বিবিধ ভাবনা (১৭)

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১.
মুসলিমদের পতনের শুরু তখন থেকেই যখন প্রাসাদতূল্য মসজিদ গড়া গুরুত্ব পেয়েছে এবং গুরুত্ব হারিয়েছে রাষ্ট্রকে দুর্বৃত্তদের দখল থেকে মুক্ত করা। ফলে মসজিদের সংখ্যা বাড়লেও মুসলিমগণ ব্যর্থ হয়েছে প্রকৃত মুসলিম হতে। এতে মুসলিম দেশগুলো অধিকৃত হয়ে গেছে শয়তানী শক্তি হাতে। এবং রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে শয়তানের হাতিয়ারে এবং দুর্বৃত্ত উৎপাদনের কারখানায়। এতে পরাজিত হয়েছে এবং বিলুপ্ত হয়েছে নবীজী (সা:)’র ইসলাম –যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, জিহাদ, শুরা, ঐক্য এবং প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্ব ।

ইবাদত রূপে গুরুত্ব পেয়েছে মসজিদে গিয়ে নামায আদায়। কিন্তু মসজিদ যেমন ইবাদতের একমাত্র স্থান নয়, তেমনি শ্রেষ্ঠতম স্থানও নয়। শ্রেষ্ঠতম ইবাদত হলো জিহাদ। সেটি হয় সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গণে। এই জিহাদই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র পাল্টায়। একমাত্র জিহাদই পারে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গণে শয়তানের বাহিনী ও শয়তানের এজেন্ডাকে পরাজিত করতে । একমাত্র তখনই মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীন বিজয়ী হয়, শরিয়ত প্রতিষ্ঠা পায় এবং মুসলিমগণ পায় শক্তি ও ইজ্জত নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ।   

২.
অমুসলিমগণ দেশ গড়া নিয়ে উৎসব করে। অথচ মুসলিমগণ উৎসব করে দেশ ভাংঙ্গা নিয়ে। অমুসলিমগণ ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, অখন্ড ভারত গড়েছে। অথচ মুসলিমগণ অখণ্ড আরব ভূমিকে ২২ টুকরোয় বিভক্ত করেছে। পাকিস্তানকেও ভেঁঙ্গেছে।

অথচ মহান আল্লাহতায়ালা গড়াকে পছন্দ করেন, ভাংঙ্গাকে নয়। এবং শয়তান পছন্দ করে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি। মুসলিমগণ তাদের নিজ ভূমিতে বিজয়ী করছে শয়তানের এজেন্ডাকে। মহান আল্লাহতায়ালার সাথে এর চেয়ে বড় গাদ্দারি আর কি হতে পারে? এ গাদ্দারির অপরাধ নিয়ে কি পরকালে জান্নাত মিলবে?

৩.
দেশের সকল দুর্বৃত্তদের অপরাধের যে সামর্থ্য তার চেয়ে বহুগুণ বেশী সামর্থ্য হলো দুর্বৃত্ত সরকারের। দেশের পুলিশ বাহিনী, প্রশাসনিক বাহিনী, আদালত-বাহিনী, সেনাবাহিনী তখন চুরি-ডাকাতি, গুম, খুন, সন্ত্রাস ইত্যাদি দুর্বৃত্ত কর্মের হাতিয়ারে পরিণত হয়। দেশের সকল চোর-ডাকাতগণ সব ঘরে ডাকাতি করার সামর্থ্য রাখে না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনী পারে। তখন দেশ জুড়ে চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, ব্যাংক-ডাকাতি ও শেয়ার মার্কেট লুট মামূলী ব্যাপার হয়ে যায়। তাই দুর্বৃত্তদের হাতে দেশ অধিকৃত হলে সমগ্র দেশ দ্রুত সভ্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়। তাই সেরা নেক কর্মটি হলো দুর্বৃত্ত শাসক নির্মূল। ইসলামে এ কাজের রয়েছে জিহাদের মর্যাদা।

৪.
৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের কোথাও মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়তি আইনকে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। অথচ প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ হলো আদালতে শরিয়তের পালন। অথচ এক্ষেত্রেই মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এতে অপমান ও অবমাননা হয় মহান আল্লাহতায়ালার। এভাবে বিজয়ী ও সন্মানিত করা হয় শয়তানকে। অথচ শয়তানের এজেন্ডাকে বিজয়ী করা নিয়েই মুসলিম দেশগুলোর রাজনীতি। শয়তানের এ বিজয় এবং শরিয়তের এ পরাজয নিয়ে হৃদয়ে গভীর বেদনা না থাকাটিই বেঈমানীর লক্ষণ।

৫.
নানা ভাষা ও নানা অঞ্চলের হিন্দুরা একতাবদ্ধ হয়ে বিশাল ভারতের জন্ম দিয়েছে। ফলে ভারত একটি শক্তি।
আর মুসলিমগণ ভাষার নামে ও অঞ্চলের নামে বিভক্ত হয়ে দুর্বল হয়েছে। মুসলিমদের এরূপ শক্তিহীনতায় একমাত্র শয়তানই খুশি হয়। অথচ মুসলিমগণ সে মুসলিম ভূগোলের এ বিভক্তি নিয়ে উৎসব করে -যেমন ১৬ ডিসেম্বরে বাংলাদেশে হয়।
৬.
রোগ-ভোগ, প্রাণহানি, অঙ্গহানি ও সম্পদ হানির ন্যায় কোন বিপদ যখন ব্যক্তির মনে মহান আল্লাহতায়ালার ভয় সৃষ্টি করে এবং তাঁর কাছে নিয়ে যায় –তবে সেটি বিপদ নয়। সেটি বরং নেয়ামত। কিন্তু সম্পদ, সন্তান, সুস্বাস্থ্যের ন্যায় নেয়ামতগুলো যদি মন থেকে মহান আল্লাহতায়ালার ভয় বিলুপ্ত করে এবং তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে নেয় -তবে সেটি আযাব।
৭.
ঈমানদারের পরিচয়টি হলো সে তাঁর সকল সামর্থ্যকে ব্যয় করে নিজেকে জান্নাতের যোগ্য রূপে গড়ে তোলায়। ফলে ঈমানদারের জীবনে আসে বেশী বেশী নেক আমলের লাগাতর পেরেশানী ও তাড়াহুড়া। ফলে তাকে বাজে আড্ডায় দেখা যায় না। বরং দেখা যায় ধ্যানমগ্নতায়, কোর’আনের জ্ঞানার্জনে এবং জিহাদের ন্যায় সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতে।

অপর দিকে বেঈমানের পরিচয় হলো সে তার সকল সামর্থ্য ব্যয় করে দুনিয়ার জীবনে আনন্দ বাড়াতে। উপার্জন বাড়াতে অপরাধ কর্মে নামে। তাকে দেখা যায় নাচগান, খেলাধুলা ও আমোদ-ফুর্তির আসরে। আগ্রহ থাকে না কোর’আনের জ্ঞানার্জনে।এবং জিহাদের নাম শুনলে তার হৃদয়ে কাঁপুনি ধরে।  
৮.
চরিত্র গড়ে আখেরাতের ভয়।এবং আখেরাতের ভয় গড়ে কোর’আনের জ্ঞান। তাই কোর’আনের জ্ঞান অর্জন অর্থাৎ কোর’আন বুঝা নামায-রোযার আগে ফরজ করা হয়েছে। জনগণের মনে আখেরাতের ভয় বাড়লে দুর্বৃত্তি দমনে পুলিশ লাগে না। তখন ব্যক্তি নিজেই নিজের বিরুদ্ধে পুলিশে পরিণত হয়।

নাচ, গান, সিনেমা, বাজে আড্ডা, খেলাধুলার সংস্কৃতি ভুলিয়ে দেয় আখেরাতের ভয়। বিনোদন ও সংস্কৃতির নামে মানবের মন থেকে পরকালের ভয় বিলুপ্ত করাই শয়তানের এজেন্ডা। শয়তান এভাবেই ব্যক্তিকে জাহান্নামের যোগ্য করে গড়ে তোলে। আখেরাতের ভয় বিলুপ্ত হলে সমাজে নানারূপ অপরাধ কর্মের সুনামী আসে। তখন পুলিশ অপরাধ দমন না করে নিজেরাই অপরাধ কর্মে লিপ্ত হয়। উদাহরণ হলো বাংলাদেশ।