রাজনীতি ও রাষ্ট্র নির্মাণে ঈমানদারের এজেন্ডা এবং বেঈমানের এজেন্ডা
- Posted by Dr Firoz Mahboob Kamal
- Posted on September 11, 2026
- Bangla Articles, Bangla বাংলা, সমাজ ও রাজনীতি
- No Comments.
ফিরোজ মাহবুব কামাল
দর্শন ও স্বপ্ন কথা বলে
দর্শন ও স্বপ্ন কথা বলে; ঘুমন্ত জাতিকেও দর্শন জাগিয়ে তোলে এবং বিজয়ী করে। ব্যক্তির দর্শন ও স্বপ্ন প্রকাশ পায় তার ভাবনা, তাড়না, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। ঈমানদার ও বেঈমান কখনোই একই রূপ দর্শন, একই রূপ স্বপ্ন ও একই রূপ রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে বাঁচে না। একই রূপ রাষ্ট্রও নির্মাণ করে না। প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার স্বপ্ন। স্বপ্নের মধ্য যেমন নেক কর্মের বীজ থাকে, তেমনি থাকে পাপের তথা অপরাধের বীজ। ব্যক্তির রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও বাঁচার এজেন্ডার মাঝে তার স্বপ্ন দেখা যায়। স্বপ্নের মধ্য ধরা পড়ে ব্যক্তির বাঁচার নিয়ত। মু’মিন ব্যক্তি তাঁর দর্শন, স্বপ্ন এবং বাঁচার নিয়তটি পায় পবিত্র কুর’আন থেকে। তাই যে ব্যক্তি কুর’আন পড়ে না ও বুঝে না, তার স্বপ্নটি কখনোই ঈমানদারের স্বপ্নের অনুরূপ হয়না। ঈমানদারের স্বপ্নে স্থান পায় তাঁর মহান প্রভু মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার বিষয়টি। সে আমৃত্যু বাঁচে, প্রতিদিন ভাবে, কথা বলে এবং বুদ্ধি দিয়ে ও অস্ত্র দিয়ে লড়াই করে সে স্বপ্ন পূরণের তাড়না নিয়ে। তার স্বপ্ন একটাই, সেটি হলো মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজেকে প্রিয়তর করা এবং তাঁর মাগফিরাত লাভের জন্য নিজেকে যোগ্যতর করা। সে স্বপ্ন পূরণের তাড়নায় ঈমানদার তাঁর নিজ সামর্থ্যের সবটুকু বিনিয়োগ নিয়ে আল্লাহর পথে। সে বাঁচে মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডার সাথে পূর্ণ একাত্ম হয়ে। অর্ধেকের বেশি সাহাবা এ পথে শহীদ হয়ে গেছেন। এমন ঈমানদারদের নিয়ে মহান রব নিচের আয়াতে বলেছেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
অর্থ: “যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন তাদের অন্তর ভয়ে কেঁপে উঠে। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কুর’আনের আয়াত, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ারদেগারের উপর ভরসা পোষণ করে।”-(সুরা আনফাল, আয়াত ২)।
সর্বদ্রষ্টা মহান আল্লাহ তায়ালা শুধু ব্যক্তির কর্ম ও চরিত্র দেখেন না, দেখেন তাঁর নিয়ত। দেখেন তার ভাবনা, তাড়না ও বিনিয়োগ। কারণ, তাঁর নিয়ত, ভাবনা, তাড়না ও বিনিয়োগের মধ্যে ধরা পড়ে কেন সে বাঁচে, কেন সে লড়াই করে ও কেন সে মৃত্যুবরণ করে -সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি। মানুষে মানুষে যে বিশ্বজুড়া বিভক্তি ও সংঘাত -তার মূল কারণটি হলো ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্ন। বিপরীত স্বপ্নের কারণে ঈমানদার ও বেঈমান কখনোই রাজনীতির একই মোহনায় মিলিত হয়না, স্বপ্ন সেখানে বিভক্তির দেয়াল রূপে খাড়া হয়। তখন নিজ নিজ বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের ভিত্তিতে রাজনীতিতে ভিন্ন স্রোত সৃষ্টি হয়। স্বপ্নে সে ভিন্নতার কারণেই ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমগণ হিন্দুদের থেকে ভিন্নতর রাষ্ট্র পাকিস্তান গড়েছিল। কারণ, উভয়ের স্বপ্নের মাঝে মিলন বা সমন্বয় অসম্ভব ছিল।
সেক্যুলারিস্টদের স্বপ্ন দেখা যায় তাদের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির মাঝে। সে চিত্রটি ঈমানদারদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেক্যুলারিস্টগণ তাদের বাঁচা-মরা, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহের মূল প্রেরণাটি পায় তাদের পার্থিব স্বার্থ উদ্ধারের তাড়না থেকে। কারণ, সেক্যুলারিজমের আভিধানিক অর্থই ইহজাগতিক স্বার্থ উদ্ধারের ভাবনা নিয়ে বাঁচা। সে ভাবনার মধ্যে ধর্মের বা আখেরাতের ভাবনার কোন স্থান নাই। এরাই রাজনীতিতে স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী রাজতন্ত্রী, গোত্রবাদী, বর্ণবাদী, শ্রেণীবাদী, জাতীয়তাবাদী ও কম্যুনিস্ট হয়। তারা লড়াই করে, যুদ্ধ করে এবং রক্ত দেয় তাদের মতবাদী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা দিতে। ইসলামের প্রতি অঙ্গীকার না থাকায় এরা নামে মুসলিম হলেও রাজনৈতিক লক্ষ্যপূরণে এমনকি মূর্তিপূজারী ও সাম্রাজ্যাবদী কাফিরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে। পাকিস্তান আমলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টগণ স্বপ্ন দেখে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জনগোষ্ঠির পরিচয় বাড়াতে।
রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী ও প্যান ইসলামী চেতনার মাঝে কখনো ম্যাচিং হয়না। ফলে তাদের জাতীয়তাবাদী স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা গণ্য হয় প্যান ইসলামী চেতনার উপর নির্মিত পাকিস্তান। এজন্যই তাদের লক্ষ্য হয় পাকিস্তান ভাঙা। তাদের কাছে বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ ও উর্দুভাষা মোহাজিরদের নিয়ে নির্মিত বহুভাষী প্যান ইসলামী পাকিস্তান গণ্য হয় সাম্প্রদায়িক অনাসৃষ্টি রূপে। এমন কি তাদের কাছে গৌরবের কর্ম রূপে গণ্য হয় না নবীজী (সা:)’য়ের হাতে আরব, ইরানি, তুর্কি, কুর্দি, হাবশি, মুর ইত্যাদি বহু ভাষীদের নিয়ে নির্মিত মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রও। জাতীয়তাবাদী চেতনাধারীদের নিয়ে এখানেই সমস্যা। কুয়ার ব্যাঙ যেমন তার কুয়াকে নিয়ে ভাবে, তেমনি জাতীয়তাবাদী ও উপজাতীয়তাবাদীরা ভাবে তাদের নিজেদের ভাষাভিত্তিক ক্ষুদ্র ভৌগলিক অঙ্গণ নিয়ে। তাদের ছোট মন কখনোই বড় কিছু নিয়ে ভাবতে পারেনা। ফলে ১৯৭১’য়ে তারা যুদ্ধ করেছে পাকিস্তান ভাঙতে। পাকিস্তান ভাঙার সে যুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্টগণ পার্টনার রূপে বেছে নেয় ভারতীয়দের।
কিন্তু ঈমানদারদের স্বপ্নটি ভিন্ন এবং বিশাল। তারা ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও অঞ্চল ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে বহু ভাষী ও বহু বর্ণের মানুষদের নিয়ে বিশাল ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখে। সে স্বপ্ন পূরণের জিহাদে তারা নিজেদের জান, মাল, মেধা ও শ্রমের বিনিয়োগ করে। সেরূপ রাষ্ট্র গড়ায় গুরুত্ব পায় মুসলিম উম্মাহর শক্তি, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার বিষয়। এবং গুরুত্ব পায় আল্লাহ তায়ালার আইন ও তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠার বিষয়। বর্ণবাদী, গোত্রবাদী ও জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্রতার বদলে সে প্যান-ইসলামী হয়। ফলে তাঁর কাছে গুরুত্ব পায় শুধু নিজের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নয়, বরং অন্য ভাষা, অন্য বর্ণ ও অন্য অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলিমদের জান মালের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার বিষয়ও। গুরুত্ব পায় তাদের সাথে একতাবদ্ধ হওয়ার বিষয়। এমন চেতনা নিয়ে মুসলিম উম্মাহ অতীতে খেলাফত গড়েছিল এবং সে পথে বিশ্বশক্তির মর্যাদা পেয়েছিল। সে চেতনা নিয়েই ১৯৪৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমগণ জনসংখ্যয় সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র এবং চীন ও ভারতের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিল বাঙালি মুসলিমগণ। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা দানকারী প্রতিষ্ঠান মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল ঢাকায়। এবং অখণ্ড ভারতের বুকে বাংলাই ছিল মুসলিম লীগের মূল ঘাঁটি। বস্তুত পাকিস্তানের সৃষ্টিই হলো সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে বাঙালি মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম।
পরিতাপের বিষয়, ১৯৪৭’য়ের সে প্যান-ইসলামী দর্শন আজ বাঙালি মুসলিম চেতনায় বেঁচে নাই। বিপুল সংখ্যক বাঙালি মুসলিমের চেতনায় সে দর্শন মারা যায় ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই। পুর্ব পাকিস্তানের উপর আঘাত হানে সেক্যুলারিজম, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিকতার প্রবল জোয়ার। সে জোয়ারে কচুরিপানার ন্যায় ভেসে যায় এমন কি তাদেরও অনেকে -যারা পাকিস্তানকে প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিল। স্রোতে ভেসে যাওয়া লোকেরাই পরিণত হয় পাকিস্তানের ঘরের শত্রুতে। এরাই রাজনীতির অঙ্গণে আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও গুপ্ত কম্যুনিস্ট পার্টি গড়ে তোলে। তারা সেক্যুলারিজম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্লাবন আনে বাঙালি মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে। প্রভাব বাড়ে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের। ১৯৪৭’য়ে দেশটির জন্ম থেকেই পাকিস্তান ভাঙার যে পুরনো ভারতীয় এজেন্ডা -সেটিই এসব সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী দলগুলির এজেন্ডাতে পরিণত হয়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট ও সামরিক দুর্বলতাকে তারা দেশটির ধ্বংসে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করে। ১৯৭১’য়ে তারা ভারতের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং বিজয়ী হয়।
নবীজী (সা:)’য়ের যুগেও আরবের বুকে সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিকতার জাহিলয়াত ছিল। সেদিন ইসলামই জাহিলিয়াতের সে জাহান্নামমুখী স্রোত থেকে আরবদের মুক্তি দিয়েছিল। ইসলামের কারণেই গোত্রে গোত্রে বিভক্ত আরবগণ সীসাঢালা প্রাচীরসম ঐক্যবদ্ধ উম্মাহতে পরিণত হয়েছিল। সেরূপ বিভক্তি দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের মাঝেও ছিল। বিভক্তি ছিল ভাষা, অঞ্চল, মাজহাব, তরিকা, ফেরকা, পীর মুরিদী ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাক্কালে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমগণ সফল হয় বিভক্তির এ ফিতনা থেকে নিজেদের বাঁচতে। ভাষা ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে ভারতের নানা প্রদেশের মুসলিমগণ তখন একতাবদ্ধ হয় প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্বের বন্ধনে। তারা অনুপ্রাণিত হয় উম্মাহর ধারণায়। সে মুসলিম ভাতৃত্ব বিপ্লব আনে ভারতীয় মুসলিমদের রাজনীতিতে। ফলে ইংরেজ শাসক শক্তি ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শক্তির বিরোধীতা সত্ত্বেও ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমগণ সফল হয় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা দিতে। মহম্মদ ঘুরি’র হাতে ভারত বিজয়ের পর বস্তুত পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাই ছিল উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
বাঙালি মুসলিমের আদর্শিক রূপান্তর
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে প্যান ইসলামের যে প্রবল জোয়ার এসেছিল তা দ্রুত ভাটায় পরিণত হয। নতুত জোয়ার শুরু হয় নব্য জাহিলিয়াতের। সে নব্য জাহিলিয়াতের মুল বার্তাটি মূর্তিপূজা ছিল না, বরং ছিল ভাষা পূজা, জাতি পূজা ও প্রবল আঞ্চলিকতার। শুরু হয় কম্যুনিজমের নামে জাহিলিয়াতের আরেক তীব্র স্রোত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সে স্রোতকে আরো বেগবান করে। সে স্রোতে ভাসা বাঙালি মুসলিমদের আদর্শিক রূপান্তরের নমুনা হলো, ফুলের মালা নিয়ে নগ্ন পায়ে স্মৃতি স্তম্ভের বেদীমূলে হাজিরা দেয়া। শুরু হয় বেদী স্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে আরতি পেশ। বস্তুত এভাবেই শুরু হয় বাঙালি মুসলিমের ইসলাম থেকে দূরে সরা এবং সে সাথে শুরু হয় বাঙালি মুসলিমের হিন্দুয়ানী আদলে সাংস্কৃতিক রূপান্তর। এভাবেই শুরু হয় পূর্ব বাংলার বুকে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির জোয়ার -যা দিন দিন তীব্রতর হয়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরার সাথে।
বাঙালি মুসলিমের মনে নব্য জাহিলিয়াতের মিশ্রণটি হলো ভূ-রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী, চিন্তা চেতনায় সেক্যুলারিস্ট, অফিস আদালাতে ঘুষখোর এবং সংস্কৃতিতে হিন্দুত্ববাদী ও পতিতা পল্লীর রক্ষক। ১৯৭১’য়ে এ জোয়ার নতুন মাত্রা পায়। সে সময় জাহিলিয়াতের জোয়ার এতোটাই তীব্রতা পায় যে, বাঙালি মুসলিমদের একটি বৃহৎ অংশ তাতে ভেসে যায়। ১৯৪৭’য়ের প্যান-ইসলামী চেতনা ছেড়ে তারা হাতে তুলে নেয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের পতাকা। “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর”য়ের বদলে ধ্বনিত হয় “জয় বাংলা”। জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্ট ও বামধারার রাজনৈতিক সংগঠন, মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি পরিণত হয় বাঙালি মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর মূল হাতিয়ারে। পাকিস্তান ভাঙার লক্ষ্যে তারা কোয়ালিশন গড়ে পাকিস্তানের আজন্ম শত্রু পৌত্তলিক ভারতের সাথে। ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ হলো, বাঙালি মুসলিমদের এই সেক্যুলারমুখী ও জাতীয়তাবাদী আদর্শিক রূপান্তর এবং সে সাথে পৌত্তলিক ভারতের সাথে কোয়ালিশনের রাজনীতি। কারণ, ভারতের সাথে এ কোয়ালিশনের ফলে ভারতের এজেন্ডাই বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত হয়। বাঙালি মুসলিমের রাজনীতিতে এটি ছিল ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন। ফল দাঁড়ায়, পাকিস্তান ভাঙার লক্ষ্যে শেখ মুজিব ১৯৬৬’য়ে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার সাথে যে গোপন আগরতলা ষড়যন্ত্র করেছিল সেটি আর গোপন থাকেনি; ১৯৭১’য়ে সেটিই প্রকাশ্য যুদ্ধে রূপ নেয়। বরং ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার সাথে মুজিবের ষড়যন্ত্রের রাজনীতিও তার ভক্তদদের কাছে গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
জন্ম থেকেই পাকিস্তানের সমস্যা ছিল। সে সমস্যাকে জটিলতর করেছিল দেশটির গণতান্ত্রিক রাজনীতির ব্যর্থতা, সামরিক স্বৈরশাসন, দুর্বৃত্ত আমলা চক্র, জন্মের বহু পূর্ব থেকেই বেড়ে উঠা আঞ্চলিক বৈষম্য এবং ভারতীয় হস্তক্ষেপ। গণতান্ত্রিক রাজনীতির ব্যর্থতার জন্য পূর্ব পাকিস্তানীরাও কম দায়ী নয়। সন্ত্রাসী খুনিতে পরিণত হয় প্রাদেশিক সংসদের বাঙালি সদস্যরা। ১৯৫৭ সালে ঢাকায় প্রাদেশিক পরিষদের বৈঠক চলা কালে ডিপুটি স্পীকারকে সংসদ সদস্যদের হাতে নিহত হতে হয়। কিন্তু সে হত্যাকাণ্ডের জন্য কারো শাস্তি হয়নি। এটি এক বিশাল অরাজকতা। অরাজকতা সামরিক শাসন ডেকে আনে।
দেশে সমস্যা থাকলে দেশবাসীর দায়িত্ব হয় সে সমস্যার সামাধানে সর্বাত্মক চেষ্টা করা। বাঙালি মুসলিমগণ ছিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা শতকরা ৫৬ ভাগ। ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্কারে তাদের দায়ও ছিল সর্বাধিক। কিন্ত তারা সেসব সমস্যার সমাধানের পথে যায়নি। সমস্যার সামাধানে না গিয়ে তারা বরং রাজনৈতিক সমস্যাকে তীব্রতর, জটিলতর ও সহিংসতর করার কাজে লেগে যায়। তারা বেছে নেয় দেশকে খণ্ডিত করার আত্মঘাতী যুদ্ধের পথ। এটি ছিল নিজ দায়িত্বের সাথে গাদ্দারী। তারা ভুলে যায় পাকিস্তানের সৃষ্টিতে বাঙালি মুসলিমদের অতীত অবদানের কথা। ১৯৪৭ সালে বাঙালি মুসলিমগণ কলকাতা, ঢাকাসহ বাংলার সকল শহরগুলির রাজপথে “পাকিস্তান কা মতলব কিয়া? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর” এবং “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” এ ধরণের ধ্বনি তুলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বলবান করেছিল। সে সময় বাংলাই ছিল মুসলিম লীগের শাসনাধীন একমাত্র প্রদেশ। বাংলাই ছিল ভারতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রদেশ। বাঙালি মুসলিমের সহযোগিতা ছাড়া পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা সেদিন অসম্ভব ছিল। অথচ সে বাঙালিরাই ১৯৭১ সালে ভারতের পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধের গোলাম সৈনিকে পরিণত হয়। এটি ছিল বাঙালি মুসলিম জীবনে বিশাল আদর্শিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিচ্যুতি –এ হলো পূর্ণাঙ্গ ভূ-রাজনৈতিক ইউ টার্ন। সে বিচ্যুতির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একদিকে তারা যেমন হিন্দুত্ববাদী ভারতের অতি কাছে পৌঁছে গেছে, তেমনি দূরে সরেছে পবিত্র কুর’আনের শিক্ষা থেকে। তার প্রমাণ, ১৯৭১’য়ে তারা ভারতের অর্থ, অন্ন, অস্ত্র, প্রশক্ষিণ নিয়ে এবং ভারতীয় সৈনিকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। অথচ ১৯৪৭’য়ে এমনটি চিন্তাও করা যেত না। আত্মঘাতী এ রাজনীতির নেতৃবৃন্দ সামরিক দিক দিয়ে দুর্বল ও অরক্ষিত বাংলাদেশকে ১৯৭১’য়ে দক্ষিণ এশিয়ার ইসরাইল ভারতের হাতে তুলে দেয়।
প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায় হলো কুর’আনের বিধানের প্রতি অনুগত থাকা। এ ক্ষেত্রে বিদ্রোহ চলে না। বিদ্রোহ ব্যক্তিকে কাফিরে পরিণত করে। মহান রাব্বুল আলামীন কাফিরদের সাথে বন্ধত্ব করাকে হারাম করেছেন। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ এসেছে সুরা আল ইমরানের ২৮ নম্বর এবং সুরা মুমতাহানার ১ নম্বর আয়াতে। সে সাথে হারাম করেছেন মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি এবং কোন মুসলিম দেশ ভাঙাকে। এ বিষয়ে আয়াত এসেছে সুরা আল ইমরানের ১০৩ ও ১০৫ নম্বর আয়াতে। কিন্তু মহান রবয়ের সে হুকুম ১৯৭১’য়ের সেক্যুলারিস্ট বাঙালি নেতাদের কাছ গুরুত্ব পায়নি। তারা বরং চরম অবজ্ঞা দেখিয়েছে সে হুকুমের প্রতি। বাঘ ভালুকের সাথ যেমন বন্ধুত্ব চলে না, তেমনি বন্ধুত্ব করা চলেনা আগ্রাসী কাফিরদের সাথে। সেটি ১৯৪৭’য়ের বাঙালি মুসলিম নেতাগণ বুঝেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা এতোটাই ধর্মচ্যুৎ যে পৌত্তলিক কাফিরদের শুধু বন্ধু রূপেই গ্রহণ করেনি বরং তাদের অন্ন, অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের দাস সৈনিক রূপে যুদ্ধ করেছে। সাড়ে চৌদ্দশত বছরের মুসলিম ইতিহাসে বাঙালি মুসলিমের গাদ্দারীর এটি এক অনন্য ইতিহাস। এমন গাদ্দারী থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলো একাত্তরের এ গাদ্দারীর ইতিহাসে স্কুল কলেজে পড়ানো উচিত।
একটি মুসলিম দেশে জুলুম, বৈষম্য, অবিচার ও অন্যায় থাকতেই পারে। ইসলাম সেগুলির বিরুদ্ধে লড়াইকে জিহাদের মর্যাদা দেয়। কিন্তু হারাম করেছে দেশ ভাঙাকে। কারণ দেশ ভাঙলে সমস্যার সমাধান হয়না; বরং তাতে মুসলিম উম্মাহ দুর্বল ও অরক্ষিত হয়। দেশ ভাঙার পথটি তাই উম্মাহর বিরুদ্ধে আত্মঘাতী নাশকতার পথ। জীবিত দেহে নানা রকমের রোগ থাকতেই পারে। কিন্তু রোগ আছে বলে কাউকে হত্যা করা যায় না। তেমনি দেশে রাজনৈতিক সংকট আছে বলে সে দেশ ভাঙা জায়েজ হয়না। কিন্তু মুজিব ও তার অনুসারীরা সে কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিতে পারিনি। অবশ্য মুজিবের ন্যায় বিদেশী শক্তির দাসদের থেকে কাণ্ডজ্ঞান আশা করা যায়না। কারণ, দাসদের কাজ মনিবের হুকুম পালন; ন্যায়-অন্যায়ের বিচার সেখানে গুরুত্ব পায়না। বাঙালি সেক্যুলারিস্টদের যদি পবিত্র কুর’আনের জ্ঞান থাকতো তবে ১৯৭১’য়ে কখনোই তারা পৌত্তলিক শিবিরে গিয়ে উঠতো না। তখন বুঝতে পারতো, কুর’আনী বিধানের বিরুদ্ধে যাওয়াটি কোন মামুলি বিষয় নয়। এটি শুধু পার্থিব জীবনে আযাব আনে না, আখেরাতে জাহান্নামে হাজির করে।
হালাল যুদ্ধ ও হারাম যুদ্ধ
প্রতিটি জাতির জীবনেই যুদ্ধ থাকে। সে যুদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে হতে পারে, তেমনি হতে পারে রণাঙ্গণের সশস্ত্র যুদ্ধ। সে যুদ্ধ যেমন হালাল হতে পারে, তেমনি হারাম হতে পারে। যুদ্ধ মানব জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্ম। এখানে বিনিয়োগ হয় ব্যক্তির শ্রেষ্ঠ সামর্থ্যের। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পরীক্ষা হয় ব্যক্তির ঈমানের এবং ন্যায় অন্যায় নিয়ে ব্যক্তির নিজের বিচার বোধের। বিচার হয় দায়িত্ববোধের। কে কোন যুদ্ধে যোগ দিল এবং নিজ সামর্থ্যের বিনিয়োগ করলো -রোজ হাশরের বিচার দিনে তার জবাব দিতে হবে। হারাম যুদ্ধে আহত বা নিহত হওয়াতে ইসলামে অঙ্গীকারশূণ্য সেক্যুলার সরকারের পক্ষ থেকে পদক মিলতে পারে, ইসলাম থেকে দূরে সরা জাতীয়তাবাদী সেক্যুলারিস্ট জনগণ থেকে প্রচুর বাহবাও জুটতে পারে -কিন্তু সে হারাম যুদ্ধে অংশগ্রহণ বা প্রাণদান তাকে জাহান্নামে নিবে।
যে যুদ্ধ সংগঠিত হয় শত্রুর আগ্রাসনের মুখে ইসলামকে বিজয়ী করতে, মুসলিম রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বাঁচাতে বা মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জতকে প্রতিরক্ষা দিতে -এমন প্রতিটি যুদ্ধই হালাল। এমন যুদ্ধের আযানে সাড়া দেয়া ফরজ। কারণ, এখানে যুদ্ধের আযানটি দেয়া হয় মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে। কারণ, মহান রব ইসলামের বিজয় চান এবং তিনি মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চান। তিনি চান মুসলিম উম্মাহর একতা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং ইজ্জতের সুরক্ষা। বস্তুত এমন প্রতিটি যুদ্ধই হালাল, যার লক্ষ্য মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করা। এমন যুদ্ধে নিহত হলে শহীদের মর্যাদা মেলে।
অপর দিকে যে যুদ্ধের সংঘটক কাফির পক্ষ বা সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী শক্তি এবং যে যুদ্ধের লক্ষ্য ইসলামকে বিজয়ী করা নয় এবং মুসলিম ভূমির স্বাধীনতা ও অখণ্ডতার সুরক্ষা দেয়াও নয়, বরং উদ্দেশ্য যেখানে মুসলিম রাষ্ট্রকে পরাজিত ও খণ্ডিত করা -এমন প্রতিটি যুদ্ধই হারাম যুদ্ধ। বুঝতে হবে, যে যুদ্ধে ইসলামের বিজয় এবং মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কোন প্রসঙ্গ নয়, বরং সংঘটিত হয় ভাষা, জাতি, দল, মতবাদ ও রাজশক্তির নামে -বুঝতে হবে সেটি হারাম যুদ্ধ। শয়তানের এজেন্ডাই হলো এমন যুদ্ধের প্রকৃত এজেন্ডা। ১৯৭১’য়ের মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধটি ছিল পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধ। পৌত্তলিক ভারত শুধু এ যুদ্ধের অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণই দেয়নি, বরং এ যুদ্ধের মূল যোদ্ধাও ছিল ১০ ডিভিশন ভারতী কাফির বাহিনী। পৌত্তলিকদের অর্থ, অস্ত্র ও সৈন্যদের দ্বারা পরিচালিত এমন যুদ্ধ কখনোই হালাল যুদ্ধ হতে পারেনা, এটি ছিল একটি বিশুদ্ধ হারাম যুদ্ধ। তাই এ যুদ্ধে কোন ইসলামপন্থী দল, কোন আলেম, কোন মাদ্রাসার ছাত্র যোগ দেয়নি। মুসলিম কখনো এমন যুদ্ধে যোগ দিতে পারে না। এমন যুদ্ধে নিহত হলে জাহান্নামে যেতে হয়। ঈমানী দায় হলো, এমন প্রতিটি হারাম যুদ্ধ থেকে বাঁচা। বরং ১৯৭১’য়ে তাদের যুদ্ধটি ছিল হালাল যারা পৌত্তলিক ভারত ও তার মিত্রদের হাত থেকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের অখণ্ডতা বাঁচানোর জন্য লড়াই করেছিল।
বাঙালি মুসলিম জীবনে প্রধান রাজনৈতিক যুদ্ধের শুরুটি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লড়াই দিয়ে। সেটি ছিল এ উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান এবং পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালনের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির যুদ্ধ। আজ ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যেই হচ্ছে গণহত্যা, তাদের গৃহে আগুন দেয়া হচ্ছে, মুসজিদ মাদ্রাসা ভাঙা হচ্ছে এবং মসিজদের মাইকও খুলে নেয়া হচ্ছে -যাতে আযান ধ্বনি বাইরে শোনা না যায়। সরকারের নীতি নতুন মসজিদ নির্মাণের জন্য অনুমতি না দেয়া; মসজিদের ভিতরে জায়গার অভাবে মানুষ বাধ্য হয় জুম্মার নামাজে রাস্তায় বা মাঠে দাঁড়াতে। আর বাইরে দাঁড়ালে নামাজীদের উপর হামলা শুরু হয় হিন্দু গুণ্ডা ও পুলিশের। রাস্তার উপর হিন্দুদের ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে রথ যাত্রা, পূজো, মেলা ও কীর্তন হতে পারে, কিন্তু মুসলিমদের নামাজের জন্য আধা ঘন্টা সময় দিতেও তারা রাজী নয়। মুসলিমদের অধিকারশূণ্য করাই ভারত সরকারের নিয়ম।
হিন্দু শাসিত ভারতে মুসলিমদের জান মাল যে নিরাপত্তা পাবে না, তারা যে পূর্ণ ইসলাম পালনের অধিকার পাবে না এবং রাজনীতিতে স্থান পাবে না -সেটি পাকিস্তান আন্দোলনের নেতাগণ ১৯৪৭’য়ের আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লড়াইটি শুধু হালাল যুদ্ধই ছিল না, বরং সেটি ছিল একটি ফরজ যুদ্ধ। সে যুদ্ধে পাকিস্তানপন্থীগণ বিজয়ী হলেও সে যুদ্ধ ১৯৪৭’য়ে শেষ হয়নি। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা রুখতে ব্যর্থ হয়ে ভারতের লক্ষ্য হয় পাকিস্তানকে খণ্ডিত করা। ভারতীয় যুদ্ধের শুরুটি হয় পূর্ব পাকিস্তানে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক অঙ্গণে। সে যুদ্ধে ভারতের সহযোগী হয় ইসলাম থেকে দূরে সরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীগণ। মুজিব ও তার সঙ্গীগণ এ যুদ্ধে ভারতের বিশ্বস্ত পার্টনারে পরিণত হয়।
বাঙালি জীবনে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ
প্রতিটি যুদ্ধের পিছনে শুধু দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ থাকে না, থাকে দু’টি ভিন্ন স্বপ্ন। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি পক্ষ ছিল প্যান ইসলামী চেতনাধারী; তারা স্বপ্ন দেখতো ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ এবং মুসলিম উম্মাহর উত্থান নিয়ে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে তারা সে স্বপ্ন পূরণের হাতিয়ার ভাবতো। এরাই ১৯৭১’য়ের অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র হাতে খাড়া হয়। ইতিহাসে এরাই রাজাকার নামে পরিচিত। অপর পক্ষটি ছিল ভারত সমর্থিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার পক্ষ। তাদের কাছে বহুভাষা ও বহু অঞ্চলের জনগণ নিয়ে গঠিত প্যান ইসলামী পাকিস্তান অসহ্য ছিল। তাদের চেতনায় ইসলামের বিজয় নিয়ে কোন অঙ্গীকার ছিল না। তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজেদের বাঙালি পরিচয়টিই, তাদের চেতনায় ইসলামের কোন স্থান ছিলনা। তারা চাইতো বাংলা ভাষা ভিত্তিক বাংলাদেশ। এরাই পাকিস্তান ভাঙতে ভারতীয় শিবিরে যোগ দেয়। এরাই ইতিহাসে মুক্তিবাহিনী নামে পরিচিত। উভয়ের মাঝে আপোষ বা সমন্বয় অসম্ভব ছিল; ফলে অনিবার্য হয় যুদ্ধ। ১৯৭১’য়ের যুদ্ধের এটিই হলো প্রেক্ষাপট। এ প্রেক্ষাপট সামনে থাকলে কোনটি হালাল যুদ্ধ আর কোনটি হারাম যুদ্ধ সেটি বুঝা সহজ হয়ে যায়।
শয়তান শুধু মূর্তি পূজা দিয়ে মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরায় না। বরং দূরে সরায় এবং জাহান্নামমুখী করে জাতি পূজা, জন্মভূমি পূজা, ভাষা পূজা, বর্ণ পূজা, গোত্র পূজার দিকে ডেকে। এরূপ পূজা অর্চনার সংস্কৃতি দিয়ে সমাজে মেরুকরণের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধের জন্ম নেয়। বাংলাদেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে সেরূপ মেরুকরণ আজও বেঁচে আছে। বাংলাদেশের মাটিতে যতদিন বেঁচে থাকবে ইসলাম, যতদিন বেঁচে থাকবে ইসলামের উত্থান প্রতিরোধে শয়তান ও তার অনুসারীদের ইসলাম বিরোধী বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক যুদ্ধও। যুদ্ধে সৈনিক মারা যায়, কিন্তু সৈনিকের স্মৃতি ও তাদের বয়ান যুগ যুগ বেঁচে থাকে। ফলে প্যান-ইসলামী চেতনার ধারক রাজাকার বাহিনী ও ইসলামী চেতনাশূণ্য মুক্তিবাহিনীর মাঝে ১৯৭১’য়ে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সে যুদ্ধের বয়ান যুগ যুগ বেঁচে থাকবে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে। সে বয়ান লাগাতর বিভক্তির উত্তাপ ছড়াতেই থাকবে। কারণ, অস্ত্রের যুদ্ধ থেমে গেলেও বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ কখনো থামে না।
এ পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে পৌত্তলিকতার সনাতন অজ্ঞতা হাজার হাজার বছরেও দূর হয়নি। গাছের পাশে আগাছা যেমন বেঁচে আছে; তেমনি যুগ যুগ বেঁচে থাকবে পৌত্তলিকতার সনাতন অজ্ঞতাও। তেমনি বিলুপ্ত হবে না ১৯৭১’য়ের পৌত্তলিক ভারত এবং ভারতসেবী বাঙালি ফ্যাসিস্ট ও সেক্যুলারিস্টদের একাত্তরের মিথ্যা বয়ান। পুরোহিত মারা যায়, কিন্তু পৌত্তলিকতা বেঁচে থাকে। তেমনি আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত হয়েছে বটে; কিন্তু ১৯৭১’য়ের আওয়ামী বয়ান বেঁচে আছে। একাত্তরের সে বয়ান নিয়ে বিএনপি’র নেতাগণ ইতিমধ্যেই ময়দান গরম করা শুরু করেছে। এটিও সত্য, যেখানে ঈমানদার থাকে সেখানে যুদ্ধুও থাকে। কারণ ঈমান নিয়ে বাঁচার অর্থ মিথ্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে বাঁচা। মুসলিম উম্মাহর স্মৃতি থেকে বদর, ওহুদ, খন্দকের স্মৃতি যেমন বিলুপ্ত হয়নি; যেমন বিলুপ্ত হয়নি স্পেন ও দিল্লি থেকে মুসলিম শাসন নির্মূলের স্মৃতি, তেমনি বিলুপ্ত হবে না ১৯৭১’য়ে পাকিস্তানের বিভক্তি ও বঙ্গীয় বদ্বীপের মুসলিম ভূমির উপর পৌত্তলিক ভারত ও তার সেবাদাসদের যু্দ্ধ জয়ের স্মৃতি। মীর জাফর ও তার অনুচরদের বিশ্বাসঘাতকতার স্মৃতি যেমন ভোলার নয়, তেমনি ভোলার নয় শেখ মুজিব ও তার অনুচরদের বিশ্বাসঘাতকতার স্মৃতিও। সে স্মৃতির ভিত্তিতেই আগামী দিনের বিজয়ের পথ নির্মিত হবে।
ANNOUNCEMENT
ওয়েব সাইটটি এখন আপডেট করা হচ্ছে। আগের লেখাগুলো নতুন ওয়েব সাইটে পুরাপুরি আনতে কয়েকদিন সময় নিবে। ধন্যবাদ।
LATEST ARTICLES
- বাংলাদেশ রাষ্ট্র: আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শো‘কেস
- The Ideological Engineering in the Muslim World & the Catastrophic Outcomes
- রাজনীতিতে সিরাতাল মুস্তাকীম ও সিরাতাদ দোয়াল্লিন
- এ জীবন কিরূপে বিফল হয় এবং কিরূপে সফল হয়?
- রাষ্ট্রই যখন নাশকতার হাতিয়ার
বাংলা বিভাগ
ENGLISH ARTICLES
RECENT COMMENTS
- Fazlul Aziz on The Israeli Crimes, the Western Complicity and the Muslims’ Silence
- Fazlul Aziz on India: A Huge Israel in South Asia
- Fazlul Aziz on ইসলামী রাষ্ট্রের কল্যাণ এবং অনৈসালিমক রাষ্ট্রের অকল্যাণ
- Fazlul Aziz on বাংলাদেশে দুর্বৃত্তায়ন, হিন্দুত্ববাদ এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ
- Fazlul Aziz on Gaza: A Showcase of West-led War Crimes and the Ethnic Cleansing
ARCHIVES
- October 2026
- September 2026
- August 2026
- July 2026
- June 2026
- May 2026
- April 2026
- March 2026
- February 2026
- January 2026
- December 2025
- November 2025
- October 2025
- September 2025
- August 2025
- July 2025
- June 2025
- May 2025
- April 2025
- March 2025
- February 2025
- January 2025
- December 2024
- October 2024
- September 2024
- August 2024
- July 2024
- June 2024
- May 2024
- April 2024
- March 2024
- February 2024
- January 2024
- December 2023
- November 2023
- October 2023
- September 2023
- August 2023
- July 2023
- June 2023
- May 2023
- April 2023
- March 2023
- January 2023
- December 2022
- November 2022
- October 2022
- September 2022
- August 2022
- July 2022
- June 2022
- May 2022
- April 2022
- March 2022
- February 2022
- January 2022
- November 2021
- October 2021
- September 2021
- August 2021
- July 2021
- June 2021
- May 2021
- April 2021
- March 2021
- February 2021
- January 2021
- December 2020
- November 2020
- October 2020
- April 2020
- March 2020
- February 2020
- January 2020
- December 2019
- November 2019
- October 2019
- September 2019
- August 2019
- July 2019
- June 2019
- May 2019
- April 2019
- March 2019
- February 2019
- January 2019
- December 2018
- November 2018
