসলিম রাজনীতিক, কবি সাহত্যিক বা বুদ্ধিজীবীকে সামনে রেখে ছাত্রও নিজেকে মুসলিম রূপে গড়ে তুলতে পারে না। পাশ্চাত্য দেশে এজন্যই নিজ নিজ ইতিহাস থেকে খ্যাতিনামা বীর, ধর্মীয় নেতা, সমাজ সংস্কারক, বৈজ্ঞানিক, রাজনীতিবিদ, কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের তুলে ধরে, মুসলিম ইতিহাস থেকে নয়। কিন্তু এদিক দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অপরাধগুলি কম হচ্ছেনা।

দেশটির জাতীয়তাবাদীদের অপরাধ শুধু এ নয়, জাতীয় জীবনে উন্নয়ন উপহার দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। জাতিকে প্রচন্ড ভাবে অহংকারিও করেছে। আহত ও দুর্বল করেছে প্যানইসলামি চেতনাকে। ফলে জাতীয় জীবনে গুরুত্ব হারিয়েছেন ইসলামের মহান ব্যক্তি ও বীরপুরুষগণ। ফলে ছাত্ররা হারিয়েছে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বা ‘ফিগার অব হাইনেস’ এর মডেল। নিছক বাঙ্গালী হওয়ার কারণে অতিশয় দুর্বল ও সামান্য চরিত্রগুলোকে বড় করে দেখানো হয়েছে। নিছক রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কোন কোন ব্যক্তিকে হাজার বছরের সেরা বাঙ্গালী রূপেও চিত্রিত করা হয়েছে। অথচ তাদের অনেকে যেমন ছিলেন মিথ্যাচারি ও খুনি, তেমনি ছিলেন নিষ্ঠুর স্বৈরাচারিও। গণতন্ত্রের নামে ভোট নিয়ে তারা চরম স্বৈরাচার উপহার দিয়েছেন। ফলে চরিত্র গঠনের টার্গেট রূপে জাতি কোন উন্নত মডেলই পায়নি। ফলে ছাত্ররা কাদের অনুসরণ করবে? শূণ্যস্থান কখনই শূণ্য থাকে না, ফলে সে শূণ্যতা পূরণ করেছে দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদ, সন্ত্রাসী ও ব্যাভিচারি ব্যাক্তি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে সন্ত্রাস, ছিনতাই ও ব্যাভিচারির অভয় অরন্যে। এ ব্যর্থতারই বড় প্রমাণ, সেখানে ধর্ষনে সেঞ্চুরি-উৎসবও হয়েছে।

 

ইবাদত গণ্য হয়নি শিক্ষালাভ ও শিক্ষাদান

শিক্ষা-সংস্কারের লক্ষ্যে বাংলাদেশে অতীতে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। বহু শিক্ষা-কমিশন রিপোর্টও রচিত হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজে কিছুই হয়নি। ব্যর্থতার জন্য দায়ী স্রেফ সরকারি বা বেসরকারি দল নয়, সবাই। কারণ, কারো পক্ষ থেকেই দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালিত হয়নি। এ ব্যর্থতার কারণ, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ও দর্শন শিখাতেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি। মূসলিম নামধারিরাও এটিকে ইবাদত ভাবেনি। তারাও জ্ঞানার্জনকে ফরজ জ্ঞান করেনি। শিক্ষকগণ এটিকে উপার্জনের মাধ্যমে ভেবেছেন, ছাত্রদের কাছে এটি পরিণত হয়েছে কোনরূপে সার্টিফিকেট লাভের উপায় রূপে। ফলে ফাঁকিবাজি হয়েছে উভয় দিক থেকেই। চিকিৎসায় ফাঁকিবাজি হলে রোগী বাঁচে না, তেমনি শিক্ষাদানে ফাঁকিবাজি হলে জাতি বাঁচে না। শিক্ষাক্ষেত্রের এ ব্যর্থতা থানা-পুলিশ বা আইন-আদালতে লোক বাড়িয়ে দিয়ে দূর করা যায় না। তাই বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা এখন শিক্ষা সমস্যা। ভূল চিকিৎসায় কোন রোগী মারা গেলে তা নিয়ে আন্দোলন হয়। অথচ বিস্ময়ের বিষয়, ভূল শিক্ষায় সমগ্র জাতি যেখানে বিপদগ্রস্ত -তা নিয়ে আন্দোলন দূরে থাক উচ্চবাচ্যও নেই। মুমূর্ষ ব্যক্তির যেমন সে সামর্থ্য থাকে না, তেমনি অবস্থা যেন জাতিরও। আর এটি হলো জাতির নৈতিক মুমূর্ষতা।

এরূপ নাজুক অবস্থায় শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়লে চলে না। হাত দিতে হয় আরো গভীরে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মানের লক্ষ্যে শিক্ষালাভ ও শিক্ষাদানের বিষয়ে একটি পরিপূর্ণ আন্দোলনে রূপ দিতে হয়। শিক্ষা নিজেই কোন উদ্দেশ্য নয়। বরং এটি হলো একটি উদ্দেশ্যকে সফল করার মাধ্যম মাত্র। মহান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে জানমালের বিনিয়োগের এটি হলো পবিত্র অঙ্গণ। তাই স্রেফ শিক্ষার খাতিরে শিক্ষা নয়, নিছক উপার্জন বাড়ানোর লক্ষ্যেও নয়। বরং এটি হলো, জীবনের মূল পরীক্ষায় পাশের মাধ্যম। মুসলিম জীবনে গুরুত্বপূরণ ইবাদত হলো শিক্ষাদান ও শিক্ষালাভ। শিক্ষালাভের মাধ্যমেই মানুষ হিদায়েত পায়। তাই শিক্ষা হিদায়েত লাভের মাধ্যমও। অমুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে মুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল পার্থক্যটি হলো বস্তুত এখানে। অথচ শিক্ষার এ মূল দর্শনটিই বাংলাদেশে আলোচিত হয়নি। গুরুত্বও পায়নি। বরং প্রভাব বিস্তার করে আছে সেক্যুলার দর্শন ও চেতনা। ফলে পবিত্র ইবাদতের বদলে স্রেফ রুটিরুজির পেশাতে পরিণত হয়েছে। তাই শিক্ষা সংস্কারে কাজ  শুরু করতে হবে শিক্ষার এ মূল দর্শন থেকে। কেন শিখবো, কেন শেখাবো এবং কেন এটিকে আমৃত্যু সাধনা রূপে বেছে নেব – এসব  প্রশ্নের উত্তর অতি সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ ভাবে দিতে হবে। এটি যে পেশা নয়, নেশা নয় বরং ফরজ ইবাদত সেটিও ছাত্র ও শিক্ষকের মনে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হতে হবে। এবং সেটি বুঝাতে হবে মানব সৃষ্টির মূল-রহস্য ও দর্শনকে বোঝানোর মধ্যে দিয়ে। আলোকিত করতে হবে ব্যক্তির বিবেককে। জ্ঞান অর্জনের এ অঙ্গণে ব্যর্থ হলে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের কোন অঙ্গণেই যে বিজয় সম্ভব নয় -সে ধারনাটিও স্পষ্টতর করতে হবে।

 

জীবনের মূলযুদ্ধ ও জয়-পরাজয়ের ভাবনা

মু’মিনের জীবনে যুদ্ধ সর্বত্র। তবে দ্বীনের বিজয়ের মূল যুদ্ধটি হয় শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানেই। অন্য যুদ্ধগুলি আসে পরে। বরং সত্যতো এটাই, সে লড়াইটি বাংলাদেশে ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। আরো বিপদের কারণ, এ লড়াইয়ে ইসলামের পক্ষের শক্তি লাগাতর হেরেই চলেছে। আজ থেকে ৭০  বছর পূর্বে বাঙালী মুসলিমের জীবনে যে ইসলামি চেতনা, প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্ব ও সততা ছিল, আজ সেটি নেই। ছিল না দেশের অভ্যন্তরে চিহ্নিত বিদেশী শত্রুর এত দালাল। ফলে আজ বিধ্বস্ত হতে চলেছে বাঙালী মুসলিমদের মনবলও। দেশের সরকার সাহস হারিয়েছে এমনকি মায়ানমারের মত দেশের বিরুদ্ধে সত্য কথার বলার। ফলে দেশের ভিতরে ও বাইরে গুঞ্জন উঠেছে স্বাধীন দেশরূপে বাংলাদেশের টিকে থাকার সামর্থ্য নিয়ে। তাই এখন চলছে নিছক টিকে থাকার লড়াই। এ লড়ায়ে হেরে গেলে হারিয়ে যেতে হবে ইতিহাস থেকে। বাঁচতে হলে এবং এ যুদ্ধে জিতলে হলে হাত দিতে হবে শিক্ষার আশু সংস্কারে। কারণ শিক্ষাঙ্গণেই নির্মিত হয় জাতির মেরুদণ্ড। এবং গড়ে উঠে সাহসী ও ঈমানদার নেতৃত্ব। সেটি শুধু সরকারি ভাবে নয়, বেসরকারি ভাবেও। শিক্ষাঙ্গণের এ যুদ্ধে সৈনিক হতে হবে প্রতিটি ঈমানদারকে।

শিক্ষার সংস্কারে প্রথমে যেটি সুস্পষ্ট করতে হবে তা হলো, আমরা কোন পরিচয়ে বেড়ে উঠতে চাই সেটি। ধর্মনিরপেক্ষ বাঙ্গালী না মুসলিম রূপে। এটি আমাদের বাঙালী মুসলিমের জীবনে মূল প্রশ্ন। কারণ, শিক্ষার মূল দর্শন ও দিক-নির্দেশনা আসবে সে বিবেচনা থেকেই। এ যাবত যে চেষ্টা হয়েছে সেটি হলো, সেক্যুলার বাঙ্গালী রূপে বেড়ে উঠার চেষ্টা। আমরা আজ যেখানে পৌঁছেছি -সেটি সেই সেক্যুলার বাঙ্গালী হওয়ার নিরসল চেষ্টাতেই। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাঙ্গালীর সাহিত্য-সংস্কৃতি, পত্র-পত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশন বস্তুতঃ এ যাবত সে লক্ষেই কাজ করেছে। কিন্তু সেটি কোন মহৎ লক্ষে আমাদের পৌঁছায়নি। তাছাড়া বাঙ্গলী রূপে বিরাট কিছু হতে পারলেও আমাদের জীবনের মূল পরীক্ষায় তাতে পাশ জুটতো না। এভাবে অর্জিত হতো না, মহান আল্লাহ পাক আমাদের যে জন্য সৃষ্টি করেছেন সেটিও। বিচার দিনে যে হিসাব আমাদের দিতে হবে সেটি হলো মুসলিম রূপে আমাদের সফলতা কতটুকু সেটি। বাঙ্গালী-অবাঙ্গালীর পরিচয় সেখানে অর্থহীন। মুসলিমের শিক্ষার মূল লক্ষ্য, শুধু পার্থীব সফলতাকে নয়, পরকালের সফলতাকে নিশ্চিত করা। এটুকু নিশ্চিত না হলে নিছক ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, আইনজ্ঞ, বিজ্ঞানী, শিক্ষক বা অন্য কোন পেশায় সফল ভাবে বেড়ে উঠায় কল্যান নেই। নিছক পেশাদারি সাফল্যে হয়তো সচ্ছল ভাবে বাঁচা যায়, কিন্তু তাতে মূল পরীক্ষায় সফলতা জুটে না। আমাদের হারাম-হালাল ও আচার-আচরণ যে অন্যদের থেকে ভিন্ন -সেটি তো এই ইসলামি চেতনার কারণেই। সেক্যুলার বাঙ্গালী রূপে বেড়ে উঠার মধ্যে যে কোন কল্যাণ নেই -সেটি এক বলিষ্ঠ প্রত্যয়ে পরিণত করতে হবে। এ লক্ষ্যে অর্থব্যয় যে হারাম ও অতি বিপদজনক -সেটিও জনমলে বদ্ধমূল করতে হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমাদের জন্য কল্যানকর করতে হলে সেটি হতে হবে পরিপূণ ইসলামের আলোকে। হালাল-হারামের ক্ষেত্রে যেমন আপোষ চলে না, তেমনি আপোষ চলে না ইসলামি শিক্ষা লাভের ফরজ আদায়ে। নইলে অনর্থক হবে শিক্ষার নামে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থব্যয় ও শ্রমব্যয়। এরূপ অনর্থক কাজে শুধু দুনিয়াবি অকল্যাণই বাড়বে না, বরং তা পরকালে জাহান্নামের অনন্ত আযাবে নিয়েও হাজির করবে। ১ম সংস্করণ ১৯/১১/২০১৭; ২য় সংস্করণ ১৮/১২/২০২০।