রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গণহত্যা ও আগ্রাসন যেখানে গণতন্ত্র

ফিরোজ মাহবুব কামাল

নেশা আধিপত্য বিস্তারের

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্ণধারদের বড্ড অহংকার মার্কিন গণতন্ত নিয়ে। অহংকার মার্কিন বিচার ব্যবস্থা ও মার্কিন মূল্যবোধ নিয়েও। যেমন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি হওয়ার অহংকার চেপেছিল হিটলারের মাথায়। সে অহংকারে হিটলার পদানত করতে চেয়েছিল সমগ্র ইউরোপকে। বহু কোটি মানুষের তাতে প্রাণনাশ হয়েছিল। তেমনি অহংকার চেপেছে মার্কিনীদের মাথায়ও। নেশা এখানে আধিপত্য বিস্তারের। হিটলার যেটি ইউরোপময় করতে চেয়েছিল, অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টগণ সেটিই চেয়েছে বিশ্বময় করতে। সে জিদ নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা করে। আরো জিদ, যারাই মার্কিন আধিপত্যের বিরোধীতা করবে তাদের ঘাড়ে পৌঁছে দিবেন মার্কিন বিচার। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বহুবার সে কথা শুনিয়েছেন বিশ্ববাসীকে। তার দাবী, যারা মার্কিনীদের ঘৃনা করে তারা সেটি করে মার্কিন গণতন্ত্র, মার্কিন বিচার ও মূল্যবোধের প্রতি ইর্ষার কারণে।

১১ সেপ্টেম্বরের হামলার তেমনই এক ব্যাখা সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তৎক্ষনাৎ দিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি কি সত্যই তাই? প্রশ্ন হলো কি সেই মার্কিন গণতন্ত্র? কি সেই মার্কিন বিচার ও মূল্যরোধ? তাদের রাজনীতি, তাদের গণতন্ত্র ও মূল্যবোধ আজ আর কোন গোপন বিষয় নয়। যেখানেই তারা গেছে সেখানেই তারা সেটিকে সাথে নিয়ে গেছে। অতীতে জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লেবারনের মানুষ তাদেরকে অতি কাছে থেকে দেখেছে। এখন দেখছে আফগানিস্তান ও ইরাকের মানুষ। সবগুলি দেশেই হত্যা, সন্ত্রাস, দস্যুতা ও জবর দখলকে তারা  নিজেদের জাতিও নীতিতে পরিণত করেছিল। এসব দেশের মানুষ মার্কিনী গণতন্ত বলতে কতটুকু গণতন্ত বুঝে, আর কতটুকু বুঝে এ্যাটম বোমা, নাপাম বোমা, আগুণে বোমা, ক্লাস্টার বোমা আর গুয়ান্তোনামো বে’র কনসেনট্রেশন ক্যাম্প সেটি কি বুঝার জন্য কি বুশের ওয়াজ শুনার প্রয়োজন আছে। বিশ্ববাসী কি এতটাই মুর্খ ও বিবেক শূণ্য যে এসব স্বচক্ষে দেখেও তা বুঝবে না? মানব শিশু রূপে জন্ম নেওয়ার কারণেই যেমন কেউ মানবতা পায় না তেমনি নির্বাচিত হলেই কেউ সভ্যতর হয়না। বুশ যেমন নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছেন, তেমনি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম ব্যক্তি হিটলারও এসেছিল। ফলে গণতন্ত্র নিয়ে বড়াই চলে না। বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে হত্যা, সন্ত্রাস, দস্যুতাকে বিশ্বময় ছড়াচ্ছে তাতে মার্কিন গণতন্ত্র কতটা “ডিমোক্রাসি” আর কতটা “ডিমোনক্রাসি” বা দৈত্যতন্ত্র সেটিই এখন বিবেচনার বিষয়।

তালেবানদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার বড় বাহানা ছিল তারা দেশটিতে মানাধিকার প্রতিষ্ঠা করবে, জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিবে। আফগানিস্তান দখল হলো, সরকারও প্রতিষ্ঠা হলো -কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে কি? জনগণ পেয়েছে কি তাদের মৌলিক অধিকার? এসেছে কি স্থিতিশীলতা? দেশটি আজ বহু টুকরায় বিভক্ত। ক্ষমতায় বসিয়েছে সেসব জঘন্য খুণীদের যারা মানবহত্যাকে দেশের সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে । দেশটিতে খুণোখুণি বন্ধ হোক তা নিয়ে এদের সামান্যতম আগ্রহও নেই। আর তেমনি একটি পরিবেশে মার্কিন বাহিনীও সুযোগ পেয়েছে যত্র তত্র মানুষ খুণ করার। ফলে কে তাদের বিচার করবে? বন্য পশু জঙ্গলে শিকার ধরলে যেমন বিচার হয় না তেমনি বিচার নেই এ খুণীদেরও। বনের পশুহত্যাকে জঙ্গলের গাছ-পাথর ও অন্য পশুরা যেমন নীরবে দেখে তেমনি মার্কিনীদের নৃশংস হত্যাকান্ডকে নীরবে দেখেছে আফগানিস্তানের পুতুল সরকার। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব তোলা হয়েছিল দুনিয়ার কোন আদালতই যেন মার্কিন খুণীদের বিচারের বৈধতা না পায়। এবং সেটি পাশও হয়ে গেছে। যেন বৈধতা পেল সমগ্র বিশ্বটাকেই তারা আফগাস্তান বানানোর। যথেচ্ছাচারে এরা দেশ দখল করবে, শত সহস্র বোমা ফেলে মানুষ খুণ করবে, যারাই বিরোধীতা করবে তাদের ঘর বাড়ী জ্বালিয়ে দিবে, নারী-শিশুকে পঙ্গু করবে – এসব বর্বরতাও জাতিসংঘ  আইনে বৈধতা পেল। তবে সে প্রস্তাবটি পাশ করাতে ব্যর্থ হলেও তাদের অসুবিধা ছিল না। যে আইন তাদের খেয়ালখুশিকে বৈধতা দেয় না সেটিকে তারা বৈধতা দেয় না; বুড়ো আঙ্গুল দেখায়। যেমনটি করেছে ইরাককের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্রে। তারা নিজেরাও জানে তাদের এ নিষ্ঠুরতা ইতিহাসের বর্বরতম অপরাধ।

 

হত্যা মূল্যবোধের

মার্কিন কর্মকর্তাগণ অধিকৃত দেশের নিরীহ মজলুমের প্রতিরোধ যুদ্ধকে বলছে সন্ত্রাস। আর পরদেশে নিজেদের আগ্রাসন এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকর্মকে বলছে স্বাধিনতা ও গণতন্ত্রের লড়াই। এভাবে বিশ্বজুড়ে প্রসার বাড়াচ্ছে এক বিকৃত মূল্যবোধের। ফলে তারা শূধু গণহত্যার নায়কই নয়, মূল্যবোধের হন্তাও। সাধারণ খুণী, দূর্বৃত্ত ও দস্যুদের থেকে তাদের মূল পার্থক্য মূলত এখানেই। কারণ সাধারণ দূর্বৃত্তরা মানুষ খুণ করলেও সে খুণকে ন্যায্য বা যথার্থ বলে দাবী করে না। ফলে তাদের হাতে প্রাণনাশের ঘটনা ঘটলেও তাতে মূল্যবোধের মৃত্যু হয় না। ফলে হত্যাকান্ড যেমন প্রশংসনীয় হয় না, তেমনি হত্যার নায়ক বিচারও এড়াতে পারে না।

কিন্তু মার্কিনী সন্ত্রাসে বিশ্বের মূল্যবোধই বদলে যাচ্ছে। আর তার প্রভাব পড়ছে জাতিসংঘের উপর। এর প্রমাণ, যে যুদ্ধ জাতিসংঘের অনুমোদন পেল না, যার পক্ষে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের সমর্থণ ছিল না এবং যা ছিল জাতিসংঘ সংবিধানের সম্পূর্ণ লংঘন -তেমন এক অবৈধ যুদ্ধে ইরাক অধিকৃত হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে  শাস্তি না দিয়ে বা তিরস্কার না করে বা ইরাক থেকে আগ্রাসী বাহিনীর অপসারণের ব্যবস্থা না করে বরং ইরাকের উপর আগ্রাসী মার্কিন বাহিনীর অধিকার মেনে নিল। এবং অধিকার দিল সেদেশের অর্থ-ভান্ডারে হাত দেওয়ার। আর এ ভাবেই পুরস্কৃত করা হলো এ অপরাধি দেশটিকে। মূল্যবোধ এভাবে বিকৃত হয়েছে বলেই নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজ সৈন্যদের যুদ্ধাপরাধারের বিরুদ্ধে যে কোন বিচারকে নিষিদ্ধ করে যে প্রস্তাব এনেছিল সেটিও পাশ হয়ে গেল।

মূল্যবোধের এ বিকৃতির কারণেই প্রশ্রয় পাচেছ মার্কিনী খুণীচক্র। নিজেদের কু-কর্মকেও তারা হিতকর্ম বলছে। আন্তর্জাতিক দস্যুতাকেও স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য বলছে। ইরাক ও আফগানিস্তানের নিরস্ত্র মানুষকে যেভাবে হত্যা করছে সেটিকেও গণতন্ত্রের পক্ষে প্রয়োজনীয় কর্ম বলে প্রচার করছে। শুধু তাই নয়, বিশ্ববাসীকে এ বর্বর কাজে তাদের পিছে সারিবদ্ধ হতে বলছে। আর এমন চেতনা যে শুধু মাকিন প্রশাসনে ভর করেছে তা নয়, বরং গ্রাস করেছে দেশটির জনগণের বিবেকবোধকেও। ফলে তৃতীয় বিশ্বের কোন নিরক্ষর গ্রাম্য কৃষক ইরাকের উপর মাকিন আগ্রাসনকে যেভাবে অন্যায় বলতে পারলো -তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ দূরে থাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ প্রফেসরও তা পারিনি। পারিনি অধিকাংশ লেখক, কলামিষ্ট, বুদ্ধিজীবী, কংগ্রেস ও সিনেট সদস্যরাও।

মার্কিন মূল্যবোধ ও বিচারবোধ যে কতটা বীভৎস পথে পা বাড়িয়েছে তারই প্রমাণ হলো গুয়ান্তানামো বে’র কারাগার। যারা কোন দিন আমেরিকায় গেল না, সেখানে গিয়ে কোন যুদ্ধও করলো না, কোন মার্কিনীকে হত্যাও করলো না –এরূপ শত শত নিরপরাধ মানুষকে নিয়ে তোলা হয়েছে কিউবার গুয়ান্তানামো দ্বীপের কারাগারে। তারা যে অপরাধ করেছে সে প্রমাণও মার্কিনীদের হাতে নেই। আইনের ভাষায় যথার্থ ভাবেই তারা নিরপরাধ। এমন মানুষদের বন্দী করে রাখা দুনিয়ার যে কোন আইনেই অবৈধ। এমন কাজ করে থাকে দূর্বৃত্ত হাইজাকারগণ। অথচ মার্কিনীরা সেটিই করেছে। গুয়ান্তানামো কারাগারের এসব নিরাপরাধ ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে হাতবাঁধা, চোখবাঁধা, পায়ে লোহার শিকলপড়া অবস্থায়। চিড়িয়াখানায় রাখা বাঘ-ভালুককেও চলাফেরার জন্য জায়গা দেয়া হয়; কিন্তু তাদের তা দেয়া হয়নি। নিষ্ঠুরতায় হিটলার ও তার কনসেনট্রেশণ ক্যাম্পকেও হার মানায়। আর এটিকেই প্রেসিডেন্ট বুশ বড় গর্ব করে বলছে মার্কিন বিচার। গোঁ ধরেছেন এমন বিচার বিশ্বময় প্রতিষ্ঠা করে ছাড়বেন। অর্থাৎ মার্কিন আধিপত্যের বিরোধীদের ধরে ধরে গুয়ান্তানামো দ্বীপে হাজির করবেন। অথবা গুয়ান্তানামো দ্বীপের বর্বরতাকে হাজির করবেন বিশ্বের কোনে কোনে। একবিংশ শতাব্দী এ ভাবেই পরিণত হবে মার্কিন আধিপত্যের শতাব্দী। এটি রুখতে কোন আন্তজাতিক আইন তাদের পায়ে বেড়ি পড়াক -মার্কিনীরা সেটি মানতে রাজী নয়।

 

মৃত জাতিসংঘ

মার্কিনীদের আগ্রাসী অভিপ্রায়ের কারণেই জাতিসংঘকে পরিণত হয়েছে মরা লাশে, এখন শুধু এর দাফনই বাঁকি। ফলে বিবেকমান কোন মানুষের পক্ষে এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করাই এখন দুরুহ। এমন তীক্ততা নিয়ে এমন কি মিস্টার হ্যানস ব্লিক্সের মত মৃদুভাষী কুটনৈতিকও মার্কিন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের প্রকাশ্যে “বাস্টার্ড” বলতে বাধ্য হয়েছেন। তার সে বেদনাভরা অভিব্যক্তির বিস্তারিত বিবরণ ছেপেছে ২০০৩ সালের ১১ জুনের দৈনিক গার্ডিয়ান। হ্যানস ব্লিক্সের দুঃখের কারণ মার্কিন কর্তৃপক্ষ ইরাকের উপর হামলাকে জায়েজ করতে তার রিপোর্টের ভাষাকে মার্কিনীদের জন্য অনুকূল করতে বলেছিল। কিন্তু তিনি তা না করায় পেন্টাগণ তার বিরুদ্ধে জঘন্য প্রচারণায় চালায়। অবশেষে তার কাজকে বন্ধ করতে বাধ্য করে।

লক্ষাধিক সৈন্য, হাজার হাজার স্পাই ও শত শত অস্ত্র বিশেষজ্ঞ মাঠে নামিয়েও মার্কিন কর্তৃপক্ষ যেখানে বিগত দুই মাসে তথাকথিত “উইপন্স অব মাসডিসট্রাকশন” আবিস্কার করতে পারলো না, হ্যানস ব্লিক্সের ক্ষুদ্র অস্ত্রপরিদর্শক দলকে সে কাজ মাত্র দুই সপ্তাহে সমাধা করতে বলেছিল। তাকে একদিনও বাড়তি সময় দিতে রাজী হয়নি। ইরাকে অস্ত্র থাক আর না থাক সেটি বড় কথা নয়, মার্কিনীদের লক্ষ্য ছিল জাতিসংঘ পরিদর্শক দলের রিপোর্ট যেন তাদের হামলার পক্ষে দলিল হিসাবে কাজ করে। এবং সেটি সত্বর। কোন বিবেকমান মানুষের জন্যই এটি মেনে নেওয়া ছিল অপমানজনক। সম্ভব হয়নি হ্যানস ব্লিক্সের পক্ষেও। এক সময় তিনি সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ফলে মার্কিনীদের মতিগতি বুঝার সামর্থ্য বা কুশলতা যে তার ছিল না তা নয়। তাছাড়া তিনি দীর্ঘকাল কাজ করেছেন জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ পদে। ফলে মার্কিন কর্তৃপক্ষের হাঁড়ির খবর তিনি রাখেন। ফলে তিনিই যদি মার্কিন কর্তাব্যক্তিদের বাস্টার্ড বলেন তবে যারা মাকিন ক্লাস্টার বোমা, কামানের গোলা ও নানা বিধ সন্ত্রাসের শিকার তারা তাদেরকে কি বলবে?   

 

ইরাকে গণহত্যা ও লুন্ঠন

ইরাক দখলের দুই মাস অতীত হলো। অথচ আজও তারা কিছুই করতে পারি। চলছে প্রশাসনিক শূণ্যতা। নাই নিরাপত্তা। নাই পানি ও বিদ্যুৎ সাপ্লাই। নাই খাদ্য-রেশন। পানিহীন, বিদ্যুৎহীন, খাদ্যহীন ও নিরাপত্তাহীন অবস্থায় মানুষ অতি অবর্ণনীয় দুরাবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। অথচ যেটি সফল ভাবে চালাতে পারছে সেটি হলো গণহত্যা। গত ২০০৩ সালের ১৩ জুন একদিনেই মার্কিন বাহিনী ৯৭ জনকে হত্যা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের শিক্ষাবিদ ও গবেষকগণের বরাত দিয়ে ১৪ জুনের (২০০৩ সাল) গার্ডিয়ান খবর ছেপেছে এ অবধি ১০ হাজার বেসামরিক ইরাকীকে হত্যা করা হয়েছে। এবং হত্যাকান্ড চলছে অন্যভাবেও। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ঔষধ না থাকায় বহু মানুষ মারা যাচ্ছে বীনাচিকাৎসায়। ভেঙ্গে পড়েছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে কলেরা। মনে হচ্ছে দখলদার মার্কিনীদের এসব দিকে ভ্রক্ষেপও নাই। অথচ ইতিমধ্যে তারা দেশটির তেলের খনিতে হাত দিয়েছে। শুরু করেছে তেলোত্তলন। চালু করেছে রিফাইনারি। তেলের খনিগুলোকে সঁপে দিচ্ছে মার্কিন কোম্পানীগুলোর হাতে। ঘরে ঢুকে দস্যু যেমন সিন্দুকে হাত দেয় এরা তেমন হাত দিয়েছে ইরাকের অর্থভান্ডারে। এবং এটিকেও বলছে মার্কিন বিচার।

 

প্রতারণা ফিলিস্তিনীদের সাথে

অপর দিকে একই রূপ অভিনব মার্কিন বিচার চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে ফিলিস্তিনীদের উপর। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির জন্য প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ প্রশাসন প্রণয়ন করেছে তথাকথিত ’রোড-ম্যাপ’। স¤প্রতি এটি নিয়ে দরবার করতে প্রেসিডেন্ট বুশ মধ্যপ্রাচ্য সফর করলেন। এ রোড-ম্যাপ ফিলিস্তিনীদের শান্তি ও স্বাধীনতা কতটুকু নিশ্চিত করবে সেটি  বলা না হলেও ফিলিস্তিনীদের বলা হচ্ছে ইসরাইলীদের শান্তি ও নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে। বলা হচ্ছে অস্ত্র পরিত্যাগ করতে। অথচ ইসরাইল প্রত্যহ হেলিকপ্টার গানশিপ ও ট্যাংক নিয়ে ফিলিস্তিনের বস্তিতে ঘুরছে ও মানুষ খুণ করছে তা নিয়ে মার্কিনীদের কোন বক্তব্য নেই।   আজ অবধি যতজন ইসরাইলী ফিলিস্তিনীদের হাতে মারা গেছে তার চেয়ে বহু গুণ বেশী ফিলিস্তিনী মারা গেছে ইসরাইলী সামরিক বাহিনীর হাতে। অথচ তাদেরকে সন্ত্রাসী না বলে সন্ত্রাসী বলা হচ্ছে ফিলিস্তিনীদের। ইতিহাসে অন্যের দেশদখল সব সময়ই নিন্দিত হয়েছে এবং প্রশংসিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। মার্কিনীরা ফিলিস্তিনীদের মুক্তিযুদ্ধকে বলছে সন্ত্রাস। অথচ ভূলে যায়, সেটি হলে বড় সন্ত্রাসী বলতে হয় প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনকেও। কারণ তিনিও অস্ত্র হাতে ইংরেজ উপনিবেশিক শক্তির দখলদারির বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। ফলে মার্কিন বিচারবোধ যে কতটা বিকৃত, কতটা অমানবিক ও কান্ডজ্ঞান বর্জিত সেটি এর পরও বুঝতে বাঁকি থাকে? এমনই এক অসুস্থ্য বিবেকবোধের কারনে ইয়াসির আরাফত ফিলিস্তিনীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হলে কি হবে তাকে তারা মানতে রাজি নয়। তার সাথে কথা বলতেও ইচ্ছুক নয়। কথা বলার জন্য মার্কিন চাপে আবু মাজেনকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছে।

অপরদিকে যে ইসরাইল ফিলিস্তিনকে গ্রাস করলো এবং দখলকৃত ভূমি থেকে সৈন্য অপসারণের জাতিসংঘ প্রস্তাবকে বার বার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালো সে ইসরাইলই  হলো মার্কিনীদের পরম মিত্র। ইসরাইল বলেছে ১৯৬৭ সালের আগ্রাসনে অধিকৃত ভূমি থেকে তারা পিছু হঠবে না। রাজি নয় অধিকৃত পশ্চিম তীরে যে হাজার হাজার ইহুদী পল্লী নির্মাণ করেছে সেগুলি উঠিয়ে নিতে। রাজি নয় ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে যাদেরকে তারা নিজ গৃহ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল তাদের ঘরে ফিরতে দিতে। অথচ ফিলিস্তিনীদের সেটি মৌলিক অধিকার। তাদের ঘরে ফেরার সে অধিকার মেনে নিয়ে জাতিসংঘে প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছে। ইসরাইল রাজি নয় ১৯৬৭ সালে দখল করা জেরুজালেম শহরটি ফিরত দিতে। অথচ এটিও জাতিসংঘ প্রস্তাব অনুযায়ী ফিলিস্তিনীদের প্রাপ্য।

অতীতে ফিলিস্তিন নিয়ে বহু কনফারেন্স হয়েছে। ওসলো, মাদ্রিদ, প্যারিস, ক্যাম্প ডেভিড, আকাবা, শারমাল শেখসহ বহুস্থানে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ইসরাইল ভূমি থেকে পূর্ণ ভাবে হাত গুটাতে যেমন রাজি নয়, তেমনি রাজি নয় ফিলিস্তিনী উদ্বাস্তুদের নিজ গৃহে ফিরবার অধিকার দিতে। ইসরাইলী কর্মকর্তাগণ সে কথা অতীতের ন্যায় এবারও স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এরপরও মার্কিনীদের কাছে শান্তির শত্রু ইসরাইল নয়, বরং শত্রু হলো তারা যারা জাতিসংঘ প্রস্তাবের বাস্তাবায়ন চায়। প্রেসিডেন্ট বুশ এর পরও ফিলিস্তিনী নেতাদের নাকে স্বাধীন ফিলিস্তিনের মূলা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। এটি যে প্রচন্ড প্রতারণা সেটি বুঝবার সামর্থ কি ফিলিস্তিনীদের নেই? কথা হলো, যে ব্যক্তি ইরাকে অস্ত্র আছে বলে অবিরাম মিথ্যা বলতে পারে, ইরাকের উপর বেআইনী হামলা ও জবর দখলকে গণতন্ত্র বলতে পারে, হাজার হাজার ইরাকী জনগণের মার্কিন বিরোধী মিছিলের পরও যে ব্যক্তি সেটিকে মার্কিনীদের প্রতি ইরাকীদের “আহলান সাহলান” বলতে পারে -তার পক্ষে স্বাধীন ফিলিস্তিনের মিথ্যা প্রতিশ্র“তি দেওয়া কি এতই কঠিন?

মার্কিনীদের কাজ শুধু আগ্রাসনের নতুন ক্ষেত্র তৈরী করা নয়, বরং আগ্রাসনের পুরনো ক্ষেত্রগুলোকে আরো অশান্ত ও রক্তাত্ব করা। ফলে যে আগ্রাসন ও অশান্তি আজ ফিলিস্তিনে বেঁচে আছে তা যে আফগানিস্তান ও ইরাকেও আরো বহু কাল বেঁচে থাকবে এবং আর বহু দেশে সেরূপ অবস্থা সৃষ্টি হবে তা নিয়ে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? কারণ, দুর্বৃত্ত শক্তি শুধু দুর্বৃত্তিই বাড়াতে পারে; সুনীতি নয়। এবং সেটি যদি বিশ্বশক্তি হয় তখন বিপদ সমগ্র বিশ্ববাসীর –বিশেষ করে যারা শক্তিহীন তাদের। ১ম সংস্করণ ১৫/০৬/২০০৩; ২য় সংস্করণ ১৬/০১/২০২১।




My COVID Experience

Dr. Firoz Mahboob Kamal

In the name of Allah Subhana wa Ta’la –the Most Merciful and the Most Compassionate, I like to say that I feel greatly blessed to share my COVID experience with others. In fact, I have been given a new life. I am very grateful to Almighty Allah SWT for His great mercy on me. I was taken to my local hospital in London on the 25th of April and released on the 17th of September in 2020. I was treated as a case COVID-19. Of my 146 days in the hospital, I was in the Intensive Care Unit (ICU) for 120 days. It is very rare to have such a long stay in ICU. COVID has three forms: mild, moderate, and severe. I passed through all three forms and turned to have the most severe one. Seven days prior to admission, I developed mild symptoms like a dry cough that changed to fever and shivering in the night. In about 90 percent of cases, the disease subsides without any treatment. In the remaining 10 percent cases, it may turn very severe, need ICU admission, and may cause death.

On 24th April, one day prior to my hospital admission, I didn’t feel that much unwell which could warrant my hospital admission. On that day, I drove for 3 hours on a motorway at about 70 miles per hour from my workplace place where I used to work as a consultant in acute medicine. After returning to my residence in London, I have a good sleep that night. On 25th April, in the afternoon, I started feeling weak and unwell; but still, surprisingly, I didn’t have any shortness of breathing or any serious symptoms. But COVID sometimes runs silently and harms badly. I felt I must check my oxygen level. I didn’t have any oximeter at home; my son bought it from the market. I found my oxygen level at 86 percent; normally it should be 94-98 percent. It was alarming low. I didn’t have any doubt that I have COVID. So it was clear to me that I need oxygen and must go to a hospital. My family called an ambulance and within ten minutes it arrived. In the meantime, I send an email to my all contacts informing them about COVID and asking them to make sincere dowa. I have 4 daughters and a son; all of them quickly came to my house. In those days hundreds of people were dying every day; so my COVID was a huge shock for my wife and the children. Their face turned very gloomy with an apprehension that I may not return from the hospital.       

The ambulance paramedics found my oxygen saturation quite low and quickly started with oxygen. I was taken to the resuscitation room of the Accident and Emergency (A&E) department of King George Hospital –the nearest hospital from my house. I was still alert, oriented, and conversant. Initially, I was started with a simple mask; after a while, I was started with CPAP (continuous positive airway pressure) oxygenation. It was difficult to tolerate the CPAP machine. In the past, I worked as a registrar in respiratory medicine. Now I realise why some patients in the respiratory ward preferred to die instead of taking CPAP machine. How long I was on CPAP, I can’t remember. At one point I was told by one of the doctors that I need a ventilator. It was very alarming to me; I got the message that my situation is quite serious. The doctor was asking for my consent. I told him to go ahead with it.

Since I was told that I need a ventilator, it was a tremendous shock for me. I felt I may not survive. I had a dream since my school days. I felt, my dream now stand shattered. I have a firm belief that we the Muslims do not have any scarcity of wealth but have a serious shortage of knowledge. We have scores of people in agriculture, business, industry, army, and other professions. But we need many more people in the field of writing.  And it is the Sunnah (tradition) of Allah SWT to start with disseminating knowledge. Knowledge sets the status of humans –both here and in the hereafter. Adam (peace be upon him)’s knowledge -as imparted by Allah SWT made him fit to get sijda (prostration) from the angels. So, it has been my passion to follow the sunnah of Allah SWT. I took my pen as a weapon to fight for Islam. I took the medical profession as a decent survival tool and also as a tool to serve humanity. But my prime objective in life was to work as a servant of Allah SWT –especially in the field of knowledge.

When I was told that I need a ventilator, I thought, the time has come to return back to my Allah SWT. But I had a deep apprehension that I am leaving this world almost empty-handed. I wrote hundreds of articles in Bengali and English. All those articles are written in the last thirty years to address the problems of the Muslim Ummah and to find out the solution. Although those articles were published in various newspapers, journals, blogs, but I could publish only one book. In order to give long life to my thoughts, I needed to publish them as books. Hence, prior to hospital admission, I started to edit all those articles for final compilation in several books. In my absence, nobody can do it. Since COVID related deaths were mounting in London, I felt a sense of great disappointment. However, I realized that I can only dream; things are not in my hand. So I possessed no other option but to surrender to the design of Allah SWT. I couldn’t see my own face; but it must be a very gloomy one.

I don’t know when I was put on a ventilator. Since a ventilator can’t be fitted while the patient is awake, I needed to be induced with a comma. One day I found my son is sitting beside me. He was smiling. Seeing him, I was also smiling. After my admission to the hospital, it was the first time that I saw anyone of my family member. My son asked me whether I know how long I have been in hospital. I told you, may be one or two days. He told me that I was in a comma for about two and a half months. I was surprised. I even didn’t know that I was still in ICU. My son informed me that I was critically unwell. The doctors were struggling very hard to bring my oxygen level to the desired level. I had a tracheostomy.  

Later on, I came to know from my family that I was so unwell that even the ICU doctors thought, I am losing the battle. In the middle of the month of Ramadan, I deteriorated so much that the doctors asked my family for an immediate visit for the final departing look. However, by the grace of Allah SWT, I didn’t deteriorate further and survived. But after about two weeks, on the day of Eid ul Fitr, my condition worsened for the second time. My family was asked again to rush to the hospital. In that time, my family had sleepless days and nights. All praises to Allah SWT, I survived that critical moment, too. On the following day, my family was informed that my condition has started improving.

While I was in a comma I didn’t know what happened to me. But while I came out of the comma, a new phase of difficulties started. I started to have excessive secretions from my throat, hallucinations, nightmares and bizarre dreams. I had to keep a suction machine in my hands to suck secretion from my throat. My left arm was totally powerless. Most of these are the symptoms of post-COVID syndrome and the -effects of medications.

Since I am a doctor, the consultants, the registrars, the nurses started to tell me their story about the severity of my illness. They told me that it was a miracle that I recovered. And it was also clear that only Almighty Allah SWT could do such a miracle. I saw my CT scan of the chest with my own eyes. There was no doubt that it was really a miracle to survive after such an extensive lesion in the lung. I had a multi-organ failure. I had pneumonia, clots, and fluid in both lungs. I had kidney failure that needed dialysis. I had also heart failure secondary to clot in the lung. My liver function also got deranged. Whereas, I was a reasonably healthy man before this COVID attack. My lungs, heart, kidney and liver were perfectly normal. It is a great blessing of Allah SWT that my organs have recovered.

I was also told that the ICU team observed my birthday and posted the photos in NHS website. I am not aware of anything of that. Later on, I knew that my friends in the UK, in the Middle East, Bangladesh and other countries could see those photos. It looked strange to me; since I didn’t celebrate my birthday myself in my whole life.

All my days in the hospital gave me a personal spiritual experience. During my old days in schools, colleges, universities, I hardly got a chance to have an exclusive long-time focus on the ultimate destiny in the hereafter. Such thoughts used to come and go and showed little sustenance. My difficult days in the hospital gave me detachment from the world and more attachment with the thoughts of the hereafter. The death and the days after the death stood so close to me. I was standing on a sharp cliff, needed only a slight push to slip onto the other side of the life – the endless hereafter. My COVID could go worse at any time. We are so vulnerable. We are living in a sea of invisible killers; but still we are not aware of that. All of our earnings in this life will be useless if we can’t transfer those assets to the hereafter. Allah SWT has given us enough potentials; what could be the best option than investing those potentials to please Him. There is no doubt that Allah SWT has given me a new life with new opportunities to enrich my treasure in the hereafter.

It is also true that the issue of life or death is not decided by the doctors, nor on the surface of the earth. It is decided only by Allah SWT in the heaven. No virus or bug can kill a man unless it is sanctioned by Allah SWT. Hence dowa works. It is a powerful tool to seek Allah SWT’s help. Almighty Allah SWT listens to dowa and also responds to dowa –as revealed repeatedly in the Holy Qur’an.

By keeping me alive, Allah SWT has given me opportunities to know some unbelieving things. I have never been a highly connected man. But I am deeply moved to know that thousands of people all over the world prayed for my recovery. In many mosques in London, people made collective dowa for me. Some shed tears for me. That happened in Bangladesh, too. There were zoom dowa sessions over the internet. Some people gave sadaqa for my life. I could never imagine that the people whom I didn’t meet in my life would do that. It is incredible. I am deeply grateful and thankful to all of them. I understand, they could show such deep empathy towards me only because of their intense Islamic sense of brotherhood. I am sure they will get rewards from Allah SWT for their love for one of His slaves. Such love and fraternity are indeed the great asset of the Muslim Ummah. It also works as a strong source of inspiration for me. 23/11/2020.

   

 

 

 




দিল্লিতে সরকারি উদ্যোগে মুসলিম গণহত্যা

প্রকল্পটি সরকারি ও পরিকল্পিত

নরেন্দ্র মোদি সরকারের ন্যাশনাল রেজিষ্টার অব সিটিজেন (এন.আর.সি.) এবং সিটিজেনশিপ এ্যামেন্ডমেন্ট এ্যাক্ট (সি.এ. এ.)’য়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে প্রায় দুইমাস যাবত। থামবার নাম নিচ্ছে না। সেটি শুরু হয়েছিল দিল্লির শাহিন বাগে মুসলিম নারী-পুরুষদের দিনরাত অবস্থান ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে। প্রতিবাদের সে মডেল ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। একই রূপ মডেলের অবস্থান ধর্মঘট চলছে কলকাতার পার্ক সার্কাসেও। শুরু হয়েছে ভারতের অন্যান্য বড় বড় শহরে। আন্দোলনকারিদের ঘোষণা, সি.এ. এ. এবং এন.আর.সি এ বাতিল না করা পর্যন্ত  এ আন্দোলন তারা চালিয়ে যাবে। তাদের কথা, এটি তাদের নিজ জন্মভূমিত বাঁচা-মরার অধিকার আদায়ের লড়াই। আন্দোলন থামলে বিপন্ন হবে তাদের নাগরিক অধিকার। আন্দোলনের ফলে পশ্চিম বাংলা, পাঞ্জাব, বিহার, কেরালা, তামিল নাড়ুসহ বেশ কিছু প্রদেশের সংসদ এ মর্মে প্রস্তাব পাশ করেছে যে তারা এ আইন বাস্তবায়ন করবে না। এ আন্দোলন কি করে থামানো যায় সেটিই হলো নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় বিজিপি সরকারের সবচেয়ে বড় মাথা ব্যাথা। শাহিন বাগে যখন ধর্না চলছে তখনই শুরু হয় দিল্লির প্রাদেশিক সংসদের নির্বাচন। বিজিপি নির্বাচন লড়ে শাহিন বাগের ধর্না নির্মূলের এজেন্ডা দিয়ে। কিন্তু নির্বাচনে বিজিপি’র ভরা ডুবি ঘটে। নির্বাচনে জিতলে ধর্না নির্মূলে পুলিশ নামানোর পক্ষে যুক্তি পেশ করতো। সে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় মোদি রাস্তায় দলীয় গুন্ডা নামিয়েছে এবং শুরু করেছে নির্মম গণহত্যা এবং মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে আগুন দেয়ার কাজ। এটি যে  মোদি সরকারের নিজ হাতের কাজ -সে যুক্তিতেই কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগের দাবি তুলেছে।   

অপরদিকে সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার অপপ্রচারটিও লক্ষ্যণীয়। এরা সরকারি দলের গুন্ডাদের একতরফা মুসলিম নির্মূলের হত্যাকান্ডকে এন.আর.সি’র পক্ষ ও বিপক্ষের মাঝে সংঘাতের পরিণতি বলে চিত্রিত করছে। অথচ মুসলিম প্রতিবাদকারিগণ দুইমাস যাবত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করছে কারো উপর কোন রূপ হামলা না করেই। বরং বার বার হামলা হয়েছে তাদের উপরই। কখনো সেটি পুলিশের পক্ষ থেকে, কখনো বা হিন্দুত্ববাদী গুন্ডাদের পক্ষ থেকে। উল্লেখ্য হলো, মুসলিমদের দুর্বল ও নির্মূলের লক্ষ্যে ১৯৪৭ সাল থেকে মুসলিম মহল্লার উপর হিন্দুদের পক্ষ থেকে বহু হাজার হামলা হয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, হামলাকারিদের গুরুতর অপরাধকে লঘু করার দায়িত্ব নিয়েছে মিডিয়া। এবং সেটি করছে এক পক্ষের নিরেট হামলাকে দুই পক্ষের দাঙ্গা রূপে জাহির করে।

মুসলিমদের উপর এরূপ হামলার হেতু বুঝতে হলে শাসকদল বিজেপি’র জন্ম কাহিনী, দর্শন ও নীতি বুঝতে হবে। বিজিপি কোন স্বয়ংসৃষ্ট রাজনৈতিক দল নয়। এটি মূলতঃ ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ (আর.এস.এস)’য়ের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। আর.এস.এস’য়ের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২৫ সালে মারাঠীদের রাজ্য মহারাষ্ট্রের নাগপুর শহরে।  এর প্রতিষ্ঠাতা হলো, উগ্র হিন্দুত্ববাদী মারাঠী হেডগিয়ার। হেডগিয়ারের মগজে ছিল প্রচণ্ড মুসলিম ভীতি। তার ধারণা ছিল, ব্রিটিশের দিন ঘনিয়ে এসেছে। তাদের চলে যাওয়ার পর ভারত জুড়ে অস্তিত্বের মূল লড়াইটি হবে মুসলিমদের সাথে। সংখ্যা লঘু হয়েও ভারতে ৬ শত বছরেরও অধীক কাল মুসলিম শাসন তাদের সে ভয়কে আরো তীব্রতর করেছে। বস্তুতঃ মুসলিম নির্মূলের সে লড়াইয়ে মানসিক ও সামরিক দিক দিয়ে হিন্দুদের সদা প্রস্তুত রাখাই হলো আর.এস.এস প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য। ফলে শুরু থেকেই আর.এস.এস গড়ে উঠেছে একটি উগ্র জঙ্গি সংগঠন রূপে। ভারত জুড়ে মুসলিমদর উপর উপর্যপরি হামলা হলো সে জঙ্গি চেতনারই প্রকাশ। দিল্লিতে সেটিই সম্প্রতি দেখা গেল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ আজকের শত শত বিজিপি নেতাকর্মীগণ হলো মূলতঃ  সে জঙ্গি চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠা  আর.এস.এস’এর ফসল।

 

লক্ষ্য হিন্দু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা

নরেন্দ মোদি ও অমিত শাহের ন্যায় আর.এস.এস নেতাকর্মীদের মুসলিম বিরোধী হিংস্র রূপটি অতীতে বার বার ধরা পড়ছে মুসলিম নির্মূলের নৃশংস গণহত্যা গুলিতে। সেটি যেমন ১৯৯২ সালে মোম্বাইতে, তেমনি ২০০২ সালে গুজরাতে, ২০১৩ সালে মোজাফ্ফর নগরে এবং ২০২০ সালে দিল্লিতে। সাভারকার আর.এস.এসের প্রতিষ্ঠাতা হেডগিয়ারের বুদ্ধিবৃত্তিক গুরু। সাভারকার নিজে হিন্দুত্বের মূল শিক্ষাটি পেয়েছিল বাঙালী সাম্প্রদায়িক সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জি থেকে। বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জি তার আনন্দমঠ উপন্যাসে হিন্দুত্ব শব্দটির প্রথম প্রয়োগ করেন। আনন্দমঠের কবিতার একটি প্যারা থেকেই ভারতের জাতীয় সঙ্গিতের উদ্ভব। তখন কলকাতা ছিল হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মূল উৎস। শুধু বঙ্কিম চ্যাটার্জি নয়, হিন্দু মহাসভার সভাপতি ও বিজিপির পৈতিক সংগঠন জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিও কলকাতার।   উল্লেখ্য হলো, সে কলকাতাতেই বেশ কিছু বছর কেটেছিল হেডগিয়ারের। সেটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে লেখাপড়া করার লক্ষ্যে।  

সাভারকার ও হেডগিয়ার –এ দুই জনই ভারতে মুসলিমদের হিন্দুদের সমান নাগরিক রূপে গ্রহণ করার বিপক্ষে। ১৯৪০’য়ে আর.এস.এস’য়ের সভাপতি হয় গোলওয়ালকার। ভারতে তখন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন।গোলওয়ালকারের যুক্তি ছিল, হিন্দুদের মূল দুষমন ইংরেজগণ নয়, সেটি ভারতবাসী মুসলিম। এমন একটি চেতনার কারণেই আর.এস.এস. কখনোই ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইয়ে অংশ নেয়নি, বরং সুযোগ নিয়েছে ইংরেজদের ছত্রছায়ায় শক্তি বৃদ্ধির। তাদের সে চরিত্র সুস্পষ্ট ধরা পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালে। তখন গোলওয়ালকার ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয় হিন্দুদের ভর্তির কাজে লেগে যায়।

১৯৪৮ সালে নাথুরাম গডসে নামক এক আর.এস.এস কর্মী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলেনর প্রধান হিন্দু নেতা গান্ধিকে হত্যা করে। নাথুরাম গডসে মনে করতো, গান্ধির কারণেই পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে। সে ধারণাটি অধিকাংশ আর.এস.এস কর্মীর। আর.এস.এস’য়ের উদ্দেশ্য, ভারতকে একটি হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করা। তাদের ধারণা, সে কাজে বাধাটি শুধু মুসলিমগণ নয়। বাধা গান্ধি ও তাঁর অনুসারিগণও। শুরুতে এ দলের নেতাকর্মীগণ ভারতীয় সংবিধানকেও মেনে নিতে অস্বীকার করে। কারণ সংবিধান রচনায় হাত ছিল দলিত নেতা ভিম অম্বিদকারের। তাতে রয়েছে,  ধর্মনিরপেক্ষিতা এবং সকল ধর্মমতের মানুষের সম-অধিকারের কথা। তাদের বিরোধ ভারতের জাতীয় পতাকা নিয়েও। এবং সে বিরোধের কারণেই ১৯৪৭ সাল থেকে ২০০২ সাল অবধি ৫২ বছর আর.এস.এস তার কেন্দ্রীয় অফিসে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেনি। তাদের দাবী, ভারতের পতাকাটি হবে গৈরিক।

সংগঠন রূপে আর.এস.এস’এর বিস্তৃতি সমগ্র ভারত জুড়ে। ২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী আর.এস.এস’য়ের শাখার সংখ্যা ৮৪,৮৭৭। সন্ত্রাসী কর্মের জন্য এ অবধি আর.এস.এস ৪ বার নিষিদ্ধ হয়েছে; সেটি  ১৯৪৭, ১৯৪৮, ১৯৭৫ এবং ১৯৯২ সালে। ১৯৪৮ সালে নিষিদ্ধ হয়েছিল গান্ধিকে হত্যার কারণে এবং ১৯৯২ সালে নিষিদ্ধ হয়েছিল ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার অপরাধে। আর এস এসের মূল এজেন্ডা যে ভারত থেকে মুসলিম নির্মূল -সেটি প্রকাশ পায় সংগঠনটির প্রতিষ্ঠার শুরুতেই। আর.এস.এস’য়ের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২৫ সালে। প্রতিষ্ঠার দুই বছরের মাথায় এর জন্মস্থান নাগপুর থেকে মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে হত্যাকান্ড শুরু করে। হামলার তিন দিনের মুখে সকল মুসলিমকে নাগপুর ছাড়তে বাধ্য হয়। ইংরেজ শাসকগণ তাতে বাধা দেয়নি। মুসলিম নির্মূলে নামে কাশ্মিরেও। শ্রীনগরের ন্যায় কাশ্মিরের জম্মু এলাকাটিও ছিল মুসলিম সংখ্যাগুরু। কিন্তু কাশ্মিরের শেষ হিন্দু ডোগরা রাজা তার শাসনের শেষ দিনগুলিতে এ স্ট্রাটেজিক এলাকাটিকে মুসলিম শূণ্য করতে সেনা বাহিনী নিয়োগ করে। সে কাজে সহায়তা দিতে ডাক পড়ে আর এস এস’এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুণ্ডাদের। তখন সেখানে হাজির হয় ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত আর.এস.এস কর্মী। ১৯৪৮ সালে মুসলিম নিধন শুরু হয় নিজাম শাসিত হায়দারাবাদে। সে কাজেও ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সহায়তা করে আর.এস.এস।

 

গণহত্যার গুজরাতি মডেল

মুসলিম নির্মূলের কাজটি আর এস এস তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বার বার করেছে ক্ষমতার বাইরে থেকে।  সে কাজটি অতি সহজ হয় বিজিপির হাতে ক্ষমতায় আসার পর। নাথুরাম গডসে মাত্র একজন ব্যক্তিকে হত্যা করেছিল। কিন্তু তার সতীর্থ আর এস এস ক্যাডার নরেন্দ্র মোদি হত্যা করেছে বহু হাজার মানুষকে। কারণ, মোদি সে হত্যাকান্ডে সমগ্র রাষ্ট্রীয় পুলিশ ও প্রশাসন থেকে সাহায্য পেয়েছে। নাথুরাম গডসে সে সহায়তা পায়নি। নরেন্দ্র মোদি মুসলিম হত্যার যে প্রকল্পটি দিল্লিতে প্রয়োগ করলো সেটি মূলতঃ তার নিজ হাতে রচিত গুজরাতি মডেল। সে মডেলটির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, মুসলিম হত্যা, মুসলিম নারী ধর্ষন এবং তাদের ঘরাবাড়ি ও দোকানপাটে আগুণ দেয়ার কাজে আর এস এস গুণ্ডাদের নামানো। এবং সে কাজে পূর্ণ সুযোগ দিতে পুলিশ ও সরকারি প্রশাসনকে পুরাপুরি নিষ্ক্রীয় রাখা। ফলে যে নৃশংসতা ২০০২ সালে গুজরাতে দেখা গিয়েছিল সেটিই দিল্লিতে ঘটলো।

সভ্য দেশে কোন গৃহে ডাকাত বা খুনিদের হামলার সংবাদ পেলে ৫/১০ মিনিটের মধ্যে পুলিশ হাজির হয়। ডাকাত বা খুনিরা যাতে পালাতে না পারে সে জন্য পুরা এলাকা ঘিরে ফেরা হয়। জনগণ সে নিরাপত্তাটুকু পেতেই পুলিশ পালতে রাজস্ব দেয়। কিন্তু পুলিশের সেরূপ সভ্য কর্ম যেমন গুজরাতে হতে দেয়া হয়নি, তেমনি দিল্লিতেও হয়নি। ফলে গুজরাতে পুলিশের অনুপস্থিতিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে খুনি ও গুন্ডারা ইচ্ছামত মুসলিমদের হত্যা, ধর্ষণ এবং তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে আগুন দিয়েছে। পুলিশ বাধা দেয়নি। সে পুলিশ নিষ্ক্রীয়তার নজির বহু। একটি দৃষ্টান্ত দেয়া যাক। গুজরাতে একজন মুসলিম নেতা ছিলন এহসান জাফরি। তিনি কংগ্রেস দলের স্থানীয় এমপিও ছিলেন। তার ঘরে অআশ্রয় নিয়েছিল প্রায় তিন শত মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশু। জনাব জাফরি মোদির কাছে পুলিশ সাহায্য চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পুলিশের নিরাপত্ত পাননি। তিনি গৃহের বাইরে এসে হামলাকারীদের বলেন, তোমরা সাথে  যা ইচ্ছা করো তবে অআমার গৃহে যারা আশ্রয় নিয়েছে তাদের হত্যা করো না।” কিন্তু গুন্ডাগণ জনাব জাফরি হাতপা কেটে আগুনে জ্বালিয়েছে। এবং যারা তার গৃহে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের অধিকাংশকেও হত্যা করেছে। যেসব পুলিশ অফিসার সে বীভৎস অপরাধকর্ম থামানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছে মোদি সরকার তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ অন্যত্র বদলী করেছে।       

 

পুলিশের যে নিষ্ক্রিয়তা দিল্লিতে

দিল্লিতে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার বিররণ দিয়েছে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা। পত্রিকাটি ২৯/২/২০২০ তারিখে ছাপে, “দিল্লিতে চার দিনব্যাপী সংঘর্ষ চলাকালীন দিল্লি পুলিশের কাছে ১৩ হাজার ২০০টি ফোন গিয়েছিল। কোথাও গুলি চলছে, কোথাও গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ আসছিল। তা সত্ত্বেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ফোনে বার বার অভিযোগ করা সত্ত্বেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।” ফলে গুণ্ডাদের হাতে ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে চলা হত্যাকান্ডে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে শত শত –যাদের মাঝে অনেকেই এখনো মৃত্যুর সাথে লড়ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা যে আরো বাড়বে সে সম্ভাবনাই অধীক। সে সাথে পেট্রোল ঢেলে শত শত ঘরবাড়ি ও দোকানপাটও জ্বালানো হয়েছে।

২৯/২/২০২০ তারিখে আনন্দবাজারের আরো রিপোর্টঃ “পুলিশ কন্ট্রোল রুমের কল লগ খতিয়ে দেখা গিয়েছে, ২৩ তারিখ, রবিবার বিক্ষোভের প্রথম দিন সন্ধ্যাতেই ৭০০ ফোন গিয়েছিল পুলিশের কাছে। ২৪ তারিখে একধাক্কায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫০০। ২৫ ফেব্রুয়ারি ৭ হাজার ৫০০ ফোন পায় পুলিশ। তার পর দিন অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি ১ হাজার ৫০০টি ফোন পায় পুলিশ। শুধুমাত্র যমুনা বিহার থেকেই ভজনপুরা থানায় ২৪-২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার ফোন এসেছিল বলে জানিয়েছে ওই সংবাদমাধ্যম। ভজনপুরা থানার আট পাতার কল রেজিস্টার খতিয়ে দেখে তারা জানিয়েছে, কোন নম্বর থেকে ফোন আসছে, কী অভিযোগ এবং তার প্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার জন্য রেজিস্টারের পাতায় আলাদা আলাদা কলাম থাকলেও, শুধুমাত্র কোথা থেকে ফোন এসেছিল, কী অভিযোগ তা-ই লেখা রয়েছে। এমনকি গুলি চলা এবং আগুন লাগানোর অভিযোগও লেখা রয়েছে তাতে। কিন্তু অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার উল্লেখ নেই সে ভাবে। অর্থাৎ অভিযোগ পেয়েও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনও ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।”

 

নৃশংস সন্ত্রাসে পুলিশ

মুসলিম বিরোধী সন্ত্রাসের কাজটি শুধু বিজিপি ও আর.এস.এসের দলীয় গুন্ডাদের কাজই নয়, সে নৃশংস কাজে নামে খোদ পুলিশকেও। সে ঘটনা যেমন পূর্বেও বহুবার দেখা গেছে, তেমনি এবারও দেখা গেল রাজধানী শহর দিল্লিতে। আহত ও আধমরা মুসলিমদের হাসপাতাল না নিয়ে পুলিশ তাদের মাথায় আঘাত দিয়েছে এবং জয় শ্রীরাম ও বন্দে মাতরম গাইতে চাপ দিয়েছে। এমন কি ঘটনাস্থলে এ্যামবুলেন্সও পৌঁছতে দেয়নি। তারা যেন আহতদের মৃত্যুই কামনা করছিল। এ প্রসঙ্গে আনন্দবাজারের ২৯/২/২০২০ তারিখের রিপোর্টঃ “সাম্প্রদায়িক হিংসা চলাকালীনই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল ভিডিয়োটি। তাতে আধমরা অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকা পাঁচ যুবকের উপর নৃশংস অত্যাচার চালাতে দেখা গিয়েছিল পুলিশকে। জোর করে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ানো হচ্ছিল তাঁদের দিয়ে। না গাইলে চুলের মুঠি ধরে রাস্তায় মাথাও ঠুকে দেওয়া হচ্ছিল। জানতে চাওয়া হচ্ছিল, ‘‘আর আজাদি চাই!’’ নৃশংস অত্যাচারের শিকার সেই পাঁচ যুবকের মধ্যে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ওই যুবককে ফয়জান (২৪) বলে শনাক্ত করা গিয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক কিশোর সিংহ বলেন, ‘‘মঙ্গলবার নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডে ওই যুবককে ভর্তি করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ওঁর শরীরে গুলি লাগে। অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ছিল। ভিডিয়োতে ফুটপাতের পাশে নীল জামা পরা এক যুবককে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। তিনিই ফয়জান বলে জানা গিয়েছে।’’

 

“নাগরিকত্ব চাই? দিচ্ছি, দাঁড়া!”

২৯/২/২০২০ তারিখে আনন্দ বাজার আরো রিপোর্ট করেছে, “মৌজপুরে মহম্মদ ইব্রাহিমের বাড়ির গেট ভেঙে ঢুকে এক দল লোক যখন পেট্রল ছড়াচ্ছে, তাদের মুখে একটাই শাসানি। বিএসএফ জওয়ান মহম্মদ আনিসের বাড়িতে তাণ্ডব শুরুর সময় একই সুরে গালিগালাজ— ‘ইধার আ পাকিস্তানি! তুঝে নাগরিকতা দেতে হ্যায়।’ প্রথমে বাড়ির বাইরে গাড়িতে আগুন লাগানো হয়, তার পরে আনিসের বাড়িতে ঢুকে গ্যাস সিলিন্ডার খুলে আগুন ধরিয়ে দেয় জনতা, ২০০২ সালে গুজরাতের মতোই। বাবা, কাকা, খুড়তুতো বোনকে নিয়ে কোনও ক্রমে পালান আনিস। তাঁর আর বোনের বিয়ের জন্য টাকা, গয়না রাখা ছিল বাড়িতেই। সব পুড়ে ছাই। মৌজপুর-বাবরপুর চক থেকে বাঁ দিকে বাঁক নিলেই সারি সারি দোকানের ধ্বংসস্তূপ কালো ছাই মেখে দাঁড়িয়ে। দোকানের সামনে আবিদ হুসেন বলছিলেন, ‘‘আগুন লাগানোর সময় বাধা দিয়ে বললাম, কী দোষ করেছি? মারতে মারতে বলল, তোদের বড্ড বাড় বেড়েছে। গোটা দেশকে শাহিন বাগ বানাতে চাইছিস!’’ মঙ্গলবার রাতে ভজনপুরায় পাঁচ যুবককে রাস্তায় ফেলে পেটানো হয়। কারখানার কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন। তাঁদের এক জন, বছর কুড়ির হাবিবের মাথায় ব্যান্ডেজ। মুখ ফেটেছে। হাবিব বলেন, ‘‘উইকেট দিয়ে পেটাচ্ছিল আর বলছিল, তোদের নাকি আজাদি চাই? এই নে আজাদি।’’

 

“গুজরাতের দাওয়াই”

২৯/২/২০২০ আনন্দবাজার আর ছেপেছে, “জাফরাবাদের রাস্তার পাশের মাঠে শাহিন বাগের মতোই দু’মাস ধরে সিএএ-এনআরসি-র বিরুদ্ধে ধর্না চলছিল। সীলমপুর থেকে জাফরাবাদ পর্যন্ত দু’কিলোমিটার রাস্তায় বন্ধ দোকানের শাটারে কালো কালিতে লেখা: ‘নো সিএএ, নো এনআরসি’। জাফরাবাদ মেট্রো স্টেশনের হলুদ রঙের দেওয়াল, রাস্তার মধ্যে মেট্রো লাইনের স্তম্ভের গায়েও একই স্লোগান। জাফরাবাদ মেট্রো স্টেশনের নীচের রাস্তায় ধর্না শুরুর পরেই বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র তিন দিনের মধ্যে রাস্তা খালি করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। বুধবার পুলিশ-আধাসেনা জাফরাবাদের রাস্তা খালি করার পরে কপিল ঘোষণা করেন, ‘‘আর কোনও শাহিন বাগ হবে না।’’ গোকুলপুরীর ছাই হয়ে যাওয়া টায়ার মার্কেটের ব্যবসায়ী ইউসুফ হারুন বলেন, ‘‘সোমবার বিকেল থেকে ওরা একের পর এক দোকানে আগুন লাগিয়েছে। আর বলেছে, গোটা দিল্লিটাকে শাহিন বাগ করতে দেব না।’’ ব্যবসাদার জামিল সিদ্দিকির কথায়, ‘‘ওরা বলছিল, তোরা গোটা দেশে সিএএ-এনআরসি নিয়ে অশান্তি পাকাচ্ছিস। গুজরাতের মতো আর একটা দাওয়াই না-দিলে চলবে না।’’বধ্যভূমি উত্তর-পূর্ব দিল্লির এ-সব আলাদা ঘটনার একটাই যেন যোগসূত্র— সিএএ-এনআরসি-র বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-আন্দোলনের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা। দিল্লির উদাহরণ দেখিয়ে শাহিন বাগের মতো আন্দোলন আর কোথাও দানা বাঁধার আগেই শেষ করে দেওয়া।

দিল্লির ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডিজ় অব ডেভেলপিং সোসাইটিজ়’-এর অধ্যাপক হিলাল আহমেদের মন্তব্য, ‘‘বার্তা স্পষ্ট। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিয়ে মত প্রকাশের অধিকার নেই। বিশেষত আপনি যদি গরিব, চাষি, মহিলা, দলিত, আদিবাসী বা মুসলিম হন।’’ ২০১১-র জনগণনা বলছে, উত্তর-পূর্ব দিল্লির প্রায় ২২.৪ লক্ষ মানুষের ৬৮.২ শতাংশ হিন্দু। যেখানে দুই সম্প্রদায় মিলেমিশে বাস করছিল, সেখানেই সংঘর্ষ হয়েছে। নারায়ণ বলছেন, ‘‘মুসলিমরা এ বার নিজেদের মহল্লার মধ্যেই থাকবে। ভাইচারা শব্দটাই শিকেয় উঠে গেল। ভেদাভেদ এখন আরও স্পষ্ট।’’

 

পরিকল্পিত গণহত্যা

দেশের কোন নিভৃত গ্রামগঞ্জে নয়, গণহত্যা এবং জ্বালাও পোড়াও ঘটেছে দিল্লির ন্যায় রাজধানী শহরে। এবং ৪ দিন ধরে। এমন গণহত্যা কখনোই হঠাৎ করে হয় না। কোন দৈবাৎ  দুর্ঘটনার কারণেও হয়না। তাছাড়া এমন প্রকাণ্ড ধ্বংস কান্ড বা গণহত্যা কখনোই রাষ্ট্রের কর্ণধারদের অনুমতি ছাড়া ও সহযোগিতা ছাড়া ঘটেনা। বরং রাজধানীর বুকে এমন বিশাল হত্যাকান্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ হয় প্রশাসনের পরিকল্পনা মাফিক। সেটি যেমন ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে গুজরাতে হয়েছে, সেটিই হলো মোদির ছত্রছায়ায় দিল্লিতেও। দাঙ্গার জন্য চাই চিহ্নিত শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে গভীর ঘৃণা। এখানে সরকারের শত্রুপক্ষ হলো তারাই যারা সরকারি নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছে। প্রতিবাদী পক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টির কাজটিই করা হয়েছে সরকারি মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে। ২০১৯ সালের নির্বাচন কাল থেকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ মুসলিমদের দেশের শত্রু তথা ভেতরের “উঁইপোকা” রূপে অভিহিত করে আসছে। কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী বিজিপি নেতা অনুরাগ ঠাকুর ২৭/১/২০২০ তারিখে দিল্লির শাহিন বাগের আন্দোলনকারিদের দেশদ্রোহী রূপে চিত্রিত করেছে এবং বলেছে, “দেশ কো গাদ্দারকো গোলি মারো শালোকো”। কতবড় কুৎসিত ও উস্কানিমূলক কথা! বস্তির গুন্ডার গালি একজন মন্ত্রীর মুখে! এটি কি তবে অসভ্য গুন্ডারাজ? বিজিপি এমপি প্রবেশ বর্মা বিকাশপুরী জনসভায় শাহিন বাগের আন্দোলনকারিদের লক্ষ্য করেছে বলেছে, “এরা এবার ঘরে ঘরে ঢুকে মা-বোনদের ধর্ষণ করবে”। এমন কথা বলার উদ্দেশ্য যেমন ঘৃণা সৃস্টি, তেমনি শাহিন বাগের আন্দোলনকারিদের বিরুদ্ধে হামলায় উস্কানি দেয়া।

অপরদিকে সন্ত্রাস দমনে পুলিশের নিরবতা কতটা তীব্র -সেটিও ধরা পড়ে ৩০/১/২০২০ তারিখে। সেদিন সারিবদ্ধ পুলিশের সামনে এক যুবক জামে মিল্লির প্রতিবাদী ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে গুলি ছুঁড়ে এই বলে, “তোম আজাদি চাহতে হো, এ লও আজাদী।” কিন্তু তাকে গ্রেফতার বা থামাতে পুলিশের মাঝে কোন নড়াচড়া নজরেপড়েনি। যে কোন সভ্য দেশেই সন্ত্রাসের লক্ষ্যে মানুষের মাঝে ঘৃণা ছড়ানো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। সে অপরাধে মন্ত্রী বা পুলিশকে আদালতে তোলা হয়, তাদের চাকুরিও যায়। কিন্তু ভারতে সে সব কিছু হয় না, বরং প্রমোশন হয়। নরেন্দ্র মোদি চা বিক্রেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী পদ অবধি পৌঁছেছে লাগাতর ঘৃণাপূর্ণ বক্তৃতা ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে। মোদির সবচেয়ে বড় ও সফল সন্ত্রাসটি ছিল মোঘল আমলে গড়া ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসে। সে সফল সন্ত্রাসের জন্য বিজিপি নেতা প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী তাকে রাজপথ থেকে তুলে নিয়ে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেয়। নিয়োগপ্রাপ্তির ২ মাসের মধ্যে গুজরাতে আরেক বীভৎস বর্বরতা ঘটায়। সেটি মুসলিম নির্মূলের গণহত্যা, গণধর্ষণ ও ধ্বংসকান্ড। তাতে মোদির মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও তার নিজদেশে প্রকাণ্ড প্রমোশন মেলে। কিছুকালের মধ্যে তাকে  প্রধানমন্ত্রীর পদটি দেয়া হয়। ফ্যাসিবাদী রাজনীতির এটিই নিয়ম।যে যত বর্বর, সেই ততো বড় নেতা। বিজিপির অন্য নেতারাও সে পথ ধরেছে। অপর দিকে যারাই তাদের বিরুদ্ধে দাড়ায় তারাই শাস্তি পায়। তাই শাস্তি পেল দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি এস. মুরলিধর। তাঁর অপরাধ, দিল্লির পুলিশকর্তাকে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেসব নেতাগণ ঘৃনাপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে। আর তাতেই তাঁকে সে পদ থেকে সরিয়ে রাতারাতি পাঞ্জাবে বদলি করা হয়।

ভারতে ভয়ানক দুর্দিন শুধু মুসলিমদের জন্যই নয়, প্রতিটি সভ্য ও বিবেকবান মানুষের জন্যও। এরূপ অসভ্যতা কখনোই কোন দেশের সীমানায় সীমিত থাকে না। করোনা ভাইরাসের ন্যায় ফ্যাসিবাদের ভাইরাসও সীমানা পেরিয়ে দ্রুত প্রতিবেশী দেশেও ছড়ায়। বাংলাদেশে মোদি-ভক্ত হাসিনার প্রচন্ড ফ্যাসিবাদী তান্ডব তো তারই আলামত। ডাকাত কখনোই একাকী ডাকাতিতে নামে না, বরং অন্য ডাকাতদের সাথে নিয়ে বিশাল দল গড়ে। সেরূপ নীতি ফ্যাসিবাদীদেরও। তাদের সে বন্ধনটি শুধু দেশীয় রাজনীতির অঙ্গনেও দেখা যায় না, দেখা যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। জার্মানীর হিটলার, ইটালীর মোসোলিনী ও স্পেনের ফ্রাংকোর ফ্যাসিবাদীদের মাঝে তাই গভীর বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে তুলতে পেরেছিল। একই কারণে হাসিনার সাথে নরেন্দ্র মোদির সম্পর্কও অতি গভীর।নিজ পিতার জন্ম শতবার্ষিকীর ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে মোদিকে সন্মানিত অতিথি রূপে দাওয়াত দিয়ে হাসিনা প্রমাণ করলো মোদি তার কত আপন। কোন ভদ্রজন কি খুনিকে নিজ গৃহে দাওয়াত দেয়? তাতে ধরা পড়ে চরিত্র, চেতনা ও রাজনীতিও। তাই বিপদ শুধু ভারতীয় মুসলিমদের নয়, গুরুতর বিপদ বাংলাদেশের মুসলিমদেরও। ০১/০৩/২০২০     

 




ভারতে মসজিদ ধ্বংস ও মুসলিম নির্মূল প্রকল্প

উৎসব অসভ্য কর্মে

মসজিদ বা অন্য কোন ধর্মের উপাসনালয় ধ্বংস করা কোন কালেই এবং কোন দেশেই সভ্যকর্ম রূপে বিবেচিত হয়নি। সভ্যকর্ম রূপে বিবেচিত হয়নি কোন একটি ধর্মের অনুসারিদের হত্যা করা, তাদের মহিলাদের ধর্ষণ করা এবং শিশুদের আগুণে ফেলে উল্লাস করা। এটিও কোন সভ্য কর্ম নয় যে, কে গরুর মাংস খেলো বা কে শুকর বা শাপ খেলো তার ভিত্তিতে রাস্তায় পিটিয়ে কাউকে হত্যা করা। এরূপ হত্যাকান্ড চিরকালই বিবেচিত হয়েছে অতিশয় বর্বর ও অসভ্য কর্ম রূপে। অথচ এরূপ অসভ্য ও বর্বর কর্মগুলি ভারতে নিয়মিত উৎসবভরে হচ্ছে।  এরূপ অসভ্যতা ভারতে যে কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তারই প্রমাণ হলো, এ বর্বরতা নিছক কোন দলের দুর্বৃত্ত নেতাকর্মীদের মাঝে সীমিত নেই। বরং সেটি ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠির মাঝে। ফলে মসজিদ ভাঙ্গার ন্যায় বর্বর কর্মটি কোথাও শুরু হলে সে অসভ্যতাটিও লাখ লাখ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। সেটি ১৯৯২ সালে সেরূপ একটি উৎসব দেখা গেছে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসকালে। এ বর্বরতাটি এতটাই পবিত্র গণ্য হয়েছে যে, কোন পুলিশ, কোন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা মন্ত্রী ঘটনাস্থলে এসে সেটি থামানোর চেষ্টা করেনি। আরো লক্ষ্যণীয় হলো, মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুদের হত্যা এবং মহিলাদের ধর্ষণের লক্ষ্যে কোন শহরে মুসলিম জনবসতির উপর হামলা শুরু হলে সেখানেও লাখ লাখ হিন্দুর ঢল নামে। যেন সেটিও একটি পবিত্র কর্ম। ১৮৮৩ সালে আসামের নেলীতে, ১৯৯২ সালে মুম্বাইয়ে, ২০০২ সালে গুজরাতে এবং ২০১৩ সালে উত্তর প্রদেশের মুজাফ্ফর নগরে তো সেটিই হয়েছে। সে অসভ্য বর্বরতায় অপরাধীদের পূর্ণ সুযোগ দিতে পুলিশ, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সেনবাহিনীও সচরাচর ঘটনাস্থল থেকে পরিকল্পিত ভাবেই অদৃশ্য থেকেছে। যেন তারা কিছু দেখেনি এবং শুনেনি।

মূল সমস্যাটি তাই শুধু অসভ্য অপরাধ কর্মগুলিতে বিপুল সংখ্যক হিন্দুর অংশ গ্রহণ নয়, বরং সে বর্বর কর্মগুলিকে ঘৃণা না করে সর্বমহলে সেগুলিকে পবিত্র জ্ঞান করা। সে সাথে কাপুরুষের ভূমিকায় নেমেছে দেশের লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। এমন কি ভারতের মুসলিম আলেমগণও।ভারতীয় মুসলিমদের অতিশয় দুশ্চিন্তার কারণ মূলতঃ এখানেই্। দুশ্চিন্তা এতটাই বেড়েছে যে, মায়েরা তাদের সন্তানদের মাথায় টুপি দিয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করে এ ভয়ে যে, বজরং দল, বিজিপি, আর.এস.এস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের গুন্ডারা পথে তাদের পিটিয়ে লাশ বানিয়ে ফেলবে। কিছু দিন আগে কলকাতার মুসলিম মেয়র ফিরহাদ হাকিম এমন একটি পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন তার এক বক্তৃতাতে।  মুসলিম ব্যবসায়ীগণ হাটে গরু বেঁচতে যেতেও ভয় পায়, না জানি গো-রক্ষক ভলেন্টেয়ারেরা পথে তাদের হত্যা করে ফেলে। কারণ, এগুলিই তো অহরহ হচ্ছে। লক্ষণীয় হলো, যে নৃশংস অসভ্যতার শিকার হচ্ছে মুসলিম নর-নারী ও শিশুগণ, তা থেকে এখন বাদ পড়ছে না ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদগুলিও।    

২০১৪ এবং ২০১৯ সালে নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপি)র বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার কারণটি এ নয় যে, দলটি ক্ষমতায় এসে ভারত থেকে দারিদ্র্য দূর করেছে। বরং বাস্তবতা হলো, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব ভারতে দিন দিন বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে দলটির ব্যর্থতা বিশাল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠির বাস এখনো ভারতে। প্রতি বছর বহু হাজার কৃষক আত্মহত্যা করে স্রেফ ঋণের অর্থ পরিশোধ না করতে পেরে। বহুকোটি মানুষ ভিটামাটি হারিয়ে বস্তিতে বসবাস করে। এবং বহুকোটি আদিবাসী বেঁচে আছে বনজঙ্গলের জীব, ফলমূল ও কচু-ঘেচু খেয়ে। বিজিপির জনপ্রিয়তার মূল কারণটি অন্যত্র। সেটি ভারতীয় হিন্দুদের মাঝে চরম মুসলিম বিদ্বেষ সৃষ্টিতে দলটির সফলতা। যে রাজনৈতিক দলটি মুসলিম নির্মূল ও মসজিদ নির্মূলে অধীকতর নৃশংস হওয়ার দৃষ্টান্ত রাখছে -ভারতীয় হিন্দুগণ সে দলকেই বিপুল ভোটে বিজয়ী করছে। সমগ্র ভারত জুড়ে হিন্দুদের মাঝে এরূপ মুসলিম বিদ্বেষের কারণেই গুজরাতের মুসলিম গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদি আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনে বিজিপির পক্ষে জোয়ার সৃষ্টির আরো কারণ, এ দলটিই নেতৃত্ব দিয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর প্রায় ৫ শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদটিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার কাজে। এবং ১৯৯২ সালে ও ২০০২ সালে নেতৃত্ব দিয়েছিল যথাক্রমে মুম্বাই ও গুজরাতে মুসলিম গণহত্যায়।

ভারতীয় মুসলিমদের জন্য ভয়ানক বিপদ এজন্যও যে, মুসলিম নির্মূল এবং মসজিদ নির্মূলের নৃশংস চেতনাটি শুধু বিজিপি,আর.এস.এস, শিব সেনা, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরং দলের গুন্ডাদের মাঝে সীমিত নয়। ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের মাঝেও। এবং সেটিরই সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া যায় সুপ্রিম কোর্টের গত ৯ নভেম্বরের রায়ে। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ আজ থেকে ২৭ বছর আগে যে চেতনার পরিচয় দিয়েছিল তা থেকে তারা অনেক দূর পিছু হটেছে। ২৭ বছর আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের বর্বরতাটিকে তারা একটি জঘন্য ফৌজদারি অপরাধ রূপে গণ্য করেছিল। সে অপরাধে উস্কানি দেয়ার অপরাধে বিজিপির নেতা এবং সাবেক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লাল কৃষ্ণ আদভানিসহ অনেকের বিরুদ্ধেই আদালত থেকে সমন জারি করা হয়েছিল। অথচ সে বিচারকগণই এখন মসজিদ ধ্বংসকারি গুন্ডাদের সাথে সুর মিলিয়ে রায় দিল বাবরি মসজিদের ভিটাতেই মন্দির হবে। ফলে ২৭ বছর আগে যে অপরাধকর্মটি অপরাধ রূপে গণ্য হয়েছিল এখন সেটি আর অপরাধ থাকছে না। বরং গ্রহনযোগ্য ধর্মীয় কর্ম রূপে গণ্য হচ্ছে। এরই ফলে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের অপরাধ নিয়ে যে মামলাগুলি এখনও আদালতে ঝুলছে, সে গুলি সত্ত্বর তুলে নেয়ার জন্য হিন্দু সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে দাবিও উঠছে। সেদিনও দূরে নয় যখন সে মামলাগুলি সত্যই তুলে নেয়া হবে। এবং আসামীগণ চিত্রিত হবে হিরো রূপে।   

 

বিচারের নামে ভূমি বিনিময়ের সালিশ

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের রায়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ ন্যায়বিচারের বদলে নিছক ভূমি লেনদেনের সালিশী পেশ করলো। এবং আদালতের এ রায়ে বিচারকদের আসল মতলবটিও প্রকাশ পেল। এখন এটি সুস্পষ্ট যে, বিচারের মূল লক্ষ্যটি ছিল ফ্যাসিস্ট হিন্দুত্ববাদীদের মনবাসনা পূর্ণ করা। বিচারের রায়ে হিন্দু ফ্যাসিস্টদের বিজয়টি তাই বিশাল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পেয়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদীগণ এতটাই গর্বিত যে, তাদের কাছে অসহ্য হলো সাত শত বছরের মুসলিম শাসনের ইতিহাসকে হজম করা। আরো অসহ্য হলো, চোখের সামনে মুসলিম শাসনের স্মৃতি ধারণকারি প্রতিষ্ঠাগুলিকে বরদাশত করা। বস্তুতঃ এমন একটি ঘৃনার কারণে প্রতিটি মুসলিম এবং প্রতিটি মুসলিম প্রতিষ্ঠানই তাদের কাছে অসহ্য। যে মুসলিমগণ ভারত শাসন করেছিল তাদের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তারা প্রতিশোধ নিতে চায় যারা বেঁচে আছে সে মুসলিমদের থেকে। এমন একটি সহিংস চেতনার কারণে ভারত ভূমি থেকে তারা শুধু মুসলিমদেরই নির্মূল চায় না, নির্মূল করতে চায় ইসলাম ও মুসলিম স্মৃতি নিয়ে বাঁচা প্রতিষ্ঠানগুলিকেও। তেমন একটি উদ্দেশ্য নিয়েই তারা গুন্ডামী করে নির্মূল করে দিল ৫ শত বছরের পুরানো ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদকে। অথচ এরূপ একটি গুরুতর বর্বরতাকে খাটো করতেই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মসজিদ ধ্বংসের ন্যায় গুরুতর এক সন্ত্রাসী অপরাধকে নিছক ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ রূপে বিচার করলো। আদালতের বিচারকদের ধারণা, ৫ একর জমি দিয়ে মুসলিমদের সহজেই তুষ্ট করা যাবে এবং সে সাথে এ বীভৎস অপরাধের কান্ডকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়া যাবে। বিচারকদের রায়ে বাবরি মসজিদের ন্যায় ঐতিহাসিক মসজিদের মূল্য যেন ৫ একর জমি। যেন ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের ৫ একর জমি কেনার সামর্থ্যও নাই। মুসলিমদের প্রতি এরচেয়ে বড় অবমাননা আর কি হতে পারে? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার সাথি হিন্দুত্ববাদী অন্যান্য নেতাকর্মীগণ তাই সুপ্রিম কোর্টের বিচারের রায়ে প্রচন্ড খুশি। কারণ মুসলিমদের যেখানে প্রচন্ড পরাজয় ও অপমান –নরেন্দ্র মোদি ও তার সাথিগণ ততই খুশি হবে -সেটিই তো স্বাভাবিক?

ভারতের প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং আদালতের হিন্দুদের এ বিষয়টি নিশ্চয়ই জানা নেই যে, কোন ভূমিতে যখন মসজিদ নির্মিত হয় তখন সে ভূমির মালিকানা কোন ব্যক্তি, সরকার বা ওয়াক্বফ বোর্ডের থাকে না। প্রতিটি মসজিদই মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের নিজের ঘর। এবং প্রতিটি মসজিদের ইমারত এবং জমির তিনিই একমাত্র মালিক। তাই ভারতীয় হিন্দুগণ মহান আল্লাহতায়ালার মালিকানায় হাত দিয়েছে। তবে আল্লাহতায়ালার ঘরে কেউ হাত দিলে প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হয় তাঁর খলিফা রূপে সে ঘরের পাহারা দেয়া। তাই ৫ একর জমির বিনিময়ে সে ঘরের জমি মন্দির নির্মাণে হিন্দুদের দিয়ে দেয়াটি ঈমানদারি হতে পারে না। এ নিয়ে আপোষ করার কোন এখতিয়ার কোন মুসলিম রাজনৈতিক দল বা ওয়াকফ কমিটিরও থাকে না। হাদীসে বলা হয়েছে, পৃথিবী পৃষ্টে যারা আল্লাহর ঘর গড়েন, আল্লাহতায়ালাও তাদের জন্য জান্নাতে ঘর গড়েন। এবং আল্লাহর সে ঘরের পাহারা দেয়ার কাজটিও তাই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এক্ষেত্রে ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের ব্যর্থতাটি বিশাল। তারা আল্লাহতায়ালার ঘরের নিরাপত্তা দিতে পারিনি। প্রশ্ন হলো, এখন কি তারা আল্লাহর ঘরের ভিটায় মুশরিকদের মন্দির নির্মাণকে মেনে নিবে?   

 

বিচারকদের অবিচার

আদালতের রায়ে বিচারকগণ একথা বলতে বাধ্য হয়েছে যে, এ প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি যে মসজিদের নীচে মন্দির ছিল। অতীতে এমন দাবী এমন কি তুলসী দাস, শিবাজী, বিবেকান্দ, গুরু গোবিন্দ, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী এবং অরবিন্দ ঘোষের ন্যায় যারা ভারতের ইতিহাসে প্রখ্যাত হিন্দু পন্ডিত, নেতা বা বুদ্ধিজীবী -তারাও কখনো করেনি। অথচ ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পিছনে মূল কারণ রূপে দেখানো হয়েছে, মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল মন্দিরের উপর। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার মূল হোতা বিজিপি নেতা লাল কৃষ্ণ আদভানীর দাবি ছিল, মসজিদের ইমাম যে মেম্বরের উপর দাঁড়িয়ে খোতবা দেন, রামের জন্মস্থান ছিল তারই নীচে। মসজিদ ভেঙ্গে সেখান মন্দির নির্মাণ ছাড়া অন্য কোন প্রস্তাবে সে কিছুতেই রাজি ছিল না। তবে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার মধ্য দিয়েই বিজিপি ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলির প্রকল্প শেষ হয়নি। মুসলিম বিরোধী সে ঘৃনাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন আরো অনেক মসিজদের তলায় মন্দিরের তত্ত্ব শোনাচ্ছে। এবং সেটি ঘৃনাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের রাজনীতিকে আরো তীব্রতর করার প্রয়োজনে। তাই বিজিপির এ অপরাজনীতি যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন মসজিদ নির্মূলের রাজনীতিও তীব্রতর হবে। অবিকল সে কথাটিই বলেছেন ভারতীয় হিন্দুদের এক আধ্যাত্মিক গুরু স্বামী অগ্নিবেশ। বলা হচ্ছে মথুরার শাহী মসজিদটি নাকি শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমির উপর। তলায় মন্দিরের কিসসা শোনানো হচ্ছে বারানসির জ্ঞানবাপি মসিজদের বিরুদ্ধেও। কল্পনা করতে তো আর ইতিহাস লাগে না, প্রত্নতাত্তিক প্রমাণ লাগে না। লাগে শুধু কল্পনাবিলাসী মন। এবং গাঁজার কল্কের ন্যায় সেরূপ মনের অধিকারীদের সংখ্যা কি ভারতে কম? এমন কি বলা হচ্ছে, তাজমহলও আগে একটি মন্দির ছিল। সোসাল মিডিয়াতে ইতিমধ্যেই চার শতটি মসজিদের তালিকা পেশ করেছে। বলা হচ্ছে, বাবরি মসজিদের ন্যায় সেগুলিও একের পর এক ধ্বংস করা হবে। তাছাড়া মিথ্যার শক্তি তো বিশাল। একবার রটিয়ে দিলে সে মিথ্যা কোটি কোটি অনুসারি পেয়ে যায়। গরুকে দেবতার আসনে বসানো হয়েছে এবং গো-মুত্রকে পবিত্র পানীয় রূপে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে এরূপ মিথ্যা রটিয়েই। ইবলিসের বিশ্বজোড়া বিশাল অনুসারি তো এ মিথ্যার উপরই।

ভারতের বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ব বিশারদ হলেন দিল্লির জওহারলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ভারমা। তার গবেষণালদ্ধ আবিস্কার হলো, বাবরি মসজিদের নীচে যে পুরোন ইমারতের আলামত পাওয়া গেছে সেটি হলো একটি পুরোন মসজিদের, মন্দিরের নয়। তার যুক্তি, একটি পুরোন ছোট মসজিদের ভিটায় বিশাল মসজিদ নির্মাণ করা হয়। আদালতের বিচারকগণও তাদের রায়ে মিস্টার ভার্মার সে অভিমতটি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, প্রফেসর ভার্মার সে আবিস্কারটি মেনে নিলেও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ সে সত্যের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার প্রদানে নৈতিক বলের প্রমাণ দিতে পারেননি। সেটি সম্ভবতঃ ফ্যাসিবাদী সরকারের ভয়। কারণ বিচারপতিগণও ক্ষুদ্র মানব। দুর্বলতার উর্দ্ধে তারা কোন ফেরেশতা নন। তাদেরও সংসার চালাতে হয় সরকার থেকে পাওয়া বেতন দিয়ে। তাদেরকে যারা নিরাপত্তা দেয় তারা সরকারেরর পুলিশ। তাদের সন্তানদের রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে  হয়, হাটেবাজারে ও স্কুল-কলেজে যেতে হয়। পথে ঘাটে হিন্দু ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে কে তাদের নিরাপত্তা দিবে? একারণেই দুর্বৃত্ত ফ্যাসিস্টদের হাতে দেশ অধিকৃত হলে, যে প্রতিষ্ঠানটির সর্বপ্রথম মৃত্যু ঘটে সেটি হলো দেশের আদালত ও ন্যায় বিচার। আদালত তখন ব্যবহৃত হয় ফ্যাসিবাদী সরকারের খায়েশ পুরণে। এরূপ নতজানু আদালতের রায়কে মান্যতা দেয়াও বস্তুতঃ আরেক নৈতিক অপরাধ। এবং সে অপরাধটি করতে জনগণকে তখন বাধ্য করে ফ্যাসিবাদী সরকার। আদালতের রায় যত ন্যায়বিচার-বিবর্জিত হোক না কেন -সে রায় মেনে নেয়াকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নসিহতও শোনানো হয়। এবং সেরূপ গর্হিত কাজ যেমন ভারতে হচ্ছে তেমনি বাংলাদেশেও হচ্ছে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট এভাবেই ব্যবহৃত হয়েছে দেশের সকল রাজনৈতিক দলের সর্বসম্মতিতে গৃহিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বিলুপ্ত করার ন্যায় এক বিবেক-বিবর্জিত কাজে। কারণ স্বৈরাচারি শেখ হাসিনার ভোট ডাকাতিকে সহজ করার জন্য সেটি জরুরী ছিল। ভারতেও একই ভাবে আদালত ব্যবহৃত হলো বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ন্যায় অতি অসভ্য কাজকে জায়েজ করতে।

অথচ রাজনৈতিক ময়দানে  বিগত ২৭ বছরেও কোন সরকারের পক্ষেই এরূপ গর্হিত কর্মকে জায়েজ করা সম্ভব হয়নি। এমন কি নব্বইয়ের দশকে বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকারও পারেনি। কারণ রাজনীতিতে একটি লজ্জাশরমের ব্যাপার থাকে। সে সাথে নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়ও থাকে। ফলে বিজিপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলি ১৯৯২ বাবরি মসজিদ মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারলেও পরবর্তী কোন সরকার থেকেই সে অপরাধ কর্মের পক্ষে বৈধতা আদায় করতে পারেনি। ফলে মসজিদের ভূমিতে মন্দির নির্মাণের এজেন্ডাও সফল হয়নি। গুজরাতে মুসলিম গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদির বিজয়টি এক্ষেত্রে বিশাল। তার শাসনামলেই নিজের ও তার সঙ্গিদের হাতে সংঘটিত মসজিদ ধ্বংসের ন্যায় এক গুরুতর অপরাধকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের দিয়ে বৈধ করে নেয়া হলো।

অথচ মসজিদ ধ্বংসের বিষয়টি ছিল পুরাপুরি একটি ফৌজদারি অপরাধের বিষয়। দেশে আইনের শাসন থাকলে, কোন ফৌজদারি অপরাধই শাস্তি এড়াতে পারে না। কিন্তু ভারতের আদালতে সে অপরাধের কোন বিচারই হলো না। দেশে আইনের শাসন কতটা অনুপস্থিত এ হলো তারই প্রমাণ। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টিকে অপরাধের বিষয় রূপে না দেখে সেটিকে হিন্দু-মুসলিমদের মাঝে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ রূপে খাড়া করেছে। বিচারও করেছে স্রেফ সে গন্ডির মধ্যে থেকে। সে বিরোধ মিটাতে গিয়ে এক দিকে যেমন মসজিদ ধ্বংসের গুরুতর অপরাধকে লঘু করে সেটিকে জায়েজ বা গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করেছে, তেমনি মুসলিমদের ঘুষ দিয়ে তুষ্ট করার চেষ্টাও হয়েছে। সেটি করতেই মসজিদের পবিত্র ভূমিতে মন্দির করার অনুমিত দিয়ে অন্যত্র ৫ একর ভূমি মুসলিমদের দেয়ার প্রস্তাব রেখেছে। কিন্তু ন্যায় বিচার তো কখনোই এভাবে হয়না। একটি মসজিদকে যে গুড়িয়ে দেয়া হলো সে অপরাধের শাস্তি কোথায় গেল? আদালত যদি মনে করে, বাবরি মসজিদের ভূমিতে শুরুতেই মন্দির ছিল; তবে আবার ৫ একর জমি দেয়ার প্রয়োজন পড়লো কেন? অন্য দিকে আদালত যদি মনে করে মসজিদের নীচে মন্দিরের কোন প্রমাণ নাই এবং মসজিদটি তার নিজস্ব ভূমিতেই ছিল -তবে কেন সেখানে মন্দির নির্মিত হবে?  ৫ একর জমি দেয়ার কারণটি কি তবে মসজিদের জমিটি মন্দিরে জন্য গুন্ডামী করে কেড়ে নেয়ার মূল্য? এটি তো বিচারের নামে দুর্বৃত্তি। মুসলিমগণ সে দুর্বৃত্তিকে বিচারের নামে মেনে নিবে কেন?     

 

ভেসে গেছে সেক্যুলার দলগুলিও

ভারতের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেও বিগত ২৭ বছরে আমূল পরিবর্তন এসেছে। তারাও মসজিদ ধ্বংসের ন্যায় অসভ্য কুকর্মকে ঘৃণা করার সভ্য চেতনাটি হারিয়ে ফেলেছে। ভারতীয় কংগ্রেস, উত্তর প্রদেশের সমাজবাদি দল, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, দলিতদের দল বহুজন সমাজ পার্টি, তামিলদের দল তেলেঙ্গু দেশম পার্টির ন্যায় সংগঠনগুলি যারা এতদিন নিজেদের সেক্যুলার রূপে পরিচয় দিয়েছে তারাও বিজিপি,আর.এস.এস, শিব সেনা, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরং দলের গুন্ডাদের সাথে সুর মিলিয়ে মসজিদের ভিটাতেই মন্দির নির্মাণকে সমর্থণ দিচ্ছে্। অথচ ১৯৯২ সালে যখন বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয় তখন অবস্থা এমনটি ছিল না। তখন সে ঘটনাকে নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস দলীয় প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও। নিন্দার পাশাপাশি তিনি এ ওয়াদাও দিয়েছিলেন, সরকার আবার সেখানে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করবে। সে প্রতিশ্রুতি যে স্রেফ মুসলিমদের শান্ত করার লক্ষ্যে ছিল -তা নিয়ে কি আদৌ সন্দেহ থাকে? ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘটিত এ অপরাধগুলি নিছক বর্বরতা নয়, নৃশংস প্রতারণাও। সে প্রতারণা যেমন ২৭ বছর আগে করা হয়েছিল, তেমনি আজও হচ্ছে।  লক্ষণীয় হলো, যে নাশকতাটি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের কাছে ফৌজদারি অপরাধ রূপে গণ্য হয়েছিল -সে অপরাধ রুখতে ঘটনাস্থলে কোন পুলিশ আসেনি। যে অপরাধকে ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও নিন্দা করলেন, সে অপরাধ দমনে তার কেন্দ্রীয় সরকারও কোন ব্যবস্থাই নেয়নি। সে অপরাধের সাথে যারা জড়িত ছিল তাদেরকে কোন রূপ শাস্তিও দেয়নি। এবং আদালতও বিগত ২৭ বছরে তার চরিত্র হারিয়েছে। যে আদালতে মসজিদ ভাঙ্গার অপরাধটি একটি ফৌজদারি মামলা রূপে গৃহিত হয়েছিল, সে আদালতই সহিংস গুন্ডামীর মাধ্যমে যারা মসজিদ ভাঙ্গলো তাদেরকে ৯ নভেম্বরের রায়ে পুরস্কৃত করলো।

 

অপরাধে সংশ্লিষ্ট হলো আদালতও

ভারতে অহরহ যা কিছু হচ্ছে তা সভ্য রীতি-নীতি থেকে বহু দূরে। কোন ভূমির উপর যদি মসজিদের ন্যায় পবিত্র একটি ইমারত থাকে এবং তা নিয়ে যদি আদালতে মামলা থাকে -তবে সে বিতর্কে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের কি এ অধীকার থাকে যে বিতর্কিত মসজিদটিকে তারা গুন্ডামী করে ভেঙ্গে দিবে? তারপর মসজিদের ভিটায় মন্দির নির্মাণের দাবী তুলবে? এবং মসজিদ ভাঙ্গার কিছু দিন পর দেশের সুপ্রিম কোর্টও সেখানে মন্দির নির্মাণের অনুমতি দিবে? কোন সভ্য সমাজে কি এমনটি ভাবা যায়? এসব তো নিরেট গুন্ডাতন্ত্রের কথা। এরূপ ক্ষেত্রে যে কোন সভ্য দেশেই সরকার ও আদালতের দায়িত্বটি বিশাল। এক্ষেত্রে আদালতের দায়িত্বটি ছিল, বাবরি মসজিদের ভূমিটি কি আদৌ রামের জন্মভূমি তা নিয়ে নিরপেক্ষ ফয়সালা দেয়া। এবং ভারতের সরকার ও তার পুলিশ বাহিনীর  দায়িত্ব ছিল, আদালতের সে ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত বাবরি মসজিদকে নিরাপত্তা দেয়া। যে সভ্য সমাজের সেটিই তো রীতি। কিন্তু বাবরি মসজিদের ক্ষেত্রে সে সভ্য রীতি আদৌ মানা হয়নি। আদালতের ফয়সালা ছাড়াই একটি পক্ষকে আইন নিজ হাতে নিতে দেয়া হয়েছে। পরে আদালত নিজেই অপরাধীদের পদাংক অনুসরণ করেছে। তাই ১৯৯২ সালে মসজিদ ভাঙ্গার গুন্ডামীটি যে গুরুতর অপরাধ ছিল – আদালত সে বিষয়টি সে সময় মেনে নিলেও ৯ ই নভেম্বরের রায়ে সেটিই ঘোষিত হয়েছে যা অপরাধীগণ সব সময় চেয়ে এসেছে। ফলে সুপ্রিম কোর্টের এ রায়ের মধ্য দিয়ে বিচারকদের গুন্ডা-তোষণ নীতিই সুস্পষ্ট হয়েছে। আদালতের বড় ব্যর্থতা হলো, মসজিদ ভাঙ্গার ফৌজদারি অপরাধের মামলাটি বিগত ২৭ বছর যাবত ঝুলে থাকলেও সে অপরাধের জন্য কোন অপরাধীকেই শাস্তি দেয়া হয়নি। প্রশ্ন হলো, তবে কি অপরাধীদের পুরস্কৃত করার জন্যই মামলাটি নিয়ে দীর্ঘকার গড়িমসি করা হচ্ছিল? অবশেষে রায়ে আইনের শাসনের বদলে গুন্ডাদের শাসনকেই বিজয়ী কর হলো। মসজিদর ভাঙ্গার পূর্বে উগ্রহিন্দুদের আস্ফালন ছিল, বাবরি মসজিদের স্থানেই মন্দির হবে। আদালত অবশেষে সে উদ্ধত আস্ফালনকেই পূরণ করলো। এরূপ অবস্থায় মুসলিমগণ কাদের কাছে বিচার চাইবে? তাদের নিজেদের জানমাল এবং মসজিদ-মাদ্রাসারই বা কীরূপে নিরাপত্তা পাবে?      

বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হলো এ যুক্তিতে যে, মসজিদটি গড়া হয়েছিল রামের জন্ম ভূমিতে। প্রশ্ন হলো, কোথায় এবং কোন বছরে রামের জন্ম -সে বিবরণ কি কোথাও কোন কিতাবে লেখা আছে? সেটি কোথাও নাই। অনেকের মতে রামের ধারণাটিই হলো গনেশের নাক বা ঋষিদের রথে চড়ে আকাশে উড়ার মত পৌরাণিক কল্প -কাহিনী মাত্র। বাস্তবে কোন রাম অযোধ্যায় জন্ম নেয়নি। তার নামে কোন মন্দিরও ছিল না। বাবরি মসজিদের জমির পরিমাণ ২.৭ একর। কথা হলো, এত বড় বিশাল জমির উপর রামের জন্ম হলো এবং সেখানে একটি বিশাল মন্দির নির্মিত হলো –এরূপ এক বিশাল কাজ ভারতীয় ইতিহাস থেকে বিলুপ্ত হয় কি করে? তাছাড়া বাবরি মসজিদ তো নির্মিত হয়েছিল ১৫২৮ সালে। ভারতে ইতিহাস লেখার কাজের শুরু তারও বহুশত বছর আগে থেকে। হিন্দুদের দাবী সত্য হলে বাবরি মসজিদ নির্মিত হওয়ার পূ্র্বে এ বিশাল ভূমিতে রামের নামে বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ মন্দির থাকার কথা। সে বিশাল মন্দির ভাঙ্গার কর্মটিও তো ইতিহাসে স্থান পাওয়ার কথা।  কিন্তু আদালতে হিন্দুগণ এরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোন প্রমাণই পেশ করতে পারিনি। তাছাড়া জমির মালিকানা নিয়ে কোন বিরোধ থাকলে সে বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত ছিল মসজিদটি ভাঙ্গার বহু পূর্বেই। সভ্য সমাজে সে নিষ্পত্তি করার জন্য তো আদালত। কিন্তু ভারতে সেটিও হয়নি। লক্ষণীয় হলো, মসজিদ ধ্বংসের লক্ষ্যে প্রতিটি অপরাধ ঘটানো হয়েছে ধাপে ধাপে এবং পরিকল্পনা মাফিক। প্রথমে মসজিদের ভূমিতে রামের জন্মভূমির মিথ্যাচার, এরপর ১৯৪৯ সালে মসজিদে মুর্তি রেখে অপবিত্রকরণ। এরপর ১৯৯২ সালে মসজিদের বিনাশ। এবং ২০১৯ সালে এসে দেশের সুপ্রিম কোর্ট থেকে মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় লাভ। কথা হলো, মসজিদ না ভাঙ্গলে কি ঐ স্থানে মন্দির বানানোর জন্য আদালত অনুমতি দিতে পারতো? এবং রাম জন্মভূমির মিথ্যা না ছড়ালে কি মসজিদ ভাঙ্গার কাজে লাখ লাখ হিন্দুদের জড়ো করা যেত?

বাবরী মসজিদ ধ্বংসের বর্বরতাটি বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। এ বর্বরতার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেল ভারতীয় হিন্দুদের মুসলিম বিরোধী অসভ্য ও সহিংস মনের আসল রূপটি। ভারতে এরূপ ঘটনা যেমন এই প্রথম নয়, শেষও নয়। যারা হাজার হাজার মুসলিম নর-নারী ও শিশুদের উৎসবভরে হত্যা করতে পারে, মুসলিম শিশুদের আগুনে ফেলতে পারে, মুসলিম নারীদের উপর গণধর্ষণ করতে পারে এবং গরুর গোশতো খাওয়ার সন্দেহে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করতে পারে -তাদের কাছে ইট-পাথরের প্রাণহীন মসজিদ গুড়িয়ে দেয়াটি মামূলী ব্যাপার মাত্র। ভারতীয় মুসলিমদের মাথার উপর কীরূপ ভয়াবহ বিপদ -সেটি বুঝতে কি এরপরও কিছু বাঁকি থাকে?  তাছাড়া বিষয়টি শুধু বিজিপি, আর. এস. এস, বিশ্ব হিন্দুপরিষদ, শিব সেনা বা বজরং দলেরও নয়। সে ভয়ানক মুসলিম বিদ্বেষ ঢুকেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় হি্ন্দুদের চেতনায়। ফলে নির্বাচনে বিজয়ী হচ্ছে মসজিদ ভাঙ্গায় অংশ নেয়া দলগুলি। 

 

ভারত জুড়ে অক্ষত হিন্দু মন্দির ও অহিংস মুসলিম নীতি

ভারতে ইতিহাসের পাঠটি কখনোই নিরেপক্ষ ভাবে দেয়া হয় না। ব্রিটিশ আমল থেকেই ইতিহাস পাঠ হয়েছে মুসলিমদের ভিলেন রূপে দেখানোর জন্য। নিরপেক্ষ বিচার হলে প্রকাশ পেতো  ভারতে মুসলিম শাসন অন্যান্য দেশ ও সভ্যতার তুলনায় কতটা অহিংস ও উন্নত ছিল। মুসলিম বাদশাহগণ নিজেদের মাঝে যতই ঝগড়া-বিবাদ বা লড়াই করুক না কেন ভারতীয় হিন্দুদের নির্মূলে তারা কখনোই হাত দেয়নি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ইতিহাসের দিকে নজর দিলে ভারতে মুসলিম শাসনের এ শ্রেষ্ঠ দিকটা অবশ্যই নজরে পড়ার মতো। অথচ জাতি, বর্ণ ও ধর্মভিত্তিক গণনির্মূল মানব ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। কোটি কোটি মানুষ সে নির্মূল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে। স্পেন এবং পর্তুগালে গেলে মনেই হবে না যে, সেখানে মুসলিমগণ ৭ শত বছর শাসন করেছিল এবং ইউরোপীয়দের সভ্যতর করতে মুসলিমদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এবং ভারতের দিকে তাকালেও মনে হবে না যে এখানে বৌদ্ধদের রাজত্ব ছিল। খৃষ্টান শাসকগণ যেমন ইউরোপ,আমেরিক ও অস্ট্রেলিয়া থেকে অখৃষ্টান আদিবাসীদের নির্মূল করেছে, হিন্দুগণও তেমনি ভারত থেকে বৌদ্ধদের নির্মূল করেছে। কিন্তু মুসলিম শাসন আমলে এরূপ কোন বর্বরতা ঘটেনি। মুসলিম শাসনামলে ভারতে হিন্দু নির্মূলে গণহত্যা হয়েছে –ইতিহাসে সে প্রমাণ নাই। তাদের হাতে নির্মূল হয়েছে এমন কোন হিন্দু প্রতিষ্ঠানের কোন দৃষ্টান্ত নাই। ফলে ভারতের শতকরা ৮০ জনগণই হিন্দু থেকে গেছে; অক্ষত থেকে গেছে তাদের মন্দিরগুলিও। এবং সাত বছর শাসন করেও মুসলিমগণ রয়ে গেছে সংখ্যালঘু। অথচ রোমান সম্রাট কন্সটান্টাইন চতুর্থ শতাব্দীর গোড়ায় খৃষ্টান ধর্ম গ্রহন করে তার সাম্রাজ্যের সবাইকে জোর করে খৃষ্টান বানায়। রাশিয়ার জারও সেটিই করেছে।

তাছাড়া কোন ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি ভাঙ্গা কি কোন সভ্য কর্ম? অমুসলিমদের উপাসনালয় ভাঙ্গা দূরে থাক, তাদের উপাস্যদের গালি দেয়াও ইসলামে নিষিদ্ধ। নবীজী (সাঃ)র হাদীস, অমুসলিমের দেবদেবীকে গালি দিলে তারাও মুসলিমদের মহান আল্লাহকে গালি দিবে। ইসলামে মসজিদ গড়া একটি পবিত্র কর্ম। এবং এ কাজটির মধ্যে থাকে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার পবিত্র প্রেরণা। এমন পবিত্র প্রেরণা নিয়ে কোন মুসলিম কি অন্য ধর্মের উপাসনালয় ধ্বংসের ন্যায় অপরাধে জড়িত হতে পারে? মুসলিমগণ শুধু ভারতই জয় করেনি, এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বহু দেশ জয় করেছে। সে সব দেশে অমুসলিমদের বিশাল বিশাল উপাসনালয় ছিল। তারা যে সেগুলিকে ধ্বংস করেনি বা সেগুলির স্থলে মসজিদ গড়েনি তারই প্রমান হলো, ইস্তাম্বুল, জেরুজালেম, আলেকজান্দ্রিয়ার ন্যায় বহু শহরে বিশাল বিশাল গির্জা এখনো খৃষ্টান ধর্মের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতীয় মুসলিম শাসকগণ ভারত জুড়ে বহু শহরের পত্তন ঘটিয়েছে। সে সময় জনসংখ্যা কম হওয়াতে শহরের ভিতরে ও বাইরে বহু খালি জায়গাও ছিল। ফলে মোগলদের কি প্রয়োজন পড়লো যে, বিস্তর খালি জমি পড়ে থাকতে তারা মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ গড়বে? তাতে কি ছওয়াব পাওয়া যায়?

ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস প্রায় ৭ শত বছরের। দীর্ঘকালীন এ মুসলিম শাসনের পরও ভারতে যত মসজিদ তার চেয়ে বহুগুণ হলো মন্দিরের সংখ্যা। মন্দির ভাঙ্গা লক্ষ্য হলে বহু আধা ভাঙ্গা, আংশিক ভাঙ্গা ও ক্ষতবিক্ষত মন্দিরও দেখা যেত। প্রশ্ন হলো, সারা ভারত জুড়ে যে অসংখ্য বিশাল মাপের পুরোন মন্দির এখনো বিদ্যমান -তার কোন একটিও কি আধা বা আংশিক ভাঙ্গা? কোন একটি মন্দিরের গায়েও দেখা যায় কি মুসলিমদের পক্ষ থেকে নিক্ষিপ্ত গোলা বা কামানের দাগ?

মুসলিমগণ ভারত শাসন করেছে হিন্দুদের সহযোগিতা নিয়ে। মানসিংয়ের ন্যায় মুসলিম শাসকদের দরবারে বহু হিন্দু যেমন জেনারেল হয়েছে, তেমনি মন্ত্রী এবং উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনিক অফিসারও হয়েছে। মুসলিম রাজপুত্রদের সাথে তারা নিজেদের কন্যাদেরও বিয়ে দিয়েছে। তাদের সে সহযোগিতার কারণেই মুসলিম শাসন দীর্ঘকাল স্থায়ী হতে পেরেছে। আরো লক্ষ্যণীয় হলো, ভারতের সম্পদ পূর্ব-পুরুষদের দেশে নিয়ে সেখানে তারা তাজমহল বা প্রাসাদ গড়েনি। যা কিছু করার তারা ভারতেই করেছে। ইংরেজদের ন্যায় ভারতকে তারা ঔপনিবেশিক কলোনী মনে করেনি, বরং নিজের দেশ মনে করেছে। এদেশের প্রতিরক্ষায় তারা প্রাণ দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ করলে কি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগণ কি মুসলিম শাসকদের সাথে সহযোগিতা করতো? অপর দিকে ভারতীয় হিন্দুদের নিজেদের কান্ডটিও চোখে পড়ার মত। হিন্দু রাজা শংকরাচর্যের আমলে ভারতীয় হিন্দুগণ বৌদ্ধ শাসনকেই শুধু নির্মূল করেনি, নির্মূল করেছে যেমন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের, তেমনি বিশাল বিশাল বৌদ্ধ মঠগুলিকে। প্রাণে বাঁচতে তাদেরকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায়, নেপাল, শ্রীলংকা ও বার্মায় পলায়ন করে।  

 

প্রকল্প মুসলিম-নির্মূল

ভারতীয় হিন্দুগণ অতীতে যেমন বৌদ্ধদের নির্মূল করেছে, এখন নির্মূল করতে চায় মুসলিমদের। ফলে তাদের লক্ষ্য শুধু মসজিদ নির্মূল নয়, মুসলিম নারী, পুরুষ এবং শিশু নির্মূলও। আর লক্ষ্য যখন নির্মূল-করণ, তখন তাদের কাছে মসজিদ বা মুসলিমদের বৈধ বা অবৈধ হওয়াটি কোন ব্যাপারই নয়। তাই বাবরি মসজিদ নিয়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায় শোনার মত ধৈর্য্য হিন্দুদের ছিল না। নরেন্দ্র মোদী যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন ৩ হাজারের বেশী মুসলিম নর-নারী ও শিশুদের হত্যা করা হয়। জ্বালিয়ে দেয়া হয় মুসলিমদের শত শত ঘরবাড়ি ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। প্রশ্ন হলো, তারা কি গুজরাতে অবৈধ ছিল?

মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে বিজিপি ও আর.এস.এস ঘরানার লোকেরা চারটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে্। একাজে তাদের অনুকরণীয় আদর্শ হলো ফ্যাসিস্ট হিটলার। হিটলারের ইহুদী নির্মূলের সফলতাটি আর.এস.এস নেতা সাভারকারের খুব ভাল লেগেছিল। সাভারকার ইহুদী বিদ্বেষ নাই। তার তীব্র বিদ্বেষটি স্রেফ মুসলিমদের বিরুদ্ধে। মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে যে প্রকল্পগুলি ভারতে চলছে তা হলোঃ এক). দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলিম নির্মূল, দুই). ন্যাশনাল রেকর্ড অব সিটিজেন (এন, আর.সি) প্রকল্পের নামে মুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া। ইতিমধ্যে আসামে ১৯ লাখ লোককে নাগরিকত্বহীন করা হয়েছে। একই প্রকল্প বাস্তবায়ীত করতে চায় সারা ভারত জুড়ে। পশ্চিম বাংলা বিজিপি’র সভাপতি দিলিপ ঘোষের দাবী, পশ্চিম বাংলার ২ কোটি মানুষ ভারতীয় নাগরিকের তালিকা থেকে বাদ পড়বে। এর অর্থ হলো, তাদের পাঠানো হবে বাংলাদেশে। তিন). মুসলিমদের হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করা। এটিকে তারা বলছে “ঘর ওয়াপসি” -যার অর্থ হলো হিন্দুধর্ম থেকে মুসলিম হওয়া মুসলিমদের আবার হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে নেওয়া। চার). কালচারাল কনভার্শন। এ প্রকল্পের অর্থ হলো হিন্দু ছেলে বা হিন্দু মেয়েদের সাথে বিবাহের মধ্য দিয়ে করে হিন্দু সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়া।      

 

বাংলাদেশীদের দায়ভার

২০ কোটি ভারতীয় মুসলিমদের সামনে আজ তাই মহা দুর্দিন। তবে এ দুর্দিনের মোকাবেলা তাদের নিজেদেরই সচেষ্ট হতে হবে। আর সে জন্য অপরিহার্য হৃদয়ে পবিত্র কোর’আনের শিক্ষা নিয়ে নির্ভেজাল মুসলিম পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠা। মনে রাখতে হবে সেক্যুলারিজমে দীক্ষা নিয়ে মুসলিমদের রক্ষা নাই। একমাত্র মুসলিম হলেই আল্লাহর সাহায্য তখন অনিবার্য হয়। আর আল্লাহর সাহায্য পেলে তখন কি আর অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে? সংকট যতটি তীব্র হোক, মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবের রাজা-বাদশাহদের কাছ থেকে পাওয়ার কিছু নেই। তারা এ বর্বরতার নিন্দাও করবে না। বরং যে নরেন্দ্র মোদির হাতে হাজার হাজার মুসলিমের রক্ত তাকে সৌদি আরব দিয়েছে সে দেশটির সর্বোচ্চ খেতাব। এবং ভারতের অর্থনীতি মজবুত করতে বিনিয়োগ করেছে ২২ বিলিয়ন ডলার। আরব আমিরাতও লাগাতর সমর্থন করছে নরেন্দ্র মোদির কাশ্মিরে গণহত্যার নীতিকে। শুধু প্রতিবেশী রূপে নয়, মুসলিম রূপে বাংলাদেশীদের দায়ভারটি বিশাল। কারণ, ২০ কোটি ভারতীয় মুসলিমদের সংকটটি শুধু ভারতীয় মুসলিমদের নয়, বরং সেটি সমগ্র উপমহাদেশের মুসলিমদের সংকট। তাছাড়া ঠোট উড়ে গেলে দাঁতেও বাতাস লাগে। তাই ভারতের ২০ কোটি মুসলিম নির্মূল হলে বাংলাদেশের মুসলিমগণও নিরাপদে থাকবে না।

তাছাড়া এক মুসলিম তো আরেক মুসলিমের ভাই। তাই ঈমানদারি শুধু নামায-রোয, হজ্ব-যাকাত পালন নয়,  হৃদয়ে অন্য মুসলিমকে নিজের ভাই জ্ঞান করে তার কল্যাণে কিছু করাও। এ প্রসঙ্গে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের একটি বিশেষ উক্তি অতি স্মরণযোগ্য। সেটি ছিল উসমানিয়ায় খেলাফতের বলকান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। তিন তাঁর নিজের সম্পাদিত “আল হেলাল” পত্রিকাতে লিখেছিলেন, “বলকানের রণাঙ্গনে যুদ্ধরত কোন তুর্কি মুসলিম সৈনিকের পা যদি গুলিবিদ্ধ হয়, আর তুমি যদি সে গুলির ব্যথা হৃদয়ে অনুভব না করো, তবে খোদার কসম তুমি মুসলিম নও।” এটিই তো খালেছ বিশ্বজনীন মুসলিম ভাতৃত্বের কথা। তাই প্রশ্ন হলো, মুসলিম ও মসজিদের নির্মূলে ভারতে যে নৃশংসতা চলছে তার ব্যথা যদি কোন বাঙালী মুসলিম হৃদয়ে অনুভব না করে তবে কি সে মুসলিম? মৃত মানুষ যেমন ব্যথা অনুভব করে না, মৃত ঈমানের মানুষও তেমনি অপর মুসলিম ভাইয়ের ব্যথা অনুভব করেনা। তবে এখানে বিষয়টি শুধু ব্যথা পাওয়া নিয়ে নয়, বরং অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ হলো সে বেদনা লাঘবে কিছু কাজ করা। বুঝতে হবে, ভারতীয় মুসলিমগণ শক্তিশালী হলে বাংলাদেশের মুসলিমগণও শক্তিশালী হবে।

তাছাড়া ভারতের তূলনায় বাংলাদেশ ছোট দেশ হলেও সন্ত্রাসী ভারতকে শিক্ষা দেয়ার বিস্তর সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশীদের হাতে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের করিডোর। বাংলাদেশ হলো ভারতের অতি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। বহু লক্ষ ভারতীয় কাজ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। ভারতের পণ্য বিদেশে যায় বাংলাদেশের বন্দর দিয়ে। ফলে বাংলাদেশীরা জেগে উঠলে ধ্বস নামবে ভারতের অর্থনীতিতে। কিন্তু সমস্যা হলো বাংলাদেশীরা নিজেরাই ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের কারাগারে বন্দি। আর বন্দি মানুষ তো চোখের সামনে কাউকে ডুবে বা জ্বলে মরতে দেখলেও তাকে সাহায্যে করতে পারে না।

অথচ ১৭ কোটি স্বাধীন মানুষের সামর্থ্য তো বিশাল। কিন্তু সে সামর্থ্য তো কেড়ে নিয়েছে হাসিনার কারাগার। এবং এটি ভারতীয় স্ট্রাটেজীও। ভারত তার নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হাসিনাকে দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশকে একটি কারাগারে পরিণত করেছে –যাতে বাংলাদেশের মানুষ তাদের প্রতিবেশী ভাইদের বাঁচাতে কিছু করতে না পারে। তাই ভারতের মুসলিম ভাইদের জন্য ঈমানী দায়িত্ব পালন করতে হলে বাঙালী মুসলিমদের প্রথমে নিজ দেশের ফ্যাসিস্ট সরকারের কারগার থেকে মুক্তি পেতে হবে। ২৩/১১/২০১৯ (নিবন্ধটি লেখা হয় লন্ডনে আলেমদের এক সমাবেশে পেশের জন্য।)     

  

 

 




ভারতে অসভ্য শাসন এবং বিপন্ন মুসলিম

অসভ্যতায় নতুন মাত্রা 

ভারতে শাপ পূজা,গরু পূজা, লিঙ্গ পুজার ন্যায় বহু অসভ্যতা বেঁচে আছে বহু হাজার যাবত। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর সে অসভ্যতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাতে যোগ হয়েছে চরম নৃশংস। অসভ্যতার এরূপ তান্ডব এমন কি হিংস্র পশুদের জগতেও দেখা যায় না। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা এক শ্রেণীর কাফেরদের গবাদী পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট্ বলেছেন। সেটিরই প্রমাণ মিলছে ভারতে মানবরূপী সে নৃশংস অসভ্যদের শাসনে। বনজঙ্গলে গণহত্যা ও গণধর্ষণ যেমন হয়না, তেমনি তা নিয়ে উৎসবও হয় না। কাউকে আগুণে ফেলে হত্যার ন্যায় বীভৎসতাও হয় না। কিন্তু ভারতে এরূপ সবকিছুই হচ্ছে।

দেশটি রক্তাত্ব যুদ্ধ চলছে মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে। চলমান এ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার দল বিজেপি। সাথে রয়েছে বিজেপির জন্মদাতা সংগঠন আর এস এস, এবং সে সাথে বজরং দল, বিশ্বহিন্দু পরিষদ ও শিবসেনাসহ অসংখ্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। রণমুর্তি ধারণ করেছে এমন কি সাধুসন্যাসীগণও। চলমান এ যুদ্ধের মূল অস্ত্রটি হলো মুসলিম বিরোধী তীব্র ঘৃণা। ঘৃণার বিষ মৃত্যু, ধর্ষণ ও নির্যাতন ডেকে আনে হাজার হাজার মুসলিমের জীবনে। সেটি যেমন বার বার দেখা গেছে গুজরাত, মুম্বাই, আসাম, মুজাফনগর, আগ্রা, মুরাদাবাদের ন্যায় নানা স্থানে, তেমনি তার প্রকট রূপটি দেখা যাচ্ছে কাশ্মীরে।

নরেন্দ্র মোদি এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীগণ যে হিন্দু ভারত নির্মাণ করতে চায় সেখানে মুসলিমদের জন্য কোন স্থান নেই। মুসলিমগণও স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচবে, শিক্ষা-দীক্ষা ও চাকুরি-বাকুরিতে অংশ নিবে বা চাষাবাদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য করবে -সেটি তাদের কাছে অসহ্য। নিরেট ফ্যাসিবাদের এর চেয়ে নিখুঁত টেক্সটবুক উদাহরণ আর কি হতে পারে? মুসলিমদের জন্য ভয়ানক বিপদের কারণ হলো এ ফ্যাসিস্টদের হাতেই অধিকৃত হয়েছে  আধুনিক ভারতের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, পুলিশ বিভাগ, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ও মিডিয়া। এদের দাপটে এমন কি হিন্দু মানাবাধিকার কর্মীগণও মুখ খুলতে পারছে না। ফলে মুসলিম বিরোধী বিষাক্ত ঘৃণার লাগামহীন প্রকাশ ঘটছে লাগাতর মুসলিম গণনিধন, নারীধর্ষণ এবং মুসলিমদের ঘরবাড়ী ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে।

তবে বিপদ যে শুধু ভারতীয় মুসলিমদের –তা নয়। ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়া-বাহী মশা সীমান্ত মানে না। তেমনি সীমান্ত মানে না ফ্যাসিবাদী চেতনাও। হিটলারের আমলে মানবতাবিধ্বংসী এ হিংস্র মতবাদটি তাই শুধু জার্মানী ও ইতালীতে সীমিত থাকেনি, প্রায় সমগ্র ইউরোপকে গ্রাস করেছিল। একই অবস্থা হতে যাচ্ছে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতেও। ফলে ফ্যাসিবাদের নৃশংসতা শুধু গুজরাতে সীমিত নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র ভারতে। ছড়িয়ে পড়েছে এমন কি পাশ্ববর্তী শ্রীলংকা এবং মায়ানমারে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, গণধর্ষণ এবং ঘরবাড়ী জ্বালানোর তান্ডব শুরু হয়েছে এ দু’টি বৌদ্ধ-অধ্যুষিত দেশেও। নির্ভেজাল ফ্যাসিবাদ বলতে যা বুঝায় -তা ইতিমধ্যেই চেপে বসেছে বাংলাদেশেও। ফলে দেশটিতে চালু হয়েছে গুম, খুন ও বিচার বহির্ভুত হত্যার সরকারি রাজনীতি। লাঠিয়াল রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশের পুলিশ, সেনাবাহিনী, RAB, আত্মসমর্পিত আদালত এবং শাসক দলের দলীয় গুন্ডা বাহিনী। বিলুপ্ত করা হয়েছে মিটিং-মিছিলের স্বাধীনতা ও  নিরপেক্ষ নির্বাচন।  

 

অসভ্যতা যেখানে রাজনীতির হাতিয়ার

কাশ্মীরে ইতিমধ্যেই এক লাখের অধিক মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষিতা হয়েছে হাজার হাজার নারী। বহু হাজার বৃদ্ধ, যুবক, মহিলা ও শিশু হয়েছে আহত, অন্ধ ও পঙ্গু। মুসলিম হত্যা ও নারী ধর্ষণের অভয় অরণ্য হলো এখন কাশ্মীর। সেখানে কোন অপরাধই –তা যত নৃশংসই হোক তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। নরেন্দ্র মোদি এখন কাশ্মীরীদের শায়েস্তা করতে সৈনিকের লেবাস পড়িয়ে হাজার হাজার বিজিপী ও আর এস এস গুন্ডাদের সেখানে পাঠাচ্ছে। লক্ষ্য, এ নৃশংস অসভ্যদের দিয়ে নিরস্ত্র কাশ্মীরীদের ঘরে ঘরে ঢুকে পিটানো এবং নারীধর্ষণের অসভ্যতাকে ব্যাপকতর করা। এভাবে সে বাস্তবায়ীত হচ্ছে মোদির আবিস্কৃত মুসলিম গণহত্যা ও গণধর্ষণের গুজরাতি মডেল। ফ্যাসিবাদী নেতাগণ দলীয় গুন্ডাদের জন্য এভাবেই খুলে দেয় অপরাধের ফ্লাড গেট। একই কারণে বাংলাদেশ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে এবং শেখ হাসিনার অনুসারি ছাত্রলীগের কর্মীর দ্বারা জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসব হয়েছে। 

লক্ষণীয় হলো, কাশ্মীরে বা ভারতে মুসলিম-নির্মূল ও ধর্ষণের অসভ্যতা যতই নৃশংসতর হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা ততই তুঙ্গে উঠছে। হিন্দুরা পূজণীয় চরিত্র খোঁজে বিষাক্ত স্বর্প ও শিবের রণমুর্তির মাঝে। চেতনায় বিষপূর্ণ ফ্যাসিবাদি মোদী এজন্যই তাদের কাছে এতো প্রিয়। ২০০২ সালে গুজরাতে তার নেতৃত্বে যে গণহত্যা হয়েছিল তাতে বিশ্বব্যাপী মোদির বিরুদ্ধে ধিক্কার উঠেছিল। এমন কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারও সেদেশে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু তাতে মোদি থামেনি। কারণ, তার জানা ছিল হিন্দু ভোটারের চেতনায় অসভ্যতার মান। সে জানতো নির্বাচনে ভোট বাড়াতে হলে চাই মুসলিম নির্মূলের নৃশংসতা। চাই বিপুল সংখ্যায় মুসলিম নারী ধর্ষণ। তাই গুজরাতে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসার সাথে সাথে তীব্রতর করে মুসলিম নিধন ও মুসলিম নারীধর্ষণের বীভৎসতা। সে নৃশংস অসভ্যতার স্মৃতি তাজা থাকতেই দেয় গুজরাতে নির্বাচন। ফলে যা তার প্রত্যাশা ছিল সেটিই হয়েছে। নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয় মোদি। এবং তার জনপ্রিয়তা শুধু গুজরাতে সীমিত থাকেনি; ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ভারতে। মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছে সে নৃশংস অসভ্যতার সিঁড়ি বয়েই। এ হলো তথাকথিত গণতান্ত্রিক ভারতের চিত্র।  

 

নরেন্দ্র মোদির সফল স্ট্রাটেজী

গুজরাতের পূর্ববর্তী মুখ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে নরেন্দ্র মোদীর মুখ্য মন্ত্রী হওয়ার পিছনে মূল কারণটি ছিল তার দানবীয়্ চরিত্র। ১৯৯২ সালে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার কাজে গুন্ডা সংগ্রহে তার ভূমিকাটি ছিল বিশাল। তার সে ভূমিকাই তাকে শুধু গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী করেনি, ভারতের প্রধানমন্ত্রীও করেছে। ২০১৪ সালের তূলনায় ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজিপির বিজয়টি ছিল আরো অবাক করার মত। ২০১৯ সালের বিজয়ের পিছনেও কাজ করেছে ৫ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে তার সরকারের মুসলিম বিরোধী নৃশংসতর নীতি। গরু রক্ষার নামে হিন্দু গুন্ডাদের ক্ষমতা দেয়া হয় পথে ঘাটে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যার। ফলে সে বর্বরতা রোধে মোদীর সরকার বোধগম্য কারণেই কোন উদ্যোগ নেয়নি।

নরেন্দর মোদী সরকার ও তার গুন্ডাদের নৃশংস বর্বরতার এক হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত হলো ২০১৭ সালের পহেলা এপ্রিল পেহলু খান হত্যাকান্ড। রাজস্থানের পেহলু খান ও তার দুই ছেলে হরিয়ানার গরুর হাট থেকে গরু কেনে ঘরে ফিরছিল। পথে উগ্রহিন্দুদের বাহিনী তাদের উপর হামলা করে। তারা যে হাট থেকে গরু কিনেছে তার বৈধ কাগজ দেখিয়েও নিষ্কৃতি মেলেনি। গুরুতর আহত পেহেলু খান হাসপাতালে মারা যান। কিন্তু খুনের বিচারে খুনিদের শাস্তি মেলেনি। ২০১৯ সালের ১৫ই আগস্ট ইন্ডিয়ার এক্সপ্রেস খবর ছাপে ৭ জন আসামীকেই আদালত মুক্তি দিয়েছে। যদিও পেহেলু খানের উকিল খুনের সাথে আসামীদের জড়িত থাকার প্রমাণ স্বরূপ ভিডিও চিত্র আদালতে পেশ করেছিল। গরুপূজারীদের হাতে মুসলিম নিহত হলে, পুলিশ ও আদালতের আগ্রহ নাই খুনিদের শাস্তি দেয়ায় –এ হলো বাস্তবতা। বরং পত্রিকায় প্রকাশ, পেহলু খান ও তার দুই ছেলেকে শাস্তি দিতে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কেস তুলেছে গরু পাচারের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে। এতে বুঝা যায়, মুসলিম নিধন-পাগল গুন্ডারা শুধু রাজপথই দখলে নেয়নি, শুধু প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আসনেই বসেনি, বরং নিজেদের দখলে নিয়েছে দেশের পুলিশ বিভাগ এবং আদালতও।      

ভারতে ভোট বৃদ্ধির আরেক মোক্ষম কৌশল হলো পাকিস্তান বিরোধী হুংকার দেয়া। সামনে ছিল ২০১৯ সালের নির্বাচন। তাই জনপ্রিয়তা বাড়াতে নরেন্দ্র মোদি শুধু রণ-হুংকারই দেয়নি, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলাও করে বসে। এতে দ্রুত তুঙ্গে উঠে মোদির জনপ্রিয়তা। তাছাড়া ২০১৯ সালের নির্বাচনে বেছে বেছে এমন সব যুদ্ধাংদেহীদের মনোনয়ন দেয়া হয় -যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে মুসলিম হত্যার ফৌজদারি মামলা। ভূপালের প্রাজ্ঞ ঠাকুর, গুজরাতের অমিত শাহ তো তারই উদাহরণ। হিটলারের ন্যায় নরেন্দ্র মোদিও হত্যাপাগল অপরাধীদের বিপুল সংখ্যায় রাজনীতির ড্রাইভিং সিটে বসিয়েছে। ফলে মুসলিম হত্যায় ভারত সরকারকে হিটলারের ন্যায় গ্যাস চেম্বার নির্মাণ করতে হচ্ছে না। বরং দেশের রাস্তাঘাট এবং জনপদগুলোই পরিণত হয়েছে গণহত্যা, গণধর্ষণ ও নির্যাতনের অভয় অরণ্যে। হিটলার জার্মানদের এতোটা অসভ্য ও নৃশংস করতে পারিনি। ফলে তাকে গ্যাস চেম্বার খুলতে  হয়েছে লোক চক্ষুর অন্তরালে। কিন্তু ভারতে এ নৃশংস অসভ্যতা নিয়ে লজ্জা-শরমের বালাই না।      

এতদিন বিজেপির ক্যাডারগণ মুসলিমদের হাতে গরু দেখলেই পিঠিয়ে মেরে ফেলতো। এরপর মাথা টুপি দেখলে তাদের মাথা থেকে টুপি কেড়ে নিয়ে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করতো। এখন হিন্দুদের হাতে পথে-ঘাটে লাঞ্ছিত বা মার খেয়ে মরার জন্য হাতে গরুর রশি বা মাথায় টুপি থাকার প্রয়োজন নাই, মুসলিম নাম হলেই যথেষ্ঠ। টিকিট কিনে ট্রেনে উঠে নিজের সিটটি ছেড়ে দিতে হয় মুসলিম যাত্রীদের। সে সাথে  গালিও খেতে হয়। তবে কাশ্মীরীদের বিরুদ্ধে বাড়তি রাগের কারণ, তারা ভারতে থাকার বিরোধী। তারা যোগ দিতে চায় পাকিস্তানে। ফলে তারা পরিণত হয়েছে হত্যা ও ধর্ষণ-পাগল গুন্ডাদের হাতে জিম্মি পাকিস্তানীতে।   

 

গুজরাতের নৃশংসতা

মুসলিমদের বিরুদ্ধে নরেন্দ্র মোদি ও তার দলীয় ক্যাডারদের ঘৃণা যে কতটি তীব্র -সেটি দেখা গেছে মোদির শাসনামলে গুজরাতে। সেখানে ধর্ষণ পরিণত হয়েছিল যুদ্ধাস্ত্রে। ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন তার নেতৃত্বে মুসলিম নিধন এবং মুসলিম নারীদের গণধর্ষণের উৎসব শুরু হয়। ২ হাজারের বেশী মুসলিমকে সেখানে হত্যা করা হয় -যার মধ্যে বহু নারী এবং শিশুও ছিল। ধর্ষিতা হয়েছে শত শত। সে বর্বরতার এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন প্রখ্যাত লেখিকা  অরুনদ্ধতি রায়। সোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল হ্‌ওয়া এক বক্তৃতায় তিনি তুলে ধরেন, কীরূপ বর্বরতার সাথে প্রাদেশিক পরিষদের একজন বিধায়ককে জীবন্ত আগুনে ফেলে হত্যা করা হয়। এহসান জাফরী নামক উক্ত বিধায়কের অপরাধ ছিল তিনি মুসলিম ছিলেন এবং তার ঘরে প্রাণ বাঁচাতে বহু মুসলিম নারী, শিশু, বৃদ্ধ আশ্রয় নিয়েছিল। আশ্রয়কারীরা ভেবেছিল, এহসান জাফরী যেহেতু বিধায়ক, তার গৃহে আশ্রয় নিলে প্রাণে বাঁচা যাবে। এহসান জাফরীর গৃহ হত্যাপাগল বিজিপির গুন্ডা ও ধর্ষনকারীদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে যায়। পরিস্থিতি গুরুতর দেখে তিনি অনেক সরকারি কর্মকর্তাকে ফোন করেন। ফোন করেন কংগ্রস-নেত্রী সোনিয়া গান্ধিকেও। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নিজে ঘর থেকে বের হয়ে তিনি ঘেরাওকারীদের বলেন, তোমরা আমার সাথে যা ইচ্ছা করতে চাও করো, কিন্তু যারা আমার ঘরে আশ্রয় নিয়েছে তাদের বাঁচতে দাও। কিন্তু এহসান জাফরীর সে আবেদনে কাজ হয়নি; হামলা হয়েছে তার গৃহে। আশ্রয় নেয়া শিশু, মহিলা এবং বৃদ্ধদের কাউকেই বাঁচতে দেয়া হয়নি। ঘরে ফিরতে দেয়া হয়নি এহসান জাফরীকেও, তার হাত পা কাটা হয়েছে এবং হত্যা করা হয়েছ জীবন্ত আগুনে ফেলে। এ হলো মোদি এবং তার কর্মীদের নৃশংস অসভ্যতার মান। এরূপ অসংখ্য নৃশংসতা  হয়েছে পুলিশের চোখের সামনে এবং চলেছে কয়েক সপ্তাহ ধরে। যেসব পুলিশ অফিসার বিবেকের তাড়নায় মুসলিম-নিধন ও ধর্ষণ থামাতে উদ্যোগী হয়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ অন্যত্র বদলী করেছে। এ নরেন্দ্র মোদিকে শেখ হাসিনা নিয়মিত ভেট পাঠায় বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ পাঞ্জাবী আর আমের ঝুড়ি সাজিয়ে। খুনিরা কখনোই খুনের উস্তাদকে সমীহ করতে ভূল করেনা। তাই শাপলা চত্ত্বরের খুনি হাসিনা গুজরাতের খুনি মোদিকে উপঢৌকন পাঠাবে –সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? 

 

অসভ্যতা শুধু বিজিপির নয়

তবে ইতিহাসের আরেক সত্য হলো, মুসলিম হত্যার নৃশংস অসভ্যতা শুধু বিজেপী, আর এস এস, বজরং দল, বিশ্বহিন্দু পরিষদ বা শিবসেনাদের বিষয় নয়; সে অসভ্যতা কংগ্রেসী এবং বামপন্থি হিন্দুদেরও। ভারতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বড় মুসলিম গণহত্যাটি হয়েছে কংগ্রেসের শাসনমালে। সেটি ১৯৪৮ সালে, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জওহারলাল নেহেরু। সেটি ঘটেছিল মুসলিম শাসক নিযামের শাসনাধীন হায়দারাবাদকে ভারতভূক্ত করার সময়। কোন কোন তথ্য মতে মৃতের সংখ্যা ৫০ হাজার, অনেকের মতে এক লাখের বেশী।

এতবড় গণহত্যা ও গণধর্ষণের পরও কারো কোন বিচার হয়নি, শাস্তি হয়নি। কোন তদন্তও হয়নি। নিহত মশামাছিদের যেমন কেউ গণনা করে না, ভারত সরকারও তেমনি নিহতদের উপর কোন তথ্য সংগ্রহ করেনি। হত্যাকান্ডটি ঘটে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে। মুসলিম নারীদের উপর গণধর্ষণে নামানো হয় হিন্দু ও শিখ গুণ্ডাদের। ইতিহাসে এটি পরিচিত  ভারতের গোপন হত্যাকান্ড নামে। সে গণহত্যার মূল নায়ক ছিল ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উপপ্রধানমন্ত্রী আরেক গুজরাতি সর্দার বল্লব ভাই পাটেল। সে উগ্র সাম্প্রদায়িক খুনি পাটেল হলো বিজিপি বা আর এস এসের নেতাকর্মীদের কাছে অতি পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। ছিল কংগ্রেসেরও অন্যতম প্রধান কেন্দ্রীয় নেতা। আর এস এসের চেতনাধারীগণ শুধু বিজিপিতে নয়, কংগ্রসের মধ্যেও যে কতটা উচ্চাসনে স্থান পেয়েছে -এ হলো তারই নজির। সে খুনিকে সম্মানিত করতে গুজরাতে নির্মাণ করা হয়েছে ৬০০ ফুট লম্বা মুর্তি। সমগ্র পৃথিবীতে সর্বকালের এটিই হলো সবচেয়ে বড় মুর্তি।

অপর দিকে ১৯৮৩ সালের ১৮ই ফেব্রেয়ারীতে আসামের নওগাঁও জেলার নেলীতে বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে নৃশংস গণহত্যাটি ঘটেছিল -সেটিই হলো আসামের সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণহত্যা। সেটিও ঘটেছিল কংগ্রেসের শাসনামলে। তখন কেন্দ্রে ও আসামে –উভয় স্থলেই ছিল কংগ্রেসের সরকার। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিল ইন্দিরা গান্ধি। সে গণহত্যায় মৃতের সংখ্যা সরকারি ভাবে ২,১৯১ জন বলা হলেও বেসরকারি হিসাবে তা ছিল ১০ হাজারের উপর। ১৮ই ফেব্রেয়ারীর সকালে মুসলিম নির্মূলের উদ্দেশ্য নিয়ে স্থানীয় হিন্দুগণ পরিকল্পিত ভাবে হামলা করে ১৪টি গ্রামের উপর। নারী-শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কেউই রেহাই পায়নি। পশুদের মাঝে কেউ খুন বা ধর্ষিক হলে পশুসমাজে তা নিয়ে বিচার বসে না। মুসলিম নর-নারী খুন বা ধর্ষিতা ভারতের আদালতেও সেটি হয়। নরেন্দ্র মোদির পূর্বে কংগ্রেসও তেমনি এক নিরেট অসভ্যতা নামিয়ে এনেছিল যেমন হায়দারাবাদে, তেমনি আসামের নেলীতে।

তাই নেলীতে অতি নৃশংস গণহত্যার পরও তা নিয়ে আদালতে কোন বিচার বসেনি। কারো কোন শাস্তিও দেয়া হয়নি। সে সময় মুসলিমদের পক্ষ থেকে থানায় ৬৮৮টি হত্যা মামলা হয়েছিল, সরকার সবগুলো মামলাই খারিজ করে দেয়। এবং সেটি করা হয় গণহত্যর মূল আয়োজক চরম মুসলিম বিরোধী ছাত্র সংগঠন “অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন”র (AASU) উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতাদের তুষ্ট করতে। এবং ১৯৮৫ সালে সেটি করে আরেক কংগ্রেসী প্রধানমন্ত্রী এবং ইন্দিরার পুত্র রাজিব গান্ধি। ইন্দিরার আমলে তেওয়ারীর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়; ৬০০ পৃষ্টার একটি রিপোর্টও লেখা হয়। সে রিপোর্টের মাত্র তিনটি কপি রয়েছে; তবে কোনটিই আজ অবধি আলোর মুখ দেখেনি। সে রিপোর্টটি পরিকল্পিত ভাবে গোপন করা হয়েছে অপরাধীদের ভয়ানক অপরাধগুলিকে গোপন করার জন্য। এভাবে গণহত্যার নায়কগণই শুধু শাস্তি থেকে মুক্তি পায়নি, সরকারকে নিষ্কৃতি দেয়া হয়েছে সে গণহত্যার শিকার মুসলিম পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার দায়বদ্ধতা থেকে। কোথাও মুসলিম বিরোধী গণহত্যা হলে তদন্তের নামে এরূপ কমিটি করা এবং সে কমিটির রিপোর্টকে গোপনা করাই হলো প্রতিটি সরকারের চিরাচরিত নীতি। সেটি যেমন কংগ্রেসের, তেমনি বিজিপির। বরং মুসলিম নির্মূলের লক্ষকে সামনে রেখে আসামের পরিস্থিতিকে এখন অন্যদিকে ঘোরানো হচ্ছে। আসামে চলমান গণহত্যাগুলি থেকে যেসব মুসলিম এতোদিন বেঁচে এসেছে এখন তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে ভারত থেকে তাড়ানোর ফন্দি করা হচ্ছে। তাদেরকে বাদ দেয়া হয়েছে ভারতীয় নাগরিকের তালিকা থেকে। এবং বহু আগেই বাদ দেয়া হয়েছে ভোটের তালিকা থেকে। এদের সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষ। বাংলাদেশ সরকার তাদের নিতে রাজী না তাদেরকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। তখন তাদের বাঁচতে হবে নাগরিকত্বহীন, ভোটাধিকারহীন, মানবাধিকারহীন পশুর জীবন নিয়ে। মায়ানমারের সরকার যা করেছে রোহিঙ্গাদের সাথে -ভারত সরকার অবিকল সেটিই করতে যাচ্ছে আসামের মুসলিমদের সাথে।   

অপরদিক বাবরি মসজিদে ভেঙ্গে মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার কাজটিও বিজিপি আমলে হয়নি, হয়েছে কংগ্রেসের শাসনামলে। তখন ভারতে কংগ্রেস দলীয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নরসিমা রাও। মসজিদ ভাঙ্গার কাজটি চলে সারাদিন ধরে। চলে প্রচণ্ড উৎসবভরে। সে সন্ত্রাসী ঘটনাটি সারা বিশ্বের মানুষ টিভিতে দেখেছে। দেখেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী পরিষদ সদস্য, লোকসভার সদস্য এবং প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্মকর্তাগণ।কিন্তু ঐতিহাসিক মসজিদ ধ্বংসের সন্ত্রাস থামাতে কেউই কোন উদ্যোগই নেয়নি। তাদের সবাই সে বর্বরতাটি নীরবে দেখেছে। এরূপ নৃশংসক অসভ্যতা কি কোন সভ্য দেশে আশা করা যায়? অথচ সেটিই হলো ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নীতিবোধ। কংগ্রেসের শাসনামলেই বহু হাজার শিখকে হত্যা করা হয় ইন্দিরা গান্ধি হত্যার প্রতিশোধ নিতে। সে হ্ত্যাকান্ডেরও কোন বিচার হয়নি। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা নিয়ে আন্দোলন বিজিপি নেতা আদভানি শুরু করলেও হিন্দুদের জন্য মসজিদের দরজা প্রথম খুলে দেয় রাজীব গান্ধি। এবং এতেই পরবর্তীতে উৎসাহ পায় বিজেপি নেতাকর্মীগণ।

 

যে অপরাধ বামপন্থিদের

বামপন্থিগণ নিজেদের অসাম্প্রদায়িক রূপে পরিচয় দেয়।  কিন্তু মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের কান্ড কি কম সাম্প্রদায়িক ও কম  হৃদয়বিদারক? পশ্চিম বাংলায় বাপফ্রন্ট ক্ষমতায় ছিল ৩৪ বছর। মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় শতকরা তিরিশ ভাগ হলেও পশ্চিম বাংলার সরকারি চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও নয়। সরকারের যেখানে খরচ সেখানেই আয়। সরকারি চাকুরিতে স্থান পেলে তাই জনগণের বঞ্চনা বাড়ে। পশ্চিম বাংলার মুসলিমদের এ বঞ্চনা গুজরাতের মুসলিমদের চেয়েও অধিক। এটি কি বামপন্থিদের অসাম্প্রদায়িক নীতির প্রকাশ? বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা শতকরা ৯ ভাগ; অথচ তাদের সংখ্যা চাকুরিতে শতকরা ২০ ভাগেরও বেশী। তাছাড়া বামপন্থিগণও যে কতটা সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন তার প্রমাণ তারা রেখেছে ২০১৯ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে। গত নির্বাচনে পার্লামেন্টের একটি আসনেও সিপিএম এবং তার শরীক বামপন্থিরা বিজয়ী হতে পারিনি। বামপন্থিদের ভোট পড়েছে বিজিপীকে বিজয়ী করতে। ফলে পশ্চিম বাংলায় বিজিপির আসন ২ থেকে বেড়ে ১৮তে উন্নীত হয়েছে।

ভারতে আরেক অন্যতম  প্রধান বামপন্থি সংগঠন হলো উত্তর প্রদেশের মুলায়াম সিং ইয়াদবের সমাজবাদী দল। এ দলটির হাতেও ক্ষমতা গিয়েছিল উত্তর প্রদেশে। এবং তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পিছনে ছিল উত্তর প্রদেশের প্রায় ২০% ভাগ মুসলিম ভোট। অথচ সে দলটির শাসনামলেই ২০১৩ সালে অতি নৃশংস মুসলিম গণহ্ত্যা ঘটে মুজাফ্ফর নগরে। প্রায় ২০০ জন মুসলিমকে হত্যা করা হয় এবং গৃহহীন করা হয় ৫০ হাজারকে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলে সে গণহত্যা। কিন্তু সে গণহত্যা থামাতে উত্তর প্রদেশের বামপন্থি সরকার কার্যকর কোন ভূমিকাই পালন করেনি। দাঙ্গা শেষে উদ্বাস্তুদেরকে তাদের নিজ ঘরে ফেরার নিরাপত্তাও দেয়নি। ফলে ৬ বছর পরও তাদের অধিকাংশই এখনো ক্যাম্পে উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছে। এ হলো ভারতীয় বামপন্থিদের মানবতার মান।       

 

গণহত্যা ও গণধর্ষণ কি অভ্যন্তরীণ বিষয়?

গণহত্যা, গণধর্ষণ বা গণনির্যাতন – এ অপরাধগুলির কোনটিই কোন দেশেরই অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। ভারতেরও নয়। এগুলি মানবতা বিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ। এগুলি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের এবং সে রাষ্ট্রের বুকে নিহত মানবতার সুস্পষ্ট আলামত। কোন অপরাধীই নিজের অপরাধ-প্রবনতাকে নিজের মধ্যে সীমিত রাখে না, বরং সমাজে হত্যা, ধর্ষণ ও চুরি-ডাকাতি নিয়ে বাঁচাই তার সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। এমন অপরাধীদের হাতে রাষ্ট্র অধিকৃত হলে অপরাধ কর্মের প্লাবন আসে রাষ্ট্র জুড়ে। তাই গণহত্যা, গণধর্ষণ বা গণনির্যাতন শধু কাশ্মীরে সীমিত নয়, সে বর্বরতা অতি বীভৎস রূপে ঘটছে গুজরাত, আসাম, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্রসহ সমগ্র ভারত জুড়ে। শুধু মুসলিমদের বিরুদ্ধে নয়, খৃষ্টান, আদিবাসী এবং নিম্ম বর্ণের দুর্বল মানুষদের বিরুদ্ধেও।

পাশের বাড়ীতে খুন, ধর্ষণ বা অগ্নিসংযোগ ঘটলে তা কখনোই সে গৃহের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। সেটি থামাতে প্রতিবেশীদের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে পড়ে। এবং সেটি রাষ্ট্রের ব্যাপারেও। তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সরকার যদি শেখ মুজিব বা শেখ হাসিনার ন্যায় নিজেরাই খুন-গুমের রাজনীতির ফ্যাসিবাদী দুর্বৃত্ত হয় তবে অন্য কথা। এরা তখন ফ্যাসিবাদকে তীব্রতর করতে প্রতিবেশী ফ্যাসিস্টদের কোয়ালিশন গড়ে। হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদীর মাঝে সেটিই হয়েছে। তাই বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদী হাসিনা যে নরেন্দ্র মোদীর ফ্যাসিবাদী নৃশংসতায় সর্বাত্মক সহায়তা দিবে –সেটি শুধু স্বাভাবিকই নয়, কাঙ্খিত বিষয়ও। তাই হাসিনার সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা, বাংলাদেশের জনগণ যাতে কাশ্মীরীদের প্রতি সমর্থণ জানাতে ভারতের বিরুদ্ধে মারমুখী না হয়।    

কোন দেশে গণহত্যা, গণধর্ষণ বা গণনির্যাতনের অপরাধগুলি ঘটায় সে দেশের ফাসিস্ট সরকার। সে অপরাধের শিকার হয় অসহায় দুর্বল জনগণ। ভারতে সে অসহায় জনগোষ্ঠি হলো মুসলিম জনগণ। এবং অপরাধী পক্ষটি হলো নরেন্দ্র মোদীর সরকার ও তার দল বিজিপি। সাথে রয়েছে আর এস এস, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরং দল ও শিব সেনাসহ সকল হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। যারা বিশ্বে শান্তি চায় তারা এমন একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের নিদারুন নৈতিক ব্যর্থতা ও নৃশংস বর্বরতা নিয়ে কখনোই নিশ্চুপ থাকতে পারেনা। নিশ্চুপ থাকলে এ নৃশংস অপরাধগুলি ঘটাতে বেপরোয়া হবে সে দেশের ভয়ংকর অপরাধীগণ। তখন সংঘটিত হবে ইতিহাসের অতি বর্বরতম গণহত্যা -যা নিকট অতীতে ঘটেছে রুয়ান্ডা ও বসনিয়াতে। তখন ভারত থেকে নির্মূল হবে সেদেশে ২০ কোটি মুসলিম।  

 

ঈমানের পরীক্ষা বাংলাদেশীদের

হত্যা, গুম, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার মজলুম মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোটি মুসলিম উম্মহর রাজনীতির বিষয় নয়, এটি দ্বীনি ফরজ তথা বাধ্যতামূলক। স্রেফ নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত আদায়ে ঈমান বাঁচে না; ঈমান বাঁচাতে দায়িত্ববান হতে হয়। মুসলিম উম্মাহ একটি দেহের ন্যায়। ফলে এক হাতে কেউ আঘাত হানলে অন্য হাত ত্বরিৎ বাধা দেয়। ফলে কোন মুসলিমের উপর হামলা হলে নিষ্ক্রীয় ও নীরব থাকাটি ঈমানদারী নয়। ফলে মজলুম কাশ্মীরীদের বাঁচাতে ময়দানে নামার দায়িত্বটি শুধু পাকিস্তানীদের নয়, বাংলাদেশীদেরও। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমদেরও। সে দায়িত্ব পালনে অবহেলার অর্থ বেঈমানী নিয়ে বাঁচা।

যে কোন যুদ্ধের তিনটি রূপ থাকে। এক) সামরিক; ২) অর্থনৈতিক; ৩) বুদ্ধিবৃত্তিক। বাংলাদেশের জনগণ অন্ততঃ অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। এ মুহুর্তে বাংলাদেশের নাগরিকদের উপর ফরজ হলো ভারতের পণ্য বর্জন করা। ভারতের পণ্য কেনার অর্থ হলো, মুসলিম হত্যায় ভারতকে যুদ্ধের রশদ সংগ্রহ এবং অস্ত্র নির্মাণে বা ক্রয়ে সাহায্য করা। অতএব এটি ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধ এবং ধর্মীয় ভাবে হারাম। এর অর্থ দাড়ায়, যে ব্যক্তি ভারতীয় পণ্য কিনবে সে বস্তুতঃ সরাসরি শরীক হবে সকল প্রকার ভারতীয় অপরাধের সাথে। এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে যত মুসলিম নিহত, ধর্ষিত বা নির্যাতিত হবে –ভারতীয় পণ্যের সে ক্রেতা জড়িত হবে সেসব অপরাধের সাথেও। ফলে কোন মুসলিম কি জেনে বুঝে ভারতীয় পণ্য কিনতে পারে?

বাংলাদেশের হাসিনা সরকারকে বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত করেনি। এ সরকার বস্তুতঃ ভারতের মদদপুষ্ট সরকার। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে আছে ভারত সরকার ও ভারতীয় গোয়েন্দাদের সহায়তা নিয়ে। ফলে ভারতে মুসলিমগণ যতই খুন, ধর্ষণ ও নির্মম অত্যাচারের মুখে পড়ুক না কেন, -যে কোন ভারতীয় গুণ্ডার ন্যায় হাসিনাও সেটিকে সমর্থন কররে। হাসিনার সরকার বরাবরই বলে আসছে কাশ্মীরে যা কিছু হচ্ছে তা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। অথচ কোন দেশে মুসলিমদের উপর হত্যা, ধর্ষণ বা অত্যাচার হলে তাদেরকে তা থেকে বাঁচানো প্রতিটি মুসলিমের কাছে তার ঈমানদারীর বিষয়ে পরিণত হয়। সেটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক নীতিতে পরিণত হয় প্রতিটি মুসলিম দেশের। তাই যারা ভারতের দাস তারা চুপ থাকলেও কোন মুসলিমের কাছে সেরূপ আত্মসমর্পণের নীতি কি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে? কারণ ঈমানদারকে শুধু মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসুলের পক্ষে সাক্ষ্য দিলে চলে না, দাঁড়াতে হয় জালেমের বিরুদ্ধেও। ১৭/০৮/২০১৯

 




ভারতীয় নির্বাচনঃ বিশাল বিজয় অপরাধীদের

অপরাধীদের নিরংকুশ বিজয়

২০১৯ সালের ভারতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয় জুটলো ভয়ানক অপরাধীদের। তাদের বিজয়ে ভারতের ২০ কোটি মুসলিম এবং বহু কোটি খৃষ্টান ও তথাকথিত দলিত বা অচ্ছুৎদের জীবনে যে দ্রুত দুর্গতি নেমে আসবে -তা নিয়ে সন্দেহ অতি সামান্যই। জোরদার হবে আসাম থেকে ৪০ লাখ মানুষের গায়ে বাংলাদেশীর লেবেল লাগিয়ে যে দেশত্যাগে বাধ্য করার ন্যায় বহুবিধ মুসলিম বিরোধী উদ্যোগ। সে নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়বে পশ্চিম বাংলাতেও। কিন্তু তাতে পরিনামে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যে খোদ ভারত -তা নিয়েও কি কোন সন্দেহ আছে? অপরাধীদের বিজয়ে কোন দেশই লাভবান হয়না। বরং বাড়ে অপরাধ কর্ম ও অশান্তি। তাছাড়া বিজয়ী অপরাধীগণ যে ভয়ানক অপরাধী -সে বিষয়টি কোন গোপনীয় বিষয় নয়। নরেন্দ্র মোদী ও তার সেনাপতি অমিত শাহের হাতই শুধু গুজরাতের মুসলিম রক্তে রঞ্জিত নয়, রক্তের গন্ধ আসে আরো অনেক বিজয়ী এমপি ও মন্ত্রীদের গা থেকেও। নিছক অহিন্দু হওয়ার অজুহাতে যে দেশের ২০ কোটি মানুষকে –যা জার্মান, ইংল্যান্ড বা ফান্সের জনসংখার তিনগুণের অধীক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গণ থেকে পরিকল্পিত ভাবে দূরে রাখা হয়, সে দেশে কল্যাণকর কিছু কি আশা করা যায়? কল্যাণমুখি সরকারের কাজ তো ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও জাত-পাতের উর্দ্ধে উঠে দেশের বেকার নাগরিকদের কাজ দেয়া, কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে রাখা নয়। অথচ ভারতে ২০ কোটি মুসলিমদের অবহেলিত রাখাই হলো সরকারি নীতি।

ভারতীয়গণ অতীতের ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি। প্রায় দেড় শত বছর আগে বাংলার হিন্দুদের জীবনেও রেনাসাঁ এসেছিল। কিন্তু পরিণামে সে রেনাসাঁ বাঙালী হিন্দুদের তেমন কোন কল্যাণ দেয়নি। কারণ, হিন্দুরা নিজেদের কল্যাণ চেয়েছিল প্রতিবেশী মুসলিমদের অকল্যাণ ঘটিয়ে। তারা এগিয়ে যেত চেয়েছিল শিক্ষা-দীক্ষা, চাকুরি-বাকুরি ও অর্থনীতিতে , মুসলিমদের বাদ দিয়েই। তাদের সে অপরাধের কারণেই ১৯৪৭’য়ে বাংলা বিভক্ত হয়েছে। এবং বাঙালী হিন্দুরা শুধু ভারতীয় রাজনীতিতেই প্রভাব হারায়নি, প্রভাব হারিয়েছে নিজ প্রদেশ পশ্চিম বাংলাতেও। এবারের নির্বাচনের পর পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতার বানার্জির আশংকা, গুজরাতের উগ্রবাদী হিন্দুদের খুনোখুনি ও মুসলিম নিপীড়নের রাজনীতি শুরু হতে যাচ্ছে খোদ পশ্চিম বাংলায়।

মমতার বানার্জির আশংকাটি আদৌ ভিত্তিহীন নয়। এবারের সংসদ নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপি)’র সবচেয়ে বড় বিজয়টি এসেছে পশ্চিম বাংলায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজপি পেয়েছিল রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের মাঝে মাত্র ২টি; এবার পেয়েছে ১৮টি। এ বিশাল বিজয়ে বলীয়ান হয়ে বিজিপি ইতিমধ্যেই কলকাতাসহ পশ্চিম বাংলার নানা শহরে রাজনৈতিক পরিবেশ লাগাতর অশান্ত ও উত্তপ্ত করে চলেছে। অরাজকতার দোহাই দিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে মমতা বানার্জীর সরকারকে হটিয়ে কেন্দ্রীয় শাসন বলবৎ করার। তাছাড়া বিজিপি কোন রাজ্যে শক্তিশালী হলে সে রাজ্যে যা দ্রুত বিনষ্ট হয় তা হলো সাম্প্রদায়িক সম্পৃতি ও শান্তির পরিবেশ। ছিটানো হয় ঘৃনার পে্ট্রোল। সৃষ্টি হয় যে কোন মুহুর্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন জ্বলে উঠার উপযোগী পরিবেশ। মোদীর শাসনামলে এমনটিই হয়েছে গুজরাতে, এবং আজ তা হতে যাচ্ছে উত্তর প্রদেশে। উত্তর প্রদেশে ঘরে গরুর গোশতো রাখার সন্দেহে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। হত্যা করা হচ্ছে গরু-ব্যবসায়ীদের। ভারতীয় মুসলিমদের প্রাণের মূল্য গরুর চেয়েও নীচে নেমেছে। সরকারের প্রায়োরিটি যতটা গরুর নিরাপত্তা দিতে, সেটি নেই মুসলিমের জান-মাল ও ইজ্জত বাঁচাতে। অবস্থা এতটাই নাজুক যে, মুসলিম মায়েরা টুপি মাথায় দিয়ে সন্তানদের মসজিদে পাঠাতে ভয় পায়। আশংকা এখানে বজরং দল বা আরএসএস গুন্ডাদের হাতে পথে নিহত হওয়ার। তেমন একটি মুসলিম বিরোধী সন্ত্রাসের হাওয়াই বেগবান হচ্ছে পশ্চিম বাংলায়। তবে পশ্চিম বাংলায় খুনোখুনি শুরু হলে সেটি যে শুধু যে পশ্চিম বাংলা সীমিত থাকবে না -তা বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে সমগ্র পূর্ব-ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে। ভারতে ২০ কোটি মুসলিমের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বটি মূলতঃ ভারত সরকারের। কিন্তু ভারত তাতে ব্যর্থ হলে ২০ কোটি মুসলিম কি তবে বিলীন হয়ে যাবে? প্রতিবেশী রূপে সুস্থ্য আচরণে হিন্দুগণ ব্যর্থ হলে তাদের জন্য পৃথক ভূমির দাবী তখন অনিবার্য হয়ে উঠবে। এ ২০ কোটি মুসলিম বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে গিয়ে সেখানে ঘর বাঁধেনি। আসমান থেকেও তারা নাযিল হয়। জন্মসূত্রে তারা ভারতীয়; ফলে ভারত ভূমিতেই নিরাপদ বাসস্থান পাওয়াটি যে তাদের বৈধ মানবিক অধিকার -সেটি কি অস্বীকারের উপায় আছে?        

 

মৃত গণতন্ত্র এবং বিজয় ফ্যাসিবাদের

শিক্ষা, সংস্কৃতি, দর্শন, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধে জনগণের স্তরে বিপ্লব না এলে নির্বাচনে বিপুল ভাবে বিজয়ী হয় চোর-ডাকাত, ভোট-ডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও সন্ত্রাসীর ন্যায় ভয়ানক অপরাধীরা। তখন স্বৈরাচারি খুনিরা শুধু এমপি বা মন্ত্রী হয় না, বরং দেশের নেতা, পিতা, বন্ধু রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। এর উদাহরণ শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং সবচেয়ে বড় উদাহরণটি হলো ভারত। গণতন্ত্রের নামে সেখানে শুরু হয়েছে হিন্দু মেজরটির বর্বর স্বৈর শাসন। ডাকাত আরেক ডাকাতকে কখনোই নিন্দা করে না। ফলে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ভোটচুরি, ভোটডাকাতি এবং গুম-খুন ও সন্ত্রাসের যে রাজনীতি প্রতিষ্ঠা দিয়েছে তা বিপুল প্রশংসিত হচ্ছে ভারতীয় শাসক মহলে। মোদীর শাসনামলে ভারতের অর্থনীতিতে কোন উন্নয়ন ঘটেনি, বরং বেড়েছে বেকারত্ব এবং এসেছে অর্থনৈতিক মন্দা। ঋণের দায়ভারে আত্মহত্যা করছে হাজার গরীব কৃষক। অথচ এরপরও এবারের নির্বাচনে বিজেপি’র বিজয়টি ২০১৪ সালের বিজয়ের চেয়েও বিশাল। এর কারণ, মোদী অর্থনীতিতে উন্নতি আনতে না পারলেও এনেছে উগ্র হিন্দুত্বের জোয়ার। ভারতের ন্যায় দেশগুলোতে অর্থনীতির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধর্ম –সেটি হিন্দু ধর্ম। এরই ফল হলো, ৫৪৩ সিটের পার্লামেন্টে ২০১৪ সালে বিজিপি পেয়েছিল ২৮২ সিট এবং এবার পেয়েছে ৩০৩ সিট। ২০১৪ সালে পেয়েছিল ৩১.৩% ভোট এবং এবার পেয়েছে ৩৭.৪%।

গণতন্ত্রকে যদি বলা হয় জনগণের ভোটে যোগ্যবানদের নির্বাচনের প্রক্রিয়া -তবে এ নির্বাচনে গণতন্ত্র শুধু পরাজিতই হয়নি, তার মৃত্যু হয়েছে। বিজয়ী হয়েছে নিরেট ফ্যাসিবাদ। ভারতের রাজনীতি অধিকৃত হয়েছে ভয়ানক খুনি ও অপরাধীদের হাতে। এরই প্রমাণ, নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভায় এবার যারা স্থান পেল তাদের মাঝে বিভিন্ন ধরনের ফৌজদারি অপরাধে বিচারাধীন আসামি হলো ৩৯ শতাংশ। গতবারে তাদের সংখ্যা ছিল ৩১ শতাংশ। বিজয়ীদের মধ্যে ২০১ এমপি এমন যারা নানারূপ অপরাধের আসামি। ভারতীয় গবেষণা সংস্থা এডিআর’য়ের মতে মন্ত্রিসভার ৫৭ সদস্যের মাঝে ২২ জনের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি মামলা আছে। বিষয়টি কোন গোপন বিষয়ও নয়। অপরাধ জগত থেকে আসা এসব মন্ত্রীরা নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামাতে তারা নিজেরাই উল্লেখ করেছিল যে, ফৌজদারি মামলায় তারা আসামী। কিন্তু তাতে তাদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়াতে কোন বাধা পড়েনি। তাদের মধ্যে ১৬ জন হলো এমন অপরাধী যারা খুন ও ধর্ষণের ন্যায় গুরুতর অপরাধের আসামী। আদালতে সাতটি মামলা আছে এমন ব্যক্তিও মন্ত্রী হয়েছেন। নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিরুদ্ধে রয়েছে চারটি মামলা।

এবারের নির্বাচনী যুদ্ধে নরেন্দ্র মোদীর মূল সেনাপতি ছিল অপরাধ জগতের অমিত শাহ। মোদীর ন্যায় অমিত শাহের বাড়ীও  গুজরাতে। তাদের উভয়ের হাতই শিক্ত হয়েছে ২০০২ সালে গণহত্যার শিকার মজলুম মুসলিমদের রক্তে। মুখ খুললে এখনো রক্তের গন্ধ বেরুয় তাদের মুখ থেকে। দুর্বৃত্তি বিপুল সমৃদ্ধি দিয়েছে তাদের সম্পদে। ২০১২ সালে নির্বাচনী হলফনামায় অমিত শাহ তার পরিবারের  সম্পদ দেখিয়েছিল ১২ কোটি ভারতীয় রুপি। ২০১৯ সালে দেখিয়েছে ৩৯ কোটি। ৭ বছের তার সম্পদে বেড়েছে ২৭ কোটি রুপি। এত বিপুল অর্থ আকাশ থেকে পড়েনি, বরং তা হলো অপরাধের কামাই। ভারতে অতি দ্রুত ধনি হওয়ার সহজ ব্যবসাটি হলো সরকারি দলে যোগ দেয়া। এ ব্যবসায় কোন পুঁজি লাগে না, লাগে স্রেফ সন্ত্রাসের সামর্থ্য। সে সামর্থ্য থাকলে  রাজনৈতিক পদ এবং ক্ষমতা -উভয়ই জুটে।

ডাকাত দলে সবচেয়ে নৃশংস ডাকাতকে সর্দার করা হয়, তেমনি সন্ত্রাসের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসীকে। সন্ত্রাসের সে সামর্থ্য না থাকলে স্থান জুটে ভোটারের কাতারে, মন্ত্রী বা এমপি রূপে না। এক কালের “টি বয়” নরেন্দ্র মোদীর কপাল খুলে তখন যখন বিজেপি নেতা লাল কৃষ্ণ আদভানীর নেতৃত্বে হিন্দুত্বের জোয়ার শুরু হয়। মোদি আদবানীর দৃষ্টি কেড়েছিল ১৯৯২ সালে। সেটি গুজরাত থেকে হাজার হাজার উগ্র হিন্দুদের অযোধ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ গুড়িয়ে দেয়ার কাজে নিয়ে। বাবরী মসজিদ ধ্বংসে মোদী ছিল আদভানীর অন্যতম সেনাপতি। বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পুরস্কার স্বরূপ বিজিপির পক্ষ থেকে মোদিকে দেয়া হয় গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীর পদটি। গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পরই তার নেতৃত্বে শুরু হয় আরেক নৃশংস পর্ব। সেটি গুজরাতের মুসলিমদের উপর হত্যা, ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ী ও দোকানে আগুণ দেয়ার প্রক্রিয়া। ২০০২ সালে শুরু হয় মুসলিম নির্মূলের গণহত্যা। মুখ্যমন্ত্রী রূপে সে সময় মোদীর উপর মূল দায়িত্বটি ছিল পুলিশকে নিষ্ক্রীয় রেখে হত্যা, ধর্ষণ এবং ব্যবসায় আগুণ দেয়ার কাজে হিন্দু গুন্ডাদের পর্যাপ্ত সময় দেয়া। সে নিধনযজ্ঞে মৃত্যু ঘটে ২ হাজারের বেশী নরনারী ও শিশুর। পুড়িয়ে ছাই করা হয় বহু হাজার মুসলিমের গৃহ ও দোকানপাট। যে সব আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে গৃহহীন অসহায় মুসলিমগণ স্থান নিয়েছিল মোদী সেগুলিও বন্ধ করে দেয়। সেগুলি চিহ্নিত হয়েছিল শিশু উৎপাদনের কারখানা রূপে।

 

খুন-ধর্ষণের বিচারে অনুমতি নিতে হবে অপরাধী থেকে!    

অপরাধীদের বিপুল বিজয়ে পরিস্থিতি এতটাই পাল্টে গেছে যে, কোন খুনি বা ধর্ষকের বিচারের আগে সে অপরাধী থেকে প্রথমে অনুমতি নিতে হবে। কারণ তারাই মন্ত্রী ও এমপি। গুজরাতে মুসলিম দলন প্রক্রিয়া এবং ২০০২ সালে মুসলিম গণহত্যার কাজে নরেন্দ্র মোদীকে যে অমিত শাহ সর্বপ্রকার সহায়তা দিয়েছিল সেই এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে থাকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব। গুজরাতে যখন মুসলিমদের হত্যা ও তাদের ঘরাড়ী পোড়ানোর কাজ মহা ধুমধামে চলছিল তখন সে হত্যাযজ্ঞ থামাতে পুলিশ বাহিনী কোন দায়িত্ব পালন করেনি। বরং যেসব পুলিশ অফিসারগণ নিজ উদ্যোগে দাঙ্গা থামাতে তৎপর হয়েছিল তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল অন্যত্র বদলী করে। যাদের নেতৃত্বে সেদিন গুজরাতে গণহত্যা পরিচালিত হয়েছিল তাদের হাতেই এখন ভারতের শাসন ভার। ফলে গুজরাত হয় এখন সমগ্র ভারত। আসাম থেকে তাই ৪০ লাখ মুসলিমের বিতাড়নের ষড়যন্ত্র। স্মরণীয় হলো, কলকাতায় মুসলিম এলাকার মধ্য দিয়ে এবার এক নির্বাচনি মিছিল নেতৃত্ব দিয়েছিল অমিত শাহ। সে মিছিল থেকে অকথ্য ভাষায় দু’পাশের মুসলিমদের উদ্দ্যশ্য করে গালি গালাজ করা হয়। অসহায় মুসলিমেরা সেদিন সে অকথ্য গালিগালাজ মুখ বুজে সহ্য  করেছে। প্রতিক্রিয়া দেখালে সেদিনই শুরু হতো মুসলিম নিধনমুখি দাঙ্গা।

নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ৯ দিন পর নরেন্দ্র মোদি শ্রীলঙ্কায় যান। লক্ষ্য ছিল, চার্চের উপর সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত খ্রিষ্টানদের প্রতি সহানুভূতি জানানো। এটি ছিল নির্লজ্জ ভন্ডামী। মোদি কি ভূলে গেছে ভারতীয় খৃষ্টানদের উপর তার নিজ দলের নেতাকর্মীদের নৃশংস হত্যাকান্ডের কথা? মোদির মন্ত্রীসভায় স্থান পেয়েছে উড়িষ্যার হি্ন্দু চরমপন্থিদের নেতা প্রতাপ চন্দ্র সারাঙ্গী। প্রতাপ সারাঙ্গী সাতটি ফৌজদারি মামলার আসামি। সে হলো আরএসএস-বিজেপি রাজনৈতিক গোষ্ঠির সবচেয়ে আক্রমণাত্মক সংগঠন বজরং দল উড়িষ্যার রাজ্যের সভাপতি। এই দলের কর্মীরাই ১৯৯৯ সালে উড়িষ্যায় অস্ট্রেলিয়ান খ্রিষ্টান যাজক গ্রাহাম স্টেইনকে দুই ছেলেসহ ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করে।এরূপ এক বীভৎস খুনের সাথে জড়িত হওয়া সত্ত্বেও প্রতাপের রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠায় কোন ছেদ পড়েনি।  ২০০২ সালে ‘বজরং দল’, ‘দুর্গাবাহিনী’ এবং ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ মিলে উড়িষ্যার বিধানসভা ভবনের যে হামলা করে, তাতেও নেতৃত্বে ছিল প্রতাপ সারাঙ্গীর। সে সময় তাকে আটকও করা হয়েছিল। অথচ এ খুনি প্রতাপকে একটি নয় দুটি দপ্তরের মন্ত্রী করা হয়েছে। বিজেপির কর্মীদের কাছে সে হলো ‘উড়িষ্যার মোদি। সন্ত্রাস ও খুনের সামর্থ্য থাকলে বিজিপিতে যে কীরূপ মূল্য মেল -প্রতাপ হলো তারই প্রমাণ।

তবে নৃশংস অপরাধের সাথে জড়িত হওয়ার কাহিনী কারো কারো জীবনে অমিত শাহ ও প্রতাপ চন্দ্রের চেয়েও অধীকতর বর্বর ও নৃশংস। তাদেরই একজন হলো ভূপালের প্রাগ্য ঠাকুর। এখনো তাকে মন্ত্রী করা হয়নি। তবে প্রতাপ চন্দ্রের মন্ত্রিত্ব পাওয়াতে রাস্তা খুলে গেল প্রাগ্য ঠাকুরের পথ। ২০০৮-এর সেপ্টেম্বরে ভারতজুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে স্থানে স্থানে যে লাগাতর বোমা হামলা চালানো হয় তার মূল আয়োজক ছিল প্রাগ্য ঠাকুর। কোথাও কোথাও আবার মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় হিন্দুদের উসকে দিতে হিন্দু স্থাপনার উপরও সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থলে পাওয়া গেছে হামলার কাজে ব্যবহৃত প্রাগ্যের মোটরসাইকেলও। পুলিশী তদন্তে প্রাগ্যের সংশ্লিষ্টতা ধরা পড়ে ‘রাষ্ট্রীয় জাগরণ মঞ্চ’, ‘অভিনব ভারত’ ইত্যাদি নামে বহু গোপন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সাথে। বহুহত্যার সাথে জড়িত এ সন্ত্রাসীকে বিজিপি ভূপাল আসনে প্রার্থী রূপে খাড়া করে। মধ্যপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দ্বিগবিজয় সিংকে প্রায় চার লাখ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে বিজয়ী হয় প্রাগ্য ঠাকুর।

ভোটের মধ্য দিয়ে ভোটারের মন কথা বলে। প্রাগ্য ঠাকুর, অমিত শাহ প্রতাপ সারাঙ্গীর মত অপরাধীদের বিপুল ভোটে বিজয়ে প্রমাণ মেলে ভারতীয় ভোটারদের অন্তরে মুসলিম বিদ্বেষী রূপটি কতটা প্রকট। এমন বিষাক্ত মনের ভোটারদের মাঝে কি গণতন্ত্র বাঁচে? বাঁচে কি মানবিক সভ্যতা? এরূপ দেশে সহজেই সন্ত্রাসী দল গড়া যায়, কিন্তু সভ্য গণতান্ত্রিক সরকারও কি গড়া যায়?  নির্বাচনী প্রচারকালে গান্ধীর হত্যাকারীকে নাথুরাম গড়সে’কে প্রাগ্য ঠাকুর প্রকাশ্যেই দেশপ্রেমিক রূপে অভিহিত করেছে। কিন্তু তার সে উক্তি বিজিপি’র কাছে আপত্তিকর মনে হয়নি। ফলে দলীয় প্রার্থী পদ থেকে তাকে প্রত্যাহারও করেনি। আর সন্ত্রাসে তার জড়িত থাকার বিষয়? প্রাগ্যের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগকে মিথ্যা বলছে বিজিপি প্রধান অমিত শাহ। আরো বিস্ময়ের বিষয় হলো, প্রাগ্য ঠাকুরের বিরুদ্ধে প্রধান তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা হেমন্ত কারকারে’কে রহস্যমূলক ভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে। প্রাগ্যের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তদন্তে নামায় তাকেও প্রাণ হারাতে হয় সন্ত্রাসী হামলায়।

ভারতীয় গবেষণা সংস্থা এডিআর’য়ের রিপোর্ট মতে লোকসভায় নির্বাচিত এমপি’দের মাঝে ২৩৩ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের মামলা রয়েছে। গত সংসদের চেয়ে এ সংখ্যাটি ১৪ শতাংশ বেশি। এখন বিষয়টি সুনিশ্চিত যে, আগামী দিনে ভারতের নীতি নির্ধারণ করবে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, প্রতাপ চন্দ্র, প্রাগ্য ঠাকুরের মত ভয়ানক অপরাধীরা। প্রশ্ন হলো, উগ্রবাদিদের হাতে অধিকৃত ভারতের ভবিষ্যৎ চেহারাটি যে কতটা হিংসাত্মক হবে -তা নিয়ে অনুমান করাটি কি আদৌ কঠিন? ভারতীয় জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ মুসলিম। সরকারি চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও নয়। উত্তর প্রদেশে প্রায় ৫ কোটি মুসলিমের বাস। কিন্তু বিগত পার্লামেন্টে তাদের মধ্য দিকে একজনও এমপি হতে পারেনি। এবার ২০ কোটি মুসলিমের মধ্য থেকে এমপি’র সংখ্যা মাত্র ২৫ জন। ঢাকা, করাচী বা লাহোরের মত একটি শহরে যত জন মুসলিম ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, উকিল, সরকারি অফিসার, পুলিশ অফিসারের বাস ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের মাঝে তার সিকি ভাগও নেই। এরূপ অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বললে বলা হয় মুসলিমের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব। বলা হয় মুসলিম তোষণ। সেটিকে চিত্রিত করা হচ্ছে অপরাধ রূপে। মানবতা তো পশুত্ব নিয়ে বাঁচে না, সেজন্য মানবিক পরিচয়টি তো অপরিহার্য। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে সে মানবিক রূপটি এখন মৃত। আর মানবতার মৃত্য হলে নরহত্যা, নারী-ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও যে উৎসবে পরিণত হবে সেটিই তো স্বাভাবিক। উৎসবের সে প্রচণ্ড রূপটি দেখা যায় মুসলিম গণহত্যামুখি দাঙ্গাগুলিতে।

 

শুরুটি বহু আগে থেকেই                    

তবে ভারত জুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেরূপ হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও পথেঘাটে দাড়ি টেনে অপমান করার যে অভিযান চলছে -সেটি হঠাৎ করে শুরু হয়নি। শুরুটি শত বছর আগে থেকে। ভারত আজকের এ অবস্থায় পৌঁছেছে সংঘবদ্ধ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ফলে। এরূপ একটি অবস্থা সৃষ্টিতে লাগাতর কাজ করেছে বহু হিন্দু বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, ধর্মগুরু ও মিডিয়া কর্মী। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী জাগরণ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বাণী নিয়ে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তিটি রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণ উত্তপ্ত করেন তিনি হলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকার। তার চিন্তাধারায় পুষ্ট হয়ে ভারত জুড়ে প্রতিষ্ঠা পায় আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ এবং আজকের বিজিপি। নরেন্দ্র মোদীর রাজনীতির শুরু হয় আরএসএস থেকে। সাভারকারই জোরে জোরে বলা শুরু করেন, “হিন্দুদের মূল শত্রু হলো মুসলিম, ইংরেজগণ নয়। -(সূত্রঃ (Jaffrelot (2009). Hindu Nationalism: A Reader. Princeton University Press. pp. 14–15, 86–93. ISBN 1-4008-2803-1) প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি হিন্দুদেরকে ইংরেজদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিতেও উৎসাহ দেন। এবং অধিকৃত আরব ভূমিতে ইংরেজদের হাতে ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হলে সেটিকেও তিনি সমর্থণ দেন। কংগ্রেসের ব্রিটিশ বিরোধী “ভারত ছাড়” আন্দোলনেরও তিনি বিরোধীতা করেন। তিনিই বলেন, “যেসব মুসলিম ভারতের পুলিশ ও সেনাবাহিনী রয়েছে তারা হলো ” traitors” তথা  গাদ্দার। ভারত সরকারকে তিনি পরামর্শ দেন সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সরকারি প্রশাসনে মুসলিমদের সংখ্যা কমাতে। নিষিদ্ধ করতে বলেন মুসলিমদের অস্ত্র কারখানার মালিক বা শ্রমিক হওয়া থেকে। -(সূত্রঃ McKean, Lise (1996), Divine Enterprise: Gurus and the Hindu Nationalist Movement, University of Chicago Press, ISBN 97-0-226-56009-0)

সাভারকারের পর হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার আরেক তারকা হলো মাধব সদাশিব গোয়ালকার। সাভারকারের ন্যায় গোয়ালকারও ছিল মারাঠী। ১৯৩৮ সালে হিন্দুভারতের যে রূপরেখাটি তিনি পেশ করেন তা হলো নিম্নরূপ: “The non-Hindu people of Hindustan must either adopt Hindu culture and language, must learn and respect and hold in reverence the Hindu religion, must entertain no idea but of those of glorification of the Hindu race and culture…..In a word, they must cease to be foreigners, or may stay in the country wholly subordinated to the Hindu nation, claiming nothing, deserving no privileges, far less any preferential treatment—not even citizens’ rights.” (“Pakistan and a World in Disorder—A Grand Strategy for the Twenty-First Century”, p.78)।

 

গোয়ালকারের কথা, “হিন্দুস্থানের অহিন্দুদের অবশ্যই হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দু ভাষাকে গ্রহন করতে হবে। তাদেরকে অবশ্যই শিখতে হবে এবং ভক্তি করতে হবে হিন্দু ধর্মকে। হিন্দু বর্ণ ও হিন্দু সংস্কৃতির জয়কীর্তন ছাড়া অন্য কোন চেতনাকে তারা প্রশ্রয় দিতে পারবে না। তারা কিছু দাবীও করতেও পারবে না –এমনি মৌলিক নাগরিক অধিকারও নয়।” হিন্দু ভারত নিয়ে সাভারকার ও গোয়ালকারের এটিই হলো সেই রূপরেখা যা আজ কোন কিতাবে বন্দি নয়; বরং সেটির বাস্তবায়নে নেমেছে বিজিপি, আরএসএস, বজরং দল, শিব সেনা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ন্যায় অসংখ্য সংগঠন। তাদের ভারতে  মুসলিমদের কোন স্থান নেই। হিটলারের ন্যায় তারাও রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে গণতন্ত্র ও নির্বাচনকে ব্যবহার করছে স্রেফ মই রূপে। কিন্তু তাদের আসল পথটি হলো ফ্যাসিবাদের। তাদের কাছে তাই অনুকরণীয় বীর পুরুষ হলো জার্মানীর হিটলার ও ইতালীর মুসোলিনী–যা সুস্পষ্ট সাভারকারের লেখাতে। জার্মান ইহুদীদের যে স্থানে বসিয়ে হিটলার তাদের নির্মূলে নেমেছিল, ভারতীয় মুসলিমদের জন্য বরাদ্দকৃত স্থানটিও হলো সেটি। তবে হিটলারে নৃশংস নীতি থেকে শিক্ষা নিলেও তারা শিক্ষা নেয়নি তার ভয়াবহ পরিণতি থেকে। সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে হিটলারের জার্মানী ছিল বিশ্বশক্তি। তা সত্ত্বেও হিটলারের ফ্যাসিবাদ জার্মানীকে যা দিয়েছে তা হলো নিদারুন পরাজয়, নৃশংস বর্বরতা ও বীভৎস ধ্বংসযজ্ঞ। প্রশ্ন হলো, বিজিপির ফ্যাসিবাদ ভারতকেও কি ভিন্ন কিছু দিবে? ১৪/০৬/২০১৯




Betrayal of Islamic Priority and the Infrastructure of Failure

The priority –

The core belief (iman) of a man never remain obscure or hidden; rather gets expressed with precision through the priority of his survival. In fact, iman of a believer works through setting the priority –the most important issue in life. In absence of iman, one fails to discover the right priority; hence runs the risk of total failure of all survival efforts. Such a man also runs the risks of becoming a mercenary for the worst evil forces on earth; as a result, earns a place in hellfire. A believer’s sole priority is to please Allah Sub’hana wa Ta’lais by serving His agenda on earth that entails the victory of Islam -His only prescribed religion, over the religions of falsehood. He even shows his readiness to sacrifice his life. A believer thus works as His helper (ansarAllah) to free people from the roads to hellfire. Only this way, a believer can serve his own agenda of earning forgiveness from his Lord and attaining a place in the paradise. Such a core priority plays the pivotal role in deciding his priorities in politics, culture, education, warfare and other aspects of life. As a result, a believer is qualitatively different from a disbeliever. Instead of floating with the cultural, ideological or political tide, he remains tightly anchored to his own core agenda.

For a true Muslim, mere faith and faith-based rituals are not enough. He must know the priorities of Islam, too; and needs to embrace those priorities as his own. His incongruence or incompatibility with the Islamic priorities gives clear evidence that no longer he belongs to the Muslim ummah. This is a clear mark of de-islamisation. Such a de-islamised man shows his ideological and cultural readiness to join the enemy rank and make war against the Muslims. Because of such de-islamised people, the evil ideologies like communism, socialism, nationalism, tribalism, secularism, monarchism could recruit millions of readymade mercenaries from the Muslim communities. The colonialist cum imperialists of the West, too, could raise hundreds of thousands of mercenaries from these people. They fought wars and gave lives to strengthen the infidel occupation of the Muslim lands. Such crimes still continue. In Islam, such home-grown enemies of Islam are called murtadh; in the prophet’s (peace be upon him) days the sharia law was applied to give them the capital punishment.

Instead of tribal, racial or linguistic commonness, the common faith, the common vision and the common priority united the Muslims in their golden days. Hence, the concept of nation state was unknown in more than thirteen hundred years of the Islamic history. The disease of the Western ideologies could infect the Muslims only after the colonial occupation.

Understanding of the Islamic priority runs very low in the Muslim World. Whereas success never comes from prioritisation of the wrong and the unimportant things.  In the name of Islam, building mosques, religious madrasas, schools and colleges still receives the highest priority. But the question arises, is it the right priority for the Muslims to build more mosques, more schools and more universities? The Muslims now possess thousand times more mosques and schools than they had at their golden days. They have more PhD’s and university graduates than the USA or China had at the time of their economic take off. In fact, the priority should be exactly the same as the prophet of Islam (peace be upon him) had 14 hundred years ago. It is to build a fully Islamic state. After his death, the rightly guided companions of the prophet (peace be upon him) worked hard and sacrificed a lot as his khalifa (viceroy) to give strong sustenance to the prophet’s state. It continued as the Islamic Caliphate in later days.

It is very significant to note that the prophet (peace be upon him) of Islam didn’t build a single mosque or madrasah during his initial 13 years of prophet hood in Mecca. Then, the main focus was to build war-ready enlightened soldiers who will be ready to sacrifice their life, wealth and every potential to establish and protect the state. For that, the prophet (peace be upon him) was an all-time teacher, model and mentor for the Meccan Muslims. Hence, his companion never said like the companions of Prophet Musa (peace be upon him), “O Musa! Go ahead with your God to fight for us, we stay here only to wait.” The prophet (peace be upon him) never failed to anticipate such indispensable wars –as happened in Badar, Ohud, Hunayun and many other places, even before the inception of the state.

 

The danger & the way-out

In a non-Muslim or un-Islamic state, one gets little opportunity to know Islam. Nor can practise Islam fully. More awfully, runs the risk of melt-down in a hostile political, cultural and ideological milieu. As a result, the hellfire becomes the ultimate abode. The western countries have indeed shown their strength as a powerful melting pot. It is the case not only in a Western or non-Muslim country; a Muslim country under the infidel or the secularist occupation also present with the same consequence. To be a true Muslim, like foods and drinks, it also needs inputs and throughputs from Islamic value-adding institutions. He or she needs to go through a refining process of Islam’s own educational and cultural system. To ensure such an environment of Islamic enrichment and to protect the ummah from an ideological cum cultural melt-down, the prophet (peace be upon him) of Islam and his rightly guided companions needed to establish an Islamic state from day one. It is indeed the greatest wisdom and the most important sunnah of the prophet (peace be upon him). It is also a Qur’anic obligation. In the whole history of Islam, it proved to be the most costly project. And it is also the most beneficial project for the whole mankind. To defend such a crucial institution, more than 70 percent of the prophet (peace be upon him)’s companions needed to sacrifice their lives.

However, whatever massive has been the cost, the benefits of such an Islamic caliphate is immensely huge. No man or institution can approach near to its achievement. In the whole human history, it is the only model of civilizational excellence. The early Muslims could reach the highest civilizational peak only due to this massive humanising project on earth; not due to its millions of mosques or monuments. The survival of Islam, the continuation of the prophetic mission, the security of the Muslims’ lives and the sustenance of Muslims’ glory through centuries were only possible through such a supportive structure of caliphate. One can feel the importance of oxygen only when he runs out of it. The same is true with an Islamic caliphate. In its absence, the Muslims now suffer from relentless calamities. Such an institutional collapse of the Muslims and divisions of the ummah into 57 states have indeed given birth to a perfect recipe for endless catastrophe. The demographic surge of the Muslims, the huge number of mosques, madrasas and industries, the bulging per capita income of some Arab States and even the nuclear bombs of Pakistan couldn’t work as the substitute of the Islamic caliphate. The collapse of khelafa has indeed precipitated the collapse of the Muslim ummah as a civilizational force. The fall-out of such a collapse has been so awful that it made almost 1.5 billion Muslims the real orphans. The Hindu’s have India, the Christians have the USA, the Chinese have China, the Jews have Israel; but the Muslims have none. In absence of such a civilizational core state, the Muslims in Syria, Iraq, Afghanistan, Kashmir, Myanmar, Chechnya, Palestine, Xinxiang and many other parts of the world now suffer from extreme persecution, humiliation and deaths.

 

Survival without a mission!

It needs little evidence to prove that Islam can’t be fully practised in a non-Muslim state. It is equally true in a Muslim state under the enemy occupation. The ruling clique of the non-Muslim and the un-Islamic countries never allows any space to practise sharia, hudud, shura and jihad. How one can be a true Muslim without practising these fundamentals? Enjoining the right (a’maru bil ma’ruf) and eradicating the wrongs (nehi anil mukar) are the two-prong mission that has been Divinely assigned on every Muslim to help attain the highest rank on earth and in the hereafter –as has been revealed in Sura al-Imran, verse 110. Only through engaging in such a mission, a believer can prove himself a true helper unto Allah Sub’hana wa Ta’la. A believer then turns to a tool to fulfil His Vision that Islam should prevail over all other religions. (The famous Qur’an narrative of the Vision: li’yuzhirahu ala’ddini kullihi). But under enemy occupation, it is legally allowed only to be the helper of the occupying forces; any visible pursuance of an Islamic mission is considered a punishable offence.

In a non-Muslim or un-Islamic country, truly, a Muslim is allowed to survive only with a detachment from the Qur’anic decree. Therefore, he has to live without Islam’s mission and vision. This is why migration from a kuffar land to an Islamic country received so much important in Islam. Hence, the migration of the Prophet Muhammad (peace be upon him) and his companions from Mecca to Medina received recognition as the most important milestone in the civilizational growth of Islam. The beginning of the Islamic calendar from the year of migration indeed gave the full recognition to this point.  In fact, only after the establishment of an Islamic caliphate, the Muslims could enjoy a safe premise to practise full Islam. Only such a big state can provide the infrastructural strength in fulfilling the Islamic obligation to help prevail Islam over the falsehood. And only such a pan-Islamic state can help dismantle the divisive walls raised in the name of land, language, race and ethnicity. Hence, absence of such a core Islamic state precipitates the worst catastrophic consequence: the Muslims are then forced to live without full Islam. They are forced to reconcile even with the imposed occupation, deaths, destruction, deviation and ideological cum cultural corruptions of the Muslim lands.

 

The punishing void  

For a civilizational growth of a human, a constant nurture in a value-adding institutional environment is indispensable. Family, mosques, madrasas, schools and the cultural cum educational milieu of the country constitute the essential parts of such a value adding process. In absence of such institutions, the risk of moral, cultural and spiritual deprivation and death is immense. In fact, in such an institutional void, men and women even with the physical fitness turn equal and even inferior to the animals –as has been stated in the holy Qur’an. (The Qur’anic expression: ulaika k’al an’am, bal hum adal. Meaning: they are like the animal, rather worse than that). The naked men and women who live like animals in the jungles of Nicobar Island or Papua New Guinea, are indeed the products of such institutional void. Physically and genetically they resemble a man or woman; but they can’t fit in a human society. Instead, they show more compatibility with the fellow animals. When they see men and women in their near vicinity, these fellow members of the same human species quickly disappear into the forest –as shown in documentaries on their life. It reinforces the notion that meeting mere bodily needs doesn’t make people true human. The moral, educational, cultural and spiritual needs to be adequately addressed, too. For that, in the field of education and culture, a value-adding vast infrastructure must be in place to constantly build and strengthen the humane, moral and spiritual ingredients of every man and woman. Otherwise, they run the grave risk of moral death.

 

The magic state power

Family, community, mosques, schools and colleges have their invaluable importance as the value-adding institutions. But none of these is equal or superior to state and its powerful infrastructure. State is the most powerful institution on earth that can add ultimate humanising or dehumanising factors to humans. The occupying force of a state can easily undo the influence of other social and religious institutions. Millions of mosques or madrasas are helpless to encounter the influence of the state power. Even mosques and madrasas can be turned into pubs, clubs, stables or fodder stores –as happened in Soviet Russia and China during the communist era. If any state power falls in the hand of evil forces, they can cause unimaginable havoc on earth. Not only can they drop nuclear bombs and turns cities into rubbles, but also can endorse the worst criminals as god in the public life –as happened at the hand Pharaoh and Nimrod. The magic of state power doesn’t end here; it can even approve the most scandalous crimes in the name of religion. It can indoctrinate people even in believing the most unbelievable. Cow, snake or idol worshipping pagan belief is indeed the product of such state-sponsored indoctrination.

 

Such manipulative state power can even turn the societal space more harmful than jungles. The animals never persuade people in worshiping snakes, cows or idols: therefore do not guide people to hellfire. Nor do they promote a tyrant killer like Pharaoh to the label of a god. In fact, the most harmful evil creatures on earth were not born in jungles, rather in states run by the people like Pharaoh, Hitler, Stalin, Bush or Putin. The state institutions then work as the largest evil industry to produce the most murderous people in an industrial scale. Occupying states, colonising countries, running gas chambers and dropping nuclear bombs, cluster bombs, barrel bombs or chemical bombs then become the acceptable norms. Such evil states become the tools for making more devastating wars, World Wars, genocidal massacres, ethnic cleansing and mindless exploitation. The states then work as a massive machine to mould people as cheerleaders or enthusiastic voters even for the worst killers on earth.

 

The task of promoting and protecting moral and spiritual health of humans is so heavy that it can’t be accomplished by some individuals, parties or groups. Nor could be done mere at homes, mosques or madrasas. Islamisation of people is unattainable without full islamisation of the state and its institutions; both must go parallel to each other. Otherwise the state and the people those who run the state go in the reverse direction together. Therefore, nothing can be more important than islamisation of state. Such an extreme sociological cum political necessity has also been emphasized in the holy Qur’an; and was an inseparable part of the prophet’s (peace be upon him) sunnah. Building an Islamic state is indeed the greatest and the most distinctive legacy of Prophet Muhammad (peace be upon him). In fact, the huge success of the early Muslims owes greatly to the contribution of such a powerful Islamic state. Only through such a state, Islam could emerge as the most powerful civilizational force on earth; and within a short span of time, the Muslims could raise a powerful core state to promote Allah Sub’hana wa Ta’la’s agenda both at home and abroad. No other faith or religion, nor even the great prophets like Musa (peace be upon him) or Isa (peace be upon him) could build such a state. As a result, they couldn’t build any civilisation either. For the same reason, Buddha failed too.

 

The highest piety

For building a higher civilisation, it needs inclusive involvement of all the state and non-state actors and the institutions. To accomplish such a highest act of piety, it also needs indispensable inputs from All-knowing Allah Sub’hana wa Ta’la. Such Divine inputs are made available through the revealed Books. And, in such an endeavour of state-building, all the believing men and women need to be fully mobilised and engaged –as happened in the days of prophet (peace be upon him). It is indeed a binding obligation on them. Therefore, for a Muslim, remaining inactive or unengaged is not an option. In fact, success or failure of the ummah in raising such an Islamic state and civilisation depends on the level of people’s involvement. In such an islamising endeavour, the entire state establishment with all of its leaders, institutions and manpower must play the coordinating, mobilising and leadership role. Otherwise, all efforts meet failure. In prophet’s days, not a single believer remained inactive or disengaged from it. Any form of disengagement was known as a marker of disbelief (kufr) or hypocrisy (munafiqat). No other sector demanded such a massive investment of time, energy, wealth and human lives than building the Islamic state; most of the companions needed to sacrifice their life. On the other hand, in absence of Islamic state building endeavour, the people don’t sit idle. They engage in doing the opposites: they fight for the mutual destruction -as happening now in the Muslim World. As a result, instead of moving forward, the people go quickly downhill.

Building hospitals, high ways, farms, fisheries or industries are definitely good deeds. But such economic or welfare works do not add any moral highness to anyone. Nor does it add any guidance to save people from hellfire. But the fate of the mankind is decided elsewhere. It is the Divine state building for the Divine purpose of enjoining the right and eradicating the wrong. The Muslim countries now have thousands of hospitals, high ways, farms, fisheries and industries. They have nuclear bombs, too. But that didn’t help them emerge as a civilizational moral force on earth. Neither did that add an iota of glory to the Muslims on the world stage. The Muslims built 57 national or tribal states, each with a different map and flag. But none of these state has any humanising or islamising role. The islamising or humanising objective of Islam can never be achieved by a national or tribal state; rather such states are fully incompatible with Islam’s core agenda. Such states can’t match with the Vision of Allah Sub’hana wa Ta’la. This is the greatest calamity of the secular, tribal and nationalist states that swarm in the Muslim World. Such a state leads its people to a total failure in the hereafter; it indeed works as a fast moving train on a satanic track to the hellfire. Whereas, the Muslims should set the state-craft on the siratul mustaqeem; only then, the state can help people moving towards paradise. Then, it does the greatest benefit to its citizens. It is indeed the real blessing of an Islamic state. Can any amount of other material or social benefits can match such benefit in the hereafter? Therefore, what else can be the act of highest piety than building an Islamic state? It is awful that such a distinctive difference between an Islamic and a non-Islamic state mostly goes unnoticed by the Muslims due to hostile propaganda of the evil forces!

 

The infrastructure of failure

Civilisation can’t be built on a small patch of tribal or national landscape; it requires a much bigger trans-national and trans-ethnic territory. So, tribalism and nationalism have no place in Islam. Hence, it is a civilizational need to abolish the restrictive tribal, ethnic or national boundaries. So, the early Muslims didn’t delay for a single day in dismantling the tribal, geographical or linguistic walls of separation; they quickly went far beyond the boundary of Arabian Peninsula. But the priority of the leaders of a national and tribal state is different; they search even for the faintest line of divisions among people on tribal and ethnic pretext and fortify the divisions. They totally ignore the Qur’anic decree that such division is forbidden in Islam. Due to such deviant leaders, the Islam’s heart land of the Middle East is divided into more than 20 tribal states. Thus, they have successfully restricted the growth of pan-Islamic world power. In fact, such tribal states stand as the greatest obstacle against the emergence of a united ummah; and work as the perfect recipe for further failure and catastrophe. To continue with the project for destroying the Muslim cities into rubbles, they have forged close coalition with the known enemies of Islam who dismantled the khilafa in the past and mutilated the Muslim heart land into pieces. Therefore, the US, the French, the British and the Russian bomber jets enjoy the full freedom in the sky of the Muslim World to bomb any Muslim city they like. Due to such a narrow and restrictive world view of these tribal rulers and their absolute opportunism, the civilizational growth of the Muslim ummah now meets with a total failure. Although the Muslims could create 57 states, but failed very awfully to build a single core civilizational state. This is the greatest and the ugliest failure of the Muslim ummah. Here lies the core pathology of all political, cultural, ideological and civilizational failure of the Islamic world. And how can one imagine that such a criminal failure of the ummah will ever go unpunished in hereafter?

 

Only by building a true Islamic state, a Muslim can discharge his obligatory mission of enjoining the right and forbidding the wrong. Otherwise, sharia survives only in books –as happened in the case of Divine laws revealed to the prophet Musa (peace be upon him). Therefore, what else could be best good deed than engaging in Islamic state building jihad? The greatest wisdom of the early Muslims lies in the fact that they could clearly understand the crucial importance of an Islamic state. Hence, even in the tiny Muslim community of Arabia, there was no shortage of people to sacrifice their wealth and lives to make it a great success. In fact, except few physically disabled persons, none remained away from the continuous jihad of Islamic state building. This is why the companions of the prophet Muhammad (peace be upon him) are labelled as the best people of the whole human history. It is indeed the holiest deed on earth. Whoever gets killed in the making and defending such a state is called shaheed. And a shaheed has a special place in Islam; they gets direct entry to paradise without facing any accountability in the day of judgement. The Almighty Lord gets so much pleased with their self-sacrificing deed that they are given food and drink even after their death –as promised in the holy Qur’an.

 

The best model

In the holy Qur’an, the prophet Muhammad (peace be upon him) has been labelled as the best model (us’watun hasana) for the whole mankind. His distinctiveness from other prophets lies in his great success as a state and civilisation builder. In annals of human history, there is no shortage people who utter wonderful words on equality, justice, human rights and higher values; but they couldn’t put those words into practice. But Prophet Muhammad (peace be upon) is the only exception. He laid the foundation of a trans-ethnic civilizational state; and framed its judiciary, administration and the welfare system based on equality and justice. So no one was discriminated based on his or her skin colour, race or social identity. He raised Islam not only as a faith, but also as the most powerful civilising force on earth that could mould people’s belief, culture, law and warfare according to the Divine guidance. There exist civilisations like the Western, the Chinese, the Hindu and the Japanese ones; but none of these are based on the Divine guidance. All these civilisations are based on pagan or idiosyncratic notions on the creation of the world, laws, lives, states, societies, caste and others. Since prophet Musa (peace be upon him) or Jesus (peace be upon him) couldn’t build any state, hence the Jews and the Christians stand in darkness vis-à-vis guidance on state building and running its judiciary, warfare or administration. So, like any unguided ignorant human, they invented scores of evil ideologies to find some ways in the darkness. So, the Judo-Christian world could easily be the fertile breeding grounds for racism, slavery, nationalism, fascism, Nazism, capitalism, colonialism, communism, imperialism and other highly toxic ideologies. As a consequence, they could cause horrific havoc on earth by causing wars of occupation, ethnic cleansing, slave trading and mass scale hijacking of non-white people to feed their slave markets. They could also set a new level of cruel barbarity by creating gas chambers, making holocausts, creating World Wars and dropping nuclear bombs. In the name of culture, religious festivals, they could blend the Greek and Roman paganism with their corrupt perception of Christianity and Judaism. In the whole human history, Islam is the only religion that could purge the ancient pagan ignorance from the statecraft, religious practices and culture; and could raise a civilisation based on Divine laws and guidance. Hence, the distinctive superiority of Islamic civilisation does not rest on its grand mosques, minarets, cities, gardens, public baths, dresses, costumes, potteries and arts; rather the most defining features are its Divine laws (sharia), the nourishing cultures, the enlightening education, the ethnic tolerance and the universal cosmopolitanism. They could conquer huge expanses of lands, but unlike others they didn’t cause holocausts or ethnic cleansing for making space exclusively for them. Instead, they preferred remaining religious minorities in the newly conquered lands for hundreds of years –as seen in the Balkan, Spain, Africa and India. 25/10/16

 




মায়ানমারে পরিকল্পিত রোহিঙ্গা নির্মূল

নির্মূল-প্রক্রিয়া পৌঁছেছে চুড়ান্ত পর্যায়ে

রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মায়ানমার সরকারের জিনোসাইড বা গণহত্যাটি কোন সাম্প্রতিক নৃশংসতা নয়। সেটি চলছে তিন দশকের বেশী কাল ধরে, এবং সুপরিকল্পিত এক ব্লু-প্রিন্টের অংশ রূপে। সম্প্রতি সেটি পৌঁছেছে তার চুড়ান্ত পর্যায়ে। বিশ্বের  শক্তিবর্গ এ ঘৃন্যতম জিনোসাইডকে বন্ধ করা দুরে থাক, নিন্দা করতেও ব্যর্থ হয়েছে। সেটিই প্রকাণ্ড ভাবে ধরা পড়েছে গত ২৮ই সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে। সে বৈঠকটি কোনরূপ সিদ্ধান্ত ও মায়ানমারের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব ছাড়াই শেষ হয়েছে। উক্ত বৈঠকে রোহিঙ্গাদের উপর হামলা ও তাদের নির্মূলের জন্য রাশিয়ার প্রতিনিধি মায়ানমারের সেনা চৌকির উপর রোহিঙ্গা আরাকান সালভেশন আর্মির হামলাকে দায়ী করেছে; এবং সমর্থন করেছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত মায়ানমার সরকারের সকল নৃশংসতাকে। সমর্থন জানিয়েছে চীনও। এহেন নব্য ফাসিস্টদের সমর্থন করছে ভারত ও জাপানের মত দেশগুলিও  -গণতন্ত্র নিয়ে যাদের প্রচণ্ড গর্ব। বিশ্বের প্রধান প্রধান শক্তিগুলি যে কতটা হৃদয়হীন, নীতিহীন ও নৈতীকতা শূণ্য -এ হলো তারই প্রমাণ। এরূপ নৈতীক শূণ্যতার কারণেই অতীতে এরা দু’টি বিশ্বযুদ্ধ, ভয়ানক গণহত্যা ও বর্ণবাদী নির্মূল উপহার দিয়েছে।

কোন ব্যক্তির বর্বরতা ও বিবেকহীনতা শুধু তারা কর্মের মধ্যে ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে, অন্যের দুর্বৃত্তি ও বর্বরতাকে সমর্থণ করার মধ্য দিয়েও। তাই মায়ানমার সরকারের নৃশংসক বর্বরতার প্রতি সমর্থনের কারণে রাশিয়া, চীন ও ভারতীয় শাসক মহলের নিজস্ব নৃশংস রূপটিও আর গোপন থাকেনি । তাছাড়া অধিকৃত মুসলিম ভূমিতে তাদের নিজেদের নৃশংসতাটিও কি কম? প্রেসিডেন্ট পুটিনের হাত রক্তাক্ত চেচেন ও দাগিস্তানী মুসলিমদের রক্তে। আশির দশকে আফগানিস্তান এবং ১৯৯৯-২০০০ সালে চেচনিয়ায় প্রচণ্ড ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর রাশিয়ার যুদ্ধ বিমানগুলি এখন হত্যা ও ধ্বংস-যজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে সিরিয়ার শহরগুলিতে। অপরদিকে চীন নিষ্ঠুর বর্বরতা চালাচ্ছে অধিকৃত জিনজিয়াংয়ে উইগুর মুসলিমদের উপর। তাদের মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, ইবাদত-বন্দেগী ও কোরআন শিক্ষার উপরও চাপানো হয়েছে কঠোর বিধি-নিষেধ। বিগত ৭০ বছর যাবৎ কাশ্মীরে চলছে ভারতীয় অধিকৃতি এবং সে সাথে ভারতীয় সেনা বাহিনীর পক্ষ থেকে হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের  যাঁতাকল। কোন অপরাধকে নিন্দা করার জন্য যা অপরিহার্য তা হলো নৈতীক বল। প্রশ্ন হলো, নিজ দেশে যারা মুসলিম-হত্যা ও নির্যাতনের সাথে জড়িত, তারা কি অন্যদেশের -বিশেষ করে মায়ানমার সরকারের জেনোসাইডকে নিন্দা করার নৈতীক বল রাখে? সম্প্রতি বৃহৎ শক্তিবর্গের নৈতীক বলের সে শূণ্যতাটিই প্রকট ভাবে ধরা পড়লো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে। ,

রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলমান কয়েক দশকের নৃশংস নিষ্ঠুরতা্য় তাদের জনসংখ্য দ্রুত কমেছে। ১৯৫২ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ১২ লাখ। (সূত্রঃ জেনোসাইড ইন মায়ানমার, লন্ডনের কুইন মেরী ইউনিভার্সিটির গবেষণা।) ১৯৫২ সাল থেকে ২০১৭ সাল এ দীর্ঘ ৬৫ বছরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ন্যায় প্রতিটি মুসলিম দেশের জনসংখ্যা তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। কিন্তু কি বিস্ময়! বিগত ৬৫ বছরেও রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংখ্যা বাড়েনি, বরং দারুন ভাবে কমছে। ২০১৭ সালে এসে এখন বলা হচ্ছে তাদের সংখ্যা ১.১ মিলিয়ন তথা ১১লাখ। তাদের বিরুদ্ধে সরকার পবরিচালিত নির্মূল প্রক্রিয়া যে কত্টা সফল এ হলো তারই দলিল। নইলে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিশ্চিত ৩৬ লাখে পৌঁছতো। ফল দাঁড়িয়েছে, মুসলিম সংগরিষ্ঠ আরাকান বা রাখাইন এখন বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় পরিণত হয়েছে। জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই এখন বৌদ্ধ। তবে নির্মূল-কর্ম এখন যেরূপ গতি পেয়েছে তাতে অচিরেই একটি আরাকান মুসলিম-শূণ্য এলাকায় পরিণত হবে। রোহিঙ্গা নির্মূল প্রক্রিয়াটি যে শধু গণহত্যার মাধ্যমে চলছে তা নয়। সেটি চলছে আরো কয়েকটি পথে। রোহিঙ্গাদের সংখ্যা যাতে না বাড়ে সে জন্য সরকা্রের পক্ষ থেকে চাপানো হয়েছে বিবাহের উপর নিয়ন্ত্রণ। বিবাহিতদের বাধ্য করা হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণে। অপরাধ হলো, দু’টির অধীক শিশু জন্ম দেয়াকে। সে সাথে বাধ্য করা হচ্ছে দেশত্যাগে। সুদুর সৌদি আরবেই বসবাস করছে দেড় লাখ। তারা সেখানে গিয়েছিল ষাটের দশকে। লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বাস মালয়েশিয়া।

জন্মহার কমানোর সাথে মায়ানমার সরকারের লক্ষ্য হলো মৃত্যুহার বাড়ানো। তাই রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষদের বঞ্চিত করা হচ্ছে চিকিৎসা-সেবা থেকে। মায়ানমারের কোন হাসপাতালে তাদের প্রবেশাধীকার নাই। ফলে তাদের মাঝে মৃত্যুর হার, বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যুর হার, মায়ানমারের অন্যান্য এলাকা থেকে অধীক। হাসপাতালের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখার পাশাপাশি তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে শিক্ষা থেকেও। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা দূরে থাক, রোহিঙ্গা মুসলিমগণ বঞ্চিত হচ্ছে এমন কি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা থেকেও। সম্ভবতঃ তাদের ধারণা, দিন দিন দুর্বল হয়ে নির্মূল হওয়ার পথটি যাদের জন্য সরকারি নির্দিষ্ট তাদের আবার চাকুরি-বাকুরি, শিক্ষা ও চিকিৎসা-সেবার প্রয়োজন কি? লন্ডনের কুইন মেরী ইউনিভার্সিটির গবেষণায় প্রমাণ মেলেছে, আরাকানে মুসলিম নির্মূলকরণ প্রকল্প যেভাবে এ অবধি কার্যকর করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে তা মূলতঃ ৬টি পরিকল্পিত স্তরে। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ফায়ারস্টাইনের মতে প্রতিদেশে এটিই হলো জেনাসাইডের সনাতন পদ্ধতি। ৫টি স্তর পাড়ি দিয়ে মায়ানমারে সেটি পৌঁছেছে এখন সর্বশেষ স্তরে। সে স্তরগুলির বিবরণ হলো নিম্নরূপঃ

 

 

প্রথম স্তর: স্টিগমাটাইজেশন

যে কোন দেশে জেনোসা্‌ইড বা গণনির্মূলকরণ প্রকল্পের এটিই হলো প্রথম ধাপ। এ স্তরটিতে টার্গেট জনগোষ্টিকে নানা ভাবে ডি-হিউম্যানাইজড ও দেশের সকল ব্যর্থতার জন্য বলির পাঠা বানানো হয়। যেমন জার্মানীর সকল পরাজয় ও ব্যর্থতার জন্য হিটলার ইহুদীদের দায়ী করতো। একই অবস্থা মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসিলমদের। তাদের গায়ে ইচ্ছামত সর্বপ্রকার অপবাদ লেপন করা হচ্ছে। তাদেরকে চিত্রিত করা হচ্ছে কালো, কালার, কুৎসিত ও বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারি রূপে।  পথে ঘাটে গরু-ছাগলের গলায় ছুরি চালালে তার বিরুদ্ধে কোন জনপদেই প্রতিবাদ উঠে না। কারণ, যাদের হত্যা করা হচ্ছে তারা তো পশু। তেমনি কাউকে মানব থেকে মানবেতর  স্তরে নামাতে পারলে তাদের নির্মূলের বিরুদ্ধেও কেউ প্রতিবাদ করে না। তারা যে নির্মূলযোগ্য ও হত্যাযোগ্য সেটিই তখন সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। সে কাজটিই অতি পরিকল্পিত ভাবে হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে। অতীতে জার্মান থেকে ইহুদী, আমেরিকা থেকে রেড ইন্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়া থেকে অ্যাবঅরিজিন এবং বসনিয়া থেকে মুসলিমদের নির্মূলের লক্ষ্যে তাদেরকেও এরূপ মানবেতর এক ঘৃণীত জীব রূপে চিত্রিত করা হয়েছিল। ডি-হিউম্যানাইজেশনের এ স্তরটি অতিক্রান্ত হলেই রাজনৈতীক দলের ক্যাডার, দেশের পুলিশ, সেনাসদস্য, সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিচার বিভাগের বিচারকগণও তখন নিজ নিজ ক্ষমতা নিয়ে নির্মূলের কাজে লেগে যায়। ১৯৭১য়ে তেমন একটি জঘন্য প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছিল বাংলাদেশে বসবাসকারি কয়েক লক্ষ অবাঙালী নারী, পুরুষ ও শিশু। ফলে অবাঙালী হত্যা, অবাঙালী নারী ধর্ষণ এবং তাদেরকে নিজ নিজ ঘর থেকে উৎখাত করে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ, রাজনৈতীক নেতাকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে কোন রূপ প্রতিবাদ উঠেনি। গণহত্যার নায়কগণ প্রতিদেশেই এভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগে বিবেকের মৃত্যু ঘটায়। বাংলাদেশে তেমন একটি প্রক্রিয়া এখনও সুপরিকল্পিত ভাবে চলছে তাদের বিরুদ্ধে যারা একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সেটি গভীর হওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে দেয়া রায়কে আরো কঠোরতর করতে বাধ্য হয় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকগণও। বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামপন্থিদের নির্মূলে এ হলো ভারত ও ভারতীয় অর্থে প্রতিপালিত ইসলামের শত্রুপক্ষের অতি সুপরিচিত কৌশল। মায়ানমারে তেমন একটি নির্মূলমুখি পদ্ধতির শিকার হলো রোহিঙ্গা মুসলিমগণ।

 

দ্বিতীয় স্তর: হয়রানি,সহিংসতা ও সন্ত্রাস

যখন কোন সরকার একটি জনগোষ্ঠির নির্মূল চায়, তাদের বিরুদ্ধে নিজেদের কর্মকে শুধু ঘৃণা সৃষ্টির মধ্যে সীমিত রাখে না। সেগুলি আরো সহিংস ও আরো বর্বরতর করে। তখন রাজনৈতীক দলের ক্যাডার, সরকারি প্রতিষ্ঠান সমুহ  ও সরকারি কর্মচারিগণ পরিণত হয় তাদের বিরুদ্ধে নানারূপ হয়রানি, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের প্রচণ্ড হাতিয়ারে। তখন সরকারেরর সহয়তায় সে জনগোষ্ঠির নির্মূলের দাবি নিয়ে শহরে শহরে নির্মূল কমিটি গড়ে উঠে এবং তারা নির্মূলে সহিংস পথেও নামে –যেমনটি একাত্তরে বাংলাদেশে বিহারীদের বিরুদ্ধে নেমেছিল। মায়ানমারে আজ যে বার্মীজ জাতীয়তাবাদীগণ রোহিঙ্গাদের নির্মূলে নেমেছে তারাদের জন্ম ও বেড়ে উঠাটিও মূলত বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের ন্যায় একই রূপ সহিংস চেতনা নিয়ে। ফলে তারা আদর্শিক সহোদর হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের। একারণেই বার্মীজ সরকার যখন রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলি একের পর জ্বালিয়ে দিতে ব্যস্ত, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সেটি নিন্দনীয় গণ্য হয়নি। তিনি সেটিকে নিন্দা করে কোন বিবৃতিও দেননি। বরং নিজের খাদ্যমন্ত্রীকে মায়ানমারে পাঠিয়েছিলেন সেখান থেকে চাউল কিনতে। এবং মায়ানমার সরকারকে প্রতিশ্রুতি দেন, রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষ থেকে কোন সশস্ত্র লড়াই শুরু হলে বা্ংলাদেশের সেনাবাহিনী সেদেশের সরকারের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে লড়বে। মায়ানমার সরকারের এরূপ মুসলিম-নির্মূল নীতির প্রতি গভীর আশির্বাদ রয়েছে ভারত সরকারেরও। সেটি জানাতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ছুটে যান মায়ানমারে। এবং ঘোষণা দেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে সকল নির্মূল কর্মে ভারত সরকার মায়ানমার সরকারের পাশে থাকবে। সম্প্রতি প্রচণ্ড মুসলিম বিদ্বেষী ভারতীয় সংগঠন আর. এস. এস.য়ের নেতাগণও মায়ানমারে ছুটেছিল একই কথা জানাতে।

মায়ানমারে রোহিঙ্গা-নির্মূলকামী সংগঠনগুলোর সংখ্যা অনেক। তবে তাদের মধ্যে প্রধান হলো ‘মা বা থা’ এবং ‘৯৬৯ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট’। রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বলা হোক -তাতেও এসব সংগঠনের প্রচণ্ড আপত্তি। তাদের দাবি, রোহিঙ্গা বলে মায়ানমারে কোন জনগোষ্ঠি নাই। যারা আছে তারা হলো বাংলাদেশ থেকে আগত বাঙালী। অতএব দাবী, তাদের একমাত্র বাঙালীই বলতে হবে এবং বাংলাদেশেই তাদের ফিরে যেতে হবে। যেমন বাংলাদেশের নির্মূল কমিটির দাবি, সকল অবাঙালীদের পাকিস্তানে চলে যেতে হবে। জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুন যখন তার বক্তৃতায় রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বলেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধেও এরা বিক্ষোভ করেছিল। রোহিঙ্গাদের এ ভয়াবহ বিপদ কালে তারা জাতিসংঘের ত্রাণসামগ্রীও রোহিঙ্গা গ্রামে পৌঁছতে বাধা দিচ্ছে। বাধা দিচ্ছে, বিদেশী কোন সাংবাদিককে ঢুকতেও। রোহিঙ্গা সমাস্যার সমাধান খুঁজতে জাতিসংঘের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনান যখন মায়ানমারে যান, তাঁর বিরুদ্ধেও তারা মিছিল করেছিল। মায়ানমারে ১৩০টির বেশী জাতিসত্ত্বা আছে। কিন্তু স্বীকৃতি নাই রোহিঙ্গাদের। শত শত বছর সে দেশে বসবাস করলে কি হবে, আইন করে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছে। চিত্রিত হয়েছে অবৈধ অনুপ্রবেশকারি রূপে। তাদের দাবী, এ অবৈধদের থেকে তাদের বসত ভিটা্, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য, জমি-জমা, চাকুরি-বাকুড়ি  ছিনিয়ে নেয়া হোক। ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সেটি কার্যকরও করা হয়েছে।

তৃতীয় স্তর: আইসোলেশন ও পৃথকীকরণ

জাতিগত নির্মূলের এ হলো তৃতীয় পর্যায়। যতদিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ নির্মূল বা দেশত্যাগে বাধ্য করার সুযোগ সৃষ্টি না করা যায়, ততদিন পর্যন্ত তাদের পলিসি হলো, চিহ্নিত জনগোষ্ঠিকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠি থেকে পৃথক করা। হিটলার সে লক্ষ্যেই ইহুদীর জন্য গড়েছিল কনসেন্ট্রেশন কাম্প। গ্যাস চেম্বার নিয়ে হত্যা করার পূর্ব পর্যন্ত সে ক্যাম্পগুলোর নানা রূপ কষ্ট, অপুষ্টি ও বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর জন্য নিহত হওয়ার জন্য তাদেরকে প্রস্তুত করা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে একই নীতির প্রয়োগ করা হয় অবাঙালীদেরকে বিরুদ্ধে। তাদেরকে নিজ নিজ ঘর-বাড়ী থেকে উঠিয়ে মহম্মদপুরের জেনেভা কাম্পের ন্যায় কনসেন্ট্রেশন কাম্পগুলোতে নিয়ে যায়। তেমনি মিয়ানমারেও রোহিঙ্গাদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে বহু কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। এরূপ নতুন নতুন ক্যাম্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে অথবা বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার জন্য কয়েক বছর পর পরই রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর ঘরবাড়িতে আগুণ দেয়া হয়। এবং সেসব ক্যাম্প ঘিরে পুলিশ বা সেনাবাহিনীর ফাঁড়ি বসানো হয় যাতে সে ক্যাম্পের বন্দিদশা থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমগণ বাইরে আসতে না পারে বা কোথাও গিয়ে আবার যেন কোন আবাদী গড়ে না তুলে।

এরূপ আইসোলেশন বা পৃথকীকরণ হলো মানুষকে শক্তিহীন করার সফল প্রক্রিয়া। সংঘবদ্ধতা ও সমাজবদ্ধতার মধ্যেই একটি জনগোষ্ঠির শক্তি। আইসোলেশন বা পৃথককরণের মধ্য দিয়ে একটি জনগোষ্ঠির পারস্পারিক সংযোগ বিলীন করা হয়। এভাবে তাদের দুর্বল করা হয়। দেশের সামাজিক, রাজনৈতীক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শের অঙ্গণ থেকে তাদেরকে জোরপূর্বক বিচ্ছন্ন করা হয়। একারণে বস্তুবাসী রোহিঙ্গা মুসলিমগণ আজ নেতাশূণ্য ও সংগঠনশূণ্য। কোন মুসলিম সমাজে সংঘবদ্ধতা ও সমাজবদ্ধতা গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলো মসজিদ। এটিই ইসলামের সনাতন সামাজিক ইন্সটিটিউশন। জমিনের উপর এটিই মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিষ্ঠান। সেটি ইসলাম ও মুসলিমের শত্রুদের অজানা নয়। ফলে প্রতিদেশেই ইসলামের শত্রুপক্ষ শুধু রাষ্ট্রের দখলদারিই হাতে নেয় না,  দখলদারি প্রতিষ্ঠা করে এবং পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করে দেশের মসজিদগুলিও। রাশিয়া ও চীনে তাই হাজার হাজার মসজিদকে কম্যুনিষ্টগণ আস্তাবল বানিয়েছিল। একই ভাবে মায়ানমারে শত শত মসজিদকে ধ্বংস করা হয়েছে, অথবা সেগুলির দরজায় তালা লাগানো হয়েছে। মুসলিম নির্মূলকামী ‘মা বা থা’ এবং ‘৯৬৯ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট’এর নেতাগণ মসজিদকে বলে মুসলিমদের দুর্গ। তাই মসজিদকে তারা যেমন নিজেরা ধ্বংস করে, তেমনি সরকারেরর কাছেও দাবী করে সেগুলো দ্রুত বন্ধ করে দেয়ার। কোন চায়ের দোকানে বেশী মুসলিম জড়ো হলে তদন্ত শুরু হয়, সেটি মসজিদ কিনা।

 

চতুর্থ স্তর: পরিকল্পিত ও পর্যায়ক্রমীক দুর্বলীকরণ

রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্মূল করণে যে রোডম্যাপটি হুবহু অনুসরণ করা হচ্ছে তার একটি নৃশংস পর্যায় হলো, টার্গেট করে ক্রমান্বয়ে তাদেরকে দৈহীক, নৈতীক, অর্থনৈতীক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে দুর্বল ও নির্জীব করা। এজন্য তারা যেমন তাদেরকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ঠাসাঠাসী করে জড়ো করে, তেমনি ক্যাম্পে রেখে তাদেরকে আলো-বাতাস, শিক্ষা-দীক্ষা, ধর্মকর্ম, রাজনীতি, সমাজকর্ম ও পরস্পরে মেলামেশার ন্যায় অপরিহার্য বিষয়গুলো থেকেও বঞ্চিত করে। সে সাথে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয় লাগাতর অপমান, অবমাননা, ও নির্যাতন। পরিকল্পিত ভাবে অপুষ্টি, মহামারি ও চিকিৎসাহীনতা তাদের জন্য নিত্য সহচর করা হয়। যেসব রোহিঙ্গাগণ এক সময় স্বচ্ছল গৃহস্থ্য, চাকুরিজীবী বা ব্যবসায়ী ছিল, তাদের ঘর-বাড়ি, দোকান-পাঠ ও চাকুরি-বাকুড়ি কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব বস্তিবাসী করা হয়েছে। যারা এক সময় মসজিদের ইমাম, স্কুল-কলেজের শিক্ষক বা রাজনৈতীক দলের নেতা ছিল তারা এখন নিঃস্ব বস্তিবাসী। তাদের যেমন শহরে প্রবেশাধীকার নেই, তেমনি নেই হাট-বাজার, হাসপাতাল, বিদ্যালয়ে প্রবেশের অধীকার। অধীকার নেই এমনকি মসজিদে যাওয়ার। বস্তির ঘরের আলো-বাতাসহীন স্যাঁত-সেঁতে মেঝেতে রোগাগ্রস্ত দুর্বল দেহ নিয়ে রাত-দিন শুয়ে থাকা ও ধুকে ধুকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া ছাড়া তাদের সামনে কোন বিকল্প পথ খোলা রাখা হয়নি। চাকু চালিয়ে জবাই করা বা বন্দুকের গুলিতে হত্যাই একমাত্র গণহত্যা নয়। গণহত্যার আরেক নৃশংস রূপ হলো এভাবে মৃত্যুর দিকে জোরপূর্বক ঠেলে দেয়া।

 

পঞ্চম স্তর: মূলোৎপাটন

এটি হলো টার্গেট জনগোষ্ঠি নির্মূলের চুড়ান্ত পর্যায়। এ পর্যায়ে শুরু হয় হয় হত্যা ও বলপূর্বক দেশ থেকে বহিস্কারের ন্যায় ভয়ানক নৃশংসতা। মায়ানমারে সেটিই এখন তীব্র রূপ ধারণ করেছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের মূলোৎপাটনের সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই  অর্ধেকের বেশী রোহিঙ্গা মুসলিম গ্রামকে ইতিমধ্যেই মুসলিম শূণ্য করা হয়েছে। গ্রামগুলিতে আগুণ দিয়ে তাদের ঘর-বাড়ির চিহ্নপর্যন্ত বিলুপ্ত করা হয়েছে। শুধু ঘর-বাড়ীই নয়, মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির যা কিছু নিদর্শন -যেমন মসজিদ-মাদ্রাসা, সেগুলিকেও নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে বা হচ্ছে্। বিগত তিন সপ্তাহে ৫ লাখের বেশী রোহিঙ্গা মুসলিমকে মায়ানমার ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেলের ভাষায় এটিই হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুত রিফিউজী-করণের ইতিহাস। যাদেরকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে তাদের ফেরত নেয়া তো দূরের কথা, প্রতিদিন অবশিষ্ঠ রোহিঙ্গাদেরও দেশত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। এখনো যারা ঘর-বাড়ী ছাড়েনি, পরিকল্পিত ভাবে তাদের গ্রামগুলিতে গিয়ে সেনা হামলার ভয় দেখানো হচ্ছে। ফলে তারাও প্রাণ ভয়ে দ্রুত দেশ ছাড়ছে। প্রশ্ন হলো, এই যখন প্রতিবেশীদের আচরণ, তখন সে ভূমিতে রোহিঙ্গা মুসলিমগণ ভবিষ্যতে ফিরে যাওয়ার সাহসই বা পাবে কোত্থেকে? কারণ, কোন দেশে শুধু ঘরবাড়ির নির্মাণই বড় কথা নয়, সন্মান নিয়ে বাঁচার পরিবেশও তো জরুরী। সেটি কি কখনো আবার ফিরে আসবে?  যাদের মন এতটা বিষপূর্ণ তাদের কি সামর্থ থাকে?

 

ষষ্ঠ স্তর: মুসলিম-মূক্ত আরাকান

গণহত্যার এটিই হলো সর্বশেষ স্তর। রোহিঙ্গা মুসলিম নির্মূলের প্রকল্পটি এ স্তরে পৌঁছলে আরকানে যে মুসলিম জনবসতি ছিল, মুসলিম শাসন ও সভ্যতা ছিল, এবং সেখানে যে শত শত মসজিদ ও মাদ্রাসা ছিল -তার কোন আলামতই আর থাকবে না। যেমন নেই সাতশত বছরের অধীক কাল মুসলিম শাসনে থাকা স্পেনে। অথচ মুসলিম শাসনামলে স্পেন ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রভূমি। সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল মুসলিম তাহজিব ও তমুদ্দন। বহু বিখ্যাত মুসলিম আলেম ও মনিষীর জন্ম হয়েছে স্পেনে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় বিদ্যার্জনের লক্ষ্যে ইউরোপের নানা দেশ থেকে ছাত্রগণ তখন স্পেনের শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে ভিড় করতো। অথচ সে দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলিম নারী, পুরুষ, শিশুই শুধু বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, বিলুপ্ত হয়ে গেছে তাদের ঘর-বাড়ি, মসজিদ-মাদ্রাসা ও শিক্ষা-সংস্কৃতিও। মুসলিমদের সে অতীত ইতিহাস খুঁজতে এখন যাদুঘর ও লাইব্রেরীতে যেতে হয়। আরাকানে দ্রুত সেটিই হতে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, বিশ্বের ১.৬ বিলিয়ন মুসলিম কি রোহিঙ্গা মুসলিমদের তেমন একটি বিলুপ্তি-করণ প্রক্রিয়া নীরবে দেখবে? সেরূপ নীরবতা কি কখনো ঈমানের আলামত হতে পারে? ৩/১০/২০১৭