সেক্যুলারিস্টদের নাশকতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

যে নাশকতাটি চেতনা রাজ্যে

 ইসলামের বিরুদ্ধে সেক্যুলারিস্টদের অপরাধ বহুমুখি। তবে সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো তারা মুসলিমদের মধ্যকার প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্ববোধকে বিলুপ্ত করতে সমর্থ হয়েছে। অর্থাৎ পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা এক মুসলিমকে অপর মুসলিমের ভাই রূপে যেরূপ পরিচয় করিয়ে দিলেন –সেটিকে যে ভূলিয়ে দিয়েছে তা নয়। বরং ভাষা, বর্ণ, ভৌগলিক ভিন্নতার পরিচয়ে অন্য ভাষা, অন্য বর্ণ ও অন্যদেশে জন্ম নেয়া মুসলিমদের হত্যা করাকে তারা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে  পরিণত করেছে। অর্থাৎ ফিরিয়ে নিয়েছে ইসলামপূর্ব আদিম জাহিলিয়াতের দিকে।  মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশের বিরুদ্ধে এটিই হলো তাদের বড় বিদ্রোহ। তাই বাংলাদেশে ১৯৭১’য়ে বহু হাজার অবাঙ্গালী মুসলিমকে হত্যা করা, তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসাবাণিজ্য দখল করা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদীদের কাছে ন্যায়সঙ্গত মনে হয়েছে।

অথচ নানা ভাষা, নানা অঞ্চল ও নানা বর্ণের মুসলিমদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্রেফ নামাযে খাড়া হলে চলে না, তাকে একই রূপ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই ভূগোলে বাঁচবার অভ্যাস গড়ে তুলতে হয়। নইলে ভাষা অঞ্চল ও বর্ণের ভূ্গোল ভাঙ্গার হারাম কাজটি শুরু হয়। ৫৭টি মুসলিম দেশ তো এরূপ হারাম পথেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রশ্ন হলো, ৫৭টি মুসলিম দেশ সৃষ্টি হওয়াতে মুসলিমদের কি সামান্যতম শক্তিও বৃদ্ধি পেয়েছে। বরং যত বাড়বে মুসলিম দেশের সংখ্যা, ততই বাড়বে মুসলিম উম্মাহর দুর্বলতা। এবং তাতে আনন্দ বাড়ায় কাফের শক্তিবর্গের। এরূপ বিভক্তিতে লাভবান হয়েছে কিছু স্বার্থশিকারী ব্যক্তি  যারা পেয়েছে এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশে শাসকের আসনে বসবার সুযোগ। ফলে সৃষ্টি হয়েছে এ বিশাল শাসক শ্রেণী। শত্রু শক্তির কাজ হয়েছে এ বিভক্ত মানচিত্রকে দীর্ঘ আয়ু দেয়া। আর এ কাজে বিপুল সংখ্যক মুসলিম পরিণত হয়েছে শত্রু শক্তির জোগালদারে।

দেয়ালের সিমেন্ট খুলে নিলে সে দেয়াল ধ্বসাতে শক্তি লাগে না। ঝড়ো বাতাসে বা বৃষ্টির পানিতেই তা ধ্বসে যায়। জাতীয় জীবনে তেমনই একটা অবস্থার সৃষ্টি হয় একতার অভাবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে “বুনিয়ানুন মারসুস” অর্থ সীসাঢালা দেয়াল বলেছেন। সে দেয়ালের সিমেন্ট হল, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব। মুসলিম হওয়ার অর্থই হল, সে ভাতৃত্বের বন্ধনকে নিজ গলায় পড়িয়ে নেয়া। এটিই মুসলিম উম্মাহর সিমেন্ট। জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টগণ মুসলিম জীবন থেকে সে সিমেন্টই খুলে নিয়েছে। ফলে মুসলিম উম্মাহকে ৫৭টি টুকরোয় বিভক্ত করতে কোন হালাকু-চেঙ্গিজ, ক্লাইভ বা ক্রসেডারদের রক্তক্ষয়ী লড়াই লড়তে হয়নি। সে কাজটি নিজ খরচে করে দিয়েছে ভিতরের এ সেক্যুলারিস্ট শত্রুরা। খুনি বা ডাকাতেরা যেমন নিজেদের অতি জঘন্য অপরাধগুলি নিয়ে উৎসবও করে, তেমনি অবস্থা মুসলিম নামধারি এসব অপরাধীদের। অথচ পবিত্র কোরআনের কোন একটি আয়াত এবং নবীজী (সাঃ)র কোন একটি হাদীসও এমন পাওয়া যাবে যা মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি গড়াকে সমর্থণ করে? বরং নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “আল্লাহর রশিকে শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরো, এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না।” অর্থাৎ ইসলামে বিধান হলো, একতা গড়া ফরজ এবং বিভক্তি গড়া হারাম। অথচ মুসলিম বিশ্বে ‘এ কোর’আনী নির্দেশের বিপরীতটি ঘটছে –এবং সেটি মুসলিমদের হাতে। ঐক্য গড়ার বদলে বিভক্ত ভূগোল গড়ার দিনগুলি মুসলিম দেশগুলিতে উৎসবের দিনে পরিণত হয়েছে।

একটি কাঁচের পাত্র ভাঙ্গলেও তা নিয়ে দুঃখ হয়। অথচ তার মূল্য কতটুকু? অথচ বৃহৎ ভূগোলের গুরুত্ব অপরিসীম। ভূগোলই নির্ধারণ করে বিশ্ববাসীর সামনে দেশবাসির ইজ্জত, গুরুত্ব ও শক্তি-সামর্থ্য। নির্ধারণ করে, দেশটি স্বাধীন দেশ রূপে আদৌ টিকে থাকবে কি না সে বিষয়টিও। ভূগোল যতই ছোট হতে থাকে ততই কমতে থাকে শক্তি-সামর্থ্য, স্বাধীনতা ও ইজ্জত। ভূগোলের গুরুত্ব এতোই অধিক যে এক ইঞ্চি ভূগোল বাড়াতে হলেও প্রচণ্ড যুদ্ধ লড়তে হয়। মানব জাতির ইতিহাস তো ভূগোল বাড়ানো বা কমানোর ইতিহাস। তাই যারা ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে চায় তারা ভূগোল ছোট করায় নয়, মনযোগী হয় সেটি বাড়াতে। নবীজী (সাঃ) তাই রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সটান্টিনোপল দখলের নসিহত করে যান। কারণ, তিনি চাইতেন মুসলিমগণ বেড়ে উঠুক বিশ্বশক্তির মর্যাদা। উসমানিয়া খেলাফতের বিশাল ভূগোল গড়তে বহু লক্ষ মুসলিমের রক্ত ব্যয় হয়েছিল। সে রক্ত ব্যয়ে ৬-৭ শত বছর যাবত শুধু ইজ্জতই বাঁচেনি, লক্ষ লক্ষ মুসলিমের জীবনও বেঁচেছিল। এবং শত শত বছর ধরে বেঁচেছিল শতকোটি মুসলিমের স্বাধীনতা। কিন্তু সে ভূগোল না বাঁচায় আজ মুসলিমদের জীবন যেমন বাঁচছে না তেমনি স্বাধীনতা এবং ইজ্জতও বাঁচছে না। ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন, বসনিয়া, চেচনিয়া, কসভো, লিবিয়া, আলজিরিয়ার ন্যায় দেশগুলি যে রক্তপাত -তা তো সে ভূগোল না বাঁচারই ফল। পৌত্তলিক হিন্দুরা একতার সে বল বুঝে, তাই ভারতের নানা ভাষাভাষি হিন্দুরা বিশাল ভূগোলের ভারতকে জন্ম দিয়েছে। অথচ ১৫০ কোটি মুসলিমগণ ভারতের সিকি ভাগ আয়োতনের একটি মুসলিম দেশেরও জন্ম দিতে পারিনি। বিশ্বের সর্ববৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠির বসবাস ভারতে হলে কি হবে, সে বৃহৎ ভূগোলের বলেই ভারত আজ বিশ্বরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ১৯৪৭’য়ের পূর্বে ভারতের মুসলিমগণ তেমন একটি বৃহৎ ভূগোলের গুরুত্ব বুঝেছিল। ফলে বাঙালী, পাঞ্জাবী, বিহারী, গুজরাতী, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ ও নানা ভাষাভাষী মুসলিমগণ মিলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু সেটি ভারতের পৌত্তলিক কাফেরদের যেমন ভাল লাগেনি, তেমনি ভাল লাগেনি তাদের সেবাদাস শেখ মুজিব ও তার অনুসারি বাঙালী কাপালিকদের। ফলে তারা যৌথ ভাবে সে বৃহৎ ভূগোলের বিনাশে যুদ্ধ শুরু করে এবং ১৯৭১’য়ের  ১৬ই ডিসেম্বর সে কাজে সফলও হয়।       

 

 যে রোগ গোপন থাকে না

কোন কিছুতে পচন ধরলে সেটি গোপন থাকে না। প্রকাশ পায় উৎকট দুর্গন্ধ থেকে। তেমনি ঈমানের পচনও গোপন থাকে না। কে মুসলিম আর কে অমুসলিম, কে ঈমানদার আর কে বেঈমান -সেটি তাই নানা ভাবে প্রকাশ পায়। ব্যক্তির ঈমান ও বেঈমানীর প্রকাশটি ঘটে ব্যক্তির কথাবার্তা, চাল­চলন, খাদ্য-পানীয়, ধর্মকর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে। তবে সবচেয়ে বেশী ধরা পড়ে রাজনীতিতে। কারণ রাজনীতিতে মেরুকরণ শুরু হলে প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ মেরুতে গিয়ে হাজির হয় –লোহার গুড়া যেমন চম্বুকের দুইপ্রান্তে জড়ো হয়। রাজনীতিতে একেই বলে পোলারাইজেশন। এরূপ পোলারাইজেশনে কেউ তার চিন্তাচেতনার অতি কাছের লোকটিকে খুঁজে নিতে ভূল করে না। একাত্তরে তাই কদাচিৎ দুয়েকজন বাদে সকল বামপন্থি, সকল বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্ট, সকল অমুসলিম দিল্লিমুখি হয়েছিল। দিল্লির কাফের শাসক চক্রই তাদের চেতনা ও দর্শনের অতি কাছের আত্মীয় মনে হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বহু ইসলামি দল ছিল, বহু লক্ষ ছিল তাদের সমর্থক ও কর্মী্। ছিল বহু হাজার মাদ্রাসা ও তার বহু লক্ষ ছাত্র ও শিক্ষক। কিন্তু তাদের কেউ কি ভারতের কোলে আশ্রয় নিয়েছিল? নেয়নি। কারণ ভারত তাদের কাছে শত্রু গণ্য হয়েছিল।

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের পর একই রূপ পোলারাইজেশন শুরু হয়েছে সমগ্র মুসলিম দেশে। প্রতিটি মুসলিম দেশের নাগরিক এখন দ্বি-জাতিতে বিভক্ত; একটি ইসলামের পক্ষের, অপরটি বিপক্ষের। সেক্যুলারিস্টগণ সমবেত হয়েছে মার্কিনী শিবিরে। একাত্তরে বাংলাদেশে যারা ভারতমুখি হয়েছিল তারাই এখন মার্কিনমুখি। ভারত নিজেও এখন মার্কিনীদের পার্টনার। নবীজী (সাঃ)র আমলেও প্রচণ্ড মেরুকরণ হয়েছিল। সে মেরুকরণে মুনাফিকগণ মক্কার মুশরিক ও মদিনার ইহুদীদের সাথে গিয়ে মিশেছিল। মুনাফিকদের মুনাফেকি তাই ধরা পড়েছিল কবরে যাওয়ার আগেই। অথচ তারা বহুদিন ধরে বহু ওয়াক্ত নামায খোদ নবীজী(সাঃ)র পিছনে মসজিদে নববীতে পড়েছিল।

ইসলাম কবুলের কাজটি কখনোই গোপনে হয়না। মানব জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। এ ঘোষণার মাধ্যমে ব্যক্তি জানিয়ে দেয়া হয় সে কোনপক্ষে লড়বে। ইসলাম কবুলের ঘোষণাটি জনসম্মুখে দেয়াটি শুধু ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয, আইনগত বাধ্যবাধকতাও। রণাঙ্গণে প্রতিটি সৈনিককে তার নিজ নিজ পোষাক নিয়ে হাজির হতে হয় –নইলে কে শত্রুপক্ষের এবং কে নিজপক্ষের সেটি চেনা যাবে কেমনে? ঈমানদারকেও তেমনি রণাঙ্গণে নিজের ঈমানের ঘোষণা দিয়ে ময়দানে নামতে হয়। এ ঘোষনাটি না দিলে কে মুসলিম আর কে অমুসলিম -সেটি চেনা যাবে কীরূপে? অজানা ও অচেনা মানুষদের নিয়ে বিশুদ্ধ মুসলিম সমাজ, মুসলিম জামায়াত, মুসলিম রাষ্ট্র, মুসলিম আর্মিই বা গড়ে তোলা যাবে কি করে? মুসলিমদের উপর শরিয়তের প্রয়োগই বা হবে কীরূপে? সেনাবাহিনীর দায়িত্ব তো তার উপরই বর্তায় যে সেনাবাহিনীর সদস্য, সে দায়িত্ব পালনে অবহেলায় কোর্টমার্শালের বিধান তো রাস্তার লোকের উপর প্রয়োগ হতে পারে না। কারা সে বাহিনীর সদস্য -সে পরিচয়টি জানা তাই জরুরী। সে পরিচয়য়টি জানা শুধু জামায়াতে ইমাম নিয়োগের ক্ষেত্রেই জরুরী নয়, জরুরী হলো রাষ্ট্রের ইমাম বা আমির নির্বাচনের ক্ষেত্রেও্।

পবিত্র কোর’আনে মুসলিমদের বলা হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার দল তথা হিজবুল্লাহর সদস্য। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায় এবং আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ে। তাই মুসলিম হওয়ার অর্থ, অন্য ধর্ম, অন্য দল ও অন্য আদর্শ ছেড়ে তখন একমাত্র আল্লাহর দলে শামিল হওয়া। এবং আল্লাহর রাস্তায় আমৃত্যু লড়াইয়ে লেগে যাওয়া। তাই কোন অমুসলিম যখন মুসলিম হয় তখন ইসলাম কবুলের সে ঘোষণাটিকে জনসম্মুখে দেয়া বা নিজের নাম পবিবর্তনটিই একমাত্র শর্ত নয়, বরং শর্ত হলো সাবেক দলটি ত্যাগ করা এবং হিজবুল্লাহর সৈনিক রূপে নতুন দায়ভারটি কাঁধে নেয়া। সে দায়ভারটি হলো, প্রতিটি লড়াইয়ে ইসলামের পক্ষ নেয়া এবং শত্রুর বিনাশে নিজের জান, মাল ও শ্রমের বিনিয়োগ করা। ঈমানদারের জন্য এজন্যই অসম্ভব হয় ইসলামে অঙ্গিকারহীন তথা সেক্যুলার হ্‌ওয়া। এবং অসম্ভব হয় জাতীয়তাবাদী বা সমাজবাদী হওয়া। এবং অসম্ভব হয় সাম্রাজ্যবাদীদের বা পৌত্তলিক কাফেরদের বন্ধু হওয়া।

 

 ভিতরের শত্রু

 এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই –এ বিশেষ খেতাবটি মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া। এবং ঘোষিত হয়েছে সুরা হুজরাতে। ফলে যার মধ্যে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে সে কখনোই মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া এ খেতাবটির মর্যাদা রক্ষায় ভূল করে না। নইলে মর্যাদাহানী হয় মহান আল্লাহতায়ালার। সৈনিকেরা যেমন অন্য সৈনিকদের সাথে কাধে কাঁধ মিলিয়ে একই রণাঙ্গনে ও একই বাংকারে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে, মুসলিমও তাই তার অপর মুসলিম ভাইয়ের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে। ইসলামের গৌরব কালে আরব, কুর্দি, তুর্কি, মুর –ইত্যাদি নানা বর্ণের মানুষ একত্রে লড়েছিল বলেই তো সেদিন মুসলিমদের হাতে বিজয়ের পর বিজয় এসেছিল। অপর দিকে পরাজয় বাড়িয়েছে অনৈক্য। লড়াইয়ের ময়দানে যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, সে মূলতঃ বিচ্ছিন্ন হয় ইসলাম থেকেও। যুদ্ধ বিগ্রহ তো এভাবেই সমাজের বুকে ফিল্টারের কাজ করে -যা বেঈমানদের থেকে ঈমানদারদের পৃথক করে।  ওহুদের যুদ্ধে তো সেটাই হয়েছিল। একারণেই কারা ইসলামের পক্ষে এবং কারা বিপক্ষে -সেটি গোপন থাকা বা গোপন রাখার বিষয় নয়। মুসলিম রূপে বাঁচার জন্য অপরিহার্যতা হলো নিজের ঈমানদারীকে রাজনীতি, সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে প্রকাশ করা। মুসলিম জীবনে তাই নিরপেক্ষ থাকার কোন হেতু নাই।  

নবীজী(সাঃ)’র যুগে নিজেকে মুসলিম রূপে ঘোষণা দেয়ার বিপদটা ছিল অতি ভয়ানক। কাফেরগণ এমন ঘোষণাকারিকে শুধু ধর্মের জন্যই নয়, নিজেদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধেও হুমকি ভাবতো, ফলে তার প্রাণ নিতে উদ্যত হতো। ফলে তার উপর নেমে আসতো সীমাহীন অত্যাচার। ইসলাম কবুলের ঘোষণা দেয়ার কারণে হযরত সুমাইয়া (রাঃ) ও তার স্বামী হযরত ইয়াসের (রাঃ)কে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। হযরত খাব্বাব (রাঃ)কে জলন্ত অঙ্গারের উপর শুইয়ে দেয়া হয়েছিল। প্রচণ্ড দুপুরে তপ্ত বালির উপর শুইয়ে দেয়া হতো হযরত বেলাল (রাঃ)কে। এমন অবর্ণনীয় বিপদ বহু সাহাবীর জীবনে নেমে এসেছিল। তিনটি বছর তাদেরকে অবরুদ্ধ থাকতে হয়েছে শেবে আবু তালেবে। নবীজী(সাঃ)’র জীবনে সে সময়টিই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাল। খাদ্যের অভাবে তাদের গাছের পাতাও খেতে হয়েছে। এরূপ নির্যাতনও যখন তাদেরকে ইসলামের পথ থেকে ফিরাতে পারিনি। তখন খোদ নবীজী (সাঃ)সহ তাদের সবাইকে নির্মূলেরও চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এত বিপদর পরও মুসলিমগণ তাদের ঈমান গোপন রাখেননি। তারা যে মুসলিম সেটির স্বাক্ষ্য দিয়েছেন নিজেদের কথা ও কর্মের মাধ্যমে। তাই সেদিন কে কাফের আর কে মুসলিম -সেটি গোপন থাকেনি। গোপন থাকেনি মুনাফিকদের পরিচয়ও। তাই ইসলামের শত্রুদের বেঈমানীটি জানার জন্য সে কালের মুসলিমদের কিয়ামত অবধি অপেক্ষা করতে হয়নি।

মলমুত্র বা দেহের বর্জ সর্বদেহে ছড়িয়ে পড়লে মৃত্যু অনিবার্য হয় । তাই বাঁচার স্বার্থে খাদ্য গ্রহণ যেমন জরুরী, তেমনি জরুরী হলো, বর্জ বা মলমুত্র পরিত্যাগ করাটিও। মুসলিম সমাজে সে ক্ষতিকর বর্জ হলো মুনাফিকগণ। আজকের সংকটের মূল কারণ হলো এরা। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবাদের যুগে মুসলিম সমাজ থেকে সে বর্জগুলি নিয়মিত পরিত্যক্ত হয়েছিল বলেই মুসলিম সমাজ সুস্বাস্থ্য পেয়েছিল এবং সম্ভব হয়েছিল সর্বশ্রেষ্ঠ  সভ্যতার নির্মান। কিন্তু আজকের সমস্যটি হলো, বিপুল বর্জ জমেছে মুসলিম দেহে। ফলে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখা বা ইসলামের বিজয় প্রতিহত করাই যাদের ঘোষিত রাজনীতি –এমন শত্রুগণও মুসলিম দেশে নেতা নির্বাচিত হয়। এভাবেই শত্রুর হাতে অধিকৃত হয় মুসলিম দেশ। ইসলামের পরাজয়ে তখন কি প্রয়োজন পড়ে বাইরের শক্তির? চিহ্নিত বিদেশী কাফের শত্রুদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে মুসলিম নামধারী এসব দেশী শত্রুগণ।

 

নায়ক সবচেয়ে বড় অপরাধের

বিগত ১৪শত বছরে ইতিহাসে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় বড় ক্ষতিগুলি হয়েছে বিগত একশত বছরে। এই একশত বছরেই মুসলিম ভূখন্ড সবচেয়ে বেশী খণ্ডিত হয়েছে এবং সবচেয়ে বেশী রক্তাত্ব হয়েছে। সে সাথে শক্তিহীনও হয়েছে। বিলুপ্ত হয়েছে মুসলিমদের সিভিলাইজেশনাল স্টেট। বাংলার মাটিতে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর হাতে মুসলিমদের প্রথম বিজয় এসেছিল ১২০২ সালে। কিন্তু এ বাঙলায় বিগত ৮০০ বছরে নানা যুদ্ধ বিগ্রহে মুসলিমদের যত রক্ত ঝরেছে তার বহু গুণ বেশী রক্ত ঝরেছে একমাত্র একাত্তরে। তেমনি কাশ্মিরে বিগত ৮০০ বছরেও কোন কালেই এত রক্তপাত ঘটেনি যা ঝরেছে বিগত ৭০ বছরে। এক লক্ষ কাশ্মিরীকে হত্যা করা হয়েছে। একই রূপ অবস্থা ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, আলজিরিয়াসহ প্রতিটি মুসলিম দেশে।

 

এসব রক্তপাতের জন্য যতটা বিদেশী ও বিধর্মীরা দায়ী -তার চেয়ে বেশী দায়ী মুসলিম নামধারী জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিষ্টগণ। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে আধুনিক কালে সবচেয়ে বড় অপরাধগুলি ঘটেছে তাদের হাতেই। অন্যরা মুসলিমদের সম্পদ লুন্ঠন করছে, আর এরা লুন্ঠন করেছে ঈমান। ফলে সহজ করেছে জাহান্নামের পথে চলা। তাদের কারণে মুসলিমগণ যে হিন্দু, খৃষ্টান বা অন্য কোন ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে -তা নয়। বরং তারা মুসলিম চেতনা থেকে ইসলামের মৌল বিশ্বাসকেই হঠিয়ে দিয়েছে। ইংরাজীতে একে্‌ই বলা হয় ডি-ইসলামাইজেশন। এর অর্থঃ ইসলাম থেকে দূরে সরা তথা চেতনাকে ইসলামশূণ্য করা। সেটি যেমন ইসলামের মৌল বিশ্বাস থেকে দূরে সরা, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের মিশন থেকে দূরে সরা। এরূপ দূরে সরার কারণে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির পক্ষে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে নেওয়ায় কাজটি অতি সহজ হয়ে গেছে। ফলে মুসলিমগণ পরিণত হয়েছে নিজ দেশের পরাধীন নাগরিকে। এবং ইসলামের মূল মিশন মুসলিমদের কাছেই অপরিচিত রয়ে গেছে। মুসলিম জীবনে এর চেয়ে ভয়ানক বিপদ  আর কি হতে পারে? ২৮/১১/২০২০।




বাংলা সাহিত্যে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও নাশকতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

হাতিয়ার সাংস্কৃতিক যুদ্ধের

সমগ্র ভারত মাঝে ইসলামের প্রসার সবচেয়ে দ্রুত ঘটেছিল বাংলায়। এরই ফল হলো, বিশ্বের আর কোন দেশে এতো ক্ষুদ্র ভৌগলিক সীমানার মধ্যে এতো মুসলিমের বসবাস নাই যা বাস করে বাংলায়। তবে ইসলামের প্রসার রোধে ইসলামের শত্রুরা কোন কালেই বসে থাকেনি। যেমন আজ নয়, তেমনি অতীতেও ছিল না। অতীতে মুসলিমদের বিজয় রোধে তাদের সামরিক সামর্থ্য ছিল না, তবে সামর্থ্য ছিল ভাষা ও সাহিত্যের অঙ্গণে। ভাষা ও সাহিত্য পরিণত হয় ইসলামে বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক যুদ্ধের হাতিয়ারে। ইসলামের যখন দ্রুত প্রসার ঘটছিল তখন সে প্রসার ঠেকাতে ময়দানে নামে শ্রী চৈতন্য দেব ও তাঁর সাথীরা বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে। গীর্জায় ভক্তিমূলক গানের মধ্যে বেঁচে আছে খৃষ্টান ধর্ম। তেমনি ভক্তিমূলক বৈষ্ণব গানের মধ্যে হিন্দু ধর্মও যেন নতুন প্রাণ পায়। বৈষ্ণব সন্যাসীরা তাদের ভাববাদী গান নিয়ে বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতো, আর তাদের ঘিরে জমা হত গ্রামের হিন্দু নর-নারীরা। গানের মাঝে তারা ধর্ম খুঁজে পায়। শ্রী চৈতন্য দেব ও তার শিষ্যরা এ ভাবে আবির্ভূত হয়েছিল এক সংগঠিত শক্তি রূপে, হিন্দু ধর্মের অনুসারিদের  মনে যোগ করছিল এক নতুন আধ্যাত্মীকতা। কোথাও কোথাও তারা মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও গড়ে তোলে। তাদের কারণেই স্তিমিত হয়ে যায় বাংলায় ইসলামের প্রসার, যা পরবর্তীতে দারুন ভাবে প্রভাবিত করে বাংলার পরবর্তী মানচিত্র ও রাজনীতি। বলা যায়, বৈষ্ণব সাহিত্যির ফলেই বাংলার পশ্চিম অংশের জনগণের অধিকাংশই হিন্দু থেকে গেছে। ফলে ধর্মীয় ভাবে বাংলা বিভক্ত থেকে গেছে সেদিন থেকেই। বাংলার ভূগোলের সবচেয়ে দুর্বলতা এই ধর্মীয় এবং ভৌগলিক বিভক্তি। ফলে আরব, ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান যেরূপ মুসলমানদের অখণ্ড মানচিত্র রূপে গড়ে উঠে, নির্মাণ করে শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র -সেটি বিভক্ত বাংলাদেশে সম্ভব হয়নি। এভাবেই রহিত হয়ে যায় বিশ্বের মানচিত্রে একটি মুসলিম শক্তিশালী রাষ্ট্র রূপে বাংলাদেশের উত্থান। কারণ শক্তিশালী রাষ্ট্রের নির্মাণে শুধু জনশক্তিই জরুরী নয়, অপরিহার্য হল বৃহৎ ভূগোলের বল।     

তবে বাংলাদেশের মুসলিমদের বিপদ শুধু শ্রী চৈতন্য ও তাঁর আমলের বৈষ্ণব পদাবলী নয়। বাংলা সাহিত্যকে ঘিরে নানা প্রকল্প কাজ করছে মুসলিমদের চেতনা বিনাশে। বাংলার মুসলিমদের বড় ব্যর্থতা হলো বাংলা ভাষাকে যেমন তারা শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের ভাষা রূপে যথার্থ ভাগে গড়ে তুলতে পারিনি, তেমনি বাড়াতে পারিনি আরবী, ফার্সী বা উর্দুর ন্যায় অন্যান্য সমৃদ্ধ ভাষা থেকে শিক্ষা লাভের সামর্থ্য। মানুষ তার দেহের পুষ্টি বাড়াতে নানা হাটের নানা দোকান থেকে নানা দেশের খাদ্য ক্রয় করে। তেমনি মনের বা ঈমানের পুষ্টিবাড়াতে নানা ভাষার নানা বই পড়তে হয়। মুসলিম শাসনামলে, এমন কি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলেও আলেম-উলামা বা শিক্ষিত বাঙালী মুসলিমদের কাছে শিক্ষা,সংস্কৃতি ও ধর্মের ভাষা ছিল আরবী, ফার্সি বা উর্দু। কিন্তু আরবী, ফারসী ও উর্দুর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে অনেক আগেই। ফলে দিন দিন অপুষ্টি বেড়েছে বাঙালী মুসলিমের চেতনায়। অবস্থা দিন দিন আরো ভয়ানক হচ্ছে। শতবছর আগেও একজন বাঙালী মুসলিমের পক্ষে সেক্যুলার বা জাতীয়তাবাদী হওয়া অসম্ভব ছিল। মুর্তিপূজার ন্যায় সেটিকে কুফরী বা হারাম মনে করত। সে সময় আলেম বা শিক্ষিত বাঙালী মুসলিম মাত্রই ছিল প্যান-ইসলামী। তখন তাদের কাছে পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধি, বিহারী, গুজরাতী ও অন্যান্য অবাঙালী মুসলিমগণ শত্রু মনে হয়নি, বরং তাদেরকে তারা ভাই রূপে গ্রহণ করেছে। তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নেমেছে। ১৯৪৭ সালে হিন্দু ও ব্রিটিশদের প্রবল বাধার মুখে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তো তেমনি এক প্রেক্ষাপটে। অথচ আজ সেটি কল্পনা করাও অসম্ভব। ভাষার নামে সবচেয়ে বড় নাশকতাটি ঘটেছে তাই চেতনার ভূমিতে। মাত্র ৫০ বছর আগেও একজন বাঙালী মুসলিমের পক্ষে গেরুয়া ধুতি পরে মঙ্গল প্রদীপ হাতে নিয়ে মিছিল করা অচিন্তনীয় ছিল। অসম্ভব ছিল থার্টি ফাস্ট নাইট বা ভ্যালেন্টাইন দিবস পালনে রাস্তায় নামা। অসম্ভব ছিল একজন পল্লির বধুর পক্ষে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাছ পাহাড়া দেয়া বা সূদ খাওয়া। কিন্তু এমন গর্হিত তথা হারাম কর্ম এখন অহরহ হচ্ছে। বরং এসবই পরিণত করা হচ্ছে বাংলাদেশীদের সংস্কৃতিতে। 

                                                            

দৈন্যতাটি জ্ঞানের

শিক্ষাহীন, জ্ঞানহীন ও চিন্তাভাবনাহীন মানুষের পক্ষেও সুস্থ্য দেহ নিয়ে শত বছর বাঁচা সম্ভব, কিন্তু সেরূপ শূণ্যতা নিয়ে মুসলিম রূপে একদিন বাঁচাও সম্ভব নয়। এমন জ্ঞানহীন মানুষের পক্ষে মুসলিম হওয়াই অসম্ভব। সেটি যে কতটা অসম্ভব সেটিই সুস্পষ্ট করেছেন মহান আল্লাহতায়ালা নিজে। সেটি পবিত্র কোর’আনে তাঁর নিজের ঘোষণায়, “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল ওলামা” অর্থঃ একমাত্র জ্ঞানবান ব্যক্তিগণই আমাকে ভয় করে। অর্থাৎ একমাত্র জ্ঞানবান মানুষগণই প্রকৃত মুসলিম হয়। ফলে মুসলিম হওয়ার জন্য জ্ঞানবান হওয়াটি অপরিহার্য। তাই নামায রোযার পূর্বে ফরয করা হয়েছে জ্ঞানার্জন, এবং সেটি প্রতিটি মুসলমান নর-নারী উপর। পবিত্র কোর’আনের প্রথম শব্দটি তাই নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত নয় বরং ‘ইকরা’ অর্থ ‘পড়’। তাই যেখানেই মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্রের পত্তন ঘটবে সেখানে শুধু কৃষি, শিল্প ও ব্যাবসা-বাণিজ্যই গড়ে উঠবে না, গড়ে উঠবে জ্ঞান-বিজ্ঞানও। তাই মুসলিম সমাজে শুধু মসজিদই গড়ে উঠে না, গড়ে উঠে বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরী। গড়ে উঠে সৃষ্টিশীল সাহিত্য, সমৃদ্ধ হয় ভাষা। তখন বিদ্যাদানের সে ফরয কাজটি শুধু বিদ্যালয়ে চলে না, লাগাতর চলে বিদ্যালয়ের বাইরেও। মসজিদ-মাদ্রাসার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে পরিণত হয় প্রতিটি গৃহও। কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। এক্ষেত্রে বাংলাভাষার দৈন্যতাটি বিশাল। বালাভাষী মুসলিমদের সংখ্যা ইরানী ও তুর্কীদের চেয়ে বেশী। সংখ্যায় আরব, ইন্দোনেশিয়ান ও পাকিস্তানী মুসলিমদের পরই তাদের অবস্থান। কিন্তু বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার বাড়লেও বাংলা ভাষায় ইসলামী জ্ঞানের চর্চা তেমন বাড়েনি। অথচ সাহিত্য ও জ্ঞানের রাজ্যে বিপ্লব না এলে কি রাজনৈতিক শক্তি বাড়ে? নির্মিত হয় কি সভ্যতা?

বাঙালী মুসলিমদের সাহিত্য-সংকট আজকের নয়, শুরু থেকেই। মুসলিম শাসনের আগে বাংলার শাসক ছিল সেন রাজবংশ। তাদের আগমন ঘটেছিল ভারতের কর্ণাটক থেকে। বাংলা ভাষার চর্চা নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা ছিল না। বরং বাংলা ভাষা ছিল তাদের ঘৃনার শিকার। হিন্দু ব্রাহ্মণগণ এ ভাষাকে এক সময় পক্ষিভাষা বলত। ফলে তাদের আমলে বাংলা সাহিত্যে কোন উন্নয়ন ঘটেনি। বাংলাদেশের স্বাধীন সুলতানেরা প্রথম শুরু করে বাংলা ভাষার পরিচর্যা। তবে সেটি যতটা না ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে, তার চেয়ে বেশী ছিল রাজনৈতিক প্রয়োজনে। তাদের লক্ষ্য ছিল, বাংলাদেশসহ ভারতের পূর্ব ভাগে দিল্লির প্রভাব মূক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের নির্মাণ। শাসকগণ নিজেরা ছিলেন অবাঙালী, তাদের পরিবারে ভাষা ছিল ফার্সী। রাষ্ট্র পরিচালনা ভাষাও ছিল ফার্সী। সে সময় দিল্লির শাসকগণ ছিল মুসলিম, তাদের ভাষাও ছিল ফার্সী। ফলে দিল্লি থেকে পৃথক ভূগোলের নির্মাণের স্বার্থে প্রজাদের মাঝে একটি পৃথক ভাষাভিত্তিক দেয়াল খাড়া করাকে তারা জরুরী মনে করে। তাদের কাছে রাজনৈতিক প্রয়োজনটি বড় হওয়ার কারণে গুরুত্ব হারায় মুসলিমদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রয়োজনে আরবী, ফার্সী বা বাংলা ভাষার উন্নয়ন। অথচ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রয়োজনটি গুরুত্ব পেলে কয়েক শত বছরের মুসলিম শাসনে অন্ততঃ বাংলা ভাষায় কিছু ধর্মীয় পুস্তক রচনা বা অনুবাদের ব্যবস্থা নেয়া হত। কিন্তু সেটি হয়নি। বরং সে লক্ষে যা কিছু হয়েছে তা বেসরকারি ভাবে। এবং অতি সীমিত ভাবে।     ভা    

                                           

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিম বিদ্বেষ

 লক্ষণীয় হল, মুসলিমগণ যখন বাংলা ভাষাকে নিজেদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ভাষা রূপে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছিল তখন হিন্দুরা অনুধাবন করে ভাষার গুরুত্ব। বিশেষ করে দ্রুত-প্রসারমান ইসলামের প্রতিরোধে। এ ভাষাকে তারা একদিকে যেমন গড়ে তোলে নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতির ভাষা রূপে, তেমনি ব্যবহার করে প্রতিবেশী মুসলিমদের ইসলামী চেতনা বিনাশের লক্ষ্যে। হিন্দুদের রচিত সাহিত্যের মাধ্যমে বাংলার হিন্দুদের মাঝে যে রেনেসাঁর সূত্রপাত হয় তা আদৌ সেক্যুলার ছিল না। বরং তাতে ছিল প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক ও মুসলিম বিদ্বেষী চরিত্র। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল, দ্বীনবন্ধু মিত্র, রবীন্দনাথ ও শরৎচন্দ্রের মত যেসব ব্যক্তিবর্গ সে রেনাসাঁ আন্দোলনের নেতা ছিলেন -তারা ছিলেন মনে প্রাণে হিন্দু। তারা হিন্দুদের জাগরণ বা রেনেসাঁকে দেখতেন হিন্দু রূপে বেড়ে উঠার মধ্য দিয়ে। হিন্দুত্বের বাইরে কোন আন্দোলনকে তারা হিন্দুর জাগরণ রূপে দেখতেন না। তাছাড়া তারা সেটিকে দেখতেন অখণ্ড ভারতে বাঙালী হিন্দুদের একীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে। সে আমলেই আসে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ। বাংলা সাহিত্যে আসে তখন নতুন জোয়ার। হিন্দুদের এ জাগরণে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের সহায়তাও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্র ভাষা ছিল ফারসী। কিন্তু সেটি উচ্ছেদ করে ইংরেজীর প্রচলন করা হয়। আর এতে সরকারি খাতায় রাতারাতি নিরক্ষরে পরিণত হয় আরবী-ফারসী ভাষায় শিক্ষিত মুসলিমগণ। অপর দিকে হিন্দুগণ ইংরেজী শিখে ইংরেজ শাসনের দক্ষ কলাবেরটরে পরিণত হয়। এবং লাভ করতে থাকে নানারূপ সরকারি সুযোগ সুবিধাও। বঙ্কিম চন্দ্র ছিলেন তাদেরই একজন। ইংরেজী সাহিত্যের ধাঁচে তারাই বাংলা সাহিত্যে পদ্য ও গদ্য রচনা শুরু করেন।

আর বাংলা সাহিত্যের হিন্দু-রেনাসাঁর বাণীটি প্রবল ভাবে ফুঠে উঠে বাঙালী হিন্দুদের রাজনীতিতেও। হিন্দু রেনেসাঁ আন্দোলনের নেতাদের হাতেই তখন ভারতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব। ভারতীয় কংগ্রেস নিজেকে অসাম্প্রদায়িক সংগঠনের দাবী করলেও সেটি যে কতটা ধোকাবাজী ছিল, সেটিও সেদিন গোপন থাকেনি। তখন কংগ্রেসের নেতা ছিলেন স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। ১৮৯৫ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর তিনি পুনায় আমন্ত্রিত হন শিবাজী স্মৃতিসভায়। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেন, “মহোদয়গণ, এখানে এই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে (দেয়ালে টাঙ্গানো শিবাজী ছবি দেখিয়ে) আমরা কি তাঁর জীবন থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারি না? এই আন্দোলনের প্রতি আমার উষ্ণতম সমর্থন ও সহানুভুতি আছে। সমগ্র ভারতের সহানুভুতি আছে। আমি জানি শিবাজী বার বার বঙ্গদেশে হামলা করেছিলেন, তাঁর বাহিনী আমাদের সম্পদ লুট করেছে, আমাদের মন্দির ও গৃহদেবতা ধ্বংস করেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ করছি যে, ইংরেজদের সভ্যতা সূচক শাসনে আমরা এখন অখণ্ড ভারতে পরিণত হয়েছি। একজন বাঙ্গালী হিসাবে শিবাজীর পবিত্র স্মৃতির প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।” –(সুত্র: স্পিচেস বাই দি অনারেবল বাবু সুরেন্দ্রনাথ বঙ্গোপাধ্যায়, পঞ্চম খন্ড, এস কে লাহিড়ী এন্ড কোং, কোলকাতা, ১৮৯৬, ৮৬ পৃঃ)।

রবীন্দ্রনাথের চেতনাও এক্ষেত্রে ভিন্নতর ছিল না। শিবাজী উৎসব সম্পর্কে গিরিরাজা শঙ্কর রায় চৌধুরী লিখেছেন,“তিলক প্রবর্তিত শিবাজী উৎসবে কবিতা, গল্প-উপন্যাস, গান ও নাটকে সে চেতনারই নানা ভাবে প্রকাশ ঘটে। তরঙ্গ বাংলাদেশেও আসিয়া লাগিয়াছিল। সখারাম গণেশ দেউস্কর সম্ভবত ১৯০২ সালে মারাঠার এই বীরপুজা বাংলাদেশে প্রবর্তিত করেন। তদবধি মহাসমারোহে কয়েকবার কলিকাতা ও মফস্বলে শিবাজী উৎসবের সাম্বাৎসরিক অধিবেশন হইয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ, বিপিনচন্দ্র প্রভৃতি সকলেই এই উৎসবে যোগদান করিয়াছিলেন। রবীন্দ্রনাথের শিবাজী উৎসব সম্বন্ধে কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে অমর হইয়াছে।(সূত্রঃ গিরিরাজা শঙ্কর রায় চৌধুরী, শ্রী অরবিন্দু ও বাংলার স্বদেশী যুগ, নবভারত পাবলিশার্স, কোলকাতা, পৃঃ ২৭৩)।

বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যিক হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার সাহিত্যের যেটি প্রবলতম দিক সেটি তাঁর আধুনিক হিন্দু মানস। হিন্দু রেনেসাকেঁ তিনিই শীর্ষে পৌছে দেন। তাই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের চরিত্রটি বুঝতে হলে বুঝতে হবে রবীন্দ্র-মানসকে। কিন্তু কি সে রবীন্দ্র-মানস বা রবীন্দ্র চেতনা? সে রবীন্দ্র-চেতনার পরিচয় তুলে ধরেছেন আবুল মনসুর আহমদ, যিনি নিজেও ছিলেন একজন সেক্যুলার চেতনার মানুষ। লিখেছেন,“হাজার বছর মুসলমানরা হিন্দুর সাথে একদেশে একত্রে বাস করিয়াছে। হিন্দুদের রাজা হিসেবেও, প্রজা হিসেবেও। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই হিন্দু-মুসলমানে সামাজিক ঐক্য হয় নাই। হয় নাই এই জন্য যে, হিন্দুরা চাহিত ‘আর্য-অনার্য, শক, হুন’ যেভাবে ‘মহাভারতের সাগর তীরে’ লীন হইয়াছিল মুসলমানেরাও তেমনি মহান হিন্দু সমাজে লীন হইয়া যাউক। তাদের শুধু ভারতীয় মুসলমান থাকিলে চলিবে না, হিন্দু মুসলমান’ হইতে হইবে। এটা শুধু কংগ্রেসী বা হিন্দু সভার জনতার মত ছিল না, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মত ছিল। -(সুত্রঃ আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা ১৫৮-১৫৯। রবীন্দ্রনাথের জমিদারী ছিল কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহে। এলাকার অধিকাংশ রায়তই ছিল মুসলিম। তিনি সেখানে গরু কোরবানী নিষিদ্ধ করেছিলেন, অথচ দেবী কাত্যায়নীর পুজা উপলক্ষে পনর দিনব্যাপী লাঠি খেলা ও যাত্রাভিনয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই পুজার ব্যয়ভার হিন্দু-মুসলমান সব প্রজাকে বহন করতে হতো। পনর দিনব্যাপী এই মহোৎসব অনুষ্ঠানে যে বাড়তি খরচ হতো, সে জন্য তিনি একতরফাভাবে খাজনা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলামের মত সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী লিখেছেন, “শান্তি নিকেতনে রবীন্দ্রনাথ পৌষ মেলার প্রবর্তন করেন ১৮৯৪ সালের ডিসেম্বরে। তারই অনুসরণে শিলাইদহে স্থানীয় দেবী কাত্যায়নীর পুজা উপলক্ষে ১৯০২ সালে ১৫ দিন ব্যাপী স্বদেশী মেলা প্রবর্তন করেন যেখানে লাঠি খেলা ও যাত্রাভিনয় প্রাধান্য পায়। এই মেলাতে রাখীবন্ধন ব্যবস্থাও চালু করা হয়। স্বদেশী এবং বাগ্মী কালিমোহন ঘোষকে কবি কাছে নিয়ে আসেন এই স্বদেশী মেলা উপলক্ষে। কবিগুরুর নির্দেশে তিনি সর্বক্ষণ গ্রামে গ্রামে ঘুরে শত শত যুবককে স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। -(সুত্রঃ মাযহারুল ইসলাম, কর্মযোগী রবীন্দ্রনাথঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২রা জৈষ্ঠ, ১৩৯৭।

 

হাতিয়ার ইসলামী চেতনা বিনাশের

ইসলামী চেতনা বিনাশের উপকরণ বাংলা সাহিত্যে প্রচুর। সাহিত্য কাউকে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে না। বরং ধীরে ধীরে হত্যা করে তার চেতনাকে। আর বাংলায় নিহত হচ্ছে বাঙালী মুসলিমদের ইসলামী চেতনা। এবং সেটি চলছে বহু শত বছর ধরে। সে চেতনা বিনাশী প্রকল্পের কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। মোহম্মদ কবিরউদ্দীন সরকার বহু বছর আগে বাংলার পাঠ্য পুস্তক নিয়ে তৎকালীন ‘বাসনা’ পত্রিকায় (২য় সংখ্যা, জৈষ্ঠ, ১৩১৬) লিখেছিলেন, “আজকাল বিদ্যালয়াদিতে যে সকল সাহিত্য ও ঐতিহাসিক পুস্তকাদি পঠিত হইতেছে, তাহা হিন্দু দেবদেবী, মুণি-ঋষি, সাধু-সন্নাসী, রাজা-মহারাজা, বীর-বীরাঙ্গাণা ইত্যাদির উপখ্যান ও জীবন চরিত আদিতেই পরিপূর্ণ হিন্দুর ধর্ম-কর্ম, ব্রত-অর্চনা, আচার-ব্যবহার ইত্যাদির মাহাত্ম্য বর্ণনাতেই সেই পাঠ্যগ্রন্থ অলংকৃত। মুসলমানদের পীর-অলি-দরবেশ, নবাব-বাদশাহ, পন্ডিত-ব্যবস্থাপক. বীর- সব বীরাঙ্গনাদির উপখ্যান বা জীবন-বৃত্তান্ত অথবা ইসলামের নিত্য-কর্তব্য ধর্মাধর্ম্ম ব্রত উপাসনা, খয়রাত-যাকাত ইত্যাদির মাহাত্ম্যরাজীর নামগন্ধও ঐ সকল পুস্তকে নাই, বরঞ্চ মুসলমান ধর্মের ধার্মিকদের প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষের াবই বর্ণিভাবই বর্ণিত আছে।….প্রথম বর্ণ পরিচয় কাল হইতেই আমাদের বালকগণ রামের গল্প, শ্যামের কথা, হরির কাহিনী, কৃষ্ণের চরিত্র ইত্যাদি পড়িতে থাকে। যদু-মধু, শিব-ব্রহ্মা, রাম-হরি ইত্যাদি নামেই পাঠ আরম্ভ করিতে হয়। কাজে কাজেই আমাদের সরলমতি কোমল প্রকৃতি শিশুগণ বিদ্যালয় পঠিত হিন্দুগণের উল্লিখিত বিষয়গুলোর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী হয় এবং আমাদের জাতীয় পবিত্র শাস্ত্র ও ইতিহাস উপাখ্যান ধর্ম-কর্মাদির বিষয় অপরিজ্ঞাত হইয়া থাকে।” –(সূত্রঃ মুস্তফা নুরউল ইসলামঃ সাময়িক পত্রে জীবন ও জনমত, বাংলা একাডেমী¸ ঢাকা। পৃঃ ৩০-৩১)।

ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ লিখেছিলেন,“কি পরিতাপের বিষয় আমাদের শিশুগণকে প্রথমেই রাম শ্যাম গোপালের গল্প পড়িতে হয়। সে পড়ে গোপাল বড় ভাল ছেলে। কাশেম বা আব্দুল্লাহ কেমন ছেলে সে তাহা পড়িতে পায় না। এখন হইতেই তাহার সর্বনাশের বীজ বপিত হয়। তারপর সে তাহার পাঠ্যপুস্তকে রাম-লক্ষণের কথা, কৃষ্ণার্জ্জনের কথা, সীতা-সাবিত্রির কথা, বিদ্যাসাগরের কথা, কৃষ্ণকান্তের কথা ইত্যাদি হিন্দু মহাজনদিগেরই আখ্যান পড়িতে থাকে। সম্ভবতঃ তাহার ধারণা জন্মিয়া যায়, আমরা মুসলমান ছোট জাতি, আমাদের বড় লোক নেই। এই সকল পুস্তুক দ্বারা তাহাকে জাতীয়ত্ববিহীন করা হয়। হিন্দু বালকগণ ঐ সকল পুস্তক পড়িয়া মনে করে আমাদের অপেক্ষা বড় কেহ নয়। মোসলমানরা নিতান্তই ছোট জাত। তাহাদের মধ্যে ভাল লোক জন্মিতে পারে না।” অবস্থা এতটাই গুরুতর ছিল যে মাদ্রাসাতে হিন্দুদের লেখা বই পড়ানো হতো। ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ লিখেছিলেন, “মক্তবে ও মুসলমান বালিকা বিদ্যালয়েও আমাদিগের শিশুগণকে হিন্দুর লিখিত পুস্তক পড়িতে হয়, তদপেক্ষা আর কি কলংকের কথা আছে? আমরা কি এতই  মূর্খ যে তাহাদের জন্য পুস্তক রচনা করিতে পারি না? মূল পাঠ্য ইতিহাস সম্বদ্ধে ঐ কথা। তাহাতে বুদ্ধদেবের জীবনী চার পৃষ্ঠা আর হযরত মোহম্মদ (সাঃ)এর জীবনী অর্ধপৃষ্ঠ মাত্র। অথচ ক্লাসে একটি ছাত্রও হয়তো বৌদ্ধ নহে। আর অর্ধাংশ ছাত্র মুসলমান।.. মূল পাঠ্য ইতিহাসে হিন্দু রাজাদের সম্বদ্ধে অগৌরবজনক কথা প্রায় ঢাকিয়া ফেলা হয়, আর মুসলমানদিগের বেলা ঢাকঢোল বাজাইয়া প্রকাশ করা হয়। গুণের কথা বড় একটা উল্লিখিত হয় না। ফল দাঁড়ায় এই, ভারতবর্ষের ইতিহাস পড়িয়া ছাত্ররা বুঝিল, মুসলমান নিতান্তই অপদার্থ, অবিশ্বাসী, অত্যাচারী এবং নিষ্ঠুর জাতি। পৃথিবী হইতে তাহাদের লোপ হওয়াই মঙ্গল। (সূত্রঃ আমাদের (সাহিত্যিক) দারিদ্রতা, মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আল এসলাম¸ ২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা, জৈষ্ঠ ১৩২৩, সংগ্রহে মুস্তফা নুরউল ইসলামঃ সাময়িক পত্রে জীবন ও জনমত, বাংলা একাডেমী¸ ঢাকা। পৃঃ ৩০-৩১)।

 

সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ ও সাহিত্যের নামে বিষপান

হিন্দুদের এ মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা শুধু সাহিত্যের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। সে চেতনাধারীদের হাতে অধিকৃত হয়েছিল বাংলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও। সাংবাদিক ও লেখক জনাব আবুল কালাম সামসুদ্দীন (মাসিক মোহম্মদী এবং দৈনিক পাকিস্তান) লিখেছেন, “বস্তুতঃ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় মুসলমানদের আপত্তিকর তথা হিন্দুত্বের পরিপোষক বিষয়সমুহ চালু করে বুঝাবার এই চেষ্টা চলেছিল যে, এ সবই হলো বাঙালী ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও জাতীয় বৈশিষ্ট্য। কাজেই হিন্দুদের মত মুসলমানদেরও এসবে আপত্তি করার কিছু নাই। কিছু সংখ্যক তরলমতি মুসলমান তরুণদের মনে এ প্রচরণার প্রভাব পড়ে নাই, একথা বলিতে পারি না। তাছাড়া স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মতো মনিষীও এ প্রকার উক্তি করতে দ্বিধা করেন নাই যে, মুসলমানরা ধর্মে ইসলামানুসারী হলেও জাতিতে তারা হিন্দু। কাজেই তারা ‘হিন্দু-মুসলমান’। বাঙলার শিক্ষা ক্ষেত্রে এই ‘হিন্দু-মুসলমান’ সৃষ্টির চেষ্টাই অব্যাহতগতিতে শুরু হইয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য-পুস্তকের মাধ্যমে। মুসলমান তরুণদের একশ্রেণী এ প্রচারণায় এতটা প্রভাবান্বিত হয়েছিলো যে, এদেরই গুরুস্থানীয় জনৈক চিন্তাশীল মুসলমান অধ্যাপক (কাজী আব্দুল ওদুদ) এক প্রবন্ধে নির্দ্বিধায় লিখেই ফেলেছিলেন যে এদেশী মুসলমান হচ্ছে ‘হিন্দু-মুসলমান’।-  (আবুল কালাম সামসুদ্দীন, অতীত দিনের স্মৃতী, পৃঃ ১৫০)।

রবীন্দ্র-সাহিত্যের মধ্যে যে হিন্দু সাম্প্রদায়ীকতা ও হিন্দু মানস সেটি ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের কাছে স্বভাবতই গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেটিকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য পরিল্পিত ভাবে সুগারকোট লাগানো হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে এই বলে যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অসাম্প্রদায়ীক। বলা হচ্ছে তিনি উভয় বাংলার কবি, তিনি বিশ্বকবি, ইত্যাদি বহুকিছু। প্রশ্ন হলো, রবীন্দ্রনাথ যে জন্মভূমির স্বপ্ন দেখতেন বা কথা বলতেন সেটি কি হিন্দু-মুসলমান উভয়ের? যে চেতনা ও যে ধর্মবিশ্বাসের কথা বলতেন সেটিও কি সার্বজনীন বাঙালীর? রবীন্দ্রনাথ তার ‘জন্মভূমি’ প্রবন্ধে যে জন্মভূমির কথা আলোচনা করেছেন সেখানে আছে মায়ের পূজা, মায়ের প্রতিষ্ঠা, আছে অধিষ্ঠাত্রী দেবী ও ভারতীয় ভারতীয় বীণাধ্বনি। তিনি যে মনে প্রাণে মুর্তিপূজারী হিন্দু ছিলেন তার পরিচয় রেখেোছন তার পূজারিনী কবিতায়। লিখেছেন,

“বেদব্রাহ্মণ-রাজা ছাড়া আর কিছু

কিছু নাই ভবে পূজা করিবার।”

রবীন্দ্র-দর্শন ও রবীন্দ্র সাহিত্যের উপর মূল্যায়ন করেছেন তাঁরই এক প্রগাঢ় ভক্ত শ্রী নীরদ চৌধুরি। তিনি লিখেছেন,“একটা বাজে কথা সর্বত্র শুনিতে পাই। তাহা এই, রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি হিসেবে ‘বিশ্বমানব’ ও লেখক হিসাবে ‘বিশ্ব মানবতার’ই প্রচারক। কথাটার অর্থ ইংরেজী ও বাংলা কোনো ভাষাতেই বুঝিতে পারিনা। তবে অস্পষ্টভাবে ধোঁয়া-ধোঁয়া যেটুকু বুঝি, তাহাকে অর্থহীন প্রলাপ বলিয়া মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ অপেক্ষা বিশিষ্ট বাঙালী খাঁটি বাঙ্গালী হিন্দু জন্মায় নাই।” -(সুত্রঃ ‘বাঙালী জীবনে রমণী’ নীরদ চন্দ্র চৌধুরী, পৃঃ ১৪১)।

বাংলায় হিন্দু-মুসলিমের পাশাপাশি বসবাস শত শত বছর ধরে। একই আলো-বাতাস, একই নদ-নদী,একই মাঠ-ঘাট নিয়ে তাদের বসবাস। সাধারণ হিন্দু-মুসলিমের মাঝে বিবাদ ততটা না থাকলেও হিন্দু সাহিত্যিকগণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু করেছেন সাহিত্যের ময়দানে। এমনকি রবীন্দ্রনাথও সুরুচী ও ভদ্রতার পরিচয়ও দিতে পারেননি। তাঁর “বৌ ঠাকুরানীর হাট” উপন্যাসে তিনি প্রতাব চরিত্রের মুখ দিয়ে ম্লেছদের দূর করে আর্য ধর্মকে রাহুর গ্রাস থেকে মুক্ত করার সংকল্প করেন। গোরা উপন্যাসে গোরার মুখ দিয়ে ইসলাম বিষয়ে জঘন্য উক্তি করিয়েছেন। “সমস্যাপূরণ” গল্পে অছিমদ্দিনকে হিন্দু জমিদারের জারজ সন্তান বানিয়েছেন। মুসলিমদের চরিত্র হননে সকল শালীনতার উর্দ্ধে উঠেছেন বঙ্কিমচন্দ্র। অথচ তিনিই বাংলা সাহিত্যে হিন্দুদের আদর্শ পুরুষ। মুসলিম বিদ্বেষী এ ব্যক্তিটি ছিলেন রবীন্দ্রনাথেরও অতি প্রিয়। বঙ্কিম তাঁর সাহিত্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে গালিগুলি বেছে বেছে ব্যবহার করেছেন তা হলো হীন, নীচ, কাপুরুষ, যবন, ম্লেছ, নেড়ে ইত্যাদি। আগে ‘নেড়ে’ গালিটি বৌদ্ধদের দেয়া হতো, পরে সে প্রয়োগ হতে থাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে। “কৃষ্ণকান্তের উইল”‘য়ে দানেশ খাঁকে দিয়ে মুসলিমদেরকে শুয়োর বলে গালি দিয়েছেন। “রাজসিংহ” উপন্যাসে কতিপয় স্ত্রীলোককে দিয়ে আওরাঙ্গজেবের মুখে লাথি মারার ব্যবস্থা করেছেন। “মৃণালিনী”তে বখতিয়ার খিলজীকে ‘অরণ্য নর’ বলেছেন। “কবিতা” পুস্তকে তিনি লিখেছেন,

“আসে আসুক না আরবী বানর

আসে আসুক না পারশী পামর”   

“রাজসিংহ” উপন্যাসে আওরাঙ্গজেবের কন্যা জেবুন্নিসার মুখে ভাষা গুঁজে দিয়েছেন এভাবে,

“জেবউন্নিসা হাসিয়া বলিল,“ঐ পুরাতন কথা। বাদশাহজাদীরা কখন বিবাহ করে?

মবারক। এই মহাপাপ….

জেব উন্নিসা উচ্চ হাসিল। বলিল বাদশাহজাদীর পাপ! আল্লা এ সকল ছোট লোকের জন্য করিয়াছেন –কাফেরদের জন্য। আমি না হিন্দু বামুনের মেয়ে, না রাজপুতের মেয়ে যে এক স্বামী করিয়া চিরকাল দাসত্ব করিয়া শেষে আগুনে পুড়িয়া মরিব!”

এ হলো বাংলা সাহিত্যের বড় বড় মহারথিদের চেতনার মান। তাদের মন ও মানস মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে কতটা ঘৃনাপূর্ণ ও বিষপূর্ণ ছিল -এ হলো তার নমুনা। অথচ মুসলিম-বিদ্বেষপূর্ণ বাংলা সাহিত্যকে হিন্দু-মুসলিম –উভয়ের সাহিত্য বলে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা বাড়ানো হচ্ছে বাংলাদেশে। এমন বিষপূর্ণ সাহিত্য কি মুসলিম চেতানায় পুষ্টি জোগাতে পারে?

বিষ পান সবদেশেই কম বেশী ঘটে। তবে তাতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হলেও জাতির মৃত্যু আসে না। কারণ কোন বিষই ঘরে ঘরে ছড়ায় না। কিন্তু সাহিত্যের মাধ্যমে চেতনা রাজ্যে বিষ ছড়ায় ঘরে ঘরে। তাই সাহিত্যের মাধ্যমে বিষ পান শুরু হলে বিপন্ন হয় সমগ্র জাতি। চেতনায় তখন মহামারি দেখা দেয়।  চেতনা মারা পড়লে তখন মারা পড়ে ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য বাছবিচারের নৈতিক বল। আজকের বিশ্বে তেমনি একটি নৈতিক বলহীন জাতির নমুনা হল বাংলাদেশ। এবং সে বিপন্নতাই অতি প্রকট ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে দেশটির দূর্নীতি, সন্ত্রাস, গুম-খুন, ভোটডাকাতির রাজনীতি, অর্থনৈতিক পরনির্ভরতা এবং ভারতের প্রতি আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।  লন্ডন, ১ম সংস্করণ ২০/০২/১১; ২য় সংস্করণ ২৭/১১/২০২০।  

 

  




বিবিধ ভাবনা-৮

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১.

একটি মুসলিম দেশকে বিভক্ত করা ও দুর্বল করার দিনকে কেউ যদি বিজয়-দিবসে পরিণত করে -সে যত নামায়-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন করুক না কেন -তাকে কি ঈমানদার বলা যায়? ইসলাম শুধু নামায-রোযা্ ও  হজ্ব-যাকাতের  বিধানই দেয় না, বরং সে সাথে অলংঘনীয় নীতি মালা দেয়ে রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহেরও। ঈমানদারের রাজনীতিতে তখন গুরুত্ব পায় ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে মুসলিম দেশের অখণ্ডতা রক্ষা। গুরুত্ব পায় প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব। এবং চরম গাদ্দারী রূপে চিহ্নিত হয় ভাষা ও অঞ্চলের নামে সে দেশকে খণ্ডিত করার কাজ। হারাম গণ্য হয় কাফের শক্তি থেকে অর্থ,    প্রশিক্ষণ ও হাতিয়ার নিয়ে মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা।

মুসলিম হ্‌ওয়ার শর্ত হলো, ইসলামের প্রতিটি বিধান শতকরা শতভাগ মেনে চলা। বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের জীবনে ইসলামী বিধানের প্রতি সে আনুগত্য থাকলে তারা কি ১৯৭১’য়ে ভারতের ন্যায় একটি শত্রু দেশের  কোলে গিয়ে উঠতো? এবং সেদেশের কাফের শক্তির ঘরে বিজয় তুলে দিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটাতো?

ব্যক্তির ঈমান দেখা যায় না। কিন্তু ঈমানদারকে চেনা যায় কাকে সে বন্ধু এবং কাকে সে শত্রুরূপে গ্রহণ করলো –তা থেকে। ঈমানদার  কখনোই কোন কাফেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করে না। এ কাজ বেঈমানদের। মীর জাফর বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্তাব্যক্তি রবার্ট ক্লাইভকে। তাতে ইংরেজদের হাতে লুন্ঠিত হয় বাংলার স্বাধীনত। আর শেখ মুজিব বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছিল ভারতের কাফের শাসক ইন্দিরা গান্ধিকে। এবং তাতে দ্বিতীয়বার পরাধীনতা নেমে আসে বাংলাদেশীদের জীবনে।  মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার পর বাঙালী মুসলিম ইতিহাসে এটাই হলো সবচেয়ে কলংকিত ইতিহাস। ইসলাম ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শেখ মুজিব ও তার অনুসারিদের অপরাধ এবং ভারতের প্রতি তাদের দাসসুলভ চরিত্র আজ আর গোপন বিষয় নয়। শেখ হাসিনার হাতে বাংলাদেশে আজ যা কিছু হচ্ছে -তা তো তার পিতার অপরাধ কর্মেরই ধারাবাহিকতা।

২.

শেখ হাসিনা বলে “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”। একথা তো শয়তানের। শয়তান তো এভাবেই কালী পূজা, দুর্গা পূজার ন্যায় নানা দেব-দেবী পূজাকে বাঙালী মুসলিমের উৎসবে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করে। শয়তান এভাবেই মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরায় এবং পৌত্তলিকতার কাছে টানে। প্রশ্ন হলো, হিন্দুরা কি কখনো মুসলিমদের গরু কোরবানী ন্যায় ঈদ উৎসবকে নিজেদের উৎসব রূপে গ্রহণ করবে? মুসলিমগণ তো জবাই করে তাদের গো-দেবতাকে। ফলে সে উৎসবে তার যোগ দেয় কি করে? তারা তো গো-মুত্র সেবন করে এবং গোবর মেখে ঘরের পবিত্রতা আনে। একই কারণে মুসলিমগণ বা কি করে দেব-দেবীর মুর্তির সামনে গিয়ে উৎসব করে? তাদের মহান নবী (সাঃ)’র সূন্নত তো মুর্তি ভাঙ্গার, মুর্তি গড়া বা মুর্তির সামনে গিয়ে ভক্তি দেখানো নয়। তাই কাফেরদের উৎসবগুলি একান্তই তাদের নিজস্ব উৎসব, সেগুলি কখনোই মুসলিমদের উৎসব হতে পারে না। তেমনি মুসলিমদের উৎসবগুলিও হিন্দুদের উৎসব হতে পারে না।

৩.

সেুক্যুলারিস্টগণ সূদকে মুনাফা, ব্যভিচারকে ব্যবসা এবং মুর্তিপূজাকে ভাস্কর্য শিল্পে পরিণত করেছে। ঢাকা যে মসজিদের শহর –ঢাকার এ ইসলামী পরিচয় শেখ হাসিনার ভাল লাগেনি। সেটি যে কোন সেক্যুলারিস্টেরই ভাল লাগার কথা নয়। যেখানে ইসলাম আছে -সেটিই তাদের কাছে পশ্চাদপদতা মনে হয়। আর মসজিদ তো ইসলাম ও মুসলিম সমাজের প্রতীক। এ জন্যই শেখ হাসিনা ঢাকা শহরকে মসজিদের শহরের পরিবর্তে মুর্তির শহরে পরিনত করতে চায়। সে মুর্তিগুলি হবে তার পিতা শেখ মুজিবের। মুজিব পূজারীগণ দাবী তুলেছে মুজিবের মুর্তি স্থাপন করতে হবে প্রতিটি স্কুল, প্রতিটি কলেজ ও প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবং সে সাথে প্রতিটি জেলা, প্রতিটি থানা ও প্রতিটি ইউনিয়নে। এভাবে চেষ্টা হচ্ছে মুর্তিপূজাকে বাঙালীর সংস্কৃতিতে পরিনত করা। ইবলিস যা এতো কাল পারিনি, সেটাই প্রতিষ্ঠা দিচ্ছে হাসিনা।এরূপ পূজার সংস্কৃতির শুরু হয়েছে ২১শে ফেব্রেয়ারীতে শহিদ মিনার ফুল দেয়ার নামে স্তম্ভ পূজার মধ্য দিয়ে। বেঈমানদের ক্ষমতায় রাখার এই হলো বিপদ। তখন হামলা হয় ঈমান-আক্বীদার ভূমিতেও।

৪.

রাষ্ট্র কোন ব্যক্তি বা দলের নয়। এর মালিকানা মহান আল্লাহতায়ালার। মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে প্রতিটি ব্যক্তির জিম্মাদারী হলো রাষ্ট্রকে চোর-ডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও বেঈমানদের দখলদারী থেকে বাঁচানো। এবং দায়িত্ব হলো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের জনগণ যে সে দায়িত্ব পালনে কতটা ব্যর্থ সেটাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ভোট-ডাকাত হাসিনার শাসন। প্রশ্ন হলো, এ বিশাল ব্যর্থতা কি মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ করে ঢাকা যায়? মসজিদ-মাদ্রাসা তো ইসলামের দুর্গ। দুর্গের কাজ তো সৈন্য পালন ও জিহাদ গড়ে তোলা। নবীজী (সাঃ)র আমলে তো সেটাই হয়েছে। কিন্তু যে দেশে লক্ষ লক্ষ দুর্গ থাকা সত্ত্বেও ইসলামের শত্রুপক্ষ বিজয়ী হয় -সে দুর্গগুলিকে কি আদৌ দুর্গ বলা যায়?

৫.

সভ্য সমাজে চোর-ডাকাতদের জেলে যেতে হয়। আর অসভ্য সমাজে চোর-ডাকাত এবং ভোটডাকাতও নেত্রী ও মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর সন্মান পায়। যেমন ডাকাত দলে সর্দার হয় সবচেয়ে বড় ডাকাত। একটি দেশের জনগণের চরিত্র বুঝতে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। সেটি নজরে পড়ে দেশের শাসকের চরিত্র দেখে। বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশীদের মুখে কালি লাগানোর জন্য তাই প্রধানমন্ত্রীর আসনে ভোটচোর হাসিনার উপস্থিতিই যথেষ্ট।

সভ্য জনপদে হিংস্র পশু ঢুকলে সেটিকে হত্যা করতে হাতের কাছে যা পায় তা নিয়ে জনগণ রাস্তায় নামে। সেটি না হলে সে জনপদও জঙ্গলে পরিনত হয়। তাই কোন দেশে চোর, ডাকাত, খুনি বা দুর্বৃ্ত্ত ব্যক্তি শাসকের চেয়ারে বসলে তার নির্মূলে সে দেশের সভ্য জনগণ যুদ্ধ শুরু করে। তেমন একটি যুদ্ধ না হলে সমগ্র দেশ তখন অসভ্য দেশে পরিণত হয়। তখন সে দেশে দুর্বৃ্ত্ত চোর-ডাকাত ও ভোটডাকাতও মাননীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী রূপে গণ্য হয়। এমন কি গণতন্ত্র হত্যাকারি গণদুশমনকে জাতির পিতা এবং বন্ধু বলা হয়। তখন দেশে বাড়ে চুরি,ডাকাতি, খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণ। আজকের বাংলাদেশ তো সে অসভ্যতারই উদাহরণ।

৬.

চোর-ডাকাতগণও নিজেদের বদনাম ঢাকার চেষ্টা করে। সমাজে তারাও ভাল সাজার ভান করে। ডাকাতও তখন দান করে। ভোটচোর হাসিনাও তেমনি তাহাজজুদ নামাজের ঢোল পেটায়। নিজ হাতে সেলাই করে ও মাছ ধরে -তা নিয়েও ঢেড়া পেটায়। তখন আওয়ামী লীগের মুখপত্র দৈনিক ইত্তেফাক ‘হাসিনা সেলাই করে ও অবসরে মাছ ধরে’ –সে খবর গুরুত্ব দিয়ে ছাপে। 

৭.

হিফাজতে ইসলামের অনেকেই বলেন তারা রাজনীতিতে নাই। তাহলে যে চোরডাকাতগণ দেশ দখলে নিয়েছে তাদের থেকে দেশকে মুক্ত করবেন কীরূপে? শরিয়তই বা প্রতিষ্ঠা করবেন কী করে? নবী তো রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। অতএব রাজনীতি না করার অর্থ নবীজীর একটি পবিত্র সূন্নতকে অমান্য করা। তাছাড়া রাজনীতি কি স্রেফ নবীজী (সাঃ) সূন্নত? এটি তো সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে শয়তান নির্মূলের পবিত্র জিহাদ তথা সেরা ইবাদত। মহান আল্লাহতায়ালা তো চান ঈমানদারদের  হাত দিয়ে দুর্বৃত্তদের শিকড় কাটতে –যা বলা হয়েছে সুরা আনফালের ৭ নম্বর আয়াতে। তাই যারা রাজনীতি থেকে দূরে থাকে তারা মূলত আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। আলেম রূপে পরিচয় দিলেও তারা পানি ঢালছে ইসলামের শত্রুপক্ষের শিকড়ে। ইসলামের শত্রুপক্ষ চায় রাজনীতির অঙ্গণ ইসলামমুক্ত হোক।   

৮.

কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজারের খবর, ভারতে কারাবন্দীদের সংখ্যা ৪ লাখ ৬৬ হাজার। এর মধ্যে ৩ লাখ ৩০ হাজার অর্থাৎ শতকরা ৭০ ভাগই বন্দী আছে বিনা বিচারে। এটি কি সভ্যদেশের আলামত? ভারতে নানা রূপ অসভ্যতা চলছে এমন কি ধর্মের নামে। সমগ্র শরীরে গরুর গোবর মেখে উৎসব করা হচ্ছে -সে ছবিও দেখা গেছে।  দলিত শ্রেণীর বহুহাজার কিশোরীকে প্রতিবছর  দেবদাসীর খেতাব দিয়ে মন্দিরের পুরোহিতদের যৌন লালসার পূরণে জিম্মি বানানো হয়। এ বিশ্বাসে যে পরজন্মে তারা বর্ণ জন্ম পাবে। উচ্চ কয়েক বছর পর এ দেবদাসীদের পতিতাপল্লিতে যেতে হয়; নিজ পরিবারে তাদের স্থান হয় না। আল-জারিয়া টিভি ইংরেজী সার্ভিস এর উপর এক বেদনাসিক্ত ডকুমেন্টারী প্রচার করেছে।

অথচ ভারতে বহু শত বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষ লক্ষ বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক। নিজেদেরকে এরা ভদ্র রূপে দাবি করে। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, এ ভয়ানক অসভ্যতা ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন নাই। মিডিয়াও এরূপ অসভ্যতার বিরুদ্ধে সোচ্চার নয়। রবীন্দ্র নাথ যখন বেঁচে ছিলেন তখনও বিধবাদের মরতে হতো মৃত স্বামীর চেতায় দগ্ধ হয়ে। কিন্তু রবীন্দ্র নাথও সে অসভ্যতার বিরুদ্ধে কথা বলেননি। বরং কবিতা লিখেছেন সতিদাহকে মহামান্বিত করতে। কি এক বিকট অসভ্যতা!  এ অসভ্যদের মাঝে ২০ কোটি মুসলিমকে কে যে কীরূপ যাতনা নিয়ে বাঁচতে হয় -তা কি বুঝতে বাঁকি থাকে? 

তুরস্ক কেন ইস্তাম্বুলের আয়া সোফিয়াকে মসজিদ বানালো তা নিয়ে খৃষ্টান দেশগুলোর প্রচন্ড অভিযোগ। অথচ কর্ডোভার ঐতিহাসিক মসজিদে কেন নামায পডা বন্ধ কর হলো এবং সেটিকে গীর্জা বানালো -সে কথা তারা বলে না।

১০.

বাংলাদেশে বহু হাজার চোর-ডাকাতের বাস। কিন্তু কোন দুর্বৃত্তের অপরাধই হাসিনার চেয়ে অধীক নয়। সাধারণ চোর-ডাকাতগণ বড় জোর কয়েকটি ঘরে বা কয়েকটি গ্রামে চুরি-ডাকাতি করে। কিন্তু হাসিনা হানা দিয়েছে সারা দেশের বহু কোটি মানুষের ঘরে। ছিনিয়ে নিয়েছে তাদের মহামূল্যবান এবং প্রতিষ্ঠা দিয়েছে গুম,খুন ও নির্যাতনের রাজনীতি। এতবড় বিশাল অপরাধ কি বাংলাদেশের তাবত চোর-ডাকাতদের সবাই মিলে করার সামর্থ্য আছে? তাই মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে জালেম শাসকদের শাস্তিটি হবে সবচেয়ে বেশী।

১১.

মুজিবামলে বাংলাদেশে বহু হাজার চোর-ডাকাত, খুনি ও সন্ত্রাসী ছিল। কিন্তু তাদের কারো অপরাধই মুজিবের চেয়ে বেশী ছিল না। শেখ মুজিব অপরাধের তালিকাটি বিশাল। হত্যা করেছে ৩০ হাজারের বেশী  বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীকে, দেশ বেচে দিয়েছে ভারতের হাতে। নিজ দলের গুন্ডাদের দিয়ে প্রায় ৪ লাখ বিহারীদের সব কিছু কেড়ে নিয়ে তাদেরকে রাস্তায় বসানোর ন্যায় অসভ্য কান্ডটি ঘটিয়েছে। এ আওয়ামী গুন্ডাদের হাতে শত শত অবাঙালী মহিলাদের ধর্ষিতাও হতে হয়েছে। বাংলার বুকে এরূপ নিরেট অসভ্যতা আওয়ামী আমল ছাড়া আর কোন কালেই হয়নি। দুর্ভিক্ষ ডেকে এনে মেরেছে বহু লক্ষ। হত্য করেছে গণতন্ত্র। চালু করেছে এক দলীয় বাকশাল। ইসলামপন্থিদের জেলে পাঠিয়েছে এবং নিষিদ্ধ করেছে তাদের রাজনীতিকে। চোর-ডাকাত, খুনি ও স্বৈরাচারিকে কোন ভদ্র ও ঈমানদার মানুষ শ্রদ্ধা করে না। এ কাজ অসভ্য বেঈমানদের। তাই মুজিবের ন্যায় অপরাধীকে যারা জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু বলে তারাও কি কম অসভ্য ও কম বেঈমান?

১২.

ঈমান নিয়ে বাঁচার অর্থ দুর্বৃত্ত নির্মূলের অঙ্গিকার নিয়ে বাঁচা। দুর্বৃত্ত নির্মূলে যেমন মুখ খুলতে হয় তেমনি যুদ্ধেও নামতে হয়। শেখ হাসিনার ন্যায় দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে নীরব থাকার অপরাধটি তাই ভয়াবহ। এতে বিদ্রোহ হয় মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের। তাতে পরাজিত হয় ইসলাম এবং বিজয়ী হয় ইসলামের দুশমনগণ। এমন কাজের জন্য পরকালে উঠতে হবে দুর্বৃত্তদের সাথে।

১৩.

নবীজীর কথা: অন্যায় দেখলে হাত দিয়ে রুখো। সে সামর্থ্য না থাকলে মুখ দিয়ে রুখো। সে সামর্থ্য না থাকলে মন দিয়ে ঘৃণা করো। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মুসলিম নবীজী (সা)’র এ নির্দেশ মানলে কি দুর্বৃত্ত হাসিনা বাঁচতো? ভোটচোর হাসিনা বেঁচে আছে গুম, খুন, ফাঁসি ও নির্যাতনের ফ্যাসিবাদী রাজনীতি নিয়ে। হৃদয়ে সামান্য ঈমান থাকলে এ দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে গভীর ঘৃণা সৃষ্টি হতো। তখন সে ঈমানদার ব্যক্তি হাসিনাকে কি কখনো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলতো? বরং বেঈমানী এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বহু আলেমধারী ব্যক্তি ভোটচোর হাসিনাকে কওমী জননী বলে অভিহিত করছে।

১৪.

সম্প্রতি এক সভায় ভোটচোর হাসিনার উক্তি: “জনসমর্থন না থাকলে কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারে না।” এ কথা বলে হাসিনা বুঝাতে চেয়েছে,  তার ক্ষমতায় টিকে থাকাই প্রমাণ করে তার জনসমর্থণ আছে। প্রশ্ন হলো, ইংরেজগণ ১৯০ বছর শাসন করেছিল কি জনসমর্থনের বলে? সেটি তো নৃশংস নীতি ও অস্ত্রের বলে। হাসিনা তো তাদেরই অনুসরণ করছে।

১৫.

Donald Trump is exposed as white supremacist, racist, liar & nonsensical during his rule. But still more than 70 million people voted for him. It exposed the immortality of the huge number of the Americans.

১৬.

ঘরে ডাকাত ঢুকলে নামাযে মন বসেনা। তখন ফরজ হয় ডাকাত তাড়ানো। তেমনি দেশ ডাকাতদের দখলে গেলে সে দেশে যথার্থ ইবাদত করা যায় না। তাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো ডাকাত নির্মূলের মধ্য দিয়ে পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি করা। ইসলামে এজন্যই দুর্বৃত্ত নির্মূলের এ কাজ পবিত্র জিহাদ।




আমার কোভিড অভিজ্ঞতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

মহাদয়াময় মহান আল্লাহতায়ালার অপরিসীম মেহেরবানী যে তিনি আমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। নিজের কোভিড অভীজ্ঞতা নিয়ে আজ যেরূপ অন্যদের সামনে আমার কথাগুলি তুলে ধরছি সে সামর্থ্যটি তো একমাত্র তারই দেয়া। অতি সত্য কথা হলো, করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালা আমাকে একটি নতুন জীবন দান করেছন। আমি দয়াময় রা্ব্বুল আলামীনের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। গত এপ্রিলের ২৫ তারিখে আমাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতাল থেকে বের হই ১৭ই সেপ্টম্বর। মোট ১৪৬ দিন থাকি হাসপাতালে। এর মধ্যে ১২০ দিন থাকি আই.সি.ইউ’তে। এতো দীর্ঘদিন আই.সি.ইউ’তে থাকার ইতিহাস অতি বিরল। আমাকে চিকিৎসা করা হয় কোভিড রোগী হিসাবে। কোভিড রোগ সাধারণতঃ তিন প্রকারের হয়ে থাকে। এক).  ম্রিদু (mild) মাত্রার; দুই). মাঝারি (moderate) মাত্রার; তিন). গুরুতর (severe) কোভিড। আমার ক্ষেত্রে শুরু হয় ম্রিদু মাত্রা নিয়ে। প্রথমে শুকনো কাশি দেখা দেয়। এরপর রাতে জ্বর ও কাঁপুনি। পরে রূপ নেয় গুরুতর কোভিডে। শতকরা ৯০ ভাগ কোভিডের ক্ষেত্রে কোন চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না। রোগীকে হাসপাতালে নিলেও দ্রুত বিদায় দেয়া হয়। কিন্তু বাঁকি শতকরা ১০ ভাগের ক্ষেত্রে রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। রোগীকে অক্সিজেন দেয়া লাগে, অনেককে আই.সি.ইউ (intensive care unit)’তে ভর্তি করা লাগে। এদের মধ্য থেকে অনেকে মারা যায়। আমি ছিলাম শেষাক্ত গ্রুপের একজন।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মাত্র একদিন আগে আমার হাসপাতাল কর্মস্থল থেকে বিকালে লন্ডনের বাসায় ফিরি। সেদিন ব্যস্ত মটরওয়েতে ঘন্টায় ৭০ মাইল বেগে বিরামহীন তিন ঘটা গাড়ি চালিয়েছিলাম। আমি সেখানে মেডিসিনের কনসাল্টেন্ট হিসাবে কাজ করতাম। ফিরার পথে তেমন কোন অসুবিধাই মনে হয়নি। রাতে ভালই ঘুম হলো। পরের দিন সকালেও ভাল ছিলাম। বিকালে দুর্বলতা অনুভব করতে থাকলাম। কাশিও হচ্ছিল। গায়ে জ্বর ছিল না। কোভিড নিয়ে সমস্যা হলো রোগটি নীরবে দেহে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। রোগী জানতে পারে না যে সে মহাবিপদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিকেলে আমার মনে হলো, আমার অক্সিজেন লেবেল দেখা উচিত। কোভিডের প্রধান লক্ষণ হলো, রক্তের অক্সিজেন লেবেল নীচে নামিয়ে আনে। বাসায় অক্সিজেন মাপার কোন যন্ত্র ছিল; আমার ছেলে সেটি দ্রুত বাজার থেকে কিনে আনে। দেখা গেল আমার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৮৬%। স্বাভাবিক মাত্রা হলো ৯৪-৯৮%। বুঝতে পারলাম, দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে এবং অক্সিজেন নিতে হবে। আমার যে কোভিড হয়েছে তা নিয়ে আর কোন সন্দেহই থাকলো না। সাথে সাথে এ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলো।

আমার এক ছেলে এবং ৪ মেয়ে। এক মেয়ে কাছে থাকে। অন্যদের খবর দেয়া হলো। তারা কাছেই থাকতো; তাড়াতাড়ি চলে এলো। ইতিমধ্যে আমার ইমেল লিস্টে যাদের নাম ছিল সবাইকে বার্তা দিলাম যে আমি কোভিডে আক্রান্ত হয়েছি। আমি তাদের কাছে দোয়ার আবেদন করলাম। আমার ইমেল তালিকায় অনেক নেকবান্দাহ আছেন এবং তারা আমাকে ভালবাসেন। আমার বিশ্বাস ছিল, এ খবর পাওয়া মাত্র তারা আমার জন্য রাব্বুল আলামীনের কাছে আন্তরিক ভাবে দোয়া করবেন। এবং দোয়াই ছিল ভরসা।

১০ মিনিটের মধ্যেই এ্যাম্বুলেন্স এসে গেল। প্যারামেডিকগণ আমার অক্সিজেন চেক করে দেখলো অক্সিজেন লেবল অনেক নীচে। সাথে সাথে অক্সিজেন দেয়া শুরু করলো। এবার আমাকে এ্যাম্বুলেন্সে নেয়ার পালা। আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের মুখ তখন অত্যন্ত বিবর্ণ। লন্ডনে শত শত মানুষ তখন কোভিডের কারণে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে। ফলে চারিদিকে কোভিড ভীতি। তাই কোভিডে আক্রান্ত হওয়াটি মামূলী বিষয় নয়। আবার ঘরে ফিরবো কি না তা নিয়ে সন্দেহ জাগাটাই স্বাভাবিক। সবাইকে বিদায় জানালাম; এ্যাম্বুলেন্স দ্রুত রওয়ানা দিল হাসপাতালের দিকে। সাথে কারো হাসপাতালে যাওয়ার অনুমতি নেই, তাই একাকী যেতে হলো।   

আমার বাসা থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী হলো কিং জর্জ হাসপাতাল। সেখানেই আমাকে নেয়া হলো। দেখি কোভিড রোগীদের জন্য আলাদা গেট। আমাকে নেয়া হয় এ্যাকসিডেন্ট ও ইমার্জেন্সী বিভাগের রিসাসিটেশন রুমে। সেখানে আবার অক্সিজেন মাপা হলো। দ্রুত এক্স-রে করা হলো এবং ব্লাড পরীক্ষার জন্য রক্ত নিল। প্রথমে অক্সিজেন দেয়া শুরু হয় সাধারণ মাস্ক দিয়ে। পরে CPAP (continuous positive airway pressure) লাগানো হয়। আমি তখনও সজ্ঞান এবং স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছি। CPAP সহ্য করা সহজ নয়। আমি একসময় লন্ডনের হাসপাতালে রেসপিরেটরী মেডিসিনের রেজিস্টার ছিলাম। বুঝতে পারলাম, কেন অনেক রোগী CPAP লাগানোর চেয়ে মরে যাওয়াই শ্রেয় মনে করতো। আমাকে কতক্ষন CPAP’য়ের উপর রাখা হয়েছিল তা আমার জানা।

প্রথম রাতটি আদৌ ভাল কাটেনি। উপড় হয়ে শুয়ে বহু কষ্ট সয়ে অক্সিজেন নিতে হয়েছে। যতক্ষন হুশ ছিল ভেবেছি, আর কত ঘন্টা এভাবে আমাকে কষ্ট সইতে হবে? এভাবে দিনের পর দিন থাকা তো অসম্ভব। ইতিমধ্য একজন ডাক্তার এসে বললেন, আমাকে ভিন্টিলেটরের উপর রাখাটি জরুরী। তিনি আমার সম্মতি চান। আমি সাথে সাথে সম্মতি জানিয়ে দিলাম। বুঝতে বাঁকি থাকলো না, আমার অবস্থা অতি গুরুতর। ভিন্টিলেটর হলো কোভিড চিকিৎসার সর্বশেষ স্তর। তখন মনে হলো, আমার বেঁচে থাকা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে। এখন যে পৃথিবীটা দেখছি সম্ভবতঃ এটিই শেষ দেখা।  

ভিন্টিলেটরের কথা শুনে মনের ভিতরে হতাশা ও বেদনাটি অতি গভীর হলো। আমার জীবনে একটি স্বপ্ন ছিল। মনে হচ্ছিল, স্বপ্নটি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। অথচ স্কুল জীবন থেকে সে স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়েছি। আমি স্বপ্ন দেখতাম পশ্চাদপদ, পরাজিত ও  অপমানিত মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে কিছু করার। আমি বিশ্বাস ছিল, মুসলিম উম্মাহর অভাব সম্পদে নয়, লোকবলে নয়, ভূগোলেও নয়। সেটি জ্ঞান। জ্ঞানই মানুষকে দেয় শক্তি, বিজয় ও ইজ্জত। আদম (আঃ) জ্ঞানের বলেই ফিরেশতাদের সাথে প্রতিযোগিতায় জিতেছিলেন এবং তাদের সিজদা পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন। আদম (আঃ) সে জ্ঞান পেয়েছিলেন মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। তাই জ্ঞানদান মহান আল্লাহতায়ালার সূন্নত। মহান নবীজী (সাঃ)কেও তাই নামায-রোযা দিয়ে তাঁর মিশন শুরু করতে বলেননি। শুরু করেছেন ইকরা তথা পড় ও জ্ঞানবান হও –এদিয়ে। তাই আমার স্বপ্ন ছিল, শেখা ও শেখানোর রাজ্যে কিছু কাজ করা। জ্ঞান বিতরণের কাজে লেখনীকে বেছে নেয়া।

লেখনীর শক্তি যে কত প্রচণ্ড –সেটি আমি ছোট বেলা থেকেই অনুভব করেছি। বহুবই আমার শরীরে তখন শিহরণ তুলেছে। সেসব বই পড়ে আমি চেয়ারে বসে থাকতে পারতাম না। তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হতো আমার মনের ভূবনে। সভ্য সমাজ বা সভ্যতা কখনোই ভাল পানাহারের কারণে সৃষ্টি হয় না; সেটি হয় ভাল বইয়ের কারণে। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম, হায়! আমি যদি তাদের মত লেখক হতে পারতাম। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, ডাক্তারী, ইঞ্জিনীয়ারিং –এরূপ নানা পেশায় লক্ষ লক্ষ মানুষের ভীড়। কিন্তু একটি জাতি কতটা মানবিক গুণাবলী নিয়ে বেড়ে উঠবে -সেটি নির্ভর করে সে জাতির মাঝে কতজন জ্ঞান বিতরণের কাজে তথা লেখালেখিতে নিয়োজিত হলো তার উপর। চিকিৎসা বিজ্ঞানকে আমি বেছে নিয়েছিলাম সন্মানজনক উপার্জন ও মানব খেদমতের হাতিয়ার রূপে। কিন্তু বাঁচার মূল লক্ষ্যটি ছিল মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করা। এবং সে লক্ষে লেখালেখির ময়দানে তাঁর একজন একনিষ্ট সৈনিক রূপে যুদ্ধ করা। তাই কলম বেছে নিয়েছিলাম সে যুদ্ধে হাতিয়ার রূপে। লেখালেখির কাজে নিজের সামর্থ্য বাড়ানোর লক্ষ্যে উর্দু, ফার্সি এবং আরবী ভাষা শেখার চেষ্টা করেছি। বিগত তিরিশ বছরের বেশী কাল ধরে সে স্বপ্ন নিয়ে বহুশত প্রবন্ধ লিখেছি। সেগূলির সবই ছাপা হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকা, জার্নাল ও ওয়েব সাইটে। বহুদিন ধরেই ভাবছিলাম এ লেখাগুলিকে দীর্ঘ আয়ু দিতে হলে বই আকারে প্রকাশ করতেই হবে। সেগুলি তখন আমার জন্য সাদকায়ে জারিয়া হবে। ভাবছিলাম, আগামী এক বছরের মধ্যেই কয়েক খানি বই প্রকাশ করবো। তাই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পূর্বে গভীর রাত জেগে জেগে আমার সে প্রবন্ধগুলির এডিটিং করছিলাম। কিন্তু  কোভিড যেন আমার সব স্বপ্ন চুরমার করে দিল। সে বেদনাটি আমাকে খুবই কষ্ট দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এখন মহান আল্লাহতায়ালার কাছে ফিরে যাওয়ার পালা। দুঃখ হচ্ছিল, আমি তো ফিরে যাচ্ছি এক রকম খালি হাতে। আফসোস হচ্ছিল, সাদকায়ে জারিয়ার কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। মহান আল্লাহতায়ালা আমাকে যা দিয়েছেন তা তো ওপারে পাঠাতে পারলাম না। সে এক করুণ বেদনা। ওপারে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম মাত্র, এমন মুহুর্তেই কোভিডের হামলা। পরে ভাবলাম, আমি তো স্রেফ স্বপ্নই দেখতে পারি। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সামর্থ্য তো আমার হাতে নাই। আমাকে নিয়ে তো মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব পরিকল্পনা আছে। আমি যে তাঁর সৈনিক -সেটি মহান আল্লাহতায়ালা ছাড়া আর কে ভাল জানেন? তিনি তো আমার নিয়েত জানেন। অতএব আমার কাজ মহান আল্লাহতায়ালার পরিকল্পনার কাছে আত্মসমর্পণ করা। নিজেকে শান্তনা দিচ্ছিলাম এভাবে। এরূপ ভাবনার মধ্যেই হারিয়ে গেলাম।

কখন আমাকে ভিন্টিলেটরের উপর নেয়া হলো আমার তা জানা নাই। ভিন্টিলেটর কখনোই সজ্ঞান মানুষের উপর লাগানো যায় না। রোগীকে অজ্ঞান করতে হয়। আমাকে কখন অজ্ঞান করা হয় –সেটিও বুঝতে পারিনি। অজ্ঞান অবস্থায় কখন কি হয়েছে তা একটুও টের পায়নি। একবার চোখ খুলে দেখি আমার ছেলে আমার পাশে বসা। তার মুখে হাঁসি। সম্ভবতঃ তখন আমার মুখেও হাঁসি ছিল। কারণ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর এই প্রথম পরিবারের কাউকে দেখছি। কনসাল্টেন্ট তাকে ডেকে এনেছে আমাকে দেখে যাওয়ার জন্য। সে আমাকে প্রশ্ন করলো, কতদিন আমি হাসপাতালে আছি। আমি বল্লাম, এক দিন বা দুই দিন। সে বল্লো তুমি আড়াই মাস বেহুশ ছিলে। আরো বল্লো, আমার অবস্থা নাকি খুবই খারাপ ছিল, ডাক্তার খুবই সমস্যায় পড়েছিল আমার অক্সিজেন লেবেল কাঙ্খিত মাত্রায় আনতে। একসময় ১০০% অক্সিজেনও দিতে হয়েছে। তখনও বুঝতে পারিনি যে, আমি আই.সি.ইউতে।   

পরে আমার স্ত্রী ও ছেলে থেকে জানতে পারি, আই.সি.ইউ’র ডাক্তারগণ আমার ব্যাপারে খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিল। তারা ভেবেছিল, আমি আর বাঁচবো না। গত রামাদ্বানের মাঝামাঝি সময়ে অবস্থা এতোই খারাপ হয়ে যায় যে, ডাক্তার বাসায় ফোন করে আমার স্ত্রীকে তাড়াতাড়ি শেষদেখা দেখার জন্য হাসপাতালে আসতে বলে। তবে করুণাময় মহান আল্লাহর রহমতে সে সময় অবস্থা আর খারাপ হয়নি। কিন্তু তার ২ সপ্তাহ পর ঈদুল ফিতরের দিন অবস্থা আবার খারাপ হয়ে যায়। ডাক্তারদের পক্ষ থেকে আমার পরিবারের প্রতি ডাক আসে শেষ দেখা দেখে আসার জন্য। মহান আল্লাহতায়ালার অপার মেহেরবানী যে, সেবারও রক্ষা পেয়ে যাই্। পরের দিন ডাক্তার ফোনে আমার ছেলেকে জানায়, “সুখবর আছে, তোমার আব্বার শরীর ভালোর দিকে।” এরপর আমি ধীরে ধীরে সুস্থ্য হতে থাকি। উল্লেখ্য হলো, হাসপাতালের কনসাল্টেন্ট ও নার্সগণ আমার পরিবারের সদস্যদের সাথে বেশ ভাল ব্যবহার করেছেন। আই.সি.ইউ’য়ের টিম আমার জন্মদিনও পালন করেছে। এবং তার ছবি NHS (National Health Service) ওয়েব সাইটে দিয়েছে। সে ছবি আমার বন্ধুগণ বিলেত, বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশ থেকে দেখেছে।      

আমার জ্ঞান ফিরে আসার পর আই.সি.ইউ’য়ের কনসাল্টেন্ট ও নার্সগণ আমার অবস্থার বর্ণনা শুনানে শুরু করেন। আমি যেহেতু ডাক্তার তাদের সেসব বলার বেশ আগ্রহও ছিল। তারা সবাই বলতো, এটি অলৌকিক ব্যাপার যে আমি বেঁচে গেছি। সত্য হলো, মহান আল্লাহতায়ালার কাছে এরূপ অলৌকিক কিছু ঘটানো কোন ব্যাপারই নয়। আমি স্বচোখে আমার ফুসফুসের সিটি স্কান দেখেছি। ফুসফুসের যে অবস্থা দেখেছি তাতে সত্যই বেঁচে যাওয়াটি আমার কাছে অলৌকিকই মনে হয়েছে। আমার দুটি ফুসফুসেই নিউমোনিয়া হয়েছিল। সে সাথে দুই ফুসফুসেই ইম্বোলিজম হয়েছিল; সে সাথে পানিও জমেছিল। আমার কিডনি ফেল করায় ডায়ালাইসিস দিতে হয়েছিল। ফুসফুসে ইম্বোলিজম হওয়াতে হার্টও ফেল করেছিল। সে সাথে লিভারেও দোষ দেখা দিয়েছিল। অথচ কোভিড হওয়ার আগে আমি  সুস্থ্য ছিলাম। আমার ফুসফুস, কিডনি, হার্ট, লিভার –এসব কিছুই পুরাপুরি সুস্থ্য ছিল।  

হুশ ফেরার পরও আমি দুই মাস হাসপাতালে ছিলাম। পরিবারের কাউকে আসতে দিত না। ভিডিও মারফত সাক্ষাৎ করানো হতো। বেহুশ অবস্থায় আমার শরীরের উপর কীরূপ বিপদ গেছে তা বুঝতে পারিনি। কিন্তু যখন হুশ ফিরলো তখন শুরু হলো নতুন সমস্যা। এমন রাতও গেছে যে একটি মিনিটও ঘুমাতে পারিনি। জীবনে কোনদিন ঘুমের বড়ি খেতে হয়নি। কিন্তু তখন ঘুমের বড়ি না খেলে ঘুমই হতো। আবার ঘুম হলে নানা রূপ স্বপ্ন দেখতাম। হ্যালুসিনেশন হতো। আমার বাম হাতে কোন শক্তি ছিল না। খাড়া হওয়া দূরে থাক, বসে থাকতে পারতাম না। পাঁচ মিনিট বসে থাকলেই হাঁপিয়ে উঠতাম। অক্সিজেন দেয়া লাগতো। ফিজিওথেরাপিস্টগণ কাজ শুরু করলো। বাচ্চাকে হাটা শেখানোর ন্যায় আমাকে হাটা শেখানো শুরু করলো। দুই চার কদম হাটতে পারলে ফিজিওথেরাপিস্টরা বাহবা দিত। পাশে হুইল চেয়ার ও অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে তারা প্রস্তুত থাকতো আমাকে বিশ্রাম দেয়ার জন্য। প্রায় দুই মাস এ রকম ফিজিওথেরাপির দেয়ার পর আমি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে সমর্থ হলাম। তখন তারা বল্লো, আমি এখন বাসায় ফিরতে পারবো।     

হাসপাতালের দিনগুলিতে আমি বিচ্ছিন্ন হয়েছিল দুনিয়ার জগত থেকে। সে মুহুর্তে তীব্রতর হয়েছিল আখেরাতের ভাবনা। আমি মৃত্যুকে অনেক কাছে থেকে দেখেছি। নড়বড়ে পায়ে দাঁড়িয়েছিলাম এপার ও ওপারের মাঝে এমন এক খাড়া পর্বত চুড়ার উপর যে সামান্য ধাক্কা দিলেই অনন্ত অসীম পরকালে গিয়ে পড়তাম। সেখান থেকে আর ফিরে আসা যেত না। আমার শরীরের কোভিড যে কোন সময় আরো খারাপ রূপ নিতে পারতো। এ পার্থিব জীবন কতই না ভঙ্গুর! করোনার ন্যায় কত অসংখ্য অদৃশ্য প্রাণনাশী শত্রুর মাঝে আমাদের বসবাস। অথচ এর বিপরীত এক মৃত্যহীন জীবন রয়েছে পরকালে। সেখানে কোন করোনা নাই। জান্নাতে স্থান পেলে সামান্যতম ব্যাথা-বেদনাও নাই। অথচ সে পরকাল নিয়ে ভাবনাই নাই। এর চেয়ে বড় বেওকুফি আর কি হতে পারে? জান্নাতের পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার চেয়ে বুদ্ধিহীনতাই বা কি হতে পারে?

সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, জীবন ও মৃত্যুর ফয়সালাটি কখনোই জমিনের উপর হয় না। সেটি হয় আসমানে। ফয়সালা নেন একমাত্র আল্লাহ সুবহানা ওয়া তায়ালা। সেখানে কারো অংশীদারিত্ব চলে না। পবিত্র কোর’আনে তাই বলা হয়েছে “মা আসাবা মিম মুসিবাতিন ইল্লা বি ইযনিলিল্লাহ” –(সুরা তাগাবুন, আয়াত ১১)। অর্থঃ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন বিপদই তোমাদের স্পর্শ করতে পারে না। তাই কোন প্রাণনাশী ভাইরাস বা জীবাণু মৃত্যু ঘটাতে পারে না -যদি না সে সিদ্ধান্তটি মহান আল্লাহতায়ালার হয়। তবে এক্ষেত্রে দোয়ার শক্তি বিশাল। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দার দোয়া শুনেন এবং জবাবও দেন। সে কথাটি পবিত্র কোর’আনে বার বার বলা হয়েছে। বলা হয়েছে “ফাজকুরুনী, আজকুরুকুম”। অর্থঃ তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো। এবং মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণে যাওয়া তথা তাঁর সাহায্য পাওয়ার উত্তম মাধ্যম হলো দোয়া।  

মহান আল্লাহতায়ালা আমাকে প্রাণে বাঁচিয়ে অনেক কিছু জানার সুযোগ করে দিয়েছেন। মারা গেলে কিছুই জানতে পারতাম না। আমি কোন বিখ্যাত ব্যক্তি নই; অন্যদের সাথে আমার যে সংযোগ -সেটি শুধু লেখনীর মাধ্যমে। কিন্তু অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছি জেনে যে, হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন দেশে আমার জন্য দোয়া করেছেন। লন্ডনের বিভিন্ন মসজিদে আমার জন্য সমবেত ভাবে দোয়া করা হয়েছে। ইন্টারনেটে জুম বৈঠক করে দোয়া করা হয়েছে একাধিক বার। দোয়ার মজলিস বাংলাদেশেও হয়েছে। সূদুর কানাডাতেও দোয়া হয়েছে। কেউ কেউ আমার জন্য সাদাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ চোখের পানি ফেলেছেন। এসবই শুনেছি অন্যদের থেকে। বিশাল মনের অধিকারি এসব ভাইবোনদের বেশীর ভাগকে আমি কোনদিন দেখিনি। তাদের এ বিশাল মনের পরিচয় জেনে আমি অত্যন্ত অভিভূত হয়েছি। এমনটি কোনদিনই ভাবতে পারিনি। ভালবাসা কেনা যায় না। ভালবাসা দেখানোর সামর্থ্যও সবার থাকে না। ফলে যারা সেদিন আমার প্রতি ভালবাসা দেখিয়েছেন তারা নিঃসন্দেহে মহৎ গুণের অধিকারী। আমি তাদের প্রতি গভীর ভাবে কৃতজ্ঞ। মহান আল্লাহতায়ালা নিশ্চয়ই তাদেরকে প্রতিদান দিবেন। ইসলামী ভাতৃত্ববোধ যে মুসলিমদের মাঝে এখনো বেঁচে আছে -এ হলো তারই নমুনা। নানা হতাশার মাঝে এটিই বিশাল আশার পথ দেখায়। গভীর ভাবে আমাকে অনুপ্রেরণাও জোগায়। মুসলিমগণ যখন ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠে তখন হিংসার বদলে এরূপ দোয়ার সংস্কৃতিই প্রবলতর হয়। মানুষ তো এভাবেই একে অপরের প্রতি কল্যাণমুখি হয়। ২৪/১১/২০২০।




My COVID Experience

Dr. Firoz Mahboob Kamal

In the name of Allah Subhana wa Ta’la –the Most Merciful and the Most Compassionate, I like to say that I feel greatly blessed to share my COVID experience with others. In fact, I have been given a new life. I am very grateful to Almighty Allah SWT for His great mercy on me. I was taken to my local hospital in London on the 25th of April and released on the 17th of September in 2020. I was treated as a case COVID-19. Of my 146 days in the hospital, I was in the Intensive Care Unit (ICU) for 120 days. It is very rare to have such a long stay in ICU. COVID has three forms: mild, moderate, and severe. I passed through all three forms and turned to have the most severe one. Seven days prior to admission, I developed mild symptoms like a dry cough that changed to fever and shivering in the night. In about 90 percent of cases, the disease subsides without any treatment. In the remaining 10 percent cases, it may turn very severe, need ICU admission, and may cause death.

On 24th April, one day prior to my hospital admission, I didn’t feel that much unwell which could warrant my hospital admission. On that day, I drove for 3 hours on a motorway at about 70 miles per hour from my workplace place where I used to work as a consultant in acute medicine. After returning to my residence in London, I have a good sleep that night. On 25th April, in the afternoon, I started feeling weak and unwell; but still, surprisingly, I didn’t have any shortness of breathing or any serious symptoms. But COVID sometimes runs silently and harms badly. I felt I must check my oxygen level. I didn’t have any oximeter at home; my son bought it from the market. I found my oxygen level at 86 percent; normally it should be 94-98 percent. It was alarming low. I didn’t have any doubt that I have COVID. So it was clear to me that I need oxygen and must go to a hospital. My family called an ambulance and within ten minutes it arrived. In the meantime, I send an email to my all contacts informing them about COVID and asking them to make sincere dowa. I have 4 daughters and a son; all of them quickly came to my house. In those days hundreds of people were dying every day; so my COVID was a huge shock for my wife and the children. Their face turned very gloomy with an apprehension that I may not return from the hospital.       

The ambulance paramedics found my oxygen saturation quite low and quickly started with oxygen. I was taken to the resuscitation room of the Accident and Emergency (A&E) department of King George Hospital –the nearest hospital from my house. I was still alert, oriented, and conversant. Initially, I was started with a simple mask; after a while, I was started with CPAP (continuous positive airway pressure) oxygenation. It was difficult to tolerate the CPAP machine. In the past, I worked as a registrar in respiratory medicine. Now I realise why some patients in the respiratory ward preferred to die instead of taking CPAP machine. How long I was on CPAP, I can’t remember. At one point I was told by one of the doctors that I need a ventilator. It was very alarming to me; I got the message that my situation is quite serious. The doctor was asking for my consent. I told him to go ahead with it.

Since I was told that I need a ventilator, it was a tremendous shock for me. I felt I may not survive. I had a dream since my school days. I felt, my dream now stand shattered. I have a firm belief that we the Muslims do not have any scarcity of wealth but have a serious shortage of knowledge. We have scores of people in agriculture, business, industry, army, and other professions. But we need many more people in the field of writing.  And it is the Sunnah (tradition) of Allah SWT to start with disseminating knowledge. Knowledge sets the status of humans –both here and in the hereafter. Adam (peace be upon him)’s knowledge -as imparted by Allah SWT made him fit to get sijda (prostration) from the angels. So, it has been my passion to follow the sunnah of Allah SWT. I took my pen as a weapon to fight for Islam. I took the medical profession as a decent survival tool and also as a tool to serve humanity. But my prime objective in life was to work as a servant of Allah SWT –especially in the field of knowledge.

When I was told that I need a ventilator, I thought, the time has come to return back to my Allah SWT. But I had a deep apprehension that I am leaving this world almost empty-handed. I wrote hundreds of articles in Bengali and English. All those articles are written in the last thirty years to address the problems of the Muslim Ummah and to find out the solution. Although those articles were published in various newspapers, journals, blogs, but I could publish only one book. In order to give long life to my thoughts, I needed to publish them as books. Hence, prior to hospital admission, I started to edit all those articles for final compilation in several books. In my absence, nobody can do it. Since COVID related deaths were mounting in London, I felt a sense of great disappointment. However, I realized that I can only dream; things are not in my hand. So I possessed no other option but to surrender to the design of Allah SWT. I couldn’t see my own face; but it must be a very gloomy one.

I don’t know when I was put on a ventilator. Since a ventilator can’t be fitted while the patient is awake, I needed to be induced with a comma. One day I found my son is sitting beside me. He was smiling. Seeing him, I was also smiling. After my admission to the hospital, it was the first time that I saw anyone of my family member. My son asked me whether I know how long I have been in hospital. I told you, may be one or two days. He told me that I was in a comma for about two and a half months. I was surprised. I even didn’t know that I was still in ICU. My son informed me that I was critically unwell. The doctors were struggling very hard to bring my oxygen level to the desired level. I had a tracheostomy.  

Later on, I came to know from my family that I was so unwell that even the ICU doctors thought, I am losing the battle. In the middle of the month of Ramadan, I deteriorated so much that the doctors asked my family for an immediate visit for the final departing look. However, by the grace of Allah SWT, I didn’t deteriorate further and survived. But after about two weeks, on the day of Eid ul Fitr, my condition worsened for the second time. My family was asked again to rush to the hospital. In that time, my family had sleepless days and nights. All praises to Allah SWT, I survived that critical moment, too. On the following day, my family was informed that my condition has started improving.

While I was in a comma I didn’t know what happened to me. But while I came out of the comma, a new phase of difficulties started. I started to have excessive secretions from my throat, hallucinations, nightmares and bizarre dreams. I had to keep a suction machine in my hands to suck secretion from my throat. My left arm was totally powerless. Most of these are the symptoms of post-COVID syndrome and the -effects of medications.

Since I am a doctor, the consultants, the registrars, the nurses started to tell me their story about the severity of my illness. They told me that it was a miracle that I recovered. And it was also clear that only Almighty Allah SWT could do such a miracle. I saw my CT scan of the chest with my own eyes. There was no doubt that it was really a miracle to survive after such an extensive lesion in the lung. I had a multi-organ failure. I had pneumonia, clots, and fluid in both lungs. I had kidney failure that needed dialysis. I had also heart failure secondary to clot in the lung. My liver function also got deranged. Whereas, I was a reasonably healthy man before this COVID attack. My lungs, heart, kidney and liver were perfectly normal. It is a great blessing of Allah SWT that my organs have recovered.

I was also told that the ICU team observed my birthday and posted the photos in NHS website. I am not aware of anything of that. Later on, I knew that my friends in the UK, in the Middle East, Bangladesh and other countries could see those photos. It looked strange to me; since I didn’t celebrate my birthday myself in my whole life.

All my days in the hospital gave me a personal spiritual experience. During my old days in schools, colleges, universities, I hardly got a chance to have an exclusive long-time focus on the ultimate destiny in the hereafter. Such thoughts used to come and go and showed little sustenance. My difficult days in the hospital gave me detachment from the world and more attachment with the thoughts of the hereafter. The death and the days after the death stood so close to me. I was standing on a sharp cliff, needed only a slight push to slip onto the other side of the life – the endless hereafter. My COVID could go worse at any time. We are so vulnerable. We are living in a sea of invisible killers; but still we are not aware of that. All of our earnings in this life will be useless if we can’t transfer those assets to the hereafter. Allah SWT has given us enough potentials; what could be the best option than investing those potentials to please Him. There is no doubt that Allah SWT has given me a new life with new opportunities to enrich my treasure in the hereafter.

It is also true that the issue of life or death is not decided by the doctors, nor on the surface of the earth. It is decided only by Allah SWT in the heaven. No virus or bug can kill a man unless it is sanctioned by Allah SWT. Hence dowa works. It is a powerful tool to seek Allah SWT’s help. Almighty Allah SWT listens to dowa and also responds to dowa –as revealed repeatedly in the Holy Qur’an.

By keeping me alive, Allah SWT has given me opportunities to know some unbelieving things. I have never been a highly connected man. But I am deeply moved to know that thousands of people all over the world prayed for my recovery. In many mosques in London, people made collective dowa for me. Some shed tears for me. That happened in Bangladesh, too. There were zoom dowa sessions over the internet. Some people gave sadaqa for my life. I could never imagine that the people whom I didn’t meet in my life would do that. It is incredible. I am deeply grateful and thankful to all of them. I understand, they could show such deep empathy towards me only because of their intense Islamic sense of brotherhood. I am sure they will get rewards from Allah SWT for their love for one of His slaves. Such love and fraternity are indeed the great asset of the Muslim Ummah. It also works as a strong source of inspiration for me. 23/11/2020.

   

 

 

 




প্রসঙ্গ জঙ্গি ইসলাম ও মডারেট ইসলাম

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বিজয় শত্রুশক্তির

নবীজী (সাঃ)র যুগে ইসলামের নানা রূপ ও নানা ফেরকা ছিল না। ছিল না শিয়া ও সূন্নী ইসলাম, সূফী ইসলাম এবং ওহাবী ইসলামের অস্তিত্ব। তেমনি মডারেট ইসলাম, জঙ্গি ইসলাম বা চরমন্থি ইসলাম বলেও কিছু ছিল না। সেদিন ছিল ইসলামের একটি মাত্র রূপ। ইসলামের সে সনাতন রূপটি কোথাও বেঁচে নাই। বেঁচে াবেআছে স্রেফ কোরআন-হাদীসের মাঝে। আজকের মুসলিমদের বড় সমস্যা হলো, কোরআন- হাদীসের সে শিক্ষা থেকে তারা দূরে সরেছে। তাদের কাছে সবচেয়ে অপরিচিত ও অজানা রয়ে গেছে নবীজী (সাঃ)’র ইসলাম। ফলে তারা বিস্মিত হয় ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কথা শুনে। এবং আরো বিস্মিত হয় জিহাদের কথা শুনে। কারণ, তারা যে ইসলামের সাথে পরিচিত সে ইসলামে মসজিদ-মাদ্রাসা, খানকা, দরগাহ, তাবলিগ, ছিল্লাহ, গাশত, তাসবিহ-তাহলিল, তরিকত, মারেফত, পীর-মুরিদী, ইসলামী দল ও দলীয় ক্যাডারের কথা আছে। নির্বাচনের কথাও আছে। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কথা নেই। জিহাদও নাই। ইসলামের নামে প্রাণদানের কথাও নাই। তারা কোরআন হাদীস পড়লেও তা পড়ে তাদের নিজ ফিরকা, নিজ দল ও নিজ মজহাবের ইসলামকে অন্য মজহাব, অন্য দল, অন্য পীর ও অন্য ফিরকার মোকাবেলায় উত্তম রূপে প্রমাণ করার লক্ষে। ইসলামকে রাষ্ট্রের বুকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে যেমন নয়, তেমনি নবী করীম (সাঃ)’র আমলের ইসলামকে জানার জন্যও নয়। এবং সেটি হলে নবীজী (সাঃ)’র আমলের ইসলাম তাদের কাছে এতো অপরিচিত থাকে কি করে? মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামের শরিয়তী বিধানই বা এতো অপরাজিত হয় কি করে?

মানব সমাজে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি হলো রাষ্ট্র। সেটি যদি ইসলামের শত্রু পক্ষের দখলে যায় তখন কি সে সমাজে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ঘটে? সম্ভব হয় কি পূর্ণদ্বীন পালন? বিজয়ী হয় কি মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা? ইসলামের মিশন হলো অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। মুসলিম মাত্রই এ মিশনে আত্মনিয়োগ করে বলেই পবিত্র কোর’আনে তাদেরকে সর্বশ্রষ্ঠ জাতি বলা হয়েছে। কিন্তু সেটি কি স্রেফ নামায-রোযা পালন ও মসজিদ গড়ার মধ্য দিয়ে সম্ভব? একাজে চাই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি। চাই, তাদের নির্মূলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সমূহের সহযোগিতা। এজন্যই জরুরি হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে নেয়া। সে লক্ষ্যে মূল লড়াইটি হয় রাজনীতির ময়দানে। এবং সে লড়াইয়ে মহান আল্লাহতায়ালা ঈমানদারের সামর্থ্যের বিনিয়োগটি দেখতে চান। রাজনীতির ময়দান থেকে দূরে থেকে অলীক স্বপ্ন দেখা যায়, কিন্তু তাতে ইসলামের বিজয় আসে না। এমন স্বপ্ন নিয়ে এককালে সুফী দরবেশগণ খানকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং রাজনীতিতে অনীহা ও নির্লিপ্ততা বাড়িয়েছিলেন সাধারণ মুসলিমদের। আর তাতে একচ্ছত্র আধিপত্য ও দুর্বৃত্তি বেড়েছিল স্বৈরাচারি রাজা-বাদশাহদের। স্বৈরাচারি শাসকগণ তো সেটিই চায়। তারা চায় রাজনীতির ময়দান প্রতিদ্বন্দীমুক্ত হোক। রাজনীতির ময়দান থেকে প্রতিদ্বন্দীদের দূরে সরাতেই ব্রিটিশ সরকার ভারতে আলীয়া মাদ্রাসা নির্মাণ করেছিল। আজও মুসলিম দেশগুলিতে একই ঘটনা ঘটছে। ধর্মপালন ও ধর্মীয় শিক্ষার নামে আজও একই ভাবে মুসলিমদের মাঝে রাজনীতিতে অনীহা বাড়ানো হচ্ছে। ফলে তার কুফলও ফলছে। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অনীহার কারণে বাংলাদেশের মত একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কাজ যে শুধু ব্যহত হচ্ছে -তা নয়, বরং তাতে বাড়ছে স্বৈরাচারি শাসকগোষ্ঠির দুর্বৃত্তি এবং ইসলামের পরাজয়।

 

সুবিধাবাদীদের কুতর্ক ও কুকৌশল

ইসলামের ইতিহাসে যে বিষয়টি অতীত কাল থেকেই সবসময়ই চলে আসছে তা হলো, যেখানেই যুদ্ধ-বিগ্রহ ও আত্মত্যাগের কঠিন পরীক্ষা সেখানেই বিতর্ক খাড়া হয় সেটি এড়ানোর। সেটি নবীজী (সাঃ)’র আমলে যেমন হযেছে তেমনি নবীজী (সাঃ)’র পূর্বেও হয়েছে। এবং আজও হচ্ছে। বদরের যুদ্ধের প্রাক্কালে নবীজী (সাঃ)’র সাথেও তা নিয়ে অনাকাঙ্খিত বিতর্ক করেছিলেন কিছু সাহাবী। সাহাবাদের মধ্যে তখন দুটি ভাগ দেখা দিয়েছিল। একদল চাচ্ছিলেন যুদ্ধকে পরিহার করতে। আরেক দল জিহাদে প্রস্তুত ছিলেন। মহান আল্লাহতায়ালা সে বিভেদটি দেখেছেন এবং সে চিত্রটিও তুলে ধরেছেন সুরা আনফালের প্রথম রুকুতে। পবিত্র কোর’আনে বলা হয়েছে,“এটি এরূপ, তোমার প্রতিপালক যেরূপ ন্যায়ভাব তোমাকে তোমার গৃহ হতে বের করেছিলেন, মু’মিনদের একটি দল সেটি পছন্দ করেনি। সত্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাওয়ার পরও তারা তোমার সাথে বিতর্ক করেছিল। মনে হচ্ছিল তারা যেন মৃত্যুর দিকে চালিত হচ্ছে, আর তারা যেন তা প্রত্যক্ষ করছে। স্মরণ কর! আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, দুই দলের একদল তোমাদের আয়ত্তাধীন হবে। (অথচ) তোমরা চাচ্ছিলে নিরস্ত্র দলটি তোমাদের আয়ত্তাধীন হোক। অথচ আল্লাহ চাচ্ছিলেন, তাঁর বাণী দ্বারা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং কাফেরদের শিকড় নির্মূল করবেন। এজন্য যে, তিনি সত্যকে সত্য এবং অসত্যকে অসত্য রূপে প্রতিপন্ন করবেন, যদিও অপরাধীগণ এটি পছন্দ করে না। -(সুরা আনফাল, আয়াত ৫ -৮)।

মহান আল্লাহতায়ালা স্রেফ নামায-রোযা-হজ-যাকাতের ন্যায় ইবাদত নিয়ে খুশি নন। ঈমানদারদের থেকে এগুলিই তাঁর একমাত্র চাওয়া-পাওয়া নয়। উপরুক্ত আয়াতগুলিতে তাঁর যে লক্ষ্যটি ঘোষিত হয়েছে তা হলো, ঈমানদারদের দিয়ে তিনি “সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং কাফেরদের শিকড় নির্মূল করবেন” এবং “সত্যকে সত্য এবং অসত্যকে অসত্য প্রতিপন্ন করবেন”। মু’মিনদের উপর প্রকৃত ঈমানী দায়ভারটি তাই মহান আল্লাহতায়ালার সে অভিপ্রাযের সাথে পুরাপুরি সম্পৃক্ত হওয়া। “সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা”, “কাফেরদের শিকড়কে নির্মূল করা” এবং “সত্যকে সত্য ও অসত্যকে অসত্য রূপে প্রতিপন্ন করা”র মিশনটি তাই শুধু মহান আল্লাহতায়ালার মিশন নয়, ঈমানদারদের মিশনও। সাহাবাগণ সেটি বুঝতে ভূল করেননি। ফলে নিজেদের জানমাল দিয়ে সে কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। কোর’আন শিক্ষা এবং নামায-রোযা-হজ-যাকাতের ন্যায় সর্বপ্রকার ইবাদতের মূল লক্ষ্যটি হলো, সে আত্মনিয়োগে ঈমানদারদের সামর্থ্য বাড়ানো। সে সামর্থ্যটি যে ইবাদতে বাড়ে না, বুঝতে হবে সে ইবাদত মেকী। এমন মূল্যহীন মেকী ইবাদতে যারা অভ্যস্থ ছিল তারাই আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের নেতৃত্বে ওহুদের ময়দান থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল। এবং বদরের যুদ্ধের প্রাক্কালে যাদের মধ্যে সামান্য গড়িমসি এসেছিল, তাদের সে গড়িমসি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে কতটা অপছন্দের ছিল –সেটিই প্রকাশ পেয়েছে পবিত্র কোরআনের উপরুক্ত আয়াতগুলি।

 

বিভ্রাটটি জ্ঞানের ময়দানে

আজকের সমস্যাগুলি শুধু নিরক্ষর মুসলিমদের নিয়ে নয়। বরং সেটি ডিগ্রিধারী বুদ্ধিজীবী ও আলেমদের নিয়ে। এবং সেটি জ্ঞানের ময়দানে বিকট বিভ্রাটের কারণে। সে বিভ্রাটের কারণে তারা যেমন মহান আল্লাহর কোর’আনী অভিপ্রায় বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তেমনি ব্যর্থ হচ্ছেন সে অভিপ্রায়ের সাথে পুরাপুরি একাত্ম হতে। ফলে সেদিনের মুষ্টিমেয় সাহাবাগণ কাফের-অধ্যুষিত আরবের বুকে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আনতে সমর্থ হলেও আজকের লক্ষ লক্ষ আলেম ও ইবাদতকারি ব্যর্থ হচ্ছেন এমন কি শতকরা নব্বই ভাগ মুসলিমের দেশে। এর কারণ, তারা ইসলাম শিখছেন ফিরকাপরস্ত, পীরপরস্ত ও দলপরস্ত আলেমদের থেকে। ফলে তাদের জীবনে আল্লাহপরস্তির বদলে বেড়েছে পীরপরস্তি, ফেরকাপরস্তি ও দলপরস্তি। এখানে আখেরাতের ভাবনার বদলে কাজ করছে ইহকালীন ভাবনা। এটিই হলো আলেমদের সেক্যুলারিজম। এমন সেক্যুলারিজমের প্রভাবে ইহুদী আলেমরা আল্লাহর বানী বিক্রয় করতো। আজও ধর্ম নিয়ে বাণিজ্য বেড়েছে বহু মুসলিম আলেমের মাঝে। তাদের চাকুরির ক্ষেত্র বাড়াতে বহু মাদ্রাসাও নির্মিত হচ্ছে। তারা ওয়াজ করেন অর্থলাভ দেখে। ফলে বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশগুলিতে আওয়ামী লীগের ন্যায় ইসলামের বিপক্ষ শিবিরেও ইসলামের লেবাসধারী আলেমের অভাব হচ্ছে না। তাই শাপলা চত্ত্বরে শেখ হাসিনা বহু শত হিফাজতে ইসলামের কর্মীকে হত্যা করলে কি হবে  তাকে “কওমী জননী”র  খেতাব দেযা হয়েছে। পবিত্র কোর’আনকে তারা রেখে দিয়েছে তেলাওয়াতের জন্য, সেখান থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য নয়। নিজেদের ওস্তাদ বা শিক্ষকদের মত তাদেরও কাজ হয়েছে নিজ নিজ মজহাব, ফিরকা বা তরিকতকে বিজয়ী করা। ওস্তাদ বা পীরদের অভিপ্রায় কি সেটিই তাদের কাছে বড়, আল্লাহর অভিপ্রায় কি তা নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথা নেই। ফলে মাথাব্যাথা নেই ইসলামী রাষ্ট্র গড়া নিয়েও।  

 

কীরূপে সৃষ্টি হলো জঙ্গি ইসলাম ও মডারেট ইসলামের বিভাজন

বসবাসটি একই স্থানে বা একই ঘরে হলেও সবাই যেমন একই ভাবে দেখে না, তেমনি একই রূপে ভাবে না। দেখা ও ভাবনার সামর্থ্যটি গড়ে উঠে ব্যক্তির ধ্যান-ধারণার মডেল বা প্যারাডাইম অনুযায়ী। ফলে ভিন্নতা গড়ে উঠে রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ধর্মকর্মে। কোর’আনী জ্ঞান থেকে যারা দূরে সরেছে এবং যাদের উপর প্রভাব পড়েছে পাশ্চত্যের লিবারেল ধ্যান-ধারণার, তাদের কাছে নবীজী (সাঃ)’র ইসলাম –যাতে রয়েছে জিহাদ, ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়তের প্রতিষ্ঠা এবং ভাষা ও অঞ্চলের নামে গড়ে উঠা বিভক্তির দেয়ালগুলি ভাঙ্গার লড়াই -সে ইসলাম তাদের কাছে অদ্ভুদ ও অসহ্য লাগে। সে ইসলামকে তারা ৭ম শতাব্দীর ইসলাম বা জঙ্গি ইসলাম বলে পরিত্যাগ করে। নবীজী (সাঃ)’র সে সনাতন ইসলামের বদলে তারা গড়ে তোলে ইসলামের এক ভিন্ন মডেল। এবং সেটিকে তারা নিজেদের চিন্তা-চেতনার মডেল অনুযায়ী গড়ে তোলে। সেটিকে তারা বলে আধুনিক ইসলাম বা মডারেট ইসলাম। অথচ ধ্যান-ধারণার মডেলটি সবার অভিন্ন কোর’আনী মডেল হলে এরূপ জঙ্গি ইসলাম ও মডারেট ইসলামের বিভাজনটি কখনোই দেখা যেত না। নবীজী (সাঃ)’র যুগে এরূপ বিভাজন ছিল না। কারণ, ঈমানদারদের চেতনায় তখন একটি মাত্রই মডেলই কাজ করতো এবং সেটি ছিল পবিত্র কোর’আনের। কিন্তু পরবর্তীতে দূরত্ব বেড়েছে কোর’আনের সাথে এবং ধ্যান-ধারণার অঙ্গণে উদ্ভব ঘটেছে নানারূপ মডেলের।       

কোরআন বুঝার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা নিয়ে খেদোক্তি করেছেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন এবং দারুল উলুম দেওবন্দর প্রধান শায়খুল হাদীস জনাব মাওলানা মাহমুদুল হাসান সাহেব। ভারতের তৎকালীন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে তাঁকে গ্রেফতার করে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ মাল্টাতে রেখেছিল। মূক্তি পেয়ে তিনি দেওবন্দে আলেমদের এক সম্মেলন ডেকেছিলেন। সেখানে বলেছিলেন, “মুসলিমদের ব্যর্থতার কারণ নিয়ে কয়েক বছর ধরে আমি বহু চিন্তাভাবনা করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে মুসলিমদের ব্যর্থতার কারণ দু’টি। এক). কোরআন শিক্ষায় গুরুত্ব না দেয়া। দুই. মুসলিমদের মাঝে অনৈক্য। আমরা বেশী জোর দিয়েছি হাদীস শিক্ষায়। এবং সেটিও অন্য মজহাবের তুলনায় হানাফী মজহাবকে শ্রেষ্ঠ প্রমানিত করতে। আমরা কোর’আন বুঝায় তত জোর দেয়নি।”  কোর’আন থেকে দূরে সরার কারণেই নবীজী (সাঃ)’র ইসলাম –যাতে রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র, খেলাফত, জিহাদ, শরিয়তের প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিমদের মাঝে প্যান-ইসলামিক ঐক্য, তা গণ্য হচ্ছে জঙ্গি ইসলাম রূপে। এভাবে মুসলিম দেশে অপরিচিত রয়ে গেছে কোর’আনের ইসলাম। 

 

কোর’আনের আনুগত্য কি জঙ্গি ইসলাম?

ঈমানদার হওয়ার অর্থ শুধু এ নয়, মুখে কালেমা পাক পাঠ করা হবে, মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস ঘোষিত  হবে এবং পালিত হবে নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত। এর বাইরে ঈমানদারকে আরো বহু দূর যেতে হয়। চুক্তিবদ্ধ হতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার সাথে। সে চুক্তির ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মোমেনদের কাছ থেকে তাদের জান ও মাল, এই মূল্যে যে তাদের জন্য নির্ধারিত থাকবে জান্নাত। তাঁরা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায়, অতঃপর (আল্লাহর শত্রুদেরকে) হত্যা করে ও নিজেরাও নিহত হয়। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোরআনে ঘোষিত এ সত্য প্রতিশ্রুতিতে তিনি অবিচল। এবং আল্লাহর চেয়ে আর কে অধিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারে? সুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেন-দেনের উপর যা তোমরা করছো তাঁর সাথে। আর এটিই হলো মহা সাফল্য।” –(সুরা তাওবাহ, আয়াত ১১১)। অর্থাৎ এ চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার উপরই ঈমানদারের মহা-সাফল্য। আর সে সাফল্যই মোমেনের জীবনে মহা-আনন্দ আনে।

উপরুক্ত আয়াতে যেমন জিহাদের কথা আছে, তেমনি আছে জান ও মালের কোরবানীর কথা। আছে সে জিহাদে শত্রুকে হত্যা করা এবং নিজে নিহত হওয়ার কথা। যারা জিহাদ-বিমুখ তারা মহান আল্লাহতায়ালার এ ঘোষণার মাঝে জঙ্গিবাদের গন্ধ পাবে -সেটিই স্বাভাবিক। কারণ, যার মধ্যে যুদ্ধ থাকে সেটিই তো জঙ্গি। অথচ উপরুক্ত আয়াতের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে ইসলামের প্রকৃত রূপ; এবং সেটি মহান আল্লাহতায়ালার নিজস্ব বর্ণনায়। প্রশ্ন হলো, কোর’আনের এ আয়াতগুলি মেনে চলা কি উগ্র ইসলাম? তবে স্বাভাবিক ইসলাম কি? সেটি কি তবে উক্ত আয়াতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ? সেরূপ বিদ্রোহ তো কাফের বানায়। পবিত্র কোর’আনে এরূপ আয়াত তো বহু। নিছক রাজনৈতিক স্বার্থে ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে অধিকৃত দেশগুলিতে পবিত্র কোর’আনের এ আয়াতগুলি পড়ানো হয়না। তাদের ভয়, এতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদ শুরু হবে। ফলে ছাত্রদের দৃষ্টি থেকে এরূপ আয়াতগুলি আড়াল করা হয় স্রেফ নিজেদের আবিস্কৃত মডারেট ইসলামকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে। প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ থাকলেই যদি তাকে জঙ্গি বলা জায়েজ হয় তবে বিশ্বের সবচেয়ে জঙ্গিধর্ম হলো খৃষ্টান ধর্ম। কারণ এ ধর্মের অনুসারি ব্রিটিশ, এ্যামেরিকান, ফরাসী ও স্প্যানিশগণ বহুশত যুদ্ধ করেছে এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার দেশগুলিতে। তাছাড়া এরা যেমন অতীতে ক্রসেডের জন্ম  দিয়েছে তেমনি দুটি বিশ্বযুদ্ধেরও জন্ম দিয়েছে। এবং বিগত শত বছরে সবচেয়ে বেশী যুদ্ধ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অতএব দেশটিকে অবশ্যই জঙ্গি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলা উচিত। জঙ্গি ধর্ম তো হিন্দু ধর্মও। কারণ হিন্দু ধর্মের অনুসারিগণ যেমন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বারা বার যুদ্ধ  করেছে তেমনি অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে কাশ্মিরে।

পবিত্র কোরআন এজন্য নাযিল হয়নি যে মানুষ তা শুধু সুললিত কন্ঠে বার বার পাঠ করবে এবং মুখস্থ করবে। বরং দায়িত্ব হলো, কোর’আনের শিক্ষাকে যেমন নিজেরা পালন করবে তেমনি সকল ধর্মের উপর সেটিকে বিজয়ী করতেও অগ্রণী হবে। একাজে বিপক্ষ শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর এবং আপোষহীনও হবে। সেটি যে শুধু কোর’আনের ঘোষণা -তা নয়, অনুরূপ ঘোষণা দেয়া হয়েছিল পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবগুলিতেও। ইসলামে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো রাষ্ট্রীয় বিপ্লব ও অন্যান্য ধর্মের উপর ইসলামের বিজয়। কারণ, ইসলামে অন্য ধর্মের সত্যতা ও বৈধতা নাই। এগুলি মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার হাতিয়ার। সেগুলিকে বৈধতা দেয়ার অর্থ মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার শয়তানী প্রজেক্টকে সহায়তা দেয়া। তাই মানব কল্যাণে অতি জরুরী হলো ইসলামের বিজয়। এবং এখানে আপোষ চলে না। মহান আল্লাহতায়ালা তো সেটিই চান। মুসলিম রাষ্ট্রে অন্য ধর্মগুলি বেঁচে থাকে ইসলামের বিজয় মেনে নিয়েই। পবিত্র কোরআনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, “তিনিই তাঁর রাসূলকে পথনির্দেশ ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, অপর দ্বীনের উপর সেটিকে বিজয়ী করার জন্য। আর সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।” অপর দিকে ঈমানদারদের গুণাবলী নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নিজের বর্ণনাটি হলো, “মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাদেরকে রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবে। তাদের লক্ষণ, তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার প্রভাব পরিস্ফুট থাকবে, তাদের এরূপ বর্ণনা যেমন তাওরাতে রয়েছে, তেমনি রয়েছে ইঞ্জিলেও।”–(সুরা ফাতহ, আয়াত ২৮ -২৯)। ফলে কোথায় সে আপোষমুখিতার নসিহত? কোথায় সে মডারেশন?  

যারা মডারেট ইসলামের প্রবক্তা তাদের কাছে জিহাদ হলো জঙ্গি ইসলামের প্রতীক। অথচ জিহাদই যে পরকালে জাহান্নামের আগুণ থেকে মূক্তি দেয় সে ঘোষনাটি এসেছে খোদ মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। বলা হয়েছে “হে মুমিনগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দিব যা তোমাদেরকে (জাহান্নামের) যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দিবে? আর তা হলো, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবনপণ করে জেহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বোঝ। -(সুরা সাফ, আয়াত ১০-১১)। বিষয়টি সুস্পষ্ট। মু’মিনের আখেরাতে মূক্তির পথটি নিছক কালেমা পাঠ, নামায-রোযা ও হজ-যাকাত পালনের মাঝে রাখা হয়নি। সেটি রাখা হয়েছে জিহাদে। আর যেখানে জিহাদ থাকে, সেখানে সে জিহাদের বরকতে ইসলামী রাষ্ট্রও গড়ে উঠে। তখন সে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা ঘটে শরিয়তের। তাই যে ভূমিতে ইসলামী রাষ্ট্র নাই এবং ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ নাই -বুঝতে হবে সে সমাজে ইসলামের সঠিক উপলব্ধি এবং প্রাকটিসও নাই। এমন দেশে মুসলিমদের জীবন কাটে ইসলাম ছাড়াই।  

 

 নিষ্ক্রীয়তা ও নির্লিপ্ততা কি জায়েজ?

ঈমানদারের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী, সমাজবাদী বা সেক্যুলার রাজনীতিকে বিজয়ী করতে ভোটদান, অর্থদান, শ্রমদান বা রক্তদান অচিন্তনীয়। সেটি কীরূপ হবে সেটি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন স্বয়ং মহান আল্লাহতায়ালা। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সে সুস্পষ্ট ঘোষণাটি নবী করীম (সাঃ)’কে শুনানো হয়েছে এভাবে,“তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করে দিয়েছেন, যার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মুসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না। -(সুরা আশ-শুরা, আয়াত ১৩)। নানা যুগে ও নানা ভূখণ্ডে প্রেরীত নবী-রাসূলদের মাঝে বহুবিধ ভিন্নতা সত্ত্বেও যে অভিন্ন উদ্দেশ্যটি সর্বযুগে ছিল সেটি হলো দ্বীনের প্রতিষ্ঠা। শরিয়তে ভিন্নতা থাকলেও অভিন্ন ছিল দ্বীনের ধারণা। দ্বীনের সে মূল কথাটি হলো, আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য। প্রতিটি বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা গণ্য হতো কুফরি রূপে। এমন কুফরির পথ বেছে নেয়ার কারণে শুধু যে ইবলিস ও কাফেরগণ অভিশপ্ত হচ্ছে তা নয়, অভিশপ্ত হচ্ছে মুসলিম নামধারি বিদ্রোহীরাও। কারণ নিছক নামে মুসলিম হলে সে অভিসম্পাত থেকে বাঁচা যায় না।

প্রশ্ন হলো দ্বীন কি? শরিয়তই বা কি? দ্বীন হলো মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া জীবন-বিধান। যারা সে বিধানের পূর্ণ আনুগত্য করে তাদেরকে বলা হয় মুসলিম। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া সে চুড়ান্ত বিধানটি হলো পবিত্র কোরআন। আর শরিয়ত হলো কোর’আনে ঘোষিত আইন-কানূন। রাজনীতির অঙ্গণে কোরআনের বিধানটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার পূর্ণ সার্বভৌমত্ব, এ ক্ষেত্রে কাউকে শরীক করাটি শিরক। আল্লাহতায়ালার দ্বীন ও তাঁর শরিয়ত পালনের সর্বশেষ উদাহরণ রেখেছেন শেষ নবী হযরত মহম্মদ (সাঃ)। সেটিই সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। নবীজী (সাঃ)’র সে প্রক্রিয়ায় যেমন দাওয়াত ছিল, তেমনি জানমাল নিয়ে জিহাদ এবং সে জিহাদের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাও ছিল। এটিই হলো নবীজী (সাঃ)র শ্রেষ্ঠ সূন্নত –যা কল্যাণ আনে কোটি কোটি মানুষের জীবনে। ঈমানদার হওয়ার দায়বদ্ধতা হলো, সে সূন্নতের অনুসরণ। মুসলমানদের মাঝে সে সূন্নতের কতটা অনুসরণ হচ্ছে সেটি বুঝা যায় ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়তের প্রয়োগে সফলতা ও ব্যর্থতা দেখে। এদিক দিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা শুধু ব্যর্থতাতেই পরিপূর্ণ নয়, বরং মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মকও।

 

মানদণ্ডটি আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত

কোনটি সত্য এবং কোনটি মিথ্যা, কোনটি ন্যায় এবং কোনটি অন্যায়, কোনটি ধর্ম এবং কোনটি অধর্ম -তা নিয়ে সবার বাছবিচার এক নয়। অশ্লিলতা, ব্যভিচার এবং পর্ণোগ্রাফিও তাই বহু দেশে অপরাধ নয়। এরূপ ভিন্নতা থেকেই জন্ম নিয়েছে নানা ধর্ম, নানা দর্শন ও নানা মতবাদ। প্রতিটি সভ্য-সমাজেই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্য-মিথ্যা, ধর্ম-অধর্ম এবং ন্যায়-অন্যায়ের সঠিক মানদণ্ড স্থির করা। এবং সে অনুযায়ী সুষ্ঠ বিচার করে। নইলে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা আসে না। সভ্যতাও গড়ে উঠে না। তবে কী হবে সে সত্য-মিথ্যা, ধর্ম-অধর্ম ও ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড? ইসলামে সেটি নির্ধারণ করে দিয়েছেন স্বয়ং মহান আল্লাহতায়ালা। তাঁর দেয়া সে মানদণ্ডটি হলো পবিত্র কোর’আন। এখানে নতুন কিছু আবিস্কারের সুযোগ নেই। আবিস্কার গণ্য হয় বিদয়াত রূপে এবং তা হাজির করে জাহান্নামে। ঈমানদার হওয়ার দায়বদ্ধতা হলো, সে কোর’আনী মানদণ্ডের পূর্ণ অনুসরণ। মুসলিমকে তাই শুধু মুর্তিপুজা ও নাস্তিকতার গোনাহ থেকে বাঁচলে চলে না, আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত বিধানের অবাধ্যতা থেকেও বাঁচতে হয়।

নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাতের বিধানগুলি তো ব্যক্তিগত ভাবেই পালন করা যায়। কিন্তু অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার ন্যায় শরিয়তের বহু বিধান পালনে অপরিহার্য হয়ে পড়ে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো। এজন্যই সচেষ্ট হতে হয় এবং প্রয়োজনে কোরবানী পেশ করতে হয় ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায়। তেমন এক ঈমানী দায়বদ্ধতা থেকেই জন্ম নেয় মুসলিম জীবনে রাজনীতি। তাই এ রাজনীতিতে ইহজাগতিক মুনাফা লাভের ভাবনা থাকে না, বরং থাকে আল্লাহর কাছে পরকালে জবাবদেহীতার ভয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “..যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী বিচারের ফয়সালা করে না তারা কাফের। -(সুরা মায়েদাহ, আয়াত ৪৪)। পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছেঃ “…যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী বিচারের ফয়সালা করে না তারা জালেম। -(সুরা মায়েদাহ, আয়াত ৪৫)। আবার বলা হয়েছে “…যারা আল্লাহর নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী বিচারের ফয়সালা করে না তারা ফাসেক তথা পাপী। -(সুরা মায়েদাহ, আয়াত ৪৭)। তাই শুধু নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাত পালন করলেই কাফের, জালেম ও ফাসেক হওয়া থেকে মুক্তি মেলে না। তাকে রাষ্ট্র ও সমাজের বুকে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠাতেও সচেষ্ট হতে হয়। রাষ্ট্রে আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ইসলামে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটি বুঝাতে মহান আল্লাহতায়ালা সুরা মায়েদায় উপরুক্ত তিনটি আয়াত একত্রে নাযিল করেছেন। অথচ এভাবে একই সুরায় পরপর তিনটি আয়াত নামায-রোযা বা হজ-যাকাতের গুরুত্ব বোঝাতেও নাযিল হয়নি।

রাষ্ট্র সেক্যুলার বা নাস্তিকদের হাতে গেলে পাল্টে যায় ন্যায়-অন্যায় ও পাপ-পূণ্যের বিচার বোধ। সেক্যুলার সমাজে নারী-পুরুষের ব্যাভিচারও তখন প্রেম রূপে নন্দিত হয়। শত্রুদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে মুসলিম দেশকে ভাঙ্গাও তখন রাজনীতি গণ্য হয়। উলঙ্গতা তখন সংস্কৃতি, পতিতাবৃত্তি তখন পেশা এবং সূদও তখন অর্থনীতি মনে হয়। বাংলাদেশসহ অনেক মুসলিম দেশে তো সেটিই ঘটছে। অথচ শরিয়তের বিচারে এগুলি শুধু জঘন্য পাপই নয়, শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধও। আল্লাহর আইনের প্রতিষ্ঠায় যারা অনাগ্রহী তাদের প্রকৃত পরিচয়টি যে কি, সেটিও উক্ত তিনটি আয়াতে সুস্পষ্ট ভাবে বলে দেয়া হয়েছে। একটি মুসলিম রাষ্ট্রের চরিত্র কতটা ইসলামী সে বিচারটি দেশটির মুসলিম জনসংখ্যা বা মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা গুণে হয় না। সেটি হলে বাংলাদেশে বিখ্যাত ইসলামি রাষ্ট্র হতো। বরং সে বিচারটি হয় সেদেশে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও আল্লাহর শরিয়তি আইনের প্রতিষ্ঠা আছে কিনা -সেটি দেখে। তবে আখেরাতে বিচারের কাঠগড়ায় খাড়া করা হবে কোন দেশকে নয়, বরং সে দেশের প্রতিটি নাগরিককে। তখন বিচার হবে আল্লাহর নির্দেশিত পথে রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার কাজে কার কি অবদান ছিল সেটির। ফলে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহী ও তা থেকে নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ আছে কি? মডারেট ইসলামের ঢাল কি সেদিন কাজে লাগবে? সেদিন তো মানদণ্ড হবে পবিত্র কোর’আনের ইসলাম। ২২/১১/২০২০ 




মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি প্রসঙ্গে

ফিরোজ মাহবুব কামাল

চুড়ান্ত ব্যর্থতা ও সফলতার বিষয়

আজকের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এ নয়, শিল্প-কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদে পিছিয়ে আছে। বরং সবচেয়ে বড়টি ব্যর্থতা হলো, তারা ব্যর্থ হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে। সভ্য ভাবে জীবনযাপন বনে জঙ্গলে সম্ভব নয়, সে জন্য আপদমুক্ত পরিবেশে নিরাপদ ঘর গড়তে হয়। তেমনি শত্রুকবলিত বিশ্বে নিরাপদ রাষ্ট্রও গড়তে হয়। ঘরবাড়ী তো চোর-ডাকাত, ধর্ষক এবং খুনিও গড়তে পারে। জাতির যোগ্যতা ধরা পড়ে দুর্বৃত্তমুক্ত সভ্যতর রাষ্ট্র গড়ার মধ্যে। রাষ্ট্র যখন গুম, খুন, চুরিডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের নায়কদের হাতে অধিকৃত হয়, তখন স্রেফ অসভ্যতাই বাড়ে। তখন ঈমান-আক্বিদা, ইজ্জত-আবরু ও জান-মালের নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস অসম্ভব হয়। অসম্ভব হয় পূর্ণভাবে ধর্ম পালন। তাই সভ্য রূপে বসবাসের জন্য ঘরাবাড়ি, রাস্তাঘাট ও কলকারখানা নির্মাণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সভ্য রাষ্ট্র গড়া। এ পৃথিবী পৃষ্টে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ নাই। ক্ষেতের আখ যেমন চিনিতে পরিণত হয় চিনিকলের গুণে, তেমনি উন্নত মানব ও উচ্চতর সভ্যতা তো গড়ে উঠে রাষ্ট্রের গুণে। শ্রেষ্ঠতর বিজ্ঞান তাই সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণের বিজ্ঞান। নবীজী (সাঃ) তাই মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর নিজের ঘর  না গড়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার সর্বশ্রেষ্ঠ কর্মে মনোযোগী হয়েছিলেন। রাষ্ট্রনায়কের কাজটি তিনি নিজ হাতে তূলে নিয়েছিলেন। নবীজী (সাঃ) তাই শুধু ওযু, তায়াম্মুম, নামায-রোযা, হজ্ব-উমরাহ’র ন্যায় ইবাদতের পদ্ধতিই শিখিয়ে যাননি, বরং ১০ বছর যাবত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে হাতে কলমে শিখিয়ে গেছেন রাষ্ট্র নির্মাণ ও পরিচালনার পদ্ধতিও।  যার মধ্যে ঈমান আছে এবং নবীজী (সাঃ)’র প্রতি সামান্যতম ভালবাসা আছে সে কি নবীজী (সাঃ)’র এ গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত পালনে অমনোযোগী হতে পারে? কি করে রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারে?

ইসলাম বিশ্ববাসীকে বহু কিছুই দিয়েছে; কিন্তু ইসলামের সবচেয়ে  গুরুত্বপূর্ণ দানটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রের হাত দিয়েই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। শরিয়তের ন্যায় মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠদান তখন কিতাবে বন্দী থাকেনি, বরং সমাজে তা পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। তখন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল আইনের শাসন। কিন্তু আজকের মুসলিমগণ মসজিদ-মাদ্রাসায় গড়ায় মনযোগী হয়েছে, কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র গড়ায় নয়। নবীজী (সাঃ)র আমলে মদিনায় মসজিদে নববী ভিন্ন কোন মসজিদ ছিল না, অথচ বাংলাদেশে প্রতি গ্রাম ও প্রতি মহল্লায় একাধিক মসজিদ। তাতে ইসলামের বিজয় না এসেছে বিজয় বেড়েছে শয়তানের। শয়তানের এজেন্ডা হলো মানব সন্তানদের জাহান্নামে নেয়া। সে জন্যই চায়, পৃথিবীর কোন প্রান্তে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন যেন বিজয়ী না হয়। চায়, তাঁর শরিয়তি বিধান যেন প্রতিষ্ঠা না পায়। এবং শয়তান কখনোই চায় না মুসলিমগণ বেড়ে উঠুক বিশ্বশক্তি রূপে। এই জন্যই শয়তানী শক্তিবর্গ মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় বাধা দেয় না, সেগুলি নির্মূল করে না। বরং নির্মূল করে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের যে কোন উদ্যোগ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাই ঘোষণা দিয়েছিল, পৃথিবীর কোন প্রান্তে যদি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয় তবে সেটি বোমা মেরে ধুলিস্যাৎ করা হবে। যেন ইবলিস তার মুখ দিয়েই নিজের এজেন্ডার ঘোষণা দিয়েছিল। ইসরাইল, মিশর, ভারত, সৌদি আরব, সিরিয়া, মায়ানমারসহ পৃথিবের নানা প্রান্তে বহু দুর্বৃত্ত শাসক নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে। বহু দেশে গণহত্যা হচ্ছে নিয়মিত। পদদলিত হচ্ছে মৌলিক মানবিক অধিকার। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্য দেশগুলি সেগুলি নির্মূলের কথা বলে না। বরং সে সব দুর্বৃত্তদের নৃশংসতা বাড়াতে অস্ত্রের জোগান দেয়।

মানবাধিকার, নারীর অধিকার, দারিদ্রমুক্তি, দাসমুক্তি, দুর্বৃত্তিমুক্তি, ন্যায় বিচার, আইনের শাসন –এরূপ ভাল ভাল কথা বহু মানবই অতীতে বলে গেছেন। কিন্তু নবীজী (সাঃ)ই হলেন একমাত্র মহামানব যিনি ভাল ভাল কথা শুধু মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেই দ্বায়িত্ব সারেননি, বরং সেগুলিকে কার্যেও পরিণত করেছেন। এবং সেটি সম্ভব হয়েছিল তাঁর হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থাকার কারণে। রাষ্ট্রই হলো পৃথিবী পৃষ্ঠে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।  এ প্রতিষ্ঠানটি শয়তানের শক্তির হাতে থাকলে কোন নেক কর্মই করা সম্ভব নয়। মশা-মাছি যেমন আবর্জনার স্তুপে বেড়ে উঠে, তেমনি দুর্বৃত্তরা বেড়ে দুর্বৃত্ত কবলিত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলিতে। মশা-মাছির উপদ্রব কমাতে এজন্যই আবর্জনার নির্মূলে সচেষ্ট তে হয়। এজন্যই সবচেয়ে বড় নেককর্ম হলো রাষ্ট্রের বুক থেকে শয়তানী শক্তির নির্মূল এবং সেটিকে নিজ দখলে নেয়া। ঈমানদারদের রাজনীতির এটিই তো মূল এজেন্ডা। শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে বা নামাযীর সংখ্যা বাড়িয়ে সেটি সম্ভব নয়। নির্মূলের সে কাজটি যাতে অবিরাম হয় সে জন্য রাজনীতিতে অংশ নেয়াকে নবীজী (সাঃ) তাঁর উম্মতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নত রূপে প্রতিষ্ঠা দেন। সে সূন্নতটি পালন করেছেন সাহাবায়ে কেরামও। ঈমানদারের জীবনে জিহাদ আসে এবং সে জিহাদে শাহাদত আসে মূলত রাজনীতিতে অংশ নেয়ার কারণে। স্রেফ নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতে নিজেকে সীমিত করলে সে মহান মুহুর্তগুলি জীবনে কখনোই আসে না। এজন্যই বাংলাদেশের মত দেশগুলিতে নামাযী, হাজী, আলেম ও পীরদের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়লেও শহীদের সংখ্যা বাড়ছে না।  

মুসলিমদের পতনের কারণ, ইসলামের বহু ফরজ বিধান এবং নবীজী (সাঃ)’র বহু সূন্নত থেকে তারা দূরে সরেছে। তবে সবচেয়ে কারণটি হলো, তারা দূরে সরেছে নবীজী (সাঃ)’র রাজনীতির সূন্নত থেকে।  নবীজী (সাঃ)’র পবিত্র এ সূন্নতটি যে শুধু সাধারণ মুসলিমদের দ্বারা অমান্য হচ্ছে তা নয়, বরং সবচেয়ে বেশী অমান্য হচ্ছে তাদের দ্বারা যারা সমাজে আলেম নামে পরিচিত। রাষ্ট্রনায়কের যে আসনে খোদ নবীজী (সাঃ) বসেছেন এবং বসেছেন হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমর (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), এবং হযরত আলী (রাঃ)’র ন্যায় মহান সাহাবাগণ -সে আসনে বসায় তাদের আগ্রহ নাই। চেষ্টাও নাই। বরং রাজনীতি থেকে আলেমদের দূরে থাকার কারণে সে পবিত্র আসন দখলে গেছে ইসলামের শত্রুদের হাতে। বরং বিস্ময়ের বিষয়, রাজনীতি থেকে দূরে থাকাটি তাদের কাছে গণ্য হয় রুহানী পবিত্রতা রূপে। এবং রাজনীতি গণ্য হয় ক্ষমতালোভীদের দুষ্ট পেশা রূপে। প্রশ্ন হলো, রাজনীতি যদি দুষ্ট পেশা হয় তবে নবীজী (সাঃ) কেন রাষ্ট্রনায়ক হলেন? ‌এতে কি তাঁর রুহানী পবিত্রতা বিনষ্ট হয়েছিল?

রাজনীতি হলো রাষ্ট্রীয় অঙ্গণকে শয়তানের দখলদারী থেকে মূক্ত করার হাতিয়ার। এটি শুধু নবীজী (সাঃ)’র সূন্নতই নয়, বরং পবিত্র জিহাদ। শয়তান চায় ঈমানদারদের হাত থেকে রাজনীতির এ হাতিয়ারকে কেড়ে নিয়ে নিরস্ত্র করতে চায়। তখন সহজ হয় বিনাযুদ্ধে রাষ্ট্রের উপর শয়তানী শক্তির দখলদারী। এজন্যই শেখ মুজিব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পাওয়া মাত্র ইসলামপন্থিদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। নিষিদ্ধ করেছিল ইরানের শাহ, সিরিয়ার হাফেজ আল আসাদ এবং মিশরের জামাল আব্দুন নাসেরের ন্যায় ইসলামের দুশমনগণ। একই কারণে জনগণের জন্য রাজনীতি নিষিদ্ধ করে সকল স্বৈরাচারি শাসকগণ। হিফাজতে ইসলামের রাজনীতি রুখতে শেখ হাসিনা তাই শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যা ঘটিয়েছিল। এবং ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের।

 

শয়তানের এজেন্ডা এবং মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা

শয়তান চায় ইসলামে অঙ্গিকারহীন সেক্যুলার রাজনীতি। চায়, রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামবিরোধী শক্তির  অধিকৃতি। চায়, বহু টুকরায় বিভক্ত মুসলিম উম্মাহর দুর্বল ভূগোল। চায়, শরিয়তমুক্ত আদালত। চায়, কোর’আন মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা। সর্বোপরি শয়তানের লক্ষ্য হলো, সকল মানব শিশুকে জাহান্নামে নেয়া। অপর দিকে মহান আল্লাহতায়ালা চান, রাজনীতির অঙ্গণে ইসলামের বিজয়। চান, মুসলিম উম্মাহর মাঝে সীসাঢালা প্রাচীরসম ঐক্য। চান, ভাষা-বর্ণ-আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে মুসলিম উম্মাহর বিশাল ভূগোল। চান, আদালতে তাঁর দেয়া শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। চান, প্রতিটি মানব সন্তানের জন্য কোর’আনের জ্ঞান। সর্বোপরি চান, প্রতি মানব সন্তানকে জান্নাতে নিতে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, মহান আল্লাহতায়ালা যা চান -তা নিয়ে মুসলিমদের ভ্রক্ষেপ নাই। তারা ব্যস্ত শয়তান যা চায় সেগুলি বিজয়ী করতে। মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা গুরুত্ব পেলে কি মুসলিম বিশ্ব ৫৭ টুকরায় বিভক্ত হতো। ভারতে ভাষার সংখ্যা প্রায় ৭৮০টি। সরকারি ভাবে স্বীকৃত ভাষার সংখ্যা ২২টি। বর্ণ ও ধর্মের সংখ্যাও অনেক। তাছাড়া নানা বর্ণ ও নানা ভাষাভাষীর মাঝে একতা গড়া হিন্দু ধর্মে বাধ্যতামূলকও নয়। এরপরও ভারতে একত্রে একই ভূগোলে বসবাস করে ১২০ কোটি মানুষ। অপর দিকে আরব ভূ-খন্ডে ভাষা এক, অধিকাংশ মানুষের ধর্ম এবং বর্ণও এক। অথচ আরব ভূ-খন্ড বিভক্ত ২২ টুকরায়। শরিয়তের শাসন যেমন ভারতে  নাই, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া আরব বিশ্বেও নাই।  অতএব শয়তানের এজেন্ডা কোথায় অধিক বিজয়ী? বিষয়টি তো যে কোন ঈমানদারের বিবেকে ঝড় তোলার মত। কিন্তু তা নিয়ে ক’জন চিন্তিত। বরং বিভক্ত মানচিত্র নিয়ে প্রতিটি মুসলিম দেশে উৎসব হয়!  

মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে চরম বিদ্রোহটি শুধু নাস্তিক হওয়া বা মুর্তিপূজারী হওয়ার মধ্য দিয়ে ঘটে না।  সেটি ঘটে উম্মাহর মাঝে বিভক্তি এবং আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা না দেয়ায়। এমন বিদ্রোহ আযাব নামিয়ে আনে। মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে কি এ ব্যর্থতার কৈফিয়ত দিতে হবে না? একটি দেশে সমাজতন্ত্রিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে সে দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। তেমনি পুঁজিবাদ বা সেক্যুলারিজমের প্রতিষ্ঠা বাড়ে যদি সে মতবাদের অনুসারিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়। তেমনি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পাবে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? তাই দেশে কতগুলি মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মিত হলো বা কতজন আলেম তৈরি হলো -মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সেটিই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বরং অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে কতটা অগ্রগতি হলো -সেটি। কারণ মহান আল্লাহতায়ালা চান তার দ্বীনের বিজয় এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। শরিয়তের প্রতিষ্ঠা মসজিদের জায়নামাযে বা মাদ্রাসার ক্লাসরুমে হয় না। সেটি ঘটে রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, মাত্র কয়েক লক্ষ সাহাবী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে কাজটি করতে পেরেছিলেন, আজকের দেড়শত কোটি মুসলিম সেটি পারছে না। এ ব্যর্থতাটি আরো বিশাল ব্যর্থতার জন্ম দিয়েছে। এ ব্যর্থতা নামিয়ে এনেছে মহান আল্লাহতায়ালার আযাব।   

মুসলিমগণ পেয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ দান। সেটি হলো পবিত্র কোর’আন। এ পবিত্র আমানতের সাথে তাদের খেয়ানতটি অতি বিশাল। একমাত্র কোর’আনেই রয়েছে পার্থিব ও পারকালীন সাফল্যের রোডম্যাপ। এটি হলো সকল নৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক রোগমুক্তির প্রেসক্রিপশন। কিন্তু মুসলিমদের অপরাধ, মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া প্রেসক্রিপশনের বদলে তারা গ্রহণ করেছে শয়তানী পক্ষের দেয়া প্রেসক্রিপশনকে। ফলে মুসলিম দেশের আদালতে শরিয়তী আইনের বদলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কাফেরদের দেয়া আইন। একতার বদলে তারা নিয়েছে বিভক্তির পথ; ৫৭টি ন্যাশন স্টেটের নামে তারা গড়েছে বিভেদ ও বিভক্তির দেয়াল।

 

 

ইহুদীদের পথে মুসলিমেরা

আল্লাহর দ্বীনের মূল কথা হলো তাঁর আনুগত্য। সেটি তাঁর প্রতিটি হুকুমের প্রতি। কিন্তু বনি ইসরাইলের লোকেরা তথা ইহুদীরা ইতিহাস গড়েছিল আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে। মহান আল্লাহতায়ালা তাদের সে অবাধ্যতার কাহিনী পবিত্র কোর’আনে বার বার তুলে ধরেছেন। একটি জাতির জীবনে এমন অবাধ্যতা কিভাবে পরাজয় ও বিপর্যয় ডেকে আনে বার বার সে উদাহরণও দিয়েছেন। লক্ষ্য, কোর’আনের অনুসারিদের হুশিয়ার করা। ইহুদীরা হলো আল্লাহতায়ালার দ্বীনের ব্যর্থ ছাত্র। ব্যর্থ ছাত্রদের ইতিহাস পবিত্র কোর’আনে বার বার উল্লেখ করার কারণ সম্ভবতঃ এটিই যে, দ্বীনের নতুন ছাত্র মুসলিমগণ সে ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিবে। কিন্তু শিক্ষা না নিয়ে মুসলিমগণ ইহুদীদের পথ অনুসরণ করছে। ইহুদীগণ বিভক্ত হয়েছিল ১২ গোত্রে, আর মুসলিমগণ বিভক্ত হয়েছে ৫৭টি রাষ্ট্রে।

সিনা মরুভূমিতে বনি ইসরাইলীদরে বাঁচাতে করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালা বছরের পর বছর আসমান থেকে মান্না ও সালওয়া পাঠিয়েছিলেন। ফলে খাদ্য সংগ্রহে তাদের কোনরূপ মেহনতই করতে হয়নি। যখন মহান আল্লাহতায়ালার নেয়ামত আসে তখন বাড়তি কিছু দায়ভার এবং পরীক্ষাও আসে। কিন্তু বনি ইসরাইলরা সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিল। ফলে আযাব তাদের ঘিরে ধরে। তাদেরকে যেমন গৃহহীন হতে হয়েছে, তেমনি নানা দেশে বার বার গণহত্যার শিকারও হতে হয়েছে। হযরত মূসা (আঃ) যখন মাত্র ৪০ দিনের জন্য আল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন তখনই গাভীর মুর্তি তৈরী করে সেটির পূজা শুরু করেছে। এক মুর্তিপূজককে তারা ধর্মের স্থপতি রূপে গ্রহণ করেছে। ইহুদীদেরও শরিয়ত দেয়া হয়েছিল। মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাদেরকে কানান দেশে গিয়ে বসতি স্থাপন এবং সেখানে ইসলামি রাষ্ট্র নির্মানের হুকুমও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু  তারা মহান আল্লাহতায়ালার সে হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। তখন কানানে চলছিল জালেমদের শাসন। তাদের নির্মূলে প্রয়োজন জিহাদের। কিন্তু সে জিহাদে আগ্রহ ছিল না ইহুদীদের। তারা বলেছিল, “হে মূসা (আঃ) তুমি এবং তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ কর। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।” নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ যেমন জিহাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিল, ইহুদীগণ সেরূপ সাড়া দিলে মূসা (আঃ)’র হাতে তখন খেলাফতে রাশেদা প্রতিষ্ঠা হতো। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হয়েছেন নিজ সাথীদের বিদ্রোহের কারণে।

আজকের মুসলিম বিশ্ব অধিকৃত ইসলামের শত্রুপক্ষের হাতে। শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করতে হলে সে অধিকৃতির বিলুপ্তি চাই। সে জন্য জিহাদ চাই।  কিন্তু আজকের মুসলিমগণ সেরূপ একটি জিহাদ থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে –যেমন দূরে ছিল ইহুদীগণ।  অথচ মুসলিমদের জন্য মান্না ও সালওয়া আসছে অতি বিপুল ভাবে। সেটি আসমান থেকে নয়, বরং মাটির বুক চিরে। আসছে শত শত ট্রিলিয়ন ডলারের তেল-গ্যাস ও নানারূপ খনিজ সম্পদ রূপে। সে অঢেল সম্পদ লাভে মুসলিমদের কোন মেহনতই করতে হচ্ছে না। তেল-গ্যাসের বাইরেও রয়েছে মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দান, সেটি আল-কোরআন। প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের বিজয়ের পিছনে মূল শক্তি ছিল এই আল-কোরআন। আল-কোরআনের অনুসরণের মাধ্যমেই তারা সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের ব্যর্থতা শুধু আল-কোরআনের অনুসরণে নয়, দারুন ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে প্রদত্ত সম্পদের ব্যবহারেও। বিশ্বের আর কোন জাতির হাতে এতবড় নেয়ামত যেমন নেই, এত বড় খেয়ানতও নাই। আর খেয়ানত তো সব সময় পরাজয় ও আযাব ডেকে আনে। বিশ্বের মুসলিমগণ তো সে আযাবেরই মুখে। তাদের দেশ অধিকৃত হচ্ছে, শহরগুলি বিধ্বস্ত হচ্ছে। লাখে লাখে মানুষ নিহত হচ্ছে। এবং বহু লক্ষ মুসলিম নারী-পুরুষ উদ্বাস্তুর বেশে নানা দেশের পথে ঘাটে ঘুরছে।   

 

কেন অপরিহার্য ইসলামী রাষ্ট্র?

আল-কোরআনের যেখানেই পূর্ণ অনুসরণ, সেখানেই প্রতিষ্ঠা পায় ইসলামী রাষ্ট্র। বিষয়টি অন্যভাবেও বলা যায়, ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া সম্ভব নয় আল-কোরআনের পূর্ণ অনুসরণ। শরিয়তে প্রতিষ্ঠা দিতে ইসলামী রাষ্ট্র চাই। ইসলামী রাষ্ট্র চাই ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা দিতে ও মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোল বাড়াতে। আর্কিটেক্টের প্রণীত ডিজাইন পূর্ণভাবে অনুসৃত হলে সে ডিজাইন মাফিক কাঙ্খিত ইমারতটি নির্মিত হবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। সেটি ইসলামী রাষ্ট্রের বেলায়ও। মহান আল্লাহতায়ালা হলেন ইসলামি রাষ্ট্রের স্থপতি। সে রাষ্ট্রের নির্মানে প্রতিটি মুসলিম হলো তাঁর কারিগর। নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম কোর’আন-প্রদত্ত সে ডিজাইনের অনুসরণে নিজেদের শ্রম, মেধা, অর্থ ও রক্ত ব্যয় করেছিলেন বলেই নির্মিত হয়েছিল ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী সভ্যতার ইমারত। আর আজকের মুসলিমগণ নিজেদের শ্রম, মেধা, অর্থ ও রক্ত ব্যয় করছে সেক্যুলার, জাতীয়তাবাদী, পুঁজিবাদী বা সমাজবাদী ডিজাইনে রাষ্ট্র নির্মানে। মহান আল্লাহতায়ালার সাথে এর চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা বা গাদ্দারী আর কি হতে পারে?  

প্রশ্ন হলো, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোরআনের কি পূর্ণ অনুসরণ সম্ভব? সরকারের অুনমতি ছাড়া একখানি স্কুল, মাদ্রাসা, কারখানা বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাও সম্ভব নয়। কোরআন হাদীসের আলোকে একখানি ফতোয়া দেয়াও সম্ভব নয়। ফলে কীরূপে সম্ভব আল-কোরআনে নির্দেশ-মাফিক অন্যায়ের প্রতিরোধ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা? কীরূপে সম্ভব শরিয়তের প্রতিষ্ঠা? অনৈসলামিক দেশে শরিয়তী বিধান তো কিতাবে বন্দী হয়ে পড়ে। যেমনি হয়েছে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশে। এজন্যই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে অতি প্রিয় হলো ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। একমাত্র তখনই তাঁর দ্বীনের বিজয় আসে। এমন রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় মহান আল্লাহতায়াল তাঁর সম্মানিত ফেরেশতাদের পাঠান। কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুসলিম মোজাহিদ আর ফেরেশতাগণ তখন একাকার হয়ে যায়। তখন অনিবার্য হয় বিজয়লাভ। সেটি যে শুধু বদর যুদ্ধে ঘটেছিল তা নয়, তেমন ঘটেছিল ওহুদ, খন্দক, হুনায়ুন, তাবুক, মুতাসহ অসংখ্য যুদ্ধে। সে বিবরণ পবিত্র কোরআনে বার বার এসেছে। অথচ মসজিদের জায়নামাযে বা পীরের খানকায় জিকরে বসে বা নামাযে বসে ফিরশতা নামিয়ে আনা হয়েছে -সে প্রমাণ নেই। সাহায্য পাওয়ার শর্তটি হলো, ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং সে রাষ্ঠ্রের প্রতিরক্ষায় নিজেদের জানমালের বিনিয়োগ। তখন বিনিয়োগ বাড়ে মহান আল্লাহতায়ালার। নবীজী (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম তো সে পথেই মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য পেয়েছিলেন। তেমন একটি ইসলামী রাষ্ট্র রাসূল্লাহ (সাঃ)র মক্কী জীবনে নির্মিত হয়নি, ফলে সেখানে বদর, ওহুদ, খন্দক, হুনায়ুনের ন্যায় জানমালের বিনিয়োগের ক্ষেত্রও প্রস্তুত হয়নি। জান-মালের সে বিনিয়োগটি নামায-রোযা ও হজ-যাকাতে ঘটে না। সে জন্য হিযরত করতে হয়, হিযরত শেষে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাও করতে হয়। শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয়, সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসে মক্কার মুসলমানদের মদিনায় হিজরত এজন্যই এতটা ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের হিজরতের ফলে শুধু যে একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল তা নয়, উদ্ভব ঘটেছিল মানব-ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। মানব জাতির ইতিহাস সে দিনটিতে নতুন মোড় নিয়েছিল। হিজরতের দিনটি থেকে সাল গণনা চালু করে সেকালের মুসলিমগণ হিজরতের গুরুত্বকেই মূলত বুঝিয়েছেন।

 

আল্লাহর সাহায্য যে পথে অনিবার্য হয়

ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না পেলে সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার প্রশ্নই উঠে না। প্রশ্ন উঠে না শরিয়ত প্রতিষ্ঠার এবং সে সাথে জিহাদের। সেরূপ অনৈসলামিক রাষ্ট্রে গুরুত্ব হারায় ঈমানদারদের জানমালের বিনিয়োগের বিষয়টিও। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী না হলে মুসলিমদের জানমাল ও মেধার এজন্যই বিপুল অপচয় ঘটে। তখন কোটি কোটি মানুষ জানমালের কোন রূপ বিনিয়োগ না রেখেই ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায়। অথচ ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মানে বিস্ফোরণ ঘটে সে শক্তির। নবীজীর আমলে দাওয়া, জিহাদ ও রাজনীতির ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ময়দানে নেমে এসেছিলেন প্রতিটি মুসলিম। কিছু অন্ধ, পঙ্গু ও বৃদ্ধ ছাড়া প্রত্যেকে ছুটেছেন জিহাদের ময়দানে। তখন বেতনভোগী সেনা-অফিসার বা সেপাই পালনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি। প্রতিটি নাগরিক পরিণত রাষ্ট্রের অতন্দ্র প্রহরীতে। প্রতিটি ঘর পরিণত হয়েছিল রাষ্ট্রের পাওয়ার হাউসে। অথচ আজ সে সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়েছে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে শতকরা একজন লোকও কি তেমন বিনিয়োগে নেমেছে? বাংলাদেশের মত গরীব দেশে উচ্চ বেতন বা দামী প্লটের প্রতিশ্রুতি দিতে হয় সেনা অফিসারদের। নবীজী দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে পাথরের আঘাতে আহত হয়েছেন। অথচ আজ অর্থ না দিলে আলেমগণ রাজী নন ওয়াজ করতে। কোর’আনের বাণী এভাবে তেজারতের মাধ্যেম পরিণত হয়েছে। সেক্যুলারিজম তথা পার্থিব স্বার্থ চেতনা মুসলিমদের চেতনাকে যে কতটা কলুষিত করেছে -এ হলো তার নমুনা। ফলে ইসলাম শক্তি পাবে কোত্থেকে? মহান আল্লাহতায়ালাই বা কেন এমন পথভ্রষ্ট জাতিকে বিজয়ী করতে ফেরেশতাদের পাঠাবেন? আল্লাহতায়ালা তো তাদের সাহায্যে ফেরেশতা পাঠান তাঁর রাস্তায় যাদের নিজেদের জানমালের বিনিয়োগটি বিশাল। 

ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইসলামের যে দ্রুত প্রসার হয় এবং মুসলিমগণ যে দ্রুত বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয় -তা নিয়ে সেক্যুলার মুসলিমদের সংশয় থাকলেও সেরূপ সংশয় শয়তানের নাই। তাছাড়া মানব সমাজে সবচেয়ে কঠিন কাজটি ঘর গড়া, রাস্তাঘাট নির্মাণ বা কারখানা গড়া নয় বরং মানব সন্তানকে ঈমানদার রূপে গড়ে তোলা। সে কঠিন কাজটি শুধু পিতামাতার দ্বারা হয় না। ওয়াজ মহফিল বা পীরের হুজরাতেও হয় না। সে জন্য রাষ্ট্র চাই। সে কাজে সকল রাষ্টীয় প্রতিষ্ঠানগুলির সহযোগিতা চাই। চাই, জাহান্নামে পথে টানে এরূপ প্রতিষ্ঠানগুলির বিলুপ্তি। নবীজী (সাঃ) তাঁর মক্কী জীবনের ১৩ বছরের লাগাতর চেষ্টায় এমন কি তিন শত মানুষকেও মুসলিম বানাতে পারেননি। হযরত ঈসা (আঃ) তাঁর সারা জীবনে হাতে গুণা মাত্র কয়েকজনকে ঈমানদার বানাতে পেরেছিলেন। কারণ হযরত ঈসা (আঃ)’য়ের হাতে রাষ্ট্র ছিল না। মক্কী জীবনে নবীজী (সাঃ)’র হাতেও রাষ্ট্র ছিল না। অথচ মদিনা কেন্দ্রীক ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে তোলার পর দলে দলে ইসলাম কবুলের জোয়ার শুরু হয়। শয়তান সেটি জানে। শয়তান এ জন্যই ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা নবীজী (সাঃ)র আমলে মেনে নিতে রাজী হয়নি, আজও রাজী নয়। ২০০১ সালে আফগানিস্তানের উপর মার্কিন হামলার মূল হেতুতো সেটিই। উপমহাদেশের মুসলিমদের পাকিস্তান প্রজেক্ট এজন্যই শুরু থেকে হামলার মুখে পড়ে। বাংলাদেশে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির সরকার এজন্যই ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে নির্যাতনে নামে এবং খুঁজে খুঁজে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করে।

ইসলামী রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব ও আইন-কানুন যেহেতু মহান আল্লাহতায়ালার, সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় তাঁর বিনিয়োগও বিশাল। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালার সে নিজস্ব বিনিয়োগের বিবরণটি এসেছে এভাবেঃ “স্মরণ কর, (বদরের যুদ্ধের প্রাক্কালে) তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে সাহায্য প্রার্থণা করেছিলে; তখন তিনি তোমাদেরকে জবাব দিয়েছিলেন, “আমি তোমাদিগকে সাহায্য করবো এক হাজার ফিরেশতা দিয়ে, যারা একের পর আসবে।” –(সুরা আনফাল, আয়াত ৯)। বদরের যুদ্ধে কাফের যোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল এক হাজার। আর মুসলিম মোজাহিদদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন। এবং তারাও কোন চুড়ান্ত যুদ্ধের জন্য পরিকল্পনা মাফিক সেখানে হাজির হননি। তাদের লক্ষ্য ছিল, আবু সুফিয়ানের সিরিয়া থেকে ফেরতগামী বাণিজ্য কাফেলার উপর স্ট্রাটিজিক হামলা এবং তাকে সবক শেখনো। কিন্তু আল্লাহতায়ালার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। তিনি চাচ্ছিলেন একটি যুদ্ধ যাতে গলা কাটা পড়বে আবু জেহেল, ওতবা, শায়বার মত শীর্ষস্থানীয় কাফের সর্দারদের। ফলে ঘনিয়ে এলো ভয়ানক এক যুদ্ধ। সংখ্যায় অল্প হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমগণ সেদিন পিছুটান দেয়নি। ইহুদীদের ন্যায় নবীজী (সাঃ)কে তাঁরা একথা বলেননি, “যাও তুমি আর তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ কর। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।” বরং বলেছেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনার উপর ঈমান এনেছি। আপনি যদি আমাদেরকে নিয়ে সমূদ্রেও ঝাঁপিয়ে পড়েন তবুও আমাদেরকে সাথে পাবেন।” মহান আল্লাহ তো তাঁর বান্দাহর এমন বিনিয়োগটিই দেখতে চান। তাদের নিজ প্রাণের এমন বিনিয়োগই আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যলাভকে সুনিশ্চিত করে। অতীতে মুসলমানদের বিজয় তো এভাবেই এসেছে। এমন বিজয় যেমন জনশক্তিতে আসেনি, তেমনি অর্থবলেও আসেনি। এসেছে আল্লাহর সাহায্যে। আর কার সাহায্য মহা-পরাক্রমশালী আল্লাহর সাহায্যের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে? পবিত্র কোরআনে তাই বলেছেন, “এবং কোন সাহায্যই নাই একমাত্র আল্লাহর নিকট থেকে আসা সাহায্য ছাড়া। আল্লাহই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” –(সুরা আনফাল আয়াত ১০)। শত্রু শক্তির বিরুদ্ধে লড়ায়ে মুসলিমদের প্রস্তুতিতে কোন রূপ কমতি থাকলে সেটি পূরণ করে দেন প্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহতায়ালা। এটিই মহান আল্লাহর সূন্নত। বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের যা সৈন্যসংখ্যা ছিল আল্লাহতায়ালা তার তিনগুণের অধিক ফিরেশতাদের দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। আর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ যখন সাহায্য করেন তখন কি সে বাহিনীকে দুনিয়ার কেউ হারাতে পারে? নিঃস্ব ও স্বল্প সংখ্যক মুসলিমদের পক্ষে সে কালে বিশ্বশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মূল রহস্য তো এখানেই। আজও কি এর বিকল্প পথ আছে?

কোন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠিও যখন নিছক মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা নিয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে তখন সে রাষ্ট্রটি আল্লাহতায়ালার রাষ্ট্রে পরিনত হয়। আল্লাহতায়ালার সাহায্য লাভের জন্য সে রাষ্ট্রটি তখন শ্রেষ্ঠ অসিলায় পরিনত হয়। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত না হলে তাই মুসলিমেরা বঞ্চিত হয় মহান আল্লাহর সাহায্য লাভের সে সুনিশ্চিত অসিলা থেকে। মুসলমানদের জীবনে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা ঘটে তখন। মান্না-সালওয়া জুটলেও তখন বিজয় আসেনা, ইজ্জতও বাড়ে না। নির্মিত হয় না ইসলামী সভ্যতা ও বিশ্বশক্তি। আজকের মুসলিমগণ অঢেল সম্পদের উপর বসবাস করেও পরাজিত ও অপমানিত হচ্ছে তো সে কারণেই। অথচ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় মহান আল্লাহর ফিরেশতারা সদাপ্রস্তুত। সে প্রতিশ্রতি মহান আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে বার বার শুনিয়েছেন। তবে ফেরেশতাদের জমিনে নামার শর্ত হলো, ঈমানদারদের নিয়েত যেমন ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় থাকতে হয়, তেমনি থাকতে হয় সে লক্ষ্যে নিজেদের সর্বাত্মক বিনিয়োগটি। নবীজী (সাঃ)’র সাহাবাদের নিয়তে  কোন দূষণ ছিল না। মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি নিয়েও তাদের  মনে কোন সন্দেহ ছিল না। এবং কোনরূপ কার্পণ্য ছিল না নিজ নিজ জানমালের বিনিয়োগে। বিজয়ের পথে এটিই তো একমাত্র রোড ম্যাপ। কিন্তু আজ মুসলিমদের চেতনায় বড় বিভ্রাট গড়ে উঠেছে এ ক্ষেত্রটিতে। তাদের নিয়তে যেমন ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা নেই, তেমনি সে লক্ষ্যে বিনিয়োগও নাই। তাদের ভরসা বেড়েছে নিজেদের অর্থ, অস্ত্র ও লোকবলের উপর, আল্লাহর সাহায্যের উপর নয়। ফলে অর্থ, অস্ত্র ও জনশক্তি বাড়লেও পরাজয় এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।  ২১/১১/২০২০




ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র

বিদ্রোহ আল্লাহর বিরুদ্ধে

জাতির পরাজয় এবং বিপর্যয়ের কারণগুলি বহুবিধ। তবে শুরুটি হয় জনগণের চিন্তা-চেতনা থেকে। হাত-পায়ে যত শক্তিই থাক, মগজ হুশ হারালে দেহও শক্তিহীন হয়। তেমনি অবস্থা একটি জাতির। অতীতে মুসলিমগণ যখন বিজয়ের পর বিজয় এনেছিল এবং দ্রুত প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল বিশ্বশক্তি রূপে -তখন তাদের হাতে তেল-গ্যাস ও বিশাল জনশক্তি ছিল না। হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসাও ছিল না। কিন্তু মুসলিম নারী-পুরুষের চেতনায় সুস্থ্যতা ছিল। জীবনের মিশন নিয়ে পূর্ণ সচেতনতা ছিল। সে সুস্থ্যতা ও সচেনতার মূল ভিত্তিটি ছিল ঈমান এবং কোরআনী জ্ঞান। কিন্তু আজ সে সচেতনতা প্রায়ই  বিলুপ্ত। চেতনার সে বেহাল অবস্থাটি প্রকাশ পাচ্ছে মুসলিমদের ধর্ম-কর্ম, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আচার-আচরণে। ফলে ব্যর্থ হচ্ছে ফরজ দায়িত্ব পালেন। এরই প্রমাণ, তারা ব্যর্থ হয়েছে ঐক্যবদ্ধ হতে। ব্যর্থ হয়েছে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে। পূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার বদলে প্রায়োরিটি পাচ্ছে ভাষা, অঞ্চল, দেশ, মজহাব ও ফেরকার পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠা। এভাবে গড়ছে আত্মঘাতী বিভক্তি। পৃথিবীতে আজ ৫৭টি মুসলিম দেশ; উড়ছে ৫৭টি জাতীয় রাষ্ট্রের পতাকা। কিন্তু কোথাও কি উড়ছে ইসলামের পতাকা? বরং  প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নৃশংস স্বৈরাচার ও রাজতন্ত্র; পদদলিত হচ্ছে মৌলিক মানবিক অধিকার। এবং জোয়ার এসেছে কুফরি আইন-কানূন, সূদ-ঘুষ, মদ-জুয়া, পতিতাবৃত্তির ন্যায় পাপাচারের।

হুশ হারালে ভাবনার ও মাতমের সামর্থ্য থাকে না। ফলে ইসলামের পরাজয়ের পরও মুসলিমদের মাঝে মাতম নেই। চিন্তা-ভাবনাও নাই। নেতৃবর্গ ব্যস্ত নিজেদের স্বার্থ হাসিল, দলের বিজয় ও গদি দখল নিয়ে। অপরদিকে জনগণও বসে নাই; তারা ব্যস্ত নিজেদের এজেন্ডা নিয়ে। নিজেদের কাজকর্ম, ধর্মপালন, রাজনীতি, সংস্কৃতি, প্রশাসন এবং আইন-কানূনের মধ্যেও যে মহান আল্লাহতায়লার এজেন্ডা থাকে এবং সে এজেন্ডার বাস্তবায়নে প্রতিটি ঈমানদারের যে ঈমানী দায়বদ্ধতা থাকে -সে হুশই বা ক’জনের। বরং বিচ্যুতি এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, বিস্মৃতির পাশাপাশি প্রশ্ন তোলা হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা নিয়ে। বিতণ্ডা উঠছে খোদ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে। অনেকেরই দাবী, কোর’আন নাযিলের লক্ষ্য ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়, বরং সেটি ব্যক্তির ইসলাহ ও আত্মীক পরিশুদ্ধি। অথচ তারা ভূলে যায়, পবিত্র কোরআনে বহু আয়াত নাযিল হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার আইন প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়ে। শরিয়তের আইন না মানলে পবিত্র কোর’আনে তাকে কাফের, জালেম ও ফাসেক বলা হয়েছে। এবং ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা না দিলে শরিয়তের প্রতিষ্ঠাই বা কীরূপে সম্ভব? সাহাবী কেরামদের জানমালের বিশাল ভাগ ব্যয় হয়েছে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এবং সে রাষ্ট্রে আল্লাহর এজেন্ডা বাস্তবায়নে। শতকরা ৭০ ভাগের বেশী সাহাবী সে কাজে শহীদ হয়েছেন। নবীজী (সাঃ)কে যুদ্ধের পর যুদ্ধ করতে হয়েছে এবং তিনি নিজেও আহতও হয়েছেন। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের কাছে পূর্ণ  আত্মসমর্পণ। যে কোন বিদ্রোহ ও অবাধ্যতাই হলো কুফরি। সে অবাধ্যতাটি যেমন নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত পালনে হতে পারে তেমনি হতে পারে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অঙ্গণও। এর চেয়ে বড় অবাধ্যতা আর কি হতে পারে, মুসলিমগণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলো এবং সে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা দিল কাফেরদের প্রণীত আইন? এবং মহান আল্লাহতায়ালার বদলে নিজেরাই আইনপ্রণেতা হয়ে বসলো। এটি তো তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতার উপর হামলা। এ কাজ তো কাফের, জালেম  ও ফাসেকের।      

ব্যক্তির জীবনে বড় রকমের পরিশুদ্ধি কখনোই ভাবনাশূণ্য অলস জীবনে আসে না। পরিশুদ্ধিটি তখন আসে যখন জীবন কাটে অর্থ, শ্রম, মেধা এবং জানের কোরবানীর মধ্য দিয়ে। এবং সেটি ঘটে মহান আল্লাহতায়ালার পথে জিহাদে। এ জন্যই যে জনগণের মাঝে জিহাদ নাই, সে জনপদে নামায-রোযা, হজ-যাকাত যতই থাক, চরিত্র ও কর্মে তাদের মাঝে পরিশুদ্ধি আসে না। ইসলামী রাষ্ট্রও গড়ে উঠে না। বরং মুসলিম দেশ তখন ইতিহাস গড়ে দুর্নীতিতে। “সামেয়’না ওয়া তায়া’না” অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম শুনলাম এবং মেনে নিলাম –আত্মার এমন ধ্বনিটি মূলত পরিশুদ্ধ আত্মার। পরিতাপের বিষয়, মুসলিম সমাজে তেমন একটি স্বতঃস্ফুর্ততা বিলুপ্ত হয়েছে। বরং “শুনলাম এবং বিদ্রোহ করলাম” –সেটিই আজ রীতিতে পরিণত হয়েছে। মূলত সে বিদ্রোহের উপরই প্রতিষ্ঠিত আজকের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সংবিধান, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি। ফলে মুসলিম দেশে মহা-পরাক্রমশালী আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বদলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে জনগণের সার্বভৌমত্ব। এবং নর্দমায় গিয়ে পড়েছে শরিয়তী আইন, খেলাফতী শাসন ও বিশ্বমুসলিম ভাতৃত্ব। উদ্ধতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে খোদ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে। এর চেয়ে বড়  শিরক আর কি হতে পারে? শিরকের গুনাহ কি কখনো মাফ হয়?  

 

বিতর্ক ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা নিয়ে

ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এখন আর শুধু মুসলিম নামধারী সেক্যুলারিস্টদের মাঝে সীমিত নয়; অনাগ্রহ ও বিতণ্ডা শুরু হয়েছে আলেম সমাজ ও ইসলামী দলগুলোর মধ্যেও। দেশের রাজনীতি এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাবলিগ জামায়াত, নানা তরিকার সুফীদল ও অধিকাংশ পীরদের কোন মাথাব্যাথা নেই। অনেকে সেটিকে দুনিয়াদারিও বলে। তাদের এ অনাগ্রহে প্রচণ্ড খুশি সেক্যুলারিস্টগণ। মুসলিম দেশগুলির রাজনীতিতে এরাই বিজয়ী শক্তি। তারা চায়না ধর্মপ্রাণ মানুষ রাজনীতিতে তাদের প্রতিদ্বন্দি রূপে খাড়া হোক। পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের স্ট্রাটেজী,এদেরকে সাথে নিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিটি উদ্যোগকে প্রতিহত করা। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে সূন্নত নবীজী(সাঃ) রেখে গেছেন, সে পথে এগুনোর চেষ্ঠা যেমন অতীতে হয়েছে তেমনি আজও হচ্ছে। যে সব আলেম ইসলামি রাষ্ট্রের নির্মানে বিশ্বাসী তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়  হলেন, নজদের শেখ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহাব, বাংলার হাজী শরিয়াতুল্লাহ ও শহীদ হাজী নেছার আলী তিতুমীর, মিশরের শহীদ হাসানূল বান্না, শহীদ কুতুব, শেখ ইউসুফ কারযাভী, পাকিস্তানের মাওলানা মওদূদী ও ডাক্তার ইসরার আহমেদ, ফিলিস্তিনের শেখ আযযাম,সূদানের ডক্টর হাসান তুরাবী এবং তিউনিসিয়ার রশীদ আল ঘানুশী প্রমুখ। শিয়াদের মধ্য এ মতের প্রধান ধারক হলেন, ইরানের আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমিনী, আয়াতুল্লাহ মুর্তজা মোতাহারী, লেবাননের আয়াতুল্লাহ শেখ ফজলুল্লাহ প্রমুখ। ইরানের বিপ্লব,আফগানিস্তানে তালেবানদের উত্থান ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রদায়িক বিপ্লবের ফলে এ মতের অনুসারিরা দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে তাদের ঘোরতর প্রতিপক্ষ রূপে দাঁড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইসরাইল ও ভারতসহ বিশ্বের তাবত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ। নবীজী (সাঃ)র নির্দেশিত ইসলামের মূল ধারায় ফিরে যাওয়ার যে কোন উদ্যোগকে তারা বলছে মৌলবাদ। চিত্রিত হচ্ছে পাশ্চাত্যের সেক্যুলার মূল্যবোধের ঘোরতর প্রতিপক্ষ রূপে। এবং মুসলিমদের আজকের বিভক্ত মানচিত্র ও পরাজিত অবস্থাকে বলছে স্থিতিশীলতা। এরূপ বিভক্তির মাঝে নিজেদের নিরাপত্তা দেখে। তাদের দাবী, মুসলিম বিশ্বের এ স্থিতিশীলতাকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। “গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর” নামে নানা দেশে তারা যে রক্তাত্ব যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে তার মূল লক্ষ্য হলো, নবীজী (সাঃ)র ইসলামের দিকে ফিরে যাওয়ার এ বিপ্লবী ধারাকে প্রতিহত করা। 

ইসলামী রাষ্ট্র নির্মান নিয়ে মুসলিম দেশের সেক্যুলারিষ্টদের চেতনার বিভ্রাট যে কতটা প্রকট তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। আওয়ামী লীগের নেতা এবং এক সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জনাব হোসেন শহীদ সহরাওয়ার্দী। পাকিস্তানকে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার দাবীর জবাবে তিনি বলতেন, ইসলামী রাষ্ট্র আবার কেন? যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম, সেটিই তো ইসলামী রাষ্ট্র। অবাক করার মত কথা। অথচ জনাব সহরাওয়ার্দী মুর্খ ছিলেন না। ছিলেন ব্যারিষ্টার। জন্মেছিলেন এমন এক মুসলিম পরিবারে যে পরিবারে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিসহ বহু জ্ঞানী ব্যক্তি জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু এই হলো তাঁর জ্ঞানের গভীরতা! একই রূপ চেতনা বিভ্রাট নিয়ে বসবাস করছে প্রতিটি মুসলিম দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ। অথচ অতি সাধারণ কথা হলো,পরিবারের সদস্যের সবাই নামে মুসলিম হলেই সেটি ইসলামি পরিবার হয় না। কত পরিবারই তো আছে যেখানে নামায-রোযা-হজ-যাকাত নাই, পর্দা-পুশিদাও নাই। হারাম-হালাল, সূদ-ঘুষের বাছবিচারও নাই। আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে চলছে অহরহ। এমন পরিবারে মদজুয়া, নাচ-গান, ব্যাভিচারি ও বেপর্দাগী যেমন চলতে পারে,তেমনি সেগুলি সেক্যুলারিজম,সমাজাবাদ ও জাতীয়তাবাদের ঘাঁটিও হতে পারে। সেসব পরিবারের লোকেরা এমনকি কোরআনী বিধানের প্রয়োগের বিরুদ্ধে যুদ্ধাংদেহীও হতে পারে। এমন পরিবারের সদস্যরা নামে মুসলিম হলেও তাদেরকে কি ইসলামী বলা যায়? তেমনি দেশের নাগরিকদের অধিকাংশ মুসলিম হলেই কোন রাষ্ট্র ইসলামী হয় না। ইসলামী হওয়ার জন্য শর্ত হলো, সেখানে সার্বভৌমত্ব থাকবে একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালার। এবং আইন-আদালতে থাকবে শরিয়তের বিধান।

 

বিভ্রান্তি ইসলামকে জানায়

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিতর্কটি শুরু হয়েছে মূলত ইসলাম-পালন নিয়ে মতের ভিন্নতা থেকে। সবাই যেমন ইসলামকে একই ভাবে দেখে না, তেমনি ধর্মকর্মও সবাই একই ভাবে করে না। ইসলাম বলতে অনেকেই বুঝে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল, আখেরাত, বিচারদিন, ফিরেশতা ও আসমানী কিতাবের উপর ঈমান এবং নামায-রোযা-হজ-যাকাত পালন। তাদের চিন্তার গণ্ডিতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভাবনা যেমন নেই, তেমনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জিহাদ এবং কোরবানীও নেই। আল্লাহর শরিয়তী বিধান রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হলো কি হলো না -তা নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথা বা আগ্রহও নেই। তাদের ধর্ম-পালন স্রেফ নামায-রোযা-হজ-যাকাত পালনে সীমিত। বহুশত বছর ধরে মুসলিম দেশগুলিতে এরাই ধর্মপ্রাণ মুসলিম বলে প্রশংসিত হয়ে আসছে। তাদের ইসলামকে বলা হয় মডারেট ইসলাম। অপরদিকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যারা বিশ্বাসী তাদেরকে চিত্রিত করা হয় মৌলবাদী বা চরমপন্থি মুসলিম রূপে। তাদের ইসলামকে বলা হচ্ছে পলিটিকাল ইসলাম। বাংলাদেশের সেক্যুলারিষ্টরা তাদেরকে জঙ্গিবাদী রূপে অভিহিত করছে এবং তাদের ইসলামকে বলছে জঙ্গি ইসলাম। স্বৈরাচার অধিকৃত প্রতিটি মুসলিম দেশে তাদেরকে রাজনৈতিক শত্রু রূপে দেখা হয়। তাদের উপর যে শুধু রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা জেল-জুলুম আছে তা নয়, তাদের হত্যায় কোন রূপ বিচার অনুষ্ঠানের প্রয়োজন আছে বলেও মনে করা হয় না।

ইসলামের আংশিক অনুসরণকারিগণ আজ ঘরে ঘরে। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ হজ্বে যায়। বাংলাদেশে তাবলিগের জামায়াতের ইজতেমাতেও বিশ লাখের বেশী মানুষ তল্পি-তল্পা নিয়ে হাজির হয়। দেশে দেশে এরূপ বহু এজতেমা হচ্ছে¸ নির্মিত হচ্ছে হাজার হাজার মসজিদ ও মাদ্রাসা। লিখিত হচেছ শত শত বই। কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে লোক নেই। বরং বিরোধীতা শুরু হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা নিয়ে। বলা হচ্ছে, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ ও কোরবানী পেশের বিষয়টি ঈমানদার হওয়ার জন্য শর্ত নয়। অনেকে বলছেন,আল্লাহতায়ালা দেখেন মুমিনের ঈমান, দেখেন তাঁর প্রতি ব্যক্তির ভালবাসা, তাঁর আক্বিদা এবং নামায-রোযা-হজ-যাকাতের ন্যায় ইবাদত। এ মতের প্রচারে শুধু যে সেক্যুলার রাজনীতিবিদ ও বু্দ্ধিজীবীগণ ময়দানে নেমেছে তা নয়, ময়দানে নেমেছে বহু হাজার আলেম, অসংখ্য বুদ্ধিজীবী, এমন কি তথাকথিত ইসলামি আন্দোলনের বহু নেতা-কর্মীও।

 

বিভ্রান্তি ধর্মের নামে 

ভেজাল ঔষধও ঔষধের রূপ ধরে বাজারে আসে। তেমনি মেকী ধর্মও ধর্মের নামে রূপ ধরে আসে। বনি ইসরাইলীদের কোন পৌত্তলিক কাফের বা নাস্তিক পথভ্রষ্ট করেনি। পথভ্রষ্ট করেছে তাদের আলেমরা। তারা মূসা (আঃ)’র শেখানো প্রকৃত ইসলামকে জনগণ থেকে আড়াল করেছে। হযরত মূসা (আঃ)এর শিক্ষাকে আবার জীবন্তু করার চেষ্টা করলেন যখন ঈসা (আঃ), তখন ইহুদী আলেমগণ মিথ্যা অপবাদে তাঁকে জেরুজালেমের রোমান শাসকের হাতে তুলে দিল। তাঁকে হত্যা করারও দাবী জানালো।  মহান আল্লাহতায়ালা তাদের সে অপরাধের বিবরণ অতি বিষদ ভাবে তুলে ধরেছেন পবিত্র কোর’আনে। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে নবীজী (সাঃ)’র ও তাঁর সাহাবাযে কেরামের জিহাদ ও কোরবানীকে আজ যারা সাধারণ মুসলিমদের থেকে আড়াল করে রেখেছে তারাও কোন পৌত্তলিক কাফের নয়। ইহুদী-নাছারা বা নাস্তিকরাও নয়। সে কাজ তো তাদের, যাদের হাতে অধিকৃত দেশের মসজিদ-মাদ্রসা।

ইসলামের লেবাসধারি অনেকে ইদানিং বলা শুরু করেছেন, আধ্যাত্মীক পরিশুদ্ধির উপর সমাজ বা কম্যুনিটি গড়ে তোলাই যথেষ্ট। এবং বলছেন, এটিই মুসলিমদের প্রধান কাজ, রাষ্ট নির্মাণ নয়। আধ্যাত্মীকতাকেই তারা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম রূপে চিত্রিত করছেন। রাষ্ট্র, রাজনীতি, শরিয়ত, জিহাদ –এসবকে তারা নিজেদের ধর্মীয় কাজ-কর্মের তালিকা থেকেই বিদায় দিয়েছেন। অনেকে বলছেন, সেক্যুলারিজমের সাথে ইসলামের কোন সংঘাত নেই। এভাবে জায়েজ বলছেন সেক্যুলারিজমকেও। এভাবে বিভ্রাট ঘটছে যেমন ইসলাম বুঝায়, তেমনি ধর্মপালনে। শ্রী চৈতন্য দেব ভক্তিমূলক গান গেয়েই বাংলায় ইসলামের দ্রুত প্রসার রুখে দিয়েছিলেন, এবং তিনি দেখিয়েছিলেন ধর্ম-পালন ও ধার্মিক সাজার সহজ পথ। হিন্দুরা তখন গানের মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজেছে। গানের মধ্যে আধ্যাত্মীকতা ও মনের তৃপ্তি খোঁজে সুফি তরিকার অনুসারি বহু মুসলিমও। ফলে কদর বেড়েছে লালন ফকির ও হাসন রাজার মত গায়কদের। ভক্তি ভরে গান গাইলে এবং ভক্তির অতিশায্যে পাগল হলে, এবং পাগলের বেশে এমনকি উলঙ্গ হলেও মহান আল্লাহতায়ালা অধিক খুশি হবেন -এমন ধারণাও অনেকের। এরূপ পাগল মারা গেলে তার কবর ঘিরে বসে গান এবং মদ-গাঁজা-হিরোইন সেবনের আসর।। ভাবটা এমন, মনে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি থাকলে গান গেয়ে মদ-গাঁজা-হিরোইন সেবনে দোষ নেই। প্রয়োজন নেই আল্লাহর হুকুম পালনের। ধর্ম নিয়ে এমন বিভ্রান্তিতে সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হয়েছে খৃষ্টান ধর্মের অনুসারিগণ। যীশু খৃষ্টের প্রতি ভালবাসার গানই এ ধর্মের মূল কথা। রবিবারে গীর্জায় দল বেঁধে সে গান গাওয়াটাই তাদের প্রধান ধর্মকর্ম। এ ধর্মে হারাম-হালালের কোন বালাই নেই। পাপ যত বিশাল ও জঘন্যই হোক -তাতে শাস্তির ভয়ও নেই। তাদের বিশ্বাস, তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত ঈসা (আঃ) বহু আগেই করে গেছেন। খৃষ্টানদের কাজ হলো শুধু গীর্জায় গিয়ে তাঁর প্রতি ভক্তিতে গান গাওয়া। চিকিৎসার নামে ঝাড়-ফুঁকের মধ্যেও যেমন অজ্ঞ মানুষের তৃপ্তিবোধ ও মনতুষ্টি থাকে, তেমনি তৃপ্তিবোধ ও মনতুষ্টি রয়েছে এমন ধর্মপালনেও। সেটি আদৌ সত্য-নির্ভর কিনা -তা নিয়ে চিন্তাভাবনা নেই।

ধর্মপালনের নামে বাংলাদেশের মুসলিমদের বিভ্রান্তু ও পথভ্রষ্ট করার সে সনাতন কৌশলটি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ। তারা লালন শাহ ও হাসন রাজার গানের খোঁজ করছে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মানের আন্দোলন যতই তীব্রতা পাচ্ছে, সেক্যুলারিস্টদের পক্ষ থেকে ততই বাড়ছে এসব গানের গুরুত্ব। নিছক মুসলিম সেক্যুলারিস্টই নয়, এদের পিছনে অমুসলিমদেরও বিপুল অর্থ, শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ হচ্ছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় পশ্চিমা দেশগুলির বিনিয়োগের সাথে বিনিয়োগ করছে ভারতও। কারণ, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রতিহত করার মধ্যেই তাদের সামরিক, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। তারা জানে, সভ্যতা কখনোই খানকায় গড়ে উঠে না। লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসায় নির্মাণেও বিশ্বশক্তি গড়ে উঠে না। সেটি সম্ভব হলে বাংলাদেশে উচ্চতর সভ্যতা গড়ে উঠতো। এবং দেশটি বিশ্বশক্তিতে পরিনত হতো। এজন্য চাই ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। এজন্যই ইসলামী বিরোধী শক্তির টার্গেট মসজিদ-মাদ্রাসা বা খানকা নয়। বরং সেগুলির নির্মাণে তারা অর্থ দেয়, মসজিদ নির্মাণে জমিও দেয়। কিন্তু তারা বদ্ধপরিকর ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ প্রতিহত করায়। সে লক্ষে তারা লাগাতর প্রচারনা, সামরিক হামলা ও ড্রন হামলার স্ট্রাটেজী গ্রহণ করেছে।

 

বিজয় শয়তানের এজেন্ডার

শয়তান জানে, মানব নিয়ে মহান আল্লাহতায়ালার পরিকল্পনাটি।  শয়তান আরো জানে, ইসলামী রাষ্ট্রই এ জমিনে মহান আল্লাহতায়ালার ফিরেশতা নামিয়ে আনে, তখন বিশ্বশক্তিতে পরিনত হয় মুসলিম রাষ্ট্র। ফলে সভ্যতার দ্বন্দে এমন রাষ্ট্রই হলো শয়তানী শক্তির প্রকৃত প্রতিপক্ষ। এমন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা প্রতিহত করা গেলে শয়তানের সামনে আর কোন প্রতিদ্বন্দীই থাকে না। মিশর, সৌদি আরব, সিরিয়া, আমিরাত, বাহরাইনসহ বহু মুসলিম দেশে রয়েছে অতি বর্বর ও নৃশংস স্বৈরাচারি শাসক। কিন্তু তাদের নিয়ে পাশ্চাত্য শক্তিসমূহের কোন ভাবনা নাই। তাদের ভাবনা স্রেফ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠারোধ নিয়ে। এবং সেকাজে মুসলিম দেশের স্বৈরাচারি শাসকদেরকে তারা পার্টনার রূপে গ্রহণ করছে এবং গড়ে তুলেছে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন।  

মানুষের মাঝে নিজের স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্বার্থের ন্যায় নানা স্বার্থ কাজ করে। সে স্বার্থপরতায় মানুষ আপোষ করে এবং বিভ্রান্তও হয়। কিন্তু ঈমানদারকে কাজ করতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছাপূরণে। ফলে ঈমানদারের সম্পর্ক মহান আল্লাহ ও তার নাযিলকৃত কোরআনের সাথে। ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থ তাই নিছক মুসলিম অধ্যূষিত রাষ্ট্র নয়। রাষ্ট্রকে ইসলামী হতে হলে তাকে পরিচালিত হতে হয় আল্লাহর নির্দেশনায়। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সাথে তখন গুরুত্ব পায় তাঁর এজেন্ডার সাথে পরিপূর্ণ একাত্মতাও। সেখানে প্রতিষ্ঠা পায় ইসলামের শরিয়তী বিধান। খাবারে টেবিলে শুকরের গোশত ও মদ শোভা পেলে কি সে পরিবারে সদস্যদের ঈমান বাঁচে? বাঁচে কি ইসলাম? মুসলিম পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব শুধু নামায-রোযা পালন নয়, বরং হারাম-হালালের বাছবিচারও। সেটি খাদ্য-পানীয়, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, আইন-আদালতসহ সর্ব ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে দায়িত্বশূণ্য হলে ঈমানশূন্যতার জন্ম দেয়। এজন্যই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের দায়ভার প্রতিটি ঈমানদার নাগরিকের কাঁধে এসে যায়।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “উদখুলু ফি সিলমে কা’ফ্ফা”, অর্থঃ ইসলামে প্রবেশ করো পরিপূর্ণ রূপে। অর্থাৎ যেখানেই আল্লাহর হুকুম, সেখানেই সে হুকুম প্রতিপালনে অবনত হও। রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও আইন-আদলতের অঙ্গণকেও ইসলামের অধীনে আনতে হয়। আল্লাহর বিধানকে তাই নিছক নামায-রোযা-হজ-যাকাতে সীমিত রাখার সুযোগ নাই। আত্মীক পরিসুদ্ধি শূন্যে ঘটে না, সে লক্ষ্য পূরণে পরিসুদ্ধি আনতে হয় সমাজ ও রাষ্ট্রে। তখন রাষ্ট্রে আসে নৈতিক স্বাস্থ্যসম্পন্নতা। সে জন্য রাষ্ট্রকে কোরআনী বিধানের আঁওতায় আনা এতো জরুরি। কিন্তু সে উদ্দেশ্যটি ব্যাহত হয় যদি আদালতে কুফরি আইন প্রতিষ্ঠা পায় এবং সংবিধানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর উপর আস্থা বিলুপ্ত হয়। বাংলাদেশে তো সেটিই হয়েছে। দেশটির সংবিধান থেকে যেমন আল্লাহর উপর আস্থা ও তাঁর সার্বভৌমত্ব বিলুপ্ত হয়েছে, তেমনি আদালতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ব্রিটিশ কাফেরদের প্রণীত পেনাল কোড। ফলে দেশটিতে নিষিদ্ধ নয় সূদ, মদ, জুয়া, পতিতাবৃত্তির ন্যায় নানাবিথ পাপাচার। কারারুদ্ধ করা হয় ঘরে জিহাদ বিষয়ক বই রাখার কারণে। প্রশ্ন হলো, শয়তানের এজেন্ডাকে এভাবে বিজয়ী করে কি আল্লাহতায়ালার করুণা মিলবে? মিলবে কি পরকালে মুক্তি? ২০/১১/২০২০

 




সাতচল্লিশের স্বাধীনতা ও একাত্তরের আত্মঘাত

ফিরোজ মাহবুব কামাল

ষড়যন্ত্র ইতিহাসের বিরুদ্ধে

বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের অপরাধ বহুমুখি। তাদের লক্ষ্য মূলত ৪টিঃ এক), ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারি; দুই). বাংলাদেশে ইসলামী চেতনার বিনাশ; তিন). গণতন্ত্র হত্যা; চার). দেশের সম্পদের  উপর চুরি-ডাকাতি। এদের দাপট এতোই যে, ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে কথা বললে আবরার ফাহাদের ন্যায় লাশ হতে  হয়। অথবা ইলিয়াস আলী এবং আরো বহুশত মানুষের ন্যায় গুম হয়ে যেতে হয়। ইসলামপন্থিদের রুখতে এরা শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যা ঘটাতেও কসুর করে না। এরা পঞ্চমুখ ভারতীয় নেতাদের প্রশংসায়। অথচ শহীদ সহরাওয়ার্দী, খাজা নাযিমুদ্দীন, মাওলানা আকরাম খান, নুরুল আমীনের মত যেসব বাঙালী মুসলিম নেতাগণ বঙ্গীয় এ ভূমিকে ১৯৪৭ সালে ভারতের বুকে বিলীন হওয়া থেকে বাঁচালো -তাঁদের  কথা এরা মুখে আনে না। যেন বাংলাদশ নামক ভূমির জন্ম মুজিবের হাতে এবং সেটি ১৯৭১’য়ে। অপর দিকে ভারতের বুকে চলছে যে মুসলিম বিরোধী গণহত্যা, নারী ধর্ষণ ও ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ –তার নিয়েও এরা মুখ খুলতে রাজি নয়। ভারতে দিনদুপুরে পুলিশের সামনে যেভাবে বাবরী মসজিদ ধুলিস্যাৎ হলো –সেটিও তাদের কাছে অপরাধ নয়। মনিব চুরি-ডাকাতি, খুন-ধর্ষণ করলেও গোলাম যেমন নিন্দা না করে জোগালের কাজ করে -তেমনি অবস্থা ভারতসেবী বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের। কিন্তু এরাই অনাসৃস্টি বলে পাকিস্তানের সৃষ্টিকে এবং চরিত্রহনন করে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতাদের।

১৯০ বছর ব্রিটিশের গোলামীর পর বাঙালী মুসলিমেরা স্বাধীনতা পায় ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট। এ বিশাল সত্যকে অস্বীকার করার অর্থ ইতিহাসকে অস্বীকার করা। ১৯৭১’য়ে ভারতের বিজয় এবং পাকিস্তানের পরাজয়কে বড় করতে গিয়ে ১৯৪৭’য়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে খাটো করা হয় পরিকল্পিত ভাবে। সেটি বাংলার ইতিহাসে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের অপরাধকে আড়াল করা এবং তাদের নামকে বড় করার স্বার্থে। সে সাথে বাংলাদেশের উপর ভারতীয় আধিপত্যকে জায়েজ করার স্বার্থে। অথচ ১৯৪৭’য়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অস্বীকার করলে বাংলাদেশের অস্তিত্বই থাকে না। ১৯৪৭’য়ে প্রতিষ্ঠা পায় পাকিস্তান। আজকের বাংলাদেশ যা কিছু পেয়েছে তা পেয়েছে পাকিস্তান থেকেই। তাই বাংলাদেশের ইতিহাস বুঝতে হলে অবশ্যই জানতে হয় পাকিস্তানের ইতিহাস। বাংলাদেশ কেন ১৯৪৭’য়ে ভারতের প্রদেশ না হয়ে পাকিস্তানের প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান হলো –এটি ইতিহাসের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বাঙালী মুসলিমের বহুদিনের ব্যাথা-বেদনা, ক্রন্দন ও জীবন দর্শন –যা পশ্চিম বাংলার হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ ভিন্নতার কারণেই ১৯৪৭’য়ে বাঙালী হিন্দু ও বাঙালী মুসলিগণ একসাথে চলতে পারিনি; তাদের রাজনৈতিক পথ ভিন্নতর হয়। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসের বইগুলিতে সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি পরিকল্পিত ভাব লুকানো হয়েছে। সেটি বাঙালী মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের কৃত নৃশংস অপরাধগুলিকে আড়াল করার লক্ষ্যে। ১৯৭১’য়ে পূর্ব পাকিস্তানের সেক্যুলারিস্টগণ বাঙালী হিন্দুদের সাথে একই মহনায় এবং একই লক্ষ্যে মিলিত হয়। সে মিলনের লক্ষ্য ছিল যেমন পাকিস্তানের বিনাশ, তেমনি বাঙালী মুসলিমদের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকেই বানচাল করা।      

১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগষ্ট শুধু ব্রিটিশ শাসনের গোলামী থেকে মুক্তির দিন ছিল না, বরং মুক্তির দিন ছিল অখন্ড ভারতের কাঠামোয় হিন্দুদের হাতে গোলাম হওয়ার মহাবিপদ থেকেও। কাশ্মিরী মুসলিমদের জীবনে ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগষ্ট আসেনি, ফলে তাদের জীবনে স্বাধীনতাও আসেনি। ফলে আজও তারা ভারতীয় হিন্দুদের হাতে খুন হচ্ছে, ধর্ষিতা হচ্ছে এবং নৃশংস ভাবে নির্যাতিতও হচ্ছে।  ১৭৫৭ সালে পশাশীর ময়দানে স্বাধীনতা হারানোর পর ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগষ্টই বাঙালী মুসলিম জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগষ্টের সে বিশাল অর্জনকে পরিকল্পিত ভাবে ভূলিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি মূলত বাঙালী মুসলিমের চেতনার ভূমিতে ভারতসেবীদের দখলদারী। এর লক্ষ্য, বাঙালীর ইতিহাসে একাত্তরের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নেই এবং মুজিবের চেয়ে বড় মানবও নাই –সে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা দেয়া। কারণ, সত্য বেঁচে থাকলে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা দেয়া যায় না। তাই মিথ্যাকে বাঁচাতে হলে সত্যকে দাফন করতে হয়। ১৯৪৭’য়ের স্বাধীনতার পিছনে বলিষ্ঠ একটি দর্শন ছিল। এবং সেটি বাঙালী রূপে নয়, বরং মুসলিম রূপে বিশ্ব মাঝে মাথা তুলে দাঁড়ানোর দর্শন। তাই ইতিহাসের বইয়ে ১৯৪৭’য়ের ১৪ই আগষ্ট হাজির করলে হাজির হয় বাঙালী মুসলিমের মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার স্বপ্ন। তখন মারা পড়ে ভারতসেবী সেক্যুলারিস্ট বাঙালীর চেতনা। এবং সেটি হলে মুজিবসহ একাত্তরের নেতাকর্মীগণ গণ্য হয় ইসলাম ও মুসলিমের ঘৃনীত দুষমন রূপে।

 

১৯৪৭’য়ের দর্শন ও স্বাধীনতা

ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিনগুলিতে ভারতীয় মুসলিমদের সামনে চুড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এমন একটি মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যেখানে তাদের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরু নিরাপত্তা পাবে। সুযোগ পাবে নিজ ধর্ম নিয়ে স্বাধীন ভাবে বাঁচার। এবং সুযোগ পাবে সে দেশটিকে ইসলামের দুর্গ রূপে গড়ে তোলার। সে সময়টি ভারতীয় মুসলিমদের জন্য ছিল অতিশয় ক্রান্তিলগ্ন। ব্রিটিশগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা ভারত ছেড়ে শীঘ্রই চলে যাবে। হিন্দুরা প্রস্তুতি নিচ্ছিল সমগ্র ভারতের শাসন ক্ষমতা নিজ হাতে নেয়ার। ফলে বিপদ ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের পদতলে পিষ্ট হওয়ার। একবার ভারত জুড়ে হিন্দু শাসন প্রতিষ্ঠা পেলে সেখান থেকে বেড়িয়ে আসা কঠিন হতো। সে মহাবিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি দীর্ঘ লড়াইয়ের। সে লড়াইয়ে জিতবার জন্য প্রয়োজন ছিল ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে অটুট ঐক্য। প্রয়োজন ছিল এমন একজন সুযোগ্য নেতার যিনি সে ঐক্য গড়ে তোলার যোগ্যতা রাখেন। এবং যোগ্যতা রাখেন সে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেয়ার। তখন প্রয়োজন ছিল, স্বাধীন পাকিস্তানের কেসটি ব্রিটিশ শাসকদের দরবারে বুদ্ধিমত্তার সাথে পেশ করার। এবং প্রয়োজন ছিল, ভারতীয় মুসলিমদের শান্তুপূর্ণ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবী না মানলে গুরুতর একটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ অনিবার্য এবং তাতে ব্রিটিশদের নিরাপদে ঘরে ফেরাও যে অসম্ভব হবে -সে ভয়াবহ খবরটিও ব্রিটিশের মনে যুক্তি সহকারে বদ্ধমূল করা।

ব্রিটিশের আদালতে ভারতীয় মুসলিমদের মামলাটি কে সুন্দর ভাবে পেশ করতে পারবে -সে প্রশ্নটি সেদিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখন মুসলিম লীগ ছিল বহু ভাগে বিভক্ত। মুসলিম নেতাদের মাঝে তখন প্রতিটি প্রদেশে চলছিল প্রচণ্ড বিবাদ। বাংলায় ফজলুল হকের মত নেতা নিছক ক্ষমতার লোভে জোট বেঁধেছিলেন হিন্দু মহাসভার মত প্রচণ্ড মুসলিম বিদ্বেষীদের সাথে, গড়েছিলেন শ্যামা-হক কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা। ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশী মুসলিমের বাস ছিল বাংলায়। কিন্তু তাঁরা সমগ্র ভারতের মুসলিমদের কি নেতৃত্ব দিবে, নিজেরাই লিপ্ত ছিল প্রচণ্ড কলহবিবাদে। অথচ ভারতের বুকে তখন নতুন ইতিহাস নির্মিত হতে যাচ্ছে। আগামী বহুশত বছরের জন্য নির্মিত হতে যাচ্ছে রাজনীতির এক নতুন প্রেক্ষাপট। এমন মুহুর্তের জন্য একটি জাতিকে শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়। ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পর ভারতের শাসনভার যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের হাতে যায় তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে হিন্দুরা পাবে যা ইচ্ছে তাই করার অধিকার। এমনটি হলে মুসলিমদের জন্য শুধু মনিবের বদল হবে, স্বাধীনতা আসবে না। বরং ঘাড়ে চাপবে ব্রিটিশের চেয়েও নৃশংসদের শাসন। বাংলার মুসলিমগণ হিন্দু-মানস ও হিন্দু জমিদারদের নির্মম অত্যাচার ও শোষণ দেখেছে নিজ চোখে এবং নিজ ঘরের আঙিনায়। সেটির বিরুদ্ধে তবুও ব্রিটিশ আদালতে অভিযোগ তোলা যেত। কিন্তু সমগ্র ভারতের শাসন যদি হিন্দুদের হাতে যায় তখন দুর্বিসহ এক মহাবিপর্যয় নেমে আসবে ভারতীয় মুসলিমদের জীবনে।

 

বাঙালী মুসলিমের ১৯৪৭-পূর্ব প্রজ্ঞা

রাষ্ট্রের শাসনভার হিন্দুদের হাতে গেলে পরিনতি যে কতটা তভয়াবহ হবে -তা নিয়ে বাঙালী মুসলিম মনে সামান্যতম সংশয়ও ছিল না। বাংলার মুসলিমদের মাঝে শিক্ষার হার তখন শতকরা ৭ ভাগও ছিল না। অথচ সে নিরক্ষরতা সত্ত্বেও হিন্দু শাসনের নাশকতা টের পেতে তারা বিন্দুমাত্র ভূল করেনি। তাই গান্ধি বা নেহেরুকে তারা বন্ধু রূপে গ্রহণ করেনি। বাঙালী মুসলিমদের সেদিনের প্রজ্ঞা রক্ষা করেছিল হিন্দুদের গোলাম হওয়া থেকে। অথচ আজ কোথায় সে প্রজ্ঞা? বাংলাদেশে আজ  বহুশত প্রফেসর, বহুশত বিচারপতি, বহু হাজার আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবী। কিন্তু তারা গণতন্ত্র হত্যাকারি এক ফ্যাসিস্টকে নেতা, পিতা, বন্ধু বলছে। ভোটচোরকে মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী বলছে। এ হলো তাদের প্রজ্ঞার নমুনা। আজকের এ ডিগ্রিধারিগণ যে কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিচ্ছে, বাংলার নিরক্ষর গ্রামীন জনগণের ১৯৪৭ সালের কাণ্ডজ্ঞানটি তার চেয়ে বহুগুণ উত্তম ছিল। কাণ্ডজ্ঞান আসে বিবেকের সুস্থ্যতা, চিন্তাভাবনার সামর্থ্য, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নৈতিক সততা থেকে; বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট থেকে নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েও নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। বরং বিপদ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের কুশিক্ষা মনের সে মহৎ গুণগুলি ধ্বংস করে দিতে পারে। বাংলাদেশের আজকের শিক্ষাব্যবস্থা তো সে ধ্বংস-প্রক্রিয়াকেই প্রকট ভাবে বাড়িয়েছে। আজকের দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশ তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিপ্রাপ্ত দুর্বৃত্তদেরই সৃষ্টি।

বাংলার নিরক্ষর মানুষগুলোর ১৯৪৭ সালে সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞাটি হলো, তারা ভাষা ও আঞ্চলিক ক্ষুদ্রতার উর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন। বাংলার সীমানা পেরিয়ে এক অবাঙালী জিন্নাহকে তারা নেতা রূপে গ্রহণ করেছিলেন, হিন্দু স্বার্থের কোন সেবাদাসকে নয়। গণতন্ত্রের হত্যাকারি কোন ফাসিষ্ট নেতাকেও নয়। এটি ছিল এক অপূর্ব বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি। নইলে সেদিন পাকিস্তানই প্রতিষ্ঠা পেত না। এটি কি অস্বীকারের উপায় আছে, সুলতান মহম্মদ ঘোরীর হাতে দিল্লি বিজয়ের পর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাই ছিল দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এবং সেটি সম্ভব হয়েছিল বাঙালী মুসলিমদের প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির কারণে। তাদের সে প্রজ্ঞার কারণেই উপমহাদেশের রাজনীতির সবচেয় গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ বাংলা পরিণত হয় মুসলিম লীগের দুর্ভেদ্য দুর্গে। পাকিস্তান গড়ার চুড়ান্ত লড়াইটি হয় বাংলার রাজধানী কলকাতায়। সেটি ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগষ্ট জিন্নাহর ঘোষিত ডাইরেক্ট এ্যাকশন দিবস পালন কালে হিন্দু গুন্ডাদের হাতে ৫ হাজারের বেশী মুসলিমের প্রাণ দানের মধ্য দিয়ে। প্রয়োজনে বিপুল রক্ত দিয়েই যে মুসলিমগণ পাকিস্তান বানাবে -এ ছিল সেদিনের ঘোষণা। জিন্নাহর “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান”এর এ ছিল বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। ব্রিটিশ শাসকচক্র সেটি বুঝতে ভূল করেনি। কংগ্রেস নেতা গান্ধিও বুঝতে ভূল করেনি। ফলে পাকিস্তানের জন্মের বিষয়টি সেদিন কলকাতার রাস্তায় চুড়ান্ত হয়ে যায়। ব্রিটিশ ও কংগ্রেস –উভয়ই পাকিস্তান দাবীকে মেনে নেয়। বাঙালী মুসলিমদের সে প্রজ্ঞা ও প্রাণদান ভারতসেবী সেক্যুলারিস্ট বাঙালীদের কাছে যতই নিন্দিত হোক, কৃতজ্ঞতা ভরে তা যুগ যুগ স্মরণ রাখবে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ পাকিস্তানের জনগণ। বাংলাদেশ আজ ভারতীয় আধিপত্যের গোলাম। কিন্তু বাঙালী মুসলিমদের সৃষ্ট পাকিস্তান যেরূপ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে পরিণত হচ্ছে –সেটিও কি কম গর্বের? 

অখন্ড ভারতের প্রবক্তরা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ও জিন্নাহর বিরোধীতা করবে -সেটি স্বাভাবিক। কারণ সেটি তাদের রাজনীতিতে বেঁচে থাকার মূল বিষয়। ভারতের মদদপুষ্ট বাঙালীরাও তাঁকে ঘৃনা করবে সেটিও স্বাভাবিক। কারণ, ভারতের অর্থে সে লক্ষ্যেই তারা প্রতিপালিত হয়। বরং সেটি বাংলাদেশের মাটিতে ভারতসেবী রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার বিষয়ও। কিন্তু যারা ভারতীয় মুসলিমদের স্বাধীনতা ও কল্যাণ দেখতে চান তারাও কি জিন্নাহর অবদানকে অস্বীকার করতে পারেন? তার নেতৃত্বেই তো গড়ে উঠেছিল বিশ্বের সর্ব বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। জিন্নাহই একমাত্র নেতা যিনি ভারতের সূন্নী-শিয়া, দেওবন্দী-বেরেলভী, বাঙালী-বিহারী, পাঞ্জাবী-পাঠান, সিন্ধি-বেলুচ তথা নানা ফেরকা ও নানা ভাষার মুসলিমদের একত্রিত করতে পেরেছিলেন। এটি ছিল এক বিশাল অর্জন; এবং বহুলাংশে অসাধ্য কাজ। একাজটি অন্য কারো হাতে কি হয়েছে? কার হাতেই বা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল? অথচ মুসলিমদের মাজে একতা প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। অথচ বহু নেতা ও বহু আলেম এমন মহান কাজে উদ্যোগ নেয়া দূরে থাক, আগ্রহ পর্যন্ত দেখাননি। ব্যস্ত থেকেছেন নিজেদের মাদ্রাসা বা হুজরা নিয়ে। সমগ্র ভারতের মুসলিমদের একতাবদ্ধ করা দূরে থাক, অধিকাংশ নেতা বা আলেমগণ তো ব্যস্ত থেকেছেন নিজ নিজ ফেরকা¸ মজহাব ও অঞ্চল ভিত্তিক বিভক্তি গড়া নিয়ে। অথচ বিভক্তি ও বিভেদ গড়া ইসলামে হারাম।

 

খাঁচার জীবন ও স্বপ্ন দেখার সামর্থ্য

মুসলিমগণ রাষ্ট্র গড়ে এজন্য নয় যে, সেখানে শুধু ঘর বাঁধবে, সন্তান পালন করবে ও ব্যবসা-বাণিজ্য করবে। বরং দায়ভারটি আরো বিশাল। সেটি ইসলামী রাষ্ট্র গড়া এবং সে রাষ্ট্রে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা করা। পূর্ণভাবে ইসলাম পালন তো একমাত্র এভাবেই  সম্ভব। ইসলাম মানব জাতির জন্য কি দিতে চায় সেটিকে বিশ্ববাসীর সামনে দর্শনীয় (showcasing) করা। ঈমানদারের জীবনে এটিই তো মূল কাজ। এটি তো মহান আল্লাহতায়ালার খলিফা তথা প্রতিনিধি হওয়ার দায়ভার। মুসলিমকে তাই শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়লে চলে না, ইসলামী রাষ্ট্র্ও গড়তে হয়। মুসলিম জীবনে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ও সবচেয়ে রক্তাত্ব লড়াই তো ইসলামী রাষ্ট্র্ গড়া নিয়ে। এ দায়ভার পালন করতে গিয়েই মক্কার মুসলিমগণ নিজেদের ঘরাবাড়ি ছেড়ে মদিনায় গিয়েছিলেন। এবং নিজ অর্থ, নিজ শ্রম ও নিজ রক্তের বিনিয়োগ ঘটিয়েছিলেন। নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের শতকরা ৭০ ভাগের বেশী শহীদ হয়েছেন সে দায়ভার পালনে।

খাঁচার বন্দিদশা সিংহকে যেমন শিকার ধরার দায়ভার থেকে দূরে রাখে, তেমনি অমুসলিম দেশের বন্দিদশী মুসলিমদেরকে ভুলিয়ে দেয় ইসলামী রাষ্ট্র গড়া ও শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দায়ভার। কেড়ে নেয় ইসলামী সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের সামর্থ্য। তাই কোন দেশে অমুসলিমদের শাসনাধীনে শরিয়ত বা ইসলামী সভ্যতার প্রতিষ্ঠা ঘটেছে ইতিহাসে তার নজির নেই। এজন্যই ব্রিটিশ ভারতের পরাধীনতার দিনগুলিতে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দূরে থাক, মুসলিমগণ তার স্বপ্নও দেখতে পারিনি। সে স্বপ্ন যেমন হোসেন আহম্মদ মাদানীর ন্যায় দেওবন্দি আলেমগণ দেখেননি, তেমনি মাওলানা মওদূদীও দেখেননি। তাবলিগ জামায়াতের মাওলানা ইলিয়াসও দেখেননি। তারা বড় জোর মসজিদ-মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা, বই লেখা, পত্রিকা প্রকাশ করা বা ওয়াজ-নসিহতে অংশ নিতে পারতেন। কিন্তু  ইসলামের মিশন বা নবীজী (সাঃ)র সূন্নত শুধু এগুলো নয়। খাঁচার পরাধীনতার সবচেয়ে বড় কুফল হল, স্বাধীন জীবনের সাধই কেড়ে নেয়। কেড়ে নেয় লড়বার আগ্রহ। আনে স্থবিরতা। এজন্যই হিজরত অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ক্ষেত্র বিশেষে সেটি ফরজ। হিজরত দেয় জালেমের জিন্দান থেকে মুক্ত হয়ে নিজের সমগ্র সামর্থ্য নিয়ে বেড়ে উঠার সুযোগ। তাই যে দেশে যত মোহাজির সে দেশে তত উন্নয়ন। পাকিস্তানে পারমানবিক বোমাসহ বহু কিছু দিয়েছে মোহাজিরগণ। অথচ বাংলাদেশে বিহারী মুহাজিরদের ঘরবাড়ী ও দোকানপাট কেড়ে নিয়ে বস্তিতে পাঠানো হয়েছে। এটি এক নিরেট অসভ্যতা এবং এসেছে একাত্তরের চেতনা থেকে।   

ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়াটি বেওকুফি। প্রথমে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, তারপর সেটির ইসলামীকরণ। ব্রিটিশ শাসনামলে শরিয়ত বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবী তুললে সেটির বিরুদ্ধে প্রবল বিরোধীতা আসতো ভারতীয় হিন্দুদের পক্ষ থেকেই শুধু নয়, ব্রিটিশের পক্ষ থেকেও। যে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার উসমানিয়া খেলাফতকে ধ্বংস করলো তাদের শাসনাধীনে থেকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবী তুললে সেটি কি তারা মেনে নিত? বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রকল্পটি তখন নর্দমায় গিয়ে পড়তো।পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় ফায়দাটি হলো, ১৯৪৭য়ের ১৪ই আগষ্টের পর দেশটির বিশাল মূসলিম জনগোষ্ঠির স্বপ্নই পাল্টে গেল। ফলে যেসব দেওবন্দী আলেম বা জামায়াতে ইসলামীর যে সব নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানে হিজরত করলেন তারা তখন স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এ হলো সবচেযে বড় সুফল। দীর্ঘ গোলামী জীবনের পর এলো এক মহা সুযোগ। জামায়াতে ইসলামের নেতারা তখন ব্রিটিশ শাসনাধীন গোলামী জীবনের দলীয় গঠনতন্ত্র তাড়াতাড়ি পাল্টিয়ে ফেললেন। সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানের রাজনীতিতে অংশ নেয়ার এবং পাকিস্তানকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার।

 

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানঃ কেন এতো পার্থক্য?

কোনটি খাঁচার পাখি আর কোনটি বনের পাখি -সেটি বুঝতে কি বেশী বিদ্যাবুদ্ধি লাগে? তেমনি কে স্বাধীন দেশের আর কে পরাধীন দেশের -সেটিও কি বুঝতে বেগ পেতে হয়? তেমনি দুই ভিন্ন চেতনার মানুষের মাঝের ভিন্নতাগুলিও সহজে ধরা পড়ে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে একাত্তরের চেতনাধারীগণ তেমনি এক ভিন্ন চরিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। অন্যদের থেকে তাদের ভিন্নতাটি যেমন দেহের নয়, তেমনি পোষাক-পরিচ্ছদ বা খাদ্যেরও নয়। বরং সেটি চেতনার। চেতনা একটি জাতির জীবনে ইঞ্জিনের কাজ করে। কখনো সেটি সামনে নেয়, কখনো বা পিছনে নেয়। এবং ইসলামী চেতনা শুধু সামনেই নেয় না, জান্নাতেও নেয়। অপর দিকে অনৈসলামিক চেতনাগুলি যেমন গুম, খুন, ফাঁসি, ধর্ষণ, চুরিডাকাতি ও ভোটডাকাতির দিকে নেয়, তেমনি নেয় জাহান্নামেও। পরিতাপের বিষয় হলো বাংলাদেশে পিছনে টানার চেতনাধারীগণই এখন ক্ষমতায়। সে নাশকতামূলক চেতনাকে তারা একাত্তরের চেতনা বলে।

একাত্তরের চেতনা যে কতটা আত্মঘাতি এবং বাংলাদেশকে যে কতটা পিছনে নিয়ে গেছে সেটি বুঝার যায় পাকিস্তানের সাথে তুলনা করা উচিত। কারণ উভয়ের যাত্রা তো একই সাথে শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশ আজ অধিকৃত ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের হাতে। পাকিস্তানে আজ বহুদলীয় গণতন্ত্র। নির্বাচনের নামে সেখানে ভোটডাকাতি হয় না। বিরোধী দলগুলি শুধু রাজপথে নয়, পার্লামেন্টেও বিপুল সংখ্যায়। সে দেশে লাখ লাখ মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ হয়ে। পুলিশ সে সব সমাবেশে হামলা করে না। বাংলাদেশের ন্যায় গুম, খুন ও ফাঁসীর রাজনীতি সেখানে নাই। পত্র-পত্রিকার রয়েছে অবাধ স্বাধীনতা। পত্রিকার সম্পাদককে গুন্ডা লেলিয়ে অপমান ও মারপিট করা হয় না। অসংখ্য টিভি চ্যানেল সেখানে মুক্তভাবে কাজ করছে। গণতন্ত্র চর্চায় বাংলাদেশ যে পাকিস্তান থেকে কতটা পিছিয়ে পড়েছে সে হুশ কি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের আছে? আর প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে? পাকিস্তান এখন বহুশত মিজাইল এবং বহু পারমানবিক বোমার অধিকারি। সেগুলির পাশাপাশি ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান তারা নিজেরাই তৈরী করে। লক্ষণীয় হলো, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের এরূপ পিছয়ে পড়া গণ্য হচ্ছে একাত্তরের চেতনার বিজয় রূপে। পাকিস্তানের নাম শুনলে যে বাকশালীরা দাঁত মাজে অন্ততঃ তাদের তো এনিয়ে লজ্জা হওয়া উচিত।

বাঙালী সেক্যুলারিস্টগণ বড্ড খুশি ইসলামের ভারতীয় মডেল নিয়ে। ইসলামের এ মডেলে নামায-রোযা আছে, হজ্ব-যাকাত এবং তাবলিগও আছে। কিন্তু শরিয়তের প্রতিষ্ঠার কোন ভাবনা নেই। জিহাদও নেই। এটি এক অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম। ভারত সরকার ইসলামের এ ভারতীয় মডেলকেই আওয়ামী লীগ সরকারের হাত দিয়ে বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করাতে চায়। তাই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে রাজপথে না নামলে কি হবে, লাগাতর বেড়ে চলেছে তাবলিগ জামাতের ইজতেমায় লোকের সমাগম। শেখ হাসিনা নিজেও তাবলিগ জামাতের দোয়ার মজলিসে হাজির হয়। পাকিস্তানে শরিয়ত প্রতিষ্ঠিত না হলেও, সে সম্ভাবনা বিলুপ্ত হয়নি। প্রবর্তিত করেছে ব্লাফফেমী আইন। ফলে মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লিখলে বা বললে প্রাণদণ্ড হয়। প্রাসাদ গড়তে ভূমি চাই। তেমনি ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে উপযোগী দেশ চাই। পাকিস্তান মুসলিমদের জন্য সে ভূমিটা দিয়েছে। ফলে যতদিন পাকিস্তানে থাকবে, সে সম্ভাবনাও থাকবে। অথচ বাংলাদেশে আজ শরিয়ত দূরে থাক, গঠনতন্ত্রে বিসমিল্লাহ রাখাই অসম্ভব হচ্ছে। অসম্ভব হয়েছে জিহাদের উপর বই প্রকাশ করা। জিহাদকে বলা হচ্ছে সন্ত্রাস। ইসলামী সংগঠনগুলোকে জঙ্গি সংগঠন বলে নেতাদের জেলে ঢুকানো হচ্ছে।

 

হুমকি অস্তিত্বের বিরুদ্ধে

বাঘের পাল দ্বারা ঘেরাও হলে বিশাল হাতিও রেহাই পায় না। তাই যে জঙ্গলে বাঘের বাস সে জঙ্গলের হাতিরাও দল বেঁধে চলে। বাংলাদেশের বাস্তবতা হল, মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এক দেশ। ঘেরাও হয়ে আছে আগ্রাসী হিন্দুদের দ্বারা। ফলে বাংলাদেশ এক অরক্ষিত দেশ। এদেশটির সীমাবদ্ধতাও প্রচুর। যে কোন দেশের প্রতিরক্ষার খরচ বিশাল। প্রতিরক্ষার খরচ কমাতে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের জন্ম হয়েছে। আর ভারতের ন্যায় বিশাল আগ্রাসী দেশের মোকাবেলায় সে খরচ তো আরো বিশাল। এ বাস্তবতার দিকে খেয়াল রেখেই বাংলার তৎকালীন নেতা খাজা নাযিমউদ্দিন, সোহরাওয়ার্দী, আকরাম খান, নুরুল আমীন প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী সভায় লোহোর প্রস্তাবে সংশোধনী এনেছিলেন এবং পাকিস্তানে যোগ দেবার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পূর্ব বাংলা এভাবেই পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিল সেদেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশে রূপে। অথচ এরূপ পাকিস্তানভূক্তিকেই আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা বলছে পাকিস্তানে উপনিবেশিক শাসন। মিথ্যাচার আর কাকে বলে? কোন দেশে ঔপনিবেশিক শাসন গড়তে হলে যুদ্ধ লড়তে হয়। প্রয়োজন পড়ে মীর জাফরদের। প্রয়োজন পড়ে লর্ড ক্লাইভ ও পলাশীর। প্রশ্ন হল, ১৯৪৭’য়ে কে ছিল সেই মীর জাফর? কে ছিল ক্লাইভ? তবে সে মীর জাফর কি ছিলেন সোহরাওয়ার্দী? খাজা নাজিমুদ্দিন বা আকরাম খাঁ -যারা বাংলাকে পাকিস্তান ভূক্ত করেছিলেন? আর সে ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনীই বা কোথায়? মেজর জিয়া, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর আব্দুল জলিল, মেজর খালিদ মোশাররফ কি তবে সে ঔপনিবেশিক সেনা বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন?

১৯৪৭’য়ে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর দেশটির প্রধানতম সমস্যা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। সে সমস্যার সমাধানটি আদৌ পাকিস্তানকে খন্ডিত করার মধ্যে ছিল না। নিজ ভূমিতে ভারতকে ডেকে আনার মধ্যেও ছিল না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ রূপে শুধু পাকিস্তানের রাজনীতিতে নয়, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর রাজনীতিতে এবং সে সাথে বিশ্ব রাজনীতিতে বাঙালী মুসলিমগণ প্রভাব ফেলতে পারতো। কিন্তু শেখ মুজিব সে সুযোগ থেকেও তাদেরকে বঞ্চিত করেছে। বাঙালী মুসলিমদদের বিরুদ্ধে এটি হলো মুজিবের আরেক ঘৃণ্য অপরাধ। তবে জনগণও নির্দোষ নয়। জনগণের অপরাধ, তারা নির্বাচিত করেছে মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্র হত্যাকারি এক ফাসিস্টকে। তার পক্ষে শুধু যে ভোট দিয়েছে তা নয়, অর্থ, সময় এবং রক্তও দিয়েছে। সে সাথে পরম বন্ধু রূপে গ্রহণ করেছে ভারতীয়দের। অপর দিকে ভারতের প্রতি অন্ধ মোহ গ্রাস করছে শুধু সেক্যুলারিস্টদেরই নয়, বহু ইসলামপন্থিকেও। ১৬ই ডিসেম্বর এলে ১৯৭১’য়ের ভারতীয় বিজয় এবং বাংলাদেশের উপর ভারতের অধিকৃতিকে নিজেদের বিজয় বলে এরা উৎসবও করে। বাঙালী মুসলিমের চিন্তা-চেতনার ভূমিতে এ হলো ভয়ানক এক আত্মঘাতি রোগ। দৈহিক রোগ না সারলে তা প্রতিদিন বাড়ে। তেমনি বাড়ে চেতনার রোগও। এবং চেতনার এ রোগ অতি সংক্রামকও। তাই যে রোগটি এক সময় ভারতপন্থি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের ছিল সেটি এখন অন্যদেরও গ্রাস করছে। বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এর চেয়ে ভয়ানক হুমকি আর কি হতে পারে? ১ম সংস্করণ ০৭/০৬/২০১১; ২য় সংস্করণ ১৯/১১/২০২০। 




ভারতের বাংলাদেশ ভীতি এবং নানামুখি নাশকতা

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

কারণঃ ইসলাম ভীতি

ভারতীয় রাজনীতি, বিদেশনীতি ও সমরনীতির মূল চরিত্রটি শুধু চীন ও পাকিস্তানভীতি নয়, বরং বাংলাদেশভীতিও। প্রচণ্ড পাকিস্তানভীতির কারণেই দেশটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে এবং দেশটিকে খন্ডিত করতে প্রকান্ড যুদ্ধ শুরু করে। ভারতের যুদ্ধ বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও। এবং সে যুদ্ধটি সীমান্তে  না হলেও লাগাতর হচ্ছে দেশটির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গণে। এবং সেটি ১৯৭১ সাল থেকেই। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি তাজুদ্দীনের সাথে ৭ দফা চুক্তি করেছিলেন  এবং শর্ত লাগিয়েছিলেন যাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে না পারে। এবং শর্ত চাপানো হয়, অন্য কোন দেশের সাথে সম্পর্ক গড়তে হলে ভারতের অনুমতি নিতে হবে। একই উদ্দেশ্যে মুজিবকে দিয়ে ভারত ২৫ সালা দাসচুক্তি সই করিয়ে নিয়েছিল। এবং বাংলাদেশের সেনা বাহিনীকে দুর্বল রাখতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অব্যবহৃত বহু হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ভারতীয় সেনাবাহিনী নিজ দেশে নিয়ে যায়।

ভারতের এরূপ বাংলাদেশ-বিরোধী তৎপরতার মূল কারণ, ইসলাম ভীতি। ভারতীয়রা জানে, ইসলামী দর্শন, কোর’আনের জ্ঞান এবং জিহাদী চেতনা প্রতিটি মুসলিমকে দেয় বিজাতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অদম্য সাহস। দেয় ঈমানী বল ও আপোষহীনতা। ইসলামে নামায-রোযার যেমন ফরজ, তেমনি ফরজ হলো সর্বশক্তি নিয়ে প্রতিরোধে দাঁড়ানো। অতীতে আফগান মোজাহিদ যে শক্তির বলে ব্রিটিশ বাহিনী ও পরে সোভিয়েত বাহিনীকে পরাজিত করেছিল সেটি অস্ত্রবল ছিল না। অর্থবলও নয়। বরং সেটি ছিল ইসলামী চেতনার বল। আজও সে শক্তির বলে তারা মার্কিনীদের পরাজয় করে চলেছে। বিগত ২০ বছরের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও তার ৪০টি মিত্রদেশগুলি কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। প্রাণনাশ হয়েছে তাদের বহু হাজার সৈনিকের। কিন্তু আফগান মুজাহিদদের পরাজিত করতে পারেনি। এমন কি আফগানিস্তানের অর্ধেক ভূমিকেও কখনো দখলে নিতে পারেনি। অথচ বাংলাদেশ আফগানিস্তান নয়। বাংলাদেশীরা সংখ্যায় আফগানদের থেকে ৪ গুণের অধিক। এতবড় বিশাল জনশক্তির মাঝে ইসলামি চেতনার বিস্ফোরণ হলে তা কাঁপিয়ে দিবে সমগ্র ভারতকে।

বাংলাদেশের মূল শক্তি তার ভূগোল নয়, সম্পদও নয়; বরং জনশক্তি। এবং জনশক্তির সাথে ইসলামের সংযোগ হলে জন্ম নেয় এক মহাশক্তি। তখন সংযোগ ঘটে সর্বময় শক্তির অধিকারি  মহান আল্লাহতায়ালার সাথে। তখন যুদ্ধের তারা একা থাকে না, তাদের  সাথে যোগ দেয় ফেরেশতারাও। মরুর নিঃস্ব আরবেরা তো বিশ্বশক্তিতে ময়দানে পরিণত হয়েছিল মহান আল্লাহতায়ালার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় হওয়াতে। ১৯৪৭ সালে এই বাঙালী মুসলিমগণই ভারতের ভূগোল ভেঙ্গে দিয়েছিল এবং জন্ম দিয়েছিল বিশ্বের সরববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের। তেমন একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্প বাংলাদেশের জনগণ আবারো সৃষ্টি করতে পারে। ভারত তাই বাঙালী মুসলিমদের তাদের শক্তির মূল উৎস কোর’আন থেকে দূরে সরাতে চায়। আর একাজে ভারতের সুবিধা হল, আওয়ামী লীগকে তারা নতজানু কলাবোরেটর রূপে পেয়েছে। বাঙালী হিন্দুদের চেয়েও এ কাজে তারা ভারতের প্রতি বেশী বিশ্বস্ত ও তাঁবেদার। ভারত সে সুযোগটিকেই কাজে লাগাতে চায়।

একাত্তরের বিজয়কে ধরে রাখার স্বার্থে আওয়ামী লীগের কাঁধে লাগাতর বন্দুক রাখাটিই ভারতের জাতীয় নীতি। তবে এলক্ষ্যে ভারতের শাসকচক্র শধু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উপরই পুঁজি বিনিয়োগ করছে না। তাদের স্ট্রাটেজী, সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা নয়। তাই পুঁজি বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশের মিডিয়া, সাংস্কৃতিককর্মী, সাহিত্যকর্মী, আলেম-উলামা, ছাত্র-শিক্ষক, এমন কি ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মীদের উপরও। সে সাথে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে ভারতে পড়ার সুযোগও করে দিয়েছে। ভারত জানে, তাদের জাল থেকে আওয়ামী লীগ কখনোই হারিয়ে যাওয়ার নয়। ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে এ দলটি নিজ গরজেই ভারতের পক্ষ নিবে। কারণ, ভারতের হাতে যেমন আছে বাঙালী হিন্দুর ভোট, তেমনি আছে বিশাল রাষ্ট্রীয় পুঁজি এবং ভারত-প্রতিপালিত মিডিয়া। নির্বাচনী জয়ের জন্য এগুলো জরুরী। তবে ভারত চায়,অন্যদেরও পক্ষে আনতে এবং সকল ভারতপন্থিদের জোটবদ্ধ রাখতে। এ জন্যই আওয়ামী লীগকে বাধ্য করে সকল ভারতপন্থিদের সাথে মহাজোট গড়তে ও তাদেরকে ক্ষমতার ভাগী করতে।

 

পাকিস্তানের ব্যর্থতা ও ভারতের বিজয়

বাংলাদেশের উপর ভারতের আজকের অধিকৃতি বুঝতে হলে পাকিস্তানের অতীত ব্যর্থতাগুলি বুঝতে হবে। পাকিস্তান সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি অর্থনৈতিক ছিল না। প্রশাসনিকও নয়। বরং সেটি ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রগুলিতে পাকিস্তানের ব্যর্থতাই ভারতের বিজয়কে সহজ করে দেয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণের ব্যর্থতাকে কখনোই সামরিক শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করা যায় না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্যান-ইসলামী চেতনার ভিত্তিতে। ১৯৪৭’য়ে মুসলিম লীগের দুটি মূল  স্লোগান ছিল “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর” এবং “পাকিস্তান কি মতলব কিয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। ছিল আল্লাহতায়ালার উপর বিশ্বাস এবং পরস্পরের মাঝে ঈমানী বন্ধন।

একটি আদর্শিক দেশকে বাঁচাতে হলে আদর্শকে মজবুত ও গণভিত্তি দিতে হয়। নইলে দেশ ভেঙ্গে যায়। পাকিস্তানের ২৩ বছরে আমলে বহু বিশ্ববিদ্যালয়, বহু ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ ও মেডিকেল কলেজ, বহু ডিগ্রি কলেজ, ক্যাডেট কলেজ, মডেল স্কুল, জেলা স্কুল, ক্যান্টনমেন্ট ও কলকারাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনে যা কিছু হয়েছে -এ ছিল তার চেয়ে বহু গুণ অধিক। পূর্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার ভারতের চেয়েও অধিক ছিল। কিন্তু  বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানটি দখলে নেয় ইসলাম ও পাকিস্তানের শত্রুপক্ষ। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গণে জোয়ার আসে সেক্যুলারিজম ও সোসালিজমের। সে জোয়ারে ভাসতে থাকে বিপুল সংখ্যক ছাত্র ও শিক্ষক। এতে মারা পড়ে ১৯৪৭’য়ের প্যান-ইসলামিক চেতনা। আর ইসলামী চেতনা না বাঁচলে সে চেতনাধারি দেশটির অস্তিত্বও যে সংকটে পড়বে -সেটিই তো স্বাভাবিক। তাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজয় একাত্তরে রণাঙ্গনে হলেও আদর্শিক পরাজয়টি হয়েছিল বহু আগেই্‌। সেটি বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে। এবং সেটি ভারতসেবী ও ইসলামবিরোধী বুদ্ধিজীবীদের হাতে। এরাই একাত্তরে ভারতের হাতে বিজয় তুলে দেয়। এবং বাংলাদেশের ভূমিতে এরাই আজ ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদার।

কোন দেশকে বাঁচাতে হলে শুধু অস্ত্রধারি সৈনিক হলে চলে না, কলমধারি লড়াকু সৈনিকও চাই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল লড়াইটি করেছিল এই কলমধারি সৈনিকগণই। ফলে ১৯৪৭’য়ে একটি তীরও ছুঁড়তে হয়নি। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহতায়ালা কলমের কসম খেয়ে কলমের শক্তিকে তিনি স্বীকৃতি দিয়েছেন।  কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিবৃত্তির রণাঙ্গনে ইসলামের পক্ষে তেমন শক্তিমান সৈনিক ছিল না। যারা ১৯৪৭ সালের পূর্বে সক্রিয় ছিলেন তারাও ১৯৪৭ সালের পর লড়াই ছেড়ে দর্শকের গ্যালারিতে স্থান নিয়েছিলেন। ২৩ বছরে একখানি বইও এ নিয়ে লেখা হয়নি, কেন ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা হলো? ১১ শত মাইল দূরের পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে বাঙালী মুসলিমদের জোট বাঁধাই বা কেন জরুরি হলো? ভারত তো ১৯৪৭ সালের আগে অখন্ডই ছিল। কিন্তু সে ভূগোলকে ভাঙ্গার প্রয়োজন কেন দেখা দিল? ২৩ বছরে সেসব প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের ছাত্ররা দেশে বিদেশে কত জীবজন্তু, লতা-পাতা, কবিতা-পুথির উপর গবেষণা করে, পিএইচডি ডিগ্রিও নেয়। কিন্তু অখন্ড ভারত ভেঙ্গে কেন পাকিস্তান সৃষ্টি হল -তা নিয়ে কোন গবেষণা হয়নি। তেমন কোন বইও লেখা হয়নি। আজ যেরূপ অখন্ড ভারতের পক্ষে কথা বলা হচেছ এবং বাঙালী মুসলিম মনে যেভাবে অখন্ড ভারতের মোহ বাড়ছে, সেটি কখনোই হতো না যদি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা নিয়ে ছাত্রদের প্রকৃত ইতিহাস জানানো হতো। রাতের অন্ধকারে সুবিধা হয় চোর-ডাকাত-দুর্বিত্তদের। তেমনি জ্ঞানের অভাবে সুবিধা হয় শত্রুদের। তখন জনপ্রিয়তা পায় মিথ্যা প্রচরণা। অজ্ঞ থাকা এজন্যই কবীরা গুনাহ।

অনেকেই বলে,“পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা না হলেই মুসলিমদের জন্য ভাল হতো। অখন্ড ভারতে মুসলিমদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ হতো এবং এ বিশাল জনসংখ্যা ভারতে শক্তিশালী মুসলিম শক্তির জন্ম ঘটাতো”। তারা বলে,“পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় মুসলিমদের কোন কল্যাণটি হয়েছে?” কিন্তু প্রশ্ন হলো, অখন্ড ভারতে থাকাই যদি কল্যাণকর হতো তবে ভারতে বসবাসকারি প্রায় ২০ কোটি মুসলিমের এতো দুরাবস্থা কেন? বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে যত মুসলিমের বাস তার চেয়ে বেশী মুসলিমের বাস ভারতে। কিন্তু ভারতে বসবাসরত মুসলিমদের শক্তি বা শান্তি বিগত ৭০ বছরে কতটুকু বেড়েছে? বরং বেড়েছে বঞ্চনা, নির্যাতন ও অপমান। হিন্দু গুন্ডাদের হাতে নিহত, ধর্ষিতা ও পথে ঘাটে চড়-থাপ্পর খাওয়াটি তাদের জীবনে অতি নিত্য-নৈমত্তিক ব্যাপার। এ নিয়ে কোন বিচার হয় না, কারো শাস্তিও হয় না। কাশ্মিরে জনসংখ্যার শতকরা ৭০ ভাগ হলো মুসলিম; কিন্তু তাতে কি তাদের নিজ প্রদেশ শাসনের অধিকার মিলেছে? বরং ভারতের অন্যান্য প্রদেশগুলিতে স্বায়ত্বশাসনের যে বিধান রয়েছে, কাশ্মিরীদের থেকে সেটিও কেড়ে নেয়া হয়েছে। সমগ্র কাশ্মির এখন উন্মুক্ত কারাগার।

প্রশ্ন হলো, অখন্ড ভারতের শতকরা ৩০ বা ৪০ ভাগ মুসলিম হলে তারা কি শতকরা ৬০ বা ৭০ ভাগ হিন্দুর সাথে প্রতিযোগিতায় পারতো? নিরাপত্তা পেত কি তাদের জানমাল? ব্রিটিশ শাসকদের নীতি ছিল মুসলিম দলন ও হিন্দু পালন। ব্রিটিশের সহযোগিতা পেয়ে হিন্দুরা মুসলিমদের থেকে শিক্ষাদীক্ষা, চাকুরি-বাকুরি, ব্যবসা-বানিজ্যে ও অর্থনীতিতে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছিল। পুলিশ দফতর, আদালত, প্রশাসন, শিক্ষাঙ্গণ, মিডিয়াসহ সর্বত্র ছিল হিন্দুদের আধিপত্য। নিজেদের সে  প্রতিষ্ঠিত সুযোগ-সুবিধাগুলি থেকে মুসলিমদের জন্য সামান্যতম ছাড় দিতেও তারা রাজী ছিল না। সমাজের প্রতি স্তরে তখন মুসলিমদের প্রতি কদম এগুতে হতো হিন্দুদের ভিড় ঠেলে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর সর্বস্তরে মুসলিমদের জন্য যেরূপ খালি স্থান সৃষ্টি হয়েছিল ভারতে সেটি অভাবনীয় ছিল। অপর দিকে ভারতের রাজনীতিতে তখন তীব্রতর হচ্ছিল মুসলিম বিরোধী উগ্রতা। সর্বত্র যেন মুসলিম নিধনে দাঙ্গা দাঙ্গা ভাব। হিন্দু নেতারা প্রকাশ্যেই বলা শুরু করেছিল, হিন্দুস্থান হিন্দুদের জন্য। হিন্দুস্থানে থাকতে হলে হিন্দু হতে হবে, নইলে তল্পি তল্পা নিয়ে কোন মুসলিম দেশে চলে যেতে হবে। বিজিপি নেতারা আজও সেটিই বলে। শুরু করেছিল ‘শুদ্ধি’র নামে মুসলিমদের হিন্দু বানানোর আন্দোলন। হিন্দুদের মুসলিম বিদ্বেষী বিষাক্ত মন যে চিকিৎসার সম্পূর্ণ অযোগ্য –সেটি সঠিক ভাবে বুঝেছিলেন কায়েদে আযম মহম্মদ আলী জিন্নাহ ও তাঁর সহচর মুসলিম নেতৃবৃন্দ। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন অচিরেই শেষ হবে। কিন্তু অখন্ড ভারত ভূমিতে একবার হিন্দু শাসনের যাঁতাকলে পড়লে -তা থেকে আর মুক্তি মিলবে না। ফলে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা। অন্যান্য মুসলিমদের সাথে বাঙালী মুসলিমগণও তখন নামে “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান”এর আন্দোলেন। ইতিহাসের এ পাঠ বাংলাদেশের স্কুলের বই থেকে পরিকল্পিত ভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে। এবং সেটি ভারতসেবী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা দেবার স্বার্থে।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সংখ্যালঘুদের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য এ শতাব্দির শুরুতে একটি তদন্ত কমিশন ঘটনা করেছিলেন। সে তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে যে তথ্যগুলো বেরিয়ে এসেছে তা অতি করুণ। শিক্ষা ও চাকুরিতে মুসলমানদের অবস্থা ভারতের নমশুদ্রদের চেয়েও খারাপ। ভারতে মুসলিমদের অবস্থা ১৯৪৭’য়ে যা ছিল তা থেকেও বহু নিচে নেমেছে। অর্থনৈতিক বঞ্চনার পাশাপাশি তারা নিয়মিত মারা যাচ্ছে মুসলিম-বিরোধী গণহত্যায়। মুসলিম মহিলারা হচ্ছে ধর্ষণের শিকার। দাঙ্গার নামে তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট জ্বালানোটি হিন্দুদের কাছে যেন উৎসবের বিষয়। ভারতীয় জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ মুসলিম; কিন্তু সরকারি চাকুরিতে তাদের সংখ্যা শতকরা ৩ ভাগেরও কম।

পাকিস্তানের ব্যর্থতা অনেক, কিন্তু দেশটির অর্জন কি এতোই তুচ্ছ? পাকিস্তানের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালগুলিতে যত মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করে ভারতে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা তার ১০ ভাগের এক ভাগও নয়। অথচ একটি দেশের মানুষ কতটা সামনে এগুচ্ছে বা কীরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক শক্তিসঞ্চয় করছে তা পরিমাপের একটি নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা। ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে অতি নগন্য প্রফেশনালদের সংখ্যা। পাকিস্তানের একমাত্র করাচী শহরে যতজন ডাক্তার, শিক্ষক, প্রকৌশলী,আইনবিদ, প্রফেসর, বিজ্ঞানী, আমদানী-রফ্তানীকারক ও সামরিক অফিসারের বসবাস সমগ্র ভারতীয় মুসলিমদের মাঝেও তা নেই। তাছাড়া পাকিস্তানে যতজন পারমানবিক বিজ্ঞানী বা পদার্থ বিজ্ঞানীর বসবাস তা ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে দূরে থাক, ৫৭টির বেশী মুসলিম দেশের মাঝে কোন দেশেই নাই। সম্প্রতি ব্রিটিশ পত্রিকায় প্রকাশ, পাকিস্তানের আনবিক বোমার সংখ্যা ফ্রান্সের প্রায় সমকক্ষ। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একমাত্র তাদের হাতেই রয়েছে আনবিক বোমাধারি দূরপাল্লার মিজাইল -যা ভারতীয় প্রযুক্তির চেয়ে অগ্রসর। রয়েছে যুদ্ধ বিমান তৈরীর সামর্থ্য। একাত্তর থেকে পাকিস্তান অনেক সামনে এগিয়েছে। দেশটি আজও বেঁচে আছে সে সামরিক শক্তির জোরেই। নইলে ভারত ইতিমধ্যে পাকিস্তানকে কয়েক টুকরোয় বিভক্ত করে ফেলতো। একাত্তরের পর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW সেটির পরিকল্পনাও এঁটেছিল। ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রায়না তার বই “Inside RAW”য়ে সে বিষয়ে বিস্তর বিবরণ তুলে ধরেছেন। সামরিক শক্তির বিচারে পাকিস্তানই হলো সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। এ কারণেই দেশটি তার জন্ম থেকেই সকল আন্তর্জাতিক ইসলাম-বিরোধী শক্তির টার্গেট। অখন্ড ভারতে বসবাস করলে শক্তি সঞ্চয়ের কি এরূপ সুযোগ মিলতো? শক্তি সঞ্চয়ের জন্য তো পায়ের তলায় মাটি চাই, স্বাধীনতাও চাই। ভারতের মুসলিমদের কি সেটি আছে? বন্দীদের সংখ্যা জেলে যতই বৃদ্ধি পাক তাতে কি জেলবাসীদের শক্তি বাড়ে?

 

ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও

বীজ সব জায়গায় গজায় না, বেড়েও উঠে না। বনেজঙ্গলে পড়লে গজালেও বেড়ে উঠে না। ভারতে মুসলিম প্রতিভা যে নাই -তা নয়। প্রতিটি শিশুরই বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়। কিন্তু ভারতে মুসলিম শিশুর বেড়ে উঠার অনুকূল পরিবেশই নাই। সামনে এগুনোর পথ নাই। ভারতের কাছে বাংলাদেশের বড় অপরাধ, দেশটি তার মুসলিম নাগরিকদের ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠার সুযোগ করে দিয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠার অর্থই হলো মৌলবাদী বা সন্ত্রাসী হওয়া। একই ধারণা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। ভারত মনে করে বাংলাদেশ সন্ত্রাসী উৎপাদনের ঘাঁটি। একই রূপ অভিযোগ পাকিস্তান, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধেও। ভারত চায়, বাংলাদেশের সরকারও ভারতের ন্যায় মুসলিমদের ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠাকে কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করুক। ভারতের প্রতি নতজানু হাসিনা ভারতের সে দাবীটি যে কতটা মেনে নিয়েছে তা বুঝা যায় ঘরে ঘরে পুলিশ নামিয়ে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করা থেকে।  সেটি দেখা যায়, কোর’আনের তাফসিরকারকদের দেশ ছাড়া করা বা কারাবন্দী করা থেকে।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা অনর্থক বললে স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টিও অনর্থক হয়ে দাঁড়ায়। তাই পাকিস্তানের সৃষ্টিকে অনর্থক বা অনাসৃষ্টি বলাটি মামূলী ব্যাপার নয়, এটি এক গভীর ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধেও।  বাংলাদেশ তার সমগ্র মানচিত্রটা পেয়েছে মূলত পাকিস্তান থেকে। বাংলাদেশীরা একাত্তরের পর এক ইঞ্চি ভূমিও এ মানচিত্রে বাড়ায়নি। তাই বাংলাদেশীদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ১৯৪৭’য়ে অর্জিত স্বাধীনতা। ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতা জুটেছে বটে, স্বাধীনতা নয়। ১৯৭১’য়ের ১৬ই ডিসেম্বরকে স্বাধীনতা দিবস বললে পূর্বের পাকিস্তানী ২৩ বছরকে ঔপনিবেশিক বিদেশী শাসন বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তখন অর্থ দাঁড়ায় পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন। কিন্তু সেটি হলে কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর ঢাকার খাজা নাযিম উদ্দিন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হন কি করে? বগুড়ার মহম্মদ আলী এবং আওয়ামী লীগের সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হন কি করে? পশ্চিম পাকিস্তানীরা কি তা মেনে নিত। মিথ্যা কথায় হিসাব মিলানো যায় না। তাই হিসাব মেলে না পাকিস্তানী আমলকে ঔপনিবেশিক আমল বললে। তবে সে মিথ্যাটি বলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্বার্থপরতা আছে। সেটি নিজেদের অপরাধগুলিকে গৌরবময় করার স্বার্থে। সে সাথে লক্ষ্য, প্রভুরাষ্ট্র ভারতের আগ্রাসী চরিত্রকে আড়াল করা। কিন্তু যারা সে অপরাধে জড়িত নয় এবং লিপ্ত নয় ভারতের লেজুড়বৃত্তিতে, অন্ততঃ তাদের তো সত্য কথাগুলো নির্ভয়ে বলা উচিত।

মুসলিম ইতিহাসে অপরাধীদের তালিকাটি বিশাল। মীর জাফরের ন্যায় কেউ বা অপরাধ করেছে মুসলিম ভূমিকে বিদেশী শত্রুর হাতে তুলে দিয়ে। কেউ বা ভয়ানক পরাধ করেছে মুসলিম দেশকে খন্ডিত করার মাধ্যমে দুর্বল করে। মুজিব অপরাধ করেছে উভয় ভাবেই। মুজিবের কারণে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানই শুধু দুর্বল হয়নি, দুর্বল হয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ। সে সাথে ভারতের ন্যায় একটি শত্রুদেশের হাতে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ভূ-প্রাকৃতিক ও সামরিক ভাবে ঘেরাও হয়ে গেছে বাংলাদেশ। এরই ফলে যেমন গোলামী এসেছে, তেমনি এসেছে সীমাহীন লুন্ঠন। ফলে এসেছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষও। এবং তাতে মৃত্যু হয়েছে বহু লক্ষ বাংলাদেশীর। এমন কি পানি শূণ্যতায় মারা পড়েছে বাংলাদেশের নদীগুলিও।

 

মুজিবের নাশকতা

একই সাথে মহান আল্লাহতায়ালা ও ভারতের ন্যায় পৌত্তলিক কাফের শক্তিকে খুশি করা যায় না। যে কোন একটিকে বেছে নিতে হয়। শেখ মুজিব এবং তার অনুসারি বাঙালী জাতীয়তাবাদীগণ মহান আল্লাহতায়ালার বদলে ভারতের কাফের শাসকদের খুশি করার পথটি বেছে নিয়েছে এবং উৎসব বাড়িয়েছে দিল্লির শাসকমহলে। মহান আল্লাহতায়ালা কখোনই মুসলিমদের বিভক্তি, পরাজয় ও শক্তিহানীকে পছন্দ করেন না। যা মুসলিমদের পরাজয় আনে তা মহান আল্লাহতায়ালার আযাব ডেকে আনে। এজন্য যার মধ্যে সামান্যতম ঈমান আছে, সে কখোনই কাফেরদের বিজয় বাড়ায় না। এমন কাজ তো শয়তানের অনুসারি কাফেরদের, ঈমানদারের। অথচ মুজিব ও তার সাথীরা সেটিই করেছে একাত্তরে।

মীর জাফরের গাদ্দারীর পিছনে তার স্বার্থ হাসিলের বিষয়টি ছিল। তেমন একটি স্বার্থপরতা মুজিবেরও ছিল। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে একাত্তরের ন্যায় পরাজয়টি বিরল। পৌত্তলিক কাফেরগণ তাদের সমগ্র ইতিহাসে কোন কালেই মুসলিমদের উপর এরূপ বিজয় পায়নি। ইন্দিরা গান্ধি তাই দর্প ও গর্ব ভরে বলতে পেরেছিল, “হাজার সাল কি বদলা লে লিয়া”। এবং সেটি মুজিবের কারণে। বাংলার মুসলিম ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে কলংকিত অধ্যায়। একাত্তরে যেটি জুটেছে সেটি হলো, ভারতীয় প্রভাব বলয়ে অন্তর্ভুক্তি। ১৯৭১’থেকে ভারত বাংলাদেশকে গণ্য করে তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সীমানার ভিতরের একটি দেশ। যেমন নিযামের হায়দারাবাদ গন্য হত ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের কাছে। নিযাম সে আমলে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন। অথচ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নিজদেশের প্রতিরক্ষায় কোন ট্যাংক বা দূরপাল্লার একখানি কামানও কিনতে দেয়নি। ভারতের বাইরে কোন বৃহৎ শক্তির সাথে সম্পর্কও গড়তে দেয়নি। ইচ্ছামত ট্রানজিট নিতে ব্রিটিশেরা দেশটির মধ্য দিয়ে জালের মত রেল লাইন বসিয়েছিল। তাই ১৯৪৮ সালে ভারত-ভূক্ত করতে ভারতকে বেগে হতে হয়নি। দুর্বল এক আশ্রিত রাষ্ট্রের অবকাঠামো ব্রিটিশেরা পূর্ব থেকেই সে দেশে নির্মাণ করে গিয়েছিল।

বাংলাদেশেও তেমনি গোলামীর এক মজবুত অবকাঠামো নির্মান করছে ভারত ও তার বাংলাদেশী সহযোগীরা। সেটি যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক, তেমনি সাংস্কৃতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক। নিযাম শাসিত হায়দারাবাদের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশগণ যেমন যথেচ্ছারে ট্রানজিট নিয়েছিল, একই ভাবে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নিচ্ছে ভারত। এবং ভারত কখনোই চায় না বাংলাদেশ পারমানবিক শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান ও চীনের সাথে সম্পর্ক মজবুত  করুক এবং উচ্চমানের অস্ত্র সংগ্রহ করুক। একমাত্র অজ্ঞতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রাটই বাংলাদেশের এ বন্দিদশাকে ভুলিয়ে দিতে পারে। এমন অজ্ঞতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রাটে পরাধীনতাও স্বাধীনতা মনে হয়। বাংলাদেশের ভারতপন্থিদের কাজ হয়েছে বাঙালী মুসলিমদের মাঝে সে বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রাটকেই আরো তীব্রতর করা। একাত্তরে ভারতের ঘরে যেমন বিজয় তুলে দিয়েছিল, এখনো সেই একই খেলা তারা লাগাতর খেলে যাচ্ছে। ১ম সংস্করণ ০৭/০৬/১১; ২য় সংস্করন ১৭/১১/২০২০।