কেন ব্যর্থ হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ?

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

কুর’আন বুঝার কাজটিই হয়নি

মুসলিম জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণ নয়; জনসংখ্যায় ও সম্পদে বিশাল বৃদ্ধিও নয়। সেটি হলো ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব এবং তাঁর শরিয়া কতটা বিজয়ী হবে, পৃথিবী পৃষ্ঠ কতটা দূর্নীতিমুক্ত হবে এবং সুবিচার কতটা প্রতিষ্ঠা পাবে -সেটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের উপর। নইলে ইসলামের এজেন্ডা স্রেফ কিতাবে থেকে যায়। মুসলিম উম্মাহর সাফল্য দৃশ্যমান হয় ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে সাফল্য দেখে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যর্থতা দেখে নিশ্চিত বলা যায়, পবিত্র কুর’আন বুঝার কাজটি তাদের দ্বারা আদৌ হয়নি এবং এখনো হচ্ছে না। তাদের ধর্মচর্চা স্রেফ নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, দোয়া দরুদের মধ্যেই সীমিত রয়ে গেছে।

বিপদের মূল কারণ, জীবনের পথচলায় পবিত্র কুর’আন যে রোডম্যাপ দেয়, সে রোডম্যাপটি শুধু কিতাবেই রয়ে গেছে। ইসলাম বাদ দিয়ে মুসলিমরা পথ চলছে জাতীয়তাবাদ, দলবাদ, ফ্যাসিবাদ ও সেক্যুলারিজমের পথ বেয়ে। এ পথগুলি তো বিচ্যুতি, বিদ্রোহ ও পাপের পথ। নামাজীরাও ভোট দিয়ে এবং রাজস্ব দিয়ে এমন পাপের বিজয়ে সমর্থন জুগাচ্ছে। তাদের রাজনীতিতে শরিয়তী বিধি নিষেধের কোন স্থান নাই। ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশটিতে পতিতাবৃত্তি, সূদী ব্যাংক, মদ জুয়া, চাঁদাবাজি, ঘুষের প্রশাসন -এরূপ নানা পাপকর্মকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। পাপের এ প্লাবন প্রতিরোধে এমন কি যারা নামাজী, রোজাদার ও হাজী -তাদের মাঝেও কোন তাড়না নাই। পাপের প্লাবনে নাক ভাসিয়ে চলাই তাদের ধর্ম পালন ও সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিমগণ নবীজী (সা:)কে রাসূল ও পথপ্রদর্শক রূপে বিশ্বাস করলেও তাঁর বাণী ও তাঁর প্রদর্শিত পথের অনুসরণের কাজটি তাদের দ্বারা হচ্ছে না। অথচ কীভাবে পূর্ণ ইসলাম এবং রাজনীতি, শিক্ষা সংস্কৃতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থায় কি করণীয় -সেটি শেখানোই ছিল নবীজী (সা:)’য়ের মূল মিশন। সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি তিনি হাতে কলমে শিখিয়ে গেছেন। ইবাদতকে তিনি শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও দোয়া দরুদের মাঝে সীমিত রাখেননি, মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাকে তিনি পূর্ণ প্রতিষ্ঠা দিয়ে গেছেন। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে মুসলিমগণ বিপুল অর্থ, শ্রম ও রক্ত ব্যয়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। সমগ্র মানব ইতিহাসে সেটিই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ নেক কর্ম। মহান রব’য়ের এজেন্ডা আর কোন কালেই এতোটা বিশাল ভাবে বিজয়ী হয়নি। নবীজী (সা:) নিজে ১০টি বছর সে রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন। অথচ আজকের মুসলিমগণ তাঁর সে রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনের সূন্নত থেকে কোন শিক্ষাই নেয়নি। ফলে গাদ্দারীটি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে নবীজী (সা:)’য়ের মহা মূল্যবান শিক্ষার সাথে।  তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যে, নবীজী (সা:)’য়ের অনুসরণ মানেই মহান রব’য়ের অনুসরণ। এবং নবীজী (সা:)’য়ের সাথে গাদ্দারীর অর্থ, মহান রব’য়ের সাথে গাদ্দারী। প্রশ্ন হলো, যারা বাঁচে মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে গাদ্দরী নিয়ে, তাদের নামাজ রোজা হজ্জ যাকাত ও দোয়া দরুদের আদৌ কি কোন মূল্য থাকে?     

মুসলিম জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নবীজী (সা:)’য়ের ইসলাম পালনের সাথে নিজের ইসলাম পালনকে মিলিয়ে দেখা। ঈমানদারকে প্রতিক্ষণ বিচার করতে হয়, কতটুকু হচ্ছে নবীজী (সা:)’য়ের অনুসরণ এবং কতটুকু হচ্ছে তাঁর শিক্ষার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা। একজন ঈমানদার এভাবেই নিজের হিসাব নিজে নেয়। তখন মহান রব’য়ের কাছে হিসাব দেয়ার কাজটি সহজ হয়ে যায়। নবীজী (সা:) যে পথে চলেছেন সেটিই হলো বিশুদ্ধ কুর’আনের পথ। এ পথকে বলা হয় সিরাতাল মুস্তাকীম। নবীজী (সা:)’য়ের চলা সে পথে শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ছিল না; ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদও ছিল। সে রাষ্ট্রে ছিল আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা। ছিল অন্যায় ও দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং ন্যায় ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠার জিহাদ।

কিন্তু আজকের মুসলিমগণ নবীজী (সা:)’য়ের অনুসৃত সিরাতাল মুস্তাকীমে নাই। সেটির প্রমাণ, মুসলিম বিশ্বের কোথাও প্রতিষ্ঠা পায়নি ইসলামী রাষ্ট্র। এবং কোন মুসলিম দেশেই স্থান পায়নি মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া। মুসলিম বিশ্বের বর্তমান ভূ-রাজনীতি, শিক্ষা সংস্কৃতি, আইন আদালত ও যুদ্ধ বিগ্রহ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, মুসলিমগণ নাই সিরাতাল মুস্তাকীমের উপর। এবং সিরাতাল মুস্তাকীমের উপর না থাকার অর্থ, তারা যাত্রী জাহান্নামের। বিস্ময়ের বিষয় হলো, যারা নেই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে, যারা অনুসরণ করে না নবীজী (সা:)’য়ের রাজনৈতিক আদর্শ -তারাই দাবী করে আশেকে রাসূল রূপে! তাদের এ দাবী যে কতটা অসত্য -সেটি বুঝে উঠতেও তারা ব্যর্থ। তাদের অবাধ্যতা শুধু নবীজী (সা:)’য়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং মহান আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধেও। এরূপ অবাধ্যতা নিয়ে কি কখনো ঈমানদার হওয়া যায়?

 

অজ্ঞতাই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা

মুসলিমদের মাঝে ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা এতোটাই গভীর যে, অধিকাংশ মুসলিম জানেই না যে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালনের কাজটি শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত, দোয়া-দরুদ পালন করলে চলেনা; শুধু মসজিদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা দিলেও চলে না। অবশ্যই প্রতিষ্ঠা দিতে হয় ইসলামী রাষ্ট্র। মুসলিমদের মাঝে এ অজ্ঞতা বাঁচিয়ে রেখেছে তথাকথিত মৌলভী, মুফতি, আলেম ও পীরগণ। তারা জনগণের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল করেছে যে, ইসলাম পালনের অর্থ নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাত ও দোয়া দরুদ পালন। বুঝানো হয়, ৫ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় করলে এবং সাথে কিছু ওজিফা পাঠ করলে নিশ্চিত জান্নাত মিলবে। তাদের ভাবনায় জিহাদের কোন স্থান নাই; আল্লাহর পথে জান মালে বিনিয়োগের কোন কথা নাই। ভাবনায় স্থান নাই ইসলামী রাষ্ট্রের। ফলে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ যে ইসলাম পালন করতেন, সে ইসলাম তাদের জীবনে দেখ যায় না।

মোল্লা, মৌলভী, মুফতি, আলেম ও পীরের পরিচয়ে যারা নিজেদের নবীজী (সা:)’য়ের উত্তরাধিকারী হওয়ার দাবি করে, তারা নাই ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে। তারা শুধু আত্মসংস্কারের কথা বলে, রাষ্ট্র সংস্কারের নয়। তাদের অধিকাংশই নাই রাজনীতিতে। ফলে ইচ্ছা করেই নিজ অনুসারীদের কাছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরে না। যারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে তাদেরকে এরা দুনিয়ারদার বলে। রাজনীতিকে এরা ক্ষমতালোভীদের পেশা বলে। অথচ ভুলে যায়, রাজনীতি যেমন আবু লাহাব ও আবু জেহেলের ছিল, তেমনি ছিল নবীজী (সা:)’য়েরও। পার্থক্য ছিল কেবল এজেন্ডায়। নবীজী (সা:)’য়ের রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করা। সে এজেন্ডা নিয়েই তিনি ১০ট বছর রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। আর রাষ্ট্রপ্রধানের কাজ তো রাজনীতির কাজ। প্রশ্ন হলো, নবীজী (সা:) যে রাজনীতিতে অংশ নিলেন, সে রাজনীতি নিষিদ্ধ হয় কি করে? রাজনীতিতে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি থাকার কারণেই রাজনীতি কখনো বর্জনীয় হতে পারে না। তাছাড়া শুধু রাজনীতি কেন? ইমামতি, পীর মুরিদী, শিক্ষকতা, ব্যবসা বাণিজ্য,প্রশাসন, পুলিশ, ডাক্তারি ইত্যাদি সব পেশাতেই স্বার্থান্বেষী দুর্বৃত্ত রয়েছে। তাহলে কি সেসব পেশাও বর্জন করতে হবে?  

 

জিহাদশূণ্যতাই ঈমানশূণ্যতা                                                                                 

ডাক্তার হতে হলে ডাক্তারি শাস্ত্র জানতে হয়। তেমনি যারা মুসলিম হতে চায়, তাদের অবশ্য ইসলাম জানতে হয়। না জানলে পালন করবে কেমনে? জ্ঞানার্জনে ফাঁকিবাজি হলে মুসলিম হওয়াতেই ফাঁকিবাজি থেকে যায়। জাহেল ব্যক্তি নামাজী, রোজাদার বা হাজী হতে পারে, কিন্তু সে কখনোই ঈমানদার হতে পারে না। সে বরং মুনাফিক হয়। ঈমানদার হওয়ার অর্থ শুধু আল্লাহ তায়ালা, তাঁর রাসূল, তাঁর কিতাব, তাঁর দ্বীন, ফিরেশতাকুল ও আখেরাতের উপর বিশ্বাস নয়, বরং সে বিশ্বাসের বাইরেও তাঁকে বহুদূর এগোতে হয়। মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে জানতে এবং সে এজেন্ডার সাথে পূর্ণ একাত্ম হতে হয়। যারা সে এজেন্ডার সাথে একাত্ম হয়, তাদের জীবনে সে এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদও শুরু হয়।

ঈমান কাকে বলে এবং প্রকৃত ঈমানদার কারা -সেটি জানতে হলে অবশ্যই নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের জীবনীর দিকে তাকাতে হয়। কারণ, তাদের জীবনই ঈমান ও ঈমাদারের দৃশ্যমান মডেল। তখন জানা যায়, তাদের জীবনে শুধু আল্লাহ, আখেরাত এবং তাঁর রাসূল, ফিরেশতাকুল ও কিতাবের উপর বিশ্বাস ছিল না, শুধু নামাজ রোজা হজ্জ যাকাত ও তাসবিহ পাঠ ছিল না; বরং তাদের জীবনে লাগাতর জিহাদ ছিল এবং সে জিহাদে অর্থ, শ্রম, মেধা ও প্রাণের কুরবানী ছিল। এরূপ ঈমান, আমল ও জিহাদের সামগ্রীকতা নিয়ে যাদের জীবন, একমাত্র তারাই প্রকৃত ঈমানদার।

ঈমানের এরূপ সঠিক পরিচয়টি যেমন নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের জীবন থেকে জানা যায়, তেমনি ঈমানের সঠিক সংজ্ঞাটি জানা যায় পবিত্র কুর’আনের বহু আয়াত এবং নবীজী (সা:)’য়ের বহু হাদীস থেকে।  পবিত্র কুর’আনে বলা হয়েছে:

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ۚ أُولَـٰئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ

অর্থ: “একমাত্র তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না ফিরেশতা কূল ফিরেশতা কূল ফিরেশতা কূল এবং আল্লাহর পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জেহাদ করে। ঈমানের দাবীতে একমাত্র তারাই সত্যনিষ্ঠ।” -(সুরা হুজরাত, আয়াত ১৫)।

উপরিউক্ত আয়াতে দেয়া হয়েছে ঈমানের অতি সুসংহত (comprehensive) সংজ্ঞা। তাই যাদের জীবনে জিহাদ নাই, তাদের জীবনে নামাজ রোজা হজ্জ যাকাত ও তাসবিহ পাঠ যতই থাক, সেগুলি তাকে ঈমানদার বানায়না। এমন জিহাদশূণ্য ব্যক্তিগণ ঈমানের দাবীতে সাচ্চা নয়। ঈমান একটি কুর’আনী পরিভাষা (jargon)। ঈমানের সংজ্ঞা কি, সেটি সঠিক ভাবে জানা যায় একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা থেকে। সেজন্য কুর’আন পড়তে হয়। ইসলামে আরো অনেক কুর’আনী পরিভাষা আছে, সেগুলির সঠিক অর্থ জানতে হলে পবিত্র কুর’আন বুঝতে হয়। পবিত্র কুর’আনে মহান আল্লাহ তায়ালা সেগুলির বর্ণনা অতি সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন। মহান রব’য়ের সে অভয় বাণীটি সুরা ক্বামারে ৪ বার এসেছে। বলা হয়েছে:

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ

অর্থ: “আমি কুর’আনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, আছে কি কোন চিন্তাশীল?” –(সুরা ক্বামার, ১৭)।

মুসলিমগণ যতদিন কুর’আন থেকে ইসলাম বুঝার চেষ্টা করেছে ততদিন মুসলিমদের মাঝে এতো বিভক্তি সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু যখনই কুর’আন থেকে দূরে সরেছে তখনই বেড়েছে মহান রবয়ের সাথে দূরত্ব । তখন বেড়েছে মুসলিমদের বিভক্তি, বেড়েছে ফিরকা, ত্বরিকা ও মজহাবের সংখ্যা। যারা মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি বাড়াতে চায় তারা মুসলিমদের কুর’আন থেকে দূরে রাখতে চায়। তারা বলে, কুর’আন বুঝা খুবই কঠিন। সে বাহানায় তারা ছাত্রদের শুধু তেলাওয়াত ও হিফজ শেখায়। অথচ মহান আল্লাহ তায়ালা নামাজ রোজা ও হ্জ্জ যাকাত ফরজ করার আগে পবিত্র কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনকে প্রতিটি নর নারীর উপর ফরজ করেছেন। এ ফরজ আদায়ের তাড়নাতেই মিশর, সিরিয়া, ইরাক, সূদান, লিবিয়া, আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মৌরতানিয়ার জনগণ মাতৃভাষাকে পরিত্যাগ করে আরবী ভাষাকে গ্রহণ করেছিল। আজ সে তাড়না বেঁচে নাই। ফলে বেড়েছে বিচ্যুতি ও বিভক্তি।

বুঝতে হবে জ্ঞানার্জনের ফরজ আদায় না হলে ইসলামের অন্য ফরজগুলি সঠিক ভাবে আদায় হয়না। তখন আদায় হয়না ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের ফরজ জিহাদ। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনে কুর’আনী জ্ঞানার্জনের ফরজটি আদায় হয়নি। কারণ, মুসলিম দেশগুলিতে পবিত্র কুর’আন থেকে জ্ঞান দানের কোন প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোই গড়া হয়নি। জনগণের রাজস্বের অর্থে চলা স্কুল কলেজগুলি সে বিষয়ে জ্ঞানদান করে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রিধারীদের অধিকাংশই বাঁচে মনের ভুবনে জাহিলিয়াতের জঞ্জাল নিয়ে। স্কুল কলেজ শুধু পেশাদারীতে প্রতিদ্বন্দীতার সামর্থ্য বাড়িয়েছে; ঈমানে পুষ্টি ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সামর্থ্য দেয়নি।  এমন জাহেলদের কাছে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের পবিত্র জিহাদ ধর্মীয় উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস মনে হয়। দেশের মাদ্রাসাগুলি ছাত্রদের বিশুদ্ধ কুর’আন পাঠ শেখালেও কুর’আন বুঝার সামর্থ্য সৃষ্টি করেনা। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষা শেষ করলেও তাদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে দেখা যায় না। তাদের কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে যায় ইমামতি, মোয়াজ্জিনী ও মকতব-মাদ্রাসার শিক্ষকতাতে।

                                                                                                                                                                   

সকল ব্যর্থতার কারণ কুর’আন বুঝায় ব্যর্থতা

ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝা ও অনুসরণের কাজটি  শুধু আলেম, ইমাম, মোহাদ্দেস ও বুদ্ধিজীবীদের কাজ নয়; নামাজ রোজার ন্যায় এটি ফরজ হলো প্রতিটি মুসলিমের উপর। যে ব্যক্তি পথ চলে, তাকে অবশ্যই শুরুতে পথটি চিনে নিতে হয়। তেমনি যে ব্যক্তি জান্নাতে যেতে চায়, তাকে অবশ্যই জান্নাতের রোডম্যাপটি জানতে হয়। পবিত্র কুর’আন হলো জান্নাতের রোডম্যাপ। জান্নাতের এ রোডম্যাপ একজন আলেম বা আল্লামা জানলে তাতে নিজের জানার ফরজটি আদায় হয়না। জানার প্রয়োজনটিও দূর হয়না। কুর’আন বুঝাটি তাই মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ। নইলে জান্নাত শুধু স্বপ্নেই থেকে যায়। কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনের ফরজটি পালিত না হওয়ার কারণে আজকের মুসলিমগণ ব্যর্থ হচ্ছে সঠিক ইসলামকে খুঁজে পেতে ও অনুসরণ করতে।

মুসলিমদের সকল ব্যর্থতার শুরু এ অজ্ঞতা থেকে। সে অজ্ঞতার কারণে তারা ব্যর্থ হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের গুরুত্ব বুঝতে। এটি এক ভয়ানক জাহিলিয়াত। এরূপ জাহিলিয়াত নিয়ে ঈমানদার হওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব হলো সভ্য মানব হওয়া এবং সভ্য রাষ্ট্র নির্মাণে অংশ নেয়া। এই জন্যই মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম যে যুদ্ধকে ফরজ করা হয়েছিল সেটি হলো জাহিলিয়াতের বিরুদ্ধে জিহাদ। জান্নাতে পথে চলার এটিই হলো মুসলিম জীবনের প্রথম ধাপ। অথচ মুসলিমগণ জান্নাতের পথে চলতে চায় সে পথের প্রথম ধাপে পা না রেখেই। ফলে আদৌ হচ্ছে না সামনে এগোনোর কাজ। অথচ জ্ঞানার্জনের জিহাদটি হলে মুসলিমগণ জানতে পারতো নিজেদের ব্যর্থতার কারণ। জানতে পারতো, অতীতে মুসলিমগণ কী করে বিস্ময়কর বিজয় পেল। তখন এটিও বুঝতো, কী করে তারা ইসলাম থেকে এতোটা দূরে সরলো? তখন সহজ হতো মুসলিম উম্মাহর পুনরুত্থানের কাজ। এবং সহজ হতো ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ। ০৯/০৫/২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *