বিবিধ ভাবনা-৭

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১.

বাক-স্বাধীনতার অর্থ কাউকে ব্যঙ্গ করা বা গালি-গালাজের স্বাধীনতা নয়। সেটি হলে সমাজে সংঘাত ও অশান্তি অনিবার্য হয়ে উঠে। অন্যকে গালি-গালাজ করা যে কোন সভ্য সমাজে এবং যে কোন সভ্য বিচারেই অতি অসভ্য কাজ। অথচ সে অসভ্যতার প্রবল চর্চা হচ্ছে ফ্রান্সে। সে অসভ্যতাকে নোংরা আর্ট বা কার্টুনে পরিনত করা হয়েছে। এবং সেটি ব্যবহৃত হচ্ছে মহান নবীজী (সাঃ)’র চরিত্রে কালিমা লেপনের কাজে। সে অসভ্যতাকে সমর্থন দিচ্ছে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। অথচ ফ্রান্সে সে দেশের জাতীয় পতাকার অবমাননা করলে মোটা অংকের জরিমানা দিতে হয়।

অসভ্য মানুষদের সমস্যা হলো, তারা সভ্য আচরন জানে না। ফ্রান্সবাসীর চেতনায় সে অসভ্যতা যে কতটা গভীর –কার্টুন নিয়ে নোংরামী হলো তারই নজির। বিশ্বকে অশান্ত ও যুদ্ধময় করার জন্য পারমানবিক বোমা লাগে না। এমন অসভ্য  মানসিকাতাই যথেষ্ট। সে অসভ্য চেতনা নিয়েই ফান্সের সেনাবাহনী ১৫ লাখ আলজিরিয়ানকে হত্যা করেছিল। আলজিরিয়ানদের অপরাধ, তারা স্বাধীনতা চেয়েছিল। স্বাধীনতার সে যুদ্ধকে তখন সন্ত্রাস বলেছিল। আলজিরিয়ার বুকে সে অসভ্য গণহত্যা চালাতে পারমানবিক বোমার প্রয়োজন পরেনি। প্রয়োজন পড়েছিল অসভ্য মনের। সে অসভ্য মন ফ্রান্সবাসীর জীবনে আজও যে কতটা প্রবল ভাবে বেঁচে আছে -সেটি বুঝা যায় নবীজী (সাঃ)’র ন্যায় মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ মানবটির বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ কার্টুন নির্মান থেকে। এরূপ অসভ্যতা বিশ্বের সভ্য মানুষদের গায়ে বিশেষ করে মুসলিমদের গায়ে যে আগুন লাগাবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? বিক্ষুব্ধ মুসলিমদের সন্ত্রাসী বললে কি বিক্ষুব্ধ মুসলিম বিশ্ব শান্ত হবে। সে জন্য তো চাই ফ্রান্সবাসীর অসভ্য মনকে সভ্যতর করা।

২.

বিশ্বের কোথাও কোন অসভ্য বর্বরতা ঘটলে সেটির নিন্দা না করাটি আরেক অসভ্যতা। ফ্রান্সে মহান নবীজী (সা)’কে নিয়ে কার্টুন এঁকে যে অসভ্যতার প্রকাশ ঘটলো -সেটির নিন্দা না করে বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ করলো তার নিজ অসভ্যতাকে। অসভ্য কর্মের নিন্দা জানানোর জন্য চাই সভ্য মন। কিন্তু সে সভ্য মন নেই বাংলাদেশের আওয়ামী ঘরানার নেতাকর্মীদের মাঝে। এটি তাদের অতি পুরানো ব্যাধি। ফলে ভারতে যখন ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদকে ধ্বংস করা হয় এবং গুজরাতে হত্যা করা হয় বহু হাজার মুসলিমকে, তখনও শেখ হাসিনা ও সাথীরা সে বর্বর কর্মের নিন্দা করেনি। ভারতে চলছে মুসলিমদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র, কাশ্মিরে চলছে গণতন্ত্র -সেটিকেও তারা নিন্দা করেনি। এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে হাসিনা ও তার সাথীরা বেঁচে আছে কতটা অসভ্য মন নিয়ে। এরূপ অসভ্য মন নিয়ে ভোট-ডাকাতি করা যায়, গুম-খুনের রাজনীতিকে বলবান করা যায়,শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যাও চালানো যায়, কিন্তু অসভ্য কর্মকে নিন্দা করা যায় না।   

৩.

Right of free speech doesn’t give license to anyone to abuse others. It is pure evil. The French cartoonist is practising such evil against the Prophet Muhammad (peace be upon him) and the French President is supporting it. Such support makes French President complicit in the crime. Such mocking of the Prophet of Islam through cartoon is enough to ignite Muslims’ anger. Thus the French cartoonists are playing with fire. But it is very sad that French President Macron is not containing his mad dogs, but blaming Islam for the Muslims’ outburst. He is indeed adding fuel to the fire.                                                                  

৪.

বাংলাদেশে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর লোকদের নিজ নিজ অভিভাবক আছে। তাদের গায়ে হাত দিলে বাহিনীর লোকেরা ছুটে আসে। সরকারি দলের কোন নেতা-কর্মীর গায়ে হাত পড়লে সমগ্র প্রশাসন ময়দানে নামে। কিন্ত দুঃখের বিষয় হলো, অভিভাবক নেই দেশের জনগণের যারা রাজস্ব দেয় ঐসব বাহিনীর প্রতিপালনে। ফলে জনগণের মধ্য থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ গুম, খুন ও ধর্ষণের শিকার হলেও তাদেরকে সে যাতনা থেকে মুক্তি দেয়ার কেউ নাই। পুলিশ, প্রশাসন ও আদালতের কাজ হয়েছে তাদের পকেট হাতড়িয়ে নেয়া। রাজনৈতিক নেতাদের  কাজ হয়েছে স্রেফ নিজের গদি পাহারা দেয়া্।

এ অবস্থা থেকে মু্ক্তি পেতে হলে জনগণকে নিজের অভিভাবক নিজে হতে হবে। শুধু তাই নয়, নিজের অধিকার নিজে আদায় করে নিতে হবে। এছাড়া গুম, খুন ও ধর্ষণ থেকে বাঁচার বিকল্প পথ নেই। এ লক্ষ্যে প্রতিটি মানুষকে যোদ্ধা হওয়া ছাড়া উপায় নাই। এটি এক অতিশয় গুরু দায়িত্ব। সে সাথে পবিত্র দায়িত্বও। ইসলামে এটি জিহাদ। নামায-রোযার ন্যায় জিহাদকে ফরজ করা হয়েছে দুর্বৃত্ত নির্মূলের এ পবিত্র লড়াইয়ে সকল মানুষের সংশ্লিষ্টতা বাড়াতে। দুর্বৃত্তি থেকে মুক্তি এবং সভ্যতর সমাজ নির্মাণে এছাড়া বিকল্প পথ আছে কি?

 ৫.

The Europeans have the ugly legacy of cleansing the Muslims from Spain, the Jews from German, the Red Indians from America, the Aborigines from Australia, and the Maoris from New Zealand. Now they are going back to their own legacy and turning against the Muslims. The Muslims must be aware of the situation on the ground and unitedly plan to face the reality. Inaction like a lame-duck only adds to their sufferings.

৬.

নবীজী (সা:)কে যদি কেউ অবমাননা করে, আর তাতে যদি কারো মনে ব্যথা না জাগে -তবে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি পুরা বেঈমান। সে নিজেকে মু্সলিম রূপে দাবী করলে বুঝতে হবে সে মুনাফিক। কারণ, ঈমানদার হওয়ার শর্ত হলো, তাকে নিজ প্রাণের চেয়েও ভাল বাসতে হয় নবীজী(সাঃ)কে। তাই নবী (সাঃ)র অবমাননা হলে প্রতিবাদী হওয়াটি  সন্ত্রাস বা রেডিক্যালিজম নয়, সেটি স্বাভাবিক ঈমানের প্রকাশ মাত্র।

৭.

The US Supreme Court has 9 judges. Of them, 6 are republican & 3 are a democrat. If politics enter into court, how impartial justice can be served. So it is not unusual that the US judiciary gets easily biased on race, religion and partisan issues.It is indeed a tribal practice.

৮.

যারা শয়তানের সৈনিক তাদের সামরিক বিনিয়োগ হাজার হাজার বিলিয়ন ডলারের। মার্কিনীদের বিনিয়োগ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশী। তারা বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ করে এবং হাজারে হাজার প্রাণও দেয়। মুসলিম তো  আল্লাহর সৈনিক। কিন্তু তাদের বিনিয়োগ কতটুকু? অথচ পরকালে মুক্তির জন্য যেমন ঈমান থাকাটি জরুরী, তেমনি জরুরী হলো আল্লাহার রাস্তায় অর্থদান। অর্থদান যে শুধু অস্ত্র কেনার জন্য জরুরী –তা নয়। জরুরী হলো বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইকে তীব্রতর করতেও। নইলে শত্রুর সামরিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হামলা থেকে প্রতিরক্ষা মেলে।

নবীজী (সাঃ)’র সাহাবাগণ জিহাদে অর্থদানে ইতিহাস গড়েছেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর ঘরের সবকিছু নবীজী (সাঃ)’র সামনে পেশ করেছেন যাতে তা জিহাদে লাগানো যায়। মহান আল্লাহতায়ালা আজকের মুসলিমদের সম্পদ কম দেননি। কিন্তু সে বিপুল সম্পদ ব্যয় হচ্ছে নিজেদের জৌলুস বাড়াতে। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে এবং উন্নত অস্ত্রের নির্মাণে সে অর্থের বিনিয়োগ সামান্যই। ফলে বাড়ছে মুসলিমদের পরাজয় ও নিরাপত্তহীনতা। ৩১/১০/২০২০   




অধিকৃত বাংলাদেশ এবং শত্রুশক্তির এজেন্ডাপূরণের রাজনীতি

ফিরোজ মাহবুব কামাল

অধিকৃতিটি শত্রুপক্ষের

বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতা হলো, দেশটি এখন আর মুসলিমদের হাতে নেই্। ইসলাম ও মুসলিম –এ দুটি শব্দ পরিত্যক্ত হয়েছে দেশের মূল পরিচিতি থেকে। বাংলাদেশের উপর বর্তমান অধিকৃতিটি ইসলামের শত্রুপক্ষের। নিজের মুসলিম পরিচয়টি অবৈধ শাসকচক্রের কাছে কোন গুরুত্বই বহন করে না। গুরুত্ব পায় তার ভাষা, ভূগোল, বর্ণ ও দল ভিত্তিক পরিচয়টি। তারা গর্বিত সেক্যুলার বাঙালী রূপে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে যত উচ্চবাচ্যই হোক না কেন, দেশ শাসনে তারা স্বাধীন নয়। বরং অধিকৃতিটা এখানে ভারতের ন্যায় শত্রুদেশের। তাজউদ্দীনের প্রবাসী সরকারের ন্যায় বর্তমান শাসকচক্রটি দিবারাত্র খাটছে ভারতের এজেন্ডা পালনে। তবে পার্থক্যটি হলো, তাজউদ্দীনের বসবাস ছিল কলকাতায়, আর হাসিনার বাস ঢাকায়। পাকিস্তান আমলে যারা ছিল ভারতের ট্রোজান হর্স তথা গুপ্ত সৈনিক, একাত্তরের পর তারা অবতীর্ণ হয়েছে প্রকাশ্যে ময়দানে। তাদের কারণে ভারতের দখলদারিটি স্রেফ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অঙ্গণে নয়; সেটি অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় আক্বীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও। ক্ষমতাসীন জোটটি যে ভারতপন্থি সেটি তারা গোপনও করে না। বরং ভারতের প্রতি অবনত থাকা এবং ভারতীয় স্বার্থের পাহারা দেয়াটি নিজেদের দায়বদ্ধতা মনে করে। ভারতের প্রতি তেমন একটি দায়বদ্ধতার কারণে ভারতীয় অধিকৃতির বিরুদ্ধে কেউ আওয়াজ করলে তাকে এরা লাশে পরিণতে করে। বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে তো এমন চেতনাধারীদের হাতেই নিহত হতে হলো। ফলে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পরিচিতি এখন ভারতীয় বলয়ভূক্ত একটি আশ্রীত দেশরূপে। ফলে বাংলাদেশে বুকে ভোট-ডাকাতি, গুম-খুন বা শাপলা চত্ত্বরের ন্যায় গুরুতর গণহত্যা ঘটলেও বিদেশীরা তা নিয়ে কিছু বলে না। ভাবে, এটি ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। তারা ভাবে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতেরও কিছু করার অধিকার আছে।

ভারতের আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে বাংলাদেশের উপর ভারতেসবীদের অধিকৃতি প্রথমে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বরে। সেটি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধজয়ের ফলে। পরবর্তীতে তা বার বার নতুন জীবন পেয়েছে ভোট ডাকাতির মাধ্যমে। এ অধিকৃতির সাথে শুধু যে বাঙালী জাতীয়তাবাদী নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসী ক্যাডারগণ জড়িত –তা নয়। বরং জড়িত দেশের প্রশাসন,পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী, বিচার ব্যবস্থা,নির্বাচনি কমিশন এবং মিডিয়া। কারণ, ভারতীয় পঞ্চম বাহিনী বা ট্রোজান হর্সদের অবস্থান শুধু দেশের রাজনীতির অঙ্গণে নয়, বরং সর্বস্তরে ও সর্বপ্রতিষ্ঠানে। ভারত-বিরোধী নেতাকর্মীগণ তাই লাশ হয় শুধু লগি-বৈঠা ও পিস্তলধারী রাজনৈতিক ক্যাডারদের হাতে নয়, আদালতের বিচারকদের হাতেও। আত্মবিক্রীত বিচারকদের হাতে ভোট ডাকাতির নির্বাচনও সুষ্ঠ নির্বাচন রূপে বৈধতা পায়। শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যায় তাই রাজনৈতিক গুণ্ডাদের পাশে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও দেখা যায়। তাদের সাথে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশের ভিতরে ও বাইরে কর্মরত ভারতীয় গুপ্তচরেরা। এরা কখনোই চায় না, বাংলাদেশের বুকে জনগণের মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পাক। সেটি চাইলে ভারত সরকার কখনোই শেখ মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচারকে সমর্থন দিত না। সমর্থন দিত না ভোট ডাকাতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হাসিনা সরকারকে। ভারত চায় এক পরাধীন বাংলাদেশ। এবং কখনোই চায় না, দেশটির জনগণ নিজ নিজ ধর্মকর্ম ও আক্বীদা-বিশ্বাস নিয়ে স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠুক। তবে ইসলামের শত্রুপক্ষের এরূপ ষড়যন্ত্র নতুন নয়। এর শুরু ১৯৭১ থেকেও নয়। বরং সেটি ১৯৪৭ সাল থেকেই। তবে হাসিনার সুবিধাটি হলো, মুজিবের ন্যায় তাকে চোরা পথে আগরতলায় গিয়ে ভারতীয় গুপ্তচরদের সাথে গোপন বৈঠক করতে হয় না। সে বৈঠকগুলি বসে বঙ্গভবনে বা গণভবনে।

মুসলিমদের কীভাবে দাবিয়ে রাখা যায় -সে বিষয়ে ভারতীয় কুটিল শাসকগণ সিদ্ধহস্ত। সে কাজে তারা হাত পাকিয়েছে ভারত ও কাশ্মীরের মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানারূপ নির্যাতনে নেমে। ভারতে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ২০ কোটি -যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার চেয়ে অধীক। অথচ একমাত্র ঢাকা শহরে যতজন মুসলিম ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, আইনবিদ, কৃষিবিদ, হিসাবরক্ষক, শিল্পপতি, প্রফেসর এবং সামরিক ও বেসামরিক অফিসার বসবাস করে এবং তাদের হাতে যত গাড়ী ও দালানকোঠা আছে তা সমগ্র ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের নাই। বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের কথা তো বাদই রইলো। এ প্রসঙ্গে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের স্থাপিত সাচার কমিশনের রিপোর্টটি বড়ই মর্মান্তিক। সে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতীয় মুসলিমদের অবস্থা দেশের অচ্ছুৎ নমশুদ্রদের চেয়েও খারাপ।

 

অসম্ভব করা হয়েছে ধর্মপালন

পরিপূর্ণ ধর্মপালন অসম্ভব করতে চালু করা হয়েছে নিয়ন্ত্রণের ভারতীয় মডেল। শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, ভারতীয় মুসলিমদের জন্য অসম্ভব করা হয়েছে ইসলামি শিক্ষালাভ, শরিয়ত পালন এবং পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠা। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধান পালন ছাড়া কি পরিপূর্ণ ইসলাম পালন সম্ভব? শরিয়ত পালনের সে ব্যর্থতা নিয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়া যাবে? সেটি যে অসম্ভব, সেটি সুস্পষ্ট করা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে, “যারা (কোরআনে) নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার কার্য পরিচালনা করে না তারা কাফের। –তারা জালেম। –তারা ফাসেক।”-(সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭)। তাই নামায-রোযা পালনে কোন ঈমানদার যেমন আপোষ করতে পারে না, তেমনি আপোষ করতে পারে না শরিয়ত প্রতিষ্ঠায়।

ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে যখন বঙ্গ বিজিত হয় তখন বাংলার মুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ১০ ভাগও ছিল না। অথচ তখনও তিনি শরিয়ত ভিন্ন অন্য কোন আইনকে আদালতে স্থান দেননি। কারণ মুসলিমের কাছে শরিয়তী আইন ভিন্ন সব আইনই কুফরী আইন। ফলে মুসলিম ভূমিতে সেগুলি আবর্জনার ন্যায় অবৈধ ও পরিতাজ্য। মুসলিম যেমন নিজ ঘরে মুর্তি রাখতে পারে না, তেমনি নিজ রাষ্ট্রে কুফরি আইনও রাখতে পারেনা। তাই কোন দেশে শাসনক্ষমতা হাতে পেলে মুসলিম শাসকগণ প্রথম দিন থেকেই নামায-রোযা, হজ-যাকাতের সাথে শরিয়তী আইনেরও প্রতিষ্ঠা শুরু করে। মুসলিম হওয়ার এটি এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা। সেটি না করলে ঈমান থাকে না। আর ঈমান ভেঙ্গে গেলে কি ইবাদত কবুল হয়? কবুল হয় কি দোয়া-দরুদ? ওজু ভেঙ্গে গেলে যেমন নামায হয় না, তেমনি ঈমান ভেঙ্গে গেলে কোন ইবাদত ও দোয়াদরুদও কবুল হয় না। এমন কি হজ্বের দিনে দোয়া কবুলের স্থান আরাফতের ময়দানে গিয়ে দোয়া করলেও এমন কাফেরের দোয়া কবুল হয় না। ঈমানহীন,আমলহীন ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারহীন ব্যক্তিগণ যদি মুসলিম হওয়ার দাবী করে তবে তারা গণ্য হয় মুনাফিক রূপে। এমন ব্যক্তির নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, দোয়াদরুদ তাকে মুনাফিফ হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে না। ওহুদের যুদ্ধের সময় এমন মুনাফিকদের সংখ্যা ছিল শতকরা ৩০ ভাগ। মসজিদের জায়নামাজে তাদের চেনা যায়নি। তাদের মুনাফিকি ধরা পড়ে ওহুদ যুদ্ধের সময়। নবীজী (সাঃ) সে যুদ্ধে মদিনা থেকে এক হাজার সঙ্গি নিয়ে রওনা দেন, কিন্তু সে বাহিনী থেকে ৩০০ জন ছিটকে পড়ে। তখন ধরা পড়ে তাদের মুনাফেকি। নবীজী (সাঃ)র পিছনে নামায পড়ে এবং রোযা রেখেও মুনাফিক হওয়া থেকে তারা বাঁচেনি। এরূপ মুনাফিকদের সংখ্যা আজ যে বহুগুণ -তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে?

 

এতো অপপ্রচার কেন জিহাদের বিরুদ্ধে?

বাংলাদেশের ন্যায় দেশগুলিতে সেক্যুলারিস্টগণ জিহাদের বিরুদ্ধে বড্ডো সোচ্চার। হেতু কি? কারণ, প্রতিটি দেশে জিহাদই দেয় মুসলিমদের জানমাল, ঈমান-আক্বিদা ‌ও রাষ্ট্রের মুল প্রতিরক্ষা। সেটি ভাষা, ভূমি, আলোবাতাস বা জলবায়ু থেকে আনে না। তাই যেখানে জিহাদ নাই, সেখানে স্বাধীনতাও নাই। নাই পূর্ণ দ্বীন পালনের সুযোগ। তাছাড়া এ জিহাদই মুসলিম নামধারি ইসলামের শত্রুদের মুনাফিকি প্রকাশ করে দেয়। প্রকাশ করে দেয়, তাদের শত্রুশক্তির সাথে সম্মিলিত ষড়যন্ত্রগুলিও। তাই যে সমাজে জিহাদ নেই, সে সমাজে কে সাচ্চা ঈমানদার, আর কে মুনাফিক -সেটি চেনার অন্য উপায় নেই। তখন দুর্বৃত্ত ভণ্ডদের জন্য সহজ হয়ে যায় মুসলিম সেজে ইসলাম ও মুসলিমের ক্ষতি করাটি। তখন টুপিদাড়ি ও মাথায় কালো পট্টি বেঁধে মুসলিমদের ধোকা দেয়। জিহাদ যেহেতু তাদের আসল চেহারা ফাঁস করে দেয় এবং বানচাল করে  দেয় তাদের এজেন্ডা, এ দুর্বৃত্তগণ ইসলামের এ সর্বোচ্চ ইবাদতকে তাই বন্ধ করতে চায়। এমন কি এ ইবাদতকে সন্ত্রাস বলেও প্রচার করে।

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলীতে ইসলামের বড় বড় ক্ষতিগুলো কাফেরদের দ্বারা হয়নি; হয়েছে এসব মুনাফিকদের হাতে। ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতার নামে মুসলিম বিশ্ব যেরূপ ৫৭টি দেশে বিভক্ত -সেটি কি নবীজী (সাঃ)র সূন্নত? এটি তো ইসলামের শত্রু মুনাফিকদের কাজ। এমন বিভক্তিতে কি মহান আল্লাহতায়ালা খুশি হন? নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এসব মুনাফিকরা ছিল পরাজিত, কিন্তু এখন তারা বিজয়ী। ফলে বিপদ বেড়েছে ইসলাম ও মুসলিমের। ভাষা, বর্ণ ও ভূগোলের নামে মুসলিমদের বিভক্ত রাখা এবং শরিয়তী বিধানকে পরাজিত রাখাই তাদের রাজনীতি। নিজেদের বিজয়কে ধরে রাখার জন্য বিশ্বের তাবৎ কাফের শক্তির সাথে এরা মৈত্রী গড়ে। বাংলাদেশের মাটিতে সে অপরাধমূলক রাজনীতিটি হয়েছে দেশটির সেক্যুলারিস্টদের হাতে। এবং তাতে বিপুল ভাবে লাভবান হচ্ছে ভারত।   

ব্যক্তির সাচ্চা ঈমানদারি ধরা পড়ে ইসলামের বিজয়ে তার আপোষহীন অঙ্গীকারে। মুনাফিকদের জীবনে সে অঙ্গীকার থাকে না। এ কারণেই তারা দূরে থাকে জিহাদের ময়দান থেকে। কারণ জিহাদ জান ও মালের কোরবানী চায়, স্রেফ মুখের কথা এখানে কাজ দেয় না। ফলে জান ও মাল বাঁচানো যাদের মূল লক্ষ্য, তারা নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচিত দিলেও পরিণত হয় জিহাদের শত্রুতে। এবং বিরোধীতা করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। সে লক্ষ্যে তারা জোট বাঁধে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে। এ পথেই তারা নিজেদের স্বার্থ দেখে। এভাবে তারা নিজেদের পরিণত করে স্বার্থপর এক নিকৃষ্ট জীবে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মানব জাতির বিভাজনটি তিন শ্রেণীতে। এক). ঈমানদার, দুই). কাফের, তিন). মুনাফিক। ইসলামী রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদে অংশ না নেয়ায় তারা ঈমানদার নয়। যেহেতু তারা নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করে সেহেতু তারা কাফেরও নয়। তারা গণ্য হয় মুনাফিক রূপে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মুনাফিকগণ গণ্য হয় কাফেরদের চেয়েও অধীকতর নিকৃষ্ট জীব রূপে। মুনাফিকদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালার ক্রোধ যে কঠোর -সেটি বুঝা যায় পবিত্র কোরআনের এ আয়াতেঃ “নিশ্চয়ই মুনাফিকদের অবস্থান হবে জাহান্নামের আগুনের সর্বনিম্ন স্তরে, তাদের জন্য জুটবে না কোন সাহায্যকারী।” –(সুরা নিসা,আয়াত ১৪৫)। প্রশ্ন হলো,পরকালে যাদের জন্য বরাদ্দ জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থান, দুনিয়াতেও কি তারা কোন সম্মানজনক স্থান পায়? বিশ্বমাঝে এরাই কাফেরদের থেকেও অধীক অপমানিত ও অসম্মানিত হয় এবং দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে।

 

যে কুফলটি শত্রুশক্তির অধীনতায়

শরিয়তের প্রতিষ্ঠা এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে এছাড়া সুস্থ্য সমাজ বা রাষ্ট গড়ে উঠতে পারে না। এজন্য নবীজী (সাঃ) মদিনায় হিজরতের পর নিজের ঘর না গড়ে প্রথমে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছেন। অথচ অধিকৃত বাংলাদেশে সেটি অসম্ভব। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি চিত্রিত হচ্ছে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস রূপে। অথচ নামায-রোযার ন্যায় ইসলামের এটি অতি মৌলিক বিষয়। শরিয়ত পালিত না হলে ইসলাম পালন হয় না -সেটিই হলো ইসলামের বুনিয়াদী আক্বিদা। এমন একটি বিশ্বাসের কারণেই সিরাজদ্দৌলার আমলেও বাংলার প্রতিটি আদালতে শরিয়তী আইন ছিল। শরিয়তী আইন ছিল মোঘল শাসিত ভারতে। কিন্তু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কাফেরদের দখলদারী প্রতিষ্ঠার পর নির্মূল করা হয় শরিয়ত আইন। এভাবে অসম্ভব করা হয় পরিপূর্ণ দ্বীনপালন। ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ।  ব্রিটিশগণ ভারতের জনসংখ্যার শতকরা একভাগও ছিল না, কিন্তু ভারত জুড়ে কুফরি ব্রিটিশ আইন প্রয়োগ করতে তারা কোনরূপ বিলম্ব করেনি। অথচ তাদের অনুসারি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের দাবী,শরিয়তী আইন প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা শতভাগ মুসলিম হতে হবে। নইলে অমুসলিমদের কি হবে? অথচ নবীজী বা খলিফায়ে রাশেদার আমলে মুসলিম ভূমিতে কি শতকরা ৮০ ভাগ মুসলিম ছিল? মিশরে আজও শতকরা ১৫ ভাগ অমুসলিম। অথচ বাংলাদেশে মুসলিমগণ জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগ।

ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে অধীনতার কুফলটি গভীর। এতে অসম্ভব হয় মহান আল্লাহতায়ালার পূর্ণ ইবাদত। এতে অসম্ভব হয় পূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠা। তাই এটি হারাম। কাফের শক্তির অধিকৃতি থেকে বাঁচাটি তাই সর্বোচ্চ ইবাদত। সে হারাম থেকে বাঁচতে তাই জিহাদ লড়তে হয়। অথবা অধিকৃত সে দেশ থেকে হিজরত করতে হয়। বনের সিংহকে ২০ বছর খাঁচায় বন্দী রাখার পর দরজা খুলে দিলে সে খাঁচার বাইরে যায় না। স্বাধীন ভাবে বাঁচা ও শিকার ধরায় তার রুচী থাকে না। গোলামী জীবন এভাবে শুধু বন্দী বাঘ বা সিংহের অভ্যাসেই পরিবর্তন আনে না, পরিবর্তন আনে মানব সন্তানের বিশ্বাস, অভ্যাস ও সংস্কৃতিতেও। এরই উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। কাফেরদের গোলামীর খাঁচায় বাঙালী মুসলিমদের জীবন কেটেছে ১৯০ বছর। বিশ্বর খুব কম মুসলিম জনগোষ্ঠির জীবনেই এত দীর্ঘকালীন কাফের শক্তির গোলামী এসেছে। দিল্লির মুসলিমগণ গোলাম হয়েছে বাঙলীদের ১০০ বছর পর ১৮৫৭ সালে।

কাফেরদের জিন্দানে দীর্ঘ গোলামীর ফলে বাঙালী মুসলিমের জীবনে বিলুপ্ত হয়েছে পূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচার রুচি এবং অভ্যাস। বিলুপ্ত হয়েছে ইসলামের সনাতন বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। বরং চেতনার গভীরে ঢুকেছে কুফরির শিকড়। ফলে বাঙালী মুসলিগণ রুচি হারিয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও শরিয়ত পালনে। ফলে বিশ্বের কোনে কোনে আজ  যেরূপ চলছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে অদম্য জিহাদ, বাংলাদেশে মাদ্রাসার হুজুর বা মসজিদের ইমামগণ শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কথা মুখে আনতে রাজী নয়। তারা ভাবেন নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত, দোয়া-দরুদ ও তাসবিহ পাঠ এবং বড় জোর তাবলীগ জামায়াতের ইজতেমায় অংশ নেয়াই হলো ইসলাম। তারা ভাবেন, পরকালে তাতেই মুক্তি মিলবে। কথা হলো, শরিয়তকে দূরে সরিয়ে কি পালিত হয় মহান আল্লাহতায়ালার পূর্ণ গোলামী। নবীজী ও তার সাহাবাদের জীবনে একটি দিনও কি শরিয়তী আইনের বাইরে কেটেছে? শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা বাড়াতে বার বার তাদেরকে জিহাদের ময়দানে নামতে হয়েছে; পেশ করতে হয়েছে অর্থ ও রক্তের কোরবানী। বাংলাদেশের জন্য বিপদ হলো, বাংলাদেশ থেকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ বিদায় নিলেও বিদায় নেয়নি তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গড়ে উঠা মানসিক গোলামগণ।

স্রেফ নামাজ-রোযা বা হজ্ব-যাকাতে কাফেরদের জিন্দানে গোলাম হওয়ার নাশকতা থেকে নাজাত মেলে না। সে সামর্থ্য নামাজ-রোযা, হজ-যাকাত ও দোয়াদরুদের থাকে না বলেই সে নাশকতা থেকে বাঁচাতে ইসলামের প্রেসক্রিপশন হলো জিহাদ। সে জিহাদে জানমালের কোরবানীর চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে উত্তম কোন নেককর্ম নেই। তাই পবিত্র কোরআনের ঘোষিত হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ভালবাসেন যারা আল্লাহর রাস্তায় সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সারি বেঁধে যুদ্ধ করে।” –(সুরা সাফ. আয়াত ৪)। ফলে যারা মহান আল্লাহতায়ালার ভালবাসা চায় তাদের সামনে জিহাদ ভিন্ন অন্য রাস্তা নাই। জিহাদ পালনে যারা অনীহা দেখায় মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ঈমানের দাবীতে সাচ্চা বলতেও নারাজ। পবিত্র কোরআনে সে ঘোষনাটি এসেছে এভাবে, “একমাত্র তারাই মু’মিন যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান আনে, অতঃপর আর কোনরূপ দ্বিধাদ্বন্দে ভোগে না এবং নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। (ঈমানের দাবীতে) তারাই সাচ্চা।”–(সুরা হুজরাত, আয়াত ১৫)। জিহাদ যে প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ এবং জিহাদ থেকে দূরে থাকা যে মুনাফেকীর লক্ষণ –অধিকাংশ মোফাচ্ছিরদের মতে এ আয়াতটি হলো তার সুস্পষ্ট দলিল। কথা হলো, একটি কাফের দেশের হামলা প্রতিরোধে যে যুদ্ধ তার চেয়ে পবিত্র জিহাদ আর কি হতে পারে? 

তাই ঈমানের দাবীতে কে কতটা সাচ্চা -সেটি যাচাইয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত মাপকাঠিটি নামায-রোযা বা হজ-যাকাত নয়। বেশী বেশী দোয়াদরুদ পাঠও নয়। সেটি হলো জিহাদে জান ও মালের বিনিয়োগ। নামায-রোযা পালনে ও তাসবিহ পাঠে নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের জীবনে কোন রূপ কমতি ছিল না। কিন্তু এরপরও তারা শুধু নামাযী,রোযাদার বা হাজীই ছিলেন না, তাদের প্রত্যেকে সশস্ত্র যোদ্ধাও ছিলেন। সকল সঙ্গিদের রণাঙ্গনে হাজির করার ক্ষেত্রে সমগ্র মানব ইতিহাসে মহান নবীজী (সাঃ)র এটি এক অনন্য সাফল্য। বিশ্বের আর কোন নেতা কি তার অনুসারিদের সিকি ভাগকেও সশস্ত্র যোদ্ধা রূপে রণাঙ্গণে প্রাণদানে হাজির করতে পেরেছে? অথচ মহান নবীজী (সাঃ)র সাফল্য এক্ষেত্রে শতভাগ। জিহাদে ঈমানদারদের এরূপ আত্মদান ও অর্থদানের কারণেই মুসলিম ভূমি শত শত বছর যাবত বেঁচেছে কাফিরদের হাতে অধিকৃত হওয়া থেকে। মুসলিম ভূমিতো তখনই শত্রুর হাতে অধিকৃত হতে শুরু করেছে যখন ধর্মপালন স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ পাঠে সীমিত হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামের শত্রুশক্তির বিজয়ের কারণ, জিহাদী চেতনা বিলুপ্ত হয়েছে অধিকাংশ মুসলিমের মগজ থেকে। ফলে মুক্তি মিলছে না শত্রুদের অধিকৃতি থেকে।

 

পুরনো পরাধীনতা নতুন নামে

স্বাধীনতার নামে অধিকাংশ মুসলিম দেশে আজও যা চলছে সেটি মূলতঃ ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে পুরানো পরাধীনতারই ধারাবাহিকতা। তবে সেটি নতুন নাম, নতুন মানচিত্র ও নতুন পতাকা নিয়ে। নাম, মানচিত্র ও পতাকা পাল্টে গেলেও পরাধীনতা যে শেষ হয়নি -সেটি বুঝা যায় মুসলিম দেশের আদালতগুলোর দিকে তাকালে। সেখানে পূর্ণ অধিকৃতি কুফুরী আইনের। দেখা যায়, সংবিধানে দিকে নজর দিলে। সেখানেও নাই মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব। প্রশ্ন হলো, দেশের উপর ইসলামের বিজয় ও মুসলিমদের দখলদারির প্রমাণ কি মসজিদ-মাদ্রাসা ও নামাযীর সংখ্যা? ভারতের ন্যায় কাফের শাসিত দেশে মসজিদের কি সংখ্যা কম? নামাযীর সংখ্যাও কি নগন্য? সেটি তো বুঝা যায় দেশে সার্বভৌমত্ব কোন আইনের –তা থেকে। একজন কাফের থেকে ঈমানদার ব্যক্তির ভিন্নতর পরিচয় তো মহান আল্লাহতায়ালা উপর তাঁর ঈমান ও আমলের কারণে। তেমনি মুসলমি দেশ কাফের দেশ থেকে ভিন্নতর পরিচয় পায় সে দেশে শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা থেকে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মুসলিমের পরিচয়টি তাঁর পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফা রূপে। খলিফার সে দায়ভারটি শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ পাঠে আদায় হয় না। সে লক্ষ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো কোরআনে বর্নিত শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। বস্তুতঃ সে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে প্রকাশে ঘটে সাচ্চা ঈমানের। সে ঈমানের বলেই এমন ব্যক্তি হাজির হয় জিহাদের ময়দানে। যার মধ্যে ঈমানের সে গভীরতা নাই -সে ব্যক্তি সারা জীবন নামায-রোযায় কাটালেই তাকে জিহাদে দেখা যায়না।

 

কী কারণে সর্বশ্রষ্ঠ জাতির মর্যাদা মুসলিমের?

অন্য কোন ইবাদতে প্রাণ গেলে সরাসরি জান্নাত জুটে না। কিন্তু জুটে জিহাদে প্রাণ গেলে। শহীদকে মৃত বলা হারাম। মহান আল্লাহতায়ালার পথে নিহত হওয়ায় সে পায় নতুন জীবন। এবং সেটি জান্নাতে। কিন্তু কেন এ মহান মর্যাদা জিহাদে প্রাণ দানে? কারণ, শহীদের প্রাণ দানে জাতি পায় শয়তানের গোলামী থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচার অধিকার। নইলে শয়তানী শক্তির গোলামী অনিবার্য হয়। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ভাবে বসবাসের গুরুত্ব যে কত অধীক – শহীদদের বিশাল মর্যাদা থেকে সে প্রমাণই মেলে। ইসলামের বিজয় নিয়ে বাঁচার সে বিধানটি হলো জিহাদ। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। সেটি নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলের কারণে নয়। বরং এ কারণে যে, তাদের আমলেই ইসলাম একটি বিজয়ী বিশ্বশক্তি রূপে আবির্ভুত হয়েছে। সে আমলে প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষা পেয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র। পূর্ণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে শরিয়ত। এবং তাদের আমলে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় ঝান্ডা উড়াতে যত জিহাদ সংগঠিত হয়েছে তা আর কোন কালেই হয়নি। সে সব জিহাদে তাদের জান ও মালের বিনিয়োগটি ছিল অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে অধীক। শতকরা সত্তর ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। সে বিশাল বিনিয়োগের ফলেই পেয়েছে বিশ্বশক্তির মর্যাদা। সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে গর্বের জায়গাটি এজন্যই তাদের। পবিত্র কোরআনে তাদের কর্মের উপর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা।

কিন্তু বাংলাদেশীদের মাঝে কোথায় সে সাচ্চা ঈমানদারী? কোথায় সে আগ্রহ শ্রেষ্ঠ ইবাদতে? শত্রুপক্ষের অধিকৃতি থেকে মুক্তির লড়াইয়ে এবং ইসলামের বিজয়ে কোথায় সে জানমালের বিনিয়োগ? তারা তো অর্থ ও ভোট দেয়, এমন কি প্রাণ দেয় ইসলামের শত্রুপক্ষকে বিজয়ী করতে। ১৯৭১’য়ে বহু হাজার বাঙালী মুসলিম যুদ্ধ করেছে এবং প্রাণ দিয়েছে ভারতের ন্যায় একটি কাফের দেশকে বিজয়ী করতে। শত্রুর পক্ষে সে বিশাল বিনিয়োগটি তাদের নিজ জীবনে ভয়াবহ আযাব ডেকে এনেছে। মুজিব ও হাসিনার শাসন তো সে আযাবেরই অংশ। একাত্তরে ভারত বিজয়ী হওয়াতে অসম্ভব হয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। এবং সরকারি উদ্যোগে জিহাদের ন্যায় শ্রেষ্ঠ ইবাদতটি চিত্রিত হচ্ছে শাস্তিযোগ্য জঙ্গিকর্ম রূপে। এভাবে অসম্ভব করা হয়েছে পূর্ণ মুসলিম বাঁচা। এবং আইনসিদ্ধ ও প্রশংসনীয় কর্ম রূপে গণ্য হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ইসলামের শত্রুশক্তির বিজয়ে ভোট, শ্রম, অর্থ ও মেধার বিনিয়োগ।

 

শত্রুর স্বপ্ন পূরণের রাজনীতি

ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলে গেলে যে বিপদগুলি অনিবার্য হয় -বাংলাদেশে তার সবগুলিই এসেছে। এবং এসেছে অতি বর্বর ভাবেই। আরো বহুবিধ বিপদ আসার অপেক্ষায় পাইপ লাইনে। বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতা অনেক। তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো, তারা ব্যর্থ হয়েছে বাংলার মুসলিম ভূমিতে ইসলামের শত্রুপক্ষের অধিকৃতি রূখতে। সেটি যেমন ১৭৫৭ সালে, তেমনি ১৯৭১। বরং ১৯৭১’য়ে কাফের শক্তির বিজয় বাড়াতে বহু লক্ষ বাঙালী গায়ে-গতরে খেটেছে শত্রুর চাকর-বাকরের ন্যায়। অনেকে প্রাণও দিয়েছে। অথচ মুসলিম ভূমিতে ভারতের ন্যায় কোন কাফের দেশের হামলা হলে জিহাদ আর ফরজে কেফায়া থাকে, সেটি নামায-রোযার ন্যায় ফরজে আইনে পরিণত হয়। নামাযে কাজা চলে, কিন্তু এ ফরজ পালনে কাজা চলে না।, নামাজ তখন মসজিদে নয়, জিহাদের ময়দানে গিয়ে পড়তে হয়। এ জিহাদে অংশ নিতে যাদের জীবেন ব্যর্থতা, তাদের জীবনে আযাবের কোন সীমা-সরহাদ থাকে না।

তবে বাঙালীর জীবনে এখন শুধু ব্যর্থতা নয়, শুরু হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পর্ব। বিদ্রোহ এখন এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দূরে থাক, যেখানেই ইসলাম ও মুসলিম –এ শব্দ দুটি আছে, সেখানেই কাঁচি চালানো হচ্ছে। শুরু হয়েছে ভারতের ন্যায় কাফের রাষ্ট্রের স্বপ্ন পূরণের রাজনীতি। ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে ভারতে যা কিছু ঘটেছে বা এখনো ঘটছে -সেগুলিই এখন ঘটছে বাংলাদেশে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু নামটি এখনো বহাল তবিয়তে আছে; কিন্তু আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি কেটে ফেলা হয়েছে। যারাই ইসলামের শত্রুপক্ষের তাদের চরিত্রটি সব দেশেই একই রূপ হয়। তাদের মাঝে থাকে নানা ভাষা, নানা বর্ণ বা ভূগোলের নামে বিভক্তির দেয়াল। তাই দেয়াল নাই বাংলাদেশ ও ভারতে বসবাসকারি ইসলামের শত্রুদের মাঝেও। বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে আজকের যে ভূ-রাজনৈতিক দেয়াল -সেটির জন্ম একাত্তরে নয়। সেটি সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদীদেরও গড়া নয়। এটি নিরেট পাকিস্তানের লিগ্যাসী। এবং যা কিছু পাকিস্তানী সেগুলি বর্জন করাই সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের রাজনীতি। ফলে তাদের এ দখলদারি দীর্ঘায়ীত হলে সেদিন বেশী দূরে নয় যখন পাকিস্তানের গড়া সে দেয়ালকেও পাকিস্তানী বলে বিদায় দিবে। বাংলাদেশ তখন বিলুপ্ত হবে ভারতের পেটে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রদেশ রূপে পূর্ব পাকিস্তানের যে মানচিত্রটি গড়ে উঠছিল তার পিছনে ছিল ভারতীয় হিন্দুদের থেকে ভিন্নতর একটি প্রবল চেতনা –সেটি পুষ্টি পেয়েছিল প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব থেকে। মুজিব ও হাসিনার চেতনায় ইসলাম না থাকায় ১৯৪৭’য়ের সে মুসলিম চরিত্রটিও তাদের রাজনীতিতে স্থান পায়নি। বরং আছে ভারতীয় হিন্দুদের চেতনার সাথে অভিন্নতা। অভিন্ন চেতনার কারণেই পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের শিরকপূর্ণ গানকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত বানিয়েছে। সে অভিন্ন চেতনায় ভারতীয় কায়দায় জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকেও মুসলিম শব্দটি কেটে দেয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল হয়ে গেছে সলিমুল্লাহ হল। এমন কি কাজী নজরুল ইসলামের নামের সাথে ইসলাম শব্দটিও তাদের সহ্য হয়নি। ফলে ঢাকার কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ হয়ে গেছে নজরুল কলেজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত ছিল, সেটিও মুজিবামলে বিলুপ্ত করা হয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে একই রূপ বৈরীতা নিয়ে শেখ হাসিনা সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করেছেন মহান আল্লাহতায়ালার উপর আস্থার ঘোষণাটি। মুজিবের ন্যায় হাসিনার রাজনীতিতে্ও ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে শত্রুতা যে কতটা তীব্র -এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে? হৃদয়ে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে কোন মুসলিম কি এমন মুসলিম বিরোধী এজেন্ডা নিয়ে রাজনীতি করে?

 

হাসিনার উপর অর্পিত দায়ভার

ভারতীয় শাসকচক্রের এজেন্ডা পূরণ যেমন মুজিবের লক্ষ্য ছিল, সে লক্ষ্যটি হাসিনারও। জনগণের উপর আস্থা যেমন মুজিবের ছিল না, তেমনি নাই হাসিনারও। জনগণের উপর আস্থা বিলুপ্ত হলে স্বৈরাচারি শাসকগণ জনগণের ভোটের অধিকারটি কেড়ে নেয়। কেড়ে নেয় মিটিল-মিছিল ও মত প্রকাশের অধিকারও। মুজিব তাই একদলীয় বাকশালী শাসন চালু করেছিল। ভোটচুরি তখন কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। অপর দিকে হাসিনা বেছে নিয়েছে দেশ জুড়ে ভোট ডাকাতির পথ। জনগণের উপর আস্থা বিলুপ্ত হলে বাড়ে বিদেশী শক্তির উপর নির্ভরতা। মুজিব ও হাসিনার কাছে সে বিদেশী শক্তি হলো ভারত। মুজিবের ন্যায় হাসিনাও জানে, ভারত খুশী হলেই তার গদি বাঁচবে। কথা হলো, ভারতের ন্যায় আগ্রাসী কুটিল রাষ্ট্রকে খুশি করা কি এতটাই সহজ? সিকিমের নেতা লেন্দুপ দর্জিকে সেটি করতে গিয়ে ভারতের পেটে সিকিমকে বিলীন করতে হয়েছে। মুজিব ও হাসিনার কাছেও তাই অনিবার্য হয়ে পড়ে ভারতীয় এজেন্ডাকে নিজেদের এজেন্ডা রূপে গ্রহণ করাটি। তাই ভারতীয় এজেন্ডার অন্তর্ভুক্তি দেখা যায় ভারতের সাথে মুজিবের স্বাক্ষরিত ২৫ সালা দাসচুক্তিতে। দেখা যায়, ভারতকে ফারাক্কায় পদ্মার পানি তুলে নেয়ার অধিকার দেয়াতে। এবং দেখা যায়, সীমান্ত বাণিজ্যের নামে ভারতীয় পণ্যের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেয়ায়। এমন কি সেটি দেখা যায়, বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক অফিসগুলোতে গোয়েন্দাগিরির জন্য ভারতের গুপ্তাচর সংস্থা র’য়ের জন্য স্থান করে দেয়ায়।

তবে হাসিনার কাছে ভারতের দাবীর তালিকাটি আরো বিশাল। ভারত শুধু বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে করিডোর নিয়ে খুশী নয়। বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের রয়েছে কিছু গুরুতর ভীতি। দেশটির প্রচণ্ড ভয়, বাংলাদেশে ইসলামের আসন্ন উত্থান নিয়ে। এ ভয় ভারতীয় শাসক মহলের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। মধ্যপাচ্যে ইসলামপন্থিদের উত্থান ঠ্যাকাতে সমগ্র পাশ্চাত্য শক্তি একজোট হয়েও হিমশীম খাচ্ছে। তারা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে আফগানিস্তানে। বাংলাদেশ ৪ কোটি মানুষের আফগানিস্তান বা ইরাক নয়। ভারতের ভয়, বাংলাদেশে ১৭ কোটি মুসলিমের জীবনে ইসলামের জোয়ার উঠলে সে জোয়ার ঠ্যাকানো ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। সে জোয়ার আঘাত হানবে প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে –বিশেষ করে পশ্চিম বাংলা ও আসামে। তখন অসম্ভব হবে বাংলাদেশে অভ্যন্তরে তার নিজের ভাড়াটিয়া সৈনিকদের বাঁচানো। ইসলামের সে জোয়ার ঠ্যাকাতে ভারত বাংলাদেশের সরকারকেও ব্যবহার করতে চায়।

ভারত জানে, বাঙালী মুসলিম জীবনে পাকিস্তানের পক্ষে জোয়ার উঠাতেই ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি এড়ানো সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানের জনক মূলতঃ বাঙালী মুসলিমেরাই। তাদের ভয়, বাঙালী মুসলিম আবার ইসলামের পতাকা নিয়ে জেগে উঠলে ভারতের মানচিত্রে আবারো হাত পড়বে। ফলে হাসিনার উপর চাপানো দায়ভারও বেড়েছে। তাই ভারতের এজেন্ডা পূরণের স্বার্থে ইসলাম ও মুসলিমের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া ছাড়া শেখ হাসিনার সামনে ভিন্ন পথ নাই। ইসলামপন্থিদের দমনে ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবীকে ঠ্যাঙ্গারে হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের শত শত নেতাকর্মীদের হত্যা ও হত্যার পর তাদের লাশগুলো মিউনিসিপালিটির ময়লা সরানোর গাড়িতে তুলে গায়েব করা এবং বিচারের নামে জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের ফাঁসি দেয়ায় হাসিনা এজন্যই এতটা নির্মম। আর এতে প্রচুর শাবাস মিলছে ভারতের শাসক মহল থেকে।

 

আরেক কাশ্মির এখন বাংলাদেশ

ভারতীয় বাহিনী কাশ্মিরে যে কাজটি করছে, দিল্লির শাসকচক্র চায় হাসিনা সরকারও বাংলাদেশে সে অভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়ে অগ্রসর হোক। সমগ্র কাশ্মির এখন জেলখানা। ভারতের সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশকেও পরিণত করা হচ্ছে আরেক কাশ্মিরে। ইসলাম, ইসলামপন্থি ও ভারত-বিরোধীদের নির্মূলে হাসিনা এজন্যই এতোটা বেপরোয়া। আবরার ফাহাদদের মত দেশপ্রেমিকদের তাই অতি নির্মম ভাবে লাশ হতে হচ্ছে। তাছাড়া একাজে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় পঞ্চম বাহিনীর লোক কি কম? তারা শুধু রাজনীতির ময়দানে নয়, তারা দলে ভারী দেশের মিডিয়া, পুলিশ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী এমন কি বিচার ব্যবস্থাতেও।

হাসিনা সরকারের এজেন্ডা এখন আর কোন গোপন বিষয় নয়। দেশের স্বার্থের চেয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের গদিরক্ষা এবং গদি রক্ষার স্বার্থ ভারতীয় এজেন্ডা পূরণ। দেশবাসীর স্বার্থ গুরুত্ব পেলে বহু খুন, বহু ধর্ষণ ও বহু হাজার কোটি টাকার ডাকাতির সাথে জড়িতদের অবশ্যই আদালতে তোলা হতো। এবং তাদের বিচার হতো। কিন্তু তা না করে হাসিনা ব্যস্তু ইসলাম ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলে। তার সরকারের নৃশংস নিষ্ঠুরতা বেড়েছে জনগণের মৌলিক অধীকার কেড়ে নেয়ায়। এবং নির্লজ্জতার সাথে নেমেছে ভোট ডাকাতিতে। একাজ তো দেশ ও জনগণের শত্রুদের। দেশের চিহ্নিত বিদেশী শত্রুদের সাথে হাসিনা সরকারের এজন্যই এতটা গভীর মিত্রতা।

 

যে অপরাধ জনগণের

ইতিহাসের আরেক সত্য হলো, ভয়ানক অপরাধগুলি শুধু অপরাধী শাসকচক্রের কারণে ঘটে না, সেগুলি বরং তীব্রতর হয় জনগণের পক্ষ থেকে সে অপরাধ সয়ে যাওয়ার কারণেও। এজন্যই বাংলাদেশীদের জন্য ভয়ানক বিপদের কারণটি স্রেফ দেশটির দুর্বৃত্ত শাসকচক্র নয়, বরং সে আম জনগণও যারা দুর্বৃত্ত শাসকচক্রের সীমাহীন অপরাধগুলিকে নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে। সভ্য জনপদে হিংস্র বাঘ ঢুকলে জনগণ হাতের কাছে যা পায় তা নিয়ে রাস্তায়  নামে এবং বাঘকে বধ করে। তেমনি ঘটে যদি সভ্য জনগণের ঘাড়ে দুর্বৃত্ত ভোট চোরদের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি। ফলে সভ্য শাসনের বদলে নির্মিত হচ্ছে অসভ্য শাসনের ইতিহাস। আজ না হলেও শত বছর পর এ বঙ্গীয় ভূ-পৃষ্ঠের নতুন প্রজন্ম জেনে বিস্মিত হবে যে, তাদের পূর্বপুরুষগণ মুজিব-হাসিনার ন্যায় দুর্বৃত্তদের শাসনকেও মেনে নিয়েছিল। ব্যর্থ হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে সফল গণবিল্পব ঘটাতে। শুধু তাই নয়, তারা তাদের ন্যায় দুর্বৃত্তদেরকে মাননীয় বলতো। এবং ভারতের ন্যায় শত্রুদেশের এজেন্ট এবং গণহত্যাকারি ফ্যাসিস্ট মুজিবকে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা বলতো। ১ম সংস্করণ ২৮/০৩/২০১৬; ২য় সংস্করণ ৩১/১০/২০২০।

 




অধিকৃত বাংলাদেশ এবং শত্রুশক্তির এজেন্ডাপূরণ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

অধিকৃতিটি শত্রুপক্ষের

বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন বাস্তবতা হলো, দেশটি এখন আর মুসলিমদের হাতে নেই্। ইসলাম ও মুসলিম –এ দুটি শব্দ পরিত্যক্ত হয়েছে এদেশের মূল পরিচিতি থেকে। বাংলাদেশের উপর বর্তমান অধিকৃতিটি ইসলামের শত্রুপক্ষের। মুসলিম হওয়াটি তাদের কাছে কোন গুরুত্বই বহন করে না। তারা গর্বিত ভারতপন্থি সেক্যুলার বাঙালী রূপে। দেশ শাসনে তারা স্বাধীন নয়, বরং তাজউদ্দীনের প্রবাসী সরকারের ন্যায় দিবারাত্র খাটছে ভারতের এজেন্ডা পালনে। তবে পার্থক্যটি হলো, তাজউদ্দীনের বসবাস ছিল কলকাতায়, আর হাসিনার অবস্থান ঢাকায়। পাকিস্তান আমলে যারা ছিল ভারতের ট্রোজান হর্স তথা গুপ্ত সৈনিক, একাত্তরের পর তারা অবতীর্ণ হয়েছে প্রকাশ্যে ময়দানে। তাদের কারণে ভারতের দখলদারিটি স্রেফ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অঙ্গণে নয়; সেটি অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক,বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় আক্বীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও। ক্ষমতাসীন জোটটি যে ভারতপন্থি সেটি তারা গোপনও করে না। বরং ভারতের প্রতি অবনত থাকাটি নিজেদের দায়বদ্ধতা মনে করে। ফলে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পরিচিতি এখন ভারতীয় বলয়ভূক্ত একটি আশ্রীত দেশরূপে। ফলে বাংলাদেশে বুকে ভোট-ডাকাতি বা শাপলা চত্ত্বরের ন্যায় গুরুতর গণহত্যা ঘটলেও বিদেশীরা তা নিয়ে কিছু বলে না। তারা ভাবে এটি ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। ভাবে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতেরও কিছু করার অধিকার আছে।

ভারতের আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে বাংলাদেশের উপর ভারতেসবীদের অধিকৃতি প্রথমে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বরে। সেটি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধজয়ের ফলে। পরবর্তীতে তা বার বার নতুন জীবন পেয়েছে ভোট ডাকাতির মাধ্যমে। এ অধিকৃতির সাথে শুধু যে বাঙালী জাতীয়তাবাদী নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসী ক্যাডারগণ জড়িত –তা নয়। বরং জড়িত দেশের প্রশাসন,পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী, বিচার ব্যবস্থা,নির্বাচনি কমিশন এবং মিডিয়া। কারণ, ভারতীয় পঞ্চম বাহিনী বা ট্রোজান হর্সদের অবস্থান শুধু দেশের রাজনীতির অঙ্গণে নয়, বরং সর্বস্তরে ও সর্বপ্রতিষ্ঠানে। ভারত-বিরোধী নেতাকর্মীগণ তাই লাশ হয় শুধু লগি-বৈঠা ও পিস্তলধারী রাজনৈতিক ক্যাডারদের হাতে নয়, আদালতের বিচারকদের হাতেও। আত্মবিক্রীত বিচারকদের হাতে ভোট ডাকাতির নির্বাচনও সুষ্ঠ নির্বাচন রূপে বৈধতা পায়। শাপলা চত্ত্বরের গণহত্যায় তাই রাজনৈতিক গুণ্ডাদের পাশে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও দেখা যায়। তাদের সাথে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশের ভিতরে ও বাইরে কর্মরত ভারতীয় গুপ্তচরেরা। এরা কখনোই চায় না, বাংলাদেশের বুকে জনগণের মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পাক। সেটি চাইলে ভারত সরকার কখনোই শেখ মুজিবের বাকশালী স্বৈরাচারকে সমর্থন দিত না।  এবং সমর্থন দিত না ভোট ডাকাতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হাসিনা সরকারকে। ভারত চায় না স্বাধীন বাংলাদেশ। এবং কখনোই চায় না, দেশটির জনগণ তাদের নিজ নিজ ধর্মকর্ম ও আক্বীদা-বিশ্বাস নিয়ে স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠুক। তবে ইসলামের শত্রুপক্ষের এ ষড়যন্ত্রটি নতুন নয়। এর শুরু স্রেফ ১৯৭১ থেকেও নয়। বরং সেটি ১৯৪৭ সাল থেকেই। তবে হাসিনার সুবিধাটি হলো, মুজিবের ন্যায় তাকে চোরা পথে আগরতলায় গিয়ে ভারতীয় গুপ্তচরদের সাথে গোপন বৈঠক করতে হয় না। সে বৈঠকগুলি বসে বঙ্গভবনে বা গণভবনে।

মুসলিমদের কীভাবে দাবিয়ে রাখা যায় -সে বিষয়ে ভারতীয় শাসকগণ সিদ্ধহস্ত। সে কাজে তারা হাত পাকিয়েছে ভারত ও কাশ্মীরের মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানারূপ নির্যাতনে নেমে। ভারতে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ২০ কোটি -যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার চেয়ে অধীক। অথচ একমাত্র ঢাকা শহরে যতজন মুসলিম ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, আইনবিদ, কৃষিবিদ, হিসাবরক্ষক, শিল্পপতি, প্রফেসর এবং সামরিক ও বেসামরিক অফিসার বসবাস করে এবং তাদের হাতে যত গাড়ী ও দালানকোঠা আছে তা সমগ্র ভারতের ২০ কোটি মুসলিমের নাই। বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের কথা তো বাদই রইলো। এ প্রসঙ্গে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের স্থাপিত সাচার কমিশনের রিপোর্টটি বড়ই মর্মান্তিক। সে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতীয় মুসলিমদের অবস্থা সে দেশের অচ্ছুৎ নমশুদ্রদের চেয়েও খারাপ।

 

অসম্ভব হয়েছে ধর্মপালন

শুধু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, পরিকল্পিত ভাবে ভারতীয় মুসলিমদের জন্য অসম্ভব করা হয়েছে ধর্মপালন। ইসলামি শিক্ষালাভ, শরিয়ত পালন এবং পরিপূর্ণ মুসলিম রূপে তাদের বেড়ে উঠা। সে অভিন্ন ভারতীয় প্রকল্পটি এখন বাংলাদেশের মুসলিমদের উপরও চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তী বিধান পালন ছাড়া কি পরিপূর্ণ ইসলাম পালন সম্ভব? শরিয়ত পালনের সে ব্যর্থতা নিয়ে কি মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়া যায়? সেটি যে অসম্ভব, সেটি সুস্পষ্ট করা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছে, “যারা (কোরআনে) নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার কার্য পরিচালনা করে না তারা কাফের। –তারা জালেম। –তারা ফাসেক।”-(সুরা মায়েদা আয়াত ৪৪,৪৫,৪৭)। তাই নামায-রোযা পালনে কোন ঈমানদার যেমন আপোষ করতে পারে না, তেমনি আপোষ করতে পারে না শরিয়ত প্রতিষ্ঠায়।

ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে যখন বঙ্গ বিজিত হয় তখন বাংলার মুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ১০ ভাগও ছিল না। অথচ তখনও তিনি শরিয়ত ভিন্ন অন্য কোন আইনকে আদালতে স্থান দেননি। কারণ মুসলিমের কাছে শরিয়তী আইন ভিন্ন সব আইনই কুফরী আইন। ফলে মুসলিম ভূমিতে সেগুলি অবৈধ ও পরিতাজ্য। মুসলিম যেমন নিজ ঘরে মুর্তি রাখতে পারে না, তেমনি নিজ রাষ্ট্রে কুফরি আইনও রাখতে পারেনা। তাই কোন দেশে শাসনক্ষমতা হাতে পেলে মুসলিম শাসকগণ প্রথম দিন থেকেই নামায-রোযা, হজ-যাকাতের সাথে শরিয়তী আইনেরও প্রতিষ্ঠা শুরু করে। মুসলিম হওয়ার এটি এক অনিবার্য দায়বদ্ধতা। সেটি না করলে ঈমান থাকে না। আর ঈমান ভেঙ্গে গেলে কি ইবাদত কবুল হয়? কবুল হয় কি দোয়া-দরুদ? ওজু ভেঙ্গে গেলে যেমন নামায হয় না, তেমনি ঈমান ভেঙ্গে গেলে কোন ইবাদত ও দোয়াদরুদও কবুল হয় না। এমন কি হজ্বের দিনে দোয়া কবুলের স্থান আরাফতের ময়দানে গিয়ে দোয়া করলেও এমন কাফেরের দোয়া কবুল হয় না। ঈমানহীন,আমলহীন ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারহীন ব্যক্তিগণ যদি মুসলিম হওয়ার দাবী করে তবে তারা গণ্য হয় মুনাফিক রূপে। এমন ব্যক্তির নামায-রোযা, হজ্-যাকাত, দোয়াদরুদ তাকে মুনাফিফ হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে না। ওহুদের যুদ্ধের সময় এমন মুনাফিকদের সংখ্যা ছিল শতকরা ৩০ ভাগ। মসজিদের জায়নামাজে তাদের চেনা যায়নি। তাদের মুনাফিকি ধরা পড়ে ওহুদ যুদ্ধের সময়। নবীজী (সাঃ) সে যুদ্ধে মদিনা থেকে এক হাজার সঙ্গি নিয়ে রওনা দেন, কিন্তু সে বাহিনী থেকে ৩০০ জন ছিটকে পড়ে। তখন ধরা পড়ে তাদের মুনাফেকি। নবীজী (সাঃ)র পিছনে নামায পড়ে এবং রোযা রেখেও মুনাফিক হওয়া থেকে তারা বাঁচেনি। এরূপ মুনাফিকদের সংখ্যা আজ যে বহুগুণ -তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে?

 

এতো অপপ্রচার কেন জিহাদের বিরুদ্ধে?

বাংলাদেশের ন্যায় দেশগুলিতে সেক্যুলারিস্টগণ জিহাদের বিরুদ্ধে বড্ডো সোচ্চার। হেতু কি? কারণ, জিহাদই প্রতিটি মুসলিমদেশের প্রতিরক্ষার মূল শক্তি। ভূমি, আলোবাতাস বা জলবায়ু নয়। যেখানে জিহাদ নাই সেখানে স্বাধীনতাও নাই। তাছাড়া এ জিহাদই ইসলামের  শত্রুদের মুনাফিকি প্রকাশ করে দেয়। প্রকাশ করে দেয় শত্রুশক্তির সাথে তাদের ষড়যন্ত্রগুলিও। যে সমাজে জিহাদ নেই, সে সমাজে কে সাচ্চা ঈমানদার, আর কে মুনাফিক -সেটি চেনার অন্য উপায় নেই। তখন দুর্বৃত্ত ভণ্ডদের জন্য সহজ হয়ে যায় মুসলিম সেজে ইসলাম ও মুসলিমের ক্ষতি করাটি। তখন টুপিদাড়ি ও মাথায় কালো পট্টি বেঁধে মুসলিমদের তারা ধোকা দেয়। জিহাদ যেহেতু তাদের আসল চেহারা ফাঁস করে দেয়, এ দুর্বৃত্তগণ ইসলামের এ সর্বোচ্চ ইবাদতকে সে জন্য বন্ধ করতে চায়। এবং এ পবিত্র ইবাদতকে বদনাম করতে এটিকে সন্ত্রাস বলে প্রচার করে।

বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলীতে ইসলামের বড় বড় ক্ষতিগুলো কাফেরদের দ্বারা হয়নি; হয়েছে এসব মুনাফিকদের হাতে। ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতার নামে মুসলিম বিশ্ব যেরূপ ৫৭টি দেশে বিভক্ত -সেটি কি নবীজী (সাঃ)র সূন্নত? এটি তো ইসলামের শত্রু মুনাফিকদের কাজ। নবীজী (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে তারা ছিল পরাজিত, কিন্তু এখন তারা বিজয়ী। ফলে বিপদ বেড়েছে ইসলাম ও মুসলিমের। ভাষা ও ভূগোলের নামে মুসলিমদের বিভক্ত রাখা এবং শরিয়তী বিধানকে পরাজিত রাখাই তাদের রাজনীতি। তারা সে বিজয়কে ধরে রাখার জন্য বিশ্বের তাবৎ কাফের শক্তির সাথে মৈত্রী  গড়বে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? বাংলাদেশের মাটিতে সে অপরাধমূলক রাজনীতিটি হয়েছে দেশটির সেক্যুলারিস্টদের হাতে। এবং তাতে লাভবান হয়েছে ভারত।   

ব্যক্তির সাচ্চা ঈমানদারি ধরা পড়ে ইসলামের বিজয়ে আপোষহীন অঙ্গীকার থেকে। মুনাফিকদের জীবনে সে অঙ্গীকার থাকে না। এ কারণেই তারা দূরে থাকে জিহাদের ময়দান থেকে। কারণ জিহাদ জান ও মালের কোরবানী চায়, স্রেফ কথায় কাজ দেয় না। ফলে জান ও মাল বাঁচানো যাদের জীবনের মূল প্রজেক্ট, তারা পরিণত হয় জিহাদের শত্রুতে। তখন জোট বাঁধে ইসলামের শত্রুপক্ষের সাথে। এ পথেই তারা নিজেদের স্বার্থ দেখে। মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মানব জাতির বিভাজনটি মূলতঃ তিন শ্রেণীতে। এক). ঈমানদার, দুই). কাফের, তিন). মুনাফিক।এবং মহান আল্লাহতায়ালার কাছে মুনাফিকগণ গণ্য হয় কাফেরদের চেয়েও অধীকতর নিকৃষ্ট জীব রূপে। মুনাফিকদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহতায়ালার ক্রোধ যে কঠোর -সেটি বুঝা যায় পবিত্র কোরআনের এ আয়াতেঃ “নিশ্চয়ই মুনাফিকদের অবস্থান হবে জাহান্নামের আগুনের সর্বনিম্ন স্তরে, তাদের জন্য জুটবে না কোন সাহায্যকারী।” –(সুরা নিসা,আয়াত ১৪৫)।তবে এ কোরআনী ঘোষণার মাঝে বিবেকমান মানুষের জন্য রয়েছে আরেকটি কঠোর হুশিয়ারি। সেটি হলো,পরকালে যাদের জন্য বরাদ্দ জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্থান, দুনিয়াতেও কি তারা কোন সম্মানজনক স্থান পায়? বরং বিশ্বমাঝে তারা অপমানিত ও অসম্মানিত হয় দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে।

মুসলিম সমাজে শরিয়তের গুরুত্বটি অপরিসীম। এছাড়া কোন মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট গড়ে উঠতে পারে না। অথচ অধিকৃত বাংলাদেশে সেটি সম্ভব নয়। শরিয়ত প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কোন জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস নয়; নামায-রোযার ন্যায় এটি ইসলামের অতি মৌলিক ও মামূলী বিষয়। বরং শরিয়ত পালিত না হলে যে ইসলাম পালন হয় না -সেটিই হলো ইসলামের বুনিয়াদী বিশ্বাস। এমন একটি বিশ্বাসের কারণেই সিরাজদ্দৌলার আমলেও বাংলার প্রতিটি আদালতে শরিয়তী আইন ছিল। শরিয়তী আইন ছিল মোঘল শাসিত ভারতে। কিন্তু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কাফেরদের দখলদারী প্রতিষ্ঠার পর নির্মূল করা হয় শরিয়ত আইন। তখন অসম্ভব হয় পরিপূর্ণ দ্বীনপালন। ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে অধিকৃত হওয়ার এটিই হলো সবচেয়ে বড় বিপদ।  ব্রিটিশগণ ভারতের জনসংখ্যার শতকরা একভাগও ছিল না, কিন্তু ভারত জুড়ে কুফরি ব্রিটিশ আইন প্রয়োগ করতে তারা কোনরূপ বিলম্ব করেনি। অথচ তাদের অনুসারি বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের দাবী,শরিয়তী আইন প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা শতভাগ মুসলিম হতে হবে। অথচ নবীজী বা খলিফায়ে রাশেদার আমলে মুসলিম ভূমিতে কি শতকরা ৮০ ভাগ মুসলিম ছিল? মিশরে আজও শতকরা ১৫ ভাগ অমুসলিম। অথচ বাংলাদেশে মুসলিমগণ জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগ।

 

যে ভয়ানক কুফলটি শত্রুশক্তির অধীনতায়

ইসলামের শত্রু শক্তির হাতে অধীনতার কুফলটি গভীর এবং বহুমুখি। এতে অসম্ভব হয় মহান আল্লাহতায়ালার পূর্ণ ইবাদত। অসম্ভব হয় পূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠা। তাই এটি হারাম। এবং তা থেকে বাঁচাটি সর্বোচ্চ ইবাদত। ঈমানদারগণ সে হারাম থেকে বাঁচে শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ লড়ে। অথবা হিজরত করে। বনের সিংহকে ২০ বছর খাঁচায় বন্দী রাখার পর দরজা খুলে দিলে সে খাঁচার বাইরে যায় না। স্বাধীন ভাবে বাঁচা ও শিকার ধরায় তার রুচী থাকে না। গোলামী জীবন এভাবে শুধু বন্দী বাঘ বা সিংহের অভ্যাসেই পরিবর্তন আনে না, পরিবর্তন আনে মানব সন্তানের বিশ্বাস, অভ্যাস ও সংস্কৃতিতেও। অথচ কাফেরদের গোলামীর খাঁচায় বাঙালী মুসলিমদের জীবন কেটেছে ১৯০ বছর। বিশ্বর খুব কম মুসলিম জনগোষ্ঠির জীবনেই এত দীর্ঘকালীন কাফের শক্তির গোলামী এসেছে। দিল্লির মুসলিমগণ গোলাম হয়েছে বাঙলীদের ১০০ বছর পর ১৮৫৭ সালে।

কাফেরদের জিন্দানে দীর্ঘ গোলামীর ফলে বাঙালী মুসলিমের জীবনে বিলুপ্ত হয়েছে পূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচার রুচী এবং অভ্যাস। বিলুপ্ত হয়েছে ইসলামের সনাতন বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। বরং চেতনার গভীরে ঢুকেছে কুফরির শিকড়। এবং বিলুপ্ত হয়েছে শরিয়ত প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ। ফলে বিশ্বের কোনে কোনে আজ  যেরূপ চলছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে অদম্য জিহাদ, বাংলাদেশে মাদ্রাসার হুজুর বা মসজিদের ইমামগণ শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কথা মুখে আনতে রাজী নয়। তারা ভাবেন নামায-রোযা, হজ-যাকাত, দোয়া-দরুদ ও তাসবিহ পাঠ এবং বড় জোর তাবলীগ জামায়াতের ইজতেমায় অংশ নেয়াই হলো ইসলাম। তারা ভাবেন, পরকালে তাতেই মুক্তি মিলবে। কথা হলো, শরিয়তকে দূরে সরিয়ে কি ঈমান বাঁচানো যায়? পালিত হয় কি মহান আল্লাহতায়ালার পূর্ণ গোলামী। নবীজী ও তার সাহাবাদের জীবনে একটি দিনও কি শরিয়তী আইনের বাইরে কেটেছে? শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা বাড়াতে বার বার তাদেরকে জিহাদের ময়দানে নামতে হয়েছে; পেশ করতে হয়েছে অর্থ ও রক্তের কোরবানী। বাংলাদেশের জন্য আরেক বিপদ হলো, বাংলাদেশ থেকে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশগণ বিদায় হলেও বিদায় নেয়নি তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গড়ে উঠা মানসিক গোলামগণ।

 

শ্রেষ্ঠ ইবাদতটি যেখানে অপরাধ

কাফেরদের জিন্দানে গোলাম হওয়ার যে সর্বমুখি নাশকতা –তা থেকে স্রেফ নামাজ-রোযা বা হজ-যাকাতে নাজাত মেলে না। সে সামর্থ্য নামাজ-রোযা, হজ-যাকাত ও দোয়াদরুদের থাকে না বলেই অধিকৃত জীবনের যে দুর্বিষহ নাশকতা থেকে বাঁচাতে ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসক্রিপশন হলো জিহাদ। সে জিহাদে জানমালের কোরবানীর চেয়ে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে উত্তম কোন নেককর্ম নেই। পবিত্র কোরআনের তাই ঘোষিত হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ভালবাসেন যারা আল্লাহর রাস্তায় সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় সারি বেঁধে যুদ্ধ করে।” –(সুরা সাফ. আয়াত ৪)। ফলে যারা মহান আল্লাহতায়ালার ভালবাসা পেতে চান তাদের সামনে জিহাদ ভিন্ন অন্য রাস্তা নাই। এবং জিহাদের নির্দেশ পালনে যারা অনীহা দেখায় মহান আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ঈমানের দাবীতে সাচ্চা বলতেও নারাজ। পবিত্র কোরআনে সে ঘোষনাটি এসেছে এভাবে, “একমাত্র তারাই মু’মিন যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান আনে, অতঃপর আর কোনরূপ দ্বিধাদ্বন্দে ভোগে না এবং নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। (ঈমানের দাবীতে) তারাই সাচ্চা।”–(সুরা হুজরাত, আয়াত ১৫)। জিহাদ যে প্রতিটি ঈমানদারের উপর ফরজ এবং জিহাদ থেকে দূরে থাকা যে মুনাফেকীর লক্ষণ –অধিকাংশ মোফাচ্ছিরদের মতে এ আয়াতটি হলো তার সুস্পষ্ট দলিল। কথা হলো, একটি কাফের দেশের হামলা প্রতিরোধে যে যুদ্ধ তার চেয়ে পবিত্র জিহাদ আর কি হতে পারে?  

তাই ঈমানের দাবীতে কে কতটা সাচ্চা -সেটি যাচাইয়ে মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত মাপকাঠিটি নামায-রোযা বা হজ-যাকাত নয়। বেশী বেশী দোয়াদরুদ পাঠও নয়। সেটি হলো জিহাদে জান ও মালের বিনিয়োগ। নামায-রোযা পালনে ও তাসবিহ পাঠে নবীজী (সাঃ)র সাহাবীদের জীবনে কোন রূপ কমতি ছিল না। কিন্তু এরপরও তারা শুধু নামাযী,রোযাদার বা হাজীই ছিলেন না, তাদের প্রত্যেকে সশস্ত্র যোদ্ধাও ছিলেন। সকল সঙ্গিদের রণাঙ্গনে হাজির করার ক্ষেত্রে সমগ্র মানব ইতিহাসে মহান নবীজী (সাঃ)র এটি এক অনন্য সাফল্য। বিশ্বের আর কোন নেতা কি তার অনুসারিদের সিকি ভাগকেও সশস্ত্র যোদ্ধা রূপে রণাঙ্গণে প্রাণদানে হাজির করতে পেরেছে? অথচ মহান নবীজী (সাঃ)র সাফল্য এক্ষেত্রে শতভাগ। জিহাদে ঈমানদারদের এরূপ আত্মদান ও অর্থদানের কারণেই মুসলিম ভূমি শত শত বছর যাবত বেঁচেছে কাফিরদের হাতে অধিকৃত হওয়া থেকে। মুসলিম ভূমিতো তখনই শত্রুর হাতে অধিকৃত হতে শুরু করেছে যখন ধর্মপালন স্রেফ নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ পাঠে সীমিত হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামের পক্ষের শক্তি আজ পরাজিত। কারণ, সে জিহাদী চেতনা বিলুপ্ত হয়েছে অধিকাংশ মুসলিমের মগজ থেকে। ফলে মুক্তি মিলছে না শত্রুদের অধিকৃতি থেকে।

 

পুরনো পরাধীনতা নতুন নামে

স্বাধীনতার নামে অধিকাংশ মুসলিম দেশে আজও যা চলছে সেটি মূলতঃ ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে পুরানো পরাধীনতারই ধারাবাহিকতা। তবে সেটি নতুন নাম, নতুন মানচিত্র ও নতুন পতাকা নিয়ে। নাম, মানচিত্র ও পতাকা পাল্টে গেলেও পরাধীনতা যে আদৌ শেষ হয়নি সেটি বুঝা যায় মুসলিম দেশের আদালতগুলোর দিকে তাকালে। সেখানে পূর্ণ অধিকৃতি কুফুরী আইনের। দেখা যায়, সংবিধানে দিকে নজর দিলে। সেখানেও নাই মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব। প্রশ্ন হলো, দেশের উপর ইসলামের বিজয় ও মুসলিমদের দখলদারির প্রমাণ কি মসজিদ-মাদ্রাসা ও নামাযীর সংখ্যা? ভারতের ন্যায় কাফের শাসিত দেশে মসজিদের কি সংখ্যা কম? নামাযীর সংখ্যাও কি নগন্য? সেটি তো বুঝা যায় দেশে সার্বভৌমত্ব কোন আইনের –তা থেকে। একজন কাফের থেকে ঈমানদার ব্যক্তির ভিন্নতর পরিচয় তো মহান আল্লাহতায়ালা উপর তাঁর ঈমান ও আমলের কারণে। তেমনি মুসলমি দেশ কাফের দেশ থেকে ভিন্নতর পরিচয় পায় সে দেশে শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা থেকে। মহান আল্লাহতায়ালার নিয়োগপ্রাপ্ত খলিফার দায়ভারটি শুধু নামায-রোযা, হজ-যাকাত ও তাসবিহ পাঠে আদায় হয় না। সে লক্ষ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো কোরআনে বর্নিত শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা। বস্তুতঃ সে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে প্রকাশে ঘটে সাচ্চা ঈমানের। সে ঈমানের বলেই এমন ব্যক্তি হাজির হয় জিহাদের ময়দানে। যার মধ্যে ঈমানের সে গভীরতা নাই -সে ব্যক্তি সারা জীবন নামায-রোযায় কাটালেই তাকে জিহাদে দেখা যায়না।

লক্ষণীয় হলো, অন্য কোন ইবাদতে প্রাণ গেলে সরাসরি জান্নাত জুটে না। কিন্তু সেটি জুটে জিহাদে প্রাণ গেলে। নিহত হওয়ায় সে নতুন জীবন পায়। এ থেকে প্রমাণ মেলে, মহান আল্লাহর কাছে কাফের শক্তির অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে বসবাসের গুরুত্ব কত অধীক। ইসলাম নিয়ে স্বাধীনতা ভাবে বাঁচার সে বিধান তাই জিহাদ। নবীজী (সাঃ)র সাহাবাগণ ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। সেটি শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও তাসবিহ-তাহলিলের কারণে নয়। বরং এ কারণে যে, তাদের আমলেই ইসলাম একটি বিজয়ী বিশ্বশক্তি রূপে আবির্ভুত হয়েছে। সে আমলে প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষা পেয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র। পূর্ণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে শরিয়ত। এবং তাদের আমলে মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের বিজয় ঝান্ডা উড়াতে যত জিহাদ সংগঠিত হয়েছে তা আর কোন কালেই হয়নি। সে সব জিহাদে তাদের জান ও মালের বিনিয়োগটি ছিল অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে অধীক। শতকরা সত্তর ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। সে বিশাল বিনিয়োগ দিয়েছে বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছে । ফলে সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে তারাই সবচেয়ে গর্বের। পবিত্র কোরআনে তাদের কর্মের উপর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা।

কিন্তু বাংলাদেশীদের মাঝে কোথায় সে সাচ্চা ঈমানদারী? কোথায় সে আগ্রহ শ্রেষ্ঠ ইবাদতে? ইসলামের বিজয়ে কোথায় সে জানমালের বিনিয়োগ? তারা তো অর্থ ও ভোট দেয়, এমন কি প্রাণ দেয় ইসলামের শত্রুপক্ষকে বিজয়ী করতে। ১৯৭১’য়ে বহু হাজার বাঙালী মুসলিম যুদ্ধ করেছে এবং প্রাণ দিয়েছে ভারতের ন্যায় একটি কাফের দেশকে বিজয়ী করতে। শত্রুর পক্ষে তাদের সে বিনিয়োগ বরং ভয়াবহ আযাব ডেকে এনেছে। মুজিব ও হাসিনার শাসন তো সে আযাবেরই অংশ। একাত্তরে ভারত বিজয়ী হওয়াতে অসম্ভব হয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। এবং জিহাদের ন্যায় শ্রেষ্ঠ ইবাদতটি গণ্য হচ্ছে শাস্তিযোগ্য জঙ্গিকর্ম রূপে। এভাবে অসম্ভব করা হয়েছে পূর্ণ মুসলিম হওয়া। এবং আইনসিদ্ধ ও প্রশংসনীয় কর্ম রূপে গণ্য হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ইসলামের শত্রুশক্তির বিজয়ে ভোট, শ্রম, অর্থ ও মেধার বিনিয়োগ।

 

সেক্যুলারিস্টদের রাজনীতিঃ ভারতের স্বপ্ন পূরণের হাতিয়ার

কোন দেশ ইসলামের শত্রুপক্ষের দখলে গেলে যে বিপদগুলি আসে -বাংলাদেশে তার সবগুলিই এসেছে। এবং এসেছে অতি বর্বর ভাবেই। আরো বহুবিধ বিপদ আসার অপেক্ষায় পাইপ লাইনে রয়েছে। বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতা অনেক। তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো, তারা ব্যর্থ হয়েছে বাংলার মুসলিম ভূমিতে ইসলামের শত্রুপক্ষের অধিকৃতি রূখতে। সেটি যেমন ১৭৫৭ সালে, তেমনি ১৯৭১। বরং ১৯৭১’য়ে কাফের শক্তির বিজয় বাড়াতে বহু লক্ষ বাঙালী গায়ে-গতরে খেটেছে চাকর-বাকরের ন্যায়। অনেকে প্রাণও দিয়েছে। অথচ মুসলিম ভূমিতে ভারতের ন্যায় কোন কাফের দেশের হামলা হলে জিহাদ আর ফরজে কেফায়া থাকে, সেটি নামায-রোযার ন্যায় ফরজে আইনে পরিণত হয়। নামাযে কাজা চলে, কিন্তু এ ফরজ পালনে কাজা চলে না। নামাজ তখন মসজিদে নয়, জিহাদের ময়দানে গিয়ে পড়তে হয়। এ জিহাদে অংশ নিতে যাদের জীবেন ব্যর্থতা, তাদের জীবনে আযাবের কোন সীমা-সরহাদ থাকে না।

তবে বাঙালীর জীবনে এখন শুধু ব্যর্থতা নয়, শুরু হয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পর্ব। বিদ্রোহ এখন এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দূরে থাক, যেখানেই ইসলাম ও মুসলিম –এ শব্দ দুটি আছে, সেখানেই কাঁচি চালানো হচ্ছে। শুরু হয়েছে ভারতের ন্যায় কাফের রাষ্ট্রের স্বপ্ন পূরণের রাজনীতি। ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে ভারতে যা কিছু ঘটেছে বা এখনো ঘটছে -সেগুলিই এখন ঘটছে বাংলাদেশে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু নামটি এখনো বহাল তবিয়তে আছে; কিন্তু আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি কেটে ফেলা হয়েছে। যারাই ইসলামের শত্রুপক্ষে তাদের চরিত্রটি সব দেশেই একই রূপ হয়। তাদের মাঝে থাকে না ভাষা, বর্ণ বা ভূগোলের নামে বিভক্তির দেয়াল। তাই দেয়াল নাই বাংলাদেশ ও ভারতে বসবাসকারি ইসলামের শত্রুদের মাঝেও। বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে আজকের যে ভূ-রাজনৈতিক দেয়াল -সেটির জন্ম একাত্তরে নয়। সেটি সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদীদেরও গড়া নয়। এটি নিরেট পাকিস্তানের লিগ্যাসী। এবং যা কিছু পাকিস্তানী সেগুলি বর্জন করাই সেক্যুলার বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের রাজনীতি। ফলে তাদের এ দখলদারি দীর্ঘায়ীত হলে সেদিন বেশী দূরে নয় যখন পাকিস্তানের গড়া সে দেয়ালকেও পাকিস্তানী বলে বিদায় দিবে। বাংলাদেশ তখন বিলুপ্ত হবে ভারতের পেটে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রদেশ রূপে পূর্ব পাকিস্তানের যে মানচিত্রটি গড়ে উঠছিল তার পিছনে ছিল ভারতীয় হিন্দুদের থেকে ভিন্নতর একটি প্রবল চেতনা –সেটি পুষ্টি পেয়েছিল প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব থেকে। মুজিব ও হাসিনার চেতনায় ইসলাম না থাকায় ১৯৪৭’য়ের সে মুসলিম চরিত্রটিও তাদের রাজনীতিতে স্থান পায়নি। বরং আছে ভারতীয় হিন্দুদের চেতনার সাথে অভিন্নতা। চেতনার সে অভিন্নতার কারণেই তারা ভারতীয় কায়দায় জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকেও মুসলিম শব্দটি কেটে দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল হয়ে গেছে সলিমুল্লাহ হল। এমন কি কাজী নজরুল ইসলামের নামের সাথে ইসলাম শব্দটিও তাদের সহ্য হয়নি। ফলে ঢাকার কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ হয়ে গেছে নজরুল কলেজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামে কোরআনের আয়াত ছিল, সেটিও মুজিবামলে বিলুপ্ত করা হয়েছে। ইসলামের বিরুদ্ধে একই রূপ বৈরীতা নিয়ে শেখ হাসিনা সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করেছেন মহান আল্লাহতায়ালার উপর আস্থার ঘোষণাটি। মুজিবের ন্যায় হাসিনার রাজনীতিতে্ও ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে শত্রুতা যে কতটা তীব্র -এরপরও কি বুঝতে বাঁকি থাকে? শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে কোন মুসলিম কি এমন ইসলাম এবং মুসলিম বিরোধী এজেন্ডা নিয়ে রাজনীতি করে?

 

হাসিনার উপর অর্পিত দায়ভার

শেখ মুজিবের ন্যায় শেখ হাসিনা ও তার অনুসারিদের লক্ষ্য, ভারতীয় শাসকচক্রকে খুশি করা। জনগণের উপর তাদের সামান্যতম আস্থাও নাই। তারা জানে, ভারত খুশী হলেই তাদের গদি বাঁচবে। কথা হলো, ভারতের ন্যায় আগ্রাসী কুটিল রাষ্ট্রকে খুশি করা কি এতটাই সহজ? সিকিমেয়ের নেতা লেন্দুপ দর্জিকে সেটি করতে গিয়ে সিকিমকে ভারতের পেটে বিলীন করতে হয়েছে। মুজিব ও হাসিনার কাছেও তাই অনিবার্য হয়ে পড়ে ভারতীয় এজেন্ডাকে নিজেদের এজেন্ডা রূপে গ্রহণ করাটি। তাই ভারতীয় এজেন্ডার অন্তর্ভুক্তি দেখা যায় ভারতের সাথে মুজিবের স্বাক্ষরিত ২৫ সালা দাসচুক্তিতে। দেখা যায়, ভারতকে ফারাক্কায় পদ্মার পানি তুলে নেয়ার অধিকার দেয়াতে। এবং দেখা যায়, সীমান্ত বাণিজ্যের নামে ভারতীয় পণ্যের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেয়ায়। এমন কি সেটি দেখা যায়, বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক অফিসগুলোতে গোয়েন্দাগিরির জন্য ভারতের গুপ্তাচর সংস্থা র’য়ের জন্য স্থান করে দেয়ায়।

তবে হাসিনার কাছে ভারতের দাবীর তালিকাটি আরো বিশাল। ভারত শুধু বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে করিডোর নিয়ে খুশী নয়। বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের রয়েছে কিছু গুরুতর ভীতি। দেশটির প্রচণ্ড ভয়, বাংলাদেশে ইসলামের আসন্ন উত্থান নিয়ে। এ ভয় ভারতীয় শাসক মহলের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। মধ্যপাচ্যে ইসলামপন্থিদের উত্থান ঠ্যাকাতে সমগ্র পাশ্চাত্য শক্তি একজোট হয়েও হিমশীম খাচ্ছে। তারা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছে আফগানিস্তানে। বাংলাদেশ ৪ কোটি মানুষের আফগানিস্তান নয়। ভারতের ভয়, বাংলাদেশে ১৭ কোটি মুসলিমের জীবনে ইসলামের জোয়ার উঠলে সে জোয়ার ঠ্যাকানো ভারতের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সে জোয়ার আঘাত হানবে প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে –বিশেষ করে পশ্চিম বাংলা ও আসামে। তখন অসম্ভব হবে বাংলাদেশে অভ্যন্তরে তার নিজের ভাড়াটিয়া সৈনিকদের বাঁচানো।

ভারত জানে, বাঙালী মুসলিম জীবনে পাকিস্তানের পক্ষে জোয়ার উঠাতেই ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি এড়ানো সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানের জনক মূলতঃ বাঙালী মুসলিমেরাই। তাদের ভয়, বাঙালী মুসলিম আবার ইসলামের পতাকা নিয়ে জেগে উঠলে ভারতের মানচিত্রে আবারো হাত পড়বে। ফলে হাসিনার উপর চাপানো দায়ভারও বেড়েছে। তাই ভারতের এজেন্ডা পূরণের স্বার্থে ইসলাম ও মুসলিমের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া ছাড়া শেখ হাসিনার সামনে ভিন্ন পথ নাই। ইসলামপন্থিদের দমনে ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবীকে ঠ্যাঙ্গারে হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে হেফাজতে ইসলামের শত শত নেতাকর্মীদের হত্যা ও হত্যার পর তাদের লাশগুলো মিউনিসিপালিটির ময়লা সরানোর গাড়িতে তুলে গায়েব করা এবং বিচারের নামে জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের ফাঁসি দেয়ায় হাসিনা এজন্যই এতটা নির্মম। আর এতে প্রচুর শাবাস মিলছে ভারতের শাসক মহল থেকে।

 

আরেক কাশ্মির এখন বাংলাদেশ

ভারতীয় বাহিনী কাশ্মিরে যে কাজটি করছে, দিল্লির শাসকচক্র চায় হাসিনা সরকারও বাংলাদেশে সে অভিন্ন স্ট্রাটেজী নিয়ে অগ্রসর হোক। সমগ্র কাশ্মির এখন জেলখানা। ভারতের সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশকেও পরিণত করা হচ্ছে আরেক কাশ্মিরে। ইসলাম, ইসলামপন্থি ও ভারত-বিরোধীদের নির্মূলে হাসিনা এজন্যই এতোটা বেপরোয়া। আবরার ফাহাদদের তাই অতি নির্মম ভাবে লাশ হতে হচ্ছে। তাছাড়া একাজে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় পঞ্চম বাহিনীর লোক কি কম? তারা শুধু রাজনীতির ময়দানে নয়, তারা দলে ভারী দেশের মিডিয়া, পুলিশ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী এমন কি বিচার ব্যবস্থাতেও। হাসিনা সরকারের এজেন্ডা এখন আর কোন গোপন বিষয় নয়। দেশের স্বার্থের চেয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের গদিরক্ষা ও ভারতীয় এজেন্ডা পূরণ। দেশের স্বার্থ গুরুত্ব পেলে বহু খুন, বহু ধর্ষণ ও বহু হাজার কোটি টাকার ডাকাতির সাথে জড়িতদের অবশ্যই আদালতে তোলা হতো। এবং তাদের বিচার হতো। কিন্তু তা না করে হাসিনা ব্যস্তু ইসলাম ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলে। এবং তার সরকারের নৃশংস নিষ্ঠুরতা বেড়েছে জনগণের মৌলিক অধীকার কেড়ে নেয়ায়। এবং নেমেছে ভোট ডাকাতিতে। একাজ তো দেশ ও জনগণের শত্রুদের। দেশের চিহ্নিত বিদেশী শত্রুদের সাথে এজন্যই হাসিনা সরকারের এত গভীর মিত্রতা।

ইতিহাসের আরেক সত্য হলো, ভয়ানক অপরাধগুলি শুধু অপরাধী শাসকচক্রের কারণে  ঘটে না, সেগুলি বরং তীব্রতর হয় অপরাধ সয়ে যাওয়ার কারণেও। এজন্যই বাংলাদেশীদের জন্য ভয়ানক বিপদের কারণটি শুধু দেশটির দুর্বৃত্ত শাসকচক্র নয়, বরং সে আম জনগণও যারা দুর্বৃত্ত শাসকচক্রের সীমাহীন অপরাধগুলিকে নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে। সভ্য জনপদে হিংস্র বাঘ ঢুকলে জনগণ হাতের কাছে যা পায় তা নিয়ে রাস্তায়  নামে এবং বাঘকে বধ করে। তেমনি ঘটে যদি সভ্য জনগণের ঘাড়ে দুর্বৃত্ত ভোট চোরদের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি ঘটেনি। ফলে সভ্য শাসনের বদলে নির্মিত হচ্ছে অসভ্য শাসনের ইতিহাস। আজ না হলেও শত বছর পর নতুন প্রজন্ম জেনে বিস্মিত হবে যে, তাদের পূর্বপুরুষগণ মুজিব-হাসিনার ন্যায় দুর্বৃত্তদের শাসনকেও মেনে নিয়েছিল। ব্যর্থ হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে গণবিল্পব ঘটাতে। শুধু তাই নয়, তারা তাদেরকে মাননীয় বলতো। এবং ভারতের ন্যায় শত্রুদেশের এজেন্ট এবং গণহত্যাকারি ফ্যাসিস্ট মুজিবকে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা বলতো। ১ম সংস্করণ ২৮/০৩/২০১৬; ২য় সংস্করণ ৩০/১০/২০২০।




স্যাডিস্ট হাসিনা এবং বাংলাদেশের লুন্ঠিত স্বাধীনতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 মৃত্যুটি বিবেকের

অন্যের বেদনা যতই তীব্র ও হৃদয়বিদারক হোক -তা নিয়ে চোর-ডাকাতদের সামান্যতম অনুভুতি থাকে না। বরং অন্যের বেদনা বাড়িয়ে তারা উৎসব করে। তাদের তৃপ্তি তো অন্যদের খুন করায় ও নিঃস্ব করায়। অনুরূপ তৃপ্তি ভোট-চোর ও ভোট-ডাকাতদেরও। তারাও জনগণের ভোট ডাকাতি করে মহোৎসব করে। ভোট-ডাকাতির নির্বাচন শেষে হাসিনা তাই দাঁতগুলি দেখিয়ে অট্টহাসি দিয়েছিল। সভ্য সমাজে মানুষের বড় সম্পদ শুধু ধনসম্পদ নয়, সেটি ভোট দানের অধিকার। ভোট দিয়ে সে যেমন দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে, তেমনি পাল্টায় নিজের ভাগ্যও। ভোটের উপর ডাকাতিতে জনগণ ব্যাথিত হবে –সেটি তাই স্বাভাবিক। কিন্তু  জনগণের সে বেদনা নিয়ে চোর-ডাকাতদের ন্যায় ভোট-ডাকাতদেরও সামান্যতম অনুভুতি থাকে না। চোর-ডাকাতগণ চুরি-ডাকাতিতে নামে দেহের রোগের কারণে নয়, সেটি মানসিক রোগের কারণে। সেটি হলো স্যাডিজম। এ রোগে মারা পড়ে বিবেকবোধ এবং সুস্থ্য চিন্তা-চেতনা। বিবেকহীনতা ও কুরুচি তখন এতোটাই জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছে যে, অন্যের বেদনা নিয়ে এরা আনন্দ-উৎসব করে। এরা কষ্ট পায় অন্যদের সুখ দেখলে। এবং আনন্দ পায় পথে-ঘাটে সরকার-বিরোধীদের লাশ পড়াতে। তখন রাজনীতি লাশের রাজনীতিতে পরিণত হয়।

একই রূপ স্যাডিজম প্রবল কাজ করে ডাকাতদের মাঝে। ফলে ডাকাতি শেষে নিরীহ গৃহস্বামীকে হত্যা করে তারা অট্ট হাঁসি দেয়।এরূপ মস্তৃষ্ক বিকৃত স্যাডিস্টগণই ধর্ষণে সেঞ্চুরি করার পরও নির্যাতিত মহিলাদের চোখের সামনে উৎসব করে। এমন স্যাডিস্টদের প্রচণ্ড ভীড় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুব লীগের মত সরকারি দলের ক্যাডাররদের মাঝে। মল-মুত্র ও গলিত আবর্জনা যেমন মশামাছিকে আকর্ষণ করে, দুর্বৃত্ত কবলিত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলিও তেমনি দেশের অতি নৃশংস অপরাধীদেরকে টেনে এনেছে রাজনীতিতে। এদের অনেককে ঢুকানো হয়েছে পুলিশ, আদালত, সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনিক ক্যাডারে। এভাবে দ্রুত দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে সামরিক ও বেসামরিক অঙ্গণে। রাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিট দখলে গেছে বিবেকহীন স্যাডিস্টদের দখলে। বাংলাদেশীদের জন্য মহাবিপদের কারণ এখানেই। এরই আলামত, চুরি-ডাকাতি,গুম-খুন ও ধর্ষণের বর্বরতায় জনজীবন অতিষ্ট হলেও তা থেকে মুক্তি দেয়ার কোন সরকারি উদ্যোগ নেই। বরং দিন দিন সে বর্বরতা আর তীব্রতর হচ্ছে। কারণ, নিজের আনন্দ বাড়াতে হাসিনা নিজেই চায়, আরো বেশী লাশ পড়ুক। হাসিনার মানসিক অসুস্থ্যতা যে কীরূপ প্রকট সেটি বুঝা যায়, তার দলীয় কর্মীদের প্রতি এক লাশের বদলে দশটি লাশ ফেলার নির্দেশ থেকে। এজন্যই তার ক্ষমতায় আসাতে বাংলাদেশের পথেঘাটে বেড়েছে লাশের ছড়াছড়ি। লাশ পড়ছে সরকারি বাহিনীর হাতে। ২৭/১০/২০২০ তারিখে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা ও সোসাল মিডিয়া ভয়ানক খবর ছেপেছে। খবরটি হলো তদন্তকারি পুলিশ বাহিনী আওয়ামী  লীগ সংসদ  সদস্য হাজী সলিমের বাসা থেকে হাতবেড়ি এবং ওয়ারলেস যোগাযোগের সামগ্রী ক্রোক করেছে। এরূপ হাতবেড়ি ও ওয়ারলেস সামগ্রী পুলিশ কেন্দ্রে থাকার কথা। এ থেকে বুঝা যায়, এগুলো ব্যবহৃত হয়েছে সাদা পোষাকে অন্যদের ধরে এনে গুম ও খুন করার কাজে। এ অবধি দেশে বহুশত ব্যক্তি গুম ও খুন হয়েছে। তাদের অনেকে যেমন গুম-খুন সরকারি বাহিনীর হাতে হয়েছে, তেমনি হয়েছে হাজী সেলিমের বেসরকারি বাহিনীর হাতেও।  

শেখ হাসিনার হাতে লাশ ফেলার আয়োজন কতটা বেড়েছে তার একটি বিবরণ দেয়া যাক। ৩১/১/১৩ তারিখে দৈনিক যুগান্তর খবর ছেপেছিল,“ঢাকার আশেপাশে নির্জন এলাকায় লাশ আর লাশ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে সাদা পোষাক ও সাদা গাড়ির সাহায্যে অসংখ্য মানুষ গুম হচ্ছে, ঘর থেকে তুলে নেয়ার পর তারা আর ফিরে আসে না। লাশ হয়ে রাতের আঁধারে তারা ডাম্পিং হচ্ছে এবং পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে্ ঢাকার আশের পাশে মুন্সিগঞ্জের ধলেশ্বরী, মেঘনা ও পদ্মার নির্জন তীরে, মাওয়া সড়কের পাড়ে, নারয়নগঞ্জের সীতালক্ষার তীরে অথবা কাপাসীয়ার গজারী শালবনে। পত্রিকাটি আরো লিখেছে, একমাত্র ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসেই এসব এলাকায় অর্ধশত লাশ পাওয়া গেছে। লাশ পড়ছে প্রতিদিন। দৈনিক যুগান্তর লিখেছে, নারায়নগঞ্জে এক ডজন খুন হলো সম্প্রতি। সরকার মূলা ঝুলিয়েছে এ বলে যে, বিচার হবে। কিন্তু সরকারের ভূমিকা যেন এ পর্যন্তই। কোন তদন্তু নাই, কোন মামলা নেই, কোন গ্রেফতারিও নাই এবং কোন বিচারও নাই।

শুধু গাজীপুরেই ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ৮ জন খুন হয়েছে। আশুলিয়াতেই খুন হয়েছে ৫ জন। প্রশ্ন হলো, একাত্তরের খুনের চেয়ে আজকের এ খুনগুলো কি কম নৃশংস? যারা খুন হলো তাদের পরিবারের কি সরকারের কাছে চাওয়া পাওয়া নেই? সরকারের কাজ কি শুধু শেখ হাসিনার পিতামাতার হত্যাকারিদের বিচার করা? এ অপরাধগুলি কি মানবাধিকার বিরোধী নয়? খুন শুধু একাত্তরে হলেই অপরাধ।এবং সে অপরাধের বিচারের নামের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ট্রাইবিউনাল গঠিত হবে। অথচ বাহাত্তরে, তেহাত্তরে, চুহাত্তরে বা তার পরে কেউ খুন হলে তার বিচার হবে না -সেটি কি কোন সভ্য সমাজে এবং সভ্য মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য?

 

ডাকাতির শিকার আদালত

জামায়াত নেতাদের ফাঁসীর দাবী নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা­­­কর্মী ও মন্ত্রীদের রাজপথে নামতে দেখা গেছে। আব্দুল কাদের মোল্লাকে আদালত যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তি দিয়েছিল। কিন্তু এ রায়ে তারা খুশি হয়নি। তাদের দাবী, আদালতকে সে রায়ই দিতে হবে যা তারা রাজপথে দাবী করছে। তাদের দাবী, আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দিতে হবে। আদালত তাদের সে দাবী মেনে নিয়ে ফাঁসির হুকুম দিয়েছে। এর কি অর্থ দাঁড়ালো? এর অর্থঃ বিচারের দায়িত্ব এখন আর বিচারকদের হাতে নেই। বিচারকদের সে অধিকার ছিনতাই হয়ে গেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতে। ডাকাতি হয়েছে আদালতেও। সেটি এখন রাজপথে দাবী করে আদায়ের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এবং সে দাবী জানানোর অধিকারটিও একমাত্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। অন্যরা ন্যায় বিচারের দাবী নিয়ে রাস্তায় নামলে তাদের উপর গুলি চালানো হয়। এই হলো শেখ হাসিনা সরকারের বিচার ব্যবস্থা।

হাসিনা সরকারের লক্ষ্য, বিচারের নামে রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মূল। দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে দেশ আজ ছেয়ে গেছে চুরি-ডাকাতি, গুম, খুন ও ধর্ষণে। কিন্তু সেগুলি নির্মূলের দাবী নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজপথে নামতে দেখা যায় না। অথচ তারা রাজপথে আওয়াজ তোলে সরকার-বিরোধীদের ফাঁসির দাবী নিয়ে। অপর দিকে বিচারকগণ পরিণত  হয়েছে শেখ হাসিনার জল্লাদে। জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের অপরাধ, তারা বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। ফলে তারা সরকারের নির্মূলের টার্গেট। সরকারের এ ইচ্ছা পূরণে দেশের পুলিশ এবং আদালত খাটছে দলীয় লাঠিয়াল রূপে। এসব সরকারি চাকর-বাকরদের কাজ, নেতার খায়েশ পুরণে বিরোধীদের মাথায় লাঠি মারা। এবং কার মাথায় লাঠি মারতে হবে -সে ইচ্ছাটি লাঠিয়ালের নিজের নয়। সেটি নির্ধারণ করছে সরকার। সে লক্ষ্যে থানা-পুলিশ ও সরকারি প্রসিকিউশন উকিলের কাজ হয়েছে রাজনৈতিক শত্রুদের বেছে বেছে কোর্টে হাজির করা। বিশেষ করে ইসলামপন্থিদের। একাত্তরে খুন,ধর্ষণ ও লুটতরাজের মিথ্যা অভিযোগে এনে তাদের ফাঁসি দেয়াই হলো সরকার নিয়ন্ত্রিত বিচার বিভাগের মূল কাজ।

 

বিজয় আদিম ট্রাইবালিজমের

আওয়ামী লীগের উপর বিজয়টি আদিম ট্রাইবালিজমের। ফলে নেতার মৃত্যু না হলে এখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়না। নেতা নির্বাচিত হয়, রক্তের উত্তারাধিকার সূত্রে। দলের মাঝে যে ভোট হয় -সেটি নিছক আনুগত্যের মহড়া বৈ নয়। অসভ্য আদিম রীতির প্রভাবে ভোটাভুটি হলেও ট্রাইবাল নেতার নাবালুক শিশু বা পাগল পুত্রও তাতে পরাজিত হয় না। এতে বুঝা যায়  ট্রাইবাল সমাজের রীতি কতটা মজবুত। এবং বুঝা যায়, সে সমাজে জ্ঞানী, গুণি ও সভ্য মানুষেরা কতটা মূল্যহীন। একারণেই শেখ হাসিনা যত অযোগ্যই হোক, আওয়ামী লীগে তার কোন প্রতিদ্বন্দী নেই। যেন দলটিতে তার চেয়ে কোন যোগ্যতর ব্যক্তি‌ নাই। তাই নিছক নির্বাচন বা ভোটাভুটিকে গণতন্ত্র বলা যায় না। গণতন্ত্রের জন্য চাই ট্রাইবাল সংস্কৃতিমুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ -যেখানে থাকতে হয় যোগ্যতা বা গুণের খোলামেলা মূল্যায়ন। ট্রাইবাল সংস্কৃতির অসভ্যতায় যে গণতন্ত্র বাঁচে না -তারই উদাহরণ হলো আওয়ামী লীগ। দলটিতে তাই নেতা খুঁজতে হয় শেখ মুজিবের রক্তের সূত্র ধরে, যোগ্যতা এখানে বিবেচনায় আসে না। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্রশূণ্য এক ফ্যাসিস্টকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করার এ হলো আযাব। জনগণকে তাই শুধু হিংস্র পশুদের চিনলে হয় না, চিনতে হয় মানবরূপী পশুদেরও। এবং সে পশুদের নির্মূলে নিজেদের বিনিয়োগটিও বাড়াতে হয়। নইলে আযাব ঘিরে ধরে। বাংলাদেশ তো সে ব্যর্থতারই নজির।

ট্রাইবালিজমের আরেক বিপদ, এতে নিজ গোত্রের চোর-ডাকাত, খুনি সন্ত্রাসী, লুটেরা বা ধর্ষকদের বিচার হয় না। অথচ অন্য গোত্রের নিরপরাধ মানুষদের লুন্ঠন, হত্যা বা ধর্ষণ করাটি উৎসবের বিষয় গণ্য হয়। এজন্যই শেখ হাসিনার প্রথম বার ক্ষমতায় আসাতে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতার ধর্ষণে সেঞ্চুরীর উৎসবটি তার কাছে অপরাধ গণ্য হয়নি। ফলে বিচারও হয়নি। বরং সে অপরাধীরা তার কাছে প্রিয় গণ্য হয়েছে। নিজ দলের অপরাধীদের গায়ে অন্য কেউ আঁচড় দিক বা পুলিশ রিমান্ডে নিক -শেখ হাসিনার কাছে সেটি গ্রহনযোগ্য নয়। দুর্নীতির কারণে পদ্মসেতুর ন্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক সরে যেতে বাধ্য হলো। এতে সেতু নির্মাণের বহু বছরের জন্য পিছিয়ে গেল। বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়ার কারণ, দূর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত দুই সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেন ও আবুল হাসানকে বাঁচাতে বিশ্বব্যাংকের তদন্তের দাবীকে হাসিনা অগ্রাহ্য করেছিল। অথচ বিশ্বব্যাংক তাদের বিচার বাংলাদেশের মাটিতে বাংলাদেশের বিচারকদের দিয়েই চেয়েছিল। ট্রাইবাল নেতাদের ন্যায় শেখ হাসিনার কাছে তার দল বা গোত্রটি বড়, দেশ নয়। তাই পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজটি পিছিয়ে যাওয়াতে দেশের ক্ষতি হলেও তার দলের ক্ষতি হয়নি। বরং দলীয় দুই নেতা বিচারের দণ্ড থেকে বেঁচে গেল।

শিখবার বিপুল উপকরণ রয়েছে ইতিহাসে। এককালে রাজারা নিজ ভাই ও নিজ পুত্রদের সাথে নিয়ে যুদ্ধে যেত। প্রতিপক্ষের হাতে তাদের অনেকে মারাও যেত। নিহত রাজার পুত্ররা যখন রাজা হতো তখন রাষ্ট্রের সমগ্র সামর্থ্য নিয়ে নিয়োজিত হতো শত্রুদেশের বিরুদ্ধে প্রতিশোধকামী যুদ্ধে। তাই এক যুদ্ধে আরেক যুদ্ধের বীজ থেকে যায়। যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর বীজটি রয়ে গিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত জার্মানকে অপমানিত এবং চিরকাল পরাজিত রাখার সকল প্রকার উদ্যোগ নিয়েছিল বিজয়ী ফ্রান্স ও ব্রিটেন। কিন্তু তাতে পরবর্তীতে ফলাফলটি ফ্রান্স ও ব্রিটেনে জন্যও ভাল হয়নি। বরং পরিণতিটি অতি ভয়াবহ হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হতেই জার্মানগণ আরেকটি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। সমগ্র জার্মান জাতি প্রচণ্ড প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে পড়ে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের বহু নগরী যেমন ধ্বংস হয়, তেমনি বহু লক্ষ নাগরিক মারা যায় হিটলারের বোমা হামলায়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বিষয়টি ভিন্নতর হয়। বিজয়ী পক্ষ আর পূর্বের ন্যায় প্রতিশোধে নামেনি। যুদ্ধে যা ঘটেছে সেটিকে পিছনে ফেলে তারা সামনে এগিয়েছে। ফলে হাজার হাজার সামরিক অফিসার ও তাদের লক্ষ লক্ষ সৈন্যের মাঝে মাত্র কয়েকজনকে নুরেমবার্গের ট্রাইবুনালে তুলেছিল। এবং পরাজিত দেশের পুণঃনির্মাণে তারা এগিয়ে এসেছিল। জার্মান ও জাপানের ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ী, শিল্পকারখানা ও রাস্তাঘাট মেরামত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেয় বিপুল অর্থ। এর ফলটি শুভ হয়। মার্কিনীদের হামলায় বহু মিলিয়ন লোকের মৃত্যূ ও বহু নগর-বন্দর ধ্বংস হওয়ার পরও জনগণ প্রতিশোধে নামেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধই হলো পাশ্চাত্য জগতে শেষ যুদ্ধ। এবং তার কারণ, যুদ্ধপরবর্তী নেতৃবৃন্দের প্রজ্ঞা ও মহানুভবতা। সে প্রজ্ঞা ও মহানুভবতার বলেই বিজয়ী এবং পরাজিত দেশগুলি সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গণে পরস্পরের  ঘনিষ্ট মিত্রে পরিণত হয়। কিন্তু সে প্রজ্ঞা ও মহানুভবতা কি প্রতিশোধ পরায়ন আওয়ামী লীগ নেতাদের আছে?

কতটুকু শিক্ষা নেয়া হয়েছে একাত্তরের যুদ্ধ থেকে? তখন দুটি পক্ষ ছিল। একটি পক্ষ পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে, অপরটি বিপক্ষে। এটি নিতান্তই ঈমান-আক্বিদা ও রাজনৈতিক দর্শনের বিষয়; অপরাধ জগতের বিষয় নয়। মুসলিম দেশ ভাঙ্গা যে হারাম –সেটি তো ঈমানের  বিষয়। অন্যথা প্রচণ্ড বেঈমানী হয়। এজন্যই ১৯৭১’য়ে কোন ইসলামী দল, কোন আলেম, কোন পীর-মাশায়েখ এবং মাদ্রাসার কোন ছাত্র পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি। একাজটি ছিল ঈমানশূন্য বাঙালী ও বামপন্থি কাপালিকদের। তাছাড়া অখণ্ড এক বৃহৎ পাকিস্তানের প্রদেশ রূপে থাকার মাঝে বাঙালী মুসলিমের যে অধিক নিরাপত্তা -সেটি কি শুধু রাজাকারের ভাবনা? সে একই ভাবনা ছিল শেরে বাংলা ফজলুল হক, শহীদ সহরোয়ার্দি, খাজা নাযিমুদ্দীন ও ১৯৪৬’য়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী  মুসলিমের। অথচ সে বিশ্বাস রাখার কারণেই রাজাকারদের হত্যাযোগ্য অপরাধী বানানো হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এভাবেই শুরু হয় রাজনীতির নামে নির্মূলের রাজনীতি। হাসিনার ক্ষমতায় আসাতে সে রাজনীতি  আরো তীব্রতর হয়েছে।

নির্মূলের এ রাজনীতিতে বহু মানুষ যেমন কবরে গেছে; তেমনি বহু মানুষ বেঁচে আছে  মনে প্রচণ্ড জখম নিয়ে। আওয়ামী লীগের কাজ হয়েছে বিপক্ষীয়দের সে জখমে লাগাতর মরিচ লাগানো। ইতিহাস থেকে তারা কোন শিক্ষাই নেয়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী পক্ষটি পরাজিতদের জখমে লাগাতর মরিচ লাগিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য করেছিল। আওয়ামী লীগও তেমন একটি যুদ্ধ অনিবার্য করছে বাংলাদেশে। এটি কি কোন দেশপ্রেমিকের কাজ হতে পারে? তারা ভাবে, যুদ্ধে শুধু একপক্ষেই লাশ পড়বে, এবং সেটি তাদের বিরোধী শিবিরে। শেখ হাসিনা তার পরিবারের বিয়োগান্ত পরিণতি থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি। মুজিবের পরিবার একাত্তরে বাঁচলেও পঁচাত্তরে রেহাই পায়নি। কেন বাঁচেনি -অন্ততঃ আওয়ামী লীগ নেতাদের তা নিয়ে গবেষণা করা উচিত। ফ্যাসিস্ট মুজিবের সবচেয়ে বড় অপরাধটি হলো, সে নির্মম ডাকাতী করেছিল জনগণের রাজনৈতিক অধিকারের উপর। অথচ হিংস্র পশুর ন্যায় সভ্য সমাজে চোর-ডাকাতও কোনদিন নিরাপত্তা পায় না। ফলে তাতে অসম্ভব হয়েছিল মুজিবের নিজের বাঁচাটিও। ফ্যাসিবাদের অসভ্য শাসন কারো জন্যই কোন কল্যাণ দেয় না। অথচ মুজিবের সে ব্যর্থ পথটি ধরেছে হাসিনা। ফলে অন্যদের রাজনীতিই শুধু নয়, দিন দিন সংকটে পড়ছে হাসিনার নিজের রাজনীতিও। জনসমর্থণ হারিয়ে পরগাছার মত সে বেঁচে আছে পুলিশ ও দলীয় গুন্ডাদের উপর ভর করে।

 

শত্রুর তালিকাটি বিশাল

শেখ হাসিনার কাছে তার শত্রুর তালিকাটি বিশাল। এবং দেশবাসীর মাঝে শুভাকাঙ্খীদের সংখ্যা খুবই কম। সে জানে, দিল্লির শাসকচক্র ছাড়া তার কোন প্রকৃত বন্ধু নাই। হাসিনার মনে কেন এমন ধারণা বদ্ধমূল হলো, তার কারণগুলি বহুবিধ। প্রশ্ন হলো, তার পিতামাতা ও আপনজনদের হত্যার জন্য শুধু কি কিছু সামরিক অফিসার দায়ী? সমগ্র সামরিক বাহিনী তখন কি করছিল? মুজিবের মৃত্যুতে খুশিতে যারা ঢাকার রাস্তায় আনন্দ-মিছিল করলো এবং মিষ্টি খেল -সে সাধারণ জনগণের কথাই বা হাসিনা ভূলে যায় কি করে? তার কাছে অপরাধী তো সে জনগণও যারা সে হত্যার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেনি। অপরাধী তো আব্দুল মালেক উকিলের মত সেসব আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দও যারা মুজিবের মৃত্যুতে মহাখুশিতে বলেছিল,“ফিরাউনের মৃত্যু হয়েছে।” তার ক্ষোভ তো আওয়ামী লীগের সেসব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধেও যারা তাঁর পিতার রক্তঝরা লাশকে সিঁড়ির উপর ফেলে খোন্দকার মোশতাকের মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করেছিল। হাসিনার ক্ষোভ, সে সব আওয়ামী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও যারা তাকে বাদ দিয়ে আব্দুল মালেক উকিলকে দলের সভাপতি বানিয়েছিল। হাসিনার প্রত্যাশা, সমগ্র জাতি তাঁর পিতাকে সর্বাধিক সম্মান দেখাবে। অন্য কোন ব্যক্তি তাঁর পিতার চেয়ে বেশী সম্মান পাবে -সেটি তার আছে অসহ্য। অথচ সে সম্মান ও স্বীকৃতি শেখ মুজিব তার জীবদ্দশাতেই পায়নি। জনগণকে বশে আসতে মুজিবকে রক্ষিবাহিয়ে নামাতে হয়েছে। বামপন্থি নেতাগণ তো মুজিবের পিঠের চামড়া দিয়ে ঢোল বানাতে চেয়েছিল। এমন অপমানজনক কথা কি আইয়ুব খান বা ইয়াহিয়া খানকেও শুনতে হয়েছিল? আপনজনদের মৃত্যু বেদনাদায়ক। কিন্তু দলীয় নেতাকর্মীদের যে বিশ্বাসঘাতকতা -সেটিও কি কম বেদনাদায়ক?

মুজিব পাকিস্তান ধ্বংসের জন্য বছরের পর বছর কাজ করেছে। আগরতলা ষড়যন্ত্রও করেছে ভারতের চর রূপে। পাকিস্তান সরকারের এসব অজনা ছিল না। কিন্তু এরপরও কি মুজিবের গায়ে তারা কি একটি আঁচড়ও দিয়েছে? আঁচড় দিয়েছে কি মুজিব পরিবারের অন্য কোন সদস্যের বিরুদ্ধে? বরং একাত্তরের যুদ্ধকালীন ৯ মাস কালে মুজিব পরিবার ও গর্ভাবতী শেখ হাসিনা পাকিস্তান আর্মি থেকে নিয়মিত সেবা পেয়েছে। মাসোহারাও পেয়েছে। অথচ সে মুজিবকে নিহত হতে হলো বাঙালীদের হাতে? হাসিনার অভিযোগ, মুজিবকে ডিঙ্গিয়ে অনেকে ভাষানীকে মাথায় তুলেছে। কেউবা মাথায় তুলেছে জিয়উর রহমানকে। কেউবা প্রফেসর মহম্মদ ইউনুসকে। তার পিতার হত্যাদিবস ১৫ই আগষ্টের দিনে বহুমানুষ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার জন্ম দিবস রূপে উৎসব করে। এসব সহ্য করার সামর্থ্য কি শেখ হাসিনার আছে? তার মনে প্রচণ্ড ক্রোধ এজন্যই জনগণের বিরুদ্ধে। ফলে প্রতিশোধ নিচ্ছে জনগণ থেকেও। ফলে জনগণ চুরি-ডাকাতি, গুম-খুন ও ধর্ষণের শিকার হলে -তাতে হাসিনা মনের আনন্দে যে ডুগডুগি বাজাবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? হাসিনার কাছে একমাত্র আপনজন হলো দিল্লীর শাসকচত্রু। মুজিবের মৃত্যুর পর একমাত্র ভারতই তাকে আশ্রয়, প্রশ্রয় ও পরিচর্যা দিয়েছে। কারো কোলে বড় হওয়ার মধ্যে একটি দায়বদ্ধতা আছে। হাসিনার রাজনীতির মূল চরিত্রটি তখন থেকেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। সেটি যেমন ইসলামপন্থিদের নির্মূল, তেমনি ভারতের প্রতি পরিপূর্ণ দাসত্বের।

 

রক্তে প্রতিশোধের নেশা

প্রতিশোধের নেশা মানুষকে পশুর চেয়েও হিংস্র করে। মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী রক্ত ঝরেছে প্রতিশোধ-পরায়ন মানুষদের হাতে। প্রতিশোধ-পরায়ন মানুষের কাছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগের ন্যায় নিষ্ঠুরতাও উৎসব রূপে গণ্য হয়। প্রতিশোধের নেশাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের উপর দুটি আনবিক বোমা ফেলেছিল। নিউয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর মার্কিন সৈন্যরা ধ্বংস করেছে আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ারের বহু নগর-বন্দর ও জনপদ। এমন প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়ে মার্কিনীরা ইরাকী বন্দিদের উলঙ্গ করে তাদের দিয়ে পিরামিড বানিয়েছে। ভারত একই নৃশংসতা নিয়ে হত্যা, ধ্বংস ও ধর্ষণে নেমেছে কাশ্মীরে। সেরূপ নৃশংস প্রতিশোধ-পরায়নতা ধরা পড়ে শেখ হাসিনার রাজনীতিতেও। নির্মূলের যে রাজনীতি মুজিব শুরু করেছিল হাসিনা সেটিকে আরো তীব্রতর করেছে। একাত্তরের নয় মাসে -বাঙালী ও অবাঙালী –উভয়েই হিংস্রতার শিকার হয়েছে। সে আগুনে বহুলক্ষ বিহারী ঘরবাড়ি,দোকানপাঠ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। বহু বিহারী রমনি ধর্ষিতাও হয়েছে। এখন বাঙালী-অবাঙালী সংঘাত শেষ হলেও শুরু হয়েছে বাঙালীদের মাঝে আত্মঘাতি সংঘাত। শেখ মুজিব কারারুদ্ধ হলেও নিজের পিতা-মাতা কারো হাতে হারাননি। ভাইবোন এবং সন্তানও হারায়নি। ফলে তার উম্মাদনাটি শেখ হাসিনার মত এতটা প্রকট ছিল না। ফলে একাত্তরে যারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলানোর উদ্যোগ নেয়নি। কিন্তু পিতা-মাতা-ভাই-ভাবী হারা হাসিনা প্রতিপক্ষকে ফাঁসিতে ঝুলাতে চায়। স্যাডিজমের এ হলো প্রকট লক্ষণ।

বিগত সংসদ নির্বাচনগুলিতে যে সত্যটি প্রকাশ পেয়েছে তা হলো, আওয়ামী লীগের প্রাপ্তভোটের পরিমাণ মোট ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশের বেশী নয়। অর্থাৎ দেশে সংখ্যাগরিষ্ট জনগণ আওয়ামী লীগের সাথে নাই। শেখ হাসিনার ক্ষোভ কি তাতে কম? দেশবাসীর বিরুদ্ধে হাসিনার আক্রোশের বড় কারণ হলো এটি। যে দেশের প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিল তার পিতা ও তার দল আওয়ামী লীগ -তার বিরুদ্ধে জনগণের এরূপ অবস্থান হাসিনার কাছে কি সহনীয়? হাসিনার কাছে সেটি গণ্য হচ্ছে তার পিতার বিরুদ্ধে গাদ্দারি রূপে। ফলে জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিশোধে হাসিনা নৃশংস হবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? হচ্ছে তো সেটিই। দেশের মানুষ আজ পথে ঘাটে লাশ হচ্ছে, নারীরা ধর্ষিতা হচ্ছে, মানুষ গুম ও খুন হচ্ছে –এজন্যই হাসিনার তাতে ভ্রুক্ষেপ নাই। অপরাধীদের ধরা নিয়েও তেমন আগ্রহ নাই। বরং সমগ্র সামর্থ্য দিয়ে পুলিশ ও র‌্যাব নামিয়েছে তাদের শাস্তি দিতে -যারা তার রাজনীতির বিরোধী।

 

মুক্তি সহজে  মিলছে না

কোন দেশই সুনামী বা মহামারিতে ধ্বংস হয় না। বরং ধ্বংস হয় আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাতে। বাংলাদেশ বিপদ বেড়েছে এজন্য যে, রাজনীতির ময়দানে চলছে প্রচণ্ড সংঘাত। বাংলাদেশের শত্রুপক্ষ তো সেটিই চায়। ভারত চায়, বাংলাদেশ দ্রুত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হোক। একটি দেশকে দুর্বল ও পদানত রাখার এটিই তো মোক্ষম উপায়। ভারতের সে লক্ষ্য পূরণে শেখ মুজিব দেশকে বহুদূর এগিয়ে নিয়েছিল। অর্থনৈতিক মেরুদ্ণ্ড গুড়িয়ে সে দেশটিকে সে ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত করেছিল। তার হটাৎ মৃত্যুতে দেশ সে যাত্রায় বেঁচে যায়। কিন্তু ভারত তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুৎ হয়নি। দেশধ্বংসী সংঘাতকে আরো তীব্রতর করার দায়ভারটি চাপিয়েছে এবার হাসিনার উপর। সে লক্ষ্যেই মুজিবের মৃত্যুর পর ভারতের রাজধানীতে প্রতিপালিত হাসিনাকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। ভারতের শাসক মহল জনগণের ভোটের তোয়াক্কা করে না, তাই বেছে নিয়েছে ভোট ডাকাতির পথ। তারা নির্ভর করে নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির উপর। ভারতের কারণেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

কথা হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের যে দখলদারি -সেটির শুরু তো আজ নয়। এটিই তো বাঙালীর একাত্তরের প্রকৃত অর্জন। ভারতীয় স্বার্থের গোলামেরা শিকল পড়া কুকুরের ন্যায় সেটিকেই পরম স্বাধীনতা বলে এবং প্রভুর পা চাটে। এবং বিপুল ধুমধামে ১৬ই ডিসেম্বরে ভারতীয় বিজয়কে নিজেদের বিজয় রূপে উৎসব করে। শেখ হাসিনা ও তার সহচরদের কাছে ভারতের এ দখলদারি তো পূজনীয় বিষয়। ভারতীয় দখলদারির বিরুদ্ধে যে কোন প্রতিবাদকে তারা গাদ্দারি বলে। আবরার ফাহাদের ন্যায় প্রতিবাদকারিকে লাশেও পরিণত করে। হাসিনাকে হটানোর অর্থ তাই বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতকে হটানো। হাসিনা জানে, সেটি ভারত কখনোই হতে দিবে না। কারণ ভারতের কাছে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাটেজিক বিষয়। এখানে আপোষ চলে না। ভারত সেটি গোপনও রাখেনি। শেখ মুজিব ও তাজুদ্দীন সেটি জেনেই ভারতীয় গোলামীর রশিটি গলায় পেঁচিয়ে নিয়েছিল। ভারত চায়, বাংলাদেশীদের  বাঁচতে হবে ভারতীয় আধিপত্যকে মেনে নিয়েই। একাত্তরের ন্যায় ভারত যে তার দলের জন্য আরেকটি যুদ্ধ লড়ে দিবে –সেটিও হাসিনা জানে। সেটি শুধু হাসিনার স্বার্থে নয়,বরং ভারতের নিজের স্বার্থেও। তাই জনসমর্থণ বিলুপ্ত হলেও হাসিনার দাপট কমছে না। স্বাধীনতার লড়াই তাই কিছু মিটিং-মিছিলে শেষ হবার নয়। এ লড়াই দীর্ঘ ও রক্তত্ব জিহাদ হতে বাধ্য। কিন্তু বাংলাদেশে যারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি -তাদের সে লড়াইয়ে প্রস্তুতি কতটুকু? ১ম সংস্করণ ১০/০২/১৩; ২য় সংস্করণ ২৯/১০/২০২০।

 

 




উম্মাদিনী জঙ্গি হাসিনা এবং বাংলাদেশীদের জন্য মহাবিপদ সংকেত

ফিরোজ মাহবুব কামাল

হাসিনার উম্মাদিনী রূপ

বাংলাদেশের চালকের সিটে এখন উম্মাদিনী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা যে বহু আগেই সুস্থ্য কাণ্ডজ্ঞান হারিয়েছে -সে প্রমাণ প্রচুর। তাঁর উম্মাদিনী জঙ্গি রূপের কারণ মুলতঃ দুটি। এক). ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টে তার পিতামাতা,ভাই ও বহু আত্মীয়স্বজনের করুণ মৃত্যু। আপনজনদের এমন করুণ মৃত্যু যে হাসিনার মগজের ভূমিতে তীব্র আঘত হানবে -সেটিই স্বাভাবিক। দুই).তার দুর্দমনীয় ক্ষমতা-লিপ্সা। ক্ষমতার অতিলিপ্সা মানুষকে যেমন অতি নিষ্ঠুর করে, তেমনি জ্ঞানশূণ্য উম্মাদেও পরিণত করে। ইতিহাসে সে নজিরও অনেক। তবে মস্তিষ্কবিকৃত মামূলী পাগলগণ গুম,খুন,সন্ত্রাস বা গণহত্যায় নামে না। তাদের হাতে বাকস্বাধীনতা-হরন ও গণতন্ত্র-খুনও হয় না। কারণ তাদের সে ক্ষমতা থাকে না। কিন্তু ক্ষমতা-পাগল শাসকদের হাতে সেগুলি অতি বীভৎস ভাবে হয়। রাজক্ষমতা পাওয়ার স্বার্থে বহু রাজপুত্র অতীতে এমন কি নিজ পিতাকে হত্যা বা অন্ধ করেছে। এমন ক্ষমতা-পাগলরাই দেশে দেশে মীর জাফর হয়। নিজ-গদি নিরাপদ করতে গিয়ে এরা গণতন্ত্রকে যেমন হত্যা করে, তেমনি দেশবাসীকেও গুলির খাদ্য বানায়। বাংলাদেশে বড় বড় বিপদগুলো তো এসেছে এরূপ ক্ষমতালিপ্সু উম্মাদদের হাতে। ক্ষমতা-পাগল শেখ মুজিব একাত্তরে দেশবাসীকে প্রকাণ্ড একটি যুদ্ধ উপহার দিয়েছিল। নিজের ক্ষমতালাভকে সহজ করতেই মুজিব ভারতীয় হানাদার সেনাবাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ডেকে এনেছিল। আর তাতে হাজার হাজার কোটি টাকার যুদ্ধাস্ত্র ও সম্পদ ভারতীয় সেনাদের হাতে লুট হয়েছিল। মুজিবের হাতে ক্ষমতা যাওয়ায় স্বাধীনতা আসেনি, বরং গণতন্ত্র লাশ হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বাকশাল। নিজের গদি বাঁচাতে মুজিব হত্যা করেছিল তিরিশ হাজারের বেশী বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে। এবং স্বাধীনতার নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ভারতের গোলামী। মুজিব-কন্যা হাসিনা সে গোলামীকে আরো তীব্রতর করেছে এবং অসম্ভব করেছে গণতন্ত্রচর্চা।

মুজিবের পথ ধরে হাসিনাও জন্ম দিচ্ছে আরেক যুদ্ধের। এবং সেটি আসছে গৃহযুদ্ধ রূপে। গৃহযুদ্ধের জন্য যা জরুরী তা হলো জনগণের মাঝে তীব্র বিভাজন ও ঘৃণা। আর হাসিনা তার দীর্ঘ দুঃশাসনে বিভাজন ও ঘৃণা -এ দুটিই সবচেয়ে বেশী বাড়িয়েছে। জনগণে ঘৃণার সে উত্তাপ যে কতটা তীব্র সেটি আওয়ামী লীগের কিছু নেতারা নিজেরাও টের পাচ্ছে। তারাও বলছে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুৎ হলে বহু লক্ষ আওয়ামী লীগ কর্মীর প্রাণ যাবে। এতো ঘৃনার মাঝে তারা যে এখনো বেঁচে আছে -সেটি পুলিশ ও সেনাবাহিনীর পাহারাদারীর কারণে। নিজেদের বাঁচাটি নিশ্চিত করতে তাই ক্ষমতায় থাকতেই তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে চায়। চায় একটি যুদ্ধ। তেমন একটি যুদ্ধের প্রস্ততিতে আওয়ামী লীগের ক্যাডারগণ কিছু কাল আগে পুলিশী ও র‌্যাব প্রহরায় ঢাকায় শাহাবাগের মোড় দখল করে ধ্বনি তুলেছিল,“একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেক বার”।

উদ্দেশ্যটি এখানে সুষ্পষ্ট। তারা শত্রু মনে করে ইসলামপন্থিদের। একাত্তরে যেসব ইসলামপন্থিদের নির্মূল করতে পারিনি,এবার নেশা চেপেছে তাদের নির্মূলের। শ্লোগান তুলেছে রাজাকার হত্যার। এ এজেন্ডা ভারতীয়দেরও। রাজাকারের সংজ্ঞাও তারা বেঁধে দিয়েছে। একাত্তরের পর জন্ম নেয়া কোন বালকও যদি ইসলামের পক্ষে ও ভারতীয় দখলদারির বিরুদ্ধে কথা বলে –তাদের সংজ্ঞায় সে নির্মূলযোগ্য রাজাকার। তেমন একটি পরিচয় এঁটে দিয়ে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে অতি নৃশংস ভাবে হত্যা করা হলো। এর আগে ঢাকার রাজপথে লগি-বৈঠা নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বহু নিরীহ ইসলামপন্থিদের।

 

‘হট হেডেড’ শেখ হাসিনা

শেখ হাসিনার ভয়ংকর উম্মদনার পিছনে যেটি কাজ করছে সেটি শুধু ক্ষমতার লিপ্সা নয়, বরং সেটি হলো প্রচণ্ড প্রতিশোধ-লিপ্সা। প্রতিশোধ নিতে চায় তারা তার পিতা-মাতা,ভাই-ভাবী ও আত্মীয়স্বজন হত্যার। তার রাজনীতির এটিই হলো মূল এজেন্ডা, বাংলাদেশের উন্নয়ন বা কল্যাণ নয়। শান্তি ও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাও নয়। দেশবাসী চোর-ডাকাত-সন্ত্রাসী মূক্ত নিরাপদ জীবন পাক, শিক্ষাঙ্গণে শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি হোক, গ্রামেগঞ্জে শিল্পকরখানা গড়ে উঠুক বা দেশে পদ্মাসেতুর ন্যায় আরো বহু সেতু নির্মিত হোক -সেটি তার প্রায়োরিটি নয়। মনের সে প্রবল আখাঙ্খাটি হাসিনা কখনো গোপন রাখেনি। এজন্যই দেশ চুরি-ডাকাতি, গুম,খুন, সন্ত্রাস ও ধর্ষণে ডুবে গেলেও সেগুলি দমনে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়না। আগ্রহ শুধু নিজের নিরাপত্তায়।মানসিক দিক দিয়ে একজন অসুস্থ্য ব্যক্তিকে ক্ষমতায় রাখার বিপদ যে কতটা ভয়ানক হতে পারে –চুরিডাকাতি, গুম, খুন ও ধর্ষণের বাংলাদেশ হলো তারই প্রমাণ।

মানুষ সুস্থ্যতা পায় শুধু দেহের সুস্থ্যতায় নয়, বরং সে জন্য জরুরী হলো মনের সুস্থ্যতাও। অধিক শোকে এবং প্রতিশোধের প্রচণ্ড নেশায় মনের সে সুস্থ্যতা বিনষ্ট হয়। সুস্থ্যতার লক্ষণ কি শুধু পানাহার,চলাফেরা ও কথাবলার সামর্থ্য? সে সামর্থ্য বহু পাগলেরও থাকে। মনের অসুস্থ্যতা শারিরীক বল,দেহের বসন ও সাজ-সজ্জাতে ধরা পড়ে না। কে পাগল বা পাগলিনী সেটি কারো গায়ে লেখা থাকে না। ধরা পড়ে তার কথা,আচরণ ও কর্মের ভারসাম্যহীনতায়। উন্মাদের দেহীক বল থাকলেও থাকে না মানসিক সুস্থ্যতা বা ভারসাম্যতা। কথায় কথায় সে ডিগবাজি দেয়। তাই সে উন্মাদ। শেখ হাসিনার আচরণে কি সেটিই ধরা পড়ে না? সে অসুস্থ্যতার সাক্ষ্য দিয়েছে বাংলাদেশের হাইকোর্টের ফুল বেঞ্চ। আদালত অবমাননার এক রায়ে বিচারকগণ তাকে “হটহেডেড” বলে  অভিহিত করেছিলেন। “হটহেডেড” হওয়াটি মানসিক সুস্থ্যতার সার্টিফিকেট নয়। সুস্থ্য মানুষ যেমন পথ চলায় এদিক-ওদিক হেলে পড়ে না, তেমনি কথা বলাতেও উলোট পালোট করে না। কিন্তু সেরূপ ভারসাম্যতা মানসিক অসুস্থ্যতায় অসম্ভব।

শেখ হাসিনা যে মানসিক ভাবে ভারসাম্যহীন তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। সে সময় শেখ হাসিনা ঘোষণা দেয়, এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সাথে গাদ্দারি করলে সে চিহ্নিত হবে জাতীয় বেঈমান রূপে। অথচ এ ঘোষণার পরের দিন হাসিনা নিজেই আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ায়। পরে এরশাদের পাতানো নির্বাচনে যোগ দিয়ে গৃহপালীত বিরোধী দলের সংসদীয় নেত্রীর দায়িত্ব নেয়। এটি কি কোন সুস্থ্য ব্যক্তির কাজ হতে পারে? তার মনের ভারসাম্যহীন চরম অস্থিরতা দেখা যায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নিয়েও। পদ্মা সেতু প্রকল্পটি ছিল ৪ মাইল দীর্ঘ লম্বা এক বিশাল সেতু নির্মাণের। প্রস্তাবিত ঋণ ছিল প্রায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারের, যার মধ্যে ১২০ কোটি ডলার দেয়ার কথা ছিল বিশ্বব্যাংকের। বাংলাদেশের ইতিহাসেই এটিই ছিল সবচেয়ে বৃহৎ প্রকল্প। বাংলাদেশ সরকারের একার পক্ষে এতবড় প্রকল্পের জন্য অর্থ জোগান দেয়া ছিল অসম্ভব। এর পূর্বে এর অর্ধেক খরচের প্রকল্পের জন্যও বিদেশীদের কাছে হাত পাততে হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পদ্মাসেতুর গুরুত্বটি বিশাল। কিন্তু মন্ত্রীদের দুর্নীতির কারণে বিশ্বব্যাংক ঋণদান স্থগিত করে দেয় এবং দাবী করে মন্ত্রী ও অফিসারদেতর বিরুদ্ধে দূর্নীতি তদন্তের। শেখ হাসিনা প্রথমে দূর্নীতিবাজদের বিচার দূরে থাক, দূর্নীতি যে হয়েছে সেটাই অস্বীকার করে। বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাগণ দূর্নীতর প্রমাণ পেশ করলেন এবং দাবী করলেন ঋণ পেতে হলে দূর্নীতিপরায়নদের বিচার করতে হবে। অন্য দিকে পদ্মাসেতু ছিল তার নির্বাচনি ওয়াদা,এবং সেতু গড়তে হলে ঋণও জরুরী। বাধ্য হয়ে শেখ হাসিনা তখন বিচারে রাজী হয়,এবং বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার জন্য দেনদরবারের কাজে লোকও পাঠায়। কিন্তু দূর্নীতির দুই মূল হোতা এবং তাঁর সরকারের দুই সাবেক মন্ত্রীকে বিচারের বাইরে রাখে। বিশ্বব্যাংক তাতে খুশি হয়নি। ফলে বাতিল করে দেয় সম্পন্ন ঋণদান প্রকল্পটি। মুখে চুনকালি লাগলো শুধু শেখ হাসিনার সরকারের শুধু নয়, সমগ্র বাংলাদেশীদেরও। বিশ্বব্যাংকের এ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী চিত্রিত হলো চোরডাকাতের দেশরূপে। চোরডাকাতকে কে ঋণ দেয়? দেশটি অর্থ কর্জ পাওয়ারও যে অযোগ্য -সেটিও বিশ্ববাসীর কাছে বিশ্বব্যাংক জানিয়ে দিল। ফলে ঋণদান থেকে পিছিয়ে গেল জাপান,এশিয়ান ডেভোলপমেন্ট ব্যাংক ও ইসলামি ডেভোলপমেন্ট ব্যাংক। কিন্তু এতবড় বেইজ্জতির পরও শেখ হাসিনার লজ্জা হয়নি। বরং নতুন সুরে বলা শুরু করলো, তার সরকারই বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নিবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। সরকারের অন্যান্য মন্ত্রীরা বলছে,তারা দেশের অর্থে পদ্মা সেতু গড়বে। ভাবটা যেন, ব্শ্বি ব্যাংক ঋণ দিতে দু’পায়ে খাড়া ছিল এবং বাংলাদেশই সেটি নিবে না বলে তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছে। অথচ বিশ্বব্যাংক থেকে সেতু নির্মাণ হলে আজ থেকে অন্ততঃ ৫ বছর আগেই সেতুর  উপর দিয়ে গাড়ি চলতো।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান নিয়েও কি হাসিনার ডিগবাজিটা কম ভারসাম্যহীন? একসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে তাকে রাজপথে দেখা গেছে। অথচ ক্ষমতায় গিয়ে নিজেই সে বিধানকে আদালতের মাধ্যমে বাতিল করার ব্যবস্থা নিল। এখন দোষ খুঁজছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে। ২০১৩ সালের ৫ই মে তার শাসনামলে শাপলা চত্ত্বরে গুলি চালিয়ে শত শত মানুষকে নিহত ও আহত করা হয় এবং রক্তাত্ব হয় মতিঝিলের রাজপথ। কিন্তু হাসিনা বললো, সেখানে কোনরূপ গুলি চালানো হয়নি। কৌতুকের সুরে হাসিনা আরো বললো, হেফাজতের লোকেরা গায়ে রং মেখে রাস্তায় শুয়ে ছিল, পুলিশ দেখে তাঁরা দৌড়িয়ে পালিয়েছে। প্রশ্ন হলো, মানসিক ভাবে সুস্থ্য হলে কোন ব্যক্তি কি সেদিনের সে বীভৎস ও অতি নৃশংস হত্যাকান্ড নিয়ে এরূপ প্রলাপ বকতে পারে?

 

দেশধ্বংসী জঙ্গিবাদ

দেহের বেদনার চেয়ে মনের বেদনাটি বড়ই তীব্র। এবং প্রিয়জনদের মৃত্যুটা যদি নৃশংস ও মর্মন্তদ রূপে হয় তখন সে শোক সহ্য করা আরো কষ্টকর হয়ে পড়ে। দেহের ব্যথা ঔষধে সারে,কিন্তু মনের ব্যথা সারে না। হারানো আপনজনদের সে স্মৃতিটি মনের পর্দায় বার বার অসংখ্যবার হাজির হয়। মৃতদের প্রাণহীন করুণ মুখগুলি তখন আরো অস্থির করে তূলে। যখন তখন তাদের সে স্মৃতি সমগ্র চেতনা জুড়ে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দেয়। ধারালো ছুড়ির ন্যায় সে স্মৃতিগুলো মনের পটে দিবারাত্র খোঁচাতে থাকে। ফলে বাড়ে মানসিক অস্থিরতা,বাড়ে ভারসাম্যহীনতা এবং সে সাথে বাড়ে উম্মাদনা। এরূপ স্মৃতি তাদেরকে অতি প্রতিহিংসাপরায়ন করে তোলে। তখন মারা পড়ে বিবেকবোধ ও মানবতা। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে কি সেটিই ঘটছে না? একমাত্র আল্লাহর উপর প্রবল আস্থাশীল ব্যক্তিই মনের সে যাতনা থেকে মুক্তি পায়।

সেক্যুলার ব্যক্তিদের রাজনীতিতে যেমন ইসলাম থাকে না,তেমনি চেতনাতেই আল্লাহর উপর আস্থাও থাকে না। ফলে সে প্রচণ্ড প্রতিহিংসা থেকে মুক্তির পথ পায় না। মানব-ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় গণহত্যাগুলি হয়েছে এরূপ প্রতিহিংসায়। প্রতিহিংসতার সে লেলিহান আগুনে  বিগত দুটি বিশ্বযুদ্ধে প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানী বিমান হামলার প্রতিশোধ নিয়েছে দুটি আনবিক বোমা নিক্ষেপ করে। নিউয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের বদলা নিয়েছে আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়া –এ তিনটি মুসলিম দেশ ধ্বংস করে। তিন হাজার মানুষের হত্যার বদলা নিতে তারা প্রায় ১৫ লক্ষ মুসলিমকে হত্যা ও পঙ্গু করেছে। বহু লক্ষ মানুষকে উদ্বাস্তু করেছে। একই রূপ প্রতিহিংসা পরায়নতার কারণে হাসিনাও তাই নিজ দলের ক্যাডারদের এক লাশের বদলে দশ লাশ ফেলতে বলেছে। শরিষার দান পরিমাণ ঈমান থাকলে কেউ কি এমন কথা বলতে পারে?

গাড়ীর সকল যাত্রী অস্থির,অসুস্থ্য ও উদভ্রান্ত হলেও গাড়ী খাদে পড়ে না। কিন্তু ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যদি ভারসাম্যহীন অস্থির মতির উম্মাদ চালকের সিটটি দখলে নেয়। তেমনি মানসিক ভাবে ভারসাম্যহীন ব্যক্তি গৃহিনী বা সাধারণ নাগরিক হলে দেশের ক্ষতি হয় না। কিন্তু দেশ মহাবিপর্যয়ে পড়ে যদি দেশের প্রশাসন,বিচার বা রাজনীতি এমন অসুস্থ্য ব্যক্তির হাতে যায়। এবং  খোদ প্রধানমন্ত্রী ভারসাম্যহীন হলে চরম বিপর্যয়ে পড়ে সমগ্র দেশ। বাংলাদেশের আজকের বিপদের মূল কারণ তো এখানেই। উন্নত দেশের সমাজবিজ্ঞানীগণই শুধু নয়,সাধারণ নাগরিকগণও এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বুঝে। তাই প্রধানমন্ত্রীর ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর আগে শুধু দেহের স্বাস্থ্য পরীক্ষাই শুধু জরুরী নয়, অতি অপরিহার্য হলো মনের স্বাস্থ্যের খুঁটিনাটি যাচাই করা। শোক-কাতর অসুস্থ্য মানুষতো নিজ ঘরেও বাসের অযোগ্য হয়; ফলে তাকে মানসিক পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। তার জন্য বিরিভমেন্ট কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। একমাত্র মানসিক ভাবে পুরাপুরি সুস্থ্য ও স্বাভাবিক করার পরই এমন ব্যক্তিকে পরিবারে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু হাসিনার ক্ষেত্রে সে বিচার আদৌ হয়নি। সে যে মুজিবের কন্যা, শুধু সে বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে, তার উম্মাদনা নয়। ফলে দখলে নিতে পেরেছে প্রধানমন্ত্রীর আসনটি। ফলে দেশবাসীর বিপদও তাতে দিন দিন ভয়ানক রূপ নিচ্ছে।

 

প্রতিশোধের জঙ্গি রাজনীতি

পশুর নৃশংস লড়াইয়ে দর্শন বা বিচারবোধ কাজ করে না।পশু মাফ করতেও জানে না। আহত বাঘ-ভালুক তাই লড়ায়ে আরো হিংস্রতর হয়। পশুর জীবনে যেটি অতি হিংস্র রূপে কাজ করে সেটি হলো প্রতিশোধের স্পৃহা। মানব জীবন থেকে ধর্ম ও মানবতা বিলুপ্ত হলে মানুষও পশুর ন্যায় প্রতিহিংসা পরায়ন হয়। কিন্তু যাদের কাছে আল্লাহর ভয় আছে,শরিয়তী বিধান আছে,পরকালের পুরস্কার ও শাস্তির ধারণা আছে,তাদের কাছে প্রতিশোধের উর্দ্ধে উঠে মহত্তর কিছু করার প্রেরণা থাকে। প্রতিশোধের চেয়ে মাফ করতে তারা বেশী আগ্রহী হয়।ফলে শত্রু অধিকৃত মক্কা বিজিত হওয়ার পর মুসলিমদের হাতে শহরটিতে রক্তপাত হয়নি। কিন্তু যারা সেক্যুলার ও পরকালে বিশ্বাসহীন, তাদের পক্ষে শত্রুর সাথে আচরণে এরূপ সদয় হওয়াটি অসম্ভব। দলীয়,গোত্রীয় বা বর্ণবাদী বন্ধনের উর্দ্ধে উঠে উন্নত মানবিক মূল্যবোধ,বিচারবোধ বা চিন্তাভাবনা নিয়ে বিচার-বিবেচনার সামর্থ্য তাদের থাকে না। তাদের জীবনে বড় বিকলঙ্গতা হলো এটি। দৈহিক বিকলঙ্গতায় ব্যক্তির শক্তি-সামর্থ্য কমলেও তাতে সমাজ ও রাষ্ট্রের তেমন ক্ষতি হয় না, অথচ ভয়ানক ক্ষতি হয় মানসিক বিকলঙ্গতায়। বিপদের আরো কারণ, পশু সমাজের  ন্যায় অসভ্য সমাজে এমন বিকলঙ্গতা নিয়ে বিচার হয় না। বরং প্রবলতর করা হয়, প্রতিশোধ-পরায়নতাকে। প্রতিশোধের জজবাকে বেশী বেশী উস্কে দেয়াই তখন গোত্রীয় বা দলীয় নেতাদের প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়ায়। এরূপ প্রতিশোধের মাঝে তারা নিজেদের গৌরব খুঁজে। এমন সমাজে তাই অনিবার্য হয়ে উঠে রক্তাত্ব সংঘাত। সেক্যুলার রাজনীতির এটিই হলো সবচেয়ে ভয়ংকর দিক। তাদের হাতে তাই ভয়ানক রক্তপাতগুলি শুধু যুদ্ধে হয় না, বরং হয় প্রতিপক্ষের আত্মসমর্পণের পরও। বিনা রক্তপাতে মুসলিমদের হাতে যেরূপ শহরের পর শহর বিজিত হয়েছে, সেক্যুলারিস্টগণ সেটি ভাবতেও পারে না। বরং আত্মসমর্পণে উদ্যত রাষ্ট্রের উপরও তারা আনবিক বোমা ফেলে। যেমনটি জাপানের উপরে হয়েছে। একাত্তরে পাকিস্তান বাহিনীর পরাজয়ের পর লক্ষ লক্ষ অবাঙালী ও ইসলামপন্থিদের উপর যেরূপ নৃশংস হত্যা,লুটতরাজ ও নির্যাতন নেমে আসে সেটি তো ইসলাম থেকে দূরে সরা বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের বিজয়ী হওয়ার পর।

যুগে যুগে মানুষের জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রতিশোধের সে ধারাকে অব্যাহত রাখতে। ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগে আরবের কাফেরগণ শত শত বছর ধরে চালু রাখতো প্রতিশোধের যুদ্ধ। নিজ গোত্রের একজনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধ শুরু হতো তা আর থামতো না, যুগ যুগ তা বেঁচে থাকতো। অসংখ্য গান, কবিতা ও কিচ্ছা লেখা হতো প্রতিশোধের সে স্পৃহাকে আরো তীব্রতর করতে। এমন সমাজে আপোষ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগ গণ্য হতো ভীরুতা ও কাপুরষতা রূপে। একই কান্ড ঘটেছে ইউরোপে। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে যুদ্ধ চলেছে শতবছর ধরে। ইউরোপের ইতিহাসে এ যুদ্ধটি শতবছরের যুদ্ধ রূপে পরিচিত।বাংলাদেশেও আজ  শুরু হয়েছে একই তাণ্ডব। খোদ একাত্তরে ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে ভারতপন্থিদের শিবির থেকে যে ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছিল এখন সে ঘৃনায় আরো ঘি ঢালা হচ্ছে। ফলে সে ঘৃণা আজ একাত্তরের চেয়েও তীব্রতর। আর এরূপ ঘৃণা থেকে কখনোই সৌহার্দ্য বা সম্প্রীতি জন্ম নেয় না; জন্ম নেয় যুদ্ধ। ফলে গৃহযুদ্ধের যে সম্ভাবনাটি একাত্তরে ছিল না, এখন সেটি প্রবল। ফলে ভারতপন্থিদের রাজনীতিতে বেড়েছে ইসলামপন্থিদের নির্মূলের সুর। একাত্তরে শেখ মুজিব ও তাঁর অনুসারিগণ ভারতীয়দের অস্ত্র নিয়ে রক্তঝরানোর যে রাজনীতি শুরু করেছিল সেটি আর থামতে দেয়া হচ্ছে না। বরং সেটিকে কি করে আরো তীব্রতর করা যায় বেড়েছ সে আয়োজন। নর্দমার কীট যেমন আবর্জনায় বাঁচে, বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণও তেমনি বেঁচে আছে ঘৃণা ছড়ানোর সংস্কৃতিতে। তাদের মন যে কত বিষপূর্ণ সেটিই বেরিয়ে এসেছে ২০১৩ সালৈল ফেব্রেয়ারি মাসে ঢাকার শাহবাগের চৌরাস্তার বক্তৃতা-বিবৃতি,ব্যানার,কার্টুন ও ছবি থেকে। সেটি আরো বুঝা যায় বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ব্লগে ইসলামের বিপক্ষ ব্যক্তির লেখা থেকে।

বাংলাদেশের মানুষদের বিরুদ্ধে মুজিবের অপরাধ অনেক। তবেই বাংলাদেশীদের মাঝে ঘৃণার বীজ রোপনই হলো তার সবচেয়ে বড় অপরাধ। সে বীজ এখন বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। মুজিব মরে গেছে, কিন্তু দিয়ে গেছে রক্তপাতের আত্মঘাতি রাজনীতি। সে রাজনীতির মূল এজেন্ডা হলো, একাত্তরের ন্যায় বাংলার মাটিতে ভারতের অস্ত্র আবার গর্জে উঠুক এবং লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীর প্রাণ যাক। তাই এবার ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ নির্মূলে হাত দিয়েছে তাদের যারা একাত্তরে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিল। তবে আওয়ামী লীগের নির্মূলের টার্গেট শুধু একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিরা নয়। একাত্তরে পরে যারা তাদের রাজনৈতীক শত্রুতে পরিণত হয়েছে নির্মূল করতে চায় তাদেরও। কারণ আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষগণ যে শুধু একাত্তরে ছিল -তা নয়। একাত্তরের পর যেমন পঁচাত্তরে ও একানব্বইয়ে ছিল,তেমনি ২০০১য়েও ছিল। এবং আজও  আছে। তাই প্রতিশোধমূলক আঘাত থেকে কাউকে তারা ছাড় দিতে রাজী নয়। তাই শুধু জামায়াত বা মুসলিম লীগ নেতাগণ নয়ই, বিএনপি, হিজবুত তাহরির,ইসলামি ঐক্যজোটের নেতাগণও তাদের হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

 

বিপদ বাড়ছে বাংলাদেশের

হাসিনার জীবনে শোকের দিনটি হলো ১৯৭৫যের ১৫ই আগষ্ট। সেদিনই তার বহু আপনজন নিহত হয়। খুনের ঘটনা কোন জাতির জীবনেই নীরবে যায় না। সে স্মতি থেকে প্রতিশোধ-পরায়ন বহু হিংস্র মানুষের জন্ম হয়। বাংলাদেশেও সেটি হয়েছে।সেটি যেমন একাত্তরের খুন থেকে হয়েছে,তেমনি হয়েছে পরবর্তি আমলের খুন থেকেও। আজও  যে গুম-খুন গুলো হচ্ছে, সেগুলোও নীরবে হারিয়ে যাবে না। তাই যারা শান্তি চায়, তাদের কাজ হয় যে কোন ভাবে রক্তপাত কমানো। শান্তি প্রতিষ্ঠায় এর চেয়ে বড় হাতিয়ার নাই। অথচ মানসিক অসুস্থ্যদের আচরণটিই ভিন্ন। চারিদিক শোক আর আহাজারি ছড়িয়ে তারা আনন্দ পেতে চায়। শেখ হাসিনাও আনন্দ পেতে চায়,বাংলাদেশীদের জীবনে লাগাতর শোক সৃষ্টি করে। একেই বলা হয় উম্মাদিনীর উল্লাস। তাই সে এক লাশের বদলে দশটি লাশ ফেলতে বলে। এভাবে কেড়ে নেয়া হচ্ছে অসংখ্য মানুষের পিতা, পু্ত্র, স্বামী, ভাই ও আপনজন। একাজে মাঠে নামানো হয়েছে দলীয়কর্মীদের পাশে পুলিশ ও র‌্যাব বাহিনীকে। ইলিয়াস আলী গুম হলো,সাগর-রুনি খুন হলো, বহু জামাত-শিবিরকর্মীগণ নিহত হলো -তা তো সে পরিকল্পনার অংশরূপেই। অথচ তার আপনজনদের মৃত্যুর সাথে কোন রাজাকার জড়িত ছিল না,বরং তাদের খুনে জড়িত ছিল তার পিতার অনুসারি ও মুক্তিবাহিনীর লোকেরা। তবে কোন উম্মাদিনীর টার্গেট হওয়ার জন্য কি কোন অপরাধ করার প্রয়োজন পড়ে? সামনে পড়াটাই তো অপরাধ। পাকিস্তান আর্মির লোকেরা আজ হাসিনা সামনে নাই,তাই তারা টার্গেটও নয়। সামনে যেহেতু বিএনপি-জামায়াত-শিবির, হিজবুত তাহরির ও হেফাজতে ইসলাম, ফলে তারা রেহাই পাচ্ছে না।

 

প্রতিশোধের রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় মেশিনারি

শেখ হাসিনা আজ ক্ষমতাসীন। ফলে তার হুকুমের আঁওতায় পুলিশ, প্রশাসন, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীসহ বিশাল রাষ্ট্রীয় মেশিনারি। একারণে তার প্রতিশোধের সামর্থ্যও প্রচুর। ইসলামপন্থিদের নির্মূল ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা রুখতে আরব কাফের গোত্রদের যে সামর্থ্য ছিল তার চেয়ে হাসিনার সামর্থ্য অনেক বেশী। আরবের যুদ্ধ-পাগল গোত্রগুলোর কাছে ইসলামের নির্মূলে লক্ষাধিক পুলিশ ছিল না,বিশাল র‌্যাব-বাহিনী ছিল না,হাজার হাজার দলীয় কর্মীও ছিল না। তাদের হাতে ছিল না বিশাল সামরিক বাহিনী বা বহুলক্ষ মানুষ নিয়ে গড়া প্রশাসন ও কোর্টকাচারি। শেখ হাসিনার হাতে এর সব কিছুই রয়েছে। তাছাড়া তার পাশে রয়েছে সর্ববৃহৎ মুশরিক কবলিত দেশ ভারত। তবে যে নিরীহ ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আঘাত হানা হচ্ছে তাদের আহত ও ক্ষত-বিক্ষত করুণ মুখগুলোও ইতিহাসে নীরবে হারিয়ে যাবে না। প্রতিশোধমুখি বহু মানুষের জন্ম সে স্মৃতি থেকেও হবে। ফলে অনিবার্য হবে সংঘাত। এখানেই শেখ হাসিনা ও তার অনুসারিদের ভয়। তাই শেখ হাসিনাও বাংলাদেশকে আর নিরাপদ ভাবছে না, সেটি বুঝা যায় নিজের পুত্র-কন্যাদের বিদেশে রাখাতে। যে কোন গণদুষমন স্বৈরাচারির ন্যায় হাসিনাকেও বাইরে বেরুতে হয় দেশবাসীর জন্য দেশের রাস্তাঘাট ঘন্টার পর ঘন্টা বন্ধ করে। পিতার ন্যায় একদিন সে সুযোগটুকুও যে তার জুটবে না – তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? তবে তার নিজের জন্য এবং সে বাংলাদেশীদের জন্য মহা বিপদটি হলো কোন উম্মাদিনীরই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার সামর্থ্য থাকে না।  ১ম সংস্করণ ১০/০২/১৩; ২য় সংস্করণ ২৮/১০/২০২০।

 

 




শেখ হাসিনার নাশকতার রাজনীতি ও বাঙালী মুসলিমের বিপদ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 গাদ্দারিটি ইসলাম ও দেশবাসীর সাথে

প্রতি দেশের বৈধ শাসকই দেশবাসীকে প্রতিনিধিত্ব করে। শেখ হাসিনার ধর্মীয় পরিচয় বা বিশ্বাসটি স্রেফ তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় নয়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলাদেশের জনগণের কাছেও। কারণ তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী না হযে তিনি একজন সাধারণ মহিলা হলে নিজস্ব বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা নিয়ে যেখানে ইচ্ছা সেখানে ঘর বাঁধতে পারতেন বা হারিয়েও যেতে পারতেন। বহু নাস্তিক,বহু কম্যুনিষ্ট এবং বহু হিন্দু-বৈদ্ধ-খৃষ্টান ইসলামের প্রতি অবিশ্বাস নিয়ে বাংলাদেশে বসবাস করে। কত বাংলাদেশীই তো মদ-গাজা-হিরোইন খায়। কত বাঙালীই তো কতকিছু লেখে বা বলে। বহুলক্ষ বাঙালীই তো নানা দেশে নিজ ধর্ম ও নিজ সংস্কৃতির বাঁধন ছিন্ন করে খড়কুটোর ন্যায় হারিয়েও যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে কি সেটি সাজে? সরকার-প্রধান রূপে তাঁর একটি দায়বদ্ধতা আছে। সেটি বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চিন্তা-চেতনা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি।

একটি মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কাজ শুধু বিদেশী হামলা থেকে দেশের সীমান্ত বাঁচানো নয়। তাঁকে বাঁচাতে হয় জনগণের ধর্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আদর্শকেও। তাঁর দায়বদ্ধতা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ঈমান-আক্বীদা বাঁচানোর। মুসলমানরা পৃথক রাষ্ট্র নির্মান করে তো সে প্রয়োজনেই। ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা যে পশ্চিম বাংলার ন্যায় ভারতে বিলীন হয়নি তা তো সে কারণেই। শেখ হাসিনার বড় গাদ্দারিটি ভারতের জন্য ট্রানজিট দেয়া নয়। বাংলাদেশের বাজার, নদীর পানি বা ১২৩৯ একর জমি ভারতের হাতে তুলে দেয়াও নয়। বরং সেটি বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ঈমান-আক্বীদার সাথে গাদ্দারি।সে গাদ্দারির ফলেই বাংলাদেশের আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন আজ  শত্রু দ্বারা অধিকৃত এবং বিপুল ভাবে পরাজিত ইসলাম ও শরিয়তি বিধান।   

বাংলাদেশ ভারত, নেপাল বা ভূটান নয়। ইউরোপ-আমেরিকার একটি দেশও নয়। বাংলাদেশের জনগণের শতকরা ৯০ ভাগ হলো মুসলিম। আর মুসলিম হওয়ার অর্থই হল একটি মিশন নিয়ে বাঁচা। তবে সে মিশন শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাতে পালিত হয় না। বরং বিপ্লব আনতে হয় রাজনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতায়। ঈমানদারের সে বিপ্লব নিজের বিশ্বাস,আচরণ ও সংস্কৃতি থেকে শুরু হলেও সেখানে এসে সেটি থেমে যায় না। বিপ্লব আনে সমাজ ও রাষ্ট্রে। এমন কি পশুপাখি,পোকামাকড়ও যেখানে বাস করে সেখানকার পরিবেশটি তারা পাল্টিয়ে দেয়। ইসলামের বিজয়ের পর আরবের বুক থেকে তাই বিদায় নিয়েছিল কাফেরদের রাজনীতি,সমাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতি,এবং সে ভূমিতে নির্মিত হয়েছিল সম্পূর্ণ এক নতুন সভ্যতা।

তাই বাঙালী মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও রাজনীতি পশ্চিম বাংলার হিন্দু বাঙালীদের থেকে পৃথক হবে সেটি শুধু কাঙ্খিতই নয়, অনিবার্যও। সেটি না হলে বুঝতে হবে মুসলমানের মুসলমান হওয়া নিয়ে প্রকাণ্ড সমস্যা রয়ে গেছে। বরং হিন্দু বাঙালী থেকে সে পার্থক্য কতটা বিশাল ও ইসলামী তার উপরই নির্ভর করবে সে কতটা মুসলিম। কারণ পৌত্তলিকতা ও পৌত্তলিক সংস্কৃতি থেকে কে কতটা দূরে সরলো তা থেকেই বুঝা যায় সে কতটা ইসলামের কাছে আসলো। তাদের থেকে সে বিশাল ভিন্নতার কারণেই ১৯৪৭ সালেই বাঙালী মুসলিমরা বাঙালী হিন্দুদের সাথে ভারতে না গিয়ে অবাঙালী মুসলিমদের সাথে মিলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভারতের নানা প্রদেশের অবাঙালী মুসলমানদের সাথে তাদের ভাষার ভিন্নতা থাকলেও এ জীবনে বাঁচার মূল মিশনটি নিয়ে কোন ভিন্নতা ছিল না। বরং ছিল শতভাগ মিল। অথচ সে মিলটি বাঙালী হিন্দুদের সাথে শতকরা এক ভাগও ছিল না। ফলে শেখ হাসিনা শুধু বাংলায় কথা বলবেন বা বাঙালী রমনীর ন্যায় শাড়ী পড়বেন এবং ভাত-মাছ খাবেন সেটিই যথেষ্ট নয়। বরং তাঁর কথাবার্তা, চিন্তা-চেতনা ও রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের চিন্তা-চেতনা ও ঈমান-আক্বিদার প্রতিফলন ঘটবে -সেটাও জরুরী। নইলে তিনি একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের প্রধানমন্ত্রী হন কোন অধিকারে?

ইসলামের আগে আরবের নেতা ছিল আবু লাহাব বা আবু জেহলের মত পৌত্তলিক কাফেরগণ। ইসলাম বিজয়ী হবার পর এসব কাফেরগণ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। তাদেরকে আস্তাকুঁড়ে ফেলাটাই সে সময়ের বিজয়ী মুসলিমদের জন্য ছিল ঈমানী দায়বদ্ধতা। কাফেরদের স্থলে তখন নেতা হয়েছেন মহান নবীজী (সাঃ)। নবীজী (সাঃ)’য়ের ওফাতের পর নেতা হয়েছেন হযরত আবু বকর (আঃ) এবং তাঁর পর হয়েছেন হযরত ওসমান (রাঃ) এবং তার পর হযরত আলী (রাঃ)। তাদের রাজনীতিতে তাঁরা নিজেরাও সার্বভৌম ছিলেন না, বরং সার্বভৌম ছিলেন একমাত্র মহান আল্লাহ। তারা ছিলেন সে সার্বভৌম মহান আল্লাহর অনুগত খলিফা তথা প্রতিনিধি।

 

দায়িত্বশূণ্য নয় প্রজারাও

ইসলামের রয়েছে পরিপূর্ণ জীবন-বিধান। মহান আল্লাহতায়ালা শুধু ইবাদতের বিধি-বিধান,খাদ্যপানীয়ের হারাম-হালাল, সম্পত্তির বন্টন-বিধি ও ড্রেস-কোডই বেঁধে দেননি, বেঁধে দিয়েছেন বিচার-আচার ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিধানও। ঈমানদারের অধিকার নাই সে বিধিবদ্ধ বিধানের বাইরে যাওয়ার। অন্য কোন ধর্মে এমনটি নেই, ইসলাম তাই অনন্য। মুসলিম শাসকদের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্র জুড়ে সেটির প্রচার,প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষাকে সুনিশ্চিত করা। মুসলিম দেশের শাসকদের জন্য আজও  সেটিই হলো আদর্শ। রাষ্ট্রের প্রজাগণও দায়িত্বশূণ্য নন। তাদের ঈমানী দায়িত্বটি হল,রাষ্ট্র যাতে সে নীতির উপর প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণ প্রতিষ্ঠিত থাকে সেটির প্রতি নজর রাখা। নবীজী (সাঃ)’র প্রদর্শিত পথ থেকে রাষ্ট্র বিচ্যুত হলে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।  তাই খলিফা আবু বকর (রাঃ) যখন নবীজী (সাঃ)র ওফাতের পর খলিফা হন তখন এক সাহাবী তাঁর তরবারিটি খাপ থেকে বের করে বলেছিলেন,“আপনি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)র নীতি থেকে সরে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তবে এ তরবারি দিয়ে আপনাকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলবো।” একজন সাধারণ মুসলিম নাগরিকও রাষ্ট্রের ইসলামী চরিত্র সংরক্ষণে কতটা অতন্দ্র প্রহরী এবং আপোষহীন -এ হলো তার নমুনা।

মুসলিম প্রজা তাই রাষ্ট্র পরিচালনার সব দায়িত্ব সরকারের হাতে দিয়ে নিশ্চিন্তায় ঘুমায় না। পবিত্র কোরআনে এমন মুসলিমকেই তো মহান আল্লাহর সৈনিক বলা হয়েছে -যারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায় (ইউকাতিলুউনা ফি সাবিলিল্লাহ)। এবং যারা সে হুকুমের অবাধ্য, তাদেরকে বলা হয়েছে শয়তানের সৈনিক। তারা যুদ্ধ করে শয়তানের পথে (ইউকাতিলুউনা ফি সাবিলিশ শায়তান)। একারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চরিত্রটি ইসলামী হবে –সেটিই ছিল কাঙ্খিত। সেটি না হলে জনগণের জন্য অসম্ভব বা দুরুহ হয় সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা। সে রাজনীতি বরং বিচ্যুতি বাড়ায় এবং ধাবিত করে জাহান্নামের দিকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সে রূপ বিচ্যুতি করার কাজটাই হচ্ছে অতি  প্রকট ভাবে। এবং সেটি প্রকাশ পাচ্ছে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের নীতিতে। সে বিচ্যুতির কারণেই হিন্দুদের পুঁজা মণ্ডপে গিয়ে দুর্গাপুজারীদের সাথে তিনি একাত্ব হয়ে গেছেন।

 

মহাবিপর্যের মুখে দেশ  

বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য আজ মহাবিপদ। বিপদ এখানে মদ্যপ এক মাতালকে যাত্রীভর্তি বাসের ড্রাইভিং সিটে বসানোর। দেশটির শাসন ক্ষমতায় আজ এমন এক ব্যক্তি যার আস্থা দুর্গার প্রতি। দুর্গার উপর আস্থা নিয়ে কেউ কি আল্লাহর উপর আস্থা রাখতে পারে? পারে না বলেই সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বাণীটি সরানো তার জন্য এতোটা সহজ হয়েছে। হৃদয়ে শরিষার দান পরিমান ঈমান থাকলে সে জান দিত, তবুও আল্লাহর উপর আস্থার বানী কখনোই সরাতো না। তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য,শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠাকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করা। দেশে আজ নানা ধরণের অপরাধী। কেউ বা সরকারি তহবিল তছরুপ করছে, কেউবা ঘুষ খাচ্ছে, কেউবা টেন্ডার বাজী করছে, কেউবা রাস্তাঘাট ও বনভূমির গাছ কেটে নিচ্ছে। এবং সে সাথে কেউবা সন্ত্রাসের মাধ্যমে চাঁদাবাজি করছে এবং দেহব্যবসার ন্যায় পাপাচার ছড়াচ্ছে। এরাই দেশকে আবার তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

ভিক্ষার পাত্রে তলা না থাকলে কেউ ভিক্ষাও দেয় না। ভিক্ষাদাতার তখন বিশ্বাস জন্মে, দেয়া অর্থ পাত্রে থাকবে না। অর্থদান তখন অর্থহীন হবে। একারণে শেখ হাসিনার পিতার আমলে দেশে দুর্ভিক্ষ নেমে আসলেও অনেকে ভিক্ষা দেয়নি। ফলে বিপদ বেড়েছে দেশবাসীর। হাসিনার আমলে তেমনি অবস্থা আবার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক তাই পদ্মা সেতুর অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছে। নইলে এক যুগ আগেই পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়ে যেত। কিন্তু হাসিনা সরকারের তা নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। একারণেই দেশ অপরাধীদের দ্বারা ছেয়ে গেলে কি হবে, পুলিশ অপরাধীদের খুঁজছে না। তাদেরকে গ্রেফতার করে আদালতেও তুলছে না। কারণ, তাদের ব্যস্ততা সরকারি দুর্বৃত্তদের  পাহারা দেয়া। তাই পুলিশ কোমড় বেধেঁ হাজতে তুলছে তাদের যারা দুবৃত্তির অবসান চায়, মানবিক অধিকার চায় এবং  ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা চায়।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আজ শত্রু মনে করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে হ্ত্যাযোগ্য মনে করা হয়। অপর দিকে যা ইচ্ছে করার স্বাধীনতা দেয়া হচ্ছে তাদের যারা দেশ ও ইসলামের শত্রু। কোন ইসলামি দলের পক্ষ থেকে কোন মিছিল-মিটিংয়ের আয়োজন হলেই হাজার হাজার পুলিশ তখন রাস্তায় নামে। শুরু হয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। পুলিশ দিয়ে লাঠি-পেটা করা, লগি-বৈঠা নিয়ে প্রাণনাশ করা বা গ্রেফতারকৃতদের পায়ে ডাণ্ডা-বেড়ি পড়িয়ে কারারুদ্ধ করা -তাই আজ আর কোন অপরাধ কর্ম নয়। গর্হিত কর্মও নয়। বরং এমন অপরাধ কর্মেই যেন শেখ হাসিনা ও তার সরকারের পুলক। সে পুলকের সাথে প্রচণ্ড উৎসব বাড়ে পুজা মণ্ডপে গেলে। পূজা উদযাপনে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় দেখে শেখ হাসিনার মন এতটাই পুলকিত হয়েছে যে দেশে ফসলের উৎপাদনবৃদ্ধি, অর্থনীতিতে ৭% ভাগ প্রবৃদ্ধি, মানুষ সুখ-শান্তিকে তিনি দুর্গার হাতিতে চড়ে আসার সাথে সম্পৃক্ত করে ফেলেন। সরকারের বড় সফলতা বলে যেটিকে তিনি দেখিয়েছেন সেটি হলো, পূজার উৎসবে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষ একাত্ম হয়েছে। যেন দুর্গাপুজার আসরে মুসলমানদের হাজির করাটাকেই তার সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।

 

 ধর্মপালনে কতটুকু স্বাধীনতা মুসলিমদের?

দেশে হিন্দুদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা বেড়েছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কোন মুসলিমের তা নিয়ে আপত্তি থাকারও কথা নয়। কিন্তু ধর্ম পালনে অনুরূপ স্বাধীনতা কতটুকু মিলেছে মুসলিমদের? ইসলামের বিধান শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাতের বিধান নয়। সে বিধানগুলির সাথে রয়েছে শিক্ষা-সংস্কৃতি,আইন-আদালত ও রাজনীতির বিধান। কোরআনে নিদের্শ এসেছে,“আ’মিরু বিল মারুফ ওয়া নিহি আনিল মুনকার” অর্থ ন্যায়র নির্দেশ এবং অন্যায়ের নির্মূল। ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞাও বেঁধে দিয়েছে খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়লে বা নামায-রোযা-হজ-যাকাত পালন করলে মুসলমানের ধর্ম পালন হয় না। ন্যায়র নির্দেশ এবং অন্যায়ের নির্মূল করার কাজে তাকে ইসলামি রাষ্ট্রও গড়তে হয়। নবীজী (সাঃ)এবং তাঁর মহান সাহাবীগণ তো সেটিই করেছেন। সে রাষ্ট্র নির্মাণে প্রতিযুগে মুসলিম উমআহর সবচেয়ে বেশী রক্তক্ষয়, অর্থক্ষয় ও শ্রমক্ষয় হয়েছে। আজও  সত্যিকার মুসলিম রূপে বাঁচা ও বেড়ে উঠার এছাড়া ভিন্ন পথ নেই। এজন্যই আরবের কাফেরদের নামায-রোযা নিয়ে বিরোধীতা ছিল না, বরং তাদের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় হামলাটি হয়েছে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মূলে। বদর, ওহুদ,খন্দক ও হুনায়ুনের ন্যায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলো তারা সংগঠিত করেছে তো সে লক্ষ্যেই।

আর হাসিনা সরকারের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে তেমন একটি ইসলামি রাষ্ট্র যাতে গড়ে উঠার সুযোগ না পায় -তার ব্যবস্থা করা। হাসিনা সরকার তাই চুরি-ডাকাতি-খুন-সন্ত্রাস বন্ধ করা নিয়ে এতটা উদগ্রিব নয় যতটা উদগ্রিব ইসলাম পন্থিদের দল-দফতর ও সভা-সমিতি বন্ধ করায়। তাই দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেলে কি হবে, দারুন ভাবে কমানো হয়েছে ইসলামপন্থিদের কর্মকাণ্ড। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অপরাধ গণ্য হচ্ছে হোস্টেলের রুমে ইসলামি বই রাখা ও ইসলামি স্টাডি সার্কেল করা। নিছক বোরখা পড়ার কারণে অবরুদ্ধ করা হচ্ছে ছাত্রীদের, কোথাও কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকে তাদের বের করে দেয়া হচ্ছে। ছাত্রলীগ কর্মীরা কোথাও কোথাও নিছক নামায পড়ার কারণে সাধারণ ছাত্রদের উপর চড়াও হচ্ছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দাড়িটুপি নিয়ে চলাফেরা করা,বোরখা পড়া চিহ্নিত হচ্ছে জঙ্গিবাদ রূপে।

সম্প্রতি এ বিষয়ে বহু সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। যেমন,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যোসাল ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের চতুর্থ বর্ষের সবুজ নামক একজন ছাত্রকে নিছক নামায পড়ার কারণে ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। মেয়েদের বোরখা পড়ার উপর তারা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সোসিওলজি ডিপার্টমেন্ট। উক্ত ডিপার্টমেন্টে সম্প্রতি চারজন নতুন শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের উপর শর্ত লাগানো হয়, তারা দাড়ী রাখতে পারবে না, ক্লাসে পাঞ্জাবী পড়তে পারবে না এবং কোনরূপ ধর্মীয় প্রতীক নিয়ে ক্লাসে ঢুকতে পারবে না।– (দৈনিক আমার দেশ, ৩রা এপ্রিল, ২০১০)। শুধু ছাত্রলীগের গুন্ডারা নয়, বোরখা-পরিহিত ছাত্রীদের হয়রানিতে নেমেছে এমন কি পুলিশরাও। এ বিষয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিক সাম্প্রতিক খবরটি হল, পিরোজপুরে তিনজন রোরখাপরিহিত ছাত্রীকে কোন রূপ কারণ ছাড়াই পুলিশ একমাসেরও বেশী কাল ধরে গ্রেফতার করে রাখে। এবং নানারূপ হয়রানি মূলক প্রশ্ন করতে থাকে। তাদেরকে একমাত্র তখন ছেড়ে দেয়া হয় যখন সে গ্রেফতারীর বিরুদ্ধে দেশের হাইকোর্ট থেকে নির্দেশ দেয়া হয়। -(আমার দেশ, ১৯ ফেব্রেয়ারি, ২০১০)।  

 

কীর্তনে কি ইজ্জত বাড়ে?

শেখ হাসিনা ভেবেছেন, পূজামণ্ডপে গিয়ে দুর্গাকে মা বললে (যেমনটি তিনি ২০১১ সালের ৫ই অক্টোবর রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির ও রামকৃষ্ণ মিশনে দুর্গা পূজা উপলক্ষে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে বলেছিলেন) বা তার গুণকীর্তন করলেই হিন্দুদের মাঝে তার ইজ্জত বাড়বে। কিন্তু সে কীর্তনে কি ইজ্জত বাড়ে? ইজ্জত যে কতটা বেড়েছে সেটি তো ভারতীয় প্রধাণমন্ত্রী মনমোহন সিং তার বাংলাদেশ সফলে দেখিয়ে দিয়েছেন। দেখিয়েছেন পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। তিস্তা পানিচুক্তি হয়নি, অথচ তারা নিয়ে গেছে করিডোর। এবং সে করিডোর দিয়ে ভৈরব-আখাউড়া রুটে ভারতীয় পণ্যবহনও শুরু হয়ে গেছে।

ইন্দীরা গান্ধীর কাছে প্রচুর মাথা নুইয়েছিলেন তারা পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু তাতে পদ্মার পানি মিলেনি, তিন বিঘা করিডোরও জুটিনি। বরং তাতে বেরুবাড়ী গেছে, পদ্মার পানিও গেছে। তাঁর আমলে সীমান্ত বাণিজ্যের নামে ভারত বাংলাদেশের অর্থনীতির তলা ধ্বসিয়ে দূর্ভিক্ষ উপহার দিয়েছিল। ক্যারান্সি নোট ছাপানোর কন্ট্রাক্ট নিয়ে শত শত কোটির বেশী নোট ছেপে সে নোট দিয়ে লুটে নিয়েছিল সমগ্র বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা নিজেও কোলকাতার এক সভায় প্রধানমন্ত্রী নয়, মুখ্যমন্ত্রী রূপে আখ্যায়ীত হয়েছেন। এই হল ভারতীয়দের কাছে তাঁর মান-সম্মান। তাঁর পিতাকেও দিল্লির শাসকচক্র নিজেদের সেবাদাস ছাড়া বেশী কিছু ভাবেনি।২৫সালা দাসচুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করেছিল তো তেমন একটি ধারণার কারণেই। নইলে কোন স্বাধীন দেশের স্বাধীন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কোন দেশ কি এমন চুক্তি করে?    

 

শেখ হাসিনার ধর্মব্যবসা

সকল ব্যবসারই একটি অভিন্ন লক্ষ্য থাকে। সেটি মুনাফা লাভ। আর সে মুনাফা লাভের লক্ষ্যে ব্যবসায়ী শুধু পূঁজি বিনিয়োগই করে না, সে পূজির পিছনে শ্রম দেয়, মেধা দেয় এবং প্রয়োজনে প্রচুর সময়ও দেয়। বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য যে শুধু হাটবাজারে হয় তা নয়। সবচেয়ে বড় ব্যবসাটি হয় রাজনীতির ময়দানে। সেখানে যে শুধু অর্থ দিয়ে ব্যবসা হয় তা নয়, ধর্ম নিয়েও। রাজনীতির ব্যবসার মূল লক্ষ্য ক্ষমতা লাভ। সেক্যুলার দোকানী তার দোকানে পুস্তকের কাটতি বাড়াতে শুধু কোরআন-হাদীসই রাখে না, গীতা-রামায়ন-বাইবেলও রাখে। সব ক্রেতার মন জোগানোই তার ব্যবসা। তেমনি অবস্থা সেক্যুলার রাজনীতিকের। যাদের ভোট আছে তাদের কাছে গিয়েই তারা ধর্না দেয়। ফলে মন্দির, মণ্ডপ বা গীর্জায় গিয়ে তাদের দেব-দেবী বা ধর্মীয় আচারের প্রতি একাত্ম হওয়াতে যদি ভোটপ্রাপ্তির সম্ভাবনা বাড়ে তবে সেটি করতে তারা পিছুপা হয় না।

ধর্ম-ব্যাবসায়ীর ব্যবসা ধরা পড়ে তারা চাল-চলন, কথাবার্তা ও ভণ্ডামী দেখে। প্রকৃত ধার্মিকেরা কখনও লোক দেখানোর জন্য ধর্ম পালন করেন না, সময় বুঝেও তারা ধার্মিক হন না। সর্ব সময়েই তারা ধার্মিক। ধর্মব্যবসাটি অতি সহজে ধরা পড়ে ইসলামের ক্ষেত্রে। কারণ, এখানে ধর্ম পালন করতে হয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান, তাই সে বিধানের অনুসরণ যেমন নামায-রোযা-হজ-যাকাতে ঘটাতে হয়, তেমনি ঘটাতে হয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। প্রতিক্ষণ ও প্রতিকর্মে তাকে ঈমানকে সঙ্গে নিয়ে  চলতে হয়; ঈমান কখনোই জায়নামাজে ফেলে আসার বস্তু নয়। তাই ধর্মপালনে মৌসূমী হওয়ার সুযোগ ইসলামে নাই। তাকে ঈমানদারকে মুসলিম হতে হয় প্রতি বছর, প্রতি মাস, প্রতি দিন ও প্রতিক্ষণের জন্য। আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা হাতে নিলে সে বিদ্রোহীর নামায-রোযা-হজ-উমরাহর কি কোন মূল্য থাকে? তাছাড়া মুসলমান হওয়ার শর্ত হলো, আল্লাহর উপর বিশ্বাসের আগে সকল দেব-দেবী ও উপাস্যের উপর অবিশ্বাসের ঘোষণাটি সর্বপ্রথম দিতে হয়। ফলে আল্লাহর উপর ঈমান আর মা দুর্গার উপর আস্থা –এ দুটো একসাথে চলে না। যখন একসাথে শুরু হয় তখন বুঝতে হবে, এর মধ্যে ধর্ম নেই। ব্যবসা আছে। সেক্যুলার দোকানদার যেমন কোরআন-হাদীস আর গীতা-মহাভারতকে একই আলমারিতে রাখে, এরাও তেমনি দূর্গা আর আল্লাহকে একই সাথে স্থান দেয়। 

সরকারি কর্মচারি মাত্রই কর্ম জীবনে বহু কর্ম দেশের জন্য করেন। তবে রাষ্ট্রদ্রোহী রূপে গণ্য হওয়ার জন্য দেশের বিরুদ্ধে একটি মাত্র বিদ্রোহ এবং দেশের শত্রুর সাথে মাত্র একটি বার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার ঘটনাই যথেষ্ঠ। তখন তাঁকে ফাসিতে ঝুলতে হয়। তেমনি আল্লাহর একটি মাত্র হুকুমের অবাধ্যতাই প্রমাণ করে এমন অবাধ্য ব্যক্তিটি প্রকৃত মুসলিম নয়, সে কাফের। এ জন্যই যারা প্রকৃত ধার্মিক তারা ইসলামের প্রতিটি হুকুম পালনে নিষ্ঠাবান। এবং শাসকের আসনে বসলে আপোষহীন হয় শরিয়তের প্রতিষ্ঠায়। তার কাছে তখন আদর্শ হয় খোলাফায়ে রাশেদা।

প্রশ্ন হলো, শেখ হাসিনা নিজেকে মুসলিম রূপে দাবী করলেও তাঁর রাজনীতিতে ইসলাম কোথায়? তাঁর দলেই বা ইসলাম কই? শেখ হাসিনার রাজনৈতিক আদর্শ যে ইসলাম নয় সেটি তিনি গোপন রাখেননি। তাঁর আদর্শ জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজম তাঁকে ইসলামে অঙ্গিকারবদ্ধ হতে বাধা দেয়। বরং ইসলামের অনুশাসনের প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধতা তাঁর দৃষ্টিতে গণ্য হয় সাম্প্রদায়িকতা রূপে। শেখ হাসিনা একজন জাতীয়তাবাদী, এখানে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি বাংলা ভাষা ও বাংলার ভূমি। এ ভাষা ও ভূগোলভিত্তিক জাতীয়তাবাদ তার জন্য অসম্ভব করে অন্য ভাষাভাষিদের আপন করে নিতে। ইসলামে এমন ধারণা তাই হারাম; যেমন হারাম হল সূদ, ঘুষ ও বেশ্যাবৃত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে সূদ, ঘুষ ও বেশ্যাবৃত্তি যেমন প্রবল ভাবে বেঁচে আছে, তেমনি জাতীয়তাবাদ এবং সেক্যুলারিজমও প্রবল ভাবে বেঁচে আছে। এবং সেটি অতি প্রবল ভাবে বেঁচে আছে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের রাজনীতিতে। রাজনীতির ময়দানে মুনাফা বাড়াতে তারা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টানদের দরবারেও হাজির হন। হিন্দু ভোটপ্রাপ্তির লক্ষ্যে যে চেতনা নিয়ে পূজামন্ডপে তিনি কথা বলেন সেটি বিশুদ্ধ হিন্দুর। তবে তাঁর ভণ্ডামিটি হলো, সেখানে তিনি নিজেকে হিন্দু রূপে পরিচয় দেননি, বরং নিজের মুসলিম পরিচয়টিকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। নিজে যে নামায পড়েন সেটিও বলেন।  

 

প্রকল্প ইসলাম বিনাশে

শেখ হাসিনার অন্যতম পরামর্শ দাতা হলো তার পুত্র সাজিব ওয়াজেদ জয়। সাজিব ওয়াজেদের ভয় বাংলাদেশে ইসলামের জাগরণ নিয়ে। সে জাগরণ কিভাবে রুখা যায় তা নিয়ে সে একটি প্রবদ্ধ লিখেছে। তবে সেটি সে তিনি একা লেখেনি। লেখা হয়েছে একজন মর্কিনীর সাথে যৌথ ভাবে। প্রবন্ধটির নাম “Stemming the Rise of Islamic Extremism in Bangladesh” অর্থাৎ “বাংলাদেশে ইসলামী চরমপন্থিদের উত্থান কীভাবে রুখা যায়” এ শিরোনামে। নিবন্ধটি “Harvard International Review” জার্নালের ২০০৮ সালের নভেম্বর সংখ্যায় ছাপা হয়েছে। সে নিবন্ধে বাংলাদেশে কীভাবে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠা করা যায় তার একটা রোডম্যাপ দেয়া হয়েছে। সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার পথে শত্রু রূপে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে এবং সে সাথে আর্মি ও প্রশাসনে যে সব ইসলামপন্থি ব্যক্তিবর্গ চাকুরিরত তাদেরকে। সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্ট্রাটেজী রূপে যে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে তা হল: (1) displacing Islam and Islamic symbols from the political landscapes of Bangladesh, and (2) reclaiming the entire space of Islam for BAL. এর অর্থ হল:এক).বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন থেকে ইসলাম এবং ইসলামি প্রতীকগুলোর অপসারণ, এবং দুই). যে ক্ষেত্রগুলোতে ইসলামের অবস্থান সেগুলোর উপর আওয়ামী লীগের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করা। মনে রাখতে হবে,সাজিব ওযাজেদ জয় শুধু শেখ হাসিনার পুত্রই নয়,তিনি শেখ হাসিনা পরামর্শদাতাও। আর পরামর্শ তো দেয়া হয় সেগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য। সে প্রস্তাবনাগুলো যে বাস্তবায়ীত হচ্ছে তার আলামত তো বহু। আজ দেশের ইসলামি দলগুলোর উপর নির্যাতনের যে স্টীমরোলার চালানো হচ্ছে তা তো তাদের হাত থেকে দেশের রাজনীতির অঙ্গণ মূক্ত করার লক্ষ্যেই।

তবে সেক্যুলারিজমের প্রতিষ্ঠা বাড়াতে তাদের লক্ষ্য শুধু রাজনীতির ময়দান থেকে ইসলাম এবং এতদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রতীকগুলো সরানো নয়। বরং খোদ জনগণের মগজ থেকে ইসলামের অপসারণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিবর্গের এজেণ্ডাও একই রূপ। আওয়ামী লীগ চায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল পশ্চিমা শক্তিবর্গ একাজে আওয়ামী লীগকে পার্টনার রূপে গ্রহণ করুক। শেখ হাসিনার পুত্র সে ওকালতিই করেছেন উক্ত নিবন্ধে। তবে অন্যদের মাঝে যাই হোক, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চিন্তা-চেতনায় সেক্যুলারিজমের বীজ যে কতটা সফল ভাবে ঘটেছে তার জ্বলন্ড নজির খোদ শেখ হাসিনা নিজে। তবে সেক্যুলারিজমের টার্গেট মুসলমানদের মগজ থেকে ইসলামের অপসারণ হলেও অনুরূপ টার্গেট হিন্দুধর্ম, খৃষ্টান ধর্ম বা বৌদ্ধধর্ম নয়। শেখ হাসিনার মগজে তাই মজবুত ভাবেই রয়ে গেছে দুর্গাদেবীর প্রতি অতিবিশ্বাস ও অতিভক্তি।

তবে সেক্যুলারিস্টদের লক্ষ্য, নামায-রোযা-হজ-যাকাত থেকে মুসলিমদের সরানো নয়। মসজিদ মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করাও নয়। বরং এগুলি বাঁচিয়ে রেখে ইসলামকে শক্তিহীন করা। কোন গাড়িকে অচল করার জন্য সব ক’টি চাকা খুলে নেয়া জরুরী নয়। একটি মাত্র চাকা খুলে নিলেই সেটি চলার সামর্থ হারায়। ব্রিটিশগণ  যখন ভারতের শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে তখন ইসলামের সবগুলো খুঁটি ধ্বংস করেনি, নামায-রোযা-হজ-যাকাতে তারা হাত দেয়নি। বরং তারা নিজ উদ্যোগে কোলকাতায় আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছে। তার হাত দিয়েছিল জিহাদ বিষয়ক শিক্ষায়। সে লক্ষ্যে কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছে দ্বীনি শিক্ষার সিলেবাস। হায়েজ-নিফাজের মসলা, নফল-সূন্নত-ওয়াজেবের প্রকারভেদ, শিয়া-সূন্নীর বিতর্ক, হানাফী-শাফেয়ী-মালেকী-হাম্বলীদের বিরোধ -এরূপ নানা বিষয়ে বিস্তর পড়াশুনার আয়োজন থাকলেও পাঠ্য তালিকা থেকে সুপরিকল্পিত ভাবে বাদ দিয়েছে জিহাদ বিষয়ক কোরআন-হাদীসের নির্দেশনাবলি। ফলে ছাত্ররা বেড়ে উঠেছে ইসলামের উপর অপূর্ণাঙ্গ ও বিকৃত ধারণা নিয়ে।

আজও একই ষড়যন্ত্র চলছে। মার্কিনীরা হোয়াইট হাউসে ইফতার পার্টি দেয়। নামাযের জন্য জায়নামাযও পেড়ে দেয়। অথচ এরাই মুসলিম দেশগুলিতে শিক্ষার সিলেবাস নিয়ন্ত্রণে নেমেছে। তাদের চাপে মাদ্রাসাগুলো বাদ দিচ্ছে জিহাদ বিষয়ক বই। সে মার্কিনীদের সাথে হাত মিলিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। তারই আলামত, মার্কিনীদের খুশি করতে সরকার পুলিশ ও র‌্যাবের সেপাইদের ময়দানে নামিয়েছে জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করার। জিহাদ বইগুলোকে বলছে জঙ্গিবাদী বই। অথচ জিহাদ ফরজ। এবং জিহাদ লোপ পেলে বিলুপ্ত হয় মুসলমানের প্রতিরক্ষার সামর্থ। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ এটি করছে মুসলিম দেশে তাদের প্রতিষ্ঠিত দখলদারিকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে।   

 

মুসলিমের ঈমানী দায়ভার

ঘরে আগুণ লাগলে দায়ভার বেড়ে যায়। সে ঘরের নারী-পুরুষ এবং শিশুরাই শুধু নয়, সে আগুণ নেভাতে প্রতিবেশীরাও তখন প্রাণপনে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। এমন বিপদে কেউ ঘুমিয়ে থাকলে ঘর বাঁচে না, তেমনি সেও নিজে বাঁচে না। সে সময় জায়নামাযে বসে ইবাদতে মগ্ন হলে প্রাণনাশ হয়। তেমনি মুসলিম ভূমির উপর শত্রুর হামলা শুরু হলে মসজিদ-মাদ্রাসায় ইবাদতে নামলে মুসলিম ভূমির সুরক্ষা হয় না। তখন ইবাদতের স্থান জিহাদের ময়দানে। নামায তখন মসজিদে নয়, জিহাদের ময়দানে গিয়ে পড়তে হয়। ১৭৫৭ সালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ হামলার বিরুদ্ধে সে জিহাদ হয়নি বলেই ১৯০ বছরের গোলামী জুটেছিল। তেমন কোন প্রতিরোধ ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ অবধি ভারতীয় লুন্ঠনের বিরুদ্ধে হয়নি বলেই হাজার হাজার মানুষকে দুর্ভিক্ষে মারা যেতে হয়েছে। তখন লুন্ঠিত হয়েছে হয়েছে বেরুবাড়ী এবং হাজার হাজার কোটি টাকার সামরিক-বেসামরিক সম্পদই শুধু নয়, ধ্বংস করা হয়েছে দেশের শিল্প। তখন হাজার হাজার মানুষকে মারা যেতে হয়েছে ভারতীয় স্বার্থের সেবাদাস রক্ষি বাহিনীর হাতে। একই রূপ বিপর্যের মুখে আজকের বাংলাদেশ।

আজ হামলার শিকার শুধু বাংলাদেশের ভূগোল,নদ-নদী,সমূদ্রসীমা,শিল্প ও সংস্কৃতিও নয়, প্রচণ্ড হামলা শুরু হয়েছে দ্বীন ইসলামের উপর। অসম্ভব করা হয়েছে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। ইসলামের প্রতিষ্ঠা প্রতিরোধে আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক শত্রুদের সাথে কোয়ালিশন গড়েছে। শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে আজ নাস্তিক কম্যুনিস্ট, ধর্মহীন সেক্যুলার,পৌত্তলিক হিন্দু, খৃষ্টান ও বৌদ্ধদের নিজ নিজ ধর্ম, কর্ম ও রাজনীতির পুরা আজাদী দেয়া হয়েছে। অথচ ইসলামের প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাস্তায় নামলে তাদের উপর হামলা শুরু হয়। তাদেরকে কারাগারে তোলা হয়। পায়ে দণ্ডবেড়ি পড়ানো হয়। মন্দিরে দেবদেবীর পুঁজা দেখে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মনে আনন্দের হিল্লোল শুরু হয়, অথচ রাস্তায় আল্লাহু আকবর ধ্বনি শুনলে তাদের হামলায় হিংস্রতা বেড়ে যায়। এমন হামলার মুখে মুসলিমদের কাজ কি? দায়িত্বই বা কি? সেটি কি ঘুমিয়ে যাওয়া? ইসলামের শত্রুদের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং তাদের বিজয়-উৎসবে শামিল হওয়া?

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “আমি মুমিনদের জানমাল ক্রয় করে নিয়েছি জান্নাতের বিনিময়ে।” আল্লাহতায়ালার এ ক্রয় কি ইসলামের শত্রু শক্তির কাছে আত্মসমর্পণের লক্ষ্যে? কোরআনের ভাষায় সেটি তো এক মহান মিশন নিয়ে লড়াইয়ের। এবং সে লড়াইয়ে আত্মত্যাগের। ইতিহাসের কোন কালেই কোন বিজয় বা গৌরব আত্মসমর্পণে আাসেনি,এসেছে আত্মত্যাগে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা তাঁর ক্রয়কৃত মুমিনদের মিশন রূপে যা বলেছেন তা অতি সুস্পষ্ট। ইসলাম ও মুসলমানদের উপর শত্রুর হামলা হলে তাদের দায়িত্ব হবে,“তাঁরা যুদ্ধ করবে আল্লাহর রাস্তায়, তাঁরা (এ যুদ্ধে ইসলামের শত্রুদের) হত্যা করবে এবং নিজেরাও নিহত হবে।”–(সুরা তাওবাহ,আয়াত ১১১)। অথচ বিদেশী শক্তির তাঁবেদারগণ আল্লাহর নির্দেশিত এ মিশন থেকে মুসলমানদের হটাতে চায়। ইসলামের বিরুদ্ধে এটিই হলো শত্রুদের সবচেয়ে ভয়ানক বিনাশী প্রকল্প। এ প্রকল্প সফল হলে মুসলমান শুধু মহান আল্লাহর ক্রয়কৃত আমানত হওয়ার মনর্যাদাই হারাবে না,হারাবে দুনিয়াবী জীবনের গৌরব এবং আখেরাতের পুরস্কার। দেশ হবে অরক্ষিত। এবং জনগণ পরিনত হবে শয়তানি শক্তির শৃঙ্খলিত গোলামে। এবং জনগণের পায়ে গোলামীর বেড়ি পড়ানোর কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে শেখ হাসিনা ও তার দল। ফলে শেখ হাসিনার ক্ষমতায়  থাকাতে বাঙালী মুসলিমের সামনের দিনগুলি আরো ভয়ানক হবে -তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ আছে? ১ম সংস্করণ ১৬/১০/২০১১; ২য় সংস্করণ ২৭/১০/২০২০   

 

 

 




শেখ হাসিনার মা-দুর্গা ও পৌত্তলিক নাশকতা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

শেখ হাসিনার মা-দুর্গা ও পৌত্তলিকতা 

বিগত ২০১১ সালের ৫ই অক্টোবর রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির ও রামকৃষ্ণ মিশনে দুর্গা পূজা উপলক্ষে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে গিয়ে তিনি বলেছেন, “আমরা জানি এবং শুনেছি মা দুর্গা প্রত্যেক বছর কোনো না কোনো বাহন চড়ে আমাদের এ বসুন্ধরায় আসেন। এবার আমাদের দেবী এসেছেন গজে চড়ে। জানি, গজে চড়ে এলে এ পৃথিবী ধন-ধান্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে—তা আমরা দেখতেই পাচ্ছি। এবার ফসল ভালো হয়েছে। মানুষ সুখেই-শান্তিতে আছে। দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে ৭ ভাগে দাঁড়িয়েছে।”-(দৈনিক আমার দেশ, ৬ই অক্টোবর, ২০১১)।

এ কথাগুলো শেখ হাসিনা কোনরুপ নেশার ঘোরে বলেননি। জ্বরের প্রকোপে বিকার গ্রস্ততায়ও বলেননি।কোন দৈত্যদানবের ভয়ে বা র‌্যাব-পুলিশের রিমাণ্ডে গিয়েও বলেননি। তিনি সুস্থ্য মাথায় “জানেন এবং শুনেছেন” এমন দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলেছেন। দুর্গাকে তিনি আমাদের দেবী বলেছেন। “পৃথিবী ধন-ধান্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং জিডিপি বেড়েছে” এতে দুর্গা যে গজে চড়ে এসেছে সে বিশ্বাসটি আরো মজবুত হয়েছে -সেটিও বলেছেন। শেখ হাসিনা এ কথাগুলো বলেছেন মনের মাধুরি মিশিয়ে, এবং পুজা মণ্ডপে দাঁড়িয়ে।এমন অবস্থায় মানুষ যখন কথা বলে তখন সে অন্যের শেখানো কথা বলে না, একান্ত নিজের মনের কথাগুলোই অতি নির্ভয়ে বলে।

মানুষের অন্তরে কি আছে সেটি দেখা যায় না। তবে দেখা না গেলেও সেটি গোপন থাকে না। কারণ চেতনারও ভাষা আাছে। প্রকাশের জন্য তারও প্রচণ্ড আকুতি আছে। তাই সুযোগ পেলেই মুখের কথায় সেটি ফুঠে উঠে। মানুষে ভিতরের রূপটি এভাবেই বাইরে চলে আসে। তাই ঈমানদারের ঈমানদারি যেমন গোপন থাকে না,তেমনি গোপন থাকে মুনাফিকের মুনাফেকি, মিথ্যুকের মিথ্যাচার এবং পৌত্তলিকের পৌত্তলিকতাও। সেটির প্রকাশ ঘটে যেমন কথায়, তেমনি কর্ম ও আচরণে। উচ্চতর মারেফত এবং প্রগাড় প্রজ্ঞার অধিকারি ছিলেন হযরত আলী (রাঃ)। তিনে অতি মূল্যবান একটি কথা বলেছেন মানুষের ব্যক্তিত্ব নিয়ে। বলেছেন,“মানুষের ব্যক্তিত্ব তার জিহবাতে।” ব্যক্তিত্বের মধ্যেই প্রকাশ পায় মো’মেনের ঈমানদারি, আর সে ঈমানদারির প্রবল প্রকাশটি ঘটে তাঁর জিহবাতে। ঈমান আনার সাথে সাথে সে ঈমান বাইরে বেরিয়ে আসে কালেমায়ে শাহাদত পাঠের মধ্য দিয়ে। ব্যক্তির ঈমানপূর্ণ ভিতরের রূপটি এভাবেই বাইরে প্রকাশ পায়। অপর দিকে কাফেরের বেঈমানিটাও জাহির হয় তার কথায়। এখানে জিহবা সে বেঈমানিরই সাক্ষ্য দেয়। সেটি পৌত্তলিকতা বা গায়রুল্লাহ তথা শয়তানের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার মধ্য দিয়ে। নবীজীর হাদীস, “যে দুটি অঙ্গের ব্যবহারের জন্য বেশীর ভাগ মানুষ জাহান্নামে যাবে তার একটি হল তার জিহ্ববা, অপরটি যৌনাঙ্গ।” নবীজী (সাঃ) এ হাদীসে বুঝাতে চেয়েছেন, মানুষের অধিকাংশ পাপকর্ম হয় এ দুটি অঙ্গের দ্বারা। জিহবা থেকে নেক আমলের যেমন শুরু, তেমনি পাপকর্মেরও। জিহবা দ্বারাই ঈমানদার ব্যক্তি জীবনভর মহান আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের পক্ষে সাক্ষি দেয়। অন্যদের ডাকে ইসলামের দিকে, এবং বাঁচায় জাহান্নামের কঠিন আযাব থেকে। অপর দিকে এ জিহ্ববা দিয়েই কাফেরগণ বিদ্রোহ আনে আল্লাহর বিরুদ্ধে। প্রচার এবং প্রতিষ্ঠা দেয় কুফরির।  

 

শেখ হাসিনা কোন পক্ষে?

কালেমা পাঠ শুধু মুসলমানই করে না, অমুসলমানেরা করে। কালেমা পাঠের অর্থ কোন  কিছু বলা বা ঘোষণা দেয়া। কথা বলা বা বক্তৃতা দেয়ার অর্থ কিছু শব্দ, কিছু আওয়াজ বা কিছু বাক্য তৈরি নয়। বরং তাতে প্রকাশ পায় ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা,জীবন-দর্শন, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় ও ধর্ম-অধর্ম নিয়ে তার বিশ্বাসটি। ধরা পড়ে তার ঈমান। কথা বা বক্তৃতার মধ্য দিয়েই সে সাক্ষ্য দেয় তার কাছে কোন ধর্ম বা বিশ্বাসটি সত্য এবং কোনটি অসত্য। তখন জনসম্মুখে প্রকাশ পায় সে কোন পক্ষের। ইসলামে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ।  কারণ পৃথিবীতে পক্ষ মাত্র দুটিঃ একটি আল্লাহর, অপরটি গায়রুল্লাহ বা শয়তানের। তাকে যে কোন একটি পক্ষ নিতে হয়, সুযোগ নেই উভয় পক্ষে থাকার। আল্লাহতায়ালা প্রতিটি ব্যক্তি থেকে জানতে চায় সে কোন পক্ষের। তিনি চান,সে পরিচয়টি সমাজের অন্যরাও জানুক। তাই ব্যক্তির ধর্মীয় এ পরিচয়টি ইসলামে গোপন রাখার বিধান নেই। কালেমায়ে শাহাদাত পাঠের মধ্য দিয়ে ইসলাম কবুলের যে ঘটনাটি ঘটে সেটির ঘোষণা প্রথম দিনেই জনসম্মুখে দিতে হয়। যে ব্যক্তি সে সাক্ষ্য দেয়নি,সে মুসলমানও হয়নি। আল্লাহর কাছে মুসলমান বা অমুসলমান হিসাবে পরিচয় পায় মূলত এ সাক্ষ্যদানের ভিত্তিতেই। তবে সে সাক্ষ্যদানেই তার দায়িত্ব শেষ হয় না, শেষ হয় না ৫ ওয়াক্ত নামায ও একমাস রোযা আদায়েও। বরং তাকে মুসলমান রূপে বাঁচতে হয় প্রতিদিন, প্রতি মুহুর্ত। ফলে শুরু হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এবং তার নাযিলকৃত ইসলামি বিধানের পক্ষে আজীবন সাক্ষ্যদানের কাজটি, মো’মেনের জীবনে সেটিই প্রকৃত ঈমানদারি।

‍“শাহাদাহ”‌‍‍ আরবী শব্দ, অর্থ সাক্ষ্যদান। আর “কালেমায়ে শাহাদত”র অর্থ “সাক্ষ্যদান মূলক বাক্য”। কালেমা পাঠের মধ্য দিয়ে তাকে এ জগতের সবচেয়ে বড় সত্যটির পক্ষ নিতে হয়। আর সেটি “লা-শরিক আল্লাহ” যে একমাত্র মাবুদ বা উপাস্য এবং হযরত মুহাম্মদ যে তাঁর দাস ও রাসূল -সে সত্যটির।সাক্ষ্যদানের সে কাজটি প্রতিটি ঈমানদারকে আমৃত্যু জারি রাখতে হয়। সেটি যেমন নামায-রোযা-হজ-যাকাত ও জিহাদে লাগাতর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে, তেমনি ঘর-সংসার, কর্মস্থল, ইবাদতগাহ, রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষালয়, বিচারালয়সহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে। এবং সেটি পবিত্র কোর’আনে বর্নিত আল্লাহর প্রতিটি হুকুমের অনুসরণের মধ্য দিয়ে। সে হুকুমের বিরুদ্ধে যেখানেই বিদ্রোহ বা অবাধ্যতা সেখানেই কুফরি। তাই কুফুরি শুধু মুর্তিপুজা নয়, বরং আল্লাহর বিরুদ্ধে প্রতিটি বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা। রাজনীতিতে সে প্রবল বিদ্রোহটি ঘটে ইসলামের শরিয়ত বিধানকে প্রতিষ্ঠা না করার মধ্য দিয়ে। এবং সে সাথে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বদলে শাসক, দল বা জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশে তো সেটি ঘটেছে।  

ইসলাম কবুলের মূল চাবিটি হল “কালেমায়ে শাহাদত”। কালেমা পাঠে সর্বপ্রথম ‘লা ইলাহা’ বলতে হয়।‘লা ইলাহা’ র অর্থঃ “নাই কোন উপাস্য”,এবং এর পর আসে “ইল্লাল্লাহ” যার অর্থ “একমাত্র আল্লাহ ছাড়া”। ইসলাম কবুলের সর্বপ্রথম শর্তটি তাই একমাত্র আল্লাহ ছাড়া সকল উপাস্যের অস্বীকৃতি। মুসলমান হওয়ার পথে এটি এক অলংঘনীয় বাধ্যবাধকতা। অন্তরে কোন দেবদেবী বা উপাস্যের প্রতি সামান্য বিশ্বাস অবশিষ্ঠ রেখে আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের কোন সুযোগ “কালেমায়ে শাহাদত” এ রাখা হয়নি। মা-দুর্গা বলে কোন উপাস্য আছে, সে গজে চড়ে আসে এবং তার মর্তে নামাতে ভাল ফসল ফলে –এসব স্বীকার করে নিলে কালেমায়ে শাহাদত পাঠ অর্থহীন হয়ে যায়। এমন কথা বলার অর্থ কালেমায়ে শাহাদতের সুস্পষ্ট বিরুদ্ধাচরন। নামায-রোযা পালনের বিষয়টি তো আসে এর পরে। প্রশ্ন হল, কোন মুসলমান কি এমন কুফরি বাক্য মুখে আনতে পারে? এটি তো পৌত্তলিকতার পক্ষে সাফাই বা সাক্ষ্যদান। অথচ মুসলিম হওয়ার দায়বদ্ধতা হলো, তাকে আজীবন সাক্ষ্য দিতে হয় পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে। তাকে সযত্নে বাঁচতে হয় অসত্য, অন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্যদান থেকেও। নইলে ঈমান বাঁচে না। ঈমান বাঁচাতে তাই শুধু হারাম খাদ্য-পানীয় ও হারাম কর্ম থেকে বাঁচলে চলে না, এমন হারাম উচ্চারণ থেকেও বাঁচতে হয়।  

 

আঘাত ইসলামের মূল খুঁটিতে              

পূজা মন্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা যা বলেছেন -সেটি অতি ভয়ানক। যেমন আখেরাতে তাঁর নিজের জন্য, তেমনি বাংলাদেশের জন্যও। সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় তিনি এক প্রকাণ্ড সাক্ষ্য দিয়েছেন। এমন কথা উচ্চারণে ঈমান বাঁচার কথা নয়। অন্তরে শরিষার দানা পরিমান ঈমান থাকলেও কেউ এমন কথা বলতে পারে না। তিনি যা বলেছেন তা তো পৌত্তলিক কাফেরদের কথা, কোন ঈমানদারের কথা কখনোই হতে পারেনা। সাক্ষ্যদানের সে পর্ব ও আয়োজনটিও লক্ষণীয়। সেটি ছিল ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির ও রামকৃষ্ণ মিশনের পূজামণ্ডপ। টিভি ও পত্র-পত্রিকায় তাঁর সে সাক্ষ্যদানের পর্বটি বিপুল প্রচার পেয়েছে, কোটি কোটি মানুষের কাছে তা পৌঁছেও গেছে। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, ফলে তার সে সাক্ষ্যদানে কোটি কোটি মানুষ যে প্রভাবিত হবে সেটিই স্বাভাবিক। ইসলামের বিরুদ্ধে নাশকতা এখানেই। একজন সাধারণ মানুষের সাক্ষ্যদানেও আদালতের বিচারকগণও প্রভাবিত হয় এবং আসামীকে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে দেয়। সঠিক সাক্ষ্যদান তাই মানুষ জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সে সাক্ষদানটি হল আল্লাহ এ তার রাসূলের পক্ষে  সাক্ষ্যদান। ইসলামের পাঁচটি খুঁটির মাঝে এটিই সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি। এরূপ সাক্ষ্যদানের মধ্য দিয়েই সে মহান আল্লাহতায়ালার খাতায় নিজেকে মুসলিম রূপে নথিভুক্ত করে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সারা জগত জুড়ে প্রতিটি মুসলিমকে লাগাতর সে সাক্ষ্যটি দিতে হয়। তাদের সে সাক্ষ্যদানের ফলেই ইসলাম জনগণের আদালতে বিজয়ী হয়। ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার শুরু তো এখান থেকেই। ইসলামের পুরা ঘরটি ধ্বসানোর জন্য তার সবগুলি খুটি ধ্বংসের প্রয়োজন পড়েনা, কালেমায়ে শাহাদতের ন্যায় এই একটি মাত্র খুঁটির বিনাশই যথেষ্ট। নামায-রোযা বেঁচে থাকলেও তখন ইসলাম কখোনই বিজয়ী শক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা পায় না। এবং শরিয়তও প্রতিষ্ঠা পায় না। আর সে খুঁটিতেই আঘাত হানলেন শেখ হাসিনা। ইসলামের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় নাশকতা তো এটাই। “দুর্গাকে মা বলে এবং তার গজে আসাতে দেশে ফসলের উৎপাদন বেড়েছে” বলে পৌত্তলিকতার যে সাফাই তিনি গাইলেন -তাতে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের বিবেকের আদালতগুলি কি প্রভাবিত হবে না? এখানে তিনি পক্ষ নিয়েছেন সুস্পষ্ট কুফরির। রেডি ও টিভিতে তার সে কুফরি বাক্যের প্রচার করা হলো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের রাজস্বের অর্থে। মুসলিমদের অর্থে এভাবেই তিনি ও তার সরকার নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছেন ইসলামের বিরুদ্ধে।

মুর্তিপূজকেরা দুর্গাকে মা বলে, তার পদতলে মাথা নুয়ায়,এবং পূজা দেয়। বাংলাদেশের মাটিতে সেটি নতুন কিছু নয়। এসবই বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি হিন্দুর ধর্মীয় বিশ্বাস। কিন্তু কোন মুসলিম মুর্তিকে মা বলবে এবং সে মুর্তিটি হাতিতে চড়ে প্রতিবছর আসে এবং তার আসার কারণে ফসলের উৎপাদন বাড়ে – সেটি নতুন। এটি শতভাগ পৌত্তলিকতা। অথচ শেখ হাসিনা সেটিরই প্রচার করছেন। দুর্গা পূজা এতকাল বাঙালী হিন্দুদের নিজস্ব পূজা ছিল, আর হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সেটিকে বাঙালীর সার্বজনীন পূজাতে পরিনত করতে চাচ্ছে। নবীজীর আমলে মূর্তির অভাব ছিল না, খোদ কা’বার মধ্যে ছিল ৩৬০টি মুর্তি। নবীজীর সূন্নত তো কা’বা থেকে মুর্তি সরানোর, সেগুলিকে শ্রদ্ধাভরা “মা” বলা নয়। অথচ শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় সেটিই বলেছেন। আল্লাহতায়ালা ও তার দ্বীনের বিরুদ্ধে এটি এক ভয়ংকর বিদ্রোহ।  মাটিতে বীজ গজানো,সেটির বেড়ে উঠে এবং ফসল দেয়া নতুন ঘটনা নয়। এসব চিরকালই ঘটছে মহান আল্লাহর রহমতের বরকতে, দুর্গা বা কোন দেব-দেবীর গজে চড়ে আসা-যাওয়ার কারণে নয়। তাছাড়া গজে চড়ে সেরূপ আসা-যাওয়ার ক্ষমতা কি এসব মুর্তিদের আছে? এরূপ বিশ্বাস করা তো মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ইচ্ছা করলে দয়াময় মহান আল্লাহ তাঁর ঈমানদার বান্দার সব গুনাহ মাফ করে দেন, কিন্তু এরূপ শিরকের গুনাহ মাফ করেন না। নবীজীর এ ঘোষণাটি তো হাদীসে বহুবার এসেছে।

 

নামাযী কি কখনো মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়?

শেখ হাসিনা ১২ই অক্টোবর,২০১১-এ নিলফামারীর এক জনসভায় দাবী করেছেন, তিনি ৫ ওয়াক্ত নামায পড়েন। কথা হলো, তিনি কত ওয়াক্ত নামায পড়েন সেটি দেখার বিষয় নয়। তেমনি জনসভায় প্রচারেরর বিষয়ও  নয়। বরং দেখার বিষয় হলো, তিনি বাস্তবে কি করছেন সেটি। নামায-রোযা পালনের ফলে মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের প্রতি আস্থা গভীরতর হবে এবং তাঁর শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠায় অঙ্গিকার বাড়বে -সেটিই তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার অঙ্গিকার তো ইসলামী বিধানের বিনাশে। এবং ইসলামপন্থিদের কোমর ভাঙ্গায়। তারই প্রমাণ, সংবিধান থেকে তিনি আল্লাহর উপর আস্থার বাণী বিলুপ্ত করেছেন। শরিয়তী বিধানের প্রতিষ্ঠাকে তিনি মৌলবাদ বলছেন এবং ইসলামের পবিত্র জিহাদকে বলছেন জঙ্গিবাদ। অথচ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষণাটি হল, “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-আচারে ফয়সালা দেয় না তারা কাফের, …তারা যালিম, … এবং ..তারাই ফাসিক।” সুরা মায়েদা, আয়াত ৪৪, ৪৫,৪৭)। মুসলিম তাই যখন রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে পায় তখন নামায-রোযার ন্যায় আল্লাহর কোর’আনী বিধান তথা শরিয়তেরও প্রতিষ্ঠা দেয়। ভারতে মুসলিম শাসনের শেষ দিন পর্যন্ত আদালতে যে বিধানটি কায়েম ছিল সেটি তো এই শরিয়তি বিধান। কিন্তু ঔপনিবেশিক কাফেরগণ সেটি উৎখাত করে, এবং প্রতিষ্ঠা করে কুফরভিত্তিক ব্রিটিশ পেনাল কোড। আর বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ সযত্নে সে ধারাটিই অব্যাহত রেখেছে। এবং শেখ হাসিনা সে ধারারই নেত্রী। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও পৌত্তলিক ভারত ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছে তাঁর নীতিও তো সেটিই।

বার বার হজ-উমরাহ করে এবং ৫ ওয়াক্ত নামায পড়েও মানুষ যে ভয়ানক অপরাধী ও ইসলামের পরম শত্রু হতে পারে সে প্রমান তো প্রচুর।তাদের সংখ্যা এমন কি নবীজী (সাঃ)র যুগেও কি কম ছিল? হাসিনা প্রমাণ করছেন, তিনি তাদেরই একজন। নামায-রোযা পালন করা যায়, মাথায় রুমাল বেঁধে নির্বাচনের সময় পর্দা-নশীন সাজাও কঠিন নয়,কিন্তু তাতে কি ঈমানদারি বা ইসলামে অঙ্গিকার বাড়ে? নির্মিত হয় কি ইসলামি ব্যক্তিত্ব? ইসলামি ব্যক্তিত্ব তো নির্মিত হয় অন্তরে আল্লাহতায়ালার ভয় এবং ইসলামের বিজয় ও শরিয়তী বিধান প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন অঙ্গিকার থেকে। তাই খোদ নবীজী (সাঃ)র পিছনে বহুবছর নামায পড়েও মুনাফিকগণ তাই ঈমানদার হতে পারেনি। সুস্থ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারিও হতে পারিনি।  মুসলিমদের বেশ ধরলেও তারা বেড়ে উঠেছে ভয়ানক অপরাধী এবং ইসলামের ঘোরতর শত্রু রূপে। এরাই ইসলামের বিনাশে মক্কার কাফের আর মদিনার ইহুদীর সাথে জোটবদ্ধ হয়েছিল।  আজও  যারা নামায-রোযা-হজ-ওমরাহ পালন করে তাদের অনেকের অপরাধ শুধু দুর্গাকে মা বলার মধ্যে সীমিত নয়। এরা জোট বেঁধেছে তাদের সাথে যারা ইসলামের বিনাশ চায়। তারা মদদ নিচ্ছে তাদের থেকে যারা কাশ্মীর, গুজরাত, বোম্বাইয়ে মুসলিম নিধন, অযোধ্যায় মসজিদ ধ্বংস, বাংলাদেশের সীমান্তে কাটাতার দেয়া ও বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা এবং পদ্মা-মেঘনা-তিস্তার পানি তুলে নেয়াকে জাতীয় নীতি বানিয়েছে।

শেখ হাসিনার কথাবার্তা থেকে মনে হয়, তিনি যে বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশের প্রধানমন্ত্রী সে বোধটি তার নেই। নিজেকে একটি মুসলিম দেশের প্রধানমন্ত্রী ভাবলে তার কথাবার্তা,ধর্মীয় বিশ্বাস, আচরণ ও রাজনীতিতে ইসলামী চেতনার প্রতিফলনটি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু কার্যতঃ সেটি হয়নি। বরং সুস্পষ্ট বুঝা যায়, ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস থেকে তিনি কতটা বিচ্ছিন্ন। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস থেকে তিনি কতটা বিচ্ছিন্ন সম্প্রতি সেটির প্রবল প্রকাশ ঘটেছে তার বক্তৃতায়। পূজামণ্ডপে গিয়ে যা বলেছেন সেটি কোন মুসলিমের মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা নয়। এটি যেমন অস্বাভাবিক, তেমনি অকল্পনীয়। তিনি যেন প্রধানমন্ত্রী কোন পুতুলপূজারী দেশের।

 

 জিহাদ কি জঙ্গিবাদ?

মুসলিমের পুরস্কার যেমন বিশাল, তেমনি বিশাল তার দায়বদ্ধতাও। সে দায়বদ্ধতা শয়তানের সাথে লড়াই করে আজীবন মহান আল্লাহতায়ালার পথে চলার। এ লড়াই থেকে কোন মুসলিমের নিস্তার নেই। যে কাজে প্রমোশন ও পুরস্কার আছে, সে কাজে কঠিন পরীক্ষাও আছে। আর মুসলিমের জন্য তো রয়েছে এমন এক অভাবনীয় পুরস্কার দুনিয়ায় বসে যার ধারণা করাও অসম্ভব। সেটি জান্নাতপ্রাপ্তির। জান্নাতের এক ইঞ্চি ভূমিও কি হিমালয় সমান স্বর্ণ দিয়ে কেনা যায়? জান্নাতের নিয়ামত বিক্রয় হয় ভিন্ন মুদ্রায়,সেটি ঈমান ও আমিলুস সালেহ তথা নেক আমলের। সে নেক আমলটি  শুধু পথের কাঁটা সরানো নয়। কাউকে দান-সাদকা দেয়াও নয়। সেটি স্রেফ নামায-রোযা-হজ-যাকাত পালনও নয়। বরং সবচেয়ে বড় আমিলুস সালেহ বা নেক আমল হল অসত্য,অন্যায় ও কুফরির বিরুদ্ধে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জিহাদ। সে জিহাদের অর্থদান, শ্রমদান এবং প্রাণদান। নামায-রোযা-হজ-যাকাতসহ সকল ইবাদত-বন্দেগীর কাজ তো সর্বশ্রেষ্ঠ সে নেক আমলে সামর্থ সৃষ্টি। কিন্তু যে ব্যক্তির নামায-রোযা-হজ-ওমরাহ মা-দুর্গার প্রতি আস্থা বাড়ায় তাকে কি আদৌ কোন ইবাদত? যিনি প্রকৃত ঈমানদার তার ইবাদতে শুধু ব্যক্তির ঈমান-আখলাক ও কর্মই পাল্টে যায় না,পাল্টে যায় সমাজ,রাষ্ট্র ও সভ্যতাও। প্রচণ্ড ভাবে বাড়ে জিহাদের জজবা। সে নেক-আমলের বরকতেই প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ ইসলামের বিজয় এনেছিলেন,এবং জন্ম দিতে পেরেছিলেন মানব-ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। সে নেক-আমলে নবীজী (সাঃ)র শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা শহিদ হয়েছিলেন। অন্য কোন আমলে বা ইসলামের অন্য কোন বিধান পালনে মুসলমানদের এত রক্তক্ষয় হয়নি। ঈমানের চুড়ান্ত পরীক্ষা হয় মূলত এ ক্ষেত্রটিতে। আজও  যার মধ্যে ঈমান আছে,তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এ নেকআমলটিও আছে। ইহকালে ইসলামের বিজয় ও পরকালে জান্নাতপ্রাপ্তির এ ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। ভিন্ন পথ নেই জাহান্নামের ভয়ানক আযাব থেকে বাঁচারও। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সে নেক আমলের তাগিদ দিয়েছেন এভাবেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমাদেরকে কি এমন এক ব্যবসার কথা বলে দিব যা তোমাদের কঠিন আযাব থেকে রক্ষা করবে? সেটি হল, তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান আনো এবং জিহাদ কর আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের জান ও মাল দিয়ে, এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা জানতে।” –সুরা সাফ, আয়াত ১০-১১। জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার এটিই মহান আল্লাহর প্রদর্শিত পথ। সে পথটি বেছে নিয়েছিল নবী করীম (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণ।কিছু পঙ্গু ও বধির ছাড়া এমন কোন সাহাবা কি ছিল যিনি সে জিহাদে  অংশ নেননি? অথচ শেখ হাসিনা সে পবিত্র জিহাদকে বলছেন জঙ্গিবাদ। মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর বিধানের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় ধৃষ্টতা আর কি হতে পারে? 

 

বিজয়ী হলো শয়তান ও তার পৌত্তলিক শিরক

তাগুত তথা শয়তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আল্লাহর বাহিনীর লড়াইটি সর্বকালের। আল্লাহতায়ালা চান,ঈমানদারের জীবনে সে লড়াইয়ে অংশগ্রহণের তাড়নাটি তীব্রতর হোক। সে লড়াই তীব্রতর ও অনিবার্য করার স্বার্থেই মহান আল্লাহতায়ালা প্রতিটি ঈমানদারের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ রূপে শয়তানকে খাড়া করে দিয়েছেন। শয়তানকে নিয়োজিত করেছেন এমন কি নবী-রাসূলগণেরও পিছনেও। কারণ ঈমানের পরীক্ষায় তাদেরও পাশ করতে হয়। পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আলামীনের সে পরিকল্পনাটি ব্যক্ত হয়েছে এভাবেঃ “এবং এমনিভাবে আমি প্রত্যেক নবীর বিরুদ্ধে মানুষ ও জিনরূপী শয়তানদের শত্রু রূপে নিয়োজিত করেছি” –(সুরা আনয়াম, আয়াত ১১২)। এ প্রসঙ্গে নবীজী (সাঃ)র প্রসিদ্ধ হাদীস হলো, প্রতিটি মানুষের উপরই একজন শয়তান আছে। একজন সাহাবী তখন জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপরও কি শয়তান আছে?” তিনি জবাব দিলেন, “হাঁ আমার উপরও শয়তান আছে। তবে আমি সে শয়তানকে মুসলিম তথা আত্মসমর্পিত করে রেখেছি।”

শয়তানের মূল কাজটি, ঈমানদারকে লাগাতর পরীক্ষায় ফেলা। আল্লাহর পথে পথচলায় পদে পদে বাধা সৃষ্টি করা।শুধু নামায-রোযা-হজ-যাকাতের ন্যায় ইবাদতে নয়,ব্যবসা-বাণিজ্য,রাজনীতি,শিক্ষা-সংস্কৃতি,বিচার-আচার,প্রশাসনে এমনকি নির্জন জঙ্গল বা বিজন মরুভূমিতেও ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষে নিরাপদে ধর্ম পালনের সুযোগ নেই। প্রতি স্থানে ও প্রতি মুহুর্তে তাঁর বিরুদ্ধে কাজ করে শয়তান। লাগাতর চেষ্টা চালায় প্রতি পদে তাকে পথভ্রষ্ট করায়। এভাবে ঈমানদারের পরীক্ষা হয় প্রতি মুহুর্তে। জিহাদ তাই মো’মেনের জীবনে প্রতি দিন ও প্রতি মুহুর্তে। ঈমানদারের প্রকৃত বিজয় এবং সে সাথে জান্নাত লাভের মহা পুরস্কার সে পরীক্ষায় পাশ করায়। শয়তানের লাগাতর হামলা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিপদে বিজয়ী হওয়াতেই ঈমানদারের প্রকৃত সাফল্য, স্রেফ নামাযী বা রোযাদার, হাজী বা সুফী সাজাতে নয়। তবে শয়তানের হাতে পরাজয় কখনও গোপন থাকে না। গাড়ী যখন খাদে পড়ে তখন যেমন সবাই সেটি টের পায়,তেমনি কোন ব্যক্তি যখন পথভ্রষ্ট বা বেঈমান হয় সেটিও ধরা পড়ে। আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে প্রতিটি বিদ্রোহ বা অবাধ্যতাই পথভ্রষ্টতা। সেটি প্রকাশ পায় তার কথাবার্তা, ধর্মকর্ম, আচরণ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে। ঈমানদারের দায়বদ্ধতা শুধু ইবাদত-বন্দেগী নয়,বরং আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়তি বিধান পালনে। কিন্তু আল্লাহর অবাধ্যরা সে শরিয়ত মানতে রাজি নয়। একই অবস্থা শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের। তারা শরিয়তের প্রতিষ্ঠাতে তাই রাজী নয়। এক্ষেত্রে দলটির অবস্থান ইসলামের বিপক্ষে। ‘মা দুর্গা’ গজে চড়ে এসেছে বলে দেশে ফসল বেড়েছে,-এ থেকে কি বলা যায় যে দলটির নেত্রীর মুখ দিয়ে ইসলামের শিক্ষা ও দর্শন বেরুচ্ছে? শয়তান যে তাঁর উপর প্রবল ভাবে বিজয়ী তা নিয়ে কি এর পরও সন্দেহ থাকে? এমন ব্যক্তিরা ক্ষমতায় গেলে আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠাকে অসম্ভব করে এবং বিজয় আনে শয়তানী শক্তির। শয়তানের বিজয় বাড়াতেই বাংলাদেশে স্কুলছাত্রীদের হাতে হরামনিয়াম ও ডুগি-তবলা তুলে দিচ্ছে এবং মেয়েদের ফুট বল খেলায় নামাচ্ছে। এই যখন সরকারের নীতি তখন জনসভায় ‘৫ ওয়াক্ত নামায পড়ি’ এ কথা বলার অর্থ কি? এর লক্ষ্য কি জনগণকে স্রেফ ধোকা দেয়া নয়?  

শেখ হাসিনা ও তার সরকারের চরিত্র এবং বাংলাদেশের বিপদ নিয়ে আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক। মহান আল্লাহতায়ালার উপর আস্থা হল ঈমানের নির্যাস। ঈমানদার মাত্রই তাই প্রতিকর্মে ও প্রতি অবস্থায় মহান আল্লাহতায়ালার উপর আস্থার প্রকাশ ঘটায়। ঈমান যে আছে তারই প্রমাণ হলো এই আস্থা। ঈমানদারগণের মুখে তাই উচ্চারিত হয়,“ওয়া মা তাওফিক ইল্লাহ বিল্লাহ” অর্থঃ আল্লাহর দেয়া সামর্থ ছাড়া কারোই কোন সামর্থ নাই। এক্ষেত্রে আপোষ হলে এবং আস্থা কোন দেব-দেবীর উপর গড়ালে তার ঈমান থাকে না। অথচ শেখ হাসিনার আস্থা এখানে দুর্গার উপর গড়িয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,“ওয়া মা তাশাউনা ইল্লা আঁই ইয়াশাল্লাহু রাব্বুল আলামীন” অর্থঃ “এবং তোমরা যা ইচ্ছা করো তা হয় না,যদি না জগতসমূহের মহাপ্রভু আল্লাহ ইচ্ছা করেন”।–সুরা তাকবির, আয়াত ২৯)। অর্থাৎ মানুষের কোন ইচ্ছাই আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া পূরণ হয় না। তাই ব্যক্তির জীবনে যতই ঈমান বাড়ে, ততই বাড়ে মহান আল্লাহর উপর আস্থা। মার্কিনীরা এতটা ধর্মভীরু নয়,বরং তাদের পরিচিতি আধুনিক ও সেক্যুলার রূপে। কিন্তু ডলারের নোটের উপর “We trust in God” লিখেছে। যার অর্থ “আমরা আল্লাহর উপর আস্থা রাখি”। এ বাক্যটি লিখতে তাদের সে সেক্যুলারিজমে বা আধুনিকতায় বাঁধেনি। কোন নাস্তিক প্রেসিডেন্ট হলেও আল্লাহর উপর আস্থার সে ঘোষণাটি বিলুপ্ত করে না। সেটি করে না সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকে নজর রেখে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাণ্ডটি ভিন্ন। তিনি নির্বাচনকালে হাতে তসবিহ নেন, মাজারে যান, রাস্তায় মিছিল থামিয়ে নামাযেও দাঁড়িয়ে যান। তাবলিগ জামায়াতের ইজতেমা হলে সেখানে দোয়ার মজলিসে গিয়ে হাজির হন এবং মাথায় পটিও বাঁধেন। কিন্তু তিনিই দেশের সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থার বাণীটি উচ্ছেদ করে ছেড়েছেন। শয়তানের কাজে শুধু ঈমানশূন্য করা নয়, আল্লাহই উপর আস্থা শুণ্য করাও। ফলে আল্লাহর উপর আস্থার যে বানীটি বাংলাদেশের সংবিধানে ছিল সেটি শয়তানে কাছে পছন্দনীয় ছিল না। অসহ্য ছিল শয়তানের পক্ষের শক্তিরও। শয়তানের সে সাধটি পূরণ হচ্ছে শেখ হাসিনার হাত দিয়ে। কোন ঈমানদার কি এটি সহ্য করতে  পারে? ১ম সংস্করণ ১৬/১০/২০১১; ২য় সংস্করণ ২৭/১০/২০২০   




শাপলা চত্ত্বরের ঐতিহাসিক গণহত্যা এবং খুনি হাসিনার প্রলাপ

ফিরোজ মাহবুব কামাল

বিরামহীন মিথ্যাচারিতা

শেখ হাসিনা যে কতটা মিথ্যাচারি সে প্রমাণ বহু বার সামনে এসেছে। সে মিথ্যাচারিতার একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ, ২০১৩ সালে ১৯শে জুন সংসদে দেয়া তার ভাষন। ২০১৩ সালের ৫ মে দিবাগত রাতে হেফাজতে ইসলামের লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে শাপলা চত্ত্বর থেকে সরানোর সময়ে যে নৃশংস গোলাগুলি হয়েছিল,তাতে হাজার হাজার মানুষ বর্বরভাবে হতাহত হয়েছিল। রক্তের স্রোতে সেদিন ভেসে গিয়েছিল মতিঝিলের রাজপথ। অথচ সেটি শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় তা সরাসরি অস্বীকার করে। শেখ হাসিনা বলেন,“সেই (৫ মে) দিন কোনো গোলাগুলি বা সেরকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তারা সেখানে গায়ে লাল রঙ মেখে পড়ে ছিল। পরে পুলিশ যখন তাদের ধরে টান দেয়,দেখা গেল উঠে দৌড়াচ্ছে। দেখা গেল লাশ দৌড় মারল।” -(দৈনিক আমার দেশ ২০/০৬/১৩)। ৫ মে’র রাতের নৃশংসতা নিয়ে এ অবধি সরকারি দল, র‌্যাব,পুলিশ ও বিজিবীর পক্ষ থেকে বহু ব্যক্তি বহু ভাষণ রেখেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হাসিনা যে মিথ্যাচার করলেন এতবড় মিথ্যা কথা কি কেউ এ অবধি বলেছে?

সে কালো রাতে যে নৃশংস বর্বরতাটি ঘটেছে তার ভূক্তভোগী ও সাক্ষি শুধু হেফাজতে ইসলামের লক্ষাধিক নেতাকর্মীই নন, বরং প্রত্যক্ষদর্শী হলো শত শত মিডিয়া কর্মী ও সাধারণ মানুষ।তাছাড়া এ নৃশংসতার শত শত ভিডিও চিত্রও রয়েছে। এবং বিশ্বব্যাপী তা ছড়িয়ে পড়েছে। কোন সজ্ঞান ও সুস্থ্য মানুষ কি সে সচিত্র প্রমাণগুলো অস্বীকার করতে পারে? একাত্তরের ২৫ মার্চের ঘটনা নিয়ে লাগামহীন গুজব সৃষ্টি করা চলে, কারণ তার কোন ভিডিও প্রমাণ চিত্র নেই।কিন্তু সে অবকাশ ৫ মে’র ঘটনা নিয়ে নেই। অথচ শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ সে রাতের বর্বরতার ধারণকৃত ভিডিও চিত্রগুলো অস্বীকার করে চলছেন। শেখ হাসিনার এরূপ বিষোদগার কি শুধু মিথ্যাচার? বরং নিহত ও আহত হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের সাথে এক নিষ্ঠুর বিদ্রুপও।একমাত্র মানসিক ভাবে অসুস্থ্য মানুষই এমন মিথ্যচারি ও বিদ্রুপকারি হতে পারে। শুধু তাই নয়,শেখ হাসিনা উল্টো মিথ্যাচারিতার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে। মিথ্যাচারি ও অপরাধী প্রমাণের চেষ্টা করেছেন হেফাজতে ইসলামের ধর্মপ্রাণ নেতাকর্মীদের।তাদের চরিত্রহনন করতে গিয়ে তিনি ধর্মের দোহাইও দিয়েছেন। মিথ্যা কথা বলা মহাপাপ ও ধর্মবিরোধী -সে নসিহতও করেছেন উলামাদের। শেখ হাসিনা বলেছেন,“অথচ তারা (বিরোধী দল) ১ লাখ ২ হাজার গুলি,হাজার হাজার লাশের কথা বলে বেড়াচ্ছে।এ ধরনের আজেবাজে মিথ্যাচার করে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ধর্মের নামে এই অসত্য কথা বলে কোন ধরনের ইসলাম পালন তা আমি জানি না।” -(দৈনিক আমার দেশ ২০/০৬/১৩)।

ভয়ানক অপরাধীরাও নিজেদের বাঁচাতে সাধু সাজে। মাদ্রাসার হাজার হাজার নিরাপরাধ ছাত্র-শিক্ষকদের রক্তে শেখ হাসিনার হাতদুটি যে রঞ্জিত -জনগণ সেটি দেখেছে। বাংলাদেশের বাতাসও এখনও অশ্রুসিক্ত। স্বজনহারা হাজার হাজার মানুষের হৃদয়ে ক্ষত এখনো তাজা। অথচ তিনি এখন ধার্মিকের বেশ ধরেছেন,এবং নসিহত শোনাতে শুরু করেছেন। সে সাথে শহীদদের সাথে মশকরাও করছেন। তার এরূপ নাটক জনগণ অতীতেও বহুবার দেখেছে। ধর্মপ্রাণ মানুষকে বোকা বানাতে তিনি যেমন রাস্তার মাঝে মিছিল থামিয়ে নামাযে দাঁড়িয়েছেন, তেমনি মাথায় কালো পটি বেঁধে নির্বাচনি জনসভা করেছেন। হজ-উমরাও করেছেন। কিন্তু এসব করে কি তিনি পাড় পাবেন? তিনি যে কতটা ইসলামের শত্রু -সেটি তো দেশের মানুষ স্বচোখে দেখেছে।সংবিধানে তিনি যেমন আল্লাহর উপর অবিচল আস্থার কথাটিই সহ্য করতে পারেননি,তেমনি সইতে পারেননি দেশের মাটিতে কোরআনে তফসির এবং জিহাদ বিষয়ক বই।তাই তার সরকার দেশের প্রখ্যাত তাফসিরকারকদের জেলে তুলে যেমন ফাঁসিতে ঝুলানোর ব্যবস্থা করছে -তেমনি র‌্যাব ও পুলিশকে মাঠে নামিয়েছে আলেম-উলামাদের লাঠিপেটা করতে ও জিহাদ বিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করতে।

শেখ হাসিনা যে নিজে মিথ্যা ছড়াচ্ছেন সেটির সাক্ষী শুধু দেশের সাধারণ মানুষ নয়, তার নিজ সরকারের দেয়া প্রেসনোটও। মিথ্যাচারি শুধু আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা একা নন,বরং অসংখ্য। হাসিনার মুখ থেকে যে মিথ্যাটি ১৯/০৬/১৩ তারিখে বেরিয়েছে সেটিই তাদের দলের কেন্দ্রীয় যুগ্মসম্পাদক জনাব হানিফ বলেছিল ঘটনার পরপরই। তারও কথা,শাপলা চত্ত্বরে একজন মানুষকেও হত্যা করা হয়নি। তবে সরকারি প্রেসনোটে নিহতের কথা স্বীকার করলেও তাতে নিহতদের বিশাল অংকটি নিয়ে প্রকান্ড মিথ্যা বলেছে। হতাহতের প্রকৃত সংখ্যাটি প্রেসনোটে গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রেসনোট এতটুকু বলেছে যে,ঐদিন ১১ জন মানুষ মারা যায় এবং লাশ দেখা যায় শাপলা চত্ত্বরের মঞ্চের পাশে। যে কোন সভ্য দেশে পুলিশের গুলিতে একজন মারা গেলেও বিরাট খবর।তা নিয়ে তদন্ত হয়।তদন্ড শেষে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিও হয়। সরকার দায়ী হলে তাতে সরকারের ভিত্তিও নড়ে উঠে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রেয়ারি ঢাকায় মাত্র তিন জন নিহত হয়েছিল আর তাতেই একটি সরকারের পতন ঘটেছিল। হাসিনার আমলে মানুষের জীবনের মূল্য কি তবে এতটাই কমে গেল যে সরকারি প্রেসনোটে ১১ জনের মৃত্যুর তথ্য দেয়া হলেও সেটি কোন ব্যাপার রূপে গণ্য হচ্ছে না? শেখ হাসিনার কাছে আরো প্রশ্ন,ঐ দিন কিছু না হলে ১১ জন মানুষ মানুষ লাশ হলো কি করে? বলা হচ্ছে কোন রূপ গুলি ছুড়া হয়নি। তারা কি তবে আসমান থেকে বাজ পড়ায় মারা গেছে?

 

অপরাধী হাসিনা ও গণ-আদালতের রায়

হাসিনার হত্যাকারিনী অপরাধী রূপটি জনগণের কাছে আজ আর গোপন বিষয় নয়। জনগণ এখন তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায়। জনগণের আদালতে শাস্তি দেয়া শুরুও হয়ে গেছে। জনগণের হাতে কোর্টকাচারি কোট নেই। থাকলে তারা তাকে শত শত মানুষের হত্যার দায়ে ফাঁসিতে ঝুলাতো। কিন্তু তাদের হাতে আছে ভোট।আদালতে রায়ে না হলেও জনগণের ভোটের রায়ে তার পরাজয় অনিবার্য। সেটি জেনেই হাসিনাকে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট ডাকাতিতে নামতে হয়েছে। আদালতে প্রাণ বাঁচাতে ও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ডাকাতেরা ডাকাতি ও মানুষ হত্যার বিষয়গুলি যে গোপন করেবে সেটিই স্বাভাবিক। এভাবে নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণ করে সে অপরাধীরাও লোকসমাজে ফেরেশতার ন্যায় চলাফেরা করতে চায়। অপরাধীদের এটিই সনাতন খাসলত।সেটি আরো জরুরী হয়ে পড়েছে রাজনীতির ময়দানে। তাই ভয়ানক অপরাধের পরেও অপরাধী রাজনীতিবিদগণ নিজেদের ফেরেশতা রূপে জাহির করে। শত শত মানুষ খুণের পর শেখ হাসিনাও যে সেটি করবেন সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? সংসদে দাঁড়িয়ে তো সে চেষ্টাই তিনি করেছেন।

জনগণের কাছে তার এ জারিজুরি গোপন নাই। ৫ই মে রাতের ঘটনা যে কতটা নৃশংস গণহত্যা ছিল সে খবর শুধু বাংলাদেশে নয়,সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।সরকার তার মালিকাধীন টিভি ও পত্র-পত্রিকাকে কন্ট্রোল করতে পারে,কিন্তু আজকাল খবর শুধু টিভি ও পত্রিকা মারফত ছড়ায় না। অতিদ্রুত ও ব্যাপক ভাবে ছড়ায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে। সরকারের নিয়ন্ত্রন সেখানে সামান্যই।স্বৈরাচারের ঘৃণ্য অপরাধগুলো এখন কোটি কোটি মানুষ ঘরে বসে জানতে পারে। ফলে প্রচন্ড বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে তাদের প্রতি ঘৃণাবোধ। আজ থেকে দশ বছর আগেও এতটা সম্ভব ছিল না, কিন্তু এখন সেটি সম্ভব। এর ফলেই দ্রুত বিপ্লব এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলি দেশে। পতন ঘটেছে হুসনী মোবারক,বিন আলী ও গাদ্দাফীর ন্যায় স্বৈরাচারের। অথচ এসব স্বৈরাচারিদের হাত হাসিনার চেয়ে কম শক্তিশালী ছিল না। সত্য যে শক্তিশালী এবং দুর্বৃত্তদের পক্ষে সত্যকে চাপা দেয়া যে অসম্ভব -সে বিষয়টি অতীতে যেমন প্রমাণিত হয়েছে,এখনও হচ্ছে। ইতিহাসের কাঠগড়ায় স্বৈরাচারি অপরাধীগণ অতীতের ন্যায় এখনও তাই অপরাধী রূপেই প্রমাণিত হচ্ছে। সে বিচার থেকে ফিরাউন নমরুদ যেমন বাঁচেনি,বাঁচেনি হিটলার-মুজিবও। বাঁচার পথ নেই হাসিনার। অথচ শহীদগণ যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন তাদের চির অম্লান স্মৃতি নিয়ে। ইতিহাসের এটিই বড় শিক্ষা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা তাই বলেছেন, “এবং তোমরা তাদেরকে মৃত বলবে না যারা আল্লাহর রাস্তায় প্রাণ দেয়। তারা তো জীবিত কিন্তু তোমরা সেটি অনুধাবন করতে পার না।” –সুরা বাকারা। কিন্তু যারা দূনীতিগ্রস্ত্র ও মানসিক ভাবে অসুস্থ্য তাদের সামর্থ থাকে না ইতিহাসের সে পাঠ থেকে শিক্ষা নেয়ার। ইতিহাসের মুজিব ও হাসিনাদের এখানেই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা। তাই মুজিব যেমন সে শিক্ষা নেয়নি,হাসিনাও নিচ্ছে না।আজকের বাংলাদেশ সত্তরের বা তেহাত্তরের বাংলাদেশ নয়। দুর্বৃত্তদের ফেরেশতা রূপে জাহির করা এবং জনগণকে বোকা বানিয়ে তাদের পক্ষে ভোট আদায় তখন যেরূপ সহজ হয়েছিল,সেরূপ অবস্থা আজ নেই। সেটিই প্রমাণিত হয় বাংলাদেশের চারটি বড় বড় শহরেরর সিটি কপরোশনের নির্বাচনে। আওয়ামী লীগের মিথ্যাচার, দুর্বৃত্তি ও দুঃশাসনে অতিষ্ঠ জনগণ আওয়ামী লীগের জন্য ভরাডুবি ডেকে এনেছে। কিন্তু সে পরাজয় থেকেও হাসিনা যে আদৌ শিক্ষা নেয়নি সেটিই আবার প্রমাণিত হলো তার সংসদীয় বক্তৃতা থেকে।প্রমাণিত হলো,আবু জেহেল,আবু লাহাব ও মুজিব-হাসিনার ন্যায় মিথ্যাচারি অপরাধীরা তাদের সৃষ্ট মিথ্যাচার ও পাপাচারের গভীর গর্তে শুধু লাগাতর ডুবতেই পারে, বেরুতে পারে না।

তবে হাসিনার অতি বড় অযোগ্যতা হলো, নিজের পরাজয়কে মেনে নেয়ার সামর্থ্য তার নেই। ফলে প্রতিটি পরাজয় তাকে আরো নৃশংস করে তুলছে। প্রতিশোধ পরায়ন করে তুলছে জনগণের বিরুদ্ধে। আর এতে ভয়ানক ভাবে বেড়েছে তার মানসিক অসুস্থ্যতা। মানসিক ভাবে হাসিনা যে কতটা কতটা অসুস্থ্য তারই প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক কথাবার্তায়। মানসিক ভাবে অসুস্থ রোগীরা কানে কানে মৃতদের বা অশরীরীদের কথা শোনে। মানুষকে উড়ে যেতেও দেখে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এমন অবস্থাকে বলা হয় ভিসু্য়্যাল হ্যালুচিনেশন। হাসিনাও তাই হেফাজতের নিহত কর্মীদের গায়ে রং মাখা যেমন দেখেছেন,তেমনি পুলিশী হামলার মুখে লাশদের হাটতেও দেখেছেন। তার এ রোগাগ্রাস্ত অবস্থার কারণও রয়েছে। তিনি ও তার ১৪ দলীয় মিত্রগণ স্বপ্ন দেখেছিল দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার। ২০০৮ সালের বিশাল বিজয় তাদের সে স্বপ্ন আকাশচুম্বি করেছিল। সে স্বপ্ন এখন চূর্ণ হওয়ার ক্ষোভে হাসিনা এখন এক উদভ্রান্ত পাগলীতে পরিণত হয়েছেন। সেরূপ এক মানসিক অসুস্থ্যতা নিয়েই তিনি মুখ খুলেছেন সংসদে। কোন সুস্থ্য মানুষ কি ৫ই মে ও ৬ই মে’র এতবড় মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে এতটা মিথ্যাচার ও বিবেকহীন বিদ্রুপ করতে পারে? এতটা বিবেকহীন হওয়া তো একমাত্র উৎকট উম্মাদিনীর পক্ষেই সম্ভব। উম্মাদের কথায় সত্য ও বাস্তবতার কোন সংযোগ থাকে না। সেটি নাই হাসিনার বক্তব্যেও। তাই ৫ ই মের রাতে যেখানে মতিঝিলে শত শত মানুষ নিহত হলো, হাজার হাজার মানুষ আহত ও নিখোঁজ হলো -তা নিয়ে তিনি বলেছেন সেখানে কোন কিছুই ঘটেনি।

 

কি ঘটেছিল ঐ কালো রাতে?

কি ঘটেছিল সে কালো রাতে সেটি আবার জানা যাক। ঐ রাতের ঘটনা লুকাতে সরকারের চেষ্টার কোন কমতি ছিল না। সরকার-বিরোধী ‘আমার দেশ’ পত্রিকাটি যাতে কোন খবর ছাপতে না পারে সে জন্য পূর্বেই পত্রিকার ছাপাখানায় তালা লাগানো হয়। হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয়া হয় দিগন্ত টিভি ও ইসলামি টিভি। কিন্তু এরপরও প্রকৃত খবর বেরিয়ে এসেছে। ১২ই মে তারিখে দৈনিক যুগান্তর রিপোর্ট করে,পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবীর ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন এ হামলায় অংশ নিয়েছিল। হামলাকারিদের মধ্যে ১৩০০ জন এসেছিল র‌্যাব থেকে। ৫,৭১২ জন এসেছিল পুলিশ বাহিনী থেকে এবং ৫৭৬ জন এসেছিল বিজিবী থেকে। তখন শাপলা চত্ত্বরের আশেপাশে শান্তিপূর্ণ ভাবে অবস্থান নিয়ে বসে ছিল লক্ষাধিক মুসল্লি।যাদের অনেকে সে সময় তাহাজ্জুদের নামায পড়ছিলেন, কেউ বা যিকির করছিলেন, কেউ বা সারাদিন সরকারি গুন্ডা বাহিনীর হামলা মোকাবেলা করে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হামলা শুরু হয় রাত আড়াইটার সময় এবং তিন দিক দিয়ে। দৈনিক যুগান্তর লিখেছে,সমগ্র এলাকাটি সে সময় বন্দুকের গুলি,টিয়ারগ্যাসের শেল ও ধোয়াতে পূর্ণ হয়ে যায়। পত্রিকাটি বিবরণ দিয়েছে,হামলাকারি এ বিশাল বাহিনীর নেতৃত্ব দেয় র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স প্রধান লে.কর্নেল জিয়াউল হাসান,র‌্যাব-১০ এর কমান্ডার লে.কর্নেল ইমরান,র‌্যাব-৩ এর কমান্ডার মেজর শাব্বির এবং র‌্যাব ডাইরেক্টর লে.কর্নেল কিসমত হায়াত,র‌্যাব ডাইরেক্টর কামরুল আহসান এবং বিজিবী অফিসার কর্নেল ইয়াহিয়া আযম।। সেপাইদের পাশে হামলাতে অংশ নেয় ৫জন কমান্ডো অফিসার। শত্রু দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোন প্রকান্ড সীমান্ত যুদ্ধের যেমন কোড নাম থাকে তেমনি কোড নাম ছিল জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ সেনা যুদ্ধেরও। তবে একটি নয়,একাধিক। র‌্যাব এ যুদ্ধের নাম দিয়েছিল “অপারেশন ফ্লাশআউট”। আর বিজিবী নাম দিয়েছিল “ক্যাপচার শাপলা”। প্রশ্ন হলো, হাসিনার কথা মত সেখানে যদি কোন কিছু না থাকে তবে এত সৈন্য,এত পুলিশ,এত র‌্যাব ও এত অফিসার সেখানে কি করতে গিয়েছিল? তবে কি তারা শাপলা চত্ত্বরে ঘোড়ার ঘাস কাটতে জমা হয়েছিল?

একাত্তরের ৯ মাসের যুদ্ধের ভারত ও পাকিস্তানের কোন পক্ষই সীমান্ত যুদ্ধের কোন একটি একক সেক্টরে ৭ হাজার ৫ শত ৮৮ জন সৈন্য নিয়ে হামলা করেনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় ৪ হাজার মাইলের বেশী সীমানা জুড়ে পাকিস্তান যুদ্ধ করেছে মাত্র ৪৫ হাজার নিয়মিত সৈন্য নিয়ে। -(Niazi, Lt Gen AA K, 2002: The Betrayal of East Pakistan, Oxford University Press, Karachi)। ফলে কোন একক সেক্টরে এত বিপুল সংখ্যক সেনা সমাবেশের সামর্থই পাকবাহিনীর ছিল না। অথচ এক শাপলা চত্তরের ন্যায় আধা মাইলের কম জায়গায় সৈন্য নামানো হয়েছিল ৭ হাজারের বেশী। বাংলাদেশের বিগত হাজার বছরের ইতিহাসে এতবড় হামলা এবং এক রাতে এত মৃত্যু কোন কালেই হয়নি। ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে যখন আজকের বাংলাদেশের চেয়ে বৃহত্তর বাংলা বিজিত হয় তখনও এতবড় হামলা এবং এত মৃত্যু হয়নি।সে হামলাটি হয়েছিল মাত্র ১৭ জন সৈনিক নিয়ে। পলাশীর প্রান্তরে যখন ইংরেজ বাহিনীর হাতে বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হয় এতবড় রক্তপাত সেদিনও হয়নি। অথচ সেটি হলো বাঙালী সেপাইদের হাতে,এবং হাসিনার আমলে। রক্ত ঝরলো নিরীহ আলেম-উলামা ও সাধারণ মুসল্লিদের।

অথচ এতটা জানাজানির পরও হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে বলছেন ঐদিন কিছুই হয়নি। মিথ্যাচার আর কাকে বলে! মিথ্যাচারি শুধু মিথ্যাই বলে না, মিথ্যা বলায় প্রচন্ড লজ্জাহীনও হয়। ফলে জনসম্মুখে তারা নির্ভেজাল মিথ্যা গলা ফুলিয়ে বলতে পারে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে দুর্নীতি ও দুবৃত্তিতে বিশ্বের দুইশতের বেশী দেশকে হারিয়ে ৫ বার প্রথম হয়েছে। নবীজী (সাঃ) দুর্নীতির মা’ রূপে আখ্যায়ীত করেছেন মিথ্যাচারিতাকে। বাংলাদেশে দূর্নীতির এ মা’দের সংখ্যা বিপুল বলেই দুর্নীতিতে বার বার রেকর্ডই গড়েছে। বাংলাদেশে যতদিন এরূপ সীমাহীন মিথ্যাচারিতা থাকবে ততদিন দূর্নীতির রেকর্ডও নির্মিত হবে।শুধু দূর্নীতিতে নয়,মিথ্যাচারিতার প্রতিযোগীতায়ও হাসিনা যে বিশ্বের তাবত মিথ্যাচারিদের হারিয়ে প্রথম হবেন তা নিয়েও কি কোন সন্দেহ আছে? হেফাজতের কর্মীগণ রং মেখে শুয়ে ছিল এবং পুলিশের আগমনে লাশগুলো হাটা শুরু করে -হাসিনার মুখ দিয়ে সংসদে প্রদত্ত এমন ভাষন তাই অপ্রত্যাশিত কিছু নয়।মুদির দোকানদার যেমন চাল-ডাল নিয়ে ব্যবসা করে হাসিনা ও তার মিত্রদের ব্যবসাও তেমনি এ মিথ্যা নিয়ে। সে অভিন্ন ব্যবসাটি ছিল মুজিবেরও।একাত্তরে তিরিশ লাখ মানুষ হত্যার মিথ্যাটি আবিস্কার হয়েছে এ মিথ্যুকদের দ্বারাই। তিরশ লাখের জন্য ৯ মাসের যুদ্ধে প্রতি ২৫ জনে একজন এবং প্রতিদিন ১১ হাজার বাঙালীকে নিহত হতে হয় সেটি বুঝবার সামর্থ এ মিথ্যুকদের যেমন একাত্তরে ছিল না,এখনও নাই। রানা প্লাজা ধ্বসে গেছে মৌলবাদীদের ঝাঁকুনিতে -চটকদার এ মিথ্যাটি তো তাদেরই আবিস্কার।এবং সেটি পিএইডি ধারী আওয়ামী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মগজে। তাই ভবিষ্যতেও তাদের মুখ থেকে এমন আরো বহু অলীক মিথ্যার যে উদগীরণ ঘটবে তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে?

৫মে’র ভয়াল রাতের নৃশংসতা নিয়ে হাসিনার ভাষণ শুধু মিথ্যাচারিতাই নয়,রুচিহীন নিষ্ঠুর মশকরাও।অথচ যে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকাটি ৫ই মে’র দিবাগত রাতের সে সেপাহী ও পুলিশী হামলার বিবরণটি লিখেছে তা কোন মৌলবাদীদের পত্রিকা নয়। জামায়াত শিবিরের লোকেরা এ পত্রিকায় লেখালেখি করার সুযোগ পায় না। এ পত্রিকার কলামিস্ট হলো আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরির ন্যায় আওয়ামী ঘরানার বরকন্দাজগণ। দৈনিক যুগান্তর লিখেছে,এ হামলায় ১৫৫,০০০ গুলি নিক্ষেপ করা হয়।পুলিশ ছুড়েছে ৮০,০০০ টিয়ার গ্যাসের শেল এবং ৬০,০০০ রাবার বুলেট। এছাড়া ছুড়া হয়১৫,০০০ শর্টগান বুলেট এবং ১২,০০০ সাউন্ড গ্রেনেড। সরকার বলছে মাত্র ১০ মিনিট অপারেশন চলে। অথচ যুগান্তর লিখেছে হামলা হয়েছে তিন ঘন্টা ধরে, রাত ২:৩০ মিনিটে শুরু হয়ে শেষ হয় ৫:৩০ মিনিটে। তিন ঘন্টার এ যুদ্ধে নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে যে পরিমাণ বুলেট, টিয়ার গ্যাস,রাবার বুলেট ও গ্রেনেড ব্যবহার করা হয় তা পাকিস্তান আমলের সমগ্র ২৪ বছরেও ব্যবহৃত হয়নি। দেশের নিরস্ত্র সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে এতবড় বর্বরতা কি কোন কালেই হয়েছে? জনগণ রাজস্ব দেয় এ জন্য যে, তাদের অর্থে প্রতিপালিত পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবী তাদের জীবনে নিরাপত্তা দিবে।কিন্তু এখানে ঘটেছে উল্টোটি।তাদের অর্থে কিনা বুলেট,কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও গ্রেনেড ব্যবহৃত হয়েছে তাদেরই বিরুদ্ধে।কইয়ের তেলে এরূপ কই ভাজার কাজটি এদেশে করে গেছে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা সে পথই ধরেছে।উল্লেখ্য যে, র‌্যাব-সদস্যরা এ কাজে প্রশিক্ষণও নিয়েছে ব্রিটিশদের থেকে।

 

পাগলীর প্রলাপ

শেখ হাসিনা সংসদে বলেন,“আপনারা দেখেছেন যে,গায়ে লাল রঙ লাগিয়ে পড়ে আছে আর পুলিশ যখন টান দিচ্ছে উঠে দৌড়াচ্ছে। দেখা গেল লাশ দৌড় মারল।এ ধরনের নাটকও সেদিন করা হলো।রুয়ান্ডার ভূমিকম্পে যে মানুষ মারা গিয়েছিল,সেই ছবি,১৯৭৯ সালে জর্জটাউনে দুই-আড়াই হাজার মানুষ ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলে আত্মহত্যা করেছিল—সেই ছবি দেখানো হচ্ছে লাশের ছবি হিসেবে।” -(দৈনিক আমার দেশ ২০/০৬/১৩)। শেখ হাসিনা সে রাতে ঘরে বসে শাপলা চ্ত্ত্বরে লাশের দৌড় মারার চিত্র দেখেছেন!আস্ত উম্মাদিনীর প্রলাপ। তার কাছে লাশগুলো মনে হয়েছে আফ্রিকা মহাদেশের রুয়ান্ডা ও জর্জটাউনের মানুষ। কি তাজ্জবের বিষয়,বাংলাদেশী মুসল্লিদের লাশগুলো তার কাছে বাঙালী বলে মনে হয়নি! নিজ দেশের মানুষদের চিনতে তার এতটা ভ্রম? কোন সুস্থ্য মানুষ কি নিজ দেশের মানুষদের চিনতে কি এতটা ভূল করে? নিজ দেশের মানুষের লাশগুলোকে কোন বাঙালী শিশুও কি আফ্রিকা মহাদেশের মানুষের লাশ বলবে? প্রশ্ন হলো,এতবড় বদ্ধ পাগলী একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয় কি করে? যে দেশ বিশ্বে দূর্বৃত্তিতে ৫ বার প্রথম হয় সম্ভবত তেমন একটি দেশেই এমন একটি অদ্ভুত কান্ড সম্ভব!সভ্য দেশের মানুষেরা এমন পাগলিদের উপর কোন দায়িত্ব দেয়া দূরে থাক সত্ত্বর মানসিক চিকিৎসার জন্য কোন পাগলা গারদে পাঠায়। অথচ বাংলাদেশে তার উপর চাপানো হয়েছে বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম রাষ্ট্রের দায়ভার!

৫ই মে’র দিবাগত রাতের শত শত মানুষ হত্যা হাসিনার নজরে যেমন পড়েনি, তেমনি সেটি তার কাছে অপরাধও মনে হয়নি। ফলে ঐ কালো রাতটিতে শত শত মানুষ নিহত হলেও কারো বিরুদ্ধে কোন খুনের মামলা দায়ের হয়নি। যেন দেশে ঐ রাতে কোন কিছুই হয়নি। অথচ শত শত ফুটেজ রয়েছে যাতে এটি সুস্পষ্ট যে,ঐ রাতে যেখানে ভয়ানক হত্যাকান্ডটি ঘটেছে সেটি আফ্রিকার রুয়ান্ডা নয়। জর্জটাউনও নয়। বরং সেটি ঢাকার মতিঝিল। যারা গুলি করছে এবং পিটিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করছে তারাও অন্য মহাদেশ থেকে আগত কোন খুনি বাহিনী নয়। ভূমিকম্পও নয়। বরং হত্যাকারি হলো বাংলাদেশী পুলিশ,র‌্যাব ও বিজিবী সদস্যরা। সারা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ সে ফুটেজ দেখেছে। বিশ্বের নানা দেশের পত্রিকাতেও সেগুলি ছাপা হয়েছে। আল জাজিরাসহ বহু টিভি চ্যানেল সেগুলি দেখিয়েছে। এখনও সেগুলি ইন্টারনেটে দেখা যায়। অথচ এতবড় এ খুনের বিচার নিয়ে সরকারের কোন আগ্রহ নেই। বিরোধীদলের পক্ষ থেকে দাবী উঠেছিল বিচার বিভাগীয় তদন্তের। নিরপেক্ষ তদন্ত দাবী করেছিল হেফাজতে ইসলাম এবং বহু মানবাধিকার সংস্থা। কিন্তু সরকার সে পথে এগুয়নি। এখন পুরো ঘটনাকেই ধামাচাপা দিচ্ছে। ধাপাচাপা দেয়ার সে লক্ষ্য নিয়েই হাসিনা সংসদে বলেছেন ঐ রাতে কিছুই হয়নি। যে কোন সভ্য দেশে এতগুলো মানুষ দূরে থাক,একসাথে এত পশু মারা গেলেও তার দ্রুত তদন্ত হয়। অথচ হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হওয়ার পরও তা নিয়ে তদন্ত বা বিচারের আগ্রহ নেই বাংলাদেশ সরকারের। পৃথিবীর অন্যান্য মানুষেরাই বা এতে কি ভাববে? ডাকাত পাড়ায় শুধু ডাকাতিরই আয়োজন হয়,সেখানে বিচার বসে না। কারো শাস্তিও হয় না।তবে কি আওয়ামী ডাকাতদের শাসনামলে বাংলাদেশ তেমনি এক ডাকাত পাড়ায় পরিণত হয়েছে?

 

আরেক মিথ্যাচার 


অপরদিকে হাসিনা তার সংসদীয় ভাষনে অপরাধী সাব্যস্ত করেছেন বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বিশেষ করে জামায়াত ও শিবিব কর্মীদের। তাদের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ এনেছেন যে,তারা কোরআন শরিফ পুড়িয়েছে। তিনি বলেছেন,“এই কোরআন শরিফ পুড়িয়েছে। সোনার দোকান লুট করেছে। এর ভিডিও ফুটেজ আছে। জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরাই এটা করেছে।” -(দৈনিক আমার দেশ ২০/০৬/১৩)। হাসিনা এ কথা কি বিশ্বাসযোগ্য? বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটের বইয়ের দোকানগুলো ছিল সমগ্র দেশে কোরআন-হাদীসের সব চেয়ে বড় মার্কেট।সে মার্কেট পুড়াতে জামায়াত শিবির বা হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা কেন যাবে? তাদের কর্মীরা তো দেশের নানাস্থান থেকে গ্রেফতার হচ্ছে ঘরে ইসলামি বই রাখার কারণে। বরং যারা কোরআনের তাফসির মাহফিলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে এবং আলেমদের গ্রেফতার করছে, এমন কাজে তো আগ্রহ থাকবে তাদের।

প্রশ্ন হলো, কোরআন শরিফ পুড়ানোর ফুটেজ যদি সরকারের হাতে থেকেই থাকে তবে সে অপরাধের বিচার না করাই তো সরকারের আরেক অপরাধ। সরকার তবে কেন বসে আছে? বিচার কাজে বাধাটি কোথায়? বিরোধী দলও তো চাচ্ছে,কোরআন পুড়ানোর অপরাধীদের দ্রুত বিচার হোক। যারা কোরআন শরিফ পুড়িয়েছে ও সোনার দোকান লুট করেছে সে বিচার করার দায়িত্ব তো সরকারের, বিরোধীদলের নয়।কিন্তু বিচার দূরে থাক,সরকার গত এক মাসে এখনও কি কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ খাড়া করতে পেরেছে? অথচ সরকার জামায়াত ও শিবিরের এমন হাজার হাজার কর্মীকে গ্রেফতার করছে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের কোন প্রমাণ নাই। অপরাধে জড়িত থাকার কোন ফুটেজও নাই। প্রমাণের অভাবে পুলিশ কোন মামলাও খাড়া করতে পারছে না।ফলে বিনা বিচারে তাদেরকে আটক রাখছে। তাই প্রশ্ন জাগে,ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে কোরআন পুড়ানো ও সোনার দোকান লুটের যদি কোন ফুটেজই থাকতো তবে কি সরকার এতদিন বসে থাকতো? হাসিনার মিথ্যাচার এখানেও। ১ম সংস্করণ ২২/০৬/১৩; ২য় সংস্করণ ২৭/১০/২০২০

 




বিবিধ ভাবনা-৬

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১.

মুসলিমদের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের যুদ্ধ

ফ্রান্স নিজেকে সেক্যুলাজিমের গুরু মনে করে। সেক্যুলারিস্টদের বড় ভন্ডামীটি হলো, তারা সেক্যুলাজিমের ব্যাখ্যা দেয় ধর্মনিরপেক্ষ রূপে। অথচ তাদের মূল চরিত্রটি হলো প্রচন্ড ইসলাম বৈরীতার। তাই যে শিক্ষক স্কুলে নবীজী (সা:)র উপর কার্টুন দেখিয়েছিল -তাকে ফ্রান্স সরকার দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব দিয়ে সন্মানিত করেছে। অথচ এরূপ কার্টুন দেখানো নিজেই এক ভয়ানক অপরাধ এবং যে কোন সভ্য বিচারে অতি কু-রুচিপূর্ণ। এরূপ খেতাব দেয়ার মধ্য দিয়ে ফ্রান্স সরকার তার নিজের চরিত্রটা প্রকাশ করেছে। এবং সেটি জঘন্য কার্টুন নির্মাতার চেয়ে কম কুরুচিপূর্ণ নয়।

প্রতিটি ঈমানদারের কাছে তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয় হলো নবীজী(সাঃ)। তাই নবী চরিত্রের অবমাননা হলে যে কোন মুসলিম তার বদলা নিতে উদ্যোগী হবে –সেটি কোন নতুন বিষয় নয়। পূর্বেও সেটি বহুবার ঘটেছে। ফ্রান্সে রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ মুসলিম। তাদের সবাই নবী চরিত্রের এরূপ বিকট অবমাননা নীরবে মেনে নিবে -সেটি কি করে ভাবা যায়? তাই ফ্রান্স সরকারের সুবুদ্ধি থাকলে তারা ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ইসলামের প্রিয় নবীজী (সাঃ)’র বিরুদ্ধে কার্টুন যুদ্ধটি নিষিদ্ধ করতো। এটি তো মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। সে যুদ্ধের অংশ রূপে ফ্রান্স সরকার অপরাধীকে পুরস্কৃত করছে। এ যুদ্ধের ফলে প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে অন্যান্য মুসলিম দেশেও। জনগণ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে।

ইসলামের বিরুদ্ধে ফ্রান্স সরকারের সাংস্কৃতিক যুদ্ধের আরেক আলামত হলো, তারা মহিলাদের নানা অশ্লিলতাকে বৈধতা দিলেও মুসলিম মহিলাদের মাথায় স্কার্ফ পড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কভিড থেকে বাঁচতে এমনকি পুরুষেরাও এখন নেকাব তথা মাস্ক পড়ছে। অথচ মুসলিম মহিলাদের ক্ষেত্রে সেটি নিষিদ্ধ করেছিল। স্কার্ফ পরিহিত কোন মুসলিম মহিলার সরকারি চা্কুরি পাওয়ার কোন সুযোগ নাই। সুযোগ নাই কোন কলেজে ভর্তি হওয়ার। বোরখা পড়ে পাবলিক স্থানে হাজির হলে জরিমানা দিতে  হয়। বন্ধ করে দিয়েছে কোন কোন মসজিদ। কঠোরতা আরোপ করেছে নতুন মসজিদ নির্মাণের বিরুদ্ধে। ফলে জুম্মার দিনে মুসলিমদের নামায পড়তে হয় মসজিদ উপচিয়ে রাজপথে।

লক্ষণীয় আরেকটি বিষয় হলো, ইসলামের শত্রুতা অতি পুরনো। বিশ্বের কোন প্রান্তে ইসলামের উত্থান দেখা দিলে ফ্রান্স তার বিরোধীতা শুরু করে। তাই মিশরের সামরিক শাসক জেনারেল আবুল ফাতাহ সিসি যখন দেশটি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডক্টর মুরসীকে হটিয়ে ক্ষমতা হাতে নেয় এবং ইসলামপন্থিদের হত্যা শুরু করে -তখন ফ্রান্স তাকে কোলে তুলে নেয়। এবং শুরু করে তার প্রতি সর্বপ্রকার সমর্থণ ও সহযোগিতা। ফ্রান্স সৈন্য পাঠিয়েছে আফ্রিকান দেশ মালিতেও। কারণ সেখানে ঘটেছে ইসলামপন্থিদের উত্থান। তাদের রুখতে সেখানে বোমা বর্ষণ করেছে। তাছাড়া আরেকটি কারণ হলো, মালি’তে রয়েছে বিশাল বিশাল স্বর্ণ খনি। ফ্রান্স চায় না, সে স্বর্ণের খনিগুলি মুসলিমদের হাতে যাক ও তা থেকে তারা লাভবান হোক। কিছু বছর আগে ফ্রান্সের বোমারু বিমানগুলি বর্ষণ করেছে সিরিয়ার ইসলামপন্থিদের উপর। এই আগ্রাসী ফান্সই ১৫ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল আলজিরিয়াকে অধিকৃত রাখতে। তাই ফ্রান্সের মুসলিম বিরোধী চরিত্রটি অতি পুরানো। প্রশ্ন হলো, এমন একটি চরম মুসলিম বিরোধী দেশের শক্তি বাড়ে এমন কিছু করা কি জায়েজ? সেটি করলে কি ঈমান থাকে? এজন্যই যাদের মধ্যে ঈমান আছে তারা ফ্রান্সের পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছে। এটি এক অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ। কোন ঈমানদার কি এ যুদ্ধ থেকে হাত গুটিয়ে থাকতে পারে?

২.

পোপের আত্মসমর্পণ

ইসলামে যেমন মহান আল্লাহতায়ালা-প্রদত্ত শরিয়তি বিধান আছে -সেটি যেমন হিন্দু ধর্মে নাই তেমনি খৃষ্টান ধর্মেও নাই। তাই তাদের মাঝে হালাল-হারামের কোন বিধি নিষেধ নাই। ফলে সবকিছুই তাদের কাছে হালাল। সম্প্রতি খৃষ্টান জগতের ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিস হালাল ঘোষণা দিল সমকামিতার। এখন থেকে পুরুষের সাথে পুরুষের এবং মহিলার সাথে মহিলার বিবাহ বৈধ হবে। লক্ষণীয় হলো, পূর্বে অন্য কোন পোপই সেটির বৈধতা দেয়নি। ফল ধর্মহীনদের এটি আরেক বিজয়। এতে প্রকাশ পায় খৃষ্টান জগতের ধর্মহীন এক বেহাল অবস্থা।

৩.

আবর্জনার স্তুপে গেল শাসনতন্ত্র

সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলি’তে পালিত হলো বিজয় উৎসব। উৎসবের কারণ, চিলির জনগণ দেশের শাসনতন্ত্রকে আবর্জনার স্তুপে ফেলতে পেরেছে। সে শাসতন্ত্রটি রচিত হয়েছিল পেনোশের মত দুর্বৃত্ত এক সামরিক জান্তার হাতে। তাতে বৈধতা পেয়েছিল পেনোশের নিষ্ঠুর ও অসভ্য শাসন। সে হত্যা করেছিল বহু হাজার বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীকে। বাংলাদেশীদের এ থেকে শেখার আছে। বাংলাদেশের শাসতন্ত্রটি রচিত হয়েছিল তাদের হাতে যারা জন্ম দিয়েছিল বাকশালী শাসনের বর্বরতা। পেনোশের মত তারাও হত্যা করেছিল ৩০ হাজার বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীকে।

বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুতর ক্ষতিকর দিকটি হলো, এটি শরিয়ত পালনের ন্যায় ফরজ পালনে সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের এ শাসনতন্ত্র হলো মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দলিল। এ শাসতন্ত্রে মহান আল্লাহতায়ালার বদলে সার্বভৌমত্ব দেয়া হয়েছে জনগণকে। আইন প্রণয়নের সার্বভৌমত্ব দেয়া হয়েছে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে। ইসলামে এটি শতভাগ হারাম। এখানে আইন দেয়ার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্বকে খর্ব করা হয়েছে। এটি স্পষ্টতঃ শিরক। মহান আল্লাহতায়ালা অন্য গুনাহ মাফ করেন, কিন্তু মাফ পায়না শিরক। সেক্যুলারিস্টগণ শিরকপূর্ণ এ শাসনতন্ত্রকে পবিত্র বলে অভিহিত করে। কোন ঈমানদার ব্যক্তি কি এমন একটি সংবিধানকে মেনে নিতে পারে? এমন একটি সংবিধানকে আবর্জনার স্তুপে ফেলতে যতই দেরী হবে ততই গুনাহর অংক বাড়বে। 

৪.

চোর দেয় নসিহত!

সম্প্রতি পত্রিকায় শেখ হাসিনার একটি নসিহত ছাপা হয়েছে। সে নসিহতে বলা হয়েছে যেন দেশে নীতিহীন ও হলুদ সাংবাদিকতা না থাকে। কিন্তু তার মুখ থেকে এ কথা শোনা যায়নি যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যেন ভোটচোরের হাতে না যায়। দেশে গুম-খুন ও সন্ত্রাসীদের রাজত্ব যেন প্রতিষ্ঠা না পায় -সে কথাও তার ভাষণে বলা হয়নি। একথা হাসিনার মুখ থেকে বের হয়নি যে দেশের প্রতিটি চোর-ডাকাতকে শাস্তি দেয়া হবে। একথা না বলার কারণ একটিই। সে কারণটি হলো, একজন প্রমানিত ও প্রতিষ্ঠিত চোর যত বড় বড় কথাই বলুক না কেন, কখনোই নিজের বিচার চাইতে পারে না।

শেখ হাসিনা কথা বলেছে নীতিহীন ও হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে। অথচ তার নিজের সরকার বেঁচে আছে নীতিহীন হলুদ সাংবাদিকতার সাহায্য নিয়ে। তার দৃষ্টিতে সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো স্রেফ তার সরকারের প্রশংসা করা এবং সকল প্রকার নিন্দা থেকে দূরে থাকা। যে সব পত্র-পত্রিকা বা টিভি চ্যালেন তার সরকারের সামান্যতম সমালোচনা করেছে সেগুলিকে বন্ধ করা হয়েছে। ২০১২ সালের ৫ই মে যখন শাপলা চত্ত্বরে হামলা করা হয় তখন কোন সাংবাদিককে সঠিক চিত্র তুলে ধরতে দেয়া হয়নি। তখন সাংবাদিকদের দিয়ে তাই বলানো হয়েছে যা সরকার বলতে চেয়েছে। এটিই তো হলো হলুদ সাংবাদিকতা।

৫.

অসভ্য শাসনের আযাব

ব্যাংককের রাজপথগুলি আজ জনসমুদ্র। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ প্রতিবাদ মুখর। তারা সরকারের পদত্যাগ চায়। সীমিত করতে চায় রাজার ক্ষমতা। সেটি নিকট অতীতে সুদান, তিউনিসিয়া ও লিবিয়ায় যেমন দেখা গেছে, তেমনি সম্প্রতি দেখা গেল বা যাচ্ছে লেবানন, ইরাক, কিরগিজসথান, বেলারুশ, চিলিসহ বহু দেশে। এটিই তো যে কোন সভ্যদেশের সভ্য রীতি। জনগণ এভাবেই তাদের ক্ষোভ নিয়ে রাস্তায় নামে এবং সরকারের পরিবর্তন ঘটায়। সেটি যেমন পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশে ইরশাদের বিরুদ্ধেও হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অসভ্য ফ্যাসিস্ট সরকার জনগণকে সে সভ্য অধিকার দিতে রাজী নয়। তারা গুম-খুন-ফাসি দিয়ে বিরোধীদের নির্মূল করতে চায়। দেশে অসভ্য শাসনের এটি হলো এক প্রান্তিক অবস্থা। অসভ্য শাসনের এটি হলো দুঃসহনীয় আযাব।

৬.

মুসলিম দেশে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

মিশরের নির্বাচত প্রেসিডন্ট মুরসীকে যে পথে সরানো হয়েছিল তেমন একটি ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে পাকিস্তানে ইমরান খানের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানে দীর্ঘকাল পালাক্রমে শাসন করেছে পিপলস পার্টি এবং নওয়াজ শরিফের মুসলিম লীগ। ‌‌তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে বিশাল দুর্নীতির অভিযোগ। কিন্তু তারা চায় বিচার না। চায়, ইমরান খান সরকারের পতন। চায়, নিজেরা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে। কারণ একমাত্র এ পথেই  তারা মামলার সাজা থেকে মুক্তি পেতে পারে। লক্ষণীয় হলো, পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে উৎসব হচ্ছে ভারতে। সেটি প্রকাশ পাচ্ছে ভারতীয় মিডিয়ায়। ভারতের এজেন্ডা এখানে সুস্পষ্ট। ভারত চায় না প্রতিবেশী কোন দেশে গণতন্ত্র ও শান্তি প্রতিষ্ঠা পাক এবং এগিয়ে যাক অর্থনৈতিক ভাবে। ভারতের সে ষড়যন্ত্রমূলক রাজনীতি ক্ষেত্র হলো বাংলাদেশ। সেটির শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সাল থেকে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার দুর্বৃত্ত ফ্যাসিস্ট সরকার তো টিকে আছে ভারতের সহায়তা নিয়েই। ভারত তেমন একটি অবস্থা পাকিস্তানেও সৃষ্টি করতে চায়।

৭.

অনিবার্য কেন জিহাদ?

সভ্য সমাজ নির্মাণে জরুরী হলো অসভ্য শাসনের নির্মূল। সে কাজ শুধু নামায়-রোযা ও হজ্ব-যাকাত বা মসজিদ নির্মাণে হয় না। সে কাজের জন্য ফরজ করা হয়েছে জিহাদ।তাই যেখানে জিহাদ নাই সেখানে সভ্য সমাজও নাই। বাংলাদেশে নামাযীর সংখ্যা বহু কোটি। মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যাও বহু লক্ষ। কিন্তু এরপরও সেখানে সভ্য সমাজ নির্মিত হয়নি। ফলে দেশ ছেয়ে গেছে গুম-খুন-ধর্ষণ ও সন্ত্রাস। এর কারণ, জিহাদে জনগণের জান-মাল ও মেধার বিনিয়োগ নাই।

৮.

ভাল ও মন্দ লোকের পরিচয়

ভাল লোকের গুণ হলো সে সর্বদা দুর্বৃত্তকে ঘৃনা করে এবং ভালবাসে ভাল লোকদের। যে ব্যক্তি দুর্বৃত্তের পক্ষ নেয় সে নামাযী বা রোযাদার হতে পারে, হাজী বা দানশীলও হতে পারে; কিন্তু সে ব্যক্তি ঈমানদার হতে পারে না। ভাল লোকও হতে পারে না। ঈমানদারকে তো প্রতিপদে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ নিতে হয়। দুর্বৃত্তের পক্ষ নেয়া তো বেঈমানের কাজ। যারা বাংলাদেশে দুর্বৃত্তদের ভোট দেয় তাদের সবাই কি বেনামাযী? তাদের মধ্যে লক্ষ লক্ষ লোক এমনও আছে যারা নামায-রোযা পালন করে এবং তাবলিগ জামাতের ইজতেমাতেও যায়। ব্যক্তির ঈমানদারের পরীক্ষা হয় সত্য ও মিথ্যাকে চেনা এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ নেয়াতে।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে সে ভাল লোকদের সংখ্যাটি কীরূপ? নিশ্চয়ই যারা হাসিনার মত ভোটচোরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে তারা ভাল লোক হতে পারে না। ঈমানদারও হতে পারে না। কারণ, অন্তরে শরিষার দানা পরিমান ঈমান থাকলে ভোটচোরকে সন্মান দেখাতে তাদের মুখ দিয়ে কখনোই মাননীয় শব্দটি উচ্চারিত হতো না। এটি নিতান্তই বেঈমানী ও নিরেট অসভ্যতা। অথচ বাংলাদেশের অফিস-আদালত, কোট-কাছারি, সংসদ, মন্ত্রীপরিষদ, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা এবং রাজনীতির অঙ্গণ পূ্র্ণ হয়ে আছে এরূপ বেঈমানদের দ্বারা। ফলে বাংলাদেশে সভ্য সমাজ নির্মিত হবে কীভাবে? এমন দেশে গুম-খুন ও ধর্ষণের ন্যায় অসভ্যতা বাড়বে সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

৯.

Is adherence to 7th century Muslims’ legacy is terrorism?

It is very natural that those who can’t appreciate the signs of Allah SWT, they can’t appreciate the achievement of the 7th century Muslims. Any sensible man will recognise that the finest civilisation in the whole human history was made by them. Those who have the light in their mind they can see it. So, those who have true iman and fear Allah SWT, they fear to deviate a single inch from their legacy. 

We must recognise the truth that the early Muslims are the best people in the whole human history -as stated by the Prophet (peace be upon him). Allah SWT is pleased on them. Denying it is indeed the expression of deprivation of iman. Because of such deprivation of iman, they abuse those who adhere to the belief and practice of the early Muslims as terrorist and fundamentalist.




বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘাত ও সম্ভাবনা

ফিরোজ মাহবুব কামাল

কেন এতো সংঘাত?

বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দান জুড়ে চলছে গভীরতর বিতন্ডা ও সংঘাত। সংঘাত নিছক সভা-সমাবেশ, লেখা-লেখি, গালিগালাজ ও রাজনৈতিক দলাদলির মধ্যে সীমিত নয়, ঠেলে দিচ্ছে গুম, সন্ত্রাস ও  হত্যাকান্ডের দিকেও। দেশের ইসলামের বিপক্ষ শক্তটি এ সংঘাতকে আরো তীব্রতর ও রক্তাত্ব করতে চায়। ইসলামের পক্ষের শক্তিকে জঙ্গি আখ্যায়ীত করে তাদেরকে এ বিপক্ষ শক্তিটি নির্মূলেরও ঘোষণা দেয়। তারা দাবী তুলেছে, একাত্তরের ন্যায় আরেকটি যুদ্ধের। অভিন্ন দেশ, ভাষা, খাদ্য-পানীয় ও জলবায়ুর দেশ বাংলাদেশ। জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশী মুসলমান। অথচ খোলাফায়ে রাশেদার আমলে মুসলিমগণ মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগও ছিল না। নানা ধর্ম, নানা বর্ণ ও নানা ভাষার ভিন্নতায় ভরপুর ভারতসহ বিশ্বের বহুদেশ। অথচ এ দিক দিয়ে বাংলাদেশ অনন্য। মুষ্টিমেয় উপজাতীয়দের বাদ দিলে দেশটিতে সে ভিন্নতা অতি সামান্যই। প্রশ্ন হল, এতটা অভিন্নতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে কেন এ বিরামহীন সংঘাত? কারণ একটিই। ভাষা, বর্ণ ও পোষাকপরিচ্ছদে এক হলেও এক নয় তাদের চেতনা, জীবনবোধ ও দর্শন। আর সকল বিতর্ক ও সংঘাতের শুরুতো এ ভিন্ন ভিন্ন জীবনবোধ বা দর্শন থেকেই। রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ হয়েছে সে বিভক্তির উপাদানগুলোকে আরো তীব্রতর করা। ফলে বাড়ছে সংঘাতও।

নবীপাক (সাঃ)এর যুগে আরবদের ভাষা, বর্ণ ও পোষাক-পরিচ্ছদে কোন পার্থক্য ছিল না। অথচ সেখানে রক্তক্ষয়ী প্রচন্ড যুদ্ধ হয়েছে বার বার। সে যুদ্ধেরও কারণ ছিল দুটি ভিন্ন চেতনা ও দর্শন। একটি হল ইসলাম, অপরটি জাহেলিয়াত তথা অজ্ঞতা। একদল চেয়েছিল আল্লাহর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার নির্মাণ। আরেক দল চেয়েছিল আদিম অজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত আরবের সমাজ ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ। কোন পক্ষই নিজ নিজ অভিষ্ট লক্ষ থেকে এক পা পিছু হটতে রাজী ছিল না। কোন সমাজে যখন এমন দুটি আপোষহীন প্রতিপক্ষ জন্ম নেয়, সে সমাজে সংঘাত তো অনিবার্য। তখন ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে এবং পিতা পুত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে। তাই এ সংঘাত নিছক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনা বা নামায-রোযার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সীমাবদ্ধ ছিল না নিছক মুর্তি গড়া বা ভাঙ্গার মধ্যেও। বরং সে সংঘাত প্রবেশ করেছিল সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রতিটি অঙ্গণে। সে সংঘাতে সেদিন বিজয়ী হয়েছিল ইসলামের পক্ষের শক্তি। তাদের সে বিজয়ে আরব থেকে যে শুধু মুর্তি ও মুর্তিপুজা অপসারীত হয়েছিল তাই নয়, অপসারিত হয়েছিল মদ্যপান, উলঙ্গতা, ব্যাভিচার, সূদ, সন্ত্রাস, অপসংস্কৃতি, অপ-সাহিত্যসহ সকল প্রকার মিথ্যাচার ও দুর্বৃত্তি। ইসলামের সে বিজয়ে ন্যায়, সুবিচার ও পবিত্রতা নেমে এসেছিল শুধু আরব ভূমিতেই নয়; ইরান, মিশর, তুরস্ক, আফগানিস্তান, মধ্য-এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, স্পেনসহ বিশ্বের বিশাল ভূ-ভাগে। ইসলামের বিজয়ে সেদিন মহাকল্যাণ ঘটেছিল মানব জাতির।

 

কেন এতো পরাজয়?

বাংলাদেশের মানুষের বড় দুর্ভাগ্য যে দেশটিতে ইসলামের একটি পরিপূর্ণ বিজয় কোন কালেই ঘটেনি। দেশটির শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ মুসলিম হলেও দেশটির রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, বুদ্ধিবৃত্তিতে ইসলাম কোন কালেই বিজয়ী শক্তি রূপে আবির্ভূত হয়নি। আসেনি বুদ্ধিবৃত্তিক আমূল বিপ্লব। তবে এর কারণও ছিল। দেশটি বিজিত হয়েছিল তুর্কি মুসলিমদের হাতে। তাদের নিজেদের জীবনেও ইসলামের বহু মৌলিক বিষয় অজানা ছিল। তাদের অনেকেই মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছিল আব্বাসীয় খলিফাদের কৃতদাস রূপে। তাদের বাহাদুরী ছিল শুধু রণাঙ্গণে। ফলে তুর্কিদের হাতে বিস্তুর সাম্রাজ্য বিস্তার হলেও, ইসলামী জ্ঞানের বিস্তার বা উন্নয়ন তেমন ঘটেনি। শাসক মুর্খ বা জ্ঞানবিমুখ হওয়ায় বাংলাদেশে জ্ঞানার্জনের ন্যায় ফরয ইবাদতটি যথার্থ ভাবে পালিত হয়নি। গুরুত্বও পায়নি। ফলে ইসলামের বহু মৌলিক বিষয়ই বাংলাদেশীদের অজানা থেকে গেছে। এবং সেটি শত শত বছর ধরে।

মুসলিম জনসংখা বিচারে আরব, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পরই বাঙালী মুসলিমের স্থান। দেশটিতে ইসলামের ইতিহাস ৮ শত বছরের। অথচ মাত্র সত্তর বছর আগেও বাংলায় ইসলামি বই বলতে বুঝানো হত মীর মোশররফের লেখা “বিষাদ সিন্ধু”, বেহশতি জেওয়ার, নেয়ামল কোর’আন, “আনোয়ারা” উপন্যাস এবং কিছু প্রাচীন পুঁথি সাহিত্য। কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদ হয়েছে গিরিশ চন্দ্র নামক একজন হিন্দুর হাতে। সেটিও উনবিংশ শতাব্দীতে। এটি কি কম ব্যর্থতা? দেহ বাঁচাতে খাদ্য-পানীয় অপরিহার্য; নইলে মৃত্যু অনিবার্য। তেমনি  ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার জন্য চাই কোর’আনের জ্ঞান। নইলে অনিবার্য হয় ঈমানের মৃত্যু। এজন্যই হযরত আদম (আঃ)কে সৃষ্টির সাথে সাথে তাঁকে জ্ঞানদান করা হয়েছে। এবং সেটি দিয়েছেন খোদ মহান আল্লাহতায়ালা। সে জ্ঞানের বলেই ফেরেশতাদের সাথে প্রতিযোগিতায় হযরত আদম (আঃ) শ্রেষ্ঠতর ও তাদের সেজদা পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন। একই কারণে মুসলিমদের উপর সর্বপ্রথম নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ফরজ না করে জ্ঞানার্জনকে ফরজ করা হয়েছে। নামায-রোযা ফরজ হয়েছে নবীজী (সাঃ)র নবুয়ত লাভের ১১ বছর পর-সেটি মিরাজ থেকে ফেরার পর। অপরদিকে জাহেল ব্যক্তি পশুর চেয়েও নিকৃষ্টে জীবে পরিণত হয়।

অথচ জ্ঞানার্জনের সে ফরজ আদায়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী জোগানোর সামর্থ্য বাংলা ভাষার ছিল না। সে কাজ “বিষাদ সিন্ধু”, বেহশতি জেওয়ার, নেয়ামুল কোর’আন এবং কিছু পুঁথি সাহিত্য দিয়ে সম্ভব ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের নানা ভাষী মুসলিমগণ তাদের ঈমানে পুষ্টি জোগাতো উর্দু ও ফারসি ভাষা থেকে। তখন এমন কোন শিক্ষিত বাঙালী মুসলিম ছিল না যে উর্দু বুঝতো না। কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের পরিবারের ন্যায় বহু হিন্দু পরিবার ফার্সি ভাষার চর্চা হত। রবীন্দ্র নাথ নিজে ফার্সি কবি হাফিজের ভক্ত ছিলেন।  উর্দু ভাষায় সবচেয়ে বেশী বই ও পত্রিকা ছাপা হতো বাংলার রাজধানী কলকাতা থেকে, দিল্লি বা লাহোর থেকে নয়। উর্দু ভাষার সবচেয়ে শক্তিশালী কবি হলো পাঞ্জাবী-ভাষী আল্লামা মহম্মদ ইকবাল। আর সবচেয়ে শক্তিশালী গদ্য লেখক হলেন বাঙালী পিতার সন্তান এবং কলকাতাবাসী মাওলানা আবুল কালাম আযাদ।

 

বাঙালী হিন্দুর রেনাসাঁ ও বাঙালী মুসলিমের রেনাসাঁ

উপমহাদেশের বুকে প্রথম রেনেসাঁ বা জাগরণ আসে হিন্দু বাঙালীদের মাঝে। সেটি ছিল বাংলা সাহিত্যে হিন্দু লেখকদের অবদানের কারণে। এরপর আসে মুসলিম রেনেসাঁ। তবে সে মুসলিম জাগরণের পিছনে “বিষাদ সিন্ধু”, বেহশতি জেওয়ার, বা পুঁথি সাহিত্য ছিল না। হিন্দুদেরও রচিত সাহিত্য ছিল না। বরং হিন্দুদের সাহিত্য ছিল মুসলিম বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। বাঙালী মুসলিম রেনেসাঁর মূলে ছিল উর্দু সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের চেয়ে ইকবাল, গালিব, হালী, দাগ, মাওলানা মহম্মদ আলী জওহার, শিবলী নোমানী, হাসরাত মোহানী, মাওলানা আবুল কালাম আযাদের লেখনী বাঙালী মুসলিমদের বেশী নাড়া দিত। তাদের কবিতা বাঙালী উলামাদের ওয়াজে ধ্বনিত হতো। বাঙালী হিন্দুদের ন্যায় তাদের লেখনীর পরিসর কোন প্রাদেশিক সীমানা দিয়ে সীমিত ছিল না। তারা লিখতেন সমগ্র মুসলিম উম্মহর কল্যাণ নিয়ে। তাদের সে লেখনীর ফলে ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে প্রবল ভাবে গড়ে উঠে প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্বের চেতনা। সে বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের ফলে নানা প্রদেশের নানা ভাষাভাষী মুসলিমদের নিয়ে মুসলিম লীগের পাকিস্তান প্রকল্প সহজেই জনপ্রিয়তা পায়। বস্তুতঃ মুসলিম লীগের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই লড়েছিলেন এসব কলম সৈনিকেরা। তাদের সে জনপ্রিয় সাহিত্য ঢাকার নবাব পরিবারসহ বাংলার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারগুলোতেও পৌঁছতো। পৌঁছেছিল বাংলার শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী মুসলিম মহলেও। ফলে ঢাকার বুকে নবাব সলিমুল্লাহ নেতৃত্বে গড়ে উঠে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা সংগঠন ঐতিহাসিক মুসলিম লীগ।

বাঙালী মুসলিমের সে রেনাসাঁর কারণেই ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাঙলার প্রধানমন্ত্রী কোন হিন্দু হতে পারিনি। হয়েছেন শেরে বাংলা ফজলুল হক, হাসান শহীদ সহরোয়ার্দি এবং খাজা নাযিমুদ্দীন। তখন বাংলা পরিণত হয় পাকিস্তান আন্দোলনের মূল দুর্গে। মুসলিম লীগের শক্তি উপমহাদেশের অন্য কোন প্রদেশে এতটা ছিল না। তাই যুক্তি সঙ্গত ভাবেই বলা যায়, বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল বাঙালী মুসলিমদের হাতে। কিন্তু সেটি যেমন ভারতীয় হিন্দুদের ভাল লাগেনি, তেমনি ভাল লাগেনি বাঙালী সেক্যুলারিষ্টদের। তাই দেশটি ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র শুরু হয় ১৯৪৭ সাল থেকেই। শেখ মুজিব সে কথাটিই বলেছেন পাকিস্তান ফিরে এসে ১৯৭২ সালে ১০ই জানুয়ারীর সহরোয়ার্দি ময়দানের জনসভায় –যা এ নিবন্ধের লেখক নিজ কানে শুনেছেন। মুজিব সেদিন অতি গর্বভরে বলেছিলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের শুরু একাত্তর থেকে নয়, শুরুটি ১৯৪৭ সাল থেকে।” এর অর্থ দাঁড়ায়, মুজিবের সমগ্র রাজনীতি ছিল পাকিস্তান খন্ডিত করার ষড়যন্ত্র। ভারত যেহেতু সেটিই চাইতো, তাই ভারতের সাথে যৌথ ভাবে কাজ করা মুজিবের জন্য সহজ হয়ে যায়। সে লক্ষেই যৌথ প্রজেক্ট ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র। মুজিবের সে ভারতসেবী রাজনীতিকে অব্যাহত রাখাই হলো হাসিনার নীতি।   

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালী মুসলিমদের প্রকৃত মুসলিম রূপে বেড়ে উঠাকে যারা প্রচন্ড গুরুত্ব দিতেন তারা সেদিন নতুন দেশটির রাষ্ট্র ভাষা রূপে উর্দুকে প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছিলেন। কায়েদে আযম, খাজা নাযিম উদ্দিন, নূরুল আমিনের ন্যায় নেতাগণ মোল্লা বা মৌলবী ছিলেন না। কিন্তু তারা মুসলিমদের ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠার গুরুত্ব বুঝতেন। বুঝতেন সে কাজে কোর’আনী জ্ঞানের গুরুত্ব। তাতে ব্যর্থ হলে পাকিস্তান যে অখন্ড থাকবে না -সেটিও তারা বুঝতেন। কারণ, পাকিস্তান কোন ভাষা বা বর্ণ ভিত্তিক রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠা পায়নি। দেশটি প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্বের চেতনা। এ চেতনা পুষ্টি পায় কোর’আন ও হাদীস থেকে। ইসলামী চেতনা নির্মাণের সে কাজটি তাই ক্ষেত-খামার, পার্টি দফতর বা অফিস-আদালতে হয় না, হয় কোর’আনী জ্ঞান-সমৃদ্ধ ভাষার মাধ্যমে। সে প্রয়োজন মিটাতেই প্রয়োজন দেখা দেয় উর্দু ভাষার। কারণ, আরবী ভাষার পর উর্দুই হলো কোর’আনের জ্ঞানে সমৃদ্ধ সবচেয়ে উন্নত ভাষা। উর্দু ভাষাটি কোন একক প্রদেশের ভাষা ছিল না, এ ভাষার সমৃদ্ধিতে অবদান ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সকল প্রদেশের মুসলিমদের। অবদান ছিল বাঙালী মুসলিমদেরও। বাংলাদেশ সৃষ্টির পূর্ব পর্যন্ত বাংলার সকল মাদ্রাসা শিক্ষার মিডিয়াম ছিল উর্দু। মিডিয়াম ছিল সমগ্র ভারতবর্ষের সকল মাদ্রাসাতেও। পাকিস্তানের পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পাঠান ও বেলুচ জনগণ এ বিষয়টি অনুধাবন করেই নিজেদের মাতৃভাষার বদলে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা রূপে গ্রহণ করতে দ্বিধা করেনি। তাদের সে সুবুদ্ধির কারণে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের ৪টি প্রদেশ নিয়ে খন্ডিত পাকিস্তান আজও টিকে আছে। নইলে সেখানেও বাংলাদেশের ন্যায় ভারতের প্রতি নতজানু চারটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হতো। এক পারমানবিক শক্তি রূপে পাকিস্তানের উত্থান কি তখন সম্ভব হতো?

কিন্তু যাদের কাছে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার চেয়ে অধীক গুরুত্ব পায় বাঙালী রূপে বেড়ে উঠাটি, তাদের কাছে গুরুত্ব হারায় ঈমানের পুষ্টির বিষয়টি। বরং ক্ষমতালোভী সেক্যুলারিস্ট বাঙালীদের রাজনীতিতে বাঙালী মুসলিমদের প্যান-ইসলামিক চেতনাটি গণ্য হয় প্রবল বাধা রূপে। সে চেতনার বিলুপ্তিতে প্রয়োজন পড়ে কোর’আনী জ্ঞানের বিলুপ্ত। ফলে ক্ষমতা হাতে পাওয়ার সাথে সাথে সেক্যুলারিস্টদের এজেন্ডা হয়, কোর’আনের জ্ঞানচর্চা সংকুচিত বা নিয়ন্ত্রিত করা। স্কুল-কলেজের সিলেবাস থেকে বাদ পড়ে ইসলাম। ইসলাম থেকে দূরে সরার কারণে নিজেদের উপার্জন বাড়াতে ছাত্রগণ ইংরেজীসহ বিশ্বের যে কোন ভাষা শিখতে তারা রাজী, কিন্তু রাজী নয় আরবী বা উর্দুর ন্যায় কোর’আনী জ্ঞান-সমৃদ্ধ কোন ভাষা শিখতে। প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের থেকে বাঙালী মুসলিমের এখানেই মূল পার্থক্য। মিশর, সুদান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, আলজিরিয়া, মালি, মরক্কোসহ প্রায় ২০টি দেশের মুসলিম জনগণ স্রেফ কোর’আনী জ্ঞানের সাথে সরাসরি সংযোগ বাড়াতে নিজেদের মাতৃভাষাকে কবরে পাঠিয়ে আরবী ভাষাকে গ্রহণ করেছে। তারা শুধু জাহেলী যুগের পুতুল পুজাই ছাড়েনি, ভাষা পুজাও ছেড়েছে। এক্ষেত্রে বাঙালী মুসলিমদের ব্যর্থতাটি বিশাল। ভাষা পুজায় তারা বাঙালী হিন্দুদেরও হার মানিয়েছে। সেটি বুঝা যায় কলকাতায় হিন্দি ভাষার জোয়ার দেখে। অথচ বাঙালী মুসলিমগণ না পেরেছে বাংলা ভাষায় ইসলামী জ্ঞানের সমৃদ্ধি বাড়াতে, না পেরেছে অন্য কোন সমৃদ্ধ ভাষার সাথে সংযোগ গড়তে। ফলে বাড়ছে  ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা। এজন্যই নবীজী (সাঃ)র ইসলাম –যাতে রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র, জিহাদ, শরিয়তের প্রতিষ্ঠা, তা তাদের কাছে সন্ত্রাস মনে হয়।

বাঙালী মুসলিমদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে ভাতে-মাছে বেঁচে থাকাটি, ঈমান নিয়ে বেড়ে উঠা নয়। এরই ফলে তাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে ইসলাম বিরোধীদের বর্বর শাসন। দেশ পরিণত হয়েছে ভারতের ন্যায় শত্রু দেশের গোলাম রাজ্যে। সে গোলামীর নজির হলো, ঘরে কোর’আনের তাফসির ও হাদীসের বই রাখা গণ্য হয় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড রূপে। এবং কোর’আনের বিখ্যাত তাফসিরকারীকে হয় জেলে পচতে হয় অথবা দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। বাংলার বুকে ইসলামের শত্রুপক্ষের প্রথম ও সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিজয়টি আসে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সে বিজয়ের জের ধরেই তাদের দ্বিতীয় বিজয়টি আসে ১৯৭১’য়ে। সেটি ভারতের সামরিক বাহিনীর হাতে অধিকৃত হওয়ার মধ্য দিয়ে। লক্ষ্যণীয় হলো, এ দুটি বিজয় নিয়ে বাঙালী কাপালিকদের ন্যায় ভারতীয় কাফের শক্তিও প্রচন্ড  উল্লসিত। তা নিয়ে ভারতে উৎসব হয় প্রতি বছর। সেটি বুঝা যায় প্রতি বছর ২১শে ফেব্রেয়ারি ও ১৬ই ডিসেম্বরে ভারতীয় পত্র-পত্রিকার দিকে নজর দিলে। বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের আজকের পরাজিত ও নির্যাতিত অবস্থার শুরু বস্তুতঃ ইসলামের শত্রুশক্তির হাতে সে ঐতিহাসিক পরাজয় থেকেই।

বাঙালী মুসলিমদের আরেক দুর্ভাগ্য, তারা একটি উপনিবেশিক কাফের শক্তির গোলামী করেছে ১৯০ বছর ধরে। সমগ্র মুসলিম জাতির ইতিহাসে এমন ঘটনা দ্বিতীয়টি নেই। নিজদেশে সংখাগরিষ্ঠ অন্য কোন মুসলিম জনগোষ্ঠী এত দীর্ঘকাল ধরে কোন কাফের শক্তির গোলামী করেনি। বাঙ্গালী মুসলমানদের সে গোলামী শুরু হয়েছিল ১৭৫৭ সালে। উত্তর-ভারত, মহিশুর ও পাঞ্জাবের মুসলিমদের জীবনে সেটি শুরু হয়েছিল এর প্রায় একশত বছর পর। সিরিয়া, ইরাক ও ফিলিস্তিনে শুরু হয়েছিল ১৯১৭ সালে। মুসলিম বিশ্বে উপনেবিশিক কাফের শাসনের শুরুটি মূলতঃ এ বাংলা থেকেই। মুসলিম উম্মাহর ভিতরে ঢুকতে শত্রুগণ সবসময়ই দুর্বল স্থানটি খুঁজেছে। আর সেদিন সবচেয়ে দুর্বল গণ্য হয়েছিল বাংলাদেশ। সম্পদশালী  বাংলা জয়ের ফলেই শত্রুর পক্ষে দিল্লি-বিজয় সহজ হয়ে যায়। অখন্ড পাকিস্তানেও পূর্ব পাকিস্তান গণ্য হয় সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র রূপে। ফলে ভারত সহজেই এ মুসলিম ভূমিকে অধিনত করে নেয়।

 

ফরজ হলো জিহাদের প্রস্তুতি

মুসলিম হওয়ার অর্থ শুধু এ নয়, সে শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত আদায় করবে এবং মসজিদ পূর্ণ করবে। তাকে পূর্ণ করতে হয় জ্বিহাদের ময়দানও। আর অতি গুরুত্বপূর্ণ জ্বিহাদ হলো, মুসলিম ভূমিতে কাফেরী হামলার প্রতিরোধ। এ লক্ষ্যে শক্তিসঞ্চয় করা ও রণাঙ্গণে নামা প্রতি মুসলিমের উপর ফরয। পবিত্র কোরআনে সে নির্দেশটি এসেছে এভাবেঃ “ওয়াআয়িদ্দুলাহুম মা’স্তাতা’তুম মিন কুউয়া” অর্থঃ “এবং তাদের (শত্রুর) বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সম্ভাব্য সর্বশক্তি দিয়ে প্রস্তুত হও।” –(সুরা আনফাল আয়াত ৬০)। পবিত্র কোর’আনের উপরুক্ত আয়াতে যে বিষয়টির উপর জোর দেয়া হয়েছে তা হলো, যেখানেই শত্রুর হামলার সামান্যতম সম্ভাবনা আছে সেখানেই সে হামলার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধের প্রস্তুতিও থাকতে হবে। তাই সামরিক ভাবে দুর্বল থাকা হারাম। সেটি হলে সে অধিকৃত ভূমিতে ঈমান ও সৎকর্ম নিয়ে বাঁচাটি কঠিন হয়। এরই উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। উপরুক্ত আয়াতের শেষ ভাগে আরো বলা হয়েছে, “তুরহিবুনাবিহি আদুউ’আল্লাহ ও আদুউ’কুম”। অর্থঃ “সে প্রস্তুতি দিয়ে সন্ত্রস্ত্র করো আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের নিজেদের শত্রুকে”। তাই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের কাজটি শুধু বেতনভোগী সেপাইয়ের নয়। সে দায়ভার প্রতিটি মুসলিমের। তাই শত্রুর হামলার মুখে অপ্রস্তুত থাকায় গুরুতর অবাধ্যতা হয় মহান আল্লাহতায়ালার উপরুক্ত নির্দেশের। এমন অবাধ্যতা শুধু পরাজয় নয়, ভয়ানক আযাবও ডেকে আনে। মহান আল্লাহতায়ালা সে আযাবের বিবরণ শুনিয়েছেন ইহুদী জাতির ইতিহাস থেকে। ইহুদীদের অবাধ্যতা তাদের অপমান ও বিপর্যয় বাড়িয়েছে দেশে দেশে। তাই নবীজী (সাঃ)র আমলে জ্বিহাদে ময়দানে নামেননি এমন কোন সাহাবী খুঁজে পাওয়া যাবে না। নবীজী (সাঃ) স্বয়ং নেমেছেন এবং বহু যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আফগানিস্তানে ও ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মোজাহিদদের বিরামহীন প্রবল প্রতিরোধ যুদ্ধের মুল দার্শনিক ভিত্তি তো এটিই।

কিন্তু মার্কিনীরা ও তাদের সেক্যুলার মিত্ররা মুসলিমদেরকে সে কোরআনী দর্শন ও নির্দেশ থেকে দূরে হটাতে চায়। তারা চায়, মুসলিমগণ বেড়ে উঠুক হৃদয়ে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ধারণা ধারণ না করেই। অতীতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশেরাও তেমন একটি স্ট্রাটেজীর পরিচর্যা দিয়েছে তাদের অধিকৃত মুসলিম ভূমিতে। জ্বিহাদের কোর’আনী নির্দেশ ভূলিয়ে দিতে তারা গোলাম আহম্মদ কাদিয়ানীর ন্যায় এক ভন্ড নবীর জন্ম দিয়েছিল। জিহাদের ধর্মীয় বৈধতা নেই -সে কথাটি তারা সে ভন্ড নবীর মুখ থেকে শুনিয়েছিল। ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার দায়ভার নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার একার ছিল না। তাই পরাজয়ের দায়ভার শুধু মীর জাফর ও তার সহযোগীদের ঘাড়ে চাপালে সুবিচার হয়না। সেদিন মুসলিম নাগরিকগণই বা কোন দায়িত্বটি পালন করেছে? মীর জাফর তো প্রতিদেশেই থাকে। আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় এরাই দখলদার কাফের বাহিনীর সাথে সহযোগিতা করছে। কিন্তু দেশ দুটির ধর্মপ্রাণ মানুষ কি সেটি মেনে নিয়েছে? তারা তো নেমেছে প্রতিরোধ যুদ্ধে। এরূপ জ্বিহাদী মুসলিমগণই তো আফগানিস্তানে পরাজিত করেছিল এককালের বিশ্বশক্তি রাশিয়াকে। এবং দুই বার পরাজিত করেছে হানাদার ব্রিটিশদের। কিন্তু ১৭৫৭ সালে বাংলাদেশে সেটি হয়নি। সিংহকে বছরের পর বছর চিড়িয়াখানায় রাখার পর ছেড়ে দিলে স্বাধীন শিকার ধরারও যোগ্যতা হারায়। রুচী লোপ পায় স্বাধীন জীবনেরও। দরজা খুলে দিলেও তখন সে ঘর থেকে বের হয় না। তেমন অবস্থা দীর্ঘকাল গোলামী জীবনে অভ্যস্থ্ একটি জাতিরও। তখন বেড়ে উঠে ভিখারী-সুলভ মানসিকতা। সত্তরের দশকে বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক ভিক্ষার ঝুলির খেতাব পেয়েছিল সেটির কারণ নিছক দুর্ভিক্ষ ছিল না, ছিল গোলামী মানসিকতাও। গোলামের চেতনায় প্রতিরোধের সাহস থাকে না। সে গোলামী মানসিকতার কারণেই ভারত ও ভারতসেবী দাসেরা পেয়েছিল অবাধ লুন্ঠনের সুযোগ। উপনেবেশিক শাসনের এটিই বড় কুফল। বিদেশী অধীনতা থেকে মূক্তিপ্রাপ্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এখনও তাই সাহায্য-নির্ভর তথা পর-নির্ভর। ১৯০ বছরের গোলামীর কারণে বাংলাদেশে সে পর-নির্ভর অবস্থা তীব্রতর হয়েছে। সেটি শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নয় -আদর্শিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেও। এরূপ এক গোলামী অবস্থার কারণেই দেশে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অচলাবস্থা দেখা দিলেই রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা ধর্ণা দেয় বিদেশী দূতাবাসে। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া কেয়ার টেকার সরকারটি ছিল মূলতঃ তেমন একটি মানসিকতার ফসল। অআজও সেটিই বেঁচে আছে। কোন স্বাধীন দেশে কি এটি সম্ভব? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স বা জার্মানী কি একটি দিনের জন্যও এমন বিদেশী হস্তক্ষেপ মেনে নিবে?

 

অধীনতা ইসলামী শত্রুপক্ষের

বাংলাদেশের বহু বিষয় নিয়েই বহু বিতর্ক রয়েছে। তবে যা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই তা হল, দেশটিতে প্রবল ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির বিজয়। তাদের দখলে গেছে দেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিসহ প্রশাসন, আইন-আদালত, সংস্কৃতি, সেনাবাহিনী ও অর্থনীতির ময়দানও। মুসলমানদের জন্য এটি শুধু রাজনৈতিক পরাজয় নয়, আদর্শিক ও চেতনাগত বিপর্যয়ও। ইসলামের বিপক্ষ শক্তিটির দীর্ঘকালব্যাপী বিজয়ের ফলে দেশটিতে ব্যাভিচার যেমন বৈধ কর্ম, তেমনি বৈধ হল সূদ-ঘূষ, মদ্যপান এবং সিনেমা, নাটক ও নাচের নামে উলঙ্গতা ও অশ্লিলতা। ইসলাম পরিণত হয়েছে একটি পরাজিত জীবন-দর্শনে। ইসলাম অতিশয় জড়সড় হয়ে টিকে আছে মসজিদে। মূর্তি-নির্মাণের ন্যায় হারাম কাজও গণ্য হচ্ছে সাংস্কৃতিক কর্মরূপে। সে হারাম কর্মটি বাঙালী মুসলমানের সাংস্কৃতিক কর্মরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ঢাকা বিমান-বন্দরের সামনে প্রধান সড়কের উপর লালন শাহের মুর্তি স্থাপনের মধ্য দিয়ে। সেটি অপসারিত হয়েছে। কিন্তু সে হারাম কাজটির সমর্থণে কলম ধরেছে দেশের সেকুলার বুদ্ধিজীবীরা। মুসলিম নামধারি অনেকে মুর্তি-নির্মান ও মুর্তি-স্থাপনের পক্ষে রাজপথে মিছিলেও নেমেছে। অনেকে এটিকে ইসলাম-সম্মত করারও চেষ্টা করেছে। অথচ তাদের এ বোধটুকুও নেই, মুর্তি-নির্মান ধর্মীয় বৈধতা পেলে সবচেয়ে বেশী মুর্তি নির্মিত হত মক্কা-মদিনায়। কারণ মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষদের সিংহভাগ জন্ম নিয়েছে তো সেখানে। ইসলামে মুর্তি নির্মান হারাম। এ বিষয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে নবীজী(সাঃ)র হাদীসঃ “বিচারের দিন ঐ সব লোকেরা সর্বাপেক্ষা তিরস্কারের পাত্র হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টির অনুসরণে জীবজন্তু প্রস্তুত করবে তথা মুর্তি গড়বে।” -সহীহ আল-বোখারী। ফলে মূর্তিগড়া ইসলাম সম্মত হয় কি করে? মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দরতম সভ্যতর জন্ম দিয়েছে ইসলাম। কিন্তু কোথাও কি নির্মিত হয়েছে মুর্তি? ভারতবর্ষে দীর্ঘ ৮ শত বছর মুসলিম শাসনে বহু মিনার, বহু স্মৃতী সৌধ নির্মিত হয়েছে। নির্মিত হয়েছে তাজমহল। কিন্তু কোন মুর্তিও কি মুসলমানদের হাতে নির্মিত হয়েছে? মুর্তি নির্মিত হয়েছে কি উমাইয়া ও আব্বাসী আমলে?

 

রোগ ঈমানহীনতার

দেহে ব্যাধী বাড়লে জ্বরও বাড়ে। তখন ওজন কমে, ক্ষুধাও কমে যায়। এগুলো দৈহিক অসুস্থ্যতার লক্ষণ। তেমনটি ঘটে চেতনা-রাজ্যে বা ঈমানে রোগ ধরলে। ব্যক্তির রোগাগ্রস্ত চেতনা বা ঈমানহীনতার লক্ষণ হলো, সে শুধু সূদ-ঘুষই খায় না বা শুধু ব্যাভিচারিতেই নামে নামে না, বরং মুর্তি গড়ে বা সেটির স্থাপনেও আগ্রহ দেখায়। হ্রাস পায় বা পুরাপুরি বিলুপ্ত হয় কোর’আনী জ্ঞানার্জনের আগ্রহ। একটি রাষ্ট্রে কতজন বেঈমান মানুষের বসবাস সেটির পরিমাপটি যেমন সে দেশের সুদী ব্যাংক, পতিতাপল্লি, নৈশ ক্লাব, মদের দোকান ও কোর’আনী জ্ঞানে অজ্ঞ মানুষের সংখ্যা থেকে ধরা পড়ে, তেমনি ধরা পড়ে রাস্তা-ঘাটে কতটা মুর্তি নির্মিত হল সেটি দেখেও। ইরানের বাদশাহ রেজা শাহের শাসনামলে বহু মুর্তি গড়া হয়েছিল। তুরস্কে মুর্তি গড়া হয়েছে মোস্তাফা কামাল পাশা ও তার অনুসারিদের শাসনামলে। জামাল আব্দুন নাসেরের শাসনামালে মুর্তি নির্মিত হয়েছে মিশরে। যাদের হাতে এটি ঘটেছে তাদের সবাই ছিল ইসলামের বিপক্ষ শক্তি। আল্লাহর বিধানের অবাধ্যতাই ছিল তাদের রাজনীতি। এভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা যেখানেই বিজয়ী হয়েছে, সেখানে মুর্তি-গড়ারও রেওয়াজ বেড়েছে। কথা হল, এসব পথভ্রষ্ট-পাপীদের পাপকর্মকে মুসলিমগণ কেন বৈধতা দিবে? অথচ বাংলাদেশে মুর্তিগড়া জায়েজ করতে গিয়ে কেউ কেউ তাদের সে নজিরও হাজির করেছে। বাংলাদেশে মুসলিম নামধারি সেকুলারদের চেতনা রাজ্যে আল্লাহর অবাধ্যতা যে কতটা প্রকট সেটি বুঝা যায় মুর্তি নির্মাণের পক্ষে তাদের এরূপ বক্তব্য ও বিপুল আয়োজন দেখে। দেশ যে কত দ্রুততার সাথে ভ্রষ্টতার পথে এগুচ্ছে -এসবই হলো তার প্রমাণ।

 

বিদ্রোহ মহান আল্লাহতায়ালার বিরুদ্ধে

ইসলামের মূল কথা, আল্লাহ ও তার বিধানের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। তারই শাশ্বত মডেল হলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)। আল্লাহর পক্ষ থেকে যখনই কোন হুকুম এসেছে তখনই তিনি সে হুকুমের প্রতি “লাব্বায়েক” তথা “আমি হাজির” বলেছেন। এমনকি নিজ সন্তানের কোরবানীতেও। মুসলিম শব্দটিও তাঁর দেওয়া, এর অর্থ মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ। মুসলিম জীবনে সে আনুগত্যের প্রতিফলন ঘটাতে হয় শুধু নামায-রোযায় নয়, বরং প্রতিটি আচরণ, কাজকর্ম ও সংস্কৃতিতে। এক্ষেত্রে সামান্যতম অবাধ্যততাই হল পথভ্রষ্টতা বা কুফরি। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানদের জীবনে সে আনুগত্য কতটুকু? পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছেঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যখন কোন বিষয়ে হুকুম এসে যায় তখন কোন পুরুষ বা মহিলা ঈমানদারের কোন অধিকারই থাকে না যে সে হুকুমের অবাধ্য হবে। এবং যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশাবলীর অবাধ্য হলো তারাই পথভ্রষ্ট হলো সুস্পষ্ট ভ্রষ্টতার দিকে।”-(সুরা আল-আহযাব, আয়াত ৩৬)। এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকটি হলো, যে বিষয়ে মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট বিধান এসে গেছে সে বিষয়ে মত প্রকাশ বা গ্রহণ-বর্জন নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে মুসলিমের কাজ হলো সে হুকুম পালন করা। নইলে সে শামিল হয় সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টদের দলে। বাংলাদেশ মসজিদ-মাদ্রাসার দেশ। গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে ব্যাপক ভাবে পঠিত হয় পবিত্র কোরআন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহতায়ালার এ কোরআনী ঘোষণাটি কি এসব লক্ষ লক্ষ পাঠকদের নজরে পড়েনি? আর পড়লে তা থেকে তারা শিক্ষাটি কি পেল? শিক্ষা পেলে তার বাস্তবায়নই বা কোথায়? সূদ, ঘুষ, ব্যাভিচার, মদ্যপাণ ইসলামে হারাম। এব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণা এসেছে মহান আল্লাহর। কিন্তু সে নির্দেশের পরও বাংলাদেশে সেগুলি অবাধে চলছে। এসব পাপকর্ম সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রহরাও পাচ্ছে। মুসলিম পুলিশ পতিতাপল্লি পাহারা দিবে, ব্যাংকে বসে রোযাদার মুসল্লী সূদের হিসাব কষবে –নবীজী (সাঃ)’র আমলে কি এরূপ পাপকর্মের কথা ভাবা যেত? এগুলি তো মহান আল্লাহতায়ালার সুস্পষ্ট অবাধ্যতা।

সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে পথভ্রষ্ট হওয়া এবং জাহান্নামে পৌঁছার জন্য কি মুর্তিপুজারী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে? সে জন্য তো এটুকুই যথেষ্ট, কোন বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসার পরও সেটি অমান্য করা হলো। উপরের আয়াতে তো সেটিই বলা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে সেটিই অহরহ হচ্ছে। সূদীব্যাংক, পতিতাপল্লি, আদালতে বৃটিশ-আইন, সরকারি উদ্যোগে মদের দোকান –এসব তো আল্লাহর অবাধ্যতারই প্রতীক। এখন দাবী উঠেছে রাস্তায় রাস্তায় মুর্তি স্থাপনের। যে কোন ব্যক্তির সামনে রাস্তা মাত্র দুটি। একটি আল্লাহর, অপরটি গায়রুল্লাহর তথা শয়তানের। হয় সে আল্লাহর আনুগত্যকে মেনে নিবে। নতুবা শয়তানের|।ব্যক্তির ন্যায় রাষ্ট্রের সামনেও এ দুটি রাস্তা ভিন্ন তৃতীয় রাস্তা নেই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশাসন ব্রিটিশ আমল থেকেই শয়তানের তথা গায়রুল্লাহর পথ অনুসরণ করে আসছে। ব্রিটিশেরা বিদায় নিয়েছে, কিন্তু তাদের গড়া আল্লাহর অবাধ্যতার পথে চলায় পরিবর্তন আনা হয়নি। এজন্যই বাংলাদেশে আইন-সিদ্ধ হলো পতিতাবৃত্তির ন্যায় জ্বিনা বা ব্যাভিচার। এমন পাপও স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে একটি পেশা রূপে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে সূদী কায়-কারবার। বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিতি পেলেও সে মুসলিমটি চরিত্র পায়নি। কোন ধর্মপ্রাণ মুসলিম কি এ অবস্থা মেনে নিতে পারে?

 

শত্রুর বিনিয়োগ ও নতুন লড়াই

ফলে সংঘাত শুধু ঢাকার রাস্তা থেকে মুর্তি সরানো নিয়ে নয়। লড়াইয়ের কারণ আরো গভীরে। সেটি হলো, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র থেকে মহান আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতা নির্মূল করা। দেশের ৯০% ভাগ মুসলিমের উপর এটিই হলো সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে অবহেলা হলে সারা জীবন নামায পড়েও কি লাভ হবে? মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাই কোন ঘুষখোর-সূদখোরের বাড়ীতে মিলাদ পড়েনি। এমন কি কোন ধর্ম ব্যবসায়ী মোল্লা-মৌলভীর পিছনেও নামায পড়েনি। নামায পড়েছিল খোদ মহান নবীজী(সাঃ)র পিছনে। এবং সেটি প্রথম কাতারে। কিন্তু সে নামায তাকে মুনাফিক হওয়া থেকে বাঁচাতে পারেনি। তার অপরাধ, ইসলামের বিজয়ের বদলে সে আত্মনিয়োগ করেছিল ইসলামের পরাজয়ে। জোট বেঁধেছিল মক্কার কাফেরদের সাথে। আজও সেরূপ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বাংলাদেশের বহু রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কমকর্তা, বুদ্ধিজীবী ও এনজিও প্রধান। এমনকি তাদের সাথে জড়িত ধর্মের লেবাসধারি বহু ধর্মব্যবসায়ীও। এরাই সম্মিলিত ভাবে টিকিয়ে রেখেছে বাংলাদেশের ইসলামবিরোধী চরিত্র। এবং ভবিষ্যতেও সে চরিত্রকে অক্ষুণ্ন রাখতে রায়। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বলতে তারা দেশের ইসলাম-বিরোধী চরিত্রের এ অক্ষুন্নতাকেই বুঝায়। এবং পরিবর্তনের যে কোন উদৌগকেই বলছে মৌলবাদী সন্ত্রাস। এ কাজে তারা বিপুল সাহায্য পাচ্ছে কাফের রাষ্ট্রগুলো থেকে। এ লড়াই কে বলছে মৌলবাদী সন্ত্রাস ঠ্যাকানোর লড়াই। আসলে এটিই হলো, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা তথা আল্লাহর বিধান প্রতিহত করার লড়াই। ইসলামের বিরুদ্ধে এটি হলো শয়তানী শক্তির আরেক ক্রসেড্ বা ধর্মযুদ্ধ। এবং এ যুদ্ধ চলছে হয়েছে মুসলিমবিশ্ব জুড়ে।

ইসলামের বিজয় রুখতে একমাত্র বাংলাদেশেই শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ আসছে বিদেশী রাষ্ট্র থেকে। কোন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি কি তার নিজ বিশ্বাসের পরাজয়ের রাজনীতিতে জড়িত হতে পারে? তার লড়াই তো হবে ইসলামের বিজয়ে|। আল্লাহর কাছে প্রকৃত মুসলিম রূপে স্বীকৃতি পেতে হলে ইসলামের বিজয়ের এ লড়ায়ে যোগ দেওয়া ছাড়া ঈমানদারের সামনে ভিন্ন পথ আছে কি? ঈমানদার কখনোই কোন বিদেশী শক্তির মন জুগাতে রাজনীতি করে না। তার রাজনীতির লক্ষ্য তো একমাত্র আল্লাহকে খুশি করা। এবং আল্লাহকে খুশি করার মাধ্যমে জান্নাত-প্রাপ্তীকে সুনিশ্চিত করা। অথচ সে অতি পরাজিত-দশাটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ  মুসলিমদের। নিজ দেশে ইসলামের পরাজয়ও তারা নীরবে মেনে নিয়েছে। যেন কিছু করার নেই, সে পরাজয় রোধের সামর্থ্যও যেন তাদের নেই। ইসলামি সংগঠনের বহু নেতা তো প্রতিযোগীতায় নেমেছে কীরূপে মার্কিনীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া যায় তা নিয়ে। তাদের অনেকে জ্বিহাদমূক্ত ইসলামের আবিস্কার নিয়ে ব্যস্ত। প্রশ্ন হলো, তারা কি নবীজীর (সাঃ)আমলের মুসলিমদের চেয়েও দরিদ্র ও অক্ষম? নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাথীদেরকে তিন বছর অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়তে হয়েছে। অনাহারে ও অর্থাভাবে দিনের পর দিন তাঁদেরকে গাছের পাতা খেতে হয়েছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের জীবনে আজ তেমন খাদ্যভাব ও অর্থাভাব আছে কি? ফলে কোথায় সে অক্ষমতা? পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের আয়োজন বা প্রস্তুতি কম হোক অথবা বেশী হোক, বেরিয়ে পর আল্লাহর রাস্তায় এবং জ্বিহাদ কর নিজেদের মাল ও জান দিয়ে। এটিই তোমাদের জন্য অতি কল্যাণকর -যদি তোমরা সেটি বুঝতে পার।” –(সুরা তাওবাহ, আয়াত ৪১)।

বাংলাদেশে ১৬ কোটির বেশি মুসলিমের বসবাস। নবীজী (সাঃ)’র আমলে সমগ্র মুসলিম জনসংখ্যা বাংলাদেশের একটি জেলার অর্ধেকের সমানও ছিল না। ২০ লাখের বেশী হাজির হয় তাবলিগ জামাতের ইজতেমায়। বাংলাদেশের ন্যায় লক্ষ লক্ষ মসজিদ, হাজার হাজার মাদ্রাসা, কোটি কোটি মুসল্লি এমনকি খোলাফায়ে রাশেদার আমলেও ছিল না। অথচ সে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সে আমলের মুসলিমগণ একমাত্র নবীজী (সাঃ)’র আমলেই ৫০ বারের বেশী জ্বিহাদে নেমেছেন। অথচ বাংলাদেশের মুসলিমগণ বিগত ৮০০ বছরের মুসলিম ইতিহাসে ক’বার নেমেছে? ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ইসলামের পরাজিতদশা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস জুড়ে। শুধু নামায-রোযা, হজ্ব-যাকাত ও দোয়া-দরুদে কি বিজয় অর্জিত হয়? বিজয় অর্জনের এটি কি সূন্নতী তরিকা? এতো মুসলিম, এতো মসজিদ, এতো মাদ্রাসা ও এতো ইসলামি প্রতিষ্ঠান তৈরীর হওয়ার পরও কি বলতেই থাকবে, এখনও তাদের সে সামর্থ্য সৃষ্টি হয়নি? তবে সে সামর্থ্য কি সৃষ্টি হবে ইসলামের জেগে উঠার শক্তি পুরাপুরি বিলুপ্ত হওয়ার পর? এমন নীতি বহু কাল চললে তাতে কি বেঁচে থাকে মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের আগ্রহ? পবিত্র কোর’আনে তাবলিগ জামায়াতের ছিল্লা নাই, গাশত নাই, এজতেমা নাই, আখেরাত মুনাজাতও নাই। আছে মহান আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জিহাদ। ২০ লাখের জনতা যদি তাবলিগ জামায়াতে ইজতেমার বদলে ঢাকার রাস্তায় নামতো তবে ইসলাম বিরোধী দুর্বৃত্তগণ কি বাঁচার সুযোগ পেত? তখন সমগ্র রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ও তার কর্মচারিগণ দ্বীনের তাবলিগে। তখন বাংলাদেশ গড়ে উঠতো একটি ইসলামী রাষ্ট্র রূপে।

বাংলাদেশে ইসলামের আজ যে পরাজয়, ক্ষমতাসীন ইসলামের শত্রুপক্ষটি সেটিরই একটি স্থায়ী রূপ দিতে চায়। তাই দেশ এগুচ্ছে ভারতের প্রতি স্থায়ী আত্মসমর্পণের দিকে। ভারতের প্রতি এরূপ আত্মসমর্পণের চেতনাকেই তারা বলে একাত্তরের চেতনা। শুধু বর্তমান সরকার ও তার বিদেশী প্রভুগণই নয়, বাংলাদেশের সকল সেক্যুলার দলগুলিও সেটিই চায়। চায়, একাত্তরে যারা ভারতের কোলে আশ্রয় নিয়েছিল তারাও। কারণ, ভারতের ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী শক্তিবর্গ হলো বাংলাদেশী ইসলামবিরোধীদের আদর্শিক কাজিন। ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে তাদের নীতিতে এজন্যই কোন পার্থক্য নাই। এজন্যই কাশ্মিরে লক্ষাধিক মুসলিম নিহত হলে বা বাবরি মসজিদকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে বা সেদেশের মুসলিমদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিলেও ভারতসেবী এসব বাংলাদেশী দাসদের মুখে কোন প্রতিবাদ নাই। হাসিনা বরং নিয়মিত উপঢৌকন পাঠায়। কারণ, একাত্তরের চেতনা তো ভারতীয় এজেন্ডার সাথে তো এভাবেই একাত্ম হতে শেখায়। এবং প্রতিরোধে খাড়া হওয়া তো রাজাকারের চেতনা।   

এরূপ একটি পরাজিত ও আত্মসমর্পিত অবস্থান থেকে যারাই বেরুনোর পথ খুঁজে তাদেরকেই মৌলবাদী বলা হয়। তারা হত্যাযোগ্যও গণ্য হয়। বুয়েটে আবরার ফাহাদকে হত্যা করা হলো তো তেমন একটি ইসলামবিরোধী হিংস্র চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই। কথা হলো, যাদের ঈমান আছে এবং আছে সর্বশক্তিময় রাব্বুল আ’লামীনের হুকমু মানা ও তাঁর কাছে আত্মসমর্পণের আগ্রহ, দেশের এমন একটি পরাজিত ও আত্মসমর্পিত অবস্থা কি তারা মেনে নিতে পারে? পারে না বলেই সংঘাত অনিবার্য। এ কথা সত্য, বাংলাদেশে অসংখ্য মীর জাফর আছে। তবে দেশটিতে অসংখ্য ঈমানদারও আছে। রাজপথে সেটি দৃশ্যমানও হচ্ছে।  তাই এটি আর এখন ১৭৫৭ সাল নয়। একাত্তরও নয়। তাই সে সম্ভাবনা এখন কম যে, কিছু মীর জাফরদের কারণে বীনা লড়ায়েই আত্মসমর্পণ ঘটবে। এরূপ সাহসী ঈমানদারদের কারণে এখন এ সংঘাতটি নিছক ভোট-যুদ্ধ নয়। নিছক ক্ষমতা দখলের লড়াইও নয়। বরং এটি তার চেয়েও গুরুতর এক যুদ্ধ। তাই আজকের যে অস্থিরতা ও সংঘাত সেটি এক গুরুতর সংঘাতের শুরু মাত্র, শেষ নয়। এরূপ একটি সংঘাতের গুরুতর রক্তাক্ষরণে বিলুপ্ত হয়েছে সোভিয়েত রাশিয়া এবং ডুবু ডুবু অবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। সে সংঘাতই নির্মূল করবে বাংলাদেশের ইসলামের শত্রুপক্ষের। বাংলাদেশে ইসলামের ৮০০ বছরের ইতিহাসে এটিই হবে দেশটির সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধরণের গুণগত পরিবর্তন। এবং বাংলাদেশের উদ্ভব ঘটবে শক্তিশালী এক মুসলিম রাষ্ট্র রূপে। শীত যখন এসেছে, বসন্ত কি দূরে থাকতে পারে? ১ম সংস্করণ ০১/১১/০৮; ২য় সংস্করণ ২৬/১০/২০২০।