ঈমানবিনাশী জাতীয় সঙ্গিত ও দেশধ্বংসী প্রকল্প

ফিরোজ মাহবুব কামাল

যে পাপ কথা ও গানে

সমাজে বড় বড় অপরাধগুলি শুধু খুন, ব্যভিচার বা চুরিডাকাতি নয়। মানুষ কাফের হয় এবং জাহান্নামের যোগ্য হয় -মুখের কথায় ও গানে। মহান আল্লাহতায়ালাকে যে ব্যক্তি অবিশ্বাস করে বা তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দেয় – জাহান্নামে পৌঁছতে তাকে কি খুন, ধর্ষণ বা চুরি-ডাকাতিতে নামার প্রয়োজন পড়ে? বিদ্রোহের ঘোষণাটি মুখে একবার দেয়াই সে জন্য যথেষ্ঠ। অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হতে ইবলিসকে তাই খুন বা ব্যভিচারে নামতে হয়নি। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া একটি মাত্র হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই তাকে লানতপ্রাপ্ত শয়তানে পরিণত করেছে। সে হুকুমটি ছিল হযরত আদম (আ:)কে সেজদার। তাই বক্তৃতায় কি বলা হয়, সঙ্গিতে কি গাওয়া হয় বা সাহিত্যের নামে কি লেখা হয় –সেগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তা রেকর্ড হয় এবং তা নিয়ে বিচার বসবে রোজ হাশরের বিচার দিনে। মু’মিন ব্যক্তিকে তাই শুধু উপার্জন বা খাদ্য-পানীয়’র ক্ষেত্রে হারাম-হালাম দেখলে চলে না। কথাবার্তা বা লেখালেখির ক্ষেত্রেও অতি সতর্ক হতে হয়।

নবীজী(সা:)’র হাদীস: “অধিকাংশ মানুষ জাহান্নামে যাবে জিহ্বা ও যৌনাঙ্গের দ্বারা কৃত অপরাধের কারণে।” তেমনি বহু মানুষ জান্নাতেও যাবে সত্য দ্বীনের পক্ষে জিহ্বাকে কাজে লাগানো তথা সাক্ষি দেয়ার কারণে। ফিরাউনের দরবারে যে কয়েকজন যাদুকর হযরত মূসা (আ:)’র সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে মুসলিম হয়েছিলেন -তারা জীবনে এক দিনও নামায বা রোযা পালন করেননি। “মুসা (আ:) ও হারুনে (আ:)’র রবের উপর ঈমান আনলাম” –তাদের মুখ থেকে উচ্চারিত এই একটি মাত্র বাক্যই তাদেরকে সরাসরি জান্নাতবাসী করেছে। ঈমানের প্রবল প্রকাশ ঘটেছিল তাদের সে উচ্চারণে। ঈমানের সে প্রকাশ ফিরাউনের কাছে সহ্য হয়নি -তাই তাদের হাত-পা কেটে নির্মম হত্যা করা হয়। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সাক্ষদানে তারা এতই অটল ছিলেন যে, সে নির্মম হত্যাকান্ডও তাদের একবিন্দু বিচলিত করতে পারেনি। তাদের এ সাহসী উচ্চারনে মহান আল্লাহতায়ালা এতোটাই খুশি হয়েছিলেন যে, পবিত্র কোর’আনের একাধিক স্থানে তিনি নিজ কালামের পাশে তাদের সে ঘোষণাকেও লিপিবদ্ধ করেছেন। এবং ক্বিয়ামত অবধি মানব জাতির জন্য শিক্ষ্যনীয় করেছেন তাদের ঈমানী প্রত্যয়কে।

ঈমান বন্দুকের গুলি বা মিজাইলে মারা পড়ে না। মারা যায় তখন, যখন গান,সঙ্গিত বা সাহিত্যের নামে চেতনার ভূবনে লাগাতর বিষ ঢালা হয়। শয়তান বিষ পান করানোর সে কাজটাই মহা ধুমধামে করে নানারূপ গীত, গান, স্লোক ও মিথ্যা ধর্মগ্রন্থ পাঠ করানোর মধ্য দিয়ে। সে লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে শয়তানের লক্ষ লক্ষ পুরোহিত, মন্দির ও পূজামন্ডপ এবং হাজারো গান। বাংলার বুকে ইসলামের যখন প্রচন্ড জোয়ার, সে জোয়ার ঠেকাতে শয়তান যে অস্ত্রটি বেছে নিয়েছিল সেটিও কোন আধুনিক মারণাস্ত্র ছিল না। সেটি ছিল ভাববাদী গান। ইসলামের প্রসার রুখতে ভাববাদী গান ও হাতে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তখন মাঠে নেমেছিল চৈতন্য দেব ও তার শিষ্যরা। তার গানের আবেগ এতোটাই প্রবল ছিল যে, বাংলার বুকে হিন্দুদের ইসলাম কবুলের জোয়ার দ্রুত থেমে যায়। ফলে প্রায় অর্ধেক বাঙালী থেকে যায় পৌত্তলিকতা নিয়ে জাহান্নামের পথে। আজও  বাংলাদেশের বুকে শয়তানের স্ট্রাটেজীটি অবিকল অভিন্ন। তবে শয়তানের উদ্দেশ্য, হিন্দুদের মুসলিম হওয়া থেকে রুখা নয়। বরং সেটি মুসলিমদেরকে ইসলাম থেকে দূরে সরানো তথা ডি-ইসলামাইজেশন। সে কাজে শয়তান তার অবতার রূপে বেছে পেয়েছে আধুনিক মুর্তিপুজারী কবি রবীন্দ্রনাথকে।

 

একাত্তরের আত্মসমর্পণ এবং পৌত্তলিক চেতনা

বাঙালী মুসলিমদের চেতনায় ঈমানবিনাশী বিষ ঢালার কাজ যে পূর্বে হয়নি -তা নয়। সে কাজের শুরু প্রবল  হয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের শাসনামলে। সেটি উগ্র পৌত্তলিক সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম’ গান গাওয়ার মাধ্যমে। বাঙালী হিন্দুগন সে গানকে অবিভক্ত বাংলার সকল স্কুলে জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দেয়। কিন্তু বাঙালী মুসলিমগণ পৌত্তলিকদের সে ঈমানবিনাশী ষড়য্ন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ফলে সে প্রকল্প সেদিন ব্যর্থ হয়। বাঙালী মুসলিমদের সেদিনের সাফল্যের কারণ, মুসলিম রাজনীতির নেতৃত্ব মুজিবের ন্যায় ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাসদের হাতে বন্দী ছিল না। বাঙালী মুসলিমগণ হিন্দু আধিপত্যের কাছে সেদিন আত্মসমর্পিতও ছিল না। বরং তাদের চেতনার ভূমিতে সেদিন ছিল ইসলামের প্রতি গভীর অঙ্গিকার। তাছাড়া সেদিন তারা বন্ধুহীনও ছিল না। তাদের পাশে ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ভাষাভাষি বহু কোটি মুসলিম।

কিন্তু ১৯৭১’য়ে বাংলার রাজনীতির চিত্রই পাল্টে যায়। দেশ অধিকৃত হয় লক্ষাধিক ভারতীয় সৈন্যদের হাতে। এবং বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গণ তখন অধিকৃত হয় ইসলামি চেতনাশূণ্য ও ইসলামচ্যুত জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের হাতে। তখন বাড়ে ভারতের প্রতি আত্মসমর্পণ। ভারতের অর্থে ও স্বার্থে প্রতিপালিত এ সেবাদাসদের অঙ্গিকারটি ভারতের প্রতি এতোই গভীর যে, একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বহু হাজার কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র ভারতের হাতে ডাকাতি হওয়াতেও তাদের মনে সামান্যতম দুঃখ জাগেনি। সে ডাকাতি রোধে তারা কোন চেষ্টাও করেনি। অথচ সে অস্ত্র কেনায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানীদের অর্থ ছিল। ভারতের সেবাদাসগণ রুখেনি দেশের কলকারাখানার যন্ত্রপাতি লুন্ঠনও। বরং লুন্ঠনকে বাধাবিপত্তিহীন করতে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে তারা বিলুপ্ত করে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সীমান্তও। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দেশ দ্রুত পরিণত হয় তলাহীন ভিক্ষার পাত্রে। ১৯৭৪ য়ে নেমে আসে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ; তাতে মৃত্যু হয় বহু লক্ষ মানুষের। আত্মসমর্পণের পর কি আর নিজের ইচ্ছা চলে? তখন তো প্রতি পদে প্রভুর ইচ্ছাই মেনে নিতে হয়। একাত্তরে ভারতের যুদ্ধজয়ের পর তেমনি একটি পরাজিত অবস্থা নেমে আসে বাংলার মুসলিম জীবনে।

দাসদের জীবনে স্বাধীনতা থাকে না। তারা বাঁচে মনিবের পদতলে আমৃত্যু পরাধীনতা নিয়ে। সে পরাধীনতাটি যেমন ভৌগলিক মানচিত্রে, তেমনি চেতনার মানচিত্রে। একাত্তর-পরবর্তী ভারতীয় দখলদারী ও তাদের ডাকাতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ভারতের আশ্রয়ে প্রতিপালীত এহেন বাংলাদেশী দাসদের ছিল না। ফলে ভারত যা চেয়েছে তাই করেছে। স্কুলে কি গাইতে হবে বা পড়তে হবে -সেটিও নির্ধারিত করে দেয় ভারত। শাসতন্ত্রের মূলনীতিগুলিও তারা নির্ধারণ করে দেয়। নিষিদ্ধ করে দেয় ইসলামপন্থীদের রাজনীতি। অথচ ১৯৭০’য়ের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে শেখ মুজিব একটি বারের জন্যও এমন কথা উল্লেখ করেনি। এবং ইসলামপন্থী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে জনগণের রায়ও নেয়নি। পরাধীন ব্রিটিশ আমলে ইসলামের শত্রুগণ “বন্দেমাতরম” গানটি চাপাতে না পারলেও একাত্তরের পর তারা “আমরা সোনার বাংলা”কে চাপিয়েছে। একাত্তরে ইসলামের শত্রুদের এটি হলো বিশাল অর্জন।

প্রশ্ন হলো, ভাব ও ভাবনায় রবীন্দ্রনাথের “আামার  সোনার বাংলা” এবং বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম” গানের মাঝে পার্থক্য কতটুকু? উভয় গানেই দেশ মাতৃতূল্য, সে সাথে পূজনীয় বলে বন্দনা গাওয়া হয়েছে। ফলে উভয় গানের মূলেই রয়েছে অভিন্ন পৌত্তলিকতা। এমন গান কি কোন মুসলিম গাইতে পারে? যারা ঈমানশূন্য, এ গান নিয়ে তাদের আগ্রহটি গভীর। মুসলিমের ঈমান ধ্বংসে যাদের আগ্রহটি প্রবল, একমাত্র তারাই চাইবে এমন পৌত্তলিক গানকে মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিতে। এ গানটি জাতীয় সঙ্গিত রূপে বিবেচিত হওয়ার পিছনে কাজ করেছে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের সেক্যুলার ও হিন্দুয়ানী বিচারবোধ। তাদের সে মানদন্ডে রবীন্দ্রনাথ দেবতুল্য গণ্য হয়েছে। ইসলাম কি বলে -সেটি আদৌ সেদিন বিবেচনায় আনা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেক্যুলার মানদন্ডে যা কিছু হালাল, সেগুলি কি ইসলামি মানদন্ডেও হালাল? জ্বিনা সেক্যুলার মানদন্ডে কোন অপরাধই নয় -যদি সে ব্যাভিচারে সংশ্লিষ্ট নারী ও পুরুষের সম্মতি থাকে। অথচ ইসলামে রয়েছে বিবাহিত ব্যাভিচারীদের প্রস্তরাঘাতে প্রাণনাশের বিধান। আর অবিবাহিতের জন্য রয়েছে লোকসম্মুখে ৮০টি বেত্রাঘাতের শাস্তি। ঈমানদার হওয়ার দায়বদ্ধতা শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন নয়, বরং সেটি মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি বিধানের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। সেক্যুলারিস্টদের জীবনে সে আত্মসমর্পণ নাই, বরং প্রকাশ পায় বিদ্রোহ। সে বিদ্রোহের চেতনাটিই ধরা পড়েছে জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে।

 

আল্লাহতায়ালার সিলেবাস ও শয়তানে সিলেবাস

মহান আল্লাহতায়ালা চান, প্রতিটি মুসলিম বেড়ে উঠুক তাঁর প্রতি অটুট ঈমান নিয়ে। ঈমানে বৃদ্ধি ঘটানোর প্রয়োজনেই মহান আল্লাহ-রাব্বুল আলামীনের রয়েছে নিজস্ব সিলেবাস। সেটি পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানার্জন। এ জন্যই অর্থ বুঝে কোর’আন তেলাওয়াতকে বাধ্যতামূলক করেছেন। সে ফরজটি যেমন ৫ ওয়াক্ত নামাযের প্রতি রাকাতে আদায় করতে হয়, তেমনি নামাযের বাইরেও। ঈমান বৃদ্ধিতে কোর’আনী জ্ঞানের গুরুত্ব যে কত অধীক -সেটি বর্ণীত হয়েছে পবিত্র কোর’আনে। বলা হয়েছে “মুসলিম তো একমাত্র তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহর নাম স্মরণ হওয়া মাত্রই ভয়ে কেঁপে উঠে এবং যখন তাদের কাছে কোর’আনের আয়াত পড়ে শোনানো হয় তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং আল্লাহর উপর তারা নির্ভরশীল।” -(সুরা আনফাল, আয়াত ২)।

মহান আল্লাহতায়ালার প্রকল্পকে বানচাল করার লক্ষ্যে শয়তানেরও রয়েছে নিজস্ব স্ট্রাটেজী। রয়েছে নিজস্ব সিলেবাস। শয়তান চায়, ঈমানের বিনাশ। চায়, মানব মন থেকে আল্লাহর স্মরণকে ভূলিয়ে দিতে। চায়, কোর’আন থেকে দূরে টানতে। তাই শয়তানপন্থীদের হাতে দেশ অধিকৃত হলে নিষিদ্ধ হয় পবিত্র কোর’আনের জ্ঞানদান। এবং শুরু হয় নাচ, গান, খেলাধুলা ও বহুবিধ উৎসব দিয়ে শয়তানের নিজস্ব সিলেবাস। তখন গুরুত্ব পায় চৈতন্যদেব, বঙ্কীমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের ন্যায় পৌত্তলিকদের রচিত কবিতা, গান ও সাহিত্য। এভাবে শয়তান বাড়ায় মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে লাগাতর অবাধ্যতা। বাংলাদেশে কোর’আন পাঠের বদলে রবীন্দ্র-সঙ্গিত পাঠ এজন্যই বাধ্যতামূলক। সেটি শুধু দেশের স্কুলগুলিতেই নয়, এমনকি ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলোতেও। এমন কি জাতীয় সংসদসহ সকল সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও।

 

রবীন্দ্রচেতনার নাশকতা

মানুষ শুধু তার দেহ নিয়ে বাঁচে না। বাঁচতে হয় চেতনা নিয়েও। সে সুস্থ্য চেতনাটির কারণেই মানব শিশু তার মানবিক পরিচয়টি পায়। সে চেতনাটি সাথে নিয়েই মানবের সর্বত্র বিচরণ। সেটি যেমন ধর্ম-কর্ম, রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতি; তেমনি ধরা পড়ে তার গদ্য, পদ্য, কথা ও গানে। মানুষ বেড়ে উঠে, তার আমলের ওজন বাড়ে এবং মূল্যায়ন হয় -সে চেতনার গুণে। ঈমানদারের জীবনে চেতনার সে বিশেষ রূপটি হলো তার ঈমান ও আক্বীদা। বিচার দিন নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের আগে প্রথমে হিসাব হবে ঈমান ও আক্বীদার। এখানে অকৃতকার্য হলে কি সে বিচারে পাশের সম্ভবনা থাকে? মানুষের ধর্ম, কর্ম, সংস্কৃতি ও আচার-আচরনে বিপ্লব আসে তো ঈমান ও আক্বীদের গুণে। চেতনায় রোগ থাকলে কি ব্যক্তির ইবাদতে বা চরিত্রে পরিশুদ্ধি আসে?

মানুষ কি খায় -সেটি দেখা যায় তার দৈহিক স্বাস্থ্যের মাঝে। তেমনি কি শেখে -তা দেখা যায় তার কথা, চেতনা ও চরিত্রে। তাই ব্যক্তির চেতনায় শিরক বা পৌত্তলিকতা দেখে বলা যায় -তার বিদ্যাশিক্ষার কাজটি সঠিক হয়নি। বুঝা যায়, চেতনা দূষিত হয়েছে শিক্ষালয়ে। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে অন্য সব পাপ মাফ হতে পারে, কিন্তু মাফ হয়না শিরকের পাপ। অথচ রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্যে সে শিরকের বীজই ছড়িয়েছেন। বঙ্কিমের ন্যায় তিনিও উপাস্য রূপে হাজির করেছেন দেশের মাটি ও আলো-বাতাসকে। শিরকের সে রূপটি প্রবল ভাবে ছড়িয়ে আছে তার রচিত কবিতা, নাটক, ছোটগল্প ও গানে। বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে এখানেই রবীন্দ্রনাথের গুরুতর অপরাধ। বস্তুত বাঙালী মুসলিম সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি ক্ষেত-খামার বা রণাঙ্গণে হয়নি, সেটি হয়েছে দেশের শিক্ষাঙ্গণে। সেটি রবীন্দ্র সাহিত্যের মাধ্যমে। চৈতন্য দেবের কাজ সীমিত ছিল হিন্দুদের মাঝে, অথচ রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিকতা প্রবেশ করেছে মুসলিম চেতনায়।

বাংলাদেশে আজ গুম, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, চুরিডাকাতি ও ভোটডাকাতির জোয়ার। এসব খুনি ও ধর্ষকগণ আসমান থেকে পড়েনি। ক্ষেত-খামারেও বেড়ে উঠেনি। হিংস্র পশু উৎপাদনের জন্য জঙ্গল চাই। তেমনিট দুর্বৃত্ত উৎপাদনের জন্য চাই ইন্ডাস্ট্রী। বাংলাদেশে বিদ্যাশিক্ষার নামে সে কাজগুলোই করছে দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানেই বেড়ে উঠেছে অপরাধের নায়কগণ। বিশ্বের দরবারে দুর্বৃত্তিতে যারা বার বার প্রথম করলো তারা নিরক্ষর কৃষক বা শ্রমিক নয়। তারা বেড়ে উঠেছে এই শিক্ষা ব্যবস্থায়। শিক্ষার নামে বাড়ানো হয়েছে  নৈতিক ও সাংস্কৃতিক নাশকতা। স্বাস্থ্যের পতন রোধে পরিবর্তন আনতে হয় খাদ্যে, চারিত্রিক পতন রোধে তেমনি পাল্টাতে হয় শিক্ষা। নবীজী (সা:)’র যুগে তো সেটিই করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে সেটিই হচ্ছে না। ফলে অবিরাম ভাবে চলে দুর্বৃত্ত উৎপাদনের কাজ।

পৌত্তলিক চেতনায় বিশ্বের কোথাও উন্নত চরিত্র গড়ে উঠেছে বা উচ্চতর সভ্যতা নির্মিত হয়েছে -সে প্রমাণ নাই। কারণ, সেটি তো আদিম জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতার পথ। এমন অজ্ঞতায় মানুষ নিষ্ঠুর হয়, অসভ্য হয় ও অশালীন হয়। এমন জাহিলিয়াতের কারণে ভারতে হিন্দুগণ অতীতে মৃত স্বামীর চিতায় তার স্ত্রীকেও জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে। রবীন্দ্রনাথের জাহেল মনের পরিচয় মেলে সতিদাহের প্রশংসায় লেখা তার কবিতা পাঠ করে। পৌত্তলিক চেতনায় মানব সন্তানকে বিভক্ত করা হয় বিভিন্ন জাত-পাতে। ভারতে কোটি কোটি মানুষকে নিম্ন জাতের আখ্যায়ীত করে তাদেরকে অচ্ছ্যুত গণ্য করা হয়। এটি নিরেট অমানবিকতা। এতে বিলুপ্ত হয় অন্যায়কে ঘৃণা করার সামর্থ্য। একারণেই ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, গণধর্ষণ ও গণনির্যাতন হয়। এবং সরকার ও পুলিশের রুচি নাই সেগুলো রুখার। বাংলাদেশে তেমন এক অসুস্থ্য পৌত্তলিক চেতনাকে প্রতিষ্ঠা দেয়া হচ্ছে যেমন রবীন্দ্রনাথের গানকে জাতীয় সঙ্গিত করে, তেমনি তার রচিত গান, নাটক ও সাহিত্যকে জনগণের রাজস্বের অর্থে বিপুল ভাবে প্রচার করে।

 

যে গান ঈমানধ্বংসী

জাতীয় সঙ্গিতের মূল বিষয়টি ভাব, ভাষা, ছন্দ এবং আবেগের প্রকাশ নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ ঘটাতে হয় সংখ্যাগরিষ্ট দেশবাসীর ঈমান-আক্বিদা, আশা-আকাঙ্খা, দর্শন, ভিশন ও মিশন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন “আমার সোনার বাংলা” গানটি লিখেছিলেন তখন বাংলাদেশ বলে কোন স্বাধীন দেশ ছিল না। সে সময় বাংলা ছিল ভারতের একটি প্রদেশ। সে প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম হলেও তাদের সংখ্যা আজকের ন্যায় শতকরা ৯১ ভাগ ছিল না। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিজেও সে গানটিতে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ, দর্শন, চেতনা বা স্বপ্নের প্রকাশ ঘটাতে লেখেনি। সেটি যেমন তার লক্ষ্য ছিল না, ফলে সে লক্ষ্যে তাঁর প্রস্তুতিও ছিল না। পৌত্তলিকগণ সব সময়ই নতুন উপাস্য চায়। যাদের কাছে গরু-বাছুর ও শাপ-শকুন উপাস্য, তাদের কাছে নবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ তো বিশাল। তাই রবীন্দ্রপূজারি পৌত্তলিকগণ রবীন্দ্রনাথকে পূজনীয় করেছে নিজেদের সে পৌত্তলিক চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে। মনের সে পৌত্তলিক ক্ষুধা নিবারণেই “আমার সোনার বাংলা” গানকে বাংলাদেশে জাতীয় সঙ্গিতের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ভারতে সে মর্যাদাটি পেয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম” গানটি। প্রশ্ন হলো, সে পৌত্তলিক গান গাইতে ভারতের মুসলিমদের বাধ্য করা হলেও এরূপ পৌত্তলিক গান কেন বাংলাদেশের মুসলিমগণ গাইবে?

পারিবারিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম হলেও কার্যতঃ ছিলেন পৌত্তলিক। এ জগতটাকে একজন মুসলিম  যেভাবে দেখে, কোন পৌত্তলিকই সেভাবে দেখে না। উভয়ের ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন ভিন্ন, তেমনি চেতনার জগতটাও ভিন্ন। আর কবিতা ও গানে তো সে বিশ্বাসেরই প্রকাশ ঘটে। একজন মুসলিমের কাছে এ পৃথিবীর ভূমি, আলো-বাতাস, মাঠ-ঘাট, গাছ-পালা, ফুল-ফল, নদী-সমুদ্র এবং সেগুলির অপরূপ রূপ –সবকিছুই মহান আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন। এসব নিদর্শন দেখে সে মহান আল্লাহর কুদরত যে কত বিশাল সে ছবকটি পায়। ফলে স্রষ্টার এ অপরূপ সৃষ্টিকূল দেখে মু’মিন ব্যক্তি সেগুলিকে ভগবান বা মা বলে বন্দনা করে না, বরং হামদ ও নাত গায় সেগুলির সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহতায়ালার। অথচ রবীন্দ্রনাথের চোখে বাংলার অপরূপ রূপ ধরা পড়লেও মহান আল্লাহতায়ালার সর্বময় অস্তিত্ব ধরা পড়েনি। এখানেই রবীন্দ্রনাথের অজ্ঞতা ও দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর “আমার সোনার বাংলা” গানটিতে লিখেছেন:

“আমার সোনার বাংলা,

আমি তোমায় ভালবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ,

তোমার বাতাস

আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।

ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে

ঘ্রানে পাগল করে–

মরি হায়, হায় রে

ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা খেতে,

আমি কি দেখেছি মধুর হাসি।।

কি শোভা কি ছায়া গো,

কি স্নেহ কি মায়া গো–

কি আঁচল বিছায়েছ

বটের মূলে,

নদীর কূলে কূলে।

মা, তোর মুখের বাণী

আমার কানে লাগে

সুধার মতো–

মরি হায়, হায় রে

মা, তোর বদনখানি মলিন হলে

আমি নয়ন জলে ভাসি।”

রবীন্দ্রনাথের এ গানে প্রচুর ভাব আছে, ভাষা আছে, ছন্দও আছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু আছে যা একজন মুসলিমের ঈমানের সাথে প্রচন্ড সাংঘর্ষিক। এ গানে তিনি বন্দনা গেয়েছেন বাংলার ভূমির, এবং সে ভূমির আলো-বাতাস, নদীর কূল, ধানের ক্ষেত, আমবাগান ও বটমূলের। দেশকে তিনি মা বলেছেন। দেশের বিস্তৃত মাঠঘাট, নদীর পাড় ও বটমূলকে সে মা দেবীর আঁচল রূপে দেখেছেন। দেশকে হাজির করেছেন একজন দেবীর মুর্তিতে। গানটিতে ধ্বনিত হয়েছে সে মা দেবীর প্রতি অশ্রুসিক্ত বন্দনা। কিন্তু যে মহান আল্লাহতায়ালা সেগুলির স্রষ্টা, সমগ্র গানে একটি বারের জন্যও তাঁর বন্দনা দূরে থাক তাঁর নামের উল্লেখ পর্যন্ত নাই। একজন পৌত্তলিকের জন্য এটিই স্বভাবজাত। পৌত্তলিকের এখানেই মূল সমস্যা। এখানে পৌত্তলিকের ভয়ানক অপরাধটি হলো নানা দেবদেবী ও নানা সৃষ্টির নানা রূপ বন্দনার মাঝে মহান আল্লাহতায়ালাকে ভূলে থাকার। মানব জীবনের এটিই সবচেয়ে ঘৃণ্য কর্ম। মহাসত্যময় মহান আল্লাহতায়ালাকে অস্বীকারের এটিই সবচেয়ে জঘণ্যতম শয়তানি কৌশল। এটিই শিরক। এবং এজন্যই রবীন্দ্রনাথ এজন্যই একজন মুশরিক। মহান আল্লাহর বান্দার বহু বড় বড় গোনাহ মাফ করে দিবেন কিন্তু শিরকের গুনাহ কখনোই মাফ করবেন না। নবীজী (সাঃ) সে হুশিয়ারিটি বহুবার শুনিয়েছেন। তাই একজন মুসলিম এ গান গায় কি করে? সমগ্র মুসলিম ইতিহাসের কোথাও কি একজন পৌত্তলিককে এরূপ সন্মানের আসনে বসানো হয়েছে –যা হয়েছে বাংলাদেশে?

গদ্য,পদ্য, কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মুখ বা জিহবা কথা বলে না, কথা বলে তার চেতনা বা বিশ্বাস। ফলে সে কবিতা ও গানে ব্যক্তির আক্বিদা বা ধর্মীয় বিশ্বাস ধরা পড়ে। তাই “আমার সোনার বাংলা” গানে যে চেতনাটির প্রকাশ ঘটেছে সেটি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের। কোন মুসলিমের নয়। গানে ইসলামী চেতনার প্রকাশের সামর্থ্য থাকলে রবীন্দ্রনাথ মুসলিম হয়ে যেতেন। পৌত্তলিক চেতনা নিয়েই একজন পৌত্তলিক কবি কবিতা ও গান লিখবেন বা সাহিত্যচর্চা করবেন -সেটিই তো স্বাভাবিক। এমন একটি চেতনার কারণেই পৌত্তলিক ব্যক্তি শাপ-শকুন, গরু, বানর-হনুমান, নদ-নদী, বৃক্ষ,পাহাড়-পর্বতকে উপাস্য রূপে মেনে নেয় এবং তার বন্দনাও গায়। “আমার সোনার বাংলা” গানের ছত্রে ছত্রে তেমন একটি পৌত্তলিক চেতনারই প্রবল প্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে তাঁর নিজ চেতনার সাথে আদৌ গাদ্দারী করেননি। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার সাথে একজন মুসলিমের গাদ্দারী তো তখনই শুরু হয় -যখন পৌত্তলিক চেতনার এ গানকে মনের মাধুরি মিশিয়ে গাওয়া হয়। বাংলাদেশে রবীন্দ্রভক্তদের মূল প্রকল্প হলো বিপুল সংখ্যায় এরূপ গাদ্দার উৎপাদন।এবং সে লক্ষ্যে তারা বিপুল সফলতাও পেয়েছে। মুসলিম নামধারি এরূপ গাদ্দারদের কারণে আল্লাহর শরিয়তি বিধান আজ বাংলাদেশের ন্যায় শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের দেশে পরাজিত।

 

“সোনার বাংলা” গানের প্রেক্ষাপট

“আমার সোনার বাংলা” গানটি রচনার একটি ঐতিহাসিক পেক্ষাপট আছে। গানটি রচিত হয়েছিল ১৯০৫ সালের পর। বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয় ১৯০৫ সালে। পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় অর্থনীতি ও শিক্ষাদীক্ষায় অতি পশ্চাদপদ ছিল পূর্ব বঙ্গ। পূর্ববঙ্গের সম্পদে দ্রুত শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল কলকাতার হিন্দু বাবুদের। সে শহরের শতকরা ৮০ ভাগ বাসিন্দাই ছিল হিন্দু। শুধু প্রশাসনই নয়, বাংলার শিক্ষা ও শিল্প গড়ে উঠছিল স্রেফ কলকাতাকে কেন্দ্র করে। মুসলিমদের দাবী ছিল বাংলাকে বিভক্ত করা হোক এবং পূর্ববঙ্গের রাজধানি করা হোক ঢাকাকে। সে দাবীর ভিত্তিতে ভারতের তৎকালীন ভাইস রয় লর্ড কার্জন পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি আলাদা প্রদেশ গঠন  করেন। এ নতুন প্রদেশের রাজধানী রূপে গৃহীত হয় ঢাকা নগরী। শহরটি রাতারাতি জেলা শহর থেকে রাজধানী শহরে পরিণত হয়। তখন ঢাকায় কার্জন হলসহ বেশ কিছু নতুন প্রশাসনিক ইমারত এবং হাই কোর্ট ভবন নির্মিত হয়। নির্মিত হয় কিছু প্রশস্ত রাজপথ। নতুন এ প্রদেশটি ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলার এবং সে সাথে আসামের মুসলিমদের মাঝে সৃষ্টি হয় তখন নতুন রাজনৈতিক প্রত্যয়। সে প্রত্যয় নিয়ে ১৯০৬ সালে ঢাকার বুকে গঠিত হয় মুসলিম লীগ যা শুধু বাংলার মুসলিমদের জন্যই নয়, সমগ্র ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে সৃষ্টি করে নতুন আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনা।

মুসলিমদের এ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং কলকাতা ছেড়ে ঢাকার এ মর্যাদা-বৃদ্ধি কলকাতার বাঙালী বাবুদের ভাল লাগেনি। কবি রবীন্দ্রনাথেরও ভাল লাগেনি। অথচ বাঙালী মুসলিমগণ সে বিভক্তিকে নিজেদের জন্য কল্যাণকর মনে করে। তারা এটিকে কলকাতাকেন্দ্রীক হিন্দু আধিপত্য থেকে মুক্তি রূপে দেখে। বাংলা বিভক্তির বিরুদ্ধে বর্ণ হিন্দুদের পক্ষ থেকে শুরু হয় সন্ত্রাসী আন্দোলন। সে সন্ত্রাস ছিল উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক চেতনায় পরিপুষ্ট। সন্ত্রাসীরা মন্দিরে গিয়ে শপথ নিত। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সে সন্ত্রাসী আন্দোলনের সমর্থক। সে সন্ত্রাসের পক্ষে প্রয়োজন ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্রের। সে অস্ত্র জোগাতেই রবীন্দ্রনাথ যুদ্ধে নামেন তার কবিতা, গান ও উপন্যাস নিয়ে। এ প্রেক্ষাপটেই রচিত হয় “আমার সোনার বাংলা” গান।

“আমার সোনার বাংলা” গানে যা প্রকাশ পেয়েছে সেটি রবীন্দ্রনাথের একান্তই সাম্প্রদায়িক হিন্দু চেতনার, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় চেতনা সে গানে স্থান পায়নি। রবীন্দ্রনাথ মুসলিম ছিলেন না। ফলে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিশ্বাস, দর্শন, স্বপ্ন, ভিশন ও মিশনের প্রতিনিধিত্ব করার ইচ্ছা যেমন ছিল না, তেমনি সেগুলির প্রকাশ ঘটানোর সামর্থ্যও তার ছিল না। পূর্ব বাংলা পশ্চাদপদ মুসলিমদের প্রতি অগ্রসর বাঙালী হিন্দুদের কোন দরদ না থাকলেও বাংলার প্রতি তখন তাদের দরদ উপচিয়ে পড়ে। বাংলার মাঠ-ঘাট, আলো-বাতাস, জলবায়ু, বৃক্ষরাজী ও ফলমূলের প্রতি আবেগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন এ গান। এ গানের একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। সেটি স্বাধীনতা ছিল না, বরং ছিল বাংলার বিভক্তির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতার বদলে বাঙালী হিন্দুদের রাজনীতির মূল বিষয়টি হয়ে দাঁড়ায় বঙ্গভঙ্গ রদের দাবী। ব্রিটিশ শাসকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ভারত ভ্রমনে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভারত আগমন উপলক্ষে “জনগণ মনোঅধিনায়ক ভারত ভাগ্যবিধাতা” নামে কবিতা লেখেন। সেটিই আজ ভারতের জাতীয় সঙ্গিত। রবীন্দ্রনাথ ও  বাঙালী হিন্দুদের সে দাবী রাজা পঞ্চম জর্জ মেনে নেন এবং আবার বাংলা একীভূত হয়। প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা নেমে আসে পূর্ব বঙ্গের মুসলিমদের মাঝে। বিক্ষুদ্ধ এ মুসলিমদের শান্ত করতে ভারতের ব্রিটিশ সরকার তখন ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেটিও কলকাতার বাঙালী হিন্দুদের ভাল লাগেনি। তার মধ্যেও তারা কলকাতার শ্রীহানীর কারণ খুঁজে পায়। ফলে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও বাঙালী বাবুগণ তখন বিক্ষোভে রাজপথে নামেন। মিছিলে নেমেছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা রোধে কলকাতার গড়ের মাঠে অনুষ্ঠিত হয় জনসভা। সে জনসভাতেও সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ। এই হলো রবীন্দ্র মানস। সে সাথে বাঙালী হিন্দু-মানস। মুসলিম বিদ্বেষ নিয়ে রচিত রবীন্দ্রনাথের সে গানটিই এখন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত।

আজকের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের আমলের অবিভক্ত বাংলা যেমন নয়, তেমনি দেশটি ভারতভূক্ত কোন প্রদেশও নয়। রবীন্দ্রনাথের অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমদের সংখ্যা শতকরা ৫৫ ভাগের বেশী ছিল না। সে আমলের বাংলা ঢাকাকেন্দ্রীকও ছিল না। এখন এটি এক ভিন্ন চরিত্রের বাংলাদেশ -যে দেশে রবীন্দ্রনাথ একদিনের জন্যও বাস করেননি। কোনদিনও তিনি এদেশের নাগরিক ছিলেন না। এদেশের স্বাধীনতার কথা তিনি যেমন শোনেননি,তেমনি এ দেশের শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমদের নিয়ে তিনি কোন স্বপ্নও দেখেননি। ফলে বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া,স্বাধীনতা বা স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করা কি তাঁর পক্ষে সম্ভব? সবচেয়ে বড় কথা,এ সঙ্গিতটি সে উদ্দেশ্যে লেখাও হয়নি। জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের বিষয়টি দোকান থেকে ‘রেডিমেড’ সার্ট কেনার ন্যায় নয়। এটিকে বরং বিশেষ রুচি, বিশেষ আকাঙ্খা, বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে অতি বিশেষ গুণের ‘tailor made’ হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে সে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। বরং এখানে গুরুত্ব পেয়েছে রবীন্দ্রভক্তি ও রবীন্দ্রপূজার মানসিকতা।

 

বাঙালী মুসলিমের আত্মসমর্পণ

আত্মসমর্পণের পর আর এ অধিকার থাকে না, কি খাবে বা কি পান করবে সে সিন্ধান্ত নেয়ার। প্রভু যা খাওয়ায় বা পান করায় -সেটিই খেতে হয় বা পান করতে হয়। এমন কি বিষ পান করানো হলেও সেটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস থাকে না। তখন অধিকার থাকে না জাতীয় সঙ্গিত রূপে কি গাওয়া হবে -সে সিদ্ধান্ত নেয়ার। শেখ মুজিব ও তার অনুসারিদের মূল কাজটি হয় সে আত্মসমর্পণে মাথা নত করা। তাদের কারণেই বাঙালী মুসলিম জীবনে নিদারুন আত্মসমর্পণ নেমে আসে ১৯৭১’য়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে অধিকৃত হওয়ার পর। ১৯৭২’য়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে ভারত তার সেনাবাহিনীকে তুলে নিলেও হাজার হাজার চর ও রাজনৈতিক এজেন্টদের তুলে নেয়নি। বরং দেশ এখন সে এজেন্টদেরই দখলে। ভারত জানে নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভারতপন্থীদের বিজয় অসম্ভব। তাই  গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে কবরে পাঠানো হয়েছে। এবং স্থায়ী রূপ দেয়া হয়েছে ভারতীয় এজেন্টদের জবরদখলকে। ইংরেজগণ তাদের ১৯০ বছরের শাসনের গণদাবীর পরওয়া করেনি। তারা শাসন করেছে খলিফাদের মাধ্যমে; এবং সেটি হাজার হাজার মাইল দূর থেকে। ভারতীয়রাও দিল্লি বসে সেটিই চায়। সে জন্য তারাও ঢাকার শাসন ক্ষমতায় চায় আত্মসমর্পিত খলিফা। সে খলিফার শাসনকে গ্রহণযোগ্য করতেই চায়, পৌত্তলিক চেতনার চাষাবাদ। সেটি বাড়াতেই প্রয়োজন পড়েছে রবীন্দ্র সঙ্গিত ও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের।

ইসলামের শত্রুদের কাছে বাঙালী মুসলিমের আত্মসমর্পণের প্রমাণ শুধু এ নয় যে, দেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসলাম বিরোধী শাসনতন্ত্র, সূদী ব্যাংক,পতিতাপল্লি, জুয়ার আসর, মদের দোকান, অশ্লিল, ছায়াছবি এবং কুফরি আইনের আদালত। বরং আরো প্রমাণ হলো, জাতীয় সঙ্গিত রূপে তারা গেয়ে চলেছে পৌত্তলিক চেতনাপুষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গিতকে। এরূপ আত্মসমর্পণে যা বাড়ে তা হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বেঈমানি। সে বেঈমানী তখন ছড়িয়ে পড়ে জীবনের প্রতিক্ষেত্রে। ইসলামের সাথে গাদ্দারীটা তখন শুধু রাজনীতিতে সীমিত থাকে না। মুসলিম সংহতির বুকে কুড়াল মারা এবং মুসলিম রাষ্ট্র বিনাশের ন্যায় হারাম কাজটিও তখন উৎসবযোগ্য গণ্য হয়।

 

সাইনবোর্ড পৌত্তলিকতার

নবীজীর আমলেও আরব দেশে বিস্তৃত ভূমি, চন্দ্র, সূর্য্য ও আকাশ-বাতাস ছিল। সে ভূমিতেও মাঠ-ঘাট, ফুল-ফল ও বৃক্ষরাজি ছিল। কিন্তু মহান নবীজী (সা:) কি কখনো সে গুলিকে মা বলে সম্বোধন করেছেন? বরং আজীবন হামদ-নাত ও প্রশংসা গীত গেয়েছেন সে সৃষ্টিকুলের মহান স্রষ্টার। আল্লাহর অনুগত বান্দাহ রূপে মুসলিমের বড় দায়িত্ব হলো আল্লাহর নামকে সর্বত্র প্রবলতর করা বা বড় করা। কোন দেশ, ভূমি, ভাষা বা বর্ণকে যেমন নয়, তেমনি কোন ব্যক্তি বা জীবজন্তুকেও নয়। পৌত্তলিকদের থেকে ঈমানদারের এখানেই বড় পার্থক্য। এ জীবনে হেদায়াতপ্রাপ্তির চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালার বড় নেয়ামত নেই। তেমনি পথভ্রষ্ট হওয়ার চেয়ে বড় ব্যর্থতাও নেই। হেদায়াত প্রাপ্তির শুকরিয়া জানাতে ঈমানদার ব্যক্তি তাই আমৃত্যু আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করে। এ জন্য সে আল্লাহু আকবর বলে। এবং সেটির নির্দেশ রয়েছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে,“তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন তোমরা আল্লাহর নামে তাকবির বল (অর্থাৎ আল্লাহ যে মহিমাময় সর্বশ্রেষ্ঠ -সেটি মুখ দিয়ে প্রকাশ করো), যাতে তোমরা এভাবে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৫)। তাই মুসলিম শুধু জায়নামাযেই “আল্লাহু আকবর” বলে না, রাজপথের মিছিলে বা জনসভাতেও বলে। তার মুখে তাই “জয় বাংলা” বা “জয় হিন্দ” ধ্বনিত হয় না।

আব্দুল্লাহ আর ভগবান দাস –এ দুটি শুধু ভিন্ন নাম নয়, বরং দুটি ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক। ব্যক্তির নাম থেকে এভাবেই তার ধর্ম, চেতনা ও বিশ্বাসের পরিচয় মেলে। সে পরিচয়টুকু জানার জন্য তাই বাড়তি প্রশ্নের প্রয়োজন পড়ে না। ব্যক্তির নাম তাই আজীবন তার নিজ ধর্ম বা বিশ্বাসের পক্ষে সাইনবোর্ড রূপে কাজ করে। তেমনি জাতির জীবনে সাইন বোর্ড হলো জাতীয় সঙ্গিত। জাতীয় সঙ্গিত থেকেই পরিচয় মেলে জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও চেতনার। জানা যায় ভিশন ও মিশন। তাই নাস্তিকের ও আস্তিকের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন যেমন এক হয় না, তেমনি এক হয় না জাতীয় সঙ্গিতও। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত থেকে দেশবাসীর যে পরিচয়টি মেলে -সেটি কি কোন তৌহিদী মুসলিমের? সে পরিচয়টি তো রবীন্দ্রনাথের ন্যায় পৌত্তলিকের।

তাছাড়া এ গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত রূপে নির্বাচনের একটি ইতিহাস আছে। সেটি গৃহীত হয়েছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর। যারা এ সঙ্গিতটিকে গ্রহণ করেছিল -তারা ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার। তাদের চেতনায় ও রাজনীতিতে ইসলামের কোন প্রভাব ছিল না। বরং তারা পরিচিতি নিজেদের ভারতপ্রীতি, রবীন্দ্রপ্রীতি,এবং ইসলামি চেতনা নির্মূলে আপোষহীনতার কারণে। লগি বৈঠা দিয়ে ইসলামপন্থীদের হত্যা, তাদের বিরুদ্ধে  মিথ্যা মামলা এনে ফাঁসিতে ঝুলানো এবং হত্যার পর তাদের লাশ ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করাই তাদের রাজনীতি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতিও শ্রদ্ধা দেখানো তাদের রীতি নয়। সেরূপ শ্রদ্ধাবোধ ছিল না মুজিবেরও। মুজিব যে শুধু রাজনীতিতে স্বৈরাচারি ছিলেন তা নয়, প্রচণ্ড স্বৈরাচারি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির অঙ্গণেও। দেশের উপর তিনি শুধু একদলীয় বাকশালই চাপিয়ে দেননি, চাপিয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসকে উপেক্ষা করে পৌত্তলিক সংস্কৃতির আগ্রাসন। জাতীয় সঙ্গিত রূপে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে চাপানো হয়েছে তেমন এক স্বৈরাচারি মানসিকতা থেকে। এক্ষেত্রে ভারতীয় বর্ণ হিন্দুদের থেকে তার চেতনাটি আদৌ ভিন্নতর ছিল না।

 

আকুতি নিষ্ঠবান পৌত্তলিকের

প্রতিটি দেশের শুধু রাজনৈতিক,ভৌগলিক ও ভাষাগত পরিচয়ই থাকে না, থাকে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ও। জনগণের চেতনায় যেমন সুনির্দ্দিষ্ট দর্শন থাকে, তেমনি সে দর্শনের আলোকে রাজনৈতিক স্বপ্নও থাকে। সে স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠায় জনগণের জীবনে লড়াইও থাকে। সে বিচারে প্রতিটি দেশই অনন্য। সে অনন্য বৈশিষ্ঠের কারণেই পশ্চিম বাংলার ন্যায় বাংলাদেশ ভারতের অংশ নয়। পশ্চিম বাংলার সাথে বাংলাদেশের পার্থক্যটি ভূমি, জলবায়ু বা আলোবাতাসের নয়, বরং সেটি দর্শন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ভিশন ও মিশনের। পার্থক্যটি ভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার। সে ভিন্ন স্বপ্নের কারণেই ১৯৪৭’য়ে পশ্চিম বাংলার হিন্দুগণ যখন ভারতে যোগ দেয় তখন পূর্ব বাংলার মুসলিমগণ সচেতন ভাবেই বাঙালী হিন্দুদের সাথে প্রতিবেশী ভারতে যায়নি। গিয়েছে পাকিস্তানে।

জাতীয় সঙ্গিত রচিত হয় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের যে বিশেষ পরিচয় ও স্বপ্ন -সেগুলো তুলে ধরতে এবং প্রবলতর করতে। এমন সঙ্গিতের প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি উচ্চারণ থেকে প্রতিটি নাগরিক তখন পায় নতুন প্রত্যয় ও নতুন প্রেরণা। পায় স্বপ্নের সে পথটিতে অবিরাম টিকে থাকার মানসিক বল। কিন্তু জাতীয় সঙ্গিতের নির্বাচনে বাংলাদেশের মুসলিমদের সে বিশিষ্ট পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এ সঙ্গিতে যে সুর, যে দর্শন, যে বর্ণনা এবং যে আকুতি ধ্বণিত হয়েছে সেটি কোন মুসলিমের নয়, সেটি নিতান্তই একজন পৌত্তলিকের। এমন সঙ্গিত থেকে কোন মুসলিমই অনুপ্রেরণা পেতে পারে না, বরং পায় পথভ্রষ্টতা। পায় শিরকের ছবক। পায় জাহান্নামের পথ। হিন্দুস্থান চায়, বাংলাদেশীদের মাঝে ১৯৪৭’য়ের পরিচয়টি বিলুপ্ত হোক। চায়, নির্মিত হোক ইসলামচ্যুত নতুন প্রজন্ম নিয়ে এক নতুন বাংলাদেশ।

 

রবীন্দ্রসঙ্গিতের রাজনৈতিক এজেন্ডা

জাতীয় সঙ্গীত কোন সাধারণ গান নয়। তার একটি সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও দর্শনগত এজেন্ডা থাকে। তাতে দেশবাসীর মিশন ও ভিশনের ঘোষণাও থাকে। ১৯০৫ সালে বাঙালী হিন্দুদের এজেন্ডা ছিল বঙ্গভঙ্গ রদ ও অখণ্ড বাংলা। তখন প্রয়োজন দেখা যায় “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভাল বাসি” এ গানটির। কিন্তু হিন্দুদের রাজনৈতিক এজেন্ডাই পাল্টে যায় ১৯৪৭ সালে; তখন সেটি হয় বঙ্গভঙ্গ। তখন প্রয়োজন হারিয়ে ফেলে সে গান। কিন্তু ১৯৭১’য়ের পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার পর তাদের এজেন্ডা আবার পাল্টে যায়। ভারতীয় হিন্দুদের রাজনীতিতে আবার ফিরে এসেছে “অখন্ড বাংলা”র প্রকল্প। তাই আবার প্রয়োজন দেখা দেয় সে গানটির। তারা জানে, এখন অখন্ড বাংলা গড়লে সে বাংলার পক্ষে পাকিস্তানে যোগ দেয়ার সুযোগ নাই। বরং সম্ভাবনা বেড়েছে পশ্চিম বাংলার সাথে যুক্ত হয়ে ভারত ভুক্ত হওয়ার। তাতে ভারত পাবে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের উপর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ। তাতে বাড়বে ভারতের সামরিক ও সামরিক শক্তি। এ সুযোগটি পেতে অতীতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ পৃথিবীর অন্যপ্রান্ত থেকে বাংলার বুকে এসে যুদ্ধ করেছে। তাই এতো কাছে থেকে ভারত সে সুযোগ ছাড়ে কেমনে?‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ তবে সে রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তনের পূর্বে ভারত চায়, বাংলাদেশীদের চেতনার মানচিত্রে পরিবর্তন। চেতনাগত পবিবর্তনের লক্ষ্যেই পুণরায় প্রয়োজন পড়েছে অবিভক্ত বাংলার পক্ষে আবেগ সৃষ্টির। ফলে কদর বেড়েছে রবীন্দ্রনাথের “সোনার বাংলা” গানের।

কোন যুদ্ধই স্রেফ সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রকান্ড যুদ্ধ চলে বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানেও। ১৯৭১’য়ের সামরিক যুদ্ধটি শেষ হয়েছে, কিন্তু তীব্র ভাবে এখনো চলছে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ। পাকিস্তান ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে ভারত এক ধাপ এগিয়েছে মাত্র, কিন্তু অখণ্ড ভারত নির্মাণের মূল লক্ষ্যটি এখনো অর্জিত হয়নি। ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের লক্ষ্য,বাঙালী মুসলিমের আদর্শিক ভূবনে পরিবর্তন আনা। কারণ, পূর্ব বাংলার মুসলিমগণ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ভূক্ত হয় পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে ভাষা, বর্ণ বা আঞ্চলিক বন্ধনের কারণে নয়। সেটি সম্ভব হয়েছিল প্যান-ইসলামি মুসলিম ভাতৃত্বের কারণে। ইসলাম এজন্যই ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের মূল টার্গেট। ১৯৭১’য়ে সামরিক বিজয়ের পর ইসলামি চেতনা বিনাশের ভারতীয় প্রজেক্ট বহুদূর এগিয়ে গেছে। ১৯৪৭য়ে শতকরা ৯৬ ভাগ বাঙালী মুসলিম পাকিস্তানে যোগ দেয়ার পক্ষে ছিল। অথচ চিত্রটি এখন ভিন্ন। মনের মাধুরি মিশিয়ে যারা রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গায় তাদের অনেকেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টিকে অনাসৃষ্টি মনে করে। তাদের সামনে ১৯৪৭ এলে তারা পাকিস্তানে যোগ দেয়ার পক্ষে ভোট দিত না। ভারত তাই বিজয়ী হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধেও। নতুন প্রজন্ম ভূলে গেছে ১৯৪৭-পূর্ব বাঙালী মুসলিমদের দুরাবস্থার কথা। তখন বাংলার শহরে ও গ্রামে শতকরা ৯৫ ভাগ দালানকোঠা ও ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিল হিন্দুরা। শহর এলাকার শতকরা ৮৫ ভাগের বেশী জমিজমার মালিক ছিল তারা। সরকারি চাকুরীতে মুসলিমদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও ছিল না। ভারতের মুসলিমগণ এখনো সে একই অবস্থায় রয়ে গেছে।

 

আত্মসমর্পণে কি আখেরাত বাঁচবে?

বাঙালী মুসলিমের চেতনা রাজ্যে ভারতীয় দখলাদারিকে স্থায়ী রূপ দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছে সেক্যুলার বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ। এরা হচ্ছে ভারতের পক্ষে খাঁচার ঘুঘু। এদের কাজ, তাদের ন্যায় অন্যদেরও খাঁচায় বন্দী করা। এরূপ ভারতসেবী সাংস্কৃতিক সৈন্য গড়ে তোলার কাজে ভারতের বিনিয়োগটি ১৯৪৭ থেকেই। ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ভারতের সে খরচটি বিপুল ভাবে কমেছে। ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে এখন ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশী মুসলিমের নিজস্ব রাজস্বের পুঁজি। ভারতের বর্তমান স্ট্রাটেজী হলো, একাত্তরে অর্জিত অধিকৃতিকে যে কোন ভাবেই হোক লাগাতর ধরে রাখা। বাংলাদেশের উপর ভারতের দখলদারিটি শুধু সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক। সে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকৃতিরই প্রতীক হলো জাতীয় সঙ্গিত রূপে চাপিয়ে দেয়া পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের গান।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অখণ্ড হিন্দু ভারতের ধ্বজাধারি। সে অখণ্ড হিন্দু ভারতের চেতনা থেকেই ভারত থেকে মুসলিম নির্মূলের প্রবক্তা মারাঠী শিবাজীকে তিনি জাতীয় বীরের মর্যাদা দিয়েছেন। শিবাজীকে বন্দনা করে তিনি কবিতাও লিখেছেন। এখন সে রবীন্দ্রনাথকে ভারত ব্যবহার করছে বাংলাদেশের উপর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনের যোগসূত্র রূপে। এজন্যই বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা ও রবীন্দ্রঅর্চনা বাড়াতে ভারত সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের এত বিনিয়োগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের রাজস্বের অর্থে বাংলা এ্যাকাডেমীর কাজ হয়েছে প্রতিবছর পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের উপর শত শত বই প্রকাশ করা। অথচ ইসলামের মহান নবীজী(সাঃ)এবং মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষটির উপর কি এর দশ ভাগের এক ভাগ বই ছাপানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?

জনগণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে বড় অপরাধটি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়। সেটি ঘটছে চেতনা বা বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে। অপরাধটি এখানে জনগণকে জাহান্নামের আগুণে পৌঁছানোর। অথচ সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা বা হাসপাতাল গড়া নয়, বরং জাহান্নামের আগুণ থেকে নাগরিকদের বাঁচানো। এবং সেটি সম্ভব জান্নাতের পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকীমটি চিনতে এবং সে পথে পথচলায় লাগাতর সহয়তা দেয়ার মধ্য দিয়ে। ইসলামে এটি এক বিশাল ইবাদত এবং প্রতিটি শাসকের উপর এটি এক বিশাল দায়ভার। এ দায়িত্ব পালনের কাজটি সঠিক হলে মহান আল্লাহর দরবারে সে শাসক মহান মর্যাদায় ভূষিত হন। এবং কিভাবে পালন করতে হয় খোদ নবীজী (সা:) দেশ শাসনের সে গুরু দায়ভার নিজ কাঁধে নিয়ে শিখিয়ে গেছেন। শাসকদের জন্য আজও  মহান নবীজী (সা:)’র মহান সূন্নত। দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন খোলাফায়ে রাশেদার ন্যায় মহান সাহাবায়ে কেরামগণ। কিন্তু বাংলাদেশে সে দায়ভার পালিত হয়না। কারণ, শাসকের সে পবিত্র পদটি অধিকৃত হয়েছে ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। এরা আবির্ভুত হয়েছে স্বার্থ-শিকারি চোর-ডাকাত রূপে। ক্ষমতালোভী এ সেক্যুলারিস্টদের মূল মিশনটি হলো, কোর’আনে প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকীমকেই জনগণের দৃশ্যপট থেকে বিলুপ্ত করা এবং জাহান্নামে পৌঁছাটি সহজতর করা। সে লক্ষেই তাদের রাজনীতি ও শিক্ষানীতি। সে লক্ষ্যেই নৃত্য-গীত, মদ-জুয়া ও পতিতাপল্লির সংস্কৃতি। সে লক্ষ্যেই দেশ জুড়ে গড়া হচ্ছে শত শত নাট্যশালা ও সিনেমা হল। সে অভিন্ন লক্ষ্যেই এক পৌত্তলিকের রচিত সঙ্গিতকে জাতীয় সঙ্গিত রূপে গাইতে বা শুনতে জনগণকে বাধ্য করা হচ্ছে। এভাবে অধিকৃত হয়ে আছে জনগণের মনের ভূবন। জনগণের অধিকৃত সে মন বাধ্য হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে দূরে থাকতে।

অথচ মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে দূরে থাকার বিপদটি তো ভয়াবহ। তখন সে ব্যক্তির উপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তার সঙ্গিরূপে তখন নিয়োগ দেয়া হয় অভিশপ্ত শয়তানের। সে ঘোষণাটি এসেছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে, “যে কেউ রহমানের স্মরণ থেকে দূরে সরবে তার উপর নিয়োগ দেয়া হবে শয়তানের, সে তার সঙ্গি হবে।” –(সুরা জুখরুফ, আয়াত ৩৬)। রবীন্দ্র সঙ্গিত গাওয়ার অর্থ শুধু গান গাওয়া নয়। এর অর্থ, দেশবন্দনার মাঝে মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ থেকে ভূলে থাকা। ফলে তার পরিণতিটি ভয়াবহ। এখানে মহাবিপদটি সঙ্গি রূপে শয়তানকে নিজ ঘাড়ে বসিয়ে নেয়ার। জনগণের কাঁধে শয়তান বসিয়ে দেয়ার সে ভয়ানক পাপের কাজটিই করছে বাংলাদেশের সরকার। সরকারের নীতির কারণেই দিন দিন শয়তানের অধিকৃতি বাড়ছে দেশবাসীর মনের ভূবনে। আর তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গণই শুধু নয়, জনগণের চেতনার মানচিত্রও অধিকৃত হয়ে যাচ্ছে পৌত্তলিক হিন্দুদের হাতে। এভাবে জাতীয় সঙ্গিত পরিনত হয়েছে জনগণের ঈমান ধ্বংস ও জাহান্নামে পৌছানোর নীরব হাতিয়ারে। ১ম সংস্করণ ১০/০৫/২০১৫; ২য় সংস্করণ ২৫/০২/২০২১।

                                                                                                                                                                                




বিবিধ ভাবনা (২৮)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. ধর্মের নামে ব্যবসা ও দুর্বৃত্ত শক্তির বিজয়

বাংলাদেশে যারা নিজেদেরকে মুসলিম রূপে পরিচয় দেয় তাদের সংখ্যা ১৬ কোটির অধিক। দেশে ইসলামী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও অসংখ্য। তাবলিগ জামায়াতের ইজতেমায় ২০ লাখের বেশী জমায়েত হয়। অথচ দেশটিতে ইসলাম দারুন ভাবে পরাজিত। দেশের আদালতে শরিয়তী আইনের কোন স্থান নাই। শিক্ষাব্যবস্থায় কোর’আন শিক্ষার আয়োজন নাই। সংস্কৃতির উপর প্রভাব হিন্দু সংস্কৃতির এবং সে হিন্দু সংস্কৃতির অনুসরণে শুরু হয়েছে মুর্তি নির্মাণ ও মুর্তি পুজা। দেশে অর্থনীতি চলছে সূদের উপর। অথচ হাদীসে সূদ খাওয়া ও সূদ দেয়া মায়ের সাথে জ্বিনার সমান পাপ বলা হয়েছে। সেটিকে বলা হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে যুদ্ধ রূপে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশে মুসলিমগণ নিজেদের পরিচয় দেয় মুসলিম রূপে, কিন্তু বাঁচছে ইসলাম ছাড়াই। এতে আখেরাতে পরিণাম যে কি হবে -সেটি কি বুঝতে বাঁকি থাকে?

ইসলামের এ নিদারুন পরাজয়ের মাঝেও বাংলাদেশে দারুন ব্যবসা বেড়েছে ধর্মের নামে। সেটি শত শত কোটি টাকার ব্যবসা। রম রমা হয়েছে দেশের মসজিদ বিল্ডিং, মাদ্রাসা ভবন, দলীয় দফতর, পীরের আস্তানা ও মাজার। বেতন বেড়েছে মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক এবং দলীয় “হোল টাইমার”দের। অথচ মুসলিমগণ যখন খেজুর পাতা ও কাদামাটির মসজিদে নামায পড়েছে তখন বিশ্ব শক্তিতে পরিণত হয়েছে। হেতু কী? কারণ, ইসলামকে বিজয়ী করা এসব ধর্মব্যবসায়ীরা আদৌ আগ্রহী নয়। আগ্রহী নয় সূদকে নির্মূল করা, কোর’আন বুঝা ও বুঝানো ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠায়। বরং ভাবে, কি করে সংগঠনের উপার্জন, প্রতিষ্ঠা ও প্রচার বাড়ানো যায়। তেমন একটি লক্ষ্য নিয়ে ইসলামী দলের নেতাকর্মী, দলীয় ক্যাডার, পীরের মুরিদ ও মাজারের খাদেমগণ পরিণত হয়েছে সার্বক্ষণিক চাঁদাবাজে। ফলে তাদের আয় ভাবে বাড়লেও ইসলাম বিজয়ী হচ্ছে না।

যারা ব্যবসায়ে মনযোগী তারা ভালই বুঝে, ইসলামের বিজয়ে নামলে লড়াইয়ে নামতে হয়। তখন দেশে বিপ্লবের প্রসব বেদনা শুরু হয়, অস্থিরতা আসে। তখন জানমালের খরচ বাড়ে এবং কমে যায় অন্যদের থেকে প্রাপ্তির পরিমান। তাতে মন্দা আসে ব্যবসায়। ফলে কমে যায় নেতাকর্মী ও ক্যাডারদের মাসিক বেতন। সে মন্দার ভয়ে দেশে যতই দুর্বৃত্ত শাসন হোক – এ ধর্মব্যবসায়ী লড়াই নামে না। তারা চায় “স্টাটাস কো”। চায়, যা আছে তাই বেঁচে থাক। এটিই হলো ধর্মব্যবসায়ীদের নিরেট দুনিয়াদারী। এতে বিজয়ের পর বিজয় পায় এবং দীর্ঘায়ু পায় শয়তানপন্থীরা। বাংলাদেশ তো তারই দৃষ্টান্ত।

অথচ একটি দেশে সত্যিকার ইসলামী দল থাকলে সেদেশে দুর্বৃত্ত শক্তির শাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ অনিবার্য রূপে দেখা দেয়। কারণ ইসলামপন্থী ও শয়তানপন্থীদের মধ্য শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানটি অভাবনীয়। তখন সে দেশে জান্নাতের পথে যাত্রী শহীদদের সংখ্যা বাড়ে। আর শহীদের রক্তদানের ফলেই তো একটি জনগোষ্ঠীর ঈমান শূণ্যতা দূর হয়। তাই যেদেশে শহীদদের সংখা কম, সেদেশের মানুষের ঈমানশূণ্যতা অতি প্রকট। ঈমানের শ্রেষ্ঠতায় সাহাবাগণ সমগ্র মানব ইতিহাসে তূলনাহীন। কারণ, তাদের শতকরা ৬০ ভাগের বেশী রক্তদান করেছেন শহীদ হয়ে। মুসলিমগণ যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল, তার মূলে ছিল শহীদদের সে রক্ত ও ঈমান। বাংলাদেশে মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে সাহাবাদের সে পথ থেকে দূরে থেকে এবং নীচে নেমে।   

২. ডাকাত সর্দার সেনাপ্রধান!

বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সদস্যদের লজ্জা পাওয়া উচিত এ নিয়ে যে, তারা স্যালুট করে সাজাপ্রাপ্ত খুনিদের ভাই ও তাদের দুর্বৃত্তির সহায়তা দানকারী আরেক দুর্বৃত্তকে। এবং আরো লজ্জা হওয়া উচিত এ জন্য, যাকে তারা স্যালুট করে সে জড়িত ছিল ২০১৮ সালের নৈশকালীন ভোটডাকাতির সাথে। অর্থাৎ সেনাপ্রধান শুধু ভোটডাকাতই নয়, সে ডাকাতদলটির সর্দারও। এমন ডাকাতকে স্যালুট করা তো ডাকাত দলের কালচার, তা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে প্রতিষ্ঠা পায় কি করে?

৩. বইয়ের গুরুত্ব

অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধ হয় না। তেমনি বই ছাড়া কোন বিপ্লব হয় না। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি হলো নবীজী(সা:)র’ নেতৃত্বের ইসলামী বিপ্লব। সে বিপ্লবের মূলে ছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব আল কোর’আন। এ পবিত্র কিতাব ছাড়া সে বিপ্লব অসম্ভব ছিল। ইউরোপের ইতিহাস সবচেয়ে বড় বিপ্লব ছিল ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব। সে বিপ্লবের মূলে ছিল রুশো, ভল্টিয়ার ও অন্যান্য মনিষীদের রচিত বই।

বই আনে জনগণের চেতনার মডেলে পরিবর্তন। সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় সেটিকে বলা হয় প্যারাডাইম শিফ্ট। যা বিপ্লব আনে রাজনৈতিক অঙ্গণে। বাংলাদেশেও বিপ্লব আনতে হলে চাই বই। ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়া যায় না, তাই জ্ঞানের রাজ্যে বিপ্লব ছাড়া রাজনৈতিক ও সমাজ বিপ্লব আনা যায় না। তাই অপরিহার্য হলো, চিন্তার মডেলে তথা জ্ঞানের ভূবনে বিপ্লব। এবং সে কাজে পবিত্র কোর’আনের চেয়ে শ্রষ্ঠ গ্রন্থ্য আর কি হতে পারে?

৪. শয়তানী শক্তির স্ট্রাটেজী

শয়তানী শক্তির সনাতন স্ট্রাটেজী শুধু ইসলামী ব্যক্তিদের নির্মূল নয়, বরং অকার্যকর করা ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও। শয়তানী শক্তির হাতে অধিকৃত হওয়ার এখানেই বিপদ। বাংলাদেশ তারই উদাহরণ। শেখ হাসিনার ন্যায় স্বৈরাচারী ভোটডাকাতের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে সেটি আর মুসলিম রাষ্ট্র থাকে না। সেটি পরিনত হয় শয়তানের দুর্গে। শয়তানের সে দুর্গের পেটের মধ্যে লাখ লাখ মসজিদ গড়েও ইসলামের বিজয় আসে না। তখন ইসলামের প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার থাকলে দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। জিহাদ বিষয়ক বই রাখলে জেলে যেতে হয়।

মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও ইসলামী সংগঠন বাঁচে না। তাই সবচেয়ে বড় নেককর্মটি মসজিদ-মাদ্রাসা ও ইয়াতিম খানা নির্মাণ নয়, বরং সেটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ।

ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত হলে সেটি তখন কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিনত হয়। তখন জনগণকে এতিমখানা ও মাদ্রাসা নির্মাণ করা লাগে না। সে কাজ রাষ্ট্রই করে। নবীজী (সা:) এজন্যই মদিনায় হিজরাতের পর নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছেন। এবং তিনি স্বয়ং সে রাষ্ট্রের শাসকের পদে বসেছেন। কিন্তু নবীজী (সা:)’র সে শিক্ষা কতটুকু বেঁচে আছে বাংলাদেশে?  

৫. উপেক্ষিত শ্রষ্ঠ সূন্নত

নবীজী (সা:)র যে মহান সূন্নতটি পালনে মানব জাতির সবচেয়ে বড় কল্যাণটি হয় -সেটি টুপি, দাড়ি ও মেছওয়াক করার সূন্নত নয়। সেটি তাঁর রাজনীতির সূন্নত। নিজে শাসকের আসনে বসে তিনি সে সূন্নত দেখিয়ে গেছেন। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের হুজুরগণ নবীজী (সা:)’র বহু সূন্নতের বয়ান করলেও তিনি যে দেশের শাসক ছিলেন এবং রাজনীতি  করেছেন -সে সূন্নতের কথা তারা বলেন না। সে সূন্নত পালনও করেন না। বরং সে সূন্নত থেকে দূরে থাকাটি দ্বীনদারী মনে করেন। এবং রাজনীতিতে অংশ নেয়াকে দুনিয়াদারী বলেন। অবশ্য এর কারণ রয়েছে। এ সূন্নতটি যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি বিপদ ডেকে আনে আরাম-আয়াশে। এটি হলো জিহাদ। এ সূন্নত পালনে অর্থদান, শ্রমদান ও রক্তদান লাগে। সে সামর্থ্য ক’জন আলেমের? ফলে তারা বেছে নিয়েছেন টুপি, দাড়ি, পাগড়ি, মেছওয়াক ও মিষ্টি খাওয়ার সহজ সূন্নত।

৬. সন্মানিত হলো ডাকাত

কোন সভ্য দেশে চোরডাকাতদের রাস্তার ঝাড়ুদার বানানোরও রীতি নাই। কারণ, সেখানেও তারা কাজে চুরি করে বা নানারূপ কু্-কর্ম করে। একমাত্র কারাগারে রাখাতেই দেশবাসীর জন্য কল্যাণ। এরূপ অপরাধ থেকে জনগণকে বাঁচাতে ইসলাম তাই চোরদের হাত কাটার নির্দেশ দেয়। জীবাণু না মারলে যেমন দেহ বাঁচে না, তেমনি চোর-ডাকাত নির্মূল না করলে দেশ বাঁচে না। অথচ বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ন্যায় যে ডাকাতটি ভোটডাকাতির ন্যায় জঘন্য অপরাধটি করলো -সে এখন প্রধানমন্ত্রীর আসনে। আরেক অপরাধী জেনারেল আজীজ –যে ২০১৮ সালের ভোটের উপর নৈশ ডাকাতির নেতৃত্ব দিল, সে এখন সেনাবাহিনীর প্রধান। কোন সভ্য দেশে কি এমনটি আশা করা যায়?

৭. ভারতের এজেন্ডা

ভারতের হিন্দুত্ববাদী শাসকদের মূল এজেন্ডা হলো উপমহাদেশের মুসলিম শক্তির বিনাশ। চায়, হিন্দুদের অখণ্ড রাষ্ট্র ভারত। এ লক্ষেই তারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিল। পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠা পায় তখনও দেশটিকে মেনে নেয়নি। এবং ১৯৭১ সালে দেশটিকে ভাঁঙ্গতে সফল হয়। তবে মুসলিম শক্তির বিনাশের কাজটি একাত্তরের পর শেষ হয়নি; এখন দেশটি বাংলাদেশীদেরও কোমর ভাংঙ্গতে চায়। একাজে ভারতকে সাহা্য্য করছে শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ।

শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশকে শক্তি ও সামর্থ্য জোগায় সে দেশের জনগণের সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বল। তাই কোন দেশকে শক্তিহীন করার সবচেয়ে সফল স্ট্রাটেজী হলো, জনগণকে সে সামর্থ্য নিয়ে বেড়ে উঠতে না দেয়া। এবং সে কাজে মোক্ষম উপায় হলো জনগণের মৌলিক মানবিক অধিকার কেড়ে নেয়া। জনগণ তখন প্রতিরোধহীন হয় এবং শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেয়। স্বৈরশাসনের এটিই তো সবচেয়ে বড় নাশকতা। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা তো শত্রুর সে কাজটিই করছে। ভারতের কাছে এজন্যই হাসিনা এত প্রিয়।  

৮. বিচারে ব্যর্থতার পরিণাম

বিচারে ব্যর্থতার পরিণামটি ভয়ানক। রোগের চিকিৎসা না হলে -যা হয়। তাই যে কোন সভ্য দেশ সামান্য কিছু চুরি হলেও তার বিচার হয়। কারণ, চোরকে প্রশ্রয় দিলে চোরগণ দলে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তখন চোরদের হাতে সমগ্র দেশ ডাকাতি হয়ে যায়। শেখ হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতের হাতে বাংলাদেশের ভাগ্যে তো সেটিই ঘটেছে।

বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা হলো, ২০১৮ সালে এতো বড় একটা ভোটডাকাতী হয়ে গেল –সে জন্য কারো কোন শাস্তি হলো না। বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশে রাজনীতিতে এটি যেন কোন এজেন্ডাই নয়। জনগণও তা নিয়ে ভাবে না। বুদ্ধিজীবীগণও তা নিয়ে লেখে না। মৃত্যুশয্যায় শায়ীত মুমূর্ষু ব্যক্তি যেমন নিজের চিকিৎসা আর ভাবে না, তেমনি এক করুণ অবস্থা এখন বাংলাদেশের। নৈতিক পচন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ডাকাত সর্দারনীকে শাসকের আসনে বসিয়ে তাকে মাননীয় নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বলা হয়। সেটি শুধু চোর-ডাকাতগণই বলে না, নিজেদেরকে যারা সুশীল বলে দাবী করে তারাও বলে। কোন সভ্য সমাজে কি এমনটি ভাবা যায়? বাংলাদেশ আর কত নীচে নামবে? ১৯/০২/২০২১।




মুজিবের লিগ্যাসী: দেশধ্বংসী নাশকতা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

ফিরোজ মাহবুব কামাল                                                                                                                                                        নাশকতা ইসলামের বিরুদ্ধে

মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু মহান আল্লাহতায়ালা, তাঁর রাসূল ও ইসলামের উপর বিশ্বাস নয়। বিশ্বাসের সাথে কিছু দায়বদ্ধতাও অনিবার্য করে। প্রতিটি মুসলিমের উপর সে মূল দায়বদ্ধতাটি হলো, ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থে সর্ব মুহুর্তে আপোষহীন হওয়া। কারণ, যেখানে ইসলাম থাকে, সেখানে অনৈসলামও থাকে। এবং ইসলাম ও অনৈসলামের মাঝে অবিরাম লড়াইও থাকে। সে লড়াইয়ে ইসলামের পক্ষে আপোষহীন চেতনা নিয়ে বাঁচাই হলো প্রকৃত ঈমানদারী। নইলে নাশকতা ও বেঈমানী হয় ইসলাম ও মুসলিমের সাথে। রাজনীতির অঙ্গণে যাদের পদচারণা তাদের উপর সে দায়বদ্ধতা আরো অধিক। তখন সে রাজনীতিতে ইসলাম ও মুসলিমের বিজয়ে বিনিয়োগ ঘটাতে হয় নিজের বুদ্ধিবৃত্তি, অর্থ, শ্রম ও রক্তের। রাজনীতি তখন পবিত্র জিহাদে পরিণত হয়। সে জিহাদে নিহত হলে শহীদ হয়। গৌরব কালে মুসলিমদের রাজনীতি বলতে  তো সেটিই বুঝাতো। মুসলিমগণ বিশ্বে সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছে এবং জন্ম দিয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার –তা তো সে জিহাদী রাজনীতির কারণেরই।

শেখ মুজিব নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করতেন। কিন্তু তাঁর রাজনীতিতে ইসলামের বিজয় আসেনি। মুসলিমদের গৌরবও বাড়েনি। বরং বিজয় ও গৌরব বেড়েছে ভারতীয় কাফেরদের। বিজয়ী হয়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরা বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ। এবং শক্তিহানী ঘটেছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের। তাই মুজিবের রাজনীতির মূল চরিত্রটি ছিল ইসলামের সাথে গাদ্দারীর। তবে শেখ মুজিবের গাদ্দারিটা শুধু পাকিস্তানের সাথে ছিল না। সে গাদ্দারিটা ছিল যেমন ইসলামের বিরুদ্ধে, তেমনি বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিল বাংলাভাষী। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জনের লড়াইকে তিনি পাকিস্তান ভাঙ্গার লড়াইয়ে পরিণত করেন। এবং সেটি স্রেফ ভারতীয় অভিলাষ পুরণে। অথচ পাকিস্তান ভাঙ্গার এ কাজটি ভারত নিজ খরচে ১৯৪৭ সাল থেকেই করে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। অতএব এ কাজের জন্য মুজিবের নেতা হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। ভারতের আজ্ঞাবহ দাস হওয়াই যথেষ্ট ছিল। বাস্তবে তিনি সে দাসসুলভ কাজটিই বেশী বেশী করেছেন।

মুজিবের ভারত সেবার রাজনীতিতে চরম লাভবান হয়েছে যেমন ভারত, তেমনি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঙালী মুসলিম। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল তারাই। গণতন্ত্র বাঁচলে শুধু পাকিস্তানের রাজনীতি নয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর রাজনীতিতে, বাঙালী মুসলিমগণ সুযোগ পেত নেতৃত্বদানের। অখন্ড পাকিস্তান বেঁচে থাকলে আজ লোকসংখ্যা হতো ৪০ কোটি। দেশটি হতো পারমানবিক বোমার অধিকারী পৃথিবীব তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক রূপে বাঙালী মুসলিমগণ পেত বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ।  মুজিবের অপরাধ, সে সুযোগ থেকে বাঙালী মুসলিমদের তিনি শুধু বঞ্চিতই করেননি, বরং গোলাম বানিয়েছেন ভারতের। ভারতের ঘরে তিনি বিশাল বিজয় তুলে দিয়েছেন। ১৯৭১’য়ের যুদ্ধের বিজয়ী ভারত তখন লুটে নেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অব্যবহৃত হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র। সে লুন্ঠনের বিরুদ্ধে শেখ মুজিব প্রতিবাদ না করে নীরব থেকেছেন। অথচ পাকিস্তানের সে অস্ত্র কেনায় অর্থ জুগিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকগণও। অতএব এ লুট শুধু পাকিস্তানের উপর ছিল না, ছিল বাংলাদেশের অর্থের উপর। প্রভুর সামনে গোলামদের প্রতিবাদের সাহস থাকে না। সে সাহস সেদিন মুজিবের মধ্যেও দেখা যায়নি। বরং প্রকট ভাবে যা দেখা গেছে সেটি ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এবং সেটি ভারতকে সাথে নিয়ে। এবং ষড়যন্ত্র হয়েছে ইসলাম ও মুসলিমের পরাজয় বাড়াতে। শেখ মুজিবের সে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি আজও বেঁচে আছে হাসিনার রাজনীতিতে।

ইসলামের হারাম হালামের বিধানগুলো শুধু খাদ্য-পানীয়ে নয়, সেটি রয়েছে রাজনীতিতেও। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম রাজনীতিতে আমৃত্যু অংশ নিয়ে দেখিয়ে গেছেন রাজনীতির ফরজ বিষয়গুলো। নবীজী (সা:) সেটি হাতে কলমে শিখিয়ে গেছেন রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে নিজে বসে। তিনি শিখিয়ে গেছেন, ইসলাম কখনোই নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলে সীমিত রাখার বিষয় নয়। ইসলামের বিধানকে পূর্ণ ভাবে প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজে রাষ্ট্রই হলো মূল হাতিয়ার। রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলিকে ইসলামের বাইরে রাখলে ইসলাম পালনের কাজটি হয় না। তখন রাষ্ট্রের উপর প্রতিষ্ঠা পায় না মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়ত বিধান। রাষ্ট্র তখন শয়তানের দুর্গে পরিণত হয়। শয়তানের সে দুর্গের মাঝে হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রসা গড়েও ইসলামের পরাজয় রোধ করা যায় না। এবং তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। এতো মসজিদ ও মাদ্রাসা বিশ্বের আর কোন দেশে নাই। অথচ দেশটির উপর অধিকৃতি শয়তানী শক্তির। ফলে কোর’আনের তাফসিরকারকদের এদেশে জেলে থাকতে হয়। গণহত্যার শিকার হতে মুসল্লীদের। এবং মুর্তিগড়া হয় রাষ্ট্রীয় অর্থে এবং মুর্তিপূজারীর গানকে গাওয়া হয় জাতীয় সঙ্গিত  রূপে।

ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ নেক আমল তাই মসজিদ-মাদ্রাসা গড়া নয়, বরং সেটি হলো শয়তানের দুর্গরূপী রাষ্ট্রকে নির্মূল করে সেটিকে ইসলামের দুর্গে পরিণত করা। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম তো সেটিই করেছেন। মদিনার হিজরতের পর নবীজী (সা:) তাই নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছেন। কিন্তু ইসলামে অ চেতনাশূণ্য শেখ মুজিব ও তার অনুসারীগণ নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে কোন শিক্ষাই নেননি। শিক্ষা নিয়েছেন এবং ষড়যন্ত্র করেছেন ভারতীয় কাফেরদের সাথে একাত্ম হয়ে। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে বিধিবদ্ধ করেছেন জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষবাদ, সমাজতন্ত্রের ন্যায় হারাম মতবাদ। সংকুচিত করেছেন কোর’আন শিক্ষা। এবং নিষিদ্ধ করেছেন ইসলাম প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে রাজনৈতিক দল গড়া। ইসলাম থেকে দূরে না সরলে কাফেরগণ কখনোই বন্ধু রূপে গ্রহণ করে না। শেখ মুজিব ও তার দলের লোকেরা এতোটাই ইসলামচ্যুৎ যে, ইসলামপন্থী ও পাকিস্তানপন্থীদের নির্মূলে ভারত তাদেরকে আজ্ঞাবহ পার্টনার রূপে গ্রহণ করে। ভারতের অস্ত্র ও অর্থ নিয়ে সে কাজে তারা ঝাঁপিয়েও পড়ে। ইসলামের সাথে তাদের দুষমনি শুধু ১৯৭১’য়ের বিষয় নয়; সে অভিন্ন রূপটি ধরা পড়েছে যেমন শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে, তেমনি ২০১৩ সালের ৫মে শাপলা চত্ত্বরে হিফাজতে ইসলামের মুসল্লীদের বিরুদ্ধে গণহত্যায়।

বাংলাদেশের মাটিতে ১৯৭১’য়ে বহু ইসলামী রাজনৈতিক দল ছিল। ইসলামী দলের বহু লক্ষ নেতা-কর্মী এবং সমর্থকও ছিল। কিন্তু তারা ভারতের এজেন্ডা পূরণে হাতে অস্ত্র নেয়নি। ভারতেও যায়নি। একই কারণে কোন আলেম এবং কোন পীর সাহেবও একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গার সে কবিরা গুনাহতে অংশ নেয়নি। তাদের অনেকে রাজাকার হয়েছে, বহু হাজার রাজাকার প্রাণও দিয়েছে।একাত্তরের রাজাকারের চেতনা ছিল এই কবিরা গুনাহ থেকে বাঁচার চেতনা। মুসলিম যুদ্ধ করে মুসলিম দেশের ভূগোল বাড়াতে, সেটিকে ভাঙ্গতে বা খর্ব করতে নয়। মুসলিম দেশে ভাঙ্গার কাজটি তো কাফেরদের কাজ। একাত্তরে সে এজেন্ডা ছিল ভারতের। শেখ মুজিব ও তার দল ভারতের সে এজেন্ডাকে নিজেদের এজেন্ডা বানিয়ে নিয়েছে। মুসলিম দেশ ভাঙ্গতে বা মুসলিম দেশের ভূগোল বিলীন করতে যুগে যুগে বহু যুদ্ধ করেছে কাফেরগণ।  উসমানিয়া খেলাফত ভেঙ্গে বিশের বেশী টুকরোয় বিভক্ত করেছে ব্রিটিশ ও ফরাসী ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। তখন তাদের চর ও দাস হিসাবে খেটেছে আরব জাতিয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টগণ। সে সাথে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, দুবাই, আবুধাবি, ওমানের ট্রাইবাল নেতাগণ। তাদের সে গাদ্দারীতে আরব বিশ্বের উপর দখলদারী বেড়েছে কাফের শক্তির; এবং শক্তিহানী হয়েছে মুসলিমদের। তাদের সে গাদ্দারীর কারণেই আরব ভূখন্ড আজ ২২ টুকরায় বিভক্ত। মুসলিম উম্মাহ শক্তিহানির মূল কারণ তো এই বিভক্তি। আর বাংলাদেশের মাটিতে সে গাদ্দারী এবং বিভক্তির মূল নায়ক ছিলেন শেখ মুজিব। প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন ভারতবন্ধু; কখনোই বঙ্গবন্ধু বা মুসলিমবন্ধু নন। প্রকৃত মুসলিম শুধু মুসলিমের বন্ধুই হয় না, তাঁর প্রতিরক্ষায় সৈনিকে পরিণত হয়। ভারতে বসবাসকারী মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের যে নীতি, মুজিব ও তার অনুসারীগণ সে নীতিই প্রয়োগ করেছে বাংলাদেশে। ফলে একাত্তরে মুজিবের অনুসারীদের হাতে যত পাকিস্তানপন্থী বাঙালী ও অবাঙালী মুসলিম নিহত হয়েছে তার তূলনা একমাত্র ভারতের মুসলিম গণহত্যার সাথেই মেলে।

 

সর্বমুখী নাশকতা

শেখ হাসিনার ঘোষণা, তিনি কাজ করছেন মদিনা সনদ নিয়ে। প্রকৃত সত্যটি এর বিপরীত। শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিব যে সনদ নিয়ে কাজ করেছেন তার মূল বিধিটি হলো ভারতের প্রতি দাসত্বের। সে সনদ অনুসারেই শেখ মুজিব বাংলাদেশের ভূমি বেরুবাড়ি ভারতের হাতে তুলে দেন। তুলে দিয়েছেন পদ্মার পানিও। ভারতে যাচ্ছে ৫৪টি নদীর পানি। অথচ পাকিস্তানী আমলের ২৩ বছরে একদিনের জন্যও বেরুবাড়ির গায়ে ভারত হাত দিতে পারিনি। পদ্মার পানিও তুলে নিতে পারিনি। ভারত শেখ মুজিবকে তার নিজ স্বার্থের সেবাদাস হিসাবে গ্রহণ করলেও বাংলাদেশীদের কখনোই বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে পারিনি। তারই প্রমাণ, দিল্লীর শাসকচক্র মুজিবকে শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজেই ব্যবহার করেনি, ব্যবহার করেছে বাংলাদেশের মেরুদন্ড ভাঙ্গার কাজেও। বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংসে মুজিবের নাশকতা ছিল বহুমুখী। মুজিব বিলুপ্ত করেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমান্ত। সেটি করেন সীমান্ত বাণিজ্যের নামে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় পণ্যের বাজার বসিয়ে। তিনি তার প্রভু দেশের কাছে বাংলাদেশের কারেন্সি নোট ছাপানোর দায়িত্ব দেন। আর ভারত সে সুযোগ পেয়ে কয়েক শত কোটির বেশী অতিরিক্ত নোট ছেপে নিজের হাতে রেখে দেয়। সে অর্থ দিয়ে সীমান্ত ঘিরে বসানো মুক্ত বাজার থেকে বাংলাদেশীদের থেকে বিদেশী মুদ্রা, কাঁসা-পিতল, পাকিস্তান আমলে বিদেশ থেকে ক্রীত যন্ত্রপাতি ও সঞ্চয়কৃত ধাতব পদার্থ কিনে ভারতে নিয়ে যায়। জাতীয়করণের নামে মুজিব ধ্বংস করেন পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানা। এভাবেই পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করা হয় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এবং ১৯৭৪ সালে ডেকে আনা হয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ  -যাতে প্রাণহানি হয় বহু লক্ষ মানুষের। দরিদ্র মানুষ তখন কাপড়ের অভাবে মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়।

নবীজী (সা:)’র আমলে মদিনা সনদের লক্ষ্য ছিল, মুসলিমদের দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি। লক্ষ্য ছিল, সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও ইসলামী সভ্যতার নির্মাণ। হাসিনা নাম নিচ্ছেন মদিনা সনদের, অথচ যাচ্ছেন উল্টো দিকে। শেখ মুজিবের ন্যায় তারও লক্ষ্য, মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো ও তাদের শক্তি হানি। লক্ষ্য, ইসলামের রাষ্ট্র নির্মাণের যে কোন উদ্যোগের প্রতিরোধ। এবং সেটি তিনি বার বার ঘোষণা দিয়েই করছেন। একটি দেশের শক্তির মূল উৎস ৪টি। এক). রাজনৈতিক শক্তি; দু্ই). শিক্ষা ও সংস্কৃতি; তিন). সামরিক শক্তি; চার). অর্থনৈতিক শক্তি। আওয়ামী লীগ এ ৪টি খাতেরই বিনাশে হাত দিয়েছে। ইতিমধ্যে সেগুলিকে তছনছও করা হয়েছে। রাজনীতির মধ্য দিয়েই জনগণ পায় একতা, পায় প্রতিরোধের সাহস। রাজনৈতিক দিক দিয়ে জনগণকে পঙ্গু করার লক্ষ্যেই শেখ মুজিব গণতন্ত্রকে কবরে পাঠায় এবং প্রতিষ্ঠা দেয় একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার। সেনাবাহিনীর শক্তিহানী করতে গড়ে তোলা হয় বিকল্প রক্ষিবাহিনীকে। একই লক্ষ্যে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই সংঘটিত হয় পিলখানা হত্যাকাণ্ড। সেখানে হত্যা করা হয় সেনাবাহিনীর ৫৭ জন অফিসারকে। ১৯৭১’য়ের যুদ্ধেও এতো অফিসারের মৃত্যু হয়নি। সে যুদ্ধে পাকিস্তানও এতো অফিসার হারায়নি। আর্মির পাশাপাশি শক্তি হানি করা হয় বি.ডি.আর’য়ের। শত শত বি.ডি,আর. সদস্যকে কারাবন্দি করা হয়। বন্দী অবস্থায় অনেকের মৃত্যু হয়েছে জেলখানায়। অপর দিকে দেশের শিক্ষাব্যববস্থা ধ্বংসে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করা হয়েছে দলীয় ক্যাডার তৈরীর কারখানায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কসাইখানায় পরিণত করা হয়েছে আবরার ফাহাদদের মত দেশপ্রেমিকদের হত্যা করার লক্ষ্যে। বছরের বেশীর ভাগ সময়ই সেগুলো বন্ধ থাকে রাজনৈতিক ক্যাডারদের মাঝে সংঘাতের কারণে। লেগে থাকে দীর্ঘ সেসন জট। এভাবেই বাড়ানো হয়েছে শিক্ষা খাতে নাশকতা। অপর দিকে অর্থনীতিতে নাশকতা বাড়াতে ব্যাংক থেকে বিদেশে পাচার হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার বিদেশী মূদ্রা। এমনকি চোরদের হাত পড়েছে স্টেট ব্যাংকের ভান্ডারেও। 

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার মাঝে ভারতের স্বার্থটি বিশাল। ভারত চায় ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ টিকে থাকুক স্রেফ ভারতীয় পণ্যের ক্রেতা হিসাবে। অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দি হিসাবে নয়। বাংলাদেশীদের ক্রয়ক্ষমতা ভারতীদের চেয়ে অনেক বেশী। কারণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেমন উৎপাদন বেড়েছে, তেমনি বিদেশী অর্থের উপার্জন বেড়েছে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশীর বিদেশে কর্মসংস্থানের কারণে। ফলে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর পকেটে এখন অনেক পয়সা। এতবড় বাজার ভারতের পশ্চিম বাংলা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, আসাম, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা, মেঘালয়ের মত ছয়-সাতটি প্রদেশ মিলেও নাই। এ বাজার ভারত দখলে দখলে নিতে চায়। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের বিপুল বিনিয়োগ ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাস পালনে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ মুজিব ও তার অনুসারীদের দাপটের মূল কারণ, তাদের পিছনে ভারতের এ অর্থ বিনিয়োগ।

এক সময় পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনে সমগ্র পৃথিবীতে পূর্ব পাকিস্তান প্রথম ছিল। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশী অর্থ উপার্জিত হত এ খাতে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পূর্ব পাকিস্তানের এবং পরে বাংলাদেশের সে প্রতিদ্বন্দি অবস্থান ভারত মেনে নিতে পারেনি। ভারত চেয়েছিল সে মর্যাদা তা নিজের জন্য। সেজন্যই ভারতের প্রয়োজন দেখা দেয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ আদমজী জুটমিলসহ সকল পাট শিল্পের ধ্বংস। ভারতের স্বার্থে সে কাজটি সমাধা করে দেয় তাদেরই পালিত সেবাদাস শেখ মুজিব। মুজিব আমলে একদিকে যেমন পাটকলগুলোকে অচল করা হয় তেমনি পাটের গুদাম গুলোতে আগুণ দেয়া হয়। আর অপরদিকে ভারত তার পুরোন পাটকলের বদলে বাংলাদেশের সীমান্ত ঘিরে গড়ে তোলে বহু পাটকল। তখন বাংলাদেশের সস্তা কাঁচা পাট দেশে মূল্য না পেয়ে ভারতের বাজারে গিয়ে উঠে। ভারত তখন তাড়াতাড়ি পাট শিল্পে বিশ্বে প্রথম হওয়ার হওয়ার মর্যাদা অর্জন করে। আজ বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দী উঠেছে গার্মেন্টস শিল্পে। ভারত সেটিকেও ধ্বংস করতে চায়। আর গার্মেন্টস শিল্পকে আজ ধ্বংস করা হচ্ছে অতি পরিকল্পিত ভাবে। এ শিল্পে নামানো হয়েছে কিছু দুর্বৃত্ত ও ডাকাতদের। যারা নেমেছে দরিদ্র শ্রমিকের রক্তচোষক রূপে। যে শিল্পে রক্তচোষন হয় দরিদ্র শ্রমিকের সে শিল্প কি বেঁচে থাকে? সে শিল্প বরং মহান আল্লাহতায়ালার আযাব ডেকে আনে। তখন তাতে আগুণ লাগে বা ভবন ধ্বসে পড়ে। সাভারে যা ঘটে গেল তা কি তার ই আলামত নয়।

আওয়ামী লীগের ভোটের রাজনীতিতে দেশের দরিদ্র মানুষ পরিণত হয়েছে রাজনীতির কাঁচা মালে। সেটি যেমন মুজিব আমলে, তেমনি হাসিনার আমলে। শেখ মুজিব সোনার বাংলা প্রতিশ্রুতি দিতে ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে ভোট নিয়েছিলেন। ওয়াদা দিয়েছিলেন আট আনা সের চাল খাওয়োনোর। অথচ উপহার দিয়েছিলেন দুর্ভিক্ষ ও লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু। তেমনি ২০০৮ সালে হাসিনা ওয়াদা দিয়েছিলেন ৮ টাকা সের চাল খাওয়ানোর। কিন্তু খাইয়েছেন ৪৫ টাকা সের দরে। ওয়াদা দিয়েছিলে বিনা মূল্যে সারের। ওয়াদা দিয়েছেন ঘরে ঘরে চাকুরির। সবই ছিল প্রকান্ড মিথ্যাচার। ২৪ নভেম্বর ২০১২-তে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের গার্মেন্টস কারখানায় আগুন লেগে ১১১ কর্মী পুড়ে মারা যায়। হাসিনা সরকার ওয়াদা দিয়েছিল ক্ষতিপুরণের। কথা ছিল কারণ খুঁজে শাস্তি দেয়ার। কিন্তু সে সব কিছুই হয়নি। স্বজন হারা পরিবারগুলিকে কোনরূপ ক্ষতিপুরণ দেয়া হয়নি। কারণ, তাজরীনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর দেলোয়ার হোসেন একজন সরকার সমর্থক ব্যক্তি।ফলে কারো পক্ষে তার পকেট থেকে স্বজনহারাদের জন্য ক্ষতিপুরণ আদায় করে দেয়াও সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে কথা বলবে এমন কোন শ্রমিক সংগঠনও গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। কয়েক বছর আমিনুল ইসলাম একজন ব্যক্তি গার্মেন্টস ইন্ডাসট্রিতে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। সে অপরাধে তাকে লাশ হতে হয়। পুলিশ ৪ দিন পর তার লাশ উদ্ধার করলেই দায়িত্ব সেরেছে। আজ অবধি তার খুনের কোন বিচার হয়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। তাজরীোন আগুন লাগার দুই দিন পরে ২৬ নভেম্বর ২০১২-তে চট্টগ্রামে বহদ্দার পুকুর পাড়ে নির্মীয়মান ফ্লাইওভারের গার্ডার ধ্বসে ১৫ জন নিহত হয়। কিন্তু কেন সে নির্মীয়মান ফ্লাইওভারের গার্ডার ধ্বসে পড়লো তার কোন তদন্ত হয়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। কারণ এই ফ্লাইওভার নির্মাণের কার্যাদেশ পেয়েছিল প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু-র মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাকটো পারিসা লিমিটেড এবং মীর আক্তার কনসট্রাকশন দুটি ফার্ম যুগ্মভাবে। ফলে কে তাদের গায়ে আঁচড় দিবে? এভাবেই একের পর দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী দুর্বৃত্তগণ।

অর্থনীতিতে আওয়ামী নাশকতার আরো কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা দেশের চলমান বিদ্যুৎ সঙ্কট মেটানোর লক্ষ্যে স্থায়ী কোন সাশ্রয়ী পদক্ষেপ না নিয়ে চালু করেন ব্যায়বহুল কুইক রেন্টাল সিস্টেম। এর ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা পকেটে গেছে আওয়ামী দুর্বৃত্তদের। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি, বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড)র ক্ষতি ২৫,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রাইভেট কুইক রেন্টাল কম্পানি থেকে বেশি দামে বিদ্যুত কিনে তা কম দামে বিক্রি করে বিপিডিবি। রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট থেকে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুত কেনে ১৪ থেকে ১৭ টাকা। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে সাত থেকে আট টাকার মধ্যে। এখানে অর্ধেকই ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকির যে ৯,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে তার ৮০ শতাংশই দিতে হচ্ছে কুইক রেন্টাল থেকে বেশি দামে বিদ্যুত কেনায়।ভর্তুকির এ অর্থ যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় কর্ণেল ফারুক খান, আজিজ গ্রুপ, গার্মেন্টস রফতানিকারক মোহাম্মদী গ্রুপ, ফার্নিচার বিক্রেতা অটবি গ্রুপ, সালমান রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ ইত্যাদি ন্যায় আওয়ামী রাজনীতির অর্থজোগানদারদের পকেটে। এভাবে শেখ হাসিনা তার পিতার ন্যায় রাজনীতিকে পরিণত করেছেন শুধু দেশ ধ্বংসের হাতিয়ারে নয়, বিপুল অর্থ-উপার্জনের হাতিয়ারেও।

 

নাশকতা শেয়ার বাজারে

যে কোন দেশের শিল্পায়নে অর্থের বিশাল জোগান আসে জনগণের পকেট থেকে। জনগণ তাদের অর্থ ফেলে না রেখে শিল্পকারখানার শেয়ার কিনে বিনিয়োগ করে। পাশ্চাত্যে তো এভাবেই অর্থনৈতিক অগ্রগতি এসেছে। শেয়ার মার্কেটের অর্থ নিয়েই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারত জয় করেছিল। কিন্তু আওয়ামী নাশকতা  ঘটেছে এ ক্ষেত্রটিতেও। শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন তখন নভেম্বর ১৯৯৬’য়ে শেয়ার মার্কেট প্রচন্ড ধ্বস আসে। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসায় আবার ধ্বস আসে অক্টোবর ২০১১’য়ে। শেয়ার বাজারের দ্বিতীয়বারের কেলেঙ্কারিতে দেশের প্রায় ৩৩ লক্ষ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এতে নিঃস্ব হয়ে যান। শেয়ার বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাটের জন্য যারা দায়ী সরকার তাদের একজনকেও গ্রেফতার করেনি এবং শাস্তিও দেয়নি। অথচ দিশাহারা বিনিয়োগকারীরা যখন মতিঝিলে বিক্ষোভ মিছিল করে তখন প্রধানমন্ত্রীর অথনৈতিক উপদেষ্টা ড.মসিউর রহমান বলেন, “ওরা দেশের শত্রু। সমাজের শত্রু। ওদের জন্য মাথা ঘামানোর কোনো কারণ নেই। তাদের কষ্টে আমার মন কাঁদে না। শেয়ারবাজার ধ্বসে সরকারের মাথাব্যথার কিছু নেই। কারণ শেয়ারবাজারে পুঁজি প্রকৃত বিনিয়োগে যায় না… শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখে না।”

অভয়অরণ্য চোর-ডাকাতদের 
প্রতিটি আওয়ামী শাসনামলেই দুর্বৃত্তদের পোয়া বারো হয়। দেশ পরিণত হয় চোর-ডাকাতদের জন্য অভয় অরণ্যে। সেটি যেমন মুজিব আমলে  হয়েছিল, তেমনি হাসিনার আমলেও। ডাকাতদের এখন আর ডাকাত দল গঠনের প্রয়োজন পড়েনা। তারা ডাকাতির জন্য ভূয়া বাণিজ্যিক কোম্পানি গড়ে তোলে। তখন ডাকাতি শুরু করে দেশের অর্থভান্ডারে। সেটি হাজার হাজার কোটি টাকার অংকে। আওয়ামী লীগের আমলে জনগণের অর্থের নির্মম লুটেরা হলো ডেসটিনি নামক একটি কোম্পানি। এ কোম্পানিটি ৩,২৮৫ কোটি টাকা মানি লন্ডারিং ও আত্মসাত করে। ডিসটিনির কর্মকর্তা হলেন জেনারেল হারুন। তদন্তে দুদক জেনারেল হারুনের কাছে জানতে চায় তার ব্যাংক একাউন্টে ২০ কোটি টাকা ঢুকলো কিভাবে? হারুনের জবাব,“মাসিক সম্মানী, ডিভিডেন্ড ফান্ড, এলাউন্স, কমিশন বাবদ এই টাকা আমার একাউন্টে ঢুকেছে। এছাড়া কিছু টাকা বাড়ি ভাড়া থেকেও এসেছে।” -(দৈনিক যুগান্তর, ০৫/১১/২০১২)। জেনারেল হারুন একজন আওয়ামী লীগ নেতা। দুদকের কি সামর্থ্য আছে এ নেতাকে একদিনের জন্যও জেলে নেয়ার? এতবড় দূর্নীতির পরও তাকে জেলে যেতে হয়নি।

ডেসটিনি ছাড়া আরো ত্রিশটির বেশি এম.এল.এম কোম্পানি অবাধে মানুষকে প্রতারণা করার সুযোগ পায় আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনে। এসব কম্পানির মধ্যে রয়েছে ইউনিপে টু ইউ, সাকসেস লিংক, গ্লোবাল নিউওয়ে, প্রভৃতি। দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, কয়েকটি এম.এল.এম প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে ৪,৯৬৩ কোটি টাকার কিছু বেশি এবং এর মধ্যে ব্যক্তিগত একাউন্টে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল প্রায় ৪,৬০১ কোটি টাকা। -(দৈনিক প্রথম আলো ০৯/০৯/২০১২)। টাকা বানানোর এরূপ সুযোগ দেখলে কি দুর্বৃত্তরা কি আর বসে থাকে। মরা লাশের গন্ধ পেলে যেমন শকুন ছুটে আসে তেমনি অর্থলুটের সুযোগ দেখলে দেশবিদেশের ডাকাতেরাও ছুটে আসে। বাংলাদেশের সরকার দুর্বৃত্ত চোর-ডাকাতদের জণ্য তো সে সুযোগই সৃষ্টি করেছে। তাই ২০০৫-এ এগিয়ে আসে চায়না থেকে তিয়ানশি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। -(দৈনিক আমাদের সময়.কম ০৫/১১/২০১২)। এসব চোর ডাকাতদের হাতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কুশ্রী অর্থনৈতিক কেলেংকারির ঘটনা ঘটে সোনালী ব্যাংকের শেরাটন হোটেল ব্রাঞ্চে। সেটিও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের যোগসাজসে। বাংকের ঐ শাখা থেকে ৩,৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ বা প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা লুট হয়ে যায়। হলমার্ক একাই নিয়েছে প্রায় ২,৬৬৮ কোটি টাকা। একটি ব্যাংকের একটি ব্রাঞ্চে একটি কম্পানির এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা আর কোথাও ঘটেনি। এটিই ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। (দৈনিক প্রথম আলো, ০৫/০৯/২০১২)। বাংলাদেশে সকল ডাকাত মিলেও গ্রামগঞ্জ থেকে এত অর্থ বাংলাদেশের বিগত ৫০ বছরে লুটতে পারেনি। অথচ সে লুটের সাথে জড়িত প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ।

 

মূক্তি কীরূপে?

কিন্তু এরূপ সীমাহীন লুটপাঠও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে গুরুতর কিছু মনে হয়নি। এক গোলটেবিল অনুষ্ঠানে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন,“ব্যাংকিং খাতে আমরা ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেই। এর মধ্যে মাত্র তিন বা চার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। এটা কোনো বড় অঙ্কের অর্থ নয়। এ নিয়ে হইচই করারও কিছু নেই। সংবাদ মাধ্যমে এটা নিয়ে অতিরিক্ত প্রচারণা করে দেশের ক্ষতি করছে। এমন ভাব যেন দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ধ্বসে গেছে। এতে আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।” “সোনালী ব্যাংকের এক রূপসী বাংলা শাখায় জালিয়াতি করা অর্থের পরিমাণই তিন হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অন্য কোনো বেসরকারি ব্যাংকে এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটলে ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যেত। যেমন বন্ধ হয়েছিল ওরিয়েন্টাল ব্যাংক।” -(প্রথম আলো ০৫/০৯/২০১২)।

এই অর্থমন্ত্রীই সম্প্রতি দিল্লি সফরে গিয়ে সাভারে ভবন ধ্বসে হাজারের বেশী মানুষের মৃত্যু সম্পর্কে বলেছেন, এটি কোন গুরুতর বিষয় নয়। বলেছেন, এ ভবন ধ্বসে গার্মেন্টস শিল্পের কোন ক্ষতি হবে না। বিকৃত ও অসুস্থ্য বিচারবোধ আর কাকে বলে। চোর-ডাকাত বা ব্যাভিচারিদের ঘৃনা করার সামর্থ্য চোর-ডাকাত ও ব্যাভিচারিদের থাকে না। কিন্তু দেশের নিরক্ষর সাধারণ মানুষদের তা থাকে। এমনকি শিশুদেরও সে সামর্থ্য্য থাকে। কিন্তু সে সামর্থ্য নাই হাসিনা সরকারের এসব মন্ত্রীদের। নাই খোদ শেখ হাসিনার ও তার দলীয় কর্মীদের। বাংলাদেশের মূল বিপদটি এখানেই। দেশ আজ জিম্মি এসব বিবেকহীন অসুস্থ্য ও দুর্বৃত্ত ব্যক্তিদের হাতে। তারা যতদিন ক্ষমতায় থাকবে তাতে শুধু দেশের নয়, ইসলাম এবং দেশবাসীর ঈমানের বিরুদ্ধেও নাশকতা বাড়বে। কতটা দ্রুততর সাথে এ আওয়ামী দখলদারীর সমাপ্তি ঘটবে, তার উপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা ও শান্তি। এবং নির্ভর করছে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও ঈমানের হেফাজত। দেশের স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি, দেশবাসীর ঈমানের হেফাজত  এবং তাদের ইহকাল ও আখেরাতের কল্যাণে এ ছাড়া ভিন্ন পথ আছে কী? ১ম সংস্করণ ১২/০৫/১৩; ২য় সংস্করণ, ১৮/০২/২০২১।

 




আওয়ামী শাসনে গণহত্যা ও নাশকতা এবং ব্যর্থ জনগণ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 রাষ্ট্র যেখানে জুলুমের হাতিয়ার

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সবচেয়ে বড় অপ্রিয় সত্যটি একবার বললে দায়িত্ব শেষ হয়না। চলমান নাশকতা ও দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে সব কথা বলাও হয় না। তাছাড়া দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধটি তো অবিরাম; তাই সে যুদ্ধে তাদের বিরুদ্ধে সত্য কথাটি বার বার বলতে হয়। তাতে যেমন সত্য বলার সওয়াব মিলে, তেমনি বাঁচা যায় সত্য লুকানোর কবিরা গুনাহ থেকে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অতি অপ্রিয় সত্য কথাটি হলো, দেশটিতে জুলুম-নির্যাতনের সবচেয়ে নৃশংস ও সবচেয়ে বড় অপরাধী শক্তিটি পেশাদার চোর-ডাকাত বা খুনি-সন্ত্রাসীগণ নয়। বরং সেটি খোদ রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সমূহ। সভ্য দেশের সরকারি প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আদালত জনগণকে অপরাধী দুর্বৃত্তদের হাত থেকে জনগণের জান, মাল ও ইজ্জতকে প্রতিরক্ষা দেয়। এবং অসভ্য দেশে এরাই জনগণের উপর চড়াও হয় জঘন্য অপরাধী রূপে। তখন জনগণ এসব রাষ্ট্রীয় আপরাধীদের হাতে জিম্মি হয়। রাজপথে ও জেলে তাদের উপর নির্যাতন করা হয়। বিচার-বহির্ভুত ভাবে হত্যা করা হয়। এবং ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। বাংলাদেশে এরূপ নৃশংস রাষ্ট্রীয় দুর্বৃত্তির মূল নায়ক হলো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ। তাদের নেতৃত্বে দেশের পুলিশ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও আদালতবাহিনী পরিণত হয়েছে নাশকতা ও দুর্বৃত্তির হাতিয়ারে।

নাশকতার কাজে ও নিরস্ত্র মানুষ হত্যায় পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও বিজিবি যে কতটা জোটবদ্ধ, নৃশংস ও বর্বর হতে পারে সেটির প্রমাণ মেলে ২০১৩ সালের ৫’মের রাতে। সে রাতে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বরে তারা শত শত নিরস্ত্র মানুষ নিহত ও আহত করেছিল। এটি ছিল নিরেট গণহত্যা্। বাংলাদেশের সকল ডাকাত বা সকল খুনি-সন্ত্রাসী সারা বছরে যত মানুষকে হত্যা করতে পারিনি সেখানে সরকারি এ খুনি বাহিনীগুলি একরাতে তা করেছে। ৫/০৫/১৩ তারিখে ছিল হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচী। এ অবরোধ কর্মসূচী ছিল শান্তিপূর্ণ। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ১৩ দফা দাবী আদায়। অথচ শান্তিপূর্ণ সমাবেশের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় নৃশংস গণহত্যা। দৈনিক যুগান্তর ১২/০৫/২০১৩ তারিখে খবর ছেপেছিল, শেখ হাসিনার সরকার ৭, ৫৮৮ জন্য অস্ত্রধারি সেপাইকে এ কাজে নামিয়েছিল। তাদের ১,৩০০ জন এসেছিল র‌্যাব থেকে, ৫,৭১২ জন পুলিশ থেকে এবং ৫৭৬ জন বিজিবী থেকে। যেন প্রকাণ্ড এক যুদ্ধ। পত্রিকাটি আরো লিখেছে, তারা এক লাখ ৫৫ হাজার গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। প্রশ্ন হলো ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে বা ২৪ বছরের পাকিস্তান আমলে কোনদিনও কি এতবড় বাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামানো হয়েছে? এবং এতগুলি ছোড়া হয়েছে? সরকারি বাহিনী আরেকটি অপরাধ কর্ম ঘটালো ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে। এবং সেটি নির্বাচনে চুরির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের সকল চোর মিলে যতবড় চুরির কর্ম এ অবধি করতে পারিনি -তা করলো দেশের সরকারি বাহিনী। তাতে চুরি হয়ে গেছে সকল দেশবাসীর ভোটদানের স্বাধীনতা।

 

বাংলাদেশ কি জঙ্গল?

বনেজঙ্গলে মানুষের জীবনের জানমালের নিরাপত্তা থাকে না। কারণ সেখানে চলে পশুর রাজত্ব। সেখানে কোটকাচারি যেমন থাকে না, তেমনি পুলিশও থাকে না। খুনের দায়ে বন্য বাঘ-ভালুককে হাজতে তোলা বা তাদের বিরুদ্ধে বিচার বসানোর রীতিও বনে জঙ্গলে না‌ই। পশু তাই অন্যের প্রাণনাশ করেও হুংকার দিয়ে চলা ফেরা করে। কিন্তু মানুষ তো পশু নয়; নিজেদের জান ও মালের নিরাপত্তা দিতে তারা রাষ্ট্র গড়ে। পুলিশ এবং সেনাবাহিনীও পালে। সে রাষ্ট্র পরিচালনায় সভ্য ও দায়িত্ববান সরকারও নির্বাচন করে। কিন্তু বাংলাদেশে কোথায় সে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা? বাংলাদেশ কি জঙ্গল থেকে আদৌ ভিন্নতর? জঙ্গলে যেমন খুন হলে বিচার হয় না, সেটি বাংলাদেশেও হয় না। তাই শাপলা চত্ত্বরে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হলেও কোন খুনিকে আদালতে তোলা হয়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। জঙ্গলে তো সেটিই হয়।

একটি সরকার কতটা সভ্য বা অসভ্য -সেটি কোন সরকারেরই গায়ে লেখা থাকে না। সেটি নির্ভূল ভাবে ধরা পড়ে জনগণের জানমাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা দিতে সরকার কতটা তৎপর ও সফল তা থেকে। তাই যে কোন সভ্য সরকারের রীতি হয়, কোন নাগরিক দেশে বা বিদেশে, গভীর সমুদ্রে বা গহীন জঙ্গলে হঠাৎ হারিয়ে গেলে -তার জীবন বাঁচাতে দিবারাত্র তল্লাশী করা। তেমনি কোন ব্যক্তি খুন হলে সে খুনের বিচারে বছরের পর বছর -এমন কি দশকের পর দশক ধরে লাগাতর তদন্ত করে। সরকার কতটা সভ্য ও জনদরদী, সে বিচার হয় জনগণের নিরাপত্তায় এরূপ আপোষহীন অঙ্গিকারে। কিন্তু যে দেশের সরকার লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবী ও র‌্যাবকে রাতের আঁধারে ব্রাশফায়ারে নির্বিচারে মানুষ হত্যার অনুমতি দেয়, তাকে কি আদৌও সভ্য বলা যায়? এমন রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীকে কি আদৌও সুস্থ্য বলা যায়? এমন সরকার প্রধান ও তার মন্ত্রীদের পশু বললেও তো পশুর অবমাননা হয়। কারণ আফ্রিকা বা আমাজানের গহীন বনে সকল বন্য পশুরা মিলেও কি কোন কালে এক রাতে এতো মানুষকে বধ করেছে? তাছাড়া পশু ক্ষুধার্ত না হলে শিকার ধরে না। ধরলেও এক সাথে একটার বেশী নয়। তাই মতিঝিলে যেরূপ শত শত লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেল -সেটি কোন জঙ্গলে কোন কালেই দেখা যায়নি। বিশ্বের কোন জঙ্গলে এ অবধি এরূপ অসভ্য বর্বরতাটি ঘটেনি। অথচ সেটিই বাংলাদেশে প্রকান্ড ভাবে ঘটালো হাসিনা সরকার।

 

অবাধ স্বাধীনতা দুর্বৃত্তিতে

ডাকাত দলের সর্দার তো নিজ দলের ডাকাতের বিচার করে না। সেটি করলে তো তার দল বাঁচে না। বরং ডাকাত সর্দারের এজেন্ডা হয়, দলের সদস্যদের ডাকাতির পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া এবং সবচেয়ে বড় ডাকাতদের আরো পুরস্কৃত করা। সে অভিন্ন রীতি দুর্বৃত্ত শাসকদের। হালাকু-চেঙ্গিসেরা কি তাদের দলের কোন খুনিকে বিচার করেছে? শেখ মুজিবের আমলে ৩০ হাজারের অধিক মানুষ খুন হলেও একটি খু্নেরও কি বিচার হয়নি। বরং সিরাজ শিকদারকে খুন করার পর শেখ মুজিব সংসদে দাঁড়িয়ে উল্লাসভরে বলেছেন, “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” সে অভিন্ন নীতি শেখ হাসিনারও। ফলে হাসিনার দলীয় ক্যাডারগণ পেয়েছে গুম, খুন, ধর্ষণ, ও নির্যাতনের পূর্ণ স্বাধীনতা। ফলে জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রলীগ ক্যাডার ধর্ষণে সেঞ্চুরি করলেও হাসিনা তার বিচার করেনি। বিনা বিচারে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। ফলে এরূপ দুর্বৃত্তদের শাসনে প্লাবন আসে দুর্বৃত্তিতে। সমগ্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তখন গুম, নির্যাতন ও মানব খুনের হাতিয়ারে পরিণত হয় । প্রতিযুগের হালাকু-চেঙ্গিজ-হিটলারেরা বেছে বেছে সমাজের সবচেয়ে ভয়ানক চরিত্রের খুনিদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বসিয়েছে। সেটি ঘটেছে মুজিব ও হাসিনার আমলেও। তাই নিরীহ নাগরিক হত্যার কাজটি এখন আর শুধু পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী বা বিজিবীর মধ্যে সীমিত নয়। বরং নৃশংসতায় নেমেছে প্রশাসনের কর্মকর্তা, দলীয় নেতানেত্রীর সাথে আদালতের বিচারকগণও। বিচারে সরকারি দলের কোন ক্যাডারের শাস্তি হলে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের কাজ হয়েছে তাকে মাফ করে দেয়া এবং দ্রুত জেলের বাইরে নিয়ে আসা। সম্প্রতি (ফেব্রেয়ারি, ২০২১) সেটির এক প্রামাণ্য দলিল তুলে ধরেছে আল-জাজিরা টিভি চ্যানেল। কোন সভ্য দেশে কি এমনটি ভাবা যায়?

 

মশকরা মদিনা সনদ নিয়ে!

দেশে এতো খুন, এতো গুম, এতো জুলুম, পত্রিকা ও টিভি অফিসগুলোতে এতো তালা ও এতো চুরিডাকাতির পরও শেখ হাসিনার দাবী, দেশ চলছে মদিনা সনদ অনুযায়ী। মশকরা আর কাকে বলে! প্রশ্ন হলো, মদিনা সনদ কি -সেটি কি তিনি বুঝেন? গণতন্ত্রের সাথে তার পিতার মশকরা জনগণ দেখেছে। গণতন্ত্রের কথা বলে ১৯৭০’য়ে ও ১৯৭৩’য়ে ভোট নিয়েছিলেন শেখ মুজিব। অথচ উপহার দিয়েছিলেন একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার। নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দল ও বিরোধী পত্র-পত্রিকা। স্বাধীনতার নামে মুজিবের মুখে খই ফুটতো। অথচ তিনিই ডেকে এনেছিলেন ভারতীয় সামরিক বাহিনীর অধীনতা। দেশের অভ্যন্তরে হাজার হাজার বিদেশী সৈন্য থাকলে কি স্বাধীনতা থাকে? মুজিব স্বাক্ষর করেছিলেন ভারতের সাথে ২৫ সালা দাসত্ব চুক্তি। সে চুক্তির বদৌলতে ভারত পেয়েছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যখন ইচ্ছা তখন সৈন্য সমাবেশের অধিকার। একমাত্র সে অধিকার পাওয়ার পরই ভারত ১৯৭২ সালে নিজ সৈন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে সরিয়ে নিতে রাজী হয়। ইসলামের বিরুদ্ধে মুজিবের বিশ্বাসঘাতকতা কি কম? ১৯৭০ সত্তরের নির্বাচনে মুজিব ভোট নিয়েছিলেন এ ওয়াদা দিয়ে যে, কোরআন সুন্নাহর বিরুদ্ধে কোন আইন প্রণয়ন করা হবে না। অথচ ক্ষমতায় এসেই সে ওয়াদা তিনি ভূলে যান। কোরআন সুন্নাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শণ দূরে থাক, কোরআনী বিধানের প্রতি অঙ্গিকার নিয়ে রাজনীতিকেই তিনি নিষিদ্ধ করেন। তালা ঝুলিয়ে দেন জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ সবগুলো ইসলামী দলের অফিসে। অপর দিকে হাসিনাও তার পিতার ন্যায় গণতন্ত্রের নিজস্ব মডেল পেশ করে। সেটি হলো, নির্বাচনের আগের রাতের ভোট ডাকাতি। সেটি হয়েছে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে।

মদিনা সনদের নিজস্ব একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে এ ভূপৃষ্ঠে নবীজী (সাঃ)র আগমনেরও। ইতিহাস আছে ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার। নবীজী (সা:) শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত প্রতিষ্ঠার মাঝে নিজের কাজকে সীমিত রাখেননি। নবীজী (সা:)’র মিশন ছিল, আল্লাহর জমিনকে শয়তানি শক্তির দখলদারি থেকে মুক্ত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে তাঁর জীবনে ছিল আমৃত্যু যুদ্ধ। তাছাড়া ইতিহাসের জ্বাজল্যমান শিক্ষাটি হলো, ইসলামের বিরুদ্ধে শয়তানের যুদ্ধে কোন বিরতি নাই। নমরুদ-ফিরাউন মারা যায়, কিন্তু তাদের শিক্ষা নিয়ে অন্যরা জেগে উঠে। এজন্যই বিরতি থাকতে পারে না, শয়তানের বিরুদ্ধে ঈমানদারের যুদ্ধেও। সেরূপ যুদ্ধ নিয়ে বাঁচাটাই প্রতিটি মু’মিনের আমৃত্যু জিহাদ। তাই যেখানেই শয়তানি শক্তির দখলদারি, সেখানেই শুরু হয় এ জিহাদ। ঈমানদার হওয়ার অর্থই হলো, জান ও মাল দিয়ে সে জিহাদে অংশ নেয়া। জিহাদশূণ্যতার অর্থ তাই ঈমানশূণ্যতা। সাহাবাদের যুগে কি এমন একজন সাহাবীও খুঁজে পাওয়া যাবে -যার জীবনে জিহাদ ছিল না? বোখারি শরীফের প্রসিদ্ধ হাদীস: “যে ব্যক্তি মৃত্যবরণ করলো অথচ জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়তও কোনদিন করলো না -সে ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলো মুনাফিক রূপে।” তবে বেঈমানদের জীবনেও যুদ্ধ আছে। লাগাতর যুদ্ধ আছে হাসিনার জীবনেও। তবে সেটি ইসলামের পক্ষে নয়; বরং সেটি ইসলামপন্থিদের নির্মূলে এবং ইসলামকে পরাজিত রাখার। 

 

প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কাফেরদের নীতি

নবীজী(সা:) যখন ইসলামের প্রচার শুরু করেন তখন কাফেরগণ পদে পদে তাঁকে বাধা দেয়। সর্বশেষে পরিকল্পনা নেয় নবীজী (সা:)’র প্রাণনাশের। সে মুহুর্তে নবীজীর উপর আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে হুকুম আসে মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরতের। তখন তিনি মদিনায় চলে যান। সাহাবাদের অনেকেই ইতিমধ্যে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। মদিনা ও তার আশে পাশে বসবাসকারী মুষ্টিমেয় মুসলিমদের পাশে ছিল বহু কাফের, ইহুদী ও খৃষ্টান গোত্রের বসবাস। গোত্রগুলির মাঝে ছিল শতাধীক বছরব্যাপী চলা গোত্রীয় সংঘাত। নবীজী (সা:) উদ্যোগ নেন সে গোত্রগুলির মাঝে সংঘাত থামিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার। কারণ, ইসলামের সদ্য রোপণ করা বৃক্ষের নিরাপদে বেড়ে উঠার স্বার্থে শান্তিপূর্ণ একটি পরিবেশ জরুরী ছিল। তাছাড়া এমন একটি সমাঝোতা জরুরী ছিল বহিঃশক্তির হামলা থেকে ক্ষুদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠির প্রতিরক্ষার স্বার্থেও। তেমন একটি প্রেক্ষাপটেই মদিনা ও তার আশে পাশে বসবাসরত গোত্রগুলোকে নিয়ে নবীজী (সা:) পারস্পারীক শান্তি, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তাতে ছিল সকলের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার। সেটিই হলো মদিনা সনদ। নিজ ধর্ম পালনে সেরূপ শান্তি ও নিরাপত্তা মুসলিমগণ মক্কাতে পাননি।

প্রশ্ন হলো, মদিনার সনদে মুসলিমগণ ধর্ম পালনে যে অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছিলেন, সে স্বাধীনতা কি হাসিনা সরকার বাংলাদেশের মুসলিমদের আদৌ দিচ্ছে? ইসলাম পালনের অর্থ তো শুধু নামায-রোযা ও  হজ্ব-যাকাত পালন নয়, বরং সেটি জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ইসলাম পালন। সে ধর্মপালনে অপরিহার্য হলো রাজনীতিতে জিহাদ, আদালতে শরিয়ত ও হুদুদ, বিশ্ব রাজনীতিতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতিষ্ঠা। অথচ হাসিনার রাজনীতিতে এর কোনটাই নাই। বরং আছে ইসলাম-বিরোধীতা। আদালতে শরিয়ত পালন না করাটি কবিরা গুনাহ। ফলে রোজ হাশরের বিচার দিনে মহান আল্লাহতায়ালার সামনে যার জবাবদেহীর ভয় আছে -সে কি শরিয়ত পালন থেকে কি সামান্য ক্ষণের জন্যও দূরে থাকতে পারে? এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা: “যারা আমার নাযিলকৃত বিধান অনুসরারে বিচারকার্য পরিচালনা করে না -তারা কাফের .. তারা জালেম .. তার ফাসেক।” –(সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪, ৪৫, ৪৭)। কিন্তু মহান আল্লাহর নাযিলকৃত সে শরিয়ত পালন আজ অসম্ভব করা হয়েছে বাংলাদেশে। সেটি সরকারের পক্ষ থেকে। ঔপনিবেশিক কাফের সরকার সেটি অসম্ভব করেছিল, আর পরবর্তী সরকারগুলো সেটিকেই চালু রেখেছে। অথচ মদিনার মুসলিমগণ পরিপূর্ণ ইসলাম পালনের সে সুযোগটি প্রথম দিন থেকেই পেয়েছিলেন। মদিনা সনদ অনুসারে সেখানে বসবাসরত অমুসলিমগণ মুসলিমদের সে পরিপূর্ণ ধর্মপালনে কোনরূপ বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটি। এদেশে অমুসলিমগণ তাদের ধর্ম পালনে পুরা সুবিধাগুলো পেলেও সে সুযোগ পাচ্ছে না মুসলিমগণ। তারা আপোষহীন অবস্থান নিয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে।

শেখ হাসিনা যে নীতি অনুসরণ করছেন সেটি তো মক্কার কাফেরদের নীতি। সেটি শরিয়তের প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধের নীতি। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় নাশকতা আর কি হতে পারে? যারা ইসলামের পূর্ণ অনুসরণ চায় তাদের জন্য নিরাপত্তা না বাড়িয়ে তিনি বরং নানা ভাবে বিপদ বাড়িয়ে চলেছেন। সে নীতির বাস্তবায়নের তিনি পূর্ণ সহায়তা নিচ্ছেন ভারতীয় কাফেরদের। তাই তার সরকার বাংলাদেশে কোর’আনের তাফসির বহুস্থানে বন্ধ করেছে, এবং ফাঁসির হুকুম শুনিয়েছে দেশের সবচেয়ে প্রখ্যাত তাফসিরকারকের বিরুদ্ধে। অনুমতি দিচ্ছে না ইসলামি দলগুলোরে সমাবেশের। এরই প্রমাণ, ০৫/০৫/২০১৩ তারিখে নির্বিচারে গুলি চালানো হয় হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে। শাহবাগের মোড়ে নাস্তিক ব্লগারদের মাসের পর মাস লাগাতর সমাবেশের অধিকার দিলেও সে অধিকার হাসিনা ইসলামপন্থীদের দেননি। ইসলামপন্থী দলগুলোর হাজার হাজার নেতাকর্মীকে ইতিমধ্যেই জেলে তোলা হয়েছে। বহু শত নিরস্ত্র মানুষকে শহীদ করা হয়েছে। সরকার শত শত মানুষের ঘরে পুলিশ ও র‌্যাব নামিয়েছে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করার কাজে। এমনকি ইসলাম বিষয়ক বইপত্র রাখার অপরাধে সরকার হেজাবধারি মহিলাদের ও ছাত্রীদের হাজতে তুলেছে। প্রশ্ন হলো, এই কি মদিনার সনদ অনুযায়ী দেশ-শাসন? কিন্তু আলেম-উলামাদের এ কর্মসূচীর বিরুদ্ধে সরকার হাজার হাজার পুলিশ লেলিয়ে দেয়। পুলিশের পাশাপাশি ছিল সরকারি দলের বিশাল গুন্ডাবাহিনী। এমন অসভ্য শাসনকে কি মদিনা সনদের শাসন বলা যায়?

 

সভ্য ভাবে বাঁচার খরচ ও ঈমানদারের জিহাদ

অসভ্য ভাবে বাঁচায় খরচ লাগে না। এটি স্রোতের টানে গা ভাসিয়ে দেয়ার মত। কিন্তু স্বাধীনতা ভাবে ও সভ্য ভাবে বাঁচার খরচটি বিশাল। তখন জনগণের সভ্য রুচি ও ঈমানের পরীক্ষা হয়। পরীক্ষায় পাশের তাড়নায় মুসলিম জীবনে তাই জিহাদ আসে। এবং সে জিহাদে জান ও মালের বিনিয়োগও আসে। তাই একটি দেশে দুর্বৃত্তদের অসভ্য শাসন দেখেই বলা যায়, সে দেশের মানুষ সভ্য শাসন প্রতিষ্ঠার খরচটি দেয়নি। এরই ফলে বাঁচছে অসভ্য শাসনের যাতনা নিয়ে। প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিলেন তার খরচটি ছিল বিশাল। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবাকে সে কাজে শহীদ হয়েছেন। বুঝতে হবে, মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ তাজমহল, পিরামিড বা চীনের দেয়াল গড়া নয়। বরং সেটি সভ্য মানুষ, সমাজ ও সভ্যতার নির্মাণ। একাজের জন্যই পরাকালে জান্নাত মিলবে। এবং সমগ্র মানব ইতিহাসে এ কাজে মুসলিমদের তূলনা নেই। লাগাতর জিহাদ এবং সে জিহাদে জান ও মালের বিপুল কোরবানীর মাধ্যমে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ সমগ্র আরব ভূমিকে দুর্বৃত্ত শক্তির অধিকৃতি থেকে পূর্ণভাবে মুক্তি দিয়েছিলেন। নিজে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসে খোদ নবীজী (সা:) সে জিহাদে নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাজনীতির অঙ্গণে এটিই হলো নবীজী (সা:)’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত।

মুসলিম জীবনে যে জিহাদ, সেটি শুধু নবীজী(সা:)’র আমলে সীমিত ছিল না। সীমিত ছিল না স্রেফ আরব ভূমিতেও। বরং যেখানেই তারা দেখেছেন কাফের শক্তির দখলদারি, সেখানেই শুরু করেছেন সে দখলদারি থেকে মুক্তি দেয়ার লড়াই। সে মিশন নিয়ে যেমন পৃথিবীর নানা প্রান্তে গেছেন, তেমনি এক সময় বাংলাদেশেও পৌছেছেন। কিন্তু বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশগুলি আজ আবার অধিকৃত হয়ে গেছে দুর্বৃত্ত শক্তির হাতে। এ দুর্বৃত্ত শক্তিই নবীজী(সা:)’র শরিয়ত ভিত্তিক শাসনকে মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলছে। অথচ তারা ভূলে যায়, মুসলিম ইতিহাসের সকল গৌরব অর্জিত হয়েছিল তো সে মধ্যযুগে। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দূরে থাক, ইসলামের এ শত্রুপক্ষটি সংবিধানে মহান আল্লাহর উপর আস্থার করতে চায়না। এ দুর্বৃত্ত শক্তির দখলদারীর কারণেই শরিয়তি বিধান আজ আস্তাকুঁড়ে গিয়ে পৌঁছেছে। প্রশ্ন হলো, ইসলামের এ পরাজিত দশা কি কোন মুসলিম মেনে নিতে পারে? মেনে নিলে কি তার ঈমান থাকে? মুসলিম তো ইসলামের বিজয় নিয়ে বাঁচে। বিজয় না থাকলে লড়াই নিয়ে বাঁচে। কিন্তু পরাজয় নিয়ে বাঁচার কথা কি কো ঈমানদার ভাবতে পারে?

শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিব নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করতেন। সে দাবী শেখ হাসিনাও করেন। ৪/৫/২০১৩ তারিখে সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেছেন, তার দাদার মুখে দাড়ি ছিল। নিজেকে মুসলিম রূপে জাহির করার জন্য তিনি এখন দাদার দাড়ির উল্লেখ করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিজের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়ার জন্য কি দাদার মুখে দাড়ি থাকাটি জরুরী। শেখ, সৈয়দ বা চৌধুরী পরিবারে পরিবারে জন্ম নিলে যে কেউ শেখ, সৈয়দ বা চৌধুরী হতে পারে। সেজন্য কোন যোগ্যতা লাগে না। সে পরিবারের পাগল এবং চোর-ডাকাতেরাও সে উপাধি পায়। কিন্তু মুসলিম হওয়ায় জন্য তো মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস এবং ইসলামের লক্ষ্য পুরণে আপোষহীন অঙ্গিকার চাই। সে লক্ষ্যে জান ও মালের কোরবানীও চাই। কাফের ব্যক্তির পুত্রও মুসলিম হতে পারে -যদি তাঁর মধ্যে সে অঙ্গিকার ও কোরবানী থাকে। নবীজী(সা:)’র প্রথম সারির সাহাবাদের পিতামাতা কি মুসলিম ছিলেন? প্রশ্ন হলো শেখ মুজিব, হাসিনা বা আওয়ামী লীগ নেতাদের জীবনে কোথায় সে অঙ্গিকার?

যুদ্ধে-বিগ্রহ ও রাজনীতিতে অর্থদান, শ্রমদান ও প্রাণদান বহু কাফেরও করে থাকে। কিন্তু তাদের সে ত্যাগে কি মহান আল্লাহর লক্ষ্য পূরণের নিয়েত থাকে? সে নিয়েত না থাকার কারণেই তাদের সকল ত্যাগ ও কোরবানী ব্যর্থ হয়ে যায়। ফলে তারা পৌঁছবে জাহান্নামে। কিন্তু আল্লাহকে খুশি করার নিয়েত থাকাতে ঈমানদার ব্যক্তি শহীদ হলে বিনা বিচারে জান্নাত পায়। শেখ মুজিব আজীবন রাজনীতি করেছেন। জেলও খেটেছেন। রাজনীতি করছেন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীগণও। কিন্তু কোথায় মহান আল্লাহতায়ালার লক্ষ্য পূরণের সে নিয়েত? কোথায় সে অঙ্গিকার? কোথায় আল্লাহর জমিন থেকে শয়তানি শক্তির দখলদারি মুক্তির লড়াই? এ তো ক্ষতির ব্যবসা। সুরা আছরে কি মহান আল্লাহতায়ালা কি সে মহাক্ষতির কথাটিই শুনিয়ে দেননি। বরং শেখ মুজিব তো ভারতের কাফের সৈন্যদের সাথে কাঁধ মিলিয়েছেন। তাদেরকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ডেকে এনেছেন। মুজিবের রাজনীতিতে অঙ্গিকার ছিল সমাজতন্ত্র ও বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা, মহান আল্লাহকে খুশি করা নয়। তাঁর শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও নয়। বরং ধর্মনিরপেক্ষতার নামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন প্রচন্ড ধর্ম-বিরোধীতা। ইসলামের বিরুদ্ধে সে অঙ্গিকার নিয়ে যেখানেই তিনি কোরআনের আয়াত ও ইসলাম দেখেছেন সেখান থেকেই তা সরিয়েছেন। তাই তার হাত থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত বাঁচেনি। বাঁচেনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল বা জাহাঙ্গির নগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সাথে মুসলিম শব্দ। তেমনি বাঁচেনি ঢাকার নজরুল ইসলাম কলেজের ইসলাম শব্দটি। প্রশ্ন হলো, এমন চেতনাধারী নেতাদের হাতে কি ইসলাম বাঁচে? রক্ষা পায় কি মুসলিম স্বার্থ? আল্লাহর দ্বীনের এমন চিহ্নিত শত্রুকে বাঙালী মুসলিমের বন্ধু বলা যায়? বলা যায় কি জাতির পিতা বা বন্ধু? সেটি যে কোন হিন্দু বা বৌদ্ধ বলতে পারে, নাস্তিক বা কাফেরও বলতে পারে। কিন্তু কোন মুসলিমও কি বলতে পারে? কোন মুসলিম বললে কি তার ঈমান থাকে? মুখের কথার মধ্য দিয়ে যেমন ঈমানের প্রকাশ ঘটে, তেমনি বেঈমানিও ধরা পড়ে। আল্লাহর দ্বীনের শত্রুকে বন্ধু বলা যে ঈমানদারী নয় -সেটি বুঝা কি এতোই কঠিন?

 

কবিরা গুনাহর রাজনীতি 

মুজিবের অনুসারিরা একাত্তরে ভারতীয় কাফেরদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে কাফেরদেরই এজেন্ডা পূরণ করেছে। তাতে উৎসব বেড়েছে দিল্লির শাসক মহলে। আর মাতম বেড়েছে সমগ্র মুসলিম জাহানে। মুসলিম উম্মাহকে এভাবেই মুজিব কাঁদিয়েছেন এবং হাঁসি ফুটিয়েছেন ভারতের কাফেরদের মুখে। সমগ্র মুসলিম উম্মাহগর বিরুদ্ধে এটিই ছিল মুজিবের বড় অপরাধ। তাই ভারত ও ভূটানের ন্যায় অমুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে এগিয়ে এলেও কোন মুসলিম রাষ্ট্র এগিয়ে আসেনি। মুজিব ও তার অনুসারিরা একটি মুসলিম রাষ্ট্রকে ভেঙ্গেছে। অথচ ইসলামে এটি শতভাগ হারাম। ইসলামে এটি কবিরা গুনাহ। অন্যের পকেটে হাত দেয়াই শুধু কবিরা গুনাহ নয়, কবিরা গুনাহ হলো মুসলিম দেশের ভূগোলে হাত দেয়াও। ইসলামে এ অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কবিরা গুনাহ যে শুধু শিরক, মুর্তিপুজা, সূদ-ঘুষ, ব্যাভিচার, অশ্লিলতা,মদ্যপান. চুরি-ডাকাতি তা নয়,বরং তার চেয়েও বড় কবিরা গুনাহ হলো ভাষা, বর্ণ বা ভৌগলিক পরিচয় নিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রের সংহতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা। পবিত্র কোরআনে এমন কবিরা গুনাহর বিরুদ্ধে রয়েছে কঠোর হুশিয়ারি। কিছু লোকের ব্যাভিচার ও মদ্যপানে মুসলিমদের ঘাড়ে কাফের শত্রুদের গোলামী চেপে বসে না। অথচ সেটি হয় মুসলিম ভূমিতে কাফেরদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা পেলে। মুসলিমগণ তাই ঈমানহীন, শক্তিহীন ও মর্যাদাহীন হয়। একাত্তরে মুজিব বাংলাদেশের উপর কাফের ভারতের অধিকৃতিকেই নিশ্চিত করেছিল। এখানেই ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুজিব ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মূল নাশকতা।

 

দলিল জনগণের ব্যর্থতার

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তি ও নাশকতার খতিয়ানটি বিশাল। তবে জনগণের ব্যর্থতাও কি কম? দেহ থাকলে রোগভোগ থাকে। তেমনি দেশ থাকলে দেশের শত্রুও থাকে। জনগণকে তাই শুধু প্রাণনাশী বিষ, বিষাক্ত শাপ ও হিংস্র পশুদের চিনলে চলে না। চিনতে হয় দেশের ভয়ানক শত্রুদেরও। এবং লাগাতর লড়তে হয় সেসব শত্রুদের বিরুদ্ধেও। জাতি তো এভাবেই শত্রুদের হাতে  অধিকৃত হওয়া থেকে বাঁচে। এজন্যই আমৃত্যু লড়াই দেখা গেছে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবীদের জীবনে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে সে চেনার কাজটি হয়নি। লড়াইয়ের কাজটিও হয়নি। চেনার কাজটি হলে কি যে ব্যক্তি ও যে দল জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিল, প্রতিষ্ঠা দিল নৃশংস বাকশালী স্বৈরাচার, হত্যা করলো ৩০ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী, প্রতিষ্ঠা দিল ভারতের গোলামী এবং নাশকতা ঘটালো ইসলাম ও ইসলামী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে -তাকে কি জনগণ কখনো জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলতো? অনেকে আবার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীও বলে। সভ্য জনগণ তো এমন নৃশংস অপরাধীদের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ফেলে; মাথায় তোলে না। মুখের কথার মধ্য দিয়ে তো ব্যক্তির কথা বলে। কথার মধ্যেই তো মানুষের ঈমানদারী ও বেঈমানী। তখন ধরা পড়ে চেতনার অসুস্থ্যতা। শত্রু ও চিহ্নিত অপরাধীকে পিতা ও বন্ধু বলার মধ্যে কোথায় সে বিবেকবোধ? কোথায় সে ঈমানদারী? কোথায় সে চেতনার সুস্থ্যতা? এটি তো শয়তানকে মহাত্ম বলা! আর লড়াইয়ের কাজটি হলে তো দুর্বৃত্ত শাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু হতো।  

গরু-ছাগলের পানাহার ছাড়া কোন সামাজিক বা নৈতিক দায়িত্ব নাই। কিন্তু মানুষের দায়িত্ব তো বিশাল। তাকে তো বহুবিধ নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। যার জীবনে সে দায়িত্বপালন নাই -তাকে কি গরু-ছাগলের চেয়ে উন্নততর বলা যায়? ইসলামে দায়িত্ব পালনের সে মূল হাতিয়ারটি হলো জিহাদ। এ ইবাদতে ঈমানদার ব্যক্তি লাগাতর বিনিয়োগ ঘটাতে হয় তাঁর মেধা, শ্রম, সময়, অর্থ ও রক্তের। নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলে এমন নিবিড় বিনিয়োগ হয় না। এজন্য জিহাদই হলো ঈমানদারের সর্বোচ্চ ইবাদত। ঈমানের আসল পরীক্ষা হয় জিহাদের এ অঙ্গণে। এ পবিত্র ইবাদতের মাধ্যমেই ঈমানদারগণ রাষ্ট্র থেকে দুর্বৃ্ত্তদের নির্মূল করে এবং প্রতিষ্ঠা দেয় ইনসাফ ও ন্যায়ের। এবং বিজয় আনে ইসলামের। তখন নির্মিত হয় সভ্যতর ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র। যে সমাজে জিহাদ নাই সে সমাজে প্রতিষ্ঠা পায় দুর্বৃত্তদের শাসন। তখন বিজয়ী হয় শয়তানের এজেন্ডা। বাংলাদেশ তো তারই প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। তাই বাংলাদেশ শুধু আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তি ও নাশকতার দলিলই নয়, এটি জনগণের বেঈমানী ও নিদারুন ব্যর্থতার দলিলও। ১ম সংস্করণ ১২/০৫/১৩; ২য় সংস্করণ ১৭/০২/২০২১।




আত্মঘাতের পথে বাংলাদেশ: অভাব যেখানে শিক্ষা ও দর্শনের

ফিরোজ মাহবুব কামাল

চলছে আত্মঘাত

বাংলাদেশের ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক নেই। শয্যাশায়ী রোগীর গায়ে যখন পচন ধরে এবং সে পচন যখন দুর্গন্ধ ছড়ায় – সে রোগ তখন শুধু ঘরের লোকই নয়, প্রতিবেশীও টের পায়। বাংলাদেশের বেলায় সেটিই ঘটেছে। দেশটির পচন মূলতঃ নৈতিক। সে নৈতিক পচনের বড় আলামত হলো চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের প্লাবনে ভাসা বাংলাদেশ। নানা দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়নের মডেল রূপে যেখানে আলোচিত হয় জাপান, কোরিয়া বা সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ সেখানে দূর্নীতির মডেল। দূর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে বাংলাদেশের পরিচিতি আজ বিশ্বময়। সম্প্রতি (ফেব্রেয়ারী, ২০২১) প্রখ্যাত টিভি চ্যানেল আল-জাজিরা প্রামাণ্য দলিল পেশ করে, দুর্বৃত্ত প্রতিপালনে কীরূপ সচেষ্ট দেশটির প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও সেনাবাহিনী প্রধান। দেখায়, খুনের অপরাধে দন্ডপ্রাপ্ত আসামীকেও কীরূপে দেশের কারাগার থেকে প্রেসিডেন্টের সুপারিশে বের করা হয়। দেখায়, দেশটিতে খুনির ভাই এবং একটি অপরাধী পরিবারের সদস্য কীরূপে সেনাবাহিনীর প্রধান  হয়। এবং সে সেনাপ্রধান কীরূপে খুনের আসামীকে দেশ থেকে পালাতে সাহায্য করে। এবং আরো দেখায়, খুনের আসামীকে দেশের পুলিশ খুঁজে না পেলে কি হবে, দেশটির রাজধানীর অভিজাত মহলে প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনীর প্রধানের সাথে সে পলাতক অপরাধী বিয়ের আসরে ফুর্তি করে। অতিশয় বিশাল হয়েও ডায়নোসর যেমন বিশ্ব থেকে হারিয়ে গিয়ে ইতিহাস গড়েছে, বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের বিশাল জনগোষ্ঠি তেমনি ইতিহাস গড়েছে নীতি-নৈতিকতার অঙ্গণ থেকে দ্রুত নীচে নেমে। দেশটি সবচেয়ে তলায় নেমেছে এ শতাব্দীর শুরুতে দূর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়ে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এতো ব্যর্থতা? অনেকেই ভাবেন এ ব্যর্থতার মূল কারণ বিশাল জনসংখ্যা। বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও বুদ্ধিবৃত্তি মূলত এ মতের ধারকদের দখলে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যসব উন্নয়ন পরিকল্পনার চেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় জন্মনিয়ন্ত্রণকে। তাই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প বা কৃষির গুরুত্ব বুঝাতে ঘরে ঘরে কোন সরকারি কর্মচারির পদধুলি না পড়লেও কনডম বা জননিয়ন্ত্রন বড়ি হাতে প্রতিমাসে কেউ না কেউ পৌঁছবেই। বাংলাদেশ সরকারের সবচেয়ে স্বচ্ছল বিভাগ হলো এটি। বিদেশী ঋণদাতাদেরও সর্বাধিক নজর এ বিভাগটির উপর। বাংলাদেশের জন্ম থেকে এ অবধি যত বিদেশী অর্থ এ বিভাগটি পেয়েছে তা আর কোন বিভাগ পায়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতো বিনিয়োগ ও এতো মেহনতের পরও দেশ কি সামনে এগিয়েছে?  প্রশ্ন হলো, জনসংখ্যাবৃদ্ধিকে সমস্যা মনে করা কি ইসলামে জায়েজ? এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ মুসলিমের ঈমান শুধু হালাল পানাহারে বাঁচে না, ধ্যান-ধারণা ও দর্শনকেও এজন্য হালাল হতে হয়। তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রশ্নটি নিছক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমাজনীতির বিষয় নয়, এটি অতি আক্বিদাগত বিষয়ও। এর সাথে জড়িত মুসলিম থাকা না থাকার প্রশ্ন। কারণ হারাম তথা অসিদ্ধ আক্বিদা নিয়ে তো মুসলিম হওয়া যায় না।  

মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তথা আশরাফুল মাখলুকাত হলো মানুষ; সোনা-রূপা, তেল-গ্যাস বা কোন জীবজন্তু নয়। মানুষ শুধু শ্রেষ্ঠ-সৃষ্টিই নয়, বরং এ পৃথিবী পৃষ্ঠে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফাও। আল্লাহর এ খলিফার মর্যাদা ফেরেশতার চেয়েও উর্দ্ধে। তাই প্রতিটি ঈমানদারকে নামায-রোযার ন্যায় এ বিশ্বাসটিকে হৃদয়ে ধারণ করে বাঁচতে হয়। এ বিশ্বাস না থাকলে মুসলিম হওয়া যায় না। নইলে সে শয়তানের খলিফায় পরিণত হয়। তাছাড়া কোন শিল্পির শ্রেষ্ঠ শিল্পকে তুচ্ছ বলার অর্থ সে শিল্পিকে অবমাননা করা। তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে আপদ বললে অবমাননা হয় মহান আল্লাহতায়ালার। তাতে হেয় করা হয় তার মহান কুদরত ও হিকমতকে। নামায পড়ে বা রোযা রেখে কি সে অবমাননার গোনাহ থেকে মুক্তি মেলে? তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির প্রতি এমন অবজ্ঞা নিয়ে কি কোন মুসলিম আল্লাহতায়ালার রহমত পেতে পারে? এমন কদর্য চিন্তা বিবেকের পচনেই সম্ভব, সুস্থ্যতায় নয়। এবং সে পচনে বাংলাদেশী মুসলিমগণ যে বহুদূর এগিয়েছে সে প্রমাণই কি কম? এ পচনের কারণে সূদ-ঘুষ-দূর্নীতির ন্যায় হারাম কর্ম বাংলাদেশে আচারে পরিণত হয়েছে। পাপকে বৈধতা দিয়ে পতিতাপল্লি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং সে পাপের আইনগণ বৈধতাও দেয়া হয়েছে।

সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে কি হবে, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয় ব্যভিচারের ন্যায় পাপাচারের পাহারাদারীতে। ফলে ব্যভিচার, ধর্ষণ, গণধর্ষন উপচে পড়েছে জনপদে। পকেটমার গণপিটুতি মারা পড়লে কি হবে, পাপের ব্যবাসায়ী ব্যভিচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নাই। গবাদি পশুকে আপদ ভাবা হয় না; বরং সবাই গবাদী পশুর বংশ-বিস্তার চায়। কিন্তু সে মর্যাদা মানুষের নেই। ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ মরছে জন্মানোর আগেই। গর্ভপাতের নামে দেশজুড়ে চলছে নীরব গণহত্যা। দেশী-বিদেশী অর্থে অসংখ্য এনজিও কর্মী একাজে নৃশংস খুনীর বেশে নেমেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার অমুসলিম দেশেগুলিতেও গর্ভপাতের নামে এরূপ মানবহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়। আন্দোলনও হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি নেই। সরকার, জনগণ, মসজিদের ইমাম, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা এসব জেনেও না জানার ভান করে। বরং জনসংখ্যা এভাবে কমানোতে অনেকেই খুশি। সরকার বিশ্বময় এটিকে তাদের সফলতা বলে প্রচার করছে। ফলে জন্ম নিচ্ছে না মায়ের পেটে জন্ম নেওয়া শিশুদের বাঁচানোর পক্ষে আন্দোলন। এমন মৃত বিবেক ও বিকৃত চেতনার ফলে মানুষ হারিয়েছে তার নিজের মূল্যমান। শিশুহত্যার পাশাপাশি খুনীদের হাত পড়ছে এখন জীবিতদের গলায়ও। ফলে বেড়ে চলেছে হত্যা, ধর্ষণ ও সন্ত্রাস। আগুণ দেওয়া হচ্ছে যাত্রীভর্তি বাসে। ধর্ষণেও উৎসব হচ্ছে। মানুষ বিবস্ত্র ও লাঞ্ছিত হচ্ছে প্রকাশ্য রাজপথে-যেমন হরতাল কালে  রাজনৈতিক ক্যাডারদের হাতে হয়েছে।

 

মূল কারণ জাহেলিয়াত                         

দারিদ্র্য তথা সম্পদের অভাবকে যারা সকল ব্যর্থতার কারণ বলেন, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তিও কি কম? তাদের কথা, অভাব থেকেই স্বভাব নষ্ট হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে সবচেয়ে নষ্ট চরিত্র ও নষ্ট স্বভাব হলো তাদের যারা ধনী। দেশের অধিকাংশ ঘুষখোর, সূদখোর, মদখোর, ব্যভিচারি, সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদ ও ঋণখেলাফী এসেছে তাদের মধ্য থেকে। অথচ তাদের পাশে বহু অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি স্বভাব-চরিত্রে অতি উত্তম দৃষ্টান্ত রাখছে। কথা হলো, দর্শন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির অঙ্গণে যারা কর্মহীন বা সৃষ্টিহীন -তারা কি সম্পদ সৃষ্টি করে? বরং আনে দারিদ্র্য। সম্পদ মানুষের সৃষ্টি এবং এ জন্য চাই সৃষ্টিশীল মানুষ। এমন মানুষ গড়ে উঠে শুধু দেহের গুণে নয়, মনের গুণে। আর এমন মানবিক গুণে বেড়ে উঠার জন্য চাই উপযুক্ত শিক্ষা ও দর্শন। অশিক্ষা, অপসংস্কৃতি ও দূর্নীতি একটি জনগোষ্টিকে শুধু সৃষ্টিহীনই করে না, অনাসৃষ্টিপূর্ণ দুর্বৃত্ত রূপেও গড়ে তুলে। দারিদ্র্য ও দূর্ভিক্ষ এমন দেশের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের বেলায় সেটিই হয়েছে।

বাংলাদেশের দারিদ্র্যের জন্ম জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতা থেকে। জনসংখ্যা থেকেও নয়; ক্ষুদ্র ভূগোল থেকেও নয়। বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র দেশ হলো সিঙ্গাপুর। আয়তন মাত্র ২৪০ বর্গ মাইল। জনসংখ্যা ৫৭ লাখ। আয়তনে ও লোকসংখ্যায় ঢাকা শহরের অর্ধেকের চেয়েও কম। প্রতি বর্গমাইলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বাংলাদেশের চেয়ে অধিক। অথচ দেশটির বাৎসরিক বৈদেশিক রফতানি ৩৯০.৩ বিলিয়ন ডলার (২০১৯ সালের পরিসংখ্যান মতে)। অথচ ২০১৯ সালে ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশের মোটি বৈদেশিক রফতানি ছিল মাত্র ৪৬.৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের জনসংখ্যা সিঙ্গাপুরের তূলনায় প্রায় ৩০ গুণ। অথচ সিঙ্গাপুরের রফতানি বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় সাড়ে ৮ গুণ অধিক। সোনার খনি বা তেলের খনি নিয়ে সিঙ্গাপুর এ অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেনি। বরং এ সাফল্য এনেছে দেশটির সৃষ্টিশীল মানুষ। মানুষকে তারা আপদ ভাবেনি বরং সোনার বা তেলের খনির চেয়েও মহামূল্যবান ভেবে তাদের উন্নয়নে মনযোগী হয়েছে। ফলে সিঙ্গাপুরের একজন নাগরিকের যে উৎপাদন ক্ষমতা তা বাংলাদেশের বহু হাজার মানুষের মধ্যেও সৃষ্টি হয়নি।

 

অভাব দর্শন বা ফিলোসফির 

বাংলাদেশের অভাব মূলত দর্শন বা ফিলোসফিতে। একটি দেশের অগ্রগতি বা বিজয় শুরু হয় দর্শন থেকেই। খাদ্য যেমন দেহের শক্তি বাড়ায়, দর্শন তেমনি মনের শক্তি বাড়ায়। মানুষ সৃষ্টিশীল হয় তো মনের শক্তির কারণেই, দেহের শক্তির কারণে নয়। তাই যারা দেশ গড়তে চায় তারা মানুষের বিশ্বাসে বা দর্শনে হাত দেয়। বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিস্কার হলো পারমানবিক শক্তি। সে  শক্তি বলে আলোকিত হয় কিছূ শহর, চালিত হয় কিছূ কলকারখানা, জাহাজ বা সাবমেরিন। অথচ দর্শন আলোকিত করে এবং পাল্টে দেয় কোটি কোটি মানুষের মনের জগত। পাল্টে দিতে পারে বিশ্বের মানচিত্র। এক্ষেত্রে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ পেশ করেছে ইসলাম। ইসলামের আগমনে আরবের ভূগোলে বা জলবায়ুতে পরিবর্তন আসেনি। মাটির তলায় সোনার খনি বা তেলের খনিও আবিস্কৃত হয়নি। পরিবর্তন আসেনি মানুষের দৈহিক আকার-আকৃতি বা অবয়বে। বরং বিপ্লব এসেছিল তাদের জীবন দর্শনে। পরিবর্তন এসেছিল চিন্তার মডেলে। সে পরিবর্তনের ফলে জীবন ও জগত নিয়ে মানুষের ধ্যান-ধারণাই পাল্টে যায়। পরিবর্তন আসে তাদের কর্মে ও আচরণে। সে পরিবর্তনের পথ ধরে পাল্টে গিযেছিল মধপ্রাচ্যের ভূগোল, ভাষা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি তথা সবকিছূ। দর্শনের বলেই নিঃস্ব আরবেরা বিশ্বের সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছিল।

ইসলামের পূর্বে আরবের মানুষ ভাবতো জীবনের শুরু ও শেষ ইহলোকেই, পরকাল বা বিচার দিন বলে কিছু নেই। ভাবতো, মৃত্যুর পর তাদের হাড্ডি-মাংস মাটিতে মিশে যাবে এবং ধুলায় হারিয়ে যাবে চিরতরে। ফলে তারা তাদের সকল প্রচেষ্টা ও মেধা নিয়োজিত করতো এ দুনিয়ার জীবনকে আনন্দময় করতে। বাংলাদেশে আজ যারা ঘুষ খায়, সূদ খায়, ব্যভিচারি করে বা গর্ভপাত ঘটিয়ে নিজ সন্তান হত্যা করে -তাদের মত তারাও সেদিন সন্ত্রাস করতো, মদ খেতো ও ব্যভিচারি করতো। এমনকি নিজ সন্তানদেরকেও জীবন্ত করব দিত। যে দর্শনটি আরবদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল তার মূল উপাদানটি ছিল মানব জীবনের সঠিক পরিচিতি। কোথায় এ জীবনের শেষ ঠিকানা তা নিয়ে সম্যক ধারণা। তাদের চেতনায় কাজ করেছিল পরকালের ভয়। পরকালের ভয় তাদের চেতনা ও চরিত্রে আনে আমূল বিপ্লব। সে আমলে গ্রহ-নক্ষত্রের পরিচয় না জানলেও তারা নিজ জীবনের পরিচয় ও পরিণতিকে জেনেছিলেন অতি সঠিক ভাবেই। এবং সেটি জেনেছিলেন সেই মহান সত্ত্বা থেকে যিনি স্বয়ং এ জীবন ও জগতের স্রষ্টা। জেনেছিলেন তাঁর প্রেরীত মহান নবী (সা:) থেকে। প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের সাফল্যের মূল কারণ, মহান আল্লাহতায়ালা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান -যা তাদের মুক্তি দিয়েছিল জাহলিয়াত থেকে এবং দেখিয়েছিল আলোকিত পথ। উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণ কি এছাড়া সম্ভব?  

 

এ জীবন পরীক্ষাপর্ব 

যে দর্শনসুলভ প্রজ্ঞা মুসলিম জীবনের মোড় পাল্টে দেয় তা হলো, ইহকালীন এ জীবনখানি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় না। পার্থিব এ জীবন অন্তহীন এক জীবনের শুরুর পর্ব মাত্র। এ পর্বে কৃতকার্যতা ও পুরস্কার যেমন আছে, তেমনি ব্যর্থতা এবং শাস্তিও আছে। এবং পাশ ও ফেল নির্ধারণে লাগাতর পরীক্ষাও আছে। দুনিয়ার এ জীবন মূলত সেই পরীক্ষাকেন্দ্র। সে পরীক্ষা মৃত্যু অবধি নেওয়াটিই হলো -এ ইহকালীন জীবনের মূল লক্ষ্য। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরীক্ষার সমাপ্তি হয় বটে, তবে তাতে জীবনের সমাপ্তি ঘটে না। পরকালে শুরু হয় পরীক্ষায় পাশ বা ফেলের ফলাফল ভোগের পালা। মহান আল্লাহতায়ালার সে ঘোষনাটি এসেছে এভাবে: “আল্লাযী খালাকাল মাওতা ওয়াল হায়াতা লি ইয়াবলুয়াকুম আইয়োকুম আহসানা আমালা” -(সুরা মুলক, আয়াত-১)।” অর্থ: “তিনি মৃত্যু ও জীবনকে এ জন্য সৃষ্টি করেছেন যে তিনি পরীক্ষা করবেন তোমাদের মধ্যে কে আমলের দিক দিয়ে উত্তম।” বস্তুত মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠটি হলো পবিত্র কোর’আনের ঘোষিত এ হুশিয়ারি। এবং সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞা হলো, জীবনের প্রতি মুহুর্ত এ বোধ নিয়ে বাঁচা। এ বোধটুকু হৃদয়ে স্থান না পেলে জীবনে ব্যক্তির সকল জ্ঞানগরিমা, মেধা ও জানমালের বিনিয়োগ ব্যর্থ হতে বাধ্য। পরীক্ষার হলকে তখন নাট্যশালা, পানশালা বা কর্মশালা মনে হয়। মানুষ তখন মত্ত হয় ফূর্তিতে। কর্মজীবী, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী বা পেশাদার রূপে জীবনে সফল হওয়াটাই জীবনের মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়। উপার্জন, আনন্দ-উৎসব বা নিছক সময় কাটানোই তখন বাঁচবার মূল উদ্দেশ্য মনে হয়। এমন আত্মমগ্নতায় জানাই হয় না যে, এ জীবন একটি পরীক্ষা কেন্দ্র মাত্র। এবং অন্তহীন এক জীবন অপেক্ষা করছে পরীক্ষার পর। তখন গভীর অজ্ঞতা থেকে যায়, কিসে সফলতা এবং কিসে বিফলতা -সে বিষয়েও। এ পৃথিবী পৃষ্টে লক্ষাধিক নবী-রাসূল আগমনের মূল কারণটি মানুষকে কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান বা বাণিজ্য শেখানো ছিল না; বরং সেটি ছিল এ জীবনে যে পরম সত্যটি সবচেয়ে বড় কল্যাণটি দেয় -সে সত্যটি শেখাতে। তাদের কাজ ছিল জান্নাতের পথ দেখানো। মানুষ জাহান্নামের আগুণে যাবে কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান বা বাণিজ্যে ব্যর্থতার কারণে নয়, বরং সে পরম সত্যটিকে না জানার কারণে। সে সত্যকে জানাতে নাযিল হয়েছিল অন্যান্য আসমানি কিতাব। 

পরীক্ষা চলাকালে কেউ নাচগান, আমোদ-ফুর্তি করে না। অলস অবকাশে অনর্থক সময়ও কাটায় না। বরং পাায়খানা প্রশ্রাবের ন্যায় জরুরী কাজ আটকিয়ে রেখে পুরা সময়কে পরীক্ষার কাজে লাগায়। এ ভয়ে না জানি প্রশ্নপত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তখন প্রতি মুহুর্তের চেষ্টাটি হয়, পরীক্ষার খাতায় কি করে নাম্বার বাড়ানো যায়। সাহাবায়ে কেরাম এ জীবনকে পরীক্ষাপর্ব রূপে গ্রহন করেছিলেন বলেই তারা দিবারাত্র নেক আমলে ব্যস্ত থাকতেন। নেক আমলে তাড়াহুড়া ছিল তাদের সর্ব-অস্তিত্ব জুড়ে। পবিত্র কোরআনেও সেটিরই তাগিদ এসেছে এভাবে, “সা’রিয়ু ইলা মাগফিরাতিম মির রাব্বিকুম” -(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১৩৩)। অর্থ: “তাড়াহুড়া কর তোমাদের রব থেকে মাগফিরাত লাভে।” সুরা হাদিদে বলা হয়েছে, “সা’বেকু ইলা মাগফিরাতিম মির রাব্বিকুম” অর্থ: “তোমরা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করো তোমাদের রব থেকে মাগফিরাত লাভে।” তাড়াহুড়া এজন্য যে, পরীক্ষার শেষ ঘন্টা যখন তখন বীনা নোটিশে বেজে উঠতে পারে। তাই সন্যাসী সেজে সমাজ-সংসার, অর্থনীতি-রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, দাওয়াত ও জিহাদের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ ইসলামে নেই। পরীক্ষায় পাশে এমন কি খোদ নবীজী (সা:)কেও নামতে হয়েছে; তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। বার বার জিহাদের ময়দানেও তাঁকে হাজির হতে হয়েছে। এমনকি রণাঙ্গণে নিজে আহতও হয়েছেন। নবীজী (সা:)’র সে সূন্নত মেনে সাহাবায়ে কেরাম যেমন অবিরাম দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন, তেমনি রাজনীতি ও প্রশাসনেও নেমেছেন। জ্ঞানচর্চার পাশাপাশী জিহাদেও নেমেছেন। তারা কর্মময় ছিলেন জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে। রাতে না ঘুমিয়ে অভাবী মানুষ খুঁজেছেন। খলিফা হয়েও পিঠে আটার বস্তা নিয়ে গরীবের ঘরে ছুটেছেন। উটের পিঠে চাকরকে বসিয়ে নিজে রশি টেনেছেন। ইসলামের দাওয়াত নিয়ে পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী, মরুভূমি ও সাগর অতিক্রম করেছেন। যখন কাগজ-কলম আবিস্কৃত হয়নি তখনও তারা জ্ঞানচর্চায় ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

 

প্রতিটি সৃজনশীল কর্মই ইবাদত

ঈমানদারের কল্যাণধর্মী প্রতিটি কর্মই হলো ইবাদত। এগুলো হলো নেক আমল। এতে সঞ্চয় বাড়ে আখেরাতের এ্যাকাউন্টে।  প্রতিটি মুসলিম এভাবেই পরিনত হয় সৃষ্টিশীল কর্মের শক্তিশালী পাওয়ার হাউসে। মানুষ শুধু বই পড়ে শেখে না, শেখে কর্ম থেকেও। সে যেমন নিজে শেখে, তেমনি অন্যকেও শেখায়। কাজ করা, শেখা ও শেখনো যখন জনগণের সংস্কৃতিতে পরিণত হয় -তখন লাগাতর মূল্য সংযোজন হয় জনগণের জীবনে। মূল্য সংযোজন হয়, নানারূপ কৃষি ও খনিজ পণ্যের উপরও। এমন ঈমানদারদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বিপুল সমৃদ্ধি আসে দেশের অর্থনীতিতে। তখন বাড়ে দেশের জিডিপি। প্রকৃত ঈমানদারের এ সৃষ্টশীলতা বলিষ্ঠ ভাবে তুলে ধরেছেন আল্লামা ইকবাল তার ফার্সি কবিতায়। লিখেছেন, “হরকে উ’রা লিয্যাতে তাখলিক নিস্ত, পিশে মা জু’জে কাফির ও যিনদিক নিস্ত।’ অর্থ: “যার মধ্যে নাই সৃজনশীলতা, আমাদের কাছে সে কাফির ও নাস্তিক ভিন্ন অন্য কিছু নয়।” পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “ওয়া লি কুল্লি দারাজাতিন মিম্মা আমেলু” অর্থ: “এবং মানুষের সকল মর্যাদা নির্ধারিত হবে তার কর্মের মধ্য দিয়ে।” অর্থাৎ যার জীবনে কর্ম নেই (আল্লাহর কাছে) তার মর্যাদাও নেই। তাই কর্মহীন পরগাছা জীবন দ্বীনদারি নয়, এটি ঈমানহীনতা। মুসলিম তো মহান আল্লাহতায়ালার নামের যিকর করবে কর্মের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রেখে, আলস্যে সময় কাটিয়ে নয়। উত্তম চাষ ও বীজ ছিটানোর পরই রেযেক বৃদ্ধিতে সে তার মহান প্রভুর কাছে রহমত চাইবে। প্রকৃত ঈমানদার তাই মহান আল্লাহর কাছে বিজয় চায় জিহাদের ময়দানে দাঁড়িয়ে, ঘরে বা মসজিদে বসে নয়। কারণ, সাহায্যদানের পূর্বে মহান আল্লাহতায়ালা বান্দাহর নিজের প্রস্তুতি বা বিনিয়োগ কতটুকু -সেটি দেখতে চান।

মুসলিমগণ তখনই শত্রুর বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছেন যখন সে লক্ষ্যে নিজেদের প্রাণ কোরবানীতে দু’পায়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মুসলিমদের এমন প্রস্তুতি দেখে মহান আল্লাহতায়ালা তাদের দোয়ার জবাব দিয়েছিলেন ফেরেশতা পাঠিয়ে। জিহাদ ছেড়ে জায়নামাযে দাঁড়িয়ে মুসলিমগণ যখন বিজয় চাওয়া শুরু করেছে –তখন থেকেই পরাজয় শুরু হয়েছে। আজ মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দোয়া আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, কাশ্মির ও চেচনিয়ার মুসলিমদেরকে জালেমদের হাত থেকে বাঁচাতে যে ব্যর্থ হচ্ছে -তার কারণ তো এটি। মুসলিমের যুদ্ধবিগ্রহ, জ্ঞানার্জন, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ, শিক্ষকতা, চিকিৎস্যকতা, লেখালেখি আদৌ দুনিয়াদারি নয় বরং এর প্রতিটিই হলো নেক আমল বা ইবাদত। পথের কাঁটা সরানো যেখানে উত্তম নেক আমল, সেখানে গলার কাঁটা এবং সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বের নানা কোন থেকে কাঁটা সরানো কি দুনিয়ারি হতে পারে? ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরবের বিরান মরুভূমিতে যে বিশ্ব-শক্তি জন্ম নিয়েছিল সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে আজও সেটিই সর্বাধিক গৌরবের। সেটি সম্ভব হয়েছিল কয়েক লাখ সৃষ্টিশীল মানুষের কারণে। তাদের একজনের সৃষ্টির সামর্থ্য বাংলাদেশের একটি জেলাতেও সৃষ্টি হয়নি। তারা শুধু সম্পদেই সমৃদ্ধি আনেননি, বিপুল সমৃদ্ধি এনেছিলেন জীবনদর্শন তথা ফিলোসফিতে। আজকের দেড়শত কোটি মুসলমানের অর্জন সে তুলনায় অতি তুচ্ছ। দর্শনই দেয় দূর্নীতির বিরুদ্ধে ইম্যুউনিটি বা প্রতিরোধশক্তি। দেয় চারিত্রিক বল। নির্মাণ করে নৈতিক মেরুদন্ড। নিছক উৎপাদন বাড়িয়ে দর্শনের এ দারিদ্র্য দূর হয়না। অর্জিত হয় না চারিত্রিক সুস্থ্যতা।

 

মূল ব্যর্থতাটি শিক্ষাখাতে

বাংলাদেশ কৃষি ও শিল্পের অঙ্গণে উৎপাদন বাড়লেও ডুবছে দূর্নীতির প্লাাবনে। ফলে ধ্বসেছে দেশবাসীর নৈতিক মেরুদণ্ড। নৈতিক মেরুদণ্ড কৃষি ক্ষেত বা কল-কারখানাতে নির্মিত হয় না, নির্মিত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বই, পত্র-পত্রিকা, মসজিদ-মাদ্রাসা এবং বুদ্ধিজীবীদের হাতে। কিন্তু বাংলাদেশে জ্ঞানার্জনের সে কাজটিই হয়নি। অথচ ইসলামে জ্ঞানার্জন ফরয করার মূল উদ্দেশ্যই হলো, পুষ্টি পাবে জনগণের চেতনা, দর্শন ও ঈমান। তখন ব্যক্তি পাবে তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয়। জ্ঞান ছাড়া ব্যক্তির রুহ যেমন পুষ্টি পায় না, তেমনি তাঁর ঈমানও বাঁচে না। নবীপাক (সা:) এজন্যই এক মুহুর্তের জ্ঞানার্জনকে সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। জ্ঞানীর কলমের কালীকে শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র বলেছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়া এজন্যই শ্রেষ্ঠ সাদকায়ে জারিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের এটিই হলো সবচেয়ে ব্যর্থ খাত।

সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি রাস্তাঘাট, প্রাসাদ ও কলকারখানা গড়া নয়; সেটি জনগণকে জাহান্নামে আগুণ থেকে বাঁচানো। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ নাই। এ কাজ নবী-রাসূলদের। তাদের অবর্তমানে এ কাজ ইসলামী রাষ্ট্রের। কাউকে হাজার কোটি টাকা দান করে এ কল্যাণটি করা যায় না। এ কাজটি সুচারু ভাবে করতেই নবীজী (সা:) রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নিজে হাতে নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, জনগণকে জাহন্নামের আগুণ থেকে বাঁচানোর কাজে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি হলো রাষ্ট্র। এ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি শয়তান ও তার অনুসারিদের হাতে পড়লে বিপদটি ভয়াবহ রূপ নেয়। তখন মহল্লায় মহল্লায় মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও সে বিপদ থেকে বাঁচা যায় না। রাষ্ট্র হলো সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। নবীজী (সা:) ও খোলাফায়ে রাশেদা রাষ্ট্রকে যেভাবে সে লক্ষ্যে ব্যবহার করেছেন -সেটিই প্রতি যুগের মুসলিমদের জন্য শ্রেষ্ঠ অনুকরণীয় সূন্নত। মুসলিমদের আজকের পরাজয়ের মূল কারণ, তাদের জীবনে সে সূন্নত বেঁচে নাই।

রাষ্ট্র ভোটডাকাত, চোর-ডাকাত ও নানারূপ দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বৃত্তায়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তখন জনগণকে জাহান্নামের পথে টানে। বাংলাদেশে তো সেটিই হচ্ছে। ফলে দেশের চাষিরা ও শ্রমিকেরা ক্ষেতে খামারে ও কারখানায় যতটুকু সৃষ্টিশীলতা এনেছে, দেশের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষকেরা তা দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলোতে আনতে পারিনি। অথচ দেশে মসজিদ-মাদ্রাসা ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় দেশে প্রচুর বেড়েছে। বেড়েছে শিক্ষিতের হারও। কিন্তু জনমন সমৃদ্ধ হয়নি সুস্থ্য দর্শনে। বাড়িনি চরিত্র। প্রশ্ন হলো, যে শিক্ষা দূর্নীতি, সন্ত্রাস ও পাপাচার বাড়ায় তাকে কি শিক্ষা বলা যায়? বিষপানে দেহের মৃত্যু ঘটে। কুশিক্ষায় মৃত্যু ঘটে বিবেক ও ঈমানের। ফলে অতি নাশকতা মূলক অপরাধ হলো কুশিক্ষা দান। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষালয়গুলোতে সে অপরাধকর্মই হচ্ছে। এটি তো পাপের বাণিজ্য। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষার নামে সে পাপের বাণিজ্যই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

অথচ ইসলামের নিজে শেখা যেমন ইবাদত, তেমনি ইবাদত হলো অন্যকে শেখানো। এবং উত্তম দান হলো জ্ঞানদান।  নবীজী (সা:)’র হাদীস: “যারা কোর’আন শিখে এবং অন্যকে শেখায় তারাই শ্রেষ্ঠ মানুষ।” তিনি আরো বলেছেন, যারা জ্ঞানার্জনের পথে ঘরে থেকে বের হয় তাদের উদ্দেশ্যে শুধু ফিরেশতারা নয়, অন্য জীবেরাও দোয়া করে। শিক্ষার গুরুত্ব মুসলিমগণ বুঝেছিল বলেই মুসলিমগণ তাদের গৌরবকালে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শিক্ষিত জাতি ছিল। আর আজ অশিক্ষায় ও কুশিক্ষায় কাফেরদেরকেও তারা হারিয়ে দিয়েছে। এবং সে ব্যর্থতার উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। দেশটির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জীবনকে রঙ্গশালা রূপে ভাবতে শিখিয়েছে। উৎপাদন বাড়িয়েছে অসংখ্য দুর্বৃত্তের যারা দখল জমিয়েছে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ সর্বক্ষেত্রে। ফলে ব্যর্থতা বেড়েছে সর্বস্তরে।

প্রচণ্ড ভ্রষ্টতার শিকার দেশের আলেম, ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মী, পীর, সুফি, মসজিদের ইমামগণও। আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার রাজনীতি ইসলামে ফরয। শরিয়ত ভিন্ন অন্য কোন আইন মেনে বিচার করা শতভাগ কুফরি। এটি জাহান্নামের পথ। অথচ সে কুফরি বিচার ব্যবস্থাই বাংলাদেশে বিজয়ী। অথচ ইসলামপন্থীদের মাঝেও সে কুফরি নির্মূলের জিহাদ নাই। নবীজী (সাঃ)র এমন কোন সাহাবী পাওয়া যাবে না যারা জনগণকে জাহান্নামের আগুণ থেকে মুক্তি দিতে অর্থদান, শ্রমদান এমনকি জীবন দানে জিহাদে নামেননি। অথচ আজ বহু পীর, আলেম ও মোল্লা-মৌলবী সে রাজনীতিকে দুনিয়াদারী বলছে। এবং দ্বীনদারী বলছে ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তদের সাথে আপোষ ও সহযোগিতাকে। দেশ পরিণত হয়েছে জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার বাহনে। এমূহুর্তে বাঁচতে হলে জাতিকে ফিরিয়ে নিতে জীবনের মূল পাঠের দিকে -যা আল্লাহপাক নবীদের মারফত শিখিয়েছেন। সেটি হলো পবিত্র কোর’আনে বর্ণীত সিরাতুল মুস্তাকীমের পথ। আত্মাবিনাশী আরবরা এ পথেই বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল। বাংলাদেশের সামনেও এ ছাড়া ইজ্জত নিয়ে বাঁচার ও জান্নাতে পৌঁছার ভিন্ন কোন পথ খোলা আছে কি? ১ম সংস্করণ ১০/১০/২০০৪; ২য় সংস্করণ ১৫/০২/২০২১।

 




ভারতের যুদ্ধ এবং অরক্ষিত বাংলাদেশ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

লক্ষ্য শুধু স্বার্থ শিকার

১৯৭১’য়ের পর থেকে বাংলাদেশের ভূমি, পানি, সম্পদ ও জনগণ যে কতটা অরক্ষিত সেটি বুঝতে কি প্রমাণের প্রয়োজন আছে? ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে যে দাবীগুলো ভারতীয় নেতাগণ মুখে আনতে সাহস পায়নি -সেগুলি মুজিবামলে আদায় করে ছেড়েছে। পাকিস্তান আমলে তারা বেরুবাড়ির দাবী করেনি, কিন্তু একাত্তরে শুধু দাবিই করেনি, ছিনিয়েও নিয়েছে। এবং সেটি মুজিবের হাত দিয়ে। প্রতিদানে কথা ছিল তিন বিঘা করিডোর বাংলাদেশকে দিবে। কিন্তু ভারত সেটি দিতে দীর্ঘকাল গড়িমসি করেছে। বরং আঙরপোতা, দহগ্রামের ন্যায় বহু বাংলাদেশী ছিটমহলের বাসিন্দারা এখনও ভারতের কাছে জিম্মি। ভারত সেগুলিতে যাওয়ার করিডোর দিতে গড়িমসি করলে কি হবে, করিডোর নিয়েছে বাংলাদেশের পেটের মধ্য দিয়ে। তারা এখন পূর্ব ভারতের প্রদেশগুলিতে যাবে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। এ সুযোগ নিয়েছে প্রতিবেশীর প্রতি পারস্পরিক সহযোগিতার দোহাই দিয়ে। অথচ এমন সহযোগিতা কোন কালেই ভারত প্রতিবেশীকে দেয়নি। ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার তার পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগের স্বার্থে করিডোর চেয়েছিল। সেটিকে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওয়ারলাল নেহেরু একটি অদ্ভুদ দেশের অদ্ভুত আব্দার বলে মস্করা করেছিলেন। বলেছিলেন, ভারতের নিরাপত্তার প্রতি এমন ট্রানজিট হবে মারাত্মক হুমকি। শুধু তাই নয়, একাত্তরে ভারতীয় ভূমির উপর দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের পিআইয়ের বেসামরিক বাণিজ্য বিমান উড়তে দেয়নি। এমন কি শ্রীলংকার উপর চাপ দিয়েছিল যাতে পাকিস্তানী বেসামরিক বিমানকে কোন জ্বালানী তেল না দেয়।

ভারতের একই রূপ আচরণ বাংলাদেশের সাথে। ১৯৭১’য়ের যুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দরে কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়। ফলে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটছিল বন্দরে মালামাল বোঝাই ও উত্তোলনের কাজে। এতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। দেশে তখন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। ছিল নিতান্তই দুঃসময়। বাংলাদেশের জন্য চট্রগ্রাম বন্দরটিই ছিল মূল বন্দর। এমন দুঃসময়ে অন্য কেউ নয়, ভারতের অতি বন্ধুভাজন শেখ মুজিব অনুমতি চেয়েছিলেন অন্ততঃ ৬ মাসের জন্য কোলকাতার বন্দর ব্যবহারের। তখন ভারত সরকার জবাবে বলেছিল বাংলাদেশকে সে সুবিধা দেয়া যাবে না। এটিকেও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করেছিল। প্রতিবেশী সুলভ সহযোগিতার বুলি তখন নর্দমায় স্থান পেয়েছিল। এমনকি শেখ মুজিবকেও ভারত আজ্ঞাবহ এক সেবাদাস ভৃত্যের চেয়ে বেশী কিছু ভাবেনি। ভৃত্যকে দিয়ে ইচ্ছামত কাজ করিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু তার আব্দারও কি মেনে নেওয়া যায়?

প্রতিবেশী দেশের সাথে ভারতের বৈরী আচরনের আরো কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। প্রতিবেশী নেপাল ও ভূটানের সাথে বাণিজ্য চলাচল সহজতর করার জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট চেয়েছিল বাংলাদেশ। নেপাল চেয়েছিল মংলা বন্দর ব্যবহারের লক্ষ্যে ভারতের উপর দিয়ে মালবাহি ট্রাক চলাচলের ট্রানজিট। ভারত সে দাবি মানেনি। অথচ সে ভারতই চায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রায় ছয় শত মাইলের ট্রানজিট। ফলে বুঝতে কি বাঁকি থাকে, পারস্পারিক সহযোগিতা বলতে ভারত যেটি বুঝে সেটি হলো যে কোন প্রকারে নিজের সুবিধা আদায়। প্রতিবেশীকে সুবিধা দেয়া নয়। কথা হলো, বাংলাদেশের জন্য ১৭ কিলোমিটারের ট্রানজিট যদি ভারতের জন্য নিরাপত্তা-সংকট সৃষ্টি করে তবে সে যুক্তি তো বাংলাদেশের জন্যও খাটে। তাছাড়া বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ভারতের সৃষ্ট ষড়যন্ত্র নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে মুজিব নিহত হওয়ার পর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্ব অনেক আওয়ামী লীগ ক্যাডার ভারতে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের সীমান্তে তারা সন্ত্রাসী হামলাও শুরু করে। তাদের হামলায় বহু বাংলাদেশী নিরীহ নাগরিক নিহতও হয়। ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থাগুলি তাদেরকে যে শুধু অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে তাই নয়, নিজ ভূমিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারেরও পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগের টিকেট পিরোজপুর থেকে দুই-দুইবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতার ভারতে গিয়ে স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন গড়ে তুলেছে সত্তরের দশক থেকেই। ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত এসব সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া দূরে থাক -তাদেরকে নিজভূমি ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দিয়েছে। এসব কি প্রতিবেশী-সুলভ আচরণ? অথচ সে ভারতই দাবি তুলেছে আসামের উলফা নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার। হাসিনা সরকার তাদেরকে ভারতের হাতে তুলেও দিচ্ছে। অথচ কাদের সিদ্দিকী ও চিত্তরঞ্জন সুতারের ন্যায় উলফা নেতাদের ভাগ্যে বাংলাদেশের মাটিতে জামাই আদর জুটেনি। ঘাঁটি নির্মান, সামরিক প্রশিক্ষণ ও বাংলাদেশের ভূমি থেকে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনার সুযোগও জুটেনি। বরং জুটেছে জেল।

 

ষড়যন্ত্র বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার

বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের করিডোর যে কতটা আত্মঘাতি এবং কি ভাবে সেটি বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত করবে -সে বিষয়টিও ভাববার বিষয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত জুড়ে মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম -ভারতের এ সাতটি প্রদেশ। এ রাজ্যগুলির জন্য এমন কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট রয়েছে যা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক). সমগ্র এলাকার আয়তন বাংলাদেশের চেয়েও বৃহৎ অথচ অতি জনবিরল। দুই) সমগ্র এলাকাটিতে হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ট। ফলে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ নিয়ে সমগ্র উপমহদেশে যে রাজনৈতিক সংঘাত ও উত্তাপ এ এলাকায় সেটি নেই। ফলে এখানে বাংলাদেশ পেতে পারে বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী যা তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্ঠিত বাংলাদেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব -এ দুই দিকের সীমান্ত অতি সহজেই নিরাপত্তা পেতে পারে এ এলাকায় বন্ধু সুলভ কোন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে। অপরদিকে নিরাপত্তা চরম ভাবে বিঘ্নিত হতে পারে যদি কোন কারণে তাদের সাথে বৈরীতা সৃষ্টি হয়। তাই এ এলাকার রাজনীতির গতিপ্রকৃতির সাথে সম্পর্ক রাখাটি বাংলাদেশের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান যেমন আফগানিস্তানের রাজনীতি  থেকে হাত গুটাতে পারে না তেমনি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয় এ বিশাল এলাকার রাজনীতি থেকে দূরে থাকা। যেহেতু এ এলাকায় চলছে প্রকাণ্ড এক জনযুদ্ধ তাই তাদের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি করা হবে আত্মঘাতি।  অথচ ভারত চায়, বাংলাদেশকে তাদের বিরুদ্ধে খাড়া করতে। তিন). একমাত্র ব্রিটিশ আমল ছাড়া এলাকাটি কখনই ভারতের অন্তর্ভূক্ত ছিল না, এমনকি প্রতাপশালী মোঘল আমলেও নয়। হিন্দু আমলে তো নয়ই। মুর্শিদ কুলি খাঁ যখন বাংলার সুবেদার তথা গভর্নর, তখন তিনি একবার আসাম দখলের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সে দখলদারি বেশী দিন টিকিনি। আসামসহ ৭টি প্রদেশের ভূমি ভারতভূক্ত হয় ব্রিটিশ আমলের একেবারে শেষ দিকে। ভারতীয়করণ প্রক্রিয়া সেজন্যই এখানে ততটা সফলতা পায়নি। এবং গণভিত্তি পায়নি ভারতপন্থি রাজনৈতিক দলগুলি। চার). সমগ্র এলাকাটি শিল্পে অনুন্নত এবং নানাবিধ বৈষম্যের শিকার। অথচ এলাকাটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। ভারতের সিংহভাগ তেল, চা, টিম্বার এ এলাকাতে উৎপন্ন হয়। অথচ চা ও তেল কোম্মানীগুলোর হেড-অফিসগুলো কোলকাতায়। কাঁচামালের রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানগুলিও এলাকার বাইরের। ফলে রাজস্ব আয় থেকে এ এলাকার রাজ্যগুলি বঞ্চিত হচ্ছে শুরু থেকেই। শিল্পোন্নত রাজ্য ও শহরগুলো অনেক দূরে হওয়ায় পণ্যপরিহন ব্যয়ও অধিক। ফলে সহজে ও সস্তায় পণ্য পেতে পারে একমাত্র উৎস বাংলাদেশ থেকেই। ভারতকে করিডোর দিলে সে বাণিজ্যিক সুযোগ হাতছাড়া হতে বাধ্য। পাঁচ) যুদ্ধাবস্থায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হল নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্ত এ এলাকায় সে সুযোগ ভারতের নেই। ভারতের সাথে এ এলাকার সংযোগের একমাত্র পথ হল পার্বত্যভূমি ও বৈরী জনবসতি অধ্যুষিত এলাকার মধ্য অবস্থিত ১৭ কিলোমিটার চওড়া করিডোর। এ করিডোরে স্থাপিত রেল ও সড়ক পথের কোনটাই নিরাপদ নয়। ইতিমধ্যে গেরিলা হামলায় শত শত সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির সেখানে প্রাণনাশ হয়েছে। ছয়). নৃতাত্বিক দিক দিকে এ এলাকার মানুষ মাঙ্গোলিয়। ফলে মূল ভারতের অন্য যে কোন শহরে বা প্রদেশে পা রাখলেই একজন নাগা, মিজো বা মনিপুরি চিহ্নিত হয় বিদেশী রূপে। তারা যে ভারতী নয় সেটি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য এ ভিন্নতাই যথেষ্ট। এ ভিন্নতার জন্যই সেখানে স্বাধীন হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ চলছে বিগত প্রায় ৬০ বছর ধরে। ভারতীয় বাহিনীর অবিরাম রক্ত ঝরছে এলাকায়। বহু চুক্তি, বহু সমঝোতা, বহু নির্বাচন হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতার সে যুদ্ধ না থেমে বরং দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। ফলে বাড়ছে ভারতের অর্থনৈতিক রক্তশূণ্যতা। সমগ্র এলাকা হয়ে পড়েছে ভারতের জন্য ভিয়েতনাম। আফগানিস্থানে একই রূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল রাশিয়ার জন্য। সে অর্থনৈতিক রক্তশূণ্যতার কারনে বিশাল দেহী রাশিয়ার মানচিত্র ভেঙ্গে বহু রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। ভারত রাশিয়ার চেয়ে শক্তিশালী নয়। তেমনি স্বাধীনতার লক্ষ্যে এ এলাকার মানুষের অঙ্গিকার, আত্মত্যাগ এবং ক্ষমতাও নগণ্য নয়। ফলে এ সংঘাত থামার নয়। ভারত চায় এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু ভারতের কাছে সংকট মুক্তির সে রাস্তা খুব একটা খোলা নাই।

ভারত করিডোর নিচ্ছে পণ্য-পরিবহন ও আভ্যন্তরীণ যোগাযোগের দোহাই দিয়ে। বিষয়টি কি আসলেই তাই? মেঘালয়, ত্রিপুরা, অরুনাচল, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের সমুদয় জনসংখ্যা ঢাকা জেলার জনসংখ্যার চেয়েও কম। এমন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির জন্য পণ্যসরবরাহ বা লোক-চলাচলের জন্য এত কি প্রয়োজন পড়লো যে তার জন্য অন্য একটি প্রতিবেশী দেশের মধ্য দিয়ে করিডোর চাইতে হবে? সেখানে এক বিলিয়ন ডলার বিণিয়োগ করতে হবে? যখন তাদের নিজের দেশের মধ্য দিয়েই ১৭ কিলোমিটারের প্রশস্ত করিডোর রয়েছে। বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলো দেশের আভ্যন্তরীণ সড়কের দুরবস্থার কথা জানিয়ে এতকাল পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছে। এবার ভারত বলছে তারা সড়কের উন্নয়নে বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন ডলার লোন দিতে রাজী। এবার বাংলাদেশ যাবে কোথায়? অথচ এই এক বিলিয়ন ডলার দিয়ে ভারত তার ১৭ মাইল প্রশস্ত করিডোর দিয়ে একটি নয়, ডজনের বেশী রেল ও সড়ক পথ নির্মাণ করতে পারতো। এলাকায় নির্মিত হতে পারে বহু বিমান বন্দর। ভারতের সে দিকে খেয়াল নাই, দাবী তুলেছে বাংলাদেশের মাঝ খান দিয়ে যাওয়ার পথ চাই-ই। যেন কর্তার তোগলোকি আব্দার। গ্রামের রাস্তা ঘুরে যাওয়ায় রুচি নেই, অন্যের শোবার ঘরের ভিতর দিয়ে যেতেই হবে। গ্রামের ঝোপঝাড়ের পাশ দিয়ে রাস্তায় পথ চলতে অত্যাচারি কর্তার ভয় হয়। কারণ তার কুর্মের কারণে শত্রুর সংখ্যা অসংখ্য। না জানি কখন কে হামলা করে বসে। একই ভয় চেপে বসেছে ভারতীয়দের মাথায়। সমগ্র উত্তরপূর্ব ভারতের স্বাধীনতাকামী জনগণের কাছে তারা চিহ্নিত হয়েছে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী রূপে। তারা চায় ভারতীয় শাসন থেকে আশু মুক্তি। এ লক্ষে জানবাজি রেখে তারা যুদ্ধে নেমেছে। ফলে ভারতের জন্য অবস্থা অতি বেগতিক হয়ে পড়েছে। একদিকে কাশ্মীরের মুক্তিযুদ্ধ দমনে যেমন ছয় লাখেরও বেশী ভারতীয় সৈন্য অন্তহীন এক যুদ্ধে আটকা পড়ে আছে তেমনি তিন লাখের বেশী সৈন্য যুদ্ধে লিপ্ত উত্তর-পূর্ব এ ভারতে। যুদ্ধাবস্থায় অতিগুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে যতই এ যুদ্ধ তীব্রতর হচ্ছে ততই জোরদার হচ্ছে এ করিডোরের দাবী। ভারত তাই দিশেহারা। বাংলাদেশে স্বৈরাচারি বা নির্বাচিত যে সরকাররই আসুক না কেন তারা তাদের যে কাছে যে দাবীটি অতি জোরালো ভাবে পেশ করছে তা হলো এই করিডোরের দাবী। এ বিষয়টি কি বুঝতে আদৌ বাঁকি থাকে, ভারত করিডোর চাচ্ছে নিতান্তই সামরিক প্রয়োজনে? আর বাংলাদেশের জন্য শংকার কারণ মূলত এখানেই। ভারত তার চলমান রক্তাত্ব যুদ্ধে বাংলাদেশকেও জড়াতে চায়। এবং কিছু গুরুতর দায়িত্বও চাপাতে চায়। কারো ঘরের মধ্য দিয়ে পথ চললে সে পথে কিছু ঘটলো সহজেই সেটির দায়-দায়িত্ব ঘরের মালিকের ঘাড়ে চাপানো যায়। তার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলা ঠুকা যায়। কিন্তু বিজন মাঠ বা ঝোপঝাড়ের পাশে সেটি ঘটলে আসামী খুঁজে পাওয়াই দায়। ভারত এজন্যই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ৬ শত মাইলের করিডোর এবং সে করিডোরের নিরাপত্তার দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশের কাঁধে চাপাতে চায়। তখন এ পথে ভারতীয়দের উপর হামলা হলে বাংলাদেশকে সহজেই একটি ব্যর্থ দেশ এবং সে সাথে সন্ত্রাসী দেশ রূপে আখ্যায়ীত করে আন্তর্জাতিক মহলে নাস্তানাবুদ করা যাবে। সে সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় সামরিক হস্তক্ষেপকে ন্যায়সঙ্গত বলার বাহানাও পাওয়া যাবে।

 

ভারতীয়দের ইসলামভীতি ও আগ্রাসন                       

ভারতীয়দের মুসলিম বিরোধী রাজনীতির মূলে হলো হিন্দুমনের প্রচণ্ড মুসলিম ভীতি। এরূপ মুসলিম ভীতির কারণে ভারতের ২০ কোটি মুসলিমকে তারা বন্ধু ভাবতে পারে না। এমন এক ভীতির কারণেই তাদেরকে ভারতীয় নাগরিক রূপে পূর্ণ নাগরিক অধিকার দিতে রাজী নয়। প্রচণ্ড মুসলিম ভীতির কারণেই দেশটিতে জন্ম দিয়েছে যেমন আর. এস. এস’য়ের মত জঙ্গি সংগঠন। বহু লক্ষ আর. এস. এস ক্যাডারকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয় মুসলিম নির্মূলে অংশ নেয়ার লক্ষ্যে। সব সময়াই মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। মুসলিম ভীতির সে ভারতীয় রাজনীতির প্রকাশটি শুধু ভারতীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধেই নয়, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও কাশ্মীরী মুসলিমদের বিরুদ্ধেও। সে ভীতিরই প্রকাশ ঘটে ভারতে মুসলিম নির্মূলের অসংখ্য দাঙ্গা, কাশ্মীরের গণহত্যা এবং পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বিরোধী ভারতীয় নীতিতে। ভারত কি জানে না, ঘৃণা শুধু ঘৃণাই জন্ম দিতে পারে? এবং প্রতিটি ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া আছে? মুসলিম বিরোধী ভারতীয় নীতির কারণেই উপমহাদেশের মুসলিমদের মনে জন্ম নিয়েছে ভারত বিরোধী তীব্র ঘৃণা। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে ভারতীয় যানবাহন চলা শুরু হলে সেগুলির উপর হামলার সম্ভাবনা কি কম?

ভারতী বাহিনী কাশ্মীরের মুসলিমদের উপর নিষ্ঠুর বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ ৬০ বছর যাবত। প্রায় এক লাখ কাশ্মীরীকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে, হাজার হাজার নারী হয়েছে ধর্ষিতা। এখনও সে হত্যাকান্ড ও ধর্ষণ চলছে অবিরাম ভাবে। ১৯৪৮ সালে অগ্রসর মুসলিম মুজাহিদদের হাতে শ্রীনগর শহরের পতন হওয়া থেকে বাঁচাতে জাতিসংঘের কাছে ভারত সরকার ওয়াদা করেছিল কাশ্মীরীদের ভাগ্য নির্ধারণে সেখানে গণভোট অনুষ্ঠিত করার অনুমতি দিবে। জাতিসংঘ নিরাপত্ত পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিও নেয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু ভারত সে প্রতিশ্রুতি রাখেনি। সেটি নিছক গায়ের জোরে। এভাবে কাশ্মীরীদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধের পথে। অপর দিকে ভারত জুড়ে মুসলিম হত্যা, ধর্ষণ, ঘরবাড়ীতে আগুণ, এমনকি মসজিদ ভাঙ্গা হয় অতি ধুমধামে ও উৎসবভরে। অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার কাজ হয়েছে হাজার পুলিশের সামনে দিন-দুপুরে। হাজার হাজার সন্ত্রাসী হিন্দুদের দ্বারা ঐতিহাসিক এ মসজিদটি যখন নিশ্চিহ্ন হচ্ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও, বিরোধী দলীয় নেতা বাজপেয়ী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ সম্ভবতঃ আনন্দ ও উৎসবভরে ডুগডুগি বাজাচ্ছিলেন। এটি ছিল বড় মাপের একটি ঐতিহাসিক অপরাধ। অথচ এ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ভারত সরকারের কোন পুলিশ কোন অপরাধীকেই গ্রেফতার করেনি। আদালতে কারো কোন জেল-জরিমানাও হয়নি। ভাবটা যেন, সেদেশে কোন অপরাধই ঘটেনি। ভারতীয়দের মানবতাবোধ ও মূল্যবোধের এটিই প্রকৃত অবস্থা। দেশটিতে দাঙ্গার নামে হাজার হাজার মুসলিমকে জ্বালিয়ে মারার উৎসব হয় বার বার। সাম্প্রতিক কালে আহমেদাবাদে যে মুসলিম গণহত্যা হল সংখ্যালঘূদের বিরুদ্ধে তেমন কান্ড পাকিস্তানের ৭০ বছরের জীবনে একবারও হয়নি। বাংলাদেশের ৫০ বছরের জীবনেও হয়নি।

কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আযাদ লিখেছিলেন, ‘‘আফ্রিকার কোন জঙ্গলে কোন মুসলিম সৈনিকের পায়ে যদি কাঁটাবিদ্ধ হয় আর সে কাঁটার ব্যাথা যদি তুমি হৃদয়ে অনুভব না কর তবে খোদার কসম তুমি মুসলিম নও।” –(সুত্র: মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রচনাবলী, প্রকাশক: ইসলামী ফাউন্ডেশন, ঢাকা)। এমন চেতনা মাওলানা আবুল কালাম আযাদের একার নয়, এটিই ইসলামের বিশ্ব-ভাতৃত্বের কথা। যার মধ্যে এ চেতনা নাই তার মধ্যে ঈমানও নাই। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে যেমন সেক্যুলারিজমের জোয়ারে ভাসা ভারতপন্থী বহু ক্যাডার আছে, তেমনি প্যান-ইসলামের চেতনায় উজ্জিবীতত বহু লক্ষ মুসলিমও আছে। করিডোরের পথে সাক্ষাৎ চোখের সামনে তথা হাতের সামনে মুসলিম হত্যাকারি ও মসজিদ ধ্বংসকারি ভারতীয় সৈনিকদের কাছে পেয়ে এদের কেউ কেউ যে তাদের উপর বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়বে না সে গ্যারান্টি কে দেবে? তাছাড়া ১৯৪৭ সালে বাংলার মুসলিমগণ যে স্বাধীন পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তা নিজ বাংলার বাঙালী হিন্দুদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নয়, বরং অবাঙালী মুসলিমদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে। সে চেতনা ছিল প্যান ইসলামের। সেটি কি এতটাই ঠুনকো যে আওয়ামী বাকশালীদের ভারতমুখি মিথ্যা প্রচারনায় এত সহজে মারা মরবে? চেতনাকে শক্তির জোরে দাবিয়ে রাখা যায়, হত্যা করা যায় না। আর ইসলামি চেতনাকে তো নয়ই। ভারত সেটি জানে, তাই বাংলাদেশ নিয়ে তাদের প্রচণ্ড ভয়।

 

অধিকৃত বাংলাদেশ ও আরোপিত যুদ্ধ

অধিকৃত দেশের নাগরিক ও স্বাধীন দেশের নাগরিক –উভয় নাগরিকদের সাথে আচরণ কখনোই একই রূপ হয় না। বাংলাদেশকে কি ভারত স্বাধীন দেশ মনে করে? স্বাধীন দেশ মনে করলে বাংলাদেশীদের সাথে ভারতের শাসক ও সৈনিকদের আচরণ কি কখনো এতটা ঔদ্ধত্যপূর্ণ হতো? প্রতি বছরে বহু শত বাংলাদেশী নাগরিককে ভারতীয় বর্ডার সিকুরিটি ফোর্স তথা বি.এস.এফ হত্যা করছে। তারকাটার বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা হয় তাদের লাশ। এবং এর কোন প্রতিকার কোন বাংলাদেশী পায়নি। নিরীহ মানুষের এমন হত্যাকান্ড বিএসএফ পাকিস্তান সীমান্তে বিগত ৬০ বছরেও ঘটাতে পারিনি। এমনকি নেপাল বা ভূটান সীমান্তেও হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভারত সরকারের কাছে যে কতটা মূল্যহীন ও তুচ্ছ এবং দেশের জনগণ যে কতটা অরক্ষিত -সেটি বোঝানোর জন্য এ তথ্যটিই কি যথেষ্ট নয়? বহুবার তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়েক কিলোমিটার ঢুকে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। ইচ্ছামত গরুবাছুড়ও ধরে নিয়ে গেছে। বাঁধ দিয়ে সীমান্তের ৫৪টি যৌথ নদীর পানি তুলে নিয়েছে বাংলাদেশের মতামতের তোয়াক্কা না করেই। ফারাক্কা নির্মাণ করেছে এবং পদ্মার পানি তুলে নিয়েছে এক তরফা ভাবেই। টিপাইমুখ বাধ দিয়ে সুরমা ও কুশিয়ারার এবং তিস্তার উপর উজানে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশকে পানিশূণ্য করার ষড়যন্ত্র করছে। এদের মুখে আবার প্রতিবেশী মূলক সহযোগিতার ভাষা?

ভারতের আগ্রাসী ভূমিকার কারণেই বাংলাদেশের ঘরে ঘরে জন্ম নিয়েছে ভারতবিরোধী চেতনা। এমন চেতনাকে নিজের নিরাত্তার জন্য ভারত বিপদজনক মনে করে। কারণ, মুসলিম মনে ভারতের প্রতি ঘৃণা ও আক্রোশও গোপন কিছু নয়। বেতনভোগী কয়েক হাজার এজেন্ট দিয়ে এমন চেতনাধারিদের দমন যে অসম্ভব -সেটি ভারতও বুঝে। তাই চায়, বাংলাদেশ সরকার ভারত বিরোধীদের শায়েস্তা করতে বিশ্বস্ত ও অনুগত ঠ্যাঙ্গারের ভূমিকা নিক। এজন্যই তারা বেছে নিয়েছে শেখ হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাত অবৈধ সরকার। ভারত জানে, এমন অসভ্য কাজ কোন নির্বাচিত সভ্য সরকার দিয়ে সম্ভব নয়। একাজের জন্য চোরডাকাতের ন্যায় বিবেকহীন লোক চাই।  সেকাজে শেখ হাসিনা ইতিমধ্যেই তার পারঙ্গমতা প্রমাণ করেছে। সেটি দেশের ইসলামপন্থী নেতা-কর্মীদের ফাঁসি, গ্রেফতার, নির্যাতন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং ইসলামী বইপুস্তক বাজয়াপ্ত করার মধ্য দিয়ে। শেখ হাসিনার সরকার রীতিমত যুদ্ধ শুরু করেছে দেশের ইসলামপন্থীদের নির্মূলে। সেটি শুধু জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নয়, হিজবুত তাহরির, মাওলানা ফজলুল হক আমিনীর ইসলামী ঐক্যজোট, চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ সকল ইসলামী দলের বিরুদ্ধেই। কে বা কোন দল একাত্তরে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল -সেটি তাদের কাছে বড় কথা নয়। বরং কারা এখন ভারতের বিপক্ষে এবং ইসলামের পক্ষ নিচ্ছে -সেটিই তাদের বিবেচনায় মূল। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নেমেছে। আওয়ামী বাকশালী পক্ষটি এমন একটি যুদ্ধের হুংকার বহু দিন থেকে দিয়ে আসছিল এবং এখন সেটি শুরুও হয়ে গেছে। বাংলাদেশীদের ঘাড়ে তাই এখন অঘোষিত ভারতীয় যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ব্যয়ভার যেমন ভারতীয়রা বহন করছে, তেমনি কমাণ্ডও তাদের হাতে। বাংলাদেশ বস্তুত এ পক্ষটির হাতেই আজ অধিকৃত। ১ম সংস্করণ ০৯/০৯/২০১১; ২য় সংস্করণ ১৪/০২/২০২১।

 




দুর্বৃত্তদের দখলদারী ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 রাজনীতি: জাতীয় জীবনের ইঞ্জিন

জাতীয় জীবনে মূল ইঞ্জিনটি হলো ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি। এ ইঞ্জিনই জাতিকে সামনে বা পিছনে টানে। চলাটি কোন পথে হবে – উন্নয়নের পথে না পতনের পথে- সেটিী ক্ষেত-খামার, কলেজ-বিশ্বাবিদ্যালয় ও মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে নির্ধারিত হয় না, পুরাপুরি নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় ইঞ্জিনের চালকদের উপর। কোন একটি জাতির ব্যর্থতা দেখে নিশ্চিত বলা যায়, সে জাতির রাজনৈতিক নেতাদাগণ সঠিক ভাবে কাজ করেনি। চালকের সিটে ভাল লোক নাই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলতঃ সেটিই ঘটেছে। কোন দেশের উন্নয়ন বা সুখ-সমৃদ্ধির জন্য এটি জরুরী নয় যে, সেদেশের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে বিপ্লব আসতে হবে। বরং বিপ্লব আনতে হয় নেতৃত্বে এবং সেদেশের রাজনীতিতে। রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ পায় পথ-নির্দেশনা, রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে পায় অনুকরণীয় মডেল খুঁজে পায়। আলেকজান্ডারের আমলে গ্রীস যখন বিশ্বশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ তখন গ্রীসের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে কোন পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন এসেছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বে। তেমনি আরবের মুসলিমগণ যখন বিশ্বের প্রধান শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করলো তখন আরবের জলবায়ু, আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক সম্পদে কোন বিপ্লব আসেনি। বরং বিপ্লব এসেছিল তাদের চরিত্রে, নেতৃত্বে ও রাজনীতিতে।

রাজনীতি হল সমাজসেবার সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। মুসলিম সমাজে এ কাজ করেছেন ইসলামের মহান নবী এবং তাঁর শ্রেষ্ঠতম সাহাবীগণ। রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে দেশের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে বসানো তাই নবীজী (সা:)র সূন্নত। এ আসনে বসেছেন খোদ নবীজী (সা:)। নবীজী (সা:)’র ওফাতের পর বসেছেন শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ। তাঁরা ছিলেন এমন সাহাবা যারা জীবদ্দশাতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালনের পাশাপাশি যারা আল্লাহতায়ালার রাস্তায় নিজের সময়, মেধা ও জানমাল কোরবান করতে দু’পায়ে খাড়া এ কাজটি মূলত তাদের। কিন্তু সমাজসেবার এ মাধ্যমটি যদি ক্ষমতালিপ্সু ও স্বার্থশিকারী দুর্বৃত্তদের হাতে হাইজ্যাক হযে যায় তখন সে জাতির পতন, পরাজয় বা বিশ্বজোড়া অপমানের জন্য কি কোন বিদেশী শত্রুর প্রয়োজন পড়ে? ঝাড়ুদার হতে হলেও সততা লাগে, নইলে রাস্তা থেকে আবর্জনা দূর হয় না। আর রাজনীতিবিদদের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে আবর্জনারূপী দুর্বৃত্তদের সরানো। সে সাথে সুনীতির প্রতিষ্ঠা। কোর’আনের ভাষায় মু’মিনের সে মিশনটি “আমারু বিল মারুফ” এবং “নেহী আনিল মুনকার”। অর্থাৎ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের নির্মূল। সে কাজের প্রতি অতিশয় গুরুত্ব দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষনাটি হলো: “তোমাদের মধ্যে অবশ্যই এমন একদল মানুষ থাকতে হবে যারা কল্যাণের পথে মানুষকে ডাকবে এবং ন্যায়ের নির্দেশ দিবে ও অন্যায়ের পথ থেকে রুখবে, এবং তারাই হল সফলকাম”। -(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৪)। আর এটাই তো মুসলিমদের বাঁচা-মরা ও রাজনীতির মূল মিশন। নিছক নামায-রোযার মধ্য দিয়ে কি আল্লাহর নির্দেশিত এ হুকুমটি পালিত হয়? মেলে কি সফলতা? তাই আল্লাহতায়ালার কাছে যারা সফল হিসাবে গণ্য হতে চায় তাদেরকে শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালন করলে চলে না। পাশাপাশি এ পবিত্র কাজকেও জীবনের মিশন রূপে বেছে নিতে হয়। তাই তাই প্রকৃত ঈমানদারদের কাজ শুধু রাজনীতিতে অংশ নেওয়া নয়; বরং সে কাজে অর্থদান, শ্রমদান এমনকি প্রাণদানও। সাহাবায়ে কেরামের জীবনে তো সেটিই দেখা গেছে।

অথচ বাংলাদেশের অবস্থাটি ভিন্নতর। দেশটির লাখ লাখ মসজিদ ভরতে নামাযীর অভাব হয় না। এ দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ রোযা রাখে। বহু হাজার মানুষ প্রতিবছর হজ্ব করে। বহু লক্ষ মানুষ প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াতও করে। অথচ ন্যায়ের পথে মানুষকে ডাকছে ক’জন? ক’জন সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে ন্যায়ের নির্দেশ দিচ্ছে? দুর্বৃত্ত মানুষদের রুখছেই বা ক’জন? অথচ রাজনীতিতে দেশের নামাজীরা যে অংশ নিচ্ছে না তা নয়। বরং তারাই সারি বেধে ভোট দেয় ইসলাম বিরোধীদের বিজয়ী করতে। নবীজী(সা:)’র আমলে লক্ষ লক্ষ মসজিদ ছিল না, কোটি কোটি নামাযীও ছিল না। সংখ্যায় নগন্য সংখ্যক হয়েও তাঁরা আরব ভূমি থেকে দূর্নীতি ও দুর্বত্তদের নির্মূল করেছিলেন। নির্মূল করেছিলেন আবু লাহাব ও আবু জেহেলদের মত ইসলাম বিরোধী সকল নেতাদের। অথচ বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টেটি। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিমদের হাতে দুর্বৃত্ত ও ইসলাম-বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা শুধু বিপুল ভোটে নির্বাচিত ও প্রতিপালিতই হয় না, প্রতিরক্ষাও পায়। বিপুল গণসমর্থণ নিয়ে এরা নেতা হয়, মন্ত্রী হয়, প্রশসনের কর্মকর্তাও হয়। দেশটির রাজনীতির ময়দানটি অধিকৃত হয়ে গেছে অতি দুষ্ট ও দুর্বত্ত প্রকৃতির লোকদের হাতে। অথচ যে দেশে আইনের শাসন আছে সে দেশে দূর্নীতিবাজদের পক্ষে নেতা হওয়া দূরে থাক, রাস্তার ঝাড়ুদার হওয়াও অসম্ভব। দূর্নীতিবাজদের দিয়ে রাস্তার ময়লা তোলার কাজটি যথার্থভাবে হয় না। কারণ খুটেঁ খুটেঁ ময়লা তোলার কাজেও অতি নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল হওয়াটি জরুরী। বরং জাতীয় জীবনে প্রকৃত আবর্জনা হল এ দূর্নীতিবাজেরা, তাই প্রতিদেশেই তাদের স্থান হয় কারাগারে। আবর্জনার ন্যায় তাদেরও স্থান হওয়া উচিত আস্তাকুঁড়ে। দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ইসলাম অতি কঠোর ও আপোষহীন। যারা চুরি করে পবিত্র কোর’আন তাদের হাত কাটতে বলে।

 

রাজনীতি: দুর্বৃত্তায়নের হাতিয়ার

বাংলাদেশের ব্যর্থতা এজন্য নয় যে, দেশটিতে সম্পদের কমতি রয়েছে বা দেশের ভূগোল বা জলবায়ু প্রতিকূল। ব্যর্থতার জন্য মূলত দায়ী দেশের দুষ্ট রাজনীতি। কারণ, বাংলাদেশে যেরূপ রাজনীতির চর্চা হচ্ছে সেটি আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত পথ বেয়ে এগুচ্ছে না। মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত সে সরল পথটি হল সিরাতুল মোস্তাকিম, যা প্রকাশ পেয়েছে পবিত্র কোর’আন ও নবীজী (সাঃ)র সূন্নাহতে। আর এ সিরাতুল মোস্তাকিম শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, ইবাদত-বন্দেগীর পথই দেখায় না। দেখায় সুস্থ্য রাজনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির পথও। আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ না করে রাষ্ট্র, সমাজ বা পরিবারে শান্তি আসবে এরূপ বিশ্বাস করাই তো কুফরি তথা ঈমান-বিরুদ্ধ। এটি শিরক। তাই প্রশ্ন, এমন বিশ্বাস নিয়ে কি কেউ মুসলিম থাকতে পারে? আল্লাহর প্রদর্শিত পথ তথা ইসলাম ছাড়া শান্তি ও সমৃদ্ধি সম্ভব হলে তো ইসলামের প্রয়োজনই ফুরিয়ে যায়। অথচ তেমন একটি প্রচন্ড ইসলাম বিরোধী চেতনার প্রতিফলন ঘটছে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও আইন-আদালতে। এ ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামের প্রয়োজনই অনুভব করা হচ্ছে না। ইসলাম সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে নিছক মসজিদে ও কিছু পরিবারে। ফলে সমগ্র রাষ্ট্র জুড়ে বাড়ছে সূদ, পতিতাবৃত্তি, ব্যভিচার, ঘুষ, চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস ও মদ্যপানের ন্যায় সর্ববিধ হারাম কাজ।

অথচ ইসলামের আগমন শুধু ব্যক্তির পরিশুদ্ধির লক্ষ্যে নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিশুদ্ধির লক্ষ্যেও। সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবেশ যদি পাপে জর্জরিত থাকে তবে কি কোন মানব শিশু সহজে সিরাতুল মুস্তাকীম পায়? নবীজী (সাঃ)র হাদিস: “প্রত্যেক মানব শিশুর জন্ম হয় মুসলিম রূপে। কিন্তু সে ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে হয়ে অমুসলিম হয় (পারিবারীক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়) পরিবেশের প্রভাবে।” কোন শিশুই তার পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সামর্থ্য নিয়ে হাজির হয় না। যারা নবেল প্রাইজ পেয়েছে সে সামর্থ্য তাদেরও ছিল না। সে সামর্থ্য তো একটি বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের। এজন্য তো চাই ওহীর তথা কোর’আনের জ্ঞান। তাই কোন শিশুকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচাতে হলে তাকে শুধু পানাহার দিলে চলে না, জাহিলিয়াত তথা অজ্ঞতার অন্ধকার পরিবেশ থেকে মুক্তি দিতে হয়। জাহিলী পরিবেশে এমন কি সিরাতুল মুস্তাকীম পায় না এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীগণও। তাই সবচেয়ে সওয়াবে কাজ হলো, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অজ্ঞতা তথা জাহিলিয়াত-মুক্ত করা। রাষ্ট্রের অবকাঠামো ও তার পরিচালনা কোর’আনের জ্ঞানে অজ্ঞ সেক্যুলারিস্টদের হাতে রেখে রাষ্ট্র বা সামাজের পরিবেশকে কি জাহিলিয়াত-মুক্ত করা যায়? সেটি অসম্ভব বলেই নবীজী (সাঃ) তার কর্মের পরিধি স্রেফ মসজিদ নির্মাণ ও কোর’আনের জ্ঞান বিতরণের মাঝে সীমিত রাখেননি। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করেছেন এবং নিজে সে রাষ্ট্রের প্রধান রূপে দায়িত্ব পালন করেছেন।  

মানব জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে পথভ্রষ্ট অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে। রাষ্ট্র তখন জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার দ্রুতগামী ট্রেনে পরিণত হয়। একটি বাসের সকল যাত্রী মাতাল হলেও তাদের সঠিক গন্তব্যস্থলে পৌঁছার সম্ভাবনা থাকে যদি চালক সুস্থ্য হয় এবং জ্ঞান রাখে সঠিক পথের। কিন্তু চালক নিজে মাতাল বা অজ্ঞ হলে সবার ভূল পথে চলাটি অনিবার্য হয়ে উঠে। এজন্যই ইসলামে শ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ নয়, সেটি রাষ্ট্রকে অনৈসলামিক শক্তির হাত থেকে মুক্ত করে পরিপূর্ণ ইসলামী করা। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের জনগণের জন্য ভয়ানক বিপদের কারণ, দেশ অধিকৃত হয়েছে ভয়ানক অপরাধীদের হাতে। তাদের নিজেদের নাই পবিত্র কোরআনের তথা সিরাতুল মুস্তাকীমের জ্ঞান। তাদের রাষ্ট্র অধিকৃত হওয়ায় রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে পথভ্রষ্ট করার হাতিয়ারে। ফলে ভ্রষ্ট্তা বাড়ছে শুধু শিশুদের নয়, বয়স্কদেরও। শিক্ষা ও সংস্কৃতির নামে সোসল ইঞ্জিনীয়ারিং হচ্ছে জনগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে। মৌলবাদ বলে পরিহার করা হচ্ছে ইসলামের বিধানকে।

 

অধিকৃতি দুর্বৃত্তদের

ইসলামের প্রতি এরূপ আচরনকে শুধু ভ্রষ্টতা বললে ভূল হবে, বরং এটি হল আল্লাহর বিরুদ্ধে পরিপূর্ণ বিদ্রোহ। আর সে বিদ্রোহই প্রকাশ পাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। মুষ্টিমেয় ইসলামি দল ছাড়া বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো আল্লাহর প্রদর্শিত সে সিরাতুল মোস্তাকিমের অনুসরণ দূরে থাক, সেটির প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে না। আল্লাহর বিরুদ্ধে এটি কি সীমাহীন ঔদ্ধতা। এমন আচরণের তুলনা চলে চিকিৎস্যক ও তার দেওয়া চিকিৎসার বিরুদ্ধে মরনাপন্ন রোগীর ঔদ্ধতার সাথে। এরাই রাজনীতিকে পরিণত হয়েছে লুটপাঠ, শোষন এবং আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে। রাজনৈতিক দলের বহুলক্ষ কর্মী ও নেতা, সামরিক বাহিনীর শত শত অফিসার, শত শত সরকারি আমলা, হাজার হাজার ধনি ব্যবসায়ী ও ধর্মব্যবসায়ীসহ নানা জাতের সুযোগ সন্ধানীরা নেমেছে এ পেশাতে। কোন ডাকাত দলে বা সন্তাসী দলে এত দুর্বৃত্ত ও ধোকাবাজের সমাবেশ ঘটেনি যা ঘটেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। দুর্বত্তদের যারা যত বেশী দলে ভেড়াতে পারে তারাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী। রাজনীতির নামে রাস্তায় লগিবৈঠা দিয়ে পিঠিয়ে মানুষ হত্যা বা যাত্রীভর্তি বাসে আগুণ দেওয়া এরূপ রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের কাছে কোন অপরাধই নয়। বরং ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে সেটিকে তারা অপরিহার্য মনে করে। বাংলাদেশের ইতিহাস এমন বর্বর ও বীভৎস অপরাধ কর্মে ভরপুর। খুণোখুণির ঘটনা ঘটেছে এমনকি সংসদেও। গণতন্ত্রের নামে দেশে বার বার নির্বাচন হয়, কিন্ত সে নির্বাচনে সৎ ও যোগ্য মানুষের নির্বাচন কি সম্ভব? মিথ্যা ওয়াদা ও ধোকাবাজীর উপর যে দেশে নিয়ন্ত্রণ নেই, সে দেশে কি দুর্বৃত্তদের পরাজিত করা যায়? নির্বাচন তাদের সামনে বরং রাস্তা খুলে দেয়।

নির্বাচন পরিণত হয়েছে নাশকতার আরেক হাতিয়ারে। ডাকাতি হয় ব্যালটের পর। এবং বিজয়ী হয় চোর-ডাকাতেরা। এরাই দখলে নেয় দেশের প্রশাসন, শিল্প, আইন-আদালতসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে বাংলাদেশে বার বার নির্বাচন হলেও শোষন, লুটপাঠ, দুবৃত্তি ও দূর্নীতি থেকে দেশবাসীর মূক্তি মিলছে না। বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে কোন জাতি কি কখনো সুপথ পায়? তখন তো বিভ্রান্তি নেমে আসে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র জুড়ে। তেমনি বিপদ নেমে আসে রাজনীতি বিপথগামী হলে। তাই জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ইস্যু হল, রাজনীতির ভ্রষ্টতা দূর করা। ইসলামে এটিই জিহাদ। নবীজীর আমলে মুসলমানদের সবচেয়ে বেশী কোরবানী পেশ করতে হয়েছে রাজনীতির ময়দানের আবর্জনা সরাতে। সে সমাজেও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধের পথে বড় বাধা রূপে কাজ করছিল আবু লাহাব, আবু জেহলের মত দুর্বৃত্ত নেতারা। এসব দুর্বৃত্তদের সরাতে যত লড়াই ও রক্তক্ষয় হয়েছে সমাজে নামায-রোয়া, হজ্ব-যাকাত বা অন্য কোন বিধান প্রতিষ্ঠা করতে তা হয়নি। মুসলমানের বাঁচার মধ্যে যেমন লক্ষ্য থাকে, তেমনি লক্ষ্য থাকে প্রতিটি কর্মের মধ্যেও। ইসলামী পরিভাষায় সেটিই হল নিয়ত। আর সে নিয়তের কারণেই মুসলমানের প্রতিটি কর্ম -তা যত ক্ষুদ্রই হোক- ইবাদতে পরিণত হয়।

 

ভ্রষ্টতা রাজনীতির লক্ষ্যে ও এজেন্ডাতে

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের রাজনীতির মূল লক্ষ্যটি কি? রাজনীতির মূল ইস্যু বা এজেন্ডা কি শুধু সরকার পরিবর্তন? এটি কি নিছক নির্বাচন? লক্ষ্য কি শুধু রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত ও কলকারাখানা নির্মান? অথবা পণ্য বা মানব রপ্তানীতে বৃদ্ধি? বাংলাদেশে এ অবধি নির্বাচন ও সে সাথে সরকার পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। নানা দল নানা এজেন্ডা নিয়ে ক্ষমতায় গেছে। কিন্তু দেশ কতটুকু সামনে এগিয়েছে? জনগণের জীবনে উচ্চতর মানবিক মূল্যবোধই বা কতটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছে? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এ জন্য দরিদ্র নয় যে, সেখানে সম্পদের অভাব। বরং দারিদ্র্যের কারণ, সে সব প্রাকৃতিক সম্পদে তারা অতি কমই মূল্য সংযোজন করতে পারে। তারা যেমন ব্যর্থ নিজেদের মূল্য বাড়াতে, তেমনি ব্যর্থ খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য বাড়াতে। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় অক্ষমতা। একটি দেশের প্রাচুর্য্য তো বাড়ে সে দেশে মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কতটুকু মূল্য সংযোজন হল তার উপর। পাট, তূলা, চা, কফি, তেল, গ্যাস, তামা, কপার, ইউরেনিয়াম, বক্সাইট, টিনের ন্যায় অধিকাংশ কৃষি ও খনিজ সম্পদের উৎস হল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। কিন্তু এ সম্পদের কারণে বেশী লাভবান হয়েছে পাশ্চাত্য। কারণ এসব কৃষি ও খণিজ সম্পদের উপর সিংহভাগ মূল্য সংযোজন হয়েছে পাশ্চাত্য দেশগুলির কারখানায়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো রয়ে গেছে কাঁচামাল বা খনিজ সম্পদের জোগানদার রূপে। পাশ্চাত্য দেশের কোম্পানীগুলোর কারণেই আফ্রিকার কোকো সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে চকলেট হিসাবে প্রচুর সমাদার পাচ্ছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ নানা ব্রান্ডের চকলেটের পিছনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচও করছে। এভাবে চকলেট বিক্রি করে ধনী হয়েছে পাশ্চাত্য কোম্পানীগুলো। অথচ প্রচন্ড অনাহারে ভুগছে কোকা উৎপাদনকারি আফ্রিকার দেশগুলো। একই ভাবে তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারি দেশগুলোর চেয়ে বেশী অর্থ কামিয়েছে পাশ্চাত্যের তেল ও গ্রাস কোম্পানীগুলি। মূল্য সংযোজনের ফায়দা তো এটাই। তাই যারা ব্যবসা বুঝে তারা একত্রে হলে চেষ্টা করে কারখানা খোলার। কারণ, কারখানা হল মূল্য সংযোজনের অংগন।

তবে জাতি সবচেয়ে বেশী লাভবান হয় যখন মূল্য সংযোজন হয় মানুষের উপর। কারণ, মানুষই হলো আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তেলের বা সোনার মূল্য হাজারো গুণ বাড়লেও সেটি কি গুণবান ও সৃষ্টিশীল মানুষের সমান হতে পারে? মানুষের উপর মূল্য সংযোজন হলে সে মানুষটি মহৎ গুণে বেড়ে উঠে। সে মানুষটির সামর্থ্য বাড়ে প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের উপর মূল্য সংযোজনে। এজন্যই শিল্পোন্নত দেশগুলো শিক্ষাখাতে তথা মানব সম্পদের উন্নয়নে এত ব্যয় করে। মানুষের মূল্য বৃদ্ধি বা গুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বা উদ্যোগ নেওয়া এজন্যই ইসলামে এত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার সওয়াব এজন্যই এতো বেশী। কারণ এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজই হল মানুষের উপর মূল্য সংযোজন করা তথা তাদেরকে মহত্তর গুণ নিয়ে বেড়ে উঠায় সহায়তা দেওয়া। তাদের কারণে সমাজ ও রাষ্ট্র তখন বহুগুণে সমৃদ্ধ হয়। এমন রাষ্ট্রের বুকেই নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। মানুষ গড়ার এ মহান কাজটিই এ জন্যই তো মুসলিম রাজনীতির মূল এজেন্ডা। তখন রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়, মানুষকে জান্নাতের যোগ্য করে গড়ে তোলা। এমন মানুষের গুণেই আল্লাহর সাহায্য ও শান্তি নেমে আসে ধরাপৃষ্টে। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে তো সেটিই হযেছিল। ইসলামে এমন রাজনীতি তাই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটিই হয়নি। এজন্যই দেশটি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি ও সর্বাধিক দূর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র রূপে।

যে কোন দেশে রাজনীতির মূল ইস্যুটি নির্ধারিত হয় সে দেশের জনগণের ধর্ম, জীবনদর্শন, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন থেকে। তাই পূঁজিবাদী ও সমাজবাদী দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা এক নয়। তেমনি এক নয় মুসলিম ও অমুসলিম দেশের রাজনৈতিক এজেন্ডা। ব্যক্তির অন্তরে বা চেতনায় লালিত আদর্শ বা বিশ্বাস শুধু তার ধর্ম-কর্ম, ইবাদত-বন্দেগী, খাদ্য-পানীয়ের ব্যাপারেই নিয়ম বেঁধে দেয় না, নির্ধারিত করে দেয় তার জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও। তা থেকেই নির্ধারিত হয় মুসলিমদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা। তাই এক ভূমিতে আরবের কাফেরদের এজেন্ডা ও মুসলিমদের এজেন্ডা এক ছিল না। মুসলমান যখন বিজয়ী হয় তখন সমাজ থেকে শুধু মূর্তিগুলোই অপসারিত হয়নি। অপসারিত হয়েছিল তাদের প্রচলিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধ। অপসারিত হয়েছিল ইসলাম বিরোধী নেতৃত্ব। কারণ, একটি মুসলিম সমাজ কখনই অমুসলিম বা সেকুলার মূল্যবোধ ও নেতৃত্বের অধীনে গড়ে উঠতে পারে না। এবং এগুতে পারে না কাঙ্খিত লক্ষ্যে। যেমন প্লেনের ইঞ্জিন নিয়ে কোন রেল গাড়ী সামনে এগুতে পারে না। রাজনীতি যেমন জাতির ইঞ্জিন, তেমনি সে ইঞ্জিনের জ্বালানী শক্তি হল উচ্চতরদর্শন বা ফিলোসফি। মুসলিমদের ক্ষেত্রে সেটি হল ইসলাম তথা কোর’আনী দর্শন।

যে রাজনীতিতে উচ্চতর দর্শন নেই, সে রাজনীতিতে গতি সৃষ্টি হয় না উচ্চতর লক্ষ্যে চলার। তখন নেমে আসে জগদ্দল পাথরের ন্যায় স্থবিরতা। স্রোতহীন জলাশয়ে যেমন মশামাছি বাড়ে, তেমনি দর্শন-শূণ্য স্থবির রাজনীতিতে বৃদ্ধি ঘটে দর্শনশুণ্য দুর্বৃ্ত্ত মানব-কীটদের। সেটিরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো বাংলাদেশের রাজনীতি। নবীজী(সাঃ)’র আমলে মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে যে প্রচন্ড বিপ্লব ও গতি সৃষ্টি হয়েছিল তার কারণ, রাজনীতির ইঞ্জিন তখন আল্লাহপ্রদত্ত দর্শন পেয়েছিল। চালকের পদে বসেছিলেন মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানবগণ। অথচ সে প্রচন্ড শক্তি থেকে দারুন ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশের আজকের রাজনীতি। কারণ, বাংলাদেশের ড্রাইভিং সিটে বসে আছে চোর-ডাকাত ও ভোট-ডাকাতগণ। দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে ইসলাম ও আল্লাহর নাম নেওয়া তাদের কাছে সাম্প্রদায়ীকতা। তারা দাবী তুলছে, ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। স্বৈরাচারি আওয়ামী-বাকশালী আমলে নিষিদ্ধ হয়েছিল ইসলামের নামে রাজনীতির সে মৌলিক নাগরিক অধিকার। সরকারি মহলে নিষিদ্ধ হয়েছিল বিসমিল্লাহ। অপসারিত হয়েছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রোম থেকে কোরআন ও মহান আল্লাহতায়ালার নাম। এভাবে দর্শনশূণ্য হয়েছিল মুজিবামলের রাজনীতি। এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিব-বন্দনা। ফল দাঁড়িয়েছিল, সবচেযে বড় ও দ্রুত ধ্বংস নেমেছিল নীতি-নৈতিকতা, আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে। সৃষ্টি হয়েছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। প্রাণ হারিয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষই শুধু নয়, দেশের স্বাধীনতা, মানবতা ও ন্যূনতম মানবিক অধিকার। তখন ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের পায়ের তলায় পিষ্ট হযেছিল দেশের সার্বভৌমত্ব। গণতন্ত্র ও মানবতার সে কবরের উপর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মুজিবের একদলীয় বাকশালী স্বৈরাচার।

 

ক্ষমতাসীনদের ইসলামভীতি

দাবী উঠেছে, ইসলামের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার। কথা হলো, এ দাবী উঠানোর হেতু কি? কারণ একটিই, আর তা হলো বাংলাদেশকে নীচে নামানোর কাজকে আবার তীব্রতর করা। ইসলামী দর্শন, আইন ও মূল্যবোধের পরাজয়ের মধ্যেই তাদের আনন্দ। রাজনীতির ইঞ্জিনকে পুণরায় দর্শন-শূণ্য করাই তাদের মূল লক্ষ্য, তাদের প্রভু ভারতও সেটিই চায়। সত্তরের দশকেও তারা সেটিই করেছিল। দাবীটিও এসেছে সেই একই আওয়ামী বাকশালীদের পক্ষ থেকে। এমর রাজনীতির পিছনে রয়েছে প্রচন্ড ইসলামি ভীতি। তাদের ভয়ের কারণ, বাংলাদেশের ৯০%ভাগ মানুষ মুসলিম। দেশটিতে প্রবল ভাবে বাড়ছে ইসলামী জ্ঞানচর্চা এবং সে সাথে প্রবলতর হচ্ছে ইসলামী চেতনা। ফলে বাড়ছে ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক শক্তি। আর ইসলামের বিজয় মানেই শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। ইসলামের বিজয় মানে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে ইসলামী বিধানের পূর্ণ-প্রয়োগ এবং সেক্যুলার মূল্যবোধ ও রীতি-নীতির বিলুপ্তি। তখন বিলুপ্তি ঘটবে দেশের ইসলাম বিরোধী শক্তির রাজনীতির। আর সে কারণেই বাংলাদেশের আওয়ামী-বাকশালী সেক্যুলার মহলটির মনে ঢুকেছে প্রবল ইসলাম ভীতি।

দেশের সেক্যুলারিস্ট পক্ষটি কখনোই নিজেদের রাজনৈতিক পরাজয়টি মেনে নিতে রাজী নয়। তাই চুড়ান্ত লড়াইটি শুরুর আগেই ইসলামের নামে দেশের ইসলামপন্থী জনগণকে সংগঠিত হওয়াটিকেই নিষিদ্ধ করতে চায়। আর সংগঠিত না হতে পারলে ইসলামপন্থীগণ সে লড়াই বা করবে কি করে? একাকী কারো পক্ষেই বড় কিছু করা সম্ভব নয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে তো নয়ই। আওয়ামী-বাকশালী সেক্যুলারদের পরাজয় করাটি তখন ইসলামপন্থীদের সাধ্যের বাইরে থেকে যাবে। আর এভাবে সহজেই নিশ্চিত হবে দেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে তাদের বর্তমানের বিজয়ী অবস্থানকে ধরে রাখা। ইসলামপন্থীগণ যাতে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে সে জন্য এখন থেকেই তাদের বিরুদ্ধে নির্মূলের হুমকী দেয়। তবে এমন একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য কাফের বা ইসলামের চিহ্নিত দূষমনদের জন্য অস্বাভাবিক নয়, নতুনও নয়। বরং অতি সনাতন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিম -সে দেশে এমন ইসলামবিরোধী রাজনীতি বাজার পায় কি করে? ১ম সংস্করণ ২৫/১০/২০০৮; ২য় সংস্করণ ১৪/০২/২০২১

 




দুর্বৃত্তদের অধিকৃতি, রাজনীতিতে ইসলাম নিষিদ্ধকরণ এবং মু’মিনের দায়ভার

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে

বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টদের মুখোশটি ধর্মনিরপেক্ষতার। তারা দেশে জোয়ার এনেছে দুর্বৃত্তি ও দুঃশাসনের। অতীতে দুর্নীতিতে দেশটিকে এরা ৫ বার বিশ্বে প্রথম করেছিল। কিন্তু রাজনীতির অঙ্গণে তাদের যুদ্ধটি ইসলামের বিরুদ্ধে। তারা বলে, রাজনীতিতে তারা ধর্মের ব্যবহার হতে দিবে না। কিন্তু তারা ভাল করেই জানে রাজনীতিতে ধর্ম নিষিদ্ধ হলে হিন্দু, খৃষ্টান বা বৌদ্ধধর্মের কোন ক্ষতি হবে না। কারণ, বাংলাদেশে হিন্দু, খৃষ্টান, বৌদ্ধ বা অন্য কোন ধর্মের অনুসারিদের ধর্মভিত্তিক কোন রাজনৈতিক দল নাই। বাংলাদেশে নিজেদের ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা তাদের লক্ষ্যও নয়। ফলে রাজনীতিতে ধর্ম নিষিদ্ধ হলে তাদের আদৌ কোন ক্ষতি নাই। তাছাড়া অমুসলিমগণ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, বরং দলটির মিত্র ও ভোটার। ফলে বর্তমান শাসক মহলে তাদের বিরুদ্ধে আক্রোশ থাকার কথা নয়। তাছাড়া শেখ হাসিনার মনে তার মিত্রদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ইচ্ছা জাগবে –সেটিও কি ভাবা যায়? সেক্যুলারিস্টদের যুদ্ধটি ইসলামের বিরুদ্ধে। রাজনীতিতে ধর্ম নিষিদ্ধ হলে ক্ষতি হবে একমাত্র ইসলামের। কারণ, ইসলাম শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের বিধানই দেয় না। বিধান দেয় রাজনীতি, বিচার-আচার, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, যুদ্ধ-বিগ্রহের বিধানও। সে বিধানগুলোর প্রতিষ্ঠার জন্যই রাজনীতিতে অংশ নেয়া মুসলিম জীবনে ফরজ। নইলে অসম্ভব হয় পূর্ণ ইসলাম পালন; এবং তাতে জাহান্নামে যাওয়ার বিপদ বাড়বে আখেরাতে। পবিত্র কোর’আনে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার বিধানগুলো তখন শুধু কিতাবেই থেকে যায়। অথচ সে বিধানগুলো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই নবীজী (সা:)’কে শাসকের আসনে বসতে হয়েছে। সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দিতে আমৃত্যু যুদ্ধ লড়তে হয়েছে। উনার ইন্তেকালের পর শাসকের আসনে বসেছেন তাঁরই শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ। তাই ঈমানদারদের উপর ফরজ হলো, নবীজী (সা:)’র সে মহান সূন্নতকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। এবং যে রাজনীতি সে সূন্নতের প্রতিষ্ঠাকে বাধাগ্রস্ত করে -সেটিই বরং মুসলিম ভূমিতে নিষিদ্ধ করা ফরজ।

পানাহারে যেমন হালাল-হারাম আছে, তেমনি হালাল-হারাম আছে রাজনীতিতে। শুধু হালাল নয়, ফরজ হলো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দেয়া। এবং হারাম হলো শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে বাধা দেয়া। এটি বিদ্রোহ ও প্রকান্ড যুদ্ধ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। কোন মুসলিম দেশেই পতিতাবৃত্তি, মদ, জুয়া, সূদ, জুয়া হালাল হতে পারে না। তেমনি হালাল বা বৈধ হতে পারে না শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে বাধা দেয়ার রাজনীতি। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে হচ্ছে উল্টোটি। সরকার আইন করেছে, ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার আছে এমন কোন রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেয়া যাবে না। ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার গণ্য হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা রূপে। কথা হলো, ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার যদি হয় সাম্প্রদায়িকতা, তবে সবচেয়ে বেশী সাম্প্রদায়িক ছিলেন নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ। মুসলিম জীবনের দায়ভার তো নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের নীতি নিয়ে রাজনীতি করা।

বাংলাদেশে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধ শুরু করে শেখ মুজিব। এবং সেটিও ধর্মনিরপেক্ষতার নামে। মুজিবের আমলে সকল ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং কারাবন্দী করা হয়েছিল সকল ইসলামপন্থী নেতাদের। মুসলিম ভূমিতে কাফেরগণ যা চায় -মুজিব তাই করেছিল। শেখ মুজিব নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করলেও তার লক্ষ্য মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা ছিল না, বরং সেটি ছিল ভারতীয় কাফের শাসকদের খুশি করা। কারণ তারাই ছিল তার রাজনীতির প্রভু। ভারতসেবার সে রাজনীতি নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনা। তাই কাশ্মীরে ও ভারতে মুসলিমগণ হত্যা, ধর্ষণ, নির্মম নির্যাতনের মুখে পড়লে কি হবে –হাসিনা ভারতের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। উগ্র হিন্দুগণ মসজিদ মাটিতে মিশিয়ে দিলেও শেখ হাসিনা নিন্দা করেনা। অপর দিকে ভারতীয় কাফেরদের খুশি করতে তার রাজনীতিতে অনিবার্য হয়ে উঠেছে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও নির্যাতন।      

নীতিটি নমরুদ ও ফিরাউনের

সমাজ ও রাষ্ট্রের চত্বরে ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠাকে নিষিদ্ধ করার এ নীতিটি যেমন নমরুদ ও ফিরাউনের ছিল, তেমনি শেখ মুজিবেরও ছিল। এখন সে নীতি নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে শেখ হাসিনা। ইসলাম ও ইসলাপন্থিদের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারি শেখ হাসিনার যু্দ্ধটি বহুদিনের। হাসিনা দেশের সংবিধানে মহান আল্লাহতায়ালার উপর আস্থার ঘোষণাটি পর্যন্ত বরদাশত করতে রাজী নয়। ফলে সে দেশের রাজনীতিতে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়ত প্রতিষ্ঠার রাজনীতি থাকতে দিবে -সেটিই বা কি করে আশা করা যায়? ফলে হযরত ইব্রাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে যেমন নিজেদের জন্মভূমিতে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার অধিকার দেয়া হয়নি, তেমনি সে অধিকার ছিনিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের থেকেও। দেশের মানচিত্র ও ইতিহাস বার বার পাল্টে যায়। কোটি কোটি নতুন মানুষও জন্ম নেয়, কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিরুদ্ধে শয়তান ও তার অনুসারিদের নীতি যে বিন্দুমাত্র পাল্টায় না -এ হলো তার নমুনা।    

শয়তান কোন কালেই তার মূল শত্রুকে চিনতে ভূল করেনি। সে ভূলটি যেমন ফিরাউন-নমরুদের আমলে করেনি। তেমনি আধুনিক আমলেও নয়। শয়তান জানে, আল্লাহতায়ালার পবিত্র কালাম কোর’আনই হলো পৃথিবী পৃষ্টে মহান আল্লাহতায়ালার একমাত্র রশি -যা অটুট বন্ধন গড়ে ঈমানদারদের সাথে। মু’মিন ব্যক্তি তো সে রশির টানেই সিরাতুল মুস্তাকীমে চলে। তাই পবিত্র কোর’আনের ঘোষণা: “ওয়া মাই ইয়া’তিছিম বিল্লাহ ফাকাদ হুদিয়া ইলা সিরাতুল মুস্তাকীম।” অর্থ: “এবং যারা আঁকড়ে ধরলো আল্লাহকে তথা তাঁর রশি পবিত্র কোর’আনকে তারাই পেল সিরাতুল মুস্তাকীমের হিদায়েত।” কিন্তু শয়তানের পক্ষের শক্তি সে বন্ধনটি চায় না। তারা তো চায় মানব সন্তানদের জাহান্নামে নিতে। এবং সেটি একমাত্র সম্ভব কোর’আনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে।

এ জমিনের বুকে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সবচেয়ে বলিষ্ঠ সাক্ষ্যটি পেশ করে পবিত্র কোর’আন। কোর’আনই হলো ইসলামের মূল উৎস্য। এই কোর’আনই কোটি কোটি মানুষকে মহান আল্লাহর স্বার্বভৌমত্ব ও আইন প্রতিষ্ঠায় নিজেদের জানমাল কোরবানীতে অনুপ্রাণীত করে। তাছাড়া ইসলাম কোথাও স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত নিয়ে হাজির হয় না, হাজির হয় কোর’আনের শরিয়তি বিধান নিয়েও। দেশের আদালতে শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠা পেলে শয়তানের এজেন্টদের অপরাধের বিচার হয় এবং তাদের জেলে যেতে হয়। জেলে যেতে হয় সেক্যুলারিস্টদেরও। তাই শয়তানী শক্তির স্ট্রাটেজীটি হলো, কোর’আন নিষিদ্ধকরণ। আর কোর’আন নিষিদ্ধকরণ সম্ভব না হলে স্ট্রাটেজী হয়, কোর’আন শিক্ষায় বিকৃত আনা যাতে মুসলিমগণ ইসলামের মূল পরিচয় পেতে ব্যর্থ হয়। শয়তান ও তার অনুসারিগণ অতীতে সে স্ট্রাটেজীর প্রয়োগ করেছে সকল আসমানী কিতাবের বিরুদ্ধে। ফলে জাব্বুর, তাওরাত ও ইঞ্জিল তার অবিকৃত রূপ নিয়ে কোথাও বাঁচেনি। বিকৃতি এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ঈসা (আঃ)’র ন্যায় একজন মরণশীল মানবকে খোদার পুত্র ও খোদায় পরিণত করেছে। কিন্তু কোর’আনের ক্ষেত্রে সেটি পারিনি। কিন্তু সে ব্যর্থথতা সত্ত্বেও শয়তানের প্রজেক্ট থেমে যায়নি। এখন চায়, সে অবিকৃত কোর’আনের প্রতিষ্ঠা রুখতে। চায়, জমিনের বুকে মহান আল্লাহতায়ালার সে রশিটি কেটে দিতে।

 

কেন নিষিদ্ধ করতে চায় ইসলামপন্থিদের রাজনীতি?

ইসলামী রাজনীতির মূল কথা, মহান আল্লাহতায়ালার সাথে বান্দার সম্পর্ককে মজবুত করা, তাঁর প্রতি আনুগত্য বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠা দেয়া তাঁর শরিয়তী বিধান। সে রাজনীতিকেই নিষিদ্ধ করতে চায় শয়তান ও তার অনুসারিগণ। তারা জানে, রাষ্ট্রের বুকে কোর’আনী বিধান প্রতিষ্ঠা পেলে তাদের সৃষ্ট বিভ্রান্তি ও দুর্বৃত্তির পথ বন্ধ করে দেয়াই হবে রাষ্ট্রের নীতি। মানুষ তখন সত্যদ্বীনের আলো পাবে, তাতে সহজ হবে জান্নাতের পথে চলা। তাতে ব্যর্থ হবে জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার শয়তানী প্রকল্প। শয়তান ও তার অনুসারিরা এজন্যই বাঁচাতে চায়, জাহেলিয়াতের তথা অজ্ঞানতার কালো অন্ধকার। এবং সেটি কোর’আনের আলো নিভিয়ে দিয়ে। চায় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার প্রতিরোধ। তাই যুগে যুগে শয়তানের মূল যুদ্ধটি হলো পবিত্র কোর’আন ও তার রচিয়েতা খোদ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। তাই ইসলামের আন্তর্জাতিক শত্রুগণ মুসলিম দেশগুলিতে অতিশয় নৃশংস স্বৈরাচারিদের শাসন যুগের পর যুগ মেনে নিলেও শরিয়ত প্রতিষ্ঠাকামী কোন সরকারকে একদিনের জন্যও মানতে রাজি নয়। আলজিরিয়া, আফগানিস্তান, সোমালিয়া ও মিশরসহ যেখানেই শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকামীগণ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে -সেখানেই তারা নিজেদের সেক্যুলারিস্ট মিত্রদের নিয়ে প্রতিরোধে নেমেছে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে শয়তান ও তার অনুসারিদের সাফল্যের মূল কারণ, পবিত্র কোরআনের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে তারা পুলিশ, প্রশাসন, বিজেবী, সেনাবাহিনী ও আদালতের ন্যায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের হাতিয়ারে পরিণত করতে পেরেছে।

শয়তান ও তার অনুসারিগণ জানে, মসজিদ-মাদ্রাসায় ইসলামের জ্ঞানচর্চা হলেও তার প্রতিষ্ঠা ঘটে রাজনীতির পথ ধরে। ফলে ইসলামের প্রতিষ্ঠা রুখতে রাজনীতির ময়দানে ইসলাম নিষিদ্ধ করাকে তারা অপরিহার্য মনে করে। তাই ইসলামের শত্রুপক্ষটির কাছে মসজিদ-মাদ্রাসা, নামায-রোযা, তাবলিগী ইজতেমা বা পীর-মুরিদী কোন ইস্যু নয়। তারা বন্ধ করে রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামের প্রবেশ। বাংলাদেশের মত দেশে রাজনীতিতে গুম, খুন, সন্ত্রাসের জন্ম দিয়েছে এ সেক্যুলারিস্টগণ। অথচ ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে মৌলবাদ বা জঙ্গিবাদ বলে সেটিকে নিষিদ্ধ করতে চায়। দেশের উপর পূর্ণ দখলদারীর লক্ষ্যে ইসলামপন্থিদের গ্রেফতার করা, গ্রেফতারের পর অত্যাচার করা ও হত্যার লক্ষ্যে ক্রসফায়ারে দেয়ার বিধানও চালু করেছে। তবে সেক্যুলারিস্টদের বড় কাপুরুষতা হলো, ঘোষণা দিয়ে কোরআন নিষিদ্ধ করার সাহস তাদের নাই। ফলে কোর’আনের এ চিহ্নিত শত্রুরা নেমেছে ভিন্ন কৌশলে। কোর’আন নিষিদ্ধের ঘোষণা না দিয়ে তারা বরং নিষিদ্ধ করতে চায় যে কোন রাজনৈতিক উদ্যোগ -যা কোর’আনের তথা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায়। এবং নির্মূল করতে চায় সে রাজনীতির নেতাকর্মীদের। সে নির্মূলকর্মকে জায়েজ করার লক্ষ্যে তাদের গায়ে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থির লেবেল এঁটে দিচ্ছে। শরিয়ত বাদ দিয়ে ইসলাম হয় না এবং যে ইসলামে শরিয়তের বিচার রয়েছে সে ইসলামই যে নবীজী সাঃ)র ইসলাম -সে প্রকান্ড সত্যটি তারা ইচ্ছা করেই বলে না।

 

সবচেয়ে সশস্ত্র ও চরমপন্থি পক্ষ

শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে জঙ্গি, সবচেয়ে সশস্ত্র ও সবচেয়ে চরমপন্থি হলো ইসলামের শত্রুপক্ষ। নিরস্ত্র জনগণকে রাজপথে শান্তিপূর্ণ মিছিল বা জনসমাবেশ করতে দিতেও তারা রাজী নয়। অথচ তারা নিজেরা রাজপথে নামছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী রূপে। নিরস্ত্র মানুষ খুনে তারা নামছে বন্দুক, বুলেট ও কামান নিয়ে। সেটি যেমন মিশর, সিরিয়া, সৌদি আরব, আলজিরিয়া ও নাইজিরিয়ায় দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় বাংলাদেশের রাজপথেও। গণহত্যার নৃশংস কান্ড ঘটেছে ঢাকার শাপলা চত্বরে। তাদের হাত সর্বত্রই রক্তে রঞ্জিত। গণদাবির মুখে কোথায়ও এরা গদি ছাড়তে রাজি নয়। বরং নিজেদের গদি বাঁচাতে সর্বত্রই এরা ভয়ংকর গণহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। ইসলামের এ শত্রুপক্ষটি সিরিয়ার বুকে ইতিমধ্যেই এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। সে হত্যাকান্ড দিন দিন আরো ব্যাপকতর হচ্ছে। তিরিশ লাখের বেশী মানুষকে তারা ইতিমধ্যেই গৃহহীন করেছে। মিশরে এরাই সে দেশের ইতিহাসের সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসীকে বন্দুকের জোরে হটিয়েছে এবং তাঁকে কারারুদ্ধ করেছে। কারারুদ্ধ অবস্থায় তাঁর হত্যারও ব্যবস্থা করেছে। সামরিক ক্যুর বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদ রুখতে কায়রোর রাজপথে প্রায় দেড় হাজার নিরস্ত্র ও নিরপরাধ মানুষকে তারা এক রাতে হত্যা করেছে। অস্ত্র ও সন্ত্রাস –উভয়ই সামরিক বাহিনীর হাতে, অথচ সন্ত্রাসী দল রূপে অভিযুক্ত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে নিরস্ত্র রাজনৈতিক দল ইখওয়ানূল মুসলিমূনকে। এরা এতটা নির্লজ্জ যে, ড. মুরসীর নিরস্ত্র গণতান্ত্রিক দলকে জঙ্গি বলে নিষিদ্ধ করলেও সে দেশের সশস্ত্র সামরিক বাহিনীকে পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক দলে। রাজনৈতিক দলের প্রধানের ন্যায় সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আবুল ফাতাহ সিসি নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদেও দাঁড়িয়েছে। সমগ্র প্রশাসন ও প্রচারযন্ত্র পরিণত হয়েছে নতজানু চাটুকারে। একই স্ট্রাটেজী নিযে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশের ইসলামের শত্রুপক্ষও। সশস্ত্র পুলিশ, RAB, বিজিবী ও সেনাবাহিনীকে সাথে নিয়ে রাজনীতির উপর পুরা দখলে নিয়েছে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী ক্যাডারেরা। অপর দিকে রাজনীতি নিষিদ্ধের ষড়যন্ত্র হচ্ছে নিরস্ত্র ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে।

 

সেক্যুলারিস্টদের যুদ্ধ ও ঈমানদারের জিহাদ

মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত বিধানগুলো যতদিন কোর’আনের পৃষ্ঠায় বন্দী থাকবে এবং সেগুলির প্রতিষ্ঠা বাদ দিয়ে মুসলিমগণ যতদিন নিছক তেলাওয়াত নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, ততদিন সে কোর’আনের বিরুদ্ধে ইসলামের শত্রুপক্ষের কোন আপত্তি নেই। বরং তেলাওয়াতের প্রতিযোগিতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক ক্বিরাত মহফিলের আয়োজন করতেও তারা রাজি। কার্পণ্য নাই ক্বারিদের বিপুল অংকের পুরস্কার দিতেও। মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র দুর্বৃত্ত শাসকদের সেটাই সংস্কৃতি। কিন্তু বিপত্তি ও বিরোধ শুরু হয় তখনই যখন সে কোর’আনী বিধানের প্রতিষ্ঠা নিয়ে জিহাদ শুরু হয়। রাজনীতির শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং মিছিলও তখন সন্ত্রাস রূপে চিত্রিত হয়। হত্যাযোগ্য সন্ত্রাসী গণ্য করা হয় সে সমাবেশ বা মিছিলে যোগদানকারিগণ। এভাবেই ইসলামের শত্রুপক্ষ নিরস্ত্র ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে একটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। এবং সেটি বাংলাদেশের ন্যায় শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমদের দেশে! প্রতিযুদ্ধেই দুটি সশস্ত্র পক্ষ থাকে। কিন্তু এখানে সশস্ত্র পক্ষ মাত্র একটি। এবং সেটি হামলাকারি সরকারি পক্ষ।

‌প্রশ্ন হলো, ইসলামের শত্রুপক্ষ যখন এতটাই যুদ্ধাংদেহী ও নির্মূলমুখী, সে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ থেকে ঈমানদারের পরিত্রাণ কীরূপে? দূরে থাকারও সুযোগ কি আছে? খোদ নবীজী (সাঃ) মনের দুঃখে মক্কা ছেড়ে মদিনায় চলে গেলেও কাফেরগণ তাঁর পিছু ছাড়েনি। ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনীর নির্মূলে ২৫০ মাইল দূরের মদিনাতেও তারা ধেয়ে গিয়েছিল।একবার নয়, তিনবার। মদিনার ক্ষুদ্র একটি গ্রামভিত্তিক মুসলিম উপস্থিতিকে চিরতরে নির্মূলের লক্ষে আরব ভূমির নানা গ্রোত্রের কাফেরগণ বিশাল কোয়ালিশনও গড়েছিল। তারা ১০ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে শেষবার মদিনাকে ঘিরে ধরেছিল। ইতিহাসে এ যুদ্ধ জঙ্গে আহযাব বা খন্দকের যুদ্ধ নামে পরিচিত। শয়তান ও তার অনুসারিদের এজেন্ডা প্রতিযুগে একই। ইসলামের নির্মূল ছাড়া তারা থামতেই রাজি নয়। ফলে প্রতিযুগেই মুসলিমদের বাঁচতে হয়েছে লড়াই করে। তাই শুধু কালেমা পাঠ বা নামায-রোযা ও হজ-যাকাতের যোগ্যতা নিয়ে মুসলিমের বাঁচাটি নিশ্চিত হয় না, জিহাদের নামার যোগ্যতাটিও চাই।

কোন ব্যক্তির জীবনে ইসলামের জোয়ার এলে সে জোয়ারটি শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে সীমিত থাকে না, জোয়ার আসে জিহাদের অঙ্গণেও। ঈমান ও জিহাদ বস্তুত প্রতিটি ঈমানদারের জীবনে একত্রে চলে। এবং সে জিহাদের লক্ষ্য হয়, শত্রুশক্রির মোকাবেলা করা এবং আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী করা। তাছাড়া ইসলামের বিজয়, শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম ভূমির প্রতিরক্ষা -কোন কালেই কি লড়াই ছাড়া ঘটেছে? অসংখ্য লড়াই লড়তে হয়েছে খোদ নবীজী (সাঃ)কে। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবাকে শহীদ হতে হয়েছে তো সেসব লড়াইয়ে। নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালনে কি এত অর্থ ও রক্ত ক্ষয় হয়? জিহাদ যে ইসলামের প্রধানতম অঙ্গ নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম তো সেটিই প্রমাণিত করে গেছেন। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মু’মিন ব্যক্তির এ জিহাদ যে কত প্রিয় সেটি তিনি গোপন রাখেননি। পবিত্র কোর’আনের নানা ছত্রে সেটি তিনি বার বার বর্ণনা করেছেন। যেমন বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ভাল বাসেন যারা তার রাস্তায় যুদ্ধ করে সিসাঢালা মজবুত দেয়ালের ন্যায় সারিবদ্ধ ভাবে।”–(সুরা সাফ, আয়াত ৪)। আর যারা জিহাদ থেকে দূরে থাকে তাদের প্রতি সাবধান বানীও উচ্চারণ করেছেন। বলেছেনঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কি হলো যে যখন তোমাদের বলা হলো আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়ো, তথন তোমরা মাটি আঁকড়ে ভূতলে পড়ে থাকলে? তোমরা কি আখেরাতের বদলে পার্থিব জীবনের প্রতি রাজী হয়ে গেলে? অথচ আখেরাতের তুলনায় পার্থিব জীবনের ভোগসামগ্রী তো অতি সামান্যই।”–(সুরা তাওবা, আয়াত ৩৮)। বিশাল প্রস্তুতির অপেক্ষায় জিহাদকে বিলম্বিত করাকেও আল্লাহতায়ালা পছন্দ করেননি।বরং বলেছেন,“তোমাদের প্রস্তুতি কম হোক বা বেশী হোক, বেরিয়ে পড়ো। জিহাদ করো তোমাদের মাল ও প্রাণ দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা জানতে।”–(সুরা তাওবা, আয়াত ৪১)।

মানব দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো হৎপিন্ড, মগজ, ফুসফুস, কিডনি, লিভার ইত্যাদি। এর কোন একটি বিকল হলে মানুষ বাঁচে না। তেমনি মুসলিম জীবনে ইসলাম ও ঈমান বাঁচাতে হলে শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত হলে চলে না। বাঁচাতে হয় ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিধান জিহাদকেও। নইলে ইসলাম বাঁচে না। তখন মুসলিম দেশে বিজয়ী হয় ইসলামের শত্রুপক্ষ। মুসলিম ইতিহাসে শয়তানি শক্তির এমন বিজয় বার বার এসেছে। তাই নবীজীর প্রসিদ্ধ হাদীসঃ “যে ব্যক্তি জিহাদ করলো না এবং জিহাদের নিয়েতও করলো -সে ব্যক্তি মুনাফিক।” আর মুনাফিকের বাসস্থান হবে জাহান্নামের সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থানে। কোন মুসলিম দেশে এমন ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়লে সে দেশে ইসলামের বিজয় আসে না। বরং বাড়ে পরাজয় ও অপমান। শয়তান ও তার অনুসারিগণ এজন্যই মুসলিমের জীবন থেকে জিহাদ হটাতে চায়। মুসলিমদের প্রতিরক্ষাহীন করার লক্ষ্যে এটিই হলো তাদের মূল এজেন্ডা। তাই জিহাদের ন্যায় এ শ্রেষ্ঠ ইবাদতকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ আখ্যায়ীত করে মুসলিম জীবন থেকে বিদায় দিতে চায়। তাই বাজেয়াপ্ত করে জিহাদ বিষয়ক বই। জিহাদকে নিষিদ্ধ করার কাজটি ঔপনিবেশিক কাফের শাসন আমলে থেকে শুরু হয়। এরই ফল হলো, বাঙালী মুসলিমের জীবনে নামায-রোযা আছে। হজ্ব-যাকাতও আছে। কিন্তু যেটি নাই সেটি হলো এই জিহাদ। মদিনায় মাত্র ১০ বছর অবস্থান কালে নবীজী (সাঃ) যতগুলো জিহাদ করেছেন বাঙালী মুসলিমগণ বিগত ৮শত বছরেও করেনি। ফলে সে আমলে ক্ষুদ্র মদিনা বিশ্বশক্তিতে পরিণত হলেও বাংলাদেশে বেড়েছে শত্রুশক্তির দখলদারি।

 

জিহাদের প্রকারভেদ

জিহাদ তিন প্রকারেরঃ এক).বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ, দুই).রাজনৈতিক জিহাদ এবং তিন).সামরিক বা সশস্ত্র জিহাদ বা কিতাল। তবে শুরুটি হয় বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ দিয়ে। এ জিহাদটি হয় চেতনার ভূমিতে। এ যুদ্ধে হাতিয়ার হলো কোর’আনের জ্ঞান, দর্শন ও বিদ্যাবুদ্ধি। লক্ষ্য শুধু ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা ও দর্শন থেকে চেতনাকে মুক্ত করা নয়, সে সাথে নাজায়েজ প্রবৃত্তির অধিকৃতি থেকে মুক্ত করাও। একেই বলা হয় নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ। এ জিহাদে বিজয়ী না হলে অন্য দুটি জিহাদে সৈনিক জুটে না। তখন রাজনৈতিক ও সামরিক জিহাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গণে ইসলামের বিজয় জুটে না। নবীজী (সাঃ) তাঁর মক্কি জীবনের ১৩ বছর ধরে সে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদটি লাগাতর করেছেন।এ বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদটি হলো আল্লাহ¸ তাঁর রাসূল ও তাঁর সত্য দ্বীনের পক্ষে কথা, কলম ও বিদ্যাবু্দ্ধি দিয়ে সাক্ষ্য দেয়া। সে সাক্ষ্যদানটি শুরু হয় কালেমায়ে শাহাদাত পাঠের মধ্য দিয়ে। পবিত্র কোর’আনে তাই মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর পক্ষে খাড়া হয়ে যাও এবং সাক্ষি দাও ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠায়।”-(সুরা মায়েদা, আয়াত ৮)। মু’মিনের জীবনে আল্লাহর পক্ষে সাক্ষিদানের এ কাজটি শুরু হলে প্রবেশ ঘটে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদের ময়দানে। একই রূপ নির্দেশ দেয়া হযেছে সুরা নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে যাও, স্বাক্ষি রূপে খাড়া হয়ে যাও আল্লাহর পক্ষে।” তাই যুগে যুগে ঈমানদারগণ শুধু নামাযের জায়নামাজেই খাড়া হননি, দৃঢ় ভাবে খাড়া হয়েছেন জিহাদের ময়দানেও। সেটি যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদের ময়দানে, তেমনি রাজনীতিতে ও সশস্ত্র জিহাদের ময়দানে।

মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের পক্ষে সাক্ষ্যদানে খাড়া হওয়ার অর্থই হলো শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। সশস্ত্র শয়তানি শক্তি তখন নিরস্ত্র সাক্ষিদাতার উপর আঘাত হানে। আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের পক্ষে সাক্ষ্যদানের কারণেই হযরত ইয়াসির (রাঃ), হযরত সুমাইয়া (রাঃ), হয়রত খাব্বাব(রাঃ) ও হযরত বেলাল (রাঃ)’র ন্যায় বহু নিরস্ত্র মানুষের জীবনে সীমাহীন নির্যাতন নেমে এসেছিল। অনেককে নির্মম ভাবে শহীদও হতে হয়েছে। নমরুদের দরবারে ইব্রাহিম (আঃ) এবং ফিরাউনের দরবারে হযরত মূসা (আঃ) তো সে নিরস্ত্র জিহাদটি দিয়েই দ্বীনের প্রচার শুরু করেছিলেন। নমরুদ নিজেকে খোদা দাবি করতো। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তার দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন,“আমার আল্লাহ পূর্ব দিক থেকে সূর্যোদয় ঘটান।তুমি সেটি পশ্চিম দিকে ঘটাও।” ইব্রাহিম (আঃ)এর এরূপ বুদ্ধিবৃত্তি মহান আল্লাহতায়ালার এতই ভাল লেগেছিল যে তিনি তার কথাগুলোকে পবিত্র কোরআনে নিজের কালামের পাশে স্থান দিয়েছেন। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধটি করেছেন এমন কি তাঁর মুর্তিনির্মাতা পিতার বিরুদ্ধেও। কিন্তু সে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদের শাস্তি স্বরূপ তাঁর মত নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ ব্যক্তিকে জলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তবে সে জ্বলন্ত আগুণ থেকে মহান রাব্বুল আলামীন তাঁকে ফিরেশতা পাঠিয়ে উদ্ধার করেছেন এবং ব্যর্থ করে দিয়েছেন শয়তানের কৌশল। ফিরাউনের দরবারে আল্লাহর পক্ষে স্রেফ সাক্ষি দেয়ার কারণে হযরত মূসা (আঃ)’এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রে বিদ্রোহ সৃষ্টির অভিযোগ আনা হযেছিল এবং তাঁকে এবং তার নিরস্ত্র অনুসারিদের হত্যার জন্য ফিরাউনের বিশাল বাহিনী সমূদ্র পর্যন্ত ধাওয়া করেছিল। এই হলো নিরস্ত্র মানুষের শান্তিপূর্ণ বুতবে বাংলাদেশেও কি নিরস্ত্র ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের কৌশলটি ভিন্নতর?

মুসলিম শহীদ হয় শুধু সশস্ত্র জিহাদে নয়। বরং বহু নিরস্ত্র মুসলিম মান যুগে যুগে শহীদ হয়েছেন এবং আজও হচ্ছেন বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক অঙ্গণের নিরস্ত্র জিহাদে। মিশরের প্রখ্যাত মোফাচ্ছেরে কোরআন শহীদ কুতব কারো বিরুদ্ধে একটি তীঁরও ছুড়েননি। কিন্তু তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে শহীদ করা হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তির জিহাদে আপোষহীন মুজাহিদ হওয়ার কারণে। একই কারণে মাওলানা মওদূদীকেও ফাঁসীর হুকুম শোনানো হয়েছিল। অতীতে ইমাম মালিক (রহ:), ইমাম আবু হানিফা (রহ:), ইমাম শাফেয়ী (রহ:), ইমাম হাম্বলী (রহ:), ইমাম তাইমিয়া (রহ:)’র ন্যায় মুসলিম ইতিহাসের বিখ্যাত ব্যক্তিদেরকেও জেলে নেয়া হয়েছে এবং তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন করা হয়েছে এবং অনেককে শহীদ করা হয়েছে এই বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদে মুজাহিদ হওয়ার কারণে। রাজনৈতিক অঙ্গনে যারা নিরস্ত্র মুজাহিদ তাদের লাশও কি দেশে দেশে  পড়ছে? বিগত মাত্র এক বছরে ৪ হাজারের বেশী নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে মিশরের সামরিক শাসক। ৭০ হাজারের বেশী নিরীহ মানুষকে তারা জেলে তুলেছে। শত শত নিরস্ত্র মানুষকে শহীদ করা হয়েছে এবং এখনো সে হত্যাকান্ড অবিরাম ভাবে চলছে বাংলাদেশে। সেটি যেমন ঢাকার শাপলা চত্বরের সমাবেশে হয়েছে, তেমনি হচ্ছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে। হত্যা ও গুমের পাশাপাশি হাজার হাজার নিরস্ত্র নেতাকর্মীকে শুধু ইসলামের পক্ষে কথা বলার অপরাধে জেলা তোলা হচ্ছে এবং তাদের উপর নৃশংস নির্যাতন করা হচ্ছে।  

 

মূল ব্যর্থতাটি জিহাদে

দেহে প্রাণ থাকলে হৃদয়ে স্পন্দন থাকে, তেমনি হাত-পা’য়ে নড়াচড়াও থাকে। তেমনি অন্তরে ঈমান যে বেঁচে আছে সেটির প্রমাণ দেয় জিহাদ। আল্লাহর পথে পবিত্র জিহাদই মুনাফিক থেকে মু’মিনকে পৃথক করে। মুসলিম দেশের আইন-আদালত, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহে ইসলাম বেঁচে থাকে তো এ জিহাদের বরকতেই। হৃৎপিন্ড কয়েক সেকেন্ড বন্ধ থাকলে দেহ বাঁচে না। তেমনি মুসলিমগণ জিহাদ বিমুখ হলে খোদ মুসলিম দেশেও ইসলাম তার কোরআনী রূপ নিয়ে বাঁচে না। তখন ইসলামের নামে যে ধর্মকে বাঁচতে দেখা যায় সেটি নবীজী (সাঃ)’র ইসলাম নয়। গৃহের মালিক কখন ঘুমিয়ে পড়বে, সে মুহুর্তের অপেক্ষায় থাকে চোরগণ। মুসলিমগণ কখন জিহাদ-বিমুখ হয় এবং অস্ত্র ছেড়ে ভোগলিপ্সায় লিপ্ত হয় – শয়তানও সে মুহুর্তের অপেক্ষায় থাকে। তখন সে মুসলিম দেশের উপর তারা ত্বরিৎ দখলদারিত্ব নিয়ে নেয়। বাংলাদেশের উপর তো সেটিই ঘটেছে।

বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতা অনেক। তবে মূল ব্যর্থতাটি জিহাদের অঙ্গনে। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো: সর্বসময়ের জন্য আল্লাহর দ্বীনের জাগ্রত প্রহরী হয়ে যাওয়া। এ প্রহরার কাজে কোন বিরতি চলে না। নামায-রোযায় ক্বাজা আছে, কিন্তু জিহাদে ক্বাজা নেই। এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ হলো,“তাদের মোকাবেলায় তোমরা প্রস্তুতি নাও সর্বশক্তি দিয়ে এবং (সর্বদা) প্রস্তুত রাখো তোমাদের ঘোড়াকে।এবং এভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখবে তোমাদের শত্রুদের এবং (সে সাথে) আল্লাহর শত্রুদের।”–(সুরা আনফাল, আয়াত ৬০)। এমন জিহাদের গুরুত্ব বুঝাতে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কি এমন এক ব্যবসার কথা বলে দিব যা তোমাদেরকে বেদনাদায়ক আযাব থেকে রেহাই দিবে? সেটি হলো, তোমরা আল্লাহর উপর বিশ্বাস করো,এবং আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ও প্রাণ দিয়ে জিহাদ করো। এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা জানতে। (এরূপ জিহাদে অংশ নেয়ার পুরস্কার স্বরূপ) আল্লাহ তোমাদের পাপ মার্জনা করে দিবেন এবং তোমাদের দাখিল করবেন জান্নাতে যার পাদদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত, এবং স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। এটিই তো মহাসাফল্য।”–(সুরা সাফ,আয়াত ১০-১২)।

মু’মিনের ঈমানদারিটা এজন্যই স্রেফ নামায-রোযা ও হজ-যাকাত পালনে শেষ হয় না। ঈমানদারির প্রকাশ ঘটে শত্রু-হামলার প্রাণপণ প্রতিরোধেও। সারা রাত নফল ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে সীমান্ত প্রতিরক্ষায সামান্য মুহুর্তের সময় দানকে।–(হাদীস)। তাই ইসলাম ও মুসলিমদের উপর যখনই হামলা হয়, ইসলামের এ অতন্দ্র প্রহরীরা সে হামলার মোকাবেলায় বীরদর্পে খাড়া হয়। অথচ বাঙালী মুসলিমদের দ্বারা সেটি ঘটেনি। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীগণ তাই সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে নিরাপদ ভূমি রূপ বেছে নিয়েছিল বহু হাজার মাইল দূরের জিহাদ-বিমুখ বাঙালী মুসলিম অধ্যুষিত দেশকে। আফগানিস্তান, ইরান বা কাছের তুরস্কের উপর হামলাকে সতর্কতার সাথে পরিহার করেছে। তবে আফগানিস্তান, ইরান বা তুরস্কের উপর পরবর্তিতে যে হামলা হয়নি -তা নয়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী হামলার বিরুদ্ধে সে দেশগুলিতে তুমুল জিহাদ গড়ে উঠেছিল, এবং শত্রুদেরকে তারা শোচনীয় ভাবে পরাজিতও করেছিল।পলাশির ময়দানে যতজন ইংরেজ সৈনিক হাজির হয়েছিল তার চেয়ে বেশী সৈনিক নিয়ে তারা কাবুলের উপর হামলা করেছিল। কিন্তু সেখানে তাদের বিজয় জুটেনি, বরং আফগান মুজাহিদদের হাত থেকে একজন মাত্র ইংরেজ সৈনিক প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে আসতে পেরেছিল। অথচ পলাশীর প্রান্তরে প্রায় ৫০ হাজার মুসলিম সৈন্য মাত্র কয়েক হাজার ইংরেজ সৈন্যের সামনে নীরবে দাঁড়িয়েছিল। তারা কোন যুদ্ধই করেনি।বাঙালী মুসলমানদের স্বাধীনতা এভাবেই সেদিন নিরবে অস্তমিত হয়েছিল। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সাথে এ গাদ্দারিটা কি শুধু মীর জাফরের? সে যুদ্ধে দেশের বাঁকি মুসলিমদের ভূমিকাই বা কি ছিল? গাদ্দারি তো শত্রু্র দখদারির মুখে নিরব থাকাটাও। অথচ সে গাদ্দারিটি চলেছে ১৯০ বছর ধরে। বাঙালী মুসলিমগণ নিজেদের এ গুরুতর অপরাধটি ভূলেছে সব দোষ মীর জাফরের উপর চাপিয়ে। এবং বিপদের আরো কারণ, নিজেদের এ প্রকান্ড অপরাধ ও ঈমানী ব্যর্থতা থেকে আজও  তারা কোন শিক্ষা নিতে রাজি নয়।

 

ষড়যন্ত্র জিহাদ নিষিদ্ধের

শয়তান জিহাদের সামর্থ্যটি বুঝে। শয়তানের মূল কৌশলটি তাই জিহাদ থেকে মুসলিমদের অমনযোগী করা। শয়তানের এজেন্টগণ তাই মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ায বাধা দেয় না। নামায-রোযা, হজ-যাকাত বা দোয়া-দরুদের উপর লেখা বইও বাজেয়াপ্ত করে না। তাবলিগ জামায়াতের ইজতেমাতেও তারা কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে না। বরং সে ইজতেমার নিরাপত্তা বাড়ায় ও নিজেরাও তাতে যোগ দেয়। কিন্তু বাজেয়াপ্ত করে জিহাদ বিষয়ক বই। এবং নিষিদ্ধ করে কোরআনের তাফসির। ইংরেজগণ জিহাদ নিষিদ্ধ করতেই গোলাম আহম্মদ কাদিয়ানিকে ভন্ড নবীর বেশে ভারতে নামিয়েছিল। মুসলমানদের জিহাদ থেকে দূরে রাখার কাজে প্রয়োজন পড়েছিল ভন্ড-আলেম তৈরীর। আর সেজন্যই ইংরেজগণ নিজ হাতে গড়েছিল মাদ্রাসা। জিহাদকে বদনাম করার কাজে বাংলাদেশেও সর্বাত্মক চেষ্টা হচ্ছে। সে কাজে ময়দানে নামানো হচ্ছে, তরিকত, মারেফত, সুফিবাদের নামে হাজার হাজার ভন্ডদের। লোক-সমাগম বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগ হচ্ছে পীর, সুফি ও আউল-বাউলদের মাজারে। এজেন্ডা একটিই, জিহাদের ময়দান থেকে মুসলমানদের দৃষ্টি ফেরানো। এভাবে আল্লাহর দ্বীনের বিজয়কে প্রতিহত করা।

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে ইসলামের শত্রুশক্তির ষড়যন্ত্রটি বিশাল। কারণ, দেশটিতে বসবাস ১৬ কোটি মুসলিমের। প্রতিটি মুসলমানই ইসলামি বিপ্লবের বিশাল শক্তি। শক্তির সে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বাংলাদেশেও। সে বিস্ফোরণ শুধু বাংলাদেশেরই রাজনীতিই নয়, সমগ্র দক্ষিণ-এশিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। সেটি ইসলামের শত্রু পক্ষ বুঝে –বিশেষ করে ভারত। এজন্যই সে বিজয় রুখতে ইসলামের শত্রুপক্ষের বিনিয়োগটি বিশাল। ইসলামি বিপ্লবের সে বিস্ফোরণটি রুখতেই তারা রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামকে নিষিদ্ধ করতে চায়। এবং প্রতিষ্ঠিত করতে চায় নিজেদের একচ্ছত্র দখলদারি। রাজনীতির সে অঙ্গণটিতে ইসলামপন্থিদের তারা সামান্যতম স্থান দিতেও রাজি নয়। একই কারণে নবীজী (সাঃ)কে স্থান দিতে চায়নি আবু জেহেল ও আবু লাহাবের দল। রাজনীতির অঙ্গণে ঈমানদারদের প্রবেশ ঘটুক এবং সে ক্ষেত্রের দখলদারি নিয়ে মুসলিমদের পক্ষ থেকে চ্যালেঞ্জ খাড়া হোক -সেটি ইসলামের শত্রুপক্ষ চায় না। সেটি মুজিব যেমন চায়নি, হাসিনাও চায় না। চায় না ভারত ও ইসলামের আন্তর্জাতিক শত্রুপক্ষও। মিশরের নির্বাচনে সর্বাধিক ভোট পাওয়া ইখওয়ানূল মুসলিমীনকে নিষিদ্ধ করার প্রেক্ষাপট তো সেটিই। নিরস্ত্র সে দলটিকে সন্ত্রাসী দল বলে নিষিদ্ধ করা হলো ও গ্রেফতার করা হলো দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে। লক্ষণীয় হলো, গণহত্যায় সামরিক বাহিনীর সে স্বৈরাচারি আচরণের বিরুদ্ধে পাশ্চত্য মহলে কোন প্রতিবাদ উঠেনি। কারণ তারাও মিশরের রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামপন্থিদের বিশাল উপস্থিতিতে খুশি হতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও ইসলামপন্থিদের দ্রুত উত্থান নিয়ে চিন্তিত। তাই তারা আইন করে সে উত্থান রুখতে চায়। রাজনীতিতে ইসলাম নিষিদ্ধের মূল হেতু তো সেটিই। 

 

ঈমানদারের দায়ভার

কিন্তু কথা হলো, ইসলামকে বিজয়ী করার দায়ভার তো প্রতিটি ঈমানদারের। মিশরে যা কিছু হলো বা বাংলাদেশে যা কিছু হচ্ছে –তা কি অপ্রত্যাশীত? ইসলামের শত্রুপক্ষটি রাজনীতি বা বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে ঈমানদারদের জন্য নিরাপদ স্থান করে দিবে সেটি কি ভাবা যায়? অতীতে কোথাও কি সেটি ঘটেছে? এবং ভবিষ্যতেও কি তা আশা করা যায়? বরং তাদের পক্ষ থেকে নানারূপ বাধাবিপত্তি আসবে, হত্যা ও নৃশংসতা চাপিয়ে দেয়া হবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। তাছাড়া বিজয় তো আসে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। ঈমানদারের দায়ভার তো শুধু তাঁর দ্বীনের রাস্তায় লাগাতর জিহাদ করে যাওয়া। জান্নাতলাভের পূর্ব শর্ত হলো সেই জিহাদ। তাই পবিত্র কোরআনে রাব্বুল আ’লামিনের অতি সুস্পষ্ট ঘোষণা: “তোমাদের ভেবে নিয়েছো, (তোমরা এমনিতেই) জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ তো এখনো দেখেননি তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল।”–(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৪২)। প্রতিটি ঈমানদারের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে এটি এক ভয়ংকর সাবধানবানী। জান্নাত প্রবেশের পূর্ব শর্ত কি -সেটি এ আয়াতে বলে দেয়া হয়েছে। সেটি হলো জিহাদের রাস্তায় যোগদান এবং সে রাস্তায় ধৈর্যশীলতা। জিহাদের ময়দানে মু’মিনের বিনিয়োগ কতটুকু সেটি তিনি অবশ্যই পরিক্ষা করবেন। আর সে রাস্তায় অবিরাম টিকে থাকায় তার ধৈর্যই বা কতটুকু -সেটুকুও তিনি যাচাই করবেন। বলা হয়েছে: “তোমাদের কি ভেবে নিয়েছো যে তোমাদের এমনিতেই ছেড়ে দেয়া হবে, এবং আল্লাহ জেনে নিবেন না তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুসলমানদের ছাড়া অন্য কাউকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করা থেকে বিরত রয়েছে? তোমরা যা করো সে বিষয়ে তো আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।”–(সুরা তাওবা,আয়াত ১৬)। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আরো সাবধানবানী হলো: “তোমরা কি হাজিদের পান করানো ও মসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করাকে তাদের সমান মনে করো যারা ঈমান আনে আল্লাহ ও আখেরাতের উপর এবং জিহাদ করে আল্লাহর রাস্তায়? আল্লাহর নিকট তারা সমান নয়। আল্লাহ জালেমদের হেদায়েত করেন না।”–(সুরা তাওবা, আয়াত ১৯)। ফলে যাদের জীবনে নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, কোরআন-তেলাওয়াত, দরুদপাঠ, হাজিদের সেবা, মসজিদের খেদমত ও দান-খওরাত গুরুত্ব পেল অথচ গুরুত্ব পায়নি জিহাদ, তাদের জন্য উপরুক্ত আয়াতগুলিতে রয়েছে ভয়ানক দুঃসংবাদ।

আল্লাহতায়ালা হাশর দিনের প্রশ্নপত্র গোপন রাখেননি। কোর’আনের ছত্রে ছত্রে সেটি প্রকাশ করে দিয়েছেন। কিসে পাশ মার্ক আর কিসে ফেল মার্ক -সেটিও বলে দেয়া হয়েছে। তাই যারা কোর’আন বুঝে তারা সে প্রশ্নপত্র অনুযায়ী প্রস্তুতিও নেয়। এমন ঈমানদারগণ শুধু নামায আদায়ের জন্য মসজিদই খোঁজে না, জিহাদের ময়দানও খোঁজে। তাই হাজার হাজার যুবক এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশ থেকে বহু হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এখন সিরিয়ায় ছুটেছে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে ছুটেছিল আফগানিস্তানে। সাহাবায়ে কেরামের যুগে এজন্যই শতাধিক জিহাদে লোকবলের কোন কমতি পড়েনি। প্রায় ৮ শত বছর আগে জিহাদ লড়তে তুর্কি যুবকেরা হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে বাংলার মাটিতে ছুটে এসেছিল। বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন থেকে মুর্তিপুজার ন্যায় আদিম অসভ্যতা দূর হয়েছিল তো সে জিহাদের বরকতে।

কিন্তু আজ বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলিমের জীবনে সে বিনিয়োগ কই? নদীর স্রোত থেমে গেলে নদীর বুক জুড়ে বিশাল চরা জেগে উঠে। নদী তখন ছোট ছোট মরা নদীতে পরিণত হয়। তেমনি উম্মাহর জীবনে জিহাদ থেমে গেলে মুসলিম ভূমি কাফের, ফাসেক, জালেম, মুনাফিক ও স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের দখলদারিতে চলে যায়। বাংলাদেশ তো সেটিই ঘটেছে। ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে কোন মুসলিম দেশ এরূপে অধিকৃত হতে দেখে নিঃসন্দেহে বলা যায়, দেশটির মুসলিমদের জীবনে জিহাদের সংস্কৃতি স্থান পায়নি। তাছাড়া জিহাদের ময়দানে মুসলিমদের মাঝে যতটা ঐক্য গড়ে উঠে সেটি জিহাদশূণ্য রাজনীতির ময়দানে গড়ে উঠে না। জিহাদে অবস্থান কালে গভীরতর হয় পরকালের ভাবনা, গুরুত্ব পায় আল্লাহকে খুশি করার আধ্যাত্মিকতা। অপর দিকে ক্ষমতালিপ্সার রাজনীতিতে যা গুরুত্ব পায় তা হলো পার্থিব স্বার্থ শিকার। ফলে বাড়ে বিরোধ। তাই মুসলিম উম্মাহর জীবনে যতদিন জিহাদ ছিল, ততদিন একতাও ছিল। এবং ছিল এশিয়া,আফ্রিকা ও ইউরোপ ব্যাপী এক বিশাল ভূগোল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এত বিরোধ ও বিভক্তি তো মুসলিম জীবনে জিহাদ না থাকার কারণে।

ইসলামের বিপক্ষ শক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলাম নিষিদ্ধ করতে পারে। নিষিদ্ধ করতে পারে জিহাদ বিষয়ক বইপুস্তকও। কিন্তু ইসলাম ও মুসলিমগণ তো কোন কালেই শয়তান ও তার অনুসারিদের অনুমতি নিয়ে বাঁচেনি। তাছাড়া সে অনুমতি কি তারা কখনো পেয়েছে? বরং শত্রুশক্তির নানারূপ বাধাবিপত্তির মুখে মুসলিম তো বেঁচেছে লাগাতর জিহাদ করে। নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালনে মুসলিম কি কারো অনুমতি নেয়? তাই বুদ্ধিবৃত্তি ও রাজনীতির অঙ্গণে জিহাদের ন্যায় ফরজ ইবাদত পালনেও কি তারা কারো অনুমতির অপেক্ষায় থাকে? মুসলিমদের ভরসার স্থল তো একমাত্র সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ। আর আল্লাহতায়ালা যাদের সহায় হন, তাদের কি আর কোন সহায়তার প্রয়োজন পড়ে? তখন বিজয় কি কেউ রুখতে পারে? ঈমানদারির দায়ভার তো সে আল্লাহনির্ভর চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠা। তাতে লোপ পায় যেমন শত্রুশক্তির ভয়, তেমনি বিলুপ্ত হয় গায়রুল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা। মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য তো এভাবেই অনিবার্য হয়ে উঠে। মুসলমানের বিজয় তো এপথেই আসে। ১ম সংস্করণ ২২/০৩/২০১৪; ২য় সংস্করণ ০৩/০২/২০২১।




অতীতের ব্যর্থতা এবং বাংলাদেশের আজকের বিপর্যয়

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 আজকের বিপর্যয়

বাংলাদেশের আজকের বিপর্যয়টি যেমন গভীর, তেমনি ভয়ানক। দেশটিতে অসম্ভব হয়েছে সভ্য জীবন-যাপন। নৃশংস ফ্যাসিবাদ বলতে যা বুঝায় -প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তারই টেক্সটবুক ভার্শন। ক্ষমতাসীন দলের নাশকতায় মারা পড়েছে সংসদীয় গণতন্ত্র, কেড়ে নেয়া হয়েছে মৌলিক মানবাধিকার, কোমড় ভাঙ্গা হয়েছে বিরোধী দলগুলোর, বিলুপ্ত হয়েছে নিরপেক্ষ নির্বাচন, দলীয়করণের শিকার হয়েছে আদালত এবং প্লাবন এসেছে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের। তারা দখলে নিয়েছে রাজনীতিই শুধু নয়, দেশের বিচার ব্যবস্থা, মিডিয়া, প্রশাসন, পুলিশ -এমনকি সেনাবাহিনী তাদের আজ্ঞাবহ সেবাদাসে পরিণত হয়েছে। সরকারের যা ইচ্ছা তাই করার আজাদী রয়েছে। কিন্তু জনগণের অধিকার নাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে মিটিং, মিছিল ও প্রতিবাদের। দুর্বৃত্তদের হাতে শত শত কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। সেটিও যেন মামূলী বিষয়; প্রতিকার নাই।

রাজনীতির ময়দানে নিরংকুশ বিজয়টি ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের। তাদের কারণে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ভারতীয় এজেন্ডা। বাংলাদেশ থেকে ভারতের চাওয়ার তালিকাটি বিশাল। ভারত চায়, নবীজী (সা:)’র ইসলাম –যাতে আছে ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়তের প্রয়োগ, জিহাদ, বিশ্বমুসলিম ভাতৃ্ত্ব, শুরা ভিত্তিক শাসন এবং একতা, তা পুরাপুরি বাংলাদেশের বিলুপ্ত হোক মুসলিম জনগণের চেতনা থেকে। ভারতের কাছে নবীজী (সা:)’র  ইসলাম হলো মৌলবাদ এবং জিহাদ হলো সন্ত্রাস। ভারতের দাবী, বাংলাদেশের মুসলিমদের সরতে হবে ইসলাম থেকে। ইসলামের পক্ষ নেয়াটাই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশের ভারতেসেবী পক্ষটিও অবিকল সেটিই বলে। ভারত চায়, বাংলাদেশের মানুষ বাঁচুক মুর্তিনির্মাণ ও মুর্তির সামনে ভক্তি জানানোর হিন্দু সংস্কৃতি নিয়ে। ভারতের সে সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা দিতেই রাস্তাঘাট পূর্ণ হচ্ছে মুর্তিতে –৮ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে কখনোই সেটি হয়নি। এমনকি হিন্দু শাসন আমলেও এতো মুর্তি গড়া হয়নি -যা আজ হচচ্ছে।

ভারত চায়, ভারতে মুসলিমগণ খুন, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হলে বা সেদেশে মসজিদ ধ্বংস করা হলে বাংলাদেশ সরকারের কাজ হলো তা নিয়ে নীরব থাকা। এবং জনগণকে রাস্তায় ভারতবিরোধী প্রতিবাদ থেকে প্রতিহত করা। এবং ভারত চায়, বাংলাদেশের বানিজ্যিক বাজার ও শ্রম বাজার সম্পূর্ণ উম্মুক্ত হোক ভারতীয়দের জন্য। লক্ষণীয় হলো, ভারত যা কিছু চায় তা সবই দিয়েছে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকার। ভারতকে অকাতরে দেয়া নিয়ে হাসিনার প্রচুর গর্বও। অতীতে একই ভাবে শেখ মুজিবও দিয়েছিল। কিন্তু ভারত থেকে পাওয়ার অংকটি ফাঁকা। পদ্মার নায্য পানি যেমন মিলছে না, মিলছে না তিস্তার পানিও।

 

অতীতের ব্যর্থতা

অতীতের ব্যর্থতাগুলো পরবর্তীতে ভয়ানক বিপর্যের কারণ হয়। এবং আজকের ব্যর্থতাগুলো বিপর্যয় সৃষ্টি করবে ভবিষ্যতে। প্রশ্ন হলো, কি সে অতীতের ব্যর্থতা? এবং আজকের ব্যর্থতাগুলোই কি? বাংলাদেশের কল্যাণ নিয়ে যারা ভাবে তা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়্ বাংলাদেশে আজ যে বিপর্যয় তার শিকড় রোপন করা হয়েছিল দেশটির জন্মের বহু আগেই। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোথায় সে ব্যর্থতা এবং কারা সে ব্যর্থতার নায়ক সেগুলো  চিহ্নত করা। নইলে আজকের ব্যর্থতার কারণগুলো যেমন জানা  যাবে না, তেমনি ভবিষ্যতের বিপর্যয় থেকেও মুক্তি মিলবে না।

বাংলাদেশের বর্তমান ব্যর্থতাগুলোর শিকড় বপন করা হয়েছে ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে। ঘটেছে ব্রিটিশ শাসনামলেও। সে ব্যর্থতার কারণ যেমন অপরাধী চক্রের রাজনীতি, তেমনি বুদ্ধিজীবী চক্রের ভয়ানক বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তি। সে সাথে যোগ হয়েছে প্রতিবেশী ভারতের আগ্রাসী ষড়যন্ত্র। তারা যৌথ ভাবে ব্যর্থ করে দেয় উপমহাদেশের মুসলিমদের বিশাল রক্ত ব্যয়ে অর্জিত পাকিস্তান প্রজেক্ট। দেশটির ধ্বংসের মধ্যে তারা নিজেদের স্বার্থ পূরণের রাস্তা খুঁজেছে। তবে তাদের ধ্বংস প্রক্রিয়া ১৯৭১’য়ে থেমে যায়নি, বরং সে অভিন্ন অপরাধীদের হাতেই জিম্মি হলো আজকের বাংলাদেশ।

ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর হাতে বঙ্গ বিজয়ের পর বাঙালী মুসলিমদের সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্ব ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। সে সময় পাকিস্তান ছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। এবং সে রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ জনগোষ্টি ছিল বাঙালী মুসলিম। এবং সে পাকিস্তান আজ পারমানবিক অস্ত্রধারী একমাত্র মুসলিম দেশ। ফলে বাঙালী মুসলিমগণ সুযোগ পেয়েছিল শুধু মুসলিম বিশ্বের নয়, সমগ্র বিশ্ব রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার। হতে পারতো দক্ষিণ এশিয়ার বুকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রধান কর্ণধার। কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের সে সুবর্ণ সুযোগ বাঙালী কাপালিকদে ভাল লাগেনি। ফলে সে সুযোগটি বিনষ্ট করতে তারা উঠে পড়ে লাগে।

প্রতিবেশীর গোলাম হওয়ার নেশা যখন চাপে তখন স্বাধীন থাকাটাই অসহ্য হয়ে উঠে। এদের কাছে তাই অসহ্য হয়ে পড়ে পাকিস্তানের বৃহৎ ভূগোল। এবং সে ভূগোল ভাঙ্গার কাছে ভারতের ন্যায় কুচক্রি ও সুযোগ-সন্ধানী পার্টনারও পেয়ে যায়। ভারত পাকিস্তান ভাঙ্গার সে কাজটি নিজ খরচে ১৯৪৭ সালে করে দিতে দুই পাড়ে খাড়া ছিল। তাদের প্রয়োজন ছিল শেখ মুজিবের ন্যায় একজন আজ্ঞাবহ সেবাদাসের। সে সুযোগটি আসে ১৯৭১’য়ে। ফলে মুক্তি বাহিনীকে একটি জেলা বা একটি মহকুমাও স্বাধীন করতে হয়নি। ভারতীয় সেনাবাহিনী সে কাজটি নিজ দায়িত্বে ও নিজ খরচে করে দিয়েছে। একাজের জন্য ভারতের পদসেবা, অর্থসেবা ও ভারতের এজেন্ডার প্রতিষ্ঠা দিয়ে বাঁচাই এখন বাঙালী কাপালিকদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি। ভারতের প্রতি চির কৃতজ্ঞ হয়ে বাঁচাটাই তাদের কাছে গর্বের। 

 

পাকিস্তান আমলের বড় ব্যর্থতাটি

পাকিস্তান আমলের বড় ব্যর্থতাটি অর্থনৈতিক ছিল না। প্রশাসনিকও নয়। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার ছিল ভারতের চেয়েও অধিক। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রশাসকগণ আসতো পাকিস্তান থেকে উন্নয়নের মডেল শিখতে্। সে সময় বহু বিশ্ববিদ্যালয়, বহু মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ, ডিগ্রী কলেজ, ক্যাডেট কলেজ, স্কুল, ক্যান্টনমেন্ট ও কলকারাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্ত ২৩ বছরে একখানি বইও এ নিয়ে লেখা হয়নি যে কেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা হলো। ভারত তো ১৯৪৭ সালের আগে অখণ্ডই ছিল। কিন্তু কেন ভাঙ্গার প্রয়োজন দেখা দিল? পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে এ প্রশ্নটির জবাব দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের ছাত্ররা দেশ-বিদেশের কত জীবজন্তু, লতা-পাতা, কবিতা-পুঁথির উপর গবেষণা করে। পিএইচডি ডিগ্রিও নেয়। কিন্তু অখণ্ড ভারত ভেঙ্গে কেন পাকিস্তান সৃষ্টি হলো -তা নিয়ে কোন গবেষণা করা হয়নি। তেমন কোন বইও লেখা হয়নি। আজ যে অখণ্ড ভারতের কথা বলা হচেছ এবং যেভাবে বাঙালী মুসলিমের মনে বাড়ছে অখণ্ড ভারতের মোহ, সেটি কখনোই এতটা প্রতিষ্ঠা পেত না যদি সে সময় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা নিয়ে ছাত্রদের প্রকৃত ইতিহাস জানানো হত। রাতের অন্ধকারে সুবিধা হয় চোর-ডাকাত-দুর্বিত্তদের, তেমনি অজ্ঞতায় মহা সুবিধা পায় বিদেশী শত্রুরা। তখন জনপ্রিয়তা পায় তাদের ধোকাপূর্ণ বুলি এবং ক্ষতিকর ধ্যান-ধারণা। অখণ্ড ভারতের মোহ তো সে কারেণই বাড়ছে। ইসলামে অজ্ঞ থাকা এজন্য কবীরা গুনাহ।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল ইসলাম ও প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্ব। ইসলামই ছিল পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে একমাত্র যোগসূত্র। এমন একটি আদর্শিক দেশের প্রতি সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রি ও ইসলামবিরোধীদের দরদ থাকার কথা নয়। বরং এমন দেশে তাদের রাজনৈতিক মৃত্যু অনিবার্য। সেটি তারা বুঝতো বলেই দিবারাত্র খেটেছে দেশটির ত্বরিৎ ধ্বংসে। কিন্তু পাকিস্তানের সরকারের যারা কর্ণধার ছিল তারা এ ঘরের শত্রুদের চিনতে পারিনি। চিনলেও তাদের থেকে বাঁচার কোন চেষ্টা করেনি। বরং তাদের অবাধে বাড়তে দিয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধের বহু  আগেই বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গনটি ভারতসেবীরা দখলে চলে যায়। পাকিস্তান ও ইসলামের পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের তেমন কোন লড়াকু সৈনিকই ছিলনা। একই অবস্থা আজও।

সেক্যুলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেদিন যারা বের হয়েছেন তারা পাকিস্তানের বা ইসলামের পক্ষে লাঠি না ধরে নিজেদের শ্রম ও মেধার বিনিয়োগ করেছেন তার বিনাশে। ষাটের দশকে তারা লাঠি ধরেছিলেন সোভিয়েত রাশিয়া বা চীনের পক্ষে। আর এখন খাটছেন ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণে। তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম যে বাঙালীকে পাকিস্তান সরকার বৃত্তি দিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠায় তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক জনাব আব্দুর রাজ্জাক। অথচ এই আব্দুর রাজ্জাকই বিলেত থেকে ফিরে এসে যে কাজটি লাগাতর করেছেন তা হলো পাকিস্তানের শিকড় কাটার কাজ। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিব তাঁর এ রাজনৈতিক গুরুকে জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা দেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আব্দুব রাজ্জাকের ন্যায় এ রকম গাদ্দার ছিলেন প্রচুর। এদেরই অনেকেই এখন খাটছেন ভারতের সেবাদাস রূপে। এদের কারণেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইসলাম-বিরোধীদের দুর্গে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলেও তাদের মিশন শেষ হয়নি। বাংলাদেশের ভুগোলের মধ্যেও তারা পাকিস্তান ও ১৯৪৭’য়ের গন্ধ টের পায়। এবং যা কিছু পাকিস্তানী -তাই তাদের কাছে ঘৃণ্য। এদের অনেকে নাকি পাকিস্তানের নাম উচ্চারন করলে টুথ পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজে। তারা শুধু পাকিস্তানের নয়, শত্রু স্বাধীন বাংলাদেশেরও।

 

নাশকতা চেতনা বিভ্রাটের

বাঙালী মুসলিমের চেতনা বিভ্রাটের আলামতগুলো বিশাল। অনেকেই বলে, “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না হলেই তো ভাল হতো। অখণ্ড ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হতো -এ বিশাল জনসংখ্যা শক্তিশালী মুসলিম শক্তির জন্ম ঘটাতো।” একথা বলার মতলবটি হলো, বাংলাদেশ না হলে ভাল হতো -সে কথাটা পরোক্ষ ভাবে বলা। এরূপ কথা ১৯৪৭’য়ের আগে কংগ্রেসপন্থি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের নেতা-কর্মীগণও বলতো। তারাও চায়নি, বাংলাদেশ অখন্ড ভারতের বাইরে থাক। সিলেটে যখন গণভোট হয় তখন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের আলেমগণ বহু চেষ্টা করেছে যেন সিলেটে ভারতে থাকে। বাংলাদেশ ভারতে মিশে গিলে এখনও তারা খুশি হয়। 

বাংলাদেশে মুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ৯১ ভাগ। কিন্তু তাতে কি রাজনীতি, সংস্কৃতি ও প্রশাসনে হিন্দু বা ভারতীয়দের দাপট কমেছে? কাশ্মীরে শতকরা ৭০ ভাগ মুসলিম। কিন্তু তাতে কি তারা স্বাধীন ভাবে বাঁচার সুযোগ পেয়েছ। অনেকের প্রশ্ন, “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় মুসলিমদের কোন কল্যাণটি হয়েছে?” কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন হলো, ভারতে বসবাসকারি প্রায় ২০ কোটি মুসলিমেরই বা কোন কল্যাণটি হয়েছে? বাংলাদেশে যত মুসলিমের বাস তার চেয়ে বেশী মুসলিমের বাস ভারতে। কিন্তু ভারতীয় মুসলিমদের শক্তি কতটা বেড়েছে? বরং বঞ্চনা সেখানে সর্বত্র। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ভারতের সংখ্যালঘুদের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য একটি তদন্ত কমিশন ঘটনা করেছিলেন। সে তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে যে তথ্যগুলো বেরিয়ে এসেছে তা তো অতি করুণ। শিক্ষা ও চাকুরিতে মুসলিমদের অবস্থা ভারতের অচ্ছুত নমশুদ্রদের চেয়েও খারাপ। ১৯৪৭’য়ে ভারতের মুসলিমদের যে অবস্থা ছিল তা থেকেও তারা অনেক নিচে নেমেছে। অর্থনৈতিক বঞ্চনার পাশাপাশি তারা নিয়মিত নির্মম ভাবে মারা যাচ্ছে এবং লুটপাঠ ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে মুসলিম-নির্মূলের অসংখ্য দাঙ্গায়। ভারতীয় জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ মুসলিম হলেও চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও নয়। কিন্তু ভারতীয় মুসলিমের সে বঞ্চনার ইতিহাস বাঙালী মুসলিমদের সামনে তুলে ধরা হয়নি। পাকিস্তান আমলের এ এক বড় ব্যর্থতা। নেকড়েকে নেকড়ে রূপে পরিচয় না করিয়ে বিপদ তো ভয়াবহ।   

 

পাকিস্তান কি সত্যিই ব্যর্থ?

বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের খাসলত হলো নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে পাকিস্তানের ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরা। নিজেরা যে ৫ বার দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হলো -সে কথা তারা বলে না। তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি বা শাড়ীর বদলে মাছধরা জাল পড়ে বাঙালী মহিলা যে বিশ্বময় ইতিহাস গড়লো -সে কথাও বলে না। অথচ লাহোর বা করাচীতে বোমা ফুটলেই বলে পাকিস্তান একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। পাকিস্তানের ব্যর্থতা অনেক। তবে দেশটির অর্জন কি এতোই তুচ্ছ? পাকিস্তানের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালগুলিতে যত মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করে ভারতে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা তার ২০ ভাগের এক ভাগও নয়। অথচ একটি দেশের মানুষ কতটা সামনে এগুচ্ছে বা কীরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক শক্তিসঞ্চয় করছে -সেটি পরিমাপের একটি নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা। ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে চাকুরিজীবী প্রফেশনালদের সংখ্যাও অনি নগন্য।

পাকিস্তানের একমাত্র করাচী শহরে যত ডাক্তার, শিক্ষক, প্রকৌশলী, আইনবিদ, প্রফেসর, বিজ্ঞানী ও সামরিক অফিসারের বসবাস -সমগ্র ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে তা নেই। তাছাড়া পাকিস্তানে যতজন পারমানবিক বিজ্ঞানী বা পদার্থ বিজ্ঞানীর বসবাস তা ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে দূরে থাক, ৫৭টির মুসলিম দেশের মধ্যে কোন দেশেই নাই। সম্প্রতি ব্রিটিশ পত্রিকায় প্রকাশ, পাকিস্তানের পারমানবিক বোমার সংখ্যা ফ্রান্সের প্রায় সমকক্ষ। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একমাত্র তাদের হাতেই রয়েছে পারমানবিক বোমাধারি দূরপাল্লার মিজাইল যা ভারতীয় প্রযুক্তির চেয়ে অগ্রসর। একাত্তর থেকে পাকিস্তানে তাই অনেক সামনে এগিয়েছে। দেশটি আজও বেঁচে আছে সে সামরিক শক্তির জোরেই। নইলে ভারত ইতিমধ্যে দেশটিকে আরো কয়েক টুকরোয় বিভক্ত করে ফেলতো। একাত্তরের পর ভারতীয় র’ সেটির পরিকল্পনাও এঁটেছিল। ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রায়না তার বই “Inside RAW”য়ে সে বিষয়ে বিস্তর বিবরণ তুলে ধরেছেন।

সামরিক শক্তির বিচারে পাকিস্তানই হল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। আর এ কারণেই দেশটি তার জন্ম থেকেই সকল আন্তর্জাতিক ইসলাম-বিরোধী শক্তির টার্গেট। অখণ্ড ভারতে বসবাস করলে মুসলিমদের কি এরূপ শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ মিলতো? শক্তি সঞ্চয়ের জন্য তো নিজের পায়ের তলায় মাটি চাই, স্বাধীনতাও চাই। ভারতের মুসলিমদের কি সেটি আছে? কারাগারে বন্দীদের সংখ্যা যতই বৃদ্ধি পাক তাতে কি তাদের শক্তি বাড়ে? মুসলিমদের জন্য ভারত কি জেলখানা থেকে ভিন্নতর?

বীজ সব জায়গায় গজায় না,বেড়েও উঠে না। বনেজঙ্গলে পড়লে গজালেও বেড়ে উঠে না। ভারতে মুসলিম প্রতিভা যে নাই -তা নয়। প্রতিটি শিশুরই থাকে বিপুল সম্ভাবনা। কিন্তু ভারতে মুসলিম শিশুকে বেড়ে উঠার অনুকূল পরিবেশ দেয়া হয়না। হিজরত এজন্যই ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মক্কার বন্দী জীবন ছেড়ে হিজরত এজন্যই আল্লাহপাক ফরয করেছিলেন। হিজরতের মাধ্যমেই তাঁরা সেদিন পেয়েছিলেন উর্বর ভূমিতে গিয়ে নিজ প্রতিভা নিয়ে বেড়ে উঠার সামর্থ্য। এর ফলে পেয়েছিলেন শক্তিশালী সভ্যতার নির্মান ও বিশ্বশক্তি রূপে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সামর্থ্য। সাতচল্লিশের পর ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলিম ভারত থেকে হিযরত করে পাকিস্তান গিয়েছিলেন এমন এক চেতনায়। পাকিস্তানের পারমানবিক বোমা আবিস্কারক ড.আব্দুল কাদির হলেন তাদেরই  একজন।

তাছাড়া পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা অনর্থক গণ্য হলে শুধু পাকিস্তান নয়, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রয়োজনীতাও অনর্থক হয়ে দাঁড়ায়। তাই পাকিস্তানের সৃষ্টিকে অনর্থক বা অনাসৃষ্টি বলা বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর চিন্তা। বাংলাদেশ তার সমগ্র মানচিত্রটা পেয়েছে পাকিস্তান থেকে। বাংলাদেশীরা একাত্তরে বা তার পরে এ একইঞ্চি ভূমিও এ মানচিত্রে বাড়ায়নি। তাই বাংলাদেশী মুসলিমদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ১৯৪৭’য়ে অর্জিত স্বাধীনতা। ১৯৭১’য়ে এসে পাকিস্তান থেকে শুধু বিচ্ছিনতাই জুটেছে, স্বাধীনতা নয়। ১৯৭১’য়ের ১৬ই ডিসেম্বরকে স্বাধীনতা দিবস বললে তার পূর্বের পাকিস্তানী ২৩ বছরকে ঔপনিবেশিক বিদেশী শাসন বলে প্রমাণিত করতে হয়। কিন্তু সে পাকিস্তানী আমলকে ঔপনিবেশিক বিদেশী শাসনামল বললে কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর ঢাকার খাজা নাযিম উদ্দিন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হন কি করে? বগুড়ার মহম্মদ আলী এবং আওয়ামী লীগের সোহরোয়ার্দী প্রধানমন্ত্রীই বা হন কি করে? মিথ্যা কথায় হিসাব মিলানো যায় না। তবে মিথ্যা কথা বলার পিছনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা আছে। সেটি নিজেদের কৃত অপরাধগুলোকে গৌরবময় করার স্বার্থে। তাছাড়া তাদের দায়বদ্ধতা হলো ভারতের আগ্রাসী চরিত্রকে আড়াল করার। কিন্তু যারা আওয়ামী লীগের সে অপরাধের সাথে জড়িত নয় এবং লিপ্ত নয় ভারতের লেজুড়বৃত্তিতে, অন্তত তাদের তো সত্য কথাগুলো নির্ভয়ে বলা উচিত।

বরং একাত্তরে যেটি জুটেছে সেটি হলো, ভারতীয় প্রভাব বলয়ে প্রবেশ। ১৯৭১’য়ের পর থেকে ভারত বাংলাদেশকে গণ্য করে তার প্রতিরক্ষা সীমানার অন্তভূক্ত একটি দেশ রূপে। যেমন হায়দারাবাদেরর নিযামের রাজ্য গণ্য হতো ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের কাছে। হায়দারাবাদের নিযাম সে আমলে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন। অথচ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নিজ দেশের প্রতিরক্ষায় দূরপাল্লার একখানি কামানও কিনতে দেয়নি। দেশটির মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নিতে জালের মত রেল লাইন বসিয়েছিল। তাই ১৯৪৮ সালে ভারত-ভূক্ত করতে ভারতকে বেগ পেতে হয়নি। এক দুর্বল আশ্রিত রাষ্ট্রের অবকাঠামো ব্রিটিশেরা পূর্ব থেকেই সেদেশে নির্মাণ করে গিয়েছিল। বাংলাদেশেও তেমনি এক অবকাঠামো নির্মাণ করেছে ভারত ও তার বাংলাদেশী সহযোগীরা। সেটি যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক, তেমনি সাংস্কৃতিক ও সামরিক। তেমন একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখেই একাত্তরের যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান আর্মির অব্যবহৃত সকল অস্ত্র ভারতীয় সেনাবাহিনী নিজ দেশে নিয়ে যায়। একমাত্র অজ্ঞতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মহাবিভ্রাটই এ সত্যকে ভুলিয়ে দিতে পারে। অথচ বাংলাদেশের ভারতপন্থিরা সে বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রাটই বাড়িয়ে চলেছে। আর সে অজ্ঞতা ও বিভ্রাটের কারণেই ভারতের জালে আটকা বন্দীদশা নিয়েও আজ ভারতপন্থি বাঙালী মহলে হচ্ছে মহোৎসব।   

 

সামনে মহা বিপদ

আজকের ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারি শাসক বাংলাদেশে যেভাবে গণতান্ত্রিক আচার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে -তা ভবিষ্যতে মারাত্মক রকমের বিপর্যয়ের জন্ম দিবে। স্বৈরাচার নিজেই দেশ শাসনের এক নৃশংস ও অসভ্য রীতি। এবং সে অসভ্য শাসনই এখন বাংলাদেশের মানুষের ঘাড়ের উপর। গণতান্ত্রিক শাসনের সভ্য রীতি হাওয়ায় জন্ম নেয় না, সে জন্য লাগাতর পরিচর্যা দিতে হয়। লাগাতর পরিচর্যার মাধ্যমে গণতন্ত্র জনগণের সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়। তখন জনগণ ভোটচুরি ও ভোটডাকাতিকে মন থেকে ঘৃণা করতে শেখে। অথচ সে সংস্কৃতি ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারে গড়ে উঠে না।

স্বৈরাচারি শাসনের বড় নাশকতা হলো এটি দেশকে নেতা শূণ্য করে। পাল্টে দেয় মানুষের মূল্যবোধ ও বিচারবোধ। দুর্বৃত্ত স্বৈরশাসন জনগণকে ভোটচোর ও ভোটডাকাতদেরও মাননীয়, মহান নেতা, দেশবন্ধু, দেশনেত্রী বা জাতির পিতা বলতে শেখায়। এভাবে জনগণের চেতনা ও সংস্কৃতি পাল্টায়। এখানেই বাংলাদেশের জন্য মহা বিপদ। ১৯৭১’য়ে দেশের মানচিত্র পাল্টানো হয়েছিল। এখন চলছে চেতনা, চরিত্র ও সংস্কৃতি পাল্টানোর কাজ। কারণ শয়তান শুধু মুসলিমদের ভূগোল বিভক্ত করা নিয়ে খুশি নয়। আরো নিচে নামাতে চায়। জাহান্নামের পূর্ণ উপযোগী করে গড়ে তুলতে চায়। এজন্য জনগণের ঈমান, আমল ও সংস্কৃতির অঙ্গণে নাশকতা ঘটায়। কারণ স্বৈরাচার তো সুস্থ্য চেতনা ও সংস্কৃতিতে বাঁচে না। অসভ্য স্বৈরাচারি শাসকগণ নিজেরা পাল্টায় না; বরং জনগণকে পাল্টায় নিজেদের দুর্বৃত্তির সাথে ম্যাচিং তথা সমন্বয় বাড়াতে। এজন্যই স্বৈরশাসনে দুর্বৃত্ত উৎপাদনে বাম্পার ফলে। বাংলাদেশের জন্য ভয়ংকর বিপদের কারণ এখানেই্। ২৭/০১/২০২১।   

 




বাংলাদেশের অস্তিত্বের সংকট

ফিরোজ মাহবুব কামাল

মডেলটি ব্যর্থতার                                                             

বিশ্বমাঝে বাংলাদেশ এখন এক ব্যর্থতার মডেল। সেটি যেমন ভোট-ডাকাতি ও নৃশংস ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের। তেমনি পর পর পাঁচবার দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হওয়ার। এবং সে সাথে গুম, খুন, চুরি ডাকাতি, ব্যাংক ডাকাতি, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের জোয়ার আনার। তাই যারা নীচে নামতে চায় তারা বাংলাদেশ বহু কিছু শিখতে পারে। সব রোগের পিছনেই কারণ থাকে। তাই কারণ আছে বাংলাদেশের এরূপ নীচে নামারও। পতনের শুরুটি চেতনার বিভ্রাট বা অসুস্থ্যতা থেকে। চেতনাই ব্যক্তিকে কর্ম ও আচরণে পথ দেখায়। ভারতের অনেকে যেরূপ গো-মুত্র সেবন করে, দলিতদের যেরূপ অচ্ছুৎ বলে এবং কিছুকাল আগেও বিধবাদের স্বামীর চিতায় জ্বালিয়ে হত্যা করতো –তা তো অসুস্থ্য চেতনার কারণে। তাই দুর্বৃত্তিতে লিপ্ত দেখে নিশ্চিত বলা যায়, চেতনার ভূমিটি সুস্থ্যতা হারিয়েছে। বাংলাদেশীদের রোগটি এখানেই। পরিতাপের বিষয়ট হলো, ১৯৭১’য়ে দেশটির জন্ম থেকে জনগণকে সুস্থ্য কোন দর্শন বা চেতনার সন্ধানই দেয়া হয়নি। বরং সেটিকে আড়াল করা হয়েছে। অথচ সুস্থ্য ইসলামের ন্যায় সুস্থ্য জীবন-দর্শনের কারণে মুসলিমগন তাদের গৌরব কালে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হতে পেরেছিলেন। 

বিপদের আরো কারণ, বাংলাদেশী মুসলিমদের চেতনার বিভ্রাট যে দিন দিন ভয়ানক রূপ নিচ্ছে -সে প্রমাণ প্রচুর। রোগ নিয়ে জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার তখনই প্রয়োজন হয় যখন সেটি দেহের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশীদের চেতনার রোগটি এখন আর লুকিয়ে নেই, বরং সর্ববিধ সিম্পটম নিয়ে নিজের উপস্থিতি জাহির করছে। জাতীয় জীবনে কোন রোগই -তা সে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা নৈতিক হোক, হঠাৎ আসে না। বাড়ে বহুকাল ধরে। ঝড় শুরু হওয়ার আগে থেকেই আকাশে যেমন কালো মেঘ জমতে শুরু করে তেমনি জাতির জীবনেও কালো মেঘ জমতে থাকে বিপর্যের বহু আগে থেকেই। কালো মেঘ দেখেও ঝড়ের আলামত টের না পাওয়াটি অজ্ঞতা। তেমনি মানব জীবনের ভয়ানক অজ্ঞতাটি হলো, প্রচণ্ড বিচ্যুতি ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে থেকেও তা নিয়ে বোধোদয় না হওয়া। এ অজ্ঞতা নিরক্ষরতার চেয়েও ভয়ানক।

এমন অজ্ঞতা যে শুধু দেশের সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে বিরাজ করছে তা নয়, প্রকট রূপ ধারণ করেছে তাদের মাঝেও যারা নিজেদেরকে ধর্মভীরু মুসলিম ও ইসলামি আন্দোলনের কর্মী বা সমর্থক বলে দাবী করে। বাংলাদেশের অর্জিত ব্যর্থতার জন্য শুধু কোন একক ব্যক্তি বা দল দায়ী নয়, দায়ী সবাই। দুর্বৃত্ত শাসনকে যারা নীরবে মেনে নেয় দায়ী তারাও। কর্পুর যেমন দিন দিন হাওয়ায় হারিয়ে যায়, বাংলাদেশের মানুষের আক্বিদা ও আচরণ থেকে ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধও যেন হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে আজ থেকে ৫০ থেকে বছর আগে বাংলার মানুষ ইসলামের যতটা কাছে ছিল, এখন ততটাই দূরে। তখন বিছমিল্লাহ বা আল্লাহর উপর আস্থা নিয়ে অন্ততঃ মুসলিমদের মাঝে বিরোধ ছিল না। অথচ এখন ঈমানের সে মৌল বিশ্বাসটি দেশের শাসনতন্ত্রে উল্লেখ করাও অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ইসলাম থেকে বাংলাদেশের মানুষ যে কতদূর দূরে সরেছে এ হল তার নমুনা। আর এ অবস্থা সৃষ্টির জন্য যেটি সফল ভাবে কাজ করেছে সেটি দেশের সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা। এ শিক্ষা ব্যবস্থার মূল প্রবর্তক ছিল ব্রিটিশ শাসকেরা। এর মূল কাজটি মুসলিমদের ঈমান বা আল্লাহর উপর আস্থা বাড়ানো ছিল না, ছিল ইসলাম থেকে দ্রুত দূরে সরানো। মহান আল্লাহপাক ও তার রাসূল কি বললেন সেটি ঔপনিবেশিক শাসনামলে যেমন গুরুত্ব পায়নি, এখনও পাচ্ছে না। বরং গুরুত্ব পাচ্ছে ডারউইন, ফ্রয়েড, কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস, ল্যাস্কী বা রাসেলের মত অমুসলিমগণ কি বললো সেটি।

 

সেক্যুলার শিক্ষার নাশকতা

বিষ যেমন দেহের অভ্যন্তুরে ঢুকে দেহের প্রাণশক্তি বিনষ্ঠ করে, সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থাও তেমনি বিনষ্ট করছে ঈমান। মড়ক ধরায় চেতনায়। তাই আল্লাহর উপর আস্থা বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে সেক্যুলারিস্ট ও নাস্তিকদের আর লাঠি ধরতে হচ্ছে না, দেশের শিক্ষ্যাব্যবস্থাই সেটি ত্বরিৎ সমাধা করছে। ফলে দেশে ৯০ ভাগ মুসলিম -এ পরিসংখ্যানটি নিছক বইয়ের পাতায় রয়ে গেছে; দেশবাসীর কাজ-কর্ম, ঈমান-আক্বীদা, নীতি-নৈতীকতায় নয়। বরং বাড়ছে মুর্তি নির্মাণ, মুর্তির সামনে মাতা নত করে খাড়া হওয়া ও মঙ্গল প্রদীপের কদর। এ শিক্ষা ব্যবস্থার ফলেই সফল ভাবে সমাধা হয়েছে কোর্ট-কাছারি, আইন-আদালত, প্রশাসন ও রাজনীতি থেকে ইসলাম সরানোর কাজ। আল্লাহর দ্বীনটির এমন নিষ্ঠুর অবমাননা স্বচক্ষে দেখার পরও রুখে দাঁড়ানোর লোক দেশে শতকরা ৫ জনও নাই। থাকলে ঢাকা শহরে শরিয়তের পক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের মিছিল হত। আর শতকরা ৯০ জন মুসলিমের দেশে ইসলামের এরূপ পরাজয় ডেকে আনার জন্য ভারত, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তাবত ইসলামী বিরোধী শক্তির কাছে কদর বাড়ছে দেশের সেক্যুলার রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও এনজিও কর্মীদের। ভূয়শী প্রশংসা পাচ্ছে ইসলামকে পরাজিত করার এ বাংলাদেশী মডেল। ফলে RAB বা পুলিশের হাতে ভয়ানক ভাবে মানবাধিকার লংঘিত হলেও তা নিয়ে পাশ্চাত্যে শাসকগণ নিন্দা দূরে থাক, মুখ খুলতেই রাজী নয়।  

শূণ্যস্থান বলে এ জগতে কিছু নেই। শূণ্যস্থান থাকে না চেতনা রাজ্যেও। সুশিক্ষার ব্যবস্থা না হলে দেশবাসীর মনের ভূবন কুশিক্ষার দখলে যাবেই। তখন ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়ে অর্থদান, শ্রমদান ও রক্তদানের কাজটি কুশিক্ষাপ্রাপ্ত জনগণই নিজ গরজে সমাধা করে দেয়। কুশিক্ষা তখন ইসলামকে পরাজিত করার কাজে সফল হাতিয়ার রূপে কাজ দেয়। একারণে যারা ইসলামের বিজয় চায় তারাও সর্ব প্রথম যেটিকে গুরুত্ব দেয় সেটি দেশবাসীর সুশিক্ষা। এবং বন্ধ করে দেয় কুশিক্ষার সকল প্রতিষ্ঠানকে। এরূপ কাজটি ছিল নবী-রাসূলদের। মুসলিমদের দায়ভার তো সে কাজকে চালু রাখা। মহান আল্লাহতায়ালাও তাঁর সর্বশেষ নবী (সাঃ)কে সর্বপ্রথম যে পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তা নামায-রোযার নয়, বরং জ্ঞানার্জনের।

সাম্প্রতিক কালে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব এবং সেক্যুলার শিক্ষার নাশকতা যারা সবচেয়ে বেশী বুঝেছেন তারা হলো ইরানী আলেমগণ। মহম্মদ রেজা শাহের প্রতিষ্ঠিত দেশের সকল সেক্যুলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তিন বছরের জন্য তাঁরা বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু ইসলামের নামে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেলেও দেশটির নেতাদের দ্বারা সেটি হয়নি। যারা ইসলামের পক্ষের শক্তি ছিল তারাও বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি, ফলে ইসলামী শিক্ষার প্রবর্তন নিয়ে আন্দোলনও করেননি। এর ফলে বহাল তবিয়তে থেকে যায় ব্রিটিশের প্রবর্তিত সেক্যুলার শিক্ষাব্যাবস্থা। পাশ্চাত্যের যৌন ফিল্ম এবং রাশিয়া ও চীনের সমাজতান্ত্রিক বই ও পত্র-পত্রিকা যাতে অবাধে প্রবেশ করতে পারে -সেজন্য দেশের দরজা পুরাপুরি খুলে দেয়া হয়। যুবকদের চেতনায় মহামারি বাড়াতে এগুলোই পরবর্তীতে ভয়ানক জীবানূর কাজ করে। পাকিস্তান আমলে দেশের রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটগুলোকে সে জীবাণূ-ব্যবসায়ীদের হাতে লিজ দেয়া হয়েছিল। এভাবে দেশের এবং সেসাথে ইসলামের ঘরের শত্রু বাড়ানো হয়েছিল বিপুল হারে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই যারা বিরোধীতা করেছিল এবং দেশটি প্রতিষ্ঠার পর যারা তার বিনাশে সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছিল -তারা হলো সেক্যুলারিস্ট জাতীয়তাবাদী এবং সমাজতন্ত্রিরা। সমাজতন্ত্র মারা গেছে, কিন্তু মারা যাওয়ার আগে মরণ ছোবল মেরে যায় পাকিস্তানের বুকে।

 

বিজয়ী হিন্দু এজেণ্ডা

উপমহাদেশের রাজনীতিতে সবসময়ই দুটি পক্ষ ছিল। দুই পক্ষের দুটি ভিন্ন এজেণ্ডাও ছিল। ফলে ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র নির্মানের দুটি বিপরীত ধারাও ছিল। একটি ছিল অখণ্ড ভারত নির্মানের ধারা। এ ধারার নেতৃত্বে ছিল কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ। অপরটি ছিল প্যান-ইসলামিক মুসলিম ধারা। শেষাক্ত এ ধারাটিই জন্ম দেয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের নির্মাণের মূল ভিত্তি ছিল জিন্নাহর দেয়া দ্বি-জাতি তত্ত্ব। যার মূল কথা হলো: চিন্তা-চেতনা, মন ও মনন, নাম ও নামকরণ, তাহজিব ও তামুদ্দনের বিচারে মুসলিমগণ হলো হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন জাতি। তাদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য, ভিশন ও মিশন তাই এক ও অভিন্ন হতে পারে না। তাই অখণ্ড ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু-ভারতের কাঠামোর মাঝে মুসলিমদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শরিয়ত অনুসরণের এজেন্ডা পূরণ অসম্ভব। পৃথক ও স্বাধীন পাকিস্তান এ এজেন্ডা পূরণে অপরিহার্য। হিন্দু কংগ্রেস ও ব্রিটিশ শাসকদের প্রচণ্ড বিরোধীতা সত্ত্বেও ১৯৪৭’য়ে দ্বি-জাতি তত্ত্বই বিজয়ী হয় এবং প্রতিষ্ঠা পায় পাকিস্তান।

কিন্তু অখণ্ড-ভারত নির্মাণের লক্ষে আত্মনিবেদিত হিন্দু নেতারা ১৯৪৭’য়ের সে পরাজয়কে মেনে নেয়নি। সুযোগ খুঁজতে থাকে মুসলিমদের সে বিজয়কে উল্টিয়ে দেয়ার। সে সুযোগ আসে ১৯৭১’য়ে। ১৯৭১’য়ে তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক বিজয় লাভ করে দেশটির পূর্বাঞ্চলে। ফলে বিজয়ী হয় হিন্দু এজেন্ডা। ভারত ১৯৪৭’য়ের পরাজয়ের বদলা নিয়ে নেয়। নিজেদের সাম্প্রদায়িক প্রকল্পকে মুসলিমদের কাছে আকর্ষণীয় করতে গায়ে সেক্যুলারিজমের লেবাস লাগায়। এটিকে ধর্মনিরপেক্ষতা বলে জাহির করে। সেক্যুলারিজমের মুসলিম-বিরোধী রূপটি নিয়ে বাংলাদেশের মুসলিমদের মনে প্রচণ্ড অজ্ঞতা থাকলেও সে অজ্ঞতা ভারতীয় মুসলিমদের নেই। ভারতের মুসলিম শিশুরাও সেটি বুঝে। তারা সেটি বুঝেছে হিন্দুদের দ্বারা সংঘটিত মুসলিম বিরোধী অসংখ্য দাঙ্গায় সহায়-সম্পদ ও আপনজনদের হারিয়ে; এবং চোখের সামনে মা-বোনদের ধর্ষিতা হতে দেখে। কিন্তু হিন্দু-ভারতের সে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক রূপটিকে পর্দার আড়ালে রাখা হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিমদের থেকে। বরং কুৎসিত রূপে চিত্রিত করা হয়েছে দেশের ইসলামপন্থি এবং একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিদের। এভাবে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর মনে যেমন সৃষ্টি করা হয়েছে পাকিস্তান-বিরোধী প্রচণ্ড ঘৃনা। সে সাথে লালন করা হয়েছে অখণ্ড ভারতের প্রতি মোহ। লাগাতর প্রচারণার ফলে বাংলাদেশী মুসলিমদের মনে এ বিশ্বাসও জন্ম নিয়েছে যে,পাকিস্তানের সৃষ্টিই ভূল ছিল এবং ভূল ছিল জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্ব।

পাকিস্তানকে যারা অনর্থক অনাসৃষ্টি বলে তারা যে শুধু ভারতীয় কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ তা নয়। তাদের সাথে সুর মিলিযে একই কথা বলে বাংলাদেশের কম্যুনিষ্ট, নাস্তিক, জাতীয়তাবাদী এবং মুসলিম নামধারি সেক্যুলারিষ্টগণ। হিন্দু-মুসলিম মিলন ও অখণ্ড ভারতের পক্ষে নানা গুণগানের কথাও তারা বলে। ১৯৭১’য়ে থেকে বাংলাদেশের সকল ছাত্র-ছাত্রী এবং জনগণ শুধু তাদের বাজানো ক্যাসেটটিই লাগাতর শুনে আসছে। অথচ কেন যে বাংলার মুসলিমগণ বিপুল ভোটে পাকিস্তানের পক্ষ নিল -সে কথা তারা বলে না। সে সময় শেখ মুজিব স্বয়ং কেন পাকিস্তানের পক্ষ নিলেন সে কথাও তারা বলে না। বরং বলে, পাকিস্তান সৃষ্টিই ভূল ছিল। তাদের সে নিরচ্ছিন্ন প্রচারণা কাজও দিয়েছে। ফল দাঁড়িয়েছে, এখন সে প্রচরণায় প্লাবনে ভেসে গেছে বহু ইসলামপন্থিরাও। ফলে ১৬ ডিসেম্বর এলে ভারতপন্থিদের সাথে তাঁরাও ভারতীয় বাহিনীর বিজয়ের দিনে উৎসবে নামে। বাংলাদেশে ইসলামি ধারার রাজনীতিতে এটি এক গুরুতর বিচ্যুতি, এবং এক বিশাল চেতনা-বিভ্রাট। তারা এমন সব কথা বলে, একাত্তরের পূর্বে কোন ইসলামপন্থির মুখে তা কখনোই শোনা যায়নি।

 

ইম্যুনিটি ইসলামের বিরুদ্ধে

অমুসলিম পরিবেষ্ঠিত এক ক্ষুদ্র দেশে নিজেদের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে বাঁচতে হলে চিন্তা-চেতনায় বলিষ্ঠ ইম্যুনিটি তথা প্রতিরোধ শক্তি চাই। রোগের বিরুদ্ধে মানব দেহে ভ্যাকসিন বা টিকা সে ইম্যুনিটিই বাড়ায়। তখন কলেরা,যক্ষা বা পলিওর মত ভয়ংকর রোগের মধ্যে থেকেও মানুষ নিরাপদে বাঁচতে পারে। কোর’আনের জ্ঞান ও ইসলামের দর্শন মূলত ঈমানদারের চেতনায় সে ইম্যুনিটিই তীব্রতর করে। তখন উলঙ্গতা, অশ্লিলতা ও নানা রূপ কুফরির মাঝেও মুসলিমগণ ঈমান নিয়ে বাঁচতে পারে। হিজরতের আগে মক্কার মুসলিমগণ তো তেমন এক ইম্যুনিটির কারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠ কাফেরদের মাঝেও বলিষ্ঠ ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন। অথচ মুসলিম অধ্যুষিত সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামিক ইম্যুউনিটি গড়ার সে কাজটি হয়নি। বরং উল্টোটি হয়েছে। ইম্যুনিটি গড়া হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে; এবং সেটি ইসলাম-বর্জিত শিক্ষার মাধ্যমে। ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের মনের গভীরে ইসলামের মৌল ধ্যানধারণা ও শিক্ষাগুলোও প্রবেশ করতে পারছে না।

ইসলামী চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠাকে সাম্প্রদায়িক বা মৌলবাদ আখ্যা দিয়ে সেটি বাংলাদেশের ন্যায় বহু মুসলিম দেশে অসম্ভব করা হয়েছে। সেটি অসম্ভব ছিল মক্কার কাফের সমাজেও। নবীজী (সা:)’কে ইসলামের প্রচারের কাজ তাই লুকিয়ে লুকিয়ে করতে হতো। এমন প্রকাশ্যে নামায পড়াও বিপদজনক ছিল। দ্বীনের এ অপরিহার্য কাজের জন্য যে অনুকূল অবকাঠামো দরকার সেটি যেমন কাফের অধ্যুষিত মক্কায় সম্ভব হয়নি, তেমনি কোন অমুসলিম রাষ্ট্রেও সম্ভব নয়। নবীজী (সা:)’কে তাই মদিনায় গিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রের কাজ নিছক হাসপাতাল, রাস্তাঘাট বা কলকারখানা নির্মাণ নয়। বরং সেটি হলো, ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা। এবং অনৈসলামের বিরুদ্ধে প্রতিটি নাগরিকের মনে ইম্যুনিটি গড়ে তোলা। কোন রাষ্ট্রের এর চেয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। খাদ্য-পানীয় তো বিশ্বের সব দেশেই জুটে। এমন কি পশুও না খেয়ে মরে না। কিন্তু মুসলিম মন ও মানস প্রকৃত নিরাপত্তা পায় এবং ঈমানী পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠে একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্রে। ইসলাম রাষ্ট্র নির্মান তো এজন্যই ফরয। নইলে কুফরির বিশ্বব্যাপী স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। তখন সে শুধু বেঁচে থাকে পারিবারীক মুসলিম নামটি নিয়ে, মুসলিম চরিত্র নিয়ে নয়। সোভিয়েত রাশিয়ার কম্যুনিস্ট কবলিত মুসলিমগণ তো বহুলাংশে হারিয়ে গেছে তো একারণেই। একই কারণে তারা হারিয়ে যাচ্ছে পাশ্চত্যের দেশগুলিতেও।

বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট একটি দেশ হলে কি হবে, ১৯৭১’য়ে যে দর্শনের উপর দেশটি জন্ম নিয়েছিল তাতে মুসলিম রাষ্ট্রের কাঙ্খিত সে মূল কাজটিই গুরুত্ব পায়নি। বরং চেতনার ভূমিতে ঢুকানো হয়েছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজমকে পরিচিত করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষবাদ রূপে। অথচ কোরআন ও সূন্নাহ মতে এ তিনটি মতবাদের যে কোন একটিকে বিশ্বাস করাই কুফরি। মুসলিম হওয়ার অর্থ ধর্ম-নিরপেক্ষ হওয়া নয়, বরং সর্ব-অবস্থায় ইসলামের পক্ষ নেয়া। নিজেকে মুসলিম দাবী করে ইসলামের বিজয়ে পক্ষ না নেয়াটি নিরেট মুনাফিকি। এবং পক্ষ নেয়ার অর্থ, ইসলামের বিজয়ে নিজের অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্ত দেয়া। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী তো সে কাজে শহিদ হয়েছেন। তাই মুসলিম কখনো জাতীয়তাবাদী হয় না। সেক্যুলারিস্ট হয় না। বরং শতভাগ ইসলামী হয়। সে তার পরিচয় ভাষা বা ভূগোল থেকে পায় না। বর্ণ বা গোত্র থেকেও নয়। পায় ঈমান থেকে।

আর সমাজতন্ত্র? সেটি আজ  খোদ সোভিয়েত রাশিয়াতেই আবর্জনার স্তুপে গিয়ে পড়েছে। অথচ শেখ মুজিব সে আবর্জনাও বাংলাদেশের মুসলিমদের মাথায় চাপিয়েছিলেন। এবং সে জন্য জনগণ থেকে কোন রায়ও নেননি। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে এটি কোন ইস্যুও ছিল না। শেখ মুজিব বাঙালী মুসলিমদের মাথার উপর এ কুফরি মতবাদগুলি চাপিয়েছেন নিছক তাঁর প্রভু দেশ ভারত ও রাশিয়াকে খুশি করার জন্য। ইসলামের বিরুদ্ধে মুজিবের গুরুতর অপরাধ, একাত্তরের পর ছাত্র-ছাত্রীদের মনে কুফরি ধ্যান-ধারণা বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন না দিয়ে বরং টিকা লাগিয়েছেন ইসলামের বিরুদ্ধে। আর সে অপরাধ কর্মটি করেছেন জনগণের দেয়া রাজস্বের অর্থে। এ ভাবে কঠিন করা হয়েছে বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের মনে ইসলামের মৌল শিক্ষার প্রবেশ। জিহাদ বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার ন্যায় ইসলামের এ মৌল বিষয়গুলো বাংলাদেশের মানুষের কাছে আজ  গ্রহন-যোগ্যতা পাচ্ছে না –সেটি তো একারণেই। নতুন প্রজন্ম পাচ্ছে না ভ্রষ্ট মতবাদগুলোর মোকাবেলায় ইসলামিক ইম্যুনিটি। ফলে জোয়ারের পানির ন্যায় তাদের চেতনায় ঢুকেছে হিন্দু রাজনীতির এজেন্ডা -যার মূল কথাটি আজও অবিকল তাই যা তারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে বলতো।

যে দেশটি ইসলামী নয় সেদেশে ইম্যুনিটি গড়ার সে ফরয কাজটি করে মসজিদ-মাদ্রাসা, আলেম-মাশায়েখ, ইসলামি সংগঠন, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ। তাঁরা সেটি করেন কোর’আন-হাদিস ও ইসলামী দর্শনের জ্ঞান বাড়িয়ে। নবীজী (সাঃ)র মক্কী জীবন তো সেটিরই সূন্নত পেশ করে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার যেমন সে কাজ করেনি, সঠিক ভাবে সেটি হয়নি আলেমদের দ্বারাও। ইসলামি সংগঠনগুলো ব্যস্ত ক্যাডার-বৃদ্ধি, অর্থ-বৃদ্ধি ও ভোট-বৃদ্ধির কাজে, কোর’আনের জ্ঞান ও ইসলামী দর্শন বাড়াতে নয়। তাদের অর্থের বেশীর ভাগ ব্যয় হয় দলীয় আমলা প্রতিপালনে। সে সাথে দেশের মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোও তাদের হাতে অধিকৃত যাদের চেতনায় ইসলামের বিজয়ের কোন ভাবনা নেই। মসজিদ ও মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটিগুলোতে দখল জমিয়ে আছে সেক্যুলার মোড়ল-মাতবর, রাজনৈতিক ক্যাডার ও আলেমের লেবাস ধারী কিছু রাজনৈতিক বোধশূন্য ব্যক্তি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়লেও ইসলামের বিজয় বাড়ছে না। বরং মুসলিমদের চেতনা রাজ্যে দূষণ বাড়ছে ভয়ানক ভাবে। এমন এক দূষণ প্রক্রিয়াই ফলেই অখণ্ড ভারতের মোহ জেগে উঠছে এমন কি ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মাঝেও।

বাস্তবতা হলো, ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের যে সামরিক বিজয় এসেছিল তাতে শুধু পাকিস্তানের ভূগোলই পাল্টে যায়নি, পাল্টে গেছে বাংলাদেশী মুসলিমদের মনের ভূগোলও। ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়-উৎসবের সাথে ভারত আরেকটি মহা-উৎসব করতে পারে বাঙালী মুসলিমের চেতনা রাজ্যে তাদের এ বিশাল বিজয় নিয়ে। বাঙালী হিন্দুর যখন প্রবল রেনেসাঁ, মুসলিমদের উপর এমন আদর্শিক বিজয় তারা তখনও পায়নি। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের সবচেয়ে বড় অপরাধ হল, হিন্দুদের কোলে তিনি এরূপ একটি সহজ বিজয় তুলে দিয়েছেন।

সামরিক বিজয় পরাজিত দেশে কখনই একাকী আসে না। সাথে আনে আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিজয়ও। বাংলাদেশের ভূমিতে ভারতের বিশাল বিজয় তাই একাত্তরে এসে থেমে যায়নি। বিজয়ের পর বিজয় আসছে সর্বক্ষেত্রে। একাত্তরে তাদের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানের বিনাশ ছিল না, ছিল ইসলামী চেতনার বিনাশও। তাছাড়া তাদের এ যুদ্ধটি নিছক পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও ছিল না, ছিল ইসলাম ও বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধেও। পাকিস্তান-বিরোধী যুদ্ধটি শেষ হয়েছে একাত্তরেই। কিন্তু শেষ হয়নি বাংলাদেশের মাটি থেকে ইসলামপন্থিদের নির্মূলের কাজ। তাই ভারত তার পদলেহীদের দিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ একটা অস্থির অবস্থা বজায় রেখেছে সেই ১৯৭১ থেকেই। তাছাড়া আওয়ামী লীগের আচরণ দেখেও বোঝা যায়, ভারতের পক্ষ থেকে বাঁকি কাজটি সমাধার মূল দায়িত্বটি পেয়েছে তারাই। বেছে বেছে ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধকরণ, ইসলামী নেতাদের বিনা বিচারে গ্রেফতার, মাদ্রাসার পাঠ্যসূচী ও মসজিদে খোতবার উপর নিয়ন্ত্রণ, অফিসে ও ঘরে ঘরে গিয়ে ইসলামী বই বাজেয়াপ্ত করা -ইত্যাদী নানা কর্মসূচী নিয়ে এগুচ্ছে তারা।

 

ভারতের বাংলাদেশ ভীতি এবং এজেণ্ডা

বাংলাদেশের ভূমিতে ভারতীয়দের এত তৎপরতার মূল কারণ, বাংলাদেশে ভীতি। ভয়ের সে মূল কারণটি হলো ইসলাম। ভারতীয়রা বোঝে, ইসলামী দর্শন এবং কোর’আনের জ্ঞানই জোগাতে পারে যে কোন আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি। অতীতে আফগান জনগণ যে শক্তির বলে ব্রিটিশ বাহিনী ও পরে সোভিয়েত বাহিনীকে পরাজিত করেছিল সেটি অস্ত্রবল নয়। অর্থবলও নয়। বরং সেটি ছিল ইসলামী চেতনার বল। সে শক্তির বলে আজও তারা মার্কিনীদের পরাজয় করে চলেছে। ২০ বছরের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও তার ৪০টি মিত্রদেশকে বিজয়ের কাছে ভিড়তে দেয়নি। আর বাংলাদেশীরা আফগানদের থেকে সংখ্যায় ৫ গুণ অধিক। এতবড় বিশাল জনশক্তির মাঝে ইসলামি চেতনার বিস্ফোরণ হলে তাতে কেঁপে উঠবে সমগ্র ভারত। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ ও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির মূলে তো তারাই।

বাংলাদেশের মূল শক্তি তাই তার ভূগোল নয়, সম্পদও নয়। বরং এই মুসলিম জনশক্তি। আর এই জনশক্তির সাথে ইসলামের যোগ হলে জন্ম নিয়ে এক মহাশক্তি। মরুর নিঃস্ব আরবেরা তো বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল এমন এক মিশ্রণ হওয়াতেই। ভারত তাই বাংলাদেশের মানুষকে কোর’আনের জ্ঞান থেকে দূরে সরাতে চায়। আর একাজে ভারতের সুবিধা হল, আওয়ামী লীগকে তারা অতি আগ্রহী কলাবোরেটর রূপে পেয়েছে। বাঙালী হিন্দুদের চেয়েও এ কাজে তারা ভারতের প্রতি বেশী বিশ্বস্থ ও তাঁবেদার। ভারত সে সুযোগটির সদ্ব্যাবহার করতে চায়। একাত্তরের বিজয়কে যুগ যুগ ধরে রাখার স্বার্থে আওয়ামী লীগের কাঁধে লাগাতর বন্দুক রাখাটিকে তারা অপরিহার্যও ভাবে। তবে এলক্ষ্যে তারা যে শধু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের উপরই পুঁজি বিনিয়োগ করছে -তা নয়। তাদের স্ট্রাটেজী, এক ঝুড়িতে সব ডিম না রাখা। তাই বিশাল পুঁজি বিনিয়োগ করেছে দেশের মিডিয়া, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যকর্মী, আলেম-উলামা, ছাত্রশিক্ষক, এমন কি ইসলামী দলগুলোর উপরও। সে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে তারা ভারতে পড়ার সুযোগও করে দেয়েছে। এখন বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করছে দেশের ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার উপর। ভারত জানে, তাদের হাত থেকে আওয়ামী লীগ হারিয়ে যাওয়ার নয়। ক্ষমতায় থাকার সার্থে এ দলটি নিজ গরজেই ভারতে পক্ষ নিবে। কারণ, ভারতের হাতে যেমন রয়েছে বাংলাদেশের হিন্দু ভোট, তেমনি আছে রাষ্ট্রীয় পুঁজি, আছে ভারত-প্রতিপালিত বিশাল মিডিয়া। নির্বাচনী জয়ের জন্য এগুলোই জরুরি।

 

অরক্ষিত বাংলাদেশ

বাঘের পাল দ্বারা ঘেরাও হলে বিশাল হাতিও রেহাই পায় না। তাই যে জঙ্গলে বাঘের বাস সে জঙ্গলের হাতিরাও দল বেঁধে চলে। বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এক দেশ। ঘেরাও হয়ে আছে আগ্রাসী হিন্দুদের দ্বারা। ফলে বাংলাদেশ এক অরক্ষিত দেশ। তাই এদেশটির সীমাবদ্ধতা প্রচুর। যে কোন দেশের প্রতিরক্ষার খরচ বিশাল। আর ভারতের মত একটি বিশাল আগ্রাসী দেশের বিরুদ্ধে সে খরচ তো আরো বিশাল। এ বাস্তবতার দিকে খেয়াল রেখেই বাংলার তৎকালীন নেতা খাজা নাযিমউদ্দিন, সোহরোয়ার্দি, আকরাম খান, নূরুল আমীন, তমিজুদ্দীন খান প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী সভায় লোহোর প্রস্তাবে সংশোধনী এনেছিলেন এবং পাকিস্তানে যোগ দেবার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পূর্ব বাংলা এভাবেই পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিল সেদেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশে রূপে। অথচ এরূপ পাকিস্তানভূক্তিকেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বলছে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন। নিরেট মিথ্যাচার আর কাকে বলে? কোন দেশে ঔপনিবেশিক শাসন গড়তে হলে যুদ্ধ লড়তে হয়। প্রয়োজন পড়ে মীর জাফরদের। প্রয়োজন পড়ে লর্ড ক্লাইভ ও পলাশির। প্রশ্ন হল, ১৯৪৭’য়ে কে ছিল সেই মীর জাফর? কে ছিল ক্লাইভ? সে মীর জাফর কি ছিলেন সোহরোয়ার্দী? খাজা নাজিমুদ্দিন বা আকরাম খাঁ যারা বাংলাকে পাকিস্তান ভূক্ত করেছিলেন? আর ঔপনিবেশিক বাহিনীই বা কোথায়? কোথায় করলো তারা যুদ্ধ? জেনারেল ওসমানী, মেজর জিয়া, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর আব্দুল জলিল, মেজর খালিদ মোশার্রফ কি তবে সে উপনিবেশিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন?

তবে জনগণও নির্দোষ নয়। জনগণের অপরাধ, তারা ১৯৭০ সালে নির্বাচিত করেছে গণতন্ত্র হত্যাকারি এক ফাসিস্টকে। স্বৈরাচারি মুজিবকে যে শুধু ভোট দিয়েছে তা নয়, অর্থ এবং রক্তও দিয়েছে। সে সাথে পরম বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে ভারতীয়দের। ভারতের মোহ শুধু একাত্তরে নয়, আজও বেঁচে আছে বহু বাংলাদেশীদের মনে। সেটি গ্রাস করছে শুধু সেক্যুলারদেরই নয়, বহু ইসলামপন্থিকেও। তাদের চেতনার বিভ্রাটটি এতোই গভীর যে, ভারতের বিজয় এবং বাংলাদেশের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের আধিপত্যকেও নিজেদের বিজয় ও নিজেদের অর্জন বলে উৎসবও করে। বাঙালী মুসলিমের এ এক ভয়ানক আত্মঘাতি রূপ। রোগ না সারলে সেটি প্রতিদিন বাড়ে। তেমনি বাড়ে চেতনার রোগও। তাই যে রোগ এক সময় ভারতপন্থি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মগজে ছিল সেটি এখন অন্যদেরও গ্রাস করছে। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় হুমকি আর কি হতে পারে? ১ম সংস্করণ ০৭/০৬/২০১১; ২য় সংস্করণ ২৬/১১/২০২১।