গণহত্যা, বৈষম্য বা জুলুম কখনোই কোন মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙাকে জায়েজ করে না

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

যুদ্ধ যে ভাবে ডেকে আনা হলো

এ নিয়ে বিতর্ক নেই যে, ১৯৭১’য়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বড় রকমের হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। হত্যাকাণ্ড যে শুধু পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে হয়েছে -তা নয়। হত্যাকাণ্ডের শুরু হয়েছে বাঙালির হাতে অবাঙালি হত্যা ও অবাঙালির দোকান পাট লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে। সেটি মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই। আমি স্বচোখে মার্চের ৩ তারিখে ঢাকার গুলিস্তানের জিন্নাহ এভিনিউতে অবাঙালিদের বিশাল ডিপার্টমেন্টাল শপ গ্যানিস লুট হতে দেখেছি। লুট হয়েছে নবাবপুর ও ইসলামপুরের অবাঙালিদের দোকান। হামলা শুরু হয় পাক সেনা বাহিনীর সৈন্যদের উপর। কিছু নিরস্ত্র পাক সৈন্যকে ঢাকার রাস্তায় একাকী পেয়ে হত্যা করা হয়েছে। এতে সৈন্যদের ক্যান্টনমেন্টের বাইরে বেরুনো বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনীয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের আবাসিক হলগুলোতে যেসব অবাঙালি ছাত্ররা থাকতো তাদের উপর ছাত্র লীগের কর্মীরা হামলা শুরু হয়। ছাত্র লীগের পক্ষ থেকে স্লোগান শুরু হয় “একটা দুইটা ছাতু (অবাঙালি) ধর, সকাল বিকাল নাস্তা কর” জাতীয় স্লোগান। ছাত্রলীগের কর্মীরা ফ্যাসিবাদী নৃশংসতা নিয়ে তখন ঢাকার রাস্তায়।

১৯৭০’য়ের ৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হওযার পর মুজিব ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠে। তারা কর্মী বাহিনীও উগ্রমূর্তি ধারণ করে। অথচ ক্ষমতা হস্তান্তর এতো সহজ ব্যাপার ছিল না। মুজিব পাকিস্তানের ৫টি প্রদেশের মাঝে মাত্র একটি প্রদেশে বিজয়ী হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের ৪টি প্রদেশে তার দল সংসদে কোন সিট পায়নি। কোয়ালিশন ছাড়া তার পক্ষে সমগ্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া অসম্ভব ছিল। সেরূপ একটি কোয়ালিশন গড়া আদৌ কঠিন ছিল না। জুলফিকার আলী ভূট্রো রাজী ছিল। ন্যাপের নেতা খান আব্দুল ওয়ালী খান এবং মুসলিম লীগের মমতাজ দওলাতানাও রাজী ছিল। অথচ মুজিব কোয়ালিশনের রাজী ছিল না। অথচ এ থেকে বুঝা যায়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া মুজিবের কোন আগ্রহ ছিল না। তার পরিকল্পনায় ছিল রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ভাঙা ও স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি। আর সেটিই ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্রের রোডম্যাপ। নির্বাচনি বিজয় সে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন সহজ করে দেয়।

 

 ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ড কি স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল?

এ নিবন্ধের লেখকের সুযোগ মিলেছিল ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্দানে দাঁড়িয়ে মুজিবের ঐতিহাসিক বক্তৃতা শোনার। সোহরাওয়ার্দী উদ্দানের ভাষণে শেখ মুজিব সেনাবাহিনীর সদস্যদের ভাত-পানি বন্ধ করে মারার নির্দেশ দেন। এবং হাতের কাছে যা আছে তা দিয়ে যুদ্ধের ডাক দেন। মুজিব তার ভাষণে “এরারের যুদ্ধ স্বাধীনতার যুদ্ধ” রূপে ঘোষণা দেন। ফলে বন্ধ করে দেয়া হয় ক্যান্টনমেন্টগুলোতে খাদ্য সরবরাহ; সেটি ২৫ মার্চের ২ সপ্তাহ আগে থেকেই। এভাবেই মুজিব পরিকল্পিত ভাবে শুরু করেন একটি রক্তাক্ত যুদ্ধ। এমন একটি যুদ্ধের প্রস্তুতি ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই নিচ্ছিল। শুধু অপেক্ষায় ছিল  মুজিবের ন্যায় একজন ভারতসেবীর। তাই যারা আবুল মনসুর আহমেদের মত বলেছেন, ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ড না হলে কখনোই মুক্তি যুদ্ধ শুরু হতো না -তারা সত্য বলেননি।

বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যদি ফিরেশতাদের ন্যায় আচরণ করতো, তবুও শেখ মুজিব পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ বানাতো। কারণ, সেটি ছিল তার রাজনীতির মিশন। মুজিব তার মনের সে কথাটি স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করে পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারীর সোহরাওয়ার্দী উদ্দানের জনসভায়। মুজিব সেদিন তারস্বরে বলেছিল, “স্বাধীনতার লড়াইয়ের শুরু ১৯৭১’য়ে নয়, এ লড়াই শুরু করেছিলাম ১৯৪৭ থেকে।” সেদিনে সে বক্তৃতা এ প্রবন্ধের লেখক নিজ কানে শুনেছিল। মুজিবের সে কথা এখনো লেখকের কানে বাজে।

তাছাড়া ষাটের দশকে শেখ মুজিব যখন পাকিস্তান ভাঙার লক্ষ্যে ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা RAW’য়ের সাথে মিলে আগরতলা ষড়যন্ত্র করেছিল, সে ষড়যন্ত্রেও এমন একটি যুদ্ধের পরিকল্পনা ছিল। তখন পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র এক ডিভিশন পাক সৈন্য অবস্থান করতো। এক ডিভিশন সৈন্যের অর্থ ১২ বা ১৩ হাজার সৈন্য। ভারত সরকার ও শেখ মুজিব ভেবেছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্য, পুলিশ বাহিনী এবং ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) একত্রে বিদ্রোহ করলে তারা সহজেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরাজিত করবে এবং তারা আত্মসমর্পণে বাধ্য হবে। অনুরূপ একটি ধারণা ছিল মেজর জিয়ারও।  তাই আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে মেজর জিয়া ১৯৭১’য়ের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। বিদ্রোহের পর মেজর জিয়া তার কমাণ্ডিং অফিসার নিরস্ত্র কর্নেল জানজুয়াকে হত্যা করে এবং তাঁর লাশ গায়েব করে বা পচিয়ে দেয়। এটি ছিল এক বিশুদ্ধ যুদ্ধ অপরাধ।

প্রশ্ন হলো মুজিব যখন পাকিস্তান ভাঙার লক্ষ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র করেছিল তখন কি কোন ২৫ মার্চের ন্যায় গণহত্যার ঘটনা ঘটেছিল। আরো প্রশ্ন হলো, ষাটের দশকে ছাত্র লীগ নেতা সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ ও তাদের সাথীরা যখন পাকিস্তান ভাঙার লক্ষ্যে নিউক্লিয়াস বানিয়ে কাজ শুরু করেছিল, তখন কি ২৫ মার্চের রাতের ন্যায় কোন গণহত্যা ঘটেছিল? সেরূপ ঘটনা ঘটেনি। তাই যারা ২৫ মার্চের গণহত্যাকে পাকিস্তান ভাঙার দলিল রূপে পেশ করে -তাদের ব্যাখ্যটি আদৌ সত্য নির্ভর নয়।

পঁচিশে মার্চের হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা নিয়ে প্রচুর মতভেদ রয়েছে। কারোই প্রকৃত সংখ্যাটি জানা নেই। মিথ্যা রটনায় বিস্ময়কর রেকর্ড গড়েছে কাদের সিদ্দিকী। সে তার বই “স্বাধীনতা ৭১”য়ে দাবী করে, পঁচিশে মার্চের এক রাতেই তিন লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কাদের সিদ্দিকী যে কতটা চিন্তাশূণ্য আবাল সেটি বুঝা যায়, তার উর্বর মস্তিষ্কের ভূয়া সংখ্যা থেকে। যেন আধা রাতের মধ্যে তিন লাখ মানুষ হত্যা করা এবং তাদের লাশ গায়েব করা অতি সহজ কাজ! এটি পর্বত প্রমাণ মিথ্যা। তখন পূর্ব পাকিস্তানে পাক সৈন্যের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪ হাজার। পরবর্তীতে সে সংখ্যা ৪৫ হাজারে উন্নিত করা হয়। এ মিথ্যুক খুনি নৃশংসতায় রেকর্ড গড়েছিল ৪ জন বিহারী বন্দীকে ঢাকা স্টেডিয়ামে বেয়োনেটি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। নৃশংসতার সে চিত্র আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল।   ‌

 

হত্যা-জুলুম-অবিচার কি দেশভাঙা জায়েজ করে?  

একাত্তরে নিহতদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কেউই একথা বলে না যে, একাত্তরে জুলুম ও হত্যাকাণ্ড হয়নি। ‌ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভাঙা নিয়ে। প্রশ্ন হলো, জুলুম ও হত্যাকাণ্ড পাকিস্তান ভাঙা জায়েজ করে কিনা? শরিয়তের রায় এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট। দেশ ভাঙা হারাম এবং দেশের সংহতি বজায় রাখা ফরজ। কারণ আল্লাহ তায়ালার একতাকে ফরজ করেছেন এবং বিভক্তিকে হারাম করেছেন। তাই মুসলিম দেশের ভূগোলের প্রতিরক্ষা ইসলামে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। একাজ পবিত্র জিহাদ। ইসলামে জিহাদ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত।

দেশ না বাঁচলে মুসলিমদের জান, মাল ও ইজ্জত বাঁচেনা। তাই দেশ বাঁচানো ফরজ। অতীতে মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোলের প্রতিরক্ষা দিতে হাজার হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন। নবীজী (সা:)’র অর্ধেকের বেশী সাহাবা এ কাজে শহীদ হয়ে গেছেন। তাই সরকারি বাহিনীর কিছু জালেমের হাতে কিছু মানুষের নিহত হওয়াতে মুসলিম দেশ ভাঙা জায়েজ হয়না। যেমন ঘরে সাপ ঢুকলে ঘর জ্বালানো জায়েজ নয়। সে বরং অপরাধ। ঘর জ্বালালে করলে মাথার উপর ছাদ থাকে না। তেমনি রাষ্ট্র ভাঙলে নিরাপত্তা দেয়ার কেউ থাকে না। জালেম সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের উপর যারা জুলুম করে, হত্যা ও ধর্ষণ করে -তারা অবশ্যই গুরুতর অপরাধ করে। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে অবশ্যই তাদের জবাব দিতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ বরং ফরজ। ইসলাম তাই তাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের কৃত অপরাধের জন্য রাষ্ট্রের ভূগোলকে কখনোই দায়ী করা যায়না। তাই রাষ্ট্রের শাসক যত জালেম হোক সেটিকে বাহানা বানিয়ে কোন অবস্থাতেই রাষ্ট্রের ভূগোলকে খণ্ডিত করা যাবে না। সেটি হারাম। অপরাধী সরকারের অপরাধের কারণে মুসলিম রাষ্ট্রকে খণ্ডিত করার ন্যায় গুরুতর অপরাধ তাই কখনো জায়েজ হয়না। সেটি ফেতনা। অথচ একাত্তরে সেটিই হয়েছে।

 

একাত্তরের যুদ্ধটি ছিল একটি হারাম যুদ্ধ ও ফিতনা  

যে কাফির শক্তির অধিকৃতি থেকে স্বাধীনতা লাভের যুদ্ধকে ইসলামে পবিত্র জিহাদ তথা শ্রেষ্ঠ ইবাদত বলা হয়। এবং মুসলিম দেশ ভাঙ্গার যুদ্ধকে হারাম যুদ্ধ বা ফিতনা বলা হয়। ফিতনা হলো একটি কুর’আনী পরিভাষা। ফিতনার অর্থ হলো, এমন সব অপরাধী কর্মকাণ্ড -যা মুসলিমদের স্বাধীনতা, জান-মাল-ইজ্জতের নিরাপত্তা ও পূর্ণ দ্বীন পালনকে বিপন্ন করে। বিপন্ন করে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তার শরিয়ার প্রতিষ্ঠ।  এবং অসম্ভব করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। প্রতিটি ফিতনার পিছনে থাকে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি সাধনের এজেন্ডা। তাতে থাকে কাফির ও মুনাফিকদের সংশ্লিষ্টতা।

মুসলিমদের প্রতিটি খাদ্য যেমন হালাল হতে হয়, তেমনি প্রতিটি যুদ্ধকে শতভাগ জিহাদ হতে হয়। যে যুদ্ধ জিহাদ নয়, সে যুদ্ধই ফিতনা। এবং সেটি হারাম। যে যুদ্ধে মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোল খণ্ডিত হয় এবং যে যুদ্ধ পরিচালিত ভারতের ন্যায় একটি কাফির শক্তির অর্থ, অর্থ, প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনায় -সে যুদ্ধ কখনো হালাল যুদ্ধ বা জিহাদ হতে পারে না। সেটি বাঙালি মুসলিমদের স্বাধীনতার যুদ্ধও হতে পারে না। তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তান কখনোই কাফিরদের অধিকৃত কোন পরাধীন ভূমি ছিলনা। পাকিস্তানের ৪ জন প্রধানমন্ত্রী, ২ জন রাষ্ট্র প্রধান ও ৩ জন স্পীকার ছিলেন বাঙালি। ফলে একাত্তরের যুদ্ধকে কখনো স্বাধীনতার যুদ্ধ বলা যায় না; এটি ছিল পাকিস্তানের ন্যায় একটি মুসলিম দেশ ভাঙার হারাম যুদ্ধ ।

একটি দেশে গণহত্যা, জুলুম, অবিচার, বৈষম্যের ন্যায় নানা নিপীড়ন মূলক অপরাধ থাকতেই পারে। সেগুলি উমাইয়া, আব্বাসিয়া ও উসমানিয়া আমলেও ছিল। সেগুলির বিরুদ্ধে লড়াইকে ইসলাম পবিত্র জিহাদের মর্যাদা দেয়। কিন্তু সে অপরাধ গুলিকে অজুহাত বানিয়ে কোন মুসলিম দেশ ভাঙা হারাম। তাই কোন আলেম বা মুফতি কখনোই সেগুলিকে অজুহাত বানিয়ে খেলাফত ভাঙাকে জায়েজ বলে ফতোয়া দেননি। একই কারণে কোন বাঙালি আলেম বা মুফতি একাত্তরের ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ডকে অজুহাত বানিয়ে পাকিস্তান ভাঙাকে জায়েজ বলেননি। এর অর্থ এই নয় যে, হাজার হাজার আলেম ও মুফতি স্বাধীনতাপ্রেমী ও দেশপ্রেমী ছিলেন না। মুসিলম দেশ ভাঙাটি নিতান্তই শয়তানী শক্তির প্রকল্প। কারণ তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুসলিম উম্মাহ এবং লাভবান হয় কাফির শক্তি। একাত্তরে যুদ্ধে যেমন লাভবান হয়েছে হিন্দুত্ববাদী ভারত।

একটি দেশে গৃহযুদ্ধ, প্লাবন, সুনামি, মহামারি, ভূমিকম্প ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে লাখ লাখ লোক নিহত হতেই পারে। ‌ কিন্তু তাতে একটি জাতি শত্রুর হাতে অধিকৃত হয় না, স্বাধীনতাও হারায় না। এবং তাতে নিরাপত্তা হারায় না জনগণের জান, মাল ও ইজ্জত। কিন্তু একটি মুসলিম দেশকে খণ্ডিত করার অর্থ হলো, মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করা, দুর্বল করা এবং শত্রুর হাতে পরাজিত হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করা। ‌একাত্তরের শেখ মুজিব ও তার অনুসারী বাঙালি ফ্যাসিস্ট, কম্যুনিস্ট, সেক্যুলারিস্ট ও হিন্দুত্ববাদীরা তো তাই করেছে।

 

ভারতীয় এজেন্ডাই ছিল মুজিব ও মুক্তিবাহিনীর এজেন্ডা

ভারত পাকিস্তান ভাঙতে চেয়েছিল, মুক্তিবাহিনীও সেটিই চেয়েছে। ভারতের যুদ্ধ পরিকল্পনাই ছিল মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ পরিকল্পনা। ভারত চাইতো মুসলিমগণ ইসলাম থেকে দূরে সরুক ও ইসলামপন্থীদের হ্ত্যা করুক। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরাও ইসলাম থেকে দূরে সরেছে ও ইসলামপন্থীদের হত্যা করেছে। ১৯৭১’য়ে ভারতের যুদ্ধজয়ের পর বাংলাদেশের উপর চেয়ে বসে ভারতীয় অধিকৃতি। ভারতের এজেন্ডাই হয় মুজিব-হাসিনার এজেন্ডা। ফলে অসম্ভব করা হয় পূর্ণ ইসলাম পালন। ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকারে নীতি হলো ভারতের মুসলিম নির্যাতন, সে নীতি ছিল শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার।

পূর্ণ ইসলাম পালন করতে হলে অবশ্যই জিহাদে অংশগ্রহণ থাকতে হয়। জিহাদ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। জিহাদ হলো রাষ্ট্রকে দুর্বৃত্তি মুক্ত ও পরিশুদ্ধকরণের হাতিয়ার। যে রাষ্ট্রে জিহাদ নাই সে রাষ্ট্রে লক্ষ লক্ষ মসজিদ-মাদ্রাসা থাকলেও প্লাবনটি দুর্বৃত্তির। এবং যার জীবন জিহাদ নাই সে নিজেকে মুসলিম দাবী করলেও বুঝতে হবে সে মুনাফিক। অথচ হাসিনার শাসনামলে জিহাদ দূরে থাক, গৃহে জিহাদ বিষয়ক বই রাখা ও বই পাঠ গণ্য হতো শাস্তিযোগ্য ফৌজদারী অপরাধ। জিহাদের প্রতি সেরূপ ধারণা ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদেরও। ইসলামে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শরিয়া’র বিচার। শরিয়া পালন না করলে তাকে কাফির, জালেম ও ফাসেক বলা হয় -যেমনটি বলা হয়েছে সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে। অথচ শরিয়া’র কথা বলাও বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রূপে চিত্রিত হয়।

ইসলাম আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কুর‌’আন থেকে জ্ঞান লাভ। নামাজ-রোজার আগে এই জ্ঞান লাভের কাজটি ফরজ করা হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে সে ফরজ পালনের কোন সুযোগ রাখা হয়নি। আজকের মুসলিম উম্মাহর বিপদের মূল কারণ হলো ৫০টির বেশী টুকরোয় বিভক্তি। ইসলামে একতা ফরজ, আর বিভক্তি হারাম। দেশভাঙা তো বিভক্তির পথ। ভারত ও তার সেবাদাসদের অধিকৃতির কারণে দেশভাঙার ন্যায় বিভক্তি উৎসবের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। এবং যারা জিহাদ, শরিয়া, কুর’আনী জ্ঞানচর্চা নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল -তাদেরকে  জেল-জুলুম ও ফাঁসির মুখে পড়তে হয়েছে। এসবই তো ‌একাত্তরের পাকিস্তান ভাঙার পরিণতি। পাকিস্তান ভাঙার অর্থ যে ভারতের ন্যায় কাফির শক্তির অধিকৃতিকে অনিবার্য করা -সেটি বুঝার কারণেই একাত্তরে কোন ইসলামী দল, কোন আলেম, কোন ইমাম, কোন পীর পাকিস্তান ভাঙার পক্ষে অবস্থান নেয়নি। তারা বরং পাকিস্তান ভাঙাকে হারাম বলেছে। এবং তারা অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল।

 

গণহত্যা দিয়েছে তারাই যারা একাত্তরে যুদ্ধে এনেছে

ভারতকে সাথে নিয়ে যারা একাত্তরের যুদ্ধ এবং যুদ্ধজনীত গণহত্যাকে অনিবার্য করেছে, তারাই বাংলাদেশে এনেছে গণহত্যার পর গণহত্যা। দীর্ঘ লড়াই ও বহু রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা ১৯৪৭’য়ে অর্জিত হয়েছিল, সে স্বাধীনতা হারিয়ে যায় ১৯৭১’য়ে। একাত্তরের ভারতের বিজয়ের ফলে এ মুসলিম ভূমিতে কবরস্থ হয় গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকার। বাংলাদেশের ইতিহাসের বইয়ে যে সত্যটি গোপন করা হয় তা হলো, একাত্তরের যুদ্ধের আগে  ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ -এই ২৩ বছরে পাক সেনাবাহিনীর হাতে এক জন বাঙালিও নিহত হয়নি। পাকিস্তানের মাটিতে নিহতের কাণ্ড ঘটেছিল একমাত্র যুদ্ধকালীন ৯ মাসে। একাত্তরের গণহত্যার জন্য তারা কি দায় এড়াতে পারে যারা সেদিন রক্তাক্ত একটি যুদ্ধকে অনিবার্য করেছিল? অপরাধী তো তারাই যারা একাত্তরে একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক নিষ্পত্তির বদলে যুদ্ধের ডাক দিয়েছিল। সে অপরাধ তো মুজিব ও তার অনুসারীদের। একাত্তরের যুদ্ধটি ছিল ভারতের একটি পরিকল্পিত যুদ্ধ -যার প্রস্তুতি ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই নিচ্ছিল। সেরূপ একটি যুদ্ধের পরিকল্পনা ছিল মুজিবের আগরতলা ষড়যন্ত্রেও।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বার বার গণহত্যা হয়েছে। যেমন হয়েছে শেখ মুজিবের শাসনামলে, তেমনি হয়েছে হাসিনার শাসনামলে। গণহত্যা হয়েছে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজপথে লগি বৈঠা দিয়ে। ২০০৯ সালে গণহত্যা হয়েছে ‌পিলখানায়। গণহত্যা হয়েছে ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে। এবং বিশাল গণ হত্যা হয়েছে ২০২৪ এরৎ জুলাই-আগস্টের বিপ্লব কালে -যাতে ১৪ শতের বেশী নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। এবং সবচেয়ে বড় গণহত্যা হয়েছে ১৯৭৪ সালের মানব সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে। ১৫ লাখের বেশী মানুষের সেদিন মৃত্যু ঘটেছিল ভারতীয় লুটেরা চক্র ও আওয়ামী দুর্বৃত্ত শাসক শ্রেণীর যৌথ লুণ্ঠনে। এসবই সম্ভব হয়েছিল একাত্তরে সংঘটিত ফিতনা বিজয়ী হওয়ার কারণে। এমন একটি জঘন্য ফিতনাকে মুক্তিযুদ্ধ বলে তা নিয়ে উৎসব করা বস্তুত আরেক বিশাল ফিতনা। পরিতাপের বিষয় হলো বাঙালি মুসলিমদের বিশাল অংশ হাবুডুবু খাচ্ছে এ ফিতনার মাঝে। ১০/০৯/২০২৫

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *