ভাষা-আন্দোলন: বাঙালী সেক্যুলরিস্টদের ষড়যন্ত্র ও নাশকতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

লক্ষ্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক 

১৯৫২’এর ভাষা-আন্দোলনের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলার স্বীকৃতি ছিল না। বরং পাকিস্তান এবং যে প্যান-ইসলামী চেতনার ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তার বিনাশ এবং ইসলামী চেতনাবর্জিত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই যে পাকিস্তান খন্ডিত হয়েছে –সে কথাটি এখন বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ, হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি ও কম্যুনিস্টগণ অতি গর্বের সাথেই বলে। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হলেও ইসলামি চেতনা বিনাশের কাজটি এখনো শেষ হয়নি এবং নির্মূল হয়নি ইসলামের পক্ষের শক্তি। তাই শেষ হয়নি ভাষা আন্দোলনের নামে বাঙালীর চেতনা জগতে সেক্যুলার ধারার সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক বিপ্লবের কাজ। তাই এ আন্দোলনের একটি প্রবল আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক এজেন্ডাও আছে। এ আন্দলোনের লক্ষ্য ছিল বাঙালী মুসলিমের সাংস্কৃতিক কনভার্শন। তেমন একটি আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক এজেন্ডাকে সামনে রেখেই বাংলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা রূপে স্বীকৃতি পেলেও পাকিস্তান আমলেই বেগবান করা হয়েছে বাঙালী মুসলিম সন্তানদের মাঝে স্তম্ভপূজা। হিন্দুগণ মন্দিরে গিয়ে যা করে -সেটিই করা হয় ২১ ফেব্রেয়ারীতে স্তম্ভের পাদদেশে ফুল ও ভক্তি দিয়ে। ভাষা আন্দোলনের নাশকতা তাই শুধু পাকিস্তান ধ্বংসে শেষ হয়নি। এটিকে পরিকল্পিত ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে ইসলামী চেতনার বিনাশের কাজে।

ভাষা আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের দাবী, ভাষা আন্দোলন না হলে বাঙালী জাতীয়তাবাদ কখনই এতটা প্রচণ্ডতা পেত না এবং স্বাধীন বাংলাদেশও সৃষ্টি হতো না। ১৯৪৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের একতা, কল্যাণচিন্তা, ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিরূপে মুসলিমদের আবার উত্থান -এরূপ নানা স্বপ্ন মাথায় নিয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। ভাষা-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সে স্বপ্নেরই মৃত্যু হয়েছে। তাই ইসলাম বিরোধী শক্তির এটি এক বিশাল বিজয়। বিজয় বেড়েছে ভারতের। বাংলাদেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, আইন-আদালত ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে ইসলামপন্থীগণ যেরূপ এক পরাজিত শক্তি এবং বিজয়ী রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তি -তার মূল কারণ তো এ ভাষা-আন্দোলন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন। উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতিতে বহু ঘটনা ঘটেছে, তবে যে ঘটনাটি ভারতের আধিপত্যবাদী হিন্দুদের প্রচুর আনন্দ জুগিয়েছে এবং সে সাথে তাদেরকে প্রচন্ড লাভবানও করেছে -তা হলো এই ভাষা আন্দোলন। এদের অনেকে ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়েও খুশি হয়েছিল। সিরাজদ্দৌলার পরাজয়কে ইংরেজদের সাথে হিন্দুগণও উৎসবযোগ্যরূপে গণ্য করেছে। কারণ, তাতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার উপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। সিরাজুদ্দৌলার চরিত্রে কালীমা লেপন করে বহু হিন্দু কবি-সাহিত্যিক বহু কবিতা, বহু উপন্যাস ও বহু নাটক লিখেছেন। অথচ সে তূলনায় মীর জাফর ও ক্লাইভের কুৎসিত রূপটি তুলে ধরা হয়েছে সামান্যই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাপদাদাগণই যে শুধু ইংরেজদের প্রশংসায় গদগদ ছিলেন তা নয়, রবীন্দ্রনাথ নিজেও ইংরেজ রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত আগমন উপলক্ষ্যে তাকে ভারতের ভাগ্যবিধাতা রূপে কবিতা লিখে প্রশংসা গেয়েছেন। “জয়ো হে, জয়ো হে, ভারত ভ্যাগ্যবিধাতা” – এ স্তুতি গেয়ে জয়োধ্বণিও দিয়েছেন। তিনি ইংরেজদর থেকে নাইট উপাধীও পেয়েছিলেন।

তবে মুসলিমগণ ১৭৫৭ সালের সে পরাজিত দুরাবস্থা থেকে গাঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারই ফল দাঁড়িয়েছিল, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে যখন থেকে ভারতে নির্বাচন দেওয়া শুরু হয়, তখন থেকে বাংলার শাসন ক্ষমতায় কোন হিন্দুকে বসতে দেইনি। অবিভিক্ত বাংলায় তিন জন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের তিন জনই ছিলেন মুসলিম। অথচ তখন মুসলিমদের সংখ্যা হিন্দুদের তুলনায় খুব একটি বেশী ছিল না। জনসংখ্যার ৫৫% হলেও অর্থনীতি, শিক্ষা, চাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মুসলিমদের পশ্চাৎপদতা হিন্দুদের তুলনায় ছিল বিশাল। তারপরও শতকরা ৭৫ ভাগ হিন্দু অধ্যুষিত কলকাতায় বসে ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল অবধি এ ১১ বছর মুসলিম প্রধানমন্ত্রী শাসন করেছে। অবশেষে ১৯৪৭ সালে হিন্দু ও ইংরেজ উভয়ের প্রবল বিরোধীতা সত্ত্বেও লড়াই করে তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল। মুসলিমদের জন্য এ ছিল বিশাল বিজয়। কিন্তু উত্থানমুখী মুসলিমদের কোমর ভেঙ্গে দেয় ভাষা আন্দোলন। মুসলিমদের মধ্যে ভাষা ও অঞ্চল-ভিত্তিক বিভক্তি, ভাতৃঘাতি লড়াই, পাকিস্তানের ধ্বংস এবং ইসলামী চেতনা বিনাশের বীজ বপন করা হয়েছিল এ আন্দোলনে। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই প্রতিষ্ঠা পায় বাংলাদেশ। ফলে যে চেতনার ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ঘটেচে তার মৃত্যু ঘটে পূর্ব পাকিস্তানে। এ জন্যই আজ মহা আনন্দ ভারতীয় আগ্রাসনবাদীদের। কারণ, ১৯৭১’য়ে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম দেশ পাকিস্তানই শুধু বিভক্ত হয়নি,  বাংলাদেশও পাকাপোক্তভাবে ধরা দিয়েছে ভারতের ফাঁদে। এখন আর বেরুনোর পথ নেই। ভারত এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পেরেছে।

 

উৎসব শত্রু শিবিরে

নিজেদের ক্ষতিটা অনেকেই বুঝতে পারে না। তবে সে ক্ষতিটি সহজে বুঝা যায় শত্রু শিবিরে উৎসব দেখে। তাছাড়া মুসলিমদের কোন কল্যাণ হলো এবং তাতে হিন্দুগণ খুশি হবে তা কি কখনো ভাবা যায়?  আধিপত্যবাদী বর্ণহিন্দুদের কুটিল ও হিংসাত্মক চরিত্রের সাথে যাদের পরিচয়টি গভীর -তাদের অভিজ্ঞতাটি আদৌও সুখের নয়। মুসলিমদেরকে তারা ভৃত্য রূপে গ্রহণ করতে রাজী, বন্ধু হিসাবে নয়। তাদের গৃহে কোন মুসলিম দৈবাৎ প্রবেশ করলে, গোবর দিয়ে না লেপলে তা পবিত্র হয়না। সেটি বুঝা যায় ভারত সরকারের নীতিতে। মুসলিমদের তারা হিন্দুদের সমান নাগরিক অধিকার দিতেও রাজী নয়। লক্ষ লক্ষ মুসলিমদের তারা বাংলাদেশী বলে তাদের বহিস্কারের ফন্দি আঁটছে। ভারতে শতকার ১৫ ভাগ মুসলিম হলে কি হবে, সরকারি চাকুরীতে শতকরা ৫ ভাগও নাই। হিন্দু সংস্কৃতি যা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা হলো, দাঙ্গা বাধিয়ে তাদের হত্যা, ধর্ষণ ও তাদের গৃহে লুটতরাজ। হিন্দুত্ববাদীদের মিছিল-মিটিং যে স্লোগানটি অহরহ ধ্বনিত হয় তা হলো, মুসলিমদের জন্য দুটি ঠিকানা: হয় পাকিস্তকান, না হয় কবরস্থান।

কায়েদে আজম মহম্মদ তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করেন হিন্দু ও মুসলিমের মিলনের দূত রূপে। সে লক্ষ্য নিয়ে যোগ দেন কংগ্রসে।  প্রখ্যাত রাজনীতিবদি সরোজীনী নাইডু তাঁকে হিন্দু-মুসলিম মিলনের দূত বলে অভিহিত করতেন। কিন্তু অচিরেই তাঁর সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। ভগ্ন হৃদয় নিয়ে হিন্দুদের সম্পর্কে বলতেন, তারা “incorrigible” তথা সংশোধনের অযোগ্য। হিন্দুদের নিয়ে কাজ করেছেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী জনাব শেরেবাংলা ফজলুল হক। হিন্দু মহাসভা নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীকে তিনি তার মন্ত্রী সভায় নেন। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতাও প্রীতিকর ছিলনা। তিনি বলতেন, “কলকাতার হিন্দু পত্রিকাগুলো যখন আমার কোন কর্ম বা সিদ্ধান্তের পক্ষে লেখা শুরু করে, তখনই বুঝতে হবে সেটির দ্বারা মুসলিমদের জন্য বড় রকমের ক্ষতি আশংকা রয়েছে।” ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের ভেঙ্গে যাওয়া নিয়ে কোলকাতার পত্রিকাগুলো শুধু পক্ষেই লেখেনি, এখনো বছর ঘুরে প্রতি বছর ২১ ফেব্রেয়ারী এবং ১৬ ডিসেম্বর এলে কলকাতা ও দিল্লীতে উৎসব শুরু হয়। তাই মুসলিমদের ক্ষতির মাত্রা বোঝার জন্য কি কোন গবেষণার প্রয়োজন আছে? সেটি বুঝা যায় তাদের উল্লাসের মাত্রা দেখে। পরিতাপের বিষয় হলো, বাঙালী মুসলিমগণ তাদের নিজেদের কল্যাণের চেয়ে হিন্দুদের বিজয় বৃদ্ধিকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছে। এবং সেটি বাঙালী সেক্যুলারিস্ট জাতীয়তাবাদীদের নেতৃত্বে। বাংলাদেশীদের কল্যাণ নিয়ে তাদের আগ্রহ নিলে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর ভারতীয় সেনা বাহিনীকে লুটাপাটে নামতো?  উপহার দিত কি দুর্ভিক্ষ? সমস্যা হলো, গোলামেরা কখনোই মনিবের দোষগুলো দেখে না, তাদের মনযোগ স্রেফ গোলামী নিয়ে। বাংলাদেশের মাটিতে তার নমুনা হলো বাঙালী সেক্যুলারিস্ট জাতীয়তাবাদীগণ।   

 

ভাষা আন্দোলনে মিথ্যাচার

বাংলাদেশের ইতিহাসে অতি মিথ্যাচার হয়েছে বাংলা ভাষা ও ভাষা-আন্দোলনকে ঘিরে। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি হলো, বাঙালীর মুখের ভাষা নাকি পাকিস্তান সরকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। এ প্রসঙ্গে যে সত্যটিকে তারা বুঝতে রাজী নয় তা হলো, দেশের অনেক গুলো ভাষার মধ্য থেকে একটিকে রাষ্ট্র বানানোর অর্থ অন্য ভাষাগুলোকে কবরে পাঠানো নয়। বাংলা ছাড়াও পাকিস্তানে পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পশতু, বেলুচ ভাষা রয়েছে। উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা বানানোর অন্য সব ভাষার কোনটিরই মৃত্যু হয়নি। বরং সেগুলোও সমৃদ্ধ হয়েছে। সে সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ঢাকার সন্তান খাজা নাযিম উদ্দীন। তখন পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন আরেক বাংলাভাষী জনাব নুরুল আমীন। পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৫৪ সালে। বাংলা ভাষার উন্নয়নে বাংলা এ্যাকাডেমী ও বাংলা-উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশী ভাষার বিপুল সংখ্যক বইয়ের বাংলায় তরজমার কাজ তখনই শুরু করা হয়। বলা যায়, বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার কাজে সরকারি ভাবে পাকিস্তানের ২৩ বছরে যে কাজ করা হয় তা অতীতে হাজার বছরেও হয়নি। বাংলা ভাষার উন্নয়নে ভারতের পশ্চিম বাংলাতেও এত সরকারি বিনিয়োগ হয়নি।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে আরেক মিথ্যাচার হলো, দুনিয়ার আর কোথাও নাকি ভাষার নামে এতো রক্তদান হয়নি যা হয়েছে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রেয়ারীতে। অথচ হিন্দি ভাষাকে যখন দক্ষিণ ভারতের তামিলদের উপর চাপিয়ে দেয়া চেষ্টা হয়, বহু গুণ বেশী মানুষ প্রাণ দেয় সে চেষ্টা রুখতে। একই ঘটনা ঘটে আসামের কাছাড় ও করিম গঞ্জে। বহু মানুষ সেখানেও প্রাণ দেয় যখন বাংলা ভাষার উপর অসমিয় ভাষাকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়।

 

সংস্কৃতি স্তম্ভপূজার   

বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিলেও ২১শে ফেব্রুয়ারি উদযাপন বেগবান করা হয়েছে দুটি কারণে। একটি রাজনৈতিক, অপরটি আদর্শিক। রাজনৈতিক প্রয়োজনটি ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘৃনা সৃষ্টির কাজে এ আন্দোলনকে ব্যবহার করা। আদর্শিক প্রয়োজনটি হলো, বাংলার মুসলমানদের মন ও মনন থেকে ইসলামি চেতনার বিনাশ এবং সে সাথে সেকুলারিজম আবাদে সেটিকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে বটে, কিন্তু সেকুলারাইজেশনের কাজ শেষ হয়নি। ফলে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে অনুষ্ঠানের প্রয়োজনও শেষ হয়নি। থেমে যায়নি প্রভাতফেরীর নামে হাজার হাজার নারীপুরুষকে একত্রে রাতের আঁধারে রাস্তায় নামানোর আয়োজন। বরং ইসলামী চেতনার দ্রুত বিকাশ এবং ইসলামী রাষ্ট্র বিপ্লবের আন্দোলন দেশে দেশে প্রবলতর হওয়ায় গুরুত্ব বেড়ে গেছে একুশে ফেব্রুয়ারির। এবং সেটি বুঝা যায় একুশে ফেব্রুয়ারি উৎযাপনের বর্তমান মাত্রা দেখে। একুশের বই মেলা পরিণত হয়েছে সেকুলার চেতনা-ভিত্তিক সাহিত্যের প্লাবন সৃষ্টির কাজে। পাকিস্তান আমলে ২১’শে ফেব্রুয়ারি পালিত হতো বছরের মাত্র একটি দিনে, এবং সেটিও মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য। এখন শুরু হয়েছে সারা দেশব্যাপী স্তম্ভপূজা। সে আমলে সেকুলার এবং বামপন্থি ছাত্র-ছাত্রীরাই শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারিতে নগ্নপদে স্মৃতীস্তম্ভে গিয়ে ফুল চড়াতো। এসব ছাত্র-ছাত্রীরা ছিল মূলতঃ আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ও সমর্থক। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা এ থেকে সচেতনতার সাথে দূরে থাকতো। যাদের মধ্যে ইসলামের সামান্য জ্ঞান ছিল এবং ইসলামের অনুশাসন পালনে সামান্য অঙ্গিকার ছিল, স্তম্ভের সামনে দাড়িয়ে তারা এমন সম্মান প্রদর্শনকে নির্ভেজাল শিরক মনে করতো।

শহীদ শব্দের অপব্যবহার ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন

আদর্শের জন্য প্রাণদান ইসলামে নতুন কিছু নয়, নবীজী (সাঃ)র সাহাবাদের অর্ধেকের বেশী শহীদ হয়েছেন। “শহীদ” শব্দটিও এসেছে ইসলাম থেকে। শহীদদের রক্তের বরকতেই আল্লাহর রহমত প্রাপ্তি ঘটেছিল এবং নির্মিত হয়েছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে যা কিছু গর্বের তার বেশীর ভাগের নির্মাতা তারাই। বিশ্বের সকল মুসলিমদের কাছে তাই তারা সর্বকালের পরম সম্মানের পাত্র। কিন্তু ইসলামে সম্মান প্রদর্শনেরও নিজস্ব রীতি আছে। সেটি স্তম্ভ গড়ে নয়। স্তম্ভের গোড়ায় ফুল দিয়ে স্তম্ভপূজাও নয়। রাতে বা প্রভাতে নারী-পুরুষকে রাস্তায় নামিয়েও নয়। শহিদদের স্মৃতিতে স্তম্ভ গড়া সিদ্ধ রীতি হলে শুধু মক্কা-মদীনাতে নয়, মুসলিম বিশ্বের অসংখ্য শহরে হাজার হাজার স্তম্ভ গড়া হতো। সেসব স্তম্ভে বছরের একটি দিনে শুধু নয়, প্রতিদিন ফুল দেওয়া হতো। কিন্তু সেটি হয়নি। কারণ সেটি মুসলিম সংস্কৃতি নয়। ইসলামসিদ্ধও নয়। অথচ বাংলাদেশের নগরে বন্দরের প্রতিটি স্কুল-কলেজে বহু লক্ষ স্তম্ভ গড়ে সেটিকে আজ বাঙালীর সংস্কৃতি রূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এভাবে মুসলিম জীবনে শুরু হয় চরম সাংস্কৃতিক পথভ্রষ্টতা। তাই বাঙালী মুসলিম জীবনে শতভাগ হারাম রীতি চালু করা হয় ভাষা আন্দোলনের নামে। এভাবে খুলে দেয়া হয় জাহান্নামে পথ।

এ সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতা এসেছে আদর্শিক ভ্রষ্টতা থেকে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে দেহব্যবসার মত ব্যাভিচার যেমন আইনগত বৈধতা পেয়েছে, তেমনি বৈধতা পেয়েছে আরেক হারাম কর্ম স্তম্ভপূজা। এমন সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতার পিছনে ভ্রষ্ট দর্শনটি হলো সেকুলারিজম –যার মূলকথা পরকালের ভাবনা বিলুপ্ত করে মানুষকে দুনিয়ামুখি করা। মানুষের ঢল মসজিদমুখি না করে স্তম্ভমুখি করা। বাঙালী মুসলমানদের জীবনে এভাবেই নেমে এসেছে এক ব্যাপক সাংস্কৃতিক কনভার্শন। সংস্কৃতির পথ ধরে এভাবেই চরম দুষণ ঘটেছে বাঙালী মুসলিমদের চেতনালোকে। ইসলামের শত্রুদের আজকের স্ট্রাটেজী মুসলিমদেরকে হিন্দু বানানো নয়। বরং সংস্কৃতির লেবাসে এমন সব বিশ্বাস ও রীতিনীতিতে অভ্যস্থ করা -যা ইসলামের মূল শিক্ষা থেকেই দূরে সরিয়ে নেয়। এভাবেই মুসলিমদের সরানো হচ্ছে ইসলাম থেকে। ফলে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিমের দেশে অনিবার্য পরিণতি হলো ইসলামের লাগাতর পরাজয়। এবং সেটি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক অঙ্গণে।

সেক্যুলারিজমের প্রচার ও প্রভাব বাংলাদেশ সৃষ্টির পর এতটাই গভীরতর হয়েছে যে, বহু ইসলামপন্থী নেতাকর্মীও সে স্রোতে ভেসে গেছে। ফলে এখন আর শুধু আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কম্যিউনিষ্ট পার্টির নেতা-কর্মীগণই নগ্ন পদে ফুলের মালা নিয়ে স্তম্ভপূজায় হাজির হচ্ছে না, হাজির হচ্ছে তথাকথিত ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতাকর্মীও। রাজনৈতিক বিজয়ের পাশে বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের জন্য এটি হলো এক আদর্শিক বিজয়। হযরত ঈসা (আ:) ও হযরত মূসা (আ:)’র  অনুসারিদের সমস্যা এ নয় যে, তারা মু্র্তিপূজায় ফিরে গেছে। বরং তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক অঙ্গণে। এবং সে পথভ্রষ্টতার কারণেই তারা বিদ্রোহী হয়েছে আল্লাহর ফরমানের বিরুদ্ধে। ফলে সমগ্র খৃষ্টান ও ইহুদী জগতে আল্লাহর বিধান আজ পরাজিত। পুরাতন টেস্টামেন্ট বা তাওরাতের বিধানগুলো তাই শুধু কেতাবেই রয়ে গেছে। একই ভাবে গভীর ভ্রষ্টতা নেমে এসেছে বাঙালী মুসলিম জীবনে। 

ইন্সটিটিউশন পূজাপালনের

জনগণের মাঝে আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক ভ্রষ্টতা সার্বজনীন করার স্বার্থেও ইন্সটিটিউশন চাই। মুর্তিপুজার ন্যায় সনাতন পথভ্রষ্টতা ও মিথ্যাচার বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে মুর্তিগড়া ও এসব মুর্তির পদতলে ফুল দেওয়া হলো হিন্দুদের ধর্মীয় ইন্সটিটিউশন। সে আচার বাঁচিয়ে রাখতে বাংলার হিন্দু সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বারো মাসে তের পার্বন। গড়া হয়েছে লক্ষাধিকর মন্দির ও পূজামন্ডপ। একই আদলে বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টগণও ভাষা আন্দোলনের নামে বাংলাদেশের নগর-বন্দরেই শুধু নয়, গ্রাম-গঞ্জেও স্মৃতিস্তম্ভের নামে বিপুল সংখ্যায় ইন্সটিটিউশন গড়ে তুলেছে। চালু করেছে স্তম্ভপূজা। বস্তুত বাংলার সেকুলারিষ্টদের এটিই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন। একুশের নামে প্রতিবছর যে অনুষ্ঠান হয় সেগুলীর মূল লক্ষ্য ভাষায় সমৃদ্ধি আনা নয়, বরং তা হলো, সেক্যুলার ধারণাকে আরো প্রবলতর করা এবং সে সাথে দীর্ঘজীবী করা। এমনকি ২১ ফেব্রেয়ারীর বদলে ৮ ফাল্গুনও চালু করতে পারিনি। ভাষায় সমৃদ্ধি আনা লক্ষ্য হলে, সে জন্য কি নগ্নপদে মিছিল করা ও স্তম্ভের বেদীমূলে নত শিরে ফুলদানের প্রয়োজন পড়ে? রাষ্ট্রভাষা রূপেও কি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন পড়ে? উর্দু ভাষা ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্র ভাষা ছিল না। কিন্তু সে ভাষার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে সে আমলে। উর্দু ভাষায় পবিত্র কোরআনের বহু অনুবাদ ও বহু তফসির লেখা হয়েছে। বহু তরজমা ও বহু ব্যাখা লেখা হয়েছে হাদীস গ্রন্থগুলিরও। অসংখ্য গ্রন্থ্ লেখা হয়েছে ফিকাহ শাস্ত্র, নবী-জীবনী, সাহাবা-জীবনী, দর্শন ও ইতিহাসের উপর। সমৃদ্ধি এসেছে উর্দু প্রবন্ধ, কবিতা ও গজলে। কিন্তু বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম রাষ্ট্রে রাষ্ট্র-ভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরও বাংলা ভাষায় উন্নয়ন কতটুকু হয়েছে? বাংলা ভাষার যা কিছু উন্নয়ন হয়েছে তা হয়েছে বাঙালী হিন্দুদের দ্বারা। এবং সে উন্নয়ন হয়েছে তখন যখন বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষা ছিল না।

বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের নামে যা কিছু হয়েছে তা মূলত হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। এমন একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এখনও অপূর্ণ থাকায় একুশে ফেব্রুয়ারী পালনে সেকুলারিষ্টদের উদ্যোগে কমতি আসছে না, বরং দিন দিন সেটিকে আরো তীব্রতর করা হচ্ছে। অথচ মনযোগ নাই বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করায়। বাংলাদেশের মানুষের চেতনার উন্নয়ন, নৈতিকতার উন্নয়ন ও বাংলা ভাষার উন্নয়ন নিয়ে পশ্চিম বাংলার একজন হিন্দুর অভিমতটি শোনা যাক। পশ্চিম বঙ্গের দেবেন্দ্র ভট্টাচার্য নামক একজন শিক্ষক ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। দেশে ফিরে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের বাঙালীদের নিয়ে যা লিখেছিলেন তা থেকে কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। লিখেছিলেন, “…আপনাদের আর্ট-কালচার দেখেও আমি হতাশ হয়েছে। ২২ বছরে আপনারা এমন একটি বই প্রকাশ করতে পারেননি যা নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে উপভোগ করা যায়।… আমি হুমায়ুন আহমদের কয়েকটি বই পড়বার চেষ্টা করেছিলাম। রচনার মান অতি নিম্নমানের। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের জীবনের কোন সামগ্রিক চিত্র এর মধ্যে পেলাম না। শুনেছি, তিনি নাকি এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। তার কয়েকটা ছোট গল্প এবং একটা উপন্যাস পাঠ করার পর আমার ধারণা জন্মেছে, পাঠকের পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দেয়ার ক্ষমতা তার আছে। এর অধিক কিছু নেই। এরকম একজন লোক জনপ্রিয় হতে পেরেছেন এ দ্বারা এটাই প্রমানিত হয় যে, এদেশের শিক্ষার মান কত নীচু।” -(সরকার শাহাবুদ্দীন আহম্মদ, আত্মঘাতী রাজনীতির তিন কাল, বুকস ফেয়ার; ২০০৪)।

ভাষার দায়িত্ব

মনের ভাব প্রকাশ করার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর মাধ্যম নেই। কিন্তু শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান মানুষ রূপে বেড়ে উঠার স্বার্থে মনের ভাব প্রকাশ করাটাই একমাত্র কাজ নয়। অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জ্ঞানলাভ করাটাও। নইলে মনের ভাবেরও সভ্যতর প্রকাশ ঘটে না। তাই মাতৃ ভাষাকে শিক্ষার ভাষা, জ্ঞানের ভাষা এবং সংস্কৃতির ভাষাও হতে হয়। এ বিচারে মুসলিমদের ক্ষেত্রে ভাষার দায়িত্বটা আরো বেড়ে যায়। ভাষাকে তখন সিরাতুল মোস্তাকিম তথা জান্নাতের পথ দেখানোর দায়িত্বটা পালন করতে হয়। বান্দাহর উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর মহান রাসূল (সাঃ)’র কথাগুলোও তাই ভাষাকে শেখাতে হয়। একটি ভাষার এটিই হলো সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা -যেমন খাদ্যের সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা হলো পুষ্টি জোগানো। তাই খাদ্যে নিছক মুখরোচক স্বাদ থাকলেই চলে না। নিজ দেশে বা নিজ ঘরে খাদ্য না থাকলে এজন্যই বাঁচার তাগিদে খাদ্যের সন্ধানে নামতে হয়। নইলে অনিবার্য হয় মৃত্যূ। তেমনি চেতনার মৃত্যূ ও ঈমানের মৃত্যু ঠেকাতে মুসলিমকে এমন ভাষা শিখতে হয় যে ভাষায় ঈমানের খাদ্য মেলে। এমন এক দায়বদ্ধতার কারণেই লক্ষ লক্ষ বাংলাভাষী আজও আরবী শেখে। অনেকে উর্দুও শেখে। এভাবে অন্যভাষা শিক্ষার মধ্যে বাংলাভাষার বিরুদ্ধে শত্রুতা কোথায়? ষড়যন্ত্রই বা কোথায়? ইসলামের জ্ঞান না থাকলে মুসলিমানের পক্ষে তখন মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাই অসম্ভব। ইসলামে জ্ঞানার্জন ফরয তো মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার তাগিদেই। মাতৃভাষা ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ না হলে তখন অন্য ভাষার সাহায্য নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বাংলার মুসলিমদের একারণেই শত শত বছর ধরে প্রথমে আরবী ও ফার্সী এবং পরে উর্দু ভাষার দরবারে ছুটতে হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যের বেশীর ভাগই হিন্দুদের রচিত। হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের পার্থক্য শুধু খাদ্য-পানীয়তেই নয়। দেহের খাদ্যের ন্যায় বিশাল পার্থক্য রয়েছে উভয়ের মনের খাদ্যতেও। মুসলিম নিছক সাহিত্যরস উপভোগের স্বার্থে সাহিত্য পাঠ করেনা। তাকে সে পাঠের মাধ্যমে ঈমানকেও বাঁচাতে হয়। ফলে বাঙালী হিন্দুদের রচিত বাংলা সাহিত্যে মুসলিমদের জ্ঞানগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজন পুরণ হওয়ার ছিল না। বরং তাতে ভয়ানক ক্ষতিসাধনের ভয় ছিল। কারণ হিন্দুগণ বই লিখেছেন তাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োজনে। মুসলিমদের প্রয়োজন তারা পুরণ করবে সেটি কি আশা করা যায়? বিষয়টি এমন কি কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরে পড়ে। তিনি তার এক বন্ধুকে লেখা পত্রে লিখেছিলেন, “আজকের বাঙালা ভাষা যদি বাঙালী মুসলমানদের ভাব সুস্পষ্টভাবে ও সহজ ভাবে প্রকাশ করতে অক্ষম হয়, তবে তারা বাঙালা পরিত্যাগ করে উর্দু গ্রহণ করতে পারেন।” –(প্রবাসী, ১৩৪১: বৈশাখী সংখ্যা)।   

বিশ্বে ভাষার সংখ্যা বহু হাজার। কিন্তু সব ভাষার কি প্রয়োজনীয় সামর্থ্য আছে? বাংলা, পাঞ্জাবী, গুজরাতি, সিন্ধি, কাশ্মিরী, পশতু, অসমীয়, তেলেগুসহ অনেক ভাষা রয়েছে দক্ষিণ এশিয়াতেও। কিন্তু এসব ভাষায় ইসলামী জ্ঞানের বিশাল ভূবন দূরে থাক, মাত্র শত বা দেড় শত বছর আগে কোরআন ও হাদীসের কোন অনুবাদও ছিল না। সমস্যা হলো কোন ভাষায় সেটি রাতারাতি গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। এ কাজে শত শত বছর লাগে। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমগণ পূর্বে সে অভাব পুরণ করতো ফার্সী ও আরবী ভাষা শিখে। ইংরেজরা ফার্সীকে বিলুপ্ত করে দেয়। তখন উপমহাদেশের মুসলমানগণ মনযোগী হয় সম্মিলিত ভাবে উর্দু ভাষা চর্চা ও সেটিকে সমৃদ্ধ করার কাজে। তাই উর্দু ভাষার আজ যে সমৃদ্ধি তার পিছনে ভারতে বিশেষ কোন একটি প্রদেশের বা এলাকার মুসলিমদের অবদান বললে ভূল হবে। এতে অবদান রয়েছে উত্তর ভারতের মুসলিমদের সাথে দক্ষিণ ভারতের মুসলিমদেরও। অবদান রয়েছে পশ্চিম ভারতের মুসলিমদের সাথে পূর্ব ভারতের মুসলিমদেরও। এদিক দিয়ে মুসলিমগণ হিন্দুদের চেয়েও অগ্রসর ছিল। হিন্দুদের তখনও সর্বভারতীয় কোন ভাষা দূরে থাক, বর্ণমালাই ছিল না। হিন্দিতে দেবনাগরীর প্রচলন আসে অনেক পরে। তাদেরকে শব্দভান্ডার গড়ে তুলতে সাহায্য নিতে হয় সংস্কৃত ভাষার ন্যায় একটি মৃত ভাষা থেকে। অথচ মুসলিমগণ উর্দুকে সমৃদ্ধ করে আরবী ও ফার্সীর ন্যায় দুটি জীবন্ত ভাষা থেকে। ফলে উর্দু পরিণত হয় একটি প্রাণবন্ত ভাষায়। পরিণত হয় একটি প্যান-ইসলামিক ও প্যান-ভারতীয় ভাষা।

 উর্দুর সামর্থ্য ও বাংলা ভাষার দৈন্যতা

ভারতীয় উপমহাদেশের বুকে উর্দুই ছিল একমাত্র ভাষা যা বাংলা, আসাম, বিহার, উড়িষ্যা, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, হায়দারাবাদ, পাঞ্জাব, সিন্ধু, কাশ্মির, গুজরাট, মাদ্রাজসহ সর্বভারতের শিক্ষিত মুসলিমদের প্রায় সবাই বুঝতো। কিন্তু সে মর্যাদা বাংলা ভাষার ছিল না। সিন্ধি, পাঞ্জাবী, গুজরাতী বা পশতু ভাষারও ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষার করার দাবী উঠে বস্তুত সে প্রেক্ষাপটেই। তাই এটিকে বাংলার বিরুদ্ধে কি ষড়যন্ত্র বলা যায়? অথচ বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের পক্ষ থেকে সে মিথ্যাটিই লাগাতর বলা হয়ে থাকে। বাংলার পক্ষে পূর্ব পাকিস্তান থেকে যে দাবী উঠে সেটি নিছক পাকিস্তানে বাঙালীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে। কিন্তু পূর্ব বাংলার পাশাপাশি পাকিস্তানে যে আরো ৪টি প্রদেশ আছে সে বিষয়টিকে ভাষা আন্দোলনের নেতারা বিবেচনায় আনেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই তারা দাবী তুলেছে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হলেও বাংলা ছিল নিছক একটি প্রাদেশিক ভাষা, বাংলার বাইরে তার কোন গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। এমন একটি ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করলে কি পাকিস্তান লাভবান হতো? অথচ উর্দু পাকিস্তানের কোন একটি প্রদেশের ভাষা না হলেও সব প্রদেশের শিক্ষিত মানুষেরা সে ভাষাকে বুঝতো। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ হাছিলের লক্ষ্যে ভাষা আন্দোলনের নেতারা সে সত্যটা সেদিন বুঝতে রাজী হয়নি।

পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি ছিলেন গুজরাটি। উর্দু তাঁর মাতৃভাষা ছিল না। কিন্তু তাঁর নিরপেক্ষ বিচারে উর্দুর কোন বিকল্প ছিল না, কারণ উর্দুই ছিল সমগ্র পাকিস্তানের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষা। পাকিস্তানী নেতারা তখন পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতির স্বার্থে একটি মাত্র ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতি ছিলেন। একাধিক ভাষা রাষ্ট্রভাষা হলে তাতে সংহতি না বেড়ে বিভক্তি বাড়বে, সে আশংকা তাদের ছিল। সে বিষয়টি ভাষা আন্দোলনের নেতাগণও বুঝতেন। তাই পাকিস্তান ভাঙ্গা যাদের লক্ষ্য ছিল, ভাষা আন্দোলনের পিছনে তারা একতাবদ্ধ হয় এবং সেটিকে তারা রাজনীতির মূল হাতিয়ারে পরিণত করে। পাকিস্তানের তৎকালীন নেতারা যার আশংকা করেছিলেন ১৯৭১’য়ে সেটিই সত্য প্রমাণতি হয়েছে। সে সময়ের পাকিস্তানী নেতাদের ভূল-ত্রুটি যাই থাক, সে সত্যকে বুঝতে তারা ভূল করেননি।

কুপের ব্যাঙ সমুদ্রে ছেড়ে দিলে সে গর্তের তালাশ করে। বৃহৎ সমুদ্রে বাসে তার রুচি থাকে না। তেমনি বাঙালী জাতীয়তাবাদী নেতারাও নিজেদের বন্দী করে ভারত ঘেরা ক্ষুদ্র বাংলাদেশের চার দেওয়ালের মাঝে। তাই বাংলাদেশের ক্ষুদ্র মানচিত্রে ফিরে আসার সংগ্রামের শুরু একাত্তরে নয়, ১৯৪৭ থেকেই। সে সত্যটিই প্রকাশ পায় যখন শেখ মুজিব পাকিস্তানের জেল থেকে দেশে ফিরে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী সোহরোয়ার্দী উদ্দ্যানের জনসভায় বল্লেন, “স্বাধীনতার সংগ্রামের শুরু একাত্তর থেকে নয়, সাতচল্লিশ থেকেই।” বাঙালীরা নিজেদের দেশও কখনোই নিজেরা শাসন করেনি। পাল বা সেন রাজাও বাঙালী ছিল না। ফলে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের দায়িত্বভার হাতে নেওয়ার যে গণতান্ত্রিক সুযোগটি এসেছিল সে দায়ভার নেয়ার আগেই জোয়ালই ঢেলে দেয়। দেশের সংখ্যগরিষ্ঠ জনগণ কোন সংখ্যালঘিষ্টদের থেকে কখনো পৃথক হয়না। মুসলিমগণ ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে কখনোই ভারত থেকে পৃথক হয়ে পাকিস্তান বানাতো না। পাকিস্তান থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর পৃথক হওয়ার বিষয়টি সমগ্র মানব ইতিহাসে তাই এক বিরল দৃষ্টান্ত। 

 

ভাষা পূজা বনাম ঈমান বাঁচানোর তাগিদ

ইমানদারকে শুধু দেহ বাঁচালে চলে না, ঈমানও বাঁচাতে হয়। নইলে জাহান্নামে যেতে হয়। ঈমান বাঁচাতে যে ভাষায় কোর’আনের জ্ঞান পাওয়া যায় মুসলিমকে সে ভাষা থেকেই জ্ঞানাহরন করতে হয়। এটি ফরজ। ভাষা পূজায় সে কাজ উপেক্ষিত হলে ঈমানের মৃত্যু ঘটে। মিশর, সূদান, আলজেরিয়া, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো, ইরাক, সিরিয়া, লেবাননের ন্যায় বহু দেশের মানুষ সে ফরজ পালনের তাগিদে নিজেদের মাতৃভাষাকে দাফন করে আরবী ভাষাকে নিজেদের ভাষা এবং সে সাথে রাষ্ট্রের ভাষা রূপে গ্রহন করেছিল। কারণ তারা বুঝেছিল, মাতৃভাষা পূজায় জ্ঞানার্জনের ফরয পালন হবে না। তাতে আত্মা পুষ্টি পাবে না, ঈমানও বাঁচবে না। একমাত্র ইসলামী জ্ঞানই সন্ধান দেয় সিরাতুল মোস্তাকিমের। তখন মুক্তি আসে এ দুনিয়ায় ও আখেরাতে। নইলে ব্যর্থ হয় সমগ্র বাঁচাটাই। এ ঈমানী উপলদ্ধিটি বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনে ১৯৪৭’য়ের পূর্বে যেমন ছিল, ১৯৪৭’য়ের পরও ছিল। এমন একটি আত্মীক ক্ষুধা বাংলার ন্যায় পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্তপ্রদেশ ও বেলুচিস্তানের ন্যায় অ-উর্দুভাষী প্রদেশেও ছিল। ঈমানের এমন দাবীতে অনেক বাঙালী মুসলমান আরবী হরফে বাংলা লেখার চিন্তাভাবনাও করেছিলেন। তাদের যুক্তিটি ছিল, হিন্দুদের রচিত বাংলা সাহিত্য মুসলিম মানসে দুষিত চিন্তার জীবাণু ছড়াবে। পাইপ যোগে ঘরে দূষিত পানি পৌঁছতে থাকলে তাতে দেহ বাঁচে না। তেমনি ঈমানও বাঁচে না চেতনায় দূষিত দর্শনের জীবাণু পৌছতে দিলে। বাঙালী হিন্দুগণ মুসলিমদের উপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব করতে না পারলেও আজ সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব করছে তো এভাবেই। ফলে রবীন্দ্রনাথের মত মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু আধিপত্যবাদের কবি পরিণত হয়েছে বাঙালী সেকুলারিষ্টদের আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক গুরুতে। অথচ এই সেই রবীন্দ্রনাথ যিনি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে কোলকাতার রাজপথে প্রতিবাদে নেমেছিলেন। তিনি জানতেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ করার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া। মুসলিম-প্রধান পূর্ববাংলার জন্য এ ছিল ব্রিটিশ সরকারের ওয়াদা। কিন্তু মুসলিমদের সে কল্যাণ সাম্প্রদায়ীক রবীন্দ্রনাথের ভাল লাগেনি। ভাল লাগেনি কোলকাতার হিন্দু পত্রিকাগুলোরও। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তখন মক্কা বিশ্ববিদ্যালয় বলে ব্যাঙ্গ করতো। জমিদার রূপে রবীন্দ্রনাথ নিজে রাজস্ব তুলতেন পূর্ব বাংলা থেকে। অথচ তিনি তাঁর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দু-অধ্যুষিত বোলপুরে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, যে রবীন্দ্রনাথ পূর্ব বাংলার মুসলিমদের শিক্ষিত হওয়াকে পছন্দ করেননি, তার গান পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতে।

হিন্দুদের রচিত মুসলিম বিদ্বেষী বাংলা সাহিত্যের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে যারা বাংলা ভাষার হরফ পাল্টানোর পরামর্শ রেখেছিলেন তাদের যুক্তি ছিল, এতে বাঁচবে বাংলার মুসলিম মানস। এবং সংযোগ বাড়বে আরবী ও উর্দুর সাথে। এতে সমৃদ্ধি আসবে বাংলা ভাষায়। তাদের কথা, হিন্দু সাহিত্য ও মুসলিম সাহিত্য এক নয়। যেমন এক নয় উভয়ের ধর্ম, জীবনবোধ ও দর্শন। উর্দু ও হিন্দির জন্ম মূলত একই ভৌগলিক এলাকায়। কিন্তু দু’টি ভাষার মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল দেওয়াল এবং সেটি শুধু বর্ণমালার নয়, শব্দ, উপমা ও দর্শনের। একই ভূমিতে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও উর্দু ছুটেছে আরবী-ফারসীর দিকে। আর হিন্দি ছুটেছে সংস্কৃত ভাষার দিকে। ঈমান বাঁচানোর সে তাগিদে বাংলার মুসলিমদেরও অনেকে তাই আরবী হরেফে বাংলা লেখার কথা ভাবতেন। কিন্তু সে জন্য কি পাকিস্তানকে দায়ী করা যায়? কিন্তু সেটিই হয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকার উর্দুকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল -তা সত্য নয়। সেটি ছিল ধর্মপ্রাণ ও ইসলামী জ্ঞান-পিপাসু মানুষের মনের দাবী। সে দাবী ছিল ধর্মপ্রাণ বাঙালী মুসলিমদেরও। বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই এ বিষয়টি নানা ভাষাভাষী ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে চিন্তাভাবনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। একই রূপ প্রয়োজনের তাগিদে ফার্সী ভাষা রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা পেয়েছে আফগানিস্তানে। 

তবে জ্ঞানের ক্ষুধা সবার থাকে না। ক্ষুধা তো স্বাস্থ্যের লক্ষণ। স্বাস্থ্য-পতনে যেমন ক্ষুধা লোপ পায়, তেমনি ঈমানের পঁচনে লোপ পায় জ্ঞানের ক্ষুধা। বিশেষ করে ইসলামী জ্ঞানের। তখন ক্ষুধা বাড়ে অখাদ্যে। মুসলিমের ঈমানের সে পঁচনটি ধরা পড়ে জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ ও সেকুলারিজমের ন্যায় বাতিল মতবাদে দীক্ষা ও ইসলামে অঙ্গিকারহীনতার মাধ্যমে। সেটি আরো প্রকট সিম্পটম রূপে ধরা পড়ে দুর্বৃত্তিতে বার বার শিরোপা পাওয়ার মধ্য দিয়ে। ঈমানের এমন প্রকট রোগে যারা আক্রান্ত তাদের মাঝে কোরআন শিক্ষায় আগ্রহ থাকবে -সেটি কি আশা করা যায়? ইসলামী জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে আরবী, উর্দু বা অন্য কোন ভাষা শেখা এজন্যই তাদের কাছে অনর্থক মনে হয়। সেক্যুলার বা বামপন্থি বাঙালীদের কাছে ভাষার গুরুত্ব বিবেচিত হয় সে ভাষায় কথা বলা, গান করা, সাহিত্য রচনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অফিস আদালত চালানোর মধ্যে। একারণেই ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনের আকুতিটি তারা বুঝতেই পারেনি। বরং তারা মনেপ্রাণে ভয় করতো উর্দুকে। কারণ উর্দু নিছক ভাষা ছিল না, ছিল প্যান-ইসলামিক চেতনার প্রতীক। এ ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছিল এমন শত শত প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিক, আলেম ও গ্রন্থকার, যাদের মাতৃভাষা উর্দু ছিল না। উর্দু ভাষায় সবচেয়ে শক্তিশালী কবি এসেছেন পাঞ্জাব থেকে; এবং তিনি আল্লামা মহম্মদ ইকবাল। এবং সবচেয়ে শক্তিশালী গদ্য লেখক এসেছেন বাংলা থেকে; এবং তিনি হলেন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ। অনেক প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক এসেছেন হায়দারাবাদের ন্যায় দক্ষিণ ভারত থেকে। উপমহাদেশের আর কোন ভাষায় এমন নজির নেই। এতে ফল দাঁড়িয়েছিল যেখানেই উর্দু ভাষার চর্চা বেড়েছে সেখানেই জোরদার হয়েছে প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব। এমন কি পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে সমগ্র ভারত জুড়ে যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট তৈরী হয় তার পিছনেও উর্দু ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজকের পাকিস্তানে এজন্যই সিন্ধুর জিএম সৈয়দের জাতীয়তাবাদী জিয়ে সিন্ধ আন্দোলন এবং সীমান্ত প্রদেশের খান আব্দুল গাফ্ফার খানের পখতুনিস্তান আন্দোলনও মারা পড়েছে। অথচ পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে প্রথম আন্দোলন শুরু করেছিল তারাই। বাংলার সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের কাছে সে ইতিহাস অজানা ছিল না, তাই তারা শুধু রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি নিয়েই খুশি থাকেনি। পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু ভাষার চর্চাকেও তারা রুদ্ধ করে দেয়। ফলে ভাষা আন্দোলনের নামে বাংলা ভাষার উন্নয়ন যা হয়েছে তার চেয়ে সেটি ব্যবহৃত হয়েছে পাকিস্তানের অবকাঠামোর মধ্যে বাঙালী মুসলমানের একাত্ম হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ রূপে। ফলে প্যান-ইসলামিক চেতনার বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলনের চেতনা পরিণত হয়েছে এক লৌহ দেয়ালে। রাষ্ট্রভাষা রূপে কোন ভাষাকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অর্থ যে সে ভাষাকে মুখ থেকে কেড়ে নেওয়া নয় -সে সত্যটুকুও বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ মেনে নিতে রাজী ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে বাংলাভাষা কোন কালেই রাষ্ট্র ভাষা ছিল না। শত শত বছর ধরে ফার্সী ভাষা বাংলাদেশে রাষ্ট্র ভাষা ছিল, তখন কি বাংলাকে বাঙালীর মুখ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল? রাষ্ট্রভাষা না হওয়াতে পাঞ্জাবী, সিন্ধি,পশতু বা বেলুচ ভাষাও কি পাকিস্তান থেকে বিলুপ্ত হয়েছে? অথচ কত মিথ্যাচার না হয়েছে এবং আজও হচ্ছে এ নিয়ে।

 প্রকল্প অশিক্ষিত করার

আসা যাক ইতিহাসের দিকে। দেখা যাক, বাংলার মুসলিমদের কাছে উর্দু কীভাবে গুরুত্ব পেল সে বিষয়টি। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশের হাতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনতা বিলুপ্ত হওয়ায় মুসলিমদের জীবনে যে শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল তা নয়, প্রচন্ড বিপর্যয় এসেছিল মুসলমান রূপে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রেও। তারা যে বাংলার অর্থনীতি, বিশেষ করে বিশ্ববিখ্যাত মসলিন শিল্পকে বিনষ্ট করার লক্ষ্যে মসলিন শিল্পিদের আঙুল কেটেছিল তাই নয়, তারা প্রকল্প নেয় মুসলিমদের অশিক্ষিত করায়। এভাবে অসম্ভব করে তুলেছিল মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। কারণ, অশিক্ষায় আর যাই হোক মুসলিম হওয়া যায়। নামায-রোযা ফরজ না করে জ্ঞানার্জন ফরজ করা হয় -জ্ঞানের সে গুরুত্বের  কারণেই। ব্রিটিশদের হাতে অধিকৃত হওয়ার আগে বাংলার রাষ্ট্রভাষা এবং সে সাথে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভাষা ছিল ফার্সী। অথচ ইংরেজ শাসকেরা ফার্সীর বদলে ইংরাজীকে চালু করে এবং ফার্সী ভাষায় জ্ঞানলাভ অসম্ভব করে। ইংরেজদের হাতে এটিই ছিল মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। ব্রিটিশ শাসনের আগে বাংলায় ৪০ হাজারেরও বেশী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। বাংলার প্রায় সিকি ভাগ জমি বরাদ্দ ছিল সে মাদ্রাসাগুলো চালানোর খরচ জোগাতে। কিন্তু ইংরেজগণ সে জমি কেড়ে নেয়; ফলে বন্ধ হয়ে যায় মাদ্রাসাগুলো। এভাবেই ইংরেজগণ কার্যকর করে, বাংলার মুসলিমদের দ্রুত মূর্খ এবং সে সাথে দরিদ্র বানানোর প্রকল্প। তারা শুধু মসলিন শ্রমিকদের আঙ্গুলই কাটেনি, তাদের শিক্ষার ভাষাকেও নিষিদ্ধ করে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পে মুসলিমগণ ব্রিটিশদের প্রতিদ্বন্ধি হোক- সেটি তাদের কাম্য ছিল না। তাছাড়া শিক্ষা আত্মসচেনত করে, আগ্রাসনের মুখে প্রতিবাদী ও প্রতিরোধীও করে। সৃষ্টি করে জিহাদের জজবা। তাই ইংরেজদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ইসলামের জ্ঞানচর্চায় বাধা সৃষ্টি করা। জ্ঞানচর্চা থেকে দূরে সরলে, দূরে সরতে হয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতা থেকেও। এভাবেই অশিক্ষার সাথে অর্থনৈতিক দুর্গতিও নেমে আসে বাংলার মুসলিম জীবনে। এমন কি সেটি ধরা পড়েছে ব্রিটিশ শাসনামলের ইংরেজ আমলা ও লেখক ডব্লিও. ডব্লিও. হান্টারের চোখে। তিনি লিখেছেন, “যেসব মুসলমানদের পক্ষে একসময় দরিদ্র হওয়াই অসম্ভব ছিল এখন (ইংরেজ নীতির কারণে) তাদের পক্ষে স্বচ্ছল থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

 

বাংলা ভাষায় হিন্দু সাম্প্রদায়ীকতা

বাংলায় ইংরেজ শাসনের ফলে আনন্দ ও প্রতিপত্তি বেড়েছিল হিন্দুদের। সেটি মুসলিমদের বিস্তর ক্ষতির বিনিময়ে। ইংরেজগণ শুরুতেই বুঝেছিল, মুসলিমগণ কখনই তাদের বন্ধু হবে না। বরং সব সময়ই তাদেরকে হানাদার ভাববে। ফলে ভারত শাসনকে দীর্ঘায়ীত করার লক্ষ্যে তারা পার্টনারশিপ গড়ে তোলে হিন্দুদের সাথে। তখন সবচেয়ে বেশী সুবিধা পায় বাঙালী হিন্দুগণ। মুসলিমদের দাবীয়ে রাখার পাশাপাশি ইংরেজদের পলিসি হয় হিন্দুদের উপরে তোলা। এবং সেটি শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে। ইংরেজগণ তখন মুসলিম শাসনামলের ভূমি আইন পরিবর্তন করে চালু করে চিরস্থায়ী প্রথা যার ফলে সৃষ্টি হয় অর্থশালী হিন্দু জমিদার শ্রেণী। হিন্দুগণ তখন ইংরেজী ভাষা শেখার পাশাপাশি বাংলাভাষা গড়ে তোলাতেও মনযোগী হয়। বাংলাভাষার উন্নতি কল্পে ইংরেজ মিশনারীগণ গড়ে তোলে ছাপাখানা। বাংলাভাষায় সাহিত্য সৃষ্টিতে এগিয়ে আসে বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের ন্যায় বিশাল এক ঝাঁক সাহিত্যিক। তাদের সাহিত্যের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলার হিন্দুদের মাঝে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জাগরণ আনা। এসব হিন্দু সাহিত্যিকদের সাহিত্যে শব্দ, উপমা ও দর্শন সংগৃহীত হত সংস্কৃত ভাষায় রচিত বেদ, রামায়ন, মহাভারত থেকে। বাংলা মুসলিমদের মাতৃ ভাষা হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুদের রচিত এ সাহিত্যে মুসলিমদের মনের খোরাক ছিল না। মিটতো না তাদের শিক্ষা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন। ফলে হিন্দুদের রচিত এ সাহিত্যে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাঙালী হিন্দুদের মাঝে রেনেসাঁ শুরু হলেও মুসলমিমদের উপর তার কোন প্রভাবই পড়েনি।

 

মুসলিম রেণাসাঁ ও উর্দু

অশিক্ষা ও বিপর্যয় থেকে বাঁচবার জন্য মুসলিমদেরও নিজস্ব সাহিত্য চর্চায় হাত দিতে হয়। মুসলিমদের তখন ধাবিত হতে হয় অধিকতর সমৃদ্ধ উর্দু ভাষার দিকে। কারণ, বাংলায় ফার্সী ভাষা নিষিদ্ধ হলেও উর্দু ও ফার্সীর চর্চা জোরে শোরে চলছিল দিল্লীসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে। নিছক চাকুরী ও শিক্ষার প্রয়োজন মেটাতে আজ কোটি কোটি বাঙালী ইংরেজী শিখছে। এবং সে বিদেশী ভাষা শিক্ষায় শত শত ঘন্টা ব্যয়ও করছে। কিন্তু তখন বাংলার মুসলিমদের উর্দু ভাষা শিক্ষার আবশ্যকতা ছিল আরো বেশী। সেটি চাকুরীর প্রয়োজনে ছিল না, ছিল মুসলিম রূপে বাঁচার প্রয়োজনে। অনন্তু-অসীম জীবনের আখেরাত বাঁচাতে। এবং সে প্রয়োজনেই বাংলার বুকে গড়ে তোলা হয় নতুন মডেলের মাদ্রাসা। শুরু হয় উর্দু চর্চা। ১৯৩৭ সালে কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টির কোয়ালিশন সরকার। এরপর জোরদার হয় উর্দু শিক্ষার উদ্যোগ। ১৯৩৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক দ্বিধাহীন ভাবে ঘোষণা দেন, “আমি দৃঢ় ভাবে এ মত পোষন করি, যাদের মাতৃভাষা বাংলা, সেসব মুসলিম ছাত্রদের সবার জন্য উর্দুভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।” -(Star of India, 9 April, 1936).

এর পূর্বে ১৯৩৮ সালের ৩’রা এপ্রিল মুসলিম লীগের আসানসোল সম্মেলনে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক মুসলিমনদের সাংস্কৃতিক সংহতির স্বার্থে উর্দুকে মুসলিম ছাত্রদের জন্য বাধ্যতামূলক করার উপর জোর দেন। -(Star of India, 9 April, 1938. p6)। বাংলার মুসলিমদের সৌভাগ্য হলো, হিন্দুদের মাঝে রেনেসাঁ মুসলিমদের তুলনায় অনেক আগে শুরু হলেও তারা অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক শাসন ক্ষমতা হাতে নিতে পারেনি। শাসন ক্ষমতা যায় মুসলিম প্রধানমন্ত্রীদের হাতে এবং সেটি একযুগের বেশী স্থায়ী হয়। প্রধানমন্ত্রী হন জনাব ফজলুল হক, জনাব সোহরোওয়ার্দী্ ও জনাব নাজিমুদ্দিন। এবং সে সরকারের শিক্ষানীতির ফল হলো, সে সময় বাংলার বুকে শিক্ষিত এমন কোন বাঙালী মুসলিম পাওয়াই কঠিন ছিল যে উর্দু ভাষা জানতো না। অনেকে ফার্সীও জানতো। শুধু ফজলুল হক নন, উর্দুর পক্ষে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেন হোসেন শহীদ সোহরোওয়ার্দী। তিনি বলেছিলেন, “উর্দু এবং উর্দু ও ফার্সীর বর্ণমালা হলো আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা রক্ষার দুইটি লৌহ দেওয়াল।”-(Star of India, 28th April, 193)। সৈয়দ আমির আলী বলেন, “আরবী এবং উর্দু সমগ্র ইসলামী বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের আবেগ ও অনুভূতির একতা গড়ে তোলে। একতা ছাড়া আর কোথায় অধিক শক্তির সন্ধান পাওয়া যাবে?” -(The Spirit of Islam, London, 1955)।

বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন এমনকি কিছু ইংরেজ পন্ডিত ব্যক্তিও। তখন বাংলার ডি.পি. আই. ছিলেন W.W. Hornwell । তিনি লিখেন, “The question of Urdu is the question of life of death of Mohammadan education in Bengal.” –(The Mussalman, 22 June 1917, p2-3). তার বক্তব্য ছিল, মোঘল শাসনের অবসানের পর ফার্সী চর্চাকে বাংলায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। এবং বাংলার মুসলিমদের বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। অথচ সমস্যা হলো, বাংলা ভাষা হলো হিন্দুদের সাম্প্রদায়ীক ধারণা, ঐতিহ্য এবং দর্শনের ভাষা -যা মুসলিমদের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। তার অভিমত ছিল, বাংলার মুসলিমদের বাংলা শিখতে হবে -কারণ এটি তাদের মাতৃভাষা। তবে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় হলো, সংস্কৃতির ভাষা উর্দু ও ফার্সী। তিনি এ কথাও উল্লেখ করেন, “এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুভব করেই বাংলার উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মুসলিগণ উর্দু ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।” এমন একটি উপলদ্ধি নিয়েই তিনি পরামর্শ রাখেন, বাংলার সকল মুসলিমদের জন্য উর্দু ভাষা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হোক। এছাড়া তিনি উর্দু প্রশিক্ষণ স্কুল এবং উপযোগী উর্দু পাঠ্যবই প্রস্তুতেরও পরামর্শ রাখেন। -(The Mussalman, 22 June 1917, p 2-3)।

বাংলা সাহিত্য নিয়ে হিন্দুদের অভিমত কি ছিল সেটিও দেখা যাক। শনিবারের চিঠিতে লেখক পরিমল গোস্বামী জোরের সাথে লেখেন, “বাংলা সাহিত্য হলো মূলত বাঙালী হিন্দুদের অবদান। সেহেতু বাংলার সাথে হিন্দুর আধ্যাত্মীক সংযোগ। এবং মুসলিমগণ বাংলার উন্নয়নে কোন কাজই করেনি। সুতরাং তাদের এর প্রতি কোন দরদও নেই।”-( শনিবারের চিঠি, ১০ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, কার্তীক ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা ১৩)। এ প্রসঙ্গে জয়া চ্যাটার্জীর লেখা থেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া যাক:  “বাংলার হিন্দু জাগরণের কথা লিখতে গিয়ে যদুনাথ সরকার আধুনিক বাঙলার ইতিহাসে মুসলিমদের অবস্থানকেও অস্বীকার করেন। তার কথা, আধুনিক বাঙলা হলো হিন্দু ভদ্রলোকদের সৃষ্টি। ব্রিটিশদের কাছ থেকে আহৃত দীপ্তির সাহায্যে তারা বাঙলাকে পুনরায় ভারতীয় সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। অধিকার বলেই বাংলা তাই তাদেরই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নব জাগরণই হলো শুধু ভদ্রলোকের সংস্কৃতির প্রতীক নয়, সেই সঙ্গে একটি হিন্দু বাঙলার, যেখানে মুসলমানের ঠাই নেই। –(জয়া চ্যাটার্জী, বাঙলা ভাগ হলো; ২০০২)

উর্দু শিক্ষার গুরুত্ব বুঝাতে তখন বাংলায় গড়ে উঠে বহু সংগঠন। অনুষ্ঠিত হয় নানা শহরে সম্মেলন। ১৯১৭ সালে এমনই একটি সম্মেলন হয়ছিল বরিশালে। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বরিশাল কনফারেন্সে যে প্রস্তাবনা গৃহীত হয়েছিল তা হলো:

• আরবী ও ফার্সী ভাষার শিক্ষাদান ৭ম শ্রেণী থেকে নয়, ৫ম শ্রেণী থেকে শুরু করতে হবে

• যাদের মাতৃভাষা উর্দু নয় তাদের জন্য কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পরীক্ষায় উর্দুকে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে স্বীকৃত দিতে হবে।

• কোলকাতা মাদ্রাসা ও অন্যান্য মাদ্রাসার নিম্নশ্রেণীতে বাংলা ও উর্দুকে একে অপরের বিকল্প ভাষা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। -( The Mussalman, 11 May 1917 p3)।

১৯০৮ সালের ১৮ই এপ্রিলে পূর্ণিয়াতে অনুষ্ঠিত হয় মোহমেডান এডুকেশন কনফারেন্স। সে কনফারেন্সে সৈয়দ আব্দুল্লাহ সোহরোওয়ার্দী বাঙলার মুসলিমদের উর্দু শেখার প্রতি আহবান জানান। -(The Mussalman, 24 April 1908 p5.)। ১৯৩৩ সালে ২রা জুলাই কিদিরপুরে অনুষ্ঠিত হয় বেঙ্গল প্রাদেশিক উর্দু কনফারেন্স। সে অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে জনাব এস.ওয়াজেদ আলী মুসলিমদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র ও ঐক্যের উপর জোর দেন। তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা ও জাতি হিসাবে বেঁচে থাকার স্বার্থে উর্দু জরুরী।-(The Mussalman, 4 July 1933 p.9)। 

বাঙালী কেন উর্দু কনফারেন্স করবে? কেনই বা উর্দুর পক্ষে কথা বলবে সেটি আজকের মত সেদিনেও অনেকের মনে উদয় হয়েছিল। তখন তার ব্যাখ্যা দিতে উর্দু সম্মেলনের জনৈক সেক্রেটারি বলেন,“উর্দু সম্মেলন বিশুদ্ধভাবে মুসলিমদের নিজস্ব ব্যাপার। তাই এটি ভিতরের আহ্বান।” -(The Mussalman, 5th July, 1933, p2)। অর্থাৎ উর্দুর প্রতি তাদের এ আগ্রহের পিছনে কোন সরকারের বা গোষ্ঠীর চাপ ছিল না। বরং তারা সেটি করেছেন নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে। পুষ্টিকর খাদ্যের সন্ধানে স্বাস্থ্য-সচেতন ব্যক্তি মাত্রই নিজ গরজে রাস্তায় নামে, কারো চাপের প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাতেও উর্দুর প্রতি এমন এক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল তেমনি এক প্রয়োজনের তাগিদে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বহু বাংলাভাষী নেতা উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবী করেছিল তেমনি এক প্রেরণা থেকে। এমন একটি প্রেরণাকে কি পশ্চিম পাকিস্তানীদের চাপিয়ে দেওয়া ষড়যন্ত্র বলা যায়? উর্দুতো পাকিস্তানের কোন এলাকার ভাষা ছিল না। বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গে সে বিষয়টি আদৌ সততার সাথে বিবেচনা করেনি। 

 উর্দু ও প্যান-ইসলামীজম

ইসলামী জ্ঞানের বিশাল ভান্ডারের পাশাপাশি উর্দু ভাষার মাধ্যমে বাংলার মুসলিমদের আরেকটি রাজনৈতিক সুবিধাও হাছিল হয়। সেটি হলো, আত্মীক সম্পর্ক গড়ে উঠে ভারতের বিভিন্ন কোণের মুসলিমদের সাথে। তখন বাংলার রাজধানী কোলকাতা পরিণত হয় উর্দু ভাষার অন্যতম কেন্দ্রে। তখন ভারতের অন্য যে কোন শহর থেকে অধিক সংখ্যক উর্দু পত্রিকা ও বই ছাপা হতো বাংলার রাজধানী কলকাতা থেকে। এ শহর থেকেই তখন প্রকাশিত হত তৎকালীন ভারতের জাগরণ সৃষ্টিকারি আল-হেলাল ও হামদর্দের ন্যায় বহু উর্দু পত্রিকা। আল-হেলালের সম্পাদক ছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ। তখন তিনি খেলাফত আন্দোলনে পক্ষে জনমত গড়ে তুলছিলেন। হামদর্দের সম্পাদক ছিলেন মাওলানা মহম্মদ আলী জওহর। তিনি ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের নেতা। এসব পত্রিকার কারণেই বাংলার মুসলিমদের মাঝেই শুধু নয়, জাগরণ আসে এবং প্যান-ইসলামী চেতনা গড়ে উঠে সমগ্র ভারত জুড়ে। ফলে মহম্মদ আলী, শওকত আলী, আবুল কালাম আযাদ পরিচালিত খেলাফত আন্দোলনে একাত্ম হতে বাংলার মুসলিমদের কোনে সুবিধা হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল অনুপ্রেরণা তো এসেছিল এই প্যান-ইসলামী চেতনা থেকেই। তাই ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলো তখন রাষ্ট্র ভাষা রূপে উর্দুই প্রাধান্য পাবে -সেটিই কি স্বাভাবিক ছিল না? বরং সে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই। কিন্তু ইর্ষাকাতর বাঙালী সেকুলারিষ্টগণ সেটিকে দেখেছে বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রূপে।

মুসলিম মানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলনের নায়কদের বড় সফলতা হলো, বাঙালী মুসলমানদের হাতে এ আন্দোলনটি একটি প্রায়োরিটির তালিকা ধরিয়ে দিয়েছে। সেটি হলো, তারা প্রথমে বাঙালী। তারপর বাংলাদেশী। এবং তারপর মুসলিম। ভাষা আন্দোলন কতটা গভীরভাবে বাংলাদেশের মুসলিমদের ডি-ইসলামাইজড করেছে এ হলো তার উদাহরণ। এটি হলো সেকুলারাইজেশনের এক চুড়ান্ত বিজয়। অথচ মুসলিমদের কাছে তার মুসলিম পরিচিতিটিই মূল। আল্লাহর কাছে বিচার দিনে একমাত্র তাঁর মুসলিম পরিচিতিটাই গুরুত্ব পাবে, বাঙালী বা বাংলাদেশী পরিচয় নয়। প্রশ্ন উঠবে,তার মুসলিম পরিচিতিটি কতটা স্বার্থক, কতটা সফল ও কতটা আপোষহীন। কে কতটা বাঙালী রূপে বাঁচলো -সে প্রশ্ন সেদিন উঠবেই না। প্রশ্ন হলো, যে পরিচয় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে গুরুত্ব রাখে না -সে পরিচয় মুসলিমের কাছে এতো গুরুত্ব পায় কীরূপে? এটি কি ঈমানের স্খলন নয়? অথচ সেটিই বাঙালী মুসলিম জীবনে প্রকট।

 

 ভেসেছে ইসলামপন্থীরাও

ভাষা আন্দোলনের স্রোতে ভাষা থেকে এমন কি অনেক ইসলামপন্থীরাও রেহাই পাননি। প্রচন্ড স্রোত শুধু কচুরীপানাই ভাসায় না, ভাসিয়ে নেয় অনেক শিকড়ধারীদেরও। সে স্খলন যে কতটা ইসলামপন্থীদের আচ্ছন্ন করেছিল তার উদাহরণ দেওয়া যাক। ভাষা আন্দোলন নিয়ে ইসলামী জাগরণের কবি ফররুখ আহম্মদ লিখলেন, “মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা, খোদার সেরা দান”। তিনি ভূলেই গেলেন, মহান আল্লাহতায়ালার সেরাদান ভাষা নয়, সেটি হলো আল-কোরআন। ভাষা শেখাতে নবী পাঠাতে হয় না। ফেরেশতাদেরও দুনিয়াতে আসতে হয় না। অথচ কোর’আন শেখাতে ফেরেশতা ও নবীজী (সা:) পাঠাতে হয়েছে। তাই ভাষাকে খোদার সেরা দান বললে আল-কোরআনের মর্যাদাহানী হয়। মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা সিরাতুল মোস্তাকিম দেখায় না, পরকালীন মু্ক্তিও দেয় না। সে পথ দেখায় কোরআনী জ্ঞান। সবারই মাতৃভাষা থাকে। নিকোবর দ্বীপ ও পাপুয়া নিউগিনিতে এখনও যারা প্রস্তর যুগের অসভ্যতা নিয়ে জঙ্গলে বাস করছে তাদেরও মাতৃভাষা আছে। তবে যা নেই তা হলো তাদের জীবনে সিরাতুল মোস্তাকিম। তাই মায়ের ভাষাকে খোদার সেরা দান বলা যায় কি করে? মায়ের ভাষাতো পশুপাখীরও থাকে। মায়ের ভাষা অন্ধকারেও টানতে পারে, জাহান্নামেও নিতে পারে -যদি সে ভাষা ঈমানের খাদ্য না জুগায়। মায়ের ভাষা সেরা হলে মিশর, ইরাক, সিরিয়া, সূদান, আলজিরিয়া, মরক্কো, তিউনিসা, লিবিয়ার মানুষ ইসলামের প্রাথমিক যুগে কেন মাতৃ ভাষাকে কবরে পাঠালো? ফররুখ আহমদের মত ইসলামের জাগরণের কবির এরূপ কবিতা বাংলাদেশে ইসলামের পক্ষের শক্তির অনেকের মনেই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। তার এ কবিতায় বিভ্রান্ত হয়ে ভাষা আন্দোলনের ন্যায় বাংলার মুসলিম ইতিহাসের একটি আত্মঘাতি ঘটনা নিয়েও অনেকে অহংকার করতে শিখেছে।

অপর দিকে তমুদ্দন মজলিসের নেতারা নিজেদেরকে ইসলামী তাহজিব ও তমুদ্দনের সেবক মনে করেন। অথচ তারা ভাষা আন্দোলনের নামে ইসলাম-বিদ্বেষী সেক্যুলারদের দলে ভীড়ে তাদের মাঠকর্মী রূপে খেটেছেন। ডক্টর শহিদুল্লাহও বলে বসলেন, আমি প্রথমে বাঙালী, তারপর মুসলিম। অনেকের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন সূফী রূপে। তিনি ছিলেন ফুরফুরার পীরের খলিফা। কিন্ত খলিফার মুখে একি কথা! তার প্রধানতম গর্ব ছিল বাঙালী হওয়া নিয়ে, মুসলিম হওয়া নিয়ে নয়। কথা হলো, এটা কি ইসলামের শিক্ষা? অথচ মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ দানটি বাঙালী বা অবাঙালী হওয়া নয়, সেটি মুসলিম হওয়া। অথচ ডক্টর শহিদুল্লাহর গর্ব বাঙালী হওয়া নিয়ে! প্রথম সারীর বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের এই হলো চিন্তা-চেতনার মান।

ইসলাম ব্যক্তিকে শুধু নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে নিয়ত বাঁধতে বলে না। বাঁচা-মরা ও প্রতিটি চেষ্টা-প্রচেষ্টার মধ্যেও নিয়ত বাঁধতে বলে। যেমনটি হযরত ইবরাহীম (আঃ) বেঁধেছিলেন। আর সেটি হলো, “আমার নামায, আমার কোরবানী, আমার বাঁচা এবং আমার মৃত্যু –সব কিছুই রাব্বুল আলামীন মহান আল্লাহর জন্য।” হযরত ইব্রাহীম (আ:) এর এমন নিয়তে মহান আল্লাহতায়ালা এতই খুশি হয়েছিলেন যে তাঁর সে কথাগুলোকে চিরকালের জন্য সকল ঈমানদারদের জন্য অনুকরণীয় করে রেখেছেন। মুসলমানের জীবনে প্রকৃত সফলতা মিলবে কে কতটা এ নিয়ত পালনে সফল হলো তার উপর। বস্তুত মুসলিম তাঁর জীবনে ভিশন, মিশন ও প্রায়োরিটি পায় এ আয়াত থেকে। তাঁর মুসলমানিত্ব নির্ভর করে এমন মিশন নিয়ে বাঁচার মধ্যে। মুসলিমের জীবনে রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাজনীতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষা, বন্ধুত্ব ও সম্পৃতির মূল নিয়ন্ত্রক হবে এমন নিয়েত। এখানে ভাষার কোন স্থান নেই। গায়ের রং ও ভূগোলেরও কোন স্থান নেই। রোজ হাশরের বিচার দিনে মহান আল্লাহ কখনই এ প্রশ্ন করবেন না যে তোমার মাতৃভাষা কি ছিল? বরং প্রশ্ন হবে কতটুকু মুসলিম ছিলে -সেটি।

 

ভাষা আন্দোলনের নাশকতা

মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো ভাষা, বর্ণ, অঞ্চলের বিভেদ ভূলে প্যান-ইসলামিক হওয়া। এক্ষেত্রে ব্যর্থতার অর্থ ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠায় ব্যর্থতা। অর্থাৎ মুসলিম হওয়ায় ব্যর্থতা। প্রশ্ন হলো, যে ব্যক্তির জীবনে প্রথম প্রায়োরিটি হয় বাঙালী হওয়া, তার কাছে কি অন্য ভাষার মুসলিমের সাথে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে একাত্ম হওয়া গুরুত্ব পায়? অথচ মুসলিমদের কাজ তো নানা ভাষা ও নানা অঞ্চলের হয়েও এক দেহে লীন এক উম্মতে ওয়াহেদা গড়া। নামায-রোযা আদায়ের ন্যায় এটিও তো ফরয। কিন্তু যখন বাঙালী হওয়াটাই প্রায়োরিটি হয়, তখন ভাষাগত পরিচয়টিই রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ জীবনের বহু কিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে যায়। অভিন্ন বাংলা ভাষার নামে তখন অন্য বাঙালী -তা সে হিন্দু হোক, খৃষ্টান হোক, বৌদ্ধ হোক বা নাস্তিক হোক, তাদের সাথে একাত্ম হওয়াটাই গুরুত্ব পায়। তখন গুরুত্ব হারায় অন্য ভাষী মুসলিম ভাইয়ের সাথে একতা গড়ার বিষয়টি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। নানা ভাষাী মুসলিমদের মাঝে একতা গড়ার ন্যায় ফরজ কাজটি তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে বাঙালীদের মনে গুরুত্ব হারায় পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। বরং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ভারতের পশ্চিম বাংলার সাথে সম্পর্ককে ঘনিষ্টতর করা। ফলে বাঙালী মুসলিম শুধু পাকিস্তান ও উপমহাদেশের মুসলিম থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি, বরং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে মুসলিম জাহান থেকেও। তাই কাশ্মীর,ভারত বা আরাকানের মজলুম মুসলিমদের মুক্তির বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ মাথা ঘামায় না। মনে করে সেগুলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়। নির্যাতিত ফিলিস্তিনীদের জন্যও বাংলাদেশ থেকে তেমন সাহায্য যায় না। বাংলাদেশের সেকুলার রাজনীতিতে বস্তুত এগুলো কোন প্রসঙ্গই নয়।

যখন কোন মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাষা শিখে তখন তার সাথে শুধু মুখের যোগযোগই বাড়ে না, বাড়ে আত্মার সংযোগও। তখন গড়ে উঠে আত্মীক সম্পর্কও। ভাষার মূল কাজ তো এই সংযোগই গড়া। বাংলা ভাষা চর্চার পাশাপাশি উর্দু শেখার কারণে বাংলার মানুষের যে লাভটি হয়েছিল তা হলো, উপমহাদেশের অন্য মুসলিমদের সাথে তাদের মনের সংযোগটি বেড়েছিল। সে সাথে বেড়েছিল জ্ঞানের ঐশ্বর্যও। বেড়েছিল ঔদার্যতাও। এরই ফলে বাঙালী মুসলিমগণ সামর্থ্য পায় উপমহাদশের অন্য মুসলিমদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ফল দাঁড়ালো, অন্য ভাষার অবাঙালী ভাইয়েরা চিত্রিত হলো ছাতুখোর দুষমন রূপে। অথচ এক মুসলিম যে অন্য মুসলিমের ভাই – সে খেতাবটি মহান আল্লাহতায়ালার দেওয়া। তাই মুসলিমগণ একে অপরের ভাই বলবে -সেটি এক অলংঘনীয় ঈমানী দায়বদ্ধতা। নইলে গাদ্দারী হয় মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশের সাথে। অথচ বাঙালী মুসলিমের মাঝে সে গাদ্দারীই প্রবলভাবে বাড়িয়েছে ভাষা আন্দোলন। এভাবে ছিন্ন করা হয় পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মাঝে প্যান-ইসলামী বন্ধন। অথচ এটি শুধু রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক অপরাধই নয়, ইসলামের দৃষ্টিতে হারামও। এমন বিচ্ছিন্নতাই যে কোন মুসলিম জনপদে আল্লাহর আযাব অনিবার্য করার জন্য যথেষ্ট। এরূপ আযাবের জন্য পুতুল পূজার প্রয়োজন নেই। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কোর’আনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “এবং তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা সুস্পষ্ট ঘোষণা আসার পরও পরস্পরে মতভেদ ও বিভক্তি গড়লো। তারাই হলো সে সব ব্যক্তি যাদের জন্য রয়েছে বিরাট আযাব। -(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৫)।

মহন আল্লাহতায়ালা শুধু একতা গড়াকেই ফরয করেননি, এভাবে হারাম করেছেন বিভক্তি গড়াকেও। তাই ঈমানদার ব্যক্তি শুধু নামায-রোযাতেই মনযোগী হয় না, অতি একনিষ্ঠ হয় মুসলিমদের মাঝে একতা গড়তে এবং অতিশয় সচেষ্ট হয় বিভক্তি এড়াতেও। এমন এক সমৃদ্ধ ইসলামি চেতনার কারণেই ১৯৪৭’য়ে বাংলার মুসলিমগণ অন্যভাষী মুসলিমদের সাথে একত্রিত হয়ে পাকিস্তান গড়েছিল। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের নাশকতায় সেটি বিলুপ্ত হয়েছে। এরই ফল হলো, বাঙালী মুসলিমের মাঝে আজ থেকে শত বছর আগে যে চারিত্রিক, নৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুণ ছিল -তা আজ আর বেঁচে নাই। শত বছর আগে অন্ততঃ অন্য ভাষা, অন্য বর্ণ ও অন্য ভূগোলের মুসলিমদের ভাই বলার ঈমানী সামর্থ্য ছিল; এবং তাদের সাথে একত্রে রাজনীতি করা এবং কাফের শত্রুর বিরুদ্ধে একত্রে যুদ্ধ করারও আগ্রহ ছিল। এখন সেটি বিলুপ্ত। অন্য ভাষার মুসলিমদের সাথে শুধু ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতাই বাড়েনি, বেড়েছে মনের দূরত্বও। দিন দিন সেটি আরো গভীরতর হচ্ছে। অপর দিকে ভারতীয়দের ন্যায় কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব উৎসবে পরিণত হয়েছে। এবং সে সাথে উৎসবে পরিণত হয়েছে অবাঙালী মুসলিমদের সাথে বিচ্ছিন্নতার দিনগুলোও। তাই ১৯৫২’য়ের ভাষা আন্দোলন শুধু বাঙালীর মুসলিমের রাজনৈতিক ভূগোলই পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছে মনের ভূগোলও। এবং তা অসম্ভব করছে প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। ১ম সংস্করণ ২১/১২/২০১৭; ২য় সংস্করণ ২৩/০২/২০২১।




আওয়ামী দুঃশাসনের দুই পর্ব

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 আওয়ামী দুঃশাসন ও হাসিনার বড়াই

মানব চরিত্রে পরিবর্তন আসে তার দৈহীক গুণের কারণে নয়। জলবায়ু, ভূগোল বা সম্পদের গুণেও নয়। বরং ধ্যান­-ধারনা ও বিশ্বাসের কারণে। ধ্যান­-ধারনা ও বিশ্বাস পাল্টে গেলে তাই চরিত্রও পাল্টে যায়। নবী-রাসূলগণ তাই মানব চরিত্র পাল্টাতে তাদের বিশ্বাসে হাত দিয়েছেন। নবীজী (সাঃ)র  আমলে সাহবাদের চরিত্রে যে মহান বিপ্লব এসেছিল এবং যেভাবে নির্মিত হয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা -সেটি জীবন ও জগত নিয়ে তাদের বিশ্বাসে আমূল বিপ্লব আসার কারণে। সে বিশ্বাস পাল্টাতে কাজ করেছেন মহান আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর জ্ঞান নিয়ে। সে রূপ কোন ধ্যান-ধারণা ও জ্ঞানের বিপ্লব আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জীবনে বিগত সত্তর বছরেও আসেনি। বরং তাদের সর্বাত্মক প্রয়াস পুরনো ও ব্যর্থ বিশ্বাসগুলোকে ধরে রাখায়। ফলে আওয়ামী লীগের বয়স বাড়লেও দলটির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনে কোনরূপ চারিত্রিক পরিবর্তন আসেনি। বরং বয়সের ভারে চোরডাকাতের জীবনে যেমন চুরিডাকাতিতে নৃশংস অভিজ্ঞতা আসে তেমনি নৃশৃংসতা এসেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জীবনেও। ফলে রাজনৈতীক সমাবেশ করা, মিছিল করা,পত্রিকা প্রকাশ করার ন্যায় জনগণের মৌলিক অধিকার হননে মুজিব যেরূপ বাকশালী একদলীয় শাসন চালু করেছিল, হাসিনা সেটি করছে বাকশাল চালু না করেই। ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিব যেরূপ ভোট ডাকাতির নির্বাচন করেছিল, হাসিনা সে ধারাটি শুধু বজায় রাখেনি বরং ২০১৪ এবং ২০১৮ নির্বাচনে তার চেয়েও নৃশংস রূপ দিয়েছে।  মুজিব ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলকে সংসদের ৭ সিটে বিজয় দিয়েছিল, হাসিনা তার চেয়ে এক সিটও বেশী দেয়নি।  

মুজিব দেশে লাল বাহিনী, রক্ষিবাহিনী, দলীয় স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী নামিয়ে তিরিশ-চল্লিশ হাজার মানুষ খুন করেছিল, কিন্তু ঢাকার রাজপথে একরাতে ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন সেনা ও পুলিশ নামিয়ে শত শত মানুষ হত্যার ন্যায় নৃশংসতা দেখাতে ভয় পেয়েছিল। ফলে তার হাতে শাপলা চত্ত্বরের ন্যায় গণহত্যা হয়নি।কিন্তু শেখ হাসিনা সে গণহত্যাটি ঘটিয়েছে কোনরূপ দ্বিধাদ্বন্দ না করেই, এবং তেমন একটি ভয়ানক নৃশংসতার পরও হাসিনা বলছে সে রাতে কিছুই হয়নি। দূর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে,অথচ তারপরও হাসিনার বড়াই,দেশ তার আমলেই সবচেয়ে বেশী উন্নতি করেছে। দেশ যে কতটা দ্রুত দূর্নীতিতে ডুবে যাচ্ছে সেটির কিছুটা বিবরণ পাওয়া যায় শেখ হাসিনার প্রতি লেখা জনৈক লায়েকুজ্জামানের লেখা একটি খোলা চিঠিতে। সে চিঠি থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি দেয়া যাকঃ “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একটু খোঁজ-খবর নিয়ে দেখুন মন্ত্রী-এমপিরা কি করেছেন এলাকায়। .. তারা আচার-আচরণে, চলনে-বলনে কেবল আপনাকেই তুষ্ট রাখে বাক্যবাণে, কারণ আপনি হচ্ছেন তাদের কামাই-জামাই করার তাবিজ। ..বড় হচ্ছে মালপানি। বৃহত্তর ফরিদপুর থেকে নির্বাচিত একজন এমপি আগে ভাঙাচুরা একটা গাড়ি ব্যবহার করতেন, এখন তার দামি গাড়ি তিনটি। আগে থাকতেন ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে, এখন ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক। ওই এমপির নির্বাচনী এলাকার দলীয় কর্মীদের অভিযোগ, যারা টাকা নিয়ে আসেন তারা এমপির বাসার দোতলায় যেতে পারেন, যারা টাকা আনেন না তাদের ঠিকানা নিচে, তারা ওপরের তলায় পৌঁছতে পারেন না। ..চট্টগ্রামে বনকর্মীদের ত্রাহি অবস্থা, চেটেপুটে যারা খাচ্ছে তাদের কিছু বলার ক্ষমতা নেই বনকর্মীদের। এক ক্ষমতাধর মন্ত্রীর নিকট আত্মীয় তারা। হয়তো আপনার কাছে রিপোর্ট আছে অথবা নেই- কম করে হলেও ১০০ এমপিকে এলাকায় যেতে হয় হয়তো পুলিশ না হয় প্রাইভেট বাহিনী নিয়ে। ..কয়েক মাস আগে রাজশাহীর এক এমপিকে নিজের নির্বাচনী এলাকা থেকে ফিরতে হয়েছে দু’হাতে পিস্তলের গুলি ছুড়তে ছুড়তে। বিক্ষুব্ধ কর্মীদের রোষানল থেকে জীবন বাঁচাতে গুলি ছুড়ে পালাতে হয়েছে এমপিকে। এক কমিউনিস্ট মন্ত্রীর ভাগ্নে কিভাবে লুটে খাচ্ছে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুই দপ্তরের টেন্ডার- চোখ মেললেই তা দেখা যাবে। ওই কমিউনিস্ট মন্ত্রী ঢাকার প্লট বরাদ্দ দিচ্ছেন তার নির্বাচনী এলাকার নিকট আত্মীয়দের নামে। সরাসরি কোটার ওই প্লট পেতে অন্যরা গেলে তিনি বলে দেন প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ লাগবে। বৃহত্তর ফরিদপুরের আরেক জাঁদরেল মন্ত্রীর সোনার ভাই তো এলাকায় মন্ত্রীর জনপ্রিয়তা তলানিতে এনে ঠেকিয়েছেন। জেলার সব কাজে মন্ত্রীর ভাইয়ের পার্সেন্টেজ লাগবে, কাজের আগে বাড়িতে তার ভাগের টাকা পৌঁছে দিতে হয়। মন্ত্রী আবার জনসভাতে ভাইয়ের প্রশংসা করে বলেন, এমন ভাই পাওয়া যায় কপাল ফেরে। নিশ্চুপ হয়ে যান কর্মীরা, ধমকের ভয়ে কেউ সত্য কথাটা বলেন না মন্ত্রীকে। দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার এক জেলা সদরের হায়ার করা একদা বাম নেতা এমপি তো বহাল তবিয়তে লুটে যাচ্ছেন তার দুই পুত্রধন আর এক মদের ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতাকে সঙ্গে নিয়ে। ওই জেলার পাশে সীমান্ত এলাকার আরেক এমপি পুরো নির্বাচনী এলাকার টাকা রোজগারের সেক্টরগুলো তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ রেখেছেন নিজের হাতে, অন্য দুই সেক্টরের একটি দিয়েছেন ছেলেকে, আরেকটি বউকে। উত্তরবঙ্গের এক মন্ত্রী মাঠে ছেড়ে দিয়েছেন তার ছেলেকে। টয়লেট নির্মাণের টেন্ডার হলেও তার ছেলে হাজির হয় সেখানে। দু’চারজন মন্ত্রী-এমপি বাদে বেশির ভাগেরই একই অবস্থা। এতো গেল কামাই রোজগারের দিক। এতো গেল এমপি-মন্ত্রীদের কথা। আপনার আশপাশ দিয়ে যারা আছেন তাদের খবর কি? নিজের এলাকায় তারা কত বিঘা জমি কিনেছেন, ক’টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান করেছেন একটু খবর নিলেই জানতে পারবেন ওই সব ফুটন্ত গোলাপের কথা, সর্বশেষ তারা বিসিএস নিয়োগে ডাক তুলেছেন ১০ লাখ করে। ওই সব হচ্ছে আপনার নাগের ডগায় বসে। আপনার আশপাশেই তারা টাকা বানানোর মেশিন বসিয়েছে”।

আওয়ামী যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখন যে শুধু দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি সংকটে পড়ে তা নয়। প্রচণ্ড ধস নেমে আসে দেশের প্রবাহমান ন্যায়নীতি, আচার-ব্যাবহার ও মূল্যবোধেও। ভয়ানক দুর্বৃ্ত্তিতে নামে তখন সমগ্র প্রশাসন। চোরডাকাতগণ তখন যেন প্রবল বল পায়। তাদের কারণে তখন ধ্বস নামে দেশের শেয়ার বাজারে। সীমাহীন ডাকাতি শুরু হয় দেশের অর্থ ভান্ডারে। সন্ত্রাসীরা তখন দল বেঁধে প্রকাশ্য রাজপথে নেমে আসে। পুলিশ, র‌্যাব, বিজীবী তখন খুনিতে পরিণত হয়। হলমার্ক, ডিস্টিনী, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ন্যায় কোম্পানীগুলো যেভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ডাকাতি করলো -সেটি কি আর কোন আমলে হয়েছে? সরকারি চোর-ডাকাতদের কারণেই পদ্মাসেতুর বরাদ্দকৃতত ঋণ বাতিল হয়ে গেল। ফলে পিছিয়ে গেল পদ্মা সেতুর ন্যায় দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। এতে শুধু পদ্মা সেতু পিছিয়ে গেল না, বহু বছরের জন্য পিছিয়ে গেল সমগ্র দেশ। আমরা এমনিতেই বিশ্বের বহু দেশ থেকে নানা ভাবে পিছিয়ে আছি। এখন আর পিছিয়ে থাকার সময় আছে? এখন তো অতি দ্রুত সামনে এগুনোর সময়। কিন্তু বর্তমান সরকার সে এগিয়ে যাওয়াই অসম্ভব করে রেখেছে। দূর্নীতির দায়ে পদ্মা সেতু ভেস্তে গেলে কী হবে, সে দূর্নীতির দায়ে কারো কি কোন শাস্তি হয়েছে? বিশ্বব্যাংক এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী হৈ চৈ করলেও হাসিনা সরকারের কি তাতে ঘুম ভেঙ্গেছে? বাংলাদেশ মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বরে যেভাবে শত শত মানুষকে হত্যা করা হলো এবং গুম করা হলো অসংখ্য লাশ হলো সেটিই বা আর কোন কালে হয়েছে? আজ যেভাবে ইসলামপন্থিদের ধরে ধরে নির্যাতন করা হচ্ছে সেটি কি আবু জেহল ও আবু লাহাবের আমলের বর্বরতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় না? শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে এটিই কি ইসলামপন্থিদের প্রাপ্য? বায়তুল মোকাররম মসজিদের গেটে পুলিশ তালা পর্যন্ত ঝুলিয়েছে, এভাবে মুসল্লিদের মসজিদের ঢুকতেও বাধা দেয়া হচ্ছে। কোন মুসলিম দেশে কি সেটি ভাবা যায়? সরকার পরিকল্পিত ভাবে দেশকে একটি সংঘাতের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

মিথ্যার সয়লাব ও বেইজ্জতি দেশবাসীর

আবহমান কাল থেকেই মানব জাতির মাঝে দুটি পক্ষ। একটি সত্যের, অপরটি মিথ্যার। নির্ভেজাল সত্যটি আসে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। সে সত্য থেকেই মানুষ পায় কোনটি ন্যায় এবং কোনটি অন্যায় তার একটি নির্ভূল ধারণা। সে ধারণাটি দৈহীক বলেও আসে না, কলকারখানায়ও আবিস্কৃত হয় না। মানব জাতিকে সত্যের সন্ধানটি দিতেই করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালা এ পৃথিবীকে লক্ষাধিক নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। সে মহাসত্য বিধানটি হলো ইসলাম। মানব জীবনে সবচেয়ে বড় কর্মটি হলো সে সত্যের অনুসরণ। এর চেয়ে বড় মহৎ কর্ম এ সংসারে দ্বিতীয়টি নাই। সে সত্য অনুসরণের ফলেই মু’মিন ব্যক্তি মৃত্যুর পর জান্নাত পায়। এবং এ পৃথিবীও নেক আমলে ভরে উঠে। এটিই ইসলামী মিশন। অপরদিকে শয়তান ও তার অনুসারিদের লক্ষ্য হলো ইসলামের সে কোরআনী সত্যকে সর্বভাবে প্রতিরোধ করা। সে কাজে তাদের মূল অস্ত্রটি হলো অসত্য তথা মিথ্যা। যারাই কোরআনী সত্যের অনুসারি নয়, তারাই মূলত শয়তানের অনুসারি। তাদের রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস –সবকিছুই তখন হয়ে পড়ে মিথ্যা নির্ভর। সত্যের অনুসারিদের পরাজিত করতে তারা তখন মিথ্যাকে সর্বভাবে বলবান করে। নর্দমার কীট যেমন আবর্জনায় বেচে থাকে এরাও তেমনি মিথ্যার উপর বেঁচে থাকে। আল্লাহ প্রদত্ত সত্যের আলোকে নিভিয়ে দিতে শয়তানি পক্ষটি এজন্যই যুগে যুগে মিথ্যার জাল বিস্তার করেছে। আর মিথ্যার বিজয় এলে মিথ্যুক দুর্বৃত্তরাও তখন মর্যাদা পায়। সে মিথ্যার প্রবল জোয়ারের কারণেই নমরুদ ফিরাউন বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে খোদা রূপে স্বীকৃত পেয়েছে। উপাস্য রূপে  স্বীকৃতি পেয়েছে কোটি কোটি গরুবাছুর, শাপশকুন, নদীনালা, পাহাড়-পর্বত ও প্রাণহীন মুর্তি। একই ভাবে মিথ্যার উপাস্যদের কাছে অতি নৃশংস খুনি ও স্বৈরাচারি শাসকেরা্ও রাষ্ট্রের নেতা, দেশের বন্ধু, জাতির পিতা এরূপ নানা খেতাবে ভুষিত হয়েছে। দেশে শয়তানের এ পক্ষটি ক্ষমতায় আসলে তাই সে দেশে মিথ্যার জোয়ার শুরু হওয়াটাই নিয়ম। বাংলাদেশ আজ সে জোয়ারেই প্লাবিত। কারণ, বাংলাদেশে আজ যারা ক্ষমতাসীন তারা ইসলামের পক্ষের শক্তি নয়। তাদের অবস্থান যে ইসলামের বিপক্ষে -সেটি তারা গোপনও রাখেনি। ইসলামের শরিয়তি বিধানের পরাজয় এবং ইসলামপন্থিদের হত্যা ও নির্যাতনের মাঝেই যে তাদের উৎসব -সেটিও তারা জাহির করছে বার বার। এদের কারণেই বাংলাদেশে আজ মিথ্যার প্রচন্ড সয়লাব। সে মিথ্যার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।

আওয়ামী সরকারের আবিস্কৃত মিথ্যার সংখ্যা অসংখ্য। সেটি যেমন মুজিব আমলে, তেমনি হাসিনার আমলে। মুজিবামলেই রচিত হয়েছিল একাত্তরে  তিরিশ লাখ নিহতের গাঁজাখোরি মিথ্যাটি। বলা হয়েছিল, বাংলা ভাষা ও বাঙালীর নির্মূলই হলো পাকিস্তান সরকারের মূল লক্ষ্য। মিথ্যাচারিরা স্বভাবতঃই বিবেকশূণ্য হয়। প্রকট মিথ্যাকে সত্য থেকে পার্থক্য করার জন্য যে কান্ডজ্ঞান লাগে সে কান্ডজ্ঞানের মৃত্যুটা এখানে জরুরী, নইলে গরুছাগলকে যেমন দেবতা বলা যায় না,তেমনি ফিরাউন-নমরুদকে ভগবান এবং মুজিবের ন্যায় বাকশালী গণশত্রুদের নেতা, পিতা বা বন্ধু বলার রূচি সৃষ্টি হয় না। বাংলাদেশের বুকে আওয়ামী শাসন মূলত সে মিথ্যার আবাদই বিপুল ভাবে বাড়িয়েছে। তাই নয় মাসে তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করতে হলে যে প্রতিদিন ১১ হাজার মানূষ হত্যা করতে হয় সে হিসাব করার মত বিবেকটুকুও আওয়ামী বাকশালীদের ছিল না।

আরেক মিথ্যা আবিস্কার করে সরকারের লোকেরা বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। সেটি রানা প্লাজা ধসে যাওয়ার ১৭ দিন পর সে ধ্বংসস্তুপ থেকে রেশমাকে উদ্ধারের মধ্য দিয়ে। সত্য ঘটনা থেকে মানুষের নজর কাড়ার ক্ষেত্রে অলীক মিথ্যার সে সামর্থ্যটি বিশাল। হাসিনা ও তার দলবল সেটি বুঝে, তাই তাদের দ্বারা ঘটে রেশমা কাহিনীর আবিস্কার। শুধু দেশবাসীর নয়, বিশ্ববাসীর নজরও সে ঘটনাটি কেড়ে নিয়েছিল। এভাবে সরকার প্রমাণ করতে চেয়েছিল তার সরকারের পরিচালিত উদ্ধার কাজটি কতই না চমৎকার ও সফল। সরকার তেমন একটি অহংকার নিয়েই তো উদ্ধারকাজে বিদেশীদের সহায়তা দানের প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মিথ্যা দিয়ে অপরাধীদের যেমন কলংকমোচন হয় না, তেমনি সে পথে তাদের ইজ্জতও বাড়ে না। কারণ মিথ্যাকে বেশী দিন গোপন রাখা যায় না। রেশমা উদ্ধারের কাহিনীটি যে অলীক মিথ্যা ছিল -সেটি আজ আবিস্কৃত হয়েছে। আবিস্কৃত সে সত্যটি আজ বিশ্বব্যাপী বিপুল প্রচারও পাচ্ছে। লন্ডনের বহুল প্রচারিত ডেইলী মিরর তা নিয়ে এক নিবন্ধ ছেপেছে। সেরূপ খবর ছাপা হচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও। আর এতে কালিমা লেপন হচ্ছে শুধু শেখ হাসিনার মুখে নয়, বাংলাদেশীদের মুখেও। দেশে মশা মাছি ও গলিত আবর্জনার বাড়লে ম্যালেরিয়া,কলেরা ও টাইফয়েডের ন্যায় রোগভোগও বাড়ে। তাতে মানুষের মৃত্যুও বাড়ে। দুষিত পরিবেশে বসবাসের এটিই বিপদ। তেমনি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেল অথচ বাকশালী স্বৈরাচার নেমে আসলো না, দেশের সম্পদ লুন্ঠিত হলো না বা পথে ঘাটে মানুষ লাশ হলো না –সেটি কি ভাবা যায়? গোখরা শাপ যেমন বিষ নিয়ে চলাফেরা করে,আওয়ামী লীগও তেমনি বেঁচে থাকে গণতন্ত্রধ্বংসী, অর্থনীতি ধ্বংসী তথা দেশধ্বংসী এক নাশকতামূলক চরিত্র নিয়ে। হাসিনার দুঃশাসন কি সেটিই প্রমাণ করছে না?

 

মুজিবী দুঃশাসনের দিনগুলি

মুজিবী দুঃশাসনের সে দিনগুলি বাংলাদেশের মানুষ আজ প্রায় ভূলতে বসেছে। অথচ আওয়ামী লীগ ও আজকের হাসিনা আমলের এ দুঃশাসন বুঝতে হলে মুজিবী দুঃশাসন বুঝাটি অতি জরুরী। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয় বলেই বোকাদের পা একই গর্তে বার বার পড়ে। অথচ নবীজী (সা:) বলেছেন, ঈমানদের পা কখনোই একই গর্তে বার বার পড়ে না। কারণ অতীত ইতিহাস থেকে তারা শিক্ষা নেয়। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানদের ক্ষেত্রে সে জ্ঞানলাভটি ঘটেনি। ফলে একই গর্তে তাদের পা বার বার পড়ছে। ফলে তাদের জীবনে আওয়ামী দুঃশাসন বার বার নেমে আসছে। আওয়ামী নেতাকর্মীদের কাছে স্বর্ণযুগ হলো মুজিবামল। নবাব শায়েস্তা খাঁর আমল তাদের কাছে কিছুই না। মুজিবই হলো তাদের কাছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী। কিন্তু কীরূপ ছিল সে মুজিবামল? মুজিবকে চিনতে হলে ইতিহাসের সে পাঠটি নেয়া অতি জরুরী। তবে সমস্যা হলো সে আমলের প্রকৃত চিত্রটি বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় মেলে না। সুপরিকল্পিত ভাবে সে বিবরণগুলি গায়েব করা হয়েছে। স্থান পেয়েছে শুধু মুজিব বন্দনা। কিন্তু সে ইতিহাসটি বেঁচে আছে বিদেশী পত্র-পত্রিকায়। এ নিবন্ধে সে আমলের বিদেশী পত্রিকা থেকেই কিছু উদাহরণ পেশ করা হবে। বাংলাদেশ সে সময় কোন ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সাহিত্য,জ্ঞান-বিজ্ঞান বা খেলাধুলায় চমক সৃষ্টি করতে না পারলেও বিশ্বব্যাপী খবরের শিরোনাম হয়েছিল দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি, হত্যা, সন্ত্রাস, ব্যর্থ প্রশাসন ও স্বৈরাচারের দেশ হিসাবে।

১৯৭৪ সালের ৩০ শে মার্চ গার্ডিয়ান পত্রিকা লিখেছিল,“আলীমুদ্দিন ক্ষুধার্ত। সে ছেঁড়া ছাতা মেরামত করে। বলল, যেদিন বেশী কাজ মেলে, সেদিন এক বেলা ভাত খাই। যেদিন তেমন কাজ পাই না সেদিন ভাতের বদলে চাপাতি খাই। আর এমন অনেক দিন যায় যেদিন কিছুই খেতে পাই না।” তার দিকে এক নজর তাকালে বুঝা যায় সে সত্য কথাই বলছে। সবুজ লুঙ্গির নীচে তার পা দু’টিতে মাংস আছে বলে মনে হয় না। ঢাকার ৪০ মাইল উত্তরে মহকুমা শহর মানিকগঞ্জ। ১৫ হাজার লোকের বসতি। তাদের মধ্যে আলীমুদ্দিনের মত আরো অনেকে আছে। কোথাও একজন মোটা মানুষ চোখে পড়ে না। কালু বিশ্বাস বলল,“আমাদের মেয়েরা লজ্জায় বের হয় না-তারা নগ্ন।” আলীমুদ্দিনের কাহিনী গোটা মানিকগঞ্জের কাহিনী। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাহিনী,শত শত শহর বন্দরের কাহিনী। এ পর্যন্ত বিদেশ থেকে ৫০ লাখ টনেরও বেশী খাদ্যশস্য বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যাদের জন্য পাঠানো হয়েছে তারা পায়নি।”

 

আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি

১৯৭৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখে লন্ডনের নিউ স্টেট্সম্যান লিখেছিল,“বাংলাদেশ আজ বিপদজনক ভাবে অরাজকতার মুখোমুখি। লাখ লাখ লোক ক্ষুধার্ত। অনেকে না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে। .. ক্ষুধার্ত মানুষের ভীড়ে ঢাকায় দম বন্ধ হয়ে আসে।.. বাংলাদেশ আজ দেউলিয়া। গত আঠার মাসে চালের দাম চারগুণ বেড়েছে। সরকারি কর্মচারিদের মাইনের সবটুকু চলে যায় খাদ্য-সামগ্রী কিনতে। আর গরীবরা থাকে অনাহারে। কিন্তু বিপদ যতই ঘনিয়ে আসছে শেখ মুজিব ততই মনগড়া জগতে আশ্রয় নিচ্ছেন। ভাবছেন, দেশের লোক এখনও তাঁকে ভালবাসে;সমস্ত মুসিবতের জন্য পাকিস্তানই দায়ী। আরো ভাবছেন,বাইরের দুনিয়া তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসবে এবং বাংলাদেশ উদ্ধার পাবে। নিছক দিবাস্বপ্ন.. দেশ যখন বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে,তখনও তিনি দিনের অর্ধেক ভাগ আওয়ামী লীগের চাইদের সাথে ঘরোয়া আলাপে কাটাচ্ছেন। .. তিনি আজ আত্মম্ভরিতার মধ্যে কয়েদী হয়ে চাটুকার ও পরগাছা পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন।…সদ্য ফুলে-ফেঁপে ওঠা তরুণ বাঙালীরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের শরাবখানায় ভীড় জমায়। তারা বেশ ভালই আছে। এরাই ছিল মুক্তিযোদ্ধা- বাংলাদেশের বীর বাহিনী। .. এরাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের বাছাই করা পোষ্য। আওয়ামী লীগের ওপর তলায় যারা আছেন তারা আরো জঘন্য। .. শুনতে রূঢ় হলেও কিসিঞ্জার ঠিকই বলেছেনঃ “বাংলাদেশ একটা আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলি।”

১৯৭৪ সালে ২রা অক্টোবর,লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় জেকুইস লেসলী লিখেছিলেন,“একজন মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে,আর অসহায় দৃষ্টিতে তার মরণ-যন্ত্রণাকাতর চর্মসার শিশুটির দিকে তাকিয়ে আছে। বিশ্বাস হতে চায় না, তাই কথাটি বোঝাবার জন্য জোর দিয়ে মাথা নেড়ে একজন ইউরোপীয়ান বললেন, সকালে তিনি অফিসে যাচ্ছিলেন,এমন সময় এক ভিখারি এসে হাজির। কোলে তার মৃত শিশু। ..বহু বিদেশী পর্যবেক্ষক মনে করেন বর্তমান দুর্ভিক্ষের জন্য বর্তমান সরকারই দায়ী। “দুর্ভিক্ষ বন্যার ফল ততটা নয়,যতটা মজুতদারী চোরাচালানের ফল”-বললেন স্থানীয় একজন অর্থনীতিবিদ।.. প্রতি বছর যে চাউল চোরাচালন হয়ে (ভারতে) যায় তার পরিমাণ ১০ লাখ টন।”  ১৯৭৪ সালের ২৫ অক্টোবর হংকং থেকে প্রকাশিত ফার ইস্টার্ণ ইকোনমিক রিভিয়্যূ পত্রিকায় লরেন্স লিফসুলজ লিখেছিলেন,“সেপ্টেম্বর তৃতীয় সপ্তাহে হঠাৎ করে চাউলের দাম মণ প্রতি ৪০০ টাকায় উঠে গেল। অর্থাৎ তিন বছরে আগে -স্বাধীনতার পূর্বে যে দাম ছিল – এই দাম তার দশ গুণ। এই মূল্যবৃদ্ধিকে এভাবে তুলনা করা যায় যে,এক মার্কিন পরিবার তিন বছর আগে যে রুটি ৪০ সেন্ট দিয়ে কিনেছে,তা আজ কিনছে ৪ পাউন্ড দিয়ে। কালোবাজারী অর্থনীতির কারসাজিতেই এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।..২৩শে সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে শেখ মুজিব ঘোষণা করলেন,“প্রতি ইউনিয়নে একটি করে মোট ৪,৩০০ লঙ্গরখানা খোলা হবে।” প্রতি ইউনিয়নের জন্য রোজ বরাদ্দ হলো মাত্র দুমন ময়দা। যা এক হাজার লোকের প্রতিদিনের জন্য মাথাপিছু একটি রুটির জন্যও যথেষ্ট নয়।”

নিউয়র্ক টাইমস পত্রিকা ১৯৭৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর তারিখে লিখেছিল,“জনৈক কেবিনেট মন্ত্রীর কথা বলতে গিয়ে একজন বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ বললেন, “যুদ্ধের পর তাঁকে (ঐ মন্ত্রীকে) মাত্র দুই বাক্স বিদেশী সিগারেট দিলেই কাজ হাসিল হয়ে যেত,এখন দিতে হয় অন্ততঃ এক লাখ টাকা।” ব্যবসার পারমিট ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য আওয়ামী লীগারদের ঘুষ দিতে হয়। সম্প্রতি জনৈক অবাঙালী শিল্পপতী ভারত থেকে ফিরে আসেন এবং শেখ মুজিবের কাছ থেকে তার পরিত্যক্ত ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানাটি পুনরায় চাল করার অনুমোদন লাভ করেন। শেখ মুজিবের ভাগিনা শেখ মনি -যিনি ঐ কারখানাটি দখল করে আছেন-হুকুম জারি করলেন যে তাকে ৩০ হাজার ডলার দিতে হবে। শেখ মুজিবকে ভাল করে জানেন এমন একজন বাংলাদেশী আমাকে বললেন,“লোকজন তাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করুক,এটা তিনি পছন্দ করেন। তাঁর আনুগত্য নিজের পরিবার ও আওয়ামী লীগের প্রতি। তিনি বিশ্বাসই করেন না যে, তারা দুর্নীতিবাজ হতে পারে কিংবা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে।”

 

পথেঘাটে লাশ ও জালপড়া বাসন্তি

দেখা যাক, প্রখ্যাত তথ্য-অনুসন্ধানী সাংবাদিক জন পিলজার ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সম্পর্কে কি বলেছিলেন। তিনি ১৯৭৪ সালের ১৭ই ডিসেম্বর লন্ডনের ডেইলী মিরর পত্রিকায় লিখেছেন,“একটি তিন বছরের শিশু -এত শুকনো যে মনে হলো যেন মায়ের পেটে থাকাকালীন অবস্থায় ফিরে গেছে। আমি তার হাতটা ধরলাম। মনে হলো তার চামড়া আমার আঙ্গুলে মোমের মত লেগে গেছে। এই দুর্ভিক্ষের আর একটি ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান এই যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ৫০ লাখ মহিলা আজ নগ্ন দেহ। পরিধেয় বস্ত্র বিক্রি করে তারা চাল কিনে খেয়েছে।” পিলজারের সে বক্তব্য এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সে অভিমতের প্রমাণ মেলে ইত্তেফাকের একটি রিপোর্টে। উত্তর বংগের এক জেলেপাড়ার বস্ত্রহীন বাসন্তি জাল পড়ে লজ্জা ঢেকেছিল। সে ছবি ইত্তেফাক ছেপেছিল। পিলজার আরো লিখেছেন,“সন্ধা ঘনিয়ে আসছে এবং গাড়ী আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম-এর লরীর পিছনে পিছনে চলেছে। এই সমিতি ঢাকার রাস্তা থেকে দুর্ভিক্ষের শেষ শিকারটিকে কুড়িয়ে তুলে নেয়। সমিতির ডাইরেক্টর ডাঃ আব্দুল ওয়াহিদ জানালেন,“স্বাভাবিক সময়ে আমরা হয়ত কয়েক জন ভিখারীর মৃতদেহ কুড়িয়ে থাকি। কিন্তু এখন মাসে অন্ততঃ ৬০০ লাশ কুড়াচ্ছি- সবই অনাহার জনিত মৃত্যু।”

লন্ডনের “ডেইলী টেলিগ্রাফ” ১৯৭৫ সালের ৬ই জানুয়ারি ছেপেছিল,“গ্রাম বাংলায় প্রচুর ফসল হওয়া সত্ত্বেও একটি ইসলামিক কল্যাণ সমিতি (আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম) গত মাসে ঢাকার রাস্তা,রেল স্টেশন ও হাসাপাতালগুলোর মর্গ থেকে মোট ৮৭৯টি মৃতদেহ কুড়িয়ে দাফন করেছে। এরা সবাই অনাহারে মরেছে। সমিতিটি ১৯৭৪ সালের শেষার্ধে ২৫৪৩টি লাশ কুড়িয়েছে- সবগুলি বেওয়ারিশ। এগুলোর মধ্যে দেড় হাজারেরও বেশী রাস্তা থেকে কুড়ানো। ডিসেম্বরের মৃতের সংখ্যা জুলাইয়ের সংখ্যার সাতগুণ।.. শেখ মুজিবকে আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বোঝা বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ছোট-খাটো স্বজন প্রীতির ব্যাপারে তিনি ভারী আসক্তি দেখান। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া বাঁকী পড়ে থাকে।.. অধিকাংশ পর্যবেক্ষকদের বিশ্বাস,আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকট রোধ করার কোন সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম এ সরকারের নেই। রাজনৈতিক মহলো মনে করেন, মুজিব খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বুনিয়াদ আরো নষ্ট করে দেবেন। তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছেন। ডেইলী টেলিগ্রাফের আশংকা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। জরুরী অবস্থা জারি করেছেন, আরো বেশী ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন। অবশেষে তাতেও খুশি হননি, সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে তিনি একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। আওয়ামী লীগ যাকে নিয়ে গর্ব করে, এ হলো তার অবদান।

১৯৭৫ সালের ২১শে মার্চ বিলেতের ব্রাডফোর্ডশায়র লিখেছিল,“বাংলাদেশ যেন বিরাট ভুল। একে যদি ভেঙ্গে-চুরে আবার ঠিক করা যেত। জাতিসংঘের তালিকায় বাংলাদেশ অতি গরীব দেশ। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে যখন বন্যা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে দেশের দক্ষিণ অঞ্চল ডুবে যায় তখন দুনিয়ার দৃষ্টি এ দেশের দিকে – অর্থাৎ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের দিকে নিবদ্ধ হয়। রিলিফের বিরাট কাজ সবে শুরু হয়েছিল। এমনি সময়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুণ জ্বলে উঠল। –কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ যখন শুরু হলো,তখন জয়ের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। একমাত্র ভারতের সাগ্রহ সামরিক হস্তক্ষেপের ফলেই স্বল্পস্থায়ী-কিন্তু ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী- যুদ্ধের পর পাকিস্তানের পরাজয় ঘটে এবং বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়।” পত্রিকাটি লিখেছে, “উড়োজাহাজ থেকে মনে হয়,যে কোন প্রধান শহরের ন্যায় রাজধানী ঢাকাতেও বহু আধুনিক অট্রালিকা আছে। কিন্তু বিমান বন্দরে অবতরণ করা মাত্রই সে ধারণা চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যায়। টার্মিনাল বিল্ডিং-এর রেলিং ঘেঁষে শত শত লোক সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, কেননা তাদের অন্য কিছু করার নাই। আর যেহেতু বিমান বন্দর ভিক্ষা করবার জন্য বরাবরই উত্তম জায়গা।”

পত্রিকাটি আরো লিখেছে, “আমাকে বলা হয়েছে,অমুক গ্রামে কেউ গান গায়না। কেননা তারা কি গাইবে? আমি দেখেছি,একটি শিশু তার চোখে আগ্রহ নেই,গায়ে মাংস নেই। মাথায় চুল নাই। পায়ে জোর নাই। অতীতে তার আনন্দ ছিল না, বর্তমান সম্পর্কে তার সচেতনতা নাই এবং ভবিষ্যতে মৃত্যু ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না সে।” দেশে তখন প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ চলছিল। হাজার হাজার মানুষ তখন খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছিল। মেক্সিকোর “একসেলসিয়র” পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবকে যখন প্রশ্ন করা হলো, খাদ্যশস্যের অভাবের ফলে দেশে মৃত্যুর হার ভয়াবহ হতে পারে কিনা,শেখ মুজিব জবাব দিলেন,“এমন কোন আশংকা নেই।” প্রশ্ন করা হলো,“মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,পার্লামেন্টে বিরোধীদল বলেন যে,ইতিমধ্যেই ১৫ হাজার মানুষ মারা গেছে।” তিনি জবাব দিলেন,“তারা মিথ্যা বলেন।” তাঁকে বলা হলো,”ঢাকার বিদেশী মহলো মৃত্যু সংখ্যা আরও বেশী বলে উল্লেখ করেন।” শেখ মুজিব জবাব দিলেন,“তারা মিথ্যা বলেন।” প্রশ্ন করা হলো,দুর্নীতির কথা কি সত্য নয়? ভুখাদের জন্য প্রেরিত খাদ্য কি কালোবাজারে বিক্রী হয় না..? শেখ বললেন, “না। এর কোনটাই সত্য নয়।”-(এন্টার প্রাইজ,রিভার সাইড,ক্যালিফোর্নিয়া, ২৯/০১/৭৫)।

বাংলাদেশ যে কতবড় মিথ্যাবাদী ও নিষ্ঠুর ব্যক্তির কবলে পড়েছিল এ হলো তার নমুনা। দেশে দুর্ভিক্ষ চলছে, সে দুর্ভিক্ষে হাজার মানুষ মরছে সেটি তিনি মানতে রাজী নন। দেশে কালোবাজারী চলছে,বিদেশ থেকে পাওয়া রিলিফের মাল সীমান্ত পথে ভারতে পাড়ী জমাচ্ছে এবং সীমাহীন দুর্নীতি চলছে সেটি বিশ্ববাসী মানলেও তিনি মানতে চাননি। অবশেষে পত্রিকাটি লিখেছে,“যে সব সমস্যা তার দেশকে বিপর্যস্ত করত সে সবের কোন জবাব না থাকায় শেখের একমাত্র জবাব হচ্ছে তাঁর নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা বৃদ্ধি। জনসাধারণের জন্য খাদ্য না হোক,তার অহমিকার খোরাক চাই।” -(এন্টার প্রাইজ,রিভার সাইড, ক্যালিফোর্নিয়া,২৯/০১/৭৫)।

 

কবরে  শায়ীত হলো গণতন্ত্র

শেখ মুজিব যখন বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন তখন লন্ডনের ডেইলী টেলিগ্রাফে পিটার গিল লিখেছিলেন,“বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দেশ থেকে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটুকু লাথি মেরে ফেলে দিয়েছেন। গত শনিবার ঢাকার পার্লামেন্টের (মাত্র) এক ঘণ্টা স্থায়ী অধিবেশনে ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে শেখ মুজিবকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছে এবং একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকে ক্ষমতা অর্পণ করেছে। অনেকটা নিঃশব্দে গণতন্ত্রের কবর দেয়া হয়েছে। বিরোধীদল দাবী করেছিল,এ ধরণের ব্যাপক শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের ব্যাপারে আলোচনার জন্য তিন দিন সময় দেয়া উচিত। জবাবে সরকার এক প্রস্তাব পাশ করলেন যে,এ ব্যাপারের কোন বিতর্ক চলবে না। .. শেখ মুজিব এম.পি.দের বললেন, পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র ছিল “ঔপনিবেশিক শাসনের অবদান”। তিনি দেশের স্বাধীন আদালতকে “ঔপনিবেশিক ও দ্রুত বিচার ব্যাহতকারী” বলে অভিযুক্ত করলেন।” অথচ পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিব ও তাঁর আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী পদ্ধতির গণতন্ত্রের জন্য কতই না চিৎকার করেছেন। তখন পাকিস্তানে আইউবের প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির গণতন্ত্রই তো ছিল। গণতন্ত্রের নামে আওয়ামী লীগের পতাকা তলে যে কতটা মেরুদণ্ডহীন ও নীতিহীন মানুষের ভীড় জমেছিল সেটিও সেদিন প্রমাণিত হয়েছিল। এতদিন যারা গণতন্ত্রের জন্য মাঠঘাট প্রকম্পিত করতো -তারা সেদিন একদলীয় স্বৈরাচারি শাসন প্রবর্তনের কোন রূপ বিরোধীতাই করল না। বরং বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এতবড় গুরুতর বিষয়ে যখন সামান্য তিন দিনের আলোচনার দাবী উঠল তখন সেটিরও তারা বিরোধীতা করল। সামান্য এক ঘণ্টার মধ্যে এতবড় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিল। অথচ গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে এক টাকা ট্যাক্স বৃদ্ধি হলে সে প্রসঙ্গেও বহু ঘণ্টা আলোচনা হয়। ভেড়ার পালের সব ভেড়া যেমন দল বেঁধে এবং কোন রুপ বিচার বিবেচনা না করে প্রথম ভেড়াটির অনুসরণ করে তারাও সেদিন তাই করেছিল। আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রের দাবী যে কতটা মেকী,সেটির প্রমাণ তারা এভাবেই সেদিন দিয়েছিল। দলটির নেতাকর্মীরা সেদিন দলে দলে বাকশালে যোগ দিয়েছিল, এরকম একদলীয় স্বৈরচারি শাসন প্রতিষ্ঠায় তাদের বিবেকে সামান্যতম দংশনও হয়নি।

১৯৭৪ সালে ১৮ অক্টোবর বোষ্টনের ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরে ডানিয়েল সাদারল্যান্ড লিখেছিলেন,“গত দুই মাসে যে ক্ষুধার্ত জনতা স্রোতের মত ঢাকায় প্রবেশ করেছে,তাদের মধ্যে সরকারের সমর্থক একজনও নেই। বন্যা আর খাদ্যাভাবের জন্য গ্রামাঞ্চল ছেড়ে এরা ক্রমেই রাজধানী ঢাকার রাস্তায় ভিক্ষাবৃত্তির আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু মনে হচ্ছে সরকার এদেরকে রাজপথের ত্রিসীমানার মধ্যে ঢুকতে না দিতে বদ্ধপরিকর। এরই মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যককে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে সারাদিন দুই এক টুকরা রুটি খেতে পাওয়া যায, মাঝে মাঝে দুই-একটা পিঁয়াজ ও একটু-আধটু দুধ মেলে। ক্যাম্পে ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না। “যে দেশে মানুষকে এমন খাঁচাবদ্ধ করে রাখা হয় সেটা কি ধরনের স্বাধীন দেশ”- ক্রোধের সাথে বলল ক্যাম্পবাসীদেরই একজন। ক্যাম্পের ব্লাকবোর্ডে খড়িমাটি দিয়ে জনৈক কর্মকর্তা আমার সুবিধার্থে প্রত্যেকের রুটি খাওয়ার সময়সূচির তালিকা লিখে রেখেছেন। “তালিকায় বিশ্বাস করবেন না”-ক্যাম্পের অনেকেই বলল। তারা অভিযোগ করল যে, রোজ তারা এক বেলা খেতে পায়- এক কি দুই টুকরা রুটি। কোন এক ক্যাম্পের জনৈক স্বেচ্ছাসেবক রিলিফকর্মী জানাল যে, “সরকারী কর্মচারীরা জনসাধারণের কোন তোয়াক্কা করে না। তারা বাইরের জগতে সরকারের মান বজায় রাখতে ব্যস্ত। এ কারণেই তারা লোকদেরকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাচেছ। বিদেশীরা ভুখা-জনতাকে রাস্তায় দেখুক এটা তারা চায় না।”

১৯৭৪ সালে ৩০ অক্টোবর লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় পিটার প্রেসটন লিখেছিলেন, “এই সেদিনের একটি ছবি বাংলাদেশের দৃশ্যপট তুলে ধরেছে। এক যুবতি মা -তার স্তন শুকিয়ে হাঁড়ে গিয়ে লেগেছে,ক্ষুধায় চোখ জ্বলছে – অনড় হয়ে পড়ে আছে ঢাকার কোন একটি শেডের নীচে,কচি মেয়েটি তার দেহের উপর বসে আছে গভীর নৈরাশ্যে। দু’জনাই মৃত্যুর পথযাত্রী। ছবিটি নতুন,কিন্তু চিরন্তন। স্বাধীনতার পর থেকে ঢাকা দুনিয়ার সবচেয়ে -কলিকাতার চেয়েও -বীভৎস শহরে পরিণত হয়েছে। সমস্ত বীভৎসতা সত্ত্বেও কোলকাতায় ভীড় করা মানুষের যেন প্রাণ আছে,ঢাকায় তার কিছুই নাই। ঢাকা নগরী যেন একটি বিরাট শরণার্থী-ক্যাম্প। একটি প্রাদেশিক শহর ঢাকা লাখ লাখ জীর্ণ কুটীর,নির্জীব মানুষ আর লঙ্গরখানায় মানুষের সারিতে ছেয়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলে যখন খাদ্যাভাব দেখা দেয়,ভুখা মানুষ ঢাকার দিকে ছুটে আসে। ঢাকায় তাদের জন্য খাদ্য নেই। তারা খাদ্যের জন্য হাতড়ে বেড়ায়,অবশেষে মিলিয়ে যায়। গেল সপ্তাহে একটি মহলের মতে শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই মাসে ৫০০ লোক অনাহারে মারা যাচ্ছে। এর বেশীও হতে পারে,কমও হতে পারে। নিশ্চিত করে বলার মত প্রশাসনিক যন্ত্র নাই।.. জন্মের পর পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সাহায্যের এক অভূতপূর্ব ফসল কুড়িয়েছিলঃ ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড। আজ সবই ফুরিয়ে গেছে। কোন চিহ্ন পর্যন্ত নেই। রাজনীতিবিদ, পর্যবেক্ষক, দাতব্য প্রতিষ্ঠান -সবাই একই যুক্তি পেশ করছে যা অপরাধকে নিরাপদ করছে, দায়িত্বকে করছে অকেজো। তাদের মোদ্দা যুক্তি হলো এই যে, বাংলাদেশের ঝুলিতে মারাত্মক ফুটো আছে। যত সাহায্য দেয়া হোক না কেন, দুর্নীতি, আলসেমী ও সরকারী আমলাদের আত্মঅহমিকার ফলে অপচয়ে ফুরিয়ে যাবে। বেশী দেয়া মানেই বেশী লোকসান।”

 

সামনে গুরুতর বিপদ

পাত্রের তলায় ফুটো থাকলে পাত্রের মালামাল বেড়িয়ে যায়,তবে তা বেশী দূর যায় না। আশে পাশের জায়গায় গিয়ে পড়ে। তেমনি বাংলাদেশের তলা দিয়ে বেড়িয়ে যাওয়া সম্পদ হাজার মাইল দূরের কোন দেশে গিয়ে উঠেনি,উঠেছিল প্রতিবেশী ভারতে। আর এ ফুটোগুলো গড়ায় ভারতীয় পরিকল্পনার কথা কি অস্বীকার করা যায়? পাকিস্তান আমলে ২৩ বছরে পাকিস্তান সরকারের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল,সীমান্ত দিয়ে চোরাকারবারী বন্ধ করা। এ কাজে প্রয়োজনে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের বসানো হত। অথচ শেখ মুজিব সীমান্ত দিয়ে চোরাকারবারি বন্ধ না করে ভারতের সাথে চুক্তি করে সীমান্ত জুড়ে বাণিজ্য শুরু করেন। এভাবে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে দেশের তলায় শুধু ফুটো নয়,সে তলাটিই ধসিয়ে দিলেন। তলা দিয়ে হারিয়ে যাওয়া সম্পদ তখন ভারতে গিয়ে উঠল। ভারত বস্তুত তেমন একটি লক্ষ্য হাছিলের কথা ভেবেই সীমান্ত বাণিজ্যের প্রস্তাব করেছিল। অথচ পাকিস্তান আমলে ভারত এ সুবিধার কথা ভাবতেই পারেনি। অথচ মুজিব সেটাই বিনা দ্বিধায় ভারতের হাতে তুলে দিলেন। বাংলাদেশের বাজারে তখন আর রাতের আঁধারে চোরাচালানকারী পাঠানোর প্রয়োজন পড়েনি। দিন দুপুরে ট্রাক-ভর্তি করে বাংলাদেশের বাজার থেকে সম্পদ তুলে নিয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা তখন পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানার যন্ত্রাংশ খুলে নামে মাত্র মূল্যে ভারতীয়দের হাতে তুলে দেয়।

তলাহীন পাত্র থেকে পানি বেরুতে সময় লাগে না,তেমনি দেশের তলা ধসে গেলে সময় লাগে না সে দেশকে সম্পদহীন হতে। ভারতের সাথে সীমান্ত বাণিজ্যের দাড়িয়েছিল, ত্বরিৎ বেগে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল বাংলাদেশে। শেখ হাসিনা সে মুজিবী আমল ফিরিয়ে আনতে চায়। সম্প্রতি শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরি পরামর্শ দিয়েছেন ভারতের সাথে অভিন্ন মুদ্রা ও অভিন্ন ভিসার। উপদেষ্টাগণ তো মনিবের মেজাজ বুঝে কথা বলেন।  তাই ইকবাল সোবহান চৌধুরি যে কথা বলেছেন, সেটি হাওয়া থেকে বলেননি। বরং হাসিনা সামনে কোন দিকে যাবেন তারই আভাস দিয়েছেন মাত্র। প্রশ্ন হলো, যে বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের ভোটদানের অধীকারের উপর নৃশংস ডাকাতি হওয়াতেও রাস্তায় নামলো তারা কি দেশের স্বাধীনতার উপর ডাকাতি রুখতে রাস্তায় নামবে? অথচ স্বাধীনতা বাঁচাতে শুধু রাস্তায় নামলে চলে না, যুদ্ধেও নামতে হয়। কিন্তু সে সম্ভাবনা কোথায়? বাংলাদেশের সামনে গুরুতর বিপদের কারণ তো এখানেই। ১৪/০২/২০২১




পাকিস্তান কেন ভেঙ্গে গেল?

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

সংকট জন্মের পূর্ব থেকেই

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পূর্ব থেকেই অনেকেই দেশটির প্রতিষ্ঠা যেমন চায়নি। তেমনি প্রতিষ্ঠার পর দেশটি বেঁচে থাকুক সেটিও চায়নি। বিরোধী পক্ষটি যে শুধু ভারতী কংগ্রেস ছিল তা নয়, ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তি এবং হিন্দুমহাসভার ন্যায় সকল সাম্প্রদায়িক হিন্দু সংগঠন। বিরোধীতা করেছে দেওবন্দি ফেরকার আলেমগণও। তাদের প্রবল বিরোধীতা সত্ত্বেও সাতচল্লিশে পাকিস্তুান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বটে, কিন্তু দেশটির অস্তিত্বের বিরুদ্ধে হুমকি সব সময়ই থেকে যায়। শত্রুদের হাতে দেশটির ধ্বংসের মোক্ষম হাতিয়ার রূপে ধরা দেয় দেশটির জটিল শাসনতান্ত্রিক সংকট ও জন্মের পূর্ব থেকে বিরাজমান বৈষম্য। অথচ এ দুটির কোনটিই পাকিস্তান নিজে সৃষ্টি করেনি; পাকিস্তানের দার্শনিক ভিত্তির সাথেও সেটি জড়িত নয়। অথচ তার ক্ষতিকর দায়ভার পাকিস্তানকেই বইতে হয়। পূর্ব বাংলা, পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ (বর্তমান নাম: পখতুন খা খায়বার) ও বেলুচিস্তান এ পাঁচটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। পূর্ব বাংলা নিয়ে গঠিত অংশের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান এবং বাঁকি চারটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত হয় পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের আয়তন ছিল ৫৫,৫৯৮ বর্গমাইল, এবং পশ্চিম পাকিস্তানের আয়তন ৩,০৭, ৩৭৪ বর্গ মাইল। জনসংখ্যায় পূর্ব পাকিস্তানীরা ছিল পাকিস্তানের মোট জসসংখ্যার ৫৬% ভাগ, কিন্তু প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ব্যবসা বাণিজ্যের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে ছিল অনেক কম।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভাষা, ধর্ম বা অঞ্চলভিত্তিক জনসংখ্যার অনুপাদে সরকারি প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে লোক নিয়োগের রীতি ছিল না। ফলে ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসনে ও সেনাবাহিনীতে জনসংখ্যার অনুপাতে বাঙালী মুসলিমদের উপস্থিতি ছিল না। ফল দাঁড়িয়েছিল, সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের সময় কোন বাঙালী মুসলিমই সেনাবাহিনীর কোন সিনিয়র অফিসার ছিল না। সে সময় ভারতের সিভিল সার্ভিস (আই..সি.এস) এবং পুলিশ সার্ভিসে সর্বমোট ১০১ জন মুসলিম ছিল। তাদের মধ্যে বাঙালী মুসলিম ছিল মাত্র ১৮ জন। ৩৫ জন ছিল পশ্চিম পাকিস্তান ভূক্ত এলাকার। বাকীরা ৪৮ জন ছিল ভারতের সে সব এলাকা থেকে যা পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত হয়নি। ১৯৪৭ সালে ভারতে বিভাগ কালে ১০১ জন মুসলিম অফিসারের মধ্যে ৯৫ জনই পাকিস্তানের পক্ষে যোগদানের ঘোষণা দেয়,এবং অবাঙালীদের প্রায় সবাই বসবাসের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। -(Session and Rose, 1990)। এর ফলে পাকিস্তানের প্রশাসনে রাতারাতি বাঙালী-অবাঙালীর মাঝে বিশাল বৈষম্য সৃষ্টি হয়। এবং এ বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পূর্বে ব্রিটিশ শাসনামলে। তখন ভারতের সিভিল সার্ভিস (আই..সি.এস) এবং পুলিশ সার্ভিসে লোক নিয়োগে ব্রিটিশ সরকার ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়নি, গুরুত্ব দেয়া হত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রার্থীর ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্যকে। শিক্ষাদীক্ষায় পশ্চাদপদ হ্ওয়ার কারণে ভারতীয় প্রশাসনে শুরু থেকেই জনসংখ্যার অনুপাতে প্রশাসনে বাঙালী মুসলিমদের অনুপাতটি ছিল খুবই কম।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান – এ উভয় প্রদেশ থেকেই বিপুল সংখ্যক অমুসলিম সরকারি কর্মচারি ভারতে চলে যায়। প্রশাসনে দেখা দেয় বিরাট শূণ্যতা। একই সময় শুরু হয় ভারত থেকে মোহাজিরদের জোয়ার। ফলে সে শূণ্যতা পূরণে ভারত থেকে আগত মোহাজিরগণদের দ্রুত নিয়োগ দেয়া শুরু হয়। পাকিস্তানের প্রশাসনে যোগ্যতার ভিত্তিতে লোক নিয়োগের ব্রিটিশ পদ্ধতিকে অব্যাহত রাখা হয়, ফলে সে সময় ভারত, বার্মা ও এমন কি অন্যদেশের যোগ্যতর মুসলিমগণ পাকিস্তানের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার সুযোগ পায়। সে সময় যোগ্য লোকের সন্ধানটি এতোই প্রবল ছিল যে জার্মান নওমুসলিম নাগরিক মুহাম্মদ আসাদকে জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধি করে নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের যোগ্যতর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনরূপ অবিচার বা বৈষম্যমূলক আচারন করা না হলেও শুরু থেকেই পাকিস্তানের প্রশাসনে দেখা দেয় বাঙালী-অবাঙালীর মাঝে চোখে পড়ার মত বিরাট বৈষম্য। আর সে বৈষম্যকে পেশ করা হয় বাঙালীর বিরুদ্ধে অবিচার রূপে, এবং সে জন্য দায়ী করা হয় পাকিস্তানের সরকারকে। পরবর্তীতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে এ বৈষম্য ব্যবহৃত হয় দেশবিধ্বংসী হাতিয়ার রূপে। এরূপ বৈষম্য ভারতেও ছিল। পাঞ্জাবী শিখদের সংখ্যা বাঙালী হিন্দুদের চেয়ে বেশী নয়, কিন্তু ভারতের সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনে শিখ ও অন্যান্য অবাঙালীদের অনুপাত বাঙালী হিন্দুদের তুলনায় অনেক বেশী ছিল। এমনকি খোদ পশ্চিম বাংলাতে অধিকাংশ কলকারখানার মালিক অবাঙ্গালীরা। কিন্তু সে বৈষম্যের কারণে বাঙালী হিন্দুদের মাঝে বিচ্ছেদের দাবী উঠেনি। এবং সে বৈষম্য রাজনীতিতে প্রবল বিষয়ও হয়ে উঠেনি। অথচ পাকিস্তানে বাঙালী মুসলিমদের মাঝে অবাঙালী-বাঙালী বৈষম্যকে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়।     

 

বাঙালী মুসলিমদের পশ্চাদপদতা

ব্রিটিশ আমলেও প্রশাসনের ন্যায় বাঙালীদের হাতে কোন শিল্প-কলকারখানাও ছিল না। ছিল না ব্যবসা-বাণিজ্যও। ১৯৪৭ সালের পূর্বে খোদ অবিভক্ত বাংলাতে ব্যাবসা-বাণিজ্য ছিল বাঙালী হিন্দু এবং অবাঙালী মারোয়ারিদের হাতে। তখন ভারতের মুসলিমদের মাঝে ব্যবসা-বাণিজ্যে যারা কিছুটা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তাদের প্রায় সবাই ছিল অবাঙালী। আদমজী, ইস্পাহানী, বাওয়ানী, মেমন ইত্যাদী ব্যবসায়ী পরিবারগুলো ১৯৪৭ সালের পূর্ব থেকেই কলকাতা, মোম্বাই, আহমেদাবাদ, মাদ্রাজের ন্যায় শহরগুলিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তারা ভারত ত্যাগ করে পাকিস্তানে চলে আসে। তাদের প্রায় সবাই পশ্চিম পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। শুধু পশ্চিম পাকিস্তানে নয়, পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পায়নে ভারত থেকে আগত এ মোহাজির ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অবদান ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের অর্থনীতিতে তারা পাওয়ার হাউস রূপে কাজ করে। ভারতের পরাধীন ভূমিতে এতকাল যে প্রতিভা আড়ষ্ঠ ছিল -তা স্বাধীন পাকিস্তানের মূক্ত পরিবেশে অর্থনৈতিক জোয়ার সৃষ্টি করে। শিল্প স্থাপনে পাকিস্তানের যাত্রাটি শুরু হয় বলতে গেলে শূণ্য থেকে। পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায় পশ্চিম পাকিস্তানও ছিল মূলত কৃষিভূমি। কিন্তু দুই প্রদেশেই শিল্পায়ন শুরু হয়। ভারত থেকে আগত  মোহাজিরদের প্রায় সবাই পশ্চিম পাকিস্তানে বসত গড়ায় প্রবৃদ্ধির সে হার পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল অধিক। তবে লক্ষণীয় হলো, ষাটের দশকের শেষ দিকে এসে প্রবৃদ্ধির সে হার দুই প্রদেশের মধ্যে সমান পর্যায়ে পৌঁছে যায়।    

তবে অর্থনীতি, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের পাশাপাশি বৈষম্য রাজনীতির ময়দানেও কম ছিল না। অবিভক্ত ভারতের মুসলিম রাজনীতিতেও শেরে বাংলা ফজলুল হক, হাসান শহীদ সহরোওয়ার্দি ও নাজিমুদ্দিনের মত বাঙালী মুসলিম নেতাদের প্রভাব ছিল বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সর্বভারতীয় মুসলিমদের রাজনীতিতে কায়েদে আযম যে ভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন কোন বাঙালী মুসলিম নেতা তাঁর ধারে কাছেও ছিলেন না। উপমহাদেশের মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভূবনের তাদের অবদান তেমন চোখে পড়ার মত ছিল না। এমন কি খোদ বাংলাতেও তারা ছিল বাঙালী হিন্দুদের সৃষ্ট সাহিত্যের প্রভাব বলয়ে আবদ্ধ।  অথচ জনসংখ্যার ৫৬% বাঙ্গালী হওয়ার ফলে পাকিস্তানের শাসনের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় তাদের। কিন্তু প্রকট সমস্যা দেখা দেয়, স্রেফ অধিক জনসংখ্যার হওয়ার দাবীতে বাঙ্গালীর সে মেজরিটি শাসনকে পাকিস্তানের অপর চারটি প্রদেশের অবাঙালী নাগরিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করা নিয়ে। কারণ রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ও গ্রহণযোগ্যতা তো আসে অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, শিক্ষাগত  ও সামরিক সামর্থের ভিত্তিকে। বাঙালী মুসলিমদের এর কোনটিই ছিল না।

 

পুরনো বৈষম্য ও নতুন সংকট

১৯৪৭ সালে বাঙালী মুসলিমদের নিয়ে ভীতি দেখা দিয়েছিল বাঙালী হিন্দুদের মনেও। তখন অবিভক্ত বাংলায় মুসলমান জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫৫% , আর হিন্দুরা ছিল ৪৫%। বাংলার প্রশাসন, শিক্ষা-সাহিত্য, শিল্প-বাণিজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল ক্ষেত্র ছিল হিন্দুদের দখলে। অবিভক্ত বাংলার রাজধানী ছিল কলকাতায়, তখন সে নগরীর শতকরা ৮০ ভাগ জনগণ ছিল হিন্দু। মুসলিমদের প্রাধান্য এমনকি ঢাকাতেও ছিল না। ঢাকার অবস্থান মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বাংলাতে হলেও সে শহরে হিন্দুদের সংখ্যা ছিল মুসলিমদের চেয়ে অধিক, মুসলিমদের সংখ্যা ছিল মাত্র শতকরা ৪০%। ঢাকা শহরের দোকানপাঠ ও রিয়েল এস্টেট সম্পদের প্রায় ৮০% ভাগের মালিক ছিল হিন্দুরা। অনুরূপ অবস্থা ছিল সকল জেলা ও মহকুমা শহর গুলোতেও।

অপরদিকে বাঙালী হিন্দুদের রাজনৈতিক প্রভাব শুধু বাংলাতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের প্রভাব বিস্তৃত ছিল সমগ্র ভারতের রাজনীতি জুড়ে। ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের জন্মই হয়েছিল কলকাতায়। শুরুতে দলটির  প্রধান প্রধান নেতারা ছিল বাঙালী হিন্দু। সমগ্র ভারতে সর্বপ্রথম রেনেসাঁ তথা জাগরণ এসেছিল বাঙালী হিন্দুদের মাঝে। তাদের মাঝে ছিল সুরেন্দ্রনাথ ব্যাণার্জি, সুভাষ চন্দ্র বোস, শরৎ বোস, চিত্তরঞ্জণ দাশের ন্যায় বড় বড় নেতা। ছিল রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র। তাদের প্রভাব ছিল সমগ্র ভারত জুড়ে। সে তুলনায় মুসলিমগণ ছিল অনেক পিছনে। কিন্তু ১৯৩৭ সাল থেকে প্রদেশে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার রেওয়াজ শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলার শাসন ক্ষমতার কর্ণধার কোন হিন্দু হতে পারেনি। বাংলা অবিভক্ত থাকলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম শাসন থেকে তাদের নিস্তার নাই -সেটি বুঝতে পেরেই হিন্দু বাঙালীরা ১৯৪৭-য়ে বাংলা বিভাগের দাবী তোলে। অথচ মুসলিম লীগ সে সময় বাংলা বিভাগের বিরোধীতা করেছিল।

 

ভয় ও অবিশ্বাসের রাজনীতি

পাকিস্তান সৃষ্টির পর একই বাঙালী ভীতি ঢোকে অবাঙালী পাকিস্তানীদের মনে। তবে পার্থক্য হল, বাঙালী হিন্দুরা বাঙালী মুসলিমের মেজরিটি শাসন থেকে বাঁচবার তাগিদে যেভাবে খোদ বাংলাকেই বিভক্ত করে ফেলে অবাঙালী পাকিস্তানীরা সে ভয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গেনি। তারা বরং চেয়েছে বাঙালীর সে সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনের উপর শাসনতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার। তাদের ইচ্ছা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন যেন অবিবেচক সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে পরিনত না হয়। এজন্যই পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণোয়নের কাজটি এক জটিল সমস্যায় রূপ নেয় এবং বিলম্বিতও হয়। ভারতের ন্যায় পাকিস্তানেও শাসনতন্ত্র তৈরীর কাজ যে শুরু যে হয়নি তা নয়, কিন্তু ভারতে সে কাজটি এতটা জটিল ছিল না। পাকিস্তানে সমস্যা ছিল শাসনতন্ত্রে ইসলামের স্থান নির্ধারণ করা নিয়ে। হিন্দুদের মাঝে ধর্মীয় পেনাল কোড নেই। ফলে শাসনতন্ত্রে ধর্মীয় বিধানের কোন স্থানও নেই। তাছাড়া শুরু থেকেই কংগ্রেস সেক্যুলারিজমের পক্ষে জনগণকে দীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু সেক্যুলারিজম ইসলামে হারাম, ইসলামে রয়েছে শরিয়তী বিধান। প্রতিটি মুসলিমের উপর নামায-রোযার ন্যায় সে শরিয়তী বিধান মেনে চলাটিও ফরজ। ফলে ১৪ শত বছর ধরে মুসলিমগণ যেখানেই কোন রাষ্ট্র গড়তে পেরেছে সেখানেই শরিয়তী বিধানও চালু করেছে। সেটি ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে ভারত এবং বাংলাতেও ছিল।

১৯৪৭য়ে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর সে শরিয়তী বিধানের দিকে ফিরে যাওয়াটি মুসলিমদের উপর ফরজ হয়ে দাঁড়ায়। দেশের আলেমগণ এ নিয়ে সোচ্চার হয়। ফলে শাসনতন্ত্রে সেটি নিশ্চিত করাটি অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সে কাজটি এতটা সহজও ছিল। পাকিস্তানের মুসলিমগণ ছিল সূন্নী ও শিয়াতে বিভক্ত। ছিল দেওবন্দী-বেরেলভীর দ্বন্দ। ছিল বিপুল সংখ্যক সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিষ্ট -যারা রাষ্ট্রে ইসলামি শরিয়তের প্রতিষ্ঠার প্রচণ্ড বিরোধী ছিল। অবশেষে সে সমস্যার দ্রুত সমাধান হয় নবাব লিয়াকত খানের প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে শাসনতন্ত্রের ২২ দফা মূলনীতি পাশের মধ্য দিয়ে। অপর দিকে সংখ্যাগরিষ্ট শাসনের উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার একটি সুরাহা করা হয়। বগুড়ার মহম্মদ আলী যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তখন শাসনতন্ত্রে পার্লামেন্টে উচ্চ পরিষদ ও নিম্ন পরিষদ -এ দুই পরিষদে বিভক্ত করার প্রস্তাব করা হয়। নিম্ম পরিষদে জনসংখ্যার অনুপাতে এবং উচ্চ পরিষদে ৫ প্রদেশের সমান আসন রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়। এভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে একটি সমতা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। গণপরিষদে সেটি অধিকাংশ সদস্যের তাতে সমর্থণ ছিল। কিন্তু সেটি গোলাম মুহাম্মদের স্বৈরাচারি পদক্ষেপে বানচাল হয়ে যায়। ফলে শাসনতান্ত্রিক সংকট একটি সমাধানের কাছে পৌছেও সে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।

চৌধুরি মোহম্মদ আলীর প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে প্রণীত ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে পার্লামেন্টে দুই অঞ্চলের সমান আসন রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়। আই্য়ুব খানের আমলে রচিত ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে সমান প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগসহ অনেক পূর্ব পাকিস্তানী দল সমতার সে বিধানটি মেনে নিতে রাজী হয়নি। তবে এক্ষেত্রে স্মরণীয় যে, পাকিস্তানের বর্তমান (২০২১ সালে) জনসংখ্যা ২২ কোটির বেশী, আর বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। ফলে জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংসদের আসন বরাদ্দ হলে কিছুদিনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানীরা তাদের সে সংখ্যাগরিষ্টতা হারাতো। তখন শুরু হতো সংখ্যাগরিষ্ঠ অবাঙালী শাসনের ভয়।

জেনারেল ইয়াহিয়া খানই প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান যিনি এক ব্যক্তি এক ভোটের ভিত্তিতে জনসংখ্যার ভিত্তিতের পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে তথা পার্লামেন্টে প্রদেশের সদস্য নির্ধারণ করেন। কিন্তু ইয়াহিয়া খানের সে সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের রাজনীতিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ১৯৪৭ সালে বাঙালী মুসলিমের সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনের যে ভয় বাঙালী হিন্দুদের মাঝে প্রকট রূপ ধারণ করেছিল সেটিই দেখা দেয় জুলফিকার আলী ভূট্টোর ন্যায় পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের মনে। বাঙালী হিন্দুদের মত তারা পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের আলাদা হওয়া দাবী না তুললেও তাদের অনেকে গোপনে উৎসাহ জুগিয়েছে বাঙালীদের আলাদা হওয়ায়। অনেকের বিশ্বাস,শেখ মুজিবের হাতে ৬ দফা প্রস্তাবটি তুলে দিয়েছিল এক পশ্চিম পাকিস্তানী আমলা। ১৯৭০ সালের নির্বাচন কালে বাঙালী হিন্দুদের মতই জুলফিকার আলী ভূট্টো ও তার সাথীরা সে “বাঙালী শাসন”এর সে ভয়ই পশ্চিম পাকিস্তানীদের মনে ঢুকাতে সমর্থ হয়। এবং বানচাল করে দেয় ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদের ৩রা মার্চ ঢাকায় বৈঠক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাকে। তিনিই বলেন,“ওধার তোম, ইধার হাম”এর মত অদ্ভুদ স্লোগান।” এবং তিনি জাতীয় পরিষদের পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, “যারা ঢাকার বৈঠকে যাবে তাদের পা ভেঙ্গে দেয়া হবে।” তিনি আরো বলেন,“তারা যেন রিটার্ন টিকেট না নিয়ে ঢাকায় যায়।” ১৯৪৭ সাল থেকেই যেসব বাঙালী জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা মেনে নিতে পারেনি, এবং সবসময়ই সচেষ্ট ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন করায় -ভূট্টো তাদের পরিকল্পনার সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগলিক দূরত্ব ছিল প্রায় ১২০০ মাইল। তবে মনের দূরত্ব ছিল আরো বেশী। উনিশ শ’ সাতচল্লিশে ভারত থেকে পাকিস্তানে আসার পথে বহু লক্ষ মুসলমান নরনারী হিন্দু ও শিখ গুণ্ডাদের হাতে নিহত হয়। ধর্ষিতা হয বেশুমার মুসলিম নারী। ফলে হিন্দু ও শিখদের মুসলিম বিদ্বেষের যে হিংস্র পরিচয়টি তারা ১৯৪৭ সালেই লাভ করে সেটি বাংলার মুসলিমদের জীবনে ঘটেনি। এরই ফল দাঁড়িয়েছিল, ফজলুল হকের মত নেতারা যখন কোলকাতায় গিয়ে “বাংলা অবিভাজ্য” বয়ান দেন এবং ভারতীয় হিন্দু নেতাদের সাথে বন্ধুত্বের হাত বাড়ান তখন পশ্চিম পাকিস্তানীরা যে তাতে শুধু বিস্মিত হয়েছে তাই নয়, তাঁর রাজনীতির উপরও তাদের অনাস্থা বাড়ে। এরই ফল দাড়ায়, ফজলুল হককে যখন তাঁর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় -তখন সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানে কোন প্রতিক্রিয়া হয়নি।

 

ক্ষমতালিপ্সার রাজনীতি

পাকিস্তানের সৃষ্টির মূলে ছিল প্যান-ইসলামিক চেতনা। সে চেতনাটি যাদের মনে প্রবলতর ছিল একমাত্র তারাই ছিল পাকিস্তানের প্রকৃত কল্যাণকামী। ভূট্টোর মত মদ্যপায়ী সেক্যুলারিষ্টদের কাছে অখণ্ড পাকিস্তান বাঁচিয়ে রাখা গুরুত্ব পাবে -সেটিই বা কি করে আশা করা যায়? ভূট্টো ইসলামী অনুশাসনের বিরুদ্ধে এতটাই বিদ্রোহী ছিলেন যে তিনি সে বিদ্রোহীটি গোপন রাখার প্রয়োজন মনে করতেন না। তিনি মদ পান করতেন, সেটিও তিনি গোপন রাখার প্রয়োজনও মনে করেননি। ১৯৭৭ সালে লাহোরের গোলবাগে এক নির্বাচনী জনসভায় সেটি তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “আমি মদপান করি,তবে অন্যদের ন্যায় মানুষের রক্ত পান করিনা।” সেদিন নিজের মদ্যপানকে জায়েজ করতে গিয়ে তিনি অন্যদের রক্তপায়ী রূপে অভিহিত করেছিলেন। আমি নিজে সে জনসভায় উপস্থিত ছিলাম, এবং নিজ কানে তার সে বক্তৃতাটি শুনিছিলাম। প্রশ্ন হলো, ইসলামের হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যার মধ্যে এতটা প্রকট তার মধ্যে কি ইসলামি আদর্শভিত্তিক পাকিস্তান বাঁচানোয় অঙ্গিকার থাকতে পারে? বরং অখণ্ড পাকিস্তানের বেঁচে থাকাটি অসম্ভব হতো তার ক্ষমতা লাভে।

১৯৭০’এর নির্বাচনের পর ভুট্টোর কাছে পরিস্কার হয়ে যায়, তার পক্ষে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া অসম্ভব। পাকিস্তানের বেঁচে থাকাটি দেশটির মুসলিম জনগণের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার নিজের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রধানমন্ত্রী হওয়া। ফলে তার রাজনীতিতে শুরু হয় পাকিস্তানের স্বার্থের সাথে তাঁর ব্যক্তি স্বার্থের দ্বন্দ। সে দ্বন্দে তিনি নিজের স্বার্থ পূরণের পথটি তিনি বেছে নেন। এ জন্যই ১৯৭০’এর নির্বাচনে একটি বারের জন্যও তিনি পূর্ব পাকিস্তানে কোন নির্বাচনী জনসভা করেননি, পূর্ব পকিস্তানীদের থেকে কোন রূপ সমর্থণও চাননি। একই অবস্থা ছিল শেখ মুজিবের। মুজিবও সুস্পষ্ট বুঝতে পারে, অখণ্ড পাকিস্তানে তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়া অসম্ভব। কারণ, সে জন্য তো জরুরি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের দলের উপস্থিতি। তবে মুজিব তা নিয়ে ভাবতো না। তাঁর মনের মানচিত্রে অখণ্ড পাকিস্তানের কোন স্থান ছিল না। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সমর্থন লাভ নিয়ে মুজিব কখনোই আগ্রহী ছিলেন না। তিনি আগ্রহী ছিলেন শুধু পূর্ব বাংলা নিয়ে।

যাদের মধ্যে নামায আদায়ের তাগিদ নেই তাদের আবার মসজিদ নির্মান এবং সে মসজিদের সুরক্ষার ভাবনা কিসের? তাই পাকিস্তানের মূল শত্রু ছিল দেশটির ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য সেক্যুলারিষ্টগণ। তারাই ভারতের ন্যায় অপেক্ষায় থাকা শত্রুদের সুযোগ করে দেয়। উঁই পোকা যেমন খুঁটিকে ভিতর থেকে খেয়ে ফেলে এরাও তেমনি পাকিস্তানকে ভিতর থেকে প্রাণশূণ্য করে ফেলে। পাকিস্তানের এ ঘরের শত্রুরা যেমন দেশের রাজনীতিতে ছিল, তেমনি ছিল সেনাবাহিনী, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে। একাত্তরের বহু আগেই এ সেক্যুলারিষ্টগণ পাকিস্তানকে খণ্ডিত করে ফেলে, এবং বিভক্তির সে চিত্রটিই প্রকাশ পায় ১৯৭০ এর নির্বাচনে। মুজিবের রাজনীতিতে যেমন পশ্চিম পাকিস্তান ছিল না, তেমনি ভুট্টোর রাজনীতিতেও পূর্ব পাকিস্তান ছিল না। ফলে শেখ মুজিব যেমন তার নির্বাচনী লড়াইকে শুধু পূর্ব পাকিস্তানে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, তেমনি ভূট্টোও তার লড়াইকে সীমিত রেখেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে।

খাজা নাজিমুদ্দীন, সহরোওয়ার্দি, বগুড়ার মহম্মদ আলীদের মত নেতারা পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন তা নয়। বরং পূর্ব পাকিস্তানের কল্যাণ চিন্তার সাথে তাদের মাঝে কাজ করেছিল অখণ্ড পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সে দেশটিকে শক্তিশালী করার ভাবনাটিও। ফলে তাদের রাজনীতিতে অন্য প্রদেশের নাগরিকদের সাথে সমঝোতার প্রেরণাও ছিল। ফলে প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে তাঁরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের মনে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর প্রতি আস্থা সৃষ্টিতে সচেষ্ট ছিলেন। আপোষ ফর্মালা উদ্ভাবনেও তাঁরা স্বচেষ্ট ছিলেন। এমন এক চেতনা নিয়েই প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ভাষানীর দাবীর জবাবে জনাব সহরোওয়ার্দি বলেছিলেন, ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ৯৮% স্বায়ত্বশাসন দিয়ে দেয়া হয়েছে। তাঁরা জনসংখ্যা বিচারে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্টতা যেরূপ জানতেন, তেমনি জানতেন অবাঙালীদের তুলনায় নিজেদের পশ্চাদপদতা নিয়েও।

একটি দেশের রাজনীতিতে শুধু জনসংখ্যায় বাড়াটাই বড় কথা নয়, যোগ্যতা নিয়ে বাড়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। ইহুদীরা মার্কিন ও ব্রিটিশ রাজনীতিতে অতীতে ও এবং আজও যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সেটি সংখ্যাগরিষ্টতার কারণে নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দায়বদ্ধতাও বিশাল। সে দায়বদ্ধতা শুধু নির্বাচনে ভোটদান নয়, বরং দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসন, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, সাহিত্য, বিজ্ঞান এমনকি খেলাধুলার অগ্রগতিতে সবার চেয়ে বেশী ভূমিকা রাখতে হয়। নইলে শুধু সংখ্যাগরিষ্টতার কারণে কারো মর্যাদা বাড়ে না। রাজনীতিতে গ্রহণ যোগ্যতাও বাড়ে না। ইংল্যান্ডে বাঙালীদের সংখ্যা ইহুদীদের চেয়ে অধিক। কিন্তু তাতে কি ব্রিটিশ রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও শিল্পে কি বাঙালীর প্রতিষ্ঠা বা গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে? অথচ ইহুদীরা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য বা মন্ত্রীই হয় না, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবেল বিজয়ী প্রফেসর, নাম করা ডাক্তার, বিখ্যাত প্রকৌশলী, শিল্প মালিক এবং আবিস্কারকও হয়। যে কোন দেশে প্রত্যেক নাগরিককে অন্য নাগরিকের সাথে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা করে সামনে এগুতে হয় -সেটি যেমন শিক্ষা, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যে, তেমনি প্রশাসনে। এ প্রতিযোগিতায় ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতা গুরুত্ব দেয়া শুরু হলে গুরুত্ব হারায় যোগ্যতা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ ব্শ্বি-শক্তি, দেশটি সে শক্তি অর্জন করেছে যোগ্যবানদের মূল্য দেয়ার মধ্য দিয়ে। যোগ্যতার বিচারে উত্তির্ণ হলে এমনকি বিদেশীদেরও তারা নিজ দেশে বরণ করে নেয়। অবাঙালীর তুলনায় পাকিস্তানে বাঙালীর পশ্চাপদতা ছিল চোখে পড়ার মত। পাকিস্তানে শিল্পায়ন শুরু হয়েছিল বলতে গেলে শূণ্য থেকে। স্বাধীনতা লাভে প্রথম দিনটিতেই হিন্দুস্থান এক্ষেত্রে বহু পথ এগিয়ে ছিল। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির সাথে শিল্পে যে প্রবৃদ্ধি শুরু হয় সেটি অখণ্ড পাকিস্তানী আমলের ২৩ বছরে ভারত কখনই অতিক্রম করতে পারিনি। সেটি এসেছিল ভারত থেকে হিজরতকারী অবাঙালী প্রশাসক, ব্যবসায়ী ও শিল্প-পরিচালকদের কারণে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তখন প্রশাসকগণ আসতো সে দ্রুত শিল্পোন্নয়নের ছবক নিতে। অথচ সে উন্নয়নে বাঙালীর অবদান ছিল সামান্যই।  

পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার মূল কারণটি হলো মুজিব ও ভূট্রোর ক্ষমতালিপ্সার রাজনীতি। দেশ ভেঙ্গে যাক –তা নিয়ে যেমন মুজিবের কোন দুঃখ ছিলনা। ভূট্টোরও ছিল না। উভয়েই হতে চেয়েছে প্রধানমন্ত্রী। অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় মুজিবের কোন আগ্রহ ছিল না। ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারীতে পাকিস্তান থেকে ফিরে ঢাকার সোহরাওয়ার্দি ময়দানের জনসভায় মুজিব বলেন, “স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই ১৯৭১ সালে নয়, ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু করেছিলাম।” মুজিবের সে বয়ান সেদিন আমি নিজ কানে শুনেছি। আর ভারত তো ১৯৪৭ সাল থেকেই অপেক্ষায় ছিল এমন একটি মুহুর্তের। ভারতের হামলা প্রতিরোধ করার সামর্থ্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছিল না। ফলে ভারত যা চেয়েছে ১৯৭১’য়ে তাই হয়েছে। তাই পাকিস্তান ভেঙ্গে গেল দেশটির নিজের ব্যর্থতার কারণে নয়, বরং ঘরের শত্রু ও বিদেশী শত্রুদের যৌথ ষড়যন্ত্রে। ২৯/০১/২০২১




সেক্যুলারিস্ট বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রাট ও নাশকতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

পথভ্রষ্টতা যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক অলংকার

কোন জাতির ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে হলে নজর দিতে হয় সে জাতির বুদ্ধিজীবীদের। কারণ, তারাই বসে দেশবাসীর চেতনার ড্রাইভিং সিটে। জাতি ভ্রষ্টতার শিকার হয় তাদের কারণে। কোন জাতি কখনোই দেশের কৃষক-শ্রমিক তথা সাধারণ জনগণের নিরক্ষরতার কারণে বিপর্যস্ত হয় না। কৃষি, শিল্প, রাস্তাঘাট ও ব্যবসা-বানিজ্যে পিছিয়ে থাকার কারণেও নয়। বিপর্যয়, বিভ্রান্তি ও ধ্বংস ডেকে আনে মূলত বুদ্ধিজীবী, জ্ঞানী বা আলেম রূপে যারা পরিচিতি পায় তাদের ভ্রষ্টতা। জাতিকে পথ দেখানোর নাম করে তারাই জাতিকে পথভ্রষ্ট ও বিপর্যস্ত করে। এরাই ঘৃণা, বিভক্তি, সংঘাত ও যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করে। বনি ইসরাইলের আলেমদের কারণেই ইহুদীগণ অভিশপ্ত ও বিপর্যস্ত জাতিতে পরিনত হয়েছে। পবিত্র কোর’অআনে এ বিষয়টি বার বার তুলে ধরা হয়েছে। মানুষকে পথ দেখানোর কাজটি মূলত পয়গম্বরদের। তাদের অবর্তমানে সে কাজটি করে দেশের আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তিরা। এটিই হলো একটি জাতির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে তাদের মর্যাদা তাই সর্বোচ্চে। কিন্তু সে জন্য শর্ত হল, জ্ঞানীদেরকে সত্য পথের পথিক হতে হয়।

মানব জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনটি নাম-ডাক, ধনসম্পদ বা সন্তান-সন্ততি নয়, বরং সেটি হলো সঠিক-পথ প্রাপ্তি। আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এটিই সবচেয়ে বড় নিয়ামত। সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি জান্নাতে নেয় না; নেয় সত্যপথ প্রাপ্তি। মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ এ নিয়ামতটি পাওয়ার জন্য তাই ঈমানদারকে নামাযের প্রতি রাকাতে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে “ইহদিনাস সিরাতুয়াল মোস্তাকিম” বলে দোয়া করতে হয়। নইলে নামাযই হয় না। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কোরআনে শেখানো এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া। তবে সে দোয়ার কবুলের শর্ত হলো, “ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তায়ীন” অর্থাৎ “একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং একমাত্র আপনার থেকেই সাহায্য চাই” বলে মহান আল্লাহতায়ালার সকল হুকুমের প্রতি পরিপূর্ণ  দাসত্বে নিজেকে নিবেদিত করতে হয়। এবং সে দাসত্ব কি ভাবে করতে হয় সেটিরই আল্লাহপ্রদত্ত গাইড বুক হলো পবিত্র কোর’আন।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নাশকতা দেশটির জলবায়ু, রোগজীবাণু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘটেনি। সেটি ঘটেছে সেক্যুলারিষ্ট বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের হাতে। তাদের মূল চরিত্রটি হলো পবিত্র কোর’আনে বর্ণিত সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে পরম ভ্রষ্টতার। এ ভ্রষ্টতাকে পেশ করে নিজেদের চরিত্রের অলংকার রূপে। এটিকে বলে প্রগতিশীলতা। এবং সিরাতুল মুস্তাকীমে চলাটি গণ্য হয় সাম্প্রদায়িকতা ও পশ্চাদপদতা রূপে। বাংলাদেশে ভ্রষ্ট পথে চলা মানুষের সংখ্যাটি বিশাল। দেশে মিথ্যাচার, চুরি-ডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণের যে জোয়ার –তার মূল কারণ ভ্রষ্ট পথে চলা এ দুর্বৃত্তরা। এবং জাতিকে এ স্থানে টেনে এনেছে ভ্রষ্ট চরিত্রের বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা।  পথভ্রষ্টগণ শুধু নিজেরাই ভ্রষ্ট পথে চলে না; অন্যদেরও তারা সে পথ পথটিতে। সমগ্র মানব ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ কর্ম। এ কাজটি পাপিষ্ট শয়তানের। এ কাজ জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার। এমন কি দুনিয়াকেও এরা জাহান্নামে পরিণত করে। বিশ্বজোড়া পথভ্রষ্টতা, অনাচার ও পাপাচার তথা জাহান্নামের পথে মানুষের যে ভিড় -তা তো মানবরূপী এসব শয়তানদের কারণেই। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “যারা ঈমান এনেছে তাদের বন্ধু আল্লাহ, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যায়। আর যারা কাফের, তাদের বন্ধু হল শয়তান। সে তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়।” সেক্যুলারিষ্ট বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ তো সে কাজই করছে। সেক্যুলার বা ধর্মে অঙ্গিকার শূণ্য কোন বুদ্ধিজীবী বা ডিগ্রিধারি ব্যক্তিগণ যে আলোর পথ তথা সঠিক পথ দেখাতে পারে বা তাদের সে যোগ্যতা আছে -সেটি বিশ্বাস করাই তো শিরক। ইসলামে এরূপ বিশ্বাস কবিরা গুনাহ। সত্যপথ দেখানোর কাজ একমাত্র মহান আল্লাহর যেমন পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “ইন্না আলায়নাল হুদা”। অর্থঃ পথ দেখানোর কাজটি নিশ্চয়ই আমার। এবং সে দেখানোর পথের সন্ধান মেলে পবিত্র কোর’আনে।

 

ভারতসেবী দাসচরিত্র ও মিথ্যাচর্চা

বাংলাদেশীদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদটি হলো, দেশবাসীকে ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য, কল্যান-অকল্যানের ছবক দিচ্ছে ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য সেক্যুলার বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা। দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, আইন-আদালতসহ সর্বক্ষেত্রে তারাই জনগণকে পথ দেখায়। ফলে যা হবার সেটিই অতি ভয়ানক ভাবে হচ্ছে। বাড়ছে সত্য পথ থেকে বিচ্যুতি। এদের কারণেই দেশজুড়ে বাড়ছে মিথ্যার প্রসার; সেটি যেমন ধর্ম নিয়ে, তেমনি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি নিয়ে। সেক্যুলার বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের মাঝে ভারতসেবী দাসচরিত্র ও মিথ্যাচর্চা যে কতটা গভীর তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। সে উদাহরণটি দেয়া যাক সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের মাঝে যিনি প্রথম সারির কলামিস্ট তার লেখা থেকে। সেটি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ২০১১’য়ের ১২ সেপ্টম্বর তারিখে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত তার একটি নিবন্ধ থেকে।  নিবন্ধটি লিখেছিলেন কায়েদে আজম মহম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু দিবস উপলক্ষ্যে “আজ ‘কায়েদে আজম’ বেঁচে থাকলে কী ভাবতেন কী করতেন” শিরোনামে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর সাথে জড়িত আছে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের ইতিহাস এবং সেসাথে তাদের শত্রুদের ইতিহাসও।

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছিলেন, “খবরটি ঢাকার একটি কাগজে বের হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে ভারত তার দেশের মুসলমানদের সংখ্যা কম করে দেখাচ্ছে। ২০০১ সালে ভারতের আদমশুমারিতে দেখানো হয়েছে মুসলমানদের সংখ্যা ১৩ কোটি ৮০ লাখ। কিন্তু আমেরিকার হিসাব মতে এই সংখ্যা অনেক বেশি। নয়াদিল্লির মার্কিন দূতাবাসের হিসাবে এই সংখ্যা ১৬ থেকে ১৮ কোটি। গতকাল (রোববার) যখন আমার হাতে আসা ঢাকার কাগজে এই খবরটি পড়ছি, তখন চকিতে মনে পড়ল, আজ ১১ সেপ্টেম্বর। ১৯৪৮ সালের এই দিনে পাকিস্তানি মুসলমানদের দ্বারা সম্বোধিত ‘কায়েদে আজম’ ইন্তেকাল করেন। তিনি অবিভক্ত ভারতের তৎকালীন ১০ কোটি মুসলমানকে একটি আলাদা জাতি বলে দাবি করে দেশটিকে ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ছুরিতে ভাগ করেছিলেন। মৃত্যুর ৬৩ বছর পর আজ যদি তিনি কবর থেকে হঠাৎ জেগে উঠতেন এবং জানতেন খণ্ডিত ভারতেই এখন মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি অথবা মার্কিন হিসাব অনুযায়ী ১৬ থেকে ১৮ কোটি, তাহলে তিনি কী করতেন? কী ভাবতেন? আরেকটি পাকিস্তান দাবি করতেন কি?”

তিনি আরো লিখেছেন, “ধর্মের ভিত্তিতে জাতিত্ব নির্ধারণ এবং দেশ ভাগ করার মতো সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক বুদ্ধি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো একজন আধুনিকমনা, পাশ্চাত্য শিক্ষিত নেতাকে কেমন করে পেয়ে বসেছিল তা ভাবলে এখন বিস্মিত হতে হয়। … তিনি অবিভক্ত ভারতের ১০ কোটি মুসলমানের মধ্যে ৪ কোটিকে ভারতে রেখে ৬ কোটিকে নিয়ে পাকিস্তান গঠন করেছিলেন। ..তার বুদ্ধিতে কি এই কথা ধরা পড়েনি যে, এই চার কোটি মুসলমান ভারতে বাস করেই কালক্রমে ১৪ কোটি হয়ে দাঁড়াতে পারে! তখন তারা ভারতীয় হতে চাইলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের কাছে সমান মর্যাদার ভারতীয় বলে গৃহীত হতে নাও পারেন। তখন তাদের স্বার্থ, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা ক্রমাগত ক্ষুণ্ণ হতে থাকবে বই বাড়বে না। ভারতে এখন মুসলমানদের ভাগ্যে তাই ঘটছে। ওয়েবসাইট উইকিলিকস সম্প্রতি নয়াদিল্লির মার্কিন দূতাবাসের এক তারবার্তা প্রকাশ করে ভারতীয় মুসলমানদের বর্তমান পশ্চাৎপদ ও অনুন্নত অবস্থার কথা ফাঁস করে দিয়েছে। উইকিলিকসের ফাঁস করা খবরে বলা হয়েছে, ‘গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ইউএস ভিউজ অন ইন্ডিয়ান ইসলাম অ্যান্ড ইটস ইন্টারপ্রেটেশন’ শিরোনামে দিল্লির মার্কিন দূতাবাস ওয়াশিংটনে একটি তারবার্তা পাঠায়। ভারতের বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তারবার্তায় বলা হয়, ২০০১ সালের সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতে মুসলমানের সংখ্যা ১৩ কোটি ৮০ লাখ। কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি- ১৬ থেকে ১৮ কোটি। তারবার্তায় ভারতের মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়, ‘ভারতে আজিম প্রেমজির মতো কোটিপতি থাকলেও বেশিরভাগ মুসলমানের অবস্থা খুবই খারাপ। মুসলমানরা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। ভারতের পার্লামেন্ট এবং অন্যান্য নির্বাচনী বডিতে মুসলমানদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। ভারতের দলিত শ্রেণীর চেয়ে মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি তুলনামূলকভাবে বেশি। কিছু সংখ্যক মুসলমানের অবস্থার উন্নতি হলেও তাদের চিত্র ভারতের মুসলমানদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সামগ্রিক চিত্র নয়।’

তিনি আরো লিখেছেন, “এই হচ্ছে নয়াদিল্লির মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো রিপোর্টে বর্ণিত ভারতের ১৪ কোটি অথবা ১৮ কোটি মুসলমানের বর্তমান অবস্থা। চল্লিশের দশকে ধর্মের ছুরিতে শুধু অবিভক্ত ভারতকে কর্তন করা নয়, ভারতের মুসলমানদেরও বিভক্ত করে তৎকালীন ছ’কোটি মুসলমানের জন্য ‘হোমল্যান্ড’ তৈরি করতে গিয়ে জিন্নাহ কি ভাবতে পেরেছিলেন, অবশিষ্ট চার কোটি এবং তাদের কোটি কোটি ভবিষ্যৎ বংশধরের জন্য তিনি যুগ যুগ ধরে ‘নিজভূমে পরবাসী’ হওয়ার ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন? তাদের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হবে? কাশ্মীর সমস্যা জন্ম নেবে?

 কেন এতো জিন্নাহ বিরোধীতা?

লক্ষণীয় হলো উক্ত নিবন্ধে দিল্লির মার্কিন দূতাবাস ভারতের মুসলমানদের পশ্চাদপদতা নিয়ে যে তথ্য তুলে ধরেছে সে পশ্চাদপদতার জন্য আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী ভারত সরকারকে দায়ী করতে রাজী নন। দায়ী করেছেন কায়েদে আজমকে। দায়ী করেছেন তার নেতৃত্বে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকে। তাই লিখেছেন, “তিনি ভারতের মুসলমানদের উপকার করার বদলে তাদের যে অপকার করে গেছেন, তার প্রমাণ আজকের ব্যর্থ এবং বিধ্বস্ত রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং ভারতের মুসলমানদের বর্তমান দুর্দশা ও দুরবস্থা।” উক্ত নিবন্ধে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী নিজেকে পেশ করেছেন ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয় রূপে। তিনি বিরোধীতা করেছেন জনাব জিন্নাহ’র দ্বি-জাতি তত্ত্বকে। অথচ দ্বি-জাতি তত্ত্বকে অস্বীকার করলে মেনে নিতে হয় হিন্দু কংগ্রেসী নেতাদের এক ভারতীয় জাতির তত্ত্ব। সেটি হলে বাঙালীদের আলাদা জাতি রূপে পরিচিতি এবং সে পরিচিতি নিয়ে পৃথক বাংলাদেশ নির্মাণের অধিকার থাকে কি?  দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরোধীতার মধ্য দিয়ে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী কি তবে অখন্ড ভারত নির্মাণের পক্ষে উকালতি করছেন?

ভারতীয় হিন্দুগণ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা চায়নি। ভারত  আজ যেভাবে ২০ কোটি মুসলিমকে সে দেশের দলিত বা নমশুদ্রদের চেয়ে নীচে রাখতে পেরেছে, একই ভাবে গোলাম করে রাখতে  চেয়েছিল পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ৪০ কোটি মুসলিমদেরও। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কারণেই সেটি সম্ভব হয়নি। এ ব্যর্থতার কারণে দিল্লীর শাসকচক্রের প্রচণ্ড ক্ষোভ; তাই তারা পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধী। একই কারণে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীও পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধী।  আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর দুঃখ তো পাকিস্তানের বেঁচে থাকা নিয়ে। তিনি প্রচণ্ড খুশি হতেন যদি ভারত খন্ডিত হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত না হতো। গান্ধি বা নেহেরু না হলেও ভারত স্বাধীন হতো। কিন্তু জিন্নাহ না হলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হতো না। কারণ ভারতের নানা ভাষা ও নানা মজহাবে বিভক্ত মুসলমানদের একতাবদ্ধ করার দুরুহ কাজটি অন্য কোন মুসলিম নেতার পক্ষে সে সময় সম্ভব ছিল না। আর এজন্যই জিন্নাহর প্রতি ভারতীয় হিন্দুদের এত ক্ষোভ, এত আক্রোশ। একই কারণে আক্রোশ আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীরও। তার আক্রোশ শুধু কায়েদে আজমের উপর নয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও। পাকিস্তান কেন আজও বেঁচে আছে সেটিই তার কাছে অসহ্য।      

প্রশ্ন হল, ভারতকে তার মুসলিম নাগরিকদের প্রতি মানবিক হতে কি কায়েদে আজম নিষেধ করেছিলেন? সে জন্য পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাই বা দায়ী হয় কি করে? বরং লক্ষ্যনীয় হল, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্টদের অধীনে ভারতীয় মুসলিমদের জানমাল, ইজ্জত, আবরু কতটা বিপদাপন্ন সেটি আজ থেকে ৬৫ বছর আগে কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ সুস্পষ্ট ভাবে দেখতে পেরেছিলেন। কিন্তু সেভাবে দেখার সামর্থ্য আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর মত লোকগুলির কি আছে? সে দেশে নিয়মিত দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুদের উৎসব ভরে হত্যা করা হয়। পুলিশের চোখের সামনে দিনদুপুরে মসজিদ ধ্বংস করা হয় – যেমন ১৯৯২ সালে লাখ লাখ হিন্দু অযোধ্যায় ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদকে ধ্বংস করে। সেদেশে ধর্ষিত হয় মুসলিম নারী; ধর্ষনের পর তাদেরকে আগুণে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু সে অপরাধের জন্য কাউকে গ্রেফতার করা হয় না, আদালতেও তোলা হয় না। অরুন্ধুতি রায়ের মত বহু বিবেকমান ভারতীয় বুদ্ধিজীবী মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও গৃহে অগ্নিসংযোগের ন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার।  কিন্তু সেরূপ প্রতিবাদের ভাষা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর মুখে নাই, নাই তাদের নেত্রী শেখ হাসিনারও মুখেও। অথচ তারা পাকিস্তানের সৃষ্টিকেই অনর্থক মনে করে। এবং পাকিস্তানকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে।

 

 

হামলা বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে

প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কি সত্যই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র? তিনি কি দেখেন না, ৫৭ টি মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো পাকিস্তান। আজকের পাকিস্তান আজ আর একাত্তরের পাকিস্তান নয়। দেশটির হাতে রয়েছে পারমানবিক বোমা। রয়েছে দূরপাল্লার মিজাইল। যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, কামান, ইত্যাদি যুদ্ধাস্ত্র তারা নিজেরাই তৈরী করে। তাছাড়া পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার ফলে মুসলিমদের যে উপকার হয়েছে সেটি কি এতটাই তুচ্ছ? বাংলাদেশ যে মানচিত্র পেয়েছে সেটি তো পাকিস্তান থেকেই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত না হলে কি বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো? এটুকু বুঝার সামর্থ্য কি তার নাই? এই হলো বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের চেতনার মান! পাকিস্তানের সৃষ্টিকে অনর্থক বলে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করছে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে। 

ভারতে মুসলিমদের সংখ্যা পাকিস্তানের মুসলিমদের চেয়ে অধিক। কিন্তু পাকিস্তানের করাচী বা লাহোরের ন্যায় একটি মাত্র শহরে যতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আর্মি অফিসার, বিচারপতি, আইনবিদ, প্রশাসনিক আমলা আছে এবং তাদের হাতে যে পরিমান ধন-সম্পদ সঞ্চিত হয়েছে -তা কি ভারতের সমুদয় মুসলিমদের আছে? পাকিস্তানের অন্যান্য শহরগুলির কথা তো বাদই রইলো। সম্পদ ও শিক্ষার বাইরে উন্নয়নের বড় মাফকাঠি হলো, জানমালের নিরাপত্তা ও ইজ্জত। এক্ষেত্রেও পাকিস্তানের মুসলিমদের অর্জন কি কম? পাকিস্তানী একজন মুসলিম যতটা স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বসবাস করে -তা কি কোন ভারতীয় মুসলিম ভাবতে পারে?

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তানীরা কায়েদে আজম তথা শ্রেষ্ঠ নেতা বলে সম্মান দেখায় সেটি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ভাল লাগেনি। তিনি বরং তাকে হাফ এডুকেটেড ব্যারিস্টার বলে হেয় করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বরং শ্রেষ্ঠ বলার চেষ্টা করেছেন শেখ মুজিবকে। শেখ মুজিব যে শ্রেষ্ঠ সেটি প্রমানের জন্য এক পাকিস্তানী সাংবাদিক বন্ধুর মন্তব্যকে পেশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “লন্ডনে এক পাকিস্তানি সাংবাদিক-বন্ধু আমাকে বলেছেন, ‘তোমরা বড় ভাগ্যবান তাই শেখ মুজিবের মতো নেতা পেয়েছিলে। তিনি সময় মতো বাংলাদেশকে পাকিস্তানের জংলি ফৌজি শাসন থেকে মুক্ত করে আলাদা স্বাধীন দেশ না করলে এখন পাকিস্তানের পূর্বাংশ হিসেবে তোমরাও একদিকে তালেবানি সন্ত্রাসে জর্জরিত এবং অন্যদিকে মার্কিনি ড্রোন হামলার শিকার হতে। তোমরা এখন এই গ্রেট লিডারের সামান্য ভুলত্রুটির যতই সমালোচনা কর, একথা ভুললে চলবে না, তিনি তোমাদের স্বাধীন জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং একটি স্বাধীন নেশন স্টেট উপহার দিয়ে গেছেন। পাকিস্তানের সঙ্গে সহমরণে তোমাদের যেতে হয়নি।’

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর যে বন্ধুটি শেখ মুজিবকে গ্রেট লিডার বলেছেন সে ব্যক্তিটি শেখ মুজিব যে বাংলাদেশকে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি রূপে বিশ্ব মাঝে পরিচিত করলো এবং গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে বাকশাল প্রতিষ্ঠা দিল -সে বিষয়গুলি কি জানেন? তাছাড়া মুজিব বা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ন্যায় পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অসংখ্য শত্রুর বসবাস দেশটির জন্ম থেকেই। ফলে পাকিস্তান ভাঙ্গলে তাদের ভাল লাগবে সেটিই তো স্বাভাবিক। মুজিবের ইমেজকে বড় করতে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী তেমন একজনকেই খাড়া করেছেন।  জিন্নাহর পাকিস্তান আর যাই হোক তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি হয়নি। পাকিস্তানে একদলীয় বাকশালও প্রতিষ্ঠা পায়নি। দেশবাসীকে রক্ষিবাহিনীর নির্মম অত্যাচারও সইতে হয়নি। এবং দেশটি পরিনত হয়নি ভারতের গোলাম রাষ্ট্রে। বরং বাংলাদেশের আজ যে পৃথক অস্তিত্ব সেটিও তো সম্ভব হয়েছে জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায়।   

 

বাঙালী মুসলিম চেতনায় কায়েদে আজম

কায়েদে আজম বাঙালী ছিলেন না। কিন্তু তারপরও তাঁর প্রশংসায় বাঙালী কবি-সাহিত্যিকেরা যত কবিতা লিখেছেন তা কি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির গ্রেট লিডার মুজিবকে নিয়ে লেখা হয়েছে? ভয়ভীতি দেখিয়ে কাউকে দিয়ে কবিতা লেখানো যায় না। কবিতা লেখার সে প্রেরণাটি আসে মনের গভীর থেকে। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী তার লেখায় বুঝাতে চেয়েছেন, পাকিস্তানী আমলে নিছক ঘটা করেই কায়েদে আজমের জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন করা হতো, তার সাথে বাঙালীর মনের যোগ ছিল না। তার মন্তব্যটি যে কতটা অসত্য সেটি প্রমানের জন্য বাংলা সাহিত্যে কায়েদে আজমকে নিয়ে রচিত অসংখ্য বাংলা কবিতা ও প্রবন্ধই কি যথেষ্ট নয়? বাংলা কবিতা থেকে তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।

অন্য কেউ নন, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরিদের স্বপক্ষীয় কবি খোদ বেগম সুফিয়া কামাল কায়েদে আজমকে নিয়ে লিখেছেন,

“তসলীম লহ, হে অমর প্রাণ! কায়েদে আজম, জাতির পিতা!

মুকুট বিহীন সম্রাট ওগো! সকল মানব-মনের মিতা।

অমা-নিশীথের দুর্গম পথে আলোকের দূত! অগ্রনায়ক!

সিপাহসালার! বন্দী জাতিরে আবার দেখালে মুক্তি-আলোক।”

                 – (মাহে নও। ডিসেম্বর ১৯৫৯)।

অন্য এক কবিতায় তিনি লিখেছেন,

“জাতির পতাকা-তলে একত্রিত সকলে তোমারে

স্মরণ করিছে বারে বারে,

তোমার আসন আজও সকলের হৃদয়ের মাঝে

তোমারে লইয়া ভরে আছে।

যুগে যুগে তুমি তব দানের প্রভায়

চিরঞ্জীব হয়ে র’বে আপনারী দিব্যি মহিমায়।

কায়েদে আজম। তবদান

মহাকাল-বক্ষ ভরি রহিবে অম্লান।”

                -(মাহে নও। ডিসেম্বর ১৯৫৫)

সুফিয়া কামাল আরেক কবিতায় লিখেছেন,

“হে সিপাহসালার! তব দৃপ্ত মনোরথে

ছুটাইয়া টুটাইয়া জিন্দানের দ্বার

আনিলে প্রদীপ্ত দীপ্তি ঘুচায়ে শতাব্দী অন্ধকার

মৃত্যু নাহি যে প্রাণের ক্ষয় নাহি তার দেয়া দানে

লভি আজাদীর স্বাদ, এজাতি-জীবন তাহা জানে

তোমার জনম দিনে, তোমার স্মরণ দিনে

কায়েদে আজম! তব নাম

কোটি কন্ঠে ধ্বনি ওঠে, কহে, লহ মোদের সালাম।”

                         –(পাক-সমাচার। ডিসেম্বর: ১৯৬৩)। 

কায়েদে আজম স্মরণে সিকান্দার আবু জাফর লিখেছেন,

“ডোবেনি যে রবি, নেভেনি যে আলো

মুছিবে না কোন কালে,

এই কালে পৃথিবীর ভালে

জ্যোতি-প্রদীপ্ত উজ্বল সেই

সূর্য্যের প্রতিভাস

সে রচিয়া গেছে মৃত্যুবিহীন

আপনার ইতিহাস।

সে ছড়ায়ে গেছে মৃত্যুঞ্জয়ী

মহাজীবনের বীজ,

সে ফোটায়ে গেছে লক্ষ বুকের

তিমির সরসী নীরে

চির প্রভাতের আনন্দ সরসিজ।

মৃত্যু ‘অতীত জীবন তাহার

মৃত্যু সাগর তীরে

দিগন্তহীন সীমা বিস্তৃত জীবনের মহাদেশে

যুগ-যুগান্ত সে আসিবে ফিরি ফিরে।

বহু মৃত্যুর দিগন্ত হতে সে এনেছে কেড়ে

জীবনের সম্মান;

ক্ষয় নাহি তার নাহি তার অবসান।

অযুত মৌন কন্ঠ ভরিয়া নব জীবনের গান

ফোটা যে বারে বারে

মৃত্যু কি তারে স্তব্ধ করিতে পারে? 

           -(শাহেদ আলী সংকলিত, ১৯৮৯)

আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী, আওয়ামী লীগ আমলের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং বাংলা এ্যাকাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক ডঃ মাযহারুল ইসলাম লিখেছেন,

“সহসা আলোর পরশ লাগালো

প্রাণে প্রাণে এক চেতনা জাগলো

আধার দুয়ার খুলে গেল সম্মুখে

কে তুমি হে নব-পথ-সন্ধানী আলোকদ্রষ্টা?

কে তুমি নতুন মাটির স্রষ্টা?

যে এনেছে বুক জুড়ে আশ্বাস

যে দিয়েছে সত্তা নিয়ে বাঁচবার বিশ্বাস

অগণন মানুষের হৃদয়-মঞ্জিলে

-সে আমার কাযেদে আজম

আমার তন্ত্রীতে যার ঈমানের একতার

শৃঙ্খলার উঠিছে ঝংকার

সুন্দর মধুর মনোরম।” -(শাহেদ আলী সংকলিত, ১৯৮৯)

 

ড. মাজহারুল ইসলাম অন্য এক কবিতায় কায়েদে আজম সম্পর্কে লিখেছেন,

“আঁধারের গ্লানিভরা জাতির জীবন

কোথাও ছিল না যেন প্রাণ স্পন্দন

মৃত্যু­-তুহীন দিন গুণে গুণে এখানে ওখানে

শুধু যেন বারবার চলিষ্ণু পখের প্রান্তে ছেদ টেনে আনে

ম্লান পথ হয়ে ওঠে আরো ঘন ম্লান

আঁধারে বিলীন হলো মুক্তি-সন্ধান।

তারপর মৃত্যু-জয়ী সে এক সৈনিক

সৃষ্টির আনন্দ নিয়ে নেমে এলো আঁধারের পথে

চোখে মুখে অপূর্ব স্বপন

হাতে আঁকা অপরূপ নতুন দেশের রূপায়ন

এ মাটিতে সে এক বিস্ময়,

মৃত বুকে প্রাণ এলো

মুক্তির চেতনা এলো।

প্রাণ যাক তবু সেই স্বপ্ন হোক জয়

নির্বিকার ত্যাগের আহবান!

পথে পথে রক্তের আহবান।

  -মাটির ফসল, -(শাহেদ আলী সংকলিত,১৯৮৯)

বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক এবং ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জনাব আবু হেনা মোস্তাফা কামাল কায়েদে আজমের সম্মানে লিখেছেন,

“প্রদীপ্ত চোখে আবার আকাশকে দেখলাম

পড়লাম এক উজ্বল ইতিহাসঃ

সে ইতিহাসের পাতায় পাতায় একটি সোনালী নাম…

আবার আমরা আমরা চোখ তুলে তাই দেখলাম এ আকাশ।

তোমাকে জেনেছি আকাশের চেয়ে বড়—

সাগরের চেয়ে অনেক মহত্তর—

কেননা ক্লান্ত চোখের পাতায় নতুন আলোর ঝড়

তুমি এনে দিলে । নতুন জোয়ার ছুঁয়ে গেল বন্দর।

        -(মাহে নওঃ ডিসেম্বর ১৯৫৩)     

কায়েদে আজমের মৃত্যুতে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন,

“অনুর্বর প্রহরে আমার-প্রাণ দিলে সুর দিলে তুমি,

আমার মৃত্তিকালদ্ধ ফসলের ভিত্তিভূমি তুমি।

প্রতিকূল প্রহরের প্রবঞ্চনা ফিরে গেল অসীম কুন্ঠায়,

আসলাম দীপ্ত পথে খরতর সূর্যের আশায়।

তুমি সে সূর্যের দিন,তুমি তার আরম্ভের প্রভা,

সবুজের সমারোহ জীবনের দগ্ধ দিন

প্রাণের বহ্নিব মোহে জেগে উঠে নতুন সঙ্গীতে-

অপূর্ণ জীবন আজ পরিপূর্ণ হলো বন্ধু তোমার ইঙ্গিতে।

মানব কন্ঠে যে সুর জাগালে তুমি,

সে সুরে এবার তুলে কল্লোল আমার জন্মভূমি।

  • নয়া সড়ক (বার্ষিকী), (সংকলনে শাহেদ আলী, ১৯৮৯)।

 

বিপদ জ্ঞানের দৈন্যতায়

মানুষ যে দেশে বা যে পরিবেশে বসবাস করে সেখানে বসবাসকারি শত্রুমিত্র, উপকারি-অনুপকারিকে জানতে হয়। জানতে হয় কোনটি বিষাক্ত শাপ, কোনটি ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ, কোথায় বাঘের বাস, কে দুর্বৃত্ত, এবং কোথায় চোর-ডাকাতদের পাড়া -সেগুলোও। সেগুলিকে চিনতে মহল্লায় আলোও জ্বালাতে হয়। তেমনি জানতে হয় জাতীয় জীবনে কে প্রকৃত শত্রু ও কে প্রকৃত মিত্র। বাংলার মানুষ এক কালের মশার কামড়ে লাখে লাখে প্রাণ হারিয়েছে। তারা জানতোই না যে সে মশার রক্তে বসবাস করে ম্যালেরিয়ার ঘাতক জীবানু। তেমনি প্রতি দেশে ও মহাদেশে বহু আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী ব্যক্তিবর্গ যেমন আছে, তেমন আছে নিষ্ঠুর লুটেরাও। তেমনি আছে বিদেশী শত্রুর অর্থে প্রতিপালিত হাজার হাজার দেশীশত্রুও। নমরুদ ও ফিরাউনের মত স্বৈরাচারি শাসকদের উপস্থিতি তো প্রতি যুগেই। মীর জাফর শুধু ১৯৫৭ সালেই আসেনি। তাই মুসলিম হওয়ার দায়বদ্ধতা শুধু মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর মহান রাসূলকে চেনা নয়। তাঁকে যুগের নমরুদ, ফিরাউন ও মীর জাফরদেরও চিনতে হয়। তাই শধু ১৯৭১ এর ইতিহাস জানলে হয় না, ১২০২, ১৭৫৭, ১৮৫৭, ১৯৪৭’য়ের ইতিহাসও জানতে হয়।

তাই শুধু পাঠ্য বইয়ের ইতিহাস পড়লেও চলে না। পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও খুঁজতে হয় ইতিহাসের জ্ঞান। কারণ পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাসটি লেখে বিজয়ী পক্ষ। ফলে পরাজিতগণ যত ভাল মানুষই হোক না কেন, তাদের প্রতি সে ইতিহাসে প্রচণ্ড অবিচার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আরোপিত হয় বহু মিথ্যা অভিযোগ। সে অভিযোগের বিরুদ্ধে জবাব দেয়ার সুযোগও দেয়া হয়না। তাই পাঠ্য পুস্তকের ইতিহাসে ১৭৫৭ সালের বিজয়ী পক্ষ ইংরেজরা প্রশংসিত। তাদের প্রশংসায় যে শুধু ইংরেজ ঐতিহাসিকেরা লিখেছে তা নয়, বিস্তর লেখেছে ইংরেজ স্বার্থের সেবাদাস বহু বাঙালীও। এমনকি রবীন্দ্রনাথ নাথও ইংরেজ সম্রাটের প্রশংসায় কবিতা লিখেছেন। সে সাথে চরিত্র হনন করা হয়েছে সিরাজুদ্দৌলার। তাঁকে মদ্যপ ও জ্বিনাকারি বানানো হয়েছে। অন্ধকার কূপের হতাকারিও বানানো হয়েছে। তেমন চরিত্রহনন হয়েছে ১৮৫৭ সালের মোজাহিদদের। একই ভাবে চরিত্র হনন করা হয়েছে একাত্তরের ইতিহাসেও। সে ইতিহাসে ভিলেন রূপে খাড়া করা হয়ছে তাদেরকে -যারা খাড়া হয়েছিল ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।   

পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা ও কারিগরি জ্ঞানে অনগ্রসরতার কারণে কোন দেশই ধ্বংস হয় না। ধ্বংস হয় দর্শন ও ইতিহাস-জ্ঞানে অনগ্রসরতার কারণে। কারণ, অনগ্রসরতার কারণে লোপ পায় সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করার বুদ্ধিবৃত্তিক বল। তখন দুর্বৃত্তরা দেশের পিতা, নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পায়। মুসলিমগণ যখন মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সভ্যতার জন্ম দিল তখন পদার্থ, রাসায়নিক বা কারিগরি ক্ষেত্রে যে বিশাল বিপ্লব এসেছিল -তা নয়। রাস্তাঘাট, কলকারখানা যে বিপুল ভাবে গড়ে উঠিছিল তাও নয়। সেটি সম্ভব হয়েছিল ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাসের জ্ঞানে গভীরতার কারণে। তখন বিপ্লব এসেছিল কোর’আন বুঝায় এবং সে অনুযায়ী আমল করায়। বিপ্লব এসেছিল জীবন ও জগত নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্রে। বিপ্লব এসেছিল মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধে। বিপ্লব এসেছিল মানুষের বাঁচার লক্ষ্য এবং পদ্ধতিতে। সে বিপ্লবের ফলে বিপ্লব এসেছিল উন্নত মানব রূপে বেড়ে উঠায়। ফলে মানুষ তখন মহামানব রূপে বেড়ে উঠেছিল। আর যে রাষ্ট্রে মহামানবের সংখ্যা বাড়ে সে রাষ্ট্র যে মহান-সভ্যতার জন্ম দেয় -সেটিই তো স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের আজকের বিপর্যয় ও ব্যর্থতার কারণ, দেশে রাস্তা ঘাট, কলকারখানা ও ক্ষেতখামারের কমতি ততটা নয় যতটা দৈনত্য জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে জ্ঞানের সর্বশ্রষ্ঠ উৎস কোর’আন চর্চার ক্ষেত্রে। এবং তার কারণ, দেশটির বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণ দখলে গেছে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ন্যায় মিথ্যাসেবী ও ভারতসেবী বুদ্ধিজীবীদের হাতে। আর এতে দেশ ছিনতাই তবে দুর্বৃত্তদের হাতে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? ১ম সংস্করণ, সেপ্টম্বর ২০১১; ২য় সংস্করণ, ০৩/১২/২০২০।




বাংলা সাহিত্যে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও নাশকতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

হাতিয়ার সাংস্কৃতিক যুদ্ধের

সমগ্র ভারত মাঝে ইসলামের প্রসার সবচেয়ে দ্রুত ঘটেছিল বাংলায়। এরই ফল হলো, বিশ্বের আর কোন দেশে এতো ক্ষুদ্র ভৌগলিক সীমানার মধ্যে এতো মুসলিমের বসবাস নাই যা বাস করে বাংলায়। তবে ইসলামের প্রসার রোধে ইসলামের শত্রুরা কোন কালেই বসে থাকেনি। যেমন আজ নয়, তেমনি অতীতেও ছিল না। অতীতে মুসলিমদের বিজয় রোধে তাদের সামরিক সামর্থ্য ছিল না, তবে সামর্থ্য ছিল ভাষা ও সাহিত্যের অঙ্গণে। ভাষা ও সাহিত্য পরিণত হয় ইসলামে বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক যুদ্ধের হাতিয়ারে। ইসলামের যখন দ্রুত প্রসার ঘটছিল তখন সে প্রসার ঠেকাতে ময়দানে নামে শ্রী চৈতন্য দেব ও তাঁর সাথীরা বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে। গীর্জায় ভক্তিমূলক গানের মধ্যে বেঁচে আছে খৃষ্টান ধর্ম। তেমনি ভক্তিমূলক বৈষ্ণব গানের মধ্যে হিন্দু ধর্মও যেন নতুন প্রাণ পায়। বৈষ্ণব সন্যাসীরা তাদের ভাববাদী গান নিয়ে বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতো, আর তাদের ঘিরে জমা হত গ্রামের হিন্দু নর-নারীরা। গানের মাঝে তারা ধর্ম খুঁজে পায়। শ্রী চৈতন্য দেব ও তার শিষ্যরা এ ভাবে আবির্ভূত হয়েছিল এক সংগঠিত শক্তি রূপে, হিন্দু ধর্মের অনুসারিদের  মনে যোগ করছিল এক নতুন আধ্যাত্মীকতা। কোথাও কোথাও তারা মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও গড়ে তোলে। তাদের কারণেই স্তিমিত হয়ে যায় বাংলায় ইসলামের প্রসার, যা পরবর্তীতে দারুন ভাবে প্রভাবিত করে বাংলার পরবর্তী মানচিত্র ও রাজনীতি। বলা যায়, বৈষ্ণব সাহিত্যির ফলেই বাংলার পশ্চিম অংশের জনগণের অধিকাংশই হিন্দু থেকে গেছে। ফলে ধর্মীয় ভাবে বাংলা বিভক্ত থেকে গেছে সেদিন থেকেই। বাংলার ভূগোলের সবচেয়ে দুর্বলতা এই ধর্মীয় এবং ভৌগলিক বিভক্তি। ফলে আরব, ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান যেরূপ মুসলমানদের অখণ্ড মানচিত্র রূপে গড়ে উঠে, নির্মাণ করে শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র -সেটি বিভক্ত বাংলাদেশে সম্ভব হয়নি। এভাবেই রহিত হয়ে যায় বিশ্বের মানচিত্রে একটি মুসলিম শক্তিশালী রাষ্ট্র রূপে বাংলাদেশের উত্থান। কারণ শক্তিশালী রাষ্ট্রের নির্মাণে শুধু জনশক্তিই জরুরী নয়, অপরিহার্য হল বৃহৎ ভূগোলের বল।     

তবে বাংলাদেশের মুসলিমদের বিপদ শুধু শ্রী চৈতন্য ও তাঁর আমলের বৈষ্ণব পদাবলী নয়। বাংলা সাহিত্যকে ঘিরে নানা প্রকল্প কাজ করছে মুসলিমদের চেতনা বিনাশে। বাংলার মুসলিমদের বড় ব্যর্থতা হলো বাংলা ভাষাকে যেমন তারা শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের ভাষা রূপে যথার্থ ভাগে গড়ে তুলতে পারিনি, তেমনি বাড়াতে পারিনি আরবী, ফার্সী বা উর্দুর ন্যায় অন্যান্য সমৃদ্ধ ভাষা থেকে শিক্ষা লাভের সামর্থ্য। মানুষ তার দেহের পুষ্টি বাড়াতে নানা হাটের নানা দোকান থেকে নানা দেশের খাদ্য ক্রয় করে। তেমনি মনের বা ঈমানের পুষ্টিবাড়াতে নানা ভাষার নানা বই পড়তে হয়। মুসলিম শাসনামলে, এমন কি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলেও আলেম-উলামা বা শিক্ষিত বাঙালী মুসলিমদের কাছে শিক্ষা,সংস্কৃতি ও ধর্মের ভাষা ছিল আরবী, ফার্সি বা উর্দু। কিন্তু আরবী, ফারসী ও উর্দুর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে অনেক আগেই। ফলে দিন দিন অপুষ্টি বেড়েছে বাঙালী মুসলিমের চেতনায়। অবস্থা দিন দিন আরো ভয়ানক হচ্ছে। শতবছর আগেও একজন বাঙালী মুসলিমের পক্ষে সেক্যুলার বা জাতীয়তাবাদী হওয়া অসম্ভব ছিল। মুর্তিপূজার ন্যায় সেটিকে কুফরী বা হারাম মনে করত। সে সময় আলেম বা শিক্ষিত বাঙালী মুসলিম মাত্রই ছিল প্যান-ইসলামী। তখন তাদের কাছে পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধি, বিহারী, গুজরাতী ও অন্যান্য অবাঙালী মুসলিমগণ শত্রু মনে হয়নি, বরং তাদেরকে তারা ভাই রূপে গ্রহণ করেছে। তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নেমেছে। ১৯৪৭ সালে হিন্দু ও ব্রিটিশদের প্রবল বাধার মুখে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তো তেমনি এক প্রেক্ষাপটে। অথচ আজ সেটি কল্পনা করাও অসম্ভব। ভাষার নামে সবচেয়ে বড় নাশকতাটি ঘটেছে তাই চেতনার ভূমিতে। মাত্র ৫০ বছর আগেও একজন বাঙালী মুসলিমের পক্ষে গেরুয়া ধুতি পরে মঙ্গল প্রদীপ হাতে নিয়ে মিছিল করা অচিন্তনীয় ছিল। অসম্ভব ছিল থার্টি ফাস্ট নাইট বা ভ্যালেন্টাইন দিবস পালনে রাস্তায় নামা। অসম্ভব ছিল একজন পল্লির বধুর পক্ষে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাছ পাহাড়া দেয়া বা সূদ খাওয়া। কিন্তু এমন গর্হিত তথা হারাম কর্ম এখন অহরহ হচ্ছে। বরং এসবই পরিণত করা হচ্ছে বাংলাদেশীদের সংস্কৃতিতে। 

                                                            

দৈন্যতাটি জ্ঞানের

শিক্ষাহীন, জ্ঞানহীন ও চিন্তাভাবনাহীন মানুষের পক্ষেও সুস্থ্য দেহ নিয়ে শত বছর বাঁচা সম্ভব, কিন্তু সেরূপ শূণ্যতা নিয়ে মুসলিম রূপে একদিন বাঁচাও সম্ভব নয়। এমন জ্ঞানহীন মানুষের পক্ষে মুসলিম হওয়াই অসম্ভব। সেটি যে কতটা অসম্ভব সেটিই সুস্পষ্ট করেছেন মহান আল্লাহতায়ালা নিজে। সেটি পবিত্র কোর’আনে তাঁর নিজের ঘোষণায়, “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল ওলামা” অর্থঃ একমাত্র জ্ঞানবান ব্যক্তিগণই আমাকে ভয় করে। অর্থাৎ একমাত্র জ্ঞানবান মানুষগণই প্রকৃত মুসলিম হয়। ফলে মুসলিম হওয়ার জন্য জ্ঞানবান হওয়াটি অপরিহার্য। তাই নামায রোযার পূর্বে ফরয করা হয়েছে জ্ঞানার্জন, এবং সেটি প্রতিটি মুসলমান নর-নারী উপর। পবিত্র কোর’আনের প্রথম শব্দটি তাই নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত নয় বরং ‘ইকরা’ অর্থ ‘পড়’। তাই যেখানেই মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্রের পত্তন ঘটবে সেখানে শুধু কৃষি, শিল্প ও ব্যাবসা-বাণিজ্যই গড়ে উঠবে না, গড়ে উঠবে জ্ঞান-বিজ্ঞানও। তাই মুসলিম সমাজে শুধু মসজিদই গড়ে উঠে না, গড়ে উঠে বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরী। গড়ে উঠে সৃষ্টিশীল সাহিত্য, সমৃদ্ধ হয় ভাষা। তখন বিদ্যাদানের সে ফরয কাজটি শুধু বিদ্যালয়ে চলে না, লাগাতর চলে বিদ্যালয়ের বাইরেও। মসজিদ-মাদ্রাসার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে পরিণত হয় প্রতিটি গৃহও। কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। এক্ষেত্রে বাংলাভাষার দৈন্যতাটি বিশাল। বালাভাষী মুসলিমদের সংখ্যা ইরানী ও তুর্কীদের চেয়ে বেশী। সংখ্যায় আরব, ইন্দোনেশিয়ান ও পাকিস্তানী মুসলিমদের পরই তাদের অবস্থান। কিন্তু বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার বাড়লেও বাংলা ভাষায় ইসলামী জ্ঞানের চর্চা তেমন বাড়েনি। অথচ সাহিত্য ও জ্ঞানের রাজ্যে বিপ্লব না এলে কি রাজনৈতিক শক্তি বাড়ে? নির্মিত হয় কি সভ্যতা?

বাঙালী মুসলিমদের সাহিত্য-সংকট আজকের নয়, শুরু থেকেই। মুসলিম শাসনের আগে বাংলার শাসক ছিল সেন রাজবংশ। তাদের আগমন ঘটেছিল ভারতের কর্ণাটক থেকে। বাংলা ভাষার চর্চা নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা ছিল না। বরং বাংলা ভাষা ছিল তাদের ঘৃনার শিকার। হিন্দু ব্রাহ্মণগণ এ ভাষাকে এক সময় পক্ষিভাষা বলত। ফলে তাদের আমলে বাংলা সাহিত্যে কোন উন্নয়ন ঘটেনি। বাংলাদেশের স্বাধীন সুলতানেরা প্রথম শুরু করে বাংলা ভাষার পরিচর্যা। তবে সেটি যতটা না ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে, তার চেয়ে বেশী ছিল রাজনৈতিক প্রয়োজনে। তাদের লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশসহ ভারতের পূর্ব ভাগে দিল্লির প্রভাব মূক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের নির্মাণ। শাসকগণ নিজেরা ছিলেন অবাঙালী, তাদের পরিবারে ভাষা ছিল ফার্সী। রাষ্ট্র পরিচালনা ভাষাও ছিল ফার্সী। সে সময় দিল্লির শাসকগণ ছিল মুসলিম, তাদের ভাষাও ছিল ফার্সী। ফলে দিল্লি থেকে পৃথক ভূগোলের নির্মাণের স্বার্থে প্রজাদের মাঝে একটি পৃথক ভাষাভিত্তিক দেয়াল খাড়া করাকে তারা জরুরী মনে করে। তাদের কাছে রাজনৈতিক প্রয়োজনটি বড় হওয়ার কারণে গুরুত্ব হারায় মুসলিমদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রয়োজনে আরবী, ফার্সী বা বাংলা ভাষার উন্নয়ন। অথচ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রয়োজনটি গুরুত্ব পেলে কয়েক শত বছরের মুসলিম শাসনে অন্ততঃ বাংলা ভাষায় কিছু ধর্মীয় পুস্তক রচনা বা অনুবাদের ব্যবস্থা নেয়া হত। কিন্তু সেটি হয়নি। বরং সে লক্ষে যা কিছু হয়েছে তা বেসরকারি ভাবে। এবং অতি সীমিত ভাবে।     ভা    

                                           

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিম বিদ্বেষ

 লক্ষণীয় হল, মুসলিমগণ যখন বাংলা ভাষাকে নিজেদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ভাষা রূপে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছিল তখন হিন্দুরা অনুধাবন করে ভাষার গুরুত্ব। বিশেষ করে দ্রুত-প্রসারমান ইসলামের প্রতিরোধে। এ ভাষাকে তারা একদিকে যেমন গড়ে তোলে নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতির ভাষা রূপে, তেমনি ব্যবহার করে প্রতিবেশী মুসলিমদের ইসলামী চেতনা বিনাশের লক্ষ্যে। হিন্দুদের রচিত সাহিত্যের মাধ্যমে বাংলার হিন্দুদের মাঝে যে রেনেসাঁর সূত্রপাত হয় তা আদৌ সেক্যুলার ছিল না। বরং তাতে ছিল প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক ও মুসলিম বিদ্বেষী চরিত্র। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল, দ্বীনবন্ধু মিত্র, রবীন্দনাথ ও শরৎচন্দ্রের মত যেসব ব্যক্তিবর্গ সে রেনাসাঁ আন্দোলনের নেতা ছিলেন -তারা ছিলেন মনে প্রাণে হিন্দু। তারা হিন্দুদের জাগরণ বা রেনেসাঁকে দেখতেন হিন্দু রূপে বেড়ে উঠার মধ্য দিয়ে। হিন্দুত্বের বাইরে কোন আন্দোলনকে তারা হিন্দুর জাগরণ রূপে দেখতেন না। তাছাড়া তারা সেটিকে দেখতেন অখণ্ড ভারতে বাঙালী হিন্দুদের একীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে। সে আমলেই আসে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ। বাংলা সাহিত্যে আসে তখন নতুন জোয়ার। হিন্দুদের এ জাগরণে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের সহায়তাও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্র ভাষা ছিল ফারসী। কিন্তু সেটি উচ্ছেদ করে ইংরেজীর প্রচলন করা হয়। আর এতে সরকারি খাতায় রাতারাতি নিরক্ষরে পরিণত হয় আরবী-ফারসী ভাষায় শিক্ষিত মুসলিমগণ। অপর দিকে হিন্দুগণ ইংরেজী শিখে ইংরেজ শাসনের দক্ষ কলাবেরটরে পরিণত হয়। এবং লাভ করতে থাকে নানারূপ সরকারি সুযোগ সুবিধাও। বঙ্কিম চন্দ্র ছিলেন তাদেরই একজন। ইংরেজী সাহিত্যের ধাঁচে তারাই বাংলা সাহিত্যে পদ্য ও গদ্য রচনা শুরু করেন।

আর বাংলা সাহিত্যের হিন্দু-রেনাসাঁর বাণীটি প্রবল ভাবে ফুঠে উঠে বাঙালী হিন্দুদের রাজনীতিতেও। হিন্দু রেনেসাঁ আন্দোলনের নেতাদের হাতেই তখন ভারতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব। ভারতীয় কংগ্রেস নিজেকে অসাম্প্রদায়িক সংগঠনের দাবী করলেও সেটি যে কতটা ধোকাবাজী ছিল, সেটিও সেদিন গোপন থাকেনি। তখন কংগ্রেসের নেতা ছিলেন স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। ১৮৯৫ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর তিনি পুনায় আমন্ত্রিত হন শিবাজী স্মৃতিসভায়। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “মহোদয়গণ, এখানে এই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে (দেয়ালে টাঙ্গানো শিবাজী ছবি দেখিয়ে) আমরা কি তাঁর জীবন থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারি না? এই আন্দোলনের প্রতি আমার উষ্ণতম সমর্থন ও সহানুভুতি আছে। সমগ্র ভারতের সহানুভুতি আছে। আমি জানি শিবাজী বার বার বঙ্গদেশে হামলা করেছিলেন, তাঁর বাহিনী আমাদের সম্পদ লুট করেছে, আমাদের মন্দির ও গৃহদেবতা ধ্বংস করেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ করছি যে, ইংরেজদের সভ্যতা সূচক শাসনে আমরা এখন অখণ্ড ভারতে পরিণত হয়েছি। একজন বাঙ্গালী হিসাবে শিবাজীর পবিত্র স্মৃতির প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।” –(সুত্র: স্পিচেস বাই দি অনারেবল বাবু সুরেন্দ্রনাথ বঙ্গোপাধ্যায়, পঞ্চম খন্ড, এস কে লাহিড়ী এন্ড কোং, কোলকাতা, ১৮৯৬, ৮৬ পৃঃ)।

রবীন্দ্রনাথের চেতনাও এক্ষেত্রে ভিন্নতর ছিল না। শিবাজী উৎসব সম্পর্কে গিরিরাজা শঙ্কর রায় চৌধুরী লিখেছেন,“তিলক প্রবর্তিত শিবাজী উৎসবে কবিতা, গল্প-উপন্যাস, গান ও নাটকে সে চেতনারই নানা ভাবে প্রকাশ ঘটে। তরঙ্গ বাংলাদেশেও আসিয়া লাগিয়াছিল। সখারাম গণেশ দেউস্কর সম্ভবত ১৯০২ সালে মারাঠার এই বীরপুজা বাংলাদেশে প্রবর্তিত করেন। তদবধি মহাসমারোহে কয়েকবার কলিকাতা ও মফস্বলে শিবাজী উৎসবের সাম্বাৎসরিক অধিবেশন হইয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ, বিপিনচন্দ্র প্রভৃতি সকলেই এই উৎসবে যোগদান করিয়াছিলেন। রবীন্দ্রনাথের শিবাজী উৎসব সম্বন্ধে কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে অমর হইয়াছে।(সূত্রঃ গিরিরাজা শঙ্কর রায় চৌধুরী, শ্রী অরবিন্দু ও বাংলার স্বদেশী যুগ, নবভারত পাবলিশার্স, কোলকাতা, পৃঃ ২৭৩)।

বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যিক হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার সাহিত্যের যেটি প্রবলতম দিক সেটি তাঁর আধুনিক হিন্দু মানস। হিন্দু রেনেসাকেঁ তিনিই শীর্ষে পৌছে দেন। তাই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের চরিত্রটি বুঝতে হলে বুঝতে হবে রবীন্দ্র-মানসকে। কিন্তু কি সে রবীন্দ্র-মানস বা রবীন্দ্র চেতনা? সে রবীন্দ্র-চেতনার পরিচয় তুলে ধরেছেন আবুল মনসুর আহমদ, যিনি নিজেও ছিলেন একজন সেক্যুলার চেতনার মানুষ। লিখেছেন,“হাজার বছর মুসলমানরা হিন্দুর সাথে একদেশে একত্রে বাস করিয়াছে। হিন্দুদের রাজা হিসেবেও, প্রজা হিসেবেও। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই হিন্দু-মুসলমানে সামাজিক ঐক্য হয় নাই। হয় নাই এই জন্য যে, হিন্দুরা চাহিত ‘আর্য-অনার্য, শক, হুন’ যেভাবে ‘মহাভারতের সাগর তীরে’ লীন হইয়াছিল মুসলমানেরাও তেমনি মহান হিন্দু সমাজে লীন হইয়া যাউক। তাদের শুধু ভারতীয় মুসলমান থাকিলে চলিবে না, হিন্দু মুসলমান’ হইতে হইবে। এটা শুধু কংগ্রেসী বা হিন্দু সভার জনতার মত ছিল না, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মত ছিল। -(সুত্রঃ আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১৫৮-১৫৯। রবীন্দ্রনাথের জমিদারী ছিল কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহে। এলাকার অধিকাংশ রায়তই ছিল মুসলিম। তিনি সেখানে গরু কোরবানী নিষিদ্ধ করেছিলেন, অথচ দেবী কাত্যায়নীর পুজা উপলক্ষে পনর দিনব্যাপী লাঠি খেলা ও যাত্রাভিনয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই পুজার ব্যয়ভার হিন্দু-মুসলমান সব প্রজাকে বহন করতে হতো। পনর দিনব্যাপী এই মহোৎসব অনুষ্ঠানে যে বাড়তি খরচ হতো, সে জন্য তিনি একতরফাভাবে খাজনা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলামের মত সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী লিখেছেন, “শান্তি নিকেতনে রবীন্দ্রনাথ পৌষ মেলার প্রবর্তন করেন ১৮৯৪ সালের ডিসেম্বরে। তারই অনুসরণে শিলাইদহে স্থানীয় দেবী কাত্যায়নীর পুজা উপলক্ষে ১৯০২ সালে ১৫ দিন ব্যাপী স্বদেশী মেলা প্রবর্তন করেন যেখানে লাঠি খেলা ও যাত্রাভিনয় প্রাধান্য পায়। এই মেলাতে রাখীবন্ধন ব্যবস্থাও চালু করা হয়। স্বদেশী এবং বাগ্মী কালিমোহন ঘোষকে কবি কাছে নিয়ে আসেন এই স্বদেশী মেলা উপলক্ষে। কবিগুরুর নির্দেশে তিনি সর্বক্ষণ গ্রামে গ্রামে ঘুরে শত শত যুবককে স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। -(সুত্রঃ মাযহারুল ইসলাম, কর্মযোগী রবীন্দ্রনাথঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২রা জৈষ্ঠ, ১৩৯৭।

 

হাতিয়ার ইসলামী চেতনা বিনাশের

ইসলামী চেতনা বিনাশের উপকরণ বাংলা সাহিত্যে প্রচুর। সাহিত্য কাউকে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে না। বরং ধীরে ধীরে হত্যা করে তার চেতনাকে। আর বাংলায় নিহত হচ্ছে বাঙালী মুসলিমদের ইসলামী চেতনা। এবং সেটি চলছে বহু শত বছর ধরে। সে চেতনা বিনাশী প্রকল্পের কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। মোহম্মদ কবিরউদ্দীন সরকার বহু বছর আগে বাংলার পাঠ্য পুস্তক নিয়ে তৎকালীন ‘বাসনা’ পত্রিকায় (২য় সংখ্যা, জৈষ্ঠ, ১৩১৬) লিখেছিলেন, “আজকাল বিদ্যালয়াদিতে যে সকল সাহিত্য ও ঐতিহাসিক পুস্তকাদি পঠিত হইতেছে, তাহা হিন্দু দেবদেবী, মুণি-ঋষি, সাধু-সন্নাসী, রাজা-মহারাজা, বীর-বীরাঙ্গাণা ইত্যাদির উপখ্যান ও জীবন চরিত আদিতেই পরিপূর্ণ হিন্দুর ধর্ম-কর্ম, ব্রত-অর্চনা, আচার-ব্যবহার ইত্যাদির মাহাত্ম্য বর্ণনাতেই সেই পাঠ্যগ্রন্থ অলংকৃত। মুসলমানদের পীর-অলি-দরবেশ, নবাব-বাদশাহ, পন্ডিত-ব্যবস্থাপক. বীর- সব বীরাঙ্গনাদির উপখ্যান বা জীবন-বৃত্তান্ত অথবা ইসলামের নিত্য-কর্তব্য ধর্মাধর্ম্ম ব্রত উপাসনা, খয়রাত-যাকাত ইত্যাদির মাহাত্ম্যরাজীর নামগন্ধও ঐ সকল পুস্তকে নাই, বরঞ্চ মুসলমান ধর্মের ধার্মিকদের প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষের াবই বর্ণিভাবই বর্ণিত আছে।….প্রথম বর্ণ পরিচয় কাল হইতেই আমাদের বালকগণ রামের গল্প, শ্যামের কথা, হরির কাহিনী, কৃষ্ণের চরিত্র ইত্যাদি পড়িতে থাকে। যদু-মধু, শিব-ব্রহ্মা, রাম-হরি ইত্যাদি নামেই পাঠ আরম্ভ করিতে হয়। কাজে কাজেই আমাদের সরলমতি কোমল প্রকৃতি শিশুগণ বিদ্যালয় পঠিত হিন্দুগণের উল্লিখিত বিষয়গুলোর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী হয় এবং আমাদের জাতীয় পবিত্র শাস্ত্র ও ইতিহাস উপাখ্যান ধর্ম-কর্মাদির বিষয় অপরিজ্ঞাত হইয়া থাকে।” –(সূত্রঃ মুস্তফা নুরউল ইসলামঃ সাময়িক পত্রে জীবন ও জনমত, বাংলা একাডেমী¸ ঢাকা। পৃঃ ৩০-৩১)।

ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ লিখেছিলেন,“কি পরিতাপের বিষয় আমাদের শিশুগণকে প্রথমেই রাম শ্যাম গোপালের গল্প পড়িতে হয়। সে পড়ে গোপাল বড় ভাল ছেলে। কাশেম বা আব্দুল্লাহ কেমন ছেলে সে তাহা পড়িতে পায় না। এখন হইতেই তাহার সর্বনাশের বীজ বপিত হয়। তারপর সে তাহার পাঠ্যপুস্তকে রাম-লক্ষণের কথা, কৃষ্ণার্জ্জনের কথা, সীতা-সাবিত্রির কথা, বিদ্যাসাগরের কথা, কৃষ্ণকান্তের কথা ইত্যাদি হিন্দু মহাজনদিগেরই আখ্যান পড়িতে থাকে। সম্ভবতঃ তাহার ধারণা জন্মিয়া যায়, আমরা মুসলমান ছোট জাতি, আমাদের বড় লোক নেই। এই সকল পুস্তুক দ্বারা তাহাকে জাতীয়ত্ববিহীন করা হয়। হিন্দু বালকগণ ঐ সকল পুস্তক পড়িয়া মনে করে আমাদের অপেক্ষা বড় কেহ নয়। মোসলমানরা নিতান্তই ছোট জাত। তাহাদের মধ্যে ভাল লোক জন্মিতে পারে না।” অবস্থা এতটাই গুরুতর ছিল যে মাদ্রাসাতে হিন্দুদের লেখা বই পড়ানো হতো। ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ লিখেছিলেন, “মক্তবে ও মুসলমান বালিকা বিদ্যালয়েও আমাদিগের শিশুগণকে হিন্দুর লিখিত পুস্তক পড়িতে হয়, তদপেক্ষা আর কি কলংকের কথা আছে? আমরা কি এতই  মূর্খ যে তাহাদের জন্য পুস্তক রচনা করিতে পারি না? মূল পাঠ্য ইতিহাস সম্বদ্ধে ঐ কথা। তাহাতে বুদ্ধদেবের জীবনী চার পৃষ্ঠা আর হযরত মোহম্মদ (সাঃ)এর জীবনী অর্ধপৃষ্ঠ মাত্র। অথচ ক্লাসে একটি ছাত্রও হয়তো বৌদ্ধ নহে। আর অর্ধাংশ ছাত্র মুসলমান।.. মূল পাঠ্য ইতিহাসে হিন্দু রাজাদের সম্বদ্ধে অগৌরবজনক কথা প্রায় ঢাকিয়া ফেলা হয়, আর মুসলমানদিগের বেলা ঢাকঢোল বাজাইয়া প্রকাশ করা হয়। গুণের কথা বড় একটা উল্লিখিত হয় না। ফল দাঁড়ায় এই, ভারতবর্ষের ইতিহাস পড়িয়া ছাত্ররা বুঝিল, মুসলমান নিতান্তই অপদার্থ, অবিশ্বাসী, অত্যাচারী এবং নিষ্ঠুর জাতি। পৃথিবী হইতে তাহাদের লোপ হওয়াই মঙ্গল। (সূত্রঃ আমাদের (সাহিত্যিক) দারিদ্রতা, মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আল এসলাম¸ ২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা, জৈষ্ঠ ১৩২৩, সংগ্রহে মুস্তফা নুরউল ইসলামঃ সাময়িক পত্রে জীবন ও জনমত, বাংলা একাডেমী¸ ঢাকা। পৃঃ ৩০-৩১)।

 

সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ ও সাহিত্যের নামে বিষপান

হিন্দুদের এ মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা শুধু সাহিত্যের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। সে চেতনাধারীদের হাতে অধিকৃত হয়েছিল বাংলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও। সাংবাদিক ও লেখক জনাব আবুল কালাম সামসুদ্দীন (মাসিক মোহম্মদী এবং দৈনিক পাকিস্তান) লিখেছেন, “বস্তুতঃ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় মুসলমানদের আপত্তিকর তথা হিন্দুত্বের পরিপোষক বিষয়সমুহ চালু করে বুঝাবার এই চেষ্টা চলেছিল যে, এ সবই হলো বাঙালী ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও জাতীয় বৈশিষ্ট্য। কাজেই হিন্দুদের মত মুসলমানদেরও এসবে আপত্তি করার কিছু নাই। কিছু সংখ্যক তরলমতি মুসলমান তরুণদের মনে এ প্রচরণার প্রভাব পড়ে নাই, একথা বলিতে পারি না। তাছাড়া স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মতো মনিষীও এ প্রকার উক্তি করতে দ্বিধা করেন নাই যে, মুসলমানরা ধর্মে ইসলামানুসারী হলেও জাতিতে তারা হিন্দু। কাজেই তারা ‘হিন্দু-মুসলমান’। বাঙলার শিক্ষা ক্ষেত্রে এই ‘হিন্দু-মুসলমান’ সৃষ্টির চেষ্টাই অব্যাহতগতিতে শুরু হইয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য-পুস্তকের মাধ্যমে। মুসলমান তরুণদের একশ্রেণী এ প্রচারণায় এতটা প্রভাবান্বিত হয়েছিলো যে, এদেরই গুরুস্থানীয় জনৈক চিন্তাশীল মুসলমান অধ্যাপক (কাজী আব্দুল ওদুদ) এক প্রবন্ধে নির্দ্বিধায় লিখেই ফেলেছিলেন যে এদেশী মুসলমান হচ্ছে ‘হিন্দু-মুসলমান’।-  (আবুল কালাম সামসুদ্দীন, অতীত দিনের স্মৃতী, পৃঃ ১৫০)।

রবীন্দ্র-সাহিত্যের মধ্যে যে হিন্দু সাম্প্রদায়ীকতা ও হিন্দু মানস সেটি ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের কাছে স্বভাবতই গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেটিকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য পরিল্পিত ভাবে সুগারকোট লাগানো হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে এই বলে যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অসাম্প্রদায়ীক। বলা হচ্ছে তিনি উভয় বাংলার কবি, তিনি বিশ্বকবি, ইত্যাদি বহুকিছু। প্রশ্ন হলো, রবীন্দ্রনাথ যে জন্মভূমির স্বপ্ন দেখতেন বা কথা বলতেন সেটি কি হিন্দু-মুসলমান উভয়ের? যে চেতনা ও যে ধর্মবিশ্বাসের কথা বলতেন সেটিও কি সার্বজনীন বাঙালীর? রবীন্দ্রনাথ তার ‘জন্মভূমি’ প্রবন্ধে যে জন্মভূমির কথা আলোচনা করেছেন সেখানে আছে মায়ের পূজা, মায়ের প্রতিষ্ঠা, আছে অধিষ্ঠাত্রী দেবী ও ভারতীয় ভারতীয় বীণাধ্বনি। তিনি যে মনে প্রাণে মুর্তিপূজারী হিন্দু ছিলেন তার পরিচয় রেখেোছন তার পূজারিনী কবিতায়। লিখেছেন,

“বেদব্রাহ্মণ-রাজা ছাড়া আর কিছু

কিছু নাই ভবে পূজা করিবার।”

রবীন্দ্র-দর্শন ও রবীন্দ্র সাহিত্যের উপর মূল্যায়ন করেছেন তাঁরই এক প্রগাঢ় ভক্ত শ্রী নীরদ চৌধুরি। তিনি লিখেছেন,“একটা বাজে কথা সর্বত্র শুনিতে পাই। তাহা এই, রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি হিসেবে ‘বিশ্বমানব’ ও লেখক হিসাবে ‘বিশ্ব মানবতার’ই প্রচারক। কথাটার অর্থ ইংরেজী ও বাংলা কোনো ভাষাতেই বুঝিতে পারিনা। তবে অস্পষ্টভাবে ধোঁয়া-ধোঁয়া যেটুকু বুঝি, তাহাকে অর্থহীন প্রলাপ বলিয়া মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ অপেক্ষা বিশিষ্ট বাঙালী খাঁটি বাঙ্গালী হিন্দু জন্মায় নাই।” -(সুত্রঃ ‘বাঙালী জীবনে রমণী’ নীরদ চন্দ্র চৌধুরী, পৃঃ ১৪১)।

বাংলায় হিন্দু-মুসলিমের পাশাপাশি বসবাস শত শত বছর ধরে। একই আলো-বাতাস, একই নদ-নদী,একই মাঠ-ঘাট নিয়ে তাদের বসবাস। সাধারণ হিন্দু-মুসলিমের মাঝে বিবাদ ততটা না থাকলেও হিন্দু সাহিত্যিকগণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু করেছেন সাহিত্যের ময়দানে। এমনকি রবীন্দ্রনাথও সুরুচী ও ভদ্রতার পরিচয়ও দিতে পারেননি। তাঁর “বৌ ঠাকুরানীর হাট” উপন্যাসে তিনি প্রতাব চরিত্রের মুখ দিয়ে ম্লেছদের দূর করে আর্য ধর্মকে রাহুর গ্রাস থেকে মুক্ত করার সংকল্প করেন। গোরা উপন্যাসে গোরার মুখ দিয়ে ইসলাম বিষয়ে জঘন্য উক্তি করিয়েছেন। “সমস্যাপূরণ” গল্পে অছিমদ্দিনকে হিন্দু জমিদারের জারজ সন্তান বানিয়েছেন। মুসলিমদের চরিত্র হননে সকল শালীনতার উর্দ্ধে উঠেছেন বঙ্কিমচন্দ্র। অথচ তিনিই বাংলা সাহিত্যে হিন্দুদের আদর্শ পুরুষ। মুসলিম বিদ্বেষী এ ব্যক্তিটি ছিলেন রবীন্দ্রনাথেরও অতি প্রিয়। বঙ্কিম তাঁর সাহিত্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে গালিগুলি বেছে বেছে ব্যবহার করেছেন তা হলো হীন, নীচ, কাপুরুষ, যবন, ম্লেছ, নেড়ে ইত্যাদি। আগে ‘নেড়ে’ গালিটি বৌদ্ধদের দেয়া হতো, পরে সে প্রয়োগ হতে থাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে। “কৃষ্ণকান্তের উইল”‘য়ে দানেশ খাঁকে দিয়ে মুসলিমদেরকে শুয়োর বলে গালি দিয়েছেন। “রাজসিংহ” উপন্যাসে কতিপয় স্ত্রীলোককে দিয়ে আওরাঙ্গজেবের মুখে লাথি মারার ব্যবস্থা করেছেন। “মৃণালিনী”তে বখতিয়ার খিলজীকে ‘অরণ্য নর’ বলেছেন। “কবিতা” পুস্তকে তিনি লিখেছেন,

“আসে আসুক না আরবী বানর

আসে আসুক না পারশী পামর”   

“রাজসিংহ” উপন্যাসে আওরাঙ্গজেবের কন্যা জেবুন্নিসার মুখে ভাষা গুঁজে দিয়েছেন এভাবে,

“জেবউন্নিসা হাসিয়া বলিল,“ঐ পুরাতন কথা। বাদশাহজাদীরা কখন বিবাহ করে?

মবারক। এই মহাপাপ….

জেব উন্নিসা উচ্চ হাসিল। বলিল বাদশাহজাদীর পাপ! আল্লা এ সকল ছোট লোকের জন্য করিয়াছেন –কাফেরদের জন্য। আমি না হিন্দু বামুনের মেয়ে, না রাজপুতের মেয়ে যে এক স্বামী করিয়া চিরকাল দাসত্ব করিয়া শেষে আগুনে পুড়িয়া মরিব!”

এ হলো বাংলা সাহিত্যের বড় বড় মহারথিদের চেতনার মান। তাদের মন ও মানস মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে কতটা ঘৃনাপূর্ণ ও বিষপূর্ণ ছিল -এ হলো তার নমুনা। অথচ মুসলিম-বিদ্বেষপূর্ণ বাংলা সাহিত্যকে হিন্দু-মুসলিম –উভয়ের সাহিত্য বলে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা বাড়ানো হচ্ছে বাংলাদেশে। এমন বিষপূর্ণ সাহিত্য কি মুসলিম চেতানায় পুষ্টি জোগাতে পারে?

বিষ পান সবদেশেই কম বেশী ঘটে। তবে তাতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হলেও জাতির মৃত্যু আসে না। কারণ কোন বিষই ঘরে ঘরে ছড়ায় না। কিন্তু সাহিত্যের মাধ্যমে চেতনা রাজ্যে বিষ ছড়ায় ঘরে ঘরে। তাই সাহিত্যের মাধ্যমে বিষ পান শুরু হলে বিপন্ন হয় সমগ্র জাতি। চেতনায় তখন মহামারি দেখা দেয়।  চেতনা মারা পড়লে তখন মারা পড়ে ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য বাছবিচারের নৈতিক বল। আজকের বিশ্বে তেমনি একটি নৈতিক বলহীন জাতির নমুনা হল বাংলাদেশ। এবং সে বিপন্নতাই অতি প্রকট ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে দেশটির দূর্নীতি, সন্ত্রাস, গুম-খুন, ভোটডাকাতির রাজনীতি, অর্থনৈতিক পরনির্ভরতা এবং ভারতের প্রতি আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।  লন্ডন, ১ম সংস্করণ ২০/০২/১১; ২য় সংস্করণ ২৭/১১/২০২০।  

 

  




সাতচল্লিশের স্বাধীনতা ও একাত্তরের আত্মঘাত

ফিরোজ মাহবুব কামাল

ষড়যন্ত্র ইতিহাসের বিরুদ্ধে

বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের অপরাধ বহুমুখি। তাদের লক্ষ্য মূলত ৪টিঃ এক), ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারি; দুই). বাংলাদেশে ইসলামী চেতনার বিনাশ; তিন). গণতন্ত্র হত্যা; চার). দেশের সম্পদের  উপর চুরি-ডাকাতি। এদের দাপট এতোই যে, ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে কথা বললে আবরার ফাহাদের ন্যায় লাশ হতে  হয়। অথবা ইলিয়াস আলী এবং আরো বহুশত মানুষের ন্যায় গুম হয়ে যেতে হয়। ইসলামপন্থিদের রুখতে এরা শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যা ঘটাতেও কসুর করে না। এরা পঞ্চমুখ ভারতীয় নেতাদের প্রশংসায়। অথচ শহীদ সহরাওয়ার্দী, খাজা নাযিমুদ্দীন, মাওলানা আকরাম খান, নুরুল আমীনের মত যেসব বাঙালী মুসলিম নেতাগণ বঙ্গীয় এ ভূমিকে ১৯৪৭ সালে ভারতের বুকে বিলীন হওয়া থেকে বাঁচালো -তাঁদের  কথা এরা মুখে আনে না। যেন বাংলাদশ নামক ভূমির জন্ম মুজিবের হাতে এবং সেটি ১৯৭১’য়ে। অপর দিকে ভারতের বুকে চলছে যে মুসলিম বিরোধী গণহত্যা, নারী ধর্ষণ ও ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ –তার নিয়েও এরা মুখ খুলতে রাজি নয়। ভারতে দিনদুপুরে পুলিশের সামনে যেভাবে বাবরী মসজিদ ধুলিস্যাৎ হলো –সেটিও তাদের কাছে অপরাধ নয়। মনিব চুরি-ডাকাতি, খুন-ধর্ষণ করলেও গোলাম যেমন নিন্দা না করে জোগালের কাজ করে -তেমনি অবস্থা ভারতসেবী বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের। কিন্তু এরাই অনাসৃস্টি বলে পাকিস্তানের সৃষ্টিকে এবং চরিত্রহনন করে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতাদের।

১৯০ বছর ব্রিটিশের গোলামীর পর বাঙালী মুসলিমেরা স্বাধীনতা পায় ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট। এ বিশাল সত্যকে অস্বীকার করার অর্থ ইতিহাসকে অস্বীকার করা। ১৯৭১’য়ে ভারতের বিজয় এবং পাকিস্তানের পরাজয়কে বড় করতে গিয়ে ১৯৪৭’য়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে খাটো করা হয় পরিকল্পিত ভাবে। সেটি বাংলার ইতিহাসে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের অপরাধকে আড়াল করা এবং তাদের নামকে বড় করার স্বার্থে। সে সাথে বাংলাদেশের উপর ভারতীয় আধিপত্যকে জায়েজ করার স্বার্থে। অথচ ১৯৪৭’য়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অস্বীকার করলে বাংলাদেশের অস্তিত্বই থাকে না। ১৯৪৭’য়ে প্রতিষ্ঠা পায় পাকিস্তান। আজকের বাংলাদেশ যা কিছু পেয়েছে তা পেয়েছে পাকিস্তান থেকেই। তাই বাংলাদেশের ইতিহাস বুঝতে হলে অবশ্যই জানতে হয় পাকিস্তানের ইতিহাস। বাংলাদেশ কেন ১৯৪৭’য়ে ভারতের প্রদেশ না হয়ে পাকিস্তানের প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান হলো –এটি ইতিহাসের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বাঙালী মুসলিমের বহুদিনের ব্যাথা-বেদনা, ক্রন্দন ও জীবন দর্শন –যা পশ্চিম বাংলার হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ ভিন্নতার কারণেই ১৯৪৭’য়ে বাঙালী হিন্দু ও বাঙালী মুসলিগণ একসাথে চলতে পারিনি; তাদের রাজনৈতিক পথ ভিন্নতর হয়। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসের বইগুলিতে সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি পরিকল্পিত ভাব লুকানো হয়েছে। সেটি বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের কৃত নৃশংস অপরাধগুলিকে আড়াল করার লক্ষ্যে। ১৯৭১’য়ে পূর্ব পাকিস্তানের সেক্যুলারিস্টগণ বাঙালী হিন্দুদের সাথে একই মহনায় এবং একই লক্ষ্যে মিলিত হয়। সে মিলনের লক্ষ্য ছিল যেমন পাকিস্তানের বিনাশ, তেমনি বাঙালী মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকেই বানচাল করা।      

১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগষ্ট শুধু ব্রিটিশ শাসনের গোলামী থেকে মুক্তির দিন ছিল না, বরং মুক্তির দিন ছিল অখন্ড ভারতের কাঠামোয় হিন্দুদের হাতে গোলাম হওয়ার মহাবিপদ থেকেও। কাশ্মিরী মুসলিমদের জীবনে ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগষ্ট আসেনি, ফলে তাদের জীবনে স্বাধীনতাও আসেনি। ফলে আজও তারা ভারতীয় হিন্দুদের হাতে খুন হচ্ছে, ধর্ষিতা হচ্ছে এবং নৃশংস ভাবে নির্যাতিতও হচ্ছে।  ১৭৫৭ সালে পশাশীর ময়দানে স্বাধীনতা হারানোর পর ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগষ্টই বাঙালী মুসলিম জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগষ্টের সে বিশাল অর্জনকে পরিকল্পিত ভাবে ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি মূলত বাঙালী মুসলিমের চেতনার ভূমিতে ভারতসেবীদের দখলদারী। এর লক্ষ্য, বাঙালীর ইতিহাসে একাত্তরের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নেই এবং মুজিবের চেয়ে বড় মানবও নাই –সে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। কারণ, সত্য বেঁচে থাকলে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা দেয়া যায় না। তাই মিথ্যাকে বাঁচাতে হলে সত্যকে দাফন করতে হয়। ১৯৪৭’য়ের স্বাধীনতার পিছনে বলিষ্ঠ একটি দর্শন ছিল। এবং সেটি বাঙালী রূপে নয়, বরং মুসলিম রূপে বিশ্ব মাঝে মাথা তুলে দাঁড়ানোর দর্শন। তাই ইতিহাসের বইয়ে ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগষ্ট হাজির করলে হাজির হয় বাঙালী মুসলিমের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার স্বপ্ন। তখন মারা পড়ে ভারতসেবী সেক্যুলারিস্ট বাঙালীর চেতনা। এবং সেটি হলে মুজিবসহ একাত্তরের নেতাকর্মীগণ গণ্য হয় ইসলাম ও মুসলিমের ঘৃনীত দুষমন রূপে।

 

১৯৪৭’য়ের দর্শন ও স্বাধীনতা

ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিনগুলিতে ভারতীয় মুসলিমদের সামনে চুড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এমন একটি মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যেখানে তাদের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরু নিরাপত্তা পাবে। সুযোগ পাবে নিজ ধর্ম নিয়ে স্বাধীন ভাবে বাঁচার। এবং সুযোগ পাবে সে দেশটিকে ইসলামের দুর্গ রূপে গড়ে তোলার। সে সময়টি ভারতীয় মুসলিমদের জন্য ছিল অতিশয় ক্রান্তিলগ্ন। ব্রিটিশগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা ভারত ছেড়ে শীঘ্রই চলে যাবে। হিন্দুরা প্রস্তুতি নিচ্ছিল সমগ্র ভারতের শাসন ক্ষমতা নিজ হাতে নেয়ার। ফলে বিপদ ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের পদতলে পিষ্ট হওয়ার। একবার ভারত জুড়ে হিন্দু শাসন প্রতিষ্ঠা পেলে সেখান থেকে বেড়িয়ে আসা কঠিন হতো। সে মহাবিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি দীর্ঘ লড়াইয়ের। সে লড়াইয়ে জিতবার জন্য প্রয়োজন ছিল ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে অটুট ঐক্য। প্রয়োজন ছিল এমন একজন সুযোগ্য নেতার যিনি সে ঐক্য গড়ে তোলার যোগ্যতা রাখেন। এবং যোগ্যতা রাখেন সে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়ার। তখন প্রয়োজন ছিল, স্বাধীন পাকিস্তানের কেসটি ব্রিটিশ শাসকদের দরবারে বুদ্ধিমত্তার সাথে পেশ করার। এবং প্রয়োজন ছিল, ভারতীয় মুসলিমদের শান্তুপূর্ণ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবী না মানলে গুরুতর একটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ অনিবার্য এবং তাতে ব্রিটিশদের নিরাপদে ঘরে ফেরাও যে অসম্ভব হবে -সে ভয়াবহ খবরটিও ব্রিটিশের মনে যুক্তি সহকারে বদ্ধমূল করা।

ব্রিটিশের আদালতে ভারতীয় মুসলিমদের মামলাটি কে সুন্দর ভাবে পেশ করতে পারবে -সে প্রশ্নটি সেদিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখন মুসলিম লীগ ছিল বহু ভাগে বিভক্ত। মুসলিম নেতাদের মাঝে তখন প্রতিটি প্রদেশে চলছিল প্রচণ্ড বিবাদ। বাংলায় ফজলুল হকের মত নেতা নিছক ক্ষমতার লোভে জোট বেঁধেছিলেন হিন্দু মহাসভার মত প্রচণ্ড মুসলিম বিদ্বেষীদের সাথে, গড়েছিলেন শ্যামা-হক কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা। ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশী মুসলিমের বাস ছিল বাংলায়। কিন্তু তাঁরা সমগ্র ভারতের মুসলিমদের কি নেতৃত্ব দিবে, নিজেরাই লিপ্ত ছিল প্রচণ্ড কলহবিবাদে। অথচ ভারতের বুকে তখন নতুন ইতিহাস নির্মিত হতে যাচ্ছে। আগামী বহুশত বছরের জন্য নির্মিত হতে যাচ্ছে রাজনীতির এক নতুন প্রেক্ষাপট। এমন মুহুর্তের জন্য একটি জাতিকে শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়। ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পর ভারতের শাসনভার যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের হাতে যায় তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে হিন্দুরা পাবে যা ইচ্ছে তাই করার অধিকার। এমনটি হলে মুসলিমদের জন্য শুধু মনিবের বদল হবে, স্বাধীনতা আসবে না। বরং ঘাড়ে চাপবে ব্রিটিশের চেয়েও নৃশংসদের শাসন। বাংলার মুসলিমগণ হিন্দু-মানস ও হিন্দু জমিদারদের নির্মম অত্যাচার ও শোষণ দেখেছে নিজ চোখে এবং নিজ ঘরের আঙিনায়। সেটির বিরুদ্ধে তবুও ব্রিটিশ আদালতে অভিযোগ তোলা যেত। কিন্তু সমগ্র ভারতের শাসন যদি হিন্দুদের হাতে যায় তখন দুর্বিসহ এক মহাবিপর্যয় নেমে আসবে ভারতীয় মুসলিমদের জীবনে।

 

বাঙালী মুসলিমের ১৯৪৭-পূর্ব প্রজ্ঞা

রাষ্ট্রের শাসনভার হিন্দুদের হাতে গেলে পরিনতি যে কতটা তভয়াবহ হবে -তা নিয়ে বাঙালী মুসলিম মনে সামান্যতম সংশয়ও ছিল না। বাংলার মুসলিমদের মাঝে শিক্ষার হার তখন শতকরা ৭ ভাগও ছিল না। অথচ সে নিরক্ষরতা সত্ত্বেও হিন্দু শাসনের নাশকতা টের পেতে তারা বিন্দুমাত্র ভূল করেনি। তাই গান্ধি বা নেহেরুকে তারা বন্ধু রূপে গ্রহণ করেনি। বাঙালী মুসলিমদের সেদিনের প্রজ্ঞা রক্ষা করেছিল হিন্দুদের গোলাম হওয়া থেকে। অথচ আজ কোথায় সে প্রজ্ঞা? বাংলাদেশে আজ  বহুশত প্রফেসর, বহুশত বিচারপতি, বহু হাজার আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবী। কিন্তু তারা গণতন্ত্র হত্যাকারি এক ফ্যাসিস্টকে নেতা, পিতা, বন্ধু বলছে। ভোটচোরকে মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী বলছে। এ হলো তাদের প্রজ্ঞার নমুনা। আজকের এ ডিগ্রিধারিগণ যে কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিচ্ছে, বাংলার নিরক্ষর গ্রামীন জনগণের ১৯৪৭ সালের কাণ্ডজ্ঞানটি তার চেয়ে বহুগুণ উত্তম ছিল। কাণ্ডজ্ঞান আসে বিবেকের সুস্থ্যতা, চিন্তাভাবনার সামর্থ্য, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নৈতিক সততা থেকে; বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট থেকে নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। বরং বিপদ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের কুশিক্ষা মনের সে মহৎ গুণগুলি ধ্বংস করে দিতে পারে। বাংলাদেশের আজকের শিক্ষাব্যবস্থা তো সে ধ্বংস-প্রক্রিয়াকেই প্রকট ভাবে বাড়িয়েছে। আজকের দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশ তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিপ্রাপ্ত দুর্বৃত্তদেরই সৃষ্টি।

বাংলার নিরক্ষর মানুষগুলোর ১৯৪৭ সালে সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞাটি হলো, তারা ভাষা ও আঞ্চলিক ক্ষুদ্রতার উর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন। বাংলার সীমানা পেরিয়ে এক অবাঙালী জিন্নাহকে তারা নেতা রূপে গ্রহণ করেছিলেন, হিন্দু স্বার্থের কোন সেবাদাসকে নয়। গণতন্ত্রের হত্যাকারি কোন ফাসিষ্ট নেতাকেও নয়। এটি ছিল এক অপূর্ব বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি। নইলে সেদিন পাকিস্তানই প্রতিষ্ঠা পেত না। এটি কি অস্বীকারের উপায় আছে, সুলতান মহম্মদ ঘোরীর হাতে দিল্লি বিজয়ের পর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাই ছিল দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এবং সেটি সম্ভব হয়েছিল বাঙালী মুসলিমদের প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির কারণে। তাদের সে প্রজ্ঞার কারণেই উপমহাদেশের রাজনীতির সবচেয় গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ বাংলা পরিণত হয় মুসলিম লীগের দুর্ভেদ্য দুর্গে। পাকিস্তান গড়ার চুড়ান্ত লড়াইটি হয় বাংলার রাজধানী কলকাতায়। সেটি ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগষ্ট জিন্নাহর ঘোষিত ডাইরেক্ট এ্যাকশন দিবস পালন কালে হিন্দু গুন্ডাদের হাতে ৫ হাজারের বেশী মুসলিমের প্রাণ দানের মধ্য দিয়ে। প্রয়োজনে বিপুল রক্ত দিয়েই যে মুসলিমগণ পাকিস্তান বানাবে -এ ছিল সেদিনের ঘোষণা। জিন্নাহর “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান”এর এ ছিল বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। ব্রিটিশ শাসকচক্র সেটি বুঝতে ভূল করেনি। কংগ্রেস নেতা গান্ধিও বুঝতে ভূল করেনি। ফলে পাকিস্তানের জন্মের বিষয়টি সেদিন কলকাতার রাস্তায় চুড়ান্ত হয়ে যায়। ব্রিটিশ ও কংগ্রেস –উভয়ই পাকিস্তান দাবীকে মেনে নেয়। বাঙালী মুসলিমদের সে প্রজ্ঞা ও প্রাণদান ভারতসেবী সেক্যুলারিস্ট বাঙালীদের কাছে যতই নিন্দিত হোক, কৃতজ্ঞতা ভরে তা যুগ যুগ স্মরণ রাখবে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ পাকিস্তানের জনগণ। বাংলাদেশ আজ ভারতীয় আধিপত্যের গোলাম। কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের সৃষ্ট পাকিস্তান যেরূপ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে পরিণত হচ্ছে –সেটিও কি কম গর্বের? 

অখন্ড ভারতের প্রবক্তরা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ও জিন্নাহর বিরোধীতা করবে -সেটি স্বাভাবিক। কারণ সেটি তাদের রাজনীতিতে বেঁচে থাকার মূল বিষয়। ভারতের মদদপুষ্ট বাঙালীরাও তাঁকে ঘৃনা করবে সেটিও স্বাভাবিক। কারণ, ভারতের অর্থে সে লক্ষ্যেই তারা প্রতিপালিত হয়। বরং সেটি বাংলাদেশের মাটিতে ভারতসেবী রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার বিষয়ও। কিন্তু যারা ভারতীয় মুসলিমদের স্বাধীনতা ও কল্যাণ দেখতে চান তারাও কি জিন্নাহর অবদানকে অস্বীকার করতে পারেন? তার নেতৃত্বেই তো গড়ে উঠেছিল বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। জিন্নাহই একমাত্র নেতা যিনি ভারতের সূন্নী-শিয়া, দেওবন্দী-বেরেলভী, বাঙালী-বিহারী, পাঞ্জাবী-পাঠান, সিন্ধি-বেলুচ তথা নানা ফেরকা ও নানা ভাষার মুসলিমদের একত্রিত করতে পেরেছিলেন। এটি ছিল এক বিশাল অর্জন; এবং বহুলাংশে অসাধ্য কাজ। একাজটি অন্য কারো হাতে কি হয়েছে? কার হাতেই বা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল? অথচ মুসলিমদের মাজে একতা প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। অথচ বহু নেতা ও বহু আলেম এমন মহান কাজে উদ্যোগ নেয়া দূরে থাক, আগ্রহ পর্যন্ত দেখাননি। ব্যস্ত থেকেছেন নিজেদের মাদ্রাসা বা হুজরা নিয়ে। সমগ্র ভারতের মুসলিমদের একতাবদ্ধ করা দূরে থাক, অধিকাংশ নেতা বা আলেমগণ তো ব্যস্ত থেকেছেন নিজ নিজ ফেরকা¸ মজহাব ও অঞ্চল ভিত্তিক বিভক্তি গড়া নিয়ে। অথচ বিভক্তি ও বিভেদ গড়া ইসলামে হারাম।

 

খাঁচার জীবন ও স্বপ্ন দেখার সামর্থ্য

মুসলিমগণ রাষ্ট্র গড়ে এজন্য নয় যে, সেখানে শুধু ঘর বাঁধবে, সন্তান পালন করবে ও ব্যবসা-বাণিজ্য করবে। বরং দায়ভারটি আরো বিশাল। সেটি ইসলামী রাষ্ট্র গড়া এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করা। পূর্ণভাবে ইসলাম পালন তো একমাত্র এভাবেই  সম্ভব। ইসলাম মানব জাতির জন্য কি দিতে চায় সেটিকে বিশ্ববাসীর সামনে দর্শনীয় (showcasing) করা। ঈমানদারের জীবনে এটিই তো মূল কাজ। এটি তো মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা তথা প্রতিনিধি হওয়ার দায়ভার। মুসলিমকে তাই শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়লে চলে না, ইসলামী রাষ্ট্র্ও গড়তে হয়। মুসলিম জীবনে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ও সবচেয়ে রক্তাত্ব লড়াই তো ইসলামী রাষ্ট্র্ গড়া নিয়ে। এ দায়ভার পালন করতে গিয়েই মক্কার মুসলিমগণ নিজেদের ঘরাবাড়ি ছেড়ে মদিনায় গিয়েছিলেন। এবং নিজ অর্থ, নিজ শ্রম ও নিজ রক্তের বিনিয়োগ ঘটিয়েছিলেন। নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের শতকরা ৭০ ভাগের বেশী শহীদ হয়েছেন সে দায়ভার পালনে।

খাঁচার বন্দিদশা সিংহকে যেমন শিকার ধরার দায়ভার থেকে দূরে রাখে, তেমনি অমুসলিম দেশের বন্দিদশী মুসলিমদেরকে ভুলিয়ে দেয় ইসলামী রাষ্ট্র গড়া ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দায়ভার। কেড়ে নেয় ইসলামী সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের সামর্থ্য। তাই কোন দেশে অমুসলিমদের শাসনাধীনে শরিয়ত বা ইসলামী সভ্যতার প্রতিষ্ঠা ঘটেছে ইতিহাসে তার নজির নেই। এজন্যই ব্রিটিশ ভারতের পরাধীনতার দিনগুলিতে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দূরে থাক, মুসলিমগণ তার স্বপ্নও দেখতে পারিনি। সে স্বপ্ন যেমন হোসেন আহম্মদ মাদানীর ন্যায় দেওবন্দি আলেমগণ দেখেননি, তেমনি মাওলানা মওদূদীও দেখেননি। তাবলিগ জামায়াতের মাওলানা ইলিয়াসও দেখেননি। তারা বড় জোর মসজিদ-মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা, বই লেখা, পত্রিকা প্রকাশ করা বা ওয়াজ-নসিহতে অংশ নিতে পারতেন। কিন্তু  ইসলামের মিশন বা নবীজী (সাঃ)র সূন্নত শুধু এগুলো নয়। খাঁচার পরাধীনতার সবচেয়ে বড় কুফল হল, স্বাধীন জীবনের সাধই কেড়ে নেয়। কেড়ে নেয় লড়বার আগ্রহ। আনে স্থবিরতা। এজন্যই হিজরত অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ক্ষেত্র বিশেষে সেটি ফরজ। হিজরত দেয় জালেমের জিন্দান থেকে মুক্ত হয়ে নিজের সমগ্র সামর্থ্য নিয়ে বেড়ে উঠার সুযোগ। তাই যে দেশে যত মোহাজির সে দেশে তত উন্নয়ন। পাকিস্তানে পারমানবিক বোমাসহ বহু কিছু দিয়েছে মোহাজিরগণ। অথচ বাংলাদেশে বিহারী মুহাজিরদের ঘরবাড়ী ও দোকানপাট কেড়ে নিয়ে বস্তিতে পাঠানো হয়েছে। এটি এক নিরেট অসভ্যতা এবং এসেছে একাত্তরের চেতনা থেকে।   

ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়াটি বেওকুফি। প্রথমে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, তারপর সেটির ইসলামীকরণ। ব্রিটিশ শাসনামলে শরিয়ত বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবী তুললে সেটির বিরুদ্ধে প্রবল বিরোধীতা আসতো ভারতীয় হিন্দুদের পক্ষ থেকেই শুধু নয়, ব্রিটিশের পক্ষ থেকেও। যে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার উসমানিয়া খেলাফতকে ধ্বংস করলো তাদের শাসনাধীনে থেকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবী তুললে সেটি কি তারা মেনে নিত? বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রকল্পটি তখন নর্দমায় গিয়ে পড়তো।পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় ফায়দাটি হলো, ১৯৪৭য়ের ১৪ই আগষ্টের পর দেশটির বিশাল মূসলিম জনগোষ্ঠির স্বপ্নই পাল্টে গেল। ফলে যেসব দেওবন্দী আলেম বা জামায়াতে ইসলামীর যে সব নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানে হিজরত করলেন তারা তখন স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এ হলো সবচেযে বড় সুফল। দীর্ঘ গোলামী জীবনের পর এলো এক মহা সুযোগ। জামায়াতে ইসলামের নেতারা তখন ব্রিটিশ শাসনাধীন গোলামী জীবনের দলীয় গঠনতন্ত্র তাড়াতাড়ি পাল্টিয়ে ফেললেন। সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানের রাজনীতিতে অংশ নেয়ার এবং পাকিস্তানকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার।

 

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানঃ কেন এতো পার্থক্য?

কোনটি খাঁচার পাখি আর কোনটি বনের পাখি -সেটি বুঝতে কি বেশী বিদ্যাবুদ্ধি লাগে? তেমনি কে স্বাধীন দেশের আর কে পরাধীন দেশের -সেটিও কি বুঝতে বেগ পেতে হয়? তেমনি দুই ভিন্ন চেতনার মানুষের মাঝের ভিন্নতাগুলিও সহজে ধরা পড়ে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে একাত্তরের চেতনাধারীগণ তেমনি এক ভিন্ন চরিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। অন্যদের থেকে তাদের ভিন্নতাটি যেমন দেহের নয়, তেমনি পোষাক-পরিচ্ছদ বা খাদ্যেরও নয়। বরং সেটি চেতনার। চেতনা একটি জাতির জীবনে ইঞ্জিনের কাজ করে। কখনো সেটি সামনে নেয়, কখনো বা পিছনে নেয়। এবং ইসলামী চেতনা শুধু সামনেই নেয় না, জান্নাতেও নেয়। অপর দিকে অনৈসলামিক চেতনাগুলি যেমন গুম, খুন, ফাঁসি, ধর্ষণ, চুরিডাকাতি ও ভোটডাকাতির দিকে নেয়, তেমনি নেয় জাহান্নামেও। পরিতাপের বিষয় হলো বাংলাদেশে পিছনে টানার চেতনাধারীগণই এখন ক্ষমতায়। সে নাশকতামূলক চেতনাকে তারা একাত্তরের চেতনা বলে।

একাত্তরের চেতনা যে কতটা আত্মঘাতি এবং বাংলাদেশকে যে কতটা পিছনে নিয়ে গেছে সেটি বুঝার যায় পাকিস্তানের সাথে তুলনা করা উচিত। কারণ উভয়ের যাত্রা তো একই সাথে শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশ আজ অধিকৃত ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের হাতে। পাকিস্তানে আজ বহুদলীয় গণতন্ত্র। নির্বাচনের নামে সেখানে ভোটডাকাতি হয় না। বিরোধী দলগুলি শুধু রাজপথে নয়, পার্লামেন্টেও বিপুল সংখ্যায়। সে দেশে লাখ লাখ মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ হয়ে। পুলিশ সে সব সমাবেশে হামলা করে না। বাংলাদেশের ন্যায় গুম, খুন ও ফাঁসীর রাজনীতি সেখানে নাই। পত্র-পত্রিকার রয়েছে অবাধ স্বাধীনতা। পত্রিকার সম্পাদককে গুন্ডা লেলিয়ে অপমান ও মারপিট করা হয় না। অসংখ্য টিভি চ্যানেল সেখানে মুক্তভাবে কাজ করছে। গণতন্ত্র চর্চায় বাংলাদেশ যে পাকিস্তান থেকে কতটা পিছিয়ে পড়েছে সে হুশ কি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের আছে? আর প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে? পাকিস্তান এখন বহুশত মিজাইল এবং বহু পারমানবিক বোমার অধিকারি। সেগুলির পাশাপাশি ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান তারা নিজেরাই তৈরী করে। লক্ষণীয় হলো, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের এরূপ পিছয়ে পড়া গণ্য হচ্ছে একাত্তরের চেতনার বিজয় রূপে। পাকিস্তানের নাম শুনলে যে বাকশালীরা দাঁত মাজে অন্ততঃ তাদের তো এনিয়ে লজ্জা হওয়া উচিত।

বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ বড্ড খুশি ইসলামের ভারতীয় মডেল নিয়ে। ইসলামের এ মডেলে নামায-রোযা আছে, হজ্ব-যাকাত এবং তাবলিগও আছে। কিন্তু শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কোন ভাবনা নেই। জিহাদও নেই। এটি এক অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম। ভারত সরকার ইসলামের এ ভারতীয় মডেলকেই আওয়ামী লীগ সরকারের হাত দিয়ে বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করাতে চায়। তাই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে রাজপথে না নামলে কি হবে, লাগাতর বেড়ে চলেছে তাবলিগ জামাতের ইজতেমায় লোকের সমাগম। শেখ হাসিনা নিজেও তাবলিগ জামাতের দোয়ার মজলিসে হাজির হয়। পাকিস্তানে শরিয়ত প্রতিষ্ঠিত না হলেও, সে সম্ভাবনা বিলুপ্ত হয়নি। প্রবর্তিত করেছে ব্লাফফেমী আইন। ফলে মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লিখলে বা বললে প্রাণদণ্ড হয়। প্রাসাদ গড়তে ভূমি চাই। তেমনি ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে উপযোগী দেশ চাই। পাকিস্তান মুসলিমদের জন্য সে ভূমিটা দিয়েছে। ফলে যতদিন পাকিস্তানে থাকবে, সে সম্ভাবনাও থাকবে। অথচ বাংলাদেশে আজ শরিয়ত দূরে থাক, গঠনতন্ত্রে বিসমিল্লাহ রাখাই অসম্ভব হচ্ছে। অসম্ভব হয়েছে জিহাদের উপর বই প্রকাশ করা। জিহাদকে বলা হচ্ছে সন্ত্রাস। ইসলামী সংগঠনগুলোকে জঙ্গি সংগঠন বলে নেতাদের জেলে ঢুকানো হচ্ছে।

 

হুমকি অস্তিত্বের বিরুদ্ধে

বাঘের পাল দ্বারা ঘেরাও হলে বিশাল হাতিও রেহাই পায় না। তাই যে জঙ্গলে বাঘের বাস সে জঙ্গলের হাতিরাও দল বেঁধে চলে। বাংলাদেশের বাস্তবতা হল, মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এক দেশ। ঘেরাও হয়ে আছে আগ্রাসী হিন্দুদের দ্বারা। ফলে বাংলাদেশ এক অরক্ষিত দেশ। এদেশটির সীমাবদ্ধতাও প্রচুর। যে কোন দেশের প্রতিরক্ষার খরচ বিশাল। প্রতিরক্ষার খরচ কমাতে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের জন্ম হয়েছে। আর ভারতের ন্যায় বিশাল আগ্রাসী দেশের মোকাবেলায় সে খরচ তো আরো বিশাল। এ বাস্তবতার দিকে খেয়াল রেখেই বাংলার তৎকালীন নেতা খাজা নাযিমউদ্দিন, সোহরাওয়ার্দী, আকরাম খান, নুরুল আমীন প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী সভায় লোহোর প্রস্তাবে সংশোধনী এনেছিলেন এবং পাকিস্তানে যোগ দেবার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পূর্ব বাংলা এভাবেই পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিল সেদেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশে রূপে। অথচ এরূপ পাকিস্তানভূক্তিকেই আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা বলছে পাকিস্তানে উপনিবেশিক শাসন। মিথ্যাচার আর কাকে বলে? কোন দেশে ঔপনিবেশিক শাসন গড়তে হলে যুদ্ধ লড়তে হয়। প্রয়োজন পড়ে মীর জাফরদের। প্রয়োজন পড়ে লর্ড ক্লাইভ ও পলাশীর। প্রশ্ন হল, ১৯৪৭’য়ে কে ছিল সেই মীর জাফর? কে ছিল ক্লাইভ? তবে সে মীর জাফর কি ছিলেন সোহরাওয়ার্দী? খাজা নাজিমুদ্দিন বা আকরাম খাঁ -যারা বাংলাকে পাকিস্তান ভূক্ত করেছিলেন? আর সে ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনীই বা কোথায়? মেজর জিয়া, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর আব্দুল জলিল, মেজর খালিদ মোশাররফ কি তবে সে ঔপনিবেশিক সেনা বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন?

১৯৪৭’য়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর দেশটির প্রধানতম সমস্যা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। সে সমস্যার সমাধানটি আদৌ পাকিস্তানকে খন্ডিত করার মধ্যে ছিল না। নিজ ভূমিতে ভারতকে ডেকে আনার মধ্যেও ছিল না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ রূপে শুধু পাকিস্তানের রাজনীতিতে নয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর রাজনীতিতে এবং সে সাথে বিশ্ব রাজনীতিতে বাঙালী মুসলিমগণ প্রভাব ফেলতে পারতো। কিন্তু শেখ মুজিব সে সুযোগ থেকেও তাদেরকে বঞ্চিত করেছে। বাঙালী মুসলিমদদের বিরুদ্ধে এটি হলো মুজিবের আরেক ঘৃণ্য অপরাধ। তবে জনগণও নির্দোষ নয়। জনগণের অপরাধ, তারা নির্বাচিত করেছে মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্র হত্যাকারি এক ফাসিস্টকে। তার পক্ষে শুধু যে ভোট দিয়েছে তা নয়, অর্থ, সময় এবং রক্তও দিয়েছে। সে সাথে পরম বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে ভারতীয়দের। অপর দিকে ভারতের প্রতি অন্ধ মোহ গ্রাস করছে শুধু সেক্যুলারিস্টদেরই নয়, বহু ইসলামপন্থিকেও। ১৬ই ডিসেম্বর এলে ১৯৭১’য়ের ভারতীয় বিজয় এবং বাংলাদেশের উপর ভারতের অধিকৃতিকে নিজেদের বিজয় বলে এরা উৎসবও করে। বাঙালী মুসলিমের চিন্তা-চেতনার ভূমিতে এ হলো ভয়ানক এক আত্মঘাতি রোগ। দৈহিক রোগ না সারলে তা প্রতিদিন বাড়ে। তেমনি বাড়ে চেতনার রোগও। এবং চেতনার এ রোগ অতি সংক্রামকও। তাই যে রোগটি এক সময় ভারতপন্থি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের ছিল সেটি এখন অন্যদেরও গ্রাস করছে। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এর চেয়ে ভয়ানক হুমকি আর কি হতে পারে? ১ম সংস্করণ ০৭/০৬/২০১১; ২য় সংস্করণ ১৯/১১/২০২০। 




বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁ ও নাশকতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল 

রেনাসাঁ থেকে আত্মঘাত

বাঙালী হিন্দুদের মাঝে যেমন জাগরণ এসেছে, তেমনি প্রচন্ড আত্মঘাত এবং নাশকতাও এসেছে। বাঙালী হিন্দুগণ তাদের এ জাগরণকে বলে বাঙালীর রেনেসাঁ। কিন্তু সে রেনেসাঁ কি সমগ্র বাঙালীর? তাদের আত্মঘাতটি এসেছে রেনেসাঁর ঠিক পরপরই। এবং তাদের হাত দিয়ে নাশকতাটি ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে। ঘটনার পরম্পরা দেখে মনে হয়, জাগরণটি যেন এসেছিল তাদেরকে আত্মঘাতের দিকে দ্রুত ঠেলে দেবার জন্যই। বাঙালী হিন্দুর সে আত্মঘাতটি ষোল কলায় পূর্ণ হয় ১৯৪৭ সালে বাংলার দেহ খন্ডিত করার মধ্য দিয়ে। বাংলা নিয়ে বাঙালী হিন্দুদের যে বিশাল স্বপ্ন ছিল তা যেন হটাৎ মারা যায়। ফলে ইউরোপীয় রেনেসাঁ যেমন ইউরোপীয়দের শিক্ষা, শিল্প, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে লাগাতর উন্নয়ন আনে এবং তাদেরকে বিশ্বশক্তিতে পরিনত করে, বাঙালী হিন্দুর জীবনে সেটি ঘটেনি। কিছুটা বেড়ে উঠার পর তাদের বেড়ে উঠাটি হঠাৎ থেমে যায়। বিশ্বমাঝে দূরে থাক, এমনকি ভারতীয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতেও তারা গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিনত হতে পারেনি। তবে তাদের আত্মঘাতটি নীরব আত্মহত্যা ছিল না, প্রচন্ড নাশকতা ঘটিয়েছে বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে এবং বিপন্ন করেছে বাঙালী মুসলিমের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাটি। বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশের সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ রূপে উপমহাদেশ বা মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতেই শুধু নয়, বিশ্বরাজনীতিতেও বাঙালী মুসলিম যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো সেটিও তাদের ষড়যন্ত্রে মারা পড়ে ১৯৭১’য়ে।

অথচ উনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শিক্ষা, সাহিত্য ও বিজ্ঞানে বাঙালী হিন্দুর অর্জনটি কম ছিল না। কিন্তু এখন সেটি নিছক ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বাঙালী হিন্দুর প্রচন্ড গর্ব, কিন্তু তার বিশাল সাহিত্যে বাঙালীর জাগরণ বেগবান না হয়ে বরং আত্মঘাত বাড়ায়। বলা হয়, বাঙালীর রেনেসাঁ শুরু হয় রাজা রামমোহন থেকে। আর রবীন্দ্রনাথের মরদেহের সাথে সেটিও শশ্মান ঘাটে গিয়ে পৌঁছে। তাই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বাঙালীর গর্ব বাড়ালেও আত্মঘাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। মৃত্যু যখন কোন ঘাতকের পক্ষ থেকে আসে তখন সেটি হত্যাকান্ড। আর যখন সেটি নিজ হাতের কামাই, তখন সেটি আত্মঘাত বা আত্মহত্যা। আর বাঙালীর হিন্দুদের জীবনে দ্বিতীয়টিই এসেছিল। এবং সে আত্মঘাতের ঘটনাটি শ্রী নিরোদ চন্দ্র চৌধুরীর চোখেও ধরা পড়েছিল। তবে নীরদ বাবুর ভূল হলো, তিনি সেটিকে হিন্দু বাঙালীর আত্মঘাত না বলে তাঁর লিখিত “আত্মঘাতি বাঙালী” বইতে বাঙালীর আত্মঘাত বলেছেন। সম্ভবত তিনি সেটি ইচ্ছাকৃত ভাবেই বলেছেন। কারণ, শরৎচন্দ্র চ্যাটার্জীর মত তিনিও হয়ত বাঙালী বলতে শুধু বাঙালী হিন্দুদেরই বোঝাতেন। যেমন শরৎচন্দ্র লিখেছেন, “আমাদের স্কুলে বাঙালী ও মুসলমানদের মাঝে খেলা।”

 

চেতনায় মুসলিম বিদ্বেষ

বাংলার ইতিহাসে বড় সত্যটি হল, এ দেশে ইসলামের আগমন ও মুসলিম শাসনকে হিন্দুরা কখনই মেনে নিতে পারিনি। তেল আর পানি যেমন একত্রে মেশে না, তেমনি বাংলার হিন্দু ও মুসলিমগণ ৮ শত বছরের বেশী কাল পাশাপাশি বসবাস করলেও তাদের মাঝে সৌহাদ্য-সম্প্রীতি গড়ে উঠেনি। মুসলিমগণ হিন্দুদের কাছে ম্লেছ, মোছলা, যবন, নেড়ে এবং বহিরাগতই রয়ে গেছে। সেটি যেমন বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের মত প্রথম সারির হিন্দু সাহিত্যিকের লেখায়, তেমনি সাধারণ হিন্দুদের চেতনায়। ঘৃনাপূর্ণ হিন্দু-মনের বেদনায়ক সে স্মৃতিটি বাংলার মুসলিমদের ঘরে ঘরে। তারই ক্ষুদ্র চিত্র তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক জনাব আসাফউদ্দৌলাহ। ঢাকায় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “পড়তাম ফরিপুর জেলা স্কুলে। কোনদিন ক্লাসে দ্বিতীয় ছাড়া প্রথম হতে পারিনি। প্রথম হলাম ১৯৪৮ সালে। হিন্দু শিক্ষকদের কাছে আমরা ছিলাম মোছলা। পাজামা পড়তাম বলে বলতো দোনালা। আমার নাম আসাফউদ্দৌলাহ, অথচ হিন্দুরা সে নামে না ডেকে বলতো ফসফসা। হিন্দু বন্ধুদের বাসায় গিয়েছি এবং একবার ভূলে বই ফেলে আসি। বই আনতে গিয়ে দেখি আমার বন্ধুর মা তীব্র ভাষায় গালী-গালাজ করছে। বলছে সব অপবিত্র হয়ে গেছে। আমি যেখানে বসেছিলাম সে জায়গা ও সে চেয়ার পানি ঢেলে ধুচ্ছে। হাফইয়ার্লী পরীক্ষার খাতায় বাবরকে ভারতের শ্রেষ্ঠ শাসক লেখেছিলাম। কেন চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত বা অশোক লিখলাম না -সে অপরাধে আমাকে বেঞ্চের উপর দাঁড়াতে বলা হয়েছে। পিয়নকে দিয়ে হাতের তালুতে বেতের ঘা মারা হয়েছে।” (সূত্রঃ বক্তৃতার ইউটিউব ভিডিও)। হিন্দু মনে ঘৃণার মাত্রাটা এতটাই অধিক ছিল যে, মুসলিমদের পৃতৃদত্ত নামটাকেও তারা সঠিক ভাবে বলতো না। কোলকাতার হিন্দু পত্রিকাগুলো প্রখ্যাত মুসলিম লীগ নেতা ও দৈনিক আজাদ পত্রিকা সম্পাদক জনাব মাওলানা আকরাম খাকে বলতো আক্রমণ খাঁ। আরেক নেতা জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে বলতো সুরাবর্দী।  

প্রতিবেশীকে বিকৃত নামে ডাকা, গালী দেয়া বা ঘৃণা করা ভদ্রতা নয়, সুরুচীর ও সুশীল মনের পরিচয়ও নয়। বিশেষ করে সে প্রতিবেশীকে, যার সাথে একই গ্রাম-গঞ্জ ও মাঠ-ঘাট, একই আলো-বাতাস, একই নদী-পুকুর, একই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, একই রাস্তাঘাট ও হাট-বাজার ভাগাভাগি করে বসবাস করতে হয়। অথচ হিন্দু মনে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণার মাত্রাটি এতটাই অধিক ছিল যে, কোন মুসলিম হিন্দুর ঘরে পা রাখলে গঙ্গাজল ও গোবর ছিটিয়ে সে স্থান পবিত্র করতো। সে চিত্রটি চোখে পড়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা “গোরা” উপন্যাসেও। প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এমন ঘৃণা এবং এমন বিদ্বেষের নজির বিশ্বের আর কোন দেশে নাই। যার সাথে একত্রে বসবাস -তার বিরুদ্ধে এমন ঘৃণা কি সে রাষ্ট্রে বা সমাজে শান্তি আনে? বরং তাতে তীব্রতর ও রক্তাত্ব হয় বিভক্তি ও সংঘাত। আরো বিপদ হল, ঘৃণার সে বীজকে বাঙালী হিন্দুরা শুধু বাংলাতে সীমাবদ্ধ রাখেনি, ছড়িয়ে দিয়েছে সমগ্র ভারত জুড়ে। আর প্রতিবেশীর প্রতি ঘৃণা যখন প্রবলতর হয়, তখন তাদের প্রতি সহানুভুতি, সুবিচার বা কল্যাণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। বরং তাদের ঠকানো বা শোষন করাটাই সামাজিক নীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে যে ঘৃণার উপর ভিত্তি করে মুসলিমদের শোষণ ও বঞ্চনার প্রক্রিয়া বাংলাতে শুরু হয়েছিল -সেটিই এখন সমগ্র ভারত জুড়ে।

বাংলার হিন্দু জমিদারগণ মারা গেছেন। কিন্তু তাদের অবিচারটি বেঁচে আছে খোদ ভারত সরকারের নীতিতে। ফলে হিন্দু জমিদারগণ মুসলিম প্রজাদের সাথে যেরূপ অত্যাচার করতো -সেটিই হচ্ছে সমগ্র ভারতীয় প্রশাসনে। ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ। অথচ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কর্তৃক স্থাপিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে, সরকারি চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৩ ভাগেরও কম, বড় চাকুরিতে দূরে থাক ছোট চাকুরিতে তাদের স্থান নেই। বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার তারা সর্বত্র। শুধু মাত্র ঢাকা, লাহোর বা করাচীর মত একটি শহরে যতজন মুসলিম ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, ব্যবসায়ী, বিচারক, আইনজ্ঞ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বাস করে সমগ্র ভারতে ২০ কোটি মুসলমানের মধ্যেও তা নেই। ভারতীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের বিবেকহীন অবিচার ও নাশকতা যে কতটা গভীর সেটি বোঝার জন্য কি এ পরিসংখ্যানটিই যথেষ্ট নয়? আরো ভয়ানক বিবেকহীনহতা হল, এটি যে প্রচন্ড অন্যায় ও অবিচার -সেটিও আজকের ভারতে রাজনীতির কোন প্রসঙ্গ নয়। ফলে প্রতিকারেরও কোন উদ্যোগ নেই। দুর্বৃত্তি, অবিচার ও অনাচার প্রতি সমাজেও ঘটে। কিন্তু সভ্য সমাজের পরিচয় হল, সে দুর্বৃত্তি ও অনাচার অপরাধ রুপে চিত্রিত হয় এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠে এবং প্রতিকারেরও ব্যবস্থা হয়। কিন্তু ভারতে হচ্ছে তার উল্টোটি। দিন দিন শুধু অবিচারই বাড়ছে না, অবিচারের সাথে মুসলিমের জানমাল ও ইজ্জতের উপরও হাত পড়ছে। বার বার দাঙ্গা বাঁধিয়ে মুসলিম-হত্যা হচ্ছে, তাদের নারীরা ধর্ষিতা হচ্ছে, মসজিদও ধ্বংস করা হচ্ছে। আজ থেকে শত বছর আগে বাবরী মসজিদের ন্যায় ঐতিহাসিক মসজিদকে গুড়িয়ে দেয়া হয়নি। অথচ এখন সেটি হচ্ছে। এবং অতি উৎসবভরে হচ্ছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, এরূপ জঘন্য অপরাধও চিত্রিত হচ্ছে না কোন অপরাধ রূপে। ফলে সে অপরাধের কোন বিচার হচ্ছে না, সেজন্য কারো কোন শাস্তিও হচ্ছে না। ভারতীয় হিন্দুদের মত যে মুসলিমবিদ্বেষে কতটা ভয়ানক ভাবে অসুস্থ্য -সেটি কি এর পরও বুঝতে বাঁকি থাকে?

অথচ মুসলিম শাসকগণ হিন্দুদের শুধু প্রশাসনিক আমলা, জমিদার, হিসাবরক্ষক, তালুকদারই পদেই বসায়নি, তাদেরকে মন্ত্রী এবং সেনাপতির পদেও বসিয়েছে। মোঘল বাদশাহদের ন্যায় নবার সিরাজুদ্দৌলার গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতিও ছিলেন হিন্দু। মুসলিম শাসনামলে দেশে হিন্দু-মুসলিমের মাঝে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে –সে ইতিহাস বিরল। কিন্তু তাতেও হিন্দুদের মনে মুসলিম বিদ্বেষ ও ঘৃনার মাত্রা বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং সে বিদ্বেষ এতটাই প্রবল ছিল যে, মুসলিমদের চরম শত্রুদের তারা পরম বন্ধু রূপে গ্রহন করেছে। তাদের মাঝে কাজ করেছে শত্রুর বন্ধুকে বন্ধু রূপে গ্রহন করার নীতি। এরই প্রমাণ, প্রতিবেশী বাঙালী মুসলিমদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ না করতে পারলে কি হবে, বহু হাজার মাইল দূরের অন্য এক মহাদেশ থেকে আগত ইংরেজদের তারা বিস্বস্ত বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে। ইংরেজের যে গুণটি তাদেরকে আকৃষ্ট করেছে তা হল তাদের মুসলিম-বিনাশী নীতি। একই ভাষা ও একই ভূখন্ডে বসবাসকারি বাঙালী মুসলিমদের প্রতি এই হলো তাদের বাঙালীত্বের নমুনা। মুসলিমদের মুসলিম হওয়াটাই তাদের কাছে অপরাধ গণ্য হয়েছে। ফলে পল্লির নিরীহ কৃষক প্রজাটিও হিন্দু জমিদারের অত্যাচার ও শোষন থেকে নিষ্কৃতি পায়নি। মুখের দাড়ী রাখার জন্যও তাকে খাজনা দিতে হয়েছে। মুসলিম-বিরোধীতা বাঙালী হিন্দুর মনে এতটা প্রবল ভাবে বাসা বেঁধেছিল যে যখনই কোন কিছুতে মুসলিমের কল্যাণ দেখেছে তখনই প্রাণপনে সেটির বিরোধীতা করেছে। সেটি ১৯০৫’য়ের বঙ্গভঙ্গ হোক বা ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হোক বা ১৯৩৫ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিমদের সরকার গঠন হোক বা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হোক বা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেশটির টিকে থাকার বিষয় হোক। এমন বিষপূর্ণ চেতনার কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোলকাতার রাস্তায় মিছিল করেছেন। ১৯৩৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙলী মুসলিমদের অবিভক্ত বাংলায় সরকার সুযোগ আসে। সেটি ভোটার তালিকায় মুসলিমদের সংখ্যা হিন্দুদের চেয়ে অধিক হওয়ার কারণে। কিন্তু সেটি রবীন্দ্রনাথের মত ব্যক্তিদের কাছে ভাল লাগেনি। মুসলিমগণ যাতে বাংলায় মন্ত্রীসভা গঠন না করতে পারে সে জন্য ১৯৩৬ সালের জুন মাসে বাংলার তৎকালীন গভর্নরের কাছে বাঙালী হিন্দুগণ পত্র লেখে। তাতে দাবী করা হয়, বাঙালী মুসলিমগণ যেহেতু শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থসম্পদ ও সামাজিক মর্যাদায় বাঙালী হিন্দুদের চেয়ে নীচে, অতএব হিন্দুদের উপর তাদের শাসক হওয়ার কোন অধিকার নাই। এবং সে পত্র স্বাক্ষর করেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের চরম মুসলিম কি  এরপরও গোপন থাকে। অথচ তাঁর গানই বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত! সে পত্রে সাক্ষর করেছিলেন এমন কি শরৎচন্দ্র চন্দ্র চট্টপাধ্যয়ও। অপর দিকে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির দাবী ছিল, মুসলিমগণ যেহেতু নিন্মবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত -ফলে তাদের অধিকার নেই হিন্দুদের উপর শাসক হওয়ার। -(সৌমিত্র দস্তিদারের ডকুমেন্টারী)।     

 

সভ্যতার সংঘাতে বাঙালী হিন্দু

প্রফেসর হান্টিংটন তাঁর “Clush of Civilisation” বইতে সভ্যতার অনিবার্য সংঘাতের কথা বলেছেন। সে সংঘাত ইসলামী সভ্যতার সাথে পাশ্চাত্য সভ্যতার। তাঁর পরামর্শ, সে লড়াইয়ে জিততে হলে পাশ্চত্য শক্তিকে হিন্দুভারত ও রাশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য শক্তির সাথে কোয়ালিশন গড়তে হবে। হান্টিংটনের মতে মুসলিম সভ্যতাই পাশ্চাত্যের খৃষ্টান সভ্যতার মূল প্রতিদ্বন্দী। এ পরামর্শটি তিনি এমন এক সময় দিয়েছেন যখন মুসলিমগণ পরাজিত, বিভক্ত ও অধঃপতিত এবং মুসলিম রাষ্ট্রগুলির অধিকাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে পাশ্চাত্য শক্তির হাতে অধিকৃত। কিন্তু ১৭৫৭ সালে বাংলায় ইংরেজ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা যখন শুরু হয় তখন মুসলিমদের অবস্থা আজকের মত দুর্বল ছিল না। তখন মুসলিমগণই ছিল প্রধানতম বিশ্বশক্তি। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশরা বিশ্বশক্তি হওয়া দূরে থাক, উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তিও ছিল না। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় ঘটে নিতান্তই প্রাসাদ ষড়ন্ত্রের ফলে, দুর্বল সামরিক শক্তির কারণে নয়। তখনও বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা ছাড়া প্রায় সমগ্র ভারত মুসলিমদের হাতে। উসমানিয়া খেলাফতের দখলে তখনও গ্রীস, বুলগিরিয়া, বসনিয়া, সার্বিয়া, সাইপ্রাস, মেসিডোনিয়া, ক্রিমিয়া, আলবেনিয়াসহ ইউরোপের বিশাল ভূ-ভাগ। ইরান, আফগানিস্তান তখনও শক্তিশালী স্বাধীন রাষ্ট্র। ঠিক এমন অবস্থায় বাংলা থেকে শুরু হয় ব্রিটিশ শক্তির মুসলিম ভূমিতে আগ্রাসন। সভ্যতার সংঘাতটি শুরু হয় বস্তুত তখন থেকেই। প্রফেসর হান্টিংটন যে পরামর্শটি দিচ্ছেন, ইংরেজগণ সেটির প্রয়োগ করেছে আজ থেকে প্রায় তিনশত বছর আগেই। তারা জানতো, মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন ও সে বিজয় ধরে রাখা তাদের একার পক্ষে অসম্ভব। ফলে শুরুতেই তারা বিশ্বস্ত পার্টনার খুঁজতে থাকে। পার্টনার তাঁরা পেয়েও যায়। মুসলিমদের মধ্য থেকে মীর জাফরদের ন্যায় মুষ্টিমেয় কিছু বিশ্বাসঘাতক পেলেও তাঁদের মূল পার্টনার ছিল বাঙালী হিন্দুগণ।

বাঙ্গালী হিন্দুর মন যে কতটা বিষপূর্ণ ও প্রতিহিংসাপূর্ণ ছিল সেটির বহিঃপ্রকাশ ঘটে ইংরেজ আমলে রচিত তাদের সাহিত্যে। সেটি যেমন প্রকাশ পায় বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বচন্দ্রগুপ্ত, নবীনচন্দ্র, হেমচন্দ্রের মত প্রচন্ড মুসলিম বিদ্বেষী সাহিত্যিকদের লেখায়, তেমনি প্রকাশ পায় রবীন্দ্র ও শরৎ-সাহিত্যেও। শুধু সাহিত্যে নয়, প্রচন্ড মুসলিম বিদ্বেষ ফুটে উঠে বাঙালী হিন্দুর শিক্ষাব্যবস্থা, পত্র-পত্রিকা, রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও। অথচ এই আমলটিই হল বাঙালী হিন্দুদের সবচেয়ে আলোকিত ও সবচেয়ে গৌরবের। তাজ্জবের বিষয়, এ আমলে বাংলার হিন্দুদের মাঝে পাশ্চাত্যের শিক্ষা, সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটলেও তাদের মনের বিদ্বেষপূর্ণ কুৎসিত অন্ধকারটি তাতে দূর হয়নি। বরং বেড়েছে বহুগুণ। এদিক দিয়ে বলা যায়, বাঙালীর ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে অন্ধকার যুগ। সে সময় যতই বেড়েছে হিন্দুর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, ততই বেড়েছে তাদের মনে মুসলিম বিদ্বেষ। হিন্দু-মুসলিমের ধর্ম ও মতের অমিলগুলো শত শত বছরের। কিন্তু কোন কালেই হিন্দুদের কবিতা, গান, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও ছড়ায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে এতো ঘৃণা, এতো গালি, এতো মিথ্যাচার এতোটা তীব্র ভাবে ভাবে প্রকাশ পায়নি, যা পেয়েছে তথাকথিত এ রেনেসাঁ আমলে। মুসলিম বিরোধী প্রচারে হঠাৎ এমন জোয়ার সৃষ্টির অন্যতম কারণ ইংরেজদের পক্ষ থেকে দেয়া উস্কানি। শুরু থেকেই ইংরেজদের নীতি ছিল devide and rule অর্থাৎ ভাগ করো এবং শাসন করো। নিজেদেরকে সেক্যুলার রূপে দাবী করলেও তারা এখানে বিভেদের রেখাটি টেনেছে ধর্মের নামে। আর ভাগাভাগীটা তো তখনই তীব্রতর রূপ নেয় যখন সেটি প্রতিষ্ঠিত হয় গভীর ঘৃণার উপর। হিন্দু-মুসলিমের এ ভাগাভাগীটা না হলে মুষ্টিমেয় ইংরেজের পক্ষে কি ভারত শাসন সম্ভব হত? ভারতে ব্রিটিশে শাসনের প্রতিরক্ষায় এতো ইংরেজ লাঠি ধরেনি বা কলম ধরেনি যত হিন্দু বাঙালী ধরেছে। এখানে হিন্দুর মনে যে বিষয়টি প্রবল ভাবে কাজ করেছে সেটি হলো, মুসলিম ভীতি ও মুসলিমদের থেকে প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছা। এমন এক ভীতিপূর্ণ ও প্রতিশোধ-পরায়ন মানসিক অবস্থার কারণেই ইংরেজ শাসন তাদের কাছে আশির্বাদ মনে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তসহ অধিকাংশ হিন্দুদের সাহিত্যে সে সুরটি প্রবল।    

 

রেনাসাঁ থেকে স্নায়ুযুদ্ধ

হিন্দুদের মনে মুসলিম বিরোধী ঘৃণা সৃষ্টির মূল দায়িত্বটি পালন করে ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্ট তথা প্রাচ্যবিদগণ। সেটি মিথ্যা ইতিহাস রচানার মাধ্যমে। গবেষণার নামে বিকৃত ইতিহাস লেখা তখন সাম্রাজ্যবাদীদের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এসব ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্টগণ হিন্দুদের মনে এ বিশ্বাসটি বদ্ধমূল করে যে, অতীতে তাদের সভ্যতা ছিল এবং সে সভ্যতা স্বর্ণোজ্বলও ছিল। আরো বলে, সেটি ধ্বংস করেছে বহিরাগত মুসলিম শাসকেরা। মুসলিমগণ এভাবে চিত্রিত হয় হিন্দুদের পরম শত্রু রূপে। এসব ওরিয়েন্টালিস্টদের লেখা সেসব বই বগলে করে আধুনিক হিন্দু লেখকগণ সভা-সমিতি করেছে এবং সেগুলির সাথে আরো রং চং মেখে সারা ভারতের হিন্দুদের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। নিজেদের পূর্বপুরুষদের যদি অন্য দেশের প্রফেসর এসে রাজপুত্র এবং এক গৌরবজনক সভ্যতার নির্মাতা বলে -তবে সেটি কার ভাল না লাগে? তখন বরং সে সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে নাচতে শুরু করবে –সেটিই তো স্বাভাবিক। তেমন উল্লাসের ভাব ভারতীয় হিন্দুদের মাঝেও এসেছিল। অথচ মুসলিমগণ যখন বাংলা দখল করে তখন এদেশে পিরামিডের ন্যায় পিরামিড, চীনের দেয়ালের ন্যায় দেয়াল বা ব্যাবিলিয়নের উদ্যানের ন্যায় উদ্যান পায়নি। তখন সমগ্র ভারত জুড়ে দিল্লি, লাহোর বা আগ্রার ন্যায় কোন শহর ছিল না। কুতুব মিনারের ন্যায় কোন মিনার এবং তাজমহলের ন্যায় কোন সৌধও ছিল না। ফলে সেগুলো ধ্বংস করার প্রয়োজন দেখা দেয় কি করে? বরং সে আমলের মন্দিরগুলি ভারতের নানা স্থানে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। বরং ঐতিহাসিক স্থাপত্য ধ্বংসের ইতিহাস গড়ছে তো হিন্দুগণ। বাবরী মসজিদের বিনাশ তো তারই প্রমাণ।

মিথ্যা অভিযোগ খাড়া করতে গবেষণা লাগে না। সেটি উৎপাদিত হয় মিথ্যুকের মগজে। এবং সে কাজে ওরিয়েন্টালিস্টদের মগজের উর্বরতা কম ছিল না। শুধু  বাংলা বা ভারতে নয়, ইংরেজগণ যেখানেই গেছে সেখানেই বিভক্ত সৃষ্টির এ কাজটি অতি সুচারু ভাবে করেছে। তাতে ফল দাড়িয়েছে, নানা বর্ণ ও নানা ভাষার জনগণ যেখানে শান্তিপূর্ণ ভাবে শত শত বছর পাশাপাশি বসবাস করেছে, তাদের পক্ষে একত্রে এক ভূখন্ডে বসবাস করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। গবেষণার নামে বই লেখে আরবদের ক্ষেপিয়েছে তুর্কী ও ইরানীদের বিরুদ্ধে, আবার ইরানী ও তুর্কিদের ক্ষেপিয়েছে আরবদের বিরুদ্ধে। অপরদিকে তুর্কি, কুর্দি ও ইরানীদের থেকে দূরে টানার পর আরবদেরকেও তারা একতাবদ্ধ থাকতে দেয়নি। তাদের মধ্যে বিভেদ গড়েছে বিভিন্ন গোত্র ও বিভিন্ন ভৌগলিক এলাকার নামে। মধ্যপ্রাচ্য আজ যেরূপ ২২ টুকরায় বিভক্ত -সেটি তো সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিকদের সৃষ্ট। এর কারণ, তারা নিজেদের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ দেখে মুসলিমদের বিভক্ত রাখার মাঝে। ফলে মুসলিমদের বিভক্ত করা ও পদতলে রাখাই তাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি।

শত্রু দেশের আগ্রাসনটি নিছক রণাঙ্গণে সীমিত থাকে না, সেটি হাজির হয় সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় আগ্রাসন নিয়েও। শুরু হয় স্নায়ু যুদ্ধ। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ইংরেজদের লড়াইটি তাই পলাশীর ময়দানে শেষ হয়নি। বরং সেটি তীব্রতর হয়েছে শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও অর্থনীতির ময়দানে। সে লড়াইটি তীব্রতর করতে বাংলায় এবং পরে ভারতে তারা শুধু সামরিক সেনা ছাউনিই গড়েনি, গড়েছে শিক্ষা, ধর্ম, গবেষণা ও সংস্কৃতির নামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। তাই সৈনিকদের পাশাপাশি বহু প্রফেসর ও গবেষকও এনেছে। তাই ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা একদিকে যেমন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ গড়ে এদেশের হিন্দুদের ব্রিটিশরাজ রক্ষার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তেমনি এসিয়াটিক সোসাইটি গড়ে গবেষণার নামে হিন্দুদের মন মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিষাক্ত করার লক্ষ্যে বইয়ের পর বই লিখেছে। শুধু সামরিক শক্তির জোরে কোন শক্তিই কোন দেশকে বেশী দিন ধরে রাখতে পারে না। শক্ত ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে গাছ যেমন মজবুত শিকড় গড়ে, সরকারও তেমনি দেশের জনগণের গভীরে ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংযোগ গড়ে। এই মজবুত সংযোগটির কারণেই ভারতে মুসলিম শাসন সাড়ে ছয়শত সাল টিকে থাকে।

ইংরেজদের কাছেও এদেশে সাম্রাজ্য স্থাপনের লক্ষ্যটি নিছক কিছু বছরের জন্য ছিল না, ছিল শত শত বছরের জন্য। তারা জানতো, নব প্রতিষ্ঠিত এ সাম্রাজ্যের আয়ু বাড়াতে হলে শুধু দেশের ভূগোলে নয়, মনের ভূগোলেও অধিকার জমাতে হবে। এদেশবাসীর মধ্য থেকে প্রচুর সংখ্যক দালাল বা কলাবোরেটর গড়ে তুলতে হবে। নইলে কয়েক হাজার প্রবাসী ইংরেজদের দ্বারা এ বিশাল ভারত দীর্ঘকাল অধিকারে রাখা অসম্ভব। এ লক্ষ্যে ধর্মান্তর যেমন জরুরী, তেমনি জরুরী হলো বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কনভার্শন। তারা এটাও জানতো, কলাবোরেটর বা সহযোগী খোঁজার কাজটি করতে হবে হিন্দুদের মাঝে। কারণ তারা জানতো, সে কাজটি সহজ নয় মুসলিমদের মাঝে। ইংরেজগণ রাজ্য ছিনিয়ে নেয় মুসলিমদের থেকে। ফলে মুসলিমদের কাছে ইংরেজগণ ছিল তাদের স্বাধীনতা, ধর্ম, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির দুষমন। মুসলিম মনে এ পরাজয়ের বেদনাটি ছিল প্রতিদিন ও প্রতি মুহুর্তের। ব্রিটিশরা সেটি বুঝতো। ফলে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিস্তার ও সেটি প্রতিরক্ষার বিরুদ্ধে মুসলিমদেরকেই তারা মূল শত্রু ভাবতো। এবং নির্ভরযোগ্য পার্টনার ভাবতো হিন্দুদের। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কনভার্শনের উর্বর ক্ষেত্র রূপে গণ্য হয় শিক্ষাঙ্গণ। হিন্দুদের জন্য গড়া হয় স্কুল-কলেজ। সেসব স্কুল-কলেজ থেকে বাঙালী হিন্দুগণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি সেবাদাস মানস নিয়ে বেরুতে শুরু করে। তারা পরিনত হয় ব্রিটিশ শাসনের পাহারাদার সৈনিকে। এভাবে বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁ বেড়ে উঠে ব্রিটিশসেবী এক দালাল চেতনা নিয়ে।  

 

ব্রিটিশের মুসলিমদলন ও হিন্দুলালন নীতি

কৃষক তার গরুকে ঘাস দেয়ে যাতে সে লাঙল টানতে পারে। তেমনি ইংরেজগণও শিক্ষার নামে হিন্দুদের সামর্থ্য বাড়িয়েছে -যাতে তারা ব্রিটশদের শাসন ও লুন্ঠনে সহায়তা দেয়। ফলে রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি গুরুত্ব পায় হিন্দুদের মাঝে ইংরেজী ভাষা, ইংরেজের দর্শন, সাহিত্য ও সংস্কৃতির দ্রুত বিস্তার। অপর দিকে মুসলিমদের অশিক্ষিত রাখা ও অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল রাখার মাঝে নিজেদের কল্যাণ দেখে। প্রণীত করে এমন এক শিক্ষানীতি –যাতে ব্যাপকতর হয় ভারত ভূমিতে দালাল উৎপাদনের কাজ। ভারতে এমন একটি শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য ব্যাখা করতে গিয়ে লর্ড ম্যাকলে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “ব্রিটিশ সরকার ভারতে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করবে যার মাধ্যমে এমন একদল ভারতীয় সৃষ্টি হবে যারা শুধু রক্তে-মাংসে হবে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তা-চেতনা, মন ও মননে হবে ব্রিটিশ (অর্থাৎ ব্রিটিশের সেবক)।” সে স্ট্রাটেজীকে সামনে রেখে ময়দানে নামে উইলিয়াম কেরীর ন্যায় বহু পাদ্রী। প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীরাম পুর কলেজ, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, হিন্দু কলেজ  ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। গড়ে তোলা হয় ছাপাখানা। প্রকাশনা শুরু হয় বহু পত্র-পত্রিকার। লক্ষ্য, বাংলার হিন্দুদেরকে তাদের প্রতিবেশী মুসলিমদের থেকে সামাজিক মর্যাদার দিক দিয়ে আলাদা করা। এবং মন ও মননে, চেতনা ও দর্শনে নিজেদের কাছের মানুষ রূপে গড়ে তোলা। বাংলার হিন্দুদের মাঝে তখন সাজ সাজ রব, বিশেষ করে বর্ণ হিন্দুদের মাঝে। প্রশাসন, বিচার ও শিক্ষা থেকে মুসলিমদের পরিকল্পিত ভাবে হঠিয়ে হিন্দুদের জন্য বিশাল শূণ্যস্থান সৃষ্টি করা হয়। তাদের জন্য সষ্টি করা হয় অর্থ উপার্জনের বিপুল সুযোগও। ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর কেরানী, এজেন্ট ও ঠিকাদার এবং ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব কালেক্টর, আদালতের মুন্সেফ-ম্যাজিস্টেট বা উকিল, ব্রিটিশ গুপ্তচর সংস্থার এজেন্ট -এগুলো হয়ে দাঁড়ায় সে কালের বাঙ্গালী হিন্দুদের কাছে অতি আকর্ষণীয় পেশা। বঙ্কিম চন্দ্রের ন্যায় প্রথম সারির লেখকদের জীবনের সিংহভাগ কেটেছে ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব কালেক্টর রূপে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কোলকাতা থেকে পত্রিকা বের করেছেন যার মূল কাজ ছিল ইংরেজদের বন্দনা করা, মুসলিম চরিত্রে কালীমা লেপন করা, আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সেবায় হিন্দুদের অনুপ্রাণিত করা। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের জীবন কেটেছে ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী ও ব্রিটিশ সরকারের অতি বিশ্বাসভাজন এজেন্ট রূপে। এধরণের শত শত তাঁবেদার হিন্দুদের অর্থনৈতিক ভিত্তিটা আরো মজবুত করতে তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় জমিদারি। সারা বাংলার গ্রামে গঞ্জে বিদ্রোহী মুসলিমদের রুখতে ব্রিটিশের পক্ষে লাঠিয়ালের মূল দায়িত্বটা পালন করেছে এ দুর্বৃত্ত জমিদারগণই। এরূপ দালাল শ্রেণীর কারণেই মুষ্টিমেয় ব্রিটিশদের প্রশাসনের কাজে থানায় থানায় বা গ্রাম পর্যায়ে নামতে হয়নি; তাদের কাজ ছিল বড় বড় শহরে বসে শুধু নির্দেশ দেয়া। এভাবেই ভারত জুড়ে প্রতিষ্ঠা পায় বিদেশী ব্রিটিশ সরকার ও তার দেশী দালাল শ্রেনীর যৌথ দুর্বৃত্ত শাসন।

কোম্পানীর লক্ষ্য ব্যবসার নামে অবাধ লুন্ঠন। কোন খয়রাতি কাজকর্ম বা জনকল্যাণ তাদের লক্ষ্য ছিল না। ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতে এসেছে, ভারতে নতুন নতুন রাজ্য জয় করেছে, সে সব অধিকৃত রাজ্যে দুর্গ গড়েছে নিছক শোষনভিত্তিক সে বাণিজ্যিক প্রজেক্টের অংশ রূপে। কোম্পনী জনগণ থেকে উচ্চহারে রাজস্ব নিয়েছে সে শোষণ ও শাসন প্রক্রিয়াকে তীব্রতর করতে। এভাবেই মুনাফা বাড়িয়েছে এবং মুনাফার সে অর্থ বিলেতে ব্রিটিশ সরকার ও কোম্পানীর শেয়ার হোল্ডারদের হাতে পৌঁছে দিয়েছে। ব্রিটিশ পণ্যের বাজার বাড়াতে বাংলার জগতবিখ্যাত মসলিন শিল্পকে ধ্বংস করা হয়েছে। মসলিনের উৎপাদন বন্ধ করতে এমন কি তাঁতীদের আঙ্গুলও কাটা হয়েছে। বাংলাদেশে ব্রিটিশ শাসন তাই সর্বার্থেই ছিল এক সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও নির্যাতনমূলক শাসন। তাদের সে সীমাহীন শোষণের ফলেই বাংলায় ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার কিছু কাল পরই ১৭৭০ সালে সৃষ্টি হয় ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। তাতে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। ইতিহাসের সেটিই ছিয়াত্তরের মন্বন্তর রূপে পরিচিত। তারা আরেকটি দুর্ভিক্ষ উপহার দেয় ১৯৪৪ সালে। সেটি আসে বাংলার খাদ্যের মওজুদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গণে পাঠিয়ে দেয়ার ফলে। শেষাক্ত এ দুর্ভিক্ষেও লক্ষ লক্ষ বাঙালীর মৃত্যু ঘটে। অথচ সাত শত বছরের মুসলিম শাসনে বাংলায় বা ভারতে একটি বারও দুর্ভিক্ষ আসেনি। বরং নবাব শায়েস্তা খানের আমলে খাদ্যপণ্যের সস্তা মূল্য বিশ্বে রেকর্ড গড়েছিল। প্রতি দেশেই সাম্রাজ্যবাদী বিদেশী শাসন নির্যাতন, লুন্ঠন, দেশী শিল্পের বিনাশ ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে হাজির হয়। মুসলিম শাসনকালে সেটি হয়নি।  তাই বাংলায় বা ভারতে মুসলিম শাসনকে কখনোই ঔপনিবেশিক বিদেশী শাসন বলা যায় না। মুসলিমগণ এদেশে কখনই ব্যবসায়ীক লক্ষ্যে বা লুন্ঠনের স্বার্থে সাম্রাজ্য স্থাপন করেনি। আর্য ও অনার্য বহুবর্ণের মানুষ বাংলার বাইরে থেকে এসে এদেশে বসবাস করছে। তেমনি মুসলিমগণও ভারতে ঘর বেঁধেছে। এটিই তো মানব সভ্যতার রীতি। দেয়াল গড়ে বা কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে মানবের সে প্রবাহ অতীতে কখনোই বন্ধ করা হয়নি। অপর দিকে বেশীর ভাগ বাঙালী মুসলিম তো বাংলার আদিবাসী; তারা মুসলিম হয়েছে ইসলাম কবুলের মাধ্যমে। বিদেশ থেকে যে সব মুসলিম বাংলায় এসেছে তারা যা কিছু গড়েছে তা বাংলাতেই গড়েছে। বাংলার সম্পদ নিয়ে ব্রিটিশগণ যেমন বিলেতে নগর-বন্দর গড়েছে, বাংলার কোন মুসলিম শাসকই সেটি করেনি। ঢাকা, সোনার গাঁ, গৌড়, মূর্শিদাবাদ, বাগের হাট ও উত্তর বঙ্গে যা কিছু ঐতিহাসীক কৃর্তি -তা তো মুসলিমদেরই গড়া। অথচ হিন্দু রাজাগণও এদেশ বহুকাল শাসন করেছে। কিন্তু তাদের সে নিদর্শনগুলি কোথায়? ব্রিটিশদের গড়া নিদর্শনগুলিই বা কোথায়? তাছাড়া এদেশের উপর বর্গী হামলা, মগ হামলা, মারাঠা হামলা ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যারা প্রাণ দিয়েছে তারা তো প্রায় সবাই মুসলিম। পলাশীর রণাঙ্গন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, মজনু শাহের ফকির বিদ্রোহ বা দুদু মিয়ার ফারায়েজী আন্দোলন –সর্বত্র তো তারাই। অথচ ব্রিটিশ আমলে হিন্দুদের দ্বারা ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদারীর যে ইতিহাস নির্মিত হল -সেটিকে বলা হচ্ছে বাঙালীর রেনেসাঁ যুগ। এবং ইংরেজ শাসন চিত্রিত হচ্ছে আশির্বাদ রূপে। আর মুসলিম শাসনামলকে বলা হচ্ছে অন্ধকার যুগ বলে!

 

হিন্দু সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা

বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্যরা তাদের সাহিত্যে যে মুসলিম বিরোধী বিষ উদগিরণ করেছেন সেটি বাংলার মধ্য যুগের বা আদি যুগের সাহিত্যে পাওয়া যায় না। বাঙালী কবি-সাহিত্যিকদের মগজে ঘৃনাপূর্ণ মিথ্যার বিষ ঢুকিয়েছিল বস্তুত ইংরেজগণ। তারাই প্রথম আবিস্কার করে, ভারতের মুসলিম শাসন শুধু ধ্বংস, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও শোষণ ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। বলেছে, মন্দির ভেঙ্গে তার উপর মসজিদ গড়েছে। তাদের লেখনিতে শিবাজীর চরিত্র অংকিত হয়েছে হিন্দু জাগরনের এক মহান ও আদর্শনীয় বীর রূপে, আর মোঘল বাদশা আওরঙ্গজীব চিত্রিত হয়েছেন কুৎসিত ভিলেন রূপে।

বাংলায় হিন্দুদের বাস মুসলিমদের চেয়ে অধিক কাল ধরে। অথচ তাদের ব্যর্থতা হল, সমগ্র ইতিহাস ঘেঁটে একজন হিন্দুকেও বের করতে পারে যিনি স্বাধীনতার লড়াইয়ে বাংলার মানুষের সামনে আদর্শ হিসাবে চিত্রিত হতে পারেন। সেরূপ একটি চরিত্রের তালাশে বঙ্কিম ও মাইকেল মধুসূদন যেমন ব্যর্থ হয়েছেন, রবীন্দ্রনাথও ব্যর্থ হয়েছেন। ইতিহাসে পাতায় সে এক বিশাল শূন্যতা। সে শূন্যতা পূরণে রবীন্দ্রনাথকে তাই অবাঙালী শিবাজীকে হিরো রূপে পেশ করতে হয়েছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “শিবাজী উৎসব” কবিতায় শিবাজীর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন,

“হে রাজ-তপস্বী বীর, তোমার সে উদার ভাবনা

বিধর ভান্ডারে

সঞ্চিত হইয়া গেছে, কাল কভু তার এক কণা

পারে হরিবারে?

তোমার সে প্রাণোৎসর্গ, স্বদেশ-লকক্ষীর পূজাঘরে

সে সত্য সাধন,

কে জানিত, হয়ে গেছে চির যুগ-যুগান্তর ওরে

ভারতের ধন।”

এই হল রবীন্দ্রনাথের বিচার বোধ। এই হল রবীন্দ্র মানস ও চেতনা! তবে এটি শুধু রবীন্দ্রনাথের একার চেতনাগত সমস্যা নয়, এটিই মূল সংকট ছিল বাঙালীর রেনেসাঁর কর্ণধারদের। কিছু দালানকোঠা ও কলকারখানা গড়া, কিছু ডিগ্রিধারি মানুষ গড়া, কিছু কবিতা-উপন্যাস লেখা, রাজনীতিতে কিছু আলোড়ন তোলাই একটি জাতির জীবনে জাগরণ আনার জন্য কি যথেষ্ট? বিশাল বিপ্লবের কাজে উচ্চতর দর্শনও লাগে। সে দর্শনটিই আনে জনগণের চেতনা রাজ্যে বিপ্লব। কিন্তু বাংলার হিন্দুগণ সে দর্শনের খোঁজ পায়নি। ফলে তাদের মনের রাজ্যে বিপ্লবও আসেনি। বরং ঘোর অন্ধকারই রয়ে গেছে। রামমোহন রায় এবং রবীন্দ্রনাথের দাদা দ্বারকানাথ সে দর্শনের খোঁজে হিন্দুর পৌত্তলিকতা ছেড়ে একাশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। মধুসূদন দত্ত খৃষ্টান হয়ে গেছেন। অপর দিকে বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ, অরবিন্দো ঘোষেরা হিন্দুদের আবার সনাতন পৌত্তলিকার দিকে ফিরেয়ে এনেছেন। ফলে হিন্দুদের আবার ফিরিয়ে নিয়েছেন সে স্থানটিতে যেখান থেকে রাম মোহন, দ্বারকানাথ ও তাদের সাথীরা যাত্রা শুরু করেছিলেন। এরই ফল হলো, রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সন্তানেরাও আর সে ব্রাহ্ম ধর্মে স্থির থাকতে পারেননি, ফিরে গেছেন হিন্দু পৌত্তলিকতায়। রবীন্দ্রনাথ এমন এক কট্টর হিন্দু হওয়ার কারণেই শিবাজীকে হিরো বানিয়েছেন। আর শিবাজীর মত একজন দস্যু চরিত্রের মানুষ যখন হিরো হয় তখন কি সে জাগরণ বেঁচে থাকে? আর এটিই বাংলার হিন্দুর রেনেসাঁর আদর্শিক ও নৈতিক সংকট। এমন সংকট খোদ রেনেসাঁরই মৃত্যু ঘটায়। বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁও তাই বাঁচেনি।

দেখা যাক, রবীন্দ্র নাথ যাকে “হে রাজস্বী বীর” বলে মুগ্ধ মনে কবিতা লিখেছেন তার প্রকৃত পরিচয়টি কি? ব্যক্তিকে বুঝা যায় তার ঘনিষ্ট বন্ধু ও আরাধ্য ব্যক্তিকে দেখে। রবীন্দ্র মানস ও তাঁর চেতনাকে বুঝতে হলে শিবাজীকেও বুঝতে হবে। এতে বুঝা যাবে রবীন্দ্রনাথভক্তদের রাজনৈতীক এজেন্ডা। প্রশ্ন হল, তিনি কি আদৌ বীর ছিলেন? শিবাজীর পরিচয় হল, মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবকে তিনি ব্যস্ত রেখেছিলেন মারাঠা অঞ্চলে লুকিয়ে থেকে অতর্কিত হামলার মধ্য দিয়ে। এটি ছিল দিল্লির মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে উগ্রহিন্দুর সন্ত্রাস। সম্মুখ সমরে আসার সামর্থ্য শিবাজীর ছিল না। যুদ্ধে একবার পরাজিত ও বন্দী হওয়ার পর ফন্দি করে লুকিয়ে পালিয়েছিলেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব একবার সেনাপতি আফজাল খাঁর নেতৃত্বে ১০ হাজার সৈন্যের এক বাহিনীকে তার বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যুদ্ধের বদলে আলোচনায় ডেকে আফজাল খাঁকে তিনি হত্যা করেন। সেটি ছিল কাপুরুষিত হত্যা। সে সময় আফজাল খাঁ তাকে ইসলামী  উদারতায় আলিঙ্গনে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। সে মুহুর্তে তার বাঁ হাতে লুকানো “বাঘের নখ” দিয়ে তার দেহ ছিন্ন করেন। অথচ এ নিরেট কাপুরুষতা বীরতূল্য গণ্য হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কাছে, যা নিয়ে বিশাল এক কবিতাও লিখেছেন। এ হল রবীন্দ্রনাথের বিবেচনা ও মানবতার মান! রবীন্দ্রনাথ বরং সে সব ঐতিহাসিকদেরও নিন্দা করেছেন যাদের দৃষ্টিতে শিবাজী ছিল এক বর্বর দস্যু। রবীন্দ্রনাথ তাঁদেরকে মিথ্যাময়ী বলেছেন, এবং তাঁদের বিদ্রুপ করে লিখেছেন,

“বিদেশীর ইতিবৃত্ত দস্যু বলে করে পরিহাস

অট্টহাস্য রবে…

তব পুণ্য চেষ্টা যত তস্করের নিস্ফল প্রয়াস

এই জানে সবে।

অয়ি ইতিবৃত্ত কথা, ক্ষান্তু করো মুখর ভাষণ

ওগো মিথ্যাময়ী,

তোমার লিখন- ‘পরে বিধাতার অব্যর্থ লিখন

হবে আজি জয়ী।

যাহা মরিবার নহে তাহারে কেমনে চাপা দিবে

তব ব্যঙ্গ বাণী

যে তপস্যা সত্য তারে কেহ বাধা দিবে না ত্রিদিবে

নিশ্চয় সে জানি।”

ঐতিহাসিক ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ “হিন্দু জাতীয়তা জ্ঞান বহু হিন্দু লেখকের চিত্তে বাসা বেঁধেছিল, যদিও স্বজ্ঞানে তাঁদের অনেকেই কখনই এর উপস্থিতি স্বীকার করবেন না। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ভারতের শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ যাঁর পৃথিবীখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবিকতাকে সাম্প্রদায়িক দৃ্ষ্টভঙ্গীর সঙ্গে কিছুতেই সুসংগত করা যায় না। তবুও বাস্তব সত্য এই যে, তাঁর কবিতাসমূহ শুধুমাত্র শিখ, রাজপুত ও মারাঠাকুলের বীরবৃন্দের গৌরব ও মাহাত্মেই অনুপ্রাণিত হয়েছে, কোনও মুসলিম বীরের মহিমা কীর্তনে তিনি কখনও একচ্ছত্রও লেখেননি –যদিও তাদের অসংখ্যই ভারতে আবির্ভূত হয়েছে। এ থেকেএ প্রমাণিত হয় উনিশ শতকী বাংলার জাতীয়তা জ্ঞানের উৎসমূল কোথায় ছিল।” –(সূত্রঃ Dr. Romesh Chandra Majumder, History of Bengal, p 203.)

বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁ যুগে সবচেয়ে ঘৃণ্য যে কাজটি হয়েছে তা হলো, ইংরেজদের কলাবোরেটর রূপে হিন্দুদের যোগদান। সমগ্র উপমহাদেশে তারাই সর্বপ্রথম এ পেশায় নামে। কয়েক ডজন নবেল প্রাইজ দিয়েও কি বাঙালীর এ কলংক ঢাকা যাবে? তখন ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনে দুই ধরনের বাবু দেখা যেত। এক), গোরা বা শ্বেতাঙ্গ বাবু, দুই), বাঙালী বাবু। বাঙালী বাবুদের ইংরেজ-সেবা শুধু প্রশাসনে সীমাবদ্ধ থাকেনি এবং শুধু বাংলাতেও সীমাবদ্ধ রাখেনি। প্রশাসনের পাশে সাহিত্যেও সেটি প্রবল ভাবে প্রকাশ পায়। বাংলার সীমান্ত ডিঙ্গিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে বিহার, আসাম, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, রাজস্থান, গুজরাতসহ ভারতের অন্যান্য প্রদেশে। শিকারী যেমন শিকারী ঘুঘুকে দিয়ে ঘুঘু ধরে, তেমনি ইংরেজগণও বাঙালী হিন্দুদের দিয়ে সমগ্র ভারতের অন্যান্য প্রদেশের হিন্দুদেরও তাঁবেদারে পরিণত করে। ইংরেজ সেবার যে আদর্শ রবীন্দ্র-পরিবার ও বঙ্কিমচন্দ্র স্থাপন করেন, সেটিই ভারতীয় হিন্দুদের আদর্শে পরিণত হয়। ফল হলো, এমনকি কংগ্রেস নেতা করম চাঁদ গান্ধিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশের পক্ষে যুদ্ধে যোগদান ও প্রাণদানের পক্ষে নিজ প্রদেশ গুজরাতে সৈন্য সংগ্রহে নেমেছিলেন।

বাঙালী হিন্দুদের অপরাধ শুধু এ নয় যে, মুসলিম বিরোধী বিদ্বেষ ছড়িয়ে বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে তারা বিষাক্ত করেছে। তারা বিষাক্ত করেছে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের হিন্দুদের মনও। ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্টগণ মুসলিম বিদ্বেষপূণ মিথ্যা দিয়ে যেসব ইতিহাস রচনা করে, সেগুলি সর্বপ্রথম গলধঃকরণ করে বাঙালী হিন্দুগণ। পরে তারা সেগুলির সাথে নিজ মনের আবেগ মিশিয়ে নিজেরাও ইতিহাস লেখে এবং সেগুলি সমগ্র ভারত ব্যাপী ছড়িয়ে দেয়। বস্তুত এসব হিন্দু বাঙালীদের লেখা বইগুলোই বহুকাল যাবত পঠিত হয়ে আসছে সারা ভারতের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবই রূপে। অহিন্দু ও অভারতীয় ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্টদের লেখা ইতিহাসের স্থলে সে বইগুলোর বাড়তি সুবিধাটি হল, বাঙালী হিন্দুদের হাতে রচিত হওয়ার সেগুলো ভারতের অন্য এলাকার হিন্দুদের কাছে সহজে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। সে সময়ের ইতিহাসে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিবৃত্তির পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শুরুও এই বাংলা থেকে। সেটিও এ বর্ণহিন্দুদের হাতে। আজ ভারত জুড়ে হিন্দুত্বের জোয়ার। সেটির শুরুও বাঙালী হিন্দুদের থেকে। এর আদি গুরু বঙ্কিম চ্যাটার্জি। তার লেখা ‘আনন্দ মটে” ধ্বনিত হয়েছে উগ্র হিন্দুত্বের বাণী। ‘আনন্দ মটে”র বন্দে মাতরম গানটি গৃহীত হয়ে ভারতের জাতীয় সংগীত রূপে।

ভারত থেকে মুসলিম নির্মূলের মিশন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ তথা আর. এস.  এস। এর প্রতিষ্ঠাতা  হেডগেয়ার তার মুসলিম বিরোধী চেতনার পরিপুষ্টি পেয়েছে শিক্ষাকালে কলকাতায় অবস্থান কালে। ভারতের রাজনীতিতে আজ যে উগ্র সাম্প্রদায়িক বিজিপি –সেটির শুরু হিন্দু মহাসভা থেকে। আর হিন্দু মহাসভার জন্ম কোলকাতায়, এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। তিনি ছিলেন বাঙালী, এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখার্জির পুত্র। তিনি নিজেও ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ অবধি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন।  আততায়ীর হাতে গান্ধীর মৃত্যু হলে দোষ বর্তায় হিন্দু মহাসভার উপর। সে দুর্নাম থেকে বাঁচার তাগিদে তিনি নতুন দল গড়েন ভারতীয় জনসংঘ -যা পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে হয় ভারতীয় জনতা পার্টি, সংক্ষেপে বিজেপী। বার বার নাম পরিবর্তন করা হলেও এ দলের মুসলিম বিদ্বেষপূর্ণ কট্টর সাম্প্রদায়ীক নীতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।

 

মুসলিম গণহত্যায় বাঙালী হিন্দুর লিগ্যাসি                

মুসলিম গণহত্যার রাজনীতির জন্মটি আহমেদাবাদ, মোম্বাই বা মিরাটে হয়নি, হয়েছিল হিন্দু রেনেসাঁর জন্মভূমি কলকাতায়। এবং এ সন্ত্রাসী রাজনীতির শুরু বস্তির গুন্ডা, চোর-ডাকাত বা নারীধর্ষক দুর্বৃত্তদের হাতেও হয়নি, বরং হয়েছে শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ন্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালী উপাচার্যের হাত দিয়ে। সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের মনও যে কতটা বিষাক্ত ও প্রতিহিংসাপূর্ণ হতে পারে -এ হল তার নমুনা। শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ১৯৪১ সালে হিন্দুদের এক জনসভায় বলেছিলেন, মুসলিমরা যদি পাকিস্তান চায় তবে তাদের তল্পিতল্পা বেঁধে ভারত ত্যাগ করা উচিত।–(BLCP, 1941)। পাকিস্তানের জন্ম ও তার বেঁচে থাকাটি তাঁর মত হিন্দুনেতাদের কাছে যে কতটা অসহ্য ছিল -এ হলো তার নমুনা। তাঁর কাছে অসহ্য হলো ভারতে মুসলিমদের বসবাসও। বাবরী মসজিদ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন বিজেপী নেতা লাল কৃষ্ণ আদভানী। বিজিপির আরেক নেতা নরেন্দ্র মোদী ইতিহাস গড়েছেন গুজরাতে মুসলিম হত্যায় নেতৃত্ব দিয়ে। তবে যে শহরটি মুসলিম গণহত্যাকে রাজনৈতিক আচার রূপে প্রথম শুরু হয় সেটিও ভারতের অন্য কোন শহর নয়, সেটি বাঙালী হিন্দুদের শহর কলকাতা। আহমেদাবাদ, মুম্বাই, মুরাদাবাদ, বিহার ও ভারতের অন্যান্য স্থানে মুসলিম নির্মূলের গণহত্যাগুলি এসেছে বাঙ্গালী বাবুদের সৃষ্ট ১৯৪৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত মুসলিম বিরোধী গণহত্যার পর।

কলকাতার হিন্দুদের মন যে কতটা মুসলিমবিদ্বেষপূর্ণ ও দাঙ্গাপাগল -সেটিই প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৪৬ সালের মুসলিম বিরোধী গণহত্যায়। সে গণহত্যার কিছু নিজ চোখে-দেখা ভয়াবহ বর্ণনাটি দিয়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বাঙালী প্রফেসর ড. তপন রায় চৌধুরী তাঁর “বাঙাল নামা” বইতে। প্রফেসর ড.তপন রায় চৌধুরী লিখেছেন, “নিজের চোখে দেখা ঘটনার বিবরণে ফিরে যাই। হস্টেলের বারান্দা থেকে দেখতে পেলাম রাস্তার ওপারে আগুন জ্বলছে। বুঝলাম ব্যাপারটা আমার চেনা মহাপুরুষদেরই মহান কীর্তি। হস্টেলের ছাদে উঠে দেখলাম –আগুন শুধু আমাদের পাড়ায় না, যতদূর চোখ যায় সর্বত্র আকাশ লালে লাল। তিন দিন তিন রাত কলকাতার পথে ঘাটে পিশাচনৃত্য চলে। … দাঙ্গার প্রথম ধাক্কা থামবার পর বিপজ্জনক এলাকায় যেসব বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন ছিলেন, তাঁদের খোঁজ নিতে বের হই। প্রথমেই গেলাম মুন্নুজন হলে। ..নিরঙ্কুশ হিন্দু পাড়ার মধ্যে ওদের হস্টেল। তবে ভদ্র বাঙালি পাড়া। সুতরাং প্রথমটায় কিছু দুশ্চিন্তা করিনি। কিন্তু দাঙ্গা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শিক্ষিত বাঙালির রুচি-সংস্কৃতির যেসব নমুনা দেখলাম, তাতে সন্দেহ হল যে, মুন্নুজান হলবাসিনী আমার বন্ধুদের গিয়ে আর জীবিত দেখবো না। …হোস্টেলের কাছে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে ভয়ে আমার বাক্যরোধ হল। বাড়ীটার সামনে রাস্তায় কিছু ভাঙা স্যুটকেস আর পোড়া বইপত্র ছড়ানো। বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে। ফুটপথে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন – একটু আগে পুলিশের গাড়ি এসে মেয়েদের নিয়ে গেছে।…শুনলাম ১৬ই আগষ্ট বেলা এগারোটা নাগাদ একদল সশস্ত্র লোক হঠাৎ হুড়মুড় করে হস্টেলে ঢুকে পড়ে। প্রথমে তারা অশ্রাব্য গালিগালাজ করে যার মূল বক্তব্য –মুসলমান স্ত্রীলোক আর রাস্তার গণিকার মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। …হামলাকারিরা অধিকাংশই ছিলেন ভদ্রশ্রেণীর মানুষ এবং তাঁদের কেউ কেউ ওঁদের বিশেষ পরিচিত, পাড়ার দাদা। ” –(তপন রায়চৌধুরী, ২০০৭)।

প্রফেসর ড.তপন রায় চৌধুরি আরো লিখেছেন, “খুনজখম বলাৎকারের কাহিনী চারি দিক থেকে আসতে থাকে। …বীভৎস সব কাহিনী রটিয়ে কিছু লোক এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পায়। তার চেয়েও অবাক হলাম যখন দেখলাম কয়েকজন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত লোক মুসলমানদের উপর নানা অত্যাচারের সত্যি বা কল্পিত কাহিনি বলে বা শুনে বিশেষ আনন্দ পাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে দু-তিনজন রীতিমত বিখ্যাত লোক। প্রয়াত এক পন্ডিত ব্যক্তি, যাঁর নাম শুনলে অনেক নিষ্ঠাবান হিন্দু এখনও যুক্তকরে প্রণাম জানায়, তাঁকে এবং সমবেত অধ্যাপকদের কাছে নিকাশিপাড়ার মুসলমান বস্তি পোড়ানোর কাহিনি বলা হচ্ছিল। যিনি বলছিলেন তিনি প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিশ্বাসযোগ্য লোক। বেড়া আগুন দিয়ে বস্তিবাসীদের পুড়িয়ে মারা হয়। একজনও নাকি পালাতে পারিনি। ছেলেটি বলছিল, কয়েকটি শিশুকে আগুনের বেড়া টপকে তাদের মায়েরা আক্রমণকারীদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যাতে ওদের প্রাণগুলি বাঁচে। বাচ্চাগুলিকে নির্দ্বিধায় আবার আগুনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। আমরা শুনেছিলাম, এই কুকীর্তির নায়ক কিছু বিহারী কালোয়ার। তাই ভয়াবহ বর্ণনাটি শুনে সুশোভনবাবু মন্তব্য করেন, “এর মধ্যে নিশ্চয়ই বাঙালি ছেলেরা ছিল না?” শুনে সেই পন্ডিত প্রবর গর্জে উঠলেন, “কেন, বাঙালি ছেলেদের গায়ে কি পুরুষের রক্ত নেই?” –(তপন রায়চৌধুরী, ২০০৭)।

 

বাঙালী হিন্দুর স্বার্থপরতা ও বিভক্ত বাংলা

বাংলার হিন্দুদের চেতনায় স্বার্থপরতাটি অতি প্রকট। তাতে মারা পড়ে মানবতা ও বিবেক বোধ। ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভক্ত হয় মূলত এমনি এক বিষাক্ত ও স্বার্থপর মনের প্রেক্ষাপটে।  তবে তেমন একটি চেতনায় বাংলা বিভক্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের বহু আগেই; ১৯৪৭ সালে সে বিভক্তিটি আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও স্বীকৃতি পায় মাত্র। রেনেসাঁর নামে বাংলার হিন্দুদের মাঝে যেরূপ আত্মপুজা ও মুসলিম ঘৃনার চর্চা শুরু হয়েছিল সেটিই ধাবিত করে বাঙালী হিন্দুদের আত্মঘাতে। সে আত্মঘাতী রেনেসাঁয় গুরুত্ব পায় মুসলিমদের পিছনে ফেলে হিন্দুদের দ্রুত এগিয়ে চলা। পাশাপাশি দুটো গাছ জন্ম নিলে একটি অপরটির জন্য কিছু জায়গা ছেড়ে দেয়, সে প্রয়োজনে দুটি গাছই দুই পাশে কিছুটা হেলে যায়। কিন্তু হিন্দুগণ প্রতিবেশী মুসলিমদের জন্য কোন স্থান ছেড়ে দিতে রাজী ছিল না। তারা সবটুকুই নিজেদের দখলে রাখতে চেয়েছিল। তারা দখল নিতে চেয়েছিল অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা ও প্রশাসনের সবটুকু জুড়ে। অথচ তখন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৫%। একটি দেশের ৪৫% ভাগ মানুষ তার ৫৫% ভাগ মানুষকে পিছনে ফেলে সামনে এগুয় কি করে? সেটি ভাবনায় আসেই বা কীরূপে? উগ্র স্বার্থপরতায় সবকিছুই সম্ভব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বশক্তি। কিন্তু তাদের বেড়ে উঠার পিছনে বড় কারণটি হল, দেশটি সাদা-কালা, ইউরোপীয়-অইউরোপীয় সকল নাগরিককে বেড়ে উঠার জন্য স্থান করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলায় সেটি হয়নি। বাঙালী হিন্দুদের সেরূপ উদারতাই ছিল না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মুসলিমদের জন্য সরকারি চাকুরিতে কিছু স্থান ছেড়ে দেয়ার জন্য হিন্দুদের সামনে সুপারিশ রেখেছিলেন, কিন্তু সেটিও তাদের পছন্দ হয়নি। হিন্দুগণ তাদের প্রতিষ্ঠিত স্বার্থকে একটুও ছাড়তে রাজী ছিল না। প্রশ্ন হলো, দুটি সম্প্রদায়ের মাঝে এতো ঘৃনা, এতো অবিশ্বাস ও এতো বঞ্চনা বিরাজ করলে সে দেশ কি সামনে এগুতে পারে? এটিতো সংঘাত ও আত্মঘাতের পথ। শ্রী নীরদ চন্দ্র চৌধুরী তার বই ‘আত্মঘাতী বাঙালী’তে বাঙালী হিন্দুর নানা নৈতিক রোগের চিত্র পেশ করলেও তাদের এ অতি নৃশংস, অমানবিক ও মুসলিমবিদ্বেষী চিত্রটি তুলে ধরেননি।

 

বাঙালী রেনাসাঁ কি আদৌ কি রেনাসাঁ?

দেখা যাক, বাংলায় হিন্দু জাগরণের নায়ক কারা ছিলেন? কী ছিল তাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দর্শন? এ জাগরণের শুরু রাজা মোহন থেকে এবং শেষ হ্য় রবীন্দ্রনাথে। এর সময়কাল উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক অবধি। প্রশ্ন হলো, এ জাগরণকে কি আদৌ রেনেসাঁ বলা যায়? রেনাসাঁর অর্থ পুনর্জাগরণ। এ শব্দটির প্রথম প্রয়োগ হয় ষোড়ক ও শপ্তদশ শতকের ইউরোপে যে জাগরণ শুরু হয় সেটি বোঝাতে। গ্রীক ও রোমানদের হাতে খৃষ্টের জন্মের আগে ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ার বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে সাম্রাজ্য গড়ে উঠে। তাদের হাতেই প্রতিষ্ঠা ঘটে পাশ্চাত্য সভ্যতার। ইউরোপের জাগরণটি ছিল মূলত সেটির পুনর্জন্ম ঘটানোর। আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতাকেও বলা হয় সে গ্রীকো-রোমান সভ্যতারই পরম্পরা রূপ। কিন্তু বা্ংলায় হিন্দুদের মাঝে যে জাগরণ আসে সেটিকে রেনেসাঁ বললে এ কথাও মেনে নিতে হয় যে, বাংলার হিন্দুদের দ্বারা এর পূর্বেও একবার সভ্যতা নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ তাদের হাতেও বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু বাঙালী হিন্দুর ইতিহাসে সেরূপ জাগরণ বা সাম্যাজ্য নির্মাণের প্রমাণ কই? সেটি কি সেন রাজাদের আমল? সেনা রাজারা হিন্দু হলেও তারা তো বাঙালী ছিল না। তারা এসেছিল দক্ষিণ ভারতের কর্নাটাকা থেকে। সেনদের পূর্বে তো ছিল বৌদ্ধ পাল রাজবংশ। বস্তুত উনবিংশ শতাব্দীর এ বাঙালী হিন্দুর জাগরণ যেমন রেনেসাঁ ছিল না, তেমনি সমগ্র বাঙালীরও ছিল না। এমনকি সমগ্র হিন্দুদেরও নয়, এটি ছিল বাংলার সংখ্যালঘু বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়ের জাগরণ। বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ আজকের ন্যায় সেদিনও মুসলিম ছিল। তারা ছিল এ বঙ্গেরই আদিবাসী। কথা হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদেরকে যখন কোনরূপ রেনেসাঁ বা জাগরণ থেকে বাদ রাখা হয় সেটিকে কি সমগ্র বাঙালীর রেনেসাঁ বলা যায়?      

বাংলায় হিন্দু জাগরণের নামে যা কিছু ঘটেছে সেটির মূলে যারা ছিলেন তারা হলেন রাজা রামমোহন রায়, কবি রবীন্দ্রনাথের দাদা দ্বারকনাথ ঠাকুর, কেশব চন্দ্র সেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, রামতনু লাহিড়ীর ন্যায় ব্যক্তিবর্গ। শুরুতে যে দর্শনটা কাজ দেয় সেটিও হিন্দু দর্শন ছিল না। ছিল ব্রাহ্মসমাজের নব আবিস্কৃত ধর্ম -যা ছিল পৌত্তলিকতা বিরোধী। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন সে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রধান প্রবক্তা। তাঁর পৌত্তলিকতা বিরোধী সে ধারণাটি আসে ইসলাম ও খৃষ্টান ধর্মের প্রভাব থেকে। মাইকেল মধুসূদনের মত অনেকেই যেমন খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন তেমনি রাজা রামমোহন রায়, দ্বারকনাথ ঠাকুর, কেশব চন্দ্র সেনের মত অনেকেই খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষা না নিলেও হিন্দুদের সনাতন পৌত্তলিকতাকে বর্জন করেছিলেন। এক ঈশ্বর ভিত্তিক ব্রাহ্ম ধর্ম কোলকাতা ভিত্তিক বুদ্ধিজীবীদের মাঝে আলোড়ন তুলতে সমর্থ হলেও সাধারন হিন্দুদের মাঝে সে ধর্মের তেমন বিস্তার ঘটেনি। তারা ব্যর্থ হয়েছেন ধর্মীয় ইন্সটিটিউশন গড়ে তুলতে। তবে তাদের মূল সমাস্যটি হলো তাদের যেমন কোন পয়গম্বর ছিল না, তেমনি কোন ধর্মীয় গ্রন্থও ছিল না। শুধু চিন্তাভাবনা, বুদ্ধিবৃত্তি বা ইনটেলেকচুয়ালিজমের উপর ভিত্তি করে ধর্ম প্রতিষ্ঠা পায় না। ফলে ব্রাহ্ম ধর্ম ব্যর্থ হয়েছে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে এবং রবীন্দ্রনাথের মত ব্রাহ্মরা অবশেষে মিশে গেছেন পুরোন হিন্দুধর্মের মূল দেহে। বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে হাজির হন, বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল, দ্বীনবন্ধু মিত্র, রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্রের মত সাহিত্যিক। সাহিত্যের পাশাপাশি হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণের বাণী নিয়ে হাজির হাজির হন বিপিন চন্দ্র পাল, স্বামী বিবেকানন্দ ও অরবিন্দু ঘোষ।  বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন জগতিশ চন্দ্র বোস ও সত্যন্দ্র নাথ বোস। রাজনীতিতে আসেন সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জী, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষ বোস এবং শরৎ বোস। এভাবেই শুরু হয় তথাকথিত রেনেসাঁ। এটি বাংলায় শুরু হলেও বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিমদের তাতে কোন প্রতিনিধিত্ব ছিল না।

যে কোন জাগরণেরই একটি উচ্চতর নৈতিক ও মানবিক লক্ষ্য থাকে। অজ্ঞতা, পশ্চাদপদতা ও কুসংস্কারের বদলে মানবতা তখন নতুন প্রাণ পায়। তখন জেগে উঠে বিবেক। রেনেসাঁকে তখনই প্রকৃত রেনেসাঁ বা পুনর্জন্ম বলা যায়। কিন্তু বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁয় কতটুকু বেড়েছিল মানবতা? কতটুকু জেগেছিল বিবেক? রবীন্দ্র নাথ যখন কবিতা লেখা শুরু করেন তথাকথিত বাঙালী রেনেসাঁ তখন মধ্য গগনে। অথচ তখনও বাংলায় সতিদাহের নামে বিধবা রমনীদের চিতায় জ্বলতে হচেছ। বাংলার ইতিহাসে এটি এক কালো অধ্যায়। অথচ রবীন্দ্রনাথের কবিতায় সে নৃশংস বর্বরতাটি প্রশংসিত হয় বিধবার আত্মদান রূপে। সেটির প্রতি শ্রদ্ধাভরে এবং উৎসাহভরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,

“জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ

পরান সপিবে বিধবা বালা।

জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুন

জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা।”

সতিদাহ প্রথাকে আইন করে বিলুপ্ত করে ব্রিটিশ সরকার। বিধবা হিন্দু রমনীদের বাঁচানো নিয়ে কবিতা বা প্রবন্ধ না লিখলেও রবীন্দ্রনাথের নজর পরে তাদের গো’ দেবতা বাঁচানোর দিকে। তখন সে গো’ দেবতা বাঁচানোর মিশন নিয়ে ময়দানে নামেন শিবাজীর আরেক ভক্ত মহারাষ্ট্রের কট্টোর সাম্প্রদায়িক নেতা তিলক। তিনি ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “গোরক্ষিণী সভা”। গরু বাঁচাতে গিয়ে তখন ভারত জুড়ে শুরু হয় মুসলিম হত্যা। রবীন্দ্রনাথও তিলকের এ মিশনে একাত্ম হন এবং তাঁর নিজ জমিদারী এলাকায় গরু কোরবানী নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই হল, হিন্দু বাঙালীর রেনেসাঁ চেতনা। ঐতিহাসিক নীরদ চৌধুরী তাই লিখেছেন, “রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সকলেই জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন একটি মাত্র সমন্বয় সাধনের, আর সে সমন্বয়টি হিন্দু ও ইউরোপীয় চিন্তাধারার। ইসলামী ভাবধারা ও ট্রাডিশন তাঁদের চেতনাবৃত্তকে কখনও্ স্পর্শ করেনি। -(সূত্র, Nirod Chandra Chowdhury, Autobiography of an Unknown Indian, p 196.)

ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পরও এদেশে ইংরেজী ভাষার পাশাপাশি আরবী, ফারসী, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষার চর্চা ছিল। কিন্তু রাজা রামমোহন রায়ের মত বাঙালীদের সেটি পছন্দ হয়নি। তারা জোর দেয় আরবী ও ফার্সী বর্জনে এবং সরকারকে বলে ইংরেজী চর্চার উপর গুরুত্ব দিতে। রাজা রাম মোহন রায় যখন লন্ডন যান সেখানে গিয়েও সেটিই ব্রিটিশ সরকারকে বোঝান। অথচ ভারতীয় মুসলিমদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ভাষা ছিল আরবী ও ফারসী। মুসলিম নর-নারীদের উপর জ্ঞান শিক্ষা এ জন্য ফরয নয় যে -তা থেকে স্রেফ ব্যবসা-বাণিজ্যে ও চাকুরিতে সুবিধা হবে। বরং এ জন্য যে, শিক্ষার মাধ্যমে জীবন ও জগত নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটিকে জানার সুযোগ মিলবে। সুযোগ মিলবে মহান আল্লাহতায়ালার হিদায়েতের বাণীটি জানার। সুযোগ মিলবে ইসলামী সংস্কৃতি নিয়ে বেড়ে উঠার। একমাত্র তখনই সে শিক্ষার মাধ্যমে মানব জীবনের সবচেয়ে বড় উপকারটি হয়। একজন মুসলিমের জীবনে শিক্ষার প্রয়োজন ও শিক্ষাবিষয়ক মূল দর্শনটির মোদ্দা কথা তো এটাই। সে প্রয়োজনটি না মিটলে সে শিক্ষালাভে মুসলিম মনে অনাগ্রহ জাগাটাই স্বাভাবিক। ব্রিটিশদের প্রণীত শিক্ষানীতিতে মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন মেটানোর বিষয়টিকে পরিকল্পিত ভাবে বাদ দেয়া হয়। বরং গুরুত্ব পায় ব্রিটিশের কেরানী, সেপাই, ট্যাক্স কালেক্টর, ম্যাজিস্টেট তথা সদা অনুগত দাসসৃষ্টির বিষয়টি। ফলে শিক্ষানীতি হাতিয়ারে পরিনত হয় ব্রিটিশের কলাবোরেটর বা দালাল সৃষ্টির। তাই আত্মসন্মানবোধ সম্পন্ন কোন মুসলিম কি এমন শিক্ষায় আগ্রহী হতে পারে?

সত্য তো এটাই, ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজীবাদীদের আগমন ভারতবাসীদের শিক্ষিত করার জন্য ঘটেনি। সে আগমন এদেশে বসবাসের লক্ষ্যেও ছিল না। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী বা ব্রিটিশ সরকার কোন খয়রাতি প্রতিষ্ঠানও ছিল না। তাদের দায়বদ্ধতা ছিল না ভারতবাসীর প্রতিও; সেটি ছিল কোম্পানীর ব্রিটিশ শেয়ার হোল্ডারদের প্রতি। ফলে তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়, বাণিজ্যের নামে অধিক শোষন ও লুন্ঠন। শোষণ ও লুন্ঠনের কাজটি তীব্রতর করার স্বার্থে তারা কোম্পানীর কাজকে শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমিত রাখেনি। আত্মনিয়োগ করে নতুন নতুন রাজ্যজয় ও রাজ্যশাসনে। ফলে যে কোন সংজ্ঞায় তারা ছিল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শত্রু। সুশিক্ষা ও সুস্থ্য চেতনাধারী কোন মানুষই এরূপ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীর গোলামী মেনে নিতে পারে না। তাদের সেবকও হতে পারে। ইসলামে এটি হারাম। ফলে সুশিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রই তাদের শত্রু হবে ও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হবে -সেটাই স্বাভাবিক। যে কোন সুস্থ্য মানুষের ন্যায় ইংরেজরাও এ সত্যটি বুঝতো। ইংরেজগণ তাই সুশিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে নিজ শত্রুদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটাবে -সেটি কি বিশ্বাস করা যায়? শিক্ষার লক্ষ্য যদি হয় শত্রুর সাম্রাজ্যবাদী দখলদারীকে মজবুত করার হাতিয়ার -তবে কোন স্বদেশপ্রেমিক কি তাতে শামিল হতে পারে? এখানেই হিন্দু-মানসের সাথে তৎকালীন মুসলিম-মানসের মূল পার্থক্য।

 

বাঙালী হিন্দুর গোলাম-মানস

হিন্দুরা ব্রিটিশদের শত্রু ভাবতো না, বরং ভাবতো ভগবানের প্রেরিত মূক্তিদাতা। সেটি ধরা পড়ে হিন্দুদের রচিত সাহিত্যে। বৃটিশ রাজাকে ‘জন-গণ-মনঅধিনায়ক, জয়ো হে’ বলে রবীন্দ্রনাথ স্তুতিমূলক কবিতা লিখেছেন। শরৎচন্দ্র তার “পথের দাবী” উপন্যাসে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সেটি পছন্দ করেননি। নিন্দা জানিয়ে তিনি শরৎচন্দ্রকে চিঠি দিয়েছেন। লিখেছিলেন, “কল্যাণীয়েষু, তোমার পথের দাবী পড়া শেষ করেছি। বইখানি উত্তেজক। অর্থাৎ ইংরেজদের শাসনের বিরুদ্ধে পাঠকের মনকে অপ্রসন্ন করে তোলে। …ইংরেজ রাজ ক্ষমা করবেন এই জোরের উপরেই ইংরেজ রাজকে আমরা নিন্দা করি এটাতে পৌরুষ নেই। আমি নানা দেশে ঘুরে এলুম। আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে এই দেখলাম একমাত্র ইংরেজ গবর্নমেন্ট ছাড়া স্বদেশী বা বিদেশী প্রজার বাক্যে বা ব্যবহারে বিরুদ্ধতা আর কোন গভর্নমেন্ট এতটা ধৈর্য্যের সঙ্গে সহ্য করে না।– ইতি তোমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারিখ ৭/৩/১৩৩৩।  –(সূত্রঃ শ্রী শিশির কর)।

শরৎচন্দ্রের কাছে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের যে পোষমানা চেতনাটির প্রকাশ ঘটেছে -সেটি শুধু রবীন্দ্রনাথের একার ছিল না। এমন একটি উপলব্ধি ছিল সে আমলের অধিকাংশ শিক্ষিত হিন্দুদের। আর এখানেই কাঙ্খিত লক্ষ্য হাছিলে ব্রিটিশদের প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থার বড় সাফল্য। শিক্ষার লক্ষ্য শুধু অক্ষরজ্ঞান, হিসাবজ্ঞান বা কারিগরিজ্ঞান নয়, বরং শিক্ষার মধ্য দিয়েই ধর্ম, চিন্তা-চেতনা, দর্শন, রাজনীতি¸ সমাজনীতি, সংস্কৃতি ও রুচীবোধে আসে বিপ্লবী পরিবর্তন। এতে মন পায় সঠিক দিকনির্দেশনা। পায় বিবেক ও বিদ্যাবুদ্ধিকে কাজে লাগানোর সামর্থ্য। তখন ব্যক্তির মন পায় ন্যায়কে ভালবাসা ও অন্যায়কে ঘৃণা করার বল। এ সামর্থ্য সৃষ্টি না হলে বুঝতে হবে শিক্ষানীতি নিষ্ফল।

শিক্ষা শুধু সুশিক্ষার নয়, কুশিক্ষারও বাহন হতে পারে। ফিরাউন, নমরুদ, হিটলার, মুসোলিনির মত অতি দুর্বৃত্তদেরও একটি শিক্ষানীতি ছিল। আজকের সাম্রাজ্যবাদী দুর্বৃত্তদেরও আছে। ভারতে তেমনি ব্রিটিশ শাসকদেরও ছিল। শিক্ষার মধ্য দিয়ে মিশনারিরা যেমন ছাত্রদের নিজ ধর্মে টানে, সাম্রাজ্যবাদীরা তেমনি গড়ে নিজেদের পক্ষে লাঠিধরার লোক। বস্তুত শিক্ষার মাধ্যমেবাঙালী হিন্দুগণ পরিণত হয়েছিল ব্রিটিশ শাসকদের লাঠিয়ালে। গোলাম-মানস নিয়ে তারা এতটাই বিপুল সংখ্যায় সে কাজে নেমেছিল যে, ১৯০ বছর ঔপনিবেশিক শাসনে ইংরেজগণ নিজেরা নিজেদের শাসন বাঁচাতে লাঠি ধরার খুব একটা প্রয়োজন বোধ করেনি। বাঙালী হিন্দু বাবুগণই সেটি দক্ষতার সাথে করেছে।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ইংরেজী শিখেনি। এটি সত্য, অধিকাংশ মুসলমানই ইংরাজী শেখায় ও ইংরেজদের সহযোগিতায় এগুয়নি। তবে কারণটি সহজ। ঔপনিবেশিক আগ্রাসীদের সহযোগীতায় হাত বাড়ানো ইসলামে হারাম। যেমন হারাম মদ্যপান ও জ্বিনা। এটি শুধু মুসলিম রাজনীতিবিদদের কথা নয়, কোর’আন-হাদীসের কথাও। ইসলামে জ্ঞানার্জন ফরজ। মুসলিম যেমন নামায-রোযার ন্যায় ইবাদত থেকে দূরে থাকতে পারে না, তেমনি দূরে থাকতে পারে না জ্ঞানার্জন থেকেও। বেঁচে থাকার জন্যই পানাহার ফরজ। তবে পানাহারের নামে যদি হারাম বস্তু সেবনের ব্যবস্থা হয় -তখন সেটি হারাম। তেমনি শিক্ষার বিষয়টিও। ব্রিটিশগণ শিক্ষার নামে সেটিরই ব্যবস্থা করেছিল। শিক্ষার লক্ষ্য ছিল, শত্রুশাসনের সেবাদাস বানানো। ভারতের মুসলিমদের, বিশেষ করে বাংলার মুসলিমদের সে শিক্ষা থেকে দূরে থাকার দূরে থাকার এটিই মূল কারণ। ফলে মুসলিমগণ তখন মসজিদ ও মাদ্রাসাকেন্দ্রীক বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

ব্রিটিশ প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দূরে থাকার ফলে মুসলিমগণ চাকুরি-বাকুরি ও অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও তারা বেঁচেছিল ব্রিটিশের মানসিক গোলাম হওয়া থেকে। কতটা বেঁচেছিল তার উদাহরণ দেয়া যাক রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রাজা রাজা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “কিছুদিন হইল একদল ইতর শ্রেণীর অবিবেচক মুসলমান কলিকাতার রাজপথে লৌহ খন্ড হস্তে উপদ্রবের চেষ্টা করিয়াছিল। তাদের জন্য বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, উপদ্রবের লক্ষ্যটা বিশেষরূপে ইংরেজদের প্রতি। তাহাদের যথেষ্ট শাস্তিও হইয়াছিল। …কেহ কেহ বলিল মুসলমানদের বস্তিগুলো একেবারে উড়াইয়া পুড়াইয়া দেওয়া যাক…।” –রবীন্দ্রনাথ রচনাবলী, ১০ম খন্ড, পৃঃ ৪২৮-৪২৯।

ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীরা যে কোন সভ্য দেশেই প্রতিরোধের মুখে পড়ে। সেদেশের শুধু শিক্ষিত লোকেরাই এ দুর্বৃত্তদের ঘৃনা করে না, ঘৃনা করে এমনকি নিরক্ষর মানুষেরাও। তাদের বিরুদ্ধে মিছিল, লড়াই -এমনকি অস্ত্র ধারনও জায়েজ মনে করে। মানব মনে এমন ঘৃনা ও এমন প্রতিরোধ গড়ে উঠার জন্য বড় মহাত্মা বা সাধক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সুস্থ্য মানুষের এটাই তো মানবিক গুণ। কোলকাতার রাস্তার যে মুসলিম ব্যক্তিটি ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন সে ব্যক্তিটি রবীন্দ্রনাথের ন্যায় নোবেল বিজয়ী ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীও ছিলেন না। তিনি ছিলেন রাস্তার মানুষ। কিন্তু বিবেকের যে মান সে নিরক্ষর ব্যক্তিটির মাঝে প্রকাশ পেয়েছিল -তা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু প্রফেসর এবং বহু নোবেল বিজয়ীও দেখাতে পারেননি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে ঘৃনা করার সে নৈতিক বল এমন কি রবীন্দ্রনাথ দেখাতে পারেননি। অথচ রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ইতর বলেছেন। অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ ব্যবহৃত হয়েছেন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের উকিল রূপে। তাঁর বই ব্যবহৃত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার দলিল রূপে। তাঁর লেখা “চার অধ্যায়” উপন্যাসটির শত শত কপি ব্রিটিশ সরকার তাঁর অনুমতি নিয়ে ভারতের বিভিন্ন জেলে রাজবন্দীদের মাঝে বিতরণ করেছে -যাতে তা দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে ব্রেইন ওয়াশ তথা মগজ ধোলাই করা যায়। (সূত্রঃ অরবিন্দ পোদ্দার)।

রেনেসাঁর নামে বাংলার হিন্দুদের মগজে যেটি প্রবল ভাবে দানা বাঁধে সেটি মুসলিম ভীতি ও ইংরেজদের প্রতি সেবাদাস মানসিকতা। তাদের ভয়ের কারণ, ইংরেজদের চলে যাওয়ার পর না জানি মুসলিমগণ আবার ভারতের শাসনকর্তায় পরিণত হয়। অতিরিক্ত ভয় অনেক সময় আত্মহত্যায় ধাবিত করে। ভীতু মন আঁধার রাতে দূরের আলোকে ভূতের আলো ভাবে। ভয়ে এমন ভীতু ব্যক্তি বাকশক্তি হারায়। একই অবস্থা বাঙালী হিন্দুর। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সে ভয়ের কারণে ইংরেজ শাসনামলকে তারা নিজেদের অবকাঠামো মজবুত করার কাজে ব্যবহার করে। সেটি যেমন শিক্ষাদীক্ষায়, তেমনি রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য ও শিল্পে।  শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রগতির সাথে সাথে বাড়তে থাকে তাদের মনবল ও আত্মবিশ্বাস।  সে সাথে বাড়ে মুসলিম বিদ্বেষ ও ঘৃনা। তাদের মাঝে প্রবলতর হয় অখন্ড হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। যে স্বপ্ন এক কালে বঙ্কিম ও রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রকাশ পেয়েছিল সেটিই পরবর্তীতে হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপী) ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতাদের নীতিতে পরিণত হয়। বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁ এ ভাবেই জন্ম দেয় ভারত জুড়ে হিন্দু জাগরণ।

অন্যরা না জানলেও বাঙালী হিন্দুগণ ভালই জানে প্রতিবেশী সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিমদের তারা কতটা ঘৃনা, কতটা অবিশ্বাস ও কতটা ভয় করে। পাশের প্রতিবেশীকে অবিশ্বাস ও ভয়ানক শত্রু ভাবলে কেউ কি রাতে ঘুমাতে পারে? ঘুমাতে পারে না বলেই তারা ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা থেকে তারা পৃথক হয়ে যায়। এভাবে বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁর মৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু সে রেনাসাঁ কালে যে ঘৃনা ও বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ রোপন করা হয়েছিল সেটি মরিনি, বরং তা প্রকান্ড রূপে বেড়ে উঠেছে। এখন সেটি বিষময় ফল ফলাচ্ছে; এবং অবিরাম ভাবে। বাঙালী হিন্দুর সে মৃত রেনেসাঁর মূল সুরটি এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ভারত সরকারের আগ্রাসী নীতির মধ্যে। সেটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে হিন্দু আধিপত্য প্রতিষ্ঠার। ফলে ১৯৪৮’য়ে কাশ্মিরে ভারতীয় আগ্রাসন ও জবরদখল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বার বার যুদ্ধ, একাত্তরের পর বাংলাদেশের উপর ২৫ সালা দাসচুক্তি –এগুলি বস্তুত সে অভিন্ন আধিপত্যবাদী স্ট্রাটেজীরই অংশ। ফলে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর দেশটির সম্পদের অবাধ লুন্ঠন ও লুন্ঠনের মধ্য দিয়ে ১৯৭৪’য়ে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ ঘটাতে তাদের বিবেকে সামান্যতম দংশনও হয়নি। ভারত তখন লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীর জীবনে জঠর জ্বালা ও মৃত্যু উপহার দিয়েছিল। আর এখন সে বিষের ফলটি সীমান্ত ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া, উজানে পানি অপহরন, সমুদ্রসীমা ও তালপট্টি দখল, তিনবিঘা সহ সীমান্ত-ভূমি দখল এবং সীমান্তে লাগাতর মানুষ হত্যায় রূপ নিয়েছে। একটি জনগোষ্ঠীর অহংকারপূর্ণ অভিলাষ কিভাবে তার নিজের আত্মঘাত ও অন্যের বিরুদ্ধে নাশকতায় রূপ নেয় এ হল তার নমুনা।  লন্ডনঃ ১ম সংস্করণ ১২/০৩/১১; ২য় সংস্করণ ১৪/১১/২০২০

গ্রন্থপঞ্জিঃ

1). Bengal Legislative Council Proceedings (BLCP) 1941, Vol. LIV No 6, p 216.

২). তপন রায়চৌধুরী, ২০০৭; বাঙালনামা, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯।

৩). শ্রী শিশির কর, নিষিদ্ধ বাংলা, পৃঃ ২৪,৩২, দরদী শরৎচন্দ্র, মনীন্দ্র চক্রবর্তী, শরৎচন্দ্রের টুকরো কথা, অবিনাশ চন্দ্র ঘোষ)।

৪). অরবিন্দ পোদ্দার, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, উচ্চারণ, কোলকাতা, পৃঃ৩২০)।

৫). সৌমিত্র দস্তিদার, মুসলমানের কথা (ডকুমেন্টারী) Source: Youtube.




বাঙালী সেক্যুলারিষ্টদের ভারতপ্রেম এবং ইতিহাস বিকৃতি

সেক্যুলারিস্টদের ভারত-প্রেম ও অন্ধত্ব

গভীর প্রেম মানুষকে অন্ধ করে দেয়। ভারত প্রেম তেমনি অন্ধ করেছে বাঙালী জাতিয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের। এর ফল হলো, ভারতের জঘন্য অপরাধগুলোও তাদের নজরে পড়ে না। অথবা সেগুলো দেখেও তারা না দেখার ভান করে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের অপরাধের তালিকাটি বিশাল। একাত্তরের যুদ্ধ শেষে হাজার হাজার কোটি টাকার পাকিস্তান আর্মির অস্ত্র লুন্ঠন, ফারাক্কা বাঁধ, টিপাইমুখ বাঁধ, তিস্তার পানি লুন্ঠন, বর্ডার সিক্যিউরিটি ফোর্সের হাতে শত শত বাংলাদেশীর নিয়মিত হত্যা, বাণিজ্যের নামে বাংলাদেশের বাজার দখল এবং বাংলাদেশী পণ্য ভারতে ঢুকতে না দেয়া, ন্যায্য পাওনা তিনবিঘা দিতে অস্বীকৃতি, তালপট্টি দ্বীপ ছিনিয়ে নেয়া এবং বাংলাদেশের সমূদ্রসীমানায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ন্যায় অসংখ্য ও জঘন্য অপরাধ ভারত সরকারের। সম্প্রতি শুরু হয়েছে পাশ্ববর্তী আসাম ও পশ্চিম বাংলার ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশী অভিহিত করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা।

তবে এ অপরাধগুলোই ভারত সরকারের একমাত্র অপরাধ নয়। আরো গুরুতর অপরাধ হল,বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বে তারা হাত দিয়েছে। ভারত কোমর বেঁধেছে বাংলাদেশের উপর সামরিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দখলদারি প্রতিষ্ঠার। তাদের এ লক্ষ্য পূরণে তাদের সাথে দিবারাত্র কাজ করেছে বাংলাদেশে অভ্যন্তরে তাদের অর্থে পালিত পঞ্চম বাহিনীর লোকেরা। ভারতের অপরাধগুলো আড়াল করার লক্ষ্যে এসব ভারতপ্রেমী বাংলাদেশীদের স্ট্রাটেজী হল,বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারতকে নয় পাকিস্তানকে মূল শত্রুরুপে চিত্রিত করা। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ –এ তেইশ বছর হল বাঙালী মুসলমানদের ইতিহাসে পাকিস্তানী আমল।। ভারতপ্রেমীদের কাজ হল,২৩ বছরের পাকিস্তানী যুগকে বাঙালী মুসলমানদের জীবনে সবচেয়ে কালো যুগ রূপে চিত্রিত করা। এ যুগে বাঙালীর অকল্যাণ ছাড়া কোন কল্যাণই হয়নি, সেটিই বার বার তুলে ধরা। এ যুগকে তারা বলে পাকিস্তানের উপনিবেশিক যুগ। তবে পাকিস্তানের যে ইতিহাস বিশ্ববাসীর জানা তা দিয়ে এ মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত করা অসম্ভব। কারণ উপনিবেশিক রাষ্ট্র বলেতে যে ভাবে ব্রিটিশ, ফ্রাঞ্চ, স্পেনীশদের ন্যায় ইউরোপীয়দের বোঝানো  হয়ে থাকে, পাকিস্তান কোন কালেই সেরূপ রাষ্ট্র ছিল না। তাই তারা অন্য পথ ধরেছে। সে পথ ইতিহাস বিকৃতির।

কে শত্রু আর কে মিত্র, নতুন প্রজন্ম সে ধারণাটি পায় ইতিহাস-জ্ঞান থেকে। সে জ্ঞানের কারণেই মীর জাফরেরা জাতির কাছে ঘৃনীত হয়। শত্রু রূপে চিহ্নিত হয় উপনিবেশিক ব্রিটিশেরা। ফলে আগ্রাসী শক্তি শুধু দেশের রাজনীতি,সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে হাত দেয় না, ইতিহাসেও হাত দেয়। এজন্যই ভারতীয়দের বিণিয়োগ কোন কালেই বাংলাদেশের শিল্প ও কৃষিতে না থাকলে কি হবে, প্রচুর বিণিয়োগ বেড়েছে টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। মুজিব আমলে তাই শিল্প,শিক্ষা ও গণতন্ত্র ধ্বংস করার পাশাপাশি শত শত কোটি টাকার বিণিয়োগ হয়েছে ইতিহাসের বই লেখা ও প্রকাশনায়। বাংলাদেশে আজও  সে কাজটি অতি জোরে জোরে চলছে। ভারতীয় এ প্রজেক্টে বহু ভারতীয় লেখক,বুদ্ধিজীবী ও র’ এজেন্টের সাথে ময়দানে নেমেছে শত শত বাংলাদেশী সেক্যুলার লেখক,কলামিস্ট,সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী। এরূপ প্রজেক্টের ফলেই একাত্তরে নিহত তিরিশ লাখের ন্যায় বহু বিকট আকারের মিথ্যাকে তারা বাজারে ছড়াতে সমর্থ হয়েছে।

বাঙালী মুসলমানের ইতিহাসে পাকিস্তানের তেইশ বছরের সময়টি অতি স্বল্প সময়ের। সম্রাট আকবর বা আও রঙ্গজেব একাই এর চেয়ে দ্বিগুণ সময়ের বেশী রাজত্ব করেছেন। তবে স্বল্প সময়ের হলেও বাঙালীর ইতিহাসে এ সময়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পূর্বে আর কখনই কোন বাঙালী মুসলমান তাদের নিজ ভূগোলের বাইরে বিশাল ভূ-খণ্ড জুড়ে প্রধানমন্ত্রি বা মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পায়নি। এই ছিল প্রথম ও শেষ সুযোগ। ইতিহাসের এ পর্বে শুধু যে একাত্তরের যুদ্ধ ঘটেছে তা নয়। ১৯৪৭-এ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৬৫-এ ভারতীয় আগ্রাসনের ন্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও আছে। দেশটির প্রতিষ্ঠা ও বেঁচে থাকার বিরুদ্ধে এ সময়টাতেই চলেছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের লাগাতর ষড়যন্ত্র ও আগ্রাসনের ইতিহাস। সে ইতিহাসে যেমন বহু মীরজাফর আছে, তেমনি বহু হাজার লড়াকু মোজাহিদও আছে। ভারতসেবী শেখ মুজিব যেমন আছে,তেমনি আছে নবাব সলিমুল্লাহ,কায়েদে আজম, খাজা নাজিমুদ্দীন,সোহরাওয়ার্দী,শেরে বাংলা,নুরুল আমীনসহ বহু নেতাও। কিন্তু ভারতসেবী বুদ্ধিজীবীদের কাজ হয়েছে বেছে বেছে শুধু ভারতসেবী ব্যক্তিদের কর্মকে মহান রূপে তুলে ধরা। আর মানবিক করে দেখানো ভারতের ভূমিকাকে। এমন কি একাত্তরে ভারতের স্থল ও বিমান হামলা,মানবহত্যা এবং সীমাহীন লুন্ঠনও তাদের কাছে অপরাধ মনে হয় না। তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে বরং ভারত-বিরোধীদের চরিত্রহনন। এমন এক আত্মবিক্রীত চেতনার কারণে ১৯৪৭-এ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ভারতীয় হিন্দুদের কুটীল ষড়যন্ত্রও তাদের কাছে কোন ষড়যন্ত্র গণ্য হয় না। অপরাধ গণ্য হয় না সাতচল্লিশে বাংলা বিভাগ এবং ১৯৬৫ সালের সামারিক হামলা। অপরাধ নয় ফারাক্কা বাঁধ, টিপাইমুখ বাঁধ ও তিস্তামুখ বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশকে মরুভূমি বানানো,বা সীমান্তে হামলা চালিয়ে শত শত বাংলাদেশী হত্যাও।

 

আপত্তি পাকিস্তানের বেঁচে থাকাতে

১৯৭১-এ সাবেক পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানের বিলুপ্তি ঘটেছে, কিন্তু শুধু এটুকু নিয়েই ভারতসেবী এ বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ খুশি নয। পাকিস্তান এখনও কেন বেঁচে আছে তাতেই তাদের আপত্তি। সে সাথে প্রচণ্ড দুঃখও। দেশটি আরো খণ্ডিত হোক এবং বিলুপ্ত হোক, সেটাই তাদের ঐকান্তিক বাসনা। তাদের সে বাসনাটি প্রায়ই ফুটে উঠে তাদের লেখালেখি ও রাজনীতিতে। বাঙালী জাতিয়তাবাদী এ পক্ষটির অনেকে নামে মুসলমান হলেও ১৯৪৭-যে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা যেমন চাইনি, তেমনি আজও  চায়না দেশটি বেঁচে থাকুক। তাদের সহানুভুতি তাই পাকিস্তানের সীমান্ত্রপ্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি। অথচ কোন মুসলিম দেশের বিভক্তি বা অকল্যাণ কামনা করা ইসলামে হারাম। এটি কবিরা গুনাহ। তাই কোন মুসলমানের এটি কামনা হতে পারে না, এমন কামনা তো দুষমনদের। মুসলমানের কাজ তো পরস্পরে একতা গড়া, বিভক্তি গড়া নয়। পবিত্র কোরআনে তাই মহান আল্লাহতায়ালার হুকুম হল, “তোমার আল্লাহর রশিকে মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধর, পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না।” বিভক্তি বা বিচ্ছিন্নতা তাই ইসলামে হারাম। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের মাঝে ইসলামের অনুসরণ যখন তীব্রতর ছিল তখন মুসলিম ভূগোলের আয়তন বাংলাদেশের চেয়ে শতগুণ বাড়লেও রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়েনি। পরবর্তীতে বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে ইসলামে অঙ্গিকারহীন জাতীয়তাবাদী দুর্বৃত্তদের হাতে নেতৃত্ব যাওয়াতে।   

পাকিস্তানের বিনাশ যে বাঙালী সেকুলারিস্টদের কাছে আজও কতটা কাঙ্খিত তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে “জয় হিন্দ” ও “জয় বাংলা”র ন্যায় স্লোগান নিয়ে সিন্ধু প্রদেশেও গড়ে উঠেছিল জি.এম সৈয়দের বিচ্ছিন্নতাবাদী “‌‍জিয়ে সিন্ধ” আন্দোলন। সে আন্দোলনের ভিত্তিটা ছিল ভাষাভিত্তিক সিন্ধি জাতিয়তাবাদ। একই ভাবে সীমান্ত প্রদেশে তখন দানা বেঁধেছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী পাঠানদের পখতুনিস্তান আন্দোলন। বিদ্রোহ গড়ে তোলা হয়েছিল বেলুচিস্তান প্রদেশেও। এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পিছনে প্রত্যক্ষ মদদ ছিল ভারত সরকারের। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’য়ের সংশ্লিষ্টতার সে বিবরণ তুলে ধরেছেন ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রায়না তার “ইনসাইড র” বইতে। কিন্তু ভারতীদের মদদ সত্ত্বেও বিচ্ছিন্নতাবাদী সে আন্দোলন সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশে বহু আগেই মৃত্যু বরণ করেছে। কিন্তু লক্ষণীয় হল, বাংলাদেশের বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের চিন্তা-চেতনায় এখনও তা বেঁচে আছে। তাই শেখ হাসিনার সরকার সম্প্রতি পুরস্কৃত করলো পাকিস্তানের আমৃত্যু শত্রু মৃত জি.এম সৈয়দকে। অথচ এসব ভারতপ্রেমীরা এমনটি ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ে ভাবে না। জি.এম সৈয়দকে পুরস্কৃত করা এতটাই মহৎ কর্ম হয়ে থাকলে পুরস্কৃত করা উচিত ছিল আসামের উলফা নেতা এবং মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরও। কারণ তারাও তো ভাষা ও অঞ্চল-ভিত্তিক স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখে। অথচ তাদের পুরস্কৃত করা দূরে থাক, শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া উলফা নেতাদের গ্রেফতার করে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এতটা প্রশংসনীয় হলে উলফাদের হাতে ১০ ট্রাক পৌছানোর জন্য তার নায়কদের জেলে না পুরে পুরস্কৃত করা উচিত ছিল। সে কাজটি গোপনে অন্যদের করতে না দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের নিজের পক্ষ থেকে করা উচিত ছিল, যেমন ভারত করছে এবং এখনও করছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। সত্য হল, ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের প্রদেশগুলোতে চলমান মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকার পক্ষ নিয়েছে দখলদার ভারতীয় বাহিনীর। তাদের কাছে অখণ্ড ভারতে স্বাধীনতার আওয়াজ তোলাই অপরাধ। অথচ তাদের কাছে তেমন একটি বিদ্রোহ পুরস্কৃত হওয়ার যোগ্য যদি সেটি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হয়। তাই কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী ও আসামের উলফা নেতাদের প্রতি সামান্যতম সমর্থন দিতে রাজী নয়। অথচ সমর্থণ দিচ্ছে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের। অথচ সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ বা বেলুচিস্তানকে কখনই সামরিক শক্তির বলে পাকিস্তানভূক্তি করা হয়নি, তারা পাকিস্তান ভূক্ত হয়েছিল স্বেচ্ছায়। অথচ কাশ্মীরকে ১৯৪৮ সালে ভারতভূক্ত করা হয়েছিল সে দেশের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে; এবং সামরিক শক্তিবলে। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী এ এলাকাটি তাই অধিকৃত। আন্তর্জাতিক চাপে কাশ্মীরীদের ভাগ্য নির্ধারণে ভারত সেখানে গণভোট অনুষ্ঠানের ওয়াদাও করেছিল। কিন্তু সে ওয়াদা ভারত আজও পালন করেনি। ফলে স্বাধীনতার লড়াই চলছে ভারতীয় দখলদারির বিরুদ্ধে। সে দখলদারি বহাল রাখতে সেখানে অবস্থান নিয়েছে ৭ লাখ ভারতীয় সৈন্য। সে দখলদার ভারতীয় সৈন্যদের হাতে সেখানে ইতিমধ্যেই ৭০ হাজারের বেশী মুসলমানের মৃত্যু ঘটেছে, এবং ধর্ষিতা হয়েছে বহু হাজার মুসলিম নারী। আর্ন্তজাতিক মহলে প্রতিবাদ উঠলেও আওয়ামী সেক্যুলারিস্টদের মনে তা নিয়ে কোন নিন্দাবাদ নেই।

 

জিন্নাহ বিদ্বেষ ও ইতিহাস বিকৃতি

ঘৃনা-বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা মনের সুস্থ্যতা নয়, বরং জটিল নৈতিক রোগ। দৈহিক রোগে খাদ্য, পথ্য ও ঔষধ গ্রহণের সামর্থ লুপ্ত হয়। নৈতিক রোগ কেড়ে নেয় সত্য মেনে নেয়ার সামর্থ। বিশেষ করে সে সত্যটি যদি হয় রাজনৈাতিক প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে। রাজনৈতিক স্বার্থে তখন বরং বাড়ে মিথ্যাচর্চা ও ইতিহাস বিকৃতি। ১৯৪৭-এ ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ব্রিটিশের ষড়যন্ত্র এবং একাত্তরের যুদ্ধে তিরিশ লাখের মৃত্যুর ন্যায় হিমালয়-সম মিথ্যার বিশাল বিশাল পাহাড় গড়া হয়েছে সে নৈতিক রোগের কারণেই। বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মন যে শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই বিষপূর্ণ তা নয়, তাদের বিদ্বেষ ও ঘৃনা পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বিরুদ্ধেও। এটা নিশ্চিত যে, গান্ধি না হলেও ভারত স্বাধীন হত। কিন্তু জিন্নাহ না হলে ১৯৪৭-এ ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব ছিল। কারণ সে লড়াইটি শুধু মুসলিম বিদ্বেষী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল আধিপত্যবাদী ভারতীয় বর্ণহিন্দুদের বিরুদ্ধেও। তখন প্রয়োজন ছিল এমন এক যোগ্য নেতার যিনি ভাষা, বর্ণ, গোত্র, আঞ্চলিকতা, মজহাব ও ফেরকার উর্দ্ধে উঠে সর্বভারতীয় মুসলমানদের একতাবদ্ধ করার সামর্থ রাখেন। কাজটি শুধু রাজপথে জনসভা ও বিক্ষোভের ছিল না। প্রয়োজন ছিল এমন এক প্রজ্ঞাবান উকিলের যিনি ব্রিটিশের দরবারে মুসলমানে দাবী-দাওয়া নিয়ে যোগ্যতার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক ও আইনী লড়াই লড়তে পারেন। ভারতীয় মুসলমানগণ সেদিন সে গুণগুলি জিন্নাহর মধ্যে দেখেছিলেন। তারাই মি. জিন্নাহকে ‘কায়েদে আজম”’ খেতাবে ভূষিত করেছিল। এ খেতাব ছিল মি.জিন্নাহর সে বিরল গুণেরই স্বীকৃতি। নেতা হিসাবে তাঁকে বেছে নেয়া যে সঠিক ছিল, কায়েদে আজম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেটি তিনি প্রমাণ করে গেছেন।

সত্য তো এটাই, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর হাতেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল আধুনিক ইতিহাসের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। শুধু পাকিস্তানের ইতিহাসে নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের ৭ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে জিন্নাহর স্থান এজন্যই অতি উচ্চে। সুলতান মুহাম্মদ ঘোরীর হাতে ভারত বিজয়ের পর ভারতীয় মুসলমানদের ইতিহাসে এটাই হল সবচেয়ে বড় বিজয়। ভারতীয় মুসলমানগণ পেশাওয়ার থেকে চট্টগ্রাম এবং কাশ্মীর থেকে মাদ্রাজ -এ বিশাল দেশে নানা ভাষা, নানা ফেরকা,নানা মাজহাবে তখন বিভক্ত। কোন একটি বিশেষ গোত্র, বর্ণ, অঞ্চল, ফেরকা বা ভাষাভাষীর নেতা হওয়া সহজ,এমন কি হালাকু ও চেঙ্গিজের ন্যায় বর্বর ব্যক্তিও নেতাও নেতা হতে পারে। এমন কি সম্ভব হয়েছিল শেখ মুজিবের ন্যায় গণহত্যাকারি বাকশালী স্বৈরাচারির পক্ষেও। কিন্তু এসবের প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে বিশাল এলাকা জুড়ে বিভক্ত এক জনগোষ্ঠির নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রয়োজন হয় বিরল প্রতিভা, গভীর প্রজ্ঞা ও বিশাল ব্যক্তিত্বের। তেমন এক বিস্ময়কর প্রতিভা, প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্বের বলেই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতীয় মুসলমানদের নেতা হতে পেরেছিলেন। জিন্নাহর জীবনে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, বাঙালী, পাঞ্জাবী, বিহারী, সিন্ধি, গুজরাতি, শিয়া, সূন্নী, দেওবন্দি, বেরেলভী নানা ভেদ-ভেদাভেদের এ বিভক্ত মানুষকে তিনি একতাবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। সেদিন নানা বাধা অতিক্রম করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সে একতার বলেই।

অথচ আজকের ন্যায় সেদিনও নেতার অভাব ছিল না। বাংলা, পাঞ্জাব, আসাম, বিহার, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশসহ ভারতের প্রতি প্রদেশেই তখন মুসলমানদের বহু নেতা ছিল। কিন্তু কায়েদে আজম ছিলেন সেসব নেতাদেরও নেতা। ‘কায়েদে আজম’ অর্থ শ্রেষ্ঠ নেতা। সে শ্রেষ্ঠ নেতাকে সেদিন মেনে নিয়েছিলেন এবং তার প্রতি সম্মান দেখিয়েছিলেন শেরে বাংলা ফজলূল হক,সোহরাওয়ার্দী,নাযিমউদ্দীন,নুরুল আমীন,ভাষানী,আবুল হাশিম,আকরাম খান ও শেখ মুজিবসহ বাংলা ও আসামের মুসলিম নেতারাও। বাংলাদেশের ন্যায় দেশে সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় দল গড়লে মানুষ দলে দলে সে দলে শামিল হয়। এখানে সামরিক বাহিনীর চাপ প্রচণ্ড কাজ দেয়। কিন্তু সেদিন তাদের উপর কেউ চাপ প্রয়োগ করেনি। জিন্নাহর নেতৃত্বকে তারা সেদিন স্বেচ্ছায় মেনে নিয়েছিলেন।

জিন্নাহর সে বিরল ও বিশাল ব্যক্তিত্ব যে শুধু রাজনৈতিক নেতাদের আলোড়িত করেছিল তা নয়, আন্দোলিত করেছিল সমগ্র ভারতের মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের্। এমনকি বাংলা সাহিত্যেও কায়েদে আজমকে নিয়ে যে সাহিত্য রচিত হয়েছে তা কোন বাঙালী নেতাকে নিয়ে লেখা হয়নি। তবে ভারতের আধিপত্যবাদী বর্ণহিন্দুগণ পাকিস্তান আন্দোলনকে যেমন মেনে নিতে পারিনি, তেমনি মেনে নিতে পারিনি সে আন্দোলনের নেতাকেও। ফলে জিন্নাহ পরিণত হয়েছিলেন তাদের পরম শত্রুতে। তাদের মনে জিন্নাহ-বিদ্বেষ এতটাই তীব্র ছিল যে উপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকদেরও তারা এতটা গালি দেয়নি যতটা দিয়েছে জিন্নাহকে। সে ঘৃনা নিয়ে তারা জিন্নাহকে বলেছে ‘হাফ এডুকেটেড’ ব্যারিস্টার। বলেছে ক্ষমতালোভী, বলেছে সাম্প্রদায়িক। তবে তাদের সে ঘৃনা অনাকাঙ্খিত ছিল না। কারণ, তিনি তাদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছিলেন। অখণ্ড ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য নির্মানের স্বপ্নকে যিনি ভণ্ডুল করলেন, তাঁকে তারা শ্রদ্ধা দেখাবে সেটি কি আশা করা যায়?

 

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর বিষ-উদগীরণ

বাংলাদেশের বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের আচরণ শুধু অদ্ভূদই নয়, বিস্নয়করও। বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে তাদের প্রচণ্ড গর্ব। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না পেলে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা যে অসম্ভব ছিল সে বোধ কি তাদের আছে? বাংলাদেশের মুসলমানদের চেয়ে অধিক মুসলমানের বাস ভারতে, কিন্তু তাদের কি স্বাধীন হওয়ার সামর্থ আছে? সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের জিন্নাহবিরোধী হওয়ার হেতু আছে। কিন্তু বাংলাদেশীরা জিন্না্হবিরোধী হয় কি করে? তবে ইতিহাসের শিক্ষা,দাসদের নিজস্ব দর্শন,ধর্ম,জীবনবোধ বা সংস্কৃতি যেমন থাকে না। তেমনি বিচারবোধও থাকে না। মনিবের ধর্ম, দশর্ন ও সংস্কৃতিকেই তারা আপন করে নেয়। তেমনি মনিবের রায় বা ব্চিারই তাদের বিচার হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গদের খৃষ্টান হওয়া ও তাদের অনুকরণে পোষাক-পরিচ্ছদ ও নামগ্রহণ করার কারণ তো এটাই। একই রূপ অবস্থা বাংলাদেশের ভারতসেবী বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাদের। তাদের জীবন ও জগত জুড়ে ভারতীয় সংস্কৃতির তীব্র জোয়ার তো একারণেই। ভারতীয় হিন্দুর ন্যায় তাদের মনেও প্রবল ঘৃনা পাকিস্তান ও তার প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজমের বিরুদ্ধে। তাদের মন ও মনন যে কতটা বিষপূর্ণ সম্প্রতি তারই প্রকাশ ঘটেছে ভারতসেবী এ শিবিরের অন্যতম লেখক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখায়। গত ১২ সেপ্টম্বর (২০১১) দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় কায়েদে আজমের মৃত্যু দিবস উপলক্ষ্যে “আজ ‘কায়েদে আজম’ বেঁচে থাকলে কী ভাবতেন কী করতেন” শিরোনামে তিনি একটি নিবন্ধ লিখেছেন। নিবন্ধটিতে তিনি অনেক অসত্য কথা বলেছেন,ঘটিয়েছেন জঘন্য ইতিহাস বিকৃতি। উদগীরণ ঘটেছে তার মনে দীর্ঘ দিন ধরে জমা বিষের। লেখাটি শুরু করেছেন ভারতের মুসলমানদের দুরাবস্থা নিয়ে। অথচ সে নিদারুন দুরবস্থার জন্য তিনি ভারতকে দায়ী না করে দায়ী করেছেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা  ও তার নেতা কায়েদে আজমকে। ভারত সরকার ও তার মুসলিমবৈরী নীতি নিয়ে তিনি একটি কথাও লিখেননি। এদিক দিয়ে তিনি ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয়। মুসলমানদের এ পশ্চাদপদতা নিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং একটি কমিশন নিয়োগ করেছিলেন, সে কমিশন তার রিপোর্টও পেশ করেছে। সে রিপোর্টে মুসলমানদের এ নিদারুন দুরাবস্থার কারণ রূপে কায়েদ আজম বা পাকিস্তানের নাম নেই, যেমনটি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী উল্লেখ করেছেন।

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী তাঁর লেখাটি শুরুটা করেছেন এভাবে, “খবরটি ঢাকার একটি কাগজে বের হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে ভারত তার দেশের মুসলমানদের সংখ্যা কম করে দেখাচ্ছে। ২০০১ সালে ভারতের আদমশুমারিতে দেখানো হয়েছে মুসলমানদের সংখ্যা ১৩ কোটি ৮০ লাখ। কিন্তু আমেরিকার হিসাব মতে এই সংখ্যা অনেক বেশি। নয়াদিল্লির মার্কিন দূতাবাসের হিসাবে এই সংখ্যা ১৬ থেকে ১৮ কোটি।” আব্দুল গাফফার চৌধুরি তাঁর নিবদ্ধে মার্কিন দূতাবাসের পাঠানো এ গোপন খবরটি উদ্ধৃত করে বুঝাতে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু ভারত সরকার মুসলমানদের জনসংখ্যা নিয়ে কেন এ মিথ্যাচার ঘটাচ্ছে এবং মার্কিনীদের কাছেই বা কেন বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ মনে হল তা নিয়ে জনাব চৌধুরি কোন মন্তব্যই করেননি। সে খবরের গভীরে যাওয়ার চেষ্টাও করেননি। অথচ মার্কিন দূতাবাসের গোপন রিপোর্টের মূল লক্ষ্য ছিল, মুসলমানদের প্রকৃত সংখ্যা গোপন করার ভারতীয় ষড়যন্ত্রটি তুলে ধরা। কোন দেশই তার দেশের সৈন্যদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করে না। ভারতও তেমনি প্রকাশ করছে না মুসলমানদের প্রকৃত সংখ্যা। এখানে কাজ করে ভারতীয় বর্ণহিন্দু শাসক শ্রেণীর মুসলিম ভীতি। তাদের ভয়, মুসলমানদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ পেলে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। সরকারি চাকুরিতে তারা আরো অংশিদারীত্ব দাবী করবে। তাতে আঘাত পড়বে হিন্দুদের প্রতিষ্ঠিত কায়েমী স্বার্থে। বিষয়টি মার্কিনী দূতাবাসের কাছে ধরা পড়লেও আব্দুল গাফফার চৌধুরি তা নিয়ে নীরব। ভূতের ভয়ে আতংকগ্রস্ত মানুষ যেমন সব কিছুর মধ্যে ভূত দেখতে পায় তেমন অবস্থা জনাব চৌধুরির। আর এ রোগ তাঁর একার নয়, সকল ভারতসেবীরই। তাদের কাছে পাকিস্তান দায়ী শুধু বাংলাদেশের দুরাবস্থার জন্যই নয়, ভারতীয় মুসলমানদের পশ্চাদপদতার জন্যও।

 

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির মিথ্যাচারিতা

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির বুদ্ধিবৃত্তিক মিথ্যাচারিতা এবং সে সাথে বড় ধৃষ্টতা হল, যে কায়েদে আজমের প্রতি বাংলার প্রায় সকল নামকরা মুসলিম নেতা শ্রদ্ধা দেখালো তাকে তিনি অপরাধী রূপে খাড়া করেছেন। তিনি লিখেছেন, “গতকাল (রোববার) যখন আমার হাতে আসা ঢাকার কাগজে এই খবরটি পড়ছি, তখন চকিত মনে পড়ল, আজ ১১ সেপ্টেম্বর। ১৯৪৮ সালের এই দিনে পাকিস্তানি মুসলমানদের দ্বারা সম্বোধিত ‘কায়েদে আজম’ ইন্তেকাল করেন। তিনি অবিভক্ত ভারতের তৎকালীন ১০ কোটি মুসলমানকে একটি আলাদা জাতি বলে দাবি করে দেশটিকে ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ছুরিতে ভাগ করেছিলেন। মৃত্যুর ৬৩ বছর পর আজ যদি তিনি কবর থেকে হঠাৎ জেগে উঠতেন এবং জানতেন খণ্ডিত ভারতেই এখন মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি অথবা মার্কিন হিসাব অনুযায়ী ১৬ থেকে ১৮ কোটি, তাহলে তিনি কী করতেন? কী ভাবতেন? আরেকটি পাকিস্তান দাবি করতেন কি?” আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির দাবী, ‘জিন্নাহ শুধু পাকিস্তানীদের দ্বারা কায়েদে আজম রূপে সম্বোধিত হতেন’ এ কথাটি সত্য নয়। প্রকৃত যে সত্যটি তিনি ইচ্ছা করেই গোপন করেছেন তা হল, মি. জিন্নাহ ‘কায়েদে আজম’ রূপে সবচেয়ে বেশী সম্বোধিত হয়েছেন অবিভক্ত বাংলায়। এর প্রমাণ, জিন্নাহ যখন ‘কায়েদে আজম’ উপাধি পান তখন তার দল মুসলিম লীগের সরকার ছিল একমাত্র বাংলাতেই, পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ বা সিন্ধুতে নয়।  বাংলা ছিল তার রাজনীতির মূল দূর্গ। পাকিস্তানের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশী বুঝেছিল বাংলার মুসলমানরাই। ১৯৪০ সালে ২৩শে মার্চ লাহোরের মিন্টো পাকে মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় সম্মেলনে পাকিস্তান প্রস্তাবটি যিনি পেশ করেছিলেন তিনিও কোন পাঞ্জাবী, সিন্ধি বা  পাঠান ছিল না, ছিল বাঙালী মুসলমান ফজলুল হক।

“ভারতের বর্তমান ১৮ কোটি মুসলমানদের নিয়ে তিনি কী করতেন” -এ প্রশ্নের জবাব কায়েদে আজম  বেঁচে থাকলে হয়তো তিনিই দিতেন। জবার কি দিতেন সেটি অন্য কারো পক্ষে বলা অসম্ভব। তবে বেঁচে থাকলে তিনি প্রচণ্ড আনন্দ পেতেন এ দেখে যে, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা কতটা অপরিহার্য ও সঠিক ছিল। কংগ্রেসে পক্ষে তার “শো বয়” মাওলানা আবুল কালাম আযাদ যত কথাই বলুক, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের শাসনে মুসলমানদের যে কোন কল্যাণ নেই সেটি আজ ভারতের মুসলমানদের অধঃপতিত অবস্থা নিজেই প্রমাণ করছে। হিন্দুদের অধীনে ভারতীয় মুসলমানদের বঞ্চনা ও দুর্দশাগত যে জীবনের তিনি আশংকা করেছিলেন সেটিই সঠিক প্রমানিত হয়েছে। ভারতের সকল মুসলমানকে মুক্তি দিতে না পারলেও অন্তত দুই-তৃতীয়াংশকে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের ন্যায় দুঃসহ যাতনা থেকে উদ্ধার করাটি কি কম সফলতা? ডুবন্ত জাহাজের অর্ধেকের বেশী লোককে বাঁচানো কি কম কথা? পাকিস্তান ও বাংলাদেশের তিরিশ কোটি মানুষ আজ পরাধীনতামূক্ত স্বাধীন জীবন পেয়েছে তো ১৯৪৭-এ পাকিস্তানের বরকতেই। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং পারমাণবিক শক্তিধারি একমাত্র এ মুসলিম রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠা কি কম অর্জন? আজকের পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ভারতের পেটের মধ্যে থাকলে তাতে ভারতের আয়োতন নিঃসন্দেহে আরো বিশাল হতো। ভারতীয় বর্ণবাদী উচ্চবর্ন হিন্দুদের সাম্রাজ্য লিপ্সা হয়তো আরো বলবান হতো। কিন্তু তাতে মুসলমানের কি গৌরব বাড়তো? জেলখানায় কয়েদীর সংখ্যা বাড়লে কি তাদের শক্তিও বাড়ে? পরাধীন ১৮ কোটি ভারতীয় মুসলমানের সাথে বরং যোগ হত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আরো বত্রিশ কোটি মুসলমান।

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির মত ভারতসেবী বুদ্ধিজীবীদের সমস্যা হল, তাদের গৌরব মুসলমান হওয়াতে নয়, বরং সেক্যুলার বাঙালী হওয়াতে। সে সুবাদে ভারতের সেক্যুলার বাঙালী হিন্দুদের সাথে তাদের মনের সংযোগ। ইসলাম ও মুসলিম পরিচয়ের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে বহু আগেই। ফলে বিশ্বে সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে তারা আনন্দ পান না, বরং কষ্ট পান সে রাষ্ট্রের প্রতিষ্টা ও বলবান হওয়াতে। তাদের আনন্দ তো মুসলিম রাষ্ট্রের বিভক্তি ও বিনাশে, বরং উল্লাস বাড়ে ভারতের শক্তি ও গৌরব বৃদ্ধিতে। তাই স্বপ্ন দেখেন, অবশিষ্ঠ পাকিস্তান কবে টুকরো টুকরো হয়ে বিলুপ্ত হয় তা নিয়ে। তাদের কষ্ট তো ভারতের বিভক্তিতে। তাই ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তি নিয়ে তারা কংগ্রেস ও বিজেপীর ক্যাডারদের ন্যায় মর্মবেদনায় ভোগেন।

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরি লিখেছেন, “ধর্মের ভিত্তিতে জাতিত্ব নির্ধারণ এবং দেশ ভাগ করার মতো সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক বুদ্ধি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো একজন আধুনিকমনা, পাশ্চাত্য শিক্ষিত নেতাকে কেমন করে পেয়ে বসেছিল তা ভাবলে এখন বিস্মিত হতে হয়। … তিনি অবিভক্ত ভারতের ১০ কোটি মুসলমানের মধ্যে ৪ কোটিকে ভারতে রেখে ৬ কোটিকে নিয়ে পাকিস্তান গঠন করেছিলেন। ..তার বুদ্ধিতে কি এই কথা ধরা পড়েনি যে, এই চার কোটি মুসলমান ভারতে বাস করেই কালক্রমে ১৪ কোটি হয়ে দাঁড়াতে পারে! তখন তারা ভারতীয় হতে চাইলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের কাছে সমান মর্যাদার ভারতীয় বলে গৃহীত হতে না-ও পারেন। তখন তাদের স্বার্থ, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা ক্রমাগত ক্ষুণ্ণ হতে থাকবে বই বাড়বে না। ভারতে এখন মুসলমানদের ভাগ্যে তাই ঘটছে।”

জিন্নাহর বিরুদ্ধে তাঁর দোষারোপ, ধর্মের ভিত্তিতে তিনি জাতিত্ব নির্ধারণ করেছেন। সেক্যুলারিস্টদের এটি এক প্রবলতম রোগ। তাদের কাছে মানব জাতির বিভক্তিটা ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও ভৌগলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে। ধর্মীয় পরিচয় তাদের কাছে গুরুত্বহীন। অথচ মহান আল্লাহর কাছে মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো তার ধর্মীয় পরিচয়। জান্নাতে স্থান প্রাপ্তি ঘটবে সে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে, ভাষা, বর্ণ বা অঞ্চলের ভিত্তিতে নয়। তাই আল্লাহর কাছে মানব জাতির বিভক্তিটা মূলত ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরিদের বিভাজনের সে নীতি ১৯৪৭-এ উপমহাদেশের মুসলমানদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। সেদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানের কাছে তাই গুরুত্ব পায়নি বাঙালী পরিচয়টিও। ফলে সেদিন বাংলার মুসলমানগণ বাঙালী হিন্দুদের সাথে একাত্ব না হয়ে একাত্ব হয়েছিল অবাঙালী মুসলমানদের সাথে। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির কাছে সেটি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক মনে হলেও সেটিই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানাদের চেতনা। এবং এ চেতনা জনাব জিন্নাহর একার ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি ছিল সে চেতনা।  পাকিস্তান ভেঙ্গে গেছে বটে, কিন্তু সে চেতনার কি মৃত্যু ঘটেছে? মৃত্যু ঘটলে কি স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের কি কোন ভিত্তি থাকে? তা হলে পশ্চিম বাংলার ন্যায় বাংলাদেশও ভারতে বিলীন হয়ে যেত।

 

উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে!

কায়েদে আযমের নেতৃত্বে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকে দায়ী আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরি লিখেছেন, “তিনি ভারতের মুসলমানদের উপকার করার বদলে তাদের যে অপকার করে গেছেন, তার প্রমাণ আজকের ব্যর্থ এবং বিধ্বস্ত রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং ভারতের মুসলমানদের বর্তমান দুর্দশা ও দুরবস্থা।” আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরি এখানে ভারতের মুসলমানদের বর্তমান দুর্দশার সাথে পাকিস্তানের বিধ্বস্ত অবস্থার জন্যও জনাব জিন্নাহকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, “জিন্নাহ উপকার করার বদলে অপকার করেছেন।” অথচ প্রকৃত সত্য হলো, পাকিস্তানের বর্তমান দুরাবস্থার জন্য দায়ী আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির ন্যায় সেক্যুলার নেতৃবৃন্দের নীতিহীনতা, জিন্নাহ নন। শেখ মুজিবের মত যেসব নেতারা ১৯৪৭-এ প্যান-ইসলামী চেতনায় উজ্জীবীত হয়ে অবাঙালীদের সাথে মিলে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন তারা পরবর্তীতে সে নীতিতে অটল থাকতে পারেননি। তারা লিপ্ত হয়েছেন ক্ষমতা দখলের নোংরা রাজনীতিতে। এবং হাত মিলিয়েছেন পাকিস্তানের শত্রু পক্ষের সাথে। ফলে যে পক্ষটি ভারতের মুসলমানদের দুর্দশা বাড়িয়ে চলেছে তারাই ব্যর্থতা বাড়াচ্ছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের। জিন্নাহ বিশাল একটি ভূমি এবং সে সাথে সম্ভাবনার দ্বারকে উম্মূক্ত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের মুসলমানদের ব্যর্থতা যে সে অমূল্য ভূমিকে তারা সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। এজন্য কি তাই জিন্নাহকে দায়ী করা যায়? এবং সে দায়ভার সবচেয়ে বেশী ছিল বাংলাদেশীদের। কারণ পাকিস্তানের ৫৬% জনগণ তো ছিল তারাই। কিন্তু সে দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির যুক্তি, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার ফলেই ভারতীয় মুসলমানদের দুর্দশা বেড়েছে। এবং ভারতে বেড়েছে মুসলিম বৈরীতা। প্রশ্ন হল, ভারত সরকারকে মুসলিম বৈরী না হয়ে মানবিক হতে কি কায়েদে আজম নিষেধ করেছিলেন? পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাই বা দায়ী হয় কি করে? কংগ্রেস ধর্মের উর্দ্ধে উঠে হিন্দু-মুসলিম উভয়ের কল্যাণ চায় সে কথা ১৯৪৭ এর পূর্ব থেকেই বলে আসছে। কিন্তু সেটির বাস্তব প্রয়োগ কোথায়? সেটি কি মসজিদ-নির্মূল, মুসলিম হত্যা ও ধর্ষণ এবং তাদের বঞ্চনা বাড়িয়ে? তবে কায়েদে আযমের অসামান্য প্রজ্ঞা হল, তিনি ভারতীয় হিন্দুদের মনের কুৎসিত রূপটি যতটা নিখুঁত ভাবে দেখেছিলেন সেটি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরিদের মত সেক্যুলারদের চোখে আজও ধরা পড়েনি। এমনকি হিন্দু সন্ত্রাসীদের হাতে বাবরী মসজিদের ধ্বংস, শত শত মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা, গুজরাতে মুসলিম নিধন, কাশ্মীরে গণহত্যা ও দখলদারি, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ফারাক্কা,টিপাইমুখ বাঁধ,সীমান্তে কাঁটাতার এবং বিএসএফের হাতে শত শত বাংলাদেশী হত্যার পরও। অথচ আজ থেকে ৭০ বছর আগেই কায়েদে আজম  সেটি সুস্পষ্ট ভাবে দেখতে পেরেছিলেন। ফলে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকে সেদিন তিনি অপরিহার্য ভেবেছিলেন। কিন্তু এত কিছুর পরও সে বিপদ বুঝবার সামর্থ আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর মত লোকগুলোর বেড়েছে কতটুকু? পুলিশের চোখের সামনে দিন-দুপুরে ভারতে মসজিদ ধ্বংস করা হয়, ধর্ষিতা হয় হাজার হাজার মুসলিম নারী, এবং ধর্ষনের পর তাদেরকে আগুণে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু সে অপরাধের জন্য কাউকে গ্রেফতার করা হয় না, আদালতেও তোলা হয় না। অরুন্ধুতি রায়ের মত বহু বিবেকমান ভারতীয় বুদ্ধিজীবী মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হত্যা, ধর্ষন, লুটতরাজের ন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিন্তু সে প্রতিবাদের ভাষা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর মুখে যেমন নাই তেমনি নাই তাদের নেত্রী শেখ হাসিনারও নাই। নেই ভারতের কংগ্রেসী মুসলিম নেতাদেরও নেই। তারা বরং পাকিস্তানের সৃষ্টিকেই অনর্থক মনে করেন।

 

এতই কি তুচ্ছ তেইশ বছরের অর্জন? 

প্রশ্ন হল, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার ফলে মাত্র তেইশ বছরে মুসলমানদের যে উপকার হয়েছে সেটি কি এতটাই তুচ্ছ? ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা পাকিস্তানের বা বাংলাদেশের মুসলমানদের চেয়ে অধিক। কিন্তু পাকিস্তানের করাচী বা লাহোর বা ইসলামাবাদের ন্যায় একটি মাত্র শহরে যতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, আর্মি অফিসার, বিচারপতি, আইনবিদ, প্রশাসনিক আমলা আছে এবং তাদের হাতে যে পরিমান ধন-সম্পদ সঞ্চিত হয়েছে তা কি ভারতের সমুদয় মুসলমানের আছে? তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ২৩ বছরে যত জন বাঙালী মুসলিম ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, আর্মি অফিসার, বিচারপতি, আইনবিদ, প্রশাসনিক আমলা হতে পেরেছে তা ব্রিটিশ শাসনের ১৯০ বছরেরও কি তার দশভাগের এক ভাগ হতে পেরেছিল? তাছাড়া জনগণের উন্নয়নের মাপকাঠি শুধু সম্পদ, চাকুরি-বাকুরি ও শিক্ষা নয়, বরং বড় মাপকাঠি হল, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, জানমালের নিরাপত্তা, সুরক্ষিত ইজ্জত-আবরু এবং স্বাধীন জীবনের উপলদ্ধি। এক্ষেত্রেও পাকিস্তানের মুসলমানদের অর্জন কি কম? পাকিস্তানের একজন মুসলমান যতটা স্বাধীনতা, জানমালের নিরাপত্তা ও ইজ্জত-আবরু নিয়ে বসবাস করে তা কি কোন ভারতীয় মুসলমান কল্পনা করতে পারে?

জিন্নাহকে পাকিস্তানীরা কায়েদে আজম  তথা শ্রেষ্ঠ নেতা বলে সম্মান দেখায় সেটি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ভাল লাগেনি। তাঁকে বরং হাফ এডুকেটেড ব্যারিস্টার বলে হেয় করার চেষ্টা করেছেন। শ্রেষ্ঠ বলার চেষ্টা করেছেন শেখ মুজিবকে। শেখ মুজিব যে শ্রেষ্ঠ সেটি প্রমানের জন্য তিনি তাঁর এক পাকিস্তানী সাংবাদিক বন্ধুর মন্তব্য পেশ করে লিখেছেন, “লন্ডনে এক পাকিস্তানি সাংবাদিক-বন্ধু আমাকে বলেছেন, ‘তোমরা বড় ভাগ্যবান তাই শেখ মুজিবের মতো নেতা পেয়েছিলে। তিনি সময়মতো বাংলাদেশকে পাকিস্তানের জংলি ফৌজি শাসন থেকে মুক্ত করে আলাদা স্বাধীন দেশ না করলে এখন পাকিস্তানের পূর্বাংশ হিসেবে তোমরাও একদিকে তালেবানি সন্ত্রাসে জর্জরিত এবং অন্যদিকে মার্কিনী ড্রোন হামলার শিকার হতে। তোমরা এখন এই গ্রেট লিডারের সামান্য ভুলত্রুটির যতই সমালোচনা কর, একথা ভুললে চলবে না, তিনি তোমাদের স্বাধীন জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং একটি স্বাধীন নেশন স্টেট উপহার দিয়ে গেছেন। পাকিস্তানের সঙ্গে সহমরণে তোমাদের যেতে হয়নি।’ আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির যে বন্ধুটি শেখ মুজিবকে গ্রেট লিডার বলেছেন সে শেখ মুজিব যে বাংলাদেশকে “তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি” রূপে বিশ্ব মাঝে পরিচিত করেছিলেন সে বিষয়টি কি তিনি জানেন না? জিন্নাহর পাকিস্তান আর যাই হোক তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি হয়নি। তিনি পাকিস্তানে একদলীয় বাকশালও প্রতিষ্ঠা করেননি। নিরস্ত্র দেশবাসীর উপর রক্ষিবাহিনীর নির্মম অত্যাচারও নামিয়ে দেননি। বরং আজকের যে বাংলাদেশ সেটিও সম্ভব হয়েছে জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায়।  

 

বাঙালীর চেতনা ও সাহিত্যে কায়েদে আজম

কায়েদে আজমকে কেন কাযেদে আজম বলা হল, তা নিয়েও আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী ক্ষোভ। তিনি লিখেছেন, পাকিস্তানী আমলে নিছক ঘটা করেই কায়েদে আজমের জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন করা হত। তার সাথে বাঙালীর মনের যোগ ছিল না। তাঁর অভিযোগ, জনাব জিন্নাহকে কায়েদে আজম বলার সাথে তাঁর জন্মদিবস ও মৃত্যু দিবস পালনে বাঙালীদের বাধ্য করা হত। কিন্তু তাঁর এ কথা যে অসত্য সে সাক্ষী খোদ বাংলা সাহিত্য। কায়েদে আজম বাঙালী ছিলেন না। কিন্তু তারপরও তাঁকে নিয়ে বাঙালী কবি-সাহিত্যিকেরা যত কবিতা লিখেছেন তা কি আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির গ্রেট লিডারকে নিয়েও কি লেখা হয়েছে? ভয়ভীতিতে সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। কাউকে কবিতা লিখতে বাধ্য করা যায় না। কবিতা লেখার প্রেরণাটি মনের গভীর থেকে। কায়েদে আজমের প্রতি বাঙালী মুসলমানের শ্রদ্ধাবোধ যে কতটা গভীর ও অকৃত্রিক ছিল বাংলা কবিতা থেকে তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। অন্য কেউ নন, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরিদের স্বপক্ষীয় কবি খোদ বেগম সুফিয়া কামাল কায়েদে আজমকে নিয়ে লিখেছেন,

“তসলীম লহ, হে অমর প্রাণ! কায়েদে আজম, জাতির পিতা!

মুকুট বিহীন সম্রাট ওগো! সকল মানব-মনের মিতা।

অমা-নিশীথের দুর্গম পথে আলোকের দূত! অগ্রনায়ক!

সিপাহসালার! বন্দী জাতিরে আবার দেখালে মুক্তি-আলোক।”

                 – (মাহে নও। ডিসেম্বর ১৯৫৯)।

 

অন্য এক কবিতায় তিনি লিখেছেন,

“জাতির পতাকা-তলে একত্রিত সকলে তোমারে

স্মরণ করিছে বারে বারে,

তোমার আসন আজও  সকলের হৃদয়ের মাঝে

তোমারে লইয়া ভরে আছে।

যুগে যুগে তুমি তব দানের প্রভায়

চিরঞ্জীব হয়ে র’বে আপনারী দিব্যি মহিমায়।

কায়েদে আজম। তবদান

মহাকাল-বক্ষ ভরি রহিবে অম্লান।”

                -(মাহে নও। ডিসেম্বর ১৯৫৫)

 

সুফিয়া কামাল আরেক কবিতায় লিখেছেন,

“হে সিপাহসালার! তব দৃপ্ত মনোরথে

ছুটাইয়া টুটাইয়া জিন্দানের দ্বার

আনিলে প্রদীপ্ত দীপ্তি ঘুচায়ে শতাব্দী অন্ধকার

মৃত্যু নাহি যে প্রাণের ক্ষয় নাহি তার দেয়া দানে

লভি আজাদীর স্বাদ, এজাতি-জীবন তাহা জানে

তোমার জনম দিনে, তোমার স্মরণ দিনে

কায়েদে আজম! তব নাম

কোটি কন্ঠে ধ্বনি ওঠে, কহে, লহ মোদের সালাম।”

                         –(পাক-সমাচার। ডিসেম্বর: ১৯৬৩)। 

 

কায়েদে আজম স্মরণে সিকান্দার আবু জাফর লিখেছেন,

“ডোবেনি যে রবি, নেভেনি যে আলো

মুছিবে না কোন কালে,

এই কালে পৃথিবীর ভালে

জ্যোতি-প্রদীপ্ত উজ্বল সেই

সূর্য্যের প্রতিভাস

সে রচিয়া গেছে মৃত্যুবিহীন

আপনার ইতিহাস।

সে ছড়ায়ে গেছে মৃত্যুঞ্জয়ী

মহাজীবনের বীজ,

সে ফোটায়ে গেছে লক্ষ বুকের

তিমির সরসী নীরে

চির প্রভাতের আনন্দ সরসিজ।

মৃত্যু ‘অতীত জীবন তাহার

মৃত্যু সাগর তীরে

দিগন্তহীন সীমা বিস্তৃত জীবনের মহাদেশে

যুগ-যুগান্ত সে আসিবে ফিরি ফিরে।

বহু মৃত্যুর দিগন্ত হতে সে এনেছে কেড়ে

জীবনের সম্মান;

ক্ষয় নাহি তার নাহি তার অবসান।  

অযুত মৌন কন্ঠ ভরিয়া নব জীবনের গান

ফোটা যে বারে বারে

মৃত্যু কি তারে স্তব্ধ করিতে পারে? 

           -(শাহেদ আলী সংকলিত, ১৯৮৯)

 

 

আওয়ামী লীগ আমলের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং বাংলা এ্যাকাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক ডঃ মাযহারুল ইসলাম লিখেছেন,

“সহসা আলোর পরশ লাগালো

প্রাণে প্রাণে এক চেতনা জাগলো

আধার দুয়ার খুলে গেল সম্মুখে

কে তুমি হে নব-পথ-সন্ধানী আলোকদ্রষ্টা?

কে তুমি নতুন মাটির স্রষ্টা?

যে এনেছে বুক জুড়ে আশ্বাস

যে দিয়েছে সত্তা নিয়ে বাঁচবার বিশ্বাস

অগণন মানুষের হৃদয়-মঞ্জিলে

-সে আমার কাযেদে আজম

আমার তন্ত্রীতে যার ঈমানের একতার

শৃঙ্খলার উঠিছে ঝংকার

সুন্দর মধুর মনোরম।” -(শাহেদ আলী সংকলিত, ১৯৮৯)

 

ড. মাজহারুল ইসলাম অন্য এক কবিতায় কায়েদে আজম সম্পর্কে লিখেছেন,

“আঁধারের গ্লানিভরা জাতির জীবন

কোথাও ছিল না যেন প্রাণ স্পন্দন

মৃত্যু­-তুহীন দিন গুণে গুণে এখানে ওখানে

শুধু যেন বারবার চলিষ্ণু পখের প্রান্তে ছেদ টেনে আনে

ম্লান পথ হয়ে ওঠে আরো ঘন ম্লান

আঁধারে বিলীন হলো মুক্তি-সন্ধান।

তারপর মৃত্যু-জয়ী সে এক সৈনিক

সৃষ্টির আনন্দ নিয়ে নেমে এলো আঁধারের পথে

চোখে মুখে অপূর্ব স্বপন

হাতে আঁকা অপরূপ নতুন দেশের রূপায়ন

এ মাটিতে সে এক বিস্ময়,

মৃত বুকে প্রাণ এলো

মুক্তির চেতনা এলো।

প্রাণ যাক তবু সেই স্বপ্ন হোক জয়

নির্বিকার ত্যাগের আহবান!

পথে পথে রক্তের আহবান।

  -মাটির ফসল, -(শাহেদ আলী সংকলিত,১৯৮৯)

 

বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক এবং ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জনাব আবু হেনা মোস্তাফা কামাল কায়েদে আজমের সম্মানে লিখেছেন,

“প্রদীপ্ত চোখে আবার আকাশকে দেখলাম

পড়লাম এক উজ্বল ইতিহাসঃ

সে ইতিহাসের পাতায় পাতায় একটি সোনালী নাম…

আবার আমরা আমরা চোখ তুলে তাই দেখলাম এ আকাশ।

 

তোমাকে জেনেছি আকাশের চেয়ে বড়—

সাগরের চেয়ে অনেক মহত্তর—

কেননা ক্লান্ত চোখের পাতায় নতুন আলোর ঝড়

তুমি এনে দিলে । নতুন জোয়ার ছুঁয়ে গেল বন্দর।

        -(মাহে নওঃ ডিসেম্বর ১৯৫৩)     

 

কায়েদে আজমের মৃত্যুতে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন,

“অনুর্বর প্রহরে আমার-প্রাণ দিলে সুর দিলে তুমি,

আমার মৃত্তিকালদ্ধ ফসলের ভিত্তিভূমি তুমি।

প্রতিকূল প্রহরের প্রবঞ্চনা ফিরে গেল অসীম কুন্ঠায়,

আসলাম দীপ্ত পথে খরতর সূর্যের আশায়।

তুমি সে সূর্যের দিন,তুমি তার আরম্ভের প্রভা,

সবুজের সমারোহ জীবনের দগ্ধ দিন

প্রাণের বহ্নিব মোহে জেগে উঠে নতুন সঙ্গীতে-

অপূর্ণ জীবন আজ পরিপূর্ণ হলো বন্ধু তোমার ইঙ্গিতে।

মানব কন্ঠে যে সুর জাগালে তুমি,

সে সুরে এবার তুলে কল্লোল আমার জন্মভূমি।

–        নয়া সড়ক (বার্ষিকী), (সংকলনে শাহেদ আলী, ১৯৮৯)।

  

পাকিস্তানে লড়াই ও আত্মসমর্পিত বাঙালী সেক্যুলারিস্ট

 পাকিস্তান কেন আজও বেঁচে আছে সেটিই জনাব আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির কাছে বিস্ময়। তাঁর কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানের ব্যর্থতাগুলো। ১৯৪৭শে দেশটির প্রতিষ্ঠার কারণে যে ৩০ কোটি মানুষ স্বাধীন জীবনের স্বাদ পেল সেটি তাঁর কাছে কোন গুরুত্বই পেল না। তিনি পাকিস্তানের প্রতি নিজের ঘৃনাবোধটি তুলে ধরেছেন এভাবে, “ভারত থেকে ভাগ করে এনে তৎকালীন যে ছ’কোটি মুসলমানের জন্য তিনি ‘সাধের পাকিস্তান’ গড়লেন, তার অবস্থাই বা এখন কী? .. রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীদের অংশ পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ আলাদা হয়ে যায়। খণ্ড পাকিস্তানের অবশিষ্ট অংশ হিংস্র জঙ্গিবাদের এখন লীলাভূমি এবং মিত্র আমেরিকার বর্বর ড্রোন বোমা হামলায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। পাকিস্তানের মুসলমানরা শিয়া-সুন্নি, আহমদিয়া-সুন্নি, মোহাজের ও অমোহাজের ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত হয়ে আত্মঘাতী বিবাদে লিপ্ত এবং আল কায়দা ও তালেবানরা সেখানে তাদের সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।” 

এটি সত্য, পাকিস্তানের ব্যর্থতা অনেক। সেখানে ড্রোন হামলা আছে, বোমা বিস্ফোরণও আছে। কিন্তু দেশটির বেঁচে থাকার লড়াই তো আজ থেকে নয়, তার জন্ম থেকেই। শুধু ড্রোন নয়, দেশটিকে ১৯৪৮, ১৯৬৫ ও ১৯৭১-এ তিনটি বড় বড় যুদ্ধও লড়তে হয়েছে। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, সেক্যুলারিজম ও ভারতের ন্যায় আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তান একটি ফ্রণ্টলাইন স্টেট। সে যুদ্ধ এখনও চলছে। তবে ভারতপন্থি জাতিয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের কাছে বাংলাদেশ যেমন অরক্ষিত ও অধিকৃত, পাকিস্তানে সেটি ঘটেনি। বরং তারা জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টদের পরাজিত করেছে সিন্ধুতে, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানে। সীমান্ত প্রদেশে ছিল কংগ্রেসী সীমান্ত গান্ধী আব্দুল গাফ্ফার খানের ঘাঁটি। শেখ মুজিবের বহু আগে তাঁর জন্ম। রাজনীতিতে তাঁর শিকড়ও ছিল গভীরে। পাকিস্তানের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে প্রথম আঘাতটি হেনেছিল তাঁর অনুসারিরাই। কিন্তু সে ঘাঁটিতে তাঁর অনুসারিরা আজ পরাজিত। তাঁর সে পাখতুনিস্তান আন্দোলন আজ বিলুপ্ত। সিন্ধুতে “জিয়ে সিন্ধ” আন্দোলনও ছিল পাকিস্তানের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে আরেক ষড়যন্ত্র। কিন্তু আজ  তারাও সেখানে পরাজিত।

দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়ার পরাজয়ে,এবং সে সাথে বিশ্বশক্তির মঞ্চ থেকে দেশটির বিলুপ্তিতে। লড়াইয়ের সে চেতনা নিয়েই পাকিস্তান গড়ে তুলে পারমানবিক বোমা ও দূরপাল্লার মিজাইলের ভাণ্ডার। নিজ দেশে নির্মাণ করছে যুদ্ধি বিমান যা বিদেশেও বাজার পাচ্ছে। পাকিস্তান আজ লড়াইয়ে লিপ্ত খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও। ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সমর্থন দিচ্ছে কাশ্মরীদের। তাছাড়া দেশটির অভ্যন্তরে দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে সেক্যুলারিষ্ট শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইও। দ্বিজাতি তত্ত্ব শুধু ভারতে নয়, প্রবল ভাবে সক্রিয় পাকিস্তানেও। সেখানে আল্লাহর অনুসারি মুসলমান যেমন আছে, তেমনি শয়তানের অনুসারি প্রচণ্ড দুষমনও আছে। ফল লাগাতর লড়াইও আছে। দেশটি একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানে পরাজিত হয়েছে,কিন্তু সে পরাজয়ের পরও যুদ্ধ শেষ হয়নি। লড়াই চলছে অবিরাম। অবিরাম লড়াই যে এখনও চালিয়ে যাচ্ছে সেটিই তো শক্তি, সাহস ও জীবনের লক্ষণ। সভ্যতা তো সেখানেই নির্মিত হয়, যে এলাকার মানুষ লাগাতর লড়াই করতে জানে। তেমন লড়াই কি বাংলাদেশে আছে? কোন অধিকৃত দেশের মজলুল মুসলমানের সমর্থনে বাংলাদেশ কোনকালেও কি কিছু করেছে? নবীজীর আমলে মাত্র ১০ বছরে সাহাবায়ে কেরাম যত যুদ্ধ লড়েছেন বাঙালীরা কি বিগত ৭ শত বছরেও লড়েছে? লড়েনি। ফলে সভ্যতা গড়ে উঠেছে আরবের ধূসর মরুতে, বাংলাতে নয়। আত্মসমর্পিত দাস জীবনে লড়াই থাকে না, অস্থিরতাও থাকে না। কিন্তু তাতে কি গৌরব বাড়ে? গড়ে উঠে কি উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতি? বাংলাদেশে যুদ্ধ নাই, কিন্তু তাতে কি ইজ্জত বেড়েছে? বরং ৫ বার জুটেছে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের খেতাব। যে কোন সৃষ্টি কাজে প্রচণ্ড প্রসব বেদনা আছে। লক্ষ্য যেখানে স্বাধীনতা ও সম্মান নিয়ে বাঁচা, সেখানে লাগাতর এ লড়াই থেকে কি নিস্তার আছে? প্রতি কদম সেখানে এগুতে হয় লড়াই করে। বিজয় আনতে হয় বিপুল রক্তের দামে। পাকিস্তানীরা আজ সে মূল্যটিই দিচ্ছে। এমন কি নবীজীর সামনেও এছাড়া বিকল্প পথ ছিল না। পাকিস্তানের দিল্লির কাছে আত্মসমর্পিত মন নিয়ে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরিরা কি সে সত্যটি বুঝেন? ২৮/০৯/১১

 

 

 




বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁ ও নাশকতা

রেনাসাঁ না আত্মঘাত

বাংলার হিন্দুদের মাঝে যেমন জাগরন এসেছে, তেমনি প্রচন্ড আত্মঘাত এবং নাশকতাও এসেছে। বাঙালী হিন্দুরা তাদের এ জাগরনকে বলে বাঙালীর রেনেসাঁ। কিন্তু সে রেনেসাঁ কি সমগ্র বাঙালীর? তাদের আত্মঘাতটি এসেছে জাগরণের ঠিক পরপরই। এবং তাদের হাত দিয়ে নাশকতাটি ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানদের বিরুদ্ধে। ঘটনার পরম্পরা দেখে মনে হয়, জাগরনটি যেন এসেছিল তাদেরকে আত্মঘাতের দিকে দ্রুত ঠেলে দেবার জন্যই। বাঙালী হিন্দুর সে আত্মঘাতটি ষোল কলায় পূর্ণ হয় ১৯৪৭ সালে বাংলার দেহ খন্ডিত করার মধ্য দিয়ে। ফলে বাংলা নিয়ে বাঙালী হিন্দুদের যে বিশাল স্বপ্ন ছিল তা যেন হটাৎ মারা যায়। ফলে ইউরোপীয় রেনেসাঁ যেমন ইউরোপীয়দের শিক্ষা, শিল্প, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে লাগাতর উন্নয়ন আনে এবং তাদেরকে বিশ্বশক্তিতে পরিনত করে, বাঙালী হিন্দুর জীবনে সেটি ঘটেনি। কিছুটা বেড়ে উঠার পর তাদের বেড়ে উঠাটি হঠাৎ থেমে যায়। বিশ্বমাঝে দূরে থাক, এমনকি ভারতীয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতেও তারা গুরুত্বপূর্ণ শক্তিও হতে পারেনি।

তবে তাদের আত্মঘাতটি নীরব আত্মহত্যা ছিল না, প্রচন্ড নাশকতা ঘটিয়েছে বাঙালী মুসলমানদের বিরুদ্ধে এবং বিপন্ন করেছে বাঙালী মুসলমানের মুসলমান রূপে বেড়ে উঠাটি। বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম দেশের সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ রূপে শুধু মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতেই নয়, বিশ্বরাজনীতিতেও যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো সেটি মারা পড়ে একাত্তরে। অথচ উনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শিক্ষা, সাহিত্য ও বিজ্ঞানে বাঙালী হিন্দুর অর্জনটি কম ছিল না। কিন্তু এখন সেটি নিছক ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বাঙালী হিন্দুর প্রচন্ড গর্ব, কিন্তু তার বিশাল সাহিত্যে বাঙালীর জাগরন বেগবান না হয়ে বরং আত্মঘাত বাড়ায়। বলা হয়, বাঙালীর রেনেসাঁ শুরু হয় রাজা রামমোহন থেকে। আর রবীন্দ্রনাথের মরদেহের সাথে সেটিও শশ্মান ঘাটে গিয়ে পৌঁছে। তাই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বাঙালীর গর্ব বাড়ালেও আত্মঘাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। মৃত্যু যখন কোন ঘাতকের পক্ষ থেকে আসে তখন সেটি হত্যাকান্ড। আর যখন সেটি নিজ হাতের কামাই, তখন সেটি আত্মঘাত বা আত্মহত্যা। আর বাঙালীর হিন্দুদের জীবনে দ্বিতীয়টিই এসেছিল। এবং সে আত্মঘাতের ঘটনাটি শ্রী নিরোদ চন্দ্র চৌধুরীর চোখেও ধরা পড়েছিল। তবে নীরদ বাবুর ভূল হল, তিনি সেটিকে হিন্দু বাঙালীর আত্মঘাত না বলে তাঁর লিখিত “আত্মঘাতি বাঙালী” বইতে বাঙালীর আত্মঘাত বলেছেন। সম্ভবত তিনি সেটি ইচ্ছাকৃত ভাবেই বলেছেন। কারণ শরৎচন্দ্র চ্যাটার্জীর মত তিনিও হয়ত বাঙালী বলতে শুধু বাঙালী হিন্দুদেরই বোঝাতেন। যেমন শরৎচন্দ্র লিখেছেন, “আমাদের স্কুলে বাঙালী ও মুসলমানদের মাঝে খেলা।”

 

হিন্দুচেতনায় মুসলিম বিদ্বেষ

বাংলার ইতিহাসে বড় সত্যটি হল, এ দেশে ইসলামের আগমন ও মুসলিম শাসনকে হিন্দুরা কখনই মেনে নিতে পারিনি। তেল আর পানি যেমন একত্রে মেশে না, তেমনি বাংলার হিন্দু ও মুসলমানগণ ৮ শত বছরের বেশী কাল পাশাপাশি বসবাস করলেও তাদের মাঝে সৌহাদ্য-সম্প্রীতি গড়ে উঠেনি। মুসলমানগণ হিন্দুদের কাছে ম্লেছ, মোছলা, যবন, নেড়ে এবং বহিরাগতই রয়ে গেছে। সেটি যেমন বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের মত প্রথম সারির হিন্দু সাহিত্যিকের লেখায়, তেমনি সাধারণ হিন্দুদের চেতনায়। ঘৃনাপূর্ন হিন্দু-মনের বেদনায়ক সে স্মৃতীটি বাংলার মুসলমানদের ঘরে ঘরে। তারই ক্ষুদ্র চিত্র সম্প্রতি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক জনাব আসাফউদ্দৌলাহ। ঢাকায় আয়োজিত আলোচনা সভায় স্মৃতীচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “পড়তাম ফরিপুর জেলা স্কুলে। কোনদিন ক্লাসে দ্বিতীয় ছাড়া প্রথম হতে পারিনি। প্রথম হলাম ১৯৪৮ সালে। হিন্দু শিক্ষকদের কাছে আমরা ছিলাম মোছলা। পাজামা পড়তাম বলে বলতো দোনালা। আমার নাম আসাফউদ্দৌলাহ, অথচ হিন্দুরা সে নামে না ডেকে বলতো ফসফসা। হিন্দু বন্ধুদের বাসায় গিয়েছি এবং একবার ভূলে বই ফেলে আসি। বই আনতে গিয়ে দেখি আমার বন্ধুর মা তীব্র ভাষায় গালী-গালাজ করছে। বলছে সব অপবিত্র হয়ে গেছে। আমি যেখানে বসেছিলাম সে জায়গা ও সে চেয়ার পানি ঢেলে ধুচ্ছে। হাফইয়ার্লী পরীক্ষার খাতায় বাবরকে ভারতের শ্রেষ্ঠ শাসক লেখেছিলাম। কেন চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত বা অশোক লিখলাম না সে অপরাধে আমাকে বেঞ্চের উপর দাঁড়াতে বলা হয়েছে। পিয়নকে দিয়ে হাতের তালুতে বেতের ঘা মারা হয়েছে।” (সূত্রঃ বক্তৃতার ইউটিউব ভিডিও)। হিন্দু মনে ঘৃনার মাত্রাটা এতটাই অধিক ছিল যে, মুসলমানদের পৃতৃদত্ত নামটাকেও তারা সঠিক ভাবে বলতো না। কোলকাতার হিন্দু পত্রিকাগুলো প্রখ্যাত মুসলিম লীগ নেতা ও দৈনিক আজাদ পত্রিকা সম্পাদক জনাব মাওলানা আকরাম খাকে বলতো আক্রমণ খাঁ। আরেক নেতা জনাব হোসেন শহীদ সোহরোয়ার্দীকে বলতো সুরাবর্দী।

 

প্রতিবেশীকে বিকৃত নামে ডাকা, গালী দেয়া বা ঘৃনা করা ভদ্রতা নয়, সুরুচীর ও সুশীল মনের পরিচয়ও নয়। বিশেষ করে সে প্রতিবেশীকে, যার সাথে একই গ্রাম-গঞ্জ ও মাঠ-ঘাট, একই আলো-বাতাস, একই নদী-পুকুর, একই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, একই রাস্তাঘাট ও হাট-বাজার ভাগাভাগি করে বসবাস করতে হয়। অথচ হিন্দু মনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃনার মাত্রাটি এতটাই অধিক ছিল যে, কোন মুসলমান হিন্দুঘরে পা রাখলে গঙ্গাজল ও গোবর ছিটিয়ে সে স্থান পবিত্র করত। সে চিত্রটি চোখে পড়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা “গোরা” উপন্যাসেও। প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এমন ঘৃণা এবং এমন বিদ্বেষের নজির বিশ্বের আর কোন দেশে নাই। যার সাথে একত্রে বসবাস তার বিরুদ্ধে এমন ঘৃনা কি সে রাষ্ট্রে বা সমাজে শান্তি আনে? বরং তাতে তীব্রতর ও রক্তাত্ব হয় বিভক্তি ও সংঘাত। আরো বিপদ হল, ঘৃনার সে বীজকে বাঙালী হিন্দুরা শুধু বাংলাতে সীমাবদ্ধ রাখেনি, ছড়িয়ে দিয়েছে সমগ্র ভারত জুড়ে। আর প্রতিবেশীর প্রতি ঘৃনা যখন প্রবলতর হয়, তখন তাদের প্রতি সহানুভুতি, সুবিচার বা কল্যাণ প্রুতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। বরং তাদের ঠকানো বা শোষন করাটাই সামাজিক নীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে যে ঘৃনার উপর ভিত্তি করে মুসলমানদের শোষণ ও বঞ্চনার প্রক্রিয়া বাংলাতে শুরু হয়েছিল সেটিই এখন সমগ্র ভারত জুড়ে। বাংলার হিন্দু জমিদারগণ মারা গেছেন। কিন্তু তাদের অবিচারটি বেঁচে আছে খোদ ভারত সরকারের নীতিতে। ফলে অত্যাচারি জমিদারগণ মুসলমান প্রজার সাথে করতো সেটিই হচ্ছে সমগ্র ভারতের প্রশাসনে। ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ। অথচ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কর্তৃক স্থাপিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে, সরকারি চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৩ ভাগও নয়, বড় চাকুরিতে দূরে থাক ছোট চাকুরিতে তাদের স্থান নেই। বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার তারা সর্বত্র। শুধু মাত্র ঢাকা, লাহোর বা করাচীর মত একটি শহরে যতজন মুসলমান ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, ব্যবসায়ী, বিচারক, আইনজ্ঞ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বাস করে সমগ্র ভারতে ২০ কোটি মুসলমানের মধ্যেও তা নেই। ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের বিবেকহীন অবিচার ও নাশকতা যে কতটা গভীর সেটি বোঝার জন্য কি এ পরিসংখ্যানটিই যথেষ্ট নয়? আরো ভয়ানক বিবেকহীনহতা হল, এটি যে প্রচন্ড অন্যায় ও অবিচার সেটিও আজকের ভারতে রাজনীতির কোন বড় বিষয় নয়। ফলে প্রতিকারেরও কোন উদ্যোগ নেই। দুর্বৃত্তি, অবিচার ও অনাচার প্রতি সমাজেও ঘটে। কিন্তু সভ্য সমাজের পরিচয় হল, সে দুর্বৃত্তি ও অনাচার অপরাধ রুপে চিত্রিত হয় এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠে এবং প্রতিকারেরও ব্যবস্থা হয়। কিন্তু ভারতে হচ্ছে তার উল্টোটি। দিন দিন শুধু অবিচারই বাড়ছে না, অবিচারের সাথে মুসলমানের জানমাল ও ইজ্জতের উপরও হাত পড়ছে। বার বার দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলিম-হত্যা হচ্ছে, তাদের নারীরা ধর্ষিতা হচ্ছে, মসজিদও ধ্বংস করা হচ্ছে। আজ থেকে শত বছর আগে বাবরী মসজিদের ন্যায় কোন ঐতিহাসিক মসজিদকে গুড়িয়ে দেয়া হয়নি। অথচ এখন সেটি হচ্ছে। এবং অতি উৎসবভরে হচ্ছে। সেটি চিত্রিত হচ্ছে না কোন অপরাধ রূপে। আর সেজন্য কারো কোন শাস্তিও হয়নি।

 

ইংরেজপ্রাতি ও মুসলিম বিরোধীতা

অথচ মুসলিম শাসকগণ হিন্দুদের শুধু প্রশাসনিক আমলা, জমিদার, হিসাবরক্ষক, তালুকদারই পদেই বসায়নি, তাদেরকে মন্ত্রী এবং সেনাপতির পদেও বসিয়েছে। মোঘল বাদশাহদের ন্যায় নবার সিরাজুদ্দৌলার গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতিও ছিলেন হিন্দু। মুসলিম শাসনামলে দেশে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে –সে ইতিহাস বিরল। কিন্তু তাতেও হিন্দু মনে মুসলিম বিদ্বেষ ও ঘৃনার মাত্রা বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং সে বিদ্বেষ এতটাই প্রবল ছিল যে, মুসলমানদের চরম শত্রুদের তারা পরম বন্ধু রূপে গ্রহন করেছে। তাদের মাঝে তখন কাজ করেছে শত্রুর বন্ধুকে বন্ধু রূপে গ্রহন করার নীতি। তাই প্রতিবেশী বাঙালী মুসলমানদের বাঙালী হিন্দুগণ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ না করতে পারলে কি হবে, বহু হাজার মাইল দূরের অন্য এক মহাদেশ থেকে আগত অবাঙালী ও অহিন্দু ইংরেজদের তারা বিস্বস্ত বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে। ইংরেজের যে গুণটি তাদেরকে আকৃষ্ট করেছে তা হল তাদের মুসলিম-বিনাশী নীতি। একই ভাষা ও একই ভূখন্ডে বসবাসকারি বাঙালী মুসলমানদের প্রতি এই হল তাদের বাঙালীত্বের নমুনা। মুসলমানদের মুসলমান হওয়াটাই তাদের কাছে অপরাধ হয়েছে। ফলে পল্লির নিরীহ কৃষক প্রজাটিও হিন্দু জমিদারের অত্যাচার ও শোষন থেকে নিষ্কৃতি পায়নি। মুখের দাড়ীর জন্যও তাকে খাজনা দিয়ে হয়েছে। মুসলিম-বিরোধীতা বাঙালী হিন্দুর মনে এতটা প্রবল ভাবে বাসা বেঁধেছিল যে যখনই কোন কিছুতে মুসলমানের কল্যাণ দেখেছে তখনই প্রাণপনে সেটির বিরোধীতা করেছে। সেটি ১৯০৫য়ের বঙ্গভঙ্গ হোক, বা ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হোক, বা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হোক, বা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেশটির টিকে থাকার বিষয় হোক। এমন বীষপূর্ণ চেতনার কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোলকাতার রাস্তায় মিছিল করেছেন।

 

প্রফেসর হান্টিংটন তাঁর “Clush of Civilisation” বইতে সভ্যতার অনিবার্য সংঘাতের কথা বলেছেন। সে সংঘাত ইসলামী সভ্যতার সাথে পাশ্চাত্য সভ্যতার। তাঁর পরামর্শ, সে লড়াইয়ে জিততে হলে পাশ্চত্য শক্তিকে হিন্দুভারত ও রাশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য শক্তির সাথে কোয়ালিশন গড়তে হবে। হান্টিংটনের মতে মুসলিম সভ্যতাই পাশ্চাত্যের খৃষ্টান সভ্যতার মূল প্রতিদ্বন্দী। এ পরামর্শটি তিনি এমন এক সময় দিয়েছেন যখন মুসলমানগণ পরাজিত, বিভক্ত ও অধঃপতিত; এবং মুসলিম রাষ্ট্রগুলির অধিকাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে পাশ্চাত্য শক্তির হাতে অধিকৃত। কিন্তু ১৭৫৭ সালে বাংলায় ইংরেজ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা যখন শুরু হয় তখন মুসলমানদের অবস্থা আজকের মত দুর্বল ছিল না। মুসলমানগণ তখনও প্রধানতম বিশ্বশক্তি। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশরা বিশ্বশক্তি হওয়া দূরে থাক, উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তিও ছিল না। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় ঘটে নিতান্তই প্রাসাদ ষড়ন্ত্রের ফলে, দুর্বল সামরিক শক্তির কারণে নয়। তখনও বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা ছাড়া প্রায় সমগ্র ভারত মুসলমানদের হাতে। উসমানিয়া খেলাফতের দখলে তখনও গ্রীস, বুলগিরিয়া, বসনিয়া, সার্বিয়া, সাইপ্রাস, মেসিডোনিয়া, ক্রিমিয়া, আলবেনিয়াসহ ইউরোপের বিশাল ভূ-ভাগ। ইরান, আফগাসিস্তান তখনও শক্তিশালী স্বাধীন রাষ্ট্র। ঠিক এমন অবস্থায় বাংলা থেকে শুরু হয় ব্রিটিশ শক্তির মুসলিম ভূমিতে আগ্রাসন। সভ্যতার সংঘাতটি শুরু হয় বস্তুত তখন থেকেই। প্রফেসর হান্টিংটন যে পরামর্শটি আজ দিচ্ছেন, ইংরেজগণ সেটির প্রয়োগ করেছে আজ থেকে প্রায় তিন শত বছর আগেই। তারা জানতো, মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন ও সে বিজয় ধরে রাখা তাদের একার পক্ষে অসম্ভব। ফলে শুরুতেই তারা বিশ্বস্ত পার্টনার খুঁজতে থাকে। পার্টনার তাঁরা পেয়েও যায়। মুসলিমদের মধ্য থেকে মীর জাফরদের ন্যায় মুষ্টিমেয় কিছু বিশ্বাসঘাতকপেলেও তাঁদের মূল পার্টনার ছিল বাংলার হিন্দুরা।

 

হিন্দুবাঙালীর সাহিত্যচর্চা ও বাংলার অন্ধকার যুগ

বাঙ্গালী হিন্দুর মন যে কতটা বিষপূর্ণ ও প্রতিহিংসাপূর্ণ ছিল সেটির বহিঃপ্রকাশ ঘটে ইংরেজ আমলে রচিত তাদের সাহিত্যে। সেটি যেমন প্রকাশ পায় বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বচন্দ্রগুপ্ত, নবীনচন্দ্র, হেমচন্দ্রের মত প্রচন্ড মুসলিম বিদ্বেষী সাহিত্যিকদের লেখায়, তেমনি প্রকাশ পায় রবীন্দ্র ও শরৎ-সাহিত্যেও। শুধু সাহিত্যে নয়, প্রচন্ড মুসলিম বিদ্বেষ ফুটে উঠে বাঙালী হিন্দুর শিক্ষাব্যবস্থা, পত্র-পত্রিকা, রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও। অথচ এই আমলটিই হল বাঙালী হিন্দুদের সবচেয়ে আলোকিত ও সবচেয়ে গৌরবের। তাজ্জবের বিষয়, এ আমলে বাংলার হিন্দুদের মাঝে পাশ্চাত্যের শিক্ষা, সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটলেও তাদের মনের বিদ্বেষপূর্ণ কুৎসিত অন্ধকারটি এতে দূর হয়নি। বরং বেড়েছে বহুগুণ। এদিক দিয়ে বলা যায়, বাঙালীর ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে অন্ধকার যুগ। সে সময় যতই বেড়েছে হিন্দুর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, ততই বেড়েছে তাদের মনে মুসলিম বিদ্বেষ। হিন্দু-মুসলিমের ধর্ম ও মতের অমিলগুলো শত শত বছরের। কিন্তু কোন কালেই হিন্দুদের কবিতা, গান, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও ছড়ায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে এত ঘৃণা, এত গালী, এত মিথ্যাচার এতটা তীব্র ভাবে ভাবে প্রকাশ পায়নি, যা পেয়েছে তথাকথিত এ রেনেসাঁ আমলে। মুসলিম বিরোধী প্রচারে হঠাৎ এমন জোয়ার সৃষ্টির অন্যতম কারণ ইংরেজদের পক্ষ থেকে দেয়া উস্কানী। শুরু থেকেই ইংরেজদের নীতি ছিল devide and rule অর্থাৎ ভাগ কর এবং শাসন কর। নিজেদেরকে সেক্যিউলার রূপে দাবী করলেও তারা এখানে বিভেদের রেখাটি টেনেছে ধর্মের নামে। আর ভাগাভাগীটা তো তখনই তীব্রতর রূপ নেয় যখন সেটি প্রতিষ্ঠিত হয় গভীর ঘৃনার উপর। হিন্দু-মুসলিমের এ ভাগাভাগীটা না হলে মুষ্টিমেয় ইংরেজের পক্ষে কি ভারত শাসন সম্ভব হত? ভারতে ব্রিটিশে শাসনের প্রতিরক্ষায় এত ইংরেজ লাঠি ধরেনি বা কলম ধরেনি যত হিন্দু বাঙালী ধরেছে। এখানে হিন্দুর মনে যে বিষয়টি প্রবল ভাবে কাজ করেছে সেটি হল, মুসলিম ভীতি ও মুসলমানদের থেকে প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছা। এমন এক ভীতিপূর্ণ ও প্রতিশোধ-পরায়ন মানসিক অবস্থার কারণেই ইংরেজ শাসন তাদের কাছে আশির্বাদ মনে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তসহ অধিকাংশ হিন্দুদের সাহিত্যে সে সুরটি প্রবল।

 

হিন্দুদের মনে মুসলিম বিরোধী ঘৃণা সৃষ্টির মূল দায়িত্বটি পালন করে ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্ট তথা প্রাচ্যবিদগণ। সেটি মিথ্যা ইতিহাস রচানার মাধ্যমে। গবেষণার নামে বিকৃত ইতিহাস লেখা তখন সাম্রাজ্যবাদীদের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এসব ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্টগণ হিন্দুদের মনে এ বিশ্বাসটি বদ্ধমূল করে যে, অতীতে তাদের সভ্যতা ছিল এবং সে সভ্যতা স্বর্ণোজ্বলও ছিল। আরো বলে, সেটি ধ্বংস করেছে বহিরাগত মুসলিম শাসকেরা। মুসলমানগণ এভাবে চিত্রিত হয় হিন্দুদের পরম শত্রু রূপে। এসব ওরিয়েন্টালিস্টদের লেখা সেসব বই বগলে করে আধুনিক হিন্দু লেখকগণ সভা-সমিতি করেছে এবং সেগুলির সাথে আরো রং চং মেখে সারা ভারতের হিন্দুদের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। নিজেদের পূর্বপুরুষদের যদি অন্য দেশের প্রফেসর এসে রাজপুত্র এবং এক গৌরবজনক সভ্যতার নির্মাতা বলে তবে কার না ভাল লাগে? তখন সে সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে সে তো নাচতে শুরু করবে। ভারতীয় হিন্দুদের সেটিই হয়েছিল। অথচ মুসলমানগণ যখন বাংলা দখল করে তখন এদেশে পিরামিডের ন্যায় কোন পিরামিড, চীনের দেয়ালের ন্যায় কোন দেয়াল বা ব্যাবিলিয়নের উদ্যানের ন্যায় কোন উদ্যান পায়নি। তখন ভারতে দিল্লি, লাহোর বা আগ্রার ন্যায় কোন শহর বা তাজমহলের ন্যায় কোন সৌধও ছিল না। ফলে সেগুলো ধ্বংস করার প্রয়োজন দেখা দেয় কি করে? বরং ছিল কিছু মন্দির যা ভারতের নানা স্থানে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। বাবরী মসজিদকে যেভাবে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে সেরূপে মন্দিরগুলোকে তারা ধ্বংস করেনি।

 

মিথ্যা অভিযোগ খাড়া করতে কোন গবেষণা লাগে না, সেটি উৎপাদিত হয় মিথ্যুকের মগজে। আর সে কাজে ওরিয়েন্টালিস্টদের মগজের উর্বরতা কম ছিল না। শুধু  বাংলা বা ভারতে নয়, ইংরেজগণ যেখানেই গেছে সেখানেই বিভক্ত সৃষ্টির এ কাজটি অতি সুচারু ভাবে করেছে। তাতে ফল দাড়িয়েছে, যে জনগণ শান্তিপূর্ণ ভাবে শত শত বছর পাশাপাশি বসবাস করেছে তাদের পক্ষে একত্রে এক ভূখন্ডে বসবাস করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। গবেষণার নামে বই লেখে আরবদের ক্ষেপিয়েছে তুর্কী ও ইরানীদের বিরুদ্ধে, আবার ইরানী ও তুর্কীদের ক্ষেপিয়েছে আরবদের বিরুদ্ধে। অপরদিকে তুর্কী, কুর্দী ও ইরানীদের থেকে দূরে টানার পর আরবদেরকেও তারা একতাবদ্ধ থাকতে দেয়নি। তাদের মধ্যে বিভেদ গড়েছে গোত্র ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূ-ভন্ডের নামে। মধ্যপ্রাচ্য আজ যে ২২টুকরায় বিভক্ত সেটি তো সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিকদের সৃষ্ট। তারা নিজেদের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ দেখেছে অন্যদের বিভক্ত রাখার মধ্যে।

 

যে যুদ্ধ পলাশীতে শেষ হয়নি

শত্রু দেশের আগ্রাসনটি নিছক রণাঙ্গণে সীমাবদ্ধ থাকে না, সেটি হাজির হয় সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় আগ্রাসন নিয়েও। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইংরেজদের লড়াইটি তাই পলাশীর ময়দানে শেষ হয়নি। বরং সেটি আরো তীব্রতর হয়েছে শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও অর্থনীতির ময়দানে। সে লড়াইটি তীব্রতর করতে বাংলায় এবং পরে ভারতে তারা শুধু সামরিক সেনা ছাউনিই গড়েনি, গড়েছে শিক্ষা, ধর্ম, গবেষণা ও সংস্কৃতির নামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। তাই সৈনিকদের পাশা বহু প্রফেসর ও গবেষকও এনেছে। তাই ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা একদিকে যেমন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ গড়ে এদেশের হিন্দুদের ব্রিটিশরাজ রক্ষার সামরিক প্রশিক্ষণ দিযেছে, তেমনি এসিয়াটিক সোসাইটি গড়ে গবেষণার নামে হিন্দুদের মন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষাক্ত করার লক্ষ্যে বইয়ের পর বই লিখেছে। শুধু সামরিক শক্তির জোরে কোন শক্তিই কোন দেশকে বেশী দিন ধরে রাখতে পারে না। শক্ত ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে গাছ যেমন মজবুত শিকড় গড়ে, সরকারও তেমনি দেশের জনগণের গভীরে ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংযোগ গড়ে। এই মজবুত সংযোগটির কারণেই ভারতে মুসলিম শাসন সাড়ে ছয়শত সাল টিকে থাকে। ইংরেজদের কাছেও এদেশে সাম্রাজ্য স্থাপনের লক্ষ্যটি নিছক কিছু বছরের জন্য ছিল না, ছিল শত শত বছরের জন্য। তারা জানতো, নব প্রতিষ্ঠিত এ সাম্রাজ্যের আয়ু বাড়াতে হলে শুধু দেশের ভূগোলে নয়, মনের ভূগোলেও অধিকার জমাতে হবে। এদেশবাসীর মধ্য থেকে প্রচুর সংখ্যক দালাল বা কলাবোরেটর গড়ে তুলতে হবে। কয়েক হাজার প্রবাসী ইংরেজদের দ্বারা এ বিশাল ভারত দীর্ঘকাল অধিকারে রাখা অসম্ভব ছিল। এ লক্ষ্যে ধর্মান্তর যেমন জরুরী, তেমনি জরুরী বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কনর্ভাশন। তারা এটাও জানতো, কলাবোরেটর বা সহযোগী খোঁজার কাজটি করতে হবে হিন্দুদের মাঝে। মুসলমানদের মাঝে সেটি অসম্ভব। ইংরেজগণ তাদের থেকেই রাজ্য ছিনিয়ে নিয়েছিল, যার ফলে তাদের ভাগ্যে নেমে আসে দুর্বিসহ দুর্যোগ। ফলে মুসলমানদের কাছে তারা ছিল তাদের স্বাধীনতা, ধর্ম, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির দুষমন। মুসলিম মনে ইংরেজদের হাতে এ পরাজয়ের বেদনাটি ছিল প্রতিদিন ও প্রতি মুহুর্তের। ব্রিটিশরা সেটি বুঝত। ফলে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিস্তার ও সেটি প্রতিরক্ষার বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকেই মূল শত্রু ভাবতো। এবং নির্ভরযোগ্য পার্টনার ভাবতো হিন্দুদের। কৃষক তার গরুকে ঘাস দেয়ে যাতে সে লাঙল টানতে পারে। তেমনি ইংরেজগণও শিক্ষার নামে তাদের কলাবোরেটরদের সামর্থ বাড়িয়েছে -যাতে শাসন ও লুন্ঠনে প্রবল সহায়তা দেয়। এজন্যই মুসলমানদের শিক্ষিত করায় তাদের কোন আগ্রহ ছিল না। ফলে রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি তাদের কাছে গুরুত্ব পায় হিন্দুদের মাঝে ইংরেজী ভাষা, ইংরেজের দর্শন, সাহিত্য ও সংস্কৃতির দ্রুত বিস্তার। এবং প্রণীত করে সুপরিকল্পিত এক শিক্ষানীতি। ভারতে এমন একটি শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য ব্যাখা করতে গিয়ে লর্ড ম্যাকলে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “ব্রিটিশ সরকার ভারতে এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করবে যার মাধ্যমে এমন একদল ভারতীয় সৃষ্টি হবে যারা শুধু রক্তে-মাংসে হবে ভারতীয়, কিন্তু চিন্তা-চেতনা, মন ও মননে হবে ব্রিটিশ।” অর্থাৎ ব্রিটিশের সেবক। সে স্ট্রাটেজীকে সামনে রেখে ময়দানে নামে উইলিয়াম কেরীর ন্যায় বহু পাদ্রী। প্রতিষ্টিত হয় শ্রীরাম পুর কলেজ, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, হিন্দু কলেজ  ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। গড়ে তোলা হয় ছাপা খানা। প্রকাশনা শুরু হয় বহু পত্র-পত্রিকার। লক্ষ্য, বাংলার হিন্দুদেরকে তাদের প্রতিবেশী মুসলমানদের থেকে আলাদা করে মন ও মননে, চেতনা ও দর্শনে ভিন্ন তাদের কাছের মানুষ রূপে গড়ে তোলা। বাংলার হিন্দুদের মাঝে তখন সাজ সাজ রব, বিশেষ করে বর্ণ হিন্দুদের মাঝে। প্রশাসন, বিচার ও শিক্ষা থেকে মুসলমানদের পরিকল্পিত ভাবে হঠিয়ে হিন্দুদের জন্য বিশাল শূণ্যস্থান সৃষ্টি করা হয়। তাদের জন্য সষ্টি করা হয় অর্থ উপার্জনের বিপুল সুযোগও সৃষ্টি করা হয়। ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর কেরানী, এজেন্ট ও ঠিকাদার, ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব কালেক্টর, আদালতের মুন্সেফ-ম্যাজিস্টেট বা উকিল, ব্রিটিশ গুপ্তচর সংস্থার এজেন্ট -এগুলো হয়ে দাঁড়ায় সে কালের বাঙ্গালী হিন্দুদের কাছে অতি আকর্ষণীয় পেশা। বঙ্কিম চন্দ্রের ন্যায় প্রথম সারির লেখকদের জীবনের সিংহভাগ কেটেছে ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব কালেক্টর রূপে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কোলকাতা থেকে পত্রিকা বের করেছেন যার মূল কাজ ছিল ইংরেজদের বন্দনা করা, মুসলিম চরিত্রে কালীমা লেপন করা, আর ব্রিটিশ সেবায় হিন্দুদের অনুপ্রাণিত করা। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের জীবন কেটেছে ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী ও ব্রিটিশ সরকারের অতি বিশ্বাসভাজন এজেন্ট রূপে। এধরণের শত শত তাঁবেদার হিন্দুদের অর্থনৈতিক ভিত্তিটা আরো মজবুত করতে তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় জমিদারি। সারা বাংলার গ্রামে গঞ্জে ব্রিটিশের পক্ষে লাঠিয়ালের মূল দায়িত্বটা পালন করেছে তারাই। মুষ্টিমেয় ব্রিটিশদের তাই রাজ্য শাসনে গ্রামে গ্রামে নামতে হয়নি, বরং তাদের কাজ হয় বড় বড় শহরে বসে শুধু নির্দেশ দেয়া। এভাবে ব্রিটিশ সরকার গড়ে তোলে সুবিধাভোগী ও স্বার্থপর এক কলাবোরেটর শ্রেনীর বিশাল নেটওয়ার্ক।

 

ব্রিটিশ শোষন ও বিধ্বস্ত মুসলিম অর্থনীতি

কোম্পানীর লক্ষ্য ব্যবসায়ী মুনাফা লাভ। কোন খয়রাতি কাজকর্ম বা জনকল্যাণ এর লক্ষ্য নয়। ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী মুনাফা বাড়াতেই ভারতে এসেছে, এবং ভারতে এসে নতুন নতুন রাজ্য জয় করেছে। সে সব রাজ্যে দুর্গ গড়েছে নিছক শোষনভিত্তিক সে বাণিজ্যিক প্রজেক্টের অঙ্গ রূপে। কোম্পনী জনগণ থেকে উচ্চহারে রাজস্ব নিয়েছে সে শোষন ও শাসন প্রক্রিয়াকে তীব্রতর করতে। এভাবেই মুনাফা বাড়িয়েছে এবং মুনাফার সে অর্থ বিলেতে ব্রিটিশ সরকার ও কোম্পানীর শেয়ার হোল্ডারদের হাতে পৌছে দিয়েছে। বাংলাদেশে ব্রিটিশ শাসন তাই সর্বার্থেই ছিল এক সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসন। তবে তাদের সে শাসনের যতটা না ছিল ব্যবসায়ীক মুনাফা তার ছেলে বেশী ছিল দস্যৃবৃত্তিকি লুন্ঠন। তাদের সে সীমাহীন লুন্ঠনের ফলেই বাংলা জয়ের কিছু কাল পরই ১৭৭০ সালে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে যাতে দেশের এক-তৃতীয়াংশ জনগণ মারা যায়। ইতিহাসের সেটিই ছিয়াত্তরের মনন্তর রূপে পরিচিত। ব্রিটিশ শাসকেরা বাংলার উপর আরেকটি দুর্ভিক্ষ উপহার দেয় ১৯৪৪ সালে। এবং সেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে। তখন সামরিক বিজয়টাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, জনগণকে দুর্ভিক্ষে বাঁচানো নয়। শেষাক্ত এ দুর্ভিক্ষেও লক্ষ লক্ষ বাঙালীর মৃত্যু ঘটে। তাছাড়া তাদের ভয়াবহ শোষনের ফলে  অধিকাংশ মুসলিম পরিবারে ফি বছর অনাহার লেগেই থাকতো। ফলে অতি উচ্চ ছিল শিশু মৃত্যুর হার। ফলে বাংলায় ব্রিটিশের ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনে মুসলিম জনসংখ্যায় খুব কমই বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃদ্ধি ঘটেছে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর।

 

অথচ সাড়ে পাঁচ শত বছরের মুসলিম শাসনে কোন দুর্ভিক্ষ বাংলায় বা ভারতে একটি বারও আসেনি। বরং শায়েস্তাখানের আমলে খাদ্যপণ্যের সস্তা মূল্য বিশ্বে রেকর্ড গড়েছিল। বাংলায় বা ভারতে মুসলিম শাসনকে তাই কোন অবস্থাতেই ঔপনিবেশিক শাসন বলা যায় না। সাম্রাজ্যবাদী বিদেশী শাসনও নয়। মুসলিমগণ এদেশে কখনই ব্যবসায়ীক লক্ষ্যে বা লুন্ঠনের স্বার্থে সাম্রাজ্য স্থাপন করেনি। এদেশে আর্য ও অনার্য বহু জাতির মানুষ যেমন বাংলার বাইরে থেকে এসে এদেশে মিশে গেছে তেমনি মিশে গেছে মুসলমানগণও। আর বেশীর ভাগ মুসলমান তো বাংলার আদিবাসী, তারা মুসলমান হয়েছে ইসলাম কবুলের মাধ্যমে। তারা যা কিছু গড়েছে তা বাংলাতেই গড়েছে। এখানকার সম্পদ নিয়ে ব্রিটিশগণ যেমন বিলেতে নগর-বন্দর গড়েছে, তেমন কোন নগর বন্দর বাংলার কোন মুসলিম শাসক বাংলার বাইরে গড়েনি। ঢাকা, সোনার গাঁ, গৌড়, মূর্শিদাবাদ, বাগের হাট ও উত্তর বঙ্গে যা কিছু ঐতিহাসীক কৃর্তি তা তো মুসলমানদেরই গড়া। অথচ হিন্দু রাজাও এদেশ বহুকাল শাসন করেছে। কিন্তু তাদের সে নিদর্শন গুলো কোথায়? তাছাড়া এদেশের উপর বর্গী হামলা, মগ হামলা, মারাঠা হামলা ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যারা প্রাণ দিয়েছে তারা তো মুসলমানেরাই। পলাশী রণাঙ্গন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, মজনু শাহের ফকির বিদ্রোহ বা দুদূ মিয়ার ফারায়েজী আন্দোলন –সর্বত্র তো তারাই। অথচ ব্রিটিশ আমলে হিন্দুদের দ্বারা ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদারীর যে ইতিহাস নির্মিত হল সেটিকে বলা হচ্ছে বাংলার রেনেসাঁ যুগ। ইংরেজ শাসন চিত্রিত হচ্ছে আশির্বাদ রূপে। আর মুসলিম শাসনামলকে বলা হচ্ছে অন্ধকার যুগ বলে!

 

ব্রিটিশের বিভাজন নীতি ও বাঙালী হিন্দু বুদ্ধিজীবীর বিষ-উদগিরণ

বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্যরা তাদের সাহিত্যে যে মুসলিম বিরোধী বিষ উদগিরণ করেছেন সেটি বাংলার সমাজ ও আলোবাতাস থেকে উদ্ভুত হলে তার নমুনা মধ্য যুগের বা আদি যুগের সাহিত্যেও পাওয়া যেত। কিন্তু তা নেই। তাদের মগজে ঘৃনাপূর্ণ মিথ্যার বিষটি ঢুকিয়েছিল বস্তুত ইংরেজগণ। তারাই প্রথম আবিস্কার করে, ভারতের মুসলিম শাসন শুধু ধ্বংস, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও শোষণ ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। বলেছে, মন্দির ভেঙ্গে তার উপর মসজিদ গড়েছে। তাদের লেখনিতে শিবাজীর চরিত্র অংকিত হয়েছে হিন্দু জাগরনের এক মহান ও আদর্শনীয় বীর রূপে, আর মোঘল বাদশা আওরঙ্গজীব চিত্রিত হয়েছেন কুৎসিত ভিলেন রূপে। বাংলায় হিন্দুদের বাস মুসলমানদের চেয়ে অধিক কাল ধরে। অথচ তাদের ব্যর্থতা হল, সমগ্র ইতিহাস ঘেঁটে একজন হিন্দুকেও বের করতে পারে যিনি স্বাধীনতার লড়াইয়ে বাংলার মানুষের সামনে আদর্শ হিসাবে চিত্রিত হতে পারেন। তেমন চরিত্রের তালাশে বঙ্কিম ও মাইকেল মধুসূদন যেমন ব্যর্থ হয়েছেন, রবীন্দ্রনাথও ব্যর্থ হয়েছেন। সে এক বিশাল শূন্যতা। রবীন্দ্রনাথকে তাই অবাঙালী শিবাজীকে হিরো রূপে পেশ করতে হয়েছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “শিবাজী উৎসব” কবিতায় শিবাজীর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন,

“হে রাজ-তপস্বী বীর, তোমার সে উদার ভাবনা

বিধর ভান্ডারে

সঞ্চিত হইয়া গেছে, কাল কভু তার এক কণা

পারে হরিবারে?

তোমার সে প্রাণোৎসর্গ, স্বদেশ-লকক্ষীর পূজাঘরে

সে সত্য সাধন,

কে জানিত, হয়ে গেছে চির যুগ-যুগান্তর ওরে

ভারতের ধন।”

এই হল রবীন্দ্রনাথের বিচার বোধ। এই হল রবীন্দ্র মানস ও চেতনা! তবে এটি শুধু রবীন্দ্রনাথের চেতনার সমস্যা নয়, এটিই মূল সংকট ছিল বাঙালীর রেনেসাঁর কর্ণধারদের। কিছু দালানকোঠা ও কলকারখানা গড়া, কিছু ডিগ্রিধারি মানুষ গড়া, কিছু কবিতা-উপন্যাস লেখা, রাজনীতিতে কিছু আলোড়ন তোলাই একটি জাতির জীবনে জাগরণ আনার জন্য যথেষ্ট নয়। এরূপ বিশাল কাজের জন্য উন্নতর একটি দর্শনও লাগে। সে দর্শনটিই আনে জনগণের চেতনা রাজ্যে বিপ্লব। কিন্তু বাংলার হিন্দুগণ সে দর্শনের খোঁজ পায়নি। ফলে তাদের মনের রাজ্যে বিপ্লবও আসেনি। বরং ঘোর অন্ধকারই রযে গেছে। রামমোহন রায় ও দ্বারকানাথ সে দর্শনের খোঁজে হিন্দুর পৌত্তলিকতা ছেড়ে একাশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। মধুসূদন দত্ত খৃষ্টান হয়ে গেছেন। কিছু বঙ্কিমচন্দ্র, স্বামী বিবেকানন্দ, অরবিন্দো ঘোষেরা হিন্দুদের আবার সনাতন পৌত্তলিকার দিকে ফিরেয়ে এনেছেন। ফলে হিন্দুদের আবার ফিরিয়ে নিয়েছেন সে স্থানটিতে যেখান থেকে রাম মোহন, দ্বারকানাথ ও তাদের সাথীরা যাত্রা শুরু করেছিলেন। এরই ফল হল, রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সন্তানেরাও আর সে ব্রাহ্ম ধর্মে স্থির থাকতে পারেননি, ফিরে গেছেন হিন্দু পৌত্তলিকতায়। রবীন্দ্রনাথ এমন এক কট্টর হিন্দু হওয়ার কারণেই শিবাজীকে হিরো বানিয়েছেন। আর শিবাজীর মত একজন দস্যু চরিত্রের মানুষ যখন হিরো হয় তখন কি সে জাগরণ বেঁচে থাকে? আর এটিই বাংলার হিন্দুর রেনেসাঁর আদর্শিক ও নৈতীক সংকট। এমন সংকট খোদ রেনেসাঁরই মৃত্যু ঘটায়। বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁও তাই বাঁচেনি।

 

দেখা যাক, রবীন্দ্র নাথ যাকে “হে রাজস্বী বীর” বলে মুগ্ধ মনে কবিতা লিখেছেন তার প্রকৃত পরিচয়টি কি? রবীন্দ্র মানস ও তাঁর চেতনাকে বুঝতে হলে শিবাজীকেও বুঝেতে হবে। এতে বুঝা যাবে রবীন্দ্রনাথভক্তদের রাজনৈতীক এজেন্ডা। প্রশ্ন হল, তিনি কি আদৌ বীর ছিলেন? শিবাজীর পরিচয় হল, মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবকে তিনি ব্যস্ত রেখেছিলেন মারাঠা অঞ্চলে লুকিয়ে থেকে অতর্কিত হামলার মধ্য দিয়ে। সম্মুখ সমরে আসার সামর্থ তার ছিল না। যুদ্ধে একবার পরাজিত ও বন্দী হওয়ার পর ফন্দি করে লুকিয়ে পালিয়েছিলেন। আরেক বার সম্রাট আওরঙ্গজেব সেনাপতি আফজাল খাঁর নেতৃত্বে ১০ হাজার সৈন্যের এক বাহিনীকে তার বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যুদ্ধের বদলে আলোচনায় ডেকে আফজাল খাঁকে তিনি হত্যা করেন। সেটি ছিল কাপুরুষিত হত্যা। সে সময় আফজাল খাঁ তাকে ইসলামী  উদারতায় আলিঙ্গনে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। সে মুহুর্তে তার বাঁ হাতে লুকানো “বাঘের নখ” দিয়ে তার দেহ ছিন্ন করেন। অথচ এ নিরেট কাপুরুষতা বীরতূল্য গণ্য হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কাছে, যা নিয়ে বিশাল এক কবিতাও লিখেছেন। এ হল রবীন্দ্রনাথের বিবেচনা ও মানবতার মান! রবীন্দ্রনাথ বরং সে সব ঐতিহাসিকদেরও নিন্দা করেছেন যাদের দৃষ্টিতে শিবাজী ছিলেন এক বর্বর দস্যু। রবীন্দ্রনাথ তাঁদেরকে মিথ্যাময়ী বলেছেন, এবং তাঁদের বিদ্রুপ করে লিখেছেন,

“বিদেশীর ইতিবৃত্ত দস্যু বলে করে পরিহাস

অট্টহাস্য রবে…

তব পুণ্য চেষ্টা যত তস্করের নিস্ফল প্রয়াস

এই জানে সবে।

অয়ি ইতিবৃত্ত কথা, ক্ষান্তু করো মুখর ভাষণ

ওগো মিথ্যাময়ী,

তোমার লিখন- ‘পরে বিধাতার অব্যর্থ লিখন

হবে আজি জয়ী।

যাহা মরিবার নহে তাহারে কেমনে চাপা দিবে

তব ব্যঙ্গ বাণী

যে তপস্যা সত্য তারে কেহ বাধা দিবে না ত্রিদিবে

নিশ্চয় সে জানি।”

 

ঐতিহাসিক ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ “হিন্দু জাতীয়তা জ্ঞান বহু হিন্দু লেখকের চিত্তে বাসা বেঁধেছিল, যদিও স্বজ্ঞানে তাঁদের অনেকেই কখনই এর উপস্থিতি স্বীকার করবেন না। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ভারতের শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ যাঁর পৃথিবীখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবিকতাকে সাম্প্রদায়িক দৃ্ষ্টভঙ্গীর সঙ্গে কিছুতেই সুসংগত করা যায় না। তবুও বাস্তব সত্য এই যে, তাঁর কবিতাসমূহ শুধুমাত্র শিখ, রাজপুত ও মারাঠাকুলের বীরবৃন্দের গৌরব ও মাহাত্মেই অনুপ্রাণিত হয়েছে, কোনও মুসলিম বীরের মহিমা কীর্তনে তিনি কখনও একচ্ছত্রও লেখেননি –যদিও তাদের অসংখ্যই ভারতে আবির্ভূত হয়েছে। এ থেকেএ প্রমাণিত হয় উনিশ শতকী বাংলার জাতীয়তা জ্ঞানের উৎসমূল কোথায় ছিল।” –(সূত্রঃ Dr. Romesh Chandra Majumder, History of Bengal, p 203.)

 

ব্রিটিশের বাঙালী কলাবোরেটর

বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁ যুগে সবচেয়ে ঘৃণ্য যে কাজটি হয়েছে তা হল, ইংরেজদের কলাবোরেটর রূপে তাদের যোগদান। সমগ্র উপমহাদেশে তারাই সর্বপ্রথম এ পেশায় নামে। কয়েক ডজন নবেল প্রাইজ দিয়েও কি বাঙালীর এ কলংক ঢাকা যাবে? তখন ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনে দুই ধরনের বাবু দেখা যেত। এক, গোরা বা শ্বেতাঙ্গ বাবু, দুই, বাঙালী বাবু। বাঙালী বাবুদের ইংরেজ-সেবা শুধু প্রশাসনে সীমাবদ্ধ থাকেনি এবং শুধু বাংলাতেও সীমাবদ্ধ রাখেনি। প্রশাসনের পাশে সাহিত্যেও সেটি প্রবল ভাবে প্রকাশ পায়। বাংলার সীমান্ত ডিঙ্গিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে বিহার, আসাম, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, রাজস্থান, গুজরাতসহ ভারতের অন্যান্য প্রদেশে। শিকারী যেমন শিকারী ঘুঘুকে দিয়ে ঘুঘু ধরে, তেমনি ইংরেজগণও বাঙালী হিন্দুদের দিয়ে সমগ্র ভারতের অন্যান্য প্রদেশের হিন্দুদেরও তাঁবেদারে পরিণত করে। ইংরেজ সেবার যে আদর্শ রবীন্দ্র-পরিবার ও বঙ্কিমচন্দ্র স্থাপন করেন, সেটিই ভারতীয় হিন্দুদের আদর্শে পরিণত হয়। ফল হল, এমনকি কংগ্রেস নেতা করম চাঁদ গান্ধিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশের পক্ষে যুদ্ধে যোগদান ও প্রাণদানের পক্ষে নিজ প্রদেশ গুজরাতে সৈন্য সংগ্রহে নেমেছিলেন।

 

বাঙালী হিন্দু ও ভারতীয় রাজনীতিতে উগ্র-হিন্দুবাদ

বাঙালী হিন্দুদের অপরাধ শুধু নয় যে, মুসলিম বিরোধী বিদ্বেষ ছড়িয়ে বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে তারা বিষাক্ত করেছে। তারা বিষাক্ত করেছে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের হিন্দুদের মনও। ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্টগণ মুসলিম বিদ্বেষপূণ মিথ্যা দিয়ে যেসব ইতিহাস রচনা করে, সেগুলি সর্বপ্রথম গলধঃকরণ করে বাঙালী হিন্দুগণ। পরে তারা সেগুলির সাথে নিজ মনের আবেগ মিশিয়ে নিজেরাও ইতিহাস লেখে এবং তা সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে দেয়। বস্তুত এসব হিন্দু বাঙালীদের লেখা বইগুলোই বহুকাল যাবত পঠিত হয়ে আসছে সারা ভারতের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবই রূপে। অহিন্দু ও অভারতীয় ইংরেজ ওরিয়েন্টালিস্টদের লেখা ইতিহাসের স্থলে সে বইগুলোর বাড়তি সুবিধাটি হল, বাঙালী হিন্দুদের হাতে রচিত হওয়ার সেগুলো ভারতের অন্য এলাকার হিন্দুদের কাছে সহজে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। সে সময়ের ইতিহাসে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল, সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিবৃত্তির পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শুরুও এই বাংলা থেকে।সেটিও এ বর্ণহিন্দুদের হাতে। সেটির মূল নায়ক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্রপাধ্যায়। তিনি প্রথম বাঙালী জাগরণের কথা বললেও পরবর্তীতে সর্বভারতীয় হিন্দু জাগরণের অবতারে পরিণত হন। তার উপন্যাস আনন্দমঠ সে জাগরণের বানি নিয়ে প্রথমে বাংলায় এবং পরে সমগ্র ভারতে হিন্দু জাতিয়তাবাদী জাগরণ আনে। তার গান বন্দেমাতরমের মধ্য দিয়ে বিমুর্ত হয় হিন্দু রেনেসাঁর মূল সুর। কংগ্রেস সে গানকে ভারতের জাতীয় সংগীত রূপে।

 

এতো গেল সাহিত্যিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার কথা। রাজনৈতীক ময়দানেও মুসলিম বিরোধী উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়ীকতার জন্মও বাঙালী হিন্দু বাবুদের হাতে। ভারতে আজ ভারতীয় বিজেপীর যে মুসলিম বিরোধী প্রচন্ড সাম্প্রদায়ীক রাজনীতি সেটিও বালঠ্যাকারের মহারাষ্ট্রে বা নরেন্দ্র মোদীর গুজরাতে জন্ম নেয়নি। অযোধ্যাতেও জন্ম নেয়নি। জন্ম নিয়েছে বাঙালী বাবুদের দ্বারা বাংলায়। আজকের যে বিজিপি, সেটিই শুরুতে ছিল হিন্দু মহাসভা। আর হিন্দু মহাসভার জন্ম কলকাতায়, এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। তিনি ছিলেন বাঙালী, এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখার্জির পুত্র। তিনি নিজেও ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ অবধি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন।  আততায়ী হাতে গান্ধীর মৃত্যু হলে দোষ বর্তায় হিন্দু মহাসভার উপর। সে দুর্নাম থেকে বাঁচার তাগিদে তিনি নতুন দল গড়েন ভারতীয় জনসংঘ যা পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে হয় ভারতীয় জনতা পার্টি, সংক্ষেপে বিজেপী। বার বার নাম পরিবর্তন হলেও এ দলের মুসলিম বিদ্বেষপূর্ণ কট্টর সাম্প্রদায়ীক নীতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।  তাই ভারতের মুসলিম নিধনের রাজনীতির সূত্রপাত আহমেদাবাদ, মোম্বাই বা মিরাটে হয়নি, হয়েছিল হিন্দু রেনেসাঁর জন্মভূমি কোলকাতায়। এ রাজনীতির শুরু বস্তির গুন্ডা বা ধর্ষনারী দুর্বৃত্তদের হাতেও নয়, বরং হযেছে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালী উপাচার্যের হাত দিয়ে। সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের মনও কতটা যে বীষাক্ত ও প্রতিহিংসাপূর্ণ করতে পারে এ হল তার নমুনা। শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ১৯৪১ সালে হিন্দুদের এক জনসভায় বলেছিলেন, মুসলমানরা যদি পাকিস্তান চায় তবে তাদের তল্পিতল্পা বেঁধে ভারত ত্যাগ করা উচিত।–(BLCP, 1941)। পাকিস্তানের জন্ম ও তার বেঁচে থাকাটি তাঁর মত হিন্দুনেতাদের কাছে যে কতটা অসহ্য ছিল এ হল তার নমুনা। তাঁর কাছে অসহ্য হল ভারতে মুসলমানদের বসবাসও। বাবরী মসজিদ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন বিজেপী নেতা লাল কৃষ্ণ আদভানী। বিজিপির আরেক নেতা নরেন্দ্র মোদী ইতিহাস গড়েছেন গুজরাতে মুসলিম হত্যায় নেতৃত্ব দিয়ে। তবে যে শহরে মুসলিম হত্যা রাজনৈতীক আচার রূপে সর্বপ্রথম যাত্রা শুরু করে সেটিও অন্য কোন শহর নয়, সেটি বাঙালী হিন্দুদের শহর কোলকাতা। আহমেদাবাদ, মুম্বাই, মুরাদাবাদ, বিহার ও ভারতের অন্যান্য স্থানের দাঙ্গাগুলো তো এসেছে বাঙ্গালী বাবুদের সৃষ্ট ১৯৪৬ সালে কোলকাতার দাঙ্গাটির পর।

 

মুসলিম নিধনের সুত্রপাতে কলকাতা

কোলকাতার হিন্দুদের মন যে কতটা মুসলিমবিদ্বেষপূর্ণ ও দাঙ্গাপাগল সেটিরও প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায়। সে দাঙ্গার কিছু নিজ চোখে-দেখা ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বাঙালী প্রফেসর ড. তপন রায় চৌধুরী তার “বাঙাল নামা” বইতে। প্রফেসর ড.তপন রায়চৌধুরি লিখেছেন, “নিজের চোখে দেখা ঘটনার বিবরণে ফিরে যাই। হস্টেলের বারান্দা থেকে দেখতে পেলাম রাস্তার ওপারে আগুন জ্বলছে। বুঝলাম ব্যাপারটা আমার চেনা মহাপুরুষদেরই মহান কীর্তি। হস্টেলের ছাদে উঠে দেখলাম –আগুন শুধু আমাদের পাড়ায় না, যতদূর চোখ যায় সর্বত্র আকাশ লালে লাল। তিন দি্ন তিন রাত কলকাতার পথে ঘাটে পিশাচনৃত্য চলে। … দাঙ্গার প্রথম ধাক্কা থামবার পর বিপজ্জনক এলাকায় যেসব বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন ছিলেন, তাঁদের খোঁজ নিতে বের হই। প্রথমেই গেলাম মুন্নুজন হলে। ..নিরঙ্কুশ হিন্দু পাড়ার মধ্যে ওদের হস্টেল। তবে ভদ্র বাঙালি পাড়া। সুতরাং প্রথমটায় কিছু দুশ্চিন্তা করিনি। কিন্তু দাঙ্গা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শিক্ষিত বাঙালির রুচি-সংস্কৃতির যেসব নমুনা দেখলাম, তাতে সন্দেহ হল যে, মুন্নুজান হলবাসিনী আমার বন্ধুদের গিয়ে আর জীবিত দেখবো না। …হোস্টেলের কাছে পৌঁছে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে ভয়ে আমার বাক্যরোধ হল। বাড়ীটার সামনে রাস্তায় কিছু ভাঙা স্যুটকেস আর পোড়া বইপত্র ছড়ানো। বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে। ফুটপথে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন – একটু আগে পুলিশের গাড়ি এসে মেয়েদের নিয়ে গেছে।…শুনলাম ১৬ই আগষ্ট বেলা এগারোটা নাগাদ একদল সশস্ত্র লোক হঠাৎ হুড়মুড় করে হস্টেলে ঢুকে পড়ে। প্রথমে তারা অশ্রাব্য গালিগালাজ করে যার মূল বক্তব্য –মুসলমান স্ত্রীলোক আর রাস্তার গণিকার মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। …হামলাকারিরা অধিকাংশই ছিলেন ভদ্রশ্রেণীর মানুষ এবং তাঁদের কেউ কেউ ওঁদের বিশেষ পরিচিত, পাড়ার দাদা। ” –(তপন রায়চৌধুরী, ২০০৭)। তিনি আরো লিখেছেন, “খুনজখম বলাৎকারের কাহিনী চারি দিক থেকে আসতে থাকে। …বীভৎস সব কাহিনী রটিয়ে কিছু লোক এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পায়। তার চেয়েও অবাক হলাম যখন দেখলাম কয়েকজন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত লোক মুসলমানদের উপর নানা অত্যাচারের সত্যি বা কল্পিত কাহিনি বলে বা শুনে বিশেষ আনন্দ পাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে দু-তিনজন রীতিমত বিখ্যাত লোক। প্রয়াত এক পন্ডিত ব্যক্তি, যাঁর নাম শুনলে অনেক নিষ্ঠাবান হিন্দু এখনও যুক্তকরে প্রণাম জানায়, তাঁকে এবং সমবেত অধ্যাপকদের কাছে নিকাশিপাড়ার মুসলমান বস্তি পোড়ানোর কাহিনি বলা হচ্ছিল। যিনি বলছিলেন তিনি প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিশ্বাসযোগ্য লোক। বেড়া আগুন দিয়ে বস্তিবাসীদের পুড়িয়ে মারা হয়। একজনও নাকি পালাতে পারিনি। ছেলেটি বলছিল, কয়েকটি শিশুকে আগুনের বেড়া টপকে তাদের মায়েরা আক্রমণকারীদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যাতে ওদের প্রাণগুলি বাঁচে। বাচ্চাগুলিকে নির্দ্বিধায় আবার আগুনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। আমরা শুনেছিলাম, এই কুকীর্তির নায়ক কিছু বিহারী কালোয়ার। তাই ভয়াবহ বর্ণনাটি শুনে সুশোভনবাবু মন্তব্য করেন, “এর মধ্যে নিশ্চয়ই বাঙালি ছেলেরা ছিল না?” শুনে সেই পন্ডিতপ্রবর গর্জে উঠলেন, “কেন, বাঙালি ছেলেদের গায়ে কি পুরুষের রক্ত নেই?” –(তপন রায়চৌধুরী, ২০০৭)।

 

বাংলার হিন্দুদের এই হল চেতনার মান ও বিবেক বোধ। বাংলা বিভক্ত হয় মূলত এমনি এক বিষাক্ত মনের প্রেক্ষাপেট।  তাই বাংলা বিভক্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের বহু আগেই, ১৯৪৭ সালে সেটি আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও স্বীকৃতি পায় মাত্র। রেনেসাঁর নামে বাংলার হিন্দুদের মাঝে যেটি আত্মপুজা ও মুসলিম ঘৃনার চর্চা শুরু হয়েছিল সেটিই ধাবিত করে এক মহা আত্মঘাতে। সেখানে গুরুত্ব পায় মুসলমানদের পিছনে ফেলে হিন্দুদের দ্রুত এগিয়ে চলা। পাশাপাশি দুটো গাছ জন্ম নিলে একটি অপরটির জন্য কিছু জায়গা ছেড়ে দেয়, প্রয়োজনে দুটি গাছই দুই পাশে হেলে যায়। কিন্তু হিন্দুগণ মুসলমানদের জন্য কোন স্থান ছেড়ে দিতে রাজী ছিল না। তারা দখল নিতে চেয়েছিল অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা ও প্রশাসনের সবটুকু জুড়ে। অথচ তখন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৫%। একটি দেশের ৪৫% ভাগ মানুষ তার ৫৫% ভাগ মানুষকে পিছনে ফেলে সামনে এগুয় কি করে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বশক্তি। কিন্তু তাদের বেড়ে উঠার পিছনে বড় কারণটি হল, দেশটি সাদা-কালা, ইউরোপীয়-অইউরোপীয় সকল নাগরিককে বেড়ে উঠার জন্য স্থান করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলায় সেটি হয়নি। বাঙালী হিন্দুদের সেরূপ উদারতাই ছিল না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মুসলমানদের জন্য সরকারি চাকুরিতে কিছু স্থান ছেড়ে দেয়ার জন্য হিন্দুদের সামনে সুপারিশ রেখেছিলেন, কিন্তু সেটিও তাদের পছন্দ হয়নি। প্রশ্ন হল, দুটি সম্প্রদায়ের মাঝে এত ঘৃনা, এত অবিশ্বাস ও এত বঞ্চনা বিরাজ করলে সে দেশ কি সামনে এগুতে পারে? এটিতো সংঘাত ও আত্মঘাতের পথ।

 

হিন্দু রেনাসাঁর নায়কঃ তাদের দর্শন ও কীর্তি

দেখা যাক, বাংলায় হিন্দু জাগরণের নায়ক কারা ছিলেন? কী ছিল তাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দর্শন? এ জাগরনের শুরু রাজা মোহন থেকে এবং শেষ হ্য় রবীন্দ্রনাথে। এর সময়কাল উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক অবধি। প্রশ্ন হল, এ জাগরনকে কি আদৌ রেনেসাঁ বলা যায়? রেনাসাঁর অর্থ পুণঃজাগরণ। এ শব্দটির প্রথম প্রয়োগ হয় ষোড়ক ও শপ্তদশ শতকের ইউরোপে যে জাগরন শুরু হয় সেটি বোঝাতে। গ্রীক ও রোমানদের হাতে খৃষ্টের জন্মের আগে ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ার বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে সাম্রাজ্য গড়ে উঠে। তাদের হাতেই প্রতিষ্ঠা ঘটে পাশ্চাত্য সভ্যতার। ইউরোপের জাগরনটি ছিল মূলতঃ সেটির পুণঃজন্ম ঘটানোর। আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতাকেও বলা হয় সে গ্রীকো-রোমান সভ্যতারই পরম্পরা রূপ। কিন্তু বা্ংলায় হিন্দুদের মাঝে যে জাগরন আসে সেটিকে রেনেসাঁ বললে মেনে নিতে হয় বাংলার হিন্দুদের দ্বারা এর পূর্বেও একবার সভ্যতা নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ তাদের হাতেও বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু বাঙালী হিন্দুর ইতিহাসে সেরূপ জাগরন বা সাম্যাজ্য নির্মাণের প্রমাণ কোথায়? সেটি কি সেন রাজাদের আমল? সেনা রাজারা হিন্দু হলেও তারা বাঙালী ছিল না। এসেছিল ভারতের কর্নাটাকা থেকে। সেনদের পূর্বে তো ছিল বৌদ্ধ পাল রাজবংশ। বস্তুত উনবিংশ শতাব্দীর এ বাঙালী হিন্দুর জাগরন যেমন রেনেসাঁ ছিল না, তেমনি সমগ্র বাংলারও ছিল না। এটি ছিল বাংলার সংখ্যালঘু বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়ের জাগরন, এমনকি সমগ্র হিন্দুদেরও নয়। কারণ বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ তো আজকের ন্যায় সেদিনও ছিল মুসলমান। সে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদেরকে যখন বাংলার কোন জাগরন থেকে বাদ রাখা হয় সেটিকে কি সমগ্র বাংলার রেনেসাঁ বলা যায়?

 

বাংলায় হিন্দু জাগরণের নামে যা কিছু ঘটেছে সেটির মূলে যারা ছিলেন তারা হলেন রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথের দাদা দ্বারকনাথ ঠাকুর, কেশব চন্দ্র সেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমান দত্ত, রামতনু লাহিড়ীর ন্যায় ব্যক্তিবর্গ। শুরুতে যে দর্শনটা কাজ দেয় সেটিও হিন্দু দর্শন ছিল না। ছিল ব্রাহ্মসমাজের নব আবিস্কৃত ধর্ম যা ছিল পৌত্তলিকতা বিরোধী। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন সে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রধান প্রবক্তা। তাঁর পৌত্তলিকতা বিরোধী সে ধারণাটি আসে ইসলাম ও খৃষ্টান ধর্মের প্রভাব থেকে। মাইকেল মধুসূদনের মত অনেকেই যেমন খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন তেমনি রাজা রামমোহন রায়, দ্বারকনাথ ঠাকুর, কেশব চন্দ্র সেনের মত অনেকেই খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষা না নিলেও হিন্দুদের সনাতন পৌত্তলিকতাকে বর্জন করেছিল। তবে কোলকাতা ভিত্তিক বুদ্ধিজীবীদের মাঝে এক ঈশ্বর ভিত্তিক ব্রাহ্ম ধর্ম আলোড়ন তুলতে সমর্থ হলেও সাধারন হিন্দুদের মাঝে সে ধর্মের তেমন বিস্তার ঘটেনি। তারা ব্যর্থ হয়েছে ধর্মীয় ইন্সটিটিউশন গড়ে তুলতে। তবে তাদের মূল সমাস্যটি হল তাদের যেমন কোন পয়গম্বর ছিল না, তেমনি কোন ধর্মীয় গ্রন্থও ছিল না। শুধু চিন্তাভাবনা, বুদ্ধিবৃত্তি বা ইনটেলেকচুয়ালিজমের উপর ভিত্তি করে ধর্ম প্রতিষ্ঠা পায় না। ফলে ব্রাহ্ম ধর্ম ব্যর্থ হয়েছে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে¸ এবং রবীন্দ্রনাথের মত ব্রাহ্মরা তাই অবশেষে মিশে গেছেন পুরোন হিন্দুধর্মের মূল দেহে। এর পর আসেন বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল, দ্বীনবন্ধু মিত্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের মত সাহিত্যিক। সাহিত্যের পাশাপাশি হিন্দু ধর্মের পুণর্জাগরনের বাণী নিয়ে হাজির হাজির হন বিপিন চন্দ্র পাল, স্বামী বিবেকানন্দ ও অরবিন্দু ঘোষ।  বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন জগতিশ চন্দ্র বোস ও সত্যন্দ্র নাথ বোস। রাজনীতিতে আসেন সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জী, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষ বোস এবং শরৎ বোস। এভাবেই শুরু হয় তথাকথিত রেনেসাঁ। এটি বাংলায় শুরু হলেও বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের এতে কোন প্রতিনিধিত্ব ছিল না।

 

যে কোন জাগরণেরই একটি উচ্চতর মানবিক লক্ষ্য থাকে। অজ্ঞতা, পশ্চাদপদতা ও কুসংস্কারের বদলে মানবতা তখন নতুন প্রাণ পায়। রেনেসাঁকে তখনই প্রকৃত রেনেসাঁ বা পুনঃজন্ম বলা যায়। কিন্তু সে বাঙলার হিন্দু রেনেসাঁর মানবতার মান কতটুকু ছিল? রবীন্দ্র নাথ যখন কবিতা লেখা শুরু করেছেন বাঙালীর তথাকথিত রেনেসাঁ তখন মধ্য গগনে। অথচ তখনও বাংলায় সতিদাহের নামে বিধবা রমনীদের চিতায় জ্বলতে হচেছ। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় সেটি প্রশংসিত হয় বিধবার আত্মদান রূপে। তিনি সেটির প্রতি শ্রদ্ধাভরে উৎসাহ দিয়ে লিখেছেন,

“জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ

পরান সপিবে বিধবা বালা।

জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুন

জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা।”

 

সতিদাহ প্রথাকে আইন করে বিলুপ্ত করে ব্রিটিশ সরকার। বিধবা হিন্দু রমনীদের বাঁচানো নিয়ে কবিতা বা প্রবন্ধ না লিখলেও রবীন্দ্রনাথের নজর পরে তাদের গো’ দেবতা বাঁচানোর দিকে। তখন সে গো’ দেবতা বাঁচানোর মিশন নিয়ে ময়দানে নামেন শিবাজীর আরেক ভক্ত মহারাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক নেতা তিলক। তিনি ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “গোরক্ষিণী সভা”। তখন গরু বাঁচাতে গিয়ে তখন ভারত জুড়ে শুরু হয় মুসলিম হত্যা। রবীন্দ্রনাথও তিলকের এ মিশনে একাত্ম হন এবং তাঁর জমিদারী এলাকায় গরু কোরবানী নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই হল, হিন্দু বাঙালীর রেনেসাঁ চেতনা। ঐতিহাসিক নীরদ চৌধুরী তাই লিখেছেন, “রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সকলেই জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন একটি মাত্র সমন্বয় সাধনের, আর সেটি সমন্বয়টি হিন্দু ও ইউরোপীয় চিন্তাধারার। ইসলামী ভাবধারা ও ট্রাডিশন তাঁদের চেতনাবৃত্তকে কখনও্ স্পর্শ করেনি। -(সূত্র, Nirod Chandra Chowdhury, Autobiography of an Unknown Indian, p 196.) ইংরেজদের শাসন প্রতিষ্ঠার পরও এদেশে ইংরেজী ভাষার পাশাপাশি আরবী, ফারসী, হিন্দি, সংস্কৃত ভাষার ন্যায় ভাষাচর্চা ছিল। কিন্তু রাজা রামমোহন রায়ের মত বাঙালীদের সেটি পছন্দ হয়নি। তারা জোর দেয় আরবী ফার্সী বর্জন করে সরকারকে ইংরেজী চর্চার উপর গুরুত্ব দিতে। রাজা রাম মোহন রায় যখন লন্ডন যান সেখানে গিয়েও সেটিই ব্রিটিশ সরকারকে বোঝান। অথচ ভারতীয় মুসলমানদের ধর্ম ও সংস্কৃতির ভাষা ছিল আরবী ও ফারসী। মুসলিম নর-নারীদের উপর জ্ঞান শিক্ষা এ জন্য ফরয নয় যে তা থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে ও চাকুরিতে সুবিধা হবে। বরং এ জন্য যে, শিক্ষার মাধ্যমে এ জীবন ও জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটিকে জানার সুযো্গ মিলবে। সুযোগ মিলবে মহান আল্লাহর হিদায়েতের বাণীটি জানার। সুযোগ মিলবে ইসলামী সংস্কৃতি নিয়ে বেড়ে উঠার। একমাত্র তখনই সে শিক্ষার মাধ্যমে মানব জীবনের সবচেয়ে বড় উপকারটি হয়। একজন মুসলমানের জীবনে শিক্ষার প্রয়োজন ও শিক্ষাবিষয়ক মূল দর্শনটির মোদ্দা কথা তো এটাই। তাই সে প্রয়োজনটি না মিটলে  সে শিক্ষালাভে অনাগ্রহ জাগাটাই স্বাভাবিক। ব্রিটিশদের প্রণীত শিক্ষানীতিতে মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন মেটানোর বিষয়টিকে পরিকল্পিত ভাবে বাদ দেয়া হয়। বরং গুরুত্ব পায় ব্রিটিশের কেরানী, সেপাই, ট্যাক্স কালেক্টর, ম্যাজিস্টেট তথা সদা অনুগত দাসসৃষ্টির বিষয়টি। ফলে হাতিয়ারে পরিনত হয় ব্রিটিশের কলাবোরেটর বা দালাল সৃষ্টির। তাই আত্মসন্মানবোধ সম্পন্ন কোন মুসলমান কি এমন শিক্ষায় আগ্রহী হতে পারে?

 

ব্রিটিশ এজেন্ডা ও হিন্দু মানস

ব্রিটিশ সাম্রাজীবাদীরা ভারতবাসীদের শিক্ষিত করার জন্য এদেশে আসেনি। আসেনি এদেশে বসবাসের জন্যও। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানী বা ব্রিটিশ সরকার কোন খয়রাতি প্রতিষ্ঠানও ছিল না। তাদের দায়বদ্ধতা ভারতবাসীর প্রতিও ছিল না, ছিল কোম্পানীর ব্রিটিশ শেয়ার হোল্ডারদের প্রতি। ফলে তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়, বাণিজ্যের নামে অধিকতর শোষন ও লুন্ঠন। শোষণ ও লুন্ঠনের কাজটি তীব্রতর করার স্বার্থেই তারা কোম্পানীর কাজকে শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমিত রাখেনি। আত্মনিয়োগ করে রাজ্যজয় ও রাজ্যশাসনে। এজন্যই যে কোন সংজ্ঞায় তারা ছিল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী। সুশিক্ষায় ও সুস্থ্য চেতনায় কোন মানুষই এরূপ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীর গোলামী মেনে নিতে পারে না। তাদের সেবকও হতে পারে। বরং সুশিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রই তাদের শত্রু হবে ও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হবে সেটাই স্বাভাবিক। যে কোন সুস্থ্য মানুষের ন্যায় ইংরেজরাও এ সত্যটি বুঝতো। ইংরেজগণ তাই সুশিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে নিজ শত্রুদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটাবে সেটি কি বিশ্বাস করা যায়? শিক্ষার লক্ষ্য যদি হয় শত্রুর সাম্রাজ্যবাদী দখলদারীকে মজবুত করার হাতিয়ার তবে তার সাথে কি কোন স্বদেশপ্রেমিক শামিল হতে পারে? এখানেই হিন্দু-মানসের সাথে তৎকালীন মুসলিম-মানসের মূল পার্থক্য। হিন্দুরা ব্রিটিশদের শত্রু ভাবতো না, বরং ভাবতো ভগবানের প্রেরিত মূক্তিদাতা। সেটি ধরা পড়ে হিন্দুদের রচিত সাহিত্যে। বৃটিশ রাজকে ‘জন-গণ-মনঅধিনায়ক, জয় হে’ বলে রবীন্দ্রনাথ স্তুতিমূলক কবিতা লিখেছেন। শরৎচন্দ্র তার “পথের দাবী” উপন্যাসে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সেটি পছন্দ করেননি। নিন্দা জানিয়ে তিনি শরৎচন্দ্রকে চিঠি দিয়েছেন। লিখেছিলেন, “কল্যাণীয়েষু, তোমার পথের দাবী পড়া শেষ করেছি। বইখানি উত্তেজক। অর্থাৎ ইংরেজদের শাসনের বিরুদ্ধে পাঠকের মনকে অপ্রসন্ন করে তোলে। …ইংরেজ রাজ ক্ষমা করবেন এই জোরের উপরেই ইংরেজ রাজকে আমরা নিন্দা করি এটাতে পৌরুষ নেই। আমি নানা দেশে ঘুরে এলুম। আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে এই দেখলাম একমাত্র ইংরেজ গবর্নমেন্ট ছাড়া স্বদেশী বা বিদেশী প্রজার বাক্যে বা ব্যবহারে বিরুদ্ধতা আর কোন গভর্নমেন্ট এতটা ধৈর্য্যের সঙ্গে সহ্য করে না।– ইতি তোমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারিখ ৭/৩/১৩৩৩।  –(সূত্রঃ শ্রী শিশির কর)।

 

শরৎচন্দ্রের কাছে লেখা রবীন্দ্রনাথের এ চিঠিতে যে পোষমানা চেতনার প্রকাশ ঘটেছে সেটি শুধু রবীন্দ্রনাথের একার ছিল না। এমন একটি উপলব্ধি ছিল সে আমলের অধিকাংশ শিক্ষিত হিন্দুদের। আর এখানেই ব্রিটিশ প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থার বড় সাফল্য। শিক্ষার লক্ষ্য শুধু অক্ষরজ্ঞান, হিসাবজ্ঞান বা কারিগরিজ্ঞান নয়, বরং শিক্ষার মধ্য দিয়েই ধর্ম, চিন্তা-চেতনা, দর্শন, রাজনীতি¸ সমাজনীতি, সংস্কৃতি ও রুচীবোধে আসে বিপ্লবী পরিবর্তন। মন পায় সঠিক দিকনির্দেশনা। তবে শিক্ষা শুধু সুশিক্ষা নয়, কুশিক্ষাও হতে পারে। ফিরাউন, নমরুদ, হিটলার, মুসোলিনির মত অতি দুর্বৃত্তদেরও একটি শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল। আজকের সাম্রাজ্যবাদী দুর্বৃত্তদেরও আছে। ভারতে তেমনি ব্রিটিশ শাসকদেরও ছিল। শিক্ষার মধ্য দিয়ে মিশনারিরা যেমন ছাত্রদের নিজ ধর্মের দিকে টানে, সাম্রাজ্যবাদীরা তেমনি গড়ে নিজেদের পক্ষে লাঠিধরার লোক। ভারতে তারা এতটা বিপুল সংখ্যায় গড়ে উঠেছিল যে তাদের ১৯০ বছর ঔপনিবেশিক শাসনে তাদের নিজেদের লাঠি ধরার প্রয়োজন খুব একটা দেখা দেয়নি। আর বাঙালী হিন্দুগণ লাঠিধরার কাজে ভারতের অন্য যে কোন ভাষাভাষীদের চেয়ে অধিক সংখ্যায় ছিল তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে?

 

ঔপনিবেশিক শাসন প্রসঙ্গে হিন্দু দর্শন ও মুসলিম দর্শন

মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ইংরেজী শিখেনি। এটি সত্য, অধিকাংশ মুসলমানই ইংরাজী শেখায় ও ইংরেজদের সহযোগিতায় এগুয়নি। তারও বোধগম্য কারণ ছিল। সেটি বোঝাও সহজ। ঔপনিবেশিক আগ্রাসীদের সহযোগীতায় হাত বাড়ানো ইসলামে হারাম। এটি শুধু মুসলমানের রাজনীতির কথা নয়, ধর্মেরও কথা। ইসলামে জ্ঞানার্জন ফরজ। মুসলমান যেমন নামায-রোযার ন্যায় ইবাদত থেকে দূরে থাকতে পারে না, তেমনি দূরে থাকতে পারে না জ্ঞানার্জন থেকেও। বেঁচে থাকার জন্যই পানাহার ফরজ, কিন্তু সে পানাহারের নামে যদি হারাম বস্তু সেবনের ব্যবস্থা হয় তখন সেটি হারাম। তেমনি শিক্ষার বিষয়টিও। ব্রিটিশগণ শিক্ষার নামে সেটারই ব্যবস্থা করেয়ছিল।। ভারতের মুসলমানদের, বিশেষ করে, বাংলার মুসলমানদের সে শিক্ষা থেকে দূরে থাকার দূরে থাকার এটিই হল মূল কারণ। ফলে মুসলমানগণ তখন মসজিদ ও মাদ্রাসাকেন্দ্রীক বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ব্রিটিশ প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দূরে থাকার ফলে মুসলমানগণ চাকুরিবাকুরি ও অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও তারা বেঁচেছিল ব্রিটিশের মানসিক গোলাম হওয়া থেকে। কতটা বেঁচেছিল তার উদাহরণ দেয়া যাক রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রাজা রাজা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “কিছুদিন হইল একদল ইতর শ্রেণীর অবিবেচক মুসলমান কলিকাতার রাজপথে লৌহ খন্ড হস্তে উপদ্রবের চেষ্টা করিয়াছিল। তাদের জন্য বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, উপদ্রবের লক্ষ্যটা বিশেষরূপে ইংরেজদের প্রতি। তাহাদের যথেষ্ট শাস্তিও হইয়াছিল। …কেহ কেহ বলিল মুসলমানদের বস্তিগুলো একেবারে উড়াইয়া পুড়াইয়া দেওয়া যাক…।” –রবীন্দ্রনাথ রচনাবলী, ১০ম খন্ড, পৃঃ ৪২৮-৪২৯। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীরা যে কোন সভ্য দেশেই প্রতিরোধের মুখে পড়ে। সেদেশের শুধু শিক্ষিত লোকেরাই এ দুর্বৃত্তদের ঘৃনা করেনা, ঘৃনা করে এমনকি নিরক্ষর মানুষেরাও। তাদের বিরুদ্ধে মিছিল, লড়াই এমনকি অস্ত্র ধারনও তারা জায়েজ মনে করে। মানব মনে এমন ঘৃনা ও এমন প্রতিরোধ গড়ে উঠার জন্য বড় মহাত্ম বা সাধক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সুস্থ্য মানুষের এটাই তো মানবিক গুণ। কোলকাতার রাস্তার যে মুসলমান ব্যক্তিটিকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে সে ব্যক্তিটি রবীন্দ্রনাথের ন্যায় নোবেল বিজয়ী ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীও ছিল না। সে ছিল রাস্তার মানুষ। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে ঘৃনা করার যে নৈতিক বল সে দেখিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ কি সেটি পেরেছেন? অথচ রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ইতর বলেছেন। অথচ রবীন্দ্রনাথের বই ব্যবহৃত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার দলিল রূপে। তাঁর লেখা “চার অধ্যায়” উপন্যাসটির শত শত কপি ব্রিটিশ সরকার তাঁর অনুমতি নিয়ে ভারতের বিভিন্ন জেলে রাজবন্দীদের মাঝে বিতরণ করেছে যাতে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে ব্রেইন ওয়াশ তথা মগজ ধোলাই করা যায়। (সূত্রঃ অরবিন্দ পোদ্দার)।

 

বাঙালী হিন্দুর মুসলিম ভীতি ও আত্মঘাত

রেনেসাঁর নামে বাংলার হিন্দুদের মগজে যেটি প্রবল ভাবে দানা বাঁধে সেটি মুসলিম ভীতি ও ইংরেজদের প্রতি সেবাদাস মানসিকতা। তাদের ভয়ের কারণ, ইংরেজদের চলে যাওয়ার পর না জানি মুসলিমগণ আবার ভারতের শাসনকর্তায় পরিণত হয়। অতিরিক্ত ভয় অনেক সময় মানুষ আত্মহত্যায় ধাবিত করে। বাঙালী হিন্দুদের ক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে। সে ভয়ের কারণেই তারা ১৯০৫ সালে যেমন বাংলার বিভক্তির বিরোধীতা করেছে,আবার ১৯৪৭য়ে এসে বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে জিদ ধরে। সে ভয় নিয়েই তারা ইংরেজ শাসনামলকে তারা নিজেদের অবকাঠামো মজবুত করার কাজে ব্যবহার করে। সেটি যেমন শিক্ষাদীক্ষায়, তেমনি রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য ও শিল্পে। শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রগতির সাথে সাথে বাড়তে থাকে তাদের মনবল ও আত্মবিশ্বাস। সে সাথে নিজেদের মনে বৃদ্ধি ঘটায় মুসলিম বিদ্বেষ ও ঘৃনা। তাদের মাঝে প্রবলতর হয় অখন্ড হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। যে স্বপ্ন এক কালে বঙ্কিম ও রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রকাশ পেয়েছিল সেটিই পরবর্তীতে হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপী) ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতাদের নীতিতে পরিণত হয়। বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁ এ ভাবেই জন্ম দেয় ভারত জুড়ে হিন্দু জাগরন। সে সাথে মুসলিম শক্তির নির্মূলের স্বপ্নও। ঘৃনার ফলে তারা সামর্থ হারিয়েছে প্রতিবেশীকে বন্ধু রূপে দেখার।

 

ঘন আঁধার রাতে ভীতু মন দূরের আলোকে ভূতের আলো ভাবে। ভয়ে সে বাকশক্তি হারায়। একই অবস্থা বাঙালী হিন্দুর। এটাই তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। অন্যরা না জানলেও তারা ভাল জানে তারা তাদের প্রতিবেশী সংখ্যাগরিষ্ট বাঙালী মুসলমানদের কতটা ঘৃনা, কতটা অবিশ্বাস ও কতটা ভয় করে। পাশের প্রতিবেশীকে অবিশ্বাস ও ভয়ানক শত্রু ভাবলে কেউ কি রাতে ঘুমুতে পারে? ঘুমুতে পারে না বলেই তারা ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা থেকে তারা পৃথক হয়ে যায়। এভাবে বাঙালী হিন্দুর রেনেসাঁর মৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু সে রেনাসাঁ কালে যে ঘৃনা ও বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ রোপন করা হয়েছিল সেটি মরিনি, বরং তা প্রকান্ড রূপে বেড়ে উঠেছে। এখন সেটি বিষময় ফলও ফলাচ্ছে, এবং অবিরাম ভাবে। এবং বাঙালী হিন্দুর মৃত রেনেসাঁর সে মূল সুরটি এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ভারত সরকারের আগ্রাসী নীতির মধ্যে। সেটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে হিন্দু আধিপত্য প্রতিষ্ঠার। ফলে ১৯৪৮য়ে কাশ্মিরে ভারতীয় আগ্রসন ও জবরদখল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বার বার যুদ্ধ, একাত্তরের পর বাংলাদেশের উপর ২৫ সালা দাসচুক্তি ছিল সে অভিন্ন আধিপত্যবাদী স্ট্রাটেজীরই অংশ। ফলে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর দেশটির সম্পদের নির্মম লুন্ঠন ও লুন্ঠনের মধ্য দিয়ে ১৯৭৪য়ে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ ঘটাতে তাদের বিবেকে সামান্যতম দংশনও হয়নি। তখন লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীর জীবনে ভারত জঠরজ্বালা ও মৃত্যু উপহার দিয়েছিল। আর এখন সে বিষের ফল সীমান্ত ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া, উজানে পানি অপহরন, সমুদ্রসীমা ও তালপট্টি দখল, তিনবিঘা সহ সীমান্ত-ভূমি দখল এবং সীমান্তে লাগাতর মানুষ হত্যায় রূপ নিয়েছে। একটি জনগোষ্ঠীর অহংকারপূর্ণ অভিলাষ কিভাবে তার নিজের আত্মঘাত ও অন্যের বিরুদ্ধে নাশকতায় রূপ নেয় এ হল তার নমুনা। লন্ডন ১২/০৩/১১

গ্রন্থপঞ্জিঃ

1). Bengal Legislative Council Proceedings (BLCP) 1941, Vol. LIV No 6, p 216.

২). তপন রায়চৌধুরী, ২০০৭; বাঙালনামা, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ৪৫ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯।

৩). শ্রী শিশির কর, নিষিদ্ধ বাংলা, পৃঃ ২৪,৩২, দরদী শরৎচন্দ্র, মনীন্দ্র চক্রবর্তী, শরৎচন্দ্রের টুকরো কথা, অবিনাশ চন্দ্র ঘোষ)।

৪). অরবিন্দ পোদ্দার, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, উচ্চারণ, কোলকাতা, পৃঃ৩২০)।