বিবিধ ভাবনা ৭০

image_pdfimage_print

 ফিরোজ মাহবুব কামাল

১. হিসাব দেয়ার আগেই হিসাব নেয়া উচিত

মহান আল্লাহতায়ালার কাছে হিসাব দেয়ার আগেই প্রতিটি মুসলিমের নিজের হিসাব নিজে নেয়া উচিত। এর মধ্যেই প্রকৃত প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা। এ নসিহতটি হযরত ওমরের (রা:)। তখন থেকে প্রস্তুতির পর্ব শুরু হয়ে যায়। এতে সহজ হয় রোজ হাশরের বিচার দিনে মহাবিচারক মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে হিসাব দেয়া। অথচ বাঙালী মুসলিমের জীবনে সে হিসাবটি কই? প্রতিটি মুহুর্ত সে বিচার নিয়ে বাঁচার ভাবনাই হলো তাকওয়া। বাঙালী মুসলিম জীবনে সে বিচার থাকলে তো নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে গভীর ভাবনা শুরু হতো। সে ব্যর্থতা শুধরানোরও চেষ্টা হতো। তখন চরিত্র ও কর্মে বিপ্লব আসতো। যার জীবনে হিসাব-নিকাশ নাই তার জীবনে কি কোন বিপ্লব আসে? বাংলাদেশীগণ আফগানদের তুলনায় ৫ গুণ। আফগানগণ সংখ্যায় এতো কম হয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত রাশিয়া ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ন্যায় তিনটি বিশ্বশক্তিকে শোচনীয় ভাবে পরাজিত করেছে। মানব জাতির ইতিহাসে এ কৃতিত্ব একমাত্র তাদের। আফগানদের জীবনে কেন এতো বিজয় এবং বাঙালী মুসলিম জীবনে কেন এতো পরাজয় -তা নিয়েই বা ভাবনা ক’জনের।

বাংলাদেশে এখন ভোটডাকাত শেখ হাসিনার অধিকৃতি। উপরুক্ত বিশ্বশক্তি গুলির তুলনায় হাসিনা ক্ষুদ্র মশা মাত্র। কিন্তু বাঙালী মুসলিমগণ মশাও তাড়াতে পারছে না। মশা মারতে কি কামান দাগা লাগে? খালি হাতেই মারা যায়। ইরানের শাহ, মিশরের হোসনী মোবারক, তিউনিসিয়ার জয়নাল বিন আলী, রোমানীয়ার চচেস্কুর মত বহু স্বৈরশাসক তাড়াতে জনগণকে কামান দাগতে হয়নি। সে সব স্বৈর শাসকদের জনগণ খালী হাতেই তাড়িয়েছে। অথচ সেসব স্বৈরশাসকগণ হাসিনার চেয়ে অধিক শক্তিশালী ছিল। তাদের পিছনে বিশ্বশক্তির সমর্থনও ছিল।

হংকংয়ের জনসংখ্যা মাত্র ৮০ লাখ। সেখানে চীনের স্বৈরনীতির বিরুদ্ধে ২০ লাখ লোক প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। অথচ বাংলাদেশে এক লাখ মানুষও কি কখনো স্বৈরাশাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে? অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। ঢাকা শহরেই বাস করে প্রায় দুই কোটি। যদি ৪০ লাখ ঢাকার রাজপথে অবস্থান ধর্মঘট করতো তবে হাসিনার পুলিশ কি তা রুখতে পারতো? যুদ্ধ দূরে থাক, রাস্তায় নামার সাহসটুকুও যাদের নাই –তারা কি সভ্য জীবনের স্বাদ পায়? তাদের বাঁচতে হয় গুম, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের অসভ্যতা নিয়ে। অথচ হাত-পা, দেহ, মগজ –এসব কি আফগানী বা হংকংবাসীদের তুলনায় বাঙালীদের কম? হাতে তরবারী থাকলেই জয় আসে না, যুদ্ধে জিততে হলে সেটির ব্যবহার করতে হয়। তেমনি সভ্য ভাবে বাঁচতে হলে মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া নেয়ামতের ব্যবহার করতে হয়। পশুর সে সামর্থ্য থাকেনা বলেই সে পশু। মানুষও পশুতে পরিণত হয়, সে সামর্থ্যের ব্যবহার যদি না করে। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে এমন মানুষদের পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন। অপর দিকে সেই শ্রেষ্ঠ মানব যে এসব সামর্থ্যের সুষ্ঠ ব্যবহার করে। সভ্য মানুষের দায়ভার তাই দেশকে সভ্যতর কাজে অসভ্যদের নির্মূলে নামতে হয়। এবং সে কাজে নিজের দৈহিক, আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যে ব্যবহার করতে হয়।

দেশের শাসন ক্ষমতায় ভোটডাকাত, আদালতে কাফেরদের রচিত কুফরি আইন, শিক্ষায় ইসলাম বর্জন, ব্যাংকে সুদ, শহরে পতিতা পল্লী বসিয়ে বাঙালী মুসলিমদের কত সুখের বসবাস! কোন ঈমানদার কি তা সহ্য করে? সহ্য করলে কি ঈমান থাকে? নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের সময় কি এমনটি ভাবা যেত? কিন্তু বাঙ্গালীরা এসব পাপকে শুধু সহ্যই করে না, সেগুলি বাঁচাতে ট্যাক্সও দেয়। রাজনীতিক, প্রশাসক ও পুলিশ হয়ে সেগুলিকে তারা পাহারা দেয়। ইসলামের বিরুদ্ধে এ বিশাল বিদ্রোহ নিয়ে তাদের মাঝেও কোন প্রতিবাদ ও ক্ষোভ নাই যারা প্রতিদিন নামায পড়ে। এ কি কম বিস্ময়ের? কথা হলো, এগুলি মেনে নিলে কি কেউ মুসলিম থাকে? দাড়ি লম্বা করে, মাথায় টুপি দিয়ে, হাতে তাসবিহ নিয়ে কি এ পাপ মোচন হয়? এ নিয়ে কি বাঙালী মুসলিমের কোন ভাবনা আছে? মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে কি এ নিয়ে হিসাব অবশ্যই দিতে হবে না? সে হিসাব দেয়ার আগে হিসাবটি নিলে কি কল্যাণ হতো না?

২. সভ্য ও স্বাধীন ভাবে বাঁচার খরচ

পানাহারের বাঁচার খরচটি পশুপাখিও জুটাতে পারে। কিন্তু সভ্য ভাবে বাঁচার খরচটি বিশাল। এখানেই ব্যক্তির ঈমান ও গুণাগুণের বিচার হয়। সভ্য ভাবে বাঁচতে হলে দুর্বৃত্ত নির্মূলের লড়াই নিয়ে বাঁচতে হয়। মুসলিম জীবনে এটি স্রেফ রাজনীতি নয়, এটিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। এটি পবিত্র জিহাদ। মহান আল্লাহতায়ালা চান তাঁর বান্দারা দুর্বৃত্ত শাসকের গোলাম রূপে নয়, বরং মানবিক অধিকার নিয়ে সভ্য ভাবে বাঁচুক। সেরূপ সভ্য ভাবে বাঁচার প্রচেষ্ঠাকেই তিনি জিহাদের মর্যাদা দিয়েছেন। নামায-রোযায় মারা গেলে কেউ শহীদ হয় না, বিনা হিসাবে জান্নাতও মেলে না। কিন্তু বিনা হিসাবে জান্নাত জুটে দুর্বৃত্ত নির্মূল ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার জিহাদে নিহত হলে। অথচ সে নূন্যতম সভ্য চেতনাটি বাঙালীর নাই, কিন্তু আফগানদের আছে। তাই আফগানদের জীবনে জিহাদ আছে। তাঁরা জিহাদে শহীদ হয়ে বিনা হিসাবে জান্নাত পাওয়ার রাস্তায় খুঁজে। লাখে লাখে তারা শহীদও হয়েছে। নিজ দেশে বিদেশী শত্রুর বিজয় ও ইসলামের পরাজয় কখনোই তাঁরা মেনে নেয়নি। একই কাজে নবীজী (সা:)’র অর্ধেকের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন। অথচ বাঙালী বেছে নিয়েছে দুর্বৃত্ত শাসকের পদতলে গোলামীর পথ। কারণ, এ পথটি সহজ, এবং এ পথে যুদ্ধ লাগে না। এজন্যই বাঙালীর বড় পরিচয়টি হলো, সমগ্র এশিয়ার বুকে তারাই হলো ইংরেজদের সবচেয়ে সিনিয়র গোলাম। তাদের আগে এশিয়া মহাদেশের আর কেউই ইংরেজ শাসকের গোলাম হয়নি। দিল্লির পতন হয় ১৮৫৭ সালে এবং বাংলার পতন হয় ১০০ বছর আগে ১৭৫৭সালে। বেশী দিন গোলামী করলে গোলামীই জাতির সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। যেমন, দীর্ঘদিন খাঁচায় বন্দী রাখার পর খাঁচার পাখিকে ছেড়ে দিলেও সে আবার খাঁচায় ফিরে আসে। এজন্যই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালীর নেশা ধরে আবার গোলামীতে ফিরে যাওয়ায়। এবং সেটি ভারতের পদতলে। ১৯৭১’য়ে সেটিই ঘটেছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাঙালীর এ বিশাল ব্যর্থতা নিয়ে বাঙালী বুদ্ধিজীবী মহলে কোন গবেষণা নাই। আলোচনাও নাই। বরং নানা ভাবে গর্ব উপচিয়ে পড়ছে। 

আর আজ বাঙালীরা ইতিহাস গড়ছে হাসিনার ন্যায় এক দুর্বৃত্ত ভোটডাকাতের গোলামী মেনে নিয়ে! সমগ্র দেশবাসীর ভোটডাকাতি হয়ে গেল, অথচ তা নিয়ে কোন প্রতিবাদ হলো না। বরং সে ভোটডাকাতকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, আদালতের বিচারক, উকিল, সচিব, সেনাবাহিনীর জেনারেলও মনের মাধুরি মিশিয়ে মাননীয় বলে। এটি কি কম লজ্জার? অথচ সে লজ্জা দূরীকরণের কোন উদ্যোগ নাই। একাত্তরে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার বড় কারণটি এখানেই। বাঙালীর ঘাড়ে চেপেছিল ভারতের গোলামী নিয়ে বাঁচার উম্মাদনা। স্বাধীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন নাগরিক রূপে বাঁচার রুচি তারা হারিয়ে ফেলেছিল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের  রাষ্ট্র প্রধান হয়েছেন বাঙালী। তিনি হলেন খাজা নাযিমুদ্দীন। কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর তিনিই তাঁর আসনে বসেন। তিন বার দেশটির প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন বাঙালী। তারা হলেন খাজা নাযিমুদ্দীন, মহম্মদ আলী বোগরা ও হোসেন শহীদ সোহরোওয়ার্দী। সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের নেতা রূপে তারা পেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বিশেষ মর্যাদা। পেয়েছেন বিশ্ব-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ। কিন্তু সে মর্যাদা বাঙালীর ভাল লাগেনি। স্বাধীনতা বাদ দিয়ে বেছে নিয়েছে ভারতের গোলামী। এবং ভারতের পদতলে গোলামীকেই ভেবেছে স্বাধীনতা। এখন সেটিই পুরাদমে চলছে। ভারতের বিরুদ্ধে কথা বললে তাই আবরার ফাহাদের ন্যায় নৃশংস ভাবে লাশ হতে হয়, অথবা ইলিয়াসের ন্যায় গুম হয়ে যেতে হয়। শুধু হাসিনার নয়, কোটি কোটি বাঙালীর চেতনার ভূমি দখল করে নিয়েছে ভারত।

স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচার খরচটি বিশাল। স্বাধীন রূপে বাঁচতে পাকিস্তানকে তাই বিশাল সামরিক বাহিনী গড়তে হয়েছে। নিজ হাতে নির্মাণ করতে হয়েছে পারমানবিক বোমা, বোমারু বিমান, ট্যাংক, মিজাইল ইত্যাদি। বাংলাদেশীদের কি সে সামর্থ্য আছে? সে সামর্থ্য না থাকলে কি স্বাধীনতা দোয়া-দরুদে বাঁচে? পরাধীনতা তখন অনিবার্য হয়। মেজর আব্দুল জলিলের কথাই বলতে হয় “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা।” সেই পরাধীনতাই হলো একাত্তরের মূল অর্জন। তেমন একটি পরাধীনতা থেকে বাঁচার জন্যই ১৯৪৭ সালে বাঙালী মুসলিম নেতাগণ স্বেচ্ছায় পাকিস্তানভুক্ত হয়। কিন্তু সে সামান্য ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বিষয়টি বুঝার সামর্থ্য ইসলামশূণ্য এবং ইতিহাসের জ্ঞানশূণ্য মুজিব-তাজুদ্দীনের যেমন ছিল না, তেমিন মেজর জিয়াউর রহমানেরও ছিল না। শেখ মুজিব ১৯৪৭’য়ে বাংলার মুসলিমদের পাকিস্তান-প্রেম নিজ চোখে দেখেছে। নিজেও কলকাতার রাস্তায় জনসমুদ্রে মিশে “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” বলেছে। তাই পাকিস্তান ভাঙ্গার কথা প্রকাশ্যে মুখে আনতে ভয় পেয়েছে। এজন্যই পাকিস্তান ভাঙ্গার লক্ষ্যে ভারতকে সাথে নিয়ে যা কিছু করেছে সেটি গোপনে করেছে। তাই বন্দী হওয়ার পূর্বে সুযোগ ও সময় হাতে থাকা সত্ত্বেও শেখ মুজিব কখনোই স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়নি। কিন্তু সে চেতনা ও সে ইতিহাস জ্ঞান মেজর জিয়ার ছিল না। তাই সে চট্রগ্রামের কালুর ঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এবং স্বেচ্ছায় গিয়ে উঠে ভারতের কোলে। ভারতের কোলে উঠাকেই ভেবেছিল বাঙালীর স্বাধীনতা।

এখন গোপন তথ্যগুলি প্রকাশ পাচ্ছে। পাকিস্তান ভাঙ্গার মূল প্রকল্পটি ছিল সোভিয়েত রাশিয়া, ভারত ও ইসরাইলের। এবং সেটি মুজিবের অজান্তে ১৯৭১ সালের বহু আগে থেকেই। পাকিস্তান বেঁচে থাকুক সেটি ভারত ১৯৪৭ সালে দেশটির জন্ম থেকেই চায়নি। চায়নি সোভিয়েত রাশিয়াও। সোভিয়েত রাশিয়া পাকিস্তানকে গণ্য করতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব-বলয়ের দেশ রূপে। ফলে পাকিস্তানকে দুর্বল করার মাঝে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্টকে দুর্বল করা মনে করতো। অপরদিকে ইসরাইল কখনোই চাইতো না মুসলিম বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান বেঁচে থাক। ইসরাইলের ন্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও চায়নি পাকিস্তান বেঁচে থাক। কারণ, পাকিস্তানের শক্তিবৃদ্ধি মানেই মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধি। তাতে বাধাপ্রাপ্ত হতো বৃহত্তর ইসরাইল নির্মাণের প্রজেক্ট।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইহুদী জেনারেল জ্যাকব ছিল তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের উপর হামলার মূল স্থপতি। এমন কি ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনেরাল মানেক শ’ও পাকিস্তানের উপর হামলায় ইতস্ততঃ করছিল। তার ধারণা ছিল, চীন পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়াবে। জেনারেল জ্যাকবের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের কিছু নেতা ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক গড়ে। তারই ধারাবাহিকতায় মুজিব কন্যা হাসিনা পাসপোর্টে ইসরাইলে প্রবেশের উপর বাধা-নিষেধ তুলে নিয়েছে এবং গড়ে তুলেছে ইসরাইলের সাথে বানিজ্য চুক্তি। এবং কিনেছে স্পাই সফ্ট ওয়ার। ভারত, রাশিয়া এবং ইসরাইল –এ দেশ তিনটির কারোই স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার ভাবনা ছিল। তাদের মূল এজেন্ডাটি ছিল পাকিস্তানের ন্যায় একটি মুসলিম দেশকে খন্ডিত করা। এবং সে রাশিয়া-ভারত-ইসরাইলী প্রকল্পের সাথে যোগ দিয়েছিল বাঙালী বামপন্থি, রামপন্থি, মুজিবপন্থি ও জিয়াপন্থিগণ। এরা সেদিন ভারতের সাথে একাকার হয়ে বাঙালীর স্বাধীনতা বাড়ায়নি বরং বিজয় বাড়িয়েছে সোভিয়েত রাশিয়া, ভারত ও ইসরাইলের। এরাই একাত্তরে সংগঠিত করে অবাঙালী মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে বিশাল গণহত্যা। বাংলার ইতিহাসে এটিই হলো সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যা। অথচ সে নৃশংস গণহত্যার কথা তারা মুখে আনে না। বাঙালীর ইতিহাসের বইয়েও তার কোন বর্ণনা নাই। যেন একাত্তরে বিহারীদের বিরুদ্ধে কিছুই ঘটেনি। এরা শুধু পাকিস্তানী সেনাদের হাতে বাঙালী হত্যার কথা বলে। এই হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃ্ত্তি। এরাই আজ উৎসব করে হাসিনার হাতে ইসলামপন্থিদের নির্মূল হওয়া নিয়ে।

মেজর জিয়া নিজে হাতে চট্টগ্রামে হত্যা করেছে তার সিনিয়র নিরস্ত্র অবাঙালী পাকিস্তানী অফিসারদের। নিরস্ত্র অফিসারদের এভাবে হত্যা করাটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনে শতভাগ যুদ্ধাপরাধ। যেসব দুর্বৃত্তগণ একাত্তরে বিহারীদের ঘরবাড়ী ও দোকানপাঠ দখল করছিল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের হাতে ঘরবাড়ীর মালিকানার দলিল তুলে দেন। এটি ছিল আরেক মানবতাবিরোধী অপরাধ। জেনারেল জিয়া একাত্তরের সে ভয়ানক অপরাধকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে বৈধতা দেন। বিমান বাহিনীর প্রধান তোয়াবের ন্যায় নরম ইসলামপন্থিও জিয়ার কাছে সহ্য হয়নি। জেনারেল জিয়া তাকে বরখাস্ত করেন। এসবই ইতিহাস। তার বেপর্দা স্ত্রী খালেদা জিয়া তার নগ্ন মাথায় মহান আল্লাহতায়ালার বিধানের বিরুদ্ধে সর্বদা বিদ্রোহের ঝান্ডা নিয়ে ঘুরাফেরা করেন। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থণ না পেলে তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়া অসম্ভব ছিল। কিন্তু প্রতিদানে জামায়াত নেতা প্রফেসর গোলাম আযমকে তিনি জেলবন্দী করেন। বিশ্বাসঘাতকতা আর কাকে বলে? আজ বাংলাদেশে যা কিছু চলছে তার জন্য তো দায়ী মূলত বাপপন্থি, রামপন্থি, মুজিবপন্থি ও জিয়াপন্থিগণ। আজও এরাই বাঙালী মুসলিমদের ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠার মূল শত্রু। ইসলামকে বিজয়ী করতে হলে এদের সাথে লড়াই অনিবার্য।  

 

৩. জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নাশকতা

জাতীয়তাবাদ ইসলামে শতভাগ হারাম –যেমন হারাম শুকরের গোশতো খাওয়া ও জ্বিনা করা। অথচ জাতীয়তাবাদ হলো বাংলাদেশে বাপপন্থি-মুজিবপন্থি-জিয়াপন্থিদের মূল কালেমা। শুকরের গোশতো খেয়ে ও জ্বিনা করে মাত্র কিছু লোক জাহান্নামমুখি হয়। কিন্তু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি জাহান্নামমুখি করে সমগ্র দেশবাসীকে। আধুনিক কালে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় বড় ক্ষতিগুলি ইহুদী, খৃষ্টান ও পৌত্তলিকদের হাতে হয়নি, হয়েছে মুসলিম নামধারী জাতীয়তাবাদীদের হাতে। এরাই মুসলিমদের ঘরের শত্রু। তারাই আরব বিশ্ব ভেঙ্গে ২২ টুকরো করেছে এবং একাত্তরে পাকিস্তানকে ভেঙ্গেছে। নানা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে একত্রে বসবাসকে তারা অসম্ভব করেছে। এভাবে শক্তিহানী করেছে মুসলিমদের এবং বিজয় বাড়িয়েছে ইসলামের শত্রুদের। এদের কারণেই ভারত আজ আঞ্চলিক শক্তি এবং চেপে বসেছে বাংলাদেশের উপর।

কোন মুসলিম দেশের ভাঙ্গার অর্থই তো মুসলিমদের শক্তিহানী করা। এজন্যই বিভক্তি গড়া ইসলামে শতভাগ হারাম। মুসলিমদের বিভক্তিতে খুশি হয় শয়তান। এবং একতায় খুশি হন মহান আল্লাহতায়ালা। মুসলিমদের বিজয় ও গৌবব তো তখনই বেড়েছে যখন তারা দেশ ভাঙ্গার বদলে গড়ায় ও ভূগোল বাড়ানোতে মনযোগী হয়েছে। পরাজয়ের শুরু তো তখন থেকেই যখন গড়ার বদলে ভাঙ্গার কাজ শুরু করেছে। এবং সেটি হয়েছে ভাষা, বর্ণ, আঞ্চলিকতার নামে। তাই যার মধ্যে শরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে -এমন ব্যক্তি কি কখনো জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যোগ দিতে পারে? এজন্যই একাত্তরে কোন ইসলামী দল, কোন হাক্কানী আলেম, মাদ্রাসার কোন শিক্ষক ও কোন পীর পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেয়নি। শয়তানী শক্তিবর্গকে খুশি করার এ কাজটি ছিল ইসলাম থেকে দূরে সরা বিভ্রান্ত লোকদের। যাদের বড়াই সেক্যুলারিস্ট ও জাতীয়তাবাদী হওয়া নিয়ে।  

 

৪. বাঙালী মুসলিমের বিকৃত ইসলাম

বাঙালী মুসলিমগণ বেঁচে আছে নিজেদের আবিস্কৃত এক বিকৃত ইসলাম নিয়ে। তাতে আছে মিলাদ পড়া, কবর পূজা, পীরের দরবারে অর্থ দেয়া, হাসিনার ন্যায় ভোটডাকাতকে কওমী জননী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলা, এবং তাবলিগ জামায়াতের চিল্লা-গাশত নিয়ে বাঁচা। তারা ইসলামের বিজয় নিয়ে ভাবে না। তারা ইসলামের শত্রুদের নির্মূল নিয়েও ভাবে না। কুর’আন-হাদীস কি নির্দেশনা দেয় –সে খোঁজও তারা রাখে না। দেশে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও আদালতে তাঁর শরিয়তী আইনের প্রতিষ্ঠা নিয়েও ভাবে না। তারা ভাবে শুধু নিজেদের বাঁচা ও ভোগবিলাস নিয়ে।

কিছু নামায-রোযা-হজ্জ-যাকাত করে, কিছু মসজিদ-মাদ্রাসা গড়ে ও কিছু দান-খয়রাত করেই তারা ভাবে অনন্তকালের জন্য জান্নাতে বিশাল প্রাসাদের মূল্যটি পরিশোধ করা হয়ে গেছে। এখন শুধু মৃত্যুর পর বুঝে নেয়ার পালা। কুর’আন পড়লেও জানার চেষ্টা করে না, বান্দাদের থেকে মহান আল্লাহতালার মূল চাওয়ার বিষয়টি কি। কুর’আন বুঝা তাদের রুচিতে সয় না। ফলে তারা না বুঝে কুর’আন পড়ে। মনে করে কুর’আন স্রেফ না বুঝে পড়া, চুমু খাওয়া ও মখমলে জড়িয়ে উপরে তুলে রাখার জন্য নাযিল হয়েছে। ভাবে, তা থেকে কিছু জানা ও মানার কোন প্রয়োজন নাই। মোল্লা-মৌলভীরাও কুর’আন বুঝার উপর গুরুত্ব দেন না। কুর’আন বুঝা নয়, মক্তব-মাদ্রাসায় স্রেফ পড়তে শেখানো হয়। না বুঝে পড়াকেই তারা বিশাল ছওয়াবের কাজ বলে। অথচ ইসলামের গৌরব কালে কুর’আন বুঝার গরজে মুসলিমগণ নিজের মাতৃ ভাষা দাফন করে আরবীকে গ্রহণ করেছে।

যারা জান্নাতে যেতে চায়, মৃত্যুর আগে তাদেরকে জান্নাতের মূল্য পরিশোধ করতে হয়। জান্নাতের মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরামগণ নিজেদের জান ও মাল নিয়ে জিহাদের ময়দানে নেমেছেন। এভাবেই ইসলামকে তারা বিজয়ী করেছেন। এবং ইসলামের শত্রুদের নির্মূল করেছেন। জিহাদ না থাকলে কি নবীজী (সা:) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন? সম্ভব হতো কি সর্ববৃহৎ বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থান?

জিহাদই দেয় প্রতিরক্ষা। জিহাদই দেয় বিজয়। জিহাদের পথেই ঘটে শত্রুর নির্মূল। যেখানে জিহাদ নাই, সেখানে পরাজয় অনিবার্য। জিহাদই দরিদ্র আফগানদের তিনটি বিশ্বশক্তির বিরুদ্ধে বিজয় দিয়েছে। তাই যারা ইসলামের শত্রু তাদের লক্ষ্য মুসলিমদের নামাযশূণ্য করা নয়, বরং জিহাদশূণ্য করা। হাসিনার ন্যায় ইসলামের শত্রুশক্তি তাই জিহাদ বিষয়ক বই বাজেযাপ্ত করছে। হাসিনা সেটি করছে শয়তানকে খুশি করতে এবং ইসলামের পরজয়কে স্থায়ী করতে।

বাংলাদেশের মুসলিমগণ নবীজী (সা:) এবং তাঁর সাহাবাদের অনুসৃত জিহাদের পথে নাই। তারা বরং ইসলামের পরাজয় বাড়িয়েছে ইসলামের শত্রুদের পক্ষে ভোট দিয়ে, অর্থ দিয়ে ও তাদের পক্ষে লাঠি ধরে। এরপরও দাবী করে তারা নাকি বিশ্বের সবচেয়ে ধর্মভীরু মুসলিম! তাদের গর্ব, তারা দেশ ভরে ফেলেছে মসজিদ-মাদ্রাসা দিয়ে। অথচ মহান আল্লাহতায়ালা কাছে মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো তার শরিয়তী আইন কতটা প্রতিষ্ঠা পেল এবং কতটা প্রতিষ্ঠা পেল তার সার্বভৌমত্ব। তিনি চান, ইসলামের পূর্ণ বিজয়। কোন সত্যিকার মুসলিম কি তাই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনের পরাজয় মেনে নিতে পারে? অথচ বাঙালী মুসলিমগণ ইসলামের পরাজয় শুধু মেনেই নেয়নি, সে পরাজয় নিয়ে চিহ্নিত শত্রুদের সাথে নিয়ে উৎসব করে।

৫. বিশ্বাসঘাতকতা মহান আল্লাহতায়ালার সাথে

রাজার পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যগণ রাজার আইনের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন। আইনভঙ্গকারীকে দেখা মাত্রই তারা আদালতে তোলে। সে কাজের জন্যই তারা রাজার ভান্ডার থেকে বেতন পায়। মুসলিম তো মহান আল্লাহতায়ালার সার্বক্ষণিক সৈনিক। সৈনিকসুলভ কাজের প্রতিদান স্বরূপ সে পরকালে পাবে অনন্ত কালের জন্য জান্নাত। সে জিহাদে নামে সর্বজাহানের রাজা মহান আল্লাহতায়ালার আইনের প্রতিষ্ঠা দিতে। মুসলিম জীবনে সে জিহাদ না থাকলে কাউকে কি মুসলিম বলা যায়? সে দায়িত্বহীনতা তো মহান আল্লাহতায়ালার সাথে সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা।

নবীজী (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামদের আমলে কি ভাবা যেত, আদালতে বিচার হবে কাফেরদের রচিত আইনে? সেরূপ হলে কি তাঁরা বসে থাকতেন? অথচ আজ বাংলাদেশের মুসলিমগণ শুধু বসেই থাকে না, কাফেরদের আইনের কাছে বিচার ভিক্ষা করে! অথচ পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণা: যারা তার নাযিলকৃত বিধান (শরিয়ত) অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করেনা তারা কাফের, তারা জালেম এবং তারা ফাসেক। -(সুরা মায়েদা ৪৪, ৪৫, ৪৭)। এরূপ হুশিয়ারী একজন ঈমানদার ভূলে কী করে? এ হুশিয়ারীর কারণে ইউরোপীয় কাফেরদের হাতে অধিকৃত হওয়ার পূর্ব কোন মুসলিম দেশে একদিনের জন্যও শরিয়ত ভিন্ন অন্য কোন আইনে বিচার হয়নি। শরিয়ত বিলুপ্ত করেছে বিদেশী কাফেরগণ। মুসলিমদের বড় অপরাধ হলো, তারা সেটিকে পুণরায় বহাল করেনি। এখন বাঁচছে সে গুরুতর অপরাধ নিয়েই। বিস্ময়ের বিষয় হলো তথাকথিত আলেমদের মাঝেও এ নিয়ে কোন ক্ষোভ ও বিক্ষোভ নাই। শরিয়তের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন আন্দোলন নাই।

বাংলাদেশে ১৬ কোটি মুসলিম। এর মধ্যে এক লাখ মুসলিমের মাঝেও যদি বিনা হিসাবে জান্নাতে যাওয়ার ভাবনা থাকতো তবে দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠার দাবী নিয়ে লাগাতর জিহাদ শুরু হয়ে যেতো। নিশ্চিত জান্নাত লাভের সেটিই তো একমাত্র পথ। তখন দেশে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পেত। ভারতে বহু হাজার কৃষক নিজেদের দাবী নিয়ে ৮ মাস যাবত দিল্লির রাস্তায় অবস্থান ধর্মঘট করছে। প্রচণ্ড শীত ও গরমে প্রায় ৫০০ জন মারা গেছে। ঢাকার রাস্তায় আল্লাহতায়ালার আইন শরিয়তের দাবী নিয়ে রাস্তায় বসার জন্য কি ১ লাখ ঈমানদার আছে? নামলে কি সরকার তাদের দাবী অগ্রাহ্য করার সাহস দেখাতো? কথা হলো মহান আল্লাহতায়ালার আইনের প্রতিষ্ঠা নিয়ে সে ভাবনা ক’জনের? দেশের পুলিশ, প্রশাসন, আদালত ও সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্য নিজেদের মুসলিম রূপে পরিচয় দেয়। তাদের অনেকে নামায-রোযাও পালন করে। কিন্তু শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাদের আগ্রহ কই? আগ্রহ না থাকাটি কি ঈমানের পরিচয়? ০২/০৮/২০২১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *