একাত্তরের গণহত্যার দলিল (এক)

image_pdfimage_print

যে কাহিনী শুনতে নেই (০৫)

ময়মনসিংহ হত্যাকান্ড

১.

“… নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার পাশাপাশি উজ্জল মানবিক চৈতন্য ও বিবেক সম্পন্ন মানুষওতো আছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এমন ঘটনা পাশাপাশিও দেখেছি। ময়মনসিংহের কিছু ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ময়মনসিংহের ছত্রপুর এলাকার রেল কলোনীতে অনেক বিহারী ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় সে কলোনীতে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে পুড়ে মরে শিশু, নারী ও পুরুষ। আগুন-নেভার পর কোন কোন ঘরে পুড়ে যাওয়া আদম সন্তানের বিকৃত ও বীভৎস চেহারা দেখে চমকে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিল এক মানুষ অন্য মানুষকে কি করে এত নিষ্ঠুরভাবে মারে॥”(১৮ এপ্রিল, ১৯৭৬)

— শামসুজ্জামান খান / দিনলিপি ॥ [ অন্বেষা – ফেব্রুয়ারি, ২০১০ । পৃ: ১৩৬ ]

০২.

“… When the Army moved in Mymensingh aided by information from the informers it found 1,500 widows and orphans sheltering in a local mosque.

A man identified as the Assistant postmaster of Mymensingh showed scars on his neck and what he said was a bayonet mark on his body.

The man said he lived in a colony known as Shanti of 5,000 non-Bengalis, only 25 survived the massacre on April 17. The interview ended abruptly when the Assistant Postmaster mentioned the killing and mutilation of his family and burst into tears.

The General Commanding in Mymensingh District said the killings began in the latter half of March and was carried out by the Awami League volunteers, the armed wing of Sheikh Mujibur Rahman’s secessionist Awami party.

East Bengali Rifles and Regiment troops who defected to the secessionist cause were also involved. Non Bengali people and people with technical skills were consistently butchered, he said.”

— Maurice Quantance / The Sun (Singapore) – 9 May, 1971

“… One hears of the most horrifying stories. Murder, rape, destruction, looting on a massive scale – there is so much of it that one finds oneself absorbing these terrifying tales without turning a hair. Inevitably, the central figure in this bloody drama is the poor Bihari.

But the real tragedy which has engulfed the Bihari community does not lie in the number of people killed but in the gruesome variety of methods of killing. Ten thousand people wiped out in two nights of horror in one town is a story which will last a week.

Eye witnesses are prepared to testify to the correctness of the story that Biharis were dragged or enticed from their homes and taken to the slaughter house where they were butchered slowly with a knife.

In Mymensingh, an East Pakistani army officer had a delightful breakfast with the family of a brother officer from West Pakistan before shooting dead its members.

Men were hacked to pieces beginning from the feet. A pregnant woman, a West Pakistani, was grabbed by hooligans and dragged into the street. Her belly was cut and the child was bayoneted. She is alive but is now bereft of the will to live. A women was killed but her three-month-old child was allowed to live but not before they had cut off one of its hands.

A doctor drained the blood out of people with a syringe and let them die.

In a refugee camp for Biharis from Mymensingh a man burst into tears while narrating his experience. An army officer who is now in charge of the camp was so moved that he turned his face away to hide his tears. Later, this officer, one of the first to reach Mymensingh, took me aside and said in a whisper, ‘what he was told you is not a hundredth of what I have seen in Mymensingh.”

— Guardian (London) / 10 May, 1971

“… Reporters later visited a refugee camp in Dacca where 3,000 homeless from Mymensingh lodged. Doctors were treating 25 men and 15 women, all non-Bengalis, for what they said were bullet, knife and axe wounds inflicted by Bengalis during the past weeks. One seven year old boy sat dully on a single hospital bed with his four year old brother and doctors said that only their 13 year-old brother was left in the family. One women had severe knife cuts and another had her hand almost chopped off by an axe. Both said they had been carried off wounded by Bengali youths.

One nineteen year-old Bihari student, shot through the stomach, said Bengali thugs had ordered all the men from his part of shanti outside and opened fire with automatic weapons.

He was hit three times and fell unconscious, he said, but survived because the rebels thought him dead. A number of other men bore bullet wounds.”

— Malcolm Brown / New York Times (NY) – 11 May, 1971

“… There is evidence that non-Bengalis, largely immigrants from India who sought refugee after the 1947 partition, were attacked, hacked to death and burnt in their homes by mobs. Eye witnesses told stories of 1,500 widows and orphans fleeing to a mosque at Mymensingh, in the north as armed men identified as secessionist slaughtering their husbands and fathers. A mill manager showed journalists a mass grave where he said well over 100 women and children were buried.

Scene of the killing – just before the Army moved in – was the mill recreation hall and it stank of death the day journalists saw it this week. Human hair and blood-strains lay about the building. The Assistant postmaster at Mymensingh showed journalists a neck scar and bayonet wounds. Choking back tears, he said he was one of 25 survivors out of 5,000 non-Bengalis attacked by Awami League supporters and army deserters.

There can be little doubt that some atrocities were committed by groups can separatists. Generally, such killings were bone by Bengali workers nurturing grudges against shop foremen and administrators in Jute mills, many of the foremen are Biharis, Moslem immigrants from India, who have done well in East Pakistan and whose success is resented by the less successful Bengalis.

Major Osman Choudhury, the Commander of the South, West Division of the Liberation Front in East Pakistan, admitted this afternoon that East Pakistan Rifles and Bengali volunteers were raiding and killing the minority community of Bihari Muslims “because they are spies and have sided with West Pakistan.” Major Choudhury, of the East Pakistan Rifles, met journalists here on the Indo-Pakistan border. He said that Bihari Muslims, who are identified linguistically and ethnically with the West Pakistanis, had helped President Yahya’s soldiers to massacre Bengalis. The Bengali officer was being questioned in the light of news reports and fears that a great number of the non-Bengali minority community, five million strong, have been killed in a wave of reprisals.

There was no question of Bihari Joining the Liberation Front, he said, “If we get a Bihari, we kill him. We are also raiding their houses and killing them.”

— Maurice Quaintance / Daily News (Colombo) – 15 May, 1971

তথ্যসূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র ( ৭ম খন্ড) / সম্পা: হাসান হাফিজুর রহমান ॥ [ তথ্য মন্ত্রণালয় – জুন, ১৯৮৪ । পৃ: ৩১৮-৩২৬ ]

০৩.

“… পূর্ব পাকিস্তান সংকটের উপর পাকিস্তান সরকারের ১৯৭১ সালে আগস্টে প্রকাশিত শ্বেতপত্রে ব্যাপক নৃশংসতার যে তালিকা দেয়া হয়েছিল তা পাঠকদের জন্য ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। একটি ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছিল এভাবে: 

২৭ মার্চ ময়মনসিংহ সেন-নিবাসে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট/ ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস্‌ বিদ্রোহ করে এবং তারা তাদের সহকর্মী পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসার ও আবাসিক ভবনগুলোতে আরো যারা ছিলেন তাদের নির্বিচরে হত্যা করে। শ্বেতপত্রে ডিস্ট্রিক্ট জেল এবং শাঁখারিপাড়া ও অন্যান্য নয়টি কলোনীর পুরুষদের হত্যা করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সকল পশ্চিম পাকিস্তানী ও অবাঙালি মহিলাদের জোর করে ধরে এনে মসজিদ ও স্কুলে জমা করা হয়েছিল এবং ২১ এপ্রিল সেন-বাহিনী শহরের নিয়ন্ত্রণ নিলে ওই সব মহিলাদের সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়।

ময়মনসিংহ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কয়েকজন পাকিস্তানী অফিসারের স্মৃতিচারণ নিয়ে আমি ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর-এ বিষয়টি উত্থাপন করলে তারা আমাকে প্রথমদিকে জানান যে ওই সময় ময়মনসিংহে কোনো সেনানিবাস ছিল না। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে – ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস্‌ ও ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারকেই ময়মনসিংহে স্থানীয়ভাবে সকলে ‘ক্যান্টনমেন্ট’ বলত। ময়মনসিংহ শহরের একজন প্রবীণ ভদ্রলোক মুহাম্মদ আব্দুল হক, আমাকে ক্যান্টমেন্টের ওই স্থানটি দেখিয়েছেন এবং নিশ্চিত করেছেন যে সেখানে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী অফিসারদের হত্যা করা হয়।

অন্য একজন বাসিন্দা শেখ সুলতান আহমেদ যিনি আবেগে-আপ্ুত হয়ে বর্ণনা করেন কীভাবে তিনি সে সময় জনতার একজন হয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘিরে চিত্কার দিয়ে ভিতরে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত তাদের সহকর্মী বাঙালিদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন। আহমেদের দেয়া তথ্যানুয়ায়ী ঢাকায় সেনা অভিযানের খবর ময়মনসিংহে পৌঁছানোর পরপরই ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের মাঝে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। বাঙালিদের পক্ষ নিয়ে হাজার হাজার স্থানীয় বাঙালি জড়ো হয় ক্যান্টনমেন্টের বাইরে। তবে ওই ঘটনায় কোনো বেসামরিক লোক হতাহত হয়নি। ভিতরে বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই সংঘর্ষ চলে – পশ্চিম পাকিস্তানীরা যতোক্ষণ পেরেছিল ততোক্ষণ প্রতিরোধ করেছিল। তিনি যে হিসেবে দিয়েছিলেন তাতে আনুমানিক একশ’ জন পাকিস্তানী অফিসার ও সৈনিক সেখানে নিহত হয়েছেন।

আহমেদ আরো দাবি করেছেন দাঙ্গার পর তিনি ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে সেনা কর্মকর্তাদের মৃতদেহ দেখেছেন। কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানী পালানোর চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের কেটে হত্যা করে। আহমেদ ব্যক্তিগতভাবে ক্যান্টনমেন্টে একজন লোককে দেখেছেন যিনি বিক্ষুদ্ধ জনতার দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে হাত জোড় করে প্রাণ ভিক্ষা চাইছিলেন আর বলছিলেন সেখানে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা আছে, কিন্ত তাকেও হত্যা করা হয়েছিল গুলি করে ও দা দিয়ে কুপিয়ে। আহমেদ জানান, ওই দৃশ্য দেখে তার দারুণ কষ্ট হয়েছিল। তিনি আরো জানান নারী ও শিশুদের হত্যা করা হয়েছিল, অনেক নারীকে হত্যা করা হয়েছিল ধর্ষণ করে। আবার কয়েকজনকে অন্য বাঙালিরা উদ্ধার করে অন্যান্য অফিসারদের সাথে নিকটস্থ জেলখানায় রেখেছিল॥”

— ডেড রেকনিং : ১৯৭১-এর বাংলাদেশ যুদ্ধের স্মৃতি / শর্মিলা বসু (মূল: Dead Reckoning : Memories of the 1971 Bangladesh War । অনু: সুদীপ্ত রায়) ॥ [ হার্স্ট এন্ড কোম্পানী – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৮৮-৮৯ ]

০৪.

“… ১৯৭১ সালে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের জঙ্গি, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বিদ্রোহী সৈন্যরা ময়মনসিংহে অবাঙালি হত্যাকাণ্ডে মেতে উঠে। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের কবল থেকে ময়মনসিংহ পুনরুদ্ধার করা নাগাদ এ হত্যাকাণ্ড অব্যাহত ছিল। সাক্ষ্য প্রমাণে দেখা গেছে যে, এখানে ২০ হাজার অবাঙালিকে হত্যা করা হয়েছিল । ১৯৭১ সালের ২৬-২৭ মার্চ ময়মনসিংহ সেনানিবাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্য এবং আধা-সামরিক ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বিদ্রোহ করে এবং ব্যারাক ও আবাসিক কোয়ার্টারে মধ্যরাতে আকস্মিক হামলা চালিয়ে শত শত পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার ও সৈন্যকে হত্যা করে। রক্তপাত থেকে মহিলা ও শিশুরাও রেহাই পায়নি।

১৬ এপ্রিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একদল বিদ্রোহী সৈন্য ময়মনসিংহ জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে ১৭ জন বিশিষ্ট অবাঙালি নাগরিককে হত্যা করে। এসব বিশিষ্ট নাগরিককে বিদ্রোহীরা সেখানে আটক রেখেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে উন্মত্ত জনতা এবং বিদ্রোহী বাঙালি সৈন্যরা ময়মনসিংহ শহরের শানকিপাড়া ও ৯টি আবাসিক এলাকার প্রায় সকল অবাঙালি পুরুষকে হত্যা করে। দেড় হাজারের বেশি মহিলা ও শিশুকে গবাদি-পশুর মতো একটি মসজিদ ও স্কুলে জড়ো করে রাখা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৩১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ময়মনসিংহ শহর পুনর্দখল করার সময় এসব মহিলা ও শিশুকে উদ্ধার করা হয়। বিদ্রোহীরা আওয়ামী লীগ বিরোধী বহু বাঙালিকে হত্যা করে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিনিধি মরিস কুইন্টান্স মে মাসের গোড়ার দিকে ময়মনসিংহ সফর করেন। ১৯৭১ সালের ১৫ মে ‘সিলোন ডেইলি নিউজে’ তার প্রেরিত একটি সংবাদে বলা হয়:

“১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তির সময় ভারত থেকে অভিবাসনকারী অবাঙালিদের ওপর জনতার হামলা, তাদের কুপিয়ে হত্যা এবং তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।…

প্রতাক্ষদর্শীরা ময়মনসিংহের উত্তর দিকে একটি মসজিদে আশ্রয়গ্রহণকারী দেড় হাজার বিধবা ও এতিম শিশুর মর্মন্তুদ উপাখ্যান বর্ণনা করেছেন। বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাদের স্বামী ও পিতাকে হত্যা করেছে।”

১৯৭১ সালের ৭ মে ‘নিউইয়র্ক টাইমসে’ প্রকাশিত ময়মনসিংহ থেকে পাকিস্তানি প্রতিনিধি ম্যালকম ব্রাউন প্রেরিত আরেকটি সংবাদে বলা হয়ঃ

“কর্মকর্তারা বলেছেন যে, সরকারি সৈন্যরা শহরের (ময়মনসিংহ) নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার আগে বাঙালিরা কমপক্ষে এক হাজার বিহারী অথবা অবাঙালিকে হত্যা করেছে। সেনাবাহিনীর অফিসাররা জনগণের সঙ্গে সাংবাদিকদের পরিচয় করিয়ে দেন। এসব জনগণ সাংবাদিকদের জানিয়েছে, ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পরক্ষণে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা বিহারী হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।…

একজন অফিসার বলেছেন, বহু লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। এসব লাশ শনাক্ত করা অথবা কবর দেয়া অসম্ভব। তিনি বলেছেন, এসব লাশ ব্রহ্মপূত্র নদে ভাসিয়ে দেয়া হবে।…

ময়মনসিংহের বাইরে ফসলের মাঠ ও ফলের বাগান এবং গুচ্ছ গুচ্ছ বস্তিঘরে দৃশ্যত প্রাণহানি ঘটেছে সর্বধিক। বস্তিঘরগুলো পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়েছে।”

আমেরিকান বার্তা সংস্থা এপি“র একজন প্রতিনিধি ১৯৭১ সালে মে মাসের শুরুতে ময়মনসিংহ সফর করেন। শহরের পোস্ট মাস্টারের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি তার রিপোর্টে লিখেছেন:

“যেখানে আমি (পোস্ট মাস্টার) বসবাস করতাম সেখানে ৫ হাজার অবাঙালি ছিল। বর্তমানে সেখানে মাত্র ২৫ জন জীবিত।”

একই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ১৯৭১ সালের ৭ মে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিনিধি মরিস কুইন্টান্স ময়মনসিংহ থেকে তার প্রেরিত রিপোর্টে বলেছেন:

“সাংবাদিকদের গোলযোগপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে দ্বিতীয় দিনের মতো হেলিকপ্টারে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়। সাংবাদিকরা ময়মনসিংহের পোস্ট মাস্টার এসিস্ট্যান্ট হিসেবে পরিচয়দানকারী এক ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন৷ তিনি তার ঘাড়ে একটি দাগ দেখান। তিনি বলেছেন, এ দাগ হচ্ছে তার শরীরে বেয়নেট চার্জের চিহ্ন। লোকটি জানিয়েছেন, তিনি ৫ হাজার অবাঙালির একটি কলোনিতে বাস করতেন।১৭ এপ্রিলের হত্যাকাণ্ড থেকে এ কলোনির মাত্র ২৫ জন বেঁচে যায়। এ এসিস্ট্যান্ট পোস্ট মাস্টার তার পরিবারের হত্যাকাণ্ড এবং পরিবারের সদস্যদের লাশ ক্ষতবিক্ষত করার উপাখ্যান উল্লেখ করার সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়লে আকস্মিকভাবে সাক্ষাৎকার গ্রহণ শেষ হয়ে যায়।…

ময়মনসিংহের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং বলেছেন, মার্চের শেষাংশে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আওয়ামী লীগের সশস্ত্র শাখা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সপক্ষত্যাগী সৈন্যরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।”

এ বইটি লেখার জন্য করাচিতে ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে ময়মনসিংহে অবাঙালি হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। তারা তাদের সাক্ষ্যে সেখানে রক্তপাত ও বিভীষিকার অভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন।

 

একশো সাতচচল্লিশতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৫৫ বছরের মুজিবুর রহমান ময়মনসিংহ শহরের শানকিপাড়া কলোনির ১২ নম্বর ব্লকের ৮ নম্বর কোয়ার্টারে বসবাস করতেন। তার কাপড়ের একটি দোকান ছিল। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“১৯৭১ সালে মার্চের শেষ সপ্তাহে আমি আমাদের এলাকার মসজিদে আছরের নামাজ পড়ছিলাম। হঠাৎ করে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের প্রায় ২০০ বাঙালি সৈন্য এবং আওয়ামী লীগের জঙ্গিরা শানকিপাড়া কলোনি আক্রমণ করে। তারা মসজিদে নামাজ আদায়রত অবাঙালি মুসল্লিদের ওপর মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করে। গোলাগুলিতে কমপক্ষে ৮০ জন মুসল্লি নিহত এবং অনেকে আহত হয়। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আক্রমণকারীরা ধারণা করেছিল, আমি মরে গেছি। গভীর রাতে আমি জ্ঞান ফিরে পাই। চুপি চুপি বাড়িতে ফিরে আসি। আমি দেখতে পাই যে, বাঙালি বিদ্রোহীরা আমার বাড়ি লুট করেছে। আমার পুত্র ও পুত্রবধূ নিখোঁজ। কয়েকটি বাড়িতে আগুন জ্বলছে। বাড়িতে যাবার পথে আমি অসংখ্য লাশ পড়ে থাকতে দেখি। কয়েকজন বৃদ্ধা মহিলা লাশের ওপর পড়ে বিলাপ করছিল। রাতের নীরবতা ভেঙ্গে দূর থেকে গুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল। বিদ্রোহীরা কলোনির সকল অবাঙালি পুরুষকে হত্যা করে। তারা দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ ক্রন্দনরত মহিলাদের একটি বিশাল মসজিদে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে এ শহর পুনরুদ্ধার করার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী এসব মহিলাকে উদ্ধার করে। আমাদের এলাকায় কমপক্ষে ৫ হাজার অবাঙালি বসবাস করতো। তাদের মধ্যে ২৫ জনের বেশি রক্ষা পায়নি। জীবিতদের মধ্যে আমিও ছিলাম একজন। আমি চিরদিনের জন্য ময়মনসিংহ ত্যাগ করে করাচিতে এসে পৌঁছি।”

 

একশো আটচল্লিশতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩৮ বছরের নাসিমা খাতুনের স্বামী সৈয়দ তাহির হোসেন আখতার ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে কেরাণী হিসেবে চাকরি করতেন। বাঙালি বিদ্রোহীরা তাকে হত্যা করে। নাসিমা খাতুন তার বিয়োগান্ত স্মৃতি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন:

“শানকিপাড়া কলোনির সি-ব্লকে আমাদের একটি ছোট বাড়ি ছিল।বাসিন্দাদের সবাই ছিল অবাঙালি। ১৯৭১ সালে মার্চের মাঝামাঝি থেকে ভীতি ও দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ঘনীভূত হতে থাকে। মার্চের শেষদিকে রাইফেল ও মেশিনগান সজ্জিত বিদ্রোহীরা আমাদের এলাকায় বেশকিছু বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে পুরুষদের হত্যা এবং মহিলা ও শিশুদের অপহরণ করে। ১৭ এপ্রিল প্রায় ১৫ হাজার রক্তপিপাসু বিদ্রোহী ও দুর্বৃত্ত রাইফেল ও মেশিনগান নিয়ে আমাদের কলোনি আক্রমণ করে। তারা শত শত ঘরে অগ্নিসংযোগ এবং পুরুষ ও ছেলেদের ঘর থেকে টেনে নিয়ে হত্যা করে। আমার স্বামী ও পুত্র আমাদের বাড়ির সামনের দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। আমাদের পালানোর কোনো পথ ছিল না। প্রায় ৫০ জন দুর্বৃত্ত দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে। আমি আল্লাহ ও পবিত্র কোরআনের দোহাই দিয়ে আমার স্বামী ও পুত্রের প্রাণভিক্ষা চাই। একজন দুর্বৃত্ত রাইফেলের বাট দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করলে আমি মাটিতে পড়ে যাই। দুর্বৃত্তরা আমার স্বামী ও পুত্রকে টেনে বাইরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। আমি তাদের লাশের ওপর বিলাপ করতে চাইলাম। কিন্ত দুর্বৃত্তরা বেয়নেট দিয়ে খোঁচা মেরে আমাকে একটি স্কুল ভবনে নিয়ে যায়। সেখানে আমার মতো শত শত শোকাহত বিধবা ও মা আশ্রয় নিয়েছিল। এ নরকে জীবন ছিল যন্ত্রণা। আমি বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ি। রাত-দিন প্রলাপ বকতাম। মহিলারা বিলাপ করতো। ক্ষুৎ পিপাসায় শিশুরা কাঁদতো। কয়েকজন মহিলা ও শিশু মারা যায়। কদাচিৎ কিশোরীদের দেখা যেতো। জৈবিক লালসা চরিতার্থ করার জন্য দুর্বৃত্তরা তাদের অপহরণ করেছিল। বন্দিদশার চতুর্থ দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের উদ্ধার করে৷ আমাকে ঢাকায় একটি ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে আমার পিতা আমাকে চট্টগ্রামে তার বাড়িতে নিয়ে যান। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি চট্টগ্রাম থেকে করাচিতে প্রত্যাবাসন করি ৷”

 

একশো উনপঞ্চাশতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৬০ বছরের বৃদ্ধ শেখ হাবিবুল্লাহ ছিলেন একটি বেবিট্যাক্সির মালিক। তিনি নিজেই বেবিট্যাক্সি চালাতেন। শেখ হাবিবুল্লাহ বসবাস করতেন ময়মনসিংহের শানকিপাড়া এলাকার কিস্টোপুরে দৌলতমুন্সী রোডের ১৪ নম্বর বাড়িতে। ১৯৭১ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তরা তার চারটি জওয়ান ছেলেকে হত্যা করে। শেখ হাবিবুল্লাহ জানান, তিনি ও তার ছেলেরা চমৎকার বাংলা বলতে পারতেন। তিনি ১৯৪৭ সালের আগস্টে উপমহাদেশ বিভক্তির অব্যবহিত পরে ভারতের বিহার রাজ্য থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসন করেন। তাদেরকে ‘বিহারী” বলা হতো। তিনি উর্দু ভুলে গিয়েছিলেন। তাই তিনি সাক্ষ্যদানের দলিলে দস্তখত করেন বাংলায়। বেদনা বিধুর কণ্ঠে শেখ হাবিবুল্লাহ তার জীবনের অবিস্মরণীয় স্মৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন:

“১৯৭১ সালে মার্চের মাঝামাঝি ময়মনসিংহকে উত্তেজনা গ্রাস করে। অবাঙালিদের ভয়ভীতি দেখানো হতো। তাদেরকে উপহাস করা হতো। গুজব শোনা যাচ্ছিল যে, পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে লুন্ঠিত অস্ত্র এবং ভারত থেকে পাচারকৃত অস্ত্র নিয়ে আওয়ামী লীগ অবাঙালিদের ওপর হামলা করবে। ২৩ মার্চ প্রথম আওয়ামী লীগের গুন্ডারা শানকিপাড়া কলোনিতে হামলা করে। মার্চের শেষ সপ্তাহ এবং এপ্রিলের প্রথমার্ধে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র গুন্ডা এবং বিদ্রোহী বাঙালি সৈন্যরা হাজার হাজার অবাঙালিকে হত্যা করে এবং তাদের বাড়িঘর লুট ও অগ্নিসংযোগ করে। এপ্রিলের শুরুতে ৫০ জন সশস্ত্র বিদ্রোহীর একটি দল আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। আমার উপযুক্ত ছেলে সানাউল্লাহ, শফি আহমেদ, আলী আহমেদ ও আলী আখতার আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। একজন বন্দুকধারী আমার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে হত্যা করার জন্য বন্দুক তাক করলে আমি তাকে ঝাপটে ধরি। সে আমাকে মাথায় আঘাত করলে আমি মাটিতে পড়ে যাই। আমার জ্ঞান হারানোর ঠিক আগ মুহূর্তে মেশিনগানের গুলি চালানো হয়। গুলিতে আমার ছেলেরা ধরাশায়ী হয়। তারা রক্তে ভাসছিল। আমি সানাউল্লাহ ও শফি আহমেদের স্ত্রীদের চিৎকার দিয়ে একটি রুমের দিকে দৌড়ে যেতে দেখি। সেখানে তাদের স্বামীদের হত্যা করা হচ্ছিল। আমি জ্ঞান হারাই। দুর্বৃত্তরা ভেবেছিল আমি মারা গেছি। পরদিন ভোরে আমি জ্ঞান ফিরে পাই। আমি আমার চার পুত্রের লাশ দেখতে পাই। আমি প্রায় পাগল হয়ে যাই। তাদের রক্তমাখা মুখে চুমো দেই। তাদের হৃদস্পন্দন অনুভব করার চেষ্টা করি। কিন্ত হায়! তাদের সবাই ছিল তখন মৃত। আমার দুই পুত্রবধূর কোনো খোঁজ নেই। আমার বাড়ি লুন্ঠিত। মূল্যবান কোনো জিনিসপত্র নেই। আমি আমার ছেলেদের লাশ দাফনের জন্য গোরস্তানে নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছিলাম। আমার আশপাশে কোনো জীবিত মানুষ নেই। আমার কানে দূর থেকে গুলির আওয়াজ ভেসে আসছিল। আমাদের ভুতুড়ে কলোনিতে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ছিল একমাত্র জীবনের স্পন্দন। আমার বাড়ির পাশের রাস্তায় লাশের ছড়াছড়ি।

এলাকার একটি মসজিদে কয়েকজন ভাগ্যাহত বিহারী আশ্রয় নিয়েছিল। বাঙালিরা এ মসজিদের নাম দিয়েছিল ‘বিহারী মসজিদ’৷ একটি বিশাল সশস্ত্র গ্রুপ মসজিদের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে ১৭৫ জন অবাঙালিকে হত্যা করে। প্রায় তিন শ’ অবাঙালি শানকিপাড়ায় তাদের বাড়িঘর ছেড়ে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়। তাদের কোনে অস্ত্র ছিল না।এপ্রিলের গোড়ার দিকে বিদ্রোহীরা তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ময়মনসিংহ পুনরুদ্ধার করার পর আমি গোরস্তানে আমার ছেলেদের লাশ দাফন করি। আমি নিকটবর্তী চল্লিশবাড়ি, ছত্রিশবাড়ি, ইসলামাবাদ ও আইকা কলোনিতে যাই। আমার মতো দু’একজন বৃদ্ধ ছাড়া সেখানে আর কেউ জীবিত ছিল না। একসময়ের জনবহুল কলোনিগুলোতে জনমানবের কোনো চিহ্ন ছিল না। গোটা এলাকায় পঁচা লাশের দুর্গন্ধ ৷ অসংখ্য বাড়ি ভস্মীভূত। বাড়িঘরগুলো ছাই ভস্মে পরিণত ৷ আমি জানতে পেরেছিলাম যে, ময়মনসিংহে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকার সময় বিদ্রোহীরা শানকিপাড়া কলোনিতে দেড় হাজারের বেশি অবাঙালি যুবতী মহিলাকে ধর্ষণ ও অপহরণ করেছে। কয়েকজন বিহারী মহিলা নিজেদের ইজ্জত বাঁচাতে কুয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে।

থানার কাছাকাছি বড় মসজিদের বাঙালি ইমাম ছিলেন একজন ফেরেশতা। তিনি শানকিপাড়া হত্যাযজ্ঞে জীবিত পাঁচ শতাধিক বিহারীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ইমাম সাহেব বাঙালি বিদ্রোহীদের কাছে তাদের জীবন ভিক্ষা চান। বাঙালি মোয়াজ্জিনের সহায়তায় তিনি অন্যান্য এলাকায় ধার্মিক বাঙালিদের কাছ থেকে ভাত সংগ্রহ করে মসজিদে আশ্রিত ভীত সন্ত্রস্ত অবাঙালি পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের খাইয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের গুন্ডারা তাকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী যথাসময়ে এসে পৌঁছে যাওয়ায় তার জীবন রক্ষা পায় এবং বিহারীরা মসজিদে আশ্রয় লাভের সুযোগ পায়। মার্চে অবাঙালি হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার আগে বেবিট্যাক্সি ড্রাইভার হিসেবে আমি ভালোভাবে সেনানিবাস চিনতাম। সেখানে অবস্থানরত সৈন্যদের মধ্যে আমার পাঠান ও পাঞ্জাবী বন্ধু ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেনানিবাস পুনর্দখল করার তিনদিন পর সেখানে গিয়ে আমি ২৬-২৭ মার্চ মধ্যরাতে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী বাঙালি সৈন্যদের হামলায় অবাঙালি সৈন্য ও তাদের পরিবারবর্গের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা জানতে পারি। আমার পশ্চিম পাকিস্তানি বন্ধু সৈন্যদের কোনো চিহ্ন ছিল না। আমি ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে করাচিতে ফিরে আসি।”

 

একশো পঞ্চাশতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩১ বছরের আনোয়ার হোসেন ময়মনসিংহে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালের মার্চে একজন বাঙালি বন্ধু তার জীবন রক্ষা করে। শরৎকালে তাকে ও তার পরিবারকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের পতন ঘটলে ঢাকার মোহাম্মদপুরে তারা আতঙ্কিত জীবনযাপন করে। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘের তত্বাবধানে তারা করাচিতে পৌঁছে। আনোয়ার হোসেন ১৯৭১ সালে মার্চের ঘটনাবলীর ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন:

“১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ আওয়ামী লীগ ময়মনসিংহে একটি বিরাট মিছিল বের করে। মিছিলকারীদের অনেকের কাছে ছিল রাইফেল, বর্শা, কুঠার, ছোরা ও লাঠি। আমার স্থানীয় বাঙালি বন্ধু আমাকে জানিয়েছিলেন যে, মিছিলকারীদের মধ্যে ময়মনসিংহের স্থানীয় লোক ছিল কম। মিছিলটি আমাদের এলাকা প্রদক্ষিণ করে এবং বিহারীদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়। মিছিলে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের উগ্রপন্থীরা মাইকে ঘোষণা করে যে, সকল অবাঙালিকে স্বেচ্ছায় অস্ত্র জমা দিতে হবে। নয়তো তল্লাশি চালানো হবে এবং কারো কাছে অস্ত্র পাওয়া গেলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে। আমাদের এলাকার বিহারী অধিবাসীরা তাদের অস্ত্র জমা দেয়। অস্ত্রের মধ্যে ছিল কয়েকটি বন্দুক, ছোরা ও বর্শা। যেসব অবাঙালি মিছিলকারীদের কাছে অস্ত্র জমা দিতে গিয়েছিল তাদেরকে একটু দূরে একটি খোলা জায়গায় হেঁটে যেতে বলা হয়। সেখানে তাদেরকে হত্যা করা হয়। কয়েক ঘন্টা পর মিছিলকারীরা আমাদের এলাকায় ফিরে আসে এবং অসংখ্য অবাঙালির বাড়িঘর লুট ও অগ্নিসংযোগ করে। বন্দুকের মুখে বিলাপরত মহিলাদের একটি স্কুল ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। এসব মহিলার অনেকের সঙ্গে ছিল দুগ্ধপোষ্য শিশু। মার্চের মাঝামাঝিতে আমি আশংকা করছিলাম যে, বিহারীদের ওপর বাঙালিদের হামলা আসন্ন। আমি একজন চরিত্রবান ইসলামপ্রিয় বাঙালি বন্ধুর সহায়তা কামনা করি। আমাদের এলাকায় আওয়ামী লীগের হামলা শুরু হওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে আমি তার বাড়িতে আমার পরিবার স্থানান্তরিত করি। এভাবে আমি হত্যাকাণ্ড থেকে রেহাই পায়। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ময়মনসিংহ পুনদর্খল করার পর আমি আমাদের বাড়িতে ফিরে যাই। আমার বাড়ি ছিল আংশিক ভস্মীভূত ও লুন্ঠিত। আমি একসময়ের হাস্য কোলাহলপূর্ণ জনবহুল বসতিতে খুব কমসংখ্যক অবাঙালিকে জীবিত দেখতে পাই।”

 

একশো একান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩৫ বছরের ফাহিম সিদ্দিকী ময়মনসিংহে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন এবং দু’ভাইকে নিয়ে সীতারামপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। ১৯৭১ সালের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি তার সাক্ষ্য বলেছেন:

“১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি একটি রুশ জাহাজে করাচির উদ্দেশে চট্টগ্রাম ত্যাগ করি। আমি মনস্থির করেছিলাম যে, বিগত সোয়া দু’বছরের দুঃস্বপ্ন ভুলে যাবো। আমি আমার জীবনের সর্বোত্তম সময় ময়মনসিংহে কাটিয়েছি। আমি এ শহরকে অত্যন্ত ভালোবাসতাম এবং বাঙালি ও অবাঙালিদের মধ্যে আমার অত্যন্ত ভালো বন্ধু ছিল। আমি চমত্কার বাংলা বলতে পারতাম ৷ ১৯৭১ সালে মার্চের শেষদিকে বন্দুক ও শাবল নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি উন্মত্ত জনতা আমাদের এলাকায় অবাঙালিদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে। পুরুষদের হত্যা, বাড়িঘর লুট ও অগ্নিসংযোগ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। দুর্বৃত্তরা আমার বাড়ি লুট করে এবং নিকটবর্তী একটি মাঠে আমার উপযুক্ত দুই ভাইকে হত্যা করে। এ মাঠটি ছিল একটি বধ্যভূমি। আমাদের এলাকায় দুর্বৃত্তরা প্রবেশ করার কয়েক মিনিট আগে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। আমি একটি জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনে আশ্রয় নেই। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ থেকে ময়মনসিংহ পুনর্দখল করা নাগাদ আমি সেখানে অবস্থান করি। আমি আমার এলাকায় হত্যাকাণ্ড থেকে খুব কম লোককে জীবিত থাকতে দেখতে পাই।”

 

একশো বায়ান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩৫ বছরের আনোয়ারী বেগম ময়মনসিংহে রেলওয়ে কলোনির টি-৫৬ নম্বর কোয়ার্টারে বসবাস করতেন। তিনি বাঙালি বিদ্রোহীদের হাতে তার স্বামীর হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেন। আনোয়ারী বেগম তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে ময়মনসিংহ শহর ছিল বাঙালি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। এ সময় অর্ধ ডজন বাঙালি আমাদের বাসায় এসে আমার স্বামীকে জানায় যে, আমরা আমাদের যাবতীয় নগদ অর্থ ও অলঙ্কার দিয়ে দিলে তারা আমাদের রক্ষা করবে। আমি তৎক্ষণাৎ আমার সব অলঙ্কার খুলে তাদের হাতে তুলে দেই। দ্রুত নগদ অর্থগুলো বাঙালি আগন্তকদের কাছে হস্তান্তর করি। আমরা আতঙ্কের মধ্যে রাত কাটাই। আমি আমাদের বাড়ি ছেড়ে শহরের অন্য এলাকায় এক বাঙালি বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেয়ার জন্য আমার স্বামীকে পরামর্শ দেই। কিন্তু যারা আমাদের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও অলঙ্কার নিয়েছিল তাদের নিরাপত্তা প্রদানের আশ্বাসে তিনি আমার প্রস্তাবে দ্বিমত পোষণ করেন। পরদিন এক ডজন সশস্ত্র বিদ্রোহী আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে ৷ তাদের মধ্যে তিনজন তার আগের দিন আমাদের বাড়িতে এসেছিল। তাদের কারো কারো মাথায় ছিল লাল ক্যাপ ৷ তাদেরকে হিন্দু বলে মনে হলো। আমার স্বামী তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করলে তারা তার বুকে গুলি করে। গুলিতে তার শরীর রক্তে ভেসে যায়। আমার স্বামীর একজন অবাঙালি বন্ধু ও তার ছেলে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলে গুলিতে তাদের ঝাঝরা করে দেয়া হয়। বিদ্রোহীরা আমার ১৬ বছরের ছেলের খোঁজ করে। আমি তাকে ছাদে এক গাদা মাদুরের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলাম। বিদ্রোহীরা সূর্যাস্তের পর ময়মনসিংহকে নিষ্প্রদীপ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। আমার বাড়িতে কোনো আলো ছিল না। বারান্দায় আমার স্বামীর গোঙানির শব্দ শুনে পা টিপে টিপে তার কাছে যাই। তাকে পানি খেতে দেই। তার রক্ত মুছে দেই। তিনি খুব ক্ষীণ স্বরে কথা বলছিলেন। বাঙালি বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কা করে তিনি আমাকে ভয় না পাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বললেন, “আল্লাহর ওপর ভরসা রেখো। তিনি তোমাদের রক্ষা করবেন।” আমার স্বামী আমাদের ১০ মাস বয়সী ছেলের গালে চুমো দেন। তারপর তিনি আমাদের ৯ বছরের দ্বিতীয় ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। হামলার সময় আমার দ্বিতীয় ছেলে খাটের নিচে লুকিয়েছিল। আমার স্বামীর মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হয়। তার ক্ষত স্থান থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। তবে তিনি ছিলেন সাহসী। তিনি আমাকে তার বন্ধু ও বন্ধুর ছেলের নাড়ি পরীক্ষা করতে বললেন। তাদের শরীর ছিল ঠান্ডা। তারা ছিল মৃত। খুব ভোরে আমার স্বামী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। জোরে চিৎকার করে উঠি। আমার চিতকার শুনে বিদ্রোহীরা আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে আমার দিকে তাদের বন্দুক তাক করে। তারা আমাকে তাদের সঙ্গে যাবার নির্দেশ দিয়ে বললো, তারা আমার স্বামীকে কবর দেবে। আমি একটি কম্বল দিয়ে তার মুখ ঢেকে দিয়ে তাদের অনুসরণ করি। সঙ্গে ছিল আমার দুই ছেলে। বড় ছেলে ছিল ছাদে লুকানো।

আমাদের চলার পথ এবং আশপাশের রাস্তায় ছিল শত শত লাশ। বহু বাড়িঘর ভস্মীভূত। ভ্রাম্যমাণ বিদ্রোহীরা বাড়িঘরে জীবিতদের খুঁজছিল। তারা জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে কয়েকটি লাশে ছ্যাকা দেয়। যেখানে সামান্য কিছু নড়াচড়া করছিল সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছোঁড়া হচ্ছিল।আমাদেরকে শহরের একটি মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। পথে বিদ্রোহীরা আমাদেরকে বললো, কয়েকদিন পর আমরা তাদের বাসায় কাজ করবো। তাই তারা আমাদের হত্যা করছে না। মসজিদের ভেতরের দৃশ্য ছিল ভয়াবহ। শত শত ক্রন্দনরত মহিলা ও শিশু। কোনো পানি ও খাদ্য নেই।আমি আমার শাড়ির একটি অংশ ছিঁড়ে তাতে আমার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে শোয়াই। আমরা মসজিদের এক খাদেমকে আমাদের জন্য একটু পানি এনে দিতে বলি। খাদেম আমার অনুরোধ রক্ষা করেন। দু’দিন আমাদের কোনো খাদ্য ছিল না। তৃতীয় দিন মসজিদের ইমাম আমাদেরকে সামান্য খাবার দেন। তিনি বাঙালি হলেও আমাদের কাছে ছিলেন ফেরেশতা। রাতদিন তিনি দুশ্চিন্তা করতেন ৷ বলতেন, বিদ্রোহীরা আমার বড় ছেলেকে সম্ভবত খুন করেছে। চতুর্থ দিন আমার দোয়া কবুল হয়। সেদিন আমার বড় ছেলে মসজিদে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সে জানায় যে, তার প্রতি একজন বাঙালি প্রতিবেশীর দয়া হয়েছিল। তিনি তাকে মসজিদে পৌছে দিয়েছেন। ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ময়মনসিংহ পুনর্দখল করে আমাদেরকে উদ্ধার করে। নিহত অবাঙালিদের পঁচা গলা লাশ দাফনে অনেক দিন লেগেছিল। আমি আমার স্বামীর লাশের খোঁজে আমাদের বাড়িতে ফিরে যাই। কিন্তু তার লাশের কোনো চিহ্ন ছিল না। মেঝেতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাক্ষ্য বহন করছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরকে ঢাকায় একটি ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তর করে। আমরা সেখানে শান্তিতে বসবাস করেছি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনী পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিলে আবার আমাদের দুর্ভাগ্য শুরু হয়। নির্যাতন ও দুঃখ দুর্দশায় এত অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম যে, আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম। অবসন্ন শরীর ছাড়া আমাদের হারানোর আর কিছু ছিল না। ১৯৭৪ সালের মার্চে আমি ও আমার তিন সন্তান ঢাকা থেকে বিমানযোগে করাচিতে প্রত্যাবাসন করি।”

 

একশো তিপান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

১৯৭১ সালে মার্চের শেষদিকে ময়মনসিংহের শানকিপাড়ায় বিদ্রোহীরা ৫০ বছরের কামরুন্নেছার স্বামী মোহাম্মদ কাসিম ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে হত্যা করে। তিনি অশ্রুভেজা চোখে তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“সময়টি ছিল মার্চের শেষ সপ্তাহ, ১৯৭১ সাল। আমরা গুজব শুনছিলাম ছিলাম যে, আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী সৈন্যরা ময়মনসিংহের সকল উর্দূভাষী লোককে হত্যার পরিকল্পনা করছে। এ গুজব শুনতে পেয়ে আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। কয়েকটি জায়গায় অবাঙালি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। প্রতিদিন বিক্ষোভকারীরা ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিতো এবং দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অবাঙালি এলাকা প্রদক্ষিণ করতো। সন্ধ্যায় কয়েকটি বাঙালি ছেলে আমাদের দরজার কড়া নাড়ে এবং আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে চায়। তিনি দরজা খুলে দিলে কয়েকজন সশস্ত্র লোক ঘরে প্রবেশ করে। অস্ত্রের মুখে তারা তাকে এবং আমার উঠতি বয়সের ছেলেকে তাদের সঙ্গে যেতে বলে। আমি আমার স্বামী ও ছেলের প্রতি দয়া দেখাতে এবং তাদের জীবন ভিক্ষা দিতে তাদের অনুরোধ করি। কিন্ত তারা ছিল হৃদয়হীন পাষাণ। আমি আমার স্বামী ও ছেলেকে আর কখনো দেখিনি। দুর্বৃত্তরা তাদের হত্যা করে। আমার কাঁধে একটি বেয়নেট দিয়ে খোঁচা দিয়ে তারা আমাকে দ্বিগুণ গতিতে হাঁটতে বাধ্য করে। আমাকে নিকটবর্তী একটি স্কুল ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরো শত শত মহিলা ও শিশুকে আটক রাখা হয়েছিল। আমরা রাস্তায় ও রাস্তার পাশে তাদের হতভাগ্য স্বামী ও পিতার রক্তমাখা লাশ দেখেছিলাম ৷ আমি একজন বিদ্রোহীকে একটি লাশে জ্বলন্ত সিগারেট ঠেসে ধরতে দেখি। জীবিত মনে করে সে সিগারেট চেপে ধরেছিল। কিন্ত লোকটি ছিল পুরোপুরি মৃত। পরদিন স্কুল ঘরে আশ্রিত মহিলা ও শিশুদের একটি বিশাল মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। এ মসজিদে আরো শত শত বিধবা ও এতিম শিশু ছিল। এসব বিধবা ও এতিম শিশু তাদের প্রিয়জনদের জন্য বিলাপ করছিল। মসজিদের বাঙালি ইমাম ছিলেন দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তিনি আমাদের জন্য খাদ্য ও পানি সংগ্রহ করেন। ইমাম সাহেব আমাদেরকে হত্যা করা থেকে বিদ্রোহীদের বিরত রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী যথাসময়ে পৌঁছে যাওয়ায় আমরা মৃত্যুর ছোবল থেকে রক্ষা পাই। সেনাবাহিনী আমাদের উদ্ধার করে ঢাকায় একটি ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তর করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সৈন্য ও মুক্তিবাহিনী ঢাকা দখল করে নেয়ার পর আমাকে আরো শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে আমি ঢাকা থেকে করাচিতে প্রত্যাবাসন করি।”

 

একশো চুয়ান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

১৯৭১ সালের মার্চে-এপ্রিলে ৬০ বছরের গাফুরুন্নিসা ময়মনসিংহে দুর্ভোগে পতিত হন। বিদ্রোহীরা তার স্বামী ও পুত্রকে হত্যা করে। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“১৯৭১ সালে মার্চের শেষ সপ্তাহে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈন্যরা আমাদের এলাকায় হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে। প্রাথমিকভাবে আমাদের এলাকার পাঞ্জাবী বাসিন্দারা তাদের হামলার শিকার হয়। আমাদের এলাকার প্রায় ৭০টি পাঞ্জাবী পরিবারের সকল যুবক ও মাঝবয়সী পুরুষকে অস্ত্রের মুখে একটি দূরবর্তী জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা জানতে পেরেছিলাম যে, জায়গাটি ছিল অবাঙালিদের হত্যার জন্য বিদ্রোহীদের তৈরি একটি কসাইখানা। এপ্রিলের দ্বিতীয় পক্ষকালে এসব সন্ত্রাসী আমাদের এলাকার অন্যান্য অবাঙালির ওপর হামলা চালায়। অবাঙালিদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ এবং বাসিন্দাদের হত্যা করা হয়। তারা আমার বাড়িতে ঢুকে আমার স্বামী ও বিবাহিত ছেলেকে টেনে হিচড়ে অর্ধ ক্রোশ দূরে একটি খোলা মাঠে নিয়ে যায়।

আমি এসব বন্দির মধ্যে আমার ভাই ও তার কিশোর পুত্রকে দেখতে পাই। আটককৃত অবাঙালিদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে বাংলাদেশের পতাকাকে স্যালুট করার নির্দেশ দেয়া হয়। বন্দুক তাক করে রাখা সত্ত্বেও তাদের অনেকে বাংলাদেশের পতাকার প্রতি সম্মান জানাতে অস্বীকৃতি জানায়। এসময় বিদ্রোহীদের বন্দুক থেকে এক ঝাঁক বুলেট ছুটে যায় এবং শত শত নির্দোষ মানুষ ঢলে পড়ে। যাদের শেষনিঃশ্বাস ত্যাগে দেরি হচ্ছিল তাদের হৃদপিন্ডে ফের গুলি করা হয়। কোনো পুরুষ জীবিত নেই একথা নিশ্চিত হয়ে বিদ্রোহীরা আবার অবাঙালিদের বাড়িঘরে চড়াও হয়। তখন বিধবা মহিলারা তাদের স্বামীদের জন্য বিলাপ করছিল। আমি একজন নেতাকে তার সহযোগীদের বলতে শুনেছি যে, চাকরাণী হিসেবে খাটানোর জন্য অবাঙীলি মহিলাদের রেহাই দেয়া হচ্ছে। আমার সঙ্গে ছিল আমার বিধবা পুত্রবধূ ও তার এক বছরের পুত্র। আমাদেরকে একটি স্কুল ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন আমাদের ঠাঁই হয় একটি বিশাল মসজিদে। যন্ত্রণা ও দুর্ভোগের মধ্যে আমরা ৬ দিন এ মসজিদে অবস্থান করি। অধিকাংশ সময় আমরা আমাদের স্বামী ও ছেলেদের আখেরাতে মুক্তির জন্য দোয়া করতাম। ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ময়মনসিংহ পুনর্দখল করে আমাদেরকে উদ্ধার করে। আমাদেরকে ঢাকায় একটি ত্রাণ শিবিরে স্থানাস্তর করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নেয়ার পর আমরা ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি বিহারী ক্যাম্পে ভীতির মধ্যে বসবাস করতাম। ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ আমাকে, আমার পুত্রবধূ ও তার শিশু ছেলেকে করাচিতে প্রত্যাবামন করলে আমাদের দুর্দশার অবসান ঘটে।”

 

একশো পঞ্চান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩০ বছরের জেবুন্নিসার স্বামী মোহাম্মদ ইব্রাহিম ছিলেন ময়মনসিংহ রেলের একজন কর্মচারী। জেবুন্নিসা তার অকাল বৈধব্য বরণের ট্রাজেডি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন:

“আমরা দীর্ঘদিন আমাদের বাঙালি প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতাম। আমার স্বামী ছিলেন শান্ত প্রকৃতির ও কঠোর পরিশ্রমী। রাজনীতিতে তার কোনো আগ্রহ ছিল না। ১৯৭১ সালে মার্চের শেষ সপ্তাহে বেশ কয়েকজন অপরিচিত সশস্ত্র যুবক আমাদের দরজা ভেঙ্গে আমার স্বামীকে কাবু করে ফেলে। আমার স্বামী ও তিন শিশু সন্তানকে রেহাই দেয়ার জন্য আমি তাদের কাছে কাকুতি মিনতি করি। তারা আমাকে থাপ্পর দিয়ে এবং আমার ক্রন্দনরত শিশুদের লাথি মেরে আমার স্বামীকে ধরে বাড়ির বাইরে নিয়ে যায়। আরেক দল ক্রুদ্ধ জনতা তাকে গণপিটুনি দিয়ে টেনে হিঁচড়ে বধ্যভূমিতে নিয়ে যায়। বিদ্রোহী জনতা আমার বাড়ি লুট করে এবং অস্ত্রের মুখে আমাকে ও আমার শিশু সন্তানদের একটি ছোট ভবনে নিয়ে যায়। আমি জানতে পেরেছিলাম যে, ভবনটি ছিল একটি পুরনো কারাগার। আমরা এ নরকে তিন সপ্তাহের বেশি অবস্থান করি। দুর্ভোগ এত তীব্র ও অসহ্য হয়ে দাঁড়ায় যে, আমি আল্লাহর কাছে মৃত্যু কামনা করতাম। ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরকে এ নরক থেকে উদ্ধার করে। তিনদিন আমি আমার স্বামীর খোঁজে গোটা ময়মনসিংহ ঘুরেছি। কিন্তু তার কোনো সন্ধান পাইনি। আমাদের সৈন্যরা আমাকে সান্তনা দেয়৷ ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি আমাকে ও আমার এতিম শিশুদের ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ আমাদেরকে নিরাপদে করাচিতে প্রত্যাবাসন করলে আমাদের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়।”

 

একশো ছাপান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

২৪ বছরের শাহজাদী বেগমের স্বামী আখতার হোসেন ময়মনসিংহে একজন পোস্টম্যান হিসেবে চাকরি করতেন । ১৯৭১ সালে এপ্রিলের প্রথমার্ধে ময়মনসিংহ শাহজাদী বেগমের স্বামী আখতার হোসেন, শ্বশুর ও দেবরকে হত্যা করা হয়। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছেন:

“ময়মনসিংহ শহরের উপকণ্ঠে আমাদের একটি ছোট্ট বাড়ি ছিল। ১৯৭১ সালে মার্চের মাঝামাঝি থেকে আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছিলাম । আমরা আতঙ্কজনক খবর পাচ্ছিলাম যে, আওয়ামী লীগের জঙ্গিরা সকল পাঞ্জাবীকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। ২৩ মার্চ আমার স্বামী আতঙ্কিত হয়ে বাড়িতে ফিরে এসে জানান যে, আওয়ামী লীগের জঙ্গি, বিদ্রোহী সৈন্য ও পুলিশ তার প্রচুর পাঞ্জাবী বন্ধুকে হত্যা করেছে। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে একটি সশস্ত্র বাঙালি জনতা আমাদের বাড়িতে ঢুকে আমার স্বামী, শ্বশুর ও আমার কিশোর দেবরকে টেনে বের করে নিয়ে যায়। বন্দুকের মুখে তারা মহিলাদেরকে ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়। আমার স্বামী, শ্বশুর ও দেবরসহ অবাঙালি পুরুষদের একটি খোলা মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

বিদ্রোহীরা আমাকে ও আমার দুই শিশু মেয়েকে তাদের সঙ্গে যেতে বাধ্য করে। আমরা একটি সবুজ মাঠ অতিক্রম করার সময় একটি ভয়াবহ দৃশ্য দেখি। মাঠে শত শত লাশ। ফায়ারিং স্কোয়াডে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। মনে হলো কাউকে কাউকে চাকু অথবা ছোরা মেরে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের আটককারী একজন বাঙালি বিদ্রোহী একটি শরীর নড়াচড়া করে উঠতে দেখে তৎক্ষণাৎ গুলি করে। আমি আতঙ্কে চোখ বন্ধ করি।আমার দুই মেয়ে ভয়ে কাঁপতে শুরু করে। আমাদের আটককারীদের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি এবং চকচকে বেয়নেটের মুখে প্রথর রোদে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের উপায় ছিল না। একটি রাস্তা ধরে এগিয়ে যাবার সময় আমরা পুরো রাস্তায় অসংখ্য রক্তাক্ত লাশ দেখতে পাই। কাউকে কাউকে ট্রাকে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি যে, বহু অবাঙালির মৃতদেহ নিকটবর্তী বহ্মপুত্রে ফেলে দেয়া হয়। পথে আমরা শত শত ভস্মীভূত ঘরবাড়ি ও বস্তিঘর দেখতে পাই।

আমরা একটি স্কুল ভবনে এক ঘন্টা অবস্থান করি। স্কুল ভবনের একটি অংশকে দৃশ্যত অবাঙালি হত্যাকাণ্ডের জন্য কসাইখানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখানে ছিল মৃতদেহের স্তুপ। আমাদেরকে আরেকটি স্কুল ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। এ স্কুলে শত শত শোকাহত মহিলা ও শিশুকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল। আমি একজন মহিলার হাতে একটি পবিত্র কোরআন দেখি। কোরআনের দোহাই দিয়ে মহিলা তার শিশু বাচ্চাদের খোঁজে তাকে বাড়িতে যাবার অনুমতি দিতে আটককারীদের কাছে অনুরোধ করছিলেন। একজন তরুণ আটককারী তার হাত থেকে কোরআন কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তার মুখে আঘাত করে।

 

আমরা এ কারাগারে এক সপ্তাহ নির্যাতিত হই। বহু শিশু পিপাসা ও ক্ষুধায় মারা যায়। ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরকে উদ্ধার করে। অধিকাংশ মহিলা ও শিশুকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। আমি ময়মনসিংহে ফিরে যাই। ৮ মাস আমরা শান্তিতে বসবাস করছিলাম। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী ময়মনসিংহ দখল করে নিলে আবার আমাদের আতঙ্কিত জীবন শুরু হয়। ১৯৭২ সালের গোড়ার দিকে ময়মনসিংহে বিহারীদের জন্য নির্মিত ব্রেডক্রসের একটি শিবিরে স্থানান্তরিত হলে আমাদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি ও আমার দুই সন্তান করাচিতে প্রত্যাবাসন করি। আমি বিশ্বাস করি যে, ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে ময়মনসিংহে যারা অবাঙালিদের হত্যা করেছিল তাদের অধিকাংশ ছিল ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী বাঙালি হিন্দু।”

 

একশো সাতান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৪৫ বছরের আমিনা খাতুনের স্বামী জয়নুল আবেদীন ছিলেন একজন মিস্ত্রি! ১৯৭১ সালে এপ্রিলের মাঝামাঝি ময়মনসিংহের শানকিপাড়ায় বিদ্রোহীরা জয়নুল আবেদীনকে হত্যা করে। আমিনা খাতুন তার স্বামীর হত্যাকান্ড সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন:

“১৫ এপ্রিল একটি সশস্ত্র গ্রুপ আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। তারা আমার বাড়ি লুট করে এবং আমাকে ও আমার স্বামীকে নিকটবর্তী একটি মাঠে নিয়ে যায়। মহিলাদের কাছ থেকে একটু দূরে পুরুষদের লাইনে দাঁড় করানো হয়। বন্দিদের সবাই ছিল অবাঙালি! হঠাৎ করে কঠোর দর্শন এক যুবক গুলি করার নির্দেশ দেয়। তার নির্দেশ দানের সঙ্গে সঙ্গে শতাধিক অবাঙালির বুক বিদীর্ণ হয়ে যায়। আমার হৃদয়ে এখনো সে স্মৃতি গেঁথে রয়েছে। আমি আমার স্বামীকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখি। তার বুক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। মৃত্যু যন্ত্রণায় তিনি কাতরাচ্ছিলেন। আমি তার পাশে ছুটে যাবার চেষ্টা করি। এসময় একজন বন্দুকধারী বন্দুক দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করে। আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফিরে এলে শুরু হয় আমার ওপর অকথ্য নির্যাতন। আমাকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচা মারা হতো। লাখি দেয়া হতো। সেই সঙ্গে চলতো অশ্লীল গালিগালাজ। আমাকে একটি মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ছিল আরো শত শত বিধবা মহিলা ও শিশু ৷ মসজিদের বন্দি জীবন ছিল নরকতুল্য। আমরা ৬ দিন বন্দি ছিলাম ৷ ৬ দিনের মধ্যে আমরা চারদিন কেবল পানি খেয়ে বেঁচে থাকি। আমাদের কোনো খাবার ছিল না। ক্ষুধায় বহু শিশুর মৃত্যু হয়। আমাদের প্রতি মসজিদের কয়েকজন খাদেমের দয়া হয়৷ তারা আমাদের জন্য ভাত সংগ্রহ করে। ক্ষুধার্থ শিশুরা এসব ভাত খায়। আমাদেরকে জানানো হয় যে, বিদ্রোহীরা আমাদেরকে হত্যা করবে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। ২১ এপ্রিল দুপুরের প্রাক্কালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের উদ্ধার করে। তার আগে মসজিদ থেকে বিদ্রোহীরা পালিয়ে যায়। সকল দুঃস্থ মহিলা ও শিশুকে ঢাকায় একটি ত্রাণ শিবিরে স্থানান্তর করা হয়৷ ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে আমি করাচিতে প্রত্যাবাসন করি।”

 

একশো আটান্নতম সাক্ষীর বিবরণ: 

৩২ বছরের সায়রার স্বামী আবদুল হামিদ খান ময়মনসিংহে পুলিশ বাহিনীতে ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিদ্রোহীরা তাকে হত্যা করে। সায়রা তার স্বামীকে হত্যা করার দৃশ্য দেখেছেন। তিনি এ ঘটনার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন:

“আমার স্বামী অবাঙালি ও পাঠান হওয়ায় ১৯৭১ সালে মার্চের মাঝামাঝি থেকে বাঙালি বিদ্রোহী সৈন্য ও পুলিশ তাকে হত্যা করার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিল। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তাদের একটি গ্রুপ আমাদের বাড়িতে ঢুকে আমার স্বামীকে ঘায়েল করে ফেলে এবং তাকে টেনে হিচড়ে নিকটবর্তী একটি ধানক্ষেতে নিয়ে যায়। আমার সন্তানরা কান্নাকাটি করছিল। আমি আমার তিন সন্তানের কান্নাকাটি উপেক্ষা করে বিদ্রোহীদের পিছু নিয়ে ধানক্ষেতে গিয়ে হাজির হই। আল্লাহর নামে আমি আমার স্বামীর জীবন ভিক্ষা দেয়ার জন্য তাদেরকে অনুরোধ করি। কিন্ত তারা আমার স্বামীকে হত্যা করতে ছিল বদ্ধপরিকর ৷ তাদের একজন একটি লম্বা ছোরা দিয়ে আমার স্বামীর গলা কেটে ফেলে। আমি শিহরিত ও বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। আমি আমার স্বামীর দিকে ছুটে গেলে ঘাতকরা আমাকে ঝাপটে ধরে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে। আমার স্বামীর মৃত্যু ত্বরান্বিত করার জন্য ঘাতকরা তার পেট ও বুকে ছুরিকাঘাত করে। এ সময় আমি তার গোঙানি শুনতে পাই। ঠিক তখন চারজন বন্দুকধারী ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় এবং আমাকে টানা হ্যাচড়া করে আমার বাড়িতে নিয়ে যায়। আমার বাড়ি ছিল লুন্ঠিত। আমার ভীতসন্ত্রস্ত শিশুরা ছিল ঘরের দরজায় দাঁড়ানো। বন্দুক উঁচিয়ে সন্ত্রাসীরা আমাকে একটি বিশাল মসজিদে নিয়ে যায়। সেখানে যাবার পথে রাস্তায় আমি শত শত লাশ দেখি। বহু ঘরবাড়ি ছিল ভস্মীভূত। মসজিদের অভ্যন্তরে জীবন ছিল মৃত্যু সমতুল্য। শোকে স্তম্ভিত সহস্রাধিক মহিলা ও শিশু ছিল সেখানে আশ্রিত। অধিকাংশকে তুলে নিয়ে যাওয়ায় আমি কদাচিৎ তাদের দু’একজনকে দেখতে পাই। মসজিদের খাদেম নিকটবর্তী পুকুর থেকে আমাদের জন্য কিছু পানি নিয়ে আসেন। এ পানি আমাদের জীবন রক্ষায় সহায়ক হয়। ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরকে এ প্রেতপুরী থেকে উদ্ধার করে। সেনাবাহিনী আমাকে ও আমার এতিম শিশুদের ঢাকায় স্থানান্তর করে। ঢাকায় আমরা একটি ত্রাণ শিবিরে বসবাস করতাম। ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে আমরা বিমানে করাচি এসে পৌছি।”

 

একশো উনষাটতম সাক্ষীর বিবরণ: 

২৭ বছরের নাসিমা ছিলেন বাঙালি। তবে তার স্বামী আবদুল জলিল ছিলেন বিহারী। ময়মনসিংহে আবদুল জলিলের একটি খুচরা দোকান ছিল। ১৯৭১ সালের মার্চে বিদ্রোহীরা আবদুল জলিলকে হত্যা করে। নাসিমা তার স্বামী হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন:

“বিহারীর সঙ্গে বিয়ে হওয়ায় বাঙালিদের কেউ কেউ আমাকে এবং আমার পরিবারকে ঘৃণা করতো। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ একদল দাঙ্গাবাজ দুষ্কৃতিকারী ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে। তারা আমাদের দোকান লুট করে সেখানে আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করে। তার হত্যাকাণ্ডের দুঃসংবাদ পৌঁছলে আমি তার লাশ উদ্ধারে আমাদের দোকানে ছুটে যাই। তার লাশের কোনো চিহ্ন নেই। তবে তাজা রক্তের দাগ ছিল দৃশ্যমান। আমাকে জানানো হয় যে, হত্যাকারীরা তার লাশ ট্রাকে তুলে অদূরে নদীর দিকে গেছে। ১৯৭১ সালে এপ্রিলের গোড়ার দিকে বিদ্রোহী সৈন্যরা আমাকে তাড়িয়ে দিলে আমি আমার বাঙালি পিতামাতার সঙ্গে বসবাস করতে যাই। আমার পিতামাতা ছিলেন খুবই ধার্মিক। তারা কঠোর ভাষায় অবাঙালি হত্যাকান্ডের নিন্দা করেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিলে বিহারী ও পাকিস্তানের প্রতি অনুগত বাঙালি হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। ১৮ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে আমার পিতা ও দু’ভাইকে হত্যা করে। আমাদের বাড়িতে হামলার সময় আমি এবং আমার ৫ বছরের তৃতীয় ভাই এক প্রতিবেশীর বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। এ প্রতিবেশী আমাদেরকে পাশের একটি গ্রামে পালিয়ে যেতে সহয়তা করেন। সেই গ্রামে আমরা বসবাস করি এবং দু’বছরের বেশি ধানক্ষেতে কাজ করি। জাতিসংঘ অবাঙালিদের প্রত্যাবাসন শুরু করলে আমি পাকিস্তানে আসার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাতে থাকি। বাংলাদেশে আমার কোনো স্থান ছিল না। সেখানে আমার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল এক একটি যন্ত্রণা। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি বিমান যোগে করাচিতে এসে পৌছাই।”

প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ময়মনসিংহে অবাঙালি হত্যাকারী আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী সৈন্যরা ১৯৭১ সালে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রার মুখে ভারতে পালিয়ে যায়। ময়মনসিংহে প্রবেশ করার পর পাকিস্তানি সৈন্যরা নিহত অবাঙালিদের গণকবরের ব্যবস্থা করে। ১৯৭১ সালের ৮ মে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ময়মনসিংহ থেকে ম্যালকম ব্রাউন প্রেরিত এক সংবাদে বলা হয়ঃ

“একটু পরে পরে রাস্তা বরাবর ভস্মীভূত সারি সারি ঘরবাড়ি। লাশগুলো অগভীর গর্তে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে এবং কবরের ওপর লাল ইটের স্তুপ। এমনকি বাড়িঘরের বারান্দায় ইটের নিচে লাশ দেখা গেছে। বাড়িগুলো পরিত্যক্ত ও বন্ধ। “মাটি চাপা দেয়া লাশগুলো ছিল বিদ্রোহীদের হাতে নিহত অবাঙালিদের। কিন্ত ভারত ও আওয়ামী লীগ অপপ্রচার করতো যে, এসব গণকবর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নিহত বাঙালিদের॥”

— ব্লাড এন্ড টীয়ার্স / কুতুবউদ্দিন আজিজ (মূল: Blood and Tears । অনু: সুশান্ত সাহা) ॥ [ ইউপিপি – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ১৮১-১৯৪ ]

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *