স্বাধীন বঙ্গভূমির ইতিকথা

… কোলকাতার দৈনিক আজকাল ১৯৮৯ সালের ২২, ২৩ ও ২৪শে এপ্রিল বাংলাদেশের ৬টি জেলা নিয়ে হিন্দুদের আলাদা বাসভূমিক ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ প্রতিষ্ঠার ভারতীয় চক্রান্তের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে ৩টি ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশ করে। ষড়যন্ত্রের প্রাথমিক ধারণা লাভের জন্যে এই রিপোর্টই যথেষ্ট। ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ শীর্ষক রঞ্জিত শূর-এর লেখা রিপোর্টটি এইঃ

“… বাংলাদেশের দু’টুকরো করে হিন্দুদের জন্য আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য জোর তৎপরতা চলছে। বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ ২০,০০০ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ গঠনের উদ্যোগ আয়োজন চলছে অনেকদিন ধরে। এতদিন ব্যাপারটা সামান্য কিছু লোকের উদ্ভট চিন্তা বা প্রলাপ বলেই মনে হত। কিন্তু সম্প্রতি দেশী-বিদেশী নানা শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে ব্যাপারটা বেশ দানা বেধে উঠেছে। ইতিমধ্যেই ঘোষিত হয়েছে ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ সরকার। রাষ্ট্রপতি পার্থ সামন্ত। রাজধানী সামন্তনগর (মুক্তি ভবন)। সবুজ ও গৈরিক রঙের মাঝে সূর্যের ছবি নিয়ে নির্দিষ্ট হয়েছে জাতীয় পতাকা। জাতীয় সঙ্গীতঃ ধনধান্যে পুষ্পে ধরা, আমাদের এই বসুন্ধরা। সীমানাঃ উত্তরে পদ্মা, পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে ভারত, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। প্রস্তাবিত সীমানার মধ্যে পড়েছে বাংলাদেশের ছয়টি জেলাঃ খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, বরিশাল এবং পটুয়াখালী। এই ছয়টি জেলা নিয়েই ২৫ মার্চ ১৯৮২ ঘোষিত হয়েছে তথাকথিত ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ রাষ্ট্র। স্বাধীন বঙ্গভূমিকে বাস্তব রূপ দেওয়ার সমস্ত উদ্যোগই চলছে কিন্তু পশ্চিম বঙ্গ থেকে। নেপথ্য নায়করা সবাই জানেন এই রাজ্যেই বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর বিভিন্ন জেলা – ২৪ পরগনা, নদীয়া এবং উত্তর বাংলায় চলছে ব্যাপক তৎপরতা। অভিযোগ, ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত দুই বাংলাদেশী নেতা কাদের (বাঘা) সিদ্দিকী এবং চিত্তরঞ্জন ছুতোর মদত দিচ্ছেন হিন্দু রাষ্ট্রের পক্ষে। প্রবক্তাদের যুক্তি বাংলাদেশে মুসলমানদের শাসন চলছে। হিন্দুদের জীবন ও সম্পত্তি তাদের হাতে নিরাপদ নয়। বিশেষত বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্র ঘোষনার পর ঐ দেশের হিন্দুরা পরাধীন জীবন যাপন করছে। তাই প্রয়োজন হিন্দুদের জন্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র-বঙ্গভূমি।

বঙ্গভূমি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সংগঠক নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘ। ১৯৭৭ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় এই সংগঠনকির জন্ম হয়। জন্ম উপলক্ষে ১৫৯ গরফা মেইন রোডের সভায় নাকি উপস্থিত ছিলেন একজন আইএএস অফিসার অমিতাভ ঘোষ। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডাঃ কালিদাস বৈদ্য (এমবিবিএস ডাক্তার), সুব্রত চট্টোপাধ্যয় (বিলাত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার), নীহারেন্দ্র দত্ত মজুমদার (পশ্চিম বাংলার প্রাক্তন আইনমন্ত্রী) এবং শরৎ চন্দ্র মজুমদার (বাংলাদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী)। অন্য সূত্রের খবর চিত্তরঞ্জন ছুতোরও ঐ সভায় হাজির ছিলেন। ১৭ সেপ্টেম্বর সংস্থা গোলপার্কে সভা করে প্রথম প্রকাশ্যে ‘হোমল্যাণ্ড’ দাবী করে। এরপর মাঝে মধ্যে সভা-সমাবেশ হত। এর মধ্যেই নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘে ভাঙন ধরে। ১৯৭৯ সালে হয় দু’টুকরো। ডাঃ কালিদাস বৈদ্যের নেতৃত্বাধীন নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের ঠিকানাঃ গরফা মেইন রোড। সুব্রত চ্যাটার্জির নেতৃত্বাধীন নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের ঠিকানাঃ ৮০ ধনদেবী মান্না রোড, নারকেলডাঙ্গা। এদের থেকে বেরিয়ে আর একটি অংশ তৈরী করে বঙ্গদেশ মুক্তিপরিষদ। ঠিকানা মছলন্দপুর। আরও একটি অংশ তৈরী করে সংখ্যালঘু কল্যাণ পরিষদ। চলে চিত্ত ছুতোরের ভবানীপুরের বাড়ী থেকে।

পরস্পরের বিরুদ্ধে চাপান উতোরের মধ্যেই ঢিমেতালে চলছিল ‘বঙ্গভূমি’র পক্ষে প্রচার। কিন্তু ১৯৮২ সালে বঙ্গভূমি আন্দোলন একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। ঐ বছরের ২৫শে মার্চ ঘোষিত হয় স্বাধীন বঙ্গভূমি রাষ্ট্র। তৈরী হয় ‘সৈন্য বাহিনী’ বঙ্গসেনা। সৈনাধ্যক্ষ ডাঃ কালিদাস বৈদ্য। সুব্রত চ্যাটার্জীর গ্রুপ ঐ ঘোষণা না মানলেও বঙ্গভূমি দখলের জন্য ঐ বছরেই তৈরী করে ‘অ্যাকশন ফোরাম’ বাংলা লিবারেশন অর্গানাইজেশন (বিএলও)। আরও পরে বঙ্গদেশ মুক্তি পরিষদ তৈরী করে ‘সৈন্য বাহিনী’ লিবারেশন টাইগার্স অব বেঙ্গল (বিএলটি)। নেতা রামেশ্বর পাশোয়ান একজন বিহারী, থাকেন গরফার রামলাল বাজারে। এরপর বিভিন্ন সংগঠন মাঝে মাঝেই বঙ্গভূমি দখলের ডাক দেয়। সীমান্ত অভিযান করে। কিন্তু কখনই ব্যাপারটা এদেশের মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। ’৮৮ এর জুলাই থেকে অবস্থাটা ধীরেধীরে পাল্টাতে শুরু করে। ঐ বছর ২২ জুলাই ‘বঙ্গসেনা’ একটি সম্মেলন করে। এরপরই শুরু হয় একের পর এক কর্মসূচী। সীমান্ত জেলাগুলোতে চলতে থাকে একের পর এক সমাবেশ মিছিল মিটিং। ২৩ নভেম্বর ‘বঙ্গভূমি’ দখলের জন্য বনগাঁ সীমান্ত অভিযানে ৮/১০ হাজার লোক হয়। ২২-২৩ জানুয়ারী বনগাঁ থেকে বঙ্গ ‘সেনা’র মহড়া হয়। ২৪ মার্চ ও ২৫ মার্চ হয় আবার বঙ্গভূমি অভিযান। ৭ এপ্রিল রাজীব গান্ধীর কলকাতা আগমন উপলক্ষে সিধু কান ডহরে বিএলও এক জমায়েতের ডাক দেয়। প্রত্যেকটা কর্মসূচীতে ভাল লোক জড়ো হয়। বাংলাদেশে গেল গেল রব উঠে। এপারের সংবাদ মাধ্যমগুলো এই প্রথম গুরুত্ব সহকারে মনোনিবেশ করে খবর প্রচার করে। দেশে-বিদেশে ‘বঙ্গভূমি’র দাবি এবং দাবিদার নিয়ে কম-বেশী হৈচৈ শুরু হয়। আবার ২২ জুলাই অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছে বঙ্গভূমি দখলের জন্য। কালিদাস বৈদ্যের দাবি ঐ দিন এক লক্ষ লোক জমায়েত হবে।

স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলনের নেপথ্য নায়কদের আসল পরিচয় কি? কি তাদের আসল উদ্দেশ্য? কে এই ‘রাষ্ট্রপতি’ পার্থ সামন্ত? কি ভূমিকা নিচ্ছেন ভারত সরকার? এসব তথ্য জানার জন্য অনুসন্ধান চালাই তাদের কর্মস্থলগুলিতে। দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলি ডাঃ কালিদাস বৈদ্য, সুব্রত চ্যাটার্জী, রামেশ্বর পাশোয়ার, কে পি বিশ্বাস, রাখাল মণ্ডল প্রমুখ নেতাদের সঙ্গে। অনুসন্ধানের সময় বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে চিত্ত ছুতোরের নাম। বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি কিন্তু কিছুতেই দেখা করতে বা কথা বলতে রাজী হননি। এই দীর্ঘ অনুসন্ধানে এটা স্পষ্ট হয়েছে, ‘স্বাধীন’ হিন্দুরাষ্ট্র তৈরীর চেষ্টা আজকের নয়। পঞ্চাশের দশকেই হয়েছিল এর ব্লুপ্রিন্ট। “বঙ্গভূমি ও বঙ্গসেনা” পুস্তিকায় ডাঃ কালিদাস বৈদ্য নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ১৯৫২-তে তাঁরা তিনজন যুবক কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যান এবং ‘সংখ্যালঘুদের মুক্তির জন্য ব্যাপক কর্মতৎপরতা’ চালান। ‘গোপনে স্বাধীনতা ও তার সঙ্গে স্বতন্ত্র বাসভূমির কথাও’ প্রচার করেন। ঐ তিন যুবক হলেন কালিদাস বৈদ্য, চিত্তরঞ্জন ছুতোর এবং নীরদ মজুমদার (মৃত)।

বাংলাদেশে বেশ কিছু কাগজে লেখা হয়েছে “বঙ্গভূমি আন্দোলন ভারতেরই তৈরী”। ৮৮ সালের জুলাই থেকেই বঙ্গভূমি আন্দোলন ধীরে ধীরে দানা বাধতে শুরু করে। এটা কি নেহাৎই কাকতালীয়? ১৯৮২ সালে যখন ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি সরকার’ ঘোষণা করা হয়েছিল, বাংলাদেশের কাগজগুলিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মূল সুর ছিল, ইন্দিরার মদতেই এসব হচ্ছে। সাম্প্রতিক ‘বঙ্গভূমি’ আন্দোলনের পেছনে নাকি ভারত সরকারের হাত আছে।

প্রথম আন্দোলনের মূল হোতা ডাঃ কালিদাস বৈদ্য এবং রহস্যময় চরিত্র চিত্ত ছুতার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এবং বাংলাদেশে বহুকাল ভারতের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টির পিছনেও ছিল তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বস্তুত ভারতীয় এজেন্ট হিসেবেই এই দু’জন এবং নীরদ মজুমদার তৎকালীন পূর্ববঙ্গে গিয়েছিলেন। চিত্তবাবু ওখানে রাজনৈতিকভাবেও বিশেষ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন মূলত তার ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য। সংসদের সদস্যও হয়েছিলেন।

ডাঃ বৈদ্য এতটা পারেননি। পরবর্তীকালে দু’জনের মধ্যে বিরোধও হয়। ডাঃ বৈদ্য ভারত সরকারের সমর্থন হারান। কিন্তু মুজিব সরকারের ওপর প্রভাব খাটাবার জন্য চিত্ত ছুতারকে ভারত সরকার চিরকালই ব্যবহার করেছে। এখনও ভারত সরকারের তরফে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন চিত্তবাবু। অনেকেই বলে, তাঁর সোভিয়েত কানেকশন নাকি প্রবল। চিত্তবাবু ভবানীপুরের রাজেন্দ্র রোডের বিশাল বাড়িতে সপরিবারে অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। কোথা থেকে আসে ঐ টাকা? ভারত সরকার কেন তাকে জামাই আদরে পুষছেন? তার বসতবাড়িটাও দুর্ভেদ্যও। পাহারা দেন বেশকিছু শক্ত সমর্থ যুবক। যারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ করত। বনগাঁ লাইনে ‘বঙ্গভূমি’ সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক প্রচার যে, ঐ বাড়িটাই ‘বঙ্গসেনা’র ঘাঁটি। ভারত সরকারের মদদের আরও প্রমাণ, রাজীব গান্ধীর বিবৃতি। তিনি একাধিকবার বিবৃতি দিয়েছেন যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। বাড়ছে অনুপ্রবেশ। আকাশবাণী থেকেও একাধিকবার প্রচার হয়েছে। যেমন, ১৭ জানুয়ারী ‘বঙ্গভূমি’ পন্থীরা বাংলাদেশ মিশন অভিযান করলে ঐ খবর আকাশবাণী প্রচার করে। ১৮ জানুয়ারী রাজীব গান্ধী অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেন। এছাড়াও বলা যায়, এতদিন ধরে বঙ্গভূমি জিগির চলছে, বারে বারে শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে লোক নিয়ে গিয়ে সীমান্তে গণ্ডগোল ছড়ানো হচ্ছে তীব্র সাম্প্রদায়িক প্রচার চালানো হচ্ছে, ‘সৈন্যবাহিনী’ ঘোষণা করছে, প্রতিবেশী দেশের এলাকা নিয়ে পাল্টা সরকার ঘোষিত হয়েছে – তবুও পুলিশ তাদের কিছু বলে না কেন? সীমান্তে সমাবেশ বা ওপারে ঢোকার চেষ্টা হলে পুলিশ তুলে নিয়ে কয়েকশ’ গজ দূরে ছেড়ে দেয়। নেতাদের গ্রেফতারও করা হয় না। ভারত সরকারের মদদ না থাকলে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে গভীর যোগাযোগ না থাকলে, এটা কি সম্ভব হত?

ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের কথা ডাঃ বৈদ্যও অস্বীকার করেননি। তিনি বলেন, “মদদ নয় প্রশ্রয় দিচ্ছে বলতে পারেন। তবে মদদ দিতেই হবে। আমরা জমি প্রস্তুত করছি’। তিনি বলেন, “আমি ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, কিভাবে রাখছি, কার মাধ্যমে রাখছি বলব না। আমার বক্তব্য ক্রমাগতই তাদের বোঝাবার চেষ্টা করছি। সত্যিই যদি যথেষ্ট লোকজন জড় করতে পারি, তবে ভারত সরকারকে সৈন্যবাহিনী দিয়ে সাহায্য করতেই হবে। আমার একটা সরকার আছে। সৈন্যবাহিনী আছে। ভারতীয় সৈন্যবাহিনী ‘বঙ্গসেনা’ নামেই ঢুকবে বাংলাদেশে। আমরা সেই পরিস্থিতি তৈরী করার চেষ্টা করছি”। কিভাবে?

বঙ্গসেনা, বিএলও, বিএলটি সবার সঙ্গে কথা বলে যা বুঝেছি সেটা এরকমঃ ‘বঙ্গভূমি’ পন্থীরা চান বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক অত্যাচার চালাক। যাতে তারা দলে দলে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে শুরু করে। শরণার্থীদের বোঝা বইতে হবে ভারত সরকারকে। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের হস্তক্ষেপ করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশে ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় বড় শহরে কিছু অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের আরও একটা ইচ্ছা, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগুক, ব্যাপক হিন্দু নিধন হোক, যাতে এদেশের সংখ্যাগুরু হিন্দুদের সেন্টিমেন্টকে খুশী করার জন্য ভারত সরকার হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়।

‘বঙ্গভূমি’র ফেরিওয়ালাদের স্পষ্ট বক্তব্যঃ ভারত সরকারকে বেছে নিতে হবে দু’টোর একটা। তারা দেড় কোটি হিন্দু শরণার্থীর দায়িত্ব নেবেন, নাকি ‘স্বাধীন হিন্দুরাষ্ট্র’ ‘বঙ্গভূমি’ তৈরী করে দেবেন, যে বঙ্গভূমি একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে সিকিমের মত ভারতের অঙ্গরাজ্যে রূপান্তরিত হবে?”

– আবুল আসাদ / একশ’ বছরের রাজনীতি ॥ [ বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি – মে, ২০১৪ । পৃ: ৩২২-৩২৬ ]

 




জিহাদ ছাড়া কি জান্নাত পাওয়া সম্ভব?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

জিহাদ: চাবি জান্নাতের

মানব জীবনের মূল সাফল্যটি হলো জান্নাতপ্রাপ্তি। ঈমানদারের জীবনে এটিই হলো মূল গোলপোষ্ট। দুনিয়ার জীবনে বিপুল সম্পদ, আনন্দ-উল্লাস ও সুস্বাস্থ্য জুটলেও সেটি  অতি ক্ষণস্থায়ী। অথচ যারা জান্নাত পায় তারা সেটি পায় অনন্ত অসীম কালের জন্য। সে জীবনে কোন মৃত্যু নাই। ফলে যারা পরকালে বিশ্বাস করে তাদের প্রতিটি মুহুর্ত কাটে জান্নাতে পাওয়ার ভাবনা নিয়ে। তাদের প্রতিটি প্রচেষ্টা হয়, কি করে নিজেকে জান্নাতের জন্য তৈরী করা যায় সে চিন্তাটিকে লাগাতর মগজে রেখে। নবীজী (সা:)’র হাদীস: নিজের আমলের বলে কেউ জান্নাত পাবে না; জান্নাত পাবে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মাগফেরাত লাভের ফলে। তাই ঈমানদারের জীবনে সর্বসময়ের ভাবনা, নিজেকে কী করে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মাগফিরাত পাওয়ার যোগ্য রূপে গড়ে তোলা যায় সেটি। এ ক্ষেত্রে জিহাদের অবদানটি বিশাল। জিহাদ জীবনের বাঁচার এজেন্ডাই পাল্টে দেয়। জিহাদ নিয়ে বাঁচার অর্থ: মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা নিয়ে বাঁচা এবং সে এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগ করা –এমন কি প্রাণদান করা। আর যারা মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা নিয়ে বাঁচে ও প্রাণদান করে -তাদের থেকে কে বেশী তাঁর পক্ষ থেকে মাগফিরাত লাভের অধিক হকদার?           

মানব জাতির জন্য ফুল-ফলে, ধনে-ধানে ও নানারূপ ঐশয্যে ভরা এ পৃথিবী নিজেই এক বিশাল দান। এ বিশ্বজগতে কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্র। এ পৃথিবীতে শত শত পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর, নদ-নদী, বৃক্ষরাজী, জীবজন্তু ও নানা বর্ণের মানবসৃষ্টি। এ বিশাল বিশ্বজগত showcasing করে মহান আল্লাহতায়ালার অপার ক্ষমতার। তবে মানবের জন্য এর চেয়েও বিস্ময়কর কুদরত অপক্ষা করছে আখরোত। সেদিন আজকের নশ্বর মানুষ অবনিশ্বর সৃষ্টিতে পরণিত হবে। মৃত্যুরই সেদিন মৃত্যু ঘটবে। সেখানে রয়েছে জান্নাত –যার মাঠ-ঘাট, ফলমূল, খাদ্য-পানীয়, নদ-নদী ও নানাবধি আয়োজন নিয়ে শুধু কল্পনাই করা যায়, প্রকৃত ধারণা করা অসম্ভব। সেখানে অপরূপ সম্ভারে সাঁজানো হয়েছে অসংখ্য পৃথিবী। জান্নাতের এ চিত্রটি নিয়ে যে ব্যক্তি বাঁচে -সে কি এক মুহুর্তও বাঁচে সে জান্নাতটি পাওয়ার বাসনাকে হৃদয়ে ধারণ না করে? আশাই মানুষকে কর্মে আগ্রহী কর্মে। যারা জীবনে আশা নাই -তার জীবনে কর্মও নাই। আশাহীন সে ব্যক্তি তখন হারিয়ে যায় স্থবিরতায়। কিন্তু যে ব্যক্তি বাঁচে জান্নাত পাওয়ার আশা নিয়ে তাঁর কর্ম, আচরণ ও ত্যাগে আসে অভূতপূর্ব বিপ্লব। বিপ্লব তাকে ফিরেশতার পর্যায়ে নিয়ে যায়। সেটিই দেখা গেছে সাহাবায়ে কিরামের জীবনে। বিশাল সাম্রাজ্যের খলিফা হয়েও উটের পিঠে চাকরকে বসিয়ে নিজে রশি ধরে টেনেছেন। আটার বস্তা নিজে পিঠে উঠিয়ে দুস্থ্য মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন।

মুসলিম উম্মাহর মূল সংকটটি হলো: ইসলামের সে কোরআনী চেতনা যেমন বেঁচে নাই্, তেমনি বেঁচে নাই নবীজী (সা:)’র ইসলাম ও সে যুগের মুসলিম ঐতিহ্য। এবং বেঁচে নাই জিহাদী চেতনা। মুসলিম বেঁচে আছে কোর’আন ও হাদীসের মৌলিক শিক্ষাগুলা হৃদয়ে ধারণ না করেই। জিহাদ হলো মু’মিনের জীবনে ইঞ্জিন। এবং সে ইঞ্জিনের জ্বালানী হলো ঈমান। বিমানে ডানা ও দেহ থাকলেই সেটি উড়ে না; উড়ার জন্য ইঞ্জিন থাকতে হয়। তেমনি শুধু নামায-রোযা, হ্জ্ব-যাকাতও থাকলে মুসলিম হওয়া যায় না্। পূর্ণ মুসলিম  হতে হলে জিহাদ নিয়ে বাঁচতে হয়। জিহাদ না থাকলে মুসলিমের সংখ্যা বাড়লেও ইসলামের বিজয় আসেনা। তখন বাঁচতে হয় শয়তান ও তার অনুসারিদের প্রতি দাসত্ব নিয়ে। আর একই ভূমিতে কি শয়তানের দাসত্ব এবং মহান আল্লাহর দাসত্ব একত্রে চলে?

আভিধানিক অর্থে মুসলিম তো সেই যে পুর্ণ-আত্মসমর্পিত মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি। অথচ মুসলিম দেশগুলোতে সে আত্মসমর্পণ ও দাসত্বটি শয়তানের প্রতি। শয়তানের প্রতি দাস-সুলভ সে আত্মসমর্পণটি বুঝা যায় দেশের আদালত থেকে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইনকে বিলুপ্ত করে কাফেরদের আইন প্রতিষ্ঠা দেয়ার মধ্যে। হৃদয়ে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে কেউ কি মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী আইনের এরূপ অবমাননা এক মুহুর্তের জন্যও বরদাস্ত করতে পারে? মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে এ বেঈমানী ও বিদ্রোহ কি নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাহাজ্জুদ নামায দিয়ে ঢাকা যায়? এরূপ বেঈমানদের তো মহান আল্লাহতায়ালা সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে কাফের, জালেম ও ফাসেক বলে চিত্রিত করেছেন।

প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালা শরিয়তের বিরুদ্ধে যাদের এরূপ বিদ্রোহ তাদেরকে কি তিনি পরকালে জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করবেন? যারা নামায-রোযাকে বেহেশতের চাবি মনে করেন -তাদের অন্ততঃ এ বিষয়ে বোধোদয় হওয়া উচিত। ঘুমের ঘোরে চোখ বন্ধ করে জান্নাতে পৌছা যায় না। সে পথে চলতে হলে চোখ খুলে কোর’আন বর্ণীত সিরাতুল মুস্তাকীম পথটি অনুসরণ করতে হয়। এবং সে পথের সবটুকুতেই জিহাদ। কখনো সে জিহাদ বুদ্ধিবৃত্তিক, কখনো বা অস্ত্রের। যে পথে জিহাদ নাই, বুঝতে হবে সেটি ভিন্ন পথ, কখনো সেটি সিরাতুল মুস্তাকীম নয়। কিন্তু যারা কোর’আন না বুঝে স্রেফ তেওয়াতে দায়িত্ব সারে -তাদের পক্ষে কোর’আনের পথটি চেনা এবং সে পথে চলা সম্ভবই বা কি করে?     

 

জিহাদে পরীক্ষা হয় ঈমানের

যেখানে পুরস্কারটি অতি বিশাল, সেখানে পরীক্ষাটিও কঠিন। সমাজে ঈমানের দাবী নিয়ে যেমন সাচ্চা ঈমানদার আছে, তেমনি বিপুল সংখ্যক মুনাফিকও আছে। তাই কে ঈমানদার আর কে মুনাফিক –সেটি বুঝা যাবে কীরূপে? খোদ নবীজী (সা:)’র যুগেও মুনাফিকদের মসজিদে প্রথম সারিতে দেখা গেছে। তাদেরকে রোযা রাখতেও দেখা গেছে। অপর দিকে চোর-ডাকাত এবং কাফেরগণও দান-খয়রাত করে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে জরুরি হলো, কে মুনাফিক এবং কে ঈমানদার –সেটি সঠিক ভাবে সনাক্ত করা। সে কাজে ছাঁকুনির কাজটি করে একমাত্র জিহাদ। জিহাদের সে প্রয়োগ নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার পরিকল্পনাটি ঘোষিত হয়েছে এভাবে: “তোমারা কি ধারণা করে নিয়েছো, এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো দেখেননি তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ করেছে এবং কারা ধৈর্যশীল?” –(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১৪২)। এবং আরো ঘোষণা: “তোমরা কি মনে করে নিয়েছো যে তোমাদেরকে ছেড়ে দেওেয়া হবে অথচ আল্লাহ জেনে নেবেন না যে তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে আল্লাহ ও মুসলিম ব্যতীত অন্যদের অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গহণ করা থেকে বিরত থেকেছে?  আর তোমরা যা করো সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। -(সুরা তাওবাহ, আয়াত ১৬)। এবং বলা হয়েছে: “তোমরা কি ধারণা করে নিয়েছো যে, এমনতিইে জান্নাতে প্রবশে করব? অথচ সে অবস্থার মুখোমুখি তোমরা এখনও হওনি -যা তোমাদের পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে হয়েছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও ভয়ানক কষ্ট। তারা এমন ভাবে শিহরিত হয়েছে যে তাতে নবী এবং যারা তাঁর প্রতি যারা ঈমান এনেছে তারা একথা পর্যন্ত বলেছে যে, কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য। তোমরা শুনে নাও আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী।” –(সুরা বাকারা, আয়াত ২১৪)।

মুসলিম হওয়ার অর্থ: মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নির্ধারিত পরীক্ষার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়া। পরীক্ষায় না বসলে কোন ছাত্রই বুঝতে পারে না তার জ্ঞানের দুর্বলতা কোথায়। তেমনি জিহাদ দেয় ঈমানের সঠিক পরিমাপ। তাই যার জীবনে জিহাদ নাই -সে বুঝতেই পারে না তার ঈমানের শূণ্যতা কতো গভীর। বরং তার নামায-রোযা, হ্জ্ব-যাকাত ও দানখয়রাত তাকে ঈমানের দাবীতে অহংকারী করে ফেলে। এবং সে অহংকারের কারণে যারা ইসলামের পথে জিহাদ করে, নির্যাতিত হয় এবং শহীদ হয় -তাদের আত্মত্যাগকে তারা খাটো করে। মু’মিনের জীবনে পরীক্ষা যে কতটা অনিবার্য সে বিষয়টি মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোর’আনে বার বার ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন বলেছেন: “মানুষ কি ধরে নিয়েছে যে, ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাদেরকে মুক্তি দেয়া হবে? এবং এ ব্যাপারে কোন পরীক্ষা করা হবে না? অথচ তাদের পুর্বে যারাই ঈমানরে দাবী করেছে তাদেরকে আমরা পরীক্ষা করেছি, -এ জন্য যে আল্লাহ যেন জানতে পারেন ঈমানের দাবীতে কে সাচচা এবং কে মিথ্যাবাদী।” –(সুরা আনকাবুত, আয়াত ২-৩)। তাই ঈমান আনলে দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং তখন শুরু হয় পরীক্ষার পর্ব। ঈমান নিয়ে বাঁচতে বা মরতে হলে -এ পরীক্ষা থেকে বাঁচার রাস্তা রাস্তা নাই্। এবং সে পরীক্ষাটি হয় জিহাদের মধ্য দিয়ে। তাই নবীজী (সা:)’র এমন কোন সাহাবা ছিল না যারা জিহাদ করেননি। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী শহীদ হয়েছেন। সেদিন যারা জিহাদ করেনি তারা চিহ্নিত হয়েছে মুনাফিক রূপে। 

মহান রাব্বুল আলামিন ব্যক্তির মনের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বিষয় সবই জানেন। তাই ব্যক্তির ঈমানের অবস্থা জানার জন্য তার ইবাদত বা জিহাদ দেখার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালা চান, ব্যক্তি তার মৃত্যুর আগে নিজেই জেনে নিক তার নিজের ঈমান বা বেঈমানীর প্রকৃত অবস্থা। এভাবে ব্যক্তিকে সুযোগ করে দেন মৃত্যুর আগে তার নিজের পরিশুদ্ধির। জিহাদে অংশগ্রহণ করলো কি করলো না -সে বিষয়টি ঈমানের প্রকৃত অবস্থাটি ব্যক্তির চোখের সামনে আঙ্গুল দিয়ে তুলে তুলে ধরে। সেটি যেমন তার নিজের সামনে, তেমনি অন্যদের সামনেও। অন্য মুসলিমগণও তখন জানতে পারে কে তাদের নিজেদের লোক, আর কে শত্রু পক্ষের। এরূপ চেনার কাজটি মসজিদের জায়-নামাযে হয় না, রোযা বা হজ্বের জমায়তেও হয় না। পরীক্ষার আরো উচ্চতর ও নিবীড় ক্ষেত্র চাই। দশ হাজার টাকা বেতনের চাকুরীর ক্ষেত্রে মাধ্যমিক স্তরের সার্টিফিকেট দিয়ে চলে। কিন্তু বেতনের পরিমান লাখ টাকা হলে তখন কঠিন হয় পরীক্ষার মান। জান্নাত পাওয়ার অর্থ হাজার কোটি টাকা পাওয়া নয়। জান্নাতের এক ইঞ্চি ভূমি পাহাড় সমান সোনা দিয়ে কেনা যাবে না। সেটি কিনতে হয় জিহাদে নিজের জান, মাল ও সামর্থ্যের কোরবানী নিয়ে। পবিত্র কোর’আনে সে পরম ঘোষণাটি একবার নয়, বার বার শোনানো হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বার বার এরূপ ঘোষণার লক্ষ্য, যারা শুধু কালেমা পাঠ, নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালনের মধ্য দিয়ে জান্নাত পাওয়ার স্বপ্ন দেখে তাদের মারাত্মক ভূলটি ধরিয়ে দেয়া। লক্ষ্য, যেন তাদের ঘুম ভাঙ্গে। এবং জিহাদ যে জান্নাতের চাবি –সে গুরুতর বিয়য়টি যেন মৃত্যুর আগেই তারা বুঝতে পারে।     

ইসলাম ও তার শরিয়তী বিধানকে বিজয়ী করার লড়াইয়ে আপোষ চলে না। আপোষ হলে বিচ্যুতি হয় জীবনে বাঁচার মূল মিশন থেকে। আপোষের পথটি জাহান্নামের পথ। ঈমানদারদের আনুগত্য ও অঙ্গিকার একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডার প্রতি। এবং রাব্বুল আলামীনের সে এজেন্ডা হলো সকল দ্বীনের উপর তাঁর দ্বীনের বিজয়। পবিত্র কোর’আনে সে এজেন্ডাটি ঘোষিত হয়েছে “লি’ইউযহিরাহু আলা দ্বীনি কুল্লিহি” এ বয়ানে। তাই তার শরিয়তের পরাজয় নিয়ে বাঁচাটি কোন মু’মিনের এজেন্ডা হতে পারে না। সে এজেন্ডাটি শয়তানের। ঈমানদারের জীবনে জিহাদ তাই অনিবার্য হয়ে উঠে। সমাজ  ও রাষ্ট্রে বসবাসকারি অন্য যারা ঈমানদারের এ অভিপ্রায়ের সাথে ভিন্নমত রাখে -তাদের বিরুদ্ধে ঈমানদারকে এ ক্ষেত্রটিতে অতি অনড় ও আপোষহীন হতে হয়। সেরূপ আপোষহীনতার মধ্যেই মু’মিনের ঈমানদারী; এবং আত্মসমর্পণ হলো কুফরি। বাস্তবতা হলো, শরিয়ত প্রতিষ্ঠার যে কোনরূপ উদ্যোগকে ইসলামের বিপক্ষ-শক্তি কখনোই মেনে নেয় না। এটিকে তারা নিজেদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও প্রতষ্ঠিত বিধি-ব্যবস্থার বিরোধী গণ্য করে। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা যে তাদের কায়েমী স্বার্থ, রাজনৈতিক দখলদারি ও প্রতিপত্তিকে বিপন্ন করবে -সেটি তারা বুঝে। ইসলামের বিরুদ্ধে এজন্যই তারা আপোষহীন। সে আপোষহীনতা নিয়ে তারা লাগাতর যুদ্ধ লড়তেও প্রস্তুত।

 

জিহাদশূণ্যতা অসম্ভব করে হিদায়েতলাভ

বহু মুসলিম দেশে অনেক নেতার রাজনীতি বেঁচে আছে অমুসলিমদের ভোটে ও কাফের রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সাহায্যে। বৃহৎ শক্তিবর্গ ও নিজদেশে বসবাসকারি সংখ্যালঘুদের মুখের দিকে তাকিয়ে মুসলিম নামধারী এসব নেতারা শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠার কথা মুখে আনতেও ভয়। মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার চেয়ে কাফেরদের খুশি করাটি তাদের কাছে বেশী গুরুত্ব পায়। তাদের কাছে আখেরাতের চেয়ে গুরুত্ব পায় দুনিয়ার জীবন। এমনকি আল্লাহর দ্বীনের অস্বীকারকারীদের তারা কাফের বলতেও রাজী নয়। অথচ পৃথিবী পৃষ্টের বাঘ-ভালুকদের যেমন চিনতে হয়, তেমনি চিনতে হয় কাফের, মুনাফিক ও ফাসেকদের। মানব জাতি যাতে মহান আল্লাহতায়ালার এ শত্রুদের সঠিক চিনতে পারে সে জন্য তাদের পরিচিতিটি বার বার তুলে ধরা হয়েছে পবিত্র কোর’আনে। পৃথিবীটি একটা রণাঙ্গণ। ঈমানদারের জীবনে যুদ্ধ এখানে প্রতিদিন। যুদ্ধ এখানে ইসলামকে বিজয়ী করার, এবং শয়তানের পক্ষকে পরাজিত করার। ফলে এ রণাঙ্গণে শত্রুদের চিনতে যদি ভূল হয় তবে যুদ্ধ হবে কীরূপে? কাফেরকে কাফের বলাই তো মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। কাফের তো তারাই যারা ইসলামকে মহান আল্লাহতায়ালার একমাত্র দ্বীন রূপে মানতে রাজী নয়। এবং রাজী নয় তাঁর শরিয়তী বিধানকে প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিত। এরাই তো মুসলিম ভূমিতে ইসলামী বিধানকে পরাজিত করে রেখেছে। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার বিধানকে যারা পরাজিত করে রাখে তাদেরকে কি মুসলিম বলা যায়?

অনেকে নামায-রোযা আদায় করলেও শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কথা মুখ আনতে রাজী নয়। তারা ভাবে, শরিয়তের পক্ষ নিলে প্রতিবেশী অমুসলিম দেশ ও বৃহৎ শক্তিবর্গ নারাজ হবে। ভাবে, তাতে নারাজ হবে দেশের সংখ্যালঘুরাও। তাদের ভয়, এতে তাদের ভোট-ব্যাংকে টান পড়বে। ভাবে, তাতে নির্বাচনী বিজয় অসম্ভব হবে। এরূপ স্বার্থপর চিন্তায় কি ঈমান বাঁচে? এরূপ রাজনৈতিক স্বার্থ চিন্তায় গুরুত্ব হারায় মহান আল্লাহতায়ালা কি চান –সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। বরং গুরুত্ব পায়, অমুসলিমগণ কি চায় -সেটি। তখন এজেন্ডা হয়, অমুসলিমের এজেন্ডা নিয়ে রাজনীতি করা। অথচ মুসলিমদের রাজনীতিই শুধু নয়, তার বাঁচা-মরা নির্ধারিত হয়, মহান আল্লাহতায়ালা কি চান –সে ভাবনা থেকে। দেশের সংখ্যালঘু ভোটার বা বৃহৎ শক্তিবর্গ কি বলে সেটি দূরে থাক, তার নিজ পিতা-মাতার ন্যায় আপনজনদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাটিও তাঁর কাছে গুরুত্বহীন -যদি তারা ইসলামের বিপক্ষের হয়। মু’মিনের জীবনে মূল বিষয়টি হলো একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা। এ প্রসঙ্গে মু’মিনদের সাবধান করতে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে হুশিয়ারীটি এসেছে এভাবে: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের পিতা ও ভাইদের বন্ধু রূপে গ্রহণ করোনা যদি তারা ঈমান অপক্ষো কুফরকে ভালবাসে। আর তোমাদের মধ্যে যারা তাদরেকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করবে তারা সীমালংঘনকারী।” -(সুরা তাওবাহ, আয়াত ২৩)। আরো বলা হয়েছে: “(হে মুহম্মদ!) বলে দাও! তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা -যার ক্ষতি হওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের বাসস্থান –যাকে তোমরা পছন্দ করো আল্লাহ, তাঁর রসুল ও তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয় -তবে অপক্ষো করো, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আল্লাহ ফাসেক লোকদের হিদায়েত করেন না।” -(সুরা তাওবাহ, আয়াত ২৪)।

মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় ও সে লক্ষ্যে লড়াই এতোই গুরুত্বর্পূণ যে, পিতা-মাতা ও ভাই-বোনের বিরোধীতা, পারিবারীক ও গোত্রীয় স্বার্থচিন্তা, ব্যবসা-বাণিজ্যেরে ক্ষয়-ক্ষতি -কোনটাই যেন সে কাজ থেকে ঈমানদারকে বিচ্যুৎ করতে না পারে। যারাই নানা বাহানায় সে লড়াই থেকে দূরে থাকে মহান আল্লাহপাকের কাছে তারাই হলো ফাসেক তথা দুর্বৃত্ত। তাদের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর খবরটি হলো, তারা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে বিবেচিত হয় হিদায়েতের অযোগ্য রূপে –যা ঘোষিত হয়ছে উপরুক্ত আয়াতে। মানব জীবনের সবচে্য়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনটি হলো হিদায়েত লাভ। যারাই হিদায়েতের অযোগ্য, তারাই জান্নাতের অযোগ্য। এবং সে অযোগত্যটি অর্জিত হয় জিহাদ থেকে দূরে থাকার জন্য।  স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত -সে অযোগ্যতা দূর করে না। জিহাদের বিকল্প একমাত্র জিহাদই। তাই যে সমাজে মুসলমিগণ দূরে সরে জিহাদ থেকে -সে সমাজে নামাযী, হাজী ও রোযাদারের সংখ্যা বাড়লেও শরিয়তের পথে চলার লোকের সংখ্যা বাড়ে না। কারণ, শরিয়ত মোতাবেক চলার জন্য তো চাই হিদায়েত লাভ। অথচ যারা জিহাদ থেকে দূরে থাকে -তাদের হিদায়েত না দেয়াটাই মহান আল্লাহতায়ালার নীতি। আর এর ফলে  দেশ ভরে উঠে মুসলিম নামধারী ভয়ংকর পথভ্রষ্টদের দিয়ে। উদাহরণ হলো, বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলো।   

 

হারাম যুদ্ধ বনাম ফরয জিহাদ

জিহাদের যোগ দেয়ার সামর্থ্য সবার থাকে না। দুর্বলতা এখানে ঈমানের। জিহাদ হলো খালেছ ও বলিষ্ঠ ঈমানের প্রকাশ। ঈমান বাড়লে জিহাদে সংশ্লিষ্টতা বাড়ে। ঈমান যাদের তলায় ঠেকেছে তাদের পক্ষে জিহাদে যোগ দেয়াটি অভাবনীয়। জিহাদ একমাত্র তাদের জীবনে দেখা যায় -যারা বাঁচে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার জন্য। এটি দেয়ার জায়গা, নেয়ার জায়গা নয়। আখেরাতের চেয়ে পার্থিব স্বার্থ-উদ্ধার যাদের অধিক গুরুত্বর্পূণ তাদের পক্ষে জিহাদের ময়দানে পা রাখা অসম্ভব। এমন পার্থিব চেতনারই আধুনিক পরিভাষা হলো সেক্যুলারিজম। এদের কাছে পরকালীন চেতনা গণ্য হয় সাম্প্রদায়িকতা। অথচ এদেরই অনেকে নিজেদের পরিচয় দেয় ঈমানদার রূপে। তাদের অনেকে নামায-রোযা এবং হজ্ব-যাকাত পালন করে। অথচ সাড়া দেয়না জিহাদের ডাকে। পবিত্র কোর’আনে এদের সম্মন্ধে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কি হলো, যখন আল্লাহর পথে বের হবার জন্যে তোমাদের বলা হয় তখন মাটি জড়িয়ে ধরো, তোমরা কি আখারাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেল? অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনে উপকরণ অতি অল্প। -(সুরা তাওবাহ, আয়াত ৩৮)।

পরকাল ভূলে মাটি জড়িয়ে ধরার এ চেতনাটি হলো নিরেট সেক্যুলারিজম তথা পার্থিবতা। সেক্যুলারিস্টদের জীবনেও যুদ্ধ আছে। তবে সে যুদ্ধ পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্য। সাম্রাজ্য বিস্তারের যুদ্ধ, ঔপনিবেশিক যুদ্ধ, শ্রেণীযুদ্ধ, এথনিক ক্লিন্জিংয়ের যুদ্ধ, জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ ও বিশ্বযুদ্ধ –এরূপ প্রতিটি যুদ্ধই হলো সেক্যুলারিজমের যুদ্ধ। কিন্তু তাদের কাছে অপছন্দীয় হলো মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার যুদ্ধ। একমাত্র যে যুদ্ধটিকে মহান আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে ফরয করা হয়েছ সেটি হলো ইসলামী বিধানকে বিজয়ী করা ও সে বিধানকে প্রতিরক্ষা দেয়ার যুদ্ধ। অন্য সকল যুদ্ধ হারাম। সে ফরয যুদ্ধটির হুকুম এসেছে এভাবে: “তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দীয়। পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়তো কোন বিষয় পছন্দের নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তো কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয়, অথচ সেটি তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুত আল্লাহ যা জানেন তোমরা তা জান না।” –(সুরা বাকারাহ, আয়াত ২১৬)। অথচ আল্লাহতায়ালা যে যুদ্ধকে ফরয করেছেন সে যুদ্ধকেই সন্ত্রাস বলা হচ্ছে। এবং হালাল করে নিয়া হয়েছে সেক্যুলারিস্টদের হারাম যুদ্ধগুলোকে।

 

সৎ কর্ম ও অপরাধ কর্মে রাষ্ট্রের সামর্থ্য

মহান আল্লাহতায়ালা চান, মানুষ তার সামর্থ্যের বিনিয়োগ করুক ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধে। মানবের জন্য এটিই সবচেয়ে কল্যাণকর কর্ম। সমাজ শান্তিময় ও সভ্যতর হয় -এ কর্মটি সুচারু ভাবে হলে। মুসলিম জীবনে এটিই মূল মিশন। রাষ্ট্রই যে সকল মঙ্গল ও অমঙ্গলের মূল -সেটি ইসলাম যতটা বিশুদ্ধ ভাবে তুলে ধরেছে তা অন্য ধর্ম তুলে ধরে নাই। রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ যা চায়, জনগণকে সে দিকেইে যেতে হয়। অপরাধ-কর্মে দেশের সকল অপরাধীদের যে সামর্থ্য -তা থেকে রাষ্ট্রের স্বৈরাচারি শাসক এবং তার পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অপরাধ-কর্মের সামর্থ্য শতগুণ অধিক।  তারা সন্ত্রস্ত করতে পারে সমগ্র দেশবাসীকে। যে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের সবচেয়ে বড় সূদখোর -সে দেশে সূদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার ওয়াজ হলেও জনগণকে সূদ থেকে বাঁচানো যায় না। বরং সূদ দিতে ও সূদ খেতে জনগণও তখন বাধ্য হয়। বাঁচার তাগিদে লক্ষ লক্ষ মুসলিম নামধারি ব্যক্তি তখন সূদী ব্যাংকে চাকুরি নেয়। অথচ সূদ খাওয়া, সূদ দেওয়া এবং সূদের হিসাব লেখা হারাম। সূদ খাওয়াকে মহান আল্লাহতায়ালার রাসূল নিজের মায়ের সাথে জ্বেনার ন্যায় অপরাধ বলে ঘোষণা দিয়েছেনে। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সে জ্বিনার অপরাধ অবিরাম করে যাচ্ছে। মদ আমদানী ও বিক্রয় করা হারাম। অথচ বিদেশ থেকে বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশের বিমান বন্দরে ঢুকলে সরকারের যে ব্যবসাটি প্রথমে নজরে পড়ে সেটি হলো মদের ব্যবসা। এমন দেশে দীবারাত্র ওয়াজ নসিহত করলেও কি মদ্যপান বন্ধ হবে? তেমনি ব্যাভিচারীর বিষয়। জ্বেনা বা পতিতাবৃত্তির সবচেয় বড় পাহারাদার হলো সরকার। জনগণের রাজস্বের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ব্যভিচারের পাহারা দিচ্ছে সরকারি পুলিশ। আল্লাহর কাছে দোয়া বা বড় বড় ওয়াজ মহফিল বসিয়ে কি ব্যভিচার কি দূর হবে? নর্দমায় গলিত আবর্জনা জমিয়ে শুধু দোয়ার বরকতে কি মশা নির্মূল হয়? সে জন্য তো মশার আবাদ-ভূমি নির্মূল করতে হয়। বিষয়টি অভিন্ন সমাজ থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূলের বিষয়ও। প্রতিটি মুসলিমের উপর দায়িত্ব হলো দুর্বৃত্ত নির্মূলের দায়িত্ব। এটিই জীবনকে সফল করার পথ। পবিত্র কোর’আনে সে দায়িত্বের কথাটি বলা হয়েছে এভাবে: “তোমাদের মধ্যে এমন এক উম্মত অবশ্যই থাকতে হবে যারা মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকবে, ন্যায়ের নির্দেশ দিবে এবং অন্যায়কে রুখবে। এবং তারাই হলো সফলকাম।”-(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৪)।

 

জিহাদ কেন অনিবার্য?

আর দুর্বৃত্ত নির্মূলের মিশন নিয়ে ময়দানে নামলে যুদ্ধ অনিবার্য। মুসলিম জীবনে একারণেই অনিবার্য হয় জিহাদ। কারণ, কোন সমাজ বা রাষ্ট্রই শূণ্যস্থান নয়। সেখানে বসে আসে এমন কিছু ব্যক্তি ও দল -যারা দুর্বৃত্তির ব্যবসায়ী। বাংলাদেশের ন্য্যয় মুসলিম দেশগুলি এদের কারণেই দুর্নীতিতে বিশ্বে শিরোপা পেয়েছে। অন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়ের প্রতিরোধ তাদের রাজনীতি। এদের নির্মূলে মহান আল্লাহতায়ালা যুদ্ধকে ফরয করেছেন। সে ঘোষণাটি এসেছ এভাবে: “আর মুশরকিদের সাথে তোমরা যুদ্ধ করো সমবেত ভাবে, যেমন তারাও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে সমবেত ভাবে। মনে রেখো, আল্লাহ মুত্তাকীনদের সাথে রয়েছেন। আর ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও অধিক পাপের। বস্তুত তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদেরকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে, যদি তা সম্ভব হয়। তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দাঁড়াবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। আর তারাই হলো জাহান্নামবাসী। তারা চিরকাল সেখানে বাস করবে। আর এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই যে, যারা ঈমান এনেছে, যারা হিজরত করেছে, আর আল্লাহর পথে লড়াই করেছে -তারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী। আর আল্লাহ হচ্ছেন ক্ষমাশীল ও করুণাময়। -(সুরা আল-বাক্বারা, আয়াত ২১৭-২১৮)।

আর যারা মহান আল্লাহতায়ালার জিহাদের এ হুকুমকে অবহেলা করে তাদেরকে শুনিয়েছেন চরম হুশিয়ারী। দিয়েছেনে কঠিন আযাবের খবর। বলা হয়েছে: “যদি বের না হও, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে মর্মন্তদ আযাব দিবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। তোমরা তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না, আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। -(সুরা তাওবাহ, আয়াত ৩৯)। এবং এটিও শর্ত নয় যে, জিহাদের জন্য বিশাল বাহিনী গড়তে হবে। সে জন্য হাজার হাজার ট্যাংক, শত শত যুদ্ধ বিমান ও বিশাল বিশাল নৌ-বহর থাকতে হব। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী জিহাদ চালিয়ে যেতে হবে সর্ব-অবস্থায়। ঈমানদারের কাজ হলো খালেছ নিয়তে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে পড়া। তাদরেকে সাহায্য করার জন্য আল্লাহতায়ালার অসংখ্য ফিরেশতা সদাপ্রস্তত। বান্দাহর নিজিস্ব বিনিয়িোগ শুরু হলে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্যও শুরু হয়ে যায়।

মুসলিমদের আজকের পরাজয়ের কারণ, জিহাদের ময়দানে তাদের নিজস্ব বিনিয়োগ নাই। তাদের সকল সামর্থ্যের বিনিয়োগ হচ্ছে ভাষা, ভূগোল, ফিরকাহ ও দলীয় স্বার্থে, মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজযে নয়। ফলে আল্লাহর সাহায্যও আসছে না। যারা বিনিয়োগ করছে তারা আজও বিজয় পাচ্ছে। আফগানিস্তানে একটি বিশ্বশক্তির পরাজয় হলো তো সে সাহায্যের বদৌলতেই। আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মুমিনের উপর লড়াইয়ের তাগিদটি এসেছে এভাবে: “তোমরা বের হয়ে পড়ো তোমাদের প্রস্তুতি স্বল্প হোক অথবা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে হোক; এবং জিহাদ করো আল্লাহর পথে নিজদের মাল ও জান দিয়ে। এটি তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পারো।” –(সুরা তাওবাহ, আয়াত ৪১)। এখানে বিশাল প্রস্তুতির কথা বলা হয়নি। নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা আছে তা দিয়েই ময়দানে নামার। নবীজী (সা:) যদি কাফের শক্তির সমকক্ষ লোকবল ও অস্ত্রবল সংগ্রহের অপেক্ষায় থাকতেন তবে কি কোন দিনও জিহাদে নামার যুক্তি খুঁঝে পেতেন? কাফেরদের সংখ্যাবল ও অস্ত্রবল তো সব সময়ই অধিক ছিল। মুসলিমদের প্রতিরক্ষা, ইজ্জত এবং কল্যাণ কখনোই ঘরে বসে থাকাতে বাড়ে না, লড়াইয়ের পথে বেরিয়ে পড়াতে। মহান আল্লাহতায়ালা সেটি জানিয়েছেন এভাবে: “যারা জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করে, আল্লাহ তাদের পদমর্যদা বাড়িয়ে দিয়েছেন যারা ঘরে অবস্থান নেয় তাদের তুলনায় এবং প্রত্যেকের সাথেই আল্লাহ কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ মুজাহিদদেরকে ঘরে অবস্থানকারীদের তুলনায় মহান প্রতিদানে শ্রেষ্ঠ করেছেন।” –( সুরা নিসা, আয়াত ৯৫)।  

 

অসম্ভব ভাবনা

মাহে রমাদ্বানের রোযা ফরজ করতে পবিত্র কোর’আনে একটি মাত্র আয়াত নাযিল হয়েছে। বেশি আয়াত নাযিল হয়নি হজ্বের বিধান ফরজ করতে। নামায ও যাকাতের হুকুম বার বার এসেছে; কিন্তু সে নির্দেশগুলো এসেছে অন্য হুকুমের সাথে একই আয়াতের অংশ রূপে। সমগ্র একটি অআয়াত জুড়ে এবং ধারাবাহিক কয়েকটি আয়াত জুড়ে এসেছে এমন উদাহরণ বিরল। কিন্তু জিহাদের হুকুমগুলি যখন এসেছে তখন সেটি এসেছে বিস্তারিত ভাবে; অনেক সময় ধারাবাহিক কয়েটি আয়াত জুড়ে। সে সাথে এসেছে জিহাদে জানমাল কোরবানীর বিশাল পুরস্কারের সুসংবাদ নিয়ে। কেন এরূপ? বিষয়টি ভাববার বিষয়। বস্তুত এতে বুঝা যায় মহান আল্লাহতায়ালার বিচারে জিহাদ কতো গুরুত্বপূর্ণ।

নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি দেয়; কিন্তু জিহাদ হলো সমাজ ও রাষ্ট্র পরিশুদ্ধির একমাত্র হাতিয়ার। এ হাতিয়ার কাজ না করলে সমাজ ও রাষ্ট্র দুর্বৃত্তদের হাতে অধিকৃত হয়। তখন অসম্ভব হয় পৃথিবী পৃষ্টে মহান আল্লাহর নিজের দ্বীনের বিজয়। মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয়টি মসজিদের জায়নামাযে আসে না, আসে জিহাদে ময়দানে। যারা নিজেদের অর্থ, মেধা ও রক্ত দিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করে তাদের চেয়ে আর কে তাঁর কাছে অধিক প্রিয় হতে পারে? জিহাদ বাড়ায় মহান আল্লাহতায়ালার মহান উদ্দেশ্য ও তাঁর এজেন্ডার সাথে গভীর সংশ্লিষ্টতা। অপর দিকে জিহাদ থেকে দূরে থাকার অর্থ তাঁর ইচ্ছা ও এজেন্ডার সাথে সম্পর্কহীনতা।

মহান আল্লাহতায়ালার  পক্ষ ও শয়তানের পক্ষের মাঝে যুদ্ধটি যেখানে তীব্র ও রক্তাত্ব -সেখানে পক্ষ না নেয়া এবং নিষ্ক্রীয় থাকাও তো মহা অপরাধ। কারণ, সেরূপ নিষ্ক্রীয়তায় বিজয় বাড়ে শয়তানের। কথা হলো, জিহাদে অংশ না নিয়ে যারা বিজয় বাড়ায় শয়তানের এবং পরাজিত করে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে -তাদের চেয়ে অধিক অপরাধীই বা কে হতে পারে?  প্রশ্ন হলো, জিহাদবিমুখ এরূপ অপরাধীদের জান্নাত দিয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালা পুরস্কৃত করবেন? কোন সুস্থ্য মানুষ কি সেটি ভাবতে পারে? নিতান্তই এটি এক অসম্ভব ভাবনা।  ১ম সংস্করণ ০১/০১/২০১২; ২য় সংস্করণ ৩০/০১/২০২১।




শেখ মুজিবের সাথে কিছুক্ষণের স্মৃতি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ। পরন্ত বিকেলে কয়েক জন বন্ধুর সাথে ঢাকার ইসলামপুর রোডে ফুটপাথে হাঁটছি। দোকানে দোকানে তখন কেনাকাটার ভীড়। এমন সময় পিছন থেকে হঠাৎ আমার নাম ধরে ডাকার আওয়াজ। আমি এসেছি মফস্বলের গ্রাম থেকে। ঢাকায় বন্ধু-বান্ধব তেমন নেই। ফলে রাস্তার ফুটপাথে আমাকে কেউ এভাবে ডাকবেন সেটি ছিল অভাবিত। বিস্ময়ে চোখ ফিরালাম। দেখি আমাদের এলাকার অতি পরিচিত ডাক্তার। তিনি আমাদের পারিবারীক চিকিৎস্যকও। বেশ অমায়ীক মানুষ। তখন এমবিবিএস ও এল এম এফের পাশাপাশী ন্যাশন্যাল পাশ ডাক্তারও গ্রাম এলাকায় দেখা যেত। তিনি ছিলেন শেষাক্ত শ্রেনীর। আমার চাচাজানের তিনি ছিলেন অতি ঘনিষ্ট বন্ধু। ডাক্তারীর পাশাপাশি তিনি রাজনীতি করতেন এবং ছিলেন আওয়ামী লীগের থানা পর্যায়ের একজন নেতা। ভাল ছাত্র হিসাবে কিছুটা পরিচিতি থাকায় এবং সে সাথে পারিবারীক চিকিৎস্যক হওয়ার কারণে আমাকে তিনি স্নেহের চোখে দেখেন। উনার সাথে ছিলেন আমাদের এলাকার আরেকজন ব্যক্তি যিনি পরবর্তীতে আমাদের এলাকার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। আমার ছোটভায়ের সাথে উনার মেয়ের বিয়ে হওয়াতে তিনি আমার আত্মীয়তে পরিণত হয়েছিলেন। দুঃখজনক হল, চেয়্যারম্যান থাকা অবস্থায় তিনি সন্ত্রাসীদের হাতে অল্প বয়সেই নিহত হন। উনারা কুষ্টিয়ার গ্রাম থেকে ঢাকাতে এসেছেন।সামান্য কিছু কুশলাদি বিণিময়ের পর ডাক্তার সাহেব আমাকে বল্লেন,“আমরা বায়তুল মোকাররমে কিছু কেনাকাটা করবো, তুমিও আমাদের সাথে চল।” উনাদের সে প্রস্তাবে আমি সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম।

ঢাকাতে নিজ এলাকার মানুষ মানেই আপন মনে হত। ফলে তাদের সাথে সময় কাটানোর প্রচণ্ড এক আনন্দ ছিল। উনাদের খুশি করতে পারি তেমন একটা বাতিকও ছিল। আমার বন্ধু সাথীদের থেকে বিদায় নিয়ে তাদের সাথে হাঁটা শুরু করলাম। ঢাকা শহরে কেনাকাটার কোন অভিজ্ঞতা আমার আদৌ ছিল না। নতুন নতুন ঢাকায় এসেছি, ফলে ঢাকার দোকান-পাঠ নিয়েও আমার অভিজ্ঞতা ছিল সামান্য। আমার থেকে উনারা কোন সাহায্য ও পরামর্শ পাবেন না, সেটি উনারা জানতেন। কিন্তু তারপরও তারা কেন সাথে নিলেন তা আমি সেদিন বুঝতে পারিনি। তবে এখন তার কারণ কিছু বুঝি। কেন বুঝি সেটির কিছু ব্যাখা দেই। পাকিস্তানের একজন বিখ্যাত আইনবিদ ছিলেন জনাব আল্লাহবখশ খোদাবখশ ব্রোহী। সংক্ষেপে তাঁকে বলা হতো একে ব্রোহী। তিনি পাকিস্তানের আইনমন্ত্রীও হয়েছিলেন। দেখতে কেতাদুরস্ত মিষ্টার মনে হলেও মনেপ্রাণে প্রচণ্ড ধার্মিক ছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি শেখ মুজিবের আইনজীবী ছিলেন। তবে তাঁর আরেকটি বড় পরিচয় ছিল। সেটি হলো, তিনি ছিলেন একজন উঁচুমানের দার্শনিক। সেটি প্রথম টের পাই লাহোরের এক সেমিনারে তাঁর দেয়া এক বক্তৃতা শুনে। সেটি আরো ভাল ভাবে বুঝি তাঁর লেখা বই “এ্যাডভেন্চার ইন সেল্ফ এক্সপ্রেশন” নামক বিখ্যাত বইটি পড়ে। বইটি অতি উচ্চাঙ্গের। বইটি আমার এতই ভাল লেগেছিল যে কিছু কিছু চ্যাপ্টার কয়েকবার পড়েছি। সে বইয়ের কিছু কথা আমার মনে এখনও রেখাপাত করে আছে। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, “every event is destined to promote a serious purpose”। তাঁর এ কথার মর্মার্থ যা বুঝেছি তা হলো, জীবনের কোন ঘটনাই অর্থহীন নয়। লক্ষ্যহীন ভাবে সেগুলি ঘটেও না। গাছের পাতা যেমন মহান আল্লাহর অনুমতি ছাড়া পড়ে না, তেমনি কোন ঘটনাও তার অনুমতি ছাড়া ঘটে না। ব্যক্তির জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার একটি অন্তঃনিহিত উদ্দেশ্যে থাকে। আর সেটি হলো মহৎ একটি লক্ষ্যের দিকে তার জীবনকে ত্বরান্বিত করা। মানুষের দায়িত্ব হল, সেসব ঘটনা –তা ভাল হোক বা মন্দ হোক তা থেকে লাগাতর শিক্ষা নেয়া। যারা এসব ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নেয় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও দার্শনিকে পরিণত হয। কুনফুসিয়াস, সক্রেটিস, প্লেটো, গৌতম বুদ্ধের মত ব্যক্তিরা তাই কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না হয়েও মানব ইতিহাসের বিখ্যাত দার্শনিক। কথাটা যে কতটা সত্য তা আমার জীবনে আমি বহুবার উপলব্ধি করেছি। আমার জীবনে বহু ঘটনা শুরুতে আদৌ কল্যাণকর মনে হয়নি, বরং আসন্ন ক্ষতি বা বিপদের কারণ মনে হয়েছে। কিন্তু পরে দেখিছে সেটিই আামার জীবনে বড় কল্যাণ বেয়ে এনেছে। পরে এক মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স পড়তে গিয়ে অনেক গুরুকে বলতে শুনেছি, যারা জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নিতে জানে তাদের জীবনে ব্যর্থতা বলে কিছু নেই। বরং বড় বড় সে ব্যর্থতাগুলি তাদের জীবনে শিক্ষার অমূল্য সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সেদিন তাদের সাথে ঢাকার রাস্তায় ঘুরাটা আমার কাছে অনর্থক মনে হলেও তা বস্তুত অর্থহীন সময়ক্ষেপণ ছিল না। বরং তা দিয়েছে এমন শিক্ষা যা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরূপে জানবার সুযোগ হয়নি। হয়তো তেমন একটি শিক্ষা দেয়ার জন্যই আল্লাহপাক আমাকে ইসলামপুর রোড থেকে তুলে নিয়ে তাদের সাথে কিছুক্ষণ চলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। অলিগলি, মাঠেঘাটে, ঘরে-বাইরে ও নানা মানুষের মাঝে কোথায় যে শিক্ষার কত অমূল্য রত্ন ছড়িয়ে আছে তা কে জানে?

বায়তুল মার্কেট থেকে উনারা কিছু শাড়ী কিনলেন। তারপর বললেন, “আমরা আওয়ামী লীগ অফিসে যাব। তুমিও চলো আমাদের সাথে।” আমারও কোন ব্যস্ততা ছিল না, তাই রাজী না হওয়ারও কোন কারণ ছিল না। তখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিস পুরোন পল্টনে। বায়তুল মোকাররম ও জিপিওর উত্তর পাশে যে হাউস বিল্ডিং ফাইনান্সের বিল্ডিং তার পূর্ব পাশের রাস্তা দিয়ে কিছুটা উত্তরে গেলেই রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে আওয়ামী লীগের অফিস। সম্ভবত বিল্ডিংটি ছিল তিন তালা। আমরা দুই তালায় উঠলাম। রাস্তায় কাউকে জিজ্ঞেস না করে ডাক্তার সাহেব যেভাবে সরাসরি অফিসে গিয়ে পৌছলেন তাতে মনে হল সে অফিসে তিনি পূর্বেও গেছেন, নইলে মফস্বলের লোকের পক্ষে ঢাকার কোন অফিস এত সহজে চেনা সম্ভব হয় কি করে? দুই তলায় উঠেই ডানপার্শ্বের বড় রুমটাতে সোজা ঢুকে পড়লেন। কেউ কোন বাধা দিল না। ঢুকেই দেখি শেখ মুজিব বসা। তাঁর সামনে একটি মাঝারী আকারের টেবিল। টেবিলের সামনে দুই খানি খালি চেয়ার। পাশে আরেক খানি। আমরা তিন জন একসাথে ঢুকি। ডাক্তার সাহেবকে দেখা মাত্রই শেখ মুজিব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি আমাদের তিন জনের সাথেই একে একে হাত মেলালেন। টেবিলের পাশের তিনটি চেয়ারে আমাদের বসতে বললেন। সাথে সাথে তিন কাপ চায়ের হুকুম দিলেন। ডাক্তার সাহেব বসলেন শেখ মুজিবের বাঁ পাশের চেয়ারে অতি কাছে। আমি বসলাম সরাসরি সামনের চেয়ারে।

আমি তো অবাক। আমাদের ডাক্তার সাহেব এলাকায় খুব একটা বিখ্যাত লোক নন। তার নিজের কোন চেম্বার বা ফার্মেসীও নেই। তিনি রোগী দেখেন অন্যের ফার্মেসীতে বসে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে রোগী দেখেন পুরোন এক সাইকেলে চড়ে। অথচ শেখ মুজিব তখন বিখ্যাত ব্যক্তি। তাকে দেখে শেখ মুজিব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগতম বলবেন সেটি দেখে আমি সেদিন অভিভূত হয়েছিলাম। বুঝতে বাকি থাকলো না, শুধু জেলা পর্যায় নয়, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সাথে শেখ মুজিবের সম্পর্ক কত গভীর। শেখ মুজিবের সেদিনের বডি ল্যাংগুজে আমি এতটাই বিস্মিত হয়েছিলাম যে সে গল্প আমি পরবর্তীতে বহু লোককে বহুবার বলেছি। তবে তার সে বডি ল্যাংগুজের বিবরণ আমি আমার স্ত্রীর কাছেও বহুবার শুনেছি। আমার শ্মশুর সাহেব এক সময় ছিলেন বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার আওয়ামী লীগের নেতা। তিনি আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হয়ে শিক্ষাকতায় যোগ দেন। প্রথমে জগন্নাথ কলেজ, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগে যোগ দেন। কিন্তু  শিক্ষাকতা তাঁর ভাল লাগেনি। পঞ্চাশের দশকের শুরুতেই সে পেশা ছেড়ে দিয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে আইন-ব্যবসায় যোগ দেন। তাতে তিনি যথেষ্ট ভাল করেন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্টাতা সদস্য। আইয়ুব আমলের আগে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়্যারম্যান রূপেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন জেলা পরিষদের চেয়্যারম্যানদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা থাকতো। অবশ্য আইয়ুব খান এসে সে ক্ষমতা জেলাপ্রশাসকদের হাতে তুলে দেন। মাওলানা ভাষানীসহ অনেক বড় বড় আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁর বাসায় এসেছেন। পরে তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে দেন। শেখ মুজিব যখন ৬ দফা পেশ করেন তখন পূর্ব পাকিস্তানের সতেরো জেলার মধ্যে ১৩ জেলার আওয়ামী নেতাই সেটির বিরোধীতা করে বেড়িয়ে যান যান, এবং তিনি ছিলেন তাদের একজন। আলীগড়ে পড়া অবস্থায় তিনি ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। সে পাকিস্তানের ক্ষতি তাঁর কাছে ছিল অসহনীয়। শেখ মুজিবের ৬ দফার মধ্যে তিনি সেটি টের পেয়ে সরে দাঁড়িয়েছেছিলেন। আওয়ামী লীগে থাকলে তিনি সম্ভবত একজন মন্ত্রী হতে পারতেন। শেখ মুজিব ছিলেন আমার শাশুড়ীর আত্মীয়, সম্পর্কে হতেন মামা। আমার শাশুড়ীও ছিলেন গোপালগঞ্জের মেয়ে। সত্তরের নির্বাচনী জলসা করতে যখন তিনি কুষ্টিয়ায় আসেন তখন তিনি এসেছিলেন আমার শ্মশুর সাহেবের বাসায়। সেটিই ছিল তার শেষ আসা। সেদিন জলসা শেষে তারা গলার ফুলের মালা আমার দাদী শাশুড়ীর গলায় পড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমার দাদী শাশুড়ী তখন পক্ষাগ্রস্ত শয্যাশায়ী রোগী। কিন্তু সে মুহুর্তেও তিনি ভোট চাইতে ভূলেননি। আমার শ্মশুর তাঁর দলকে ভোট দিবেন না সেটি জানতেন, কিন্তু ভোট চেয়েছেন আমার শাশুড়ীর কাছে। বলেছিলেন, “জানি, জামাই তো ভোট দিবে না, তুই কিন্তু ভোটটা আমাকেই দিবি।” নির্বাচনী জয় যে শেখ মুজিবের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ হলো তার নমুনা। তার রাজনীতি ছিল অতি ফোকাসড তথা সুস্পষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক। সেটি, যে কোন ভাবে নির্বাচনী জয়। ব্যাবহারের গুণে তিনি সহজেই মানুষের সাথে এভাবে ঘনিষ্ঠ হতে পারতেন।     

শেখ মুজিবকে আমি এর আগে কোনদিন দেখিনি। তবে পরে বিভিন্ন জনসভায় তাঁকে কয়েকবার আরো দেখেছি। আমি ভাবতেও্র পারিনি জীবনে এমন কাছে থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ পাব। আমাদের জন্য চা আসলো। আমাদের গ্রামের বাড়ীতে চা খাওয়ার প্রচলন ছিলনা। ঢাকায় এসে তখনও চা খেতে অভ্যস্থ হযে উঠিনি। ফলে চা খাওয়ার চেয়ে আমার নজর ছিল রুমের অন্যদের দিকে। রুমে তখন অনেক লোক। রুমটিও মোটামুটি বড়। দেখি কোনে কোনে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ চুপি চুপি আলাপ সারছেন। রুমের বাইরেও মানুষের ভিড়। তাদের কথাবার্তাও রুমের মধ্যে ভেসে আসছে। গুঞ্জন চারদিকে। যেন শেয়ার বাজার। শেখ মুজিব বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে একের পর এক আলাপ সারছেন, আলাপের ফাঁকে মুখে পাইপ ঢুকিয়ে মাঝে মাঝে তামাক টানছেন। দেশের প্রেসিডেন্ট তখন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তিনি জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওয়াদা দিয়েছেন। এমন ভাব, সে ওয়াদায় তিনি যে অটল থাকবেন সেটি প্রমাণ করেই ছাড়বেন। এবং সেটি তিনি প্রমাণ করেছিলেনও। তবে অন্য কোন জেনেরেলের এক্ষেত্রে কোন সুনাম ছিল না। দেশজুড়ে তখন নির্বাচনের আমেজ। আওয়ামী লীগের নমিনেশন নিয়ে তখন শুরু হয়েছে জোর লবিং। সেটি সেখানে বসেই বুঝা যাচ্ছিল। আমাদের ডাক্তার সাহেব তার মুখটি শেখ মুজিবের অতি কাছে নিয়ে চুপি চুপি কিছু যেন বললেন। আমার সেটি জানার আগ্রহও ছিল না, তবে কিছু আওয়াজ যা কানে ভেসে আসলো তা থেকে বুঝলাম তিনিও কুষ্টিয়ায় দলের মনোনয়ন নিয়ে কিছু কথা শেখ সাহেবের কাছে রাখলেন।

এমন সময় দুইজন তাগড়া জোয়ান সাথে নিয়ে ঢুকলেন আব্দুর রাজ্জাক। আব্দুর রাজ্জাক তখন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান। ইনিই সেই আব্দুর রাজ্জাক যিনি পরে মন্ত্রী হয়েছেন। শেখ মুজিবের অতি কাছে গিয়ে তিনি দুই যুবককে পরিচয় দিলেন এই বলে, “এরা দুই জন আমাদের ভাল কর্মী। এরা লালবাগের। আপনি তো জানেন, ওখানে জামায়াতের ঘাঁটি।” শেখ মুজিব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যুবক দু’জনের কাঁধ চাপড়িয়ে সাবাস জানালেন। উৎসাহ দিলেন দলের জন্য বেশী বেশী কাজের। তবে আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্য শুনে আমি তো অবাক। কারণ, লালবাগ কখনই জামায়াতের ঘাঁটি ছিল না। লালবাগে তখন বিশাল খারেজী মাদ্রাসা। সে মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন মোহাম্মদউল্লাহ হাফেজজী হুজুরের মত ব্যক্তিবর্গ। তারা ছিলেন ঘোরতর জামায়াত বিরোধী। ফলে আব্দুর রাজ্জাকের রাজনৈতিক জ্ঞান নিয়েই আমার কিছুটা সংশয় দেখা দিল।

যতক্ষন বসে ছিলাম দেখলাম, শেখ মুজিবের অফিস রুমের দরজাটি বরাবরই খোলা। দরজায় কোন প্রহরীর বালায় নেই। ফলে ফ্রি ট্রাফিক। ইচ্ছামত মানুষ তাঁর রুমে ঢুকছেন। যেমন নেতারা ঢুকছে, তেমনি ঢুকছে সাধারণ কর্মীরা। সেখানে দেখলাম আমার চেনাজানা এক পত্রিকার হকার। সে আমাদের কলেজ হোস্টেলে পত্রিকা বিলি করতো। মাথায় টুপি, বিপুল বপুধারী সে হকারটির কাজ ছিল পত্রিকা বিলির পাশাপাশি চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে আওয়ামী লীগের বানী প্রচার করা। সেখানে তাঁকে দেখেও আমি বিস্মিত হলাম। প্রশ্ন জেগেছে, এখানে এ হকারের কি কাজ? এটি তো দলের কেন্দ্রীয় অফিস। আমার প্রত্যাশা ছিল, এখানে তো তারাই আসবে যারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন এবং নীতি নির্ধারণ করবেন। এ অফিসের কাজ হবে তাদের মাঝে সংযোগ ও সলাপরামর্শের কিছু সুযোগ করে দেয়া। কিন্তু তেমন কোন পরিবেশই দেখলাম না। এক বিশৃঙ্খল অবস্থা। দেখলাম মাষ্টার গুল খান এক পশ্চিম পাকিস্তানী ঘুরাফেরা করছেন। তিনি তখন পাঞ্জাব আওয়ামী লীগের নেতা। তার নাম পূর্বে পত্রিকায় পড়েছি, এবার সামনে দেখলাম।

উনিশ শ’ সত্তরের জানুয়ারী মাসটি ছিল নির্বাচনী জনসভার মাস। আওয়ামী লীগ তখন দেশ জুড়ে জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণার উদ্যোগ নিয়েছে। জেলায় জেলায় তখন প্রধান প্রধান সড়গুলিতে বড় বড় নৌকা আর শেখ মুজিবের নামে গেট তৈরীর হিড়িক। কুমিল্লা থেকে আগত আওয়ামী লীগের এক নেতা শেখ মুজিবকে প্রশ্ন করলেন, তাঁর আগমন উপলক্ষ্যে কুমিল্লাতে ক’টি গেট বানানো হবে? প্রশ্নটি আমার কাছে অদ্ভুত লাগলো। নেতার নামে ক’টি গেট বানানো হবে -সেটির জন্য আবার শেখ মুজিবকে জিজ্ঞেস করতে হবে? এটি কিসের নমুনা? এটি তো মেরুদন্ডহীন পদসেবী চরিত্র? সে প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব সেদিন কি বলেছিলেন সেটি সুস্পষ্ট শুনতে পারিনি। গণতন্ত্র সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষমতায়ন ঘটায়, কিন্তু এটি কি ক্ষমতায়নের নমুনা? ক’টি গেট বানাতে হবে সে মামূলী সিদ্ধান্তটিও একজন জেলা পর্যায়ের নেতা নিতে পারছেন না। এসেছেন সরাসরি শেখ মুজিব থেকে জানতে! এটি কি কম তাজ্জবের বিষয়? দেখি ওখানে সবাই শেখ মুজিবকে স্যার বলে ডাকছেন। একজন বল্লেন, “স্যার, আমি আগামী রবিবার আপনার বাসায় দেখা করতে চাই।” উত্তরে শেখ মুজিব পাইপে মুখ লাগিয়ে গম্ভীর ভাবে বল্লেন সেটি অসম্ভব। আরো বল্লেন, “জানো তো, সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর জন্য আমাকে কিছু ভাবতে হয়? অতএব রবিবারে সম্ভব নয়।” তার সে উক্তিতে আমি সেদিন অবাক হয়েছিলাম। দেশবাসীর জন্য একজন নেতার ভাবনা তো সর্বক্ষণের। এটি কি কোন দিনক্ষণ বেঁধে হয়? তাছাড়া দিনক্ষণ বেঁধে হলেও সেটি কি ঘোষণা দেয়ার মত?

তবে সে সন্ধাতে বিস্ময়ের আরো কিছু বাঁকী ছিল। একজন ব্যক্তি মুজিবের বাঁ পাশে দাড়িয়ে কিছু বলা শুরু করলেন। বুঝা যাচ্ছিল তিনি এসেছেন মফস্বল থেকে। তিনি যা বিবরণ শুনাচ্ছিলেন তা হল, জামায়াতে ইসলামের লোকেরা নাকি গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রচার করছে যে তাদের ঢাকায় যেতে হবে। তারা আরো বলছে শেখ মুজিব নাকি তাদের ঢাকায় হাজির হতে বলেছেন। আমার কাছে তার এ বিবরণ মিথ্যা ও হাস্যকর মনে হল। ১৮ই জানুয়ারিতে পল্টন ময়দানে জামায়াতে ইসলামীর প্রথম নির্বাচনী জনসভা। সে সভায় মাওলনা মওদূদীসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তৃতা দেয়ার কথা। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মাওলানা মওদূদীর সাথে আরো অনেক কেন্দ্রীয় নেতা আসছেন। জামায়াতের নেতা ও কর্মী বাহিনী তখন সে জনসভাকে যতটা সম্ভব বিশাল ও ঐতিহাসিক করার জন্য দেশব্যাপী আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল, সকল জেলা থেকে যত বেশী সম্ভব লোক জড় করা। কিন্তু তারা সেজন্য শেখ মুজিবের নাম ব্যবহার করব সেটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। এটির কোন প্রমাণ নাই। এটি কি চাটুকার এক কর্মীর পক্ষ থেকে নেতার সামনে তার নেতার ইমেজকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা? কিন্তু শেখ মুজিব সে মিথ্যাকে কীরূপে গ্রহণ করলেন সেটি তার মুখ থেকে প্রকাশ পেল না। তিনি জবাবে কিছুই বল্লেন না। কিন্তু নিজে থেকে যা বল্লেন, সেটি ছিল আমার কাছে মনে হল যেমন ভয়ানক তেমনি বিস্ময়কর। মুখের পাইপ থেকে টানা তামাকের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে রাগতঃ স্বরে বল্লেন, “লাহোর-করাচীর ব্যবসায়ীদের পয়সা নিয়ে মওদূদী বাঙ্গালী কিনতে আসছে। দেখে নিবে কি করে মিটিং করে।”

তার কথা শুনে আমি অবাক। তিনি বলছেন, মওদূদী বাঙ্গালী কিনতে আসছেন। তা হলে প্রশ্ন হল, বাঙ্গালী কি বিক্রয়যোগ্য পণ্য? মুজিবের চোখে এটিই কি বাঙালীর মূল্যায়ন? মাওলানা মওদূদী পাকিস্তানের একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। দেশের যে কোন স্থানে জনসভা করার অধিকার তাঁর নাগরিক অধিকার। সে অধিকারকে খর্ব করার কোন অধিকার শেখ মুজিবের ছিল না। সেটি হলে তা হবে এক শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। বাঙ্গালী কেনাই যদি মাওলানা মওদূদীর পরিকল্পনা হয় তবে সেটির মোকাবেলা তাঁকে রাজনৈতিক ভাবে করা উচিত। কিন্তু সে অভিযোগ এনে পল্টন ময়দানে মাওলানা মওদূদীকে মিটিং করতে দেয়া হবে না -এটি কি ধরণের বিচার? এটি তো ফ্যাসীবাদ। এভাবে জনসভা বানচাল করা কি কোন সভ্য দেশে শোভা পায়? অথচ মনে হল, মুজিব দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে তিনি জামায়াতে ইসলামীকে মিটিংই করতে দিবেন না। আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক রূপে জাহির করেন। কিন্তু এটি কি গণতন্ত্রের নমুনা?

মুজিবের সে কথাটি রুমের অনেকেই শুনলেন। কিন্তু দেখলাম কারো মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া নেই। যেন তিনি কোনরূপ অন্যায় বা অশোভন কথা বলেননি। এটিই মনে হলো আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি। সংস্কৃতি থেকেই তো মানুষ সিদ্ধ-অসিদ্ধ, ন্যায়-অন্যায়ের একটি মাপকাঠি পায়। এজন্য কাউকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া লাগে না। সে সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে কথা বললে সেটি তো মামূলীই মনে হবে। সন্ত্রাস বা ফ্যাসীবাদ যখন দলীয় সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায় তখন সে দলের নেতা রুমভর্তি মানুষের সামনে অন্যদলের মিটিং ভাঙ্গার ন্যায় দম্ভোক্তিটি প্রকাশ্যে করতে পারেন। ডাকাত পাড়ারও নিজস্ব একটি সংস্কৃতি থাকে। সেখানে কে কতটা নৃশংস ভাবে ডাকাতি করলো, ধর্ষণ করলো বা খুন করলো সেটিই বাহবা পায়। ভদ্রতা, মানবতা, দয়াবোধ সে পাড়ায় বাজার পায় না। এমন এক অসুস্থ্য সংস্কৃতির কারণেই এক ডাকাত ঘর ভর্তি অন্য ডাকাতদের সামনে নৃশংস ডাকাতির বিবরণ বুক ফুলিয়ে দেয়। সেটি সেখানে বীরত্ব রূপে মনে গণ্য হয়। কিন্তু সভ্য সমাজে সেটি ঘটে না। তেমনি পতিতাপল্লির সংস্কৃতিতে অশ্লিল বা উলঙ্গ থাকাটি কোন অসাধারণ কিছু নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রতিদ্বন্দী ডিমোক্রাটদলীয় প্রার্থীর কোন জনসভা পণ্ড করেননি। শুধু তাদের হেড অফিসে গোপন খবর সংগ্রহের জন্য লুকানো যন্ত্র ফিট করেছিলেন। আর এ অপরাধেই তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়তে হয়েছিল।পিটার ম্যান্ডেলসন ছিলেন ব্রিটিশ লেবার দলের এক প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী। তাকে বলা হত কিং মেকার। তাঁর সমর্থনের বলেই টনি ব্লেয়ার প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি এক ব্যবসায়ীর ভাড়া করা প্যারিসের এক হোটেল রুমে ছিলেন বলে তাঁকে মন্ত্রীত্ব হারাতে হয়েছিল। যদি কোন মন্ত্রী মিথ্যা কথা বলেছেন এটি যদি প্রমাণিত হয় তবে সে অপরাধে ব্রিটেনে এখনও মন্ত্রীত্ব যায়। সততা, সত্যবাদীতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা –এগুলো সভ্য সমাজের জন্য অপরিহার্য। অপরদিকে অন্যদলের রাজনৈতিক মিটিং পন্ড করা ও সে মিটিংয়ে মানুষ খুন করা তো মারাত্মক অপরাধ। অথচ জামায়াতের ১৮ই জানুয়ারীর মিটিংয়ে সেটিই ঘটেছিল। এবং সেটিই আমি স্বচোখে দেখিছি। সে বিবরণও পরে দিব।      

আওয়ামী লীগ অফিস থেকে বিষন্ন মন নিয়ে ফিরলাম। দুশ্চিন্তা বাড়লো দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আকাশে তখন ঘন কালো মেঘ। যখন তখন ঝড় শুরু হতে পারে। তবে তখনও ভাবেনি,পাকিস্তান হয়তো আর বাঁচবে না। কারণ সে বিতর্ক তখনও শুরু হয়নি। বরং শেখ মুজিব নিজেও মাঠে ময়দানে জোরে জোরে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিচ্ছেন। ইয়াহিয়া এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এ্যাডমিরাল আহসানের সাথেও দেখা করছেন। তখন তিনি ব্যস্ত নির্বাচনী বিজয় নিয়ে। তবে মুজিবের মত ব্যক্তির হাতে যে গণতন্ত্র বাঁচবে না সে বিষয়ে আমার সেদিন বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। প্রচণ্ড সে হতাশা নিয়েই সেদিন আমি আওয়ামী লীগ অফিস থেকে ফিরেছিলাম। আমি তখন এক তরুন কলেজ ছাত্র। কিন্তু আমার সেদিনের সে ধারণা বিন্দুমাত্র মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি। ১৯৭৪ সালে একদলীয় বাকশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে সেটি তা প্রমাণ করে ছেড়েছেন।

ঢাকায় বসবাস কালে আমার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল পল্টন ময়দানের প্রতিটি জনসভায় যোগদান করা। ঢাকায় এটিই ছিল জনসভার জন্য সবচেয়ে প্রসিদ্ধ জায়গা। আমার বড় আকর্ষণ ছিল মাওলানা ভাষানীর বক্তৃতা। ঢাকায় অনুষ্ঠিত কয়েকটি জনসভায় আমি তাঁর বক্তৃতা শুনেছি। তার জনসভায় প্রচুর লোকসমাগম হত। তার বক্তৃতার ভঙ্গিটা ছিল অতি চিত্তাকর্ষক। মানুষকে খ্যাপানোর দিক দিয়ে তাঁর জুড়ি ছিল না। । একবার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত ওয়ালীখানপন্থি ন্যাপের নেতাদের বক্তৃতাও শুনলাম। অবশেষে এল ১৯৭০য়ের ১৮ই জানুয়ারি। সেদিনও আমি গিয়ে হাজির। দেখি চারি দিক থেকে প্রচুর লোক আসছে। মনে হচ্ছিল অনেক লোক হবে। বহু লোক এসেছে মফস্বল থেকে। তখনও মাওলানা মাওদূদীসহ কোন কেন্দ্রীয় নেতাই মঞ্চে এসে হাজির হননি। তখন পল্টন ময়দানের দক্ষিণ ও পশ্চিম পার্শ্বে ছিল ইটের দেয়াল। মঞ্চ হতো ময়দানের পূর্ব দিকে। দেখলাম জামায়াতের স্বেচ্ছাসেবীরা মাঠের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা সুদৃঢ় করা ব্যবস্থা করছে। তাদের হাতে বিভিন্ন শ্লোগান বিশিষ্ঠ পোষ্টার। ময়দানের উত্তরের দিকে দেখলাম কিছু পুলিশ। ইতিমধ্যে বক্তৃতা শুরু হয়ে গেছে। জেলা ও প্রাদেশিক পর্যায়ের কিছু নেতা তখন বক্তৃতা দিয়ে মাঠ গরম করেছেন।

লক্ষ করলাম,পশ্চিম দিকের জিন্নাহ এভিনিউতে এখন যা বঙ্গবন্ধু এভিনিউ নামে পরিচিত, সেখানে বেশ কিছু সংখ্যক যুবক দাড়িয়ে জটলা পাকাচেছ। মিটিং তখন আধাঘন্টাও চলেনি। এরপর শুরু হল মিটিং লক্ষ করে বড় বড় পাথর নিক্ষেপ। মাঠে তখন হাজার হাজার মানুষের ভিড়। এমন ভিড়ের মাঝে পাথর ছুড়লে লক্ষভ্রষ্ট হওয়ার উপায় নেই। পাথর গুলো সহজেই তার কাঙ্খিত টার্গেটে গিয়ে আঘাত হানছিল। লাগছিল কারো মাথায়, কারো গায়ে, কারো বা পায়ে। অনেকের মাথা ফেটে রক্ত বেরুচ্ছিল। অনেকে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ এরূপ অবিরাম পাথর বর্ষণের পর শুরু হল উত্তরের পাশ থেকে দলবদ্ধ হামলা। কয়েক শত যুবক লাঠি নিয়ে জনসভার মধ্যে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছিল। তাদের রুখার জন্য সাহসিকতার সাথে প্রাণপণ চেষ্টা করছিল জামায়াতের স্বেচ্ছাসেবকগণ। প্রায় আধাঘন্টা ধরে তারা তাদের রুখে রেখেছিল। এর মধ্যে এল পুলিশ।পুলিশ দেখে জামায়াতের স্বেচ্ছাসেবীরা মনে হয় ভেবেছিল, এবার পুলিশ হামলাকারীদের রুখবে। আর এতেই শুরু হল আরেক বর্বরতা। এবং সেটি ভয়ানক ভাবে। অথচ এতক্ষণ স্বেচ্ছাসেবীরা ভালই রুখছিল। তারা বার বার ধাওয়া করে তাদেরকে জলসা থেকে বহুদুর হটিয়ে রেখে আসছিল। কিন্তু পুলিশ হামলাকারিদের না রুখে বরং তাদের জনসভার মধ্যে ঢুকার সুযোগ করে দিল। ফলে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়লো জনসভার নিরাপত্তা। সহজেই পণ্ড হল জনসভা। এবার নেতাকর্মীদের প্রাণ নিয়ে বাঁচাবার পালা। দেখলাম লম্বা শেরওয়ানী,পাঞ্জাবী,আলখেল্লা পরিহিত ৬০-৭০ বছরের বৃদ্ধকে দক্ষিণের দেয়াল টপকিয়ে প্রাণ বাঁচাবার কি করুণ চিত্র! পালাবার সময়ও তাদের উপর পড়ছে পাথর,কারো পিঠে উপর লাঠির আঘাত।সেখানে সেদিন দুই জন প্রান হারান। আহত হন শত শত। আহতদের অনেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে পুণরায় আহত হন ছাত্র লীগ কর্মীদের হাতে। পল্টন ময়দানের নিকটতম প্রতিবেশী হল গভর্নর হাউস। কিন্তু এতবড় হামলার সে খবর কি সেদিন সেখানে পৌছেছিল? এত বড় হামলার পরও কাউকে সেদিন একদিনের জন্যও গ্রেফতার করা হয়নি। কারো কোন শাস্তিও হয়নি। প্রশাসন আওয়ামী লীগকে যে কতটা ছাড় দিয়েছিল এ হলো তার প্রমাণ। 

পরদিন দৈনিক পত্রিকাগুলোর খবর দেখে আরেক বিস্ময়। দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ বিশাল ব্যানার হেডিং দিয়ে খবর ছেপেছিল, জনসভায় আগত জনতার উপর জামায়াতকর্মীদের বর্বর হামলা। একটি জাতি যখন অধঃপতনের দিকে যায় তখন সে দেশের দুর্বৃত্তরাই শুধু বিবেকশূন্য হয় না, ভয়ানক অমানুষে পরিণত হয় মানুষরূপীরাও। সেদিনের দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদ পড়ে অন্তত সেটিই মনে হয়েছিল। কয়েকটি পত্রিকায় নিহতদের ছবি ছাপা হয়েছিল। নিহতদের দুই জনই এসেছিল মফস্বলের জেলা থেকে। তাদের ছবি দেখে সেদিন এটিই প্রশ্ন জেগেছিল, কি অপরাধে তাদের হত্যা করা হলো? কি জবাব দেয়া হবে তাদের আপনজনদের? আপনজনগন সান্তনাই বা পাবে কীরূপে? কোন সভ্যদেশে কি এটি ভাবা যায়? স্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থ হাছিলে এভাবে নিরপরাধ মানুষ হতে হবে? কোন সভ্যদেশে এমন ঘটনা ঘটেলে সকল দল মিলে তার একটি তদন্ত দাবী করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে দাবীও করেনি।

আওয়ামী লীগ অফিসে বসে সেদিন মুজিবের মুখ থেকে মাওলানা মওদূদীর মিটিং পণ্ড করার যে দৃঢ় অঙ্গিকার শুনেছিলাম, সেটি সেদিন স্বচোখে দেখলাম। তবে এতটা নৃশংসতার মধ্য দিয়ে যে এটি ঘটবে, সেটি সেদিন ভাবতে পারিনি। সেদিন যারা মারা গিয়েছিল বা আহত হয়েছিল তারা ছিল এই বাংলারই নিরীহ-নির্দোষ অতি সহজ-সরল মানুষ। যে কোন সভ্যদেশে এমন প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই প্রচণ্ড বর্বরতা। সে বর্বর ঘটনার আমি একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। দেখেছি তার মূল নায়ককেও। হত্যাকাণ্ড সবার চোখের সামনে ঘটে না। কিন্তু যার সামনে ঘটে তার ঘাড়ে আল্লাহপাক চাপিয়ে দেন এক গুরুতর দায়ভার। সে হলো সে সংঘটিত অপরাধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ইসলামে সে সাক্ষী গোপন করা কবীরা গোনাহ। বাংলাদেশে সে কবীরা গুনাহটি অতি বেশী বেশী হয় বলেই শত শত খুন হলেও তার বিচার হয় না। এর ফলে ভয়ানক খুনিরা মহান নেতাতে পরিণত হয়। ১৮ জানুয়ারীর পর পরবর্তী রোববার ছিল ২৫ জানুয়ারী। ঐদিন ছিল কনভেনশন মুসলিম লীগের মিটিং; প্রধান বক্তা ছিলেন দলের প্রধান ফজলুল কাদের চৌধুরী। ঐদিনও আমি পল্টন ময়দানে হাজির হয়েছিল। সেদিনও দেখলাম গুন্ডাদের হামলা। ইটের বর্ষণে সে মিটিংও পণ্ড করে দেয়া। এ হলো আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রের রূপ।

শেখ মুজিবকে জাতির পিতা বা বঙ্গবন্ধু যাই বলা হোক না কেন, আমি সেদিন তাঁর মধ্যে যে রূপটি দেখেছিলাম সেটি আদৌ কোন মানবতার রূপ নয়। বাঙ্গালীর বন্ধুর রূপতো নয়ই। বরং ভয়ানক এক মানব-শত্রুর। সেটি আরো প্রবল ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর শাসনামলে। বন্দী অবস্থায় সিরাজ শিকদার হত্যার পর তিনি সংসদে দাড়িযে বলেছিলেন, “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?” তিনি শুধু তিরিশ হাজারেরও বেশী বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীকেই হত্যা করেননি, হত্যা করেছিলেন গণতন্ত্র ও ন্যূনতম মৌলিক মানবিক অধিকারকেও। প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একদলীয় বাকশাল, বন্ধ করেছিলেন সকল বিরোধী দল ও তাদের পত্র-পত্রিকা। আমার স্মৃতির ভাণ্ডারে দিন দিন আরো বহু স্মৃতিই জমা হয়েছে। সেগুলির কোনটি আনন্দ দেয়, কোনটি প্রচণ্ড পীড়াও দেয়। কিন্তু সেগুলির মাঝে যে স্মৃতিটি এখনও আমাকে দারুন পীড়া দেয় তা হলো মুজিবের হাতে হত্যাকাণ্ডের এ করুণ স্মৃতি। আরো পীড়া দেয় বাঙালীর মানবিক পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠায় ব্যর্থতা নিয়ে।

প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধি বলেছিলেন, একটি জাতির মানবিক গুণে বেড়ে উঠায় ব্যর্থতা বা সফলতা ধরে পড়ে পশুদের সাথে তাদের আচরণ দেখে। কিন্তু এ কথা তিনি বলেননি, নৈতিক ব্যর্থতাটি আরো নিখুঁত ভাবে ধরা পড়ে একই সমাজের নিরপরাধ মানুষের সাথে আরেক মা‌নুষের অসভ্য ও নৃশংস আচরণে। ভারতে সে দারুন অসভ্যতাটি ধরা পড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নামে নিরপরাধ মুসলিমদের হত্যা, ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ী ধ্বংসের মধ্যে। হিটলারের আমলে জার্মানীতে সেটি দেখা গেছে ইহুদীদের বিরুদ্ধে। ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারিদের মাঝে ভিন্ন মতের মানুষের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ থাকে না; বরং থাকে হত্যর নেশা। ফলে তাদের রাজনীতিতে যেটি প্রবলতর হয় সেটি হলো গুম, খুন, সন্ত্রাস ও জেল-জুলুম। তাই স্বৈরাচারি শাসনে অসম্ভব হয় জনগণের সভ্য রূপে বেড়ে উঠে। স্বৈরাচারি শাসনের এটিই হলো সবচেয়ে বড় নাশকতা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেটিই বার বার ফিরে আসছে। এ পিছনে রয়েছে শেখ মুজিবের লিগ্যাসি। এ কারণেই স্বৈরাচার হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস মানবতা বিরোধী অপরাধ। সভ্য মানুষের রীতি হলো সে অপরাধীদের ঘৃণা করা; সন্মান করা নয়। একটি দেশের জনগণের নৈতিক ব্যর্থতা অতি প্রকট ভাবে ধরা পড়ে যখন সে সব স্বৈরাচারি খুনিদের ঘৃনা না করে জাতির পিতা, বন্ধু, নেতা, নেত্রী ও মাননীয়’র আসনে বসানো হয়। এমনটি ঘটে মানবিক গুণ ও বিবেকের মৃত্যুতে। অথচ বাংলাদেশে সেটিও কি কম হচ্ছে?     ২৩/০৪/২০১১

 




পাকিস্তান কেন ভেঙ্গে গেল?

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

সংকট জন্মের পূর্ব থেকেই

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পূর্ব থেকেই অনেকেই দেশটির প্রতিষ্ঠা যেমন চায়নি। তেমনি প্রতিষ্ঠার পর দেশটি বেঁচে থাকুক সেটিও চায়নি। বিরোধী পক্ষটি যে শুধু ভারতী কংগ্রেস ছিল তা নয়, ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তি এবং হিন্দুমহাসভার ন্যায় সকল সাম্প্রদায়িক হিন্দু সংগঠন। বিরোধীতা করেছে দেওবন্দি ফেরকার আলেমগণও। তাদের প্রবল বিরোধীতা সত্ত্বেও সাতচল্লিশে পাকিস্তুান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বটে, কিন্তু দেশটির অস্তিত্বের বিরুদ্ধে হুমকি সব সময়ই থেকে যায়। শত্রুদের হাতে দেশটির ধ্বংসের মোক্ষম হাতিয়ার রূপে ধরা দেয় দেশটির জটিল শাসনতান্ত্রিক সংকট ও জন্মের পূর্ব থেকে বিরাজমান বৈষম্য। অথচ এ দুটির কোনটিই পাকিস্তান নিজে সৃষ্টি করেনি; পাকিস্তানের দার্শনিক ভিত্তির সাথেও সেটি জড়িত নয়। অথচ তার ক্ষতিকর দায়ভার পাকিস্তানকেই বইতে হয়। পূর্ব বাংলা, পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ (বর্তমান নাম: পখতুন খা খায়বার) ও বেলুচিস্তান এ পাঁচটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। পূর্ব বাংলা নিয়ে গঠিত অংশের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান এবং বাঁকি চারটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত হয় পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের আয়তন ছিল ৫৫,৫৯৮ বর্গমাইল, এবং পশ্চিম পাকিস্তানের আয়তন ৩,০৭, ৩৭৪ বর্গ মাইল। জনসংখ্যায় পূর্ব পাকিস্তানীরা ছিল পাকিস্তানের মোট জসসংখ্যার ৫৬% ভাগ, কিন্তু প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ব্যবসা বাণিজ্যের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে ছিল অনেক কম।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভাষা, ধর্ম বা অঞ্চলভিত্তিক জনসংখ্যার অনুপাদে সরকারি প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে লোক নিয়োগের রীতি ছিল না। ফলে ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসনে ও সেনাবাহিনীতে জনসংখ্যার অনুপাতে বাঙালী মুসলিমদের উপস্থিতি ছিল না। ফল দাঁড়িয়েছিল, সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের সময় কোন বাঙালী মুসলিমই সেনাবাহিনীর কোন সিনিয়র অফিসার ছিল না। সে সময় ভারতের সিভিল সার্ভিস (আই..সি.এস) এবং পুলিশ সার্ভিসে সর্বমোট ১০১ জন মুসলিম ছিল। তাদের মধ্যে বাঙালী মুসলিম ছিল মাত্র ১৮ জন। ৩৫ জন ছিল পশ্চিম পাকিস্তান ভূক্ত এলাকার। বাকীরা ৪৮ জন ছিল ভারতের সে সব এলাকা থেকে যা পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত হয়নি। ১৯৪৭ সালে ভারতে বিভাগ কালে ১০১ জন মুসলিম অফিসারের মধ্যে ৯৫ জনই পাকিস্তানের পক্ষে যোগদানের ঘোষণা দেয়,এবং অবাঙালীদের প্রায় সবাই বসবাসের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। -(Session and Rose, 1990)। এর ফলে পাকিস্তানের প্রশাসনে রাতারাতি বাঙালী-অবাঙালীর মাঝে বিশাল বৈষম্য সৃষ্টি হয়। এবং এ বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পূর্বে ব্রিটিশ শাসনামলে। তখন ভারতের সিভিল সার্ভিস (আই..সি.এস) এবং পুলিশ সার্ভিসে লোক নিয়োগে ব্রিটিশ সরকার ভাষা,বর্ণ ও আঞ্চলিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়নি, গুরুত্ব দেয়া হত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রার্থীর ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্যকে। শিক্ষাদীক্ষায় পশ্চাদপদ হ্ওয়ার কারণে ভারতীয় প্রশাসনে শুরু থেকেই জনসংখ্যার অনুপাতে প্রশাসনে বাঙালী মুসলিমদের অনুপাতটি ছিল খুবই কম।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান – এ উভয় প্রদেশ থেকেই বিপুল সংখ্যক অমুসলিম সরকারি কর্মচারি ভারতে চলে যায়। প্রশাসনে দেখা দেয় বিরাট শূণ্যতা। একই সময় শুরু হয় ভারত থেকে মোহাজিরদের জোয়ার। ফলে সে শূণ্যতা পূরণে ভারত থেকে আগত মোহাজিরগণদের দ্রুত নিয়োগ দেয়া শুরু হয়। পাকিস্তানের প্রশাসনে যোগ্যতার ভিত্তিতে লোক নিয়োগের ব্রিটিশ পদ্ধতিকে অব্যাহত রাখা হয়, ফলে সে সময় ভারত, বার্মা ও এমন কি অন্যদেশের যোগ্যতর মুসলিমগণ পাকিস্তানের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার সুযোগ পায়। সে সময় যোগ্য লোকের সন্ধানটি এতোই প্রবল ছিল যে জার্মান নওমুসলিম নাগরিক মুহাম্মদ আসাদকে জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধি করে নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের যোগ্যতর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনরূপ অবিচার বা বৈষম্যমূলক আচারন করা না হলেও শুরু থেকেই পাকিস্তানের প্রশাসনে দেখা দেয় বাঙালী-অবাঙালীর মাঝে চোখে পড়ার মত বিরাট বৈষম্য। আর সে বৈষম্যকে পেশ করা হয় বাঙালীর বিরুদ্ধে অবিচার রূপে, এবং সে জন্য দায়ী করা হয় পাকিস্তানের সরকারকে। পরবর্তীতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে এ বৈষম্য ব্যবহৃত হয় দেশবিধ্বংসী হাতিয়ার রূপে। এরূপ বৈষম্য ভারতেও ছিল। পাঞ্জাবী শিখদের সংখ্যা বাঙালী হিন্দুদের চেয়ে বেশী নয়, কিন্তু ভারতের সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনে শিখ ও অন্যান্য অবাঙালীদের অনুপাত বাঙালী হিন্দুদের তুলনায় অনেক বেশী ছিল। এমনকি খোদ পশ্চিম বাংলাতে অধিকাংশ কলকারখানার মালিক অবাঙ্গালীরা। কিন্তু সে বৈষম্যের কারণে বাঙালী হিন্দুদের মাঝে বিচ্ছেদের দাবী উঠেনি। এবং সে বৈষম্য রাজনীতিতে প্রবল বিষয়ও হয়ে উঠেনি। অথচ পাকিস্তানে বাঙালী মুসলিমদের মাঝে অবাঙালী-বাঙালী বৈষম্যকে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়।     

 

বাঙালী মুসলিমদের পশ্চাদপদতা

ব্রিটিশ আমলেও প্রশাসনের ন্যায় বাঙালীদের হাতে কোন শিল্প-কলকারখানাও ছিল না। ছিল না ব্যবসা-বাণিজ্যও। ১৯৪৭ সালের পূর্বে খোদ অবিভক্ত বাংলাতে ব্যাবসা-বাণিজ্য ছিল বাঙালী হিন্দু এবং অবাঙালী মারোয়ারিদের হাতে। তখন ভারতের মুসলিমদের মাঝে ব্যবসা-বাণিজ্যে যারা কিছুটা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তাদের প্রায় সবাই ছিল অবাঙালী। আদমজী, ইস্পাহানী, বাওয়ানী, মেমন ইত্যাদী ব্যবসায়ী পরিবারগুলো ১৯৪৭ সালের পূর্ব থেকেই কলকাতা, মোম্বাই, আহমেদাবাদ, মাদ্রাজের ন্যায় শহরগুলিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তারা ভারত ত্যাগ করে পাকিস্তানে চলে আসে। তাদের প্রায় সবাই পশ্চিম পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। শুধু পশ্চিম পাকিস্তানে নয়, পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পায়নে ভারত থেকে আগত এ মোহাজির ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অবদান ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের অর্থনীতিতে তারা পাওয়ার হাউস রূপে কাজ করে। ভারতের পরাধীন ভূমিতে এতকাল যে প্রতিভা আড়ষ্ঠ ছিল -তা স্বাধীন পাকিস্তানের মূক্ত পরিবেশে অর্থনৈতিক জোয়ার সৃষ্টি করে। শিল্প স্থাপনে পাকিস্তানের যাত্রাটি শুরু হয় বলতে গেলে শূণ্য থেকে। পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায় পশ্চিম পাকিস্তানও ছিল মূলত কৃষিভূমি। কিন্তু দুই প্রদেশেই শিল্পায়ন শুরু হয়। ভারত থেকে আগত  মোহাজিরদের প্রায় সবাই পশ্চিম পাকিস্তানে বসত গড়ায় প্রবৃদ্ধির সে হার পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল অধিক। তবে লক্ষণীয় হলো, ষাটের দশকের শেষ দিকে এসে প্রবৃদ্ধির সে হার দুই প্রদেশের মধ্যে সমান পর্যায়ে পৌঁছে যায়।    

তবে অর্থনীতি, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের পাশাপাশি বৈষম্য রাজনীতির ময়দানেও কম ছিল না। অবিভক্ত ভারতের মুসলিম রাজনীতিতেও শেরে বাংলা ফজলুল হক, হাসান শহীদ সহরোওয়ার্দি ও নাজিমুদ্দিনের মত বাঙালী মুসলিম নেতাদের প্রভাব ছিল বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সর্বভারতীয় মুসলিমদের রাজনীতিতে কায়েদে আযম যে ভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন কোন বাঙালী মুসলিম নেতা তাঁর ধারে কাছেও ছিলেন না। উপমহাদেশের মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভূবনের তাদের অবদান তেমন চোখে পড়ার মত ছিল না। এমন কি খোদ বাংলাতেও তারা ছিল বাঙালী হিন্দুদের সৃষ্ট সাহিত্যের প্রভাব বলয়ে আবদ্ধ।  অথচ জনসংখ্যার ৫৬% বাঙ্গালী হওয়ার ফলে পাকিস্তানের শাসনের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় তাদের। কিন্তু প্রকট সমস্যা দেখা দেয়, স্রেফ অধিক জনসংখ্যার হওয়ার দাবীতে বাঙ্গালীর সে মেজরিটি শাসনকে পাকিস্তানের অপর চারটি প্রদেশের অবাঙালী নাগরিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করা নিয়ে। কারণ রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ও গ্রহণযোগ্যতা তো আসে অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, শিক্ষাগত  ও সামরিক সামর্থের ভিত্তিকে। বাঙালী মুসলিমদের এর কোনটিই ছিল না।

 

পুরনো বৈষম্য ও নতুন সংকট

১৯৪৭ সালে বাঙালী মুসলিমদের নিয়ে ভীতি দেখা দিয়েছিল বাঙালী হিন্দুদের মনেও। তখন অবিভক্ত বাংলায় মুসলমান জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫৫% , আর হিন্দুরা ছিল ৪৫%। বাংলার প্রশাসন, শিক্ষা-সাহিত্য, শিল্প-বাণিজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল ক্ষেত্র ছিল হিন্দুদের দখলে। অবিভক্ত বাংলার রাজধানী ছিল কলকাতায়, তখন সে নগরীর শতকরা ৮০ ভাগ জনগণ ছিল হিন্দু। মুসলিমদের প্রাধান্য এমনকি ঢাকাতেও ছিল না। ঢাকার অবস্থান মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বাংলাতে হলেও সে শহরে হিন্দুদের সংখ্যা ছিল মুসলিমদের চেয়ে অধিক, মুসলিমদের সংখ্যা ছিল মাত্র শতকরা ৪০%। ঢাকা শহরের দোকানপাঠ ও রিয়েল এস্টেট সম্পদের প্রায় ৮০% ভাগের মালিক ছিল হিন্দুরা। অনুরূপ অবস্থা ছিল সকল জেলা ও মহকুমা শহর গুলোতেও।

অপরদিকে বাঙালী হিন্দুদের রাজনৈতিক প্রভাব শুধু বাংলাতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের প্রভাব বিস্তৃত ছিল সমগ্র ভারতের রাজনীতি জুড়ে। ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের জন্মই হয়েছিল কলকাতায়। শুরুতে দলটির  প্রধান প্রধান নেতারা ছিল বাঙালী হিন্দু। সমগ্র ভারতে সর্বপ্রথম রেনেসাঁ তথা জাগরণ এসেছিল বাঙালী হিন্দুদের মাঝে। তাদের মাঝে ছিল সুরেন্দ্রনাথ ব্যাণার্জি, সুভাষ চন্দ্র বোস, শরৎ বোস, চিত্তরঞ্জণ দাশের ন্যায় বড় বড় নেতা। ছিল রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র। তাদের প্রভাব ছিল সমগ্র ভারত জুড়ে। সে তুলনায় মুসলিমগণ ছিল অনেক পিছনে। কিন্তু ১৯৩৭ সাল থেকে প্রদেশে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার রেওয়াজ শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলার শাসন ক্ষমতার কর্ণধার কোন হিন্দু হতে পারেনি। বাংলা অবিভক্ত থাকলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম শাসন থেকে তাদের নিস্তার নাই -সেটি বুঝতে পেরেই হিন্দু বাঙালীরা ১৯৪৭-য়ে বাংলা বিভাগের দাবী তোলে। অথচ মুসলিম লীগ সে সময় বাংলা বিভাগের বিরোধীতা করেছিল।

 

ভয় ও অবিশ্বাসের রাজনীতি

পাকিস্তান সৃষ্টির পর একই বাঙালী ভীতি ঢোকে অবাঙালী পাকিস্তানীদের মনে। তবে পার্থক্য হল, বাঙালী হিন্দুরা বাঙালী মুসলিমের মেজরিটি শাসন থেকে বাঁচবার তাগিদে যেভাবে খোদ বাংলাকেই বিভক্ত করে ফেলে অবাঙালী পাকিস্তানীরা সে ভয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গেনি। তারা বরং চেয়েছে বাঙালীর সে সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনের উপর শাসনতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার। তাদের ইচ্ছা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন যেন অবিবেচক সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে পরিনত না হয়। এজন্যই পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণোয়নের কাজটি এক জটিল সমস্যায় রূপ নেয় এবং বিলম্বিতও হয়। ভারতের ন্যায় পাকিস্তানেও শাসনতন্ত্র তৈরীর কাজ যে শুরু যে হয়নি তা নয়, কিন্তু ভারতে সে কাজটি এতটা জটিল ছিল না। পাকিস্তানে সমস্যা ছিল শাসনতন্ত্রে ইসলামের স্থান নির্ধারণ করা নিয়ে। হিন্দুদের মাঝে ধর্মীয় পেনাল কোড নেই। ফলে শাসনতন্ত্রে ধর্মীয় বিধানের কোন স্থানও নেই। তাছাড়া শুরু থেকেই কংগ্রেস সেক্যুলারিজমের পক্ষে জনগণকে দীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু সেক্যুলারিজম ইসলামে হারাম, ইসলামে রয়েছে শরিয়তী বিধান। প্রতিটি মুসলিমের উপর নামায-রোযার ন্যায় সে শরিয়তী বিধান মেনে চলাটিও ফরজ। ফলে ১৪ শত বছর ধরে মুসলিমগণ যেখানেই কোন রাষ্ট্র গড়তে পেরেছে সেখানেই শরিয়তী বিধানও চালু করেছে। সেটি ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে ভারত এবং বাংলাতেও ছিল।

১৯৪৭য়ে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর সে শরিয়তী বিধানের দিকে ফিরে যাওয়াটি মুসলিমদের উপর ফরজ হয়ে দাঁড়ায়। দেশের আলেমগণ এ নিয়ে সোচ্চার হয়। ফলে শাসনতন্ত্রে সেটি নিশ্চিত করাটি অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সে কাজটি এতটা সহজও ছিল। পাকিস্তানের মুসলিমগণ ছিল সূন্নী ও শিয়াতে বিভক্ত। ছিল দেওবন্দী-বেরেলভীর দ্বন্দ। ছিল বিপুল সংখ্যক সেক্যুলারিস্ট ও কম্যুনিষ্ট -যারা রাষ্ট্রে ইসলামি শরিয়তের প্রতিষ্ঠার প্রচণ্ড বিরোধী ছিল। অবশেষে সে সমস্যার দ্রুত সমাধান হয় নবাব লিয়াকত খানের প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে শাসনতন্ত্রের ২২ দফা মূলনীতি পাশের মধ্য দিয়ে। অপর দিকে সংখ্যাগরিষ্ট শাসনের উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার একটি সুরাহা করা হয়। বগুড়ার মহম্মদ আলী যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তখন শাসনতন্ত্রে পার্লামেন্টে উচ্চ পরিষদ ও নিম্ন পরিষদ -এ দুই পরিষদে বিভক্ত করার প্রস্তাব করা হয়। নিম্ম পরিষদে জনসংখ্যার অনুপাতে এবং উচ্চ পরিষদে ৫ প্রদেশের সমান আসন রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়। এভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে একটি সমতা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। গণপরিষদে সেটি অধিকাংশ সদস্যের তাতে সমর্থণ ছিল। কিন্তু সেটি গোলাম মুহাম্মদের স্বৈরাচারি পদক্ষেপে বানচাল হয়ে যায়। ফলে শাসনতান্ত্রিক সংকট একটি সমাধানের কাছে পৌছেও সে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।

চৌধুরি মোহম্মদ আলীর প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে প্রণীত ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে পার্লামেন্টে দুই অঞ্চলের সমান আসন রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়। আই্য়ুব খানের আমলে রচিত ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে সমান প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগসহ অনেক পূর্ব পাকিস্তানী দল সমতার সে বিধানটি মেনে নিতে রাজী হয়নি। তবে এক্ষেত্রে স্মরণীয় যে, পাকিস্তানের বর্তমান (২০২১ সালে) জনসংখ্যা ২২ কোটির বেশী, আর বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। ফলে জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংসদের আসন বরাদ্দ হলে কিছুদিনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানীরা তাদের সে সংখ্যাগরিষ্টতা হারাতো। তখন শুরু হতো সংখ্যাগরিষ্ঠ অবাঙালী শাসনের ভয়।

জেনারেল ইয়াহিয়া খানই প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান যিনি এক ব্যক্তি এক ভোটের ভিত্তিতে জনসংখ্যার ভিত্তিতের পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে তথা পার্লামেন্টে প্রদেশের সদস্য নির্ধারণ করেন। কিন্তু ইয়াহিয়া খানের সে সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের রাজনীতিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ১৯৪৭ সালে বাঙালী মুসলিমের সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনের যে ভয় বাঙালী হিন্দুদের মাঝে প্রকট রূপ ধারণ করেছিল সেটিই দেখা দেয় জুলফিকার আলী ভূট্টোর ন্যায় পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের মনে। বাঙালী হিন্দুদের মত তারা পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের আলাদা হওয়া দাবী না তুললেও তাদের অনেকে গোপনে উৎসাহ জুগিয়েছে বাঙালীদের আলাদা হওয়ায়। অনেকের বিশ্বাস,শেখ মুজিবের হাতে ৬ দফা প্রস্তাবটি তুলে দিয়েছিল এক পশ্চিম পাকিস্তানী আমলা। ১৯৭০ সালের নির্বাচন কালে বাঙালী হিন্দুদের মতই জুলফিকার আলী ভূট্টো ও তার সাথীরা সে “বাঙালী শাসন”এর সে ভয়ই পশ্চিম পাকিস্তানীদের মনে ঢুকাতে সমর্থ হয়। এবং বানচাল করে দেয় ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদের ৩রা মার্চ ঢাকায় বৈঠক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাকে। তিনিই বলেন,“ওধার তোম, ইধার হাম”এর মত অদ্ভুদ স্লোগান।” এবং তিনি জাতীয় পরিষদের পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, “যারা ঢাকার বৈঠকে যাবে তাদের পা ভেঙ্গে দেয়া হবে।” তিনি আরো বলেন,“তারা যেন রিটার্ন টিকেট না নিয়ে ঢাকায় যায়।” ১৯৪৭ সাল থেকেই যেসব বাঙালী জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা মেনে নিতে পারেনি, এবং সবসময়ই সচেষ্ট ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন করায় -ভূট্টো তাদের পরিকল্পনার সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগলিক দূরত্ব ছিল প্রায় ১২০০ মাইল। তবে মনের দূরত্ব ছিল আরো বেশী। উনিশ শ’ সাতচল্লিশে ভারত থেকে পাকিস্তানে আসার পথে বহু লক্ষ মুসলমান নরনারী হিন্দু ও শিখ গুণ্ডাদের হাতে নিহত হয়। ধর্ষিতা হয বেশুমার মুসলিম নারী। ফলে হিন্দু ও শিখদের মুসলিম বিদ্বেষের যে হিংস্র পরিচয়টি তারা ১৯৪৭ সালেই লাভ করে সেটি বাংলার মুসলিমদের জীবনে ঘটেনি। এরই ফল দাঁড়িয়েছিল, ফজলুল হকের মত নেতারা যখন কোলকাতায় গিয়ে “বাংলা অবিভাজ্য” বয়ান দেন এবং ভারতীয় হিন্দু নেতাদের সাথে বন্ধুত্বের হাত বাড়ান তখন পশ্চিম পাকিস্তানীরা যে তাতে শুধু বিস্মিত হয়েছে তাই নয়, তাঁর রাজনীতির উপরও তাদের অনাস্থা বাড়ে। এরই ফল দাড়ায়, ফজলুল হককে যখন তাঁর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় -তখন সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানে কোন প্রতিক্রিয়া হয়নি।

 

ক্ষমতালিপ্সার রাজনীতি

পাকিস্তানের সৃষ্টির মূলে ছিল প্যান-ইসলামিক চেতনা। সে চেতনাটি যাদের মনে প্রবলতর ছিল একমাত্র তারাই ছিল পাকিস্তানের প্রকৃত কল্যাণকামী। ভূট্টোর মত মদ্যপায়ী সেক্যুলারিষ্টদের কাছে অখণ্ড পাকিস্তান বাঁচিয়ে রাখা গুরুত্ব পাবে -সেটিই বা কি করে আশা করা যায়? ভূট্টো ইসলামী অনুশাসনের বিরুদ্ধে এতটাই বিদ্রোহী ছিলেন যে তিনি সে বিদ্রোহীটি গোপন রাখার প্রয়োজন মনে করতেন না। তিনি মদ পান করতেন, সেটিও তিনি গোপন রাখার প্রয়োজনও মনে করেননি। ১৯৭৭ সালে লাহোরের গোলবাগে এক নির্বাচনী জনসভায় সেটি তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “আমি মদপান করি,তবে অন্যদের ন্যায় মানুষের রক্ত পান করিনা।” সেদিন নিজের মদ্যপানকে জায়েজ করতে গিয়ে তিনি অন্যদের রক্তপায়ী রূপে অভিহিত করেছিলেন। আমি নিজে সে জনসভায় উপস্থিত ছিলাম, এবং নিজ কানে তার সে বক্তৃতাটি শুনিছিলাম। প্রশ্ন হলো, ইসলামের হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যার মধ্যে এতটা প্রকট তার মধ্যে কি ইসলামি আদর্শভিত্তিক পাকিস্তান বাঁচানোয় অঙ্গিকার থাকতে পারে? বরং অখণ্ড পাকিস্তানের বেঁচে থাকাটি অসম্ভব হতো তার ক্ষমতা লাভে।

১৯৭০’এর নির্বাচনের পর ভুট্টোর কাছে পরিস্কার হয়ে যায়, তার পক্ষে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া অসম্ভব। পাকিস্তানের বেঁচে থাকাটি দেশটির মুসলিম জনগণের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার নিজের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রধানমন্ত্রী হওয়া। ফলে তার রাজনীতিতে শুরু হয় পাকিস্তানের স্বার্থের সাথে তাঁর ব্যক্তি স্বার্থের দ্বন্দ। সে দ্বন্দে তিনি নিজের স্বার্থ পূরণের পথটি তিনি বেছে নেন। এ জন্যই ১৯৭০’এর নির্বাচনে একটি বারের জন্যও তিনি পূর্ব পাকিস্তানে কোন নির্বাচনী জনসভা করেননি, পূর্ব পকিস্তানীদের থেকে কোন রূপ সমর্থণও চাননি। একই অবস্থা ছিল শেখ মুজিবের। মুজিবও সুস্পষ্ট বুঝতে পারে, অখণ্ড পাকিস্তানে তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়া অসম্ভব। কারণ, সে জন্য তো জরুরি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের দলের উপস্থিতি। তবে মুজিব তা নিয়ে ভাবতো না। তাঁর মনের মানচিত্রে অখণ্ড পাকিস্তানের কোন স্থান ছিল না। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সমর্থন লাভ নিয়ে মুজিব কখনোই আগ্রহী ছিলেন না। তিনি আগ্রহী ছিলেন শুধু পূর্ব বাংলা নিয়ে।

যাদের মধ্যে নামায আদায়ের তাগিদ নেই তাদের আবার মসজিদ নির্মান এবং সে মসজিদের সুরক্ষার ভাবনা কিসের? তাই পাকিস্তানের মূল শত্রু ছিল দেশটির ইসলামে অঙ্গিকারশূণ্য সেক্যুলারিষ্টগণ। তারাই ভারতের ন্যায় অপেক্ষায় থাকা শত্রুদের সুযোগ করে দেয়। উঁই পোকা যেমন খুঁটিকে ভিতর থেকে খেয়ে ফেলে এরাও তেমনি পাকিস্তানকে ভিতর থেকে প্রাণশূণ্য করে ফেলে। পাকিস্তানের এ ঘরের শত্রুরা যেমন দেশের রাজনীতিতে ছিল, তেমনি ছিল সেনাবাহিনী, প্রশাসন, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে। একাত্তরের বহু আগেই এ সেক্যুলারিষ্টগণ পাকিস্তানকে খণ্ডিত করে ফেলে, এবং বিভক্তির সে চিত্রটিই প্রকাশ পায় ১৯৭০ এর নির্বাচনে। মুজিবের রাজনীতিতে যেমন পশ্চিম পাকিস্তান ছিল না, তেমনি ভুট্টোর রাজনীতিতেও পূর্ব পাকিস্তান ছিল না। ফলে শেখ মুজিব যেমন তার নির্বাচনী লড়াইকে শুধু পূর্ব পাকিস্তানে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, তেমনি ভূট্টোও তার লড়াইকে সীমিত রেখেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে।

খাজা নাজিমুদ্দীন, সহরোওয়ার্দি, বগুড়ার মহম্মদ আলীদের মত নেতারা পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন তা নয়। বরং পূর্ব পাকিস্তানের কল্যাণ চিন্তার সাথে তাদের মাঝে কাজ করেছিল অখণ্ড পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সে দেশটিকে শক্তিশালী করার ভাবনাটিও। ফলে তাদের রাজনীতিতে অন্য প্রদেশের নাগরিকদের সাথে সমঝোতার প্রেরণাও ছিল। ফলে প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে তাঁরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের মনে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর প্রতি আস্থা সৃষ্টিতে সচেষ্ট ছিলেন। আপোষ ফর্মালা উদ্ভাবনেও তাঁরা স্বচেষ্ট ছিলেন। এমন এক চেতনা নিয়েই প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ভাষানীর দাবীর জবাবে জনাব সহরোওয়ার্দি বলেছিলেন, ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ৯৮% স্বায়ত্বশাসন দিয়ে দেয়া হয়েছে। তাঁরা জনসংখ্যা বিচারে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্টতা যেরূপ জানতেন, তেমনি জানতেন অবাঙালীদের তুলনায় নিজেদের পশ্চাদপদতা নিয়েও।

একটি দেশের রাজনীতিতে শুধু জনসংখ্যায় বাড়াটাই বড় কথা নয়, যোগ্যতা নিয়ে বাড়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। ইহুদীরা মার্কিন ও ব্রিটিশ রাজনীতিতে অতীতে ও এবং আজও যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সেটি সংখ্যাগরিষ্টতার কারণে নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দায়বদ্ধতাও বিশাল। সে দায়বদ্ধতা শুধু নির্বাচনে ভোটদান নয়, বরং দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসন, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, সাহিত্য, বিজ্ঞান এমনকি খেলাধুলার অগ্রগতিতে সবার চেয়ে বেশী ভূমিকা রাখতে হয়। নইলে শুধু সংখ্যাগরিষ্টতার কারণে কারো মর্যাদা বাড়ে না। রাজনীতিতে গ্রহণ যোগ্যতাও বাড়ে না। ইংল্যান্ডে বাঙালীদের সংখ্যা ইহুদীদের চেয়ে অধিক। কিন্তু তাতে কি ব্রিটিশ রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও শিল্পে কি বাঙালীর প্রতিষ্ঠা বা গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে? অথচ ইহুদীরা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য বা মন্ত্রীই হয় না, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবেল বিজয়ী প্রফেসর, নাম করা ডাক্তার, বিখ্যাত প্রকৌশলী, শিল্প মালিক এবং আবিস্কারকও হয়। যে কোন দেশে প্রত্যেক নাগরিককে অন্য নাগরিকের সাথে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা করে সামনে এগুতে হয় -সেটি যেমন শিক্ষা, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যে, তেমনি প্রশাসনে। এ প্রতিযোগিতায় ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতা গুরুত্ব দেয়া শুরু হলে গুরুত্ব হারায় যোগ্যতা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ ব্শ্বি-শক্তি, দেশটি সে শক্তি অর্জন করেছে যোগ্যবানদের মূল্য দেয়ার মধ্য দিয়ে। যোগ্যতার বিচারে উত্তির্ণ হলে এমনকি বিদেশীদেরও তারা নিজ দেশে বরণ করে নেয়। অবাঙালীর তুলনায় পাকিস্তানে বাঙালীর পশ্চাপদতা ছিল চোখে পড়ার মত। পাকিস্তানে শিল্পায়ন শুরু হয়েছিল বলতে গেলে শূণ্য থেকে। স্বাধীনতা লাভে প্রথম দিনটিতেই হিন্দুস্থান এক্ষেত্রে বহু পথ এগিয়ে ছিল। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির সাথে শিল্পে যে প্রবৃদ্ধি শুরু হয় সেটি অখণ্ড পাকিস্তানী আমলের ২৩ বছরে ভারত কখনই অতিক্রম করতে পারিনি। সেটি এসেছিল ভারত থেকে হিজরতকারী অবাঙালী প্রশাসক, ব্যবসায়ী ও শিল্প-পরিচালকদের কারণে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তখন প্রশাসকগণ আসতো সে দ্রুত শিল্পোন্নয়নের ছবক নিতে। অথচ সে উন্নয়নে বাঙালীর অবদান ছিল সামান্যই।  

পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার মূল কারণটি হলো মুজিব ও ভূট্রোর ক্ষমতালিপ্সার রাজনীতি। দেশ ভেঙ্গে যাক –তা নিয়ে যেমন মুজিবের কোন দুঃখ ছিলনা। ভূট্টোরও ছিল না। উভয়েই হতে চেয়েছে প্রধানমন্ত্রী। অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় মুজিবের কোন আগ্রহ ছিল না। ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারীতে পাকিস্তান থেকে ফিরে ঢাকার সোহরাওয়ার্দি ময়দানের জনসভায় মুজিব বলেন, “স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই ১৯৭১ সালে নয়, ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু করেছিলাম।” মুজিবের সে বয়ান সেদিন আমি নিজ কানে শুনেছি। আর ভারত তো ১৯৪৭ সাল থেকেই অপেক্ষায় ছিল এমন একটি মুহুর্তের। ভারতের হামলা প্রতিরোধ করার সামর্থ্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছিল না। ফলে ভারত যা চেয়েছে ১৯৭১’য়ে তাই হয়েছে। তাই পাকিস্তান ভেঙ্গে গেল দেশটির নিজের ব্যর্থতার কারণে নয়, বরং ঘরের শত্রু ও বিদেশী শত্রুদের যৌথ ষড়যন্ত্রে। ২৯/০১/২০২১




আল-কোর’আনে জিহাদ ও মুসলিম জীবনে গাদ্দারী

ফিরোজ মাহবুব   কামাল

প্রসঙ্গ: সর্বশ্রেষ্ঠ নেককর্ম এবং সবচেয়ে বড় অপরাধ

 মানব জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি কাউকে কোটি টাকা দান করা নয়, বরং তাকে জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচানো। তেমনি সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয় কাউকে জাহান্নামে নেয়াতে। শয়তানের পক্ষের শক্তি সে ক্ষতিটি করে রাষ্ট্রের বুকে পবিত্র কোর’আনের শিক্ষা ও শরিয়ত বিধানকে বিলুপ্ত করে। রাষ্ট্রের সংবিধান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসন ও রাজনীতি এ কাজে হাতিয়ার রূপে কাজ করে। ফলে এরাই হলো সমগ্র মানব ইতিহাসে সবচেয়ে অপরাধী চক্র। এরা যেমন আল্লাহর শত্রু, তেমনি মানব জাতির শত্রু। এদের কারণ রাষ্ট্র জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার বাহনে পরিণত হয়্। অপর দিকে কোটি কোটি মানুষের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ সে নেক কর্ম করাটি অতি সহজ হয়ে যায় যদি ইসলামী রাষ্ট্র গড়া যায়। তখন জনগণকে জান্নাতে নেয়া এবং জাহান্নামে আগুণ থেকে বাঁচানো রাষ্ট্রীয় নীতি, নেতাদের রাজনীতি ও দেশের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। এজন্যই মানব সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ইসলামী রাষ্ট্র গড়া এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্মটি হলো সে রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে জিহাদে নিয়োজিত হওয়া। শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী সে নেক কর্মে শহীদ হয়ে গেছেন। নবীজী (সা:)’র মহান সূন্নতটি এ ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূরণ এবং অনুকরণীয়। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে তিনি নিজের ঘর না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে্ছেন এবং নিজে সে রাষ্ট্রের শাসকের পদে বসেছেন। এবং তার ইন্তেকালের পর তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ বসেছেন। সে রাষ্ট্রের কারণে কোটি কোটি মানুষ জান্নাতের যোগ্য রূপে গড়ে উঠতে পেরছে এবং মুসলিমগণ জন্ম দিতে পেরেছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে কি সেটি সম্ভব হতো?        

এ জীবনে সফল হতে হলে জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যটি বুঝা জরুরি। যেমন যাত্রাপথে জরুরি হলো গন্তব্যস্থলটি জানা। জন্ম ও মৃত্যু -নিছক এর মধ্যেই মানব জীবনের শুরু ও সমাপ্তি নয়। শুধু জন্ম ও মৃত্যুর জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হয়নি। মানুষের জন্ম একটি বিশেষ লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে।  সে বিশেষ লক্ষ্যটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন মহান স্রষ্টা নিজে। জীবনের সফলতা নির্ভর করে সে লক্ষ্য অর্জনে কতটা কামিয়াব হলো তার ভিত্তিতে। পশুর জীবন থেকে মানুষের জীবনের মৌলিক পার্থক্যটি এখানেই্। পশুর ন্যায় মানুষ নিছক পানাহারে জীবন সাঙ্গ করে না। বরং সে মহান স্রষ্টার নির্ধারিত লক্ষ্যটি নিয়ে বাঁচে, এবং সে লক্ষ্য পূরণে লড়াই করে ও প্রাণ দেয়। এরূপ বাঁচার মধ্যেই ঘটে তার জীবনের মূল পরীক্ষা। জীবনের সফলতা ও বিফলতা নির্ধারিত হয় সে পরীক্ষায় কৃতকার্যতার উপর। মহান আল্লাহতায়ালা সে পরীক্ষাটির কথা বলেছেন এভাবে: “যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, (তাঁর লক্ষ্য হলো) তিনি পরীক্ষা করবেন, তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।–(সুরা মুলক আয়াত ২)।

পবিত্র কোর’আনের উপরুক্ত আয়াতটির মধ্যেই ঘোষিত হয়েছে মানব জীবনের মূল এজেন্ডা। মানব জীবনে সে পরীক্ষাটি হয় মৃত্যু অবধি। তাই ঈমানদার রূপে বাঁচার অর্থই হলো প্রতি মুহুর্তে পরীক্ষার মধ্যে থাকার ভাবনা নিয়ে বাঁচা। এখানে পরীক্ষা হয় ঈমান ও আমলের। জান্নাত পেতে হলে তাই শুধু ঈমান থাকলে চলে না, ঈমান ও আমল – এ উভয় অঙ্গণেই তাকে পরীক্ষায় পাশ করতে হয়।

তবে ব্যক্তির কোন আমলটি মহান আল্লাহতায়ালার বিচারে তাঁকে শ্রেষ্ঠতর করবে এবং পরকালে চুড়ান্ত সফলতা দিবে -সে বিষয়েও তিনি কোনরূপ অস্পষ্টতা রাখেননি। পবিত্র কোর’আনে সে বিষয়টি নানা ভাবে নানা স্থানে অতি স্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করেছেন। চলার পথ থেকে কাঁটা সরানো, সালাম দেয়া, ভাল উপদেশ দেয়া এবং ক্ষুদার্ত মানুষকে খাদ্য ও দরিদ্রকে অর্থদান -এসবই ভাল নেক আমল। নেক আমল হলো নামায-রোযা আদায়, যাকাত দান, হজ্ব পালন এবং মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ। মানব জীবনে এরূপ নেক কর্ম নানাবিধ ও অজস্র, এবং তার মূল্যমানও ভিন্ন ভিন্ন। তাই মহান আল্লাহতায়ালা কর্মের সে মূল্যমানের সে ভিন্নতাটি তুলে ধরেছেন এভাবেঃ “হাজীদের পানি পান করানো এবং মসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করাকে কি তোমরা সেসব ব্যক্তির নেক কর্মের সমতূল্য মনে করো যারা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান আনে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করে? আল্লাহর নিকট তারা উভয়ে সমান নয়। আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।” –(সুরা তাওবা, আয়াত ১৯)।

উপরুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা নেক আমলের প্রায়োরিটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। হাজীদের পানি পান করানো এবং মসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করা নিঃসন্দেহে নেক আমল। কিন্তু তা কখনই জিহাদের সমকক্ষ হতে পারে না। যে রোগীর প্রচ্ণ্ড রক্তক্ষরণ ঘটেছে, তার তো সত্ত্বর রক্ত দরকার। তাকে ভিটামিন বড়ি সেবনে কালক্ষেপন করাতো ভয়ানক অপরাধ। তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্র যেখানে আল্লাহর দ্বীনের দুষমনদের হাতে অধিকৃত, সেখানে পথের কাটা সরানোয় মধ্যে কালক্ষেপণ প্রশংসনীয় কর্ম হতে পারে না। তাকে তো রাষ্ট্রের বুকে চেপে বসা বৃহৎ কাটাটি সরাতে হবে। এজন্য তাকে জিহাদে নামতে হবে। আজকের মুসলিমদের বড় সমস্যা, তাদের সে প্রায়োরিটি সম্পর্কিত জ্ঞানই লোপ পেয়েছে। ফলে দেশে মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ায় মনযোগ বাড়লেও জিহাদে মনযোগ বাড়েনি।

যেখানে সমগ্র রাষ্ট্র আল্লাহর দ্বীনের শত্রুদের হাতে অধিকৃত, সেদেশের মসজিদ মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও যে শয়তানে হাতে অধিকৃত হবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? তাই হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা গড়েও বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে ইসলামে বিজয় আনা যাচ্ছে না। বরং দিন দিন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর বাড়ছে আল্লাহদ্রোহী শয়তানী শক্তির দখল। জিহাদের গুরুত্ব বুঝাতে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “যারা ঈমান আনে, হিজরত করে এবং নিজেদের সম্পদ ও নিজেদের জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে তারাই আল্লাহর নিকট মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, আর তারাই সফলকাম।” –(সুরা তাওবা, আয়াত ২০। আরো বলেছেন, “(হে মুহম্মদ!) বল, “যদি আল্লাহ,তাঁর রাসূল এবং আল্লাহ পথে জিহাদ অপেক্ষা তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হয় তোমাদের পিতা,তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভ্রাতা, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দা পড়ার আশংকা করো এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা ভালবাস, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর হুকুম আসা অবধি। আল্লাহ পাপাচারীকে সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।” –(সুরা তাওবা, আয়াত ২৪)।

 

 জিহাদের গুরুত্ব ও শহীদের মর্যাদা

জিহাদের গুরুত্ব ও মর্যাদা যে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কত অধিক -সেটি বুঝা যায় জিহাদের ময়দানে নিহত শহিদদের মহান মর্যাদা দেখে। পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে: “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত মনে করোনা, বরং তারা জীবিত এবং তারা তাদের প্রতিপালক থেকে জীবিকাপ্রাপ্ত হন।” –(আল-ইমরান, আয়াত ১৬৯)। ওহুদের ময়দানে যে ৭০ জন সাহাবী শহিদ হয়েছিলেন, পবিত্র কোরআনের এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল তাদের সন্মানে। মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে মৃত বলতে নিষেধ করেছেন। মৃত্যু শব্দটি ব্যবহৃত হবে অন্যদের জন্য, শহিদদের জন্য নয়। তাদের জন্য এ শব্দের ব্যবহার হারাম। মহান আল্লাহতায়ালা দরবারে শহিদদের জন্য হলো এ এক ভিন্নতর পরিচয় এবং এক ভিন্নতর মর্যাদা। তবে মহান আল্লাহতায়ালার রাস্তায় যারা জিহাদে যোগদান করেন -তারা যদি শহিদ না হয় তবু তাদের মর্যাদা কম নয়। তারাও পান মহা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি। সে বিষয়টি পবিত্র কোর’আনে ঘোষিত হয়েছে এ ভাবে: “যখম হওয়ার পরও যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়েছে তাদের মধ্যে যারা সৎকাজ করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।”-(আল ইমরান, ১৭২)। সেদিন ঈমানদারদেরকে ভয় দেখানো হয়েছিল, শত্রুর বিপুল শক্তির। কিন্তু আল্লাহনির্ভর এ আত্মত্যাগী মোজাহিদগণ ছিলেন ভয়শূন্য। তাঁদের নির্ভরতা ছিল একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার উপর। তাদের সে আল্লাহ-নির্ভরতায় খুশি হয়েছিলেন মহান আল্লাহপাক। পবিত্র কোর’আনে তাঁদের সম্পর্কে বলা হয়েছে: “এদেরকে লোকে বলেছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে, সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় কর। কিন্তু তা তাদের ঈমানকে দৃঢ়তর করেছিল,তারা বলেছিল,“আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম অভিভাবক।”-(আল ইমরান আয়াত ১৭৩)।

 

জিহাদ-বিরোধীতা: সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ

মানব জীবনে সবচেয়ে বড় অপরাধটি চুরিডাকাতি, ব্যভিচারি, মানুষ খুন নয়, সেটি হলো জিহাদের বিরুদ্ধে নামা বা তার বিরোধীতা করা। কারণ, জিহাদ হলো জমিনের উপর মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার লড়াই। কিছু লোকের চুরিডাকাতি, ব্যভিচারি, মানব খুনে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার সে মিশনটি পরাজিত হয় না। কিন্তু সেটি হয়, যদি রাষ্ট্র থেকে জিহাদ বিলুপ্ত হয়। জিহাদের বিলুপ্তির লক্ষ্যে দাঁড়ানোর অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিপক্ষে যুদ্ধে নামা। সেটি মূলত শয়তানকে বিজয়ী করার প্রকল্প। এরূপ গুরুতর অপরাধের সাথে যারা জড়িত হয় তারাই জাহান্নামের বাসিন্দা হয়। বস্তুত এরাই হলো শয়তান। মানবকে জাহান্নামে নেয়াই তাদের মিশন। তাই সাহাবাদেরকে যারা কুফর শক্তির ভয় দেখিয়েছিল এবং মুসলিমদের জিহাদ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছিল -তাদের চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। সেটি হলো: “এরাই হলো শয়তান, তোমাদেরকে তারা তাদের বন্ধুদের ভয় দেখায়, সুতরাং যদি তোমরা মু’মিন হও তবে তাদেরকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় কর।” –(আল-ইমরান, আয়াত ১৭৫)।

জিহাদ বিরোধীদের সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়াল আরো ঘোষণা: “যারা কুফরীতে ত্বরিতগতি, তাদের আচরণ যেন তোমাকে কষ্ট না দেয়। তারা কখনও আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ চান না আখেরাতে তাদের কোন অংশ দিতে, তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।” –(আল-ইমরান, আয়াত ১৭৬। আরো বলা হয়েছে, “যারা ঈমানের বিনিময়ে কুফরী ক্রয় করে তারা কখনো আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।–(আল-ইমরান, আয়াত ১৭৭। বলা হয়েছ: “কাফিরগণ  যেন কিছুতেই মনে না করে যে, আমি অবকাশ দেই তাদের মঙ্গলের জন্য; আমি অবকাশ দিয়ে থাকি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি পায় এবং তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। -(আল-ইমরান, আয়াত ১৭৮।

 

জিহাদ কেন অপরিহার্য?

জিহাদ মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য প্রক্রিয়া। মানব জাতিকে নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালা নিজস্ব এজেন্ডা, ভিশন ও মিশন রয়েছে। জিহাদ হলো সে এজেন্ডা, ভিশন ও মিশনকে বিজয়ী করার বিধান। তিনি মানব জাতিকে পৃথিবী পৃষ্টে যেমন সফল দেখতে চান, তেমনি সফল দেখতে চান আখেরাতেও। এবং সে সফলতার জন্য মানব জাতিকে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়। জিহাদ বস্তুত সে সফল হওয়ার প্রক্রিয়া। এটি হলো মহান আল্লাহতায়ালা এজেন্ডা, ভিশন ও মিশন নিয়ে বাঁচার লড়াই। তাই যারা ঈমান নিয়ে বাঁচতে ও মরতে চায় তাদের বাঁচতে হয় জিহাদী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই। মহান আল্লাহতায়ালা বস্তুত এ জিহাদী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সকল প্রকার দুর্বৃত্তদের থেকে ঈমানদের পৃথক করেন। তাই যেখানে ঈমানদার ও বেঈমানের বসবাস, সেখানে অপরিহার্য হয়ে পড়ে মহান আল্লাহতায়ালার জিহাদী প্রক্রিয়াটি। নইলে অসম্ভব হয় ঈমানদার ও বেঈমানের বিভাজন করাটি।

পবিত্র কোর’আনে জিহাদের সে বিশেষ উদ্দেশ্যটির কথা বলা হয়েছে এভাবে: “যদি কোন বিপর্যয় তোমাদের আঘাত করে, তবে অনুরূপ বিপর্যয় তো অন্যদের উপরও আঘাত হেনেছিল। এবং আমরা এ দিনগুলোর আবর্তন ঘটাই এ জন্য যে, আল্লাহ যাতে জানতে পারেন তাদেরকে যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের মধ্য থেকে বেছে নিতে পারে শহীদদের। আল্লাহ জালেমদের পছন্দ করেন না। এবং (জিহাদের মধ্য দিয়ে) এ জন্য আল্লাহ তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন যারা ঈমান আনে এবং ধ্বংস করেন যারা কাফের।” –(সুরা আল-ইমরান, অআয়াত ১৪—১৪১)। উপরুক্ত আয়াতে মহান আল্লাহায়ালার অতি গুরুত্বপূর্ন ঘোষণাটি হলো, তিনি তাঁর অতি প্রিয় বান্দাহদের নামাযের জামায়াত থেকে বেছে নেন না, সে বাছাইয়ের কাজটি করেন জিহাদের ময়দান থেকে। তাই যারা মহান আল্লাহায়ালার তালিকায় নিজের নাম লেখাতে চায় তাদেরকে জিহাদের ময়দানে  হাজির হওয়া ছাড়া উপায় নাই। তাছাড়া জান্নাতের প্রবেশ পথটিও হলো এই জিহাদ। সেটি বলা হয়েছে এভাবে: “তোমরা কি মনে করেছো নিয়েছো যে, এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো জানলেন না, তোমাদের মধ্য থেকে কারা জিহাদ করলো এবং কারা ছবর ধারণ করলো।” –(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১৪২)।

উপরুক্ত আয়াতে জিহাদের দুটি বিশেষ উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। এক). ঈমানদারদের জীবনে লাগাতর পরিশুদ্ধি। দুই). কাফেরদের নির্মূল। মানব জাতিকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের জন্য এ দু্টি প্রক্রিয়াই অপরিহার্য। জীবাণু বাঁচিয়ে রেখে মানব জীবন বাঁচানো যায় না। তেমন দুর্বৃত্তদের বাঁচিয়ে রেখে সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা দেয়া যায় না। মহান আল্লাহতায়ালা তাই এ দুর্বৃত্তদের শিকড় কাটতে চান। তাঁর সে লক্ষ্যের কথা ঘোষিত হয়েছে এভাবে: “আল্লাহ চান হককে প্রতিষ্ঠা দিতে এবং চান কাফেরদের শিকড় কাটতে।” –(সুরা আনফাল, আয়াত ৭)। শিকড় কাটার সে কাজটি তিনি ফিরেশতাদের দিয়ে করেন না, সেটি করেন তাঁর ঈমানদার বান্দাদের মাধ্যমে। জিহাদকেই এজন্য তাদের উপর ফরজ করেছেন। প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার এটিই হলো মহান আল্লাহতায়ালার স্ট্রাটেজি। পবিত্র কোর’আনে এ প্রসঙ্গে আরো বলা হয়েছে: “অসৎ লোকদের সৎ লোকদের থেকে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা যে অবস্থায় রয়েছো আল্লাহ সে অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না। অদৃশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদেরকে অবহিত করবেন না, তবে আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের উপর ঈমান আনো।। তোমরা ঈমান আনলে এবং তাকওয়া অবলম্বন করলে তোমাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। -(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১৭৯।

 

মুসলিম জীবনে গাদ্দারী

আল্লাহতায়ালার কাছে মানব জাতির বিভাজন দুটি দলে। একটি দল বাঁচে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার জিহাদ নিয়ে; আরেকটি দল বাঁচে শয়তানের মিশনকে বিজয়ী করার যুদ্ধ নিয়ে। পবিত্র কোর’আনে সে বিভাজনটি ঘোষিত হয়েছে এভাবে: “যারা ঈমান এনেছে তারা জিহাদ করে আল্লাহর রাস্তায়; আর যারা কাফের তারা যুদ্ধ করে শয়তানের পথে। অতঃপর যুদ্ধ করো শয়তানের আউলিয়াদের তথা বন্ধুদের বিরুদ্ধে। নিশ্চয়ই শয়তানের ষড়যন্ত্র  দুর্বল।” –(সুরা নিসা, আয়াত ৭৬)। অতএব ঈমান আনার সাথে সাথে ঈমানদারের উপর কিছু ঈমানী দায়িত্বও আসে যায়। তখন তাঁকে বাঁচতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার পথে জিহাদ নিয়ে। তাই ঈমান গোপন থাকার বিষয় নয়। ঈমান সুস্পষ্ট দেখা যায়। এবং সেটি দেখা যায় ব্যক্তির জীবনের লড়াই এবং সে লড়াইয়ের এজেন্ডার মধ্যে। তাই যে ব্যক্তির জীবনে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করার জিহাদ নাই, সে ব্যক্তির ঈমানও নাই। নিষ্ক্রীয় থাকার মধ্যেও ঈমানদারী নাই। কারণ, সে  নিষ্ক্রীয়তায় মহান আল্লাহতায়ালার দল ও তাঁর শরিয়তি বিধান বিজয়ী হয় না। বরং তাতে শয়তানের বিজয় বাড়ে। তাই সেটি প্রকৃত ঈমানদারের কাজ হতে পারে না।

আজকের মুসলিমদের জীবনে ব্যর্থতা বহুবিধ। তবে মূল ব্যর্থতাটি জিহাদ নিয়ে বাঁচায়। ব্যর্থতা এখানে মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক হওয়াতে। তাদের সে ব্যর্থতাটি ধরা পড়ে মুসলিম দেশগুলোতে শরিয়তী বিধানের বিলু্প্তিতে। ধরা পড়ে, নবীজী (সা:)’র ইসলাম -যাতে রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়তী আইন, হদুদ, জিহাদ, মুসলিম ঐক্য, সে ইসলাম বেঁচে না থাকাতে। তবে মুসলিম জীবনে যে যুদ্ধ নাই –তা নয়। বরং অসংখ্য রক্তাক্ত যুদ্ধের ইতিহাস রয়েছে। জান ও মালের বিপুল বিনিয়োগের ইতিহাসও আছে। মুসলিম দেশগুলোত আজ যেরূপ কুফরি আইন, জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম ও নৃশংস স্বৈরাচারি বর্বরতা -সেটি কি কোন পৌত্তলিক কাফেরদের কারণে? বরং মুসলিম ভূমিতে ইসলামের বিধান পরাজিত হয়েছে এবং শয়তানের প্রকল্পগুলো বিজয়ী হয়েছে তো তাদের হাতে -যারা নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। অর্থাৎ মুসলিম খাটছে শয়তানের সৈনিক রূপে। এরা অতীতে ব্রিটিশ কাফেরদের সৈনিক রূপে মুসলিম হত্যায় ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়াতেও যুদ্ধ করেছে। এবং নিজ দেশ দখলে নিয়েছে শয়তানের এজেণ্ডাকে বিজয়ী করতে। মুসলিমগণ এভাবেই ইতিহাস গড়েছে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে গাদ্দারীতে। তাদের রাজনীতি, সমরনীতি, সংস্কৃতি ও আইন-আদালত পরিণত হয়েছে সে গাদ্দারীর হাতিয়ারে। এ গাদ্দারী যে আযাব নামিয়ে আনবে সেটি কি স্বাভাবিক নয়? এবং সেটি শুধু এ দুনিয়ায় নয়, বরং আখেরাতেও। ২৮/০১/২০২১।

 

  




বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের পাকিস্তান-বিদ্বেষ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

অবজ্ঞা জিন্নাহর প্রতি                                                                          

বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের চেতনার মূল উপাদান যেমন গভীর ভারত প্রেম, তেমনি গভীর হলো পাকিস্তান-বিদ্বেষ। পাকিস্তান কেন সৃষ্টি হলো তা নিয়েই তাদের ক্ষোভ। তাদের চরম ক্রোধ ও পরম অবজ্ঞা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি। তারা নিজেরা ইসলাম পালন ও প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকারহীন হলে কি হবে, জনার জিন্নাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ, তিনি ইসলাম পালনে নিষ্ঠাবান ছিলেন না। অতএব তাদের যুক্তি, জিন্নাহর গড়া দেশকে কি কখনো সমর্থন করা যায়? সে দেশকে ইসলামী বলা যায়?

কিন্তু কথা হলো, আদালতে মামলা লড়তে কেউ কি উকিলের ধর্মজ্ঞানের খোঁজ নেয়? বরং তাঁরা তো উকিলের উকালতির যোগ্যতা দেখেন। দেখেন, তিনি তাঁর মামলাটি জিতিয়ে দিতে পারবেন কিনা। ১৯৪৭’য়ে ভারতীয় মুসলিমদের সামনে তক্ষনাৎ লক্ষ্যটি খেলাফত প্রতিষ্ঠা ছিল না, শরিয়তের প্রতিষ্ঠাও ছিল না। বরং ছিল এমন একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যেখানে তারা স্বাধীন ভাবে বাঁচবার সুযোগ পাবে। সুযোগ পাবে ভবিষ্যতে সে দেশটিকে ইসলামের দুর্গ রূপে গড়ে তোলার। সে সময় প্রয়োজন ছিল ভারতীয় মুসলিমদের ঐক্য; সে সাথে প্রয়োজন ছিল এমন একজন নেতার যিনি সে ঐক্য গড়ে তোলার যোগ্যতা রাখেন। আরো প্রয়োজন ছিল, স্বাধীন পাকিস্তানের সে কেসটি ব্রিটিশ শাসকদের দরবারে বুদ্ধিমত্তার সাথে পেশ করার। ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়াটি বেওকুফি। প্রথমে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, তারপর সেটির ইসলামীকরণ। তথন শরিয়ত বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবী তুললে সেটির বিরুদ্ধে প্রবল বিরোধীতা আসতো ভারতীয় হিন্দুদের পক্ষ থেকে নয়, বরং ব্রিটিশের পক্ষ থেকে। যে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ উসমানিয়া খেলাফতকে ধ্বংস করলো তাদের শাসনাধীনে থেকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবী তুললে সেটি কি তারা মেনে নিত? তখন বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রকল্পই নর্দমায় গিয়ে পড়তো।

ব্রিটিশের আদালতে ভারতের মুসলমানদের মামলাটি কে সুন্দর ভাবে পেশ করতে পারবে সে প্রশ্নটি সেদিন অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখন মুসলিম লীগ ছিল বহু ভাগে বিভক্ত। মুসলিম নেতাদের মাঝে তখন প্রতিটি প্রদেশে চলছিল প্রচণ্ড বিবাদ। বাংলায় ফজলুল হকের মত নেতা নিছক ক্ষমতার লোভে জোট বেঁধেছিলেনে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নেতৃত্বাধীন হিন্দু মহাসভার মত প্রচণ্ড মুসলিম বিদ্বেষী শক্তির সাথে, গড়েছিলেন শ্যামা-হক কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা। সবচেয়ে বেশী মুসলিমের বাস ছিল বাংলায়। কিন্তু তাঁরা সমগ্র ভারতের মুসলিমদের কি নেতৃত্ব দিবে, তারা নিজেরাই লিপ্ত ছিল প্রচণ্ড কলহবিবাদে। ভারতের ইতিহাসে তখন ক্রান্তিলগ্ন। আগামী বহু শত বছরের জন্য তখন ভারতের নতুন ভৌগলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নির্মিত হতে যাচ্ছে। কোন জাতিকে এমন  মুহুর্তের জন্য শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়। ব্রিটিশেরা তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা ভারতের শাসনভার ভারতীয়দের হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে। যদি ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের হাতে যায় তবে মহা বিপর্যয় নেমে আসবে ভারতের মুসলিমদের উপর। সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে তারা তখন যা ইচ্ছে তাই করার সুযোগ পাবে। এমনটি হলে মুসলিমদের জন্য তখন শুধু মনিব বদল ঘটবে, স্বাধীনতা আসবে না। বাংলার মুসলিমগণ হিন্দু-মানস ও হিন্দু জমিদারদের নির্মম অত্যাচার ও শোষণ দেখেছে নিজ চোখে এবং নিজ ঘরের আঙিনায়। সেটির বিরুদ্ধে তবুও ব্রিটিশ আদালতে অভিযোগ তোলা যেত। কিন্তু সমগ্র ভারতের শাসন যদি হিন্দুদের হাতে যায় তখন দুর্বিসহ এক মহাবিপর্যয় নেমে আসবে ভারতীয় মুসলিমদের জীবনে। তাই হিন্দুদের হাতে রাষ্ট্রের শাসনভার গেলে তার পরিনতি যে ভয়াবহ হবে তা নিয়ে বাঙালী মুসলিমদের মনে সামান্যতম সংশয়ও ছিল না। বাংলার মুসলিমদের মাঝে শিক্ষার হার তখন শতকরা ৭ ভাগও ছিল না। কিন্তু সে নিরক্ষরতা সত্বেও হিন্দু শাসনের ভয়ানক ভবিষ্যৎ আলামত টের পেতে ভূল করেনি। তাই গান্ধি বা নেহেরুকে তারা বন্ধু রূপে গ্রহণ করেননি। এ ছিল তৎকালীন বাঙালী মুসলিমদের প্রজ্ঞা।

অথচ আজ? বাংলাদেশে আজ  বহু শত প্রফেসর, বহু বিচারপতি, বহু হাজার আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবী। ১৯৪৭’য়ে এরূপ শিক্ষিতজনের সংখ্যা আজকের তুলনায় শত ভাগের এক ভাগও ছিল না। কিন্তু আজকের এ ডিগ্রিধারিরা যে কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিচ্ছেন- বাংলার নিরক্ষর গ্রামীন জনগণ ১৯৪৭ সালে তার চেয়ে অধিক কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছিলেন। কাণ্ডজ্ঞান আসে বিবেকের সুস্থ্যতা, চিন্তাভাবনার সামর্থ্য, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নৈতিক সততা থেকে। সার্টিফিকেট থেকে নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ ছিলেন মুসলিম ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। বিশ্ববিদ্যালয়ের কুশিক্ষা বরং মনের সে মহৎগুলো ধ্বংসও করে দিতে পারে। বাংলাদেশের আজকের শিক্ষাব্যবস্থা তো সে ধ্বংস প্রক্রিয়াকেই প্রকট ভাবে বাড়িয়েছে। দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশ তো মূলত তথাকথিত এ শিক্ষিতদেরই নিজ হাতের সৃষ্টি। এরূপ অপরাধীদের কারণেই গণতন্ত্র হত্যাকারী এক গুরুতর অপরাধী এবং বাকশালী ফাসিস্ট জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধুর খেতাব পেয়েছে। তাদের কাছে ভোটডাকাতও মাননীয় গণ্য হয়। ভারতের বহু হাজার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় যেমন ভারতীয়দেরকে গরুপূজা ও গোমুত্র সেবন থেকে বাঁচাতে পারিনি তেমনি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদেরও বাঁচাতে পারিনি স্বৈরাচারপূজা থেকে।

১৯৪৭ সালে বাংলার নিরক্ষর মানুষগুলো সেদিন তারা ভাষা ও আঞ্চলিক ক্ষুদ্রতার বন্ধনে বন্দী হয়নি। বরং সে বন্ধনের উর্ধ্বে উঠে এক অবাঙালী জিন্নাহকে নিজেদের নেতা রূপে গ্রহণ করেছিলেন, কোন ভারতীয় সেবাদাসকে নয়। গণতন্ত্রের হত্যাকারি কোন ফাসিষ্ট নেতাকেও নয়। এ এক অপূর্ব বিচক্ষণতা। মানবিক গুণের এ হলো এক বিশাল নিদর্শন। এ ছিল প্যান-ইসলামীক ঈমানী চেতনার প্রকাশ। নইলে সেদিন পাকিস্তানই প্রতিষ্ঠা পেত না। জনাব জিন্নাহ ছিলেন সর্বভারতে অন্যতম সেরা আইনজীবী। তাঁর ছিল মুসলিম স্বার্থের প্রতি অটুট অঙ্গিকার। সে অঙ্গিকারটি যখন তিনি কংগ্রেস করতেন তখনও দেখিয়েছেন। মুসলিম স্বার্থের সুরক্ষায় তিনিই ১৪ দফা পেশ করেছিলেন। দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবালের দৃষ্টিতে জিন্নাহর সে গুণটি ধরা পড়েছিল বলেই তিনি তাঁকে ভারতের বিপর্যস্ত মুসলিমদের নেতৃত্বের দায়ভার নিতে অনুরোধ করেছিলেন। এ বিষয়টি হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহঃ)ও বুঝতেন। তিনিও কংগ্রেসপন্থি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বিরোধীতার মুখে জিন্নাহর প্রতি সমর্থন দেয়ার জন্য ভারতীয় মুসলিমদের প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। সে সময় তাঁর মত সুন্দর করে ও বলিষ্ঠ ভাবে আর কে মুসলিমদের দাবীটি উত্থান করতে পেরেছিলেন? মুসলিমদের মনের কথা তার মুখ দিয়ে ধ্বনিত হতো। অখণ্ড ভারতপন্থী সেক্যুলারিস্টরা জিন্নাহর বিরোধীতা করবে –সেটিই ছিল স্বাভাবিক। কারণ সেটিই ছিল তাদের রাজনীতির মূল বিষয়।

ভারতের মদদপুষ্ট বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ জিন্নাহকে ঘৃনা করবে –সেটি তো তাদের রাজনীতির এজেন্ডা। তাদের ঘৃনা তো মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধি ও ইসলামের জাগরণের বিরুদ্ধেও। তাদের এজেন্ডা ও আনন্দ তো মুসলিমদের ইসলামশূণ্য করা নিয়ে। এজন্যই তারা অতি সহজে ভারতীয় হিন্দুদের মিত্র হতে পারে। কিন্তু যারা ভারতীয় মুসলিমদের স্বাধীনতা ও কল্যাণ দেখতে চান -তারা কি জিন্নাহর অবদানকে অস্বীকার করতে পারেন? তার নেতৃত্বেই গড়ে উঠে ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। তিনিই একমাত্র নেতা যিনি ভারতের সূন্নী-শিয়া, দেওবন্দী-বেরেলভী, বাঙালী-বিহারী, পাঞ্জাবী-পাঠান, সিন্ধি-বেলুচ তথা নানা ফেরকা ও নানা ভাষার মুসলমানদের একত্রিত করতে পেরেছিলেন। এটি ছিল এক বিশাল কাজ। একাজটি অন্য আর কার হাতে হয়েছে? কার হাতেই বা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল? বহু নেতা ও বহু আলেম এমন মহান কাজে উদ্যোগ নেয়া দূরে থাক, আগ্রহ পর্যন্ত দেখাননি। বরং ব্যস্ত থেকেছেন নিজেদের দল, দরবার, মাদ্রাসা ও হুজরা নিয়ে। সমগ্র ভারতের মুসলিমদের একতাবদ্ধ করা দূরে থাক, অধিকাংশ নেতা বা আলেমগণ তো নিজ ফেরকা¸ নিজ মজহাব বা নিজ প্রদেশের মুসলিমদের একতাবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও তেমন যোগ্যতাই দেখাতে পারেননি। বরং ফেরকা ও মজহাবের নামে বাড়িয়েছেন বিভক্তি ও বিভেদ। অথচ বিভক্তি ও বিভেদ গড়া হারাম।

 

খাঁচার জীবন ও স্বপ্ন দেখার সামর্থ্য

খাঁচার পাখি বাসা বাঁধার চিন্তা করে না। খাবার খোঁজার চিন্তাও করে না। খাঁচার বন্দীদশায় সে সামর্থ্য থাকে না। ফলে সে ভাবনাও থাকে না। কিন্তু খাঁচার বাইরের স্বাধীন পাখিকে সে ভাবনা প্রতি মূহুর্তে করতে হয়। মুসলিম রাষ্ট্র গড়ে শুধু এজন্য নয় যে, সেখানে সে ঘর বাঁধবে, সন্তান পালন করবে ও ব্যবসা-বাণিজ্য করবে। বরং তাঁর দায়-ভারটি আরো বিশাল। সেটি ইসলামী রাষ্ট্র গড়া এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দেয়া। ঈমানদার হওয়ার এটিই তো মূল দায়ভার। এ দায়ভার পালন করতে গিয়েই মুসলিমগণ নিজ মাতৃভূমি থেকে হিজরত করে মদিনায় গিয়েছিলেন। এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে নিজ অর্থ, নিজ শ্রম, নিজ মেধা ও নিজ রক্তের বিনিয়োগ ঘটিয়েছিলেন। নবীজী (সাঃ)র আমলে শতকরা প্রায় ৬০ ভাগের বেশী সাহাবী শহীদ হয়েছেন সে দায়ভার পালনে। খাঁচার বন্দিদশা সিংহকে যেমন শিকার ধরার দায়ভার থেকে দূরে রাখে, তেমনি অমুসলিম দেশের বন্দিদশী মুসলিমকে ভুলিয়ে দেয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দায়ভার। কেড়ে নেয় ইসলামী সমাজ ও সভ্যতার নির্মাণের সামর্থ্য। তাই কোন অমুসলিমের দেশে ও অমুসলিমদের শাসনাধীনে শরিয়ত বা ইসলামী সভ্যতার প্রতিষ্ঠা ঘটেছে -ইতিহাসে তার নজির নেই। তাই ব্রিটিশ ভারতের মুসলিমগণ সে ঔপনিবেশিক পরাধীনতার দিনে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্টা দূরে থাক, তার স্বপ্নও দেখতে পারিনি। সে স্বপ্ন যেমন হোসেন আহম্মদ মাদানীর ন্যায় দেওবন্দি আলেমগণ দেখতে পারিনি, তেমনি মাওলানা মওদূদীও দেখতে পারিনি। তাবলিগ জামায়াতের মাওলানা ইলিয়াসও দেখতে পারেননি। তারা বড় জোর মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, বই লেখা, পত্রিকা প্রকাশ করা বা ওয়াজ-নসিহতের আয়োজন করতে পারতেন। কিন্তু এভাবে কি পূর্ণ ইসলাম পালন হয়? ইসলামের মিশন বা নবীজী (সাঃ)র সূন্নত শুধু এগুলো নয়।

খাঁচার পরাধীনতার সবচেয়ে বড় কুফল হল, স্বাধীন জীবনের সে সাধই কেড়ে নেয়। কেড়ে নেয় লড়বার আগ্রহ। আনে স্থবিরতা। খাঁচার বাঘকে তাই ছেড়ে দিলেও সে খাঁচা ছেড়ে সহজে বেড়িয়ে আসতে চায় না। তাই যখন উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশের খাঁচা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার দিন ঘনিয়ে এলো তখনও দেওবন্দী ওলামাদের অনেকে স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে মেনে নিতে পারিনি। তারা শুধু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতাই করেনি, বরং হিন্দুদের অধীনে আরেক খাঁচায় ঢুকাটিকেই শ্রেয়তর মনে করলো। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় ফায়দাটি হল, ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগষ্টের পর দেশটির বিশাল মূসলিম জনগোষ্ঠির স্বপ্নই পাল্টে গেল। ফলে যেসব দেওবন্দী আলেম বা জামায়াতে ইসলামীর যে সব নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানে হিজরত করলেন তারা তখন স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন ইসলামী রাষ্ট্র নির্মানের। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এ হলো প্রথম এবং সবচেযে বড় সুফল। দীর্ঘ গোলামী জীবনের পার এল এক মহা সুযোগ। জামায়াতে ইসলামের নেতারা তখন ব্রিটিশ শাসনাধীন গোলামী জীবনের দলীয় গঠনতন্ত্র তাড়াতাড়ি পাল্টিয়ে ফেললেন। সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানের রাজনীতিতে অংশ নেয়ার এবং পাকিস্তানকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার। অপর দিকে ভারতের জামায়াত বা জমিয়তে উলামা হিন্দের অবস্থা? তারা এখনও কিছু মাদ্রাসা-মসজিদ গড়া, বই লেখা, ওয়াজ মহফিল করা নিয়ে ব্যস্ত। এর বাইরে স্বপ্ন দেখার সামর্থ্য তাদের অতি সামান্যই। নবীজী (সা:)’র পূর্ণ ইসলাম –যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, জিহাদ, শরিয়ত, হুদুদ, শুরা ও মুসলিম ঐক্য, সেটির পালন দূরে থাক তা নিয়ে তারা ভাবতেও পারেন না।  

                                                   

স্বাধীন মুসলিম ও পরাধীন মুসলিম

কোনটি খাঁচার পাখি আর কোনটি বনের মুক্ত পাখি সেটি বুঝতে বেশী বিদ্যাবুদ্ধি লাগে না। তেমনি কে স্বাধীন মুসলিম আর কে পরাধীন মুসলিম -সেটিও বুঝতেও বেশী বেগ পেতে হয় না। উভয়ের মাঝের ভিন্নতাটি দেহের নয়, পোষাক-পরিচ্ছদ বা খাদ্যের নয়, বরং চেতনার এবং সামর্থ্যর। পাকিস্তান নিয়ে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদী মহল ও তার দোসররা বড় চিন্তিত। অথচ তাদের সে চিন্তা ২০ কোটি ভারতীয় মুসলিমদের নিয়ে নেই। ১৬ কোটি বাংলাদেশীদের নিয়েও নাই। খাঁচার জীবকে নিয়ে কি কেউ চিন্তা করে? যত ভয় তো বনের মূক্ত বাঘকে নিয়ে। ফলে ইসলামের শত্রু পক্ষের চিন্তার কারণ, পাকিস্তানে জিহাদী চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠা বিপুল সংখ্যক মানুষকে নিয়ে। তাদের সামর্থ্য তারা দেখেছে আফগানিস্তানের জিহাদে। আফগান মোজাহিদদের সাথে নিয়ে তারাই সোভিয়েত রাশিয়াকে পরাস্ত করে ছেড়েছে। তারাই গড়ে তুলেছিল সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জিহাদ। সে লড়াইয়ে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে অন্যান্য দেশের মুসলমানদের। তারই ফলে হাজার হাজার মুসলিম ছুটে এসেছে সূদুর আল-জিরিয়া, সৌদি আরব, মিশর, লিবিয়া, জর্দান, সিরিয়া থেকে। এটি ছিল এমন এক নিরেট জিহাদ যা নিয়ে কারো কোন সন্দেহ ছিল না। জিহাদটি ছিল সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন কম্যুনিষ্ট কাফের কোয়ালিশনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত মুসলিমদের।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক’জন ভারতীয় মুসলিম সে জিহাদে যোগ দিয়েছে? ক’জন বাংলাদেশী মুসলিম যোগ দিয়েছে? অথচ ভারত ও বাংলাদেশ আলজিরিয়া, মিশর বা সৌদি আরবের ন্যায় আফগানিস্তান থেকে দূরের দেশ নয়। কিন্তু ভারত থেকে কেউ যায়নি। বাংলাদেশ থেকেও তেমনটি যায়নি। খাঁচায় বন্দী মানুষ সামনে মানুষ খুন হতে দেখেও তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করে না। কারণ সে সামর্থ্য তাঁর থাকে না। ফলে কোন সাধারণ ভারতীয় মুসলিম দূরে থাক সেদেশের কোন বিখ্যাত আলেমের মাঝেও সে জিহাদী চেতনা জাগেনি। অথচ বহু হাজার সাধারণ পাকিস্তানীরা সে জিহাদে শহিদ হয়েছেন। শহিদ হয়েছেন এমনকি সেদেশের প্রেসিডেন্ট জেয়াউল হক। তাদের সে রক্ত ও কোরবানীর বরকতেই দুনিয়ার মানচিত্র থেকে সোভিয়েত রাশিয়া বিলুপ্ত হয়েছে। জন্ম নিয়েছে ১৫টি স্বাধীন দেশ। অথচ এর আগেও সোভিয়েত রাশিয়া হাঙ্গেরী ও চেকোস্লাভাকিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছিল। দেশ দুটিকে দখলও করেছিল। কিন্তু সে সময় সোভিয়েত রাশিয়ার গায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও একটি আঁচড়ও কি কাটতে পেরেছে? কারণ সেখানে বহু মিত্র দেশ থাকলেও তাদের পাশে পাকিস্তান ছিল না।

 

কেন এতো পাকিস্তান বিদ্বেষ?

যাদের চেতনায় ইসলাম বিদ্বেষ, তাদের চেতনায় অনিবার্য কারণেই পাকিস্তান-বিদ্বেষ এসে যায়। তাদের কাছে পাকিস্তানের অপরাধ, দেশটি তার জনগণকে দিয়েছে কোর’আন চর্চা ও ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠার অবাধ সুযোগ। সে সুযোগ অধিকাংশ মুসলিম দেশেই নাই্। এমন কি সৌদি আরবেও নাই। সে দেশটির মাদ্রাসাগুলোতে যে ইসলামের চর্চা হয় সেখানে নামায-রোযা, হজ-যাকাতের পাশাপাশি জিহাদ আছে। শরিয়তের প্রতিষ্ঠার তাগিদও আছে। আর সে ইসলামী জ্ঞান চর্চায় যোগ দিচ্ছে বিশ্বের নানা দেশের যুবক। এখানেই মার্কিনীদের ভয়। তারা চায়, মুসলিমদের ইসলাম চর্চায় নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, বিয়ে-শাদী ও বিবি তালাকের মসলা থাকবে -সেটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও জিহাদ থাকবে এবং খেলাফতের প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার থাকবে -সেটি হতে পারে না। ভারতে ব্রিটিশ শাসকরা তাদের দীর্ঘ শাসনামলে ইসলাম চর্চাকে এর বাইরে যেতে দেয়নি। মুসলিমদের স্বাধীন কোরআন চর্চার অধিকার তারা কখনোই দেয়নি। সে নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের। তাই তারা পাকিস্তানসহ সকল মুসলিম দেশের স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার সিলেবাসে সংশোধন আনতে চাপ দিচ্ছে।

ইসলামের শত্রুশক্তি জানে, জিহাদ থাকলে আগ্রাসী দেশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধও থাকবে। জিহাদ শুরু হবে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়েও। শরিয়ত হলো সেক্যুলার আইন-আদালতের বিরুদ্ধে কোর’আনী বিধান। এটি একটি বিকল্প মূল্যবোধ। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য তাদের আইন-আদালত ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে কোন বিকল্প বিধান ও মূল্যবোধ মেনে নিতে রাজী নয়। আফগানিস্তানে মার্কিনী হামলার মূল কারণ তো সেটাই। তারা পৃথিবীকে একটি গ্লোবাল ভিলেজ মনে করে। চায়, সে গ্লোবাল ভিলেজে অভিন্ন পাশ্চাত্য মূল্যবোধ ও আাইনের প্রতিষ্ঠা। তাদের ব্যাভিচারী ও মদ্যপায়ী নাগরিকগণ কোন মুসলিম দেশে বেড়াতে গিয়ে শরিয়তি আইনের মুখে পড়ুক -সেটি তারা মেনে নিতে রাজী নয়। মার্কিনীরা এজন্যই যে কোন দেশে ইসলামী শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিরোধী। তাদের অবস্থান ও যুদ্ধ তাই মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। আর মার্কিনীরা যা পাকিস্তান ও অন্যান্য মুসলিম দেশে চায়, ভারত সেটিই বাস্তবায়ন করছে তার খাঁচায় অন্তরীণ ভারতীয় মুসলিমদের উপর। ফলে ভারতীয় মুসলিমদের ইসলাম চর্চায় নামায-রোযা আছে, হজ্ব-যাকাত এবং তাবলিগ জামায়াতও আছে। কিন্তু তাদের মাঝে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কোন ভাবনা নেই। জিহাদও নেই। ফলে তারা বাঁচছে এ এক অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম নিয়ে। ভারত সরকার ইসলামের সে মডেলই আওয়ামী লীগারদের দিয়ে বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করাতে চায়। বাংলাদেশের রাজপথে তাই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে জনগণ সড়কে না নামলে কি হবে, লাগাতর বেড়ে চলেছে তাবলিগ জামায়াতের ইজতেমায় লোকের সমাগম। এটি ঠিক, পাকিস্তান আজও একটি ইসলামী রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠা পায়নি। তবে যা  প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেটিও কি বাংলাদেশে বা ভারতে কি ভাবা যায়? অন্য কোন মুসলিম দেশও কি এতটা এগিয়েছে। ভারতে মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণে সহজে অনুমতি মেলে না। ফলে দিল্লি, মোম্বাইয়ের ন্যায় অনেক শহরে মানুষ জুম্মার নামায পড়ছে রাজপথে দাঁড়িয়ে। গরু কোরবানী নিষিদ্ধ করা হয়েছে বহু প্রদেশে। অনেক শহরে মাইকে আযানও দেওয়ার অনুমতিও নেই। এই হলো ভারতীয় মুসলিমদের স্বাধীনতা। 

পাকিস্তান প্রতিষ্টার কয়েক বছরের পর সমগ্র উলামা একত্রিত হয়ে ২২ দফা ইসলামী মূল নীতি অনুমোদন করে। আজও সেটি পাকিস্তানে শাসনতন্ত্রের মৌলিক অংশ যা ধাপে ধাপে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে সরকারের উপর বাধ্যতামূলক করে রেখেছে। এবং অসম্ভব করে রখেছে শরিয়তের বিরুদ্ধে কোন আইন প্রণয়ন। ফলে পাকিস্তানে শরিয়ত পরিপূর্ণ ভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে কি হবে, সে সম্ভাবনা এখনও বিলুপ্ত হয়নি। প্রবর্তিত হয়েছে ব্লাফফেমী আইন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লিখলে বা বললে প্রাণদণ্ড হয়। অথচ ভারতে সেটি ভাবাও যায় না। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে স্বপ্নও দেখা যায় না।

ইমারত গড়তে হলে প্রথমে ভূমি চাই। পাকিস্তান মুসলিমদের জন্য সেই ভূমিটা দিয়েছে। তাই যতদিন পাকিস্তানে থাকবে, সে সম্ভাবনাও থাকবে। অথচ বাংলাদেশে আজ শরিয়ত দূরে থাক, গঠনতন্ত্রে বিসমিল্লাহ রাখাই অসম্ভব হচ্ছে। অসম্ভব হয়েছে জিহাদের উপর বই প্রকাশ করা। জিহাদকে বলা হচ্ছে সন্ত্রাস। ইসলামী সংগঠনগুলোকে জিহাদী সংগঠন বলে নেতা-কর্মীদের জেলে ঢুকানো হচ্ছে। ইসলামপন্থীদের দমনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ ভারতীয়দের চেয়েও ভারতীয়। তারা ব্যস্ত তাদের ভারতীয় মনিবদের খুশি করা নিয়ে। কারণ, ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতকে খুশি করাটিকে তারা অপরিহার্য মনে করে। তাই ভারতে হিজাব, ইসলামী সংগঠন বা ইসলাম চর্চার বিরুদ্ধে যা হচ্ছে, বাংলাদেশে হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশী।

বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের চেতনায় যে প্রচণ্ড পাকিস্তান বিদ্বেষ -তার কারণ মূলত ইসলাম ভীতি। তেমন এক প্রচণ্ড ইসলাম ভীতির কারণে শুধু পাকিস্তান নয়, তাদের ঘৃণা ও বিদ্বেষের টার্গেট বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম দেশই যেখানে ইসলামের পতাকা নিয়ে জনগণ জেগে উঠেছে। যে ভয় নিয়ে ভারতের হিন্দুগণ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিল -তা থেকে বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ এক কদমও দূরে সরেনি। এরাই হলো ঘরের শত্রু। এরা বেঁচে আছে হিন্দু এজেন্ডা নিয়ে। বাংলাদেশী মুসলিমদের জন্য বিপদের মূল কারণ, দেশটি ইসলামের এ চিহ্নিত শত্রুদের হাতেই অধিকৃত।  ২৮/০১/২০২১।




কাশ্মীরের জিহাদ এবং ভারতের অপ্রতিরোধ্য পরাজয়

ফিরোজ মাহবুব কামাল

দিশেহারা ভারত

সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের শক্তি যখন সমগ্র বিশ্বে শীর্ষে -তখন তারা দুই বার পরাজিত হয়েছিল আফগানিস্তানে। সোভিয়েত রাশিয়ার সামরিক শক্তি যখন তুঙ্গে তখনও তারা পরাজিত হয়েছিল আফগানিস্তানে।  শুধু পরাজিত হয়নি, দেশটি ১৫ টুকরোয় বিভক্ত হয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাস্ত্রের ভান্ডারে যখন দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক ধ্বংসাকারি অস্ত্রশস্ত্র এবং আফগানিস্তানে হাজির হয়েছিল আরো ৪০টি মিত্র রাষ্ট্রের সৈন্য নিয়ে -তারাও বিজয় পায়নি আফগানিস্তানে। জিহাদের শক্তিই ভিন্ন। আফগানিস্তানে যে ব্রিটিশ, সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয়েছে ভারত তার চেয়ে শক্তিশালী নয়। কাশ্মীরের জিহাদও দুর্বল নয়। সেটি বুঝা যায় কাশ্মীরে ৬ লাখ ভারতীয় সৈন্যের সমাবেশ নিয়ে।

কাশ্মীর নিয়ে ভারত এখন দারুন দিশেহারা অবস্থায়। তাদের পরাজয় দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হচ্ছে। ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশয়িার যে অবস্থা হয়েছিল – কাশ্মীরে ভারত সেদিকেই এগুচ্ছে। তবে পার্থক্য হলো, মার্কিন ও রুশদের পক্ষে তাদের অধিকৃত দেশে কোমড় বেঁধে লড়বার প্রচুর লোক ছিল। কারণ, আফগানিস্তানে রাশিয়ান কম্যুনিস্টদের পক্ষে লড়বার জন্য হাজার হাজার আফগান কম্যুনিস্ট ছিল। তেমনি ভিয়েতনামে মার্কিনীদের পক্ষে ছিল কম্যুনিজম বিরোধী হাজার ভিয়েতনামী সৈনিক। কিন্তু ভারত কাশ্মীরে কোন রাজনৈতিক মতবাদ নিয়ে হাজির হয়নি, বরং হাজির হয়েছে নিরেট সাম্রাজ্যবাদী সামরিক আগ্রাসন নিয়ে। চাপিয়েছে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের নৃশংসতা। তাছাড়া সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সাথে রয়েছে কাশ্মীরীদের সাথে ভারতের অতীত প্রতারণার ইতহিাস। আছে আসমুদ্র-হিমাচল জুড়ে হিন্দু সাম্রাজ্য নির্মাণের স্বপ্ন। আছে মুসলিম বিরোধী প্রচন্ড সাম্প্রদায়িকতা। ফলে হিন্দু-সাম্রাজ্য নির্মাণে এ যুদ্ধটি ভারতীয় সৈন্যদের একাই লড়তে হচ্ছে। এবং সৈন্যদের প্রায় সবাই হিন্দু। অপর দিকে কাশ্মীরী মুজাহিদদের সাথে সমগ্র বিশ্বের বিশ্বের মুসলিম বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষদের সহমর্মিতা।

কাশ্মীরীদের স্বাধীনতার লড়াইটি দীর্ঘদিনের। শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে, যখন কাশ্মীরের হিন্দুরাজা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম প্রজাদের মতামতের তোয়াক্কা না করে ভারতে যোগ দিয়েছিল। কাশ্মীরী মুসলিমদের এ নায্য লড়াইকে ভারতীয় শাসক মহল সন্ত্রাস বললেও কাশ্মীরা তা বলে না। আগে লড়াইটি ছিল কাশ্মীরী জাতীয়তাবাদী লড়াই। কিন্তু এখন সেটি শতভাগ পবিত্র জিহাদ। এখানেই কাশ্মীরীদের লড়াইয়ের শক্তি। ভারতের জন্য বিপদ হলো, জিহাদ কোথাও একবার শুরু হলে তা আর থামে না। দিন দিন তা বরং শক্তিশালী হয়্। ভারতের কাশ্মীরে সেটিই হচ্ছে। সে জিহাদের মোকাবেলায় কাশ্মীরে ভারত ৬ লাখ সৈন্য মোতায়েন করেছে। শ্রীনগরসহ শহরগুলোর প্রতিটি শহরের প্রতিটি মহল্লায় এবং প্রতি রাস্তায় সারিবদ্ধ ভাবে ২৪ ঘন্টার জন্য অবস্থান নিয়েছে ভারতীয় সৈন্যরা। ভারত এরূপ বিশাল সংখ্যক সৈন্য ১৯৬৫ সালে ও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নিয়োজিত করেনি। অথচ এ বিশাল সৈন্য নিয়োগের পরও বিজয় মিলছে না। কতকাল এ যুদ্ধ চলবে সেটিও কেউ বলতে পারছে না। তাছাড়া যুদ্ধের মেয়াদ যতই বাড়ে, তাতে বাড়ে বিজয়ের বদলে পরাজয়ের সম্ভাবনা।

তাছাড়া প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো কাশ্মীরের পরিস্থিতইতে আরো জটিল করেছে। ভারতের সংবিধানে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ছিল, মোদি সরকার সেটিকে রহিত করেছে। ভারতের অন্য রাষ্ট্রের বাসিন্দাদের জন্য কাশ্মীরে ভূমি ক্রয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। মোদি সরকার সেটিও তুলে দিয়েছে। এ ছাড়া হিন্দু অধ্যুষিত জম্মু, মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর এবং বৌদ্ধ অধ্যুষিত লাদাখ – এ তিন অঞ্চলে কাশ্মীরকে বিভক্ত করেছে্‌। এছাড়া নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে গভর্নর শাসন জারি করেছে। তবে এতে লাভবান হয়েছে স্বাধীনতাকামীগণ।      

কাশ্মীরে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। অর্থাৎ ঢাকা শহরের জনসংখ্যার অর্ধেকের কিছু বেশী। অথচ তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ভারত সরকার ৬ লাখের বেশী সৈন্য মোতায়েন করেছে। ১৯৭১’য়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনা বাহিনী যে সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করেছিল -এ সৈন্যসংখ্যা তার চেয়ে ১৩ গুণের অধিক। জেনারেল নেয়াজীর মতে ১৯৭১’য়ে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানী সৈন্যদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৫ হাজার। (সূত্র: The Betrayal of East Pakistan; General A.K. Niazi)। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ১৯৭১’য়ে ছিল সাড়ে সাত কোটি – কাশ্মীরের আজকের মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ১০ গুণ। ভারতীয় সেনাবাহিনী এ অবধি এক লাখেরও বেশী মানুষকে হত্যা করেছে। তাদের হাতে বহু হাজার নারী ধর্ষিতাও হয়েছে। বহু হাজার মানুষকে তারা কারারুদ্ধ বা পঙ্গু করছে। কিন্তু তারপরও কাশ্মীরীদের স্বাধীনতার লড়াই থামা দূরে থাক -তা বরং দিন দিন প্রচন্ডতর হচ্ছে। জ্বলন্ত আগুণে লাগাতর পেট্রোল ঢাললে যা হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী পেট্রেোল ঢালার সে কাজটি করছে লাগাতর হত্যা, ধর্ষণ, জেল-জুলুম ও গৃহে অগ্নসংযোগের মাধ্যমে।

আগুণে লাগাতর পেট্রোল ঢালার কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। কিছু কাল আগে ভারতীয় সেনাবাহিনী ৯ বছরের এক বালক এবং ১৫ জন তরুণকে অতি নৃশংস ভাবে হত্যা করে। এতে সমগ্র কাশ্মীর জুড়ে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আগুণ। শ্রীনগর, বারামুল্লাহ, শোপর ও অন্যান্য নগরে হাজার হাজার তরুন ফিলিস্তিনী ইন্তেফাদার অনুকরণে ঢিল-পাথর নিয়ে ভারতীয় সৈন্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কাশ্মীরীদের এরূপ ইন্তেফাদা তথা গণজাগরণ ঠেকাতে ভারতীয় বাহিনী কাশ্মীরের প্রতিটি শহর ও গ্রামকে রণাঙ্গণে পরিণত করেছে। দেশ রণাঙ্গণ পরিণিত হলে নিজ বাহিনীর সৈনিক ছাড়া সবাইকে শত্রু মনে হয়। ভারতীয় বাহিনীর কাছে তাই হত্যাযোগ্য শত্রু মনে হচ্ছে রাজপথের নিরস্ত্র কাশ্মীরী  যুবকেরা। ফলে কাশ্মীরে নিরপরাধ মানব হত্যা অতি মামূলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাউকে হত্যা করার জন্য সন্ত্রাসী রূপে অভিযোগ আনাটাই যেন যথেষ্ট। কোনরূপ তদন্ত ভারতীয় সৈন্যদের কাছে অনর্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

জিহাদই একমাত্র পথ

কাশ্মীর সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথটি ভারত নিজেই বন্ধ করে দিয়েছে। কাশ্মীরীদের সামনে এখন যে পথটি খোলা রয়েছে সেটি হলো জিহাদের। শান্তিপুর্ণ সমাধান তো তখনই সম্ভব হয় যখন সামরিক আগ্রাসনের বদলে জনগণের মতামত গুরত্ব পায়। ভারতের কাছে কাশ্মীরী জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার গুরুত্ব নাই। তাদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে একমাত্র অখন্ড ভারত নির্মাণের প্রকল্প। হিন্দুত্ববাদী বিজিপী ক্ষমতায় আসাতে সে অভিলাষ আরো তীব্রতর হয়েছে। শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিল জাতিসংঘ; এবং সেটি ১৯৪৮ সালে। সে সময়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে কাশ্মীরে গণভোটের পক্ষে প্রস্তাব গৃহিত হয়েছিল। তাতে জনগণের অধিকার স্বীকৃতি পেয়েছিল। তারা পাকিস্তানে যোগ দিবে, না ভারতে থাকবে, না স্বাধীন থাকবে –সে সিদ্ধান্ত তারা নিজে নিবে। পাকিস্তান এবং ভারত –উভয়ই সে প্রস্তাব মেনে নেয়। জাতিসংঘের ইতিহাসে এই প্রথমবার সর্বসম্মতিতে গৃহিত জাতিসংয়ের একটি প্রস্তাবকে বিবাদমান দুই পক্ষই মেনে নেয়। মার্কিন এ্যাডমিরাল নিমিটজের উপর দায়িত্ব দেয়া হয় কাশ্মীরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের।

কিন্তু ভারত সরকার সে গণভোটে পরাজয়ের গন্ধ পেয়ে তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু ভেবেছিলেন তাঁর কাশ্মীরী বন্ধু শেখ আব্দুল্লাহ গণভোটে ভারতকে বিজয়ী করতে সহায়তা দিবেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই ভারতীয়দের আসল মতলব নিয়ে কাশ্মীরী নেতা শেখ আব্দুল্লাহর মোহভঙ্গ হয়। ভারত সরকারও তাঁর উপর আস্থা রাখতে পারিনি। গণভোটে পরাজয় নিশ্চিত জেনে জাতিসংঘ প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে ভারত সরকার লাগাতর বলা শুরু করে, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য্ অঙ্গ। এবং বলতে শুরু করে কাশ্মীর নিয়ে আর কোন আলোচনার প্রশ্ন উঠে না। বরং উস্কানীমূলক ভাবে একথাও বলে, আলোচনায় যদি বসতেই হয় তবে সেটি হবে কাশ্মীরের পাকিস্তানভূক্ত অংশকে কীভাবে ভারতের সাথে যুক্ত করা যায় তা নিয়ে। এ হলো কাশ্মীর সমস্যার সমাধান নিয়ে জাতিসংঘ প্রস্তাবনার সাথে ভারতের বিশ্বাসঘাতকতা।

প্রশ্ন হলো, ভারতীয়দের কাছে শান্তিপুর্ণ সমাধানের অর্থ যদি কাশ্মীরের ভারতভুক্তি হয় -তবে শত বছর আলোচনা চালিয়েও কোন লাভ হবে কী? ভারত সরকারের কথা, “আলোচনা চাই তবে কাশ্মীর যে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ -তা নিয়ে আলোচনার কোন সুযোগ নাই।” ভারতে এরূপ মনভাবের কারণে শুধু পাকিস্তান সরকারই নয়, কাশ্মীরীরাও ভারতের সাথে আলোচনায় আগ্রহ হারিয়েছে। আগ্রহ হারিয়েছে মধ্যস্থতাকারি প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘও। এমনই এক পক্ষাপটে জনগণ বুঝতে পেরেছে জিহাদ ছাড়া স্বাধীনতার রাস্তা নাই।

 

অবনতি ভারত-পাকিস্তান সর্ম্পকে

ইতিমধ্যে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সর্ম্পকেও মারাত্মক অবনতি ঘটছে। পাকিস্তানের বালাকটে বিমান হামলা করে ভারত অবস্থাকে আরো উত্তপ্ত করেছে। পঞ্চাশের দশকে  ভারত পানিচুক্তি করেছিল পাকিস্তানের সাথে। সে চুক্তিতে বিপুল ভাবে লাভবান হয়েছিল ভারত। সে সময় পাকিস্তানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সংকট ছিল প্রকট। পাকিস্তানকে চলতে হতো বিশ্বব্যাংকের কৃপার উপর। বিশ্বব্যাংকের চাপেই পাকিস্তান সে সময় অসম পানচুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এরপরও ভারত সে চুক্তি মানছে না। চুক্তি ভঙ্গ করে পানি তুলে নিচ্ছে সেসব নদী থেকে যে নদীগুলোর পানি পাকিস্তানের পাওনা। পাকিস্তানের সবগুলো নদী এসেছে কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে। ভারত শুরু করেছে সে গুলোর উপর বাঁধ-নির্মাণ। ফলে রাজনৈতিক বিবাদ এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বিপদ এখন তুঙ্গে। পাকিস্তান কাশ্মীর নিয়ে ৭০ বছর অপেক্ষা করেছে। কিন্তু এখন যদি পানি বিবাদে ৫ বছরও অপক্ষো করে তবে পাকিস্তানের বিরাট অংশ মরুভূমতি পরিণত হবে। তাই কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ না হলেও পানি নিয়েও যুদ্ধ অনিবার্য হতে চলেছে।

অপর দিকে কাশ্মীরের লড়াই এখন আর কোন সেক্যুলার যুদ্ধ নয়। রূপ নিয়েছে শতভাগ বিশুদ্ধ জিহাদে। রাজনীতি বহুলাংশই হাতছাড়া হয়ে গেছে কাশ্মীরের ও পাকিস্তানের সেক্যুলার নেতাদের হাত থেকে। হাতছাড়া হয়ে গেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাত থেকেও। অতীতে তিনটি যুদ্ধ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যা অর্জন করেছিল, মোজাহিদগণ চলমান জিহাদে তার চেয়ে বেশী অর্জন করেছে। ফলে বিপদ বেড়েছে ভারতের। আলাপ-আলোচনায় বসতে চাইলেও তারা পার্টনার পাচ্ছে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, আলাপ-আলোচনা লাগাতর চললওে তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। শত চুক্তি হলেও তাতে জিহাদ যে থামবে -সে সম্ভবনাও কম।

 

ভারতের অপ্রতিরোধ্য পরাজয়

ভারতের বিপদ দিন দিন বাড়ছে। ভারতের জন্য আসন্ন বিপদের কারণ, আফগানিস্তানে মার্কিনীদের পরাজিত দশা। আফগানিস্তানের যুদ্ধটিই হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘকালীন যুদ্ধ। তবে ২০ বছর যাবত চলা এ যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোন সফলতা পায়নি। মার্কিনী বাহিনী এখন পলায়নের রাস্তা খুঁজছে। পলায়নের পর্বটি নিরাপদ করতে দারুণ ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে পাকিস্তানের উপর। নইলে সৈন্য ও  রশদ-সামগ্রী নিরাপদে ফেরত নেওয়াই কঠিন হবে। কারণ, ঘরে ফেরার পথে লোটাকম্বল সাথে নিয়ে য্দ্ধু লড়া যায় না। তাই এ মুর্হুতে পাকিস্তানের উপর বেশী চাপ প্রয়োগের সুযোগ মার্কিনীদের হাতে নাই। তাই এতো দিন কাশ্মীরে পাকিস্তানীদের পরিচালিত জিহাদ থামাও বল মার্কিনীদের উপর ভারত সরকার যেরূপ চাপ দিত -সে সুযোগ এখন নাই। তাছাড়া আফগানিস্তান যখন সোভিয়েত রাশিয়ার দখলে ছিল তখন আনন্দে ভারত ডুগডুগি বাজিয়েছিল। সে খবর মার্কিনীরাও যেমন জানে, তেমনি তালবানগণও জানে। তালেবানগণ তাই প্রচন্ড ভারত বরিোধী। এবং অচিরেই আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতায় তারাই আসছে। এখানেই ভারতের জন্য বিপদ। ভারত থেকে তারা প্রতিশোধ নিবে -সেটাইি স্বাভাবিক। অপর দিকে কাশ্মীরের মুজাহিদগণ পাবে তাদের ঘনিষ্ট মিত্র। তাছাড়া জিহাদ কখনোই কোন ভৌগলিক সীমান্তে সীমিত থাকে না। ফলে আফগানিস্তানের জিহাদ যে নিজ ভূমিতে সীমিত না থেকে যে কাশ্মীরেও প্রবেশ করবে -সেটিই স্বাভাবিক। ভারতের হৃৎপিন্ডে এজন্য কম্পন শুরু হয়েছে।

অপরদিকে সোভিয়েত দখলদারীর সময় ভারতীয় চরগণ আফগানিস্তানে রুশদের ছত্রছায়ায় বসে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উস্কানী দিয়েছিল। কারণ, ভারতের পাকিস্তান ভাঙ্গার প্রকল্প ১৯৭১’য়ে শেষ হয়নি। ভারত চায়, অবিশিষ্ট পাকিস্তানও খন্ডিত হোক।  কিন্তু তালেবানদের হাতে ক্ষমতা যাওয়ায় তল্পিতল্পা সমেত ভারতীয় চরগণ কাবুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। তালেবানদের পরাজয় এবং মার্কিনীদের দখলদারীর প্রতিষ্ঠার পর ভারত সরকার আবার সেই একই ষড়যন্ত্র শুরু করে। বেলুচিস্তানের বিচ্ছন্নবাদীরা আবার পেতে শুরু করে ভারত থেকে প্রচুর অর্থ ও অস্ত্র। ফলে পাকিস্তাানের নানা শহরে শুরু হয় বোমা বি্স্ফোরণ।

তাই ভারতের সাথে পাকিস্তানের বিরোধ শুধু কাশ্মীর নিয়ে নয়। আরো বহু বিষয় নিয়ে। তবে রাজনীতির হাওয়া এখন ভারতের বিরুদ্ধে। ভারত এখন প্রবলতর এক জিহাদের মুখোমুখী। বিগত ২০ বছরেও যে জিহাদকে ভারতীয় সেনা বাহিনী পরাজিত করতে পারিনি, আগামী ২০ বছরে যে পারবে -সে সম্ভবনা ক্ষীণ। ভারতের জন্য মাওবাদী নকশালদের পরাজিত করা সহজ। কিন্তু অসম্ভব হলো জিহাদকে পরাজিত করা। কারণ, জিহাদে পক্ষ শুধু দুটি নয়, বরং এখানে থাকে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ। ফলে জিহাদের ময়দানে হাজির হন তাঁর ফেরেশতাগণ। তাই জিহাদ শতভাগ বিশুদ্ধ হলে তার পরাজয় নাই। সেক্যুলার সেনাবাহিনীর যুদ্ধ থেকে জিহাদের এখানেই মূল পার্থক্য। অতীতে সোভিয়েত রাশিয়া তাই আফগানিস্তানে জিততে পারিনি। পারছে না মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও তার মিত্রগণ। ফ্রান্স জিততে পারিনি আলজিরিয়াতে। ভারতের রাজনীতিকগণ সেটি টের না পেলেও দেশটির সেনাবাহিনী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

 

বিরামহীন রক্তক্ষরণের মুখে ভারত

তাছাড়া প্রতিটি যুদ্ধের খরচই অতি বিশাল। যুদ্ধে শুধু সৈনিকদেরই রক্তক্ষরণ ঘটায় না, গভীর রক্তক্ষরণ ঘটায় অর্থনীতিতে। তাই যারা উন্নয়ন চায় তারা যুদ্ধকে পরিহার করে। তাছাড়া ভারতের অর্থনীতিতে এখন দারুন মন্দা। অর্থনৈতিক উৎপাদন এখন শূণ্যের কোঠায়। এরপর কোভিড ১৯’য়ের কারণে দারুন মহামারি লেগেছে অর্থনীতিতে। তাছাড়া ভারত হচ্ছে social exclusion’য়ের দেশ। যে দেশ উন্নতি চায় সে দেশটি চায়, দেশের প্রতিটি মানুষ উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় শামিল হোক। তারা নেয় social inclusion’য়ের পলিসি। বাগানের সবগুলো গাছ ফল দিলে্ই তো উৎপাদন বাড়ে। কিন্তু উগ্র মুসলিমবিদ্বেষ ও বর্ণবিদ্বেষের কারণে ভারতে সেরূপ জনকল্যাণমূলক মহৎ নীতির কোন স্থান নাই। ফলে ২০ কোটি মুসলিম এবং ২০ কোটি দলিত –এ ৪০ কোটি মানুষকে উন্নয়নের প্রক্রিয়ার ধারে কাছে আসতে না দেয়াই ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের নীতি। বিজেপির ক্ষমতায় আসাতে সে নীতি আরো তীব্রতর হয়েছে্। একারণেই ভারতের ১৩০ কোটি মানুষের অর্থনীতি ১৩ কোটি মানুষের জাপানের চেয়েও ক্ষুদ্রতর।

একজন সৈনিককে রণাঙ্গণে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি  বছর খরচ হয় এ মিলিয়ন তথা ১০ লাখ ডলার। এটা ঠিক, একজন ভারতীয় সৈন্যকে রণাঙ্গণে রাখতে ১০ লাখ ডলার খরচ হয় না। কারণ, মার্কিন সৈনিক জীবনযাত্রার যে মান, সে মান ভারতীয় সৈনিকদের নাই। কিন্তু সে খরচ কি গড়ে মার্কিনীদের চেয়ে ২০ গুণ কম অর্থাৎ আধা লাখ ডলারও হবে না? এবং বছরে মাথা পিছু খরচ আধা লাখ ডলার হলে তাতে ৬ লাখ সৈন্যকে শুধু রণাঙ্গণে রাখতেই খরচ হবে ৩০ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া আছে অস্ত্রের খরচ। ফলে ২০ বছরে খরচ হবে ৬০০ বিলিয়ন ডলার। ফলে পাকিস্তানের জন্য এটি এক মহা সুযোগ। তাদের চিরশত্রু এখন ফাঁদে পড়েছে। ফলে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে যুদ্ধ শুরু করার কোন প্রয়োজনই নাই। ভারতীয় সেনা বাহিনী রণাঙ্গণে এরূপ বিশ বা তিরিশ বছর ফেঁসে থাকলেই তো তাদের লাভ।

দেহ যত বিশালই হোক, লাগাতর রক্তক্ষরণ হলে হাতিও নির্জিব হয়ে মাটিতে ঢলে পড়ে। ভারত কোন অর্থনৈতিক হাতি নয়, বরং দুনিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠির বসবাস হলো ভারতে। তাছাড়া দেশটিতে চলছে গভীর অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ। কাশ্মীবের যুদ্ধ সে রক্তক্ষরণ তারা তীব্রতর করছে্। অনুরূপ রক্তক্ষরণের কারণেই সোভিয়েত রাশিয়ার ভেঙ্গে ১৫টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। ভারত কি সেদিকেই এগোচ্ছে না? ফলে কাশ্মীরী জনগণ নয়, বরং শিখ, মেজো, নাগা, মনিপুরীসহ আরো বহু মজলুম জনগণই যে ভারতের জিন্দান ভেঙ্গে স্বাধীন হবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? ২৫/০১/২০২১।

 

 




বিবিধ ভাবনা (১৭)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১.
মুসলিমদের পতনের শুরু তখন থেকেই যখন প্রাসাদতূল্য মসজিদ গড়া গুরুত্ব পেয়েছে এবং গুরুত্ব হারিয়েছে রাষ্ট্রকে দুর্বৃত্তদের দখল থেকে মুক্ত করা। ফলে মসজিদের সংখ্যা বাড়লেও মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে প্রকৃত মুসলিম হতে। এতে মুসলিম দেশগুলো অধিকৃত হয়ে গেছে শয়তানী শক্তি হাতে। এবং রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে শয়তানের হাতিয়ারে এবং দুর্বৃত্ত উৎপাদনের কারখানায়। এতে পরাজিত হয়েছে এবং বিলুপ্ত হয়েছে নবীজী (সা:)’র ইসলাম –যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, জিহাদ, শুরা, ঐক্য এবং প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব ।

ইবাদত রূপে গুরুত্ব পেয়েছে মসজিদে গিয়ে নামায আদায়। কিন্তু মসজিদ যেমন ইবাদতের একমাত্র স্থান নয়, তেমনি শ্রেষ্ঠতম স্থানও নয়। শ্রেষ্ঠতম ইবাদত হলো জিহাদ। সেটি হয় সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে। এই জিহাদই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র পাল্টায়। একমাত্র জিহাদই পারে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গণে শয়তানের বাহিনী ও শয়তানের এজেন্ডাকে পরাজিত করতে । একমাত্র তখনই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হয়, শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পায় এবং মুসলিমগণ পায় শক্তি ও ইজ্জত নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ।   

২.
অমুসলিমগণ দেশ গড়া নিয়ে উৎসব করে। অথচ মুসলিমগণ উৎসব করে দেশ ভাংঙ্গা নিয়ে। অমুসলিমগণ ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, অখন্ড ভারত গড়েছে। অথচ মুসলিমগণ অখণ্ড আরব ভূমিকে ২২ টুকরোয় বিভক্ত করেছে। পাকিস্তানকেও ভেঁঙ্গেছে।

অথচ মহান আল্লাহতায়ালা গড়াকে পছন্দ করেন, ভাংঙ্গাকে নয়। এবং শয়তান পছন্দ করে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি। মুসলিমগণ তাদের নিজ ভূমিতে বিজয়ী করছে শয়তানের এজেন্ডাকে। মহান আল্লাহতায়ালার সাথে এর চেয়ে বড় গাদ্দারি আর কি হতে পারে? এ গাদ্দারির অপরাধ নিয়ে কি পরকালে জান্নাত মিলবে?

৩.
দেশের সকল দুর্বৃত্তদের অপরাধের যে সামর্থ্য তার চেয়ে বহুগুণ বেশী সামর্থ্য হলো দুর্বৃত্ত সরকারের। দেশের পুলিশ বাহিনী, প্রশাসনিক বাহিনী, আদালত-বাহিনী, সেনাবাহিনী তখন চুরি-ডাকাতি, গুম, খুন, সন্ত্রাস ইত্যাদি দুর্বৃত্ত কর্মের হাতিয়ারে পরিণত হয়। দেশের সকল চোর-ডাকাতগণ সব ঘরে ডাকাতি করার সামর্থ্য রাখে না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনী পারে। তখন দেশ জুড়ে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, ব্যাংক-ডাকাতি ও শেয়ার মার্কেট লুট মামূলী ব্যাপার হয়ে যায়। তাই দুর্বৃত্তদের হাতে দেশ অধিকৃত হলে সমগ্র দেশ দ্রুত সভ্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়। তাই সেরা নেক কর্মটি হলো দুর্বৃত্ত শাসক নির্মূল। ইসলামে এ কাজের রয়েছে জিহাদের মর্যাদা।

৪.
৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের কোথাও মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি আইনকে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। অথচ প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ হলো আদালতে শরিয়তের পালন। অথচ এক্ষেত্রেই মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এতে অপমান ও অবমাননা হয় মহান আল্লাহতায়ালার। এভাবে বিজয়ী ও সন্মানিত করা হয় শয়তানকে। অথচ শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করা নিয়েই মুসলিম দেশগুলোর রাজনীতি। শয়তানের এ বিজয় এবং শরিয়তের এ পরাজয নিয়ে হৃদয়ে গভীর বেদনা না থাকাটিই বেঈমানীর লক্ষণ।

৫.
নানা ভাষা ও নানা অঞ্চলের হিন্দুরা একতাবদ্ধ হয়ে বিশাল ভারতের জন্ম দিয়েছে। ফলে ভারত একটি শক্তি।
আর মুসলিমগণ ভাষার নামে ও অঞ্চলের নামে বিভক্ত হয়ে দুর্বল হয়েছে। মুসলিমদের এরূপ শক্তিহীনতায় একমাত্র শয়তানই খুশি হয়। অথচ মুসলিমগণ সে মুসলিম ভূগোলের এ বিভক্তি নিয়ে উৎসব করে -যেমন ১৬ ডিসেম্বরে বাংলাদেশে হয়।
৬.
রোগ-ভোগ, প্রাণহানি, অঙ্গহানি ও সম্পদ হানির ন্যায় কোন বিপদ যখন ব্যক্তির মনে মহান আল্লাহতায়ালার ভয় সৃষ্টি করে এবং তাঁর কাছে নিয়ে যায় –তবে সেটি বিপদ নয়। সেটি বরং নেয়ামত। কিন্তু সম্পদ, সন্তান, সুস্বাস্থ্যের ন্যায় নেয়ামতগুলো যদি মন থেকে মহান আল্লাহতায়ালার ভয় বিলুপ্ত করে এবং তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে নেয় -তবে সেটি আযাব।
৭.
ঈমানদারের পরিচয়টি হলো সে তাঁর সকল সামর্থ্যকে ব্যয় করে নিজেকে জান্নাতের যোগ্য রূপে গড়ে তোলায়। ফলে ঈমানদারের জীবনে আসে বেশী বেশী নেক আমলের লাগাতর পেরেশানী ও তাড়াহুড়া। ফলে তাকে বাজে আড্ডায় দেখা যায় না। বরং দেখা যায় ধ্যানমগ্নতায়, কোর’আনের জ্ঞানার্জনে এবং জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতে।

অপর দিকে বেঈমানের পরিচয় হলো সে তার সকল সামর্থ্য ব্যয় করে দুনিয়ার জীবনে আনন্দ বাড়াতে। উপার্জন বাড়াতে অপরাধ কর্মে নামে। তাকে দেখা যায় নাচগান, খেলাধুলা ও আমোদ-ফুর্তির আসরে। আগ্রহ থাকে না কোর’আনের জ্ঞানার্জনে।এবং জিহাদের নাম শুনলে তার হৃদয়ে কাঁপুনি ধরে।  
৮.
চরিত্র গড়ে আখেরাতের ভয়।এবং আখেরাতের ভয় গড়ে কোর’আনের জ্ঞান। তাই কোর’আনের জ্ঞান অর্জন অর্থাৎ কোর’আন বুঝা নামায-রোযার আগে ফরজ করা হয়েছে। জনগণের মনে আখেরাতের ভয় বাড়লে দুর্বৃত্তি দমনে পুলিশ লাগে না। তখন ব্যক্তি নিজেই নিজের বিরুদ্ধে পুলিশে পরিণত হয়।

নাচ, গান, সিনেমা, বাজে আড্ডা, খেলাধুলার সংস্কৃতি ভুলিয়ে দেয় আখেরাতের ভয়। বিনোদন ও সংস্কৃতির নামে মানবের মন থেকে পরকালের ভয় বিলুপ্ত করাই শয়তানের এজেন্ডা। শয়তান এভাবেই ব্যক্তিকে জাহান্নামের যোগ্য করে গড়ে তোলে। আখেরাতের ভয় বিলুপ্ত হলে সমাজে নানারূপ অপরাধ কর্মের সুনামী আসে। তখন পুলিশ অপরাধ দমন না করে নিজেরাই অপরাধ কর্মে লিপ্ত হয়। উদাহরণ হলো বাংলাদেশ।   




অতীতের ব্যর্থতা এবং বাংলাদেশের আজকের বিপর্যয়

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 আজকের বিপর্যয়

বাংলাদেশের আজকের বিপর্যয়টি যেমন গভীর, তেমনি ভয়ানক। দেশটিতে অসম্ভব হয়েছে সভ্য জীবন-যাপন। নৃশংস ফ্যাসিবাদ বলতে যা বুঝায় -প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তারই টেক্সটবুক ভার্শন। ক্ষমতাসীন দলের নাশকতায় মারা পড়েছে সংসদীয় গণতন্ত্র, কেড়ে নেয়া হয়েছে মৌলিক মানবাধিকার, কোমড় ভাঙ্গা হয়েছে বিরোধী দলগুলোর, বিলুপ্ত হয়েছে নিরপেক্ষ নির্বাচন, দলীয়করণের শিকার হয়েছে আদালত এবং প্লাবন এসেছে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের। তারা দখলে নিয়েছে রাজনীতিই শুধু নয়, দেশের বিচার ব্যবস্থা, মিডিয়া, প্রশাসন, পুলিশ -এমনকি সেনাবাহিনী তাদের আজ্ঞাবহ সেবাদাসে পরিণত হয়েছে। সরকারের যা ইচ্ছা তাই করার আজাদী রয়েছে। কিন্তু জনগণের অধিকার নাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে মিটিং, মিছিল ও প্রতিবাদের। দুর্বৃত্তদের হাতে শত শত কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। সেটিও যেন মামূলী বিষয়; প্রতিকার নাই।

রাজনীতির ময়দানে নিরংকুশ বিজয়টি ভারতসেবী সেক্যুলারিস্টদের। তাদের কারণে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ভারতীয় এজেন্ডা। বাংলাদেশ থেকে ভারতের চাওয়ার তালিকাটি বিশাল। ভারত চায়, নবীজী (সা:)’র ইসলাম –যাতে আছে ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়তের প্রয়োগ, জিহাদ, বিশ্বমুসলিম ভাতৃ্ত্ব, শুরা ভিত্তিক শাসন এবং একতা, তা পুরাপুরি বাংলাদেশের বিলুপ্ত হোক মুসলিম জনগণের চেতনা থেকে। ভারতের কাছে নবীজী (সা:)’র  ইসলাম হলো মৌলবাদ এবং জিহাদ হলো সন্ত্রাস। ভারতের দাবী, বাংলাদেশের মুসলিমদের সরতে হবে ইসলাম থেকে। ইসলামের পক্ষ নেয়াটাই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশের ভারতেসেবী পক্ষটিও অবিকল সেটিই বলে। ভারত চায়, বাংলাদেশের মানুষ বাঁচুক মুর্তিনির্মাণ ও মুর্তির সামনে ভক্তি জানানোর হিন্দু সংস্কৃতি নিয়ে। ভারতের সে সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা দিতেই রাস্তাঘাট পূর্ণ হচ্ছে মুর্তিতে –৮ শত বছরের মুসলিম ইতিহাসে কখনোই সেটি হয়নি। এমনকি হিন্দু শাসন আমলেও এতো মুর্তি গড়া হয়নি -যা আজ হচচ্ছে।

ভারত চায়, ভারতে মুসলিমগণ খুন, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হলে বা সেদেশে মসজিদ ধ্বংস করা হলে বাংলাদেশ সরকারের কাজ হলো তা নিয়ে নীরব থাকা। এবং জনগণকে রাস্তায় ভারতবিরোধী প্রতিবাদ থেকে প্রতিহত করা। এবং ভারত চায়, বাংলাদেশের বানিজ্যিক বাজার ও শ্রম বাজার সম্পূর্ণ উম্মুক্ত হোক ভারতীয়দের জন্য। লক্ষণীয় হলো, ভারত যা কিছু চায় তা সবই দিয়েছে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকার। ভারতকে অকাতরে দেয়া নিয়ে হাসিনার প্রচুর গর্বও। অতীতে একই ভাবে শেখ মুজিবও দিয়েছিল। কিন্তু ভারত থেকে পাওয়ার অংকটি ফাঁকা। পদ্মার নায্য পানি যেমন মিলছে না, মিলছে না তিস্তার পানিও।

 

অতীতের ব্যর্থতা

অতীতের ব্যর্থতাগুলো পরবর্তীতে ভয়ানক বিপর্যের কারণ হয়। এবং আজকের ব্যর্থতাগুলো বিপর্যয় সৃষ্টি করবে ভবিষ্যতে। প্রশ্ন হলো, কি সে অতীতের ব্যর্থতা? এবং আজকের ব্যর্থতাগুলোই কি? বাংলাদেশের কল্যাণ নিয়ে যারা ভাবে তা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়্ বাংলাদেশে আজ যে বিপর্যয় তার শিকড় রোপন করা হয়েছিল দেশটির জন্মের বহু আগেই। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোথায় সে ব্যর্থতা এবং কারা সে ব্যর্থতার নায়ক সেগুলো  চিহ্নত করা। নইলে আজকের ব্যর্থতার কারণগুলো যেমন জানা  যাবে না, তেমনি ভবিষ্যতের বিপর্যয় থেকেও মুক্তি মিলবে না।

বাংলাদেশের বর্তমান ব্যর্থতাগুলোর শিকড় বপন করা হয়েছে ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে। ঘটেছে ব্রিটিশ শাসনামলেও। সে ব্যর্থতার কারণ যেমন অপরাধী চক্রের রাজনীতি, তেমনি বুদ্ধিজীবী চক্রের ভয়ানক বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তি। সে সাথে যোগ হয়েছে প্রতিবেশী ভারতের আগ্রাসী ষড়যন্ত্র। তারা যৌথ ভাবে ব্যর্থ করে দেয় উপমহাদেশের মুসলিমদের বিশাল রক্ত ব্যয়ে অর্জিত পাকিস্তান প্রজেক্ট। দেশটির ধ্বংসের মধ্যে তারা নিজেদের স্বার্থ পূরণের রাস্তা খুঁজেছে। তবে তাদের ধ্বংস প্রক্রিয়া ১৯৭১’য়ে থেমে যায়নি, বরং সে অভিন্ন অপরাধীদের হাতেই জিম্মি হলো আজকের বাংলাদেশ।

ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর হাতে বঙ্গ বিজয়ের পর বাঙালী মুসলিমদের সমগ্র ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্ব ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। সে সময় পাকিস্তান ছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। এবং সে রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ জনগোষ্টি ছিল বাঙালী মুসলিম। এবং সে পাকিস্তান আজ পারমানবিক অস্ত্রধারী একমাত্র মুসলিম দেশ। ফলে বাঙালী মুসলিমগণ সুযোগ পেয়েছিল শুধু মুসলিম বিশ্বের নয়, সমগ্র বিশ্ব রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার। হতে পারতো দক্ষিণ এশিয়ার বুকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রধান কর্ণধার। কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের সে সুবর্ণ সুযোগ বাঙালী কাপালিকদে ভাল লাগেনি। ফলে সে সুযোগটি বিনষ্ট করতে তারা উঠে পড়ে লাগে।

প্রতিবেশীর গোলাম হওয়ার নেশা যখন চাপে তখন স্বাধীন থাকাটাই অসহ্য হয়ে উঠে। এদের কাছে তাই অসহ্য হয়ে পড়ে পাকিস্তানের বৃহৎ ভূগোল। এবং সে ভূগোল ভাঙ্গার কাছে ভারতের ন্যায় কুচক্রি ও সুযোগ-সন্ধানী পার্টনারও পেয়ে যায়। ভারত পাকিস্তান ভাঙ্গার সে কাজটি নিজ খরচে ১৯৪৭ সালে করে দিতে দুই পাড়ে খাড়া ছিল। তাদের প্রয়োজন ছিল শেখ মুজিবের ন্যায় একজন আজ্ঞাবহ সেবাদাসের। সে সুযোগটি আসে ১৯৭১’য়ে। ফলে মুক্তি বাহিনীকে একটি জেলা বা একটি মহকুমাও স্বাধীন করতে হয়নি। ভারতীয় সেনাবাহিনী সে কাজটি নিজ দায়িত্বে ও নিজ খরচে করে দিয়েছে। একাজের জন্য ভারতের পদসেবা, অর্থসেবা ও ভারতের এজেন্ডার প্রতিষ্ঠা দিয়ে বাঁচাই এখন বাঙালী কাপালিকদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি। ভারতের প্রতি চির কৃতজ্ঞ হয়ে বাঁচাটাই তাদের কাছে গর্বের। 

 

পাকিস্তান আমলের বড় ব্যর্থতাটি

পাকিস্তান আমলের বড় ব্যর্থতাটি অর্থনৈতিক ছিল না। প্রশাসনিকও নয়। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার ছিল ভারতের চেয়েও অধিক। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রশাসকগণ আসতো পাকিস্তান থেকে উন্নয়নের মডেল শিখতে্। সে সময় বহু বিশ্ববিদ্যালয়, বহু মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ, ডিগ্রী কলেজ, ক্যাডেট কলেজ, স্কুল, ক্যান্টনমেন্ট ও কলকারাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্ত ২৩ বছরে একখানি বইও এ নিয়ে লেখা হয়নি যে কেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা হলো। ভারত তো ১৯৪৭ সালের আগে অখণ্ডই ছিল। কিন্তু কেন ভাঙ্গার প্রয়োজন দেখা দিল? পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে এ প্রশ্নটির জবাব দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের ছাত্ররা দেশ-বিদেশের কত জীবজন্তু, লতা-পাতা, কবিতা-পুঁথির উপর গবেষণা করে। পিএইচডি ডিগ্রিও নেয়। কিন্তু অখণ্ড ভারত ভেঙ্গে কেন পাকিস্তান সৃষ্টি হলো -তা নিয়ে কোন গবেষণা করা হয়নি। তেমন কোন বইও লেখা হয়নি। আজ যে অখণ্ড ভারতের কথা বলা হচেছ এবং যেভাবে বাঙালী মুসলিমের মনে বাড়ছে অখণ্ড ভারতের মোহ, সেটি কখনোই এতটা প্রতিষ্ঠা পেত না যদি সে সময় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা নিয়ে ছাত্রদের প্রকৃত ইতিহাস জানানো হত। রাতের অন্ধকারে সুবিধা হয় চোর-ডাকাত-দুর্বিত্তদের, তেমনি অজ্ঞতায় মহা সুবিধা পায় বিদেশী শত্রুরা। তখন জনপ্রিয়তা পায় তাদের ধোকাপূর্ণ বুলি এবং ক্ষতিকর ধ্যান-ধারণা। অখণ্ড ভারতের মোহ তো সে কারেণই বাড়ছে। ইসলামে অজ্ঞ থাকা এজন্য কবীরা গুনাহ।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল ইসলাম ও প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্ব। ইসলামই ছিল পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে একমাত্র যোগসূত্র। এমন একটি আদর্শিক দেশের প্রতি সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রি ও ইসলামবিরোধীদের দরদ থাকার কথা নয়। বরং এমন দেশে তাদের রাজনৈতিক মৃত্যু অনিবার্য। সেটি তারা বুঝতো বলেই দিবারাত্র খেটেছে দেশটির ত্বরিৎ ধ্বংসে। কিন্তু পাকিস্তানের সরকারের যারা কর্ণধার ছিল তারা এ ঘরের শত্রুদের চিনতে পারিনি। চিনলেও তাদের থেকে বাঁচার কোন চেষ্টা করেনি। বরং তাদের অবাধে বাড়তে দিয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধের বহু  আগেই বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গনটি ভারতসেবীরা দখলে চলে যায়। পাকিস্তান ও ইসলামের পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের তেমন কোন লড়াকু সৈনিকই ছিলনা। একই অবস্থা আজও।

সেক্যুলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেদিন যারা বের হয়েছেন তারা পাকিস্তানের বা ইসলামের পক্ষে লাঠি না ধরে নিজেদের শ্রম ও মেধার বিনিয়োগ করেছেন তার বিনাশে। ষাটের দশকে তারা লাঠি ধরেছিলেন সোভিয়েত রাশিয়া বা চীনের পক্ষে। আর এখন খাটছেন ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণে। তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম যে বাঙালীকে পাকিস্তান সরকার বৃত্তি দিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠায় তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক জনাব আব্দুর রাজ্জাক। অথচ এই আব্দুর রাজ্জাকই বিলেত থেকে ফিরে এসে যে কাজটি লাগাতর করেছেন তা হলো পাকিস্তানের শিকড় কাটার কাজ। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিব তাঁর এ রাজনৈতিক গুরুকে জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা দেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আব্দুব রাজ্জাকের ন্যায় এ রকম গাদ্দার ছিলেন প্রচুর। এদেরই অনেকেই এখন খাটছেন ভারতের সেবাদাস রূপে। এদের কারণেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইসলাম-বিরোধীদের দুর্গে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলেও তাদের মিশন শেষ হয়নি। বাংলাদেশের ভুগোলের মধ্যেও তারা পাকিস্তান ও ১৯৪৭’য়ের গন্ধ টের পায়। এবং যা কিছু পাকিস্তানী -তাই তাদের কাছে ঘৃণ্য। এদের অনেকে নাকি পাকিস্তানের নাম উচ্চারন করলে টুথ পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজে। তারা শুধু পাকিস্তানের নয়, শত্রু স্বাধীন বাংলাদেশেরও।

 

নাশকতা চেতনা বিভ্রাটের

বাঙালী মুসলিমের চেতনা বিভ্রাটের আলামতগুলো বিশাল। অনেকেই বলে, “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না হলেই তো ভাল হতো। অখণ্ড ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হতো -এ বিশাল জনসংখ্যা শক্তিশালী মুসলিম শক্তির জন্ম ঘটাতো।” একথা বলার মতলবটি হলো, বাংলাদেশ না হলে ভাল হতো -সে কথাটা পরোক্ষ ভাবে বলা। এরূপ কথা ১৯৪৭’য়ের আগে কংগ্রেসপন্থি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের নেতা-কর্মীগণও বলতো। তারাও চায়নি, বাংলাদেশ অখন্ড ভারতের বাইরে থাক। সিলেটে যখন গণভোট হয় তখন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের আলেমগণ বহু চেষ্টা করেছে যেন সিলেটে ভারতে থাকে। বাংলাদেশ ভারতে মিশে গিলে এখনও তারা খুশি হয়। 

বাংলাদেশে মুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ৯১ ভাগ। কিন্তু তাতে কি রাজনীতি, সংস্কৃতি ও প্রশাসনে হিন্দু বা ভারতীয়দের দাপট কমেছে? কাশ্মীরে শতকরা ৭০ ভাগ মুসলিম। কিন্তু তাতে কি তারা স্বাধীন ভাবে বাঁচার সুযোগ পেয়েছ। অনেকের প্রশ্ন, “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় মুসলিমদের কোন কল্যাণটি হয়েছে?” কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন হলো, ভারতে বসবাসকারি প্রায় ২০ কোটি মুসলিমেরই বা কোন কল্যাণটি হয়েছে? বাংলাদেশে যত মুসলিমের বাস তার চেয়ে বেশী মুসলিমের বাস ভারতে। কিন্তু ভারতীয় মুসলিমদের শক্তি কতটা বেড়েছে? বরং বঞ্চনা সেখানে সর্বত্র। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ভারতের সংখ্যালঘুদের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য একটি তদন্ত কমিশন ঘটনা করেছিলেন। সে তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে যে তথ্যগুলো বেরিয়ে এসেছে তা তো অতি করুণ। শিক্ষা ও চাকুরিতে মুসলিমদের অবস্থা ভারতের অচ্ছুত নমশুদ্রদের চেয়েও খারাপ। ১৯৪৭’য়ে ভারতের মুসলিমদের যে অবস্থা ছিল তা থেকেও তারা অনেক নিচে নেমেছে। অর্থনৈতিক বঞ্চনার পাশাপাশি তারা নিয়মিত নির্মম ভাবে মারা যাচ্ছে এবং লুটপাঠ ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে মুসলিম-নির্মূলের অসংখ্য দাঙ্গায়। ভারতীয় জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ মুসলিম হলেও চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগও নয়। কিন্তু ভারতীয় মুসলিমের সে বঞ্চনার ইতিহাস বাঙালী মুসলিমদের সামনে তুলে ধরা হয়নি। পাকিস্তান আমলের এ এক বড় ব্যর্থতা। নেকড়েকে নেকড়ে রূপে পরিচয় না করিয়ে বিপদ তো ভয়াবহ।   

 

পাকিস্তান কি সত্যিই ব্যর্থ?

বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের খাসলত হলো নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে পাকিস্তানের ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরা। নিজেরা যে ৫ বার দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হলো -সে কথা তারা বলে না। তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি বা শাড়ীর বদলে মাছধরা জাল পড়ে বাঙালী মহিলা যে বিশ্বময় ইতিহাস গড়লো -সে কথাও বলে না। অথচ লাহোর বা করাচীতে বোমা ফুটলেই বলে পাকিস্তান একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। পাকিস্তানের ব্যর্থতা অনেক। তবে দেশটির অর্জন কি এতোই তুচ্ছ? পাকিস্তানের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালগুলিতে যত মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করে ভারতে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা তার ২০ ভাগের এক ভাগও নয়। অথচ একটি দেশের মানুষ কতটা সামনে এগুচ্ছে বা কীরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক শক্তিসঞ্চয় করছে -সেটি পরিমাপের একটি নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা। ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে চাকুরিজীবী প্রফেশনালদের সংখ্যাও অনি নগন্য।

পাকিস্তানের একমাত্র করাচী শহরে যত ডাক্তার, শিক্ষক, প্রকৌশলী, আইনবিদ, প্রফেসর, বিজ্ঞানী ও সামরিক অফিসারের বসবাস -সমগ্র ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে তা নেই। তাছাড়া পাকিস্তানে যতজন পারমানবিক বিজ্ঞানী বা পদার্থ বিজ্ঞানীর বসবাস তা ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে দূরে থাক, ৫৭টির মুসলিম দেশের মধ্যে কোন দেশেই নাই। সম্প্রতি ব্রিটিশ পত্রিকায় প্রকাশ, পাকিস্তানের পারমানবিক বোমার সংখ্যা ফ্রান্সের প্রায় সমকক্ষ। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একমাত্র তাদের হাতেই রয়েছে পারমানবিক বোমাধারি দূরপাল্লার মিজাইল যা ভারতীয় প্রযুক্তির চেয়ে অগ্রসর। একাত্তর থেকে পাকিস্তানে তাই অনেক সামনে এগিয়েছে। দেশটি আজও বেঁচে আছে সে সামরিক শক্তির জোরেই। নইলে ভারত ইতিমধ্যে দেশটিকে আরো কয়েক টুকরোয় বিভক্ত করে ফেলতো। একাত্তরের পর ভারতীয় র’ সেটির পরিকল্পনাও এঁটেছিল। ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রায়না তার বই “Inside RAW”য়ে সে বিষয়ে বিস্তর বিবরণ তুলে ধরেছেন।

সামরিক শক্তির বিচারে পাকিস্তানই হল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। আর এ কারণেই দেশটি তার জন্ম থেকেই সকল আন্তর্জাতিক ইসলাম-বিরোধী শক্তির টার্গেট। অখণ্ড ভারতে বসবাস করলে মুসলিমদের কি এরূপ শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ মিলতো? শক্তি সঞ্চয়ের জন্য তো নিজের পায়ের তলায় মাটি চাই, স্বাধীনতাও চাই। ভারতের মুসলিমদের কি সেটি আছে? কারাগারে বন্দীদের সংখ্যা যতই বৃদ্ধি পাক তাতে কি তাদের শক্তি বাড়ে? মুসলিমদের জন্য ভারত কি জেলখানা থেকে ভিন্নতর?

বীজ সব জায়গায় গজায় না,বেড়েও উঠে না। বনেজঙ্গলে পড়লে গজালেও বেড়ে উঠে না। ভারতে মুসলিম প্রতিভা যে নাই -তা নয়। প্রতিটি শিশুরই থাকে বিপুল সম্ভাবনা। কিন্তু ভারতে মুসলিম শিশুকে বেড়ে উঠার অনুকূল পরিবেশ দেয়া হয়না। হিজরত এজন্যই ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মক্কার বন্দী জীবন ছেড়ে হিজরত এজন্যই আল্লাহপাক ফরয করেছিলেন। হিজরতের মাধ্যমেই তাঁরা সেদিন পেয়েছিলেন উর্বর ভূমিতে গিয়ে নিজ প্রতিভা নিয়ে বেড়ে উঠার সামর্থ্য। এর ফলে পেয়েছিলেন শক্তিশালী সভ্যতার নির্মান ও বিশ্বশক্তি রূপে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সামর্থ্য। সাতচল্লিশের পর ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলিম ভারত থেকে হিযরত করে পাকিস্তান গিয়েছিলেন এমন এক চেতনায়। পাকিস্তানের পারমানবিক বোমা আবিস্কারক ড.আব্দুল কাদির হলেন তাদেরই  একজন।

তাছাড়া পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা অনর্থক গণ্য হলে শুধু পাকিস্তান নয়, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রয়োজনীতাও অনর্থক হয়ে দাঁড়ায়। তাই পাকিস্তানের সৃষ্টিকে অনর্থক বা অনাসৃষ্টি বলা বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর চিন্তা। বাংলাদেশ তার সমগ্র মানচিত্রটা পেয়েছে পাকিস্তান থেকে। বাংলাদেশীরা একাত্তরে বা তার পরে এ একইঞ্চি ভূমিও এ মানচিত্রে বাড়ায়নি। তাই বাংলাদেশী মুসলিমদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ১৯৪৭’য়ে অর্জিত স্বাধীনতা। ১৯৭১’য়ে এসে পাকিস্তান থেকে শুধু বিচ্ছিনতাই জুটেছে, স্বাধীনতা নয়। ১৯৭১’য়ের ১৬ই ডিসেম্বরকে স্বাধীনতা দিবস বললে তার পূর্বের পাকিস্তানী ২৩ বছরকে ঔপনিবেশিক বিদেশী শাসন বলে প্রমাণিত করতে হয়। কিন্তু সে পাকিস্তানী আমলকে ঔপনিবেশিক বিদেশী শাসনামল বললে কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর ঢাকার খাজা নাযিম উদ্দিন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হন কি করে? বগুড়ার মহম্মদ আলী এবং আওয়ামী লীগের সোহরোয়ার্দী প্রধানমন্ত্রীই বা হন কি করে? মিথ্যা কথায় হিসাব মিলানো যায় না। তবে মিথ্যা কথা বলার পিছনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা আছে। সেটি নিজেদের কৃত অপরাধগুলোকে গৌরবময় করার স্বার্থে। তাছাড়া তাদের দায়বদ্ধতা হলো ভারতের আগ্রাসী চরিত্রকে আড়াল করার। কিন্তু যারা আওয়ামী লীগের সে অপরাধের সাথে জড়িত নয় এবং লিপ্ত নয় ভারতের লেজুড়বৃত্তিতে, অন্তত তাদের তো সত্য কথাগুলো নির্ভয়ে বলা উচিত।

বরং একাত্তরে যেটি জুটেছে সেটি হলো, ভারতীয় প্রভাব বলয়ে প্রবেশ। ১৯৭১’য়ের পর থেকে ভারত বাংলাদেশকে গণ্য করে তার প্রতিরক্ষা সীমানার অন্তভূক্ত একটি দেশ রূপে। যেমন হায়দারাবাদেরর নিযামের রাজ্য গণ্য হতো ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের কাছে। হায়দারাবাদের নিযাম সে আমলে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন। অথচ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নিজ দেশের প্রতিরক্ষায় দূরপাল্লার একখানি কামানও কিনতে দেয়নি। দেশটির মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নিতে জালের মত রেল লাইন বসিয়েছিল। তাই ১৯৪৮ সালে ভারত-ভূক্ত করতে ভারতকে বেগ পেতে হয়নি। এক দুর্বল আশ্রিত রাষ্ট্রের অবকাঠামো ব্রিটিশেরা পূর্ব থেকেই সেদেশে নির্মাণ করে গিয়েছিল। বাংলাদেশেও তেমনি এক অবকাঠামো নির্মাণ করেছে ভারত ও তার বাংলাদেশী সহযোগীরা। সেটি যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক, তেমনি সাংস্কৃতিক ও সামরিক। তেমন একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখেই একাত্তরের যুদ্ধ শেষে পাকিস্তান আর্মির অব্যবহৃত সকল অস্ত্র ভারতীয় সেনাবাহিনী নিজ দেশে নিয়ে যায়। একমাত্র অজ্ঞতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মহাবিভ্রাটই এ সত্যকে ভুলিয়ে দিতে পারে। অথচ বাংলাদেশের ভারতপন্থিরা সে বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রাটই বাড়িয়ে চলেছে। আর সে অজ্ঞতা ও বিভ্রাটের কারণেই ভারতের জালে আটকা বন্দীদশা নিয়েও আজ ভারতপন্থি বাঙালী মহলে হচ্ছে মহোৎসব।   

 

সামনে মহা বিপদ

আজকের ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারি শাসক বাংলাদেশে যেভাবে গণতান্ত্রিক আচার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে -তা ভবিষ্যতে মারাত্মক রকমের বিপর্যয়ের জন্ম দিবে। স্বৈরাচার নিজেই দেশ শাসনের এক নৃশংস ও অসভ্য রীতি। এবং সে অসভ্য শাসনই এখন বাংলাদেশের মানুষের ঘাড়ের উপর। গণতান্ত্রিক শাসনের সভ্য রীতি হাওয়ায় জন্ম নেয় না, সে জন্য লাগাতর পরিচর্যা দিতে হয়। লাগাতর পরিচর্যার মাধ্যমে গণতন্ত্র জনগণের সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়। তখন জনগণ ভোটচুরি ও ভোটডাকাতিকে মন থেকে ঘৃণা করতে শেখে। অথচ সে সংস্কৃতি ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারে গড়ে উঠে না।

স্বৈরাচারি শাসনের বড় নাশকতা হলো এটি দেশকে নেতা শূণ্য করে। পাল্টে দেয় মানুষের মূল্যবোধ ও বিচারবোধ। দুর্বৃত্ত স্বৈরশাসন জনগণকে ভোটচোর ও ভোটডাকাতদেরও মাননীয়, মহান নেতা, দেশবন্ধু, দেশনেত্রী বা জাতির পিতা বলতে শেখায়। এভাবে জনগণের চেতনা ও সংস্কৃতি পাল্টায়। এখানেই বাংলাদেশের জন্য মহা বিপদ। ১৯৭১’য়ে দেশের মানচিত্র পাল্টানো হয়েছিল। এখন চলছে চেতনা, চরিত্র ও সংস্কৃতি পাল্টানোর কাজ। কারণ শয়তান শুধু মুসলিমদের ভূগোল বিভক্ত করা নিয়ে খুশি নয়। আরো নিচে নামাতে চায়। জাহান্নামের পূর্ণ উপযোগী করে গড়ে তুলতে চায়। এজন্য জনগণের ঈমান, আমল ও সংস্কৃতির অঙ্গণে নাশকতা ঘটায়। কারণ স্বৈরাচার তো সুস্থ্য চেতনা ও সংস্কৃতিতে বাঁচে না। অসভ্য স্বৈরাচারি শাসকগণ নিজেরা পাল্টায় না; বরং জনগণকে পাল্টায় নিজেদের দুর্বৃত্তির সাথে ম্যাচিং তথা সমন্বয় বাড়াতে। এজন্যই স্বৈরশাসনে দুর্বৃত্ত উৎপাদনে বাম্পার ফলে। বাংলাদেশের জন্য ভয়ংকর বিপদের কারণ এখানেই্। ২৭/০১/২০২১।   

 




বাংলাদেশের অস্তিত্বের সংকট

ফিরোজ মাহবুব কামাল

মডেলটি ব্যর্থতার                                                             

বিশ্বমাঝে বাংলাদেশ এখন এক ব্যর্থতার মডেল। সেটি যেমন ভোট-ডাকাতি ও নৃশংস ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের। তেমনি পর পর পাঁচবার দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হওয়ার। এবং সে সাথে গুম, খুন, চুরি ডাকাতি, ব্যাংক ডাকাতি, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের জোয়ার আনার। তাই যারা নীচে নামতে চায় তারা বাংলাদেশ বহু কিছু শিখতে পারে। সব রোগের পিছনেই কারণ থাকে। তাই কারণ আছে বাংলাদেশের এরূপ নীচে নামারও। পতনের শুরুটি চেতনার বিভ্রাট বা অসুস্থ্যতা থেকে। চেতনাই ব্যক্তিকে কর্ম ও আচরণে পথ দেখায়। ভারতের অনেকে যেরূপ গো-মুত্র সেবন করে, দলিতদের যেরূপ অচ্ছুৎ বলে এবং কিছুকাল আগেও বিধবাদের স্বামীর চিতায় জ্বালিয়ে হত্যা করতো –তা তো অসুস্থ্য চেতনার কারণে। তাই দুর্বৃত্তিতে লিপ্ত দেখে নিশ্চিত বলা যায়, চেতনার ভূমিটি সুস্থ্যতা হারিয়েছে। বাংলাদেশীদের রোগটি এখানেই। পরিতাপের বিষয়ট হলো, ১৯৭১’য়ে দেশটির জন্ম থেকে জনগণকে সুস্থ্য কোন দর্শন বা চেতনার সন্ধানই দেয়া হয়নি। বরং সেটিকে আড়াল করা হয়েছে। অথচ সুস্থ্য ইসলামের ন্যায় সুস্থ্য জীবন-দর্শনের কারণে মুসলিমগন তাদের গৌরব কালে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হতে পেরেছিলেন। 

বিপদের আরো কারণ, বাংলাদেশী মুসলিমদের চেতনার বিভ্রাট যে দিন দিন ভয়ানক রূপ নিচ্ছে -সে প্রমাণ প্রচুর। রোগ নিয়ে জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার তখনই প্রয়োজন হয় যখন সেটি দেহের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশীদের চেতনার রোগটি এখন আর লুকিয়ে নেই, বরং সর্ববিধ সিম্পটম নিয়ে নিজের উপস্থিতি জাহির করছে। জাতীয় জীবনে কোন রোগই -তা সে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা নৈতিক হোক, হঠাৎ আসে না। বাড়ে বহুকাল ধরে। ঝড় শুরু হওয়ার আগে থেকেই আকাশে যেমন কালো মেঘ জমতে শুরু করে তেমনি জাতির জীবনেও কালো মেঘ জমতে থাকে বিপর্যের বহু আগে থেকেই। কালো মেঘ দেখেও ঝড়ের আলামত টের না পাওয়াটি অজ্ঞতা। তেমনি মানব জীবনের ভয়ানক অজ্ঞতাটি হলো, প্রচণ্ড বিচ্যুতি ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে থেকেও তা নিয়ে বোধোদয় না হওয়া। এ অজ্ঞতা নিরক্ষরতার চেয়েও ভয়ানক।

এমন অজ্ঞতা যে শুধু দেশের সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে বিরাজ করছে তা নয়, প্রকট রূপ ধারণ করেছে তাদের মাঝেও যারা নিজেদেরকে ধর্মভীরু মুসলিম ও ইসলামি আন্দোলনের কর্মী বা সমর্থক বলে দাবী করে। বাংলাদেশের অর্জিত ব্যর্থতার জন্য শুধু কোন একক ব্যক্তি বা দল দায়ী নয়, দায়ী সবাই। দুর্বৃত্ত শাসনকে যারা নীরবে মেনে নেয় দায়ী তারাও। কর্পুর যেমন দিন দিন হাওয়ায় হারিয়ে যায়, বাংলাদেশের মানুষের আক্বিদা ও আচরণ থেকে ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধও যেন হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে আজ থেকে ৫০ থেকে বছর আগে বাংলার মানুষ ইসলামের যতটা কাছে ছিল, এখন ততটাই দূরে। তখন বিছমিল্লাহ বা আল্লাহর উপর আস্থা নিয়ে অন্ততঃ মুসলিমদের মাঝে বিরোধ ছিল না। অথচ এখন ঈমানের সে মৌল বিশ্বাসটি দেশের শাসনতন্ত্রে উল্লেখ করাও অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ইসলাম থেকে বাংলাদেশের মানুষ যে কতদূর দূরে সরেছে এ হল তার নমুনা। আর এ অবস্থা সৃষ্টির জন্য যেটি সফল ভাবে কাজ করেছে সেটি দেশের সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা। এ শিক্ষা ব্যবস্থার মূল প্রবর্তক ছিল ব্রিটিশ শাসকেরা। এর মূল কাজটি মুসলিমদের ঈমান বা আল্লাহর উপর আস্থা বাড়ানো ছিল না, ছিল ইসলাম থেকে দ্রুত দূরে সরানো। মহান আল্লাহপাক ও তার রাসূল কি বললেন সেটি ঔপনিবেশিক শাসনামলে যেমন গুরুত্ব পায়নি, এখনও পাচ্ছে না। বরং গুরুত্ব পাচ্ছে ডারউইন, ফ্রয়েড, কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস, ল্যাস্কী বা রাসেলের মত অমুসলিমগণ কি বললো সেটি।

 

সেক্যুলার শিক্ষার নাশকতা

বিষ যেমন দেহের অভ্যন্তুরে ঢুকে দেহের প্রাণশক্তি বিনষ্ঠ করে, সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থাও তেমনি বিনষ্ট করছে ঈমান। মড়ক ধরায় চেতনায়। তাই আল্লাহর উপর আস্থা বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে সেক্যুলারিস্ট ও নাস্তিকদের আর লাঠি ধরতে হচ্ছে না, দেশের শিক্ষ্যাব্যবস্থাই সেটি ত্বরিৎ সমাধা করছে। ফলে দেশে ৯০ ভাগ মুসলিম -এ পরিসংখ্যানটি নিছক বইয়ের পাতায় রয়ে গেছে; দেশবাসীর কাজ-কর্ম, ঈমান-আক্বীদা, নীতি-নৈতীকতায় নয়। বরং বাড়ছে মুর্তি নির্মাণ, মুর্তির সামনে মাতা নত করে খাড়া হওয়া ও মঙ্গল প্রদীপের কদর। এ শিক্ষা ব্যবস্থার ফলেই সফল ভাবে সমাধা হয়েছে কোর্ট-কাছারি, আইন-আদালত, প্রশাসন ও রাজনীতি থেকে ইসলাম সরানোর কাজ। আল্লাহর দ্বীনটির এমন নিষ্ঠুর অবমাননা স্বচক্ষে দেখার পরও রুখে দাঁড়ানোর লোক দেশে শতকরা ৫ জনও নাই। থাকলে ঢাকা শহরে শরিয়তের পক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের মিছিল হত। আর শতকরা ৯০ জন মুসলিমের দেশে ইসলামের এরূপ পরাজয় ডেকে আনার জন্য ভারত, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তাবত ইসলামী বিরোধী শক্তির কাছে কদর বাড়ছে দেশের সেক্যুলার রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও এনজিও কর্মীদের। ভূয়শী প্রশংসা পাচ্ছে ইসলামকে পরাজিত করার এ বাংলাদেশী মডেল। ফলে RAB বা পুলিশের হাতে ভয়ানক ভাবে মানবাধিকার লংঘিত হলেও তা নিয়ে পাশ্চাত্যে শাসকগণ নিন্দা দূরে থাক, মুখ খুলতেই রাজী নয়।  

শূণ্যস্থান বলে এ জগতে কিছু নেই। শূণ্যস্থান থাকে না চেতনা রাজ্যেও। সুশিক্ষার ব্যবস্থা না হলে দেশবাসীর মনের ভূবন কুশিক্ষার দখলে যাবেই। তখন ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়ে অর্থদান, শ্রমদান ও রক্তদানের কাজটি কুশিক্ষাপ্রাপ্ত জনগণই নিজ গরজে সমাধা করে দেয়। কুশিক্ষা তখন ইসলামকে পরাজিত করার কাজে সফল হাতিয়ার রূপে কাজ দেয়। একারণে যারা ইসলামের বিজয় চায় তারাও সর্ব প্রথম যেটিকে গুরুত্ব দেয় সেটি দেশবাসীর সুশিক্ষা। এবং বন্ধ করে দেয় কুশিক্ষার সকল প্রতিষ্ঠানকে। এরূপ কাজটি ছিল নবী-রাসূলদের। মুসলিমদের দায়ভার তো সে কাজকে চালু রাখা। মহান আল্লাহতায়ালাও তাঁর সর্বশেষ নবী (সাঃ)কে সর্বপ্রথম যে পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তা নামায-রোযার নয়, বরং জ্ঞানার্জনের।

সাম্প্রতিক কালে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব এবং সেক্যুলার শিক্ষার নাশকতা যারা সবচেয়ে বেশী বুঝেছেন তারা হলো ইরানী আলেমগণ। মহম্মদ রেজা শাহের প্রতিষ্ঠিত দেশের সকল সেক্যুলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তিন বছরের জন্য তাঁরা বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু ইসলামের নামে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেলেও দেশটির নেতাদের দ্বারা সেটি হয়নি। যারা ইসলামের পক্ষের শক্তি ছিল তারাও বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি, ফলে ইসলামী শিক্ষার প্রবর্তন নিয়ে আন্দোলনও করেননি। এর ফলে বহাল তবিয়তে থেকে যায় ব্রিটিশের প্রবর্তিত সেক্যুলার শিক্ষাব্যাবস্থা। পাশ্চাত্যের যৌন ফিল্ম এবং রাশিয়া ও চীনের সমাজতান্ত্রিক বই ও পত্র-পত্রিকা যাতে অবাধে প্রবেশ করতে পারে -সেজন্য দেশের দরজা পুরাপুরি খুলে দেয়া হয়। যুবকদের চেতনায় মহামারি বাড়াতে এগুলোই পরবর্তীতে ভয়ানক জীবানূর কাজ করে। পাকিস্তান আমলে দেশের রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটগুলোকে সে জীবাণূ-ব্যবসায়ীদের হাতে লিজ দেয়া হয়েছিল। এভাবে দেশের এবং সেসাথে ইসলামের ঘরের শত্রু বাড়ানো হয়েছিল বিপুল হারে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই যারা বিরোধীতা করেছিল এবং দেশটি প্রতিষ্ঠার পর যারা তার বিনাশে সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছিল -তারা হলো সেক্যুলারিস্ট জাতীয়তাবাদী এবং সমাজতন্ত্রিরা। সমাজতন্ত্র মারা গেছে, কিন্তু মারা যাওয়ার আগে মরণ ছোবল মেরে যায় পাকিস্তানের বুকে।

 

বিজয়ী হিন্দু এজেণ্ডা

উপমহাদেশের রাজনীতিতে সবসময়ই দুটি পক্ষ ছিল। দুই পক্ষের দুটি ভিন্ন এজেণ্ডাও ছিল। ফলে ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র নির্মানের দুটি বিপরীত ধারাও ছিল। একটি ছিল অখণ্ড ভারত নির্মানের ধারা। এ ধারার নেতৃত্বে ছিল কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ। অপরটি ছিল প্যান-ইসলামিক মুসলিম ধারা। শেষাক্ত এ ধারাটিই জন্ম দেয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের নির্মাণের মূল ভিত্তি ছিল জিন্নাহর দেয়া দ্বি-জাতি তত্ত্ব। যার মূল কথা হলো: চিন্তা-চেতনা, মন ও মনন, নাম ও নামকরণ, তাহজিব ও তামুদ্দনের বিচারে মুসলিমগণ হলো হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন জাতি। তাদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্য, ভিশন ও মিশন তাই এক ও অভিন্ন হতে পারে না। তাই অখণ্ড ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু-ভারতের কাঠামোর মাঝে মুসলিমদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শরিয়ত অনুসরণের এজেন্ডা পূরণ অসম্ভব। পৃথক ও স্বাধীন পাকিস্তান এ এজেন্ডা পূরণে অপরিহার্য। হিন্দু কংগ্রেস ও ব্রিটিশ শাসকদের প্রচণ্ড বিরোধীতা সত্ত্বেও ১৯৪৭’য়ে দ্বি-জাতি তত্ত্বই বিজয়ী হয় এবং প্রতিষ্ঠা পায় পাকিস্তান।

কিন্তু অখণ্ড-ভারত নির্মাণের লক্ষে আত্মনিবেদিত হিন্দু নেতারা ১৯৪৭’য়ের সে পরাজয়কে মেনে নেয়নি। সুযোগ খুঁজতে থাকে মুসলিমদের সে বিজয়কে উল্টিয়ে দেয়ার। সে সুযোগ আসে ১৯৭১’য়ে। ১৯৭১’য়ে তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক বিজয় লাভ করে দেশটির পূর্বাঞ্চলে। ফলে বিজয়ী হয় হিন্দু এজেন্ডা। ভারত ১৯৪৭’য়ের পরাজয়ের বদলা নিয়ে নেয়। নিজেদের সাম্প্রদায়িক প্রকল্পকে মুসলিমদের কাছে আকর্ষণীয় করতে গায়ে সেক্যুলারিজমের লেবাস লাগায়। এটিকে ধর্মনিরপেক্ষতা বলে জাহির করে। সেক্যুলারিজমের মুসলিম-বিরোধী রূপটি নিয়ে বাংলাদেশের মুসলিমদের মনে প্রচণ্ড অজ্ঞতা থাকলেও সে অজ্ঞতা ভারতীয় মুসলিমদের নেই। ভারতের মুসলিম শিশুরাও সেটি বুঝে। তারা সেটি বুঝেছে হিন্দুদের দ্বারা সংঘটিত মুসলিম বিরোধী অসংখ্য দাঙ্গায় সহায়-সম্পদ ও আপনজনদের হারিয়ে; এবং চোখের সামনে মা-বোনদের ধর্ষিতা হতে দেখে। কিন্তু হিন্দু-ভারতের সে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক রূপটিকে পর্দার আড়ালে রাখা হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিমদের থেকে। বরং কুৎসিত রূপে চিত্রিত করা হয়েছে দেশের ইসলামপন্থি এবং একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিদের। এভাবে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর মনে যেমন সৃষ্টি করা হয়েছে পাকিস্তান-বিরোধী প্রচণ্ড ঘৃনা। সে সাথে লালন করা হয়েছে অখণ্ড ভারতের প্রতি মোহ। লাগাতর প্রচারণার ফলে বাংলাদেশী মুসলিমদের মনে এ বিশ্বাসও জন্ম নিয়েছে যে,পাকিস্তানের সৃষ্টিই ভূল ছিল এবং ভূল ছিল জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্ব।

পাকিস্তানকে যারা অনর্থক অনাসৃষ্টি বলে তারা যে শুধু ভারতীয় কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ তা নয়। তাদের সাথে সুর মিলিযে একই কথা বলে বাংলাদেশের কম্যুনিষ্ট, নাস্তিক, জাতীয়তাবাদী এবং মুসলিম নামধারি সেক্যুলারিষ্টগণ। হিন্দু-মুসলিম মিলন ও অখণ্ড ভারতের পক্ষে নানা গুণগানের কথাও তারা বলে। ১৯৭১’য়ে থেকে বাংলাদেশের সকল ছাত্র-ছাত্রী এবং জনগণ শুধু তাদের বাজানো ক্যাসেটটিই লাগাতর শুনে আসছে। অথচ কেন যে বাংলার মুসলিমগণ বিপুল ভোটে পাকিস্তানের পক্ষ নিল -সে কথা তারা বলে না। সে সময় শেখ মুজিব স্বয়ং কেন পাকিস্তানের পক্ষ নিলেন সে কথাও তারা বলে না। বরং বলে, পাকিস্তান সৃষ্টিই ভূল ছিল। তাদের সে নিরচ্ছিন্ন প্রচারণা কাজও দিয়েছে। ফল দাঁড়িয়েছে, এখন সে প্রচরণায় প্লাবনে ভেসে গেছে বহু ইসলামপন্থিরাও। ফলে ১৬ ডিসেম্বর এলে ভারতপন্থিদের সাথে তাঁরাও ভারতীয় বাহিনীর বিজয়ের দিনে উৎসবে নামে। বাংলাদেশে ইসলামি ধারার রাজনীতিতে এটি এক গুরুতর বিচ্যুতি, এবং এক বিশাল চেতনা-বিভ্রাট। তারা এমন সব কথা বলে, একাত্তরের পূর্বে কোন ইসলামপন্থির মুখে তা কখনোই শোনা যায়নি।

 

ইম্যুনিটি ইসলামের বিরুদ্ধে

অমুসলিম পরিবেষ্ঠিত এক ক্ষুদ্র দেশে নিজেদের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে বাঁচতে হলে চিন্তা-চেতনায় বলিষ্ঠ ইম্যুনিটি তথা প্রতিরোধ শক্তি চাই। রোগের বিরুদ্ধে মানব দেহে ভ্যাকসিন বা টিকা সে ইম্যুনিটিই বাড়ায়। তখন কলেরা,যক্ষা বা পলিওর মত ভয়ংকর রোগের মধ্যে থেকেও মানুষ নিরাপদে বাঁচতে পারে। কোর’আনের জ্ঞান ও ইসলামের দর্শন মূলত ঈমানদারের চেতনায় সে ইম্যুনিটিই তীব্রতর করে। তখন উলঙ্গতা, অশ্লিলতা ও নানা রূপ কুফরির মাঝেও মুসলিমগণ ঈমান নিয়ে বাঁচতে পারে। হিজরতের আগে মক্কার মুসলিমগণ তো তেমন এক ইম্যুনিটির কারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠ কাফেরদের মাঝেও বলিষ্ঠ ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন। অথচ মুসলিম অধ্যুষিত সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামিক ইম্যুউনিটি গড়ার সে কাজটি হয়নি। বরং উল্টোটি হয়েছে। ইম্যুনিটি গড়া হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে; এবং সেটি ইসলাম-বর্জিত শিক্ষার মাধ্যমে। ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের মনের গভীরে ইসলামের মৌল ধ্যানধারণা ও শিক্ষাগুলোও প্রবেশ করতে পারছে না।

ইসলামী চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠাকে সাম্প্রদায়িক বা মৌলবাদ আখ্যা দিয়ে সেটি বাংলাদেশের ন্যায় বহু মুসলিম দেশে অসম্ভব করা হয়েছে। সেটি অসম্ভব ছিল মক্কার কাফের সমাজেও। নবীজী (সা:)’কে ইসলামের প্রচারের কাজ তাই লুকিয়ে লুকিয়ে করতে হতো। এমন প্রকাশ্যে নামায পড়াও বিপদজনক ছিল। দ্বীনের এ অপরিহার্য কাজের জন্য যে অনুকূল অবকাঠামো দরকার সেটি যেমন কাফের অধ্যুষিত মক্কায় সম্ভব হয়নি, তেমনি কোন অমুসলিম রাষ্ট্রেও সম্ভব নয়। নবীজী (সা:)’কে তাই মদিনায় গিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রের কাজ নিছক হাসপাতাল, রাস্তাঘাট বা কলকারখানা নির্মাণ নয়। বরং সেটি হলো, ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা। এবং অনৈসলামের বিরুদ্ধে প্রতিটি নাগরিকের মনে ইম্যুনিটি গড়ে তোলা। কোন রাষ্ট্রের এর চেয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। খাদ্য-পানীয় তো বিশ্বের সব দেশেই জুটে। এমন কি পশুও না খেয়ে মরে না। কিন্তু মুসলিম মন ও মানস প্রকৃত নিরাপত্তা পায় এবং ঈমানী পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠে একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্রে। ইসলাম রাষ্ট্র নির্মান তো এজন্যই ফরয। নইলে কুফরির বিশ্বব্যাপী স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। তখন সে শুধু বেঁচে থাকে পারিবারীক মুসলিম নামটি নিয়ে, মুসলিম চরিত্র নিয়ে নয়। সোভিয়েত রাশিয়ার কম্যুনিস্ট কবলিত মুসলিমগণ তো বহুলাংশে হারিয়ে গেছে তো একারণেই। একই কারণে তারা হারিয়ে যাচ্ছে পাশ্চত্যের দেশগুলিতেও।

বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট একটি দেশ হলে কি হবে, ১৯৭১’য়ে যে দর্শনের উপর দেশটি জন্ম নিয়েছিল তাতে মুসলিম রাষ্ট্রের কাঙ্খিত সে মূল কাজটিই গুরুত্ব পায়নি। বরং চেতনার ভূমিতে ঢুকানো হয়েছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজমকে পরিচিত করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষবাদ রূপে। অথচ কোরআন ও সূন্নাহ মতে এ তিনটি মতবাদের যে কোন একটিকে বিশ্বাস করাই কুফরি। মুসলিম হওয়ার অর্থ ধর্ম-নিরপেক্ষ হওয়া নয়, বরং সর্ব-অবস্থায় ইসলামের পক্ষ নেয়া। নিজেকে মুসলিম দাবী করে ইসলামের বিজয়ে পক্ষ না নেয়াটি নিরেট মুনাফিকি। এবং পক্ষ নেয়ার অর্থ, ইসলামের বিজয়ে নিজের অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্ত দেয়া। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী তো সে কাজে শহিদ হয়েছেন। তাই মুসলিম কখনো জাতীয়তাবাদী হয় না। সেক্যুলারিস্ট হয় না। বরং শতভাগ ইসলামী হয়। সে তার পরিচয় ভাষা বা ভূগোল থেকে পায় না। বর্ণ বা গোত্র থেকেও নয়। পায় ঈমান থেকে।

আর সমাজতন্ত্র? সেটি আজ  খোদ সোভিয়েত রাশিয়াতেই আবর্জনার স্তুপে গিয়ে পড়েছে। অথচ শেখ মুজিব সে আবর্জনাও বাংলাদেশের মুসলিমদের মাথায় চাপিয়েছিলেন। এবং সে জন্য জনগণ থেকে কোন রায়ও নেননি। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে এটি কোন ইস্যুও ছিল না। শেখ মুজিব বাঙালী মুসলিমদের মাথার উপর এ কুফরি মতবাদগুলি চাপিয়েছেন নিছক তাঁর প্রভু দেশ ভারত ও রাশিয়াকে খুশি করার জন্য। ইসলামের বিরুদ্ধে মুজিবের গুরুতর অপরাধ, একাত্তরের পর ছাত্র-ছাত্রীদের মনে কুফরি ধ্যান-ধারণা বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন না দিয়ে বরং টিকা লাগিয়েছেন ইসলামের বিরুদ্ধে। আর সে অপরাধ কর্মটি করেছেন জনগণের দেয়া রাজস্বের অর্থে। এ ভাবে কঠিন করা হয়েছে বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের মনে ইসলামের মৌল শিক্ষার প্রবেশ। জিহাদ বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠার ন্যায় ইসলামের এ মৌল বিষয়গুলো বাংলাদেশের মানুষের কাছে আজ  গ্রহন-যোগ্যতা পাচ্ছে না –সেটি তো একারণেই। নতুন প্রজন্ম পাচ্ছে না ভ্রষ্ট মতবাদগুলোর মোকাবেলায় ইসলামিক ইম্যুনিটি। ফলে জোয়ারের পানির ন্যায় তাদের চেতনায় ঢুকেছে হিন্দু রাজনীতির এজেন্ডা -যার মূল কথাটি আজও অবিকল তাই যা তারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে বলতো।

যে দেশটি ইসলামী নয় সেদেশে ইম্যুনিটি গড়ার সে ফরয কাজটি করে মসজিদ-মাদ্রাসা, আলেম-মাশায়েখ, ইসলামি সংগঠন, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ। তাঁরা সেটি করেন কোর’আন-হাদিস ও ইসলামী দর্শনের জ্ঞান বাড়িয়ে। নবীজী (সাঃ)র মক্কী জীবন তো সেটিরই সূন্নত পেশ করে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার যেমন সে কাজ করেনি, সঠিক ভাবে সেটি হয়নি আলেমদের দ্বারাও। ইসলামি সংগঠনগুলো ব্যস্ত ক্যাডার-বৃদ্ধি, অর্থ-বৃদ্ধি ও ভোট-বৃদ্ধির কাজে, কোর’আনের জ্ঞান ও ইসলামী দর্শন বাড়াতে নয়। তাদের অর্থের বেশীর ভাগ ব্যয় হয় দলীয় আমলা প্রতিপালনে। সে সাথে দেশের মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোও তাদের হাতে অধিকৃত যাদের চেতনায় ইসলামের বিজয়ের কোন ভাবনা নেই। মসজিদ ও মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটিগুলোতে দখল জমিয়ে আছে সেক্যুলার মোড়ল-মাতবর, রাজনৈতিক ক্যাডার ও আলেমের লেবাস ধারী কিছু রাজনৈতিক বোধশূন্য ব্যক্তি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়লেও ইসলামের বিজয় বাড়ছে না। বরং মুসলিমদের চেতনা রাজ্যে দূষণ বাড়ছে ভয়ানক ভাবে। এমন এক দূষণ প্রক্রিয়াই ফলেই অখণ্ড ভারতের মোহ জেগে উঠছে এমন কি ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মাঝেও।

বাস্তবতা হলো, ১৯৭১’য়ে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের যে সামরিক বিজয় এসেছিল তাতে শুধু পাকিস্তানের ভূগোলই পাল্টে যায়নি, পাল্টে গেছে বাংলাদেশী মুসলিমদের মনের ভূগোলও। ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়-উৎসবের সাথে ভারত আরেকটি মহা-উৎসব করতে পারে বাঙালী মুসলিমের চেতনা রাজ্যে তাদের এ বিশাল বিজয় নিয়ে। বাঙালী হিন্দুর যখন প্রবল রেনেসাঁ, মুসলিমদের উপর এমন আদর্শিক বিজয় তারা তখনও পায়নি। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের সবচেয়ে বড় অপরাধ হল, হিন্দুদের কোলে তিনি এরূপ একটি সহজ বিজয় তুলে দিয়েছেন।

সামরিক বিজয় পরাজিত দেশে কখনই একাকী আসে না। সাথে আনে আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিজয়ও। বাংলাদেশের ভূমিতে ভারতের বিশাল বিজয় তাই একাত্তরে এসে থেমে যায়নি। বিজয়ের পর বিজয় আসছে সর্বক্ষেত্রে। একাত্তরে তাদের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানের বিনাশ ছিল না, ছিল ইসলামী চেতনার বিনাশও। তাছাড়া তাদের এ যুদ্ধটি নিছক পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও ছিল না, ছিল ইসলাম ও বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধেও। পাকিস্তান-বিরোধী যুদ্ধটি শেষ হয়েছে একাত্তরেই। কিন্তু শেষ হয়নি বাংলাদেশের মাটি থেকে ইসলামপন্থিদের নির্মূলের কাজ। তাই ভারত তার পদলেহীদের দিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ একটা অস্থির অবস্থা বজায় রেখেছে সেই ১৯৭১ থেকেই। তাছাড়া আওয়ামী লীগের আচরণ দেখেও বোঝা যায়, ভারতের পক্ষ থেকে বাঁকি কাজটি সমাধার মূল দায়িত্বটি পেয়েছে তারাই। বেছে বেছে ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধকরণ, ইসলামী নেতাদের বিনা বিচারে গ্রেফতার, মাদ্রাসার পাঠ্যসূচী ও মসজিদে খোতবার উপর নিয়ন্ত্রণ, অফিসে ও ঘরে ঘরে গিয়ে ইসলামী বই বাজেয়াপ্ত করা -ইত্যাদী নানা কর্মসূচী নিয়ে এগুচ্ছে তারা।

 

ভারতের বাংলাদেশ ভীতি এবং এজেণ্ডা

বাংলাদেশের ভূমিতে ভারতীয়দের এত তৎপরতার মূল কারণ, বাংলাদেশে ভীতি। ভয়ের সে মূল কারণটি হলো ইসলাম। ভারতীয়রা বোঝে, ইসলামী দর্শন এবং কোর’আনের জ্ঞানই জোগাতে পারে যে কোন আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি। অতীতে আফগান জনগণ যে শক্তির বলে ব্রিটিশ বাহিনী ও পরে সোভিয়েত বাহিনীকে পরাজিত করেছিল সেটি অস্ত্রবল নয়। অর্থবলও নয়। বরং সেটি ছিল ইসলামী চেতনার বল। সে শক্তির বলে আজও তারা মার্কিনীদের পরাজয় করে চলেছে। ২০ বছরের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও তার ৪০টি মিত্রদেশকে বিজয়ের কাছে ভিড়তে দেয়নি। আর বাংলাদেশীরা আফগানদের থেকে সংখ্যায় ৫ গুণ অধিক। এতবড় বিশাল জনশক্তির মাঝে ইসলামি চেতনার বিস্ফোরণ হলে তাতে কেঁপে উঠবে সমগ্র ভারত। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ ও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির মূলে তো তারাই।

বাংলাদেশের মূল শক্তি তাই তার ভূগোল নয়, সম্পদও নয়। বরং এই মুসলিম জনশক্তি। আর এই জনশক্তির সাথে ইসলামের যোগ হলে জন্ম নিয়ে এক মহাশক্তি। মরুর নিঃস্ব আরবেরা তো বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছিল এমন এক মিশ্রণ হওয়াতেই। ভারত তাই বাংলাদেশের মানুষকে কোর’আনের জ্ঞান থেকে দূরে সরাতে চায়। আর একাজে ভারতের সুবিধা হল, আওয়ামী লীগকে তারা অতি আগ্রহী কলাবোরেটর রূপে পেয়েছে। বাঙালী হিন্দুদের চেয়েও এ কাজে তারা ভারতের প্রতি বেশী বিশ্বস্থ ও তাঁবেদার। ভারত সে সুযোগটির সদ্ব্যাবহার করতে চায়। একাত্তরের বিজয়কে যুগ যুগ ধরে রাখার স্বার্থে আওয়ামী লীগের কাঁধে লাগাতর বন্দুক রাখাটিকে তারা অপরিহার্যও ভাবে। তবে এলক্ষ্যে তারা যে শধু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের উপরই পুঁজি বিনিয়োগ করছে -তা নয়। তাদের স্ট্রাটেজী, এক ঝুড়িতে সব ডিম না রাখা। তাই বিশাল পুঁজি বিনিয়োগ করেছে দেশের মিডিয়া, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যকর্মী, আলেম-উলামা, ছাত্রশিক্ষক, এমন কি ইসলামী দলগুলোর উপরও। সে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে তারা ভারতে পড়ার সুযোগও করে দেয়েছে। এখন বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করছে দেশের ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার উপর। ভারত জানে, তাদের হাত থেকে আওয়ামী লীগ হারিয়ে যাওয়ার নয়। ক্ষমতায় থাকার সার্থে এ দলটি নিজ গরজেই ভারতে পক্ষ নিবে। কারণ, ভারতের হাতে যেমন রয়েছে বাংলাদেশের হিন্দু ভোট, তেমনি আছে রাষ্ট্রীয় পুঁজি, আছে ভারত-প্রতিপালিত বিশাল মিডিয়া। নির্বাচনী জয়ের জন্য এগুলোই জরুরি।

 

অরক্ষিত বাংলাদেশ

বাঘের পাল দ্বারা ঘেরাও হলে বিশাল হাতিও রেহাই পায় না। তাই যে জঙ্গলে বাঘের বাস সে জঙ্গলের হাতিরাও দল বেঁধে চলে। বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এক দেশ। ঘেরাও হয়ে আছে আগ্রাসী হিন্দুদের দ্বারা। ফলে বাংলাদেশ এক অরক্ষিত দেশ। তাই এদেশটির সীমাবদ্ধতা প্রচুর। যে কোন দেশের প্রতিরক্ষার খরচ বিশাল। আর ভারতের মত একটি বিশাল আগ্রাসী দেশের বিরুদ্ধে সে খরচ তো আরো বিশাল। এ বাস্তবতার দিকে খেয়াল রেখেই বাংলার তৎকালীন নেতা খাজা নাযিমউদ্দিন, সোহরোয়ার্দি, আকরাম খান, নূরুল আমীন, তমিজুদ্দীন খান প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী সভায় লোহোর প্রস্তাবে সংশোধনী এনেছিলেন এবং পাকিস্তানে যোগ দেবার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পূর্ব বাংলা এভাবেই পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিল সেদেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশে রূপে। অথচ এরূপ পাকিস্তানভূক্তিকেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বলছে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন। নিরেট মিথ্যাচার আর কাকে বলে? কোন দেশে ঔপনিবেশিক শাসন গড়তে হলে যুদ্ধ লড়তে হয়। প্রয়োজন পড়ে মীর জাফরদের। প্রয়োজন পড়ে লর্ড ক্লাইভ ও পলাশির। প্রশ্ন হল, ১৯৪৭’য়ে কে ছিল সেই মীর জাফর? কে ছিল ক্লাইভ? সে মীর জাফর কি ছিলেন সোহরোয়ার্দী? খাজা নাজিমুদ্দিন বা আকরাম খাঁ যারা বাংলাকে পাকিস্তান ভূক্ত করেছিলেন? আর ঔপনিবেশিক বাহিনীই বা কোথায়? কোথায় করলো তারা যুদ্ধ? জেনারেল ওসমানী, মেজর জিয়া, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর আব্দুল জলিল, মেজর খালিদ মোশার্রফ কি তবে সে উপনিবেশিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন?

তবে জনগণও নির্দোষ নয়। জনগণের অপরাধ, তারা ১৯৭০ সালে নির্বাচিত করেছে গণতন্ত্র হত্যাকারি এক ফাসিস্টকে। স্বৈরাচারি মুজিবকে যে শুধু ভোট দিয়েছে তা নয়, অর্থ এবং রক্তও দিয়েছে। সে সাথে পরম বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে ভারতীয়দের। ভারতের মোহ শুধু একাত্তরে নয়, আজও বেঁচে আছে বহু বাংলাদেশীদের মনে। সেটি গ্রাস করছে শুধু সেক্যুলারদেরই নয়, বহু ইসলামপন্থিকেও। তাদের চেতনার বিভ্রাটটি এতোই গভীর যে, ভারতের বিজয় এবং বাংলাদেশের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের আধিপত্যকেও নিজেদের বিজয় ও নিজেদের অর্জন বলে উৎসবও করে। বাঙালী মুসলিমের এ এক ভয়ানক আত্মঘাতি রূপ। রোগ না সারলে সেটি প্রতিদিন বাড়ে। তেমনি বাড়ে চেতনার রোগও। তাই যে রোগ এক সময় ভারতপন্থি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের মগজে ছিল সেটি এখন অন্যদেরও গ্রাস করছে। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় হুমকি আর কি হতে পারে? ১ম সংস্করণ ০৭/০৬/২০১১; ২য় সংস্করণ ২৬/১১/২০২১।