একাত্তরের গণহত্যার দলিল  (দুই)

image_pdfimage_print

যে কাহিনী শুনতে নেই (০৬)

================

খুলনা হত্যাকান্ড

—————

০১.

“… ঘন্টা দেড়েক পর আবার খবর এলো, লেবার কলোনিতে ভয়ানক এক হত্যাযজ্ঞ চলছে। বিহারি নিধন হচ্ছে। আমরা কয়েকজন অফিসার আমাদের দোতলা বিল্ডিংয়ের ছাদে উঠলাম, খুব বেশি কিছু দেখা গেলো না। শুধু দেখলাম, কিছু লোক মৃতদেহ টেনে নিয়ে নদীর দিকে যাচ্ছে। আর ঘন্টা দুই-তিন পর খবর পেলাম, বিহারি পুরুষ প্রায় শেষ। বিহারি নারী এবং শিশুদেরকে নদীর ধারে কাস্টম অফিসারের বাড়িতে নিয়ে রাখা হচ্ছে। সঠিক সময় মনে নেই। আনুমানিক বেলা তিনটার দিকে একজন বাঙালি ম্যানেজার আমাকে ডেকে নিয়ে জেনারেল ম্যানেজার সাহেবের বাংলো সংলগ্ন পাঁচিলের কাছে নিয়ে গেলেন। পাঁচিলের ওপাশেই কাস্টম অফিসারের কোয়ার্টার। উঁচু পাঁচিল। কিছু ইট জোগাড় করে আমার দাঁড়াবার বন্দোবস্ত করে তিনি আমাকে বললেন, একটু তাকিয়ে দেখেন। আমি মাথা উঁচু করে তাকালাম। যে বীভৎস দৃশ্য দেখলাম, তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে পেরেছিলাম। মাথা ঘুরে গেলো, তাকাতে পারলাম না – নেমে এলাম। সিরাজ চৌধুরী উঠে দেখতো গেলো। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে সে নেমে এলো। মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে সিরাজ কাঁদতে লাগল। মাঝে মাঝে বলতে লাগলো, ‘হে আল্লাহ, এ তুমি কী দেখালে?’ আমার দিকে তাকালো। কেন তাকালো তা জানি না।

… বেলা চারটে নাগাদ বিস্মিত হয়ে দেখলাম যে একজন অপরিচিত লোক রাইফেল নিয়ে আমাদের অফিসার্স কলোনিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার সঙ্গে আছে দুই-তিনজন শ্রমিক। আর আছে দশ-বারোজন অল্পবয়স্ক ছেলে। এরা সবাই আমাদেরই কলোনির বেয়ারা-বাবুর্চিদের সন্তান। এদের প্রত্যেকের হাতে লাঠি ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র। একটু পরেই একজন বাঙালি ম্যানেজার এসে বললেন, এরা দাবি করছেন যে অবাঙালি অফিসারদের এদের হাতে তুলে দিতে হবে। আমি বললাম, অসম্ভব। এই লোককে এক্ষুণি কলোনি ছেড়ে চলে যেতে বলো। কিন্তু লোকটা গেলো না। সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। বিশ্রী একটা অবস্থা।

সিকিউরিটি অফিসার সরদার খানের নিরাপত্তার জন্যে চিন্তিত হয়ে পড়লাম। সঙ্গে সঙ্গে সরদার খানের নিরাপত্তার জন্যে তার ঘরের সামনে সিকিউরিটি ক্লার্ক আমানুল্লাহকে মোতায়েন করলাম। আমানুল্লাহকে নির্দেশ দিলাম, কাউকে যেন ভেতরে ঢুকতে দেয়া না হয়। নিজে দেখে এলাম, সরদার খান তার কামরায় বসে কোরআন শরীফ পড়ছে, আর তার পাশে বসে তার ভাইপো, যার বয়স চোদ্দ-পনের বছর। এই ভাইপো কিছুদিন আগে চাচার কাছে বেড়াতে এসেছিলো।

বাঙালি ম্যানেজারদের বুঝিয়ে বললাম, প্রত্যেক অবাঙালি ম্যানেজারের বাসায় যেয়ে বলে আসতে যে তারা যেন বাইরে না আসে, দরজা বন্ধ করে ঘরের মধ্যে থাকে। বাঙালি ম্যানেজারদের বললাম, বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে তারা যেন আবাসিক এলাকা পাহারা দেন। অজ্ঞাতনামা হত্যাকারী যদি আমাদের কোন ম্যানেজারকে হত্যা করার চেষ্টা করে, আমরা যেন সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালাতে দ্বিধা না করি। বাঙালি বা অবাঙালি, প্রত্যেককে নিরাপদ রাখা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। সব বাঙালি অফিসার আমার সঙ্গে একমত।

আনুমানিক বেলা পাঁচটা। আমার বাসার ড্রয়িংরুমে বসে আছি। একা বসে আছি। সারাদিন ছুটোছুটি করে বড়ো পরিশ্রান্ত। কিছুই ভাবতে পারছি না। একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্যে বসেছিলাম। এমন সময় সিকিউরিটি ক্লার্ক আমানুল্লাহ টলতে টলতে আমার ঘরে ঢুকে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো এবং বললো, আমার সাহেবকে বোধহয় আর বাঁচাতে পারলাম না। ঠিক তখনই পরপর দুটো গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। আমানুল্লাহ কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। পরে জানলাম, আমানুল্লাহ সরদার খানের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। অজ্ঞাতনামা হত্যাকারী তার দলবল নিয়ে আমানুল্লাহকে সরে যেতে বলে। আমানুল্লাহ সরতে অস্বীকার করলে তার বুকে রাইফেল ধরে অজ্ঞাতনামা লোকটা বলে, আপনি না সরলে আমি এখনই গুলি করবো। আমরা সরদার খানকে মারবো না, শুধু তার রিভলবারটা নেবো। আমরা কথা দিচ্ছি, আমরা কথা রাখবো। এরপর আমানুল্লাহ সরে দাঁড়ালেই অজ্ঞাতনামা হত্যাকারী ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং সরদার খানের বুকে রাইফেল ধরে তাকে বের করে নিয়ে যায়। এই দেখেই আমানুল্লাহ আমার কাছে ছুটে আসে। একটু পরে জানলাম, অজ্ঞাতনামা হত্যাকারী সরদার খান ও তার ভাইপোকে ক্লাবের কাছে নদীর ধারে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

এই প্রথম বড়ো অসহায় বোধ করলাম। একটা নিরাপত্তাহীনতার ভাব মনের মধ্যে কাজ করতে লাগলো। কয়েকজন বাঙালি ম্যানেজারকে নিয়ে পরামর্শ করলাম যে, কী করে বাইরের এই লোকগুলোকে আমাদের এলাকা থেকে বের করা যায়। ম্যানেজাররা বললেন, তারা অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অজ্ঞাতনামা হত্যাকারী ও তার সাঙ্গপাঙ্গ বাইরে যেতে রাজি না। তার হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল। সে অবশ্য কথা দিয়েছে আর কাউকে হত্যা করবে না। কিন্তু তার উদ্দেশ্য সন্দেহজনক। তাকে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। আমরা খুব সাবধানে তার গতিবিধির দিকে নজর রাখলাম। আমরা এখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আর কোন অবাঙালি অফিসার যেন নিহত না হয়।

… যতদূর মনে পড়ে, ২৭ মার্চ বেলা দুটা নাগাদ আমাদের গেটের বিহারি দারোয়ানরা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লো। তারা আর ডিউটি করতে পারলো না। তারা প্রথমে কয়েকজন অবাঙালি ম্যানেজারের বাসায় গিয়ে আশ্রয় চেয়েছিলো। অবাঙালি ম্যানেজাররা তাদেরকে আমার বাসায় পাঠিয়ে দেন। আমি তাদের ফেরাতে পারলাম না। তাদেরকে আমার বাসায় আশ্রয় দিলাম। সন্ধ্যা নাগাদ আরও সাত-আটজন বিহারি দারোয়ান আমার বাসায় আশ্রয় নেয়। আমি তাদেরকে স্টোররুম, কিচেন এবং ডাইনিংরুম ছেড়ে দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেই। আমি আধঘন্টা পরপর গিয়ে ওদের খোঁজখবর নিতাম। এরা শুধু পানি খেতে চাইতো। বিসমিল্লাহ নামের এক বিহারি দারোয়ান আমার বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলো। আমার খুব প্রিয় দারোয়ান। আমার অনেক বিপদ-আপদে সে সব সময় আমার পাশে থেকেছে। কখনও আমাকে বিপদের মধ্যে ফেলে চলে যায়নি। আমার স্পষ্ট মনে আছে; ওইদিন সন্ধ্যায় একবার বিসমিল্লাহ দারোয়ান তার দুই হাত দিয়ে আমার মুখটা জড়িয়ে ধরে খুব করুণভাবে জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘স্যার , হাম বাঁচে গা তো?’ রাত দুটা পর্যন্ত এদের খবর নিয়েছিলাম। তারপর আর পারিনি। পরদিন ভোরবেলায় এদের খোঁজ নিতে গিয়ে আর এদেরকে পাইনি। জানি না এদের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো। হয়তো এরা পালিয়ে গিয়েছিলো, নয়তো অজ্ঞাতনামা সেই হত্যাকারীদের হাতে এদেরকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিলো।

… উনত্রিশ মার্চ ভোরবেলায় যখন আমার ফ্ল্যাটে ঢুকি, তখন বারান্দায় দশ-বারোজন লোককে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখেছিলাম। এরা সবাই বিহারি। লেবার কলোনি থেকে কোনরকমে বেঁচে রাতের অন্ধকারে কীভাবে যেন অফিসার্স কলোনিতে ঢুকে পড়েছে। মনে হয়, এদের মধ্যে দুই জন পুরুষ, দুই জন মহিলা এবং বাকিরা এদের ছেলেমেয়ে। এদের চোখের চাহনি আজও ভুলতে পারিনি। বেঁচে থাকার জন্যে, একটু আশ্রয়ের জন্যে করুণ চাহনি। হত্যাকারীরা রাইফেল নিয়ে তখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাড়াতাড়ি বিহারি লোকগুলোকে নিয়ে আমার বাসার পেছনের কিচেন গার্ডেনে গেলাম। টমেটো গাছের জন্যে মাচা করেছিলাম। সেই মাচার নিচে এদেরকে লুকিয়ে রাখলাম। মনে আছে ঘন্টা দুই পরে গিয়ে এদেরকে আর পাইনি। আজও জানি না এদের ভাগ্যে কী ঘটেছিলো।

উনত্রিশ মার্চ সকালে খবর নিয়ে জানলাম যে, বাঙালি ম্যানেজাররা ও তাদের পরিবারবর্গ সবাই নিরাপদে আছেন। রাতেরবেলায় তাদের কারও কোন ক্ষতি হয়নি। সকাল নয়টার দিকে জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি লুকিয়ে ছিলেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বাসায়। আমার কথা শুনে বেরিয়ে এলেন। সারা রাত ঘুমাননি। চোখ লাল। বললাম, ‘আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়। লেবার কলোনি জনমানবশুন্য। বিহারি সব শেষ। বাঙালিরা নদী পার হয়ে পালিয়েছে। শুধু অফিসাররাই আছি। যে কোন মুহুর্তে আর্মি এসে যেতে পারে। আর্মি এলে আমাদেরকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করবে। চলুন নদী পার হয়ে গ্রামে চলে যাই।’ জেনারেল ম্যানেজার সাহেব বললেন, ‘গ্রামে গেলে গ্রামের লোকেরা আমাদের (অবাঙালিদেরকে) হত্যা করবে। অতএব গ্রামে যাওয়া সমীচীন নয়। তোমরা সবাই এখানে থাকো, যদি আর্মি আসে তবে তাদের হাত থেকে আমি তোমাদেরকে বাঁচাবো।’ ‘না’ বলতে পারলাম না। কথা দিলাম থাকবো। বাইরে চলে এলাম॥”

— কাজী আনোয়ারুল ইসলাম / আমার একাত্তর ॥ [ অবসর – ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮ । পৃ: ৪৯-৫৫ ]

০২.

“… ২৮-২৯শে মার্চ, ১৯৭১। খুলনা শহর। ক্রিসেন্ট জুট মিলস্, খালিশপুর ও স্টার জুট মিলস্, চান্দিমহল। খুলনায় আওয়ামী লীগের আধা-সামরিক শিক্ষা শিবির গঠন করা হয়। তথাকথিত পশ্চিম পাকিস্তানী “দালালদের” বিরুদ্ধে সুসংবদ্ধ হত্যা ও অগ্নিকান্ড চলতে থাকে। ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয় এবং ব্যাপকভাবে হত্যাকান্ড চলতে থাকে। গলা কেটে ফেলার আগে হতভাগ্য ব্যক্তিদের উৎপীড়ন করা হতো। নিরাপরাধ নারী ও শিশুদের রাস্তায় টেনে এনে হত্যা করা হয়। যারা প্রাণের ভয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো ও বেঁচেছিলো, তাদের নদী থেকে উঠিয়ে আনা হয়। তারপর তাদের পেট চিরে আবার নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তাদের রক্তে নদীর পানি লাল হয়ে গিয়েছিলো। মিল সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়। কিছু সংখ্যক অফিসার মুক্তিপণ দিয়ে বেঁচে যান। হতাহতের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার।

… ২৮-২৯শে মার্চ, ১৯৭১। পিপলস জুট মিলস্, খালিশপুর, খুলনা। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস্, আনসার এবং আওয়ামী লীগ কর্মীরা বয়সের প্রতি কোন লক্ষ্য না রেখে উচ্ছৃঙ্খল হত্যাকান্ডে লিপ্ত হয়। ৪ শ’ ৬৭ জন নিহত হয়।

… ২৮-২৯শে মার্চ, ১৯৭১। নিউ কলোনী, খালিশপুর, খুলনা। প্রায় ১০ হাজার আওয়ামী লীগ কর্মী কলোনী ঘেরাও করে ফেলে। বিদ্রোহী পুলিশরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সমানে ৬ ঘন্টারও বেশি সময় গোলাগুলি বর্ষণ চলতে থাকে। প্রায় ৩শ’ লোক নিহত হয়॥”

তথ্যসূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র / সম্পা : বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ॥ [ আগামী প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৩ । পৃ: ১৪৪-১৪৫ ]

০৩.

“… Soon after Bangladesh was liberated on December 16, 1971, violence became an indulgence of the victorious Bengalis against the Biharis. Fearing total unrest, the local authorities in Khulna put the Biharis in a local jail for their safety; Zaibunisa with her four daughters, ages twelve, eight, three years, and six months, lived in the jail for several months. Having no resources for supporting her young and dependent family, Zaibunisa and her children often went to bed hungry. She recounted that one morning, “the three-year-old and the six-month-old baby refused to get up from their sleep. They died of hunger in the night.”

— Yasmin Saikia / Women, War, and the Making of Bangladesh : Remembering 1971 ॥ [ Duke University Press – 2011 । p. 96 ]

০৪.

“… রুস্তম আলী সিকদার যিনি খেলোয়াড় কোটায় পিওন সুপারভাইজার হিসেবে ক্রিসেন্ট জুট মিলে নিয়োগ পেয়েছিলেন, তিনি সেই ১৯৫৩ সাল থেকেই আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তার দাবি অনুযায়ী তার সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল, অন্যদেরও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং ১৯৬৯ সালেই ৪০০ সদস্যের একটি বাহিনী তিনি সংগঠিত করেছিলেন। তারা ১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম সপ্তাহে মাঠে কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করেন।তারা মিল গেটে ব্যারিকেড স্থাপন করেছিলেন যাতে সেনাবাহিনী মিলে ঢুকতে না পারে এবং বাঙালি বা বিহারী শ্রমিকরা যাতে মিল থেকে বের না হতে পারে। তারা যোগাযোগ রেখেছিলেন বাঙালি পুলিশ ও ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস্‌ সদস্যদের সাথে, কিন্তু তাদের কাছে ছিল শুধুমাত্র পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র আর তা তারা পেয়েছিলেন মিলের নিরাপত্তা কর্মীদের কাছ থেকে।

প্রথম দিকে তারা বাঙালি ও বিহারীদের মাঝে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য বিহারীদের সাথে একটি চুক্তি করেছিলেন, কিন্ত এক রাতে ক’জন বিহারী পান আনার অজুহাতে মিলের বাইরে গেলে রুস্তম আলী সিকদার ও অন্য বাঙালিরা এ যাওয়াটা সহজভাবে গ্রহণ করেনি (যদিও তারা তাদের সন্দেহের পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো কারণ বের করতে পারেনি)।

মিলের স্পিনিং বিভাগের প্রবীণ আব্দুর রব সর্দারেরও দাঙ্গা হাঙ্গামার অভিজ্ঞতা আছে কারণ তিনি আওয়ামী লীগ ও মুসলীম লীগের (বিহারী) একাধিক দাঙ্গায় জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালে দৌলতপুর থানার বাঙালি পুলিশ অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। একই ধরনের কাহিনী অন্যান্য থানা থেকেও শোনা গিয়েছিল। সে সময় জুট মিলে “শান্তি কমিটি” গঠন করা হয়েছিল বাঙালি ও বিহারী উভয় সম্প্রদায়ের পাঁচজন করে সদস্য নিয়ে যারা লাঠি দিয়ে মিল পাহারা দিত। আব্দুর রব সর্দারের ভাষ্য অনুযায়ী মিল ম্যানেজার রহমতউল্লাহ ও অন্যান্য অফিসাররা ছিলেন ইসমাইলীয়া সম্প্রদায়ের এবং তারা সব সময় ন্যায় বিচারের পক্ষে থাকা ও মিলে কর্মরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাঝে শান্তি বজায় রাখতে চেষ্টা করতেন। ২৪ মার্চের রাত থেকেই মিলের বাইরে গোলাগুলি শুরু হয় এবং পরদিনই সেনাবাহিনী ওই এলাকায় পাহারা দেয়া শুরু করে। তবে মিল গেটে লোহার বীম দিয়ে স্থাপিত ব্যারিকেড থাকার জন্য সৈন্যরা মিলে প্রবেশ করতে পারেনি। দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা যারা অস্ত্র নিয়ে পালিয়েছিলেন তারা নদী দিয়ে মিলের পিছনে আসেন এবং একটি পানির ট্যাংকের উপর অবস্থান নেন।

একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল পিপলস্‌ জুট মিলে। ২৭ মার্চ বিহারীরা তাদের কোয়ার্টারে ড্রাম বাজাতে শুরু করে। সর্দারের মতে বাঙালিদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০০ জন। সংখ্যার দিক থেকে বিহারীরা ছিল অনেক বেশি, কিন্তু ওই দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা ও আরো কয়েকজন বাঙালি বিহারীদের দিকে গুলি করলে কয়েকজন বিহারী আহত হয় এবং অন্যরা আতংকিত হয়ে পড়ে। এরপর উত্তেজিত বাঙালি জনতা হাতের কাছে যা পায় যেমন দা ইত্যাদি তাই নিয়ে বিহারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পরে নির্বিচারে হত্যা করে নারী, পুরুষ ও শিশুদের। তাদের মৃতদেহগুলো ফেলে দেয়া হয় নদীতে। সর্দারের ধারণা একই ঘটনা অন্য জুট মিলেও ঘটেছিল। লাশগুলো ফেলে দেয়ার পর তিনি ওই রাতে খুলনা ত্যাগ করে বরিশাল চলে যান ও সেখান থেকে ভারতে পৌঁছে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

আমি সর্দারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওই দিন কতোজন বিহারী পুরুষ, নারী ও শিশু নিহত হয়েছিল – এক ডজন? শত শত? এক হাজার? “তাতো হবেই”, তিনি বললেন এবং সহজেই একমত হয়ে জানালেন এক হাজার এবং তারপর নিম্নস্বরে ও আকার ইঙ্গিতে বোঝালেন প্রকৃতপক্ষে তার সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। অল্পসংখ্যক আক্রমণকারী বাঙালিও ওই ঘটনায় মারা গিয়েছিল।

খুলনার বাইরে খালিশপুরের নিউ কলোনীর বেঁচে যাওয়া বিহারীরা আমাকে তাদের ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা কথা বলেছেন! দুই বা তিনজন তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিলেন ও এদের মাঝে কেউ কেউ মাথা ঝাঁকিয়ে বা আরো তথ্য যোগ করে বর্ণনাটা আমাকে পরিষ্কার করে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। তবে প্রত্যেকে একমত হয়েছিলেন যে সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল ক্রিসেন্ট জুট মিলে ও তারপরই ছিল পিপলস্‌ জুট মিল। মার্চের প্রথম দিকে সাধারণ ধর্মঘট শুরু হওয়ার পর রাস্তায় কয়েকজন বিহারীকে হত্যা করা হয়েছিল, ২৮ মার্চ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল মিলের ভিতরে। বিহারীরা জানান সে সময় বাঙালিরা ‘ফাঁসির মঞ্চ’ তৈরি করে সেখানে বিহারীদের ঝুলিয়ে হত্যা করে।সেনাবাহিনী সেখানে পৌঁছলে বেঁচে যাওয়া বিহারীরা পাকিস্তান সরকারের কাছে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা উপস্থাপন করে। কতগুলো মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল – এর জবারে বিহারীরা বলেন – ‘লাখোন’ (লাখো)।যেহেতু বাঙালিরাই স্বীকার করেছেন কয়েক হাজারের, তাহলে যুক্তিসঙ্গতভাবে অনুমান করা যেতে পারে সেখানে ওই একটি ঘটনায় কয়েক হাজার বিহারী নারী, পুরুষ ও শিশুদের হত্যা করেছিল বাঙালিরা৷

৭ মার্চ শেখ মুজিব ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে তার এতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। ওতে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকেন। ঠিক সে সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সবুর খানের বাড়ির উল্টোদিকে অবস্থিত খুলনা সার্কিট হাউসে ২২ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের মেজর শামিন জান বাবর অবস্থান করছিলেন। তিনি ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের যশোর সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন৷ গোলযোগের সূত্রপাত হয়েছিল ১ মার্চের পরই। এর পরপরই পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবের শাসন শুরু হয়ে যায়। সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টের ভিতরেই থাকতে পরামর্শ দেয়া হয় এবং কোনো কিছুতেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করতে বা সাড়া না দিতে বলা হয়। ২৪ মার্চের রাতে খুলনায় বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে শুরু হয় সমন্বয়হীনভাবে বিক্ষিপ্ত গুলিবর্ষণ। ২৫ মার্চ মেজর শামিন জান বাবরকে খুলনা শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। খুলনা রেডিও স্টেশনে সেনাবাহিনীর যে ইউনিটকে পাঠানো হয়েছিল সেটি অতর্কিত হামলার কবলে পড়লে কয়েকজন সৈন্য প্রাণ হারান কিন্তু মেজর বাবর জানান বিদ্রোহীদের নিহতের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি এবং বাকীরা পালিয়ে গিয়েছিল।

খুলনা নিয়ন্ত্রণে আনতে এক সপ্তাহ বা ওই রকম সময় লেগেছিল। মেজর বাবর নৌকায় নদীপথে মিল এলাকা দেখতে গিয়েছিলেন। নদীতে অগণিত পঁচা ফুলে ওঠা মানুষের দেহতে মেজর বাবরের নৌকা ধাক্কা খায়। এতে তার মতো একজন অদম্য সৈনিকও ওই ভয়াবহ দৃশ্য থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। মিলের ভিতরে তিনটি কসাইখানা বানিয়েছিল বাঙালি শ্রমিকরা। হত্যাকাণ্ডের জন্য গিলোটিনের ন্যায় একটা স্থাপনা সেখানে তৈরি করা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা ও অত্যাচার করার জন্য সেখানে বেশ কিছু যন্ত্রপাতিও পাওয়া গিয়েছিল। মেঝে ছিল রক্তের আবরণে ঢাকা। পরে মেজর বাবর সেনা প্রধান জেনারেল হামিদ ও পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল নিয়াজীকে ওই কসাইথানায় নিয়ে এসে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। ‘আমি তাদের বলেছিলাম – কেন ওইসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর সংবাদ মাধ্যমে দেওয়া হয়নি এবং তারা আমাকে বলেন যে, সরকার বাঙালিদের বিরুদ্ধে কোনো “পাল্টা প্রতিশোধের” ঘটনা ঘটুক তা চায়নি বলেই ওইসব চেপে যাওয়া হয়েছে॥”

— ডেড রেকনিং : ১৯৭১-এর বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি / শর্মিলা বসু (মূল: Dead Reckoning : Memories of the 1971 Bangladesh War । অনু: সুদীপ্ত রায়) ॥ [ হার্স্ট এন্ড কোম্পানী – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৮৫-৮৮ ]

০৫.

“… খুলনা ছিল পূর্ব পাকিস্তানে পাটের ব্যবসা ও পাট শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম সপ্তাহে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিদ্রোহে এখানে চরম বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ে। ৪ মার্চ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একদল দাঙ্গাবাজ স্থানীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ আক্রমণ করে, যন্ত্রপাতির ক্ষতিসাধন করে এবং কয়েকজন কর্মচারীকে হত্যা করে।নিহতদের বেশির ভাগ ছিল অবাঙালি। পরদিন একটি বিশাল জনতা রাইফেল, শিকল, বর্শা ও ছোরা নিয়ে চারটি দোকান লুট করে এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটি হোটেলে অগ্নিসংযোগ করে। আরেকদল জনতা বিস্ফোরক, বন্দুক, বর্শা ও বাঁশের লাঠি নিয়ে খুলনার নিকটবর্তী দৌলতপুর ও খালিশপুরে অবাঙালিদের দোকানপাট এবং বাড়িঘরে হামলা চালায় এবং ৫৭ জনকে হত্যা করে। কয়েকদিন পর তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়।

৬ মার্চ বাঙালি জঙ্গিরা অবাঙালিদের ভীতি প্রদর্শনে খুলনায় একটি বিশাল মিছিল বের করে। কয়েকজন সশস্ত্র বিক্ষোভকারী অস্ত্র ও গোলাবারুদের দোকান লুট করার চেষ্টা করে। সংঘর্ষে কয়েকজন হতাহত হয়৷ শহরের বেসামরিক প্রশাসন ভেঙ্গে পড়ে। পুলিশ বাহিনী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের জঙ্গি সমর্থকরা অবাঙালি এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্বেষ ছড়াতে থাকে। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে খুলনায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিদ্রোহ তুঙ্গে পৌঁছে। হত্যা ও ভীতি প্রদর্শন করার জন্য অবাঙালিদের চিহ্নিত করা হয়। এ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আওয়ামী লীগের সহিংসতা ও সন্ত্রাসের কাছে খুলনা ও তার আশপাশের শহরগুলো জিম্মি হয়ে যায়। বিদ্রোহীরা যশোর-খুলনা সড়কের কয়েকটি জায়গা অবরোধ করে এবং ব্যারিকেড দেয়। খুলনায় ৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ থেকে জীবিত অবাঙালিরা নতুন করে হামলার শিকার হয়। আওয়ামী লীগের জঙ্গি কর্মী ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বিদ্রোহীরা অবাঙালিদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।

২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একদল বিদ্রোহী এ শহর এবং তার আশপাশের এলাকায় অবাঙালি বসতিতে সর্বাত্বক হামলা করে এবং কমপক্ষে ৫ হাজার নির্দোষ মানুষকে হত্যা করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এগিয়ে আসা নাগাদ মার্চের তৃতীয় সপ্তাহের পুরো সময়ে বাঙালি বিদ্রোহীরা অবাঙালিদের রক্তপাত ঘটায়। তারা কয়েকটি জঘন্য কসাইখানা স্থাপন করে। এসব কসাইখানায় অবাঙালি মহিলা ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বিদ্রোহীরা খুলনা ও তার আশপাশের নদীগুলোতে বহু লাশ ভাসিয়ে দেয়। গুলি করে হত্যা করার আগে অবাঙালি ও পাকিস্তানপন্থী বাঙালিদের নির্যতন করা হতো।

প্রত্যক্ষদর্শীরা গলা কাটা ও পেট ফাঁড়া বহু লাশ নদীতে ভাসতে দেখেছেন। বিদ্রোহীরা খুলনা ও খুলনার উপকণ্ঠে বহু জুট মিল ও শিল্প-কারখানা লুট ও ভাঙচুর করে। বিদ্রোহীরা অবাঙালি শ্রমিকদের উত্তপ্ত বয়লারে ফেলে জীবন্ত হত্যা করে। খালিশপুর ও দৌলতপুরে অবাঙালি পল্লীতে বর্বরতার সঙ্গে নির্দোষ অবাঙালিদের হত্যা করা হয়। তাদের ঘরবাড়ি ও বস্তি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। মার্চের শেষ সপ্তাহে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী আনসার এবং আওয়ামী লীগের সশস্ত্র জঙ্গিরা অবাঙালিদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ গণহত্যা পরিচালনা করে।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আওয়ামী লীগ খুলনায় আধা-সামরিক প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করে। এসব প্রশিক্ষণ শিবিরে দলের স্বেচ্ছাসেবকদের অস্ত্র চালনা শিক্ষা দেয়া হতো। খুলনা শহরের শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকায় বহু পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যবসায়ী, মিল-কারখানার নির্বাহী এবং তাদের পরিবারবর্গকে অপহরণ করা হয়। মুক্তিপণ আদায়ে তাদের আটক রাখা হয়। আত্মীয়-স্বজনরা মুক্তিপণ পরিশোধ করা সত্ত্বেও তাদের অনেককে হত্যা করা হয়।

যেসব বাঙালি তাদের অবাঙালি বন্ধুদের আশ্রয় দিয়েছিল, বিদ্রোহীরা তাদেরকেও হত্যা করে। ১৯৭১ সালে মার্চের গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন জানিয়েছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার একদিন আগে ২৯ মার্চ খুলনাকে আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত একটি শহরের মতো মনে হচ্ছিল। ১৯৭১ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহের সময় খুলনা ও তার আশপাশের শহরগুলোতে কী পরিমাণ লোক নিহত হয়েছিল সে ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন হিসেব পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিল-মে’তে খুলনা সফরকারী বিদেশি ও পাকিস্তানি সাংবাদিকদের সেনাবাহিনীর অফিসাররা জানিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের হাতে কমপক্ষে ৯ হাজার লোক নিহত হয়েছে। কিন্ত এ বইয়ের জন্য সাক্ষাৎকার প্রদানকারী প্রত্যক্ষদর্শীরা বিশ্বাস করছেন যে, ১৯৭১ সালের মার্চে অবাঙালি নিধনকালে খুলনায় প্রায় ৫০ হাজার অবাঙালি নিহত হয়৷ তারা জোর দিয়ে বলেছেন, খুলনা ও তার আশপাশের শহরগুলোতে হাজার হাজার অবাঙালিকে হত্যা করা ছাড়াও খুলনা জেলার অন্যান্য শহর থেকে পালিয়ে আসা শত শত অবাঙালি পরিবারকে শহরে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ পথগুলোতে হত্যা করা হয়।

খুলনার প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পিপলস্‌ জুট মিল এবং ক্রিসেন্ট জুট মিলে সশস্ত্র বাঙালিদের হামলায় মহিলা ও শিশুসহ ৫হাজারের বেশি অবাঙালি নিহত হয়। খুলনা রেলওয়ে কলোনিতে হত্যাযজ্ঞে বাঙালি বিদ্রোহীরা এ কলোনির ৬ হাজার বাসিন্দার অধিকাংশকে হত্যা করে। বিদ্রোহীরা শত শত অবাঙালি যুবতী মহিলাকে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে প্যারেড করায়। এসব গ্রামে সুরক্ষিত ঘরবাড়িতে যুবতী মহিলাদের নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয়। অপহরণকারীরা তাদের অনেককে হত্যা করে। তাদের কেউ কেউ বরিশাল পালাতে সক্ষম হয়। তাদেরকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী উদ্ধার করে ঢাকা নিয়ে আসে এবং মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তর করে।

নিউইয়র্ক টাইমসের ঢাকা সংবাদদাতা ম্যালকম ব্রাউন মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তান সফর করেন। ১৯৭১ সালের ৯ মে তার প্রেরিত একটি সংবাদে নিউইয়র্ক টাইমসে বলা হয়:

“খুলনায় সাংবাদিকদের কয়েকটি ভবন দেখানো হয়। এসব ভবনে বন্দিদের শিরশ্ছেদ করার জন্য কাষ্ঠ দণ্ড ছিল বলে জানা গেছে। মহিলাদের রক্তমাখা কাপড়-চোপড়ের ছিন্নভিন্ন অংশ ও কেশ গুচ্ছ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এ জায়গাটি হাজার হাজার অবাঙালি বাসিন্দাকে হত্যা করার জন্য বাঙালি বিদ্রোহীরা ব্যবহার করেছিল বলে জানা গেছে।”

১৯৭১ সালে ৯ মে ওয়াশিংটনের সানডে স্টার-এর একটি রিপোর্টে খুলনায় অবাঙালি হত্যাকাণ্ডের আরো একটি ভয়াবহ বিবরণ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়ঃ

“গতকাল খুলনায় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত একটি সফরে সাংবাদিকরা চালা ঘরে একটি কসাইখানা দেখেছেন। মার্চ এবং এপ্রিলের গোড়ার দিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহের চূড়ান্ত দিনগুলোতে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা ভারতের বিহার থেকে অভিবাসনকারী বিহারী, পশ্চিম পাকিস্তানি এবং অন্যান্য অবাঙালিকে হত্যা করার জন্য এসব চালা ঘর ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে।… সাংবাদিকদের শিকল সংযুক্ত একটি কাঠের দণ্ড দেখানো হয়। এখানে ছোরা দিয়ে মহিলা ও শিশুদের শিরশ্ছেদ করার খবর পাওয়া গেছে ।… একটি গাছের সঙ্গে সংযুক্ত একটি পিতলের গলাবন্ধ দেখা গেছে। বাসিন্দারা জানিয়েছে, এ গলাবন্ধে ফাঁস লাগিয়ে বন্দিদের হত্যা করা হয়েছে। আরেকটি গাছে দড়ি লাগানো দেখা গেছে। গলায় ফাঁস দেয়ার জন্য এ দড়ি ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।লাশগুলো নিচু দেয়ালের ওপাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে।… খুলনায় অবাঙালি এলাকায় সারি সারি ভস্মীভূত ঘরবাড়ি ও দোকানপাট দেখা গেছে। দৃশ্যত বাঙালিরা এসব বাড়ি ও দোকান ভস্মীভূত করেছে।”

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে দেখা গেছে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী খুলনা ও তার আশপাশের শহরগুলো থেকে বিদ্রোহীদের বিতাড়িত করার পর তারা সরাসরি ভারতের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদেরকে বীরের সম্মান এবং নিরাপদ আশ্রয় দেয়। খুলনায় অবাঙালিদের ওপর হামলাকারীদের অনেকেই ছিল বাঙালি হিন্দু। এসব বাঙালি হিন্দু অবাঙালি বিশেষ করে ভারতের বিহার থেকে অভিবাসনকারী অবাঙালিদের প্রতি তীব্র ঘৃণা পোষণ করতো। কট্টরপন্থী আওয়ামী লীগারদের ভয়ে খুলনার অধিকাংশ লোক এত আতঙ্কিত ছিল যে, তাদের ভয়ে কেউ অবাঙালিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিবাদ জানানোর সাহস পায়নি।

সাতষট্টিতম সাক্ষীর বিবরণ:

৩৭ বছরের নিসার আহমেদ খান খুলনার খালিশপুর শিল্প এলাকায় একটি হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের শেষদিকে খুলনায় অবাঙালিদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফা সহিংসতা শুরু হলে ১৯৭২ সালে তিনি নেপালে পালিয়ে যান। ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে তিনি কাঠমন্ডু থেকে পাকিস্তানে আসেন এবং করাচিতে বসতি স্থাপন করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসের রাজত্ব সম্পর্কে তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও পুলিশ খালিশপুরে পাকিস্তানি পতাকা অপবিত্র করে শহরের সকল ভবন ও কলকারখানার শীর্ষে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে বাঙালি বিদ্রোহীরা অবাঙালিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে থাকে এবং আমাদের হত্যা করার প্রস্ততি নেয়া হচ্ছে বলে গুজব উঠে। আমি খালিশপুর এলাকায় স্যাটেলাইট টাউনের জি-১০ নম্বর সেক্টরে একটি ভাড়া করা বাসায় বসবাস করতাম। আমার স্থুল ছিল পিপলস্‌ জুট মিলের কাছাকাছি । এ জুট মিলের কাছে প্রায় ১৫ হাজার অবাঙালি বসবাস করতো। তাদের অনেকেই বসবাস করতো বস্তিতে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ অবাঙালিদের আশ্বস্ত করেন যে, তাদেরকে কোনো প্রকার উত্যক্ত অথবা ক্ষতি করা হবে না। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও কয়েকজন বাঙালি পুলিশ কর্মকর্তা এলাকার প্রধান মসজিদে অবাঙালি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়ে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অবাঙালি ইমামের উপস্থিতিতে তারা শপথ গ্রহণ করেন যে, কোনো অবাঙালির কোনো ধরনের ক্ষতি করা হবে না। তাদের এ আশ্বাস যে কোনো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা নিরাপত্তার জন্য ঢাকায় এগিয়ে যাওয়া থেকে অবাঙালিদের বিরত রাখে।

২৩ মার্চ রাতে এবং পরদিন বাঙালি বিদ্রোহীরা এই এলাকায় অবাঙালিদের বিরুদ্ধে হামলায় লিপ্ত হয়। বিদ্রোহীরা সকল প্রবেশ পথ অবরোধ এবং অবাঙালিদের পালিয়ে যাবার পথ বন্ধ করে দেয়। রাইফেল, স্টেনগান, হ্যান্ড গ্রেনেড, ছোরা ও বল্লম সজ্জিত হয়ে একটি বিশাল উন্মত্ত জনতা অরক্ষিত অবাঙালি পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিদ্রোহীরা গোটা এলাকা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তারা অবাঙালিদের বাড়িঘর লুট করে এবং বাসিন্দারা পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে। বহু মহিলা ও শিশু প্রধান মসজিদ এবং আমার স্কুলে আশ্রয় নেয়। আল্লাহর ওয়াস্তে নির্দোষ মানুষকে হত্যা না করার জন্য অনুরোধ জানালে বিদ্রোহীরা মসজিদের ইমামকে হত্যা করে। বিদ্রোহীদের কাছে ক্ষমা বলতে কোনো জিনিস ছিল না। এ শব্দটি তারা ভুলে গিয়েছিল৷

বাঙালি বিদ্রোহীরা মেয়ে ও যুবতী মহিলাদের অপহরণ করে। এসব অপহৃত মেয়ে ও যুবতী মহিলারা স্কুল ভবনে আশ্রয় নেয়। বিদ্রোহীরা রাতে তাদের ধর্ষণ করতো। বাধাদানকারীদের তৎক্ষণাৎ গুলি করে হত্যা করা হতো। সম্ভ্রম রক্ষায় কয়েকজন মহিলা যৌন নির্যাতন চেম্বারের ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে।

বিদ্রোহীরা কয়েকজন বৃদ্ধ পুরুষ, মহিলা ও শিশুকে হাটিয়ে নদীর তীরে মনুষ্য কসাইখানায় নিয়ে যায়। সেখানে তাদের হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। বিদ্রোহীরা শহর থেকে বহু লাশ ট্রাকে করে নদীর তীরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে লাশগুলো পানিতে ফেলে দেয়া হয়।আমার স্কুলের কাছে ছিল আমার প্রিয় বন্ধু সগীর আহমেদ খানের বাড়ি। সশস্ত্র ব্যক্তিরা তার বাড়িতে প্রবেশ করে প্রত্যেককে গুলি করে হত্যা করে। তার বাড়ি লুট এবংআংশিকভাবে ভস্মীভূত করা হয়।

২৪ মার্চ হত্যাযজ্ঞের দিন আমি আমার স্কুলে যেতে পারিনি। পরদিন একজন বাঙালি কর্মচারী স্যাটেলাইট টাউনে আমার বাড়িতে আসে এবং আমার কাছে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিবরণ প্রকাশ করে। সে আমাকে জানায় যে, স্কুল ভবনে যুবতী মহিলাসহ শত শত মানুষের লাশ স্তূপ দিয়ে রাখা হয়েছে।

৩০ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী খুলনায় প্রবেশ করলে বিদ্রোহীরা পিছু হটে। এই ফাঁকে আমি আমার স্কুলে যাই। সেখানে গিয়ে যে দৃশ্য দেখেছি তা ছিল ভয়াবহ। শত শত রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত লাশের স্তূপ। লাশের পঁচা দূর্গন্ধ। লাশ কবর দিতে, রক্তের দাগ মুছতে এবং দূর্গন্ধ দূর করতে আমার পুরো এক মাস লেগেছিল।”

আটষট্টিতম সাক্ষীর বিবরণ:

২৯ বছরের মাহবুব আলম খুলনায় পিপলস জুট মিলে সিনিয়র একাউন্টস ক্লার্ক হিসেবে চাকরি করতেন। মাহবুব অবাঙালি হত্যাকাণ্ডের সময় একজন বিশ্বস্ত বাঙালি বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেন। তার বহু আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করা হয়। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি করাচিতে প্রত্যাবাসন করেন৷ মাহবুব আলম তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“আমি খুলনার খালিশপুরে ওল্ড কলোনিতে একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতাম। খুলনা জেলার প্রায় অর্ধেক অবাঙালি খালিশপুরে কেন্দ্রীভূত ছিল এবং তাদের অনেকেরই ছিল চমত্কার বাড়ি। আমাদের কলোনি থেকে বাঙালি শ্রমিকদের বসতি খুব দূরে ছিল না। এসব বাঙালি শ্রমিক পিপলস্‌ জুট মিলে চাকরি করতো। আওয়ামী লীগাররা এসব বাঙালি শ্রমিককে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে উসকানি দিচ্ছিল।১৯৭১ সালের ২৩-২৪ মার্চ প্রায় ৫ হাজার সশস্ত্র বাঙালি বিদ্রোহী অবাঙালিদের বাড়িঘর আক্রমণ করে এবং হাজার হাজার অবাঙালি নর-নারী ও শিশুকে হত্যা করে।

বিদ্রোহীরা আমাদের এলাকায় একটি কসাইখানা স্থাপন করে। এ কসাইখানায় হত্যা করার আগে বহু স্বচ্ছল অবাঙালিকে নির্যাতন করা হতো। অবস্থাপন্ন ঘরের মহিলাদের বন্দুকের মুখে তাদের লুকানো অলঙ্কার ও নগদ অর্থের খোঁজ দিতে বাধ্য করা হয়। এসব মহিলার চোখের সামনে তাদের প্রিয়জনদের হত্যা করা হয়।”

ঊনসত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

৩০ বছরের আনসার আহমেদ ছিলেন খুলনার খালিশপুরে স্যাটেলাইট টাউনে একটি দর্জি দোকানের মালিক। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের একদল সশস্ত্র সমর্থক ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বিদ্রোহী সৈন্যরা আমাদের এলাকায় অবাঙালি বসতিতে আক্রমণ চালায়। তারা প্রায় ২৪ ঘণ্টা রক্তপাত ঘটায়। আক্রমণকারীরা বর্বরতার সঙ্গে নির্দোষ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। তাদের বাড়িঘর লুট এবং অগ্নিসংযোগ করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো কলোনি একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। হত্যাকাণ্ডের হাত থেকে রেহাই পেতে অনেকে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বিদ্রোহীরা তাদের গুলি করে হত্যা করে। বিদ্রোহীরা অবাঙালিদের পালানোর সব রাস্তা বন্ধ করে দেয় এবং বন্দুকধারীরা লুকানো স্থান থেকে গুলিবর্ষণ করে। আমি, আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা আমাদের বাড়ির ছাদে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করি। ৩০ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী খুলনার নিয়ন্ত্রণ পুন:প্রতিষ্ঠা করা সত্ত্বেও অগণিত লাশ কবর দিতে অনেক দিন লেগে যায়।”

সত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

৩৪ বছরের এ. এস. সাইফুল্লাহ ১৯৭১ সালের মার্চে খুলনার খালিশপুরে ক্রিসেন্ট জুট মিলে অবাঙালি হত্যাযজ্ঞের একজন সাক্ষী। তিনি ১৯৭১

সালের ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনীর দ্বিতীয় দফা রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়ার হাত থেকে রক্ষা পান। অনেক চড়াই উতড়াই পেরিয়ে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে তিনি পাকিস্তানে ফিরে আসেন। সাইফুল্লাহ তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“২৩ থেকে ২৯ মার্চের মধ্যে খালিশপুর এলাকায় ক্রিসেন্ট জুট মিলের অবাঙালি শ্রমিক, তাদের পরিবার-পরিজন এবং অন্যান্য অবাঙালি অধিবাসীদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। প্রথম দুদিন আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও পুলিশের বিদ্রোহী সদস্যরা অবাঙালিদের বিরুদ্ধে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালায়। বাঙালি বিদ্রোহীরা বহু অবাঙালিকে অপহরণ করে। পরে এসব অপহৃত অবাঙালিকে কসাইখানায় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। ক্রিসেন্ট জুট মিলের কম্পাউন্ডে তিন রুমের একটি ব্লক ছিল। বিদ্রোহীরা এ-ব্লককে কসাইখানায় পরিণত করে। শত শত অবাঙালি পুরুষ, মহিলা ও শিশুকে খাবার ও পানীয় ছাড়া এ কসাইখানায় দু’দিন আটক রাখা হয়। পরে তাদেরকে অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতার সঙ্গে হত্যা করা হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী খুলনায় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার পর আমি এ কসাইখানা দেখেছি। মাটিচাপা দেয়ার জন্য লাশগুলো সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু সর্বত্র ছিল রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। একটি পাত্রে আমি মানুষের চোখের কর্ণিয়া দেখেছি। যেসব হতভাগ্যের চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছিল এসব কর্ণিয়া

ছিল তার প্রমাণ। আমি প্রায়ই ভাবি বিদ্রোহীরা চোখ তুলে নিয়ে কী ধরনের পৈশাচিক আনন্দ পেতো।”

একাত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

৫০ বছর বয়স্ক শাহজাহান খান খুলনার চান্দিমহলে স্টার জুট মিলে চাকরি করতেন। তিনি ১৯৭১ সালের মার্চে অবাঙালি হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছেন। শাহজাহান খান তার সাক্ষ্যে বলেছেন: “১৯৭০ সালে আমি কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসন করি এবং খুলনায় বসতি স্থাপন করি। শুরুতেই আমি স্টার জুট মিলে যোগদান করি। আমিঘি মিলের ওয়েডিং মাস্টার পদে পদোন্নতি লাভ করি। ২৮ মার্চ মেশিনগান, রাইফেল ও বর্শা সজ্জিত একদল লোক এ জুট মিলের অবাঙালি শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের ওপর হামলা চালায়। আক্রমণকারীরা কয়েকজন অবাঙালি শ্রমিককে পর্যুদস্ত করে তাদেরকে মিলের উত্তপ্ত বয়লারে নিক্ষেপ করে। বহু অবাঙালি শ্রমিক পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পলায়নের সময় তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়৷

আমি মিল থেকে পালিয়ে আমার বাড়ির দিকে দৌড়াতে থাকি। একটি গুলি আমার বাহুতে বিদ্ধ হয়৷ গুলিবিদ্ধ হয়েও আমি আমার বাড়ির দিকে দৌড়ানো অব্যাহত রাখি। ঘরের দরজায় পৌঁছা মাত্র আরেকটি গুলি আমার পায়ে লাগে। পায়ে গুলি লাগায় আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। তার আগে আক্রমণকারীরা আমার বাড়ি তছনছ করে এবং আমার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে হত্যা করে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তিন দিন পর আমি নিজেকে খুলনা হাসপাতালে দেখতে পাই। পাকিস্তান সেনাবাহিনী শহরে প্রবেশ করে এবং আহতদের হাসপাতালে স্থানান্তর করে। আমাদের এলাকায় অবাঙালিদের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। বাঙালি বিদ্রোহীরা শত শত অবাঙালি মেয়ে ও যুবতী মহিলাকে অপহরণ করে এবং ধর্ষণ করার পর নদীর তীরে তাদের হত্যা করে। নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়া ছিল তাদের সাধারণ রীতি। ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে আমি পাকিস্তানে প্রত্যাবাসন করি।”

বাহাত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

৬৯ বছর বয়স্ক শাকুর আহমেদ খুলনার খান জাহান আলী রোডে ছেলের বাসায় বসবাস করতেন। তার মতে, ১৯৭১ সালের মার্চে খুলনায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশকে উন্মত্ততা গ্রাস করেছিল। শাকুর আহমেদ তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“বাঙালিদের অধিকাংশই অত্যন্ত ভদ্র। কট্টরপন্থী একটি সংখ্যালঘু অংশ বিপুলসংখ্যক বাঙালিকে বিভ্রান্ত করেছিল এবং বিহারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় লিপ্ত হতে তাদের প্ররোচিত করে ৷ আমি উপমহাদেশ বিভক্তির অনেক আগে থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস করতাম। ভারতের মুলেরে আমার জন্ম। তবে আমার জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে পূর্ব পাকিস্তানে। আমার ছেলের জন্ম খুলনায়। আমরা চমত্কার বাংলা বলতে পারতাম। কিন্ত স্থানীয় বাঙালিরা আমাদেরকে বিহারী বলতো।

১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীরা অবাঙালিদের ভীতি প্রদর্শনে আমাদের এলাকায় কুচকাওয়াজ করতো। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে অবাঙালিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সহিংসতা শুরু হয়। ২৩ মার্চ একদল সশস্ত্র লোক আমাদের এলাকায় আক্রমণ চালায় ৷ তারা আমার স্ত্রী ও একমাত্র ছেলেকে হত্যা করে। তারা আমাকে এবং আমার ছেলের দু’টি শিশু পুত্রকে রেহাই দেয়। আমার নাতিরাই এখন আমার জীবন, তারাই এখন আমার স্বপ্ন। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমরা করাচিতে প্রত্যাবাসন করি।”

তিয়াত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

৬০ বছরের বৃদ্ধ নবী বক্সের তিন পুত্রকে ১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম সপ্তাহে খুলনার প্লাটিনাম জুবিলি মিলে বাঙালি বিদ্রোহীরা হত্যা করে। ১৯৭৩

সালের শরৎকালে তিনি পাকিস্তানে প্রত্যাবাসন করেন এবং করাচিতে বসতি স্থাপন করেন। নবী বক্স তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“আমি প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে বিগত ১০ বছর ধরে চাকরি করতাম। আমার তিন পুত্র এ মিলে কাজ করতো। আমরা খুলনার খান জাহান আলী রোডে একটি ছোট বাড়িতে বসবাস করতাম।

২৪ মার্চ একদল বিদ্রোহী বাঙালি জুবিলি জুট মিলে অবাঙালি শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। তারা আমার তিন ছেলেকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করলে তাদের কয়েকজনের সঙ্গে আমার ধস্তাধস্তি বেধে যায়। হামলাকারীরা আমাকে কাবু করে ফেলে এবং আমার অসহায় চোখের সামনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করে। আমার মাথায় গুলি লাগলে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। আক্রমণকারীরা বিদায় নেয়ার পর একজন বাঙালি শ্রমিক আমাকে টেনে হিচড়ে স্টোর রুমে নিয়ে যায়। সেখানে আমার ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ করা হয়। বাঙালি বিদ্রোহীদের সন্ত্রাসের রাজত্ব থেকে সেনাবাহিনী খুলনাকে মুক্ত করা নাগাদ আমি সেখানেই অবস্থান করি।”

চুয়াত্তরতম সাক্ষীর বিবরণ:

২৮ বছরের রাবিয়া বেগমের স্বামী রুস্তম আলী খুলনায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী হিসেবে চাকরি করতেন। রাবিয়ার মতে, বাঙালিদের মধ্যে বহু আল্লাহভীরু লোক ছিলেন। এসব বাঙালি দৃঢ়ভাবে অবাঙালি হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছেন। কিন্ত তারা ছিলেন অসহায়। আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহীরা ছিল সশস্ত্র। অন্যদিকে হৃদয়বান বাঙালিরা ছিল নিরস্ত্র। রাবিয়া বেগম শুনতে পেয়েছিলেন যে, অবাঙালিদের হত্যা ও নির্যাতনের জন্য কসাইখানা স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৭১ সালে তার বাড়ি লুট এবং তার স্বামীকে হত্যা করা হয়। সে ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন:

“১৯৭১ সালে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে অবাঙালিদের জীবন দুঃস্বপ্লে পরিণত হয়। প্রতিদিন আমরা গুজব শুনতাম যে, বাঙালি বিদ্রোহীরা আমাদের কলোনিতে হামলা চালিয়ে আমাদের সবাইকে হত্যা করবে। ২৩ মার্চ সেই ভয়াবহ দিন এসে উপস্থিত হয়। সেদিন একদল সশস্ত্র বিদ্রোহী আমাদের কলোনি আক্রমণ করে৷ আমার স্বামী দর্শনায় একটি সরকারি কাজে অবস্থান করছিলেন। বাড়িতে আমি এবং আমার বৃদ্ধা শাশুড়ি ছিলাম একমাত্র বয়স্ক মানুষ। গুলির শব্দ শুনে আমি বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে এবং অন্য একটি এলাকায় আমাদের একজন বিশ্বস্ত বাঙালি মহিলার বাড়িতে আশ্রয়গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেই। আমি আমার শাশুড়িকে আমার সঙ্গে যেতে রাজি করানোর চেষ্টা করি। কিন্ত তিনি অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন, বৃদ্ধা হওয়ায় বিদ্রোহীরা তাকে রেহাই দেবে। আমি তাকে ফেলে আমার দু’সন্তান নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই এবং নিরাপদে আমার গোপন আশ্রয়স্থলে পৌঁছি। সেনাবাহিনী খুলনায় প্রবেশ করার পর আমি আমার বাড়িতে ফিরে আসি। বাড়িতে ফিরে গিয়ে যে দৃশ্য দেখি তাতে আমি ভীষণ মর্মাহত হই। আমার বাড়ির অর্ধেকটা ভস্মীভূত। যাবতীয় মূল্যবান সামগ্রী লুন্ঠিত। আমার শাশুড়ি প্রহৃত। বিদ্রোহীদের প্রহারে তিনি আহত। আমি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালে তার চিকিৎসা করা হয়। বাড়িতে কোনো অলঙ্কার না পেয়ে বিদ্রোহীরা রাগান্বিত হয়। আমাদের সম্পদের খোঁজ দিতে তারা আমার শ্বাশুড়িকে প্রহার করে। আমাদের লুকানোর মতো কোনো সম্পদ ছিল না।

সেনাবাহিনী খুলনার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার পর আমি একটি চাকরি নেই। আমার উপার্জিত অর্থ দিয়ে আমি নিজে, আমার সন্তান ও আমার শাশুড়ির ভরণ-পোষণ করেছি। আমি আমার স্বামীর কোনো তথ্য পাচ্ছিলাম না। আমি জানতে পারি যে, বিদ্রোহীরা দর্শনায় তাকে হত্যা করেছে।

১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে মুক্তিবাহিনী খুলনা দখল করে নিলে নতুন করে আমার দুঃস্বপ্ন শুরু হয়। শহরে আবার শুরু হয় অবাঙালি হত্যাযজ্ঞ। ভাগ্যক্রমে আমরা হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাই। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে আমরা ঢাকা থেকে করাচিতে প্রত্যাবাসন করি॥”

— ব্লাড এন্ড টীয়ার্স / কুতুবউদ্দিন আজিজ (মূল: Blood and Tears । অনু: সুশান্ত সাহা) ॥ [ ইউপিপি – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৮৩-৯০ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *