স্বাধীন বঙ্গভূমির ইতিকথা

… কোলকাতার দৈনিক আজকাল ১৯৮৯ সালের ২২, ২৩ ও ২৪শে এপ্রিল বাংলাদেশের ৬টি জেলা নিয়ে হিন্দুদের আলাদা বাসভূমিক ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ প্রতিষ্ঠার ভারতীয় চক্রান্তের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে ৩টি ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশ করে। ষড়যন্ত্রের প্রাথমিক ধারণা লাভের জন্যে এই রিপোর্টই যথেষ্ট। ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ শীর্ষক রঞ্জিত শূর-এর লেখা রিপোর্টটি এইঃ

“… বাংলাদেশের দু’টুকরো করে হিন্দুদের জন্য আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য জোর তৎপরতা চলছে। বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ ২০,০০০ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ গঠনের উদ্যোগ আয়োজন চলছে অনেকদিন ধরে। এতদিন ব্যাপারটা সামান্য কিছু লোকের উদ্ভট চিন্তা বা প্রলাপ বলেই মনে হত। কিন্তু সম্প্রতি দেশী-বিদেশী নানা শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে ব্যাপারটা বেশ দানা বেধে উঠেছে। ইতিমধ্যেই ঘোষিত হয়েছে ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ সরকার। রাষ্ট্রপতি পার্থ সামন্ত। রাজধানী সামন্তনগর (মুক্তি ভবন)। সবুজ ও গৈরিক রঙের মাঝে সূর্যের ছবি নিয়ে নির্দিষ্ট হয়েছে জাতীয় পতাকা। জাতীয় সঙ্গীতঃ ধনধান্যে পুষ্পে ধরা, আমাদের এই বসুন্ধরা। সীমানাঃ উত্তরে পদ্মা, পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে ভারত, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। প্রস্তাবিত সীমানার মধ্যে পড়েছে বাংলাদেশের ছয়টি জেলাঃ খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, বরিশাল এবং পটুয়াখালী। এই ছয়টি জেলা নিয়েই ২৫ মার্চ ১৯৮২ ঘোষিত হয়েছে তথাকথিত ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ রাষ্ট্র। স্বাধীন বঙ্গভূমিকে বাস্তব রূপ দেওয়ার সমস্ত উদ্যোগই চলছে কিন্তু পশ্চিম বঙ্গ থেকে। নেপথ্য নায়করা সবাই জানেন এই রাজ্যেই বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর বিভিন্ন জেলা – ২৪ পরগনা, নদীয়া এবং উত্তর বাংলায় চলছে ব্যাপক তৎপরতা। অভিযোগ, ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত দুই বাংলাদেশী নেতা কাদের (বাঘা) সিদ্দিকী এবং চিত্তরঞ্জন ছুতোর মদত দিচ্ছেন হিন্দু রাষ্ট্রের পক্ষে। প্রবক্তাদের যুক্তি বাংলাদেশে মুসলমানদের শাসন চলছে। হিন্দুদের জীবন ও সম্পত্তি তাদের হাতে নিরাপদ নয়। বিশেষত বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্র ঘোষনার পর ঐ দেশের হিন্দুরা পরাধীন জীবন যাপন করছে। তাই প্রয়োজন হিন্দুদের জন্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র-বঙ্গভূমি।

বঙ্গভূমি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সংগঠক নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘ। ১৯৭৭ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় এই সংগঠনকির জন্ম হয়। জন্ম উপলক্ষে ১৫৯ গরফা মেইন রোডের সভায় নাকি উপস্থিত ছিলেন একজন আইএএস অফিসার অমিতাভ ঘোষ। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডাঃ কালিদাস বৈদ্য (এমবিবিএস ডাক্তার), সুব্রত চট্টোপাধ্যয় (বিলাত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার), নীহারেন্দ্র দত্ত মজুমদার (পশ্চিম বাংলার প্রাক্তন আইনমন্ত্রী) এবং শরৎ চন্দ্র মজুমদার (বাংলাদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী)। অন্য সূত্রের খবর চিত্তরঞ্জন ছুতোরও ঐ সভায় হাজির ছিলেন। ১৭ সেপ্টেম্বর সংস্থা গোলপার্কে সভা করে প্রথম প্রকাশ্যে ‘হোমল্যাণ্ড’ দাবী করে। এরপর মাঝে মধ্যে সভা-সমাবেশ হত। এর মধ্যেই নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘে ভাঙন ধরে। ১৯৭৯ সালে হয় দু’টুকরো। ডাঃ কালিদাস বৈদ্যের নেতৃত্বাধীন নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের ঠিকানাঃ গরফা মেইন রোড। সুব্রত চ্যাটার্জির নেতৃত্বাধীন নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের ঠিকানাঃ ৮০ ধনদেবী মান্না রোড, নারকেলডাঙ্গা। এদের থেকে বেরিয়ে আর একটি অংশ তৈরী করে বঙ্গদেশ মুক্তিপরিষদ। ঠিকানা মছলন্দপুর। আরও একটি অংশ তৈরী করে সংখ্যালঘু কল্যাণ পরিষদ। চলে চিত্ত ছুতোরের ভবানীপুরের বাড়ী থেকে।

পরস্পরের বিরুদ্ধে চাপান উতোরের মধ্যেই ঢিমেতালে চলছিল ‘বঙ্গভূমি’র পক্ষে প্রচার। কিন্তু ১৯৮২ সালে বঙ্গভূমি আন্দোলন একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। ঐ বছরের ২৫শে মার্চ ঘোষিত হয় স্বাধীন বঙ্গভূমি রাষ্ট্র। তৈরী হয় ‘সৈন্য বাহিনী’ বঙ্গসেনা। সৈনাধ্যক্ষ ডাঃ কালিদাস বৈদ্য। সুব্রত চ্যাটার্জীর গ্রুপ ঐ ঘোষণা না মানলেও বঙ্গভূমি দখলের জন্য ঐ বছরেই তৈরী করে ‘অ্যাকশন ফোরাম’ বাংলা লিবারেশন অর্গানাইজেশন (বিএলও)। আরও পরে বঙ্গদেশ মুক্তি পরিষদ তৈরী করে ‘সৈন্য বাহিনী’ লিবারেশন টাইগার্স অব বেঙ্গল (বিএলটি)। নেতা রামেশ্বর পাশোয়ান একজন বিহারী, থাকেন গরফার রামলাল বাজারে। এরপর বিভিন্ন সংগঠন মাঝে মাঝেই বঙ্গভূমি দখলের ডাক দেয়। সীমান্ত অভিযান করে। কিন্তু কখনই ব্যাপারটা এদেশের মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। ’৮৮ এর জুলাই থেকে অবস্থাটা ধীরেধীরে পাল্টাতে শুরু করে। ঐ বছর ২২ জুলাই ‘বঙ্গসেনা’ একটি সম্মেলন করে। এরপরই শুরু হয় একের পর এক কর্মসূচী। সীমান্ত জেলাগুলোতে চলতে থাকে একের পর এক সমাবেশ মিছিল মিটিং। ২৩ নভেম্বর ‘বঙ্গভূমি’ দখলের জন্য বনগাঁ সীমান্ত অভিযানে ৮/১০ হাজার লোক হয়। ২২-২৩ জানুয়ারী বনগাঁ থেকে বঙ্গ ‘সেনা’র মহড়া হয়। ২৪ মার্চ ও ২৫ মার্চ হয় আবার বঙ্গভূমি অভিযান। ৭ এপ্রিল রাজীব গান্ধীর কলকাতা আগমন উপলক্ষে সিধু কান ডহরে বিএলও এক জমায়েতের ডাক দেয়। প্রত্যেকটা কর্মসূচীতে ভাল লোক জড়ো হয়। বাংলাদেশে গেল গেল রব উঠে। এপারের সংবাদ মাধ্যমগুলো এই প্রথম গুরুত্ব সহকারে মনোনিবেশ করে খবর প্রচার করে। দেশে-বিদেশে ‘বঙ্গভূমি’র দাবি এবং দাবিদার নিয়ে কম-বেশী হৈচৈ শুরু হয়। আবার ২২ জুলাই অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছে বঙ্গভূমি দখলের জন্য। কালিদাস বৈদ্যের দাবি ঐ দিন এক লক্ষ লোক জমায়েত হবে।

স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলনের নেপথ্য নায়কদের আসল পরিচয় কি? কি তাদের আসল উদ্দেশ্য? কে এই ‘রাষ্ট্রপতি’ পার্থ সামন্ত? কি ভূমিকা নিচ্ছেন ভারত সরকার? এসব তথ্য জানার জন্য অনুসন্ধান চালাই তাদের কর্মস্থলগুলিতে। দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলি ডাঃ কালিদাস বৈদ্য, সুব্রত চ্যাটার্জী, রামেশ্বর পাশোয়ার, কে পি বিশ্বাস, রাখাল মণ্ডল প্রমুখ নেতাদের সঙ্গে। অনুসন্ধানের সময় বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে চিত্ত ছুতোরের নাম। বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি কিন্তু কিছুতেই দেখা করতে বা কথা বলতে রাজী হননি। এই দীর্ঘ অনুসন্ধানে এটা স্পষ্ট হয়েছে, ‘স্বাধীন’ হিন্দুরাষ্ট্র তৈরীর চেষ্টা আজকের নয়। পঞ্চাশের দশকেই হয়েছিল এর ব্লুপ্রিন্ট। “বঙ্গভূমি ও বঙ্গসেনা” পুস্তিকায় ডাঃ কালিদাস বৈদ্য নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ১৯৫২-তে তাঁরা তিনজন যুবক কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যান এবং ‘সংখ্যালঘুদের মুক্তির জন্য ব্যাপক কর্মতৎপরতা’ চালান। ‘গোপনে স্বাধীনতা ও তার সঙ্গে স্বতন্ত্র বাসভূমির কথাও’ প্রচার করেন। ঐ তিন যুবক হলেন কালিদাস বৈদ্য, চিত্তরঞ্জন ছুতোর এবং নীরদ মজুমদার (মৃত)।

বাংলাদেশে বেশ কিছু কাগজে লেখা হয়েছে “বঙ্গভূমি আন্দোলন ভারতেরই তৈরী”। ৮৮ সালের জুলাই থেকেই বঙ্গভূমি আন্দোলন ধীরে ধীরে দানা বাধতে শুরু করে। এটা কি নেহাৎই কাকতালীয়? ১৯৮২ সালে যখন ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি সরকার’ ঘোষণা করা হয়েছিল, বাংলাদেশের কাগজগুলিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মূল সুর ছিল, ইন্দিরার মদতেই এসব হচ্ছে। সাম্প্রতিক ‘বঙ্গভূমি’ আন্দোলনের পেছনে নাকি ভারত সরকারের হাত আছে।

প্রথম আন্দোলনের মূল হোতা ডাঃ কালিদাস বৈদ্য এবং রহস্যময় চরিত্র চিত্ত ছুতার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এবং বাংলাদেশে বহুকাল ভারতের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টির পিছনেও ছিল তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বস্তুত ভারতীয় এজেন্ট হিসেবেই এই দু’জন এবং নীরদ মজুমদার তৎকালীন পূর্ববঙ্গে গিয়েছিলেন। চিত্তবাবু ওখানে রাজনৈতিকভাবেও বিশেষ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন মূলত তার ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য। সংসদের সদস্যও হয়েছিলেন।

ডাঃ বৈদ্য এতটা পারেননি। পরবর্তীকালে দু’জনের মধ্যে বিরোধও হয়। ডাঃ বৈদ্য ভারত সরকারের সমর্থন হারান। কিন্তু মুজিব সরকারের ওপর প্রভাব খাটাবার জন্য চিত্ত ছুতারকে ভারত সরকার চিরকালই ব্যবহার করেছে। এখনও ভারত সরকারের তরফে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন চিত্তবাবু। অনেকেই বলে, তাঁর সোভিয়েত কানেকশন নাকি প্রবল। চিত্তবাবু ভবানীপুরের রাজেন্দ্র রোডের বিশাল বাড়িতে সপরিবারে অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। কোথা থেকে আসে ঐ টাকা? ভারত সরকার কেন তাকে জামাই আদরে পুষছেন? তার বসতবাড়িটাও দুর্ভেদ্যও। পাহারা দেন বেশকিছু শক্ত সমর্থ যুবক। যারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ করত। বনগাঁ লাইনে ‘বঙ্গভূমি’ সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক প্রচার যে, ঐ বাড়িটাই ‘বঙ্গসেনা’র ঘাঁটি। ভারত সরকারের মদদের আরও প্রমাণ, রাজীব গান্ধীর বিবৃতি। তিনি একাধিকবার বিবৃতি দিয়েছেন যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। বাড়ছে অনুপ্রবেশ। আকাশবাণী থেকেও একাধিকবার প্রচার হয়েছে। যেমন, ১৭ জানুয়ারী ‘বঙ্গভূমি’ পন্থীরা বাংলাদেশ মিশন অভিযান করলে ঐ খবর আকাশবাণী প্রচার করে। ১৮ জানুয়ারী রাজীব গান্ধী অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেন। এছাড়াও বলা যায়, এতদিন ধরে বঙ্গভূমি জিগির চলছে, বারে বারে শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে লোক নিয়ে গিয়ে সীমান্তে গণ্ডগোল ছড়ানো হচ্ছে তীব্র সাম্প্রদায়িক প্রচার চালানো হচ্ছে, ‘সৈন্যবাহিনী’ ঘোষণা করছে, প্রতিবেশী দেশের এলাকা নিয়ে পাল্টা সরকার ঘোষিত হয়েছে – তবুও পুলিশ তাদের কিছু বলে না কেন? সীমান্তে সমাবেশ বা ওপারে ঢোকার চেষ্টা হলে পুলিশ তুলে নিয়ে কয়েকশ’ গজ দূরে ছেড়ে দেয়। নেতাদের গ্রেফতারও করা হয় না। ভারত সরকারের মদদ না থাকলে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে গভীর যোগাযোগ না থাকলে, এটা কি সম্ভব হত?

ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের কথা ডাঃ বৈদ্যও অস্বীকার করেননি। তিনি বলেন, “মদদ নয় প্রশ্রয় দিচ্ছে বলতে পারেন। তবে মদদ দিতেই হবে। আমরা জমি প্রস্তুত করছি’। তিনি বলেন, “আমি ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, কিভাবে রাখছি, কার মাধ্যমে রাখছি বলব না। আমার বক্তব্য ক্রমাগতই তাদের বোঝাবার চেষ্টা করছি। সত্যিই যদি যথেষ্ট লোকজন জড় করতে পারি, তবে ভারত সরকারকে সৈন্যবাহিনী দিয়ে সাহায্য করতেই হবে। আমার একটা সরকার আছে। সৈন্যবাহিনী আছে। ভারতীয় সৈন্যবাহিনী ‘বঙ্গসেনা’ নামেই ঢুকবে বাংলাদেশে। আমরা সেই পরিস্থিতি তৈরী করার চেষ্টা করছি”। কিভাবে?

বঙ্গসেনা, বিএলও, বিএলটি সবার সঙ্গে কথা বলে যা বুঝেছি সেটা এরকমঃ ‘বঙ্গভূমি’ পন্থীরা চান বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক অত্যাচার চালাক। যাতে তারা দলে দলে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে শুরু করে। শরণার্থীদের বোঝা বইতে হবে ভারত সরকারকে। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের হস্তক্ষেপ করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশে ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় বড় শহরে কিছু অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের আরও একটা ইচ্ছা, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগুক, ব্যাপক হিন্দু নিধন হোক, যাতে এদেশের সংখ্যাগুরু হিন্দুদের সেন্টিমেন্টকে খুশী করার জন্য ভারত সরকার হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়।

‘বঙ্গভূমি’র ফেরিওয়ালাদের স্পষ্ট বক্তব্যঃ ভারত সরকারকে বেছে নিতে হবে দু’টোর একটা। তারা দেড় কোটি হিন্দু শরণার্থীর দায়িত্ব নেবেন, নাকি ‘স্বাধীন হিন্দুরাষ্ট্র’ ‘বঙ্গভূমি’ তৈরী করে দেবেন, যে বঙ্গভূমি একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে সিকিমের মত ভারতের অঙ্গরাজ্যে রূপান্তরিত হবে?”

– আবুল আসাদ / একশ’ বছরের রাজনীতি ॥ [ বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি – মে, ২০১৪ । পৃ: ৩২২-৩২৬ ]

 




একাত্তরের গণহত্যা (৯)

যে কাহিনী শুনতে নেই (১৪)

সংগ্রহে: কায় কাউস
================
দিনাজপুর হত্যাকান্ড

০১.
“… জামাল হায়দার তার অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন। মার্চ মাসে তিনি পার্টির নির্দেশে দিনাজপুর ছিলেন। ২৫ মার্চের পর দিনাজপুর ছিল স্বাধীন। সেখানে রাজনৈতিক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল। ছয়জনকে নিয়ে একটা কমিটি গঠিত হয়েছিল, যারা দিনাজপুরের প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সে কমিটিতে ছিলেন হাজী দানেশ (ভাসানী-ন্যাপ), অধ্যাপক ইউসুফ আলী (আওয়ামী লীগ), গুরুদাস তালুকদার (কমিউনিস্ট পার্টি), এস এ বারী (ভাসানী-ন্যাপ), মোস্তফা জামাল হায়দার ও এজেডএম ইউসুফ মোজাফফর (মুসলিম লীগ, পরবর্তীতে ইউপিপি)। দিনাজপুরে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ছে। পরিস্থিতি বেশ ভালই ছিল। এমন সময় সৈয়দপুর থেকে পশ্চাৎপসরণরত বাঙালি সৈন্য ও ইপিআর সদস্যরা দিনাজপুর শহরে চলে এলে উক্ত কমিটি তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। বাঙালি সৈন্যরা উর্দুভাষীদের হত্যা করতে শুরু করে। তখনকার এক মর্মস্পর্শী কাহিনী শুনিয়েছেন জামাল হায়দার।

আমাদেরই দলের এক কিশোর বালুবাড়িতে থাকতো। তাদের প্রতিবেশী ছিল পাঞ্জাবি সেনা অফিসার। তার এক কিশোরী কন্যা ছিল। দু’জন পরস্পরকে চিনতো, হয়তো পরস্পরকে ভালো লাগতো। কিন্তু যাকে বলে প্রেম তেমন কিছু ছিল না।

নদীর পাড়ে দাঁড় করানো হয়েছে পাক সৈন্য ও অবাঙালি পরিবারদের। ইপিআর সদস্যরা তাদের গুলি করে মারবে। বালুবাড়ির সেই কিশোরটি দেখছে, তার প্রতিবেশী পরিবার ও সেই কিশোরী মৃত্যদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্তদের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি ছটফট করছে, হয়তো ভাবছে কোনভাবে বাঁচানো যায় কিনা তার চেনা সেই কিশোরীটিকে। হোক না সে উর্দুভাষী। কিন্তু সে তো কোন অন্যায় করেনি। ভালো লাগার দাবি নিয়ে কি তাকে বাঁচানো যায় না? না, যায় না। এমন পরিবেশে কিছুই করা যায় না। এ যে যুদ্ধ। তবু ছেলেটির মন মানছে না, সে ছটফট করছে।এমন সময় সেই কিশোরী দেখতে পেল উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রতিবেশী কিশোর। মেয়েটি তখন তার নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে আরম্ভ করলো’ — ‘ভাই, মুঝে বাঁচাও, মুঝে বাঁচাও।’ এক পর্যায়ে মেয়েটি উচ্চস্বরে বলে উঠলো, — ‘মুঝে বাঁচাও, ম্যায় তুমকো শাদী করোঙ্গা, মুঝে বাঁচাও।’ কিন্তু কোন আর্ত নিবেদন কোন কাজে আসেনি। অপরদিক থেকে একটি রাইফেলের গুলি মেয়েটির কন্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিল॥”
— হায়দার আকবর খান রনো / শতাব্দী পেরিয়ে ॥ [ তরফদার প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি, ২০০৫ । পৃ: ২৬২-২৬৩ ]

০২.“
… আমরা যারা ছাত্রলীগে ছিলাম তারা স্কুল কলেজগুলোতে ক্যাম্পেইন চালাতাম কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী। ২৫ মার্চের আগে এই এলাকায় বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিলো। এই এলাকার পার্বতীপুর এবং সৈয়দপুরে বিপুলসংখ্যক বিহারী (অবাঙালি মুসলিম) ছিলো। ফুলবাড়ি এবং অন্যান্য স্থানেও বিহারী ছিলো। কিন্তু তারা আইসোলেটেড অবস্থায় ছিলো। আমার কিছু ক্লাসমেটও বিহারী ছিলো। ফুলবাড়ি যেহেতু একটা ছোট এলাকা সেহেতু ঐ সময় বাঙালি বিহারীদের মধ্যে তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে দিনাজপুরে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছিলো। কিন্তু সেগুলোও অতো বড় নয়। খুব একটা লার্জ স্কেলে তেমন ঘটনা ঘটেনি। পার্বতীপুরে সে সময় বাঙালিরা খুব কম যাতায়াত করতো। কিন্তু তারপরও ছোটোখাটো কিছু ঘটনা সেখানে ঘটেছে। তখন বিহারীরা সংগঠিত হচ্ছিলো। বাঙালিরাও সংগঠিত হচ্ছিলো। আমরা সংবাদ পেতাম যে, বিহারীরা মিছিল বের করেছে। তখন বাঙালিরাও তাদের প্রতিরোধ করার জন্য মিছিল নিয়ে বেরিয়েছে। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে মারামারি হয়েছে। একদম শেষের দিকে অর্থাৎ ২৫ মার্চের আগ দিয়ে দিনাজপুরে বাঙালি বিহারী সংঘাত হয়েছে। দিনাজপুর হাউজিংয়ে বিহারীরা বসবাস করতো। সেখানে একটা সংঘাত হয়॥”
— মেজর জেনারেল (অব:) আবু লায়েস মো: ফজলুর রহমান / (সাক্ষাৎকার)
তথ্যসূত্র : দিনাজপুরে মুক্তিযুদ্ধ / সম্পা : মোহাম্মদ সেলিম ॥[ সুবর্ণ – মার্চ, ২০১১ পৃ: ১৫০ ]

০৩.
“… সেই স্মৃতি কিছুটা বেদনাদায়ক। মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন আমাদের এলাকায় বেশ কিছু অবাঙালি বাঙালিদের হাতে নিহত হয়েছিলো, যেটা আমার কাছে অমানবিক বলে মনে হয়েছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের পর্যন্ত যেভাবে মারা হয়েছিলো তা ছিল বেদনাদায়ক। এমন ঘটনাও দেখা গেছে যে, অবাঙালি ইপিআর অফিসারের বউকে গোল পোস্টের বারে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে সাধারণ মানুষকে দেখাবার জন্যে। এই সমস্ত ঘটনা আমার কাছে পৈশাচিক বলে মনে হয়েছিলো। আমাদের ইপিআর-এর সাথে আনসার ও মুজাহিদরা মিলে এই খুন-খারাবিগুলো করেছিলো বলে জানি। আমি তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে বাধা দিতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তারা বলেছিলো, উকিল সাহেব আমাদের রাইফেলটা কিন্তু উল্টো দিকে ঘুরে যেতে পারে, কথা বলবেন না। তখন আমি তাদেরকে কিছু বলিনি। কিন্তু মর্মাহত হয়েছিলাম।

মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের ১২ তারিখের মধ্যে এ সব ঘটনা ঘটেছিলো। দিনাজপুর জেলার গোটাটাতেই ঘটেছে। কিন্তু সব ঘটনা আমি নিজের চোখে দেখিনি। ঠাকুরগাঁওয়ের ঘটনা আমি নিজের চোখে দেখেছি।
ঠাকুরগাঁও শহরের উত্তর পাশে গার্লস স্কুলের পাশে নদী ছিলো। সেই নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে তাদের গুলি করে মারা হতো। অনেকের নাম আমার মনে পড়ে। বিহারী হায়াত আশরাফ ও তার ছেলে। আমাদের বন্ধু আনোয়ার, কমর সলিম, ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার, সাইফুল্লাহ, কুদ্দুস — এদের কেউ কেউ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলো। আর এক খাঁ ও তার ছেলে পেলেরা। তার এক ছেলে অবশ্য বেঁচে আছে।

অবাঙ্গালিদের হত্যার ব্যাপারে ন্যাপ, আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি বা আর যারা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাদের কোনো হাত ছিলো না। প্রকৃতপক্ষে সেই সময় ইপিআর ক্যাম্প থেকে যারা অস্ত্রসহ বেরিয়ে আসলো এবং আনসার ও মুজাহিদ যাদের কাছে রাইফেল ছিলো, গুলি ছিলো, তারাই এ সব কাজ করেছে। তাদের সঙ্গে অবশ্য কিছু দুষ্কৃতিকারীও ছিলো। তাদের উপর প্রকৃতপক্ষে কারোরই নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। কোনো ধরণের নিয়ন্ত্রই ছিলো না। যারা অবাঙ্গালি নিধন করেছিলো — তাদের কয়েকজনের সঙ্গে আমি পরে কথা বলেছি। তাদের ভীতিটা ছিলো এই রকম — পরবর্তীকালে দেশে যদি শান্তি ফিরে আসে এবং সরকার কাজ করে তখন এই অবাঙালিরাই আমাদের চিনিয়ে দেবে যে এরা ইপিআর ছিলো। এরা এই কাজ করেছে। তখন আমাদের কোর্ট মার্শাল হবে। আমরা মারা যাবো।

কমর সলিমের বাড়িতে বহু অবাঙালি আশ্রয় নিয়েছিলো, সেখানে গিয়ে গুলি করে করে হত্যা করা হয় তাদেরকে। পাশবিক অত্যাচার করে গুলি করা হয়েছে এমন ঘটনা আমাদের এলাকায় কম। জেলখানায় কিছু লোক রাখা হয়েছিলো। জেলখানা থেকে বের করে তাদের গুলি করে মারা হয়েছিলো। আমি এবং কমিউনিস্ট পার্টির কামরুল হোসেন আমরা দু’জনেই চেষ্টা করেছিলাম খুন খারাবিটা বন্ধ করতে। কিন্তু তারা বন্ধ তো করেইনি, উল্টো আমাদের ভীতি প্রদর্শন করলো যে, তাদের রাইফেলের নল আমাদের দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। বস্তুত: সে সময় রাজনৈতিক নেতৃত্ব কার্যকর ছিলো না, ছিলো রাইফেলধারীদের নেতৃত্ব। আজ আমার নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়। এই সমস্ত লোককে আমরা আশ্বাস দিয়েছিলাম যে, চিন্তা করো না, কোনো অসুবিধা হবে না। আসলে আমাদেরও ধারণা ছিলো না যে, তাদেরকে এভাবে গুলি করে মারা হবে। আমরা যদি তাদেরকে বলতাম যে, রাতের অন্ধকারে যে যেদিকে পারো পালিয়ে যাও, তাহলেও হয়তো অনেক জীবন রক্ষা পেতো। কিন্তু আমরা তাদের বলেছি চিন্তা করবেন না, আমরা তো আছি। কিন্তু প্রয়োজনের সময় আমরা তাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি। নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে ছিলো না। যার হাতে অস্ত্র তার হাতেই ক্ষমতা। আমি বাধা দিতে গিয়ে বিপদগ্রস্থ হয়েছিলাম। আমরা পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা।

হত্যার সঙ্গে সম্পদ লুন্ঠনের ব্যাপার ছিলো। লুন্ঠনটা কোনো বিশেষ অর্থে কাজ করেছে বলে মনে হয় না। লুন্ঠনটা যে কেবল গুটিকয়েক অস্ত্রধারীরা করেছে তা নয়, বরং আমার জানা মতে, লুন্ঠনটা করেছে সাধারণ মানুষ। গ্রাম-গঞ্জ থেকে লুন্ঠনকারীরা এসে বিভিন্ন জায়গায় তারা লুট করেছে। এ সব আমরা নিজ চোখেই দেখেছি। এরা পলিটিক্যালি মটিভেটেড নয়। তারা কোনো রাজনৈতিক দল বা সেই দলের কোনো অঙ্গসংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলো না। তাদের মূল কাজটাই ছিলো লুট করা। গ্রাম থেকে লোকজন এসে পাগলের মতো সব লুট করেছে। আর আমরা অসহায়ের মতো তা দেখেছি, কিছুই করতে পারিনি। অবাঙালিদের তো বটেই, আমরা যখন চলে গিয়েছি বা যাচ্ছি তখন আমাদেরগুলোও লুট হয়েছে।আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে গেছে

আমার যেটা বেশি করে মনে হয় সেটা হলো — অবাঙালিদের কেউ কেউ আমাদের উপর অনেকটাই নির্ভর করেছিলো। তারা ভেবেছিলো, বিপদের সময় আমরা তাদের সাহায্য করতে পারবো। কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারিনি। এটা আমাকে খুব কষ্ট দেয়। আমরা যখন দেশ ত্যাগ করে চলে যেতে লাগলাম তার আগ পর্যন্ত অবাঙালিদের মারা হয় এবং তাদের সঙ্গে যে গহনা ও টাকা-পয়সা ছিলো সেই সব গহনা ও টাকা-পয়সা কন্ট্রোল রুমে জমা হচ্ছিলো এবং সেটার পরিমাণ ছিলো প্রচুর। সোনাদানা, টাকা সব ট্রাঙ্কে রাখা হচ্ছিলো এবং সার্বক্ষণিক সেখানে পাহারাদার ছিলো। যাদের মারা হচ্ছিলো বিভিন্ন জায়গায় সেখান থেকেই সংগৃহীত অর্থ-সম্পদ কন্ট্রোল রুমে জমা করা হচ্ছিলো। যারা এ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলো তারা কিছু নিয়েছে এ কথা ঠিক। কিন্তু বেশিরভাগই জমা হয়েছিলো কন্ট্রোল রুমে। এক সময় এই জমার পরিমাণটা, সোনা-দানা এবং টাকা-পয়সায় বেশ বড় আকার ধারণ করলো। ঠাকুরগাঁও যখন পতন হতে শুরু করলো তখন কতিপয় নেতা এ সব সম্পদ নিয়ে পালিয়ে গেলো। আমি তাদের নাম বলবো না। আমি নিজ চোখে দেখেছি কারা এ সব নিয়ে গেছে। ঐ সব ব্যক্তিরা কিন্তু ভারতে পালিয়ে গেলেও পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনো অবদান রাখেনি। তারা ঐ সব গয়নাগাটি, টাকা-পয়সা কিভাবে কোথায় রাখবে এইসব নিয়ে ব্যস্তছিলো
এরা কোন দলে সেটা আমার জানা। কারণ ঠাকুরগাঁও ছোট জায়গা। আমি সবাইকে বিশেষভাবে চিনি। কিন্তু আমি তাদের নাম বলবো না। কারণ আমার নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে। কোন্ ব্যক্তি, কোন্ দলের, কারা কারা ব্যাঙ্ক লুট থেকে টাকা নিয়েছে এ সবই আমি জানি।কিন্তু তাদের সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারবো না।
আমাদের এলাকার অবাঙালিরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে তখন — যখন পাকিস্তানিরা ঠাকুরগাঁও দখল করলো। তারা এটা করেছে জিঘাংসা চরিতার্থ করার জন্য। আমি জানি, ঠাকুরগাঁওয়ে এ সময় রাজনৈতিকভাবে এমন কোন অবাঙালী নেতৃত্ব ছিলো না যে, তারা রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তানের পক্ষে বা আমাদের বিপক্ষে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু পরবর্তীকালে পাকিস্তানি আর্মিরা যখন আমাদের এলাকা দখল করে নিলো এবং আমরা আমাদের এলাকা ছেড়ে চলে আসলাম তখন তারা অনেক অন্যায় কাজ করেছে। কেউ অর্থ-সম্পদ লুন্ঠনের জন্য করেছে আবার কেউ প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে করেছে এ কথা আমরা বলতে পারি॥”
— এডভোকেট বলরাম গুহঠাকুরতা / (সাক্ষাৎকার)
তথ্যসূত্র : দিনাজপুরে মুক্তিযুদ্ধ / সম্পা : মোহাম্মদ সেলিম ॥ [ সুবর্ণ – মার্চ, ২০১১ । পৃ: ১৭৯-১৮২ ]

০৪.
“… ১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে দিনাজপুরে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠে। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের উসকানিমূলক ভাষণে বাঙালিদের উত্তেজনা তুঙ্গে পৌঁছে। প্রতিবাদ বিক্ষোভ, সহিংসতা এবং অবাঙালিদের ভয়ভীতি প্রদর্শনে তাদের এ উন্মত্ততার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আওয়ামী লীগের জঙ্গিরা স্থানীয় প্রশাসন অচল করে দেয় এবং তারা ভয়ভীতি প্রদর্শনের রাজত্ব কায়েম করে।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বিদ্রোহ এবং বেসামরিক প্রশাসন অচল করে দেয়ার সাফল্য আওয়ামী লীগকে আরো দুঃসাহসী করে তোলে। তাতে সহিংসতার তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। এসময় অবাঙালিদের ওপর দুর্যোগ নেমে আসে। মার্চের দ্বিতীয় পক্ষকালে এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে দানবীয় শক্তিতে অবাঙালি জনগোষ্ঠীকে উৎখাত করার অভিযান পরিচালনা করা হয়। দিনাজপুর শহরে আওয়ামী লীগের এক মাসের সন্ত্রাসে অবাঙালিদের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৫ থেকে ৩০ হাজার। অন্যদিকে গোটা দিনাজপুর জেলায় অবাঙালিদের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল এক লাখ। কাঞ্চন নদীর তীরে উন্মূক্ত কসাইখানায় হাজার হাজার অবাঙালিকে হত্যা করা হয়। বসত বাড়ির লোকজনকে হত্যা করার পর বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়। জলন্ত বাড়িঘরে লাশশুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করছেন যে, কাঞ্চন নদীতে অসংখ্য লাশ ভাসিয়ে দেয়ায় এবং জলন্ত আগুনে পুড়িয়ে ফেলায় নিহতদের সংখ্যানিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়

২২ মার্চ স্টেনগান ও রাইফেল উঁচিয়ে আওয়ামী লীগ শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি জঙ্গি মিছিলের নেতৃত্ব দেয়। মিছিল থেকে অবাঙালিদের উৎখাতে বাঙালিদের উসকানি দেয়া হয়। ২৫ মার্চ উন্মত্ত জনতা দিনাজপুরের উপকণ্ঠে অবাঙালি মালিকানাধীন একটি বাসে অগ্নিসংযোগ করে। বাসের চালক এবং সাত জন অবাঙালি যাত্রীকে হত্যা করা হয়। একইদিন বাঙালি বিদ্রোহীরা দিনাজপুর-সৈয়দপুর সড়কে পোস্টাল সার্ভিসের একটি ভ্যান ভস্মীভূত করে। ভ্যানের কন্ডাক্টরকে গুলি করে হত্যা এবং চালককে আহত করা হয় । তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি জীপে হামলা চালায় এবং জীপের আরোহী পাঁচ জন সৈন্যকে আহত করে। হাজার হাজার অবাঙালি মহিলা ও শিশুর সঙ্গে পৈশাচিক ও হীন আচরণ করা হয়। পিছু হটা বিদ্রোহীরা চার শ”র বেশি অবাঙালি যুবতী মহিলাকে ভারতে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

১৯৭১ সালে মার্চের শেষ সপ্তাহে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়। অবাঙালি মালিকানাধীন সকল স্টোর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে সহিংসতার বিস্তার ঘটে। ক্ষুদ্ধ, উন্মত ও ক্রুদ্ধ জনতার মিছিল কখনো কখনো ১০ হাজারে পৌঁছতো। জনতা গোটা শহরে মিছিল ও সমাবেশ করতো। এসব সমাবেশে অবাঙালিদের হত্যা এবং ধ্বংসের জন্য শপথ গ্রহণ করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারকে অচল করে দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। মার্চের শেষ সপ্তাহে প্রতি রাতে বিদ্রোহী সৈন্য ও সশস্ত্র বাঙালিদের নিক্ষিপ্ত গুলির আওয়াজ, দোকানের দরজা ও জানালা ভাঙ্গার শব্দ, শ্লোগানের বজ্রধ্বনি এবং লুটপাটের শোরগোল শোনা যেতো। অবাঙালিদের বাড়িঘরে আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলতে দেখা যেতো। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ তাদের জ্বালাময়ী ভাষণে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতেন এবং তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট লুট এবং আগ্নিসংযোগকে বাঙালি দেশপ্রেমের পরিচয় বলে ঘোষণা করতেন। নদী তীরবর্তী কসাইখানাগুলোতে নিষ্ঠুর পৈশাচিকতা প্রদর্শন করা হতো। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈন্যরা অবাঙালি নিধনে স্থাপিত কসাইখানাগুলোতে নিয়োজিত জল্লাদ ও রক্তপিপাসু দানবদের তত্ত্বাবধান করতো।

দিনাজপুরে এক মাসে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ পরিচালিত সন্ত্রাসে এত লোক নিহত হয়েছিল যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এ শহরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর সেখানে জীবিতদের মধ্যে ছিল মাত্র কয়েকজন বৃদ্ধা মহিলা ও শিশু। অবাঙালিদের সমুচিত শিক্ষা দানে গাছের ডগায় বহু লোকের মাথা টানিয়ে রাখা হয়েছিল॥”
— ব্লাড এন্ড টীয়ার্স / কুতুবউদ্দিন আজিজ (মূল: Blood and Tears । অনু: সুশান্ত সাহা) ॥ [ ইউপিপি – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৯৭-৯৮ ]




একাত্তরের গণহত্যা (৮)

 

যে কাহিনী শুনতে নেই (১৩)
================
মোহনগঞ্জ হত্যাকান্ড

সংগ্রহে: কাউ কাউস
——————-
০১.
“… আমার নানাজান দীর্ঘদিনের মুসলিম লীগ কর্মী। তখন শান্তি কমিটির সভাপতি হয়েছেন। নানাজানের শান্তি কমিটিতে যোগ দেবার ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করছি। আমি আমার নানাজানের জন্যে সাফাই গাইছি না। আমার সাফাইয়ের তার প্রয়োজন নেই। তবু সুযোগ যখন পাওয়া গেল বলি। চারদিকে তখন ভয়ঙ্কর দু:সময়। আমার বাবাকে পাকিস্তানী মিলিটারী গুলি করে হত্যা করেছে। নানাজান আমাদের সুদূর বরিশালের গ্রাম থেকে উদ্ধার করে নিজের কাছে নিয়ে এসেছেন। তাও এক দফায় পারেননি। কাজটি করতে হয়েছে দু’বারে। তার অনুপস্থিতিতেই তাকে শান্তি কমিটির সভাপতি করা হল। তিনি না বলতে পারলেন না। না বলা মানেই আমাদের দু’ ভাইয়ের জীবন সংশয়। আমাদের আশ্রয় সুরক্ষিত করার জন্যেই মিলিটারীদের সঙ্গে ভাব রাখা তিনি প্রয়োজন মনে করেছিলেন। তার পরেও আমার মা এবং আমার মামারা নানাজানের এই ব্যাপারটি সমর্থন করতে পারেননি। যদিও নানাজানকে পরামর্শ দিতে কেউ এগিয়ে আসেননি। সেই সাহস তাদের ছিল না। তারা নিজেদের সমর্পন করেছিলেন নিয়তির হাতে।

শান্তি কমিটিতে থাকার কারণে মিলিটারীদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কত মানুষের জীবন তিনি রক্ষা করেছেন সেই ইতিহাস আমি জানি এবং যারা আজ বেঁচে আছেন তারা জানেন। গুলির মুখ থেকে নানাজানের কারণে ফিরে আসা কিছু মানুষই পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যুর কারণ হযে দাঁড়ায়। তাকে মরতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। তার মত অসাধারণ একজন মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মারা গেলেন, এই দু:খ আমার রাখার জায়গা নেই॥”
— হুমায়ুন আহমেদ / আমার আপন আধাঁর ॥ [ প্রতীক প্রকাশন – ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৩ । পৃ: ৮১ ]
০২.
“… বাবার বাড়ি মোহনগঞ্জ পৌছেই আমরা একটা অত্যন্ত খারাপ খবর পেলাম। আমাদের বাড়ির কাছেই মোহনগঞ্জ থানা, সেখানে পাকিস্তান মিলিটারি এসে ঘাঁটি তৈরি করেছে। থানার চারিদিকে গাছপালা কেটে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে, থানা কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা, বালুর বস্তা দিয়ে বাংকার তৈরি হয়েছে। খারাপ খবর সেটি নয়, খারাপ খবরটি হচ্ছে বাবা যখন আমাদের আনতে গিয়েছেন তখন মিলিটারিরা তাকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান তৈরি করে দিয়েছে। বাবা ছিলেন না বলে প্রথমে আরেকজনকে তৈরি করেছিল। সে এলাকা ছেড়ে সপরিবারে পালিয়ে গেছে। এখন বাবা হচ্ছেন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, মিলিটারির হুকুম তিনি এলেই যেন দেখা করতে যান।

বাবা খুব মুষড়ে পড়লেন। মিলিটারি এসেই এই এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব শুরু করেছে, একেবারে বাড়ির পাশে এসে গুলি করে মানুষ মেরে পুকুরে ভাসিয়ে দিয়েছে। দিন দুপুরে মেয়েদের ওপর অত্যাচার। মানুষজনের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, গরু বাছুর ধরে খাওয়ার কথা তো ছেড়েই দিলাম। বাবা বারান্দায় জলচৌকিতে বসে দীর্ঘ সময় ভাবলেন। তার এমনিতে এত বড় পরিবার, তার ওপর শহর থেকে পালিয়ে ছেলেরা তাদের বউ-বাচ্চা নিযে এসেছে। এখন আমিও আমার ছেলেমেয়ে নিয়ে এসেছি, সবাইকে নিয়ে পালিয়ে যাবেন কোথায়, সবাই তো পালিয়ে তার কাছেই এল। পালিয়ে যদি না যান তিনি কী করবেন? মিলিটারিকে বলবেন তিনি এই দায়িত্ব চান না? কী কৈফিয়ত দেবেন?
বাবা কোনো কৈফিয়ত দিতে পারেননি, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেই ভয়াবহ অশুভ শক্তির সামনে পরাভূত হয়ে তাকে শান্তি কমিটির দায়িত্ব নিতে হলো।
সেই অপরাধে ডিসেম্বর মাসের আট তারিখ মুক্তিযোদ্ধার একটি দলের হাতে আমার বাবা (শেখ আবুল হোসেন) এবং তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী আমার ছোট ভাই নজরুল মারা যায়। স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই সময়টি বড় নিষ্করুণ সময়।
আমার দু:খ হয় এই ভেবে যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতার কথা সত্যিকারভাবে যদি একজন মানুষ জানত সেটি হচ্ছে আমার বাবা।

… অসংখ্য মানুষকে বাবা প্রাণে রক্ষা করেছিলেন, সেনাবাহিনীর কাছে গিয়ে তাদের প্রাণ ভিক্ষা করতে গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রকৃত রূপ তিনি যেভাবে দেখেছিলেন, আর কেউ সেটা দেখেনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি তার যে রকম ঘৃণা ছিল আর কারো সম্ভবত সে রকম ছিল না। স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্যায়ে যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সহযোগিতা করেছিল তারা গা ঢাকা দিল। বাবা গা ঢাকা দিলেন না, তিনি তাদের সাথে কোনো সহযোগিতা করেননি, তিনি অসংখ্য মানুষকে প্রাণে বাঁচিয়ে এনেছেন, যাদের প্রাণে বাঁচিয়েছেন তাদের কেউ কেউ মুক্তিবাহিনীতেও যোগ দিয়েছে, তিনি কেন গা ঢাকা দেবেন?
কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পৈশাচিক অত্যাচারের প্রতিশোধের আগুন তবুও তাকে স্পর্শ করেছিল।

আমার বাবা স্বেচ্ছায় শানিত্বাহিনীতে যোগ দেননি, আমাদের সবাইকে নিয়ে পালিয়ে যাবার তার কোনো জায়গা ছিল না, তাই সেনাবাহিনীর অশুভ শক্তির সামনে তাকে সেই কলঙ্কের টীকা পরে থাকতে পরে থাকতে হয়েছিল। তিনি সেনাবাহিনীর সাথে কোনো সহযোগিতা করেননি, বরং অসংখ্য মানুষকে তিনি প্রাণে রক্ষা করেছেন। আমি তাকে কাছ থেকে দেখেছি। তাই জানি যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্যে তার মনে ঘৃণা ছাড়া আর কিছু ছিল না। তাই শুধু আমার বাবার জন্যে রয়েছে আমার বুকভরা ভালোবাসা। কিন্তু যারা স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল তাদের আর কারো জন্যে আমার কোনো ভালোবাসা নেই॥”
— আয়েশা ফয়েজ / জীবন যে রকম ॥ [ সময় – ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ । পৃ: ৭৪-৭৬ ]

০৩.
“… মোহনগঞ্জ থানার প্রভাবশালী দালাল ছিল দৌলতপুর গ্রামের আবুল হোসেন শেখ, নুরুল ইসলাম ও রবিউল্লাহ্। বড় কাশিয়া গ্রামের গোলাম রব্বানী খান পাঠান, সুরুজ আলী পাঠান, ছদ্দু মিয়া, হাবিবুর রহমান সম্রাট, মাহতাব উদ্দিন, আবদুল খালেক, অমজাদ মিয়া। খরম শ্রী গ্রামের আবদুস সাত্তার। দেওথান গ্রামের লাল হোসেন ও ইব্রাহিম। মোহনগঞ্জ থানা মসজিদের তৎকালীন ইমাম সোনামনি খাঁ। মাঘান গ্রামের চাঁন মিয়া, কারী মিয়া। আলোকদিয়া গ্রামের আবদুর রেজ্জাক। মামুদপুর গ্রামের ছুয়াব মিয়া।

মোহনগঞ্জে উপর্যুক্ত দালালদের সহযোগিতায় পাক হানাদার বাহিনী অনেক হত্যাকান্ড ও অগ্নিকান্ড ঘটিয়েছিল। মোহনগঞ্জ থেকে হানাদার বাহিনী পলায়ন করলে অর্থাৎ ৮ ডিসেম্বর বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ কয়েক জন দালাললে পিটিয়ে হত্যা করে। সেদিনের গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিল আবুল হোসেন শেখ, নজরুল শেখ, নুরুশেখ, আবদুল আজিজ, নুরুল ইসলাম, রবিউল্লাহ, গোলাম রাব্বানী খান পাঠান, ছুদ্দু মিয়া, লাল হোসেন, ইব্রাহিম, সোনামদ্দি খাঁ, আবদুস সাত্তার, আশরাফ আলী চৌধুরী। সাধারণ মানুষ নিহত দালালদের লাশ নদীর ঘাটে ফেলে রেখেছিল॥” — আলী আহাম্মদ খান আইয়োব / নেত্রকোণা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ॥[ গতিধারা – এপ্রিল, ২০০৯।পৃ: ১০

     
 

 




একাত্তরের গণহত্যা (৭)

 

যে কাহিনী শুনতে নেই (১২)

সংগ্রহে: কাউ কাউস

=============

“… ২৪শে জানুয়ারী টাঙ্গাইলে অস্ত্র জমা দেবার অনুষ্ঠানে কাদের সিদ্দিকী ঘোষণা করলো “তারা ঐ এলাকায় স্বাধীনতা পরবর্তী আমলে মাত্র ৪ জন দালালকে হত্যা করেছে। আর অবশিষ্ট সবাইকে বিচারের জন্য কর্তৃপক্ষের হাতে সমর্পণ করেছে”। গণতন্ত্রের পূজারী, আইনের শাসনের জন্য আন্দোলনকারী এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এই ঘোষণার জবাব দান প্রসঙ্গে শেখ সাহেব যে ভাষণ দিলেন, তা শান্ত পরিবেশ সৃষ্টির পক্ষে মোটেই সহায়ক ছিল না। তিনি বললেন “ওরে কাদের তুই যদি চারটা না মেরে হাজার মারতিস আমি তোকে কিছুই বলতাম না”। জনতা তার ঐতিহ্য অনুযায়ী ফাঁকা হাতের বিপুল করতালির মধ্যে এই ভাষণকে গ্রহণ করেছিলো।

… জেল অফিসে ছিল অসম্ভব ভিড়। মিরপুর মোহাম্মদপুর থেকে প্রায় আট-নয় শত উর্দূভাষী নাগরিককে বন্দী করে আনা হয়েছে। কাউকে গেটের মধ্যে এবং কাউকে অফিস সংলগ্ন অন্যান্য কামরায় রাখা হয়েছে। প্রায় লোকের শরীরে যখম। তাজা রক্তের প্রলেপ দেহের সর্বাঙ্গে। মনে হলো বন্দী করবার পর প্রচুর মারপিট করা হয়েছে। অফিসে জনৈক সুঠাম দেহী ও সুশ্রী চেহারার ভদ্রলোক প্রবেশ করলে সবাই উঠে দাঁড়ালো। সেই ফ্যান্সীকাট গোঁফওয়ালা দু’জন যুবকও তার কাছে এগিয়ে এসে মুক্তিবাহিনীর সদস্য বলে পরিচয় দিল। কথাবার্তায় জানলাম উনি জেলার। বাস্তব ক্ষেত্রে জেলের হর্তাকর্তা। নাম নির্মল চন্দ্র রায়। মুক্তিবাহিনীর এই সদস্যদের যথেষ্ট ইজ্জত দেখালেন জেলার বাবু। ইতিমধ্যে কয়েকজন সিপাই পাশের কামরা থেকে একজন উর্দূভাষীকে নিয়ে আসলো জেলারের কাছে এবং বললো “এই সেই লোক”। লোকটি বৃদ্ধ, বয়স আশির উর্ধে, সাদা দাড়িতে, ফর্সা চেহারায় ও খুন ঝরা শরীরে তাকে অপূর্ব লাগছিল আমার কাছে। লোকটিকে দেখামাত্র জেলার গোটা কয়েক লাথি মারল। আর সেই সঙ্গে গোঁফওয়ালা যুবক দু’টির মধ্যে একজন বৃদ্ধের শরীরে উপর্যুপরি আঘাত হানতে লাগল। কি অপরাধ ছিলো বৃদ্ধের জানিনা, কেন মারা হলো তাও জানিনা তবে এরূপ মারপিট করবার কোন বিধান ধর্মে বা দেশের আইনে নাই তাই জানি। 

মনের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলছিল, কিন্তু আমিও বৃদ্ধের মত বন্দী। মন দূর অতীতের রুদ্ধ দরজায় ঘা দিল। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হিন্দুদের হাতে মার খেয়ে পঁচিশ বছর আগে আমরা মুক্তির একটি পথ বেছে নিয়েছিলাম। কালের ঘটনা প্রবাহে ‘মুক্তিকে’ অভিশাপ মনে করে ‘দেবতাদের কাছ থেকে বাঙ্গালী হবার ‘বর’ চেয়ে নিয়েছি।’ জাতীয়তাবাদের আগুনে জীবনের পবিত্র মূল্যবোধ, মানবীয় অনুভূতিগুলোকে জ্বালিয়ে ছাই করেছি। আপন পরের পার্থক্য বিস্মৃত হয়েছি, অমৃত ও হলাহলের পার্থক্য ভূলে গেছি। অতীতে নির্মল বাবুরা এই ভাবেই মেরেছেন। কিন্তু অতীতে যা ছিল দোষনীয় বর্তমানে তা নয়। অতীতের মানবিক মূল্যবোধ পরিবর্তন করতে আর সহনশীল মনোভাব গড়তে আমাদের মত সেকেলেদের সময় লাগবে বৈকি! এই দেশে ধর্ম নিরপেক্ষ সমাজ কায়েমের জন্য বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নির্মল বাবুদের পদচারণার মধ্য দিয়েই শুরু হোকনা॥”— সা’দ আহমদ / মুজিবের কারাগারে পৌণে সাতশ দিন। (নিজস্ব – সেপ্টেম্বর, ১৯৯০ । পৃ: ৩৩/৩৮-৩৯)।  

   



একাত্তরের গণহত্যা (৭)

 

যে কাহিনী শুনতে নেই (১১)

সংগ্রহে কায় কাউস

=============

“… একাত্তর নাকি আমাদের জাতির ‘স্যালভেশনের’ মাইলফলক। আর ১৬ই ডিসেম্বর, সে তো আমাদের ‘মহান বিজয়ের’ সিংহদুয়ার। অতএব এখান থেকেই শুরু করা যাক।

 … রানু (প্রয়াত কমরেড রাশিদা) গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলো শহরে পাঞ্জাবী সেনাদের আগমনের আগেই। ২৫শে মার্চের পর পাঞ্জাবী সেনাদের হাতে জান খোয়ানোর চেয়েও বেশি, ইজ্জত খোয়ানোর ভয়ে শহর থেকে সব মেয়েমানুষ দলে দলে গ্রামে পাড়ি জমিয়েছিলো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রানুর দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো ভিন্নতর। আসলে রানু নিজের আজন্মলালিত শহরটিকে ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলো আর দশটি মেয়েমানুষের মতো যতটা না পাঞ্জাবীদের ভয়ে, তার চেয়েও বেশি অন্য এক বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ঐ বিশেষ ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর এ শহরের বাতাস যেনো পাথর হয়ে চেপে বসেছিলো ওর বুকে। 

‘ক্রাকডাউনের’ পর ঢাকা থেকে পাঞ্জাবী সেনাদের আগমনের পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত আমাদের এ মফস্বল শহরটি ছিলো পুরোপুরি মুক্ত এলাকা। বিশেষ করে ২৭-২৮ মার্চে শহরতলী এলাকায় অবস্থিত ইপিআর ক্যাম্পের সব অবাঙালি অফিসার-জওয়ান বউ-বাচ্চা সহকারে খতম হওয়ার পর গোটা শহর তখন পুরোপুরি শত্রুমুক্ত। এক অভাবিত মুক্তির স্বাদে কয়টা দিন শহরের অলিতে গলিতে আর ঘরে ঘরে আপাতমুক্তির আনন্দ-উল্লাসের কী যে জোয়ার বয়েছিল, তা স্বচক্ষে না দেখলে বোঝা যায় না। রানুর মনেও আনন্দ-উল্লাসের হয়তো কমতি ছিলো না।

কিন্তু এরই মাঝে হঠাৎ এক সকালে ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান চেতনা’ হুমড়ি খেয়ে পড়লো শহরের বিহারী কলোনীগুলোর ওপর। হৈ হৈ রৈ রৈ করে রীতিমতো কুরুক্ষেত্র আর লংকাকান্ড চললো পুরো তিন দিন। বিহারী ছেলে, বুড়ো ও নারী-পুরুষের রক্তের স্রোত বয়ে গেলো কলোনীগুলোর ওপর। সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, নিষ্ক্রিয়, অসহায় নারী-পুরুষ-শিশুর ওপর একতরফা হত্যাযজ্ঞ চললো পুরো তিনটে দিন। 

রানু এই চরম লোমহর্ষক বর্বর মুহুর্তেও কাউকে না জানিয়ে একাকী কলোনীতে দৌড়ে গিয়েছিলো। তাহমিনাদের ঘরের আঙীনায় পৌঁছে ওর বাবা-মা’র লাশ দেখে আৎকে উঠলেও সে পিছ-পা হয়নি। প্রিয়তমা বান্ধবীকে উদ্ধারের আশায় অতি দু:সাহসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে তাহমিনাদের ঘরে ঢুকে পড়েছিলো এবং ঢুকেই আর্তচিৎকারে কলোনীর আকাশ প্রকম্পিত করে দিয়েছিলো। রানুর চোখের সামনে এক বীভৎস দৃশ্যের নিস্তব্ধতা। মেঝেতে তাহমিনার লাশ পড়ে আছে চিৎ হয়ে, পরনে ওর একটি সুতোও নেই। রক্তে সারা ঘর ভাসছে।

তার পরদিনই রানু শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যায়। ‘মুক্তিযুদ্ধের’ পুরো ৯টি মাস রানুকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেও আমি ব্যর্থ হই। ওর মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মায় ৭১-এ এই দেশের মাটিতে অসহায় মানুষকে নির্বিচারে হত্যা, অবলা নারীর ওপর বলাৎকার ইত্যকার পাশবিক কার্যকলাপ প্রথম নাকি শুরু করে একশ্রেণীর বাঙালিরাই। রানুকে যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার দায়িত্ব দেয়া যেতো, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিশ্চয়ই শুরু হতো এই কলংকময় অধ্যায় দিয়ে। 

কিন্তু রানু কি সেদিন জানতো, ৭১-এ ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের’ সূচনায় এমন নারকীয় যজ্ঞ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সর্বত্রই চলেছিলো নির্বিচারে। পাঞ্জাবীদের ‘মালাউন’ নিধন এবং বাঙালিদের ‘বিহারী’ নিধন এ দুয়ে মিলে তৈরি হয়েছিলো যে ‘ককটেল’ এবং তারই সাথে দিল্লীর সঞ্জীবনী সুধা পান করে যাত্রা শুরু হয়েছিলো যে ‘মুক্তিযুদ্ধের’, আজকের এই ১৬ই ডিসেম্বরে তো তারই ষোলকলা পূর্ণ হলো॥”— রইসউদ্দিন আরিফ (সাবেক সম্পাদক, পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি) / আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন সমগ্র ॥ [পাঠক সমাবেশ – ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ । পৃ: ১১৯ / ১২৪-১২৫

   



ভাষা আন্দোলন ও ভারতীয় ষড়যন্ত্র

 

ভারত ষড়যন্ত্র ছিল পূর্ব-পাকিস্তান কে পশ্চিম-পাকিস্তান থেকে আলাদা করা। সে ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল ভাষা আন্দোলনে সহায়তা দেয়া। ভাষা আন্দোলনের এই বিষয়টি সর্বপ্রথম জনসম্মুখে আনেন তৎকালে ভারতীয় চর হিসেবে পরিচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন। কিন্তু গণপরিষদের অন্য কোন সদস্য তার এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেননি। বহুজাতি নিয়ে গঠিত পাকিস্তানে এই বক্তব্য সাম্প্রদায়িক বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তার প্রস্তাব নাকচ হয়।অতঃএব এটা বাংলার গণমানুষের দাবী এটা বলা অযৌক্তিক। বাংলার সব মানুষ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিল এটাও সঠিক নয়। ঢাকায় সেসময় প্রচুর ছাত্র উর্দুর পক্ষেও ভূমিকা রেখেছিলো।  বাংলার কোন রাজনৈতিক নেতা বায়ান্নোর আগ পর্যন্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন না। ঢাকা ভার্সিটি ও জগন্নাথ কলেজের (তখন কলেজ ছিল) কিছু ছাত্র ছাড়া এই আন্দোলন কেউ করেনি।

বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনায় নিয়ে আসে তথাকথিত প্রগতিবাদী ইসলামী সংগঠন, সমাজতান্ত্রিক ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষ ইসলামের প্রবক্তা খেলাফতে রব্বানী। তাদেরই কালচারাল উইং তমুদ্দুনে মজলিশ। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরোধী আন্দোলনও তখন জমে উঠে। এই প্রসঙ্গে আবুল কাসেম বলেন, “এদিকে উর্দু সমর্থক আন্দোলন গড়ে উঠে। স্বনামখ্যাত মৌলানা দ্বীন মোহাম্মদ সাহেব প্রমুখকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল্লায় ও মফস্বলের বহুস্থানে উর্দুকে সমর্থন করে বহু সভা করা হয়। এরা কয়েক লাখ দস্তখত যোগাড় করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এক মেমোরেণ্ডাম পেশ করেন। পথেঘাটে ইস্টিমারে এ স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজ চলে। স্বাক্ষর সংগ্রহের পর কয়েকজন নামকরা ব্যক্তি করাচীতে গিয়ে সরকারের কাছে পেশ করে আসেন।”  

যারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে ছিলেন তারা কেউ কিন্তু অবাঙালি ছিলেন না। তাদের যুক্তি হলো পূর্ব পাকিস্তানে যদি বাংলাকে অফিসিয়াল ভাষা করা হয় তবে অন্যান্য অঞ্চল যেমন পাঞ্জাব, সিন্ধ, বেলুচ, কাশ্মীরে তাদের নিজস্ব ভাষা চালু হবে। এক্ষেত্রে বাঙালিদের সেসব অঞ্চলে কাজ করা ও শিক্ষাগ্রহণ করা কঠিন হবে। অন্যদিকে বাংলায় অন্যান্য জাতি গোষ্ঠির পাকিস্তানীরা আসবে না। ফলে দীর্ঘদিনের ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের শোষণের ফলে পিছিয়ে থাকা বাংলা আরো পিছিয়ে যাবে। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় সংহতি বিনষ্ট হবে।

 ১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর করাচিতে একটি শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের সাধারণ ভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর প্রতিবাদে ৬ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। এ সময় পাকিস্তান সেন্ট্রাল পাবলিক সার্ভিস কমিশন কর্তৃক ১৫ ডিসেম্বর এক সার্কুলারে বাংলাকে বাদ দিয়ে ইংরেজি ও উর্দুকে পরীক্ষার বিষয়ভুক্ত করায় তার বিরুদ্ধে অধ্যাপক আবুল কাসেম এক বিবৃতি দেন। আবুল কাসেম এমনভাবে বিবৃতি দেন যেন পাকিস্তানে বাঙালি বাদে আর কোনো জাতি গোষ্ঠী নেই। তার এই অনুচিত বিবৃতি ছাপে নি কোনো পত্রিকা। 

আবুল কাসেম এই বিবৃতি ৩১ ডিসেম্বর ভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদে ছাপার ব্যবস্থা করেন। কলকাতার ঐ পত্রিকা এ বিষয়ে পাকিস্তানের কড়া সমালোচনা করে ও বাঙালি নির্যাতনের অভিযোগ এনে “অবিশ্বাস্য” শিরোনামে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ওই পত্রিকায় কপি ঢাকায় নিয়ে এসে প্রচারণা চালায় তমুদ্দুনে মজলিসের কর্মীরা। এই ঘটনা ঢাকাবাসীর মনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তাদের আগের ধারণা সত্য হয়েছে বলে তারা মনে করেন। নতুন একটি ইসলামী ভাবধারার রাষ্ট্রে ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্যই মুশরিকরা কিছু ছাত্রদের লেলিয়ে দিয়েছে। এরকমটাই ভাবতে থাকেন ঢাকাবাসী। তারা তমুদ্দুনের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান গ্রহণ করেন।  

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রেমহরি বর্মন, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানায়। তারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য ছিলেন। একমাত্র চারজন হিন্দু ছাড়া আর কোনো পূর্ব পাকিস্তানের গণপরিষদ সদস্য এই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেননি। ফরিদপুরের নেতা তমিজুদ্দিন খানের নেতৃত্বে গণপরিষদের সকল বাঙালি নেতা একযোগে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। ঢাকার নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন যে, “পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ চায় রাষ্ট্রভাষা উর্দু হোক, আমরা সবাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতি চাই।” পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান এ প্রস্তাবটিকে পাকিস্তানে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন। উর্দুকে লক্ষ কোটি মুসলমানের ভাষা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কেবলমাত্র উর্দুই হতে পারে”। গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথের সংশোধনী প্রস্তাব ভোটে বাতিল হয়ে যায়।

 

   

 

 




একাত্তরের গণহত্যা (৬)

 

  যে কাহিনী শুনতে নেই (০৪)

একটি সাধারণ গণহত্যা

Kai kaus

০১.

“… পাকবাহিনী পাবনায় তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে — ১১ এপ্রিল এই মর্মে এক খবর পাকশীতে পৌঁছতেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব অবাঙালিদের বাঁচিয়ে রাখা আর নিরাপদ ভাবলেন না। তাই সমস্ত অবাঙালিকে পাকশীর অবাঙালিদের একমাত্র স্কুল, মুসলিম স্কুলে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হ’ল।

সকাল থেকেই প্রায় চার-পাঁচ শত অবাঙালি সমবেত হ’ল মুসলিম স্কুলে (বর্তমানে পাকশী রেলওয়ে কলেজ)। তাদেরকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিলো এই বলে যে, বাইরের গ্রাম থেকে আসা বাঙালিরা যাতে তাদের জান-মালের ক্ষতি করতে না পারে সে জন্য তাদেরকে মুসলিম স্কুলে রেখে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। সেই মিথ্যে আশ্বাসে বিশ্বাস করে এরা দলে দলে এসেছিলো বাঁচার নিশ্চয়তার আশায়। এই অবাঙালিদের অধিকাংশই ছিলো খেটে খাওয়া ছাপোষা মানুষ। অসহযোগ আন্দোলনের ফলে তাদের অনেকেই কাজ না পেয়ে দু’তিনদিন অভুক্ত অবস্থায় ছিলো। দুপুর নাগাদ সকল অবাঙালিকে তিনটি লাইনে দাঁড় করিয়ে নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করা হ’ল। একজন ইপিআর-এর নির্দেশে অবশিষ্ট নারী ও শিশুকে একটি কক্ষে বন্দী করে জানালা দিয়ে পেট্রোল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এর পরই শুরু হয় মুসলিম স্কুলে সমবেত হয়নি, অথচ রেলওয়ে কলোনিতে প্রাণভয়ে আত্মগোপন করে আছে এমন অবশিষ্ট অবাঙালিকে খুঁজে খুঁজে মারার পালা। অবশ্য এ ব্যাপারে প্রতিরোধ বাহিনী বা ইপিআর-রা অংশ নেয়নি। কিছুসংখ্যক সুযোগ সন্ধানী গুন্ডাপান্ডা লুটপাটের আশায় কলোনিতে এ হত্যাকান্ড চালায়।

দুপুর একটার দিকে নঈম সাহেবের বাসায় এইসব দুর্বৃত্ত ঢুকে একে একে সবাইকে গুলি করে। তারা বেরিয়ে যাওয়ার পর ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, সবাই মারা গেছে শুধু একটি শিশু তার রক্তাপ্লুত মায়ের বুকে মাথা রেখে কাঁদছে। এ সময় এমন কিছু অবাঙালিকেও হত্যা করা হয়েছিলো যারা একাত্ম হয়ে গিয়েছিলো বাঙালিদের সাথে। এজাজ নামে একজন অবাঙালি যুবক, যার প্রায় সকল বন্ধুই ছিলো বাঙালি, যে সুন্দর বাংলা বলতে পারত, নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয়ও দিত, মুসলিম স্কুল থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসেও শেষ পর্যন্ত সে বাঁচতে পারেনি। সে তার বন্ধুদের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলো। তাতেও কিছু হয়নি। তার সহপাঠী এক বন্ধুর বুলেটের আঘাতেই তাকে দিতে হয়েছিলো প্রাণ।

বোরহান খাঁ, উর্দু কবি, উত্তরবঙ্গের প্রতিটি ‘মুশায়েরা’য় যিনি কবিতা পাঠ করতেন, সেই আত্মভোলা মানুষটিও সেদিন বাঁচতে পারেনি। মুজিব, যে পড়তো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাকে তার বন্ধুরাই জামে মসজিদের পাশে এনে হত্যা করে॥”

— আবুল কালাম আজাদ / মুক্তিযুদ্ধের কিছু কথা : পাবনা জেলা ॥ [ জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী – জুলাই, ১৯৯১ । পৃ: ২৫ ]

০২.

“… ১১ই এপ্রিল সকালেই পাকশীতে বসবাসরত সকল বিহারিকে পরিবার-পরিজনসহ পাকশীর একমাত্র উর্দু মিডিয়াম মুসলিম হাইস্কুলে সমবেত হওয়ার জন্য নির্দেশ জারি করা হয়। তাদেরকে আশ্বাস দেয়া হয় যে, সকল বিহারির নিরাপত্তার জন্যই এটা করা হচ্ছে এবং এখানে জমায়েত হলে তাদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা হবে। এই আশ্বাসের পর প্রায় চার-পাঁচশ বিহারি নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ এসে অল্পক্ষণের মধ্যেই জমায়েত হয়েছিল মুসলিম স্কুল প্রাঙ্গণে।

এরপর দুপুর নাগাদ নারী ও শিশুদের স্কুলের একটি বড় কক্ষে ঢোকানো হয় এবং অন্যদের তিন-চার লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে ঘরের ভেতরে বন্দি নারী-শিশুদেরও জানালা দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এদিকে এ সময়ে ঈশ্বরদীর দিক থেকে মর্টার ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দ পাকশীর দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসতে শোনা যাচ্ছিল। এ অবস্থায় তড়িঘড়ি করে নিহত বিহারিদের লাশ ট্রাকে করে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে পদ্মা নদীতে ফেলার কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু দুই ট্রাক লাশ এভাবে ফেলার পর পরই মর্টার শেল ও গুলি ছুড়তে ছুড়তে এবং রাস্তার দু’পাশে বাড়িঘর ও দোকানপাটে আগুন লাগাতে লাগাতে পাকিস্তানি বাহিনী পাকশীর কাছাকাছি চলে আসে। সন্ধ্যার আগেই হানাদার বাহিনী পাকশীতে অবস্থান নেয়॥”

— কামাল আহমেদ / ‘৭১ চেতনায় অম্লান ॥ [ র‍্যামন পাবলিশার্স – ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ । পৃ: ৯২-৯৪ ]

০৩.

“… পাকসি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে কেন্দ্র। ১৯৭১ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহের আগে এখানে প্রায় এক হাজার অবাঙালি পরিবার বসবাস করতো। মার্চের শুরুতে আওয়ামী লীগ দৃশ্যত এ শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। পুলিশ, আধা-সামরিক ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও আনসার কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এমন কোনো দিন ছিল না যেদিন মিছিল অথবা সমাবেশের মতো কর্মসূচিগুলোর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ শক্তি প্রদর্শন করেনি।সমাবেশগুলোতে অস্ত্রের সমাবেশ ঘটানো হতো। বেশকিছু অবাঙালি যুবক প্রহৃত হয় এবং অবাঙালিদের দোকানপাট লুট করা হয়।

মার্চের শেষ সপ্তাহ এবং এপ্রিলের শুরুতে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের বিষবাষ্প তুঙ্গে পৌঁছে। রেলওয়ে কলোনিতে বসবাসকারী অবাঙালিরা সন্ত্রাসী হামলার টার্গেট হয়ে দাঁড়ায়। কলোনির বাসিন্দাদের অধিকাংশ ছিল রেলওয়ের কর্মচারী এবং তাদের পরিবার। ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল এ আবাসিক কলোনিতে সর্বাত্বক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। কলোনির প্রায় ২ হাজারের বেশি বাসিন্দাকে হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী শহরের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করার ঠিক পূর্বক্ষণে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

একশো বারোতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৫২ বছরের আবু মোহাম্মদ ছিলেন রেলওয়ের একজন কর্মচারী৷ তিনি রেলওয়ে কলোনিতে বসবাস করতেন। হত্যাযজ্ঞে তার পরিবারের সাত জনকে হত্যা করা হয়। আবু মোহাম্মদকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয় ৷ ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি করাচিতে প্রত্যাবাসন করেন। আবু মোহাম্মদ তার পরিবারের হৃদয়বিদারক হত্যাকান্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন :

“… ১৯৭১ সালে মার্চের শেষ সপ্তাহে আওয়ামী লীগের উগ্রপন্থী ও বাঙালি বিদ্রোহীরা স্টেনগান ও রাইফেল উচিয়ে পাকসি রেলওয়ে স্টেশন এবং রেলওয়ে কর্মচারীদের আবাসিক কলোনি আক্রমণ করে। তারা রেলওয়ের সকল অবাঙালি কর্মচারীকে পাকসি রেলওয়ে প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। সে সময় আমি ছিলাম ডিউটিতে৷ আমার বাম পায়ে একটি বুলেট বিদ্ধ হলে আমি আহত হই। বুলেট বিদ্ধ হয়ে আমি মাটিতে পড়ে যাই এবং মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকি। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। আমার ক্ষতস্থানে তীব্র ব্যথা করছিল। আক্রমণকারীরা বিকালে রেলওয়ে স্টেশন ত্যাগ করে আবাসিক কলোনি আক্রমণ করে৷ আমি মেশিনগানের একটানা গুলির আওয়াজ শুনি। …

আমার কোয়ার্টার ছিল কিছুটা দূরে। পাশে ছিল একটি মসজিদ। আমি এ মসজিদে নামাজ পড়তাম। মধ্যরাতের পর আমি হামাগুড়ি দিয়ে মসজিদে যেতে সক্ষম হই। কোথাও আলোর কোনো চিহ্ন ছিল না। চুপি চুপি মসজিদে প্রবেশ করে অন্ধকারে মসজিদের মেঝেতে মহিলাদের মতো একদল মানুষ দেখতে পেলাম। তাদের অনেকেই ছিল প্রায় বিবস্ত্র।

আমাকে বিদ্রোহীদের একজন মনে করে কে যেন বলে উঠলে, ‘এ নরক যন্ত্রণার চেয়ে আমাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলো।’ ফিসফিস করে আমি আমার পরিচয় দেয়ায় তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এবং কিভাবে বাঙালি বিদ্রোহীরা তাদের পুরুষদের হত্যা, তাদেরকে অপহরণ এবং ধর্ষণ করেছে আমার কাছে তার বিস্তারিত বিবরণ দেয়। তাদের একজন বললো, “মসজিদে নিক্ষেপ করার আগে আমাদের জামা-কাপড় খুলে নেয়া হয় এবং আমাদেরকে একটি স্কুলে নগ্ন অবস্থায় হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অপহরণকারীরা আমাদের সম্ভ্রমহানি করে। গভীর রাতে আমাদেরকে মসজিদে ফেলে দিয়ে যাওয়া হয়। দু’জন মেয়ে পথে পালানোর দুঃসাহস দেখিয়েছিল। তাদের মৃতদেহ মসজিদ প্রাঙ্গণে পড়ে রয়েছে।’ এসব ধর্ষিতা মহিলা ছিল রেলওয়েতে আমার সহকর্মীদের কন্যা অথবা স্ত্রী।…

পরদিন বিদ্রোহীরা পিছু হটে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট পাকসিতে প্রবেশ করে। তারা আমাদের উদ্ধার করে। হাসপাতালে আমার চিকিৎসা করা হয়। হত্যাযজ্ঞে আমার পরিবারের সকল সদস্য নিহত হয়। জীবিত মহিলা ও শিশুদের ঢাকায় একটি ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তর করা হয়।”

একশো তেরোতম সাক্ষীর বিবরণ: 

শামসুজ্জোহা হলেন ১৯৭১ সালে ঈশ্বরদী হত্যাকান্ডের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। ঈশ্বরদী থেকে ৮ মাইল দূরে তিনি এ হত্যাকান্ড প্রত্যক্ষ করেন। হত্যাকান্ড সম্পর্কে তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“… আমার চাচাতো ভাই জামাল মালিক পাকসিতে পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের গার্ড হিসেবে চাকরি করতো। তার ১২ সদস্যের পরিবার বাস করতো রেলওয়ে কলোনির একটি কোয়ার্টারে। ১৯৭১ সালে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে জামাল ও তার পরিবারের সবাই নিহত হয়। কয়েকজন পুরুষকে হত্যা করা হয় কোয়ার্টারে গুলি করে। কয়েকজন বৃদ্ধ, যুবতী, মহিলা ও শিশুসহ বাদবাকিদের একটি স্কুল ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, তাদেরকে সেখানে আশ্রয় দেয়া হবে এবং কোনো ক্ষতি করা হবে না। সেই ভয়াবহ দিনে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলের বিদ্রোহীরা স্কুল প্রাঙ্গণে মেশিনগানের গুলিতে তাদের ঝাঝরা করে দেয়। এ হত্যাকান্ডের এক ঘন্টা আগে আটক যুবতী মহিলাদের বন্দুকের মুখে অন্য একটি স্কুল ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিদ্রোহীরা তাদের শ্লীলতাহানি ঘটায়। পিছু হটার আগে বিদ্রোহীরা এসব ধর্ষিতা যুবতী মহিলার অনেককে একটি মসজিদে ঠেলে দেয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের মুক্ত করে।”

একশো চৌদ্দতম সাক্ষীর বিবরণ: 

১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল পাকসিতে অবাঙালি হত্যাযজ্ঞের সময় ১৫ বছরের মোহাম্মদ কাইয়ুমের পিতামাতা ও বড় বোনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কাইয়ুম সেই উপাখ্যানের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছে:

“…আমরা রেলওয়ে কলোনিতে বসবাস করতাম। খুব ভোরে “জয় বাংলা” শ্লোগান দিয়ে একদল লোক রেলওয়ে কলোনি আক্রমণ করে। তারা আমাদের বাড়ি লুট করে এবং বন্দুকের মুখে আমাদেরকে কলোনি থেকে একটু দূরে একটি পুরনো স্কুল ভবনে নিয়ে যায়। আটককৃতদের মধ্যে ছিল রেলওয়ে কলোনির শত শত পুরুষ, মহিলা ও শিশু। আটককারীরা আমাদেরকে ভুল আশ্বাস দিয়েছিল । তারা বলেছিল, আমাদের জীবন রক্ষা করা হবে।

শেষ বিকালে বন্দুক, রামদা ও বর্শা উচিয়ে আমাদের আটককারীরা সকল বন্দি পুরুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। দু’জন দু’জন করে বন্দি পুরুষদের কম্পাউন্ডের একটি কোণে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাদের চোখের সামনে তাদেরকে প্রথমে রামদা দিয়ে কুপিয়ে পরে গুলি করে হত্যা করা হয়। বন্দুকধারীরা আমার পিতাকে হত্যা করার জন্য টানা হ্যাচড়া করে নিয়ে যাবার সময় আমার মা ও বড় বোন নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। সেই ভয়াবহ দৃশ্য এখনো আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। দু’জন বন্দুকধারী আমার মা ও বড় বোনকে গুলি করে। রাইফেল দিয়ে গুলি করার আগে রামদা দিয়ে আমার পিতার বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়া হয়। আমার সঙ্গে দাঁড়ানো ছিল আমার ৮ বছরের ছোট বোন। ঠিক তখন কয়েকজন পুরুষ বন্দি খালি হাতে আটককারীদের ওপর হামলা চালালে ছুটোছুটি শুরু হয়। …

আমার সামনে ছিল একটি পরিত্যক্ত বাড়ি। বাড়িটির অর্ধেক ছিল ভস্মীভূত। আমি আমার ক্রন্দনরত বোনকে আমার কাঁধে তুলে নেই এবং বাড়িটির দিকে দৌড়ে যাই। রুদ্ধশ্বাসে আমরা ধ্বংসযজ্ঞেপূর্ণ একটি রুমে অগ্নিদগ্ধ একটি তোষকের নিচে লুকাই। আমরা এ ভূতুড়ে বাড়িতে ২৪ ঘণ্টা অবস্থান করি। ক্ষুধা ও পিপাসায় আমার ছোট বোন কান্নাকাটি শুরু করলে আমরা চুপিচুপি নিকটবর্তী একটি মাঠে যাই। সেখানে আমরা পানি পান করি। রাতে আমরা মাঠের শেষ প্রান্তে একটি জঙ্গলে আশ্রয় নেই। আমরা বন্য ফলমূল খেতাম। পাতার বিছানায় ঘুমাতাম। পরদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের উদ্ধার করে। তারা আমাদেরকে ঈশ্বরদী নিয়ে যায়। সেখানে অন্যান্য এতিম শিশুর সঙ্গে আমরা একটি বাড়িতে বাস করতাম। আমি দিনমজুর হিসেবে কাজ করতাম। তাতে আমাদের দু’ভাই বোনের বেশ চলতো। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় বাহিনীর কাছে ঈশ্বরদীর পতন ঘটলে আমরা নতুন করে দুর্ভোগে পড়ি। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে আমরা করাচিতে প্রত্যাবাসন করি॥”

— ব্লাড এন্ড টীয়ার্স / কুতুবউদ্দিন আজিজ (মূল: Blood and Tears । অনু: সুশান্ত সাহা) ॥ [ ইউপিপি – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ১৩৫-১৩৭ ]

 

 




একাত্তরের গণহত্যা (৫)

 যে কাহিনী শুনতে নেই (০১)

 সংগ্রহে: কায় কাউস

================

০১.

“… সুধীর, জানা আছে, নতুন মানুষজনের সঙ্গে আলাপিত হতে ভালবাসে, ভালবাসে পুরানো মানুষদের সঙ্গ-সাক্ষাৎ। তার কোনো তাড়া নেই। ছোটো রাস্তাকে কী করে প্রলম্বিত করা যায়, সেটাই তার লক্ষ্য। খুলনা শহর খুব ছোটো নয়। রিকশায় যেতে যেতে কত গল্পই না সে করে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালীন প্রতিশােধমূলক গণহত্যার খবর, মুক্তিযোদ্ধা নামধারী অনেক সশস্ত্র মানুষের যুদ্ধ এবং পরবর্তীকালীন কার্যকলাপ, অনেক কিছুর খবরই তার ঝোলায় মজুত। সেসব কথা নিরপেক্ষভাবে কোনো লেখক গবেষকের বই পুস্তকে দুর্লভ।

সুধীর সারা দেশ ঘুরে বেড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের আগেও সে পথে প্রান্তরে এ জেলা সে জেলা করত। এখন সে সেইসব অজানা কাহিনি, কথা বলে যাচ্ছে, অবশ্য অন্য লোকের কান বাঁচিয়ে। খুলনার খালিসপুরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা তার কাছেই সবিস্তারে শুনলাম। আগে আরাে একজন একদিন সে কাহিনির আভাস আমাকে দিয়েছিলেন। তিনি একজন সরকারি আমলা। তাঁর নামটা সঙ্গত কারণেই উল্লেখ করা যায় না, যেহেতু স্বপদে না থাকলেও এখনো তিনি জীবিত এবং এদেশে ওদেশে ব্যাপকভাবে পরিচিত। সুধীরের নামটাও সে কারণে পালটেই রেখেছি।

দুজনেই বলেছিল, মুক্তিযুদ্ধ মিটে যাবার পর দেশ স্বাধীন হলে এরকম হত্যাকাণ্ডের কী কিছু প্রয়োজন ছিল? খালিসপুরে নাকি দশ হাজার অবাঙালি বিহারী মুসলমান, নারী, শিশু, বৃদ্ধ, যুবা নির্বিশেষে গণহত্যার বলি হয়েছিল। সরকারি আমলাটি আমার অত্যন্ত এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বন্ধু ছিলেন। তিনি একটা বিশাল হাড় কঙ্কালের স্থূপ আমাকে দেখিয়ে বলেছিলেন, ভাই, হাড় দেখে কিন্তু বাঙালি অবাঙালি বোঝা যায় না। খান সেনা, রাজাকার, আলবদরেরা জঘন্যতম কাজ করেছিল। তারা পাকিস্তানের সহযােগী হয়ে ধ্বংসকাণ্ড চালিয়েছিল তাতে ভুল নেই। কিন্তু কিছু মুক্তিযাদ্ধা? মুক্তিযোদ্ধা বা স্বাধীনতা সংগ্রামী অর্থ কী? তারাও কী ঘাতক, ধর্ষক অথবা সুযোগ সন্ধানী হবে, খান সেনা অথবা তাদের সহযাগীদের মতো? তাহলে আমরা কাকে ঘৃণা করব অথবা ভালোই বা বাসব কাকে? কথাগুলো আমার অবশ্যই সুমানবিক মনে হয়েছিল। শুধু মানবিক বলছি না এ কারণে যে হত্যা এবং ভালোবাসা উভয়ই তঁ মানবিক কর্ম।

 

সুধীর বলেছিল, যারা দেশকে পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য হাতে অস্ত্র নিয়েছিল তারা মধ্যবিত্ত, সাধারণ গৃহস্থদের কিশোর কিশোরীদের যখন দলভুক্ত করে তখন এবং যুদ্ধ পরবর্তীকালে কিছুমাত্র কম যৌন অপরাধ, খুন এবং লুঠতরাজ করেনি। এদের মধ্যের একটা ব্যাপক সংখ্যক মানুষের পরিচয় খুব গৌরবজনক যে ছিল না, যুদ্ধ পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী এক বছরের মধ্যে তার ব্যাপক প্রমাণ আমি খুব ভালোভাবে জেনেছি। এখনো জানছি। কিন্তু এসব কথা নিয়ে কোনো বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশে বা এদেশে যে তেমন নিরপেক্ষ কোনাে লিখিত তথ্য হাজির করেছেন, এমন খবর আমার কাছে নেই।

এমনকী ১৯৭০-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হবার পর আদমজী জুটমিলে যে ব্যাপক অবাঙালি মুসলমানদের কেটে বুড়িগঙ্গায় ভাসানাে হয়েছিল, সে কথাও ওখানকার অনেকেই জানতেন এবং জানেন। তখন তো মিলিটারি হামলা শুরুই হয়নি। সেইসময় হিলিবর্ডার দিয়ে অজস্র অবাঙালি উদ্বাস্তু যখন ভারত ভূখণ্ডে ঢোকার চেষ্টা করছিল, তখন তাদের এদিকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তারা বিজয়ী রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে তাড়া খেয়ে এদিকে আসছিল আবার এদিক থেকে তাড়া খেয়ে যাচ্ছিল ওদিকে। এরা সব বিহারী মুসলমান, যারা দাঙ্গায় অথবা স্বেচ্ছায় ওদেশে থিতু হয়েছিল বা হতে সচেষ্ট ছিল। একথা সত্য, তাদের একটা বড় অংশই বাঙালি বিদ্বেষী ছিল এবং দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের সিংহ ভাগই পশ্চিম পাকিস্তানিদের মতো তাদের কুক্ষিগত ছিল। কিন্তু এটাই বিরােধের অথবা খুনোখুনির একমাত্র কারণ ছিল না। তবে এসব নিয়ে ব্যাপক বিশ্লেষণের স্থান এ আলেখ্য নয়, নিরাপদও নয়। 

উপমহাদেশের তাবৎ রাজনীতিবিদেরাই এ ব্যাপারে সমানভাবে দোষী। যেদিন এসব কথা নিয়ে নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনা সম্ভব হবে তখন অনেক তথ্য তত্ত্বই পালটে যাবে। আপাতত এ আলোচনা বন্ধ করি শুধু একটি কথা বলে, যে, আবেগের দিক দিয়ে ঘটনাটি যত গাঢ় ছিল, কোনো আদর্শের বিচারে তার মাহাত্ম্য সর্বজনের মধ্যে যে ততটা ছিল, এমন বলা মুশকিল। অধুনাকার পরিবস্থা দেখে তার যাথার্থ বােঝা আদৌ কষ্টকর নয়। তবে এ কথাটিও বলি যে এই আলােচনার দ্বারা আমি মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করতে চাইছি না। এটা মুক্তিযুদ্ধের পেছন দিক॥”

— মিহির সেনগুপ্ত / ধানসিদ্ধির পরণকথা ॥ [ দে’জ পাবলিশিং (কলকাতা) – জানুয়ারি, ২০০৮ । পৃ: ২১-২৩ ]

০২.

“… যতদূর মনে পড়ে, ২৭ মার্চ বেলা দুটা নাগাদ আমাদের গেটের বিহারি দারোয়ানরা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লো। তারা আর ডিউটি করতে পারলো না। তারা প্রথমে কয়েকজন অবাঙালি ম্যানেজারের বাসায় গিয়ে আশ্রয় চেয়েছিলো। অবাঙালি ম্যানেজাররা তাদেরকে আমার বাসায় পাঠিয়ে দেন। আমি তাদের ফেরাতে পারলাম না। তাদেরকে আমার বাসায় আশ্রয় দিলাম। সন্ধ্যা নাগাদ আরও সাত-আটজন বিহারি দারোয়ান আমার বাসায় আশ্রয় নেয়। আমি তাদেরকে স্টোররুম, কিচেন এবং ডাইনিংরুম ছেড়ে দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেই। আমি আধঘন্টা পরপর গিয়ে ওদের খোঁজখবর নিতাম। এরা শুধু পানি খেতে চাইতো। বিসমিল্লাহ নামের এক বিহারি দারোয়ান আমার বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলো। আমার খুব প্রিয় দারোয়ান। আমার অনেক বিপদ-আপদে সে সব সময় আমার পাশে থেকেছে। কখনও আমাকে বিপদের মধ্যে ফেলে চলে যায়নি। আমার স্পষ্ট মনে আছে; ওইদিন সন্ধ্যায় একবার বিসমিল্লাহ দারোয়ান তার দুই হাত দিয়ে আমার মুখটা জড়িয়ে ধরে খুব করুণভাবে জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘স্যার , হাম বাঁচে গা তো?’ রাত দুটা পর্যন্ত এদের খবর নিয়েছিলাম। তারপর আর পারিনি। পরদিন ভোরবেলায় এদের খোঁজ নিতে গিয়ে আর এদেরকে পাইনি। জানি না এদের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো। হয়তো এরা পালিয়ে গিয়েছিলো, নয়তো অজ্ঞাতনামা সেই হত্যাকারীদের হাতে এদেরকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিলো।     

… উনত্রিশ মার্চ ভোরবেলায় যখন আমার ফ্ল্যাটে ঢুকি, তখন বারান্দায় দশ-বারোজন লোককে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখেছিলাম। এরা সবাই বিহারি। লেবার কলোনি থেকে কোনরকমে বেঁচে রাতের অন্ধকারে কীভাবে যেন অফিসার্স কলোনিতে ঢুকে পড়েছে। মনে হয়, এদের মধ্যে দুই জন পুরুষ, দুই জন মহিলা এবং বাকিরা এদের ছেলেমেয়ে। এদের চোখের চাহনি আজও ভুলতে পারিনি। বেঁচে থাকার জন্যে, একটু আশ্রয়ের জন্যে করুণ চাহনি। হত্যাকারীরা রাইফেল নিয়ে তখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাড়াতাড়ি বিহারি লোকগুলোকে নিয়ে আমার বাসার পেছনের কিচেন গার্ডেনে গেলাম। টমেটো গাছের জন্যে মাচা করেছিলাম। সেই মাচার নিচে এদেরকে লুকিয়ে রাখলাম। মনে আছে ঘন্টা দুই পরে গিয়ে এদেরকে আর পাইনি। আজও জানি না এদের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো।

উনত্রিশ মার্চ সকালে খবর নিয়ে জানলাম যে, বাঙালি ম্যানেজাররা ও তাদের পরিবারবর্গ সবাই নিরাপদে আছেন। রাতেরবেলায় তাদের কারও কোন ক্ষতি হয়নি। সকাল নয়টার দিকে জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি লুকিয়ে ছিলেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বাসায়। আমার কথা শুনে বেরিয়ে এলেন। সারা রাত ঘুমাননি। চোখ লাল। বললাম, ‘আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়। লেবার কলোনি জনমানবশুন্য। বিহারি সব শেষ। বাঙালিরা নদী পার হয়ে পালিয়েছে। শুধু অফিসাররাই আছি। যে কোন মুহুর্তে আর্মি এসে যেতে পারে। আর্মি এলে আমাদেরকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করবে। চলুন নদী পার হয়ে গ্রামে চলে যাই।’ জেনারেল ম্যানেজার সাহেব বললেন, ‘গ্রামে গেলে গ্রামের লোকেরা আমাদের (অবাঙালিদেরকে) হত্যা করবে। অতএব গ্রামে যাওয়া সমীচীন নয়। তোমরা সবাই এখানে থাকো, যদি আর্মি আসে তবে তাদের হাত থেকে আমি তোমাদেরকে বাঁচাবো।’ ‘না’ বলতে পারলাম না। কথা দিলাম থাকবো। বাইরে চলে এলাম॥”    

— কাজী আনোয়ারুল ইসলাম / আমার একাত্তর ॥ [ অবসর – ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮ । পৃ: ৫৪-৫৫ ]

 




একাত্তরের গণহত্যা-চার

 

যে কাহিনী শুনতে নেই (০৮)

================

চট্টগ্রাম হত্যাকান্ড (০১

Kai Kaus

০১.

“… একটি অভিজ্ঞতা যা আজো আমাকে হানা দেয়। কালুরঘাটের অনুষ্ঠান শেষ করে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছি। দেখলাম একটা গাড়ি আটকানো হয়েছে। ভেতরে একটি অবাঙালি পুরুষ ও একটি বাঙালি মহিলা। সড়কের বিভিন্ন পোস্ট যারা পাহারা দিচ্ছিলেন তারাই আটকেছে।

অবাঙালি পুরুষটিকে মহিলাটির কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হলো। মহিলাটিও কিছুতেই ছাড়বে না তাকে। অনুনয়, বিনয়, পায়ে ধরা সমস্ত কিছুই মহিলাটি করছেন। কিন্তু কোন কিছুতেই কোন ফল হলো না। মহিলাটির শাড়ি ও ব্লাউজ ছিঁড়ে গেল। তাকে জোর করে গাড়িতে তুলে দেয়া হলো। গাড়িটি আবার চলে গেলো উল্টোমুখে। অবাঙালি পুরুষটির হাতে ছিল একটি ব্রিফকেস, সম্ভবত: তার মধ্যে টাকা, গহনা ইত্যাদি থাকলেও থাকতে পারে। পুরুষটিকে নিরাপদে পার করে দিতে বাঙালি হয়েও মহিলাটি এসেছিল, ভেবেছিল সফল হবে।

পুরুষটিকে সামনেই একটি গাছের পেছনে নিয়ে যাওয়া হলো। সড়ক পাহারায় যারা নিযুক্ত ছিলেন, তাদের কাছে তখন রাইফেল না থাকায় রাস্তার পাশের কোন বাসা থেকে একটা ভোঁতা ছুরির মতো কেউ এনে দিয়েছিল। সেই ভোঁতা অস্ত্রটি দিয়ে অবাঙালি লোকটিকে শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে মারা হয়েছিল।

আজো ভাবি, যুদ্ধের সময় মহিলাটি কেনো তার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিল? যুদ্ধের চেয়েও কি তবে প্রেম বড়? মানুষের সাথে মানুষের যে নাড়ির যোগ তা কি আবহমান প্রবাহিত? মানুষে মানুষে নিজেদের মধ্যে যতো যুদ্ধই করুক সবকিছুরই উর্ধ্বে মানুষ ও মনুষ্যত্বই শেষ কথা? তবে কি সব যুদ্ধের লক্ষ্য মানুষ ও মনুষ্যত্বের বিজয় ঘোষণার সমাপ্তির সংগীত?

…আমার লেখা একটি শ্লোগান (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত) “ওরা মানুষ হত্যা করছে, আসুন আমরা আমরা পশু হত্যা করি” সে সময় বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল॥”

— মুস্তফা আনোয়ার (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক) / মুস্তফা আনোয়ার রচনা সমগ্র ॥ [ সম্পাদনা : আব্দুল মান্নান সৈয়দ । ঐতিহ্য – ফেব্রুয়ারী, ২০১০। পৃ: ৩৭০ ]

০২.

“… কর্ণফুলী মিলে বাঙালিরা সকল পশ্চিম পাকিস্তানী ও বিহারীদের ও তাদের পরিবার পরিজনদের একটি ক্লাব হলে নিয়ে যায় ও সেখানে গুলি করে তাদের হত্যা করে। মেজর আনিস সেখনে যান এবং মৃতদেহের স্তুপ দেখতে পান যেখানে কেবলমাত্র একজন নারী ও একটি শিশু বেঁচে ছিল। হতভাগ্যদের সেখানে গণকবর দেয়া হয়। এপ্রিলের শেষ কিংবা মে মাসের প্রথম দিকে আর্মি এভিয়েশনের ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে লে. জেনারেল) আলী কুলি চট্টগ্রাম উড়ে যান। তিনি কর্ণফুলী মিল পরিদর্শন করেন। তখনও সেখানকার দেয়ালে ও সিঁড়িতে মজুত ছিল রক্তের চিহ্নসহ স্পষ্ট খুন খারাবীর আলামত। বিদেশী সংবাদ মাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল মিলে অবাঙালিদের ব্যাপক হত্যাকান্ডের প্রমাণ।

রাজা ত্রিদিব রায় চট্টগ্রামে উভয়পক্ষের বাড়াবাড়ির কথা লিখেছেন। তার এক চাচা ও দু’জন চাচাতো ভাইকে সেনাবাহিনী নিয়ে গেলে তারা আর কখনোই ফিরে আসেনি। “অন্যদিকে রাঙ্গামাটিতে ২৬ মার্চ-এর পর থেকে আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিদ্রোহী পুলিশ সদস্য ও ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদস্যরা বিহারীদের ধরে নিয়ে যেতে শুরু করে…বাঙালিদের এ সব অপকর্মের সাথে যোগ না দেয়ায় তারা পাহাড়িদের হুমকি দিয়ে বলে, ‘বিহারী ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের পর তোমাদের পালা আসবে’।” ত্রিদিব রায় অবাঙালি নারী-পুরুষ ও শিশুদের প্রতি বাঙালিদের হৃদয়বিদারক নৃশংসতা নিয়ে অনেক লিখেছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী ক্যাডাররা মানুষকে বাধ্য করতো তাদের অর্থ ও চাল দেয়ার জন্য এবং সেখানে সেনাবাহিনী পৌঁছলে গ্রামবাসী তাদেরকে মনে করতো রক্ষাকর্তা হিসেবে॥”

— ডেড রেকনিং : ১৯৭১-এর বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি / শর্মিলা বসু (মূল: Dead Reckoning : Memories of the 1971 Bangladesh War । অনু: সুদীপ্ত রায়) ॥ [ হার্স্ট এন্ড কোম্পানী – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৯২ ]

০৩.

“… ১৯৭১ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাঙালি বিদ্রোহে জনবহুল বন্দর নগরী চট্টগ্রামে অবাঙালিদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান সংকটে ১৯৭১ সালের আগস্টে প্রকাশিত পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্রে চট্টগ্রাম ও তার আশপাশের এলাকায় অবাঙালিদের মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল ১৫ হাজারের নিচে। কিন্ত এ বই প্রকাশের প্রয়োজনে গৃহীত শত শত প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য থেকে জানা গেছে যে, ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রাম হত্যাযজ্ঞে ৫০ হাজারের বেশি অবাঙালি নিহত হয়েছে। হাজার হাজার মৃতদেহ কর্ণফুলি নদী ও বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করা হয়। বাঙালি বিদ্রোহীরা এ শহর এবং শহরের উপকণ্ঠে ১৭টি কসাইখানায় বহু নির্দোষ অবাঙালিকে হত্যা ও নির্যাতন করেছিল ৷ এসব নির্যাতিত অবাঙালির লাশ ভস্মীভূত করা হয়।

মনে হচ্ছে বাঙালি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য ছিল ১২ বছরের বেশি সব অবাঙালিকে হত্যা করা। অবাঙালি পুরুষদের হত্যা করার পাশাপাশি ১৯৭১ সালে মার্চের শেষ দিনগুলোতে এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বাঙালি বিদ্রোহীরা বহু নারী ও শিশুকে হত্যা করে। প্রদেশের অন্য যে কোনো জায়গার চেয়ে চট্টগ্রামে অবাঙালি হত্যাকান্ডের ভয়াবহতা ছিল প্রচণ্ড।খুলনা, যশোর, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহ ছিল ব্যতিক্রম।

আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড ঢাকায় বিদ্রোহের সূচনা ঘটানোর ঠিক পরক্ষণে ৩ মার্চ পাহাড়, নদী ও বনভূমি শোভিত নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ নগরীতে অগ্নিকাণ্ড ও মৃত্যুর আগ্নেয়গিরির উদ্‌গীরণ ঘটে। গভীর রাতে আওয়ামী লীগের বন্দুকধারী সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বে উন্মত্ত জনতা শহরে অবাঙালি বসতি আক্রমণ করে এবং হাজার হাজার ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। বিদ্রোহীদের হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ওয়ারলেস কলোনি ও ফিরোজশাহ কলোনি। এককভাবে ফিরোজশাহ কলোনিতে ৭ শত ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং এসব বাড়ির অধিকাংশ পুরুষ, মহিলা ও শিশুকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। অনেকে তাদের জ্বলন্ত ঘরবাড়ি থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু পালিয়ে যাবার সময় পথে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের হাতে তারা নিহত হয়।

নির্বিচার হত্যাকাণ্ড থেকে যে ক’জন বেঁচে গেছে তারা এ নিষ্ঠুরতাকে মর্তের দোযখ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। মুক্তিপণের জন্য অবস্থাপন্ন অবাঙালিদের অপহরণ করা হয়। পরে অপহৃতদের কসাইখানায় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন যে, আওয়ামী লীগের উর্ধ্বতন নেতা এম. আর. সিদ্দিকী ছিলেন এ হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাকারী এবং তিনি চট্টগ্রামে ঘৃণ্য অবাঙালি হত্যাকাণ্ড তত্ত্বাবধান করেছেন। ৩ মার্চ রাতে প্রথম অগ্নিসংযোগের পর শহরের অন্যান্য অবাঙালি বসতিতে হামলা চালাতে বিদ্রোহীদের সাহস বৃদ্ধি পায়। বিদ্রোহীরা রৌফাবাদ, হালিশহর, দোতলা, কালুরঘাট, হামজাবাদ ও পাহাড়তলীতে শত শত অবাঙালি বাড়িঘরে লুটপাট চালায় ও অগ্নিসংযোগ করে। বাড়ি থেকে অপহৃত অবাঙালিদের কসাইখানায় হত্যা করা হয়।

মার্চের প্রথম পক্ষকালে চট্টগ্রাম ও তার আশপাশে অবাঙালি পুরুষদের পর্যায়ক্রমে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তাদের স্বেচ্ছাসেবকদের অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেয়। কিছু অস্ত্র লুট করা হয়েছিল আগ্নেয়াস্ত্রের দোকান ও পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে এবং আরো অস্ত্র এসেছিল ভারত থেকে। আক্রান্ত হওয়া নাগাদ গুলিবর্ষণ না করার জন্য সেনা ও নৌবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। স্থানীয় পুলিশ বাহিনী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। চট্টগ্রামে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। অধিকাংশ কর্মী বাঙালি হওয়ায় অগ্নিনির্বাপক বাহিনী ছিল স্থবির। অগ্নিনির্বাপক গাড়ি জ্বলন্ত বস্তির আগুন নেভাতে যেতে চেষ্টা করে। কিন্ত বের হওয়া মাত্র বিদ্রোহীরা এসব গাড়ি পুড়িয়ে দেয়।

মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে চট্টগ্রামে বিদ্রোহীরা এতটুকু শক্তি সঞ্চয় করে যে, তারা এলাকায় সামরিক বাহিনীকেও চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে। ১৮ মার্চ রাতে সশস্ত্র ব্যক্তিরা প্রতিটি অবাঙালি আবাসিক কলোনিতে হামলা চালায়। হাজার হাজার অবাঙালির জন্য রাতটি ছিল বিভীষিকাময়। বন্দুকধারীরা কোনো প্রশ্ন না করে বাড়িঘরে ঢুকে বাসিন্দাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। কোনো কিছু নড়াচড়া করতে দেখলেই তারা গুলি করতো।

২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’কে আওয়ামী লীগ ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে নামকরণ করে। সেদিন বিদ্রোহীরা তাদের ব্যাপক শক্তিপ্রদর্শন করে। বেশ কয়েকটি জায়গায় পাকিস্তানের পতাকা টুকরো টুকরো করা হয়। রাতে অবাঙালিদের ওপর ফের হামলা হয়। ইপিআর, আনসার ও স্থানীয় পুলিশ বিদ্রোহ করায় আওয়ামী লীগের শক্তি বৃদ্ধি পায়। বিদ্রোহীরা ছিল সুসজ্জিত এবং তাদের গোলাবারুদ সরবরাহের কোনো ঘাটতি ছিল না। ২৫ মার্চ বিদ্রোহীরা চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় সেনা ও নৌবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং শহর অভিমুখী সকল রাস্তা অবরোধ করার চেষ্টা করে। তারা ক্যান্টনমেন্টে সৈন্য ও অস্ত্র পরিবহন রোধে আগ্রাবাদ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যস্ত মহাসড়কে বিরাট বিরাট ব্যারিকেড স্থাপন করে। তারা মূল সড়কে পরিখা খনন করে এবং যানবাহন চলাচল বন্ধে মহাসড়ক বরাবর দগ্ধ ট্রাক ও লরি এবং বিটুমিনের ড্রাম স্তূপ করে রাখে। বিদ্রোহীরা বন্দরে গুদামজাতকৃত গোলাবারুদ লুট করে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যরা বিদ্রোহ করে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়। ২৬ মার্চ ছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটানোর এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের চূড়ান্ত দিন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য গুরুতৃপূর্ণ শহরে পূর্বাহ্নে আঘাত হেনে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ এবং ১ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি বাঙালি বিদ্রোহীর বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে প্রদেশে শক্তি ছিল অপর্যাপ্ত। এজন্য বহু জায়গায় বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকা পুনরুদ্ধারে সেনাবাহিনীর কোথাও কোথাও এক সপ্তাহ থেকে এক মাস সময় লেগেছিল। চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী ক্ষিপ্রগতিতে বন্দর এবং বিমানবন্দরের মতো শহরের কৌশলগত অংশগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল নাগাদ বহু আবাসিক এলাকা সশস্ত্র বন্দুকধারীদের আওতায় থেকে যায়। এ নারকীয় মুহূর্তে হাজার হাজার অবাঙালিকে গণহারে হত্যা করা হয়। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার ছিল চট্টগ্রামে বিদ্রোহীদের অপারেশনাল হেডকোয়ার্টার এবং শহরে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয় ছিল মূল

কসাইখানা। এ কসাইখানায় নির্যাতন করার সেল ও চেম্বার ছিল। নির্যাতনের সেলগুলোতে আটক অবাঙালিদের শরীর থেকে সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত বের করে নেয়া হতো। রক্ত বের করা হয়ে গেলে অবাঙালিদের হত্যা করা হতো। উসমানিয়া গ্লাস ওয়ার্কস, হাফিজ জুট মিল, ইস্পাহানি জুট মিল ও অন্যান্য ফ্যাক্টরি এবং বিবিরহাটে আমিন জুট মিল এবং চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলি পেপার মিলে অবাঙালি কর্মচারী এবং তাদের পরিবারবর্গের হত্যাকাণ্ডে প্রদর্শিত নিষ্ঠুরতা প্রাচীন চীনের অসভ্য হুনদের বর্বরতাকে ছাড়িয়ে যায়। ১৯৭১ সালে মার্চের শেষ ৫ দিন এবং এপ্রিলের গোড়ার দিকে বিদ্রোহীরা এসব জায়গায় অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড চালায়।বিদ্রোহীদের বর্ণবাদী গণহত্যা থেকে খুব কমসংখ্যক অবাঙালি রক্ষা পেয়েছিল।

চট্টগ্রামে গভর্নমেন্ট রেস্ট হাউজের কুখ্যাত কসাইখানায় প্রায় চার হাজার অবাঙালিকে হত্যা করা হয়। তাদের শরীর থেকে রক্ত বের করে নেয়া হয়। বাঙালি ডাক্তাররা তাদের চোখ থেকে কর্ণিয়া তুলে নেয়। তড়িঘড়ি করে খোড়া অগভীর গর্তে এসব লাশ চাপা দেয়া হয়। কারো মধ্যে বেঁচে থাকার ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখা দিলে তার মাথার খুলিতে গুলি করা হতো।

আওয়ামী লীগের জঙ্গিরা মসজিদের কয়েকজন ইমামকে বিহারীদের হত্যা করা বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে ফতোয়া দিতে বাধ্য করে। চট্টগ্রামে ফায়ার ব্রিগেড অফিসের কাছে একটি মসজিদে অর্ধ ডজন অবাঙালিকে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহীরা তাদেরকে বাড়ি থেকে অপহরণ করেছিল। কালুরঘাট শিল্প এলাকায় বাঙালি বিদ্রোহীরা তিন শত মহিলাসহ প্রায় ৫ হাজার অবাঙালিকে জবাই করে। কালুরঘাট হত্যাকাণ্ড থেকে খুব কমসংখ্যক অবাঙালি রক্ষা পেয়েছিল। আটক অবাঙালি মহিলাদের ধর্ষণ করা হয়। কাউকে কাউকে ধর্ষণ করা হয়েছিল প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায়।

হালিশহর, কালুরঘাট ও পাহাড়তলীতেও বর্বর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। এসব এলাকায় বাঙালি বিদ্রোহী সৈন্যরা গোটা বসতির চারদিকে পেট্রোল ও কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারপর অগ্নিকুণ্ড থেকে পালিয়ে যাওয়া অবাঙালিদের হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালে মার্চের শেষ সপ্তাহ এবং এপ্রিলের শুরুতে এই নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে চট্টগ্রাম ও তার আশপাশের এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার অবাঙালি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মৃতদেহগুলো পুড়িয়ে দেয়ায় অথবা নদী কিংবা সাগরে নিক্ষেপ করায় নিহতদের সঠিক সংখ্যা কখনো জানা যাবে না। হিংস্র বিদ্রোহীদের অনেকেই ছিল হিন্দু। এসব হিন্দু বিদ্রোহী মসজিদ ও মুসলমানদের মাজার অপবিত্র এবং পবিত্র কোরআনের কপিতে অগ্নিসংযোগ করে।

এ বইয়ের জন্য গৃহীত সাক্ষাৎকারগলোতে প্রত্যক্ষদর্শীরা এম. আর. সিদ্দিকীকে ‘চট্টগ্রামের কসাই” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তারা অভিযোগ করেছে যে, তার ব্যক্তিগত তত্বাবধানে শহরে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ে কসাইখানায় হত্যাকাণ্ড চালানো হতো। নিরীহ অবাঙালিদের হত্যা করতে তিনি তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, “এই জারজদের হত্যা করো”। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে বিদ্রোহীদের হতাহত সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকায় বাঙালি ডাক্তার রক্ত সরবরাহের আহ্বান জানান। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে এম. আর. সিদ্দিকী কসাইখানায় বন্দি অসহায় অবাঙালিদের শরীর থেকে রক্ত বের করে নিতে তার লোকদের নির্দেশ দেন। এমনকি তিনি পঙ্গু বাঙালি সৈন্যদের দেহে প্রয়োজনীয় অঙ্গ সংযোজনে অবাঙালিদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছেদনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মার্চের শেষ দিনগুলোতে কসাইখানায় স্তুপীকৃত লাশগুলো হয়তো গর্তে পুঁতে ফেলা হয় নয়তো মাটি ও আর্বজনা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চাপ সহ্য করতে না পেরে বিদ্রোহীরা পিছু হটার সময় মসজিদ ও স্কুল ভবনে সমবেত শত শত অসহায় নারী ও শিশুকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে হত্যা করে। চট্টগ্রামে অবাঙালি পুরুষদের পাইকারীহারে হত্যা করার পাশাপাশি কয়েক হাজার অবাঙালি মেয়ে ও তরুণীকে অপহরণ এবং ধর্ষণ করা হয়। কখনো কখনো বাঙালি বিদ্রোহীদের ঘাঁটিগুলোর কাছাকাছি সুরক্ষিত বাড়িগুলোতে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটতো। 

নৈরাজ্যবাদী বিদ্রোহীরা সন্তান অথবা স্বামীকে হত্যা করার অসহনীয় দৃশ্য দেখতে মহিলাদের বাধ্য করতো। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের দানবীয় শাসন থেকে চট্টগ্রামকে মুক্ত করার পর জীবিত অবাঙালিরা তাঁদের বিধ্বস্ত জীবন নতুন করে শুরু করে এবং তাদের ভস্মীভূত ঘরবাড়ি মেরামত করে। তবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ী ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনী পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নেয়ার পর তাদের ভগ্ন জীবন আবার ভেঙ্গে পড়ে। হাজার হাজার অবাঙালি নিহত হয়, অবাঙালি পরিবারগুলোকে তাদের মেরামত করা ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয় এবং জীবিতদের ঠাঁই হয় রেডক্রসের ত্রাণ শিবিরে।

১৯৭১ সালের মে মাসে ৬ জন বিদেশি সাংবাদিক পূর্ব পাকিস্তান সফর করেন। মর্ট রোসেনবাম ছিলেন তাদের একজন। ১৯৭১ সালের ১২ মে ওয়াশিংটনের ইভিনিং স্টারে তার প্রেরিত একটি রিপোর্টে বলা হয়:

“বন্দর নগরী চট্টগ্রামে একটি জুট মিলের বিনোদন ক্লাবে কাপড়ের স্তুপের ভেতর রক্তমাখা একটি পুতুল গড়াগড়ি খাচ্ছিল। এ ক্লাবে বাঙালিরা ১৮০ জন মহিলা ও শিশুকে হত্যা করে। বাঙালিরা দেশপ্রেমের উত্তেজনায় মত্ত হয়ে কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানিকে হত্যা করে। বাঙালি বেসামরিক লোক ও মুক্তি ফৌজ ভারতের বিহার রাজ্য থেকে আগত (ভারতীয় অভিবাসী) বিহারীদের গণহত্যায় লিপ্ত হয় এবং হাটবাজার ও বসতবাড়ি তছনছ করে, ছুরিকাঘাত, গুলিবর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগ করে। কখনো কখনো ধর্ষণ ও লুটপাটেও লিপ্ত হয় ৷”

১৯৭১ সালের ১২ মে আমেরিকান বার্তা সংস্থা এপি প্রেরিত একটি রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াশিংটনের ইভিনিং স্টারে আরো বলা হয়:

“গতকাল গুরুত্বপূর্ণ এ বন্দর নগরী সফরকারী সাংবাদিকরা জানিয়েছেন যে, তারা ব্যাপক গোলা ও গুলিবর্ষণে ক্ষয়ক্ষতির এবং বিদ্রোহীদের হাতে ব্যাপক বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার প্রমাণ দেখতে পেয়েছেন।প্রভাবশালী ইস্পাহানি পরিবারের মালিকানাধীন জুট মিলগুলোতে সাংবাদিকরা মিলের বিনোদন ক্লাবে গত মাসে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের হাতে নিহত ১৫২ জন অবাঙালি মহিলা ও শিশুর গণকবর দেখতে পেয়েছেন।

বুলেটে ক্ষত-বিক্ষত এ ক্লাবের মেঝেতে এখনো রক্তমাখা জামা-কাপড় ও খেলনা পড়ে রয়েছে। দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২৫ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রামে পশ্চিম পাকিস্তানি ও ভারতীয় অভিবাসীদের (১৯৪৭ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বসতি স্থাপনকারী মুসলমান) হত্যা করা হয়েছে।

অধিবাসীরা একটি ভস্মীভূত ডিপার্টমেন্ট ভবন দেখিয়ে বলেছে, সেখানে বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তানের সাড়ে তিন শ’ পাঠানকে হত্যা করেছে।”

১৯৭১ সালের ১০ মে চট্টগ্রাম থেকে ম্যালকম ব্রাউন প্রেরিত নিউইর্য়ক টাইমসে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়:

“সেনাবাহিনী এসে পৌঁছানোর আগে যে সময় বিচ্ছিন্নতাবাদী আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা চট্টগ্রাম নিয়ন্ত্রণ করছিল তখন ভারত থেকে আগত বিহারী অভিবাসীদের তুলনামূলক সমৃদ্ধিতে দৃশ্যত ঈর্ষান্বিত বাঙালি শ্রমিকরা ব্যাপক সংখ্যায় বিহারীদের হত্যা করে।”

১৯৭১ সালে এপ্রিলের প্রথম পক্ষকালে লন্ডনের সানডে টাইমসের পাকিস্তানি প্রতিনিধি এন্থনি মাসকারেনহাস পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্রোহ কবলিত এলাকা সফর করেন। ১৯৭১ সালের ২ মে সানডে টাইমসে মাসকারেনহাস প্রেরিত এক রিপোর্টে বলা হয়:

“চট্টগ্রামে মিলিটারি একাডেমির কর্নেল কমান্ডিংকে হত্যা করা হয়। এসময় তার আট মাসের অন্তঃসত্তা স্ত্রীকে ধর্ষণ করে তলপেটে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রামের আরেকটি অংশে জীবন্ত অবস্থায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের একজন অফিসারের চামড়া ছিলে ফেলা হয়। তার দু’পুত্রের শিরচ্ছেদ করা হয়। তার স্ত্রীর তলপেটে বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করে তার উন্মুক্ত শরীরের ওপর পুত্রদের মাথা রেখে যাওয়া হয়। বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো বাঁশ দিয়ে জরায়ু বিদীর্ণ বহু যুবতী মেয়ের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়।

চট্টগ্রাম এবং খুলনা ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর। সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানিরা সমবেত হয়েছিল।”

১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল ডারহামের ডার্লিংটনের নর্দার্ন ইকো’তে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়:

“আমেরিকান সহায়তা প্রকল্পে কর্মরত মার্কিন প্রকৌশলী লিও লামন্সডেন বলেছেন যে, গত সপ্তাহে সেনাবাহিনী এগিয়ে আসার আগে দু”সপ্তাহ পর্যত্ত বাঙালি অধ্যুষিত চট্টগ্রামে বন্দর এলাকায় আতঙ্কিত পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভিড় ছিল।”

১৯৭১ সালে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস কবলিত চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৫ হাজার অবাঙালি করাচি এসে পৌঁছে। এসব অবাঙালি শরণার্থী অবাঙালিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় বাঙালিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা প্রতিরোধে পশ্চিম পাকিস্তানি পত্রপত্রিকায় তাদের বর্ণনা প্রকাশের ওপর বিধি নিষেধ আরোপ করে।

 

ত্রিশতম সাক্ষীর বিবরণ:

৪০ বছরের মোহাম্মদ ইসরাইল চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ইস্পাহানি নিউ কলোনির ২৮ নম্বর কোয়ার্টারে বসবাস করতেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারত পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিলে মোহাম্মদ ইসরাইল নতুন করে দুর্ভোগে পতিত হন। ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি করাচিতে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ অবাঙালি গণহত্যাকালে তার বোন, ভগ্নিপতি এবং শিশু ভাগিনা নিহত হয়। ইসরাইল তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“আমরা বহু বছর ধরে চট্টগ্রামে বসবাস করতাম এবং আমাদের প্রত্যেকে বাংলা বলতে পারতাম। আমি ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলাম এবং পাহাড়তলীতে আমি আমার বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে তাদের বাসায় বসবাস করতাম।

৩ মার্চ বিকালে আওয়ামী লীগের জঙ্গি সমর্থকদের নেতৃতে প্রায় ৫শ’ বাঙালি ইস্পাহানি কলোনি আক্রমণ করে। এ কলোনিতে অধিকসংখ্যক অবাঙালি বসবাস করতো। আক্রমণকারীদের সঙ্গে ছিল জ্বলন্ত মশাল ও কয়েকটি বন্দুক। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার প্ররোচনা ছাড়া জনতা উন্মত্ততায় লিপ্ত হয় ৷ তারা বাড়িঘরে কেরোসিন ও পেট্রোল ছিটিয়ে অগ্নিসংযোগ করে। লোকজন ঘর থেকে বের হলে আক্রমণকারীরা গুলিতে তাদের হত্যা করে।

১০ জন সশস্ত্র বিদ্রোহী আমাদের ঘরের দরজা ভেঙ্গে ফেলে এবং উদ্যত বন্দুক নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা আমার ভগ্নিপতিকে গুলি করে। তিনি ঘটনাস্থলে নিহত হন। আমি আহত হই এবং মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকি। আমার বোন আক্রমণকারীদের বাধা দিতে গেলে তাকে বেয়নেট চার্জ করা হয়। আক্রমণকারীরা তার কোল থেকে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে কেড়ে নেয়। আমার বোন যখন মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছিল তখন আমার ভাগিনাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে আক্রমণকারীরা আমাদের বাড়ি লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমি হামাগুড়ি দিয়ে একটি ভবনে যেতে সক্ষম হই। এ ভবনে আমি কয়েকদিন লুকিয়ে থাকি। আক্রমণকারীরা দু’হাজার অবাঙালির বসতি এ কলোনির প্রতিটি ঘর পুড়িয়ে দেয়। তারা জ্বলন্ত বাড়িঘরে বহু মৃত দেহ নিক্ষেপ করে৷

কয়েকজন দয়ালু বাঙালি আওয়ামী লীগের এই ঘৃণ্য আচরণ এবং নির্বিচারে অবাঙালি হত্যাকাণ্ডে মর্মাহত হয় ৷ কিন্ত তার! ছিল অসহায়৷ কেননা আক্রমণকারীদের সঙ্গে ছিল বন্দুক। ৩ মার্চের পৈশাচিকতায় আওয়ামী লীগ সফল হওয়ায় উৎসাহিত এবং নিশ্চিত হয় যে, অবাঙালি নিধনে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তারা কোনো বাধার মুখোমুখি হবে না।”

একত্রিশতম সাক্ষীর বিবরণ:

২৩ বছরের নূর মোহাম্মদ সিদ্দিকী চট্টগ্রামে ফিরোজশাহ কলোনিতে একটি ভাড়া করা বাসায় পিতামাতার সঙ্গে বসবাস করতো। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞে সে তার অধিকাংশ আত্মীয়-স্বজনকে হারায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে নূর মোহাম্মদ চট্টগ্রাম ত্যাগ করে করাচিতে এসে পৌঁছায়। সে তার মর্মস্পর্শী সাক্ষ্যে বলেছে:

“৩ মার্চ দুপুরে আওয়ামী লীগের প্রায় ৫ হাজার সশস্ত্র কর্মী এবং তাদের সমর্থক ফিরোজশাহ কলোনি আক্রমণ করে। তাদের সঙ্গে ছিল ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের কয়েকজন সশস্ত্র বিদ্রোহী। তাদের পরণে ছিল ডিউটিকালীন ইউনিফর্ম। অবাঙালিদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্ররোচনা ছাড়া উন্মত্ত জনতা উন্মাদ হয়ে উঠে। আওয়ামী লীগের জঙ্গি সমর্থকরা শত শত ঘরবাড়ি লুট করে এবং পেট্রোল ও কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাসিন্দারা দৌড়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলে সশস্ত্র লোকেরা খুব কাছ থেকে তাদের গুলি করে।আমি আল্লাহর বিশেষ রহমতে হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাই।

আক্রমণকারীরা এগিয়ে এলে আমি একটি স্টোর রূমে আত্মগোপন করি। আত্মগোপন থেকে বের হয়ে আমি আমাদের এলাকায় শত শত ভস্মীভূত ঘরবাড়ি দেখতে পাই। এলাকার সর্বত্র ছিল লাশের দুর্গন্ধ। আক্রমণকারীরা কাউকে কাউকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়। এসব অর্ধমৃত লোকগুলো কাতরাচ্ছিল। কিন্তু সহায়তা করার মতো কেউ ছিল না। পুলিশ উধাও হয়ে যায়। পরদিনও আমাদের এলাকায় আক্রমণকারীরা ঘোরাফেরা করছিল। যেসব অবাঙালি কলোনি থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে তাদেরকে রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়। রাতে বহু অবাঙালি মেয়েকে অপহরণ এবং খালি ঘরে ধর্ষণ করা হয়। বহু শিশুকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়। মায়েদেরকে শিশুদের করুণ মৃত্যু প্রত্যক্ষ করতে বাধ্য করা হয়। দু’দিনের ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞে ফিরোজশাহ কলোনি আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত একটি লোকালয়ের রূপ ধারণ করে ৷

এ ভয়াবহ মাসের স্মৃতি আমি কোনোদিন ভুলতে পারিনি। মনে হচ্ছিল সবগুলো লোক যেন হত্যা, লুট ও ধর্ষণের জন্য উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। এ রক্তগঙ্গায় নিহতদের সবাই ছিল অবাঙালি। কয়েকজন পাকিস্তানপন্থী বাঙালি তাদের অবাঙালি বন্ধুদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। এসব পাকিস্তানপন্থী বাঙালিকে চরম শাস্তি দেয়া হয়। এমনকি হত্যা করা হয়।’

 

বত্রিশতম সাক্ষীর বিবরণ:

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ৪০ বছরের শরিফানের চোখের সামনে তার দু’পুত্র ও স্বামীকে হত্যা করা হয়। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“আমার স্বামী শামসুল হক চট্টগ্রামে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। আমি আমার দু’ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রামের লতিফাবাদে একটি ছোট ঘরে বসবাস করতাম। ৩ মার্চ একদল উন্মত্ত বাঙালি-অবাঙালি বস্তি এবং আমাদের এলাকায় হামলা চালায়। তারা শত শত বস্তিঘর ও বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। আক্রমণকারীরা হয়তো অবাঙালি পুরুষদের হত্যা করে নয়তো বন্দি হিসেবে ট্রাকে করে নিয়ে যায়। কয়েকজন অবাঙালি জ্বলন্ত ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু তাদেরকে রাইফেলের গুলিতে হত্যা করা হয়! ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডে অনেকে প্রাণ হারায়।

একদল লোক আমার ঘর লুট করে এবং পরে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে একজন বন্দুকধারী আমাদের ওপর গুলি চালায়। আমার দু’পুত্র আহত হয়। আমি এবং আমার স্বামী হতবুদ্ধি হয়ে যাই। আমি আমার শাড়ি ছিঁড়ে তাদের ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ করে দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্ত্র ১০ মিনিটের মধ্যে তাদের শরীর নিথর হয়ে যায়। বুক ভরা যন্ত্রণা নিয়ে আমরা নিকটবর্তী একটি মসজিদে আশ্রয় নেই। আমার স্থামী ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আমি শাড়ি থেকে আমার পুত্রদের রক্তের দাগ ধুয়ে ফেলি। ঠিক এসময় আমি একটি বিকট আর্তনাদ শুনতে পাই এবং আক্রমণকারীরা মসজিদে প্রবেশ করে। তারা জানালো, মসজিদে আশ্রয় গ্রহণকারী সকল অবাঙালি পুরুষকে হত্যা করা হবে। পুরুষরা বয়স্ক হওয়ায় আমি বন্দুকধারীদের পায়ে পড়ে তাদের জীবন ভিক্ষা চাই। একজন আক্রমণকারী তার পায়ের বুট দিয়ে আমাকে আঘাত করে।একটি রাইফেলের গুলির শব্দ হয়। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলাম আমার প্রিয় স্বামী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গেছেন। তার বুক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। আমি অজ্ঞান হয়ে যাই এবং কয়েক ঘন্টা অচেতন থাকি।

মসজিদে অবস্থানকারী মহিলাদের প্রিয়জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এসব মহিলা তাদের প্রিয়জনদের লাশ মসজিদের একটি কোণায় সরিয়ে রাখে। তারা নিজ নিজ শাড়ি দিয়ে চাদর বানিয়ে লাশগুলো ঢেকে রাখে। আমাদের কাছে কবর খোঁড়ার মতো কোনো শাবল অথবা খুন্তি ছিল না। আমরা অশ্রুজল, ভীতি ও সন্ত্রাসের মধ্যে মসজিদে তিন সপ্তাহের বেশি অবস্থান করি। মার্চের শেষদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরকে একটি স্কুল ভবনে ত্রাণ শিবিরে নিয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নেয়ার পর মুক্তিবাহিনী আমাদেরকে উত্যক্ত করেছিল। কিন্তু রেডক্রস আমাদেরকে রক্ষা এবং সহায়তা করে। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমরা করাচিতে প্রত্যাবাসন করি।’

— ব্লাড এন্ড টীয়ার্স / কুতুবউদ্দিন আজিজ (মূল: Blood and Tears । অনু: সুশান্ত সাহা) ॥ [ ইউপিপি – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৫৪-৬০ ]

 

 




একাত্তরের গণহত্যা (তিন)

যে কাহিনী শুনতে নেই (০৭)

সংগ্রহে: কায় কাউস

================

কাপ্তাই হত্যাকান্ড

০১.                                                                                                               

“… ২৫ মার্চ রাত ১১টার দিকে আমি যখন ঘুমানোর চেষ্টা করছি, তখন আমার টেলিফোন বেজে ওঠে। এত রাতে টেলিফোন বেজে ওঠা মোটেও স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু আমরা একটা অস্বাভাবিক সময় পার করছিলাম। তাই যেকোনো কিছুই প্রত্যাশিত ছিল। আমার অফিসের ব্যক্তিগত সহকারী মুজিবুল হক ফোনটি করেছিল। তখন তার কাজ ছিল কাপ্তাইয়ের একমাত্র টেলিফোন এক্সচেঞ্জটিতে বসে সমস্ত কলের নজরদারি করা। উত্তেজিত কন্ঠে সে আমাকে বলল, ‘চট্টগ্রাম থেকে টেলিফোনে এইমাত্র খবর এসেছে যে, শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এবং ইয়াহিয়া খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ঢাকায় ভীষণ লড়াই চলছে।’

চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হান্নান খবরটি প্রচার করেছেন। ভীত হয়ে আমি জানতে চাইলাম ব্যাপারটা ক্যাপ্টেন হারুনকে জানানো হয়েছে কি না। মুজিবুল জানাল, বুথে যে বাঙালি সুবেদার ছিল, সে খবরটি জানাতে ছুটে গেছে।

 … ওদিকে খবর পেয়েই ক্যাপ্টেন হারুন চৌধুরী ছুটে যান ইপিআর শিবিরে। তিনি তখন সেকেন্ড ইন কমান্ড। মেজর পীর মোহাম্মদ কোনো কিছু আঁচ করতে পারার আগেই হারুন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। তবে কেউ হতাহত হয়নি। এনসিওদের অস্ত্র সংবরণ করিয়ে পিছমোড়া করে হাত বেঁধে একটি বিশাল কক্ষে আটকে রাখা হয়। 

 … অল্পক্ষণের মধ্যেই মেজর পীর মোহাম্মদের বাড়িটি ইপিআর জওয়ানরা ঘিরে ফেলে এবং তিনি গৃহবন্দী হন। বিদ্রোহ সম্পন্ন হয়ে যায় এবং কাপ্তাইয়ে আমাদের জন্য পিছু ফেরার কোনো উপায় ছিল না। আর আমরা তখনো জানি না, ঢাকায় কী হচ্ছে। সবকিছুই হচ্ছিল জনাব হান্নানের কাছ থেকে পাওয়া একটিমাত্র টেলিফোন-বার্তার মাধ্যমে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে অনুভব করলাম, আমরা ভীষণ বিপদের মধ্যে আছি।

 … ২৬শে মার্চ রাত দুইটার (২৫ মার্চ দিবাগত) কয়েক মিনিট পর আরেকটা ফোন এল। এক্সচেঞ্জ থেকে অপারেটর আমাকে জানাল যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে। আসলে তাৎক্ষণিক বিপদটা কেটে গেছে। কিন্তু আমরা অনেক বড় ও প্রলম্বিত বিপদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম, যে ধরণের বিপদের মোকাবিলা জীবনে আমরা অনেকে কখনো করিনি।

 … আমার বাসা থেকে ইপিআরের ক্যাম্প ১০০ মিটারের মতো। ৫০-৬০ জন লোকের ছোটখাটো ভিড় চোখে পড়ল। দেখলাম, ইপিআরের অবাঙালি জওয়ানদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের পিছমোড়া করে রাখা হয়েছে। তারা অসহায়ের মতো প্রাণভিক্ষা চাইছিল। আমাদের মতো তাদেরও জীবন মূল্যবান। হঠাৎ কেউ একজন আমার হাত থেকে টর্চলাইটটি নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। এর পরই আবার হইচই। ইপিআরের একজন অবাঙালি দৌড়ে পালিয়ে ঝোপের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিল। তাকে ধরে নিয়ে আসা হলো ক্যাপ্টেনের কাছে। ক্যাপ্টেন হারুন তার রিভলবারটি বের করে ওর বুকে ঠেকিয়ে গুলি করতে উদ্যত হলেন। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে লোকটি ক্যাপ্টেনের পা জড়িয়ে ধরল। এ যাত্রায় প্রাণে রক্ষা পেলেও কয়েক দিন পরই সে মৃত্যুবরণ করে।

পাকিস্তানি সৈনিকদের হত্যা করা সহজ ছিল না। কয়েক শ প্রাণঘাতী ৩০৩ বুলেট ছুড়তে হয়েছিল ব্যাংক ভবনের প্রথম তলায়। এখানে নিরস্ত্র, অনাহারী পাকিস্তানি এনসিওদের ইন্টার্নির জন্য রাখা হতো। গোলাগুলিতে ভবনের চেহারাটা জলবসন্ত রোগীর মতো হয়ে গিয়েছিল। তারপরও সেনারা আত্মসমর্পণ করেনি। তারা জানত যে আত্মসমর্পণ করতে বাইরে এলেই দরজার সামনে তাদের হত্যা করা হবে। শেষ পর্যন্ত দুজন লোক সাহস করে টিনের চালের ছাদে গিয়ে ওঠে। তাদের একজন ছিল মোল্লা নামের এক বদমাশ লোক। তারা দুতিনটা টিন তুলে ফেলে ভেতরে গুলি চালায়। অবশ্য অনাহারে লোকগুলো এমনিতেই কয়েক দিন পর মারা যেত। কয়েকজন বুদ্ধিমান লোক দ্রুত ভবনের ওপর নতুনভাবে আস্তর করে দিল, যেন বোঝা না যায় গুলি চালানো ও হত্যাকান্ড হয়েছে। আর পাকিস্তানি সেনারা যে আসবে এবং শহরে যাকেই পাবে, তার ওপর প্রতিশোধ নেবে, সেটাও সবার জানা ছিল। ১৭টি মৃতদেহ সেতুর পেছনে ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়। নিকটবর্তী কুষ্ঠ হাসপাতাল থেকে মরণাপন্ন কুষ্ঠ রোগীদের এনে এখানে রাখা হতো।

ইপিআর ক্যাম্পে জড়ো হওয়া স্থানীয় লোকজন অস্থির ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। এরকম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে কী করতে হয়, সে বিষয়ে কারোরই কোনো ধারণা ছিল না। রাতের অন্ধকার থাকতেই ইপিআরের লোকজন তাদের অস্ত্র ও ব্যাগ নিয়ে ট্রাকে চেপে কাপ্তাই ত্যাগ করে। পরে আমি মেজর রফিকের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম, তিনি চট্টগ্রাম থেকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন হারুনকে তার বাহিনী নিয়ে যোগদান করার জন্য। আর তাই ক্যাপ্টেন হারুন দ্রুত কাপ্তাই থেকে চলে যান। চট্টগ্রামে যাওয়ার আগে তিনি বন্দী পাকিস্তানি জওয়ানদের স্থানীয় পুলিশ ও জঙ্গি লোকজনের তত্ত্বাবধানে রেখে যান। যাওয়ার আগে তিনি কাপ্তাইয়ের নিরাপত্তার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেননি আর কখনোই কাপ্তাইয়ে ফিরে আসেননি। 

 … ২৯ মার্চ ইপিআরের দুজন জওয়ানকে নিয়ে স্থানীয় কিছু লোক পীর মোহাম্মদের বাড়ির সামনে জড়ো হয় তাকে হত্যা করার জন্য। … আমরা ইপিআরের জওয়ানদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে মেজরকে হত্যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। কেননা, পশ্চিম পাকিস্তানেও আমাদের প্রায় ৩০ হাজার সৈনিক রয়েছে। এখানে বন্দী পাকিস্তানি সেনাদের যদি আমরা হত্যা করি, তাহলে পাকিস্তানিরাও প্রতিশোধ নেবে। এর জবাবে আমাদের বলা হলো, ‘হাইকমান্ড থেকে মেজরকে হত্যার নির্দেশ এসেছে। এর বেশি কিছু আমরা জানি না। আমরা বন্দীদের নিয়ে যেতেও পারি না। আমরা তাদের নিয়ে কী করব?’

মেজর পীর মোহাম্মদ অবশ্য বুঝতে পেরেছিলেন যে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। তিনি জানতেন যে তার সেনারা বিদ্রোহ করতে পারে। এটাও বুঝেছিলেন যে তার সহকর্মীরা নিহত হয়েছে। দেশে সেনা অভিযানের এবং যুদ্ধাবস্থার খবরও নিশ্চয়ই বেতারের মাধ্যমে তিনি পেয়েছিলেন। 

জওয়ানরা যখন বাড়ি ঘিরে ফেলেছে, তখন তিনি বাইরে বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে এক ট্রাংকবোঝাই অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ। তিনি বললেন যে, তিনি শহীদ হতে প্রস্তুত ছিলেন। তার বদলে তিনি আত্মসমর্পণ করতে চান। তার এই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলো। দুই হাত ওপরে তুলে পিছু ফিরে দাঁড়াতেই প্রথম গুলিটা ছোড়া হলো। দ্বিতীয় গুলিতে তিনি সিঁড়িতে রক্তের ধারার ওপর পতিত হলেন। মিসের পীর মোহাম্মদ ভেতর থেকে তাদের দত্তক নেয়া বাঙালি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। এক মুহুর্ত থমকে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো স্বামীকে দেখলেন। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন হত্যাকারীদের দিকে। তাদের রাঙামাটি নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি লঞ্চ আগেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। সেটাতেই তারা গিয়ে উঠলেন। এরপর আমি আর তাদের কোনো খবরই জানতে পারিনি। মৃত্যুর আগে পীর মোহাম্মদ হয়তো তার হত্যাকারীদের ওপর গুলি চালাতে পারতেন। তবে নিজের স্ত্রী-কন্যার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি তা করেননি।

 … পরের দুই সপ্তাহ ছিল ভয়াবহ। যেখানেই অবাঙালিদের দেখা মিলছিল, সেখানেই তাদের ঘিরে ধরে হত্যা করা হচ্ছিল। ইপিআর ও পুলিশের কিছু লোক এই হত্যাকান্ড চালাচ্ছিল। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল স্থানীয় কিছু লোক। এদের মধ্যে দুজন রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে হত্যাযজ্ঞে নেমেছিল। এদের একজন হলেন আবদুল জব্বার। তিনি অবশ্য পরে ভারতে মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত হন তার অপকর্মের জন্য। অপরজন শুক্কুর আলী ছিলেন কাপ্তাই বাজারের মাংস বিক্রেতা। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের হত্যাকান্ডের পর তিনি কাপ্তাইয়ের বড় রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন। কাপ্তাই বন থেকে টিক কাঠ বিক্রি করে প্রচুর অর্থেরও মালিক হন। যারা এই হত্যাকান্ডের পরিণতি সম্পর্কে বুঝতে পেরেছিল, তারা পার করছিল একটা আতঙ্কজনক সময়। তবে পাকিস্তানি সেনাদের মতো এই হত্যাকারীরাও ছিল নির্লিপ্ত।

মৃত্যুর আগে গাজী উদ্দিন খান পাঠান নামের এক ঠিকাদার আর্তচিৎকার করে বলেছিল, ‘ওরা আমার কাছে টাকা চেয়েছিল। আমার যা কিছু ছিল, সবই ওদের দিয়েছি। আর এখন ওরা আমাকে মেরে ফেলছে।’ হত্যাকান্ড চলছিল। আবাসিক কলোনীর নারী ও শিশুরা হত্যাকান্ড দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। আমরা যেন নরকের অধিবাসী হয়ে গিয়েছিলাম। 

একদিন এক অবাঙালি শুধু কোমরে একটা কাপড় জড়ানো অবস্থায় কোথা থেকে যেন উদয় হলো। ও কিছু বলতে পারার আগেই কয়েকজন লোক ‘গুপ্তচর গুপ্তচর’ বলে চিৎকার করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি কোনোমতে তাকে মারা পড়ার হাত থেকে বাঁচালাম। তার কাছে জানতে চাইলাম, সে কে। কিন্তু সে কোনো কথা বলতে পারছিল না। হাতে একটা খালি পাত্র ছিল। বুঝতে পারলাম, সে বেশ কয়েক দিন ধরে কিছু খায়নি। তাই খাবারের জন্য ভিক্ষা করতে বেরিয়েছে। খেয়াল করলাম, তার দাঁতগুলো খুব পরিষ্কার। মনে হলো, সমাজের উঁচু তলারই মানুষ। কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছে। এক তরুণ তাকে নদীর ওপারে অবাঙালি শিবিরে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু অত দূর হেঁটে যাওয়ার শক্তি তার অবশিষ্ট ছিল না। আবার যাওয়ার পথেই কোনো বীরপুরুষ হয়তো তাকে শেষ করে দিত। তারপরও তাকে যেতে দেওয়া হলো। আমি ভেবেছিলাম, সে শিবিরে পৌঁছালেও বাঁচতে পারবে না।

দু’তিনদিন পর ওই লোকটাকে আবার আমাদের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। তার শরীরের চামড়া আরও বেশি করে হাড্ডীর সঙ্গে লেগে গেছে। আমি বুঝতে পারলাম না কী করব। পাকিস্তানি সেনারা যখন আসবে, তখন সে নিশ্চয়ই আমাকে দেখিয়ে দেবে। কেননা, আমাকে রাইফেল নিয়ে চলাফেরা করতে দেখেছে। আমি কাঁধ থেকে রাইফেলটা নামিয়ে তার বুক বরাবর তাক করলাম। লোকটা দুই হাত ওপরে তুলতেও পারছিল না। বিড়বিড় করে কী বলতে চাচ্ছিল, ‘চালাও গুলি, আমি আর পারছি না। আমার সব গেছে। এখন আমাকেও শেষ করে দাও।’ অথবা হয়তো প্রাণভিক্ষা চাইছিল। 

আমি একটু থমকে গেলাম। ভাবলাম যে কয়েক দিন আগেই জাভেদকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলাম, আর এখন নিজের নিরাপত্তার জন্য আরেকজনকে হত্যা করতে যাচ্ছি! শেষ পর্যন্ত রাইফেলটা নামিয়ে নিলাম। একটা বড় ঝুঁকি নিয়ে ফেললাম। সন্ধ্যার সময় ফিরে এসে ভাবলাম, লোকটাকে কিছু খাবার দেব, যেন সে অনাহারে না মরে। কিন্তু তাকে আর খুঁজে পেলাম না। ধারণা করলাম, শান্তিতে মরার জন্য হয়তো কাছের কোনো জঙ্গলে চলে গেছে। লোকটাকে বাঁচাতে পারলাম না বলে খুব খারাপ লেগেছিল। তবে চার দশক পর এটা মনে করে ভালো লাগে যে তাকে আমি গুলি করিনি। যদি আজও সে বেঁচে থাকে, তাহলে হয়তো আমাকে মনে করবে – অন্তত ঘৃণার সঙ্গে নয়।

 … দিনে ও রাতে বাস বোঝাই করে ইপিআরের সদস্যদের সীমান্ত এলাকা থেকে সরিয়ে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। অবাঙালি ইপিআরের সদস্যরা তাদের বাঙালি সহকর্মীদের হাতে নিহত হয়। অনেককে হাত-পা বেঁধে খাদের পানিতে ফেলে দেওয়া হয় বলেও শুনতে পাই। রাতে যখন তারা বাস-ট্রাকে চেপে চট্টগ্রামে রওনা হতো, তখন যে আওয়াজ হতো, তা ছিল রীতিমতো রোমহর্ষক। 

 … যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম, তা বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। প্রতিটি মুহুর্তেই পাকিস্তানি সেনাদের আগমন আতঙ্ক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। আমাদের কোনো ধরণের শক্তি আর অবশিষ্ট ছিল না।অবাঙালিদের হত্যা করার পর আমাদের নৈতিক শক্তিও ফুরিয়ে গিয়েছিল। তাদের অনেককেই আমরা ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। আমাদের কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও ছিল না।

 … এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কাপ্তাই, চন্দ্রঘোনা ও আশপাশের অবাঙালিরা প্রায় সবাই ইপিআরের লোকজন ও তাদের সহযোগীদের কব্জায় চলে আসে। এরপর তাদের হত্যা করা হয়। এটা যেন সেই উগ্র জাতীয়তাবাদের আরেক পিঠ, যেখানে নির্মমতা ও অন্ধত্ব মিশ্রিত হয়ে আছে। হত্যাকান্ড থেকে বেঁচে যাওয়া পুরুষ, নারী ও শিশুদের নিয়ে বড় ধরণের সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমে তাদের কিছু পুরোনো ঘরে রাখা হয়। আর অভিজাত পরিবারের সদস্যদের ঠাঁই মেলে বিদেশিদের থাকার ছোট ছোট বাংলোয়। ১৩ এপ্রিল তৃতীয়বারের মতো আমরা যখন জায়গা বদল করি, তখন এরকম একটি বাংলোয় উঠি। 

আমাদের কেউ কেউ অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এই ভেবে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এলে কী ভয়ংকর প্রতিশোধ গ্র্হণের ঘটনা ঘটতে পারে। তাতে অবশ্য পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে হত্যাকারীরা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। এরা বেশির ভাগই কাপ্তাইয়ের বাইরে থাকত। আর তাই আমরাসহ যারা কাপ্তাইয়ে থাকি, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের তেমন কোনো চিন্তা ছিল না। এর মধ্যে ঠিক করা হয়, নিহত ব্যক্তিদের স্ত্রী ও সন্তানদের দূরে সরিয়ে রাখা হবে। এ জন্য লেকের মধ্যে ছোট্ট একটা দ্বীপে কয়েক বস্তা আটাসহ তাদের ফেলে আসা হবে, যেন পাকিস্তানি সেনারা এসে স্বগোত্রীয় বিধবা ও নিগৃহীত নারী ও শিশুদের দেখতে না পায়। আমি জানি না, এই নিষ্ঠুর পরিকল্পনা কে বা কারা করেছিল। তবে একাধিকবার চিন্তাভাবনার পর এটা বাদ দেওয়া হয়। ফলে একটা বিরাট অপরাধ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। অনেক বছর আগে ছাত্রাবস্থায় আমি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাসের ভিত্তিতে তৈরি করা “ফর হুম দ্য বেল টোলস” ছবি দেখেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, বাস্তব জীবনে আমি সেই চলচ্চিত্রটাই যেন দেখছি। এবার ঘন্টা আমাদের জন্যই বাজছিল।

 … এক বছর পর বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে সরকারি সফরে আমি আবার কাপ্তাই যাই, তখন নিহত অবাঙালিদের পরিবারের নারী-শিশুদের সেখানে দেখতে পাই। তাদের জন্য কেউই আর কিছু করেনি। অনেক তরুণী এমন জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়, যা কোনো মেয়ে স্বেচ্ছায় বেছে নেবে না। আমরা যখন কোলাহলপূর্ণ পাঠান কলোনি অতিক্রম করছিলাম, তখন বিদ্যুৎ বোর্ডের প্রধান ডব্লিউ চৌধুরী বলছিলেন, ‘যারা এই অবস্থা সৃষ্টি করেছে, খোদাতা’আলা তাদের শাস্তি দেবেন।’ ওই দিন সকালেই মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে হত্যাকারীদের নেতা নিজেকে বড় একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করে এবং বলে যে যুদ্ধে তার সহায়-সম্পত্তি ও হাজার হাজার টাকা খোয়া গেছে। সে সরকারের কাছে ক্ষতিপুরণও দাবি করে। তবে আমি জানতাম, সে খুব সাধারণ একজন মানুষ, তার তেমন কিছুই ছিল না। শুধু কাপ্তাই বাজারে একটা মাংসের দোকান ছিল।

 … গোটা পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে আমি বিরাট একটা ঝুঁকি নিয়ে ফেলি। তাই যন্ত্রচালিত একটি দেশি নৌকায় করে ৮ এপ্রিল রাঙামাটির দিকে রওনা দিই । … তবলছড়ী ঘাটে নেমে আমি সরাসরি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও আমার বন্ধু এম ই শরিফের বাসভবনে গেলাম। … শরিফ বলল, আগরতলা জেলা প্রশাসনের অনুরোধে তৌফিক ইমাম সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানীতে যান আলোচনার জন্য। সেখানে দুই দিন থেকে আগের সন্ধ্যায় ফিরে এসেছেন। … জানতে পারলাম, মিসেস ইমাম সন্তানসম্ভাবা, সময়ও অনেক এগিয়ে এসেছে। তাই তারা দু-তিন দিনের মধ্যে আগরতলায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।

শফিক আমাকে যা বলেছিল, ইমাম সাহেবও আমাকে সেই একই কথা বললেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের সেনারা পরাজিত হয়েছে ও পিছু হটেছে। আর তাই প্রতিরোধ পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তার পরই গোটা প্রদেশ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। আমি তাকে আমাদের এলাকা কাপ্তাই ও চন্দ্রঘোনায় নির্বিচারে অবাঙালি নিধন ও আমাদের উদ্বেগের কথা জানালাম। এভাবে অবাঙালি হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে প্রশাসন কেন নিষ্ক্রিয় ছিল, তা-ও জানতে চাইলাম। এর জবাবটা দিলেন আলী সাহেব। তিনি বললেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে এটা করা হয়েছে। তারা আগরতলা থেকে এই নির্দেশ দিয়েছিল।’ 

 … আমরা নিশ্চিত ছিলাম, ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী কাপ্তাই আক্রমণ করবে। তারপরও আরেকটা দিন নিরাপদে কেটে গেল। আমাকে কাপ্তাই ছাড়তেই হচ্ছিল। কেননা, আমার মতো পেশার মানুষকে পাকিস্তানিরা ১ নম্বর শত্রু বলে চিহ্নিত করে। আবার আমার সুইডিশ ইনস্টিটিউটের কিছু ছাত্র সক্রিয়ভাবে আন্দোলনেও জড়িয়ে পড়েছিল। ইনস্টিটিউটের বাস ও গাড়ি ব্যবহার হচ্ছিল বিদ্রোহীদের চলাচলের জন্য। শহরের প্রবেশমুখে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে ইনস্টিটিউটের লরি নিয়ে যাওয়া হয়।

ইনস্টিটিউটের প্রাঙ্গণে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তবে সবচেয়ে খারাপ কাজ হয়েছিল, অবাঙালি নিধনে ইনস্টিটিউটের প্রাঙ্গণ ব্যবহার করা। হত্যা করার পর তাদের মৃতদেহগুলো ইনস্টিটিউটের খেলার মাঠ সংলগ্ন জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়। দুটি বাস ভর্তি করে অবাঙালিদের চন্দ্রঘোনা থেকে এনে নামানো হয় এবং একজন একজন করে হত্যা করা হয়। কয়েক শ মিটার দূরে আমি অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হত্যাকান্ড দেখে অদূরে স্টাফ কোয়ার্টার ভবন থেকে নারী-শিশুদের আর্তচিৎকার আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। দুই দিন পর মৃতদেহগুলোয় পচন ধরায় বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ডি-৮ বুলডোজার এনে মাটি ও বালুর সঙ্গে মরদেহগুলোকে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। মৃত্যুর আগে অনেকেই তাদের টুপি-তসবিহ ও কোরআন শরিফ একটা বাক্সে রেখে দেয়। ভালো মুসলমান হিসেবে তারাও আমাদের মতো আল্লাহর দয়া চেয়েছিল। তাদের সেই প্রার্থনা মঞ্জুর হয়নি। 

 … শরীরে শাড়ি প্যাঁচানো এক নারীকে একাকী হেঁটে আসতে দেখলাম। সে যেন সম্পূর্ণ উদভ্রান্ত হয়ে গেছে। মিসেস হামুদুর রহমান নিশ্চয়ই স্রষ্টাকে দুষছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দেরিতে পাঠানোর জন্য। তার স্বামী ও দুই ছেলেকে ইপিআর স্থানীয়দের সহযোগিতায় হত্যা করেছিল। হামুদুর ছিলেন একজন বাঙালি। এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে। মিসেস হামুদুর হত্যাকারীদের কাছে এই বলে অনেক কাকুতি-মিনতি করেছিলেন, যেন দুই ছেলের একজনকে রেহাই দেওয়া হয় পরিবারকে দেখাশোনা করার জন্য। তাতেও কাজ হয়নি। হামুদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি তার পকেট ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা সদর দপ্তরে গোপনে খবর পাঠাতেন। আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধির স্তর এরকমই ছিল ! পরিবারটি তাদের এমন একজন মানুষকে হারাল, যার কোনো ধারণাই ছিল না যে আশপাশে কী হচ্ছে। সেই সঙ্গে হারাল দুই ভাইকে। বিধবা মাকে নিয়ে অল্প বয়সী মেয়েটি বেঁচে রইল, যে কিনা চমৎকার রবীন্দ্রসংগীত গাইত। বেঁচে রইল শোক করার জন্য॥”

— ফারুক আজিজ খান (প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব, মুজিবনগর) / বসন্ত ১৯৭১ : মুজিবনগর সরকারের কেন্দ্র থেকে দেখা মুক্তিযুদ্ধ ॥ [ প্রথমা প্রকাশন – মার্চ, ২০১৫ । পৃ: ৩৮-৬৮ ]

০২.

“… ২৬-৩০শে এপ্রিল, ১৯৭১। কর্নফুলী পেপার ও রেয়ন মিলস, চন্দ্রঘোনা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা। ব্যাপক লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকান্ড অনুষ্ঠিত হয়। মেয়েদের ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। উদ্ধার করার পর তারা অবর্ণনীয় ধর্ষণ ও বর্বরতার কাহিনী বর্ণনা করে। হতাহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। 

 ২৭-৩০শে এপ্রিল, ১৯৭১। রাঙ্গামাটি। রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানীদের একত্রিত করে নির্যাতন ও হত্যা করাহয়।পাঁচশ লোক প্রাণ হারায়॥”

 তথ্যসূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র / সম্পা : বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ॥ [ আগামী প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৩ । পৃ: ১৪৩ ]

 

০৩.

“…পয়ষট্টিতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩৫ বছরের ওয়াজিহুন্নিসার স্বামী কেন্দ্রীয় শুল্ক বিভাগে চাকরি করতেন। তার পোস্টিং ছিল চন্দ্রঘোনায়। ওয়াজিহুন্নিসা তাদের শহরে ১৯৭১ সালের মার্চে সংঘটিত অবাঙালি হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন:

“১৯৭১ সালে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের এলাকায় বাড়িতে এসে অবাঙালিদের আশ্বস্ত করে যে, অস্ত্র সমর্পণ করা হলে তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না। আমার ভদ্রলোক স্বামী তাদের নির্দেশ মেনেনেন এবং তার অস্ত্র সমর্পণকরেন। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে আওয়ামী লীগের ভ্রাম্যমাণ সশস্ত্র লোকেরা অবাঙালিদের আতঙ্কিত করে তোলে এবং তাদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে। তারা পালানোর সব ক’টি রাস্তা বন্ধ করে দেয়।

২৬ মার্চ আওয়ামী লীগের একটি সশস্ত্র গ্রুপ আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে এবং আমার স্বামীকে তাদের কার্যালয়ে যাবার নির্দেশ দেয়। আমি জানতাম যে, এটা হচ্ছে একটি ছুঁতা এবং তারা আমার স্বামীর রক্তের জন্য পিপাসার্ত।

২৭ মার্চ আরেকদল সশস্ত্র লোক আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে। তারা আমাকে এবং আমার স্বামীর তিন ভাইকে জানায় যে, রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক আমাদেরকে নিরাপত্তা প্রদানে তার কার্যালয়ে নিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা যাত্রা শুরু করলে সশস্ত্র লোকেরা আমাকে বন্দুকের ডগার মুখে ফিরে যাবার নির্দেশ দেয়। তারা আমার দেবরদের দড়ি দিয়ে বেঁধে ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়। বিকালে একদল উন্মত্ত বাঙালি জনতা আমাদের এলাকায় হামলা চালায় এবং অবাঙালিদের বাড়িঘর লুট করে। আমাদের পুরুষদের অপহরণ করা হয়। একদল লোক আমার বাড়ি ভাঙচুর করে এবং সিলিং ফ্যান ও ওয়ার্ডড্রপ ছাড়া সবকিছু লুট করে। তারা অবাঙালি মহিলা ও শিশুদেরকে গরু-ছাগলের মতো তাড়িয়ে একটি বিশাল ভবনে নিয়ে যায়। আমাদেরকে সেখানে অবস্থান করার নির্দেশ দেয়া হয়। ১৫ দিন আমরা অনাহারে ছিলাম। আমরা আল্লাহর সহায়তা কামনা করি। ১৩ এপ্রিল আমাদের আটককারীরা জানতে পারে যে, পাকিস্তানি সৈন্যরা চন্দ্রঘোনার দিকে এগিয়ে আসছে। বিদ্রোহীরা আমাদেরকে লাইনে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয়। আমরা জানতাম যে, তারা আমাদের ওপর গুলি চালাবে। আমাদের কয়েকজন পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। তাতে বিশৃঙ্খ লা দেখা দেয়। হঠাৎ একটি গোলা এসে পতিত হয় এবং আমাদেরকে যেখানে রাখা হয়েছিল সেখান থেকে কয়েক গজ দূরে গোলাটি বিস্ফোরিত হয়। আমরা দূরে তাকিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের একটি কোম্পানিকে সবুজ ও অর্ধ চন্দ্রাকৃতির নিশান উড়িয়ে আমাদের দিকে ধেয়ে আসতে দেখলাম।আমাদের আটককারীরা ভীত হয়ে পড়ে এবং ইঁদুরের মতো পালিয়ে যায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের পানি ও খাবার দেয়। তারা চন্দ্রঘোনায় আরেকটি শিবিরে আটক ২শ’ অবাঙালি মহিলা ও শিশুকে মুক্ত করে।আমরা জানতে পারি যে, বিদ্রোহীরা চন্দ্রঘোনা থেকে যেসব অবাঙালিকে অপহরণ করেছিল তাদেরকে হত্যা করে লাশ কর্ণফুলি নদীতে ফেলে দিয়েছে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরকে চট্টগ্রামে একটি ত্রাণ শিবিরে ঠাঁই দেয়। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনী চট্টগ্রাম দখল করে নেয়ার পর তারা অবাঙালি হত্যাকাণ্ড এবং তাদের ধ্বংস সাধনে মেতে উঠে। শীতকালে আমার ছোট মেয়ে ঠাণ্ডায় আক্রাত্ত হয়। কোনো হাসপাতাল বিহারীর সন্তানকে চিকিৎসা প্রদানে সম্মত হয়নি। সে আমার কোলে মৃত্যুবরণ করে। কয়েকদিন পর আমাকে রেডক্রসের একটি শিবিরে তোলা হয়। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি করাচিতে প্রত্যাবাসন করি।”

চট্টগ্রামের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে যে, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে বাঙালি বিদ্রোহীরা কর্ণফুলি পেপার ও রেয়ন মিল লুট করে এবং অবাঙালি স্টাফ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে। খুব কমসংখ্যক লোক পালাতে সক্ষম হয়। পিতা অথবা স্বামীকে হত্যা করার পর শত শত অবাঙালি যুবতীকে অপহরণ কর হয়। বাঙালি বিদ্রোহীরা অপহৃত অবাঙালি যুবতীদের ধর্ষণ করার পর হত্যা করে। হিসেব করে দেখা গেছে যে, ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে চন্দ্রঘোনায় ৫ হাজারের বেশি অবাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। এ সংখ্যা পাকিস্তান সরকারের হিসেব থেকে অনেক বেশি। পাকিস্তান সরকার আগস্টে পূর্ব পাকিস্তান সংকটের ওপর প্রকাশিত শ্বেতপত্রে চন্দ্রঘোনায় অবাঙালিদের মৃত্যুর সংখ্যা ৩ হাজার উল্লেখ করা হয়েছিল। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বিদ্রোহী সৈন্যরা কর্ণফুলি পেপার মিলের যাবতীয় নগদ অর্থ লুট করে এবং বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণ পরিশোধ করায় কয়েকজন সিনিয়র স্টাফ সদস্যকে রেহাই দেয়।

রাঙ্গামাটি হলো নৈসর্গিক দৃশ্য সম্বলিত পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি মনোরম শহর। চট্টগ্রাম থেকে ৪৫ মাইল দূরে কর্ণফুলি নদীর তীরে এ শহর অবস্থিত । ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহের অগ্নিশিখা এ শহরকে গ্রাস করে এবং এখানে শত শত অবাঙালিকে হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা রাঙ্গামাটিতে বসবসকারী সকল অবাঙালিকে আটক করে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী এসে পৌঁছানোর আগে তাদের হত্যা করে। একসময় রাঙ্গামাটি সার্কিট হাউজে দুর-দূরান্তের পর্যটকরা ভিড় করতো। বিদ্রোহীরা এ সার্কিট হাউজকে তাদের অপারেশনাল ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। এখান থেকে বিদ্রোহীরা চন্দ্রঘোনা ও রাঙ্গামাটিতে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতো।

ছিষট্টিতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩৪ বছরের আবিদ হোসেন কর্ণফুলি পেপার মিলে চাকরি করতেন।মিলের আশপাশে কোনো স্টাফ কোয়ার্টার না পাওয়ায় তিনি রাঙ্গামাটিতে একটি বাড়িতে বাস করতেন। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি স্ত্রীসহ করাচিতে প্রত্যাবাসন করেন। আবিদ হোসেন তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

১৮ মার্চ কর্ণফুলি পেপার মিলে প্রথম বড় ধরনের হামলার সূত্রপাত হয়।সেদিন আওয়ামী লীগের জঙ্গি সমর্থকরা অবাঙালি স্টাফ ও তাদের পরিবারকে হত্যা এবং মিল দখল করার জন্য বাঙালি শ্রমিকদের উত্তেজিত করে। পরিণতি আঁচ করতে পেরে আমি আমার বাড়িতে ছুটে যাই এবং আমি আমার স্ত্রীসহ একজন ধার্মিক ও বিশ্বস্ত বাঙালি বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেই।

১৯৭১ সালে পুরো মার্চ জুড়ে আওয়ামী লীগের লোকজন অবাঙালিদের ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলে এবং হত্যার জন্য বহু অবাঙালিকে অপহরণ করে। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে বাঙালি বিদ্রোহীরা সকল অবাঙালিকে আটক করে এবং স্কুল ভবনগুলোতে তাদের জড়ো করে। সেনাবাহিনী এসে পৌঁছানোর আগে আটককৃতদের গুলি করে হত্যা করা হয়। সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের হটিয়ে দেয়ার পর আমি চট্টগ্রামে এক বন্ধুর বাড়িতে স্থানাস্তরিত হই। রাঙ্গামাটিতে এসে আমি কদাচিৎ অবাঙালিদের দেখতে পাই। রাঙ্গামাটিতে আওয়ামী লীগের সহিংসতা থেকে কয়েকজন পালাতে সক্ষম হয়। এসব লোক ১৯৭১ সালের এপ্রিলে চাকমা উপজাতীয় বস্তিতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার পর তাদেরকে ফের রাঙ্গামাটিতে ফিরিয়ে আনা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিদ্রোহীরা রাতের অন্ধকারে ট্রাক বোঝাই লাশ কর্ণফুলি নদীতে নিক্ষেপ করতো। বহু লাশ বঙ্গোপসাগরে ভেসে যায়। বিদেশি জাহাজের ক্রু ও যাত্রীরা সাগরে ভাসমান অসংখ্য লাশ দেখেছে॥”

— ব্লাড এন্ড টীয়ার্স / কুতুবউদ্দিন আজিজ (মূল: Blood and Tears । অনু: সুশান্ত সাহা) ॥ [ ইউপিপি – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৭৯-