বাংলাদেশের জন্মের বৈধতার সংকট

ফিরোজ মাহবুব কামাল

অতীত কালে কোন রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের জন্ম দিতে জনগণের ভোট লাগতো না, দেশ জয়ের শক্তি থাকলে যে কোন যুদ্ধবাজ সেনাবাহিনী একটি এলাকা দখল করে রাষ্ট্রের জন্ম দিত। সেনাপ্রধান নিজেকে সার্বভৌম শাসক রূপে ঘোষণা দিত। তখন জাতিসংঘ ছিল না, কোন আন্তর্জাতিক আইনও ছিল না। রাষ্ট্র দখলে রাখার রাজনৈতিক ও সামরিক সামর্থ্য থাকলে সে সামর্থ্যই রাষ্ট্রের বৈধতা উৎপাদন করতো। কিন্তু এখন সে নীতি অচল। এখন নতুন রাষ্ট্রের বৈধতা তৈরী হয় জনগণের ভোটের ভিত্তিতে। ISIS ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল এলাকা জুড়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল সামরিক শক্তির বলে। কিন্তু সে রাষ্ট্র বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রগুলির বৈধতা পায়নি।

সূদান ভেঙে দক্ষিণ সূদান নামে একটি নতুন রাষ্ট্র তৈরী হয়েছে। সে রাষ্ট্র নির্মাণে আন্তর্জাতিক নজরদারিতে গণভোট হয়েছে। দক্ষিণ সূদানের সংখ‌্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোট দিয়ে সে স্বাধীন রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ফলে বিশ্বের সবাই সে রাষ্ট্রকে মেনে নিয়েছে। ঠিক একই ভাবে আন্তর্জাতিক নজরদারিতে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব তিমুরে গণভোটের ভিত্তিতে স্বাধীন পূর্ব তিমুর প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ঠিক একই ভাবে ১৯৪৬ সালের গণভোটের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। গণভোটের ভিত্তিতেই আসাম প্রদেশের সিলেট জেলা পাকিস্তান ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্ম সেরূপ গণভোটের ভিত্তিতে হয়নি। সেরূপ একটি গণভোটের প্রস্তাব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পেশ করেছিলেন। ১৯৭১’য়ের নভেম্বরের মাঝামাঝিতে ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত মিস্টার জয়কুমার অটাল ইসলামাবাদে তাঁর পরিচয় পত্র পেশ করেন। তাঁর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্বাধীন বাংলাদেশ প্রশ্নে জাতিসংঘের নজরদারীতে গণভোটের প্রস্তাব দেন এবং মিস্টার অটালকে দিল্লিতে গিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সাথে তা নিয়ে আলাপ করতে বলেন। সে সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তাবও পেশ করেন। সেটিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণের একমাত্র বৈধ পথ। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধি সে প্রস্তাব নাকোচ করে দেন। তার যুক্তি ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনেই সে গণরায় নেয়া হয়ে গেছে। (G.W. Chowdhury, 1974. The Last Days of United Pakistan)  

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি এ বিষয়ে একটি প্রকাণ্ড অসত্য ও বিভ্রান্তিকর কথা বলেছেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ ভোট নিয়েছিল ছয় দফা ভিত্তিক পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র তৈরীর প্রস্তাব পেশ করেির্বাচন করেছে সরকারের ঘোষিত ৮ দফা ভিত্তিক Legal Frame Work’য়ে স্বাক্ষর করে। সেখানে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রতি অঙ্গীকার প্রকাশ করতে হয়েছিল। মুজিব কোন নির্বাচনি জনসভাতেই স্বাধীন বাংলাদেশের নির্মাণের দাবী জানায়নি। বরং জনসভাগুলিতে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্দানে আওয়ামী লীগের প্রথম নির্বাচনি জনসভায় আমি উপস্থিত থেকে তার মুখে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান শুনেছি। ৭ মার্চের জনসভাতেও আমি উপস্থিত ছিলাম; সে জনসভাতেও তার মুখে পাকিস্তান জিন্দাবাদ শুনেছি।   

১৯৭১’য়ের এ ২৬ শে মার্চ মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। একজন নয়, দশ জন মেজর সেরূপ ঘোষণা দিলেও বাংলাদেশের সৃষ্টি বৈধতা উৎপাদন করে না। সেরূপ ঘোষণা গণভোটের বিকল্প হতে পারেনা। তাছাড়া এ ধরনের ঘোষণা দেয়ার জন্য জনগণের পক্ষ থেকে মেজর জিয়ার কোন ম্যান্ডে ছিল না এমন কি স্বাধীনতার ঘোষণা খোদ শেখ মুজিব দিলেও সে সেটা বৈধ হতো না। কারণ ১৯৭০’য়ের নির্বাচনে জনগণ মুজিবকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচন করেছিল। জনগণ তাকে স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণের ম্যান্ডেট দেয়নি।    

এমন কি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধও স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির বৈধতা দেয়না। এমনকি দুই লাখ বাঙালিও সে মুক্তি যুদ্ধে অংশ নেয়নি। এমনকি দশ লাখ বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও তা স্বাধীন বাংলাদেশের বৈধতা উৎপাদন করতো না। কারণ তাদের সে মুক্তিযুদ্ধ জনগণের রায়ের বিকল্প নয়। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা সমগ্র দেশ দূরে থাক, একটি জেলা বা থানা স্বাধীন করতে পারেনি। একাত্তরের যুদ্ধে পাক বাহিনীকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিল ভারত। যুদ্ধজয়ই যদি একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করে, তবে বাংলাদেশের সার্বভৌম মালিক বা জনক হলো ভারত। কারণ ভারতীয় সেনাবাহিনী শক্তির জোরে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ বানিয়েছিলভারত নিজেকে বাংলাদেশের মালিক ভাবতো বলেই পাকিস্তান আর্মির হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ও বিপুল সম্পদ ভারতে নিয়ে যায়। সেটিকে তারা বৈধ অধিকার মনে করতো।

ভারত তার নিজ হাতে জন্ম দেয়া বাংলাদেশকে মুজিবের হাতে তুলে দিয়েছিল এ শর্তে যে, দেশটি শাসন করবে ভারতের এজেন্ডা মাফিকএমন কি শাসনতন্ত্রের মূল নীতিও বেঁধে দিয়েছে ভারত। ভারতের ইচ্ছা মাফিক সেনা বাহিনীকে দুর্বল করেছিল। এজন্যই মুজিব কখনোই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান রূপে দেশ চালায়নি। হাসিনাও চালায়নি। দেশ শাসন করেছে ভারতের দাস রূপে। ভারতের এজেন্ডাই ছিল মুজিব ও হাসিনার এজেন্ডা। ভারত সরকারের ন্যায় তারাও আচরণ করেছে দেশবাসীর শত্রু রূপে। তাই জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাক স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ভারত দেশের সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা করে; আর মুজিব-হাসিনা হত্যা করতো দেশের অভ্যন্তরে। সে জন্যই নির্মিত হয়েছিল গুম, খুন, গণহত্যা, ক্রসফায়ারে হত্যা, বৈচারিক হত্যা এবং আয়নাঘরের নিপীড়ন মূলক সংস্কৃতি।

বিশ্বের রাষ্ট্রগুলি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতি দিয়েছে পাকিস্তানও। ১৯৭১’য়ের যুদ্ধে ৯৩ হাজার পাকিস্তানী ভারতে বন্দী ছিল। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিলে তাদের মুক্ত করা অসম্ভব ছিল। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সে সময় বাংলাদেশের স্বীকৃতির বিরুদ্ধে তুমুল ছাত্র আন্দোলন চলছিল। কিন্তু তারপরও স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে জাতিসংঘ আইন লংঘন করে। জাতিসংঘের আইন তার কোন সদস্য রাষ্ট্রকে খণ্ডিত করার অধিকার অন্য রাষ্ট্রকে দেয় না। রাষ্ট্র ভাঙতে গণভোট লাগে। সে নীতি লংঘন করার কারণে জন্মের সাথে সাথে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হতে পারিনি। চীন ১৯৭৫ সাল অবধি স্বীকৃতি দেয়নি। সৌদি আরবসহ বহু রাষ্ট্রই স্বীকৃতি দিতে দেরী করেছে। অবশেষে বিশ্বের সব রাষ্ট্রই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে স্বীকৃতি দিলেও বাংলাদেশের জন্মের অবৈধতা থেকেই যায়। একজন জারজ সন্তানকেও তার প্রতিবেশীরা বাঁচার অধিকার দেয়; তাকে হত্যা করেনা। তবে বাঁচার অধিকার দিলেও কখনোই তার অবৈধ জন্মের নৈতিক বৈধতা দেয়না। কারণ অবৈধদের নৈতিক বৈধতা দিলে সমাজ ও তার নৈতিক মূল্যবোধ বাঁচে না। বাংলাদেশীদের জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জার আর কি হতে পারে যে বাংলাদেশকে শত শত বছর বাঁচতে হবে ভারত সৃষ্ট জন্মের এই অবৈধতার কলংক নিয়ে!   ১৪/০১/২০২৬

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *