মুসলিম-জীবনের দায়ভার ও ব্যর্থ মুসলিম

ফিরোজ মাহবুব কামাল

যে দায়িত্বটি সাক্ষ্যদানের

মুসলিম জীবনে যেটি সর্বসময় অপরিহার্য তা হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সাক্ষ্যদান। সে সাক্ষ্যদানের উপর নির্ভর করে তার মুসলিম হওয়া ও না হওয়ার বিষয়টি। এ সাক্ষ্যটি স্রেফ মহান আল্লাহতায়ালার অস্তিত্বের পক্ষে নয়, বরং সেটি তাঁর সর্বময় সার্বভৌম কর্তৃত্ব, তিনিই যে একমাত্র উপাস্য, তার নির্দেশিত ইসলামই যে একমাত্র সঠিক ধর্ম, তাঁর আইনই যে একমাত্র বৈধ আইন এবং পবিত্র কোর’আনই যে জান্নাতে পৌঁছার একমাত্র পথ –সেগুলোর পক্ষেও সাক্ষ্য দেয়া। আরো সাক্ষ্য দিতে হয়, রাসূলে পাক হযরত মহম্মদ (সাঃ) হচ্ছেন তাঁর গোলাম ও রাসূল। ইসলামী পরিভাষায় এরূপ সাক্ষ্যদানকে বলা হয় শাহাদাহ। মুসলিম হতে আগ্রহী প্রতিটি ব্যক্তিকে এ কালেমায়ে শাহাদাহ পাঠ করতে হয়; নইলে মুসলিম হওয়ার চিন্তাও করা যায়না। মুসলিম জীবনে সকল বিপ্লবের উৎস হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে অন্তরের গভীর থেকে এ সাক্ষ্যদান।

মুসলিমের জীবনে জান্নাতে পথে রূপে যাত্রা শুরু হয় বস্তুত “কালেমায়ে শাহাদা” পাঠের মধ্য দিয়ে।শাহাদা তথা সাক্ষ্যদান একটি প্রবল বিশ্বাসের প্রতিধ্বনী। ঈমানদারকে আজীবন বাঁচতে হয় সে বিশ্বাস নিয়ে। সে বিশ্বাস হারানোর অর্থই বেঈমান বা কাফের হয়ে যাওয়া। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে এরূপ সাক্ষ্যদানের মধ্যে ঈমানদার পায় তাঁর বাঁচার মূল এজেন্ডা ও মিশন। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ন কোন এজেন্ডা ও মিশন যে নেই –ঈমানদারকে বাঁচতে হয় সেরূপ একটি বলিষ্ঠ বিশ্বাস নিয়েও। এ বিশ্বাস থেকে সামনে হটলে সে আর মুসলিমই থাকেনা। নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় ইবাদতগুলোর মূল কাজ হচ্ছে ঈমানদারের জীবনে সাক্ষ্যদানের সে সামর্থ্য-বৃদ্ধি। কিন্তু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন করা সত্ত্বেও কোন ব্যক্তি যদি মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইন পালনের চেয়ে কোন শাসক, দল বা পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব ও আইনকে প্রাধান্য দেয় -তবে বুঝতে হবে তার ইবাদত মূল্যহীন। সে সাথে পোক্ত বেঈমানও।

জনসম্মুখে সাক্ষ্যদাতার গুরুত্বটি প্রতি সমাজেই অপরিসীম। জনগণের আদালতে সত্যকে বিজয়ী করতে হলে তার পক্ষে সাক্ষ্যদানকারি চাই। সত্য যে প্রকৃতই সত্য এবং মিথ্যা যে প্রকৃতই মিথ্যা -সেটুকু বলার জন্যও তো লোক চাই। নইলে সমাজের সাধারণ মানুষ সত্যকে জানবে কেমনে? মিথ্যাকেই বা চিনবে কেমনে? সাক্ষ্যদানের সে কাজটি না হলে মিথ্যার নির্মূল ও সত্যের প্রতিষ্ঠাই বা কীরূপে হবে? মহান আল্লাহতায়ালার অস্তিত্ব ও কুদরত যে সত্য এবং তাঁর কোর’আনী বাণী যে সত্য – সে ঘোষণা দেয়া এবং সে সত্যের প্রতিষ্ঠায় তো সাহসী লোক চাই। মানব সমাজে সে কাজটি ফেরেশতাদের নয়; সেটি ঈমাদারদের। একাজের জন্যই তাঁরা মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফা। এবং এ মহান কাজের পুরস্কারটিও সর্বোচ্চ; সেটি জান্নাত। আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে মুসলিম জীবনে কাজে শুরু তাই শাহাদা বা সাক্ষ্যদান থেকে।

আরবের বুকে সত্যের ঝান্ডা নিয়ে নবীজী (সাঃ) দাঁড়িয়েছিলেন বলেই অগনিত মানুষ সেদিন মহান আল্লাহতায়ালাকে চিনেছিলেন। চিনেছিলেন তাঁর দ্বীনকে। পেয়েছিলেন জান্নাতের পথ। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে বলিষ্ঠ সাক্ষ্যদানের যে সূন্নত মহান নবীজী (সাঃ) পেশ করেছিলেন, সে সূন্নতকেই মহান সাহাবাগণ তাদের বাঁচার মূল লক্ষ্য ও মিশনে পরিণত করেছিলেন। এ মিশন নিয়ে বহু কষ্ট সয়ে বহু দুর্গম পাহাড়-পর্বত ও মরুভূমি পাড়ি দিয়ে তাঁরা বহু দেশে গেছেন। তাদের সে কোরবানীর ফলেই সেসব দেশের মানুষের পক্ষেও সত্যপথ-প্রাপ্তি সেদিন সম্ভব হয়েছিল। এবং তাতে সম্ভব হয়েছিল ইসলামে বিজয় এবং নির্মিত হয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে আর কোন জনগোষ্ঠিই মহান আল্লাহতায়ালার নামকে বড় করতে এবং তাঁর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা দিতে নিজেদের অর্থ, রক্ত, সময়, মেধা ও সামর্থ্যের এরূপ বিনিয়োগ করেননি। এজন্যই তারা পরিচিতি পেয়েছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে। মহান আল্লাহতায়ালা যে তাঁদের কর্মে সন্তুষ্ট সে ঘোষণাটি তিনি দিয়েছেন পবিত্র কোর’আনে। এজন্যই সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সামনে তারাই শ্রেষ্ঠ মডেল।

মহান আল্লাহতায়ালা চান, তাঁর নিজের সত্য পরিচয় ও সত্য দ্বীন প্রতিটি দেশে পরিচিতি পাক ও বিজয়ী হোক। এবং পরাজিত হোক শয়তানের এজেন্ডা। এ কাজ তিনি ফেরাশতাদের দ্বারাও করতে পারতেন। করতে পারতেন নিজ কুদরত দ্বারাও। যে কুদরতের বলে চন্দ্র-সূর্য নিজ কক্ষপথ থেকে সামান্য ক্ষণের জন্যও বিচ্যূত হয় না, তেমনটি মানুষের জন্যও নির্ধারণ করতে পারতেন। কিন্তু সেটি হলে মানুষের জন্য পরীক্ষা ও পরীক্ষা পরবর্তী শাস্তি ও পুরস্কারের যে ব্যবস্থা রেখেছেন -সেটি অসম্ভব হতো। এ পৃথিবীটি তিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবকে পরীক্ষার জন্য; ফেরেশতাদের জন্য নয়।  তিনি চান, তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে নেয়ামত ভরা জান্নাত দিয়ে পুরস্কৃত করতে। একাজ ফেরেশতাগণ করলে মানব সন্তানেরা জান্নাতের হকদার হতো কোন যুক্তিতে?

পরীক্ষায় পাশে সামর্থ্য বাড়াতে মানব জাতির উপর মহান আল্লাহতায়ালার অপার রহমতটি হলো, তিনি সত্যদ্বীনসহ লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। কিতাব নাযিল করেছেন। কি ভাবে সে পরীক্ষায় পাশ করতে হয় ও জান্নাতের যোগ্য রূপে কিভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে হয় -নবী-রাসূলদের কাজ ছিল সে জরুরি বিষয়গুলো শেখানো। এবং ঈমানদারদের কাজ হলো নবী-রাসূলদের যে শিক্ষাগুলোকে রাষ্ট্রের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জীবন-যাপনের রীতি-নীতিতে পরিণত করা। পবিত্র কোর’আনে মুসলিমদের উপর সে অর্পিত দায়িত্বের বর্ণনাটি এসেছে এভাবে: “ওয়া কাযালিকা জায়ালনাকুম উম্মাতাও ওসাতাল লি’তাকুনু  শুহাদা’আ আলান্নাস ওয়া ইয়াকুনার রাসূলু আলায়কুম শাহিদা।” অর্থ: (হে মুসলিমগণ) অতঃপর এভাবে তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠা করলাম সত্যপন্থি একটি উম্মাহ রূপে -যাতে তোমরা সাক্ষ্য দাও সমগ্র মানব জাতির উপর এবং রাসূল সাক্ষ্য দিবেন তোমাদের ব্যাপারে। -(সূরা বাকারা, আয়াত ১৪৩)।

 

যে দায়ভারটি জিহাদের

মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু মহান আল্লাহতায়ালাকে বিশ্বাস করা নয়, বরং তাঁর পক্ষে প্রতি জনপদে আমৃত্যু সাক্ষ্যদানকারি হয়ে যাওয়া। তাই অন্য কোন ধর্মবিশ্বাস বা মানুষের গড়া কোন মতবাদ ও আইনের অনুসারি হওয়াটি মুসলিম জীবনে অভাবনীয়। সেগুলির পক্ষে সাক্ষীদাতা হওয়াটি হারাম। ইসলামী আক্বীদার সাথে সেটি সুস্পষ্ট বেঈমানী। কারণ সাক্ষ্যদানের অর্থ তো সেগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। তাই জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, সেক্যুলারিজম, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ –এসব অনৈসলামিক মতবাদে বিশ্বাসী হওয়াটি ইসলামের সাথে সুস্পষ্ট গাদ্দারী। এরূপ গাদ্দারীতে বিজয়ী হয় শয়তান এবং পরাজিত হয় ইসলাম। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সাক্ষ্যদানের কাজটি হতে হয় পরিপূর্ণ; কোর’আনে ঘোষিত বিধানের কোন একটি বিষয়কে বাদ দেয়া এবং তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো হারাম। এবং সাক্ষ্যদানটি শুধু মৌখিক ভাবে দিলে চলে না; সেটিকে হতে হয় প্রতিটি কথা, কর্ম, লেখনি, বুদ্ধিবৃত্তি, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি -এমনকি নিজের জীবন দিয়ে। কারণ, ঈমানের পরীক্ষাটি শুধু কথার নয়, আমলেরও। ইসলাম তাই শুধু মৌখিক বিশ্বাস চায় না, কোরবানীও চায়। কারণ, অন্যায় ও অসত্যের শয়তানী পক্ষটি কখনোই বিনাযুদ্ধে নিজেদের মিথ্যার ব্যবসাটি গুটিয়ে নিতে  রাজি নয়। তারা চায়, তাদের মনগড়া মিথ্যার বিজয় এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার অব্যাহত সুযোগ। এটি নিশ্চিত করতেই তারা নিশ্চিহ্ন করতে চায় সত্যকে ও সকল সত্যপন্থিদের। মিথ্যাকে বাঁচাতে অতীতে তারা নবী-রাসূলদের মত মহামানবদেরও হত্যা করেছে। তারা যুদ্ধ করেছিল মহান নবীজী (সা:) ও তাঁর সাথীদের নির্মূলে। আরবের কাফেরগণ সে লক্ষ্যে বদর, ওহুদ, খন্দক, হুনায়ুনের ন্যায় রণাঙ্গণে বিপুল সংখ্যায় হাজির হয়েছিল। যুগ পাল্টায়, কিন্তু শয়তানী শক্তির এজেন্ডা ও স্ট্রাটেজী পাল্টায় না। ফলে মিথ্যার সাথে সংঘাত এড়ানোর পথ কখনো খোলা থাকে না। ফলে নবীজীর (সাঃ) ন্যায় অতি শান্তিপ্রিয় ব্যক্তির পক্ষেও যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়নি। তাই বাস্তবতা হলো, যেখানেই ঈমান, জিহাদ সেখানেই অনিবার্য। ফলে যে জীবনে জিহাদ নাই, বুঝতে হবে সে জীবনে ঈমানও নাই।

শয়তানী শক্তির সাথে সংঘাতময় পরিণতির কথা মহাজ্ঞানী মহান আল্লাহপাকের চেয়ে আর কে বেশী জানেন? তাই পবিত্র কোর’আনে ঈমানের সাথে বার বার জিহাদ এবং সে জিহাদে জানমালের কোরবানীর কথাও বলা হয়ছে। যারা প্রাণ দেয় তারা পেশ করে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সর্বোচ্চ কোরবানী। তাদের সে কোরবানীতে মহান আল্লাহতায়ালা যে কতটা খুশী হন -সেটিরও বার বার প্রকাশ ঘটেছে পবিত্র কোর’আনে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে শহীদদের মর্যাদাই ভিন্ন; তাঁদেরকে মৃত বলাকে তিনি হারাম বলেছেন। তাঁদেরকে তিনি জান্নাতে প্রবেশ করাবেন বিনা হিসাবে। মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় সন্মান এবং বড় বিজয় আর কি হতে পারে? মহান আল্লাহতায়ালা এমন বিজয় দিতে চান প্রতিটি ঈমানদারকে। সে বিজয়কে সুনিশ্চিত করতেই মহান আল্লাহতায়ালা ইসলাম কবুলের সাথে সাথে প্রতিটি মুসলিমকে একটি পবিত্র অগ্রিম চুক্তিতে আবদ্ধ করেন। সেটি হলো জান্নাতের বিনিময়ে ঈমানদারের জানমাল ক্রয়ের চুক্তি। সে চুক্তিটির ঘোষণা এসেছে এভাবে: “ইন্নাল্লাহা আশতারা মিনাল মু’মিনিনা আনফুসাহুম ওয়া আমওয়ালাহুম বি আন্নালাহুমুল জান্নাহ। ইউকাতেলুনু ফি সাবিলিল্লাহি, ফাইয়াকতুলুনা ও ইয়ুকতালুন।” অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মুনিদের জানমাল কিনে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। তারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে এবং অতঃপর তারা নিহত হয় বা (শত্রুদের) হত্যা করে।” -(সুরা তাওবাহ, আয়াত ১১১)।

 

নিরপেক্ষতা যেখানে হারাম

ঈমানদার হওয়ার অর্থই হলো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে সম্পাদিত পবিত্র চুক্তির শর্ত নিয়ে বাঁচা। নইলে পুরা বাঁচাটাই হারাম পথে হয়। ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন মতবাদ বা ভিন্ন শক্তির পক্ষে যাওয়া দূরে থাক, মহান আল্লাহতায়ালার সাথে এরূপ চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তি কি কখনো নিরপেক্ষ থাকার কথা ভাবতে পারে? তাতে ভঙ্গ হয় সে পবিত্র চুক্তি। তাতে মহান আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতাই শুধু হয় না, চরম অবমাননাও হয়। এটি ইসলামের এতোই মৌলিক বিষয় যে ১৪ শত বছর পূর্বের নিরক্ষর বেদূঈনগণও সেটি ষোল আনা বুঝতেন। তারা জানতেন, মুসলিম হওয়ার অর্থই ইসলামের পক্ষ নেয়া।  ফলে ইসলাম ও অনৈসলামের দ্বন্দে নিরপেক্ষ থাকার বিষয়টি তারা ভাবতেই পারেননি। সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে মুসলিম বিশ্বে আজ যেটি প্রচলিত -সেটি নবীপাকের সময় যেমন ছিল না, তেমনি সাহাবায়ে কোরমের সময়ও ছিল না। এ মতবাদের জন্ম ইউরোপীয় অমুসলিমদের হাতে। সেটি জনজীবনে খৃষ্টান পাদ্রীদের অত্যাচার রুখতে। ইসলামের মৌলিক শিক্ষায় যারা অজ্ঞ, নবীজীর (সাঃ) সূন্নতের সাথে যারা অপরিচিত এবং সুস্পষ্ট ভাবেই যারা পথভ্রষ্ট -একমাত্র তারাই সেক্যুলার হতে পারে, কোন মুসলিম নয়। অপর দিকে যার জীবনে জিহাদ নাই, বুঝতে হবে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে তার কোন চুক্তিবদ্ধতাও নাই। এমন ব্যক্তির চুক্তি শয়তানের সাথে। সে তখন নিজের অর্থ, শ্রম, সময়, মেধা এবং জানের বিনিময় করে ইসলামকে পরাজিত ও শয়তানী শক্তিকে বিজয়ী করার কাজে। দেশে দেশে ইসলাম পরাজিত তো এসব মুসলিম নামধারী শয়তানপন্থিদের কারণেই।   

মহান আল্লাহতায়ালার সুস্পষ্ট নির্দেশটি যেখানে তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করায় লক্ষে সাক্ষ্যদান, অর্থদান, শ্রমদান, মেধাদান, এমনকি প্রাণদানের –সেখানে ধর্মনিরপেক্ষ থাকা জায়েজ হয় কি করে? দুই শত বছরের উপনিবেশিক শাসনে মুসলিম ভূমিতে পতিতাবৃত্তি, সূদী লেনদেন, মদ্যপান, জুয়া, অশ্লীলতা, নগ্নতা ও নানারূপ পাপকর্ম যেমন বাণিজ্য ও সংস্কৃতি রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে -তেমনি ধর্মনিরপক্ষতার মত হারাম ধারণাটিও রাজনৈতিক মতবাদরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এরাই মুসলিম দেশগুলিতে শয়তানি শক্তির বিশ্বস্ত প্রতিনিধি। এদের কারণেই আফগানিস্তান বা ইরাক দখলে সাম্রাজ্যবাদী কাফেরদের বন্ধুর অভাব হয় না। মুসলিমদেরকে ইসলামে অঙ্গিকারহীন ও নিষ্ক্রীয় করার লক্ষ্যে শত্রুপক্ষ এদের শাসনকেই মুসলিম দেশগুলোতে দীর্ঘায়ীত করতে চায়। এসব পাশ্চাত্য-দাসদের শাসন বাঁচাতে এরা ঘাঁটি গেড়েছে মুসলিম বিশ্বের কোনে কোনে। ইসলামের উত্থান রুখতে এরা নিরীহ জনগণের উপর গণবিধ্বংসী অস্ত্রও প্রয়োগ করছে।

মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সাক্ষ্যদান শুধু মুসলিম হওয়ার শর্ত নয়, ঈমানের বড় পরীক্ষাও। এ সাক্ষ্যদান যেমন মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে, তেমনি শয়তানি শক্তির বিপক্ষে। দুর্বৃত্ত কবলিত সমাজে সশস্ত্র  দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদান বিপদ ডেকে আনে। ফিরাউনের বিরুদ্ধে যে ক’জন মিশরীয় যাদুকর ঈমান এনেছিলেন তারা ফিরাউনের বিরুদ্ধে কোন অপরাধই করেনি। সমাজে কোন অঘটনও ঘটায়নি। তারা স্রেফ হযরত মূসা (আ:) ও হযরত হারুন (আ:)’র মাবুদ মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে জনসন্মুখে সাক্ষ্য দিয়েছিল মাত্র। তাতেই তাদের হাত-পা কেটে অতি নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। একই অবস্থা হয়েছিল হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সাথে। তিনিও কারো বিরুদ্ধে কোন অপরাধ করেননি। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে শুধু সাক্ষ্যদানের কারণে তাকে আগুণে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আগুণ থেকে রক্ষা পাওয়ার পর তাঁকে দেশ ত্যাগে বাধ্য হতে হয়েছিল। নবী পাক (সাঃ)’এর সাথে যা ঘটেছিল সেগুলোও ভিন্নতর ছিল না। তাঁকেও মক্কার কাফেরদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে হিজরত করতে হয়েছিল। অবস্থা আজও ভিন্নতর নয়।

আজকের ফিরাউনগণও মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সাক্ষ্যদানকারিদের বিরুদ্ধে একই রূপ হিংস্র ও নৃশংস। ইসলামের পক্ষ নেয়াটিও তাদের কাছে হত্যাযোগ্য অপরাধ গণ্য হয়। আলজিরিরায় ইসলামপন্থিগণ যখন নির্বাচনে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন তাদের উপর সামরিক বাহিনী লেলিয়ে দেয়া হলো। লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করো হলো এবং নেতাদের বিনা-বিচারে কারারুদ্ধ করা হলো। কারণ, শয়তানি শক্তির কাছে অসহ্য ছিল ইসলামপন্থিদের বিজয়। তারা জানতো, ইসলামের বিজয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, শিক্ষা, আইন-আদালত সবই মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। প্রতিষ্ঠা পাবে শরিয়ত। তাই ইসলামপন্থিদের ক্ষমতায় আসতে দেয়নি। আসতে দিতে চায় না ভবিষ্যতেও। একই তান্ডব ঘটানো হয়েছে মিশরে। চলছে লিবিয়াতে। চলছে সিরিয়াতেও। এসবের পিছনে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ। ইসলামকে পরাজিত রাখার যুদ্ধে যোগ দিয়েছে রাশিয়া ও ফ্রান্স। তাই ইসলাম নিয়ে বাঁচতে হলে কি এ সংঘাত এড়ানোর উপায় আছে?

 

ভিন্ন পথ নেই

আফগানিস্তানে যখন পাথরের বুদ্ধের মূর্তি ভাঙ্গা হলো -তা নিয়ে তখন বিশ্বব্যাপী শোরগোল তোলা হয়েছিল। অথচ আলজেরিয়ায় যে প্রায় দেড় লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হলো -তা নিয়ে তাদের মুখে প্রতিবাদ নেই। আল্লাহতায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকারবদ্ধ প্রতিটি মুসলমানই এভাবে পরিণত হয়েছে হত্যাযোগ্য টার্গেটে। ফলে মুসলিমগণ যতই শান্তিবাদী হোক –শত্রু শক্তির চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। তাদের এজেন্ডা সুস্পষ্ট। তারা চায়, মুসলিমগণ ভূলে যাক নবীজী (সা:)’র যুগের ইসলাম –যাতে রয়েছে ইসলাম রাষ্ট্র, শরিয়ত, জিহাদ, খেলাফত ও মুসলিম ঐক্য। তারা চায়, কোর’আন বাদ দিয়েই মুসলিমগণ ইসলাম পালন করুক। বেছে নিক, আত্মসমর্পণের পথ। কিন্তু আত্মসমর্পণের পথ তো ঈমানের পথ নয়। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো, পরিপূর্ণ ইসলাম নিয়ে বাঁচা। এবং ইসলাম নিয়ে বাঁচার অর্থই হলো ইসলাম রাষ্ট্র, শরিয়ত, জিহাদ, খেলাফত ও মুসলিম ঐক্য নিয়ে বাঁচা। নইলে মুসলমানত্ব বাঁচে না। তাই ইসলাম রাষ্ট্র ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মুসলিমদের কাছে নিছক রাজনীতি নয়, এটি আখেরাত বাঁচানোর বিষয়। আল্লাহপাকের ঘোষণা হলো, “মাল লাম ইয়াহকুম বিমা আনযালাল্লাহু ফা উলায়িকা হুমুল কাফিরুন।” অর্থ: “আল্লাহর নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী যারা বিচারকার্য পরিচালনা করে না -তারা কাফের।” (সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪)। সুরা মায়েদা, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে তাদেরকে জালেম ও ফাসেক তথা দুর্বৃত্ত বলেও চিহ্নিত করা হয়েছে।  

ফলে কাফের, জালেম ও ফাসেক তথা দুর্বৃত্ত শুধু মূর্তিপূজকেরাই নয়, যারা শরিয়ত অনুযায়ী দেশ শাসন করে না তারাও। অথচ মুসলিম দেশগুলোতে তাদেরই শাসন চলছে। নামায-রোযা থেকে দূরে সরলে যেমন ঈমান বাঁচে না, তেমনি ঈমান বাঁচে না শরিয়ত থেকে দূরে সরলেও। ফলে শয়তানি শক্তির সাথে সংঘাত যত অনিবার্যই হোক এবং শত্রু যত ক্ষমতাধরই হোক -কোন মুসলিম কি শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজ থেকে পিছিয়ে থাকতে পারে? জান বাঁচানোর জন্য কি তারা ঈমান বর্জন করতে পারে? অনন্ত অসীম কালের জান্নাত লাভে অবশ্যই মূল্য পেশ করতে হয়। এ জীবনের অতি তুচ্ছ বস্তুটিও বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। বিনা মূল্যে কি তাই জান্নাত আশা করা যায়? দুনিয়ার সমূদয় সম্পদ দিয়ে জান্নাতের এক ইঞ্চি ভূমিও ক্রয় করা যায় না। শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে সংঘাতে অর্থদান, রক্তদান বা প্রাণদান তো সে মূল্যদানেরই প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়াই হলো অতীতের নবী-রাসূল ও ঈমানদারগণের প্রক্রিয়া। এটিই হলো জিহাদ। নবী পাকের (সাঃ) সাহাবীগণ যত বৃদ্ধ, যত দরিদ্র বা যত নিরক্ষরই হোক, জিহাদে অংশ নেননি এমন নজির নেই। আশি বছরের বৃদ্ধ সাহাবীও শত্রুর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তাই এ যুগের মুসলিমগণ জিহাদে অংশ না নিয়ে আল্লাহপাক খুশি হবেন -সেটি কি ভাবা যায়? নিছক কালেমা পাঠ ও নামাজ-রোযা আদায়ে কি সেটি সম্ভব? এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের ঘোষণা, “আম হাসিবতুম আন তাদখুলুল জান্নাতা ওয়া লাম্মা ইয়াতিকুম মাসালুল্লাযীনা খালাউ মিন কাবলিকুম মাস্সাতহুমুল বা’সায়ু ওয়া জাররায়ু ওয়া জুলজিলু হাত্তা ইয়াকুলাররাসূলু ওয়াল্লাযীনা আমানু মায়াহু মাতা নাসরুল্লাহ, আলা ইন্না নাসরুল্লাহিল কারিব।” অর্থ: তোমরা কি মনে করে নিয়েছো যে এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের কাছে সে পরীক্ষার দিন এখনও আসেনি যা পূর্ববর্তী নবী রাসূলদের উপর এসেছিল। তাদের উপর এমন বিপদ-আপদ ও ক্ষয়ক্ষতি মধ্যে পড়েছিল এবং তাদেরকে এমন ভাবে প্রকম্পিত করা হয়েছিল যে, এমনকি রাসূল এবং তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তাঁরা আওয়াজ তুলতো এই বলে যে আল্লাহর সাহায্য কোথায়? নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী।” -(সুরা বাকারা, আয়াত ২১৪)।

 

সংস্কৃতি গাদ্দারীর

পরাজয়ের কারণ, মুসলিমদের সংখ্যা বাড়লেও মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে সাক্ষ্যদানকারীদের সংখ্যা বাড়েনি। বরং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তাঁর এজেন্ডার সাথে চরম গাদ্দারীর। মুসলিম রূপে পরিচয় দিলেও শরিয়তী আইন যে মানুষের গড়া আইনের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর -সে সাক্ষ্যটিও তারা দিচ্ছে না। দিলে তার প্রতিষ্ঠা কই?  বরং ইসলামের সাথে গাদ্দারী এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শরিয়তের পক্ষ নেওয়াকে তারা মৌলবাদ ও সন্ত্রাস বলে। ইসলামের বিজয় চাওয়াকে সাম্প্রদায়িকতা বলে। মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলে শরিয়তকে। তারা ভাবে, এসব যুদ্ধ-বিগ্রহ, ক্ষয়ক্ষতি ও অশান্তির পথ। অথচ মুসলিম বিশ্ব জুড়ে আজ যে অশান্তি ও পরাজয় তার মূল কারণ তো আল্লাহর আইনের অনুপস্থিতি। দায়ী তাদের ক্ষমতালিপ্সা ও দুর্নীতি। ইসলামের যারা আত্মস্বীকৃত শত্রুপক্ষ, শরিয়তের বিরুদ্ধে যাদের অবস্থান সুস্পষ্ট -তাদেরকে বিজয়ী করতে এরা শুধু অর্থ ও ভোটই দেয় না, তাদের পক্ষে অস্ত্র ধরে এবং রক্তও দেয়। মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারের পরিচয়ের সাথে তাদের পরিচয়টি তুলে ধরেছেন এভাবে: “যারা ঈমানদার তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর পথে, আর যারা কাফের তারা যুদ্ধ করে শয়তানের পথে।” ফলে আল্লাহর পথে লড়াই করা ছাড়া মুসলিম থাকার আর কোন পথ খোলা আছে কি?

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোতে মানুষ যে অর্থ, শ্রম ও রক্ত দিচ্ছে না তা নয়। বরং তাদের খরচের খাতটি বিশাল। বাংলাদেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে একাত্তরেও। তবে তাদের অর্থ, শ্রম ও রক্তদানে বিজয়ী হচ্ছে শয়তানী শক্তি, ইসলাম নয়। অথচ হওয়া উচিত ছিল এর উল্টোটি। ফলে পাপ শুধু ইসলামে অঙ্গিকারহীন সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতাদেরই নয়, মুসলিম পরিচয় দানকারী সাধারণ মানুষেরও। মহান আল্লাহতায়ালার নাম ও তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করতে যখন এতো অনিহা -তাতে কে দোয়া কবুল হয়? তাই মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম যখন মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, রোহিঙ্গা, উইঘুর বা কাশ্মিরের নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষে সাহায্য চেয়ে হাত তুলেন –সে দোয়া কবুল হয়না। কারণ, দোয়া কবুলের আগে আল্লাহপাক মুসলিমদের নিজেদের বিনিয়োগটা দেখেন। অথচ সাহাবায়ে কেরামের দোয়া অতীতে কবুল হয়েছে। কারণ, ইসলামের বিজয়ে তাদের বিনিয়োগটি ছিল বিশাল। সমুদয় সম্পদই শুধু নয়, এমনকি নিজ জীবনখানি দান করতেও তারা সদাপ্রস্তুত ছিলেন। সত্যিকার অর্থেই তারা ছিলেন আল্লাহর বাহিনী তথা হিযবুল্লাহ। ফলে আল্লাহপাক তার নিজ বাহিনীর বিজয় না চেয়ে বিপক্ষ শয়তানের বিজয় সহয়তা দিবেন -সেটি কি হতে পারে? তাই সেদিন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী বিশাল বিশাল শত্রুবাহিনীর উপর বিজয়ী হয়েছে। শূণ্য থেকে তারা তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সবচেয়ে সভ্যতর সভ্যতার জন্ম দিয়েছেন। তাদের হাতে পরাজিত হয়েছে রোমান ও পারসিক সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তি।

মহান আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুত সাহায্য লাভের শর্ত হলো, তাঁর দ্বীনের বিজয়ে পরিপূর্ণ সাহায্যকারী হয়ে যাওয়া। আর এ কাজটি শুধু মুসলিম রাজনীতিবিদ ও ইসলামি সংগঠনসমূহের নেতা-কর্মীদের নয়, বরং প্রতিটি মুসলিমের। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে প্রতিটি মুসলিমকে আলাদা ভাবে হাজির হতে হবে। ইসলামকে বিজয়ী করায় কার কি বিনিয়োগ -সেদিন হবে সে হিসাব দেয়ার পালা। নেতারা কে কি করছেন সে প্রশ্ন সেখানে অবান্তর। মুসলিম হিসাবে ইসলামি দলের নেতার যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি দায়িত্ব রয়েছে প্রতিটি নাগরিকেরও। অধিকাংশ মানুষ পঙ্গু নয়, নিঃস্ব নয়, শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিকল বা বোধশূণ্যও নয়। ফলে দায়শূণ্যও নয়। ইসলামের বিজয়ে যে সব সাহাবায়ে কেরাম তাদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন তাদের চেয়ে আজকের মুসলিমদের শারীরিক ও আর্থিক যোগ্যতা কি কম? বাড়ী-গাড়ি, বিদ্যাশিক্ষা ও বাঁচবার আয়োজন বরং তাদের চেয়ে সমৃদ্ধতর। ফলে বিচার দিনে এ প্রশ্ন উঠবেই, তাদের তুলনায় বিনিয়োগটি কই?

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: “ছুম্মা লা’তুসআলুন্না ইওয়ামা’ইজিন আনিন্নায়ীম।” অর্থ: “অতঃপর সেদিন এ প্রদত্ত নিয়ামতের ব্যাপারে অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে।” -(সুরা তাকাছুর, আয়াত ৮)। এ জীবন, এ মেধা, এ সময়, এ সহায়-সম্পদ – সব কিছুই মহান আল্লাহতায়ালার দান। এগুলি যেমন নিজ সৃষ্টি নয়, তেমনি কোন নেতা বা শাসকের দানও নয়। ফলে মহান আল্লাহ-প্রদত্ত এ নেয়ামত খরচ হওয়া উচিত ছিল তাঁরই রাস্তায়। অথচ সেটি বিনিয়োগ হচ্ছে ইসলামের শত্রুপক্ষকে ক্ষমতাসীন করার কাজে। মুসলিমগণ এভাবে পরিণত হয়েছে শয়তানের সাহায্যকারীতে। তাদের শ্রম, রাজস্ব ও ভোটদানের ফলেই তাদের মাথার উপর বসে আছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির আধিপত্য। শুধু মুখে কালেমা পাঠ করলে কি সাক্ষ্যদান হয়? সাক্ষ্য দিতে হয় প্রতিটি কর্ম, কথা ও লেখনী দিয়ে। সাক্ষ্য দিবে তাদের গড়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠান। আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের পক্ষে এরূপ লাগাতর সাক্ষ্যদানের মধ্যে দিয়ে প্রতিটি সত্যের পক্ষে সাক্ষ্যদান তখন  মোমেনের জীবনে অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন বিলুপ্ত হয় মিথ্যা। এবং পরাজিত হয় মিথ্যার পক্ষের শক্তি। সভ্যতর ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র তো এভাবেই গড়ে উঠে।

 

বিনিয়োগ শত্রুর বিজয়ে

শুধু আয়ের পথটি হালাল হলে চলে না। ব্যয় বা বিনিয়োগের পথটিও শতভাগ হালাল হতে হয়। হারাম আয়ের যেমন কঠোর শাস্তি আছে, তেমনি কঠোর শাস্তি আছে হারাম বিনিয়োগেরও। অথচ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুসলিমদের পাপটি বিশাল। বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে তাদের অর্থ, মেধা, শ্রম এবং সময়ের বিশাল বিনিয়োগ হচ্ছে ইসলামের শত্রুপালনে ও শত্রুর বিজয়ে। এটি পাপের এক বিশাল খাত। এ বিনিয়োগের কারণেই বাংলাদেশে ইসলাম আজ পরাজিত। দেশটিতে যারা ইসলামের বিপক্ষ শক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তাদেরকে অর্থ দেয় ও সমর্থণ দেয় -এমন অনেকেই যারা নামায পড়ে এবং রোযা রাখে। মুসলিম রূপে পরিচয় দিতে তাদের অনেকে গর্ববোধও করে। অথচ মুসলিমদের দায়ভার শুধু হারাম পানাহার, সূদ, ঘুষ বা মুর্তিপূজার ন্যায় পাপ থেকে বাঁচা নয়; বাঁচতে হয় হারাম রাজনীতি ও হারাম সংগঠন থেকেও। কারণ জাহান্নামে নেয়ার বাহন রূপে কাজ করে সে রাজনীতি ও সংগঠনও।

কিন্তু বাংলাদেশের মুসলিমগণ নিজেদের অর্থদান, শ্রমদান ও মেধাদানে যেসব শিক্ষা, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়েছে – ইসলামের বিজয়ে সেগুলির অবদান কতটুকু? বরং দেশ জুড়ে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির বিজয়ের মূল কারণ তো এগুলিই। এরূপ বিনিয়োগের কারণেই গড়ে উঠেছে শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া কর্মীর নামে একপাল পথভ্রষ্ট মিথ্যাজীবী। টানছে জাহান্নামের পথে। দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ও আদালত তো এদের দ্বারাই পরিপূর্ণ। এ বিনিয়োগে শুধু রাষ্ট্রের ব্যর্থতাই বাড়ছে না, বাড়ছে জনগণের পাপের অংকটাও। এতে আযাব শুধু দুনিয়াতেই বাড়ছে না, প্রশস্ততর হচ্ছে আখেরাতের আযাবের পথও। মানব জীবনে এর বড় বিপর্যয় আর কি হতে পারে?

 

বিপদ পাওনা শাস্তির

কিসে কল্যাণ আর কিসে মহা অকল্যাণ -সে জরুরি বিষয়টিও যেন মুসলিম চেতনা থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। এ জীবন ব্যর্থ হওয়ার জন্য কি এরূপ ভাবনাশূণ্যতাই যথেষ্ট নয়? এর চেয়ে বড় আযাবই বা কি হতে পারে? তবে যারা মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত দায়ভারের কথা ভূলে যায়, এরূপ আত্মবিস্মৃতিই যে পাওনা শাস্তি -সে প্রতিশ্রুতি তো এসেছে পবিত্র কোর’আনে। শাস্তির সে প্রতিশ্রুতি শোনানো হয়েছে সুরা হাশরের ১৯ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, “এবং তোমরা তাদের মত হয়োনা যারা ভূলে গিয়েছিল আল্লাহকে তথা মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতাকে, অতঃপর তাদেরকে ভূলিয়ে দেয়া হলো নিজ কল্যাণ চিন্তাকে।”

মুসলিমগণ যে মহান আল্লাহতায়ালকে ভূলেছে এবং ভূলেছে মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতাকে -সে প্রমাণ তো প্রচুর। সে ভূলে থাকার কারণেই বাংলাদেশের ১৭ কোটি মুসলিম নিজেদের অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্তের বিনিয়োগটি তাঁর শরিয়তকে বিজয়ী করার জন্য করে না। বরং তারা ভোট দেয়, অর্থ দেয় এবং রক্ত দেয় তাদের বিজয়ী করতে -যারা ইসলামকে পরাজিত রাখতে চায়। মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ তাদের চেতনায় সামাত্যম অবশিষ্ঠ থাকলে কি এরূপ আচরণ শোভা পেত? যাদের চেতনা থেকে এভাবে বিলুপ্ত হয় মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে বিজয়ী করা এবং তাঁর নামকে বড় করার ভাবনা -তারা কি তাঁর রহমত পায়? বরং তাদেরকে তিনি ভূলিয়ে দিবেন তাদের নিজদের কল্যাণের ভাবনা এবং প্রশস্ত করবেন জাহান্নামে পথ -সেটিই তো প্রতিশ্রুত শাস্তি। সে শাস্তি যে কতটা গ্রাস করেছে সে প্রমাণই কম? যারা জান্নাতের যাত্রী, ঈমান, নেক-আমল ও জিহাদ নিয়ে বাঁচাটি তাদের জীবনে আমৃত্যু সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। আর যারা জাহান্নামের যাত্রী, তাদের সংস্কৃতি হয় পাপের প্লাবনে ভাসা। প্রশ্ন হলো, চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, গুম, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ ও সন্ত্রাসের ন্যায় অসভ্যতার প্লাবনে ভাসাই যাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতি -তাদেরকে স্থান কি কখনো জান্নাতে হয়? মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর পবিত্র জান্নাত কি এরূপ পাপা ভাসা লোকদের দিয়ে পূর্ণ করবেন? ১ম সংস্করণ ২৭/০৪/২০০৭; ২য় সংস্করণ ৩১/১২/২০২০।




একাত্তরের গণহত্যা (তিন)

যে কাহিনী শুনতে নেই (০৭)

সংগ্রহে: কায় কাউস

================

কাপ্তাই হত্যাকান্ড

০১.                                                                                                               

“… ২৫ মার্চ রাত ১১টার দিকে আমি যখন ঘুমানোর চেষ্টা করছি, তখন আমার টেলিফোন বেজে ওঠে। এত রাতে টেলিফোন বেজে ওঠা মোটেও স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু আমরা একটা অস্বাভাবিক সময় পার করছিলাম। তাই যেকোনো কিছুই প্রত্যাশিত ছিল। আমার অফিসের ব্যক্তিগত সহকারী মুজিবুল হক ফোনটি করেছিল। তখন তার কাজ ছিল কাপ্তাইয়ের একমাত্র টেলিফোন এক্সচেঞ্জটিতে বসে সমস্ত কলের নজরদারি করা। উত্তেজিত কন্ঠে সে আমাকে বলল, ‘চট্টগ্রাম থেকে টেলিফোনে এইমাত্র খবর এসেছে যে, শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এবং ইয়াহিয়া খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ঢাকায় ভীষণ লড়াই চলছে।’

চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হান্নান খবরটি প্রচার করেছেন। ভীত হয়ে আমি জানতে চাইলাম ব্যাপারটা ক্যাপ্টেন হারুনকে জানানো হয়েছে কি না। মুজিবুল জানাল, বুথে যে বাঙালি সুবেদার ছিল, সে খবরটি জানাতে ছুটে গেছে।

 … ওদিকে খবর পেয়েই ক্যাপ্টেন হারুন চৌধুরী ছুটে যান ইপিআর শিবিরে। তিনি তখন সেকেন্ড ইন কমান্ড। মেজর পীর মোহাম্মদ কোনো কিছু আঁচ করতে পারার আগেই হারুন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। তবে কেউ হতাহত হয়নি। এনসিওদের অস্ত্র সংবরণ করিয়ে পিছমোড়া করে হাত বেঁধে একটি বিশাল কক্ষে আটকে রাখা হয়। 

 … অল্পক্ষণের মধ্যেই মেজর পীর মোহাম্মদের বাড়িটি ইপিআর জওয়ানরা ঘিরে ফেলে এবং তিনি গৃহবন্দী হন। বিদ্রোহ সম্পন্ন হয়ে যায় এবং কাপ্তাইয়ে আমাদের জন্য পিছু ফেরার কোনো উপায় ছিল না। আর আমরা তখনো জানি না, ঢাকায় কী হচ্ছে। সবকিছুই হচ্ছিল জনাব হান্নানের কাছ থেকে পাওয়া একটিমাত্র টেলিফোন-বার্তার মাধ্যমে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে অনুভব করলাম, আমরা ভীষণ বিপদের মধ্যে আছি।

 … ২৬শে মার্চ রাত দুইটার (২৫ মার্চ দিবাগত) কয়েক মিনিট পর আরেকটা ফোন এল। এক্সচেঞ্জ থেকে অপারেটর আমাকে জানাল যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে। আসলে তাৎক্ষণিক বিপদটা কেটে গেছে। কিন্তু আমরা অনেক বড় ও প্রলম্বিত বিপদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম, যে ধরণের বিপদের মোকাবিলা জীবনে আমরা অনেকে কখনো করিনি।

 … আমার বাসা থেকে ইপিআরের ক্যাম্প ১০০ মিটারের মতো। ৫০-৬০ জন লোকের ছোটখাটো ভিড় চোখে পড়ল। দেখলাম, ইপিআরের অবাঙালি জওয়ানদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের পিছমোড়া করে রাখা হয়েছে। তারা অসহায়ের মতো প্রাণভিক্ষা চাইছিল। আমাদের মতো তাদেরও জীবন মূল্যবান। হঠাৎ কেউ একজন আমার হাত থেকে টর্চলাইটটি নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। এর পরই আবার হইচই। ইপিআরের একজন অবাঙালি দৌড়ে পালিয়ে ঝোপের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিল। তাকে ধরে নিয়ে আসা হলো ক্যাপ্টেনের কাছে। ক্যাপ্টেন হারুন তার রিভলবারটি বের করে ওর বুকে ঠেকিয়ে গুলি করতে উদ্যত হলেন। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে লোকটি ক্যাপ্টেনের পা জড়িয়ে ধরল। এ যাত্রায় প্রাণে রক্ষা পেলেও কয়েক দিন পরই সে মৃত্যুবরণ করে।

পাকিস্তানি সৈনিকদের হত্যা করা সহজ ছিল না। কয়েক শ প্রাণঘাতী ৩০৩ বুলেট ছুড়তে হয়েছিল ব্যাংক ভবনের প্রথম তলায়। এখানে নিরস্ত্র, অনাহারী পাকিস্তানি এনসিওদের ইন্টার্নির জন্য রাখা হতো। গোলাগুলিতে ভবনের চেহারাটা জলবসন্ত রোগীর মতো হয়ে গিয়েছিল। তারপরও সেনারা আত্মসমর্পণ করেনি। তারা জানত যে আত্মসমর্পণ করতে বাইরে এলেই দরজার সামনে তাদের হত্যা করা হবে। শেষ পর্যন্ত দুজন লোক সাহস করে টিনের চালের ছাদে গিয়ে ওঠে। তাদের একজন ছিল মোল্লা নামের এক বদমাশ লোক। তারা দুতিনটা টিন তুলে ফেলে ভেতরে গুলি চালায়। অবশ্য অনাহারে লোকগুলো এমনিতেই কয়েক দিন পর মারা যেত। কয়েকজন বুদ্ধিমান লোক দ্রুত ভবনের ওপর নতুনভাবে আস্তর করে দিল, যেন বোঝা না যায় গুলি চালানো ও হত্যাকান্ড হয়েছে। আর পাকিস্তানি সেনারা যে আসবে এবং শহরে যাকেই পাবে, তার ওপর প্রতিশোধ নেবে, সেটাও সবার জানা ছিল। ১৭টি মৃতদেহ সেতুর পেছনে ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়। নিকটবর্তী কুষ্ঠ হাসপাতাল থেকে মরণাপন্ন কুষ্ঠ রোগীদের এনে এখানে রাখা হতো।

ইপিআর ক্যাম্পে জড়ো হওয়া স্থানীয় লোকজন অস্থির ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। এরকম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে কী করতে হয়, সে বিষয়ে কারোরই কোনো ধারণা ছিল না। রাতের অন্ধকার থাকতেই ইপিআরের লোকজন তাদের অস্ত্র ও ব্যাগ নিয়ে ট্রাকে চেপে কাপ্তাই ত্যাগ করে। পরে আমি মেজর রফিকের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম, তিনি চট্টগ্রাম থেকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন হারুনকে তার বাহিনী নিয়ে যোগদান করার জন্য। আর তাই ক্যাপ্টেন হারুন দ্রুত কাপ্তাই থেকে চলে যান। চট্টগ্রামে যাওয়ার আগে তিনি বন্দী পাকিস্তানি জওয়ানদের স্থানীয় পুলিশ ও জঙ্গি লোকজনের তত্ত্বাবধানে রেখে যান। যাওয়ার আগে তিনি কাপ্তাইয়ের নিরাপত্তার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেননি আর কখনোই কাপ্তাইয়ে ফিরে আসেননি। 

 … ২৯ মার্চ ইপিআরের দুজন জওয়ানকে নিয়ে স্থানীয় কিছু লোক পীর মোহাম্মদের বাড়ির সামনে জড়ো হয় তাকে হত্যা করার জন্য। … আমরা ইপিআরের জওয়ানদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে মেজরকে হত্যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। কেননা, পশ্চিম পাকিস্তানেও আমাদের প্রায় ৩০ হাজার সৈনিক রয়েছে। এখানে বন্দী পাকিস্তানি সেনাদের যদি আমরা হত্যা করি, তাহলে পাকিস্তানিরাও প্রতিশোধ নেবে। এর জবাবে আমাদের বলা হলো, ‘হাইকমান্ড থেকে মেজরকে হত্যার নির্দেশ এসেছে। এর বেশি কিছু আমরা জানি না। আমরা বন্দীদের নিয়ে যেতেও পারি না। আমরা তাদের নিয়ে কী করব?’

মেজর পীর মোহাম্মদ অবশ্য বুঝতে পেরেছিলেন যে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। তিনি জানতেন যে তার সেনারা বিদ্রোহ করতে পারে। এটাও বুঝেছিলেন যে তার সহকর্মীরা নিহত হয়েছে। দেশে সেনা অভিযানের এবং যুদ্ধাবস্থার খবরও নিশ্চয়ই বেতারের মাধ্যমে তিনি পেয়েছিলেন। 

জওয়ানরা যখন বাড়ি ঘিরে ফেলেছে, তখন তিনি বাইরে বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে এক ট্রাংকবোঝাই অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ। তিনি বললেন যে, তিনি শহীদ হতে প্রস্তুত ছিলেন। তার বদলে তিনি আত্মসমর্পণ করতে চান। তার এই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলো। দুই হাত ওপরে তুলে পিছু ফিরে দাঁড়াতেই প্রথম গুলিটা ছোড়া হলো। দ্বিতীয় গুলিতে তিনি সিঁড়িতে রক্তের ধারার ওপর পতিত হলেন। মিসের পীর মোহাম্মদ ভেতর থেকে তাদের দত্তক নেয়া বাঙালি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। এক মুহুর্ত থমকে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো স্বামীকে দেখলেন। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন হত্যাকারীদের দিকে। তাদের রাঙামাটি নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি লঞ্চ আগেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। সেটাতেই তারা গিয়ে উঠলেন। এরপর আমি আর তাদের কোনো খবরই জানতে পারিনি। মৃত্যুর আগে পীর মোহাম্মদ হয়তো তার হত্যাকারীদের ওপর গুলি চালাতে পারতেন। তবে নিজের স্ত্রী-কন্যার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি তা করেননি।

 … পরের দুই সপ্তাহ ছিল ভয়াবহ। যেখানেই অবাঙালিদের দেখা মিলছিল, সেখানেই তাদের ঘিরে ধরে হত্যা করা হচ্ছিল। ইপিআর ও পুলিশের কিছু লোক এই হত্যাকান্ড চালাচ্ছিল। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল স্থানীয় কিছু লোক। এদের মধ্যে দুজন রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে হত্যাযজ্ঞে নেমেছিল। এদের একজন হলেন আবদুল জব্বার। তিনি অবশ্য পরে ভারতে মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত হন তার অপকর্মের জন্য। অপরজন শুক্কুর আলী ছিলেন কাপ্তাই বাজারের মাংস বিক্রেতা। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের হত্যাকান্ডের পর তিনি কাপ্তাইয়ের বড় রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন। কাপ্তাই বন থেকে টিক কাঠ বিক্রি করে প্রচুর অর্থেরও মালিক হন। যারা এই হত্যাকান্ডের পরিণতি সম্পর্কে বুঝতে পেরেছিল, তারা পার করছিল একটা আতঙ্কজনক সময়। তবে পাকিস্তানি সেনাদের মতো এই হত্যাকারীরাও ছিল নির্লিপ্ত।

মৃত্যুর আগে গাজী উদ্দিন খান পাঠান নামের এক ঠিকাদার আর্তচিৎকার করে বলেছিল, ‘ওরা আমার কাছে টাকা চেয়েছিল। আমার যা কিছু ছিল, সবই ওদের দিয়েছি। আর এখন ওরা আমাকে মেরে ফেলছে।’ হত্যাকান্ড চলছিল। আবাসিক কলোনীর নারী ও শিশুরা হত্যাকান্ড দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। আমরা যেন নরকের অধিবাসী হয়ে গিয়েছিলাম। 

একদিন এক অবাঙালি শুধু কোমরে একটা কাপড় জড়ানো অবস্থায় কোথা থেকে যেন উদয় হলো। ও কিছু বলতে পারার আগেই কয়েকজন লোক ‘গুপ্তচর গুপ্তচর’ বলে চিৎকার করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি কোনোমতে তাকে মারা পড়ার হাত থেকে বাঁচালাম। তার কাছে জানতে চাইলাম, সে কে। কিন্তু সে কোনো কথা বলতে পারছিল না। হাতে একটা খালি পাত্র ছিল। বুঝতে পারলাম, সে বেশ কয়েক দিন ধরে কিছু খায়নি। তাই খাবারের জন্য ভিক্ষা করতে বেরিয়েছে। খেয়াল করলাম, তার দাঁতগুলো খুব পরিষ্কার। মনে হলো, সমাজের উঁচু তলারই মানুষ। কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছে। এক তরুণ তাকে নদীর ওপারে অবাঙালি শিবিরে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু অত দূর হেঁটে যাওয়ার শক্তি তার অবশিষ্ট ছিল না। আবার যাওয়ার পথেই কোনো বীরপুরুষ হয়তো তাকে শেষ করে দিত। তারপরও তাকে যেতে দেওয়া হলো। আমি ভেবেছিলাম, সে শিবিরে পৌঁছালেও বাঁচতে পারবে না।

দু’তিনদিন পর ওই লোকটাকে আবার আমাদের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। তার শরীরের চামড়া আরও বেশি করে হাড্ডীর সঙ্গে লেগে গেছে। আমি বুঝতে পারলাম না কী করব। পাকিস্তানি সেনারা যখন আসবে, তখন সে নিশ্চয়ই আমাকে দেখিয়ে দেবে। কেননা, আমাকে রাইফেল নিয়ে চলাফেরা করতে দেখেছে। আমি কাঁধ থেকে রাইফেলটা নামিয়ে তার বুক বরাবর তাক করলাম। লোকটা দুই হাত ওপরে তুলতেও পারছিল না। বিড়বিড় করে কী বলতে চাচ্ছিল, ‘চালাও গুলি, আমি আর পারছি না। আমার সব গেছে। এখন আমাকেও শেষ করে দাও।’ অথবা হয়তো প্রাণভিক্ষা চাইছিল। 

আমি একটু থমকে গেলাম। ভাবলাম যে কয়েক দিন আগেই জাভেদকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলাম, আর এখন নিজের নিরাপত্তার জন্য আরেকজনকে হত্যা করতে যাচ্ছি! শেষ পর্যন্ত রাইফেলটা নামিয়ে নিলাম। একটা বড় ঝুঁকি নিয়ে ফেললাম। সন্ধ্যার সময় ফিরে এসে ভাবলাম, লোকটাকে কিছু খাবার দেব, যেন সে অনাহারে না মরে। কিন্তু তাকে আর খুঁজে পেলাম না। ধারণা করলাম, শান্তিতে মরার জন্য হয়তো কাছের কোনো জঙ্গলে চলে গেছে। লোকটাকে বাঁচাতে পারলাম না বলে খুব খারাপ লেগেছিল। তবে চার দশক পর এটা মনে করে ভালো লাগে যে তাকে আমি গুলি করিনি। যদি আজও সে বেঁচে থাকে, তাহলে হয়তো আমাকে মনে করবে – অন্তত ঘৃণার সঙ্গে নয়।

 … দিনে ও রাতে বাস বোঝাই করে ইপিআরের সদস্যদের সীমান্ত এলাকা থেকে সরিয়ে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। অবাঙালি ইপিআরের সদস্যরা তাদের বাঙালি সহকর্মীদের হাতে নিহত হয়। অনেককে হাত-পা বেঁধে খাদের পানিতে ফেলে দেওয়া হয় বলেও শুনতে পাই। রাতে যখন তারা বাস-ট্রাকে চেপে চট্টগ্রামে রওনা হতো, তখন যে আওয়াজ হতো, তা ছিল রীতিমতো রোমহর্ষক। 

 … যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম, তা বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। প্রতিটি মুহুর্তেই পাকিস্তানি সেনাদের আগমন আতঙ্ক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। আমাদের কোনো ধরণের শক্তি আর অবশিষ্ট ছিল না।অবাঙালিদের হত্যা করার পর আমাদের নৈতিক শক্তিও ফুরিয়ে গিয়েছিল। তাদের অনেককেই আমরা ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। আমাদের কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও ছিল না।

 … এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কাপ্তাই, চন্দ্রঘোনা ও আশপাশের অবাঙালিরা প্রায় সবাই ইপিআরের লোকজন ও তাদের সহযোগীদের কব্জায় চলে আসে। এরপর তাদের হত্যা করা হয়। এটা যেন সেই উগ্র জাতীয়তাবাদের আরেক পিঠ, যেখানে নির্মমতা ও অন্ধত্ব মিশ্রিত হয়ে আছে। হত্যাকান্ড থেকে বেঁচে যাওয়া পুরুষ, নারী ও শিশুদের নিয়ে বড় ধরণের সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমে তাদের কিছু পুরোনো ঘরে রাখা হয়। আর অভিজাত পরিবারের সদস্যদের ঠাঁই মেলে বিদেশিদের থাকার ছোট ছোট বাংলোয়। ১৩ এপ্রিল তৃতীয়বারের মতো আমরা যখন জায়গা বদল করি, তখন এরকম একটি বাংলোয় উঠি। 

আমাদের কেউ কেউ অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এই ভেবে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এলে কী ভয়ংকর প্রতিশোধ গ্র্হণের ঘটনা ঘটতে পারে। তাতে অবশ্য পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে হত্যাকারীরা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। এরা বেশির ভাগই কাপ্তাইয়ের বাইরে থাকত। আর তাই আমরাসহ যারা কাপ্তাইয়ে থাকি, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের তেমন কোনো চিন্তা ছিল না। এর মধ্যে ঠিক করা হয়, নিহত ব্যক্তিদের স্ত্রী ও সন্তানদের দূরে সরিয়ে রাখা হবে। এ জন্য লেকের মধ্যে ছোট্ট একটা দ্বীপে কয়েক বস্তা আটাসহ তাদের ফেলে আসা হবে, যেন পাকিস্তানি সেনারা এসে স্বগোত্রীয় বিধবা ও নিগৃহীত নারী ও শিশুদের দেখতে না পায়। আমি জানি না, এই নিষ্ঠুর পরিকল্পনা কে বা কারা করেছিল। তবে একাধিকবার চিন্তাভাবনার পর এটা বাদ দেওয়া হয়। ফলে একটা বিরাট অপরাধ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। অনেক বছর আগে ছাত্রাবস্থায় আমি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাসের ভিত্তিতে তৈরি করা “ফর হুম দ্য বেল টোলস” ছবি দেখেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, বাস্তব জীবনে আমি সেই চলচ্চিত্রটাই যেন দেখছি। এবার ঘন্টা আমাদের জন্যই বাজছিল।

 … এক বছর পর বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে সরকারি সফরে আমি আবার কাপ্তাই যাই, তখন নিহত অবাঙালিদের পরিবারের নারী-শিশুদের সেখানে দেখতে পাই। তাদের জন্য কেউই আর কিছু করেনি। অনেক তরুণী এমন জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়, যা কোনো মেয়ে স্বেচ্ছায় বেছে নেবে না। আমরা যখন কোলাহলপূর্ণ পাঠান কলোনি অতিক্রম করছিলাম, তখন বিদ্যুৎ বোর্ডের প্রধান ডব্লিউ চৌধুরী বলছিলেন, ‘যারা এই অবস্থা সৃষ্টি করেছে, খোদাতা’আলা তাদের শাস্তি দেবেন।’ ওই দিন সকালেই মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে হত্যাকারীদের নেতা নিজেকে বড় একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করে এবং বলে যে যুদ্ধে তার সহায়-সম্পত্তি ও হাজার হাজার টাকা খোয়া গেছে। সে সরকারের কাছে ক্ষতিপুরণও দাবি করে। তবে আমি জানতাম, সে খুব সাধারণ একজন মানুষ, তার তেমন কিছুই ছিল না। শুধু কাপ্তাই বাজারে একটা মাংসের দোকান ছিল।

 … গোটা পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে আমি বিরাট একটা ঝুঁকি নিয়ে ফেলি। তাই যন্ত্রচালিত একটি দেশি নৌকায় করে ৮ এপ্রিল রাঙামাটির দিকে রওনা দিই । … তবলছড়ী ঘাটে নেমে আমি সরাসরি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও আমার বন্ধু এম ই শরিফের বাসভবনে গেলাম। … শরিফ বলল, আগরতলা জেলা প্রশাসনের অনুরোধে তৌফিক ইমাম সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানীতে যান আলোচনার জন্য। সেখানে দুই দিন থেকে আগের সন্ধ্যায় ফিরে এসেছেন। … জানতে পারলাম, মিসেস ইমাম সন্তানসম্ভাবা, সময়ও অনেক এগিয়ে এসেছে। তাই তারা দু-তিন দিনের মধ্যে আগরতলায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।

শফিক আমাকে যা বলেছিল, ইমাম সাহেবও আমাকে সেই একই কথা বললেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের সেনারা পরাজিত হয়েছে ও পিছু হটেছে। আর তাই প্রতিরোধ পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তার পরই গোটা প্রদেশ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। আমি তাকে আমাদের এলাকা কাপ্তাই ও চন্দ্রঘোনায় নির্বিচারে অবাঙালি নিধন ও আমাদের উদ্বেগের কথা জানালাম। এভাবে অবাঙালি হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে প্রশাসন কেন নিষ্ক্রিয় ছিল, তা-ও জানতে চাইলাম। এর জবাবটা দিলেন আলী সাহেব। তিনি বললেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে এটা করা হয়েছে। তারা আগরতলা থেকে এই নির্দেশ দিয়েছিল।’ 

 … আমরা নিশ্চিত ছিলাম, ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী কাপ্তাই আক্রমণ করবে। তারপরও আরেকটা দিন নিরাপদে কেটে গেল। আমাকে কাপ্তাই ছাড়তেই হচ্ছিল। কেননা, আমার মতো পেশার মানুষকে পাকিস্তানিরা ১ নম্বর শত্রু বলে চিহ্নিত করে। আবার আমার সুইডিশ ইনস্টিটিউটের কিছু ছাত্র সক্রিয়ভাবে আন্দোলনেও জড়িয়ে পড়েছিল। ইনস্টিটিউটের বাস ও গাড়ি ব্যবহার হচ্ছিল বিদ্রোহীদের চলাচলের জন্য। শহরের প্রবেশমুখে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে ইনস্টিটিউটের লরি নিয়ে যাওয়া হয়।

ইনস্টিটিউটের প্রাঙ্গণে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তবে সবচেয়ে খারাপ কাজ হয়েছিল, অবাঙালি নিধনে ইনস্টিটিউটের প্রাঙ্গণ ব্যবহার করা। হত্যা করার পর তাদের মৃতদেহগুলো ইনস্টিটিউটের খেলার মাঠ সংলগ্ন জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়। দুটি বাস ভর্তি করে অবাঙালিদের চন্দ্রঘোনা থেকে এনে নামানো হয় এবং একজন একজন করে হত্যা করা হয়। কয়েক শ মিটার দূরে আমি অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হত্যাকান্ড দেখে অদূরে স্টাফ কোয়ার্টার ভবন থেকে নারী-শিশুদের আর্তচিৎকার আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। দুই দিন পর মৃতদেহগুলোয় পচন ধরায় বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ডি-৮ বুলডোজার এনে মাটি ও বালুর সঙ্গে মরদেহগুলোকে মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। মৃত্যুর আগে অনেকেই তাদের টুপি-তসবিহ ও কোরআন শরিফ একটা বাক্সে রেখে দেয়। ভালো মুসলমান হিসেবে তারাও আমাদের মতো আল্লাহর দয়া চেয়েছিল। তাদের সেই প্রার্থনা মঞ্জুর হয়নি। 

 … শরীরে শাড়ি প্যাঁচানো এক নারীকে একাকী হেঁটে আসতে দেখলাম। সে যেন সম্পূর্ণ উদভ্রান্ত হয়ে গেছে। মিসেস হামুদুর রহমান নিশ্চয়ই স্রষ্টাকে দুষছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দেরিতে পাঠানোর জন্য। তার স্বামী ও দুই ছেলেকে ইপিআর স্থানীয়দের সহযোগিতায় হত্যা করেছিল। হামুদুর ছিলেন একজন বাঙালি। এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে। মিসেস হামুদুর হত্যাকারীদের কাছে এই বলে অনেক কাকুতি-মিনতি করেছিলেন, যেন দুই ছেলের একজনকে রেহাই দেওয়া হয় পরিবারকে দেখাশোনা করার জন্য। তাতেও কাজ হয়নি। হামুদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি তার পকেট ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা সদর দপ্তরে গোপনে খবর পাঠাতেন। আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধির স্তর এরকমই ছিল ! পরিবারটি তাদের এমন একজন মানুষকে হারাল, যার কোনো ধারণাই ছিল না যে আশপাশে কী হচ্ছে। সেই সঙ্গে হারাল দুই ভাইকে। বিধবা মাকে নিয়ে অল্প বয়সী মেয়েটি বেঁচে রইল, যে কিনা চমৎকার রবীন্দ্রসংগীত গাইত। বেঁচে রইল শোক করার জন্য॥”

— ফারুক আজিজ খান (প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব, মুজিবনগর) / বসন্ত ১৯৭১ : মুজিবনগর সরকারের কেন্দ্র থেকে দেখা মুক্তিযুদ্ধ ॥ [ প্রথমা প্রকাশন – মার্চ, ২০১৫ । পৃ: ৩৮-৬৮ ]

০২.

“… ২৬-৩০শে এপ্রিল, ১৯৭১। কর্নফুলী পেপার ও রেয়ন মিলস, চন্দ্রঘোনা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা। ব্যাপক লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকান্ড অনুষ্ঠিত হয়। মেয়েদের ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। উদ্ধার করার পর তারা অবর্ণনীয় ধর্ষণ ও বর্বরতার কাহিনী বর্ণনা করে। হতাহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। 

 ২৭-৩০শে এপ্রিল, ১৯৭১। রাঙ্গামাটি। রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানীদের একত্রিত করে নির্যাতন ও হত্যা করাহয়।পাঁচশ লোক প্রাণ হারায়॥”

 তথ্যসূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র / সম্পা : বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ॥ [ আগামী প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৩ । পৃ: ১৪৩ ]

 

০৩.

“…পয়ষট্টিতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩৫ বছরের ওয়াজিহুন্নিসার স্বামী কেন্দ্রীয় শুল্ক বিভাগে চাকরি করতেন। তার পোস্টিং ছিল চন্দ্রঘোনায়। ওয়াজিহুন্নিসা তাদের শহরে ১৯৭১ সালের মার্চে সংঘটিত অবাঙালি হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন:

“১৯৭১ সালে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের এলাকায় বাড়িতে এসে অবাঙালিদের আশ্বস্ত করে যে, অস্ত্র সমর্পণ করা হলে তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না। আমার ভদ্রলোক স্বামী তাদের নির্দেশ মেনেনেন এবং তার অস্ত্র সমর্পণকরেন। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে আওয়ামী লীগের ভ্রাম্যমাণ সশস্ত্র লোকেরা অবাঙালিদের আতঙ্কিত করে তোলে এবং তাদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে। তারা পালানোর সব ক’টি রাস্তা বন্ধ করে দেয়।

২৬ মার্চ আওয়ামী লীগের একটি সশস্ত্র গ্রুপ আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে এবং আমার স্বামীকে তাদের কার্যালয়ে যাবার নির্দেশ দেয়। আমি জানতাম যে, এটা হচ্ছে একটি ছুঁতা এবং তারা আমার স্বামীর রক্তের জন্য পিপাসার্ত।

২৭ মার্চ আরেকদল সশস্ত্র লোক আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে। তারা আমাকে এবং আমার স্বামীর তিন ভাইকে জানায় যে, রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক আমাদেরকে নিরাপত্তা প্রদানে তার কার্যালয়ে নিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা যাত্রা শুরু করলে সশস্ত্র লোকেরা আমাকে বন্দুকের ডগার মুখে ফিরে যাবার নির্দেশ দেয়। তারা আমার দেবরদের দড়ি দিয়ে বেঁধে ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়। বিকালে একদল উন্মত্ত বাঙালি জনতা আমাদের এলাকায় হামলা চালায় এবং অবাঙালিদের বাড়িঘর লুট করে। আমাদের পুরুষদের অপহরণ করা হয়। একদল লোক আমার বাড়ি ভাঙচুর করে এবং সিলিং ফ্যান ও ওয়ার্ডড্রপ ছাড়া সবকিছু লুট করে। তারা অবাঙালি মহিলা ও শিশুদেরকে গরু-ছাগলের মতো তাড়িয়ে একটি বিশাল ভবনে নিয়ে যায়। আমাদেরকে সেখানে অবস্থান করার নির্দেশ দেয়া হয়। ১৫ দিন আমরা অনাহারে ছিলাম। আমরা আল্লাহর সহায়তা কামনা করি। ১৩ এপ্রিল আমাদের আটককারীরা জানতে পারে যে, পাকিস্তানি সৈন্যরা চন্দ্রঘোনার দিকে এগিয়ে আসছে। বিদ্রোহীরা আমাদেরকে লাইনে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয়। আমরা জানতাম যে, তারা আমাদের ওপর গুলি চালাবে। আমাদের কয়েকজন পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। তাতে বিশৃঙ্খ লা দেখা দেয়। হঠাৎ একটি গোলা এসে পতিত হয় এবং আমাদেরকে যেখানে রাখা হয়েছিল সেখান থেকে কয়েক গজ দূরে গোলাটি বিস্ফোরিত হয়। আমরা দূরে তাকিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের একটি কোম্পানিকে সবুজ ও অর্ধ চন্দ্রাকৃতির নিশান উড়িয়ে আমাদের দিকে ধেয়ে আসতে দেখলাম।আমাদের আটককারীরা ভীত হয়ে পড়ে এবং ইঁদুরের মতো পালিয়ে যায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের পানি ও খাবার দেয়। তারা চন্দ্রঘোনায় আরেকটি শিবিরে আটক ২শ’ অবাঙালি মহিলা ও শিশুকে মুক্ত করে।আমরা জানতে পারি যে, বিদ্রোহীরা চন্দ্রঘোনা থেকে যেসব অবাঙালিকে অপহরণ করেছিল তাদেরকে হত্যা করে লাশ কর্ণফুলি নদীতে ফেলে দিয়েছে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরকে চট্টগ্রামে একটি ত্রাণ শিবিরে ঠাঁই দেয়। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনী চট্টগ্রাম দখল করে নেয়ার পর তারা অবাঙালি হত্যাকাণ্ড এবং তাদের ধ্বংস সাধনে মেতে উঠে। শীতকালে আমার ছোট মেয়ে ঠাণ্ডায় আক্রাত্ত হয়। কোনো হাসপাতাল বিহারীর সন্তানকে চিকিৎসা প্রদানে সম্মত হয়নি। সে আমার কোলে মৃত্যুবরণ করে। কয়েকদিন পর আমাকে রেডক্রসের একটি শিবিরে তোলা হয়। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি করাচিতে প্রত্যাবাসন করি।”

চট্টগ্রামের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে যে, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে বাঙালি বিদ্রোহীরা কর্ণফুলি পেপার ও রেয়ন মিল লুট করে এবং অবাঙালি স্টাফ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে। খুব কমসংখ্যক লোক পালাতে সক্ষম হয়। পিতা অথবা স্বামীকে হত্যা করার পর শত শত অবাঙালি যুবতীকে অপহরণ কর হয়। বাঙালি বিদ্রোহীরা অপহৃত অবাঙালি যুবতীদের ধর্ষণ করার পর হত্যা করে। হিসেব করে দেখা গেছে যে, ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে চন্দ্রঘোনায় ৫ হাজারের বেশি অবাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। এ সংখ্যা পাকিস্তান সরকারের হিসেব থেকে অনেক বেশি। পাকিস্তান সরকার আগস্টে পূর্ব পাকিস্তান সংকটের ওপর প্রকাশিত শ্বেতপত্রে চন্দ্রঘোনায় অবাঙালিদের মৃত্যুর সংখ্যা ৩ হাজার উল্লেখ করা হয়েছিল। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বিদ্রোহী সৈন্যরা কর্ণফুলি পেপার মিলের যাবতীয় নগদ অর্থ লুট করে এবং বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণ পরিশোধ করায় কয়েকজন সিনিয়র স্টাফ সদস্যকে রেহাই দেয়।

রাঙ্গামাটি হলো নৈসর্গিক দৃশ্য সম্বলিত পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি মনোরম শহর। চট্টগ্রাম থেকে ৪৫ মাইল দূরে কর্ণফুলি নদীর তীরে এ শহর অবস্থিত । ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহের অগ্নিশিখা এ শহরকে গ্রাস করে এবং এখানে শত শত অবাঙালিকে হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা রাঙ্গামাটিতে বসবসকারী সকল অবাঙালিকে আটক করে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী এসে পৌঁছানোর আগে তাদের হত্যা করে। একসময় রাঙ্গামাটি সার্কিট হাউজে দুর-দূরান্তের পর্যটকরা ভিড় করতো। বিদ্রোহীরা এ সার্কিট হাউজকে তাদের অপারেশনাল ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। এখান থেকে বিদ্রোহীরা চন্দ্রঘোনা ও রাঙ্গামাটিতে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতো।

ছিষট্টিতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩৪ বছরের আবিদ হোসেন কর্ণফুলি পেপার মিলে চাকরি করতেন।মিলের আশপাশে কোনো স্টাফ কোয়ার্টার না পাওয়ায় তিনি রাঙ্গামাটিতে একটি বাড়িতে বাস করতেন। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি স্ত্রীসহ করাচিতে প্রত্যাবাসন করেন। আবিদ হোসেন তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

১৮ মার্চ কর্ণফুলি পেপার মিলে প্রথম বড় ধরনের হামলার সূত্রপাত হয়।সেদিন আওয়ামী লীগের জঙ্গি সমর্থকরা অবাঙালি স্টাফ ও তাদের পরিবারকে হত্যা এবং মিল দখল করার জন্য বাঙালি শ্রমিকদের উত্তেজিত করে। পরিণতি আঁচ করতে পেরে আমি আমার বাড়িতে ছুটে যাই এবং আমি আমার স্ত্রীসহ একজন ধার্মিক ও বিশ্বস্ত বাঙালি বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেই।

১৯৭১ সালে পুরো মার্চ জুড়ে আওয়ামী লীগের লোকজন অবাঙালিদের ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলে এবং হত্যার জন্য বহু অবাঙালিকে অপহরণ করে। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে বাঙালি বিদ্রোহীরা সকল অবাঙালিকে আটক করে এবং স্কুল ভবনগুলোতে তাদের জড়ো করে। সেনাবাহিনী এসে পৌঁছানোর আগে আটককৃতদের গুলি করে হত্যা করা হয়। সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের হটিয়ে দেয়ার পর আমি চট্টগ্রামে এক বন্ধুর বাড়িতে স্থানাস্তরিত হই। রাঙ্গামাটিতে এসে আমি কদাচিৎ অবাঙালিদের দেখতে পাই। রাঙ্গামাটিতে আওয়ামী লীগের সহিংসতা থেকে কয়েকজন পালাতে সক্ষম হয়। এসব লোক ১৯৭১ সালের এপ্রিলে চাকমা উপজাতীয় বস্তিতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার পর তাদেরকে ফের রাঙ্গামাটিতে ফিরিয়ে আনা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিদ্রোহীরা রাতের অন্ধকারে ট্রাক বোঝাই লাশ কর্ণফুলি নদীতে নিক্ষেপ করতো। বহু লাশ বঙ্গোপসাগরে ভেসে যায়। বিদেশি জাহাজের ক্রু ও যাত্রীরা সাগরে ভাসমান অসংখ্য লাশ দেখেছে॥”

— ব্লাড এন্ড টীয়ার্স / কুতুবউদ্দিন আজিজ (মূল: Blood and Tears । অনু: সুশান্ত সাহা) ॥ [ ইউপিপি – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৭৯-




পাশ্চাত্য দেশে যে মহাসংকট মুসলিমদের

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বিপদ স্রোতে ভেসে যাওয়ার

অনৈসলামিক দেশে বসবাস যে কতটা বিপদজনক -তা পাশ্চাত্য দেশগুলোতে ইতিমধ্যেই ফলতে শুরু করেছে। বানের জলে ভাসার চেয়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্লাবনে ভাসার বিপদ যে কম নয় -সে বিষয়টি এখন সুস্পষ্ট। বানের জলে ক্ষেতের ফসল ও গরুছাগল ভেসে যায়, কিন্তু এখানে ভেসে যাচ্ছে তাদের নিজের ও নিজ সন্তানদের ঈমান-আখলাক, রুচিবোধ ও সংস্কৃতি। ফলে ভেসে যাচ্ছে পরকাল। পরকাল হারানোর চেয়ে বড় বিপদ মানব জীবনে আর কি হতে পারে? অথচ সে মহাবিপদই মুসলিমদের ঘিরে ধরেছে। পরকাল বাঁচাতে মুসলিমগণ নিজেদের ঈমান-আখলাক, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ বাঁচায় এবং সেগুলো বাঁচাতে আলাদা রাষ্ট্র গড়বে, ভিন্ন কম্যুনিটি ও প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিবে এবং এ কাজে অর্থদান ও শ্রমদানের পাশাপাশি লড়াই করবে -সেটিই ছিল কাঙ্খিত। যুগে যুগে মুসলিমগণ তাই করেছে। অথচ পাশ্চাত্য দেশগুলিতে সেগুলোর কিছুই হচ্ছে না। বরং ঈমান-আখলাক ও সংস্কৃতি বাঁচাতে নয়, নিছক পানাহারে বাঁচার প্রয়োজনে মুসলিমগণ পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে ঈমান বিসর্জন দিচ্ছে। ভুলে যাচ্ছে নিজেদের ধর্ম, রুচিবোধ ও সংস্কৃতি। এটি কি কম আতংকের?

শংকার আরো কারণ, অধিকাংশ মুসলিমের মনে এ ভাবে স্রোতে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে কোন দুশ্চিন্তাও নেই। বিপদ বোঝার মত বোধশক্তিও নেই। তাদের দুশ্চিন্তা বরং পাউন্ত-ডলারের কামাই কি করে আরো বাড়ানো যায় -তা নিয়ে। উপার্জন বাড়াতে অনেকে মদবিক্রয়, রেস্তোঁরায় মদ সরবরাহের ন্যায় হারাম পথও ধরেছেন। অনেকে নানারূপ দুর্নীতিতেও নেমেছে। মুসলিমদের পচন যে কত গভীরে পৌঁছেছে -এসব হলো তারই প্রমাণ। উদ্ভিদও বেড়ে উঠার জন্য অনুকূল পরিবেশ চায়। বীজ যত উত্তমই হোক তা পাথরের উপর বা মরুভূমিতে গজায় না। ঝোপঝাড়েও বেড়ে উঠে না। একই কারণে অনুকূল পরিবেশ অপরিহার্য মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার জন্যও। তেমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতেই নবীজী (সা:) মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। এবং মদিনার বুকে সর্বপ্রথম যে কাজটি করেছিলেন -সেটি হলো ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্টা। এবং নিজে রাষ্ট্রপ্রধানের  আসনে বসে সেটিকে এক শ্রেষ্ঠ সূন্নত রূপে প্রতিষ্টা দিয়েছিলেন। তাঁর সাহাবাদের জান ও মালের সবচেয়ে বেশী কোরবানী পেশ করতে হয়েছে সে রাষ্ট্রের শক্তি বাড়াতে ও প্রতিরক্ষা দিতে। মুসলিমগণ তাদের গৌরব কালে যে ভাবে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিলেন -তার মূলে ছিল এ ইসলামী রাষ্ট্র। রাষ্ট্র না গড়ে শুধু মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়ে কি সেটি সম্ভব  হতো? অথচ ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও আদর্শের তীব্র স্রোতে বীজ ছিটিয়ে মুসলিমগণ ভাবছে তাদের নতুন প্রজন্ম সুন্দর ভবিষ্যৎ পাবে!

 

স্রোতে ভাসা কি মুসলিমের সাজে?

অন্যদের বাঁচা আর মুসলিমদের বাঁচা এক নয়। মুসলিম উদ্ভিদ নয়, অন্য জীবজন্তু বা পশুপাখিও নয় যে শুধু জন্মালো, কিছু খেলো, কিছুকাল বাঁচলো এবং মরে গেল। মুসলিম নিছক বাঁচার জন্য বাঁচে না। মরার জন্যও মরে না। মুসলিমের বাঁচা ও মরা –উভয়ের মধ্যেই সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকে। তাঁকে বাঁচতে হয়, প্রতি পদে ইবাদত নিয়ে। বাঁচতে হয় সিরাতুল মুস্তাকীম বেয়ে। মরতে হয় মহান আল্লাহ-প্রদত্ত মিশনকে নিয়ে। তাই কোন একটি দেশে বাঁচলেই চলে না, ইসলামের মিশনটি নিয়ে সেদেশে বাঁচাটি কতটা নিশ্চিত -ঈমানদারকে সে বিষয়কেও গভীর ভাবে খতিয়ে দেখতে হয়। নিছক বাঁচার স্বার্থে সাইবেরিয়ার পাখিরা শীত কালে হাজার হাজার মাইল উড়ে অন্য দেশে পাড়ি দেয়। পাখির বাঁচাতে রাজনীতি, আদর্শ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি লাগে না। কিন্তু সেরূপ বাঁচাটি কি ঈমানদারের লক্ষ্য হতে পারে? মুসলিমদের পরিচয়টি সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির। সে বিশেষ মর্যাদাটি স্রেফ পানাহারে বাঁচার কারণে নয়, বরং মিশন নিয়ে বাঁচার কারণে। সেটি হলো, “আ’মিরু বিল মারুফ” তথা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং “নেহী আনিল মুনকার” তথা অন্যায়ের নির্মূল। লক্ষ্য, উচ্চতর সভ্যতার নির্মাণ। এরূপ একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বাঁচা ও মরার কারণেই মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের “খায়রুল উম্মাহ” তথা সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ রূপে অভিহিত করেছেন। তবে এ কাজের জন্য তাঁরা মহান আল্লাহতায়ালার কারিগর মাত্র, আর্কিটেক্ট বা ডিজাইনারও নন। কিভাবে সে সভ্যতা নির্মিত হবে সেটির ডিজাইন ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। কোরআন পাক তো সে নির্দেশনারই কিতাব।

রাসূলে পাক (সা:) নিজ হাতে দেখিয়ে গেছেন, পবিত্র কোর’আনে বর্ণীত সে নির্দেশনাগুলো কি করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে কার্যকর করতে হয়। মুসলিমের প্রতি মুহুর্তের ব্যস্ততা হলো, এ মিশনকে বিজয়ী করা। সে বাঁচে, এবং বাঁচার জন্য কিছু উপার্জন করে শুধু এ মিশন চালিয়ে যাওয়ার জন্য। সে জ্ঞানার্জন করে, ঘর গড়ে, কখনো ঘর ছেড়ে হিজরত করে -নিছক সভ্যতর সমাজ নির্মাণের স্বার্থে। এটিই ঈমানদারের জিহাদ। তাই মুমিনের জীবনে শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত থাকে না, লাগাতর জিহাদও থাকে। এ জিহাদ নিজের ও অন্যদের ঈমান ও আমল বাঁচানোর। এরূপ অবিরাম জিহাদ থাকার কারণেই মুসলিমগণ তাই অনৈসলামিক সমাজে হারিয়ে যায় না, বরং অন্যরা হারিয়ে যায় তাদের সৃষ্ট সমাজে।

পানি ছাড়া যেমন মাছ বাঁচে না, মুসলিমও তেমনি বাঁচে না ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি ছাড়া। তাই একজন হিন্দু, চৈনীক বা খৃষ্টান যত সহজে ভিন্ দেশে খাপ খাইয়ে নেয়, কোন মুসলিম তা পারে না। শক, হুন, বৈদ্ধ, জৈন প্রভৃতি ধর্মের লোকেরা ভারতের হিন্দু সমাজে হারিয়ে গেলেও মুসলিমগণ যে হারিয়ে যায়নি -তার কারন তো এটিই। মুসলিমগণ যেখানেই গেছে সেখানেই তাঁরা মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথ ধরে কোর’আনের জ্ঞান-নির্ভর ইসলামী ধারার জন্ম দিয়েছে। এরূপ একটি ভিন্ন ধারা জন্ম দেয়ার মধ্যেই নিশ্চিত হয় মুসলিমের ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকাটি। নইলে হারিয়ে যেতে হয়। বহু অমুসলিম দেশে মুসলিমগণ বিপুল সংখ্যায় হারিয়ে যাচ্ছে বস্তুত একটি ইসলামী ধারা জন্ম দেয়ায় ব্যর্থ হওয়াতে।

 

যাত্রী জাহান্নামমুখি জাহাজের

ইসলামের শত্রুপক্ষ চায়, মুসলিমগণ নিজেদের ভিন্নধারাটি বিলুপ্ত করুক এবং হারিয়ে যাক সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিমদের “মেল্টিং পট”য়ে। এরূপ হারিয়ে যাওয়াকে তারা বলে সামাজিক ইন্ট্রিগ্রেশন। মুসলিমদের উদ্দেশ্যে পাশ্চত্যের দেশগুলোর এটিই হলো সরকারি নীতি। এরূপ নীতির বাস্তবায়নের মাঝে তারা নিজ সমাজের প্রগতি ভাবে। এ নীতির বাস্তবায়নে সরকারি স্কুল-কলেজের পাশাপাশী কাজ করছে শত শত এনজিও। এ লক্ষ্যে বাঁধা রূপে মনে করা হয় মসজিদ-মাদ্রাসার ন্যায় ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ফলে বন্ধ করা হয় মসজিদ-মাদ্রাসার ন্যায় ইসলামী প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল মাক্রন সেদেশের ৭০টির বেশী মসজিদে তালা লাগিয়েছে। তবে এ নীতি শুধু পাশ্চাত্য দেশগুলোর নয়; একই নীতি আন্যান্য অনেক অমুসলিম দেশেরও। কম্যুনিস্ট শাসনামালে বহু হাজার মসজিদে  তালা লাগিয়েছে সোভিয়েত রাশিয়া ও চীন। ইসলাম ও মুসলিম সংস্কৃতির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার লক্ষ্যেই চীন সরকার লক্ষ লক্ষ মুসলিম সন্তানদের তাদের পিতামাতা থেকে ছিনিয়ে নির্বাসন কেন্দ্রে তুলেছে। মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস বা দুর্বল করা হচ্ছে ভারতে। লক্ষ্য একটাই, মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকে বাধাগ্রস্ত করা। অমুসলিম দেশে বসবাসের এটিই হলো সবেচেয়ে ভয়াবহ বিপদ। এটি এমন এক জাহাজে চড়ে বসার ন্যায় -যার লক্ষ্য জাহান্নামের দিকে।    

উনুনের পাশে রাখলে পাথরের ন্যায় শক্ত বরফও গলে যায়। সেটি হয় উত্তপ্ত পরিবেশের কারণে। তেমনি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার পরিবেশও ব্যক্তিকে পাল্টে দেয়। হাদীসপাকে বলা হয়েছে, সকল শিশুর জন্ম হয় মুসলিম রূপে, কিন্তু পরিবেশের প্রভাবে তারা বেড়ে উঠে ইহুদী, নাসারা, মুর্তিপূজারী বা অন্যধর্মের অনুসারী রূপে। তাই অনৈসলামিক দেশের কুফরি পরিবেশে মুসলিম সন্তানেরা মুসলিম হিসাবে বেড়ে উঠবে -সেটি কি এতই সহজ? বিষয়টি স্রোতের উজানে লাগাতর সাঁতার কাটার মত। সাঁতারে ঢিল দিলে ভেসে যেতে হয়। সেরূপ ভেসে যাওয়া থেকে বাঁচতেই নিজের অনুকূলে স্রোত সৃষ্টি করতে হয়। সেজন্য ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে হয়। পানাহারের অভাবে কেউ জাহান্নামে যাবে না, কিন্তু সেটি অনিবার্য হয় অনৈসলামের স্রোতে ভাসাতে। এবং সেটি আরো সহজ হয় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র না থাকাতে।

 

হিযরত কেন ফরজ?

মুসলিম অভিভাবককে তাই শুধু পানাহারে হালাল-হারাম নিয়ে ভাবলে চলে না। ভাবতে হয় নিজের ও নিজ সন্তানের জন্য শিক্ষা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিয়েও। এজন্যই মুসলিমগণ অতীতে সবদেশে বসতি গড়েনি। যেখানে বসত গড়েছে সেখানকার শিক্ষা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকে নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা করেছে। ভারত ও স্পেনের মত দেশে সংখ্যা লঘিষ্ট হয়েও তারা রাজনীতিকে নিজ হাতে নিয়েছে। এমন কি পশু-পাখি, জীবজন্তুও উপযোগী পরিবেশ ছাড়া বাসা বাঁধে না।

অন্য জীবের কাছে গুরুত্ব পায় স্রেফ দৈহিক ভাবে বাঁচা। কিন্তু ঈমানদারকে শুধু দৈহিকভাবে বাঁচলে চলে না, তাঁকে বাঁচতে হয় ঈমান নিয়ে। এবং সেরূপ বাঁচায় ব্যক্তির নিজস্ব সামর্থ্যই যথেষ্ট নয়, সে জন্য জরুরি হলো দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আদর্শিক ও শিক্ষার পরিবেশ থেকে লাগাতর পুষ্টি। সে পুষ্টি যোগ হয় ঈমানের ভূমিতে। অনৈসলামিক রাষ্ট্রে সেটি অসম্ভব। তেমন একটি সহায়ক পরিবেশ পেতে ইসলামী রাষ্ট গড়া মুসলিম জীবনে এজন্যই এতো গুরুত্বপূর্ণ। জিহাদ এ জন্যই অনিবার্য হয়ে উঠে। এ জিহাদ মূলত ঈমান নিয়ে বাঁচা ও নিজেদের আখেরাত বাঁচানোর লড়াই। ইসলামি রাষ্ট্র গড়া অসম্ভব মনে হলে মুসলমান সেখানে বসতি না গড়ে বরং সে দেশ থেকে হিজরত করে। নামাজ রোজা, হজ্ব-যাকাতের ন্যায় হিজরতও তখন ফরজ ইবাদতে পরিণত হয়।

অনৈসলামিক দেশে আবাদী গড়ার যে ধারণা -সেটি সাম্প্রতিক। অমুসলিমের রাইফেল কাঁধে নিয়ে যুদ্ধে নামা বা তাদের কামানে গোলা ভরা বা কারখানায় শ্রমিক হওয়া বা জাহাজে কয়লা ঢালার যে ঐতিহ্য -সেটিও এযুগের। একাজে তারাই নেমেছে যাদের কাছে দৈহিক ভাবে বাঁচাটাই অধিক গুরুত্ব পেয়েছে, ঈমান নিয়ে বাঁচাটি নয়। এতে শক্তি বেড়েছে ইসলামের শত্রু পক্ষের, মুসলিমদের নয়। এখনও অমুসলিম শক্তিবর্গ সে লক্ষ্যেই মুসলিমদের ব্যবহার করতে চায়। অন্যদের স্বর্ণখনি বা তেলের খনির লুন্ঠনের ন্যায় এরা এখন মুসলিম দেশের মেধার খনিকেও কাজে লাগাতে চায়। দ্বীনের কাজে মুসলিমদের দেশত্যাগ অহরহ হলেও অতীতে সেটি কখনোই অমুসলিম দেশে রুজীরোজগারের জন্য হয়নি। অথচ রুটি রুজীর জন্য আজকের মুসলিমগণ এমন ভাবে নিজ ঘরাড়ী ছাড়ছে -যা শুধু আগুন লেগেছে এমন ঘর বা জাহাজ থেকে ঝাপিয়ে পড়া মানুষের সাথেই তুলনা চলে। মুসলিমদের আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যোগাযোগহীন সে যুগে জন্মভূমি ইরাক ছেড়ে সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর ও হেজাজের পথে পথে ঘুরেছেন। হাজার হাজার মাইল তিনি এভাবে ভ্রমন করেছেন। সে দেশত্যাগে রুজী-রোজগার গুরুত্ব পেলে স্ত্রী ও শিশু পুত্রকে নিয়ে তিনি কখনই মক্কার বিজন মরুভূমিতে হাজির হতেন না। অর্থের লোভে কুফুরি পরিবেশে নিজেকে সঁপে দেয়া নবীরাসুলের সুন্নত নয়। রেযেকের জন্য মুসলিমদের তাওয়াক্কুল সব সময়ই মহান আল্লাহতায়ালার উপর। মুসলিমের বাঁচবার লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রুপে দায়িত্বপালন। সে দায়িত্বপালন কি বৈরী পরিবেশে আত্মসমর্পণে বা বসবাসে হয়? বেঁচে থাকার জন্য অবশ্যই রোজগার করতে হয়। তবে রোজগারের জন্যই বাঁচতে হবে এবং সে লক্ষ্যে সকল সামর্থ্য নিয়োগ করতে হবে -সেটি কি ঈমানদারি? সেটি তো নিছক দুনিয়াদারি। এবং কোনটি ঈমানদারি আর কোনটি দুনিয়াদারি -অন্ততঃ এ দুটি বিষয়ে মুসলিমদের সম্যক উপলব্ধি প্রয়োজন। এ মৌলিক বিষয়ে অজ্ঞতা নিয়ে কে জান্নাতের পথে চলা যায়?

 

কুশিক্ষা ও অপসংস্কৃতির নাশকতা

শিক্ষা-সংস্কৃতির সৃষ্টিশীলতা যেমন বিশাল, তেমনি অতি ভয়ংকর হলো কুশিক্ষা ও অপসংস্কৃতির নাশকতা। নির্ভর করে কি উদ্দেশ্য নিয়ে শিক্ষানীতি প্রণীত হলো -তার উপর। যারা আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানদের নির্মূল করলো, হিটলারের গ্যাসচেম্বারে ইহুদীদের পুড়িয়ে মারলো, জাপানে পারমানবিক বোমা ফেললো এবং আফগানিস্তান ও ইরাকে দুই লাখের বেশী মানুষকে হত্যা করলো -তারা বনে জঙ্গলে বেড়ে উঠেনি। নিরক্ষরও ছিল না। তারা বেড়ে উঠেছিল একটি বিশেষ শিক্ষানীতি ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মানুষকে পশুর চেয়েও কত অধিক হিংস্র করতে পারে –এ হলো তারই উদাহরণ। পাশ্চাত্য দেশসমুহে মুসলিমদের বিপদের সবচেয়ে বড় কারণ হলো, কুশিক্ষা ও অপসংস্কৃতি। এ শিক্ষাই জন্ম দিয়েছে বর্ণবাদ, ঔপনিবেশবাদ, জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদের ন্যায় নৃশংস মতবাদ। তাই বিপদ শুধু ঈমান বিলুপ্তির নয়, জাতিগত বিলুপ্তিরও। শত শত মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়েও স্পেনে ৭ শত বছরের মুসলিম শাসন বাঁচেনি। বরং সম্পূর্ণ নির্মূল হতে হয়েছে। বাঁচতে হলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির জগতে বাঁচার স্ট্রাটেজী নিয়ে বাঁচতে হয়। থাকতে প্রবল প্রতিরক্ষার স্ট্রাটেজী। থাকতে হয় জিহাদের স্পিরিট। ইতিহাসের শিক্ষা তো সেটিই। কিন্তু পাশ্চাত্য দেশে বসবাসকারী মুসলিমদের মাঝে সে সবের বালাই নাই। ডলার-পাউন্ড কামাই ছাড়া তাদের তেমন কোন উচ্চতর ভাবনা নাই। যেন হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই তাদের তৃপ্তি।

চেতনা, চরিত্র ও সমাজ পরিবর্তনে শিক্ষা ও সংস্কৃতি হলো শক্তিশালী হাতিয়ার। পাশ্চাত্যে দেশে এ হাতিয়ার দুটি ইসলামের বিরুদ্ধে যেমন আগ্রাসী, তেমনি ঈমান- বিনাশীও। শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপাদানগুলি এতোই শক্তিশালী যে সংখ্যালঘুরা তাতে নিজ পরিচয় হারিয়ে বিলীন হতে বাধ্য। পাশ্চাত্য দেশের কর্ণধারগণ এজন্যই মুসলিমদের ধর্মান্তর নিয়ে ভাবে না, তারা চায় কালচারাল কনভার্শন। একাজে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো শক্তিশালী হাতিয়ার। উপনিবেশিক শাসনামলে ভারতবর্ষে এমন শিক্ষাব্যবস্থা শুরু করতে গিয়ে ব্রিটিশ শিক্ষামন্ত্রী লর্ড মেকলে বলেছিলেন, “এ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা শিক্ষিত হয়ে বেরুবে তারা শুধু রক্ত-মাংসেই ভারতীয় হবে, মন-মানসিকতায় হবে বৃটিশ।” লর্ড মেকলে আসলে এখানে অসত্য বলেছেন। লক্ষ্য আদৌ চিন্তা-চেতনা ও মন-মানসিকতায় ইংরেজ বানানো ছিল না। সেটি ছিল ব্রিটিশের গোলাম ও তাদের ঔপনিবেশিক স্বার্থের সেবাদাস বানানো। তারই ফল হলো, এমন কি কংগ্রেস নেতা করম চাঁন্দ গান্ধি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলা কালে ব্রিটিশ বাহনীকে বিজয়ী করতে ভারতীয় মাঝে সৈন্য সংগ্রহে নেমেছিলেন।

মানুষ তার সময়, শ্রম, মেধা তথা জীবনের শ্রেষ্ঠ সামর্থ্য কোথায় বিনিয়োগ করবে এবং সে বিনিয়োগের কাজে কোন দেশে বা কোন ফ্রন্টিয়ারে যাবে -সে নির্দেশটি পায় তার চেতনা ও মন-মানসিকতা থেকে। মন-মানসিকতায় বৃটিশের গোলাম হওয়ার অর্থ, বৃটিশের পক্ষে যুদ্ধ লড়া বা বৃটিশ সমাজে বিলুপ্ত হওয়াকেই তারা যথার্থ ভাববে। সে চেতনায় নিজ ধর্ম ও নিজ দেশের চেয়ে বৃটিশ স্বার্থের প্রতি অঙ্গিকার হয় অধিক। যে সব মুসলমান ১৯১৭ সালে বৃটিশ বাহিনীতে শামিল হয়ে উসমানিয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে ক্রসেড লড়েছিল -তারা ছিল এ শিক্ষানীতিরই ফসল। উল্লেখ্য যে, দুই লাখের অধিক ভারতীয় মুসলিম প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করেছিল। তাদের মাঝে বাংলার কাজী নজরুল ইসলামও ছিলেন। বায়তুল আকসা, ইরাক, সিরিয়া দখল করে বৃটিশের হাতে তুলে দেয়াকে এরা গর্বের কাজ মনে করেছিল। আজও মার্কিন নেতুত্বে যে ক্রুসেড শুরু হয়েছে সে ক্রসেডে বহু মুসলিম দেশ যে তাদের পক্ষ নিচ্ছে তার কারণ তো এ ইসলামশূণ্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি। মানুষকে বিবেক শূণ্য, ধর্মশূণ্য ও দেশপ্রেমশূণ্য করার কাজে শিক্ষানীতি যে কতটা সর্বনাশা ভূমিকা পালন করতে পারে -এ হলো তার নজির।

 

বিপদ “মেল্টিং পট”য়ের

শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজ রূপান্তরের যে শক্তিশালী প্রক্রিয়া পশ্চিমা সমাজে ক্রিয়াশীল -সমাজ বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় “মেল্টিং পট ফেনোমেনা”। উনুনের উচ্চতাপে কড়াইয়ের আলু, পটল, মরিচ, বেগুন যেমন একাকার হয়ে যায়, পাশ্চাত্য সমাজের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ায় তেমনি একাকার হয়ে যাচেছ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগণ। শিক্ষাই জীবনে পথ দেখায়। পাপ-পুণ্য ও শিষ্ঠ-অশিষ্ঠের সংজ্ঞা দেয় এবং সেসাথে ব্যক্তিকে দেয় বিশিষ্ঠ পরিচয়। হাওয়ায় যেমন প্রাসাদ গড়া যায় না, শিক্ষাছাড়া তেমনি ঈমানও গড়ে উঠে না। পবিত্র কোর’আনের সর্বপ্রথম ওহীটি হলো, “ইকরা” অর্থাৎ পড় তথা জ্ঞানবান হও। মহান আল্লাহতায়ালা নিজে শপথবাণী উচ্চারণ করেছেন কলম ও কলম দিয়ে যা লেখা হয় তার নামে -(সুরা কলম)। বিদ্যালাভ ও শিক্ষার গুরুত্ব যে কত অধিক মহান আল্লাহতায়ালার এ ঘোষনা থেকে সেটিই সুস্পষ্ট।

অপরদিকে সংস্কৃতি হলো ব্যক্তির কর্মে, চরিত্রে, চৈতন্যে ও রুচিবোধে সংস্কারের প্রক্রিয়া। কিন্তু পাশ্চাত্যের দেশসমুহে শিক্ষা ও সংস্কৃতি -এ দুটির কোনটিই ইসলামের পক্ষে নয়, বরং শিকড় কাটছে ঈমানের। ফলে মুসলিম সন্তানদের পক্ষ্যে ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠাই দিন দিন দুরুহ হচ্ছে। সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্ম অভ্যস্থ করছে অশ্লিলতা ও বিবাহ-বহির্ভুত যৌনতায়। বাড়ছে মাদকাসক্তি, বাড়ছে নানারূপ পাপাচার। ফলে এসব দেশে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে মুসলিমদের দর্শন ও জীবনবোধে। তাওহীদ, রেসালাত, আখেরাত, ইবাদত ও খেলাফতের যে মৌলিক কোর’আনী  ধারণা -সেগুলি এ শিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু অজানাই থাকছে না বরং চেতনা থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে। নিছক কোরআনের তেলাওয়াত শিখিয়ে বা কিছু ওয়াজ শুনিয়ে কি চেতনার এ বিচ্যুতি দুর করা যায়? যাচ্ছেনা। ফলে সময়ের তালে বরফ যেমন হাওয়ায় হারিয়ে যায়, লক্ষ লক্ষ মুসলিম যুবকও তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে অমুসলিম সমাজে। মাঝে মধ্যে দুয়েকজন অমুসলিমের মুসলিম হওয়ার যে আনন্দ -তা কি লাখ লাখ মুসলিম সন্তানের হারিয়ে যাওয়ার বেদনাকে লাঘব করতে পারে?

চেতনায় আরেক গভীর বিচ্যুতি হলো শিক্ষার গুরুত্ব ও তার উদ্দেশ্য নিয়ে অজ্ঞতা। শিক্ষার উদ্দেশ্য নিছক উপার্জনের কৌশল শেখানো নয়। সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, শিষ্ঠ-অশিষ্ঠ চিনতে যে শিক্ষা সাহায্য করে না -তা কি আদৌ শিক্ষা? এমন শিক্ষায় কি ঈমান গড়ে উঠে? আসে কি নেক আমলে প্রেরণা? শিক্ষা হবে প্রতি পদে সত্য-মিথ্যা চেনা ও হেদায়াত লাভের হাতিয়ার, নিছক উপার্জনের নয়। উপার্জনের কৌশলাদী আবু লাহাব বা আবু জেহেলের কম জানা ছিল না। কিন্তু তাদেরকে শিক্ষিত বলা হয়নি। আবু জেহেলকে বরং মুর্খের পিতা বলা হয়েছে। কারণ তার বিদ্যা সত্যাপোব্ধির সামর্থ্য বাড়ায়নি। পাশ্চাত্যের শিক্ষায় শিক্ষিতদের উপার্জন বাড়ছে বটে, তবে তাতে তাদের ঈমানও কি বাড়ছে?  বাড়ছে না, বরং উল্টোটি হচ্ছে। পাশ্চাত্যে মুসলিম শিশুরা ধর্মান্তরিত হচ্ছে না বটে, তবে লাখে লাখে যে নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে –সেটি তো এ কারণেই। এটিই হলো কালচারাল কনভার্শন। এরই ফলে মুসলিম সন্তানদের চরিত্র ও চাল চলনে ইসলামের নামগন্ধ থাকছে না।

এরূপ বিপর্যের মূল কারণ, শিক্ষাদানের ন্যায় ফরজ কাজটিই পাশ্চাত্যের মুসলিমদে মাঝে যথার্থ ভাবে হচ্ছে না। অথচ শিশুদের শিক্ষাকে সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিটি মুসলিমের। ঘরবাড়ী, রাস্তাঘাট, যানবাহন বা কলকারখানাগুলো অমুসলিমদের দিয়ে তৈরী করিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু সন্তানদের মুসলিম রূপে গড়ে তোলার কাজটি একান্তই তাদের নিজেদের। অমুসলিদের দিয়ে এটি করাতে গেলে বিপদটি ভয়াবহ। এতে বিদ্যা-হাসিলের ফরজ বিধানটি আদায় হয় না। তুরস্ক, পাকিস্তান ইত্যাদি মুসলিম দেশগুলি সামরিক ও বেসামরিক অফিসারদের প্রশিক্ষণের দায়ভার যেদিন থেকে পাশ্চাত্য দেশগুলিতে গেল, তাদের ধ্বংসের গতিও তখন থেকে বেড়ে গেল। বিদ্ধস্ত হলো উসমানিয়া খেলাফত, খন্ডিত ও বিপর্যস্ত হলো বড় বড় মুসলিম দেশগুলি। কারণ চেতনায় দূষিত চেতনার প্রবেশ ঘটাতে শিক্ষাব্যবস্থা পাইপ লাইনের কাজ করে। অন্যকে প্রভাবিত করার এটিই শক্তিশালী মাধ্যম। আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের পিতা-মাতা ও নেতা-নেত্রী। তারা সুশিক্ষা না পেলে তাদের সন্তানেরাও পাবে না। পিতা-মাতার দায়িত্ব শুধু সন্তানের দেহের খাদ্য জোগানো নয়, বরং মনের খাদ্যকেও সুনিশ্চিত করা। এটির উপরই নির্ভর করে তার ঈমান পুষ্টি পাবে কি পাবে না, সে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠবে কি উঠবে না – এসব গুরুত্বপুর্ণ বিষয়গুলো। কিন্তু পশ্চিমা দেশে সে সুযোগ সামান্যই। ফ্রান্সে মেয়েদের মাথায় স্কার্ফ পড়াকে যেভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাতে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার বিষয়টি তাদের কাছে কতটা অপছন্দের -সেটি কি গোপন থাকে?

তবে মুসলিম রূপে টিকে থাকা বা বেড়ে উঠার স্বার্থে বিক্ষিপ্ত ভাবে চেষ্টা যে হচ্ছে না -তা নয়। কিন্তু এর সুফল কতটুকু? বিষাক্ত পানির প্লাবনে যে ব্যক্তি ডুবতে বসেছে তাকে দুয়েক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করিয়ে কি বাঁচানো যায়? ঔষধ সারা জীবন খাওয়ার বস্তু নয়, এতে স্বাস্থ্য বাঁচে না। বরং এর জন্য দূষিত পানি থেকে পরিত্রাণ চাই; এবং নিয়মিত বিশুদ্ধ খাদ্য-পানীয় চাই। তেমনি মুসলিমদের ঈমানী স্বাস্থ্যের জন্য সুশিক্ষার ও সু-সংস্কৃতির পবিত্র পরিবেশ চাই। এজন্যই ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ চাই। কিন্তু সেটি কি পাশ্চাত্যে সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই এখানে মুসলিমদের জীবন নিরাপদ নয়। এ কঠিন বাস্তবতা অবশ্যই বুঝতে হবে।

                                  

উদ্ধার কীরূপে?

পাশ্চাত্য দেশে মুসলিমদের উদ্ধারের পথ খুব একটা বেশী নেই। বরং শংকার কারণ হলো, মুসলিমগণ উদ্ধার পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে পাশ্চাত্য দেশে আসেনি। ফলে উদ্ধার পাওয়া নিয়ে তাদের  ভাবনাও তেমন একটা নাই। প্রচেষ্টাও তেমন নাই। উদ্ধারের পথ নয় বরং যে পথটি নিশ্চিত নিমজ্জনের -সেটিই বহু মুসলিম বেছে নিয়েছে। এ পথের পথিকেরা পাশ্চাত্য সমাজে ইন্টিগ্রেটেড তথা একাত্ব হওয়া নিয়ে ব্যস্ত। তারা তাই খরচের খাতায়। মুক্তির পথ মাত্র দুইটি। প্রথমটি, কবি আল্লামা ইকবাল(পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা), মুহাম্মদ আসাদ (জার্মান নওমুসলিম, প্রখ্যাত সাংবাদিক, তাফসির লেখক ও বুদ্ধিজীবি যিনি পাকিস্তানে হিজরত করেছিলেন এবং জাতিসংঘে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদুত ছিলেন) ও পারমানবিক বিজ্ঞানী ড. আব্দুল কাদের খানের (যিনি পাকিস্তানকে পারমানবিক শক্তিতে পরিণত করেছেন) পথ। তাদের পথ হলো, পশ্চিমা দেশ থেকে যা কিছু শেখার তা দ্রুত শিখে একটি মুসলিম দেশে তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে সে দেশের উন্নয়নে লেগে যাওয়া। দ্বিতীয় পথটি হলো, মিশনারীর পথ। অমুসলিম দেশে অবস্থান একমাত্র এ পথেই জায়েজ হয়। যুগে যুগে মুসলিমগণ এ পথেই বাংলা, ভারত, বার্মা, মালয়, ও আফ্রিকার নানা দেশে অনৈসলামিক সমাজে না হারিয়ে ঈমান-আমল নিয়ে বেঁচে থাকতে পেরেছিলেন। মিশনারি কাজ চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে তাদের প্রয়োজন হবে উপার্জনের। উপার্জনের প্রয়োজনে হালাল ব্যবসা বা চাকুরি মাধ্যম হতে পারে। তবে  নিছক উপার্জনের স্বার্থে এদেশে থাকা শুধু অর্থহীনই নয়, অতি বিপদজনকও।

সাংস্কৃতিক বা আদর্শিক স্রোতে হয় উজাতে হয়, নইলে ভেসে যেতে হয়। সব সময় একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। মিশনারি স্পিরিটই মুসলিমদেরকে দিতে পারে পাশ্চাত্যের প্রচন্ড স্রোতে উজানে ছুটার শক্তি। কারণ এরূপ মিশনারীরাই চিন্তা-চেতনা ও কর্মে ভিশনারী হয়। তাদের দৃষ্টিতে সদা জাগ্রত থাকে মহান আল্লাহতায়ালার সান্যিধ্যে সফলকাম হয়ে পৌঁছার প্রচন্ড বাসনা। মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করাই তখন তাদের একমাত্র সাধনা হয়। এ বাসনা ও সাধনাতেই তাদের জীবন অবিশ্বাস্য শক্তি ও অদম্য গতি পায় –  যেমনটি ছিল রাসুলে পাকের (সা) সাহাবীদের মাঝে। সে অদম্য গতিতে তারা নানা দেশে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ছুটেছেন। পাহাড়-পর্বত, বনজঙ্গল, মরুভুমি কোন কিছুই তাদের অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারেনি। সমাজের প্রতিকূল স্রোত বা অনৈসলামিক সংস্কৃতি তাদের ভাসিয়ে নিতে পারেনি। বরং তারাই অন্যদের ভাসিয়ে নিয়েছেন নিজেদের স্রোতে। পাশ্চাত্যের স্রোত থেকে বাঁচবার তাগিদে ইউরোপের অর্থডক্স ইহুদীরা মধ্যযুগে যেভাবে শহরের অভ্যন্তরে নিজেদের জন্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ঘেটো জীবনের জন্ম দিয়েছিল -আজকের আধুনিক যুগে সেটি অচল। এমনকি ইহুদীরাও তা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। কারণ টিভি, পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট ও রাষ্ট্র পরিচালিত শিক্ষা ব্যবস্থার বদৌলতে সংস্কৃতির জোয়ার এখন বেডরুমেও ঢুকেছে। ফলে ঘেটো জীবন মুসলিমদের জন্যও মুক্তির পথ নয়।

নবী পাকের (সাঃ) যুগে মুসলিমদের যে সংখ্যা ছিল, একমাত্র লন্ডন শহরে নিয়মিত নামাযীদের সংখ্যাই তার চেয়ে কয়েকগুণ। দাওয়াতী কাজে এ বিশাল সংখ্যাকে শক্তিতে পরিণত করতে পারলে অলৌকিক কিছু আশা করাও অসম্ভব নয়। এদেশের ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব এখন মুসলিমদের। সমগ্র ইউরোপের যে আয়তন তার চেয়ে বৃহত্তর ভুখন্ডে প্রাথমিক যুগের মুষ্টিমেয় মুসলিমগণ ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। এ কাজো তাঁরা বহু দুর্গম পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা ও বিজন মরুভূমি অতিক্রম করেছেন পায়ে হেঁটে। অথচ এখানে পাশ্চাত্য সভ্যতার অভ্যন্তরে বসে সেরূপ কষ্টস্বীকারের প্রয়োজন নেই। তবে এ কাজে জরুরি হলো, অন্যদের শিক্ষিত করার আগে নিজেদেরকে শিক্ষিত করা। জরুরি, কোর’আনের জ্ঞানে নিজেদের আলোকিত করা এবং চেতনায় বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব আনা।

মহান আল্লাহতায়ালা তো সত্যিকার মুসলিমদের সাহায্য করতে সদাপ্রস্তুত। তাঁরা যদি মহান আল্লাহতায়ালার পথে এগোয়, তবে তিনিও তাঁদের দিকে ছুটে আসেন। কোর’আন পাকে সে প্রতিশ্রুতির কথা উচ্চারিতও হয়েছে বহুবার। তবে শর্ত হলো সে সাহায্য গ্রহণের সামর্থ্য থাকা দরকার। সাহায্য না আসার কারণ, সাহায্যপ্রাপ্তির জন্য তারা নিজেদেরকে তৈরীই করেনি। পাশ্চত্য দেশসমুহে মুসলিমদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বস্তুত তাদের নিজেদের প্রস্তুতির উপর। নইলে এ মহাপ্লাবনের মধ্যখানে নিজেদের ঈমান-আমল নিয়ে বেঁচে থাকাই অসম্ভব। নিজেদের ছেলেমেয়ে ও আপনজনদের অনেকেই যে সে প্লাবনে ভেসে যাবে –তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? কারণ, প্লাবনের কাজই তো গ্রাস করা। প্লাবনের পানিতে মানুষ সাগরে বা নদীতে ভেসে যায়। কিন্তু কুফরির এ প্লাবন যে জাহান্নামে নিয়ে পৌঁছাবে –সে হুশ ক’জনের? ১ম সংস্করণ ২৬/০৭/২০০৩; ২য় সংস্করণ ১০/১২/২০২০।




বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদী তান্ডব এবং বিপন্ন মুসলিম-বিশ্ব

ফিরোজ মাহবুব কামাল

সাম্রাজ্যাবাদের কেন বহুজাতিক রূপ?

পুঁজিবাদী অর্থনীতি যেমন তার বিশ্বব্যাপী দাপট ও শোষন প্রক্রিয়া চালু রাখতে বহুজাতিক কোম্পানীর রূপ নিয়েছে, তেমন বহুজাতিক কৌশল নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদের বিশ্ব রাজনীতিও। আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ এখন পুঁজিবাদী বিশ্বের বহুজাতিক প্রজেক্ট। সে বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদই হাজির হয়েছে ইরাক ও আফগানিস্তানে। ইরাক ও আফগানিস্তান দখলের চেষ্টা এই প্রথম নয়, অতীতেও হয়েছে। হামলা করেছিল এক সময়ের প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ব্রিটেন। আফগানিস্তানে দুই দুই বার হামলা করে ভয়ানক ভাবে পরাস্ত হয়েছিল তারা। হামলা করেছিল সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বশক্তি সোভিয়েত রাশিয়াও। আফগানিস্তানে প্রায় দশ বছর চেষ্টা করেও রাশিয়া ব্যর্থ হয়েছে। যে কোন যুদ্ধই বিপুল অর্থক্ষয় ও রক্তক্ষয় হয়। সে অর্থক্ষয় ও রক্তক্ষয়ের কারণে সোভিয়েত রাশিয়া নিজেই টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। প্রায় এক শত বছর আগে ব্রিটিশ বাহিনী ইরাক দখল করেছিল। কিন্তু ধরে রাখার সামর্থ্য না থাকায় হটে আসতে বাধ্য হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নতুন উপলব্ধি হলো, কোন দেশের একার পক্ষে অন্য দেশ দখল করা ও সেখানে অধিকার জমিয়ে রাখা -এখন অসম্ভব।

বিশ্বশক্তি রূপে টিকে থাকার খরচটি বিশাল। সে খরচ পোষাতে না পেরেই সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে গেছে। একই কারণে অতীতে ব্রিটিশ ও ফরাসী উপনিবেশিক শাসনেরও সমাপ্তি ঘটেছিল। তাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতসহ এশিয়া-আফ্রিকা থেকে যে ভাবে ভেগে আসতে বাধ্য হয়েছিল -সেটি কোন মানবিক মূল্যবোধের কারণে নয়। তবে বাস্তবতা হলো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হলেও, ইংরেজদের মন থেকে সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা বিলুপ্ত হয়নি। অন্য দেশের উপর আগ্রাসী হামলা ও গণহত্যা পরিচালনায় ব্রিটিশ সরকারকে তাই জন-সমর্থণ পেতে অসুবিধা হয়না। হামলা ও গণহত্যার মধ্য দিয়ে অন্যদেশের উপর অর্জিত আধিপত্য নিয়ে ব্রিটিশ মিডিয়াতে প্রচন্ড উল্লাসও হয়। যে বিপুল উল্লাসটি ইরাক ও আফগানিস্তানে হামলার সময় বিবিসিসহ সকল ব্রিটিশ মিডিয়াতে দেখা গেছে। যুদ্ধের পর সংসদীয় নির্বাচনে টনি ব্লেয়ারের ন্যায় গণহত্যার নায়কগণ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয় তো -সে কারণেই। তাই নৈতিক দিক দিয়ে লর্ড ক্লাইভের আমলের ব্রিটেন ও আজকের ব্রিটেনের মাঝে পার্থক্য অতি সামান্যই। সে সময় আধিপত্য বিস্তারে তারা ঘুষ দিত মীর জাফরের ন্যায় দুর্বৃত্ত গাদ্দারদের। এখন ঘুষ দিচ্ছে মধ্য প্রাচ্যের স্বৈরাচারি রাজা-বাদশাহদের। সৌদি আরবের সাথে বাহাত্তর বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তিতে যে বিপুল ঘুষ দেওয়া হয়েছিল সে দেশের রাজপরিবারের সদস্যদের -সে তথ্য ফাঁস করেছে ব্রিটিশ মিডিয়া। যে কোন সভ্য দেশে এটি এক গুরুতর অপরাধ। অথচ সে  অপরাধের তদন্তে যে নৈতিক দায়িত্ববোধটুকু থাকার দরকার -ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রি টনি ব্লেয়ার সেটিও দেখাতে পারেননি। এটিই হলো ব্রিটিশ শাসকচক্রের নৈতিকতার প্রকৃত মান।

 

খরচ বেড়েছে সাম্রাজ্যবাদের

সাম্রাজ্যবাদী দেশের একক সামরিক শক্তির দূর্বলতা নিয়ে সম্প্রতি সত্য কথাটি বলছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুটিন। জার্মানীতে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘‘বিশ্বশক্তি রূপে টিকে থাকাটি অতি ব্যয়বহুল। কোন একক দেশের সে সামর্থ্য নাই।’’ সে সত্যটি উপলদ্বি করেছে এমন কি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্রপক্ষও। এজন্যই মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ তার স্ট্রাটেজীই পাল্টে ফেলেছে। একই কারণে ফকল্যান্ড হামলার পর ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কোন দেশেই একাকী যায়নি। গেছে বহু জাতিক বাহিনীর সদস্য রূপে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের বিরুদ্ধে একাকী হামলা চালাতে ভয় পেয়েছে। এজন্যই বহুজাতিক হামলার পথ বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকের উপর হামলায় মার্কিন বাহিনী এজন্যই সাথে নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া, ইটালি, স্পেন, ক্যানাডা, কোরিয়া, পোলান্ড, বুলগেরিয়া, চেক রিপাবলিকসহ বহুদেশের সেনাবাহিনীকে। সহযোগিতা নিয়েছিল বা ভূমি ব্যবহার করেছিল সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ প্রায় সকল দেশের। অপর দিকে আফগানিস্তানে যুদ্ধ করছে ন্যাটোর সম্মিলিত বাহিনী। ন্যাটো যে বহুজতিক সাম্রাজ্যবাদের সামরিক ফ্রন্ট এখন আর সেটি গোপন বিষয় নয়। বহুজাতিক কোম্পানী যেমন নিজেদের বাজার ও মুনাফা বাড়াতে বাজারে শেয়ার ছাড়ে, তেমনি শেয়ার ছেড়েছে বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদী জোটও। এবং সেটি মুসলিম দেশগুলিতেও। ১৯৯১ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে হামলায় সে জোটের শেয়ার হোল্ডার রূপে তাই ডাক পড়েছিল বহু মুসলিম দেশের সমারিক বাহিনীর।

হিংস্র পশুর আসল চেহারা টের পাওয়া যায় তখন যখন সে ক্ষুদার্ত হয়। বিষয়টি অভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক্ষেত্রেও। গণতন্ত্র, বিশ্বশান্তি ও মানবিক অধিকারের বড় বড় বুলি নিয়ে ইঙ্গো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্ররা বড্ড মুখর। কিন্তু এরূপ অতি মানবিক বিষয় নিয়ে তাদের আগ্রহ যে সামান্যই সেটি পূর্বের ন্যায় আজও প্রমাণিত হচ্ছে ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, লেবাননসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি কোনে। তাদের আসল চেহারা নিয়ে তাই কোন দিব্যমান ব্যক্তির দ্বিধা-দ্বন্দের থাকার অবকাশ নাই। ইরাকে হামলার সময় তারা বলেছিল, তাদের যুদ্ধ নিছক সাদ্দামের বিরুদ্ধে, ইরাকের জনগণের বিরুদ্ধে নয়। সাদ্দামকে তারা মারাত্মক যুদ্ধাপরাধি রূপে চিত্রিত করেছিল। এ অভিযোগে তাকে হত্যাও করেছে। কিন্তু সাদ্দাম হোসেনের শাসনের শেষ হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শেষ হয়নি। এখন লিপ্ত ইরাকের জনগণ হত্যায়। তাদের যু্দ্ধের কারণে প্রায় এক লক্ষ মানুষ ইতিমধ্যে নিহত হয়েছে। দিন দিন সে হত্যাকান্ড আরো তীব্রতর হচ্ছে। কিন্ত তা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী মহলে কোন দুঃখ বা ক্ষোভ নেই। তাদের আসল লক্ষ্য সাদ্দাম বা তার সরকার ছিল না। লক্ষ্য ছিল ইরাকের তেল এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা। এ লক্ষ্যে তারা দেশটির উপর পূর্ণ আধিপত্য চায়। সাদ্দাম ছাড়া অন্য কেউ থাকলেও তারা দেশটিকে দখলে নিত। তার ইরাকের উপর হামলা যে নিছক একটি বহু জাতিক সাম্রাজ্যবাদী প্রজেক্ট তা নিয়ে আর কি কোন সন্দেহ থাকে?

 

বিভক্ত মুসলিমবিশ্ব ও দেশীশত্রুর অধিকৃতি

মুসলিম দেশগুলির সমস্যা শুধু বিদেশী শক্তির অধিকৃতি নয়, বরং সেটি দেশী শত্রুদের অধিকৃতিও। প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে জেঁকে বসে আছে নৃশংস স্বৈরশক্তি। নিজেদের গদি বাঁচাতে তারা ভয়ানক গণহত্যাতেও রাজী। বাংলাদেশে হাসিনার হাতে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যা, মিশরের জেনারেল সিসির কায়রাতে রাবা আল-আদাবিয়ার গণহত্যা এবং পাকিস্তানের ইসলামাবাদে জেনারেল মোশাররাফের লাল মসজিদের গণহত্যা তো -সে নৃশংস অধিকৃতিরই প্রমাণ। তাদের কারণে বিদেশী হামলার বিরুদ্ধে লন্ডন, ওয়াশিংটন, রোম, প্যারিসের ন্যায় সাম্রাজ্যবাদী দেশের রাজধানিতে বড় বড় মিছিল হলেও অধিকাংশ মুসলিম দেশে তা হয়নি।

মুসলিম বিশ্বের বড় সমস্যা হলো অনৈক্য। অন্য দেশে হামলা, গণহত্যা, দস্যুবৃত্তি ও আধিপত্য বিস্তারে বহু জাতিক সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে যে অটুট ঐক্য -সে রূপ ঐক্য মুসলিমদের মাঝে নেই। অথচ মুসলিমদের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কাজটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আরোপিত ফরজ বিধান। অনৈক্য ইসলামে শতভাগ হারাম। হারাম হলো, হামলাকারি কাফের বাহিনীর সাথে সহযোগিতা করা। অথচ সূদ-ঘুষ ও পতিতাবৃত্তির ন্যায় সে হারাম চর্চা বেড়েছে প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে। তাই ইরাকের উপর হামলা ও সেদেশে মুসলিম হত্যার লক্ষ্যে যখন মার্কিন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পক্ষ থেকে ডাক পড়লো -তখন তাঁবেদার ভৃত্যের ন্যায় সে ডাকে সাড়া দিল বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশরসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশ।

 

যে আগ্রাসন অনিবার্য

মুসলিম বিশ্বের, বিশেষ করে আরব বিশ্বের, সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যেমন তেল, তেমনি সকল সমস্যার মূল কারণও হলো এই তেল। তেল সম্পদ আরব ভূমিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হামলার লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করেছে। আরবদের মর্যাদা না বাড়িয়ে সে সম্পদ দাসত্বের জিঞ্জির পড়িয়েছে। বিশাল তেল সম্পদের কারণেই এ মুসলিম ভূমিতে সাম্যাজ্যবাদীরা পৃথিবীর অপর গোলার্ধ থেকে ছুটে আসছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয়ের পর মুসোল ও কিরকুকের বিশাল তেল খনি দেশটিতে ডেকে এনেছিল বৃটিশের সাম্রাজ্যবাদী শাসন। ইরাক এখনও বিশ্বের দ্বিতীয় তেল উৎপাদনকারি দেশ। ফলে বিপদ থেকেই গেছে। নিরীহ মেষ শাবক দেখে ছুটে আসে যেমন ক্ষুদার্ত নেকডে, ইরাকের তেল সম্পদ দেখে তেমনি ধেয়ে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, দেশটির প্রতিদিন প্রয়োজন পড়ে ২০ মিলিয়ন ( দুই কোটি) ব্যারেল। খাদ্য ছাড়া প্রাণ অচল, তেমনি তেল ছাড়া মার্কিনীদের অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রাও অচল। তেল ভিন্ন তাই বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের সামর্থ্য আসবে কী করে? ফলে এ তেল ক্ষেত্র দখলে রাখার প্রয়োজনটি বিশাল। ইরাকের তেলের উপর একক দখলদারি থাকার কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর উপর ইঙ্গোমার্কিনীদের বিজয় সহজতর হয়। বাস্তবতা হলো, মার্কিনীদের প্রতিদিন দুইকোটি ব্যারেল তেলের জোগানদানের সামর্থ্য সৌদি আরবের নেই। এমন তেল ভান্ডার তাদের নিজ ভূমিতেও নেই। তাছাড়া সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিনীরা এমনিতে উদ্বিগ্ন। তারা চিন্তিত, এ দেশ থেকে তাদের তেলের জোগান কতটা বহাল থাকবে -তা নিয়ে।

দস্যুকে বাঁচতে হয় লাগাতর দস্যুবৃত্তি নিয়ে। নইলে তার ঠাটবাট ও সংসার চলে না। ফলে দস্যুর জীবনে ডাকাতি তাই সংস্কৃতি ও নেশায় পরিণত হয়। তেমনি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে তার দম্ভ নিয়ে বাঁচতে নানা দেশে আগ্রাসনে নামতে হয়। ম্যালেরিয়ার জীবাণূ শরীরে ঢুকলে জ্বরের কাঁপুনি অনিবার্য; তেমনি চেতনায় সাম্রাাজ্যবাদ বাসা বাঁধলে শুরু করে অন্যের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন। নতুন ক্ষেত্র সে খুঁজবেই। জর্জ বুশ, টনি ব্লেয়ার বা ভ্লাদিমির পুটিনের মধ্যে এ ক্ষেত্রে তাই সামান্যতম পার্থক্যও নেই। বনের সব বাঘই একই চরিত্রের। তেমনি অবস্থা সকল সাম্রাজ্যবাদীরও। তাই মুসলিম ভূমিতে যতদিন সম্পদের ভান্ডার থাকবে, ততদিন থাকবে সাম্রাজ্যবাদী হামলার বিপদও। তাই ইরাক বা আফগানিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রথম হামলা যেমন নয়, তেমনি শেষ হামলাও নয়।

ডাকাত পল্লীতে সম্পদশালী থাকাটাই বিপদ। একই রূপ বিপদ, সাম্রাজ্যবাদ কবলিত এ বিশ্বে সম্পদশালী থাকাটিও। মুসলিম উম্ম্হার বড় বিপদ একারণেই। এজন্যই অতি প্রয়োজন হল প্রতিরক্ষার সদাপ্রস্তুতি ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্য। সেরূপ একটি সদা-প্রস্তুতির হুকুম এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে। পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে, ‘‘ওয়াদ্দালাহুম মাস্তাতাতুম বিল কুউয়া।’’ অর্থ: ‘‘তাদের বিরুদ্ধে সদা প্রস্তুতি নাও সর্বশক্তি দিয়ে।’’ –(সুরা আনফাল আয়াত ৬০)। শুধু প্রস্তুতিই ফরয নয়, সে সাথে অপরিহার্য হলো একতা। ইসলামে পরস্পরে একতাবদ্ধ হওয়াটি নামায-রোযার ন্যায় ফরজ। ঐক্য বুঝাতে বলা হয়েছে, ‘‘কা আন্নাহুম বুনইয়ানুম মারসুস’’ অর্থাৎ সীসা ঢালা দেওয়ালের ন্যায় অটুট। এবং আরো বলা হয়েছে, মহান আল্লাহতায়ালার কাছে তারা প্রিয় যারা যুদ্ধ করে তার রাস্তায় সীসী ঢালা প্রাচীরের ন্যায়। তাই মহান আল্লাহতায়ালার বড় অবাধ্যতা শুধু নামায-পরিত্যাগ করা নয়, সেটি হলো শত্রুর বিরুদ্ধে নিজেকে প্রস্তুত না রাখা। এবং সে সাথে বিভক্ত থাকাটিও। এরূপ অবাধ্যতা মহাপাপ। এমন পাপ কাফের শত্রুর অধিকৃতির ন্যায় ভয়ানক আযাব ডেকে আনে। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব আজ মূলত সে আযাবেরই শিকার। 

 

লক্ষ্য: জনগণকে শক্তিহীন ও অধিকারহীন রাখা

মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতির অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: এক). মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের উপর অব্যাহত আধিপত্য। দুই). সম্পদের উপর তাদের খলিফা স্বৈরাচারি শাসক গোষ্ঠির পাহারাদারি এবং রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা থেকে জনগণকে দূরে রাখা। সে লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে মধ্যপ্রাচ্যে -বিশেষ  করে তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোতে অসম্ভব করে রাখা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জোটভূক্ত দেশগুলো এ লক্ষ্যে আপোষহীন। আরব জগতে স্বৈরাচার-বিরোধী যে গণ-আন্দোলন হয়েছিল -সেটি একারণেই তাদের ভাল লাগেনি। সে গণ-বিস্ফোরণ থেকে স্বৈরাচার বাঁচাতে পরিকল্পিত ভাবেই সে জোয়ার আর বেশী দূর এগোতে দেয়নি। মিশরবাসীর জন্য যে অভূতপূর্ব অধিকার অর্জিত হয়েছিল সেটি তারা দ্রুত নস্যাৎ করে দেয়। সামরিক ক্যু’র মাধ্যমে সে দেশের ইতিহাসে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট ড. মহম্মদ মুরসীকে অপসারণ করা হয় এবং জেলে নিয়ে তাঁকে হত্যাও করা হয়।

লক্ষ্যণীয় হলো, মিশরীয় সামরিক বাহিনীর গণতন্ত্র-বিরোধী সে সন্ত্রাসকে কোন পাশ্চাত্য শক্তিই নিন্দা করেনি। নিন্দা করেনি প্রেসিডেন্ট ড. মুরসীর হত্যাকেও। অতএব এ হলো তাদের গণতন্ত্রপ্রেম। অপর দিকে তারা রাজি নয় ইরাক থেকে তাদের সামরিক বাহিনীকে সম্পূর্ণ রূপে তুলে নেওয়ায়। রাজি নয় জাতিসংঘ নীতিমালাকে মানতেও। বরং নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে লাগাতর ব্যবহার করছে জাতিসংঘকে। সত্য তো এটাই, জাতিসংঘের কাজ দাঁড়িয়েছে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সকল কুকর্মকে নিন্দা না করে বরং স্বীকৃতি দেওয়া। তাই ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনী যখন ইরাক ও আফগানিস্তান দখল করলো এবং দেশ দুটির লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করলো – সে রক্তাত্ব আগ্রাসনকে নিন্দা না করে জাতিসংঘ সেটিকে বৈধতা দিয়েছে। সে বৈধতার সূত্র ধরেই মার্কিন বাহিনী দাবী করে, ইরাকে তাদের অবস্থান অবৈধ নয়। তারা সেখানে আছে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে।

আরো লক্ষণীয় হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতই সাম্রাজ্যবাদী হানাদার চরিত্র নিয়ে হাজির হচ্ছে ততই প্রকাশ পাচ্ছে বিশ্বের মেরুদন্ডহীন মুসলিম নেতৃত্ব। এরা শুধু অযোগ্য, শক্তিহীন এবং বিভক্তই নয়, বিবেকহীনও। ইরাকের উপর হামলা যে একটি অতি অন্যায় ও অপরাধমূলক কাজ -সেটি বুঝতেও কি বড় রকমের কান্ডজ্ঞান লাগে? অথচ সে কান্ডজ্ঞানের প্রমাণ এ স্বৈরশাসকগণ রাখতে পারেনি। তাই কোন মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের মুখ থেকে এ হামলার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ শোনা যায়নি। ব্যর্থতা শুধু মুসলিম দেশগুলির সরকারেরই নয়, জনগনেরও। কোন মুসলিম রাজধানিতে এমন হামলার বিরুদ্ধে বড় রকমের কোন বিক্ষোভও আয়োজিত হয়নি। যেগুলি হয়েছে তার কোনটিই বিশাল আকারের নয়। বরং যতগুলো বৃহৎ বিক্ষোভ আয়োজিত হয়েছে তার সবগুলোই হয়েছে অমুসলিম দেশে। এবং সেগুলীর আয়োজকও ছিলেন অমুসলিমেরা।

ইরাকে হামলার বিরুদ্ধে ২০ লাখ মানুষের মিছিল হয়েছে লন্ডনে। ৩০ লাখ মানুষের মিছিল হয়েছে ইটালীর রাজধানী রোমে। সে তুলনায় করাচী, ঢাকা, কায়রো, জাকার্তা ও ইস্তাম্বুলের মত নগরীতে দশ ভাগের এক ভাগ সমাবেশও হয়নি। অথচ এ নগরগুলোর  লোকসংখ্যা লন্ডন ও রোমের চেয়ে অধিক। প্রতিটি নগরে প্রায় কোটি লোকের বাস। একটি মুসলিম দেশের উপর অন্যায় হামলা হতে যাচ্ছে – সেটি জেনে তার বিরুদ্ধে এসব নগরগুলোর প্রতিটিতে যদি দশ লক্ষ মানুষের সমাবেশ হতো -তবে মুসলিম উম্মাহ এরূপ হামলাকে কতটা ঘৃনা করে সেটির প্রমাণ মিলতো। কিন্তু সে ঘৃণা প্রকাশ পায়নি। বরং উল্টোটি হয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্র-প্রধান ও নেতারা মার্কিন প্রশাসনের কাছে বিশ্বাসভাজন হওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অথচ মার্কিন জোটের হামলায় নিহত ও আহত হয়েছে লক্ষাধিক ইরাকী ও আফগান নাগরিক, ভস্মিভূত হয়েছে হাজার হাজার কোটি ডলারের সম্পদ এবং শৃঙ্খলিত হ মুসলিম উম্মাহর একটি বিরাট অংশ। এমন  হামলায় সামান্যতম সহযোগিতাও হারাম। অবকাশ নেই নিরপেক্ষ থাকার। কিন্তু এ নিয়ে কি মুসলিম নেতৃবৃন্দের কোন ভাবনা আছে কী? আর থাকলে তার প্রকাশ কই? পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, মুসলিম মাত্রই পরস্পরের ভাই। এক ভাইয়ের ব্যাথা অপর ভাই অনুভব করবে -সেটিই তো কাঙ্খিত। অথচ সে অনুভবই যার নেই -তাকে কি ভাই বলা যায়? ভাতৃত্ববোধ না থাকলে তাকে মুসলিমই বা বলা যায় কি করে? ইরাক ও আফগানিস্তানের মুসলমিদের সে দুঃসহ ব্যাথা অনুভব দূরে থাক, কিভাবে তা বাড়ানো যায় -তা নিয়ে হামলাকারি মার্কিন বাহিনীর সাথে জর্দান, কুয়েত, সৌদিআরব, বাহরাইন, তুরস্ক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, ওমান, কাতারের সরকারগুলো বরং সহযোগীতা করতে উদগ্রীব। নিজ ভূমিতে তারা ঘাঁটি নির্মাণের অধিকার দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। প্রতিবশীর ঘরে হামলায় দস্যুকে সহায়তা দানের ন্যায় এরাও সহায়তা দিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের। নিজ নাগরিকদের ধরে ধরে কাফেরদের হাতে তুলে দিচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ এভাবে নির্মম নির্যাতনের শিকার হচেছ গোয়ান্তোনামো বে’র ন্যায় কারাগারে।

গোলামী মানসিকতায় আচ্ছন্ন মানুষের কাছে স্বাধীনতার মূল্য সামান্যই। দূর্বৃত্ত সর্দারের পার্শ্বচর হওয়ার ন্যায় এরাও সাম্যাজ্যবাদী শক্তির কাছে বিশ্বস্থ থাকাকে জীবনের বড় অর্জন মনে করে। এক কালে ভারতে কিছু মুসলিম নামধারি ব্যক্তির বৃটিশ স্বার্থের প্রতি বিশ্বস্থ্যতা এতই প্রগাঢ় ছিল যে, বৃটিশেরাও তাতে মোহিত  হতো। এমনকি তাদেরকে স্যার বলতো বা নানা উপাধিতে ডাকতো। একই ভাবে মার্কিনীদের কাছে বিশ্বস্থ হওয়ার প্রগাঢ় আগ্রহ বেড়েছে মুসলিম রাষ্ট্র প্রধান, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে। এমন বিশ্বস্থ হওয়াকে তারা জাতীয় মান-সম্মান নির্ণয়ের মানদন্ডে পরিণত করেছে। সম্প্রতি এমন গোলামী মানসিকতার উলঙ্গ প্রকাশ ঘটেছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন বিভাগ যে কয়টি দেশের নাগরিকের উপর কড়া নজর রাখার ঘোষণা দিয়েছে তাদের মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নামও রয়েছে। রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরবসহ আরো প্রায় বিশটি দেশের নাম। এসব দেশের নাগরিকের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকালে টিপসই দিতে হবে, নিয়মিত পুলিশ দফতরে হাজিরা দিতে হবে এবং ঠিকানা পরিবর্তন করলে তা অতিসত্বর সরকারকে জানাতে হবে। তা নিয়েই পাকিস্তান ও বাংলাদেশে প্রচন্ড আলোড়ন। “ইজ্জত গেল, ইজ্জত গেল” – আওয়াজ উঠেছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা সে সময় খালেদা জিয়া সরকারের পদত্যাগেরও দাবী তুলেছিলেন।

 

জর্জ বুশের ক্রসেড

মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ যে ক্রুসেডের ঘোষণা দিয়েছেন -সেটি কোন গোপন বিষয় নয়। তিনি সে কথাটি অতি প্রকাশ্যে বলেছেন। মিডিয়াতেও সেটি এসেছে। ইতিহাসে ক্রুসেডের একটি নিজস্ব পরিচিতি আছে। সেটি হলো, মুসলিম ভূমিতে ভয়ানক যুদ্ধ, মুসলিম বিরোধী গণহত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ এবং শত বছরের  আধিপত্য। তিনি একথাও বলেছেন, “এ যুদ্ধে অন্যদের অবস্থান হয় আমাদের পক্ষে, না হয় আমাদের বিপক্ষে।” এ মুসলিম বিরোধী ক্রুসেডে তিনি মুসলিমদেরকে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ দেননি। অতএব যারা তার স্বঘোষিত ক্রুসেডে মার্কিনীদের পক্ষে অস্ত্র ধরবে না -তাদেরকে শত্রু পক্ষ ভাবা এবং তাদের উপর কড়া নজর রাখাই হবে মার্কিন নীতি। এ নিয়ে একজন ঈমানদারের করণীয় কি থাকতে পারে?  তাছাড়া সে ক্রুসেডের একটি পর্ব চলছে আফগানিস্তানে, দ্বিতীয় পর্ব ইরাকে ও তৃতীয় পর্ব শুরু হয়েছে সিরিয়ায়। হয়তো এর পর হবে অন্য কোন মুসলিম দেশে।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ন্যায় মুসলিম দেশের সেক্যুলারিষ্টগণ না জানলেও মার্কিনীরা ঠিকই জানে, কোন ঈমানদারই তাদের মুসলিম বিরোধী এ ক্রুসেডে সহযোগী হবে না। ইসলামে এটি শতভাগ হারাম। মুসলিমের ঈমান তাঁকে আল্লাহ ও মুসলিম স্বার্থে বিশ্বস্থ ও অঙ্গিকারবদ্ধ করে; মার্কিন স্বার্থের প্রতি নয়। ফলে যার হৃদয়ে ঈমানের স্পন্দন আছে, মার্কিনীরা তাকে অবিশ্বাস করবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? আর সে জাগ্রত চেতনা এখন মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিমের মনে। বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে মার্কিনীদের এ সন্দেহজনক নীতি এটিই প্রমাণ করে, বাংলাদেশ যে একটি মুসলিম অধ্যুাষিত দেশ -সেটি তাদের কাছে স্বীকৃত। দেশটি ইসরাইল নয়, হিন্দুস্থানও নয়। অথচ তেমন এক প্রেক্ষাপটে মুসলিম স্বার্থে অঙ্গিকারহীন সেক্যুলারিষ্টগণ মার্কিন স্বার্থের প্রতি তাদের অঙ্গিকার প্রমাণ করতে উদগ্রিব। ইসলামে অঙ্গিকারহীন অথচ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে নিবেদিত এমন নেতৃত্ব বস্তুত এখন প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে। নিজেদের রাজনৈতিক অভিলাষ পুরণে অমুসলিম কাফের শক্তির নিজ দেশে আগ্রাসনে আহবান করা ও তাদের অস্ত্র নিয়ে মুসলিম হত্যার ইতিহাস গড়ার ঐতিহ্য এদের অনেকেরই। এমন গাদ্দারেরাই মার্কিন বাহিনীকে দাওয়াত দিয়েছিল আফগানিস্তান ও ইরাক দখলে। মুসলিম বিশ্বে হামলা ও আধিপত্যের দিন, ক্ষণ ও প্রেক্ষাপট এজন্যই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গের কাছে এতটা উপযোগী। তাই বিপদ শুধু বিদেশী শত্রুর কারণে বাড়ছে না, বাড়ছে ঘরের শত্রুর কারণেই। তাই আগ্রাসনের শিকার শুধু আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, কাশ্মির বা লেবানন নয়, তেমন একটি আগ্রাসনের মুখে সমগ্র মুসলিম উম্মাহও।  লন্ডন: ১ম সংস্করণ ০৫/০৫/২০০৭; ২য় সংস্করণ ২৯/১২/২০২০।

 




একাত্তরের গণহত্যার দলিল (এক)

যে কাহিনী শুনতে নেই (০৫)

ময়মনসিংহ হত্যাকান্ড

১.

“… নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার পাশাপাশি উজ্জল মানবিক চৈতন্য ও বিবেক সম্পন্ন মানুষওতো আছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এমন ঘটনা পাশাপাশিও দেখেছি। ময়মনসিংহের কিছু ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ময়মনসিংহের ছত্রপুর এলাকার রেল কলোনীতে অনেক বিহারী ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় সে কলোনীতে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে পুড়ে মরে শিশু, নারী ও পুরুষ। আগুন-নেভার পর কোন কোন ঘরে পুড়ে যাওয়া আদম সন্তানের বিকৃত ও বীভৎস চেহারা দেখে চমকে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিল এক মানুষ অন্য মানুষকে কি করে এত নিষ্ঠুরভাবে মারে॥”(১৮ এপ্রিল, ১৯৭৬)

— শামসুজ্জামান খান / দিনলিপি ॥ [ অন্বেষা – ফেব্রুয়ারি, ২০১০ । পৃ: ১৩৬ ]

০২.

“… When the Army moved in Mymensingh aided by information from the informers it found 1,500 widows and orphans sheltering in a local mosque.

A man identified as the Assistant postmaster of Mymensingh showed scars on his neck and what he said was a bayonet mark on his body.

The man said he lived in a colony known as Shanti of 5,000 non-Bengalis, only 25 survived the massacre on April 17. The interview ended abruptly when the Assistant Postmaster mentioned the killing and mutilation of his family and burst into tears.

The General Commanding in Mymensingh District said the killings began in the latter half of March and was carried out by the Awami League volunteers, the armed wing of Sheikh Mujibur Rahman’s secessionist Awami party.

East Bengali Rifles and Regiment troops who defected to the secessionist cause were also involved. Non Bengali people and people with technical skills were consistently butchered, he said.”

— Maurice Quantance / The Sun (Singapore) – 9 May, 1971

“… One hears of the most horrifying stories. Murder, rape, destruction, looting on a massive scale – there is so much of it that one finds oneself absorbing these terrifying tales without turning a hair. Inevitably, the central figure in this bloody drama is the poor Bihari.

But the real tragedy which has engulfed the Bihari community does not lie in the number of people killed but in the gruesome variety of methods of killing. Ten thousand people wiped out in two nights of horror in one town is a story which will last a week.

Eye witnesses are prepared to testify to the correctness of the story that Biharis were dragged or enticed from their homes and taken to the slaughter house where they were butchered slowly with a knife.

In Mymensingh, an East Pakistani army officer had a delightful breakfast with the family of a brother officer from West Pakistan before shooting dead its members.

Men were hacked to pieces beginning from the feet. A pregnant woman, a West Pakistani, was grabbed by hooligans and dragged into the street. Her belly was cut and the child was bayoneted. She is alive but is now bereft of the will to live. A women was killed but her three-month-old child was allowed to live but not before they had cut off one of its hands.

A doctor drained the blood out of people with a syringe and let them die.

In a refugee camp for Biharis from Mymensingh a man burst into tears while narrating his experience. An army officer who is now in charge of the camp was so moved that he turned his face away to hide his tears. Later, this officer, one of the first to reach Mymensingh, took me aside and said in a whisper, ‘what he was told you is not a hundredth of what I have seen in Mymensingh.”

— Guardian (London) / 10 May, 1971

“… Reporters later visited a refugee camp in Dacca where 3,000 homeless from Mymensingh lodged. Doctors were treating 25 men and 15 women, all non-Bengalis, for what they said were bullet, knife and axe wounds inflicted by Bengalis during the past weeks. One seven year old boy sat dully on a single hospital bed with his four year old brother and doctors said that only their 13 year-old brother was left in the family. One women had severe knife cuts and another had her hand almost chopped off by an axe. Both said they had been carried off wounded by Bengali youths.

One nineteen year-old Bihari student, shot through the stomach, said Bengali thugs had ordered all the men from his part of shanti outside and opened fire with automatic weapons.

He was hit three times and fell unconscious, he said, but survived because the rebels thought him dead. A number of other men bore bullet wounds.”

— Malcolm Brown / New York Times (NY) – 11 May, 1971

“… There is evidence that non-Bengalis, largely immigrants from India who sought refugee after the 1947 partition, were attacked, hacked to death and burnt in their homes by mobs. Eye witnesses told stories of 1,500 widows and orphans fleeing to a mosque at Mymensingh, in the north as armed men identified as secessionist slaughtering their husbands and fathers. A mill manager showed journalists a mass grave where he said well over 100 women and children were buried.

Scene of the killing – just before the Army moved in – was the mill recreation hall and it stank of death the day journalists saw it this week. Human hair and blood-strains lay about the building. The Assistant postmaster at Mymensingh showed journalists a neck scar and bayonet wounds. Choking back tears, he said he was one of 25 survivors out of 5,000 non-Bengalis attacked by Awami League supporters and army deserters.

There can be little doubt that some atrocities were committed by groups can separatists. Generally, such killings were bone by Bengali workers nurturing grudges against shop foremen and administrators in Jute mills, many of the foremen are Biharis, Moslem immigrants from India, who have done well in East Pakistan and whose success is resented by the less successful Bengalis.

Major Osman Choudhury, the Commander of the South, West Division of the Liberation Front in East Pakistan, admitted this afternoon that East Pakistan Rifles and Bengali volunteers were raiding and killing the minority community of Bihari Muslims “because they are spies and have sided with West Pakistan.” Major Choudhury, of the East Pakistan Rifles, met journalists here on the Indo-Pakistan border. He said that Bihari Muslims, who are identified linguistically and ethnically with the West Pakistanis, had helped President Yahya’s soldiers to massacre Bengalis. The Bengali officer was being questioned in the light of news reports and fears that a great number of the non-Bengali minority community, five million strong, have been killed in a wave of reprisals.

There was no question of Bihari Joining the Liberation Front, he said, “If we get a Bihari, we kill him. We are also raiding their houses and killing them.”

— Maurice Quaintance / Daily News (Colombo) – 15 May, 1971

তথ্যসূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র ( ৭ম খন্ড) / সম্পা: হাসান হাফিজুর রহমান ॥ [ তথ্য মন্ত্রণালয় – জুন, ১৯৮৪ । পৃ: ৩১৮-৩২৬ ]

০৩.

“… পূর্ব পাকিস্তান সংকটের উপর পাকিস্তান সরকারের ১৯৭১ সালে আগস্টে প্রকাশিত শ্বেতপত্রে ব্যাপক নৃশংসতার যে তালিকা দেয়া হয়েছিল তা পাঠকদের জন্য ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। একটি ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছিল এভাবে: 

২৭ মার্চ ময়মনসিংহ সেন-নিবাসে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট/ ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস্‌ বিদ্রোহ করে এবং তারা তাদের সহকর্মী পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসার ও আবাসিক ভবনগুলোতে আরো যারা ছিলেন তাদের নির্বিচরে হত্যা করে। শ্বেতপত্রে ডিস্ট্রিক্ট জেল এবং শাঁখারিপাড়া ও অন্যান্য নয়টি কলোনীর পুরুষদের হত্যা করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সকল পশ্চিম পাকিস্তানী ও অবাঙালি মহিলাদের জোর করে ধরে এনে মসজিদ ও স্কুলে জমা করা হয়েছিল এবং ২১ এপ্রিল সেন-বাহিনী শহরের নিয়ন্ত্রণ নিলে ওই সব মহিলাদের সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়।

ময়মনসিংহ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কয়েকজন পাকিস্তানী অফিসারের স্মৃতিচারণ নিয়ে আমি ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর-এ বিষয়টি উত্থাপন করলে তারা আমাকে প্রথমদিকে জানান যে ওই সময় ময়মনসিংহে কোনো সেনানিবাস ছিল না। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে – ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস্‌ ও ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারকেই ময়মনসিংহে স্থানীয়ভাবে সকলে ‘ক্যান্টনমেন্ট’ বলত। ময়মনসিংহ শহরের একজন প্রবীণ ভদ্রলোক মুহাম্মদ আব্দুল হক, আমাকে ক্যান্টমেন্টের ওই স্থানটি দেখিয়েছেন এবং নিশ্চিত করেছেন যে সেখানে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী অফিসারদের হত্যা করা হয়।

অন্য একজন বাসিন্দা শেখ সুলতান আহমেদ যিনি আবেগে-আপ্ুত হয়ে বর্ণনা করেন কীভাবে তিনি সে সময় জনতার একজন হয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘিরে চিত্কার দিয়ে ভিতরে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত তাদের সহকর্মী বাঙালিদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন। আহমেদের দেয়া তথ্যানুয়ায়ী ঢাকায় সেনা অভিযানের খবর ময়মনসিংহে পৌঁছানোর পরপরই ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের মাঝে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। বাঙালিদের পক্ষ নিয়ে হাজার হাজার স্থানীয় বাঙালি জড়ো হয় ক্যান্টনমেন্টের বাইরে। তবে ওই ঘটনায় কোনো বেসামরিক লোক হতাহত হয়নি। ভিতরে বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই সংঘর্ষ চলে – পশ্চিম পাকিস্তানীরা যতোক্ষণ পেরেছিল ততোক্ষণ প্রতিরোধ করেছিল। তিনি যে হিসেবে দিয়েছিলেন তাতে আনুমানিক একশ’ জন পাকিস্তানী অফিসার ও সৈনিক সেখানে নিহত হয়েছেন।

আহমেদ আরো দাবি করেছেন দাঙ্গার পর তিনি ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে সেনা কর্মকর্তাদের মৃতদেহ দেখেছেন। কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানী পালানোর চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের কেটে হত্যা করে। আহমেদ ব্যক্তিগতভাবে ক্যান্টনমেন্টে একজন লোককে দেখেছেন যিনি বিক্ষুদ্ধ জনতার দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে হাত জোড় করে প্রাণ ভিক্ষা চাইছিলেন আর বলছিলেন সেখানে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা আছে, কিন্ত তাকেও হত্যা করা হয়েছিল গুলি করে ও দা দিয়ে কুপিয়ে। আহমেদ জানান, ওই দৃশ্য দেখে তার দারুণ কষ্ট হয়েছিল। তিনি আরো জানান নারী ও শিশুদের হত্যা করা হয়েছিল, অনেক নারীকে হত্যা করা হয়েছিল ধর্ষণ করে। আবার কয়েকজনকে অন্য বাঙালিরা উদ্ধার করে অন্যান্য অফিসারদের সাথে নিকটস্থ জেলখানায় রেখেছিল॥”

— ডেড রেকনিং : ১৯৭১-এর বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি / শর্মিলা বসু (মূল: Dead Reckoning : Memories of the 1971 Bangladesh War । অনু: সুদীপ্ত রায়) ॥ [ হার্স্ট এন্ড কোম্পানী – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৮৮-৮৯ ]

০৪.

“… ১৯৭১ সালে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের জঙ্গি, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বিদ্রোহী সৈন্যরা ময়মনসিংহে অবাঙালি হত্যাকাণ্ডে মেতে উঠে। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের কবল থেকে ময়মনসিংহ পুনরুদ্ধার করা নাগাদ এ হত্যাকাণ্ড অব্যাহত ছিল। সাক্ষ্য প্রমাণে দেখা গেছে যে, এখানে ২০ হাজার অবাঙালিকে হত্যা করা হয়েছিল । ১৯৭১ সালের ২৬-২৭ মার্চ ময়মনসিংহ সেনানিবাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্য এবং আধা-সামরিক ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বিদ্রোহ করে এবং ব্যারাক ও আবাসিক কোয়ার্টারে মধ্যরাতে আকস্মিক হামলা চালিয়ে শত শত পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার ও সৈন্যকে হত্যা করে। রক্তপাত থেকে মহিলা ও শিশুরাও রেহাই পায়নি।

১৬ এপ্রিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একদল বিদ্রোহী সৈন্য ময়মনসিংহ জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে ১৭ জন বিশিষ্ট অবাঙালি নাগরিককে হত্যা করে। এসব বিশিষ্ট নাগরিককে বিদ্রোহীরা সেখানে আটক রেখেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে উন্মত্ত জনতা এবং বিদ্রোহী বাঙালি সৈন্যরা ময়মনসিংহ শহরের শানকিপাড়া ও ৯টি আবাসিক এলাকার প্রায় সকল অবাঙালি পুরুষকে হত্যা করে। দেড় হাজারের বেশি মহিলা ও শিশুকে গবাদি-পশুর মতো একটি মসজিদ ও স্কুলে জড়ো করে রাখা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৩১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ময়মনসিংহ শহর পুনর্দখল করার সময় এসব মহিলা ও শিশুকে উদ্ধার করা হয়। বিদ্রোহীরা আওয়ামী লীগ বিরোধী বহু বাঙালিকে হত্যা করে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিনিধি মরিস কুইন্টান্স মে মাসের গোড়ার দিকে ময়মনসিংহ সফর করেন। ১৯৭১ সালের ১৫ মে ‘সিলোন ডেইলি নিউজে’ তার প্রেরিত একটি সংবাদে বলা হয়:

“১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির সময় ভারত থেকে অভিবাসনকারী অবাঙালিদের ওপর জনতার হামলা, তাদের কুপিয়ে হত্যা এবং তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।…

প্রতাক্ষদর্শীরা ময়মনসিংহের উত্তর দিকে একটি মসজিদে আশ্রয়গ্রহণকারী দেড় হাজার বিধবা ও এতিম শিশুর মর্মন্তুদ উপাখ্যান বর্ণনা করেছেন। বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাদের স্বামী ও পিতাকে হত্যা করেছে।”

১৯৭১ সালের ৭ মে ‘নিউইয়র্ক টাইমসে’ প্রকাশিত ময়মনসিংহ থেকে পাকিস্তানি প্রতিনিধি ম্যালকম ব্রাউন প্রেরিত আরেকটি সংবাদে বলা হয়ঃ

“কর্মকর্তারা বলেছেন যে, সরকারি সৈন্যরা শহরের (ময়মনসিংহ) নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার আগে বাঙালিরা কমপক্ষে এক হাজার বিহারী অথবা অবাঙালিকে হত্যা করেছে। সেনাবাহিনীর অফিসাররা জনগণের সঙ্গে সাংবাদিকদের পরিচয় করিয়ে দেন। এসব জনগণ সাংবাদিকদের জানিয়েছে, ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পরক্ষণে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা বিহারী হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।…

একজন অফিসার বলেছেন, বহু লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। এসব লাশ শনাক্ত করা অথবা কবর দেয়া অসম্ভব। তিনি বলেছেন, এসব লাশ ব্রহ্মপূত্র নদে ভাসিয়ে দেয়া হবে।…

ময়মনসিংহের বাইরে ফসলের মাঠ ও ফলের বাগান এবং গুচ্ছ গুচ্ছ বস্তিঘরে দৃশ্যত প্রাণহানি ঘটেছে সর্বধিক। বস্তিঘরগুলো পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়েছে।”

আমেরিকান বার্তা সংস্থা এপি“র একজন প্রতিনিধি ১৯৭১ সালে মে মাসের শুরুতে ময়মনসিংহ সফর করেন। শহরের পোস্ট মাস্টারের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি তার রিপোর্টে লিখেছেন:

“যেখানে আমি (পোস্ট মাস্টার) বসবাস করতাম সেখানে ৫ হাজার অবাঙালি ছিল। বর্তমানে সেখানে মাত্র ২৫ জন জীবিত।”

একই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ১৯৭১ সালের ৭ মে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিনিধি মরিস কুইন্টান্স ময়মনসিংহ থেকে তার প্রেরিত রিপোর্টে বলেছেন:

“সাংবাদিকদের গোলযোগপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে দ্বিতীয় দিনের মতো হেলিকপ্টারে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়। সাংবাদিকরা ময়মনসিংহের পোস্ট মাস্টার এসিস্ট্যান্ট হিসেবে পরিচয়দানকারী এক ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন৷ তিনি তার ঘাড়ে একটি দাগ দেখান। তিনি বলেছেন, এ দাগ হচ্ছে তার শরীরে বেয়নেট চার্জের চিহ্ন। লোকটি জানিয়েছেন, তিনি ৫ হাজার অবাঙালির একটি কলোনিতে বাস করতেন।১৭ এপ্রিলের হত্যাকাণ্ড থেকে এ কলোনির মাত্র ২৫ জন বেঁচে যায়। এ এসিস্ট্যান্ট পোস্ট মাস্টার তার পরিবারের হত্যাকাণ্ড এবং পরিবারের সদস্যদের লাশ ক্ষতবিক্ষত করার উপাখ্যান উল্লেখ করার সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়লে আকস্মিকভাবে সাক্ষাৎকার গ্রহণ শেষ হয়ে যায়।…

ময়মনসিংহের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং বলেছেন, মার্চের শেষাংশে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আওয়ামী লীগের সশস্ত্র শাখা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সপক্ষত্যাগী সৈন্যরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।”

এ বইটি লেখার জন্য করাচিতে ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে ময়মনসিংহে অবাঙালি হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। তারা তাদের সাক্ষ্যে সেখানে রক্তপাত ও বিভীষিকার অভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন।

 

একশো সাতচচল্লিশতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৫৫ বছরের মুজিবুর রহমান ময়মনসিংহ শহরের শানকিপাড়া কলোনির ১২ নম্বর ব্লকের ৮ নম্বর কোয়ার্টারে বসবাস করতেন। তার কাপড়ের একটি দোকান ছিল। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“১৯৭১ সালে মার্চের শেষ সপ্তাহে আমি আমাদের এলাকার মসজিদে আছরের নামাজ পড়ছিলাম। হঠাৎ করে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের প্রায় ২০০ বাঙালি সৈন্য এবং আওয়ামী লীগের জঙ্গিরা শানকিপাড়া কলোনি আক্রমণ করে। তারা মসজিদে নামাজ আদায়রত অবাঙালি মুসল্লিদের ওপর মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করে। গোলাগুলিতে কমপক্ষে ৮০ জন মুসল্লি নিহত এবং অনেকে আহত হয়। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আক্রমণকারীরা ধারণা করেছিল, আমি মরে গেছি। গভীর রাতে আমি জ্ঞান ফিরে পাই। চুপি চুপি বাড়িতে ফিরে আসি। আমি দেখতে পাই যে, বাঙালি বিদ্রোহীরা আমার বাড়ি লুট করেছে। আমার পুত্র ও পুত্রবধূ নিখোঁজ। কয়েকটি বাড়িতে আগুন জ্বলছে। বাড়িতে যাবার পথে আমি অসংখ্য লাশ পড়ে থাকতে দেখি। কয়েকজন বৃদ্ধা মহিলা লাশের ওপর পড়ে বিলাপ করছিল। রাতের নীরবতা ভেঙ্গে দূর থেকে গুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল। বিদ্রোহীরা কলোনির সকল অবাঙালি পুরুষকে হত্যা করে। তারা দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ ক্রন্দনরত মহিলাদের একটি বিশাল মসজিদে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে এ শহর পুনরুদ্ধার করার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী এসব মহিলাকে উদ্ধার করে। আমাদের এলাকায় কমপক্ষে ৫ হাজার অবাঙালি বসবাস করতো। তাদের মধ্যে ২৫ জনের বেশি রক্ষা পায়নি। জীবিতদের মধ্যে আমিও ছিলাম একজন। আমি চিরদিনের জন্য ময়মনসিংহ ত্যাগ করে করাচিতে এসে পৌঁছি।”

 

একশো আটচল্লিশতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩৮ বছরের নাসিমা খাতুনের স্বামী সৈয়দ তাহির হোসেন আখতার ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে কেরাণী হিসেবে চাকরি করতেন। বাঙালি বিদ্রোহীরা তাকে হত্যা করে। নাসিমা খাতুন তার বিয়োগান্ত স্মৃতি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন:

“শানকিপাড়া কলোনির সি-ব্লকে আমাদের একটি ছোট বাড়ি ছিল।বাসিন্দাদের সবাই ছিল অবাঙালি। ১৯৭১ সালে মার্চের মাঝামাঝি থেকে ভীতি ও দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ঘনীভূত হতে থাকে। মার্চের শেষদিকে রাইফেল ও মেশিনগান সজ্জিত বিদ্রোহীরা আমাদের এলাকায় বেশকিছু বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে পুরুষদের হত্যা এবং মহিলা ও শিশুদের অপহরণ করে। ১৭ এপ্রিল প্রায় ১৫ হাজার রক্তপিপাসু বিদ্রোহী ও দুর্বৃত্ত রাইফেল ও মেশিনগান নিয়ে আমাদের কলোনি আক্রমণ করে। তারা শত শত ঘরে অগ্নিসংযোগ এবং পুরুষ ও ছেলেদের ঘর থেকে টেনে নিয়ে হত্যা করে। আমার স্বামী ও পুত্র আমাদের বাড়ির সামনের দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। আমাদের পালানোর কোনো পথ ছিল না। প্রায় ৫০ জন দুর্বৃত্ত দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে। আমি আল্লাহ ও পবিত্র কোরআনের দোহাই দিয়ে আমার স্বামী ও পুত্রের প্রাণভিক্ষা চাই। একজন দুর্বৃত্ত রাইফেলের বাট দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করলে আমি মাটিতে পড়ে যাই। দুর্বৃত্তরা আমার স্বামী ও পুত্রকে টেনে বাইরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। আমি তাদের লাশের ওপর বিলাপ করতে চাইলাম। কিন্ত দুর্বৃত্তরা বেয়নেট দিয়ে খোঁচা মেরে আমাকে একটি স্কুল ভবনে নিয়ে যায়। সেখানে আমার মতো শত শত শোকাহত বিধবা ও মা আশ্রয় নিয়েছিল। এ নরকে জীবন ছিল যন্ত্রণা। আমি বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ি। রাত-দিন প্রলাপ বকতাম। মহিলারা বিলাপ করতো। ক্ষুৎ পিপাসায় শিশুরা কাঁদতো। কয়েকজন মহিলা ও শিশু মারা যায়। কদাচিৎ কিশোরীদের দেখা যেতো। জৈবিক লালসা চরিতার্থ করার জন্য দুর্বৃত্তরা তাদের অপহরণ করেছিল। বন্দিদশার চতুর্থ দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের উদ্ধার করে৷ আমাকে ঢাকায় একটি ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে আমার পিতা আমাকে চট্টগ্রামে তার বাড়িতে নিয়ে যান। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি চট্টগ্রাম থেকে করাচিতে প্রত্যাবাসন করি ৷”

 

একশো উনপঞ্চাশতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৬০ বছরের বৃদ্ধ শেখ হাবিবুল্লাহ ছিলেন একটি বেবিট্যাক্সির মালিক। তিনি নিজেই বেবিট্যাক্সি চালাতেন। শেখ হাবিবুল্লাহ বসবাস করতেন ময়মনসিংহের শানকিপাড়া এলাকার কিস্টোপুরে দৌলতমুন্সী রোডের ১৪ নম্বর বাড়িতে। ১৯৭১ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তরা তার চারটি জওয়ান ছেলেকে হত্যা করে। শেখ হাবিবুল্লাহ জানান, তিনি ও তার ছেলেরা চমৎকার বাংলা বলতে পারতেন। তিনি ১৯৪৭ সালের আগস্টে উপমহাদেশ বিভক্তির অব্যবহিত পরে ভারতের বিহার রাজ্য থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসন করেন। তাদেরকে ‘বিহারী” বলা হতো। তিনি উর্দু ভুলে গিয়েছিলেন। তাই তিনি সাক্ষ্যদানের দলিলে দস্তখত করেন বাংলায়। বেদনা বিধুর কণ্ঠে শেখ হাবিবুল্লাহ তার জীবনের অবিস্মরণীয় স্মৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন:

“১৯৭১ সালে মার্চের মাঝামাঝি ময়মনসিংহকে উত্তেজনা গ্রাস করে। অবাঙালিদের ভয়ভীতি দেখানো হতো। তাদেরকে উপহাস করা হতো। গুজব শোনা যাচ্ছিল যে, পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে লুন্ঠিত অস্ত্র এবং ভারত থেকে পাচারকৃত অস্ত্র নিয়ে আওয়ামী লীগ অবাঙালিদের ওপর হামলা করবে। ২৩ মার্চ প্রথম আওয়ামী লীগের গুন্ডারা শানকিপাড়া কলোনিতে হামলা করে। মার্চের শেষ সপ্তাহ এবং এপ্রিলের প্রথমার্ধে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র গুন্ডা এবং বিদ্রোহী বাঙালি সৈন্যরা হাজার হাজার অবাঙালিকে হত্যা করে এবং তাদের বাড়িঘর লুট ও অগ্নিসংযোগ করে। এপ্রিলের শুরুতে ৫০ জন সশস্ত্র বিদ্রোহীর একটি দল আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। আমার উপযুক্ত ছেলে সানাউল্লাহ, শফি আহমেদ, আলী আহমেদ ও আলী আখতার আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। একজন বন্দুকধারী আমার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে হত্যা করার জন্য বন্দুক তাক করলে আমি তাকে ঝাপটে ধরি। সে আমাকে মাথায় আঘাত করলে আমি মাটিতে পড়ে যাই। আমার জ্ঞান হারানোর ঠিক আগ মুহূর্তে মেশিনগানের গুলি চালানো হয়। গুলিতে আমার ছেলেরা ধরাশায়ী হয়। তারা রক্তে ভাসছিল। আমি সানাউল্লাহ ও শফি আহমেদের স্ত্রীদের চিৎকার দিয়ে একটি রুমের দিকে দৌড়ে যেতে দেখি। সেখানে তাদের স্বামীদের হত্যা করা হচ্ছিল। আমি জ্ঞান হারাই। দুর্বৃত্তরা ভেবেছিল আমি মারা গেছি। পরদিন ভোরে আমি জ্ঞান ফিরে পাই। আমি আমার চার পুত্রের লাশ দেখতে পাই। আমি প্রায় পাগল হয়ে যাই। তাদের রক্তমাখা মুখে চুমো দেই। তাদের হৃদস্পন্দন অনুভব করার চেষ্টা করি। কিন্ত হায়! তাদের সবাই ছিল তখন মৃত। আমার দুই পুত্রবধূর কোনো খোঁজ নেই। আমার বাড়ি লুন্ঠিত। মূল্যবান কোনো জিনিসপত্র নেই। আমি আমার ছেলেদের লাশ দাফনের জন্য গোরস্তানে নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছিলাম। আমার আশপাশে কোনো জীবিত মানুষ নেই। আমার কানে দূর থেকে গুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল। আমাদের ভুতুড়ে কলোনিতে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ছিল একমাত্র জীবনের স্পন্দন। আমার বাড়ির পাশের রাস্তায় লাশের ছড়াছড়ি।

এলাকার একটি মসজিদে কয়েকজন ভাগ্যাহত বিহারী আশ্রয় নিয়েছিল। বাঙালিরা এ মসজিদের নাম দিয়েছিল ‘বিহারী মসজিদ’৷ একটি বিশাল সশস্ত্র গ্রুপ মসজিদের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে ১৭৫ জন অবাঙালিকে হত্যা করে। প্রায় তিন শ’ অবাঙালি শানকিপাড়ায় তাদের বাড়িঘর ছেড়ে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়। তাদের কোনে অস্ত্র ছিল না।এপ্রিলের গোড়ার দিকে বিদ্রোহীরা তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ময়মনসিংহ পুনরুদ্ধার করার পর আমি গোরস্তানে আমার ছেলেদের লাশ দাফন করি। আমি নিকটবর্তী চল্লিশবাড়ি, ছত্রিশবাড়ি, ইসলামাবাদ ও আইকা কলোনিতে যাই। আমার মতো দু’একজন বৃদ্ধ ছাড়া সেখানে আর কেউ জীবিত ছিল না। একসময়ের জনবহুল কলোনিগুলোতে জনমানবের কোনো চিহ্ন ছিল না। গোটা এলাকায় পঁচা লাশের দুর্গন্ধ ৷ অসংখ্য বাড়ি ভস্মীভূত। বাড়িঘরগুলো ছাই ভস্মে পরিণত ৷ আমি জানতে পেরেছিলাম যে, ময়মনসিংহে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকার সময় বিদ্রোহীরা শানকিপাড়া কলোনিতে দেড় হাজারের বেশি অবাঙালি যুবতী মহিলাকে ধর্ষণ ও অপহরণ করেছে। কয়েকজন বিহারী মহিলা নিজেদের ইজ্জত বাঁচাতে কুয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে।

থানার কাছাকাছি বড় মসজিদের বাঙালি ইমাম ছিলেন একজন ফেরেশতা। তিনি শানকিপাড়া হত্যাযজ্ঞে জীবিত পাঁচ শতাধিক বিহারীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ইমাম সাহেব বাঙালি বিদ্রোহীদের কাছে তাদের জীবন ভিক্ষা চান। বাঙালি মোয়াজ্জিনের সহায়তায় তিনি অন্যান্য এলাকায় ধার্মিক বাঙালিদের কাছ থেকে ভাত সংগ্রহ করে মসজিদে আশ্রিত ভীত সন্ত্রস্ত অবাঙালি পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের খাইয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের গুন্ডারা তাকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী যথাসময়ে এসে পৌঁছে যাওয়ায় তার জীবন রক্ষা পায় এবং বিহারীরা মসজিদে আশ্রয় লাভের সুযোগ পায়। মার্চে অবাঙালি হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার আগে বেবিট্যাক্সি ড্রাইভার হিসেবে আমি ভালোভাবে সেনানিবাস চিনতাম। সেখানে অবস্থানরত সৈন্যদের মধ্যে আমার পাঠান ও পাঞ্জাবী বন্ধু ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেনানিবাস পুনর্দখল করার তিনদিন পর সেখানে গিয়ে আমি ২৬-২৭ মার্চ মধ্যরাতে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী বাঙালি সৈন্যদের হামলায় অবাঙালি সৈন্য ও তাদের পরিবারবর্গের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা জানতে পারি। আমার পশ্চিম পাকিস্তানি বন্ধু সৈন্যদের কোনো চিহ্ন ছিল না। আমি ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে করাচিতে ফিরে আসি।”

 

একশো পঞ্চাশতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩১ বছরের আনোয়ার হোসেন ময়মনসিংহে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালের মার্চে একজন বাঙালি বন্ধু তার জীবন রক্ষা করে। শরৎকালে তাকে ও তার পরিবারকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের পতন ঘটলে ঢাকার মোহাম্মদপুরে তারা আতঙ্কিত জীবনযাপন করে। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘের তত্বাবধানে তারা করাচিতে পৌঁছে। আনোয়ার হোসেন ১৯৭১ সালে মার্চের ঘটনাবলীর ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন:

“১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ আওয়ামী লীগ ময়মনসিংহে একটি বিরাট মিছিল বের করে। মিছিলকারীদের অনেকের কাছে ছিল রাইফেল, বর্শা, কুঠার, ছোরা ও লাঠি। আমার স্থানীয় বাঙালি বন্ধু আমাকে জানিয়েছিলেন যে, মিছিলকারীদের মধ্যে ময়মনসিংহের স্থানীয় লোক ছিল কম। মিছিলটি আমাদের এলাকা প্রদক্ষিণ করে এবং বিহারীদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়। মিছিলে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের উগ্রপন্থীরা মাইকে ঘোষণা করে যে, সকল অবাঙালিকে স্বেচ্ছায় অস্ত্র জমা দিতে হবে। নয়তো তল্লাশি চালানো হবে এবং কারো কাছে অস্ত্র পাওয়া গেলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে। আমাদের এলাকার বিহারী অধিবাসীরা তাদের অস্ত্র জমা দেয়। অস্ত্রের মধ্যে ছিল কয়েকটি বন্দুক, ছোরা ও বর্শা। যেসব অবাঙালি মিছিলকারীদের কাছে অস্ত্র জমা দিতে গিয়েছিল তাদেরকে একটু দূরে একটি খোলা জায়গায় হেঁটে যেতে বলা হয়। সেখানে তাদেরকে হত্যা করা হয়। কয়েক ঘন্টা পর মিছিলকারীরা আমাদের এলাকায় ফিরে আসে এবং অসংখ্য অবাঙালির বাড়িঘর লুট ও অগ্নিসংযোগ করে। বন্দুকের মুখে বিলাপরত মহিলাদের একটি স্কুল ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। এসব মহিলার অনেকের সঙ্গে ছিল দুগ্ধপোষ্য শিশু। মার্চের মাঝামাঝিতে আমি আশংকা করছিলাম যে, বিহারীদের ওপর বাঙালিদের হামলা আসন্ন। আমি একজন চরিত্রবান ইসলামপ্রিয় বাঙালি বন্ধুর সহায়তা কামনা করি। আমাদের এলাকায় আওয়ামী লীগের হামলা শুরু হওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে আমি তার বাড়িতে আমার পরিবার স্থানান্তরিত করি। এভাবে আমি হত্যাকাণ্ড থেকে রেহাই পায়। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ময়মনসিংহ পুনদর্খল করার পর আমি আমাদের বাড়িতে ফিরে যাই। আমার বাড়ি ছিল আংশিক ভস্মীভূত ও লুন্ঠিত। আমি একসময়ের হাস্য কোলাহলপূর্ণ জনবহুল বসতিতে খুব কমসংখ্যক অবাঙালিকে জীবিত দেখতে পাই।”

 

একশো একান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩৫ বছরের ফাহিম সিদ্দিকী ময়মনসিংহে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন এবং দু’ভাইকে নিয়ে সীতারামপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। ১৯৭১ সালের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি তার সাক্ষ্য বলেছেন:

“১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি একটি রুশ জাহাজে করাচির উদ্দেশে চট্টগ্রাম ত্যাগ করি। আমি মনস্থির করেছিলাম যে, বিগত সোয়া দু’বছরের দুঃস্বপ্ন ভুলে যাবো। আমি আমার জীবনের সর্বোত্তম সময় ময়মনসিংহে কাটিয়েছি। আমি এ শহরকে অত্যন্ত ভালোবাসতাম এবং বাঙালি ও অবাঙালিদের মধ্যে আমার অত্যন্ত ভালো বন্ধু ছিল। আমি চমত্কার বাংলা বলতে পারতাম ৷ ১৯৭১ সালে মার্চের শেষদিকে বন্দুক ও শাবল নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি উন্মত্ত জনতা আমাদের এলাকায় অবাঙালিদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে। পুরুষদের হত্যা, বাড়িঘর লুট ও অগ্নিসংযোগ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। দুর্বৃত্তরা আমার বাড়ি লুট করে এবং নিকটবর্তী একটি মাঠে আমার উপযুক্ত দুই ভাইকে হত্যা করে। এ মাঠটি ছিল একটি বধ্যভূমি। আমাদের এলাকায় দুর্বৃত্তরা প্রবেশ করার কয়েক মিনিট আগে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। আমি একটি জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনে আশ্রয় নেই। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ থেকে ময়মনসিংহ পুনর্দখল করা নাগাদ আমি সেখানে অবস্থান করি। আমি আমার এলাকায় হত্যাকাণ্ড থেকে খুব কম লোককে জীবিত থাকতে দেখতে পাই।”

 

একশো বায়ান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩৫ বছরের আনোয়ারী বেগম ময়মনসিংহে রেলওয়ে কলোনির টি-৫৬ নম্বর কোয়ার্টারে বসবাস করতেন। তিনি বাঙালি বিদ্রোহীদের হাতে তার স্বামীর হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেন। আনোয়ারী বেগম তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে ময়মনসিংহ শহর ছিল বাঙালি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। এ সময় অর্ধ ডজন বাঙালি আমাদের বাসায় এসে আমার স্বামীকে জানায় যে, আমরা আমাদের যাবতীয় নগদ অর্থ ও অলঙ্কার দিয়ে দিলে তারা আমাদের রক্ষা করবে। আমি তৎক্ষণাৎ আমার সব অলঙ্কার খুলে তাদের হাতে তুলে দেই। দ্রুত নগদ অর্থগুলো বাঙালি আগন্তকদের কাছে হস্তান্তর করি। আমরা আতঙ্কের মধ্যে রাত কাটাই। আমি আমাদের বাড়ি ছেড়ে শহরের অন্য এলাকায় এক বাঙালি বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেয়ার জন্য আমার স্বামীকে পরামর্শ দেই। কিন্তু যারা আমাদের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও অলঙ্কার নিয়েছিল তাদের নিরাপত্তা প্রদানের আশ্বাসে তিনি আমার প্রস্তাবে দ্বিমত পোষণ করেন। পরদিন এক ডজন সশস্ত্র বিদ্রোহী আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে ৷ তাদের মধ্যে তিনজন তার আগের দিন আমাদের বাড়িতে এসেছিল। তাদের কারো কারো মাথায় ছিল লাল ক্যাপ ৷ তাদেরকে হিন্দু বলে মনে হলো। আমার স্বামী তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করলে তারা তার বুকে গুলি করে। গুলিতে তার শরীর রক্তে ভেসে যায়। আমার স্বামীর একজন অবাঙালি বন্ধু ও তার ছেলে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলে গুলিতে তাদের ঝাঝরা করে দেয়া হয়। বিদ্রোহীরা আমার ১৬ বছরের ছেলের খোঁজ করে। আমি তাকে ছাদে এক গাদা মাদুরের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলাম। বিদ্রোহীরা সূর্যাস্তের পর ময়মনসিংহকে নিষ্প্রদীপ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। আমার বাড়িতে কোনো আলো ছিল না। বারান্দায় আমার স্বামীর গোঙানির শব্দ শুনে পা টিপে টিপে তার কাছে যাই। তাকে পানি খেতে দেই। তার রক্ত মুছে দেই। তিনি খুব ক্ষীণ স্বরে কথা বলছিলেন। বাঙালি বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কা করে তিনি আমাকে ভয় না পাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বললেন, “আল্লাহর ওপর ভরসা রেখো। তিনি তোমাদের রক্ষা করবেন।” আমার স্বামী আমাদের ১০ মাস বয়সী ছেলের গালে চুমো দেন। তারপর তিনি আমাদের ৯ বছরের দ্বিতীয় ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। হামলার সময় আমার দ্বিতীয় ছেলে খাটের নিচে লুকিয়েছিল। আমার স্বামীর মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হয়। তার ক্ষত স্থান থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। তবে তিনি ছিলেন সাহসী। তিনি আমাকে তার বন্ধু ও বন্ধুর ছেলের নাড়ি পরীক্ষা করতে বললেন। তাদের শরীর ছিল ঠান্ডা। তারা ছিল মৃত। খুব ভোরে আমার স্বামী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। জোরে চিৎকার করে উঠি। আমার চিতকার শুনে বিদ্রোহীরা আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে আমার দিকে তাদের বন্দুক তাক করে। তারা আমাকে তাদের সঙ্গে যাবার নির্দেশ দিয়ে বললো, তারা আমার স্বামীকে কবর দেবে। আমি একটি কম্বল দিয়ে তার মুখ ঢেকে দিয়ে তাদের অনুসরণ করি। সঙ্গে ছিল আমার দুই ছেলে। বড় ছেলে ছিল ছাদে লুকানো।

আমাদের চলার পথ এবং আশপাশের রাস্তায় ছিল শত শত লাশ। বহু বাড়িঘর ভস্মীভূত। ভ্রাম্যমাণ বিদ্রোহীরা বাড়িঘরে জীবিতদের খুঁজছিল। তারা জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে কয়েকটি লাশে ছ্যাকা দেয়। যেখানে সামান্য কিছু নড়াচড়া করছিল সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছোঁড়া হচ্ছিল।আমাদেরকে শহরের একটি মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। পথে বিদ্রোহীরা আমাদেরকে বললো, কয়েকদিন পর আমরা তাদের বাসায় কাজ করবো। তাই তারা আমাদের হত্যা করছে না। মসজিদের ভেতরের দৃশ্য ছিল ভয়াবহ। শত শত ক্রন্দনরত মহিলা ও শিশু। কোনো পানি ও খাদ্য নেই।আমি আমার শাড়ির একটি অংশ ছিঁড়ে তাতে আমার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে শোয়াই। আমরা মসজিদের এক খাদেমকে আমাদের জন্য একটু পানি এনে দিতে বলি। খাদেম আমার অনুরোধ রক্ষা করেন। দু’দিন আমাদের কোনো খাদ্য ছিল না। তৃতীয় দিন মসজিদের ইমাম আমাদেরকে সামান্য খাবার দেন। তিনি বাঙালি হলেও আমাদের কাছে ছিলেন ফেরেশতা। রাতদিন তিনি দুশ্চিন্তা করতেন ৷ বলতেন, বিদ্রোহীরা আমার বড় ছেলেকে সম্ভবত খুন করেছে। চতুর্থ দিন আমার দোয়া কবুল হয়। সেদিন আমার বড় ছেলে মসজিদে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সে জানায় যে, তার প্রতি একজন বাঙালি প্রতিবেশীর দয়া হয়েছিল। তিনি তাকে মসজিদে পৌছে দিয়েছেন। ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ময়মনসিংহ পুনর্দখল করে আমাদেরকে উদ্ধার করে। নিহত অবাঙালিদের পঁচা গলা লাশ দাফনে অনেক দিন লেগেছিল। আমি আমার স্বামীর লাশের খোঁজে আমাদের বাড়িতে ফিরে যাই। কিন্তু তার লাশের কোনো চিহ্ন ছিল না। মেঝেতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাক্ষ্য বহন করছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরকে ঢাকায় একটি ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তর করে। আমরা সেখানে শান্তিতে বসবাস করেছি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনী পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিলে আবার আমাদের দুর্ভাগ্য শুরু হয়। নির্যাতন ও দুঃখ দুর্দশায় এত অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম যে, আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম। অবসন্ন শরীর ছাড়া আমাদের হারানোর আর কিছু ছিল না। ১৯৭৪ সালের মার্চে আমি ও আমার তিন সন্তান ঢাকা থেকে বিমানযোগে করাচিতে প্রত্যাবাসন করি।”

 

একশো তিপান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

১৯৭১ সালে মার্চের শেষদিকে ময়মনসিংহের শানকিপাড়ায় বিদ্রোহীরা ৫০ বছরের কামরুন্নেছার স্বামী মোহাম্মদ কাসিম ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে হত্যা করে। তিনি অশ্রুভেজা চোখে তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“সময়টি ছিল মার্চের শেষ সপ্তাহ, ১৯৭১ সাল। আমরা গুজব শুনছিলাম ছিলাম যে, আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী সৈন্যরা ময়মনসিংহের সকল উর্দূভাষী লোককে হত্যার পরিকল্পনা করছে। এ গুজব শুনতে পেয়ে আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। কয়েকটি জায়গায় অবাঙালি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। প্রতিদিন বিক্ষোভকারীরা ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিতো এবং দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অবাঙালি এলাকা প্রদক্ষিণ করতো। সন্ধ্যায় কয়েকটি বাঙালি ছেলে আমাদের দরজার কড়া নাড়ে এবং আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে চায়। তিনি দরজা খুলে দিলে কয়েকজন সশস্ত্র লোক ঘরে প্রবেশ করে। অস্ত্রের মুখে তারা তাকে এবং আমার উঠতি বয়সের ছেলেকে তাদের সঙ্গে যেতে বলে। আমি আমার স্বামী ও ছেলের প্রতি দয়া দেখাতে এবং তাদের জীবন ভিক্ষা দিতে তাদের অনুরোধ করি। কিন্ত তারা ছিল হৃদয়হীন পাষাণ। আমি আমার স্বামী ও ছেলেকে আর কখনো দেখিনি। দুর্বৃত্তরা তাদের হত্যা করে। আমার কাঁধে একটি বেয়নেট দিয়ে খোঁচা দিয়ে তারা আমাকে দ্বিগুণ গতিতে হাঁটতে বাধ্য করে। আমাকে নিকটবর্তী একটি স্কুল ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরো শত শত মহিলা ও শিশুকে আটক রাখা হয়েছিল। আমরা রাস্তায় ও রাস্তার পাশে তাদের হতভাগ্য স্বামী ও পিতার রক্তমাখা লাশ দেখেছিলাম ৷ আমি একজন বিদ্রোহীকে একটি লাশে জ্বলন্ত সিগারেট ঠেসে ধরতে দেখি। জীবিত মনে করে সে সিগারেট চেপে ধরেছিল। কিন্ত লোকটি ছিল পুরোপুরি মৃত। পরদিন স্কুল ঘরে আশ্রিত মহিলা ও শিশুদের একটি বিশাল মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। এ মসজিদে আরো শত শত বিধবা ও এতিম শিশু ছিল। এসব বিধবা ও এতিম শিশু তাদের প্রিয়জনদের জন্য বিলাপ করছিল। মসজিদের বাঙালি ইমাম ছিলেন দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তিনি আমাদের জন্য খাদ্য ও পানি সংগ্রহ করেন। ইমাম সাহেব আমাদেরকে হত্যা করা থেকে বিদ্রোহীদের বিরত রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী যথাসময়ে পৌঁছে যাওয়ায় আমরা মৃত্যুর ছোবল থেকে রক্ষা পাই। সেনাবাহিনী আমাদের উদ্ধার করে ঢাকায় একটি ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তর করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সৈন্য ও মুক্তিবাহিনী ঢাকা দখল করে নেয়ার পর আমাকে আরো শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে আমি ঢাকা থেকে করাচিতে প্রত্যাবাসন করি।”

 

একশো চুয়ান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

১৯৭১ সালের মার্চে-এপ্রিলে ৬০ বছরের গাফুরুন্নিসা ময়মনসিংহে দুর্ভোগে পতিত হন। বিদ্রোহীরা তার স্বামী ও পুত্রকে হত্যা করে। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“১৯৭১ সালে মার্চের শেষ সপ্তাহে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈন্যরা আমাদের এলাকায় হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে। প্রাথমিকভাবে আমাদের এলাকার পাঞ্জাবী বাসিন্দারা তাদের হামলার শিকার হয়। আমাদের এলাকার প্রায় ৭০টি পাঞ্জাবী পরিবারের সকল যুবক ও মাঝবয়সী পুরুষকে অস্ত্রের মুখে একটি দূরবর্তী জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা জানতে পেরেছিলাম যে, জায়গাটি ছিল অবাঙালিদের হত্যার জন্য বিদ্রোহীদের তৈরি একটি কসাইখানা। এপ্রিলের দ্বিতীয় পক্ষকালে এসব সন্ত্রাসী আমাদের এলাকার অন্যান্য অবাঙালির ওপর হামলা চালায়। অবাঙালিদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ এবং বাসিন্দাদের হত্যা করা হয়। তারা আমার বাড়িতে ঢুকে আমার স্বামী ও বিবাহিত ছেলেকে টেনে হিচড়ে অর্ধ ক্রোশ দূরে একটি খোলা মাঠে নিয়ে যায়।

আমি এসব বন্দির মধ্যে আমার ভাই ও তার কিশোর পুত্রকে দেখতে পাই। আটককৃত অবাঙালিদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে বাংলাদেশের পতাকাকে স্যালুট করার নির্দেশ দেয়া হয়। বন্দুক তাক করে রাখা সত্ত্বেও তাদের অনেকে বাংলাদেশের পতাকার প্রতি সম্মান জানাতে অস্বীকৃতি জানায়। এসময় বিদ্রোহীদের বন্দুক থেকে এক ঝাঁক বুলেট ছুটে যায় এবং শত শত নির্দোষ মানুষ ঢলে পড়ে। যাদের শেষনিঃশ্বাস ত্যাগে দেরি হচ্ছিল তাদের হৃদপিন্ডে ফের গুলি করা হয়। কোনো পুরুষ জীবিত নেই একথা নিশ্চিত হয়ে বিদ্রোহীরা আবার অবাঙালিদের বাড়িঘরে চড়াও হয়। তখন বিধবা মহিলারা তাদের স্বামীদের জন্য বিলাপ করছিল। আমি একজন নেতাকে তার সহযোগীদের বলতে শুনেছি যে, চাকরাণী হিসেবে খাটানোর জন্য অবাঙীলি মহিলাদের রেহাই দেয়া হচ্ছে। আমার সঙ্গে ছিল আমার বিধবা পুত্রবধূ ও তার এক বছরের পুত্র। আমাদেরকে একটি স্কুল ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন আমাদের ঠাঁই হয় একটি বিশাল মসজিদে। যন্ত্রণা ও দুর্ভোগের মধ্যে আমরা ৬ দিন এ মসজিদে অবস্থান করি। অধিকাংশ সময় আমরা আমাদের স্বামী ও ছেলেদের আখেরাতে মুক্তির জন্য দোয়া করতাম। ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ময়মনসিংহ পুনর্দখল করে আমাদেরকে উদ্ধার করে। আমাদেরকে ঢাকায় একটি ত্রাণ শিবিরে স্থানাস্তর করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নেয়ার পর আমরা ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি বিহারী ক্যাম্পে ভীতির মধ্যে বসবাস করতাম। ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ আমাকে, আমার পুত্রবধূ ও তার শিশু ছেলেকে করাচিতে প্রত্যাবামন করলে আমাদের দুর্দশার অবসান ঘটে।”

 

একশো পঞ্চান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩০ বছরের জেবুন্নিসার স্বামী মোহাম্মদ ইব্রাহিম ছিলেন ময়মনসিংহ রেলের একজন কর্মচারী। জেবুন্নিসা তার অকাল বৈধব্য বরণের ট্রাজেডি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন:

“আমরা দীর্ঘদিন আমাদের বাঙালি প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতাম। আমার স্বামী ছিলেন শান্ত প্রকৃতির ও কঠোর পরিশ্রমী। রাজনীতিতে তার কোনো আগ্রহ ছিল না। ১৯৭১ সালে মার্চের শেষ সপ্তাহে বেশ কয়েকজন অপরিচিত সশস্ত্র যুবক আমাদের দরজা ভেঙ্গে আমার স্বামীকে কাবু করে ফেলে। আমার স্বামী ও তিন শিশু সন্তানকে রেহাই দেয়ার জন্য আমি তাদের কাছে কাকুতি মিনতি করি। তারা আমাকে থাপ্পর দিয়ে এবং আমার ক্রন্দনরত শিশুদের লাথি মেরে আমার স্বামীকে ধরে বাড়ির বাইরে নিয়ে যায়। আরেক দল ক্রুদ্ধ জনতা তাকে গণপিটুনি দিয়ে টেনে হিঁচড়ে বধ্যভূমিতে নিয়ে যায়। বিদ্রোহী জনতা আমার বাড়ি লুট করে এবং অস্ত্রের মুখে আমাকে ও আমার শিশু সন্তানদের একটি ছোট ভবনে নিয়ে যায়। আমি জানতে পেরেছিলাম যে, ভবনটি ছিল একটি পুরনো কারাগার। আমরা এ নরকে তিন সপ্তাহের বেশি অবস্থান করি। দুর্ভোগ এত তীব্র ও অসহ্য হয়ে দাঁড়ায় যে, আমি আল্লাহর কাছে মৃত্যু কামনা করতাম। ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরকে এ নরক থেকে উদ্ধার করে। তিনদিন আমি আমার স্বামীর খোঁজে গোটা ময়মনসিংহ ঘুরেছি। কিন্তু তার কোনো সন্ধান পাইনি। আমাদের সৈন্যরা আমাকে সান্তনা দেয়৷ ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি আমাকে ও আমার এতিম শিশুদের ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ আমাদেরকে নিরাপদে করাচিতে প্রত্যাবাসন করলে আমাদের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়।”

 

একশো ছাপান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

২৪ বছরের শাহজাদী বেগমের স্বামী আখতার হোসেন ময়মনসিংহে একজন পোস্টম্যান হিসেবে চাকরি করতেন । ১৯৭১ সালে এপ্রিলের প্রথমার্ধে ময়মনসিংহ শাহজাদী বেগমের স্বামী আখতার হোসেন, শ্বশুর ও দেবরকে হত্যা করা হয়। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“ময়মনসিংহ শহরের উপকণ্ঠে আমাদের একটি ছোট্ট বাড়ি ছিল। ১৯৭১ সালে মার্চের মাঝামাঝি থেকে আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছিলাম । আমরা আতঙ্কজনক খবর পাচ্ছিলাম যে, আওয়ামী লীগের জঙ্গিরা সকল পাঞ্জাবীকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। ২৩ মার্চ আমার স্বামী আতঙ্কিত হয়ে বাড়িতে ফিরে এসে জানান যে, আওয়ামী লীগের জঙ্গি, বিদ্রোহী সৈন্য ও পুলিশ তার প্রচুর পাঞ্জাবী বন্ধুকে হত্যা করেছে। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে একটি সশস্ত্র বাঙালি জনতা আমাদের বাড়িতে ঢুকে আমার স্বামী, শ্বশুর ও আমার কিশোর দেবরকে টেনে বের করে নিয়ে যায়। বন্দুকের মুখে তারা মহিলাদেরকে ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়। আমার স্বামী, শ্বশুর ও দেবরসহ অবাঙালি পুরুষদের একটি খোলা মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

বিদ্রোহীরা আমাকে ও আমার দুই শিশু মেয়েকে তাদের সঙ্গে যেতে বাধ্য করে। আমরা একটি সবুজ মাঠ অতিক্রম করার সময় একটি ভয়াবহ দৃশ্য দেখি। মাঠে শত শত লাশ। ফায়ারিং স্কোয়াডে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। মনে হলো কাউকে কাউকে চাকু অথবা ছোরা মেরে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের আটককারী একজন বাঙালি বিদ্রোহী একটি শরীর নড়াচড়া করে উঠতে দেখে তৎক্ষণাৎ গুলি করে। আমি আতঙ্কে চোখ বন্ধ করি।আমার দুই মেয়ে ভয়ে কাঁপতে শুরু করে। আমাদের আটককারীদের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি এবং চকচকে বেয়নেটের মুখে প্রথর রোদে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না। একটি রাস্তা ধরে এগিয়ে যাবার সময় আমরা পুরো রাস্তায় অসংখ্য রক্তাক্ত লাশ দেখতে পাই। কাউকে কাউকে ট্রাকে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি যে, বহু অবাঙালির মৃতদেহ নিকটবর্তী বহ্মপুত্রে ফেলে দেয়া হয়। পথে আমরা শত শত ভস্মীভূত ঘরবাড়ি ও বস্তিঘর দেখতে পাই।

আমরা একটি স্কুল ভবনে এক ঘন্টা অবস্থান করি। স্কুল ভবনের একটি অংশকে দৃশ্যত অবাঙালি হত্যাকাণ্ডের জন্য কসাইখানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখানে ছিল মৃতদেহের স্তুপ। আমাদেরকে আরেকটি স্কুল ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। এ স্কুলে শত শত শোকাহত মহিলা ও শিশুকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল। আমি একজন মহিলার হাতে একটি পবিত্র কোরআন দেখি। কোরআনের দোহাই দিয়ে মহিলা তার শিশু বাচ্চাদের খোঁজে তাকে বাড়িতে যাবার অনুমতি দিতে আটককারীদের কাছে অনুরোধ করছিলেন। একজন তরুণ আটককারী তার হাত থেকে কোরআন কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তার মুখে আঘাত করে।

 

আমরা এ কারাগারে এক সপ্তাহ নির্যাতিত হই। বহু শিশু পিপাসা ও ক্ষুধায় মারা যায়। ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরকে উদ্ধার করে। অধিকাংশ মহিলা ও শিশুকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। আমি ময়মনসিংহে ফিরে যাই। ৮ মাস আমরা শান্তিতে বসবাস করছিলাম। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী ময়মনসিংহ দখল করে নিলে আবার আমাদের আতঙ্কিত জীবন শুরু হয়। ১৯৭২ সালের গোড়ার দিকে ময়মনসিংহে বিহারীদের জন্য নির্মিত ব্রেডক্রসের একটি শিবিরে স্থানান্তরিত হলে আমাদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি ও আমার দুই সন্তান করাচিতে প্রত্যাবাসন করি। আমি বিশ্বাস করি যে, ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে ময়মনসিংহে যারা অবাঙালিদের হত্যা করেছিল তাদের অধিকাংশ ছিল ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী বাঙালি হিন্দু।”

 

একশো সাতান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৪৫ বছরের আমিনা খাতুনের স্বামী জয়নুল আবেদীন ছিলেন একজন মিস্ত্রি! ১৯৭১ সালে এপ্রিলের মাঝামাঝি ময়মনসিংহের শানকিপাড়ায় বিদ্রোহীরা জয়নুল আবেদীনকে হত্যা করে। আমিনা খাতুন তার স্বামীর হত্যাকান্ড সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন:

“১৫ এপ্রিল একটি সশস্ত্র গ্রুপ আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। তারা আমার বাড়ি লুট করে এবং আমাকে ও আমার স্বামীকে নিকটবর্তী একটি মাঠে নিয়ে যায়। মহিলাদের কাছ থেকে একটু দূরে পুরুষদের লাইনে দাঁড় করানো হয়। বন্দিদের সবাই ছিল অবাঙালি! হঠাৎ করে কঠোর দর্শন এক যুবক গুলি করার নির্দেশ দেয়। তার নির্দেশ দানের সঙ্গে সঙ্গে শতাধিক অবাঙালির বুক বিদীর্ণ হয়ে যায়। আমার হৃদয়ে এখনো সে স্মৃতি গেঁথে রয়েছে। আমি আমার স্বামীকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখি। তার বুক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। মৃত্যু যন্ত্রণায় তিনি কাতরাচ্ছিলেন। আমি তার পাশে ছুটে যাবার চেষ্টা করি। এসময় একজন বন্দুকধারী বন্দুক দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করে। আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফিরে এলে শুরু হয় আমার ওপর অকথ্য নির্যাতন। আমাকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচা মারা হতো। লাখি দেয়া হতো। সেই সঙ্গে চলতো অশ্লীল গালিগালাজ। আমাকে একটি মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ছিল আরো শত শত বিধবা মহিলা ও শিশু ৷ মসজিদের বন্দি জীবন ছিল নরকতুল্য। আমরা ৬ দিন বন্দি ছিলাম ৷ ৬ দিনের মধ্যে আমরা চারদিন কেবল পানি খেয়ে বেঁচে থাকি। আমাদের কোনো খাবার ছিল না। ক্ষুধায় বহু শিশুর মৃত্যু হয়। আমাদের প্রতি মসজিদের কয়েকজন খাদেমের দয়া হয়৷ তারা আমাদের জন্য ভাত সংগ্রহ করে। ক্ষুধার্থ শিশুরা এসব ভাত খায়। আমাদেরকে জানানো হয় যে, বিদ্রোহীরা আমাদেরকে হত্যা করবে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। ২১ এপ্রিল দুপুরের প্রাক্কালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের উদ্ধার করে। তার আগে মসজিদ থেকে বিদ্রোহীরা পালিয়ে যায়। সকল দুঃস্থ মহিলা ও শিশুকে ঢাকায় একটি ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তর করা হয়৷ ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে আমি করাচিতে প্রত্যাবাসন করি।”

 

একশো আটান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩২ বছরের সায়রার স্বামী আবদুল হামিদ খান ময়মনসিংহে পুলিশ বাহিনীতে ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিদ্রোহীরা তাকে হত্যা করে। সায়রা তার স্বামীকে হত্যা করার দৃশ্য দেখেছেন। তিনি এ ঘটনার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন:

“আমার স্বামী অবাঙালি ও পাঠান হওয়ায় ১৯৭১ সালে মার্চের মাঝামাঝি থেকে বাঙালি বিদ্রোহী সৈন্য ও পুলিশ তাকে হত্যা করার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিল। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তাদের একটি গ্রুপ আমাদের বাড়িতে ঢুকে আমার স্বামীকে ঘায়েল করে ফেলে এবং তাকে টেনে হিচড়ে নিকটবর্তী একটি ধানক্ষেতে নিয়ে যায়। আমার সন্তানরা কান্নাকাটি করছিল। আমি আমার তিন সন্তানের কান্নাকাটি উপেক্ষা করে বিদ্রোহীদের পিছু নিয়ে ধানক্ষেতে গিয়ে হাজির হই। আল্লাহর নামে আমি আমার স্বামীর জীবন ভিক্ষা দেয়ার জন্য তাদেরকে অনুরোধ করি। কিন্ত তারা আমার স্বামীকে হত্যা করতে ছিল বদ্ধপরিকর ৷ তাদের একজন একটি লম্বা ছোরা দিয়ে আমার স্বামীর গলা কেটে ফেলে। আমি শিহরিত ও বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। আমি আমার স্বামীর দিকে ছুটে গেলে ঘাতকরা আমাকে ঝাপটে ধরে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে। আমার স্বামীর মৃত্যু ত্বরান্বিত করার জন্য ঘাতকরা তার পেট ও বুকে ছুরিকাঘাত করে। এ সময় আমি তার গোঙানি শুনতে পাই। ঠিক তখন চারজন বন্দুকধারী ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় এবং আমাকে টানা হ্যাচড়া করে আমার বাড়িতে নিয়ে যায়। আমার বাড়ি ছিল লুন্ঠিত। আমার ভীতসন্ত্রস্ত শিশুরা ছিল ঘরের দরজায় দাঁড়ানো। বন্দুক উঁচিয়ে সন্ত্রাসীরা আমাকে একটি বিশাল মসজিদে নিয়ে যায়। সেখানে যাবার পথে রাস্তায় আমি শত শত লাশ দেখি। বহু ঘরবাড়ি ছিল ভস্মীভূত। মসজিদের অভ্যন্তরে জীবন ছিল মৃত্যু সমতুল্য। শোকে স্তম্ভিত সহস্রাধিক মহিলা ও শিশু ছিল সেখানে আশ্রিত। অধিকাংশকে তুলে নিয়ে যাওয়ায় আমি কদাচিৎ তাদের দু’একজনকে দেখতে পাই। মসজিদের খাদেম নিকটবর্তী পুকুর থেকে আমাদের জন্য কিছু পানি নিয়ে আসেন। এ পানি আমাদের জীবন রক্ষায় সহায়ক হয়। ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরকে এ প্রেতপুরী থেকে উদ্ধার করে। সেনাবাহিনী আমাকে ও আমার এতিম শিশুদের ঢাকায় স্থানান্তর করে। ঢাকায় আমরা একটি ত্রাণ শিবিরে বসবাস করতাম। ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে আমরা বিমানে করাচি এসে পৌছি।”

 

একশো উনষাটতম সাক্ষীর বিবরণ: 

২৭ বছরের নাসিমা ছিলেন বাঙালি। তবে তার স্বামী আবদুল জলিল ছিলেন বিহারী। ময়মনসিংহে আবদুল জলিলের একটি খুচরা দোকান ছিল। ১৯৭১ সালের মার্চে বিদ্রোহীরা আবদুল জলিলকে হত্যা করে। নাসিমা তার স্বামী হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন:

“বিহারীর সঙ্গে বিয়ে হওয়ায় বাঙালিদের কেউ কেউ আমাকে এবং আমার পরিবারকে ঘৃণা করতো। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ একদল দাঙ্গাবাজ দুষ্কৃতিকারী ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে। তারা আমাদের দোকান লুট করে সেখানে আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করে। তার হত্যাকাণ্ডের দুঃসংবাদ পৌঁছলে আমি তার লাশ উদ্ধারে আমাদের দোকানে ছুটে যাই। তার লাশের কোনো চিহ্ন নেই। তবে তাজা রক্তের দাগ ছিল দৃশ্যমান। আমাকে জানানো হয় যে, হত্যাকারীরা তার লাশ ট্রাকে তুলে অদূরে নদীর দিকে গেছে। ১৯৭১ সালে এপ্রিলের গোড়ার দিকে বিদ্রোহী সৈন্যরা আমাকে তাড়িয়ে দিলে আমি আমার বাঙালি পিতামাতার সঙ্গে বসবাস করতে যাই। আমার পিতামাতা ছিলেন খুবই ধার্মিক। তারা কঠোর ভাষায় অবাঙালি হত্যাকান্ডের নিন্দা করেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিলে বিহারী ও পাকিস্তানের প্রতি অনুগত বাঙালি হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। ১৮ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে আমার পিতা ও দু’ভাইকে হত্যা করে। আমাদের বাড়িতে হামলার সময় আমি এবং আমার ৫ বছরের তৃতীয় ভাই এক প্রতিবেশীর বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। এ প্রতিবেশী আমাদেরকে পাশের একটি গ্রামে পালিয়ে যেতে সহয়তা করেন। সেই গ্রামে আমরা বসবাস করি এবং দু’বছরের বেশি ধানক্ষেতে কাজ করি। জাতিসংঘ অবাঙালিদের প্রত্যাবাসন শুরু করলে আমি পাকিস্তানে আসার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাতে থাকি। বাংলাদেশে আমার কোনো স্থান ছিল না। সেখানে আমার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল এক একটি যন্ত্রণা। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি বিমান যোগে করাচিতে এসে পৌছাই।”

প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ময়মনসিংহে অবাঙালি হত্যাকারী আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী সৈন্যরা ১৯৭১ সালে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রার মুখে ভারতে পালিয়ে যায়। ময়মনসিংহে প্রবেশ করার পর পাকিস্তানি সৈন্যরা নিহত অবাঙালিদের গণকবরের ব্যবস্থা করে। ১৯৭১ সালের ৮ মে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ময়মনসিংহ থেকে ম্যালকম ব্রাউন প্রেরিত এক সংবাদে বলা হয়ঃ

“একটু পরে পরে রাস্তা বরাবর ভস্মীভূত সারি সারি ঘরবাড়ি। লাশগুলো অগভীর গর্তে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে এবং কবরের ওপর লাল ইটের স্তুপ। এমনকি বাড়িঘরের বারান্দায় ইটের নিচে লাশ দেখা গেছে। বাড়িগুলো পরিত্যক্ত ও বন্ধ। “মাটি চাপা দেয়া লাশগুলো ছিল বিদ্রোহীদের হাতে নিহত অবাঙালিদের। কিন্ত ভারত ও আওয়ামী লীগ অপপ্রচার করতো যে, এসব গণকবর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নিহত বাঙালিদের॥”

— ব্লাড এন্ড টীয়ার্স / কুতুবউদ্দিন আজিজ (মূল: Blood and Tears । অনু: সুশান্ত সাহা) ॥ [ ইউপিপি – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ১৮১-১৯৪ ]

 




একাত্তরের গণহত্যার দলিল  (দুই)

যে কাহিনী শুনতে নেই (০৬)

================

খুলনা হত্যাকান্ড

—————

০১.

“… ঘন্টা দেড়েক পর আবার খবর এলো, লেবার কলোনিতে ভয়ানক এক হত্যাযজ্ঞ চলছে। বিহারি নিধন হচ্ছে। আমরা কয়েকজন অফিসার আমাদের দোতলা বিল্ডিংয়ের ছাদে উঠলাম, খুব বেশি কিছু দেখা গেলো না। শুধু দেখলাম, কিছু লোক মৃতদেহ টেনে নিয়ে নদীর দিকে যাচ্ছে। আর ঘন্টা দুই-তিন পর খবর পেলাম, বিহারি পুরুষ প্রায় শেষ। বিহারি নারী এবং শিশুদেরকে নদীর ধারে কাস্টম অফিসারের বাড়িতে নিয়ে রাখা হচ্ছে। সঠিক সময় মনে নেই। আনুমানিক বেলা তিনটার দিকে একজন বাঙালি ম্যানেজার আমাকে ডেকে নিয়ে জেনারেল ম্যানেজার সাহেবের বাংলো সংলগ্ন পাঁচিলের কাছে নিয়ে গেলেন। পাঁচিলের ওপাশেই কাস্টম অফিসারের কোয়ার্টার। উঁচু পাঁচিল। কিছু ইট জোগাড় করে আমার দাঁড়াবার বন্দোবস্ত করে তিনি আমাকে বললেন, একটু তাকিয়ে দেখেন। আমি মাথা উঁচু করে তাকালাম। যে বীভৎস দৃশ্য দেখলাম, তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে পেরেছিলাম। মাথা ঘুরে গেলো, তাকাতে পারলাম না – নেমে এলাম। সিরাজ চৌধুরী উঠে দেখতো গেলো। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে সে নেমে এলো। মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে সিরাজ কাঁদতে লাগল। মাঝে মাঝে বলতে লাগলো, ‘হে আল্লাহ, এ তুমি কী দেখালে?’ আমার দিকে তাকালো। কেন তাকালো তা জানি না।

… বেলা চারটে নাগাদ বিস্মিত হয়ে দেখলাম যে একজন অপরিচিত লোক রাইফেল নিয়ে আমাদের অফিসার্স কলোনিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার সঙ্গে আছে দুই-তিনজন শ্রমিক। আর আছে দশ-বারোজন অল্পবয়স্ক ছেলে। এরা সবাই আমাদেরই কলোনির বেয়ারা-বাবুর্চিদের সন্তান। এদের প্রত্যেকের হাতে লাঠি ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র। একটু পরেই একজন বাঙালি ম্যানেজার এসে বললেন, এরা দাবি করছেন যে অবাঙালি অফিসারদের এদের হাতে তুলে দিতে হবে। আমি বললাম, অসম্ভব। এই লোককে এক্ষুণি কলোনি ছেড়ে চলে যেতে বলো। কিন্তু লোকটা গেলো না। সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। বিশ্রী একটা অবস্থা।

সিকিউরিটি অফিসার সরদার খানের নিরাপত্তার জন্যে চিন্তিত হয়ে পড়লাম। সঙ্গে সঙ্গে সরদার খানের নিরাপত্তার জন্যে তার ঘরের সামনে সিকিউরিটি ক্লার্ক আমানুল্লাহকে মোতায়েন করলাম। আমানুল্লাহকে নির্দেশ দিলাম, কাউকে যেন ভেতরে ঢুকতে দেয়া না হয়। নিজে দেখে এলাম, সরদার খান তার কামরায় বসে কোরআন শরীফ পড়ছে, আর তার পাশে বসে তার ভাইপো, যার বয়স চোদ্দ-পনের বছর। এই ভাইপো কিছুদিন আগে চাচার কাছে বেড়াতে এসেছিলো।

বাঙালি ম্যানেজারদের বুঝিয়ে বললাম, প্রত্যেক অবাঙালি ম্যানেজারের বাসায় যেয়ে বলে আসতে যে তারা যেন বাইরে না আসে, দরজা বন্ধ করে ঘরের মধ্যে থাকে। বাঙালি ম্যানেজারদের বললাম, বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে তারা যেন আবাসিক এলাকা পাহারা দেন। অজ্ঞাতনামা হত্যাকারী যদি আমাদের কোন ম্যানেজারকে হত্যা করার চেষ্টা করে, আমরা যেন সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালাতে দ্বিধা না করি। বাঙালি বা অবাঙালি, প্রত্যেককে নিরাপদ রাখা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। সব বাঙালি অফিসার আমার সঙ্গে একমত।

আনুমানিক বেলা পাঁচটা। আমার বাসার ড্রয়িংরুমে বসে আছি। একা বসে আছি। সারাদিন ছুটোছুটি করে বড়ো পরিশ্রান্ত। কিছুই ভাবতে পারছি না। একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্যে বসেছিলাম। এমন সময় সিকিউরিটি ক্লার্ক আমানুল্লাহ টলতে টলতে আমার ঘরে ঢুকে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো এবং বললো, আমার সাহেবকে বোধহয় আর বাঁচাতে পারলাম না। ঠিক তখনই পরপর দুটো গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। আমানুল্লাহ কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। পরে জানলাম, আমানুল্লাহ সরদার খানের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। অজ্ঞাতনামা হত্যাকারী তার দলবল নিয়ে আমানুল্লাহকে সরে যেতে বলে। আমানুল্লাহ সরতে অস্বীকার করলে তার বুকে রাইফেল ধরে অজ্ঞাতনামা লোকটা বলে, আপনি না সরলে আমি এখনই গুলি করবো। আমরা সরদার খানকে মারবো না, শুধু তার রিভলবারটা নেবো। আমরা কথা দিচ্ছি, আমরা কথা রাখবো। এরপর আমানুল্লাহ সরে দাঁড়ালেই অজ্ঞাতনামা হত্যাকারী ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং সরদার খানের বুকে রাইফেল ধরে তাকে বের করে নিয়ে যায়। এই দেখেই আমানুল্লাহ আমার কাছে ছুটে আসে। একটু পরে জানলাম, অজ্ঞাতনামা হত্যাকারী সরদার খান ও তার ভাইপোকে ক্লাবের কাছে নদীর ধারে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

এই প্রথম বড়ো অসহায় বোধ করলাম। একটা নিরাপত্তাহীনতার ভাব মনের মধ্যে কাজ করতে লাগলো। কয়েকজন বাঙালি ম্যানেজারকে নিয়ে পরামর্শ করলাম যে, কী করে বাইরের এই লোকগুলোকে আমাদের এলাকা থেকে বের করা যায়। ম্যানেজাররা বললেন, তারা অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অজ্ঞাতনামা হত্যাকারী ও তার সাঙ্গপাঙ্গ বাইরে যেতে রাজি না। তার হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল। সে অবশ্য কথা দিয়েছে আর কাউকে হত্যা করবে না। কিন্তু তার উদ্দেশ্য সন্দেহজনক। তাকে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। আমরা খুব সাবধানে তার গতিবিধির দিকে নজর রাখলাম। আমরা এখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আর কোন অবাঙালি অফিসার যেন নিহত না হয়।

… যতদূর মনে পড়ে, ২৭ মার্চ বেলা দুটা নাগাদ আমাদের গেটের বিহারি দারোয়ানরা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লো। তারা আর ডিউটি করতে পারলো না। তারা প্রথমে কয়েকজন অবাঙালি ম্যানেজারের বাসায় গিয়ে আশ্রয় চেয়েছিলো। অবাঙালি ম্যানেজাররা তাদেরকে আমার বাসায় পাঠিয়ে দেন। আমি তাদের ফেরাতে পারলাম না। তাদেরকে আমার বাসায় আশ্রয় দিলাম। সন্ধ্যা নাগাদ আরও সাত-আটজন বিহারি দারোয়ান আমার বাসায় আশ্রয় নেয়। আমি তাদেরকে স্টোররুম, কিচেন এবং ডাইনিংরুম ছেড়ে দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেই। আমি আধঘন্টা পরপর গিয়ে ওদের খোঁজখবর নিতাম। এরা শুধু পানি খেতে চাইতো। বিসমিল্লাহ নামের এক বিহারি দারোয়ান আমার বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলো। আমার খুব প্রিয় দারোয়ান। আমার অনেক বিপদ-আপদে সে সব সময় আমার পাশে থেকেছে। কখনও আমাকে বিপদের মধ্যে ফেলে চলে যায়নি। আমার স্পষ্ট মনে আছে; ওইদিন সন্ধ্যায় একবার বিসমিল্লাহ দারোয়ান তার দুই হাত দিয়ে আমার মুখটা জড়িয়ে ধরে খুব করুণভাবে জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘স্যার , হাম বাঁচে গা তো?’ রাত দুটা পর্যন্ত এদের খবর নিয়েছিলাম। তারপর আর পারিনি। পরদিন ভোরবেলায় এদের খোঁজ নিতে গিয়ে আর এদেরকে পাইনি। জানি না এদের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো। হয়তো এরা পালিয়ে গিয়েছিলো, নয়তো অজ্ঞাতনামা সেই হত্যাকারীদের হাতে এদেরকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিলো।

… উনত্রিশ মার্চ ভোরবেলায় যখন আমার ফ্ল্যাটে ঢুকি, তখন বারান্দায় দশ-বারোজন লোককে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখেছিলাম। এরা সবাই বিহারি। লেবার কলোনি থেকে কোনরকমে বেঁচে রাতের অন্ধকারে কীভাবে যেন অফিসার্স কলোনিতে ঢুকে পড়েছে। মনে হয়, এদের মধ্যে দুই জন পুরুষ, দুই জন মহিলা এবং বাকিরা এদের ছেলেমেয়ে। এদের চোখের চাহনি আজও ভুলতে পারিনি। বেঁচে থাকার জন্যে, একটু আশ্রয়ের জন্যে করুণ চাহনি। হত্যাকারীরা রাইফেল নিয়ে তখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাড়াতাড়ি বিহারি লোকগুলোকে নিয়ে আমার বাসার পেছনের কিচেন গার্ডেনে গেলাম। টমেটো গাছের জন্যে মাচা করেছিলাম। সেই মাচার নিচে এদেরকে লুকিয়ে রাখলাম। মনে আছে ঘন্টা দুই পরে গিয়ে এদেরকে আর পাইনি। আজও জানি না এদের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো।

উনত্রিশ মার্চ সকালে খবর নিয়ে জানলাম যে, বাঙালি ম্যানেজাররা ও তাদের পরিবারবর্গ সবাই নিরাপদে আছেন। রাতেরবেলায় তাদের কারও কোন ক্ষতি হয়নি। সকাল নয়টার দিকে জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি লুকিয়ে ছিলেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বাসায়। আমার কথা শুনে বেরিয়ে এলেন। সারা রাত ঘুমাননি। চোখ লাল। বললাম, ‘আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়। লেবার কলোনি জনমানবশুন্য। বিহারি সব শেষ। বাঙালিরা নদী পার হয়ে পালিয়েছে। শুধু অফিসাররাই আছি। যে কোন মুহুর্তে আর্মি এসে যেতে পারে। আর্মি এলে আমাদেরকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করবে। চলুন নদী পার হয়ে গ্রামে চলে যাই।’ জেনারেল ম্যানেজার সাহেব বললেন, ‘গ্রামে গেলে গ্রামের লোকেরা আমাদের (অবাঙালিদেরকে) হত্যা করবে। অতএব গ্রামে যাওয়া সমীচীন নয়। তোমরা সবাই এখানে থাকো, যদি আর্মি আসে তবে তাদের হাত থেকে আমি তোমাদেরকে বাঁচাবো।’ ‘না’ বলতে পারলাম না। কথা দিলাম থাকবো। বাইরে চলে এলাম॥”

— কাজী আনোয়ারুল ইসলাম / আমার একাত্তর ॥ [ অবসর – ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮ । পৃ: ৪৯-৫৫ ]

০২.

“… ২৮-২৯শে মার্চ, ১৯৭১। খুলনা শহর। ক্রিসেন্ট জুট মিলস্, খালিশপুর ও স্টার জুট মিলস্, চান্দিমহল। খুলনায় আওয়ামী লীগের আধা-সামরিক শিক্ষা শিবির গঠন করা হয়। তথাকথিত পশ্চিম পাকিস্তানী “দালালদের” বিরুদ্ধে সুসংবদ্ধ হত্যা ও অগ্নিকান্ড চলতে থাকে। ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয় এবং ব্যাপকভাবে হত্যাকান্ড চলতে থাকে। গলা কেটে ফেলার আগে হতভাগ্য ব্যক্তিদের উৎপীড়ন করা হতো। নিরাপরাধ নারী ও শিশুদের রাস্তায় টেনে এনে হত্যা করা হয়। যারা প্রাণের ভয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো ও বেঁচেছিলো, তাদের নদী থেকে উঠিয়ে আনা হয়। তারপর তাদের পেট চিরে আবার নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তাদের রক্তে নদীর পানি লাল হয়ে গিয়েছিলো। মিল সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়। কিছু সংখ্যক অফিসার মুক্তিপণ দিয়ে বেঁচে যান। হতাহতের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার।

… ২৮-২৯শে মার্চ, ১৯৭১। পিপলস জুট মিলস্, খালিশপুর, খুলনা। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস্, আনসার এবং আওয়ামী লীগ কর্মীরা বয়সের প্রতি কোন লক্ষ্য না রেখে উচ্ছৃঙ্খল হত্যাকান্ডে লিপ্ত হয়। ৪ শ’ ৬৭ জন নিহত হয়।

… ২৮-২৯শে মার্চ, ১৯৭১। নিউ কলোনী, খালিশপুর, খুলনা। প্রায় ১০ হাজার আওয়ামী লীগ কর্মী কলোনী ঘেরাও করে ফেলে। বিদ্রোহী পুলিশরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সমানে ৬ ঘন্টারও বেশি সময় গোলাগুলি বর্ষণ চলতে থাকে। প্রায় ৩শ’ লোক নিহত হয়॥”

তথ্যসূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র / সম্পা : বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ॥ [ আগামী প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৩ । পৃ: ১৪৪-১৪৫ ]

০৩.

“… Soon after Bangladesh was liberated on December 16, 1971, violence became an indulgence of the victorious Bengalis against the Biharis. Fearing total unrest, the local authorities in Khulna put the Biharis in a local jail for their safety; Zaibunisa with her four daughters, ages twelve, eight, three years, and six months, lived in the jail for several months. Having no resources for supporting her young and dependent family, Zaibunisa and her children often went to bed hungry. She recounted that one morning, “the three-year-old and the six-month-old baby refused to get up from their sleep. They died of hunger in the night.”

— Yasmin Saikia / Women, War, and the Making of Bangladesh : Remembering 1971 ॥ [ Duke University Press – 2011 । p. 96 ]

০৪.

“… রুস্তম আলী সিকদার যিনি খেলোয়াড় কোটায় পিওন সুপারভাইজার হিসেবে ক্রিসেন্ট জুট মিলে নিয়োগ পেয়েছিলেন, তিনি সেই ১৯৫৩ সাল থেকেই আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তার দাবি অনুযায়ী তার সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল, অন্যদেরও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং ১৯৬৯ সালেই ৪০০ সদস্যের একটি বাহিনী তিনি সংগঠিত করেছিলেন। তারা ১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম সপ্তাহে মাঠে কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করেন।তারা মিল গেটে ব্যারিকেড স্থাপন করেছিলেন যাতে সেনাবাহিনী মিলে ঢুকতে না পারে এবং বাঙালি বা বিহারী শ্রমিকরা যাতে মিল থেকে বের না হতে পারে। তারা যোগাযোগ রেখেছিলেন বাঙালি পুলিশ ও ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস্‌ সদস্যদের সাথে, কিন্তু তাদের কাছে ছিল শুধুমাত্র পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র আর তা তারা পেয়েছিলেন মিলের নিরাপত্তা কর্মীদের কাছ থেকে।

প্রথম দিকে তারা বাঙালি ও বিহারীদের মাঝে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য বিহারীদের সাথে একটি চুক্তি করেছিলেন, কিন্ত এক রাতে ক’জন বিহারী পান আনার অজুহাতে মিলের বাইরে গেলে রুস্তম আলী সিকদার ও অন্য বাঙালিরা এ যাওয়াটা সহজভাবে গ্রহণ করেনি (যদিও তারা তাদের সন্দেহের পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো কারণ বের করতে পারেনি)।

মিলের স্পিনিং বিভাগের প্রবীণ আব্দুর রব সর্দারেরও দাঙ্গা হাঙ্গামার অভিজ্ঞতা আছে কারণ তিনি আওয়ামী লীগ ও মুসলীম লীগের (বিহারী) একাধিক দাঙ্গায় জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালে দৌলতপুর থানার বাঙালি পুলিশ অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। একই ধরনের কাহিনী অন্যান্য থানা থেকেও শোনা গিয়েছিল। সে সময় জুট মিলে “শান্তি কমিটি” গঠন করা হয়েছিল বাঙালি ও বিহারী উভয় সম্প্রদায়ের পাঁচজন করে সদস্য নিয়ে যারা লাঠি দিয়ে মিল পাহারা দিত। আব্দুর রব সর্দারের ভাষ্য অনুযায়ী মিল ম্যানেজার রহমতউল্লাহ ও অন্যান্য অফিসাররা ছিলেন ইসমাইলীয়া সম্প্রদায়ের এবং তারা সব সময় ন্যায় বিচারের পক্ষে থাকা ও মিলে কর্মরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাঝে শান্তি বজায় রাখতে চেষ্টা করতেন। ২৪ মার্চের রাত থেকেই মিলের বাইরে গোলাগুলি শুরু হয় এবং পরদিনই সেনাবাহিনী ওই এলাকায় পাহারা দেয়া শুরু করে। তবে মিল গেটে লোহার বীম দিয়ে স্থাপিত ব্যারিকেড থাকার জন্য সৈন্যরা মিলে প্রবেশ করতে পারেনি। দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা যারা অস্ত্র নিয়ে পালিয়েছিলেন তারা নদী দিয়ে মিলের পিছনে আসেন এবং একটি পানির ট্যাংকের উপর অবস্থান নেন।

একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল পিপলস্‌ জুট মিলে। ২৭ মার্চ বিহারীরা তাদের কোয়ার্টারে ড্রাম বাজাতে শুরু করে। সর্দারের মতে বাঙালিদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০০ জন। সংখ্যার দিক থেকে বিহারীরা ছিল অনেক বেশি, কিন্তু ওই দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা ও আরো কয়েকজন বাঙালি বিহারীদের দিকে গুলি করলে কয়েকজন বিহারী আহত হয় এবং অন্যরা আতংকিত হয়ে পড়ে। এরপর উত্তেজিত বাঙালি জনতা হাতের কাছে যা পায় যেমন দা ইত্যাদি তাই নিয়ে বিহারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পরে নির্বিচারে হত্যা করে নারী, পুরুষ ও শিশুদের। তাদের মৃতদেহগুলো ফেলে দেয়া হয় নদীতে। সর্দারের ধারণা একই ঘটনা অন্য জুট মিলেও ঘটেছিল। লাশগুলো ফেলে দেয়ার পর তিনি ওই রাতে খুলনা ত্যাগ করে বরিশাল চলে যান ও সেখান থেকে ভারতে পৌঁছে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

আমি সর্দারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওই দিন কতোজন বিহারী পুরুষ, নারী ও শিশু নিহত হয়েছিল – এক ডজন? শত শত? এক হাজার? “তাতো হবেই”, তিনি বললেন এবং সহজেই একমত হয়ে জানালেন এক হাজার এবং তারপর নিম্নস্বরে ও আকার ইঙ্গিতে বোঝালেন প্রকৃতপক্ষে তার সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। অল্পসংখ্যক আক্রমণকারী বাঙালিও ওই ঘটনায় মারা গিয়েছিল।

খুলনার বাইরে খালিশপুরের নিউ কলোনীর বেঁচে যাওয়া বিহারীরা আমাকে তাদের ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা কথা বলেছেন! দুই বা তিনজন তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিলেন ও এদের মাঝে কেউ কেউ মাথা ঝাঁকিয়ে বা আরো তথ্য যোগ করে বর্ণনাটা আমাকে পরিষ্কার করে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। তবে প্রত্যেকে একমত হয়েছিলেন যে সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল ক্রিসেন্ট জুট মিলে ও তারপরই ছিল পিপলস্‌ জুট মিল। মার্চের প্রথম দিকে সাধারণ ধর্মঘট শুরু হওয়ার পর রাস্তায় কয়েকজন বিহারীকে হত্যা করা হয়েছিল, ২৮ মার্চ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল মিলের ভিতরে। বিহারীরা জানান সে সময় বাঙালিরা ‘ফাঁসির মঞ্চ’ তৈরি করে সেখানে বিহারীদের ঝুলিয়ে হত্যা করে।সেনাবাহিনী সেখানে পৌঁছলে বেঁচে যাওয়া বিহারীরা পাকিস্তান সরকারের কাছে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা উপস্থাপন করে। কতগুলো মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল – এর জবারে বিহারীরা বলেন – ‘লাখোন’ (লাখো)।যেহেতু বাঙালিরাই স্বীকার করেছেন কয়েক হাজারের, তাহলে যুক্তিসঙ্গতভাবে অনুমান করা যেতে পারে সেখানে ওই একটি ঘটনায় কয়েক হাজার বিহারী নারী, পুরুষ ও শিশুদের হত্যা করেছিল বাঙালিরা৷

৭ মার্চ শেখ মুজিব ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে তার এতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। ওতে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকেন। ঠিক সে সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সবুর খানের বাড়ির উল্টোদিকে অবস্থিত খুলনা সার্কিট হাউসে ২২ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের মেজর শামিন জান বাবর অবস্থান করছিলেন। তিনি ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের যশোর সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন৷ গোলযোগের সূত্রপাত হয়েছিল ১ মার্চের পরই। এর পরপরই পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবের শাসন শুরু হয়ে যায়। সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টের ভিতরেই থাকতে পরামর্শ দেয়া হয় এবং কোনো কিছুতেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করতে বা সাড়া না দিতে বলা হয়। ২৪ মার্চের রাতে খুলনায় বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে শুরু হয় সমন্বয়হীনভাবে বিক্ষিপ্ত গুলিবর্ষণ। ২৫ মার্চ মেজর শামিন জান বাবরকে খুলনা শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। খুলনা রেডিও স্টেশনে সেনাবাহিনীর যে ইউনিটকে পাঠানো হয়েছিল সেটি অতর্কিত হামলার কবলে পড়লে কয়েকজন সৈন্য প্রাণ হারান কিন্তু মেজর বাবর জানান বিদ্রোহীদের নিহতের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি এবং বাকীরা পালিয়ে গিয়েছিল।

খুলনা নিয়ন্ত্রণে আনতে এক সপ্তাহ বা ওই রকম সময় লেগেছিল। মেজর বাবর নৌকায় নদীপথে মিল এলাকা দেখতে গিয়েছিলেন। নদীতে অগণিত পঁচা ফুলে ওঠা মানুষের দেহতে মেজর বাবরের নৌকা ধাক্কা খায়। এতে তার মতো একজন অদম্য সৈনিকও ওই ভয়াবহ দৃশ্য থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। মিলের ভিতরে তিনটি কসাইখানা বানিয়েছিল বাঙালি শ্রমিকরা। হত্যাকাণ্ডের জন্য গিলোটিনের ন্যায় একটা স্থাপনা সেখানে তৈরি করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা ও অত্যাচার করার জন্য সেখানে বেশ কিছু যন্ত্রপাতিও পাওয়া গিয়েছিল। মেঝে ছিল রক্তের আবরণে ঢাকা। পরে মেজর বাবর সেনা প্রধান জেনারেল হামিদ ও পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল নিয়াজীকে ওই কসাইথানায় নিয়ে এসে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। ‘আমি তাদের বলেছিলাম – কেন ওইসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর সংবাদ মাধ্যমে দেওয়া হয়নি এবং তারা আমাকে বলেন যে, সরকার বাঙালিদের বিরুদ্ধে কোনো “পাল্টা প্রতিশোধের” ঘটনা ঘটুক তা চায়নি বলেই ওইসব চেপে যাওয়া হয়েছে॥”

— ডেড রেকনিং : ১৯৭১-এর বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি / শর্মিলা বসু (মূল: Dead Reckoning : Memories of the 1971 Bangladesh War । অনু: সুদীপ্ত রায়) ॥ [ হার্স্ট এন্ড কোম্পানী – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৮৫-৮৮ ]

০৫.

“… খুলনা ছিল পূর্ব পাকিস্তানে পাটের ব্যবসা ও পাট শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম সপ্তাহে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিদ্রোহে এখানে চরম বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ে। ৪ মার্চ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একদল দাঙ্গাবাজ স্থানীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ আক্রমণ করে, যন্ত্রপাতির ক্ষতিসাধন করে এবং কয়েকজন কর্মচারীকে হত্যা করে।নিহতদের বেশির ভাগ ছিল অবাঙালি। পরদিন একটি বিশাল জনতা রাইফেল, শিকল, বর্শা ও ছোরা নিয়ে চারটি দোকান লুট করে এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটি হোটেলে অগ্নিসংযোগ করে। আরেকদল জনতা বিস্ফোরক, বন্দুক, বর্শা ও বাঁশের লাঠি নিয়ে খুলনার নিকটবর্তী দৌলতপুর ও খালিশপুরে অবাঙালিদের দোকানপাট এবং বাড়িঘরে হামলা চালায় এবং ৫৭ জনকে হত্যা করে। কয়েকদিন পর তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়।

৬ মার্চ বাঙালি জঙ্গিরা অবাঙালিদের ভীতি প্রদর্শনে খুলনায় একটি বিশাল মিছিল বের করে। কয়েকজন সশস্ত্র বিক্ষোভকারী অস্ত্র ও গোলাবারুদের দোকান লুট করার চেষ্টা করে। সংঘর্ষে কয়েকজন হতাহত হয়৷ শহরের বেসামরিক প্রশাসন ভেঙ্গে পড়ে। পুলিশ বাহিনী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের জঙ্গি সমর্থকরা অবাঙালি এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্বেষ ছড়াতে থাকে। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে খুলনায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিদ্রোহ তুঙ্গে পৌঁছে। হত্যা ও ভীতি প্রদর্শন করার জন্য অবাঙালিদের চিহ্নিত করা হয়। এ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আওয়ামী লীগের সহিংসতা ও সন্ত্রাসের কাছে খুলনা ও তার আশপাশের শহরগুলো জিম্মি হয়ে যায়। বিদ্রোহীরা যশোর-খুলনা সড়কের কয়েকটি জায়গা অবরোধ করে এবং ব্যারিকেড দেয়। খুলনায় ৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ থেকে জীবিত অবাঙালিরা নতুন করে হামলার শিকার হয়। আওয়ামী লীগের জঙ্গি কর্মী ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বিদ্রোহীরা অবাঙালিদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।

২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একদল বিদ্রোহী এ শহর এবং তার আশপাশের এলাকায় অবাঙালি বসতিতে সর্বাত্বক হামলা করে এবং কমপক্ষে ৫ হাজার নির্দোষ মানুষকে হত্যা করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এগিয়ে আসা নাগাদ মার্চের তৃতীয় সপ্তাহের পুরো সময়ে বাঙালি বিদ্রোহীরা অবাঙালিদের রক্তপাত ঘটায়। তারা কয়েকটি জঘন্য কসাইখানা স্থাপন করে। এসব কসাইখানায় অবাঙালি মহিলা ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহীরা খুলনা ও তার আশপাশের নদীগুলোতে বহু লাশ ভাসিয়ে দেয়। গুলি করে হত্যা করার আগে অবাঙালি ও পাকিস্তানপন্থী বাঙালিদের নির্যতন করা হতো।

প্রত্যক্ষদর্শীরা গলা কাটা ও পেট ফাঁড়া বহু লাশ নদীতে ভাসতে দেখেছেন। বিদ্রোহীরা খুলনা ও খুলনার উপকণ্ঠে বহু জুট মিল ও শিল্প-কারখানা লুট ও ভাঙচুর করে। বিদ্রোহীরা অবাঙালি শ্রমিকদের উত্তপ্ত বয়লারে ফেলে জীবন্ত হত্যা করে। খালিশপুর ও দৌলতপুরে অবাঙালি পল্লীতে বর্বরতার সঙ্গে নির্দোষ অবাঙালিদের হত্যা করা হয়। তাদের ঘরবাড়ি ও বস্তি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। মার্চের শেষ সপ্তাহে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী আনসার এবং আওয়ামী লীগের সশস্ত্র জঙ্গিরা অবাঙালিদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ গণহত্যা পরিচালনা করে।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আওয়ামী লীগ খুলনায় আধা-সামরিক প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করে। এসব প্রশিক্ষণ শিবিরে দলের স্বেচ্ছাসেবকদের অস্ত্র চালনা শিক্ষা দেয়া হতো। খুলনা শহরের শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকায় বহু পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যবসায়ী, মিল-কারখানার নির্বাহী এবং তাদের পরিবারবর্গকে অপহরণ করা হয়। মুক্তিপণ আদায়ে তাদের আটক রাখা হয়। আত্মীয়-স্বজনরা মুক্তিপণ পরিশোধ করা সত্ত্বেও তাদের অনেককে হত্যা করা হয়।

যেসব বাঙালি তাদের অবাঙালি বন্ধুদের আশ্রয় দিয়েছিল, বিদ্রোহীরা তাদেরকেও হত্যা করে। ১৯৭১ সালে মার্চের গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন জানিয়েছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার একদিন আগে ২৯ মার্চ খুলনাকে আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত একটি শহরের মতো মনে হচ্ছিল। ১৯৭১ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহের সময় খুলনা ও তার আশপাশের শহরগুলোতে কী পরিমাণ লোক নিহত হয়েছিল সে ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন হিসেব পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিল-মে’তে খুলনা সফরকারী বিদেশি ও পাকিস্তানি সাংবাদিকদের সেনাবাহিনীর অফিসাররা জানিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের হাতে কমপক্ষে ৯ হাজার লোক নিহত হয়েছে। কিন্ত এ বইয়ের জন্য সাক্ষাৎকার প্রদানকারী প্রত্যক্ষদর্শীরা বিশ্বাস করছেন যে, ১৯৭১ সালের মার্চে অবাঙালি নিধনকালে খুলনায় প্রায় ৫০ হাজার অবাঙালি নিহত হয়৷ তারা জোর দিয়ে বলেছেন, খুলনা ও তার আশপাশের শহরগুলোতে হাজার হাজার অবাঙালিকে হত্যা করা ছাড়াও খুলনা জেলার অন্যান্য শহর থেকে পালিয়ে আসা শত শত অবাঙালি পরিবারকে শহরে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ পথগুলোতে হত্যা করা হয়।

খুলনার প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পিপলস্‌ জুট মিল এবং ক্রিসেন্ট জুট মিলে সশস্ত্র বাঙালিদের হামলায় মহিলা ও শিশুসহ ৫হাজারের বেশি অবাঙালি নিহত হয়। খুলনা রেলওয়ে কলোনিতে হত্যাযজ্ঞে বাঙালি বিদ্রোহীরা এ কলোনির ৬ হাজার বাসিন্দার অধিকাংশকে হত্যা করে। বিদ্রোহীরা শত শত অবাঙালি যুবতী মহিলাকে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে প্যারেড করায়। এসব গ্রামে সুরক্ষিত ঘরবাড়িতে যুবতী মহিলাদের নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয়। অপহরণকারীরা তাদের অনেককে হত্যা করে। তাদের কেউ কেউ বরিশাল পালাতে সক্ষম হয়। তাদেরকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী উদ্ধার করে ঢাকা নিয়ে আসে এবং মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তর করে।

নিউইয়র্ক টাইমসের ঢাকা সংবাদদাতা ম্যালকম ব্রাউন মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তান সফর করেন। ১৯৭১ সালের ৯ মে তার প্রেরিত একটি সংবাদে নিউইয়র্ক টাইমসে বলা হয়:

“খুলনায় সাংবাদিকদের কয়েকটি ভবন দেখানো হয়। এসব ভবনে বন্দিদের শিরশ্ছেদ করার জন্য কাষ্ঠ দণ্ড ছিল বলে জানা গেছে। মহিলাদের রক্তমাখা কাপড়-চোপড়ের ছিন্নভিন্ন অংশ ও কেশ গুচ্ছ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এ জায়গাটি হাজার হাজার অবাঙালি বাসিন্দাকে হত্যা করার জন্য বাঙালি বিদ্রোহীরা ব্যবহার করেছিল বলে জানা গেছে।”

১৯৭১ সালে ৯ মে ওয়াশিংটনের সানডে স্টার-এর একটি রিপোর্টে খুলনায় অবাঙালি হত্যাকাণ্ডের আরো একটি ভয়াবহ বিবরণ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়ঃ

“গতকাল খুলনায় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত একটি সফরে সাংবাদিকরা চালা ঘরে একটি কসাইখানা দেখেছেন। মার্চ এবং এপ্রিলের গোড়ার দিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহের চূড়ান্ত দিনগুলোতে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা ভারতের বিহার থেকে অভিবাসনকারী বিহারী, পশ্চিম পাকিস্তানি এবং অন্যান্য অবাঙালিকে হত্যা করার জন্য এসব চালা ঘর ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে।… সাংবাদিকদের শিকল সংযুক্ত একটি কাঠের দণ্ড দেখানো হয়। এখানে ছোরা দিয়ে মহিলা ও শিশুদের শিরশ্ছেদ করার খবর পাওয়া গেছে ।… একটি গাছের সঙ্গে সংযুক্ত একটি পিতলের গলাবন্ধ দেখা গেছে। বাসিন্দারা জানিয়েছে, এ গলাবন্ধে ফাঁস লাগিয়ে বন্দিদের হত্যা করা হয়েছে। আরেকটি গাছে দড়ি লাগানো দেখা গেছে। গলায় ফাঁস দেয়ার জন্য এ দড়ি ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।লাশগুলো নিচু দেয়ালের ওপাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে।… খুলনায় অবাঙালি এলাকায় সারি সারি ভস্মীভূত ঘরবাড়ি ও দোকানপাট দেখা গেছে। দৃশ্যত বাঙালিরা এসব বাড়ি ও দোকান ভস্মীভূত করেছে।”

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে দেখা গেছে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী খুলনা ও তার আশপাশের শহরগুলো থেকে বিদ্রোহীদের বিতাড়িত করার পর তারা সরাসরি ভারতের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদেরকে বীরের সম্মান এবং নিরাপদ আশ্রয় দেয়। খুলনায় অবাঙালিদের ওপর হামলাকারীদের অনেকেই ছিল বাঙালি হিন্দু। এসব বাঙালি হিন্দু অবাঙালি বিশেষ করে ভারতের বিহার থেকে অভিবাসনকারী অবাঙালিদের প্রতি তীব্র ঘৃণা পোষণ করতো। কট্টরপন্থী আওয়ামী লীগারদের ভয়ে খুলনার অধিকাংশ লোক এত আতঙ্কিত ছিল যে, তাদের ভয়ে কেউ অবাঙালিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিবাদ জানানোর সাহস পায়নি।

সাতষট্টিতম সাক্ষীর বিবরণ:

৩৭ বছরের নিসার আহমেদ খান খুলনার খালিশপুর শিল্প এলাকায় একটি হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের শেষদিকে খুলনায় অবাঙালিদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফা সহিংসতা শুরু হলে ১৯৭২ সালে তিনি নেপালে পালিয়ে যান। ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে তিনি কাঠমন্ডু থেকে পাকিস্তানে আসেন এবং করাচিতে বসতি স্থাপন করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসের রাজত্ব সম্পর্কে তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও পুলিশ খালিশপুরে পাকিস্তানি পতাকা অপবিত্র করে শহরের সকল ভবন ও কলকারখানার শীর্ষে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে বাঙালি বিদ্রোহীরা অবাঙালিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে থাকে এবং আমাদের হত্যা করার প্রস্ততি নেয়া হচ্ছে বলে গুজব উঠে। আমি খালিশপুর এলাকায় স্যাটেলাইট টাউনের জি-১০ নম্বর সেক্টরে একটি ভাড়া করা বাসায় বসবাস করতাম। আমার স্থুল ছিল পিপলস্‌ জুট মিলের কাছাকাছি । এ জুট মিলের কাছে প্রায় ১৫ হাজার অবাঙালি বসবাস করতো। তাদের অনেকেই বসবাস করতো বস্তিতে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ অবাঙালিদের আশ্বস্ত করেন যে, তাদেরকে কোনো প্রকার উত্যক্ত অথবা ক্ষতি করা হবে না। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও কয়েকজন বাঙালি পুলিশ কর্মকর্তা এলাকার প্রধান মসজিদে অবাঙালি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়ে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অবাঙালি ইমামের উপস্থিতিতে তারা শপথ গ্রহণ করেন যে, কোনো অবাঙালির কোনো ধরনের ক্ষতি করা হবে না। তাদের এ আশ্বাস যে কোনো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা নিরাপত্তার জন্য ঢাকায় এগিয়ে যাওয়া থেকে অবাঙালিদের বিরত রাখে।

২৩ মার্চ রাতে এবং পরদিন বাঙালি বিদ্রোহীরা এই এলাকায় অবাঙালিদের বিরুদ্ধে হামলায় লিপ্ত হয়। বিদ্রোহীরা সকল প্রবেশ পথ অবরোধ এবং অবাঙালিদের পালিয়ে যাবার পথ বন্ধ করে দেয়। রাইফেল, স্টেনগান, হ্যান্ড গ্রেনেড, ছোরা ও বল্লম সজ্জিত হয়ে একটি বিশাল উন্মত্ত জনতা অরক্ষিত অবাঙালি পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিদ্রোহীরা গোটা এলাকা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তারা অবাঙালিদের বাড়িঘর লুট করে এবং বাসিন্দারা পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে। বহু মহিলা ও শিশু প্রধান মসজিদ এবং আমার স্কুলে আশ্রয় নেয়। আল্লাহর ওয়াস্তে নির্দোষ মানুষকে হত্যা না করার জন্য অনুরোধ জানালে বিদ্রোহীরা মসজিদের ইমামকে হত্যা করে। বিদ্রোহীদের কাছে ক্ষমা বলতে কোনো জিনিস ছিল না। এ শব্দটি তারা ভুলে গিয়েছিল৷

বাঙালি বিদ্রোহীরা মেয়ে ও যুবতী মহিলাদের অপহরণ করে। এসব অপহৃত মেয়ে ও যুবতী মহিলারা স্কুল ভবনে আশ্রয় নেয়। বিদ্রোহীরা রাতে তাদের ধর্ষণ করতো। বাধাদানকারীদের তৎক্ষণাৎ গুলি করে হত্যা করা হতো। সম্ভ্রম রক্ষায় কয়েকজন মহিলা যৌন নির্যাতন চেম্বারের ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে।

বিদ্রোহীরা কয়েকজন বৃদ্ধ পুরুষ, মহিলা ও শিশুকে হাটিয়ে নদীর তীরে মনুষ্য কসাইখানায় নিয়ে যায়। সেখানে তাদের হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। বিদ্রোহীরা শহর থেকে বহু লাশ ট্রাকে করে নদীর তীরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে লাশগুলো পানিতে ফেলে দেয়া হয়।আমার স্কুলের কাছে ছিল আমার প্রিয় বন্ধু সগীর আহমেদ খানের বাড়ি। সশস্ত্র ব্যক্তিরা তার বাড়িতে প্রবেশ করে প্রত্যেককে গুলি করে হত্যা করে। তার বাড়ি লুট এবংআংশিকভাবে ভস্মীভূত করা হয়।

২৪ মার্চ হত্যাযজ্ঞের দিন আমি আমার স্কুলে যেতে পারিনি। পরদিন একজন বাঙালি কর্মচারী স্যাটেলাইট টাউনে আমার বাড়িতে আসে এবং আমার কাছে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিবরণ প্রকাশ করে। সে আমাকে জানায় যে, স্কুল ভবনে যুবতী মহিলাসহ শত শত মানুষের লাশ স্তূপ দিয়ে রাখা হয়েছে।

৩০ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী খুলনায় প্রবেশ করলে বিদ্রোহীরা পিছু হটে। এই ফাঁকে আমি আমার স্কুলে যাই। সেখানে গিয়ে যে দৃশ্য দেখেছি তা ছিল ভয়াবহ। শত শত রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত লাশের স্তূপ। লাশের পঁচা দূর্গন্ধ। লাশ কবর দিতে, রক্তের দাগ মুছতে এবং দূর্গন্ধ দূর করতে আমার পুরো এক মাস লেগেছিল।”

আটষট্টিতম সাক্ষীর বিবরণ:

২৯ বছরের মাহবুব আলম খুলনায় পিপলস জুট মিলে সিনিয়র একাউন্টস ক্লার্ক হিসেবে চাকরি করতেন। মাহবুব অবাঙালি হত্যাকাণ্ডের সময় একজন বিশ্বস্ত বাঙালি বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেন। তার বহু আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করা হয়। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি করাচিতে প্রত্যাবাসন করেন৷ মাহবুব আলম তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“আমি খুলনার খালিশপুরে ওল্ড কলোনিতে একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতাম। খুলনা জেলার প্রায় অর্ধেক অবাঙালি খালিশপুরে কেন্দ্রীভূত ছিল এবং তাদের অনেকেরই ছিল চমত্কার বাড়ি। আমাদের কলোনি থেকে বাঙালি শ্রমিকদের বসতি খুব দূরে ছিল না। এসব বাঙালি শ্রমিক পিপলস্‌ জুট মিলে চাকরি করতো। আওয়ামী লীগাররা এসব বাঙালি শ্রমিককে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে উসকানি দিচ্ছিল।১৯৭১ সালের ২৩-২৪ মার্চ প্রায় ৫ হাজার সশস্ত্র বাঙালি বিদ্রোহী অবাঙালিদের বাড়িঘর আক্রমণ করে এবং হাজার হাজার অবাঙালি নর-নারী ও শিশুকে হত্যা করে।

বিদ্রোহীরা আমাদের এলাকায় একটি কসাইখানা স্থাপন করে। এ কসাইখানায় হত্যা করার আগে বহু স্বচ্ছল অবাঙালিকে নির্যাতন করা হতো। অবস্থাপন্ন ঘরের মহিলাদের বন্দুকের মুখে তাদের লুকানো অলঙ্কার ও নগদ অর্থের খোঁজ দিতে বাধ্য করা হয়। এসব মহিলার চোখের সামনে তাদের প্রিয়জনদের হত্যা করা হয়।”

ঊনসত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

৩০ বছরের আনসার আহমেদ ছিলেন খুলনার খালিশপুরে স্যাটেলাইট টাউনে একটি দর্জি দোকানের মালিক। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের একদল সশস্ত্র সমর্থক ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বিদ্রোহী সৈন্যরা আমাদের এলাকায় অবাঙালি বসতিতে আক্রমণ চালায়। তারা প্রায় ২৪ ঘণ্টা রক্তপাত ঘটায়। আক্রমণকারীরা বর্বরতার সঙ্গে নির্দোষ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। তাদের বাড়িঘর লুট এবং অগ্নিসংযোগ করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো কলোনি একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। হত্যাকাণ্ডের হাত থেকে রেহাই পেতে অনেকে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বিদ্রোহীরা তাদের গুলি করে হত্যা করে। বিদ্রোহীরা অবাঙালিদের পালানোর সব রাস্তা বন্ধ করে দেয় এবং বন্দুকধারীরা লুকানো স্থান থেকে গুলিবর্ষণ করে। আমি, আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা আমাদের বাড়ির ছাদে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করি। ৩০ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী খুলনার নিয়ন্ত্রণ পুন:প্রতিষ্ঠা করা সত্ত্বেও অগণিত লাশ কবর দিতে অনেক দিন লেগে যায়।”

সত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

৩৪ বছরের এ. এস. সাইফুল্লাহ ১৯৭১ সালের মার্চে খুলনার খালিশপুরে ক্রিসেন্ট জুট মিলে অবাঙালি হত্যাযজ্ঞের একজন সাক্ষী। তিনি ১৯৭১

সালের ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনীর দ্বিতীয় দফা রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়ার হাত থেকে রক্ষা পান। অনেক চড়াই উতড়াই পেরিয়ে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে তিনি পাকিস্তানে ফিরে আসেন। সাইফুল্লাহ তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“২৩ থেকে ২৯ মার্চের মধ্যে খালিশপুর এলাকায় ক্রিসেন্ট জুট মিলের অবাঙালি শ্রমিক, তাদের পরিবার-পরিজন এবং অন্যান্য অবাঙালি অধিবাসীদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। প্রথম দুদিন আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও পুলিশের বিদ্রোহী সদস্যরা অবাঙালিদের বিরুদ্ধে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালায়। বাঙালি বিদ্রোহীরা বহু অবাঙালিকে অপহরণ করে। পরে এসব অপহৃত অবাঙালিকে কসাইখানায় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। ক্রিসেন্ট জুট মিলের কম্পাউন্ডে তিন রুমের একটি ব্লক ছিল। বিদ্রোহীরা এ-ব্লককে কসাইখানায় পরিণত করে। শত শত অবাঙালি পুরুষ, মহিলা ও শিশুকে খাবার ও পানীয় ছাড়া এ কসাইখানায় দু’দিন আটক রাখা হয়। পরে তাদেরকে অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতার সঙ্গে হত্যা করা হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী খুলনায় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার পর আমি এ কসাইখানা দেখেছি। মাটিচাপা দেয়ার জন্য লাশগুলো সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু সর্বত্র ছিল রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। একটি পাত্রে আমি মানুষের চোখের কর্ণিয়া দেখেছি। যেসব হতভাগ্যের চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছিল এসব কর্ণিয়া

ছিল তার প্রমাণ। আমি প্রায়ই ভাবি বিদ্রোহীরা চোখ তুলে নিয়ে কী ধরনের পৈশাচিক আনন্দ পেতো।”

একাত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

৫০ বছর বয়স্ক শাহজাহান খান খুলনার চান্দিমহলে স্টার জুট মিলে চাকরি করতেন। তিনি ১৯৭১ সালের মার্চে অবাঙালি হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছেন। শাহজাহান খান তার সাক্ষ্যে বলেছেন: “১৯৭০ সালে আমি কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসন করি এবং খুলনায় বসতি স্থাপন করি। শুরুতেই আমি স্টার জুট মিলে যোগদান করি। আমিঘি মিলের ওয়েডিং মাস্টার পদে পদোন্নতি লাভ করি। ২৮ মার্চ মেশিনগান, রাইফেল ও বর্শা সজ্জিত একদল লোক এ জুট মিলের অবাঙালি শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের ওপর হামলা চালায়। আক্রমণকারীরা কয়েকজন অবাঙালি শ্রমিককে পর্যুদস্ত করে তাদেরকে মিলের উত্তপ্ত বয়লারে নিক্ষেপ করে। বহু অবাঙালি শ্রমিক পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পলায়নের সময় তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়৷

আমি মিল থেকে পালিয়ে আমার বাড়ির দিকে দৌড়াতে থাকি। একটি গুলি আমার বাহুতে বিদ্ধ হয়৷ গুলিবিদ্ধ হয়েও আমি আমার বাড়ির দিকে দৌড়ানো অব্যাহত রাখি। ঘরের দরজায় পৌঁছা মাত্র আরেকটি গুলি আমার পায়ে লাগে। পায়ে গুলি লাগায় আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। তার আগে আক্রমণকারীরা আমার বাড়ি তছনছ করে এবং আমার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে হত্যা করে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তিন দিন পর আমি নিজেকে খুলনা হাসপাতালে দেখতে পাই। পাকিস্তান সেনাবাহিনী শহরে প্রবেশ করে এবং আহতদের হাসপাতালে স্থানান্তর করে। আমাদের এলাকায় অবাঙালিদের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। বাঙালি বিদ্রোহীরা শত শত অবাঙালি মেয়ে ও যুবতী মহিলাকে অপহরণ করে এবং ধর্ষণ করার পর নদীর তীরে তাদের হত্যা করে। নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়া ছিল তাদের সাধারণ রীতি। ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে আমি পাকিস্তানে প্রত্যাবাসন করি।”

বাহাত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

৬৯ বছর বয়স্ক শাকুর আহমেদ খুলনার খান জাহান আলী রোডে ছেলের বাসায় বসবাস করতেন। তার মতে, ১৯৭১ সালের মার্চে খুলনায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশকে উন্মত্ততা গ্রাস করেছিল। শাকুর আহমেদ তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“বাঙালিদের অধিকাংশই অত্যন্ত ভদ্র। কট্টরপন্থী একটি সংখ্যালঘু অংশ বিপুলসংখ্যক বাঙালিকে বিভ্রান্ত করেছিল এবং বিহারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় লিপ্ত হতে তাদের প্ররোচিত করে ৷ আমি উপমহাদেশ বিভক্তির অনেক আগে থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস করতাম। ভারতের মুলেরে আমার জন্ম। তবে আমার জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে পূর্ব পাকিস্তানে। আমার ছেলের জন্ম খুলনায়। আমরা চমত্কার বাংলা বলতে পারতাম। কিন্ত স্থানীয় বাঙালিরা আমাদেরকে বিহারী বলতো।

১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীরা অবাঙালিদের ভীতি প্রদর্শনে আমাদের এলাকায় কুচকাওয়াজ করতো। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সহিংসতা শুরু হয়। ২৩ মার্চ একদল সশস্ত্র লোক আমাদের এলাকায় আক্রমণ চালায় ৷ তারা আমার স্ত্রী ও একমাত্র ছেলেকে হত্যা করে। তারা আমাকে এবং আমার ছেলের দু’টি শিশু পুত্রকে রেহাই দেয়। আমার নাতিরাই এখন আমার জীবন, তারাই এখন আমার স্বপ্ন। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমরা করাচিতে প্রত্যাবাসন করি।”

তিয়াত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

৬০ বছরের বৃদ্ধ নবী বক্সের তিন পুত্রকে ১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম সপ্তাহে খুলনার প্লাটিনাম জুবিলি মিলে বাঙালি বিদ্রোহীরা হত্যা করে। ১৯৭৩

সালের শরৎকালে তিনি পাকিস্তানে প্রত্যাবাসন করেন এবং করাচিতে বসতি স্থাপন করেন। নবী বক্স তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“আমি প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে বিগত ১০ বছর ধরে চাকরি করতাম। আমার তিন পুত্র এ মিলে কাজ করতো। আমরা খুলনার খান জাহান আলী রোডে একটি ছোট বাড়িতে বসবাস করতাম।

২৪ মার্চ একদল বিদ্রোহী বাঙালি জুবিলি জুট মিলে অবাঙালি শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। তারা আমার তিন ছেলেকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করলে তাদের কয়েকজনের সঙ্গে আমার ধস্তাধস্তি বেধে যায়। হামলাকারীরা আমাকে কাবু করে ফেলে এবং আমার অসহায় চোখের সামনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করে। আমার মাথায় গুলি লাগলে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। আক্রমণকারীরা বিদায় নেয়ার পর একজন বাঙালি শ্রমিক আমাকে টেনে হিচড়ে স্টোর রুমে নিয়ে যায়। সেখানে আমার ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ করা হয়। বাঙালি বিদ্রোহীদের সন্ত্রাসের রাজত্ব থেকে সেনাবাহিনী খুলনাকে মুক্ত করা নাগাদ আমি সেখানেই অবস্থান করি।”

চুয়াত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

২৮ বছরের রাবিয়া বেগমের স্বামী রুস্তম আলী খুলনায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী হিসেবে চাকরি করতেন। রাবিয়ার মতে, বাঙালিদের মধ্যে বহু আল্লাহভীরু লোক ছিলেন। এসব বাঙালি দৃঢ়ভাবে অবাঙালি হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছেন। কিন্ত তারা ছিলেন অসহায়। আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহীরা ছিল সশস্ত্র। অন্যদিকে হৃদয়বান বাঙালিরা ছিল নিরস্ত্র। রাবিয়া বেগম শুনতে পেয়েছিলেন যে, অবাঙালিদের হত্যা ও নির্যাতনের জন্য কসাইখানা স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৭১ সালে তার বাড়ি লুট এবং তার স্বামীকে হত্যা করা হয়। সে ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন:

“১৯৭১ সালে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে অবাঙালিদের জীবন দুঃস্বপ্লে পরিণত হয়। প্রতিদিন আমরা গুজব শুনতাম যে, বাঙালি বিদ্রোহীরা আমাদের কলোনিতে হামলা চালিয়ে আমাদের সবাইকে হত্যা করবে। ২৩ মার্চ সেই ভয়াবহ দিন এসে উপস্থিত হয়। সেদিন একদল সশস্ত্র বিদ্রোহী আমাদের কলোনি আক্রমণ করে৷ আমার স্বামী দর্শনায় একটি সরকারি কাজে অবস্থান করছিলেন। বাড়িতে আমি এবং আমার বৃদ্ধা শাশুড়ি ছিলাম একমাত্র বয়স্ক মানুষ। গুলির শব্দ শুনে আমি বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে এবং অন্য একটি এলাকায় আমাদের একজন বিশ্বস্ত বাঙালি মহিলার বাড়িতে আশ্রয়গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেই। আমি আমার শাশুড়িকে আমার সঙ্গে যেতে রাজি করানোর চেষ্টা করি। কিন্ত তিনি অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন, বৃদ্ধা হওয়ায় বিদ্রোহীরা তাকে রেহাই দেবে। আমি তাকে ফেলে আমার দু’সন্তান নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই এবং নিরাপদে আমার গোপন আশ্রয়স্থলে পৌঁছি। সেনাবাহিনী খুলনায় প্রবেশ করার পর আমি আমার বাড়িতে ফিরে আসি। বাড়িতে ফিরে গিয়ে যে দৃশ্য দেখি তাতে আমি ভীষণ মর্মাহত হই। আমার বাড়ির অর্ধেকটা ভস্মীভূত। যাবতীয় মূল্যবান সামগ্রী লুন্ঠিত। আমার শাশুড়ি প্রহৃত। বিদ্রোহীদের প্রহারে তিনি আহত। আমি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালে তার চিকিৎসা করা হয়। বাড়িতে কোনো অলঙ্কার না পেয়ে বিদ্রোহীরা রাগান্বিত হয়। আমাদের সম্পদের খোঁজ দিতে তারা আমার শ্বাশুড়িকে প্রহার করে। আমাদের লুকানোর মতো কোনো সম্পদ ছিল না।

সেনাবাহিনী খুলনার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার পর আমি একটি চাকরি নেই। আমার উপার্জিত অর্থ দিয়ে আমি নিজে, আমার সন্তান ও আমার শাশুড়ির ভরণ-পোষণ করেছি। আমি আমার স্বামীর কোনো তথ্য পাচ্ছিলাম না। আমি জানতে পারি যে, বিদ্রোহীরা দর্শনায় তাকে হত্যা করেছে।

১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে মুক্তিবাহিনী খুলনা দখল করে নিলে নতুন করে আমার দুঃস্বপ্ন শুরু হয়। শহরে আবার শুরু হয় অবাঙালি হত্যাযজ্ঞ। ভাগ্যক্রমে আমরা হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাই। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে আমরা ঢাকা থেকে করাচিতে প্রত্যাবাসন করি॥”

— ব্লাড এন্ড টীয়ার্স / কুতুবউদ্দিন আজিজ (মূল: Blood and Tears । অনু: সুশান্ত সাহা) ॥ [ ইউপিপি – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৮৩-৯০ ]




বাঙালী মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

রোগ ভাবনাশূণ্যতার‌                                                                                      

তোমরা কেন ভাবোনা (আ’ফালাতাফাক্কারুন), কেন আক্বলকে কাজে লাগাও না (আ’ফালা তাক্বীলুন), কেন মনকে গভীর ভাবে নিবিষ্ট করোনা (আ’ফালা তাদাব্বারুন)-পবিত্র কোর’আনে এ সিরিয়াস প্রশ্নগুলো খোদ মহান আল্লাহতায়ালার। মহান স্রষ্টার এ প্রশ্নগুলো তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব জাতিকে উদ্দেশ্য করে। মহাজ্ঞানীর সে প্রশ্নগুলো কি মুসলিম মনেও নাড়া দিচ্ছে? পবিত্র কোর’আনে এ প্রশ্নগুলো আমরা বার বার পড়ি। পড়ার পর বেহুশের মত আবার ঘুমিয়ে পড়ি। পশুপাখি ও গাছপালাকে উদ্দেশ্য করে এ প্রশ্নগুলো করা হলে আছড় হতো না। কারণ চিন্তা-ভাবনার সামর্থ্য পশুপাখি ও গাছপালাকে দেয়া হয়নি্। কিন্তু মুসলিমদের বিশেষ করে বাঙালী মুসলিমদের অবস্থা কি তা থেকে ভিন্নতর? অথচ ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করাই ছিল এ প্রশ্নগুলোর মূল উদ্দেশ্য। মহান আল্লাহতায়ালার এ প্রশ্নাবলীকে মুসলিমগণ যতটা মুখস্থ করেছে -তা নিয়ে ততটা চিন্তা করেনি। সেগুলোকে আমলেও নেয়নি। আমলে নিলে বাঙালী মুসলিমদের মনে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব আসতো। কিন্তু সেরূপ বিপ্লব দূরে থাক, তার ধারে-কাছেও নাই। ফলে বাংলাদেশের মত ১৭ কোটি মুসলিমের দেশে বহু লক্ষ হাফেজ ও ক্বারী সৃষ্টি হলেও ফকিহ, মোজতাহিদ বা চিন্তাবিদ তেমন গড়ে উঠেনি। ১৭ কোটির মুসলিমের মধ্য থেকে ক’জন ক’খানা তাফসির বা ইসলামের উপর মৌলিক বই লিখেছেন? জনবহুল এ মুসলিম দেশটিতে দ্বীনী মাদ্রাসায় যে তাফসির গ্রন্থগুলো পড়া হয় তার প্রায় অধিকাংশই অন্যান্য ভাষা থেকে অনুদিত। দর্শন, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস বা জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্য শাখাতেই বা ক’জন ক’খানা গ্রন্থ রচনা করেছেন? বাঙালী মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতার বড় দলিল হলো এগুলো।

তবে বাঙালী মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক এ পশ্চাৎপদতা আজকের নয়, বহু শত বছরের। বাংলাদেশে ইসলামের প্রবেশ বঙ্গবিজয়েরও বহু পূর্বে। মুসলিমদের হাতে বঙ্গবিজয় হয়েছে প্রায় আটশত বছর আগে। এ দীর্ঘ সময়ে জাতির চিন্তা-চেতনায় বিপ্লব আসতে পারতো। সৃষ্টি হতে পারতো বহু লক্ষ বইয়ের বিশাল ভূবন। যেমন হয়েছে আরবী, ফার্সী ও উর্দুতে। ইসলামের আগমনের মাত্র একশত বছরের মধ্যেই আরবে ও ইরানে বিস্ময়কর বিপ্লব এসেছিল বুদ্ধিবৃত্তিতে। অথচ সে আমলে তাদের সমুদয় লোকসংখ্যা আজকের ঢাকা শহরের চেয়ে বেশী ছিল না। এমনকি আফগানরাও ছিল সংখ্যায় অতি নগন্য। অথচ একমাত্র সুলতান মাহমুদের সাম্রাজ্যে যতজন বিজ্ঞানীর বসবাস ঘটেছিল, আমরা বিগত এক হাজার বছরেও ততজন বিজ্ঞানী গড়তে পারিনি। উল্লেখ্য, ইবনে সীনা, ইবনে ফারাবী, আল বেরুনীসহ সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী তাঁর সাম্রাজ্যে বসবাস করতো।

ইসলাম আক্বল তথা বুদ্ধিবৃত্তির ধর্ম। কোরআনের প্রতিটি আয়াত ব্যক্তিকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। একমাত্র চিন্তা-ভাবনাই মানুষকে পশুর স্তর থেকে ফেরেশতার পর্যায়ে উঠায়। অন্যসব ধর্ম থেকে ইসলামের পার্থক্যটি এক্ষেত্রে বিশাল। একমাত্র ইসলামই চিন্তা-ভাবনাকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। নবীজী (সা:)’র হাদীস: ‘‘আফযালুল ইবাদাহ তাফাক্কু’’। অর্থ: উত্তম ইবাদত হল চিন্তা ভাবনা করা। এক মহুর্তের চিন্তা-ভাবনাকে নবীজী (সা:) সারা রাতের নফল ইবাদতের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। চিন্তা-ভাবনাই সংযোগ গড়ে মহান আল্লাহতায়ালার সাথে; তাতে ওজন বাড়ে আমলের। অন্যথায় নামায-রোযার ন্যায় ইবাদত নিছক আনুষ্ঠিকতায় পরিণত হয়। যার মধ্যে চিন্তাভাবনা নাই, তার মধ্যে আল্লাহভীতিও নেই। কারণ, মহান আল্লাহতায়ালার ভয় তো আসে পরকালের ভয় থেকে। আর ভয় তো মনের বিষয়, এবং সেটি আসে নিজ পরিণতি নিয়ে গভীর ভাবনা থেকে। ভাবনাশূণ্যতা তাই পরকালের ভয়শূণ্যতার কারণ। চিন্তাশূণ্য ব্যক্তি পশু তূল্য। পশুর জীবনে যেমন ভাবনা থাকে না, তেমনি পরকালের ভয়ও থাকে না। পশুর ন্যায় এমন চিন্তাশূণ্য ব্যক্তির পক্ষে অন্য কিছু হওয়া সম্ভব হলেও কঠিন হয় মুসলিম হওয়া। এমন ভয়শূণ্যদের সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, এদের চোখ আছে – কিন্তু তা দিয়ে এরা দেখে না, কান আছে -কিন্তু তা দিয়ে এরা শুনে না, ক্বালব আছে – কিন্তু তা দিয়ে এরা ভাবে না। অথচ ভাবনার প্রক্রিয়া চালু রাখতে হলে চোখ, কান ও ক্বালবের দরজাকে সব সময় খোলা রাখতে হয়। মানব মনে সে ভাবনা প্রক্রিয়াকেই তীব্রতর করে পবিত্র কোর’আন। বিশ্বচরাচরে মহান আল্লাহতায়ালার যে নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে -সেগুলো যেমন দেখতে বলে তেমনি তা নিয়ে ভাবতেও বল। ইসলামের গৌরব কালে বুদ্ধিবৃত্তিকে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ যেমন এবাদত ভাবতো, তেমনি শাসকেরাও একাজে সহায়তা দানকে দায়িত্ব মনে করতো। ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সে সাথে রাজনৈতিক বিজয়ও এসছিল অতি দ্রুত। সমগ্র মানব ইতিহাসে সেটি তূলনাহীন।

 

অজ্ঞতা অসম্ভব করে মুসলিম হওয়া

বুদ্ধিবৃত্তির গুরুত্ব যে কত গুরুত্বপূর্ণ -সেটি বুঝা যায় পবিত্র কোর’আন পাকে ঘোষিত মহান আল্লাহতায়ালার একটি বয়ান থেকে। সে ঘোষণাটি হলো, ‘‘ইন্না মা ইয়াখশাল্লাহ মিন ইবাদিহিল উলামা।’’ অর্থ: সমগ্র সৃষ্টিকূলের মধ্যে একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে। উপরুক্ত আয়াতে যে সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে তা হলো, হৃদয়ে মহান আল্লাহর ভয় নিয়ে বাঁচা ও প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য যা অপরিহার্য -তা হলো পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান। এর বিকল্প নেই। শূণ্যে প্রাসাদ গড়া যায় না। তেমনি মহান আল্লাহতায়ালার ভয় ও ঈমানের সৌধ কখনোই অজ্ঞতার উপর নির্মিত হয় না। নামাজ পড়েও অনেকে ঘুষ খায়, সূদ খায় এবং মিথ্যা কথা বলে। বেপর্দাও হয়। এর কারণ অজ্ঞতা। যে ব্যক্তি জ্ঞানচক্ষুতে পরকাল চোখের সামনে দেখতে পায়, সেটিকে পাপাচারে নষ্ট করতে ভয় পায়। শিশু আগুনে হাত দেয় আগুনের দাহ্য ক্ষমতা না জানার কারণে। নামাজীও তেমনি ঘুষ খায় বা মিথ্যা কথা বলে পরকালের জ্ঞান না থাকার কারণে। অজ্ঞতা নিয়েও নামাযী হওয়া যায়, রোযা বা হজ্বও কারা যায়। কিন্তু পরিপক্ক ঈমানদার ও আল্লাহভীরু যে হওয়া যায় না –সে সাক্ষ্যটি অন্য কারো নয় বরং মহাজ্ঞানী ও মহাপ্রভু মহান আল্লাহতায়ালার।

অজ্ঞতার ইসলামী পরিভাষা হলো জাহিলিয়াত, যার মধ্যে এটি বিদ্যমান তাকে বলা হয় জাহেল। আর এর বিপরীত শব্দ হলো মা’রেফাত। যিনি এর অধিকারী তিনিই আরেফ। মৃত্যুর এপারে বসে ওপারে কি হবে তা উপলব্ধি করার সামর্থ্যই হলো মা’রেফাত। এ সামর্থ্যটি চোখের নয়, এটি অন্তরের। এবং সেটি একমাত্র কোর’আন-লব্ধ জ্ঞানেই সৃষ্ঠি হয়। এমন জ্ঞানই মানুষকে পাপাচারের থেকে দূরে রাখে। অপর দিকে জাহেল শুধু নাস্তিকেরা নয়, বহু আস্তিকও। যুগে যুগে ইসলামের সর্বনাশ হয়েছে মুসলিম বেশধারী এসব জাহিল আস্তিকদের কারণে। ইবাদতের নামে এসব অজ্ঞরা স্বাস্থ্যপতন ঘটালেও তাদের মনে মহান আল্লাহতায়ালার ভয়ের চেয়ে এজিদদের ন্যায় দুর্বৃত্তদের ভয়ই অধিক ছিল। সে যুগে এজিদের বাহিনীতে যারা যুদ্ধে খেটেছে তারা কাফের ছিল না। অথচ এদের হাতে ইমাম হোসেন (রা) শুধু নিহতই হননি, তাঁর লাশকে তারা ঘোড়ার পায়ের নীচে দলিত-মথিতও করেছে। এটিও সম্ভব হয়েছিল তাদের অজ্ঞতার কারণে। একজন জ্ঞানবান ব্যক্তির কাছে এমন জঘন্য কাজ অচিন্তনীয়। অজ্ঞতার কারণেই তারা ব্যর্থ হয়েছিল ইমাম হোসেন ও তাঁর ইসলামকে চিনতে। আজও এরূপ অজ্ঞ জাহেলদের কারণে ৯০% মুসলমানের দেশে ইসলামের প্রয়োগ সম্ভব হচ্ছে না। এদের কারণে আদালত থেকে শরিয়তী আইন বিলুপ্ত। এককালে ইমাম হোসেনকে যারা হত্যা করেছিল তারাই একালে ভোট দিয়ে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাকে রুখছে। তুরস্কে শতকরা ৯৮ভাগ মুসলমান। অথচ বেশী দিন আগের কথা নয়, মুসলিমদের ভোটেই সেদেশে জনগণকে বাধ্য করা হয়েছিল হারাম কাজে। এমনকি বাধা দেয়া হয়েছে বিদ্যালয়ে, অফিস-আদালতে ও পার্লামেন্টে মহিলাদের হিজাব পরিধানে। তাদের অজ্ঞতা শুধু নিজেকে নিয়ে নয়, বরং আল্লাহতায়ালা, আখেরাত, রোজহাশর তথা সমগ্র ইসলামকে নিয়ে।

আরো মুশকিল হলো, এরূপ অজ্ঞ বা জাহেল থাকাকে মুসলিমগণ আজ আর পাপ ভাবে না। অজ্ঞ থাকাটাই যে ইসলামে সবচেয়ে বড় পাপ –সে হুশও তাদের নাই। অথচ সব পাপের জন্ম তো এখান থেকেই। এ পাপাচার রুখতেই ইসলাম সকল নরনারীর উপর জ্ঞানার্জনকে সর্বপ্রথম ফরজ করা হয়েছে। কোর’আনের প্রথম ওহি “ইকারা” বা “পড়” হওয়ার তাৎপর্য তো এটিই। “ইকরা” বা “পাঠ করা” হলো জ্ঞানার্জনের চাবী। এ চাবী ছাড়া  জ্ঞানার্জনে সামনে এগোনো অসম্ভব। কোর’আন-হাদীসের জ্ঞান নয়, নিছক অক্ষরজ্ঞানের বিনিময়ে মহান নবীজী (সা:) বদর যুদ্ধের হত্যাযোগ্য যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দিয়েছিলেন। বিদ্যার্জন ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ -এটি হলো তারই উদাহরন। জ্ঞানার্জনকে অত্যাধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই সেকালে মুসলিমগণ স্বল্পসময়ে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছিলেন। অথচ আজকের মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে অজ্ঞতায়। অন্য ধর্মের লোকেরা যেখানে অন্ধ, বধির ও বোবাদের জন্যও জ্ঞানার্জনের ব্যবস্থা করেছে -সেখানে বাংলাদেশের ন্যায় বহু মুসলিম দেশের অর্ধেকেরও বেশী সুস্থ্য নর-নারী আজ নিরক্ষর।

সত্য-অসত্য, ন্যায়-অন্যায়ের উপলব্ধিতে অতিশয় জরুরী হলো ব্যক্তির চিন্তার সামর্থ্য। বিবেকমান হওয়ার পথে এটিই সেরা অবলম্বন। চিন্তার সামর্থ্য একমাত্র চিন্তাতেই বৃদ্ধি পায়। চিন্তার অনভ্যাসে সুস্থ্য মানুষও আহম্মকে পরিণত হয়। তখন পঙ্গুত্ব আসে বুদ্ধিবৃত্তিতে। যেমন দীর্ঘকাল ব্যবহার না করায় রোগীর সুস্থ্য হাত-পা-গুলোও শক্তিহীন হয়। অথচ ব্যবহারে শুধু সুস্থ্যই থাকে না, সবলও হয়। নবীজী (সা:)’র আগমনে যে আরবভূমি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়কদের জন্ম দিল -তা কয়েক বছর পূর্বেও দুর্বৃত্তদের লালনভূমি রূপে পরিচিত ছিল। কারণ, সে আমলে আরব জনগণ সুচিন্তা থেকে নিবৃত ছিল। তাতে মৃত্যু ঘটেছিল তাদের বিবেকের। ফলে ব্যাভিচার, দস্যুবৃত্তি, উলঙ্গতা বা নিজ কণ্যার জীবন্ত দাফনেও সে বিবেকে দংশন হতো না। এমন বিবেকহীনদেরকে সুচিন্তায় অভ্যস্থ করে কোর’আন বস্তুত তাদের মৃত বিবেককেই জীবিত করেছিল। অভ্যস্থ করেছিল এ আমৃত্যু ভাবনায় ও প্রচেষ্ঠায় যে কি করে আরো সভ্যতর হওয়া যায়। এভাবেই শুরু হয়েছিল তাদের অবিরাম উপরে উঠার প্রক্রিয়া। এর ফলেই তাঁরা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা গড়তে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু যখনই চিন্তা-ভাবনায় ইস্তাফা দিয়েছে -তখনই শুরু হয়েছে তাদের পতনযাত্র।

 

বিকল বুদ্ধিবৃত্তির ইঞ্জিন

মগজই দেহের ইঞ্জিন। এটি রুগ্ন হলে দেহ বেহুশ হয়। শক্তি হারায় হাত-পা ও দেহ। তেমনি জাতির মগজ হলো আলেম বা বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। জাতির পতনের শুরু তাদের পচন বা অসুস্থ্যতা থেকে। এজন্যই পতনশীল একটি জাতিকে দেখে অন্ততঃ এটুকু সঠিকভাবেই বলা যায়, সে জাতির আলেমরা যথাযথ দায়িত্বপালন করেনি। বনি ইসরাইলের পতনের বড় কারণ ছিল তাদের আলেমগণ। মহান আল্লাহতায়ালা সুরা জুম্মা’তে তাদেরকে ভারবাহী গাধার সাথে তুলনা করেছেন। গাধা বই বহন করতে পারে কিন্তু সে বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে ভাবতে পারেনা। সে ইহুদী আলেমদের অনুসারি কি মুসলিমদের মাঝে কম?

বুদ্ধিবৃত্তি বা ইলমচর্চা মানুষকে ব্যক্তিস্বার্থের উর্দ্ধে উঠে সমাজ, রাষ্ট্র ও সমগ্র বিশ্বকে নিয়ে ভাবতে ও ত্যাগে উৎসাহিত করে। এগুণটি ছাড়া সমাজে উচ্চতর ও সভ্যতর বিবর্তন অসম্ভব। তখন জাতির কাঁধে ভর করে ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা ও হানাহানি। সৃষ্টিশীলতার মাঝে যে অনাবিল আনন্দ -সেটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ব্যক্তিকে ক্ষুদ্র স্বার্থ থেকে দূরে রাখতে। তখন জাগে আরো মহত্তর হওয়ার প্রেরণা। ইবনে সীনা বা ফারাবীদের ন্যায় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠশীল মানবগণ এজন্যই কখনই কোন দুর্বৃত্ত শাসকের গোলামে পরিণত হয়নি। অথচ যে সমাজে সৃষ্টিশীল মানুষের অভাব- সে সমাজে মিরজাফরদের সংখ্যাও অধিক। এ কারণেই অতীতে উপনবেশিক বৃটিশের পক্ষে শাতিল আরবে বা অন্যান্য মুসলিম ভুমিতে মুসলিম নিধনে যুদ্ধ করা বা তাদের জাহাজে কয়লা ঢালার জন্য বাংলাদেশ থেকে ভাড়াটিয়া সৈন্য পেতে বেগ পেতে হয়নি। এমন কি গোলামের সে খাতায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি ও জাতীয় বীরও নাম লেখিয়েছে। আজও সেবাদাস পেতে অসুবিধা হচ্ছে না বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদীদের।

জনগণের ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্ঞান। পানাহারে দেহের বল বাড়লেও তাতে মনের বল বাড়ে না। অথচ অন্যের গোলাম না হয়ে স্বাধীন ভাবে বাঁচার জন্য মনের বলই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বরং দেহের বল নিয়ে অনেকেই বাজার খোঁঝে অন্যের গোলাম হওয়ার জন্য। বিশ্বে রাজনৈতিক বিপ্লব কম হয়নি, কিন্তু তাতে মানব জাতির সভ্যতর উত্তরণ ততটা হয়নি। রাজা বদল সহস্রবার হলেও এতে দাস ও ভাগ্যাহতদের ভাগ্য বদলায়নি। অথচ মানব জাতির ইতিহাসের মোড় পাল্টে দেয় ইসলাম। কারণ জ্ঞানচর্চাকে ইসলাম জনগণের স্তরে নামিয়ে আনে। পেশাদারীর স্থলে এটিকে ইবাদতে পরিনত করে। এতে বুদ্ধিবৃত্তি পরিণত হয় ব্যক্তির সার্বক্ষণিক অভ্যাসে। ফলে সুচিন্তায় তথা বুদ্ধিবৃত্তিতে অভ্যস্থ্য হয় কৃষক, শ্রমিক, তাঁতী, ব্যবসায়ীসহ সর্ব-শ্রেনীর মানুষ। পাঠশালায় পরিণত হয় সমগ্র দেশ, সকল জনপদ ও প্রতিটি ঘর। ফলে এতে গর্জে উঠে ব্যক্তির মাঝে ঘুমিয়ে থাকা শক্তিশালী ইঞ্জিন। ফলে গতি পায় সমগ্র জাতি। এভাবে ইসলাম শুধু একটি জাতির ধর্মই পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছে তার রুচিবোধ, মূল্যবোধ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি। কৃষক পরিনত হয় বিচারক বা প্রশাসকে। ক্রীতদাস পরিনত হয়েছে জেনারেলে। সেদিন কয়েক লক্ষ আরবদের মাঝে সেদিন যে মাপের ও যে সংখ্যায় চিন্তানায়কের জন্ম হয়েছিল তা আজকের মুসলিম বিশ্বের প্রায় দেড় শত কোটি মুসলিমও পারছে না। এ ব্যর্থতা মূলত তাদের শিক্ষাব্যবস্থার। কারণ এটি ব্যর্থ হচ্ছে জীবনের মূল পাঠটি শেখাতে। ব্যর্থ হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিকে ইবাদতে পরিণত করতে। ফলে ব্যর্থ হচেছ ব্যক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিন তথা বিবেককে চালিত করতে। বাংলাদেশ যেভাবে দূর্নীতিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে সেটি মূর্খতার কারণে নয়, বরং সেটি কুশিক্ষা দানকারী শিক্ষানীতির কারণে। 

 

বিজয়ী শত্রুপক্ষ

মুসলিমগণ বুদ্ধিবৃত্তিকে পরিহার করেছে দীর্ঘকাল আগেই। আক্বলের প্রয়োগ ছেড়ে নকলকে তারা ইলমচর্চা মনে করেছে। ফলে গুরুত্ব হারিয়েছে সৃষ্টিশীল জ্ঞানচর্চা। বাংলাদেশের বিগত আটশত বছরের মুসলিম ইতিহাসে ইসলামের উপর যে কয়খানী বই লেখা হয়েছে তার শতকরা নিরানব্বই ভাগ সম্ভবতঃ লেখা হয়েছে বিগত ৫০ বছরে। প্রশ্ন হলো বাঁকি সাড়ে সাতশত বছর আমরা কি করেছি? এখনও যা হচ্ছে সেটিও কি আশাব্যঞ্জক? বুদ্ধিচর্চার ময়দানে সেক্যুলার পক্ষ তথা ইসলামের শত্রুপক্ষ এখনও  বিজয়ী। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের প্রায় শতকরা ৯০ ভাগের লিখক সম্ভবতঃ তারাই। ইসলামপন্থিরা এদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েই দায়িত্ব সেরেছে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং এভাবে নিজেদের ভাবমূর্তিকে তারা বিনষ্ট করেছে। নিজেরা যে বুদ্ধিবিমুখ সেটিই জনসম্মুখে প্রমানিত করেছে। ইসলামপন্থিদের দায়িত্ব ছিল, বিপক্ষের যুক্তিকে খন্ডন করে অন্ততঃ বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে ইসলামকে বিজয়ী করা। এজন্য প্রয়োজন ছিল দুয়েক জন নয়, বহুহাজার উঁচু মাপের জ্ঞানী বা বুদ্ধিজীবী তৈরী করা। শত্রুপক্ষের জবাবে ইসলাম যা বলতে চায় তা সুন্দরভাবে গুছিয়ে বলা। কিন্তু সে কাজ হয়নি। ফলে চেতনার রাজ্যে সুচিন্তার চাষাবাদ বাড়েনি, কোর’আন যা বলতে চায় বা যুক্তি দেখায় সে গুলোকেও মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছানো হয়নি। ফলে কোরআন সবচেয়ে অধিক পঠিত কিতাব হওয়া সত্ত্বেও তাতে সমাজের অন্ধকার দুর হয়নি। অথচ ইসলামের আলো বিতরণের কাজে প্রতিটি মুসলিমই দায়বদ্ধ।

আল্লাহতায়ার নাযিলকৃত সর্বশ্রেষ্ট এ গ্রন্থটির সাথে যে জুলুম হয়েছে সম্ভবতঃ কোন কেচ্ছাকাহিনীর বইয়ের সাথেও তা হয়নি। কারণ, কেচ্ছাকাহিনীর বই যাতে শিশুরা বুঝতে সে চেষ্টা  করা হয়। ভিন্ন ভাষায় হলে সেটির অনুবাদ করা হয়। অথচ বাংলাদেশে সাতশত বছর ধরে কোর’আন পঠিত হয়েছে অনুবাদ ছাড়াই। জ্ঞানের সর্বোচ্চ উৎস্যের সাথে এমন কান্ডজ্ঞানহীন আচরন একমাত্র বিবেকের পঙ্গুত্বেই সম্ভব, সুস্থ্যতায় নয়। বুদ্ধিবৃত্তি এ যাবতকাল এদেশটিতে কতটা গুরুত্বহীন ছিল -সেটি এ থেকেই বুঝা যায়। অনেকে বলেন, কোরআন বুঝা নিছক আলেমদের কাজ। কথাটি অসত্য। সমগ্র কোর’আন ও হাদিসে এর স্বপক্ষে একটি প্রমাণও নেই। একজনের খাদ্যগ্রহণে আরেকজন বাঁচেনা। খেতে হয় সবাইকেই। তেমনি কোর’আন থেকে এক জনের জ্ঞানার্জনে অন্যের ঈমান পুষ্টি পায় না। ফলে তার জন্য মুসলমান থাকাই তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে। রোজহাশরের বিচার দিনে কোন আলেম কারো পক্ষে দাঁড়াবে না। অজ্ঞ থাকায় যে মহাপাপ –সে পাপের জন্য সবাইকে নিজের হিসাব নিজে দিতে হবে। আহারের ন্যায় জ্ঞানার্জনের দায়িত্বও সবার। নবীজীর (সা) আমলে কোর’আনকে বুঝার চেষ্টা করেছেন ক্ষেত-খামারের সাধারণ মানুষ। নামায-রোযার পাশাপাশি জ্ঞানার্জের ইবাদতেও তাদের সমান ভাবে দেখা গেছে। জ্ঞানচর্চা সেদিন তাই প্রচন্ড গণমুখীতা পেয়েছিল। এ কারণেই ঘরে ঘরে সেদিন আলেম ও শহিদ সুষ্টি হয়েছিল। ফলে মদিনার ক্ষুদ জনপদটিতে সেদিন যত মুজাহিদ ও মুজতাহিদ ফকিহর জন্ম হয়েছিল -বাংলাদেশে বিগত হাজার বছরে তার শত ভাগের এক ভাগও হয়নি। অথচ সে আমলে মদিনার জনসংখ্যা বাংলাদেশের আজকের একটি থানার সমানও ছিল না।

 

বিভ্রান্তি ইলমচর্চা ও আমল নিয়ে

অনেকে বলেন, মুসলিমদের সমস্যা ইলমে নয়, সেটি তাদের আমলে। তাদের ধারণা ইলমচর্চা যথেষ্ট হয়েছে এখন আমল প্রয়োজন। অথচ তারা ভূলে যান, আমল ইলমেরই ফসল। ব্যক্তির কদর্য আমল দেখেই বুঝা যায় সে ব্যক্তির ইলমচর্চা হয়নি। গাছ ছাড়া যেমন ফল আশা করা যায় না, তেমনি ইলম ছাড়া আমলও আশা করা যায় না। ইলমের আগে আমলে পরিশুদ্ধি চাওয়া অনেকটা ঘোড়ার আগে আগে গাড়ি জোড়ার মত। আমলে সমস্যা সৃষ্টি হয় ইলমে সমস্যা থাকার কারণে। ইলম অর্থ সার্টিফিকেট লাভ নয়, এটি হলো ব্যক্তির আত্ম-উপলব্ধি, আত্ম-আবিস্কার ও আত্ম-পরিশুদ্ধির সামর্থ্য। এ সামর্থ্য অর্জনের পরই পরিবর্তন আসে আমলে, পূর্বে নয়। ইলমই চিন্তা-ভাবনা তথা বুদ্ধিবৃত্তিকে সক্রিয় করে। চিন্তাশীল বিবেক তখন সৎকাজে উৎসাহ এবং অসৎকাজে নিষেধ করে। এজন্য ইসলামে ইলম লাভকে প্রথম ফরজ করা হয়েছিল, অন্যান্য ইবাদত এসেছে অনেক পরে।

 

ঔষধের নামে বিষপান সমাজে কম হয় না। তেমনি কম হয় না শিক্ষার নামে কুশিক্ষা এবং জ্ঞানের নামে অজ্ঞতার বিতরন। এজন্যই মাদ্রাসাতে নকল হয়, বিশ্ববিদ্যালয়েও ধর্ষণে উৎসব হয়। হাজা, মজা, চড়াজাগা নদীতে যে সামান্য পানি থাকে -তাতে নৌকা চলে না, প্লাবনও আসে না, এমন কি তা দিয়ে কৃষিকাজও হয় না। তেমনি জ্ঞানের ক্ষেত্রেও। জীবনের মোড় পাল্টাতে হলে গভীরতর জ্ঞানের প্রয়োজন। গভীর জ্ঞানেরই ফলেই আসে ব্যক্তির ঈমান, আমল ও চিন্তার মডেলে পরিবর্তন। যে কোন সমাজ বিপ্লবের জন্য এরূপ জ্ঞানের বিপ্লব শুধু জরুরী নয়, অপরিহার্যও। শুধু তেলাওয়াতে সেটি সম্ভব না। সম্ভব হলে মুসলিমরাই হতো জ্ঞান-বিজ্ঞানে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, কারণ জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাবের এতো তেলোয়াত আর কোন দেশে কোন কালেই হয়নি –যা বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলোতে হয়।

 

সমস্যা হলো, অজ্ঞতাই যে আমাদের সকল দুরাবস্থার কারণ -সেটির উপলব্ধি নিয়েও রয়েছে ব্যর্থতা। সঠিক পথের সন্ধান লাভের পর কোন সুস্থ্যব্যক্তি ভ্রান্ত পথে দৌঁড়ায় না। তেমন একটি পথে শত শত বছর চলার পরও যদি সাফল্য না আসে তবে বুঝতে হবে পথটি সঠিক নয়। আমাদের ব্যর্থতাই প্রমান করে, সঠিক পথটি আমাদের চেনাই হয়নি। জাহান্নামের আযাব এতই কঠিন যে সে আযাবের সামান্য উপলব্ধিও ব্যক্তির জীবনে মহত্তর বিপ্লব আনতে বাধ্য। সে বিপ্লব না আসলে বুঝতে হবে, সে আযাবের জ্ঞানলাভই ঘটেনি। নিজের অজ্ঞতা তখন সুস্পষ্ট রূপে ধরা পড়ে। নবীজী (সা) তাঁর ১৩ বছরের মক্কীজীবনে মুসলিমদের মাঝে পরকালের ভীতি তথা আখেরাতের জ্ঞানকেই মজবুত করেছিলেন। তার পিছনে ছিল কোর’আনের জ্ঞান। মক্কায় নাযিলকৃত সুরাগুলির আলোচ্য বিষয় ছিল এগুলো। সে সময়ে মুসলিমদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন হয়েছে। কিন্তু সে নির্যাতন বরং তাদের কোর’আন-লব্ধ জ্ঞান ও চেতনাকে আরো শানিত করেছিল। ধারালো করেছিল তাদের ঈমান ও উপলব্ধিকে।

 

মৃত্যুর মুখোমুখী দাঁড়িয়ে সত্যের সম্যক উপলব্ধির যে সামর্থ্য আসে -তা বক্তৃতায় বা ওয়াজে সৃষ্টি হয় না। ফলে মক্কায় যে কোর’আনী জ্ঞানের ভান্ডার গড়ে উঠেছিল সেটি আজও অতুলনীয়। মদিনার বুকে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল মক্কীজ্ঞানের সে শক্ত বুনিয়াদের উপর ভিত্তি করেই। জ্ঞানের গভীরতম স্তরে পৌঁছার এ মারেফাত পীরের খানকাতে সৃষ্টি হয় না। ওয়াজের মাহফিলেও নয়। বাংলাদেশে যেরূপ লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে ওয়াজ বা ইজতেমা হয় নবীজীর (সা) আমলে সেটি হয়নি। কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বক্তৃতায় নবীজী (সা) যেভাবে মানুষকে চিন্তায় আগ্রহী ও অভ্যস্থ করেছেন সেটিই বরং আত্ম-উপলব্ধির সামর্থ্য বাড়িয়েছে। এটিই হলে প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তি তথা বুদ্ধির প্রয়োগ। ইসলামি পরিভাষায় এটিই হলো তাদাব্বুর, তাওয়াক্কুল ও তাফাক্কুর। অথচ বাংলাদেশে এটিরই মহা সংকট। দেশে মাদ্রাসা বাড়ছে, মসজিদও বাড়ছে। বাড়ছে নামাযীর সংখ্যাও। কিন্তু যা বাড়েনি বা বাড়ছে না -তা হলো বুদ্ধিবৃত্তি তথা বিবেককে কাজে লাগানোর সামর্থ্য। দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, ধর্ম-কর্ম বা ব্যবসাবাণিজ্য জুড়ে আজ যে বিবেকহীনতা -সেটিই প্রমান করে সমাজকে সভ্যতর করার কাজে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। চেতনার রাজ্যে যেভাবে আগাছা বাড়ছে তাতেই প্রমানিত হয়, জ্ঞানের বীজ সেখানে যথার্থভাবে ছিটানোই হয়নি। অথচ একাজের দায়িত্বটি বিশেষ কোন নেতা বা দলের নয়, প্রতিটি মুসলিমের। কারণ, আল্লাহতায়ালার কাছে তারাই এজন্য দায়বদ্ধ। ব্যর্থতার জবাব সবাইকে আলাদা ভাবে দিতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে এভাবে পিছিয়ে থাকলে সভ্যতর সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ যে অসম্ভব -সে হুশই বা ক’জনের? বরং তাতে ব্যর্থতাই দিন দিন নতুন গভীরতা পাবে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে তো সে ইতিহাসই নির্মিত হচ্ছে।  ১ম সংস্কণ ২৩/০২/২০০৭; ২য় সংস্করণ ২৮/১২/২০২০।

 




মিডিয়ার শক্তি ও গুরুত্ব

ফিরোজ মাহবুব কামাল

মিডিয়ার শক্তি

মানব জাতির ইতিহাসে বিস্ময়কর বিপ্লব এসেছে জ্ঞানের ভূবনে। বিগত মাত্র এক শত বছরে বিশ্বে যত বিজ্ঞানী জন্ম নিয়েছেন -তা মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসেও জন্মেনি। শুরু থেকে এ অবধি জন্ম নেয়া সকল বিজ্ঞানীদের অর্ধেকেরও বেশী সম্ভবতঃ এখনো জীবিত। হাভার্ড, ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড, লন্ডন, শিকাগো প্রভৃতি নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটিতে যতজন বিজ্ঞানী আজ কাজ করেন বা শিক্ষকতা করেন মানব ইতিহাসের বহুশতাব্দী কেটে গেছে ততজন বিজ্ঞানীর জন্ম না দিয়েই। তবে এ শতাব্দীর সর্বশেষ বিপ্লব হলো মিডিয়া বিপ্লব। মানব জাতির ইতিহাসে এটি এক অতি বিস্ময়কর বিপ্লব। জ্ঞানচর্চার সামর্থ্যের বলেই মানুষ মহান স্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্টি। মিডিয়া বিপ্লব সে জ্ঞানচর্চাকে শুধু বেগবানই করেনি, জ্ঞানের ভুবনকে বাড়িয়েছে অবিশ্বাস্যভাবে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের বদৌলতে বিশ্বের যে কোন প্রান্তে বসে যে কেউ অতি নগন্য মূল্যে নানা দেশের নানা ভাষার হাজার হাজার পত্রিকা পড়ার সুযোগ পাচেছ। বিশ্বের যে কোন প্রান্তর থেকে একজন ছাত্র সহজে ঢুকে পড়তে পারে আমেরিকান কংগ্রেস লাইব্রেরীতে। তন্ন তন্ন করে খুঁজতে পারে সেখানে রাখা তার পছন্দের বই বা জার্নালের পৃষ্টা।

ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবনে পরিবর্তনে জ্ঞান ইঞ্জিনের কাজ করে। জ্ঞানই মানব জীবনে মূল্য ও মর্যাদা বাড়ায়। দেয় শক্তি। অথচ অতীতে জ্ঞান কখনই এতটা সহজলভ্য ছিল না। জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে মানুষকে একসময় পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র-মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে হয়েছে। অথচ এখন জ্ঞানের সে অবিশ্বাস্য বিশাল ভুবন কম্পিউটারের কি বোর্ডে। যাদুকেও এটি হার মানায়। এ শক্তির বদৌলতে মিডিয়া পাল্টে দিচ্ছে জ্ঞানের ভূবন, চেতনার জগত, পাল্টে দিচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা, রুচিবোধ ও মূল্যবোধ। কারণ, সকল পরিবর্তনের শুরু হয় চেতনা থেকে। ব্যক্তি তার জীবনের যাত্রা পথে নির্দেশনা পায় এখান থেকেই। আর সে চেতনা রাজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য অজ আর কোন রাজার নয়, কোন প্রেসিডেন্ট বা প্রধান-মন্ত্রীরও নয়। বরং মিডিয়ার। ফলে মিডিয়া পাল্টে দিচ্ছে বিশ্বকে। মিডিয়ার শক্তি তাই অপরিসীম।

মিডিয়া হলো জাতীয় জীবনের আয়না। মানবের চেতনা অদৃশ্য; কিন্তু দৃশ্যময় হয় কথা, কর্ম, চিন্তা ও লেখনীর মাধ্যমে। মিডিয়া সেগুলোকেই জনসম্মুখে হাজির করে। মিডিয়ার কৃতিত্ব এখানেই। পত্রিকার পাতায়, রেডিওর আওয়াজে ও টিভির শব্দ ও ছবিতে ধরা পড়ে জীবন ও জগত নিয়ে একটি জাতির উপলব্ধি, ধ্যান-ধারনা ও রুচিবোধ। জাতির নীরব উপলব্ধিগুলো মিডিয়ার মধ্য দিয়ে সরব হয়। এখানে পরিচয় মেলে  ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কারে কার কি ভাবনা। ফলে ধরা পড়ে চিন্তার সুস্থ্যতার সাথে অসুস্থ্যতাও। অপর দিকে এটি জ্ঞান বিতরণের শক্তিশালী মাধ্যম। নবীজীর (সা) নির্দেশ হলো, দোলনা থেকে কবর পর্যন্তু জ্ঞান-লাভ করো। কিন্তু কোন বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ই জ্ঞান-বিজ্ঞান আজীবন শেখায় না। কিন্তু মিডিয়া সে সুযোগ দেয় জীবনের শেষ দিন অবধি। এ গুলো হলো পত্র-পত্রিকা, রেডিও, টিভি ও জার্নাল। পত্র-পত্রিকা ও জার্নালে লেখেন এবং রেডিও-টিভিতে কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু জাঁদরেল অধ্যাপকেরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত লেকচারের চেয়ে তাদের সে লেখনি ও বক্তব্য অধিক সমৃদ্ধ। ফলে ছাত্র না হয়েও তাদের সে জ্ঞানদান প্রক্রিয়া থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ করে দেয় মিডিয়া। উন্নত দেশগুলি আজীবন শিক্ষার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম তাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সেটি হলো মিডিয়া।

বাণিজ্যিক পণ্যের লেনদেন বা বেচাবিক্রি হয় যেমন হাটবাজারে, জ্ঞানের ফেরি হয় তেমনি মিডিয়ায়। হাটবাজার ছাড়া অর্থনীতি চলে না, তেমনি মিডিয়া ছাড়া একটি আধুনিক জাতির বুদ্ধিবৃত্তিও চলে না। তাই কোন জাতি কতটা চিন্তাশীল ও বিবেকবান -সে পরিচয় মেলে তাদের মিডিয়ার অঙ্গণ দেখে। মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, এমনকি বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত অবধি এটি সংযোগ বাড়ায়। এ সংযোগ যেমন খবরা-খবর ও ব্যক্তির জানাজানিতে, তেমনি চেতনার লেনদেনেও। আত্মীয়তার প্রতিষ্ঠায় পরস্পরে জানাজানিটা হলো প্রধানতম শর্ত। পরস্পরের মাঝে সম্পর্ক গড়ায় এটি সিমেন্টের কাজ করে। ভিন দেশের নেতা, আলেম বা আবিস্কারক প্রাচীন কালে অপর দেশে অপরিচিতই থেকে যেত। কিন্তু আজ মিডিয়ার বদৌলতে অন্য গোলার্ধেও কোটি কোটি মানুষের কাছে আত্মার আত্মীয়তে পরিণত হয়েছে। জাতীয় জীবনে উন্নয়ন, সংহতি ও সম্পৃতির সৃষ্টিতে এর চেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম নেই। মুসলিম বিশ্ব জুড়ে আজ যে বিভেদ ও বিচ্ছেদ -তার কারণ অনেক। তবে অন্যতম কারণ হলো দুর্বল মিডিয়া। দুর্বল মিডিয়ার কারণে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাঝে সিমেন্ট লাগানোর কাজটিই যথার্থভাবে হয়নি। সৃষ্টি হয়নি চিন্তার সংযোগ, সমতা ও একতা। এবং বাড়ছে না সৌহার্দ ও সংহতি। ফলে যে প্যান-ইসলামিক চেতনা ইসলামের অতি মৌলিক বিষয় -সেটিই গড়ে উঠেনি। 

 

কেন মিডিয়া

পশুর জীবনে খাদ্য ও পানীয়ের সংগ্রহ ছাড়া বাঁচবার মহত্তর লক্ষ নেই। পশুরা সমাজ গড়ে না, সভ্যতাও গড়ে না। তাদের মাঝে সিমেন্ট লাগানোর প্রয়োজন পড়ে না। তারা বাঁচে অন্য পশুর বা মানুষের পেট পূর্ণ করার প্রয়োজনে। ফলে পশুর জীবনে প্রচার বা মিডিয়ার প্রয়োজন নাই। অথচ মানুষ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে। শুধু নিজেকে নিয়ে নয়, অপরকে নিয়েও ভাবে। এবং যেটি ভাবে, সেটির প্রচার ও প্রতিষ্ঠাও চায়। মিডিয়ার জন্ম এ প্রেরনা থেকেই। বিভিন্ন প্রজাতির হয়েও পশুরা একই জগতের বাসিন্দা। কিন্তু মানুষের জগত ভিন্ন ভিন্ন। এ ভিন্নতা গড়ে উঠে ভিন্ন ভিন্ন চেতনা, রুচিবোধ, সংস্কৃতি ও বাঁচবার বিবিধ প্রেরণার ভিত্তিতে। তাই ভূগোলের পৃথিবী সবার এক হলেও মনের পৃথিবী সবার এক নয়। তবে সবাই চায় অন্যকে আপন চেতনা-রাজ্যের অধিবাসী করতে। আর এ থেকেই বাড়ে প্রচার। কারণ প্রচার ছাড়া কোন কিছুর প্রসার বাড়ে না। ফলে ভৌগলিক সীমানা বাড়াতে আজ যতটা যুদ্ধের উত্তাপ, তার চেয়ে অধিক উত্তাপ নিয়ে প্রচন্ডতর যুদ্ধ চলছে প্রচার জগতে। কারণ, সবাই চায় অন্যদেরকে নিজ নিজ চেতনা, দর্শন ও সাংস্কৃতিক রাজ্যের প্রজা বানাতে। ফলে শুরু হয়েছে আদর্শিক বা সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। আজ বিশ্ব জুড়ে এ যুদ্ধেরই প্রচন্ড আয়োজন। এ যুদ্ধে পরাজিতদের চেতনার রাজ্যই শুধু বিধ্বস্ত হচ্ছে না, ধ্বসে পড়ছে তাদের রাজনৈতিক ভূগোলও। চেতনার রাজ্যে এ পরাজয়ের কারণেই সোভিয়েত রাশিয়ার রাজনৈতিক ভূগোলকে খন্ডিত করতে শত্রুদেরকে একটি তীরও ছুঁড়তে হয়নি।

রাষ্ট্রের ভুগোলে ফাটল ধরে বস্তুত চেতনার ভূগোলে ফাটল ধরার কারণে। এজন্যই অতীতে বহু সাম্রাজ্য টিকেনি। অথচ মনের রাজ্যে অটুট ঐক্য সৃষ্টি হলে খন্ডিত ভুগোলও তখন একতাবদ্ধ হয়। উত্তর অ্যামিরকায় যে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে উঠেছে সেটি যতটা সামরিক শক্তিবলে, তার চেয়ে অধিক অভিন্ন মনজগতের কারণে। অভিন্ন মন ও মননের কারণেই সেখানে ইংরেজ, ফরাসী, স্পানীশ, ডাচ, জার্মান সবাই একই সংস্কৃতিতে একাকার হয়ে গেছে। এজন্যই দেশটিকে বলা হয় “মেল্টিং পট”। একই লক্ষপথে এগুচ্ছে ইউরোপ। তারা যে একতাবদ্ধ ইউরোপ তথা ইউনাইটেড স্টেটস অব ইউরোপের জন্ম দিবে সে সম্ভাবনা অনেক। একাজে মিডিয়ার ভূমিকা বিশাল। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলিমগণ এমনই একই “মেল্টিং পট”এর জন্ম দিয়েছিল। মিশরীয়. সিরীয়, লেবাননী, ইরাকী, বারবার, সূদানী, মুর, তুর্কী, কুর্দি ও অন্যান্য বহু জনগোষ্ঠী ভিন্ ষাভাভাষী ও ভিন্ সংস্কৃতির হওয়া সত্ত্বেও সবাই একাকার হয়ে এক উম্মতে ওয়াহেদার জন্ম দিয়েছিল। সেটি সম্ভব হয়েছিল পবিত্র কোর’আনের প্যান-ইসলামী দর্শনের  কারণে। সে লক্ষ্যে কাজ দিয়েছিল অভিন্ন ধর্মরাষ্ট্র ও ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা। মানুষ তখন কোর’আনী দর্শন ও শিক্ষা নিয়ে একই চেতনা, একই রুচি, একই মূল্যবোধ ও একই জীবনবোধ নিয়ে গড়ে উঠতো। ফলে গড়ে ঊঠতো রাজনৈতিক একতাও। শক্তিশালী মিডিয়ার কারণে সেরূপ একতা গড়ার কাজটিই এখন অভাবনীয় শক্তি পেয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি শিক্ষাকে ঘরে ঘরে নেয় না, অথচ সেটি নেয় প্রচার মাধ্যম। পৌঁছে দেয় শয়নকক্ষে। নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু শিক্ষিত-অশিক্ষিত -সবার সাথে গড়ে তোলে সরাসরি সংযোগ।

তবে সৃষ্টিশীল কাজের ন্যায় অনাসৃষ্টি ও ধ্বংসাত্মক কাজেও মিডিয়ার সামর্থ্য বিশাল। মানুষকে যারা বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করতে চায় তাদের হাতেও মিডিয়া যাদুকরী শক্তি তুলে দিয়েছে। অতীতে মিডিয়া হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হয়েছে জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী, স্বৈরাচারি ও বর্ণবাদী শক্তির হাতেও। এটি এতই শক্তিশালী যে এমন কি রাষ্ট্রীয় শক্তিকেও পরাজিত করতে পারে। শুধু  একটি দেশকে নয়, সমগ্র বিশ্বকে মিডিয়া “মেল্টিং পট”য়ে পরিণত করার সামর্থ্য রাখে। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ এ শক্তির বলেই সমগ্র বিশ্বকে একটি গ্লোবাল ভিলেজ এবং নিজেদের কালচারকে গ্লোবাল কালচারে পরিণত করার স্বপ্ন দেখছে।

 

মিডিয়ার সামর্থ্য ও মুসলিমদের ব্যর্থতা

মিডিয়া এখন আর শুধু জ্ঞান-বিতরণের মাধ্যম নয়, যুদ্ধের  হাতিয়ারও। এবং সেটি স্নায়ু যুদ্ধের। নিজেদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক এজেন্ডা পূরণে পাশ্চাত্যের শক্তিবর্গের হাতে এটি এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তারা বহু দেশের সরকার ও মানচিত্র পরিবর্তন করছে মিডিয়ার সাহায্যে। তাই শুধু অস্ত্রের জোরে দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক প্রতিরক্ষা দেয়া সম্ভব নয়, সে কাজে অপরিহার্য হলো শক্তিশালী মিডিয়া। এক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলির অবস্থা অতি বেহাল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মুসলিমদের নিজে ঘরের খবর, এমন কি যুদ্ধের খবর শুনতে হয় প্রতিপক্ষের মুখ থেকে। অথচ মুসলিমগণ মিডিয়া থেকে বিস্তর লাভবান হতে পারতো। বিশেষ করে ইসলামের প্রসারে। ইসলামের লক্ষ্য, সত্যের আলোয় বিশ্বকে আলোকিত করা। ইসলামকে কবুল করা বা না করার দায়ভার অমুসলিমদের। কিন্তু বিশ্বের কোনে কোনে পবিত্র কোর’আনের বাণী পৌঁছানোর দায়িত্ব তো প্রতিটি মুসলিমের। অন্যদের কাছে কোর’আনের বাণীকে পৌঁছে দেয়া ভিন্ন অধিক দায়িত্ব এমনকি নবীদেরও দেয়া হয়নি। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সবচেয়ে উত্তম কাজ হলো তাঁর বাণীকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং মানুষকে তাঁর দিকে ডাকা। সে পবিত্র বয়নাটি এসেছে সুরা ফুস্সিলাতের ৩৩ নম্বর আয়াতে। বলা হয়েছে, “তাঁর চেয়ে কথায় আর কে উত্তম যে মানুষকে ডাকে আল্লাহর দিকে ও নেক আমল করে এবং বলে নিশ্চয়ই আমি মুসলিম।”  নবীজী (সা:) বলেছেন, “সম্ভব হলে আমার একটি বাণীকে অন্যদের কাছে দাও।” নবীজী (সা:)’র উপর যার সামান্যতম ভালবাসা আছে সে কি তাঁর নির্দেশ অমান্য করতে পারে?

মুসলিম হওয়ার অর্থ তাই একটি মিশন নিয়ে বাঁচা, সেটি কোর’আনী জ্ঞান ও নবীজী (সা:)’র শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেয়ার মিশন। এক কালে মুসলিমগণ সে মিশন পূরণে পাহাড়-পর্বত ও বিজন মরুভূমি পাড়ি দিয়েছেন। মিডিয়া সে পবিত্র কাজটিকে সহজ করে দিয়েছে; সে মিশন নিয়ে বাঁচায় ঈমানদারের কাছে শক্তিশালী হাতিয়ার তুলে দিয়েছে। বয়সের ভারে বা শারীরিক অসুস্থ্যতার কারণে অনেকেই সসস্ত্র জিহাদে অংশ নিতে পারেন না। অথচ ইসলামকে বিজয়ী করার বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদটি চলতে পারে কবরে যাওয়ার পূর্বপর্যন্ত। এবং সেটি মিডিয়াকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে। তখন মুসলিম পরিণত হয় আমৃত্যু মুজাহিদে এবং মৃত্যু ঘটে মুজাহিদ রূপে।

 

পয়গম্বরদের কাজ

প্রতিটি মুসলিমই মহান আল্লাহপাকের খলিফা বা প্রতিনিধি। খেলাফতের দায়িত্ব হলো ইসলামকে সকল ধর্ম ও মতবাদের উপর বিজয়ী করা। কিন্তু প্রচার না দিয়ে কি প্রতিষ্ঠা সম্ভব? প্রচারের লক্ষ্যেই মহান আল্লাহতায়ালা ১ লাখ ২৪ হাজার মতান্তরে ২ লাখ ২৪ হাজার রাসূল পাঠিয়েছেন। রাসূল শব্দের অর্থ হলো প্রচারক। সে যুগে পত্র-পত্রিকা ছিল না। অন্য কোন প্রচার মাধ্যমও ছিল না। রাসূলগণ নিজেরাই ছিলেন বার্তাবাহী। লোকালয়ে ঘুরে ঘুরে একাজ নিজেরা করেছেন। হযরত ইব্রাহীম (আ:) সত্যের বাণী নিয়ে তাঁর জন্মস্থান ইরাক থেকে ফিলিস্তিন গেছেন, সেখান থেকে মিশর গেছেন। গেছেন মক্কায়; সেখান থেকে আবার ফিরে গেছেন ফিলিস্তিন। এভাবে সত্যের বাণী ফেরী করতে নানা জনপদে ঘুরেছেন। যারা জান্নাতের বিনিময়ে নিজেদের জানমাল বিক্রয় করে তাঁরা তাঁর এ মহান সূন্নত নিয়ে বাঁচবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? সে মহান সূন্নত নিয়ে কিছু মুজাহিদ বাংলায় এসেছিলেন বলেই তো বাংলার মানুষ মুসলিম হওয়ার সুযোগ পেয়েছ। নইলে মুর্তিপূজারী হয়ে নিশ্চিত জাহান্নামে পৌঁছতে হতে।

আরবী ভাষায় পত্রিকাকে বলা হয় রেসালাহ। রেসালাহর সে কাজই করতেন রাসূলগণ। তাই মেডিয়া কর্মীর কাজটি পয়গম্বরদের কাজ। সে কাজটি কোর’আনের সত্য বাণীকে মানুষের ঘরে সুন্দর ভাবে পৌঁছে দেয়ার। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা মুসলিমের সে কাজের পরিচয় দিয়েছেন এ ভাবে, “ইউছাদ্দেকু বিল হুসনা” অর্থ: তারা সত্যের পক্ষে সুন্দর রূপে সাক্ষ্য দেয়। মুসলিমদের কাজ তাই শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত আদায় নয়, বরং সত্যের বীজকে সর্বত্র ছিটিয়ে দেয়াটিও। পাথর, ঝোপঝাড় ও মরুভূমিতে বীজ পড়লে তা গজায় না। গজালেও বেড়ে উঠে না। তবে এটিও সত্য, বিশাল এ পৃথিবীর সবটুকু পাথর, ঝোপঝাড় বা মরুভূমি নয়। বহু উর্বর ভূমিও রয়েছে। নবীপাক (সা) মক্কা, মদিনা ও তায়েফসহ বহুস্থানে দ্বীনের বীজ ছিটিয়েছিলেন। সে বীজ সব চেয়ে বেশী ফলেছে মদিনাতে। তবে মক্কাতেও সে বীজ বৃথা যায়নি। বরং হযরত আবু বকর (রা), হযরত হামযা (রা), হযরত ওমর (রা), হযরত উসমান ও হযরত আলী(রা)’র ন্যায় নবীজী (সা:)’র মহান সাহবাগণ বেড়ে উঠেছিলেন তো মক্কাতেই।

বিশ্বে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটি। বিশ্বে আজ যত আলেম, হাফেজ. মোফাচ্ছেরে কোরআন আছেন -তাদের সংখ্যাই নবীজী (সা:)’র সাহাবাদের সংখ্যার চেয়ে হাজার গুণ অধিক। অথচ তারাই বা দ্বীনের বীজ অমুসলিমদের মাঝে কতটা রোপন করেছেন? কোর’আনের জ্ঞানকে ছড়িয়ে কাজে কত জন মিডিয়াকে ব্যবহার করছে? বরং তাদের সকল ব্যস্ততা নিঃশেষ হচ্ছে মসজিদ-মাদ্রসার চার দেয়ালের মাঝে। তাদের চিন্তা-ভাবনায় গুরুত্ব পাচ্ছে শুধু মুসলিমদের মাঝে ইসলাম চর্চা নিয়ে। যেন অমুসলিমদের কাছে কোর’আনের বার্তা পৌঁছাটি তাদের কোন দায়িত্বই নয়। অথচ এটি নবীজী (সা:)’র সূন্নত বিরোধী। রোম, ইথিওপিয়া, পারস্যসহ বহু অমুসলিম দেশের রাজাদের কাছে নবীকরীম (সাঃ) যখন ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন তখন আরবের অধিকাংশ জনগণই ছিল অমুসলিম। এমন কি অমুসলিম ছিল তাঁর নিজ পরিবারের অনেকেই। কিন্তু নিজ জন্মভূমিতে তিনি যে বাঁধা পেয়েছেন -তা তাঁকে অন্যদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

 

অধিকৃত মিডিয়া: হাতিয়ার অসভ্যতার

ইসলামের  পক্ষের শক্তিবর্গ আজ যেমন রাষ্ট্র পরিচালনার মূল আসন থেকে অপসারিত, তেমনি দূরে সরেছে আছে মিডিয়া থেকেও। শক্তিশালী এ মাধ্যমটি আজ বস্তুবাদী, ভোগবাদী, পুঁজিবাদী ও যৌনবাদীদের হাতে অধিকৃত। ফলে বিভ্যান্তি, ব্যর্থতা ও দুর্বৃত্তায়ন বেড়েছে শুধু রাজনৈতিক ময়দানেই নয়, বরং বুদ্ধবৃত্তিক ময়দানেও। মিডিয়া পরিণত হয়েছে অসভ্যতার হাতিয়ারে। ইসলামের বিপক্ষ শক্তি ইসলামের সত্য ও সুন্দর রূপটিকে অসুন্দর, মিথ্যা ও সেকেলে বলে। ইসলামপন্থিদের গায়ে মৌলবাদ ও সন্ত্রাসের লেবেলে লাগিয়ে শুধু গালিগালাজই করে করে না, তাদের নির্মুলেও লাগে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা এদের সম্মন্ধেই বলেছেন, ”ইউকাজ্জেবু বিল হুসনা।” অর্থ: “সুন্দরকে এরা মিথ্যা বলে।” অথচ এরাই আকর্ষণীয় করে পেশ করে অসত্য, অসুন্দর ও অসভ্যতাকে। ফলে যে নগ্নতা ও অশ্লিলতা এক সময় নিষিদ্ধপল্লীর সামগ্রী ছিল, মিডিয়ার বদলে সেগুলো আজ ঘরে ঘরে ফেরী হচ্ছে। শয়তানের যে মুখগুলো নোংরা গলিতে দাঁড়িয়ে অসুন্দর ও পাপাচারে হাতছানি দিত তা এখন টিভির পর্দায় সাধারণ মানুষের শয়ন কক্ষেও সোচ্চার। মহান আল্লাহতায়ালার প্রেরিত পয়গম্বরদের বিরুদ্ধে আবু জেহেল-আবু লাহাবেরা বা ফেরাউন-নমরুদেরা যে কথা গুলো বলতো, আজকের পত্র-পত্রিকা বা রেডিও-টিভিতে সে কথা গুলোই প্রচার রংচং লাগিয়ে প্রচার করছে। সেকালের আদিম অসত্য ও অসভ্য কথাগুলো তাদের হাতে আধুনিকতা পেয়েছে। নগ্নতা ও যৌনতার ন্যায় অশ্লিল বিষয়গুলোও শিল্পরূপে প্রশংসিত হচ্ছে।

মিডিয়া জগতে আজ যেরূপ মিথ্যার একচ্ছত্র আধিপত্য তার জন্য ইসলামের পক্ষের শক্তিও কম দায়ী নয়। তারা শক্তিশালী এ মাধ্যমটির গুরুত্বই অনুধাবন করেনি। এর গুরত্বটি তো তারাই বুঝবে -যারা অন্যকে কিছু শোনাতে বা বোঝাতে চান। ভাবটা এমন, যে পথে চলার ইচ্ছাই যার নাই -সে পথের খোঁজ নেয়া কেন? মুসলিমদের কাছে দাওয়াতের মত ফরজ কাজটি গুরুত্ব না পাওয়াতেই গুরুত্ব হারিয়েছে মিডিয়াও। দ্বীনের প্রচার গুরত্ব পেলে মিডিয়াও গুরুত্ব পেত। কারণ, মিডিয়াতো প্রচারেরই হাতিয়ার। ইতিহাসে বহু জাতির ভাষা পাল্টে গেছে, ছাপাখানা আবিস্কৃত হয়েছে, নানারূপ প্রচারযন্ত্র গড়ে উঠেছে এবং কোটি কোটি বই ছাপা হয়েছে খৃষ্টান ধর্ম-প্রচারকদের উদ্যোগে। অথচ মুসলিমগণ সে কাজে তেমন নামেনি। মিডিয়া ক্ষেত্রে এরূপ ব্যর্থতার কারণেই মুসলিমগণ অন্যদের কাছে দূরে থাক, নিজ সন্তানদের কাছেও ইসলামের সত্য ও সুন্দর কথাগুলো পৌঁছাতে পারছে না। এ ব্যর্থতার কারণেই তারা ভাসছে অন্যদের সৃষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক প্লাবনে।

অথচ বহু লক্ষ মানুষের পক্ষে বহু বছরে যা সম্ভব নয়, তার চেয়েও অধিক প্রচার সম্ভব অতি অল্প সময়ে মিডিয়ার বদৌলতে। ছাত্র-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, আদালতের বিচারক, সেনাবাহিনীর অফিসার, সরকারি আমলাসহ সকল প্রকারের মানুষের কাছে তখন পৌঁছে যেত দ্বীনের দাওয়াত। এভাবে পৌঁছে যেত  রাষ্ট্রের উন্নয়নে ইসলামি চেতনাসমৃদ্ধ গঠনমূলক চিন্তাগুলিও। মিডিয়ার সৃষ্টিশীল ও শক্তিশালী ভূমিকা তো এ কারণেই। মানুষের কানে কানে ও চেতনা রাজ্যে মিডিয়া যত সহজে কোন দর্শন বা ধ্যান-ধারনাকে পৌঁছাতে পারে তা অন্যভাবে সম্ভব নয়। নবীজীর (সা) যুগে মিডিয়া না থাকাতে নবীপাক তার বাণীকে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে প্রচার করতে পারেননি। তিনি ও তাঁর মহান সাহাবাগণ মিডিয়ার অভাব পালন করেছেন পায়ে হেঁটে হেঁটে।

মহান আল্লাহতায়ালার বাণীকে অন্যদের কাছে ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজটিকে সেকালে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হত যে  সাহাবায়ে কেরাম সেগুলোকে যেমন মুখস্থ্য করতেন, তেমনি কাষ্টফলক, হাড্ডি খন্ড, পাথরের ফালি ইত্যাদির উপর লিখেও রাখতেন। পরিতাপের বিষয়, সে সাথে বিস্ময়ের বিষয় হলো, নবীজী (সা:) তাঁর নবুয়তের জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি প্রচারের যে কাজটি নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে করে গেলেন -মুসলিমদের কাছে সেটি আজ গুরুত্ব পাচ্ছে না। মসজিদের মাঝে তাসবিহ-তাহলিল নফল ইবাদত যতটা গুরত্ব পেয়েছে, দাওয়াতের ন্যায় ফরজ কাজ ততটা পায়নি। ফলে গুরুত্ব পাায়নি নিজেদের এবং সে সাথে অন্যদের ইসলামের আলোকে আলোকিত করার কাজও। অথচ পবিত্র  কোর’আনের বাণীকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানোর কাজে একমাত্র তারাই হলো মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা ও আনসার। সে দায়িত্বটি প্রতিটি মুসলিমের। বিচার দিনে এ কাজের জবাবদেহীতা প্রতিটি মুসলিমকে আলাদা ভাবে দিতে হবে। কিন্তু তাঁরা যদি সে দায়িত্ব পালন না করে -তবে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের বিপথগামী হওয়ার দায়ভাব কারা বইবে?

 

 সামনে মহাসুযোগ

বিজ্ঞানের অগ্রগতি মুসলিমদের সামনে বিশাল এক সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে। অন্যান্য ধর্ম ও মতবাদগুলোর ব্যর্থতা আজ আর গোপন কিছু নয়। তাদের ব্যর্থতার পাশাপাশি বিরাজ করছে ইসলাম প্রচারের স্বাধীনতা। নবীজী (সা:) তাঁর জীবদ্দশাতে এতো সুয়োগ পাননি। দ্বীনের ঝান্ডা নিয়ে তাঁকে প্রতি কদম যুদ্ধ করে সামনে এগোতে হয়েছে। অন্ততঃ প্রচার ক্ষেত্রে এখন সে বাধা এখন নেই। ইসলামের শক্তির উৎস হলো পবিত্র কোর’আন। মুসলিমগণ আজ নানা কদর্যতায় আছন্ন হলেও মহান আল্লাহতায়ালার এ পবিত্র গ্রন্থ্যটি এখনও অবিকৃত। মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য তাদের বিশাল তেল বা গ্যাস ভান্ডার বা জনশক্তি নয়, সেটি এই কোর’আন। সমগ্র মানব জাতির জন্যও এটিই সবচেয়ে বড় নেয়ামত। কিন্তু বিশ্ববাসীর বড়ই দুর্ভাগ্য, মহান আল্লাহতায়ালার এ পবিত্র গ্রন্থ্যটির সাথেই তাদের পরিচয় ঘটেনি। শুধু তাই নয়, এমন কি যথার্থ ভাবে পরিচয় ঘটেনি অধিকাংশ মুসলিমের সাথেও। পরিচয় করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব যাদের ছিল তারা নিজেরাই আজ অজ্ঞতার শিকার।

বিজ্ঞানের বদৌলতে বিশ্ববাসীর সামনে সুযোগ এসেছে মহান আল্লাহতায়ালার এ পবিত্র গ্রন্থ্যটি নিয়ে গভীর অধ্যয়ণ ও গবেষনার। তবে মুসলিমদের দায়িত্ব শুধু কোর’অআন থেকে শিক্ষা নেয়া নয়, বরং সবার জন্য কোর’আনকে সহজলভ্য করা। এবং সে সাথে বিশ্ব-অবলোকন ও ঘটনার বিশ্লেষণে ইসলামের নিজস্ব মানদন্ড ও মূল্যবোধকে খাড়া করা। শয়তানি শক্তির মিথ্যাচার ও মূল্যবোধ একমাত্র এভাবেই দূর হতে পারে। আর এ কাজটি অতি সহজে ও কম মেহনতে সম্ভব পত্র-পত্রিকা, টিভি-রেডিও ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তখন বিশ্ববাসীর সংযোগ বাড়বে মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত কোরআনী জ্ঞানের সাথে। আর অজ্ঞতার আঁধার অপসারণে কোরআনী জ্ঞানের ক্ষমতা তো বিস্ময়কর। সূর্যের আলো যেমন মুহুর্তের মধ্যে আঁধারমূক্ত করে, কোরআনের আলোও তেমনি আঁধার সরাতে পারে কোটি কোটি মানুষের জীবন থেকে। আলোকিত সে ব্যক্তির জীবনে তখন পরিবর্তন আসে তাঁর চেতনায়, চরিত্রে ও কর্মে। তখন নির্মিত হয় উচ্চতর মূল্যবোধের সংস্কৃতি ও সভ্যতা। ইসলামের প্রচার, প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে এভাবেই এক অভাবনীয় বিপ্লব আসতে পারে। আজও পাশ্চাত্যে প্রতিদিন যারা মুসলিম হচ্ছে তারা হচ্ছে ইসলামের সে অবিকৃত সত্য রূপকে দেখে। মুসলিমদের দায়িত্ব, সত্যের সে আলোকে আরো ব্যাপকতর ও বলিষ্ঠতর করা। মিডিয়া এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ বাহন হতে পারে। ফলে অন্যদের কাছে মিডিয়ার গুরুত্ব যেখানে রাজনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক, মুসলমানের কাছে সেটি পবিত্র ইবাদত। ২৮/১২/২০২০।

 




অধঃপতিত উম্মাহ: উত্থানের কাজটি শুরু করতে হবে কোত্থেকে?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

উত্থানে যে সূন্নত মহান আল্লাহতায়ালার  

মুসলিম উম্মাহর পতনযাত্রা বহু শত বছর পূর্বে শুরু হলেও এখনও তা থামেনি। বরং দিন দিন আরো তীব্রতর হচ্ছে। বাড়ছে বিভ্ক্তি ও ইসলাম থেকে দূরে সরা। আজ যে ইসলাম নিয়ে মুসলিমদের বসবাস -তা নবীজী (সা:)’র ইসলাম নয়। এটি তাদের নিজেদের মনগড়া। নবীজী (সা)’র ইসলামে ইসলামী রাষ্ট্র ছিল, শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ছিল, খেলাফা ছিল, ভাষা-বর্ণের উর্দ্ধে উঠে একতা ছিল এবং প্রতিটি মুসলিমে জীবনে ইসলামকে বিজয়ী করার জিহাদ ছিল। কিন্তু আজ তার কোনটাই নাই। ইসলাম ছাড়াই তারা মুসলিম! নবীজী (সা:)’র প্রতিষ্ঠিত ইসলাম খোদ মুসলিম দেশেই বিদেশী গণ্য হয়। যারা পতনমুখী এ জাতির উত্থান নিয়ে চিন্তিত, তাদের কাছে প্রশ্ন হলো উত্থানের কাজ শুরু করতে হবে কোত্থেকে? সেটি কি বাড়ী-ঘর, কৃষি, শিল্প ও রাস্তাঘাটে বিপ্লব এনে? এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নতই হলো শ্রেষ্ঠ নির্দেশনা। তিনি যেখান থেকে শুরু করেছিলেন মুসলিমদেরও আজ সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। হযরত আদম (আ:)কে সৃষ্টির পর সর্বপ্রথম তিনি তাঁকে যা দিয়েছিলেন -তা হলো শিক্ষা। সে শিক্ষার গুণেই তিনি ফেরেশতাদের সেজদা পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন। পবিত্র কোর’আন পাকে মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার যেটি প্রথম নির্দেশ, সেটিও নামায-রোজা-হজ্ব-যাকাত বা জিহাদের নয়। সেটি “ইকরা” তথা “পড়” অর্থাৎ জ্ঞানবান হওয়ার।

অন্ধকার রাতের পৃথিবীকে যেমন আচ্ছন্ন করে, অজ্ঞতা তেমনি আচ্ছন্ন করে মনের ভুবনকে। জ্ঞান দেয় মনের আলো। আর অজ্ঞতা হলো মনের অন্ধকার। সে বিশুদ্ধ জ্ঞানটি হলো পবিত্র কোর’আনের জ্ঞান। ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য, শ্লিল-অশ্লিল ও পাপপংকিলতা চিনতে দিনের আলো কাজ দেয় না। এ জন্য চাই মনের আলো তথা কোর’আনী জ্ঞান। সে জ্ঞানের অজ্ঞতা তাই মানব জীবনে সবচেয়ে বড় পঙ্গুত্ব দেয়। সে পঙ্গু মানুষটি তখন সহজ শিকারে পরিণত হয় শয়তানের হাতেও। দেহের পঙ্গুত্ব জাহান্নামে নেয় না, কিন্তু মনের পঙ্গুত্ব নেয়। তাই মানব কল্যাণে সবচেয়ে বড় নেক কর্মটি মনের সে পঙ্গুত্ব তথা অজ্ঞতা দূর করা। যারা সে অজ্ঞতা হটায় তাদেরকে নবীজী (সা:) শ্রেষ্ঠ মানব বলেছেন।

পবিত্র কোর’আন পাকে বর্ণীত হয়েছে, আল্লাহপাক ঈমানদারদের বন্ধু। পরম বন্ধু রূপে ঈমানদারদের প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ দানটি পানাহার, সন্তান ও সম্পদ নয়। সেগুলি তিনি কাফেরদেরও দেন। সর্বশ্রেষ্ঠ সে দানটি হলো, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যান। অর্থাৎ জান্নাতের পথ তথা সিরাতুল মুস্তাকীম দেখান। আর যারা বেঈমান -তাদের বন্ধু হলো শয়তান। শয়তানের কাজ তো ক্ষতিসাধন। এবং শয়তানের পক্ষ থেকে সবচেয়ে নাশকতামুলক কর্মটি হলো, সে আলো থেকে অন্ধকারে নেয়। এ ভাবেই মানুষকে জাহান্নামে নেয়। তাই যে ব্যক্তি মহান আল্লাহতায়ালা থেকে জ্ঞান-সমৃদ্ধ আলোকীত মন পেল -সেই এ জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কারটি পেল। একমাত্র এ পুরস্কারই জান্নাতের পুরস্কার আনে।  আলোকীত মনের কারণেই অন্যায়, অসত্য ও অসুন্দর থেকে ন্যায়, সত্য ও সুন্দরকে যে ভাবে মরুর নিরক্ষর মুসলিমগণ আজ থেকে ১৪ শত বছর পূর্বে সনাক্ত করতে পেরেছিলেন। অথচ আজ সেটি পারছে না পাশ্চাত্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরগনও। সেটিই পাশ্চাত্য সভ্যতার সবচেয়ে বড় পঙ্গুত্ব; বিস্ময়কর যান্ত্রিক উন্নয়নেও মনের এ পঙ্গুত্ব ঘুঁচছে না। এ নৈতিক পঙ্গুত্বের কারণেই পাশ্চাত্য দেশে ব্যাভিচার, ফ্রি-সেক্স, হোমোসেক্সুয়ালিটি, মদপানের ন্যায় আদিম পাপাচারও আজ পাপাচার রূপে গণ্য হচ্ছে না। বরং সে পাপ গণ্য হচ্ছে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সভ্য আচার রূপে। ১৪ শত বছর পূর্বে ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফা যেখানে ভৃত্যকে উঠের পিঠে চড়িয়ে উঠের রশি নিজে টেনেছেন, প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন মানব মাঝে সমতা। তথচ পাশ্চাত্যে মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কিছু দিন আগেও তারা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের গলায় রশি বেধে গবাদী পশুর ন্যায় হাটে তুলেছে। বর্ণগত প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা দিতে এথনিক ক্লিনজিংয়ে নেমেছে রেড-ইন্ডিয়ানদের  বিরুদ্ধে।

 

প্রথম ফরজ বিধানটি জ্ঞানার্জন

জ্ঞানার্জন প্রতিটি নর-নারীর উপর ফরজ। মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূল (সা:)’র উপর বিশ্বাস স্থাপনের পর এটিই হলো ইসলামের প্রথম ফরজ। অন্যান্য ফরজ বিধানগুলো এসেছে তার পর। তাছাড়া জ্ঞানার্জনের ফরজ পালন ছাড়া অন্য ফরজগুলি পালন কি সম্ভব? ইসলাম খৃষ্টান ধর্ম, হিন্দু ধর্ম বা অন্য কোন ধর্মের ন্যায় নয় যে গীর্জার যাযক বা মন্দিরের ঠাকুরকে দিয়ে উপাসনা করিয়ে নেয়া যায়। ইসলামে ইবাদতের দায়িত্ব প্রতিটি ব্যক্তির, কাউকে দিয়ে এ দায়িত্ব পালিত হওয়ার নয়। তাই ইসলামের খলিফাকেও প্রজার ন্যায় একই ভাবে নামাজ-রোযা, হজ্ব ও অন্যান্য ইবাদত করতে হয়েছে। তেমনি জিহাদের ময়দানে শুধু সৈনিকদেরই নয়, খলিফাকেও হাজির হতে হয়েছে। আর ইবাদতে তো চাই জ্ঞান-সমৃদ্ধ মনের সংযোগ; ইবাদতের সামর্থ্য অর্জনে জ্ঞানার্জন তাই জরূরী।

জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য শুধু পড়া, লেখা বা হিসাব নিকাশের সামর্থ্য বৃদ্ধি নয়, বরং মনের অন্ধকার দূর করা। ব্যক্তির দেখবার ও ভাববার সামর্থ্যে বিপ্লব আনা। মনের অন্ধকার নিয়ে মহান আল্লাহর কুদরতকে দেখা যায় না, দেখা যায় না তাঁর মহান সৃষ্টিরহস্যও। জাহেল ব্যক্তি এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালার অসীম সৃষ্টি জগতের মাঝে বসেও তাঁর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। জ্ঞানার্জন ইসলামে নিজেই কোন লক্ষ্য নয়, বরং লক্ষ্যে পৌঁছবার মাধ্যম মাত্র। লক্ষ্যটি হলো, মহান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন। এবং এটিই মুমিন ব্যক্তির জীবন-লক্ষ্য। গাড়ীর চালক যেমন যাত্রা শুরুর আগে রোগম্যাপটি জেনে নেয়, মহান আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছবার জন্য মুসলিমকেও তেমনি সঠিক রোড-ম্যাপটি জেনে নিতে চায়। আর সে রোড-ম্যাপের সঠিক জ্ঞানলাভই হলো মুসলিম জীবনে জ্ঞানার্জনের মূল লক্ষ্য। রোড-ম্যাপের এ প্রাথমিক জ্ঞানলাভটুকু সঠিক না হলে জীবনে বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি অনিবার্য হয়ে উঠে। বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে বিপুল বিপ্লব এসেছে; কিন্তু এরপরও অসংখ্য মানব যে আজ সীমাহীন বিভ্রান্তির শিকার -তার কারণ তো রোড ম্যাপ নিয়ে অজ্ঞতা।

ইসলামে জ্ঞানের অর্থ এ নয়, তাতে উপার্জনের সামর্থ বাড়বে বা কলাকৌশলে দক্ষতা বাড়বে। জ্ঞানের মোদ্দা কথা, তাতে সৃষ্টি হতে হবে মহান আল্লাহতায়ালার ভয়। যে জ্ঞান মহান আল্লাহতায়ালাকে চিনতে সাহার্য্য করলো না এবং মনে আল্লাহতায়ালার ভয়ও সৃষ্টি করলো না -সে জ্ঞান ঈমানদারের কাঙ্খিত সে  জ্ঞান নয়। এটি কারিগরী দক্ষতা, ট্রেড স্কিল বা তথ্য ও তত্ত্বজ্ঞান হতে পারে; বাঁচার আয়োজনে সে জ্ঞান সমৃদ্ধিও আনে। তবে এ জ্ঞান ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচায় না; জান্নাতেও নেয় না। ফলে সেটি যথার্থ জ্ঞান বা ইলম নয়। প্রকৃত কল্যাণকর জ্ঞান তো তাই -যা দুনিয়াতে যেমন কল্যাণ দেয়, তেমনি কল্যাণ দেয় অনন্ত-অসীম পরকালেও। অনেক পশুপাখিরও বিস্ময়কর দক্ষতা থাকে যা মানুষেরও নেই। কুকুর যেভাবে লুকানো মাদক দ্রব্য বা অপরাধীকে সনাক্ত করে -তা মানুষ বা মানুষের তৈরী আধুনিক যন্ত্রের নাই। কিন্তু এর জন্য পশুপাখিকে জ্ঞানী বলা হয় না।

মহান আল্লাহতায়ালা কোর’আন মজিদে বলেছেন, “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা।” অর্থ: “একমাত্র জ্ঞানীরাই আমাকে ভয় করে।” এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, জ্ঞান বলতে মহাজ্ঞানী রাব্বুল আলামীন কি বুঝাতে চান। জ্ঞানের মাপকাঠি তিনি বেঁধে দিয়েছেন। যার মধ্যে মহান আল্লাহতায়ালার ভয় নেই তার মধ্যে ইলমও নেই। পবিত্র কোরআন মজীদের অন্যত্র তিনি বলেছেন, “নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্ঠি ও রাত-দিনের ঘুর্ণায়নের মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে নিদর্শন।” অর্থাৎ মহান আল্লাহতায়ালা সৃষ্ট বিশাল গ্রন্থ হলো বিশ্ব-চরাচর, এ গ্রন্থের প্রতিটি ছত্রে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য আয়াত তথা নিদর্শন। জ্ঞানী তো তারাই যারা স্রষ্টার সে বিশাল গ্রন্থটি পাঠের সামর্থ্য রাখে। নানা ভাষার গ্রন্থ্য পাঠের যাদের সামর্থ্য রয়েছে অথচ স্রষ্টার এ গ্রন্থ্য পাঠে যোগত্য নেই -তাদেরকে আর যাই হোক জ্ঞানী বলা যায় না। জ্ঞানী তো তিনিই যার পুস্তক পাঠের সামর্থ্য না থাকলেও সামর্থ্য আছে বিশ্বচরাচরে ছড়ানো ছিটানো আল্লাহতায়ালার নিদর্শনগুলো পাঠের। সে সামর্থ্যটি হলো কোর’আনের  ভাষায় “বাছিরা” তথা অন্তরের দৃষ্টি। শিক্ষকের কাজ ছাত্রের অন্তরের সে দৃষ্টিকে শানিত করা। নবীজী (সা:) তাঁর সাহাবাদের অংক বা বিজ্ঞান শেখানি, বরং গভীর সমৃদ্ধি এনেছেন তাদের অন্তরের দৃষ্টিতে। অন্তরের দৃষ্টি না থাকলে সিরাতুল মুস্তাকীমে চলাকালে মহান আল্লাহতায়ালার আয়াতগুলো বিশ্বচরাচরের নানা প্রান্ত থেকে যে জ্ঞান দান করে -তা থেকে শিক্ষা নিতে সে ব্যর্থ হয়। মুসলিমগণ ইসলামের প্রাথমিক যুগে অবিস্মরণীয় জ্ঞানী হয়েছিলেন তো সে সামর্থ্য থাকার কারণেই।

 

 পতন যে কারণে অনিবার্য

পবিত্র কোর’আন পাকে বলা হয়েছে, জ্ঞানী আর অজ্ঞ ব্যক্তি কখনই এক নয়। -(সুরা যুমার, আয়াত ৯)। অন্যত্র বলা হয়েছে, “আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যান চান, তাঁর জ্ঞান বৃদ্ধি করে দেন। -(সুরা মুযাদিলা, আয়াত ১১)। অর্থাৎ মানুষের জন্য জ্ঞানের চেয়ে কল্যানকর কিছু নাই। তাই নিছক সম্পদের অন্বেষণে জীবনের সামর্থ্য বিনিয়োগে প্রকৃত কল্যাণ নাই, সম্পদের লোভ পশুর চেয়েও নীচুতে পৌঁছে দেয়। পশুর বাঁচাবার মূল প্রেরণাটি আহার সংগ্রহ হলেও -তার একটা সীমা থাকে। পেট পূর্ণ হলে সে আর তালাশ করে না। কিন্তু মানুষ সম্পদের পাহাড়ে বসেও আরো চায়। সে বিরামহীন চেষ্টা চলে কবরে যাওয়ার পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত। কোর’আনের জ্ঞান এক্ষেত্রে ব্যক্তির জীবনে ব্রেকের কাজ করে। মহান আল্লাহতায়ালা চান, ব্যক্তির জীবনে সে জ্ঞানে লাগাতর বৃদ্ধি ঘটুক। সে জ্ঞান যেহেতু তাঁর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত, অনুগত বান্দাদের শিখিয়েছেন কি ভাবে সে জ্ঞানের বৃদ্ধিতে  তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে হয়। সে দোয়াটি হলো: “হে রব! আমার জ্ঞানে বৃদ্ধি করে দাও।” (সুরা ত্বা হা, আয়াত ১১৪)। জ্ঞান থাকাটাই বড় কথা নয়, বরং সে জ্ঞানে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি হওয়া চাই। তাই উত্তরোত্তর জ্ঞান বৃদ্ধিকে এ দোয়ায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

জাতিকে বিজয়ী জাতি হিসাবে টিকে থাকার জন্য অবিরাম শিক্ষা শুধু জরুরি নয়, অপরিহার্যও। জ্ঞানের বৃদ্ধি যে দিন থেমে যায়, সেদিন থেকে পচন শুরু হয় ব্যক্তির মন ও মননে। যেমন খাদ্য গ্রহণ বন্ধ হলে ব্যক্তির জীবনে অনিবার্য হয় মৃত্যু। নবীপাক (সাঃ) এই জন্যই বলেছেন, “ধ্বংস সেই ব্যক্তির জন্য যার জীবনে একটি দিন অতিবাহিত হলো অথচ তার ইলমে বৃদ্ধিই ঘটলো না।” নবীজী (সাঃ) আরো বলেছেন, কবর থেকে দোলনা পর্যন্ত জ্ঞান লাভ করো। অর্থাৎ দেহে যতদিন প্রাণ আছে, ততদিনই জ্ঞান-অর্জন লাগাতর লেগে থাকতে হবে। ইসলাম তার প্রারম্ভ থেকেই নিরবিছিন্ন জ্ঞানলাভে যে কতটা গুরুত্ব দিয়েছে এ হলো তারই প্রমাণ। ইসলামে বিদ্যার্জন শুধু পরীক্ষায় পাশ বা সার্টিফিকেট লাভের জন্য নয়, বরং আল্লাহতায়ালাকে খুশী করা বা তাঁর দরবারে নিজের মর্যাদাকে বাড়ানোর একটি মোক্ষম হাতিয়ার। তাই মুসলিমের জন্য শিক্ষালাভ এ জন্যই স্বল্পকালীন বিষয় নয়, এটি এক আমৃত্যু প্রচেষ্টা।

যা করলে মহান আল্লাহতায়ালা খুশী হন, ইসলামে সেটিই ইবাদত। তাছাড়া জ্ঞানদান মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব শ্রেষ্ঠ সূন্নত। সে সূন্নতের ধারাকে তিনি সমুন্নত রেখেছেন পবিত্র কোর’আন নাযিল করে। তাই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে যারা প্রিয় হতে চায় তাদেরকে জ্ঞানবান হয়। তিনি চান মানব তাঁর অস্তিত্ব ও সর্বময় কুদরতের পক্ষে বিশ্ববাসীর সামনে সাক্ষ্য দিক। সে সাক্ষ্য মুর্খের বদলে কোন জ্ঞানবান ব্যক্তির পক্ষ থেকে পেশ করা হলে তার মূল্য অধিক হয়। এতে জনগণের মাঝে তাঁর দ্বীনের বিজয় বাড়ে। জ্ঞানীর কলমের কালীকে শহীদের রক্তের চেয়েও অধিক মর্যাদা দেয়া হয়েছে তো এ কারণেই। শহীদ রক্ত দেয় রণাঙ্গণে, তাতে জিহাদে মুসলিম বাহিনীর বিজয় আসে। আর জ্ঞানীর কলম জিহাদ করে মানুষের চেতনায় ভূমিতে। তখন ইসলাম বিজয়ী হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মন ও মনন জুড়ে।  

 

ইসলামের বিপ্লব মূলত জ্ঞান ও আমলের  বিপ্লব

ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা বিদ্যাশিক্ষাকে প্রতিটি নর-নারীর বাধ্যতামূলক করেছিল। ইসলামের বিপ্লব মূলত জ্ঞানের বিপ্লব তথা হৃদয়লোকের বিপ্লব। সে সাথে আমলের বিপ্লবও। ঈমানদার তাঁর সকল মহৎ কাজে উৎসাহ পায় ধর্মীয় বিধান থেকে, প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণও তেমনি প্রবল উৎসাহ পেয়েছিল ইসলামের জ্ঞানার্জনের ফরজ বিধান থেকে। ফলে ইসলামের প্রাথমিক যুগে মাত্র কয়েক দশকে জ্ঞানবিজ্ঞানে অভূতপূর্ব বিপ্লব এসেছিল। যে আরবী ভাষায় কোরআনের পূর্বে কোন গ্রন্থ ছিল না, সে আরবী ভাষায় জ্ঞানের এক এক বিশাল ভান্ডার গড়ে উঠে। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেছেন, একমাত্র দুই ব্যক্তিকে নিয়ে হিংসা করা যায়। প্রথমতঃ সে ব্যক্তি যাকে আল্লাহপাক প্রচুর সম্পদ দান করেছেন এবং সে তা থেকে প্রচুর দান খয়রাত করে। দ্বিতীয়তঃ সে ব্যক্তি যাকে আল্লাহপাক জ্ঞান দান করেছেন এবং তিনি জ্ঞানের আলোকে জীবন পরিচালনা করেন এবং তা অন্যদের শেখান। -(সহিহ বুখারী ও মুসলীম)।

হাদীস পাাকে আরো এসেছে, “যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে পথে বের হন, আল্লাহতায়ালা তাঁর জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” -(সহীহ মুসলিম)।  তিরমিযী শরিফের হাদীসে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে ঘর থেকে বের হয়, সে ব্যক্তি ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অবস্থান করে। আরো বলা হয়েছে, জ্ঞানীর ঘুম একজন অজ্ঞ ইবাদতকারীর ইবাদতের চেয়েও উত্তম। যিনি ইলম শিক্ষা দেন তাঁর জন্য মহান আল্লাহতায়ালা রহমত নাযিল করেন। ফেরেশতাকুল, জমিন ও আসমানের বাসিন্দা, এমনকি পিপিলিকা এবং মাছও তাদের জন্য দোয়া করতে থাকে। -(তিরমিযী শরিফ)। প্রশ্ন হলো, আর কোন ধর্মে কি বিদ্যাশিক্ষাকে এতো অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে? অথচ পরিতাপের বিষয়, আজকের মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে আজ্ঞ থাকায়।

জ্ঞানার্জনকে শুধু নবীজী (সাঃ) নন, সাহাবায়ে কেরামও অতিশয় গুরুত্ব দিয়ে নসিহত করে গেছেন। সে নসিহতগুলো যে কতটা বলিষ্ঠ ও হৃদয়স্পর্শী ছিল –তার উদাহরণ দেয়া যাক। হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন, সম্পদ মানুষকে পাহারাদার বানায়, আর জ্ঞান মানুষকে পাহারা দেয়। তিনি আরো বলেছেন, সম্পদ চুরী হয়, কিন্তু জ্ঞান চুরী হয় না। একমাত্র জ্ঞানই হলো এমন সম্পদ যা দিলে কমে না, বরং বৃদ্ধি পায়। তিনি আরো বলেছেন, জ্ঞানবান মানুষ বিনয়ী হয়। হযরত আলী (রাঃ)’র মতে সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়া শ্রেষ্ঠ সম্পদটি অর্থ নয়, বরং সেটি জ্ঞান। পিতা-মাতার মৃত্যুতে বা তাদের অনুপস্থিতে একমাত্র জ্ঞানই সন্তানদেরকে বিপথে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারে। অথচ রেখে যাওয়া সম্পদ পাপের পথে ব্যয় হতে পারে এবং তা সন্তানকে জাহান্নামেও নিতে পারে।

 

কুশিক্ষার নাশকতা

কুশিক্ষার নাশকতা বিষপানের চেয়েও ভয়ানক। বিষপানে দেহের মৃত্যু ঘটে। আর কুশিক্ষায় মৃত্যু ঘটে বিবেকের। বাংলাদেশে শিক্ষার নামে কুশিক্ষার আয়োজনই অধিক। দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বাড়লেও আলোকিত মনের মানুষ বাড়ছে না। বরং গ্রামের সুবোধ বালক এসব শিক্ষাঙ্গণে এসে নৃশংস দুর্বৃত্তে পরিণত হচ্ছে। চুরিডাকাতি ও নানারূপ দুর্বৃত্তিতে তথাকথিক শিক্ষিতরা নিরক্ষরদেরও হারিয়ে দিচ্ছে। দেশকে যারা বিশ্বে প্রথম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে তারা নিরক্ষর কৃষক বা শ্রমিক নয়, তারা হলো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটধারীগণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে হচ্ছে আদিম অসভ্যতার চর্চা। সেখানে ধর্ষণে সেঞ্চুরী হয় এবং সে সাথে ধর্ষণ নিয়ে উৎসবও হয় –যেমনটি জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে। ছাত্ররা পাচ্ছে খুনের প্রশিক্ষণ। তাদের হাতে নির্যাতিত হয় -এমন কি লাশ হয় নিরীহ ছাত্রগণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এর চেয়ে বড় কলংক আর কি হতে পারে? আর কুশিক্ষার প্রভাব রাজনৈতিক অঙ্গণে কি কম? নির্বাচনের নামে জনগণের ভোট ডাকাতি হয়, আবার ডাকাতি শেষে সে ডাকাতি নিয়ে উৎসবও হয়। এসবই তাদের দ্বারা হয় যারা নিজেদের শিক্ষিত রূপে দাবী করে। এমন কুশিক্ষা দেশের পতনযাত্রাকে তীব্রতর করবে  সেটিই স্বাভাবিক নয়?

 

চাই ইনসানে কামেল

অপূর্ণাঙ্গ মানব দিয়ে সভ্য সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়। সে জন্য জরুরি হলো মানব সন্তানকে ইনসালে কামেল তথা পূর্ণাঙ্গ মানব রূপে গড়ে তোলা। ইসলাম  জ্ঞানার্জনকে সভ্য ও পুর্ণ মানব গড়ার হাতিয়ার বানাতে চায়। এরূপ সম্পূর্ণ মানুষকেই ইসলামী পরিভাষায় “ইনসানে কামেল” বলা হয়। ইনসানে কামেল অর্থ খানকার দরবেশ বা কোন পীর সাহেব নন। পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থায় একজন বিজ্ঞানী বিজ্ঞানের কোন একটি শাখায় বহু কিছু জানলেও তার গভীর অজ্ঞতা ধর্মকে নিয়ে। ধর্ম বিষয়ে তার অজ্ঞতা হাজার বছর বা দুই হাজার বছর পূর্বের আদিম মানুষের চেয়ে কম নয়। এজন্যই ভারতের একজন সেরা বিজ্ঞানী সাপ, গাভী বা মাটির পুতুলকে ভগবান ভেবে পূজা দেয়। তেমনি পাশ্চাত্য দেশের নোবেল বিজয়ী একজন বিজ্ঞানী যীশুকে মহান আল্লাহতায়ালার পুত্র ভাবতে পারে। অপরদিকে বাংলাদেশে মাদ্রাসার একজন ছাত্র বেড়ে উঠে বিজ্ঞানের অনেক মৌল বিষয়ের উপর গভীর অজ্ঞতা নিয়ে। জ্ঞানার্জনের এ ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি মানুষকে অতিশয় অপূর্ণাঙ্গ করে গড়ে তুলছে। কিন্তু ইসলাম মানুষকে চায় পূর্ণাঙ্গ বা কামেল করতে। আজকের আলেমদের ন্যায় নবীজীর যুগের মুসলিমগণ অপুর্ণাঙ্গ বা নাকেছ ছিলেন না। তারা যেমন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন, তেমনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, গভর্নর, জেনারেল এবং রাজনীতিবিদ। তারা যেমন মসজিদেও নামাজে আওয়াল ওয়াক্তে হাজির হতেন তেমনি যুদ্ধের ময়দানেও ফ্রন্ট লাইনে থাকতেন। “ইনসানে কামেল” তথা পূর্ণ মানবের নজির তো তাঁরাই। অথচ আজকের আলেমদের ক’জন তাদের ৪০, ৫০, ৬০ বা ৭০ বছরের জীবনে একটি বারের জন্যও শত্রুর সামনে দাঁড়িয়েছেন?  এর কারণ, অপূর্ণাঙ্গ শিক্ষা।

ইলমের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গতা বিধানে নবীজী (সাঃ) কোরআন-হাদিসের বাইরেও জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত করেছেন। জ্ঞানার্জনে প্রয়োজনে চীন দেশে যাও – সেটি সম্ভবতঃ এজন্যই। এমনকি নবীজী (সাঃ) নিজেও শিখেছেন অন্যদের থেকে। যেমন খন্দকের যুদ্ধে পরীখার কৌশল শিখেছিলেন তাঁর ইরানী সাহাবা সালমান ফারসী থেকে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা সেকালে গ্রীক ভাষা শিখেলিলেন। এরিস্টোটল, প্লেটো সহ বহু গ্রীক বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের গ্রন্থকে তাঁরা অনুবাদ করেছিলেন। অনেকে ভারতের ভাষা শিখে হিন্দু বিজ্ঞানীদের বহু বইপুস্তক তরজমা করেছিলেন। সেটি ছিল মুসলিমদের গৌরব কাল। অথচ আজ তেমনটি হচ্ছে না। কারণ, যে জ্ঞান জাতিকে সামনে টেনে নেয় সেটির চর্চাই লোপ পেয়েছে।

জ্ঞানার্জনের একটি মাত্র মাধ্যম হলো পড়ে শিখা। তবে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যমটি হলো ছাত্রদের ভাবতে বা চিন্তাতে অভ্যস্থ্য করা। চিন্তার সামর্থ্য ব্যক্তির ভিতরে জেনারেটরের কাজ করে। এটি চালু হলে ব্যক্তির অভ্যন্তরে তখন সৃষ্টি হয় জ্ঞান লাভে দুর্দমনীয় ক্ষুধা। সে ক্ষুধা দমনে তখন সে পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র কোন কিছু অতিক্রমেই আর পিছপা হয় না। যে পাঠ্য পুস্তক বা শিক্ষকের যে বক্তৃতা ছাত্রকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে না তা কি আদৌ জ্ঞানার্জনে সহায়ক? এতে সার্টিফিকেট লাভ সহজতর হলেও তাতে জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়ে না। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজই হলো ছাত্রের মনে জ্ঞানের প্রতি নেশা ধরিয়ে দেওয়া যা তাকে আজীবন জ্ঞানপিপাসু করবে। কিন্তু মুসলিম দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা পারিনি। ফলে বাড়েনি জ্ঞানের প্রতি সত্যিকার আগ্রহ। এমন জ্ঞান বিমুখীতাই একটি জাতির পতন ডেকে আনার জন্য কি যথেষ্ট নয়?

উড়বার প্রয়োজনে পাখীর দুটো ডানাই যেমন সবল ও সুস্থ থাকা উচিত, তেমনি সুস্থ সভ্যতার নির্মানে অপরিহার্য প্রয়োজন হলো ইসলাম ও বিজ্ঞান – এ দুটো শাখাতেই ভারসাম্যম মূলক অগ্রগতি। কিন্তু সেটি হয়নি। পাশ্চাত্য সমাজ আজ ধর্মবিবর্জিত যে শিক্ষার কারণে বিপর্যয়ের মুখে, আমরা সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় সেদিকেই ধাবিত হচ্ছি। ধ্বংসমুখী এ জাতির উত্থানে আমাদের সামনে একটিই পথ। সেটি হলো, আমাদের ফিরে যেতে হবে মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত প্রেসক্রিপশনে। ইকরা বা জ্ঞানার্জনের মধ্য দিয়ে যেভাবে যাত্রা শুরু হয়েছিল আজও সেভাবেই শুরু করতে হবে। তবে সবচেয়ে আশার বাণী হলো, ইসলামের এ পথটি পরীক্ষিত পথ -যাতে ব্যর্থতার নজির নেই। বিশ্বের অন্য সব জাতি থেকে অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে মুসলিমদের যেমন মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, তেমনি গৌরবও রয়েছে। মানব ইতিহাসের শুরু থেকে এ অবধি অন্যরা লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তক্ষয়ে ব্যর্থতারই ইতিহাস গড়লেও মুসলিমদেরই রয়েছে নির্ভেজাল সফলতার গৌরবোজ্বল ইতিহাস। বস্তুতঃ মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার নির্মান হয়েছিল এ পথেই। অথচ মুসলিমগণ সে পথ থেকেই দিন দিন দূরে সরছে। ফলে গতি বাড়ছে তাদের পতনযাত্রায়। উত্থানের সে সফল পথটি তাদের কাছে উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। ২৭/১২/২০২০।




মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি প্রসঙ্গে

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 কিসে শ্রেষ্ঠত্ব?

অন্যান্য ধর্ম ও মতের অনুসারিদের থেকে মুসলিমগণ যে কারণে বিশিষ্ঠ ও শ্রেষ্ঠ -সেটি তাদের দেহের গঠন, প্রাকৃতিক সম্পদ, ভাষা, ভূগোল বা অন্য কারণে নয়। সেটি হলো আল-কোরআন। একমাত্র তাদের কাছেই রয়েছে বান্দাহর উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত সর্বশেষ এ ভাষণটি।  মহান আল্লাহতায়ালার নিজের বর্ণনায় এটি হলো “হুদালিন্নাস” অর্থাৎ “মানব জাতির জন্য প্রদর্শিত পথ”, এবং “মাওয়েজাতুন হাসানাহ” অর্থাৎ “উত্তম ওয়াজ”। হযরত আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়াকে যখন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হলো তখন তাঁদের নিজেদের এবং তাঁদের বংশধরদের জান্নাতের সুসংবাদও জানানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল, জান্নাতের পথ দেখাতে বহু নবী ও রাসূল আসবেন। নবীদের কাছে ওহী নিয়ে ফেরেশতাগণও আসবেন। লক্ষাধিক নবী-রাসূল বস্তুতঃ পথ দেখানোর সে কাজটিই করেছেন। মানবের দায়িত্ব হলো তাদের অনুসরণ করা। মুসলিমগণ এ ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে অধিক ভাগ্যবান। একমাত্র তাদের কাছেই রয়েছে পবিত্র কোরআন –যা জান্নাতের পথে চলার সর্বশেষ রোডম্যাপ। এটিই হলো সেই “সিরাতুল মোস্তাকিম”। মানব জাতির কল্যাণে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে দেয়া এটিই হলো সবচেয়ে বড় নিয়ামত। সুস্বাস্থ্য, সুখাদ্য ও ধনসম্পদে দুনিয়ার বুকে বাঁচাটি আনন্দময় হয়। কিন্তু পরকালে আনন্দময় স্থানে পৌঁছতে চাই সিরাতুল মুস্তাকীম। এবং সে পথের সন্ধান দিয়েছেন হযরত মহম্মদ (সাঃ)। সে জন্যই তিনি রাহমাতুল্লিল আ’লামীন অর্থাৎ সর্বসৃষ্টির জন্য রাহমাত।

বহু বিস্ময়কর আবিস্কারের জনক হলো মানব। কিন্তু  জান্নাতে পৌঁছার রোডম্যাপ আবিস্কারের সামর্থ্য তাদের নাই। অথচ শুধু জান্নাতে পৌঁছার জন্যই নয়, উন্নত মানব ও মানবিক সভ্যতার নির্মাণের জন্যও অতি অপরিহার্য হলো এই রোডম্যাপ। এখান থেকেই মানুষ য় সঠিক নীতিবোধ, মূল্যবোধ ও জীবনবোধ। পায় ন্যায়-অন্যায় এবং সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের সুষ্ঠ বিচাপারবোধ। পানাহার ছাড়া যেমন দেহ বাঁচে না, তেমনি এ  নীতিবোধ, মূল্যবোধ, বিচারবোধ ছাড়া মানবতাও বাঁচে না। তখন মানুষ বর্বর পশুতে পরিণত হয়। বাঘের ধারালো নখর যেমন হিংস্রতা বাড়ায়, তেমনি বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানুষকে পশুর চেয়েও হিংস্রতর করে। বিগত দু’টি বিশ্বযুদ্ধে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মৃত্যু, বহু কোটি মানুষের পঙ্গুত্ব, হাজার হাজার নগর-বন্দরের বিনাশের ন্যায় বর্বরতা কি আদিম যুগে কোন অসভ্য জাতির দ্বারা সাধিত হয়েছিল? হালাকু-চেঙ্গিজের অপরাধ এ তুলনায় তো নস্যিতূল্য। অথচ সর্বকালের সবচেয় জঘন্য এ অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল তাদের দ্বারা যারা জ্ঞানবিজ্ঞান, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রচন্ড অহংকারী। আজও সে বর্বরতায় তারা ইতিহাস গড়ছে ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও কাশ্মিরে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যার মধ্য দিয়ে। ধ্বংস করা হচ্ছে অসংখ্য ঘরবাড়ী ও ঘরবাড়ি; এবং ধর্ষিতা হচ্ছে নারী। এরূপ নৃশংস বর্বরতা কি সমুদয় পশকুলও কোন কালে করতে পেরেছে? অথচ সেটি হচ্ছে বিশ্বের অত্যাধুনিক রাষ্ট্রগুলোর দ্বারা। পারমানবিক বোমা আবিস্কার করলেও নিজেদের মাঝে উন্নত নীতিবোধ ও মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পারেনি। বিস্ময়কর যান্ত্রিক অগ্রগতি হলেও মানবতা এগোয়নি। পিরামিড নির্মাণে পাথর চাপায় প্রাণ হারিয়েছিল বহুসহস্র মানুষ; অত্যাচারিত হয়েছিল মিসরের সাধারণ প্রজা। তেমনি সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্যের জৌলুস বাড়াতে প্রাণ হারাচ্ছে দরিদ্র বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। পিরামিড যেমন নির্যাতনের প্রতীক, পাশ্চাত্য সভ্যতা তেমনি প্রতীক হলো দুর্বল জাতি সমূহের উপর সাম্রাজ্যবাদী শোষণ, শাসন ও বর্বরতার। অথচ আজ থেকে ১৪শত বছর আগে মানবতা তার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছিল। তখন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল আইনের শাসন, সার্বজনীন জ্ঞানচর্চা, ধনিদরিদ্রের সম-অধিকার, নারী স্বাধীনতা ও সম্পদে নারীর অংশীদারিত্ব। বিলুপ্ত হয়েছিল বর্ণবাদ, রাজতন্ত্র, সামন্তবাদ ও দাসপ্রথা। বিশাল রাষ্ট্রের খলিফা হয়ে আটার বস্তা পিঠে নিয়ে গরীবে ঘরে পৌঁছে দেযা ও চাকরকে উটে চড়িয়ে নিজে রশি টানার মত বিস্ময়কর ঘটনাও সেদিন সম্ভব হয়েছিল। মানুষের মহাশূণ্যে ভ্রমনের চেয়েও মুসলিমদের সে অর্জনটি ছিল বেশী বিস্ময়কর। আরবের দরিদ্র জনগণ সেদিন জন্ম দিয়েছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মানবিক সভ্যতাটির।

দৈহিক ভাবে মানুষ তো সে ভাবেই বেড়ে উঠে -যা সে খায় বা পান করে। তাই সুখাদ্য না খেলে বা বিষ পানে মৃত্যু ঘটে। তেমনি নৈতীক ভাবে মানুষ সে ভাবেই বেড়ে উঠে -যা সে পাঠ করে বা যা থেকে সে শিক্ষালাভ করে। বিবেকের মৃত্যু এ জন্যই অনিবার্য হয় অশিক্ষা ও কুশিক্ষায়। ফলে মানুষ যা কিছু খায় –সেটি যেমন অতি গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে কি পাঠ করে সেগুলিও। তাই মহান আল্লাহতায়ালা যেমন পানাহারের বিধান দিয়েছেন, তেমনি পাঠের জন্য দিয়েছেন সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব। এবং এর সুফল দেখা গেছে প্রাথমিক যুগের মুসলিম জীবনে। তারা সেদিন নৈতিকতায় শীর্ষস্থানে পৌঁছতে পেরেছিলেন এ কারণে যে, তারা জ্ঞানার্জন করতেন পবিত্র কোর’আন থেকে। তারা সর্বকালে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মাণে সফল হয়েছিলেন এ কারণে যে, তাঁরা অনুসরণ করেছিলেন মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত কোর’আনী রোডম্যাপ। ভ্রান্ত পথে আজীবন ঘুরলেও গন্তব্যে পৌঁছা না। অথচ সঠিক পথে দ্রুত পৌঁছা যায় –প্রথম যুগের মুসলিমগণ সেটিই প্রমাণ করেছেন। মাত্র কয়েক দশকে একটি পশ্চাদপদ জনপদের জনগণ বিশ্বশক্তি ও সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছেন। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের মহফিলে যে গর্ব প্রকাশ করেছিলেন বস্তুতঃ সেটিই সেদিন সার্থকতা পেয়েছিল। বান্দা তখন তার মহান মা’বুদের লক্ষ্য পূরণে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। বান্দার সে আচরণে তিনি এতোই খুশী হয়েছিলেন যে সে সন্তুষ্টির কথা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন এভাবে: “রাদীআল্লাহু আনহু ওয়া রাদূউ আনহু।” অর্থঃ আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট এবং তারাও সন্তুষ্ট আল্লাহর উপর।” 

 

কেন এ ব্যর্থতা?

তবে মুসলিমগণ আজ ব্যর্থতায় ইতিহাস করেছে। প্রশ্ন হলো, কেন এতো ব্যর্থতা? পবিত্র কোর’আন তো আজও অবিকৃত। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের যে গুরুতর ব্যধিগুলো ১৪ শত বছর পূর্বে আরোগ্য পেল সেটি কেন আজ মুসলিম বিশ্বে জেঁকে বসে আছে? পথ সঠিক হলে গাধার পিঠে বা পায়ে হেঁটেও গন্তব্যস্থলে পৌঁছা যায়। কিন্তু ভ্রান্ত পথে উন্নত যানেও সেটি অসম্ভব। মহান আল্লাহতায়ালার প্রদর্শিত রোডম্যাপের গুরুত্ব এখানেই। মুসলিমদের বর্তমান ব্যর্থতাই বলে দেয়, সঠিক পথে তারা চলছে না। সন্ত্রাস, গুম-খুন, দুর্নীতি, অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের যে স্থানে তারা পৌঁছেছে, সিরাতুল মুস্তাকীম সেখানে কখনোই নেয় না। ইসলাম যে সর্বক্ষেত্রে সফলতার সঠিক পথ সেটি ১৪ বছর পূর্বেই প্রমাণিত হয়েছে। এ পথের গুণেই মুসলমানগণ ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, রাজনীতি ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সফলতার উচ্চমার্গে পৌঁছেছিল। তখন বিশ্বের অন্যান্য জাতিরা নিমজ্জিত ছিল অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অপসংস্কৃতির গভীর অন্ধকারে। বিশ্বজুড়ে ছিল বর্বরতম স্বৈরাচার। ছিল রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধবিগ্রহ। ধর্মের নামে মানুষ তখনও মূর্তি, অগ্নি, পাহাড়-পর্ব্বত, নদ-নদী এমনকি সাপ-শকুনকেও দেবতা বলে পূজা করতো। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ছিল উলঙ্গতা। নারী ছিল অধিকার-বঞ্চিত ভোগ্যসামগ্রী। বিশ্বজুড়ে ছিল বর্ণবাদ, ছিল দাসপ্রথা। কিন্তু সে অন্ধকারের যুগে দ্রুত উন্নতির রেকর্ড গড়েছিল মুসলিমগণ। কিন্তু আজ কেন এ দুর্গতি?

রোডম্যাপ কাউকে গন্তব্যস্থলে টানে না। এটি পথ দেখায় মাত্র। পথটি জেনে নিতে হয় এবং সেটির অনুসরণ করতে হয় ব্যক্তিকেই। এজন্য যেটি অপরিহার্য সেটি হলো রোডম্যাপ থেকে শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ ও সামর্থ্য। সে সামর্থ্য বাড়াতেই ইসলামে জ্ঞানার্জন ফরয। কারণ, জ্ঞান ছাড়া মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া রোডম্যাপ থেকে পাঠোদ্ধার অসম্ভব? সম্ভব নয় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা লাভ। জ্ঞানের অভাবে হালাল-হারাম ও ন্যায়-অন্যায়ের পাঠটি অজানা থেকে যায়। ইসলামে জ্ঞানার্জন তাই নেশা, পেশা, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা কারিগরি বিষয় নয়, এটি উচ্চমার্গীয় ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। তাই না বুঝে কোর’আন তেলাওয়াতে বা সেটি জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়াতে দায়িত্ব পালন হয় না। জ্ঞানার্জনের ফরযও আদায় হয় না। আদায় হয় না বলেই না বুঝে কোর’আন তেলাওয়াত ফরয করা হয়নি, বরং ফরয করা হয়েছে বুঝে সুজে কোর’আন থেকে শিক্ষালাভকে। তথা জ্ঞান-লাভকে। অথচ বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে গুরুত্ব পেয়েছে নিছক তেলাওয়াত, কোর’আন থেকে জ্ঞান লাভ নয়। তেলাওয়াতে কি হেদায়ত মেলে? অথচ হেদায়াত না পেলে মুসলিম থাকাই তো অসম্ভব। আর হেদায়াত যে মেলেনি -সে প্রমাণ কি কম? হেদায়েত না পাওয়ার কারণেই কোর’আন তেলাওয়াতকারি সূদ খায়, ঘুষ খায় এবং নানাবিধ দূর্নীতিতে লিপ্ত হয়। কোর’আন তেলওয়াত হচ্ছে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। যে অফিসে ঘুষ ও দূর্নীতির সয়লাব, সেখানেও প্রচুর নামাযী। কোর’আন তেলওয়াতকারীর সংখ্যাও অফিসগুলিতে অনেক। অথচ দেশে দূর্নীতির প্লাবন। সয়লাব চলছে বেপর্দা, অশ্লিলতা, ধর্ষণ ও ব্যভিচারের। নগর-বন্দরে বিশাল বিশাল বাজার বসেছে পতিতাবৃত্তির।

কোর’আন থেকে শিক্ষাগ্রহণ ও সেগুলির পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে করূণাময় মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “কিতাবুন আনযালনাহু ইলাইকা মুবারাকুল্ লি’ইয়াদ্দাবারু আয়াতিহি ওয়া লি’ইয়াতাযাক্কারা উলুল আলবাব।” (সুরা সোয়াদ, আয়াত ২৯) অর্থঃ “রহমতপূর্ণ এ কিতাব আপনার উপর এজন্য নাযিল করেছি যে, যেন এর আয়াতগুলো নিয়ে তারা (ঈমানদারেরা) ভাবতে পারে এবং যারা সমঝদার ব্যক্তি তারা যেন হুশিয়ার হয়ে যায়।” এ আয়াতে কোর’আন নাযিলের মুখ্য উদ্দেশ্য ব্যক্ত হয়েছে। কোর’আন এ জন্য নাযিল হয়নি যে, ঈমানদারগণ এ পবিত্র কিতাব শুধু তেলাওয়াত করবে। বরং এ জন্য যে, আয়াতগুলো নিয়ে তারা চিন্তাভাবনা করবে। এবং যে নির্দেশাবলী দেয়া হয়েছে তা থেকে শিক্ষা নিবে। এভাবে নিজেদের ইহকাল ও আখেরাত বাঁচাতে হুশিয়ার হবে। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার এ হুশিয়ারির পরও কি কোন মুসলিম নিছক কোর’আন তেলাওয়াত নিয়ে খুশি থাকতে পারে? তাছাড়া প্রশ্ন হলো, কোন কিছু না বুঝে কি তা নিয়ে ভাবা যায়? সম্ভব হয় কি তা থেকে শিক্ষা লাভ?

কোন বিষয়ে ভাবতে হলে সেটি প্রথমে বুঝতে হয়। চিন্তা-ভাবনা জ্ঞানশূণ্যতায় হয় না। ভূতের গল্প শুনে শিশুও জানতে চায় ভূতের হতা-পা-মাথা কেমন, দেখতে কেমন ইত্যাদি। কারণ ভূতকে নিয়ে শিশুও ভাবতে চায়। কিছু বুঝতেও চায়। এটিই স্বাভাবিক। এটিই মানুষের ফিতরাত। কিন্তু মুসলিমগণ সে ফিতরাত-সুলভ স্বাভাবিক আচরণ করেনি পবিত্র কোর’আনের সাথে। বাংলাদেশের মানুষ দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হয়েই শুধু বিশ্বকে অবাক করেনি, বরং তার চেয়ে বেশী অবাক করেছে কোর’আন শিক্ষার নামে অর্থ না বুঝে স্রেফ তেলাওয়াত শিখিয়ে। বাংলাদেশের আলেমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এবং সে সাথে বুদ্ধিহীনতা হলো এটি। তারা জ্ঞানার্জনের ফরয কাজটির গুরুত্ব সেরেছে তেলাওয়াত শিখিয়ে। তেলাওয়াতে যে জ্ঞানার্জনের ফরয আদায় হয় না -সে সত্যটি তারা নিজে যেমন বুঝেনি তেমনি ছাত্রদেরও বুঝতে দেয়নি। কোন রাজা কি শুধু এটুকুতে খুশি থাকে, প্রজারা তার হুকুমগুলি শুধু পড়বে ও সেগুলিতে চুমু খাবে? এবং সেগুলি তারা বুঝবে না এবং পালনও করবে না? প্রজাদের এমন আচরণে কি রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়। বাড়ে কি সামাজিক শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি?

 

ভাবনাশূণ্যতা ও জ্ঞানশূণ্যতার বিপদ

মুসলিম মাত্রই তো মহান আল্লাহতায়ালার সৈনিক। সৈনিক বলতে বুঝায় কিছু দায়িত্ব নিয়ে বাঁচা ও তা নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। ঈমানদারের সে দায়ভারটি কোন ব্যক্তি, দল বা মতবাদকে বিজয়ী করা নয়, বরং ইসলাম ও তার শরিয়তি বিধানকে বিজয়ী করা। নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ তো সেটিই করেছেন। এবং সেটিই তো সর্বকালে ও সর্বদেশে মুসলিম জীবনের মিশন ও নবীজী (সাঃ)’র মহান সুন্নত। কিন্ত সে মিশন পালনে সফল হতে হলে সৈনিকদের তো সে মিশন বুঝতে হয়। সে জন্য জরুরী তো মহান রাব্বুল-আলামীনের হুকুমগুলি পবিত্র কোর’আন থেকে সরাসরি বুঝা ও মান্য করা। কিন্তু সেটি না করে শুধু তেলাওয়াতে ব্যস্ত হলে কীরূপে বিজয়ী হবে তাঁর দ্বীন? কীরূপে প্রতিষ্ঠা পাবে তাঁর শরিয়ত? বান্দার এমন আচরনে কি আল্লাহতায়ালা খুশী হন? এরূপ অপরাধে ভয়ানক আযাব এসেছিল বনী ইসরাইলের উপর। তাদের প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার হুশিয়ারি এসেছিল এভাবেঃ “ওয়া আনতুম তাতলু’ঊনাল কিতাবা আফালা তা’ক্বীলুন” (সুরা বাকারা, আয়াত ৪৪) অর্থ: “এবং তোমরা এ কিতাবকে তেলাওয়াত করো অথচ সেগুলো নিয়ে কি চিন্তাভাবনা করোনা।” আল্লাহপাক তাঁর কিতাবের সাথে বনী ইসরাঈলীদের আচরণে কতটা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন –এ আয়া

তে তো সেটিই প্রকাশ পেয়েছে। কথা হলো, পবিত্র কোর’আনের সাথে বাংলাদেশী মুসলিমদের আচরণ কি তা থেকে ভিন্নতর? না বুঝে তেলাওয়াতে কোর’আনের প্রতি যে অসম্মান হয় এবং তাতে যে আল্লাহতায়ালা অসন্তুষ্ট হন –সে বিষয়টি বুঝা কি এতোই কঠিন?

অথচ কোর’আন শিক্ষার নামে বাংলাদেশে যত দ্বীনি মাদ্রাসা আছে দুনিয়ার আর কোন দেশে তা নেই। বাংলাদেশের একটি জেলাতে যত মাদ্রাসা তা খোলাফায়ে রাশেদার সময় সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মাঝে ছিল না। দ্বীন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এসব মাদ্রাসা থেকে তৈরী হয়েছিল বহু মোফাচ্ছের কোর’আন, হাজার হাজার মোজাহিদ, শহীদ ও ধর্ম-প্রচারক। দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে তাঁরা নদ-নদী, মরুভূমি ও পাহাড়-পর্ব্বত অতিক্রম করেছেন। অসংখ্য জিহাদ লড়েছেন। অথচ বাংলাদেশের মাদ্রাসা থেকে যারা তৈরী হচ্ছেন তাদের সামর্থ্য মিলাদ, মুর্দাদাফন, বিবাহ পড়ানো ও ইমামতির বাইরে সমাজ, রাজনীতি, প্রশাসন, যুদ্ধবিগ্রহ, দর্শন, অর্থনীতি, সাহিত্য  ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে নজরে পড়ার মত নয়। বাজারে নাই তাদের লেখা কোন তাফসির গ্রন্থ্য। বাংলাদেশে প্রকাশিত বইয়ের ৫% ভাগের লেখকও তাঁরা নন। অথচ সমাজে তারাই আলেম বা জ্ঞানীর টাইটেল ধারি। ইসলামের গৌরব কালে চিত্রটি ভিন্ন ছিল; প্রায় শতভাগ বইয়ের লেখক ছিলেন আলেমগণ।

 

 

নিষিদ্ধ জিহাদ এবং শত্রুর অধিকৃতি

আরো বিস্ময়ের বিষয়, বহু আলেম এবং মসজিদের বহু ইমাম রাজনীতিকে দুনিয়াদারি বলে তা থেকে দূরে থাকেন। অথচ রাজনীতি তো তাই যা নির্ধারণ করে দেশ কোন দিকে পরিচালিত হবে, কি ভাবে পরিচালিত হবে এবং কোন বিধানের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে -সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি। রাজনীতির গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। কারণ, ইসলামের নিজস্ব এজেন্ডা আছে। আছে শরিয়তি বিধান। রাজনীতিতে অংশ না নিয়ে সে এজেন্ডা ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা কীরূপে সম্ভব? সেটি কি সম্ভব ইসলামের শত্রুপক্ষকে ক্ষমতায় বসিয়ে? সম্ভব কি ইসলামের এজেন্ডা ধর্ম-কর্ম ও নামায-রোযায় সীমিত করে? নবীজী (সাঃ)’র আদর্শ তো এক্ষেত্রে  সুস্পষ্ট। ইসলামের এজেন্ডা পূরণে স্বয়ং নবীজী (সাঃ)কে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসতে হয়েছে। এবং তাঁর ইন্তেকালের পর সে আসনে তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ বসেছেন।

মুসলিম জীবনে রাজনীতি তাই কোন পেশা নয়; নেশাও নয়। এটি ইসলামকে বিজয়ী করার শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এটি নবীজী (সাঃ)’র শ্রেষ্ঠ সূন্নত। যেখানে সে সূন্নতের পালন নাই, সেখানে ইসলামের বিজয় নাই। মুসলিমদের ইজ্জতও নাই। রাজনীতির এ ইবাদতে বিনিয়োগ হয় ঈমানদারের অর্থ, সময়, শ্রম ও রক্ত। এবং একমাত্র এ ইবাদতের মাধ্যমেই অর্জিত হয় আল্লাহর দ্বীনের বিজয়। এবং প্রতিষ্ঠা পায় শরিয়ত। এটিই ইসলামের পবিত্র জিহাদ। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাদের যুগে এ জিহাদ সংগঠিত হয়েছে মসজিদে নববীর মেঝে থেকে। অথচ সে জিহাদকে দেশের বহু আলেম শুধু নিজ জীবনেই নিষিদ্ধ করেননি, নিষিদ্ধ করে  রেখেছেন মসজিদ-মাদ্রাসার অঙ্গণেও। রাজনীতিকে তারা অপবিত্র বলেন। এবং তা থেকে নিজেদের দূরে রাখাকে সওয়াবের কাজ মনে করেন। অথচ তারা বুঝতে চান না, ইসলামে শত্রুদের সাথে লড়াইটি মসজিদের মেঝেতে হয় না। সেটি হয় রাজনীতির অঙ্গণে। সেখানেই নির্ধারিত হয় জয়পরাজয়। সিদ্ধান্ত হয়, রাষ্ট্র আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত পথে হবে না শয়তানের পথে চলবে। সে লড়াইয়ে ইসলামের পক্ষে যারা প্রাণ দেয় তাদেরকে শহিদ বলা হয়। তাদের মর্যাদা এতই অনন্য যে মৃত্যুর পরও মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে পানাহার দিয়ে থাকেন। জীবনের প্রতিটি রাতের সবটুকু সময় ইবাদতে কাটালেও কি এ সম্মান জুটে?

মহান রাসূলে পাক (সাঃ) শরিয়ত প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে মসজিদের জায়নামায থেকে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে নিয়ে গেছেন। অসুস্থ্য ব্যক্তিকে বাঁচানো বা অজ্ঞ ব্যাক্তিকে জ্ঞানদান ইসলামে অতি উত্তম ইবাদত। কারণ প্রথমটি মানুষের দেহ বাঁচে। এবং দ্বিতীয়টিতে বাঁচে বিবেক। তাই অতীতে ঈমানদারগণ চিকিৎসক, শিক্ষক বা মসজিদের খতিব হওয়াকে পচ্ছন্দ করতেন। কিন্তু পুরা একটি জাতিকে বাঁচানোর কাজ তো সেগুলির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। জাতি বাঁচলেই তো সভ্যতা গড়ে উঠে। তখন ইসলামও বিজয়ী হয়। এবং জাতি বাঁচানো এবং সে সাথে ইসলাম বাঁচানোর কাজটি হয় রাজনীতির অঙ্গণে। তাই রাজনীতির সমকক্ষ একমাত্র রাজনীতিই। মুসলিমদের রাজনীতিতে তাই নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বয়ং নবীজী (সাঃ)। রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে বসেই তিনি পরাজিত করেছেন আবু জেহেল ও আবু লাহাবদের নেতৃত্বকে। মসজিদের জায়নামাজে সীমিত থেকে কি সেটি সম্ভব হতো? রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটের ন্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটিতে কি তাই ইসলামের শত্রুকে বসানো যায়? তাতে তো বিজয় শত্রুর হাতে তুলে দেয়া হয়। অথচ অধিকাংশ মুসলিম দেশের মুসলিমগণ নিজেদের ভোট, অর্থ, শ্রম ও রক্তের খরচে ইসলামবিরোধী অপশক্তিকেই ক্ষমতায় বসিয়েছে। এতে কি মুসলিম স্বার্থের সুরক্ষা হয়? আসে কি ইসলামের বিজয়? দেশে দেশে শরিয়তের যেরূপ বিলুপ্তি, মুসলিমদের যেরূপ বিপন্নদশা -তার মূল কারণ তো শত্রুশক্তির অধিকৃতি। এবং এ অধিকৃতির কারণ, মুসলিমগণ রাজনীতিকে জিহাদ রূপে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং দ্বীনদারি রূপে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে রাজনীতি থেকে দূরে থাকাটি। শূণ্যস্থান কখনোই শূণ্য থাকে না। ফলে বিনা যুদ্ধেই রাষ্ট্র দখলে নিয়েছে ইসলামে অঙ্গিকারহীন সেক্যুলারিস্টগণ।

 

অঙ্গিকারহীনতাই ঈমানহীনতা

কথা হলো, ইসলামের বিজয়ে অঙ্গিকারহীন হলে কেউ কি মুসলিম থাকে? মহান আল্লাহতায়ালার উপর ঈমান ও ইসলামের বিজয়ে অঙ্গিকার –এক সাথে চলে। ইসলামে অঙ্গিকারহীনতার অর্থই তো ঈমানহীনতা। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো ইসলামের বিজয়ে অঙ্গিকারবদ্ধতা। সেটি যেমন ব্যক্তি জীবনে, তেমনি রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে। সে জন্য সে যেমন অর্থ, শ্রম ও মেধা দেয়, তেমনি রক্তও দেয়। ঈমান আনার পর মুসলিমদের ইবাদত তাই শুধু নামায-রোযা পালনে থেমে যায়নি, ইসলামের বিজয় আনতে তারা যেমন অকাতরে অর্থ ও শ্রম দিয়েছেন, তেমনি প্রাণও দিয়েছেন। ইসলামের বিজয়ে অঙ্গিকার নিয়ে যেমন রাজনীতিতে নামে, তেমনি শিক্ষা-সংস্কৃতিতেও নামে। প্রতিটি মুসলিম দেশে যাদের রাজনীতি বহু পূর্বেই নিষিদ্ধ হওয়া উচিত ছিল, তা হলো সেক্যুলারিস্টদের রাজনীতি। কারণ, এরাই হলো শয়তানের পক্ষ। শয়তানের পক্ষকে নিজ দেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় হওয়ার অনুমতি দিলে গাদ্দারি হয় ইসলামে সাথে। এদের রাজনীতি বস্তুত মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে পরাজিত করার রাজনীতি। তাতে বিজয়ী হয় চরিত্রবিনাশী অসভ্যতা। এমন রাজনীতির  কারণেই বাংলাদেশে প্লাবন এসেছে গুম, খুন, ফাঁসি, ধর্ষণ, চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতিসহ নানারূপ দুর্বৃত্তির। ফলে এ  পৃথিবী পৃষ্টে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ হলো শয়তানী পক্ষের এ রাজনীতি। কিছু লোকের খুনখারাবী, মদ্যপাণ, পতিতাবৃত্তি বা চুরি-ডাকাতিতে সমগ্র জাতি পরাজিত হয় না। দেশও ধ্বংস হয় না। আদালত থেকে শরিয়তও বিলুপ্ত হয় না। তাদের কারণে দেশে খুন, গুম, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতির জোয়ার আসে না। এমন পাপীগণ নবীজীর (সাঃ) আমলেও ছিল। কিন্তু সেক্যুলার রাজনীতি বিজয়ী হলে তাতে বিপন্ন হয় ইসলাম, বিলুপ্ত হয় শরিয়ত এবং প্রতিষ্ঠা পায় শয়তানী অসভ্যতা। তখন মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা নিয়ে রাজনীতিতে অংশ নেয়াটি গণ্য হয় ফৌজদারি অপরাধ রূপে। এ অপরাধে বহু মুসলিম দেশে মুসলিম নির্যাতন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে। ইসলামের পক্ষ নেয়ায় অনেককে ফাঁসিতে ঝুলানো হচ্ছে। ইসলামের তাবত শত্রুপক্ষ সেটিকে সমর্থণও দিচ্ছে।

লক্ষণীয় হলো, ইসলামের শত্রুপক্ষের কাছে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার যে কোন প্রচেষ্টাই গণ্য হয় প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি রূপে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সে বয়ানটি অতি প্রবল। এর কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারাই বিজয়ী পক্ষ। অথচ তারাও নিজেদেরকে মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। তাদের অনেকে নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতও আদায় করে! প্রশ্ন হলো, ইসলামের প্রতিষ্ঠার যারা বিরোধী -তারা ঈমানদার হয় কি করে? ঈমানদার হওয়ার দায়বদ্ধতা কি তারা বুঝে? এটিতো মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা তো ইসলামের বিজয় (লি ইয়ুযহিরাহু আলা দ্বীনি কুল্লিহি)। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলিতে মুসলিম নামধারী সেক্যুলারিস্টগণ যা বলে, নবীজী (সাঃ)’র যুগে মুনাফিকগণও তা প্রকাশ্যে বলতে ভয় পেত।

 

তান্ডব জাহিলিয়াতের

মুসলিম সমাজে আজ যেটি ঘটছে তার মূল কারণ, নিরেট জাহিলিয়াত। ইসলাম বিরোধীতায় এ নব্য জাহিলিয়াত আদিম জাহিলিয়াত থেকে সামান্যই ভিন্নতর। এরূপ জাহিলিয়াতের কারণেই মানুষ মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়। জাহিলিয়াতের এ রোগ সারাতে হলে যেটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, কোর’আনী জ্ঞানের গভীর চর্চা; নিছক তেলওয়াত নয়। এটিই অজ্ঞতার একমাত্র antidote তথা প্রতিষেধক। নবী করীমের (সাঃ) সময় কোরআন বুঝাটি এতোই গুরুত্ব পেয়েছিল যে দূর-দূরান্ত থেকে সাহাবাগণ নবীজীর (সাঃ) কাছে ছুটে আসতেন এটুকু জানতে যে, মহান আল্লাহতায়ালার কাছ থেকে কোন নতুন ওহী এসেছে কিনা। ওহী নাযিল হলো অথচ সেটি জানা হলো না এবং মান্য করা হলো না –একজন মু’মিনের জীবনে সেটি অভাবনীয় ছিল। না জানা ও না মানার অপরাধে জাহান্নাম যেতে হবে -এ ভয়ে প্রতিটি সাহাবী ছিলেন সদা জাগ্রত। নাযীলকৃত আয়াতগুলোকে তারা শুধু মুখস্থ্যই করতেন না, তা নিয়ে চিন্তা ভাবনাও করতেন। দর্শনের জন্ম তো চিন্তা থেকেই। এবং চিন্তাবিদগণই তো দার্শনিক হয়। তাই কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় না গিয়েও চিন্তা ভাবনার বলে প্রতিটি সাহাবী পরিণত হয়েছিলেন বিখ্যাত আলেম ও দার্শনিকে। মুসলিম বিশ্বের নানা জনপদে তারাই সেনাপতি, গভর্নর, প্রশাসক, বিচারক, মুফতি, মুফাচ্ছির, মুহাদ্দিসের দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ তারা ছিলেন কৃষক, শ্রমিক, ভেড়ার রাখাল বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

জ্ঞানার্জন করার কাজটি স্রেফ মাদ্রাসার শিক্ষক বা মসজিদের ইমামদের দায়িত্ব নয়, সে দায়িত্বটি তো প্রতিটি মুসলিমের। সাহাবায়ে কেরামগণ তারই দৃষ্টান্ত। তাই রাসূলে পাকের সাহাবা ছিলেন অথচ আলেম ছিলেন না সে নজির নেই। জ্ঞানার্জনে তৎপর ছিলেন পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও। বস্তুতঃ মুত্তাকী হওয়ার জন্য নারী-পুরুষের জন্য এ ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক সে ঘোষণাটি দিয়েছেন এভাবেঃ “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা (সুরা ফাতির, আয়াত ২৮)” অর্থঃ “বান্দাহদের মাঝে একমাত্র জ্ঞানবান তথা আলেমগণই আমাকে ভয় করে।” অর্থাৎ যার মধ্যে জ্ঞান বা ইলম নেই, তার মধ্যে আল্লাহর ভয়ও নেই। তাকওয়া সৃষ্টির জন্য তাই অপরিহার্য হলো ইলম চর্চা। ইলম অর্জন এজন্যই ফরয। নিজের নামায-রোযা যেমন নিজে করতে হয়, তেমনি এ ফরযটিও নিজে আদায় করতে হয়। নামায-রোযায় ক্বাজা আছে। কিন্তু জ্ঞানার্জনের গাফলতিতে ক্বাজা নেই, তখন বাঁচতে হয় অজ্ঞতার অভিশাপ নিয়ে। ফলে ইসলামের গৌরব যুগে ইসলাম কবুলের সাথে কোর’আন বুঝাটিও গুরুত্ব পেত। এটিকে তাঁরা অপরিহার্য ভাবতেন। সেদিন কোর’আনের এ ভাষা নবদীক্ষিত মুসলিমদের আত্মায় পুষ্টি জোগাতে পাইপ লাইনের কাজ করেছিল। এ ভাষাটির মাধ্যমে ব্যক্তি সংযোগ পেয়েছিল মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত জ্ঞানের বিশাল মহাসমূদ্রের সাথে। ফলে সেদিন পুষ্টি পেয়েছিল তাদের আত্মা ও বিবেক। ফলে গড়ে উঠেছিল কোর’আনী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি। নির্মিত হয়েছিল অতি-মানবিক সভ্যতা।

অথচ আজকের মুসলিমদের ব্যর্থতা এক্ষেত্রে প্রকট। কারণ, কোর’আনের সাথে সম্পর্কহীনতার কারণে তাদের আত্মা বা রুহ সে কাঙ্খিত পুষ্টিই পায়নি। এমন সংযোগ-হীনতায় মানুষ শুধু পশু নয় বরং পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট জীবে পরিণত হয়। তখন জন্ম সূত্রে মুসলিম হলেও চেতনার ভূমিতে তখন মৃত্যু ঘটে ইসলামী চেতনার। বিলুপ্ত হয় ইসলামি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ। বাংলাদেশে দূর্নীতি, সন্ত্রাস, ব্যাভিচার ও নগ্নতার প্রসার বেড়েছে একারণেই। মানুষ চালিত হচ্ছে নিছক বেঁচে থাকার জৈবিক স্বার্থে। বিদ্যাশিক্ষায় অর্থব্যয় পরিণত হয়েছে ব্যবসায়ীক বিনিয়োগ। এরূপ অর্থপ্রাপ্তির ভাবনায় মানুষ মনযোগী হয় বিদেশী ভাষা শিক্ষায়। কারণ  এতে রয়েছে বেশী উপার্জনের সম্ভাবনা। অধিক অর্থপ্রাপ্তির লোভেই বিপুল অর্থব্যয়ে সন্তানদের বিদেশে পাঠানো হয়। ফলে ইংরেজী, ফরাশী, জাপানীসহ বহু বিদেশী ভাষাও তারা শিখছে। কিন্তু যে ভাষাটি না জানা হলে জীবনের মুল মিশনটিই অজানা থেকে যায় এবং অসম্ভব হয় মুসলিম হয়ে বেঁচে থাকা -তা নিয়ে ভ্রক্ষেপ নেই। ফলে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে মূল ফরযটিই আদায় হচ্ছে না। ফলে সম্ভব হচ্ছে না আল্লাহভীরু মোত্তাকী রূপে মুসলমানের বেড়ে উঠাটিও। আজকের মুসলমানদের এটিই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। ১৯/১২/২০২০